Author: তাহের আলমাহদী

  • ছয়

    ছয়

    দিঘিরপাড় কাছারির নায়েব সীতানাথ ভৌমিককে দেখে ভদ্র বলেই মনে হয়েছিল ফজলের। কিন্তু তার কথা-বার্তার ধরন দেখে সে বুঝতে পারে, লোকটা ভদ্র শুধু কাপড়-চোপড়ে। সে তার পিতার সাথে তুমি-তুমি করে কথা বলছে, যদিও বয়সে সে তার চেয়ে কম করে হলেও পনেরো বছরের ছোট।

    ফজলের রাগ ধরে যায়। রাগটাকে কোনো রকমে বাগ মানিয়ে সে ধীরভাবে বলে নায়েব মশাই, আপনাদের বয়স ষাট পার হইয়া গেছে না?

    নায়েবের ভ্রু কুঞ্চিত হয়। প্রশ্নকারীকে দেখে নিয়ে সে এরফান মাতব্বরকে বলে, ‘ছেলেটা তোমার না মাতবর?’

    ‘হ বাবু।’

    ‘বলিহারি ছোঁড়ার আন্দাজ।’ ফজলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে তারপর বলে, ‘আমার বয়স দিয়ে তোর দরকার কিরে অ্যাঁ।’

    ‘না, এমনিই জিজ্ঞাস করলাম। বাজানের বয়স পঞ্চান্ন। তার সাথে যখন ‘তুমি তুমি’ কইর‍্যা কথা কইতে আছেন, তখন আন্দাজ করলাম আপনের বয়স ষাট পার হইয়া গেছে।’

    এরফান মাতব্বর ধমকে ওঠে, ‘অ্যাই ফজু, শতয়তা–ন, চো-প।’

    ধমক তো নয়, যেন একটা বাঘ গর্জে উঠেছে। নায়েবের কলজে পর্যন্ত কেঁপে ওঠে সে ধমক শুনে। মাতব্বরের গম্ভীর মুখ আর ক্রোধরক্তিম চোখের দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করে সে।

    মুখ-চোখের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনে মাতব্বর অনুনয়ের সুরে বলে, ‘নায়েব বাবু, রাগ কইরেন না। পোলাডার বুদ্ধি-বিবেচনা এহনো পাকে নাই। কার লগে ক্যামনে কথা কইতে অয়, এহনো হিগে নাই। আপনে ওরে মাপ কইরা দ্যান। অ্যাই ফজু? বাবুর কাছে মাপ চা।’ মাতব্বর পেছন দিকে মুখ ঘোরায়।

    ফজল নেই।

    মাতব্বর উঠে দরজা পর্যন্ত গিয়ে দেখে ফজল অনেক দূর চলে গেছে, হেঁটে যাচ্ছে হনহন করে।

    ফিরে এসে সে বলে, ‘বাড়িতে গিয়া লই। ওরে আচ্ছা মতন মালামত করমু। আপনে রাগ অইয়েন না।’

    ‘ছেলেটাকে লেখাপড়া শেখান হয়েছে বোধহয়?’ নায়েব বলে। আগের মতো তুমি উচ্চারণ করতে আর উৎসাহ পায় না তার মুখ।

    ‘হ, এই কেলাস নাইন পর্যন্ত পড়ছে। সংসারের কাজ-কামের লেইগ্যা আর পড়াইতে পারলাম না।’

    ‘যতটুকু পড়েছে তার জন্য অনেক ভোগান্তি আছে। শেখের ছেলে একটু লেখাপড়া শিখলেই জাত-গোত্রের কথা ভুলে যায়। মনে করে নওয়াব সিরাজদ্দৌলা হয়ে গেছে। ছেলেটা কাজ-কর্ম কিছু করে, না খালি আলফেট কেটে ঘুরে বেড়ায়?’

    ‘না কাম-কাজ করে। আমি তো বুড়া অইয়া গেছি সংসারের বেবাক কাম এহন ও-ই করে।’

    ‘করলেই ভালো। দেখি, পুরান চেক-দাখিলা কি আছে।’

    এরফান মাতব্বরের হাত থেকে খাজনার পুরানো চেক নিয়ে সে কাছারির খাতাপত্র দেখে। দু’বছরের খাজনা বাকি।

    নায়েব বলে, ‘জমি তো ভগবানের ইচ্ছায়, গঙ্গার কৃপায় পয়স্তি হয়েছে। সেলামি দিতে হবে এবার।’

    ‘তা দিমু।’

    ‘দিমু তো বুঝলাম, কিন্তু কবে?’

    ‘আইজই দিমু। আপনে খাজনার চেক কাডেন। একসাথে দিতে আছি।’

    ‘উঁহু আগে সেলামির টাকা, তারপর খাজনা।’

    এরফান মাতব্বর এক হাজার টাকা নায়েবের হাতে তুলে দেয়।

    ‘কত?’

    ‘পুরা হাজার টাকাই দিলাম।’

    ‘উঁহু। আরো এক হাজার লাগবে।’

    এরফান মাতব্বর হাতজোড় করে বলে, ‘আর দাবি কইরেন না, বাবু। চরডা লায়েক অউক। তখন আপনেরে খুশি করমু।’

    ‘কিন্তু খুশি করার সময়ই তো এখন। কই, আর কি আছে দেখি?’

    ‘আর দুই সনের খাজনার টাকা আনছি।’

    কই দেখি।

    নায়েব হাত পেতে আরো চারশ’ টাকা নিয়ে মাতব্বরের কাছ থেকে। বাংলা ১৩৪৭ সালের চেক কেটে মাতব্বরের হাতে দেয়।

    ‘এক সনের চেক দিলেন নি বাবু?’

    ‘হ্যাঁ, গত সনের চেক দিলাম। এই সনের খাজনা পরে দিলেই চলবে।’

    মাতব্বর কাছারি থেকে বেরোয়। তার মনে আফসোস–এক থোকে অনেকগুলো টাকা নেমে গেল। জমিদারের সেলামি দিতেই গেল বারো শ টাকা। মাতব্বর জানে–জমিদারের না, নায়েবের কাম। সেলামির টাকা সবটাই উঠবে নায়েবের সিন্দুকে। সে মনে মনে বলে, যত কাড়ি সুতা, সব নেয় বামনের পৈতা।

    মাতব্বর নৌকাঘাটে আসে। নৌকায় কেউ নেই। ‘হাঁক দেয়, কই গেলিরে তোরা?’

    মেরামতের জন্য ডাঙার ওপর কাত করে রাখা ঢুশা নৌকার আবডালে ছায়ায় বসে ষোলঘুটি খেলছিল ‘বাইছা’ দু’জন। ডাক শুনে তারা গামছা ঝাড়তে ঝাড়তে ছুটে আসে। দু’জনই কোলশরিক। নৌকা বাইতে তাদের নিয়ে এসেছে মাতব্বর।

    ‘ফজল কইরে? সে নায় আহে নাই?’

    ‘আইছিল। সে আমাগ লগে যাইব না। পরে যাইব।’

    ‘পরে যাইব! ক্যান?’

    ‘হে কইছে, আইজ দিঘিরপাড় খেলা আছে। তারিখের খেলা। হেই খেলা দেইখ্যা যাইব।’

    ‘কিয়ের খেলা?’

    ‘কপাটি খেলা।’

    ‘তারিখ দিছে কারা?’

    ‘তারিখ দিছে। মাঝেরচরের আক্কেল হালদার আসুলিগ লগে। গেল হাটবার চর আর আসুলিগ মইদ্যে জিদাজিদি অইছে।’

    ‘তারিখ তো দিছে। পারব আসুলিগ লগে?’

    ‘পারব না ক্যান্। আক্কেল হালদার দক্ষিণপাড় গেছে। পালং আর ভোজেশ্বর তন বড় বড় খেলোয়াড় লইয়া আইব।’

    ‘তোরা আল্লার নাম লইয়া নাও ছাড়। ফজু থাউক পইড়া। খেলা দ্যাখলেই প্যাড ভরব। জোরে বৈডা চালা। বাড়িতে গিয়া যে আছরের নামাজ পড়তে পারি।’

    উজান পানি। স্রোত ভেঙে ছলচ্ছল আওয়াজ তুলে নৌকা চলছে দুলতে দুলতে।

    নৌকায় ছই নেই। মাতব্বর ছাতা মাথায় দিয়ে বসে। তার মনে নানা ভাবনা-চিন্তার জটলা লেগেই থাকে সব সময়। আজ আবার সেখানে যোগ দিয়েছে আর এক ভাবনা।

    ভাবনা হয়েছে ফজলের আজকের ব্যবহারে। নায়েব না হয় বেতমিজের মতো তুমি তুমি করে কথা বলছিল। সে জন্য ওভাবে ঠেস দিয়ে কথা বলার কী দরকার ছিল ওর? সে হলো নায়েব। জমির মালিক যে জমিদার, তার নায়েব। এদের সঙ্গে কথা বলতে হয় তোয়াজ-তাজিমের সাথে। কটু কথা বললেও গায়ে মাখতে হয় না তা। এদের সাথে আড়ি দিয়ে, মেজাজ দেখিয়ে কি চরে বসত করা যায়? একটু নারাজ হলেই এরা এদের মেহেরবানির ঝাঁপি তুলে দেবে অন্যের হাতে। দিনকে বানিয়ে ফেলবে রাত। তার বয়স উমরেই সে কত দেখেছে–আসল হকদারকে ভোজবাজি দেখিয়ে কেমন করে এরা নতুন চরের আলমদারি দেয় অন্য লোককে। তারপর আর কি! চরের দখল নিয়ে বেঁধে যায় মারামারি খুনাখুনি। মামলা-মোকদ্দমার অতল গহ্বরে নেমে যায় বেশুমার টাকা। এভাবে সে নিজেও বড় কম ভোগেনি।

    মাতব্বর বুঝতে পারে, এরকম মেজাজ নিয়ে ফজল কোনো দিনই চরে বসত করতে পারবে না। তাই তাকে নসিহত করার কথা চিন্তা করে সে। কিন্তু ছেলেকে নসিহত করার মতো মনের জোর নেই তার।

    অভাবের সময়ে সে পুতের বউর গয়না বন্ধক দিয়েছে। সে ছুতোয় ছেলের শ্বশুর আরশেদ মোল্লা তার মেয়ে আটকে রেখেছে। বউ আনবার জন্য দুবার লোক পাঠিয়েছিল মাতব্বর। মোল্লা বলে পাঠিয়েছে, মাইয়ার শরীলের গয়না পুরা না লইয়া যেন আর মাইয়া নেওনের কথা মোখ দিয়া কয় না।

    তারপর সাত মাস পার হয়ে গেছে, ছেলে আর বউর দেখাসাক্ষাৎ একদম বন্ধ। যদিও এর জন্য বেয়াইকেই দায়ী করে, তবুও নিজের দোষটাও মাতব্বর অস্বীকার করে না। তার মনেও ঢুকেছে কেমন একটা সঙ্কোচ যার ফলে সে ছেলেকে আগের মতো কড়া কথায় ভর্ৎসনা করতে পারে না আজকাল।

    মনের পর্দায় আরশেদ মোল্লার ছায়া পড়তেই তার রাগ ফণা বিস্তার করে। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে সে মনে মনে বলে, ‘সোনাদানা আমি দিছিলাম। আমিই বন্দক দিছি। আল্লায় দিন দিলে আবার আমিই ছাড়াইয়া আনমু। তুই ত আধা পয়সার গয়নাও দেস নাই। তুই ক্যান্ মাইয়া আটকাবি? মাইয়া আকটাইয়া করবি কি তুই?’

    তার মনের অনুচ্চারিত প্রশ্ন থামে। যেন উত্তর চায় প্রতিপক্ষের। তারপর আবার তার ক্ষুব্ধ মন চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মাইয়া আটকাইয়া ঘরে খাম্বা দিবি? দে খাম্বা। দেহি কদ্দিন ঘরে রাখতে পারস মাইয়াডা। আমি আবার আমার পোলারে বিয়া করাই।’

    বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়ে। মাতব্বরের মনের ঝগড়াও থামে তখনকার মতো।

    রাত্রে খেতে বসে সে স্ত্রী-কে বলে, ‘হোন ফজুর মা, আরশেদ মোল্লারে এমুন একটা ঠাসা দিমু–’

    ‘ক্যান?’

    ‘ক্যান্ আবার! মাইয়া আটকানের মজা দেহাইয়া দিমু। ওর মাইয়া আননেরও দরকার নাই, ছাড়নেরও দরকার নাই। ওর মাইয়া ওর বাড়িতেই পচুক, বুড়ি অউক। ফজুরে আবার আমি বিয়া করাইমু।’

    ‘যা করে যেন্ চিন্তা-ভাবনা কইর‍্যা করে।’

    ‘এর মইধ্যে চিন্তা-ভাবনার কি আছে?’

    ‘চিন্তা-ভাবনার কিছু নাই? অইবার সারদা আইনের বচ্ছর ‘ওঠ ছ্যামড়া তোর বিয়া’ কইয়া ফজুরে বিয়া করাইল। কয়ডা বচ্ছর পরেই আবার ভাইঙ্গা দিল বিয়া। এতে আল্লা বেজার অয় না?’

    অতীতের ভুলের কথা তুলতেই চুপ হয়ে যায় মাতব্বর।

    অনেকক্ষণ পর সে বলে, ‘আমার দোষ দিলে কি অইব। আসলে তোমার পোলাডারই বউর ভাগ্য নাই।’

  • সাত

    সাত

    হা-ডু-ডু খেলার প্রতিযোগিতা। খেলার ভেতর দিয়ে চর আসুলির শক্তি পরীক্ষা হবে আজ।

    সামান্য কথার খোঁচা থেকে এ আড়াআড়ির সৃষ্টি হয়েছে। দিঘিরপাড়ের গুড়ের আড়তদার হাতেম শিকদার তার পাশের ধানের আড়তদার আক্কেল হালদারকে সেদিন কথায় কথায় বলেছিল, ‘আরে দ্যাখা আছে। তোমাগ চরে আবার খেলোয়াড় আছেনি! আছে সব—’

    ‘কি কইলা! খেলোয়াড় নাই!’

    ‘নাই-ইতো। তোমরা পার ঢাল-কাতরা লইয়া খুনাখুনি করতে।’

    ‘আমরা খুনাখুনি করতেও পারি, খেলতেও পারি।’

    ‘পার আমার ইয়ে। আমাগ মাকুহাটির ফরমানের খেলা দ্যাখছ? ও একবার ‘কপাইট’ কইয়া ‘ডু’ দিলে তোমায় খেলোয়াড়রা ছ্যাড়া খাইয়া ভাইগ্যা যাইব।’

    ‘আর ছাড়ান দ্যাও। ওই রহম খেলোয়াড় গণ্ডা গণ্ডা আছে আমাগ চরে।’

    ‘আছে! তবে খেইল্যা দ্যাহাও না একদিন।’

    ‘হ দ্যাহাইমু।’

    ‘কবে? তারিখ দ্যাও।’

    ‘তুমি দ্যাও তারিখ।’

    ‘পরশু মঙ্গলবার।’

    ‘না, তার পরের দিন বুধবার।’

    আজ সেই খেলার তারিখ বুধবার।

    খেলার মাঠ লোকে লোকারণ্য। জেদাজেদির খেলা। দর্শকের ভিড় তো হবেই। দুই অঞ্চলের উগ্র সমর্থকদের মনে উত্তেজনার বারুদ। শান্তিরক্ষার জন্য সশস্ত্র পুলিস এসে হাজির হয়েছে।

    বড় ময়দানের মাঝখানে দাগকাটা খেলার কোট। ষোল হাত দীর্ঘ আর দশ হাত প্রস্থ কোটটিকে মাঝখানে দাগ কেটে সমান দু’ভাগ করা হয়েছে দুই দলের জন্য। কোটের চারপাশে বাঁশের খোটা পুঁতে তার সাথে মোটা রশির ঘের বাঁধা হয়েছে। সে ঘেরের বাইরে সারি সারি লোক বসে গেছে। তাদের পেছনে গায়ে গায়ে মেশামিশি হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশির ভাগ দর্শক।

    বিকেল চারটায় খেলা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু চরের দল এখনো আসেনি। আসুলির খেলোয়াড়রা অনেক আগেই এসে গেছে। বিক্রমপুরের দুর্ধর্ষ খেলোয়াড় সব। বজ্রযোগিনীর বাদল, মাকুআটির ওসমান আর ফরমান দুই ভাই, কামারখাড়ার ভজহরি, কলমার আল্লাস, সোনারং-এর কালীপদ আর পাঁচগাঁর শাসমু এসেছে। হাফপ্যান্ট ও গেঞ্জি পরে তারা কোটের এক অংশে তৈরি হয়ে বসে আছে।

    দর্শকরা অধৈর্য হয়ে ওঠে। অধৈর্য হয়ে ওঠেন স্বয়ং রেফারিও। তার মুখের বাঁশির আওয়াজে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কিছুক্ষণ পরে পরেই তিনি তাঁর হাতঘড়ি দেখছেন আর জোড়া ফুঁ দিচ্ছেন বাঁশিতে।

    অতি উৎসাহী ছেলে-ছোকরার দল নৌকাঘাটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চরের দিক থেকে লোক বোঝাই কোনো নৌকা দেখলেই তারা হৈ-হৈ করে ওঠে, ‘ঐ যে–ঐ ঐ আইতে আছে!’ তারপর ছড়া আবৃত্তি করতে থাকে সমস্বরে–

    ‘হেঁই কপাটি তুলা ধোন,

    মশা করে ভোন্‌ ভোন্‌।

    মাছির কপালে ফোঁটা,

    মইষ মারি গোটা গোটা।’

    কোলাহল শুনে দর্শকরা একটু আশান্বিত হয়। কিন্তু নৌকা কাছে এলে দেখা যায়– খেলোয়াড়দের কেউ আসেনি। এসেছে তাদের নৈরাশ্যের কয়েকজন ভাগীদার শুধু।

    আসুলির লোকেরা ভুড় দিতে শুরু করে। তারা বলে, ‘চরুয়ারা আইব না। ওরা ডরাইয়া গেছে।’

    চরাঞ্চল থেকেও বহু লোক খেলা দেখতে এসেছে। আসুলির লোকদের ঠেস-টিটকারি শুনে তাদের মুখ কালো হয়ে যায়। কচ্ছপের মতো সুবিধে থাকলে হয়ত তারা তাদের মাথা লুকিয়ে ফেলত লজ্জায়।

    এক পক্ষ যখন আসেনি তখন অন্য পক্ষ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করবে। সেই জয় ঘোষণা করতে হবে রেফারিকে। তিনি বাঁশি বাজান, হাত নেড়ে প্রতিপক্ষের খালি কোটে ‘ডু’ দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন আসুলির দলকে।

    হঠাৎ ভিড় ঠেলে খালি মাঠে নামে একজন লোক। লোকটিকে সবাই চেনে। সাতকচরের সোলেমান। সে এক কালের নামকরা খেলোয়াড়। এখন বয়স হয়েছে। মাথার কাঁচা-পাকা চুল দেখেই বোঝা যায়, বয়স তার চল্লিশ পার হয়ে গেছে। সাত-আট বছরের মধ্যে তাকে কোথাও খেলায় নামতে দেখা যায়নি।

    রেফারির দিকে এগিয়ে সোলেমান বলে, ‘নগেন বাবু, চরের খেলোয়াড়রা আহে নাই। কিন্তু আমরা আছি চরের মানুষ। আমরা খেলুম বিনা খেলায় আসুলিগ জিত্যা যাইতে দিমু না।’

    রেফারি বলেন, ‘কিন্তু তোমাদের আক্কেল হালদার কোথায়? খেলার তারিখ দিয়ে এমন–’

    ‘হুনছি, সে খেলোয়াড় আনতে গেছে দক্ষিণপাড়। মানুষটা এহনো আইল না ক্যান্ কে জানে?’

    দর্শকদের ভেতর থেকে একজন বলে, ‘আইব কি, ডরের চোডে পথ ভুইল্যা গেছে।’

    রেফারি সোলেমানকে বলেন, ‘তবে নেমে পড়। কোথায় তোমার খেলোয়াড়রা?’

    ‘এই আনতে আছি। দশটা মিনিট সময় দ্যান।’

    সোলেমান চারদিকের দর্শকদের ওপর একবার দৃষ্টি বুলিয়ে হাঁক দেয়, ‘কে আছস রে তোরা? চরের ইজ্জত না যাইতে শিগগির আয়।’

    ভিড়ের মাঝ থেকে ফজল ও আরো তিনজন এসে যোগ দেয় সোলেমানের সাথে।

    খেলা হবে না ভেবে দর্শকরা মনমরা হয়ে গিয়েছিল। এবার তারা আনন্দে কোলাহল করে ওঠে, হাততালি দিয়ে স্বাগত জানায়, উৎসাহ দেয় চরের খেলোয়াড়দের।

    এখনো দু’জন খেলোয়াড়ের অভাব। সোলেমান ও ফজল দর্শকদের মধ্যে পরিচিত লোক খুঁজে বেড়ায়।

    ফজলের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় একটি ছেলের। রূপজানের মুখের আভাস আনন্দ জাগায় তার মনে।

    দশ বছরের ছেলেটি তার শ্যালক। সে রশির বেড়া ঘেঁষে বসে আছে। দুলাভাই মাঠে নামার পর থেকেই সে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বারবার হাত নাড়ছিল।

    হাসি বিনিময় করে ফজল তার কাছে এগিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, ‘এই দেলু কার সাথে আসছ?’

    ‘কাদিরভাইর সাথে। আরো কত মানুষ আইছে!’

    ফজল গায়ের জামা খুলে দেলোয়ারের হাতে দিয়ে তার কানে কানে বলে, ‘এইডার মধ্যে টাকা আছে সাবধানে রাইখ্য।’

    ‘আচ্ছা। জানেন দুলাভাই, কাদিরভাই কিন্তু খুব ভালো খেলে।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘হ, খুব লেংড়ি দিতে পারে।’

    ‘তাই নাকি! কই সে?’

    দেলোয়ার পেছন দিকে তাকায়। কাদিরকে খুঁজে পেয়ে সে বলে, ‘ওই যে দুলাভাই।’

    ফজলের চোখে চোখ পড়তেই তার চাচাতো শ্যালক কাদির হেসে ওঠে।

    ফজল তাকে ডাকে, ‘তাড়াতাড়ি নামো। সময় নাই।’

    কাদির হাত নেড়ে খেলতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু দর্শকরা তাকে ঠেলে মাঠে নামিয়ে দেয়।

    অন্য দিক থেকে সোলেমানও একজনকে জোর করে মাঠে নামায়।

    খেলার পোশাক নেই কারো। এভাবে খেলায় নামতে হবে কে জানত? খুঁজে-পেতে একটা প্যান্টও যোগাড় করতে পারে না কেউ। কি আর করা! খেলোয়াড়রা সবাই লুঙ্গিতে কাছা মেরে নেয়।

    সোলেমান তার খেলোয়াড়দের কোটের এক কোণে জড় করে নিচু গলায় পরামর্শ দেয়, ‘দ্যাখো, তোমরা ওগ বড় বড় খেলোয়াড় দেইখ্যা ঘাবড়াইয়া যাইও না। খালি ঠ্যাকা দিয়া যাইবা। কোনো উপায়ে ‘ড্র’ রাখতে পারলেই আইজ ইজ্জত বাঁচে। তোমরা ধীরে-সুস্থিরে খেলবা। ওরা চেতলেও চেতবা না। আবার সুযোগ পাইলেও ছাড়বা না। ঐ যে বাদল ফরমান। দাঁতাল শুয়রের মতন শক্তি ওগ গায়। ওরা কিন্তু গোতলাইয়া লইব। কায়দা মতন না পাইলে ওগ ধরবা না। আর ঐ যে কালীপদ–ব্যাডা কুলুপের ওস্তাদ। ডু দেওয়ার সময় হুঁশিয়ার। ভজার পায়ে কিন্তু সাংঘাতিক জোর। ও পাও আউগাইয়া দিব, লেংড়িও দিব। কিন্তু কেও ধরবা না। ধরলেই কিন্তু ঘোড়ার মতন ছিটা লাথি মাইর‍্যা যাইব গা। শামসু ঢুশ দিয়া ধরে। আর ঐ যে আলাস–ওরে বেড় দিলেই লাফা মাইর‍্যা চইল্যা যাইব।’

    রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে তৈরি হওয়ার জন্য তাড়া দেন।

    সোলেমান রেফারিকে দুটো আঙুল দেখায়। আরো দুমিনিট সময়ের প্রার্থনা।

    সে আবার শুরু করে, ‘তোমাগ মইদ্যে কুলুপ জানে কে?’

    ‘আমি জানি।’ ফজল বলে।

    ‘ঠিক আছে, তুমি ডান কিনারে থাকবা। আর আমি থাকমু বাঁ কিনারে।’

    ‘আচ্ছা, তবে আমার পাশে থাকব লখাই। ও কুলুপ দেওনের ভান করব, তা অইলে যে ডু দিতে আইব, তার নজর থাকব লখাইর উপরে। তখন পাশের তন কুলুপ দিমু আমি?’

    ‘হ দিও। কিন্তু যখন তখন কুলুপ দিও না। তুমিতো ডু দিতেও পারবা?’

    ‘হ পারমু।’

    ‘আর কার কি গুণ আছে কও দেহি শিগগির।’

    নিজের মুখে নিজের গুণ জাহির করতে লজ্জা পায় সবাই।

    ফজল বলে, ‘এই যে কাদির, ও পারে লেংড়ি দিতে।’

    ‘বেশ বেশ! সাবধানে ডু দিবা। কালীপদর দিগে কিন্তু ঠ্যাং বাড়াইও না।’

    ‘আর ঐ যে কোরবান। ও পারে হাতে কুলুপ দিতে।’

    ‘উঁহু। ওরা যেমুন জুয়ান, হাতে কুলুপ দিয়া জুত করতে পারবা না। ঠিক আছে, তুমি হাতে কুলুপ দেওনের ভান করবা আর আমি তখন সুবিধা পাইলে কুলুপ দিমু বাইয়া পায়ে।’

    মধু আর তালেবের তেমন কোনো বিশেষ গুণ নেই। তারা মাঝে মাঝে ‘ডু’ দেবে আর বিপক্ষের খেলোয়াড় ধরার সময় সাহায্য করবে।

    সোলেমান আরো বলে, ‘যে পয়লা ধরবা, হে যদি বোঝ ধরা ঠিক অইছে, তয় ‘ধর’ কইয়া আওয়াজ দিবা। তখন আর সবাই ঝাঁপাইয়া পড়ব। যাও আর সময় নাই। যার যার জায়গা লও গিয়া।’

    খেলা শুরু হয়।

    রেফারির বাঁশির নির্দেশ পেয়ে আসুলির দলের বাদল প্রথমে ‘ডু’ দেয়, ডিগিড্‌ডিগিড্‌ডি গিড্‌ডিগি–

    তার উত্তরে সোলেমান ‘ডু’ দেয়, ‘কপাইচ—কপাইচ—কপাইচ—’

    আলকাস : ‘ট্যাগাট্ট্যাগাট্ট্যাগা—’

    ফজল : ‘ড্যাগাড্‌ড্যাগাড্‌ড্যাগাড্‌ড্যাগা—’

    ফরমান : ‘কপাইট–কপাইট–কপাইট–’

    উত্তেজনাহীন ‘ডু’-এর মহড়া চলে কিছুক্ষণ। তারপরই আসুলির দল মেতে ওঠে। বাদল, ফরমান আর আল্লাসের ‘ডু’-এর দাপটে বিব্রত বোধ করে চরের দল।

    ছোট্ট সীমিত কোটের মধ্যে সাতজন খেলোয়াড়ের দাঁড়াবার জায়গা। এর মধ্যে থেকেই বিপক্ষের আক্রমণের মোকাবেলা করতে হবে। চরের দল তাড়া খেয়ে শেষ সীমারেখার কাছে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করে।

    ফরমান ‘ডু’ দিয়ে এগিয়ে যায়, মাঝে মাঝে হাত বাড়িয়ে থাবা মারে। কোরবান লোভ সামলাতে পারে না। সে ফরমানের হাতে কুলুপ দিয়ে বসে। কিন্তু তার হাতের ঝটকা টানে কোরবান উপুড় হয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয়।

    দলের একজন কমে গেল। সোলেমান ‘ডু’ দেয়। সময় কাটাবার জন্য মধ্য রেখার কাছ দিয়েই ঘুরে ঘুরে সে ‘কপাইচ–কপাইচ’ করে। সময় বেশি নিচ্ছে দেখে রেফারির সন্দেহ হয়, দম চুরি করছে বোধ হয় সোলেমান। তাইতো! তিনি বাঁশিতে ফুঁ দেন। কিন্তু কেউ ছুঁয়ে মারবার আগেই সোলেমান লাফিয়ে ভেগে আসে।

    ভজহরি ‘ডু’ দিতে এগিয়ে আসে। ফজলের দিকে ডান পা এগিয়ে দেয় সে। চোখে তার অবজ্ঞার হাসি। ভাবটা এই–সাহস থাকলে ধরো না দেখি, কত মুরোদ। ফজল লখাইকে কনুইর গুঁতো মেরে ইশারা করতেই সে কুলুপ দেয়ার ভান করে। ভজহরি লেংড়ি দেয় লখাইকে। অমনি ফজল ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মাজার ওপর। জাপটে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ধর।’

    সাথে সাথে আর তিনজনে ধরে রেখে দেয় ভজহরিকে।

    সোলেমান ফজলকে বাহবা দেয় আবার চুপিচুপি সাবধানও করে, ওইভাবে ঝাঁপাইয়া পইড় না। বুকে চোট লাগতে পারে।’

    ভজহরি মরে যাওয়ায় কোরবান তাজা হয়েছে। ফজল ‘ডু’ দেয়। সোলেমানের মতো সে-ও সময় ধ্বংস করে।

    ‘ট্যাগাট্টাগা’ করতে করতে আসে আক্‌লাস। সে বাঁ দিকের খেলোয়াড়দের সোজা তাড়িয়ে নিয়ে চলে। সোলেমান আর কোরবানের ‘জল্লা’ যাওয়ার মতো অবস্থা। ফজল দৌড়ে যায় আল্লাসকে ধরতে। কিন্তু সে সোলেমানকে ছুঁয়ে, লাফ মেরে ফজলকে ডিঙিয়ে পালিয়ে যায়।

    আসুলির সমর্থকরা আনন্দে হাততালি দেয়।

    দলের দুই প্রধান খেলোয়াড় মারা গেছে। এবার আর উপায় নেই।

    কাদির ‘ডু’ দেয়ার জন্য মধ্যরেখার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সতেরো বছরের নব যুবক। সুপারি গাছের মতো ওর দৈর্ঘ্য আছে, প্রস্থ নেই। হাত-পা কাঠিকাঠি, যেন তালপাতার সেপাই। ওকে দেখে আসুলির খেলোয়াড়রা অবহেলার হাসি হাসে, হাতে তুড়ি মেরে ঠাট্টা করে। তাদের ঠাট্টার জবাবে সে ‘ডু’ দেয়–

    ‘হেঁই কপাটি কয় বাট্টি?

    সাবু খাইছ কয় বাট্টি?’

    রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দেন। হাত নেড়ে বলেন, এরকম ছড়া কেটে ‘ডু’ দেয়া চলবে না। আবার ‘ডু’ দাও।

    কাদির ‘ডিগডিগ’ করতে করতে এগিয়ে যায়।

    কালিপদ আর ওসমান মাটির ওপর থাবড়া মেরে ওকে ভয় দেখায়। কিন্তু ও ঘাবড়ায় না। ওর ‘ডু’ চলতে থাকে।

    হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে কালীপদর পায়ে লেংড়ি মেরে সে চলে আসে।

    চারদিক থেকে হাততালি পড়ে। কেউ কেউ বলে, পচা শামুকেও পা কাটে।

    সোলেমান আনন্দের আতিশয্যে কাদিরকে কাঁধের ওপর নিয়ে নাচতে থাকে। কালীপদ মারা পড়ায় বেঁচে ওঠে সোলেমান ও ফজল। আবার পুরো হয় চরের দল।

    কিন্তু একটু পরেই ফরমানের আক্রমণে মারা যায় কাদির আর মধু। তারও কিছুক্ষণ পরে তালেব ‘ডু’ দিতে গিয়ে ধরা পড়ে।

    বিরতির বাঁশি বাজে। খেলার অর্ধেক সময় শেষ হলো। আসুলির দলের সবাই তাজা। চরের দলে বেঁচে আছে চারজন।

    দশ মিনিট বিশ্রামের পর আবার খেলা শুরু হয়।

    সোলেমান ‘ডু’ দিয়ে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে যায়। একটু এগিয়ে ওসমানের ওপর থাবা মারতেই শামসু ঢুস দিয়ে ধরবার জন্য ছুটে আসে। সোলেমান চক্কর মেরে শামসুকে ঘূর্ণা খাইয়ে চলে আসে।

    আক্‌লাস ‘ডু’ দিয়ে সোলেমান ও তার পাশের খেলোয়াড়দের দাবড়ে নিয়ে যায়। লাফ দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাই তার উদ্দেশ্য। ফজল তাকে বেড় দেয়। আক্‌লাস লাফ দিতেই সে সটান খাড়া হয়ে যায়, দু’হাত বাড়িয়ে আক্‌লাসের ডান হাঁটুর কাছে জাপটে ধরে। আক্‌লাস ফজলের কাঁধের ওপর ঝুলতে থাকে। তার মাথা নিচের দিকে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে হাতদুটো তার মাটি ধরবার জন্য আকুলি-বিকুল করছে।

    ‘ডু’-এর আদান-প্রদান চলে কিছুক্ষণ। চরের খেলোয়াড়রা সব ধীর-স্থির। তারা ‘ডু’ দিয়েও বেশি দূর এগোয় না, ধরবার জন্যও বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে না। শামসু আর আক্‌লাস তাজা না হওয়া পর্যন্ত আসুলির দলও বেশি মাতে না। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর মধু ও লখাইকে মেরে তারা দল পুরো করে। কিন্তু সময় আর বেশি নেই। এ পর্যন্ত তারা এক পাট্টিও বানাতে পারেনি। কয়েকটা অখ্যাত অজ্ঞাত পুচকে খেলোয়াড় তাদের এভাবে ঠেকিয়ে রাখবে, এর চেয়ে লজ্জার ব্যাপার আর কি হতে পারে?

    তারা বাদল আর ফরমানকে গোয়ার্তুমি করার জন্য ছেড়ে দেয়। মাতামাতি করে ‘ডু’ দিয়ে চেষ্টা করতে দোষ কি? ধরা পড়লে পড়ুক। আর বেঁচে আসতে পারলে তো কথাই নেই।

    বাদল আর ফরমান খ্যাপার মতো ‘ডু’ দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে চরের দলকে।

    সোলেমান সাবধান করে দেয় সবাইকে, ‘অ্যাকদিগে দাবড় লাগাইলে অন্য দিগ থিকা আউগ্‌গাইয়া আসবা। কিন্তু ধরবা না, খবদ্দার। করুক না ওরা গোলাগুলি যত পারে!’

    সোলেমানের উদ্দেশ্য সময় নষ্ট করা। সময় কাবার করে কোনো রকমে ‘ডু’ রাখতে পারলেই চরের ইজ্জত বজায় থাকে। কিন্তু বাদল আর ফরমান ‘ডু’ দিয়ে শেষ সীমারেখার কাছে দাবড়িয়ে নিয়ে যায় তাদের। সীমারেখার বাইরে গেলেই জল্লা যেতে হবে। এ অবস্থায় সোলেমানের হুঁশিয়ারি ভেস্তে যায়। ঠিক থাকতে পারে না সোলেমান নিজেও। না-মরদের মতো জল্লা গিয়ে মরার চেয়ে ধরে মরা অনেক ভাল।

    কিন্তু ধরতে গিয়েই শুরু হয় মড়ক। কোরবান আর তালেব ধরেছিল বাদলকে। কিন্তু সে দু’জনকেই হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যায়। তারপর ফরমানকে ধরতে গিয়ে মারা যায় সোলেমান। আর বাদলের দাবড় খেয়ে কাদির জল্লা যায়। টিকে থাকে শুধু ফজল।

    উত্তেজনা টগবগ করছে দর্শকদের ভেতর। এবার আসুলির ভাগ্যে নিশ্চিত জয়লাভ।

    মিনিট দুয়েক সময় আছে আর। ফজল ‘ডু’ দেয়। কিন্তু তাকে ধরবার আগ্রহ দেখায় না কেউ। সে দম শেষ করে ফিরে আসে।

    বাদল ‘ডু’ দেয়, এগিয়ে যায় লম্বা হাত বাড়িয়ে। ফজল সরতে থাকে কোণের দিকে, ধরবার ভান করে। কিন্তু বাদল ওসব গ্রাহ্যের মধ্যেই নেয় না। আর নেবেই বা কেন? দিঘে পাশে কোনোটায়ই ফজল তার সমকক্ষ নয়। ফজল মাথা নুইয়ে কুলুপ দেয়ার ভান করে। আর সেই সময় তার মাথায় থাবা মারবার জন্য বাদল একটু বেশিই এগিয়ে যায়। অমনি ফজল তড়িৎগতিতে এগিয়ে গিয়ে বাদলের মাজায় ধরে ফেলে। বাদল কোস্তাকুস্তি করে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু ততক্ষণে ফজল তাকে শূন্যে তুলে ফেলেছে।

    চারদিকে হৈচৈ কলরোল। হাততালির চোটে কানে তালা লেগে যাবার যোগাড়।

    লখাই তাজা হয়ে ডু’ দিতে যায়। তার ‘ডু’ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রেফারি খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

    চরের জনতা বেড়া গলিয়ে ছুটে আসে মাঠে। হৈ-হুঁল্লোড় করে তারা তাদের খেলোয়াড়দের ঘিরে ধরে। এক একজন খেলোয়াড়কে চার-পাঁচজনে মিলে মাথার ওপর তুলে নেয়।

    আক্কেল হালদারের ছোট ভাই তোয়াক্কেল হালদার এতক্ষণ দর্শকদের ভিড়ের মাঝে চুপটি মেরে ছিল। সে এসে বলে, ‘খেলোয়াড়গ নিয়া চলো বাজারে। আইজ তারা আমাগ ইজ্জত বাঁচাইছে। তাগ এট্টু মিষ্টিমুখ করাইয়া দেই।’

    সন্ধ্যা হয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের নিয়ে জলধর ময়রার দোকানে ঢোকে তোয়াক্কেল। ফজল আর কাদিরের জামা বগলে নিয়ে দেলোয়ার জনতার পেছনে পেছনে আসছিল। সে ও ঢুকে পড়ে দোকানে। ফজল তাকে আদর করে পাশে বসায়। বাইরে দাঁড়িয়ে জটলা করে বিশ-পঁচিশ জন হুজুগমত্ত ছেলে-ছোকরা।

    ময়রাকে তোয়াক্কেল বলে, ‘তোমার দোকানডা আইজ কিন্যা ফালাইমু আলইকর।’

    ‘তা কিন্যা ফলাওনা। আমারে শুদ্ধা কিন্যা ফালাও।’

    ‘হ কিনমু। এহন কও দেহি, কত ট্যাহার মিষ্টি আছে তোমার দোকানে।’

    ময়রা হেসে বলে, ‘কত আর অইব! দ্যাও তিরিশ ট্যাহা।’

    তোয়াক্কেল তিনটা দশ টাকার নোট ময়রার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, ‘নেও তিরিশ ট্যাহাই দিলাম। তুমি দিতে শুরু কর। আমাগ প্যাড ভরাইয়া বাইরের তাগও দিবা। দিয়া ফুরাইয়া ফালাইবা বেবাক।’

    মিষ্টি খাওয়া শেষ করে রওনা হয় সবাই।

    কাদির আগে আগে চলছে। তার পেছনে চলছে ফজল দেলোয়ারের হাত ধরে।

    দেলোয়ার নিচু গলায় বলে, ‘দুলাভাই আপনেরে বহুত দিন বিচ্‌রাইছি।’

    ‘ক্যান?’

    ‘বু আপনেরে যাইতে কইছে। হাশাইলের হাটে, দিঘিরপাড় হাটে কত বিচরাইছি আপনেরে!’

    ‘হাটে আসি নাই বহুদিন। নতুন চর লইয়া বড় ঝামেলার মইদ্যে আছি। চল, আজই যাইমু তোমাগ বাড়ি।’

    ‘যাইবেন! ঠিক!’ দেলোয়ার খুশি হয়ে ওঠে।

    ‘হ যাই। তোমাগ নায় জায়গা অইব তো?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ফজল একটু চিন্তা করে কাদিরকে ডাকে, ‘ও কাদির।’

    ‘জ্বি।’

    ‘এত তাড়াতাড়ি যাইতে আছ ক্যান্? তোমায় বাড়ি যাইমু দেইখ্যা বুঝি পলাইতে আছ?’

    ‘না-না, কি যে কন!’ লজ্জা পেয়ে বলে কাদির। ‘চলেন না যাই। আপনে তো আমায় বাড়ির পথ ভুইল্যাই গেছেন।’

    ‘তবে চলো দেখি, কাপুড়িয়া দোকানে।’

    ‘কাপড় কিনবেন নি?’

    ‘হ।’

    নিতাই কাপুড়ের দোকানে গিয়ে ফজল শ্যালকদের পছন্দমতো এক জোড়া নকশিপাড় শাড়ি কেনে। তার পরিধানের লুঙ্গিটা মাটিকাদা মেখে যাচ্ছেতাই হয়ে গেছে। এটা পরে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। তাই নিজের জন্যও সে কেনে একটা মাদ্রাজি লুঙ্গি। তারপর গগন ময়রার দোকান থেকে এক পাতিল মিষ্টি কিনে তারা নৌকায় উঠে রওনা হয়।

  • আট

    আট

    মোল্লাবাড়ির একমাত্র জামাই ফজল। শ্বশুরবাড়ির আদর-আপ্যায়নের মাত্রাটা তাই একটু বেশিই জুটত তার ভাগ্যে। তার আগমনে উৎসব শুরু হয়ে যেত মোল্লাবাড়ি। শ্বশুর-শাশুড়ি ব্যস্ত হয়ে উঠত–মুরগি জবাই করোরে, গুঁড়ি কোটরে, পিঠা বানাওরে! সে যে কত পদের পিঠা। কখনো বানাত পাটিসাপটা, বুলবুলি, ভাপা, কখনো বানাত ধুপি, চন্দ্রপুলি, চিতই, কখনো বা পাকোয়ান, শিরবিরন, বিবিখানা। চালের গুঁড়ি কুটে পিঠা বানাতে বানাতে রাতদুপুর হয়ে যেত। সে পিঠা তৈরির আসর আনন্দমুখর হয়ে উঠত গীত-গানে, কেচ্ছা-শোলকে।

    সাত-আট মাস আগেও একবার শ্বশুরবাড়ি এসেছিল ফজল। সেবারও উৎসব লেগে গিয়েছিল মোল্লাবাড়ি। জামাইয়ের আদর-যত্নের কোনো রকম ত্রুটিই হতে দেয়নি শ্বশুর-শাশুড়ি। ফজল দু’দিন ছিল সেখানে। শালা-শালীরা তাকে ঘিরে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ছিল দুদিন। ঠাট্টা-মশকরা, হাসি-হুল্লোড়ে তারা ভরে দিয়েছিল তার মন-প্রাণ।

    আজও এ বাড়িতে পা দেয়ার পর শালা-শালীরা ছুটে এসেছিল। এসেছিল কলরব করতে করতে, ‘দুলাভাই আইছে, দুলাভাই আইছে!’

    শালা-শালীরা হৈ-চৈ করতে করতে তাকে ভেতরবাড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। বেঁকি বেড়ার কাছে পৌঁছতেই শোনা যায় শ্বশুরের গলা, ‘অ্যাই দেলা, অতিথরে কাছারি ঘরে নিয়া বইতে দে।’

    অন্দর থেকে ছেলে-মেয়েদের লক্ষ্য করে ধমক ছাড়ে সে আবার, ‘অ্যাই পোলাপান, কিয়ের এত চিল্লাচিল্লি? বান্দরের খেইল আইছে, আঁ? যা, ঘরে যা শিগগির।’

    ধমক খেয়ে সুড়সুড় করে চলে গিয়েছিল সবাই। তারপর আর একজনও আসেনি তার কাছে। যে দেলোয়ার এত আগ্রহভরে তাকে নিয়ে এল, তার মুখের হাসিও মিলিয়ে যায়। ফজল বুঝতে পারে, তার এ বাড়িতে আসায় খুশি হয়নি শ্বশুর। কিন্তু কেন? তার বাবা রূপজানের গয়না বন্ধক দিয়েছে সে জন্য? রূপজান তো চিঠিতে লিখেছিল, শ্বশুরের রাগ তার ওপরে নয়। কেন সে লিখেছিল এমন কথা? আর তাকে আসতেই বা লিখেছিল কেন এত মিনতি করে? কেন দেলোয়ারকে পাঠিয়েছিল হাটে-বাজারে তাকে খুঁজতে?

    রূপজানকে দেখার জন্য ব্যাকুল বাসনা রয়েছে তারও মনে। রূপজানের আকুল আহ্বান না পেলে তার সে বাসনা পথ খুঁজে পেত না। আসত না সে এ বাড়ি। দেলোয়ার হারিকেন জ্বালিয়ে রেখে যায় কাছারি ঘরে। রূপজান কোন ঘরে কি করছে জানতে ইচ্ছে হয়েছিল ফজলের। কিন্তু জিজ্ঞেস করা আর হয়ে ওঠে না। সে গালে হাত দিয়ে বসে থাকে।

    মোরগের ক্ব-ক্ব চিৎকার শোনা যায়। খোপ থেকে মোরগ টেনে বার করছে কেউ।

    মেঘাচ্ছন্ন আকাশে বিদ্যুৎ চমকের মতো আনন্দ খেলে যায় ফজলের মনে। সে ভাবে, মোরগ জবাই করার আয়োজন হচ্ছে যখন তখন তার অনাদর হবে না নিশ্চয়।

    অন্দরে শ্বশুরের গলা শোনা যায় আবার, ‘মোরগ ধরছে ক্যাডারে?’

    কেউ উত্তর দিল কিনা শোনা গেল না।

    শ্বশুর আবার বলে, ‘রাইতের বেলা ঘুমের মোরগ লইয়া টানাটানি শুরু করছে কাঁ? আল্লা রাইত দিছে ঘুমানের লেইগ্যা। ঘুমের পশু-পক্ষীরে কষ্ট দিলে আল্লার গজব পড়ে।’

    মোরগের ক্ব-ক্ব আর শোনা যায় না। খোপের মোরগ খোপেই চলে গেছে, বুঝতে পারে ফজল।

    আবার মেঘ জমে তার মনে। বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে সে। কিন্তু এত রাত্রে নৌকা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সে অবাঞ্ছিত মুসাফিরের মতো একা বসে থাকে কাছারি ঘরে।

    এর আগে যতবার সে এ বাড়িতে এসেছে প্রত্যেক বারই শ্বশুর-শাশুড়ি হাসিমুখে এগিয়ে এসেছে। সেও তাজিমের সাথে তাদের কদমবুসি করেছে। তাকে ভেতরবাড়ি নিয়ে গিয়ে তারা জিজ্ঞেস করেছে সকলের কুশল-বার্তা, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছে জমাজমি আর ফসলাদির খবরাখবর। আজ তাদের আলাঝিলাও দেখতে পায়নি সে। তাই কদমবুসি করার সুযোগও হয়নি। দেলোয়ার হারিকেন দিয়ে সেই যে গেছে আর একবারও আসেনি তার কাছে। সে এলে তাকে সাথে করে সে অন্দরে গিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির কদমবুসি করে আসতে পারত।

    ঢুকুর-ঢুক্ আওয়াজ আসছে ঢেঁকির। ধান ভানার শব্দ। দ্রুততালের মৃদু শব্দ হলে বোঝা যেত পিঠের জন্য চালের গুঁড়ি কোটা হচ্ছে। ঢেঁকিটা যে রকম বিলম্বিত তালে ওঠা-নামা করছে তা থেকে সহজেই বুঝতে পারে ফজল, ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে শুধু একজন। রূপজান নয় তো!

    ফজল উঠে অন্দরমুখী দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। তার চোখ দুটো খুঁজে বেড়ায় একটি মুখ। কিন্তু কোনো ঘরের খিড়কি-জানালা দিয়েই সে মুখ দেখা যায় না। ঢেঁকিঘরে কোনো খিড়কি নেই। সেখানে আছে কিনা কে জানে? পশ্চিমভিটি ঘরের বারান্দায় শুধু দেলোয়ারকে দেখা যায়। সে স্কুলের পড়া তৈরি করছে বোধ হয়।

    নিঃশব্দ পায়ে ফজল সেদিকে এগিয়ে যায়। জানালার পাশে গিয়ে নিচু গলায় ডাকে, ‘দেলু।’

    ‘জ্বী।’

    ‘তোমার বু’ আছে এই ঘরে?’

    ‘না।’

    ‘ঢেঁকিঘরে আছে?’

    ‘উঁহু, সে পাকের ঘরে, মা-র লগে রানতে লাগছে।’

    ‘মিয়াজি কোন ঘরে?’

    ‘উত্তরের ঘরে।’

    ‘আমারে নিয়া চলো দেখি, মিয়াজিরে সেলাম কইর‍্যা আসি।’

    দেলোয়ারের পেছনে পেছনে উত্তরভিটি ঘরে ঢোকে ফজল।

    আরশেদ মোল্লা বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। শব্দ পেয়ে সে মাথা তুলে তাকায়।

    ‘আস্‌লামু আলাইকুম।’ ফজলের সশ্রদ্ধ সালাম।

    আরশেদ মোল্লা সালামের জবাব দেয় না।

    কদমবুসি করার জন্য ফজল তার পায়ের দিকে এগিয়ে যেতেই সে পা গুটিয়ে বসে পড়ে। হাত নেড়ে বলে, ‘উঁহু উঁহু দরকার নাই। এই পাও ধরলে লাভ অইব না। যাও নিকারি-কৈবর্তের পায়ে ধর গিয়া। দুইডা পয়সা উৎপন্ন অইব।’

    ধক করে ওঠে ফজলের বুক। তার মুখ কালো হয়ে যায়। সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না সেখানে। কাছারি ঘরে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে চৌকির ওপর।

    এতক্ষণে পরিষ্কার হয়েছে কুয়াশা। তার মাছ বেচার কথা জেনে ফেলেছে শ্বশুর। আর এ জন্যই এ বাড়িতে উল্টো হাওয়া বইছে আজ।

    আর একদণ্ড এ বাড়িতে থাকা চলে না। ফজল বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে। নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়ালে হয় তো ধরতে পারবে কোনো নৌকা।

    কাছারি ঘর থেকে বেরিয়ে কিছু দূর গিয়েই সে থমকে দাঁড়ায়। তার কুঁকড়ে-যাওয়া মন হঠাৎ চিড়বিড়িয়ে ওঠে–এভাবে চুপিচুপি চোরের মতো কেন যাবে সে? এটা তো মরদের কাজ নয়। সে কি চুরি-ছ্যাচড়ামি করেছে, না ডাকাতি বাটপাড়ি করেছে। সে করছে হালাল রুজি। এতে শ্বশুরের রাগ হওয়ার কি আছে? তার রাগের মাখা তামুক কে খেতে চায়? শুধু একজন রাগ না হলেই হয়। সে যদি বাধ্য থাকে তবে কারো তোয়াক্কা সে করে না। আজই–এই রাতেই রূপজানের সাথে বোঝাপড়া করবে সে।

    সে কাছারি ঘরে ফিরে এসে দেখে দেলোয়ার খাবার আনতে শুরু করেছে।

    আগে ভেতর বাড়িতেই তার খাবার দেয়া হতো। সামনে বসে পরিবেশন করত শাশুড়ি, নয় তো রূপজান। আজকের অবস্থা বিবেচনা করে এ ব্যবস্থায় আশ্চর্য হয় না সে।

    তার খিদে নেই তেমন। বেশি মিষ্টি খেয়ে তার মুখটা কেমন বাই-বাইতা করে। পেটের ভেতরেও কেমন বেতাল ভাব। ঝাল তরকারি দিয়ে দুটো ভাত খেলে হয়তো সে ভাবটা কেটে যেত। কিন্তু এ বাড়ির তেতো আবহাওয়ায় তার খাবার ইচ্ছে একেবারেই মরে গেছে। তবুও সে খেতে বসে। কিছু না খেলে আবহাওয়াটা হয়তো আরো তেতো, আরো বিষাক্ত হয়ে উঠবে।

    কৃষক পরিবারের নিত্যকার খাবার ডাল, ভাত, মাছের সালুন। কোনো বিশেষ পদ তৈরি হয়নি জামাইয়ের জন্য। ফজল নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুটো মুখে দিয়ে খাওয়া শেষ করে।

    দেলোয়ার মিষ্টিও নিয়ে আসে। তারই আনা মিষ্টি। ফজল বলে, ‘মিষ্টি এত খাইছি আইজ! প্যাডের মইদ্যে মিষ্টির চর পইড়া গেছে। ওগুলা লইয়া যাও।’

    মিষ্টি খেয়ে দেলোয়ারেরও একই অবস্থা। তাই আর সাধাসাধি না করে সে মিষ্টির থালা নিয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরেই সে কথা-বালিশ এনে ধপাৎ করে ফেলে চৌকির ওপর।

    শব্দটার প্রতিশব্দ হয় ফজলের বুকের ভেতর।

    দেলোয়ার বিছানা পেতে দিয়ে চলে যায়। ফজল কাঁথা আর বালিশটার দিকে চেয়ে থাকে অপলক দৃষ্টিতে।

    আগে শ্বশুরবাড়ি এলে তার শোয়ার ব্যবস্থা হতো অন্দরের কোনো নিরালা ঘরে। সেখানে থাকত পাশাপাশি দুটো বালিশ। দোসরহীন বালিশটা যেন মুখ লুকিয়ে কাঁদছে আজ।

    ফজল বসে বসে বিড়ি টানে। তার নাক আর মুখ দিয়ে গলগলিয়ে ধোঁয়া বেরোয়। তার বুকের ভেতর জ্বলছে যে ক্ষোভের আগুন, এ যেন তারই ধোয়া।

    সে উঠে পায়চারি করে এদিক-ওদিক। ঢেঁকিঘর থেকে এখনও ধানভানার শব্দ আসছে।

    হারিকেনের আলো যথাসম্ভব কমিয়ে দিয়ে অন্দরমুখি দরজায় গিয়ে দাঁড়ায় ফজল। উত্তর ও পশ্চিমভিটি ঘরে বাতি জ্বলছে।

    কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে দুটো বাতিই নিবে গেল। তাকে উপহাস করে যেন মুখ লুকাল অন্ধকারে।

    ফজল দরজা দুটোয় খিল লাগিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। হাত বাড়িয়ে হারিকেনটা নিবিয়ে দেয়।

    একটা সম্ভাবনা হঠাৎ উঁকি দেয় তার মনে। সে উঠে পড়ে। অন্ধকার ঘর অন্ধের মতো হাতড়াতে হাতড়াতে গিয়ে সে অন্দরমুখি দরজাটার খিল খুলে রেখে আসে।

    সম্ভাবনাটা তার অন্তরের উমে রূপান্তরিত হয় নিশ্চিত বিশ্বাসে। আর সে বিশ্বাসের ওপর ভর দিয়েই চলে তার প্রতীক্ষা।

    কিন্তু আসছে না কেন রূপজান? এখনো কি সবাই ঘুমোয়নি? ভারাভানুনি এখনো ধান ভানছে ঢেঁকি ঘরে। বোধহয় তার জন্যই আসতে পারছে না।

    ঢেঁকিটা যেন কিছু বলছে। কি বলছে? ফজল শুনতে পায়–ওটা বলছে, ‘আসি গো আসি, আসি গো আসি।’

    রাত অনেক হয়েছে। ঢেঁকির শব্দ আর শোনা যায় না। ফজল অধীর প্রতীক্ষায় এ-পাশ ও-পাশ করে।

    এখনও দেরি করছে কেন রূপজান? ঘুমিয়ে পড়েনি তো?

    ‘উঁহু কিছুতেই না।’ মনে মনে বলে সে। ‘চউখের দেখা দেখনের লেইগ্যা পরান যার ছটফট করে, তার চউখে কি ঘুম আইতে পারে?’

    তার মনে হয়, রূপজান জেগেই আছে, কিন্তু সাহস পাচ্ছে না বেরুবার।

    সে বিছানা ছেড়ে খালি পায়ে ঘর থেকে বেরোয়। পা টিপে টিপে পশ্চিম ভিটি ঘরের দক্ষিণ পাশের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে হয়তো এ ঘরেই শুয়ে আছে রূপজান।

    আধ-ভেজানো জানালার ফাঁক দিয়ে সে তাকায় ভেতর। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে সব একাকার। তার দৃষ্টি হারিয়ে যায় সে অন্ধকারে। সে মৃদু শিস দেয় বারকয়েক। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।

    ফজলের মনে হয় রূপজান এ ঘরে নেই। থাকলে জেগেই থাকত সে। এ অন্ধকারেও তার নড়াচড়ার আভাস পাওয়া যেত। আর হয়তো পাওয়া যেত রেশমি চুড়ির মিষ্টি রিনিঠিনি আওয়াজ।

    উত্তরভিটি ঘরেই তাহলে শুয়েছে রূপজান। কিন্তু সে ঘরের বারান্দায় থাকে শ্বশুর। সে-দিকে যেতে তাই সাহস হয় না তার। নিরাশ মনে কাছারি ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য সে পা বাড়ায়। এমন সময় শোনা যায় হালকা আওয়াজ—টুক-টুক-টুক। কাঠ বা অন্য কিছুর ওপর টোকা দেয়ার শব্দ।

    আনন্দ-শিহরণে কেঁপে ওঠে তার সমস্ত শরীর। সে তাড়াতাড়ি টিনের বেড়ায় আঙুলের টোকা দেয় তিনবার। কোনো সাড়া না পেয়ে সে আবার টোকা দেয়। কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। কিন্তু প্রত্যাশিত ঠকঠক আওয়াজ আর শোনা যায় না।

    তার মনে সন্দেহ জাগে–এ কি রূপজানের সঙ্কেত? না আর কিছু শব্দ? টিকটিকির শিকার ধরে আছাড় মারার শব্দ নয়তো?

    জানালাটা আরো একটু ফাঁক করার জন্য সে একটা পাট ভেতরের দিকে ঠেলে দেয় আর অমনি ক্রুদ্ধ আওয়াজ শোনা যায়, ‘কোঁ-ওঁ-ওঁ।’

    সে লাফ দিয়ে পিছিয়ে যায় ভয়ে। তার এক পায়ে কাঁটা ফুটে যায় কয়েকটা। কাঁটাযুক্ত শুকনো ডালটা সে টান দিয়ে খুলে ফেলে। একটা কাঁটা বোধহয় ভেঙে রয়েই গেল।

    আচমকা ভয়ে পিছিয়ে গেলেও সাথে সাথেই ফজল বুঝতে পেরেছিল, ক্রুদ্ধ আওয়াজটা একটা উমে-বসা মুরগির। সে আবার জানালার কাছে ফিরে যায়। দৃষ্টি ফেলে ঘরের ভেতর। এবারেও কিছুই ধরা দেয় না চোখে।

    তাকে চমকে দিয়ে আবার সেই আওয়াজ হয়–ঠুকঠুকঠুক। কিন্তু সেই সাথে শোনা যায় চিঁও চিঁও ডাক। ডিম ফুটে মুরগির বাচ্চা বেরুচ্ছে।

    ঠুক-ঠুক শব্দটা কিসের এতক্ষণে ধরতে পেরেছে ফজল। হতাশায় ভারাক্রান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে সে ফিরে যায় কাছারি ঘরে। কলসিতে রাখা অজুর পানি দিয়ে পা ধুয়ে সে শুয়ে পড়ে।

    কাঁটাটা বড় যন্ত্রণা দিচ্ছে পায়ে। বরই কাঁটা বোধ হয়। তাই এত ব্যথা করছে। এটা খুলতে না পারলে ঘুম আসবে না আজ। ফজল উঠে হারিকেন ধরায়। কিন্তু কি দিয়ে খুলবে কাটা? নখ দিয়ে সরু করা ম্যাচবাতির কাঠি দিয়ে সে খোঁচায় চামড়ার ওপর। কিন্তু চার পাঁচটা কাঠি ধ্বংস করেও কাঁটার নাগাল পাওয়া যায় না।

    কিসের সামান্য একটু শব্দ শুনে মাথা তোলে ফজল। একটা পাটশলা পুবদিকের জানালা দিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। বাঁ হাতে পাটশলাটা ধরে সে জানালার দিকে তাকায়। একটা হাত আবছায়ার মতো সরে গেল।

    ফজলের মনের বীণায় আনন্দের সুর বেজে ওঠে। আর সেই সুরের সাথে নেচে ওঠে তার দেহের সমস্ত অণু-পরমাণু।

    মনের উল্লাস গোপন করে সে হাসিমাখা মুখে চেয়ে থাকে জানালার দিকে। অনুচ্ছ স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলে, ‘এত রাইতে আর রংটং করণ লাগব না। আসনের ইচ্ছা থাকলে আইসা পড় শিগগির। দেরি করলে কিন্তু কপাটে খিল লাগাইয়া থুইমু।’

    জানালা থেকে দরজার দিকে চোখ ফেরাবার সময় তার নজর পড়ে হাতের পাটশলার দিকে। ওটার আগায় একটা সাদা বেলোয়ারি পুঁতি। পুঁতিটা ধরতেই পাটশলাটার ছিদ্র থেকে বেরিয়ে আসে একটা খোঁপার বেলকুঁড়ি কাঁটা।

    আনন্দের সুর ছাপিয়ে হঠাৎ বেজে ওঠে করুণ সুর। তার মনের গহনে সমাহিত একটা পুরাতন স্মৃতি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ঠিক এমনি একটা খোঁপার কাঁটা দিয়ে তার পায়ের কাঁটা তুলে দিয়েছিল জরিনা।

    সারদা আইনের বছর। বাংলা ১৩৩৬ সাল। সবার মুখে এক কথা–আইন পাশ হয়ে গেলে ছেলে-মেয়ের বিয়ে-শাদি দেয়া মুশকিল হবে। তাই বিয়ের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল দেশে। সদ্যোভূমিষ্ঠ অনেক ছেলে-মেয়েরও বিয়ে হয়েছিল সে সময়। দুই পেটের অজাতশিশুর বিয়ের ঘটকালির নজিরও নাকি আছে প্রচুর। সেই সময়ে ফজলের সাথে বিয়ে হয়েছিল জরিনার। ফজলের বয়স তখন এগারো আর জরিনার দশ। পাঁচ বছর যেতে না যেতেই জরিনা হাতে-পায়ে বেড়ে উঠল। তার সারাদেহে নেমে এল যৌবনের ঢল। আর ফজলের তখন গোঁফের রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। তারপর একদিন। ফজল তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। বার্ষিক পরীক্ষার মাত্র কয়েকদিন বাকি। রাত জেগে পড়া তৈরি করছিল সে। জরিনা ঐ সময়ে ঢুকে পড়েছিল তার পড়ার ঘরে। তার খোঁপা থেকে বেলকুঁড়ি খুলে সে ফজলের পায়ের কাঁটা তুলে দিয়েছিল। কাঁটা তোলার সময় তার পা-টা ছিল জরিনার কোলের ওপর। আর ঐ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেছিল ফজলের বাবা।

    গুরুতর ভাবনায় পড়ে যায় এরফান মাতব্বর। তার মনে হয় সেয়ানা বউটা নষ্ট করে ফেলবে তার আবাত্তি ছেলেটাকে। ছিবড়ে বানিয়ে ফেলবে। আর ওকে দূর না করলে ছেলের পড়াশুনা একেবারেই হবে না। ছেলে বই সামলাবে, না বউ সামলাবে?

    কয়েকদিনের মধ্যে একটা ব্যবস্থা করে ফেলে এরফান মাতব্বর। জরিনাকে আবার বিয়ে দিতে যে খরচ লাগবে সে বাবদ কিছু টাকা সে জরিনার ভাইয়ের হতে গুঁজে দেয়। তারপর একদিন ফজলকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে খেজুরগাছ-কাটা চকচকে ধারালো দা হাতে নিয়ে মাতব্বর গর্জে ওঠে, ‘অ্যাদে ফউজ্যা, ছ্যান দেখছস? তালাক দে, কইয়া ফ্যাল–তিন তালাক বায়েন। তেড়েংবেড়েং করলে তিরখণ্ড কইর‍্যা ফালাইমু।’

    নিতান্ত নিরুপায় ফজল উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়েছিল, ‘তিন তালাক বায়েন।’

    সেদিনই রাগে দুঃখে ফজল বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। নিরুদ্দেশ হয়ে ছিল তিন মাস। সেই থেকে তার লেখা-পড়ারও ইতি ঘটেছিল।

    স্মৃতিটাকে নির্মম শক্তিতে দাবিয়ে দেয় ফজল। আজকের এ আনন্দঘন মুহূর্তে একে কোনো রকম প্রশ্রয় দিতে রাজি নয় তার মন। মৃত অতীত মনের গহ্বরে চাপা পড়ে থাক। পড়ে থাক গহন অন্ধকারে।

    খোঁপার কাঁটাটা দিয়ে ফজল পায়ের কাঁটাটা তুলে ফেলে। আর ওটা তুলবার সময় ছলছল করে তার চোখ দুটো।

    খোঁপার কাঁটাটা দিয়ে পালালো কোথায় রূপজান? সে নিশ্চয় বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আলো জ্বলছে, তাই বোধ হয় সে আসতে লজ্জা পাচ্ছে।

    ফজল হারিকেনটা নিবিয়ে দেয়। ঘুমের ভান করে সে পড়ে থাকে বিছানায় আর মাঝে মাঝে বালিশে চিবুক রেখে দৃষ্টি ফেলে অন্ধকারে অদৃশ্য ভেজানো দরজার ওপর।

    সময় এগিয়ে চলছে। চলছে ফজলের মনের ওপর দিয়ে আশা-নিরাশার মই টেনে। বারবার মাথা তুলতে গিয়ে তার ঘাড়ে ব্যথা ধরে গেছে। ক্লান্ত হয়েছে চোখ দুটো।

    ফজল অস্থির হয়ে ওঠে। চঞ্চল হয় রক্তস্রোত শিরা-উপশিরায়। নিজেকে সে আর বিছানায় ধরে রাখতে পারে না। সে উঠে বসে। মনে মনে ভাবে–রূপজান তো এমনিতেই লজ্জাবতী লতা। এতদিনের অসাক্ষাতে লজ্জার মাত্রাটা হয়তো আরো বেড়ে গেছে। তাকে দেখলে লজ্জায় দৌড় মারবে নাতো সে? নাহ, তাকে কোনো মতেই পালাবার সুযোগ দেয়া যায় না। সে বাইরমুখি দরজার খিল নিঃশব্দে খুলে নিশ্চুপে বেরিয়ে যায়। কাছারি ঘরের পশ্চিম পাশ দিয়ে গিয়ে বেঁকিবেড়ার আড়াল থেকে সে উঁকি মারে। নাহ! রূপজানের আলাঝিলাও দেখা যায় না উঠানে। তবে কি সে কাছারি ঘরের পুবপাশে আছে? পুবদিকের জানালা দিয়েই তো সে পাটশলাটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল।

    ফজল উঠান পার হয়ে ঢেঁকিঘরের উত্তরপাশ ঘুরে পুবপাশ দিয়ে আলগোছে পা ফেলে এগিয়ে যায়।

    একটু দূরেই কাছারি ঘরের পুব পাশে ঘন অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তির আভাস পাওয়া যায়।

    হ্যাঁ, ঐ তো রূপজান বসে রয়েছে। তাকে দেখে পালিয়ে যাবে নাতো আবার! এত চোখপলানি খেলা ভালো লাগে না তার।

    ফজল পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়। কিন্তু রূপজান নড়ছে না তো একটুও! নড়লে আন্দোলিত হতো কালো অন্ধকার। বোধ হয় কাছারি ঘরের দিকে চোখ তার। তাকে ঘর থেকে বেরুতে দেখেনি তো? দেখলে সে এরকম নিশ্চুপ বসে থাকত না। উঠে দাঁড়াত অন্তত।

    ফজল নিঃশব্দে এগিয়ে যায়, পেছন থেকে বেঁধে ফেলে তাকে দুই বাহুর আবেষ্টনীতে।

    মূর্তিটি গা মোচড়ামুচড়ি করে। দুহাত দিয়ে ছাড়াবার চেষ্টা করে নিজেকে।

    ‘আরে এমুন করতেছ ক্যান্?’

    ফজল তাকে পাজাকোলা করে নেয়। চুমোয় চুমোয় ভরে দেয় তার ঠোঁট, দুটি গাল। নিজেকে মুক্ত করবার চেষ্টা করছে না আর সে এখন।

    ফজল তাকে কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিবিড় করে বুকে টেনে নিতে নিতে ফিসফিস করে সে বলে, ‘বাপের বাড়ির ভাতে রস নাই? কেমুন হুগাইয়া গ্যাছ মনে অইতাছে!’

    ‘এই কি! কাঁপতে আছ ক্যান্ তুমি?’ কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করে ফজল।

    প্রেমিকের বুকের সাথে আরো নিবিড় হয়ে মিশে যায় প্রেমিকা। নরম হাত দিয়ে গলা জাপটে ধরে তার। কিন্তু তবুও তার কাঁপুনি থামে না, কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে।

    ফজল তার গালে চুমো এঁকে দিয়ে বলে, ‘কথা কওনা ক্যান, আঁ? তোমারে কি ডরে ধরছে? কিসের ডর আঁ? এত রাইতে আর কেও জাগব না। আর জাগলেই বা কি। আমি কি অন্য মাইনষের বউ লইয়া হুইয়া রইছি?’

    একটু থেমে আবার সে বলে, ‘আইজ ভারি কষ্ট দিছ। খোঁপার কাঁটাডা দিয়া আবার পলাইয়া রইছিলা ক্যান, আঁগো? কি, মুখ বুইজ্যা রইছ যে! একবারও তো জিগাইলা না, কেমুন আছি?’

    এবারও কোনো জবাব পায় না ফজল। বুকের সাথে এক হয়ে মিশে যেতে চাইছে যেন তার প্রিয়া। তার গলায় মুখে সে চুমো দিচ্ছে বারবার।

    ফজলের চঞ্চল রক্ত আরো চঞ্চল হয়ে ওঠে। সারা দেহে জাগে পুলক-শিহরণ। তার ডান হাত কাপড়ের জঞ্জাল সরিয়ে অবতরণ করে প্রিয়ার দেহভূমিতে।

    কিন্তু এরকম লাগছে কেন? এ কোন চরে নেমেছে সে? তাকে কি কানাভুলায় পেয়েছে? পথ ভুলিয়ে নিয়ে এসেছে অন্য চরে?

    সন্দেহ জাগতেই হাতের পাঁচটি খুদে অনুচর একজোট হয়ে জরিপ করতে লেগে যার চরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত।

    তাইতো! এ চরটা তো তার পরিচিতি নয়! এর আকার-আয়তন চড়াই-উত্রাই, হালট ঢালট, খাঁজ-ভাঁজ তার অচেনা।

    ফজল এবার স্পষ্ট বুঝতে পারে এ রূপজান নয়। সে বলে ওঠে, ‘কে? কে তুমি?’

    কোন জবাব পাওয়া যায় না। তার মুখের ভাষা যখন মুক, তখন তার দেহের ভাষা মুখর হয়ে উঠেছে। তার অঙ্গে অঙ্গে সার্বজৈবিক ভাষার কলরব।

    ফজলের ব্যস্ত হাতটি বালিশের তলা থেকে ম্যাচবাতি বের করে। সে কাঠি খুলে ধরাতে যাবে অমনি একটা হাতের ঝটকা খেয়ে তার হাত থেকে ম্যাচবাতিটা ছিটকে পড়ে যায়। কাঠিগুলো শব্দ করে ছড়িয়ে যায় মেঝের ওপর। তার হতভম্ব হাতটি অন্য একটি হাতের আমন্ত্রণে ফিরে যায় কিছুক্ষণ আগের পরিত্যক্ত জায়গায়।

    দুটি কবোষ্ণ ঠোঁট ফজলের ঠোঁটে গালে সাদর স্পর্শ বুলায় বার-বার। তার সারা দেহে সঞ্চারিত হয় বাসনা-বিদ্যুৎ। রক্তে জাগে পরম পিপাসা।

    শয্যাসঙ্গিনী তাকে অনাবৃত বুকের ওপর টেনে নেয়। ফজল বাধা দেয় না বরং এগিয়ে দেয় নিজেকে। সে ভুলে যায় ভাল-মন্দ, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়। ভুলে যায় নিজের নাম পরিচয়। এ মুহূর্তে তার কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই। এখন সে শুধু একটি পুরুষ। তার দেহ অতিথি হয়েছে যে দেহের, তা শুধুই একটি রমণীর। তারও কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই। এ মুহূর্তে পরিচয়ের কোনো প্রয়োজনও বোধ করে না তারা। দুটি নর-নারী। আদিম রক্তবাহী দুটি দেহ। রক্ত-মাংসের অমোঘ দাবির কাছে তারা পরাজয় মানে। এক দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সাথী খুঁজে পায় অন্য দেহে। তারা মগ্ন হয় উচ্ছল আলাপনে, এক হয়ে দোলে তরঙ্গের দোলায়।

    কালো রাত্রি তখন চোখ বুঁজে প্রহর গুনছে।

    ফজল লুঙ্গিটা খুঁজে নিয়ে কোমরে জড়ায়। শুয়ে থাকে বিছানার এক পাশে। কি রকম একটা অশুচিতায় ছেয়ে গেছে তার আপাদমস্তক। পাপ-চিন্তায় বিব্রত তার মন।

    সে সন্তর্পণে চৌকি থেকে নামে। নিঃশব্দে মেঝে হাতড়িয়ে বেড়ায় অন্ধকারে। কিছুক্ষণ খোঁজার পর ম্যাচবাক্সটা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় একটা কাঠিও। সে শিয়রের কাছে এগিয়ে গিয়ে কাঠিটা ধরায়।

    চিৎ অবস্থায় শায়িত তিমির-সঙ্গিনী হকচকিয়ে ওঠে। সে মুখ ঢেকে ফেলে এক হাতের দাবনায়। অন্য হাতে আঁচল টেনে বুক ঢাকে, ঠিকঠাক করে বেশবাস।

    এক হাতে জ্বলন্ত কাঠিটা ধরে ফজল অন্য হাত দিয়ে তার মুখের ওপর থেকে জোর করে হাতটা সরিয়ে দেয়।

    ‘কে! কে!! জরিনা! জরু! জরু!!’

    পলাতক অতীত ফিরে আসে। সাত বছরের বিচ্ছেদ-প্রাচীর ডিঙিয়ে সে অতীত আশ্রয় খোঁজে বর্তমানের বুকে। ফজল নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে জ্বলন্ত কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বিছানায় উঠে সে নিবিড় করে জরিনাকে বুকে টেনে নেয়। সে বুকের ভেতর তোলপাড় করছে আবেগ ও বেদনার বাষ্প।

    পুঞ্জীভূত বেদনা গুমরে মরছে জরিনারও বুকের ভেতর। সেই বুকের দ্রুত ওঠা-নামা অনুভব করতে পারে ফজল। রুদ্ধ কান্না বক্ষপঞ্জর ভেদ করে বুঝি বেরিয়ে আসতে চাইছে।

    সে পরম স্নেহে জরিনার পিঠে, মাথায় হাত বুলায়। বেদনার্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে, ‘জরিনা–জরু–জরু, তুমি এই বাড়িতে কবে আইছ? ক্যান আইছ?’

    জরিনা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার চোখের পানিতে ফজলের কাঁধ ভিজে যায়।

    ফজল শঙ্কিত হয়। এখনই হয় তো গলা ছেড়ে কেঁদে উঠবে জরিনা। সে শাড়ির এক অংশ টেনে নিয়ে তার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘জরিনা, লক্ষ্মীসোনা কাইন্দ না। চলো তোমারে আউগ্যাইয়া দিয়া আসি।’

    জরিনা আরো নিবিড় করে ফজলের গলা জড়িয়ে ধরে। তার ফোঁপানির শব্দ আরো স্পষ্টতর হয়।

    ‘জরু, জরু, অবুঝের মতো কইর‍্য না। কেও টের পাইলে কেলেঙ্কারি অইয়া যাইব।’

    ফজল তাকে টেনে তোলে। বাহুবেষ্টনীতে বেঁধে, মাথায় মুখে সস্নেহে হাত বুলাতে বুলাতে তাকে সে সামনের দরজায় নিয়ে যায়। তারপর দরজা খুলে একরকম জোর করেই তাকে বের করে দেয় সে।

    জরিনা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। ফজল দাঁড়িয়ে থাকে খোলা দরজার মুখে। তার এক হাতে ছিল স্নেহ-প্রীতির স্নিগ্ধ পরশ। আর অন্য হাতে? অন্য হাতে ছিল নিরেট নিষ্ঠুরতা। সে নিষ্ঠুরতা এখন শত হাতে তার বুকে আঘাত হানছে। আঘাতে আঘাতে বেদনার বাষ্প গলে দরদর ধারায় তার দুগাল বেয়ে পড়তে থাকে।

    নিকষ কালো অন্ধকার। জরিনা পা টিপে টিপে ফিরে আসে ঢেঁকিঘরে। বলতে গেলে গেরস্তের ঢেঁকিঘরই তার আশ্রয় আজকাল। ঢেঁকিই তার অন্নদাতা।

    মেঝেতে মাদুর একটা বিছানোই ছিল। সে গিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম আসে না। সে চোখের পাতা বন্ধ করে। আর সাথে সাথেই সক্রিয় হয়ে ওঠে তার মনের চোখ। সে চোখের পাতা নেই। সে চোখ বন্ধ করা যায় না। সে চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতীতের দৃশ্যপট। পটের নিশ্চল ছবিগুলো আবার চলতে শুরু করে একের পর এক।

    একটি মেয়ে। বয়স তার দশ হবে কি হবে না। তাকে ঘিরে বসে গীত গাইছে বোন বেয়ান-ভাবির দল, ‘এমন সোন্দর বইনডি আমার পরে লইয়া যায়।’

    নতুন বাক্স ভরে আসে নতুন শাড়ি-সেমিজ, সোনা-রূপার নতুন গয়না। চাচি-ফুফু খালারাও আসে। তাকে তারা সাজায় মনের মতো করে। আসে সাক্ষী-উকিল। তারা কবুল আদায় করে, শরবত দেয়।

    পরের দিন ভোর বেলা। পালকি আসে উঠানে। মেয়েটিকে কোলের ওপর নিয়ে বসে আছে তার দাদি। কারা সব বলে, ‘যাও, কোলে কইরা লইয়া যাও দেহি কেমনতরো জুয়ান। যাও, নিজের জিনিস, শরম কি?’

    কৌতূহলী মেয়েটি টান দিয়ে সরিয়ে ফেলে বিরক্তিকর লম্বা ঘোমটাটা। একটা ছেলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। ছেলেটি তারই বয়সী বা তার চেয়ে বড়জোর বছর খানেকের বড় হবে। রেশমি আচকান তার পরনে। মাথায় ঝলমলে জরির টুপি।

    দাদির কোল থেকে তাকে তুলবার চেষ্টা করে ছেলেটি। মেয়েটি তাকে হাতের ঝটকায় সরিয়ে দেয়।

    হো-হো-করে হেসে ওঠে উঠানভর্তি লোকজন।

    আবার আসে ছেলেটি। আবার তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় সে। দাদি তার কানে কানে বলে, ‘যাও সোনাবইন। আল্লার নাম লইয়া পালকিতে গিয়া ওড।’

    ‘পালকিতে! এতক্ষণ কও নাই ক্যান্। বারে কি মজা!’

    মেয়েটি দাদির কোল থেকে ঝটকা মেরে বেরিয়ে এক দৌড়ে গিয়ে ওঠে পালকিতে। হাসি আর হাততালির হট্টগোল ওঠে চারদিক থেকে।

    ছেলেটি পালকিতে ওঠে। বসে মেয়েটির মুখোমুখি হয়ে। পালকি চলে। সুর করে সারি গাইতে গাইতে চলছে বেহারারা—

    আল্লা—হা ব-লো

    জোরে—হে চ-লো,

    বিয়া খাইয়া বল অইছে

    জোরে—হে চ-লো,

    ইনাম মিলব দশ টাকা

    হুঁশে—হে চ-লো,

    সামনে আছে কলই খেত

    কোনা—হা কা-টো।

    পায়ের তলে মান্দার কাঁটা

    দেইখ্যা হাঁ-টো।

    বিয়েটা যে কী ব্যাপার, স্পষ্ট কোনো ধারণাই ছিল না জরিনার। বিয়ের দিনের ঘটনা নিয়ে কতজনে কত ঠাট্টা করত তাকে।

    আর স্বামী কাকে বলে তা-ও কি সে জানত তখন! একটা ছবি মনে ভাসতেই হাসি পায় তার।

    ঈদের দিন। ফজল আসে তাদের বাড়িতে। আসে ঠিক নয়। নতুন বাচ্চা জামাইকে সাথে করে নিয়ে আসে তার বাবা। পাশাপাশি খেতে বসে সে ও ফজল। পরিবেশন করে তার মা। ফজলের পাতের দিকে আড়চোখে চেয়ে গাল ফুলিয়ে উঠে পড়ে জরিনা। বলে, ‘আর এক বাড়ির এক ছ্যামড়া আইছে। তারেই কেবুল বেশি বেশি দিতে আছে।’

    জরিনার মা চোখ রাঙায়, ‘এই জরিনা, চুপ।’

    ‘চুপ করমু ক্যান্? ওরে আমার রাঙা মোরগার কল্লাডা দিছ, রান দিছ। আর আমারে দিছ দুইডা আড্‌ডি।’

    ‘এই মাইয়া! ছি! ছি!’ চোখ রাঙায় তার মা।

    ফজল নিজের থালা থেকে রানটা তুলে দেয় জরিনার থালায়।

    জরিনা আবার ফুঁসে ওঠে, ‘ইস! আর একজনের পাতের জুডা খাইতে বুঝিন আক্ কইর‍্যা রইছি আমি।’

    রাতে শয্যাগত বুড়ি দাদি পাশের ঘর থেকে টিপ্পনি কাটে, ‘বিয়ার দিনতো আ কইর‍্যা আছিলি। আধা গেলাশ শরবত হেঁচার মতন এক চুমুকে গিল্যা ফালাইছিলি! নিজের পুরুষের জুডা খাইতে ঘিন্না কিলো আঁ?’

    পরে দাদি তাকে ডেকে নিয়ে পাশে বসিয়ে অনেক কথা বলেছিল, অনেক উপদেশ দিয়েছিল। কি যে সব বলেছিল তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারেনি তখন। তারপরেও তারা দু’জন একসাথে খেলেছে—চোখপলানি, নলডুবি, ঝগড়া করেছে, মারামারি করেছে। তাদের কাণ্ড দেখে হেসেছে বাড়ির লোকজন, আত্মীয়-প্রতিবেশী।

    ফজল ও জরিনা বেড়ে ওঠে। সেই সাথে বেড়ে ওঠে তাদের লজ্জা আর সঙ্কোচ। শেষ হয় একসাথে খেলাধূলা। ফজলকে দেখলেই জরিনার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে সলাজ হাসি। সে দৌড়ে পালায়। ফজলের হাস্যোজ্জ্বল চোখ দুটো পিছু ধাওয়া করে তার।

    কিন্তু লজ্জা ও সঙ্কোচ যত বাড়তে থাকে তত বাড়তে থাকে একজনের প্রতি আর একজনের আকর্ষণ।

    পনেরোয় পা দিয়ে জরিনা গায়ে-গতরে বেড়ে ওঠে লকলকিয়ে। জরিনার শ্বশুর এরফান মাতব্বর চিন্তিত হয়। কারণ মেয়ের অনুপাতে ছেলে বড় হয়নি। আর ফজল তখন স্কুলে পড়ে। এ সময়ে বউয়ের আঁচলের বাও যদি ছেলের গায়ে লাগে একবার, তবে কি আর উপায় আছে? লেখাপড়া একেবারে শিকেয় উঠে যাবে।

    জরিনার বাবা-মা তখন মারা গেছে। তার ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে এরফান মাতব্বর। ঠিক হয়–ফজল ম্যাট্রিক পাশ না করা পর্যন্ত জরিনা ভাইয়ের বাড়িতে থাকবে। সেখানে ফজলও যেতে পারবে না। শুধু উৎসব-পরবে তারা দু-একদিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি যাওয়া-আসা করতে পারবে। ফজল দিঘিরপাড় স্কুলে পড়ত। তার স্কুলে যাওয়ার পথে পড়ত শ্বশুরবাড়ি। তাকে সে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো আট মাইল দূরের নড়িয়া হাই স্কুলে। তার জন্য জায়গিরও ঠিক হলো সেখানের এক বাড়িতে।

    কিছু ফুল যখন পাপড়ি মেলে তখন মধুকর টের পায়। দীর্ঘ পথের বাধা-বিঘ্ন তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। তুচ্ছ মনে হয় কাটার ভয়।

    জরিনা পাশ ফিরে শোয়। স্মৃতি-কোঠার দরজা খুলে যায় আবার। দুপুর বেলা। দাওয়ায় বসে একটি তরুণী ফুল-সুপারি কাটছে। হঠাৎ শোনা যায় হট্টিটির ডাক–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট, টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট।

    বাড়ির পেছনে লটাবন নদীর কিনারা পর্যন্ত বিস্তৃত। ডাকটা আসছে সেদিক থেকে। সে ছাঁচতলা গিয়ে দাঁড়ায়। আবার শোনা যায়–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট। এ ডাকের অর্থ জানে একমাত্র সে-ই। সে বোঝে–একটা হট্টিটি ডাকোছে তার হট্টিটিনীকে।

    সে উঠানে আসে। ভাবি সরষে ঝাড়ছে। ওজন করছে ভাই। সরষে বেচতে হাটে যাবে সে। তাদের চোখের সামনে থেকে জরিনা একটা ভরা বদনা তুলে নেয়। ইচ্ছে করেই একটু পানি ফেলে দেয় ছলাৎ করে। তারপর ছাঁচতলা দিয়ে সে চলে যায় লটাবনে।

    অনেকক্ষণ পরে সে ফিরে আসে। আঁচলের তলায় লুকিয়ে নিয়ে আসে ঝকঝকে নতুন এক ডজন বেলকুঁড়ি কাঁটা।

    জরিনা তার খোঁপায় হাত দেয়। সেই খোঁপার কাঁটার চার-পাঁচটা এখনও টিকে আছে। টিকে আছে এক রাতের এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে।

    ঘটনা নয়, দুর্ঘটনা। আর তার জন্য দায়ী তার দুঃসাহস।

    ফজল পরীক্ষায় পড়া নিয়ে ব্যস্ত। সে সময়ে তার পড়ার ঘরে ঢুকেছিল সে। অত রাত্রে শ্বশুর যে আবার দেখে ফেলবে, কে জানত? কিন্তু কি অন্যায় দেখেছিল সে? কাঁটা তুলতে দেখেছিল ফজলের পা থেকে। এই টুকুইতো!

    জরিনা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। তার মুদিত চোখের পাতা বেঁধে রাখতে পারে না অশ্রুর প্লাবন।

    অনেক আলোর আশীর্বাদ নিয়ে, শিশিরের স্নেহ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল একটি লতা। তাতে ফুটেছিল ফুল যার বুকে ছিল আশার পরাগ, পাপড়ি-পাতায় রঙিন স্বপ্ন। ঐ রাতের দুর্ঘটনায় উৎপাটিত হলো সে লতা। তারপর যে মাটিতে পুঁতে দেয়া হলো তার শিকড়, তাতে না আছে সার না আছে রস।

    হেকমতের চেহারা চোখে ভাসতেই তার সমস্ত সত্তা বিতৃষ্ণায় ভরে যায়। ঘৃণায় কুঁচকে যায় সারা শরীর। হেকমত চোর। সে সিঁদ কেটে চুরি করে। বিয়ের মাস খানেক পরেই চুরির মালসহ ধরা পড়ে সে। তার জেল হয় তিনবছর। খালাস হয়ে আসার কিছু দিন পরেই আবার তার খোঁজ পড়ে। তারপর থেকেই সে ফেরার। চৌকিদার-দফাদারের চোখ এড়িয়ে সে ক্বচিৎ কখনো আসে। একদিনের বেশি থাকে না। কিন্তু তার আসা না আসা সমান কথা জরিনার কাছে। শীতের মেঘের কাছে কে প্রত্যাশা করে বৃষ্টি?

    বৃষ্টি নেই, ছায়া নেই এমনি এক মরুভূমি যেন জরিনার জীবন। উদগ্র পিপাসা বুকে নিয়ে ছটফট করছিল সে বছরের পর বছর। আজ মরুর আকাশে হঠাৎ মেঘ দেখে আকুলি-বিকুলি করছিল তার চাতক-মন। সে আর ধরে রাখতে পারেনি নিজেকে। এ মেঘ যে তার পরিচিত।

    জীবনে একমাত্র ফজলের সাথেই হয়েছিল তার অন্তরঙ্গ পরিচয়। সে-ই তার জীবনের প্রথম পুরুষ। বিকাশোম্মুখ সে পুরুষটি এখন পূর্ণবিকশিত। সে লাভ করেছে পূর্ণ যৌবন। যেমন হয়েছে সে দেখতে সুন্দর, তেমনি হয়েছে বলিষ্ঠ। তার অঙ্গে প্রত্যঙ্গে শক্তির সজীবতা। আজকের সান্নিধ্যের অপূর্বতায় তা স্পষ্ট অনুভূত। এর কাছে হেকমত কি? সে একটা অপদার্থ পুরুষ। তার যৌবন নেই, আছে শুধু যৌবনের পায়তারা যা শুধু হাস্যকর নয়, অসহ্য। তার কোমরে লুঙ্গির প্যাঁচে গোঁজা থাকে একটা সোডার পুটলি সব সময়। পিত্তশূলের ব্যথা উঠলেই এক খাবলা মুখে দিয়ে সে মরার মতো পড়ে থাকে বিছানায়।

    জরিনা চোখ মেলে। ফিকে জোছনায় জমাট অন্ধকার তরল হয়েছে কিছুটা। বিছানায় পড়ে থাকতে আর ভাল লাগে না তার। সে উঠে টেঁকির ওপর গিয়ে বসে কাতলা হেলান দিয়ে।

    এতক্ষণ বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেক পানি ঝরিয়েছে তার চোখ। এখন কিছুটা শান্ত হয়ে সে অনুভব করতে পারে, তার অন্তরের বেদনার সাথে মিশে আছে আজকের সফল অভিসারের আনন্দ। তখনই তার সারা দেহ-মনে নতুন করে সঞ্চারিত হয় তৃপ্তির অনুভূতি। সুখের আবেশে ঢেঁকির কাতলা দুটোকে সে জড়িয়ে ধরে দুহাতে। এই মুহূর্তে সব কিছুই তার কাছে আপন মনে হয়। এই নিঝ্‌ঝুম রাত্রিকেও মনে হয় একান্ত আপন।

    মনের আঁধারে বাসনার চামচিকেটা আবার পাখা মেলতে চায়। তাকে আর আটকে রাখতে পারছে না জরিনা। সে ঝাঁপ সরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায়।

    কৃষ্ণা নবমীর চাঁদ পূর্বদিগন্ত ছাড়িয়ে উঠে গেছে অনেকদূর। ক্ষয়িষ্ণু প্রতিবেশীর আগমনে সচকিত হয়ে উঠেছে আকাশের লক্ষ কোটি তারা। হয়ত বা বিদ্রুপের হাসি হাসছে। ঝিরঝিরিয়ে বইছে শরতের স্নিগ্ধ বাতাস। যেন ঘুমন্ত পৃথিবীর নিশ্বাস-প্রশ্বাস।

    মোহময়ী এ রাত। এমন লজ্জাহারিণী আশ্রয়দায়িনী রাতটা পলে পলে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। এমন প্রীতিময়ী রাত তার জীবনে আর আসবে না কোনো দিন। এ রাতের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান।

    জরিনা সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে উঠানের দিকে পা বাড়ায়। এ রাতের একটি মুহূর্তকণাও সে বিফলে যেতে দেবে না।

    উঠানে পা দিয়েই তার দৃষ্টি হঠাৎ থমকে যায়। একটা ছায়ামূর্তি–নারীমূর্তি ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে কাছারি ঘরের দিকে। ভেজানো দরজা ঠেলে মূর্তিটা ঢুকে পড়ে ঘরে। তার খিল এঁটে দেয়ার অস্পষ্ট শব্দ বিকট আঘাত হানে জরিনার বুকে। তার আহত আশা আক্রোশে কাঁপে, ফণা বিস্তার করে।

    সে ঢেঁকিঘরের বেড়া ধরে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর একপা-দু’পা করে এগিয়ে যায় কাছারি ঘরের দিকে। পশ্চিম পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। পুব দিকের জানালা দিয়ে চাঁদের ক্ষীণ আলোর রেশ এসে পড়ছে ঘরের ভেতর। ঘরের ঘন অন্ধকার তাতে হালকা হয়েছে কিছুটা।

    জরিনা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় নিশ্চুপে। ফিকে অন্ধকার ভেদ করে দৃষ্টি চলে তার। স্পষ্ট দেখা যায় না কিছুই শুধু রেখাচিত্র, ছায়া-অভিনয়। অস্পষ্ট ছবিগুলো তার কল্পনার তুলিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার শিরা-উপশিরায় দ্রুত আনাগোনা করে একটা উষ্ণ প্রবাহ। রোমাঞ্চিত হয় তার সারা অঙ্গ। তার চোখ নেমে আসে আপনা থেকেই।

    জরিনা ঢেঁকিঘরে ফিরে আসে। তার বুকের মধ্যে অশান্ত চামচিকের পাখা ঝাঁপটানি। কিছুতেই ওটা থামছে না। সে রান্নাঘরে গিয়ে ঢকঢক করে পানি খায়। পানি দিয়ে যেন ভিজিয়ে দিতে চায় চামচিকের অস্থির ডানা দুটো। কিন্তু থামাতে পারছে না।

    সে বিছানায় শুয়ে ছটফট করে। আবার উঠে গিয়ে মাথায় পানি দেয়। সারা দেহে অসহ্য দাবদাহ। এ দাহ কিসে শান্ত হবে?

    অনেকক্ষণ কেটে গেছে। রাত আর বেশি নেই। নিজের অজান্তেই উঠে দাঁড়ায় জরিনা । এগিয়ে চলে যন্ত্রচালিতের মত। কাছারি ঘরে গিয়ে বসে চৌকির পাশে।

    ফজল বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। অন্ধকারের আবরণে ঢাকা তার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে জরিনা। হাত বুলায় তার কপালে, মাথায়। ঘুমের ঘোরে ফজল হাত বাড়ায় তার দিকে। হাতটা তুলে নেয় জরিনা। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে ফজল ডাকে, ‘রূপজান, রূপজান।’

    জরিনা তার মাথা রাখে ফজলের বুকে। হঠাৎ ফজলের ঘুম ভেঙে যায়।

    ‘আমার রূপজান!’

    জরিনা সাড়া দেয় না। ফজল ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। অনুচ্চ স্বরে বলে, ‘ও তুমি! আবার আইছ! তুমি নিজে তে জাহান্নামে যাইবাই, আমারেও নিয়া ছাড়বা।’

    একটু থেমে আবার বলে, ‘জরিনা, তুমি অন্যের বউ। তোমার গায়ে আমার আঙুলের একটু ছোঁয়া লাগলেও পাপ অইব।’

    জরিনা তার পায়ে মাথা কুটতে থাকে। ফজল পা সরিয়ে নেয়। সে উঠে দাঁড়ায়, জরিনাকে টেনে তোলে। বলে, ‘জরিনা যাও। আর কোনো দিন আইও না। তুমি আর আমার কেউ না।’

    ‘কেউ না!’ অস্ফুট কথা জরিনার আর্তনাদের মতো শোনায়। সে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

    জরিনা চলে গেছে। সে আর কেউ নয় ফজলের। তবুও এমন হাহাকার করে উঠছে কেন, ব্যথায় ভরে উঠছে কেন তার বুকের ভেতরটা?

    এ হাহাকার, এ ব্যথা কখন থামবে, কিসে থামবে?

    ফজল ভাবে, রূপজান কাছে থাকলে এ হাহাকার উঠবে না আর। দূর হবে মনের সব দুঃখ-ব্যথা।

    ভোর হতে না হতেই ফজল কাদিরকে ডেকে আনে পাশের বাড়ি থেকে। বলে, ‘তোমার বু’রে লইয়া যাইতে চাই। মিয়াজিরে গিয়া কও।’

    ‘দুদু কি রাজি অইব?’

    ‘রাজি অইব না ক্যান্? তোমার বু’তো আমার লগে যাওনের লেইগ্যা তৈয়ার।’

    কাদির বাড়ির ভেতর যায়। ফিরে আসে অল্পক্ষণ পরেই। আরশেদ মোল্লা যা বলেছে, কাদির এসে কোনো রকম ঢাকা-চাপা না দিয়ে তাই বলে, ‘দুদু কয়, মাইয়ার গয়নাগুলা তো বেইচ্যা খাইছে বেবাক। আবার শুরু করছে মাছ-বেচা। এই জাউল্যা বাড়ি আমার মাইয়া দিমু না।’

    ‘দিব না কি করব? মাইয়াখান সিন্দুকে ভইরা রাখব? তোমার দুদুরে কইও, একদিন এই জাউল্যা ভাগাইয়া লইয়া যাইব ভদ্রলোকের মাইয়ার। তখন ইজ্জত লইয়া টান পড়ব, কইয়া রাখলাম আমি। এখন চলাম। তোমার ডিঙি দিয়া আমারে দাত্রার চরে নামাইয়া দিয়া আসো।’

    ‘দেরি করেন দুলাভাই, নাশতা খাইয়া–’

    ‘উঁহু। তুমি জলদি ডিঙি লইয়া ঘাটে আসো।’

  • মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন সৃষ্ট একটি কাহিনী-চরিত্র। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ধ্বংস পাহাড় প্রচ্ছদনামের প্রথম গ্রন্থটি থেকে শুরু করে সেবা প্রকাশনী থেকে মাসুদ রানা সিরিজে এই চরিত্রকে নিয়ে চার শতাধিক গুপ্তচরবৃত্তীয় কাহিনীর বই প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজের প্রথম দুইটি বই মৌলিক হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার বইয়ের ভাবানুবাদ বা ছায়া অবলম্বনে রচিত হওয়া বইয়ের আধিক্য দেখা যায়। তবে আরও কিছু মৌলিক বই বের হয়েছিল। মাসুদ রানার চরিত্রটিকে মূলত ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সৃষ্ট জেমস বন্ড চরিত্রটির বাঙালি সংস্করণ হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন লেখক। কিন্তু বর্তমানে সিরিজটি বাংলা বই এর জগতে স্বকীয় একটি স্থান ধরে রেখে পথ চলছে।

    চরিত্র পরিচয়

    “বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। বিচিত্র তার জীবন। অদ্ভুত রহস্যময় তার গতিবিধি। কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর সুন্দর এক অন্তর। পদে পদে তার বিপদ-শিহরন-ভয় আর মৃত্যুর হাতছানি।”

    আকর্ষণীয় বিষয়াবলী

    1. মাসুদ রানার প্রকাশিত ৪০০টি বইয়ের কোনটিতেই তার মায়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
    2. রানাকে নিয়ে বিস্মরণ বইটির কাহিনী অবলম্বনে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাসুদ রানা তৈরি হয় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে। ছবির পরিচালক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)।
    3. বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটক প্রাচীর পেরিয়ে তৈরি হয় মাসুদ রানার কাহিনী পিশাচ দ্বীপ অবলম্বনে, যার চিত্রনাট্য লেখেন আতিকুল হক চৌধুরী। মাসুদ রানা এবং সোহানা চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে নোবেল এবং বিপাশা হায়াত।
    4. মাসুদ রানার ধ্বংস পাহাড় বইটির উর্দু সংস্করণ বের হয়, যার নাম ছিলো মউত কা টিলা।
    5. মাসুদ রানা সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর, এবং কাল্পনিক সংস্থা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর সদস্য, এবং তার সাংকেতিক নাম MR-9। এছাড়া রানা এজেন্সি নামক একটি গোয়েন্দা সংস্থাও রানা পরিচালনা করে থাকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে তথা ১৯৭১-এর আগের বইগুলোতে সংস্থাটির উল্লেখ থাকতো পি.সি.আই বা “পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স” হিসেবে।

    সহায়ক চরিত্রসমূহ

    মাসুদ রানার সহায়ক চরিত্রে প্রথমেই মেজর জেনারেল রাহাত খানের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (বিসিআই) এর প্রধান। তারই তত্বাবধানে রানা নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া তার কাজে সহায়তা করে থাকে সোহেল, সলিল, সোহানা, রূপা, গিলটি মিয়া প্রমুখ চরিত্রও। সাগর-সঙ্গম বইটি লিখতে গিয়ে কোনো এক বই থেকে কাছাকাছি একটা চরিত্র পেয়ে সেটাকেই কাহিনীর উপযোগী করে বসাতে গিয়ে লেখক নিজের অজান্তেই তৈরি করে ফেলেছেন গিলটি মিয়া চরিত্রটিকে। চরিত্রটির বাচনভঙ্গি তিনি তার মায়ের থেকে পেয়েছেন, যিনি হুগলির মানুষ হলেও কলকাতা শহরে বড় হয়েছিলেন। তারই মুখের ভাষা একটু অদলবদল করে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন গিলটি মিয়ার মুখে। সিরিজের ‘সোহেল’ চরিত্রটি খানিকটা জেমস বন্ডের বন্ধু ফিলিক্স লেইটারের আদলে গড়া। ‘সোহানা’ হলো লেখকের কল্পনার বাঙালি মেয়ে।

    এছাড়া মাসুদ রানার চিরশত্রুদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য হলো বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরী, উ সেন প্রমুখ। ‘কবীর চৌধুরী’ এসেছে সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা সিরিজের চরিত্র থেকে।

    চরিত্রের ছায়া

    1. মেজর জেনারেল রাহাত খান: প্রখ্যাত সাংবাদিক রাহাত খানকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
    2. মাসুদ রানা: নাম দেওয়া হলো লেখকের বন্ধু গীতিকার মাসুদ করিম ও মেবারের রাজা রানা প্রতাপ সিংহের নাম মিলিয়ে।

    আলোচিত শত্রু

    কবীর চৌধুরী: মাসুদ রানা সিরিজের ‘ধ্বংসপাহাড়’ বই প্রথম কবীর চৌধুরীর আবির্ভাব দেখা যায়। কবীর চৌধুরী খলচরিত্র হিসেবে বেশ প্রভাবশালী। বিজ্ঞান আর মানবতা নিয়ে তার ভাবনার কথা জানা যায়। গবেষনামুখী চরিত্র কবীর চৌধুরী। সুলতা রায়ের সঙ্গে রানার বিয়ে না হাওয়া, অনীতা গিলবার্ট আর সোহানা চৌধুরীকে রানা কাছ থেকে সরিয়ে দেন কবীর চৌধুরী। বইসমূহ: ধ্বংসপাহাড়, রানা! সাবধান!!, নীল আতংক : ১, ২, শয়তানের দূত, ব্ল্যাক স্পাইডার : ১, ২, পাগল বৈজ্ঞানিক, পালাবে কোথায় : ১, ২, প্রেতাত্মা : ১, ২, জিম্মি, নকল রানা : ১, ২, স্পর্ধা : ১, ২, মরণকামড় : ১, ২, আবার সেই দুঃস্বপ্ন : ১, ২, সেই পাগল বৈজ্ঞানিক, ভাইরাস x-99, মুক্তিপণ, চীনে সংকট, অশুভ প্রহর, কনকতরী, মহাবিপদ সংকেত, অন্ধকারের বন্ধু, শয়তানের দ্বীপ।

    কাহিনী সংগ্রহ

    মাসুদ রানার অধিকাংশ কাহিনীই বিভিন্ন বিদেশী লেখকের বই থেকে ধার করা। এলিস্ট্যার ম্যাকলীন (Alistair MacLean), রবার্ট লুডলাম (Robert Ludlum), জেমস হেডলি চেজ (James Headley Chase), উইলবার স্মিথ (Wilber Smith), ক্লাইভ কাসলার (clive cussler), ফ্রেডরিক ফরসাইথ(frederick forsyth)-সহ বহু বিদেশী, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যিকের লেখা কাহিনী থেকে ধার করে মাসুদ রানার কাহিনী লেখা হয়।

    কখনও কোনো বই বিদেশী কোনো একক বই থেকেই অনুবাদ করা হয়, আবার কখনও একাধিক বই মিলিয়ে লেখা হয়। যেমন: সিরিজের তৃতীয় বই স্বর্ণমৃগ লেখা হয়েছিলো ইয়ান ফ্লেমিঙের ৩টি কাহিনীর সহায়তা নিয়ে -লিভ অ্যান্ড লেট ডাই, গোল্ড ফিঙ্গার ও অন হার ম্যাজেস্টি’য সিক্রেট সার্ভিস। একাধিক বই থেকে লেখার ক্ষেত্রে প্রথমে যেখানে যেমনটা দরকার একটা কাঠামো তৈরি করে নিয়ে মাসুদ রানার উপযোগী অংশটুকু বইগুলো থেকে নেয়া হয়। তবে একক বই থেকে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে এমন অনেক কাহিনীও পাওয়া যায় যেগুলো সাধারণত তেমন একটা পরিবর্তনের দরকার হয় না।

    ইতিহাস

    ১৯৬০ – এর দশকে কাজী আনোয়ার হোসেনের কুয়াশা সিরিজ চলছিলো সেবা প্রকাশনী থেকে। তখন জনৈক মাহবুব আমিনের সমালোচনায় তিনি থ্রিলার সিরিজ সম্বন্ধে বৈশ্বিক একটা ধারণা লাভ করেন। মাহবুব আমিনই আনোয়ার হোসেনকে ডক্টর নো বইটি উপহার দিলে আনোয়ার হোসেন নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ পান এবং মাহবুব আমিনের প্রেরণায় ছাপতে শুরু করেন মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই ধ্বংস-পাহাড়। সেই বইটি লেখা হয়েছিলো লেখকের সেগুনবাগিচার বাসার দোতলায় বসে। বইটি লিখতে ৮-৯ মাসের মতো লেগেছিলো। লেখক, প্রথমে খসড়া একটা প্লট সাজিয়েছিলেন: ‘কুয়াশা’ সিরিজের আদলে, এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কাপ্তাই শহরের কাছে একটা পাহাড়ের ভেতর অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি নিয়ে গোপন গবেষণা করছিলো। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে বিশাল লেকের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়টা। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো পাকিস্তানের কোনো শত্রু দেশের সরবরাহ করা শক্তিশালী ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেবে বাঁধটা। আর সেটা ঠেকাবে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট মাসুদ রানা। এই প্লটকে বাস্তবসম্মত করতে লেখক স্বয়ং ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কাপ্তাই, কক্সবাজার প্রভৃতি স্থানে। একাজেই ব্যয় দীর্ঘ একটা সময়। সমস্যা দেখা দিলো তৎকালীন বাংলাদেশে এরকম ঢঙে লেখার চল ছিল না বাংলা ভাষায়, থ্রিলার ধারণ করার উপযোগী ভাষাও শিখতে লাগলেন ঠেকে ঠেকে, প্রয়োজনেই তৈরি করে নিতে হয়েছিলো লেখকের নিজস্ব একটা ধরন। শেখ আবদুল হাকিম তাই নিজের লেখায় ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না, বারবার কাটাকাটি করে পাণ্ডুলিপির চেহারাটাই বিগড়ে দিলেন। তৃতীয়বার পরিষ্কার করে আবার লিখলেন গোটা কাহিনীটাই। শেষ পর্যন্ত নিজের অসন্তুষ্টি নিয়েই ছাপার জন্য প্রেসে দিয়েছিলেন, এমনকি প্রুফ রিড করার সময়ও প্রচুর সম্পাদনা করেছিলেন লেখক। এমনকি প্রকাশিত অবস্থায় হাতে পাওয়া বইটিতেও লেখক নিজে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যদিও পাঠক ঠিকই সাদরে গ্রহণ করে নেয় মাসুদ রানাকে।

    রানা’র চেহারার ক্ষেত্রে লেখক চেয়েছিলেন পাঠকই নিজেকে রানা’র জায়গায় বসিয়ে ভাবুক, তাই তিনি রানা’র চেহারার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা দেননি। প্রথম দিককার বইগুলোতে ভারতীয় গোয়েন্দা কাহিনীর প্রভাব লেখক যে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা নয়। তবে কয়েকটি বই লেখার পাশাপাশি অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, ডেসমন্ড ব্যাগলি, হ্যামন্ড ইনস, ফ্রেডেরিক ফোরসাইথ, পিটার বেঞ্চলি, কেন ফোলেট, ক্লাইভ কাসলার, এডওয়ার্ড এস আরনস, কলিন ফর্বস, জেরার্ড ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক হিগিন্স, এ জে কুইনেল, জিওফ্রি জেনকিনস, উইলবার স্মিথ প্রমুখ বড় বড় থ্রিলার লেখকের বই পড়তে পড়তে রানার চরিত্র ক্রমেই আলাদা রূপ পেতে শুরু করে।

    নামকরণ

    মাসুদ রানা’র নামকরণ করা হয় দুজন বাস্তব মানুষের নামের অংশ মিলিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন তার স্ত্রী, আধুনিক সংগীতশিল্পী ফরিদা ইয়াসমিনের সাথে পরামর্শ করে নামটি নির্বাচন করেন। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন:

    “আমাদের দুজনেরই বন্ধু স্বনামধন্য গীতিকার মাসুদ করিমের ‘মাসুদ’ আর আমার ছেলেবেলার হিরো (নায়ক) ইতিহাসে পড়া মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংহ থেকে ‘রানা’ নিয়ে নাম হলো মাসুদ রানা।”

    ক্রান্তিকাল

    কখনও কখনও এমনও হয় যে, মাসুদ রানা সিরিজ বন্ধ হবার উপক্রম হয়। প্রথমবার এমনটা হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীন হবার আগে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রানার স্বর্ণমৃগ বইটি নিষিদ্ধ (ban) করেছিলো, লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন এতে চ্যালেঞ্জ করায় গোটা সিরিজই বন্ধ করে দেওয়ার জোগাড় করেছিলেন ক্ষুব্ধ এক সরকারি কর্মকর্তা। দ্বিতীয়বার, মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন জন টেলিফোনে হুমকি দিতে শুরু করেছিলো, কেননা স্বাধীনতার আগে ভারত কেবল একটা দেশ থাকলেও যুদ্ধের সময়কার অন্যতম মিত্র দেশ ভারত, স্বাধীনতার পরে নিকটবর্তী বন্ধু দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। এতে সিরিজের প্রথম দিককার বইগুলোতে ভারতকে শত্রুপক্ষ করে সাজানো কাহিনীগুলো সাধারণ্যের রোষানলে পড়ে। তখন সেবা’র কর্ণধার বাধ্য হয়ে প্রথম দিককার কয়েকটি বই থেকে ভারতবিরোধী অংশগুলো বর্জন করে নেন, এমনকি ২টি বই পুণর্লিখনও করা হয়েছিলো। তৃতীয়বার, প্লট সংকটের কারণে আটকে গিয়েছিলো সিরিজটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর (১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে) কোনো দেশ আর বাংলাদেশের শত্রু রইল না, অথচ শত্রুদেশ ছাড়া গুপ্তচর-কাহিনী হয় না। সেটা সামাল দেয়ার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরে রানা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি খুলে গুপ্তচরবৃত্তির পাশাপাশি সিরিজটিতে গোয়েন্দা, অ্যাডভেঞ্চার, ট্রেজার-হান্ট, এমনকি বিজ্ঞানকল্প ও পিশাচ কাহিনী টেনে আনা হয়েছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিমা লেখকরা যখন শত্রু হারিয়ে দিশেহারা, উপায়ান্তর না দেখে রানা সিরিজও খাঁটি গুপ্তচরবৃত্তি থেকে সরে এসে হয়ে পড়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতির আদলে চলতে শুরু করে।

    ভ্রান্তি

    মাসুদ রানা সিরিজের ক্রিমিনাল বইটি বের হওয়ার পর দেখা গেলো যে, ঐ একই কাহিনী নিয়ে আগেই বন্দী গগল নামে একটি বই বেরিয়েছিলো। এধরনের ভুল এই সিরিজে একবারই হয়েছিল।

    বিভিন্ন মাধ্যমে মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা চরিত্রটি নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় মাসুদ রানা সিরিজের ‘বিস্মরণ’ অবলম্বনে, ১৯৭৩ সালে। আর ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। পরিচালনায় ছিলেন মাসুদ পারভেজ তথা পরবর্তীকালের জনপ্রিয় অভিনেতা সোহেল রানা। তার পরিচালিত প্রথম ছবি এটি। বিশ বছরের বেশি সময় পর পরবর্তীকালে লেজার ভিশনের ব্যানারে এই চলচ্চিত্রটি ডিভিডি আকারে বাজারে আসে। বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে প্রথম প্যাকেজ নাটক প্রাচীর পেরিয়ে এর কাহিনী রচনা করা হয় শেখ আবদুল হাকিম রচিত মাসুদ রানা সিরিজের পিশাচ দ্বীপ নামক বই থেকে। কাহিনীর নাট্যরূপ প্রদান করেন আতিকুল হক চৌধুরী। ১৯৯৪ সালে প্রচারিত এই নাটকটিতে মাসুদ রানার ভূমিকায় অভিনয় করেন জনপ্রিয় মডেল তারকা নোবেল আর তার বিপরীতে সোহানার ভূমিকায় অভিনয় করেন বিপাশা হায়াত। খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন কে. এস. ফিরোজ।

    সমালোচনা

    মাসুদ রানা সিরিজটি সাধারণ বাঙালি পাঠকের ঘরে যে একেবারে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে, তা কিন্তু নয়। ষাট দশকের শুরুতে মাসুদ রানা সিরিজের বইয়ে উল্লেখিত নর-নারীর বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতাশ্রয়ী সম্পর্কের বিবরণ পাঠকসমাজকে কিছুটা হলেও থমকে দিয়েছিলো। প্রথম দিকে এমনটাই হয়েছিলো যে, ‘প্রজাপতি’ মার্কাওয়ালা বইগুলো পড়াই নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো বাঙালি সমাজে। যারা এসকল পেপারব্যাক বই পড়তো, তাদেরকেও খারাপ নজরে দেখা হতো। বর্তমানে ইন্টারনেটের দৌলতে মাসুদ রানা সিরিজ ভারতের বাঙালীদের ভেতরেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

    মাসুদ রানা’র প্রতি নানাভাবে সমালোচনা শুরু হলে সেবা প্রকাশনী প্রথমবারের মতো বইয়ের শেষে “আলোচনা” বিভাগ চালু করে। যাতে লেখকের বক্তব্য থেকে সমালোচনাগুলোর জবাব দেয়া সম্ভব হয়। সমালোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে যেমন ছিলো কাহিনী ধার করে লেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনি ছিলো কোনো চরিত্রের মৃত্যুজনিত অতি ঠুনকো বিষয়, কেননা বইয়ের কোনো প্রিয় চরিত্রের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করা হতো লেখককে। চরিত্রের মৃত্যুজনিত বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিলো খোদ রানা’র মৃত্যুতে। অগ্নিপুরুষ বইটিতে মাসুদ রানা, নেপল্‌সের কারাদারেলি হাসপাতালে মারা যায় এবং তাকে কবর দিয়ে দেশে ফেরেন অন্য চরিত্র, মেজর জেনারেল রাহাত খান। অবশ্য পরে লেখক তা কাটিয়ে ওঠেন সামান্য একটি সুযোগ পেয়ে গিয়ে; কারণ ঐ কাহিনীর শেষাংশে রাতের আঁধারে রানার মতো দেখতে এক লোককে পুলিশের লঞ্চ থেকে গোজো দ্বীপে নামতে দেখে পাঠক হয়তো রানা মারা যায়নি মনে করে আশান্বিত হোন।

    লেখকস্বত্ব নিয়ে বিতর্ক

    ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের লেখক হিসাবে কাজী আনোয়ার হোসেনের নাম প্রকাশিত হলেও, শেখ আবদুল হাকিম এবং ইফতেখার আমিন নামে দুইজন লেখক নিজেদের এর মূল লেখক হিসেবে দাবি করেছেন এবং স্বত্ব ও রয়্যালটি দাবি করে তারা কপিরাইট রেজিস্টার অফিসে অভিযোগ করেছেন। শেখ আবদুল হাকিম কপিরাইট অফিসে অভিযোগ করেছেন, এ পর্যন্ত কুয়াশা সিরিজ ও মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি বই তিনি লিখেছেন। অপরদিকে ইফতেখার আমিন দাবি করেছেন মাসুদ রানা সিরিজে তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ৫৮টি।

    লেখকস্বত্ব নিয়ে বিতর্কের অবসান

    ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শেখ আব্দুল হাকিম ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে স্বত্ব বা মালিকানা দাবি করে সেবা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কপিরাইট আইনের ৭১ ও ৮৯ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দাখিল করেন।

    এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইনি লড়াই শেষে ২০২০ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে দাবি করা মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি এবং কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে স্বত্ব পেতে যাচ্ছেন শেখ আবদুল হাকিম।

    বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রায়ে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু সমাধান ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে কপিরাইট বোর্ড বা বিজ্ঞ আদালত থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবেদনকারীর দাবি করা ও তালিকাভুক্ত বইগুলোর প্রকাশ বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য প্রতিপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হলো। এছাড়া প্রতিপক্ষকে আবেদনকারীর কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করা প্রকাশিত বইগুলোর সংস্করণ ও বিক্রিত কপির সংখ্যা এবং বিক্রয় মূল্যের হিসাব বিবরণী এ আদেশ জারির তারিখের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

    এ বিষয়ে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘শেখ আবদুল হাকিমের দাবি করা ২৬০টি মাসুদ রানার বইয়ের মধ্যে একটি এবং কুয়াশার ৫০টি বইয়ের মধ্যে ছয়টিতে লেখক হিসেবে তার নামে কপিরাইট করা আছে। বাকিগুলোর কপিরাইট করা নেই। তবে সেগুলো তার লেখা এটি তিনি প্রমাণ করেছেন। তবে কপিরাইট অন্তর্ভুক্তির কারণে তাকে প্রতিটি বইয়ের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে। এরপর প্রতিটি বইয়ের লেখক হিসেবে তার নাম যাওয়ার পাশাপাশি, কপিরাইটও তার হয়ে যাবে।’

    তিনি বলেন, ‘কাজী আনোয়ার হোসেন চাইলে অবশ্যই আমাদের এ রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারবেন। তা অবশ্যই ৯০ দিনের মধ্যে। এখানে তিনি হেরে গেলে, হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন।’

    কপিরাইট অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শেখ আবদুল হাকিম অভিযোগ করার পর অভিযোগকারী ও প্রতিপক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতিতে ওই বছরের ১১ ও ৩০ সেপ্টেম্বর এবং ৪ নভেম্বর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে উভয়পক্ষ সপক্ষে নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেন। দাখিল করা অভিযোগের বিষয়ে প্রতিপক্ষ লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন। প্রতিপক্ষের লিখিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাদী পুনরায় সপক্ষে লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করেন। পরবর্তীতে অভিযোগকারীর দাখিল করা যুক্তির বিষয়ে প্রতিপক্ষ পুনরায় লিখিত যুক্তিতর্ক পেশ করেন।

    বিষয়টি বেশ জটিল এবং দেশের প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে লেখক ও প্রকাশকের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে, এর সন্তোষজনক ও সুষ্ঠু সমাধানের উদ্দেশ্যে উক্ত অভিযোগের বিষয়ে এদেশের বিখ্যাত ও প্রথিতযশা কয়েকজন লেখক ও প্রকাশক এবং সেবা প্রকাশনীর সাবেক ব্যবস্থাপকের লিখিত মতামত চাওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন লেখক বুলবুল চৌধুরী ও শওকত হোসেন, প্রখ্যাত শিল্পী হাসেম খান এবং সেবা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক ইসরাইল হোসেন খান। তাদের লিখিত মতামতের ওপর ভিত্তি করেই রোববার রায় দেওয়া হয়েছে।

    কপিরাইট অফিসের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। শুনানি শেষে ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ১৪ জুনের ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে রুল জারি করেন। পরবর্তীতে কাজী আনোয়ার হোসেনের করা রিট ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আদালত খারিজ করে দেন। এর ফলে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বই এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের স্বত্ব পান প্রয়াত লেখক শেখ আবদুল হাকিম। কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষের আইনজীবী হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানান।

    সিরিজের বই

    সেবা প্রকাশনী কর্তৃক মাসুদ রানা সিরিজে এই পর্যন্ত মোট ৪৬৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে বইগুলিতে মোট ৩২০টি গল্প আছে (অনেক বইয়ের দুটি, এমনকি তিনটি ভলিউম থাকায় এমনটি হয়েছে)

    চলচ্চিত্র

    1. মাসুদ রানা (১৯৭৪) : ১৯৭৪ সালে মাসুদ রানার কাহিনী নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। যার পরিচালক ছিলেন মাসুদ পারভেজ।
    2. মাসুদ রানা : মাসুদ রানা সিরিজ নিয়ে জাজ মাল্টিমিডিয়া একটি চলচ্চিত্র নির্মান করছে। একটি আপাতবাস্তব টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মাসুদ রানার চরিত্র খুঁজে বের করা হবে। চলচ্চিত্রটির বাজেট ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি বাজেটের চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির ৫০ শতাংশ হবে হলিউডে, ৪০ শতাংশ হবে বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে। আর বাকি ১০ শতাংশ থাইল্যান্ড বা এমন এলাকাগুলোতে। চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফার এবং পরিচালক প্রায় সবাই হলিউডের। অমিতাভ রেজা চৌধুরীও চলচ্চিত্রটির সাথে যুক্ত থাকবেন।

    তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া।

  • ধ্বংস পাহাড়

    ধ্বংস পাহাড়

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    [book]

    এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কবির চৌধুরী কাপ্তাই শহরের কাছে একটা পাহাড়ের ভেতর আলট্রা সোনিকস (অতিশব্দ) এবং অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি নিয়ে গোপন গবেষণা করছিলেন। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে বিশাল লেকের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়টা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের কোন শত্রু দেশের (ভারত) সরবরাহ করা শক্তিশালী ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেবেন বাঁধটা। আর সেটা ঠেকানোর দায়িত্ব পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট মাসুদ রানার উপর।

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    প্রথমেই বলে রাখি, এই বই বড়দের জন্যে লেখা।

    বাংলা সাহিত্যে রহস্যোপন্যাস বলতে বোঝায় কেবল ছোট ছেলে মেয়েদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কেনা এক ধরনের উদ্ভট গল্পের বই, যা হাতে দেখলে বাবা, কাকা, ভাইয়া এবং মাস্টার মশাই প্রবল তর্জন গর্জন করে কেড়ে নিয়ে নিজেরাই পড়তে লেগে যান, গোপনে।

    কেন পড়েন?

    কারণ এর মধ্যে এমন এক বিশেষ রস আছে যা প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা সুসাহিত্য বলি তার মধ্যে সাধারণত পাওয়া যায় না। তাই ছোটদের বই থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে, আংশিক হলেও, আনন্দ লাভ করেন বড়রা।

    কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশেষ করে ছোটদের জন্যে লেখা বলে এসব বইয়ে ছেলেমানুষির এতই ছড়াছড়ি থাকে যে আমরা বড়রা এই বই পড়ি, এবং এ থেকে আনন্দ পাই তা স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করি।

    তাই ছেলেমিটাকে যতদূর সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে বড়দের উপভোগ্য রোমাঞ্চকর রহস্যোপন্যাস রচনা করবার চেষ্টা করলাম।

    এ চিন্তা মাথায় ঢুকিয়েছেন বন্ধুবর মাহবুবুল আমীন (আবু)। তারই উৎসাহে এবং সর্বপ্রকার সহযোগিতায়, বলতে গেলে এক রকম বাধ্য হয়েই, লিখতে হলো ধ্বংস-পাহাড়। তাই এর নিন্দার সবটুকু গ্লানি অম্লান বদনে মাথা পেতে নিতে তিনি বাধ্য।

    প্রশংসার কথা কিছু বললাম না। যদি কিছু জোটেই, ভাবছি একা নিজেই চুপচাপ হজম করে ফেলব কিনা।

    কাজী আনোয়ার হোসেন
    মে, ১৯৬৬

  • ভারতনাট্যম

    ভারতনাট্যম

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    [book]

    ‘ভারতনাট্যম’ মাসুদরানা সিরিজের দ্বিতীয় বই, এবং এটি লেখকের এই সিরিজের একটি মৌলিক রচনাও। কাহিনী তেমন কিচ্ছু না, ভারতীয় সাংস্কৃতিক দল এসেছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠান করতে। মেজর জেনারেল রাহাত খান তাদের মাঝে ঘাপলা দেখতে পেলেন। নজর রাখতে গিয়ে (তৎকালীন) পিসিআইয়ের একজন এজেন্ট মারা পড়েছে। এবার পাঠানো পিসিআইয়ের মাসুদ রানাকে ফটোগ্রাফারের ছদ্মবেশে। রানা কি পারবে তাদের দুরভিসন্ধি জেনে আসতে? কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল মোলাসেস সেন্ট— অর্থাৎ চিটাগুড়ের গন্ধ। ব্যাপার কী? এ যে বিষাক্ত কেউটের চেয়েও ভয়ঙ্কর! রানার মৃত্যুসংবাদ প্রচার করেও কি ধোঁকা দেয়া গেল ওদের?

    প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়ে’র তুলনায় ‘ভারতনাট্যমে’র লেখনী আরেকটু আঁটসাট, স্মার্ট। সুলতার সাথে রানার সম্পর্ক যেমন মেলোড্রামাটিক, এটায় তা অনেকটাই অনুপস্থিত। মিত্রাকেও ভাল লেগেছে বেশ, নিজ দেশ আর প্রেমের প্রতি দোদুল্যমানতাটা আরোপিত লাগেনি। জয়দ্রথ মৈত্র মশাইও নেগেটিভ চরিত্র হিসেবে ঠিকঠাক।

    তবে জুয়ার আড্ডায় রানার টানা চার দান জিতে ফেলাটা নাটকীয়ই ছিল। যদিও তার জুয়া ভাগ্য বরাবরই অবিশ্বাস্য।

    ধ্বংস পাহাড়ের তুলনায় রানাও বেশ অনেকটা পরিণত এই বইয়ে। সাথে সোহেলের প্রথম প্রবেশ। সোহেলের হাত কাটা পড়ার মিশন নিয়ে ভিন্ন একটি বই হলেও মন্দ হতো না। ধ্বংস পাহাড়ে মাসুদ রানা ‘সিনিয়র সার্ভিস’ পান করত, এই বইয়ে ধরেছে ৫৫৫ সিগারেট।

    বর্তমান সংস্করণে আমরা ‘ভারতনাট্যমে’র অসংক্ষেপিত সংস্করণ অনুসরণ করেছি। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে।

  • স্বর্ণমৃগ

    স্বর্ণমৃগ

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    [book]

    ‘স্বর্ণমৃগ’ রচিত হয়েছে ‘ইয়ান ফ্লেমিং রচিত জেমস বণ্ড সিরিজের ‘অন হার ম্যাজেস্টিস সিক্রেট সার্ভিস’ ও ‘গোল্ডফিংগার’-এর ছায়া অবলম্বনে। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, সেবা প্রকাশনী থেকে। ‘স্বর্ণমৃগ’ মাসুদ রানা সিরিজের তৃতীয় বই এবং প্রথম খণ্ডের তৃতীয় উপন্যাস।

    হিংস্র এক স্বর্ণ চোরাচালানকারীর উদয় হয়েছে পাকিস্তানে; এক অভিনব পন্থায় স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। মাঠে নেমেই সকল প্রতিযোগীকে খেদিয়ে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে সে। এবার তার খোঁজেই পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হলো রানাকে। মাসুদ রানা চলেছে করাচি। সমুদ্রের ধারে পরিচয় হলো স্বর্ণমৃগের সাথে, খেলার চলে; উপরি পাওনা হিসেবে রানার জীবনে এলো জিনাত সুলতানা।

    লাস্যময়ী জিনাত সুলতানা ছাড়াও করাচিতে দেখা মিলল সাত ফুটি লম্বা দানব গুংগা আর রহস্যময় চরিত্রের অধিকারী ওয়ালী আহমদের যে জুয়াতে মেয়েদের হারিয়ে আনন্দ লাভ করে। প্রচণ্ড সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়ে মাসুদ রানা। জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করল রানা, শক্তির দ্বন্দ্বে ওয়ালী আহমেদের ক্ষমতার কাছে সে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুমাত্র। কিন্তু পিছিয়ে এলো না রানা, আহ্বান করল নিশ্চিত মৃত্যুকে।

    সুন্দরী জিনাতকে আত্নহত্যার হাত থেকে বাঁচিয়ে অপ্রত্যাশিত সাহায্য পাওয়া গেলো তার বাবার কাছ থেকে। বেরিয়ে পড়ল কালপ্রিটের আসল চেহারা। শেষ দৃশ্যে জিনাতের পরিনতি কী হলো তা ভালোভাবে বোঝা যায় নি। তাই তার বিষয়টা বেশ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অনুমান করতে হয়েছে।

  • দুঃসাহসিক

    দুঃসাহসিক

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    Author: তাহের আলমাহদী

    ‘দুঃসাহসিক’ কাজী আনোয়ার হোসেন রচিত ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের চতুর্থ উপন্যাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই রহস্যোপন্যাসটি রচিত হয়েছে ‘ইয়ান ফ্লেমিঙের ‘জেমস বণ্ড সিরিজে’র ‘ডায়মন্ডস আর ফরেভারে’র ছায়া অবলম্বনে। পিকিং শহর থেকে এল সাহায্যের আবেদন, একজন দুঃসাহসী বাঙালি লোক চাই। বন্ধু দেশ… যেতে হলো রানাকে। মুখোমুখি হতে হলো শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষের।

    পাকিস্তান কাউন্টার ইনটেলিজেন্স—পিসিআই-র ঢাকা শাখার কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছে চাইনিজ সিক্রেট্ সার্ভিস্ (সিএসএস)— ইউরেনিয়াম স্মাগলিং গ্যাঙের নাড়িনক্ষত্র খুঁজে বের করতে হবে। চীন, পাকিস্তানের অন্যতম বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ও সিএসএস অনেক দুঃসময়ে সাহায্য করেছে পিসিআইকে। তাই পিসিআই-র ঢাকা শাখাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সিএসএসের জন্য। পিসিআই-র অন্যতম দুঃসাহসিক অফিসার মাসুদ রানাকে পাঠানো হয় সাহায্যের জন্য। কিন্তু রানা যখন সেখানে যায়, তখন সে বুঝতে পারে যে, সে অনেক বড় বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে—যেখানে তার প্রাণসংশয়ও হতে পারে। তবুও ‘দুঃসাহসিক’ অভিযান চালিয়ে মাসুদ রানা শাংহাই থেকে হংকং, হংকং থেকে ম্যাকাও ঘুরে দুর্ধর্ষ গ্যাং রেড লাইটনিঙের ডেরা থেকে কার্য হাসিল করে বেরিয়ে আসে।

    ‘দুঃসাহসিক’ গল্পটি ভাল কিন্তু আর পাঁচটা সাধারণ স্পাই থ্রিলার গল্প থেকে আলাদা করার মত কোন বৈশিষ্ট্যই ফুটিয়ে তুলতে পারেননি লেখক। এছাড়া সংলাপগুলো অনেকটাই দুর্বল। আর লেখক মাসুদ রানা সিরিজের পূর্ববর্তী গল্পগুলোতে সেভাবে নারী চরিত্রগুলো এনেছেন, এই গল্পটিতেও প্রায় একইভাবে নারী চরিত্রটি এনেছেন; যা একেবারে গতানুগতিক—সহজ কথায়, বর্তমান থ্রিলার-রোমেন্টিক চলচ্চিত্র বা সিরিজে যেভাবে নারী চরিত্রগুলো (যদিও সেখানে নায়িকা বলে সম্বোধন করা হয়) আনা হয়, অনেকটা সেভাবেই লেখক এই গল্পেটিতে নারী চরিত্রটিকে স্থান দিয়েছেন। তবে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলায় কাহিনীটির নাম ‘দুঃসাহসিক’ যথার্থ হয়েছে।

  • হরিদাসের গুপ্তকথা

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    নবীন-সন্ন্যাসী

    পঞ্চানন রায় চৌধুরী

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    অপূর্ব্ব উপন্যাস


    প্রথম এডুলিচার সংস্করণ: বৈশাখ ১, ১৪৩২; এপ্রিল ১৪, ২০২৫

    ওসিআর, শুদ্ধিপাঠ ও সম্পাদনা : তাহের আলমাহদী

    প্রকাশক : এডুলিচার; বিশুদ্ধজ্ঞানের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান

    গ্রন্থস্বত্ব : পাবলিক ডোমেইন

    অনুসৃতি : তৃতীয় সংস্করণ, ১৩৩৭; 1930

    প্রকাশক : শ্রীতারাচাঁদ দাস; ৮২, আহিরীটোলা ষ্ট্রীট্, কলিকাতা; মুদ্রণ : চক্রবর্ত্তী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস; ২নং নিমুগোস্বামী লেন, কলিকাতা

    মূল্য : ১৷৷৹ টাকা
    The Copy-Rights of this book are the property of
    Tara Chand Dass
    Rights Strictly Reserved.
    1930


    ভূমিকা

    নিবিড় কানন মধ্যে একটি সুরভি কুসুম বিকশিত হইলে তাহার সুবাসে যেমন সমগ্র বনস্থলি আমোদিত করে, তেমনি বংশে একটি সুপুত্ত্র জন্মিলে তার বিমল যশে সেই বংশ উজ্জ্বল হ’য়ে থাকে। ইতিহাস প্রায় ধনীপক্ষে চাটুকার হইয়া থাকে, সুতরাং অন্ধকারময় খনিতে মণির ন্যায় অজ্ঞাত কুল শীল কোন দরিদ্রের গৃহে কোন মহাপুরুষ জন্মিলে প্রায় তার কোন খোঁজ খবর রাখে না।

    প্রায় এক শত বৎসর পূর্ব্বে আমাদের এই হরিদাস সুদূর পাঞ্জাবে এক প্রবাসী ব্রাহ্মণের গৃহে উদয় হইয়াছিলেন এবং বাইশ বৎসর বয়সে সন্ন্যাসের মহামন্ত্র লইয়া সংসারের সহিত সকল সম্বন্ধ ছেদন করিয়া ফেলেন। এই বাইশ বৎসরকাল সংসারে কিরূপ ভাবে, কিরূপ দরের লোকের সহিত অতিবাহিত করিয়াছিলেন এবং কোন তাপরাধ না করিয়া যেরূপ পুনঃ পুনঃ লাঞ্ছনা ভোগ করিয়াছিলেন, তাহাই এই পুস্তকে বিশদভাবে বর্ণিত হইয়াছে।

    যদি এই সংসারে বহুরূপী ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির লোক চিনিবার কাহারও সাধ হয়, মুসলমান রাজত্বের অন্তিমকালে ও ইংরাজ রাজত্বের সূত্রপাতে এই স্বর্ণ-প্রসূ বাঙ্গালা দেশের আভ্যন্তরিক অবস্থা জানিতে যদি বাসনা জন্মায়, ইতিহাস প্রসিদ্ধ অনেক বড় বড় লোকের বিচিত্র গুপ্ত রহস্য জানিবার ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে আমাদের এই ইতিহাসের সহিত আলাপ করুন, কখনই ফললাভে বঞ্চিত হইবেন না। ভয় বিস্ময় ক্রোধ প্রভৃতি রসে অন্তরার্ণব উদ্বেলিত হইয়া উঠিবে।

  • নয়

    নয়

    ফজল বাড়ি যায় না। বাড়ি গেলেই তার বাবা হয়ত জেরা শুরু করবে, ‘রাত্রে কোথায় আছিলি? কাইল নায়েবের লগে অমুন কইর‍্যা কথা কইতে গেলি ক্যান্?’

    সোজা খুনের চর চলে যায় ফজল। তাকে দেখে পুলকি-মাতব্বর আর কোলশরিকেরা কোলাহল করে ওঠে। যার যার ভাওর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তারা। রমিজ মিরধা বলে, ‘কাইল আসুলিগ একখান খেইল দ্যাহাইয়া আইছ হোনলাম?’

    জাবেদ লশকর : ‘এই মিয়া মাতবরের পো না খেললে কাইল চরের ইজ্জত থাকত না।’

    ধলাই সরদার : ‘হোন্‌লাম আসুলিগ কোন বড় খেলুরে তুমি এমুন চিবি দিছিলা, চিবির চোডে হের জিব্বাডা বোলে সোয়া আত বাইর অইয়া গেছিল?’

    ফজল : ‘আরে না মিয়া। এমন কথা কার কাছে শোনলেন?’

    ধলাই সরদার : ‘যারা খেইল দ্যাখতে গেছিল তাগ কাছেই হুনছি।’

    গতদিনের হা-ডু-ডু খেলার আলোচনায় মেতে উঠে সবাই। তাদের মুখে ফজল আর সোলেমানের খেলার তারিফ।

    সবাই চলে গেলে ফজল নিজেদের ভাওর ঘরে গিয়ে ঘরের ঝাঁপ খোলে। তাদের গাবুর একাব্বর তার অনুপস্থিতিতে বেড়ের মাছ ধরে অন্যান্যদের সাথে তারপাশা গেছে মাছ বেচতে।

    মাচানের ওপর হোগলা বিছানো রয়েছে। একপাশে রয়েছে ভাঁজকরা একটা কাঁথা। রাত্রে বারবার তাড়া খেয়েছে যে ঘুম, তা এসে বিছানাটার কোথাও লুকিয়ে রয়েছে যেন। তার অদৃশ্য হাতের আলতো পরশ অনুভব করে ফজল। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। সে কাঁথার তলা থেকে বালিশ টেনে নেয়। তারপর বিছানার ওপর ঢেলে দেয় সে তার ঘুমকাতর শরীরটাকে। কিন্তু বালিশের ওপর মাথা রাখতেই হঠাৎ চমকে ওঠে সে। লাফিয়ে ওঠে তড়াক করে।

    হায়, হায়, হায়! কি সর্বনাশের মাথার বাড়ি! এখন উপায়? ফিরে যাবে নাকি সে শ্বশুরবাড়ি?

    কিন্তু এখন গিয়ে কোনো লাভ নেই, ফজল ভাবে। এতক্ষণে কাছারি ঘরের বিছানাটা তোলা হয়ে গেছে। বালিশের তলায় রাখা খোঁপার কাঁটাটা নিশ্চয় পেয়ে গেছে রূপজান। কি কেলেঙ্কারিটা ঘটে গেল তার ভুলের জন্য।

    রূপজান কি কিছু বুঝতে পারবে? বুঝতে না পারার কোনোই হেতু নেই। একটা মাত্র কাঁটা। কয়েকটা হলেও রূপজানকে ফাঁকি দেয়া যেত। সে নিজেই ভেবে আশ্বস্ত হতো, কাঁটাগুলো তারই জন্য এনে রেখেছিল ফজল দিতে ভুলে গেছে। এখন ওই কাঁটা বালিশের নিচে রাখার যে কোনো কৈফিয়তই নেই। তাছাড়া কাঁটাটা যার খোঁপার, সে ঐ বাড়িতেই রাত্রে ছিল। তার খোঁপায় নিশ্চয় রয়েছে ওটার মতো আরো কাঁটা।

    ফজলের শিরা-উপশিরায় ঠাণ্ডা স্রোত ওঠা-নামা করছে।

    খোঁপার কাঁটাটা সম্ভবত তারই পয়সায় কেনা। জরিনাকে এ রকম এক ডজন কাঁটা দিয়েছিল সে।

    নিজের পয়সার কেনা কাঁটাটা এমন নিমকহারামি করল! দুশমনি করল! নাহ্, প্রাণহীন এ কাঁটাটার আর কী দোষ? দুশমনি করেছে জরিনা, সেই জাহান্নামের লাকড়িটা।

    ফজল ভাবে, এ ঠিক পাপের শাস্তি। পাপ খাতির করে না পাপের বাপকেও। সে কবিরা গুনা করেছে। তার জন্য এখন কড়ায়-গণ্ডায় সুদে-আসলে জরিমানা দিতে হবে।

    জরিনার জন্য ফজলের মনের কোটরে বাসা বেঁধেছিল অনেক স্নেহ-মততা, অনেক সহানুভূতি। কিন্তু এ মুহূর্তে রাগ ও বিতৃষ্ণার ঘূর্ণিঝড় উড়িয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে সে সব কোমল অনুভূতি। জরিনাকে সে মনে মনে গাল দেয়, বেহায়া ঢেম্‌নি মাগিডাই তো তারে ঠেইল্যা নামাইছে পাপের আঠাই দরিয়ায়। এখন কত যে চুবানি খাইতে অইব তার শুমার নাই।’

    ফজল তার মনশ্চক্ষে দেখতে পায়–রূপজান ঝাঁটা মেরে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে জরিনাকে।

    জরিনার জন্য আবার কেমন করে ওঠে ফজলের মন। তাড়া-খাওয়া মমতা আর সহানুভূতি মনের আশ্রয়ে ফিরে আসার জন্য পথ খোঁজে।

    ফজল রূপকথার বইয়ে পড়েছিল— রাজপুত্র আর রাজকন্যার পেছনে ধাওয়া করছে এক দৈত্য। তার গতিরোধ করার জন্য রাজকন্যা ছুঁড়ে ফেলে দেয় তার মাথার চিরুনি। সেই চিরুনি থেকে সৃষ্টি হয় কাঁটার এক দুর্ভেদ্য জঙ্গল। জরিনার খোঁপার কাঁটাটাও বুঝি তার শ্বশুরবাড়ির চারদিকে সৃষ্টি করছে দুর্ভেদ্য কাঁটার বেড়া। সে বেড়া ভেদ করে সে কি রূপজানের কাছে যেতে পারবে আর?

    ‘ফজু কইরে?’

    ফজলের চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে যায়। পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে সে ঝুপড়ি থেকে বেরোয়। তার পিতার সাথে রয়েছে মেহের মুনশি, ধলাই সরদার আর জমিরদ্দি।

    ‘হোন্ ফজু, কোলশরিকগ খবর দিছি। এহনই আইয়া পড়ব। তুই ঘরের আড়ালে ছায়ার মইদ্যে হোগলা বিছাইয়া দে। বৈডক আছে আইজ।’

    কিছুক্ষণের মধ্যেই মাতব্বরের দলের লোকজন এসে হাজির হয় বৈঠকে।

    এরফান মাতব্বর বলে, ‘হোন মিয়ারা, আল্লার ফজলে কাম পাকা-পোক্ত অইয়া গেছে। জমিদারের সেলামি দিয়া খাজনাপাতি দিয়া পরিষ্কার অইয়া আইছি। এহন এমুন কোনো ব্যাডা নাই যে চরের তিরিসীমানায় আউগ্‌গায়।’

    আহাদালী বলে, ‘কত ট্যাহা খাজনা দিলেন, মাতবরচাচা?’

    ‘দেদার টাকা ঢাল্‌ছিরে বাপু। তোমার মতো মাইনষে গইন্যা শুমার করতে পারব না। এহন কও দেহি তোমরা, ক্যামনে ভাগ করতে চাও জমি?’

    জমির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা চলে অনেকক্ষণ। অবশেষে মাতব্বরের প্রস্তাবই মেনে নেয় সকলে। চরটাকে মাঝ বরাবর লম্বালম্বি দু’টুকরো করে আটহাতি নল দিয়ে মেপে ভাগ করতে হবে। চরের মাঝখান থেকে নদীর পানি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে এক এক জনের জমি। অবস্থানের দিক দিয়ে সকলের জমিই এক ধরনের হবে। তাই উৎকর্ষের দিক দিয়েও জমিতে জমিতে বড় বেশি পার্থক্য থাকবে না।

    ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা শেষ হলে এরফান মাতব্বর বলে, ‘আমি তো ফতুর অইয়া গেছি সেলামি আর খাজনা দিয়া। এইবার আমার সেলামির যোগাড় করো।’

    ‘নল পিছে কত কইর‍্যা সেলামি নিবেন মাতব্বরের পো?’ ধলাই সরদার জিজ্ঞেস করে।

    ‘আর সব মাতবররা যেই রহম নেয়।’

    রুস্তম বলে, ‘আর সব মাতবররা তো ডাকাইত। তাগ মতন ধরলে আমরা গরিব মানুষ বাচমু ক্যামনে?’

    কদম শিকারি সায় দিয়ে বলে, ‘মাতবরভাই, এট্টু কমাইয়া ধরেন।’

    ‘তাইলে তোমরাই কও, কত কইর‍্যা দিবা।’

    রমিজ মিরধা বলে, ‘নল পিছে বিশ ট্যাহা করেন।’

    ‘বিশ টাকা! তোমাগ খায়েশ খানতো কম না! গত ছয় বচ্ছর খাজনা চালাইছি এই নাই চরের। তহন একটা আধা-পয়সা দিয়াও তো কেও সাহায্য করো নাই। এহন কোন আক্কেলে এমুন আবদার করো তোমরা?’

    ‘উপরে আল্লা আর নিচে আপনে আমাগ বাপের সমান। আপনের কাছে আবদার করমু তো কার কাছে করমু?’

    ‘তোমরা বিবেচনা কইর‍্যা কইও। চাইরশ বিশ আত দীঘল এক এক নল জমি। এক নলে কততুক জমি অয় ইসাব করছনি মেহের?’

    ‘হ, করছি। এই ধরেন সাড়ে দশ কাঠার মতন। কানির ইসাবে অয় দুই গণ্ডার কিছু বেশি। একরের ইসাবে সাড়ে সতেরো শতাংশ।’ মেহের মুনশি বলে।

    ‘এহন তোমরাই কও। সাড়ে দশ কাঠা জমির লেইগ্যা তিরিশ টাকাও দিবা না কেমুন কথা?’

    জমিরদ্দি : ‘দিতাম মাতবরের পো। কিন্তুক চরের জমি, আইজ আছে কাইল নাই।’

    ধলাই সরদার : ‘হ, হ, গাঙ্গে ভাঙ্গনের ডর না থাকলে তিরিশ ক্যান্, একশ ট্যাহাই দিতাম।’

    এরফান মাতব্বর : ‘অইচ্ছা ঠিক আছে। তোমরা পঁচিশ টাকা কইর‍্যা দিও। সবাই রাজি?’

    সবাই রাজি হয়।

    মাতব্বর আবার বলে, ‘হোন মিয়ারা, যারা আগে সেলামির টাকা দিতে পারব, তাগ ইচ্ছামতো, পছন্দমতো জমি দিয়া দিমু।’

    ভাল সরেস জমি পাওয়ার আশায় সে-দিনই সেলামির টাকা নিয়ে এরফান মাতব্বরের বাড়ি হাজির হয় অনেকে। একদিনেই আদায় হয় সাত হাজার টাকা।

    বহুদিন পরে এক সাথে অনেকগুলো টাকা হাতে পেয়ে মাতব্বরের মন খুশিতে ভরে ওঠে। তার বয়সের বোঝা হালকা মনে হয়। ভাটাধরা রক্তে অনুভূত হয় জোয়ারের পূর্বাভাস।

    টাকা অনেকগুলো। কিন্তু টাকার কাজও রয়েছে অনেক। প্রথমেই ঋণ সালিশি বোর্ডের মীমাংসা অনুযায়ী দুই মহাজনের দেনার কিস্তি শোধ করতে হবে। তারপর যেতে হবে জণ্ড পোদ্দারের দোকানে। পুতের বউর বন্ধক-দেয়া গয়নাগুলো ছাড়িয়ে আনতে হবে। ফজুর মা’র দু’গাছা গয়নাও বন্ধক পড়ে আছে আজ দু’বছর। বাড়ির সবার জন্য কাপড়চোপড় কিনতে হবে। ঘাসি নৌকাটা মেরামত করা দরকার। পানসি গড়াতে হবে একটা। মাতব্বরির মান মর্যাদা বজায় রাখতে হলে পানসি একটা রাখতেই হয়। আগেও একটা পানসি ছিল মাতব্বরের। চর ভাঙার পর অভাবের সময় সেটা বেঁচে ফেলতে হয়েছিল।

    পরের দিন। এরফান মাতব্বর হাশাইল বাজারে যায়। জগু পোদ্দারের দোকানে গিয়ে ছাড়িয়ে নেয় বন্ধক-দেয়া সবগুলো গয়না। পুতের বউর গলার হার, কানের মাকড়ি, হাতের চুড়ি আর অনন্ত। ফজুর মা’র গলার দানাকবচ আর কানের কর্ণফুল। এগুলো বন্ধক দিয়ে পাঁচশ টাকা নিয়েছিল সে। এখন সুদে আসলে দিতে হলো আটশ টাকা।

    সুদ যে কেমন করে ব্যাঙের বাচ্চার মতো পয়দা হতে থাকে বুঝে উঠতে পারে না মাতব্বর। সে মনে মনে বলে, ব্যাডা পোদারের পুত কি দিয়া যে কি ইসাব করল, বোঝতেই পারলাম না। ফজলরে সঙ্গে আনা উচিত আছিল। ও ইসাবপত্র বোঝে ভাল।

    কাপড়চোপড় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা শেষ করে এরফান মাতব্বর নৌকায় গিয়ে ওঠে। তাদের গাবুর একাব্বর নৌকা ছেড়ে দেয়।

    মাতব্বর বলে, ‘সোজা নলতা মোল্লাবাড়ি চইল্যা যা। আইজ বউ না লইয়া বাড়িত যাইমু না।’

    ভাটি পানি। তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। গয়নার পুটলিটার ওপর হাত বুলাতে বুলাতে এরফান মাতব্বর মনে মনে বলে, ‘আইজ দ্যাহাইয়া দিমু আরশেদ মোল্লারে। ও বিশ্বেস করে নাই আমার কথা। মনে করছে ওর মাইয়ার গয়না আর ছাড়াইতে পারমু না। আইজ দশটা চউখ উধার কইর‍্যা আইন্যা দেখবি, যেই গয়না বন্দক দিছিলাম, তা বেবাক ছাড়াইয়া আনছি। দেহি, এইবার তুই আমার পুতের বউ কোন ছুতায় আটকাইয়া রাখস।’

    আরশেদ মোল্লা নিজের ও গরুর গা ধোয়ার জন্য নদীতে নেমেছিল। দুটো বলদ ও একটা গাইকে গলাপানিতে দাঁড় করিয়ে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে সে ওদের গা ঘষামাজা করছিল। হঠাৎ একটা উদলা নৌকার ওপর তার চোখ পড়ে। নৌকাটা তার বাড়ির দিকে আসছে আর ওতে বসে আছে এরফান মাতব্বর।

    আরশেদ মোল্লা তাড়াতড়ি একটা ডুব দিয়ে আধা নাওয়া গরুগুলোকে খেদিয়ে নিয়ে যায় বাড়ির দিকে।

    ভেজা কাপড়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মোল্লা তার স্ত্রীকে ডাকে, ‘কইগো রূপির মা, আমার লুঙ্গি আর নিমাডা দ্যাও দেহি জলদি।’

    ‘এত জলদি কিয়ের লেইগ্যা? মাইর করতে যাইব নি?’

    ‘আগো চুপ করো। রূপজান কই?’

    ‘নাইতে গেছে।’

    ‘হোন, এরফান মাতব্বর আইতে আছে।’

    ‘কুড়ুম আইতে আছে ভাল কথা। পুরান কুড়ুমের কাছে যাইতে আবার সাজান-গোছন লাগবনি?’

    ‘দুত্তোরি যা!’ বিরক্ত হয়ে মোল্লা ভিজা কাপড়েই ঘরে যায়। লুঙ্গি বদলে নিমাটা গায়ে চড়িয়ে সে বেরিয়ে আসে। স্ত্রীকে বলে, ‘হোন, মাতবর আমার কথা জিগাইলে কইও, দিঘিরপাড় হাটে গেছে।’

    ‘ক্যান্? কুড়ুমের ডরে উনি পলাইতে আছে নি?’

    ‘পলাইতে আছি তোমারে কে কইল? হোন, আমার মনে অয় মাতবর আইতে আছে তোমার মাইয়া নিতে। আমি থাকলেই তক্কাতক্কি অইব। জোরাজুরি করব মাইয়া নেওনের লেইগ্যা। আমি বাড়ি না থাকলে আর জোরাজুরি করতে পারব না। তুমি কইও, উনি বাড়ি নাই। খালি বাড়িরতন মাইয়া দেই ক্যামনে?’

    ‘কই গেলেন বেয়াইসাব?’ এরফান মাতব্বরের গলা।

    আরশেদ মোল্লা খাটো গলায় বলে, ‘ঐ যে আইয়া পড়ছে! আমি গেলাম।’

    আরশোদ মোল্লা বাড়ির পেছন দিক দিয়ে সটকে পড়ে।

    ‘বেয়াইসাব কই?’ আবার হাঁক দেয় এরফান মাতব্বর। ‘আরে–আরে–আরে! গরুতে ক্যালার ড্যামগুলা খাইয়া ফালাইল। কই গেলেন মোল্লাসাব?’

    এরফান মাতব্বর তার হাতের লাঠি উঁচিয়ে ‘হেঁই হাঁট-হাঁট’ করে গরুগুলোকে তাড়া দেয়।

    রূপজানের মা সোনাভান ওরফে সোনাইবিবি মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে আসে গরু বাঁধবার জন্য।

    ‘আসলামালেকুম বেয়ানসাব। কেমন আছেন?’

    ‘আল্লায় ভালই রাখছে।’

    ‘মোল্লাসব কই?’

    ‘উনি হাট করতে গেছে দিঘিরপাড়।’

    ‘হাট করতে গেছে! তয় এই মাত্র গরু নাওয়াইতে দ্যাখলাম কারে?’

    ‘হ উনিই। ঐ পুবের বাড়ির তারা হাটে যাইতে আছিল। তাই ত্বরাত্বরি গিয়া ওঠছে তাগো নায়। গরু বান্ধনেরও অবসর পায় নাই।’

    সোনাইবিবি গরু বাঁধবার জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু গরুর শিং নাড়া দেখে সে ভয়ে পিছিয়ে আসে। তার মাথার ঘোমটা পড়ে যায়, নাকের দোলায়মান সোনার চাঁদবালিটা চিকমিকিয়ে ওঠে।

    মাতব্বর বলে, ‘আপনে পারবেন না। আমি আমার গাবুররে ডাক দিতে আছি। ওরে একাব্বর, এই দিগে আয়। গরুগুলারে গোয়ালে বাইন্দা রাখ।’

    মাতব্বর বেঠকখানায় গিয়ে চৌকির ওপর বসে। তার প্রশ্ন এড়িয়ে অন্দরে চলে যেতে পারে না সোনাইবিবি। সে অন্দরমুখি দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে মাতব্বরের সাথে কথা বলছে।

    ‘বউমা কই, বেয়ান সাব?’

    ‘নাইতে গেছে।’

    ‘আইজ বউমারে নিতে আইছি। একটা মাত্র পুতের বউ আমার। বউ বাড়িতে না থাকায় বাড়ি-ঘর আমার আন্দার অইয়া রইছে।’

    ‘আপনেরা আমাগ মাইয়ার মোখ্‌খান যে আন্দার কইর‍্যা থুইছেন হেই কথাতো কন্ না। মাইয়ার গয়নাগুলারে বেবাক–’

    ‘গয়নার কথা কেন? এই দ্যাহেন, বেবাক গয়না ছাড়াইয়া আনছি।’

    গয়নার পুটলিটা উঁচু করে দেখায় মাতব্বর। তারপর আবার বলে, ‘বউমারে ডাক দ্যান। তার গয়না তার আতে বুঝাইয়া দিমু আইজ।’

    কিছুক্ষণ পর রূপজান আসে। শ্বশুরের কদমবুসি করে সে দাঁড়ায় তার কাছে।

    মাতব্বর বলে, ‘তোমার এই বুড়া পোলার উপরে রাগ অইয়া রইছ মা? এই দ্যাহো।’ মাতব্বর গয়নার পুটলি খোলে। ‘এই নেও মা, তোমার গলার হার। নেও, গলায় দ্যাও। শরম কিয়ের?’

    হারটা গলায় পরে রূপজান।

    ‘আর এই ধরো কানের মাড়িজোড়া। কানে দ্যাও মা, কানে দ্যাও। তুমি তো জানো মা, কেমুন বিপাকে পইড়া গেছিলাম। তা না অইলে কি আমার মা-র গয়না বন্দক দেই আমি? কানে দিছ মা? হ্যাঁ এইতো এহন কেমুন সোন্দর দেহা যায় আমার মা-লক্ষ্মীরে।’

    একজোড়া অনন্ত ও ছয়গাছা চুড়িসহ পুটলিটা রূপজানের দিকে এগিয়ে দিয়ে মাতব্বর আবার বলে, ‘এই নেও মা। কিছু থুইয়া আহি নাই। বেবাক ছাড়াইয়া আনছি। আর দ্যাহো, কেমুন চকমক-ঝকমক করতে আছে। সবগুলারে পালিশ করাইয়া আনছি।’

    রূপজানের গয়না পরা হলে মাতব্বর বলে, ‘এইতো এহন আমার মা-র মোখ্‌খান হাসি খুশি দ্যাহা যায়। আর এই নেও শাড়ি। দ্যাহো কী সোন্দর গুলবদন শাড়ি। যাও মা শাড়ি পিন্দা তোমার মা-র কদমবুসি করো গিয়া। আর জলদি কইর‍্যা তৈয়ার অইয়া নেও।’

    সোনাইবিবি দরজার আবডালে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলে, ‘কর্তা বাড়িতে নাই। খালি বাড়িরতন মাইয়া দেই ক্যামনে?’

    ‘কর্তা নাই, কর্তানি তো আছে। যান বেয়ানসাব, বউমারে সাজাইয়া-গোজাইয়া দ্যান।’

    ‘উনি বাড়ি না আইলে তো মাইয়া দিতে পারমু না।’

    ‘উনি কোন সুম আইব, তার তো কোনো ঠিক নাই!’

    ‘হ, হাটে গেছে, আইতে দেরি অইব। আপনে আর একদিন আইয়েন।’

    ‘আর একদিন আর আইতে পারমু না। আইজই বউ লইয়া বাড়িত যাওন চাই। এইখানে এই পাড়া গাইড়া বইলাম আমি। যান, খাওনের যোগাড় করেন। পালের বড় মোরগাড়া জবাই করেন গিয়া।’

    দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা। কিন্তু এখনো বাড়ি ফিরে এল না আরশেদ মোল্লা। চৌকির ওপর শুয়ে বসে বিরক্তি ধরে গেছে এরফান মাতব্বরের। অস্বস্তিতে ছটফট করে সে। এর মধ্যে রূপজান তামাক সাজিয়ে দিয়ে গেছে বার কয়েক। প্রত্যেক বারই তাকে জিজ্ঞেস করেছে মাতব্বর, ‘কি মা, তোমার বাজান আইছে?’

    অধৈর্য হয়ে ওঠে রূপজানও। সে বার বার ছাঁচতলায় গিয়ে নদীর দিকে তাকায়। কিন্তু তার বাজানকে দেখা যায় না কোনো নৌকায়। তার ব্যাকুলতার কাছে হার মানে লজ্জা সঙ্কোচ। সে মা-কে বলে, ‘মা, বাজান এহনো আহেনা ক্যান?’

    ‘উনির আহন দিয়া তোর কাম কি?’

    ‘দ্যাহো না, মিয়াজি যাওনের লেইগ্যা কেমুন উতলা অইয়া গেছে।’

    ‘তোর মিয়াজি উতলা অইছে, না তুই উতলা অইছস?’

    লজ্জায় মাথা নত করে রূপজান। মেয়ের দিকে চেয়ে মায়ের মন ব্যথায় ভরে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সে।

    রূপজানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সে বলে, ‘আমি আর কী করতে পারি, মা। তোর বাপ বেবুঝ, গোঁয়ার। আমার কোনো কথা কানে লয় না।’

    ‘যেই গয়নার লেইগ্যা আমারে আটকাইছে, হেই গয়না তো বেবাকই দিছে আবার। বাজান বাড়িত থাকলে যাইতে মানা করত না। তুমি মিয়াজিরে কও আমারে লইয়া যাইতে।’

    ‘কোন্ ডাকাইত্যা কথা কস, মা। উনির হুকুম ছাড়া তোরে যদি এহন যাইতে দেই, তয় কি আমারে আস্ত রাখব! কাইট্যা কুচিকুচি কইর‍্যা গাঙে ভাসাইয়া দিব না!’

    ‘যদি যাইতে না দ্যাও, তয় গয়নাগুলা রাখবা কোন মোখে? এগুলা ফিরাইয়া দেই?’

    ‘ফিরাইয়া দিবি ক্যান্? উনি বাড়িত আহুক। ওনারে বুঝাইয়া-সুজাইয়া তোরে পাড়াইয়া দিমু একদিন।’

    এরফান মাতব্বর মাগরেবের নামাজ পড়েও অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু আরশেদ মোল্লার আসার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না তার। মনের এ সন্দেহ তার আরো দৃঢ় হয়। সে বুঝতে পারে, আরশেদ মোল্লা তাকে দেখে পালিয়েছে। সুতরাং সে যতক্ষণ এ বাড়িতে আছে ততক্ষণ মোল্লা কিছুতেই বাড়ি ফিরবে না।

    মাতব্বর এশার নামাজ পড়ে বাড়ি রওনা হয়। যাওয়ার সময় বেয়ানকে বলে যায়, ‘গয়নার লেইগ্যা মাইয়া আটকাইছিল। সবগুলো গয়না বুঝাইয়া দিছি। এইবার ভালমাইনষের মতন আমার পুতের বউরে যে আমার বাড়ি দিয়া আহে।’

  • দশ

    দশ

    কার্তিক গেল, অগ্রহায়ণও প্রায় শেষ হয়ে এল। কিন্তু রূপজানকে দিয়ে গেল না আরশেদ মোল্লা। লোকটার মতলব খারাপ বলে মনে হচ্ছে এরফান মাতব্বরের। মোল্লার চেহারা মনে ভাসতেই তার রক্ত টগবগ করে ওঠে, ‘জাক্কইর’ দিয়ে ওঠে সারা শরীরের রোম। তার ইচ্ছে হয়–মোল্লাকে শড়কি দিয়ে গেঁথে কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে।

    রাগ হয় তার নিজের ওপরেও। কেন সে আহাম্মকের মতো এতগুলো গয়না তুলে দিয়ে এল মোল্লার মেয়েকে? যে মোল্লা ফেরেববাজি করে নিজের নাবালক ভাইপোর দুই কানি জমি আত্মসাৎ করতে পারে, জমির লোভী সেই মোল্লা যখন নতুন চরের জমির জন্য তার কাছে এল না, তখনই সে বুঝতে পেরেছিল, লোকটার মনে খন্নাস’ভর করছে। এতটা বুঝেও কেন বোকামি করল সে! কেন দিয়ে এল গয়নাগুলো! ওগুলো থাকলে ও দিয়েই আবার সে ফজলের বিয়ে দিতে পারত।

    হুঁকো টানতে টানতে উঠানে বেরোয় এরফান মাতব্বর। সেখানে বরুবিবি রোদে দেয়া ধান ঘাটছিল পা চালিয়ে।

    মাতব্বর বলে, ‘হোন ফজুর মা, এত টাকার গয়না খামাখা দিয়া আইলাম। আমার মনে অয় গয়নাগুলা অজম করনের তালে আছে মোল্লা।’

    ‘আমারও মনে অয় গয়নাগুলো মাইরা দিব।’

    ‘কিন্তু অজম করতে দিমু না। আইজ মানুষজন খবর দিতে আছি।’

    ‘ক্যান, মানুষজন দিয়া কি অইব?’

    ‘কি অইব আবার! এত চর দখল করলাম এই জিন্দিগিতে, আর এহন নিজের পুতের বউ দখলে আনতে পারুম না!’

    ‘ওনার কি মাথা খারাপ অইল নি? কাইজ্যা-ফ্যাসাদ কইর‍্যা বউ ছিনাইয়া আনলে মাতবর বাড়ির ইজ্জত থাকব? মাইনষে–’

    ‘কি করতে কও তয়? পাজির লগে পাইজ্যামি না করলে দুইন্যায় বাঁইচ্যা থাকন যায় না।’

    ‘আবার মোল্লাবাড়ি গিয়া দেহুক না একবার।’

    ‘উঁহু! আমি আর যাইতে পারমু না। তোমার পোলারেই পাড়াইয়া দ্যাও।’

    ‘ও গেলে তো দিবইনা।’

    ‘হে অইলে ঐ মাইয়ার আশা ছাইড়া দ্যাও। গেছে গয়না যাইক। তুমি মাইয়া বিচরাও। ফজুরে আবার আমি বিয়া করাইমু।’

    ‘কিন্তুক ফজুরে রাজি করান যাইব না।’

    ‘ক্যান্ যাইব না? এমুন খুবসুরত আর ঢক-চেহারার মাইয়া যোগাড় করমু, মোল্লার মাইয়ার তন তিন ডফল সোন্দর।’

    ‘উঁহু। কত জায়গায় কত মাইয়া দ্যাখলাম। আমার রূপজানের মতন এমুন রূপে-গুণে কামে-কাইজে লক্ষ্মী মাইয়া আর পাওয়া যাইব না।’

    ‘মাইয়াডা তো লক্ষ্মী, কিন্তু বাপখান কেমুন? ওর মতো অলক্ষ্মী, পাজির পা-ঝাড়া আছে দুইন্যার মাঝে? ওর মাইয়া লক্ষ্মী অইলেই কি, আর না অইলেই কি! তুমি জিগাও তোমার পোলারে।’

    ‘উঁহু, ও রাজি অইব না কিছুতেই।’

    ‘ক্যামনে বোঝলা তুমি?’

    ‘আমি মা, আমি কি আর বুঝি না?’

    ‘তয় এমুন না-মরদের মতন চুপচাপ রইছে ক্যান্ তোমার পোলা? যায় না ক্যান্ হউর বাড়ি? আলগোছে ভাগাইয়া লইয়া আইলেই তো পারে।’

    ‘এই বুদ্ধিডাই ভাল। চুপে-চাপে কাম অইয়া গেলে কেও টের পাইব না।’

    ‘হ তোমার পোলারে এই পরামিশই দ্যাও। নেহাত যদি বউ স্ব-ইচ্ছায় না আইতে চায়, তয় জোর কইর‍্যা লইয়া আইব। তা না পারলে গয়নাগুলা যে কাইড়া লইয়া আহে।’

    ফজলও এ রকমই ফন্দি এঁটেছিল। দ্বিধা-লজ্জার চাপে তা ছিল তার মনে মনেই এত দিন। বাপ-মায়ের প্ররোচনা ঝেটিয়ে দেয় তার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। সে তার মামাতো ভাই হাশমতের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করে, তার শ্বশুর যেদিন দূরে কোথাও যাবে, রাত্রে বাড়ি ফিরবে না, সেদিন সে চলে যাবে শ্বশুর বাড়ি। রাত্রে সে থাকবে সেখানে। রাত দুপুরের পর নৌকা নিয়ে সেই বাড়ির ঘাটে হাজির হবে হাশমত।

    দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে। কিন্তু সুযোগ আর আসে না। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত ফজল মিস্ত্রিদের কাজ দেখাশুনা করে। নতুন চরে পানসি তৈরি হচ্ছে তাদের। রাতের বেলাও ভাওর ঘর ছেড়ে সে কোথাও যায় না। বসে থাকে খবরের আশায়। গোপন খবরের জন্য সে তার চাচাতো শালা কাদিরকে লাগিয়েছে।

    চুপচাপ বসে থাকলেই ফজলের মনে হানা দেয় জরিনার খোঁপার কাঁটাটা। রূপজান নিশ্চয় পেয়েছে কাঁটাটা। তার বুঝতে বাকি নেই কিছু।

    ‘বুঝুক, বুইঝ্যা জ্বইল্যা পুইড়া মরুক। ও-ই তো এর লেইগ্যা দায়ী। ঐ দিন রাইতে দেরি করল ক্যান্ ও?’ ফজলের মনে ক্ষুব্ধ গর্জন।

    কিন্তু তবুও তার মনের দ্বিধা দূর হয় না। সে কেমন করে গিয়ে দাঁড়াবে রূপজানের সামনে? কাঁটাটার কথা জিজ্ঞেস করলে কি বলবে সে?

    নাহ্, মিছে কথা ছাড়া উপায় নেই, ফজল ভাবে। এমন কিছু বানিয়ে রাখতে হবে যাতে জিজ্ঞেস করলেই ঝেড়ে দেয়া যায়।

    কিন্তু রূপজানের সাথে দেখা করার সুযোগই যে পাওয়া যাচ্ছে না।

    সুযোগের নাগাল পাওয়ার আগেই একদিন বাড়ি থেকে নূরু এসে বলে, ‘দুদু, পা-না ধোয়া জঙ্গুরুল্লা হুছি চর দখলের আয়োজন করতে আছে!’

    ‘কার কাছে শুন্‌লি?’

    ‘আইজ ইস্কুলতন আইতে লাগছি, একজন মাইয়ালোকে আমারে ডাক দিয়া নিয়া চুপে চুপে কইছে এই কথা।’

    ‘মাইয়া লোক! কে চিনস না?’

    ‘উঁহু। হে কইছে, আইজই তোর চাচার কাছে খবরডা দিস।’

    ‘মাইয়া লোকটা দ্যাখতে কেমন?’

    ‘শ্যামলা রঙ। নীলা রঙের শাড়ি পরনে।’

    ‘মোডা না চিকন?’

    ‘বেশি চিকন না। মোডাও না।’

    ‘বয়স কত অইব? বুড়ি, না জুয়ান?’

    ‘বুড়ি না। চাচির মতই বয়স অইব।’

    ফজল চিনতে পারে না কে সে মেয়েলোকটি। কিন্তু সে যে-ই হোক, নিশ্চয়ই কোনো শুভাকাক্ষী আপন জন। তার খবরটা বেঠিক বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। জঙ্গুরুল্লা দাঙ্গাবাজ। তার তবে অনেক কোলশরিক, লাঠিয়াল-লশকর। ডাইনগাঁয়ের পুব দিকে অনেক কয়টা চর দখল করেছে সে। ফজল চিন্তিত হয়।

    নূরু ও চার-পাঁচজন পুলকি-মাতব্বরকে সাথে করে ফজল বাড়ি যায়।

    এরফান মাতব্বর শুনে বিশ্বাস করতে চায় না। সে বলে, ‘নিজের এলাকা ছাইড়া জঙ্গুরুল্লা এত দূরে আইব কি মরতে?’

    মেহের মুনশি বলে, ‘কওন যায় না চাচাজান। জঙ্গুরুল্লার দলে অনেক মানুষজন।’

    ‘হ ব্যাডা ট্যাহার কুমির।’ সমর্থন করে বলে জাবেদ লশকর। ‘মাইনষে কয়, জঙ্গুরুল্লা পাল্লা-পাথর দিয়া ট্যাহা মাপে। গইন্যা বোলে শুমার করতে পারে না।’

    ‘হে অইলে তো তৈয়ার থাকতে অয়,’ এরফান মাতব্বর বলে। ‘চাকইর‍্যা ভাড়া করণ লাগব, না, তোমরাই ঠেকা দিতে পারবা?’

    ফজল : ‘আমরাই পারুম।’

    মেহের মুনশি : ‘এক কাম করলে অয়। আমাগ জমিরদ্দির মাইয়া বিয়া দিছে জঙ্গুরুল্লার কোলশরিক মজিদ খালাসির পোলার কাছে। জমিরদ্দিরে পাড়াইয়া দেই খালাসি বাড়ি। মাইয়ার কাছতন খবর লইয়া আইব গিয়া।’

    যুক্তিটা পছন্দ হয় সকলের। সেদিনই জমিরদ্দিকে বেয়াই বাড়ি পাঠিয়ে এরফান মাতব্বর চলে যায় খুনের চর। রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেয়ার জন্য সে তার লোকদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে। এক এক দল পালা অনুসারে নদীর কিনারা দিয়ে ঘুরে ঘুরে পাহারা দেবে। মাতব্বর নিজেও আস্তানা গাড়ে ভাওর ঘরে।

    চর দখলের কিছুদিন পরেই বোরো ধানের রোয়া লাগানো হয়েছিল নদীর কিনারার কোনো কোনো জমিতে। নতুন মাটিতে ফসলের জোর দেয়া যায় খুব। কিছুদিন আগে আরো কিছু জমিতে লাগানো হয়েছে বোরা ধানের রোয়া। সেগুলোও সতেজ হয়ে উঠছে।

    রোদ পোহাতে পোহাতে চরটার চারদিকে চোখ বোলায় এরফান মাতব্বর। সবুজের সমারোহ তার চোখ জুড়িয়ে দেয়। নতুন চর বলেই মনে হয় না তার কাছে। চর জাগার সাথে সাথে এমন ফসল ফলানো সম্ভব হয় না সব সময়। অপেক্ষা করতে হয় দু-এক বছর।

    জমিরদ্দি খবর নিয়ে ফিরে আসে।

    খবরটা সত্যি। বিশুগাঁওয়ের জমিদার রায়চৌধুরীরা এ তৌজির এগারো পয়সার মালিক। তাদের কাছ থেকে বন্দোবস্ত এনেছে জঙ্গুরুল্লা, তার লোকজন তৈরি হচ্ছে। জন পঞ্চাশেক চাকরিয়াও নাকি এনেছে সখিপুরার চর থেকে।

    খবর শুনে মুখ শুকিয়ে যায় উপস্থিত পুলকি-মাতব্বর আর কোলশরিকদের। তাদের উদ্বেগভরা মুখের দিকে তাকিয়ে মাতব্বর বলে, ‘জমিতে ফসল দেইখ্যা চর দখলের লোভ অইছে। আহে যে চরের কাছে। আমারে চিনে না। আমি যখন থিকা মাতবর তখন জঙ্গুরুল্লার নাম-নিশানাও আছিল না।’

    রুস্তম বলে, ‘হ, পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা এহন চদরী নাম ফুডাইছে।’

    ‘হ, মাইনষে যেমুন কয়–বাপ-বয়সে ঘোড়া না, লেজেতে লাগাম। তোমরা ঘাবড়াইও না। ওর চর দখলের খায়েশ মিডাইয়া দিমু।’

    কিন্তু মুখে যত সাহসের কথাই বলুক, মাতব্বর মনে মনে শঙ্কিত হয়। মহাভাবনায় পড়ে সে। তার দলের বেশির ভাগ লোকই আনাড়ি। তারা লাঠিও ঘোরাতে পারে না ঠিকমত । ঘোরানোর চোটে যদি বো-বো আওয়াজই না ওঠে, তাকে কি লাঠি ঘোরানো বলে? মাত্র দশ বারোজন শড়কি চালাতে পারে, বেতের ঢাল দিয়ে নিজেদের বাঁচাবার কৌশল জানে। কিন্তু পেশাদার চাকরিয়াদের সামনে তারা ধরতে গেলে কুকুরের মোকাবেলায় মেকুর।

    মাতব্বর বলে, ‘মেহের মুনশি চইল্যা যাও ট্যাংরামারি। ঐ জাগার আলেফ সরদার। আমার পুরান চাকইর‍্যা। বিশ-পঁচিশজন শাগরেদ লইয়া যেন তোমার লগেই আইয়া পড়ে। আর কদম চইল্যা যাও জাজিরার চর। গদু পালোয়নের পোলা মেঘু ওর বাপের মতোই মর্দ অইছে। ওরে আর ওর দলের পনেরো-বিশজন শড়কিদার লইয়া আইয়া পড়বা জলদি।’

    একটু থেমে মাতব্বর আবার বলে, ‘আমাগ হাংগাল-বাংগালগুলারে লইয়া কি করি? এইগুলার আতে শড়কি দিতে ভস্‌সা পাই না। ওরা শড়কি আতে পাইলে বিপক্ষের মাইষের বুকের মইদ্যে হান্দাইয়া দিব। এই গুলার আতে দিতে অইব লাডি। কিন্তুক একজনও ঠিকমত লাডি চালাইতে পারে না।’

    ‘হ, ঠিকই কইছেন। একজনও ভাল কইর‍্যা লাডি চালাইতে হিগে নাই।’ বলে রমিজ মির।

    ‘ফজল, এক কাম কর। তুই লোনসিং চইল্যা যা। তুই না কইছিলি লোনসিংয়ের কে খুব ভাল লাডি খেইল শিখছে?’

    ‘হ, তুরফান।’ ফজল বলে। ‘আমার লগে নড়িয়া ইস্কুলে পড়তো। পুলিন দাসের এক শাগরেদের কাছে সে লাঠি খেলা শিখছে।’

    ‘পুলিন দাস আবার কে?’ আহাদালী জিজ্ঞেস করে।

    ‘পুলিনবিহারী দাস। বাড়ি লোনসিং। স্বদেশী আন্দোলনের বড় নেতা। এখন বোধ করি জেলে আছে।’

    ‘আমরা হুনছি, সে এত জোরে বোঁ-বোঁ কইর‍্যা লাডি ঘুরাইতে পারত, বন্দুকের ছা তার লাডির বাড়ি খাইয়া ছিট্যাভিট্যা যাইত, তার শরীলে লাগতে পারত না।’ মাতব্বর বলে। ‘ফজল গিয়া তুরফানরে লইয়া আয়। আমাগ হাংগাল-বাংগালগুলারে কয়ডা দিন লাডি খেলার তালিম দিয়া যাইব।’

    ‘আমি আইজই যাইতে আছি।’

    ‘হ, তোমরা কিছু মোখে দিয়া এহনই বাইর অইয়া পড়। যাইতে-আইতে পথে দেরি কইর‍্য না কিন্তুক।’

    দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে তিনটা উড়োজাহাজ আসছে। বিকট আওয়াজ তুলে ওগুলো মাথার ওপর দিয়ে চলে যায় উত্তর-পূর্ব কোণের দিকে।

    এরফান মাতব্বর শুনেছে, সারা দুনিয়া জুড়ে তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেছে। সে জিজ্ঞেস করে, ‘কোন মুলুকে যাইতে আছে এগুলা, জানোনি?’

    ‘মনে অয় আসাম মুলুকে যাইতে আছে।’ বলে জাবেদ লশকর।

    উড়োজাহাজগুলো দূর-দিগন্তে মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। মাতব্বর তবুও চেয়ে আছে সেদিকে। ওগুলোর আওয়াজ যেন বাসা বেঁধেছে তার বুকের ভেতর। যেন লড়াইয়ের কাড়া নাকাড়া বেজে চলেছে সেখানে।

    মাতব্বর শক্ত করে ধরে তার হাতের লাঠিটা। তার শিথিল বাহুর পেশি কঠিন হয়ে ওঠে। স্পষ্ট হয়ে ওঠে কোঁচকানো মুখের রেখাগুলো। ঘোলাটে চোখ দুটো ঝলকে ওঠে আক্রোশে।

  • এগার

    এগার

    ফজল পরের দিনই তুরফানকে নিয়ে আসে। এসেই তুরফান পুলকি-মাতব্বর আর কোলশরিকদের জোয়ান তরুণ ছেলেগুলোকে লাঠি খেলার সবক দিয়ে শুরু করেছে। ফজল নিজেও নিচ্ছে খেলার তালিম।

    আলেফ সরদার এসেছে তার তিরিশজন সারগেদ নিয়ে। মেঘু পালোয়ান নিয়ে এসেছে ঊনিশজন। মাতব্বরের দলের আশিজনও হাজির। যার যার হাতিয়ার–ঢাল-কাতরা, লাঠি শড়কি, গুলেল-গুলি সব তৈরি।

    দূর থেকে কেমনে গম্‌গম্ আওয়াজ শোনা যায়, যেমন শোনা যায় হাটের হট্টগোল। সত্যি যেন হাট বসে গেছে খুনের চরে।

    চাকরিয়াদের সাথে নিয়ে পালা অনুসারে পাহারা দিচ্ছে কোলশরিকেরা। যাদের অবসর তারা বয়স ও প্রকৃতি-প্রবণতা অনুসারে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আড্ডা দেয়। একদল মাটিতে দাগ কেটে ষোলগুটি খেলে তো আর একদল কেচ্ছা-শোলকের আসর জমিয়ে তোলে। কোনো ভাওর ঘরে বসে যায় পুঁথি-পাঠের মজলিস। সুর করে পড়ে গাজী-কালু আর সোনাভানের পুঁথি। যেখানে পানসি নৌকা তৈরি হচ্ছে, সেখানকার আসর সবচেয়ে বেশি জমজমাট। বুড়ো আকু মিস্ত্রি টান দিয়েছে গানে–

    ও-ও জীর্ণ কাষ্ঠের একখান তরী,

    তার উপরে এক সওয়ারি,

    পাড়ি ধরছে অকুল দরিয়ায়॥

    ওরে ডওরায় পানি টুবুটুবু,

    তাইতে তরী ডুবুডুবু

    এখন ঢেউ উঠিলে হইব অনুপায়॥

    আছরের নামাজের সময় হয়নি তখনও। এরফান মাতব্বর ভাওর ঘরে বসে কোরানশরীফ পড়ছিল। গানের আওয়াজ কানে আসতেই তার ভ্রু কুঞ্চিত হয়, বিরক্তি ধরে। গানের আওয়াজ যাতে কানে না আসে সেজন্য গলার স্বর উঁচু পর্দায় চড়িয়ে কোরান তেলাওয়াতে মন দেয় সে। কিন্তু পাক কোরানের পাতা ছেড়ে তার মনমাঝি এক সময়ে চড়ে বসে জীর্ণ কাষ্ঠের তরীতে।

    ও-ও জীর্ণ কাষ্ঠের একখান তরী,

    তার উপরে এক সওয়ারি,

    পাড়ি ধরছে অকুল দরিয়ায়॥

    ওরে ডওরায় পানি টুবুটুবু,

    তাইতে তরী ডুবুডুবু

    এখন ঢেউ উঠিলে হইব অনুপায়॥

    ওরে কালা মেঘে আসমান ছাওয়া

    খাড়াঝিলিক করে ধাওয়া

    এখন তুফান ছাড়লে হবে কি উপায়?

    ওরে ও মন-মাঝি–

    সাবধানে ধরিও হাল,

    কৌশলে বান্ধিও পাল,

    উজান গাঙে পাড়ি পাওয়া দায়॥

    গান শেষ হলে এরফান মাতব্বরের সংবিৎ ফিরে আসে। নিজেকে সে তিরস্কার করে বারবার। কোরান-মজিদের পাক কালামের ওপর কেন সে তার মনকে নিবিষ্ট রাখতে পারেনি। আল্লার কালাম সে অশেষ ভক্তি নিয়ে পড়ে, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে না বলে কি তার মন উড়াল দেবে ঐ গানের কথা আর সুরের পেছনে পেছনে!

    মাতব্বর আলোয়ানের কয়েক প্যাঁচে ঢেকে নেয় তার মাথা আর কান দুটো। তারপর আবার শুরু করে কোরানশরিফ তেলাওয়াত।

    আছরের নামাজ পড়ে মাতব্বর আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। শীতে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে তার সারা শরীর।

    আবার শোনা যায় গান। দোতারা বাজিয়ে এবার গাইছে বোধহয় পাঞ্জু বয়াতি।

    দয়ালরে তোর দয়ার অন্ত নাই,

    এই আসমান জমিন

    আর সাগর গহিন।

    সবখানে তার পরমান পাই॥

    মাতব্বরের মন গানের পাখায় ভর দিয়ে আবার উড়ে চলে। তাকেও টানে গানের আসরের দিকে। সে ঝুপড়ি থেকে বেরোয়। একপা-দু’পা করে এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে। তাকে দেখে সচকিত হয়ে ওঠে সবাই। বন্ধ হয়ে যায় গান। মাতব্বরের ইচ্ছে হয় চেঁচিয়ে বলে, ‘ওরে গানে ক্ষ্যান্ত দিলি ক্যান্? চলুক, চলতে দে।’

    মাতব্বর নিজেকে সামলে নেয়। সে সকলের মুরব্বি মাতব্বর। তার উচিত নয় এদের সাথে হৈ-হুঁল্লোড় করার। এছাড়া একবার যদি এরা প্রশ্রয় পেয়ে যায় তবে গান-বাজনায় মেতে যাবে সবাই। আর ওদিক দিয়ে বিনা বাধায় জঙ্গুরুল্লা দখল করে নেবে চর।

    মাতব্বর ডাকে আকু মিস্ত্রিকে, ‘কিও মিস্ত্রি, আর কদ্দিন লাগাইবা?’

    ‘এই ধরেন কুড়ি-বাইশ দিন।’

    ‘অনেক দিন লাগাইতে আছ। জলদি করো। এরপর আবার ছই লাগাইতে অইব।’

    একটু থেমে সে ডাক দেয়, ‘ফজল কইরে?’

    ‘জ্বী।’ ভিড় থেকে বেরিয়ে আসে ফজল।

    ‘তোর লাডির খেইল কেমুন চলতে আছে?’

    ‘খুব ভাল চলতে আছে।’

    ‘উন্নতি অইছে কিছু? না খালি খালি–’

    ‘না অনেক উন্নতি অইছে।’

    ‘আরো ভাল কইর‍্যা শিখতে অইব। আর হোন, তুই, হাশমত, লালু, ফেলু, বক্কর, টিটু, একাব্বর শড়কি চালানও শিখ্যা রাখ। আর কে কে শিখতে চায়?’

    ‘আমি, আমি,’ বলে আরো দশ-বারোজন এগিয়ে আসে।

    মাতব্বর বলে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ সাবাস! তোমরা আলেফ সরদার আর মেঘু পালোয়ানের শাগরেদ অইয়া যাও। শড়কি চালান শিখ। খামাখা সময় নষ্ট কইর না। কি ভাই আলেফ সরদার, কই মেঘু, পারবা না আমাগ এই হাংগাল-বাংগালগোরে এট্টু লায়েক বানাইতো?’

    ‘পারমু না ক্যান্,’ মেঘু পালোয়ান বলে।

    ‘মেঘু রাজি অইয়া গেল নি ও?’ হাসতে হাসতে বলে আলেফ সরদার। ‘এই জমিনওলাগো এই বিদ্যা হিগাইলে হেষে আমাগ ভাত জুটব না কিন্তু কইয়া দিলাম। কি কন মাতবর-ভাই?’

    ‘আরে না-না। ভাত দেওনের মালিক আল্লা। আমরা চাইলেও কি আর তোমাগ ভাত মারতে পারমু?’

    ‘তা ঠিক কইছেন। লইয়া আহেন মণ্ডা-মিডাই। মোখ মিষ্টি কইর‍্যা তয় না পয়লা সবক দিমু।’

    পরের দিন মিষ্টিমুখ করে আলেফ সরদার আর মেঘু পালোয়ান নতুন নতুন সাগরেদদের শড়কি চালনা শেখাতে আরম্ভ করে। এরফান মাতব্বর নিজে দাঁড়িয়ে দেখে। সেও এক কালে ভাল শড়কি চালাতে পারত।

    এরফান মাতব্বর নতুন সাগরেদদের উপদেশ দেয়, মাইনষে কইতেই কয়, বাঙ্গালের মাইর, দুনিয়ার বাইর। তোমরা হেই রকম বাঙ্গাল। তোমরা কাবু পাইলে এক্কেবারে মাইরা ফালাইবা, আবার বেকাদায় পড়লে নিজেরা মরবা। এর লেইগ্যা তোমাগ তালিম দিতাছি। চরের কাইজ্যা কিন্তু রাজা-বাদশাগ লড়াই না যে যারে পাইলাম তারে খুন করলাম। চরের কাইজ্যা অইল বিপক্ষরে খেদানের লেইগ্যা। তাই নিজেরে বাঁচাইতে শিখ একদম পয়লা। তারপর শড়কি দিয়া খোঁচা দিতে শিখ। খোঁচা কিন্তু বুকে মাথায় দিবা না। খোঁচা দিবা আতে, পায়ে। খোঁচা খাইয়া যে লাঠি-শড়কি ফালাইয়া ভাইগ্যা যায়।

    রোজ ভোর বেলা তিন-চার ঘণ্টা চলে শড়কি চালনা শিক্ষা। আর বিকেল বেলা আলেফ সরদারও মেঘু পালোয়ান তাদের দল নিয়ে লাঠি-শড়কি খেলার প্রতিযোগিতায় নামে। কখনও জঙ্গুরুল্লার দল সেজে একদল আক্রমণ করে, অন্য দল এরফান মাতব্বরের পক্ষ নিয়ে তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে যায়। মহড়ার সময় ন্যাকড়া দিয়ে বেঁধে দেয়া হয় শড়কির ফলা।

    চাকরিয়ারা মাথাপিছু এক টাকা হিসেবে রোজানা পায়। তাদের সরদার দু’জন পায় দু’টাকা করে। এর ওপর আবার মাগনা খোরাক দুবেলা। কম করে খেলেও আধা সের চালের ভাত খায় এক-এক জনে এক-এক বেলা।

    চাকরিয়া এসেছে আজ বিশ দিন। এ ক’দিনে দেড় হাজার টাকার ওপর খরচ হয়ে গেছে এরফান মাতব্বরের। আরো কতদিন রাখতে হবে চাকরিয়াদের কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। কিন্তু এই হারে খরচ হলে কিছুদিনের মধ্যেই সে ফতুর হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে যা আদায় হয়েছিল সেলামি বাবদ। কোলশরিকদের কাছ থেকেও কিছু আদায় করা যাবে না এখন, আর তা উচিতও নয়। সেলামির টাকাই বহু কষ্টে যোগাড় করেছিল তারা। সে ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি অনেকে।

    এই জমিদার আর জমিদারের নায়েবরাই যত নষ্টের গোড়া। মনে মনে গর্জে ওঠে এরফান মাতব্বর। যে এগারো পয়সার মালিকানা দেখায় রায়চৌধুরীরা, সেই জাগাতো আরো অনেক দক্ষিণে, এখনো পানির তলে। ছয়-সাত বচ্ছর আগে ঐখানে চর আছিল্‌।

    নিজেগ জাগার নাম-নিশান নাই, এখন আমার চরের বন্দোবস্ত দিছে জঙ্গুরুল্লারে। জমিদার আর ওর নায়েবের পেডের ঝুলি বাইর করন দরকার। যত কাইজ্যা-ফ্যাসাদের মূলে এই জানোয়ারের পয়দারা।

    মনের আক্রোশ মনেই চাপা দিয়ে এরফান মাতব্বর জঙ্গুরুল্লার হামলা প্রতিরোধের জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে, কিন্তু এ পর্যন্ত একবারও হানা দেয়ার চেষ্টা করেনি বিপক্ষ দল। দিন দশেক আগে একবার, দিন দুই আগে আরো একবার রাত দুপুরে হৈ-চৈ করে উঠেছিল পাহারারত চাকরিয়ারা, ‘ঐ আইতে আছে, আউগ্‌গারে, আউগ্‌গা…আউগ্‌গা…’

    মারমার করে এগিয়ে গিয়েছিল দলের সবাই। ফজল নদীর কিনারায় গিয়ে পাহারাওলাদের কাছে শোনে–অনেকগুলো নৌকা এদিকে আসছিল। এদিকের হাঁক-ডাক কুদা-কুদি শুনে ভেগে গেছে।

    ফজল টর্চের আলো ফেলে।

    চাকরিয়াদের একজন বলে, ‘এহন কি আর দেহা যাইব? এতক্ষণে চইল্যা গেছে কোন মুলুকে!’

    মাতব্বর পুরানো ঘাগু। সে জানে, এ সব কিছু নয়। চাকরিয়াদের চাকরি বজায় রাখার ফন্দি আর কি। কিন্তু জেনেও সে বলে না এ কথা কাউকে। বললে শেষে হয়তো যেদিন সত্যি সত্যি বাঘ আসবে সেদিন রাখালকে বাঁচাবার জন্য আর এগিয়ে আসবে না কেউ।

    হুড়মুড় করে চলে যাচ্ছে টাকা। প্রায় শ’খানেক টাকা খরচ হয় রোজ। দিন যত যাচ্ছে, তহবিলের টাকাও কমে আসছে তত। আর এ ভাবে খরচ করা উচিত নয়, ভাবে এরফান মাতব্বর। আলেফ সরদার ও মেঘু পালোয়ানের সাথে পরামর্শ করে সে দুই দল থেকে বেছে মাত্র দশজন রেখে বাকি সবাইকে বিদেয় করে দেয়। আলেফ ও মেঘুর ‘রোজানা’ দুটাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় তিন টাকা।

  • বার

    বার

    পান্‌সি তৈরি শেষ হয়েছে। ওটায় গাবও লাগানো হয়েছে তিন পোচ। এখন পানিতে ভাসিয়ে এতে পাটাতন বসাতে হবে, ছই লাগাতে হবে।

    বুধবার জোহরের নামাজ পড়ে নৌকা ভাসানো হবে। শুভ দিন-ক্ষণ ঠিক করে রেখেছে এরফান মাতব্বর। কিন্তু বুধবার আসার তিন দিন আগেই তার জ্বর হয়। বাড়ি গিয়ে সে বিছানা নেয়।

    শুভ দিন-ক্ষণ যখন ধার্য করা হয়েছে তখন ঐ দিন ঐ ক্ষণেই নৌকা ভাসানো হবে– ফজলকে খবর পাঠায় এরফান মাতব্বর। গাবুর একাব্বর খবরের সাথে নিয়ে আসে তিনটে ধামা ভরে খই আর সের কয়েক বাতাসা।

    পাহারারত কয়েকজন ছাড়া আর সবাই জমায়েত হয়েছে নৌকা ঠেলবার জন্য।

    নৌকার বুকের সামনে মাটিতে পাতালি করে রাখা হয়েছে চারখণ্ড কলাগাছ। একবার কলাগাছের ওপর চড়িয়ে দিতে পারলে নৌকাটা সহজেই গড়িয়ে নেয়া যাবে নদীর দিকে। গায়ে গায়ে মেশামেশি হয়ে নৌকা ধরেছে অনেকে। সবার ধরবার মতো জায়গা নেই। ফজল মাথার ওপর রুমাল নেড়ে হাঁক দেয়, ‘জো-র আ…ছে…এ…এ…?’

    সকলে : ‘আ….ছে…এ…এ…।’

    ফজল : ‘এই জোর থাকতে যে জোর না দিব তার জোর নিব ট্যাংরা মাছে…এ…এ… হেঁইও…’

    সকলে : ‘হেঁইও।’

    ফজল : ‘মারুক ঠেলা।’

    সকলে : ‘হেইয়ো।’

    ফজল : ‘মারুক ঠেলা।’

    সকলে : ‘হেঁইও…ও…ও…’

    ফজল : ‘অ্যাই কলাগাছ ফ্যাল সামনে…এ…এ… মোরো ঠেলারে… এ…এ…।’

    সকলে : ‘হেঁইও, নামছে, নামছে নামছেরে– হেঁইও।’

    নৌকা নেমে গেছে নদীতে। ফজল ও আরো কয়েকজন বসেছে নৌকায়। পাঁচখানা বৈঠা এগিয়ে দেয় একাব্বর।

    সকলে চিলিবিলি করে খই আর বাতাসা ভরে নিজ নিজ গামছায়। একটা ধামায় করে কিছু খই-বাতাসা তুলে দেয়া হয় পানসিতে।

    ফজল হাল ধরেছে। চারজন টানছে বৈঠা। নতুন পানসি তরতর করে চলছে পানি কেটে। কিনারায় দাঁড়িয়ে খই-বাতাসা খাচ্ছে সবাই, আর চেয়ে দেখছে নতুন নৌকার চলন দোলন। গড়নে কোনো খুঁত আছে কিনা তাও দেখছে মনোযোগ দিয়ে।

    ‘ও মিয়ারা?’

    ডাক শুনে বাঁ দিকে মাথা ঘোরায় সবাই। উত্তর দিক থেকে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে একজন অপরিচিত লোক।

    ‘কি কও মিয়া? দৌড়াইতেছ ক্যান?’ একজন জিজ্ঞেস করে।

    ‘দারোগা-পুলিস আইতাছে।’ লোকটি বলে। ‘অ্যাঁ দারোগা-পুলিস! কই?’

    ভীত ও বিস্মিত প্রশ্ন সকলের। কারোটা উচ্চারিত হয়, কারোটা ভয়ে লুকিয়ে থাকে মুখের গহ্বরে।

    ‘ঐ চাইয়া দ্যাহো।’

    সবাই উত্তর দিকে তাকায়। সত্যি থানার নৌকা। আরো দুটি নৌকা আসছে ওটার পেছনে পেছনে।

    লোকটিকে ছুটে আসতে দেখেই পাড়ের দিকে পানসি ঘুরিয়েছিল ফজল। তাড়াতাড়ি বৈঠা মেরে ফিরে আসে সে। নৌকার থেকে লাফ দিয়ে নেমেই জিজ্ঞেস করে, ‘কি ও, কি কি?’

    ‘দারোগা-পুলিস আইতাছে, ঐ দ্যাহো চাইয়া।’

    একই সঙ্গে অনেকগুলো সন্ত্রস্ত কণ্ঠের কোলাহলে শঙ্কিত হয় ফজল। সে থানার নৌকার দিকে চেয়ে অপরিচিত লোকটিকে জিজ্ঞেস করে, ‘কিয়ের লেইগ্যা আইতে আছে?’

    ‘কাইল বোলে ডাকাতি অইছে কোনখানে?’

    ‘হ অইছে এই চরের পশ্চিম দিগে।’

    গত রাত্রে এশার নামাজের পর ফজল ও তার মাছ ধরার সঙ্গীরা বেড়ের মাছ ধরতে গিয়েছিল। চাকরিয়াদের খাওয়াবার জন্যই শুধু পৌষ মাসের হাড়-কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে মাছ ধরতে যেতে হয় আজকাল। ভাটার সময় তিরতিরে পানির মধ্যে আছাড়-পাছাড় খেয়ে মাছ ধরছিল তারা। এমন সময় শোনা যায় ডাক-চিৎকার, ‘আমারে মাইর‍্যা ফালাইছে রে। ডাকাইত–ডাকাইত।’ পরে জানা যায় পুব্যের চরের এক গেরস্ত পাট বিক্রি করে লৌহজং থেকে বাড়ি ফিরছিল নৌকায়। একদল ডাকাত তাকে মারধর করে তার পাট-বেচা পাঁচশ’ টাকা নিয়ে গেছে।

    অপরিচিত লোকটি বলে, ‘ঐ ডাকাতির আসামি ধরতে আইতে আছে।’

    ‘আসামি! আসামির খোঁজ পাইছে?’ ফজল জিজ্ঞেস করে।

    ‘হ আপনের নামও আছে। আর কদম শিকারি কার নাম? আরো চৌদ্দ-পনেরো জন।’

    ফজল স্তব্দ, বিমূঢ়। চোখে তার শূন্য দৃষ্টি।

    মেহের মুনশি লোকটিকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে ভাই? কই হোন্‌ছ এই কথা?’

    ‘আরে মিয়া আমার বাড়ি বাঁশগাও। ফজল মিয়া তো চিনে না। ওনার বাপ চিনে। তার লগে আমার বাপের গলায় গলায় খাতির আছিল। আইজ চুরির ইজাহার দিতে গেছিলাম থানায়। ফজল মিয়ারে আসামি দেওনের কথা হুইন্যা চিল-সত্বর আইছি দারোগার নাওরে পিছনে ফালাইয়া।’

    সংবিৎ ফিরে পেতেই ফজল দেখে তার লোকজন এমন কি চাকরিয়ারা পর্যন্ত ভেগে যাচ্ছে। কেউ ভাওর ঘরের দিকে ছুটছে। কেউ ছুটছে কিনারায় বাধা ডিঙিগুলোর দিকে।

    রমিজ মিরধা বলে, ‘কি মিয়া খাড়াইয়া রইছ কাঁ? ঐ দ্যাহো আইয়া পড়ল। সে এক রকম ঠেলে নিয়ে চলে ফজলকে। শিগগির নায় ওড।’

    ভাওর ঘর থেকে হাতিয়ার, বিছানাপত্র নিয়ে দৌড়ে আসে চাকরিয়াদের কেউ কেউ। ফজলের আগেই তারা নতুন পানসিটায় চড়ে বসে।

    ফজল বলে, ‘তোমরা ক্যান পলাইতেছ? তোমায় তো ধরতে আসে না।’

    ‘তোমরা যেমুন পলাইতে শুরু করছ, মনে অয় তোমরাই ডাকাতি করছ।’ মেহের মুনশি বলে।

    ‘আমরা ডাকাতি করছি, কয় কোন হুমুন্দির পুত।’ ঝাঁঝি মেরে ওঠে আলেফ সরদার।

    ‘এই চাকরা, মোখ সামলাইয়া কথা কইস।’

    ‘দ্যাখ, মোখ দিয়া না, এই শড়কি দিয়া কইমু।’ আলেফ শড়কি উঁচু করে।

    ফজল ধমকি দেয়, ‘এইডা কি শুরু করলেন আপনেরা।’

    ‘আরে আইয়া পড়ল! শিগগির ওড নায়।’ রমিজ মিরধা তাড়া দেয়।

    ফজল : ‘কেও বাকি নাইতো?’

    জাবেদ লশকর : ‘আরে না–না। ঐ চাইয়া দ্যাহ্, জমিরদ্দির নায় ওঠছে দশ-বারোজন আর ঐ যে ধলাইর নাও।’

    মেঘু পালোয়ান : ‘মিয়ারা তোমরা পুলিসের লগে দোস্তালি কর। আমরা নাও ছাইড়া দিলাম।’

    ফজল ও বাকি আর সবাই পানসিতে ওঠে। পাঁচ বৈঠার টানে ছুটে চলে পানসি।

    দূরে মান্দ্রার খড়ির মুখে জড় হয় সব ক’টা নৌকা। গুনতি করে দেখা যায় সবাই পালাতে পেরেছে।

    লালুর বাপ বলে, ‘পুলিস আইজ একটা ঠক খাইব। একটা পোনাও পাইব না করে।’

    একাব্বর ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছিল। পুলিসের কথা শুনেই নৌকার ডওরার মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে আল্লা-আল্লা করছিল সে। এতক্ষণে তার প্রাণে পানি আসে। সে বলে, ‘নাওডা আরো দূরে লইয়া যাও। পুলিস বন্দুক ছাইড়া দিব।’

    হো-হো হেসে ওঠে সবাই।

    ফজল বলে, ‘ব্যাডা কেমন নিমকহারাম। আমরা ভালরে বুইল্যা আউগাইয়া গেলাম। আর আমাগ দিল আসামি!’

    মেঘু পালোয়ান : ‘ঐ যে মাইনষে কয় না, উপকাইরারে বাঘে খায়।’

    মেহের মুনশি : ‘আমার মনে অয় কেও পরামিশ দিয়া আমাগ নাম লাগাইয়া দিছে। না অইলে ঐ অচিনা ব্যায় নাম পাইল কই?’

    আলেফ সরদার : ‘দুশমনের কি আকাল আছে? তোমায় চরের কাছে ডাকাতি অইছে, তাই সন্দ করছে, তোমরা ছাড়া আর কে করব এই কাম।’

    ফজল : ‘আমাগ না অয় সন্দ করছে, আমরা পালাইছি। কিন্তু আপনেরা ক্যান্ পলাইছেন চর খালি থুইয়া?’

    আলেফ : ‘মিয়া, তোমার একগাছ চুলও পাকে নাই। তাই বোঝতে পার না। দারোগা যহন জিগাইত–ও মিয়া তোমার বাড়ি কই? তহন কি মিছা কথা কইতে পারতাম? ট্যাংরামারির কথা হুইন্যা এক্কেরে তক্ষণ তক্ষণ মাজায় দড়ি লাগাইত। কইত এত দূর তন কি করতে আইছ এইখানে? তোমরাই ডাকাতি করছ।’

    নৌকার সবাই সায় দেয় তার কথায়। ফজলকেও মেনে নিতে হয় তার যুক্তি।

    শীতকালের বেলা তাড়াতাড়ি পালায় শীতের তাড়া খেয়ে। দারোগা-পুলিস চর থেকে চলে যায়। তাদের নৌকা দৃষ্টির আড়াল হতেই মান্দ্রার খাড়ি থেকে বেরোয় সবকটি নৌকা।

    মেহের মুনশি বলে, ‘আস্তে আস্তে চালাও। আন্ধার অউক।’

    ‘চইল্যাতত গেছে। আবার আস্তে আস্তে ক্যান?’ মেঘু পালোয়ান বলে। ‘দুফরের খাওনডা মাইর গেছে। জলদি চালাও।’

    ‘হ জলদি চালাও।’ আলেফ সরদার বলে। ‘প্যাটার মইদ্যে শোল মাছের পোনা কিলবিলাইতে আছে।’

    তবু ধীরে ধীরে চলছে নৌকা। চরের কাছে পৌঁছতে সন্ধ্যা উতরে যায়।

    ‘এই ক্যাডারে? আর আউগ্‌গাইস্ না, খবরদার!’

    ‘খাইছেরে! সব্বনাশতো অইয়া গেছে!’

    ‘হায় আল্লা, জঙ্গুরুল্লা চর দখল কইর‍্যা ফালাইছে।’

    ফজল ও তার লোকজন হতভম্ভ। তাদের নৌকা থেমে গেছে। পানিতে টুপটাপ পড়ছে কিছু। গুলেল বাঁশের গুলি বুঝতে পারে তারা। দু-একটি গুলি তাদের গায়েও এসে লেগেছে।

    আকস্মিকতার ঘোর কাটিয়ে ফজল হাঁক দেয়, ‘কারারে তোরা? ভাইগ্যা যা ভাল থাকতে। নইলে জবাই কইর‍্যা ফালাইমু।’

    ‘আইয়া দ্যাখ কে কারে জবাই করে।’

    তারপর দুই দলে চলতে থাকে অশ্রাব্য গালাগাল।

    ফজল ও মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে আলেফ ও মেঘুকে, ‘কি মিয়ারা, পারবানি লড়তে?’

    ‘লড়তে পারমু না ক্যান্। কিন্তুক এই রাইতের আন্ধারে কে দুশমন কে আপন চিনা যাইব না। আউলাপাতালি লড়াই করতে গিয়া খামাখা জান খোয়াইতে অইব।’

    একজন লাঠিয়াল : ‘আমার ঢাল-শড়কি আনতে পারি নাই।’

    মেঘু : ‘অনেকের কাছেই আতিয়ার নাই। আতিয়ার থুইয়া পলাইছে আহাম্মকরা।’

    জাবেদ লশকর : ‘তয়তো ওগো মজাই। আমাগ শড়কি দিয়াই আমাগ পেডের ঝুলি বাইর করতে পারব।’

    প্রত্যেকেই কাঁথা-বালিশ, ঢাল-কাতরা, লাঠি-শড়কি, মাছ ধরার সরঞ্জাম ইত্যাদি কিছু না কিছু হারিয়ে হায়-আফসোস করতে থাকে।

    মেহের মুনশি বলে, ‘জঙ্গুরুল্লাতো জবর ফেরেববাজ। দ্যাখছনি ক্যামনে ডাকাতি মামলা দিয়া আমাগ ছাপ্পরছাড়া কইর‍্যা দিল!’

    ‘হায় হায়রে! এত কষ্ট কইরা ধান রুইছি।’ লালুর বাপ বলে।

    মেঘু পালোয়ান : ‘জঙ্গুরুল্লা কি মরদের মতো কাম করছে নি? হিম্মত থাকলে আইত সামনাসামনি।’

    জাবেদ : ‘আহ্-হারে কতগুলা জমির ধান। এত কষ্ট কইর‍্যা–’

    আলেফ : ‘আর হায়-হুঁতাশ কইর‍্যা কি অইব? চলো, মাতবরের কাছে যাই। দেহি উনি কি করতে বুদ্ধি দ্যান্।’

    রমিজ মিরধা: ‘কাইল রাইত পোয়াইলে আহন লাগব। কাইল যদি ওগ তাড়াইতে না পারো তয় ধানের আশা মাডি দিয়া থোও।’

    ফজল : ‘দেহি, বাজান কি করতে কয়।’

    নতুন পানসি এরফান মাতব্বরের বাড়ির দিকে রওনা হয়। তার পেছনে সারি বেঁধে চলে ছোট-বড় বাইশখানা ডিঙি।

  • তের

    তের

    লাঠালাঠি হাঙ্গামা ছাড়াই খুনের চর দখল হয়েছে। এত সহজে চরটা দখল করতে পারবে, ভাবতে পারেনি জঙ্গুরুল্লা। সে মনে করেছিল–বিপক্ষের কিছু লোক আর চাকরিয়ারা অন্তত থাকবে চরে। তারা মুখোমুখি হবে তার লাঠিয়ালদের, ছোটখাট মারামারি হবে। কিন্তু কিছুই হয়নি। পুলিসের ভয়ে ওদের সবাই ছুটছাট পালিয়েছিল চর খালি রেখে।

    চর দখলের পরের দিন ভোরবেলা জঙ্গুরুল্লার পানসি এসে ভিড়ে খুনের চরের ঘোঁজায়। পানসি দেখে লোকজন ভিড় করে এসে দাঁড়ায় পানসির কাছে। জঙ্গুরুল্লা রুমিটুপি মাথায় দিয়ে শালটা ভাল করে গায়ে জড়িয়ে খাস খোপ থেকে বেরোয়। তার পেছনে বেরোয় তার দুই ছেলে হরমুজ ও জহির।

    ‘আসোলামালেকুম।’ এক সাথে সবাই সালাম দেয় জঙ্গুরুল্লাকে।

    ‘ওয়ালাইকুম সালাম।’ ফরমাশ দিয়ে তৈরি তেরো নম্বরি জুতো-জোড়া পায়ে ঢোকাতে ঢোকাতে জঙ্গুরুল্লা সালামের জবাব দেয়। জহিরের হাত থেকে রূপার মুঠিবাধানো বেতের লাঠিটা নিয়ে সে দাঁড়ায় নৌকার মাথির ওপর।

    ‘মজিদ খালাসি কই হে?’

    ‘এইতো হুজুর।’

    ‘আমিও আছি হুজুর।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘চলো, চরটা আগে দেইখ্যা লই।’

    ‘চলেন হুজুর।’ মজিদ খালাসি বলে।

    জঙ্গুরুল্লা চরের মাটিতে নামে। তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় মজিদ খালাসি ও দবির গোরাপি।

    জঙ্গুরুল্লা থপথপ করে পা ফেলে এগিয়ে যায় বুক টান করে, মাথা উঁচু করে। তার চলনে-বলনে দিগ্বিজয়ীর দৃপ্ত ভঙ্গি।

    চলতে চলতে চরটার চারদিকে চোখ বুলায় জঙ্গুরুল্লা। মাঝখানের কিছু জায়গা বাদ দিয়ে সারাটা চরেই লাগানো হয়েছে বোরো ধান। ধানগাছের গোছা পেখম ধরেছে বেশ। গাছের মাজা মুটিয়ে উঠেছে। কিছুদিনের মধ্যেই শীষ বেরুবে।

    ‘কেমুন মিয়ারা! তোমরাতো চর দখলের লেইগ্যা হামতাম শুরু করছিলা।’ চলতে চলতে বলে জঙ্গুরুল্লা। ‘অত ত্বরাহুড়া করলে এমুন বাহারিয়া ধান পাইতা কই? আমি তখন কইছিলাম না, ওরা ধান-পান লাগাইয়া ঠিকঠাক করুক, আমরা তৈয়ার ফসল ঘরে উডাইমু।’

    ‘হ, আল্লায় করলে তৈয়ার ফসল ঘরে উড়ান যাইব।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘খুব মজা, না? ধান বোনে হাইল্যা, প্যাট ভরে বাইল্যা।’ মনে মনে হাসে জঞ্জুরুল্লা।

    ‘আপনে জবর একখান ভোজবাজির খেইল দ্যাহাইছেন।’ বলে মজিদ খালাসি।

    ‘হ, এরই নাম ভোজবাজির খেইল, আক্কেলের খেইল। দ্যাখলা তো আমার আক্কেল দিয়া ওগ কেমুন বেয়াক্কেল বানাইয়া দিছি।’ জঙ্গুরুল্লার চোখে-মুখে আত্মপ্রসাদের হাসি।

    ‘হ, ওরা এক্কেরে বেয়াক্কেল অইয়া গেছে।’

    মাঘ মাস। উত্তুরে বাতাসে ঢেউয়ের আলোড়ন তোলে ধান খেতে। জঙ্গুরুল্লা শালটার এক প্রান্ত গলায় পেঁচিয়ে নেয়। বলে, ‘জবর শীত পড়ছে তো। ও মজিদ, বাইরে হোগলা বিছাইয়া দ্যাও। রউদে বইয়া তোমাগ লগে কথা কইমু।’

    চরের চারদিকটা ঘুরে ফিরে দেখে তারা এরফান মাতব্বরের তৈরি ভাওর ঘরের পুবপাশে এসে দাঁড়ায়।

    মজিদ খালাসি ঝুপড়ি থেকে হোগলা ও বিছানার চাদর এনে মাটিতে বিছিয়ে দেয়। জুতো ছেড়ে জঙ্গুরুল্লা আসনসিঁড়ি হয়ে বসে।

    ‘আর লোকজন কই?’ জিজ্ঞেস করে জঙ্গুরুল্লা।

    ‘বেড়ে মাছ ধরতে গেছে।’

    ‘বেড় দিছে! বানা পাইল কই?’

    ‘মাতব্বরের কোলশরিকরা ফালাইয়া গেছে।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘আইচ্ছা! আর কি কি ফালাইয়া গেছে?’

    ‘ঢাল-কাতরা, লাডি-শরকি, ক্যাথা-বালিশ, থালা-বাসন, তিনডা টচ লাইট।’

    ‘ঝাঁকিজাল, টানাজাল, মইয়া জাল, ইলশা জাল।’ একজন কোলশরিক দবির গোরাপির অসম্পূর্ণ তালিকা পরিপূরণের উদ্দেশ্যে বলে।

    ‘আরো অনেক কিছু—চাঁই, দোয়াইর, আটি, বইচনা, খাদইন, পারন।’ বলে আর একজন কোলশরিক।

    ‘এইডারে কয় বুদ্ধির খেইল, বোঝলা? আক্কেলের খেইল।’ জঙ্গুরুল্লা আবার তার নিজের বাহাদুরি প্রকাশ করে। ‘দ্যাখলাতো আমার আক্কেলের ঠেলায় ওগ আক্কেল গুড়ুম।’

    ‘হ, আপনের বুদ্ধির লগে কি ওরা কুলাইতে পারে? আপনের বাইয়া পায়ের বুদ্ধিও ওগ নাই।’ বলে মজিদ খালাসি।

    পায়েরও আবার বুদ্ধি থাকে! মনে মনে খুশি হয় জঙ্গুরুল্লা। সে আড়চোখে তাকায় তার নিন্দিত পা দুটোর দিকে।

    ‘বেড়ে মাছ পাওয়া যায়?’ জিজ্ঞেস করে জঙ্গুরুল্লা।

    ‘আইজই বেড় পাতছে। কিছু তো পাইবই।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘ওরা চাউল-ডাউল, তেল-মরিচ ফালাইয়া গেছে না?’

    ‘হ কিছু ফালাইয়া গেছে। আমাগ বেবাকের তিন-চারদিন চইল্যা যাইব।’

    ‘শোন, ভাটাতো শুরু অইয়া গেছে। ওরা মাছ মাইরা আসুক। বেবাক মানুষ একখানে অইলে কথা কইমু তোমায় লগে। এক কাম করো, চাউল-ডাইল তো আছেই। বেড়ে মাছও পাওয়া যাইব। রান্দনের আয়োজন কর। আইজ বেবাক মানুষ একখানে বইস্যা আমার লগে খাইব।’

    ‘হ, আয়োজন করতে আছি।’ মজিদ খালাসি বলে।

    ‘শোন, বেড়ের মাছ ধরতে গিয়ে ধানেরে পাড়াইয়া-চড়াইয়া যেন বরবাদ না করে। তোমরা গিয়া হুঁশিয়ার কইর‍্যা দিয়া আসো।’

    ‘হ যাই।’

    মজিদ খালাসি চলে যায়।

    ‘চরের পাহারায় কারা আছে?’

    ‘চাকইর‍্যারা আছে। আর যারা বেড়ে মাছ ধরতে গেছে তারাও নজর রাখব।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘ওরা আর আইতে সাহস করব না। কি মনে অয় তোমাগ, আইব ওরা? ওরা আইব ক্যামনে? কি লইয়া আইব? ওগ বেবাক আতিয়ার তো আমাগো দখলে।’

    ‘হ, আতিয়ার বানাইয়া তৈয়ার অইতে বহুত দেরি। যহন আইব, আইয়া দ্যাখব রাইস্যা গাঙ চরডারে খাবলা দিয়া লইয়া গেছে।’

    সবাই হেসে ওঠে।

    হঠাৎ হাঁক ছাড়ে জঙ্গুরুল্লা, ‘মাঝিমাল্লাগুলা গেল কই? হারামজাদারা এতক্ষণের মইদ্যে এক ছুলুম তামুক দিয়া গেল না। অই কেরা, অ ফেকু–’

    দবির গোরাপি উঠে পানসির দিকে দৌড় দেয়।

    জঙ্গুরুল্লা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘থাউক তোমার যাওনের দরকার নাই। আমিই নৌকায় গিয়া বসি। বেড়ে কি মাছ পাও আমারে দ্যাখ্যাইয়া নিও।’

    জঙ্গুরুল্লা নৌকায় উঠে ছই-এর বাইরে পাটাতনের ওপর বসে। মাঝি কেরামত ফরসি হুঁকোয় তামাক সাজিয়ে দীর্ঘ নলটা এগিয়ে দেয় তার দিকে। সে নলে মুখ দিয়ে টানে গুড়ুক—গুড়ুক।

    দবির গোরাপি, হরমুজ, জহির ও আরো কয়েকজন দাঁড়িয়েছিল পাড়ে।

    ‘ও জহির, ও হরমুজ।’

    ‘জ্বী।’

    ‘তোরা নৌকারতন শিকল নিয়া যা। দবিররে লইয়া চরটার মাপ-জোখ নে।’

    জহির নৌকা থেকে জমি মাপার শিকল নিয়ে নামে।

    জঙ্গুরুল্লা আবার বলে, ‘ওরা কেম্বায় জমি ভাগ করছিল, জানোনি দবির?’

    ‘হ, চরডারে দুই ভাগ করছে পয়লা। উত্তরে একভাগ আর দক্ষিণে একভাগ। হেরপর আট আতি নল দিয়া মাইপ্যা ভাগ করছিল।’

    ‘ঠিক আছে, আমরাও এই নলের মাপেই ভাগ করমু। ওরা যেই আইল বানছিল সেই আইল ভাঙ্গনের দরকার নাই। শিকল দিয়া নলের মাপ ক্যাদায় দিবা, জানোনানি?’

    ‘জানি।’ হরমুজ বলে। ‘আঠারো লিঙ্কে আট হাত, মানে একনল।’

    ‘ঠিক আছে তোরা যা। দুফরে খাওনের পর জমি ভাগ-বাটারার কাম করণ যাইব।’

    পুবদিক থেকে স্টিমার আসছে। এ সময়ে খাটো চোঙার জাহাজ–দেখেই জঙ্গুরুল্লা বুঝতে পারে এটা কোন লাইনের জাহাজ। চাঁদপুর থেকে গোয়ালন্দ যাচ্ছে চাটগাঁ মেল। আবার পশ্চিম দিক থেকেও আসছে একটা লম্বা চোঙার স্টিমার। এটা নিয়মিত কোনো যাত্রীজাহাজ নয়–জঙ্গুরুল্লা বুঝতে পারে।

    কোনো একটার থেকে পানি মাপা হচ্ছে। দূর থেকে তারই ঘোষণার সুর অস্পষ্ট ভেসে আসছে কিছুক্ষণ পর পর—‘দুই বাম মিলে-এ-এ-এ-এ–না–আ–আ—আ।’

    ‘কেরা, মজবুত কইর‍্যা নাও বাইন্দা রাখ। জবর ঢেউ ওঠব। দুই জাহাজের ঢেউ।’

    কেরামত পানসিটাকে কিনারা থেকে কিছুদূর সরিয়ে দুই মাথি বরাবর লগি পুঁতে রশিতে আয় রেখে শক্ত করে বাঁধে।

    স্টিমার দুটো পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসছে।

    ‘পুঁ–উ-ত।’ মেয়েলি মিহি আওয়াজে দীর্ঘ সিটি বাজায় লম্বা জাহাজ।

    ‘ফুঁ-উ-ত।’ চাটগাঁ মেল সিটির জবাব দেয় পুরুষালি মোটা বাজখাই আওয়াজে।

    ‘এই কেরা, জাহাজ দুইডা হুইসাল মারলো ক্যান্ জানস নি?’

    ‘হ, আমরা যেমুন নাও বাওনের সময় আর একটা নাও দ্যাখলে কই, হাপন ডাইন, জাহাজ দুইডাও হুইসাল দিয়া কইল হাপন বাম–যার যার বাঁও দিগ দিয়া যাও।’

    ‘দুও ব্যাডা, পারলি না কইতে। লম্বা চুঙ্গা হুইসাল দিয়া কইল–সেলামালেকুম, কেমুন আছেন? খাডো চুঙ্গা জ’ব দিল–আলেকুম সালাম। ভাল আছি। তুমি কেমুন আছ?’

    খুনের চরের উত্তর দিক দিয়ে স্টিমার দুটো একে অন্যের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। পূর্বগামী জাহাজটিতে বোঝাই হয়ে যাচ্ছে দেশী-বিদেশী সৈন্য।

    ‘এত সৈন্য যায় কই, হুজুর।’ কেরামত জিজ্ঞেস করে।

    ‘যায় লড়াই করতে। আমরা যেমুন চর দখলের লেইগ্যা বিপক্ষের লগে মারামারি করি, ওরাও তেমুন যাইতেছে বিপক্ষের লগে লড়াই করতে।’

    একটা চাঙারি তিনজনে ধরাধরি করে এনে পানসির মাথির ওপর রাখে। তিনজনই শীতে কাঁপছে ঠকঠক করে। ওদের সাথে এসেছে মজিদ খালাসি। সে বলে, কিরে তোরা শীতে এমুন ঠকঠকাইতে আছস ক্যান? তোগ এত শীত! এই শীত লইয়া পানির মইদ্যে মাছ ধরলি ক্যামনে?’

    ‘মাছ ধরনের কালে শীত টের পাই নাই।’ বলে ওদের একজন। ‘মাছ ধরনের নিশার মইদ্যে শীত আইতে পারে নাই। এহন বাতাস গায়ে লাগতেছে আর শীত করতেছে।’

    জঙ্গুরুল্লা খাস কামরায় গিয়ে গড়াগড়ি দেয়ার আয়োজন করছিল, শব্দ পেয়ে বেরিয়ে আসে। মাছ দেখে সে খুশি হয় খুব। অনেক মাছ! কমসে কম পনেরো সের দুই ওজনের একটা কালিবাউস। আর সবই ছোট মাছ-ট্যাংরা, পুটি, পাবদা, চাপিলা, বাতাসি, বেলে, বাটা, চিংড়ি।

    ‘বড় মাছ দুইডা এহনো জিন্দা আছে। দুইডারে দড়ি দিয়া বাইন্দা জিয়াইয়া রাখো।’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘ঐ দুইডারে বাড়িতে লইয়া যাইমু। কইরে, কেরা, একটা দড়ি লইয়া আয়।’

    কেরামত মাছ দুটোর কানকোর ভেতর দিয়ে রশি ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বার করে। তারপর গিঁট দিয়ে পানিতে ছেড়ে দেয়। রশির অন্য প্রান্ত বেঁধে রাখে পানসির ঘষনার সাথে।

    ‘মাছগুলা লইয়া যাও।’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘হাতে হাতে কুইট্যা রান্দনের আয়োজন করো।’

    চাঙারিটা তিনজনে ধরাধরি করে নিয়ে যায়। ওদের তিনজনের একজন মজিদ খালাসির ছেলে ফজিলত।

    কিছুদূর গিয়ে ফজিলত বলে, ‘দ্যাখলেন নি? এই মাঘ মাইস্যা শীতে ক্যাদার মইদ্যে কষ্ট কইর‍্যা মাছ ধরলাম আমরা। আর উনি বড় মাছ দুইডা থাবা মাইর‍্যা লইয়া গেল। মাইনষে কয় কথা মিছা না–শুইয়া রুই, বইস্যা কই, ক্যাদা ঘাইট্যা ভ্যাদা।’

    ‘এই ফজিলত, চুপ কর।’ মজিদ খালাসি ধমক দেয়। ‘হুজুরের কানে গেলে বাঁশডলা দিয়া চ্যাগবেগা বানাইয়া দিব। তহন ভ্যাদা মাছও পাবি না।’

    ‘আপনেরা মোখ বুইজ্যা থাকেন বুইল্যাইতো আপনেগ চ্যাগবেগা বানাইয়া রাখছে।’

    ‘আরে আবার কথা কয়! চুপ কর হারামজাদা।’

    একটু থেমে অন্য লোক দুটিকে অনুরোধ করে মজিদ খালাসি, ‘ও মিয়া ভাইরা, তোমরা কুন্তু এই নাদানের কথা হুজুরের কানে দিও না।’

    চরধানকুনিয়া পদ্মার জঠরে বিলীন হয়ে গেছে গত বর্ষার সময়। সেখানে বাইশ ঘর কোলশরিকের বসত ছিল। চরভাঙা ভূমিহীন আর সব মানুষের মতোই তারা ভেসে যায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। কয়েকজন বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে আসাম চলে গেছে। সেখানে জঙ্গল সাফ করে জমি আবাদ করলেই নাকি জমির মালিক হওয়া যায়। কয়েকজন পুরানো কাঁথা-কাপড়, হাঁড়ি-পাতিল, গাঁটরি-বোচকা বেঁধে পরিবারসহ চলে গেছে শহরে। চরভাঙা এ সব মানুষের দিনের আশ্রয় রাস্তার বট-পাকুড় গাছের তলা আর রাতের আশ্রয় অফিস আদালতের বারান্দা। যাদের সামান্য কিছু জমা টাকা আছে তারা কষ্টে-সৃষ্টে ঝুপড়ি বেঁধে নেয় বস্তি এলাকায়। পুরুষেরা কুলি-মজুরের কাজ পেলে করে, না পেলে শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয় সারাদিন। বউ-ছেলে-মেয়ে চাকুরে-ব্যবসায়ীদের বাসা-বাড়িতে ঝি-চাকরের কাজ জুটিয়ে নেয়। এমনি করে খেয়ে না খেয়ে শাক-পাতা অখাদ্য-কুখাদ্য পেটে জামিন দিয়ে এরা দিন গোনে, রাত গোনে। এরা চাষের কাজে, ফসল উৎপাদনের কাজে আর কোনো দিন ফিরে আসে না চরের মাটিতে। ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারে না আর। জমি পেতে হলে সেলামি দিতে হয়। কিন্তু সেলামির টাকা সারা জীবনেও কেউ যোগাড় করতে পারে না।

    চরধানকুনিয়ার চারজন এখানে-সেখানে কাজের সন্ধানে ঘুরে হতাশ হয়ে ফিরে আসে। তারা বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে পাতনা দিয়ে আছে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি। অন্যের জমিতে কামলা খেটে তারা অনাহারে অর্ধাহারে দিন গুজরান করে।

    জঙ্গুরুল্লা খুনের চর দখল করেছে–খবর পেয়েই তারা অনেক আশা নিয়ে এসেছে তার সাথে দেখা করতে। তারা পানসির কাছে ঘোঁজার কিনারায় চুপচাপ বসে থাকে, শুনতে থাকে জঙ্গুরুল্লার নাকডাকানি। সে খাস খোপে বিশ্রাম নিচ্ছে। তার বিশ্রামের কোনো রকম ব্যাঘাত না হয় তার জন্য মাঝি কেরামত এদের সাবধান করে দিয়েছে।

    নাকডাকানি কখন শেষ হবে বুঝতে পারে না অপেক্ষমাণ লোকগুলো। তারা আশায় বুক বেঁধে ধৈর্য ধরে বসে থাকে।

    জঙ্গুরুল্লার ঘুম ভাঙে যখন পেটে টান লাগে। উঠেই সে রূপার চেনে বাঁধা পকেট ঘড়িটা বের করে দেখে।

    ‘আরে, তিনটাতো বাইজ্যা গেছে! ইস, জহুরের নামাজটা কাজা অইয়া গেল! ও কেরা রান্দনের কি অইল?’

    ‘এহনো অয় নাই।’ কেরামত বলে। ‘মনে অয় খাইল্যা ঘাসের আগুনে তেজ নাই।’

    ‘তুই খবর দে। শীতকালের বেলা। আর এট্টু পরেই আন্ধার ঘনাইয়া আইব।’

    ‘হ, খবর দিতে আছি। হুজুর, চাইরজন মানুষ আইছে আপনের লগে দ্যাহা করনের লেইগ্যা।’

    ‘কারা? কি ব্যাপারে আইছে?’

    ‘চিনি না। কি ব্যাপারে কিছু কয় নাই।’

    জঙ্গুরুল্লা খাস খোপ থেকে বেরিয়ে গলুইয়ের ওপর দাঁড়ায়।

    ‘আসলামালেকুম।’ একসাথে সালাম দেয় চারজন।

    ‘ওয়ালাইকুম সালাম। তোমরাই দ্যাখা করতে আইছ?’

    ‘হ হুজুর। দলের মুরব্বি তোবারক বলে।’

    ‘কও, ত্বরাত্বরি কও। আমার অত সময় নাই।’

    ‘হুজুর, আমাগ ধানকুনিয়ার চর রসাতল অইয়া গেছে। আমাগ আর কিছু নাই।’

    ‘আমি কি করতে পারি, কও?’

    ‘আমাগ কিছু জমি দ্যান। আমাগ বাঁচনের একটা রাস্তা কইর‍্যা দ্যান।’

    ‘দুনিয়াশুদ্ধ মানুষের বাঁচনের রাস্তা কি আমার বানাইতে অইব?’

    ‘হুজুর আমাগ বাঁচনের আর কোন পথ নাই। আমরা গেছিলাম কালামাডি।’

    ‘কালামাটি মানে টাটানগর?’

    ‘হ, টাটানগর, বানপুর।’

    ‘সেইখানে তো শুনছি বহুত মানুষ কামে ভর্তি করতেছে। লড়াইর সরঞ্জাম বানাইতে আছে।’

    ‘হ, ভর্তি করতে আছে। হেই খবর পাইয়া গেছিলাম। কিন্তু সরদারগ, দালালগ দুইশ রুপিয়া না দিলে কোনো কামে ভর্তি অওয়ন যায় না।’

    ‘দিয়া দিতা দুইশ রুপিয়া।’

    ‘হুজুর দুইশ ট্যাহা কি গাছের গোড়া? আমরা গরিব মানুষ। পাইমু কই এত ট্যাহা?’

    ‘টাকা ছাড়া দুইন্যাই ফাঁকা। বোঝ্‌লা? তোমরা ওইখানে টাকা দিতে পার নাই, আমার সেলামির টাকা দিবা কইতন?’

    ‘আস্তে আস্তে শোধ কইরা দিমু।’

    ‘দুও ব্যাটারা। নগদ সেলামি দিয়া মাইনষে জমি পায় না। আর তোরা আইছস বাকিতে  জমি নিতে। যা-যা অন্য কিছু কইর‍্যা খা গিয়া।’

    ‘হুজুর।’ তোবারকের কথার স্বরে আকুল আবেদন।

    ‘আর প্যাচাল পাড়িস না তো। কইলামতো অন্য কিছু কইর‍্যা খা গিয়া।’

    মজিদ খালাসি ও দবির গোরাপি এসে খবর দেয়, ‘রান্না হয়ে গেছে।’ তাদের আসার পর লোক চারজন আর কিছু বলার সুযোগ পায় না।

    জঙ্গুরুল্লা একটুও দেরি না করে একেবারে খাবার জায়গায় গিয়ে বসে। খাবার জায়গা বাইরেই করা হয়েছে।

    খাদিমদারির জন্য কয়েকজন বাদে সবাই যার যার থালা নিয়ে গামছা বিছিয়ে বসে।

    খেতে খেতে আছরের নামাজও কাজা হয়ে যায়। সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করে জঙ্গুরুল্লা। সে বলে, ‘মাগরেবের নামাজের পর বৈঠক শুরু অইব।’

    এরফান মাতব্বরের তৈরি ভাওরবাড়ির এক ঘরে হারিকেনের আলোয় বৈঠক বসে। বিশিষ্ট কয়েকজন কোলশরিক নিয়ে জঙ্গুরুল্লা দুই ছেলেসহ সেখানে বসে। বাকি সবাই মাথায় গামছা বেঁধে গায়ে চাদর জড়িয়ে উন্মুখ হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।

    ‘হরমুজ, চরটার মাপজোখ নিছস?’

    ‘হ, পুবে পশ্চিমে সাড়ে ছয়চল্লিশ চেইন, উত্তর দক্ষিণে উনিশ চেইন।’

    ‘ওরা তো আটহাতি নল দিয়া মাইপ্যা ভাগ করছিল। কত নল অয় হিসাব করছস?’

    ‘হ করছি।’ দবির গোরাপি বলে। ‘ওরা পুবে পশ্চিমে মাঝ বরাবর দুই ভাগ করছিল চরডারে। উত্তর দিগে ঘোঁজা বাদ দিয়া দুইশ ছয়চল্লিশ নল আর দক্ষিণ দিগে দুইশ আটান্ন নল।’

    ‘মোট কত অয়?’

    ‘পাঁচ শ’ চার নল।’

    ‘আমাগ কোলশরিক অইল সাতষট্টি। সব্বাইকে ছয় নল কইর‍্যা দিলে, কত নল লাগে? কাগজ কলম লও, ও মজিদ।’

    মজিদ খালাসি অঙ্ক কষে বলে, ‘চারশ দুই নল।’

    ‘ঠিক আছে, এম্বায়ই ভাগ করো। একশ দুই নলের হিসাব পরে অইব।’

    পানসির মাল্লা ফেকু তামাক সাজিয়ে লম্বা নলটা এগিয়ে দেয় জঙ্গুরুল্লার দিকে। সকলের সামনে নিজের বাহাদুরি প্রকাশের স্পৃহা সে দমন করতে পারে না। বলে, ‘এই মিয়ারা, বাইরে কারা আছ? মন লাগাইয়া শোন। এরফান মাতবরের দলরে কেমুন চক্করটা দিলাম। কেমনে ছাপ্পরছাড়া কইর‍্যা দিলাম, হুহুহু। ওরা চাকইর‍্যা রাখছিল। আমি মনে মনে ঠিক করলাম, রাখুক ওরা চাকইর‍্যা। দেখি, ওগ বেতন দিয়া, খাওন দিয়া এরফান মাতবরের মিরদিনা কয়দিন সোজা থাকে। ওগ টাকা পয়সার যখন ছেরাদ্দ অইয়া গেছে, সুতা যখন খতম, তখনি দিলাম একখান গোত্তা। ব্যস, বৌকাট্টা–আ—আ–।’

    সবাই হেসে ওঠে। দবির গোরাপি বলে, ‘হুজুর কি ছোডকালে ঘুড়ি উড়াইছেন নি?’

    ‘আরে, ছোডকালে ঘুড্‌ডি আবার কে না উড়ায়! শোন, তোমাগ পরামিশ মতন যদি তখন তখনি চর দখল করতে যাইতাম, তয় কি অইত? খুনাখুনি অইত, মামলা-মকদ্দমা অইত। কিন্তু এমন খেইল দ্যাখাইলাম, আমার আক্কেলের ঠেলায় ওগ আক্কেল গুড়ুম।’

    আবার খিকখিক করে হেসে ওঠে সবাই। মজিদ খালাসি বলে, ‘হু, আপনে যেই খেইল দ্যাহাইছেন, ওগ বেবাক গেছে–ট্যাহা-পয়সা, হাতিয়ার-সরঞ্জাম। আমাগও আর খুনাখুনি মামলা-মকদ্দমার ঝামেলায় পড়তে অইল না।’

    ‘ওগ টাকা পয়সা বেবাক খতম। ওরা আর আইব ক্যামনে চর দখল করতে?’

    ‘হ, ওরা আর আইতে পারব না।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘আর দ্যাখো, তোমায় বুদ্ধি মতন যদি তখনি চর দখলের হামতাম করতাম, তয় এমনু তৈয়ার ধান পাইতা কই? কি মজা আঁ? ধান বোনে হাইল্যা, পেট ভরে বাইল্যা।’

    সবাই হি-হি, হো-হো করে হেসে উঠে।

    ‘এই বাইল্যার গুষ্টি, হাসনের কি অইল? তৈয়ার ধান তো পাইতেছ। আমারে সেলামি কত কইরা দিবা?’

    ‘আপনেই ঠিক করেন।’ মজিদ খালাসি বলে।

    ‘নল পিছু পঞ্চাশ টাকা কইর‍্যা দিও।’

    ‘পঞ্চাশ ট্যাহা খুব বেশি অইয়া যাইতেছে। এরফান মাতবর নিছিল পঁচিশ ট্যাহা কইর‍্যা।’ একজন কোলশরিক বলে।

    ‘আরে! এরফান মাতবরের লগে আমার তুলনা, আঁ! ঐ পঁচিশ টাকার জমি আছে? ঐ জমিতো গরবাদ! চাউলে পাতিলে তল! আমি পঞ্চাশ টাকা সেলামি নিয়া জমি দিমু। কারো বাপের সাধ্য নাই এই জমির কাছে আসে।’

    সবার অনুরোধে শেষে নল পিছু চল্লিশ টাকা সেলামি নিতে রাজি হয় জঙ্গুরুল্লা।

    বৈঠক শেষ করে উঠবার সময় জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘আমার ফন্দি-ফিকিরে তৈয়ার ধান পাওয়া গেছে। এই ধানের অর্ধেক আমার, মনে রাইখ্য মিয়ারা।’

    কোলশরিকদের কেউ আপত্তি করে না।

    মজিদ খালাসি হারিকেন নিয়ে আগে আগে চলে। তার পেছনে হাঁটে জঙ্গুরুল্লা ও তার দুই ছেলে। কোলশরিক ও তাদের জোয়ান ছেলেরা তাদের অনুসরণ করে দল বেঁধে।

    এতই রঙ্গেরই খেলা জান হায়রে মন,

    এতই রঙ্গেরই খেলা জান।

    দোতারা বাজিয়ে গান গাইছে কেউ।

    ‘গান গাইছে কেডা ও?’ জঙ্গুরুল্লা জিজ্ঞেস করে।

    ‘কোনো ব্যাপারি নায়ের মাঝি না অয় মাল্লা অইব মনে অয়।‘ মজিদ খালাসি বলে।

    ‘হ, অনেক পরদেশী নাও এই ঘোঁজায় পাড়া গাইড়া জিরায় তামাম রাইত।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘বানাইয়া আদম নবী

    বেহেশত করিলা রে খুবী,

    গন্দম খাইতে মানা কেন রে,

    গন্দম খাইতে মানা কেন?

    খাওয়াইয়া গন্দম দানা

    ছাড়াইলা বেহেশতখানা॥

    কি কৌশলে সংসারেতে আন

    হায়রে মন।

    এতই রঙ্গেরই খেলা জান॥

    ‘মকরমরে কও দাগা কর,

    আদমরে কও হুঁশিয়ার,

    শত্রু তোমার জানিও শয়তান রে,

    শত্রু তোমার জানিও শয়তান।

    দাগা কর, নাহি পড়,

    কে বুঝিবে খেলা তোর॥

    এর ভেদ তুমি মাত্র জান

    হায়রে মন।

    এতই রঙ্গেরই খেলা জান॥

    ‘নমরুদ পাপীয়ে বল,

    ইব্রাহিম অগ্নিতে ফেল

    আগুনরে করহ বারণ রে,

    আগুনরে করহ বারণ।

    ইব্রাহিমকে দাও কোরবানি॥

    ছুরিরে নিষেধ করো পুনঃ

    হায়রে মন।

    এতই রঙ্গেরই খেলা জান॥

    কেহ পাপী, কেহ ভক্ত

    কেহ ফকির, কেহ তখ্‌ত,

    খেলা তোমার না যায় বুঝন রে,

    খেলা তোমার না যায় বুঝন।

    কি বুঝিবে বেঙ্গু ভ্রান্ত,

    তোমার খেলার নাহি অন্ত॥

    তোমারে না বোঝে অজ্ঞ জন

    হায়রে মন।

    এতই রঙ্গেরই খেলা জান॥

    গানের কথা ও সুরে সবাই অভিভূত। বিমোহিত তাদের মন। যতক্ষণ গান চলছিল একটা কথাও কেউ বলেনি।

    গান শেষ হলে দবির গোরাপি বলে, ‘একটা মনের মতো গান হুনলাম।’

    ‘হ গানডা খুব চমৎকার।’ অনেকেই বলাবলি করে।

    সবাই পানসির কাছে এসে গিয়েছিল গান শেষ হওয়ার আগেই। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনছিল। ঐ সময়ে জঙ্গুরুল্লার চোখ জোছনার আলোয় জরিপ করছিল ঘোঁজাটা। অনেক কয়টা বড় মালের নৌকা পাড়া গেড়ে আছে ঘোঁজায়।

    ‘মজিদ, দেইখ্যা আস তো কয়ডা নৌকা আর নৌকায় কি মাল বোঝাই?’

    জঙ্গুরুল্লা ছেলেদের নিয়ে পানসিতে ওঠে। মজিদ খালাসি আর দবির গোরাপি চলে যায় নৌকার খোঁজ খবর নিতে।

    কিছুক্ষণ পরে তারা ফিরে এসে জঙ্গুরুল্লাকে জানায়–‘নৌকার সংখ্যা বার। তিনটা চালের নৌকা—খুলনা থেকে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জে। একটায় ঝুনা নারকেল বরিশালের নলসিটি থেকে ঢাকা যাচ্ছে। একটায় পেঁয়াজ যাচ্ছে কুষ্টিয়ার জগন্নাথপুর থেকে চাঁদপুর। একটায় আলু–যাচ্ছে কমলাঘাট থেকে ফরিদপুর। একটায় তেজপাতা যাচ্ছে কমলাঘাট থেকে রাজবাড়ি। একটায় খেজুর গুড়–মাদারীপুর থেকে যাচ্ছে ঢাকা। চারটা নৌকা খালি। সেগুলো বিভিন্ন বন্দরে যাচ্ছে মাল কেনার জন্য।’

    ‘এই মজিদ, আমাগ জাগায় নাও রাখছে। খাজনা আদায় করো, তোলা উডাও।’ জঙ্গুরুল্লা নির্দেশ দেয়।

    ‘যদি না দিতে চায়।’

    ‘দিতে না চাইলে পাড়া উড়াইয়া চইল্যা যাইতে কও এইখানতন।’

    মজিদ খালাসি ও দবির গোরাপি জঙ্গুরুল্লার নির্দেশ মতো তোলা উঠিয়ে চলে আসে কিছুক্ষণ পর। তিনটা নৌকা থেকে পাওয়া গেছে সের পাঁচেক চাল। অন্যগুলো থেকে পাওয়া গেছে একজোড়া নারকেল, সের দুই পেঁয়াজ, সের খানেক আলু, পোয়াটাক তেজপাতা আর মুছি খেজুরগুড় আটখান। সবগুলো এনে তারা পানসিতে তুলে দেয়। জঙ্গুরুল্লা খুশি হয়।

    ‘রাইত অনেক অইছে। আর দেরি করণ যায় না।’ জঙ্গুরুল্লা বলে। তারপর সে হাঁক দেয়, ‘এই কেরা, এই ফেকু নাও ছাইড়া দে ত্বরাত্বরি।’

    পাড়া উঠিয়ে পানসি ছেড়ে দেয় কেরামত।

    খাস খোপে হারিকেন জ্বলছে। হরমুজ ও জহিরকে বলে জঙ্গুরুল্লা, ‘নাও জিরানের এমুন সোন্দর একখান ঘোঁজা আশেপাশের কোনো চরে নাই।’

    ‘হ, ঠিকই। নাও রাখনের লেইগ্যা জায়গা খুবই চমৎকার।’ হরমুজ বলে।

    ‘আইতে আছে চৈত্র-বৈশাখ মাস। আসমানে তুফাইন্যা মেঘ দ্যাখলে বহুত নাও আইয়া পাড়া গাড়ব এই ঘোঁজায়।’

    ‘হ, তহন অনেক নাও ঢুকব এই ঘোঁজায়।’ বলে হুরমুজ।

    ‘শোন, আমার মস্তকে একখান বুদ্ধি খেলছে। এই ঘোঁজায় নাও রাখলেই খুঁটগাড়ি আদায় করন লাগব। তাতে আমাগ অনেক পয়সা আয় অইব।’

    ‘খুঁটগাড়ি আদায় করলে যদি এইখানে নাও না রাখে।’ বলে জহির।

    ‘রাখব না ক্যান্? নাও যাতে অন্য জা’গায় না রাখে তার একটা ফিকিরও আমার মগজের মইদ্যে ঘুরতে আছে। তোরা রউজ্যারে খবর দিস। সে যে কালই আমার লগে দ্যাখা করে।’

    ভাটি পানি। তবুও দূরের পথ বলে বাড়ির ঘাটে পৌঁছতে পানসিটার অনেক সময় লাগে।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    এরফান মাতব্বরের জ্বর সেরে গিয়েছিল। লাঠি ভর দিয়ে সে হাঁটাচলাও করছিল একটু আধটু। কিন্তু চর বেদখল হওয়ার কথা শুনেই সে আবার নেতিয়ে পড়েছে বিছানায়।

    চর গেছে, চরের ফসল গেছে। খাজনা আর সেলামির এতগুলো টাকাও গেছে বরবাদ হয়ে। তাদের তৈরি ভাওর ঘরে তালেবর হয়ে বসে গেছে জঙ্গুরুল্লার দল। হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, কাঁথা-বালিশ, লড়াইর হাতিয়ার–অনেক কিছুই মুফতে পেয়ে গেছে তারা। এসবের ওপরে গেছে মান-ইজ্জত। এর জন্যই বেশি মুসড়ে পড়েছে এরফান মাতব্বর।

    সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে গালাগাল দেয় দলের লোকদের, ‘হারামজাদারা, চর ছাইড়া পলালি ক্যান্ তোরা? ডাকাতি মামলায় আর কয়জনরে ধরত?’

    ‘ধরা পইড়্যা হেষে কি জেল খাটতামনি আমরা।’ একজন কোলশরিক বলে।

    ‘চাকইর‍্যা হারামজাদারা পলাইল ক্যান। ওই নিমকহারামগুলোরে খেদাইয়া দে।’

    ‘ওগ খেদাইয়া দিমু! কিন্তু আমরা যে চরদখল করতে চাই আবার।’ রমিজ মিরধা বলে।

    ‘উঁহু। পারবি না, পারবি না। কঁকাতে কঁকাতে মাতব্বর বলে। ঐ চাকইর‍্যা দিয়া কাম অইব না। আমি ভাল অইয়া লই।’

    ‘কিন্তুক বেশি দেরি অইলে ধানগুলাতে কাইট্যা লইয়া যাইব।’

    ‘লইয়া গেলে আর কি করমু।’

    জমিরদ্দি : ‘কি করমু! এতগুলা ট্যাহা দিছি আপনের সেলামি।’

    এরফান : ‘সেলামি নিয়া জমি দিছি। হেই জমি রাখতে না পারলে কি আমার দোষ? আমিও তো নায়েবরে সেলামি দিছি।’

    আহাদালী : ‘আপনে কারে দিছেন, কি দিছেন, আমরা তার কি জানি?’

    মেহের মুনশি : ‘অ্যাই তোরা বাইরে যা দেহি। মেহের মুনশি সবাইকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।’

    জমিরদ্দি : ‘ও মিয়া মুনশির পো, আমরা সেলামি দিছি ওনারে। আমরা ওনার কাছে জমি চাই।’

    মেহের মুনশি : ‘কি শুরু করলা তোমরা? মাতবরের পো-র শরীল ভাল নাই। তোমরা। চুপ অও দেহি।’

    জমিরদ্দি : ‘ক্যান্ চুপ অইমু? আমাগ সেলামির ট্যাহা ফিরত চাই।’

    রমিজ মিরধা : ‘ক্যান ফিরত চাও। তোমারে, আমাগ বেবাকরে জমি তো দিছিলই। আমরাই তো রাখতে পারলাম না।’

    আহাদালী : ‘এমুন কাইজ্যার চরের জমির লেইগ্যা সেলামি নিল ক্যান?’

    মেহের মুনশি : ‘সেলামি না নিলে চাকইর‍্যা রাখত কি দিয়া। ওগ রোজানা দিতে, ওগ খাইয়াইতে কি কমগুলা ট্যাহা খরচ অইছে?’

    রমিজ মিরধা : ‘তোমরা যার যার বাড়িত যাও। মাতবরের পো ভাল অইয়া উড়ুক, তারপর–’

    মেহের মুনশি : ‘হ, তারপর একটা কিছু করন যাইব। তোমরা যাও। খবরদার, রাইতের বেলা নিজের ঘরে শুইও না। পুলিস কিন্তু ধরতে আইব।’

    সেদিনের মতো সবাই চলে যায়।

    রোজই দু-চারজন কোলশরিক আসে এরফান মাতব্বরকে দেখতে। রুগী দেখতে এসেও তারা রুগীর বিছানার পাশে বসে ঘ্যানরঘ্যানর করে। কেউ সেলামির টাকা ফেরত চায়। এরা অনেকেই ধারকর্জ করে সেলামির টাকা যোগাড় করেছিল। কেউ বুক থাপড়ে কাঁদে। ঘরে তাদের এক দানা খাবার নেই।

    এদের সকলের অবস্থাই জানে মাতব্বর। নানা ঘাত-প্রতিঘাত সওয়া বুড়ো মন তার। সে মনে আবেগ-উচ্ছ্বাস বড় বেশি ঠাঁই পায় না। তবুও এদের দুরবস্থার কথা ভেবে ব্যথিত হয় সে। তার চোখ ছলছল করে ওঠে। কখনো বালিশের তলা থেকে পাঁচ-দশ টাকা তুলে ওদের হাতে দিয়ে বলে, ‘নে, কারো কাছে কইস না। আর কিছুদিন সবুর কর। আমার ব্যারামডা সারুক। জঙ্গুরুল্লারে আমাবস্যা দ্যাহাইয়া ছাইড়া দিমু।’

    কিন্তু মাতব্বরে ব্যারাম আর সারছে না। শরীরের ব্যারামের চেয়ে মনের ব্যারামেই সে বেশি কাহিল হয়ে পড়েছে। সে বিছানায়ই পড়ে থাকে রাতদিন। মাঝে মাঝে তার মুখ থেকে বেরোয় গালাগালের তুবড়ি। সে সময়ে রাগ ও ঘৃণায় বিকৃত হয় তার মুখ। কখনো উত্তেজনায় সে হাত-পা ছোড়ে, মাথা উঁচু করে বসতে চায়। তার গালাগালের পাত্র জমিদার, নায়েব, জঙ্গুরুল্লা, দারোগা-পুলিস, আরশেদ মোল্লা, এমন কি তার কোলশরিকরাও। তুবড়ির বারুদ পুড়ে শেষ হয়ে গেলে অনেকক্ষণ ধরে সে হাঁপায়। তারপর মরার মতো পড়ে থাকে। এ সময়ে একটু একটু করে বারুদ জমা হয়। তারপর আবার হঠাৎ তুবড়ি ছোটে।

    ফজল দিনের বেলা বাপের বিছানার পাশেই বসে থাকে ডাক্তারের ব্যবস্থামত ওষুধ পথ্য দেয়। রাত্রে পুলিসের ভয়ে সে বাড়িতে ঘুমায় না, চলে যায় দূরের কোনো আত্মীয়বাড়ি।

    একদিন আরশেদ মোল্লাকে গালাগাল দিতে দিতে মাতব্বরের রাগ গিয়ে পড়ে ফজলের ওপর। সে মুখ বিকৃত করে বলে, ‘এই একটা ভ্যাদা মাছ। আমার ঘরে ক্যান্ এইডা পয়দা অইছিল–ক্যান্ অইছিল? এত দিনের মধ্যে—আরে এতদিনের মইদ্যে পারল না আহ্ আহ–পারল না নিজের পরিবার পোষ মানাইতে। যা, আইজই যা–আহ-আহ্ বউ আনতে না পারলে––আমার বাড়িতে তোর জা’গা নাই—জাগা নাই কইয়া দিলাম।’

    বরুবিবি কাছেই ছিল। বলে, ‘হ, আইজই যা। তোর হউর-হাউরিরে কইস ওনার ব্যারামের কথা। বুঝাইয়া কইস, বউমারে দ্যাহনের লেইগ্যা ওনার পরান ছটফট করতে আছে। ওনারাও তো মানুষ। ওনাগো অন্তরে কি আর দয়া-মায়া নাই?’

    আরশেদ মোল্লার অন্তরে সত্যিই বুঝি দয়া-মায়া নেই।

    সেদিনই বিকেলবেলা ফজল শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। সাথে নিয়ে গিয়েছিল হাশমতকে।

    ফজল কাছারি ঘরে বসে থাকে। হাশমত চলে যায় অন্দরে।

    আরশেদ মোল্লাকে সালাম দিয়ে সে বলে, ফুফাজির সাংঘাতিক অসুখ, যখন-তখন অবস্থা। মাতব্বরের অসুখের কথাটা একটু বাড়িয়ে বলবার জন্য শিখিয়ে দিয়েছিল ফজল।

    আরশেদ মোল্লা শুধু ‘হু’ বলে চেয়ে থাকে হাশমতের দিকে।

    ‘ফুফাজি অস্থির অইয়া গেছে ভাবিসাবেরে দেহনের লেইগ্যা।’

    ‘হুঁ।’

    ‘বউমা-বউমা কইর‍্যা খালি কান্দে।’

    ‘পরের মাইয়া দেহনের এত আহেঙ্কাত ক্যান্? নিজের বউ-মাইয়া-পোলা দেইখ্যা পরান জুড়াইতে পারে না?’

    ‘কী যেন কন তালুইজি। নিজের মাইয়াত বিয়া দিলে চইল্যা যায় পরের বাড়ি। পুতের বউ থাকে নিজের বাড়ি, নিজের মাইয়ার মতন।’

    ‘হ-হ দেছি, মাইয়ার মতন কইও না মিয়া, কও বান্দির মতন।’

    ‘তালুইজি, ভাবিরে এহনই লইয়া যাইতে কইছে। আপনেরেও যাইতে কইছে। ফুফাজির অবস্থা খুব খারাপ। এইবার যে বাইচ্যা ওড়, মনে অয় না।’

    আরশেদ মোল্লা কোনো কথা বলে না।

    ‘কি কইলেন তালুইজি?’

    ‘উঁহু। আমার মাইয়া আর ঐ বাড়ি দিমু না। এতদিন বেচছে মাছ। এহন আবার ডাকাতি শুরু করছে।’

    ‘ডাকাতি! ওইডাতো জঙ্গুরুল্লার কারসাজি। চর দখলের লেইগ্যা মিথ্যামিথ্যি ডাকাতি মামলা সাজাইছে।’

    আরশেদ মোল্লা উঠে নদীর ঘাটের দিকে চলতে থাকে। অনুনয় বিনয় করতে করতে তার পেছনে চলে হাশমত। কিন্তু তার অনুরোধের কোনো উত্তরই দেয় না সে।

    আরশেদ মোল্লা তার ডিঙি বেয়ে পুবদিকে চলে যায়।

    হাশমত কাছারি ঘরে ফিরে আসে।

    ফজল দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তার চোখে।

    ‘উঁহু, কোনো কাম অইল না।’ হাশমত বলে। ‘এত কইর‍্যা কইলাম। কাকুতি-মিনতি করলাম। কোনো কথাই কানে নিল না। ব্যাডা এক্কেরে অমাইনষের পয়দা।’

    ‘হ, আমি জানতাম, লাথির ঢেঁকি আঙুলের টোকায় ওড্‌ব না।’

    হাশমতের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে আবার বলে, ‘তুই চইল্যা যা। লালুগ বাড়িতে গিয়া থাক্। কাইল গেছে পূর্ণিমা। চান মাথার উপরে ওডনের আগেই নাও লইয়া আইয়া পড়বি। লালুরেও সঙ্গে আনিস।’

    হাশমত চলে যায়।

    সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অন্ধকার কাছারি ঘরে চৌকির ওপর বসে আছে ফজল।

    রূপজান জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে যায় তাকে। সে ঘরে গিয়ে হারিকেন ধরায়। ওটা দেলোয়ারের হাতে দিয়ে বলে, ‘যা কাছারি ঘরে দিয়া আয়।’

    ‘উঁহু, না–না–না। আমি যাইমু না।’

    ‘ক্যান?’

    ‘ওরে মা-রে, ডাকাইত! আমার ডর করে।’

    ‘দুও বোকা।’

    ‘ও, তুমি হোন নাই? ওরে আর আমি দুলাভাই কইমু না। ও বোলে মারু ডাকাইত। রামদা লইয়া ডাকাতি করে।’

    রূপজানের চোখ ফেটে পানি আসতে চায়। সে-ও শুনেছে, ফজল ডাকাতি করে। তার বাবা কয়েকদিন আগে উঠানে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে বলছিল, ‘হোনছ রূপির মা, মাতবরের পোলাডা আর ইজ্জত রাখল না। মাছ-বেচা থুইয়া এইবার ডাকাতিতে নামছে। রামদা দ্যাহাইয়া মাইরপিট কইর‍্যা এক গিরস্তের পাঁচশ ট্যাহা লইয়া গেছে।’

    রূপজান ধরা গলায় বলে, ‘যা না দাদা, দিয়া আয়।’

    ‘উঁহু, আমি পারমু না।’

    রূপজান নিজেই শেষে কাছারি ঘরে যায়। হারিকেনটা চৌকির ওপর রেখেই সে চলে যাচ্ছিল। ফজল খপ করে তার আঁচল ধরে ফেলে। হাসিমুখে সে তাঁকায় রূপজানের দিকে। কিন্তু তার চোখে পানি দেখে ফজলের হাসি মিলিয়ে যায়। তার চোখও ঝাঁপসা হয়ে আসে।

    কারো মুখ দিয়েই কোনো কথা বেরোয় না। দুজনে চেয়ে থাকে দুজনের মুখের দিকে। একজনের মনের পুঞ্জীভূত বেদনা বুঝতে চেষ্টা করে আর একজনের চোখ।

    ফজল তাকে কাছে টানে। রূপজান হারিকেনটা নিবিয়ে দিয়ে মুখ লুকায় ফজলের বুকে।

    ‘তুমি বোলে ডাকাইত?’ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে রূপজান।

    ‘কে কইছে তোমারে?’ ফজল উত্তেজিত স্বরে বলে।

    ‘দুনিয়ার মাইনষে কয়।’

    ‘তুমিও কও? তুমিও বিশ্বাস করো এই কথা?’

    ‘উঁহু।’

    ফজল আরো নিবিড় করে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘সব জঙ্গুরুল্লার কারসাজি। মিথ্যা মামলা সাজাইয়া আমায় খুনের চর দখল কইরা লইয়া গেছে। আল্লার কসম, আমরা কেও ডাকাতি করি নাই।’

    রূপজান একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

    ‘শোন রূপজান, ডাকাতি কোনো দিন করি নাই। তবে আইজ কিন্তু ডাকাতি করমু।’

    রূপজান কোনো কথা বলে না।

    ফজল আবার বলে, ‘শোন, বাড়ির সবাই ঘুমাইয়া পড়লে তুমি আমার কাছে আইসা পড়বা।’

    ‘উঁহু, আমি আইতে পারমু না।’

    ‘ক্যান?’

    ‘সোন্দর সোন্দর কড়া দিয়া যে খোঁপা বান্দে, তারে যে বোলাইয়া লয়।’

    ফজলের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘কি কইলা বোঝলাম না।’

    ‘অহনতো বোঝবাই না। তোমার বালিশের তলায় মাইয়ালোকের খোঁপার কড়া আহে ক্যামনে?’

    ‘আরে, ও-হ্-হো-হো। ঐ দিন রাইতে তোমার দেরি দেইখ্যা মনে করলাম তুমি ঘুমাইয়া পড়ছ। তোমাগ পশ্চিমের ঘরের পিছনে গিয়া আন্দাকুন্দি যেই জানালা ঠেলা দিছি অমনি কো-ও কইর‍্যা ওঠছে তোমাগ উমের মুরগি। আমি তো মনে করছি কি না জানি কি? ডরে দিছি লাফ। আর পট্‌টত্ কইর‍্যা ঢুকলো একটা কাঁডা। টান দিয়া খুইল্যা দেখি খোঁপার কাঁডা। ঐডা তোমার না?’

    ‘ঐ রহম কাঁডা কিন্যা দিছিলা কোনো দিন?’

    ‘তবে কার খোঁপার ঐডা?’

    ‘আছে একজনের।’

    ‘দ্যাখো তো! তোমার মনে কইর‍্যাই আমি বালিশের নিচে রাখছিলাম। ঐডার খোঁচায় অনেকগুলো রক্ত ঝরছিল। পায়ে এহনো দাগ আছে দ্যাখবা?’

    ফজলের গলা জড়িয়ে ধরে রূপজান একটা দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন এঁকে দেয় তার ঠোঁটে।

    ‘আমি যাই, কেও আইয়া পড়ব।’

    ‘তোমারে ছাড়তে কি অখন মন চায়।’ রূপজানের হাতে গলায় হাত বুলিয়ে ফজল বলে, ‘তোমার গা খালি ক্যান? গয়নাগুলা কই?’

    ‘বা’জানে উড়াইয়া থুইছে চোরের ডরে।’

    ‘আইজ আমি আইছি। একটু সাজ-গোজ কইর‍্যা আইও। গয়না ছাড়া কেমুন বিধবা বিধবা দ্যাহা যায়।’

    ‘ছি! অমুন কথা কইও না। আল্লায় যে কোনো দিন অমুন না করে।’

    ‘রূপজান, ও রূপজান, কই গেলি?’

    ‘ঐ মায় বোলাইতে আছে। ছাড়ো, আমি যাই।’

    ফজলের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে চলে যায় রূপজান।

    কালো রাত সারা গায়ে জোছনা মেখে কেমন মনোহারিণী হয়েছে। বসন্তের ফুরফুরে হাওয়ায় দুলছে তার ঝলমলে আঁচল।

    রাতের বয়স যত বাড়ছে, ততোই উতলা হচ্ছে ফজল। এতক্ষণে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়। কিন্তু কেন আসছে না রূপজান?

    কাছারি ঘরে চৌকির ওপর শুয়ে শুয়ে সে এপাশ-ওপাশ করে।

    হুঁকো টানার গুড়ক-গুড়ক আওয়াজ আসছে।

    তার শ্বশুর এখনো জেগে আছে তা হলে!

    রাতের খাবার সেরে ফজল দরজায় দাঁড়িয়ে কুলকুচা করছিল। সে সময়ে শ্বশুরকে বাইরে থেকে আসতে দেখেছে সে।

    ফজলের বিরক্তি ধরে। এত রাত্রে আবার তামুকের নেশা ধরল ব্যাটার!

    ঝপ্‌পড়-ঝপ্‌পড় শব্দ তুলে স্টিমার চলছে। তার সার্চলাইটের আরো পশ্চিম দিকের জানালা গলিয়ে কাছারি ঘরে ঢোকে। ঘরটাকে দিনের মতো ফর্সা করে দিয়ে যায় কিছুক্ষণ পর পর।

    পশ্চিম থেকে পুবদিকে যাচ্ছে–কোন্ জাহাজ এটা? এ সময়ে তো কোনো জাহাজ নেই। নিশ্চয়ই সৈন্য বোঝাই করে যাচ্ছে।

    ‘হ্যাঁ, মেহেরবানি কইর‍্যা রাইতের আন্ধারেই যাইস। দিনে দুফরে যাইস না কোনো দিন।’ মনে মনে বলে ফজল।

    কয়েকদিন আগে দুপুরবেলা একটা বড় স্টিমার পশ্চিম থেকে পুবদিকে যাচ্ছিল। ওটায় বোঝাই ছিল বিদেশী সৈন্য। দশ বারোটা গোরা সৈন্য উদাম-উবস্তর হয়ে গোলস করছিল খোলা পাটাতনের ওপর।

    চাঁদ প্রায় মাথার ওপর এসে গেছে। হাশমতের আসার সময় হলো।

    বাইরে পায়ের শব্দ শোনা যায়। পুনপুনু করে কথাও বলেছে যেন কারা। বোধ হয় হাশমত আর লালু এসেছে। কিন্তু ওরা শব্দ করছে কোন সাহসে!

    ফজল তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে সামনের দরজার খিল খোলে। একটা পাট খুলতেই জোরালো টর্চের আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

    ‘ধরো, এই–এই যে আসামি।’

    ফজল অন্দরমুখি দরজার দিকে দৌড় দেয়। কিন্তু সেখানেও দাঁড়িয়ে আছে লোক।

    ফজল হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

    এলাকার দফাদার সামেদ আলীকে সাথে নিয়ে দুজন কনস্টেবল ঘরে ঢোকে। তাদের একজন হাতকড়া নিয়ে এগুতেই ফজল বলে, ‘ঐডা থুইয়া দ্যান। আমি পলাইমু না।’

    ‘পলানির জন্যিতো দৌড় মারছিলা। চোর-ডাকাইতেরে বিশ্বেস আছে।’ বলতে বলতে হাতকড়া লাগায় কনস্টেবল।

    অন্য দরজা দিয়ে হাবিলদার, জঙ্গুরুলা চৌধুরী ও আর একজন লোক ঘরে ঢোকে।

    ‘মোল্লা, বাড়ি আছ নি, ও মোল্লা?’ জঙ্গুরুল্লা চেঁচিয়ে ডাক দেয়।

    ‘কে? কারা?’ বাড়ির ভেতর থেকে প্রশ্ন করে আরশেদ মোল্লা।

    ‘আরে আসো এদিগে। দেইখ্যা যাও।’

    ফজল দফাদারকে অনুরোধ করে, ‘আপনে একটু কইয়া দ্যা না! আপনে কইলে হাতকড়াডা খুইল্যা দিব।’

    ‘খুলব নারে বাপু। তারা আইনের মানুষ। আইনের বাইরে কিছু করতে পারব না।’

    হারিকেন নিয়ে আরশেদ মোল্লা আসে। সকলের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে সে এক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিস দেখে সে যেন ভেবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কথা সরছে না তার।

    ‘চাইয়া দ্যাখ্‌ছ কি?’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘জামাইরে বুঝিন একলাই সমাদর করবা। আমরা বুঝি সমাদর করতে জানি না।’

    ‘সমাদর এই রাইত দুফরের সময়?’

    ‘এমুন সময় না আইলে কি জামাইমিয়ার দরশন পাওয়া যাইত?’

    ডুকরে কেঁদে উঠছে কেউ। আওয়াজ আসছে অন্দর থেকে।

    দ্রুতপায়ে আরশেদ মোল্লা অন্দরে চলে যায়। কাছারি ঘর থেকে শোনা যায় এ রকম নিচু গলায় সে ধমক ছাড়ে, ‘চুপ কর, চুপ কর হারামজাদি। মান-ইজ্জত আর রাখল না।’ একটু থেমে সে স্ত্রীকে বলে, ‘তুমি কি কর গো। ওরে কাঁথা দিয়া ঠাইস্যা ধরো না ক্যান্?’

    ‘উঁহু-হুঁ-হুঁ-হুঁ-হুঁ।’ চাপা কান্নার গুমরানিতে যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে জোছনা-রাতের ফিকে অন্ধকার।

    ‘থাম্‌ বেহায়া শয়তান! আরে তোমারে কইলাম কি? ওর মোখের মইদ্যে টিপ্‌লা দিয়া থোও।’

    ‘কই গেলা মোল্লা?’ কাছারি ঘর থেকে ডাক দেয় জঙ্গুরুল্লা। ‘আমরা গেলাম গিয়া।’

    আরশেদ মোল্লা ছুটে আসে কাছারি ঘরে। অনুনয়ের সুরে বলে, ‘চী সাব, ওরে ছাইড়া দ্যান। আমি জামিন রইলাম।’

    ‘আমি কি জামিনের মালিক? জিগাও হাওয়ালদার সাবরে।’

    ‘নেহি নেহি, হাওয়ালদার সাব কুছু করতে পারবে না।’ হাবিলদার বলে গম্ভীর স্বরে।

    আরশেদ মোল্লা হাতজোড় করে, ‘হাওয়ালদার সাব। ওরে জামিনে ছাইড়া দ্যান। আমি জামিন রইলাম।’

    ‘নেহি জ্বী। এ ডাকইতি মামলার এক নম্বর আছামি আছে। হামি জামিন মঞ্জুর করতে পারবে না।’

    ‘হ, ঠিক কথাই তো। থানার বড় দারোগাও পারব না।’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘যাউক বেড়াইয়া আসুক। এত চিন্তার কি আছে? এক শ্বশুরবাড়িরতন যাইতে আছে আর এক শ্বশুরবাড়ি।’

    ‘আপনে আর কাডা ঘায়ে নুনের ছিড়া দিয়েন না, চদরী সাব।’ ক্ষুণ্ণ কণ্ঠ আরশেদ মোল্লার।

    ‘আরে মিয়া, তোমার তো খরচ বাঁচল। জামাইর লেইগ্যা পিডা-পায়েস তৈয়ার করতে লাগব না কমসে কম সাতটা বছর।’

    ‘সাত বচ্ছর!’ আরশেদ মোল্লা যেন আঁতকে ওঠে।

    ‘সাত বচ্ছর না-তো কি সাতদিন! ডাকাতি অইল ‘মাডারের’ মানে খুনের ছোড ভাই।’ দফাদার বলে।

    ‘কিন্তুক—কিন্তুক–‘ অরশেদ মোল্লার মুখে কথা জড়িয়ে যায়। ‘কিন্তুক আমার–আমার মাইয়ার কি অইব চদ্‌রী সাব?’

    ‘কি অইব তা তুমি জানো আর জানে তোমার গুণের জামাই।’

    ‘চদরী সার, ওরে কন আমার মাইয়া ছাইড়া দিয়া যাইতে।’

    ‘কিরে?’ ফজলের দিকে জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘তোর শ্বশুর কি কয় শোনছস?’

    ফজল কোনো কথা বলে না।

    ‘কিরে কথা কস না ক্যান্? তুই আকাম করছস, তুই একলা তার সাজা ভোগ কর। এই বেচারার মাইয়াডারে ক্যান খামাখা কষ্ট দিবি?’

    ‘হাঁ, ইয়ে ছহি বাত কইছেন চৌধুরী সাহাব।’ জঙ্গুরুল্লার কথার সায় দেয় হাবিলদার। ‘তোম উহার বেটি কো তালাক দিয়ে দোও। বিলকুল সাফ হোয়ে যাও।’

    ‘না।’ দৃঢ়স্বরে বলে ফজল।

    ‘ওরে বাবা! ঢোঁড়া সাপের তেজ আছে দেখি।’ দফাদার বলে।

    অন্দর থেকে চাপা কান্নার ফোঁপানি ভেসে আসছে।

    ফজল কান খাড়া করে। তার দিকে তাকিয়ে তাড়া দেয় জঙ্গুরুল্লা, ‘আর দেরি করণ যায় না। চলো এই বার।’

    কাছারি ঘর থেকে বেরিয়ে রওনা হয় সবাই। যেতে যেতে জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘ও মোল্লা, তোমার কোনো কথা থাকলে আমার নৌকায় চলো।’

    বাড়ির থেকে বেশ খানিকটা দূরে নদীর ঘাটে ভিড়ে রয়েছে জঙ্গুরুল্লার পানসি। আসামি নিয়ে সেটায় চড়ে বসে সবাই। তাদের সাথে ওঠে আরশেদ মোল্লাও।

    ফজল এদিক-ওদিক তাকায়। জোছনার আলোয় দৃষ্টি চলে অনেকদূর। কিন্তু ধারে-কাছে কোনো নৌকা দেখা যায় না। ফজল ভাবে, হাশমত আসেনি। হয়ত এসেছিল, পালিয়ে গেছে। ভালই করেছে। তাকে পেলেও ছাড়ত না এরা।

    জঙ্গুরুল্লা আবার বলে, ‘কিরে ব্যাডা, কইলাম কি? তোর কাছে তো আর দেনমহরের টাকা দাবি করতে আছে না। কি ও মোল্লা, আছে দাবি?’

    ‘উঁহু, আমার মাইয়ার দেনমহরের ট্যাহা চাই না।’

    ‘এইতো। এখন মোখেরতন তিনডা কথা বাইর কইর‍্যা ফ্যাল্–তিন তালাক বায়েন। আমরা বেবাক সাক্ষী।’

    ‘না আমি কইমু না।’

    ‘ব্যাডা কইবি না। তোর গলায় পাড়া দিয়া কথা বাইর করমু।’ জঙ্গুরুল্লার সাথের লাঠিধারী লোকটি বলে।

    ফজল হাবিলদারকে বলে, ‘হাওয়ালদার সাব, আমার একটা হাত ছাইড়া দ্যান তো, দেখি কে কার গলায় পাড়া দিতে পারে।’

    ‘এই দবির, আমি থাকতে তোরা ক্যান কথা কস?’ ধমক দেয় জঙ্গুরুল্লা। তারপর সুর নরম করে বলে, ‘শোন ফজল, আমি তোর বাপের বয়সী। যা কই ভালর লেইগ্যা কই। এই বেচারার মাইয়াডারে ঠেকাইয়া রাখলে তোর কী ফয়দা অইব?’

    ‘আমার ফয়দা আমি বুঝি।’

    ‘কিন্তু আমি শুনছি মাইয়া তোরে চায় না।’

    ‘মিছা কথা, একদম মিছা কথা।’

    ‘কি মোল্লা, তুমি কি কও?’

    ‘হ ঠিক কইছেন, আমার মাইয়া ওর ঘর করতে রাজি না।’

    ‘রাজি না, তয় তারেই তালাক দিতে কন। আমি দিমু না’, ফজল বলে।

    ‘আরে মাইয়ালোকে তালাক দিতে পারলে কি আর তোরে জিগাইতাম!’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘মাইয়া যখন তোরে চায় না তখন–’

    ‘আমি বিশ্বাস করি না।’

    ‘আইচ্ছা, এই কথা? যাও তো দফাদার। আর কে যাইব? দবির যাও। মাইয়ারে জিগাইয়া আমার কাছে আইসা সাক্ষী দিবা।’

    দফাদার ও দবির গোরাপিকে নিয়ে আরশেদ মোল্লা বাড়ি যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলে, ‘মাইয়া কইছে, সে ডাকাইতের ঘর করব না।’

    ‘ছারেছার মিথ্যা কথা। আমি আমার নিজের কানে শুনতে চাই।’ ফজল বলে।

    ‘নিজের কানে শোননের কি আছেরে ব্যাডা ঘাড়ুয়া? এতগুলো মাইনষে সাক্ষী দিতে আছে।’ জঙ্গুরুল্লা খেঁকিয়ে ওঠে।

    ‘না, সিধা আঙ্গুলে ঘি উঠব না।’ দফাদার বলে।

    ‘ঠিক কথা কইছ। কাগজ-কলম বাইর কর। লেখ, অমুকের মাইয়া অমুকেরে আমি তিন তালাক বায়েন দিলাম।’

    দফাদার একটা কাগজে লিখে জঙ্গুরুল্লার দিকে এগিয়ে দেয়। জঙ্গুরুল্লা সেটা হাবিলদারের হাতে দিয়ে বলে, ‘নেন হাওয়ালদার সাব। এইবার সই আদায় করণের ভার আপনের উপর দিলাম।’

    হাবিলদার ফজলের ডানহাত থেকে হাতকড়া খুলে নিয়ে বলে, ‘করো দস্তখত, কর্ দোও।’

    ‘না করুম না।’

    গালে থাপ্পড় মেরে হাবিলদার বলে, ‘কর্ দস্তখত।’

    ‘করমু না।’ আরো জোরে চেঁচিয়ে বলে ফজল।

    আবার থাপ্পড় পড়ে ফজলের গালে।

    ‘জলদি দস্তখত কর।’

    ‘না–না–না।’

    জঙ্গুরুল্লা আরশেদ মোল্লাকে বলে, ‘তুমি বাড়ি যাও। চিন্তা কইর‍্য না। দস্তখত আদায় না কইর‍্যা ছাড়মু মনে করছ? ও মাঝিরা নৌকা ছাড়ো।’

    আরশেদ মোল্লা পানসি থেকে নেমে বাড়ির দিকে পথ নেয়।

  • পনের

    পনের

    আসাধারণ রূপ নিয়ে জন্মেছিল বলে নাম রাখা হয়েছে রূপজান। গাছপাকা শব্‌রি কলার মতো তার গায়ের রঙ। যৌবনে পা দেয়ার সাথে সাথে সে রঙের ওপর কে যেন মেখে দিয়েছে জোছনার স্নিগ্ধতা। তার ঈষৎ লম্বা মুখে টিকলো নাক। মমতা মাখানো টানা চোখ। চোখ দুটির যেন আলাদা সত্তা আছে। পাতলা ঠোঁট নেড়ে কথা বলার সময় প্রজাপতির ডানার মতো নড়ে তার চোখের পাপড়ি। ঝিলিক মেরে ওঠে ঘন নীল চোখের তারা। হাসবার সময় শশার বিচির মতো ছোট ছোট সুবিন্যস্ত দাঁত দেখা যায় কি যায় না।

    শুধু রঙ-চেহারাই নয়। স্বাস্থ্যও তার ভাল। দোহারা গড়ন। দিঘল শরীর থেকে লাবণ্য যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। মজবুত ভিতের ওপর গঠিত তার পরিপুষ্ট বক্ষে যেন বাসা বেঁধেছে সারা দুনিয়ার লজ্জা। প্রতিবেশিনীদের বিবেচনায় শরীরটা রূপজানের আমুনে। বুড়িয়ে যাবে না তাড়াতাড়ি, পাকবে আমন ধানের মতো দেরিতে। শুধু একটা জিনিসের অভাব। তার চুল কালো নয়। দু-তিন দিন তেল না পড়লে তার চুলের লালচে রঙ বেরিয়ে পড়ে।

    রঙ ও চেহারা-সুরত সবটাই রূপজান পেয়েছে তার মা সোনাভানের কাছ থেকে। সোনাভানের মা চন্দ্রভান ছিল ধলগাঁয়ের কলু বংশের মেয়ে। সে বংশের সব ছেলে-মেয়ের গায়ের রঙ শশার মতো। গ্রামের লোক তাই ঐ বংশকে বলত পাকনা শোশার ঝাড়। চন্দ্রভানের স্বামী আদালত শেখ ছিল নারায়ণগঞ্জের এক পাট-কোম্পানির মালিক জন ল্যাম্বার্টের কুঠির মালি। আর আরশেদ মোল্লা ছিল তার কুত্তার রাখাল। সায়েবের একমাত্র ছেলে স্টিফেন বিলেত থেকে এসেছিল বাপের কাছে। তার নজর পড়ে সোনাভানের ওপর। সায়েব টের পেয়ে সাত-তাড়াতাড়ি আরশেদ মোল্লার সাথে সোনাভানের বিয়ে ঘটিয়ে দু’হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বিদেয় করেন কুঠি থেকে।

    বিয়ের হাটে রূপসী মেয়ের জন্য গ্রাহকের ভিড় জমে। রূপজানের জন্যও ভিড় জমেছিল। নিলাম ডাকার মতো গয়না ও ‘শাচকে’র টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে রূপজানকে ছেলের বউ করে ঘরে নিতে পেরেছিল এরফান মাতব্বর।

    রূপজানকে মাতব্বর পছন্দ করেছিল শুধু তার রূপ দেখে। ছেলের বিরহী ভাঙা মনকে জোড়া লাগাবার জন্যই দরকার ছিল জরিনার চেয়েও সুরলী মেয়ের। তাই মেয়ের বাপের কুল, মায়ের কুল দেখবার প্রয়োজন বোধ করেনি সে, গ্রাহ্য করেননি গায়ের প্রবাদ—

    বউ আনো ঘর দেখে,

    মেয়ে দাও বর দেখে।

    প্রবাদটি যে শুধু কথার কথা নয়–পরে বুঝতে পেরেছিল সে আরশেদ মোল্লার শয়তানি দেখে। আর সে জন্য আফসোসও করেছে সে বড় কম নয়। অবশ্য নিজের কৃতকর্মের সমর্থনে সে বলে, ‘বিয়ার আসল জিনিস অইল বউ। বউডা তো রূপে-গুণে, চলা-চল্‌তিতে ভালই আছিল।’

    রূপজানের তালাকের খবর শুনে আবার ঘটকের আনাগোনা শুরু হয়েছে মোল্লাবাড়ি। সম্বন্ধের প্রস্তাব এসেছে অনেক কয়টা। দরও বাড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। সবচেয়ে লোভনীয় প্রস্তাব একটা এসেছিল জঙ্গুরুল্লার কাছ থেকে তালাকের আগেই। তার পীর মৌলানা তানবীর হাসান ফুলপুরী বছরে দু’বার আসেন এ এলাকায়। একবার বর্ষাকালে, গেরস্তের পাট বেচার সময়। আর একবার শীতকালে, আমন ধান উঠবার পরে পরেই। তিনি বজরা নিয়ে ফেরেন মুরিদানের বাড়ি। জঙ্গুরুল্লা তার জন্য নিজের বাড়িতে মসজিদের পাশে খানকাশরিফ বানিয়ে রেখেছে। পীরসাহেবের বিবিরা থাকেন সুদূর ফুলপুরে। বাঙ্গাল মুলুকের পানির ভয়ে তাদের কেউ তার সাথে আসেন না। এই বিদেশে কে তার খেদমত করে?

    তালাকের পর আবার মোল্লাবাড়ি আসে জঙ্গুরুল্লা। সে আরশেদ মোল্লাকে বলে, ‘শোনলাম অনেক সম্বন্ধ আইতে লাগছে?’

    ‘হ, আইছে কয়েকখান।’

    ‘আরে এত কায়দা-ফিকির কইর‍্যা তালাক দেওয়াইলাম আমি। আর মাইনষে বুঝি এহন তৈয়ার ললাটে চিড়া কোটতে চায়! খবরদার মিয়া, মোখের কথা যেন ঠিক থাকে।’

    ‘মোখের কথা তো ঠিক থাকব। কিন্তু একটা কথা।’

    ‘কি কথা আবার।’

    ‘জামাইর বয়স যে শ্বশুরেরতনও বেশি। ঐ যে মাইনষে কয়, তালুইর তন পুত্ৰা ভারী, হেই রহম অইয়া যাইব।’

    ‘আরে তুমি রাখো ঐ কথা। উনি অইলেন আল্লাওয়ালা মানুষ। উনারা এত ত্বরাত্বরি বুড়া অন না। দেখছ না কেমুন নুরানি চেহারা!’

    ‘হ, পীর-দরবেশরা তো আল্লার নিজের আতের তৈয়ারি। উনাগ চেহারাই আলাদা।’

    ‘হ শোন, ইদ্দতের কয়ডা মাস পার অউক। তারপর পীরসাব যখন শাওন মাসে আইবেন, তখন ইনশাল্লাহ্ কাজটা সমাধা করণ যাইব।’

    ‘আর জমির কথা যে কইছিলেন?’

    ‘আরে হ, তোমার লেইগ্যা তো দশনল জমি রাইখ্যা থুইছি খুনের চরে।’

    ‘দশনল না। আরো দশনল দিতে লাগব। মাইয়ার গয়না আপনেগ দেওনের দরকার নাই। গয়না আমিই দিমু।’

    ‘আইচ্ছা! গয়না যদি তুমি দেও, তবে নিও আরো দশ নল। কিন্তু মোখের কথা যেন্ উল্‌ডায় না।’

    সব কথা পাকাপাকি করে চলে যায় জঙ্গুরুল্লা। আরশেদ মোল্লা ব্যাপারটা গোপন রাখে। এমন কি তার স্ত্রীর কাছেও বলে না কিছু। খুনের চরে গিয়ে সে মাপজোখ করে বুঝে নেয় বিশ নল জমি।

    কিন্তু গোপন কথা বেরিয়ে পড়ে। একদিন আরশেদ মোল্লা আফার থেকে বাক্স নামিয়ে খুলে মাথায় হাত দেয়। রূপজানের একটা গয়নাও তার মধ্যে নেই। সে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দেয় স্ত্রীর সাথে, ‘কই গেল গয়না? তুই গুঁজাইয়া থুইছস?’

    ‘উনি কি কয়! আমি ক্যান্ গুঁজাইমু?’

    ‘হ, তুই না জাইলে যাইব কই? বুড়াকালে তোর গয়না পিন্দনের শখ্ অইছে।’

    ‘তোবা-তোবা! গয়না পিন্দনের শখ অইলে তো গায়ে দিয়া বইয়া থাকতাম। আর মাইয়ার শরীল খালি কইর‍্যা মাইয়ার গয়না গায় দেয় এমুন মা আছে দুইন্যায়?’

    ‘তয় গেল কই? রূপিতে সরায় নাই? রূপি, ও রূপি।’

    রূপজান এসে দাঁড়ায়। তার চোখ-মুখ ফোলাফোলা। চুল উষ্কুখুষ্কু। তেল না পড়ায় নারকেলের ছোবড়ার মতো রঙ হয়েছে সে চুলের।

    আরশেদ মোল্লা তার দিকে চেয়ে বলে, ‘গয়নাগুলা তুই সরাইয়া রাখছস?’

    রূপজান কথার জবাব দেয় না।

    ‘কি জিগাইলাম? গয়নাগুলো তুই সরাইয়া রাখছস?’

    ‘হ।’

    ‘আমারে না জিগাইয়া নিছস্ এত সাহস তোর!’

    রূপজান নিরুত্তর।

    আরশেদ মোল্লা আবার বলে, ‘কই রাখছস, লইয়া আয়। চোরের যেই উৎপাত চাইরধারে–’

    ‘যাগো জিনিস তাগো কাছে পাড়াইয়া দিছি।’

    ‘কি কইলি হারামজাদি!’ মোল্লা মেঝেতে পড়ে থাকা বাক্সের তালাটা হাতে নিয়ে লাফিয়ে ওঠে। ছুঁড়ে মারে ওটা রূপজানের দিকে। তার মাথাটা কেমন করে যেন তার অজান্তেই একদিকে কাত হয়ে যায়। আর তালাটা তার কানের পাশ দিয়ে শাঁ করে গিয়ে ভেঙে দেয় একটা চালের মট্‌কি।

    সোনাইবিবি ছুটে আসে। দু’হাত মেলে সে মারমুখি মোল্লার পথ রোধ করে দাঁড়ায়।

    ‘ছাড়ো ছাড়ো, ওরে আইজ মাইরা ফালাইমু। ধুইন্যা তুলা-তুলা কইর‍্যা ফালাইমু।’

    ‘ছিঃ—ছিঃ—ছিঃ–! জুয়ানমাইয়ার গায়ে আত তোলে, শরমও নাই। ওরে মাইর‍্যা তো ফালাইছেনই। ও কি আর জিন্দা আছে?’

    আরশেদ মোল্লা থামে। সে কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলে, ‘হারামজাদি আমারে যে মাইরা ফালাইছে! এহন আমি গয়না পাই কই?’

    ‘গয়না দিয়া কি করব?’

    ‘আরে গয়না লাগব না মাইয়ার বিয়া দিতে? গয়না দিতে না পারলে দশ নল জমি ফিরত দেওন লাগব।’

    ‘জমি ফিরত দেওন লাগব! ক্যান?’

    আরশেদ মোল্লা আর গোপন রাখতে পারে না ব্যাপারটা। জঙ্গুরুল্লার কাছে তার ওয়াদার কথা সে খুলে বলে স্ত্রীকে।

    সোনাইবিবি শুনে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, ‘মাইয়ার পরানডারে তো এক্কেরে ঝাঁজ্‌রা কইর‍্যা ফালাইছে। কায়ামরা বানাইয়া ফালাইছে। এহন আবার কবর দেওনের কারসাজি শুরু করছে।’

    মা বোঝে মেয়ের মন। সত্যিই ঝাঁজরা হয়ে গেছে রূপজানের বুকের ভেতরটা।

    ফজলকে ধরে নেয়ার পর তিনদিন সে বিছানায় পড়ে ছিল। দানাপানি ছোঁয়নি। তারপর যখন তালাকের খবর তার কানে এল তখন তার দাঁতকপাটি লেগে গিয়েছিল। হুঁশ হওয়ার পর আত্মহত্যার স্পৃহা জেগেছিল তার মনে। একটা রশি সরীসৃপের মতো তার মনের দরজায় হানা দিয়েছে বারবার। কিন্তু সে জানে আত্মহত্যা মহাপাপ। তাই সে সরীসৃপ মনের দোরগোড়া থেকেই বিদায় হয়েছে।

    রূপজান ভেবে পায় না–কেন ফজল তাকে তালাক দিয়ে গেল? সে হয়ত মনে করেছে–রূপজান জানত সব ষড়যন্ত্রের কথা। জেনেও তাকে হুঁশিয়ার করে দেয়নি কেন সে?

    কিন্তু রূপজান যে কিছুই জানত না। সে অবশ্য তাদের বাড়ির নিচে নদীর ঘাটে জঙ্গুরুল্লার পানসি দেখেছিল একদিন। তার বাপকেও যেতে দেখেছিল পানসিতে। তারা যে এরকম একটা চক্রান্ত করতে পারে তা সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে নি।

    ঐ দিন রাত্রে বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে মনে করে সে কাছারি ঘরে যাওয়ার জন্য নিশ্চুপে বিছানা ছেড়ে উঠেছিল। আলগোছে দরজার খিল খুলে কয়েক পা এগুতেই সে দেখে তার বাপ উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। সে যেমন বেরিয়েছিল তেমনি আবার ঘরে ফিরে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। বাপ দেখে ফেলেছে মনে করে তার লজ্জার সীমা-পরিসীমা ছিল না। সে যদি তখন বুঝতে পারত কেন তার বাপ জেগে রয়েছে, এতরাত্রে কোন বান্ধবের জন্য অপেক্ষা করছে, তাহলে কি আর ধরতে পারত ফজলকে? কাছারি ঘরে ছুটে গিয়ে, চিৎকার দিয়ে সে হুঁশিয়ার করতে পারত তাকে। লজ্জা-শরমের তোয়াক্কা সে করত না তখন।

    রূপজানের মনে হয়–ফজল ইচ্ছে করে তালাক দেয়নি। যারা তাকে চক্রান্ত করে ধরিয়ে দিয়েছে তারাই জোর-জবরদস্তি করে বাধ্য করেছে তাকে তালাক দিতে। কিন্তু তার বাপ যে বলে, ফজল কাগজে লিখে তালাক দিয়ে গেছে। তবে কি সে সত্যি সত্যি নিজের ইচ্ছায় তালাক দিয়েছে?

    কেন সে এ কাজ করল? কেন সে তাকে নিষ্কৃতি দিয়ে গেল? সে-তো চায়নি। এখনো তা চায় না তার মন। কোনো দিন চাইবেও না।

    আবার প্রশ্ন জাগে রূপজানের মনে—বছরের পর বছর জেল খাটতে হবে বলেই কি সে এ কাজ করল? তাকে আবার বিয়ে করার সুযোগ দিয়ে গেল?

    জেলের কথা মনে হতেই শিউরে উঠে রূপজান। সে শুনেছে–জেলে অনেক কষ্ট। সেখানে নাকি বেদম মারধর করে। পেট ভরে খেতে দেয় না। শুতে বিছানা দেয় না। গরু-মোষের মতো ঘানি টানতে হয়। চাকিতে পিষে ছাতু বানাতে হয়। কোনো কাজ না থাকলেও একদণ্ড জিরোতে দেয় না। ডালে চালে মিশিয়ে দিয়ে বলে, বাছো বসে বসে। বাছা শেষ হলে রান্না, তার পরে খাওয়া।

    রূপজানের চোখ ফেটে পানি আসে। দু’গাল বেয়ে নামে অশ্রুবন্যা। চাপা কান্নার ঢেউয়ে। থরথরিয়ে কাঁপে তার সারা দেহ। সে অস্ফুটস্বরে বলে, ‘তুমি বিনা দোষে জেলে পইচ্যা মরবা। আর আমি আর একজনের ঘরে গিয়া সাধ-আহ্লাদ পুরা করমু? না, কিছুতেই না। কিছুতেই না।’

    তাকে কি জেল থেকে খালাস করে আনা যাবে না?–ভাবে রূপজান।

    কেন যাবে না? ঠিকমত মামলার তদবির করলে, টাকা খরচ করলে নিশ্চয় তাকে খালাস করে আনা যাবে। টাকায় কি না হয় তার শ্বশুর নিশ্চয় টাকা খরচ করবে।

    কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে সন্দেহ জাগে–শ্বশুরের কাছে যদি এখন টাকা না থাকে? তার বন্ধক দেয়া গয়না ছাড়াতে যদি সব টাকা ফুরিয়ে গিয়ে থাকে?

    এ কথা মনে হওয়ার পরেই একদিন সুযোগ বুঝে সে বাক্স খুলে তার সবকটা গয়না সরিয়ে ফেলেছিল। কি হবে গয়না দিয়ে। যার গয়না তারই কাজে লাগুক। বাপের কাছে সেদিন মিথ্যে করে বলেছিল–যাদের গয়না তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। আসলে গয়নাগুলো তখনো তার কাছেই ছিল। লুকিয়ে রেখেছিল কাঁথার গাঁটরির মধ্যে। সে সুযোগ খুঁজছিল, কেমন করে কাকে দিয়ে ওগুলো পাঠাবে শ্বশুরের কাছে।

    অনেক ভেবে-চিন্তে রূপজান তার চাচাতো ভাই কাদিরকে ঠিক করে। সে জানে–এ পাড়ায় একমাত্র কাদিরেরই কিছুটা টান আছে ফজলের জন্য। আর তাকে বিশ্বাসও করা যায়।

    কাদির যেদিন গয়নার পুটলি নিয়ে মাতব্বর বাড়ি পৌঁছে, সেদিন এরফান মাতব্বরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। তার বিছানার চারপাশে বসে লোকজন দোয়া-দরূদ পড়ছে। বরুবিবি শিয়রের কাছে বসে চোখের পানি ফেলছে, চেয়ে আছে মাতব্বরের মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পরে পরে চামচে করে পানি দিচ্ছে সে মাতব্বরের মুখে। ঘরের এক কোণে বসে কাঁদছে বাড়ির মেয়েরা।

    মসজিদের ইমাম সাহেব এসে তওবা পড়িয়ে চলে গেছেন।

    বিছানা থেকে উঠবার শক্তি আগেই হারিয়েছিল এরফান মাতব্বর। আরশেদ মোল্লা জঙ্গুরুল্লার সাথে ষড়যন্ত্র করে পুলিস ফাঁড়ির পুলিস ডেকে ফজলকে ধরিয়ে দিয়েছে শুনে রাগে উত্তেজনায় সে চিৎকার করে উঠেছিল। ঝাড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সে যেন প্রচণ্ড ঝড়ে উৎপাটিত বুড়ো বটগাছ। কাঁপতে কাঁপতে সে চৌকির থেকে নিচে পড়ে বেহুঁশ হয়ে যায়। তারপর থেকেই তার জবান বন্ধ। তার অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে দ্রুত। দিঘিরপাড় থেকে ডাক্তার এসেছিলেন। ঔষধ দিয়ে বলে গেছেন, ‘রুগীকে যদি কিছু খাওয়াতে মন চায়, তবে খাওয়ানো যেতে পারে।’

    কাদির দাঁড়িয়ে থাকে স্তব্ধ, নির্বাক। সে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।

    রমিজ মিরধা কাদিরকে চিনতে পেরে বলে, ‘তুমি আরশেদ মোল্লার ভাইপুত না? তুমি আইছ কি করতে? তোমার চাচায় বুঝিন পাডাইয়া দিছে মাতবরের পো-র মরণকষ্ট দ্যাখতে?’

    ‘মাঐজীর লগে দুইডা কথা কইমু।’ কাদিরের মুখে কথা জড়িয়ে যায়।

    ‘কি কথা? কইয়া ফালাও।’ মেহের মুনশি বলে।

    ‘বু আমারে পাডাইছে। এই গয়নাগুলা দিছে। এগুলা বেইচ্যা দুলাভাইর মামলার তদবির করতে কইছে।’

    কাদির গয়নার পুটলিটা বরুবিবির দিকে বাড়িয়ে দেয়।

    বরুবিবি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

    মেহের মুনশি পুটলিটা হাতে নেয়। গয়নাগুলো খুলে রাখে বরুবিবির সামনে।

    বরুবিবি দু’হাত ভরে গয়নাগুলো তোলে। তার হাত কাঁপছে। মাতব্বরের মুদিত চোখের সামনে সেগুলো মেলে ধরে কাঁদে-কাঁদো স্বরে বলে, ‘ওগো হোনছে? বউ বেবাক গয়না পাড়াইয়া দিছে।’

    ‘ও দুদু, হোনছেন?’ কানের কাছে মুখ নিয়ে মেহের মুনশি ডাকে। মাতব্বর চোখ মেলে। মরা মাছের চোখের মতো ঘোলাটে সে চোখ।

    ‘ও দুদু, দ্যাহেন চাইয়া। বেবাক গয়না পাড়াইয়া দিছে বউ।’

    বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে মাতব্বর। তার ঠোঁট নড়ে। কি যেন বলতে চায়, কিন্তু পারে না। সে মুখ হাঁ করে।

    বরুবিবি চামচ ভরে পানি দেয় তার মুখে। সে আবার চোখ বোজে।

    তারপর আর এক রাত বেঁচেছিল মাতব্বর। মরার আগে কিছুক্ষণের জন্য তার বাকশক্তি ফিরে এসেছিল। জিভে জড়ানো ছাড়াছাড়া অস্পষ্ট কতকগুলো শব্দে সে তার অন্তিম ইচ্ছা জানিয়ে গেছে। রূপজানের গয়না সম্বন্ধে সে শুধু বলে গেছে, ‘বউর মহরানার হক।’

    কথা ক’টির ব্যাখ্যায় সকলেই একমত–রূপজানের কাছে ফজলের দেনমহরের দেনা এরফান মাতব্বর শোধ করে গেছে। রূপজান ছাড়া ও গয়নায় আর কারো হক নেই।

  • ষোল

    ষোল

    দু’সপ্তাহ হাজতবাসের পর আদালতে হাজির করা হয়েছিল ফজলকে। সেখানেই সে তার পিতার মৃত্যুর খবর পায়।

    মামলার তদবিরের জন্য মেহের মুনশি আদালতে এসেছিল। তার নিযুক্ত উকিল ফজলকে জামিনে খালাস করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন অনেক। আসামির পিতার মৃত্যু হয়েছে–এ কারণ দেখিয়েও তিনি জামিন মঞ্জুর করাতে পারেননি।

    বুকভরা কান্না নিয়ে আবার ফজল জেলে ঢোকে। কান্না চাপতে গিয়ে ফুলে ফুলে ওঠে তার বুক। ফুলে যায় চোখ-মুখ । অন্যান্য আসামিরা কাছে এসে দু-একটা সহানুভূতির কথা বলতেই তার রুদ্ধ কান্না বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে।

    অনেকক্ষণ ধরে কাঁদে ফজল। বুকের পুঞ্জীভূত মেঘ অনেক পানি ঝরিয়ে হালকা হয় কিছুটা। কান্নার তাণ্ডব কমে এলে প্রথমেই যে ছবিটি তার কল্পনায় ভাসে তা একটি কবরের। কবরের পাশে বসে কাঁদছে তার মা। পরিধানে তার সাদা থান। তার গা ঘেষে বসে আছে আমিনা আর নূরু। তারাও কাঁদছে।

    রূপজানও কি কাঁদছে? হ্যাঁ, এতো সে। সে-ও কাঁদছে। না-না-না, ভুল দেখছে সে।

    ফজল তার মনের পর্দা থেকে মুছে ফেলতে চায় রূপজানের ছবি। কিন্তু পারে না। তার মনে হয় রূপজান কাঁদছে না, কাঁদার ভান করছে। সে কাঁদতে পারে না। কেন কাদবে সে? কার জন্য কাঁদবে? ফজলের বাপ তার কে? ফজলই তো তার কিছু নয়। সে ডাকাত। ডাকাতের ঘর করবে না বলে সে তালাক নিয়েছে।

    রূপজান কি সত্যিই বলেছিল–সে ডাকাতের ঘর করবে না? এখনো সন্দেহ জাগে ফজলের মনে। কিন্তু সে যদি এ কথা না-ই বলে থাকে, তবে দু-দুটো লোক কেন সাক্ষী দিল এসে? এমন ডাহা মিথ্যে কথা বলে তাদের লাভ? কিন্তু রূপজান তো সেদিন তার কাছে বলেছিল–সে বিশ্বাস করে না ডাকাতির কথা। কি জানি, হয়ত মনে করেছে যার কপালের ভোগ সে একাই ভোগ করুক। সে কেন এমন পুরুষের অদৃষ্টের সাথে নিজেরটা জড়িয়ে নিজের ভবিষ্যত নষ্ট করবে?

    ফজল আবার ভাবে, ঠিকই করেছে রূপজান। ঐদিন যদি সে এট্টুকু বুঝত, তবে আর তাকে অতটা লাঞ্ছনা ভোগ করতে হতো না। তালাকনামায় একটা দস্তখত মেরে দিলেই সে জঙ্গুরুল্লা ও হাবিলদারের অকথ্য নির্যাতন থেকে রেহাই পেত। তার বুড়ো আঙুলে কালি মাখিয়ে জোর করে তার টিপসই নেয়ার দরকার ছিল না তাদের।

    দু’মাস কেটে গেছে। এর মধ্যে অনেক আসামি ছাড়া পেয়ে চলে গেছে। অনেক নতুন আসামি এসেছে। নতুনের মধ্যে দুজন তার পরিচিত। তারা বিক্রমপুরের নামকরা হা-ডু-ডু খেলোয়ার বাদল আর আক্‌লাস। দিঘিরপাড়ের জেদাজিদির খেলায় ষাঁড়ের মতো জোরোয়ার এই বাদলকেই সে মাজায় ধরে রেখে দিয়েছিল।

    বাদল আর আক্‌লাস জেলে ঢুকতেই ফজল ম্লান হেসে এগিয়ে যায় তাদের কাছে।

    বাদল চিনতে পেরে বলে, ‘কিহে বাহাদুর, তুমি এখানে কেন? কবে এলে?’

    ‘এই দুই মাসের কিছু বেশি।’ জবাব দেয় ফজল।

    ‘অ্যাঁ, দু’মাস!’

    একজন আসামি বলে, ‘ওনারে মিথ্যা ডাকাতি মামলায় ফাঁসাইয়া দিছে। বাপ মারা গেছে তবুও বেচারা জামিন পাইতেছে না।’

    শুনে বাদল আর আক্‌লাস দু’জনই ব্যথিত হয়।

    কয়েক দিনের মধ্যেই ওদের সাথে ফজলের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

    ওরা নাকি কোন ষড়যন্ত্র মামলার আসামি। ইংরেজ শাসকদের দেশ থেকে তাড়াবার জন্য ওরা এক গুপ্ত রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল। দলের নেতাসহ সাতজন ধরা পড়েছে।

    দলের নেতা মতির বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি হবে। এর আগে নাকি তিন বারে বছর দশেক জেল খেটেছে সে। তার পাতলা ছিপিছিপে শরীরে মেদের নামগন্ধ নেই। গাল দুটা বসে গেছে। চোখে পুরু চশমা। চোখেমুখে মেঘলা দিনের গম্ভীর্য। কথা বলার সময় চোখের তারায় বিদ্যুত জ্বলে, ঠোঁটের কোণে চিকচিক করে কেমন এক অদ্ভুত হাসি।

    তার দিকে তাকালেই শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে ফজলের। সে ভাবে দেশের স্বাধীনতার জন্য জেল খাটতে খাটতে মতিভাইয়ের স্বাস্থ্যের এ দশা হয়েছে।

    মতি তার দলের সবার সাথে কি সব আলোচনা করে। ফজল বুঝতে পারে না সব। তাদের আলোচনা থেকে সে এট্টুকু জানতে পারে–জাপানিরা রেঙ্গুন দখল করেছে। এগিয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে। চাটগাঁ ও আরো অনেক জায়গায় বোমা ফেলে ছারখার করে দিয়েছে।

    কয়েকদিন পরে আবার ফজলকে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু এবারেও তার উকিল জামিন মঞ্জুর করাতে পারেননি। মেহের মুনশির কাছে বাড়ির খবরাখবরের সাথে এক দুঃসংবাদ পায় ফজল। পুলিস আর মিলিটারি মিলে তাদের এলাকার শতশত নৌকা ফতেগঞ্জ নিয়ে আটক করেছে। ফজলদের নতুন পানসি আর ঘাসি নৌকাটাও নিয়ে গেছে। অনেকে ফতেগঞ্জ গিয়ে তাদের নৌকায় নম্বর লাগিয়ে ফেরত নিয়ে এসেছে। এর জন্য নাকি অনেক টাকা ঘুস দিতে হয়। মেহের মুনশি ফতেগঞ্জ গিয়েছিল। দেশের সব জায়গা থেকেই নৌকা আটক করা হয়েছে। হাজার হাজার নৌকার ভেতর থেকে সে ফজলদের পানসিটা খুঁজে বার করতে পারেনি। ঘাসিটা সরকার কিনে নিতে চেয়েছিল। দাম ধার্য হয়েছিল মাত্র একশ’ টাকা। তিরিশ টাকা বোট ইন্সপেক্টরকে ঘুস দিয়ে ওটায় নম্বর লাগিয়ে ফেরত আনা হয়েছে।

    ফজলের মনে হয়, নতুন পানসিটা দেখে কারো লোভ লেগেছিল। সে-ই নিজের বলে দাবি করে ঘুস দিয়ে ওটা নিয়ে গেছে।

    বিপদ কখনো একা আসে না। কথাটা একেবারে খাঁটি–ভাবে ফজল। যে পানসিটা গেল তা আর সারা জীবনেও সে গড়াতে পারবে না।

    এত নৌকা জমা করছে কেন সরকার? আবার কতগুলোয় নম্বর লাগিয়ে ছেড়েই বা দিচ্ছে কেন?–ফজল বুঝতে পারে না। বাদল বুঝিয়ে দেয় ব্যাপারটা : এই নদী-নালার দেশে নৌকা ছাড়া যুদ্ধ করা অসম্ভব। সৈন্য-সামন্ত, যুদ্ধের সরঞ্জাম ইত্যাদি পারাপার আনা-নেয়ার জন্য নৌকার দরকার। জাপানিরা এগিয়ে আসছে। দরকারের সময় যাতে নৌকার অভাব না ঘটে, আবার বেগতিক দেখলে সমস্ত নৌকা পুড়িয়ে ডুবিয়ে কৃতিত্বের সাথে পালানো যায় তাই নৌ-শুমারি করে রাখছে ইংরেজ সরকার। তারা বেছে বেছে কিছু নৌকা কিনেও রাখছে যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের জন্য।

    ফজল অবাক হয়ে ভাবে–এত খবর রাখে এ রাজনৈতিক বন্দিরা! তারা খবরের কাগজ পড়ে। তাই দুনিয়ার খবর তাদের পেটে। এক-একজন যেন খবরের গুদাম।

    খবরের কাগজ পড়বার জন্য এরা অস্থির হয়ে পড়ে। জেলখানায় খবরের কাগজ আসার সাথে সাথে রাজনৈতিক বন্দিরা এক-একজন এক-এক পাতা নিয়ে পড়তে শুরু করে। একজন পড়া আরম্ভ করলে তিন-চারজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে সে পাতার ওপর। স্বাধীনতা আন্দোলন আর যুদ্ধের খবর জানার জন্য এরা সব উদগ্রীব। এদের দেখাদেখি ফজলও কাগজ পড়া শুরু করেছে। সবার পড়া হয়ে গেলে সে কাগজের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলে। মোহামেডান স্পোর্টিং-এর খেলা থাকলে সে এদের মতো অস্থির হয়ে যেত কাগজ পড়ার জন্য। লেখাপড়া ছেড়ে দেয়ার পর সে আর কাগজ পড়ার সুযোগই পায় নি। এখন অন্যান্যদের মতো সে-ও খবরের কাগজ আসার প্রতীক্ষায় সময় গোনে।

    এতদিন দুনিয়ার কোনো খবরই রাখত না ফজল। এখন খবরের কাগজ পড়ে সে বুঝতে পারে–দুনিয়ার হালচাল বদলে যাচ্ছে, যুদ্ধের কারণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে দুনিয়ার চেহারা।

    কাগজ পড়ে সে আরো জানতে পারে, সারা দেশব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিরোধ বেড়েই চলেছে। কংগ্রেস চায় অখণ্ড ভারত আর মুসলিম লীগ চায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় মুসলিমদের জন্য আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র–পাকিস্তান।

  • সতের

    সতের

    মহকুমার জেলখানা। পাশাপাশি দুটো মাত্র ব্যারাক। একটায় রাখা হয় বিচারধীন আসামি, অন্যটায় স্বল্প মেয়াদের দণ্ডিত অপরাধী। ব্যারাক দুটোর শিকের দরজা একই দিকে অবস্থিত। দরজার সামনে খোলা লম্বা বারান্দা। একজন রাইফেলধারী সেপাই বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত টহল দিয়ে ফেরে।

    আলো-বাতাসের জন্য কয়েদিরা দরজার কাছ ঘেঁষে জটলা করে সব সময়। অনন্ত আকাশ আর সবুজ গাছপালার দিকে তাকিয়ে ক্লান্তি আসে না তাদের চোখে। মনের আনন্দে উড়ে যাওয়া মুক্ত পাখির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনেকে।

    রাত আটটার ঘণ্টা পিটিয়ে এক পাহারাদার তার চার ঘণ্টার কাজের পালা শেষ করে। নতুন পাহারাদার আসে তার জায়গায়।

    ষড়যন্ত্র মামলার আসামিরা দরজার কাছে বসে গল্পগুজব করে। শুধু মতি জানালার গরাদের ওপর দুই কনুই রেখে চুপচাপ বসে আছে। তার দৃষ্টি পাঁচিলের বাইরের একটা আমগাছের ওপর। ঘন অন্ধকারে গা ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে গাছটা। এক লহমার জন্য হঠাৎ গাছের টিকির কয়েকটা পাতা চিকমিকিয়ে ওঠে যেমন চিকমিক করে শেষ বিকেলের রোদে। কিছুক্ষণ পর পর আরো দু’বার দেখা যায় সে ক্ষীণ আলোর চিকিমিকি।

    মতি উঠে দাঁড়ায়। দলের লোকদের বলে, কিরে তোরা চুপচাপ বসে আছিস কেন? একটু গান-টান কর।

    দ্বিতীয়বার আর বলতে হয় না। একজন গানে টান দিতেই দলের সবাই গাইতে শুরু করে দেয়–

    ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা,

    তাহার মাঝে আছে দেশ এক–সকল দেশের সেরা;

    ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা;

    এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাক তুমি,

    সকল দেশের রাণী সে যে–আমার জন্মভূমি,

    সে যে আমার জন্মভূমি,

    সে যে আমার জন্মভূমি।

    ফজল ও বাকি সাত-আটজন আসামি দূরে বসেছিল। গানের আকর্ষণে ফজল গিয়ে বাদলের পাশে বসে। গানের কথা ও সুর গুনগুন করে তার মনের ভেতর।

    গান শেষ হয়। ফজলকে দেখে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে সকলে। বাদল মতির দিকে চেয়ে বলে, ‘ঠিক আছে, কোনো অসুবিধে হবে না।’

    কী ঠিক আছে, বুঝতে পারে না ফজল। কিছুক্ষণ পরই সে দেখে আক্‌লাস বিঘত দেড়েক লম্বা কালোমত কি একটা জিনিস তার জামার ভেতর থেকে বার করে রানের নিচে রাখল।

    মতি বলে, ‘মোহন, এবার তোর সেই গানটা ধর। আর তোরা সবাই কবির সাথে সাথে দোহার ধরিস আর তালে তালে তালি দিস।’

    মোহন :
    ও ভাই কোথা থেকে উড়ে এল লালমুখো বাদুড়,
    ও ভাই কোথা থেকে ………
    একজন :
    কোথা থেকে?
    মোহন :
    পার হয়ে তেরো নদী সাত সমুদ্দুর,
    সকলে :
    ও ভাই জাগো…জাগোরে ভাই জাগো,
    ও ভাই ওঠো…ওঠোরে ভাই ওঠো,
    করো তারে দূর।

    তালির তালে তাল মিলিয়ে লোহা-কাটা করাত চলে দরজার শিকের ওপর। গান আর হাততালির শব্দে ঢাকা পড়ে করাতের আওয়াজ। পাহারাদার টহল দিয়ে এদিকে মুখ ঘোরাবার আগেই কারো রানের নিচে চলে যায় করাতটা।

    মোহন :
    ও ভাই উড়ে এসে জুড়ে বসে বড় সে চতুর,
    ও ভাই উড়ে এসে…এ…এ…
    একজন :
    তারপর?
    মোহন :
    তার সাথে যোগ দি’ছে–(প্রহরীর দিকে তাকিয়ে) কে বলো তো?
    প্রহরী :
    কে?
    মোহন :
    তার সাথে যোগ দিছে ছুঁচো আর ইঁদুর,
    সকলে :
    ও ভাই মারো–মারো রে ভাই মারো,
    ও ভাই কাটো–কাটোরে ভাই কাটো,
    করো তারে দূর।

    বারবার গাওয়া হচ্ছে একই চরণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই গানের কথা আর সুর রপ্ত হয়ে যায় ফজলের। সে-ও তালি বাজিয়ে গান গায় সকলের সাথে।

    মোহন :
    ও তোর বুকে বসে খুন চুষে পেট করে সে পুর,
    ও তোর বুকে বসে…এ..এ…
    একজন :
    তারপর?
    মোহন :
    লুটে নেয় নিজ দেশে সাত-সমুদ্দূর।
    সকলে :
    ও ভাই ধরো, ধরোরে ভাই ধরো,
    ও ভাই লড়ো, লড়োরে ভাই লড়ো
    করো তারে দূর।

    দুটো শিকের বেশ কিছুটা কাটা হয়ে গেছে। কিন্তু করাতের আওয়াজ যেন বেশি হচ্ছে এখন। গান আর তালির শব্দ ছাপিয়ে রাখতে পারছে না করাতের কুড়ুৎ-কুড়ুৎ আওয়াজ। মতি শঙ্কিত হয়। সে করাত চালানো বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে মোহনকে বলে, ওরে কবি, তোর গানের জারিজুরি আর চলবে না এখন। নতুন গান তৈরি কর।

    কিছুক্ষণ পর মোহন আবার নতুন গানে টান দেয় :

    আমার দেশের কৃষাণ-মজুর,
    মাঝি-মাল্লা, কামার-কুমোর,
    ওরাই যে খাঁটি মানুষরে–
    ঐ যে দেখ মাঝি ভাই,
    বাড়িতে তার খাবার নাই,
    তবু তার বৈঠা চরে কুডুৎ-কুড়ুৎ
    সকলে :
    কুড়ুৎ-কুড়ুৎ-কুড়ুৎ-কুড়ুৎ

    হাততালি আর কুড়ুৎ-কুড়ুৎ শব্দ এবার করাতের আওয়াজকে বেমালুম ঢেকে দেয়।

    মোহন :
    ঐ যে দেখ কারিগর,
    নাইক তার চালে খড়,
    তার কুঁদ-বাটালি চলে তবু খুড়ুৎ-খুড়ুৎ
    সকলে :
    খুড়ৎ-খুড়ৎ-ঋড়ৎ-খুড়ুৎ
    মোহন:
    গোয়াল ভাইরে দেখ চেয়ে,
    দেখছে কি সে ঘি খেয়ে?
    তবু সে মাখন টানে ঘুড়ুৎ-ঘুড়ুৎ।
    সকলে :
    ঘুড়ৎ-ঘুড়ৎ-ঘুড়ৎ-ঘুড়ৎ
    মোহন :
    তাঁতি ভাইয়া কাপড় বোনে,
    ছেঁড়া কাপড় তার পরনে,
    তবু সে মাকু চালায় ঠুড়ুৎ-ঠুড়ুৎ
    সকলে :
    ঠুড়ুৎ-ঠুড়ুৎ-ঠুড়ুৎ-ঠুড়ুৎ
    মোহন :
    আমরা যে ভাই খাঁচার পাখি,
    চোখের জলে ভাসে আঁখি,
    খাঁচা ভেঙে কেমনে পালাই ফুড়ুৎ-ফুড়ৎ
    সকলে :
    ফুড়ৎ-ফুড়ৎ-ফুড়ৎ-ফুড়ৎ

    রাত বারোটায় নতুন পাহারাদার আসার আগেই দুটো শিক কাটা হয়ে গেছে। এক একটার দু’জায়াগায় করাত চালানো হয়েছে দু’হাত অন্তর। অল্প আঁশের ওপর যথাস্থানে রেখে দেয়া হয়েছে ওগুলোকে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না।

    মতি, বাদল ও আরো একজন দরজার কাছে বিছানা পেতে শুয়ে আছে।

    পেটাঘড়ি রাত একটা ঘোষণা করে।

    মতি শুয়ে শুয়েই দৃষ্টি ফেলে আমগাছটার টিকিতে। পাতার ওপর আলোর চিকিমিকি দেখে সে টোকা দেয় বাদলের গায়ে। বাদল কাশি দিয়ে সঙ্কেত জানায় আর সবাইকে!

    ঠক-ঠক আওয়াজ তুলে টহল দিচ্ছে প্রহরী। এ দরজা থেকে ঘুরে সে এগিয়ে যাচ্ছে অন্য প্রান্তে। তার বুটের আওয়াজ ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। বাদল আলগোছে মোড় দিয়ে শিকের টুকরো দুটো খসিয়ে ফেলে। সে আর আক্‌লাস চুপিসারে বেরিয়ে বারান্দার থামের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে।

    প্রহরী এগিয়ে আসছে অন্য প্রান্ত থেকে। দরজার কাছে পৌঁছবার আগেই পেছন থেকে বাদল শক্ত হাতে তার মুখ চেপে ধরে রুমাল দিয়ে। আর আক্‌লাস তাকে জাপটে ধরে রাইফেলটা সরিয়ে নেয়।

    দু’জনে তাকে মাটিতে পেড়ে তার মুখের ভেতর রুমাল গুঁজে দেয়। মুখ থেকে সামান্য আওয়াজ বের করবারও সুযোগ পায় না প্রহরী। তার লাল পাগড়িটাকে তারা দুটুকরো করে তার হাতে পায়ে বেঁধে উপুড় করে চেপে ধরে রাখে।

    মতি দলের আর সবাইকে নিয়ে নিঃশব্দ পায়ে ছুটে যায় পেছনের পাঁচিলের দিকে। বাইরে থেকে একটা দড়ির মই নেমে আসে। মই বেয়ে চটপট তারা পাঁচিলের বাইরে চলে যায়। বাদল আর আক্‌লাস এসে দেখে, ফজলও উঠছে মই বেয়ে।

    বাদল ফিস ফিস করে বলে, ‘এই ফজল, তুমি কেন পালাচ্ছ? কেন নিজের বিপদ বাড়াচ্ছ?’

    আক্‌লাস বলে, ‘আরে যেতে দাও। জলদি করো।’

    বাইরে বেরিয়ে সটকে পড়ে যে যেদিকে পারে, মিশে যায় কালো রাত্রির অন্ধকারে।

    অল্পক্ষণ পরেই বেজে ওঠে পাগলা ঘণ্টা। রাত্রির নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে ঘণ্টা বাজতে থাকে অবিরাম।

    ফজল ছুটছে। অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে, কাঁটার আঁচড় খেয়ে সে ছুটছে। একটা শুকনো খাল পেরিয়ে সে পাটখেতের ভেতর ঢোকে। চুপটি মেরে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয়া দরকার।

    খালের ভেতর কিছু একটা গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো।

    ফজল দাঁড়ায়। অন্ধকারে সাদামতো কিছু একটা নড়ছে, কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়।

    মানুষ! দলের কেউ নয় তো?

    ফজল ভয়ে ভয়ে নামে খালের ভেতর। কাছে গিয়ে টেনে তোলে মানুষটিকে।

    ‘কে? কেরে তুই? উহ্–উহ্।’

    এ যে মতিভাই! গলার স্বরে চিনতে পারে ফজল। সে বলে, ‘আমি ফজল। শিগ্‌গির ওঠেন।’

    মতিকে কাঁধে তুলে সে পাটখেতে নিয়ে বসিয়ে দেয়। হাঁপাতে থাকে তারা দুজনেই। ‘ব্যথা পাইছেননি মতিভাই?’

    ‘হ্যাঁ, পায়ে চোট লেগেছে। ছাল উঠে গেছে অনেক জায়গায়।’

    ‘হাঁটতে পারবেন?’

    ‘দেখি পারি কিনা।’ টলতে টলতে দাঁড়ায় মতি। কয়েক কদম ফেলে বলে, ‘পারব।’

    ‘তবে জলদি চলেন। কিন্তু কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না। চশমাটা পড়ে গেছে পাঁচিল ডিঙোবার সময়।’

    ‘আমার হাতে ধরেন। চলেন শিগগির। কোন দিগে যাইবেন? নিয়ে চলো তোমার যেদিকে ইচ্ছে। তুমিতো দক্ষিণ দিকে যাবে?’

    ‘হ।’

    ‘তাই চলো। রাস্তা দিয়ে যেয়ো না কিন্তু।’

    ‘না। ধানখেতের আইল দিয়া, পাটখেতের আড়ালে আড়ালে যাইতে পারমু। আন্ধার রাইতে কেও-দেখতে পাইব না।’

    মানুষের আনাগোনার শব্দ পেলে পাটখেত ঢুকে চুপটি মেরে থাকতে হবে, ‘বুঝলে?’

    ফজল একটা ধঞ্চে গাছ টেনে তোলে। ওটা ভেঙে হাত দু’য়েক লম্বা একটা লাঠি বানিয়ে নেয়। লাঠিটার এক মাথা মতির হাতে দিয়ে অন্য মাথা ধরে ফজল নিয়ে চলে তাকে অন্ধের মতো। তাড়াতাড়ি হাঁটলে তার অসুবিধা হবে ভেবে ফজল আস্তে ধীরে পা চালাচ্ছিল। মতি তাড়া দেয়, ‘আরো জোরে হাঁটো, নইলে ধরা পড়ে যাব।’

    ফজল এবার জোরে পা চালায়। মতি লাঠি ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় তার পিছু পিছু। পথে কোনো অসুবিধা থাকলে, উঁচু-নিচু থাকলে তাকে আগেই সাবধান করে দেয় ফজল।

    পূর্ব দিগন্তে চাঁদ উঁকি দিয়েছে। কৃষ্ণপক্ষের এক ফালি সরু চাঁদ। চাঁদের আকার দেখে ফজল বুঝতে পারে, বড়জোর দু’তিন দিন বাকি আছে অমাবস্যার। সে আরো বুঝতে পারে, ধলপহরের সময় হয়ে আসছে। সে বলে, ‘মতি ভাই, রাইত কিন্তু আর বেশি নাই।’

    ‘আস্তে কথা বলো।’ ফিসফিসিয়ে বলে মতি। ‘কোথায় এসেছ?’

    ‘সেরাজাবাদের খালের কিনারে আসছি। এখন কোনমুখি যাইবেন?’

    ‘খালে পানি আছে?’

    ‘না।’

    ‘খালের ভেতর দিয়ে পুব দিকে নদীর পাড়ে চলে যাও। নদীর কিনারা ধরে চলতে চলতে দেখো নৌকা পাওয়া যায় কিনা। নৌকা একটা চুরি না করে উপায় নেই।’

    খালের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর তারা নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছে।

    ছোট শাখানদী। নাম রজতরেখা। ক্ষীণ ঘোলাটে জোছনায় নদীটাকে রুপালি চাঁদরের মতো মনে হয়।

    তারা চলতে থাকে নদীর কিনারা ধরে। কিছুদূর গিয়েই একটা ছইওলা এক-মাল্লাই নৌকা দেখতে পায় ফজল। একটা বাড়ির নিচে নদীর ঘাটে বাঁধা নৌকাটা।

    ‘মতিভাই, একটা নৌকা পাইছি। কিন্তু নৌকার মাঝির বাড়ি বোধ করি নদীর পাড়েই। টের পাইয়া গেলে—’

    ‘না টের পাইব না। রাতের এ সময়ে কেউ জেগে নেই। চলো, উঠে পড়ি নৌকায়।’

    দু’জনেই নৌকায় ওঠে। ফজল রশি খুলে পাড়া উঠিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়।

    পুব পাড়ে লোকজনের বসতি কম। ওপাড়ে চলে যাও। ‘আমাকেও একটা বৈঠা দাও। চোখে ভাল না দেখলেও টানতে পারব।’

    দু’জনে বৈঠা টেনে যখন দিঘিরপাড় বরাবর পৌঁছে তখন সূর্য উঠে গেছে। দিঘিরপাড় ডানে রেখে আরো কিছুক্ষণ বৈঠা টানার পর তারা বড় নদীতে গিয়ে পড়ে।

    ‘এইবার কোনমুখি যাইবেন, মতিভাই?’

    ‘চলো দক্ষিণপাড় চলে যাই। পাড়ি দিয়ে যেতে পারবে তো?’

    ‘তা পারব। কিন্তু অনেকদূর উজাইয়া পাড়ি দিতে অইব।’

    ‘কেন?’

    ‘পানির তেজ খুব বেশি। সোজা পাড়ি দিলে দক্ষিণপাড় যাওয়া যাইব না। নৌকা ঠেইল্যা লইয়া যাইব মেঘনায়।’

    প্রাণপণ বৈঠা টানে দু’জনে। বাঁ-দিকে একের পর এক বাহেরক, সাতকচর আর চাকমখোলা পেছনে ফেলে ধীর গতিতে উজিয়ে চলছে নৌকা। আরো কিছুদূর গিয়ে ফজর দাত্রার খাঁড়ির মধ্যে নৌকা ঢুকিয়ে দেয়।

    ‘এইবার আপনে বৈঠা রাখেন, মতিভাই। আমি একলাই বাইয়া যাইতে পারমু।’

    অনভ্যস্ত মতি বৈঠা টেনে খুবই ক্লান্ত। সে বৈঠা রেখে সটান শুয়ে পড়ে ছই-এর নিচে পাটাতনের ওপর।

    দক্ষিণ দিকে নৌকা চলছে। কিছুদূর যাওয়ার পর ফজল বলে, ‘মতিভাই আমি তো প্রায় বাড়ির কাছে আইসা পড়লাম।’

    ‘উঁহু, এখন বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না তোমার।’

    ‘কিন্তু পেটে কিছু না দিলে এতটা পথ—’

    ‘তা ঠিকই বলেছ। তবে চলো। বাড়ি গিয়ে কিন্তু বেশিক্ষণ থাকা চলবে না। দেরি হলে বিপদ হবে।’

    বৈঠা টানতে টানতে ফজলের হঠাৎ মনে হয়, ‘বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। বাবা মারা যাওয়ার পর মা, বোন, আত্মীয়-স্বজন শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে। তাকে দেখে কান্নার রোল পড়ে যাবে বাড়িতে। মা বিলাপ করতে শুরু করবে। তার নিজের বুকের কান্নাও বাঁধ মানবে না তখন।’

    ফজলের চোখ ঝাঁপসা হয়ে ওঠে।

    ভোরের রোদের ছোঁয়া লাগছে পিঠে। ফজল সুমুখে ডানে বাঁয়ে তাকায়। পরিচিত পরিবেশ তার চোখ জুড়িয়ে দেয়।

    অসংখ্য ডিঙি। ডিঙির মালিকেরা ইলিশ মাছের জাল ফেলে খোট ধরে বসে আছে। সাথের লোক গলুইয়ে বসে আছে হাল ধরে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে ডিঙি একটার পর একটা। যেন ডিঙির মিছিল। দ্রুত ধাবমান ইলিশ মাছ জালে ধাক্কা খেলে খোট-ধরা হাত টের পায়, ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে সারা শরীর। আর অমনি টান মেরে জালের ছড়িয়ে থাকা প্রান্ত দুটি একসাথে মিলিয়ে বন্ধ করে দেয়। মাছ আটকা পড়ে যায় জালের ভেতর। ফজল জানে, এ এক অদ্ভুত শিহরণ, অদম্য নেশা। কোনো এক ইলিশ শিকারি নাকি স্বপ্নে খোট পেয়ে জোরে মেরেছিল এক টান। তার আঙুল ঢুকে গিয়েছিল বউর নাকের চাঁদবালির মধ্যে। টানের চোটে আঙুলে আটকানো চাঁদবালি নাক কেটে বেরিয়ে গিয়েছিল।

    কয়েকটা সরু লম্বা জেলে নৌকা নিকারির টেকের দিকে যাচ্ছে। সারা রাত জেগে মইজাল, টানাজাল, জগৎবেড় জাল দিয়ে জেলেরা ধরেছে যে মাছ তা বিক্রি করবে দাদনদার মাছের ব্যবসায়ীদের কাছে।

    বাঁদিকে একটা সোতা জুড়ে ভ্যাশাল পেতেছে এক জেলে। বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার সাথে আড়াআড়ি লম্বালম্বি কোনাকুনি বাঁশ বেঁধে সাঁকোর মতো বানানো হয়েছে। এর সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে জাল। সাঁকোর সাথে ঠেকিয়ে ওটার এক কোণে শরীরের ভার চাপিয়ে পাড় দিলে পানি থেকে মাছ নিয়ে ওপরে উঠে যায় জাল। অদ্ভুত এক ফাঁদ। ফাঁদের মালিক ফাঁদ পেতে মাকড়শার মতো চুপচাপ বসে আছে সাঁকোর ওপর।

    বড় বড় নৌকা গুনের টানে উজিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম দিকে। কাঁধে বেরুয়া ঠেকিয়ে গুন টানছে মাল্লারা। বছরের এ সময়ে ওদিকে কোথায় যাচ্ছে নৌকাগুলো—জানে ফজল। এগুলো ফজলি আম কিনতে যাচ্ছে মালদহ জেলায়। হালমাচার ওপর দাঁড়িয়ে তোতাশলা আর মুইন্যাশলা ধরে মাঝি হালে গুঁড়ি দিচ্ছে কেডোৎ-কোড়োৎ।

    পশ্চিমদিক থেকেও আসছে বড় বড় নৌকা। প্রায় পানিতরাস পর্যন্ত বোঝাই করা হয়েছে নৌকাগুলো। এগুলোতে গুটি আম আসছে রাজশাহী ও মালদহ জেলা থেকে। যাবে বড় বড় বন্দরে। তাড়াতাড়ি বন্দরে পৌঁছতে না পারলে আম পচে যাওয়ার ভয় আছে। তাই অনুকূল স্রোত থাকা সত্ত্বেও মাল্লারা প্রাণপণ দাঁড় টেনে চলেছে।

    অনেকদিন পর ফজল ফিরে এসেছে পদ্মায়। পদ্মার পানি, পদ্মার তরঙ্গ তার অন্তরঙ্গ। পদ্মার পলিমাটি তার আশ্রয়। সে আঁজলা ভরে পানি খায়। বুকভরে টানে মুক্ত বাতাস।

    ফজল ডানদিকে তাকায়। দূরে পশ্চিম দিকে একটা বাড়ি। কলাগাছের ঘন ঝাড় আড়াল করে রেখেছে ঘরগুলো। এতদূর থেকে একটা শাড়ির আঁচলও দেখা যাচ্ছে না। রূপজান কি তার কথা ভাবছে এখন?

    ‘ফজল।’

    ‘জী।’

    ‘বাদলের কাছে শুনেছি, তোমাকে মিথ্যে ডাকাতি মামলায় জড়িয়েছে। ব্যাপারটা কি বলো তো?’

    ‘ফজলের মুখে সব ঘটনা শুনে শক্ত হয়ে ওঠে তার চোয়াল।’ সে রাগে ঠোঁট কামড়ায়।

    ‘ঐ যে দ্যাখেন মতিভাই, ডানদিকে দূরে ধু ধু দেখা যায় সেই খুনের চর।’

    মতি ডান দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ ঝাঁপসা দেখতে পাচ্ছি। ইংরেজদের চাই জমিদারগুলো হচ্ছে এই সব ঝগড়া-ফ্যাসাদের মূল। ওদের খতম করা দরকার সকলের আগে।’

    কিছুক্ষণ পর আবার সে বলে, ‘জানো ফজল, আগে এখানে নদী ছিল না। এখানে ছিল একটা খাল। লোকে বলতো ওটাকে রথখোলার খাল। চাঁদরায়-কেদার রায়দের রথটানা হতো ওখান দিয়ে। আগের দিনে পদ্মা ফরিদপুরের মাঝ দিয়ে বরিশালের কন্দর্পপুরের কাছে মেঘনায় মিশেছিল। এখন যেটা আড়িয়াল খাঁ সেটাই ছিল তখন আসল পদ্মা।

    ‘আইচ্ছা! আমরা তা হইলে চরুয়া ছিলাম না, আসুলি ছিলাম!’

    ‘হয়ত ছিলে। আগে বাঙলার মাটিতে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ছিল এক সাথে। ব্রহ্মপুত্র গতি বদলে পশ্চিম দিকে গিয়ে যমুনার সাথে মিশে। এই দুটি নদীর স্রোত গোয়ালন্দের কাছে পদ্মার সাথে মিলে যায়। তার পরেই রথখোলার খাল ভাঙতে ভাঙতে নদী হয়ে যায়। চাঁদ রায় কেদার রায়ের কীর্তি, রাজ রাজবল্লভের কীর্তি ধ্বংস করে। তাই পদ্মার আর এক নাম কীর্তিনাশা।’

    ‘ভাল একটা ইতিহাসের কথা শুনাইলেন মতিভাই। আমরা তো কিছুই জানি না। জানলে কি আর আসুলিরা আমাগো নিন্দা করতে পারে? কথায় কথায় চরুয়া ভূত কইয়া ঠেশ দিতে পারে?’

    ‘এই যে নদী, এই যে তোমাদের চর–এখানে বিক্রমপুরের অনেক গ্রাম ছিল। পদ্মা বিক্রমপুরকে দু’ভাগ করে গিয়েছে। আগে বিক্রমপুরের দক্ষিণ সীমা ছিল ফরিদপুর জেলার ইদিলপুর। নদীর ভাঙনের ফলে আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীদের কেউ উত্তরপাড় রয়ে গেছে। কেউ চলে গেছে দক্ষিণপাড়।’

    ‘আমরাও তা হইলে বিক্রমপুরের লোক। এইবার আসুলিরা কেউ টিটকারি দিলেই শুনাইয়া দিমু।’

    ‘তুমি চরের লোক বলে নিজেকে ছোট মনে করো নাকি ফজল?’

    ‘আসুলিরা যে তাই কয়।’

    ‘একদম বাজে কথা। দেশ, কুল, জাতি, ধর্ম দিয়ে কি ছোট-বড় বিচার হয়? মানুষের বিচার হয় তার কাজ দিয়ে–একথা মনে রেখো। তোমার বড় পরিচয় তুমি মানুষ–পৃথিবীর আর সবার মতো মানুষ। তোমার কাজে, কথায়, অবহেলায়, উদাসীনতায় কোনো লোকের সামান্য ক্ষতিও না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবে সব সময়। যারা মানুষকে ভালবাসে, মানুষের ভাল করে তারাই বড়, তারাই মহৎ। যারা মানুষকে ভালবাসে না, মানুষের ভাল চায় না। তারাই ছোট, তারাই অধার্মিক।’

    ফজল কথাগুলোর কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না। বলে, ‘আপনারাও তো মানুষরে ভালবাসেন না। শুনছি, আপনারা ডাকাতি করেন, মানুষ খুন করেন।’

    ‘হ্যাঁ, ডাকাতি করি, দরকার হলে খুনও করি। যারা অমানুষ, যারা দিনের পর দিন মানুষের রক্ত শোষণ করে, অত্যাচার করে, যারা বিদেশী শাসকদের সাথে হাত মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে, বার বার সতর্ক করার পরেও যারা পথে আসে না, তুমি কি মনে করো তাদের বাঁচবার অধিকার আছে? বেঁচে থাকার চেয়ে তারা পচে গলে দেশের মাটির উর্বরতা বাড়াক। এদের অন্যায়-অত্যাচার আর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিকার না করে উদাসীন হয়ে বসে থাকা অন্যায়। এদের ক্ষমা করা মহাপাপ।’

    ‘কিন্তু অন্যান্য-অত্যাচারের বিচারের জন্য তো আইন-আদালত আছে।’

    ‘আইন-আদলাত!’ মতির মুখে বিদ্রুপের হাসি। একটা কাটারি যেন চিকমিকিয়ে ওঠে তার ঠোঁটের ফাঁকে। ‘আইন-আদালত তো পয়সার গোলাম। পয়সাওলা শোষক গোষ্ঠীর কথায় ওঠে বসে।’

    ‘আইচ্ছা, এই যে গরিব মাঝির নৌকাটা চুরি করলাম। এইটা কি অন্যায় হয় নাই, আমাদের?’

    ‘নিশ্চয়ই অন্যায় হয়েছে। এর প্রতিকার অবিশ্যি করতে হবে।’

    ‘কিভাবে করবেন?’

    ‘সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো পালিয়ে বাঁচি। কতদূর এলে ফজল?’

    ‘উল্টা বাতাস। নাওটা জোরে চলতেছে না। যতদূর আসছি আরো দুই এতখানি গেলে পাড়ি শেষ হইব। আমি কিন্তু বাড়ি যাইতেছি না।’

    ‘কোথায় যাচ্ছ তাহলে?’

    ‘সোজা দক্ষিণ পাড়, আপনে যেইখানে যাইতে চান।’

    ‘না খেয়ে বৈঠা বাইতে পারবে তো?’

    ‘তা পারব। কিন্তু আপনার বোধ হয় খিদা লাগব।’

    ‘না, লাগবে না। তুমি বুঝেশুনে যাও। দেখো কেউ যেন চিনতে না পারে।’

    ‘না, দাড়ি-মোচে যা একখান চেহারা হইছে, সহজে কেউ চিনতে পারব না।’

    একটা ছেঁড়া গামছা পড়ে আছে পাটাতনের ওপর। বোধ হয় মাঝি ওটা পা মোছর জন্য রেখেছে। ফজল ওটাই মাথায় বেঁধে নেয়। এবার আর তাকে চেনার সাধ্যি নেই কারো।

    একটা ছোট লঞ্চ আসছে পুব দিক থেকে।

    ‘কিসের আওয়াজ?’ জিজ্ঞেস করে মতি। ‘লঞ্চ বোধ হয়?’

    ‘হ্যাঁ, ছোট্ট একটা লঞ্চ। কিন্তু চলতি বড় জবর।’

    কিছুদূর দিয়ে লঞ্চটা চলে যায়।

    ফজল বলে, ‘কয়েকটা ধলা সাহেব যাইতেছে।’

    ‘আচ্ছা! লঞ্চটার গায়ে কিছু লেখা আছে?’

    ‘হ্যাঁ, ইংরেজীতে লেখা আছে, আর্মি বোট নম্বর পি-২৬৮। একটা সাহেব চোখে দূরবিন লাগাইয়া দেখতে আছে।’

    ‘হুঁ, নদীতে টহল দিতে শুরু করেছে। আমাদের নৌকার নম্বর আছে তো?’

    মাথির একপাশে আলকাতরা দিয়ে লেখা নম্বর পড়ে ফজল বলে, ‘হ্যাঁ আছে, ১৭৩৫ নম্বর।’

    ‘নম্বর আছে বলেই বোধ হয় কিছু বলল না। নম্বর না থাকলে কি জানি হয় তো এখনই বিপদ ঘটত।’

    ভোর থেকেই আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছিল। বেলা এক প্রহরের কিছু পরেই সারা আকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘে। যেন ছানি পড়েছে পৃথিবীর চোখে। ফজল বলে, ‘দিনের অবস্থা বড় ভাল না। মেঘ করছে খুব।’

    ‘ঝড় উঠবে না তো?’

    ‘মনে হয় না। এখন তো জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ। ঝড়-তুফান না-ও আসতে পারে। উত্তরের আসমানে খাড়াঝিল্‌কি মারতে আছে খুব।’

    ‘বৈঠাটা আমার হাতে দাও। তুমি জিরিয়ে নাও কিছুক্ষণ।’

    আরো কয়েকবার বৈঠা চেয়েছিল মতি। কিন্তু ফজল দেয়নি। এবার আর সে মানা করে না। খিদেয় চেঁ-চোঁ করছে পেট। শ্রান্ত হাত দুটো বিদ্রোহ করতে চাইছে।

    মতির হাতে বৈঠা দিয়ে বলে ফজল, ‘ডাইন কোনাকুনি রাইখেন নৌকার মাথা। তা না হইলে কিন্তু ভাটির টানে জঙ্গুরুল্লার চরের দিগে লইয়া যাইব।’

    মতির হাতে বৈঠা দেয়ার আর এক উদ্দেশ্য ছিল ফজলের। সে মাঝির কাঁথার গাঁটরি তন্নতন্ন করে খোঁজে। চোঙা-চুঙি উপুড় করে ঢেলে দেখে, হাতিয়ে দেখে নৌকার উত্তরা। কিন্তু একটা আধলাও খুঁজে পায় না সে। তার আশা ছিল দু-চার আনার পয়সা পেলে চরের কোনো ছুটকো দোকান থেকে চিড়েমুড়ি কিনে নেবে। শান্ত করবে উদরের ভোক্ষসটাকে। ওটা বড় বেশি খাই-খাই শুরু করে দিয়েছে।

    ফজল আবার বৈঠা হাতে নেয়। একটা খাড়ি উজিয়ে দক্ষিণের প্রধান স্রোতে পৌঁছবার আগেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করে।

    ‘কি করি মতিভাই এখন? বিষ্টি তো শুরু হইল।’

    ‘কোনো চরের কিনারায় নিয়ে যাও।’

    ফজল একটা ঘোঁজার ভেতর চলে যায়। পুরো নৌকাটা ঢুকিয়ে দেয় কাশবনের ভেতর। দুটো লগি পুঁতে শক্ত করে বাঁধে দুই মাথি। তারপর সে ছই-এর ভেতর ঢুকে দু’দিকের ঝাঁপ নামিয়ে দেয়।

    বৃষ্টি পড়ছে ঝরঝর। ছই-এর ওপর যেন দাপাদাপি করছে দূরন্ত ছেলেরা। ঝড়ো বাতাসে নৌকাটা দুলছে এদিক-ওদিক। ঝাঁপের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির ঝাঁপটা আসছে।

    কাঁথার ওপর মতি শুয়ে পড়েছিল। মাঝির তেলচিটে বালিশটা তার মাথার নিচে খুঁজে দেয় ফজল।

    বালিশের অর্ধেকটা ছেড়ে দিয়ে মতিভাই বলে, ‘তুমিও শুয়ে পড় ফজল, জিরিয়ে নাও। বিষ্টি যেন কখন থামে ঠিক নেই।’

    মতিভাই মাথার পাশে মাথা রেখে ফজল বলে, ‘খিদা লাগছে না মতিভাই?’

    ‘খিদে তো লেগেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই তো আমি করিনি। কাজ না করে বসে বসে খাওয়ার কথা চিন্তা করাও অন্যায়। কাজ করেছ তুমি, খিদে পাওয়া উচিত তোমার।’

    ‘আমার তো দারুণ খিদা লাগছে।’

    ‘চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করো। যে পরিশ্রম করেছ—’

    দু’জনেই চোখ বুজে পড়ে থাকে।

    খাবার সময় পেরিয়ে খিদে যখন ধীরে ধীরে মরে যায় তখন ক্লান্ত অবসন্ন শরীর ঘুমে ঢলে পড়ে।

    তারা কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, কিছু খেয়াল নেই তাদের। ঝম্‌ঝম্ বৃষ্টি পড়ছে এখনো। এখনো ঢাকা পৃথিবীর চোখ। তাই সময়ের আন্দাজ করতে পারে না তারা। তবে পেটের ভোক্ষসটা নাড়ি-ভুঁড়িগুলোকে যে রকম খুবলাতে শুরু করেছে তাতে সহজেই বোঝা যায়– খাবার সময় হয়েছে আবার। বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়েছে।

    বৃষ্টির পানিতে প্রায় টুবুটুবু হয়েছে নৌকার ডওরা। ফজল তাড়াতাড়ি কয়েকটা পাটাতন সরায়, সেঁউতি বের করে পানি সেচে।

    গলুইয়ের ঝাঁপ ফাঁক করে আকাশের দিকে তাকায় ফজল। বলে, ‘বিষ্টি ছেক দেয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, মতিভাই।’

    ‘কিন্তু সন্ধ্যার আগে বিষ্টি না থামলে সারা রাত এখানেই পড়ে থাকতে হবে।’

    ‘কেন? রাত্রেই পাড়ি দিয়া ওপার যাইতে পারব।’

    ‘কিন্তু রাতের বেলা ওপার গিয়ে কোনো লাভ নেই। পথ চিনে যেতে পারব না।’

    ‘ওপারে কোনে গ্রামে যাইবেন? কার বাড়ি?’

    ‘নয়নপুরে–আমার বোনের বাড়ি।’

    ‘নয়নপুর আবার কোনখানে?’

    ‘পণ্ডিতসার যেতে পথে পড়ে। বছর দশেক আগে এসেছিলাম একবার। বোমার মামলায় পড়ে লুকিয়ে ছিলাম অনেক দিন। এত বছর পরে পথ চিনে যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।’

    ‘কোনো চিন্তা কইরেন না মতিভাই। মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতে করতে বিলাত যাওয়া যায়।’

    ‘আজ যদি যেতে পারতাম, গিয়েই বোনকে বলতাম—শিগগির খিচুড়ি রান্না কর, ডিম ভেজে দে। আর যদি ইলিশ মাছ ভাজা থাকে তো কথাই নেই।’

    ‘আর কইয়েন না মতিভাই। জিহ্বায় পানি আইসা গেল। এই ঘন ডাওরে গরম গরম খিঁচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা আর নয়তো আণ্ডা বিরান–ওরে মাবুদের পেটের মধ্যে খাম খাম শুরু হইয়া গেছে।’

    ফজল ঢোক গিলে। তার চোখের সামনেই যেন সে দেখতে পায় গামলা ভরা খিচুড়ি। গরম গরম খিচুড়ি থেকে ধোঁয়া উঠছে। ভাজা ইলিশ মাছের খিদে-চেতানো গন্ধ এসে লাগছে নাকে।

    নাহ, আজ খিচুড়ি না পেলে পেটের ভোক্ষসটা কিছুতেই শান্ত হবে না।–ভাবে ফজল। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? কার বাড়ি গেলে এখন খিচুড়ি খাওয়া যায়? নিজেদের বাড়ি সে বহুদুর পেছনে ফেলে এসেছে। সেখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার ভাইয়ের দোস্ত রফি শিকদারের বাড়ি ধুলচর। পশ্চিম দিকে মাইল খানেক উজান ঠেলে যাওয়া যায় সেখানে। কিন্তু বৃষ্টি মাথায় করে অতটা পানি ভাঙবার শক্তি নেই শরীরে। আর এ অবস্থায় সেখানে গিয়ে বেশরমের মতো খিচুড়ির ফরমাশইবা দেবে সে কেমন করে? এ খাড়িটা ধরে বেশ কিছুদূর পিছিয়ে গেলে তাদের কোলশরিক কেরামতের বাড়ি। সেখানে গিয়েও খিচুড়ির ফরমাশ দেয়া যাবে না। আর কোথায় যাওয়া যায়?

    হ্যাঁ, অল্প কিছুদূরেই আর একটা বাড়ি আছে। বাড়িটার কথা মনে পড়তেই কেমন একটা আনন্দ তার বিধ্বস্ত মনের ধ্বংস স্থূপ সরিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু এ যেন ঠিক আনন্দ নয়, আনন্দের কালো বিষণ্ণ ছায়া।

    জরিনা তার কেউ নয়। কোনো সম্পর্ক নেই আর তার সাথে। কোনো দাবি নেই তার ওপর।

    রূপজানও আর কেউ নয় তার।

    জীবনের ভিত ধসে গেছে। ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে সব। ভগ্নস্তূপের নিচে মৃতপ্রায় মনটা তার কিছু একটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়াতে চায়।

    অধিকার ও অনধিকারের সীমান্তে এসে দাঁড়ায় ফজলের অভিলাষ। মমতা মাখানো এক পলক চাহনি, সমবেদনার দুটি কথা, স্নেহের একটুখানি পরশের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে তার বিপর্যস্ত মন। মনের এই আকুতিই তাকে তার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করতে প্ররোচিত করে। এ মুহূর্তে পেটের খিদেকে ছাপিয়ে উঠেছে মনের পিপাসা।

    বৃষ্টির তোড় আর নেই। শুধু টিপটিপানি আছে এখন। তাড়াতাড়ি নৌকার বাঁধন খুলে লগি দুটো তুলে ফেলে ফজল। তারপর কাশবন থেকে বের করে নৌকাটাকে সে স্রোতে ভাসিয়ে দেয়। বৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য সে ছই-এর ভেতর গিয়ে বসে।

    ‘কি করছ ফজল? নৌকা ছেড়ে দিলে কেন?’

    ‘কাছেই একটা বাড়ি আছে জানা শোনা।’

    ‘আচ্ছা, তবে এতক্ষণ যাওনি কেন?’

    ‘মনে ছিল না।’

    হালবিহীন নৌকা ভাটির টানে ভেসে যায় ঘুরপাক খেয়ে। কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকাটাকে ফজল আর একটা খাড়ির ভেতর বেয়ে নিয়ে যায়। কিনারায় ভিড়িয়ে বাঁধে লগি পুঁতে।

    সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখনো বৃষ্টি পড়ছে টিপিরটিপির।

    ফজল নেমে যায় নৌকা থেকে।

    মতিভাই বলে, ‘বেশি করে খাবার নিয়ে এসো। দেরি কোরো না কিন্তু।’

    ফজল কোনো জবাব না দিয়ে এগিয়ে যায়। কাশ আর লটাবনের ভেতর দিয়ে পথ। অন্ধকারে পথ চলতে চলতে সে ভাবে–জরিনার বুড়ি শাশুড়ি আছে বাড়িতে। তার চোখ এড়িয়ে কেমন করে দেখা করবে সে জরিনার সাথে? ধারে কাছে আর কোনো বাড়ি নেই–এই যা রক্ষে।

    এ তল্লাটে কোথাও চুরি হলেই হেকমতকে ধরার জন্য পুলিস আসে। জ্ঞাতিদের ঘরেও খানাতল্লাশি হয়। এজন্য বিরক্ত হয়ে তার জ্ঞাতিরা তাকে তাদের পাড়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তারাই তার ঘরদোর তুলে এনে চরের এক কোণে আলাদা বাড়ি করে দিয়েছে।

    ফজল ডাক দিয়ে উঠে, টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট্‌। না, হট্টিটির ডাক এখানো ভোলেনি সে। কিন্তু এত বছর পরে জরিনা যদি বুঝতে না পারে এ সঙ্কেত? হেকমত আজ বাড়ি আছে কি না, তাই-বা কে জানে?

    ফজল নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। পা টিপে টিপে গিয়ে দাঁড়ায় ঘরের পেছনে।

    ঘরে কুপি জ্বলছে তরজার বেড়ার ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পায়, জরিনা ছেঁড়া কাপড় সেলাই করছে, তার শাশুড়ি শুয়ে আছে মেঝের একপাশে হোগলার বিছানায়।

    ফজল সরে যায় কিছুদূরে কাশবনের কাছে। ডেকে ওঠে, টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট্‌।

    জরিনা কান খাড়া করে। বড় মধুর হট্টিটির ডাক। তার দুআঙুলে ধরা সুইটি পড়ে যায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সুইটাকে কুড়িয়ে নিয়ে আবার ফেঁড় তোলে সে।

    টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হটু…

    আবার সেই ডাক। কিছুক্ষণ পরে আবার, তারপর আরো কয়েক বার।

    জরিনা দাঁড়ায়। দরজার কাছ থেকে বদনা নিয়ে সে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

    টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট…

    ডাকটা আসছে কাশবনের দিক থেকে। জরিনা বদনাটা উঠানে রেখে সেদিকে এগিয়ে যায়। ওদিক থেকে ফজলও এগিয়ে আসে। কিন্তু অন্ধকারে একটা মানুষের মূর্তি ছাড়া আর কিছুই ঠাওর করতে পারে না জরিনা। মূর্তিটার মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই সে নিঃশঙ্ক বিশ্বাসে মাথা নোয়ায় কদমবুসি করার জন্য।

    ফজল তার দুই বাহু ধরে টেনে তোলে। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘না না জরু, আমার পায়ে হাত দিও না। আমি–আমি পাপী, আমি ডাকাইত।’ তার কণ্ঠে কান্নার রেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে।

    ‘না–না, মিছা কথা–মিছা কথা।’

    জরিনা তার হাত ধরে কাশবনের দিকে যেতে যেতে বলে, ‘আমার হাউড়ি আছে ঘরে। টের পাইয়া যাইব।’

    ‘জরু, তুমি তো কইলা মিছা কথা। কিন্তু মাইনষে কয় আমারে ডাকাইত। রূপজান– সেও কয় আমারে ডাকাইত।’ ফজলের কথায় কান্না ঝরে পড়ে।

    জরিনার চোখে পানি আসে। ধরা গরায় সে বলে, ‘আমি বেবাক হুনছি। আরশেদ মোল্লা যোগ দিছে জঙ্গু শয়তানডার লগে। ওরাই তোমারে ধরাইয়া দিছে।’

    ‘হ, এর শোধ না নিয়া ছাইড়া দিমু। শোধ নেওনের লেইগ্যাই পলাইয়া আইছি জেলেরতন।’

    ‘জেলেরতন! কবে পলাইছ?’

    ‘কাইল রাইতে। পলাইয়া যাইতে আছিলাম দক্ষিণপাড়। বিষ্টির লেইগ্যা পাড়ি দিতে পারি নাই।’

    ‘বাড়ি গেছিলা?’

    ‘না।’

    ‘খাইছ কনুখানে?’

    ‘খাই নাই। কোথায় খাইমু? সাথে একটা পয়সাও নাই।’

    ‘এতক্ষণ কও নাই ক্যান্। জলদি বাড়িত্ লও।’

    ‘তুমি কি ভাত রাইন্দা থুইছ নি?’

    ‘না, দুইডা চাউল ফুডাইতে বেশি দেরি লাগব না। কিন্তু খাইবা কি দিয়া? মাছ-তরকারি কিছু নাই।’

    ‘ডাইল আছে?’

    ‘আছে।’

    ‘তবে খিচুড়ি পাকাইতে পারবা?’

    ‘তা পারমু।’

    ‘বেশি কইর‍্যা খিচুড়ি পাকাও। সাথে নৌকায় মানুষ আছে আর একজন। আর আণ্ডা থাকলে ভাইজ্যা দিও।’

    ‘কে আছে নায়?’

    ‘তুমি চিনবা না তারে। মস্ত বড় একজন বিদ্বান মানুষ।’

    ফজলের হাত ধরে বাড়ি নিয়ে যায় জরিনা। তাকে রান্নাঘরে বসিয়ে সে ঘরে যায়। মাটির ঘড়া থেকে চলে বের করে, শিকেয় তোলা ডিবা থেকে বের করে ডাল।

    ‘কি ঘুডুঘুডু করতে আছস বউ?’ পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করে শাশুড়ি।

    ‘এই ডাওরের মইদ্যে খিচুড়ি খাইতে মন চাইতে আছে। অল্প দুগা ভাত আছে। পানি দিয়া থুই। পান্তা খাইমু।’

    শাশুড়ি বলে, ‘হ, বিষ্টি-বাদলের দিনে গরম গরম খিচুড়ি ভালই লাগে। আমি উঠমু?’

    ‘না, আপনি আন্ধারে হুইয়া থাকেন। রাইন্দা বাইড়া আপনেরে ডাক দিমু।’

    জরিনা এক হাতে কুপি অন্য হাতে হাঁড়ি নিয়ে রান্নাঘরে যায়।

    কুপির মৃদু আলোয় এতক্ষণ পরে সে প্রথম দেখতে পায় ফজলের মুখ। দাড়ি-গোঁফে বদলে গেছে চেহারা। খিদেয় শুকিয়ে গেছে মুখ। চোখ বসে গেছে। গায়ের উজ্জ্বল রঙ গেছে ফ্যাকাশে হয়ে। মাথায় এলোথেলো চুল। বহুদিন তেল-পানি না পড়ায় জট পাকিয়ে গেছে।

    জরিনা নির্বাক চেয়ে থাকে ফজলের মুখের দিকে। পলকহীন দৃষ্টি মেলে ফজলও তাকায়। গোধূলির বিষণ্ণ ছায়া জরিনার মুখে। মমতা-মাখা দুটি চোখের কোণে চিকচিক করে পানি।

    জরিনা চোখ নামায়। চাল-ডাল ধুয়ে বাটনা বেটে সে তাড়াতাড়ি রান্না চড়িয়ে দেয়।

    জরিনা চুলোর মুখে লাকড়ি গোঁজে। তার পাশে পিড়েতে বসে চাল চিবোয় ফজল।

    অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাঙে জরিনা। সে নিচু গলায় বলে, ‘মিয়াজির মরণের পর গেছিলাম তোমাগ বাড়ি। আম্মার কান্দন দেইখ্যা কইলজা ফাইট্যা যায়। মরণের দিন মিয়াজি তোমারে দ্যাখতে চাইছিল। মরার আগক্ষণে দুই-তিন বার তোমার নাম ধইর‍্যা বোলাইছিল।’

    ফজল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

    জরিনা এক সময়ে ঘরে গিয়ে নারকেল তেল আর চিরুনি নিয়ে আসে। চিরুনি চালিয়ে সে ফজলের চুলের জট ছাড়ায়, তারপর তেল মাখিয়ে আঁচড়ে দেয়, সিঁথি কেটে দেয় পরিপাটি করে।

    ‘হেকমত কই?’ জিজ্ঞেস করে ফজল।

    ‘কোনো খবর নাই। মাসখানেক আগে আইছিল একদিন রাইতে। আবার রাইতের আন্ধারেই চইল্যা গেছে।’

    ‘মোল্লাবাড়ি গেছিলা?’

    ‘গেছিলাম একদিন। তোমারে যেদিন ধরাইয়া দেয় তার কয়েকদিন আগে।’

    ‘কাইল-পরশু একবার যাইতে পারবা?’

    ‘উঁহু।’

    ‘ক্যান?’

    জরিনা কোনো উত্তর দেয় না।

    আগে রূপজান তাকে বড় গলায় বু’জান বলে ডাকত, হাসি-মশকরা করত কথায় কথায়। সে তার চুল আঁচড়ে খোঁপা বেঁধে দিত। রূপজানকে সুন্দর করে কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরতে শিখিয়েছিল সে-ই। রূপজানের বিয়ের পর জরিনা ধান ভানতে গিয়েছিল মোল্লাবাড়ি। রূপজান তার কানে কানে বলেছিল, ‘বু’জান লো, তোমার ছোডকালের পুরুষটা জ্বালাইয়া মারে আমারে। রাইতে এট্টুও ঘুমাইতে দেয় না।’ সেই রূপজান বদলে গেছে এখন। সেদিন কাজের খোঁজে গিয়ে কাজ তো জোটেইনি, ভাল ব্যবহারও পায়নি সে। রূপজান তাকে সোজা বলে দিয়েছে, ‘আমাগ ধান ভান লাগব না। আর কোনোদিন আইও না আমাগ বাড়ি।’ তারপর জরিনা আর যায়নি সে বাড়ি, আর যেতেও চায় না। তার বিশ্বাস, রূপজান কিছু টের পেয়েছিল।

    ‘কইলা না, ক্যান যাইতে পারবা না?’ ফজল আবার জিজ্ঞেস করে।

    ‘কি করতে যাইমু?’

    ‘গিয়া রূপজানরে খালি জিগাইবা—সে ডাকাইতের ঘর করব না–এমুন কথা ক্যান্ কইল? সত্য সত্যই কি সে বিশ্বাস করে আমি ডাকাইত?’

    ‘এহন আর এই কথা জিগাইয়া লাভ কি?’

    ‘লাভ নাই। খালি মনরে বুঝ দিতে চাই। রূপজান আমারে ডাকাইত মনে করে, ঘিন্না করে–এই কথা ভাবলেই মনে অয় কে যেন অন্তরডারে ট্যাঁটা দিয়া খোঁচায়।’

    ‘আইচ্ছা যাইমু একদিন।’ উড়কি দিয়ে খিচুড়ি নাড়তে নাড়তে বলে জরিনা।

    কিছুক্ষণ পরে খিচুড়ি নামিয়ে সে ডিম ভাজে। খাবার পরিবেশন করার আয়োজন দেখে ফজল বলে, ‘নায়ের মইদ্যে আমার মতো ভুখা আছে আর একজন। তারে থুইয়া খাইতে একটুও মজা লাগব না।’

    ‘তোমার কাছে বইয়া তোমারে কোনো দিন খাওয়াইতে পারি নাই। আশা করছিলাম–’

    জরিনার কথা শেষ না হতেই মুচকি হেসে ফজল বলে, ‘হ, শেষে কইতে পারবা, আর এক বাড়ির ছ্যামড়াডা বেশি বেশি খাইয়া ফালাইল।’

    হাসি ফোটে জরিনার মেঘাচ্ছন্ন মুখে। ফজল বলে, ‘সামনে বহুত দিন পইড়া রইছে। খাওয়ানের অনেক সুযোগ পাইবা।’

    ‘সত্য কও তো? আইবা তো আবার?’

    ‘হ, আইমু।’

    ‘কবে আইবা?’

    ‘আইমু একদিন।’

    ‘না, কইয়া যাইতে অইব।’

    ‘তিন-চার দিন পর।’

    ‘আমার মাথা ছুঁইয়া কও।’

    মাথা ছুঁয়ে ফজল বলে, ‘এই কইলাম। এইবার বিদায় দ্যাও। মতিভাই খিদায় মরতে আছে।’

    জরিনা কিছুটা খিচুড়ি রেখে বাকিটা হাঁড়িশুদ্ধ তুলে দেয় ফজলের হাতে। ডিম ভাজা রাখে শরার ওপর। তারপর বলে, ‘পাতিলডা গাঙের পাড়ে কাশঝোঁপের মইদ্যে থুইয়া যাইও। কাইল বিচরাইয়া লইয়া আইমু।’

    ফজল রওনা হয়। জরিনা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, হাত রাখে তার পায়ে। ফজল তার মাথায় হাত বুলায়।

    রাত্রে জোর বৃষ্টি হয়েছিল আর এক ঢলক। ভোররাত্রে নৌকার পানি সেচে পাড়ি দেয় ফজল। ভোর হওয়ার আগেই তারা দক্ষিণপাড় পৌঁছে যায়। ফজল তীরে নামে। তার হাত ধরে নামে মতি।

    ‘নৌকাটা বাঁধবার দরকার নেই।’ মতি বলে।

    ‘ভাসাইয়া লইয়া যাইব তো!’

    ‘যাকগে। নৌকার দামটা দূরের কোনো পোস্টাপিস থেকে বেনামিতে মানি অর্ডার করে দিলেই হবে।’

    ‘কার নামে মানি অর্ডার করবেন? মাঝির নামতো জানি না?’

    ‘থানার দারোগার কাছে পাঠালেই মাঝি পেয়ে যাবে টাকাটা। নৌকার নম্বরটা লিখে দেব। নৌকা চুরির পর মাঝি নিশ্চয়ই থানায় গিয়ে এজাহার দিয়েছে।’

    ‘আইচ্ছা! এখন কোন দিগে যাইবেন?’

    ‘গাঁয়ের পথ ধরে সোজা দক্ষিণ দিকে চলতে থাকো। কিছুদূর গেলেই একটা চক পড়বে।’

    মতির হাত ধরে এগিয়ে যায় ফজল। চকে পৌঁছতে পৌঁছতে ফরসা হয়ে যায়।

    চকের জায়গায় জায়গায় জমে আছে বৃষ্টির পানি। তারা ধান আর পাটখেতের আল ধরে পা চালায়। ধান আর পাট গাছের ঝরা পানিতে ভিজে যায় তাদের জামা-কাপড়।

    ছড়ছড় আওয়াজ শুনে পাশের দিকে তাকায় ফজল।

    ‘আরে কই মাছ! বিষ্টিতে কই মাছ উজাইছে মতিভাই!’

    ‘ধরো।’

    ফজল তিনটে কইমাছ পায় ধানখেতের মাঝে। মাছের কানকোর ভেতর পাটের কোষ্টা ঢুকিয়ে সে ঝুলিয়ে নেয় হাতে। চকের শেষ মাথায় পৌঁছতে পৌঁছতে গোটা পনেরো কইমাছ কুড়িয়ে পাওয়া যায়। এক হালটের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে পাওয়া যায় আরো সাতটা। সবগুলোকে সে কোষ্টায় গেঁথে নেয় মালার মতো করে।

    মতি বলে, ‘আজ খাওয়াটা খুব জমবেরে ফজল।’

    ‘হ, আল্লা খুব মেহেরবান।’

    ‘হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। মতি হাসে। কিন্তু এই মেহেরবানিটা গতকাল জাহির করলেই ভাল করত আল্লা। কাল খিদের জ্বালায় যখন কষ্ট পাচ্ছিলাম তখন অত বিষ্টি না ছিটিয়ে আমাদের নৌকায় কিছু চিড়ে-মুড়ি ছিটিয়ে দিলে বুঝতাম আল্লা খুব মেহেরবান। তাহলে কি আর খিচুড়ি মেগে খেতে হতো কাল?’

    পথের লোকের কাছে জিজ্ঞেস করতে করতে আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা গন্তব্যস্থানে গিয়ে পৌঁছে।

    বহু বছর পরে ভাইকে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলে বোন।

  • আঠার

    আঠার

    মতির বোনের বাড়ির তিনদিন ছিল ফজল। এমন একটি স্নেহের আশ্রয় ছেড়ে আসবার সময় চোখ তার ছলছল করে উঠেছিল। তার নিজের বড় বোন নেই। সে অভাব পূরণের জন্যই বোধ হয় মতিভাইয়ের সাথে এমন করে দেখা হয়েছিল তার।

    চণ্ডীপুর থেকে নৌকা কেরায়া করে সে বাড়ি রওনা হয়। বাড়ির ঘাটে পৌঁছতে রাত হয়ে যায় বেশ। জেল থেকে পালাবার পর রাতের অন্ধকারে চলাফেরা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে।

    ফজল ছই-এর ভেতর থেকে বেরোয়।

    বাড়িটা অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু অন্ধকারটা যেন বড় বেশি মনে হয় তার কাছে। বাড়ির সূর্য ডুবে গেছে, তাই বুঝি এত অন্ধকার।

    ফজলের দুচোখ অশ্রুতে ভরে যায়। সে নৌকার ভাড়া মিটিয়ে ঘাটে নামে। দুঃসহ বেদনায় ভরাক্রান্ত দেহটা বয়ে নিয়ে চলে পা দুটো। কিন্তু পায়ের নিচের মাটিতে যে আশ্বাস নেই, ভরসা নেই।

    চলতে চলতে তার মনে আবার সেই ভয় জাগে; তাকে দেখেই বাড়ির সবাই কান্না জুড়ে দেবে। ইনিয়ে-বিনিয়ে বিলাপ করতে শুরু করবে। তা শুনে তার বাড়ি আসার কথা জেনে ফেলবে আশপাশের লোকজন। জেনে ফেলবে জঙ্গুরুল্লা আর আইনের মানুষ চৌকিদার আর দফাদারও।

    ফজল দাঁড়ায়। ম্যাচবাতি জ্বালিয়ে সে ডানে বায়ে দৃষ্টি ফেলে। কিছু দূরেই দেখতে পায় তার পিতার কবর।

    সে হাঁটু গেড়ে বসে কবরের পাশে। তার বুকের কান্না রুদ্ধ কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। বেরিয়েও যায় দু-একবার। কান্নার বেগ রোধ করা যখন কঠিন হয়ে পড়ে তখন সে মুখটাকে শক্তহাতে চেপে ধরে নদীর কিনারায় ফিরে আসে। সেখানে বসে নীরবে চোখের পানি ফেলে অনেকক্ষণ। কিছুটা শান্ত হলে চরের কিনারা ধরে সে এগিয়ে যায় পশ্চিম দিকে মেহের মুনশির বাড়ি।

    দু-তিনবার দরজায় খটখট দেয়ার পর মেহের মুনশির ঘুম ভাঙে। আচমকা ঘুম ভেঙে সে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কে? কেডা ও?’

    ‘আমি। আমি ফজল।’

    ‘ফজল, আহারে ভাই, আইছ তুমি!’ কান্নাঝরা কণ্ঠে বলে মেহের মুনশি। থিতিয়ে আসা শোক আলোড়ন তোলে তার বুকের ভেতর। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কুপি জ্বালায়। ঘর থেকে বেরিয়ে ফজলকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, ‘তোমার লেইগ্যা চিন্তায় জারাজারা অইয়া গেছি আমরা। চাচিজি কাইন্দা চউখ অন্ধ কইর‍্যা ফালাইছে।’

    উদ্গত শোকাবেগ অনেক কষ্টে সংবরণ করে ফজল বলে, ‘মা-র কান্দাকাডির ডরে বাড়িতে যাই নাই। কান্দাকাডি শুনলে সব মানুষ টের পাইয়া যাইব।’

    মেহের মুনশি তার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে যায়। চৌকির ওপর বসিয়ে বলে, ‘বাড়িত না গিয়া ভালই করছ। গেল রাইতের আগের রাইতে পুলিস ঘেরাও করছিল তোমায় বাড়ি। কিন্তুক আমি জিগাই, তোমারে এই অলক্ষ্মীতে পাইল ক্যান? জেলেরতন ক্যান্ পলাইয়া আইছ?’

    ‘পলাইয়া আইছি শোধ নিতে। জঙ্গুরুল্লার লগে দোস্তালি পাতাইছে আরশেদ মোল্লা।’

    ‘হ, পা-না-ধোয়ার পাও ধইর‍্যা আরশেদ মোল্লা বিশ নল জমি পাইছে খুনের চরে।’

    ‘জমিডা ভাল কইর‍্যা খাওয়াইয়া দিমু। সবুর করেন মিয়াভাই। এই দুইডারে জবাই করতে না পারলে আমার রক্ত ঠাণ্ডা অইব না।’

    ‘কিন্তুক খুনাখুনি কইর‍্যা কি ফয়দা অইব?’

    ‘এই দুই জানোয়ারের লাশ পচাইয়া সার বানাইমু চরের মাডির। ওগ হারামিহয়রানির লেইগ্যাই বা’জান মারা গেছে, না অইলে বা’জান এত তাড়াতাড়ি মরত না।’

    ‘হ ঠিক কথাই কইছ। কিন্তুক–’

    ‘আপনে আর ‘কিন্তুক কিন্তুক’ কইরেন না তো মিয়াভাই। আপনে বুড়া অইয়া গেছেন। আপনের রক্তে তেজ নাই। আমার রক্ত যে টগবগ করতে আছে রাইতদিন।’

    ‘আমার কথা হোন ফজল। খুন-জখমি কইর‍্যা আরো বিপদ অইব। মামলামকদ্দমা। জেল-ফাঁসি—’

    ‘জেল-ফাঁসিরে আর ডরাই না, মিয়াভাই। জাহান্নামি দুইডারে খুন না করতে পারলে আমার পরান ঠাণ্ডা অইব না। ওরা জাহান্নামি। ওগ মাপ করলে জাহান্নামে যাইতে অইব।’

    ‘চর দখলের কি করবা?’

    ‘চর দখল করতে অইব। আপনেরা একজন মাতবর ঠিক করেন। তারপর—’

    ‘মাতবর ত তুমি।’

    ‘আপনে একলা কইলে তো অইব না। সব্বাই যদি না মানে তবে আর কিসের মাতবর।’

    ‘মানব না ক্যান। বেবাকে মানব।’

    ‘কিন্তু আমি তো এখন ফেরার। ডুব দিয়া রইছি। যদি কোনোদিন ভাসতে পারি তখন না হয় আমারে মাতবর বানাইবেন। এখন কারোরে মাতবর ঠিক করেন। পলাইয়া পলাইয়া যতখানি পারি ততখানি সাহায্য আমি করমু। কিন্তু আমি চরে আইছি এই খবর যেন কেও না জানে।’

    ‘না, একটা কাউয়ার কানেও যাইব না এই কথা। কিন্তু একবার চাচির লগে দেহা করণ তোমার দরকার।’

    ‘মা যেই রহম কান্দাকাডি করে। বেবাক মানুষ টের পাইয়া যাইব। চৌকিদার-দফাদার টের পাইয়া খবর দিব পুলিসের কাছে।’

    ‘হোন, আমি ভোরে গিয়া চাচিজিরে বুঝাইমু। কান্দাকাডি করতে মানা করমু। আর যদি কান্দতে চায় তয় যে কাইল দিনের বেলায়ই কাইন্দা লয় কতক্ষণ। তারপর রাইতের বেলা তোমারে লইয়া যাইমু।’

    ‘হ তাই করেন।’

    ‘আরে খালি কথা আর কথাই কইতাছি। তোমার খাওনের কথা জিগাইতে মনে নাই।’

    ‘উঁহু, আমার খাওয়া লাগব না। নতুন বইন পাইছি একজন। পথে খাওনের লেইগ্যা মুড়ি, নারকেলের লাড়ু আর ফজলি আম দিছিল।’

    ‘কে এমুন বইনডা।’

    ‘আপনে চিনবেন না। মায়ের পেডের বইনের মতন।’

    ‘আইচ্ছা, আমি বিছান কইর‍্যা দিতাছি। ঘুমাইয়া পড় জলদি। রাইত দুফর কাবার অইয়া গেছে।’

    মেহের মুনশির ঢেঁকিঘরের এক পাশে শুকনো লটাঘাসের স্তূপ। বর্ষার সময় এগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্তূপের আড়ালে হোগলার বিছানায় একটা পুরো দিন শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয় ফজল। তার মনের ভেতর পদ্মার স্রোতের মতো আঁকা-বাঁকা চিন্তা বয়ে চলে। বাবা, মা, আমিনা, নূরু, স্বার্থপর রূপজান, দুঃখিনী জরিনা সবাই এসে বারবার নোঙর ফেলে সেই স্রোতে। কখনো সে স্রোত ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি করে। তার মাঝে ঘুরপাক খায়। আরশেদ মোল্লা আর জঙ্গুরুল্লা। ফজলের মনের বিক্ষুব্ধ ঢেউ আছড়ে পড়ে তাদের ওপর।

    সন্ধ্যার অনেক পরে মেহের মুনশির সাথে সে বেরোয়। বাড়ির উঠানে পৌঁছতেই নূরু ছুটে এসে তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। বরুবিবি শব্দ পেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। মেহের মুনশি ধমক দিয়ে তাকে বিপদের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে থামে। ফজলও অনেক কষ্টে সংবরণ করে নিজেকে।

    সে মায়ের কাছে গিয়ে বসে। তাদের রুদ্ধ কান্না বুক ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। কখনো সে কান্না ফুঁপিয়ে বেরোয়। তাদের গাল বেয়ে নামে অশ্রুর প্রপাত।

    বরুবিবি ফজলের মুখে মাথায় হাত বুলায়। মা ও ছেলে দুজনেই বড় বেশি অভিভূত হয়ে পড়েছে। কারো মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোয় না।

    মেহের মুনশির তাড়া দেয়, ‘ও চাচি, বেশি দেরি করণ যাইব না। কিছু খাওয়াইতে মন চাইলে জলদি কইর‍্যা খাওয়াইয়া দ্যাও।’

    ফজল বাড়ি আসবে খবর পেয়ে অনেক পদ রান্না করেছিল বরু বিবি। আমিনা খাবার পরিবেশন করে। কিন্তু ফজলের গলা দিয়ে খাবার নামতে চায় না। সে শুধু চিবোয়। কয়েক গ্রাস মুখে তুলে এক গ্লাস পানি খেয়ে সে উঠে পড়ে।

    বরুবিবি ঝাঁপসা চোখ মেলে চেয়ে থাকে ছেলের দিকে, ধরা গলায় বলে, ‘কিছুই তো খাইলি না বা’জান?’

    ‘না মা, খিদা নাই একদম! এইখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক না। আমি যাই।’

    বরুবিবি আবার ফোঁপাতে শুরু করে।

    ‘তুমি কাইন্দ না মা। আমি ধারে কাছেই কোনো জায়গায় থাকমু। কারো কাছে কইওনা কিন্তুক। ও আমিনা, ও নূরু খবরদার!’

    আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে মেহের মুনশির সাথে বেরিয়ে পড়ে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে।

    জরিনাকে যখন কথা দিয়ে গেছে ফজল, তখন নিশ্চয়ই সে আসবে। সে জেল থেকে পালিয়েছে। তার এখন আশ্রয়ের প্রয়োজন। কিন্তু ঘরে রয়েছে শাশুড়ি। তাকে দূরে কোথাও পাঠাতে না পারলে কেমন করে তার ঘরে ফজলকে সে জায়গা দেবে? তাই সে একদিন একটা বাহানা তৈরি করে, ‘আম্মা আপনের শরীলডা খুব কাবু অইয়া গেছে।’

    ‘বুড়া মানুষ। কাবু অইলে আর কি করমু।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নাজুবিবি।

    ‘আমিতো আপনেরে প্যাড ভইরা দুইডা খাইতেও দিতে পারি না। আর যেই দিনকাল পড়ছে। ধান ভানতে বড় বেশি ডাক দেয় না কেও। চাউলের কল অওনে এই দশা। ঘর লেপন আর চিড়া কোডনের কামে আয় নাই।’

    ‘হগো মা। দিন-কাল বড় খারাপ পড়ছে। তুই আমার প্যাডের মাইয়ার তনও বেশি। যারে পেডে রাখছিলাম, হেই লক্ষ্মীছাড়াডা একটা পয়সাও দেয় না। তুই না থাকলে এতদিনে মইর‍্যা যাইতাম।’

    ‘আম্মাগো, এহন বুঝি না খাইয়া মরতেই অইব। আপনে এক কাম করেন–আপনের বইনের বাড়ি বেড়াইতে যান কয়ডা দিনের লেইগ্যা। ভাল্-ভালাই খাইয়া আহেন। আপনের শরীলডাও ভাল অইব আর এদিগে ঘরে কিছু চাউল-ডাইলও জমা অইব।’

    বেড়াতে যাওয়ার নামে নাজুবিবির ঠ্যাঙ দুটো ডিলিক দিয়ে ওঠে সব সময়। বউ একা ঘরে থাকবে বলে বেড়াবার শখ চেপে রাখতে হয় তাকে। এখন বউয়ের কাছ থেকেই যখন প্রস্তাব এসেছে বেড়াতে যাওয়ার তখন সে মনে মনে খুশি হয়। মুখে বলে, ‘কিন্তু আমি গেলে তুই ঘরে একলা থাকবি ক্যামনে?’

    ‘আমার লেইগ্যা চিন্তা কইরেন না। যেই বাড়ি কাম করতে যাইমু, হেইখানেই থাকতে পারমু আমি।’

    নাজুবিবি পরের দিনই তার বোনের বাড়ি চর-কানকাটা চলে যায়।

    জেল-পালানো আসামি রাতের আঁধারেই আসবে–বুঝতে পারে জরিনা। তাই দিনের বেলা যেখানেই থাকুক, যে কাজেই থাকুক, বেলা ডোবার আগেই সে বাড়ি ফিরে আসে।

    ফজল কাঁজির ভাত খুব শখ করে খায়। জরিনা তাই কাঁজি পেতে রেখেছে। পানিভরা মাটির হাঁড়িতে ফেলে রাখা হয় যে চাল তারই নাম কাঁজি। কাঁজির ভাত খেতে যে সব অনুপান উপকরণের দরকার তারও কিছু কিছু সে যোগাড় করে রেখেছে। লশকর বাড়ি থেকে চেয়ে এনেছে মুঠো খানের মেথি আর কালিজিরা। এগুলো খোলায় টেলে বাটা হবে। নদীতে গোসল করার সময় শাড়ির আঁচল দিয়ে ধরেছে ছোট ছোট মাছ–চেলা আর খরচান্দা। অল্প কয়েকটা মাছ এক দিনেই যা পেয়েছিল। পরের দিন এ মাছ ধরবার সময় ভটভট আওয়াজ তুলে যাচ্ছিল একটা কলের নৌকা। যাচ্ছিল বেশ কিছু দূর দিয়েই। হঠাৎ ওটা মোড় নেয় কিনারার দিকে। জরিনা জাবড়ি দেয় পানির ভেতর। গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দেয় শরীর। আঁচল ঠিক করে গায়ে জড়ায়, ঘোমটা টানে। দুটো ধলা মানুষ শিষ দিচ্ছিল। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে সে দেখে পাঁচ কি দশ টাকার কয়েকটা নোট দেখিয়ে কুৎসিত ইশারা করছে একটা বাঁদরমুখো।

    জরিনা পাড়ে উঠে একদৌড়ে এসে ঘরে ঢোকে। তারপর থেকে নদীর ঘাটে যাওয়ার আগে চারদিক ভাল করে দেখে নেয় সে।

    সেই চেলা আর খরচান্দা মাছ কয়টা শুঁটকি দিয়ে রেখেছে জরিনা। শুঁটকি মাছের ভরতা কাঁজির ভাতের এক বিশেষ অনুপূরক।

    পুরানো দুটো চাঁই ছিল ঘরের বেড়ায় টাঙানো। সে দুটোর পেটে সুতোয় গাঁথা ফড়িংয়ের টোপ ভরে সে লটা ঝোঁপের আড়ালে পেতে রাখে রোজ বিকেল বেলা। ভোরে উঠিয়ে তার ভেতর পায় পাঁচ-সাতটা করে ছোট আণ্ডালু চিংড়ি। তিন-চার দিনে অনেকগুলো হয়েছে। সবগুলোই সে জিইয়ে রেখেছে একটা পানিভরা বৌকার ভেতর। রান্নাঘরের চালে বিছিয়ে রয়েছে ফনফনে পুঁই লতা। পুঁই-চিংড়ির চচ্চড়ি ফজলের খুব প্রিয়।

    খালাসিবাড়িতে ধান ভেনে সেদ্ধ চালের বদলে আতপ চাল চেয়ে এনেছে জরিনা। এ চাল পাটায় বেটে আর কিছু না হোক কয়েকটা চিতই পিঠা বানিয়ে ফজলের সামনে দিতে পারবে সে। ঘরে গুড় আছে। এখন একটা নারকেল যোগাড় করতে হবে যেভাবে হোক।

    তিন-চার দিন পরে আসবে বলেছিল ফজল। কিন্তু সাত দিন পার হয়ে গেছে সে এল না। জরিনার একবার মনে হয়, সে আর আসবে না। পরক্ষণেই আবার মনে হয়–পুলিসের ভয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে হয়ত। সেখান থেকে বেরুতে পারছে না।

    জরিনা চাঁই দুটো নিয়ে নদীর পাড়ে যায়।

    সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। অস্তগামী সূর্যের গায়ে এক ফালি মেঘ বিধে রয়েছে বর্শার ফলার মত। সে আঘাতে সূর্যের রক্ত যেন ছড়িয়ে পড়েছে টুকরো টুকরো মেঘের ওপর।

    শাড়িটাকে কোমরে গুঁজে হাঁটুর ওপর তুলে নেয় জরিনা। তারপর পানিতে নেমে চাইদুটো লটা ঝোঁপের ভেতর পেতে রাখে।

    ডাঙায় উঠেই তার চোখে পড়ে একজোড়া বক। বকদুটো পাখা ঝাড়ছে, ঠোঁট দিয়ে একে অন্যের পালকে বিলি দিচ্ছে। আজকের মতো শেষ হয়েছে ওদের মাছ শিকার। এখন রাতের আস্তানায় ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। হঠাৎ কোথা থেকে একটা বগা উড়ে এসে তাড়া করে জোড়ের বগাটাকে। ওটাকে অনেক দূর হটিয়ে দিয়ে সে বগির দিকে আসে এবং গলা বাড়িয়ে ঠোঁট নেড়ে সোহাগ জানায়। বগিটা উড়াল দিয়ে ওর ভীরু দুর্বল সঙ্গীর কাছে চলে যায়। শক্তিশালী বগাটা আবার আক্রমণ করার আগেই বগা আর বগি সোজা দক্ষিণ দিকে উড়ে চলে যায়।

    পলকহীন চোখ মেলে জরিনা চেয়ে থাকে উড়ন্ত বক-জোড়ার দিকে। ওরা দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে সে ঘরের দিকে রওনা হয়।

    আবার ফজলের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয় তার মন। তাকে পুলিস ধরে নিয়ে যায়নি তো?

    জরিনার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। চোখের কোণে চকচক করে পানি।

    হঠাৎ তার মনে হয়, বেগানা পুরুষের জন্য এমন করে চিন্তা করা তার অন্যায়। ঘোর অন্যায়। নিজের স্বামীর জন্য সে-তো এমন করে ভাবে না। তার স্বামী ফেরার। পুলিসের ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। কি খায়, কোথায় থাকে, ঠিক-ঠিকানা নেই। তার জন্য তো একফোঁটা পানিও ঝরে না তার চোখ থেকে।

    হঠাৎ দরদর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার দু’গাল বেয়ে।

    এ অশ্রু কার উদ্দেশে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বোধ করে না জরিনা। তার মনের অপরাধবোধটাই এখন সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে।

    আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে পাশের চর থেকে। শিথিল আঁচল টেনে মাথায় দেয় জরিনা। ঘরে গিয়ে কুপি জ্বালে। নামাজ সে কদাচিৎ পড়ে। কিন্তু আজ হঠাৎ নামাজ পড়ার তাগিদ অনুভব করে সে তার মনের ভেতর।

    সে অজু করে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। অজু করা সত্ত্বেও কেমন না-পাক মনে হয় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সারা শরীর ছেয়ে রয়েছে কেমন এক অশুচিতা।

    একটা মাত্র ভাল শাড়ি আছে তার। গোলাপী রঙের সেই শাড়িটাই তার পরনে। আজই ওটা বাক্স থেকে নামিয়ে ধোয়া হয়েছিল। এ পরিষ্কার শাড়িটাই তার কাছে নাপাক মনে হয়।

    জরিনা শাড়িটা খুলে তালিমারা একটা শাড়ি পরে। আবার অজু করতে বসে প্রথমেই সে চোখের কাজল পানি দিয়ে ঘষে মুছে ফেলে। নখ দিয়ে আঁচড়ে তোলে কপালের টিপ। যত্ন করে বাঁধা খোঁপাটাও খুলে ফেলে সে।

    নামাজের শেষে সে মোনাজাত করে, ‘আল্লাহ তুমি রহিম, তুমি রহমান। আমার গুনা তুমি মাপ কাইর‍্যা দ্যাও আল্লা। আমার শরীলের গুনা, মনের গুনা, চউখের গুনা মাপ কইর‍্যা দিও আল্লাহ্। রাববানা আতেনা ফিদুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখেরাতে হাসানাতাও ওয়াকেনা আজাব আন্-নার। আমিন।’

    অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে চরের বুকে। জরিনা বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। চলন্ত নৌকার পালগুলো অস্পষ্ট হতে হতে দূরের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। চাঁদহীন আকাশে তারার মহোৎসব।

    আজ আর রান্না-বান্নার প্রয়োজন নেই। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সে ধান ভেনেছে গাজিবাড়ি। দুপুরে সেখানেই খেয়েছে। আজ রাতে তার না খেলেও চলবে।

    জরিনা ঘরে গিয়ে কুপি নিবিয়ে শুয়ে পড়ে। গত তিনচার দিন কুপি জ্বালিয়ে সে অনেক রাত পর্যন্ত বসে কাটিয়েছে। নষ্ট করেছে যুদ্ধের বাজারের দুষ্প্রাপ্য কেরোসিন। সে কয়দিনের উনা ঘুমের জন্য এখন দুনা ঘুমের প্রয়োজন। আজ আবার সারাদিন খুব খাটুনি গেছে। এ অবস্থায় শুতে না শুতেই চোখ বুজে আসার কথা। কিন্তু চোখ বুজেও ঘুম আনতে পারছে না জরিনা। সে নামাজে বসে মনের যেসব গুনা, অবাঞ্ছিত ভাবনা-চিন্তা, কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে এসেছিল, তাড়িয়ে দিয়েছিল উড়তে সক্ষম পাখির ছানার মতো, সেগুলো এখন ফিরে আসতে চাইছে মনের নীড়ে।

    এশার নামাজের আজান শুনে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে জরিনা। কুপি জ্বালে। অজু করে নামাজে দাঁড়ায়। নামাজ শেষ করে মোনাজাতের জন্য হাত উঠায়, ‘আল্লা, সব গুনা মাপ করো আল্লা। শরীলের গুনা মনের গুনা, চউখের গুনা–সব গুনা–’

    টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট্।

    জরিনার প্রার্থনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। সে তাড়াতাড়ি কুপিটা নিবিয়ে আবার শুরু করে, ‘আল্লা আমার সব গুনা মাপ করো। রাব্বানা আতেনা ফিদদুনিয়া—’

    টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট‌….

    ‘রাব্বানা আতেনা ফিদ্দুনিয়া—’ মোনাজাতের পরেরটুকু আর মনে আসছে না তার। কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কোনো রকমে সে ‘আমিন’ বলে মোনাজাতের হাত বুলায় চোখে ও কপালে।

    টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট্।

    জরিনা কানে আঙুল দেয়। কিন্তু তবুও সে স্পষ্ট শুনছে, বারবার শুনছে হট্টিটির ডাক। তার মনের তারে ঝঙ্কার দিয়ে উঠছে যে টি-টি ডাক, তাই বুঝি শুনছে সে।

    জরিনা ঘর থেকে বেরোয়। ডাকটা অনেক কাছে শোনা যাচ্ছে এখন। সে তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা বন্ধ করে রান্নাঘরের পেছনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

    টিঁ-টিঁ-টিঁ আর শোনা যাচ্ছে না এখন। তবে কি ফজল চলে গেল? ভাবে জরিনা। যাক চলে যাক। আল্লায় যেন তার মুখ আর না দেখায়।

    অস্পষ্ট পায়ের শব্দ শোনা যায়। জরিনা রান্নাঘরের কোণের দিকে গিয়ে উঁকি মারে। একটা মূর্তি উঠানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ঠায়।

    কিছুক্ষণ পরে মূর্তিটা নড়েচড়ে ওঠে। এগিয়ে গিয়ে দরজার ওপর টোকা দেয় কয়েকবার। কোনো সাড়া না পেয়ে ভেজানো দরজাটা খোলে। ম্যাচবাতি জ্বালিয়ে দেখে ঘরে কেউ নেই। মেঝেতে বিছানা পাতা। বালিশের পাশে একটা গোলাপি রঙের শাড়ি পড়ে রয়েছে।

    সে দরজাটা ভেজিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। চারদিকে চোখ বুলিয়ে বিড়ি ধরায়। সে সময়ে দেশলাইর আলোয় এক লহমার জন্য ফজলের মুখ দেখতে পায় জরিনা। তার অন্তরের স্নেহ-মমতা শাসন-শৃঙ্খলা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।

    কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফজল রওনা হয়। জরিনার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে বুকটা যেন তার রিক্ত হয়ে যায়।

    কিছুদূর গিয়েই ফজল ফিরে আসে। তার পায়ের মৃদু শব্দে জরিনার বুকের হাহাকার থামে।

    ফজল ঘরে গিয়ে ম্যাচবাতি জ্বালিয়ে কুপি ধরায়। ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে সে বুঝতে পারে, খাবার হাঁড়ি-পাতিল এ ঘরে রাখা হয় না।

    কুপি হাতে সে রান্নাঘরে যায়। সব হাঁড়ি-পাতিল চুলোর পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। এক কোণে একটা পানির কলসি। তার পাশে একটা মাটির বৌকা বাঁশের চালুনি দিয়ে ঢাকা। ওটাও বোধহয় পানিভরা।

    ফজল চালুনিটা সরিয়ে হাত দেয় বৌকার ভেতর। সাথে সাথেই ভয়ে সরিয়ে আনে হাতটা।

    ব্যথায় উৎপীড়িত মুখেও হঠাৎ হাসি ফোটে জরিনার। রান্নাঘরের পেছন থেকে বেড়ার ফাঁক দিয়ে সে সব কিছুই দেখছিল।

    ফজল কুপিটি বৌকার মুখের কাছে নিয়ে দেখতে পায় চিংড়ি মাছ গিজগিজ করছে পানির ভেতর। সে বোকার মত হেসে ওঠে। ভাগ্যিস পান্তাবুড়ির মতো শিং মাছ জিইয়ে রাখেনি জরিনা।

    কুপিটা নিবিয়ে সে বেড়া হেলান দিয়ে বসে থাকে। আহাদালীর ছোট্ট ডিঙি বেয়ে সে এসেছে। কেউ না দেখে সেজন্য ধানখেতের ভেতর ওটাকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। এখন ওটা তুলে এত রাত্রে কার বাড়ি গিয়ে সে আশ্রয় নেবে?

    খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে পেট। ফজল কুপিটা জ্বালায় আবার। সে বৌকার ভেতর থেকে কয়েকটা চিংড়ি মাছ তোলে। জীবন্ত মাছগুলো ছট্‌কা মেরে ছিটকে পড়ে এদিক ওদিক। সে ওগুলোর খোসা ছাড়ায়। চিত্রা একটা হাঁড়ির ভেতর পানি ঢেলে মাছগুলোকে ভাল করে ধুয়ে নেয়। খুঁজেপেতে একটা চিমটা পাওয়া যায় বেড়ার সাথে গোঁজা। সেটার সাহায্যে একটা মাছ পাটখড়ির আগুনে ঝলসিয়ে সে মুখে দেয়। চিবোতে চিবোতে লবণের খোঁজ করে।

    জরিনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তার বুকের ঝড় ছিন্নভিন্ন করে দেয় সব বাধা-বন্ধন। চোখের প্লাবনে ভেসে যায় সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। সে চোখ মুছে ঘোমটা টেনে ধীর পায়ে এসে দাঁড়ায় রান্নাঘরের দরজায়।

    ফজল চমকে পেছন ফিরে তাকায়। তার মুখে মলিন হাসি ফুটতে ফুটতে মিলিয়ে যায় জরিনার চোখে পানি দেখে।

    দু’জনেই দু’জনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কারো মুখ দিয়েই কোনো কথা বেরোয় না। নিজেকে সামলে নিয়ে ফজল বলে, ‘ঘরে অতিথি আইলে মানুষ খুশি অয়। তোমার চউখে পানি দেইখ্যা মনে অয় তুমি খুশি অও নাই।’

    জরিনা নিরুত্তর। তার চোখের পানির উৎস কোথায় ফজল জানে। তাই পরিবেশটা স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে সে আবার বলে, ‘তুমি খুশি অও নাই, কেমন?’

    ‘না।’

    ফজল জানে এটা তার অন্তরের কথা নয়। সে খুশি হয়েছে এ কথা তার মুখ থেকে শুনবার জন্য সে আবার বলে, ‘সত্য কইর‍্যা কও, তুমি খুশি আছ?’

    ‘না।’

    ‘তবে আমি চইল্যা যাই।’

    জরিনা কোনো উত্তর দেয় না। চুলোর পাশ থেকে সে ভাতের হাঁড়িটা তুলে নেয়। ঘর থেকে চাল এনে ধুয়ে বসিয়ে দেয় চুলোর উপর।

    ‘জানো জরিনা, চাউল বড় মাংগা অইয়া গেছে।’

    ‘হ, আমিও হুনছি। তিন ট্যাহা মনের চাউল পাঁচ ট্যাহা অইয়া গেছে।’ চুলো ধরাতে ধরাতে বলে জরিনা।

    ‘দাম আরো বাড়ছে। আইজ দর উঠছে সাড়ে পাঁচ টাকায়।’

    ‘মানুষ এইবার না খাইয়া দপাইয়া মইরা যাইব।’

    ‘হ, এইবার কী যে উপায় অইব মানুষের, কওন যায় না। দুনিয়াজোড়া লড়াই চলতে আছে। চিনি পাওয়া যায় না। কেরোসিন পাওয়া যায় না–’

    জরিনা বৌকার ভেতর থেকে আরো কয়েকটা চিংড়ি মাছ তোলে। মাছ কুটতে কুটতে সে বলে, ‘খুব খিদা লাগছে, না?’

    ‘হ সাংঘাতিক–’

    ‘খিদার চোডে মাছ পোড়াইয়া খাইতে শুরু করছিলা। পোড়া মাছ তো ভূতের ভোগ লাগে।’

    ‘হ ভূতই অইয়া গেছি। আইজ পুলিস আইছিল। খুব তালাশ করছে। সারা দিন আছিলাম একটা পাটখেতের মইদ্যে।’

    ‘ভাত ফুটতে বেশি দেরি লাগব না। তুমি চালের উপরতন কয়েকটা পুঁই এর আগা কাইট্যা আনো।’

    ফজল পুঁই-এর ডগা কেটে এনে দেয়।

    রান্না শেষ হয়। চুলোর পাশে পিড়ি বিছিয়ে ফজলকে খেতে দেয় জরিনা। মাটির বাসনে ভাত বাড়তেই ফজল বলে, ‘আমি আসছি বুইল্যা তুমি তো খুশি অও নাই। নিজের মোখেই তখন না করছ। বেখুশি মাইনষের ভাত তো মোখে দিতে ইচ্ছা করে না।’

    ‘বেখুশি মাইনষেরে দিয়া ভাত তো রান্দাইয়া ছাড়ছ। এহন মোখে দিতে ইচ্ছা করব না ক্যান?’ জরিনা মাছের সালুন দিতে দিতে বলে।

    ‘সত্য কইর‍্যা কও জরিনা, তুমি খুশি অইছ? না কইলে এই উইঠ্যা গেলাম আমি।’ ফজল সত্যি সত্যি উঠবার উদ্যোগ করে।

    ‘হ, খুশি অইছি। এইবার বিছমিল্লাহ করো।’

    ‘তুমি খাইবা না?’

    ‘আমি খাইছি।’ মিছে কথা বলে জরিনা।

    ‘আবার অল্প কইর‍্যা খাও আমার লগে।’

    ‘যহন দিন আছিল, তহনই একসাথে খাওয়ার সুযোগ পাই না। এহন আর–’

    পেটে খিদে নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করতে ভাল লাগে না ফজলের। সে গোগ্রাসে খেয়ে চলে আর জরিনা বেশি বেশি করে ভাত তরকারি তুলে দিতে থাকে তার পাতে।

    মেঝেতে পাতা হোগলার ওপর একটা নকশি কাঁথা বিছিয়ে দেয় জরিনা। তেলচিটে বালিশের ওপর বিছিয়ে দেয় নিজের হাতের তৈরি গেলাপ। তারপর মশারি খাটাতে খাটাতে বলে, ‘এইবার শুইয়া পড়। রাইত দুফর পার অইয়া গেছে।’

    ‘তোমার বালিশ কই? তুমি শুইবা না?’

    ‘উঁহু, আমি বইয়া পাহারা দিমু। জানোই তো চোরের বাড়ি। চৌকিদার-পুলিস আইতে পারে যে কোনো সময়।’

    ‘পুলিস আইতে পারে!’ আঁতকে ওঠে ফজল। ‘তবে তো এইখানে থাকন ঠিক না!’

    ‘আগে আইতো ঘন ঘন চোরবক্সরে ধরতে। এহন ক্বচিৎ কোনোদিন আহে।’

    ‘কিন্তু আমি ঘুমাইমু আর তুমি সারা রাইত জাইগ্যা থাকবা? তার চাইতে দুই জনই জাইগ্যা থাকি না ক্যান্। কথা কইতে কইতে রাইত পোয়াইয়া যাইব।’

    অতীতের গর্ভে ডুবে যাওয়া নানা কথা, নানা স্মৃতি ভেসে উঠছে জরিনার মনেও। কিন্তু জরিনা এদের বেরুবার সুযোগ না দিয়ে বলে, ‘উঁহু কথা কইও না আর। নিসাড় রাইতের কথা অনেক দূর থিকা হুনা যায়।’

    ফজল আর কথা বলে না।

    জরিনা আবার বলে, ‘হোন, পুলিস আইলে যদি পলাইতে না পার, তবে ঐ কোনায় খাড়াইয়া থাকবা। আমি তোমারে হোগলা দিয়া প্যাচাইয়া দিমু। কেও বুঝতেই পারব না।’

    ‘হেষে দম ফাপর অইয়া মইরা যাইমু না তো!’

    ‘উঁহু। মরবা না। চোরা ভাদাম্যারে এই রহম কইর‍্যা বাঁচাইয়া দিছিলাম একদিন।’

    জরিনা দরজায় খিল লাগিয়ে নিজের জন্য নামাজের মাদুরটা বিছিয়ে নেয়। তারপর কুপটি ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে বসে পড়ে তার ওপর।

    ফজল বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে। রূপজানের কোনো খবর এখনো দেয়নি জরিনা। আর দিবে বলেও মনে হয় না। জরিনার বোধ হয় ভাল লাগে না রূপজানের নাম শুনতে। ফজলেরও তাই কেমন বাধোবাধো ঠেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে। শেষে দ্বিধা কাটিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, ‘মোল্লাবাড়ি গেছিলা?’

    ‘না।’

    ‘কোনো খবর আছে?’

    ‘হোনলাম, রূপজানের নিকার কথা পাকা অইয়া গেছে।’

    ‘নিকা! কার লগে?’

    ‘ফুলপুরী মওলানার লগে।’

    ‘অ্যাঁ! উত্তেজনায় চিড়বিড়িয়ে উঠে বসে ফজল। ঐ বুইড়ার লগে! ঐ পাকনা দাড়িওয়ালার লগে। রূপজান রাজি অইছে?’

    ‘মাইয়ালোক রাজি অইলেই বা কি, না অইলেই বা কি।’

    ‘বোঝলাম জঙ্গুরুল্লা আছে এর মইদ্যে। নিজের পীররে খুশি করণের কারসাজি।’

    ফজল দাঁতে দাঁত ঘষে। তীব্র ক্রোধে ফুলে ওঠে তার সারা শরীর। পেশিগুলো শক্ত হয়ে ওঠে।

    জরিনা চেয়ে আছে মশরির দিকে। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। শুধু শোনা যায় ফজলের ফুঁসে ওঠা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।

    জরিনা তিনবার আয়াতুলকুরসি পড়ে আঙুল দিয়ে কুণ্ডলী দেয় তার চারদিকে আর মনে মনে প্রার্থনা করে, এই কুণ্ডলী ডিঙিয়ে দাগাবাজ শয়তান যেন তার কাছে আসতে না পারে।

    ফজল বিড়ি টানছে বসে বসে। বিড়ির আগুন আলেয়ার মতো জ্বলছে আর নিভছে। জরিনার মনে হয়, আলৈয়াদানা যেন দাগা দেয়ার চক্রান্ত করছে। আলোয় আকৃষ্ট পোকার মতো তাকে টানছে আর টানছে।

    সে চোখ বন্ধ করে। দু’হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে বিছানো মাদুরটা।

    অনেকক্ষণ পর চোখ খোলে জরিনা। নিঃসীম অন্ধকারে সে ডুবে আছে। সাদা মশারির অস্পষ্ট আভাস চোখে পড়ে কি পড়ে না। কিন্তু তার অন্তরালের মানুষটিকে সে যেন স্পষ্ট দেখতে পায়, শুনতে পায় তার নিশ্বাস-প্রশ্বাস।

    জরিনার মনের কোটরে ঘুমিয়ে থাকা চামচিকেটা জেগে ওঠে। নিশির ডাকে নিশাচরী বেরিয়ে যেতে চায়। তার ডানার ঝাঁপটায় জরিনার আঁকা আয়তুল কুরসীর কুণ্ডলী দূরে সরে যাচ্ছে, ফিকে হয়ে যাচ্ছে বুঝি।

    জরিনা উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখা তসবি ছড়া সে নামিয়ে আনে। মুসল্লি বাপের স্মৃতিচিহ্ন এ হাজার দানার তসবি। লক্ষ লক্ষ বার জপিত আল্লার নাম ওর প্রতিটি গুটিকায়।

    মাথা ও শরীর গলিয়ে সে তসবির মালা নামিয়ে দেয় মাদুরের ওপর। তসবির নিরাপদ আবেষ্টনীর মাঝে সে এবার শক্ত হয়ে বসে।

    ফজলও বসে আছে। রূপজানের নিকের খবর শুনে তার রক্ত টগবগ করে উঠেছিল। সে রক্তে এখন উত্তাল তরঙ্গ। সে কোথায় কোন পরিবেশে আছে সে দিকে এতটুকু খেয়াল নেই। প্রতিহিংসার পরিকল্পনায় নিবিষ্ট তার মন।

    আরশেদ মোল্লা আর জঙ্গুরুল্লা মানুষ নয়। মানুষের সুরত ধরে পয়দা হয়েছে দুটো জানোয়ার। ওদের চেহারা বিকৃত বীভৎস হয়ে দেখা দেয় তার মনের চোখে। ওদের চুল দাড়ি যেন জড়াজড়ি করে ঝুলছে সুতানালি সাপের মতো।

    জাহাজের ফুৎ-ফুৎ সিটি শুনে সংবিৎ ফিরে পায় ফজল। ঝপড় ঝপড় আওয়াজ তুলে জাহাজ চলছে। কাশি দিয়ে গলা সাফ করে সে ডাকে, ‘জরিনা ঘুমাইছ?’

    ‘না। তোমার কি ঘুম ভাইঙ্গা গেল?’

    ‘না, ঘুমাই নাই এহনো।’

    ‘ঘুমাও, রাইত দুফর কিন্তু পার অইয়া গেছে।’

    ‘ঘুম আর আইব না। তোমার ঘরে কেরোসিন তেল আছে?’

    ‘কেরোসিন দিয়া এত রাইতে কি করবা?’

    ‘আছে কোনো দরকার।’

    ‘কি দরকার?’

    ‘সাপের খোন্দলে আগুন লাগাইমু।’

    ‘এত রাইতে সাপের কথা মনে অইল ক্যান? সাপের ব্যথা দ্যাও নাই তো?’

    ‘সাপের জাত। ব্যথা না দিলেও তো কামড়াইতে পারে।’

    ‘আইচ্ছা, রাইত পোয়াইলে যোগাড় কইরা দিমু। তুমি ঘুমাও এইবার।’

    জরিনা উঠে গিয়ে মশারির চারপাশ গুঁজে দেয় হোগলার তলা দিয়ে। তারপর বলে, ‘ভাল কইর‍্যা গুঁইজ্যা দিছি মশারি। সাপ-খোপ আর ঢুকতে পারব না। তুমি নির্ভাবনায় ঘুমাও এইবার।’

    ফজল বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। জরিনা গিয়ে বসে তসবির নিরাপদ বেষ্টনীর মাঝে।