Author: তাহের আলমাহদী

  • বৃদ্ধ পরিব্রাজক ও চন্দ্রশেখর

    বৃদ্ধ পরিব্রাজক ও চন্দ্রশেখর

    প্রাসাদপুরীর আনাচে কানাচে থেকে শুরু করে রাস্তা অবধি লোকে লোকারণ্য। এত লোকের চোখের সামনে দিয়েই কাউকে ভ্রুক্ষেপ না করে চলে গেল চন্দ্রশেখর। অগন্তুক বৃদ্ধের দু’চোখে যেন কি ছিল। বৃদ্ধের চোখে চোখ রেখেই খানিক দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। চন্দ্রশেখরের চেহারাটা একেবারে নিষ্পন্দ পাথরমূর্তির মত দেখাচ্ছিল।

    ওর চোখ থেকে চোখ ঘোরালেন বৃদ্ধ নিজেই। পিছু ফিরলেন। বিজয়ী বীরের মতো এগুতে লাগলেন সামনের দিকে। অন্ধের মতো অনুসরণ করে চলতে লাগল তাঁকে চন্দ্রশেখর। চন্দ্রশেখর যেন সম্মোহিত মানুষ। ওর সঙ্গে বোধ হয় আমরাও সম্মোহিত হয়ে গেছলুম সেই সময়টায়।

    কোন বাধা দেবার ক্ষমতা ছিল না কারো। বৃদ্ধকে কিছু বলবার সাহস ছিল না কারো। নির্বাক সকলে। চন্দ্রশেখরের মা-বাবা পর্যন্ত। আগন্তুককে দেখা মাত্র তাঁরা কেমন হয়ে গেছলেন। দু’জনেরই মুখ বিবর্ণ হয়ে গেছল। রাজ্যের ত্রাস ঘিরে ধরেছিল তাঁদের চোখে।

    আলোর মালায় সাজানো প্রাসাদকে যেন অন্ধকার দেখাচ্ছিল। হয়ত আমাদের মনের চোখে অন্ধকার নেমে এসেছিল বলেই। চন্দ্রশেখরের ব্যাপারটায় স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে পড়েছিল। সবল অবস্থায় ফিরে আসতে সময় লেগেছিল বেশ খানিকটা।

    যখন আমাদের আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল, যখন আমরা সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠলুম, তখন চন্দ্রশেখর নাগালের বাইরে চলে গেছে একেবারে। আর তাছাড়া ওর বিষয় পরে যা শুনলুম—তাতে আমাদের পক্ষে ওকে ফিরিয়ে আনাও অসম্ভব হত। অন্তত বৃদ্ধের হাত থেকে ছিনিয়ে আনবার মত কোন ন্যায্য যুক্তি নীতি খাড়া করতে পারতুম না আমরা তার কাছে।

    চন্দ্রশেখরের মা-বাবার কাছ থেকেই শুনেছিলুম আমি ওর জীবন রহস্যের কথা। মা-বাবা গোপন করেই রেখেছিলেন সে কাহিনী সবার কাছে। জ্ঞাতি স্বজনের কাছে তো বটেই, তাছাড়া ছেলের কাছেও।

    তেহেড়ীগাড়োয়াল রাজ্যের রাজবংশের রক্ত বয়ে চলেছে চন্দ্রশেখরের ধমনীশিরায়। চন্দ্রশেখরকে নির্ভীক শিকারী যোদ্ধা আর রাজনীতিজ্ঞ করে গড়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন মা-বাবা। কোন বিষয়ে কোন ত্রুটি রাখেন নি জ্ঞাতসারে। তবুও ছেলে মনোমত হয় নি তাঁদের। এর জন্য আপসোসের অন্ত ছিল না। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ ভেবে হতাশায় বুক ভেঙে যেত তাঁদের মাঝে মাঝে। তখন নির্লিপ্ত দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকত না আর।

    ছেলের জীবনে ভাঙাচোরা খেলার মূলে একটি মাত্র লোকেরই ছায়া এসে পড়ত বার বার। সে ঐ বৃদ্ধের। কোন কিছু না পারার জন্য অনেক সময় ছেলের ওপর রাগ করতে গিয়েও পারেন নি মা-বাবা। দয়া এসেছে, মায়া এসেছে। ওর ছলছলে চোখের দিকে তাকিয়ে ওকে নির্দোষই মনে হয়েছে। বৃদ্ধ কি নির্দয়! ছেলেটার ওপর—তাঁদের ওপর নির্মম আঘাত হানতে এত চেষ্টা করছে কেন? ছেলেটাকে কি ভুলতে পারে না? ভুলতে পারবে না কখনো?

    ভুলতে যদি চেষ্টা করত—তাহলে এত আসত না। একবার নয় দু’বার নয়—বার বার এসেছে। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অবিশ্যি চন্দ্রশেখরকে বাঁচিয়েছে বার তিনেক। সেটা মহতের মতো কাজ করেছে। মেনে নিয়েছে মা-বাবা। তার জন্য চিরকৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার বন্ধনে বেঁধেছে বলে মা-বাবার স্নেহভরা বুক থেকে সবে ধন নীলমণি—তাঁদের চোখের মণিকে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করবে—এ কেমন কথা।

    মনে মনে কত অনুরোধ জানিয়েছে মা-বাবা–তুমি তো সব বোঝ—আমাদের মনের কথা রাখো! ছেলেটাকে ভিক্ষে দাও শুধু! তার বিনিময়ে যা চাও—নাও!

    বধির কখনো শোনে না। শুনল না ঐ বৃদ্ধও। অনুরোধে দুর্বলতা বুঝল। বিরোধ বাধাল আরো এসে এসে। তখন থেকেই অজানা আশঙ্কায় দুরু দুরু কেঁপে উঠেছিল মা-বাবার বুক। একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। বৃদ্ধের প্রভাব থেকে ছেলেকে মুক্ত করবার জন্য অন্যমনস্ক করতে চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে মন টানতে চেষ্টা করেছেন।

    বৃদ্ধকে দেখার কথা শুনেছে যখুনি, তখুনি আগুন জ্বলে উঠেছে মাথায়। বৃদ্ধকে কাছে পেলে—তাঁর দেহটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে—ভস্ম নিয়ে নরেন্দ্রনগরের পাহাড়ী ঝরণার জলে ভাসিয়ে দিয়ে নিষ্কৃতি পেতে হবে। আপনাদের শাস্তি হবে চিরকালের জন্য। ছেলেকে ধমকের সুরে বলেছেন—ওসব বাজে চিন্তা তোমার সাজে না। যাকে তুমি দ্যাখো—সে তোমার কল্পনার মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়।

    মা-বাবার কথা শুনে বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে যেত চন্দ্রশেখর। অল্প সময়ের জন্য হলেও, যাকে চাক্ষুষ দেখেছে, যার উপস্থিতি অনুভব করেছে স্পষ্ট, মৃত্যুগব্বর থেকে টেনে বার করেছে যে এক একবার—সে কল্পনার মানুষ? চন্দ্রশেখরের মন সায় দিত না একটুও এ কথায়। একথা মেনে নিতে পারবে না কিছুতেই সে। কিছুতেই না।

    ছেলের মুখচোখের ভাবগতিক দেখে বুঝতে আর বাকী থাকত না—মাবাবার কথা একটুও দাগ কাটে নি। ছেলের মনে।

    প্রমাদ গণলেন বাবা-মা।

    চন্দ্রশেখরকে নিয়ে কোথায় যাবেন তারা? লুকিয়ে রাখবেন এই ছেলেকে কোনখানে? ভেবে কুলকিনারা পেলেন না কোন। আগেকার কথা মনে পড়তে আরো নিরাশ হয়ে পড়লেন। অন্ধকার দেখলেন চতুর্দিকে। একেবারে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। একটুও ফাঁক নেই কোথাও। আলোর রেখা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না কোন দিক থেকেই। নিরুপায় তাঁরা।

    তাঁদের নিরুপায় অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বেনারস পালিয়ে যাবার সময় বেশী করে। বৃদ্ধের যে দু’চোখ সদাসর্বদা পাহারা দিয়ে রেখেছে—ঘিরে রেখেছে ছেলেকে—তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

    নিশুতি রাতে চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে উঁকি মেরে দেখেছে ছেলেকে ঐ বৃদ্ধ। জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওর হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য। নিস্তার পাওয়া যায়নি। কোথা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছিল সকলের অজ্ঞাতসারে কে জানে। সবার চোখের সামনে ছেলের কাছে উপস্থিত হয়েই, কাউকে পলক ফেলবার অবসর না দিয়েই, আত্মগোপন করেছিল আবার আশ্চর্যভাবে। বৃদ্ধ যাদু জানে নিশ্চয়। তাঁর যাদুর মায়া দেখিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল সবাইকে-বন্ধ জানলা দরজা আটকাতে পারে না তাঁকে। তাঁর দৃষ্টির আওতা থেকে পালিয়ে যাবে কে কোথায়। অবারিত যাতায়াত তার সর্বত্র।

    নিজের অগোচরেই ছেলেটাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল হয়তো বৃদ্ধ। এতটা ভালোবাসা উচিত হয়নি তাঁর পক্ষে। অন্যের ছেলেকে তার মা-বাবার চেয়ে বেশী ভালোবাসাটা নাকি ডাইনীর ভালোবাসা। কথাগুলো মনে পড়লে ভয় ধরত!

    ভালোবাসার নমুনা দেখাতে গিয়ে দারুণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল একদিন বৃদ্ধ। বেনারসে পালিয়ে আসবার কিছুদিন পরেই ঘটনাটা ঘটেছিল। সেদিন অকারণ একটা জিদ পেয়ে বসল হঠাৎ চন্দ্রশেখরকে। ওর অবুঝপনা বেড়ে উঠতেই লাগল। বেড়াতে যাবে গঙ্গার ধারে। কারো কথা শুনবে না।

    বোঝানো হল—বয়েস বাড়ছে বই কমছে না তো আর। পাঁচ-ছ বছরের ছেলের বায়না পনের-ষোল বছরে সাজে নাকি?

    সাজে। বড়মানুষের মতো গম্ভীর গলায় উত্তর দিল চন্দ্রশেখর। আরো জানাল, বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে গঙ্গার ধারে। হাত নেড়ে ডাকছে তাঁকে। সে নাকি বাড়ী থেকে বসে বসেই দেখছে সব!

    শুনে, মা বাবা স্তম্ভিত, হতবাক।

    হাড় জিরজিরে চেহারার বৃদ্ধের ক্ষমতার কথা অজানা নয় তাঁদের কাছে। ট্রেনের ব্যাপারটা ভোলার নয়। স্বপ্নের মতো হলেও কখনো মন থেকে মুছে যাবার মতো নয়। বুড়োর ডাকে বাধা দিলে রেগে গিয়ে শেষে অনর্থ না কিছু করে বসে।

    বুড়োর ডাক মেনে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হল বাবা-মার।

    গঙ্গার কাছাকাছি এসে থামল টাঙা। টাঙা থেকে নামলেন মা-বাবা। নামল চন্দ্রশেখর। বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে ডানদিকে। তাঁর পায়ের তলা দিয়ে গঙ্গা বইছে। শীতের ক্ষীণকায়া গঙ্গা বিশাল রূপে ধরেছে! ফুলে ফুলে উঠছে। অত নীচে থেকে রাস্তা অবধি উঠে এসেছে। সিঁড়ির মন্দিরগুলো জলের তলায় ডুবেছে। ওপারের বালির চরের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না। কেবল জল আর জল। অথৈ জল। কি দুর্বার স্রোত। সর্বশক্তিই নিমেষে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে গঙ্গার এই ভয়ঙ্করী প্রকৃতি।

    ভয়ঙ্করেরও একটা সৌন্দর্য আছে। একটা প্রবল আকর্ষণ আছে। এসেছে অনেক মানুষ। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে গঙ্গার এই রূপ। ভীত সন্ত্রস্ত চিত্তে দেখছে সকলে। খানিক পা বাড়ালেই অনিবার্য মৃত্যু। মুহূর্তে কোন অতলে তলিয়ে যাবে—খুঁজে পাবে না কেউ কখনো আর। তবু তাঁরা দেখতে এসেছে।

    দেখছেন চন্দ্রশেখরের মা-বাবাও। ছেলের দু’হাত ধরে দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। খেয়ালী ছেলে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বুড়োর কাছে যাবার জন্য জলের ওপর দিয়েই দৌড়াদোড়ি আরম্ভ করে দেয় শেষে।

    যা ভয় করেছিলেন, তাই হল।

    আচমকা ঝটকায় দুজনের হাত থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়াল চন্দ্রশেখর। হাতের ইশারায় ডাকছে বৃদ্ধ। আছড়ে পড়ল চন্দ্রশেখর জলের ওপর। চতুর্দিক থেকে গেল গেল আর্তনাদ উঠল সমবেত কণ্ঠের। মুহূর্তে কি যে ঘটে গেল—কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না বাবা-মা। ছেলেটা যেন হারিয়ে গেল জলের তলায়। জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন ওঁরা দুজনেই, বৃদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাত ধরে টেনে তুলল চন্দ্রশেখরকে। মায়ের কাছে নিয়ে এলো।

    হারানিধি নয়নের মণি ছেলেকে ফিরে পেয়ে বুকে টেনে নিলেন মা। হাপুস নয়নে কেঁদে বুক ভাসালেন নিজের। তখন বৃদ্ধকে মনে হয়ে ছিল অতি আপন জন। এরকম হিতাকাঙ্খী বুঝি দ্বিতীয়টি আর কেউ নেই তাঁদের। বৃদ্ধকে কৃতজ্ঞতা জানাতে মুখ তুলে তাকালেন। জলভরা চোখের ঝাপসা ভাবটা কেটে যেতে পরিস্কার দেখলেন, বৃদ্ধ নেই। আত্মগোপন করেছে তাঁর স্বভাব অনুযায়ী। এক এক সময় বৃদ্ধকে পরম মিত্র মনে হলেও, শত্রু মনে হতেও খুব বেশী সময় দেরী লাগত না তাঁদের। বৃদ্ধ যেন বাহাদুরী নেবার জন্য দুর্বল মনের ছেলেটাকে বিপদের মাঝে টেনে নিয়ে গিয়ে তুলে আনে আবার। এ যেন ঠেলে দিয়ে টেনে ধরা গোছের। অবিশ্যি বৃদ্ধের ওপর এ ধারণাটা এসে গেছল এর পরের অন্য ঘটনা দেখে।

    মিথ্যে এদেশ-ওদেশ পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো! বৃদ্ধের কাছ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে রাখা যাবে না নিজেদের। লুকিয়ে রাখা যাবে না ছেলেকে।

    দেশে-তেহেরী গাডোয়ালে ফিরে এলেন আবার মা-বাবা চন্দ্রশেখরকে নিয়ে।

    এরপর বছর ঘুরেছে। শিবচতুর্দ্দশী। শিবমন্দিরে যাচ্ছেন মা-বাবা। চন্দ্রশেখরকে সঙ্গে নিয়েই চলেছেন। পূর্বপুরুষদের শিবমন্দিরে শিবপূজা দেখবে। পাহাড়ী রাস্তায় এঁকে বেঁকে, উঁচুনীচু পথ মাড়িয়ে চলেছে ওদের গাড়ী। ঝুরিনামা বটগাছের তলায় শিবমন্দিরটা দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। খানিক গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। একটা বাকের মুখ ঘুরতে গিয়ে কারটা দুলে উঠল। একটু লাফিয়ে উঠল।

    চন্দ্রশেখরের দিকের দরজাটা হয়ত ঠিক মত বন্ধ করা হয় নি আগে থেকেই, গাড়ীটা প্রবল ঝাঁকুনি খাওয়ায় খুলে গেছে—নয়ত এমনিও খুলে যেতে পারে—কেন খুলল তার হদিস কিছু পাওয়া যায় নি। আচমকা দরজাটা খুলে যেতেই কার থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়ল বাইরে চন্দ্রশেখর। ঠিক সেই মুহুর্তেই বৃদ্ধ বাইরে থেকে সজোরে ঠেলে দিল গাড়ীর ভিতর চন্দ্রশেখরকে। অবাক চোখে দেখল চন্দ্রশেখর বৃদ্ধকে। দেখলেন তার মা-বাবাও। এখানে এসময়েও এই লোক। চন্দ্রশেখরের চিন্তা ছাড়া ওর আর অন্য কোনোও চিন্তা নেই কি। এভাবে ভগবানের চিন্তা করলে, তাঁর ওপর দিনরাত নজর রাখলে সত্যিই মানুষটা ভগবান পেয়ে যেত বোধ হয় এত দিনে। মতিচ্ছন্ন। মানুষের চিন্তা! অন্যের ছেলের চিন্তা! পরের জন্য মাথা ব্যথায় অস্থির মানুষটা। বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠেছিল স্বামী-স্ত্রীর ঠোঁটের ফাঁকে ফাঁকে।

    সে রাতে ঘরে ফেরার সময় সেই বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন আবার বৃদ্ধকে ওঁরা। নিজেদের মনেরই প্রতিচ্ছবি দেখলেন কিনা বৃদ্ধের মুখে চোখে-বুঝে উঠতে পারেন নি। বৃদ্ধের সমস্ত মুখখানায় বিদ্রুপের হাসির প্রলেপ পড়েছে।

    মা-বাবার বুকের রক্ত জল হয়ে গেছে ভয়ে। বুড়োর অসাধ্য কিছু নেই। প্রত্যেক বারে মরণ ফাঁদ থেকে চন্দ্রশেখরকে উদ্ধার করছে যেমন, তেমনি একদিন মরণ ফাঁদে ফেলেই কেড়ে নিতে পারে ছেলেটাকে ওঁদের কাছ থেকে। সব কিছু পারে বুড়ো। বুড়ো অচেনা নয়। অজানা নয়। কিন্তু ছেলের কাছে বুড়োর বিষয় গোপন করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই ওঁদের।

    বারে বারে মিথ্যে বলতে হয়েছে ছেলের কাছে। বৃদ্ধকে চেনেন না ওরা। ওরকম চেহারার কোনো লোকের সংগে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি কখনো। ওটা কোনো দুষ্ট প্রেতাত্মা। ওরা মায়াবী। মানুষকে আকর্ষণ করে। তারা সুখের ঘরে ভাঙন ধরায়। রক্ষার ভান করে মেরে ফেলে মানুষকে।

    স্বামী স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটায়। পিতাপুত্রে পৃথক করায়। অপরের সুখে গাত্রদাহ ওদের। চিন্তা করা উচিত নয় কারো। চিন্তায় ওরা কাছে এসে হাজির হয় বেশী করে। প্রশ্রয় পায়। ওদের ডাকে কাছে যাওয়া উচিত নয়।

    চন্দ্রশেখরের ভয়ের কারণ কিছু নেই। শিবের বরপুত্র সে। যে-সে শিবের নয় আবার। একেবারে দাক্ষিণাত্যের সেরা—সব চেয়ে বড় শিব—তাঞ্জোরের বৃহদীশ্বর লিঙ্গদেবের দোর ধরা সন্তান! বুড়ো প্রেত চন্দ্রশেখরকে বিপদে ফেলতে চেষ্টা করছে বারবার। বৃহদীশ্বরই বুড়োর ঘাড় ধরে, জোর করে বিপদ মুক্ত করিয়ে নিচ্ছেন। ভূতনাথ হাতে থাকলে ভূতের তোয়াক্কা করে কে! আর করা উচিতও না কারো।

    কথাগুলো ছেলেকে বোঝাবার পর শেল বিঁধতে থাকে যেন বুকে মা-বাবার। হৃৎপিণ্ড ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতে থাকে দু’জনার। তাঁদের মতো এত বড় মিথুক বোধ হয় দুনিয়ায় তৃতীয়টি নেই আর। নিজের স্বার্থের খাতিরে ছেলের কাছে এত বড় ধাপ্পা দিতে পারে না নিশ্চয় তাঁদের মতো আর কোনো মা-বাপ। অনুশোচনার আগুন জ্বলতে থাকে স্বামী স্ত্রীর বুকে মাথায়। জ্বলে দিনেরাতে। প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে।

    কেউ জানুক না জানুক—তারা জানে বৃদ্ধ কে—বৃদ্ধ কি।

    ছোট বেলা থেকেই চন্দ্রশেখরকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তায় আকাশ ভেঙে পড়ত মা বাবার মাথার ওপর।

    তখন বছর আষ্টেক বয়েস চন্দ্রশেখরের। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যে নামলেই কেমন একটা আচ্ছন্ন আচ্ছন্ন ভাব আসত যেন। তন্দ্রা নয়, ঘুম নয়। এ অবস্থাটা ওদুটোর একটাতেও পড়ে না। অথচ একটা বিশেষ ধরণের অবস্থা। ঠিক বলে বোঝানো যায় না। ওর শরীরটা থাকত এখানে মন চলে যেত অন্য রাজ্যে। সে সময়টায় বাড়ীর কথা কিছু কানে যেত না। কিছু মনে থাকত না। অন্য রাজ্যের কথা মনে থাকত ওর। অন্য রাজ্য বলতে পৃথিবী ছাড়া নয়। বাড়ী ছাড়া অন্য কোনোখানে।

    সে জায়গার সমস্ত নিখুত বর্ণনা দিত চন্দ্রশেখর। গাছপালা ঘরবাড়ী নদী পাহাড়—সবেরই কথা বলত বড় মানুষের মতো বেশ বুঝিয়ে বুঝিয়ে। যেন স্বচক্ষে ও সব দেখে এসেছে। খানিক থেকে এসেছে। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়ে যেত বেশী মা বাবা—যখন আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যাবার পর বলে উঠত—মা। কি সুন্দর ফুলের গন্ধ! কি সুন্দর ধূপের গন্ধ। পাচ্ছ? পাচ্ছ না?

    ছেলের এধরণের কথা শুনে, বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে যেতেন মা। কি বলবেন, কি উত্তর দেবেন। কোনো কিছুরই গন্ধসন্ধ পাচ্ছেন না তিনি। নির্বাক মুখে ফ্যাল ফ্যাল করে দেখতেন শুধু ছেলেকে। দেখতেন ওর ভিতর এবং বার। ছেলের কিন্তু মায়ের দেখাদেখির ওপর লক্ষ্য থাকত না কোন। নিজের মনেই বলে যেত চারদিকে ফুল আর ফুল। রঙ বেরঙের ফুলের ছড়াছড়ি। উঁচু একটা মাটির বেদির ওপর সাদা ফুলের আসন পাতা। মাটির বেদিটা আর সিঁড়িগুলো পেঁড়ি মাটির রঙে রাঙানো।

    আমি যেতে কত লোক এসে ঘিরে ধরল আমায়। বয়সী লোকেরা ধরে ধরে বেদীতে ওঠাল। বসিয়ে দিয়ে পুষ্প বৃষ্টি করতে লাগল মাথার ওপর। রাশি রাশি ফুলের মালা এসে পড়তে লাগল আমার গলায়। ফুলে ফুলে ডুবে যেতে লাগলুম আমি। ধূপ জ্বলছে আমার সামনে। অনেক ধুপ। খুব ভালো লাগছিল। সুগন্ধে ঘুম আসছিল। ঘুমিয়ে পড়ছিলুম আমি ফুলের ওপর—ফুলের স্তুপে মাথা রেখে।

    ছেলের এ স্বর্গীয় আনন্দে আনন্দ পেতেন না মা। এ আনন্দে অশুভের কালো ছায়া দেখতেন যেন। অজানা ত্রাস ঘিরে ধরত তাকে। কথা শুনতে শুনতে সর্ব শরীর কেঁপে উঠত। শোনা যায় শিব সন্ন্যাসীর দেবতা। শিব নিজেও সন্ন্যাসী তবে কি…না, না। তার ধারণা যেন মিথ্যে হয়। মিথ্যে হয়।

    তাঞ্জোরে বৃহদীশ্বর লিঙ্গদেবের একপাশে স্ত্রী পার্বতী আর এক-পাশে পুত্র সুব্রহ্মনিয়ামের—কার্তিকের মন্দির! শিব স্ত্রী-পুত্র নিয়ে তো ঘর করছেন। তার আশীর্বাদ নিশ্চয় রয়েছে চন্দ্রশেখরের ওপর। হতেই পারে না চন্দ্রশেখর সন্ন্যাসী হয়ে যাবে সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে। হতে পারে না চন্দ্রশেখরের কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়ানোটাই ওর ভবিষ্যৎ জীবনের আভাস।

    চন্দ্রশেখরের বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আট বছরের ছেলের মুখের কথা ক’টাকে যুক্তিতর্কের কাঁচিতে মনের পাতা থেকে কেটেছেটে বাদ দিতে চেষ্টা করেছেন অনেকবার মা। কিন্তু পারেন নি। ভিতরে এমন একটা দুর্বলতা চেপে বসেছিল তাঁর—তাকে নড়ানোসরানো খুব শক্তব্যাপার। তাই বিশে পড়তেই চন্দ্রশেখরের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন খুব তিনি।

    ছেলে অমত করেছিল প্রথমে বিয়ে করতে। বাপও ছেলের পক্ষই নিয়েছিলেন। আর কিছু দিন যাক না। দেরী হলে ক্ষতি কি? করবে না যে বলছে—তা তো নয়। করবে। আর দিন কতক বাদে।

    মায়ের মুখ থেকে সমস্ত রক্ত যেন সরে গেছল। ফ্যাঁকাশে দেখাচ্ছিল। ভেবেছিলেন বাপ-ছেলের অমতটা না কাল হয়ে দাঁড়ায় শেষে। অমতটাই না স্থায়ী হয়ে পড়ে ছেলের জীবনে! উনি সব বুঝে সুজেও অবুঝের মতো কেন যে বেঁফাস কথা কয়ে, নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মেরে বসেন—তা জানেন না তিনি। একে তো বিয়ের নামে মনসা হয়েই আছে ছেলে। তার ওপর কর্তা আবার ওর পক্ষ নিয়ে ধুনোর গন্ধ ছড়ালেন।

    অনেক বলেকয়ে কেঁদেকেটে তবে বিয়ে করতে রাজী করিয়েছিলেন ছেলেকে। যে রকম দিনের পর দিন বুকের যন্ত্রণাটা বাড়ছে—তাতে কখন কি হয় কে বলতে পারে। বৌ দেখে যাবার সাধটা অপূর্ণ না থেকে যায় শেষ অবধি। মায়ের চোখের কোণ চিকচিক করে উঠতে হাত দুটো ধরে বলেছিল চন্দ্রশেখর—ব্যবস্থা কর। বিয়ে করবো আমি।

    মায়ের চোখের জল টস টস করে ঝরে পড়েছিল চন্দ্রশেখরের হাতের ওপর। মা-কে হাসাবার জন্য বলেছিল, তোমার মনের মতো মন হওয়া চাই কিন্তু বৌয়ের। বিয়ের মতটাকে বাবার কাছ থেকেও পাকাপাকি করে নেবার জন্য চেষ্টা করলেন মা। বাবাকে অনুরোধ করলেন—শেখরের জন্য আমার মনের মতো মেয়ে খুঁজতে গেলে এমনিতেই দেরী হয়ে যাবে যখন, তখন দেরীতে বিয়ে হবার কথা এখন না তোলাই ভালো।

    এরপর। মা পাত্রীপর্ব নিয়ে মেনে থাকতে লাগলেন। তাঁর মনের নিরিখে মেয়েদের যাচাই-বাছাই চলতে লাগল। ছেলে না দেখতে চাইলেও মনোনীতদের ছেলের কাছে পছন্দের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। গররাজী থেকেও মায়ের নির্দেশ অমান্য করতে পারত না চন্দ্রশেখর। মেয়েদের মনে-চোখে মায়ের স্নেহমাখা চোখ আর ব্যথা বোঝা মন খুঁজে খুঁজে দিশেহারা হয়ে পড়তে লাগল। ব্যর্থতার ক্লান্তি পেয়ে বসতে লাগল ওকে।

    মেয়ে দেখাদেখির ব্যাপারে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও পড়তে হত এক এক সময়ে। যখুনি কোন মেয়েকে পছন্দ হবার উপক্রম হয়েছে চন্দ্রশেখরের—তখুনি বৃদ্ধ এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। মা শুনেছেন ছেলের মুখে। মনের সংশয় ঘোচাতে আড়াল থেকে লক্ষ্য রেখেছেন। মিথ্যে বলে নি শেখর। একটা বুকভাঙা নিশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তি করেছেন মা—অলক্ষুণে বুড়োটা শুভকাজেও বাধা দিতে আসে নিশ্চয়। মরণ কি নেই ওঁর।

    বুড়োর উপদ্রব থেকে নিশ্চিন্ত হতে হলে, খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়া দরকার চন্দ্রশেখরের। মনস্থির করলেন মা-ছেলেকে দিয়ে আর কোন পাত্রী পছন্দ করানোর দরকার নেই। ছেলে তো তার মনের কথা বলেই দিয়েছে। মনোমত ব্যবস্থা মা নিজেই করবে এখন।

    দূর সম্পর্কের জ্ঞাতির একমাত্র মেয়ে।

    — ষোড়শী সুন্দরী তন্বী বেদবতীর সঙ্গে চন্দ্রশেখরের বিয়ের পাকাপাকি ব্যবস্থা করে ফেললেন মা।

    বিয়ের দিন।

    নতুন রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে প্রাসাদ পুরী আবার। আসছে আপনজন বন্ধুবান্ধব। আসছে জানাশোনারা। আসছে অনাহুতেরাও। বসন্তরাগ বেজে উঠছে নহবতের বাজনায়। হাসিখুশিতে মশগুল হয়ে উঠেছে মেয়ে মহল ছেলেদের বারবাড়া। আঙিনায় আনন্দের ঢেউ বয়ে চলেছে পরস্পরের প্রীতি বিনিময়ের মধ্যে। ভিতরের আনন্দের ঢেউ গেটের বাইরে দর্শকদের অন্তর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দুলে উঠছে।

    সূর্য ডুবু ডুবু হয়েছে। লালচে আভা দেখা দিছে আকাশে। পণ্ডিত জানালেন বাবার কানে কানে—সকলকে শুভযাত্রার জন্যে প্রস্তুত হয়ে থাকতে হবে এবার। কনের বাড়ী যাবার যাত্রালগ্নের সময় হয়ে আসছে। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রশেখর। সুঠাম অঙ্গের সুপুরুষ চন্দ্রশেখরকে বিয়ের পোষাকে মানিয়েছে ভালো। ওর হাসি হাসি মুখখানা বড় সুন্দর দেখাচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে কথা কইতে কইতে গোলাপী সিল্কের রুমালটায় মুখ মুছছে থেকে থেকে।

    ছেলের আশপাশের সমবেতরা শুভযাত্রার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে। তাড়াড়ি বৃহদীশ্বর লিঙ্গদেবের আশীর্বাদী ফুল নিয়ে আসতে ভিতরে দৌড়লেন মা। সংগে দেবেন।

    একুশ বছর আগে তাঞ্জোর থেকে এনেছিলেন খুব যত্ন করে। সোনার কৌটোয় পুরে ঠাকুর ঘরে রেখে দিয়েছিলেন। কৌটোটাকে নিত্য সকাল সন্ধ্যায় পূজো করতেন বৃহদীশ্বর লিঙ্গদেবতার উদ্দেশে। তাঞ্জোরে এসে মায়ের অনেক দিনের সাধ মিটেছিল। মনের কথা শুনেছিলেন তাঁর বৃহদীশ্বর।

    কৌটোটায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন মা। ছেলেকে দেবেন বলে রূপোর সিংহাসন থেকে তুলে নিলেন। দেখছেন কৌটোর দিকে মা। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বৃহদীশ্বরের আড়াইশো ফিট উঁচু পাথরের মন্দিরটা। মন্দিরের ভিতরের গ্ৰেনাইট পাথরের বারোফুট উঁচু বৃহদীশ্বরশিবলিঙ্গ।

    একতারার সুর ভেসে আসছে কানে। একটি ভিখিরী মেয়ে নাট মন্দিরের সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে, সুমিষ্ট সুরেলা কণ্ঠে চোখ বুজে গাইছে—’গলে ভুজঙ্গ ভস্মলিঙ্গ শঙ্কর অনুরাগে’—

    গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তন্ময় হয়ে শুনলেন মা-বাবা। পাণ্ডা কাছে এসে মন্দিরের ইতিহাস শোনালেন।—বিখ্যাত চোল রাজাদের অক্ষয়কীর্তি এটা। এক হাজার তেইশ খৃষ্টাব্দ থেকে এক হাজার চৌষট্টি খৃষ্টাব্দ—এই দীর্ঘ এক চল্লিশ বছর ধরে মন্দির তৈরী করিয়েছেন রাজা রাজেন্দ্ৰ চোল, রাজেন্দ্র চোল ভারতগৌরব। তিনি ব্রহ্মদেশের কতকটা জয় করেছিলেন। আন্দামান নিকোবর অবধি রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।

    উপযুক্ত বাপ-মার উপযুক্ত সন্তান।

    পাণ্ডার কথায় মায়ের ভিতরটায় বোবাকান্না দাপাদাপি করতে লাগল। ছেলের মতো ছেলে। এরকম ছেলের মা কত ভাগ্যবতী। তাঁর কি একটা এরকম ছেলে হওয়া অসম্ভব। জমাব্যথা গলে গলে মায়ের দু’চোখের কোণ ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগল। অঝোরে ঝরে ঝরে পড়ছে চোখের জল। চোখের জলেই মনে মনে পূজো করলেন মন্দিরে দেবতাকে। পুরোহিত এসে মায়ের হাতে দেবতার নির্মাল্য তুলে দিয়ে গেলেন।

    নির্মাল্য মাথায় ঠেকিয়ে কর্তার মাথায় ঠেকাবেন বলে পিছন ফিরতেই দেখলেন, এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে রয়েছেন কর্তার পাশে। হাসছেন তিনি। চোখে মুখে হাসি উপচে পড়ছে। অবাক লাগল। কান্না দেখে এত হাসি। সন্ন্যাসীর কি কারো মর্মব্যথা বুঝতে নেই।

    মনের কথা তার মনের কানে নিশ্চয় শুনতে পেয়েছিলেন। সন্ন্যাসী হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, এরকম মায়ের একটা ভালো ছেলে দরকার। আমারই ইচ্ছে করছে আদর্শ মায়ের আদর খাবার জন্য মরে গিয়ে তোমাদের কাছে আসি আর একবার।

    মা দেখছেন একদৃষ্টে। সন্ন্যাসী বলে কি মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এইভাবে খোঁচা দিয়ে কথা কইতে হবে।

    খোঁচা আমি দিই নি মা। সন্ন্যাসীর গম্ভীর গলা। গম্ভীর মুখ। সত্যি কথাই বলেছি। একটু চুপ করে থেকে কিছু একটা ভেবে নিলেন যেন। চোখ দুটো বড় বড় করে মায়ের দু’চোখ দেখলেন। তারপর বললেন, ছেলে হবে। নিশ্চয়ই হবে। তবে একটা শর্ত-

    অফুরন্ত আনন্দের অনুভূতি শিহরণ জাগিয়ে তুলছে মায়ের সর্বশরীরে। মুখ দিয়ে কষ বেরুচ্ছে না। চোখ দিয়ে জল ঝরছে শুধু! ছেলে হবে। যে কোন শর্তই থাকুক না কেন—মেনে নিতে প্রস্তুত মা ছেলের বদলে।

    শর্ত শোনবার জন্য মা উদ্গ্রীব। সন্ন্যাসীর মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে আছেন।

    শর্ত শোনালেন সন্ন্যাসী। যে ছেলে আসবে সে সংসারের জন্য নয়। রাজী? কড়া জিজ্ঞাসা সন্ন্যাসীর।

    যে জন্যই আসুক—তবু আসবে তো। ঘাড় নাড়লেন মা। রাজী। জবাবটা শোনবার জন্যই যেন অপেক্ষা করেছিলেন সন্ন্যাসী। জবাব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত পায়ে চলে গেলেন সেখান থেকে।

    জোড়হাত করে সন্ন্যাসীর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাতে গিয়ে, কৌটো পড়ার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেলেন মা। নিজের অগোচরেই হাতের মুঠোটা খুলে ফেলেছিলেন তিনি। বুকের ভিতর ধড়াস করে উঠল মেঝের দিকে তাকিয়ে। কৌটোর ঢাকনি খোলা। শ্বেতপাথরের মেঝেয় পড়ে আছে বৃহদীশ্বরের নির্মাল্য—শুকনো বেলপাতা—ফুল।

    সযত্নে কুড়িয়ে নিয়ে কৌটোয় পুরলেন আবার। চোখের জলে প্রার্থনা জানালেন মা।—ঠাকুর ক্ষমা কর! শেখরকে সুখী কর।

    তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন ঠাকুর ঘর থেকে। কৌটোটা বুকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। পাছে পড়ে যায়। চন্দ্রশেখরের কাছে এলেন। ছেলের কপালে ঠেকিয়ে, আচকানের পকেটে রেখে দিলেন কৌটোটা। ছেলেকে হুঁশিয়ার করে দিলেন—দেখো যেন হারায় না!

    শুভলগ্ন উপস্থিত।

    বর বেরুবে এবার। উৎসবমুখর প্রাসাদে আচমকা বাজ পড়ল যেন। পড়ল মা-বাপের মাথায়ও। চোখকে অবিশ্বাস করতে ইছে করছে ওদের। মনে বলছেন, না, না—এ হতে পারে না কখনো। এ হতে পরে না কখনো। সশরীরে আসতে পারে না। এতদিন আসতেন রক্ত মাংসের দেহ নিয়ে নয়। আসতেন সূক্ষ্মশরীরে। এ সময়েও বা তার ব্যতিক্রম ঘটবে কেন?

    কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটছে। প্রকৃতই এগিয়ে আসছে বৃদ্ধ—তাঞ্জোরের সেই পরিব্রাজক সন্ন্যাসী। যাকে এতদিন গোপন করে রেখেছিলেন মা চন্দ্রশেখরের কাছে। এগিয়ে এলেন তিনি। চন্দ্রশেখরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখাচোখি হল দু’জনের।

    মায়ের ভীরুমন অনুনয় করতে লাগল সন্ন্যাসীকে মনে মনে।

    ওর শুভলগ্নে বাধা দেবেন না দয়া করে। আশীৰ্বাদ করুন-শেখর সুখী হোক।

    পিছু ফিরলেন সন্ন্যাসী।

    এগুতে লাগলেন সামনের দিকে। অনুসরণ করে চলল চন্দ্রশেখর।

    মায়ের ভিতরে ঘূর্ণিঝড় বইতে লাগল। ঝড়ের মধ্যে থেকেই সন্ন্যাসীর অনেক আগের বলা কথার প্রতিধ্বনি শুনতে লাগলেন মা। …সংসারের জন্য নয়।

    অস্ফুটে মায়ের মুখ দিয়েও বেরিয়ে এলো—সংসারের জন্য নয় শেখর।

  • গয়নার বাক্স

    গয়নার বাক্স

    জাফরি ঘেরা বারান্দার ভিতর থেকেই দেখল মানুষটাকে উর্মিলা।

    মানুষটার অপলক চোখের চাউনি দোতলার বারান্দায় নয় কেবল, পুরনো ঝরঝরে বাড়ীটার হাড়-পাঁজরা ভেদ করে যেন কোথায় গিয়ে আটকে পড়ছে মাঝে মাঝে। জাফরির এক ফাঁকে চোখ সরিয়ে সরিয়ে দেখেছে।

    ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছে না। এ কে—কেন এখানে? কেন অনুসরণ করে চলেছে তাকে? এ বাড়ীতে তো আর ক’টা দিন আছে মাত্র ঊর্মিলারা। এরকম সময় এমন লোকের হঠাৎ আবির্ভাবে কেমন অস্বস্তি বোধ করছে।

    অবাক হয়ে যাচ্ছে। রাস্তা পেরুবার চেষ্টা করছে লোকটা। ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় ফিরিয়ে গাড়ীগুলোর গতিপথ দেখে নিল ভালো করে। এগুচ্ছে সামনের দিকে। ঊর্মিলাদের বাড়ীর দিকে।

    বারান্দা থেকে চলে এলো উর্মিলা ঘরের ভিতর।

    পা ঝুলিয়ে বসল চারপাই-এর ওপর। জাফরির দিকে চোখ ফেরাল। লোকটা আসবে সদর দরজা পর্যন্ত। বন্ধ দরজা দেখে ফিরে যায়, না কড়া নেড়ে কাছে ডাকে বাসিন্দাদের—সেটাই দেখবার বিষয়। ডাকলে নীচে নামবে। দুঃসাহসী লোকটার মোকাবিলা করতে পিছপা হবে না একটুও।

    উর্মিলার ভিতরে সংশয়ের দানা বাঁধছে লোকটাকে ঘিরে। যদি সত্যিই কোন কাজ থাকত তার কাছে ওর, তাহলে অনেক সময়ই পেয়েছিল জানাবার। জানায় নি। যখুনি সুযোগ পেয়েছে তখুনি বোকা বোকা মুখ করে তাকিয়ে থেকেছে স্রেফ তার দিকে আর পিছু পিছু ঘুরেছে বাড়ী না আসা অবধি।

    এই দেখা আর ঘোরা পর্ব চলছে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ধরে। বাড়ী থেকে বেরুবার একটু পরেই। মাকে নিয়ে উর্মিলা টাঙায় চেপে চলেছিল গঙ্গা-যমুনা সঙ্গমে। বোশেখী পূর্ণিমায় মুণ্ডন করবে মা। পথে সামনাসামনি টাঙায় দেখা লোকটার সঙ্গে। ওর টাঙা আসছিল, ঊর্মিলাদের যাচ্ছিল।

    উর্মিলাকে দেখেই চেয়ে রইল। চোখ আর ফেরায় না। পলক আর পড়ে না। এ এক বিড়ম্বনা। পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে আদেশ করল ঊর্মিলা সইসকে। লোকটাও তার সইসকে গাড়ীর মুখ ঘোরাতে বলল।

    উর্মিলাদের সঙ্গম মুখো গাড়ীটা ছুটছে। নাগাল পাচ্ছে না পিছনের টাঙাটা। পাল্লা দিয়ে চালাবার জন্য সইসকে উত্তেজিত করে তুলল লোকটা।

    — বুড্ডে ঘোড়ে, বাচ্চে সইস, টুট হুয়ি গাড়ী। জো হোনেক হ্যাঁয় উয় হোতা।

    সইস সওয়ারীর বিদ্রুপ সইতে না পেরে ঘোডার পেটে সজোরে একটা লাথি মেরে বসল। দ্বিগুণ বেগে ছুটতে লাগল ঘোড়াটা। এলোমেলো চলছে টাঙা। সাইকেলরিক্সাটা তড়িঘড়ি পাশের রাস্তা না ধরে ফেললে সংঘর্ষ ঘটতে দেরী হত না একটুও।

    পথচারী সওয়ার আর অন্য সইসদের বাক্যবাণের বর্ষণ চলতে লাগল ছোট সইসের ওপর।

    প্রাণপণে আলগা লাগাম টেনে ধরল সে। মন্থর হল গাড়ির গতি। উর্মিলাদের গাড়ীর বরাবর চলছে এবার। উর্মিলা শুনতে পাচ্ছে সওয়ারীর গলা।—ঠিকসে চলো! নহী তো খোপরী তোড় দুঙ্গা।

    ফিরে তাকাল ঊর্মিলা। চোখাচোখি হ’ল সওয়ারির সঙ্গে। মুখে বকছে সইসকে। সইসের মাথা ভাঙছে বটে, কিন্তু তার দিক থেকে দু’চোখের নড়চড় দেখতে পাচ্ছে না একচুলও।

    ভালো লাগছে না মানুষটাকে। কেবলি মনে হচ্ছে একটা আপদ বুঝি পিছু নিয়েছে, বিষম অনর্থ ঘটবে বলে দুর্ভাগ্য আসে না একা। অনেক সঙ্গী-সাথী নিয়ে আসে।

    উর্মিলা এক নিদারুণ বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে চলছে। পিতৃভিটে ছাড়তে হবে মনে হ’লে, হৃৎপিণ্ডটাকে যেন পিষে ফিলতে থাকে কে। কিন্তু তবুও ছাড়তে হবেই। এই ভিটের মাটির সঙ্গে প্রাণ মন মিশে আছে তার। ভাঙা নড়বড়ে বলে পাথরের বাড়ীটা মায়ের মতোই দু’হাত বাড়িয়ে বুকে আঁকড়ে ধরেছিল এতদিন। সে-ও একদিন গেছে, আবারো আর একটা ভয়ঙ্কর দিন এগিয়ে আসছে তার সামনে। পথে দাঁড়ানোর দিন!

    ‘শিল্পায়ন’ করতে নেমে, অনেক ঝড়ঝাপটা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। অনেক রকম মনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়েছে। দেখেছে যেমন, চিনেছেও তেমন অনেককে।

    এসেছে অশুভ বুদ্ধির মানুষ। লালসার শ্যেনদৃষ্টি দিয়ে দেখেছে তাকে। তার রূপযৌবনের মহিমা কীর্তন করেছে পঞ্চমুখে। উপদেশ দিয়েছে কারো ঘরনী হ’তে, ভিক্ষুনী হ’তে নয়। ভিক্ষে-দুঃখু করে ‘শিল্পায়ন’ চালাবার ব্যর্থ আশা মনে পুষে না রাখাই ভালো।

    উর্মিলা দেখেছে উপদেষ্টাকে বড় বড় চোখ করে। শুনেছে তার কথা নির্বাক মুখে। তারপর দু’চোখের আগুন আগন্তুকের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে উঠে চলে গেছে।

    অপমান-অগ্রাহ্যের আগুনের জ্বালায় ছটপট করে উঠেছে আগন্তুক। জ্বালা উপশমের জন্য ঊর্মিলার সুনামে দুর্নামের কালি ছিটতে বিবেকে বাধেনি একবারের জন্যও।

    এরকম ঘটনা একটা আধটা নয়—ঊর্মিলার এই তিরিশ একতিরিশ বছর বয়েসের ভিতর বহু ঘটেছে। কোন প্ররোচনাই তাকে টলাতে পারে নি। তার ‘শিল্পায়ন’কেও নড়াতে পারেনি।

    অতি বড় শত্রুকেও অনেক সময় বলতে শোনা গেছে—উর্মিলা সাঙ্ঘাতিক শক্ত মনের মেয়ে। মন দেখার চোখ থাকলে দেখা যেত, ইস্পাত দিয়ে তৈরী ওর মন। এ অপবাদটা উর্মিলার পক্ষে আশীর্বাদ। অবিশ্যি আপনজনের কাছে তাই বলে হেসে কুটি কুটি হত। তবু কাছে কেউ আসবে না আর মন নরম করতে।

    ‘শিল্পায়নে’ কেউ উৎসাহ দেয় নি, কেউ সহায়তা করে নি বললে সত্যের অপলাপ করাই হবে। উৎসাহ দিয়েছে অনেক বাড়ির গিন্নীরা। সহায়তা করেছে অনেক কর্তা-গিন্নী—দু’জনে মিলে মেয়েদের ছুঁচের কাজ শেখাতে পাঠিয়ে দিয়েছে উর্মিলার কাছে মাসের পর মাস। অভিভাবক-অভিভাবিকাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছে ঊর্মিলা, পরিশ্রমের বিনিময়ে মাইনেটাই মস্তবড় সাহায্য। এতেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠবে তার শিশু প্রতিষ্ঠান একদিন না একদিন।

    বড় হয়ে উঠছিল বেশ। হঠাৎ ভেঙে গেল মাঝ পথে ঊর্মিলার স্বপ্নের সৌধ। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল উর্মিলা।

    উর্মিলার সীমার মধ্যে যারা ধরা ছিল, তাদের সকলেরই হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসন করে নিয়েছিল। তার স্বপ্ন ভেঙে যেতে, অন্য বিয়ের সাহায্য করতে পারে নি অনেকে নিজেদের অক্ষমতার দরুণ। তবুও চোখের জলের অর্ঘ দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে কৃপণতা করে নি কেউ।

    এটাও হয়তো চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে অতীতের মত-বিরোধী আকাঙ্ক্ষিতদের ভিতর কারো কারো। হয়তো এদেরই মধ্যে থেকেই কেউ না কেউ লোকটাকে এই ভাবে অনুসরণ করে চলতে নির্দেশ দিয়েছে। চোখে চোখে রেখো ঊর্মিলাকে। একেবারে নজরবন্দী। লোকচক্ষে হেয় প্রতিপন্ন হবে উর্মিলা তা হলে। এতদিনের অবহেলা আর অসম্মান করার ফল বুঝতে পারবে মর্মে মর্মে।

    লোকটার হাবভাবে সেই ইঙ্গিতই পাচ্ছে যেন। রাগে ফুঁসছে উর্মিলা। মনে হচ্ছে সইসের হাত থেকে চাবুকটা কেড়ে নিয়ে লোকটার পিঠের ছাল-চামড়া তুলে দেয় একেবারে। চাবুকের বাঁটের খোঁচায় দু’চোখ গেলে দিয়ে দেখার আশা মেটায়।

    ঊর্মিলার মুখখানা ভয়ানক গম্ভীর হয়ে উঠল। লোকটার দিক থেকে দৃষ্টি ফেরাল। ঘৃণাবিদ্বেষ তোলপাড় করছে ভিতরে। আত্ম-সম্ভ্রম বজায় রাখতে জানে সে ভালো করে। মর্যাদার ভিতে ফাটল ধরাতে দেবে না কাউকে জীবন থাকতে।

    মর্যাদার লড়াইয়ে হার মানতে চায় নি বলেই শ্বশুর বাড়ীর সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়েছিল এক সময়। শাশুড়ী দেওর অনেক অনুরোধ উপরোধ করেছিল থাকতে। থাকে নি উর্মিলা। রাতদুপুরে স্বামীর হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ী থেকে।

    মদের নেশায় মত্ত অবস্থা তখন স্বামীর। কথা এড়িয়ে যাচ্ছে। সর্বশরীর টলছে। দেহের অনেক জায়গায় ক্ষত হয়ে গিয়ে রক্ত ঝরছে। মেরেছে দেওর, মেরেছে শ্বশুর। মায় দারোয়ান পর্যন্ত বাদ যায়নি ওর গায়ে হাত তুলতে। একটা বিবেক-মৃত অবস্থার লোকের ওপর কি অমানুষিক অত্যাচার না করল সেদিন বিবেকবানেরা।

    এতটা দাঁড়াবে ধারণার বাইরে ছিল তার। কিছুটাও আভাস যদি পেত আগে, তা হলে সবার বারণ সত্ত্বেও, নিজের জিদ বজায় রাখবার জন্য লখিয়াবাই-এর বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হত না কখনো।

    শ্বশুর বারণ করেছিল, দরকার নেই বৌমা। জাহান্নামে যাক ও। ও নোংরা পাড়ায় যাওয়া তোমার উচিত হবে না। এ ঘরের বৌ হয়ে বিশেষ করে ওখানে…মান ইজ্জতের ব্যাপার এটাই।

    মান ইজ্জতের ব্যাপার এটাই—ওকে ওখান থেকে সরিয়ে আনা বেলেল্লাপনা করতে আর না দেওয়া। শ্বশুরের মুখের ওপর বলেছিল উর্মিলা।

    উর্মিলার মাথায় একটা পাগল জিদ চেপে গেছল সে সময়। জিদটা দিনে দিনে পরিপুষ্টি লাভ করেছে। আর সেটা হয়েছে শ্বশুরের বিমর্ষ মুখ দেখে দেখে।

    শ্বশুর ঘরে এনেছিল তাকে অনেক আশায় বুক বেঁধে। শ্বশুরের মুখের দিকে তাকালেই মনে পড়ত কেবল আগেকার কথাগুলো।

    কনে দেখতে এসেছে শ্বশুর। উর্মিলাকে দেখে সাক্ষাৎ মেনকার মেয়ে গৌরীকেই দেখল একেবারে! আনন্দে সকলের সামনেই বলে উঠল—এই মেয়েই ফেরাতে পারবে আমার কুন্দনলালকে। তবে হ্যাঁ, কুন্দনলাল মহাদেব নয়। মহাপাতক সে। দুটো ছেলে মরে যাবার পর ও। তাই শতসহস্র দোষ ওর চোখ বুঝে উপেক্ষা করেছে গিন্নী। বলেছে, দস্যি দুষ্ট হয়ে বাঁচে যদি বাঁচুক কুন্দন।

    গিন্নীর প্রশ্রয়ে প্রশ্রয়ে পাষণ্ড হয়ে উঠেছে কুন্দন। বেপরোয়া বেহায়া বড় হলে স্বভাব শোধরাবে ভেবেছিল হিতাকাঙ্ক্ষীরা। কিন্তু ফল দেখা গেল উল্টো, স্বভাব তো শুধরোয়নি-ই বরং বেড়েছে আরো। নানা উপসর্গও দেখা দিয়েছে। বাইজী আর মদের নেশায় বিবেক পর্যন্ত হারিয়েছে। গিন্নী সব জেনে শুনেও, ছেলেকে মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য নাকি লুকিয়ে চুরিয়ে, টাকা দিয়ে দিয়ে ওর অপকর্মের ইন্ধন যুগিয়ে আসছে। প্রতিবাদ করলে একেবারে মোক্ষম যুক্তি। ওকে যদি সবাই ঘেন্না করে, তাহলে স্বয়ং যমও দু’চক্ষে দেখতে পারবে না। গা ঘিন ঘিন করে সে নিজেই মরবে। ও আমাদের ঘরজোড়া করে বেঁচে থাকবে।

    মাকে ছেলের গুণকাহিনী শুনিয়ে, জিজ্ঞেস করেছিল শ্বশুর—নিছক মেয়ের ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্য এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজী আছে কি না।

    জবাব দিয়েছিল মা। এরকম সরল বাপের ছেলে কি খারাপ হতে পারে কখনো? খারাপ হলেও, বেশীদিন থাকে না। সাবিত্রী যদি বুদ্ধির জোরে মরা স্বামীকে যমের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে, ঊর্মিলা একটা উচ্ছৃঙ্খল স্বামীকে বশে আনতে পারবে না নিজের বুদ্ধির জোরে?

    এক মুখ হেসে বলেছিল শ্বশুর। সেই আশায় তো আসা। উর্মিলার চিবুক ধরে, আদর করে প্রশ্ন করেছিল, কি গো মা পারবে না?

    কথা না কয়ে মুখ টিপে হেসেছিল শুধু অষ্টাদশী সুন্দরী উর্মিলা।

    ছেলেকে ঘরমুখো করার জন্য সব বিষয়েই স্বাধীনতা দিয়েছিল শ্বশুর উর্মিলাকে।

    স্বাধীনতার অপব্যবহার করেনি একটুও উর্মিলা। স্বামীকে অনুনয় বিনয় করেছে রাতে বাড়ী থাকতে। রুখতে পারে নি। ব্যর্থ হয়েছে চেষ্টা। আহার নিদ্রা ত্যাগ করে প্রতিদিন জানলার ধারে বসে বসে দু’চোখের জলে বুক ভাসিয়েছে কেবল নিজেরই। স্বামীর অন্তর গলাতে পারে নি এক মুহূর্তের জন্যও। পাষাণ মনকে টেনে আনতে পারেনি তার দিকে। বুঝেছে এ মানুষকে এসবে আটকানো যাবে না। এতদিন ধরে পণ্ডশ্রম হয়েছে শুধু তার। অন্যপন্থা অবলম্বন করেছে।

    বেরুবার সময় সামনে দাঁড়িয়েছে। পথ আটকেছে। যেতে দেবে না। ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেছে কুন্দন। এই ভাবে রোজ পথরোধ করায় হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেছে দু’জনের ভিতর। তবু কুন্দনকে বশে আনতে পারে নি উর্মিলা।

    শ্বশুরের মুখের হাসি শুকিয়েছে। ঊর্মিলার সঙ্গে দেখা হলে মলিন মুখ আরো মলিন হয়ে ওঠে। বুকভাঙা দীর্ঘনিশ্বাস ঝরে পড়ে। ঊর্মিলার ভিতরে হাহাকার করে ওঠে।

    আপসোস করে বহুবার বলেছে শ্বশুর, নিজের ছেলেকে ফেরাতে গিয়ে, একটা মায়ের মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলুম নিজে হাতে। এর প্রায়শ্চিত্ত কি করে হবে আমার!

    সান্ত্বনার শান্তিবারি ছিটতে চেষ্টা করেছে উর্মিলা শ্বশুরের মাথায়। বাবুজী প্রায়শ্চিত্ত করতেই বা যাবে কেন অকারণে। অপরাধী উর্মিলা। যদি কাউকে প্রায়শ্চিত্ত করতেই হয়, তা ঊর্মিলাকেই করতে হবে। সাবিত্রীর মতো বুদ্ধির জোর কোথায় তার? মনে পড়ে যেত মায়ের কথা। সাবিত্রী যদি বুদ্ধির জোরে মরা স্বামীকে…নিয়ে আসতে পারে। উচ্ছৃঙ্খল স্বামীকে বশে নিজের বুদ্ধির জোরে? শ্বশুরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কথাও কানে ভেসে আসত। কি গো মা পারবে না?

    উর্মিলার ঘা খাওয়া মন কেমন যেন চনমনে হয়ে উঠত। হতাশায় ঝিমিয়ে পড়া মন যে হঠাৎ এত জোরাল হয়ে উঠত কোথা থেকে বুঝতে পারত না। মাথার মধ্যে একটা কথাই খালি ঘুরপাক খেত। পারবে। নিশ্চয়ই পারবে।

    শেষ চেষ্টা ঊর্মিলার। মন্ত্র সাধন কি শরীর পতন। সব হয়ে গেছে তার। লখিয়াবাই-এর বাড়ী যাওয়াটাই বাকি শুধু।

    লখিয়াবাই-এর বাড়ী থেকে তুলে আনবে তার স্বামীকে। না পারলে আত্মঘাতী হবে সে। আপত্তি সত্বেও জিদে অচল অটল দেখে, মত দিয়েছিল শ্বশুর বাধ্য হয়ে।

    গেছল লখিয়াবাই-এর বাড়ীতে ঊর্মিলা।

    লাল ফরাশের ওপর তাকিয়া ঠেসান দিয়ে বসে আছে লখিয়াবাই-এর গুণমুগ্ধরা। সারেঙ্গীর সুরে গলা মিলিয়ে গাইছে লখিয়াবাই। কিধার হ্যাঁয় তেরে দিল, কিধার জা রহে হ্যাঁয়… কোথা থেকে আসে অন্তর তোমার ফিরে যায় কোথায় আবার, যেথা থেকে আসে লাঞ্ছনা সয়ে—ফিরে যেতে চায় সেথা আবার। শ্রোতার দল মাথা দোলাতে দোলাতে বাহবা দিচ্ছে জড়ানো কথায়। কুন্দন চোখ বুজে মুখ বুজে দুলছে খুব। এও এক ধরনের গানের তারিফ করা হয়তো।

    সাদা সিল্কের ওড়নায় আপাদমস্তক ঢাকা উর্মিলার। দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সব। পাতলা ওড়নার ভিতর দিয়ে দেখছে লখিয়াবাইকে। দেখছে কুন্দনকে। নিজের ভাবে এত বিভোর ওরা, উর্মিলার দিকে কোনো লক্ষ্য নেই। লক্ষ্য পড়ল সামনের দিকে মুখ ফেরাতে লখিয়াবাই-এর।

    ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় লখিয়াবাই-এর হীরের নাকছাবিটা ঝকমক করে উঠল। নানা রঙের আলো ঠিকরে ঠিকরে পড়তে লাগল উর্মিলার ওড়না ঢাকা মুখে।

    এগিয়ে এলো লখিয়াবাই-এর সামনে উর্মিলা। আত্মপরিচয় দিয়ে, দৃঢ়কণ্ঠে জানাল, সে তার স্বামীকে নিয়ে যাবে এখনি থেকে এখুনি। সুরের রাজ্য থেকে অসুরের রাজ্য নেমে পড়ল লখিয়াবাই সঙ্গে সঙ্গে। যে মেয়ে এসে তার সুরের ছন্দ কেটে দিয়েছে মাঝপথে, সে ক্ষমার অযোগ্য লখিয়াবাই-এর কাছে। তাকে আর দেরী না করে গলা ধাক্কা দিয়ে ঘরের বাইরে, বাড়ীর বাইরে বার করে দেওয়া উচিত।

    মুখ থেকে কথা খসবার সঙ্গে সঙ্গে লখিয়াবাই-এর অনুচররা এগিয়ে এলো উর্মিলার কাছে। অনেক কটুকাটব্য করল তারা উর্মিলাকে। রাতে যে মেয়ে এখানে আসে, সে কেমন ধারা তা আর বুঝতে বাকি আছে নাকি কারো। বেশ তো মুখের ওড়নাটা সরিয়ে দেখলেই সব ঝামেলা চুকে যায়। সুন্দরী হলে থাক। নইলে দূর করে দেওয়া হোক। রাগে ঠক ঠক করে কাঁপছে উর্মিলা। তীব্র তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল –ওড়না খুলতে হয় ওই ভদ্রলোককে বলুন না। ওর দু’চোখে জলের ছিটে দিয়ে ঝিমুনিটা কাটিয়ে দিন না।

    পাশ থেকে একজন টিপ্পনী কাটল–ওরে বাব্বা! গলার জোর আছে বেশ। রোখ দেখ না! কুন্দনকেই চায় ও। ভালো ভালো। পছন্দসই মানুষ বটে কুন্দন। তাছাড়া আমীরওমরহ লোকও তো বটে।

    ওড়নাঢাকার ভিতরে দু’হাত নিশপিশ করে উঠছে উর্মিলার। লোকটার গালে কষে চড় বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।

    কুন্দনকে আসতে দেখে, সংযত করে নিল নিজেকে। একজন টেনে নিয়ে আসছে ওকে।

    কাছে এসে মুখের ওড়না খুলে দিয়েই হতভম্ব হয়ে গেল কুন্দন। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল খানিক। ভালো করে চোখ রগড়ে রগড়ে দেখল। ভুল দেখছে কি ঠিক দেখছে। তারপর উর্মিলার ডান হাতখানা সজোরে চেপে টেনে নিয়ে চলল বাইরে।

    বাড়ী এসে তুলকালাম করেছে বাবার সঙ্গে, ভায়ের সঙ্গে, উর্মিলার সঙ্গে। কেন ঘরের বৌ বাইরে যাবে। সবাইকে দেখে নেবে সে। বাপ-ভাই বৌকে ভোরে উঠে আর দেখতে পাবে না কেউ।

    শাসানিটা যদি স্রেফ মুখের কথাতেই আটকে থাকত তাহলে কোন গণ্ডগোলই বাধত না আর। দুহাতে উর্মিলার গলা চেপে ধরল কুন্দন। শেষ না করে ছাড়বে না। এগিয়ে এলো ছাড়াতে শ্বশুর। এগিয়ে এলে দেওর। উর্মিলাকে ছাড়াবার জন্য, বাঁচাবার জন্য একটুও ইতস্তত করে নি যেখানে সেখানে আঘাত করতে কুন্দনকে। কুন্দন ছেড়েছে উর্মিলাকে। দারোয়ান দিয়ে বার করে দিয়েছে শ্বশুর ছেলেকে।

    এক এক করে শ্বশুরের দেওয়া সমস্ত গয়না খুলে ফেলেছে ঊর্মিলা। তারপর খোলা গয়না আর তোলা গয়নার বাক্সটা সুদ্ধ, শ্বশুরের পায়ের কাছে ধরে দিয়ে প্রণাম করে এক কাপড়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ী থেকে। স্বামীর হাত ধরে লক্ষ্ণৌ থেকে এলাহাবাদে মায়ের কাছে এসে উঠেছে।

    ছেলেকে ছাড়তে চেয়েছিল শ্বশুর চিরকালের জন্য। কিন্তু ছেলের বৌকে ধরে রাখতে চেয়েছিল বরাবরের জন্য। বলেছিল, বৌমা! ও যাক! তুমি আমায় ছেড়ে যেও না।

    কান্নাভেজা গলায় বলেছে উর্মিলা, যেখানে দরোয়ান দিয়ে মারতে মারতে বার করে দেওয়া হয়েছে ওকে—সেখানে তাকেও ওই সঙ্গে ওই ভাবে বার করে দেওয়া হয়ে গেছেই।

    শ্বশুর বাড়ী ছেড়ে চলে এলেও, ঊর্মিলার সাধনা যে সার্থক হয়েছে একথা বলতেই হবে। স্বামীকে কাছে চেয়েছিল, পেয়েছে। স্বামীর মন-আত্মা ওর মন-আত্মীয় বাঁধা পড়েছে। সুরা ছেড়েছে স্বামী ছেড়েছে লখিয়াবাই-এর সুখ স্বপ্নের নেশাও। ঊর্মিলাকে না দেখতে পেলেই দিশেহারা হয়ে পড়ে।

    উর্মিলা কিন্তু স্বামীকে দেখেই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল একদিন হঠাৎ। স্বামীর দিকে ভালো করে লক্ষ্য করতে বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। কষ্টিপাথরের মতো কালো মানুষটা সাদাটে হয়ে গেছে যেন। ধার কর্জ করে ডাক্তার বৈদ্য দেখিয়েছে। রক্ত শূন্যতা অসুখ সারাতে পারেনি। বাবাকে জানাবার জন্য বলেছে কুন্দনকে। রাজী হয়নি ও। বরং রেগে গিয়ে দু’কথা শুনিয়ে দিয়েছে। তুমি দেখতে পারো দেখবে। না পারলে স্পষ্ট বলে দেবে। যেখানে দু’চোখ যায় চলে যাবো।

    চলে যেতে দেয়নি কোথাও ঊর্মিলা কুন্দনকে। সেবা যত্ন চিকিৎসায় ক্রটি করেনি কোনদিন ওর! বাপের কোন সাহায্য নেবে না ছেলে মরে গেলেও—শুনে এগিয়ে এসেছে জামাই-এর জন্য মা-ও। নিজের একমাত্র সম্বল ভাঙা বাড়ীটাও বন্ধক দিয়ে টাকা যোগাড় করেছে জামাই-এর চিকিৎসা পথ্যের জন্য। ছুঁচসুতোর যাদুতে জামা কাপড়ের ওপর রঙ বেরঙের বিচিত্র নক্সা তুলে মেয়েদের নক্সার কাজ শিখিয়ে যা পেয়েছে মা-মেয়ে, নিজেরা পেটে না খেয়ে সব ঢেলেছে কুন্দনকে বাঁচতে।

    বাপের বাড়ী আসা থেকেই মাঝে মাঝে শ্বশুর খরাখবর নিত। ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে ছেলে-বৌকে। ওদের না যাবার ধনুকভাঙা পণ থেকে একপাও সরাতে পারে নি। অসুখ বাড়াবাড়ি হতে, মা-বাবা-ভাই এসেছে। ওদের দেখে মুখ ফিরিয়ে শুয়েছে কুন্দন।

    এই ভাবেই সবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে উর্মিলার চোখে চোখ রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল কুন্দন একদিন। দু’বছরে মধ্যেই বিধিলিপির নির্মম কশাঘাতে স্বামী সোহাগিনীর সোহাগন-এয়োতীর চিহ্ন মুছে গেল।

    শ্বশুর-শাশুড়ীর অনেক অনুরোধ উপরোধ সত্ত্বেও, এরপর আর ফিরে যেতে চায়নি উর্মিলা। জোড় হাত করে, বিনয়ের সুরে বলেছে, এখানে ও গেছে। এ ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি।

    বিব্রত বোধ করেছে শ্বশুর! ভেবেছে, যেতে বলে ঊর্মিলার মর্মস্থানে আঘাত দিয়ে ফেলেছে। ধরা গলায় বলেছে, ঠিক আছে বেটী। ঠিক আছে। ভিটে ছেড়ে যেতে হয়নি উর্মিলাকে। ছেলে থাকতে যেমন আসত শ্বশুর, ছেলে চলে যাবার পরও সে ভাবটা বজায় রেখেছিল মাঝে মাঝে এসে। মেয়েদের শেখানো দেখেছে কতদিন ঊর্মিলার পাশে বসে বসে। খুশী হয়েছে খুব। শ্বশুরের খুশীর ছায়া তারও মুখে ফুটে উঠেছে। মন বুঝে কথা তুলেছে শশুর। যখের ধন আগলে আর বসে থাকতে পারছে না। কেবলি মনে হচ্ছে, বেশীদিন বাঁচবে না বুঝি। উর্মিলাকে দেওয়া গয়না উর্মিলারই প্রাপ্য। আর কারো নয়।

    হাসতে হাসতে বলেছে উর্মিলা, বাবুজী, কিছু চাইনে আমি। তোমার আশীর্বাদই আমার গয়না ঐশ্বর্য সব কিছু।

    শিল্পায়নের নাম করেও অর্থ সাহাৰ্য্য করতে চাইলে, উর্মিলার মুখে ওই একই কথা শুনতে পেত শ্বশুর। কোন বাদ প্রতিবাদ না করে, ম্লান মুখে ঊর্মিলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত শুধু শ্বশুর।

    শ্বশুরও আজ নেই। তবে কেন মনে হচ্ছে পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে? হয়ত দুর্দিনে অতীতের স্নেহস্মৃতিকে আগোচরেই সামনে টেনে এনে সান্ত্বনার অবলম্বন খুঁজেছে সে।

    শ্বশুরের জন্য ভিতরে যে রকম আকুলিবিকুলি করছে এখন—ঠিক তার মৃত্যুর সময়ও হয়েছিল। তখন মেয়েদের হাতের কাজ শেখাচ্ছে উর্মিলা। শেখানোয় মন বসাতে পারছে না কিছুতেই, শ্বশুরের ছল ছলে দুচোখ আর বিমর্ষ মুখখানাকে চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছিল না শত চেষ্টা করেও। মেঘলা আকাশের দিকে চেয়েছে মন ঘোরাতে—আরো বেশী উতলা হয়ে পড়েছে। তারপর কি যে হয়েছে, কেমন করে ঘর ছাড়া হয়ে স্টেশনে এসে ট্রেন ধরে লক্ষ্ণৌতে পৌঁছেছে—আজো চিন্তা করেও কোন হদিস পায়নি তার।

    …শ্বশুরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে গেছে। শশুর যাবার পথে। দু’চোখের দৃষ্টি আটকে পড়েছে ঊর্মিলার মুখেব ওপর। মনে হল ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল একবার। কিছু বলতে চেষ্টা করল বুঝি। পারল না। অবোল হয়ে গেছে। দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল শ্বশুরের।

    ঊর্মিলার চোখের কোণ জ্বালা করে উঠছে। তিন বছরের আগের লোকটা নতুন করে যন্ত্রণা দিতে সুরু করছে আবার।

    পাশাপাশি দুটো টাঙা চলছে। উর্মিলার তাকাতে ইচ্ছে করছে না আর ও টাঙার সওয়ারীটার দিকে। না তাকিয়েই বেশ অনুমান করতে পারছে লোকটা একদৃষ্টে দেখছে তাকে এখনো।

    গন্তব্যস্থলে এসে টাঙা দুটো থামল একসঙ্গেই। মা আর উর্মিলা দু’জনে নেমে পড়ল তাড়াতাড়ি। লোকটা কিন্তু নামল না। বসেই রইল টাঙায়। হয়তো অনেক লোক দেখে এই ব্যবস্থা।

    মায়ের মুণ্ডন সারা হলে, এক গোছা চুল নিয়ে গঙ্গাযমুনার মিলনের জলে ডুবিয়ে দিল। ইচ্ছেটা ছিল মায়ের অনেক দিন ধরে। বাড়ী ছেড়ে কোন অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে হবে কোথায় কে জানে। আগে থেকেই তাই সেরে নেওয়া হল মুণ্ডনটা।

    গাড়ীতে এসে বসেছে মা-মেয়ে। অনিচ্ছা সত্বেও, পাশের টাঙার লোকটার চোখে চোখ পড়েছে আবার। একই ভাবে বসে আছে। নির্জীব পাথরমূর্তি একেবারে। কিন্তু চোখ দুটো সজীব-সচল। ওপর-নীচে করছে কেবল। ঊর্মিলার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি দেখছে বারবার। দেখে দেখেও দেখার সাধ যেন মিটতে চাইছে না আর।

    পশ্চিমের খেয়ালী বাতাসে উর্মিলার কালো কুচকুচে কোঁকড়ানো এলোচুল গাল-কপাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ছে। হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে ঊর্মিলা। পাশের টাঙার পাথরমূর্তিটা নড়ল এবার। বেহায়া নির্লজ্জের মতো ঝুঁকে পড়ে চুল সরানো দৃশ্যটা দু’চোখ দিয়ে গিলতে লাগল যেন। ঊর্মিলার নিজের ওপরেই বিরক্ত এলো। মায়ের মতো মাথা মুড়িয়ে চুলগুলো সঙ্গমের জলে ফেলে দিয়ে এলো না কেন সে।

    আমি বেঁচে থাকতে এদৃশ্য দেখতে পারবো না রে। মরলে যা হয় করিস। মায়ের এসব কথা না শুনলেই ভাল করত সে।

    টাঙাগাড়ী চলছে। গতি বাড়ছে ধীরে ধীরে। লোকটার গাড়ীও তালে তাল মিলিয়ে চলছে উর্মিলাদের গাড়ীর সঙ্গে।

    বাড়ীর কাছ বরাবর অসতেই গাড়ীটা রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। নিশ্চয়ই সওয়ারীর ইঙ্গিতেই দাঁড়াল গাড়িটা। লোকটা নামল। এপারের গাড়িটার ওপর চোখ রেখে ওপার ধরেই এগুচ্ছে।

    লোকটা গাড়ী ছেড়েছে। সঙ্গ ছাড়েনি। এটা অদ্ভুত ঠেকছে উর্মিলার কাছে। হয়ত গাড়ীসুদ্ধ, ধরা পড়লে পালানো অসুবিধে—তাই এই নীতির আশ্রয়।

    বাড়ীর সামনে এসে টাঙা থেমেছে ঊর্মিলাদের। তাড়াতাড়ি নেমে পড়েছে মা-মেয়ে। ভিতরে ঢুকেই দরজায় খিল এটে দিয়েছে উর্মিলা। ওপরে উঠেছে এরপরে। জাফরি ঘেরা বারান্দা থেকে দেখেছে লোকটাকে। ওপারে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ীর দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি।

    বারান্দা থেকে ঘরে এসেছে। চারপাই-এ বসে চোখ ফিরিয়েছে জাফরির চারকোণা ফাঁকে। লোকটা এগিয়ে আসছে বাড়ীর দিকে। উৎকর্ণ হয়ে প্রতীক্ষা করছে উর্মিলা সদর দরজায় কড়াটা নড়ে উঠছে কিনা।

    প্রতীক্ষার তাবসান হতে বেশী লাগল না ঊর্মিলার। কড়ানাড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে।

    রাগে সর্বশরীর জ্বলে উঠল। লোকটাকে উচিত মতো শিক্ষা দিতে হবে। উঠে পড়ল চারপাই থেকে। দরজা খুলে মা-ই লোকটার সঙ্গে কথা কইতে চেয়েছিল। উর্মিলাকে নীচে যেতে বারণ করেছিল। মায়ের নিষেধ না শুনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে উর্মিলা। তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে, দরজা খুলে দিয়েছে। লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সোজা হয়ে। ইতর অভদ্র বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান—অনেক কিছু বলবার জন্য অনেক ভাষাই মুখে যুগিয়েছিল। কিন্তু একটা কথাও বেরয় নি। কথার আদি অক্ষরটা পর্যন্ত না।

    ওর ওপরে ঊর্মিলার ধারণা বুঝতে পেরেছিল যেন লোকটা। উর্মিলার মুখের ওপর থাপ্পড় মেরেছিল একটি মাত্র শব্দে-বহিন! বহিন! বিশেষ জরুরী কাজে এসেছি আপনার কাছে। ক্ষমা করবেন অসময়ে বিরক্ত করার জন্য।

    মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল উর্মিলার একেবারে। উর্মিলা বিস্মিত চোখে দেখছিল ওর দু’চোখ। দুঃসময়ে মতিবিভ্রম হয় মানুষের। অকারণ এতক্ষণ ধরে একটা অত বড় ভদ্রকে কত ভুল না ঠাউরেছে! বিস্ময়ের সীমা পরিসীমা রইল না উর্মিলার—যখন আগন্তুক দেবীপ্রসাদ তার সমস্ত কথা শোনাল।

    দেবীপ্রসাদ দেশে ছিল না এতদিন। আমেরিকায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে গেছল। শিকাগোর গ্র্যাণ্ডপার্কে বাকিংহাম ফোয়ারা দেখছিল যখন—আলো আর ফোয়ারার জলের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে একটা তন্ময়তা এসে গেছল দেবীপ্রসাদের—ঠিক সেই সময় উর্মিলাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে স্পষ্ট।

    দেখাটার কোন গুরুত্বই দেয় নি প্রথমে। দ্বিতীয়বার ইলিনয়স রাজ্যের প্রাচীন পাখী জন্তু আকারের ঢিবি গুলো দেখে অতীতে ফিরে যাচ্ছিল। যেতে যেতে এমন জায়গায় পৌঁছল, যেখানে কেমন যেন হয়ে গেল। আশ্চর্য! এবারেও উর্মিলাকে দেখল। তবে ঊর্মিলার মুখখনায় ঘন বিপদের ছায়া নেমেছে এবার। একই মেয়েকে অদ্ভুত ভাবে দু’বার দেখল। দেখল তার কায়া নয়। সপ্নের মূর্তির মতো। এরকম চেহারার কোন মেয়েকে আজ পর্যন্ত দেখে নি। অথচ দেখছে। কেন?

    বন্ধুবান্ধবকে জানিয়ে ছিল। তারা হেসেছে। বিদ্রুপ করে নানা কথা বলেছে। অনেকে মাথা খারাপের লক্ষণও দেখেছে নাকি তার ভিতর।

    হঠাৎ বাবা মারা যাবার পর স্বপ্নে উর্মিলাকে দেখতে লাগল প্রায় রোজই। লক্ষ্ণৌতে এসে আবার বাবার সঙ্গে উর্মিলাকে দেখতে পেত স্বপ্নে। তিনচারদিন আগে সারারাত ধরে দেখেছে একই স্বপ্ন। শেষের দিনে দেখল একটা নতুন জিনিস। বাবা আর উর্মিলার মাঝখানে একটা কাজ করা গয়নার বাক্স। দেখে, ঘুমুতে পারে নি একদম, চোখের পাতা এক করতে পারে নি এক বারের জন্যও। শেষে উঠে পড়েছে বিছানা থেকে। ভিতরটায় অস্থির অস্থির করছিল বড়। ঘরময় পায়চারি করছিল ঘন ঘন। কেন করছিল, কেন তার অমন হচ্ছিল—কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না।

    স্ত্রী সব শুয়ে শুয়ে লক্ষ্য করেছে। দেবীপ্রসাদের মুখে স্বপ্নকথা শুনে চমকে উঠেছে। মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ভয়ে ভয়ে স্বীকার করেছিল নিজের দোষের কথা। গোপন ব্যাপারের কথা। দেবীপ্রসাদের বাবার শরীরটা একটু খারাপ মনে হতে, স্ত্রীকে ডেকে বলেছিল, বাল্যবন্ধুর পূত্রবধূ ঊর্মিলার গয়নার বাক্স জমা রেখে গেছে বন্ধু মরবার ক’দিন আগে। যদি কখনো বিপদে পড়ে উর্মিলা, যদি তার প্রয়োজন হয়, তখন তারই প্রাপ্য জিনিস যেন দিয়ে দেওয়া হয় তাকে। বুঝিয়ে বলা হয় যেন, শ্বশুরের শেষ অনুরোধ নাকচ না করে যেন বৌমা।

    একথাও অকপটে জানিয়েছিল স্ত্রী, বাবার কাছ থেকে গয়নার বাক্সটা পেতে, সত্যিই লোভ হয়েছিল খুব। ভেবেছিল, কেই বা জানতে পারবে চেপে গেলে। কিন্তু চেপে রাখবার চেষ্টা করেও পারে নি। স্বপ্ন দেখার কথা শোনা মাত্র, বুক ঠেলে ঠেলে আপনা হতেই বেরিয়ে আসছিল কথাগুলো।

    স্ত্রীর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে দৌঁড়ে এসেছে দেবীপ্রসাদ। দেখেছে উর্মিলাকে। একবার নয়। বহুবার। দেখে দেখে স্বপ্নের মেয়ের চেহারার সঙ্গে প্রতিটি অঙ্গ মিলিয়েছে ঊর্মিলার। নিখুঁত ভাবে মিলে গেছে। এখন বহিনের গচ্ছিত জিনিস ফেরত আনবে বলে জানাতে এসেছে।

    বিস্ময়ের ঘোর কাটছে উর্মিলার। মনে হচ্ছে শশুর একবার বলেছিল… উর্মিলাকে দেওয়া গয়না ঊর্মিলারই প্রাপ্য। আর কারো নয়। মনে পড়ছে, স্বামী মারা যাবার পর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল শ্বশুর। উর্মিলা বলেছিল, এখানে ও গেছে, এভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি। শশুর বলেছিল, ঠিক আছে।

    সুদে আসলের দায়ে বাড়ীটা বিক্রি হয়ে যাবে আর দিন সাতেক বাদে। এমন সময় —

    ছেলেমানুষের মতো মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ফোঁপাতে লাগল ঊর্মিলা। উর্মিলা বেশ অনুভব করছে, শ্বশুর যেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আস্তে আস্তে।

    উর্মিলার মুখে তার জীবনের অভাবনীয় ঘটনা শুনে আমি স্থাণুর মতো বসেছিলুম চুপচাপ!

  • সুবীরের প্রত্যাবর্তন

    সুবীরের প্রত্যাবর্তন

    পরদাটা থেকে থেকে নড়ে উঠছে। পিছন থেকে কেউ যেন সরাবার চেষ্টা করছে। যে দাঁড়িয়ে আছে ওখানে তার আলগা মুঠোয় পরদার মাঝখানের কিছু অংশ চলে যাচ্ছে, আবার সরেও আসছে সঙ্গে সঙ্গে।

    অদ্ভুত ব্যাপার। কেউ ভিতরে আসছে না, আসবার কথা বলছেও না মুখে। আমার জিদ বাড়ছে, নিজে হতে ডাকব না কিছুতেই। দেখাই যাক না। পরদার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছি। ডিমলাইটের আলোয় খয়েরি রঙটা কাল্‌চে দেখাচ্ছে আমার চোখে। এরকম দেখায় না কোনদিন। আজ ভরসন্ধ্যে থেকে এই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যখুনি ওদিকটায় তাকিয়েছি তখুনি রঙ বদলে যেতে দেখেছি। হয়তো কয়েক বছর আগের একটা নৃশংস কালো ছবির ভাবনা সারাদিন ধরে পেয়ে বসেছে বলে।

    কালো ছবি। নির্মম মৃত্যু। সুবীরের মৃত্যু। সুবীরের শেষনিশ্বাস ফেলার সময় আমি দেখিনি। ওর কাছে ছিলুম না। তবে মৃত্যু যখন ওর শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে গ্রাস করবার জন্য উদ্‌গ্রীব, তখন ওর মুমূর্ষু অবস্থা দেখেছিলুম আমি। কথা বন্ধ চোখ বন্ধ। শ্রবণ শক্তিও লোপ পেয়েছিল বোধ হয়। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জোরে জোরে ডেকেছি নাম ধরে। শুনতে পাওয়ার কোন লক্ষণই প্রকাশ পেতে দেখিনি ওর মুখের কোন জায়গায়। ক্ষীণ নিশ্বাস পড়ছিল। নাড়ার গতিও ভালো নয়। হাত-পা-দেহের কোন অঙ্গই নড়তে দেখিনি। সব একেবারে শক্তি হারা। যেন একটা কাঠের পুতুল পড়ে রয়েছে লাল বাড়ির রকটার ওপর। চব্বিশ বছরের যুবকের অদৃষ্টে লেখা ছিল বোধ হয় এই ভাবে মৃত্যু।

    সেদিনকার মতো আজ সকালেও মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গেছে এক প্রস্থ। তফাৎ কেবল এবারে লাল বাড়ির রকে নয়, দক্ষিণ পাশের হলদে রঙের বাড়িটার গেটের সামনে সুবীরের বয়সী তরুণটি অচৈতন্য হয়ে পড়ে ছিল। শীর্ণকায়। হাড়পাঁজরা গোনা যাচ্ছে এক এক করে। বেচারার প্রাণটা ধুকধুক করছে তখন, বুকের বাঁ পাশটা মৃদু মৃদু কাঁপছে।

    আমার বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠল। সুবীরের প্রায় এই দশাই দেখেছিলুম। সুবীরের অমন ফর্সা রঙটা সাদা কাগজের মতো দেখাচ্ছিল।

    এর কালো রঙটা যেন জমাট নীল। ঠোঁট দুটোও নীলচে হয়ে আসছে। মানুষটা ভিজছে। পাড়ার ছেলেরা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। সুবীরকেও সরিয়ে ফেলেছিল ছেলেরা লাল বাড়ির রক থেকে।

    মানুষটা ক’দিন থেকেই এ পাড়ায় ঘোরাঘুরি করছে। বলেছে, ভিখির সে। পেটের দায়ে ভিক্ষে চাইছে। কর্মের সংস্থান করতে পারেনি কোনরকমে বহুদিন শত চেষ্টা করেও। অনাহারে অনাহারে মরতে বসেছে সে।

    পাড়ার লোকেরা—যার যেটুকু ক্ষমতা সাহায্য করেছে প্রতিদিন। তবু ওর ভবিতব্যকে রুখতে পারল না কেউ। পেটের খাবার জুগিয়েও ক্ষীণ প্রাণের শক্তি বাড়াতে পারল না কেউ ওর। পারেনি সুবীরের বেলায়ও।

    জাত ভিখিরি ছিল না সুবীর। মুখচোরা মানুষ। কারো কাছে কিছু চাইত না মুখ ফুটে। রোদ্দরে লোকের বাড়ির দোরে বসে বসে পুড়েছে। বৃষ্টিতে ভিজেছে। কেউ কিছু দিলে, নেয়নি হাত পেতে। ছেঁড়া গামছাটা বিছিয়ে দিয়ে মাথা নত করেছে লজ্জায়।

    ওকে দেখে মনে হত, ওর সব কিছুই আছে। ঘরবাড়ি—আত্মীয়-স্বজন, সব। হাজারো প্রশ্ন করেও ওর পেট থেকে কথা বার করতে পারেনি কেউ। কোথা থেকে এসেছে, দেশ-ভিটে কোথায়—কেউ জানতে পারেনি। বেশী জিজ্ঞেস করলে, ওর দু’চোখের কোণ লাল হয়েছে। চিকচিক করে উঠেছে। বোঝা গেছে অভিমানী সুবীর দারুণ ব্যথা বুকে পুষে পথে নেমেছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে গোপনে। অনেক দূরে। অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে বলে কাজ-কর্ম জানে না কিছু বোধ হয়। তাই খুঁজে পেতেও কোন কাছ যোগাড় করে নিতে পারেনি। শেষে এই পরিণতি। ঘরে না ফেরার ভীষ্মের প্রতিজ্ঞাই এই দুর্গতির কারণ ওর।

    আমার ধারণার কথা মাঝে মাঝে বলতুম আমি ওকে। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত ও আমার দিকে খানিক। তারপর একটু ম্লান হাসি হেসে বলত, বাবু কি জ্যোতিষ জানেন? আমার ভবিষ্যৎটা একটু বলুন না।

    আমি মাথা নেড়ে জানাতুম, জানিনে।

    বিশ্বাস করত না ও। হাসতে হাসতে বলত, খারাপ জানলেও ভয় পাব না আমি। আমিও হেসে চলে যেতুম আর কোন জবাব না দিয়ে। চলে গেলেও আসতুম আবার পরের দিন। আবার গল্প করতুম আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। লক্ষ্য করেছি আমি, আমাকে কাছে পেয়ে ও যেন আপনজনকেই ফিরে পেত বুঝি। আমারও ওকে খুব কাছের লোক বলেই মনে হত।

    এই কাছের লোকটি চলে গেল একদিন আমায় ছেড়ে। অর্থাৎ আমাদের পাড়া ছেড়ে। ছেলেরা সব সুবীরের কাছে দাঁড়িয়ে জটলা করছিল ওকে সরাবার জন্য। লাল বাড়ির মালিক ছেলেদের শ্মশানে নিয়ে যেতে বলল। মঙ্গলবারের মড়া অমঙ্গলই করবে। আর বাড়ির রকে বলে, তার তো করবেই, আর তাছাড়া পাড়ার কোন লোকের বাড়িই বাদ যাবে না এ অমঙ্গলের আওতা থেকে। এক বাড়ি থেকে মনোমত এক একজনকে নিজের দোসর করে নেবেই নেবে ও। এই অবধি কানে গেছিল। বিশেষ কাজের জন্য দাঁড়াতে পারিনি আর বেশী সময়। চলে গেছিলুম। পরে প্রায় বিকেলের দিকে এসে দেখি, রকটা শূন্য। শুনলুম, ছেলেরাই নাকি সুবীরকে নিয়ে গিয়ে শেষকৃত্য করেছে। ভিতরে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা আমার দাপাদাপি করেছিল বেশ কিছুক্ষণ ধরে!

    সারাটা দিন ছটফট করেছি আমি সুবীরের জন্য। শেষ সময় আসবার চেষ্টা করেও আটকে পড়লুম আরও বেশী করে। আসতে পারিনি।

    বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে।

    পরদাটা বড্ড বেশী নড়ে উঠল। আকাশ ফাটানো কড়কড় আওয়াজের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। চোখ ধাঁধানো এক ঝলক আলো ঠিকরে পড়ল ঘরে।

    পরদা সরিয়ে সেই মুহূর্তে ঘরে ঢুকল সুবীর। আমি ভীতবিস্মিত চোখে দেখছি মৃত সুবীরকে জীবন্ত মানুষের মতো। সুন্দর দেখতে হয়েছে সুবীর। দেহটা বেশ ভারী হয়েছে। গোলগাল চেহারা। সুবীর ধবধবে দাঁত বার করে হাসছে। ভরাট গালে লাল গোলাপের আভার মাঝে টোল পড়ছে।

    এসব কি দেখছি আমি। স্বপ্ন না সত্যি? বারদুয়েক চোখ বুজলুম চোখ চাইলুম। মাথাটা ঠিক আছে কি না জানবার জন্য ঝাঁকিয়ে নিলুম একবার। মাথা ঠিকই আছে। ঠিকই দেখছি। ঘুমিয়ে নয়, জেগেই।

    খালি চেয়ারটার সামনে এগিয়ে এল ধীরে ধীরে সুবীর। বসল না। দাঁড়িয়ে রইল পাশে। দেখছে আমাকে একদৃষ্টে। ওর দু’চোখ অনেক কথাই বলতে চাইছে যেন। ঠোঁট দুটো নড়ে উঠছে।

    বিদেহী এসেছে দেহ ধরে। অতৃপ্ত আত্মা এসেছে ঘুরে ফিরে আবার পুরনো জায়গায়। যা বলতে এসেছে, বলুক ও। ভয় পেলে চলবে না। কান পেতে শুনতে হবে। আমারই ডাকে ও এসেছে হয়তো। আমারই অস্থিরতা দূরের আত্মাকে কাছে এনে ফেলেছে বোধহয়।

    কথা বলতে শুরু করল সুবীর।—লাল বাড়ির রকে আমি মারা যাইনি। সে সময় মারা গেলে আর একটা নিদারুণ অপঘাত মৃত্যুকে অপেক্ষা করে বসে থাকতে হত না তাহলে আমার জন্য।

    শিউরে উঠল আমার সর্বশরীর। সুবীরের মৃত্যু তাহলে স্বাভাবিক ভাবে হয়নি। হয়েছে অপঘাতে। প্রেতাত্মা শোনাতে এসেছে তার মৃত্যু রহস্য!

    আচমকা প্রেতাত্মার মুখখানা খুব কঠিন হয়ে উঠল। গলার স্বরে উত্তেজনা ফেটে পড়তে লাগল। নিজেই নিজের নাম ধরে বলল, সুবীরের ওপর পাড়ার ছেলেরা ভয়ানক নির্দয় ব্যবহার করেছে। ওকে হাসপাতালে না দিয়ে, মৃত ঘোষণা করে, শ্মশানে নিয়ে যাবার নামে নিয়ে গেছিল হাওড়া ময়দানে। ময়দানের পূর্ব দিকটায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গা ঢাকা দিল ওরা। জনমানবশূন্য ময়দানে মাটিতে মুখ গুজে পড়ে রইল একা সুবীর।

    বিকেলে বল খেলতে এল ওখানে কোন্ পাড়ার ছেলেরা কে জানে। তারা তাদের খেলার জায়গায় মড়াটাকে পড়ে থাকতে দিতে একদম নারাজ। সকলে মিলে মড়াটাকে ময়দান থেকে বিদায় করবার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। সুবীরের দেহে ছেড়া চট জড়িয়ে ঘাড়ে করে তুলে নিল দুটি ছেলে। তারপর ছেলের দল সেই মড়া ঘিরে স্টেশনের দিকে চলল। পিছনের গেট দিয়ে লুকিয়ে স্টেশনের ভিতরে ঢুকে, যে ট্রেনটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, তার একটা কামরায় বেঞ্চির তলায় সুবীরকে ঠেলে দিয়ে নেমে পড়ল ওরা।

    সুবীর মরেনি তখনো। ছেড়া চটের ফাঁক দিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে। সব বুঝতে পারছে, সব জানতে পারছে। ছেলেদের শলা-পরামর্শ, তাকে নিয়ে কৌতুক করাকরি, সমস্ত শুনেছে স্বকর্ণে। ট্রেনে রেখে আসার জন্য ছেলেদের মধ্যে কার কত হিম্মত নিয়ে বাজি ফেলাফেলির কথাও শুনেছে।

    বলতেও বিস্ময়, ভাবতেও বিস্ময়। ট্রেনের শেষ গন্তব্যস্থল অবধি দীর্ঘ পথ একই ভাবে পড়ে রইল সুবীর। কিন্তু কারো কোন লক্ষ্যই পড়ল না তার দিকটায়। ট্রেনটার যাত্রাপথ শেষ হল বোম্বে এসে। যাত্রীরা নেমে গেল পরপর। সব কামরাই ফাঁকা। ঝাঁড়ুদাররা অন্য কামরার মতো সুবীরের কামরায় এসেও হাজির হল। সাফ করবে। বেঞ্চির তলা পরিষ্কার করতে গিয়ে একজন অন্য জনকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে ‘মিলা’ বলে চিৎকার করে উঠল।

    ওরা ভেবেছিল বুঝি ওদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। চটে মোড়া জিনিস-পত্তর আছে ওদেরই প্রাপ্য এসব। কিন্তু চট খুলতেই বুঝতে পারল বিধি বাম ওদের ওপর। মুরদা দেখে আঁতকে উঠল দু’জনে। দু’জনের মধ্যে বুড়ো ঝাঁড়ুদার সুবীরকে মিটমিট করে চাইতে দেখে, পালাতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এরপর বোম্বের হাসপাতালে সুবীরকে ওরাই ভর্তি করে দেয়। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল সুবীর সেখানে।

    হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার আগেই সুবীর মনস্থির করে ফেলল—দেশে ফিরবে না জীবনে। বাংলার কোনখানেও না। তাই খুব শিক্ষা হয়েছে। আপন-পর সকলকেই চিনেছে ভালো করে।

    প্রেতাত্মার মর্মব্যথা শুনতে শুনতে ব্যথাকাতর হয়ে উঠেছি আমি। সুবীরের অতীত দুরবস্থার দৃশ্য যথার্থ প্রত্যক্ষ করছি যেন। শুধু প্রত্যক্ষই নয়, তখনকার পরিস্থিতি-পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে চলেছি আমিও।

    প্রেতাত্মা বলছে, হাসপাতালে থাকতেই দিনমজুর মতিলালের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সুবীরের। বেরুবার পর রুটির যোগাড় করে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে ওকে। কথা রেখেও ছিল মতিলাল। বোম্বেতে কোন কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারেনি বটে, তবে তার জানা শোনা লোকের সঙ্গে কাডিপাণিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

    পাহাড় আর শালগাছ ঘেরা কাডিপাণি। কারিপাণির কোন কোন পাহাড়ের স্তরে স্তরে লুকিয়ে রয়েছে ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড। সাহেবদের নির্দেশে মজুররা পাহাড় কেটে পাথরের চাই বার করে। চাঁইয়ের বুক পিষে থেঁতলেই বাইরে বার করে নিয়ে আসা হয় শেষে ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড।

    কাডিপাণির পাহাড় কাটা মজুরের কাজ পেল সুবীর মতিলালের বন্ধুর সহযোগিতায়। বেশীদিন টিকে থাকতে পারেনি একাজে। অমানুষিক খাটুনি। অনভ্যস্ত হাতে শাবল-গাঁইতি চালিয়ে পাথর কাটতে কাটতে অবশ হয়ে আসত হাত দুটো। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠত। টলে উঠত দু’পা। মনে হত, পাশের লোকটার শাবলের মুখে ওর দেহটা লুটিয়ে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে বুঝি এখুনি।

    সহকর্মীদের অনেকের সহানুভূতি ছিল যে তার ওপর যথেষ্ট—একথা স্বীকার না করলে, মস্ত বড় অন্যায় করা হবে। সুবীরের শোচনীয় অবস্থা বুঝতে পারা মাত্র, ওরা তাকে ধরে বসিয়ে দিত। তার কাজ ওরাই করে দিত খানিক সময়। এতে ঈর্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যেত অন্যান্য সহকর্মীরা। সুবীরের মতো রূপ নেই তাদের। নেই অপরকে বশীভূত করে, নিজের কাজ করিয়ে নিয়ে আরামে বসে বসে মৌজ করা আর মুফতে মজুরির টাকা লোটা। এরকম লোককে কি কেউ বরদাস্ত করতে পারে–না পারা উচিত? মোটেই নয়। পাহাড়ের তলায় ফেলে বুকে পাথর চেপে ধরে হাড় পাজরাগুলো গুড়িয়ে গুড়ো করে দিলে, তবে তাদের বুকের জ্বলুনি ঠাণ্ডা হবে। একথা দিনের ভিতর চার-পাঁচ বার করে শুনতে হয়েছে সুবীরকে ঠকঠক করে পাথর কাটা আওয়াজের এরকম সঙ্গে সঙ্গে।

    আমার চোখের সামনে যেন সুবীরের অপঘাত মৃত্যুকে হামাগুড়ি দিয়ে আসতে দেখছি। সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর ঘাড়ের ওপর।

    আমার মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে এক হিমপ্রবাহ বয়ে গেল যেন। তার জীবিতকালের ভয়াবহ শেষ নিদারুণ কথা শোনাবে এবার প্রেতাত্মা। তটস্থ হয়ে বসে আছি আমি। সুবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিনে, অথচ চোখ নামাতেও পারছিনে। মনে ভীষণ ভয় চেপে রয়েছে। শুধু ভয় আর ভয়। কি জানি সুবীরের এমন সুন্দর মুখখানা হয়তো নিমেষে কেমন হয়ে যাবে। বীভৎস—অকল্পনায় বীভৎস।

    হাসছে প্রেতাত্মা।–সুবীর কাডিপাণি ডুংগার অর্থাৎ কাডিপাণি পাহাড় ছেড়ে যাবেই বা কোথায়? শত্রু বাড়ে বাড়ুক। মরতে হয় মরবে এখানে, বাঁচতে হয় বাঁচবে এখানে।

    এই সর্বনেশে জিদের শেকলে বাঁধা পড়ল সুবীর। আটকে পড়ল কাডিপাণির পাহাড়-ভূমিতে। প্রতিদিন কাজ সেরে, ক্লান্ত দেহে ফিরে যেত মজুরদের সঙ্গে ওদের লতাপাতায় তৈরী ঝুপড়িতে। এই ঝুপড়ি থেকে আসা-যাওয়া পথের দু’সারি শালগাছের পিছনে পিছনে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একদিন কয়েকটি যমদূত। বাগে পেলে, আটকে ফেলবে সুবীরকে। যে কোন মানুষ—যত শক্তিই ধরুক কেন সে, বেরুতে পারে না ওদের কবল থেকে। সে তুলনায় সুবীর তো শিশু।

    তাদের এই যমদূতের মতো মানুষদের কাছে সুবীর সন্দেহভাজন ব্যক্তি। নিশ্চয় জাসুস—পুলিশের টিকটিকি। তাদের চুরি-ডাকাতির গন্ধে এসে হাজির হয়েছে এই দুর্গম জায়গায়। মজুর সেজে খুঁজে বার করতে এসেছে লুকনোর গুপ্তস্থান। লোকটার হাবভাবে চেহারায় মনে হয় তাই। তারা যখন ডেরায় ফেরে, লোকটা তাদের দিকে চেয়ে চেয়ে যেন কি দেখে। চাউনিটাও বিশেষ সুবিধের বলে মনে হয় না।

    সত্যিই সুবীর লোকগুলোকে দেখত। একটা নতুন জায়গায় এসেছে, স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করবার বাসনা যে তার মনে জাগেনি, তা নয়। জেগেছিল। ওদের সঙ্গে আলাপ করবার ইচ্ছে হত রোজ। ওদের ধারণা ভুল। সুবীর কোন সময়ের জন্য সন্দেহের চোখে দেখত না, জানত না ওরা ডাকাত। ভেবেছিল স্থানীয় লোক। সুবীর খারাপকে ভেবেছে ভালো আর ডাকাতরা ভালোকে ভেবেছে খারাপ।

    এই ভুল ভাবার দরুণই ওরা সুবীরের জীবন সংশয় করে তুলতে চেয়েছিল। সুবীরকে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে ধরেছিল ওরা। কোন পালাবার পথ দেখতে পায়নি সুবীর কোনদিক দিয়েই। একসঙ্গে অনেকগুলো বলিষ্ঠ কালো হাতের বর্শা-তলোয়ার উঁচিয়ে রয়েছে তার চোখের ওপর মুখের ওপর বুকের ওপর। মুখ বন্ধ চোখ বন্ধ প্রাণ যাবার লক্ষণ।

    ওদের বৃত্তের বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে নিয়ে যেতে লাগল ওরা কোথায় কে জানে। অসহায়-নিরুপায় সুবীর মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে এসেও আবার মৃত্যুগহ্বরের দিকেই এগুচ্ছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। স্বাভাবিক মৃত্যু থেকে বেঁচে গেছিল বোধ হয় নিশংসভাবে মরবে বলে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে মারবে এরা। এদের বদ্ধমূল ধারণা—সুবীরই এদের পথের বিষাক্ত কাঁটা। নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে একে কালবিলম্ব না করে।

    সুবীরের কাছে তার প্রতিটি পদক্ষেপ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। ভয়ঙ্কর থেকে আরো ভয়ঙ্কর। আরো আরো আরো—

    সুবীরকে নিয়ে এসে যে জায়গায় থামল দুবৃত্তরা—সেখানে দিনের বেলাও রাতের অন্ধকার। ওপরের দিকটায় পাহাড়ে পাহাড়ে ঠেকাঠেকি। সূর্যের আলো প্রবেশ করে না জায়গাটায়।

    সুবীরের অর্ধমৃতের মত অবস্থা।

    দুবৃত্তদের কেউ কেউ এই ধূর্ত জাসুসকে উচিত মতো শিক্ষা দেবার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। তলোয়ারের এক কোপে ধড় থেকে ছিন্ন করে মাথাটাকে নামিয়ে দিতে চাইল কেউ। কেউ চাইল বর্শার খোঁচায় হৃৎপিণ্ডটাকে ক্ষত বিক্ষত করে তার উষ্ণ রক্তে স্নান করতে। আবার কেউ চাইল চোখ দুটো প্রথমে উপড়ে নিয়ে দগ্ধে দগ্ধে মারতে।

    কারো কোন মতলবই কার্যকরী হল না শেষ পর্যন্ত ওদের মধ্যেকার সর্দারগোছের লোকটার নির্দেশে।

    লোকটার বজ্রগম্ভীর স্বরে পাহাড়ভূমি কেঁপে উঠল।…জিওতো দাটি দইস।…জ্যান্ত কবর দাও লোকটাকে।

    কথাটার অর্থ বোঝেনি সুবীর। ভেবেছিল, তাকে মুক্তি দিতে বলছে বুঝি। কিন্তু পরে মানুষ-প্রমাণ মাটি খোঁড়াখুড়ি করতে দেখে, লোকটার কথার মর্ম বুঝতে কোন অসুবিধে হয়নি তার।

    হঠাৎ কি হল কিছু বুঝে উঠতে পারল না সুবীর। একবার গর্তের দিকে আর একবার তার দিকে ঘন ঘন চাইছে সকলে। সুবীরের মনে হচ্ছে, তাকে মাটির তলায় চাপা দেওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে সে মাটি-পাথর চাপা দেবার পর। সে এ দুনিয়ায় দাঁড়িয়েও অন্য দুনিয়ার। তার প্রেতাত্মা দেখছে ওদের। দেখছে গর্তটাকে।

    গর্তের ভিতর একটা কঙ্কাল। বিস্ফারিত চোখে দেখছে ওরা কঙ্কালটার মাথার খুলির কাছে দুটো পেতলের হাঁড়ি ভর্তি সোনার কত কি রয়েছে!

    মুখ তুলে সুবীরের দিকে তাকাতেই ওরা তার মধ্যে হঠাৎ কি দেখল কে জানে। মনে হল যেন ভূতই দেখল সবাই। সভয়ে সমস্বরে আর্তনাদ করে উঠল ওরা।

    সুবীরের দু’পাশে দু’হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল দু’জন। ওরা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিয়ে, উল্টোদিকে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াল। অন্যেরা পড়িমরি করে দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্যই যেন ছুটে পালাল।

    সবাই চলে যেতে ‘মরে গেছি’ ভাবটা কেটে গেছে সুবীরের। সচেতন হয়ে উঠেছে। ফিরে যাচ্ছিল, কে যেন তার ভিতর থেকে নিতে বলল হাঁড়ি দুটো। কার জিনিস, কে রেখেছে, সোনাদানাগুলোই বা সৎ উপায়ের না অসৎ উপায়ের —নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তোলপাড় করতে লাগল সুবীরের মনে।

    কিন্তু সুবীর যতবারই ফেলবার জন্য পা বাড়িয়েছে, ততবারই ভিতরের অকাট্য যুক্তির কথা শুনেছে।—নাও। অন্যায় হবে না। এ নিয়ে ব্যবসা করলে অনেক—অনেক টাকা আসবে। এখন যা নেওয়া হয়েছে, তার দ্বিগুণ দিয়ে দিলেই তো হবে অনাথ-আতুরদের সেবায়।

    ভিতরের কথা শুনে বড় ব্যবসাদার হয়েছে সুবীর আজ। সত্যিই অনেক টাকা উপায় করেছে। তাই আতুরদের সেবায় ভিতরের কথামতো কাজ করতে পেরে ঋণমুক্তও হয়েছে।

    সব শুনে স্তম্ভিত আমি। সুবীর বেঁচে আছে। আসেনি সুবীরের প্রেতাত্মা আমার কাছে। এসেছে সুবীর স্বয়ং। এসেছে তার জীবনের আশ্চর্য রহস্য কাহিনী শোনাতে।

  • হীরাবতীর পাথর

    হীরাবতীর পাথর

    ঘরটা যে কখন অন্ধকার হয়ে গেছে সে খেয়াল নেই হীরাবতীর। শুধু মনে আছে, জানলার ধারে এসে দাঁড়িয়েছিল সে। তখন সূর্যের এক টুকরো আলোও নেই আকাশে। অন্ধকার নামছে একটু একটু করে। ঘরে কেউ ছিল না। একলাই ছিল হীরাবতী। কেবলি তার মনে হচ্ছে, ঘুট ঘুটে অন্ধকার তার চোখে ধুলো দিয়ে ঘরের ভিতর ঝাঁপিয়ে পড়েছে একেবারে হঠাৎই।

    এই ঝাঁপানোটা বুঝতে পেরেছে ঘরের আলোটা তাড়াতাড়ি জ্বালতে গিয়ে বুকের আলো জ্বলে উঠতে দেখে।

    থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেছে কিছুক্ষণ নিজের বুকের দিকে। পাথরটা জ্বলছে। ঠিক আগেরই মতো। দিনের বেলায় নিবে থাকে একদম। মন প্রাণ স্নিগ্ধ করা চাঁদের আলো রাতে যে কোথা থেকে পায় বুঝে উঠতে পারে না। এই বুকে প্রতিবাত জ্বলেছে এক সময়। জ্বলেছে সোনার সরু চেনটার লকেট হয়ে।

    এখন? এখন আলমারীর ড্রয়ারবন্দী। বছরের একটি দিন মাত্র মুক্তি পায় শুধু। কার্তিকী অমাবস্যার সন্ধ্যেয় ব্যতিক্রম হয়েছে এই প্রথম—এবারে। সন্ধ্যের একটু আগেই মুক্তি পেয়েছে। আগে মুক্তি দিয়ে ফেলল কেন—হীরাবতী নিজেও জানে না। প্রত্যেক কার্তিকী অমাবস্যায় সন্ধ্যে থেকে সারা রাত চেন হারটা হীরাবতীর গলায় জড়িয়ে থাকত আর লকেটটা বুকের মাঝখানে আটকে থাকত। হারটা দিয়েছিল জয়কান্ত। পাথরটার অন্য একটা ইতিহাস আছে। ইতিহাস আছে বলেই বুঝি সমস্ত রাত চোখে-পাতায় এক করত না একবারের জন্যও হীরাবতী। দেখত যেন কত কি এই পাথরটির মধ্যে দিয়ে। ভোরের আলো ঘরে পৌঁছবার আগে চোখে লাগবার আগেই তুলে রাখত আবার। পাথরটা তখনো জ্বলত—তোলবার সময়ে।

    বুকের দিকে তাকিয়ে পাথরটায় ভিতর কি যেন দেখছিল, কি যেন দেখতে চেষ্টা করছিল। হঠাৎ চমকে উঠল কার জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ায়। ঘরের মধ্যে রয়েছে কেউ। তার আনমনার সুযোগ নিয়ে প্রবেশ করেছে কেউ। এতক্ষণ রুদ্ধনিশ্বাসে নিশ্চয় লক্ষ্য করছিল তাকে বেশ ভালো ভাবেই। নিশ্বাস বন্ধ করে রাখতে পারেনি আর। হয়তো নিজের অগোচরেই জোরে জোরে নিশ্বাস পড়তে সুরু করেছে ওর, নয়তো ইচ্ছে করেই ওর অস্তিত্ব জানাচ্ছে এই ভাবে।

    বুকের ভিতর কেঁপে উঠল। লকেটটা কেউ ছিনিয়ে নিতে এসেছে নাকি? হাত চাপা দিল লকেটের উপর। ঘরটা আরো জমাট অন্ধকার হয়ে উঠল। আলো জ্বালবার জন্য দ্রুত পায়ে সুইচবোর্ডের দিকে এগুল…আলো জ্বলল। আলমারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে বংশীমোহন। ওর দুচোখ জ্বলছে। বেশ জোরে স্পষ্ট করে বলল বংশীমোহন—পাথরটা ঢাকলে কেন? হাত সরাও! সরাও বলছি!

    কথায় আদেশের সুর। আদেশ অমান্য হলে যে একটা কাণ্ড হবে তা মুখচোখ দেখেই বুঝতে পারা যাচ্ছে। চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরোচ্ছে, মুখখানা লাল হয়ে উঠছে। জিদ বাড়ছে, মাথায় উষ্ণ রক্ত বইতে শুরু করেছে।

    লকেট থেকে হাত সরাল হীরাবতী। বংশীমোহনের দু’চোখের শ্যেনদৃষ্টি পাথরটার ওপর। ও দু’চোখ দিয়েই পাথরটাকে গিলে খেয়ে ফেলবে বুঝি এখুনি। হারটা দাও আমাকে। দাও বলছি শীগ্‌গির।

    ওর হাতে তুলে দিতে হবে রাত আলো করা পাথরটাকে। ভাবছে আর দেখছে, দেখছে আর ভাবছে হীরাবতী। এচোখ দেখেছে আগে, এ ধরণের কথা শুনেছে আগে।

    জয়কান্তর চাউনিতে দেখেছিল এই চাউনি। জয়কান্তর মুখে শুনেছিল প্রায় এই রকমেরই কথা দেখা-বলার বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই দুজনের মধ্যে। পার্থক্য আছে শুধু একটা বিষয়ের। সেটা পরিস্থিতির। তখন আর এখন একেবারে বিপরীত পরিস্থিতি দু’টো। তখন হারটা গলায় ঝোলে নি আর পাথরটা বুকের মাঝে জ্বলে নি। বলতে গেলে হারটা-পাথরটা ছিল না-ই তার কাছে। বলতে গেলে কেন—সত্যিই। কত বড় সত্যি এটা—সে সব জানত জয়কান্ত।

    হারটা-পাথরটা কিভাবে চলে গেল তার কাছ থেকে—সেটা স্বচক্ষে দেখেছে। তবু পাগলের মতো ক্ষেপে উঠেছিল যেন মানুষটা। আশ্চর্য! এর আগে জয়কান্তকে এরকম উত্তেজিত হতে দেখেনি কখনো হীরাবতী। রাগে অগ্নিশর্মা হতে দেখেছিল সেই প্রথম আর সেই শেষ।

    সাত চড়ে মুখে রা বেরোয় না, মাটির মানুষ জয়কান্ত। সংসারে সবার কাছে আর বন্ধুমহলে এই খ্যাতির ভিত সুদৃঢ় ছিল তার। সে ভিতে ফাটল ধরল, ধসে পড়ল। চীৎকার করে বিকৃত স্বরে বলে উঠল—সরে যাও আমার সামনে থেকে এখুনি! তোমার মুখ দেখতে চাই নে জীবনে আর! কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে যা কোনদিন করে নি, করতে সাহস করে নি—তাই করে বসল। সী-বীচে হীরাবতাকে একলা রেখেই হনহনিয়ে চলে গেল বাড়ীর দিকে।

    জয়কান্তর মুখ থেকে এসব কথা শুনবে, এমন ব্যবহার পাবে বাস্তবিকই এটা কল্পনাতীত ছিল হীরাবতীর কাছে। হীরাবতী স্তব্ধ বিস্ময়ে মানুষটার চলা পথের দিকে তাকিয়েছিল কেবল। ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারে নি। মুখে কথা সরে নি। হতবাক হয়ে গেছল একদম সে।

    একলা ছেড়ে যেতে চাইত না মানুষটা। আশপাশের মানুষদের চলাফেরা তাকানো সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখত। বলত—এরকমও বেহায়া নির্লজ্জ হতে পারে লোক। এখানে এসে যে দু’টো কথা কইব প্রাণখুলে দু’জনে—সে উপায়ও নেই। কেবল ঘুর ঘুর করছে তোমার চারপাশে ওরা। আর তোমাকেই দেখছে শুধু। দেখে দেখে আশ আর মিটছে না কিছুতেই ওদের!

    হীরাবতী নিরীহ জয়কান্তর সন্দেহ বাতিকে খোঁচা দিয়ে মজা পেতে ছাড়ত না। খিল খিল করে হেসে উঠে বলত—তা মিটবে আর কি করে বল। হীরাবতীর মতো ক’জনই বা রূপসী আছে পুরীতে! তোমার অসহ্য হয়, যেতে পারো। বাড়ী তো বেশী দূর নয়। পরে যাব’খন।

    এই যে রেখে যাচ্ছি—বলে, হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যেত জয়কান্ত।

    সেই মানুষই হীরাবতীকে একলা ফেলে চলে গেল আর বলে গেল, মুখ দেখতে চাই না…।

    জয়কান্ত বলল যা, করলও তাই।

    বুকের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা দাপাদাপি করছে হীরাবতীর। চোখের কোণ টনটন করছে। এখনো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় অহর্নিশ দু’জনের সী-বীচে বেড়ানোর দৃশ্য।

    জয়কান্তর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে বেড়াচ্ছে হীরাবতী সী-বীচে। মাঝে মাঝে জয়কান্তর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ভিতরে হাহাকার করে উঠছে। সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার মতো তার আশা ভরসা ভবিষ্যৎ ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছে জয়কান্তকে ধরে রাখা যাবে না কোনো রকমে। রোগ ধরতে পারেন নি ডাক্তার বৈদ্যরা, দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে লোকটা। সমুদ্রের ধারে বেড়ানোই একমাত্র ওষুধ এখন। কিন্ত ও ওষুধও কোনো কাজ করছে না। করবেও না। এটা জানে হীরাবতী।

    জয়কান্তর মন ভাঙছে দেহ ভাঙার চেয়ে বেশী করে। ডাক্তাররা নিজের ব্যাপারে সদা-সচেতন রুগীকে বাজে মিথ্যে বলে সান্ত্বনা দিতে ইতস্ততঃ করেছেন তাই। তবু ও ওর মনের জোর বজায় রাখতে, ‘সমুদ্রের ধারে বেড়ালে নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন’ মনগড়া প্রবোধ বাক্য শুনিয়ে ছিলেন। এতে ফল হয়েছিল খানিকটা।

    যে মানুষ শুয়ে পড়ছিল, সে উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে সুরু করলও ধীরে ধীরে। তারপর সী-বীচে নিয়ম করে আসাও হতে লাগল রোজ সন্ধ্যেয়।

    এ সব সত্ত্বেও হীরাবতী কোনো বাঁচার লক্ষণই দেখতে পায় নি জয়কান্তর শরীরে। বরং মনে হয়েছে আগের চেয়ে আরো খারাপের দিকেই যাচ্ছে ও। আগে যা-ও বা একটু আধটু খেতে পারত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে আসছে।

    বেড়াতে বেড়াতে জয়কান্ত জিজ্ঞেস করে—হীরা! এখন ভালো দেখছ না? এবারে বেঁচে উঠলুম তা হলে—

    হীরাবতীর বুকের তলায় বোবা কান্না ডুকরে ওঠে। মুখ ফিরিয়ে ছোট্ট হুঁ বলে, একটু দূরে সরে যায় নিজেকে সামলে নিতে।

    তেত্রিশ কোটি দেবতাকে মানত করেছে হীরাবতী স্বামীকে বাঁচাবার জন্য। সব নিষ্ফল। দেবতারা বধির। নির্দয়। দেবতার ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে হীরাবতী। হারিয়েছে সবার ওপর। নিজের ওপরেও।

    ম্লান মুখে হাসির মুখোশ পরে স্বামীর কথায় অনিচ্ছা সত্বেও সায় দিয়ে দিয়ে বেড়াত হীরাবতী।

    জয়কান্তকে মিথ্যে আশ্বাস দেওয়ার ফল ভোগ করতে হত দারুণ ভাবে হীরাবতীকে। অনুশোচনার যন্ত্রণায় প্রতি রাতে বারান্দায় পায়চারি করে বেড়িয়েছে। হীরাবতীর অনুশোচনার যন্ত্রণা শেষ হল একদিন। হাসির মুখোশ খুলে পড়ল মুখ থেকে। মুখের মলিনতা মিলিয়ে গেল নিমেষে। প্রকৃত খুশির ঢল নামল।

    কার্তিকী অমাবস্যা। সন্ধ্যে হয়েছে সবে। অন্ধকার অন্ধকার। সমুদ্রের ঢেউ আর সমুদ্র অন্ধকারে মিশে গেছে যেন। চোখে দেখা যাচ্ছে না কিছু। চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে যেন সমুদ্র ইচ্ছে করেই। হীরাবতীর প্রথমে মনে হয়েছিল, এই অলক্ষুণে অমাবস্যা আর সমুদ্র বুঝি তাদের দু’জনকে গ্রাস করবে বলে এই ষড়যন্ত্র করেছে। অদৃশ্যলোক থেকে ভীষণ গর্জন তুলে তুলে মৃত্যুত্রাস সৃষ্টি করছে স্রেফ। শুনে সাদা চকচকে চওড়া এক একটা বিরাট করাত দু-পাশ থেকে এগিয়ে এসে মিলছে। আবার ভেঙে দু’টুকরো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওপাশ দিয়ে আবার একটা করাত আসছে। চলে যাচ্ছে। আবার —আবার আসছে।

    অসহ্য হয়ে উঠছে এ দৃশ্য দেখা। হীরাবতী জানে, অন্ধকারে সমুদ্রে ঢেউ ভাঙার দৃশ্যটা এরকমই দেখায়। সব জেনেশুনেও ঢেউ ভাঙার ফেনাকে করাত ভাবছে তবু। ভয় ধরছে খুব। তন্ময় হয়ে দেখছে ওই ভয়ংকর দৃশ্য কেমন করে জয়কান্ত। জয়কান্তকে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরতে তাগাদা দিতে লাগল হীরাবতী।

    ফিরে যেতে রাজী হল না জয়কান্ত। প্রকৃতির অপূর্ব বিচিত্র লীলা দেখছে সে। বড় ভালো লাগছে। সাদা ফেনাটা যেন সমুদ্র থেকে স্বতন্ত্র মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সমুদ্র নেই। অথচ সমুদ্রের ঢেউ ভাঙা থেকেই ওর উৎপত্তি। এখানে মানুষের প্রাণের সঙ্গেই অন্ধকারের সমুদ্রের তুলনা চলে। প্রাণকে দেখতে পাওয়া যায় না। যায় দেহটাকে। দেহটা যেন সাদা ফেনা। মনের ভাব প্রকাশ করল হীরাবতীর কাছে জয়কান্ত।

    জয়কান্তর এ দার্শনিক তত্ত্ব মেনে নিতে পারল না হীরাবতীর মন। নিজের অজান্তেই মৃত্যুকে যে ভালোবেসে ফেলে মৃত্যুর মোহ আকর্ষণে—তার কাছে এ ধরণের বক্তব্য ছাড়া আর কি-ই বা আশা করা যেতে পারে! বুকভাঙা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল হীরাবতী। অশুভ আশঙ্কায় দুরু দুরু করছে ভিতর।। তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, অপ্রতিরোধ্য সর্বগ্রাসী কালের কালো অন্ধকার ঘিরে ধরেছে জয়কান্তকে। অনুনয় করে জয়কান্তকে ফিরে যেতে রাজী করল। শরীরটা ভালো মনে হচ্ছে না হীরাবতীর। জয়কান্তর তাড়াতাড়ি বাড়ী ফেরাই ভালো আজ।

    ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল জয়কান্ত। ফিরছে। হঠাৎ ডান পায়ে একটা পাথর এসে আছড়ে পড়তে চমকে ঘুরে দাঁড়াল। পায়ের কাছে পাথরটা জ্বলছে যেন। চাঁদের আলো ওর ভিতর দিয়ে ফুটে বেরুচ্ছে বুঝি। পাথরটাকে তুলে নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। দেখছে হীরাবতীও। মাঝে মাঝে স্বামীর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। মৃত্যুর কালোছায়া ছোপ ধরাটা যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ক্রমে জয়কান্তর মুখ থেকে। আশ্চর্য! অদৃশ্য হয়ে গেল সম্পূর্ণ একেবারে।

    এর পরের ঘটনা আরো আশ্চর্য। পাথরটা পাবার পর থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল জয়কান্ত। একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মাল ওর—পাথরটাই তার নতুন জীবন দিয়েছে। পাথরটাকে চোখের আড়াল করতে চাইত না কোন সময়ের জন্য। হীরাবতীর চেন হারের লকেট করে দিয়েছিল। হীরাবতী চোখের সামনে থাকে সর্বক্ষণ। পাথরটাও চোখে চোখে থাকবে জয়কান্তর।

    পাথর পেয়ে সমুদ্র বেড়ান বাড়ল আরও। হীরাবতীও আপত্তি করে না আর। সত্যি শরীর খারাপ থাকলেও না। নিজের দুর্বলতার দরুন নিজেই লজ্জিত। সমুদ্রের মধ্যে মৃত্যুর বিভীষিকা দেখেছিল। মস্ত ভুল সেটা তার। এখন প্রতি সন্ধ্যেয় স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসে সমুদ্রের কাছে ক্ষমা চায় পূর্বের ধারণার জন্য। ভাবে সমুদ্র থেকে অমৃতও যে ওঠে—এটা কেন আসেনি তার মাথার মধ্যে আগে। সমুদ্র থেকে যে বিষও উঠতে পারে—এটা ভাবেনি কেন আগে—এটাও ভাবতে হল একদিন হীরাবতীকে নতুন করে—মাস ছয়েক পরে।

    স্বামী-স্ত্রী হাসিখুশিতে ডগমগ। সমুদ্র সৈকতের স্নিগ্ধতা লাগছে দুজনের চোখেমুখে। বালুভূমিতে পায়ের পাতা ডুবিয়ে হাঁটছে ওরা। ঢেউ-এর শেষ ছোঁয়া লাগছে ওদের পায়ে। আকাশ-সমুদ্র এক হয়ে যাচ্ছে ওদের চোখে। সন্ধ্যে নামছে সমুদ্রের বুকে। নামল। আচমকা কি যে হয়ে গেল—কিছু বুঝে উঠতে পারল না ওরা। একটা দমকা বাতাস এসে আছড়ে পড়ল ওদের দুজনের ওপর। ওরা ছিটকে পড়ল দুজনে দুধারে। অশান্ত সমুদ্রের-অশান্ত ঢেউ ওদের আপাদ-মস্তক ভিজিয়ে দিয়ে গেল।

    নিজেদের সামলে নিয়ে উঠে একজন আর একজনের কাছে এসে দাঁড়াল যখন, জয়কান্ত হীরাবতীর কাছে এলো যখন, তখন একটা অন্তর্ভেদী আর্তনাদ করে উঠল হীরাবতীর বুকের দিকে তাকিয়ে। আর হীরাবতীও স্বামীর গলায় গলা মিলিয়ে সমস্বরে করুণ আর্তনাদ করে উঠল নিজের গলায় হাত বুলিয়ে। হার নেই পাথর নেই।

    অনেকদিন অনেক করে হীরাবতীকে বলেছিল জয়কান্ত-দেখ! পাথরটা যেন হারায় না কখনো! হারালে আমায় পাবে না আর। আমিও শেষ। অতি যত্নে রাখত তাই গলার হারটাকে হীরাবতী। কিন্তু একি হল? অতর্কিতে সমুদ্র এ চাতুরী খেলল কেন তার সঙ্গে? পূর্বের ভয়ঙ্কর ভাবার প্রতিশোধ নিল কি?

    স্বামীর মুখখানা দেখছে আর দু’চোখে জল ভরে উঠছে হীরাবতীর। পাথর খোয়া যেতে সঙ্গে সঙ্গে মানুষটাও কেমন হয়ে যাচ্ছে যেন। মুখের ভাবটা বদলাচ্ছে। রুগ্ন অবস্থার আদলে ফিরে আসছে। ফিরে এলো।

    হীরাবতীর বুকের তলায় হিমশীতল ঠাণ্ডা রক্তের স্রোত জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। জয়কান্তকে বাঁচাতে পারা যাবে না হয়তো এবারে আর। মনটা ভেঙে পড়েছে বড়।

    সর্বনেশে সমুদ্র বিষের জলে ডুবিয়ে সর্বহারা করতে বসেছে তাকে। সমুদ্র থেকে যে বিষও উঠতে পারে এটা ভাবেনি কেন আগে। কেন সমুদ্রের সামনে থেকে জয়কান্তকে আড়াল করে রাখে নি, সরিয়ে রাখেনি। ঝরঝর করে ঝরে পড়েছিল দু’চোখের জল হীরাবতীর।

    স্ত্রীর কান্না দেখে ক্ষেপে উঠেছিল জয়কান্ত। হার ফেরৎ চেয়েছিল। তার মুখ দেখবে না বলে স্থানত্যাগ করেছিল তখুনি।

    নুলিয়াদের দিয়ে সমুদ্র তোলপাড় করিয়েছে হীরাবতী। হার খুজে পাওয়া যায়নি, পাথরও মেলেনি। ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে হীরাবতীকে নুলিয়ারা বুঝিয়েসুঝিয়ে। সমুদ্রের ওপর পুরো বিশ্বাস রাখতে বলেছে ওরা হীরাবতীকে। পুরীর সমুদ্র কখনো কারো কিছু আত্মসাৎ করেনি আজ পর্যন্ত। ফিরেয়ে দিয়েছে সবার সব কিছু। হারানো জিনিস পাওয়া গেছে এদিকে না হয় অন্য দিকে।

    দু’দিন ধরে খোঁজাখুজি চলেও এদিক ওদিকে—কোনদিক থেকেই হারপাথর পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে পড়ল হীরাবতী। এদিকে জয়কান্তও তার জিদ ছাড়ছে না কিছুইে। সে মুখ দেখবে না বলেছে। হীরাবতীই তার মৃত্যুর কারণ। তার নিয়তি। তাহলে পাথর—সেখানে তার জীবন বাঁধা—সে বিষয়ে অত সাবধান করা সত্বেও এমন বেহুশ যে ঢেউ-এর ধাক্কায় হার বেরিয়ে গেল গলা থেকে। নিশ্চয় হার কেটে আসছিল, লক্ষ্য ছিল না কোন! বিশ্বাসঘাতিনীর হাতে ভুল করে পাথর সঁপে দিয়ে নিজের অজান্তেই ডেকে এনেছিল সে তখন মৃত্যুকে।

    মুখ বুজে সয়েছে হীরাবতী স্বামীর ভর্ৎসনা। মানুষটা বলে কয়ে যদি বাঁচে বাঁচুক। একটুও অযত্ন করেনি হারটাকে—পাথরটাকে। ভালো করে লক্ষ্য রাখত রোজ। চেনে ক্ষয় ধরেনি। কাটবার মতো অবস্থাও হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে বোঝালে বুঝবে না। উত্তেজনা বাড়বে বই কমবে না। তা ছাড়া বলবেই বা কাকে, বোঝাবেই বা কাকে। মানুষটার দুদিনের হাল দেখেই, বিপদ যে ঘনিয়ে আসছে—বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না একটুও।

    মানুষটা যে ছ’মাস ভালো ছিল সেই ছ’মাস অসুস্থ থাকলে যে হারে শরীর ভাঙত, মুখচোখের চেহারা হতো—দু’দিনে তাই হয়েছে ওর অসম্ভবভাবে। পাথরের সঙ্গে কি এমন জীবনের যোগসূত্র থাকতে পারে তা চিন্তা করেও কোন হদিস বার করতে পারে না হীরাবতী।

    অবিশ্বাসও করতে পারে না ঘটনাকে। যা ঘটেছে, যা ঘটতে যাচ্ছে তার প্রত্যক্ষদর্শী সে। মরণ পথের যাত্রীকে পাথরটাই বাঁচবার আশা জাগিয়ে তুলেছিল প্রবল। সুস্থও হয়ে উঠেছিল। আবার পাথরটার অবর্তমানে মানুষটা ছ’মাস পরেও পূর্বের অবস্থা ফিরে পেয়েছে। মৃত্যুর দিন গুণে চলেছে। সবই অদ্ভুত লাগছে হীরাবতীর কাছে। আরও অদ্ভুত লাগছে পাথরটাকে পাওয়া যাচ্ছে না দু’দিন ধরে—পাওয়া উচিত ছিল যেখানে।

    দুদিনের দিন পাওয়া যায় নি বটে কিন্তু হারানোর চতুর্থ দিনের দিনে পাওয়া গেছল। এবারে পায়নি জয়কান্ত। পেয়েছিল হীরাবতী।

    তিন দিনের দিন শেষ রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল জয়কান্ত। মৃত্যু পর্যন্ত স্ত্রীর দিকে তাকায় নি। কাছে এলে খোলা চোখ বুজেছে। স্বামীর মৃত্যুতে হীরাবতী অনুশোচনার আগুনে জ্বলেছে। হারটা খুলে রেখে গেলে এ মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটত না হয়ত। অনুশোচনার জ্বালা একদিন মাত্র ভোগ করে আর সহ্য করতে চায় নি সে। মরে নিষ্কৃতি পেতে চেয়েছিল। তাই জয়কান্তর মৃত্যুর পরের দিনের শেষ রাতে চুপি চুপি বেরিয়ে গেছল বাড়ীর বাইরে। সমুদ্র ফেরত দেয় না কিছু। লোকে মিথ্যে রটায়। পাথর ফেরত দেয়নি। তাকেও ফিরিয়ে দেবে না এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ। এখানে তার আশা পূরণ হবে। তার যে মুখ স্বামী দেখেনি—অন্য কেউও দেখতে পাবে না সে মুখ আর।

    …সমুদ্রের সামনে এগিয়ে আসছে। যেখানে বসত দু’জনে, বেড়াত দু’জনে যেদিকে-সেস্থানে-সেখানে এসে দাঁড়াল একটু পরে। এগিয়ে যাচ্ছে আবার সামনের দিকে। হঠাৎ হারশুদ্ধ পাথরটা এসে আছড়ে পড়ল হীরাবতীর পায়ের কাছে ঢেউয়ের জলের জলে। জ্বলে উঠল পাথরটা। উপুড় হয়ে পড়তে পড়তে টাল সামলে নিয়ে হারটা তুলে নিল হীরাবতী। মুগ্ধচোখে দেখল খানিক একদৃষ্টে। তারপর অজান্তেই নিজের গলায় গলিয়ে দিল চেন হারটা। মনে হল, বেঁচে আছে জয়কান্ত। যে জন্য যা করবার জন্য এসেছিল হীরাবতী সে পথ থেকে সরে গেল। আত্মঘাতী হতে ভুলে গেল একদল। আশ্চর্য! একবারের জন্যও মনে হল না তার—হারটা আগে পেলে জয়কান্ত বাঁচতে পারত।

    বাড়ী ফিরে গেল হীরাবতী।

    বছরের পর বছর ঘুরেছে। এই করে কেটেছে পাঁচটি বছর। এর মধ্যে একদিনের জন্যও স্বামীহারা মনে হয়নি হীরাবতীর। সময় সময় ভেবেছে, মাথাটা কি তার খারাপ হয়েছে? তা না হলে এরকম অবাস্তব কথা মাথার ভিতর জেকে বসে থাকতে পারে কেমন করে!

    তখুনি অজ্ঞাতসারে চলে গেছে আলমারীর কাছে। ড্রয়ারটা খুলতেই পাথরটা নজরে পড়েছে। বাস্তব-অবাস্তবের কথা মাথা থেকে চলে গেছে তখুনি। কেবলি ভাবতে ইচ্ছে করেছে, বেঁচে আছে জয়কান্ত। পরম তৃপ্তিতে ভরে গেছে মনপ্রাণ ভাবার সঙ্গে সঙ্গে।

    গলায় আর হারটা পরে না হীরাবতী রোজ। ড্রয়ার খুলে সকাল সন্ধ্যেয় দেখে কেবল। পরে মাত্র বছরের একটা দিন। কার্তিকী অমাবস্যার সন্ধ্যেয়। এই দিনে এই সময়ে প্রথম পেয়েছিল। পাথরটার সঙ্গে নতুন জীবনও পেয়েছিল। প্রতি বছর একটা রাত প্রাণভরে পাথরের আলোয় নিজেকে ডুবিয়ে দেয় হীরবতী। ওই আলোর ভিতর যেন জয়কান্তকেও দেখে সে চোখের সাধ মনের সাধ মিটিয়ে।

    জয়কান্ত পাথর পেয়ে যেমন নতুন জীবন পেয়েছিল, তেমনি হীরাবতীর পাথর পাবার বছরখানেক পর ভাশুরের ঘরে একটি নতুন জীবন এসেছিল।

    এই নতুন জীবন এল ভাশুরের প্রৌঢ় বয়সে। ঘর আলো করা প্রথম ছেলে। বংশীমোহন। বছর চারেকে পড়েছে বংশীমোহন। মায়ের কাছে থাকতে চায় না। চায় কাকীর কাছে সব সময়েই থাকতে। দু’মাস বয়েস থেকেই এই রকমের ও। মাসখানেক মামার বাড়ী গিয়ে অর্ধেক হয়ে এসেছে। খেত না, ঘুমুত না। বাড়ীর সকলকে জ্বালিয়ে মারত কাকীর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।

    ফিরে এসেছে কার্তিকী অমাবস্যার সন্ধ্যেয়। ঘরে এসেছে কখন জানে না। এ দিনে এ ঘরে এ সময় কেউ আসে না। বংশী আসতে চাইলেও কান্নাকাটি করে রসাতল-তলাতল করলেও ওকে জোর করে আটকে রাখা হয়। আর তাছাড়া হীরাবতী এ দিনটায় সন্ধ্যে থেকে দরজা বন্ধ রাখে। শেষ রাতে হার তুলে রেখে তবে খোলে। হার পরা অবস্থায় বেরোয় নি কারো সামনে। দেখেনি এ হার কেউ।

    দেখল বংশীমোহন। দরজা দিতে কেন ভুল করেছিল হীরাবতী। তা নিজেও জানে না। অবাক হয়ে যাচ্ছে বংশীমোহনের হার চাওয়ার ধরনে। অবাক হয়ে যাচ্ছে ওর চাউনি। হার-পাথর খোয়া যাবার পর এই ভাবের কথা শুনেছিল, এই ভাবের তাকানো দেখেছিল জয়কান্তর।

    এগিয়ে আসছে ছেলেটা। হীরাবতী দেখছে বাচ্চা নয় ও। বড়—অনেক বড়। কি বিচ্ছিরি চেহারা! জরাজীর্ণ রোগা-লিকলিকে! বুকের ভিতর একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা তোলপাড় করছে হীরাবতীর।

    না দিলে, মুখ দেখব না তোর আর।

    বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হয়ে পড়ল যেন হীরাবতী। কেঁপে উঠল ভিতর-বার। একি শুনল সে। স্পষ্ট বড় মানুষের কথা একেবারে। প্রথম থেকেই বাচ্চার আধ আধো কথা শুনতে পাচ্ছে না মোটে।

    পিছু ফিরল বংশীমোহন। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে যাচ্ছে। বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে।

    কান্নাভেজা কাঁপা গলায় বলে উঠল হীরাবতী—যেও না। তোমার পাথর তোমায় ফিরিয়ে দিচ্ছি আমি এখুনি। কথাগুলো যে কি করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো—তা-ও জানতে পারে নি হীরাবতী।

    ফিরে এলো বংশীমোহন হীরাবতার কাছে। সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে মিটিমিটি। হারটা খুলে হাতে দিল ইরাবতী।

    হাতে নিয়ে দেখছে বংশীমোহন পাথরটাকে। জ্বলছে পাথরটা। আনন্দে জ্বল জ্বল করে উঠছে দু’চোখ ওর। পরিবর্তন মুখের রুগ্ন ভাবের। পরিবর্তন হচ্ছে লিকলিকে শরীরের।

    হারটা ফিরিয়ে দিল হীরাবতীর হাতে বংশীমোহন। গম্ভীর ভাবে বলল, পাথরটা হারায় না যেন, সাবধানে রেখো।

    হারটা হাতে নিয়ে দেখাতে দেখাতে পাথরটার গোপন রহস্য কাহিনী জানিয়েছিল আমায় হীরাবতী নিজেই।

  • সোম সাঁওতাল

    সোম সাঁওতাল

    মুরলীধর পাঁচ মাথা তালগাছটার তলা দিয়ে আসছে পাথরখনির দিকে। লাল লাল শক্ত মাটির ডেলাগুলো জুতোর ডগায় ঠোক্কর খেয়ে ঠিকরে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে। পাহাড়ী নদীটার কাঠের পুলের কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। বিছানো এক একটা কাঠ থেকে অন্যটা অনেক তফাতে। চলার একটু উনিশ-বিশ হলে, বেতালে পা পড়লে, ফাঁক দিয়ে গলে একেবারে নদীর বুকে পড়তে হবে।

    দেখল খানিক নীচের দিকে তাকিয়ে মুরলীধর। কাকচোখ জল বয়ে চলেছে ঝিরঝির করে। পড়লে ডুববে না তবে খণ্ড খণ্ড পাথরের ঘায়ে দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে, আর হাড় ক’খানাও যে গুড়ো হয়ে যাবে এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ। আর তাছাড়া এত উঁচু থেকে নীচে পড়ে গেলে, অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকেও রেহাই পাবে না সে কিছুতেই।

    এই পুল দিয়েই প্রতিদিন পেরোয়, এরকম চিন্তা-ভাবনা আসেনি মাথায় কোনসময়। কিন্তু আজ আসছে। কেন আসছে, কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। একটু ভেবে স্থির করল, দোনামনা ভাব নিয়ে পুলে ওঠা যুক্তিযুক্ত নয়। ঘোরাপথ দিয়ে যাবার মনস্থ করল। দেরী হবে না হয় একটু।

    রাস্তায় ভয় ধরেছে দারুণ। চলতে চলতে কেবলই মনে হয়েছে, কতকগুলো লোকের নিঃশ্বাস তার গায়ে পড়ছে, অথচ তার আসে-পাশে নেই কেউ। দূরে দূরে মানুষ যেতে দেখেছে, তবুও ভয় কাটেনি তার।

    মনে ভয় পুষে আর বিকেলের পড়ন্ত রোদ মাথায় করে পাথরখনিতে এসে পৌঁছল মুরলীধর।

    মুখ থেকে তখন ব্লাস্টিংয়ের অর্থাৎ পাহাড় ফাটানোর তোড়জোড় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পাহাড়ের বুকে গর্ত করে করে বারুদ ঠাসা হয়ে গেছে, গর্তের বার করা নারকোল দড়িটা খানিক দূর অবধি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওর শেষ প্রান্তে আগুন ধরাবার জন্য নিকষ কালো এক মজবুত দেহের মানুষ মোমবাতি জ্বেলে অপেক্ষা করছে। ঘণ্টাধ্বনি করে লোকদের সরে যাবার নির্দেশ দেওয়া হবে এবার। মাটির তলায় চারতলা সমান পাথরখনির নীচের তলা থেকে কুলিকামিনরা উঠে আসবে ওপরে—ওপর থেকে পাহাড় কেটে যে রাস্তা করা হয়েছে নীচ অবধি—সেই রাস্তা ধরে।

    যতখানি পর্যন্ত পাহাড় ফাটাবে, পাথরের টুকরো ছিটকাবে তীরবেগে—ততখানি জায়গা লাল নিশান পুতে পুতে বিপজ্জনক এলাকার চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তার বাইরে চওড়া চার দেয়ালের ওপর কুশঘাসের ছাউনি দেওয়া মাটির কুড়েঘরখানার দাওয়ায় এসে দাঁড়াল মুরলীধর। পাহাড় ফাটানো দেখবে। ফাটানোর সময় প্রায়ই দেখে সে। খানির মালিক সে-ই।

    কিন্তু বুকটা দুরদুর করছে তার মৃত্যু ত্রাসে। এখানকার লোকজন, যাদের আপনজন ভাবত, তাদের দুশমন ভাবছে। এদের ভিতরের অনেকেরই জোড়া জোড়া চোখ মুরলীধরকে কড়া নজরবন্দী করে রেখেছে যেন। ওরা যেন তাকে মেরে ফেলার একটা ফন্দী এঁটেছে। পাহাড় ফাটার সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে ফেলবে। অশেপাশে কেউ নেই সত্যি, তবুও মনে হচ্ছে ক’টা লোক ঘোরাফেরা করছে চতুর্দিকে। এরা খুব চেনা চেনা। কে এরা বুঝতে পারছে না কিন্তু।

    মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারছে না কাউকে। সাহায্যের জন্য, এরকম পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করার জন্য সাহস করে ডাকতে পারছে না কাউকে। সে যে ভীরু নয় সাহসী—জানে সবাই। দেশ বিভাগের পর চলে এসেছে এখানে। সিন্ধু থেকে পাকুড়ে। জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে দু’পায়ে দাঁড়িয়েছে। দুঃখ-কষ্টে ভেঙে পড়েনি কখনো, শোকে তাপে মুষড়ে পড়েনি। সকলে জানে, মুরলীধর সিন্ধী অতি সাহসী।

    নিজের কাছে নিজেরই লজ্জা আসছে মুরলীধরের। লজ্জা এলেও নিস্তার নেই। সাহসের স্মৃতি টেনে এনে, সামনে তুলে ধরেও সাহস ফিরে পাচ্ছে না। মৃত্যুভয় হটাতে পারছে না। মনটা যেন আরো ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। মেরুদণ্ডের ওপর থেকে নীচে পর্যন্ত একটা কনকনে ঠাণ্ডা স্রোত বইছে। স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে আসছে।

    ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছে মুরলীধর। চরম মুহূর্ত আসছে বুঝি, এল বুঝি। বাতাসে শত্রুরা হয়ত কিছু বিষাক্ত বস্তু মিশিয়ে দিয়েছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। মুরলীধরের দম নিতে কষ্ট হচ্ছে।

    ঘণ্টাধ্বনি থামল। হুইশল বেজে উঠল। তীব্র আওয়াজটা কানের পরদা ছিড়েখুঁড়ে দিল যেন। আগুন জ্বলল বারুদের দড়িতে। দড়ি ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে আগুন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল বারুদঠাসা এক একটা গর্তের ওপর। কয়েক মুহূর্ত নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা। তারপর আকাশ ফাটানো আর্তনাদ করে পাহাড় ফাটল। সঙ্গে সঙ্গে কুঁড়েঘরের দাওয়াটা ভূমিকম্পের মত কেঁপে উঠে ধসে পড়ল।

    কোথায় ছিটকে পড়ল মুরলীধর বুঝতে পারল না। মুরলীধর বেঁচে আছে কি মরে গেছে তা-ও না।

    এ-সব স্বপ্ন দেখেছে মুরলীধর।

    মুরলীধরের গোঁ গোঁ আওয়াজে স্ত্রীর ঘুম ভেঙেছে। স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে। জেগেও কিছুক্ষণ সময় গেছে সামলাতে মুরলীধরের। স্বপ্নকে স্বপ্ন বলে মেনে নিতে মন চায়নি প্রথমে। নিজে বেঁচে আছে কি মরেছে, সন্দেহ কাটতে বেশ সময় লেগেছে।

    অনেক দিন পরেও দুঃস্বপ্নের ছবি ভুলতে পারেনি এটা প্রমাণ হয়ে যেত মাঝে মাঝে। ব্লাস্টিংয়ের সময় এক একদিন হঠাৎ মনে হয়েছে, এইবার বুঝি ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে দুনিয়া থেকে নিশ্চয় সরিয়ে ফেলবে।

    এতখানি বলে একটু চুপ করে রইল পাথরখনির ম্যানেজার। চতুর্দিকে দু’চোখ চক্কর দিয়ে এল তার একবার। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে জানাল, ব্লাস্টিং হতে দেরী নেই আর।

    কুঁড়েঘরের মাটির দাওয়ায় দু’খানা মুখোমুখি বেতের চেয়ারে আমরা বসে দুজনে। আমি আর ম্যানেজার। অন্য জগতে বিচরণ করতে করতে বলছিল সব ম্যানেজার। আমি শুনছিলুম।

    আমাকে চমকে দিয়ে বলা শুরু করল ম্যানেজার আবার—

    মুরলীধরকে দুঃস্বপ্ন থেকে থেকে বড় বেশী যন্ত্রণা দেয়—এটা ডাক্তার-বৈদ্য -মনস্তত্ববিদদের জানিয়ে ছিল সে। অনেক ওষুধ খেয়েছে ওঁদের, অনেক উপদেশও শুনেছে। ফল হয়নি। ফল হল, দুঃস্বপ্ন যখন সত্যি হল। অবিশ্যি সত্যি হল একটু অন্যভাবেই।

    এই খনিতেই অন্যদের সঙ্গে কাজ করত দুজনে। একজন বড়কা সর্দার আর অন্যজন ঝুমনা মজুরনী। বড়কা পাথরের বড় চাঁই ভাঙত ভারী হাতুড়ির ঘা বসিয়ে বসিয়ে। ঝুমনা ছোট পাথর ভেঙে আরো ছোট ছোট করত। টুকরি ভর্তি করে মাথায় চাপিয়ে ওপরে নিয়ে আসত।

    কাজের ফাঁকে ফাঁকে দুজনের হাসিমস্করা চলত। ওরা নাকি একজন অন্যকে না দেখতে পেলে পাগল হয়ে ওঠে, অস্থির হয়ে ওঠে। কাজে মন টেকে না। ঘরে বাইরে স্বস্তি-সুখ পায় না।

    এসব শুনে কোন স্বামীর না মেজাজ চড়ে, মাথায় রক্ত টগবগ করে ফুটে না ওঠে? ঝুমনার আদমীর মেজাজ চড়ল, খুন চাপল মাথায়। কিন্তু কিল খেয়ে কিল চুরিই করতে হল তাকে। বড়কা সর্দারের চেয়ে সে কমজোর তো বটেই, তাছাড়া ওর তুলনায় লোকবলও অনেক কম তার। নেই বললেই চলে।

    শেষ পর্যন্ত একটা মীমাংসা করে নিল আদমী বড়কার সঙ্গে। কিছু টাকা নিয়ে বৌকে ছেড়ে দিল। এটা সঁওতাল সমাজের রীতির মধ্যেই পড়ে। দোষ দিল না কেউ আদমীর, দোষ দিল না বড়কার। বছর চারেকের ছেলে সোমের ভার কিন্তু নিল না কেউ। না নিল আদমী, যার নিজের ছেলে। না নিল সৎবাপ বড়কা। আদমীর ঠিক দোষ দিলে চলবে না। প্রথমে নিতে চেয়েছিল লোকটা। ছেলেটাই বাধ সাধল। মাকে জড়িয়ে ধরে কি চিৎকার, কি কান্না। যাবে না বাপের কাছে। আর সত্যি কথা বলতে কি, মায়েরও ছাড়বার ইচ্ছে ছিল না একদম।

    ঝুমনার খুব আশা ছিল, অন্ততঃ তার মুখ চেয়ে বড়কা ছেলেটাকে ভালবাসবে, দেখবে। বড়কার দিন দিন আচার ব্যবহার দেখে ধারণা ধুলিসাৎ হয়ে গেছিল। বড়কার দু’চক্ষের বিষ ছেলেটা। বিয়ের পর থেকে বড়কা খালি বলতে শুরু করেছে, আপদটাকে এখান থেকে বিদায় করাই ভাল। ওর বাপ একটা আস্ত শয়তান। বড় হলে ছেলেটা কি আর না হবে বাপের মত। বিষবৃক্ষ চারা অবস্থায় মূল থেকে তুলে ফেলাই উচিত।

    বড়কার দিকে খরখরে দু’চোখে তাকাত শুধু ঝুমনা। মুখে কিছু বলত না। মানুষটার চোখের দিকে চাইলে, একটা বিপদের আঁচ পেত যেন। বুক কেঁপে উঠত। কে জানে ছেলেটার না কোন অমঙ্গল করে বসে লোকটা।

    যতটা পারল, বড়কার চোখের বাইরে সরিয়ে রাখতে লাগল সোমকে ঝুমনা।

    এটা বুঝতে পারল বড়কা। রাগে আগুন হয়ে উঠল।

    ছেলেটাকে নিয়েই ঝুমনা ব্যতিব্যস্ত দিনরাত। কাজে আসা ছেড়েছে, তার ঘরে যাওয়া ছেড়েছে। কোথায় থাকে কে জানে! ছেলেই ওর সর্বস্ব, বড়কা কেউ নয়। ছেলেটাকে সরাতে না পারলে ঝুমনাকে কাছে পাবে না বড়কা।

    পাকুড়ের অন্ধিসন্ধি খুঁজে খুঁজে ঝুমনার মাসির কাছ থেকে ঝুমনাকে আর সোমকে বার করল বড়কা। ঝুমনাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কাজ করতে রাজী করাল আবার। সোম কত আদরের। ওকে সে-ই দেখবে। সোমকে না দেখতে পেয়ে মনঃকষ্টে দিন যাচ্ছে তার। সরল মনের মেয়ে ঝুমনা বড়কার কথা বিশ্বাস করল।

    সেদিন একটু বাদেই ব্লাস্টিং হবে—এমন সময় সোম উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে এই কুড়েঘরটার দিকে আসতে লাগল। বাচ্চাটার মুখে-চোখে দারুণ ভয়। পিছু পিছু ছুটে আসছে বড়কা সর্দার আর জনাচারেক লোক। বাচ্চাটা যাতে কোন দিকে না গিয়ে এই দিকেই আসে—সেই ভাবেই ওরা তাড়িয়ে নিয়ে আসছে।

    মুরলীধর বিপদমুক্ত এলাকায় নীল আকাশের নীচে চেয়ারে বসে বসে দুঃস্বপ্নের বাস্তবরূপ দেখছে যেন। তার মনে হচ্ছে, সে সোম। তাকেই মারবার জন্য ওরা দৌড়ে আসছে।

    মুরলীধরের হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। দেহটাও। মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মৃত্যু বোধহয় এসে দাঁড়িয়ে আছে পিছনে।

    ঘরের মধ্যে সোমকে জোর করে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল বড়কা। চোখ রাঙিয়ে চেরাগলায় শাসিয়ে দিল ওদের সাঁওতালী ভাষায়, বেরুবি না এক পা-ও। এখানে ওখানে ঘুরঘুর করলে, পাথর ফেটে ঠিকরে এসে মাথায় লাগলে বাঁচাতে হবে না আর।

    মুরলীধরের ভিতর বলছে, বড়কা সর্বনেশে লোক। তলায় তলায় তাকে মেরে ফেলার বন্দোবস্ত করে বাঁচাবার চেষ্টা দেখাচ্ছে। তার নমুনা টের পাওয়া যাবে এখুনি।

    মুরলীধর যেন জড়বস্তু হয়ে যাচ্ছে এবার। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। দম আটকে আসছে তার।

    ঘণ্টা বাজছে। যে যেদিকে পারল, ছুটে পালাল। সতর্কধ্বনি থামতেই বেজে উঠল হুইশল।…দড়াম দড়াম শব্দে পাহাড় ফাটল। সঙ্গে সঙ্গে কুঁড়েঘরটা ধসে পড়ল।

    আর ঠিক সেই মুহূর্তে মুরলীধরের বুকের ওপর ছিটকে এসে পড়ল সোম। সচেতন হয়ে উঠল মুরলীধর। তার মনে হল, সে মরেছিল, প্রাণ ফিরে পেল যেন আবার। ভীতসন্ত্রস্ত সোমকে দু’হাতের বেষ্টনী দিয়ে চেপে ধরে রইল।

    খানিক বাদে সোমকে যত্ন করে নিয়ে গেল মুরলীধর নিজের বাড়িতে।

    পরে বিপদমুক্ত এলাকায় বিপদ ঘটার ইতিবৃত্ত জানতে পারা গেল অনুসন্ধান করে। বড়কাই সোমকে শেষ করার জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখে দিয়েছিল। কুড়েঘরের বাইরে পিছনের গর্তটায় সবার অলক্ষ্যে প্রচুর বারুদ ঠেসে রেখেছিল। গর্তের মুখ থেকে ঘাসের তলা দিয়ে লম্বা দড়িটা নিয়ে গেছিল অনেক দূর অবধি। দড়ির শেষের দিকটায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল সে নিজেই।

    …এবার স্নাস্টিং হবে। নিরাপদ জায়গায় সরে গেল সকলে। নতুন কুড়েঘরটার দাওয়ায় আমরা। আমার ভয় ধরছে, এ ঘরটা না উড়ে যায় আবার আমাদের নিয়ে। ম্যানেজারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি একদৃষ্টে। মুখখানায় ভয়ডরের লেশমাত্র নেই ওর। চোখে চোখ পড়তে হাসির রেখা ফুটে উঠল ঠোটের ফাঁকে। অভয় দিল যেন আমায়।

    আমি দেখছি ম্যানেজারকে। দেখতে চেষ্টা করছি শিশু সোম সাঁওতালকে মুরলীধরের স্নেহপুষ্ট তরুণ ম্যানেজার সোম সাহেবের মধ্যে।

  • রাজলক্ষ্মী

    রাজলক্ষ্মী

    চারদেয়াল এগিয়ে আসছে ক্রমশ চারদিক থেকে। শুয়ে আছে বনমালা মাঝখানে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যাবে একদম আর একটু পরেই। বেশ বুঝতে পারছে, মৃত্যু শিয়রে উপস্থিত। এই ভাবেই তার মতো মৃত্যু-যন্ত্রণা ভোগ করে গেছে বোধহয় নবাবী আমলের এক একজন সুন্দরী। জীবন্ত সমাধি দেওয়া হত সেখানে চার দেয়াল গেঁথে। এখানে দেয়াল গাঁথা হয়নি, বনমালার নিজের ঘরেরই দেয়াল চেপে-পিষে মারবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।

    বুকের ওপর কোন একটা ভারী বস্তু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তার। বস্তুটা কি বুঝে উঠতে পারছে না। তবে ভীষণ ভারী হয়ে উঠছে। হাড় পাঁজরাগুলো মটমট করে ভেঙে গুড়িয়ে যাবে বুঝি এখুনি। অসহায় অবস্থা। সাহায্যের জন্য যে কাউকে ডাকবে সে ক্ষমতাও নেই। জিভটা টানছে ভিতর দিকে। গলা থেকে বুক অবধি শুকিয়ে কাঠ। চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারছে না। বনমালা মনে মনে ডাকছে নাগরাজকে। তুমি এস! রাক্ষুসে দেয়াল চারটের মারাত্মক খপ্পর থেকে আমাকে উদ্ধার কর। আমাকে বাঁচাও। বুকের ওপর থেকে বোঝাটাকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে দাও এখুনি। সইতে পারছি নে আমি আর একতিলও।

    কেউ এল না। নাগরাজ তো নয়ই। বনমালার মনের ডাক, আকুতি কারো কানে পৌঁছবার কথা নয়। পৌঁছয়নি। মনের কানেও পৌঁছতে পারেনি কারো। মাঝ রাতে ঘুমে অচেতন প্রায় সবার মন।

    বুকের তলায় একটা অসহ্য-অজানা ব্যথার খোঁচায় বনমালার ঘুম ভেঙে গেছিল আচমকা। চোখ খুলে চতুর্দিকে তাকাতেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে সর্বশরীর শিউরে উঠল। দেখল, দেয়াল চারটে জীবন্ত হয়ে উঠেছে…চোখ চেয়ে থাকতে পারেনি বেশীক্ষণ। বুজে ফেলেছে।

    উঠতে পারছে না। নড়তে পারছে না। সমস্ত দেহটা অবসন্ন-অবশ।

    প্রাণের চেয়ে বড় আর কিছু নেই দুনিয়ায়। ভিতরের বাঁচার তাগিদে অসাড় অঙ্গে সাড় এসে গেল যেন হঠাৎ। নেভবার আগে প্রদীপ জ্বলে উঠল যেন। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে জোর করে দু’চোখ খুলতে চেষ্টা করল। পালাবার যদি কোন সুবিধে পায়, পালাবে। জানালা দরজা খুলতে পারলে, বাইরে লাফিয়ে পড়েও প্রাণ বাঁচাবে।

    চোখ খুলে তাকাতেই ভয়ানক ভাবে একটা ধাক্কা খেল বনমালা। বুকের মাঝখানে পান্না বসানো লকেটটার ওপর একটা মুখ! স্পষ্ট দেখছে ডিমলাইটের ফিকে সবুজ আলোয়। মুখখানা অজানা কোন বৃদ্ধার। এরকম চামড়া কোঁচকানো মাকড়সার জাল আঁকা মুখ এর আগে কখনো কোথাও দেখেনি। বৃদ্ধার তীক্ষ্ণ স্থির দৃষ্টি আটকে পড়েছে তার মুখের ওপর। কোটরগত চোখের আগুনের হলকায় বনমালার সমস্ত মুখ ঝলসে যাচ্ছে। এভাবে ঝলসাতে থাকলে মুখ বিকৃত হয়ে যাবে। দু’চোখ অন্ধ হয়ে যাবে জন্মের মতো।

    বনমালার চোখ মুখ গলা বুক জ্বলছে। ভীষণ জ্বলুনি। অসহ্য হয়ে উঠছে। তাকিয়ে থাকতে পারল না আর। আপনা হতেই দু’চোখের পাতা নেমে এল। বেঁহুশ হয়ে পড়ল বনমালা।

    জ্ঞান যখন ফিরল, তখন সকাল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পুবের জানালা দিয়ে আকাশের রোদ এসেছে ঘরে। প্রথম চোখ চাইতে আঁতকে উঠল বনমালা। নাগরাজের মুখে রাতে দেখা বৃদ্ধার মুখটাই দেখল যেন আবার দিনের আলোয়। অচৈতন্য হয়ে পড়ল এবারেও।

    কিংকর্তব্যবিমূঢ় নাগরাজ স্ত্রীকে নিয়ে মহা ফাঁপরে পড়ল। স্ত্রী তাকে দেখলেই চমকে উঠছে, চোখ বুজছে, জ্ঞান হারাচ্ছে।

    এই অবস্থা চলল দিন তিনেক। ডাক্তার বৈদের কোন ওষুধই কাজে লাগল না। কি রোগ ধরতে পারল না কেউ অনেক চিন্তা গবেষণা করেও।

    রুগীর মুখ থেকেও কোন কথা শুনতে পেল না যাতে রোগের কারণ খুঁজে বার করা যায়।

    বনমালার অবস্থা শোচনীয়। শুধু স্বামীর মুখ কেন, সম্বিৎ ফিরলে যে কোন লোকের মুখ চোখের সামনে পড়েছে, আত্মীয় স্বজন মায় ডাক্তার-বৈদের মুখেও ওই ভয় ধরানো জ্ঞান হারানো একটা মুখই দেখছে কেবল। বৃদ্ধার—অন্য কারো নয়।

    বৃদ্ধার মুখ দেখার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুখ বন্ধ হয়েছে। যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে। কোথায় কোন অজ্ঞাত দেশের কোন গহন অন্ধকারে অতল তলে তলিয়ে গেছে নিমেষে।

    বরাবরের সুস্থ নীরোগ বনমালার ক্ষণে ক্ষণে অজ্ঞান হয়ে পড়া ব্যামোর কথা চতুর্দিকে আপনজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। সকলেই দেখতে এল। বাড়ি ভর্তি লোকে লোক। রোগ সম্বন্ধে হিতাকাঙ্খীদের ধারণা এক এক জনের এক এক রকম। নিরাময় করে তোলবার উপদেশও ভিন্ন ভিন্ন। পরস্পরে মতপার্থক্যও যথেষ্ট।

    তবুও অন্ধকারে আলোর দিশারা ভেবে নিয়েছে নাগরাজ প্রত্যেকের মতকে। সাধ্যমত তাদের কথা রাখতে চেষ্টা করেছে। উপকার হয়নি কিছু বনমালার। সুস্থ হয়ে ওঠেনি।

    সুস্থ হয়ে উঠল তিনদিন পরে। হঠাৎ যেমন বনমালা দেখতে শুরু করেছিল বৃদ্ধার মুখ, তেমনি হঠাৎই চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছিল একেবারে সে-মুখ আশ্চর্য ভাবে। বনমালা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল আগের মতো।

    স্বাভাবিক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অন্য বিপদ এসে উপস্থিত হল আবার বাড়িতে। বনমালার ছোট বোন যেন কেমন হয়ে যেতে লাগল থেকে থেকে। ভালো করে নজর করতে দেখা গেল, বনমালার মতোই ও চোখ চাইতে পারছে না। বেঁহুশ হয়ে থাকছে বেশীর ভাগ সময়।

    নতুন রোগটা সংক্রামক মনে হল বাড়ি সুদ্ধ, সকলের। অনেকেই ভাবল বনমালার মতো আপনা হতেই সেরে যাবে হয়ত তিন দিন পরে। কিন্তু তিন দিন ছেড়ে চার দিন পাঁচ দিন হয়ে গেল, তবু একটুও সুরাহা হল না ছোট বোনের। বরং আরো বাড়ের মুখে এগুতে লাগল।

    ছ’দিনের দিন না জেনেই যে কাজ করে ফেলেছিল বনমালা, তাতেই ভালো হয়ে উঠেছিল ছোট বোন।

    অবাক লেগেছিল বনমালার কাছে সমস্ত ব্যাপারটা। তার অজ্ঞান অবস্থায় হারিয়ে যাবার ভয়ে সবুজ হীরে বসানো লকেটের হারটা গলা থেকে খুলে নিয়েছিল বোন। পরেছিল নিজের গলায়। বনমালাও বোনের অচৈতন্য ভাব দেখে দেখে তার সখের দামী হারটা চুরি যেতে পারে ভেবেছিল। খুলে নিয়েছিল হারটা তাই। খোলার কিছুক্ষণ পরই অভাবনীয় ঘটনা ঘটতে দেখেছিল। বোনের অসুস্থতা কোথায় যেন চলে গেছিল মুহূর্তে।

    সকলেই নতুন রোগের উৎপত্তি-উপশমের রহস্য জানতে পেরেছিল। হারটাই যত অনাসৃষ্টির মূল। পরলে ভয়াবহ মৃত্যুযন্ত্রণা, খুললে স্বর্গের শান্তি।

    হার রহস্যের দুটো দিক মেনে নিতে পারল না আবার কেউ কেউ। সন্দিগ্ধ মনের লোকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। এদের দলে নাগরাজও যোগ দিয়েছিল।

    মেয়ে-পুরুষ পালা করে এক একজন হারটা গলায় দিয়েছিল। একদিনের বেশী দু’দিন রাখতে পারেনি কেউ কাছে। বনমালার মতোই দেখেছে প্রত্যেকে বৃদ্ধার শুকনা মুখ চোখের আগুন। দেখেছে জীবন্ত চারটে দেয়াল জানালা-দরজা সুদ্ধ এগিয়ে আসছে। অনুভব করেছে বুকের ওপর পাথর বোকার অসহ্য যন্ত্রণা। শক্ত সমর্থদের বেঁহুশ হয়ে পড়তে দেরী লাগেনি বেশীক্ষণ।

    একবাক্যে স্বীকার করেছে সবাই-এ সর্বনেশে হার ঘরে রাখা উচিত নয়, কাছেও রাখা উচিত নয়। এ হার কাছে থাকলে দুর্বল মানুষের জীবন সংশয় হয়ে যেতে পারে চোখের পলকে।

    সখের হার ত্রাসের বাতাস ছড়াচ্ছে বাড়িময়। জহুরীকে ফিরিয়ে দিতে স্বামীর মতেই মত দিল তাড়াতাড়ি বনমালা।

    স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে এল জহুরীর দোকানে।

    হারটা ফেরৎ নিতে চাইল না জহুরী। পরিষ্কার জানিয়ে দিল, কেনার আগে বলে দেওয়া হয়েছে তো ফেরত নেওয়া হবে না আর। রাজী হয়েই তো মিস্টার-মিসেস নিয়েছেন।

    হারের রহস্য শুনে মুখখানা খুব গম্ভীর হয়ে গেল জহুরীর। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, এই একই কথা শুনে শুনে অনেকের কাছ থেকে ওই হার ফেরৎ নেওয়া হয়েছে। সেই জন্যই প্রথমে বলে দেওয়া হয়েছিল—এ হার কারো সয় না। তা সত্বেও জোর করে কিনেছিলেন মিসেস। বলেছিলেন, সওয়া-না-সওয়া ক্রেতা বুঝবে। দোকানীর মাথাব্যথার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি ফেরৎ দিতে আসবেন না কোনদিন।

    দোকানীর সব কথাই সত্যি। সয় না কথার ভিতর যে এত রহস্য লুকানো আছে, কেমন করে জানবে বনমালা? হারের সবুজ পাথরটাকে খুব পছন্দ হয়েছিল বলেই লোভ সামলাতে পারেনি।

    এখন মনে হচ্ছে, তখন যেন দোকানী আরো কিছু বলতে চেয়েছিল। উত্তেজিত হয়ে বনমালা বলতে দেয়নি। ভেবেছিল, তার পছন্দের সুযোগ নিতে চাইছে বুঝি দোকানী। আর তা ছাড়াও বাঙ্গালোরের নামীদামী ঘরের বৌ জেনে, হারটার দাম বাড়াবার ফিকির আঁটছে ভয় ধরিয়ে।

    সে ভুল ভাঙল, কিন্তু হারের কোন গতি করা গেল না। মহা সমস্যায় পড়ল স্বামী-স্ত্রী। হার নিয়েই ম্লান মুখে বাড়ি ফিরতে হল ওদের দুজনকে।

    এরপর সাত দিন ধরে স্বামী-স্ত্রীতে চিন্তা করেছে অনবরত। কি ভাবে কার কাছে বিদায় করা যায় হারটাকে। পথ খুঁজে পায়নি। অজানা লোককে না জানিয়ে গছালে, শেষ পর্যন্ত কারো না কারো মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে হবে তাদের। এ কাজ তাদের বিবেক বুদ্ধি থাকতে কিছুতেই করতে পারবে না। অথচ হারটাকে বেশীদিন সিন্দুকজাত করে রাখাও মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কে জানে, সিন্দুকের ভিতর থেকেও কখন কি মূর্তি ধরে বসে আবার।

    চিন্তায় সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায়। চাপা স্মৃতির দরজা খুলে যায়। পথ খুঁজে পেল বনমালা। মনে পড়েছে নন্দীগ্রামের ভোগনন্দীশ্বর দেবতাকে। এ হার দেবতার গলায়ই দেওয়া ভালো। দেবতার ইষ্ট-অনিষ্টের বালাই নেই। অশুভ মৃত্যুরও আশঙ্কা নেই। মনের কথা স্বামীকে জানাল বনমালা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল স্বামী-স্ত্রী।

    আটদিনের দিন ভোরে স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে নন্দীগ্রামে এল বনমালা। হারের সঙ্গে পুজোর ডালা ধরে দিল পুরোহিতের হাতে। সবুজ হীরের হার উঠল ভোগ নন্দীশ্বরের গলায়।

    নিশ্চন্ত হয়ে ঘরে ফিরল স্বামী-স্ত্রী দুজনে।

    নির্বিঘ্ন-নিশ্চিন্তে দেবতার পুজো-পাঠ করে আসছেন এতদিন ধরে ভোগনন্দীশ্বরের পুরোহিত ঠাকুর। পুজো-পাঠে বাধা পড়তে শুরু হল এবার। সন্ধ্যে-আরতির পর ধ্যানের সময় লক্ষ্য করলেন তিনি দেবতার বুকের সবুজ হীরেটায় একটা বৃদ্ধার মুখ ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। মুখখানা স্পষ্ট হয়ে উঠল। চোখ বোজা অবস্থায় এ দৃশ্য দেখলেন তিনি। তাকালেন। মনের চোখে দেখাটা বাইরের চোখ আরো পরিষ্কার দেখলেন। হতভম্ব হয়ে গেলেন।

    ষাটের কোঠায় পড়েছেন তিনি। ধ্যানের সময় বাধা—ওরকম একটা নতুন-বিস্ময় উপস্থিত হয়নি কোনদিন তাঁর মনের চোখে, বাইরের চোখে। মনের ভুল কি চোখের ভুল—বার বার চোখ বুজে আর তাকিয়ে ঠিক করতে চেষ্টা করলেন। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল—কোন দেখাই তাঁর ভুল নয়। ভিতরের বাইরের —দুটোই নির্ভুল।

    একটা বিস্ময়ের ধাক্কার রেশ থাকতে থাকতে আর একটা এসে হাজির হল। কারণ চোখে দেখছে বৃদ্ধা পুরোহিতকে। পুরোহিতও তার দৃষ্টির আওতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেন না। বৃদ্ধার মুখখানা খুব চেনা চেনা মনে হতে লাগল। স্মৃতির ভাণ্ডার হাতড়ে হাতড়ে দশ বছর আগের একটা ছবি খুঁজে পেলেন পুরোহিত।

    উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর অঞ্চল থেকে স্বামী-পুত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক একদিন। মন্দিরের সুন্দর কারুকার্য দেখে পুরোহিতের সঙ্গে বসে বসে এক একদিন অনেক কিছুই আলোচনা করেছে। কবে তৈরী হয়েছে, কারা করেছে ইত্যাদি। পুরোহিত যেটুকু জানেন, জানিয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো মন্দির তৈরী দীর্ঘ ইতিহাস। ছোল-রাজাদের আমলে শুরু, বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের সময় শেষ।

    স্ত্রীলোকটি যে ক’দিন ছিল, আরতি দেখত প্রতিদিন। ধ্যানের সময় তন্ময় হয়ে যেত মূর্তির সামনে বসে। পুরোহিতকে ভক্তিশ্রদ্ধা করত খুব। দেশে ফিরে যাবার সময় পুরোহিতের খাতায় নাম-ঠিকানা লিখিয়ে দিয়ে গেছিল। অনুরোধ কৃরেছিল, ওদিকে গেলে যেন তাদের বাড়িতে পায়ের ধুলো দিতে না ভোলন পুরোহিত মশাই।

    সেদিনকার প্রৌঢ়া আজ বৃদ্ধা। কিন্তু চোখের ভাব সেই রকমই। কেবল চামড়া কোঁচকানো ছাড়া মুখের আদল বদলায়নি বিশেষ। বেশ মনে পড়ছে, এই রকমই হার যেন তার গলায় দেখেছিলেন পুরোহিত মশাই। দেখেছিলেন এই সবুজ হীরের লকেট।

    ঘটনাটা বলতে বলতে থেমে গেল ত্রিবেণীশঙ্কর। ঘরের চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে নিল একবার। জোরে নিঃশ্বাস ফেলল একটা। ছেলের নিঃশ্বাসের সঙ্গে কমলা দেবীরও দীর্ঘ নিঃশ্বাস ঝরে পড়ল। আমি রুদ্ধনিঃশ্বাসে বসে আছি। পরের ঘটনা শোনার প্রতীক্ষা।

    দু’চোখ জলে ভরে উঠল, তবু ভেজা গলায়ই বলতে শুরু করল আবার ত্রিবেণীশঙ্কর। তখন আমার কতই বা বয়েস—বছর দশেক। ওই বয়েসে যা দেখলুম চোখের সামনে—এই বাইশ বছর বয়েসেও মনে পড়লে বুকের তলার রক্ত হিম হয়ে আসে। সে কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য!

    বাবা মা সে রাতে বাড়ি ছিলেন না। দিদিমার অসুখ দেখতে গেছিলেন বেনারসে। বাড়িতে ঠাকুমা আর আমি। ঠাকুমারও ক’দিন ধরে শরীর ভালো যাচ্ছিল না মোটে। ঘুষ ঘুষে জ্বর হচ্ছিল বোজ সন্ধ্যেয়। সন্ধ্যে থেকেই বিছানা নিতেন উনি। আমি পড়াশোনা সেরে রাত আটটা-নটা নাগাদ ওঁর কাছে শুতুম। সে রাতেও শুয়েছিলুম।

    মাঝরাতে খুটখুট-খস্‌খস্‌ আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। ঠাকুমার দিকে তাকাতেই, মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় চুপ করে থাকতে বললেন। ঘরের পূর্ব কোণে কাঠের পিলসুজের ওপর পিতলের প্রদীপটা জ্বলছিল তখন। ও কোণটায়, একটা জলচৌকির ওপর একটা বিষ্ণুর ছবি আছে। সন্ধ্যে হবার মুখে ধূপ-প্রদীপ জ্বেলে দেন নিজেই ঠাকুমা।

    প্রদীপের আলোয়ই দেখছি আমি। ঝড় নেই বৃষ্টি নেই, অথচ দরজাটা থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাইরের থেকে কেউ খোলবার চেষ্টা করছে। হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে দরজায় ঘা মেরে মেরে, দরজার কোন্ জায়গাটা যেন কাটছে। একটু পরেই ভিতরের ছিট্‌কিনি আটকাবার জায়গা থেকে একটা কাঠের টুকরো ঠক করে খসে পড়ে গেল মেঝেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে আঙুল গলিয়ে কে একজন ছিটকিনি খুলে ফেলল। বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করছে আমার ভয়ে। জড়িয়ে ধরলুম ঠাকুমাকে। ঠাকুমা ধীর-স্থির নির্বাক। দেখছেন আমাকে। দেখছেন, দেখছেন। কালো পোশাকে আপাদমস্তক ঢেকে যে এক দঙ্গল লোকহুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল, তাদের দিকে কোন লক্ষ্যই নেই ওর।

    লোকগুলো প্রত্যেকে চকচকে ছোরা উঁচিয়ে আমাদের চারপাশ ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াল, ওদের মধ্যে থেকে একজন ঠাকুমার মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে তীব্র কর্কশ স্বরে বলল, হারটা নিজে হাতে খুলে না দিলে, তোকে আর তোর নাতিকে শেষ করে দেব এখুনি।

    ঠাকুমা নিরুত্তর। লোকটার কথায় কর্ণপাত করলেন না। আমায় আর একটু চেপে ধরলেন বুকের কাছে।

    এরপর চলল ওদের তাণ্ডব। ঠাকুমার বুক থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিলে ওরা আমায়। দেয়ালে ঠেসে চেপে ধরেছে দু’জনে। আমি ঠাকুমার কাছে যাবার জন্য ধস্তাধস্তি করছি দু’জনের সঙ্গে। সেই মুহূর্তে ভয়-ডর চলে গেছিল একেবারে আমার মন থেকে।

    ঠাকুমার অবস্থা দেখছি। উনি উঠে বসেছেন। সরোষে বলছেন, ইয়ে হার নহী দুঙ্গী, নহী দুঙ্গী…। আমি কিছুতেই দেব না হার, কিছুতেই না।

    যত ঠাকুমার কাছে যাবার জন্য ছটফট করছি, হাত-পা ছুঁড়ছি চিৎকার করছি, তত দু’জনে আরো জোর করে ধরে রাখছে আমায়। একসঙ্গে অতগুলো লোক আর ঠাকুমা একা। অসুস্থ-দুর্বল ঠাকুমা দু’হাত দিয়ে প্রাণপণে বুকে চেপে রেখেছেন সবুজ হীরের লকেটটা।

    শেষ অবধি হারটা রাখতে পারেননি ঠাকুমা। বাঁচাতে পারেননি লকেটটাকে। হারটা নেবার পর নিস্তব্ধ নিঝুম রাতে বুক কাঁপানো অট্টহাসি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিল সকালে।

    হার চলে যাবার পর থেকে ঠাকুমা প্রাণে বেঁচেও মরে রইলেন যেন। মুখে অহর্নিশি হার আর হার। রাতে ঘুমুতেন না। ঘরময় পায়চারি করে বেড়াতেন। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে বলতেন,…বহুরাণী, ইয়ে হার রাজলছমী…। শাশুড়ী বলে গেছিলেন, বৌ! এ হার রাজলক্ষ্মী…।

    হারটার এক বিচিত্র, ইতিহাস শুনেছি ঠাকুমার মুখে। এ বংশে ক’পুরুষ থেকে হারটা বড় বৌয়েদেরই গলায় উঠে আসছে পর পর। শাশুড়ীরা মারা যাবার সময় নিজে হাতে গলা থেকে খুলে বড়বৌকে পরিয়ে দিয়ে গেছেন এক একজন। যিনি পরাবার সময় পাননি, চলে গেছেন হঠাৎ—তার হয়ে কুলগুরু মৃতের গলা থেকে ওই হার খুলে রীতি অনুযায়ী বড় বৌয়ের গলায় পরিয়ে দিয়েছেন। ঠাকুমাকেও তার শাশুড়ী পরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এ হার বংশের প্রথম গরীব পুরুষকে বহু ঐশ্বর্য দিয়েছিল। এর দৌলতেই এখন সব…রাজলক্ষ্মী।

    ঠাকুমা আপসোস করতেন, কোন বড় বৌ খোয়ায়নি এ হার। বংশের নিয়ম রক্ষে করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। কিন্তু তার জীবনে এ কি হল। বংশের রীতি ভঙ্গ। সর্বনাশ করে গেলেন তিনি বংশের!

    কখনো কখনো আমাকে ডেকে বলতেন, খুঁজে দেখ দিকিনি হারটা! নিশ্চয় পাবি। কোথাও না কোথাও পড়ে রয়েছে নিশ্চয়। আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি সবুজ হীরে জ্বল জ্বল করছে আমার চোখের সামনে যেন।

    কথা শুনে সকলেই ভাবল সত্যি ওঁর মাথাটা বিগড়েছে। হারটা ওঁর মনে সংস্কারের শক্ত পাঁচিল হয়ে খাড়া ছিল। সেই হার হারিয়ে যাওয়াতে সেটা ভেঙে গেছে। সে ব্যথা সামলে উঠতে আর পারলেন না উনি।

    হার চলে যাবার বছর খানেকের মধ্যে ঠাকুমার মরমর অসুখ হল বার তিনেক। ডাক্তার কবিরাজরা জবাব দিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি মরলেন না। যেন পুনর্জীবন পেয়ে বেঁচে উঠতে লাগলেন। কাছে পেলেই বলতেন, দাদুভাই! হারটা খোঁজো! তোমার মাকে না পরিয়ে যেতে পারছি নে আমি।

    আশ্চর্যভাবে হারটা নিজেই বাড়ি খুঁজে এল যেন একদিন। তখনো ঠাকুমা শয্যাশায়ী। হারটাকে নিয়ে এলেন ভোগনন্দীশ্বর মন্দিরের পুরোহিত। তিনি ঠাকুমার চোখের ডাকে থাকতে পারেননি। লকেটের ওপর ঠাকুমার ভেসে ওঠা মুখখানা এই বাড়ির দিকেই ঠেলে দিত তাকে যেন বার বার। কেবলই মনে হত ঠাকুমার দু’চোখ ডাকছে তাঁকে এই বাড়ি থেকেই বুঝি। হারটাকে নিয়ে আসতে বলছে তাঁকে তাড়াতাড়ি।

    ঠাকুমার গলায় হার পরিয়ে দিলেন পুরোহিত। লকেটের সবুজ হীরের মতো ঠাকুমার দু’চোখও জ্বল জ্বল করে উঠল। চোখের ইশারায় মাকে ডেকে কাঁপা হাতে হারটা নিজের গলা থেকে খুলে মায়ের গলায় পরিয়ে দিলেন। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, বহুরাণী ইয়ে…রাজলছমী। কথা জড়িয়ে গেল ঠাকুমার। আস্তে আস্তে দু’চোখ বুজে এল।

  • সত্যবতী

    সত্যবতী

    খানিক যেতে না যেতেই ব্রীজমোহন দাঁড়িয়ে পড়ল। পা দুটো আটকে গেছে মাটির সঙ্গে। একটা বিষম বিস্ময়ের ধাক্কা লেগেছে মনে-চোখে। চোখ-মন সজাগ করেও বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে পারছে না কিছুতেই। চোখকে অবিশ্বাস করেও বিশ্বাস করতে হচ্ছে। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে এক নারীমূতি। মূর্তি পাথর লোহার নয়, মাটি-কাঠেরও নয়। একেবারে জলজ্যান্ত রক্ত মাংসের।

    বিদ্যুতের চমকে দেখতে পাচ্ছে, মূর্তি নিশ্চল নয়। সচল, চলছে। পূর্ব দিকটাই লক্ষ্য যেন ওর। ওধারে ব্রীজমোহনও যাবে। যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সে আজ দিন তিনেক ধরে। এখন যাচ্ছে। কিন্তু সামনে এই বিপত্তি।

    গয়া শেরঘাটি বোড় থেকে ভিতরের দিকে এ জায়গাটায় বড় একটা আসে না কেউ। দিনের বেলায়ই গা ছমছম করে এলে—রাতে তো দূরের কথা। রাত হলেও সন্ধ্যের মুখেতেই নিশুতি রাতের অন্ধকার নেমেছে জায়গাটায়। আকাশ ভরা কালো ঘন মেঘ আর মুষলধারে বৃষ্টি একটা ভয়াবহ সৃষ্টি করেছে। এ সময় এ দুর্যোগে এখানে কোন ছেলের আসাই অসম্ভব যখন, তখন কোন মেয়ের কথাই আসে না। আসে না বললে চলবে না এখন আর। এসেছে একটি স্ত্রীলোক।

    বিদ্যুতের আলো অদৃশ্য হলে জমাট অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গে ঢেকে ফেলেছে স্ত্রীলোকটিকে। হারিয়ে যাচ্ছে ও নিমেষে। আকাশ-মাটির বুকে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলায় স্ত্রীলোকটি দৃশ্য-অদৃশ্য হচ্ছে বার বার ব্রীজমোহনের চোখে। এ এক বিচিত্র ছবি দেখছে ব্রীজমোহন।

    ব্রীজমোহন দেখছে আর ভাবছে। ভাবছে আর দেখছে।

    তার কাছ থেকে স্ত্রীলোকটির দূরত্বের ব্যবধান বেড়ে উঠছে ক্রমশ। বেশ বোঝা যাচ্ছে ক্ষণিক আলোর পর জমাট অন্ধকার কোন প্রতিবন্ধক হয়নি ওর পথ চলার। বোধহয় চোখের প্রখর আলোর ফলকে অন্ধকারের বুক খুঁড়ে-ফুঁড়ে পথ করে নিয়ে এগিয়ে চলেছে ও ঠিকই।

    যত দূর দৃষ্টি যায়—আলো-আঁধারিতে স্ত্রীলোকটিকে যতটুকু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে—তাতে মনে হচ্ছে ও কোন ধনীর ঘরণী। চুমকি বসানো পাতলা ফিনফিনে গোলাপী ওড়নাটা মাথা থেকে বুক অবধি ঢাকা। বৃষ্টির জলে ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। গায়ের সঙ্গে লেপটে রয়েছে। আকাশ থেকে আলোর রেখা ওই দেহে ছিটকে পড়লেই চুমকিগুলো ঝকমক করে উঠছে। যেন আসমান থেকে খসে পড়া একটা তারা ওর মাথায় পিঠে বুকে হাতে ফুটে উঠেছে। হাতের নাকের গলার গয়নাগুলো জ্বল জ্বল করে মাথা তুলেছে ওড়নার তলা থেকে।

    স্ত্রীলোকটির কোন লক্ষ্যই নেই কে তাকে দেখছে না দেখছে। আপন মনেই চলেছে ও।

    ব্রীজমোহনের আটকে পড়া দু-পা হঠাৎ আলগা হয়ে গেল যেন একটা অমোঘ আকর্ষণে। আকর্ষণটা আসছে স্ত্রীলোকটির দিক থেকেই। ওকে অনুসরণ করার দুরন্ত বাসনা জেগে উঠছে ভিতরে। পা বাড়াল ব্রীজমোহন, অনুসরণ করবে। যতই এগুচ্ছে ততই স্ত্রীলোকটি তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠল ব্রীজমোহন ওকে আটকাবার জন্য। সঙ্গে কেউ সঙ্গী নেই নিশ্চয়। থাকলে এতক্ষণ নজরে পড়ত। পথ হারিয়ে ফেলে হয়তো এসে পড়েছে এপথে। বেরুবার জন্য দ্রুত পায়ে চলছে তাই। জোরে পা চালিয়ে ধরে ফেলতে না পারলে মস্ত ক্ষতি হয়ে যাবে তার।

    স্ত্রীলোকটিকে প্রথম নজরে পড়তে মনে হয়েছিল একটা বিপত্তি এসে খাড়া হল বুঝি এ সময় তার চলাচলের সামনে। সে ভুল ভেঙেছে এখন। ওর গা ভর্তি গয়না। অজস্র ধন্যবাদ ঈশ্বরকে। এ সুযোগ গ্রহণ না করলে দুঃখকষ্ট জীবনেও ঘুচবে না তার।

    ভগবানের করুণা কত তার ওপর। তিন দিনের অভুক্ত আর্তের ডাক কানে পৌঁছেছে তার। রাতারাতি আমীর বনে যাবে ব্রীজমোহন। ব্রীজমোহন নিজে আর স্ত্রীলোকটি ছাড়া এই পাণ্ডব বর্জিত নির্জন জায়গায় আর তৃতীয় ব্যক্তি কেউ নেই। এখানে ওর করুণ আর্তনাদে দৌড়ে সাহায্য করতে আসবে না ওকে কেউ। কার্যসিদ্ধি হবে তার অনায়াসে। উদ্ধত শাণিত ছোরার সামনে হৃৎকম্প হবে রমণীর। ত্রাসে বেহুশ হয়ে ঢলে পড়ার আগেই কোন ইতস্ততঃ না করে এক একখানি গয়না নিজের দেহ থেকে খুলে খুলে কাঁপা হাতে তুলে দেবে ব্রীজমোহনের বজ্রকঠিন হাতে।

    চলছে তাড়াতাড়ি ব্রীজমোহন। স্ত্রীলোকটিও হনহনিয়ে চলছে। হনহনিয়ে চললেও কিছুতেই নিস্তার পাবে না ও ব্রীজমোহনের কাছ থেকে। আর কিছুক্ষণ বাদেই চলা থেমে যাবে। ব্রীজমোহন কত শক্তি ধরে বুঝবে তখন। ছোরার বাঁটটা চেপে ধরল শক্ত মুঠোয়। হাসছে মনে মনে। পয়সাঅলারই স্তুতি সর্বত্র। এবারে মামা-মামী বাড়ী থেকে দূর করে বার করে দেবে না আর তাকে। তাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে ঘরের দরজায় খিলতালা লাগাবে না আর দাদা-বৌদিও।

    বৌদির কথাগুলো এ সময়ে মাথার মধ্যে কিলবিল করে উঠছে কেন আচমকা! রোজই তো বল তুমি এবার রোজগার করে টাকা এনে দেবেই। মিথ্যে, সব মিথ্যে—

    না, না, না। মিথ্যে নয়। স্বগতোক্তি করে ওঠে ব্রীজমোহন। ছোরা ধরা মুঠোটা শিথিল হয়ে আসে আপনা থেকেই। প্রাণপণে চেপে ধরে আবার গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে। এটাই শেষ সম্বল তার জীবিকা উপার্জনের, এটাই তাকে ফকির থেকে আমীর করে তুলতে পারে এক মুহূর্তে। কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে ব্রীজমোহন। ভাগ্যদেবী বহু ছলনা করেছে তার সঙ্গে। তাকে অনেক রকমের মিথ্যে আশা দিয়ে নিরাশ করেছে স্রেফ। অতীতের সেই সব নির্মম খেলা নতুন করে কি খেলতে শুরু করেছে আবার ভাগ্যদেবী?

    স্ত্রীলোকের গয়নার মোহজাল বিস্তার করে তাকে ডাকছে। রমণীটি কি আলেয়ার আলো না মরুভূমির মরীচিকা? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ভিতর থেকে ঠিক বেঠিক কোন উত্তর পাচ্ছে না। একটু আগের বড়লোক হবার আশা-আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ হতে বসেছে। মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।

    মাথা গুলোনো শুরু হয় তার দশ বছর বয়েসে প্রথম। মায়ের মৃত্যুর পর। উচ্ছৃঙ্খল পিতার হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন মা দিনের পর দিন। আহার জোটেনি অর্ধেক দিন। তার নিজের না জুটলেও ব্রীজমোহনের জুটিয়েছেন তিনি। যত্ন-আত্তির কোন ত্রুটি হয়নি তার মা চলে যাবার আগে পর্যন্ত।

    মা বেঁচে থাকতেই দাদা বৌদিকে নিয়ে বাড়ী ত্যাগ করে অন্য জায়গায় চলে গেল মায়ের নির্যাতন সহ্য করতে পারেনি বলে।

    মায়ের আত্মমর্যাদা বোধ ছিল খুব বেশী। অভাব-অনটনে বিপর্যস্ত হয়েও ডাকাডাকি সত্বেও কোন আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে আশ্রয় নিতে যাননি কোন দিন। কোন সাহায্যও চাননি কারো কাছ থেকে কখনো। ব্রীজমোহনকে বাড়ী নিয়ে গিয়ে মানুষ করে তোলার জন্য মামার অনুরোধ নাকচ করে দিয়েছেন মা অনেকবার।

    মা যা নাকচ করেছিলেন, বাবা তা বহাল করলেন মায়ের মৃত্যুর পরই। অর্থাৎ মামার বাড়ী রেখে এলেন ব্রীজমোহনকে।

    বছর আষ্টেক ছিল ব্রীজমোহন সেখানে। আট বছরে আট হাল হয়েহে তার। মামার অসাক্ষাতে মামীর দুর্দান্ত দাপট সময় সময় এত অসহ্য হয়ে উঠেছে তার যে, যেখানে দুচোখ যায়, চলে যেতে ইচ্ছে করেছে। মামা বাড়ী ফিরলে কেঁদে কেটে অনুযোগ করেও কোন ফল ফলেনি। মামীর রক্তচক্ষুর কাছে মামার ম্লান চোখ নত হয়েছে। নির্বাক মুখে সেখান থেকে সরে গেছে মামা তখুনি।

    মামাতো ভায়েদের রাজার হালে থাকতে দেখেছে ব্রীজমোহন। দেখেছে তাদের বই বগলদাবা করে স্কুলে যেতে। দেখেছে বাড়ীতে এসে পড়াতেও মাস্টারকে। সমবয়সী ভায়েদের মত নিজেও হতে চেয়েছে। পারেনি। নিজের মনের কথা-ব্যথা জানিয়েও সহানুভূতি আকর্ষণ করতে পারেনি কারও। নিজে ওপর কারও করুণা-মমতা জাগিয়ে তুলতে পারেনি অন্যের অন্তরকে নাড়া দিয়েও।

    বড় থেকে ছোট পর্যন্ত—সকলেই এক বাক্যে রায় দিয়েছে—তার নাকি মাথা মোটা ভয়ানক। শত চেষ্টা করলেও কস্মিনকালে কিছু হবে না। চাকরবৃত্তি করার জন্যই জন্ম তার। প্রকৃতি-বুদ্ধিতে পরিষ্কারই বোঝা যাচ্ছে তাই। চাকরদের সঙ্গে শোওয়া-বসা নাওয়া-খাওয়ার অভ্যেস করতে করতে ওদের মত বাজার দোকান করাটাও মগজে যদি কিছু ঢোকে, তাহলে এখানে না থাকতে পারলেও ভবিষ্যৎ দিন গুজরানের ব্যবস্থা অন্য জায়গায় থেকে করতে পারবে তবু।

    এরপর আর কথা চলে না। অনুরোধ-উপরোধও না। চাকরদের টালিখোলার ছাদের ঘরে গিয়ে দড়ি ছেড়া খাটিয়ায় তেল চিটচিটে কাঁথার ওপর আছড়ে পড়েছে। হাপুসনয়নে কেঁদে কেঁদে বুক ভিজিয়েছে। মনে মনে মাকে ডেকেছে শুধু তুমি এসো! যেখানে আছে, নিয়ে যাও আমায়। মাকে ডাকতে ডাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বপ্নে দেখেছে মাকে শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছিয়ে দিতে। মাথাটা বুকে চেপে ধরেছে। বুকের ধুক পুকুনি শুনেছে চাপা কানটায় স্পষ্ট। ঘুমের ঘোরে ‘মা তুমি যেও না’ বলে চীৎকার করে উঠেছে।

    জেগে উঠে মাকে দেখতে না পেয়ে আরো কেঁদেছে। কেঁদে কেঁদে সারা হয়েছে সর্বক্ষণ। কাছে কেউ আসেনি সান্ত্বনা দিতে।

    এই ভাবে বছরের পর বছর কাটতে লাগল ব্রীজমোহনের। শেষে মামীর ক্রোধ চরমে উঠল একদিন। লঘু পাপে গুরু দণ্ড হল তার। অপরাধ—জ্বরের জন্য মামাত ভায়ের স্কুলে বই বয়ে নিয়ে যেতে নারাজ হয়েছিল সে সেদিন। মামী হিংসুটে কুঁড়েপাথরকে বসিয়ে খাওয়াতে রাজী হল না একাতলও। আশ্রয় দেওয়াও আর চলবে না তার পক্ষে একদম।

    মুখ দিয়ে কথা খসবার সঙ্গে সঙ্গে কথা মাফিক কাজও করল মামী। গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ী থেকে বার করে দিতে নির্দেশ করল চাকরদের! গলা ধাক্কা খাবার আগেই বাড়ী থেকে ম্রিয়মাণ মুখে বেরিয়ে গেছে ব্রীজমোহন।

    …দাদার কাছে এসে উঠেছে। দাদা-এক মায়ের পেটের ভাই। দাদা কখনও এরকম করতে পারবে না তার সঙ্গে। আরও আগেই আসা উচিত ছিল। এলে এত হেনস্থা হতে হত না তাকে। দাদার আশ্রয় নিশ্চয় অনেক—অনেক নিরাপদ। বরাত সঙ্গে সঙ্গে ফেরে।

    দাদার বাড়ীতে দু’বছরে আরো দুরবস্থা হল ব্রীজমোহনের। মামীকে হার মানাল বৌদি। মামী তাকে গোলাম বানাতে চেয়েছিলেন, বৌদি তাকে গুণ্ডা বানাতে চাইলেন। শুধু গুণ্ডা বানাতে চাইলে তবু রক্ষে ছিল, কিন্তু তা নয়, খুনী ডাকাত তৈরী করতে চাইলেন।

    অবিশ্যি বৌদির এটা অন্তরের কথা না ঘাড় থেকে বোঝা নামানোর জন্য মুখের কথা—বুঝতে পারেনি ব্রজমোহন তখন।

    ব্রীজমোহনকে সরোষে বলেছেন বৌদি—অপদার্থ কোথাকার! কাজ না পেলে—চুরি ডাকাতি করে উপায় করতে পারো তো! খুন-খারাপি করেও যে উপায় করে, তাকেও মানুষ বলা যায়। তুমি একটা আস্ত জন্তু। জন্তুকে পোষা হয়েছে অনেক দিন। আর একদণ্ডও না।

    বৌদির কথাগুলো বর্শার ফলার মতো বিঁধেছে মাথার ভিতর। বিঁধেছে বুকের ভিতর। বোবা যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েছে ব্রীজমোহন। দ্বিরুক্তি না করে স্থান ত্যাগ করেছে তখুনি। অনির্দিষ্ট পথে পা বাড়িয়েছে।

    …হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছেছে শেরঘাটি রোডের ওদিকে কুখ্যাত অঞ্চলে। জেনেই এসে পড়েছে সে। কতকগুলো তরুণকে একসঙ্গে বসে জটলা করতে দেখে এসেছে। যদি এদের কাছ থেকে কোনো কাজের সন্ধান পায়।

    উপস্থিত হতেই, ওরা দাঁড়িয়ে উঠে, ছোরা উচিয়ে গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে। সকলে সমস্বরে বলে উঠেছে—ক্যা হয় নিকালো।

    কাছে কিছু নেই—বিশ্বাস করেনি ওরা। একদম নগ্ন করেই দেখেছে তাকে—সত্যি বলেছে, না মিথ্যে বলেছে।

    সমস্ত প্রমাণ নেবার পর, শুনেছে ওরা ব্রীজমোহনের মামীর কথা, বৌদির কথা। জেনেছে ব্ৰীজমোহনের মনোগত ইচ্ছে। সে মানুষ হতে চায়। চুরি-ডাকাতি ধুনখারাপি করেও। বৌদির মুখে প্রথম এসব কথা শুনে সে ব্যথা পেয়েছিল খুব। কিন্তু এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে, তার ভর্ৎসনা ব্রীজমোহনের বাঁচবার পক্ষে মহামূল্য উপদেশ। বৌদির কথাগুলোই মনে মনে জপ করছে সে।

    দলের সর্দার আগন্তুক বিশ্বাসী কি অবিশ্বাসী—মনের এই সংশয় ঘোচাবার জন্য তার আপাদমস্তকে ভয় ধরানো তীক্ষ্ণদৃষ্টি ছুঁড়ে ছুঁড়ে মেরেছিস বার চারেক। তারপর মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে, হাত চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল দু’বার।

    এরপর চুরি-ডাকাতি-খুন খারাপিতে হাত পাকাবার জন্য তালিম দিয়েছিল মাসছয়েক। মাস ছয়েক এমনি ছেড়ে রেখে পরীক্ষা করেছিল—ঠিক মতো শিকার ধরতে পারে কি না সে।

    পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। দুর্বৃত্তপনায় পারঙ্গম হয়ে উঠেছে এত কম সময়ে—দেখেই সর্দারের পুরনো চেলাচামুণ্ডাদের সর্বশরীর জ্বলে গেছে হিংসেয়। সর্দারের বেশী প্রিয় হয়ে ওঠবার আগেই তাকে দল থেকে সরাবার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। দলের সকলেই একবাক্যে বলেছে সর্দারের কাছে—ব্রীজমোহন কোন কাজেরই নয়। উপায় করে তারা। ও বসে বসে তাদের বখরায় খায় শুধু। এতদিন সর্দারের কাছে ওর কাজের মিথ্যে প্রশংসা করেছে তারা ওর চেতনা আনবার জন্য—মানুষ যদি হয়ে উঠতে পারে এর মধ্যে। কিন্তু মানুষ ও হবে না। ওকে দলচ্যুত করাই যুক্তিসঙ্গত।

    সবার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে সর্দার। ব্রজমোহন দলচ্যুত হয়েছে। দলচ্যুত হবার দিনে সর্দারের কর্কশ কণ্ঠের শাসানি শুনেছে—দলের কথা কারো কাছে প্রকাশ হলে দুনিয়া থেকে সরে যেতে হবে তাকে।

    দল থেকে সরে এসে পোড়োবাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে সে। তিন দিন উপোসী—দলে ঢোকবার উপায় নেই আর। মামীর কাছে, বৌদির কাছে ফেরারও উপায় নেই। কোন কাজই জানে না সে। সুতরাং কাজ পাবার কথাই ওঠে না। কাজ পাবে না—এ অভিজ্ঞতা অনেক আগে থেকেই হয়ে আছে তার।

    সব দিক দিয়ে চিন্তা করে দেখেছে। বেঁচে থাকবার পথ খুঁজে পায়নি একটাও। পেয়েছে যেটা, সেটা আত্মরক্ষার নয়। আত্মঘাতীর।

    আত্মঘাতী হতেই মনস্থ করেছে সে। তার জন্য কাঁদবার কেউ নেই। তাকে খোঁজবার কেউ নেই। এত বড় পৃথিবীতে সে একা। সে নিজেই নিজের। সে মরলে তারই শান্তি, তারই নিষ্কৃতি।

    …মরতে যাচ্ছিল ব্রীজমোহন। মরতে গিয়েও বাঁচার পথ পেয়ে গেছে। মরার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে স্ত্রীলোকটিকে দেখার পর। ওর গয়না নজরে আসার পর। এ গয়নার বখরা পেত সর্দার। কিন্তু পাবে না আর। তাকে তাড়িয়ে ভালই করেছে। অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন। অতগুলো গয়নার মালিক সে।

    উন্মত্ত উল্লাস ব্রীজমোহনের ভিতর দাপাদাপি করছে। পৈশাচিক হাসি চাপতে পারছে না আর। মেঘ গর্জনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিকৃত গলায় হা-হা করে অট্টহাসি হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সংশয়ের দোলায় দুলেও উঠল মন। এত আনন্দ করাটা কি ঠিক হচ্ছে। স্ত্রীলোক দেখা চোখের ভুল নয়তো?

    ব্রীজমোহনের হাসির শব্দে বাজ পড়ল যেন দু’কানের পাশে স্ত্রীলোকটির। চমকে উঠে ফিরে তাকাল। ফিরে তাকানো আর থমকানোর ধরণ দেখে ব্রীজমোহনের আত্মপ্রত্যয় দৃঢ় হয়ে উঠল। স্ত্রীলোকটি মরীচিকা নয়, আলেয়ার আলো নয়। ভাগ্যিলক্ষ্মী ছলনা করছে না তাকে। ওকে নিয়ে অনেক আশা বুকের তলায় বাসা বাঁধলেও বারে বারে ভাগ্য বিপর্যয়ের জন্য সংশয়েরও অন্ত ছিল তার—সত্যি আসলে ও কি। সংশয়ের বীজ নির্মূল হয়ে গেছে একেবারে তার হাসির সময়। মানুষেরই মত ওর ভয়ার্ত স্বর বেরিয়ে এসেছে গলা থেকে–কে?

    দেখছে ব্রীজমোহন।

    ভীত-চকিত স্ত্রীলোকটি উর্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে। কালবিলম্ব না করে ব্রীজমোহনও দৌড়াতে লাগল পিছু পিছু।

    পিছনে যাত্রীবোঝাই বাসটা এগিয়ে আসছে খুব দ্রুতগতিতে। সত্যবতীদের বাসকে ছাড়িয়ে যাবে। এবাসের ড্রাইভারও পিছনের ড্রাইভারের ঔদ্ধত্য মানবার পাত্র নয় গাড়ীর গতি বাড়িয়ে দিল আরো দ্বিগুণ।

    দুটো বাসই নড়বড়ে ঝরঝরে। দু’গাড়ীর ভয়ে তটস্থ। অনিবার্য বিপদের হাত থেকে আজ আর রেহাই কেউ পাবে না বুঝি। কি কুক্ষণেই বাড়ীর বাইরে পা বাড়িয়ে ছিল তারা আজ। আকাশটা তো ভেল্কি খেলছে। মাঝে মাঝে ফুটো হয়ে যাচ্ছে। এই দুর্যোগে ড্রাইভারদেরও দুর্মতিতে পেয়ে বসেছে। দুটো গাড়ীতে পাল্লা দেওয়া-দিয়ি বন্ধ করতে বলেও কিছু হচ্ছে না। নিজেদের জিদ বজায় রাখতে ওরা অচল অটল। কার শক্তি কত বেশী—এই ঠুনকো ইজ্জত রাখতে গিয়ে এতগুলো লোকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বসেছে ওরা। অনেকে নেমে যেতে চাইল। গাড়ী থামাল না ড্রাইভাররা ইচ্ছে করেই। নামতে দেবে না কাউকে।

    ওরা না থামতে চাইলে কি হবে—গাড়ী থামল। প্রথমটি আপনা হতেই আর দ্বিতীয়টি প্রথমটির পথ আটকে রেখেছে বলে। অবিশ্য এ গাড়ীটা আপনা হতে না থামলে ও ড্রাইভার থামাতে বাধ্য হয়েছে উপায়ান্তর না দেখে।

    যেখানে গাড়ী দুটো থেমেছে, তার আশপাশে জনবসতি নেই। কেবল খেজুর শাল শিরীষ গাছগুলো ছাড়া ছাড়া ভাবে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। অন্য যাত্রীদের সঙ্গে বাস থেকে নেমে পড়ল সত্যবতীও।

    সকলেই প্রমাদ গণল। গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারলে বাঁচে। ড্রাইভারের ইঞ্জিন সারানো হলে বাঁচে। একসঙ্গে বিপদে পড়লে বোধহয় শত্রুও মিত্ত হয়ে ওঠে অন্ততঃ সে-সময়ের জন্য। এ ক্ষেত্রেও ঘটল তাই। অপর গাড়ীর প্রতি ড্রাইভারটি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই এ গাড়ীর ইঞ্জিনে হাত লাগিয়েছে। তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। ইঞ্জিনকে ঘিরে ইঞ্জিন সারানো দেখছে যাত্রীরা। কিছুক্ষণ বাদে বৃষ্টি আসতে সাত-তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠে পড়তে লাগল যাত্রীরা। এই অবসরে তাদের পাশ কাটিয়ে অপর দিকটায় চলতে লাগল সত্যবতী। নজরে পড়ল না সে-কারো। সত্যবতী চলেছে তো চলেছেই।

    পোড়ো বাড়ীর কাছ বরাবর এসে থামল। এইখানে এসেছে বার দুয়েক সে ধরমলালের সঙ্গে। শেরঘাটি শহরে তার বাপের বাড়ী। যাবার সময় ঘরের গাড়ী করে নিয়ে গেছে কতবার তাকে ধরমলাল এদিক দিয়ে।

    জায়গাটা কেমন—দেখবার ইচ্ছে হয়েছিল তার একবার। তারই অনুরোধে নামিয়ে চতুর্দিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল ধরমলাল সেবারে। আর একবার কিছু না বলতেই এমনি নামিয়েছিল। এ জায়গাটা সত্যবতীর পরিচিত। হঠাৎ এ জায়গায় আসতে মন চাইল কেন সত্যবতীর? চাইবার কারণ আছে যথেষ্ট।

    বাড়ী থেকে বেরিয়েছিল সত্যবতী সবার অজ্ঞাতে। ধরমলালেরও। বাপের বাড়ীতে যাওয়াই স্থির ছিল গাড়ীটা থেমে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। কিন্তু গাড়ীটা আকস্মিকভাবে থেমে যেতে মনের ও মতের পরিবর্তন হয়েছিল। অদম্য প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিল ভিতরে ভিতরে। ধরমলালকে জব্দ করতে হবে। সত্যবতী জব্দ করবে। করবে, করবে।

    অভিমানিনী সত্যবতীকে ঠিক চিনতে পারেনি ধরমলাল। বিয়ের বাইশ বছর পরেও না। প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে বার বার। সব ছাড়েনি।

    দাদাশ্বশুর সরাবের তরল আগুনে জ্বলে পুড়ে মরেছে। শ্বশুরেরও দাদাশ্বশুরের অবস্থা হয়েছে শেষ অবধি। বিয়ের দু’বছর পরেই শ্বশুরের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেছে সত্যবতী। স্বামীকে শত অনুরোধ উপরোধ করা সত্বেও শ্বশুরেরই পথ অনুসরণ করে চলতে দেখেছে। পূর্বপুরুষদের মতো অকালমৃত্যু বরণ করে নিতে হবে স্বামীকে এটা দিব্যচক্ষে দেখতে পেয়েছে। তাই এ বংশের এ অকাল মৃত্যুর অভিশাপ থেকে স্বামীকে বাঁচাবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। শেষে সরাব ছাড়াবার জন্য সরেষে বলেছে, সরাব ছাড়তে হবে, নয় আমাকে ভুলতে হবে।

    চমকে উঠেছে ধরমলাল, হাত ধরে বলেছে, সরাব ছাড়ব। তোমাকে ছাড়তে পারবো না। প্রতিজ্ঞা করছি তোমার হাত ধরে—আজ থেকে ছোঁবো না আর। কথা রাখেনি ধরমলাল। বরং বাড়িয়েছে আরো। স্বামীর দিকে চেয়ে চেয়ে দেখেছে সত্যবতী নির্বাক মুখে দিনের পর দিন। আর কিছু বলেনি। প্রতিজ্ঞা কথাও তোলেনি। তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু একদিন প্রয়োজন বোধ করতে হল তাকে ডাক্তারের কথা শুনে। নেশা না ছাড়ায়ে বাঁচানো দায়। লিভারটা যেতে বসেছে।

    সত্যবতী ঘরে ঢুকে প্রতিজ্ঞার কথা ধরমলালকে স্মরণ করিয়েছে নতুন করে। আর নতুন করে আরো দু-একটা কথা শুনিয়েছে। গেলাসে হাত ঠেকাতে সত্যিই সে এবাড়ী ছেড়ে চলে যাবে।

    কাজ হয়নি সত্যবতীর কথায়। গেলাসে হাত ঠেকায়নি শুধু ধরমলাল, ঠোঁটও ঠেকিয়েছে। ভিতরের উগ্র পানীয় গলায় ঢেলেছে। দেখেছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সত্যবতী। তারপর সবার অগোচরে বেরিয়ে গেছে বাড়ী থেকে।…বাসে গিয়ে উঠেবে…বাসটা থেমে পড়তে দেখে পরিচিত জায়গায় এসে পৌঁছেছে।

    এখানে পরিচিত ইঁদারার কথাটা কেবল মনে পড়েছে সত্যবতীর। ওর তলায় কেউ তাকে খুঁজতে আসবে না কোনদিন এখানে। জব্দ হবে ধরমলাল। চিরদিনের মতো হারাতে হবে সত্যবতীকে। প্রতিশ্রুতি না রাখার ফল, সত্যবতীর কথা না শোনার ফল টের পাবে, এবার।

    ইঁদারার দিকেই এগোচ্ছিল হঠাৎ পিছন থেকে ব্রীজমোহনের হাসির শব্দে চমকে উঠে থমকে গেছে একটু। কাউকে না দেখতে পেলেও ভেবেছিল, ধরমলালের কোনো খোশামুদে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। হয়তো বাড়ী থেকে বেরুবার মুখে দেখতে পেয়ে অনুসরণ করে আসছে তাকে। ধরে ফেলার ব্যঙ্গহাসির শব্দ এটা তারই। লোকটা কাছে এসে পড়ার আগে, ধরে ফেলার আগে সব শেষ হয়ে যাক তার।

    ইঁদারা লক্ষ্য করে প্রাণপণে ছুটেছে সত্যবতী।

    ছুটেছে ব্রীজমোহনও। ইঁদারাটা দেখতে পাচ্ছে সে-ও। কি সর্বনাশ। তার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে ইঁদারার মধ্যে পড়ে যাবে যে এখুনি। ব্রীজমোহনের মাথায় ভিতর ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে সব। সে যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। একি দেখছে! মা! মা ইঁদারায় ঝাঁপিয়ে পড়বে এখুনি। অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠে ব্রীজমোহন। সে বেঁচে থাকতে মাকে এভাবে মরতে দেবে না কিছুতেই। কিছুতেই না। মুঠো থেকে খসে পড়ে গেল ছোরাটা মাটিতে।

    তিনদিনের অনাহারী মানুষটার শরীরে আচমকা কি করে যে অত শক্তি এলো কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না। এক লাফে সত্যবতীর সামনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়ে এলো ইঁদারা থেকে খানিক তফাতে।

    সত্যবতী বেঁহুশ। মাথাটা লুটিয়ে পড়েছে ব্রীজমোহনের বুকের ওপর।

    জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য সেবাশুশ্রুষা করার সময় বার বার ভেবেছে ব্রীজমোহন, দশ বছর বয়সে মা তার আত্মঘাতী হয়েছেন। বটগাছ তলার ইঁদারাটায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নিশুতিরাতে। দারিদ্রের জ্বালা থেকে, বাবার নির্যাতন থেকে রেহাই পেয়েছেন মা। সেই মাকে আবার দেখল সে। স্পষ্ট দেখল।

    জ্ঞান হতে সমস্ত ঘটনা শুনে, পরিচয় জেনে, সত্যবতীকে বাড়ী ফিরিয়ে এনেছে ব্রীজমোহন।

    চায়ের নেমন্তন্নে এসে এতক্ষণ ধরে গল্পের মতো ব্রীজমোহন আর সত্যবতীর জীবন কথা শুনছিলুম আমি ধরমলালের মুখে ওদের বৈঠকখানায় বসে বসে। টেবিলে রাখা চায়ের কাপগুলোর ধোঁয়া ওঠা কখন যে বন্ধ হয়ে গেছে সে খেয়াল নেই আমাদের কারো। খেয়াল হল গোলাপী নেটের পরদা সরিয়ে, গরম চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে সত্যবতীকে ঘরে ঢুকতে দেখে।

    একগাল হেসে টেবিলের ওপর ট্রেটা রাখল সত্যবতী। গরম চায়ের পেয়ালা দুটো এগিয়ে দিল আমাদের। আমাকে আর বন্ধুকে। ধরমলালের মুখের দিকে তাকিয়ে, তার পাশের চেয়ারে ব্রীজমোহনের দিকে চেয়ে দেখলুম। আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ওরা দুজনেই হাসল। প্রথম বারে চা দেবার সময় ওদের দিকে ফিরতে এই ভাবেই হেসেছিল দুজনে। তবে তখন ধরমলাল মুখে আঙুল চেপে চুপ থাকতে ইশারা করেছিল। এবারে আর তা করল না। একবার সত্যবতীর মুখের ওপর আর একবার ব্রীজমোহনের মুখের ওপর থেকে দু’চোখ ঘুরে এলো শুধু তার। তারপর নিঃসন্তান ধরমলাল মৃদু গলায় বলল, স্ত্রীকে আর ধর্মছেলেকে কাছে পাবার পর থেকেই সব নেশায়ই অরুচি আমার।

    ব্রীজমোহনের দিকে নজর পড়তে দেখলুম, অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে সে। সত্যবতীর মুখের ওপর স্থির দৃষ্টি তার। কিন্তু সে যেন সত্যবতীকে দেখছে না। এই মুখে তার নিজের মায়ের মুখই দেখছে বুঝি।

  • দস্যু বনহুর

    দস্যু বনহুর

    ‘দস্যু বনহুর’ বাংলাদেশী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘রোমেনা আফাজ’ সৃষ্ট একটি কথাচরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি লিখেছেন ১৩৮টি কাহিনী, যা সামগ্রিকভাবে ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাসের নামও ‘দস্যু বনহুর’। ছোটবেলা নৌদূর্ঘটনায় চৌধুরী বাড়ীর ছেলে মনির হারিয়ে যায়, দস্যু সর্দার কালু খাঁ তাঁকে কুঁড়িয়ে পান ও পরবর্তিতে তাঁকে ‘দস্যু বনহুর’ রুপে গড়ে তোলেন। গরীবের বন্ধু ও চোরাকারবারীদের চিরশত্রু দস্যু বনহুর যেমন গরীবের কাছে ছিলেন সম্মানিত, তেমনি চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীদের কাছে ছিলেন যমদূতের মত। এই সিরিজের স্লোগান হচ্ছে ‘সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর’।

    দস্যু বনহুরের সহায়ক চরিত্র হিসেবে রয়েছে রহমান ও কায়েস, তারা একাধারে বনহুরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিল— একজন জঙ্গলে অন্যজন শহরে; শহুরে স্ত্রীর নাম মনিরা ও অপরজনের নাম নূরী। মনিরার গর্ভে দস্যু বনহুরে বড় ছেলে ‘নুরুজ্জামান নূর’ এর জন্ম, যে পরবর্তীতে দেশের সৎ ও সাহসী ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। নূরীর গর্ভে ‘জাভেদ’ নামে তার একটি ছেলের জন্ম হয়, যে পিতার মতই দস্যুতা করতে ভালবাসে।

  • এক

    এক

    দস্যু বনহুরের ভয়ে দেশবাসী প্রকম্পমান। পথে-ঘাটে-মাঠে শুধু ঐ এক কথা—দস্যু বনহুর—দস্যু বনহুর! কখন যে কোথায় কার ওপর হানা দিয়ে বসবে কে জানে!

    ধনীরা তো সব সময় আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাদের ভয়ই বেশি। দস্যু বনহুরের জন্য কারও মনে শান্তি নেই। দস্যু বনহুর যে কে, কেমন তার আসল রূপ, তা কেউ জানে না। কোথা থেকে আসে সে, কোথায় চলে যায়, তাও কেউ বুঝতে পারে না। গভীর রাতে জমকালো একটা অশ্বপৃষ্ঠে দেখা যায় তাকে। গোটা শরীরে তার কালো পোশাক। মাথায় কালো কাপড়ের পাগড়ি। মুখে একটা কালো রুমাল জড়ানো। কোমরের বেল্টে গুলিভরা রিভালবার। বিশেষতঃ অন্ধকার রাতেই বনহুর হানা দেয়। শহরে-বন্দরে, গ্রামে, পথে-ঘাটে-মাঠে সব জায়গায় হয় তার আবির্ভাব।

    বনহুরের নামে মানুষ যতই আতঙ্কিত হউক না কেন, আদতে বনহুর ছিল অত্যন্ত সুন্দর সুপুরুষ। মনও ছিল তার উদার—মহৎ। দস্যুবৃত্তি বনহুরের পেশা নয়—নেশা। খেয়ালের বশে সে দস্যুতা করত। দস্যুতায় বনহুর আনন্দ পেত।

    হয়ত এক ধনীর বাড়িতে হানা দিয়ে তার সর্বস্ব লুটে নিয়ে বিলিয়ে দিত সে দীন-হীন গরীবদের মধ্যে। নয় ফেলে দিত সাগরের জলে। অদ্ভুত ছিল বনহুরের চালচলন। বনহুরের প্রাণ ছিল যেমন কোমল, তেমনি কঠিন।

    বনহুরের সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার অশ্ব তাজ। যেখানে যেত বনহুর, তাজ হত তার সঙ্গী। নিজ হাতে সে তাজকে ছোলা খাওয়াতো, গা ঘষে দিত, এমন কি তাজ যখন ঘাস খেত, বনহুর পাশে বশে খেত রুটি আর মাংস। মাঠে যখন চরতো, বনহুর বসে থাকতো তার পাশে। হয়ত শিস দিয়ে ঘাস খাওয়াতো।

    তাজও তেমনি ভালবাসতো বনহুরকে। বনহুরের ইঙ্গিত তাজ বুঝতো। তাজ ছিল অত্যন্ত চালাক ও বুদ্ধিমান অশ্ব। তার গতিও ছিল উল্কার মত দ্রুত। অন্ধকারেও তাজ কোনদিন পথ হারাতো না।

    দস্যুতা করতে গিয়ে অনেক সময় বনহুর তাজকে বাইরে রেখে প্রবেশ করতো অন্দরবাড়িতে। হয়ত ধরা পড়ে যাবার ভয়ে বনহুরকে অন্য পথে প্রাচীর টপকে পালাতে হত। বনহুর শুধু একটি শিস দিত, সঙ্গে সঙ্গে তাজ গিয়ে হাজির হত তার পাশে। বনহুর প্রাচীরের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়তো তাজের পিঠে। তারপর আর কে পায় তাকে!

    তাজের লাগাম ছিল না! বনহুর তাজের কাঁধের কেশ ধরে উবু হয়ে থাকে, তাজ ছুটতো হাওয়ার বেগে।

    তাজের পিঠে ছুটে চলেছে বনহুর।

    প্রান্তরের বুক চিরে গহন বনে প্রবেশ করলো বনহুরের অশ্ব। এবার তার গতি কিছুটা মন্থর হয়ে এলো। গহন বনের মধ্য দিয়ে সরু একটা পথ ধরে ছুটতে লাগলো তাজ। ভোরের আলো তখন গহন বনকে অনেকটা হাল্কা করে এনেছে।

    বনের মধ্যে বহুকালের পুরানো এক রাজপ্রাসাদ। কালের কঠোর নিষ্পেষণে আজ সে প্রাসাদ শুধু ইটের স্তুপে পরিণত হয়েছে। এককালে সেখানে যে বিরাট এক রাজবাড়ি ছিল অনুমানে তা বুঝা যায়। আজ সে প্রাসাদের গায়ে বিরাট বিরাট অশ্বথ বৃক্ষ জন্মেছে। আগাছায় ভরে উঠেছে প্রাসাদের অন্তপুর। সেটা যেন ঐ ভগ্নপ্রাসাদের নিকটে এসে আরও ঘন হয়েছে।

    বনটা ছিল শহর ছেড়ে অনেক দূরে। তাই কোন লোকজন এ বনে কোনদিন প্রবেশ করত না। শিকারীরা মাঝে মাঝে শিকারে আসত বটে, কিন্তু তারা বনের খুব ভিতরে প্রবেশ করার সাহস পেত না। কাজেই ভগ্নপ্রাসাদটি ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে।

    সেই ভগ্নপ্রাসাদের সম্মুখে এসে বনহুরের অশ্ব থেমে ছিল। লাফিয়ে নেমে দাঁড়ালো বনহুর। সঙ্গে সঙ্গে দু’জন লোক এসে তাজকে ধরল। বনহুর ভগ্নপ্রাসাদের একটা দরজা লক্ষ্য করে এগুতেই দরজা খুলে গেল। ভিতরে প্রবেশ করল বনহুর, অমনি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে তখন দেখলে মনে হবে, যেন একটা পাথরখণ্ড বা একটা মরচে ধরা লৌহপাত।

    বনহুর দরজার ওপাশে পৌঁছতেই দু’জন সশস্ত্র দস্যু সসম্মানে সরে দাঁড়ালো।

    বাইরে থেকে রাজপ্রাসাদটাকে ভগ্নস্তুপ বলে মনে হলেও আদতে ভিতরটা তার ভগ্নস্তুপ ছিল না। সুন্দর ঝকঝকে একটা রাজবাড়ি বলেই মনে হত। বাড়ির ভিতরের পথগুলো সাদা মার্বেল পাথরে গাঁথা। উঠানে সুন্দর সুন্দর ফোয়ারা, তার চারপাশে ফুলের বাগান।

    বনহুর সে পথ ধরে সোজা এগিয়ে চলল। কিছুদূর এগুতেই সম্মুখে বিরাট বাঘের মুখের আকারে পাথরের মুখ হা করে রয়েছে। বনহুর বাঘের একটা দাঁতে পা দিয়ে চাপ দিতেই বাঘের জিভটা ভিতরে ঢুকে গেল, সেখানে দেখা গেল একটা সুড়ঙ্গ পথ, সে সুড়ঙ্গপথে দ্রুত এগিয়ে চলল সে।

    মাটির নিচে রাজপ্রাসাদের মত আর একটা বাড়ি। পাশাপাশি কয়েকটা কক্ষ। প্রত্যেক কক্ষে বেলওয়ারী ঝাড় ঝুলছে। ঝাড়ের মধ্যে অসংখ্য মোমবাতি জ্বলছে।

    মাঝখানের বড় একটা কক্ষে এক বৃদ্ধ শায়িত। শয্যাশায়িত ব্যক্তি যদিও বৃদ্ধ, তবু তার চেহারা বলিষ্ঠ। মস্তবড় গোঁফ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, কানে বালা। হাতে বালা। লোকটা অসুস্থ, মাঝে মাঝে সে কোঁকিয়ে উঠছিল। চোখের রঙ ঘোলাটে হয়ে এসেছে। মাংসপেশীগুলো যদিও শিথিল হয়ে এসেছে, তবু দেখলে বুঝা যায়, এককালে তার শরীরে ছিল অসীম শক্তি। শয্যাশায়িত বৃদ্ধ দস্যু কালু খাঁ।

    বনহুর কক্ষে প্রবেশ করলো।

    পদশব্দে মুখ তুলে তাকালো কালু খাঁ—কে, বনহুর?

     হ্যাঁ বাপু। এগিয়ে এলো সে কালু খাঁর পাশে।

    কালু খাঁ হাত দিয়ে নিজের বিছানায় একটা অংশ দেখিয়ে বলেন—বস্ বাছা।

    বনহুর বসে ছিল কালু তাঁর পাশে, বৃদ্ধের একখানা হাত মুঠায় চেপে ধরে বলেন—বাপু, এখন তোমার কেমন লাগছে?

    বৃদ্ধ ঘোলাটে চোখে বনহুরকে ভাল করে দেখার চেষ্টা করে বলেন—বনহুর, আমি আর বাঁচবো না।

    বনহুরের চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে—বাপু, আমি তোমার জন্য ভাল ডাক্তার নিয়ে আসব।

    না বনহুর, ডাক্তারের আর প্রয়োজন হবে না। একটু থেমে পুনরায় ডাকে কালু খাঁ—বনহুর।

    বল বাপু।

    বৃদ্ধ কালু খাঁ ভয়ানক হাঁফাচ্ছিল! ঘেমে নেয়ে উঠেছে তার সমস্ত শরীর, অতি কষ্টে বলে সে—বনহুর, আজ বিদায়ের দিনে তোকে একটা কথা বলবো, যা এতদিন বলি বলি করেও বলা হয়নি।

    বাপু, তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো, আমি সব শুনবো।

    না না, তা হবে না, আজ না বললে হয়ত আর কোনদিন বলা হবে না।

    বনহুর কালু খাঁর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে—বাপু, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?

    না রে না, কোন কষ্ট হচ্ছে না। বনহুর, একটু পানি দে দেখি বাছা।

    বনহুর পাশের সোরাহী থেকে এক গেলাস পানি এনে কিছুটা পানি ঢেলে দিল কালু খাঁর মুখে।

    বৃদ্ধ পানি খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলেন—বনহুর, সরে আয়, আরও কাছে সরে আয়।

    বনহুর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বলেন—এই তো আমি তোমার পাশে বাপু।

    বৃদ্ধ কালু খাঁ বলে ওঠে—বনহুর, আমি তোর বাপু নই। আমি তোর বাপু নই, বনহুর। বৃদ্ধ কালু ঘা হাঁফাতে হাঁফাতে বলে—তোকে আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। সে প্রায় বিশ বছর আগে—বালিশের তলা থেকে একটা মালা বের করে বনহুরের হাতে দেয়—বিশ বছর আগে যখন তোকে কুড়িয়ে পাই, তখন এই মালাছড়া ছিল তোর গলায়। দেখ বনহুর, এই মালা তুই চিনতে পারিস কিনা?

    বনহুর মালাছড়া হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে। হঠাৎ তার আংগুলের চাপে লকেটের ঢাকনা খুলে যায়। কি আশ্চর্য! লকেটের ভিতর তারই ছোটবেলার ছবি। পাশের ঢাকনায় আর একটা ফুটফুটে বালিকার ছবি, পাশাপাশি দু’খানা মুখ। বনহুর তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে লকেটের ছবি দু’খানার দিকে। ধীরে ধীরে তার মানসপটে ভেসে ওঠে বিশ বছর আগের একটা দৃশ্য…

    তরঙ্গায়িত নদীবক্ষে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে একটা নৌকা। দু’জন মাঝি দাঁড় টানছে, একজন মাঝি বসে আছে হাল ধরে। নৌকার সম্মুখ পাটাতনের ওপর পাশাপাশি বসে খেলা করছে একটা বালক আর একটা বালিকা। বালকের বয়স আট-নয় বছর, আর বালিকার বয়স ছয়-সাত। বালক ছবি আঁকছিল। বালিকা রুল দিয়ে ছবির ওপর আঁচড় কেটে ছবিটা নষ্ট করে দেয়। বালক অমনি মুখটা গম্ভীর করে ফেলে। বালিকা নিজের ভুল বুঝতে পেরে দুঃখিত হয়, বিনীত কণ্ঠে বলে— রাগ করলে? ভুল হয়েছে, মাফ করে দাও, মনির ভাই।

    বালক খাতাটা ছুঁড়ে ফেলে দিল নদীর জলে, তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে—দোষ করে মাফ চাইলেই বুঝি মাফ পাওয়া যায়… বালক আর বালিকা মিলে এমনি ঝগড়া চলছে।

    নৌকায় ছৈ-এর মধ্যে বসে রয়েছেন দু’জন মহিলা, তাদের অনতিদূরে একজন ভদ্রলোক বসে বসে বই পড়ছেন। ভদ্রলোক বালকের পিতা চৌধুরী মাহমুদ খান। আর ভদ্র মহিলাদের একজন বালকের আম্মা মরিয়ম বেগম, দ্বিতীয় মহিলা চৌধুরী মাহমুদ খানের বোন রওশন আরা বেগম। বালিকা রওশন আরা বেগমের কন্যা—নাম মনিরা, আর বালকের নাম মনির।

    ননদের কন্যার নাম সখ করে মরিয়ম বেগমই রেখেছিল—মনিরা বেগম। ভিতরে ভিতরে ছিল তাঁর এক গোপন বাসনা। নিজের পুত্র মনিরের নামের সঙ্গে মনিরা নাম মিল করে রাখাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

    দেশের বাড়িতে বেড়াতে এসে শিশু কন্যাটিকে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিল মরিয়ম বেগম— রওশন আপা, একটা কথা বলবো?

    রওশন আরা বেগম বলেছিল—বলো।

    মরিয়ম বেগম বলেছিল—আমার পুত্রকে তোমায় দিলাম, তোমার কন্যাটিকে আমি চাই কিন্তু।

    আনন্দের কথা। আমার মেয়ে নিয়ে তুমি যদি সুখী হও এ তো আমার পরম সৌভাগ্য।

    তারপর মনিরার এক জন্ম উৎসবে মরিয়ম বেগম দু’ছড়া মালা তৈরি করে পুত্র এবং ননদের কন্যাকে উপহার দেন। সে দিন ভাবী আর ননদের মধ্যে কথা নেয়া-দেয়ার পালা শেষ হয়ে যায়। হেসে বলেছিল মরিয়ম বেগম—এই মালা পরিয়ে দিয়ে আমি কথা পাকা করলাম, মনিরের সঙ্গে বিয়ে দেব মনিরার। সে মালা ছড়াই আজ বনহুরের হাতে। নীরব নয়নে তাকিয়ে আছে সে সম্মুখের দিকে—একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে তার মনের কোণে। যদিও অস্পষ্ট তবু বেশ মনে আছে, মায়ের সে কথার পর কিছুদিন যেতে না যেতে একদিন মনিরার আব্বা মারা গেল। খবর পেয়ে তার আব্বা চৌধুরী মাহমুদ খান স্ত্রী মরিয়ম বেগম ও পুত্র মনিরকে নিয়ে দেশের বাড়ি গেল। ফিরে আসার সময় শোকাতুরা বোনকে নিয়ে চলেন সঙ্গে করে।

    নৌকা চলছে… সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসছে। মনির আর মনিরার ঝগড়া থেমে গেলেও রাগ পড়েনি। মনির উঠে গিয়ে পিতার পাশে বসলো। চৌধুরী মাহমুদ খান হেসে বলেন—এত গম্ভীর কেন মনির? মনিরার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?

    গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে মনির—আমি ছবি আঁকছিলাম, মনিরা নষ্ট করে দিয়েছে।

    হেসে বলেন চৌধুরী সাহেব—ও এই কথা। মা মনিরা, এদিকে এসো তো!

    ভয়ে ভয়ে মনিরা গিয়ে দাঁড়ালো মামুর পাশে। চৌধুরী সাহেব তাকে আদর করে কোলে টেনে নিয়ে বলেন—তোমার মনির ভাইয়ের আঁকা ছবি নষ্ট করে দিয়েছ?

    বালিকা মৃদুস্বরে বলে—ভুল হয়েছে মামুজান। আমি মনির ভাইয়ের কাছে কত করে মাফ চাইলাম, মাফ করলো না।

    সে কি মনির, ভুল করে মনিরা যদি একটু ক্ষতি করেই থাকে, তবে কি তা ধরতে হয়? এসো মনির, বলো তোমাকে আমি মাফ করে দিয়েছি।

    মনির মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে—দিলাম ওকে মাফ করে।

    ঠিক সে মুহূর্তে নৌকাখানা দুলে উঠলো। মাঝিদের মধ্য থেকে একজনের গলা শুনা গেল—হুজুর ঝড় উঠেছে, ঝড় উঠেছে, হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার…

    চৌধুরী সাহেব ছৈ-এর ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালেন।

    আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখমণ্ডল তাঁর ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো।

    গোটা আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তার সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া।

    মনির এসে দাঁড়িয়েছে পিতার পাশে।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড ঝড় শুরু হল। মনিরাকে বুকে চেপে ধরে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে লাগলেন রওশনআরা বেগম। মরিয়ম বেগম পুত্রের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে ডাকাডাকি শুরু করলেন।

    প্রচণ্ড ঝড়ের দাপটে নৌকাখানা মোচার খোলার মত দুলছে, চৌধুরী সাহেব চিৎকার করে মাঝিদের সাবধান হবার নির্দেশ দিচ্ছেন। অন্য কোনদিকে তাঁর খেয়াল নেই।

    একে অন্ধকার রাত। তার ওপর প্রচণ্ড দাপট। মাঝিরা মরিয়া হয়ে নৌকাখানা সামলাতে চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নৌকাখানাকে রক্ষা করতে পারলো না তারা। নদীবক্ষে নৌকাখানা তলিয়ে গেল।

    খোদার হয়ত রহম ছিল। অল্পক্ষণেই ঝড়ের বেগ কমে এলে চৌধুরী সাহেব বুঝতে পারলেন, তাঁদের নৌকা গভীর নদীতে ডুবে যায়নি। নদীর একেবারে কিনারে এসে ডুবেছিল।

    মাঝিদের সাহায্যে চৌধুরী সাহেব সপরিবারে তীরে পৌঁছতে সক্ষম হলেন। কিন্তু একি, মনির কোথায়। চৌধুরী সাহেব, মরিয়ম বেগম, রওশন আরা বেগম, মনিরা সবাই আছে—শুধু নেই মনির।

    মরিয়ম বেগম বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন। চৌধুরী সাহেব অন্ধকারেই পাগলের ন্যায় ছুটাছুটি করতে লাগলেন, আর পুত্রের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন।

    এমন সময় ভোর হয়ে এলো। একমাত্র পুত্রের এই ভয়াবহ পরিণতির জন্য চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম পাগল-পাগলিনী প্রায় হয়ে ছিল। রওশন আরা বেগমও কেঁদেকেটে আকুল হলেন।

    ওদিকে স্রোতের টানে বহুদূর ভেসে গিয়েছিল মনির।

    নদীর কিনারে বালির ওপর অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে সে। খোদার মহিমায় জীবন বেঁচে গেছে মনিরের।

    এমন সময় নদীর কিনার ধরে এগিয়ে আসছিল দস্যু কাল খাঁ। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে মনিরের দিকে। দেখতে পায় সুন্দর ফুটফুটে একটা বালক পড়ে আছে বালির ওপরে। বালকটি মৃত না জীবিত দেখার জন্য কালু খাঁ বসে পড়ে তার পাশে। বুকে কান লাগিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। যখন বুঝতে পারে বালক মৃত নয় জীবিত, তখন তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটা নতুন আশার আলো উঁকি দিয়ে যায় কালু খাঁর মনে। অতি যত্নে কাঁধে উঠিয়ে গহন বনের দিকে পা বাড়ায় সে,…

    কালু খাঁ অস্ফুট কণ্ঠে ডেকে ওঠে—বনহুর!

    সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর, কালু খাঁর মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে—বাপু!

    কালু খাঁ বলতে আরম্ভ করে—বনহুর, তারপর তোকে নিয়ে এসে আমি নিজের ছেলের মতই লালন-পালন করতে লাগলাম। দিন দিন বড় হতে লাগলি তুই। ভুলে গেলি তোর পিতামাতার কথা। একদিন ফিরে এসে দেখি, তুই বনের মধ্যে একটা ঝোপের পাশে খেলা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিস। ভোরের সূর্যের আলো পড়েছে তোর মুখে। অপূর্ব সুন্দর লাগছিল তোকে। যেন শিশিরস্নিগ্ধ একটা ফুল। কতক্ষণ যে আমি তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিলাম জানি না, হঠাৎ আমার কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা শব্দ—‘বনহুর’!

    বনহুর অস্ফুট কণ্ঠে বলে ওঠে—বাপু!

    হ্যাঁ, তারপর ধীরে ধীরে মনির মুছে গিয়ে তৈরি হলো আমার বনহুর। আমি তোকে খেলাধুলার মধ্যে দিয়ে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলাম। একদিন দস্যু কালু খাঁ পরাজিত হলো বনহুরের কাছে। জয়ী হলো সে। সেদিন আমার দস্যু-জীবন সার্থক হলো, নিঃসন্তান কালু খাঁ পুত্ররত্ন লাভে সক্ষম হলো… হঠাৎ অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠে কালু খাঁ—হাঃ হাঃ হাঃ! আমার সাধনা সার্থক হয়েছে। আমার বাসনা পূর্ণ হয়েছে। দস্যু কালু খাঁ মরে গেছে… দস্যু কালু খাঁ মরে গেছে। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দস্যু বনহুর। হাঃ হাঃ হাঃ, একদিন কালু খাঁর ভয়ে দেশবাসী প্রকম্পিত হয়ে পড়েছিল, আজ প্রকম্পিত হচ্ছে দস্যু বনহুরের ভয়ে। আমার সাধনা সার্থক হয়েছে, হাঃ হাঃ হাঃ! হঠাৎ উঠে বসতে যায় কালু খাঁ, সঙ্গে সঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। বনহুর দু’হাতে তুলে ধরে ডাকে…বাপু… বাপু…

    কিন্তু কালু খাঁ তখন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বনহুর কালু খাঁর প্রাণহীন দেহটা বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে—বাপু… বাপু…

    অমনি ছুটে এলো নূরী।

    নূরী দস্যু কালু খাঁর পালিতা কন্যা। অবশ্য নূরীর পিতা দস্যু কালু খাঁরই একজন অনুচর ছিল। দস্যুতা করতে গিয়ে নিহত হয় নূরীর বাবা। সে হতে নূরী রয়ে যায় কালু খাঁর নিকটে।

    বনহুর এই বনে খেলার সাথী হিসেবে নূরীকেই পেয়েছিল পাশে। বনহুরকে ভালবাসতো নূরী। কিন্তু বনহুরের মনে নূরী তখনও দাগ কাটতে পারেনি। বনহুর নিজকে নিয়ে নিজেই ব্যস্ত থাকতো।

    নূরী ছুটে এসে কালু খাঁকে বিছানায় ঢলে পড়ে থাকতে দেখে আর্তনাদ করে ওঠে— বাপু! এ কি হয়েছে তোমার!

    বনহুর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে— নূরী, বাপু চলে গেছে। বাপু চলে গেছে…

    বিলাপ করে ওঠে নূরী—বাপু চলে গেছে। হায়, একি হলো! একি হলো—

    বনহুর দু’হাতে মুখ ঢেকে ছোট বালকের ন্যায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।

    আজ ক’দিন হলো কালু খাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঘন বনের ছায়ায় কবর দেয়া হয়েছে তাকে। বনহুর দিনরাত সে কবরের পাশে বসে থাকে। এই গহন বনে সে যে ঐ একটা মানুষকেই ভালবাসতো। সে কোনদিন ভাবতে পারেনি—কালু খাঁ তার পিতা নয়। আজ বিশটা বছর ধরে বনহুর তাকেই চিনে এসেছে। জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে এসেছে তাকে। তার যে কোন পিতা-মাতা ছিল, সে কথা ভাবতেও কষ্ট হতে লাগলো বনহুরের। সে যে শিক্ষা পেয়েছে সে শিক্ষা সভ্য সমাজের নয়, দস্যু কালু খাঁ তাকে নিজের মনের মত গড়ে তুলেছিল।

    এহেন পিতৃসমতুল্য কালু খাঁর শোক সহসা ভোলা বনহুরের পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন বনহুর কালু খাঁর কবরের পাশে বসে নীরবে চোখের পানি ফেলছিল। এমন সময় নূরী এসে দাঁড়ায় তার পাশে। বনহুরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে—হুর, বাপু চলে গেছে, তার জন্য সবসময় মন খারাপ করে কোন লাভ হবে না।

    মুখ তুলে বনহুর—নূরী, আমি যে বড় একা।

    এই তো আমি আছি তোমার পাশে।

    নূরী!

    চলো হুর, সমস্ত অনুচর তোমার প্রতীক্ষায় বসে আছে।

    নূরী!

    ভুলে যেও না হুর, তুমি দস্যু-সন্তান।

    না, আমি দস্যু-সন্তান নই, আমি দস্যু-সন্তান নই…

    সেকি! এসব তুমি কি বলছো হুর?

    নূরী জানত বনহুর কালু খাঁরই পুত্র, তাই সে অবাক হয়ে কথাটা বলে।

    বনহুর বুঝতে পারলো, কথাটা সে ভুল করেছে। কাল তাঁর হাত ধরে সে শপথ করেছে, কোনদিন সে কাউকে বলবে না, সে দস্যু কালু খাঁর পুত্র নয়। না না, সে দস্যু-সন্তান, সে দস্যু-সন্তান, উঠে দাঁড়ায় বনহুর, নূরীকে লক্ষ্য করে বলে—চলো নূরী, আজ হতে আমি ভুলে গেলাম সব।

  • দুই

    দুই

    সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট বনহুর। সামনে কয়েকজন দস্যু দণ্ডায়মান। সকলেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে—আজ আমরা মধুনগরের জমিদার বাড়িতে হানা দেব। মধুনগরের জমিদার বাসব নারায়ণ অতি দুষ্ট, শয়তান লোক। শুনেছি, একটা পয়সাও সে ভিখারীকে দান করে না। আমি চাই তার অর্থ নিয়ে ধুলোয় ছড়িয়ে দিতে। তোমরা প্রস্তুত?

    সমস্বরে বলে ওঠে দস্যু দল—হ্যাঁ সর্দার।

    বনহুর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, তারপর বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। সমস্ত দস্যু তাকে অনুসরণ করলো।

    বনহুর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতেই নূরী এসে দাঁড়ালো তার সামনে। একটা গোলাপ ফুল তার দিকে এগিয়ে ধরে বলে সে—হুর, তোমার যাত্রা শুভ হোক।

    বনহুর ফুলটা নিয়ে গুঁজে দিল নূরীর খোঁপায়, তারপর ওর চিবুক ধরে একটু নাড়া দিয়ে বলে—আল্লাহ হাফেজ!

    তাজের পিঠে চড়ে বসলো বনহুর, সঙ্গে সঙ্গে তাজ উল্কাবেগে ছুটে চললো, সমস্ত দস্যু অশ্ব ছুটিয়ে দিল তার পিছু পিছু।

    গভীর রাত।

    জমিদার বাসব নারায়ণ গভীর ঘুমে অচেতন।

    অন্যান্য দস্যুদের নিয়ে জমিদার বাড়ির প্রাচীর টপকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করলো। এক মুহূর্তে গোটা বাড়ি প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। যে যেখানে যা পেল, লুটে নিতে লাগলো। বনহুর প্রবেশ করলো জমিদার বাসব নারায়ণের কক্ষে।

    দুগ্ধফেননিভ বিছানায় বাসব নারায়ণ তখন সুখস্বপ্ন দেখছিল। বনহুর তার শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। রিভলবারের মৃদু আঘাত করে ডাকলো—নারায়ণ মশায়, উঠুন।

    ধড়মড় করে উঠে বসে বাসব নারায়ণ। সামনে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল তার কণ্ঠ। যমদূতের মত কালো পোশাকে পরা বনহুরকে রিভলবার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হৃদকম্প শুরু হলো তার। শুষ্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো—কে তুমি, কি চাও?

    বনহুরের চোখ দুটো ধক্ করে জ্বলে উঠলো। গম্ভীর কণ্ঠে বললো—দস্যু বনহুর!

    জমিদার বাসব নারায়ণের আড়ষ্ট কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এলো অস্ফুট একটা শব্দ—দস্যু বনহুর!

     হ্যাঁ।

    কিন্তু, কি চাও আমার কাছে?

    কি চাই জান না? টাকা—তোমার সমস্ত টাকা আমাকে এ মুহূর্তে দিয়ে দাও। নইলে এ দেখছো, এর এক গুলিতে তোমার টাকার মোহ ঘুচিয়ে দেব।

    বাসব নারায়ণ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বনহুরের পায়ের কাছে বসে পড়লো—বাবা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। টাকা কোথায় পাবো?

    কোথায় পাবে? এসো আমার সঙ্গে, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। বনহুর দু’পা এগুতেই বাসব নারায়ণ ছুটে গিয়ে সিন্দুক জড়িয়ে ধরলো।

    বনহুর এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে সিন্দুক খুলে যত টাকা পয়সা, সোনা-দানা নিয়ে অন্তপুর থেকে বেরিয়ে এলো।

    পরদিন গোটা শহরময় ছড়িয়ে পড়লো দস্যু বনহুরের এ দুঃসাহসিক দস্যুতার কথা। পুলিশ মহলে পর্যন্ত ত্রাসের সঞ্চার হলো।

    পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাঁর বহু প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, কিছুতেই এ দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হননি। তাঁর অভিজ্ঞ জীবনে এ যেন চরম পরাজয়।

    পুলিশ সুপার মি. বশির আহমদ পর্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তিনি নিজেও বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য উঠে পড়ে লেগে যান। গোপনে প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. শঙ্কর রাওয়ের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং কেসটা তাঁর হাতে অর্পণ করেন। অনুরোধ জানিয়ে বলেন, মি. রাও, আপনি দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করে দেশবাসীকে রক্ষা করুন।

    মি. আহমদের কথা রাখবেন বলে আশ্বাস দেন মি. রাও। তিনি ভরসা দিয়ে বলেন—আমি আপনার অনুরোধ রাখবো, দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো।

    থ্যাঙ্ক ইউ মি. রাও, আপনার ওপর আমার ভরসা রইলো। দেখুন এ ব্যাপারে আপনার যত টাকা-পয়সা এবং লোকজনের প্রয়োজন হবে পাবেন, পুলিশ ফোর্স সব সময়ের জন্য আপনাকে সাহায্য করবে।

    মি. আহমদের গাড়ি বেরিয়ে যেতেই মি. রাওয়ের সহকারী গোপালবাবু এসে এজির হলেন, মি. রাওকে লক্ষ্য করে বলেন—কি হে, ব্যাপার কি? হঠাৎ যে পুলিশ সুপারের আগমন?

    একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বলেন মি. রাও—ব্যাপার নতুন নয়, পুরানো।

    পাশের সোফায় বসে পড়ে বলেন গোপালবাবু—পুরোনো? তাহলেই সেরেছে, রোগ সারতে অনেক ঔষধের প্রয়োজন হবে।

    ঠাট্টা নয়, শুনো গোপাল।

    বল, সব শুনতে রাজি আছি।

    দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের নোটিস নিয়ে পুলিশ সুপারের আগমন হয়েছিল।

    কী বললে, বনহুরকে গ্রেপ্তার? তুমি ঐ কেস হাতে নিলে নাকি?

    না নিয়ে কি আর উপায় ছিল? পুলিশ সুপার যখন এসেছেন।

    কিন্তু এ কথা ভেবে দেখলে না শঙ্কর, কোথায় দস্যু বনহুর, আর কোথায় তুমি। আজ পর্যন্ত পুলিশবাহিনী যার টিকিটি দেখতে পায়নি, তাকে গ্রেপ্তার করবে তুমি? যা খুশি করোগে, আমি কিন্তু ওসবের মধ্যে নেই।

    গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠেন শঙ্কর রাও—কেউ যখন তার টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পায়নি, সে কারণেই আমি এগুতে চাই। দেখতে চাই কে এই বনহুর, কেমন তার শক্তি। গোপাল শুনো, আরও সরে এসো আমার কাছে।

    এলাম বল।

    গোপাল, গত পরশু রাতে জমিদার বাসব নারায়ণের বাড়িতে হানা দিয়ে দস্যু বনহুর সর্বস্ব লুটে নিয়ে গেছে।

    এ কথা আমি শুনেছি।

    শুনো, সব কথা মন দিয়ে শুনো, তারপর যা হয় বল। আমি একটা বুদ্ধি এঁটেছি।

    কি বুদ্ধি শুনি? হাতি ধরবার মত বনহুরকে গ্রেপ্তারের ফাঁদ পাততে চাও নাকি?

    এক রকম তাই।

    বল, তাহলে শুনি তোমার বুদ্ধির ফাঁদ কত মজবুত হবে?

    শুনো, আমাকে পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুনের নিকট যেতে হচ্ছে। কিছু সংখ্যক পুলিশ প্রয়োজন।

    তা তো বুঝলাম, কিন্তু তোমার বুদ্ধির কৌশল কিছুটা শুনাও। পুলিশ নিয়ে বনহুরের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করবে নাকি?

    না না, তা নয়, কথা হচ্ছে আগামী শনিবারে রায় বাহাদুর শ্যামাচরণের তিন লাখ টাকা তার দেশের বাড়ি থেকে শহরের বাড়িতে আনবে।

    একথা তুমি জানলে কি করে?

    জানতে হয় না, জেনেছি।

    তার মানে?

    মানে এই রকম একটা অভিনয় করতে হবে। আমি আজই একবার রায় শাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো। তিনি যেন এই রকম একটা কথা সকলের মধ্যে রটিয়ে দেন এবং নিজের সই করা কয়েকটা কাগজ—যাক সব বলে আর কাজ নেই, পরে সব জানতে পারবে।

    তবু একটু বল না?

    তারপর কয়েকজন পাহারাদার সঙ্গে করে শ্যামাচরণ মহাশয়ের নায়েব দেশের বাড়ি থেকে মোটরে তিন লাখ টাকা নিয়ে রওনা দেবে, কিন্তু আসলে তাদের কাছে কোন টাকা-পয়সা থাকবে না। দস্যু বনহুর জানবে তিন লাখ টাকা যাচ্ছে। এ সুয়োগ কিছুতে নষ্ট করা যায় না, তখন নিশ্চয়ই সে গাড়িতে হানা দেবে।

    খাসা বুদ্ধি তোমার!

    হ্যাঁ, খাসা বুদ্ধি এটেছি গোপাল। যে গাড়িতে টাকা আসছে, সে গাড়িকে অনুসরণ করবে পুলিশ ফোর্স, সকলের হাতেই থাকবে গুলিভরা রাইফেল। অতি গোপনে থাকবে, যেন কেউ জানতে না পারে।

    উঠে পড়েন মি. শঙ্কর রাও—গোপাল তৈরি হয়ে এসো, এক্ষণি বেরুবো।

    হাই তুলে উঠে দাঁড়ায় গোপালবাবু যাত্রা তোমার জয়যুক্ত হউক!

    বনহুর কক্ষে পায়চারী করছে। এক পাশে বিরাট একটা মশাল জ্বলছে। সম্মুখে দণ্ডায়মান তার অনুচরবৃন্দ। মশালের আলোতে দস্যু বনহুরের জমকালো পোশাক চকচক করে উঠছে। বনহুরের আসনের সামনে একটা টেবিল, টেবিলে একখানা চিঠি খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।

    বনহুর কাগজখানা হাতে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন—এ চিঠি কোথায় পেলে?

    একজন দস্যু বলে ওঠে—সর্দার, একটা লোকের পকেট থেকে চিঠিখানা পড়ে গিয়েছিল, রহমান কুড়িয়ে এনে আমাকে দিয়েছে।

    হঠাৎ বনহুর হেসে ওঠে হাঃ হাঃ করে। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে ঐ রকম আর একখানা কাগজ বের করে ঐ কাগজখানার পাশে রাখে। তারপর ঐ দস্যুটিকে বলে—কাগজ দু’খানা পড়।

    দস্যুটি কাগজ দু’খানা হাতে তুলে নিয়ে বলে ওঠে—একি সর্দার, দুটোতেই যে একই কথা লেখা রয়েছে!

    চিঠি দুটোতে লেখা ছিল—

    নায়েব বাবু, আমার তিন লাখ টাকার

    প্রয়োজন। আগামী পরশু আমার গাড়ি

    পাঠাবো। কয়েকজন পাহারাদার সহ

    ঐ টাকা নিয়ে আপনি স্বয়ং চলে আসবেন।

    —রায় বাহাদুর শ্যামচরণ।

    দস্যুটি কাগজ দু’খানা পড়া শেষ করে আবার টেবিলে রাখে। আশ্চর্য। দু’খানা কাগজের লেখা একই লোকের।

    বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে—দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের এটা একটা নতুন ফন্দি। শুধু ঐ দুটি নয়, অমনি আরও অনেক চিঠি এখানে সেখানে গোপনে ছড়ানো হয়েছে। হাঃ হাঃ হাঃ, দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করে এমন লোক পৃথিবীতে আছে নাকি? যাক এবার তোমরা বিশ্রাম করোগে।

    দস্যুগণ বেরিয়ে যায়। বনহুর নিজের বিশ্রামঘরে প্রবেশ করে।

    এমন সময় নূরী এসে দাঁড়ায় সেখানে। মধুর কন্ঠে ডাকে—হুর!

    নূরী বনহুরকে আদর করে ‘হুর’ বলে ডাকতো।

    বনহুর মাথার পাগড়িটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বলে—কি খবর নূরী?

    —হুর, তোমার দেখাই যে পাওয়া যায় না। সারাটা দিন তুমি কোথায় কাটাও?

    বনহুর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে—সারাটা দিন আমি তোমার পাশেই থাকি, তুমি আমাকে দেখতে পাও না নূরী?

    নূরী বনহুরের পাশে গিয়ে বসে, তার জামার বোতাম খুলতে খুলতে বলে—মিছে কথা। আমি অন্ধ বুঝি?

    নূরী, বনহুর কি মেয়েছেলে, তাই…

    হুর, আমি যে বড় একা। এ গহন বনে তুমি ছাড়া আর আমার কে আছে? নূরীর কণ্ঠে বেদনা ঝরে পড়ে।

    বনহুর অবাক হয়ে তাকায় নূরীর মুখের দিকে।

    নূরী বনহুরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে—এ বনে আসা অবধি আমি তোমাকে সাথীরূপে পেয়েছি, হুর। তুমিই যে আমার সব।

    নূরী, তুমি আমাকে ধরে রাখতে চাও?

    না, ধরে রাখতে চাইনে, কিন্তু…

    বুঝেছি, আবার যেন ফিরে আসি এ তো? হোঃ হোঃ করে হেসে ওঠে বনহুর—পাগলী আর কী!

    না, আমি নই, তুমি পাগল। কিছু বুঝ না, বুঝতে চাও না। এখনও তোমার ছেলেমানুষি গেল না, হুর!

    নূরী, এখন বিশ্রাম করবো। তুমি এখন যাও লক্ষ্মী মেয়ে।

    বনহুরের কথায় নূরী অভিমানভরে উঠে দাঁড়ায়—আচ্ছা আমি যাচ্ছি। আর তোমাকে বিরক্ত করতে আসবো না।

    খপ করে নূরীর হাত ধরে ফেলে বনহুর—রাগ হলো?

    আমি রাগ করলে তাতে তোমার কী আসবে যাবে? ছেড়ে দাও আমার হাত।

    নূরী, অভিমান করো না। একটু বিশ্রাম করেই আবার আমাকে বেরুতে হবে।

    তার মানে, আবার এ রাতেই তুমি বেরুবে?

    হ্যাঁ নূরী, আমার অনেক কাজ।

    শুধু কাজ আর কাজ, আজ নাই-বা বেরুলে!

    তা হয় না নূরী, বেরুতেই হবে।

    নূরী ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।

    বনহুর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়।

    গভীর রাত। তাজের পিঠে চড়ে বসলো বনহুর। আজ শরীরে স্বাভাবিক ড্রেস, প্যান্ট-কোট-টাই, মাথায় ক্যাপ। পকেটে কিন্তু গুলিভরা রিভলবার।

    গহন বন বেয়ে, নিস্তব্ধ প্রান্তরের বুক চিরে ছুটে চললো বনহুরের অশ্ব। প্রান্তর পেরিয়ে এক পল্লীতে এসে পৌঁছল বনহুর। এবার গতি অতি মন্থর করে নিল সে। শস্যক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললো। অদূরে দেখা যাচ্ছে ধবধবে সাদা রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের বাড়ি।

    বনহুর এ বাড়ির সামনে গিয়ে অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়ালো।

    সদর গেটে একজন পাহারাদার বন্দুক হাতে পাহারা দিচ্ছিল, হেঁকে উঠলো পাহারাদার—কোন্ হ্যায়?

    বনহুর তাজকে রেখে এগিয়ে গেল পাহারাদারের নিকটে— আমি শহর থেকে আসছি। রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় পাঠিয়েছেন। নায়েব বাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

    পাহারাদার লম্বা একটা সেলাম ঠুকে বলেন—আইয়ে বাবুজী, হল্ ঘরমে বঠিয়ে, হাম নায়েব বাবুকো বুলাতা হুঁ।

    আচ্ছা, —বনহুর হলঘরে গিয়ে বসলো।

    পাহারাদার লণ্ঠন হাতে অন্দরবাড়িতে প্রবেশ করে।

    কিছুক্ষণ পর নিদ্রাজড়িত চোখ দু’টি মুছতে মুছতে কক্ষে প্রবেশ করেন নায়েব বাবু।

    বনহুর উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালো, তারপর বললো—আমি শহর থেকে আসছি। রায় মহাশয় আমাকে পাঠিয়েছেন।

    বৃদ্ধ নায়েব মহাশয় বলে ওঠেন—হঠাৎ এত রাতে তিনি কি মনে করে আপনাকে পাঠালেন?

    বনহুর পকেট থেকে সে চিঠিখানা বের করে নায়েব মহাশয়ের হাতে দিয়ে বলে—এই চিঠি তিনি দিয়েছেন।

    লণ্ঠনের আলোতে বৃদ্ধ চিঠিখানা দেখলেন, তারপর তাকালেন বনহুরের মুখে।

    বনহুর হেসে বলে—আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? দেখুন পরশু যেভাবে টাকা পাঠানোর কথা ছিল, সেভাবে পাঠানো নিরাপদ নয়, সে কারণেই রায় মহাশয় পাঠিয়েছেন। আমি যেন গোপনে টাকা নিয়ে তাঁর হাতে পৌঁছে দিই।

    বৃদ্ধ নতমস্তকে কিছু ভাবতে লাগলেন।

    বনহুর গম্ভীরভাবে বলে—এ চিঠি রায় মহাশয়ের লেখা কিনা ভাবছেন বুঝি?

    না, সে বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। তিরিশ বছর ধরে আমি রায় মহাশয়ের কাজ করছি, তাঁর হাতের লেখা চিনবো না, কি যে বলেন!

    তাহলে অবিশ্বাসের কিছু নেই?

    কিন্তু…

    আর কিন্তু কি আছে নায়েব বাবু?

    আমি বলছিলাম, হঠাৎ এভাবে টাকা…

    দেয়াটা কি উচিত হবে, এই তো ভাবছেন? আমি আমার নাম-ঠিকানা সব লিখে দিয়ে যাচ্ছি।

    বেশ, তাই হবে। বসুন আমি টাকা নিয়ে আসছি। নায়েব বাবু কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। আগের দিনের সরল সহজ মানুষ, বনহুরকে এতটুকু অবিশ্বাস করলেন না। কিছুক্ষণ পর একগাদা নোট নিয়ে ফিরে এলেন, তারপর বনহুরের হাতে দিয়ে বলেন—সাবধানে নিয়ে যাবেন, পথে চোর-ডাকাত না হামলা করে।

    সে কারণেই তো এত রাতে, এত গোপনে আমার আসা।

    টাকাগুলো গুছিয়ে নিয়ে, নাম আর ঠিকানাসহ একটা রসিদ লিখে দিল বনহুর নায়েব বাবুর হাতে—এটা রেখে দিন।

    বনহুর বেরিয়ে যেতেই নায়েব বাবুর লণ্ঠনের সামনে রসিদখানা মেলে ধরলেন, সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলেন।

    কাগজখানায় লেখা আছে—

    নায়েব শশধর বাবুর নিকট হতে

    তিন লাখ টাকা বুঝে পেয়ে

    রসিদ লিখে দিলাম।

    —‘দস্যু বনহুর’

    বৃদ্ধ নায়েবের শুষ্ক কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এলো—সর্বনাশ হয়েছে, ওরে কে কোথায় আছিস, সর্বনাশ হয়েছে…

    নায়েব বাবুর চিৎকারে দারোয়ান ছুটে এলো, সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সবাই।

    সকলেই একসঙ্গে প্রশ্ন করছে—কী হলো, কী হলো?

    হাঁপাতে হাঁপাতে নায়েব বাবু আঙ্গুল দিয়ে বাইরে দেখিয়ে দিয়ে বলেন—দস্যু বনহুর সব নিয়ে গেছে। ঐ দিকে গেছে, তোমরা ধরো—ধরো ওকে…

    সবাই ছুটলো সদর গেটের দিকে। বাইরে যখন এসে দাঁড়ালো ওরা, তখন চারদিকে শুধু ঘন জমাট অন্ধকার। দূরে—অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে অশ্ব পদশব্দ—খট্ খট্ খট্……

  • তিন

    তিন

    পরদিন গোটা দেশময় হৈ চৈ পড়ে গেল। কাগজে কাগজে বেরুলো দস্যু বনহুরের অদ্ভুত দস্যুতার কথা।

    মি. শঙ্কর রাও মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিল। কি করতে কি ঘটে গেল! এত বড় ফন্দিটাও তাঁর টিকলো না। বরং বেচারা রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ এত বড় একটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেন। লজ্জায় ক্ষোভে মরিয়া হয়ে উঠলেন শঙ্কর রাও।

    পুলিশ মহলে আতঙ্কের সৃষ্টি হলো! মি. বশীর আহমদ পর্যন্ত বোকা বনে গেলেন! কারও মুখে যেন কোন কথা নেই।

    সমস্ত পথে-ঘাটে-মাঠে, অলিগলিতে পুলিশ পাহারা রইলো। সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই তারা তাকে গ্রেপ্তার করবে। পুলিশমহল থেকে ঘোষণা করে দেয়া হলো, যে দস্যু বনহুরকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

    অর্থের লোভে যে যাকে সন্দেহ হলো, ধরে নিয়ে এলো থানায়। একদিন গভীর রাতে কয়েকজন পুলিশ রাস্তায় পাহারা দিচ্ছিলো, এমন সময় একটা পাগল ছেঁড়া জামাকাপড় পরে আবোল-তাবোল বকতে বকতে চলে যাচ্ছিলো। পুলিশের দৃষ্টি আড়াল হয়ে যাবে, এমন সময় দু’জন পুলিশ ধরে ফেললো তাকে—এ বেটা, কোথায় যাচ্ছিস?

    পাগল লোকটা মাথা চুলকাতে আরম্ভ করলো। পুলিশদের সন্দেহ আরও বাড়লো, একজন লাঠি উঁচিয়ে বসিয়ে দেবে আর কী, এমন সময় একটানে মুখ থেকে দাড়ি আর গোঁফ খুলে ফেলে বলেন পাগল লোকটা—আমি পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন।

    সঙ্গে সঙ্গে পুলিশরা ‘বেকুফ’ বনে গেল। লম্বা সেলুট ঠুঁকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সকলে। হৃৎপিণ্ড তখন ধক ধক করতে শুরু করেছে ওদের। না জানি এর জন্য কপালে কি আছে, এত কষ্টের পুলিশের চাকরিটা না খোয়া যায়।

    মি. হারুন হেসে বলেন—হ্যাঁ, এই রকম সতর্ক থাকবে। পাগল কিংবা ভিখারী বলেও কাউকে খাতির করবে না। কথা ক’টি বলে চলে গেলেন ইন্সপেক্টার।

    এতক্ষণে পুলিশগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

    নূরী একটা খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চিন্তিত মনে বসে আছে।

    এমন সময় বনহুর এসে দাঁড়ালো তার পাশে। নূরীকে বিষণ্ণ মুখে বসে থাকতে দেখে হেসে বলে—কি এত ভাবছো বসে বসে?

    তোমার যেন কোন ভাবনা নেই! এই দেখ দেখি। খবরের কাগজের একটা জায়গা মেলে ধরলো বনহুরের চোখের সম্মুখে—দেখেছো?

    ওঃ তাই বুঝি এত ভাবনা? পরক্ষণেই হেসে ওঠে হাঃ হাঃ করে বনহুর, তারপর বসে পড়ে নূরীর পাশে।

    নূরীর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোটা অশ্রু। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে—তোমার কি জীবনের এতটুকু ভয় নেই?

    ভয়! কিসের ভয় নূরী?

    তোমাকে যে জীবিত কী মৃত ধরে দিতে পারবে, সে লাখ টাকা পাবে।

    নূরী, আমার ইচ্ছে হচ্ছে আমি নিজেকে নিজেই ধরিয়ে দিয়ে এক লাখ টাকা গ্রহণ করি।

    ছি! তোমার এত টাকার মোহ? টাকা? বনহুর টাকার পাগল নয় নূরী! সে চায় দুনিয়াটাকে দেখতে।

    বেশ হয়েছে, অনেক দেখেছো, এবার মানুষ হবার চেষ্টা কর।

    কেন, আমি কি মানুষ নই?

    মানুষ যদি হতে তবে এমন সব আজগুবি কথা বলতে না। থাক, চল দেখি এবার কিছু খাবে।

    বনহুর উঠে দাঁড়ায়—উঁহু, কিছু খাবো না, নূরী।

    কোথায় যাবে এই ভর সন্ধ্যায়?

    প্যান্টের পকেট থেকে কয়েক তোড়া নোট বের করে নূরীর সামনে ধরে—এগুলো মালিককে পৌঁছে দিতে।

    তার মানে?

    প্যান্টের পকেটে টাকার তোড়াগুলো রাখতে রাখতে বলে বনহুর—ঐ যে সেদিন রায় বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের নায়েবের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে এসেছিলাম তা এখনও মালিকের নিকটে পৌঁছে দেয়া হয়নি।

    তুমি আশ্চর্য মানুষ।

    কেন?

    টাকা আনলেই বা কেন, আবার ফিরিয়ে দেবারই কী প্রয়োজন আছে?

    নূরী, বনহুর সব পারে। ছলনা বা কৌশলে বনহুরকে বন্দী করা এত সহজ নয়, সেটাই জানিয়ে দিলাম। আর অযথা বৃদ্ধ, নায়েব মহাশয়কে বিপদগ্রস্ত করতে চাইনে। শ্যামাচরণ মহাশয় কিছুতেই এই তিন লাখ টাকা ছাড়বে না, বৃদ্ধ নায়েব বাবুকেই পরিশোধ করতে হবে, নয়তো হাজত বাস।

    তাতে তোমার কী, যা হয় হউকগে।

    তা হয় না নূরী, অযথা কাউকে কষ্ট দেয়া আমার ইচ্ছে নয়, আচ্ছা চলি, ভোরে ফিরে আসবো।

    নিস্তব্ধ প্রান্তরে জেগে ওঠে বনহুরের অশ্ব-পদশব্দ। নূরী দু’হাতে বুক চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায়, বুকের মধ্যে ধক্ ধক্ করে ওঠে, না জানি সে কেমনভাবে ফিরে আসবে।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণের বাড়ির পেছনে গিয়ে বনহুর তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো, তারপর প্রাচীর টপকে প্রবেশ করলো অন্তঃপুরে। একে গভীর অন্ধকার, তার উপরে বনহুরের শরীরে কালো ড্রেস থাকায় অন্ধকারে মিশে গেল সে।

    অতি সহজেই রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের কক্ষের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো।

    কক্ষে ডিমলাইট জ্বলছে। বনহুর পকেট থেকে একটা যন্ত্র বের করে অল্পক্ষণের মধ্যেই জানালার কাঁচ খুলে ফেললো, তারপর প্রবেশ করলো কক্ষে।

    খাটের ওপর রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ শায়িত। গোটা রাত অনিদ্রায় কাটিয়ে এতক্ষণে একটু ঘুমিয়েছেন। তিন লাখ টাকার শোক কম নয়, টাকার শোকে তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন। যত দোষ ঐ নায়েব বাবুর। তিনি না জেনেশুনে অপরিচিত একটা লোককে বিশ্বাস করলেন, এত টাকা ছেড়ে দিলেন তার হাতে। না, এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করতে হবে। বৃদ্ধ পুরানো নায়েব বলে খাতির করলে চলবে না, জেল খাটাবেন। কিছুতেই রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ তাঁকে রেহাই দেবেন না…এতসব ভাবতে ভাবতে কেবলমাত্র ঘুমিয়েছেন।

    বনহুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর গায়ে মৃদু আঘাত করে ডাকলো—উঠুন।

    রায়বাহাদুর ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে তাকালেন সামনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করতে যাবেন, অমনি বনহুর রিভলবার চেপে ধরলো তাঁর বুকে—খবরদার, চিৎকার করবেন না।

    বনহুরের কালো অদ্ভুত ড্রেস, মুখে, গাল পাট্টা রায়বাহাদুরকে আতঙ্কিত করে তুললো। তিনি একটা ঢোক গিলে বলেন—তুমি কে?

    বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল—দস্যু বনহুর!

    রায়বাহাদুর রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন, চিৎকার করে বলেন—তুমিই দস্যু বনহুর!

    হেসে বলে বনহুর—হ্যাঁ।

    আবার কি জন্য এসেছো? আমার তিন লাখ টাকা নিয়েও তোমার লোভ যায়নি?

    ভুল বুঝেছেন রায়বাহাদুর মহাশয়, আপনার টাকা নেইনি, আপনার নিকটে পৌঁছে দেবার জন্যই আপনার নায়েব বাবুর কাছ হতে নিয়ে এসেছি। কারণ আপনি যেভাবে টাকা নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন, সেভাবে আনাটা নিরাপদ নয়, তাই আমি—

    ওঃ তাহলে তুমি টাকাটা অন্য কেউ লুটে নেবার পূর্বেই লুটে নিয়েছে, শয়তান কোথাকার!

    দেখুন আমি শয়তান নই, শয়তানের বাবা। যাক বেশি বিরক্ত করতে চাইনে আপনাকে এ দুপুর রাতে। বুঝতেই পারছি আপনি এ তিন লাখ টাকার শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েছেন। সে কারণেই আমি তাড়াতাড়ি এলাম, এ নিন আপনার টাকা। প্যান্টের পকেট থেকে তিন লাখ টাকার তোড়া বের করে রায় বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের হাতে দিয়ে বলে—গুণে নিন।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের চোখে মুখে একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়ে। একবার হস্তস্থিত টাকা আর একবার বনহুরের কালো গালপাট্টা বাধা মুখের দিকে তাকান তিনি। একি অবিশ্বাসের কথা, বনহুর তবে কি তাকে হত্যা করতে এসেছে? ভয়ে বিবর্ণ হয়ে ওঠে তার মুখমণ্ডল।

    বনহুর পুনরায় বলে ওঠে—নিন, টাকা গুণে নিন। এক পা পাশের চেয়ারে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ কম্পিত হাতে টাকার তোড়াগুলো গুণে নিলেন।

    বনহুর বলেন—ঠিক আছে তো?

    হ্যাঁ, ঠিক আছে।

    বনহুর এক টুকরা কাগজ আর কলম বাড়িয়ে ধরলো রায়বাহাদুর মহাশয়ের সামনে—একটা রসিদ লিখে দিন, আমি তিন লাখ টাকা বুঝে পেলাম।

    শ্যামাচরণ কাগজ আর কলমটা হাতে নিয়ে লিখলেন।

    বনহুর হেসে বলেন—নিচে নাম সই করুন।

    শ্যামাচরণ মহাশয় নাম সই করে কাগজখানা বনহুরের হাতে দিলেন।

    বনহুর কাগজখানা হাতে নিয়ে আর একবার পড়ে দেখলো, তারপর পকেটে রাখলো। রিভলবার উঁচিয়ে ধরে পিছু হটতে লাগলো সে, পরমুহূর্তে যে পথে এসেছিল সে পথে অদৃশ্য হলো।

    এবার বনহুরের অশ্ব রায় মহাশয়ের দেশের বাড়ির সদর গেটে গিয়ে থামলো, অতি সতর্কতার সঙ্গে প্রাচীর টপকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করলো সে। নায়েব বাবুর কক্ষ সেদিন চিনে নিয়েছিল বনহুর, আজ সে কক্ষের দরজায় আঘাত করলো।

    নায়েব বাবুর চোখে ঘুম নেই, তিন লাখ টাকা যেমন করে হউক তাকে পরিশোধ করতেই হবে, না হলে নিস্তার নেই। কিন্তু কোথায় পাবেন তিনি অত টাকা। মাথার চুল ছিঁড়ছেন তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে— ঠিক সে মূহুর্তে কক্ষের দরজায় মৃদু শব্দে নায়েব বাবু বিছানায় উঠে বসে বলেন—কে?

    বনহুর পুনরায় শব্দ করে ঠুক ঠুক ঠুক…

    এবার নায়েব বাবু শয্যা ত্যাগ করেন। দরজা খুলে দিয়ে সম্মুখে বনহুরকে দেখেই চিৎকার করতে যান, সঙ্গে সঙ্গে বনহুর চেপে ধরে তাঁর মুখ—ভয় নেই, আজ টাকা নিতে আসিনি। রায় বাহাদুর মহাশয়ের নিকটে টাকা পৌঁছে দিয়েছি, এই নিন রসিদ।

    বৃদ্ধ নায়েব কম্পিত হাতে রসিদখানা হাতে নিয়ে হাবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না এ কথা।

    বনহুর যেমনি এসেছিল, তেমনি বেরিয়ে যায়।

    রাতের ঘটনা নিয়েই পুলিশ অফিসে আলোচনা চলছিল। রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়কে দস্যু বনহুর সে তিন লাখ টাকা ফেরত দিয়ে গেছে, এটাই আলোচনার বিষয়বস্তু।

    পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন, মি. শঙ্কর রাও, মি. গোপাল বাবু, রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় এবং বৃদ্ধ নায়েব বাবু সকলেই উপস্থিত আছেন।

    মি. হারুন বলে ওঠেন—আশ্চর্য এই দস্যু বনহুর।

    মি. শঙ্কর রাও বলেন—শুধু আশ্চর্য নয়, ইন্সপেক্টার, অদ্ভুত সে।

    গোপাল বাবু হঠাৎ বলে বসে—সত্যি আশ্চর্য বলে আশ্চর্য। কেনই বা সে টাকা নিল, আবার কেনই বা ওভাবে ফিরিয়ে দিয়ে গেল! নিশ্চয়ই দস্যু বনহুর ভয় পেয়েছে।

    শঙ্কর রাও একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বলেন—ভয় পাবার বান্দা সে নয়। সে দেখিয়ে দিল, আমি সব পারি। কিন্তু বাছাধন জানে না শঙ্কর রাও কম নয়, আমি একবার দেখে নেব দস্যু বনহুরকে।

    এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করেন চৌধুরী সাহেব। সহাস্যমুখে বলেন—গুড মর্নিং।

    সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে চৌধুরী সাহেবকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন, তারপর তিনি আসন গ্রহণ করার পর সবাই আসন গ্রহণ করলেন।

    ইন্সপেক্টার সাহেব বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন—ব্যাপার কি চৌধুরী সাহেব, হঠাৎ যে?

    কেন, আসতে নেই নাকি? হেসে বলেন চৌধুরী সাহেব।

    ইন্সপেক্টার মি. হারুন বলেন—এখানে কি মানুষ সহজে আসতে চায়?

    তার মানে?

    মানে যখন একটা কিছু অঘটন ঘটে, তখনই লোকে আমাদের এই পুণ্যভূমিতে পদধূলি দেন।

    মি. হারুনের কথায় হেসে ওঠেন সবাই।

    চৌধুরী সাহেব বলেন—সে কথা মিথ্যা নয় ইন্সপেক্টার সাহেব। তবে আমি অঘটন ঘটিয়ে আসিনি। এসেছি একটা সামান্য কথা নিয়ে।

    একসঙ্গে সকলেই চোখ তুলে তাকালেন। মি. হারুন জিজ্ঞেস করলেন—সামান্য কথা? বলুন, আপনার সামান্য কথাটাই আগে শোনা যাক। কিন্তু তার পূর্বে এদের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দি। ইনি রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় আর ইনি তাঁর নায়েব শঙ্কর বাবু আর ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. শঙ্কর রাও। উনি মি. রাওয়ের সহকারী গোপাল বাবু। এবার চৌধুরী সাহেবের পরিচয় দেন—আর উনি চৌধুরী মাহমুদ খান, হাসানপুরের জমিদার।

    চৌধুরী সাহেব আনন্দভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন—আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অত্যন্ত খুশি হলাম। যদিও আপনাদের নামের সঙ্গে আমার বেশ পরিচয় আছে।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় উঠে দাঁড়িয়ে চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে হাত মিলান—আমিও অত্যন্ত খুশি হলাম, চৌধুরী সাহেব। আপনার সুনাম অনেক শুনেছি, কিন্তু দেখা হয়নি কোনদিন। আজ এখানে আমরা একসঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দিত হলাম।

    চৌধুরী সাহেব বলেন—খবরের কাগজে যে সব ঘটনা পড়লাম এ সব কি সত্য রায়বাহাদুর সাহেব?

    আজ্ঞে হ্যাঁ, সব সত্য। কথাটা অতি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়।

    মি. হারুন হেসে বলেন—না হলে কি আর রায়বাহাদুর মহাশয়ের পুলিশ অফিসে পদধূলি পড়ে।

    চৌধুরী সাহেবই বলে ওঠেন—আমি প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলাম। আশ্চর্য এই দস্যু বনহুর। টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে সে মহৎ হৃদয়ের পরিচয় দিয়ে গেছে।

    এবার মি. রাও কথা বলেন—কাকে আপনি মহৎ হৃদয় বলছেন, চৌধুরী সাহেব? শয়তান বদমাশ। দস্যুতার এটা একটা নতুন চাল।

    কিন্তু শুনা গেছে, সে নাকি অনেক দীন দুঃখীকে মুক্তহস্তে দান করছে।

    মিথ্যে কথা চৌধুরী সাহেব, সব আজগুবি কথা। কেউ স্বচক্ষে দেখেছে? দস্যু বনহুর কাকে টাকা দিয়েছে? শয়তানটা যে অতি ধূর্ত—এ কথা মিথ্যে নয়।

    মি. হারুন বলে ওঠেন—পুলিশকে একেবারে হন্তদন্ত করে মারছে। আমরা তো একেবারে নাজেহাল হয়ে উঠেছি, থাক সে কথা। এবার বলুন চৌধুরী সাহেব, আপনার কি কথা?

    হ্যাঁ, এতক্ষণ আসল কথাটাই বলা হয়নি। দেখুন আপনারা সকলেই যখন এখানে উপস্থিত আছেন, তখন ভালোই হলো। আমি আপনাদের দাওয়াত করছি। আমার ভাগনী মনিরা বেগমের জন্ম উৎসব। অনুগ্রহ করে আজ সন্ধ্যায় আমার ওখানে যাবেন। এই নিন কার্ড। কার্ড বের করে নাম লিখলেন। তারপর প্রত্যেককে একখানা করে দিয়ে বলেন—মনে কিছু করবেন না। আপনাদের দাওয়াত করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দবোধ করছি।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় হেসে বলেন—এটা তো খোশখবর। এলাম কোন কাজে, পেলাম দাওয়াত। সত্যি আজকের দিনটা আমার বড় শুভ যাচ্ছে।

    মি. হারুন বলে ওঠেন—মিথ্যে নয় রায়বাহাদুর সাহেব। শুধু আজকের দিন নয়, কালকের রাত থেকে আপনার শুভরাত্রি শুরু হয়েছে।

    চৌধুরী সাহেব এবার মি. রাওকে লক্ষ্য করে বলেন—আপনারা নীরব রইলেন যে? গরীবালয়ে আসছেন তো?

    নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, এতবড় একটা লোভ সামলানো কি সহজ কথা! নিশ্চয়ই আসবো।

    ধন্যবাদ! একটু থেমে কি যেন চিন্তা করলেন চৌধুরী সাহেব। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলেন—আমি নিঃসন্তান। ঐ ভাগনীটাই আমার পুত্র এবং কন্যা। অনেক আশা, অনেক বাসনা নিয়েই ওকে আমি মানুষ করেছিলাম…যাক সে সব কথা, আপনারা মেহেরবানি করে আসবেন কিন্তু।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় বলে ওঠেন—চৌধুরী সাহেব, শুনেছিলাম আপনার নাকি একটি পুত্রসন্তান ছিল?

    ছিল,—বিশ বছর আগে তাকে হারিয়েছি। ইন্সপেক্টার, আপনাকে কি বলবো, আট বছরের সে বালকের স্মৃতি আজও আমরা ভুলতে পারিনি। বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে চৌধুরী সাহেবের কষ্ট— আমার মনির ছিল অপূর্ব, অদ্ভুত ছেলে।

    অনুতপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন মি. হারুন—চৌধুরী সাহেব না জেনে কথাটা বলে ভুল করেছি।

    না না, আপনি কোন ভুল করেননি ইন্সপেক্টার সাহেব। আপনি না বললেও সদাসর্বদা তার স্মৃতি আমার হৃদয়ে আঘাত করে চলেছে। অনেক কষ্টে ঐ ভাগনীটাকে চোখের সামনে রেখে তাকে ভুলে আছি। আচ্ছা আজকের মত উঠি তাহলে—কথাটা বলে উঠে পড়েন চৌধুরী সাহেব।

    সবাই তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানান।

    বাগানে বসে একটা মালা গাঁথছিল নূরী, গুন গুন করে গান গাচ্ছিলো। এমন সময় পেছনে এসে দাঁড়ায় রহমত, নূরীকে জিজ্ঞেস করলো—নূরী সর্দার কোথায়?

    ফুলের মালা গাঁথতে গাঁথতেই বলেন নূরী—কি জানি কোথায় সে? আচ্ছা রহমত, শহর থেকে কখন এলে?

    এই তো আসছি।

    নতুন কোন খবর আছে তাহলে?

    খবর না থাকলে কি আর অমনি ছুটে এসেছি।

    শহরের বিভিন্ন জায়গায় দস্যু বনহুরের অনুচর ছড়িয়ে থাকতো। নতুন কোন খবর হলেই এসে জানাতো তারা রহমতের কাছে। রহমত খবর নিয়ে ছুটতো বনহুরের নিকট।

    নূরী হেসে বলে—কি খবর রহমত, একটু বল না শুনি?

    তুমি আবার শুনবে?

    হ্যাঁ, বল?

    শহরে এক ধনবান লোক আছেন, ভদ্রলোকের নাম চৌধুরী মাহমুদ খান। আজ সন্ধ্যার পর তাঁর কন্যার জন্ম উৎসব হবে।

    তাতে কি হলো? এ আবার নতুন খবর কি?

    শুনোই না, চৌধুরী সাহেব তাঁর কন্যাকে বহুমূল্যের একটা হীরার আংটি উপহার দেবেন।

    তাই বল। নিশ্চয় খুব সুন্দর হবে সে আংটিটা?

    আমি কি আর দেখেছি! তবে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হবে। এ আংটিটা যদি তোমার আংগুলে পরো, কি সুন্দর মানাতো!

    সত্যি রহমত, আমি হুরকে বলবো, ঐ আংটি আমার চাই। মালা গাঁথা শেষ করে মালাটা ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে কথাটা বলে নূরী।

    রহমত বলে—যাই, সর্দার কোথায় দেখি।

    চলে যায় রহমত। নূরী মালা হাতে উঠে দাঁড়ায়। মালা হাতে ঝরণার দিকে এগিয়ে চলে সে। হঠাৎ ওর নজরে পড়ে ঝরনার পাশে একটা পাথরখণ্ডে বসে আছেন বনহুর।

    নূরী পা টিপে টিপে বনহুরের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর চট করে মালাটা ওর গলায় পরিয়ে দিয়ে বসে ছিল পাথরখণ্ডটার একপাশে। হেসে বলে—খুব চমকে দিয়েছি, না?

    চমকাবার বান্দা বনহুর নয়। মালাটা হাতে নিয়ে নাড়াচড়া করতে থাকে সে।

    নূরী আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে, একটা খবর আছে।

    বল!

    রহমত এসেছে।

    তারপর?

    শহরে কোন এক চৌধুরী-কন্যার নাকি জন্ম উৎসব।

    হ্যাঁ, সে উৎসবে আমারও দাওয়াত আছে।

    আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে নূরী—তার মানে?

    মানে আমি যাব সে উৎসবে।

    তাহলে তুমিও সে হীরার আংটির কথা জানতে পেরেছ? হুর, ঐ আংটি আমার চাই। বল দেবে আমাকে?

    হ্যাঁ নূরী, সে হীরার আংটিটা তোমার ঐ সুন্দর আংগুলে অপূর্ব মানাবে।

    হুর, সত্যি তুমি কত ভালবাস আমাকে।

    উঠে দাঁড়ায় বনহুর। মালাটা খুলে অন্যমনস্কভাবে নূরীর হাতে দেয়। তারপর চলে যায় সে দরবার কক্ষের দিকে, যেখানে অনুচরবৃন্দ দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতীক্ষায়।

  • চার

    চার

    চৌধুরী বাড়ি।

    আজ মনিরার জন্ম উৎসব। সকাল থেকে বাড়ির সবাই ব্যস্ত। ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র ঘসে-মুছে পরিষ্কার করা হচ্ছে। কয়েকজন পরিচারিকা নিয়ে মরিয়ম বেগম নিজেই এসব করেছেন।

    আজ মনিরার মা নেই, রওশন আরা বেগম থাকলে তাকে এসব দেখতে হতো না, আজ থেকে দু’বছর আগে তিনি কন্যার মায়া ত্যাগ করে জান্নাতবাসিনী হয়েছেন। ননদিনীর কথা স্মরণ হতেই মরিয়ম বেগমের মনটা ব্যথায় টন টন করে উঠলো। দু’চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে পডলো দু’ফোটা অশ্রু।

    মনিরার মনে আজ আনন্দের উৎস। তার সহপাঠিনীরা আসবে। বান্ধবীদের নিয়ে আমোদ-প্রমোদ করবে, হাসিগানে ভরে উঠবে আজকের সন্ধ্যাটা। মনিরা গুন গুন করে গান গাইছিল আর ঘুরে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎ কক্ষে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ায়।

    মরিয়ম বেগম তাকে দেখতে পেয়েই গোপনে চোখের পানি মুছে ফেলেন। তারপর হেসে বলেন—মনিরা, এদিকে শুনো।

    মনিরা এসে দাঁড়ায় তাঁর পাশে—আমাকে ডাকছো, মামীমা?

    হ্যাঁ মা শুনো। বিকেলে কোন শাড়ি পরবে ঠিক করে গুছিয়ে রাখোগে, নইলে তখন তাড়াহুড়া করবে।

    মামীমা, আমি তোমার একটা শাড়ি পরবো।

    সেকি মা, আমার শাড়ি যে সব সেকেলে ধরনের।

    হউক না, সে আমার ভালো। আজ আমার জন্ম উৎসব। তোমার শাড়ি হবে আমার আশীর্বাদ।

    পাগলী মেয়ে কোথাকার, যদি সখ হয়েই থাকে, তবে এই নাও চাবি, আমার ট্রাঙ্ক খুলে যে শাড়িটা তোমার পছন্দ হয় বের করে নাও।

    মনিরা চাবির গোছা হাতে নিয়ে মামীমার কক্ষে চলে যায়। ট্রাঙ্কের ঢাকনা খুলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সে। ঝকঝক করছে নানা রঙবেরঙের শাড়ি। কোনটা জরীর বুটিদার, কোনটা জরী পেড়ে, কোনটা গোটাটাই জরীর তৈরি, বেনারসী, টিস্যু, নানারকমের শাড়িতে ট্রাঙ্ক ভর্তি।

    মনিরা এক-একখানা শাড়ি বের করে অবাক হয়ে দেখতে লাগলো। ট্রাঙ্কের সমস্ত শাড়ি বের করে ফেললো মনিরা। হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে গেল ট্রাঙ্কের তলায়। সুন্দর একখানা ছবি। মনিরা সব ফেলে ফটোখানা তুলে নিল হাতে। বিস্ময়ভরা নয়নে তাকিয়ে রইলো। পাশাপাশি দুটি মুখ। একটা বালক আর একটা বালিকা। শুভ্র জ্যোৎস্নার মত নির্মল দুটি মুখ। মনিরা ফটোখানা হাতে নিয়ে ছুটলো মামীমার কক্ষে। মরিয়ম বেগমের সম্মুখে ফটোখানা মেলে ধরে বলে মনিরা—মামীমা, এ কাদের ছবি?

    মরিয়ম বেগমের দৃষ্টি ছবি খানার ওপর পড়তেই চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো, অতি কষ্টে নিজকে সংযত রেখে বলেন তিনি—ও ছবি আবার বের করলি কেন মা?

    আগে বল এ ছবি কাদের?

    ও ছবি তোর আর মনিরের।

    মনির। সে আবার কে, মামীমা?

    ওরে, সে যে আমাদের সাত রাজার ধন, হৃদয়ের মণি ছিল, আমাদের ছেলে মনির।

    হঠাৎ মনে পড়ে মনিরার একটা কথা, অনেকদিন আগে মা একদিন গল্পের ছলে বলেছিল—মনিরা, তোর মামুজান আর মামীমা তোকে যে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলোরে। বড় আশা ছিল, তোকে একেবারে নিজের করে নেবে, কিন্তু সে আশা পূর্ণ হলো না।

    আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেছিল মনিরা—সে কি মা, আমি কি তাদের নিজেরই নই?

    মা বলেছিল—তা নয়, তা নয়। থাক, আর শুনে কাজ নেই, তুমি পড়গে যাও।

    মনিরাও কম জেদী মেয়ে নয়! আব্দার ধরে বসলো—তোমাকে বলতেই হবে মা, আমি না শুনে ছাড়ছিনে।

    অগত্যা বলেছিল রওশন আরা বেগম—তোর মামুজান আর মামীমার একটা ছেলে ছিল—মনির! তারই জন্য ওরা তোকে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল, আমি কথা দিয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের সকলেরই দুর্ভাগ্য সে রত্ন রইলো না।

    মনিরা অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো—মনির। মামীমা, মনির ভাই খুব সুন্দর ছিল বুঝি?

    মরিয়ম বেগম বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন—হ্যাঁ, অপূর্ব সুন্দর ছিল আমার মনির, যেমন তুই। তাইতো তোর মায়ের কাছ থেকে তোকে চেয়ে নিয়েছিলাম।

    মামীমা, তার কি হয়েছিল?

    অসুখে সে মারা যায়নি, আমার মণি নৌকাডুবি হয়ে কোথায় ভেসে গেছে।

    —তার লাশ তোমরা পেয়েছিলে?

    না, অনেক খোঁজাখুজি করেও তার কোন চিহ্ন আমরা পাইনি।

    —গলা ধরে আসে মরিয়ম বেগমের।

    মনিরা কিছুক্ষণ স্তব্ধ নয়নে ছবিখানার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে—মামীমা, এই ছবি আমার ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখবো।

    তোর যদি ভালো লাগে রাখ মা, কিন্তু ও ছবি যেন আমার চোখে না পড়ে।

    মনিরা ছবিখানাকে বুকে আঁকড়ে ধরে মামীমার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।

    নিজের কক্ষে প্রবেশ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলো মনিরের ছোট্ট ফুটফুটে মুখখানা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল, সুন্দর নীল বুদ্ধিদীপ্ত দু’টি চোখ, উন্নত নাসিকা। ছোট বালক হলেও তার সমস্ত মুখে ছড়িয়ে আছে অপূর্ব এক প্রতিভা। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে মনিরা। নিজের শয্যার পাশে টাঙ্গিয়ে রাখলো ছবিখানা।

    আলোয় আলোময় হয়ে উঠেছে চৌধুরীবাড়ি। গাড়ি বারান্দায় অগণিত গাড়ি এসে ভীড় জমেছে। মনিরা মামার পাশে দাঁড়িয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। বান্ধবীরা আসছে—কেউ বা ফুলের মালা, কেউ বা ফুলের তোড়া নিয়ে মালাগুলো পরিয়ে দিচ্ছে মনিরার গলায়।

    অতিথিরা প্রায় সবাই এসে পড়েছেন। পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন, মি. শঙ্কর রাও, গোপালবাবু, রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয় এবং তাঁর নায়েব বাবু পর্যন্ত উৎসবে উপস্থিত হয়েছেন। এই উৎসবে শ্রেষ্ঠ অতিথি হবেন খান বাহাদুর হামিদুল হক এবং তাঁর পুত্র মুরাদ। কিন্তু এতক্ষণেও তাঁরা এসে পৌঁছলেন না। ভিতরে ভিতরে কিছুটা চিন্তিত হয়েছিলেন চৌধুরী সাহেব।

    খান বাহাদুর হামিদুল হক একজন ধনবান ব্যক্তি, তেমনি সম্মানিত ব্যক্তিও বটে। তাঁর একমাত্র পুত্র মুরাদ বহুদিন লণ্ডনে শিক্ষালাভ করার পর সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছে। চৌধুরী সাহেবের ইচ্ছা মুরাদের সঙ্গে মনিরার বিয়ে দেবেন। হামিদুল হক সাহেবেরও এ ইচ্ছা। মনিরার অপূর্ব সৌন্দর্য এবং মহৎ ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করেছিল। খান বাহাদুর সাহেবের বিপুল ঐশ্বর্য। ভবিষ্যতে নিঃসন্তান চৌধুরী সাহেবের সমস্ত ধনসম্পদ মনিরারই হবে। এই কারণেই খান বাহাদুর সাহেব পুত্র লণ্ডন থেকে ফিরে না আসতেই চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে কথাবার্তা অনেকটা পাকা করে রেখেছিলেন।

    চৌধুরী সাহেব এবং তাঁর আত্মীয়স্বজন যদিও মুরাদকে স্বচক্ষে দেখেননি, তবু কথা দিয়েছিলেন। এহেন অতিথিদের আগমনে বিলম্ব দেখে অত্যন্ত চিন্তিত হয়েছিলেন চৌধুরী সাহেব। তিনি মনিরাকে বলেন—মা, তুমি এখন ওদিকে গিয়ে দেখাশুনা করো। আমি আরও কিছুক্ষণ এখানে অপেক্ষা করি।

    মাথা দুলিয়ে বলে মনিরা—আচ্ছা আমি যাচ্ছি।

    মনিরা চলে যায়।

    চৌধুরী সাহেব গাড়ি বারান্দায় পায়চারী করতে থাকেন।

    মনিরা হলঘরে প্রবেশ করে। সম্মানিত অতিথিগণ, যে যার আসনে বসে বসে গল্প করছেন। মনিরার কয়েকজন বান্ধবী অর্গানের পাশে বসে গানবাজনা করছে। অনেকেই হাসি গল্পে মেতে উঠেছে। মাঝখানের টেবিলের ওপর স্তূপাকার প্রেজেন্টের জিনিসপত্র। কক্ষে নীল বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে। হাসিগল্পে আর অর্গানের শব্দে স্বপ্নময় হয়ে উঠেছে। একটু পরেই টেবিলে খাবার দেয়া হবে।

    শহরের এক প্রান্তে খানবাহাদুর হামিদুল হক সাহেবের বাড়ি। লণ্ডন ফেরত পুত্র মুরাদ সাজগোজ করে বেরুতেই রাত প্রায় আটটা বাজিয়ে দিল। নিজেই ড্রাইভ করে চললো মুরাদ, পেছনের আসনে হামিদুল হক সাহেব বসে রইলেন।

    নির্জন পথ বেয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে।

    ঠিক সে মুহূর্তে পথের ওপাশের ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো দুটো অশ্ব, একটাতে বনহুর স্বয়ং, অন্যটাতে বনহুরের প্রধান অনুচর রহমান। দু’জনের শরীরেই অদ্ভুত কালো ড্রেস, মুখে কালো গালপাট্টা বাধা। মোটরের সম্মুখে এসে পথ আগলে দাঁড়ালো তারা।

    মুরাদ সামনে বাধা পেয়ে গাড়ি রুখতে বাধ্য হলো।

    বনহুর রিভলবার উদ্যত করে বলেন—নেমে এসো।

    ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে খানবাহাদুর সাহেবের মুখমণ্ডল। মুরাদের অবস্থাও তাই। হঠাৎ এই বিপদের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না তারা। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে আসতে বাধ্য হলেন খান বাহাদুর সাহেব এবং মুরাদ।

    বনহুর রিভলবার ঠিক রেখে রহমানকে ইঙ্গিত করলো।

    রহমান দ্রুত মুরাদের শরীর থেকে কোটপ্যান্ট-টাই খুলে নিল।

    রাগে, ক্ষোভে অধর দংশন করতে লাগলো মুরাদ। সেও কম নয়, হাতে একটা অস্ত্র থাকলে দেখিয়ে দিত মজাটা—কিন্তু কি করবে, নীরব থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। খান বাহাদুর সাহেব ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—তোমরা কে?

    দস্যু বনহুর!

    এ্যাঁ বল কি! কি চাও বাবা তোমরা? আমাদের নিকট তো কোন অর্থ নেই।

    অর্থ চাই না। শুধু আপনারা গাড়িটা কিছুক্ষণের জন্য নেব। বনহুর তাদের বেঁধে ফেলার ইঙ্গিত করলো।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই রহমান মুরাদ এবং খান বাহাদুর সাহেবকে মজবুত করে বেঁধে ফেললো, তারপর একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে বসিয়ে দিলো।

    বনহুর ক্ষিপ্রহস্তে মুরাদের পোশাক পরে নিল, এক জোড়া গোঁফ লাগিয়ে নিল নাকের নিচে। কালো একটা চশমা চোখে পরলো, মাথার ক্যাপটা টেনে লুকিয়ে নিল সামনের দিকে বেশি করে। বনহুরের চেহারা একেবারে পাল্টে গেল। বনহুর এবার রহমানকে লক্ষ্য করে বলে—আমি যতক্ষণ না ফিরে আসি, ততক্ষণ তুমি এদের পাহারায় থাকবে।

    ড্রাইভ আসনে উঠে বসে গাড়িতে স্টার্ট দেয় বনহুর।

    বনহুরের অজানা কিছু নেই, সে অশ্বচালনা থেকে সব কিছুই চালনা করতে জানতো। বনহুরের একটা বুইক গাড়ি ছিল, সে গাড়ি বনহুর নিজেই চালাতো। শহরে বনহুরের একটা বাড়ি ছিল। সে বাড়িতেই গাড়িখানা থাকতো। মাঝে মাঝে বনহুর দরকার হলে সে বাড়িতে থাকতো।

    বনহুর গাড়ি নিয়ে ছুটে চললো।

    বনহুরের গাড়ি পৌঁছতেই চৌধুরী সাহেব চিনতে পারলেন, এ গাড়ি খান বাহাদুর সাহেবের। শশব্যস্তে এগিয়ে এলেন তিনি গাড়ির পাশে— কিন্তু একি, খানবাহাদুর সাহেব কই? অপরিচিত এক যুবক বসে আছে ড্রাইভ আসনে। চৌধুরী সাহেব বুঝতে পারলেন এই যুবকই খান বাহাদুর সাহেবের লণ্ডন ফেরত পুত্র মুরাদ। চৌধুরী সাহেব সহাস্যে বলেন—নেমে এসো বাবা।

    মুরাদ বেশি বনহুর মাথার ক্যাপটা আরও কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ছিল।

    মুরাদবেশী বনহুরের চালচলন দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলেন চৌধুরী সাহেব, তবু হেসে জিজ্ঞেস করলেন—তোমার আব্বা এলেন না কেন?

    বনহুর বলে ওঠে—হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসতে পারলেন না।

    ব্যথিত কণ্ঠে বলেন চৌধুরী সাহেব—বড় আফসোসের কথা। তিনিই যে আজ আমার এই উৎসবে শ্রেষ্ঠ অতিথি।

    দুঃখিতভাবে বলে বনহুর—আব্বার অসুস্থতার জন্যই এত বিলম্ব হলো।

    এসো বাবা।

    চৌধুরী সাহেব মুরাদবেশী বনহুরকে নিয়ে হলঘরে প্রবেশ করলেন এবং দুঃখের সাথে বলেন—একটা দুঃসংবাদ, আমার বিশিষ্ট বন্ধু খান বাহাদুর সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি আসতে পারলেন না। তাঁর পুত্র মুরাদ এসেছে।

    কক্ষের সকলেই মুরাদবেশী বনহুরের মুখে তাকালেন। মনিরাও তাকালো, বান্ধবীরা তাকে নিয়ে আলাপ-ঠাট্টা শুরু করলো, কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো মনিরা।

    চৌধুরী সাহেব সকলের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন—উনি পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন।

    বনহুর হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডশেক করলো।

    আর ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. শঙ্কর রাও, দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

    বনহুর তাঁর সাথে হ্যাণ্ডশেক করে বলেন—আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য লাভ করে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি, মি. রাও।

    আর ইনি রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়।

    রায়বাহাদুরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে বনহুর—উনি আমার পরিচিত।

    বিস্ময়ভরা কণ্ঠে রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ বলে উঠেন—এ্যাঁ। এই কণ্ঠ যেন তাঁর কাছে পরিচিত বলে মনে হলো, কিন্তু স্মরণ করতে পারলেন না, এ কণ্ঠ কোথায় তিনি শুনেছিলেন।

    বনহুর রায় বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়কে ভাববার সময় না দিয়ে বলে ওঠে—মানে আপনার সঙ্গে আমি বিশেষভাবে পরিচিত—আব্বার মুখে প্রায়ই আপনার কথা শুনেছি।

    রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ আশ্বস্ত হন।

    চৌধুরী সাহেব সম্মানিত ব্যক্তিদের সঙ্গে মুরাদবেশী বনহুরের পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর মনিরার সঙ্গে—এটা আমার ভাগনী মনিরা।

    মনিরা! নামটা শুনতেই চমকে উঠলো বনহুর। এ নামটা যেন তার বহু পরিচিত। ভাল করে তাকালো সে মনিরার দিকে। মনিরার অপূর্ব সৌন্দর্য বনহুরকে মুগ্ধ করে ফেললো। মোহগ্রস্তের মত তাকিয়ে রইলো সে।

    চৌধুরী সাহেবের কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে এলো বনহুরের—বসো বাবা, বসো।

    বনহুর আসন গ্রহণ করলো, কিন্তু মনের কোণে একটা ধাক্কা খেতে লাগলো—মনিরা কে এ মনিরা—সে মনিরা…যার ছবি এখনও তার গলায় লকেটে রয়েছে। না, না, তা হতে পারে না, কত মেয়ের নামই তো মনিরা হতে পারে।

    মনিরাকে বান্ধবীরা ধরে বসলো গান শুনাবার জন্য। অগত্যা মনিরা অর্গানের পাশে গিয়ে বসলো।

    গান শেষে করতালিতে ভরে উঠলো উৎসব কক্ষ। চৌধুরী সাহেব হীরার আংটি পরিয়ে দিল মনিরার হাতে।

    সকলের অজ্ঞাতে বনহুরের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই টেবিলে খাবার দেয়া হলো।

    খাওয়া-পর্ব শেষ হবার পর বিদায়ের পালা। মুরাদবেশী বনহুর উঠে দাঁড়ালো। চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করার পর হাত বাড়ালো পুলিশ ইন্সপেক্টার হারুনের দিকে, তারপর মি. শঙ্কর রাওয়ের সাথে হ্যাণ্ডশেক করে নিজের গাড়িতে চেপে বসলো।

    তারপর সকলেই এক এক করে বিদায় গ্রহণ করলেন। চৌধুরী সাহেব সকলকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে হলঘরে ফিরে এলেন। হঠাৎ নজর গিয়ে ছিল সম্মুখের টেবিলে। একটা নীল রঙের খাম পড়ে রয়েছে। চৌধুরী সাহেব খামখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে ছিড়ে ফেলেন। একখানা নীল রঙের কাগজের টুকরো বেরিয়ে এলো। তিনি আলোর সামনে কাগজখানা মেলে ধরতেই চমকে উঠলেন, সেটাতে লেখা রয়েছে মাত্র ক’টি শব্দ।

    “আপনাদের উৎসবে আমি এসেছিলাম।”

    —দস্যু বনহুর

    মুহূর্তে চৌধুরী সাহেবের মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে উঠলো। মনিরা এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর পাশে। ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো—ওটা কি মামুজান?

    কাগজখানা মনিরার হাতে দিয়ে বলেন চৌধুরী সাহেব—পড়ে দেখ।

    মনিরা কাগজখানা হাতে নিয়ে দৃষ্টি ফেলতেই অস্ফুট শব্দকরে উঠলো—দস্যু বনহুর।

    হ্যাঁ, সে এসেছিল!

    দস্যু বনহুর তাহলে সত্যিই এসেছিল, মামুজান?

    না, এলে এ চিঠি এলো কোথা থেকে…

    চৌধুরী সাহেবের কথা শেষ হতে না হতে গাড়ি-বারান্দা থেকে মোটরের শব্দ ভেসে এলো। ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটলেন চৌধুরী সাহেব। না জানি এত রাতে আবার কে এলো? গাড়ি-বারান্দায় পৌঁছতেই আশ্চর্য হলেন। এ যে খান বাহাদুর সাহেবের গাড়ি। তাড়াতাড়ি পাশে গিয়ে দেখলেন, গাড়ির মধ্যে বসে রয়েছেন খান বাহাদুর হামিদুল হক এবং ড্রাইভার আসনে একটা যুবক।

    চৌধুরী সাহেব আনন্দভরা কণ্ঠে বলেন—হক সাহেব আপনি এসেছেন? আসুন, আসুন।

    খানবাহাদুর ও তাঁর পুত্র মুরাদ গাড়ি থেকে নেমে এলেন।

    চৌধুরী সাহেব ব্যস্তকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—হঠাৎ আপনার কি অসুখ হয়েছিল?

    খানবাহাদুর সাহেব বলেন—চলুন সব বলছি।

    চৌধুরী সাহেব ওদের সঙ্গে করে হলঘরে প্রবেশ করলেন। খানবাহাদুর সাহেব ধপাস করে একটা সোফায় বসে পড়েন। মুরাদও বসে পড়ে আর একটা সোফায়।

    চৌধুরী সাহেব বলেন—আপনি হঠাৎ নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কি হয়েছিল?

    কে বলেন আমি অসুস্থ হয়েছিলাম?

    আপনার পুত্র মুরাদের মুখে জানতে পারলাম…

    বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন হক সাহেব—আমার পুত্র মুরাদ?

    জ্বি হ্যাঁ, কিছু পূর্বে সে চলে গেছে।

    আপনি এসব কি বলছেন চৌধুরী সাহেব? আমার পুত্র মুরাদ এই তো আমার পাশে বসা, ও তো এর আগে এ বাড়িতে কোনদিন আসেনি।

    একসঙ্গে চৌধুরী সাহেব আর মনিরা চমকে উঠে তাকালো পাশের সোফায় উপবিষ্ট যুবকের মুখের দিকে চেয়ে।

    চৌধুরী সাহেব ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলেন—কিছুক্ষণ পূর্বে আপনার গাড়ি নিয়ে যে যুবক এসেছিল, সে তবে আপনার পুত্র মুরাদ নয়?

    না, সে আমার পুত্র নয়, সে ডাকু…

    অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠে চৌধুরী সাহেব—ডাকু। সে যুবকই তাহলে দস্যু বনহুর।

    হ্যাঁ, সে যুবকই দুস্য বনহুর—তারপর হক সাহেব সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন।

    সব শুনে চৌধুরী সাহেবের কণ্ঠতালু শুকিয়ে এলো। এখন তাহলে উপায়, নিশ্চয়ই দস্যু হানা দেবার পূর্বে অনুসন্ধান নিয়ে গেল। চিন্তিতকণ্ঠে বলেন—এক্ষুণি পুলিশ অফিসে ফোন করে দিই, সমস্ত কথা তাঁদের জানানো উচিত।

    চৌধুরী সাহেব আর বিলম্ব না করে তখনই পুলিশ অফিসে ফোন করলেন।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই মি. হারুন কয়েকজন পুলিশসহ পুনরায় চৌধুরীবাড়িতে উপস্থিত হলেন। এসে সমস্ত ঘটনা শুনে থ’ মেরে গেলেন। এত বড় কথা। যে দস্যুর সন্ধানে পুলিশমহলের কারও চোখে ঘুম নেই, অহরহ যার খোজে তাঁরা হন্তদন্ত হয়ে শহরময় ছুটাছুটি করে মরছেন, সে দস্যু বনহুর তাঁদের পাশে বসে একসঙ্গে খাবার খেয়ে গেল, এমন কি হাতে হাত মিলিয়ে হ্যাণ্ডশেক পর্যন্ত করে গেল। ছিঃ ছিঃ, এর চেয়ে লজ্জার কথা কি হতে পারে। প্রখ্যাত ডিটেকটিভ শঙ্কর রাওয়ের চোখে পর্যন্ত ধূলি দিয়ে ছেড়েছে সে। এখন আর কি আছে, কয়েকজন পুলিশকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা রেখে ফিরে গেলেন।

    নিশীথ রাত।

    গোটা বিশ্ব সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে।

    বনহুরের অশ্ব চৌধুরীবাড়ির পেছনে এসে থামলো। তার শরীরে কালো ড্রেস, মাথায় পাগড়ী, মুখে কালো রুমাল বাঁধা।

    আজ কদিন থেকে চৌধুরীবাড়ির কারও চোখে ঘুম নেই। চৌধুরী সাহেব স্বয়ং গুলিভরা রিভলবার হাতে হলঘরে পায়চারী করে করে রাত কাটান। মরিয়ম বেগমের চোখেও ঘুম নেই। গোটা রাত তাঁর অনিদ্রায় কাটে। শুধু বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেন। হীরার আংটির জন্য তার কোন চিন্তা নেই, চিন্তা যত মনিরাকে নিয়ে দস্যু বনহুর হঠাৎ কিছু না অমঙ্গল ঘটিয়ে বসে।

    মনিরা নিজের কক্ষে শুয়ে আতঙ্কে শিউরে ওঠে। ঘুমাতে গিয়ে চমকে ওঠে সে। না জানি কোন মুহূর্তে তার হীরার আংটি লুটে নেবে, হয়ত তাকে জীবনে মেরে ফেলতেও পারে। দস্যুর অসাধ্য কিছু নেই। ভয়ভীতি নিয়ে প্রহর গুণে মনিরা, তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

    মনিরা হীরার আংটি আংগুলে রাখার সাহস পায়নি। আলমারীতে রেখে তালাবন্ধ করে দিয়েছে। দস্যু হানা দিলে হীরার আংটি নিয়ে যাবে, তবু তার শরীরে যেন আঘাত না পায়।

    আজ ক’দিন হলো মনিরা ঘুমায়নি, তাই গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছে আজ মনিরা।

    হলঘর থেকে চৌধুরী সাহেবের জুতোর শব্দ ভেসে আসছে। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে মরিয়ম বেগমের চুড়ির টুনটান শব্দ। সদর গেটে সশস্ত্র পুলিশ দণ্ডায়মান।

    জানালার শার্শী খুলে কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর। ধীরে ধীরে অতি লঘু পদক্ষেপে মনিরার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। প্যান্টের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে মনিরার নাকের সামনে ধরলো তারপর মনিরার বালিশের তুলা থেকে চাবির গোছা বের করে নিয়ে এগিয়ে চলে আলমারীর দিকে। অল্পক্ষণেই আলমারী খুলে বের করে আনে সে বহু মূল্যবান হীরার আংটি।

    কক্ষে একটা নীলাভ ডিমলাইট জ্বলছিল, সে আলোতে বনহুরের হাতে হীরার আংটিটা ঝকঝক করে উঠে। আংটিটা প্যান্টের পকেটে রেখে এগিয়ে যায় সে মনিরার বিছানার পাশে। ছিন্নলতার ন্যায় মনিরার সুকোমল দেহখানা বিছানায় লুটিয়ে আছে। এলোমেলো চুলগুলো ছড়িয়ে আছে ললাটের চারপাশে। অপূর্ব দেখাচ্ছিল মনিরাকে। বনহুর নির্নিমেষ নয়নে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর চলে যাবার জন্য যেমনি সে ফিরে দাঁড়াতে যায়, অমনি নজর গিয়ে পড়ে তার দেয়ালের ওপর। বিস্ময়ে চমকে ওঠে বনহুর। একী! এ তারই লকেটের ছবি। পাশাপাশি দুটি মুখ, সে আর মনিরা। আশ্চর্য! এ ছবি এখানে এলো কী করে? বনহুর নিজের গলার মালাছড়া জামার নিচে হতে টেনে বের করলো, তারপর লকেটের ঢাকনা খুলে ফেললো। একবার তাকালো সে দেয়ালের ছবিখানার দিকে তারপর পকেটে। এ যে একই ছবি! না, কোন ভুল নেই। তবে কি এই তার সে মনিরা, যে মনিরা শিশুকালে তার হৃদয় জয় করে নিয়েছিল? বনহুর ঝুঁকে ছিল মনিরার মুখের ওপর। এইতো সে তিলটা এখনও রয়েছে তার চিবুকের একপাশে। লকেটের ছবিখানার দিকে লক্ষ্য করে আশ্বস্ত হলো সে, এই তার সে মনিরা। আনন্দে বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফিরে পেয়েছে সে, তার মনিরাকে তাহলে ফিরে পেয়েছে। বনহুর বসে ছিল মনিরার পাশে, সযত্নে মনিরার ললাট থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলো। কতদিন, কত যুগ পরে সে যেন ফিরে পেল তার মনিরাকে। বনহুরের ঠোঁট দু’খানা মনিরার ললাট স্পর্শ করলো।

    এবার বনহুর মনিরার সুকোমল হাতখানা তুলে নিল হাতে, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনলো হীরার আংটিটা, অতি যত্নে পরিয়ে দিল সে মনিরার আঙ্গুলে।

    একটুকরা কাগজ বের করে তাতে লিখল—

     “আমি এসেছিলাম”

    —দস্যু বনহুর।

    কাগজখানা মনিরার বিছানার পাশে রেখে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সে।

    বনহুরের অশ্ব গিয়ে থামতেই ছুটে এলো নূরী। বনহুরকে হাত ধরে নামিয়ে নিল সে। তারপর হেসে বলেন—এনেছো আমার হীরার আংটি?

    চলতে চলতে বলে বনহুর—আনতে পারলাম না, একজন কেড়ে নিল।

    মিথ্যা কথা। দস্যু বনহুরের কাছ হতে কেউ যে কিছু কেড়ে নিতে পারবে—এ আমি বিশ্বাস করতে পারিনে।

    কেন? আমার চেয়ে কেউ কি বীরপুরুষ নেই?

    না, আমার কাছে সব পুরুষের চেয়ে তুমিই শক্তিমান।

    নূরীর কথায় হাসলো বনহুর। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে—তোমার এ বিশ্বাস অটুট রইলো কই! হীরার আংটি হাতে পেয়েও তোমার নিকট পৌঁছাতে পারলাম না।

    নূরী বনহুরের দক্ষিণ হাত চেপে ধরলো— সত্যি তুমি হীরার আংটি হাতে পেয়েও—

    হ্যাঁ নূরী, আমি পরাজিত হয়েছি।

    না, এ আমি বিশ্বাস করি না হুর, এ আমি বিশ্বাস করি না—

    নূরী, সামান্য একটা হীরার আংটি তোমাকে এতখানি মোহগ্রস্ত করে ফেলেছে?

    না হুর, শত শত হীরার আংটি আমার কাছে তুচ্ছ। আমি কিছুতেই ভাবতে পারিনে দস্যু বনহুরকে কেউ পরাজিত করতে পারে। তুমি সত্যি করে বল, কারও কাছে তুমি হেরে যাওনি?

    নূরী, তোমার বিশ্বাস যেন অটুট থাকে। ইনশাআল্লাহ বনহুর কারও কাছে শক্তির দিক দিয়ে পরাজিত হবে না।

    নূরী আনন্দে অস্ফুটধ্বনি করে ওঠে—হুর!

    নিজের কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর। নূরী তার শরীর থেকে দস্যুর ড্রেস খুলে নেয়, তারপর উভয়ে বসে পড়ে পাশাপাশি। নূরী বনহুরের চুলে আংগুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, তুমি সত্যি বীরপুরুষ। তোমার শক্তির কাছে সমস্ত লোক পরাজিত, তোমার বুদ্ধির কাছে সবাই হেয়! হাজার হাজার লোকের চোখে ধুলো দিয়ে তুমি তোমার সাধনা পূর্ণ করে চলেছে। শত শত পুলিশবাহিনী তোমাকে পাকড়াও করার জন্য অহরহ ক্ষিপ্তের ন্যায় ছুটাছুটি করছে। কেউ তোমাকে আজও পাকড়াও করতে সক্ষম হলো না। তোমার এই অভূতপূর্ব বীরত্বকে আমি শ্রদ্ধা করি। খোদা তোমাকে চিরদিন এমনি করে জয়ী করুন।

    নূরী, তুমিই শুধু আমার হিতাকাক্ষী। আর কেউ আমার মঙ্গল কামনা করে না। সবাই চায় দস্যু বনহুরের পতন!

    ছিঃ! ও কথা মুখে এনো না হুর; আমার প্রাণে বড় ব্যথা লাগে, তোমার অমঙ্গল আমার কাছে মৃত্যুর চেয়েও কষ্টদায়ক।

    বনহুর অবাক নয়নে তাকালো নূরীর অশ্রুসিক্ত চোখ দুটির দিকে। নূরী তাকে এত ভালবাসে কিন্তু ধীরে ধীরে নূরীর মুখ খানা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ভেসে ওঠে একটা সুন্দর ফুলের মত কোমল ঘুমন্ত মুখ। বনহুর দৃষ্টি নত করে কি যেন ভাবতে লাগলো।

    নূরী বলেন—হুর, আজ তোমাকে যেন কেমন ভাবাপন্ন লাগছে। কি হয়েছে তোমার?

    বললাম তো কিছু না। তুমি যাও নূরী, আমি এখন বিশ্রাম করবো।

    কেন, আমি থাকলে তোমার কি খুব অসুবিধা হচ্ছে? আমি যাই। অভিমান ভরে উঠে দাঁড়ায় নূরী।

    অন্যদিন হলে বনহুর ওর হাত চেপে ধরে পুনরায় বসিয়ে দিত কিংবা নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে বলত—চলো আমিও যাই তোমার সঙ্গে, কিন্তু আজ বনহুর নীরব থেকে যায়।

    নূরীর চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে, দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় সে।

    বনহুর বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেয়, তারপর ধীরে ধীরে বুজে আসে ওর চোখের পাতা।

    আড়ালে দাঁড়িয়ে নূরী তাকিয়ে থাকে বনহুরের মুখে। বনহুরকে নিয়ে সে রচনা করে চলেছে এক স্বপ্নসৌধ। নূরীর মন চলে যায় দূরে, অনেক দূরে—সেখানে শুধু সে আর বনহুর। কিন্তু বনহুরকে সে যতই আঁকড়ে ধরতে চায়, ততই যেন সে সরে পড়ে দূরে। কিছুতেই নূরী বনহুরের নাগাল পায় না। বিগত দিনের স্মৃতি হাতড়ে চলে নূরী। কিন্তু সেখানেও ফাঁকা লাগে, বনহুরের নাগাল সে কোনদিন পায়নি। কোথায় যেন ব্যবধান আছে দু’জনের মধ্যে।

    আর ভাবতে পারে না নূরী, সমস্ত ভাবনা যেন তার খেই হারিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে চলে যায় সে নিজের ঘরে।

    বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে নূরী কত কথা, সে ছোট্ট হতে এত বড় পর্যন্ত। সব সময় সে বনহুরকে দেখে আসছে। এক সঙ্গে খেলা করেছে, এক সঙ্গে খেয়েছে, ঝর্ণায় সাঁতার কেটেছে, কিন্তু কৈ, বনহুরকে সে তো কোনদিন নিজের করে পায়নি। ব্যথায় গুমড়ে কেঁদে ওঠে নূরীর মন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সে। বিশেষ করে আজকের কথাটা তার হৃদয়ে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে।

    কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নূরী, হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় তার, দেখতে পায় তার কক্ষের জানালার শিক বাঁকিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছে একটা হিংস্র বাঘ। অন্ধকারে বাঘের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। মাত্র আর একটা শিক বাঁকাতে পারলেই বাঘটা তার কক্ষে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।

    নূরী ভয়ার্ত কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো।

    পাশের কক্ষে ঘুম ভেঙ্গে গেল বনহুরের। নূরীর কক্ষ লক্ষ্য করে ছুটে চললো সে। কিন্তু পূর্বেই বাঘটা জানালার শিক ভেঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো।

    বনহুর কক্ষে প্রবেশ করতেই বাঘটা লাফিয়ে পড়লো তার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে বনহুর পড়ে গেল মাটিতে। নূরী আর্তনাদ করে দু’হাতে চোখ টাকলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজকে সামলে নিয়ে নিজের কোমর থেকে ছোরা খুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল বনহুরের দিকে। বনহুর ছোরাখানা লুফে নিয়ে বসিয়ে দিল বাঘটার বুকে। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি চললো বাঘ আর বনহুরের মধ্যে।

    ততক্ষণে কক্ষে আরও বহু দস্যু এসে জড়ো হয়েছে। বাঘটা তখন ঢলে পড়লো মেঝেতে। বনহুর গায়ের ধূলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো, কিন্তু তার শরীরে কয়েকটা স্থান ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরছে দরদর করে।

    নূরী এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলো না, ছুটে এসে দু’হাতে নিজের ওড়নার কাপড় ছিঁড়ে বেঁধে দিতে লাগলো ওর ক্ষত স্থানগুলো। অন্যান্য দস্যু বনহুরের এই বীরত্বে আশ্চর্য হয়ে যায়। তারা ভাবতেও পারেনি তাদের সর্দার এত বড় একটা বাঘকে একাই সাবাড় করতে পারবে। সবাই বনহুরের জয়ধ্বনি করে ওঠে।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    ভোরে ঘুম ভাঙতেই চোখ মেলে তাকালো মনিরা। মুক্ত জানালা দিয়ে ভোরের মিষ্টি হাওয়া তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালো। হাই তুলে উঠে বসলো সে। হঠাৎ তার নজর গেল হাতের আঙ্গুলে। একি! হীরার আংটি তার আঙ্গুলে এলো কি করে? সে যে আলমারীতে উঠিয়ে রেখেছিল আংটিটা! তাড়াতাড়ি বালিশের তলায় হাত দিয়ে চাবি গোছা নিতে যায়, কিন্তু কোথায় চাবির গোছা! আলমারীর কপাটে চাবির গোছা ঝুলছে!

    মনিরার বেশ স্মরণ আছে, শোবার পূর্বেও সে বালিশের তলায় চাবির গোছা হাত দিয়ে অনুভব করে নিয়ে তবেই শুয়েছে। তবে কি ঘরে কেউ এসেছিল? দরজার দিকে তাকালো সে। দরজা যেমন খিল দিয়ে আটকানো ছিল, ঠিক তেমনি আছে। ঘরে তাহলে কেউ আসেনি। মনিরা ধড়মড় করে শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো, অমনি তার নজর গিয়ে পড়ে বিছানার পাশে— একটা কাগজের টুকরা পড়ে আছে। কাগজখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে এলো—দস্যু বনহুর এসেছিল!

    ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে পুনরায় তাকালো সে নিজের আঙ্গুলে। দস্যু বনহুর তাহলে হীরার আংটি গ্রহণ না করে তার আঙ্গুলে পরিয়ে দিয়ে গেছে। এর উদ্দেশ্য কি? অপমান, ঘৃণায় রি রি করে উঠলো মনিরার শরীর। কেন সে হীরার আংটি নিয়ে গেল না, কেন সে তাকে স্পর্শ করলো? এতই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ, কি করে সে এক কথা মামুজান আর মামীমার কাছে বলবে। একটা দস্যু তার আঙ্গুলে আংটি পরিয়ে দিয়ে যাবে—!

    মনিরা দরজা খুলে মামীমার কক্ষে প্রবেশ করলো।

    মরিয়ম বেগম কন্যা-সমতুল্যা ভাগ্নীকে হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—কি হয়েছে মনিরা?

    মনিরা ব্যস্তসমস্ত কণ্ঠে বলেন—এই দেখ মামীমা, আমার হীরার আংটি আলমারীতে রেখেছিলাম, কিন্তু রাতে আমার হাতের আঙ্গুলে এসে পড়েছে।

    কি আশ্চর্য কথা, এসব কি বলছিস তুই?

    সত্যি মামীমা আলমারীতে হীরার আংটি বন্ধ করে রেখে ঘুমিয়েছিলাম, কিন্তু ভোরে দেখি হীরার আংটি আঙ্গুলে, আর চাবির গোছাও বালিশের তলায় নেই, আলমারীর গায়ে ঝুলছে।

    সর্বনাশ, এ যে অদ্ভুত কথা!

    এই দেখ—বনহুরের লেখা কাগজখানা মরিয়ম বেগমের হাতে দেয় মনিরা—এটা পড়ে দেখ।

    কাগজখানা হাতে নিয়ে দৃষ্টি বুলাতেই অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলেন মরিয়ম বেগম—একি, দস্যু বনহুর এসেছিল।

    ততক্ষণে মরিয়ম বেগমের আর্তচিৎকার শুনে ছুটে আসেন চৌধুরী সাহেব—কি হলো, কি হলো?

    ওগো, দস্যু হানা দিয়েছিল।

    দস্যু!

    হ্যাঁ, দস্যু বনহুর মনিরার কক্ষে হানা দিয়েছিল।

    হীরার আংটি নিয়ে গেছে?

    না গো, না।

    তাহলে সে হীরার আংটি নিতে পারেনি?

    নিয়েও নেয়নি।

    তার মানে?

    এবার বলে মনিরা—মামুজান, রাতে শোবার পূর্বে আংটি খুলে আলমারীতে বন্ধ করে চাবির গোছাটা বালিশের তলায় রেখেছিলাম। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আংটিটা আমার হাতের আঙ্গুলে এসে গেছে, চাবির গোছা যেখানে রেখেছিলাম সেখানে নেই, আলমারীর গায়ে ঝুলছে। বিছানায় পড়ে আছে এই কাগজের টুকরাটা, পড়ে দেখ মামুজান।

    কাগজের টুকরাখানায় নজর বুলিয়ে গম্ভীর হয়ে পড়েন চৌধুরী সাহেব। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কি যেন ভাবলেন। তারপর বলেন—এত সতর্কতার মধ্যেও সে আসতে পারলো! হলঘরে আমি, বাড়ির ভিতরে বন্দুকধারী পাহারাদার, সদর গেটে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী। এর মধ্যেও দস্যু বনহুর হানা দিতে পারলো? হীরার আংটি নেয়নি সে, কিন্তু এমন কিছু নিয়ে গেছে, যা হীরার আংটির চেয়েও মূল্যবান। দেখ দেখি, আমার ঘরের সিন্দুকটা।

    সকলে ছুটলো চৌধুরী সাহেবের শোবার ঘরে। সে ঘরের জিনিসপত্র যেটা যেখানে সে রকমই আছে, সিন্দুকের পাশেও কেউ যায়নি। আশ্বস্ত হলেন চৌধুরী সাহেব।

    মরিয়ম বেগম বলেন—দস্যু বনহুর হানা দিয়ে কিছু না নিয়েই চলে গেল, সত্যি বড় আশ্চর্যের কথা।

    হ্যাঁ, অদ্ভুত ব্যাপার, যাক পুলিশ অফিসে ফোন করছি—বলেন চৌধুরী সাহেব।

    মনিরা বলে ওঠে—কি দরকার মামুজান, সে যখন কোন অন্যায় করেনি, তখন অযথা এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে আর লাভ কি?

    মরিয়ম বেগম বলে ওঠেন—না মনিরা, তা হয় না। বাড়িতে আরও কড়া পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। শয়তানটা সুযোগ বুঝে আবার সর্বনাশ করে বসবে। হায়! একী হলো, দস্যু বনহুরের নজর শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপর এসে পড়ল। ওগো, তুমি পুলিশকে সব জানিয়ে আরও পাহারার ব্যবস্থা করো। আমি যে আর ভাবতে পারছি না। মরিয়ম বেগম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।

    স্বামীকে খেতে দিয়ে বলেন মরিয়ম বেগম—ওগো, সেদিন মনিরার জন্ম-উৎসবে খানবাহাদুর সাহেব আর তাঁর ছেলে মুরাদ ঠিকভাবে যোগ দিতে পারেননি, হঠাৎ এ দস্যুটা কি কাণ্ডই না করেছিল, আর একদিন ওদের দাওয়াত করে এসো না?

    খেতে খেতে বলেন চৌধুরী সাহেব—ঠিক বলেছ। সে কথা আমার মনেই ছিল না। আজই আমি ফোন করে দেব, কাল বিকেলে তাঁরা যেন আসেন।

    হ্যাঁ, তাই কর। কিন্তু কেবল ফোন করলে হবে না, তুমি নিজে গিয়ে দাওয়াত করে এসো। যা হোক দু’দিন পর মনিরাকে যখন মুরাদের হাতে সঁপে দিতে হবে, তখন আগে থেকে ওদের মধ্যে একটা আলাপ-পরিচয় হওয়া ভাল।

    তাহলে আমিই যাব?

    আড়ালে দাঁড়িয়ে মনিরা মামুজান আর মামীমার কথা শুনে। কি জানি কেন যেন ভালো লাগে না মনিরার। সেদিন সে মুরাদকে ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে, কিন্তু কৈ তার মনের কোণে ওর ছবি তো রেখাপাত করেনি? কোন আকর্ষণ অনুভব করেনি মনিরা হৃদয়ে। ধীরে ধীরে মনিরা চলে যায় নিজের কক্ষে। বিছানায় গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে, তাকায় সে ছবিখানার দিকে। নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে মনিরা। কি সুন্দর দুটি চোখ, অপূর্ব অদ্ভুত! মনিরার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে, সত্যই কি মনির নদীর স্রোতে ভেসে গেছে, মারা গেছে সে? না না, সে হয়তো বেঁচে আছে, মস্ত বড় যুবক হয়েছে সে, আরও সুন্দর হয়েছে হয়তো কিন্তু কি করে তা হতে পারে। গভীর পানিতে ক্ষুদ্র একটা বালক কি করে বাঁচতে পারে? মনিরার মন যেন ডেকে বলে সে বেঁচে আছে, নইলে তার লাশ পাওয়া যেত। গভীর চিন্তার অতলে তলিয়ে যায় মনিরা।

    খানবাহাদুর সাহেব আর মুরাদকে দাওয়াত করে এসেছেন চৌধুরী সাহেব। আজ বিকেলে আসবেন তাঁরা। মরিয়ম বেগম স্বহস্তে পাকশাক করছেন। চৌধুরী সাহেবের ব্যস্ততার সীমা নেই।

    মরিয়ম বেগমের পাক শেষ হতে বেলা গড়িয়ে এলো। তিনি ছুটলেন মনিরার কক্ষে। তার চুল বাঁধা, কাপড় পরা শেষ হলো কিনা দেখতে, কিন্তু মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে অবাক হলেন তিনি। মনিরা বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে বালিশের উপরে! একখানা অপরিপাটি কাপড় পরনে। মরিয়ম বেগম রাগতকণ্ঠে বলেন—মনিরা, একি, এখনও তুমি শুয়ে আছ? ওঁদের যে আসার সময় হলো?

    বই থেকে মুখ না তুলেই বলে মনিরা—কাদের আসার সময় হলো মামীমা?

    সে কি, খানবাহাদুর সাহেব আর তাঁর ছেলে মুরাদ আসবে যে!

    তাতে আমার কি?

    আশ্চর্য করলি মনি, তাতে তোর কি, তা জানিসনে?

    না তো? বই রেখে উঠে বসে মনিরা।

    মুরাদের মত এত উচ্চশিক্ষিত ছেলেকে কেন আমরা এত সমাদর করছি, এ কথা খুলে বলতে হবে তোকে?

    বুঝেছি, আমি তোমাদের গলগ্রহ হয়েছি।

    ছিঃ ছিঃ! ওসব কী বলছিস মনি?

    হ্যাঁ মামীমা, আমি তোমাদের চোখের বালি হয়ে পড়েছি। নইলে তোমরা আমাকে তাড়ানোর জন্য এত উঠে পড়ে লেগেছো কেন?

    মরিয়ম বেগম মনিরার পাশে এসে বসে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন—আমরা তোমাকে তাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছি, এসব কী বলছো মনিরা? লক্ষ্মী মেয়ে, তুমি ছাড়া আর কে আছে এই বুড়ো-বুড়ীর?

    তবে যে সব সময় বিয়ে আর বিয়ে করে ব্যস্ত হচ্ছ?

    পাগলী মেয়ে! এখন বড় হয়েছ, বিয়ে করতে হবে না?

    না, আমি বিয়ে করবো না।

    তা হয় না মনি, মেয়েছেলে কোনদিন বাপ-মার ঘর আগলে থাকতে পারে না। কথাটা একটু কঠিন কণ্ঠেই বলেন মরিয়ম বেগম।

    মনিরাও অভিমানভরা গলায় বলে—মামীমা, তোমাদের ঘর আগলে থাকতে চাইনে। আমি বিয়েও করতে চাইনে।

    মনিরা তুমি কচি খুকি নও। বয়সও তোমার কম হয়নি। সব বুঝতে শিখেছ, মুরাদের মত একটা সর্বগুণে গুণবান ছেলেকে হেলায় হারাতে পারি না। তুমি কাপড়-চোপড় পরে নিচে নেমে এসো।

    এমন সময় চৌধুরী সাহেব কক্ষে প্রবেশ করেন—একী মা মনি, এখনও তোমার হয়নি। লক্ষী মা আমার, চট করে জামাকাপড় পরে নাও।

    মরিয়ম বেগম বেরিয়ে গেল। চৌধুরী সাহেব কন্যা-সমতুল্য ভাগনীকে আদর করে আরও বলেন—তারপর নেমে গেল নিচে।

    মামুজান আর মামীমা বেরিয়ে যেতেই পুনরায় বইখানা মেলে ধরে মনিরা চোখের সামনে। কিন্তু মন আর বসে না, কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করে। বই রেখে উঠে পড়ে, কিছুক্ষণ মুক্ত জানালায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে নীল আকাশের দিকে। শুভ্র বলাকার মত ডানা মেলে সাদা সাদা মেঘগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে, সে দিকে তাকিয়ে কত কথা ভাবে সে।

    হঠাৎ নিচে গাড়ি-বারান্দা থেকে ভেসে আসে মোটরগাড়ির শব্দ! মনিরা বুঝতে পারে, খান বাহাদুর এবং তার পুত্র মুরাদ পৌঁছে গেছেন। নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও মনিরা ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করে। ড্রেসিংরুম থেকে যখন মনিরা বাইরে বেরিয়ে এলো তখন তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। নিচে নেমে আসতেই শুনতে পেল চৌধুরী সাহেব বলছেন—ঠিক কথাই বলছেন খান বাহাদুর সাহেব, শুভ কাজ যতো শীঘ্র হয় ততোই ভালো। মনিরাকে যখন আপনার এত পছন্দ— তখন কথা শেষ হয় না চৌধুরী সাহেবের, মনিরাকে দেখতে পেয়েই সহাস্যে বলেন—এই যে মা মনি এসে গেছে। এত বিলম্ব করলে কেন মা?

    খান বাহাদুর সাহেবও চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে যোগ দিয়ে বলেন—কখন থেকে আমরা তোমার প্রতীক্ষা করছি মা বসে বসে।

    মুরাদ সেদিন এভাবে মনিরাকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেনি, আজ মনিরাকে দেখে মুগ্ধ হলো সে। উঠে দাঁড়িয়ে সাহেবী কায়দায় মনিরাকে সম্ভাষণ জানালো।

    মনিরা কোন উত্তর না দিয়ে একটা সোফায় বসে ছিল।

    এ কথা সে কথার মধ্য দিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ হলো।

    মুরাদ এক সময় বলে বসলো—চলুন না মিস মনিরা, একটু বেড়িয়ে আসি।

    চৌধুরী সাহেব বলে ওঠেন—নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই, যাও মা একটু বেড়িয়ে এসো!

    মনিরা মৃদুকণ্ঠে বলেন—মামুজান, আজ আমার শরীর ভালো নেই।

    খান বাহাদুর সাহেব হেসে বলেন—বাইরের হাওয়াতে শরীর সুস্থ বোধ হবে, যাও মা, যাও।

    মরিয়ম বেগমও তাদের সঙ্গে যোগ দিল—মুরাদ যখন বলছে, তখন যাও মনিরা!

    মনিরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালো।

    মুরাদ খুশি হলো। আনন্দসূচক শব্দ করে বলেন—থ্যাঙ্ক ইউ, চলুন মিস মনিরা।

    ড্রাইভ আসনের দরজা খুলে ধরে বলে মুরাদ—উঠুন।

    মনিরা তার কথায় কান না দিয়ে পেছনের আসনে উঠে বসলো।

    মুরাদ মনে মনে একটু ক্ষুন্ন হলেও মুখ ও ভাবে তা প্রকাশ না করে ড্রাইভ আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিল।

    গাড়ি ছুটে চলেছে।

    মুরাদ সিগারেট থেকে একরাশ ধোঁয়া পেছন সিটের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলেন—এখন কি সুস্থ বোধ করছেন?

    মনিরা সে কথার জবাব না দিয়ে বলেন—চলুন কোথায় যাব।

    মৃদু হাসলো মুরাদ—কোথায় যেতে ইচ্ছে বলুন তো? ক্লাবে, না লেকের ধারে।

    ক্লাবে আমি যাই না।

    কেন? বাঙ্গালী মেয়েদের যত গোঁড়ামি। বিশ্রী ব্যাপার! বিলেতে কিন্তু এসব নেই। চলুন লেকের ধারেই যাওয়া যাক।

    লেকের ধারে এসে মুরাদের গাড়ি থেমে ছিল। নেমে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে ধরে বলেন—আসুন।

    মনিরা নেমে চলতে শুরু করলো।

    লেকের ধারে গিয়ে বসে ছিল মনিরা। মুরাদও বসলো তার পাশে, ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো সে।

    মনিরা বিরক্তি বোধ করলো, সরে বসলো সে।

    মুরাদ হেসে বলেন—মিস মনিরা, আমি বুঝতে পারিনে এ দেশের মেয়েরা এত লজ্জাশীলা কেন—আমি বিলেতে সাত বছর কাটিয়ে এলাম কিন্তু কোন মেয়ের মধ্যে এমন জড়তা দেখলাম না, ওরা যে কোন পুরুষের সঙ্গে প্রাণখোলা ব্যবহার করতে পারে।

    মনিরা গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে—মি. মুরাদ, আমি সেজন্য দুঃখিত। মেয়েদের অত স্বাধীনতা আমি পছন্দ করিনে।

    ছিঃ! ছিঃ আপনি দেখছি একদম সেকেলে ধরনের! মেয়েরাই তো আজকাল দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে আনছে। তারা এখন পুরুষের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে শিখেছে, তাইতো দেশ ও জাতির এত…

    মুরাদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে মনিরা—অইতে দেশ ও জাতির এত অবনতি।

    অবনতি! এ আপনি কি বলছেন মিস মনিরা?

    হ্যাঁ মি. মুরাদ, বিশেষ করে আমার চোখে।

    তার মানে?

    মানে মেয়েরা আজকাল বিলেতী চাল ধরেছে! বিলেতী চাল চালতে গিয়ে এত অধঃপতনে নেমে গেছে তারা, যা বলার নয়। এমন সব উৎকৃষ্ট পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে শুরু করেছে তারা, যা মুসলিম সমাজের কাছে অত্যন্ত হেয়। টেডী পোশাক পরতে গিয়ে মেয়েরা প্রায় উলঙ্গ হয়েই চলাফেরা করছে। আর দু’দিন পর তারা যে আরও কত নিচে নেমে যাবে, ভাবতেও মনে ঘৃণা জন্মে।

    মুরাদ আশ্চর্য হয়ে শুনছিল মনিরার কথাবার্তা। হেসে বলেন—মিস মনিরা, আপনি দেখছি বড় নীরস ধরনের মেয়ে। টেডী পোশাক মানুষকে কত মানায়, বিশেষ করে মেয়েদের। মিস মনিরা, আপনি এসব অনুভব করতে পারেন না।

    আমি অনুভব করতে চাইনে। চলুন, এবার ওঠা যাক।

    সেকি! এরি মধ্যে উঠতে চাচ্ছেন? মিস মনিরা, সত্যি আপনার অপরূপ সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। যদিও আপনার মন সেকেলে ধরনের কিন্তু আপনার চেহারা একেলে মেয়েদের চেয়ে অনেক সুন্দর। বিলেতী মেয়েরা কোন ছার!

    দেখুন আমার সৌন্দর্যের প্রশংসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু পুনরায় আমি একথা শুনতে চাইনে।

    মিস মনিরা, অদ্ভুত মেয়ে আপনি। আমি জীবনে বহু মেয়ের সঙ্গে মিশার সুযোগ লাভ করেছি, আপনার মত আশ্চর্য মেয়ে আমি কোনদিন দেখিনি। সে সব মেয়েরা পুরুষের মুখে নিজেদের প্রশংসা শুনার জন্য সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকে।

    প্লীজ মি. মুরাদ শুনতে চাইনে। উঠে দাঁড়ায় মনিরা।

    মুরাদ চট করে ওর হাত চেপে ধরে—আমি উঠতে দিলে তো উঠবেন! বসুন আমার পাশে।

    মনিরা বিরক্ত হয়, তবু বসে পড়ে বলে—সন্ধ্যা হয়ে এলো, মামুজান উদ্বিগ্ন হবেন।

    হেসে ওঠে মুরাদ হাঃ হাঃ করে—কি যে বলেন মিস মনিরা, আপনার মামুজান নিশ্চিন্ত আছেন। আসুন, এই সন্ধ্যেটা আমরা লেকের নিরিবিলিতে কাটিয়ে যাই। মনিরার হাত ধরে আকর্ষণ করে মুরাদ।

    মুরাদের কণ্ঠস্বর আর মনোভাব বুঝতে পেরে মনে মনে শিউরে ওঠে মনিরা। অস্বস্তি বোধ করে সে। এ জনহীন নির্জন লেকের ধারে একটা জঘন্য যুবকের পাশে মনিরা নিজকে বড় অসহায় মনে করে। সে হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে।

    কিন্তু মুরাদের বলিষ্ঠ হাতের মুঠা থেকে কিছুতেই নিজের হাতখানাকে মুক্ত করে নিতে পারে না মনিরা। ঠিক সে মুহূর্তে কোথা হতে একটা তীরফলক এসে বিঁধে গেল মুরাদের পায়ের কাছে মাটিতে।

    মুরাদ মনিরার হাত ছেড়ে দিয়ে তাকালো চারদিকে, কিন্তু কোথাও কোন জনপ্রাণী নজরে পড়ে না।

    মুরাদ তীরখানা হাতে উঠিয়ে নিতেই দেখতে পায়, সেটাতে এক টুকরা কাগজ আটকানো রয়েছে। তাড়াতাড়ি কাগজখানা খুলে নিয়ে মেলে ধরে চোখের সম্মুখে। যদিও সন্ধ্যার অন্ধকার ঝাপসা হয়ে এসেছে, তবু বেশ নজরে পড়ে, কাগজখানায় লেখা আছে—

    ‘সাবধান’

    —দস্যু বনহুর

    মুরাদের হাত থেকে কাগজখানা খসে পড়ল! ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল।

    মনিরা বুঝতে পারে নিশ্চয়ই এই কাগজে এমন কিছু আছে, যা মুরাদের মত শয়তানকেও ভীত করে তুলেছে। মনিরার মুখখানাও বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে। ভয়-জড়িত কণ্ঠে বলে মনিরা—চলুন এবার ফেরা যাক।

    ঢোক গিলে বলে মুরাদ—চলুন।

    গাড়িতে বসে ভাবে মনিরা, দস্যু বনহুর তাহলে তার পিছু নিয়েছে। কী ভয়ঙ্কর কথা! তবু মনে মনে বনহুরকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারে না সে, বনহুর যদি সে মুহূর্তে ঐ তীর ছুঁড়ে সাবধান করে না দিত তাহলে কি যে হতো! মুরাদের কবল থেকে কিছুতেই নিজকে রক্ষা করতে পারতো না। মনে প্রাণে খোদাকে ধন্যবাদ জানায় মনিরা।

    গাড়িতে বসে আর কোন কথা হয় না। কারণ ইতোপূর্বে মুরাদ একবার দস্যু বনহুরের কবলে পড়েছিল। কত ভয়ানক এ দস্যু বনহুর সে জানে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোন রকমে গাড়ি চালিয়ে চলে সে।

  • ছয়

    ছয়

    দস্যু বনহুরের আস্তানা।

    একটা সুউচ্চ আসনে দস্যু বনহুর উপবিষ্ট। সম্মুখে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান তার অনুচরবৃন্দ। মাঝখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা, সেখানে স্তূপাকার করে রাখা হয়েছে সেদিনের লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি।

    বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে—আজ তোমরা যা লুট করে এনেছে তা গরীব-দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করে দাও।

    একজন বলে ওঠে—সর্দার, এসব বহুমূল্য দ্রব্য।

    হুঙ্কার ছাড়ে বনহুর—আমি যা বললাম তাই করবে।

    আচ্ছা সর্দার।

    বনহুর উঠে দাঁড়ালো— নিয়ে যাও সব।

    সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত অনুচর এক একটা ঝোলা কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

    বনহুর সোজা চললো বিশ্রামকক্ষে।

    কক্ষে প্রবেশ করতেই নূরী এসে দাঁড়ালো পাশে, অভিমানভরা কণ্ঠে বলে—হুর, আজকাল সব সময় তুমি শহরেই পড়ে থাক কেন বলতো?

    যখন যেখানে কাজ, সেখানেই থাকি।

    তা বলে তুমি আমাকে একা ছেড়ে—

    তাছাড়া তো কোন উপায় নেই, নূরী।

    হুর, তুমি না থাকলে আমি বড় কষ্ট পাই।

    মিছেমিছি কষ্ট পাও কেন বলতো? নাসরীন আছে, সায়রা আছে, রুখসানা আছে…

    হাজার জন থাক, তবু তোমার অদর্শন অসহনীয় হুর।

    নূরী!

    হুর তুমি আমার, বলো তুমি আমাকে ভালবাস? বলো, চুপ করে রইলে কেন, বলো?

    বাসি।

    সত্যি! আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে খুশির আবেগে উঠে দাঁড়ায় নূরী, তারপর হেসে বলে—হুর, অনেকদিন হলো তুমি আমার নাচ দেখতে চাওনা, আজ দেখবে?

    যদি তোমার ইচ্ছে হয়, নাচো।

    নূরী মনের আনন্দে নাচতে শুরু করলো।

    বনহুর আনমনে তাকিয়ে রইলো নূরীর দিকে।

    এমন সময় দরজার বাইরে থেকে ডাকলো একজন অনুচর—সর্দার।

    কে রহমান? এসো।

    নূরীর নাচ থেমে যায়, কক্ষে প্রবেশ করে রহমান-সর্দার!

    বলো কি খবর?

    সর্দার, পুলিশবাহিনী রহমতকে গ্রেপ্তার করেছে।

    বলো কি!

    হ্যাঁ সর্দার। আমরা যখন বন্ধনী সেতু পার হচ্ছিলাম, তখন পুলিশ ফোর্স আমাদের ঘেরাও করে ফেলে এবং তুমুল লড়াইয়ের পর আমাদের একজনকে নিহত আর রহমতকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশবাহিনীর দু’জন নিহত হয়েছে।

    হুঁ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু তোমরা যে ঐ পথে যাবে, একথা পুলিশবাহিনী জানতে পারলো কি করে?

    সে কথা আমি জানি না সর্দার।

    এবার গর্জে উঠলো বনহুর—তোমরা রহমতকে উদ্ধার না করে ফিরে এলে কেন?

    সর্দার, প্রত্যেকটা পুলিশের হাতে গুলিভরা রাইফেল ছিল। তাছাড়া—

    আমি কোন কথা শুনতে চাইনে, কেন তোমরা তাকে না নিয়ে ফিরে এলে, বলো?

    সর্দার! ভীত কণ্ঠস্বর রহমানের।

    এখন কি তারা রহমতকে নিয়ে শহরে পৌঁছে গেছে?

    সর্দার, এখনও তারা পৌঁছতে পারেনি, রহমত গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ঘোড়া নিয়ে ছুটে এসেছি।

    যাও তাজকে প্রস্তুত করো, আমি এক্ষুণি যাব।

    বেরিয়ে যায় রহমান।

    নূরী ছলছল চোখে বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়—তুমি একাই যাবে?

    মাথায় পাগড়ী জড়াতে জড়াতে বলে বনহুর—হ্যাঁ।

    কিন্তু পুলিশ ফোর্স রয়েছে আর রয়েছে গুলিভরা রাইফেল—

    বনহুর কাপুরুষ নয়।

    হুর!

    এমন সময় পুনরায় রহমান কক্ষে প্রবেশ করে—সর্দার, তাজ প্রস্তুত।

    নূরী রিভলবারখানা বনহুরের হাতে তুলে দিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বলে—খোদা হাফেজ।

    পুলিশ ফোর্স রহমতকে বন্দী করে নিয়ে চলেছে। লাশগুলোও তাদের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়েছে। গাড়ি উল্কা-বেগে ছুটে চলেছে।

    পেছনে ছুটে আসছে তাজের পিঠে দস্যু বনহুর।

    একে অন্ধকার রাত, তার ওপর ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে, সে সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া। বনহুরের অশ্বপদশব্দ পুলিশদের কানে পৌঁছে না।

    অতি নিকটে পৌঁছে যায় বনহুর!

    বনহুর মোটরের আলো লক্ষ্য করে এগুচ্ছে। মাত্র কয়েক মিনিট। বনহুরের অশ্ব খুব কাছে এসে গেছে। হাওয়ার বেগটাও যেন আরও বেড়েছে। সাঁ সাঁ করে শব্দ হচ্ছে। সে শব্দ ভেদ করে বনহুরের অশ্ব এগিয়ে আসছে।

    মোটরের পাশ কেটে চলে যায় তাজ, বনহুর লাফিয়ে পড়ে ড্রাইভ আসনে। সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের গুলিতে ড্রাইভারের রক্তাক্ত দেহটা মুখ থুবড়ে পড়ে যায় গাড়ির মধ্যে। পুলিশরাও অন্ধকারে গুলি ছুঁড়তে থাকে, কিন্তু নিজেদের গুলিতে নিজেরাই মরতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয় পেয়ে সমস্ত পুলিশ এদিকে ওদিকে পালিয়ে গেল।

    বনহুর রহমতের হাত পায়ের বাঁধন কেটে দিয়ে তুলে নিলো তাজের পিঠে। তারপর ছুটে চললো হাওয়ার বেগে।

    পরের দিন এই ঘটনা নিয়ে সারা দেশে হুলস্থুল পড়ে গেল। পুলিশমহলে ভীষণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। মাত্র একজন দস্যু এতগুলো পুলিশকে পরাজিত করে বন্দীকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হলো, অথচ কেউ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলো না।

    মি. হারুন এবং আরও অন্যান্য পুলিশ অফিসার মিলে শংকর রাওয়ের সঙ্গে গোপন আলোচনা চালাতে লাগলেন, কি করে এ দস্যুকে পাকড়াও করা যায়।

    শংকর রাও ছদ্মবেশে বেরিয়ে ছিল, সঙ্গে গোপাল বাবুও চললেন। শংকর রাও গ্রাম্য বৃদ্ধের বেশে, গোপাল বাবুর শরীরে ছেড়া জামা-কাপড়, ঠিক একজন গ্রাম্য যুবক যেন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেফিরে বেড়াতে লাগলেন তাঁরা।

    সারাটা দিন ঘোরাফেরা করে ক্লান্ত হয়ে ছিল। সম্মুখে একটা হোটেল দেখে উঠে ছিল তারা সে হোটেলে।

    হোটেলে প্রবেশ করতেই একজন চিৎকার করে উঠলো—ভাগো হিয়াসে।

    শংকর রাও বৃদ্ধের অনুকরণে গলার স্বরকে বদলে নিয়ে বলেন–দু’কাপ চা খাব বাবু সাব।

    অন্য হোটেল দেখো গে, ভাগো এখান থেকে।

    শংকর রাও মনে মনে ভীষণ রেগে গেল। গোপাল বাবুকে সঙ্গে করে হোটেল থেকে বেরুতে যাবে, ঠিক সে মুহূর্তে কয়েকজন লোক প্রবেশ করলো হোটেলে।

    শঙ্কর রাও থমকে দাঁড়ালেন, লোকগুলোর চেহারা যেন সন্দেহজনক বলে মনে হলো তার কাছে।

    শঙ্কর রাও গোপাল বাবুর গা টিপে দিল। তারপর পকেট হাতড়ে দশ টাকার একখানা নোট বের করে এগিয়ে দিল হোটেলের ম্যানেজারের দিকে—শুধু দুকাপ চা।

    ঐ চেয়ারে বসো। হোটেলের ম্যানেজার এক কোণের দুটি চেয়ার দেখিয়ে বলল।

    শঙ্কর রাও আর গোপাল বাবু বসে ছিল এক পাশের দুটো চেয়ারে।

    যে লোকগুলো কিছু পূর্বে হোটেলে প্রবেশ করেছিল, তারা ওদিকে কয়েকখানা চেয়ারে গোলাকার হয়ে বসে পড়ে।

    বয় তাদের সম্মুখে কয়েকখানা মদের বোতল আর পেয়ালা রেখে যায়। মদ পান করতে করতে কি যেন সব আলাপ চলে তাদের মধ্যে। শঙ্কর রাও চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কান পাতেন। কে একজন বলছে—কাজ হাসিল করতে পারলে বহুৎ টাকা মিলবে। এরপর আরও কি কি যেন কথাবার্তা চললো, বুঝা গেল না।

    শঙ্কর রাও আর গোপাল বাবু সেদিনের মত পথে নেমে ছিল। সে হোটেল সম্বন্ধে সন্দেহ তাদের ঘনীভূত হলো।

    পরদিন দু’জনে ভিখারীর বেশে এসে বসলেন, হোটেলের অদূরে বটতলায় একটা কম্বল বিছিয়ে ভিক্ষে শুরু করলেন শঙ্কর রাও ও গোপাল বাবু— কিন্তু দৃষ্টি তাদের রইলো সে হোটেলের দিকে।

    সন্ধ্যে হয় প্রায়। চারদিক ঝাপসা হয়ে এসেছে। লাইটপোস্টগুলো জ্বলে উঠবে একটু পরে, ঠিক সে সময় একটা কালো রঙের মোটর এসে থামলো হোটেলের সম্মুখে।

    গাড়ি থেকে নেমে এলো এক কাবুলিওয়ালা। হোটেলে প্রবেশ করতেই হোটেলের ম্যানেজার লোকটাকে সাদর সম্ভাষণ জানালো। আরও কয়েকজন বলিষ্ঠ চেহারার লোক তাকে কুর্ণিশ জানিয়ে হোটেলের ভিতরে নিয়ে গেল।

    শঙ্কর রাও আর গোপাল বাবু বটতলা থেকে সব দেখলেন। গোপাল বাবু চোখ টিপে বলেন—শঙ্কর, তুমি যাই বলল, ঐ বেটাই দস্যু বনহুরের লোক।

    সত্যি?

    আমার সে রকমই মনে হচ্ছে।

    আজকাল মুরাদকে আর দাওয়াত করতে হয় না। প্রতিদিন একবার করে চৌধুরীবাড়িতে আসা চাই-ই। যদিও মনিরা তাকে বেশ এড়িয়ে চলে, তবু মুরাদ মনে কিছু করে না, বরং কিসে মনিরা তাকে ভালবাসবে তাই করে। মুরাদ এলে অত্যন্ত খুশি হন চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম। মনিরাকে মিশার সুযোগ দিয়ে সরে থাকেন তাঁরা, কিন্তু মনিরা সে সুযোগ চায় না, মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হয় সে।

    মনিরাকে নিয়ে প্রায়ই বেড়াতে যাবার প্রস্তাব করে মুরাদ। চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম খুশিভরা কণ্ঠে সম্মতি জানান, কিন্তু মনিরাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারেন না তাঁরা।

    একদিন মনিরা নিজের ঘরে শুয়ে আছে।

    মুরাদের গাড়ি এসে থামলো বারান্দায়। চৌধুরী সাহেব তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। মুরাদ জিজ্ঞেস করলো—মনিরা কোথায়?

    ব্যস্তকণ্ঠে বলেন চৌধুরী সাহেব—দেখি উপরে আছে বুঝি? তুমি বসো।

    আজ বসবো না চৌধুরী সাহেব। কাল আমি বলে গেছি মনিরাকে একটা ফাংশনে নিয়ে যাব। দেখুনতো ওর কাপড়-চোপড় পরা হয়েছে কিনা?

    আচ্ছা বাবা—আমি দেখছি। চৌধুরী সাহেব ব্যস্ততার সঙ্গে উপরে উঠে যান। সম্মুখে স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে বলেন—মনি কই? মুরাদ এসেছে, ওকে নাকি কোন ফাংশনে নিয়ে যাবে, কালই বলে গেছে বেচারা, দেখতো তৈরি হয়েছে কিনা!

    তাই নাকি, সে কথা তো তুমি আমাকে বলেনি, কি যে মেয়ে বাবা মরিয়ম বেগম মনিরার কক্ষের দিকে চলে যান, কিন্তু কক্ষে প্রবেশ করে অবাক হন, বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেন—এ ভরসন্ধ্যায় বিছানায় শুয়ে আছিস কেন মনিরা?

    কেন, শুতে দোষ আছে নাকি?

    মুরাদ এসেছে!

    তাতে আমার কি মামীমা?

    সেকি, কাল নাকি সে তোকে বলে গেছে, আজ কোন ফাংশনে যাবে।

    কোন ফাংশনে যাবার সখ আমার নেই।

    মুরাদ যখন বলছে তখন যা না বাছা।

    তা হয় না মামীমা, সে আমার কে যে তার সঙ্গে যাব?

    পাগলী মেয়ে! দুদিন পর সে তোর স্বামী……

    মামীমা…চিৎকার করে মরিয়ম বেগমকে থামিয়ে দেয় মনিরা।

    মরিয়ম বেগম থ’ মেরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন মনিরার মুখের দিকে, তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে যান!

    চৌধুরী সাহেব উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করছিল, স্ত্রীকে বিষণ্ণ মুখে। ফিরে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন-কি হলো? মনিরা….

    ও কথা আমাকে আর বলো না।

    সেকি! মুরাদ যে দাঁড়িয়ে আছে।

    তাকে যেতে বলো, মনিরা যাবে না।

    কি মুস্কিল! হঠাৎ আবার কি হলো তার?

    মাথাটা নাকি বডড় ধরেছে, কয়েকবার বমিও হয়েছে।

    তাই নাকি, তাহলে তো ডাক্তার ডাকতে হয়!

    ডাক্তার ডাকার আগে মুরাদকে বিদায় করে দাও।

    আচ্ছা বলছি। নিচে নেমে যান চৌধুরী সাহেব।

    মুরাদ ঘন ঘন পায়চারী করছিল, চৌধুরী সাহেবকে দেখে এগিয়ে আসে—মনিরা কই?

    বড় দুঃখের কথা বাবা, মনিরার ভয়ানক জ্বর এসেছে। যেমন বমি তেমনি নাকি মাথাধরা…

    হঠাৎ কেমন জ্বর তার?

    খুব বেশি।

    আমি তাকে একটু দেখতে পারি কি?

    হ্যাঁ…না না, তুমি আবার কষ্ট করে…

    এতে আর কষ্টের কি আছে, কই চলুন তো একবার দেখে আসি।

    তোমার ফাংশনের বিলম্ব হয়ে যাবে।

    তা হউক।

    চৌধুরী সাহেব কিছু বলার পূর্বেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে চললো মুরাদ।

    মরিয়ম বেগম আড়ালে থেকে সব শুনছিল। তিনি ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন-কাল ভোরে এসে দেখে যেও বাবা, এখন একটু ঘুমাচ্ছে।

    তা হউক, আমি ওকে জাগাবো না। উপরে উঠে মরিয়ম বেগমকে জিজ্ঞেস করলো মুরাদ-মনিরা কোথায়?

    একটা ঢোক গিলে বলেন মরিয়ম বেগম—ঐ যে ঐ ঘরে।

    কক্ষে প্রবেশ করে এগিয়ে যায় মুরাদ মনিরার বিছানার দিকে—মনিরা, তোমার নাকি অসুখ? মাথায় হাত দিতে যায় মুরাদ। আজকাল মুরাদ মনিরাকে তুমি বলে সম্বোধন করে।

    মনিরা চট করে সরে বসে বলে—খবরদার, গায়ে হাত দেব না।

    তোমার নাকি অসুখ?

    কে বলেন আমার অসুখ?

    দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চৌধুরী সাহেব আর মরিয়ম বেগমের মুখ অন্ধকার হয়ে যায়।

    মুরাদের গলা শোনা যায়—তোমার মামুজান আর মামীমা বলেন।

    মিছে কথা! আমার কোন অসুখ করেনি!

    থ্যাঙ্ক ইউ, ভেরী গুড। তাহলে তৈরি হয়ে নাওনি কেন?

    আমি আপনার সঙ্গে কোথাও যাব না।

    মনিরা!

    আমি না গেলে আপনি কি করতে পারবেন?

    তোমার মামুজান আর মামীমা এর জবাব দেব।

    মামুজান আর মামীমার মতে আমার মত নয়—একথা ভুলে যাব না মি. মুরাদ।

    মনিরা, এত সাহস তোমার?

    হ্যাঁ, আমি…কিছু বলতে যাচ্ছিলো মনিরা। সে মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করেন চৌধুরী সাহেব—মনিরা কি হচ্ছে, এসব পাগলামি..

    মুরাদ রাগতভাবে বলে ওঠে—চৌধুরী সাহেব, আমি বুঝতে পেরেছি আপনাদের চালাকি। এত মিথ্যাবাদী আপনারা!

    মুরাদের অশালীন কথা শুনে ভীষণ রেগে গেল চৌধুরী সাহেব, বলেন—মুরাদ, বিয়ে দেব বলে কথা দিয়েছিলাম, বিয়ে তো আর দেইনি। এখানে তোমার কোন অধিকার নেই। তুমি যেতে পারো।

    বেশ, আমিও দেখে নেব, কথা দিয়ে কি করে কথা পাল্টান। বলেই খট খট করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল মুরাদ।

    তখনকার মত মুরাদ চলে গেলেও বাইরে থেকে বিষধর সাপের মত ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। গুণ্ডাদের আস্তানা হলো তার সম্বল। শয়তানদের সঙ্গে চললো তার গোপন আলোচনা। হাজার হাজার টাকা সে ছড়িয়ে দিতে লাগলো গুণ্ডাদের মধ্যে, যেমন করে হউক মনিরাকে তার চাই।

    সেদিন মনিরা কোন এক ফাংশন থেকে ফিরছিল। নিজেদের গাড়ির বিলম্ব দেখে অন্য একটা ভাড়াটিয়া গাড়ি নিয়ে রওনা দিল সে।

    গাড়ি ছুটে চলেছে, মনিরা জনমুখর রাস্তার দিকে তাকিয়েছিল। ভাবছিল মুরাদের কথা, জীবন থাকতে অমন অভদ্র লোককে সে স্বামী বলে গ্রহণ করতে পারবে না। এজন্য মামুজান আর মামীমা খুশি নন, তবু কি করবে মনিরা? নিজেকে তো আর বলি দিতে পারে না! ঐশ্বর্যের কাঙ্গাল সে নয়! হঠাৎ মনিরার চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়। গাড়িখানা থেমে পড়েছে।

    মনিরা বাইরের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে যায়, এ তো শহরের পথ নয়। কখন যে গাড়িখানা তাকে নিয়ে এক নির্জন গলির মধ্যে এসে পড়েছে, সে খোয়াল নেই মনিরার।

    মনিরা জিজ্ঞেস করলো—ড্রাইভার, এ তুমি কোথায় আনলে?

    ড্রাইভার কেমন ধরনের একটা বিদঘুটে হাসি হেসে বলেন—ঠিক জায়গায় এসে গেছি, এখন নেমে পড়ন দেখি।

    ড্রাইভারের কণ্ঠস্বর এবং মুখের ভাব লক্ষ্য করে শিউরে উঠলো মনিরা। বিবর্ণ মুখে সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু বাইরে নজর পড়তেই আড়ষ্ট হয়ে গেল তার কণ্ঠ। ভয়ঙ্কর চেহারার কয়েকজন বলিষ্ঠ লোক দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে চেয়ে। কেমন যেন দুষ্টমির হাসি.তাদের সকলের মুখে।

    একজন লোক এগিয়ে এলো গাড়ির পাশে। গম্ভীর কণ্ঠে বলেন সেনেমে আসুন চট করে।

    মনিরার দেহে তখন প্রাণ আছে কি না সন্দেহ। কি করবে এখন সে? এদের হাত থেকে পরিত্রাণের তো কোন উপায় নেই। তবু কন্ঠে সাহস সঞ্চার করে নিয়ে বলেন—তোমরা আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন? কি তোমাদের উদ্দেশ্য?

    তোমার বদলে টাকা চাই। নেমে এসো।

    নামবো না, কিছুতেই আমি নামবো না। আমাকে তোমরা বাড়িতে পৌঁছে দাও, যত টাকা চাও দেব।

    হা-হা করে হেসে উঠলো লোকটি—আমরা অত বোকা নই, টাকা আমরা তোমার মামুজানের নিকট হতে চাই না। তোমাকে পেলে টাকার অভাব হবে না।

    মনিরা দাঁতে দাঁত পিষে বলে—শয়তান কোথাকার! শিগগির আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও, নইলে পুলিশে ধরিয়ে দেব। মনিরা নিজকে বাঁচাবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করে। কিন্তু দুর্বল অসহায়া একটা রমণীর কথায় ভয় পাবার বান্দা ঐ লোকেরা নয়।

    লোকটা পুলিশের নাম শুনে আরও জোরে হেসে ওঠে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে—আমি পুলিশের বাবা, পুলিশ আমার কি করবে।

    মনিরা চমকে উঠলো, বিস্ময়ভরা ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো–তুমি কে, দস্যু বনহুর?

    হ্যাঁ, তুমি দেখছি সহজেই আমাকে চিনে ফেলেছ।

    দস্যু বনহুর! বদমাইশ কোথাকার। বহুদিন থেকে তুমি আমার পেছনে লেগেছ। আমি মরবো, তবু তোমার হাতে নিজকে সঁপে দেব না।

    দেখি কেমন করে না দাও। বলিষ্ঠ লোকটা গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো এবং জোরপূর্বক মনিরাকে টেনে নামিয়ে ফেললো।

    মনিরা ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো-বাঁচাও, বাঁচাও, বাঁচাও…..

    ঠিক সে মুহূর্তে আর একখানা ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে এবং সংগে সংগে একটা যুবক ট্যাক্সি থেকে নেমে এসে ঝাঁপিয়ে ছিল বলিষ্ঠ লোকটার ওপর। গুণ্ডার দল হঠাৎ এই বিপদের জন্য প্রস্তুত ছিল না, যে যেদিকে পারলো ছুটে পালালো। বলিষ্ঠ লোকটা আর যুবকে চললো ভীষণ ধস্তাধস্তি। বেশ কিছুক্ষণ লড়াইয়ের পর বলিষ্ঠ লোকটা কাবু হয়ে এলো, সে পরাজিত হয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিল।

    গলিটার মধ্যে অন্ধকার তখন জমাট বেঁধে উঠেছে। মনিরা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছিল, আর যুবকটার মঙ্গল কামনা করছিল। ঠিক এই সময়ে যুবকটা যদি এসে না পড়তো তবে কি হত, ভাবতে পারে না সে।

    ভয়ঙ্কর লোকটা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতেই মনিরা ছুটে গেল যুবকের পাশে। বিনীতকণ্ঠে বলেন–আপনার শরীরে আঘাত লাগেনি তো?

    যুবক সোজা হয়ে দাঁড়াতেই মনিরা বিস্ময়ে শুদ্ধ হয়ে গেল। পাশের লাইটপোস্টের আলোতে সে দেখলো—প্যান্ট কোট টাই পরা একটা যুবক-অদ্ভুত অপূর্ব সুন্দর তার চেহারা।

    যুবক অন্য কেউ নয় দস্যু বনহুর। সে দূর থেকে মনিরার গাড়িখানাকে লক্ষ্য করছিল, কিন্তু পথের মধ্যে হঠাৎ একটা এক্সিডেন্ট হয়, সে কারণে কিছু বিলম্ব হয় তার। তবু ঠিক সময়ে পৌঁছতে পেরেছে বলে মনে খুশি হয়েছে। বনহুর বিষ্ময়ভরা নয়নে তাকিয়ে আছে মনিরার মুখের দিকে।

    মনিরা সম্বিৎ ফিরে পায়। দৃষ্টি নত করে নিয়ে বলে–কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব ভেবে পাচ্ছিনে, আপনি আমার জীবন রক্ষা করেছেন!

    হেসে বলে বনহুর–আপনাকে শয়তানের কবল থেকে রক্ষা করতে পেরে নিজেও কম আনন্দিত হইনি।

    ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে চারদিকে তাকালো মনিরা। তারপর চাপাকণ্ঠে বলেন–জানেন ওরা কে?

    না তো, আমি কি করে জানবো?

    দস্যু বনহুর আমাকে আক্রমণ করেছিল!

    সত্যি!

    হ্যাঁ, আপনি না এলে আমার উদ্ধার ছিল না, জানেন তো দস্যু বনহুর কত ভয়ঙ্কর!

    হেসে বলে বনহুর–হ্যাঁ, দস্যু বনহুরের নাম শুনেছিলাম, আজ তার সঙ্গে লড়াই হলো।

    আপনার বীরত্বে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনি কি করে যে অমন ভয়ঙ্কর দস্যুটাকে পরাজিত করলেন।

    আর এখানে বিলম্ব করা ঠিক নয়, দস্যু বনহুর আবার হানা দিতে পারে। চলুন, আমার গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দি।

    চলুন।

    বনহুর নিজের গাড়ির দরজা খুলে ধরে–উঠুন।

    মনিরার মাথাটা শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে–কত দ্র, মহৎ এই যুবক! গাড়িতে উঠে বসে মনিরা।

    বনহুর ড্রাইভ আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দেয়।

    গাড়িতে বসে মনিরা এই যুবকটির কথা ভাবছে। তার জীবনে এই যুবকটি যেন খোদার একটি দান। বারবার যুবকের মুখখানা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।

  • সাত

    সাত

    বনহুর ড্রাইভ আসন থেকে হাত বাড়িয়ে পেছন সীটের দরজা খুলে ধরলো–চৌধুরীবাড়ি এই শহরের সবাই চেনে। নামুন, বাড়িতে যান।

    আপনি নামবেন না?

    আজ নয়, আর একদিন।

    গাড়ি-বারান্দার উজ্জ্বল আলোতে মনিরা ভালো করে দেখলো বনহুরকে। মন যেন ওকে ছেড়ে দিতে চাইলো না, কিন্তু অপরিচিত এক যুবকের কাছে কি অধিকার আছে তার।

    বনহুর গাড়িতে স্টার্ট দিল, মনিরা তখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে।

    গাড়িখানা দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই মনিরা হলঘরে প্রবেশ করলো।

    চৌধুরী সাহেব একটা পত্রিকা দেখছিল, মনিরার পদশব্দে কাগজখানা রেখে মুখ তুলেন—একি মা, এত রাত হলো যে?

    মনিরা তার পাশের সোফায় বসে পড়ে বলেন–মামুজান, জীবনে যে বেঁচে ফিরে এসেছি, এই ভাগ্য।

    কেন মা, কোন এক্সিডেন্ট–

    না মামুজান, দস্যু বনহুর আমাকে আক্রমণ করেছিল।

    বলিস কি মনি দস্যু বনহুর।

    হ্যাঁ, ভাগ্যিস এক ভদ্র যুবক আমাকে বাঁচিয়ে নিলেন, নইলে আর কোনদিন তোমরা আমাকে ফিরে পেতে না।

    ওগো শুনছো? শুনো, শুনো–চৌধুরী সাহেব স্ত্রীকে ডাকাডাকি শুরু করলেন।

    মরিয়ম বেগম এবং চৌধুরী সাহেব মনিরার মুখে সমস্ত ঘটনা শুনে আড়ষ্ট হয়ে গেল, মুখে যেন তাদের কথা নেই।

    কিছুক্ষণ লাগলো তাদের নিজেদের সামলাতে। কি ভয়ঙ্কর কথা! প্রকৃতিস্থ হয়ে বলেন চৌধুরী সাহেব মনি, যে তোমাকে রক্ষা করলে তাকে ঘরের দরজায় এসে ওভাবে ছেড়ে দেয়া তোমার উচিত হয়নি মা।

    মরিয়ম বেগম স্বামীর কথায় যোগ দিল—শুধু রক্ষা নয়, মনিরার জীবন আমাদের মান-ইজ্জত সব বাঁচিয়েছে সে। মনিরা, তুমি শিক্ষিত মেয়ে, কি করে বিদায় দিলে? মনে একটু বাঁধলো না?

    আমি তাকে নামতে অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু উনি বলেন আজ নয়, অন্য দিন আসবেন।

    পাগলী মেয়ে, তাই বুঝি তুই তাকে ছেড়ে দিলি? জিদ করলে নিশ্চয়ই সে না নেমে পারতো না।

    ভুল হয়েছে মামীমা।

    এবার চৌধুরী সাহেব বলেন–তার পরিচয়টা জেনে নেয়াও কি তোমার উচিত ছিল না? কি তার নাম, কোথায় থাকে–

    মামুজান, আমি যেন কেমন হয়ে গিয়েছিলাম।

    সত্যি, গো, দস্যু বনহুরের কবলে–এ যে কী সাংঘাতিক ব্যাপার, ভাবলেও আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠছে। মনিরা, কোনদিন তুই একা বাইরে যাবিনে।

    হ্যাঁ মামীমা, আর অমন কাজ করবো না।

    সেদিন মনিরা একটা বইয়ের দোকানে প্রবেশ করলো কতকগুলো বইয়ের অর্ডার দিয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় তার পাশে দাঁড়ালো এক যুবক, মনিরা মুখ তুলে তাকাতেই তার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, হেসে বলেন–আপনি?

    বনহুর বলে ওঠে–আপনি দেখি আমাকে মনে রেখেছেন?

    কি যে বলেন, কোনদিনই আপনাকে ভুলবো না। কি বাঁচাই না সেদিন পনি আমাকে বাঁচিয়েছেন! আজ কিন্তু আর আপনাকে ছাড়ছিনে।

    তার মানে?

    মানে অতি স্বচ্ছ। মামুজানের হুকুম, আপনাকে তার নিকটে ধরে নিয়ে যেতে হবে।

    তাই নাকি?

    হ্যাঁ, সেদিন আপনাকে বিদায় দিয়ে কি বকাটাই না খেলাম। যেমন বকলেন মামুজান, তেমনি মামীমা।

    তাহলে তো এক বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে আর এক বিপদে পড়েছিল?

    মিথ্যে নয়। হ্যাঁ একটা কথা, মনে কিছু নেবেন না?

    বলুন?

    আপনার পরিচয়টা?

    ওঃ হ্যাঁ, পরিচয়টা এখনও আপনাকে দেয়া হয়নি। আমার নাম মনিরুজ্জামান চৌধুরী, ঠিকানা ৩৬/৩, বাগবান রোড চলুন না আজ আমার বাড়িতে, এই তো এখান থেকে একটু দূরে।

    না, তা হয় না। আপনিই আজ চলুন, পরে একদিন নিশ্চয়ই আপনার ওখানে যাব।

    কিন্তু আমি তো আজ যেতে পারছিনে মিস মনিরা!

    অবাক হয়ে তাকায় মনিরা বনহুরের মুখে। বিষ্ময়ভরা কণ্ঠে বলে–আপনি আমার নাম জানলেন কি করে?

    হেসে বলে বনহুর কারও নাম জানতে ইচ্ছে থাকলে অমনি জানা যায়। সেদিন আমি জেনে নিয়েছি।

    বেশ লোক কিন্তু আপনি।

    বনহুর আর মনিরা একসঙ্গে হাসতে থাকে।

    বইগুলো প্যাক করে মনিরার সম্মুখে রাখে দোকানদার।

    মনিরা ক্যাশমেমো দেখে টাকা মিটিয়ে দেয়, তারপর বনহুরকে লক্ষ্য করে বলে আজ কথা দিতে হবে, কবে তাহলে আসছেন?

    আমার বাড়ির এত নিকটে এসে যখন চলে যাচ্ছেন তখন আমার যাওয়া–তা যাব একদিন।

    না, তা হবে না।

    তাহলে—

    আচ্ছা চলুন।

    মনিরা বনহুরের গাড়িতে চেপে বসে।

    ড্রাইভ আসনে ওঠে বনহুর। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলে–অজানা অচেনা একজনের সঙ্গে যেতে মনে ভয় হচ্ছে বুঝি?

    কি যে বলেন–আপনার সঙ্গে ভয়, আপনি তো ডাকাতের বাবা!

    তাহলে ভরসা আছে আমার ওপর?

    খুব।

    আরও অনেক হাসিগল্প চলে।

    বিরাট একটা বাড়ির সম্মুখে এসে বনহুরের গাড়ি থেমে ছিল।

    মনিরা বাড়িখানার দিকে তাকিয়ে অবাক হলো–এ যেন রাজ প্রাসাদ।

    বনহুর ড্রাইভ আসন থেকে নেমে গাড়ির দরজা খুলে ধরলো–নেমে পড়ুন।

    মনিরা নেমে দাঁড়ালো।

    বনহুর মনিরাকে নিয়ে এগুতেই দারোয়ান সেলুট ঠুকে সরে দাঁড়ালো।

    মনিরা অবাক হয়ে চারদিকে দেখতে দেখতে এগুতে লাগলো। সেকি প্রকাণ্ড বাড়ি! গেটের পর গেট, ঘরের পর ঘর। প্রত্যেকটা ঘরে বেলওয়ারীর ঝাড় ঝুলছে। মূল্যবান সরঞ্জামে ঘরগুলো সাজানো, কিন্তু মনিরা আশ্চর্য হলো, এত বড় বাড়িটায় শুধুমাত্র ঐ একটা যুবক।

    অনেকগুলো ব্যালকনি পেরিয়ে একটা সুসজ্জিত কক্ষে প্রবেশ করলো মনিরাকে নিয়ে বনহুর। মনিরা তখনও অবাক হয়ে চারদিকে দেখছে। তার মামুজানও মস্ত বড়লোক, কিন্তু এত বড় বাড়ি তো তাদের নয়। রাজ-রাজার বাড়ি যেমন হয়, এ বাড়িটাও ঠিক তেমনি।

    বনহুর হেসে বলেন–বসুন।

    মনিরা বসে পড়ে বলে–এত বড় বাড়ি অথচ লোকজন তো দেখছিনে? আপনার বাবা-মা?

    কেউ নেই।

    আপনার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে?

    ওসব ঝঞ্চাটও নেই আমার।

    এত বড় বাড়িটায় আপনি একা থাকেন?

    চিরদিন যে একা, সে কোথায় পাবে সঙ্গী, বলুন। আপনি বসুন, আমি একটু চা-নাস্তার ব্যবস্থা–

    না না, ওসব কিছু লাগবে না, বরং আপনি বসুন।

    তা হয় না মিস মনিরা, আপনি আমার অতিথি। বনহুর বেরিয়ে যায়।

    মনিরা অবাক হয়ে ভাবে, অদ্ভুত এই যুবক। যার এত আছে, তার আবার সঙ্গীর ভাবনা? রূপ-গুণ-ঐশ্বর্য সর আছে এর কিন্তু কেন সে একা নিঃসঙ্গভাবে জীবন কাটায়? ইচ্ছে করলেই যে কোন মেয়েকে সে গ্রহণ করতে পারে। যে নারী ওকে স্বামীরূপে পাবে সে ধন্য হবে, সার্থক হবে তার জীবন কিন্তু কেন সে এতদিনও বিয়ে করেনি?

    মনিরা আনমনে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। ওপাশে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াতেই আশ্চর্য হয়। কত রকমের ফুলগাছ শোভা পাচ্ছে বাগানে। ফুরফুরে হাওয়া আর অজানা ফুলের সুরভি তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালো। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে মনিরা।

    কখন যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বনহুর, খেয়াল করতে পারেনি মনিরা। বনহুর হেসে বলে কি দেখছেন অমন করে?

    কি সুন্দর অপূর্ব! আচ্ছা জামান সাহেব, আপনি ফুল বুঝি খুব পবাসেন?

    হ্যাঁ চলুন, চা-ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

    কেন আপনি ওসব ঝামেলা করতে গেল! পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে মনিরা আর বনহুর।

    চা-নাস্তার সঙ্গে সঙ্গে বনহুর আর মনিরার গল্প চলে। মনিরা এখন অনেকটা স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। বনহুরের দৃষ্টির মধ্যে নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। বনহুরের হাসির মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে নিজকে। কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে আসে, সেদিকে খেয়াল নেই মনিরার। বনহুর স্মরণ করিয়ে দেয়–মিস মনিরা, আপনার ফেরার সময় হয়েছে, বিলম্ব হলে আপনার মামুজান নিশ্চয় চিন্তিত হবেন।

    উঠে দাঁড়ায় মনিরা সত্যি আমার যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

    বনহুর একটু হাসলো।

    মনিরা আর বনহুর গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো। মনিরা বলেনজামান সাহেব, আপনি আমাকে পৌঁছে দিচ্ছেন তো?

    আমি ড্রাইভার দিচ্ছি, সে আপনাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবে।

    না, তা হবে না! আমি কোন ড্রাইভারকে বিশ্বাস করি না।

    হো হো করে হেসে ওঠে বনহুর খুব ভয় পেয়ে গেছেন দেখছি। কিন্তু আমাকেই বা আপনার এত বিশ্বাস কেন? আমি যদি আপনাকে নিয়ে পালাই?

    পৃথিবীর কাউকে বিশ্বাস না করলেও আপনার ওপর আমার অবিশ্বাস হবে না। সত্যি জামান সাহেব, আপনি কত মহৎ!

    বুঝেছি, আপনি আমাকে আজই আপনার মামুজানের নিকটে হাজির করতে চান।

    তাহলে আপনি বুঝতে পেরেছেন আমার মনোভাব, চলুন।

    বনহুর আর বিলম্ব না করে ড্রাইভ আসনে উঠে বসে।

    চৌধুরীবাড়ি।

    চৌধুরী সাহেব, পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন, মি. শঙ্কর রাও ও গোপাল বাবু মিলে আলোচনা চলছিল। কয়েকদিন পূর্বে মনিরার সে আক্রমণ ব্যাপার নিয়েই আলোচনা চলছিল। দস্যু বনহুর যে হঠাৎ ওভাবে মনিরার ওপর হামলা করে বসবে, এ যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার। চৌধুরী সাহেব কন্যা-সমতুল্যা ভাগনীকে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিল। দস্যু বনহুরের দৃষ্টি যে তার ওপর পড়েছে, এ বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ। কি করে এ দস্যুর কবল থেকে মনিরাকে রক্ষা করা যাবে, এ নিয়ে আজ কদিন হলো পুলিশ অফিসে ঘোরাফেরা করছেন। আজ নিজে যেতে না পারায় ফোনে মি. হারুন সাহেবকে চৌধুরীবাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিল। যখন চৌধুরী সাহেব পুলিশ অফিসে ফোন করেন, তখন মি. হারুনের পাশে রাও এবং গোপাল বাবু উপস্থিত ছিল।

    শঙ্কর রাও মি. হারুনের নিকট ঘটনাটা শুনে থাকতে পারলেন না, তিনিও’গোপাল বাবুকে নিয়ে মি. হারুনের সঙ্গে চৌধুরীরাড়িতে উপস্থিত হলেন।

    সবাই মিলে আলোচনা চলছে, এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করে মনিরা আর বনহুর। মনিরা আনন্দভরা কণ্ঠে বলে ওঠে–মামুজান, ইনিই সেদিন আমাকে দস্যু বনহুরের কবল থেকে রক্ষা করেছিল।

    সকলেই একসঙ্গে বনহুরের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।

    চৌধুরী সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বনহুরকে জড়িয়ে ধরেন বুকে। তারপর আনন্দভরা কণ্ঠে বলেন–আপনাকে কি বলে যে আমি কৃতজ্ঞতা জানাবো ভেবে পাচ্ছিনে। আপনি আমার মান-ইজ্জত রক্ষা করেছেন, আপনার কাছে আমি চিরঋণী।

    পিতা-পুত্রের অপূর্ব মিলন। বনহুরের চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। কেউ না জানলেও সে জানে চৌধুরী সাহেবই তার পিতা। মনে মনে পিতাকে হাজার সালাম জানায় বনহুর।

    চৌধুরী সাহেবও হৃদয়ে একটা আলোড়ন অনুভব করেন, বনহুরকে কিছুতেই বুক থেকে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না তার।

    মামুজান আর জামান সাহেবের মিলনে মনিরার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, খুশির আবেগে বেরিয়ে যায় সে।

    এবার চৌধুরী সাহেব বনহুরকে পাশের সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসে পড়েন।

    বনহুরের অপূর্ব সৌন্দর্য সকলকে মুগ্ধ করে ফেলে। মনিরা বয়ের হাতে চায়ের সরঞ্জাম দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। চৌধুরী সাহেব কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন বনহুরকে, কিন্তু মনিরাই সকলের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিল।

    বনহুর সকলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে আসন গ্রহণ করলো।

    মনিরা হেসে বলেন–মামুজান, উনি কিন্তু মস্ত বড়লোক।

    বনহুর লজ্জিতকণ্ঠে বলেন–মিছেমিছে বাড়িয়ে বলছেন মিস মনিরা।

    না মামুজান, আমি এতটুকু বাড়িয়ে বলিনি।

    হাসিগল্পের মধ্য দিয়ে চা-নাস্তা চলে।

    চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলেন শঙ্কর রাওমি. মনিরুজ্জামান, আমি আপনাকে একটু বিরক্ত করবো। কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবো।

    স্বচ্ছন্দে করুন।

    শঙ্কর রাও একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলেন–আচ্ছা মি. জামান, আপনি মিস মনিরাকে উদ্ধারের জন্য যখননজের গাড়ি থেকে দস্যুদলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন তাদের দলে কত, জন ছিল বলে আপনার মনে হয়?

    বনহুর ভূকুঞ্চিত করে একটু চিন্তা করলো, তারপর বলেন-—পাঁচ ছ’জন হবে।

    ওরা কি সকলেই আপনাকে আক্রমণ করেছিল?

    না, আমাকে দেখামাত্র সবাই সরে পড়ে। শুধু একজন, দলের সর্দার হবে হয়তো, সে আমাকে আক্রমণ করেছিল।

    মি. হারুন বলে ওঠেন–মি. জামান, আপনার কি মনে হয়, সে লোকটাই দস্যু বনহুর?

    বনহুর একটা চিন্তার ভান করে বলে আমি তো আর দস্যু বনহুরকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করিনি, তবে অনুমানে এবং তার ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে মনে হলো বনহুর ছাড়া আর কেউ সে নয়। ইস, কি শক্তিই না তার শরীরে!

    চৌধুরী সাহেব হেসে বলেন আপনার কাছে হার মানাতে সে বাধ্য হলো। পরাজিত হলো আপনার নিকট।

    আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ মি. জামান, দস্যু বনহুরকে পরাজিত করে মিস মনিরাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। কথাটা বলে বনহুরের পিঠ চাপড়ে দেন মি. হারুন। একটু থেমে পুনরায় বলেন–আশা করি দস্যু বনহুরের গ্রেপ্তারে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন।

    নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, প্রয়োজন মত আমাকে পাবেন।

    মি. শঙ্কর রাও বলেন–হ্যাঁ মি. জামান, আপনি যদি দ্য বনহুরকে গ্রেপ্তারে আমাদের সাহায্য করেন, তবে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।

    মনিরা তন্ময় হয়ে তাকিয়ে ছিল বনহুরের মুখের দিকে। বনহুর সকলের অলক্ষ্যে একবার তাকালো মনিরার মুখে। দৃষ্টি বিনিময় হলো। দু’জনের অন্তর যেন দু’জনকে দেখতে পেল। অভূতপূর্ব আকর্ষণ অনুভব করলো মনে তারা।

    বনহুর মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালো–আজ তাহলে চলি।

    চৌধুরী সাহেবও উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যেন হৃদয়ে একটা ব্যথা অনুভব করলেন। শান্ত মিষ্টি গলায় বলেন–আবার কবে আসবেন কথা দিন?

    ঠিক বলতে না পারলেও, আসবো। আর একবার তাকালো বনহুর মনিরার দিকে। মনিরা দৃষ্টির মাধ্যমে ওকে বিদায় সম্ভাষণ জানালো।

    এরপর হতে প্রায়ই আসে বনহুর।

    চৌধুরী সাহেব, মরিয়ম বেগম সবাই বনহুরকে ভালবেসে ফেলেছেন। বনহুর এলে তারা যেন মনে শান্তি অনুভব করেন, মনিরার তো আনন্দ ধরে না। যেদিন বনহুর আসার কথা থাকে, সেদিন মনিরা নিজেকে মনের মত করে সাজায়, সকাল থেকে গুন গুন করে গান গায়।

    চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম বুঝতে পারেন ভাগ্নীর মনোভাব। তারা উভয়ে উভয়ের মুখে তাকিয়ে হাসেন, অজ্ঞাত এক বাসনা উঁকি দিয়ে যায় তাদের মনের কোণে।

    মুরাদ সেদিন রাগ করে চলে যাবার পর থেকে চৌধুরী সাহেব ভিতরে ভিতরে ভয়ানক অস্বস্তি বোধ করছিল, বনহুরের আবির্ভাব আবার তার হৃদয়ে শান্তির প্রলেপ এনে দেয়। চৌধুরী সাহেব ধীরে ধীরে ভুলে যান মুরাদকে।

    একদিন বিকেলে বনহুরের সঙ্গে মনিরা বেড়াতে বেরুলো। সে লেকের ধারে গিয়ে গাড়ি থেকে নামলো তারা। পাশাপাশি এগিয়ে চললো মনিরা আর বনহুর। কি নিয়ে যেন দু’জন বেশ হাসছিল।

    মুরাদ দূর থেকে মনিরা আর বনহুরকে লক্ষ্য করলো। হিংসায় জ্বলে উঠলো তার অন্তরটা, কটমট করে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে।

    বনহুর বলেন–মিস মনিরা, চেয়ে দেখুন ঐ অস্তগামী সূর্যের দিকে।

    হেসে বলেন মনিরা—অপূর্ব!

    ঠিক আপনার রক্তিম. গণ্ডের মত–তাই না?

    যান!

    মিস মনিরা, সত্যি আপনার মত মেয়েকে আমার বড় ভালো লাগে চোখে লজ্জা, মনে ম্রতা, মিষ্টিমধুর কণ্ঠস্বর—অপরূপ!

    মনিরার মন তখন চলে গেছে পেছনের একটি দিনে। মুরাদ আর সে পাশাপাশি বসে আছে এমনি এক সন্ধ্যায়। মুরাদ বলছে, মনিরা তুমি বড্ড লাজুক, একদম সেকেলে ধরনের কি বিশ্রী, কি কুৎসিত ইঙ্গিতপূর্ণ কণ্ঠস্বর মুরাদের।

    কি ভাবছেন মিস মনিরা?

    মিস নয়, শুধু মনিরা বলুন।

    তুমি যদি খুশি হও তাহলে তাই হবে। এবার বলো কি ভাবছো?

    বনহুর মনিরাকে তুমি বলে সম্বোধন করে। মনিরাও বনহুরকে তুমি বলে সম্বোধন করে। কারণ ওরা দুজন দুজনের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছে।

    নাই বা শুনলে সে কথা!

    যদি না বলার মত হয়, তাহলে আমি শুনতে চাইনে মনিরা।

    ঠিক সে মুহূর্তে মুরাদ মনিরার পেছনে এসে দাঁড়ালো, কঠিন কণ্ঠে বলেন–মিস মনিরা, কে এই যুবক?

    মনিরা উঠে দাঁড়ালো, সেও কঠিন কণ্ঠে বলেন–আপনি সে কথা জিজ্ঞাসা করার কে?

    তোমার আব্বা একদিন আমার সঙ্গে তোমাকে বিয়ে দেবেন কথা দিয়েছিল একথা এরই মধ্যে ভুলে গেলে? সেই অধিকারে–

    খবরদার, আর কথা বলবেন না, চলে যান এখান থেকে।

    ওঃ আজ দেখছি বড় সাহস বেড়েছে? চলো, তোমার আব্বার কাছে নিয়ে এর জবাব দেব–মনিরার হাত ধরতে যায় মুরাদ।

    সঙ্গে সঙ্গে বনহুর প্রচণ্ড এক ঘুসি বসিয়ে দেয় মুরাদের নাকে। মুরাদ পড়ে যায়, নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। ধূলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের পিঠে নাকের রক্ত মুছে, তারপর বনহুর আর মনিরার দিকে কটমট করে তাকিয়ে চলে যায়।

    হেসে ওঠে মনিরা, বনহুরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে তার মন।

    বনহুর বসতে যায়। মনিরা বলে ওখানে বসে আর কাজ নেই, চলো এবার ফেরা যাক।

    কেন, ভয় হচ্ছে?

    না, তুমি পাশে থাকলে আমার কোন ভয় নেই। তবু চলো এখানে বসতে মন আর চাইছে না।

    চলো তাহলে।

  • আট

    আট

    সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। মনিরা সাজগোজ করে ড্রইং রুমে বসে বসে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে আর বারবার তাকাচ্ছে দেয়াল ঘড়িটার দিকে।

    আজ রাত সাড়ে আটটায় এক বান্ধবীর বাড়িতে তার দাওয়াত আছে। মনিরা বনহুরকে বলে দিয়েছে। অবশ্য অবশ্য সে যেন গাড়ি নিয়ে আসে, তার গাড়িতেই যাবে মনিরা। নইলে সন্ধ্যার পর বাইরে বেরুবার সাহস নেই তার। চৌধুরী সাহেবও বারণ করে দিয়েছেন।

    মনিরা উদ্বিগ্নভাবে পায়চারী শুরু করে, হাতঘড়ির দিকে তাকায়–আটটা বেজে গেছে।

    এমন সময় গাড়ি-বারান্দায় মোটর থামার শব্দ হয়। পরক্ষণেই কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর, হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে বড় দেরী হয়ে গেছে, না?

    মনিরা টেবিল থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটা হাতে উঠিয়ে নিয়ে বলে–চলো।

    অমনি মরিয়ম বেগম দু’জনের পাশে এসে দাঁড়ান। বনহুরকে লক্ষ্য করে বলেন–দেখ বাবা, তোমার ওপর ভরসা করেই ওকে বাইরে পাঠাচ্ছি। দস্যু বনহুরের ভয়ে আমার তো কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেছে, আবার না সে মনির ওপর হামলা করে বসে।

    মরিয়ম বেগমের ব্যখাকাতর কণ্ঠস্বর বনহুরের হৃদয়ে আঘাত করলো। তার মা, তার গর্ভধারিণী জননী আজ তারই ভয়ে ভীত। আজ তার নিকটে পুত্র পরিচয় দেবার কোন অধিকার নেই। বনহুরের চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। তার অবাধ্য কণ্ঠ দিয়ে হঠাৎ একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো–মা।

    মরিয়ম বেগম বিস্ময়ভরা চোখে তাকালেন বনহুরের মুখে। এই মা ডাক তাঁর প্রাণে এক অপূর্ব শিহরণ জাগালো। মাতৃহৃদয় আকুলি বাকুলি করে উঠলো। তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। জবাব দিল বল বাবা?

    বনহুর ততক্ষণে সামলে নিয়েছে। হেসে বলেন–দস্যু বনহুর আপনার কোন অন্যায় করবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

    যাও বাবা, ওদিকে মনিরার সময় হয়ে এলো।

    চলো মনিরা।

    বনহুর আর মনিরা পাশাপাশি ড্রাইভ আসনে ওঠে বসলো। জনমুখর রাজপথ ধরে গাড়ি ছুটে চলেছে।

    মনিরার শাড়ির আঁচলখানা বারবার বনহুরের গায়ে উড়ে উড়ে পড়ছিল। একটা সুমিষ্ট গন্ধ, বনহুরের প্রাণে দোলা লাগে।

    বনহুর মৃদু হেসে বলে–মনিরা!

    বলো?

    এই নির্জন গাড়ির মধ্যে যদি মি. জামান না হয়ে দস্যু বনহুর থাকতো তোমার পাশে?

    মনিরা দক্ষিণ হাতে বনহুরের মুখ চেপে ধরে ও নাম তুমি মুখে এনো, ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।

    মনিরা!

    বলো?

    দস্যু বনহুর কি মানুষ নয়?

    মনিরা বনহুরের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে–ওসব আলোচনা না-ই বা করলে।

    মনিরা, ধর বনহুর তোমাকে খুব ভালবেসে ফেলেছে, তার প্রতিদানে তাকে তুমি ভালবাসতে পারো না?

    ছিঃ এসব কি বলছো? যে মানুষ নামের কলঙ্ক, তাকে নিয়ে তুমি ঠাট্টা করছো

    মনিরা! অস্কুট ধ্বনি করে ওঠে বনহুর।

    মনিরা চমকে উঠে বলে–কি হলো?

    কিছু না। ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে ফেলে এসে গেছি।

    বনহুর আর মনিরা কক্ষ থেকে চলে যাবার পর মরিয়ম বেগম সোফায় বসতে যাবেন, হঠাৎ সোফার পাশে একখানা নীল রঙের কাগজ পড়ে আছে। দেখতে পান।

    কাগজখানা হাতে উঠিয়ে নিয়েই চমকে ওঠেন। তাতে লেখা রয়েছে–

    আজ রাতে আমি আসবো

    –দস্যু বনহুর

    মরিয়ম বেগমের কম্পিত হাত থেকে কাগজখানা পড়ে যায়। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যান তিনি।

    কিছুক্ষণের মধ্যে চৌধুরী সাহেব এসে পড়েন। স্ত্রীকে বিবর্ণ মুখে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেন–অমন গম্ভীর হয়ে বসে আছ কেন?

    মরিয়ম বেগম আংগুল দিয়ে কাগজখানা দেখিয়ে দেন।

    চৌধুরী সাহেব কাগজখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে দৃষ্টি বুলাতেই থ হয়ে গেছেন, ঢোক গিলে বলেন–তাহলে উপায়?

    মরিয়ম বেগম বলেন–এক্ষুণি পুলিশে খবর দাও।

    ঠিক বলেছ। চৌধুরীসাহেব কালবিলম্ব না করে পুলিশ অফিসে ফোন করলেন। এইমাত্র দস্যু বনহুরের চিঠি পেয়েছি আমরা তো ভীষণ ভয় পাচ্ছি, মনিরাকে নিয়ে আমাদের যত ভাবনা। মি. হারুন, আপনিই এখন আমাদের ভরসা।

    মনিরাকে নিয়ে বনহুর যখন ফিরে এলো, তখন চৌধুরীবাড়ি পুলিশে ভরে গেছে। মি. হারুন উদ্বিগ্নভাবে পায়চারী করছেন আর বলছেন–চৌধুরী সাহেব, এই ঘটনার পরও মনিরাকে সন্ধ্যার পর বাইরে পাঠানো আপনার উচিত হয়নি।

    চৌধুরী সাহেব স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দেন ইন্সপেক্টার সাহেব, মনিরার সঙ্গে জামান আছে, সে সঙ্গে থাকলে ইনশাআল্লাহ-আমাদের আশঙ্কা করার কিছু নেই।

    এসব আলোচনা চলছে, ঠিক সে সময় বনহুর আর মনিরা হাস্যোজ্জ্বল মুখে কক্ষে প্রবেশ করলো।

    চৌধুরী সাহেব কলকণ্ঠে বলে ওঠেন–ঐ যে মনি এসে গেছে? দেখুন ইন্সপেক্টার সাহেব, আমি বললাম না আমাদের জামান থাকতে ওর কোন চিন্তা নেই।

    একথা মিথ্যে নয় চৌধুরী সাহেব। জামান সাহেব সত্যই একজন বীর পুরুষ। কথাটা বলেন মি. হারুন।

    মনিরা ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করে মামুজান, হঠাৎ ইনারা? আমি কিছু বুঝতে পারছিনে?

    চৌধুরী সাহেব ভয়ার্তকণ্ঠে বলেন–ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে গেছে।

    বনহুর আশ্চর্য হবার ভান করে বলে–ভয়ঙ্কর ঘটনা! বলছেন কি? হঠাৎ কি ঘটলো?..

    এই দেখ! চৌধুরী সাহেব নীল রঙের কাগজখানা পকেট থেকে বের করে বনহুরের হাতে দেন।

    বনহুরের মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। কাগজখানা চৌধুরী সাহেবের হাতে দিয়ে বলে ভয় পাবার কিছু নেই।

    –তার মানে? বিস্ময়ভরা গলায় বলে ওঠেন মি. হারুন। দস্যু বনহুরের চিঠি, অথচ আপনি বলছেন ভয় পাবার কিছু নেই।

    ওটা বনহুরের একটা খেয়াল, বিশেষ করে পুলিশ মহলকে সে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে

    আপনি দস্যু বনহুর সম্বন্ধে তেমন কিছু জানেন না, তাই ও কথা বলতে পারলেন। দস্যু বনহুর যে কত ভয়ঙ্কর তা শুধুমাত্র একদিনের লড়াইয়ে অনুভব করতে পারেননি সেদিন কোন বেকায়দায় পড়ে আপনার হাতে–

    সে কাবু হয়েছে, কি বলেন? কথাটা বলে হাসে বনহুর।

    চৌধুরী সাহেব বলে ওঠেন—সে যাই হইক বাবা, আজ আমি তোমাকে কিছুতেই ছেড়ে দেব না, থাকতেই হবে আমাদের এখানে।

    তা কি করে হয় বলুন, বাসায় একটা জরুরী কাজ আছে।

    তা রাতের বেলা এমন আর কি কাজ। থেকেই যান মি. জামান। কথাটা বিনয়ের সঙ্গে বলেন মি. হারুন।

    মনিরার মুখের দিকে তাকায় বনহুর। মনিরার মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, করুণ দৃষ্টির মাধ্যমে বনহুরকে সে থাকার অনুরোধ জানায়।

    অগ্যতা বনহুর থাকবে বলে কথা দেয়।

    চৌধুরী সাহেব কতকটা আশ্বস্ত হন। মি. হারুনের মুখেও হাসি ফুটে ওঠে, যাক তবু একজন শক্তিশালী সাহসী ব্যক্তি আজ তাদের সঙ্গী হলো–যদি দস্যু বনহুর এসেই পড়ে, কৌশলে তাকে বন্দী করার সুযোগ হলেও হয়ে যেতে পারে।

    গভীর রাত।

    সে হোটেল, হোটেলের সম্মুখে একটি গাড়ি এসে থেমে ছিল।

    অমনি একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে ছিল দুটি ছায়ামূর্তি।

    গাড়ি থেকে নামলো সে কাবুলীওয়ালা। অন্ধকারে চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখলো, তারপর দ্রুত হোটেলে প্রবেশ করলো।

    ছায়ামূর্তি দুটি অতি গোপনে কাবুলীওয়ালাকে অনুসরণ করলো, হোটেলের বাইরে অন্ধকারে লুকিয়ে রইলো পুলিশ ফোর্স। ছায়ামূর্তি দুটি অন্য কেউ নয়, একজন মি. শঙ্কর রাও, অন্যজন গোপালবাবু। তারা অতি সাবধানে এগিয়ে চলেন।

    কিছুদূর এগুতেই শুনতে পেলেন তাঁরা একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর। মি. শঙ্কর রাও কান পেতে চেষ্টা করলেন, কোন এক গোপন কক্ষ থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে–একটা লোকের সঙ্গে তোমরা এতগুলো লোক পারলে না, তোমরা কাপুরুষ। যত টাকা লাগে লাগবে, মেয়েটাকে আমার চাই। নইলে মনে রেখ, তোমাদের প্রত্যেককে আমি গুলি করে হত্যা করবো।

    একটা ভারী কর্কশ কণ্ঠস্বর–হুজুর, সবাই পালিয়ে গেলেও আমি পালাইনি, শেষ পর্যন্ত আপ্রাণ চেষ্টা করেছি–

    পুনরায় পূর্বের কণ্ঠ–আমি কোন কৈফিয়ত শুনতে চাইনে। এবার যদি তোমরা বিফল হও, আমি কাউকে ক্ষমা করবো না।

    নির্জন নিস্তব্ধ হোটেলের ভিতরে জেগে উঠলো ভারী বুটের শব্দ। কেউ যেন এগিয়ে আসছে।

    জমকালো রিভলবারটা দক্ষিণ হাতে চেপে ধরে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ালেন মি. শঙ্কর রাও।

    গোপাল বাবু তার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলেন–দস্যু বনহুর এদিকেই আসছে।

    হ্যাঁ, তুমি রিভলবার ঠিক রেখে সাবধানে দাঁড়াও।

    অন্ধকারে লক্ষ্য করলেন শঙ্কর রাও, হোটেল থেকে বেরিয়ে আসছে সে কাবুলীওয়ালা। অমনি এক লাফে মি. শঙ্কর রাও কাবুলীওয়ালার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রিভলবার বাকিয়ে ধরলেন, খবরদার, নড়বে না, নড়লেই মৃত্যু।

    হঠাৎ এ বিপদের জন্য ঘাবড়ে গেল কাবুলীওয়ালা।

    গোপালবাবু ততক্ষণে বাঁশিতে ফুঁ দিয়েছেন।

    মুহূর্তে হোটেলকক্ষ পুলিশ ফোর্সে ভরে উঠলো।

    ধীরে ধীরে হাত তুলে দাঁড়ালো কাবুলীওয়ালা।

    একজন পুলিশ অফিসার তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল।

    মি. শঙ্কর রাও অন্যান্য পুলিশকে ইঙ্গিত করলেন হোটেলের ভিতরে প্রবেশ করে দস্যুর অনুচরগণকে বন্দী করতে কিন্তু হোটেলে কোথাও কাউকে পাওয়া গেল না, সবাই যেন হাওয়ায় মিশে গেছে।

    মি. শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু পুলিশ ফোর্স নিয়ে বীরদর্পে ফিরে চলেন। তাদের মনে আনন্দ ধরে না। দস্যু বনহুরকে বন্দী করতে পেরেছেন, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের কথা।

    কাবুলীওয়ালাকে হাজতে বন্দী করে কড়া পাহারায় রেখে মি. শঙ্কর রাও যখন বাসায় ফিরলেন, তখন আশ্চর্য হয়ে গেল, পুলিশ ইন্সপেক্টার মি. হারুন তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

    মি. শঙ্কর রাওকে দেখামাত্র মি. হারুনু বলে ওঠেন—আপনি এসে গেছেন ভালই হলো। এক্ষুণি আপনাকে চৌধুরী বাড়ি যেতে হবে।

    কেন?

    দস্যু বনহুর চিঠি দিয়েছে, সে নাকি আজ রাতে হানা দেবে।

    বলেন কি, দস্যু বনহুর।

    হ্যাঁ।

    কিন্তু তাকে আমি এইমাত্র হাজতে বন্দী করে রেখে এলাম।

    সে কি রকম।

    আপনাকে পুলিশ অফিসে না পেয়ে মি. আহমদের নিকট পারমিশন, নিয়ে পুলিশফোর্স সঙ্গে করে সে হোটেলে হানা দিয়েছিলাম। দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। গর্বিতভাবে বলেন মি. শঙ্কর রাও।

    মি. হারুন বিস্ময়ভরাকণ্ঠে বলেন–দস্যু বনহুরকে এত সহজেই গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন, বড় আশ্চর্যের কথা! চলুন, প্রথমে তাকে

    একবার স্বচক্ষে দেখে আসি। উঠে পড়েন ইন্সপেক্টার মি. হারুন।

    চলুন।

    দেখুন আপনি এইমাত্র ক্লান্ত হয়ে ফিরলেন, পুনরায় কষ্ট করে–না না, এতে আমার কিছু মাত্র কষ্ট হবে না।

    গাড়িতে উঠে বসেন মি. হারুন এবং শঙ্কর রাও।

    পুলিশ অফিসে পৌঁছতেই শশব্যস্তে এগিয়ে এলেন সাবইন্সপেক্টার মি. কায়সার-স্যার, চৌধুরী বাড়ি থেকে আপনার নিকট ফোন এসেছে। এইমাত্র নাকি দস্যু বনহুরের আর একখানা চিঠি পাওয়া গেছে।

    একসঙ্গে বলে উঠেন মি. হারুন এবং শঙ্কর রাও–দস্যু বনহুরের চিঠি!

    ইয়েস স্যার!

    মি. শঙ্কর রাও বলে ওঠেন–চলুন দেখবেন, আমি দস্যু বনহুরকে বন্দী করতে সক্ষম হয়েছি কিনা।

    চলুন।

    আরও কয়েকজন অফিসারসহ মি. হারুন এবং মি. শঙ্কর রাও হাজত কক্ষে প্রবেশ করলেন। মি. হারুন ও মি. শঙ্কর রাও এগিয়ে যান কাবুলীওয়ালাবেশী বন্দীর দিকে।

    মি. হারুন সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে কিছুক্ষণ তাকালেন.বন্দীর মুখে, তারপর হেসে বলেন–দস্যু বনহুর এ নয়, মি. রাও।

    তার মানে?

    মানে এই দেখুন। একটানে কাবুলীওয়ালার দাড়ি খুলে ফেলেন মি. হারুন

    সকলে বিস্ময়ে চমকে ওঠেন। মি. শঙ্কর রাও অবাক হয়ে বলেন–একি, এ যে খানবাহাদুর সাহেবের ছেলে মি. মুরাদ!

    মি. হারুন বলে ওঠেন–শিগগির চলুন, বনহুর হয়তো এতক্ষণে চৌধুরীবাড়িতে হানা দিয়েছে।

    আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে মি. হারুন, মি. শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু ছুটলেন চৌধুরীবাড়ির উদ্দেশ্যে। যদিও সেখানে পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে, তবুও তারা নিশ্চিন্ত নন।

    কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেল তারা চৌধুরীবাড়িতে। কিন্তু পৌঁছতেই চৌধুরী সাহেব হস্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন–ইন্সপেক্টার সাহেব, এত কড়া পাহারার মধ্যেও দস্যু বনহুর এসেছিল।

    বলেন কি!

    হ্যাঁ, আপনি এদিকে পাহারার ব্যবস্থা করে চলে যাবার পর আমি বড় ক্লান্তি অনুভব করলাম। তাই একটু বিশ্রামের জন্য নিজের কক্ষে গেলাম, দরজা বন্ধ করে যেমনি বিছানায় শুতে যাব, অমনি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো এক ছায়ামূর্তি! কি ভয়ংকর তার চেহারা, রিভলবার উদ্যত করে বলেন সে ভয় নেই, আমি আপনাকে হত্যা করবো না, কিন্তু আমার একটা কথা আপনাকে রাখতে হবে–একটু থামলেন চৌধুরী সাহেব।

    কক্ষের সকলে স্তব্ধ নিশ্বাসে শুনছেন তার কথাগুলো। মি. হারুন একবার কক্ষের চারিদিকে তাকিয়ে নিলেন।

    চৌধুরী সাহেবের অনতিদূরেই দাঁড়িয়ে আছে মনিরা, তার ওপাশেই আর একটা সোফায় বসে আছে বনহুর। মি. হারুন কক্ষে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিতেই বনহুরের দৃষ্টি বিনিময় হলো।

    চৌধুরী সাহেব বলে চলেন আমি বললাম, তুমিই দস্যু বনহুর? সে জবাব দিল, হ্যাঁ, আমার কথা না রাখলে মৃত্যু আপনার অনিবার্য। আমি ভয়ে কম্পিতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, বলো তুমি কি বলতে চাও? সে বলেন–সাবধান, মনিরার বিনা অনুমতিতে কখনও তাকে বিয়ে দিতে যাবেন না যেন। কথা শেষ করেই সুইচ টিপে ঘর অন্ধকার করে ফেললো। আমি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম। সবাই যখন ছুটে এলো, আলো জ্বেলে দেখি কোথায় বনহুর, কেউ নেই!

    মি. হারুন গম্ভীরকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন–হুঁ।

    মি. শঙ্কর রাও বলে ওঠেন–আপনার ভাগ্নির বিয়েতে মতামত সম্বন্ধে দস্যু বনহুরের কি স্বার্থ থাকতে পারে?

    চৌধুরী সাহেব বলেন–নিশ্চয়ই বনহুরের দৃষ্টি আমার মনিরার উপর পড়েছে।

    সে কথা মিথ্যে নয়, চৌধুরী সাহেব। এ না হলে সে এখানে আসতে যাবে কেন? সত্যি আমি বড় দুঃখিত, নিজে থেকেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলাম না। কথাগুলো বলেন দস্যু বনহুর।

    না, না, এতে দুঃখ করার কিছু নেই বাবা! তুমিই বা এ অবস্থায় কি করবে। চৌধুরী সাহেব বনহুরকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেন।

    মি. হারুন হঠাৎ গম্ভীরকণ্ঠে বলে ওঠেন চৌধুরী সাহেব, বনহুরকে আজ আমি গ্রেপ্তার করবোই।

    সকলেই বিস্ময়ভরা নয়নে তাকালেন মি. হারুনের মুখে।

    মি. হারুন তেমনিভাবেই বলেন সে এ কক্ষেই বিদ্যমান। একসংগে বলে ওঠেন–বলেন কি!

    মনিরা ভয়ার্ত চোখে তাকালো কক্ষের চারিদিকে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে। সবচেয়ে নিরাপদ স্থান যেন ওর ওটা।

    মি. হারুন ঠিক সে মুহূর্তে রিভলবার বের করে উদ্যত করে ধরলেন বনহুরের দিকে এবং পুলিশদেরকে বলেন–ঐ ভদ্র যুবককে গ্রেপ্তার কর।

    মনিরা স্তব্ধ নিঃশ্বাসে তাকালো বনহুরের মুখে। বনহুরও একবার তাকিয়ে নিল মনিরার মুখের দিকে। তারপর চোখের পলক মাত্র; আচমকা এক ঝটকায় মি. হারুনের হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিয়ে লাফিয়ে ছিল মুক্ত জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে।

    পুলিশ ফোর্স একসঙ্গে গুলি ছুঁড়লো—গুডুম গুড়ুম। কতকগুলো পুলিশ। ছুটলো অন্ধকারে।

    মনিরার মনে তখন ঝড়ের তাণ্ডব বইতে শুরু করেছে। কম্পিত প্রাণে সে আল্লাহকে স্মরণ করলো–হে আল্লাহ, ওকে তুমি বাঁচিয়ে নাও। ওকে বাঁচিয়ে নাও!

    চৌধুরী সাহেব মেরে গেছেন। তাঁর শুষ্ক কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এলো–এ কি করে সম্ভব হয়? মনে মনে একটা গভীর ব্যথা অনুভব করেন। চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে।

    মি. হারুন হাবা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি হতভম্ব হয়ে ছিল। এর জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এত দ্রুত তার হাত থেকে বনহুর রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ল যে, কিসে কি হলো মি. হারুন বুঝতেই পারলেন না। চেহারা তার বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। দস্যু বনহুরকে এত নিকটে পেয়েও হারালেন!

    মি. শংকর রাও হেসে বলেন–ইন্সপেক্টার সাহেব, দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করা যত সহজ মনে করা যায়, তত সহজ নয়।

    মি. হারুন বলে ওঠেন–কিন্তু আমি দেখে নেবো দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে পারি কিনা! কথাটা বলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান মি. হারুন। অন্যান্য পুলিশ অফিসার এবং পুলিশগণ তাকে অনুসরণ করে।

  • নয়

    নয়

    গোটারাত মনিরার অদ্রিায় কাটলো। পরদিন ভোরে চায়ের টেবিলে বসে কন্যা সমতুল্যা ভাগনীর চেহারা লক্ষ্য করে চৌধুরী সাহেব বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে ছিল। তিনি জানেন, মনিরা জামানকে কত ভালবাসতো। চৌধুরী সাহেব নিজেও কম ভালবাসেন কি! অমন চেহারা; অমন ব্যবহার, কে না তাকে ভালবেসে পারে! কিন্তু সে যে সে ডাকাত শুধু। ডাকাত নয়, দুর্দান্ত দস্যু বনহুর যার ভয়ে আজ গোটা দেশবাসী কম্পমান। না না, তাকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারেন না চৌধুরী সাহেব। যতই সে ভাল হউক, যতই সে মহৎ হউক তবু সে দস্যু। শাস্তি তার পাওয়া উচিত।

    চৌধুরী সাহেব মনিরার মনকে প্রফুল্ল করার জন্য হেসে বলেন–মনি, চল মা সকাল বেলাটা কোথাও থেকে ঘুরে আসি। আজ ক’দিন থেকে তোমার মামীমাও বেড়াতে যাব বলছেন।

    মনিরা চায়ের খালি কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলেনমামুজান, আজ আমার যে এক বান্ধবীর বাড়ি যাবার কথা আছে। হাতঘড়ির দিকে তাকায় মনিরা, তারপর উঠে দাঁড়ায়।

    চৌধুরী সাহেব বুঝতে পারলেন, মনিরা নিশ্চয়ই সে দস্যু বনহুরের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। একদিন কথায় কথায় তিনি মনিরার নিকটে শুনেছিল শহরের শেষ প্রান্তে জামানের বাড়ি। রাস্তার নাম এবং নম্বরটাও তার স্পষ্ট মনে আছে। মনে মনে হাসলেন চৌধুরী সাহেব। এমন একজন দস্যুকে গ্রেপ্তার করিয়ে দিতে পারলে শুধু তার সুনাম হবে না, এতে কৃতিত্ব আছে অনেক।

    মনিরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতেই চৌধুরী সাহেব স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলেন–জানো মরিয়ম, মনি এখন কোথায় গেল?

    মরিয়ম বেগম বলেন—মনি তো বলেই গেল তার কোন বান্ধবীর বাড়ি যাবে সে।

    না গো না, মনি গেল সে দটার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

    তুমি জানলে, অথচ বাধা দিলে না?

    না, আমি বাধা দেব না; বরং তার সাক্ষাতে আমি দস্যু বনহুরকে পুলিশের হাতে তুলে দেব!

    এসব তুমি কি বলছো?

    হ্যাঁ মরিয়ম, মনিরা ছদ্মবেশী দ্ৰযুবক দস্যু বনহুরকে ভালবেসে ফেলেছে। শুধু ভালবেসেছে নয়, তাকে সে গোটা অন্তর দিয়ে কামনা করে আসছে।

    দেখ শুধু কি মনিরাই তাকে ভালবেসেছিল। কি জানি, আমার গোটা মনটাও যেন সে অধিকার করে বসেছিল। সত্যি সে যে দস্যু, একথা আমি এখনও ভাবতে পারিনে। আমার মনটা কেমন যেন ব্যথায় গুমড়ে কেঁদে উঠছে। বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে মরিয়ম বেগমের কণ্ঠ।

    চৌধুরী সাহেবের হদয়ে ব্যথার আঁচ লাগে। তিনি গম্ভীর গলায় বলেন–কি যাদু জানে সে, কে জানে। কেন যে ওকে এত ভালো লাগতো আমি নিজেও বুঝি না। যাক শুনো মরিয়ম, আমি এক্ষুণি পুলিশ অফিসে যাব।

    কেন? আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেন মরিয়ম বেগম।

    দস্যুকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করতে পারিনে, যতই মহৎ, যতই উদার হউক সে, যতই গুণ তার থাক, তবু সে দস্যু। আমার কর্তব্য তাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়া।

    কি হবে তাকে পুলিশে দিয়ে! তাছাড়া তোমার তো এতে কোন স্বার্থ নেই? আমি জানি সে যত বড় দস্যু হউক, আমাদের কোন ক্ষতিই সে করবে না কোনদিন।

    আমাদের ক্ষতি সে নাও করতে পারে। তবু চোর-ডাকাত এদের কোন বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে দেশবাসীকে ঐ দস্যুর হাত থেকে আমাকে

    বাঁচাতেই হবে। উঠে দাঁড়ালেন চৌধুরী সাহেব।

    মরিয়ম বেগম বলেন–কোথায় চললে?

    ঐ তো বললাম পুলিশ অফিসে। মি. হারুন এবং পুলিশ ফোর্স নিয়ে এক্ষুণি আমি জামানের বাড়ি যাব।

    কিন্তু—

    মনিরা সেখানে আছে, এই তো?

    হ্যাঁ।

    সে কথা আমি সব বলে নেব হারুন সাহেবকে। মনিরাকে পাঠিয়ে আমি যেন তাকে গ্রেপ্তারের সুযোগ করে নিয়েছি।

    ওগো, আমিও যাব তোমার সঙ্গে। মনিরাকে আমি নিজে গিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।

    তবে তৈরি হয়ে নাও। এক্ষুণি বেরুবো, আমার মনে হয় সে এখনও বাড়িতে আছে। কারণ সে মনিরার জন্য অপেক্ষা করবেই।

    মনিরা কক্ষে প্রবেশ করতেই বনহুর উঠে দাঁড়ালো। মনিরা গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। বনহুর এগিয়ে এলো মনিরার পাশে। কিছুক্ষণ উভয়েই নীরবে কাটলো।

    বনহুরই প্রথমে কথা বলেন আমি জানি তুমি আসবে, তাই আমি এতক্ষণ তোমার প্রতীক্ষায় আছি।

    মনিরা নীরব।

    বনহুর ওর চিবুক উঁচু করে ধরলো–মনিরা কি ভাবছো? খুব ঘৃণা হচ্ছে বুঝি?

    এতক্ষণে মনিরা কথা বলেন–আমি তোমাকে ঘৃণা করি না, ঘৃণা করি বনহুরকে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এ আমি ভাবতেও পারি না জামান, তুমি দস্যু বনহুর।

    মনিরা, মনিরা–রুদ্ধ নিঃশ্বাসে বনহুর মনিরাকে টেনে নিল কাছে।

    মনিরা বনহুরের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে সরে দাঁড়ালো তুমি আমাকে স্পর্শ করো না।

    মনিরা!

    হ্যাঁ, তুমি অপবিত্র ঘৃণিত একটা মানুষ–

    মনিরা, তুমি বিশ্বাস করো আমি অপবিত্র ঘৃণিত নই। আমি দস্যু নই। দস্যুতা আমার পেশা নয়। মনিরা তুমি আমাকে ঘৃণা করো না। পুনরায় বনহুর মনিরাকে টেনে নেয় কাছে।

    না না, তুমি আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও–তোমার সঙ্গে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই, আমি চললাম।

    না, তোমাকে আমি যেতে দেব না। মনিরাকে দক্ষিণ হাতে শক্ত করে ধরলো বনহুর। আরেক হাতে এক ঝটকায় নিজের জামার নিচে গলা থেকে সে হারছড়া টেনে বের করে মেলে ধরলো মনিরার সামনে চিনতে পার এই ছবি দুটি কাদের?

    বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো মনিরা–এ ছবি তোমার গলায় এলো কি করে? এ যে আমার আর মনিরের ছবি।

    বনহুর তখন মনিরাকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন–তোমাদের সে হতভাগ্য মনির আর কেউ নয়–দস্যু বনহুর।

    মনিরা আর্তনাদ করে উঠলো–জামান, তুমিই মনির? কেন–কেন তুমি এসব করতে গেলে?

    বনহুর মনিরাকে নিবিড়ভাবে বুকে চেপে ধরলো, তারপর বলেন–এই আমি তোমাকে স্পর্শ করে বলছি মনিরা, আর আমি দস্যুতা করবো না।

    ঠিক সে মুহূর্তে মি. হারুনসহ চৌধুরী সাহেব কক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁদের পেছনে পুলিশ ফোর্স।

    সঙ্গে সঙ্গে মনিরাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো বনহুর। বুঝতে পারলো সে, তার পিতাই আজ তাকে পুলিশের হাতে সপে দেয়ার জন্য আয়োজন করেছেন। পালালে সে এক্ষুণি পালাতে পারে। তার পায়ের তলাতে আছে এক চোরা সুড়ঙ্গ। এখনই সে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে, কিন্তু এ যে তার পিতাকে অপমান করা হবে।

    মনিরার চোখেমুখেও বিস্ময়, হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।

    মি. হারুন এগিয়ে গেল বনহুরের দিকে। বনহুর হাত দু’খানা বাড়িয়ে দিল।

    মি. হারুন নিজ হাতে বনহুরের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল।

    মনিরা আর্তনাদ করে চৌধুরী সাহেবের জামার আস্তিন চেপে বলেনমামুজান, এ তুমি কি করলে? এই দেখো–মালাছড়া চৌধুরী সাহেবের হাতে দিন মনিরা।

    এমন সময় চৌধুরী সাহেবের গাড়ি থেকে নেমে এলেন মরিয়ম বেগম। কারণ মনিরার আর্তচিৎকার তার কানে পৌঁছে ছিল, ভাগ্নীর কোন অমঙ্গল আশঙ্কা করেই তিনি ছুটে এলেন।

    চৌধুরী সাহেব মালাছড়া হাতে নিয়েই চিনতে পারলেন। এ মালা যে তার অতি পরিচিত। তিনি কিছুক্ষণ শুদ্ধ হয়ে মালার লকেটের ছবি দুটির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন—এ মালা তুই কোথায় পেলি, মনিরা।

    মনিরা আংগুল দিয়ে বনহুরকে দেখিয়ে বলেন–ওর গলায়।

    অবাক হয়ে তাকান চৌধুরী সাহেব বনহুরের দিকে।

    মনিরা বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলে–মামুজান, ঐ তোমাদের সন্তান মনির।

    চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম স্থির নয়নে দেখতে লাগলেন বনহুরকে। তাদের চোখের সামনে বনহুরের মুখ মিশে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠলো একটা শিশু মুখ।

    মরিয়ম বেগম ছুটে গিয়ে বনহুরকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে বাবা মনির। আমার মনির–

    চৌধুরী সাহেবের গণ্ড বেয়ে ঝর ঝর করে তখন ঝরে পড়ছে অশ্রুধারা। মনকে তিনি কিছুতেই প্রবোধ দিতে পারছেন না।

    মরিয়ম বেগম উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেংগে ছিল, স্বামীকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন–ওগো, কি করলে তুমি? হারানো রত্ন ফিরে পেয়ে আবার তুমি হারালে। না না, আমি মনিরকে কিছুতেই দূরে নিয়ে যেতে দেব না। দেব

    –মনির আমার মনির–পুত্রের বুকে মাথা ঠুকে কাঁদতে লাগলেন মরিয়ম বেগম।

    মি. হারুন কঠিন কণ্ঠে বলেন—বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে।

    বনহুরের শান্ত ধীরস্থির গলায় বলেন–চলুন, ইন্সপেক্টার সাহেব।

    সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী সাহেব পুত্রের হাত চেপে ধরে কেঁদে উঠলেন–বাবা মনির।

    বনহুর হেসে বলেন–আব্বা, আপনার কর্তব্য আপনি পালন করেছেন।

    একবার মা ও মনিরার দিকে তাকায় বনহুর, উভয়ের চোখেই পানি, বনহুরের চোখ দুটোও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।

    মনিরা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো–মনির, আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকবে!

  • দস্যু বনহুরের নতুন রূপ

    দস্যু বনহুরের নতুন রূপ

    ‘দস্যু বনহুরের নতুন রূপ’— এটি ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের দ্বিতীয় গ্রন্থ। ‘দস্যু বনহুর’ বাংলাদেশী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘রোমেনা আফাজ’ সৃষ্ট একটি কথাচরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি লিখেছেন ১৩৮টি কাহিনী, যা সামগ্রিকভাবে ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাসের নামও ‘দস্যু বনহুর’। ছোটবেলা নৌদূর্ঘটনায় চৌধুরী বাড়ীর ছেলে মনির হারিয়ে যায়, দস্যু সর্দার কালু খাঁ তাঁকে কুঁড়িয়ে পান ও পরবর্তিতে তাঁকে ‘দস্যু বনহুর’ রুপে গড়ে তোলেন। গরীবের বন্ধু ও চোরাকারবারীদের চিরশত্রু দস্যু বনহুর যেমন গরীবের কাছে ছিলেন সম্মানিত, তেমনি চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীদের কাছে ছিলেন যমদূতের মত। এই সিরিজের স্লোগান হচ্ছে ‘সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর’।

    দস্যু বনহুরের সহায়ক চরিত্র হিসেবে রয়েছে রহমান ও কায়েস, তারা একাধারে বনহুরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিল— একজন জঙ্গলে অন্যজন শহরে; শহুরে স্ত্রীর নাম মনিরা ও অপরজনের নাম নূরী। মনিরার গর্ভে দস্যু বনহুরে বড় ছেলে ‘নুরুজ্জামান নূর’ এর জন্ম, যে পরবর্তীতে দেশের সৎ ও সাহসী ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। নূরীর গর্ভে ‘জাভেদ’ নামে তার একটি ছেলের জন্ম হয়, যে পিতার মতই দস্যুতা করতে ভালবাসে।

  • এক

    এক

    গাঢ় অন্ধকারে গোটা পৃথিবী আচ্ছন্ন। আকাশে দু’একটি তারকা ক্ষুদে বিড়ালের চোখের মত মিটমিট করে জ্বলছে। বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেছে। গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত নড়ছে না। চারদিকে একটা গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। অন্ধকারে বিরাট বিরাট গাছ এক একটা দৈত্যের মতই মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ। এছাড়া কোন শব্দই নেই যেন দুনিয়ায়।

    অন্ধকারের বুকে গা এলিয়ে দিয়ে শহরটাও যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। শহরের বিশিষ্ট স্থানে বিরাট আকাশচুম্বী প্রাচীরে ঘেরা হাঙ্গেরী কারাগার।

    সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত এই কারাগারের একটি কক্ষে বন্দী দস্যু বনহুর। সশস্ত্র পুলিশ রাইফেল হাতে অবিরত সজাগ পাহারা দিচ্ছে। নিস্তব্ধ কারাগার কক্ষে শুধু জেগে উঠেছে সজাগ প্রহরীর ভারী বুটের শব্দ—খট খট খট।

    গভীর রাত।

    কারাগারের বড় ঘড়িটা ঢং ঢং শব্দে রাত দুটো ঘোষণা করলো। মেঝেতে পাতা শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো দস্যু বনহুর, নিজ মনে একটু হাসলো সে। তারপর দ্রুতপদে কারাগার কক্ষের পেছন দিকে এগিয়ে গেল। কাপড়ের ভেতর থেকে বের করলো একটা সিলক কর্ড। কৰ্ডখানা ছুড়ে মারলো দেয়ালের গায়ে প্রায় দশ বারো হাত উচুতে ভেন্টিলেটার লক্ষ্য করে। একবার, দু’বার, তিনবার, আটকে গেল কৰ্ডখানা ভেন্টিলেটারের সঙ্গে। জহুর আর বিলম্ব না করে কর্ড বেয়ে দ্রুত উপরে উঠতে লাগলো মসৃণ দেয়ালে কিছুতেই পা আটকাচ্ছিল না, অতি কষ্টে উঠতে লাগলো। কারাকক্ষ অন্ধকার, তাই পাহারাদারগণ টেরও পেল না। বনহুর অতিকষ্টে একেবারে ভেন্টিলেটারের পাশে পৌঁছে গেল।

    বনহুরের সর্বাঙ্গ ঘেমে উঠেছে। বার বার হাতের পিঠে ললাটের ঘাম মুছে নিচ্ছিলো সে। কর্ডদাঁতে চেপে ধরে ভেন্টিলেটারের শিক হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বনহুর, তারপর দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে শিকে চাপ দেয়। অদ্ভুত শক্তি বনহুরের শরীরে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেন্টিলেটারের শিক বাঁকিয়ে ফেলে সে। একজন বের হতে পারবে, এতটুক ফাঁক করে নিয়ে বনহুর নিঃশ্বাস ফেলে। এবার আর তাকে কে পায়। সে দ্রুত ভেন্টিলেটারের ফাঁক দিয়ে কক্ষের ও পাশে গিয়ে পৌঁছে। বনহুর কর্ডখানা খুলে পুনরায় কাপড়ের নিচে আন্ডার ওয়্যারের মধ্যে লুকিয়ে ফেললো। এবার সে দেয়াল বেয়ে অতি নিপুণতার সঙ্গে নিচে এলো। সঙ্গে সঙ্গে একজন পাহারাদার দেখে ফেললো তাকে। বনহুরকে লক্ষ্য করে রাইফেল উঁচু করে গুলি ছুড়লো। বনহুর চট করে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে আত্মরক্ষা করলো এবং পরক্ষণেই ছুটে এসে জাপটে ধরলো পাহারারত পুলিশটিকে। বলিষ্ঠ হাতের কঠিন চাপে পাহারাদারটির হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে ছুটতে লাগলো সে কারাগারের ফটক অভিমুখে।

    রাইফেলের গুলির শব্দে চারদিক থেকে অন্য পাহারাদারগণ শশব্যস্ত ছুটে এলো। মুহূর্তে কারাগারের মধ্যে বন্দী পালানোর সংকেত ধ্বনি বেজে উঠলো।

    বনহুরকে লক্ষ্য করে সমস্ত পুলিশ ছুটতে শুরু করলো।

    বনহুর কখনও থামের আড়ালে, কখনও বা হামাগুড়ি দিয়ে আত্মগোপন করে ফটকের দিকে এগুতে লাগলো।

    ইতোমধ্যে গোটা হাঙ্গেরী কারাগার প্রকম্পিত করে বিপদ সংকেত ধ্বনি হতে লাগলো। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী উদ্যত রাইফেল হাতে এদিক ওদিক ছুটতে লাগলো।

    বনহুর অতি সাবধানে এগুচ্ছে ফটকের দিকে। কয়েকজন পুলিশ উদ্যত রাইফেল হাতে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। বনহুর একটা টবের আড়ালে গুটিসুটি মেরে বসে রইলো। পুলিশের দল সরে যেতেই আবার এগুতে শুরু করলো সে।

    অতি অল্প সময়ে ফটকের নিকট পৌঁছে গেল বনহুর। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দুজন পুলিশ তার সামনে রাইফেল উঁচু করে ধরলো।

    পেছনে অসংখ্য পুলিশ ছুটে আসছে। প্রত্যেকের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। কালবিলম্ব না করে বনহুর সামনে পুলিশ দু’জনকে লক্ষ্য করে কর্ডটা ছুড়ে মারে। হঠাৎ এমন বিপদের জন্য তৈরি ছিল না পুলিশদয়। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল ওরা। তাদের হাতের রাইফেল ছিটকে পড়লো দূরে! বনহুর দ্রুতহস্তে কৰ্ডখানা ওদের শরীর থেকে খুলে নিয়ে ছুড়ে মারলো ফটকের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে কউখানা আটকে গেল। বনহুর কোমরের বেটে রিভলভার খানা গুঁজে রেখে দ্রুত কর্ডবেয়ে ফটকের মাথায় উঠে গেল।

    ততক্ষণে পুলিশ বাহিনী ফটকের নিকটে পৌঁছে গেছে। কয়েকজন পুলিশ বনহুরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লো। কিন্তু তখন বনহুর লাফিয়ে পড়েছে ফটকের ওপাশে।

    ফটকের ওপাশে যে দু’জন পুলিশ রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছিলো, তারা বনহুরকে দেখামাত্র রাইফেল উঁচু করে ধরে। একজন গুলি ছুঁড়ে বনহুরের বুক লক্ষ্য করে, বনহুর মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়, গুলিটা গিয়ে বিদ্ধ হয় অপর পুলিশের বুকে।

    একটা ক্ষীণ আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ে পুলিশটা।

    অপর পুলিশ পুনরার রাইফেল তুলে গুলি ছুঁড়তে যায়, কিন্তু বনহুর তার পূর্বেই রিভলভারের এক গুলিতে পাহারাদার পুলিশকে তার সঙ্গীর সঙ্গে পরপারে পাঠিয়ে দেয়।

    তারপর ছুটতে থাকে সম্মুখের দিকে।

    অল্পক্ষণের মধ্যে ফটক খুলে পুলিশ ফোর্স বেরিয়ে এলো, সবাই ছুটতে লাগলো এদিকে সেদিকে। কোন দিকে গেছে বনহুর কেউ জানে না।

    হাঙ্গেরী কারাগারে বিপদ সংকেত ঘণ্টা অবিরাম গতিতে বেজে চলেছে।

    বনহুর ছুটতে ছুটতে রাস্তার ধারে একটা ডাস্টবিনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল।

    তার পাশ কেটে চলে গেল একটা পুলিশ ভ্যান। ভ্যানে বিশ-পঁচিশজন পুলিশ রাইফেল উদ্যত করে দাঁড়িয়ে আছে। কারখানা চলে গেলে বনহুর সোজা হয়ে বসলো।

    অল্পক্ষণেই সমস্ত শহরে হাঙ্গেরী কারাগারের বিপদ-সংকেত ধ্বনি ছড়িয়ে ছিল। সবাই আন্দাজ করে নিল নিশ্চয়ই দস্যু বনহুর পালিয়েছে।

    বনহুর বন্দী হওয়ার গোটা শহরে একটা শান্তি ফিরে এসেছিল। আবার নগরবাসীদের মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে পড়লো।

    বনহুর ডাস্টবিনের আড়ালে লুকিয়ে কোন গাড়ির প্রতীক্ষা করতে লাগলো। ইতোমধ্যে আর একটি পুলিশ ভ্যান সে রাস্তা দিয়ে চলে গেল। বনহুর হামাগুড়ি দিয়ে বসে রইলো। হঠাৎ যদি কোন পুলিশ তাকে দেখে ফেলে, তাহলে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে হাঙ্গেরী কারাগারকক্ষে।

    বনহুর এদিক-ওদিক লক্ষ্য করে দেখছে। হঠাৎ দেখতে পেল স্টেশনের দিকে থেকে একখানা ঘোড়ার গাড়ি সে পথে এগিয়ে আসছে। হয়তো বা কোন ট্রেনযাত্রী হবে। গাড়ির সামনে বেডিংপত্র রয়েছে।

    বনহুর এ সুযোগ নষ্ট করলো না। পথের একপাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িখানা দ্রুত এগিয়ে আসছে। লাইটপোস্টের ক্ষীণালোকে দেখল কোচোয়ান গাড়ির ওপরে বসে লাগামটা শক্ত করে ধরে আছে। তার দক্ষিণ হাতে চাবুক। মাঝে মাঝে ঘোড়ার পিঠে চাবুকখানা সপাং করে গিয়ে পড়ছে।

    গাড়িখানা বনহুরের পাশে আসতেই সে ক্ষিপ্র হস্তে গাড়ির দরজা ধরে পাদানীতে উঠে দাঁড়ায় এবং এক মুহূর্তে বিলম্ব না করে গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

    গাড়ির ভেতরে একটি যুবক বসে বসে ঝিমাচ্ছিল। বনহুর তাকে কিছু বুঝার সময় না দিয়ে তার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরলো। সে লক্ষ্য করলো যুবকটা হিন্দু, কারণ তার শরীরে ধুতি আর পায়জামা। এতে বনহুরের সুবিধা হলো, ধুতির আঁচল দিয়ে অতি সহজেই যুবকটিকে মজবুত করে বেঁধে ফেললো। পূর্বেই যুবকের পকেট থেকে রুমালখানা বের করে গুঁজে দিয়েছিল সে তার মুখের মধ্যে, কাজেই যুবক একটু শব্দও করতে পারল না। যুবকের হাত-পা মজবুত করে বেঁধে গাড়ির মেঝেতে ফেলে দেয় বনহুর।

    কোচোয়ান একবার চিৎকার করে বলে-বাবু, অত নড়াচড়া করছেন কেন?

    বনহুর একটু কেশে জবাব দেয়-বড় ঠাণ্ডা লাগছে, তাই দরজা, জানালার শার্শী লাগিয়ে দিচ্ছি।

    কোচোয়ান আর কোন কথা বলে না।

    বনহুর অতি সহজেই কাজ সমাধা করে ফেললো। এবার বনহুর দেখতে পেল, গাড়ির মধ্যে একটি সুটকেস রয়েছে। বনহুর যুবকের পকেট থেকে চাবি নিয়ে সুটকেসটা খুলে ফেললো। যুবকের পকেটেই একটা ম্যাচ ছিল, বনহুর ম্যাচ জ্বেলে দেখলো তার মধ্যে যুবকের প্যান্ট-শার্ট-কোট রয়েছে। আরও অনেক কিছু রয়েছে সুটকেসে। বনহুর চটপট প্যান্ট-শাট আর কোট গায়ে পরে নিল। ভাগ্য ভাল বলতে হবে, বনহুরের মতই ছিল যুবকটির শরীরের মাপজোক, তাই কোন অসুবিধা হলো না। কিন্তু এবার বিপদে ছিল সে। প্যান্ট-সার্ট-কোটতো হলো, কিন্তু জুতো যে নেই তার পায়ে। হঠাৎ খেয়াল হলো যুবকের পায়ে নিশ্চয়ই জুতো আছে। মুহূর্ত বিলম্ব না করে যুবকের পা থেকে জুতো খুলে নিল, মনে মনে খোদার নাম স্মরণ করতে লাগলো, জুতো জোড়া যদি তার পায়ে না হয়, তবে মহা মুশকিল হবে। বরাত ভালো তাই জুতো জোড়াও তার পায়ে মাপমত হয়ে গেল।

    আসনে বসে হাফ ছেড়ে বাঁচলো বনহুর। তাদের গাড়ির পাশ কেটে আরও কয়েকখানা পুলিশ ভ্যান চলে গেল। হাসলো বনহুর। গাড়িতে বেডিংপত্র দেখে ফোর্স কোনরূপ সন্দেহ করেনি।

    তখনও দূর থেকে ভেসে আসছে হাঙ্গেরী কারাগারের বিপদ সংকেত ধ্বনি।

    বনহুরকে নিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে।

    শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে গাড়িখানা একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলেন এক পৌঢ় ভদ্রলোক। ব্যস্তকণ্ঠে তিনি ডাকাডাকি শুরু করলেন—ওরে মহেন্দ্র! ওরে মাধু। জামাইবাবুর গাড়ি এসেছে। ওরে জামাইবাবুর গাড়ি এসেছে।

    বনহুর চমকে উঠলো সর্বনাশ, সে তাহলে জামাই বনে গেল। কিন্তু এখন কোন উপায় নেই, তাকে জামাই সেজেই চালিয়ে নিতে হবে। তাড়াতাড়ি যুবকের গলায় জড়ানো মাফলারটা খুলে নিয়ে বেশ করে জড়িয়ে নিল নিজের গলায়। তারপর একটু কেশে বলেন—অত চেঁচামেচি করবেননা, ঠাণ্ডা লেগে মাথাটা বড় ধরেছে। তারপর কোচোয়ানকে লক্ষ্য করে বলে—এই! তুমি বেডিং পত্ৰনামিয়ে একটু ভেতরে পৌঁছে দাও।

    কোচোয়ান তার আসন থেকে নেমে বেডিংপত্র নামাতে শুরু করে। বনহুর নিজের হাতে সুটকেসটা নামিয়ে নেয়। প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলে ওঠেন—আহ, থাক থাক। ওরে মহেন্দ্র! এদিকে আয় না, জামাই বাবু নিজেই তো জিনিসপত্র নামিয়ে নিচ্ছেন।

    মহেন্দ্র নামে যে লোকটি এসে হাজির হল, সে তখন দ্রিার ঘোরে চোখ রগড়াচ্ছে। প্রৌঢ় ভদ্রলোক বনহুরের হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে মহেন্দ্রের হাতে দিয়ে বলেন–যা, ভেতরে নিয়ে যা, আর শুন, কোচোয়ানকে দেখিয়ে দে বেডিংপত্র কোথায় রাখবে। তারপর বনহুরকে লক্ষ্য করে বলে—এসো বাবা এসো।

    বনহুর ভদ্রলোকটিকে অনুসরণ করে।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলেন—আচ্ছা বাবা, গণেশ বলে কাউকে স্টেশনে দেখনি। সে কই?

    বনহুর খানিকটা কেশে নিয়ে বলে কই, কাউকেই তো স্টেশনে দেখলাম না।

    তবে নিশ্চয়ই বেটা কোথাও শুয়ে শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে। ভাগ্যিস বাসার ঠিকানাটা তোমাকে ভালভাবে জানিয়ে এসেছিলাম।

    হ্যাঁ, সেজন্যই বেশি বেগ পেতে হলো না!

    বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলে উঠেন-ট্রেনে বুঝি খুব ঠাণ্ডা লেগেছে।

    হ্যাঁ।

    তাই তো গলাটা যেন কেমন শুনা যাচ্ছে।

    বনহুর আঁতকে উঠে বারবার কাশতে শুরু করে। তারপর কাশি থামিয়ে বলে—উঃ গলাটা বড় ব্যথা করছে।

    উঠানে পৌঁছতেই কয়েকজন মহিলা ঘিরে ধরলো বনহুরকে, প্রৌঢ় ভদ্রলোক একজন অর্ধবয়সী মহিলাকে দেখিয়ে বলেন—উনি তোমার শাশুড়ী মাতা।

    বনহুর থতমত খেয়ে কি করবে ভাবছে, হঠাৎ মনে ছিল হিন্দুরা গুরুজনকে প্রণাম করে। বনহুর নত হয়ে বয়স্ক মহিলার পদধূলি গ্রহণ করলো।

    মহিলা বনহুরের মাথায় হাত রেখে প্রাণভরে আশীর্বাদ করতে লাগলেন।

    মহিলাগণ কানাকানি শুরু করেছে, শুনতে পেল বনহুর—মাধুরীর বর তো খুব সুন্দর হয়েছে। চমৎকার ছেলে, যেন কার্তিক।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক আনন্দভরা কণ্ঠে বলেন—”আমি আগেই বলেছিলাম, আমার পছন্দ আছে।

    বনহুর ভেতরে ভেতরে বিব্রত বোধ করতে লাগলো। সে জীবনে অনেক কঠিন বিপদ হাসিমুখে জয় করেছে, কিন্তু কোনদিন এমন বিপদে পড়েনি। একেবারে জামাই বনে গেছে। যাক তবু এতক্ষণ ঠিকভাবে চালিয়ে নিতে পেরেছে এই যথেষ্ট। কিন্তু এরপর আরও যদি কিছু সমস্যা এসে যায়, তখন তার উপায় কি হবে? এক্ষুণি ইচ্ছা করলে পালাতে পারে সে। শত শত সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে যে অদৃশ্য হতে পারে, তার কাছে সামান্য ক’জন নিরীহ প্রাণী এ কিছু নয়, কিন্তু হঠাৎ এদের কাছে নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারে না। কাজেই নিশ্চুপ থেকে যায়।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলে ওঠেন–মাধুরী কই? ঘুমিয়েছে বুঝি। মহিলাদের একজন বলে ওঠেন—জামাইবাবু আসবেন বলে এতক্ষণ সে জেগেই ছিল। এইমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওকে ডাকছি।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলেন—তাই ডাকো বৌমা, ঘুম ভাঙ্গলে দেখবে কে এসেছে।

    মহিলা ডাকতে ডাকতে কক্ষের দিকে চলে যান—মাধুরী দি মাধুরী দি, দেখো গিয়ে কে এসেছে। বনহুর ঢোক গিললো। এইবার তার চরম পরীক্ষা। মাধুরী তবে ঐ যুবকের স্ত্রী। এবার তার সবকিছু ফাঁস হয়ে যাবে। কিন্তু এতক্ষণেও তাকে এ বাড়ির কেউ চিনতে পারছে না। ব্যাপার কি? আশ্চর্য লাগে বনহুরের কাছে।

    প্রৌঢ় দ্রমহিলা বলেন-পথে কোন কষ্ট হয়নি তো বাবা?

    না, শুধু ঠাণ্ডা লেগে গলাটা যা বসে গেছে। কথাটা বলেন বনহুর।

    ভদ্রলোক ব্যস্ত কণ্ঠে বলেন-—এই ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়েই কথা বলবে, না ঘরে নিয়ে বসাবে?

    শাশুড়ী বলে ওঠেন—দেখ বাবা, আমরা তো তোমাকে দেখিনি। এমন কি এ বাড়ির কেউ তোমাকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেনি। মেয়েটাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে দিদি বিয়েটা দিয়ে দিল।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলেন-কেন জামাই কি অপছন্দ হয়েছে?

    বলো কি জামাই অপছন্দ হবে, এ যে সোনায় সোহাগা। যেমন মাধুরী তেমনি বাবা নিমাই।

    এতক্ষণে জামাইয়ের নামটা জানতে পারে বনহু। সে যুবকের নাম তবে নিমাই। হ্যাঁ, তাকে কিছুক্ষণের জন্য নিমাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। আর একটি কথা তাকে অনেকটা হালকা করে এনেছে, এ বাড়ির কেউ জামাইকে আজ পর্যন্ত চোখে দেখেনি। কিন্তু মাধুরী, সে তো নিশ্চয়ই তার স্বামীকে ভাল করে চেনে।

    বনহুরকে ভাবতে দেখে বলেন ভদ্রমহিলা কি ভাবছো বাবা, দিদি যা করেছেন খুব ভালো করেছেন। আমি ভাবতেও পারিনি এমন জামাই পাবো।

    ভদ্রলোক বলেন—তোমার দিদির পছন্দ তোমার চেয়ে অনেক বেশি। আমার মাধুরীর স্বামী যেন রাজপুত্র। দেখ বাবা, মনে কিছু করো না, মাধুরীকে বিয়ের দিনই নিয়ে না এলে ওর ঠাকুরমার সঙ্গে এ জীবনে আর দেখাই হত না।

    বনহুর ব্যথিত-কষ্ঠে বলে ওঠে-ঠাকুরমা তাহলে….

    হ্যাঁ বাবা, তিনি মারা গেছেন, কেন তুমি চিঠি পাওনি?

    বনহুর একটু চিন্তা করার ভান করে বলে—চিঠি, কই না তো তিনি কি সে দিনই….

    হ্যাঁ, মাধুরীকে নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছলাম, তার ঘণ্টাকয়েক পরেই মা মারা যান। মাধুরীও বুঝি তোমাকে একথা লিখে জানায়নি?

    না।

    তবে তোমাকে সব গোপন করে গেছে দেখছি। হঠাৎ কথাটা জানালে ব্যথা পেতে পারো তাই বুঝি মাধুরী লেখেনি।

    বনহুর লক্ষ্য করলো ওপাশের দরজায় একটা সুন্দর মুখ ভেসে উঠে আবার আড়ালে সরে গেল।

    মহিলাটি বলে ওঠেন–মাধুরী জেগেছে, যাও বাবা, ও ঘরেই খাবার পাঠিয়ে দেব। সব ঠান্ডা হয়ে গেছে কিনা, একটু গরম করে দিন।

    বনহুর বলে ওঠেনা না, রাতে আর কিছু খাব না। বড় অসুস্থ বোধ করছি।

    তাহলে একটু গরম দুধ পাঠিয়ে দিচ্ছি।

    না, কিছু খাবো না। শ্বশুর মহাশয় বলে ওঠেন—সেকি হয় বাবা? রাত্রে উপোস দিতে নেই। তুমি যাও বাবা, ঠাণ্ডায় অসুখ বাড়বে।

    বনহুর ইতস্ততঃ করছে বলে একটি যুবতী বনহুরকে লক্ষ্য করে বলেলজ্জা করছে, না? আসুন আপনাকে পৌঁছে দিই।

    বনহুর যুবতীর পেছনে চলতে চলতে ভাবে—তাদের জামাইয়ের এই প্রথম শ্বশুরালয়ে পদার্পণ। এ বাড়ির এক শ্বশুর মহাশয় ছাড়া জামাইকে কেউ বুঝি দেখে নি। তবু শ্বশুর মহাশয়ের চোখেও পাওয়ার ওয়ালা চশমা। কিন্তু জামাইবাবুর স্ত্রী সে তো তার স্বামীকে সহজেই চিনে নেবে। তখন পেছন থেকে যুবতীটি বলেন—এবার যান, সোজা ভেতরে চলে যান….

    বনহুর থমকে দাঁড়ায়, কেশে নিয়ে বলে—আজ না হয় রাতের মত অন্য ঘরে।

    কথা শেষ করতে দেয় না যুবতী রাগ দেখছি আপনার পড়েনি। বিয়ের রাতেই মাধুরী চলে এসেছিল বলে এখনও অভিমান। যান যান, ভেতরে যান।

    বনহুর দেখলো বেশি আপত্তি করা ঠিক হবে না। ধীরে পদক্ষেপে মাধুরীর কক্ষে প্রবেশ করে। দেখতে পায় লজ্জায় জড়োসড়ো একটি যুবতী মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছে খাটের একপাশে।

    বনহুর বিব্রত বোধ করে। একি অদ্ভুত পরীক্ষায় ছিল সে। নিজেকে সংযত করে একটু কেশে নিয়ে বলেন—মাধুরী।

    ঘোমটার ফাঁকে লজ্জা ভরা দৃষ্টি তোলে একবার তাকালো মাধুরী তার দিকে।

    বনহুর আরও এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। তারপর বলেন—ভালো আছেতো মাধুরী?

    মাধুরী মৃদু মধুর কণ্ঠে বলেন—আছি।

    বনহুরের মত বীরপুরুষও ঘেমে নেয়ে উঠতে লাগলো। এবার কি কথা বলবে সে? একটা বিষয়ে আশ্বস্ত হলো, মাধুরী তাকে এখনও চিনতে পারেনি। নইলে সে এতক্ষণ অমনভাবে নিশুপ থাকতো না।

    বনহুর খাটে না বসে একটা সোফায় বসে পড়ে বলেন–হঠাৎ ভয়ানক সর্দি-কাশি হওয়ায় গলাটা কেমন বসে গেছে।

    মাধুরী আড়নয়নে একবার বনহুরকে দেখে নিল, তারপর এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তার পাশে—ওগো তোমার রাগ পড়েছে?

    বনহুর চটপট কি জবাব দেবে ভেবে পায় না। কাশতে শুরু করে, পরে

    কাশি থামিয়ে বলে রাগ করে আর কতদিন থাকা যায় বল।

    মাধুরী ঘোমটা অনেকটা সরিয়ে ফেলেছে। আরও ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আনন্দভরা কণ্ঠে বলে—সত্যি আমি ভাবতেই পারিনি এত অল্প সময়ে তুমি এতটা বদলে যাবে। বিয়ের রাতের কথাটা আজও আমার মনে আছে। বাসর ঘরে যাবার পূর্বেই মায়ের চিঠি বাবার হাতে এসে পৌঁছলো-ঠাকুর মার অসুখটা ভয়ানকভাবে বেড়েছে, দেখা করতে হলে রাতের ট্রেনে আসবে। তুমি তো রেগে অস্থির, বিয়ের রাতে কিছুতেই আমাকে যেতে দেবে না। দেখ দেখি সেদিন যদি বাবার সঙ্গে আমি না আসতাম, ঠাকুরমার সঙ্গে আর জীবনে দেখা হত না।

    বনহুর অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। এবার সে বুঝতে পারলো এখানে ঠাকুরমার অসুস্থতার জন্য মাধুরীকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ঠাকুরমার অসুস্থতার জন্যই বিয়েতে মেয়ের মা ও বাড়ির কেউ যেতে পারেনি। শুধু মেয়ের বাবা মেয়েকে নিয়ে গিয়ে বিয়েটা দিয়ে এসেছেন। এমন কি বিয়ের রাতেই মাধুরীসহ তার পিতাকে চলে আসতে হয়েছিল, মাধুরী ভালো করে স্বামীকে দেখার সুযোগও পায়নি। মনে মনে খুশি হলো বনহুর।

    বনহুর মাধুরীর কথায় দুঃখভরা কণ্ঠে বলেন-ঠাকুরমার মৃত্যতে আমিও ভীষণ দুঃখিত, মাধুরী।

    সে কথা তোমার চিঠি পড়েই বুঝতে পেরেছিলাম।

    মাধুরী অলক্ষ্যে দেয়ালঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নেয় বনহুর। রাত ভোর হবার আর মাত্র ক’ঘণ্টা বাকী। হাই তোলে বনহুর মাধুরী, অনেক রাত হয়েছে। শরীরটাও ভালো লাগছে না, একটু ঘুমাবো।

    বেশ তো শুয়ে পড়ো। মাধুরী নিজ হাতে বনহুরের জামার বোতাম খুলে দিতে থাকে। মাধুরীর মাথার ঘোমটা খসে পড়েছে। বনহুর নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলো মাধুরীর মুখের দিকে। মাধুরী সুন্দরী বটে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে জামাটা খুলে মাধুরীর হাতে দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে ছিল। ইস, আজ কদিন এমন নরম বিছানায় শোয়নি বনহুর। কারাগারের কঠিন মেঝেতে আজ তিন চারটা দিন কেটেছে। ভাগ্যিস রহমান বুদ্ধি করে কড়টা তার নিকটে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। কর্ডটা তার অনেক উপকারে এসেছে। তাছাড়া বনহুরকে আটকে রাখে এ কার সাধ্য।

    মাধুরী আলনায় জামাটা রেখে বিছানায় এসে বসে। বনহুর ঘেমে ওঠে ভয়ে নয় সঙ্কোচে, মিথ্যা অভিনয় তাকে করতে হচ্ছে।

    মাধুরী বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো।

    উভয়ে নীরবে তাকিয়ে রইলো উভয়ের দিকে। মাধুরীর মনে কত আশা-আনন্দ, স্বামী তাকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেবে কিন্তু একি, এমন তো সে আশা করেনি।

    মাধুরী বলে ওঠে——অমন করে কি দেখছো?

    বনহুর হেসে বলে—তোমাকে। সত্যি মাধুরী তুমি কত সুন্দর। কথাগুলো বলে নিজেই লজ্জাবোধ করে সে।

    মাধুরী যতই ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বনহুর ততই সরে যায়। নিজকে মাধুরীর নিকট থেকে কিছুটা সরিয়ে রাখে সে।

    মাধুরী কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করে খুব ব্যথা অনুভব করলো। কই, এ পর্যন্ত তার স্বামী তো তাকে কোন সাদর সম্ভাষণ জানালো না। তবে কি এখনও তার মনে অভিমান দানা বেঁধে রয়েছে। মাধুরী বনহুরের বুকে মাথা রাখলো-ওগো এখনও তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারলে না।

    বনহুর নিজকে সংযত করে রাখে। হাত দু’খানা দিয়ে নিজের মাথার চুলগুলো এটে ধরে বলে—মাধুরী, আমি বড় অসুস্থ বোধ করছি, তাই….

    বুঝেছি ঘুম পাচ্ছে তোমার।

    হ্যাঁ মাধুরী।

    কিন্তু আমার যে ঘুম পাচ্ছে না। কতদিন তোমার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছি।

    আমি তা জানি মাধুরী। কিন্তু আমার মাথাটা এত ধরেছে তোমায় কি বলবো….

    বেশ তুমি ঘুমোও; আমি তোমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

    বনহুর পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করলো।

    মাধুরী বনহুরের চুলের ফাঁকে আংগুল বুলিয়ে চললো। কক্ষের স্বল্প আলোতে মাধুরী বনহুরের মুখের দিকে তম্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো। সেদিন স্বামীকে এমন করে দেখার সুযোগ ঘটেনি তার। এত কাছে—এত ঘনিষ্ঠ করেও পায়নি। তবে শুভদৃষ্টির সময় দেখেছিল একটু। কই, সেদিন তো তার স্বামীকে এত সুন্দর বলে মনে হয়নি। অপূর্ব অপরূপ তার স্বামী। আনন্দে মাধুরীর হৃদয় ভরে ওঠে। অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে মাধুরী বনহুরের মুখে।

    বনহুরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাধুরী। বনহুরের একটু তন্দ্ৰামত এসেছিল, সজাগ হয় সে। রাত ভোর হবার আর বেশি বিলম্ব নেই। বনহুর চোখ মেলে তাকালো। মাধুরী তার গায়ের উপর হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

    বনহুর মাধুরীর হাতখানা ধীরে ধীরে সরিয়ে রেখে উঠে বসলো। তারপর দ্রুতহস্তে পাশের বন্ধ জানালা খুলে ফেললো। এবার ফিরে তাকালো সে মাধুরীর ঘুমন্ত মুখে। তারপর টেবিলের পাশে গিয়ে একখণ্ড কাগজ আর কলম তুলে নিয়ে খচ খচ করে লিখল, “বিপদে পড়ে তোমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। ক্ষমা করো মাধুরী।”

    দস্যু বনহুর

    কাগজখানা টেবিলে ভাজ করে চাপা দিয়ে রেখে মুক্ত জানালা দিয়ে লাফিয়ে ছিল বনহুর অন্ধকারের অন্তরালে।

  • দুই

    দুই

    পুত্রশোকে চৌধুরী মাহমুদ খান আর মরিয়ম বেগম অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন। এতদিন তারা জানতেন মনির মরে গেছে। আর সে কোন দিন ফিরে আসবে না। হঠাৎ সে পুত্রকে অভাবনীয় অবস্থায় ফিরে পেলেন চৌধুরী সাহেব আর মরিয়ম বেগম। কিন্তু এমন পাওয়ার চেয়ে না পাওয়াই ছিল তাদের পক্ষে ভালো।

    মরিয়ম বেগম তো নাওয়া-খাওয়া ছেড়েই দিয়েছেন, সদাসর্বদা চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে চললেন। যে পুত্র ছিল তার জীবনের নয়নের মণি, যাকে হারিয়ে তিনি নিজেকে সর্বহারা মনে করতেন, সে হৃদয়ের নয়নের মণি, মনিরকে ফিরে পেয়ে আবার হারালেন। শুধু হারালেন নয়, নিজের হাতে তাকে বিসর্জন দিল।

    স্ত্রীর অবস্থা দর্শনে চিন্তিত হয়ে ছিল চৌধুরী সাহেব। তিনি নিজেও মনিরের জন্য অত্যন্ত কাতর ছিল। কিন্তু মনের ব্যথা মনে চেপে নিশ্চুপ রয়ে গেল। কোন উপায় নেই ওকে বাঁচাবার। চৌধুরী সাহেব সবচেয়ে বড় দুঃখ পেলেন, তাঁর পুত্র আজ ডাকু। সভ্য সমাজে তার কোন স্থান নেই।

    মনিরা যে বনহুরকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিল, এ কথা বুঝতে পেরেছিল মামুজান আর মামী মা। বনহুর গ্রেপ্তার হওয়ায় মনিরার হৃদয়েও যে ভীষণ আঘাত লেগেছে জানেন তারা। চৌধুরী সাহেব লক্ষ্য করেছেন সেদিনের পর থেকে মনিরার মুখের হাসি কোথায় যেন অন্তর্ধান হয়ে গেছে। সর্বদা বিষণ্ণ হয়ে থাকে সে।

    অহরহ মনিরা নিজের কক্ষে শুয়ে শুয়ে শুধু বনহুরের কথা ভাবে, কিছুতেই সে বনহুরকে ঘৃণার চোখে দেখতে পারে না। নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকে মনিরা বনহুরের ছোটবেলার ছবিখানার দিকে। নির্মল দীপ্ত দুটি চোখ কি সুন্দর। আজও ঐ দুটি চোখের চাহনি মনিরার হৃদয়ে গেঁথে আছে। বনহুর বন্দী হয়েছে সত্য কিন্তু একটি মুহূর্তের জন্য মনিরা তাকে বিস্তৃত হতে দেখেনি।

    চৌধুরী সাহেব পুত্রশোকে মুহ্যমান। মরিয়ম বেগম শয্যাশায়ী, মনিরার অবস্থাও তাই। গোটা চৌধুরী বাড়ি একটা নিস্তব্ধতা ও বিষাদে ভরে উঠেছে। কোথাও যেন এ বাড়িটার এতটুকু আনন্দ নেই।

    চৌধুরী সাহেব সেদিন নিজের কক্ষে শুয়ে শুয়ে পুত্র সম্বন্ধেই চিন্তা করছিল। নৌকাডুবির পর মনির কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, কেমন করে সে জীবনে বেঁচে আছে,কে তাকে লালন-পালন করলো, লেখাপড়া শিখে মানুষ না হয়ে, কেমন করে হলো সে ডাকু–

    এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করেন মরিয়ম বেগম। বিষণ্ণ মলিন মুখ মণ্ডল। স্বামীর পাশের সোফায় বসে বলেন–ওগো, বাছাকে উদ্ধারের কোনই কি উপায় নেই?

    চৌধুরী সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল–না।

    তারপর উভয়েই নীরব, গোটা কক্ষে একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।

    মরিয়ম বেগম পুনরায় স্বামীকে লক্ষ্য করে বলেন–কিন্তু আমার মন যে কিছুতেই মানছে না।

    জানি, কিন্তু কোন্ উপায় নেই।

    নাগো ও কথা বলল না। তুমি একবার ইন্সপেক্টর সাহেবের সঙ্গে দেখা করে

    অসম্ভব। একটা ডাকাতের জন্য আমি নিজেকে হেয় করবো?

    ডাকাত হলেও সে আমাদের সন্তান।

    তুমি কি পাগল হলে মরিয়ম? আমার পুত্র বলে দোষীকে তারা ছেড়ে দেবে না। ন্যায্য বিচারে তার যে দণ্ড হবে, তাই মেনে নিতে হবে।

    ওগো, আমি তা সহ্য করতে পারবো না। আমার মনিরের যদি যাবৎ। জীবন কারাদণ্ড হয়….

    শুধু কারাদণ্ড নয়, তার ফাঁসিও হতে পারে।

    বাপ হয়ে তুমি এ কথা মুখে আনতে পারলে? ওগো, আমার মণিকে তুমি বাঁচিয়ে নাও।

    মনিরা কখন আড়ালে এসে দাঁড়িয়ে মামা-মামীমার কথাবার্তা শুনছিল কেউ জানে না। চৌধুরী সাহেবের শেষ কথায় মনিরা দু’হাতে বুক চেপে বসে পড়ে মেঝেতে। বনহুরের ফাসি হতে পারে

    আর সহ্য করতে পারে না মনিরা। উঠে ধীরে ধীরে নিজের কক্ষে ফিরে যায়। দেয়াল থেকে বিছানা খানা নিয়ে দু’হাতে বুবে …. .. পিত কান্নায় ভেঙে পড়ে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলো সে–মনির, আবার কেন তুমি আমার জীবন পথে এসে দাঁড়িয়েছিলে?

    মনিরার চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে উঠে ফটোখানা।

    বনহুর বন্দী হয়েছে জানতে পেরে নূরীর ধমনীর রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। কিছুতেই সে বিশ্বাস করতে পারে না দস্যু বনহুরকে কেউ বন্দী করতে পারে। তখনই নূরী পুরুষের ড্রেসে সজ্জিত হয়ে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্যান্য অনুচরকে লক্ষ্য করে বলে–আমি বনহুরকে উদ্ধার করতে চাই। তোমরা আমাকে সাহায্য করো।

    কিন্তু বনহুরের প্রধান অনুচর রহমান তাকে ক্ষান্ত করে। গম্ভীর কণ্ঠে বলে-নূরী, উপায় থাকলে আমরা এখনও নিশ্চুপ থাকতাম না। হাঙ্গেরী কারাগার—তা অতি ভীষণ জায়গা। হাজার হাজার পুলিশ ফোর্স অবিরত কড়া পাহারা দিচ্ছে। প্রকাশ্যে সেখানে কোন কিছুই করতে পারা যাবে না। আমি গোপনে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি। তাছাড়া নূরী তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই, সর্দারকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না।

    নূরীর চোখ দুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কিন্তু একেবারে আশ্বস্ত হয় না সে, যতক্ষণ বনহুর ফিরে না আসছে ততক্ষণ নিশ্চিন্ত নয় নূরী।

    একদিন দু’দিন কুরে পাঁচটা দিন চলে গেছে। যে নূরী একটি দিন বনহুরকে না দেখলে অস্থির হয়ে পড়ে, সে নূরী আজ কদিন বনহুরকে কাছে। পায়নি।

    শুধু নূরীই নয়, বনহুরের অন্তর্ধানে তার সমস্ত অনুচরবর্গ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। ঝিমিয়ে পড়েছে গোটা বনভূমি।

    সবচেয়ে তাজের অবস্থা দুঃখজনক। বনহুর বন্দী হবার পর তাজ কেমন যেন হয়ে গেছে। ঘাস ছোলা কিছু সে মুখে নেয় না। বনহুর তাজকে নিজ হাতে ঘাস ছোলা খাওয়াতো। গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতো। বনহুরের অনুপস্থিতিতে সে অবিরত সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করত। কথা বলতে পারে না তাজ, মনের অবস্থা সে এমনি করে ব্যক্ত করত।

    বনহুরের অনুচরগণ তাজের জন্য চিন্তিত হয়ে ছিল। না খেলে দুর্বল হয়ে পড়বে তাজ। এই অশ্বই হচ্ছে বনহুরের সবচেয়ে প্রিয়।

    সেদিন নুরী অনেক চেষ্টায় গলায় পিঠে হাত বুলিয়ে একটু ছোলা আর ঘাস খাইয়েছে তাজকে, কিন্তু এমনি করে আর ক’দিন ওকে বাঁচানো যাবে।

    সর্দারের বিনা অনুমতিতে দস্যুগণ কিছুই করতে পারবে না। তাই তারা নীরব হয়েছে।

    নূরী ঝরনার ধারে বসে গান গায়। বনে বনে ঘুরে ঘুরে চোখের পানি ফেলে। যেদিকে তাকায় শূন্য বনভূমি খা খা করেছ। বনহুরকে নূরী নিজের প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসে। বনহুর ছাড়া আর কেউ যেন নেই ওর। অবশ্য সে কথা মিথ্যে নয়, এ বনে বনহুরই একমাত্র সঙ্গী—একমাত্র সম্বল।

    বনহুরকে কেন্দ্র করে নূরী কত আকাশ-কুসুম গড়ে আর ভাঙে বনহুর তার স্বপ্ন–তার সব।

    সেদিন নূরী তার নিজের কক্ষে বিছানায় শুয়ে কাঁদছিল। কই আজও তো বনহুর ফিরে এলো না। রহমান নিশ্চয়ই কোন সুবিধা করে উঠতে পারেনি। বনহুরকে না জানি হাঙ্গেরী কারাগারে কি কঠিন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! নূরীর চিন্তার অন্ত নেই। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে নূরী।

    ঠিক এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর, নূরীকে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে ব্যথিত কণ্ঠে ডাকে—নূরী।

    মুহূর্তে নূরী চোখ তুলে তাকায়। আনন্দে উজ্জল হয়ে ওঠে তার। মুখমণ্ডল। ছুটে এসে ঝাপিয়ে পড়ে সে বনহুরের বুকে হুর!

    বনহুর নূরীর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে-নূরী, খুব কেঁদেছো বুঝি এ কদিন?

    হুর, আমার মন বলেছে কেউ তোমাকে আটকে রাখতে পারবে না, তোমাকে বন্দী করে রাখতে কেউ সক্ষম হবে না।

    তোমার বিশ্বাস মিথ্যা নয় নূরী। বনহুকে আটকে রাখে কার সাধ্য। সামান্য পুলিশ বাহিনী বন্দী করে রাখবে আমাকে! হঠাৎ অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠে বনহুরহাঃ হাঃ হাঃ, হাঙ্গেরী কারগারও বনহুরকে আটকে রাখতে সক্ষম হলো না, নূরী।

    নূরী দীপ্ত প্রফুল্ল মুখে বনহুরের দিকে তাকিয়ে থাকে, সে তার মধ্যে দেখতে পায় এক নতুন রূপ।

    চৌধুরী সাহেব, মরিয়ম বেগম এবং মনিরা চায়ের টেবিলের পাশে এসে বসে, সকলের মুখেই বিষণ্ণতার ছাপ।

    বাবুর্চি চা-নাস্তা পরিবেশন করছিল, এমন সময় বয় খবরের কাগজ এনে টেবিলে রাখে।

    একসংগে চৌধুরী সাহেবের এবং মনিরার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে পত্রিকা খানার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়মাখা আনন্দ ভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করেন চৌধুরী সাহেব-হাঙ্গেরী কারাগার হতে দস্যু বনহুরের পলায়ন। শত শত পুলিশ বাহিনী তাকে আটকিয়ে রাখতে অক্ষম।

    আনন্দ বিগলিত কণ্ঠে বলে উঠলেন মরিয়ম বেগম-সত্যি আমার মনির কারাগার থেকে পালিয়েছে? সত্যি বলছো?

    হ্যাঁ গো, এই দেখ? চৌধুরী সাহেব পত্রিকার উপরের পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে লেখাগুলো দেখিয়ে দেন।

    মরিয়ম বেগম ইংরেজি জানতেন না, তিনি স্বামীকে লক্ষ্য করে বলেন—সমস্তটা পড়ে আমায় বুঝিয়ে বল না গো। আমার মনির কারাগার থেকে পালিয়েছে। না জানি বাছা আমার কোথায় আছে কেমন আছে।

    মনিরার চোখে মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে। মনির কারাগার থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছে। ইস কি আনন্দ–কি শান্তি। নিশ্চয় সে আসবে। যেমন করে হউক সে আসবে তার কাছে। মনিরা আনন্দের আবেগে আর স্থির হয়ে বসতে পারে না, ছুটে বেরিয়ে যায় সে। নিজের ঘরে গিয়ে বনহুরের ছোটবেলার ফটোখানা খুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরে–ওগো তুমি মুক্ত হয়েছ। জানি কেউ তোমাকে আটকে রাখতে পারবে না। কেউ না…

    চৌধুরী সাহেব নিজেই সমস্তটা পড়ে নিয়ে স্ত্রীকে মানে করে বুঝিয়ে বলেন। পুত্র-কন্যা যত দোষে দোষীই হউক না কেন, পিতা-মাতার নিকটে তারা স্নেহের পাত্র। কোন পিতামাতাই পুত্র কন্যার অমঙ্গল কামনা করতে পারে না। মনির আজ দস্যু জেনেও চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম তাকে ঘৃণা করতে পারে না। কারাগার থেকে পালিয়েছে জেনে মনে মনে খুশি হলেন তারা। কিন্তু একেবারে আনন্দ লাভ করতে পারলেন না। কারণ, কারাগার থেকে মনির পালিয়েছে সত্য কিন্তু সে নিরাপদ নয়। অহরহ তাকে পুলিশ বাহিনী খুঁজে ফিরছে। পুলিশ সুপার ঘোষণা করে দিয়েছে, যে দস্যু বনহুরকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় এনে দিতে পারবে তাকে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। তাছাড়াও তাকে একটা বীরত্বপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করা হবে।

    মরিয়ম বেগম বার বার খোদার নিকট বনহুরের মঙ্গল কামনা করতে লাগলেন। চোর হউক, ডাকু হউক সে সন্তান। হে খোদা তুমি আমার মনিকে রক্ষা কর। মরিয়ম বেগমের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুধারা। চৌধুরী সাহেব স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলে ওঠেন—যে সন্তান মানুষ নামে কলঙ্ক, তার জন্য ভেবে কি হবে বল। মনে কর মনির বেঁচে নেই।

    বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন মরিয়ম বেগম-বাপ হয়ে তুমি এ কথা বলতে পারলে?

    একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে বলেন চৌধুরী সাহেব—সবই আমাদের অদৃষ্ট, নইলে অমন ছেলে ক’জনের ভাগ্যে জোটে। পেয়েও আমরা সে রত্নকে পাইনি।

    মরিয়ম বেগম বলেন—সত্যি আমার মনিরের মত কই কাউকে তো দেখিনি। ওগো আমি কেন এ শোক বইবার জন্য বেঁচে রইলাম। আমার হৃদয় যে চূর্ণ বিচূর্ণ হচ্ছে। একটিবার ওকে দেখার জন্য মন যে আমার আকুলি বিকুলি করছে।

    চৌধুরী সাহেব উঠে পায়চারী শুরু করলেন, হয়তো তার চোখ দুটি ও ঝাপসা হয়ে আসছিল।

    গোটা দিনটা মনিরার উদগ্রীবভাবে কাটলো। কতবার আনন্দে অধীর। হয়েছে সে, কতবার চোখের পানিতে বুক ভাসলো। তার মনির আজ মুক্ত। তাকে কেউ ধরে রাখতে পারবে না নিশ্চয়ই সে আসবে। মন বলছে সে আসবে।

    কিন্তু সন্ধ্যা গিয়ে রাত এলো। ক্রমে রাত বেড়ে চললো। কই সে তো এলো না। তবে কি মনির আসবে না। হয়তো সে অভিমান করেছে, পিতার ওপর রাগ করেই সে আর এ বাড়িতে আসবে না।

    দু’হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো মনিরা।

    এমন সময় তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো বনহুর। চারদিক ঘন অন্ধকার। বনহুর সম্মুখস্থ জলের পাইপ বেয়ে দ্রুত উপরের দিকে এগিয়ে চললো।

    শরীরে কালো ড্রেস, মুখে কালো রুমাল বাঁধা, মাথায় কালো পাগড়ী, পেছনে মুক্ত জানালা দিয়ে ঘরের মেঝেতে লাফিয়ে ছিল সে।

    চমকে মুখ তুলে মনিরা। বনহুরকে সে কোনদিন দস্যুর ড্রেসে দেখেনি। বিস্ময়ভরা গলায় বলে ওঠে-কে তুমি?

    বনহুর এগিয়ে এসে নিজের মুখের বাধা পাগড়ী পরে আচল খুলে সঙ্গে সঙ্গে মনিরা আনন্দধ্বনি করে ওঠে-মনির!

    উহু মনির নই, দস্যু বনহুর।

    না, আমার কাছে তুমি দস্যু নও। তুমি আমার মনির..মনিরা ছুটে গিয়ে বনহুরের কণ্ঠবেষ্টন করে ধরে।

    বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করে, আবেগভরা গলায় ডাকে–মনিরা।

    মনিরা বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে–মনির তুমি আমার।

    কিন্তু আমি যে দস্যু?

    না, আমি সে কথা মানব না। তুমি যে আমার সব।

    বনহুর মনিরাসহ খাটে গিয়ে বসে। পাশাপাশি বসলো ওরা দুজনে। মনিরার হাতের মুঠায় বনহুরের একখানা হাত। ব্যাকুল নয়নে তাকিয়ে আছে মনিরা তার মুখের দিকে। কালো ড্রেসে অপূর্ব সুন্দর লাগছে বনহুরকে। মনিরা তন্ময় হয়ে দেখছে। সে দেখার যেন শেষ নেই।

    মনিরার বিস্ময়ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে বনহুর। তারপর মনিরার চিবুক ধরে উঁচু করে বলে—মনিরা, তুমি কেন আমায় মায়ার বন্ধনে বেঁধে ফেলছ বল তো?

    মনিরার গণ্ড বেরিয়ে পড়ে ফোটা ফোটা অশ্রু। স্থির কণ্ঠে বলে সে দস্যু বনহুরকে যদি মায়ার বন্ধনে বাঁধতে পারি, তবে সে হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরব।

    বনহুর ওকে আরও নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেয়, তারপর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে–মনিরা।

    মনিরা নিজেকে বিলিয়ে দেয় বনহুরের বাহুবন্ধনে।

    বানহুর শান্তকণ্ঠে বলে–মনিরা, তুমিই একদিন বলেছিলে দস্যু বনহুর মানুষ নয়, সে মানুষ নামে কলঙ্ক। সে কথা তুমি অস্বীকার করতে পার?

    মনির, তুমিও সেদিন বলেছিলে মনে পড়ে—দস্যু বলে সে কি মানুষ নয়। তার মধ্যে কি মানুষের হৃদয় নেই।

    মনিরা, আমি জানি দস্যু বলে সবাই আমাকে ঘৃণা করলেও তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারবে না।

    তুমি জানো না, তোমার আব্বা-আম্মার মনেও আজ কি ব্যথা গুমরে। কেঁদে মরছে। তুমি যে তাদের নয়নের মণি ছিলে, তোমাকে হারিয়ে তাদের প্রাণে যে কত আঘাত লেগেছিল, তা তুমি জানো না। আজও তারা তোমার সে শিশুকালের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। আজও তারা ভুলতে পারেননি তোমাকে। মামীমা প্রায়ই তোমার কথা স্মরণ করে অশ্রু বিসর্জন করেন। মামুজানের প্রাণেও কম ব্যথা নেই। তারপর তোমাকে আবার অভাবনীয়ভাবে ফিরে পেয়ে তখনই নির্মমভাবে হারালেন। মনির, তাদের অবস্থা অবর্ণীয়।

    বনহুরের চোখ দুটো ছল ছল করে ওঠে। ব্যথাভরা সুরে বলে—সব জানি মনিরা, সব বুঝি। কিন্তু আমি যে তাঁদের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছি। মনিরা আমি বড়ই হতভাগ্য, তাই অমন দেবতুল্য পিতা-মাতা পেয়েও পাইনি।

    মনির, আর আমি তোমাকে ছেড়ে দেব না। তা হয় না মনিরা।’

    তুমি আমার গা ছুঁয়ে শপথ করেছিলে আর দস্যুতা করবে না। এরি মধ্যে তুমি ভুলে গেলে সব?

    না ভুলে যে কোন উপায় নেই, মনিরা। একটা উম্মত্ত নেশা আমাকে অস্থির করে তুলেছে। আমি নিজের জন্য আর দস্যুতা করবো না। কিন্তু শয়তানের শাস্তি, কৃপণের ধন, অহংকারীর দর্প চূর্ণ আমি করবোই। মনিরা শপথ আমি রক্ষা করতে পারলাম না বলে তুমি আমাকে ক্ষমা কর।

    মনির।

    না, আমি দস্যু বনহুর। আমি দস্যু—এক লাফে বনহুর মুক্ত জানালা . দিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

    স্তব্ধ মনিরা পাথরের মূর্তির মত থ’মেরে দাঁড়িয়ে রইলো, তার কণ্ঠ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো-মনির।

    মুরাদের পিতা অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে মুরাদকে জেল থেকে বাঁচিয়ে নিলেন। কিন্তু মুরাদ মুক্ত হয়ে আবার দুর্দান্ত শয়তান হয়ে উঠলো। মনিরাই হলো তার একমাত্র লক্ষ্য। মনিরাকে তার চাই।

    তার দলবল যারা একদিন হোটেল থেকে পালিয়েছিল আবার তারা ফিরে এসে যোগ দিল মুরাদের সঙ্গে। এবার তারা অন্য একটি গোপন স্থানে আস্তানা তৈরি করলো। শয়তান নাথুরাম হলো এই দলের নেতা।

    সেদিন নাথুরামের আস্তানায় গোপন এক আলোচনা সভা বসেছিল। মুরাদ একটা উচ্চ আসনে বসেছিল। দলপতি নাথুরাম দাঁড়িয়ে আছে তার সম্মুখে আর অন্যান্য অনুচর কেউ বা দাঁড়িয়ে কেউ বা বসে আছে।

    গম্ভীর কণ্ঠে বলে মুরাদ—যত টাকা চাও তাই দেব তবু মনিরাকে আমার চাই।

    নাথুরাম গোঁফে হাত বুলিয়ে বলে—হুজুর, নাথু থাকতে মনিরাকে পাবেন না, এটা কথা হলো না। আমি ওকে এনে দেবই।

    মুরাদের চোখে মুখে ফুটে ওঠে শয়তানের হাসি-তুমিই পারবে নাথু, মনিরাকে তুমিই এনে দিতে পারবে।

    হ্যাঁ হুজুর, আমার দলের কেউ কমজোর নয়, আপনাকে খুশি করতে

    আমরা কেউ পিছ পা হবো না।

    ধন্যবাদ নাথুরাম। মুরাদ কথাটা বলে নাথুর পিঠ চাপড়ে দেয়। নাথুরামের ভয়ঙ্কর মুখে ফুটে ওঠে এক পৈশাচিক হাসি। নাথুর চেহারা দেখলে মানুষ এমনিতেই ভয় পায়। বলিষ্ঠ চেহারা। আকারে বেঁটে, মাথায়। খাটো করে ছাঁটা চুল। চোখ দুটো বিড়ালের চোখের মত ক্ষুদে কুতকতে। বড় বড় দাঁত বেরিয়ে আছে ঠোটের ওপরে। সেকি ভয়ঙ্কর চেহারা দলপতি নাথুরামের।

    এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলো নাথুরামের প্রধান অনুচর গহর আলী, নাথুরামকে লক্ষ্য করে সালাম করলো।

    মুরাদ হেসে বলেন—এত দেরী হলো কেন গহর আলী।

    বিরাট একটি ঝাঁকি দিয়ে হেসে উঠলো গহর আলী—সব খবর নিয়ে তবেই ফিরছি হুজুর। চৌধুরী সাহেবের বেটি মনিরা তার বান্ধবীদের নিয়ে আগামী পূর্ণিমার রাতে নৌকা বিহারে যাবে।

    মুরাদের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে ওঠে, একটা আনন্দ সূচক শব্দ করে ওঠে সে-ঐ রাতের জন্য প্রস্তত থেক নাথুরাম, ঐ দিন আমি মনিরাকে চাই।

    নাথুরাম হাতের মধ্যে হাত রগড়ায়-হুজুর, অগ্রিম কিছু টাকা…।

    হ্যাঁ, এই নাও-পকেট থেকে একতোড়া নোট বের করে ছুঁড়ে দেয় মুরাদ নাথুরামের হাতে—এতে পাঁচ হাজার আছে। মনিরাকে পেলে আরও দেব।

    সালাম হুজুর, আপনার অনুগত চাকর আমরা। যা বলবেন তাই করবো।

    বেশ, তাহলে আমার সব কথা স্মরণ রেখে কাজ করো। নাথুরাম, মনে রেখো সিংহের মুখের আহার কেড়ে নিচ্ছো তোমরা। দস্যু বনহুর ভালবাসে.. মনিরাকে।

    নাথুরামের বিদঘুটে মুখে একটা কুৎসিত হাসি ফুটে উঠলো। বলেন সে–দস্যু বনহুর তো দূরের কথা, ওর বাবা এসেও নাথুরামকে হটাতে পারবে। নাথুরাম হাত দিয়ে দু’বাহুতে চপেটাঘাত করে।

    সমস্ত দলবল হর্ষধ্বনি করে উঠলো–সর্দার নাথুরাম কি জয়। সর্দার নাথুরাম কি জয়।

    মুরাদ এবং অন্য সকলে এবার একটা বিরাট গোলটেবিলের চারিদিকে গিয়ে বসে, তারপর চললো বোতলের পর বোতল।

    মুরাদ জড়িত কণ্ঠে বলে ওঠেনাথুরাম, তোমাদের নৌকা তো ঠিক আছে।

    হ্যাঁ হুজুর, নৌকা ছিপনৌকা, বজরা সব ঠিক আছে। আমাদের নৌকাটাই যাতে ওরা ভাড়া করে সে চেষ্টা করবো। আপনি কিছু ভাববেন হুজুর।

    মুরাদ নাথুরামের পিঠ চাপড়ে দেয়—বহুৎ খোশ খবর। নাথু সত্যি তুমি কাজের লোক। কথার ফাঁকে হেউ হেউ করে ঢেকুর তোলে মুরাদ। তারপর সে কিন্তু আমার নিকটে ওকে কখন পোঁছাচ্ছ তাই বল?

    সে চিন্তা করবেন না হুজুর! আগে সে দিনটা আসুক। আপনার টাকা আর আমাদের মনিরা–কিছু ভাববেন না হুজুর, কিছু ভাববেন না!

    কিন্তু কি করে তোমরা তাকে আমার নিকটে পৌঁছাবে একটু শুনাও না, আমার যে বডড শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।

    নাথুরাম এপাশে ওপাশে একটু দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলে–আপনার বজরাখানা সে তিন মাইল দূরে যে বাকটা আছে সেখানে বাধা থাকবে।

    আমরা মাঝি সেজে চৌধুরী কন্যা এবং তার বান্ধবীগণকে নিয়ে ঝিনাইদাঁতে নৌকা ভাসাবো। তারপর আমাদের ছিপ প্রস্তুত থাকবে, সে ছিপ নৌকার মনিরাকে নিয়ে একেবারে আপনার বজরায়…

    চমৎকার বুদ্ধি এটেছো নাথুরাম একেবারে বিউটিফুল আইডিয়া——কিন্তু খুব সাবধানে, বুঝেছো?

    হ্যাঁ হুজুর আর বলতে হবে না। চলো নাথুরাম।

    চৌধুরী সাহেব বসে বসে একটা পত্রিকা পড়ছিল। এমন সময় বৃদ্ধ সরকার ফয়েজ সাহেব এসে দাঁড়িয়েছেন। চৌধুরী সাহেব চশমার ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন——নৌকা ঠিক করেছেন সরকার সাহেব?

    জ্বি হ্যাঁ, নৌকা ঠিক করে তবেই বাড়ি ফিরছি। নৌকা বেশ বড়সড় আর সুন্দর। ভাড়াটা একটু বেশি নেবে।

    তা নিক, নৌকাটা তবে বেশ মন মতই পেয়েছেন? দেখুন ঝড় উঠলে কোন ভয়ের কারণে নেই তো?

    না, তবে সবই খোদার হাত।

    এমন সময় মনিরা সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলে-মামু জানের শুধু ঝড়ের ভয়।

    হ্যাঁ মা, ঝড় আমার জীবনে এক চরম আঘাত দিয়ে গেছে। আচ্ছা মা মনিরা, কত বেড়ানোর জায়গা থাকতে তোমাদের কিনা নৌকা ভ্রমণের সখ চাপলো? আমার কিন্তু মন চায় না নৌকায় কোথাও যাওয়া।

    একবার ভয় পেয়েছেন তাই আপনার মনে এ দুর্বল মামুজান। তাছাড়া আমি তো একা যাচ্ছিনে। আমরা অনেকগুলো মেয়ে যাব।

    কিন্তু খুব সাবধানে থেক মা। খোদা না করুক কোন বিপদে না পড়ো।

    মনিরা গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। মনে তার অফুরন্ত আনন্দ। সেদিন বনহুরের নিবিড় আলিঙ্গন তার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সমস্ত সত্তা যেন বিলীন হয়ে গেছে বনহুরের আলিঙ্গনের মধ্যে। আজও সে নিভৃতে বসে সেদিনের সুখস্মৃতি স্মরণ করে গভীর আনন্দ উপলব্দি করে। সেদিনের সে মুহূর্ত মনিরা জীবনে ভুলবে না। এত কাছে কোনদিন ওকে পায়নি সে যেমন করে সেদিন মনিরা তাকে পেয়েছিল।

    মনিরা বিছানায় শুয়ে ডিমলাইটটা জ্বেলে দিল। হঠাৎ তার পাশের টেবিলে একটা তীরফলক এসে গেঁথে গেল, তীরফলকের সঙ্গে এক টুকরা কাগজ বাধা রয়েছে।

    মনিরা তীরফলকটা হাতে তুলে কাগজখানা খুলে নিয়ে মেলে ধরলো চোখের সামনে, সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো। কাগজের টুকরায় লেখা রয়েছে, “মনিরা, আজ রাতে আসবো আমি-বনহুর।”

    একদিন এই নাম শুনলে হৃৎকম্প শুরু হত মনিরার। মুখমণ্ডল বিবর্ণ। হয়ে উঠতো, আর আজ এই নাম কত মধুর কত আনন্দদায়ক খুশিতে আত্মহারা মনিরা কি করবে যেন ভেবে পায় না। বনহুরের ছোটবেলার ছবিখানা নিয়ে বার বার দেখতে লাগলো সে। ফুলের মত শুভ্র একটি মুখ, মনিরা ছবিটা গালে-ঠোটে ঘষতে লাগলো।

    ক্রমে রাত বেড়ে আসে। মনিরা উদগ্রীব হৃদয়ে প্রতীক্ষা করে দস্যু বনহুরের। মুক্ত জানালার পাশে গিয়ে বার-বার তাকায় অন্ধকারে। একসময় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে মনিরা, এমন সময় হঠাৎ একটা শব্দ। মনিরা ফিরে তাকিয়ে আনন্দ ধ্বনি করে উঠে-মনির এসেছো? ছুটে গিয়ে বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে—এসেছে। আজি ক’দিন থেকে তোমার জন্য ব্যাকুল চোখে পথ চেয়ে আছি।

    কেন? কেন তুমি আমার জন্য ব্যাকুলভাবে প্রতীক্ষা করো মনিরা?

    কেন তোমার প্রতীক্ষা করি আজও তুমি জানো না?

    নিষ্ঠুর!

    তার চেয়েও বেশি। দস্যু কোনদিন দয়া-মায়া জানে না মনিরা।

    না না, ও কথা বলো না মনির। তুমি যে আমার কাছে সবচেয়ে উদার মহৎ, স্নেহময়-বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদে মনিরা।

    বনহুর বিছানায় গিয়ে বসে।

    মনিরা ওর পাশে গিয়ে মাথার পাগড়ী খুলে নিয়ে পাশে টেবিলে রাখে, তারপর নিজেও বসে পড়ে পাশে।

    বনহুর ওর চিবুক ধরে নাড়া দিয়ে বলে—মনিরা, তুমি না বলেছিলে দস্যু বনহুরের নামে হৃদকম্প হয় আমার। আর আজবনহুরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে মনিরা—আজ তোমার নাম স্মরণে হৃদয় আমার আনন্দে আপুত হয়ে ওঠে। সত্যি মনিরা, তোমার নামে এত মধু….

    তাই নাকি?

    হ্যাঁ আচ্ছা, মনির আজ তোমাকে একটা জিনিস দেব, বল নেবে?

    তোমার দেয়া কোন জিনিসকেই যে আমি অবহেলা করতে পারি না মনিরা।

    বনহুরের একখানা হাত তুলে নেয় মনিরা নিজের হাতে। তারপর নিজ আংগুল থেকে সে হীরার আংটি খুলে নিয়ে পরিয়ে দেয় বনহুরের আংগুলে।

    বনহুর বলে উঠে—একি করছো মনিরা?

    হেসে বলেন মনিরা—একদিন তুমি এই হীরার আংটি হরণ করতে এসেই আমার হৃদয় চুরি করে নিয়েছ। আজ সে আংটি গ্রহণ করে তোমার হৃদয় আমাকে দান কর।

    উহুঁ, দস্যু বনহুর হৃদয় দান করতে জানে না সে জানে গ্রহণ করতে। আংটি তুমি খুলে নাও মনিরা।

    না।

    সেদিন যা নেই নি, আজ তা আমি নিতে পারবো না।

    মনির, আমার দান তুমি গ্রহণ করতে পারবে না।

    আমি অক্ষম মনিরা।

    দস্যু বনহুর জীবনে কোনদিন……

    বনহুরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে মনিরা—দয়ার দান গ্রহণ করে, এই ভো?

    হ্যাঁ, সে কথা মিথ্যে নয়।

    মনির-এ আমার দয়ার দান? প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা এসব কিছুই নেই এর মধ্যে? মনিরার কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে। গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দুফোটা অশ্রু।

    মনিরার চোখের পানি দস্যু বনহুরকে বিচলিত করে তোলে।

    প্যান্টের পকেট থেকে রুমালখানা বের করে মনিরার চোখের পানি মুছিয়ে দেয়।

    মনিরা ওর হাতের উপরে হাত রাখে। অপরিসীম এক আনন্দ তার মনে দোলা দিয়ে যায়। ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকায় মনিরা দস্যু বনহুরের মুখের দিকে।

    বনহুর অশ্রুসিক্ত মুখখানা তুলে ধরে বলে-মনিরা, বেশ আমি এটা গ্রহণ করলাম।

    বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে বলে উঠে-মনির।

    বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করে বলে—মনিরা।

    মনিরা এবার বনহুরের আংটিসহ হাতখানা নিয়ে নাড়াচড়া করতে করতে বলে—মনির, সত্যি তুমি অপূর্ব।

    উভয়ের নীরবে কেটে চলে কিছুক্ষণ। মনিরা বলে ওঠে একসময়–জানো মনির, পরশু বিকেলে আমরা ঝিনাইদা নদীতে নৌকা ভ্রমণে যাচ্ছি? সঙ্গে থাকবে আমার কয়েকজন বান্ধবী। সত্যি মনির তুমি যদি আমাদের সংগে থাকতে, ইস কত আনন্দ পেতাম।

    কিন্তু তোমার সখীরা কি খুশি হত? যদি জানতো দস্যু বনহুর তাদের নৌকায় রয়েছে।

    তারা তোমার আসল রূপ জানে না, তাই তোমার নামে তাদের এত আতঙ্ক। সত্যি মনির, একবার তারা যদি তোমায়..

    এমন সময় দরজায় মামীমার কণ্ঠ শুনা গেল–মনিরা দরজা খোল দরজা খোল। ঘরে কার সাথে কথা বলছিস?

    মনিরা চাপাকণ্ঠে বলে ওঠে-মামীমা টের পেয়েছেন।

    বনহুর ঠোটে আংগুল চাপা দিয়ে বলে—চুপ। তারপর উঠে দাঁড়ায় সে। মনিরার হাতের মুঠা থেকে বনহুরের হাতখানা খসে আসে মৃদুস্বরে বলে—চললাম।

    তারপর অন্ধকার জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায় দস্যু বনহুর।

    মনিরা জানালা বন্ধ করে দিয়ে সরে এসে দরজা খুলে দেয়।

    মরিয়ম বেগম কক্ষে প্রবেশ করে ব্যস্তকণ্ঠে বলেন—মনি, এ ঘরে কার কথা শুনলাম?

    মনিরা চোখ রগড়ে বললোকই আমি তো এই মাত্র দরজা খুলে দিলাম।

    মরিয়ম বেগম বলেন-আমি যে স্পষ্ট শুনলাম, কেউ যেন কথা বলছে?

    মনিরা হেসে বলে–তুমি স্বপ্ন দেখছো মামীমা। আমার ঘরে কে আবার কথা বলবে? দুশ্চিন্তায় তোমার মনের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। চলো মামীমা, শোবে চলো।

    কি জানি আমি তো জেগেই ছিলাম। হয়তো মনের ভুল সত্যি মা, মনি আমাকে পাগল করে দিয়ে গেছে। কথাগুলো বলতে বলতে বেরিয়ে যান মরিয়ম বেগম।

    মনিরা হাফ ছেড়ে বাঁচে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেয় সে।