Author: তাহের আলমাহদী

  • সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান

    সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান

    ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র দ্বিতীয় উপন্যাস। ‘গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযানে’র মত এটিও লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের মে মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১২তে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    রূপের ফাঁদে

    কায়রো থেকে দু’মাইল দূরে এক বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের এক দিকে বালিয়াড়ি, ছোট ছোট পাহাড়। বাকি তিন দিকে দিগন্ত বিস্তৃত বালুর সমুদ্র।

    এ মাঠ আজ লাখ মানুষের পদভারে কম্পিত। উট, ঘোড়া আর গাধায় চড়ে এসেছে মানুষ। তবে বেশীর ভাগ এসেছে পায়ে হেঁটে। চার পাঁচ দিন থেকে জমা হচ্ছে দর্শক। ভিড়ের চাপে দলিত মথিত হচ্ছে কায়রোর বাজার। সরাইখানায় উপচে পড়া ভিড়।

    এরা এসেছে সরকারী ঘোষণা শুনে। এক হপ্তা পর অনুষ্ঠিত হবে সামরিক মহড়া। মিসরের সেনাবাহিনী ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজী, অসিখেলা সহ বিভিন্ন যুদ্ধের খেলা দেখাবে। অসামরিক লোকও এসব খেলায় অংশ নিতে পারবে।

    এতে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীনর দু’টো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, যারা মিসরের সেনাবাহিনীকে দুর্বল ভাবছে তাদের ভুল ধারণা দূর করা।

    পাঁচ-ছ’ দিন আগে থেকেই লোকজন আসছে। এতে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীন বেজায় খুশী। দর্শক এক লাখ হলে নতুন সেনা ভর্তি হবে পাঁচ হাজার।

    কিন্তু সরকারী এ ঘোষণায় আলী ছিলেন উদ্বিগ্ন।

    ‘মাননীয় সুলতান!’ বললেন তিনি ‘এক লাখ দর্শক হলে এর মধ্যে এক হাজার থাকবে শক্রর গুপ্তচর। মেয়েরা আসছে গ্রাম থেকে। এদের বেশীর ভাগ সুদানী। সুদানী মেয়েরা অত্যন্ত ফর্সা, খ্রিষ্টান মেয়েরা অনায়াসে এদের সাথে মিশে যেতে পারবে।’

    ‘তোমার সমস্যা আমি বুঝতে পারছি আলী। কিন্তু এ মহড়া কেন জরুরী তা তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ। তোমার সংস্থার তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দাও।’

    ‘আমি মেলার বিপক্ষে নই সুলতান। এটা যে খুবই প্রয়োজন তাও বুঝি। আপনাকে উৎকণ্ঠায় ফেলতে চাইনি, মেলা কি সমস্যা নিয়ে আসছে তাই শুধু বলতে চাইছি।’

    কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিনি পতিতালয়। এ সব পতিতালয় রাতভর খদ্দেরে পূর্ণ থাকে।

    শহরের বাইরেও কিছু তাঁবু টানানো হয়েছে। আমার ব্রাঞ্চের রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু তাঁবু রয়েছে ভাসমান পতিতাদের। সারারাত নাচগানের আসর জমজমাট থাকে ওসব তাঁবুতে। আগামীকাল মেলা, এর মধ্যে নর্তকীরা দর্শকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রচুর অর্থ।’

    ‘মেলা শেষ হয়ে গেলে এসব থাকবে না। এর ওপর আমি কোন বিধি নিষেধ আরোপ করতে চাই না। মিসরীদের নৈতিক চরিত্র উন্নত নয়। দীর্ঘ দিনের সাংস্কৃতিক আবহ দু’একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

    সেনাবাহিনীতে লোক বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য আমার প্রচুর দর্শক প্রয়োজন। তুমি জান আলী আমাদের অনেক সৈন্য প্রয়োজন। সামরিক এবং বেসামরিক অফিসারদের বৈঠকেও আমি এ দিকটা ব্যাখ্যা করেছি।’

    ‘মিটিংয়ে আপনি বড় বেশী খোলামেলা আলোচনা করেছেন। আপনাকে এ থেকে বিরত রাখতে পারিনি সুলতান। আমার গোয়েন্দা দৃষ্টি বলছে, এসব অফিসারদের অর্ধেক আপনার অনুগত নয়। আপনি জানেন, অনেকে আপনাকে সইতে পারছে না। কারো কারো আন্তরিকতা ও আনুগত্য রয়েছে সুদানীদের সাথে। আমি এদের পেছনে একজন করে টিকটিকি লাগিয়ে রেখেছি। ওরা নিয়মিত আমাকে খোঁজ খবর দিচ্ছে।’

    ‘কোন বিপজ্জনক তৎপরত কি ধরা পড়েছে?’

    ‘না, তবে পদমর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এরা রাতে সন্দেহজনক তাঁবু এবং মিনি পতিতালয় গুলোতে যাতায়াত করে। দু’জন তো দুটি নর্তকীকে বাঁদীতেই নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে আমার মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দু’টি পাল তোলা নৌকা, দশদিন আগে নৌকাগুলো রোম উপসাগরের পাড়ে দেখা গেছে।’

    ‘এ তে বিশেষ এমন কি রয়েছে?’

    ‘স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ওদের তৎপরতা রহস্যজনক। ওখানকার সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার পর দু’জন করে বিভিন্ন স্থানে পাহারা বসানো হয়েছে। খ্রিষ্টানরা যেন আকস্মিক আক্রমণ করতে না পারে এজন্য গোয়েন্দা বিভাগের কিছু লোক স্থানীয় বেদুঈন এবং জেলেদের পোশাকে ওখানে ঘোরাফিরা করছে। কিন্তু বিশাল সাগর সৈকতে নজর রাখার জন্য এদের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। বিশেষ করে যেখানে যেখানে সাগর থেকে চ্যানেল ভেতরে ঢুকেছে সে এলাকায় নজর রাখা ওদের পক্ষে সম্ভব নয়।

    দিন দশেক আগে একটা চ্যানেল থেকে দু’টো পাল তোলা নৌকাকে বেরোতে দেখা গেছে। হয়ত রাতে এসেছিল। দু’জন দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার ছুটে গিয়েও ওদের ধরতে পারেনি, নৌকা দু’টো তখন সাগরের বেশ ভেতরে চলে গেছে। ওগুলো জেলে নৌকা ছিল না। নিশ্চয়ই সাগরের ওপার থেকে এসেছিল।

    আমাদের সৈন্যরা পাহাড়ের ফাঁক ফোঁকড় এবং মরুভূমির বিশাল এলাকা খুঁজেও কিছুই পায়নি। নৌকায় কারা ছিল, কেন এসেছে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছি না। দিগন্ত বিস্তৃত বিশাল মরুভূমিতে ওদের খুঁজে বের করা কেবল কঠিন নয়, অসম্ভবও।’

    আলী আরও বলল, ‘দেড়মাস থেকে মেলার সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। এ খবর ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছা বিচিত্র নয়। সংবাদ পেলে ওদের গোয়েন্দারা আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কায়রোতে মেয়ে কেনা বেচা শুরু হয়েছে। ক্রেতারা সাধারণ নাগরিক নয়। ব্যবসায়ী, প্রশাসক এবং সেনাবাহিনীর পদস্থ ব্যক্তি ও পতিতাদের দালালরা এসব মেয়েদের কিনছে। এদের মধ্যে খ্রিষ্টান মেয়েও থাকতে পারে, শুধু পারে না, আমি মনে করি অবশ্যই আছে।’

    এসব সংবাদে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীন উৎকষ্ঠিত হলেন না।

    রোম উপসাগরের পাড়ে খ্রিষ্টানশক্তি পরাজিত হয়েছে বছর খানেক আগে। ওখানে এখন কোন ছাউনিও নেই। আলী বিন সুফিয়া কিছু গোয়েন্দা নিয়োগ করলেও ওরা তেমন শক্তিশালী নয়। সংবাদ এসেছে খ্রিষ্টান গুপ্তচরে ছেয়ে গেছে মিসর।

    মিসরের ব্যাপারে তাদের পরিকল্পনা এখনও জনা যায়নি। শোনা যায় বাগদাদ এবং দামেশকে ওদের তৎপরতা বেশী। বিশেষ করে সিরিয়ার মুসলিম আমীর-ওমরারা মদ আর বিলাসিতায় ডুবে যাচ্ছে।

    রোম উপসাগরের যুদ্ধের সময় নুরুদ্দীন জঙ্গী খ্রিষ্টান রাজ্য আক্রমণ করে ওদের সন্ধি করতে বাধ্য করেছিলেন। বন্দীদের মধ্যে রিনান্ট নামের একজন সেনাপতিও ছিল। ওরা মুসলমান বন্দীদের হত্যা করায় জঙ্গী ওদের ছাড়েননি।

    সুলতান জঙ্গী মুসলিম বিশ্বকে সফল নেতৃত্ব দিচ্ছেন সালাহুদ্দীনের এ বিশ্বাস ছিল। তবুও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী তৈরি করছিলেন। তিনি চাইছিলেন মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার সাথে সাথে আরবকে মুক্ত করতে। একই সময়ে আক্রমণ এবং মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট রাখার জন্য প্রচুর সৈন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেমত নতুন সেনা ভর্তি হচ্ছিল না।

    পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে তার বিরোধী শক্তি ছিল প্রবল, আনুগত্য ছিল যৎসামান্য। নূরুদ্দিন জঙ্গী কিছু সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। মিসরের একটি ফৌজ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো দেখেনি। সুলতান সালাহুদ্দীনকেও দেখেনি ওরা। এজন্যই মেলার আয়োজন।

    মেলার সময় অফিসার এবং কমান্ডারদের তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মেশার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন ওদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে। ‘ওদের বোঝাতে হবে আমরা সবাই এক। সবাই চাই আল্লাহ এবং রসূলের দ্বীনকে প্রসারিত করে এ ভূখন্ডকে খ্ৰীষ্টানদের আধিপত্য মুক্ত করতে।’

    মেলার আগের দিন আলী সালাহুদ্দীন আয়ুবীকে বললেন, ‘সুলতান, শক্রর গুপ্তচরদের আমি ভয় পাই। যেসব মুসলিম ভায়েরা বেঈমানদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে, তাদের নিয়ে আমি শঙ্কিত। এদের ঈমান দৃঢ় হলে চরদের সমগ্র বাহিনীও আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারত না। নবাগতা নর্তকীদের দিয়ে ওরা জাল ফেলছে। এরপরও আমার বাহিনী দিনরাত তৎপর রয়েছে।’

    ‘তোমার লোকদের বলো দুশমনের চরদের হত্যা না করে জীবিত গ্রেফতার করতে। ওরা শক্রর জন্য চোখ এবং কান কিন্তু আমাদের জন্য ভাষা। ওদের কাছ থেকে তুমি সব খবর সংগ্রহ করতে পারবে।’

    ○ ○ ○

    মেলার দিনের সূর্য হেসে উঠল পূর্বকাশে। বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠের তিন দিকে দর্শকদের উপচেপড়া ভীড়! পাহাড়ের দিক সংরক্ষিত ওদিকে কাউকে যেতে দেয়া হয়নি।

    বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। বন্যার উত্তাল সাগরের গর্জনের ন্যায় ভেসে এল অশ্বক্ষুরধ্বনি। ধুলোয় ভরে গেল আকাশ। দু’হাজারের ও বেশী ঘোড়া ছুটে আসছে তীব্র গতিতে।

    প্রথম ঘোড়া মাঠে প্রবেশ করল। আরোহী সালাহুদ্দীন আয়ুবী। তার দু’পাশে পতাকাবাহী। পেছনে অশ্বারোহী দল।

    ঘোড়ার পিঠ রঙীন চাদরে সুশোভিত। আরোহীদের হাতে বর্শা। কোমরে তরবারী। বর্শার মাথায় রঙীন কাপড়ের তৈরী ছোট ছোট ঝাণ্ডা। মাঠে প্রবেশ করেই গতি কমিয়ে দিলেন তিনি। দুলকি চালে এগুচ্ছে ঘোড়াগুলো। সওয়াররা বসে আছে মাথা উঁচিয়ে। টানটান বুক। চোখে মুখে দৃঢ়তা।

    নিস্তব্ধতা নেমে এল দর্শকদের মাঝে। অর্ধবৃত্তের মত দাঁড়িয়ে আছে দর্শক। পেছনের দর্শকরা ঘোড়ার পিঠে। তারও পেছনে উট। প্রতিটাতে দুতিন জন করে দর্শক।

    দাঁড়ানো দর্শকদের সামনে একখানে চাদোয়া টানানো, নীচে চেয়ার পাতা। ব্যবসায়ী, বড় বড় অফিসার এবং শহরের সন্মানিত ব্যক্তিরা বসেছেন ওখানে।

    প্রথম সারিতে বসে আছেন কায়রোর মসজিদ সমূহের ইমামগণ। এরা সকলেই সালাহুদ্দীনের শ্রদ্ধাভাজন। ধর্মীয় গুরু এবং আলেমদের তিনি বেশী ভালবাসেন। অনুমতি ছাড়া তাদের মজলিসে বসেন না।

    সালাহুদ্দীন আইয়ুবী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নির্দেশ দিয়েছিলেন সবার সাথে সুস্পর্ক গড়ে তুলতে।

    এ সচিবদেরই একজন খাদেমুদ্দীন আল বারক। আলী বিন সুফিয়ানের পর সুলতানের সবচে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনীর সকল গোপন পরিকল্পনা তিনি জানেন। যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং ম্যাপ থাকত তার কাছে।

    খাদেমুদ্দীন আল বারকের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দেহে আরবীয় সৌষ্ঠব। সপ্রতিভ, সুপুরুষ।

    মঞ্চে তার পাশে এসে বসল একটা মেয়ে। অপূর্ব সুন্দরী। যুবতীর সাথে এসেছে একজন পুরুষ। বয়স ষাটেরও বেশী। ধনাট্য ব্যবসায়ী মনে হচ্ছে তাকে।

    সামনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে যুবতী বার বার তাকাচ্ছে আল বারকের দিকে। কয়েকবারই মেয়েটার তাকানো লক্ষ্য করলেন আল বারক।

    যুবতী আবার তাকাল তার দিকে। চোখাচোখি হতেই সুন্দর করে হাসল মেয়েটা। এভাবে বেশ কবার চোখাচোখি হল তাদের, প্রতিবারই মিষ্টি মধুর হাসি উপহার পেল আল বারক। আবারও হাসতে যাবে, সাথে আসা বুড়োর দৃষ্টি পড়ল তার ওপর, সাথে সাথে ঠোঁট থেকে হাসি উবে গেল মেয়েটার।

    দর্শকদের সামনে দিয়ে পেরিয়ে গেল ঘোড়সওয়াররা। এগিয়ে আসছে উষ্ট্রারোহী বাহিনী।

    উটগুলোকে সাজানো হয়েছে রঙবেরঙের কাপড় দিয়ে। বাঁকানো ঘাড়ের শীর্ষে গর্বোদ্ধত মাথা। আরোহীদের হাতে দীর্ঘ বাটঅলা বল্লম। ফলার খানিক নীচে তিন ফিট চওড়া এবং দেড় ফিট লম্বা রঙিন কাপড় বাধা। উড়ছে বাতাসে। সওয়ারের কাঁধে ধনু। উটের পালানে বাধা রঙীন তুনীর। আরোহীদের দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। হাবভাবে রাজসিক ভাব।

    উটগুলো দেখতে দর্শকদের উটের মত হলেও ওগুলো যে সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত ওদের ছন্দোবদ্ধ গতি দেখলেই তা বোঝা যায়। চলনে এমন একটা রাজসিক ভাব, মনে হয় ভিনগ্রহ থেকে এসেছে।

    আল বারক আবার চাইল মেয়েটার দিকে। চোখে চোখ রাখল। মেয়েটার চোখ থেকে একই সাথে ঝরে পড়ছে আত্মনিবেদন, আকুতি আর নীরব আমন্ত্রণ।

    বিদ্যুৎ খেলে গেল আল বারকের শরীরে। যুবতীর ঠোঁটে ভেসে উঠল লাজনম্র হাসি। বুড়োর দিকে দৃষ্টি পড়তেই যুবতীর চোখে মুখে নেমে এল একরাশ ঘৃণা ও হতাশা।

    আল বারকের স্ত্রী চার সন্তানের জননী। এ মুহুর্তে স্ত্রীর কথা ভুলে গেলেন তিনি। তাকিয়ে রইলেন যুবতীর দিকে। বাতাসে উড়ছে সুন্দরীর রেশমী নেকাব। কখনও এসে পাশে বসা আল বারকের বুকে, মুখে লুটিয়ে পড়ছে।

    আল বারক আলতো হাতে সরিয়ে দিল সে কাপড়। লজ্জা জড়ানো কণ্ঠে ক্ষমা চাইল যুবতী।

    মৃদু হাসলেন তিনি। বললেন, ‘আরে না না, এতে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে?’

    উষ্ট্রারোহীদের পেছনে পদাতিক ফৌজ, তীরন্দাজ আর তলোয়ারবাজ। পরনে সামরিক পোশাক। অপলক চোখে তাকিয়ে রইল দর্শকরা। প্রতিটি সৈনিকই সুঠাম দেহী। চেহারায় আনন্দের দ্যুতি।

    গর্বোদ্ধত বুকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। দর্শকরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুলতান সালাহুদ্দীন তা-ই চাইছিলেন।

    সবশেষে এল সাজোয়া বাহিনী। প্রতিটি কামানের পেছনে একটা করে এক্কাগাড়ী। গাড়ীতে বড় বড় পাথর এবং বিভিন্ন সাইজের ভাঁড়। ভাঁড়ে দাহ্য পদার্থ।

    ধীরে ধীরে দর্শকদের সামনে দিয়ে এরাও পেরিয়ে গেল।

    দীর্ঘ চক্কর দিয়ে ফিরে এলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। সামনে পতাকাবাহী। ডানে, বায়ে এবং পেছনে গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা। তারও পেছনে সেনাপতিদের ঘোড়া।

    সুলতান ঘোড়া থামালেন। দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে সালাম দিয়ে লাফিয়ে নামলেন ঘোড়া থেকে। চলে গেলেন চাঁদোয়ার নীচে।

    দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাল সবাই। তিনি সালামের জবাব দিয়ে নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসলেন।

    আরোহী এবং পদাতিক সৈন্যরা পাহাড়ের আড়াল হয়ে গেল। ফাঁকা ময়দান। এক দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার মাঠে প্ররেশ করল। একহাতে ঘোড়ার বলগা, অন্যহাতে উটের রশি। মধ্য মাঠে এসে ঘোড়ার পিঠে দাড়িয়ে পড়ল সওয়ার। লাগাম ছেড়ে দিয়ে উটের পিঠে লাফিয়ে পড়ল। আবার ফিরে এল চলমান অশ্বের পিঠে। এরপর লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। ঘোড়া এবং উটের সাথে ছুটে গেল কিছুদূর। আবার একলাফে ছুটন্ত ঘোড়ায় উঠে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল।

    সামান্য ডানে ঝুঁকলেন আল বারক। তার মুখ এবং মেয়েটার মাথার-মাঝে দু’তিন ইঞ্চি ফাঁক। মেয়েটা তাকে দেখল। হাসল আল বারক। মেয়েটার ঠোঁটে এখনও সেই লাজুক হাসি। এদিকে চোখ পড়তেই কপাল কুঞ্চিত হল বৃদ্ধের। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে।

    সহসা পাহাড়ের দিক থেকে উড়ে এল কতগুলো মাটির পাতিল। মাঠে পড়ে ফেটে গেল পাতিলগুলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তরল পদার্থ। আশপাশে একশ গজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। ভিজে গেল মাঠ।

    পাহাড়ের টিলায় ভেসে উঠল দু’জন তীরন্দাজের মুখ। আগুনের ফিতা বাঁধা তীর ছুঁড়ল ওরা। ভেজা মাঠে তীর পড়তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন।

    একদিক থেকে ছুটে এল চারজন ঘোড়সওয়ার। আগুনের কাছে এসেও থামল না। তীব্র গতিতে ছুটিয়ে দিল ঘোড়া। অবাক দর্শকরা ভাবল ওরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু আগুনের ভেতর দিয়ে ছুটতে দেখা গেল ওদের। বেরিয়ে গেল অপর দিক দিয়ে।

    দর্শকদের শ্লোগানে প্রকম্পিত হল আকাশ বাতাস। দু’জন আরোহীর কাপড়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। ছুটন্ত ঘোড়া থেকে লাফ দিল ওরা। গড়গড়ি খেল বালিতে। নিবে গেল পোশাকের আগুন।

    আল বারকের দৃষ্টি মাঠে নেই। বার বার তাকাচ্ছে যুবতীর দিকে। প্রতিবারই মিষ্টি করে হাসছে তরুণী। আবার দৃষ্টি ফিরে যাচ্ছে বুড়োর দিকে। হঠাৎ বৃদ্ধ উঠে গেলেন। মেয়েটাকে তার সাথে আসতে দেখেছে আল বারক।

    ‘তোমার আব্বা উঠে গেলেন কেন?’ প্রশ্ন করলেন তিনি।

    ‘বৃদ্ধ আমার পিতা নন, স্বামী।’

    ‘স্বামী!’ আল বারকের কণ্ঠে অবাক বিস্ময়। ‘তোমার পিতা মাতাই, কি এ বিয়ে দিয়েছেন!’

    ‘সে আমায় কিনে নিয়েছে।’ যুবতীর নিঃস্পৃহ জবাব।

    ‘গেলেন কোথায়?

    ‘আপনার সাথে আমার চোখাচোখির ব্যাপারটা আঁচ করে রাগ করে চলে গেছেন। সন্দেহ করছেন আপনার জন্য আমার আকর্ষণ রয়েছে।’

    ‘সত্যিই কি আমার জন্য তোমার আকর্ষণ রয়েছে।’

    লজ্জায় নত হল যুবতীর চোখ। ঠোঁটে বিনম্র হাসি। অক্ষুট কণ্ঠে বলল, ‘ওকে আর সহ্য করতে পারছি না। হাঁফিয়ে উঠেছি। কেউ আমাকে এ বুড়োর হাত থেকে মুক্তি না দিলে আত্মহত্যাই করব।’

    মাঠে সৈন্যরা সেনা নৈপূণ্য দেখাচ্ছিল। মল্লযুদ্ধ, অসি চালনা, তীরন্দাজী। দর্শক এ ধরনের ক্রীড়ানৈপুন্য আগে কখনও দেখেনি।

    এতকাল এরা দেখে এসেছে সুদানীদের। ওদের হামবড়া ভাবের অন্ত ছিল না। অফিসাররা রাস্তায় বেরুত রাজ রাজড়ার মত। তাদের সঙ্গী সেনাদল গ্রামবাসীদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত।

    চারণভূমি থেকে ওরা লুট করত পশু। কারো কাছে ভাল জাতের উট বা ঘোড়া থাকলে জোর করে নিয়ে যেত। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, সেনাবাহিনী তৈরী করা হয় জনগণের উপর অত্যাচার করার জন্য।

    কিন্তু সালাহুদ্দীন আয়ূবীর ফৌজ ছিল তারচে ভিন্ন। যারা মহড়ায় অংশ নেয়নি, তাদের ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল দর্শকদের মাঝে। জনসাধারণকে বোঝাতে হবে ফৌজ তাদেরই ভাই এবং বন্ধু। শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী সৈনিকদের জন্য ছিল কঠোর শাস্তি।

    আল বারক মহড়া সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়লেন। ভুলে গেলেন সুলতানের নির্দেশ। যুবতী তার বিবেকের উপর চেপে বসল।

    আল বারক তাকে ভাললাগার কথা বললেন। আহ্বানে সাড়া দিল যুবতী। একান্তে দেখা করতে বললেন আল বারক।

    যুবতী বলল, ‘আমি তার কেনা বাঁদি ও আমাকে বন্দী করে রেখেছে। তার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে আসা সম্ভব নয়। ঘরে তার চারজন স্ত্রী। ওরাও আমার উপর দৃষ্টি রাখে।’

    স্বীয় পদমর্যাদার কথা ভুলে গেলেন আল বারক। টিনেজারদের মত সাক্ষাতের জন্য বিভিন্ন স্থানের নাম উল্লেখ করতে লাগলেন। একটি স্থান তরুণীর পসন্দ হল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের পোড়োবাড়ী। শহরের বাইরে। ভবঘুরেরাই কেবল ওখানে যায়।

    ‘ঠিক আছে, আমি ওখানে আসতে পারি, যদি আপনি আমাকে ওর হাত থেকে বাঁচানোর ওয়াদা দেন।’

    ‘অবশ্যই। ঐ বুড়োর হাত থেকে তোমাকে মুক্ত করার ওয়াদা করছি আমি।’

    ‘কখন আসব?’

    ‘আজ রাতে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন। কি, আসবে তো?’

    মেয়েটি আবারো সেই সলজ্জ হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা।’

    ○ ○ ○

    কায়রোতে রাত নেমেছে।

    মেলা শেষ হয়েছে দু’দিন আগে। দর্শকরা যে যার বাড়ী ফিরে গেছে। অস্থায়ী পতিতালয়গুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে সরকারী নির্দেশে। সন্দেহজনক পুরুষ ও নারীদের খুঁজছিল গোয়েন্দারা।

    মেলার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। দু’দিনে চার হাজার যুবক সেনা ফৌজে ভর্তি হয়েছে।

    আল বারক চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরনে সাধারণ পোশাক। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলেন কেউ দেখছে কিনা। না, কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই বুঝতে পেরে নিশ্চিন্তে রওনা দিলেন পুরনো সেই ভাঙা বাড়ীর দিকে।

    ঘুমিয়ে পড়েছে মরুভূমি। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে থেকে থেকে ডেকে উঠছে পাহাড়ী শেয়াল। মেয়েটা বলেছিল সে বন্দিনী। সবসময় চোখে চোখে রাখা হয়। তবুও আসবে এ আশায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। আত্মরক্ষার জন্য একটা খঞ্জর সাথে নিয়েছেন।

    নারীর পাগল করা রূপের মোহ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। হৃদয় হয় ভয় শূন্য। আল বারক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হলেও এখন অবিবেচক যুবক।

    ভাঙা বাড়ীটার কাছে একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে, আপাদমস্তক ঢাকা। ছায়াটা মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলেন। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে ঢুকে গেলেন ভেতরে।

    অন্ধকার কক্ষ। পাখা ঝাপটানোর শব্দ হল। হঠাৎ গালে চড় মারল কেউ। সাথে সাথে ভেসে এল চি, চি, শব্দ। বাদুড়। ওরা বড় বড় নখ দিয়ে মুখ আঁচড়ে দেবে ভেবে ভয় পেয়ে বসে পড়লেন তিনি।

    বাদুরগুলো উড়ে বেড়াতে থাকল। ভয় পেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। উড়ন্ত বাদুড়ে ভরে গেল কক্ষ। চি চি শব্দ করতে করতে বেরিয়ে এল বাদুড়গুলোও।

    সতর্ক প্রহরায় থাকা এক বন্দিনী যুবতী কি করে এ ভয়ংকর পোড়োবাড়িতে আসবে এ কথা তিনি একবারও ভাবলেন না। উঠোনে দাঁড়িয়ে ভীত চোখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন।

    কারো পায়ের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। খঞ্জর হাতে তুলে নিলেন তিনি। মাথার উপর বাদুড় উড়ছে, পাখা ঝাপটানোর শব্দ হচ্ছে। আল বারক চাপা কণ্ঠে ডাকলেন, ‘আছেফা।’

    এ নামই তাকে বলেছিল মেয়েটা।

    ‘আপনি এসেছেন!’ আছেফার কণ্ঠ।

    ছুটে এসে আল বারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘শুধু আপনার জন্যই এ ভয়ঙ্কর স্থানে এসেছি। তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। বুড়োকে মদের সাথে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। দেরী হলে জেগে উঠতে পারে।’

    ‘মদের সাথে বিষ মিশাতে পারলে না?’

    ‘আমি কখনও মানুষ হত্যা করিনি। একজন পর-পুরুষের সাথে এভাবে ভয়ঙ্কর স্থানে আসব, তাও কি ভেবেছি কখনও!’

    আল বারক যুবতীকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। হঠাৎ পেছনের পথ আলোময় হয়ে উঠল। তার আগমন পথে জ্বলে উঠল দু’টো মশাল। এক ঝটকায় আছেফাকে পেছনে নিয়ে এলেন তিনি। এরা কি প্রেতাত্মা না মেয়েটার পেছনে এসেছে, ভাবছেন আল বারক।

    গর্জে উঠল একটা কণ্ঠ, ‘দু’টোকেই জবাই করে ফেল।’

    মশাল নিয়ে এগিয়ে এল চারজন বলিষ্ঠ জোয়ান। একজনের হাতে বর্শা, তিনজনের হাতে তরবারী।

    মশাল মাটিতে পুঁতে দিল ওরা। আলোয় ভরে গেল আঙ্গিনা। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত ওরা আল বারকের চার পাশে ঘুরতে লাগল। আছেফা তার পেছনে।

    বারান্দা থেকে শব্দ এল, ‘পেয়েছ? জীবন্ত ছেড়ো না কাউকে।’ মেয়েটার বুড়ো স্বামীর আওয়াজ।

    আছেফা পেছন থেকে সামনে চলে এল। ঘৃণা এবং ক্ৰোধকম্পিত কষ্ঠে বলল, ‘এসো, এগিয়ে এসো। খুন কর আমাকে। এ জীবনে আমার আর বাঁচার সাধ নাই। বুড়ো পাঠা, টাকার জোরে আমার জীবনটা তুমি ধ্বংস করে দিয়েছ।’

    আমার এ যৌবনকে তুমি কি দিতে পেরেছ? আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আল্লার গজব পড়বে তোমার ওপর। তোমাকে আমি ঘৃণা করি। আমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি। ওকে আমিই এখানে আসতে বলেছি…’

    আছেফা ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে।

    ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন সশস্ত্র লোক। বর্শাধারী এগোল আছেফার দিকে। বর্শার ফলা তার পেটে ঠেকিয়ে বলল, ‘ছিনাল মাগী, আর একটা কথাও না। মরবি তো মর, তার আগে ফলাটা দেখে নে। জাহান্নামে তোর নাগরকে আগে পাঠাব, না তোকে?’

    এক ঝটকায় বর্শা ধরে ফেলল আছেফা। হ্যাচক টানে কেড়ে নিয়ে আল বারক থেকে সরে গেল খানিক। এরপর বর্শা উঁচিয়ে বলল, ‘আয়, এগিয়ে আয়। দেখি একে আমার আগে কে হত্যা করে।’

    ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তম্ভিত। আল বারক খঞ্জর হাতে এগিয়ে এলেন। মেয়েটা বর্শাধারীকে আক্রমণ করল। পিছিয়ে গেল সে।

    তার সঙ্গীরা আল বারককে আক্রমণ না করে আক্রমণের পাঁয়তারা করছিল। ইচ্ছে করলে ওরা অনেক আগেই তাকে হত্যা করতে পারত।

    আছেফা ধমকাচ্ছিল। আঘাত করছিল লক্ষ্যহীন ভাবে।

    আল বারক এক ব্যক্তিকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করল। তার পেছনে ছুটে এল দু’জন, একলাফে আছেফা ওদের পেছনে চলে গেল। ইচ্ছে করলে বর্শা মেরে ওদের ঘায়েল করতে পারত আছেফা। কিন্তু খঞ্জর দিয়ে তরবারীর মোকাবিলা করা যায় না।

    বুড়ো একদিকে দাঁড়িয়ে হস্বিতম্বি করছিল। আক্রমণ প্রতি আক্রমণে কেটে গেল কিছু সময়। কেউ আহত হয়নি। আঁচড়ও লাগেনি কারও গায়ে। এবার বৃদ্ধ বলল, ‘থামো!’

    যুদ্ধ থেমে গেল।

    ‘এমন বিশ্বাসঘাতিনীকে আমি আর বাড়ীতে নেবো না। জানতাম না ও এত দজ্জাল। জোর করে নিয়ে গেলে কখন আমাকে মেরেই ফেলবে!’

    ‘আমি তোমাকে এর মূল্য পরিশোধ করে দেব।’ আল বারক বলল, ‘তুমি একে কত দিয়ে কিনেছিলে?’

    ‘আমার সম্পদের অভাব নেই। ওকে আমি আপনাকে উপহার দিলাম। আমি অবাক হচ্ছি আপনার প্রতি ওর ভালবাসা দেখে। কি পরিমাণ ভালবাসা থাকলে নিজের জীবন বিপন্ন করে এতগুলো লোকের মোকাবিলা করতে পারে একবার ভেবে দেখেছেন? ও যুদ্ধবাজ বংশের মেয়ে তো, এক যোদ্ধার ঘরেই ওকে মানাবে ভাল।’

    তাছাড়া আপনি প্রশাসনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। সুলতানের এক অনুরাগী হিসাবে আপনাকে আমি অসন্তুষ্ট করতে পারি না। আমি ব্যবসায়ী মানুষ, সারাদিন ব্যস্ত থাকি বাইরে। আর এ বুড়ো বয়সে ওর মত যুবতী ঘরে রাখাও বিপজ্জনক। আমি ওকে তালাক দিলাম। এবার ও আপনার জন্য বৈধ।’

    করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল সে। অস্ত্রধারীদের দিকে ফিরে বলল, ‘এই চল, খবরদার, এই ঘটনা কাউকে বলবি না।’

    লোকগুলো মশাল তুলে ফিরে গেল। অবাক চোখে ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন আল বারক। তার পায়ের নীচে মাটি কাঁপতে লাগল। কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল বৃদ্ধ তার সাথে প্রতারণা করেছে। পথে লুকিয়ে থেকে দু’জনকেই হত্যা করবে।

    আছেফার হাত থেকে বর্শা হাতে নিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন ভাঙা বাড়ি থেকে।

    আছেফার হাত ধরে দ্রুত হাঁটছিলেন তিনি। বারবার তাকাচ্ছিলেন ডানে, বাঁয়ে, পেছনে। সামান্য শব্দেও চমকে উঠে থেমে যেতেন। অন্ধকারেই চাইতেন এদিক ওদিক। ধীরে ধীরে হাঁটা ধরতেন আবার। শহরে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

    আছেফা থামল। তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনি কি আমায় বিশ্বাস করেন!’

    আল বারক তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগের কারণে কিছুই বলতে পারলেন না।

    এ ঘটনার পর দেখা গেল আল বারক নয়, মেয়েটাই তাকে কিনে নিয়েছে। তার মনে হচ্ছিল আছেফা তার জন্য পাগল। শুধু তার জন্য এতগুলো লোকের সাথে একা লড়াই করেছে আছেফা।

    আছেফা তার রূপের জালে আটকে ফেলেছে তাকে। আল বারক স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলল। সে স্থান দখল করল আছেফা।

    সে যুগে মেয়েদের ক্রয় বিক্রয় চলত। স্ত্রীর কোন মর্যাদা ছিল না। চারজন স্ত্রী রাখাকে পুরুষের অধিকার মনে করা হত। বিত্তশালীরা পুষত রক্ষিতা। মুসলমান ওমরাদেরকে নারীরাই ধ্বংস করেছে। স্বামীদের সন্তুষ্ট করার জন্য স্ত্রীরাই সুন্দরী মেয়ে খুঁজে এনে স্বামীদের উপহার দিত।

    আল বারক আছেফাকে নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। সবাই তখন ঘুমিয়ে। সকালে স্ত্রী দেখল স্বামীর বিছানায় এক অনিন্দ্যসুন্দর যুবতী। এতে সে মোটেই অসন্তুষ্ট হলো না। ভাবল, এমন দু’একজন স্ত্রী বা রক্ষিতা পোষার ক্ষমতা তার স্বামীর রয়েছে। ও আসায় তার কিছুটা দায়িত্ব বরং কমবে। কিন্তু একবারও ভাবল না, আজ থেকে তার ভালবাসা হারিয়ে গেছে।

    একদিন যে মেয়েরা পুরুষের সাথে কাফেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এখন তারা শুধুমাত্র পুরুষের ভোগের সামগ্রী—এ কথা ভাবতে কষ্ট হতো সালাহুদ্দীনর। এতে সমাজের অর্ধেক শক্তিই নিঃশেষ হয়নি বরং এরা জাতির পৌরুষকেও নিঃশেষ করে দিয়েছে।

    ব্যবসায়ী পণ্যের মত মেয়েদের নিলাম হত। অপহরণ, খুন ধর্ষণের ঘটনা ঘটত অহরহ। তিনি নারীদের এ অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইলেন।

    নারীকে পুরুষের এবং পুরুষকে নারীর এই অনাহুত মোহ থেকে মুক্ত করতে তিনি ‘এক স্বামীর এক স্ত্রী’ শ্লোগান তোললেন। তিনি জানতেন দু’তিনজন স্ত্রী এবং রক্ষিতার মালিক আমীর ওমরারা সরাসরি এর বিরোধিতা করবে। কারণ, এরাই ছিল নারীদের প্রধান খরিদ্দার।

    নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সালাহুদ্দীন কুমারী মেয়েদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করতে চাইলেন। এতে হারেমগুলো শূন্য হবে। নারী ফিরে পাবে মর্যাদা। কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না আসা পর্যন্ত তা সম্ভব ছিল না।

    সমাজে তার শত্রুর পরিমাণ ছিল যথেষ্ট। তিনি জানতেন, বিশ্বাসঘাতকের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি জানতেন না তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী, রাষ্ট্রীয় এবং সামরিক গোপন পরিকল্পনার রক্ষক আল বারকও এক রূপসীর ফাঁদে পড়েছেন। প্রেমের অভিনয় দিয়ে যে রূপসী তাকে আপন কর্তব্য ভুলিয়ে দিচ্ছিল।

    ○ ○ ○

  • সুবাক দুর্গে আক্রমণ

    সুবাক দুর্গে আক্রমণ

    ‘সুবাক দুর্গে আক্রমণ’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র তৃতীয় উপন্যাস। সিরিজের প্রথম দু’টি উপন্যাসের মত এটিও লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১২তে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    এই সিরিজের পূর্বের দুটি গ্রন্থের মত এটিও ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    বিষের ছোঁয়া

    কায়রোর উপশহরের এক মসজিদ। একদিন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে শহরতলীর সে মসজিদের কাছে এসে থামল আটজন অশ্বারোহী। মসজিদ থেকে সামান্য দূরে এক সরাইখানার ফটকে এসে ঘোড়া থেকে নামল ওরা। ঘোড়াগুলো তুলে দিল সরাইখানার লোকজনের হাতে। তারপর দু’জন দু’জন করে চারটে দলে ভাগ হয়ে ওরা মসজিদের চারদিকটা ভাল করে ঘুরে দেখল।

    এশার নামাজের আযান হল। ওরা একে একে এসে প্রবেশ করল মসজিদে। প্রথম সারিতে নামাজ পড়ল চারজন, চারজন দাঁড়াল মসজিদের ভিতরের সর্বশেষ কাতারে।

    নামাজ শেষ হল, মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন ইমাম সাহেব। লোকজন প্রতিদিনের মত আজও ইমাম সাহেবের ওয়াজ শোনার জন্য যে যার জায়গায় বসে পড়ল।

    ওয়াজ শুরু করলেন ইমাম সাহেব। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ‘ইমাম সাহেব! আল্লাহ আপনার জ্ঞানের আলো আরও বাড়িয়ে দিক। আপনার খ্যাতি শুনে আমরা আটজন অনেক দূর থেকে এসেছি। সমস্যা মনে না করলে জিহাদের বিষয়ে কিছু বলুন। জিহাদের তাৎপর্য আমরা বুঝি না। লোকজন বলছে আমাদের নাকি জিহাদের ভুল অর্থ বুঝানো হয়েছে।’

    ‘আমরা জিহাদ সম্পর্কে আপনার বয়ান শুনতে চাই।’ সাতটি কণ্ঠ একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হল।

    একজন বলল, ‘এ হচ্ছে সময়ের দাবী। আমাদের জিহাদের ভুল ব্যাখ্যা শোনানো হয়েছে। আমরা সঠিক অর্থ জানতে চাই।’

    ‘কোরআনের নির্দেশ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘কোরানের বাণী মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া আমার দায়িত্ব। একবার নয়, হাজার বার আমি আপনাদের কাছে জিহাদের তাৎপর্য তুলে ধরতে প্রস্তুত। জিহাদের অর্থ অন্যের জমি দখল করা বা কারও গলা কাটা নয়। হত্যা, মারামারি বা খুনাখুনিও জিহাদ নয়।’ তিনি কোরানের আয়াত পড়ে বললেন, ‘এ আমার কথা নায়, খোদার কালাম। সর্বোত্তম জেহাদ হচ্ছে নিজের নফস বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করা। তাইতো আমি বলি, পাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই হচ্ছে আসল জিহাদ। তোমরা শোননি, ইসলাম তরবারীর জোরে নয়, প্রেম এবং ভালবাসা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জিহাদের অর্থ বলদে গেছে। এর অর্থ পরিবর্তন করেছে ক্ষমতালোভীরা। খ্রিষ্টানরা অন্যের দেশ দখল করাকে ধর্মযুদ্ধ বলে। মুসলমানও একই উদ্দেশ্যে লড়াই ও ঝগড়া করাকে জিহাদ বলে। আর এসব কথা বলে ক্ষমতাসীন শাসকরা। তারা এসব বলে তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। মানুষকে ধর্মের কথা বলে যুদ্ধে লিপ্ত করে রাজা বাদশারা। এতে রাজাদের শাসন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের।’

    ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবীও কি মানুষকে অন্যায়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছেন?’ প্রশ্ন করল একজন।

    ‘না! তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হোক। বড়রা তাকে যা বলেছে, আন্তরিকতার সাথে তাই তিনি পালন করছেন। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে তার মনে ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে। ভেবে দেখো—খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়! দু’জন নবীর কথাইতো এক। হযরত ঈসা (আ.) প্রেম ভালবাসার কথা বলেছেন। আমাদের নবীও মানুষকে ভালবাসতে বলেছেন। তাহলে এসব যুদ্ধ বিগ্রহ এল কোত্থেকে! আল্লাহর জমিনে যারা নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করে মানুষকে গোলামে পরিণত করতে চায় এসব তাদের আবিষ্কার।

    আমি মিসরের সম্মানিত আমীরের কাছে যাব। তাঁকে বোঝাব জিহাদের সত্যিকার তাৎপর্য। অশিক্ষা এবং অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে তিনি যা করছেন এ হচ্ছে সত্যিকারের জিহাদ। খোতবা থেকে খলিফার নাম মুছে তিনি বড় জিহাদ করেছেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। শিশুদেরকে খোদার নামে যুদ্ধবিগ্রহ শেখানো হচ্ছে। এদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তীর  ও তরবারী। এ তীর ও তরবারী ওরা কোথায় ব্যবহার করবে? অবশ্যই কিছু মানুষ দেখিয়ে বলতে হবে, এরা তোমাদের শত্রু। এদের নিশ্চিহ্ন কর।’

    ইমাম সাহেবের কণ্ঠে ছিল অবর্ণনীয় আকর্ষণ। যাদুগ্রস্তের মত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল শ্রোতারা। তিনি আবার শুরু করলেন, ‘তোমাদের শিশুদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। তাদের সাথে তোমরাও আগুনে পুড়বে। তোমরাই ওদেরকে পাপের পথে নিক্ষেপ করেছ। সেনাপিত এবং সম্রাটগণ তোমাদের স্বর্গে নিয়ে যেতে পারবে না। শুধু দ্বীন ইসলামের প্রদীপধারী ইমাম এবং আলেমরাই স্বর্গ দিতে পারবে। সমগ্র জীবন নামাজ পড়লে এবং ভাল কাজ করলেও মানুষের রক্তে রঙ্গীন হাত দোজখে নিক্ষিপ্ত হবে।

    তোমরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত প্রদান কর। কোষাগার হল সরকারের, সরকার গরীব নয়। যাকাত হল গরীবের অধিকার। তোমাদের যাকাতের টাকায় অস্ত্র এবং ঘোড়া কিনে মানুষকে হত্যা করা হয়। যাকাত দিয়ে তোমরা বেহেস্তে যাবে, অথচ এখন পাপের ভাগী হচ্ছ। এজন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত দেয়া যাবে না।’

    ইমাম সাহেব আলোচনার বিষয় ঘুরিয়ে বললেন, ‘অনেক কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। বলারও কেউ নেই। মানুষের মধ্যে রয়েছে একটা কামজ রিপু। এ এক জৈবিক সত্বা। তোমাদের কি নারীর প্রয়োজন হয় না! এ হচ্ছে স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা। আল্লাহই এ চাহিদা তৈরী করেছেন। তোমরা এ চাহিদা পূরণ করতে পার। এ জন্যই আল্লাহ একসঙ্গে চার স্ত্রী ঘরে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন স্ত্রীও যদি না রাখতে পার তবে টাকার বিনিময়ে কোন নারীর কাছে আকাঙ্ক্ষা পুরণ করতে যাওয়া অপরাধ হবে কেন? এ চাহিদা এ আকাঙ্ক্ষা তো খোদারই দান। তাই নিরূপায় হলে এ চাহিদা তোমাদেরকে অন্ধগলিতে নিয়ে যায়। এ অপরাধ নয়। এরপরও পাপ থেকে বেঁচে থেকো, কোন পুরুষের কাছে যেয়ো না। কারণ, কোরানে আছে, পুরুষের কাছে যাওয়ার অপরাধে আল্লাহ আ’দ ও সামুদ জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

    এক থেকে চার পর্যন্ত যত ইচ্ছে বিয়ে করতে পার। নিজের স্ত্রী এবং মেয়েদেরকে ঘরের ভেতর রাখবে। আমি দেখেছি যুবতী মেয়েদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শেখানো হচ্ছে ঘোড়সওয়ারী, অসি চালনা এবং আহতকে প্রাথমিক চিকিৎকা দানের পদ্ধতি। ওরা যুদ্ধে যাবে। আহতদের সেবা করবে। প্রয়োজনে যুদ্ধ করবে। ফলে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হবে। এ চরম পাপ। এ পাপ থেকে নিজে বেঁচে থাকো। যারা মসজিদে আসে না তাদেরকেও বলো। খোদার বিধানে কেউ হস্তক্ষেপ করো না। এ বড়ই গুণার কাজ।’

    ইমাম সাহেবের ওয়াজ শেষ হল। বসার স্থান না পেয়ে দাঁড়িয়েই অনেক শ্রোতা। একজন একজন করে হুজুরের সাথে হাত মিলিয়ে সবাই ফিরে যেতে লাগল। কেউবা ঝুঁকে তাঁর হাতে চুমো খেলো।

    ইমাম সাহেবের সামনে দু’জন লোক বসা। পরণে জুব্বা। মাথায় পাগড়ি। জরির কাজ করা রুমালে ঢাকা মুখের একাংশ। কাল দীর্ঘ দাড়ি। পোশাকে আশাকে মধ্যবিত্ত মনে হয়। একজনের এক চোখ হলুদ কাপড়ে বাঁধা। বললেন, হুজুর, ‘জিহাদ সম্পর্কে আরও কিছু বলুন।’

    ‘তোমার চোখে কি হয়েছে?’

    ‘হুজুর, আমার এক চোখ খারাপ।’

    ইমাম সাহেব তাকালেন সঙ্গীর দিকে। সঙ্গীটির মুখের একাংশ রুমালে ঢাকা, ঘন দাড়ি। এ দু’জন ছাড়া সবাই চলে গেছে।

    ‘তোমাদের সন্দেহ এখনও দূর হয়নি?’ মৃদু হেসে ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন।

    ‘সন্দেহ দূর হয়েছে।’ জবাব দিল একচোখা লোকটি। ‘আমরা সম্ভবত আপনাকেই খুঁজছি। মিসরের অর্ধেকটা চষে বেড়িয়েছি আপনার জন্য। আমাদেরকে ভুল ঠিকানা দেয়া হয়েছিল।

    ‘অর্ধেক মিসরেও আমার মত আলেম পাওনি?’

    ‘খুঁজেছি তো আপনাকে। আমরা কি সঠিক স্থানে আসিনি? ওয়াজ শুনে মনে হল আমরা আপনাকেই চাইছি।’

    বাইরের দিকে তাকালেন ইমাম সাহেব। বললেন, ‘আবহাওয়া কেমন হবে জানি না।’

    ‘বৃষ্টি আসবে।’ একচোখা লোকটির জবাব।

    ‘পরিষ্কার আকাশ।’

    ‘আমরা মেঘের সৃষ্টি করব।’ বলেই হেসে উঠল লোকটি। ইমাম সাহেব মুচকি হেসে ফিসফিসিয়ে বললনে, ‘কোত্থেকে এসেছ?’

    ‘এক মাস ছিলাম ইস্কান্দারিয়া, তার আগে সুবাক।’

    ‘মুসলমান?’

    ‘ঘাতক দলের সদস্য। মুসলমান মনে করতে পারেন।’

    এবার দু’জনই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

    ‘আপনাকে ওস্তাদ মানছি।’ লোকটির সঙ্গী বলল। ‘এ যে আপনিই আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না।’

    ‘আপনি ব্যর্থ হতে পারেন না।’

    ‘সাফল্য অত সহজ নয়।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘সালাহুদ্দীনকে তোমরা চেন না। আমি জিহাদ এবং জীবন সম্পর্কে এদের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছি। কিন্তু সালাহুদ্দীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সফল হতে দিচ্ছে না। জিহাদ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য তোমরা কেন আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলে?’

    ‘সুবাক থেকে আমাদের বলা হয়েছে এটিই আপনরার বড় পরিচয়।’ জবাব দিল একচোখা লোকটি। ‘আপনার বলা প্রতিটি কথাই ওখানে আমাদে শোনানো হয়েছে। আমাদের আরও বলা হয়েছে, আপনার ওয়াজে অবশ্যই যৌনতার প্রসঙ্গ থাকবে। এসব শিখতে আপনি নিশ্চয় অনেক পরিশ্রম করেছেন?’

    ‘আমার নাম কি?’

    ‘আপনি কি আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন? সন্দেহ করছেন আমাদের? পরস্পরের পরিচিতির জন্য নাম নয় আমরা বিভিন্ন সংকেত ব্যবহার করি।’

    ‘তোমরা কি জন্য এসেছ?’

    ‘ঘাতকদল কি কাজ করে?’

    ‘আমার কাছে পাঠানো হয়েছে কেন?’

    ‘একটা উষ্ট্রীর জন্য। আপনার কাছে দু’টি রয়েছে। আপনার কাছে আসার কথা ছিল না। আপনি হয়ত খবর পেয়েছেন সালাহুদ্দীনের এক কমাণ্ডার রজবের কাছে সুবাক থেকে তিনটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। একটা ছিল আমাদের জন্য। কিন্তু দু’টাই মারা গেছে। রজবের কাটা মাথা আর সবচে সুন্দরী উষ্ট্রীটা সালাহুদ্দীনের হাতে পৌঁছেছে। ওটাও শেষ।’

    ‘হ্যাঁ, শুনেছি।’ ইমাম সাহেবের বিষন্ন কণ্ঠ। ‘আমাদের অনেক ক্ষতি হল। সালাহুদ্দীনের এক শক্তিশালী সেনাপতি আমাদের হাতে ছিল। তাকেও জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভেতরে চল, এসব কথার জন্য এ স্থান উপযুক্ত নয়।’

    দু’জনই ইমাম সাহেবের সাথে বেরিয়ে গেল।

    ইমাম সাহেব দু’জনকে নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। বাড়িটি পরিচ্ছন্ন। দু’ তিনটা কামরা পেরিয়ে একটি কামরার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ওদের সামনে পুরনো এক দরজা। দরজায় তালা লাগানো। মনে হয় দীর্ঘ দিন থেকে খোলা হয়নি। এক পাশে জানালা। ইমাম সাহেব হাত লাগালেন। জানালার পাল্লা খুলে গেল। সবাই ভেতরে তাকাল। সাজানো গোছানো কক্ষ। দেয়ালে ঝুলছে সোনার তৈরী ক্রুশ। একপাশে যিশুর অন্যদিকে মা মেরীর হাতে আঁকা ছবি। ইমাম সাহেব বললেন, ‘আমার গীর্জা। আমার আশ্রয়।’

    ‘আকস্মিক বিপদ থেকে বাঁচার জন্য কি ব্যবস্থা রেখেছেন?’ একচোখা লোকটি প্রশ্ন করল। ‘ক্রুশ এবং ছবিগুলো এভাবে রাখা ঠিক হয়নি।’

    ‘এখানে আসার দুঃসাহস কেউ করবে না।’ ইমাম সাহেব হেসে বললেন। ‘মুসলমানরা সরল এবং আবেগপ্রবণ জাতি। হালকা যুক্তি আর আবেগময় কথায় ওরা জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। জৈবিক  চাহিদা মানুষের বড় দুর্বলতা। আমি এ দুর্বলতা উস্কে দিচ্ছি। এদের শিখাচ্ছি চারটে বিয়ে করা ফরজ। ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছি অশ্লীলতার দিকে। ধর্মের নামে মুসলমানকে দিয়ে ভাল-মন্দ দুটোই করানো যায়। হাতে কোরান দেখলে এরা মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নেয়। এ আমার সফল অভিজ্ঞতা। আমি এমন একদল লোক তৈরী করব যারা কোরান হাতে নিয়ে মসজিদে বসেই জিহাদ এবং সৎকর্ম নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আমি মেয়েদের ব্যাপারে ওদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করে দিচ্ছি। সালাহুদ্দীন মেয়েদের সামরিক ট্রনিং দিচ্ছে। আমি ওদের ঘরের কোণে বন্দী রেখে অর্ধেক জনশক্তি বেকার করে দেব।’

    ‘সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছাড়ানো উচিৎ।’ একচোখা লোকটির সঙ্গী বলল। ‘সালাহুদ্দীনের বড় সাফল্য, তিনি ফৌজ এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। এ মহূর্তে যদি ঘোষণা করেন, ফিলিস্তিন জয় করব, তবে মিসরের সব মানুষ তার সঙ্গী হবে।’

    ‘তিনি এমন ঘোষণা দেবেন না। কারণ তিনি বুদ্ধিমান। আবেগপ্রবণ লোক তিন পছন্দ করেন না। একশ’ উত্তেজিত জনতার চেয়ে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিককে তিনি বেশী প্রাধান্য দেন। তিনি সস্তা শ্লোগান দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করার লোক নন, তিনি বাস্তববাদী। মানুষকে বাস্তবতা আর প্রশিক্ষণ থেকে দূরে রেখে আবেগপ্রবণ করাই আমাদের কাজ। চিন্তা ছেড়ে দেবে মুলসমানরা। অবাস্তব আবেগে উত্তেজিত হবে। থমকে যাবে শত্রুর নিক্ষিপ্ত প্রথম তীর দেখে। আবেগ ছাড়া ওদের সব কিছুই আমরা নিঃশেষ করে দেব। দেখনি ওয়াজে আমি সালাহুদ্দীনের কেমন প্রশংসা করেছি।’

    ‘এসব কথা পরে হবে। আমরা উষ্ট্রী দুটো দেখতে চাই। তারপর বলুন, আমাদের কিভাবে আশ্রয় দেবেন। ও দু’জন ছাড় এখানে কি অন্য কোন লোক থাকে?’

    ‘না, এখানে আর কেউ থাকে না।’

    ইমাম সাহেব এখন সন্দেহমুক্ত। আলাপচারিতা থেকে তিনি নিঃসন্দেহ হয়েছেন যে এরা গোপন ঘাতক দলের সদস্য। তিনি তালা খুলে কামরায় প্রবেশ করে বসতে দিলেন ওদের।

    ‘আপনারা বসুন, আমি ওদের নিয়ে আসছি।’

    কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। একটু পর ফিরে এলেন সঙ্গে দুই অপরূপা যুবতীকে নিয়ে। দু’জনই আরব্য রজনীর পরীদের মত অপূর্ব সুন্দরী। পরনে মখমলের কালো ঘাগরায় সোনালী জরির কাজ, উপরে দুধে-আলতা রঙের হাতাকাটা মিনি ব্লাউজের ওপর পাতলা রেশমী ওড়না। চোখে মুখে স্নিগ্ধ কমনীয়তার কোমল পরশ। কচি লাউ ডগার মত সতেজ আর পেলব ত্বক।

    লোকজন জানে এরা ইমাম সাহেবের স্ত্রী। আপাদমস্তক বোরকায় ঢেকে ওদের এখানে আনা হয়েছিল। এখন বোরকা নেই। দেহের বেশীল ভাগ উন্মুক্ত। ওদের সাথে যুবতীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে আলমারী থেকে মদের বোতল বের করলেন ইমাম সাহেব। গ্লাস ভরলেন। লোক দু’জন ছু’ল না, এমনকি এক নজর দেখেই চোখ ধাঁধাঁনো যুবতীদের দিক থেকেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।

    ‘আগে কাজের কথা বলি, তারপর এসব হবে।’ বলল একচোখা লোকটি।

    ‘আমরা দু’জনকে হত্যা করতে চাই।’ সঙ্গীর কণ্ঠ, ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবী এবং আলী বিন সুফিয়ান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তাদের আমরা কখনও দেখিনি। ওদেরকে চিনিয়ে দেবেন। আপনি কি দেখেছেন কখনও?’

    ‘এতবেশী, এখন অন্ধকারেও ওদের চিনতে পারব। ওদের চেনাই ছিল আমার এ অভিযানের প্রথম কাজ। আলী ভীষণ ঘাগু। ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ। তবে ছদ্মবেশে এলেও আমি তাকে ঠিকই চিনতে পারব।’

    ‘সালাহুদ্দীনের ব্যাপারে কি অভিমত?’ একচোখা লোকটি বলল।

    ‘তাকেও চিনতে কষ্ট হবে না।’

    একচোখা লোকটি কানের কাছে তুলে আনলেন হাত। এক ঝটকায় খুলে আনলেন কৃত্রিম দাড়ি, গোঁফ। ছুঁড়ে ফেললেন দূরে। টেনে ছিঁড়ে ফেললেন চোখের হলুদ পর্দা। মুর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন ইমাম সাহেব। হাঁ হয়ে গেছে মুখ। বিষ্ফারিত চোখ। আতঙ্কিত মেয়ে দু’টো একবার তাকাচ্ছিল ছদ্মবেশী লোকটির দিকে আবার দেখছিল ভয়ে পাংশু হয়ে যাওয়া ইমাম সাহেবের মুখের দিকে। ভয়, আতঙ্ক আর উদ্বেগ মেশানো কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল ইমাম সাহেব, ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবী!’

    ‘হ্যাঁ বন্ধু! আমি সালাহুদ্দীন আয়ুবী, তোমার খ্যাতি শুনে ওয়াজ শুনতে এসেছিলাম।’

    সঙ্গীর দাড়ি মুঠোয় চেপে এক ঝটকায় খুলে ফেললেন সুলতান আয়ুবী।

    ‘হ্যাঁ চিনি।’ ইমামের কণ্ঠে পরাজয়। ‘আলী বিন সুফিয়ান।’

    আকস্মাৎ মেয়ে দু’টো ঘুরে পেছনের আলমিরার ওপর থেকে ছুরি টেনে নিল। সালাহুদ্দীন আয়ুবী ও আলী বিন সুফিয়ান ওদের ক্ষিপ্রতা দেখে মোটেও অবাক হলেন না। ওরা যে সব রকমের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তা ওদের ক্ষিপ্রতা দেখেই বুঝে নিলেন।

    ওরা যখন মেয়েদের তৎপরতা দেখছিলেন সেই ফাঁকে ইমাম সাহেব পেছনে হাত চালিয়ে বের করে আনলেন তরবারী। চোখের পলকে আঘাত করলেন সালাহুদ্দীনের মাথায়।

    সালাহুদ্দীন আয়ুবী এ আঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। চকিতে সরে দাঁড়ালেন তিনি।

    ততক্ষণে দু’জনই জুব্বার বেতর থেকে তরবারী বের করে নিয়েছেন।

    তরবারী চালনায় দক্ষ হলেও আরবের বিখ্যাত দুই বীরের সামনে দাঁড়াতে পারল না ওরা।

    আলী মেয়েদের ছুরি ধরা হাতের কনুই বরাবর ছেড়ে লাথি চালালেন। সাঁই করে ছুটে গিয়ে ছুরি দুটো দেয়ালে ঠক করে বাড়ি খেল।

    সালাহুদ্দীনের তলোয়ার স্পর্শ করল ইমামের তরবারী। তলোয়ারে তলোয়ার ঠেকিয়ে চাপ বাড়ালেন তিনি। পেছনে সরে যেতে চাইল ইমাম। সালাহুদ্দীন ওর দু’পায়ের ফাঁকে নিজের পা ঢুকিয়ে দিয়ে ওকে আরেকটু ঠেলে দিলেন পিছনে। ফলে তাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে পড়ে গেল ছদ্মবেশী ইমাম। হাত থেকে ছিটকে গেল তলোয়ার।

    আলী এগিয়ে এসে অস্ত্রগুলো তুলে নিল এক এক করে। সালাহুদ্দীন আলীকে বললেন, ‘বাইরে তোমার যে বন্ধুরা আছে ডাক তাদের।’

    বেরিয়ে গেলেন আলী। ফিরে এলেন অস্ত্রধারী ছ’জন সঙ্গীকে নিয়ে। এতক্ষণ এরা বাইরে পাহারা দিচ্ছিল।

    পরদিন মসজিদের সামনে জনতার প্রচণ্ড ভীড় জমে উঠল। ইমাম এবং মেয়ে দু’টোকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল জনতার সামনে। ছদ্মবেশী ইমাম সাহেব কিভাবে জিহাদ আর যৌনতার বিরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা তুলে ধরা হল জনতার সামনে।

    সালাহুদ্দীন আবেগময় ভাষায় বললেন, ‘মুসলিম ভাইয়েরা আমার! আমার কাছে ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর কালাম ও রাসূলের সুন্নাহ। প্রিয় নবী (সা.) যা বলেছেন ও করেছেন ইসলাম বলতে আমি তাকেই বুঝি, এর বেশীও না কমও না। পরহেজগারীর নামে দিনরাত মসজিদ ও খানকায় পড়ে থাকার নাম ইসলাম হতে পারে না। আল্লাহ যেমন জামাতে নামাজ পড়ার কথা বলেছেন তেমনি বলেছেন নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এটাই ইসলাম।

    আপনারা দেখতে পেয়েছেন কিভাবে সুফী ও দরবেশ সেজে আমাদেরকে কর্মবিমুখ করার সুগভীর চক্রান্তে মেতে উঠেছে শয়তানরা। যেখানে প্রিয় নবীর সহধর্মিনীরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, ছুটে গেছেন জেহাদের ময়দানে, পূর্ণ্যময়ী মহিলা সাহাবীগণ শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন, সেখানে পর্দার নামে আমাদের অর্ধেক জনশক্তিকে গৃহবন্দী করার পায়তারা করছে। যেন রাসূলের চাইতে তারা ইসলাম বেশী বুঝে, সাহাবীদের চাইতে তারা বেশী মুত্তাকী ও পরহেজগার। এ ধরণের আলেমদের ব্যাপারে আপনারা সতর্ক থাকবেন, এরা আলেম নয় খ্রিষ্টানদের চর। ইসলাম কোন ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। আমাদের মেয়েরা অবশ্যই পর্দা করবে, তবে ততটুকুই, যতটুকু করার জন্য ইসলাম তাদের নির্দেশ দিয়েছে। আবার আমাদের মেয়েরা সমাজিক ক্রিয়াকর্মেও অংশগ্রহণ করবে, তাবে ততটুকুই, যতটুকু করার অধিকার ইসলাম তাদের দিয়েছে।

    ঘরে আগুন লাগলে পর্দার জন্য মেয়েদের ঘরের ভেতর পুড়ে মরতে হবে ইসলাম যেমন এ কথা বলে না, তেমনি খোলামেলা শরীরে রাস্তায় ঘুরে বেহায়াপনা ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অবাধ লাইসেন্সও দেয় না ইসলাম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মধ্যমপন্থী জাতি। আমরা আমাদের মাতা-ভগ্নীদেরকে বাজারের পণ্য বানাতে পারি না, এ ধরনের যে কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে, সেই সাথে শরিয়ত নির্ধারিত পন্থায় ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণের সকল সুযোগ তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে তাদের মর্যাদা ও অধিকারকেও নিশ্চিত করতে হবে।

    বন্ধুরা আমার, ওরা আমাদের ভালবাসার মন্ত্র শোনায়, মানবতার কথা বলে। আমরা ওদের মত ঘৃণার বেলুনের ওপর ভালবাসার রঙিন মোড়ক লাগাই না। আমরা মানুষকে ভালবাসি হৃদয়ের গভীর মমতা দিয়ে। আমাদের আদর্শ সেই মহামানব, প্রতিদিন চলার পথে কাটা বিছিয়ে রাখার পরও নিঃসঙ্গ অসুস্থ বুড়িকে সেবা দিয়ে যিনি আপন করে নিতে পারেন।

    ভালবাসা ও সেবার ক্ষেত্রে জাত-পাতের কোন ভেদাভেদ করতে শিখিনি আমরা। আমাদের নবী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় সে আমার উম্মত নয়। এর চে’ অধিক মানব প্রেমের কথা কে কবে বলেছে? যার মাঝে এতটুকু মানব প্রেমের সৃষ্টি না হবে সে মুসলমান হবে কেমন করে। ভেবে দেখুন, যদি আমরা নবীর উম্মতই হতে না পারলাম তবে আমাদের এতসব এবাদত বন্দেগী কোন কাজে লাগবে?

    তাই তো আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে মানবতারই জয় ঘোষিত হয়। ইসলাম চায় মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। তাই মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা একজন মুজাহিদের পবিত্র দায়িত্ব। মানুষের আহার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য চেষ্টা করা আমাদের কাছে নিছক দুনিয়াবী কাজ নয়, বরং একজন সত্যিকার মুজাহিদের কাছে এটুকু ইসলামের ন্যুনতম দাবী। এ দাবীকে পাশ কাটিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি না আমরা। আবার আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার চেষ্টা বাদ দিয়ে কেবল দুনিয়াবী সমস্যার সমাধান করাকেও আমরা ইসলাম মনে করতে পারি না।

    প্রিয় ভাইয়েরা, আমাদের সংগ্রাম তাই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর সংগ্রাম। ওরা আমাদের অস্ত্রের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে আমরা রক্তপিপাসু। না, ক্ষমার মহত্তম দৃষ্টান্ত আমরাই দেখাতে পারি। এক ফোটা রক্ত না ঝরিয়েও আমরা মক্কা জয় করতে পারি। তারপরও আমাদের নবীকে অর্ধশতাধিক লড়াই পরিচালনা করতে হয়েছিল কি জন্য? মানবতার অপমান আমরা বরদাস্ত করতে পারি না। মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আমরা আপোষ করতে পারি না। আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছি নিপীড়িত মজলুম মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। চোর যদি ধর্মের কাহিনী শুনতো তবে আমাদের অস্ত্র হাতে নেয়ার প্রয়োজন হত না। কিন্তু আমরা জানি, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।

    সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আমাদের এ লড়াই অব্যহত থাকবে। খ্রিষ্টানদের যে কোন হামলা ও ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেয়ার জন্য সবসময় সজাগ ও প্রস্তুত থাকার জন্য আমি আপনাদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।’

    সালাহুদ্দীনের বক্তৃতার পর খ্রিষ্টান গোয়েন্দাদের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেয়া হল। অবাক বিস্ময়ে জনতা শুনল ছদ্মবেশী ইমাম এবং মেয়ে দু’টোর স্বীকারোক্তি।

    তারপর জনতাকে একজন একজন করে লাইনে দাঁড় করিয়ে ইমাম সাহেবের ঘরে নিয়ে দেখানো হল ক্রুশ, মেরী আর যিশুর মূর্তি। সাধারণ মানুষের সামনে খুলে গেল এক ছদ্মবেশী খ্রিষ্টান গোয়েন্দার অপকর্মের নমুনা।

    * * *

    সুলতানের নির্দেশে সমগ্র দেশে গুপ্তচরের নিশ্ছিদ্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন আলী বিন সুফিয়ান। খ্রিষ্টান গোয়েন্দায় ভরে গিয়েছিল দেশ। ইসলামী সংস্কৃতি বিনষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্র সুলতানকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

    একজন ইমাম ইসলামী চিন্তাধারা পাল্টে দিচ্ছে সংবাদ পেয়েও তিনি তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেননি। বলেছিলেন, ‘আলী! ধর্ম আজ বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হতে শুরু করেছে। ইমাম সাহেব হয়ত এমন কোন উপদলের লোক। অথবা তিনি মনগড়া তাফসীর করছেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমি প্রশাসক—আলেম নই, যদি তাকে গুপ্তচর মনে কর ভালভাবে যাঁচাই বাছাই করে নাও। আমার চাইতে একজন ইমামের মর্যাদা অনেক উর্ধে।’

    গোয়োন্দা হলে চিনে ফেলতে পারে এ জন্য আলী নিজে মসজিদে যাননি। ক’জন লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দশ থেকে বার দিন গিয়েছে ওরা। আলীকে শুনিয়েছে ইমামের বক্তৃতার হুবহু বর্ণনা।

    আলী সুলতানকে বললেন, ‘লোকটা গোয়োন্দা না হলেও ভ্রান্ত আকিদার। তাকে ধরা উচিৎ। সে এমনভাবে জিহাদের ব্যাখ্যা করছে যা শুধু একজন শত্রুর পক্ষেই করা সম্ভব।’

    সুলতান মনোযোগ দিয়ৈ আলীর কথা শুনে বললেন, ‘ব্যাপারটা মসজিদ এবং ইমাম সম্পর্কে। কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগে আরেকটু যাচাই করা দরকার।’

    অবশেষে সুলতান সিদ্ধান্ত নিলেন আলী সহ নিজেই যাবেন ইমামের ওয়াজ শুনতে।

    আহমদ কামালের গ্রেফতার করা মেয়েটার কাছ থেকে আলী জেনে নিয়েছিলেন খ্রিষ্টান গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত কোড বা সংকেত। মেয়েটা বলেছিল, ‘গোয়েন্দারা কেউ কারো নাম বলে না। ‘আমরা মেঘ নিয়ে আসব’ বলে পরস্পরকে পরিচিত হতে হয়। সুলতান তাই করেছিলেন। ধরা পড়ল ইমাম।

    ওদের তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়ে তদন্ত শুরু করলেন গোয়েন্দা প্রধান।

    তদন্তে জানা গেল, কায়রো উপশহরের এ মসজিদ জামে মসজিদ না হলেও মুসল্লীর অভাব নেই। এলাকাটায় মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত লোকের বাস। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় এখানকার লোকগুলো জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। ফলে বেশিরভাগ লোকই কুসংস্কারে বিশ্বাসী। ওরা সহজেই মন ভোলানো আবেগময় কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

    ছ’সাত মাস ধরে এলাকার মসজিদের কথা সবার মুখেমুখে। নতুন পেশ ইমাম এশার পর এমন ওয়াজ করেন যা কেবল মর্মস্পর্শীই নয়, অভিনব ও চিত্তাকর্ষকও।

    ঘটনার বিবরণে জানা গেল, ‘একদিন দু’জন স্ত্রীসহ একজন লোক এল গাঁয়ে। উঠল এক ব্যাক্তির ঘরে। দেখতে আলেমের মত। মসজিদে আসা যাওয়া করতে লাগলেন তিনি। ধীরে ধীরে ইমাম সাহেবের ভক্ত হয়ে গেলেন নতুন আলেম।

    পনর ষোল দিন পর একদিন ইমাম সাহেব মসজিদে এলেন না। খবর নিয়ে জানা গেল তিনি অসুস্থ।

    হাকীম সাহেব তার বাসায় গিয়ে দেখলেন ইমাম সাহেবের পেটে ব্যাথা। কোন ওষুধ কাজ হল না। তিন দিন পর মারা গেলেন ইমাম সাহেব। ইমাম সাহেব যেদিন অসুস্থ হন সেদিন আগন্তুক আলেম গ্রামে ছিলেন না, আগে যেখানে থাকতেন সেখান থেকে জিনিসপত্র আনতে গেছেন।

    ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর দিন ফিরে এলেন তিনি।

    পরনে লাল জুব্বা, ফর্সা চেহারা, ধূসর দাড়ি, মধুর তেলওয়াত। ইমাম সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘আহা! অমন ভাল লোক আর হয় না। উনি তো চলে গেলেন, এখন আমাদের কি হবে?’

    ‘কি হবে মানে?’

    ‘না, বলছিলাম, এখন তো আমাদে একজন ইমাম দরকার।’

    ‘তা দরকার বৈকি। তবে কিছু মনে না করলে বলব, আপনার যা এলেম-আমল এ দায়িত্বটা যদি আপনি নেন তবে আমাদের আর কোন দুশ্চিন্তা থাকে না।’

    তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বরলেন, ‘আপনারা সবাই চাইলে এ দায়িত্ব আমি নিতে পারি। এখানে থাকলে নিরিবিলিতে কিছু এবাদত বন্দেগীর সুযোগ পাবো। যদিও শহরে ইমামতি করেই দিন কাটাতাম কিন্তু হৈ-হাঙ্গামা এ বয়সে আর ভাল্লাগেনা বলেই এখানে চলে এসেছি।’

    তার কথায় লোকজন খুবই খুশি হল। ইমাম হিসাবে এমন একজন অভিজ্ঞ আলেম পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। এলাকার গণ্যমান্য লোকজন সামান্য পরামর্শের পর তাকেই ইমাম হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিল।

    বেতন নিয়ে তিনি কোন দরকষাকষি করলেন না। বললেন, ‘আপনারা যা বিবেচনা করে দেবেন তাতেই আমার হবে। তবে কারো দেওয়া নজরানা, হাদিয়া বা তোহফা আমি গ্রহণ করতে পারবো না। আমার দরকার শুধু খাওয়া-পরা ও স্ত্রীদের নিয়ে পর্দা পুশিদা মত থাকার মত একটা বাড়ি।’

    লোকজন মসজিদের পাশেই কায়েক কামরার একটি বাড়ী খালি করে দিল। সবার সামনে তিনি বাড়ীতে এসে উঠলেন। সাথে দুই স্ত্রী। স্ত্রী দু’জনই বোরকা পড়া, হাতে দস্তানা, পায়ে মোজা। লোকজন হুজুরের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সরবরাহ করল। তার ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হল সবাই। সকলকে মোহিত করল তার সুরেলা কণ্ঠের যাদু।

    মসজিতে আযান দিলেন মৌলভী সাহেব। আযানের শব্দে নিরবতা ছেয়ে গেল সমগ্র এলাকায়। যেন ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে পবিত্র এক সুর। সুরের মূর্চ্ছনায় মসজিদে ছুটে এল মানুষ। যারা বাড়ীতে নামাজ পড়তেন ছুটে এলেন তারাও। এশার পর সমবেত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে ওয়াজ করলেন তিনি। বললেন, প্রতিরাতে এভাবে ওয়াজ করবেন।

    সুরেলা কণ্ঠের প্রতিদিন রাতে এশার নামাজের পর নিয়মিত ওয়াজ করে যাচ্ছেন ইমাম সাহেব। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর খ্যাতি। ছ’সাত মাসের মধ্যে তিনি পুরো এলাকায় সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। তার ভক্তের সংখ্যা বেড়ে চলল প্রতিদিন। অনেকে মুরিদও হল। এ মসজিদে আগে জুম্মা পড়া হত না, তিনি প্রথম জুম্মা চালু করলেন।

    চারদিকে ইমাম সাহেবের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে ওয়াজ শুনতে ছুটে আসতে লাগল দূর-দূরান্তের লোকেরা। তার আলোচনায় স্থান পেত ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো। ইবাদাত এবং ভালবাসা ছিল প্রধান বিষয়। মানুষকে বুঝাতেন, মানুষ নিজে তার ভাগ্য গড়তে পারে না। মানুষ এক দুর্বল কিটাণুকীট। খোদার হাতেই মানুষের ভাগ্য। ওয়াজের সময় পবিত্র কোরান থাকত তার হাতে। মন্ত্রমুগ্ধের মত শ্রোতারা তার কথা শুনত। তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশংসা করে বলতেন, ‘মিসরের সৌভাগ্য যে, তার মত এমন এক ব্যক্তিত্বকে পেয়েছে শাসক হিসাবে।’

    তিনি জিহাদের নুতন ব্যাখ্যা দিলেন। মানুষ নির্দ্বিধায় তা মেনে নিল।

    সুলতান আইউবী খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে জেহাদে শরীক হওয়ার আহ্বান জানালে দু’টো কারণে এ এলাকার লোকারা ব্যাপকভাবে তাতে সাড়া দিয়েছিল। প্রথম কারণটি ছিল অর্থনৈতিক। সুলতান সৈন্যদের যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা দিতেন।

    দ্বিতীয় কারণ, সালাহুদ্দীন আইউবীর দেয়া জ্বালাময়ী ভাষণ। তিনি যখন বললেন, ‘খ্রিষ্টানরা পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের চিহ্ন মুছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হল জিহাদের ময়দানে ঝাড়িয়ে পড়া’ তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ঈমানের শিখা জ্বলে উঠল। জিহাদ যে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ সুলতান ওদেরকে তা ভালভাবেই বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে ইসলামের জন্য জীবন দেওয়ার উদগ্র বাসনা নিয়েই ওরা সুলতানের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিল। এদের বিশ্বাসে চিড় ধরাবার জন্যই ইমামরূপী গোয়োন্দা এখানে আশ্রয় গেড়েছিল।

  • ঈমানদীপ্ত দাস্তান

    ঈমানদীপ্ত দাস্তান

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর শাসনকাল। পৃথিবী থেকে বিশেষত, মিশর থেকে ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলে ক্রুশ প্রতিষ্ঠার ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে খৃস্টানরা। ক্রুসেডাররা সালতানাতে ইসলামিয়ার উপর নানামুখী সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনার পাশাপাশি বেছে নেয় নানারকম কুটিল ষড়যন্ত্রের পথ। গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা ও চরিত্র-বিধ্বংসী ভয়াবহ অভিযানে মেতে উঠে তারা। মুসলমানদের নৈতিক শক্তি ধ্বংস করার হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে অর্থ, মদ আর ছলনাময়ী রূপসী মেয়েদের। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হাই কমান্ড ও প্রশাসনের উচ্চস্তরে একদল ঈমান-বিক্রেতা গাদ্দার তৈরি করে নিতে সক্ষম হয় তারা।

    ইসলামের মহান বীর মুজাহিদ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পরম বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, দুঃসাহসিকতা ও অনুপম চরিত্র মাধুরী দিয়ে সেইসব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ছিনিয়ে আনেন বিজয়।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে অস্ত্র হাতে খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ লড়েছিলেন, খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর যে অস্ত্রের আঘাত হেনেছিল, ইতিহাসে ক্রুসেড যুদ্ধ নামে তার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু সালতানাতে ইসলামীয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত খৃস্টানদের নাশকতা, গুপ্তহত্যা ও ছলনাময়ী রূপসী নারীদের লেলিয়ে দিয়ে মুসলিম শাসক ও আমীরদের ঈমান ক্রয়ের হীন ষড়যন্ত্র এবং সুলতান আইউবীর তার মোকাবেলা করার কাহিনী এড়িয়ে গেছেন অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ। সেইসব অকথিত কাহিনী ও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুঃসাহসিক অভিযানের রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী নিয়ে রচিত হলো সিরিজ উপন্যাস ‘ঈমানদীপ্ত দাস্তান’।

    বইটির মূল লেখক পাকিস্তানের প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ। পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত মূল বইটির নাম ‘দাস্তান ঈমান ফারোশোঁ কী’ (ঈমান বিক্রেতাদের আখ্যান)। আল্লাহ তাআলার পরম অনুগ্রহে আট খণ্ডে ‘দাস্তান ঈমান ফারোশোঁ কী’র বাংলা অনুবাদ করেন মুহম্মদ মহিউদ্দীন।

    ভয়াবহ সংঘাত, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঈমানদীপ্ত কাহিনীতে ভরপুর এই সিরিজ বইটি ঘুমন্ত মুমিনের ঝিমিয়েপড়া ঈমানী চেতনাকে উজ্জীবিত ও শাণিত করে তুলতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পাশাপাশি বইটি পূর্ণমাত্রায় উপন্যাসের স্বাদও যোগাবে।

  • কিতাবুত তাওহীদ : তাওহীদের মাসায়েল

    কিতাবুত তাওহীদ : তাওহীদের মাসায়েল

    কিতাবুত তাওহীদ বা তাওহীদের মাসায়েল, উর্দু ভাষায় লিখিত তাফহীমুস্‌ সুন্নাহ সিরিজের প্রথম কিতাব। উর্দু নাম, তাওহীদ কি মাসায়েল; লেখক, মুহাম্মদ ইকবাল ইবনে ইদরীস কীলানী; ব্যবস্থাপক, হারুনুর রশিদ কিলানী; প্রকাশক, হাদীস পাবলিকেশন্স, ২ শিটমহল রোড, লাহোর; প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ১৯৯৭। বাংলায় কিতাবটির একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত মুহাম্মদ হারুন আযিযী নদভীর অনুবাদ। এটি প্রকাশ করেছে দারুস-সালাম, রিয়াদ, সাউদী আরব। এডুলিচারের জন্য গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন তাহের আলমাহদী। ধর্মীয় গ্রন্থের সাহিত্যমান থাকা জরুরি নয়, এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যে কোন গ্রন্থেরই সাহিত্যমান থাকা জরুরি। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ পবিত্র কুরআনুল কারীম। সাহিত্যমানের বিবেচনা করেই কিতাবটিকে অনুবাদে হাত দিয়েছেন তাহের আলমাহদী। আশাকরি, তার অনূদিত গ্রন্থটি যেকোন পাঠকের ভাল লাগবে।

    মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, গ্রন্থটির লেখক ও অনূবাদককে তিনি কবুল করুন এবং অনূদিত গ্রন্থটির মাধ্যমে বাংলাভাষী পাঠকদের আক়ীদায়ে তাওহীদকে মজবুত করুন। আমীন!

    ( ءَأَرْبَابٌۭ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ ٱللَّهُ ٱلْوَٰحِدُ ٱلْقَهَّارُ ) ٣٩

    ভিন্ন ভিন্ন বহু রব উত্তম, না মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ্‌?

    —সূরা ইউসুফ, আয়াত ৩৯

    ⁑          ⁑          ⁑

    تَعَــالَوْا إِلىٰ كَلِمَــةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنـا وَ بَيْنَكُــمْ

    হে মানুষ! এমন এক কালিমার দিকে এসো যা তোমাদের ও আমাদের মাঝে অভিন্ন।

    • ওহে বনি ইসরাঈল! তোমাদের বিশ্বাস যে, উজাইর আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র ছিলেন এবং এটাও স্বীকার কর যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কখনও তোমরা বিবেচনা করেছ কি, আল্লাহর সত্তা হচ্ছে “হাইয়্যু” ও “কাইউম” এবং তাঁর পুত্রেরও এইসব গুণাবলী থাকা উচিত ছিল, তবে উজাইর আলাইহিস সালামের মৃত্যু হ’ল কেন? যিনি মৃত্যুবরণ করেন তিনি কি করে আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?
    • ওহে মরিয়ম পুত্র ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র এবং এটাও স্বীকার কর যে, তাঁকে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছে। কখনও চিন্তা করে দেখেছ কি, আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও যে কারও উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ার পরও তাঁর পুত্র এত দুর্বল ও অসহায় কেন ছিলেন যে তাঁকে ক্রুশে চড়ানো হয়েছিল, যাকে ক্রুশে চড়িয়ে হত্যা করা যায় তিনি কি করে আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?
    • ওহে হিন্দুগণ! তোমরা তো তেত্রিশ কোটি দেবতায় বিশ্বাস কর। তোমাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দেবতা রাখে, যেন, একেক জনের জন্য একেক দেবতা যারা নিজ নিজ ভক্তের প্রয়োজন মেটাতে এবং আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ করতে সক্ষম। যেন বাকী বত্রিশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই জন দেবতা তার প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। কখনও ভেবেছ কি, বত্রিশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই জন দেবতা যেখানে প্রয়োজন মেটাতে ও আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ করতে সক্ষম নন, তাহলে একজন কি করে সক্ষম হবেন?
    • ওহে বৌদ্ধগণ! তোমাদের বিশ্বাস যে, গৌতম বুদ্ধ মহাসত্যের সন্ধানে বছরের পর বছর মাঠে, জঙ্গলে, মরুভূমিতে পড়েছিলেন। কখনও কি ভেবেছ যে ব্যক্তি মহাসত্যের সন্ধানে দীর্ঘ সময় ঘুরে বেড়ালেন তিনি কি করে মহাসত্য হতে পারেন?
    • ওহে নিষ্পাপ ইমামদের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, জগতের ছোট বড় সকল কিছু ইমামের আদেশের অধীন এবং তোমাদের দাবী হচ্ছে, ‘আহলে বাইতে’র উপর যা মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা এসেছিল ওই সব কিছু এসেছিল আবু বাকার রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহু ও উমর রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহুর কারণে। একবারও কি ভেবে দেখেছ যে, জগতের ছোট বড় সব কিছু যাদের হুকুমের অধীন তাদের উপর মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা কী করে আসতে পারে? আর যাঁর উপর মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা আসতে পারে তিনি কী করে পৃথিবীর সব কিছুর উপর হুকুমদাতা ও সর্বশক্তিমান হন কী করে?
    • ওহে বুজুর্গানে দীন ও আওলিয়াদের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, আলী হাজওয়েরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মানুষকে ভাণ্ডার দিয়ে থাকেন; খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তুফান থেকে মুক্তি দান করে থাকেন; আবদুল ক়াদীর জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যাবতীয় বালা-মসিবত দূর করে থাকেন; ইমাম বরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি হতভাগাকে ভাগ্যবান করে থাকেন এবং সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছেলে সন্তান দান করে থাকেন। কখনও কি চিন্তা করে দেখেছ, যখন আলী হাজওয়েরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন ভাণ্ডার কে দান করতেন? যখন মুঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন তুফান থেকে মুক্তি দিতেন কে? যখন আবদুল ক়াদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন বালা-মসিবত কে দূর করতেন? যখন ইমাম বরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন হতভাগাকে ভাগ্যবান কে করতেন? যখন সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন সন্তান কে দান করতেন?
    • ওহে দুনিয়ার মানুষ! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো! আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ শিক্ষায় কখনও স্ববিরোধ থাকতে পারে না। কিন্তু তোমাদের আকাইদ ও চিন্তাধারায় থাকা স্ববিরোধ এটা প্রমাণ করে যে, তোমাদের আকাইদ ও চিন্তাধারা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়।

    অতএব, হে দুনিয়ার মানুষ! এমন এক কালিমার দিকে এসো—

    • যার শিক্ষায় কোন স্ববিরোধ নেই;
    • যা মানব জাতির আত্মাকে প্রশান্তি ও দেহকে মুক্তি দান করে;
    • যা মানব জাতিকে মর্যাদা, সম্মান ও মহত্ত্ব প্রদান করে;
    • যা মানব জাতিকে শান্তি ও নিরাপত্তা, সাম্য ও ন্যায়বিচার, সাম্য ও স্বাধীনতা; ভাতৃত্ব ও ভালবাসা ইত্যাদি উচ্চমানের মানবীয় গুণাবলীর নিশ্চয়তা প্রদান করে;
    • যা মানব জাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়।

    সেই এক মাত্র কালিমা হলো—

    لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ

    আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।

  • তাওহীদের আকীদা

    তাওহীদের আকীদা

    তাওহীদের আকীদা

    أَلْحَمْـدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَـالَـمِيْنَ وَ الصَّلاَةُ وَ السَّـلاَمُ عَلـىٰ رَسُـوْلِهِ الاَمِيْـن وَ الْعَاقِبَــةُ لِلْمُتَّقَيْنَ

    সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য, এবং তাঁর বিশ্বস্ত রসূলের উপর সালাত ও শান্তি বর্ষিত হোক এবং মুক্তাকিনদের সর্বোত্তম বিনিময় লাভ হোক। অতঃপর—

    ক়িয়ামাতের দিন মানুষের মুক্তি নির্ধারিত হবে দুটি বিষয়ের ভিত্তিতে। এক. ঈমান ও দুই. আমল সালিহ বা সৎকর্ম। ঈমান হচ্ছে আল্লাহর সত্তার প্রতি বিশ্বাস, রিসালাত ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস, ফিরিশতা ও কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, তাক়দীরের ভাল মন্দের উপর বিশ্বাস। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতময় নির্দেশ হচ্ছে— ‘ঈমানের সত্তরটির বেশি শাখা রয়েছে, এর মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হল— لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ (লা ইলাহা ইল্লালাহু—আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই) বলা। (সহীহ বুখারী)। অর্থাৎ ঈমানের ভিত্তি হল কালিমা তাওহীদ।

    আমল সালিহ বা সৎকর্ম হচ্ছে সেই কর্মসমূহ যেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের সুন্নাহ মুতাবিক করা হয়ে থাকে। নিঃসন্দেহে, পারলৌকিক মুক্তির জন্য সৎকর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তাওহীদের আক়ীদা ও সৎকর্ম—এতদোভয়ের মধ্যে তাওহীদের আক়ীদা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে।

    ক়িয়ামাতের দিন তাওহীদের আকীদা থাকলে কর্মের অপূর্ণতা ও ত্রুটি-বিচ্যূতি ক্ষমাযোগ্য হতে পারে, কিন্তু তাওহীদের আকীদায় বিকৃতি (কাফিরানা, মুশরিকানা বা তাওহীদে শির্কের মিশ্রণ) থাকলে জমিন-আসমান সমান সৎকর্মও অকেজো ও অনর্থক সাব্যস্ত হবে। সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন যে, কাফিরেরা যদি পৃথিবী সমান সোনাও সদকা করে ঈমান বিহীন অবস্থায় এই সৎকর্ম আল্লাহর নিকট ক়বুল হবে না। আল্লাহ বলেছেন—

    ( إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَمَاتُوا۟ وَهُمْ كُفَّارٌۭ فَلَن يُقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِم مِّلْءُ ٱلْأَرْضِ ذَهَبًۭا وَلَوِ ٱفْتَدَىٰ بِهِۦٓ ۗ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌۭ وَمَا لَهُم مِّن نَّـٰصِرِينَ ) ٩١

    ‘নিশ্চয়ই যারা কুফরী করে এবং সেই কাফির অবস্থায়ই মারা যায়, তাদের কেউ (নিজেকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য) পৃথিবী-ভরা স্বর্ণও বিনিময় স্বরূপ প্রদান করতে চাইলে তা তার কাছ থেকে কক্ষণও গ্রহণ করা হবে না। এরাই তারা যাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরাহ আলি-ইমরান, আয়াত : ৯১)।

    অতএব, শুধু তাদের সৎকর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে তাই নয় বরং কুফুরী আকীদার কারণে তাদেরকে কষ্টদায়ক সাজাও প্রদান করা হবে। এবং কেউ তাদের সাহায্য বা তাদের জন্য কোন সুপারিশও করতে পারবে না। সূরা আনআমে নবীদের পবিত্র জামায়াত ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, নূহ, দাউদ, সুলাইমান, আইউব, ইউসুফ, মূসা, হারুন, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ইসমাইল, ইয়াসা, ইউনুস, লূত আলাইহিস সালামের উল্লেখ করে আল্লাহ পাক বলেন,—

    ( وَلَوْ أَشْرَكُوا۟ لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ ) ٨٨

    ‘তারা যদি শিরক করত তবে তাদের সব কৃতকর্ম বিনষ্ট হয়ে যেত।’ (সূরা আন’আম, আয়াত : ৮৮)।

    শিরকের নিন্দায় পবিত্র কুরআন মাজীদের আরও কতিপয় আয়াত লক্ষ্য করুন—

    ( وَلَقَدْ أُوحِىَ إِلَيْكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَـٰسِرِينَ ) ٦٥

    ‘এবং আপনার কাছে আর আপনার পূর্ববর্তীদের কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, “আপনি যদি (আল্লাহর) শরীক স্থির করেন, তাহলে আপনার কর্ম অবশ্য অবশ্যই নিস্ফল হয়ে যাবে, আর আপনি অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।”’ —সূরা জুমার, আয়াত ৬৫।

    ( فَلَا تَدْعُ مَعَ ٱللَّهِ إِلَـٰهًا ءَاخَرَ فَتَكُونَ مِنَ ٱلْمُعَذَّبِينَ ) ٢١٣

    ‘কাজেই আপনি অন্য কোন ইলাহকে আল্লাহর সঙ্গে ডাকবেন না। ডাকলে আপনি শাস্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।’ —সূরা শূ’আরা, আয়াত ৩১৩।

    উল্লিখিত দু’টি আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় নবী সাইয়্যেদুল মুরসালীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন— আপনিও যদি শিরক করেন তাহলে আপনার সকল সৎকর্ম ধ্বংস হয়ে যাবে এবং অন্যদের সাথে আপনাকেও শাস্তি প্রদান করা হবে।

    সূরা মায়েদায় ঘোষণা করা হয়েছে—

    ( إِنَّهُۥ مَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِ ٱلْجَنَّةَ وَمَأْوَىٰهُ ٱلنَّارُ ) ٧٢

    ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম।’ — সূরা মা’য়িদাহ, আয়াত ৭২।

    সূরা নিসার একটি আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন—

    ( إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِۦ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُ ) ١١٦

    ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করেন।’ — সুরা নিসা আয়াত ১১৬।

    এই দুটি আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ তা’য়ালার সাথে শরীক করা অমার্জনীয় অপরাধ। শিরক ব্যতীত এমন কোন অপরাধ নেই যা আল্লাহ তা’য়ালা অমার্জনীয় বলেছেন বা যা করলে জান্নাত হারাম হবে বলেছেন।

    সূরা তাওবায় আল্লাহ তা’য়ালা মুশরিক অবস্থায় মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেও নিষেধ করেছেন—

    ( مَا كَانَ لِلنَّبِىِّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَن يَسْتَغْفِرُوا۟ لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوٓا۟ أُو۟لِى قُرْبَىٰ مِنۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَـٰبُ ٱلْجَحِيمِ ) ١١٣

    ‘নবী ও মু’মিনদের জন্য শোভনীয় নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তারা আত্মীয়-স্বজন হলেও, যখন এটা তাদের কাছে সুস্পষ্ট যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।’ — সুরা তওবা, আয়াত ১১৩।

    এখন শিরকের নিন্দায় কয়েকটি পবিত্র হাদীস উল্লেখ করছি—

    1. রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম মুআ’য রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে দশটি উপদেশ দিয়েছিলেন, যার মধ্যে শীর্ষ উপদেশ ছিল এই যে, لاَ تُشْرِك بِاللهِ ششَيَّئًا وَ إِنْ قُتَّلْتَ أوْ حُرِّقْتَ  অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে শিরক করো না যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়।— মুসনাদ আহমদ।
    2. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিস সালাম বলেন— সাতটি বিধ্বংসী বস্তু থেকে বেঁচে থাক — ১. আল্লাহর সাথে শিরক করা; ২. জাদু করা; ৩. অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করা; ৪. ইয়াতীমের সম্পদ খাওয়া; ৫. সুদ খাওয়া; ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা; ও ৭. সহজ সরল নারীর উপর অপবাদ আরোপ করা। —সহীহ মুসলিম।
    3. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘আল্লাহ তা’য়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার গুনাহ মাফ করতে থাকেন যতক্ষণ না আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে পর্দা তৈরি না হয়।’ সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম, পর্দা তৈরি হওয়ার অর্থ কী?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘পর্দার মানে হচ্ছে, মৃত্যু পর্যন্ত শিরকে নিমজ্জিত থাকা। —মুসনাদ আহমাদ।

    আলোচিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস সমূহ থেকে এমন ধারণা করা কঠিন নয় যে শিরক এমন পাপ যার পরিণতিতে মানুষের মৃত্যু ও ধ্বংস সুনিশ্চিত হয়ে যায়।

    নিচে কয়েকটি উদাহরণ প্রদান করা হল—

    ক়িয়ামতের দিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় পিতা আজরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সুপারিশ করবেন, জবাবে আল্লাহ তা’য়ালা বলবেন,— ‘إِنِّىْ حَرَّمْتُ الْجَنَّةَ عَلَى الْكَافِرِيْنَ’ অর্থাৎ ‘আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি’ (সহীহ বুখারী)। এই বলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুপারিশ রদ করে দেওয়া হবে।

    রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের চাচা জনাব আবু ত়ালিব সম্পর্কে কে না জানেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের নবুওয়াত লাভের পর প্রতিটি মুহূর্তে অত্যন্ত বীরত্ব ও স্থিরতার সাথে রাসুল্লাহকে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি মক্কার ক়ুরাইশদের নির্যাতন, নিপীড়ন ও অপরিসীম চাপের মুখে লৌহপ্রাচীর হয়ে খাড়া হয়েছিলেন। শিয়াবে আবি ত়ালিব1 উপত্যাকায় বন্দী থাকার দিনগুলোতে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে সম্পূর্ণরূপে সহযোগিতা করেছিলেন। আবু জাহল ও অন্যান্যরা যখন রাসুলুল্লাহকে হত্যা করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল, তখন তিনি বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের যুবকদের মসজিদুল হারাম চত্বরে একত্রিত করে প্রকাশ্যে আবু জাহলকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। জনাব আবু ত়ালিব সারাজীবন এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে সহযোগিতা করেছিলেন। যে বছর জনাব আবু ত়ালিবের ইন্তেকাল হয়েছিল, সে বছরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম দুঃখের বছর (عام الحزن) বলে অভিহিত করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের সাথে রক্তের সম্পর্ক এবং ধর্মীয় বিষয়ে তার পূর্ণ সমর্থন থাকার পরও শুধুমাত্র ঈমান গ্রহণ না করার কারণে জনাব আবু ত়ালিবকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে যেতে হবে। —সহীহ মুসলিম।

    একব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে জাদ’আনের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহিস সালামের নিকট জানতে চেয়েছিলেন যে ‘তিনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী এবং লোকেদের খাদ্য দানকারী ছিলেন, তার এই সকল নেক আমল কি ক়িয়ামাতের দিন তার কোন উপকারে আসবে?’ উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিস সালাম বললেন,— ‘না। কেননা, সে জীবনে একবারও এই কথা বলেনি,— (رَبِّ اغْفِرْلِى خَطِيْئَتِىْ يَوْمَ الدِّيْنَ) — হে আমার রব, ক়িয়ামাতের দিন আমার পাপসমূহ ক্ষমা করে দিন।’ (সহীহ মুসলিম)। অর্থাৎ, তার আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমান ছিল না, ক়িয়ামাত দিবসের প্রতিও ঈমান ছিল না; ফলে তার সকল পূণ্য ও সৎকর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে।

    উল্লিখিত সত্য ঘটনাগুলো থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, ‘আক়ীদায়ে তাওহীদ’ ব্যতীত কোন পূণ্য ও সৎকর্ম আল্লাহ তা’য়ালার দৃষ্টিতে সামান্যতম সওয়াব ও প্রতিদানের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

    শিরকের বিপরীতে, তাওহীদের বিশ্বাস ক়িয়ামাতের দিন গুনাহের কাফফারা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মাগফিরাতের কারণ হবে। রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ কালিমা স্বীকার করবে এবং এই স্বীকৃতির উপর তার মৃত্যু হবে সে নিশ্চিত জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ সাহাবীগণ জানতে চাইলেন, ‘যদি সে ব্যভিচার করে, যদি সে চুরি করে?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘হ্যাঁ! যদি সে ব্যভিচার করে, যদি সে চুরি করে।’ (সহীহ মুসলিম)। একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,— ‘হে আদম সন্তান! যদি তুমি পৃথিবী সমান পাপও করে আস কিন্তু এমন অবস্থায় আসো যে, আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করোনি, তাহলে আমি তোমার পৃথিবী সমান পাপ ক্ষমা করে দিব। (তিরমিযী)।

    ক়িয়ামাতের দিন এক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, যার নিরানব্বইটি খাতা হবে পাপে পরিপূর্ণ। সে তার পাপের কারণে হতাশ হবে। আল্লাহ তা’য়ালা ঘোষণা করবেন— ‘আজ কারও প্রতি জুলম করা হবে না, আপনাদের একটি সৎকর্ম থাকলেও কর্ম পরিমাপের পাল্লার নিকট চলে যান।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন,— ‘তার পাপসমূহ পাল্লার এক অংশে ঢেলে দেওয়া হবে এবং অপরাংশে ঢেলে দেওয়া হবে সৎকর্ম সমূহ। সেই একটি সৎকর্ম সমস্ত পাপের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে। সেই একটি সৎকর্ম হবে— أَشْهَدُ أَنْ لآَ إَلَهَ إِلاَّ اللهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ  (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম আল্লাহর রাসুল)’ — (তিরমিযি)।

    এক বৃদ্ধ রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের নিকট উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন,— ‘হে রাসুলুল্লাহ! সারা জীবন পাপে নিমজ্জিত ছিলাম, এমন কোন পাপ নেই যা করিনি; সমস্ত পৃথিবীতে যত প্রাণী রয়েছে সবার মধ্যে আমার পাপ বণ্টন করে দিলেও আমি তাদের সবাইকে নিয়ে জাহান্নামে চলে যা। আমার তাওবার কোন সুযোগ আছে কি?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বললেন,— ‘ইসলাম গ্রহণ করেছেন কি?’ লোকটি বলল,— ‘أَشْهَدُ أَنْ لآَ إَلَهَ إِلاَّ اللهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম আল্লাহর রাসুল)।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন,— ‘আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং পাপকর্মকে সৎকর্মে পরিবর্তনকারী।’ লোকটি জানতে চাইলেন,— ‘আমার পাপ ও অপরাধকে ক্ষমা করা হবে কি?’ রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন,— ‘হ্যাঁ, আপনার পাপ ক্ষমা করা হবে।’ (ইবনে কাসির)।

    একবার ভাবুন তো! একদিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের আপন চাচা, যিনি আজীবন ধর্মের ব্যাপারে আপন ভাতিজার সাহচর্যের হক আদায় করেছেন, কিন্তু তাওহীদের আক়ীদার উপর ঈমান না আনার কারণে চিরস্থায়ী জাহান্নামের হক়দার হয়ে গেছেন। অপরদিকে, একজন অপরিচিত ব্যক্তি যার সাথে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রক্তের সম্পর্ক ছিল না, এবং তিনি নিজেও তার বিশাল পাপের কথা স্বীকার করছেন, তিনি তাওহীদের আক়ীদায় বিশ্বাস করার কারণে জান্নাতের হক়দার হয়েছিলেন।

    এই সমস্ত আলোচনা থেকে উপসংহার এই যে, কেয়ামতের দিন নাজাত লাভ সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির আক়ীদার উপর নির্ভর করবে। যদি আক়ীদা কিতাব ও সুন্নাহ মোতাবেক বিশুদ্ধ তাওহীদের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, তবে সৎকর্মের উত্তম প্রতিদান ও পুরষ্কার দেওয়া হবে এবং পাপসমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু আক়ীদা তাওহীদের উপর না হয়ে শিরকের উপর হলে আসমান-জমিন পরিমাণ সৎকর্মও অগ্রহণযোগ্য এবং প্রত্যাখ্যাত হবে।

  • নারীর ফাঁদ

    নারীর ফাঁদ

    ১১৭৫ সালের এপ্রিল মাস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আপন চাচাতো ভাই খলীফা সালেহের গভর্নর সাইফুদ্দীনকে লিখলেন—

    ‘তোমরা খাঁচায় বন্দী রঙ-বেরঙের পাখি নিয়ে ফুর্তি কর। নারী আর সুরার প্রতি যাদের এত আসক্তি, তাদের জন্য সৈনিক জীবন খুবই বেমানান।’

    খলীফা সালেহ আর তার বংশজ গভর্নর সাইফুদ্দীন গোপনে মুসলিম খেলাফতের চিরশত্রু ক্রুসেডারদের চক্রান্তে ফেঁসে গেলেন। খেলাফতের রাজভাণ্ডার—মণি-মুক্তা, হীরা-জহরত, দিনার-দিহরাম দিয়ে এই দুই শাসক ক্রুসেডারদের প্ররোচিত ও সহযোগিতা করতে লাগলেন সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার চক্রান্ত আঁটা হল।

    একদিন ঠিক কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি এসে গেল ক্রুসেডারদের হাতে। তাঁরা মুসলিম শাসকদের মধ্যেই তালাশ করছিল দোসর। খলীফা সালেহ স্বেচ্ছায় ক্রুসেডারদের সেই ভয়ানক চক্রান্তে পা দিলেন। খলীফা ও ক্রুসেডারদের সমন্বিত চক্রান্তে দু’ দুবার হত্যার উদ্দেশ্যে সালাহুদ্দীনের উপর আঘাত হানা হল। দুবারই সৌভাগ্যবশত বেঁচে গেলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। তছনছ করে দিলেন ঘাতকদের সব চক্রান্ত। আঘাতে-প্রত্যাঘাতে পরাস্ত করলেন শত্রুদের। ফাঁস হয়ে গেল গভর্নর সাইফুদ্দীনের চক্রান্তের খবর।

    গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে ক্রুসেডারদের দোসর গাদ্দার সাইফুদ্দীন ঘর-বাড়ি, বিত্ত-বৈভব ফেলে পালিয়ে গেল। গভর্নরের আবাস থেকে উদ্ধার হল বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বিলাস-ব্যসন। গভর্নরের বাড়িতে পাওয়া গেল দেশী-বিদেশী অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতী, তরুণী, রক্ষিতা। এদের কেউ ছিল নর্তকী, কেউ গায়িকা, কেউ বিউটিশিয়ান, কেউ ম্যাসেঞ্জার। সবই ছিল সাইফুদ্দীনের মনোরঞ্জনের সামগ্রী ও ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের জঘন্য উপাদান।

    সাইফুদ্দীনের বাড়িতে আরও পাওয়া গেল নানা রঙের নানা প্রজাতির অসংখ্য পাখি। দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুলানো ছিল বিভিন্ন ভঙ্গিমার নগ্ন, অর্ধনগ্ন নারীদের উত্তেজক অশ্লীল ছবি। সুরাভর্তি অসংখ্য পিপা।

    সালাহুদ্দীন খাঁচার বন্দী পাখিদের মুক্ত করে দিলেন। গভর্নরের বাড়িতে বন্দী সেবিকা, নর্তকী, বিউটিশিয়ান ও শিল্পী-তরুণীদের আপনজনদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তারপর সাইফুদ্দীনকে লিখলেন—

    ‘তোমরা দুজনে কাফের-বেঈমানদের দ্বারা আমাকে হত্যা করাবার অপচেষ্টায় মেতেছ। কিন্তু একবারও ভেবে দেখনি, তোমাদের এই চক্রান্ত মুসলিম খেলাফতের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। তোমরা আমাকে হিংসা কর। তাই আমাকে তোমরা ধ্বংস করে দিতে চাও। দু’ দুইবার আমাকে হত্যা করার জন্যে লোক পাঠিয়েছ; কিন্তু সফল হতে পারনি। আবার চেষ্টা করে দেখ, হয়ত সফল হবে। তোমরা যদি আমাকে এ নিশ্চয়তা দাও যে, আমার মৃত্যুতে ইসলামের উন্নতি হবে, মুসলমানদের কল্যাণ হবে, তাহলে কাবার প্রভুর কসম করে বলছি, আমি তোমাদের তরবারী দিয়ে আমার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করিয়ে তোমাদের পদতলে উৎসর্গ করতে অসিয়ত করে যাব। আমি তোমাদের শুধু একটি কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, কাফের-বেঈমানরা কখনও মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না। ইতিহাস তোমাদের চোখের সামনে। আমাদের সোনালী অতীতের দিকে একবার ফিরে দেখ। আশ্চর্য, রাজা ফ্রাংক-রেমণ্ডের মত প্রচণ্ড ইসলাম বিদ্বেষী অমুসলিম শাসকরা তোমাদের সাথে একটু বন্ধুত্বের অভিনয় করল, আর অমনি তোমরা তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহস যুগিয়েছ! ওরা যদি সফল হত, তাহলে ওদের পরবর্তী প্রথম শিকার হতে তোমরাই। এরপর হয়ত দুনিয়া থেকে ইসলামী খেলাফত মুছে ফেলার কাজটিও সমাধা হত।

    তোমরা তো যোদ্ধা জাতির সন্তান। সৈন্য ও যুদ্ধ পরিচালনা তোমাদের ঐতিহ্যের অংশ। অবশ্য প্রত্যেক মুসলমানই আল্লাহর সৈনিক আর আল্লাহর সৈনিক হওয়ার পূর্বশর্ত ঈমান ও কার্যকর ভূমিকা।

    তোমরা খাঁচার পাখি নিয়ে ফুর্তি কর। মদ-নারীর প্রতি যাদের এত আসক্তি, সৈনিক জীবন ও যুদ্ধ পরিচালনা তাদের জন্যে খুবই বেমানান। আমি তোমাদের অনুরোধ করছি, তোমরা আমাকে সহযোগিতা কর। আমার সাথে জিহাদে শরীক হও। যদি না পার, অন্তত আমার বিরুদ্ধাচারণ থেকে বিরত থাক। আমি তোমাদের অপরাধের কোন প্রতিশোধ নেব না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আমীন।

    —সালাহুদ্দীন আইউবী

    গভর্নর সাইফুদ্দীন গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে নতুন চক্রান্তে মেতে উঠল। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর চিঠি পড়ে তার মধ্যে দ্বিগুণ প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল। যোগ দিল ইহুদী হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতক স্কোয়াডের সাথে। শুরু হল নতুন চক্রান্ত। হাসান ইবনে সাব্বাহর স্কোয়াড দীর্ঘ দিন ধরে ফাতেমী খেলাফতের আস্তিনের নীচে কেউটে সাপের মত বিরাজ করছিল।

    * * *

    হাসান ইবনে সাব্বাহ্ একজন স্বভাব-কুচক্রী। ফাতেমী খেলাফতের শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে সে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে তৎপর। শুভাকাঙ্ক্ষীর পোশাকে সর্বনাশী ষড়যন্ত্রের হোতা সে। অতি সংগোপনে ইসলামী খেলাফতকে ধ্বংস করতে গোপনে গড়ে তোলে ঘাতক বাহিনী। বিস্ময়কর যাদুময়তায় সাধারণ মানুষের কাছে সজ্জন হিসেবে আসন গেড়ে নেয় তার বাহিনী। অন্তর্ঘাত সৃষ্টি করে সেনাবাহিনীর মধ্যে। সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম দেয় সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস।

    হাসান ইবনে সাব্বাহর গুপ্ত বাহিনীতে রয়েছে চৌকস নারী ইউনিট। ওরা যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতী ও বিচক্ষণ। প্রাঞ্জল ভাষা ও বাকপটুতায় দক্ষ তারা। তাদের সংস্পর্শে গেলে যে কোন কঠিন মনের অধিকারী আর আদর্শিক পুরুষও মোমের মত গলে যায়। চক্রান্ত বাস্তবায়নে মাদক, নেশা, আফিম, হাশীশ, নাচ-গান ও ম্যাজিকের আশ্রয় নেয় তারা। এমনকি উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে হাসান বাহিনীর নারী গোয়েন্দারা নিজেদের দেহ বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। দীর্ঘ কঠোর প্রশিক্ষণ—অনুশীলনের মাধ্যমে উপযুক্ত হওয়ার পর শুরু হয় তাদের মূল কাজ। হাসান বাহিনী তাদের প্রতিপক্ষ ইসলামী খেলাফতকে নির্মূল করতে এমন একটি ঘাতক বাহিনীর জন্ম দেয় যে, এই বাহিনীর প্রশিক্ষিত গোয়েন্দারা বেশ-ভূষা ও ভাষা বদল করে কৌশলী আচার ব্যবহার দ্বারা ফাতেমী খেলাফতের শীর্ষ ব্যক্তিদের একান্ত বডিগার্ডের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও হাত করে নেয়। এর ফলে বড় বড় সামরিক কর্মকর্তারা গুপ্ত হত্যার শিকার হতে থাকেন। কিন্তু ঘাতকের কোন নাম-নিশানা খুঁজে পাওয়া যায় না।

    অল্পদিনের মধ্যেই হাসান বাহিনীর গুপ্তদল ফেদায়ী নামে সারা মুসলিম খেলাফতে ভয়ংকররূপে আবির্ভূত হয়। এদের প্রধান কাজ রাজনৈতিক হত্যা। এ কাজে এরা বেশী ব্যবহার করে সুন্দরী যুবতী আর মদ। শরাবে উচ্চমানের বিষ মিশিয়ে আসর গরম করার পর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে তারা। কিন্তু তাদের মদ-নারী সালাহুদ্দীন আইউবীর বেলায় অকার্যকর। অবৈধ নারী সম্ভোগ আর হারাম মদ-সুরায় সালাহুদ্দীনের আজন্ম ঘৃণা। সালাহুদ্দীনকে হত্যা করার একমাত্র উপায় অতর্কিত আক্রমণ। কিন্তু এটা মোটেও সহজসাধ্য নয়। সুলতান সালাহুদ্দীন সবসময় থাকেন প্রহরী-পরিবেষ্টিত। তাছাড়া তিনি নিজেও খুব সতর্ক।

    দু দুটি আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর সালাহুদ্দীন আইউবী ভেবেছিলেন, আমীর সালেহ ও গভর্নর সাইফুদ্দীন হয়ত তাঁর চিঠি পেয়ে তওবা করেছে। ওরা হয়ত আর তার সাথে দুশমনি করবে না। কিন্তু না, ওরা প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ হয়ে আছে। নতুন করে তৈরী করল সালাহুদ্দীনকে খতম করার সুগভীর চক্রান্তের ফাঁদ।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ক্রুসেডার ও সাইফুদ্দীনের হামলা প্রতিহত করে বিজয়োল্লাসের পরিবর্তে পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রাখলেন। অগ্রণী আক্রমণ করে শত্রুপক্ষের আরও তিনটি এলাকা দখল করে নিলেন তিনি। বিজিত এলাকার অন্যতম একটি হল গাঁজা।

    গাঁজার প্রশাসক জাদুল আসাদীর তাঁবুতে এক দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন সালাহুদ্দীন আইউবী। মাথায় তার শিরস্ত্রাণ। শিরস্ত্রাণের নীচে মোটা কাপড়ের পাগড়ী।

    তাঁবুর বাইরে প্রহরারত দেহরক্ষী দল। সালাহুদ্দীনের দেহরক্ষীরা যেমন লড়াকু, তেমনি চৌকস।

    রক্ষী দলের কমাণ্ডার কেন যেন প্রহরীদের রেখে একটু আড়ালে চলে গেল। এক দেহরক্ষী সালাহুদ্দীনের তাঁবুর পর্দা ফাঁক করে উঁকি দিল। ইসলামের অমিততেজী সিপাহসালার তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন। দু চোখ তার মুদ্রিত। চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন সালাহুদ্দীন। প্রহরী চকিত নেত্রে খাস দেহরক্ষীদের একবার দেখে নিল। দেহরক্ষীদের তিন-চারজন দেখল ওই প্রহরীর উঁকি মারার দৃশ্য। চোখাচোখি হল পরস্পর। তারা বিষয়টি আমলে নিল না। অন্যান্য প্রহরীদের নিয়ে গল্প-গুজবে মেতে উঠল। বাইরের প্রহরী এই সুযোগে তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করল। কোমরে তার ধারাল খঞ্জর। বের করে এক নজর দেখে নিল সেটা। বিড়ালের মত পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা সালাহুদ্দীনের দিকে।

    ঠিক তখনই পার্শ্ব পরিবর্তন করলেন সালাহুদ্দীন। খঞ্জর বিদ্ধ হল সালাহুদ্দীন আইউবীর মাথার খুলি ঘেঁষে মাটিতে।

    এই মুহূর্তে পার্শ্ব পরিবর্তন না করলে এফোঁড়-ওফোড় হয়ে যেত তার খুলি। সালাহুদ্দীন আইউবী বিদ্যুদ্বেগে ধড়মড় করে শোয়া থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি বুঝে ফেললেন, কী ঘটছে। ইতিপূর্বে দুবার একই ধরনের আক্রমণ হয়ে গেছে তার উপর। কালবিলম্ব না করে ঘাতকের চিবুকে পূর্ণ শক্তিতে একটা ঘুষি মারলেন সালাহুদ্দীন। চিবুকের হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার মট মট শব্দ শোনা গেল। পিছনের দিকে ছিটকে পড়ে ভয়ানক আর্তচীৎকার দিল ঘাতক।

    এই ফাঁকে সালাহুদ্দীন খঞ্জর তুলে নিলেন হাতে। প্রহরীর ভয়ার্ত চিৎকারে দৌড়ে আরও দুই দেহরক্ষী তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করল। তাদের হাতে খোলা তরবারী। সুলতান বললেন, ‘ওকে গ্রেফতার কর।’ কিন্তু সালাহুদ্দীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরাও। সালাহুদ্দীন নিজের খঞ্জর দিয়েই দুই তরবারীর মোকাবেলা করলেন। মুহূর্তের মধ্যে ধরাশায়ী হয়ে গেল ঘাতক দল।

    ইত্যবসরে বাইরের দেহরক্ষী দলের সবাই ঢুকে পড়ল তাঁবুতে। লড়াই বেঁধে গেল প্রচণ্ড। সালাহুদ্দীন দেখলেন, তাঁর নির্বাচিত দেহরক্ষীরা দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পরে লড়াইয়ে লিপ্ত। বোঝার উপায় ছিল না, এদের মধ্যে কে তার অনুগত আর কে শক্রর এজেন্ট। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে অবস্থা নিরীক্ষণ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিপক্ষের তরবারীর আঘাতে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ল উভয় পক্ষের কয়েকজন। আর কিছুসংখ্যক মারাত্মক আহত হয়ে কাতরাতে লাগল। আহত অবস্থায় পালিয়ে গেল বাকিরা।

    লড়াই থেমে যাওয়ার পর অনুসন্ধানে ধরা পড়ল, সালাহুদ্দীনের একান্ত দেহরক্ষীদের মধ্যে সাতজনই হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতক সদস্য। যে ঘাতক প্রথম আঘাত হেনেছিল, তাকে সালাহুদ্দীন নিজেই দেহরক্ষী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ওই নরাধম তাঁবুতে প্রবেশ করার পর ভিতরের পরিস্থিতি পরিকল্পনার বিপরীত হয়ে গেল। ওর আর্তচিৎকারে বাকিরাও তাঁবুতে প্রবেশ করলে প্রকৃত প্রহরীরাও ঘটনা আঁচ করতে পেরে দ্রুত প্রতিরোধে এগিয়ে এল। শত্রুদের পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেল। এ যাত্রায়ও বেঁচে গেলেন সালাহুদ্দীন।

    ঘাতকের বুকে তরবারী রেখে সালাহুদ্দীন জিজ্ঞেস করলেন— ‘কে তুমি? কোত্থেকে কিভাবে এখানে এসেছ? আর কে তোমাকে এ কাজে পাঠিয়েছে?’ সত্য স্বীকারোক্তির বিনিময়ে সালাহুদ্দীন ঘাতকের প্রাণ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ঘাতক বলে দিল, সে ফেদায়ী, আমীর সালেহের এক কেল্লাদার গভর্নর গোমস্তগীন এ কাজে নিযুক্ত করেছে তাকে।

    সালাহুদ্দীন আইউবী মুসলিম মিল্লাতের একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। খৃষ্টানদের কাছেও কখনই বিস্মৃত হবার নন তিনি।

    সালাহুদ্দীন আইউবীর কীর্তি-কাহিনী ঐতিহাসিকদের লেখা ইতিহাসে সংরক্ষিত। তবে তাঁর জীবন ও কর্মের বাঁকে বাঁকে আপনজন ও স্বগোত্রীয়দের হিংসাত্মক শত্রুতা, চরিত্র হনন, চারপাশের মানুষদের দ্বারা বিছানো বহু বিস্তৃত ভয়ংকর চক্রান্তজাল, শত্রুপক্ষের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আঘাত আর তাঁর মিশন ব্যর্থ করতে খৃষ্টান-ইহুদীদের ষড়যন্ত্র ও সুন্দরী নারীদের পাতা ফাঁদের কথা ইতিহাসের পাতায় বিস্তারিত বিবৃত হয়নি। সে সব অজানা ইতিহাস আমি বলার ইচ্ছা রাখি।

    * * *

    ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। সালাহুদ্দীন আইউবী সেনাপ্রধান হয়ে মিসরে আগমন করলেন। ফাতেমী খেলাফতের কেন্দ্রীয় খলীফা তাঁকে এ পদে নিযুক্ত করে বাগদাদ থেকে প্রেরণ করেন।

    মিসরের সেনাপ্রধান ও শাসকের গুরুত্বপূর্ণ পদে সালাহুদ্দীনের মত তরুণের নিযুক্তি স্থানীয় প্রশাসকদের দৃষ্টিতে ছিল অনভিপ্রেত। কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকদের দৃষ্টিতে সালাহুদ্দীন হলেন যথোপযুক্ত ব্যক্তি। বয়সে তরুণ হলেও সালাহুদ্দীন শাসক বংশের সন্তান। বাল্যকাল থেকেই কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করেছেন যুদ্ধবিদ্যা। অল্প বয়সেই যুদ্ধের ময়দানে প্রমাণ করেছেন নিজের বিরল প্রতিভা ও অসামান্য দূরদর্শিতা।

    সালাহুদ্দীন আইউবীর দৃষ্টিতে দেশ শাসন বাদশাহী নয়—জনসেবা। জাতির ইজ্জত-সম্মান, সমৃদ্ধি-উন্নতি এবং সেবার মাধ্যমে নাগরিকদের সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই শাসকদের দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু তিনি ছেলেবেলা থেকেই দেখে এসেছেন মুসলিম শাসকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা—অনৈক্য, একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্যে আমীর-ওমরার মধ্যে খৃষ্টানদের সাথে ভয়ংকর বন্ধুত্ব স্থাপনের আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা।

    শাসকদের সিংহভাগ জাগতিক বিলাস-প্রমোদে মত্ত। মদ, নারী আর নাচ-গানে শাসক শ্ৰেণী আকণ্ঠ ডুবন্ত। জীবনকে জাগতিক আরাম-আয়েশের বাহারী রঙে সাজিয়ে রেখেছে কর্তারা। মিল্লাতের ঐতিহ্য, মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনাকে শাসক শ্রেণী নিক্ষেপ করেছে অতল-গহ্বরে।

    আমীর, উজীর, উপদেষ্টা ও বড় বড় আমলার হেরেমগুলো বিদেশী খৃষ্টান সুন্দরী তরুণীদের নৃত্য-গীতে মুখরিত। শাসকদের হেরেমগুলোকে আলোকিত করে রেখেছে খৃষ্টান-ইহুদীদের প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা কিশোরীরা। শাসকদের বোধ ও চেতনা সব ওদের হাতের মুঠোয়। খৃষ্টান গোয়েন্দা মেয়েরা মুসলিম শাসকদের হেরেমে অবস্থান করে মদ-সুরা, নাচ-গান আর দেহ দিয়ে শুধু শাসকদের কব্জায়-ই রাখছে না—মুসলিম খেলাফতের প্রাণরস ভিতর থেকে উঁই পোকার মত খেয়ে খেয়ে অসাড় করে দিচ্ছিল তারা।

    খৃষ্টান রাজারা ইসলামী সালতানাতগুলোকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। মুসলিম শাসকদের মধ্যে বপণ করছে সংঘাত ও প্রতিহিংসার ধ্বংসাত্মক বীজ। এ কাজে খৃষ্টানরা এতই সাফল্য অর্জন করল যে, কিছুসংখ্যক মুসলিম শাসক খৃষ্টান সম্রাট ফ্র্যাংককে বাৎসরিক ট্যাক্স দিতে শুরু করলেন। পরস্পর প্রতিহিংসাপরায়ণ মুসলিম শাসকদের ক্ষুদ্র অঞ্চলগুলোতে গোপন সন্ত্রাস ও হামলা চালিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত করে নিরাপত্তা চাঁদা আদায় করছিল খৃষ্টান রাজারা। প্রজাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলেও ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করতে প্রজাদের রক্ত শুষে ট্যাক্স আদায় করে খৃষ্টান রাজাদের বাৎসরিক সেলামী আদায় করছিল মুসলিম শাসকরা।

    সামাজিক সংঘাত, আত্মকলহ ও শ্রেণীগত বিরোধে তখন মুসলমানদের একতা-সংহতি বিলীন। ধর্মীয় দলাদলি, মাযহাবী মতবিরোধে মুসলিম সম্প্রদায় শতধা বিভক্ত। হাসান ইবনে সাব্বাহ নামের এক ভণ্ড ইহুদী-পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির লোভে মিসরের সমাজে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিরূপে আভির্ভূত হয়। গোপনে গড়ে তোলে নিজস্ব গোয়েন্দা, সেনা ও সুইসাইড বাহিনী। এরা জঘন্য গুপ্ত হত্যায় এই প্রসিদ্ধি লাভ করে যে, হাশীশ বাহিনী রূপে সারা মিসরে এরা খ্যাত।

    এই সাব্বাহ বাহিনীর সাথে সালাহুদ্দীনের পরিচয় বাগদাদে। মাদরাসা নিজামুল মুলুকে পড়াশোনাকালীন সময়ে সালাহুদ্দীন জানতে পারেন; সাব্বাহ বাহিনীর গুপ্তঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল নিজামিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা নিজামুল মুল্‌ককে।

    নিজামুল মুল্‌ক ছিলেন মুসলিম খেলাফতের একজন যশস্বী গভর্নর। সুশাসক ও গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন তিনি। মুসলমানদের সর্বাধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এবং ইহুদী-খৃষ্টানদের বিপরীতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতেই গভর্নর নিজামুদ্দীন গড়ে তোলেন মাদরাসা নিজামিয়া। অল্পদিনের মধ্যে নিজামিয়া মাদরাসা বিশ্বের তাবৎ জ্ঞানী-গুণী-পণ্ডিতদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং শিক্ষা-দীক্ষায় খ্যাতি লাভ করে। ওখানকার শিক্ষার্থীরা ইসলাম বিরোধীদের উপযুক্ত মোকাবেলা করার যোগ্য হিসেবে গড়ে ওঠে। মাদরাসা নিজামিয়ায় আবশ্যিক রাখা হয় সামরিক প্রশিক্ষণ ও সমরকলা।

    খৃষ্টানদের কাছে এ বিষয়টি মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠে তাদের অস্তিত্বের জন্যে। তাই ওরা চক্রান্ত আঁটে। ওদের যোগসাজশে নিজামুল মুলকের দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে আবির্ভূত হয় সাব্বাহ বাহিনী। সাব্বাহ বাহিনীকে হাত করে খৃষ্টান চক্রান্তকারীরা হত্যা করে নিজামুল মুলককে। এ ঘটনা সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্মের প্রায় শত বছর আগের।

    নিজামুল মুল্‌কের মৃত্যু হলেও মাদরাসা নিজামিয়া বন্ধ হয়ে যায়নি। অব্যাহত থাকে ইসলামের সৈনিক তৈরীর প্রচেষ্টা। ওখানেই জাগতিক ও ধর্মীয় বিশেষ করে যুদ্ধ-বিদ্যায় প্রশিক্ষণ নেন সালাহুদ্দীন। রাজনীতি, কূটনীতি, ভূগোল, ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ কৌশলের উপর সালাহুদ্দীনের গভীর আগ্রহের কারণে নুরুদ্দীন জঙ্গী ও চাচা শেরেকোই তার জন্যে স্পেশাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। শিক্ষা অবস্থায়ই তাকে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্যে। সর্বক্ষেত্রেই দেখা যেত সালাহুদ্দীনের অসাধারণ যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা। অনুপম কর্মকৌশলে মুগ্ধ হয়ে জঙ্গী তাকে মিসরের গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এখান থেকেই সালাহুদ্দীনের সংগ্রামী জীবনের সূচনা।

    * * *

    সেনাপ্রধান ও গভর্নর হয়ে মিসরে পদার্পণ করলেন সালাহুদ্দীন আইউবী। রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল তার সম্মানে। স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা করল জমকালো অনুষ্ঠানের। সার্বিক আয়োজনের নেতৃত্ব দিলেন সেনা অধিনায়ক নাজি।

    নাজি মিসরের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান, পঞ্চাশ হাজার নিয়মিত বাহিনীর অধিনায়ক। মিসরে নাজি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি। মুকুটহীন সম্রাট। ভবিষ্যত গভর্নর হিসেবে নিজেকেই একমাত্র ফাতেমী খেলাফতের যোগ্য উত্তরসূরী মনে করেন তিনি। সালাহুদ্দীন আইউবীর নিয়োগে স্বপ্নভঙ্গ হল তাঁর। তবে দমে গেলেন না তিনি। সালাহুদ্দীন আইউবীকে দেখেই নাজি আশ্বস্ত হলেন, এই বালক তাঁর জন্যে মোটেও সমস্যা হবে না। নিজের দাপট যথারীতি বহাল রাখতে পারবেন তিনি।

    সালাহুদ্দীনের আগমনে বড় বড় সেনা অফিসার ও গুরুত্বপূর্ণ আমলাদের অনেকেরই ভ্রু কুঞ্চিত হল। অনেকেই নিজেকে ভাবছিল মিসরের ভাবী গভর্নররূপে। তরুণ সালাহুদ্দীনকে দেখে চোখাচোখি করল তারা। অনেকের দৃষ্টিতে ছিল তাচ্ছিল্যের ভাব। তারা জানত না সালাহুদ্দীন আইউবীর যোগ্যতা। শুধু জানত, সালাহুদ্দীন শাসক পরিবারের ছেলে। তাঁকে চাচা শেরেকোহর স্থলাভিষিক্ত করে পাঠানো হয়েছে। নুরুদ্দীন জঙ্গীর সাথে তাঁর আত্মীয়তা রয়েছে।

    এক প্রবীণ অফিসার টিপ্পনী কাটল—‘ছেলে মানুষ আমরা তাকে গড়ে নেব।’

    অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন আর অফিসারদের সমাবেশে সালাহুদ্দীন প্রথমে কিছুটা বিব্রতবোধ করলেন। নাজির কটাক্ষ চাহনি আর কর্মকর্তাদের বিদ্রূপ সালাহুদ্দীন উপলব্ধি করলেন কি-না বলা মুশকিল। তবে বয়স্ক, অভিজ্ঞ ও প্রবীণ কর্মকর্তাদের ভীড়ের মধ্যে নিজেকে নিতান্তই বালক মনে হচ্ছিল তাঁর। দ্রুত নিজেকে সামলে অফিসারদের প্রতি মনোযোগী হলেন সালাহুদ্দীন। পিতার বয়সী জেনারেল নাজির প্রতি হাত বাড়িয়ে দিলেন মোসাফাহার জন্যে। তোষামোদে সিদ্ধহস্ত নাজি পৌত্তলিকদের মত মাথা নীচু করে কুর্নিশ করল সালাহুদ্দীনকে। তারপর কপালে চুমু দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল—

    ‘আমার বুকের শেষ রক্তফোঁটা দিয়ে হলেও তোমাকে হেফাজত করব। তুমি আমার কাছে শেরেকোহ ও জঙ্গীর পবিত্র আমানত।’

    ‘আমার জীবন ইসলামের মর্যাদার চেয়ে বেশী মূল্যবান নয় সম্মানিত জেনারেল! নিজের প্রতি ফোঁটা রক্ত সংরক্ষণ করে রাখুন। ক্রুসেডারদের চক্রান্ত কালো মেঘের মত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।’ নাজির হাতে চুমো খেয়ে বললেন সালাহুদ্দীন।

    জবাবে মুচকি হাসলেন নাজি, যেন সালাহুদ্দীন তাকে মজার কোন কৌতুক শোনালেন।

    নাজি অভিজ্ঞ অধিনায়ক। মিসরের সেনাবাহিনীর অধিপতি। তার বাহিনীতে রয়েছে পঞ্চাশ হাজার সুদানী, যারা সবাই প্রশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। নাজির মুচকি হাসির রহস্য সালাহুদ্দীন বুঝতে না পারলেও এতটুকু অনুধাবন, করলেন যে, এ কৌশলী ও বিজ্ঞ সেনাপতিকে তাঁর বড় প্রয়োজন।

    নাজি মিসরেই শুধু নয়—গোটা ইসলামী খেলাফতের মধ্যে একজন ধুরন্ধর প্রকৃতির সেনাপতি। নিজ দক্ষতায় পঞ্চাশ হাজার সুদানী বাহিনী দিয়ে স্পেশাল বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তার অধীন সৈন্যরাই পালন করত শাসকদের দেহরক্ষীর দায়িত্ব। মিসরের গভর্নরের দেহরক্ষীর দায়িত্বও ন্যস্ত ছিল নাজির স্পেশাল বাহিনীর হাতে। স্পেশাল বাহিনীর প্রতিটি সৈনিক নাজির অনুগত। তার নির্দেশে অকাতরে জীবন দিতে সামান্যতম দ্বিধা করে না কেউ। বিরাট বাহিনীর কর্তৃত্বের বদৌলতে নাজি মিসর ও আশ-পাশের অন্যান্য শাসকদের জন্য ছিলেন একটি ত্রাস। শক্তিশালী সেনাবাহিনী আর কূটচালে নাজি এ অঞ্চলের মুকুটবিহীন সম্রাট। তাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন শক্তি কারও নেই। কূটকৌশলে নাজি এমনই দক্ষ যে, সরাসরি সিংহাসনে আসীন না হলেও তাকে মনে করা হত মসনদের কারিগর। নিজের কূটচালে নাজি ইচ্ছেমত শাসকদের ক্ষমতায় আসীন করতেন আর ইচ্ছে হলে সরিয়ে দিতেন। প্রশাসনে নাজিকে বলা হত সকল দুষ্টবুদ্ধির আধার। সালাহুদ্দীন আইউবীর কথার জবাবে নাজির মুচকি হাসির রহস্য অন্যরা হয়ত ঠিকই বুঝে নিল। সালাহুদ্দীন অতসব গভীর চিন্তা না করলেও এতটুকু ঠিকই ধরে নিলেন, এই শক্তিধর সেনাপতিকে তার বড় বেশি প্রয়োজন।

    ‘অনেক পথ সফর করে এসেছেন মহামান্য গভর্নর! খানিক বিশ্রাম করে নিন।’ বলল প্রবীণ এক অফিসার।

    ‘আমার মাথায় যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, আমি সে গুরুদায়িত্ব পালনের যোগ্য নই। এই দায়িত্ব আমার ঘুম আর আরাম কেড়ে নিয়েছে। আপনারা আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন, যেখানে কর্তব্যসমূহ আমার অপেক্ষা করছে।’ বললেন সালাহুদ্দীন।

    ‘দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগে আহারটা সেরে নিলে ভাল হয় না?’ সালাহুদ্দীনের উদ্দেশে বলল নাজির সহকারী।

    একটু কী যেন চিন্তা করলেন সালাহুদ্দীন। তারপর হাঁটা দিলেন সামনের দিকে।

    বিশাল এক হলরুম। সালাহুদ্দীনের ডানে নাজি, বাঁয়ে নাজির সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড ঈদরৌস। আগে পিছনে সশস্ত্র দেহরক্ষী। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে, গার্ড অব অনার দিচ্ছে নাজির স্পেশাল বাহিনীর নির্বাচিত সদস্যরা। স্পেশাল বাহিনীর সৌকর্য, সুঠামদেহ, উন্নত হাতিয়ার, অভ্যর্থনা আর গার্ড অব অনারের বিন্যস্ত আয়োজন দেখে সালাহুদ্দীনের চোখ আনন্দে চিক্ চিক্ করে উঠল। এমন একটি সুগঠিত বাহিনীর স্বপ্ন-ই দেখছিলেন তিনি।

    কিন্তু হলের গেটে গিয়ে সালাহুদ্দীন স্তম্ভিত হলেন। চিন্তায় ছেদ পড়ল তাঁর। থমকে দাঁড়ালেন তিনি।

    সুরম্য হলঘর। প্রবেশ পথে উন্নত গালিচা বিছানো।

    দরজায় পা রেখেই মলিন হয়ে গেল সালাহুদ্দীনের চেহারা। নেমে এল বিষাদ। চার উর্বশী তরুণী তাকে দেখেই নৃত্যের ভঙ্গিতে শরীর দুলিয়ে ঝুঁকে অভিবাদন জানাল। তাদের হাতে ঝুড়িভর্তি তাজা ফুল। ফুলগুলো শৈল্পিক ভঙ্গিতে ছিটিয়ে দিতে থাকল সালাহুদ্দীনের পদতলে, তার যাত্রা পথে।

    তরুণীদের পরনে মিহি রেশমের সাদা ধবধবে ঘাগরী। পিঠে ছড়ানো সোনালী চুল। তাদের ঝুলেপড়া জুলফি বাড়িয়ে তুলেছে চেহারার রওনক। তরুণীদের শরীরের দ্যুতি সূক্ষ্ম কাপড়ের বাইরে ঠিকরে পড়ছে যেন। ওদের নৃত্য-ভঙ্গিমার তালে বেজে উঠল তবলা। সানাইয়ের সুর। সঙ্গীতের মূৰ্ছনা।

    তাজা ফুল পায়ের কাছে নিক্ষিপ্ত হতেই দ্রুত পা পিছিয়ে নিলেন সালাহুদ্দীন। ডানে নাজি আর বাঁয়ে নাজির সহকারী। সালাহুদ্দীনকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেন তারা।

    ‘মোলায়েম ফুল-পাপড়ি মাড়াতে আসেনি সালাহুদ্দীন।’ ঠোঁটে রহস্যময় হাসির আভা ছড়িয়ে দিয়ে বললেন সালাহুদ্দীন। এমন নির্মল রহস্যময় হাসি আর দেখেননি কখনও নাজি।

    ‘আমরা জনাবের চলার পথে আসমানের তারা এনেও বিছিয়ে দিতে পারি মাননীয় গভর্নর!’ বললেন নাজি।

    ‘আমার যাত্রা পথে শুধু একটা জিনিস বিছানো থাকলে তা আমাকে সন্তুষ্ট করবে।’ বললেন সালাহুদ্দীন।

    ‘আদেশ করুন হুজুর কেবলা!’–গদগদ চিত্তে বলল নাজির সহকারী— ‘কোন্ সে জিনিস, যা আপনার পায়ের তলায় ছড়িয়ে দিলে আপনাকে আনন্দ দেয়?’

    ‘ক্রুসেডারদের লাশ।’ ঈষৎ তাচ্ছিল্যের সুরে মুচকি হেসে বললেন সালাহুদ্দীন। নিমিষেই তাঁর চেহারা কঠিন হয়ে গেল। চোখ থেকে ঠিকরে বেরুতে থাকল অগ্নিদৃষ্টি। ভর্ৎসনামাখা অনুচ্চ আওয়াজে বললেন—

    ‘মুসলমানদের জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয় জেনারেল।’

    মুহূর্তের মধ্যে পার হয়ে গেল অফিসারের মুখমণ্ডল।

    সালাহুদ্দীন বললেন— ‘আপনারা কি জানেন না, খৃষ্টানরা মুসলিম সালতানাতকে ইঁদুরের মত কুরে কুরে টুকরো টুকরো করছে? বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে আমাদের? জানেন কি, কেন সফল হচ্ছে ওরা? যে দিন থেকে আমরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে ফুলের পাপড়ী মাড়াতে শুরু করেছি, নিজেদের যুবতী কন্যাদের নগ্ন করে ওদের সম্ভ্রম ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছি, সেদিন থেকে ব্যর্থতা-ই হয়ে গেছে আমাদের বিধিলিপি। আমরা মাতৃত্বের মর্যাদা আর নারীর ইজ্জত রক্ষা করতে পারছি না। আপনারা জেনে রাখুন, আমার দৃষ্টি ফিলিস্তিনে নিবদ্ধ। আপনারা আমার পথে ফুল বিছিয়ে মিসরেও কি ইসলামের পতাকা ভূলুণ্ঠিত করতে চান?’

    তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চতুর্দিকটা এক নজর দেখে জলদগম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলেন সালাহুদ্দীন—

    ‘আমার পথ থেকে ফুলগুলো সরিয়ে নাও। ফুল মাড়িয়ে গেলে ও-ফুলের কাটা আমার হৃদয়টাকে ঝাঁঝরা করে দেবে। আমার পথের তরুণীদের হটাও। আমি চাই না ওদের রেশমী চুলে আটকে পড়ে আমার তরবারী অকেজো হয়ে যাক।’

    ‘আর আমাকে কখনও ‘হুজুর কেবলা’ বলে সম্বোধন করবেন না। কঠোর ঝাঁঝের স্বরে বললেন সালাহুদ্দীন। তাঁর তিরস্কারে যেন অফিসারদের দেহ থেকে মাথাগুলো সব বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

    ‘হুজুর কেবলা’ তো তিনি, যার আনীত কালেমা পড়ে আমরা সবাই মুসলমান হয়েছি। এই অধম তার নগণ্য অনুগত উম্মত মাত্র। আমি তার পয়গাম বুকে ধারণ করেই মিসর এসেছি। তার আদর্শ রক্ষায় আমি আমার জীবন কোরবান করেছি। খৃষ্টানরা আমার বুক থেকে এই পবিত্র পয়গাম ছিনিয়ে নিতে চায়, মদের জোয়ার রোম সাগরে ডুবিয়ে দিতে চায় ইসলামের ঝাণ্ডা। আমি আপনাদের বাদশা হয়ে আসিনি—এসেছি ইসলামের একজন নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক হয়ে।’

    নাজির ইশারায় তরুণীরা ফুলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আড়াল হয়ে গেল। দ্রুতপায়ে হলরুমে প্রবেশ করলেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    রাজকীয় দরবার হল। মাঝখানে এক লম্বা টেবিলে থোকা থোকা ফুলের তোড়া। দীর্ঘ চওড়া টেবিলের চারপাশে সাজানো রাজসিক খাবার। আস্ত মুরগী, খাসির রান, দুম্বার বক্ষদেশের মোলায়েম গোশতের রকমারী আয়োজন। কক্ষময় খাবারের মৌতাত গন্ধ।

    টেবিলের এক পার্শ্বে রক্ষিত সালাহুদ্দীনের জন্যে বিশেষ আসন। সালাহুদ্দীন দৃঢ়পদে আসনের পাশে দাঁড়ালেন। পাশের এক অফিসারকে জিজ্ঞেস করলেন—

    ‘মিসরের সব নাগরিক কি এ ধরনের খাবার খেতে পায়?’

    ‘না, সম্মানিত গভর্নর। সাধারণ মানুষ তো এ ধরনের খাবার স্বপ্নেও দেখে না।’

    ‘তোমরা কি সে জাতির সদস্য নও, যে জাতির সাধারণ মানুষ এমন খাবার স্বপ্নেও দেখে না?’

    কারও পক্ষ থেকে কোন জবাব এল না।

    ‘এখানে ডিউটিরত যত কর্মচারী আছে, সবাইকে ডেকে ভিতরে নিয়ে এস। এ খাবার তারা সবাই খাবে।’ নির্দেশের স্বরে বললেন সালাহুদ্দীন।

    সালাহুদ্দীন একটি রুটি হাতে নিয়ে তাতে দু টুকরো গোশত যোগ করে খেয়ে নিলেন। দ্রুত আহারপর্ব শেষ করে নাজিকে নিয়ে গভর্নরের দফতরে চলে গেলেন।

    জাঁকজমকপূর্ণ গভর্নর হাউজ। দফতর নয়, যেন এক জান্নাতি বালাখানা। দাফতরিক প্রয়োজনের চেয়ে আয়েশী আয়োজন—উপকরণ-ই বেশী। দফতরের বিন্যাসে মারাত্মক বৈষম্য। গভর্নর হাউজের দাফতরিক পরিস্থিতি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলেন সালাহুদ্দীন। তার আগেই এখানে চলে আসা আলী বিন সুফিয়ান ততক্ষণে দেখে নিয়েছেন গভর্নর হাউজের খুঁটিনাটি। সালাহুদ্দীন নাজির কাছ থেকে জেনে নিলেন বিভিন্ন বিষয়।

    দু ঘন্টা পর গভর্নর হাউজ থেকে বেরিয়ে এল নাজি। দ্রুতপায়ে নিজের ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। এক লাফে ঘোড়ায় আরোহণ করে লাগাম টেনে ধরলেন। প্রশিক্ষিত ঘোড়া ক্ষিপ্রগতিতে চলে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে।

    নিঝুম রাত। নাজির খাস কামরায় জমে উঠেছে মদের আসর। মদপানে যোগ দিয়েছে নাজির একান্ত সহযোগী দুই কমাণ্ডার। আজকের আসরের আমেজ ভিন্ন। কোন নৃত্যগীত নেই। সবার চেহারা রুক্ষ। গ্লাসের পর গ্লাস ঢেলে দিচ্ছে সাকী। গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছে তিনজন।

    নীরবতা ভঙ্গ করে নাজি বললেন—

    ‘এসব যৌবনের তেজ, বুঝলে? ক’ দিনের মধ্যেই দেখবে সব ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’

    ‘অভাগা কথায় কথায় বলে “কাবার প্রভুর কসম!” ইসলামী সালতানাত থেকে খৃষ্টানদের বিতাড়িত না করে আমি বিশ্রাম নেব না।’

    ‘হু! সালাহুদ্দীন আইউবী!’—তাচ্ছিল্যভরে উচ্চারণ করল এক কমাণ্ডার— ‘সে জানে না, ইসলামী সালতানাতের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। এখন হুকুমত চালাবে সুদানীরা।’

    ‘আপনি কি বলেননি, স্পেশাল বাহিনীর পঞ্চাশ হাজার সৈন্য সব সুদানী?’—নাজিকে জিজ্ঞেস করল অপর কমাণ্ডার— ‘বলেননি, যাদেরকে তিনি নিজের সৈন্য মনে করছেন, ওরা খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না?’

    ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে ঈদরৌস! আমি বরং তাকে আশ্বাস দিয়েছি, এই পঞ্চাশ হাজার সুদানী শার্দুল তাঁর আঙুলের ইশারায় খৃষ্টানদের ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। ওদের নিশানা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। অচিরেই ওদের বিশ্বাসের প্রতীক ক্রুশ ভূলুণ্ঠিত হবে। কিন্তু—’

    থেমে গেলেন নাজি।

    ‘কিন্তু আবার কি?’ আগ্রহের সাথে জানতে চাইল উভয় কমাণ্ডার।

    নাজি বললেন, ‘কিন্তু সে আমাকে বলল, মিসরের নাগরিকদের নিয়ে একটি সেনা ইউনিট গড়ে তুলুন। বলল, এক এলাকার মানুষের উপর সৈন্যবাহিনীকে সীমিত রাখা উচিত নয়। সে আমাদের বাহিনীর সাথে মিসরীয়দের মিশ্রণ ঘটাতে চায়।’

    ‘তা, আপনি কী বললেন?’

    ‘আমি তাকে বলেছি, শীঘ্রই আপনার হুকুম তামিল করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমি কখনই এমনটি করব না।’ বললেন নাজি।

    ‘সালাহুদ্দীন আইউবীর মেজাজ-মর্জি কেমন দেখলেন?’ নাজিকে জিজ্ঞেস করল ঈদরৌস।

    ‘দেখেই বোঝা যায়, খুব জেদী।’

    ‘আপনার অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা আর কৌশলের কাছে সালাহুদ্দীন কোন ফ্যাক্টর নয়। নতুন গভর্নর হল তো, তাই কিছুটা গরম গরম ভাব। দেখবেন, অল্প দিনের মধ্যেই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।’ বলল অন্য কমাণ্ডার।

    ‘আমি তাঁর মনোভাব বদলাতে দেব না। আমি তাকে ঘোরের মধ্যেই রাখতে চাই। ক্ষমতার নেশায় বুঁদ করে রেখেই তাকে শায়েস্তা করব।’ বললেন নাজি।

    নাজির খাস ভবনে গভীর রাত পর্যন্ত সুরাপান আর সালাহুদ্দীন আইউবী সম্পর্কে নানা আলোচনা হল। নাজি সহকর্মীদের নিয়ে ঠিক করলেন যদি সালাহুদ্দীন আইউবী তার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে ওঠে, তবে তারা কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হল।

    একদিকে চলছে নাজির চক্রান্ত। অপরদিকে সালাহুদ্দীন আইউবী গভর্নর হাউজে অফিসারদেরকে তার নিয়োগ ও কর্মকৌশলের কথা ব্যাখ্যা করছেন। সালাহুদ্দীন অফিসারদের জানালেন— ‘আমি মিসরের রাজা হয়ে আসিনি আর আমি কাউকে অন্যায় রাজত্ব করতেও দেব না।’

    সালাহুদ্দীন অফিসারদের বললেন সামরিক শক্তিবৃদ্ধি ছাড়া ইসলামী খেলাফতের দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এখানকার সেনাবাহিনীর কাঠামো ও বিন্যাস তার পছন্দ নয়, তা-ও অবহিত করলেন। বললেন— ‘পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের স্পেশাল বাহিনীতে সবাই সুদানী নাগরিক। ব্যাপারটি ঠিক নয়। কোন কাজে আঞ্চলিকতার প্রাধান্য থাকা অনুচিত। আমরা সব অঞ্চলের মানুষকেই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করতে চাই। সবাই যাতে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী দেশের সেবায় কাজ করতে পারে। তাতে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্যও দূর হবে। সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতিকল্পে এ পদক্ষেপ ফলপ্রসূ অবদান রাখবে।’

    সালাহুদ্দীন অফিসারদের জানালেন— ‘আমি জেনারেল নাজিকে বলে দিয়েছি, তিনি যেন মিসরের লোকদেরকে সেনাবাহিনীতে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করেন।’

    ‘আপনি কি বিশ্বাস করেন, নাজি আপনার নির্দেশ পালন করবে?’ সালাহুদ্দীনের কাছে জানতে চাইলেন একজন প্রবীণ সচিব।

    ‘কেন? সে আমার নির্দেশ অমান্য করবে নাকি?’

    ‘এড়িয়ে যেতে পারেন’ —সচিব বললেন— ‘এ ফৌজী কার্যক্রমে তার একক আধিপত্য। তিনি এ ব্যাপারে কারও হুকুম পালন করেন না, বরঞ্চ অন্যকে পালন করতে বাধ্য করেন।’

    সালাহুদ্দীন চুপ হয়ে গেলেন। যেন কথাটি তিনি বুঝতেই পারেননি। সচিবের কথায় তার কোন ভাবান্তর হল না। কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন নীরবে বসে থেকে তিনি সবাইকে গভর্নর হাউজ থেকে বিদায় করে দিলেন।

    আলী বিন সুফিয়ান খানিকটা দূরে বসে আছেন। সালাহুদ্দীন তাঁকেই শুধু থাকতে ইশারা করলেন। সবাই চলে যাওয়ার পর তাঁকে কাছে ডাকলেন।

    আলী একজন দক্ষ গোয়েন্দা। বয়সে সালাহুদ্দীনের বড়। কিন্তু শরীরের শক্ত গাঁথুনি, দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা আর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ আলীকে যুবকে পরিণত করেছে। নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিশ্বস্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও দূরদর্শী কমাণ্ডার হিসেবে আলীর অবস্থান সবার উপরে। মিসরের স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতি আর অবিশ্বস্ততার দিকটি বিবেচনায় রেখে জঙ্গী আলীকে সালাহুদ্দীনের সহকর্মী হিসেবে মিসর প্রেরণ করেন। সালাহুদ্দীনের অধীনে শুধু আলী নিজেই আসেননি, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তার হাতেগড়া সুদক্ষ এক গোয়েন্দা ইউনিট। এরা কমাণ্ডো, গেরিলা অভিযান ও গোয়েন্দাকর্মে পটু। প্রয়োজনে আকাশ থেকে তারকা ছিনিয়ে আনতেও এর দ্বিধা করে না।

    আলীর সবচেয়ে বেশী প্রশংসনীয় গুণটি হল, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর একই আদর্শে বিশ্বাসী। ইসলামী খেলাফত ও মুসলমানদের কল্যাণে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে আলী সালাহুদ্দীনের মত সদা প্রস্তুত।

    ‘তুমি কি লক্ষ্য করেছ আলী! ওই অফিসার বলে গেল, নাজি কারও হুকুম তামিল করে না, অন্যদেরকে সে নির্দেশ মানতে বাধ্য করে শুধু।’

    ‘জী, শুনেছি। আমার মনে হয়, স্পেশাল বাহিনীর প্রধান নাজি নামের এই লোকটি খুবই কুটিল। এ লোক সম্পর্কে আগে থেকেই আমি অনেক কথা জানি। পঞ্চাশ হাজার সৈন্য আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা নেয়; অথচ প্রকৃত পক্ষে ওরা নাজির ব্যক্তিগত বাহিনী। ব্যক্তিস্বার্থে লোকটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোটিই নষ্ট করে দিয়েছে। প্রশাসনের পদে পদে অনুগত চর বসিয়ে রেখেছে।’

    ‘সেনাবাহিনীতে সব এলাকার লোকের অনুপ্রবেশ ঘটানোর সিদ্ধান্তে আপনার সাথে আমি একমত। অচিরেই আমি এ ব্যাপারে আপনাকে বিস্তারিত জানাব। সুদানী সৈন্যরা খেলাফতের আনুগত্যের বিপরীতে নাজির আনুগত্য করে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সেনাবাহিনীর কাঠামোটাই আমাদের বদলে ফেলতে হবে কিংবা এ পদ থেকে নাজিকে সরিয়ে দিতে হবে।’

    ‘আমি প্রশাসনে আমার শত্রু তৈরী করতে চাই না আলী! নাজি আমাদের হাড়ির খবর রাখে। এ মুহূর্তে ওকে অপসারণ করা ঠিক হবে না। নিজেদের রক্ত ঝরাতে আমি তরবারী হাতে নেইনি। আমার তরবারী শত্রুর রক্তের পিয়াসী। আমি সদাচারণ ও ভালবাসা দিয়ে নাজিকে বাগে আনার চেষ্টা করছি। তুমি ওর সৈন্যদের মধ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে আমাকে জানাও বাহিনীটা আমাদের কতটুকু অনুগত।’

    ‘নাজি আনাড়ী লোক নয়। ভালবাসা আর মমতা দিয়ে ওর দুষ্ট মানসিকতা বদলানোর অবকাশ নেই। নাজি এ-সবের অনেক ঊর্ধ্বে। বেটা একটা সাক্ষাত শয়তান। ক্ষমতা, চালবাজী, দুষ্কর্মই তার পেশা এবং নেশা । লোকটা এত-ই ধূর্ত ও চালাক যে, তোষামোদ দ্বারা সে পাথরকেও মোমের মত গলিয়ে দিতে পারে।’

    সালাহুদ্দীন আইউবীকেও ঘায়েল করার জন্যে চালবাজী শুরু করলেন নাজী। সামনে কখনও তিনি নিজের আসনে পর্যন্ত বসেন না। ‘জী, হ্যাঁ’, ‘খুব ভাল’, ‘সব ঠিক’ রাজ্যের যত তোষামোদ ও চাটুকারিতার উপযোগী শব্দ-বাক্য আছে, সবই তিনি সালাহুদ্দীনের সঙ্গে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। সালাহুদ্দীনের আস্থা অর্জনের জন্যে মিসরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনীতে লোক রিক্রুট করতে শুরু করলেন তিনি।

    ধূর্তামিপূর্ণ আচরণে সালাহুদ্দীন নাজির প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেন। নাজি সালাহুদ্দীনকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, স্পেশাল বাহিনীর প্রতিটি সৈনিক খেলাফতের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত। সুদানী ফৌজ আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। তারা আপনাকে পেয়ে খুবই গর্বিত। আপনার সম্মানে তারা একটি সংবর্ধনার আয়োজন করার জন্যে আমার কাছে আবেদন করেছে। ওরা আপনাকে সম্মান জানাতে চায়; আপনাকে নিজেদের মত করে কাছে পেতে ওরা খুব-ই উদ্গ্রীব।

    সালাহুদ্দীন আইউবী নাজির প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। বললেন— ‘আমি আপনার ফৌজের দেওয়া সংবর্ধনায় যাব।’

    কিন্তু দাফতরিক কাজের ঝামেলায় সালাহুদ্দীন নাজির অনুষ্ঠানের জন্যে সময় বের করতে পারছিলেন না। তাই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে গেল কয়েক দিনের জন্য।

    * * *

  • সপ্তম মেয়ে

    সপ্তম মেয়ে

    ক্রুসেডারদের নৌ-বহর ও সেনাবাহিনীকে রোম উপসাগরে ডুবিয়ে মেরে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এখনও মিসরের উপকূলীয় অঞ্চলেই অবস্থান করছেন। সাতদিন কেটে গেছে। সুলতান সালাহুদ্দীন খৃষ্টানদের থেকে জরিমানাও আদায় করে নিয়েছেন। কিন্তু রোম উপসাগর এখনও একের পর এক নৌ-জাহাজ গলাধঃকরণ করে চলছে আর উদগীরণ করছে মানুষের লাশ। মাঝি-মাল্লা ও সৈন্যরা আগুন ধরে যাওয়া জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এখন এক এক করে ভেসে উঠছে তাদেরই মৃতদেহ।

    দূরে মাঝ দরিয়ায় সাতদিন পরও আজ কয়েকটি জাহাজের পাল বাতাসে ফড় ফড় করছে। কোন মানুষ নেই তাতে। ছেঁড়া পাল জাহাজগুলোকে সমুদ্রের দয়ার উপর ছেড়ে দিয়েছে।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সেগুলোর তল্লাশী নেওয়ার জন্য কয়েকটি নৌকা প্রেরণ করেন। বলে দেন, যদি কোন জাহাজ বা কিশতী অক্ষত থাকে, কাজে আসার মত হয়, তাহলে রশি বেঁধে টেনে নিয়ে আসবে। আর যেগুলো অকেজো, সেগুলোর মাল-পত্র বের করে আনবে।

    খৃষ্টানদের ভাসমান জাহাজগুলোর তল্লাশী নেওয়া হল। যা পাওয়া গেল, তন্মধ্যে বেশীর ভাগ অস্ত্র, খাদ্যদ্রব্য আর মানুষের লাশ।

    ভাসমান লাশগুলোকে সমুদ্রের ঊর্মিমালা তুলে তুলে তীরে ছুঁড়ে মারছে। লাশগুলোর কতিপয় আগুনেপোড়া। কিছু মাছেখাওয়া। অসংখ্য লাশ এমন যে, সেগুলোর গায়ে একটি বা একেরও অধিক তীর গাঁথা।

    কাঠ-তক্তা ও ভাঙ্গা কিশতী অবলম্বন করে সাঁতার কেটে কেটে এখনও কিছু লোক কূলে এসে উঠছে। ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত, ক্লান্ত-অবসন্ন সেই ভাগ্যাহত লোকগুলোকে ঢেউ যাকে যেখানে ছুঁড়ে মারছে, লাশের মত সেখানেই পড়ে থাকছে আর মুসলমানরা তাদের তুলে আনছে। সমুদ্রতীরে মাইলের পর মাইল এই একই দৃশ্য বিরাজ করছে।

    সুলতান সালাহুদ্দীন তার বাহিনীকে মিসরের সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং যেখানেই কোন শত্রুসেনা সমুদ্র থেকে তীরে উঠে আসবে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে শুকনো পোশাক আর পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করার এবং আহত হলে ব্যাণ্ডেজ—চিকিৎসারও ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তারপর একস্থানে জড় করছেন বন্দীদের।

    ঘোড়ায় চড়ে উপকূলীয় এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন সুলতান সালাহুদ্দীন। তার ছেড়ে কয়েক মাইল দূরে চলে গেছেন তিনি। সম্মুখে ছোট-বড় অনেকগুলো টিলা। টিলার একদিকে সমুদ্র আর পিছনে ধু ধু মরু-প্রান্তর। এই সবুজ-শ্যামল মরুদ্যানে সারি সারি খেজুর বৃক্ষ ছাড়াও আছে নানা প্রকার মরুজাত গাছ-গাছালী, ঝোঁপ-ঝাড়, বৃক্ষ-লতা।

    সুলতান সালাহুদ্দীন ঘোড়া থেকে নামলেন এবং পায়ে হেঁটে টিলার পাদদেশ বেয়ে এগিয়ে চললেন। সঙ্গে তাঁর রক্ষী বাহিনীর চার অশ্বারোহী। সুলতান নিজের ঘোড়াটা রক্ষীদের হাতে দিয়ে তাদের সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। তিন সালারও আছে তাঁর সঙ্গে। তার মধ্যে একজন হলেন সুলতান সালাহুদ্দীনের অন্তরঙ্গ বন্ধু বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ। এই যুদ্ধের মাত্র একদিন আগে তিনি আরব থেকে এসেছেন। ঘোড়াটা রক্ষীদের হাতে দিয়ে সুলতানের সঙ্গে হাঁটা দেন তিনিও।

    এখন শীতের মওসুম। শান্ত সমুদ্র। সুলতান সালাহুদ্দীন হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলেন অনেক দূর। দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেলেন রক্ষীদের। এখন তার সামনে-পিছনে-বাঁয়ে উঁচু-নীচু টিলা। ডানে বালুকাময় সমুদ্রতীর। দু আড়াই গজ উঁচু এক খণ্ড পাথরের উপর উঠে দাঁড়ান সুলতান। দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন রোম উপসাগরের প্রতি। তাঁর ঈমান-আলোকিত অবয়বে বিজয়ের আনন্দ-দীপ্তি। এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছেন শান্ত-সমাহিত নীলাভ সমুদ্রপাণে। হঠাৎ নাকে হাত রেখে তিনি বলে উঠলেন— ‘কেমন উকট একটা দুর্গন্ধ আসছে, না?’

    সমুদ্রোপকূলে এদিক-ওদিক ঘুরতে শুরু করে সুলতান সালাহুদ্দীন ও তার সালারদের দৃষ্টি। কিসের যেন ফড় ফড় শব্দ কানে ভেসে আসে তাদের। তারপর হালকা চেঁচামেচি ও কন্‌কন্ শব্দ। উপর থেকে তিন-চারটি শকুন ডানা মেলে নীচে নামতে দেখা গেল। টিলার আড়ালে সমুদ্রের তীরের দিকে অবতরণ করল শকুনগুলো। সুলতান সালাহুদ্দীন বললেন— ‘লাশ আছে।’

    ওদিকে হেঁটে গেলেন তারা। পনের-বিশ গজের বেশি যেতে হল না। তিনটি লাশ। শকুনগুলো ভাগাভাগি করে খাচ্ছে লাশগুলো। পাঞ্জা করে একটি মানবমুণ্ড নিয়ে উড়ে গেল এক শকুন। উঠেই চক্কর কাটে আকাশে। হঠাৎ পা থেকে ছুটে নীচে পড়ে যায় মুখটি। পতিত হয় সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঠিক সামনে।

    মুণ্ডটির চোখ দুটো খোলা। যেন চেয়ে আছে সুলতানের দিকে। মুখমণ্ডলের আকৃতি ও মাথার চুল বলছে, এটি কোন খৃষ্টানের মাথা। সুলতান সালাহুদ্দীন অনিমেষ নয়নে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকেন মুণ্ডটির প্রতি। তারপর সালারদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন— ‘এদের মুণ্ড সেইসব বিশ্বাসঘাতক ঈমান-বিক্রয়কারী মুসলমানদের মুণ্ড অপেক্ষা অনেক ভাল, যাদের ষড়যন্ত্রে আমাদের খেলাফত আজ নারী ও মদের চিতায় বলি হতে চলেছে।’

    ‘খৃষ্টানরা ইঁদুরের ন্যায় আমাদের সালতানাতে ইসলামিয়াকে কুরে কুরে খেয়ে চলেছে।’ বললেন এক সালার।

    ‘আর আমাদের বাদশাহ তাদেরকে কর দিচ্ছেন। ফিলিস্তীন আজ খৃষ্টানদের কব্জায়। মহামান্য সুলতান! আমরা কি আশা রাখতে পারি যে, ফিলিস্তীন থেকে আমরা ওদেরকে বিতাড়ন করতে পারব?’ বললেন বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ।

    ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না শাদ্দাদ!’ জবাব দেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ‘আল্লাহর রহমত থেকে নয়—আমরা আমাদের ভাইদের থেকে নিরাশ হয়েছি।’ বললেন অপর এক সালার।

    ‘তুমি ঠিকই বলেছ। যে আক্রমণ বাইরে থেকে আসে, তা আমরা প্রতিহত করতে পারি। তোমরা কেউ কি ভেবেছিলে, কাফিরদের এত বিশাল নৌ-সেনাবহরকে এত সামান্য শক্তি দিয়ে এত সাফল্যের সাথে আমরা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারতে পারব। তোমরা হয়ত অনুমান করতে পারনি, এই বহরে যে পরিমাণ সৈন্য আসছিল, তারা সমগ্র মিসরে মাছির মত ছেয়ে যেত! মহান আল্লাহ আমাদেরকে সাহস দিয়েছেন। আর আমরা একটু কৌশল করে তাদের গোটা বহরকে সমুদ্রতলে ডুবিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমার বন্ধুগণ! যে আক্রমণ ভিতর থেকে আসছে, অত সহজে তোমরা তা প্রতিহত করতে পারবে না। তোমার ভাই যখন তোমার উপর আঘাত হানবে, তখন তুমি আগে ভাববে, সত্যিই কি এ-কাজ আমার ভাই করেছে, নাকি অন্য কেউ। তোমার মনে সংশয় জাগ্রত হবে, আমি ভুল বুঝছি না তো! বাহুতে তুমি তার উপর তরবারীর আঘাত হানার শক্তি পাবে না। আর যদি সাহস করে তরবারী উত্তোলন করেও ফেল, তখন সুযোগ বুঝে দুশমন তোমাকে ও তাকে দুজনকেই খতম করে দেবে।’ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    সঙ্গীদের নিয়ে টিলার গা ঘেঁষে ঘেঁষে সুলতান সালাহুদ্দীন সমুদ্রতীরের দিকে এগিয়ে চললেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেলেন। মাথা নুইয়ে বালি থেকে একটা কী যেন তুললেন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বস্তুটি হাতের তালুতে নিয়ে সকলকে দেখালেন।

    কাঠের তৈরি একটি ক্রুশ। শক্ত একখণ্ড সুতায় বাঁধা। শকুনরা যে লাশগুলো খাচ্ছিল, সুলতান সালাহুদ্দীন সেগুলোর বিচ্ছিন্ন অঙ্গগুলো দেখলেন। তারপর চোখ ফেললেন মুণ্ডটির প্রতি, যা শকুনের পাঞ্জা থেকে ছুটে তাঁর সামনে এসে পড়েছিল। দ্রুত হেঁটে আবার মুণ্ডটির কাছে গেলেন। মুণ্ডটির মালিকানা নিয়ে লড়াই করছে তিনটি শকুন। সুলতান সালাহুদ্দীনকে দেখে আড়ালে চলে যায় শকুনগুলো। সুলতান মুণ্ডের উপর কুশটি রাখলেন এবং দৌড়ে সালারদের নিকট চলে গেলেন। বলতে শুরু করলেন। ‘আমি একবার খৃষ্টানদের এক কয়েদী অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তার গলায়ও ক্রুশ ছিল। সে আমাকে বলেছিল, যেসব খৃষ্টান সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়, ক্রুশে হাত রেখে তাদের থেকে শপথ নেওয়া হয় যে, ক্রুশের নামে তারা জীবনবাজি রেখে লড়াই করবে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে সর্বশেষ মুসলমানটি খতম না করে ক্ষান্ত হবে না। এই হলফের পর প্রত্যেক সৈন্যের গলায় একটি করে ক্রুশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এখানে বালির মধ্যে আমি একটি ক্রুশ কুড়িয়ে পেয়েছি। কার ছিল জানি না। রেখে দিয়েছি ঐ খুলিটির উপর, যাতে, তার আত্মা, ক্রুশবিহীন না থাকে। লোকটা ক্রুশের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। একজন সৈনিককে তার শপথের মর্যাদা দেওয়া উচিত।’

    ‘মাননীয় সুলতান! আপনার অবশ্যই জানা আছে, খৃষ্টানরা জেরুজালেমের মুসলিম নাগরিকদেরকে কী পরিমাণ কষ্ট দিচ্ছে। স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে ওখানকার মুসলমানরা। লুণ্ঠিত হচ্ছে আমাদের মেয়েদের ইজ্জত-সম্ভ্রম। আমাদের বন্দীদেরকে ওরা এখনও মুক্তি দেয়নি। তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। খৃষ্টানদের থেকে কি আমরা এর প্রতিশোধ নেব না?’ বললেন বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ।

    প্রতিশোধ নয়—নেব ফিলিস্তীন। কিন্তু ফিলিস্তীনের পথ যে আগলে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের শাসকগোষ্ঠী!’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আরও বললেন, ‘কুশে হাত রেখে সালতানাতে ইসলামিয়াকে ধ্বংস করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছে খৃষ্টানরা। আমি আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়িয়ে বুকে হাত রেখে শপথ নিয়েছি, ফিলিস্তীন উদ্ধার আমি করবই। আমি সালতানাতে ইসলামিয়ার সীমানা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবে। কিন্তু আমার বন্ধুগণ! আমার কাছে আমাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল বলে মনে হয় না। এক সময় এমন ছিল যে, খৃষ্টানরা ছিল রাজা, আমরা ছিলাম যোদ্ধা। আর এখন আমাদের বুজুর্গরা পরিণত হচ্ছেন রাজায় আর খৃষ্টানরা হচ্ছে যোদ্ধা। উভয় জাতির গতি-প্রকৃতি দেখে আমার মনে হচ্ছে, একটি সময় এমন আসবে, যখন মুসলমানরা রাজায় পরিণত হয়ে যাবে ঠিক; কিন্তু তাদের উপর শাসন চালাবে খৃষ্টানরা। মুসলমানরা রাজা হওয়ার আনন্দেই বিভোর হয়ে থাকবে। তারা বলবে, আমরা স্বাধীন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাদের স্বাধীন সত্ত্বা বলতে কিছুই থাকবে না। তারা কাফিরদের দাসত্ব ছাড়া এক পাও চলতে পারবে না। আমি ফিলিস্তীন উদ্ধার করার সংকল্প গ্রহণ করেছি বটে, কিন্তু মুসলমানদের গাদ্দারী ঠেকাবে কে? খৃষ্টানদের মস্তিষ্ক বড় উর্বর। পঞ্চাশ হাজার সুদানী সৈন্যকে পুষছিল কারা? আমাদের খেলাফত নিজের আঁচলে পুষেছিল নাজি নামক একটি বিষধর সাপকে। আমিই বোধ হয় মিসরের প্রথম গভর্নর, যে দেখতে পেয়েছে, এই বাহিনী দেশের জন্য অনর্থকই নয়—ভয়ঙ্করও বটে। নাজির চক্রান্ত যদি ফাঁস না হত, তাহলে আমরা এই বাহিনীটির হাতেই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলাম।

    হঠাৎ হাল্কা একটা শো শব্দ ভেসে আসে সকলের কানে। একটি তীর এসে গেঁথে যায় সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দু পায়ের মাঝে বালিতে। সুলতান সালাহুদ্দীনের পিঠের দিক থেকে ছুটে আসে তীরটি। সেদিকে দৃষ্টি ছিল না কারুর।

    তীরটি যেদিক থেকে ছুটে আসে, হঠাৎ চমকে উঠে সেদিকে চোখ তুলে তাকায় সকলে। উঁচু-নীচু কয়েকটি টিলা ছাড়া দেখা গেল না কিছুই। সবাই উঠে দাঁড়ান। দৌড়ে গিয়ে দেয়ালের মত উঁচু একটি টিলার আড়ালে গিয়ে আশ্রয় নেন। আরও তীর আসার আশঙ্কা আছে। খোলা ময়দানে তীরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাহাদুরী নয়। মুখে আঙ্গুল রেখে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সজোরে শিস দেন শাদ্দাদ। রেকাবে পা রেখে প্রস্তুত হয়েই ছিল রক্ষী বাহিনী। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলে তাদের ঘোড়াগুলো। তার সঙ্গে তিনজন সালার ছুটে যান সেদিকে, যেদিক থেকে তীরটি এসেছিল। তিনজন তিন পথে উঠে যায় টিলায়। সালাহুদ্দীন আইউবীও ছুটে যান তাদের পিছনে। দেখে এক সালার বলল, ‘সুলতান! আপনি আসবেন না।’ কিন্তু তার বাধা মানলেন না সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছে রক্ষী বাহিনী। সুলতান সালাহুদ্দীন তাদের বললেন, ‘ঘোড়াগুলো এখানে রেখে টিলার পিছনে যাও। ওদিক থেকে একটি তীর এসেছে। যাকেই পাবে, ধরে নিয়ে আসবে।’

    একটি টিলার উপরে উঠে যান সুলতান। চারদিক দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছোট-বড়, উঁচু-নীচু অসংখ্য টিলা চোখে পড়ে তার। সালারদের নিয়ে পিছন দিকে নেমে পড়েন তিনি। চারদিক ঘুরে-ফিরে দেখে আবার উঠে আসেন। টিলায় চোখ বুলিয়ে চতুর্দিক তাকালেন। কিন্তু নাম-গন্ধও নেই কোন মানুষের।  পাথুরে এলাকার ভিতরে, উপরে-নীচে, ডানে-বাঁয়ে সর্বত্র পাতিপাতি করে খুঁজে বেড়ায় রক্ষীরা। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না তারা।

    নীচে নেমে সুলতান সালাহুদ্দীন সে স্থানে চলে আসলেন, যেখানে বালিতে তীরটি বিদ্ধ হয়েছিল। সহকর্মীদের ডাকলেন এবং তীরটির গায়ে হাত রাখলেন। পড়ে গেল তীরটি। সুলতান বললেন— ‘দূর থেকে এসেছে, তাই পায়ের পাশে পড়েছে। অন্যথায় ঘাড়ে কিংবা পিঠে এসে বিদ্ধ হত। আর বালিতেও বেশী গাঁথেনি।’ তীরটি হাতে তুলে নিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন দেখলেন এবং বললেন, ‘হাশীশীদের নয়—খৃষ্টানদের তীর।’

    ‘সুলতানের জীবন হুমকীর সম্মুখীন।’ বললেন এক সালার।

    ‘আর আজীবন হুমকীর মধ্যেই থাকবে’ —মুখে হাসি টেনে সুলতান বললেন— ‘আমি রোম উপসাগরে কাফিরদের সেসব জাহাজ-কিশতী দেখার জন্য বের হয়েছিলাম, যেগুলো মাঝি-মাল্লাবিহীন ভাসছিল। কিন্তু আমার প্রিয় বন্ধুগণ! খৃষ্টানদের কিশতী সমুদ্রে ভাসছে ভাববেন না। তারা আবার আসবে। আসবে বজ্রের মত গর্জন করতে করতে। বর্ষিবেও। তারা আঘাত হানবে মাটির নীচ আর পিঠের পিছন থেকে। এখন থেকে খৃষ্টানদের সঙ্গে আমাদের এমন লড়াই লড়তে হবে, যা শুধু সৈন্যরাই লড়বে না। সামরিক প্রশিক্ষণে আমি নতুন এক মাত্রা যোগ করছি। তা হল গোয়েন্দা লড়াই।’

    তীরটি হাতে নিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। রওনা দিলেন ক্যাম্পের দিকে। তাঁর সালারগণও ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। একজন নিজের ঘোড়া নিয়ে এলেন সুলতানের ডান দিকে। একজন আসলেন বাঁ দিকে। একজন অবস্থান নিলেন সুলতানের পিছনে, ঠিক তার সন্নিকটে, যাতে কোন দিক থেকে তীর এলে তা সুলতানের গায়ে আঘাত হানতে না পারে।

    * * *

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তীর ছোঁড়া হল। কিন্তু সে জন্য বিন্দুমাত্র উৎকণ্ঠা নেই তার। খৃষ্টান গুপ্তচর ও কমাণ্ডোরা কিরূপ ক্ষতিসাধন করছে, নিজের তাঁবুতে বসে সালারদের কাছে তারই বিবরণ দিচ্ছেন তিনি। সুলতান সালাহুদ্দীন বললেন— ‘আলী বিন সুফিয়ানকে আমি একটি পরিকল্পনা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিলম্ব না করে তোমরা নিজ নিজ সিপাহী ও কমাণ্ডারদের মধ্য থেকে এমন কিছু লোক বেছে নাও, যারা হবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, বুদ্ধিমান, সূক্ষ্মদর্শী, দূরদর্শী ও উপস্থিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। তাদের মধ্যে থাকবে উটের ন্যায় দিনের পর দিন ক্ষুৎপিপাসা সহ্য করার শক্তি, সিংহের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার দক্ষতা। যাদের দৃষ্টি হবে ব্যাঘ্রের ন্যায় সূক্ষ্ম, যারা দৌড়াতে পারে খরগোশ ও হরিণের মত। যার বিনা অস্ত্রে লড়াই করতে পারে সশস্ত্র দুশমনের সঙ্গে। সর্বোপরি তাদের মধ্যে থাকবে না কোন প্রকার মদ-মাদকতার অভ্যাস। তারা লোভে পড়ে নীতি-নৈতিকতা ত্যাগ করবে না। যত রূপসী নারীই তাদের হাতে আসুক, যত সোনা-দানা, অর্থ-বৈভব তাদের পায়ে নিক্ষিপ্ত হোক, সবকিছু উপেক্ষিত হয়ে দৃষ্টি থাকবে তাদের কর্তব্যের প্রতি।

    তোমরা তোমাদের অধীন সকলকে বলে দাও, বুঝিয়ে দাও যে, গুপ্তচরবৃত্তি, সেনাদের মধ্যে অশান্তি-অস্থিরতা বিস্তার এবং চেতনার দিক থেকে সৈন্যদের অখর্ব করে তোলার জন্য খৃষ্টানরা সুন্দরী মেয়েদের ব্যবহার করছে। আমি মুসলমানদের মধ্যে একটি দুর্বলতা লক্ষ্য করছি, তারা নারীর প্রলোভনে অল্প সময়ে অস্ত্র ত্যাগ করে। এমন কাজে আমি মুসলিম নারীদের কখনও দুশমনের এলাকায় প্রেরণ করব না। আমরা নারীর ইজ্জতের মোহাফেজ। সেই ইজ্জতকে আমরা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না। আলী বিন সুফিয়ানের হাতে কয়েকটি মেয়ে আছে। কিন্তু ওরা মুসলমান নয়, খৃষ্টানও নয়। তারপরও আমি এর পক্ষপাতি নই।’

    তাঁবুতে প্রবেশ করে রক্ষীবাহিনীর কমাণ্ডার বলে, ‘আমার বাহিনীর লোকেরা কয়েকজন পুরুষ ও কয়েকটি মেয়ে ধরে নিয়ে এসেছে।’ সুলতান সালাহুদ্দীন বাইরে বেরিয়ে আসেন। তিন সালারও বেরিয়ে আসেন তাঁর সঙ্গে। বাইরে পাঁচজন লোক দণ্ডায়মান। লম্বা চোগা, পাগড়ী আর ধরণ-প্রকৃতি বলছে, লোকগুলো বণিক। সঙ্গে তাদের সাতটি মেয়ে। সব ক’টিই যুবতী এবং একজন অপেক্ষা অপরজন অধিক রূপসী।

    রক্ষীদের একজন—যে সুলতান সালাহুদ্দীনের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করা তীরের উৎসের সন্ধানের গিয়েছিল, বলল, ‘আমরা সমগ্র এলাকা তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করলাম; কিন্তু কোন মানুষের সন্ধান পেলাম না। পিছনে আরও দূরে চলে গেলাম। হঠাৎ দেখলাম, এরা তাঁবু খাঁটিয়ে অবস্থান করছে। সঙ্গে তিনটি উট।’

    ‘এদের তল্লাশী নেওয়া হয়েছে কি?’ এক সালার জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘হ্যাঁ, হয়েছে। বলছে, এরা ব্যবসায়ী। আমরা এদের জিনিসপত্র সব খুলে দেখেছি। দেহ-তল্লাশীও নিয়েছি। কিন্তু এই খঞ্জরগুলো ছাড়া আর কোন অস্ত্র পাওয়া যায়নি।’ বলেই পাঁচটি খঞ্জর সুলতান সালাহুদ্দীনের পায়ের কাছে রেখে দেয় এক রক্ষী।

    ‘আমরা মারাকেশের ব্যবসায়ী। যাব ইস্কান্দারিয়া। দুদিন আগে আমাদের অবস্থান ছিল এখান থেকে দশ ক্রোশ পিছনে। পরশু সন্ধ্যায় এই মেয়েগুলো আমাদের হাতে আসে। তখন তাদের পরিধানের পোশাক ছিল ভেজা। তারা আমাদের জানাল, তারা সিসিলির বাসিন্দা। খৃষ্টান সৈন্যরা এদের ঘর থেকে উঠিয়ে এনে একটি জাহাজে তুলে নেয়। এরা গরীব পিতা-মাতার সন্তান। এরা বলছে, বিপুলসংখ্যক জাহাজ ও নৌকা রওনা হয়েছিল। এদেরকে যে জাহাজে তোলা হয়েছিল, তাতে কমাণ্ডার গোছের কয়েকজন লোক এবং বেশ কজন সৈন্যও ছিল। তারা নিজেরা মদ খেয়ে, এদেরও মদ খাইয়ে আমোদ করতে থাকে। সমুদ্রের এপারের নিকটবর্তী হলে জাহাজগুলোতে আগুনের গোলা নিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে। আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষগুলো জাহাজ থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। এদেরকে তারা একটি নৌকায় বসিয়ে জাহাজ থেকে সমুদ্রে নামিয়ে ভাসিয়ে দেয়। এরা বলছে, এদের কেউ নৌকা বাইতে জানে না। তাই মাঝি-মাল্লাবিহীন নৌকাটি সমুদ্রে হেলে-দুলে ভাসতে থাকে। পরে একদিন আপনা-আপনিইনৌকাটি কূলে এসে ভীড়ে। আমরা কূলের কাছাকাছিই অবস্থান করছিলাম। এরা আমাদের কাছে চলে আসে। বড় বিপন্ন অবস্থায় ছিল মেয়েগুলো। আমরা এদের আশ্রয় প্রদান করি। এই অসহায় নারীদেরকে তাড়িয়েও দিতে পারছিলাম না; আবার বুঝেও আসছিল না যে, এদেরকে আমরা কী করি। অগত্যা এদেরকে নিয়ে আমরা সম্মুখে রওনা হই এবং একস্থানে এসে ছাউনি ফেলি। হঠাৎ এই আরোহীগণ এসে পড়েন এবং আমাদের তল্লাশী নিতে শুরু করেন। আমরা তাদের নিকট এই তল্লাশীর কারণ জানতে চাই। তারা বললেন, এটা মিসরের গভর্নর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নির্দেশ। আমরা অনুনয়-বিনয় করে বলি, আমাদেরকে তোমরা সুলতানের কাছে নিয়ে চল; তাঁকেই আমরা নিবেদন করব, যেন এই অসহায় মেয়েগুলোকে তিনি তাঁর আশ্রয়ে নিয়ে নেন। চলার পথে আমরা এদেরকে কোথায় নিয়ে ফিরব।

    মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে তারা সিসিলী ভাষায় জবাব দেয়। বড় ভীত-সন্ত্রস্থ মনে হল তাদের। দু তিনজন একত্রেই কথা বলতে শুরু করে। সুলতান সালাহুদ্দীন বণিকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কেউ এদের ভাষা বুঝ কি? একজন বলল, শুধু আমি বুঝি। এরা নিবেদন করছে, সুলতান যেন এদেরকে তার আশ্রয়ে নিয়ে নেন। এরা বলছে, আমরা বণিক কাফেলার সঙ্গে যেতে রাজি নই। এমনও হতে পারে, পথে দস্যুরা আমাদের তুলে নিয়ে যাবে। তাছাড়া এখন যুদ্ধ চলছে। সর্বত্র খৃষ্টান ও মুসলিম সেনারা গিজগিজ করছে। আমরা সৈন্যদের অনেক ভয় পাই। ঘর থেকে যখন আমাদেরকে অপহরণ করা হয়, তখন আমরা কুমারী ছিলাম, খৃষ্টান সৈন্যরা জাহাজে আমাদেরকে গণিকায় পরিণত করেছে।

    এক মেয়ে কিছু বললে বণিক তার তরজমা করে বলল, ‘মেয়েটি বলছে, আমাদেরকে মুসলমানদের রাজার নিকট পৌঁছিয়ে দিন; হয়ত তিনি আমাদের প্রতি সদয় হবেন।’

    মুখ খুলল অপর এক মেয়ে। বণিক বলল, ‘এই মেয়েটি বলছে, আমাদেরকে আর যাই করুন, খৃষ্টান সৈন্যদের হাতে তুলে দেবেন না। কোন সম্ভ্রান্ত মুসলমানের স্ত্রী হতে পারব এই নিশ্চয়তা পেলে আমি মুসলমান হয়ে যাব।’

    পিছনে দাঁড়িয়ে মুখ লুকাবার চেষ্টা করছে দু তিনটি মেয়ে। মুখে তাদের ভীতির ছাপ। ভয়ে কিংবা লজ্জায় কথা বলতে পারছে না তারা।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বণিককে বললেন, ‘এদেরকে বলুন, এরা খৃষ্টানদের কাছে ফিরে যাক আর না যাক আমরা কিন্তু এদেরকে মুসলমান হতে বাধ্য করব না। এই যে মেয়েটি একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমানের স্ত্রী হওয়ার নিশ্চয়তার শর্তে মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করল, তাকে বলুন, আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না। কেননা, মেয়েটি এক অপারগ অবস্থায় ও বিপদের মুহূর্তে মুসলমান হতে চাইছে। তাদের বলুন, যদি আমার প্রতি তাদের আস্থা থাকে, তাহলে মুসলিম নারীর ন্যায় তাদেরকে আমি আমার আশ্রয়ে নিয়ে নেব। রাজধানীতে পৌঁছে আমি তাদেরকে জেরুজালেমে খৃষ্টান পাদ্রীদের নিকট পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’

    দোভাষী বণিকের মুখে সুলতান সালাহুদ্দীনের সিদ্ধান্তের কথা শুনে মেয়েরা উৎফুল্ল হয়ে উঠে। আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠে তাদের চোখে-মুখে। তারা সুলতান সালাহুদ্দীনের এই সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে। সুলতান সালাহুদ্দীন মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র তাঁবুর ব্যবস্থা করেন এবং বাইরে সর্বক্ষণ একজন প্রহরী নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দেন।

    বন্দী মেয়েদের তাঁবু কোথায় স্থাপন করা হবে বলতে যাচ্ছিলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। এমন সময় তাঁর সম্মুখে নিয়ে আসা হয় ছয়জন খৃষ্টান কয়েদী। লোকগুলোর পরনের কাপড় ভেজা। স্থানে স্থানে রক্তের দাগ ও বালিমাখা। মড়ার মত ফ্যাকাশে চেহারা, বিধ্বস্ত শরীর।

    কমাণ্ডার জানায়, এরা এখান থেকে দেড়-দু মাইল দূরে সমুদ্রতীরে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছিল। এরা সমুদ্র মাঝে একটি ভাঙ্গা নৌকায় ভাসছিল। ভিতরে পানি ঢুকে একদিন নৌকাটি ডুবে যায়। এরা সাঁতার কেটে বহু কষ্টে কূলে এসে উঠে। ছিল বাইশজন। এখন জীবিত আছে মাত্র এই ছয়জন।

    তারা খৃষ্টান বাহিনীর সদস্য। সুলতান সালাহুদ্দীনের সামনে এসে বসে পড়ে ধড়াস্ করে। একজনের চেহারা বলছে, লোকটি সাধারণ সৈনিক নয়। সে কোঁকাচ্ছে। পোশাকে তার রক্তের দাগ নেই; আহতদের চেয়ে বেশী কষ্টে আছে বলে মনে হল তাকে। মেয়েগুলোর প্রতি এক নজর দৃষ্টিপাত করে আবার কোঁকাতে শুরু করে লোকটি।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নির্দেশ ছিল, যখন যে ধরা পড়বে, তাকেই যেন তার সামনে হাজির করা হয়। সমুদ্রে খৃষ্টান বাহিনীর নৌ ও সেনাবহর ধ্বংস হওয়ার পর এখন জীবনে রক্ষা পাওয়া খৃষ্টান সেনারা একের পর এক বন্দী হচ্ছে আর নীত হচ্ছে সুলতান সালাহুদ্দীনের দরবারে। সুলতান সালাহুদ্দীন এ বন্দীদের প্রতিও চোখ তুলে তাকালেন; কিন্তু বললেন না কিছুই। তবে অফিসার গোছের যে লোকটি বেশী কোঁকাচ্ছিল এবং যার পোশাকে রক্তের দাগ নেই, তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে নিরীক্ষা করে দেখলেন তিনি। ক্ষীণকণ্ঠে সালারদের বললেন, আলী বিন সুফিয়ান এখনও এল না! এই বন্দীদের তো অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করার ছিল, এদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এ কয়েদীর প্রতি ইঙ্গিত করে সুলতান বললেন— ‘এ লোকটিকে কমাণ্ডার বলে মনে হয়। একে চোখে চোখে রাখতে হবে। আলী বিন সুফিয়ান এলে বলবে, এদেরকে যেন ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য নেয়। সম্ভবত এ লোকটা ভিতরে আঘাত পেয়েছে, হাড়-গোড় ভেঙ্গে গেছে। এদের এখনি আহত কয়েদীদের তাঁবুতে পাঠিয়ে দাও। খাবার-পানি দাও, ব্যাণ্ডেজ-চিকিৎসা করাও।’

    ছয় পুরুষ বন্দীকে নির্ধারিত তাঁবুর দিকে নিয়ে যাওয়া হল। মেয়েগুলো একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তাদের প্রতি। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় মেয়েদেরও।

    * * *

    ফৌজি ক্যাম্পের সামান্য দূরে মেয়েদের জন্য তাঁবু স্থাপন করা হচ্ছে। সেখান থেকে কয়েকশ গজ দূরে আহত বন্দীদের তাঁবু। নতুন একটি তাঁবু স্থাপন করা হচ্ছে সেখানেও। পার্শ্বে মাটিতে পড়ে আছে ছয় নতুন আহত বন্দী। মেয়েগুলো তাকিয়ে আছে তাদের প্রতি।

    তাঁবু দুটো দাঁড়িয়ে গেছে। মেয়েরা চলে গেছে তাদের তাঁবুতে। আহত বন্দীদের নিয়ে যাওয়া হয় নতুন তাঁবুতে। মেয়েদের তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে যায় একজন প্রহরী। অল্পক্ষণের মধ্যে খাবার চলে আসে। মেয়েরা আহার করে নেয়। একটি মেয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে নতুন আহত বন্দীদের তাঁবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন আর তার চেহারায় ভীতির ছাপ নেই। প্রহরী তার দিকে দৃষ্টিপাত করে। সেও প্রহরীর দিকে তাকায়। চোখাচোখি হয় দুজনের। মেয়েটি মুখে হাসি টেনে ইঙ্গিতে বলে, আমি একটু ঐ আহত লোকগুলোর তাঁবুতে যেতে চাই। প্রহরীও ইশারায় তাকে বারণ করে। মেয়েদের তাঁবু থেকে বের হয়ে কোথাও যাওয়ার বা কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি নেই। মেয়েদের ও আহত বন্দীদের তাঁবুর মাঝে অনেকগুলো বৃক্ষ। বাঁ দিকে মাটির একটি টিলা। টিলাটি ঝোঁপ-ঝাড়ে আচ্ছন্ন।

    সূর্য ডুবে গেছে। রাত আঁধার হতে চলেছে। নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে প্রকৃতি। রাতের নিস্তব্ধতায় আহত বন্দীদের কোঁকানির শব্দ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দূরবর্তী রোম উপসাগরের কুলকুল রবও চাপা গুঞ্জনের ন্যায় কানে আসতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিজের তাঁবুতে বিরাজ করছে দিনের পরিবেশ। কারও চোখে ঘুম নেই সেখানে। তিন সালার উপবিষ্ট সুলতানের কাছে।

    সুলতান সালাহুদ্দীন পুনরায় বললেন— ‘আলী বিন সুফিয়ান এখনও এল না?’ কণ্ঠে তার অস্থিরতার সুর। একটু থেমে আবার বললেন— ‘তার দূতও এল না, না?’

    ‘কোন অসুবিধা হলে তো সংবাদ পেতাম। আশা করি সেখানে সব ঠিক আছে।’ বললেন এক সালার।

    ‘আশা তো এমনই থাকা উচিত। কিন্তু পঞ্চাশ হাজার সৈন্যই যদি বিদ্রোহ করে বসে, তবে তো সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের সৈন্য মাত্র সাড়ে তিন হাজার। দেড় হাজার অশ্বারোহী আর দু হাজার পদাতিক। তাদের মোকালোয় সুদানী সৈন্যরা সংখ্যায় অনেক বেশী, অভিজ্ঞও বটে।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ‘নাজি ও তার কুচক্রী সহচরদের নির্মূল করার পর বিদ্রোহ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছাড়া সেনাবিদ্রোহ হয় না।’ বললেন অপর এক সালার।

    ‘আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু এর জন্যে যে আলীকে দরকার!’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ অভিযানে সুলতান সালাহুদ্দীন নিজেই এসে পড়েছিলেন এখানে। সুদানী সৈন্যদের বিদ্রোহের আশঙ্কা থাকায় আলী বিন সুফিয়ানকে রেখে এসেছিলেন রাজধানীতে। এতক্ষণে ফিরে এসে সুলতানকে সেখানকার পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করার কথা। কিন্তু আলী এলেন না এখনও । তাই সুলতান অস্থির। ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে তার উৎকণ্ঠা।

    সালারদের সঙ্গে কায়রোর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন সুলতান সালাহুদ্দীন। গোটা ক্যাম্প গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। জেগে আছে শুধু সেই সাতটি মেয়ে, সুলতান সালাহুদ্দীন যাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পর্দা ফাঁক করে তাঁবুর ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখে প্রহরী। ভিতরে বাতি জ্বলছে। টের পেয়ে জাগ্রত মেয়েগুলো ঘুমের ভান করে নাক ডাকতে শুরু করে। মেয়েগুলোকে গুণে দেখে প্রহরী। ঠিক আছে—সাতজন। ঘুমিয়ে আছে সবাই। পর্দাটা ছেড়ে দিয়ে সরে আসে প্রহরী। বসে পড়ে তাঁবুর কাছ ঘেঁষে।

    তাঁবুর পর্দাসংলগ্ন শায়িত মেয়েটি নীচ থেকে পর্দাটা উঁচু করে সতর্কতার সাথে বাইরে তাকায়। পার্শ্বের মেয়েটির কানে কানে বলে, ‘বসে পড়েছে।’ পার্শ্বের জন তার পার্শ্বের জনকেও বলে, ‘বসে পড়েছে।’ এভাবে এক এক করে সব কটি মেয়ের কানে খবর পৌঁছে যায়, ‘প্রহরী বসে পড়েছে।’

    তাঁবুর অপর দরজার কাছে শুয়ে আছে যে মেয়েটি, সাবধানে উঠে বসে সে। মাটিতে বিছানো শয্যা। একটি কম্বল বিছানায় এমনভাবে ছড়িয়ে রাখে যে, দেখতে মনে হয়, কম্বলের নীচে একজন মানুষ শুয়ে আছে।

    পা টিপে টিপে দরজার নিকটে চলে যায় মেয়েটি। পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে পড়ে তাঁবু থেকে। অপর ছয়জন ধীরে ধীরে নাক ডাকতে শুরু করে।

    প্রহরী জানে, এরা সমুদ্রের বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া আশ্রিতা—কোন বিপজ্জনক বন্দী নয়। তাই নিরুদ্বেগ বসে বসে ঝিঁমুচ্ছে সে।

    পা টিপে টিপে টিলা অভিমুখে হাঁটা দেয় মেয়েটি। প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে টিলার কাছে পৌঁছে মোড় নেয় আরেকটি তাঁবুর দিকে। নতুন বন্দী ছয়জন অবস্থান করছে এ তাঁবুতে। অন্ধকার রাত। বেশ কিছু গাছ-গাছালিও আছে এখানে। প্রহরীরা মেয়েটিকে দেখে ফেলার কোনই জো নেই এখন।

    মেয়েটি বসে পড়ে। পা পা করে এগিয়ে চলে সম্মুখে। বালির টিপির মত কতগুলো কি যেন দেখা যাচ্ছে সামনে। সেগুলোর আড়ালে আড়ালে পা টিপে টিপে তাঁবুর নিকটে চলে আসে মেয়েটি। দরজার সামনে টহল দিচ্ছে একজন প্রহরী।

    একটি টিপির আড়ালে শুয়ে পড়ে মেয়েটি। কালো ছায়ার মত তাকে দেখে ফেলে প্রহরী। মেয়েটি এখন দুই প্রহরীর মাঝে। একজন নিজের তাঁবুর প্রহরী। অপরজন অন্য জখমীদের তাঁবুর। তার আশঙ্কা, জখমীদের তাঁবুর প্রহরী এদিকে এলে নিশ্চিত ধরা খেয়ে যাবে।

    ইতিউতি দৃষ্টি ফেলে, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে প্রহরী চলে যায় অন্য জখমীদের তাঁবুর দিকে। এ সুযোগে হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবুর সন্নিকটে পৌঁছে যায় মেয়েটি। পর্দা তুলে ঢুকে পড়ে ভিতরে।

    তাঁবুর ভেতরটা অন্ধকার। ক্ষীণ কণ্ঠে কোকাচ্ছে দু তিনজন জখমী। সম্ভবত তাঁবুর পর্দা ফাঁক হওয়া দেখে ফেলেছে এদের একজন। তাই অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করে— ‘কে?’

    ‘কে?’ প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে মেয়েটি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘রবিন কোথায়?’ জবাব আসে, ‘ঐ ওদিকে, তৃতীয়জন।’

    গুণে গুণে তৃতীয় ব্যক্তির কাছে চলে যায় মেয়েটি। পা ধরে নাড়া দেয় তার। আওয়াজ আসে— ‘কে?’ মেয়েটি জবাব দেয়— ‘মুবী।’

    ধড়মড় করে উঠে বসে রবিন। হাত বাড়িয়ে বাহুবন্ধনে টেনে নেয় মেয়েটিকে। শুইয়ে দেয় নিজের বিছানায়। নিজের ও তার গায়ে একটি কম্বল ছড়িয়ে দিয়ে বলে— ‘প্রহরী এসে পড়তে পারে, আমাকে জড়িয়ে শুয়ে থাক।’

    রূপসী কন্যা মুবীর দেহের উষ্ণতা গ্রহণ করে রবিন। মৌনতায় কাটে কিছুক্ষণ। তারপর রবিন বলে, ‘তোমার-আমার এই মিলনে আমি বিস্মিত। এ এক অলৌকিক ঘটনা। এতে প্রমাণিত হয়, যীশুখৃষ্ট আমাদের সাফল্য মঞ্জুর করেছেন।’

    ছয় আহত কয়েদীর যাকে সুলতান সালাহুদ্দীন ব্যতিক্রমী এবং উচ্চপদস্ত সেনা বলে অনুমান করেছিলেন, রবিন সেই ব্যক্তি। সুলতান সালাহুদ্দীন বলেও দিয়েছিলেন একে সাধারণ সিপাই বলে মনে হয় না, এর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। আলী বিন সুফিয়ান এসে তদন্ত নেবে।

    ‘তোমার জখম কেমন? হাড়-গোড় ভেঙ্গে যায়নি তো?’ জিজ্ঞেস করে মুবী।

    ‘আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি। একটি আঁচড়ও নেই দেহের কোথাও। সালাহুদ্দীনের সামনে ভান করেছিলাম মাত্র।’ জবাব দেয় রবিন।

    ‘তাহলে এখানে এসেছ কেন?’ জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।

    ‘মিসর প্রবেশ করে সুদানী বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ইসলামী ফৌজ সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে ঢুকবার কোন পথ পেলাম না। অবশেষে কৌশলের আশ্রয় নিলাম। এই পাঁচজন জখমীকে খুঁজে জড় করে জখমীর ভান ধরে এদের সঙ্গে আমিও ঢুকে পড়লাম। এখন তো পালাবারও কোন পথ পাচ্ছি না।’ জবাব দেয় রবিন।

    এবার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে রবিন বলে, ‘তুমি আমার দুটি প্রশ্নের জবাব দাও। প্রথম প্রশ্ন, সালাহুদ্দীনকে আমি জিন্দা দেখেছি। কারণটা কি? তীর নিঃশেষ হয়ে গেল, নাকি হারামখোরটা কাপুরুষ হয়ে গেল? আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, তোমরা সাতটি মেয়ের সব কজন মুসলমানদের হাতে বন্দী হলে কেন? ওরা পাঁচজন কি মরে গেছে, নাকি পালিয়ে গেছে?’

    ‘না, তারা জীবিত আছে। তুমি বলছ, যীশুখৃষ্ট আমাদের বিজয় মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু আমি বলছি, আমাদের খোদা আমাদেরকে কোন একটা পাপের শাস্তি দিচ্ছেন। আর সালাহুদ্দীন আইউবীও এখনও জীবিত থাকার কারণ, তীরটা তার দুপায়ের মাঝে বালিতে গিয়ে বিদ্ধ হয়েছিল।’ বলল মুবী।

    ‘তীর কি কোন মেয়ে ছুঁড়েছিল? ক্রিস্টোফর ছিলেন কোথায়?’ জানতে চায় রবিন।

    ‘না, তীর ছুঁড়েছিলেন ক্রিস্টোফর নিজেই। কিন্তু…’

    ‘কিন্তু ক্রিস্টোফরের তীর ব্যর্থ গেছে, তাই না? যার তীরন্দাজী দেখে শাহ অগাস্টাস অভিভূত হয়েছিলেন, এখানে এসে তার নিশানা এতই ব্যর্থ হয়ে গেল যে, ছয় ফুট দীর্ঘ আর তিন ফুট চওড়া একটা সালাহুদ্দীন তার তীর থেকে বেঁচে গেল! অভাগার হাতটা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল বোধ হয়।’ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল রবিন।

    ‘ব্যবধান ছিল অনেক। তাছাড়া ক্রিস্টোফর বললেন, ধনুক থেকে তীরটি বের হবে হবে অবস্থায় একটি পোকা এসে তার চোখে পড়ে এবং সে অবস্থায়ই লক্ষ্যহীনভাবে তীরটি বেরিয়ে যায়।’

    ‘তারপর কী হল?’

    ‘যা হওয়ার ছিল, তাই হল। সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে ছিল তিনজন কমাণ্ডার এবং চারজন দেহরক্ষী। তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আমাদের ভাগ্য ভাল ছিল। ক্রিস্টোফর টিলার আড়ালে নিরাপদে ফিরে আসেন। আমরা তীর-ধনুকগুলো বালিতে পুঁতে ফেলে উপরে উট বসিয়ে রাখি। সালাহুদ্দীনের সিপাইরা এসে পড়লে ক্রিস্টোফর জানালেন, তারা পাঁচজন মারাকেশী বণিক আর আমরা ছয়টি মেয়ে সমুদ্র থেকে উদ্ধার পেয়ে তাদের কাছে আশ্রয় নিয়েছি। মুসলিম সৈন্যরা আমাদের সামান-পত্র অনুসন্ধান করে ব্যবসার পণ্য ছাড়া আর কিছুই পেল না। তারা আমাদের সবাইকে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট নিয়ে যায়। আমরা ভাবে বুঝালাম যে, আমরা সিসিলি ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানি না। ক্রিস্টোফর সালাহুদ্দীনকে বললেন, তিনি আমাদের ভাষা বুঝেন। আমরা মেয়েরা চেহারায় ভীতি ও শঙ্কার ভাব ফুটিয়ে তুললাম।’

    সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আরও যেসব কথা হল, রবিনকে সবিস্তার সব শোনালো মুবি। এই সাতটি মেয়ে এবং মারাকেশী বণিকবেশী পাঁচজন পুরুষ আক্রমণের দুদিন আগে কুলে অবতরণ করেছিল। বণিকবেশী পুরুষ পাঁচজন ক্রুসেডারদের অভিজ্ঞ গুপ্তচর ও সেনাকমাণ্ডার। মেয়েগুলোও গুপ্তচর। তারা অত্যন্ত রূপসী। গুপ্তচরবৃত্তি ও মনন ধ্বংসের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তাদের। গোপনে হত্যাকাণ্ড সংঘটনেও তারা বেশ পারদর্শী। পুরুষ পাঁচজনের মিশন ছিল সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা আর নাজির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। মিসরের ভাষা অনর্গল বলতে পারত মেয়েগুলো। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবীর সামনে তা গোপন রাখে তারা। রবিন ছিল এ মিশনের প্রধান। নাজির সঙ্গে সাক্ষাত করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানের সতর্ক কৌশলের সাথে পেরে উঠল না তারা।

    ‘তোমরা কি সালাহুদ্দীন আইউবীকে ফাঁদে ফেলতে পার না?’ জিজ্ঞেস করে রবিন।

    ‘এখানে সবেমাত্র প্রথম রাত। আমাদের ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যদি তা সত্যমনে দিয়ে থাকেন, তাহলে তার অর্থ হল, তিনি মানুষ নন পাষাণ। আমাদের কারও প্রতি তার আকর্ষণ থাকত, তাহলে তিনি রাতে কাউকে না কাউকে নিজের তাঁবুতে অবশ্যই ডেকে পাঠাতেন। লোকটাকে হত্যা করাও অতটা সহজ নয়। একবারই তিনি উপকূলে এসেছিলেন। তীর ছোঁড়া হল। ব্যর্থ গেল তীর। সব সময় তিনি সালার ও রক্ষীদের প্রহরা বেষ্টনীতে থাকেন। এদিকে একজন মাত্র প্রহরী আমাদের মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে আর তার তাঁবুটি ঘিরে রেখে আছে গোটা রক্ষী ইউনিট।

    ‘ওরা পাঁচজন কোথায়?’ জিজ্ঞেস করে রবিন।

    ‘এই তো সামান্য দূরে। আপাতত ওরা সেখানেই থাকবে।’ জবাব দেয় মুবী।

    ‘শোন মুবী! এই পরাজয়টা আমাকে পাগল করে তুলেছে। এ ব্যর্থতার সব দায়-দায়িত্ব যেন চাপছে এসে আমার ঘাড়ে। ক্রুশের উপর হাত রেখে শপথ তো আমরা সকলেই নিয়েছি। কিন্তু সাধারণ সৈনিকদের শপথ আর আমার মত একজন দায়িত্বশীলের শপথে পার্থক্য অনেক। তুমি আমার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য কর। আমার কর্তব্যসমূহকে সামনে রেখে বিবেচনা কর। যুদ্ধের অন্তত অর্ধেকটা আমাদের মটির নীচ থেকে আর পিঠের পিছন থেকে আক্রমণ করে জয়লাভ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমি, তোমরা সাতজন এবং অরা পাঁচজন নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি। এই ক্রুশ আমার থেকে জবাব চাইছে।’

    গলায় ঝুলন্ত ক্রুশটা হাতে নিয়ে রবিন বলল— ‘এটিকে আমি আমার বুক থেকে আলাদা করতে পারি না।’

    রবিন মুবীর বুকে হাত বুলিয়ে তার ক্রুশটাও হাতে নিয়ে বলল, ‘তুমি তোমার পিতা-মাতাকে ধোকা দিতে পার, কিন্তু এই ক্রুশের মর্যাদা রক্ষায় উদাসীন হতে পার না। তোমার উপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে, তা তোমাকে পালন করতেই হবে। খোদা তোমাকে যে রূপ দিয়েছেন, তাই তোমাকে পাথর চিড়ে পথ করে দেবে। আমি তোমাকে আবার বলছি, আমাদের এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত মিলন প্রমাণ করে, সফল আমরা হবই। আমাদের বাহিনী রোম উপসাগরের ওপারে সংগঠিত হচ্ছে। যারা মারা গেছে, তারা তো মারা গেছে। যারা জীবিত আছে, তারা জানে, এটি কোন পরাজয় নয়—ছিল এক প্রতারণা। তুমি তোমার তাঁবুতে ফিরে যাও; সঙ্গী মেয়েদের বল, তারা যেন তাঁবুতেই পড়ে না থাকে। বারংবার যেন সালাহুদ্দীন আইউবী ও তার সালারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার মন জয় করার চেষ্টা করে এবং মুসলমান হওয়ার ভান ধরে। তারপর কী করতে হবে, তা তাদের জানা আছে।’

    ‘সর্বাগ্রে আমাদের জানা দরকার, ঘটনাটা ঘটল কী? সুদানীরা কি আমাদেরকে ধোকা দিল?’ বলল মুবী।

    ‘তা আমি নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারছি না। হামলার অনেক আগে আমি মিসরে কর্তব্যরত আমার গুপ্তচরদের মাধ্যমে তথ্য পেয়েছিলাম, সুদানী সৈন্যদের উপর সালাহুদ্দীন আইউবীর আস্থা নেই। অথচ তারা মিসরে মুসলমানদের নিজস্ব বাহিনী। সালাহুদ্দীন এসে যখন মিসরী বাহিনী গঠন করলেন, তখন তারা এই বাহিনীতে শামিল হতে অসম্মতি জানায়। তাদের কমাণ্ডার নাজি আমাদের সাহায্য প্রার্থনা করল। আমি নিজে তার পত্র দেখেছি এবং সত্যায়ন করেছি যে, হ্যাঁ, এটি নাজিরই পত্র এবং এতে কোন প্রতারণা নেই। এখন আমার জানতে হবে, এমনটি কেন ঘটল এবং কে ঘটাল। তথ্য সন্ধান নিয়ে নিশ্চিত না হয়ে আমি ফিরছি না। আমাকে লক্ষ্য করে শাহ আগাস্টাস বড় গর্ব করে বলেছিলেন, আমি মুসলমানদের ঘর থেকে একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে পারব। এখন চিন্তা কর মুবী! এ ঘটনায় শাহ অগাস্টাস কত মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। তিনি কি আমাকে মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা লঘু শাস্তি দিয়ে রক্ষা করবেন? উপরন্তু ক্রুশের অভিশাপ তো আছেই।’ বলল রবিন।

    ‘আমি সবই জানি রবিন। আবেগ ছেড়ে কাজের কথা বল। এখন আমার করণীয় কী তাই বল।’ বলল মুবী।

    শোচনীয় পরাজয়ের কথা স্মরণ করে অবচেতন মনে কথা বলছে রবিন। মুবীর মত চিত্তাকর্ষক এক রূপসী তরুণী যে তার বুকের সঙ্গে জড়ানো, একটি তন্বী-তরুণীর রেশম-কোমল এলোকেশগুচ্ছে যে তার মুখমণ্ডলের অর্ধেকটা আচ্ছন্ন, সে খবরই নেই তার। হঠাৎ মেয়েটার কোমল চুলের পরশ অনুভব করে রবিন বলে ওঠে, ‘মুবী! তোমার এই চুল এমনই শক্ত শিকল যে, সালাহুদ্দীন আইউবীকে এ শিকলে একবার বাঁধতে পারলেই দেখবে, বেটা তোমার গোলামে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু সর্বাগ্রে তোমাকে যে, কাজটি করতে হবে, তাহল, ক্রিস্টোফর ও তার সঙ্গীদের বলবে, তারা যেন বণিকের বেশ ধরে নাজির নিকট যায় এবং তথ্য সংগ্রহ করে, তার বাহিনী কেন বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং আমাদের গোপন তথ্য কিভাবে ফাঁস হয়ে গেল যে, সালাহুদ্দীন গুটিকতক সৈন্য দিয়ে কমাণ্ডো আক্রমণ চালিয়ে আমাদের তিন তিনটি সেনাবহর ধ্বংস করে দিল। তাদেরকে এ বিষয়টিও জেনে নিতে বলবে, নাজি তলে তলে সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে মিলে গেল কিনা। আমাদের এভাবে ধ্বংস করার জন্যই। প্রতারণামূলক পত্র লিখল কিনা। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকে আমাদের যুদ্ধ-পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমি একটি বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি, ইসলামপন্থীরা সংখ্যায় যত নগণ্যই হোক, সম্মুখসমরে সহজে আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারব না। তাই তাদের শাসকমণ্ডলী ও সামরিক অধিনায়কদের ঈমানী চেতনা ধ্বংস করতে হবে আগে। এ লক্ষ্যে আমরা তোমার মত বেশ কিছু মেয়েকে আরব শাসকদের হেরেমে ঢুকিয়ে রেখেছি।’

    ‘আবারও তুমি কথা লম্বা করছ’ —বাধা দিয়ে মুবী বলল— ‘আমরা নিজ বাসভবনে এক শয্যায় শুয়ে নেই। আমরা এখন দুশমনের হাতে বন্দী। বাইরে প্রহরীরা টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। রাত কেটে যাচ্ছে। হাতে সময় বেশী নেই। মিশন ব্যর্থ হয়ে গেছে। এখন ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী হবে, তাই বল। আমরা সাতটি মেয়ে এবং পাঁচজন পুরুষ। বল কী করব। এক তো বুঝলাম, নাজির কাছে যেতে হবে, তার প্রতারণার সন্ধান নিতে হবে। তারপর তোমাকে সংবাদ জানাব কী করে? তোমাকে পাব কোথায়?’

    আমি এখান থেকে পালিয়ে যাব। তার আগে আমি এই ক্যাম্প, ক্যাম্পের লোকসংখ্যা এবং সালাহুদ্দীনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেব। এই লোকটি সম্পর্কে আমাদের অনেক সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে ক্রুশের জন্য একমাত্র বিপদ এই লোকটি। অন্যথায় ইসলামী খেলাফত আমাদের জালে আটকা পড়ে গেছে। শাহ এম্লার্ক বলতেন, মুসলমানরা এতই শক্তিহীন হয়ে পড়েছে যে, এখন চিরদিনের জন্য তাদেরকে আমাদের গোলামে পরিণত করতে প্রয়োজন একটিমাত্র ধাক্কা। কিন্তু তার এই প্রত্যয় আত্মপ্রবঞ্চনা বলেই প্রমাণিত হল। এখানে অবস্থান করে আমাকে সালাহুদ্দীনের দুর্বল শিরাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তোমাদের পুরুষ পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে সুদানী বাহিনীকে ক্ষেপিয়ে তুলতে হবে, তাদের দিয়ে বিদ্রোহ করাতে হবে। তরে মনে রাখবে, সবচে বেশী প্রয়োজন হল, সালাহুদ্দীন যেন জীবিত থাকতে না পারে। থাকেও যদি থাকবে আমাদের জিন্দানখানার সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যেখানে জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত কখনও সূর্য চোখে দেখবে না, নজরে আসবে না আকাশের একটি তারকাও। তুমি আগে তোমার তাঁবুতে যাও এবং সহকর্মী মেয়েদেরকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দাও। তাদের বিশেষভাবে জানিয়ে দাও, একটি লোককে তোমাদের এই রেশম-কোমল চুল, মায়াবী চোখ আর হৃদয়কাড়া দেহ দিয়ে এমনভাবে অথর্ব করে দিতে হবে, যেন সে সালাহুদ্দীনের আর কোন কাজেই না আসে। সম্ভব হলে তার ও সালাহুদ্দীনের মাঝে এমন ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা একজন অপরজনের শত্রুতে পরিণত হয়ে যায়। ভাল করে মনে রেখো, লোকটার নাম আলী বিন সুফিয়ান।’

    ‘দুজন পুরুষের মধ্যে কিভাবে দুশমনি সৃষ্টি করতে হয়, তা তোমরা ভাল করেই জান। যাও, সহকর্মী মেয়েদের ভাল ভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ক্রিস্টোফরের নিকট পৌঁছে যাও। তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, তোমার তীর বুঝি সালাহুদ্দীনের উপর এসেই ব্যর্থ হল? এবার সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত্ব দাও আর তোমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় কর।’

    মুবীর চুলে চুমু খেয়ে রবিন বলল— ‘ক্রুশের জন্য প্রয়োজনে তোমাদের সম্ভমও বিলিয়ে দিতে হবে। তারপরও যীশুখৃষ্টের দৃষ্টিতে তোমরা মা মরিয়মের মত কুমারীই থাকবে। ইসলামকে মূল থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা জেরুজালেম দখল করেছি, এবার মিসর জয় করার পালা।’

    * * *

  • গনগনির গুপ্তধন

    গনগনির গুপ্তধন

    গনগনির গুপ্তধন

    বিমলেন্দু চক্রবর্তী

    প্রকাশক

    শ্রী দ্বিজদাস কর

    অণিমা প্রকাশনী

    ১৪১ কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রীট, কলকাতা-৯

    ফোন : ৩৫-৭৯১৩

    প্রথম প্রকাশ

    জন্মাষ্টমী, ২রা ভাদ্র, ১৩৯১

    ১৯শে আগষ্ট, ১৯৮৪

    মুদ্রক

    শ্ৰী দুলাল চন্দ্র ঘোষ

    নিউ লোকনাথ প্রেস

    ৮এ, কাশী বোস লেন

    কলকাতা-৭০০০০৬

    প্রচ্ছদপট ও ছবি

    বিমলেন্দু চক্রবর্তী

    মূল্য

    আট টাকা

    স্থাপত্য-শিল্পী

    গোপালকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    পরম সুহৃদবরেষু

    লেখকের অন্যান্য রচনা :

    মধ্যদিনের গান

    রহস্যময় মহেনজোদড়ো

    মহাসংগম

    শুশুনিয়ার রহস্য

    রহস্যময় আগন্তুক

    প্রতিবিশ্ব

    সোপান

    বাঘবন্দী

    সাক্ষাৎকারে ভৈরবী সাধিকা

    অজন্তার কথা

    ভারতের গুহাচিত্র

    সরু চাপা গলি। দু’পাশে মাটির বাড়ি। একের পর এক মাটির ঘর। মাথায় বিচালীর চাল। মাটির দেওয়ালে লেপ্টে আছে খোলামকুচি। একখানা দু’খানা নয়—হাজার হাজার খোলামকুচি। কোনটা লাল কোনটা কালো। ফ্যাকাসে কালো রঙের খোলামকুচিও আছে।

    এক দেওয়ালে পোতা আধখানা কলসীর কানা। পটলমামার চোখে পড়তেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। চশমার ফাঁক দিয়ে বাঁকা চোখে দেখলেন। দাঁড়ালেন না। রাস্তা এখানে বাঁক খেয়েছে। একটা সরু রাস্তা নীচের দিকে নেমে গেছে। গলি-পথ আরো সরু। গলির মুখের সামনে একটা লাল বাক্স। পোষ্ট অফিস থেকে ঝুলিয়ে রেখেছে চিঠিপত্র ফেলার জন্যে।

    পটলমামার পাশ থেকে এঙলিঙ নীচের রাস্তায় নেমে গেলেন। ঝটপট কয়েক ধাপ এগিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। দেওয়ালের গায় নিকষ কালো বড় একখানা খোলামকুচি। মাটির ভিতর থেকে দাঁত বের করে যেন হাসছে।

    পটলমামা নামলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখ দু’টি শুধু এগিয়ে গেল। তাকিয়ে আছেন দূরের মজা পুকুরের দিকে। কি যেন ভাবছেন।

    এঙলিঙ বললেন, “ইউ থি….ইউ থি….”

    পটলমামা দেখলেন। তাঁর কপালের চামড়ায় কয়েকটা ভাঁজ খেলে গেল। নিজেকে সামলে নিলেন। বললেন, “কাম ব্যাক।”

    এঙলিঙ ঘুরে দাঁড়ালেন। আবার হাঁটতে শুরু করলেন। গলি বেয়ে রাস্তায় উঠে এসে পটলমামার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দু’জনে নীরব চোখে কি যেন বললেন। তারপর হাঁটা শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে এলেন শাস্ত্রী পল্লীর শেষ প্রান্তে। সেখানেই দুর্ঘটনা ঘটলো।

    গলির মধ্য থেকে হঠাৎ একটা সাইকেল এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো দু’ জনের উপর। আর একটু হলে এঙলিঙ চাপা পড়ে যেতেন। চাপা পড়লেন না। হঠাৎ সাইকেল হুড়মুড় করে কাঁধের উপর পড়তেই লাফ মারলেন। ছিটকে পড়লেন পটলমামার গায়ের উপর। দু’ জনেই পড়ে গেলেন। পটলমামার মুখ থেকে পাইপ ছিটকে পড়লো রাস্তায়।

    যুবকটি পা নামিয়ে নিজেকে সামলে নিল। চোখ বুলিয়ে দেখে নিল দু’ জনকে। তারপরই সাইকেল চালিয়ে দিল। পটলমামার পাইপের উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে তীর বেগে বেরিয়ে গেল।

    পটলমামা উঠে গায়ের ধুলো ঝেড়ে নিলেন। এঙলিঙ চোখের চশমা নাকে ঠিক মত লাগিয়ে ঝোলা কাঁধে তুলে নিলেন। ততক্ষণে পটলমামা পা বাড়িয়েছেন। এঙলিঙ বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁর পিছনে হাঁটতে শুরু করলেন। তাঁদের দেখে মনে হল না এই মুহূর্তে কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে।

    কয়েক পা এগোতেই শাস্ত্রী পল্লীর শেষ বাড়ি এসে গেল। মাটির দোতালা ঘর। সামনে উঠোন। উঠোনে বকুল গাছ। গাছের গোড়া সিমেণ্ট দিয়ে বাঁধানো। উল্টো দিকে বাউরী পাড়া। বাড়ির শেষ প্রান্তে কয়েকটি গাছ। বাঁয়ে উঁচু ঢিপি। ঢিপির উপর তালগাছ। তালগাছের পিছনে খাদ। খাদের পরেই চড়াই। চড়াইতে কয়েকখানা ছোট ঘর। বাউরীরা থাকে।

    দু’ পা এগোতেই রাস্তার পাশে আতা গাছের নীচে হাজার হাজার ঘোড়া। ঘোড়া নয় ঘোড়ার মৃত দেহ। একের উপর আর একটা ঘোড়া মুখ থুবরে পড়ে আছে। কোন ঘোড়ার মাথা স্কন্ধচ্যুত। কোন ঘোড়ার পা ভাঙ্গা। কোন ঘোড়া চিৎ হয়ে আছে। ঠ্যাং চারটে আকাশের দিকে তুলে ধরা। রাস্তার পাশে এমন হাজার হাজার ঘোড়া দেখলে চমকে উঠতে হয়।

    পটলমামা চমকালেন না। ঘোড়ার সমাধির সামনে থমকে দাঁড়ালেন। পিছনে এসে দাঁড়ালেন এঙলিঙ। এ যেন এক যুদ্ধ ক্ষেত্র। লড়াই শেষ হয়েছে। সৈন্যরা সব ফিরে গেছে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে পড়ে আছে হাজার হাজার নিহত ঘোড়া। কালো আর লাল ঘোড়া। বর্ষার জল পেয়ে স্যাঁতলা জমে গেছে।

    এঙলিঙ অস্পষ্ট গলায় বললেন, “ইউ থি।”

    পটলমামা বললেন, “গোরাই গাজীর কবর। এগুলো মানতের ঘোড়া।”

    এঙলিঙ চোখ তুললেন। দেখতে পেলেন আতা গাছের জটলার মধ্যে ইটে গাঁথা কবর। ইটগুলি দাঁত বের করে আছে। মানুষ প্রমাণ উঁচু কবরটি। ছাদ নেই। সামনের দিকে নীচু দরজা। দরজার দু’ পাশে সামান্য নক্‌শা। মাঝখানে সমাধি। সমাধির উপর গাছের শুকনো পাতা। কতদিন ঝাঁটা পড়ে নি যেন। ধূপকাঠী জ্বলে না আর। সন্ধ্যা হলে প্রদীপ জ্বালাতে আসে না কোন ভক্ত নারী। পরিত্যক্ত গোরাই গাজী মাটির নীচে তাঁর সব বিশ্বাস আর কর্মফল নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন।

    পটলমামা আবার অস্ফুট গলায় বললেন, “গোরাই গাজীর কবর।”

    এঙলিঙ পটলমামার মুখে চোখ ফেললেন। পটলমামা কি বলছেন তা বুঝতে পারছেন না। এঙলিঙ গোরাই গাজীর নাম শোনেন নি।

    পটলমামা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। গাঢ় স্বরে বললেন, “কিছুই থাকে না। মহাকাল সব গ্রাস করে। . যুগোত্তীর্ণ নায়ক বিস্মৃত হয়ে যায়। জঙ্গল এসে কবর দখল করে।”

    এঙলিঙ মাথা কাত করে পটলমামার কথাগুলি শুনলেন। তাঁর ছোট চোখ দুটি আরও ছোট হয়ে গেল। পিট্‌-পিট্ করে খানিক সময় দেখলেন কবর। পাশেই জঙ্গলা গাছে ফুটে আছে হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল। বুনো ফুল। তার কয়েকটি তুলে কবরের উপর সাজিয়ে দিলেন। পটলমামা পকেটে হাত ঢুকিয়ে পাইপটা খুঁজলেন। পাইপ পেলেন না। শূন্য হাত পকেট থেকে তুলে আনলেন। চোখ তুললেন আকাশে। আকাশ অনাবৃত নীলে নীল। নীল সমুদ্রের মত। সেই নীল সমুদ্রে সাদা মেঘ সমুদ্রের ঢেউয়ের মত। নীলের পিছনে নীল, তার পিছনে আছে মানুষের অজানা অচেনা অজ্ঞাত এক দেশ। মৃত্যুর পরের কুহেলিকাময় সেই দেশ।

    সামনেই দেখা গেল শীলাবতী নদী। এখান থেকে শুধু বালির এক দীর্ঘ রেখা। তার পরেই সবুজ মাঠ। সবুজ গাছের জটলা। তার ছায়ায় ছায়ায় গ্রাম আর মানুষের নিত্য দিন যাপনের সংসার।

    এপারে শুধু ঢেউয়ের পর ঢেউ। নদীর ঢেউ নয়। মাটির ঢিপি। একের পর এক মাটির ঢিপি। নদীর ঢেউ যেন কার মন্ত্রে মাটি পাথরে পরিণত হয়ে স্থির হয়ে আছে।

    ঢিপির মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা পথ। পটলমামার পিছনে এঙলিঙ। দু’পাশে মাটির ঢিপি। ঢিপির উপর অসংখ্য খোলামকুচি। কোন এক খেয়ালী মানুষ যেন কয়েক হাজার হাড়ি-কলসী এখানে ভেঙে গুড়ো-গুড়ো করেছে। কবে, কোন সময়ে? উত্তর নেই। আকাশে সূর্য। তার রোদ ঢিপির উপর। লাল-কালো খোলামকুচি আর কাঁকড়। কোন কোন কাঁকর কালো। পটলমামা ঝুঁকে একটি তুলে নিলেন। বেশ ভারী। হয়তো পাথরের মধ্যে লোহা। তিনি পাথরের টুকরোটি এঙলিঙের হাতে দিলেন।

    এঙলিঙ পাথরের টুকরো নাকের কাছে এনে দেখলেন। টপ্ করে পাথর আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। পাথর খণ্ড ফিরে আসতেই খপ করে লুফে নিলেন। আবার ভাল করে দেখলেন। পাথরটা পাশের জঙ্গলে ছুড়ে ফেলে দিলেন।

    ততক্ষণে পটলমামা অনেকটা নীচে নেমে গেছেন। এখান থেকে রাস্তা নীচু হয়ে খাদ কেটে শীলাবতীতে গিয়ে মিশেছে। যত নীচে নামা যায় তত বড় খাদ চোখে পড়ে। দু’পাশে পাথর আর কাঁকড়ের তাল দোতালা বাড়ীর মত উঁচু। উপরের দিক কালো। নীচের দিক টকটকে লাল। মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাদ। শাল গাছের চারা। তাদের আঁকাবাঁকা শিকড় সাপের মত পাক খেয়ে ঝুলে আছে।

    পটলমামা থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর ডান দিকে কাঁকড়রমাটির গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটি খোলামকুচি। তিনি চোখ উপর দিকে তুললেন। আঁকা-বাঁকা শালের শিকড় আর কাঁকড়ের শক্ত দেওয়াল। এমন শক্ত মনে হয় পাথরের খোয়া ফেলে কে যেন দুরমুজ করে রেখেছে।

    “ইউ থি….ইউ থি” শুনে পটলমামা ফিরে তাকালেন। তাঁর কয়েক হাত দূরে এঙলিঙ। পিছন দিকে পিঠ ঝুঁকিয়ে ঢিপির উপর চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। কুতকুতে ছোট চোখ দুটি বিস্ময়ে বিস্ফারিত। নাকটা ফুলে আছে। চশমা নীচে নেমে এসে নাকের ডগায় ঝুলছে।

    পটলমামা দ্রুত এগিয়ে এলেন। এসে যা দেখলেন তা বিস্মিত হবার মতই। পাহাড়ের ফুট দুয়েক নীচে লাল মাটির স্তর। সেই স্তরে পর পর সাজানো আছে একের পর এক ভাঙ্গা হাড়ি-কলসীর টুকরো। তাদের গায়ের রং ধুসর কালো।

    একি কোন শ্মশান? দেখে তাই মনে হয়। খোলামকুচির অনেক অংশ বাইরে বেরিয়ে আছে। তার উপরে রোদ পড়েছে। ঝক্-ঝক্ করছে হায়েনার দাঁতের মত। কারো পিঠ পেলেই ছুবলে রক্ত বের করে নেবে।

    শ্মশান আর একটু দূরে। তাই পটলমামা দাঁড়ালেন না।

    ঢালু পথ এগিয়ে শীলাবতীর বালিতে হুমরী খেয়ে পড়েছে। পথের ডান পাশে শ্মশান। শ্মশানের পাশ থেকে নদীর রেখার মত বৃহৎ খাদ। দু’পাশে খাড়াই পাহাড়। বালি ভেঙে চলতে হয়। দু’পাশের পাহাড়ের গায়ে নানা রকম নক্‌শা। ছোট ছোট খাদ। কোথাও পাথর এগিয়ে এসেছে। রোদ পড়েছে। পাশেই দীর্ঘ ছায়া। এ যেন ঘুমন্ত রাজপুরী। একের পর এক প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। জানালা দরজা সব আছে। হাঁ করে খোলা আছে। কিন্তু কোন প্রাণী নেই। নিস্তব্ধ। দুপুরের রোদে ঝিম মেরে আছে। হয়তো এককালে প্রাণ ছিল, প্রাণী ছিল, ছিল সবুজ মায়া। এখন কিছু নেই। ক্ষত বুক হাঁ করে খুলে রেখে রোদের মধ্যে হা-হা করছে।

    পটলমামা শ্মশান পার হয়ে নীচে নামলেন না। দাঁড়ালেন সবুজ বাগানের সামনে। শ্মশানের বাঁয়ে উঁচু ঢিপি। ঢিপির চারিদিকে কাঠি পুঁতে বেড়া দেওয়া! মাঝখানে অনেক গাছ, গাছের পর গাছ। সবুজ পাতা, পাতার ফাঁকে ফুল। রুক্ষ লাল ঢিপির মাঝখানে যেন জীবনের সবুজ উজ্জ্বলতা।

    দরজা খোলাই ছিল। পর পর ইট সাজিয়ে সিড়ি তৈরী। সিঁড়ির মাথায় বিচালীর চালের ছোট মাটির ঘর। পটলমামা উপরে ওঠা শুরু করলেন। উপরে উঠতেই খানিকটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উঠোন। আরো দু’খানা মাটির ঘর। মাঝখানের ঘরে কালীর মূর্তি। কালো কালী নয়, নীল কালী। শ্মশান কালী সাধারণত নীল হয়ে থাকে।

    পাশের ছোট ঘর থেকে ছ্যাক্ ছ্যাক্ আওয়াজ আসছে। একটু একটু ধোঁয়াও বাইরে এসে গাছের পাতা বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ওটি রান্না ঘর। মাছ ভাজার শব্দ আসছে তা এঙলিঙ বুঝতে পারলেন। তাঁর নোলায় জল এসে গেল। অন্যমনস্ক হতে গিয়ে কালীর মূর্তি দেখতে পেলেন। অমনি বলে উঠলেন, “ইউ থি, মাডাল খালি।” হাঁটু ভেঙে বসে ভক্তি সহকারে প্রণাম করলেন।

    পটলমামা প্রণাম করলেন না। একটা দড়ির খাটিয়া পাতা ছিল। গিয়ে তার উপর জাঁকিয়ে বসলেন। পিঠের থলে খুলে একটা পাইপ বের করলেন। তামাক পুরে আগুন লাগিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে তাকালেন। মাথার ওপর দেখতে পেলেন আকাশমণি গাছ। কুচি-কুচি হলুদ ফুল ফুটে আছে। হাওয়ায় ডালপালা দোল খাচ্ছে। অমনি ঝাঁকে-ঝাঁকে আকাশমণি ফুল ঝরে পড়ছে। হলুদ রংয়ের যেন বৃষ্টি নামছে।

    এঙলিঙ দু’-একবার রান্না ঘরের দিকে উঁকি-ঝুঁকি মেরে এসে বসলেন পটলমামার পাশে। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে বললেন, “টান্‌ট্রিক ভৈলব ইন খিচেন লুম।” কথাটা বলে পটলমামার মুখে চোখ ফেললেন। পটলমামার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন।

    খড়মের আওয়াজ শুনে চোখ খুললেন। দেখতে পেলেন দীর্ঘকায় এক পুরুষকে। গায়ের রং ফর্সা। চিবুকের নীচে কাঁচা-পাকা দাঁড়ি, মাথায় জটা নেই, আছে কাঁধ পর্যন্ত চুল। কপালে রক্ততিলক নেই দেখে এঙলিঙ হতাশ হলেন।

    খড়ম বাজিয়ে সামনে এসে সাধুজী জিগ্যেস করলেন, “আপনারা?”

    পটলমামা যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। বললেন, “আপনি একজন প্রাক্তন বিপ্লবী। দেশমাতৃকা ছেড়ে কালীমাতায় এলেন কেন?”

    সাধুজী একটু গম্ভীর হলেন। বললেন, “আপনি যা শুনেছেন তা সত্যই শুনেছেন। তবে মায়ের মূর্তি কেন তা বলতে পারবো না। কার্যকারণ সূত্রে অনেক ওলট-পালট ঘটনা জীবনে ঘটে। ঘটে না-কি?” পটলমামার চোখে চোখ ফেলে জিজ্ঞাসা করলেন।

    পটলমামা বললেল, “হ্যাঁ, এ রকম ঘটে। এই দেখুন না আমাকে, এক সময় ছিলাম আবগারী দারোগা। এখন চাকরি ছেড়ে বাউণ্ডুলের মত ঘুরে মরছি।”

    সাধুজী বললেন, “চাকরি ছেড়ে দিলেন!”

    পটলমামা বললেন, “হ্যাঁ। পাগলামী বলতে পারেন। তবে এ রকম পাগলামীও কোন কোন মানুষ করে।”

    পটলমামা আবগারী দারোগা ছিলেন শুনে এঙলিঙ খিক্ থিক্‌ করে হেসে উঠলেন। পটলমামা ফিরে তাকাতেই অপ্রস্তুত হয়ে হাসি থামালেন। পটলমামা ডাহা মিথ্যা পরিচয় দিচ্ছিলেন বলেই এঙলিঙের হাসি পেয়েছিল।

    সাধুজী এঙলিঙকে দেখে একটু বিস্মিত হলেন। বললেন, “ইনি?”

    পটলমামা বললেন, “মিঃ এঙলিঙ। তিব্বতী দার্শনিক।”

    এঙলিঙ মাথা নীচু করে অভিবাদন জানিয়ে ফিক্ করে একটু হেসে দিলেন। বললেন, “ইউ থিত দাউন।”

    সাধুজী ভাঙ্গা চেয়ারটায় চেপে বসলেন। বসে দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে কাঁচা-পাকা দাঁড়িকে পরিপাটি করে বললেন, “আপনার নামটি জানতে পারি? আমার নাম সুকুমার রায়। এই গড়বেতারই মানুষ।”

    পটলমামা ঘরের মধ্যে কালীমূর্তির দিকে একবার তাকালেন। চোখ ফিরিয়ে এনে বললেন, “হারাধন চক্রবর্তী।”

    পটলমামা নিজের নাম ‘হারাধন চক্রবর্তী’ বলতেই এঙলিঙ ফিক্ করে হাসতে গিয়ে পটলমামার চোখে চোখ পড়তেই হাসি আটকে ফেললেন।

    সাধুজী নাম শুনে সামান্য একটু হাসলেন। পটলমামা সে হাসি দেখতে পেলেন বলে লজ্জা পেলেন। হাসি সামলে লজ্জিতভাবে বললেন, “ডাক-সাইটে আবগারী দারোগার নাম হারাধন। যে ধন হারিয়ে গেছে তাইতো হারাধন।”

    তিনজনে একসঙ্গে হেসে উঠলেন।

    হাসি থামতেই পটলমামা ঝট্ করে উঠে পড়লেন। দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালেন। দেখতে পেলেন সাইকেলটিকে। সেই পথের যুবকটি সাইকেল নিয়ে নীচের উৎরাইতে দাঁড়িয়ে আছে। পটলমামাকে দেখতে পেয়েই ঝট্ করে সরে গেল। সাইকেল চালিয়ে ঢিপির আড়ালে চলে গেল।

  • সাইফুল্লাহ

    সাইফুল্লাহ

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর যুগের ঐতিহাসিকদের রচনাবলীতে সাইফুল্লাহ নামক এক ব্যক্তির উল্লেখ এভাবে পাওয়া যায়, ‘কেউ যদি সুলতান সালাহুদ্দীনের উপাসনা করে থাকে, তাহলে সে ছিল সাইফুল্লাহ।’ সুলতান সালাহুদ্দীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ডান হাত বলে খ্যাত বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদের ডাইরীতে যা আজও আরবী ভাষায় সংরক্ষিত আছে— সাইফুল্লাহর বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে কোন ইতিহাস গ্রন্থে এ লোকটির আলোচনা পাওয়া যায় না।

    বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদের ডাইরীর ভাষ্যমতে সাইফুল্লাহ নামের এ লোকটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ওফাতের পর সতের বছর জীবিত ছিল। জীবনের এই শেষ সতেরটি বছর অতিবাহিত করেছিল সে সুলতান সালাহুদ্দীনের কবরের পার্শ্বে। লোকটি অসিয়ত করেছিল, মৃত্যুর পর যেন তাকে সুলতান সালাহুদ্দীনের পার্শ্বে দাফন করা হয়। কিন্তু সাইফুল্লাহ ছিল একজন সাধারণ মানুষ। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার কোন বিশেষত্ব ছিল না। তাই মৃত্যুর পর তাকে সাধারণ গোরস্তানেই দাফন করা হয়। অল্প ক’দিন পরই তার সমাধি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; মানুষ তার কবরের উপর ঘর তুলে বসবাস শুরু করে।

    রোম উপসাগরের ওপার থেকে সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করতে এসেছিল সাইফুল্লাহ। তখন তার নাম ছিল ‘মিগনানা মারিউস’। ইসলামের নামটাই শুধু শুনেছিল সে। তার জানা ছিল না ইসলামের আসল পরিচয়। ক্রুসেডারদের প্রোপাগাণ্ডায় বিভ্রান্ত মিগনানা মারিউসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ইসলাম একটি ঘৃণ্য ধর্ম, মুসলমানরা নারীলোলুপ ও নরখাদক এক হিংস্র জাতি। তাই মুসলমান শব্দটি কানে আসা মাত্র ঘৃণায় থু থু ফেলত মিগনানা মারিউস। কিন্তু পরম সাহসিকতা প্রদর্শন করে সালাহুদ্দীন আইউবী পর্যন্ত পৌঁছার পর মৃত্যু হয়ে গেল মিগনানা মারিউসের। তার নিষ্প্রাণ অস্তিত্ব থেকে জন্ম নিল ‘সাইফুল্লাহ্’।

    ইতিহাসের পাতায় এমন রাষ্ট্রনায়কদের সংখ্যা কম নয়, শত্রুর হাতে যারা জীবন দিয়েছিলেন কিংবা আত্মঘাতী আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ইতিহাসের সেই গুটিকতক ব্যক্তিত্বের একজন, যাদেরকে বারবার হত্যা করার চেষ্টা যেমন করেছে শত্রুরা, তেমন করেছে মিত্ররাও। সুলতান সালাহুদ্দীনকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র শত্রুদের তুলনায় বেশী করেছে মিত্ররা। তাঁর কাহিনী বর্ণনা করতে গেলে একজন ঈমানদীপ্ত জানবাজ মুমিনের পাশাপাশি একদল বে-ঈমান গাদ্দারের নিদারুণ কাহিনীও উল্লেখ করতে হয় সমান তালে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। তাই সালাহুদ্দীন আইউবী বলতেন— ‘অদূর ভবিষ্যতে ইতিহাস এমন একটি সময় প্রত্যক্ষ করবে, যখন পৃথিবীর বুকে মুসলমান থাকবে ঠিক; কিন্তু ঈমান তাদের বিক্রি হয়ে থাকবে কাফিরদের হাতে, তাদের উপর শাসন করবে খৃষ্টানরা।’

    আমরা এখন ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকাল প্রত্যক্ষ করছি।

    সালাহুদ্দীন আইউবী যখন ক্রুসেডারদের সম্মিলিত নৌ-বহরকে, রোম উপসাগরে আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, সাইফুল্লাহর কাহিনী শুরু হয় তখন থেকে। সালাহুদ্দীনের আক্রমণ থেকে ক্রুসেডারদের কয়েকটি জাহাজ রক্ষা পেয়েছিল। সাগরতীরে নিজ বাহিনীর সঙ্গে উপস্থিত থেকে সালাহুদ্দীন আইউবী সেই জীবন্ত রক্ষা পাওয়া ক্রুসেডারদের গ্রেফতার করতে থাকেন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিল সাতটি মেয়ে, যাদের বিস্তারিত কাহিনী ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।

    মিসরে বিদ্রোহ করেছিল সুদানী বাহিনী। সেই বিদ্রোহ দমন করে ফেলেন সুলতান। অপরদিকে সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীও এসে পৌঁছে তাঁর নিকট। এবার ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ-পরিকল্পনা তৈরিতে মগ্ন হয়ে পড়েন তিনি।

    রোম উপসাগরের ওপারে শহরের উপকণ্ঠে এক নিভৃত অঞ্চলে বৈঠক বসেছে খৃষ্টান কর্মকর্তাদের। শাহ অগাস্টাস, শাহ রেমাণ্ড, শাহেনশাহ সপ্তম লুই-এর ভাই রবার্টও সভায় উপস্থিত। পরাজয়ের গ্লানিতে বিমর্ষ সকলের মুখমণ্ডল। আলোচনা চলছে। এ সময়ে সভাকক্ষে প্রবেশ করে এক ব্যক্তি। নাম এম্লার্ক। ক্ষোভে-দুঃখে আগুনের ফুলকি বেরুচ্ছে যেন তার দু চোখ থেকে। খৃষ্টানদের যে সম্মিলিত নৌ-বহরকে মিসর আক্রমণে প্রেরণ করা হয়েছিল, এম্লার্ক ছিল তার কমাণ্ডার। কিন্তু আকস্মিক ঝড়ের ন্যায় তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন সালাহুদ্দীন আইউবী। বহরের একজন সৈনিককেও সমুদ্র থেকে কূলে পা রাখতে দিলেন না তিনি। মিসরের মাটিতে পা রাখতে সক্ষম হয়েছিল যেসব খৃষ্টসেনা, সালাহুদ্দীনের হাতে যুদ্ধবন্দীতে পরিণত হয় তারা।

    সভাকক্ষে বসে আছে এম্লার্ক। ক্ষোভে থর থর করে কাঁপছে তার ওষ্ঠাধর। তার বহর ডুবে মরেছে আজ পনের দিন হল। ভাসতে ভাসতে আজই ইটালীর কূলে এসে পৌঁছেছে সে। সালাহুদ্দীন আইউবীর অগ্নিতীর নিক্ষেপকারী বাহিনী পাল-মাস্তুল জ্বালিয়ে দিয়েছে তার জাহাজের। ভাগ্যক্রমে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে প্রথমবারের মত জাহাজটিকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় তার নাবিক-সৈনিকেরা। পালবিহীন জাহাজ হেলে-দুলে ভাসতে থাকে মাঝ দরিয়ায়।

    এক সময়ে দিক-চক্ৰবাল আচ্ছন্ন করে আকাশে জেগে উঠে ঘোর কালো মেঘ। শুরু হয় প্রবল ঝড়। ঝড়ের কবলে পড়ে অসংখ্য শিশু-কিশোর-নারীসহ পানির নীচে তলিয়ে যায় এম্লার্কের জাহাজটি। অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় এম্লার্ক। প্রাণ নিয়ে পৌঁছে যায় ইটালীর তীরে।

    বৈঠক চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, খৃষ্টান বাহিনীকে এত বড় ধোঁকা কে দিল? কার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এত শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হল তাদের? সংশয় ব্যক্ত করা হয় সুদানী সালার নাজির উপর। তারই পত্রের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল এ নৌ-অভিযান। নাজির সঙ্গে খৃষ্টানদের পত্ৰ-যোগাযোগ চলছিল পূর্ব থেকেই। এ যাবৎ বেশ কটি পত্র দিয়েছে সে খৃষ্টানদের। খৃষ্টানরা নাজির সর্বশেষ যে পত্রটির উপর ভিত্তি করে এ অভিযানে নেমেছিল, পূর্বের পত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হল সেটি। কিছুটা অমিল পাওয়া গেল। নাজির প্রতি সন্দেহ আরও গাঢ় হল। কায়রোতে গুপ্তচরও ঢুকিয়ে রেখেছিল তারা। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকেও কোন সংবাদ পায়নি খৃষ্টানরা। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে বিশ্বাসঘাতক নাজি ও কুচক্রী সালারদের গোপনে হত্যা করে রাতের আঁধারে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছেন, সে সংবাদ খৃষ্টানদের কানে পৌঁছানোর ছিল না কেউ। খৃষ্টানদের সম্রাট-কর্মকর্তাগণ কল্পনাও করতে পারেননি, যে পত্রের উপর ভিত্তি করে তারা মিসর অভিমুখে নৌ-বহর প্রেরণ করেছিলেন, সে পত্রখানা নাজিরই ছিল বটে; কিন্তু তার আক্রমণের তারিখ পরিবর্তন করে অন্য তারিখ লিখে দিয়েছিলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। এসব তথ্য সংগ্রহ করা ছিল খৃষ্টান গোয়েন্দাদের সাধ্যের বাইরে।

    দীর্ঘ আলাপ-পর্যালোচনার পরেও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারল না এ বৈঠক। কথা সরছে না এম্লার্কের মুখ থেকে। পরাজয়ের গ্লানিতে লোকটি যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি ক্লান্ত। পরদিনের জন্য মুলতবী করে দেওয়া হয় বৈঠক।

    রাতের বেলা। মদের আসর জমে উঠেছে খৃষ্টান কর্মকর্তাদের। নেশায় বুঁদ হয়ে পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলতে চাইছে তারা। হঠাৎ সে আসরে আগমন ঘটে এক ব্যক্তির। রেমণ্ড ছাড়া কেউ চেনে না তাকে।

    লোকটি রেমণ্ডের নির্ভরযোগ্য গুপ্তচর। হামলার দিন সন্ধ্যায় মিসরের তীরে এসে নেমেছিল সে। তারই খানিক পর এসে পৌঁছে ক্রুসেডারদের নৌ-বহর। বহরটি সালাহুদ্দীন আইউবীর ক্ষুদ্র বাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়েছিল তারই চোখের সামনে।

    বেশ কিছু তথ্য নিয়ে এসেছে লোকটি। রেমণ্ড সকলের নিকট পরিচয় করিয়ে দেয় তাকে। রিপোর্ট জানবার জন্য তাকে ঘিরে ধরে সবাই। খৃষ্টান কর্মকর্তাগণ সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য রবিন নামক এক সুশিক্ষিত অভিজ্ঞ গুপ্তচরকে সমুদ্রোপকূলে প্রেরণ করেছিল এবং তার সঙ্গে পাঁচজন পুরুষ ও সাতটি রূপসী যুবতীকে প্রেরণ করেছিল, এ গুপ্তচর তাদের সম্পর্কে অবহিত।

    আগন্তুক জানায়— ‘রবিন জখমের বাহানা দেখিয়ে আহতদের সঙ্গে সালাহুদ্দীন আইউবীর ক্যাম্পে পৌঁছে গিয়েছিল। তার পাঁচ পুরুষ সঙ্গী ছিল বণিকের বেশে। তাদের একজন—ক্রিস্টোফর যার নাম—নেপথ্য থেকে তীর ছুঁড়ে সালাহুদ্দীনের গায়ে। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় তার তীর। ধরা পড়ে যায় পাঁচজনের সকলে। মেয়ে সাতটিকেও ধরে ফেলেন সালাহুদ্দীন। বেশ চমৎকার কাহিনী গড়ে নিয়েছিল মেয়েরা। সালাহুদ্দীনকে শোনায় সে কাহিনী। মেয়েগুলোকে আশ্রয়ে রেখে পুরুষ পাঁচজনকে ছেড়ে দিয়েছিলেন সালাহুদ্দীন। কিন্তু তাঁর গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান হঠাৎ এসে পড়ে গ্রেফতার করে ফেলেন তাদেরকে। পাঁচজনের একজনকে সকলের সামনে হত্যা করে অন্যদের থেকে কথা আদায় করেন তিনি।’

    গোয়েন্দা আরও জানায়, ‘ধরা পড়ি আমিও। সালাহুদ্দীনের নিকট আমি নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দেই। তাই তিনি আমার উপর আহতদের ব্যাণ্ডেজ চিকিৎসার দায়িত্ব অর্পণ করেন। সেই সুযোগে আমি জানতে পারলাম, সুদানীরা বিদ্রোহ করেছিল বটে; কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী সে বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে ফেলেন। তিনি বিদ্রোহী অফিসার ও নেতাদের গ্রেফতার করেন।

    রবিন, তার সহযোগী চার পুরুষ ও মেয়ে ছয়টি এখন সালাহুদ্দীনের হাতে বন্দী। তবে সপ্তম মেয়েটির— যে ছিল সবচেয়ে বেশী বিচক্ষণ— তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই নিখোঁজ মেয়েটির নাম মুবিনা এরতেলাস, সংক্ষেপে মুবী।’

    গোয়েন্দা জানায়, ‘বন্দী রবিন ও তার সহকর্মীরা এখনও উপকূলীয় শিবিরেই রয়েছে। সালাহুদ্দীন ক্যাম্পে নেই। তার গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ানও অনুপস্থিত। আমি বড় কষ্টে ওখান থেকে বের হয়ে এসেছি। ঘাটে এসে একটি নৌকা পেয়ে গেলাম। দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে দ্রুত নদী পার হয়ে চলে আসি। রবিন ও তার সহকর্মী পুরুষ ও মেয়েরা মৃত্যুমুখে পতিত। পুরুষদের চিন্তা না হয় নাই করলাম; কিন্তু মেয়েগুলোকে উদ্ধার করা তো একান্ত আবশ্যক। ওরা সকলেই যুবতী এবং আমাদের বাছা বাছা রূপসী মেয়ে। উদ্ধার করতে না পারলে মুসলমানরা ওদের কী দশা ঘটাবে, তাতে আপনারা বুঝতেই পারছেন।’

    ‘এ ত্যাগ আমাদের দিতেই হবে।’ বললেন অগাস্টাস।

    ‘আপনি যদি আমাকে এ নিশ্চয়তা দিতে পারেন যে, সালাহুদ্দীন আইউবী আমাদের মেয়েদেরকে প্রাণে শেষ করেই ক্ষান্ত হবে; অন্য কোন নির্যাতনের শিকার তাদের হতে হবে না, তাহলে এ ত্যাগ স্বীকার করতে আমিও প্রস্তুত। কিন্তু এমনটি আশা করা বৃথা; মুসলমানরা ওদের সঙ্গে পশুর মত আচরণ করবে আর তাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মেয়েগুলো আমাদেরকে অভিসম্পাত করবে। আমি তাদেরকে মুক্ত করে আনার চেষ্টা করব।’ বললেন রেমণ্ড।

    ‘এমনও হতে পারে, মুসলমানরা মেয়েগুলোর সঙ্গে ভাল আচরণ দেখিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করবে। তখন আমাদের মারাত্মক, সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। এ কারণে ওদেরকে মুক্ত করে আনা একান্ত আবশ্যক। এর জন্য আমি আমার ভাণ্ডারের অর্ধেক সম্পদও উজাড় করতে প্রস্তুত আছি।’ বললেন রবার্ট।

    ‘আমাদের এ মেয়েগুলো শুধু এ কারণেই মূল্যবান নয় যে, এরা নারী। এরা প্রশিক্ষিত গুপ্তচর। এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এদের মত মেয়ে আর পাব কোথায়? এমন মেয়ে আমরা কোথায় পাব, যারা জাতি ও ধর্মের স্বার্থে—ক্রুশের স্বার্থে নিজেকে দুশমনের হাতে তুলে দেবে, দুশমনের ভোগ-বিলাসিতার উপকরণে পরিণত হবে এবং গুপ্তচরবৃত্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকবে। এ মিশনে তাদের সর্বপ্রথম বিলাতে হয় সম্ভ্রম। তদুপরি গুপ্তচর হিসেবে ধরা পড়ে গেলে কঠোর নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন হারাবার ভয় থাকে পদে পদে। এ মেয়েগুলোকে আমাদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়েছে। তারপর প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় কষ্টে মিসর ও আরবের ভাষা শেখানো হয়েছে। আমি মনে করি, এভাবে একত্রে সাতটি মেয়ে হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’ বলল আগন্তুক গোয়েন্দা।

    ‘আচ্ছা, তুমি কি নিশ্চয়তা দিতে পার, মেয়েগুলোকে সালাহুদ্দীনের ক্যাম্প থেকে বের করে আনা যাবে?’ জিজ্ঞেস করেন অগাস্টাস।

    ‘যাবে। এর জন্য প্রয়োজন বেশ কজন দুঃসাহসী সৈন্য। তবে হয়ত দু-একদিনের মধ্যে রবিন এবং তার সহকর্মী পুরুষ ও মেয়েদেরকে কায়রো নিয়ে যাওয়া হবে। তাই যদি হয়, তবে সেখান থেকে তাদেরকে বের করে আনা কঠিন হবে। সময় নষ্ট না করে উপকূলীয় ক্যাম্প থেকেই তাদেরকে মুক্ত করে আনা দরকার। আপনি বিশজন লোক দিন; আমি তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু তারা হতে হবে এমন লোক, যারা জীবন নিয়ে খেলতে জানে।’ বলল গোয়েন্দা।

    ‘যে কোন মূল্যে মেয়েগুলোকে উদ্ধার করে আনা দরকার।’ গর্জে উঠে বলল এম্লার্ক।

    খৃষ্টান বাহিনী রোম উপসাগরে যে শোচনীয় পরাজয় ও মর্মান্তিক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছিল, তার প্রতিশোধ-স্পৃহায় পাগলের মত হয়ে গেছে এম্লার্ক। লোকটি ক্রুসেডারদের সম্মিলিত নৌ-বহর এবং তার আরোহী সৈন্যদের সুপ্রীম কমাণ্ডার হয়ে এ আশা বুকে নিয়ে অভিযানে বেরিয়েছিল যে, মিসর দখলের পর জয়মাল্য তারই গলায় ঝুলবে। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরের তীরেই ঘেঁষতে দিলেন না তাকে। বেচারা জ্বলন্ত জাহাজে জীবন্ত পুড়ে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েও পড়ে গেল ঝড়ের কবলে। সেখান থেকে বেঁচে এসেছে মরতে মরতে। এখন কথা বলতে ঠোঁট কাঁপছে তার। কথায় কথায় টেবিল চাপড়িয়ে, নিজের উরুতে হাত মেরে মনের জ্বালা প্রশমিত করছে লোকটি। অবশেষে বলল—

    ‘আমি মেয়েগুলোকেও মুক্ত করে আনব, সালাহুদ্দীনকেও হত্যা করাব। উদ্ধার করে এনে এ মেয়েগুলোকে মুসলমানদের সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটনে ব্যবহার করব।’

    ‘আমি মনে-প্রাণে তোমাকে সমর্থন করি এম্লার্ক! এমন সুশিক্ষিত মেয়েদেরকে আমিও এত সহজে নষ্ট হতে দিতে চাই না। আপনাদের সকলেরই জানা আছে, সিরিয়ার হেরেমগুলোতে আমরা কি পরিমাণ মেয়ে ঢুকিয়ে রেখেছি। বেশ কজন মুসলমান গভর্নর ও আমীর তাদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে। বাগদাদে আমাদের মেয়েরা আমীরদের হাতে এমন বেশ কজন লোককে হত্যা করিয়েছে, যারা ক্রুসেডের বিরুদ্ধে শ্লোগান তুলেছিল। নারী আর মদ দিয়ে মুসলমানদের খেলাফতকে আমরা তিন ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছি, তাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছি। খেলাফত এখন ত্রিধাবিভক্ত। আমোদ-বিলাসিতায় ডুবে যেতে শুরু করেছেন খলীফারা। অবশিষ্ট আছে শুধু দুটি লোক। যদি তারা দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকে, তাহলে তারা আমাদের জন্য স্বতন্ত্র এক বিপদ হয়ে থাকবে। একজন সালাহুদ্দীন আইউবী, অপরজন নুরুদ্দীন জঙ্গী। এদের একজনও যদি বেঁচে থাকে, তাহলে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা আমাদের পক্ষে কঠিন হবে। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি সুদানীদের বিদ্রোহ দমন করেই থাকে, তাহলে তার অর্থ হল, লোকটি আমাদের ধারণা অপেক্ষাও বেশী ভয়ঙ্কর। তার বিরুদ্ধে ময়দানে মোকাবেলা করার পাশাপাশি নাশকতামূলক কার্যক্রমও আমাদের চালু করতে হবে। মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ-দলাদলি এবং অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এ মেয়েগুলোকে আমাদের একান্ত প্রয়োজন।’ বললেন রেমণ্ড।

    ‘আমাদের সকল অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। আমরা আরবে মুসলমানদের দুর্বলতা থেকে স্বার্থ উদ্ধার করেছি। মুসলমান নারী, মদ আর ঐশ্বর্য পেলে অন্ধ হয়ে যায়। মুসলমানদের নিঃশেষ করার উত্তম পন্থা হল, এক মুসলমান দিয়ে আরেক মুসলমানকে হত্যা করানো। হাতে ক’টি টাকা গুঁজে দাও, দেখবে, অর্থের লোভে তারা তাদের সাধের দ্বীন ও ঈমান ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবে না। চেষ্টা করলে তোমরা অতি অনায়াসে মুসলমানের ঈমান ক্রয় করতে পার।’ বললেন রবার্ট।

    মুসলমানদের দুর্বলতা নিয়ে আলাপ চলে দীর্ঘক্ষণ। তারপর বন্দী মেয়েদের মুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে কথা ওঠে। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, বিশজন দুঃসাহসী সেনা প্রেরণ করা হবে এ কাজে। আগামীকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রওনা হয়ে যাবে তারা।

    তৎক্ষণাৎ তলব করা হয় চারজন কমাণ্ডার। দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাদের বলা হল, ‘তোমাদের সহযোগিতার জন্য বিশজন সৈনিক বেছে নাও।’

    আলোচনায় বসে চার কমাণ্ডার। এ অভিযানে তারা কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। এক কমাণ্ডার বলল, ‘আমাদের এমন একটি ফোর্স গঠন করতে হবে, যারা মুসলমানদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে কমাণ্ডে আক্রমণ চালাতে থাকবে এবং রাতে তাদের পেট্রোল বাহিনীর উপর হামলা করে তাদেরকে অস্থির করে রাখবে। এ ফোর্সের জন্য দক্ষ ও বিচক্ষণ লোক বেছে নিতে হবে।’

    ‘কিন্তু তারা হতে হবে শতভাগ বিশ্বস্ত। এ ফোর্স আমাদের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করবে। এমনও হতে পারে, তারা কিছুই না করে ফিরে এসে শোনাবে আমরা অনেক কিছু করে এসেছি।’ বললেন অগাস্টাস।

    এক কমাণ্ডার বলল, ‘আপনি শুনে অবাক হবেন, আমাদের বাহিনীতে এমন কিছু সৈনিক আছে, যাদেরকে আমরা বিভিন্ন কারাগার থেকে এনে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করেছি। তাদের কেউ ছিল ডাকাত, কেউ সন্ত্রাসী, কেউবা ছিল ছিনতাইকারী। তারা দীর্ঘ মেয়াদী সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী ছিল। ওরা কারাগারের বদ্ধ প্রকোষ্ঠেই ধুকে ধুকে মরত। আমাদের প্রস্তাব পেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। শুনলে হয়ত আপনি বিস্মিত হবেন, আমাদের ব্যর্থ নৌ-অভিযানে এই সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী সৈনিকরা বড় বীরত্বের সাথে সালাহুদ্দীনের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কয়েকটি জাহাজকে রক্ষা করেছে। বন্দী মেয়েদেরকে মুক্ত করার অভিযানে আমি এদের তিনজনকে প্রেরণ করব।’

    ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন— ‘মুসলমানদের মধ্যে বিলাস-প্রিয়তা বেড়ে যায় এবং তাদের ঐক্য নিঃশেষ হতে শুরু করে। মুসলমানের চরিত্র ধ্বংস করার জন্য খৃষ্টানরা তাদের ঘরে ঘরে বিলাস-সামগ্রী ঢুকিয়ে দিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তাদের মনে আশা জাগে, আর এক ধাক্কায়ই তারা মুসলমানদের ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম হবে। এবার খৃষ্টানরা বিশ্বময় ইসলাম ও মুসলিম-বিরোধী ঘৃণা ছড়াতে শুরু করে এবং সকলকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানায়। জবাবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ খৃষ্টান বাহিনীতে যোগ দিতে শুরু করে। পাদ্রী থেকে আরম্ভ করে পেশাদার অপরাধীরা পর্যন্ত পঙ্কিল পথ ত্যাগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। যেসব সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী দীর্ঘমেয়াদী সাজা ভোগ করছিল, বিভিন্ন কারাগার থেকে এনে তাদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়। এ কয়েদীদের প্রতি খৃষ্টানদের বেশ আস্থা ছিল। যার কারণে সালাহুদ্দীনের বন্দীদশা থেকে মেয়েদের মুক্ত করা এবং সালাহুদ্দীনকে হত্যা করার জন্য এক কমাণ্ডার কয়েদী সৈনিকদের নির্বাচন করেছিল।’

    সকাল পর্যন্ত অতীব দুঃসাহসী ও বিচক্ষণ বিশজন সৈনিক বেছে নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। মিগনানা মারিউসও ছিল তাদের একজন, যাকে বের করে আনা হয়েছিল রোমের একটি কারাগার থেকে। যে গোয়েন্দা লোকটি ডাক্তার বেশে সুলতান সালাহুদ্দীনের ক্যাম্পে ছিল এবং তথ্য সংগ্রহ করে পালিয়ে এসেছিল, অভিযানের কমাণ্ডার নিয়োগ করা হল তাকে।

    এ বাহিনীর প্রথম দায়িত্ব হল, মেয়েগুলোকে মুসলমানদের বন্দীদশা থেকে বের করে আনা এবং সম্ভব হলে রবিন ও তার চার সহকর্মীকেও মুক্ত করা। সহজে সম্ভব না হলে রবিনদের জন্য ঝুঁকি নিতে নিষেধ করে দেওয়া হয় তাদের। দ্বিতীয় দায়িত্ব, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা।

    এ বাহিনীটিকে নতুন করে প্রাকটিক্যাল কোন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি; শুধু মৌখিক জরুরী নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি দিয়ে একটি পালতোলা নৌকায় করে মৎস শিকারীর বেশে রওয়ানা করান হয় সে দিনই।

    ○             ○             ○

    যে সময়ে এ নৌকাটি ইতালীর সমুদ্রতীর থেকে পাল তুলে রওনা হয়, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ততক্ষণে সুদানীদের বিদ্রোহ সম্পূর্ণরূপে দমন করে ফেলেছেন। অনেক সুদানী কমাণ্ডার তার বাহিনীর হাতে মারা গেছে, আহত হয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে অনেকে। অনেকে আবার দাঁড়িয়ে আছে গভর্নর হাউজের সম্মুখের চত্বরে। অস্ত্র ত্যাগ করে সুলতান সালাহুদ্দীনের আনুগত্য মেনে নিয়েছে তারা। এখন তারা সুলতানের নির্দেশের অপেক্ষায় দণ্ডায়মান।

    হাউজের ভেতরে বসে সালারদের নির্দেশনা দিচ্ছেন সুলতান। আলী বিন সুফিয়ানও তাঁর সামনে উপবিষ্ট। হঠাৎ সুলতান সালাহুদ্দীনের একটি বিষয় মনে পড়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ানকে উদ্দেশ করে বললেন— ‘আলী! গ্রেফতারকৃত গোয়েন্দা মেয়েগুলো এবং তাদের সঙ্গীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তো ভুলেই গেলাম! এখনও তো ওরা সমুদ্রোপকূলীয় কয়েদী ক্যাম্পেই রয়েছে। তুমি এক্ষুনি তাদেরকে এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা কর এবং পাতাল কক্ষে ফেলে রাখ।’

    ‘ঠিক আছে, এক্ষুনি নির্দেশ পাঠিয়ে আমি তাদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি সুলতান! আর সপ্তম মেয়েটির কথা বোধ হয় আপনি ভুলে গেছেন। মেয়েটি বালিয়ান নামক এক সুদানী কমাণ্ডারের নিকট ছিল। কিন্তু বালিয়ান হাউজের বাইরে দণ্ডায়মান আত্মসমর্পণকারী কমাণ্ডারদের মধ্যেও নেই। আহতদের মধ্যেও নেই, নেই নিহতদের মধ্যেও। আমার সন্দেহ হচ্ছে, গোয়েন্দা মেয়েদের সপ্তম মেয়েটি—যার নাম মুবী—বালিয়ানের সঙ্গে কোথাও আত্মগোপন করে আছে।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।

    ‘ঠিক আছে, তোমার সন্দেহ দূর কর আলী! আপাতত এখানে তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। বালিয়ান যদি নিখোঁজই হয়ে থাকে, তাহলে বেটা রোম উপসাগরের দিকেই পালিয়ে থাকবে। খৃষ্টানদের ছাড়া তাকে আর আশ্রয় দেবে কে? এখানে নিয়ে সে তুমি গোয়েন্দাদের পাতাল কক্ষে আটকে রাখে এবং এক্ষুনি সমুদ্রোপকূল অভিমুখে গুপ্তচর প্রেরণ কর।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ‘মহামান্য সুলতান! আমার তো মনে হয়, আমাদের গুপ্তচরদেরকে নিজেদেরই দেশে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।’ পরামর্শ দেন সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীর সালার। তিনি আরও বললেন—

    ‘খৃষ্টানদের দিক থেকে আমাদের তত আশঙ্কা নেই, যত আশঙ্কা আমাদেরই মুসলিম আমীরদের পক্ষ থেকে। আমাদের গুপ্তচরদেরকে তাদের হেরেমে ঢুকিয়ে দিন, দেখবেন, বহু অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে, ফাঁস হয়ে যাবে অনেক ষড়যন্ত্র।’ এ বলে তিনি এই স্বঘোষিত শাসকরা কিভাবে খৃষ্টানদের হাতে ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করছে, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী অনেক সময় ভেবে অস্থির হয়ে যান—কোন্‌টা করব? বাইরের আক্রমণ প্রতিরোধ করব, নাকি নিজ গৃহকে নিজেরই প্রদীপের আগুন থেকে রক্ষা করব!’

    জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীর এ সালারের বক্তব্য গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন সালাহুদ্দীন। বললেন— ‘যদি তোমরা অর্থাৎ যাদের কাছে অস্ত্র আছে, যদি তারা দ্বীন-ধর্মের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান থাকতে পার, একনিষ্ঠভাবে যদি তোমরা ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে যাও, তাহলে বাইরের আক্রমণ আর ভিতরের ষড়যন্ত্র কোনটিই জাতির এতটুকু ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা দৃষ্টিকে প্রসারিত কর, সীমান্ত ছাড়িয়ে দৃষ্টিকে নিয়ে যাও আরও অনেক দূরে বহু দূরে। মনে রেখো, সালতানাতে ইসলামিয়ার কোন সীমান্ত নেই। যেদিন তোমরা নিজেদেরকে এবং আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলামকে সীমান্তের বেড়ায় আটকে ফেলবে, সেদিন থেকেই তোমরা নিজেদেরই কারাগারে বন্দী হয়ে যাবে। আর ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকবে তোমাদের তুনীরের সীমানা। রোম উপসাগর অতিক্রম করে তোমরা আরও দূরে দৃষ্টি ফেল। সমুদ্র রোধ করতে পারবে না তোমাদের পথ। আর ঘরের আগুনকে ভয় কোরো না। আমাদের এক ফুৎকারে নিভে যাবে ষড়যন্ত্রের সব মশাল তার স্থানে আমরা ঈমানের আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ প্রজ্বলিত করব।’

    ‘আমরা আশাবাদী যে, আমরা বেঈমানদের প্রতিহত করতে পারব মুহতারাম সুলতান! আমরা নিরাশ নই।’ বললেন সালার।

    ‘মাত্র দুটি অভিশাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা কর, আমার প্রিয় বন্ধুগণ! এক, নৈরাশ্য। দুই, বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা। মানুষ প্রথমে নিরাশ হয়। তারপর বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতার আশ্রয়ে পালাবার পথ খুঁজে।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছেন আলী বিন সুফিয়ান। তৎক্ষণাৎ তিনি রোম উপসাগরের ক্যাম্প অভিমুখে এ পয়গাম দিয়ে দূতকে রওয়া করিয়ে দেন যে, রবিন, তার চার সহযোগী এবং মেয়েদেরকে ঘোড়া কিংবা উটের পিঠে চড়িয়ে বিশজন রক্ষীর প্রহরায় রাজধানীতে পাঠিয়ে দাও।

    দূতকে রওনা করিয়েই আলী বিন সুফিয়ান ছয়-সাতজন সিপাহী নিয়ে কমাণ্ডার বালিয়ানের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তার আগে বাইরে দণ্ডায়মান সুদানী কমাণ্ডারদের নিকট বালিয়ান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানিয়েছিল, লড়াইয়ের সময় তাকে কোথাও দেখা যায়নি এবং সুলতানের বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য যে বাহিনীটিকে রোম উপসাগরের দিকে প্রেরণ করা হয়েছিল, বালিয়ান তাদের সঙ্গেও যায়নি।

    বালিয়ানের ঘরে যান আলী বিন সুফিয়ান। দুজন বৃদ্ধা চাকরানী ছাড়া আর কাউকে পেলেন না সেখানে। চাকরানীরা জানায়, বালিয়ানের ঘরে পাঁচটি মেয়ে ছিল। তার নিয়ম ছিল, যখনই কোন মেয়ের বয়স একটু বেড়ে যেত, তাকে হাওয়া করে ফেলত এবং তার স্থলে আসত নতুন এক টগবগে যুবতী। তারা আরও জানায়, বিদ্রোহের আগে বালিয়ানের ঘরে একটি ফিরিঙ্গী মেয়ে এসেছিল। মেয়েটি যেমন সুন্দরী, তেমনি বিচক্ষণ। দুদিন যেতে না যেতে বালিয়ান মেয়েটির গোলাম হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহের একদিন পরে যেদিন সুদানীরা অস্ত্রসমর্পণ করে, সেদিন রাতে বালিয়ান নিজে একটি ঘোড়ায় চড়ে এবং সেই ফিরিঙ্গী মেয়েটিকে অপর একটি ঘোড়ায় চড়িয়ে অজানার উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে যায়। সাতজন অশ্বারোহীও ছিল তার সঙ্গে। হেরেমের মেয়েদের ব্যাপারে বৃদ্ধারা জানায়, যে যা হাতে পেয়েছে, তুলে নিয়ে সবাই চলে গেছে।

    ফিরে আসেন আলী বিন সুফিয়ান। হঠাৎ একটি ঘোড়া দ্রুত ছুটে এসে থেমে যায় তার সামনে। ফখরুল মিসরী তার আরোহী। ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নীচে নামে সে। হাঁফাতে হাঁফাতে কম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘আমিও আপনারই ন্যায় নরাধম বালিয়ান ও কাফির মেয়েটিকে খুঁজছি। আমি তার থেকে প্রতিশোধ নেব। এদের দুজনকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমার মনে শান্তি আসবে না। আমি জানি, সে কোন দিক গেছে। আমি তাকে ধাওয়াও করেছি। কিন্তু সঙ্গে তার সাতজন সশস্ত্র রক্ষী। আমি ছিলাম একা। রোম উপসাগরের দিকে যাচ্ছে লোকটা। কিন্তু যাচ্ছে সে সোজা পথ ছেড়ে বাঁকা পথে।’

    আলী বিন সুফিয়ানের হাত চেপে ধরে ফখরুল মিসরী বলল, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি আমায় চারজন সিপাহী দিন; ধাওয়া করে আমি ওকে শেষ করে আসি।’

    আলী বিন সুফিয়ান তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, ‘চারজন নয়, আমি তোমাকে বিশজন সিপাহী দেব। এখনও সে উপকূল অতিক্রম করতে পারেনি। তুমি আমার সঙ্গে চল।’ বালিয়ান কোনদিক গেল সে ব্যাপারে নিশ্চিত হন আলী বিন সুফিয়ান।

    ○             ○             ○

    মুবীকে নিয়ে বালিয়ান উপকূল অভিমুখে বহুদূর এগিয়ে গেছে। উপকূলগামী সাধারণ পথ ছেড়ে অন্য পথে এগুচ্ছে সে। এসব অঞ্চল-পথ-ঘাট বালিয়ানের চেনা। তাই নির্বিঘ্নে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে সে।

    কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে আত্মসমর্পণকারী সুদানী সৈন্য ও কমাণ্ডারদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, বালিয়ান তা জানে না। বালিয়ান পালাচ্ছে দুটি কারণে। প্রথমত তার আশঙ্কা, ধরা পড়লে সুলতান সালাহুদ্দীন তাকে খুন করে ফেলবেন। দ্বিতীয়ত মুবীর ন্যায় রূপসী মেয়েকে হাতছাড়া করতে চাইছে না সে। যে কোন মূল্যে নিজের জীবন রক্ষা করতে হবে এবং মুবীকেও হাতে রাখতে হবে, এই তার প্রত্যয়। বালিয়ান মনে করত, জগতের রূপসী মেয়েরা শুধু মিসর আর সুদানেই জন্মায়। কিন্তু ইতালীর এই ফিরিঙ্গী মেয়েটির চোখ-ধাঁধানো রূপ তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। মুবীর জন্য নিজের মান-সম্মান, দ্বীন-ধর্ম ও দেশ-জাতি সব বিসর্জন দিয়েছে বালিয়ান। কিন্তু এখন মুবী যে তার থেকে মুক্তি লাভ করার চেষ্টা করছে, তা বালিয়ানের অজানা। যে উদ্দেশ্যে মুবীর এ দেশে আগমন, তা নস্যাৎ হয়ে গেছে সব। তবে মুবী তার কর্তব্য পালনে ত্রুটি করেনি বিন্দুমাত্র। লক্ষ্য অর্জনে নিজের দেহ ও সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছে মেয়েটি। এখনও নিজের দ্বিগুণ বয়সী এক পুরুষের ভোগের সামগ্রী হয়ে আছে সে।

    বালিয়ান এই আত্মতৃপ্তিতে বিভোর যে, মুবী তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তার প্রতি মুবীর প্রচণ্ড ঘৃণা। একাকী পালাতে পারছে না বলে বাধ্য হয়ে এখনও বালিয়ানের সঙ্গ দিচ্ছে মুবী। মনে তার একটিই ভাবনা, কী করে রোম উপসাগর পার হওয়া যায় কিংবা কিভাবে রবিনের নিকটে পৌঁছে যাওয়া যায়।

    মুবী জানে না, রবিন এবং তার বণিকবেশী সঙ্গীরা এখন সুলতান সালাহুদ্দীনের হাতে বন্দী। মুবী বারবার বালিয়ানকে বলছে, দ্রুত চল, পথে অবস্থান কম কর, অন্যথায় ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু বে-ঈমান নারীলোলুপ বালিয়ান কোথাও ছায়াঘেরা একটু জায়গা পেলেই থেমে যায়, বিশ্রামের নামে বসে পড়ে। তারপর মেতে উঠে মদ আর মুবীকে নিয়ে।

    এক রাতে একটি কৌশল আঁটে মুবী। অতিরিক্ত মদপান করিয়ে অচেতন করে শুইয়ে রাখে বালিয়ানকে। রক্ষীরা শুয়ে পড়ে খানিকটা দূরে একটি গাছের আড়ালে। রক্ষীদের একজন বেশ টগবগে, সুঠাম সুদেহী এক বলিষ্ঠ যুবক। অত্যন্ত বিচক্ষণও বটে। পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলে মুবী। হাতের ইশারায় নিয়ে যায় খানিক দূরে অন্য একটি গাছের আড়ালে। বলে, ‘তুমি ভাল করেই জান, আমি কে, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি। আমি তোমাদের জন্য সাহায্য নিয়ে এসেছিলাম, যাতে তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর মত একজন ভিনদেশী শাসকের কবল থেকে মুক্তি পেতে পার। কিন্তু তোমাদের এই কমাণ্ডার বালিয়ান এত বিলাস-প্রিয় লোক যে, মদপান করে মাতাল হয়ে সর্বক্ষণ আমার দেহটা নিয়েই খেলা করতে ভালবাসে। আমার সহযোগিতায় বুদ্ধিমত্তার সাথে বিদ্রোহের পরিকল্পনা প্রস্তুত করে বিজয় অর্জনের চেষ্টা করার পরিবর্তে লোকটি আমাকে হেরেমের দাসী বানিয়ে রেখেছিল। তারপর নির্বোধের মত বাহিনীটিকে দুভাগে বিভক্ত করে এমন বেপরোয়াভাবে আক্রমণ করাল যে, এক রাতেই তোমাদের এত বিশাল বাহিনীটি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেল!

    তোমরা হয়ত জান না, তোমাদের পরাজয়ের জন্য এ লোকটিই দায়ী। এখন আমাকে নিয়ে যাচ্ছে শুধুই ফুর্তি করার জন্য। আমাকে সে বলছে, আমি যেন তাকে সমুদ্রের ওপারে নিয়ে গিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীতে মর্যাদাসম্পন্ন একটি পদ দিই আর আমি তাকে বিয়ে করি। কিন্তু ওসব হবে না; আমি ওকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করি। আমি স্থির করেছি, আমার যদি বিয়ে করতেই হয়, নিজের দেশে নিয়ে যদি কাউকে দেশের সেনাবাহিনীতে মর্যাদাসম্পন্ন স্থান দিতেই হয়, তবে তার জন্য আমার মনঃপূত একজন লোক বেছে নিতে হবে। আর সে হলে তুমি। তুমি যুবক, সাহসী ও বুদ্ধিমান। প্রথমবার যখন আমি তোমাকে দেখেছি, তখন থেকেই আমার হৃদয়ে তোমার ভালবাসা সৃষ্টি হয়ে আছে। তুমি এ বৃদ্ধের কবল থেকে আমাকে রক্ষা কর। আমি এখন তোমার। সমুদ্রের ওপারে চল, মর্যাদা, ধনৈশ্বর্য আর আমি সব তোমার পদচুম্বন করব। কিন্তু তার জন্য আগে এ লোকটিকে এখানেই শেষ করে যেতে হবে। লোকটি অচেতন ঘুমিয়ে আছে; তুমি যাও, ওকে খুন করে এস। তারপর চল, রওনা হই।’

    রক্ষীর ঘাড়ে হাত রাখে মুবী। মুবীর রূপের মোহ-জালে আটকা পড়ে যায় রক্ষী। দুবাহু দ্বারা জড়িয়ে ধরে মেয়েটিকে। প্রেমের যাদু দিয়ে পুরুষ বশ করায় অভিজ্ঞ মুবী। পূর্বের অবস্থান থেকে সরে একটু আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায় মেয়েটি। রক্ষীও অগ্রসর হয়ে হাত বাড়ায় তার প্রতি।

    এমন সময়ে হঠাৎ পিছন থেকে একটি বর্শা ছুটে এসে বিদ্ধ হয় রক্ষীর পিঠে। আহ! বলে চীৎকার করে ওঠে লোকটি। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। দূর থেকে ছুটে আসে একজন। রক্ষীর পিঠ থেকে বর্শাটি টেনে বের করতে করতে বলে— ‘বেটা নিমকহারাম, তোর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।’

    চীৎকার দেয় মুবী। বলে, ‘লোকটিকে তুমি খুন ……..।’ এর বেশী বলতে পারল না সে। পিছন থেকে অপর একজন তার বাহু ধরে ঝটকা এক টান দিয়ে ছুঁড়ে মারে বালিয়ানের দিকে। বলে, ‘আমরা তার পোষ্য বন্ধু। আমাদের জীবন তার উপর নির্ভরশীল। তোমরা আমাদের কাউকে তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। বিভ্রান্ত যে হয়েছে, সে তার প্রায়শ্চিত্ত পেয়ে গেছে।’

    মদের নেশায় অচেতন পড়ে আছে বালিয়ান।

    ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?’ জিজ্ঞেস করে মুবী।

    ‘যাচ্ছি সমুদ্রে ডুবে মরতে। তোমার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। বালিয়ান যেখানে নিয়ে যায়, আমরা সেখানেই যাব।’ এই বলে ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়ে তারা।

    পরদিন বেশ বেলা হলে ঘুম থেকে জাগ্রত হয় বালিয়ান। রক্ষীরা রাতের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে তাকে। মুবী বলে, ‘প্রাণের ভয় দেখিয়ে সে আমাকে, নিয়ে গিয়েছিল।’ বালিয়ান শাবাশ দেয় তার রক্ষীদের। কোন ঘটনায় নিজের একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক খুন হল, তার জন্য কোন ভাবনাই জাগল না তার মনে। মুবীর রূপ আর মদে বুঁদ হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মত হয়ে গেছে বালিয়ান। মুবী তাকে বলে, ‘ওঠ, দ্রুত রওনা হও।’ কিন্তু বালিয়ানের কোন ভাবনা নেই। নিজেকে হারিয়েই ফেলেছে যেন সে। মুবী ভাবে, এরা কত নির্দয়, কত নির্বোধ জাতি; সামান্য কারণে, হীন স্বার্থে আপন লোকদেরও হত্যা করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না!

    আলী বিন সুফিয়ান কেন যেন বালিয়ানের পশ্চাদ্ধাবন না করে ফিরে গেলেন। বিদ্রোহের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনিও।

    ○             ○             ○

    সমুদ্রোপকূলের ক্যাম্প থেকে রবিন, তার চার সঙ্গী এবং ছয়টি মেয়েকে পনেরজন রক্ষার প্রহরায় কায়রো অভিমুখে রওনা করা হয়েছে। দূত রওনা হয়ে গেছে তাদেরও আগে। বন্দীরা সকলে উটের পিঠে আর রক্ষীরা ঘোড়ায়। তারা স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলছে এবং পথে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্রাম নিচ্ছে। তাড়া নেই, শঙ্কা নেই। পথে বিপদের কোন ভয় নেই। নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায় পথ চলছে তারা। কয়েদীরা নিরস্ত্র, তদুপরি তাদের ছয়জনই নারী। কারোর পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।

    কিন্তু রক্ষীরা ভুলে গেছে, তাদের কয়েদীরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর। তীর-তরবারী ব্যবহারে সকলেই অভিজ্ঞ। তাদের দলের যাদেরকে বণিকবেশে গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা রীতিমত যোদ্ধা। আর মেয়েগুলোও সেই মেয়ে নয়, যাদেরকে মানুষ অবলা নারী মনে করে থাকে। তাদের দেহ ও রূপের আকর্ষণ, মধুভরা যৌবন আর চপলতা এমন এক অস্ত্র, যা প্রবল প্রতাপশালী রাজা-বাদশাহদেরও কুপোকাত করে ফেলতে, বড় বড় বীর যোদ্ধাকেও মুহূর্তে নিরস্ত্র করতে সক্ষম।

    রক্ষীদের কমাণ্ডার মিসরী। তার নজরে পড়ে, মেয়ে ছয়টির একজন বার বার তার প্রতি চোখ তুলে তাকাচ্ছে। চোখাচোখি হয়ে গেলে মিষ্টি-মধুর হাসি ভেসে ওঠে মেয়েটির ঠোঁটে। মেয়েটি যাদুর মত আকর্ষণ করছে কমাণ্ডারকে। তার রাঙ্গা ঠোঁটের মুচকি হাসি মোমের মত গলিয়ে ফেলছে তাকে।

    সন্ধ্যার সময় এই প্রথমবার একস্থানে যাত্রা বিরতি দেয় কাফেলা। খাবার দেওয়া হয় সকলকে। কিন্তু খাবারে হাত দিল না মেয়েটি। কমাণ্ডারকে জানান হল। কমাণ্ডার কথা বলল মেয়েটির সঙ্গে। খাবার না খাওয়ার কারণ জানতে চায় সে। জবাবে ঝর ঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে তার দুচোখ থেকে। কিছুক্ষণ নতমুখে দাঁড়িয়ে থেকে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে আপনার সঙ্গে আমি নিভৃতে কথা বলতে চাই।

    সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আসে। ঘুমিয়ে পড়ে কাফেলার সকলে। শুয়ে পড়ে কমাণ্ডারও। কিছুক্ষণ পর সে বিছানা থেকে উঠে মেয়েটিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। নিয়ে যায় আড়ালে। বলে, কি যেন বলবে বলেছিলে, এবার বল। কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে মেয়েটি বলল, আমি একটি মজলুম মেয়ে। আমাকে খুষ্টান সৈন্যরা অপহরণ করে একটি জাহাজে তুলে নিয়ে এসেছে। আমি এক অফিসারের রক্ষিতা হয়ে থাকতে বাধ্য হই।

    অন্য মেয়েদের সম্পর্কে সে জানায়, তাদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় জাহাজে। তাদেরকেও আনা হয়েছে অপহরণ করে। অগ্নিগোলার শিকার হয়ে জাহাজগুলো আগুনে পুড়তে শুরু করলে একটি নৌকায় তুলে আমাদেরকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ভাসতে ভাসতে আমরা কূলে এসে পৌঁছি। তারপর গুপ্তচর সন্দেহে বন্দী হই আপনাদের হাতে।

    বণিকবেশী গোয়েন্দারাও মেয়েগুলোর ব্যাপারে সুলতান সালাহুদ্দীনকে এ কাহিনীই শুনিয়েছিল। মিসরী রক্ষী কমাণ্ডারের জানা ছিল না এ কাহিনী, এই প্রথমবার শুনছে সে। তার প্রতি নির্দেশ, এরা ভয়ঙ্কর গুপ্তচর; কঠোর নিরাপত্তার সাথে এদেরকে কায়রো নিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীনের গোয়েন্দা বিভাগের হাতে তুলে দিতে হবে। কাজেই মেয়েদের, বিশেষ করে এই মেয়েটির কোন সাহায্য করার সাধ্য তার নেই। তাই সে নিজের অপারগতার কথা জানিয়ে দেয় মেয়েটিকে। তার জানা নেই, মেয়েটির তূণীরে আরও অনেক তীর অবশিষ্ট আছে। এক এক করে সেই তীর ছুঁড়তেই থাকবে সে।

    এবার মেয়েটি বলল, ‘আমি তোমার নিকট কোন সাহায্য চাই না। তুমি কোন সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এলেও আমি তা গ্রহণ করব না। কারণ, তোমাকে আমার এতই ভাল লাগছে যে, আমি তোমাকে বিপদে ফেলতে চাই না। তোমাকে ভালবাসি বলেই আমি মনের বেদনার কথাগুলো তোমার কাছে ব্যক্ত করেছি।’ এমন একটি রূপসী মেয়ের মুখে এ জাতীয় কথা শুনে আত্ম-সংবরণ করতে পারে কোন পুরুষ! তাছাড়া কমাণ্ডারের হাতে মেয়েটি নিতান্ত অসহায়ও বটে। তদুপরি নিঝুম রাতের নির্জন পরিবেশ। ধীরে ধীরে বরফের মত গলতে শুরু করে মিসরী কমাণ্ডারের পৌরুষ। বন্ধুসুলভ প্রেমালাপ জুড়ে দেয় সে মেয়েটির সঙ্গে। এবার মেয়েটি নিক্ষেপ করে তূণীরের আরেকটি তীর। সে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পূত-পবিত্র চরিত্রের উপর কালিমা লেপন করতে শুরু করে। বলে— ‘আমি তোমার গভর্নর সালাহুদ্দীন আইউবীকে আমার নির্যাতনের কাহিনী শুনিয়েছিলাম। আশা ছিল, তার মত একজন মহৎ ব্যক্তি আমার প্রতি দয়াপরবশ হবেন। কিন্তু আশ্রয়ের নামে তিনি আমায় নিজের তাঁবুতে নিয়ে রাখলেন এবং মদপান করে হায়েনার মত রাতভর আমার সম্ভ্রম লুট করলেন। পশুটা আমার হাড়গোড় সব ভেঙ্গে দিয়েছে। মদপান করে তিনি এমনই অমানুষ হয়ে যান যে, তখন তার মধ্যে মানবতা বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।’

    মাথায় খুন চেপে যায় মিসরীর। দাঁত কড়মড় করে বলে ওঠে, ‘এ্যাঁ, আমাদের শোনান হয়, সালাহুদ্দীন একজন পাক্কা ঈমানদার, এক্কেবারে ফেরেশতা। মদ-নারীর প্রতি নাকি তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা। আর তলে তলে করে বেড়াচ্ছেন এসব, না?’

    ‘এখন তোমরা আমাকে তারই কাছে নিয়ে যাচ্ছে। আমি যা বললাম, যদি তোমার বিশ্বাস না হয়ে থাকে, তাহলে রাতে দেখ, আমাকে কোথায় থাকতে হয়। তোমাদের সুলতান আমাকে কয়েদখানায় না রেখে রাখবেন তাঁর হেরেমে, সে কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। লোকটার কথা মনে পড়লে আমার গা শিউরে ওঠে।’ বলল মেয়েটি।

    এ জাতীয় আরও অনেক কথা বলে মিসরী কমাণ্ডারের মনে সুলতান সালাহুদ্দীনের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা সৃষ্টি করে মেয়েটি। মিসরী এখন সম্পূর্ণরূপে মেয়েটির হাতের মুঠোয়। সে তার মাথা কব্জা করে নিয়েছে। কিন্তু কমাণ্ডার জানে না, এসব হল গোয়েন্দা মেয়েদের অস্ত্র। সব শেষে মেয়েটি বলল— ‘তুমি যদি আমাকে এ লাঞ্ছনার জীবন থেকে উদ্ধার করতে পার, তাহলে আমি আজীবনের জন্য তোমার হয়ে যাব এবং আমার পিতা বিপুল স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন।’

    তার পন্থাও জানিয়ে দেয় মেয়েটি। বলে, ‘তুমি আমার সঙ্গে সমুদ্র পার হয়ে পালিয়ে যাবে। নৌকার অভাব হবে না। আমার পিতা বড় ধনাঢ্য ব্যক্তি। আমি তোমাকে বিয়ে করে নেব আর আমার পিতা তোমাকে উন্নত একটি বাড়ি ও বিপুল ধন-সম্পদ প্রদান করবেন। নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে আমাকে নিয়ে সুখে জীবন কাটাতে পারবে।’

    মিসরীর মনে পড়ে যায়, সে মুসলমান। বলল, ‘কিন্তু আমি তো আমার ধর্ম ত্যাগ করতে পারব না।’ মেয়েটি কিছুক্ষণ মৌন থেকে ভেবে বলল, ‘ঠিক আছে, তোমার জন্য আমিই আমার ধর্ম বিসর্জন দেব।’

    পলায়ন ও বিয়ের পরিকল্পনা তৈরী করে দুজনে। মেয়েটি বলল, ‘তোমার উপর আমি কোন চাপ দিতে চাই না। ভালভাবে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নাও। আমি শুধু জানতে চাই, আমার মনে তোমার প্রতি যতটুকু ভালবাসা সৃষ্টি হয়েছে, ততটুকু হৃদ্যতা আমার প্রতিও তোমার অন্তরে জেগেছে কি না। আমাকে বরণ করতে যদি তুমি প্রস্তুত হয়েই থাক, তাহলে চেষ্টা কর, যেন কায়রো পৌঁছুতে আমাদের সফর দীর্ঘ হয়। ওখানে পৌঁছে গেলে তুমি আমার গন্ধও পাবে না।’

    মেয়েটির উদ্দেশ্য, সফর দীর্ঘ হোক এবং তিন দিনের স্থলে ছয়দিন পথেই কেটে যাক। তার কারণ, রবিন ও তার সঙ্গীরা পালাবার চেষ্টা করছে। রাতে ঘুমন্ত রক্ষীদেরকে তাদেরই অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে তাদেরই ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে পালাবার পরিকল্পনা নিয়ে সুযোগের সন্ধান করছে তারা। এত মাত্র প্রথম মন্‌যিল, প্রথম অবস্থান। এরজন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সফর, যাতে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে-চিন্তে কাজ করা যায়।

    এ উদ্দেশ্য সাধনেই মেয়েটিকে ব্যবহার করছে তারা। মিসরী কমাণ্ডারকে হাত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে তার উপর। মেয়েটি প্রথম সাক্ষাতেই ধরাশয়ী করে ফেলে মিসরী কমাণ্ডারকে।

    মিসরী কমাণ্ডার তেমন ব্যক্তিত্ববান লোক নয়; একজন প্লাটুন কমাণ্ডার মাত্র। এমন সুন্দরী নারী স্বপ্নেও দেখেনি সে কখনও। অথচ এখন কিনা অনুপম এক অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতী তার হাতের মুঠোয়। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় তার হাতে নিজেকে তুলে দিয়ে বসেছে মেয়েটি। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে কমাণ্ডার। ভুলে গেছে নিজের ধর্ম ও কর্তব্যের কথা। এখন সে ক্ষণিকের জন্যও মেয়েটি থেকে আলাদা হতে চাইছে না।

    এ উন্মাদনার মধ্যে পরদিন ভোরবেলা কমাণ্ডার প্রথম আদেশ জারী করে, উট-ঘোড়াগুলো বেশ ক্লান্ত; কাজেই আজ আর সফর হবে না। রক্ষী ও উষ্ট্ৰচালকগণ এ ঘোষণায় বেশ আনন্দিত হয়। কারণ, রণক্ষেত্রে সীমাহীন পরিশ্রমে তাদেরও দেহ অবসন্ন। কায়রো পৌঁছবার কোন তাড়াও নেই তাদের।

    বিশ্রাম ও গল্প-গুজবে কেটে যায় দিন। কমাণ্ডারও মেয়েটিকে নিয়ে উন্মাতাল। দিন গিয়ে রাত এল। ঘুমিয়ে পড়ল সকলে। কমাণ্ডার মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেল খানিকটা দূরে। সকলের দৃষ্টির আড়ালে মেয়েটি রঙ্গিন স্বপ্নের নীলাভ আকাশে পৌঁছিয়ে দিল তাকে।

    পরদিন তাঁবু তুলে যাত্রা করে কাফেলা। কিন্তু কমাণ্ডার সোজা রাস্তা ছেড়ে ধরে অন্য পথ। সঙ্গীদের বলল, এ পথে সামনে ছাউনি ফেলার জন্য বেশ মনোরম জায়গা আছে। একটি বসতিও আছে কাছে। ডিম-মুরগী পাওয়া যাবে। শুনে সঙ্গীদের আনন্দ আরও বেড়ে যায় যে, কমাণ্ডার আমাদের আয়েশের চিন্তা করছেন।

    কিন্তু প্লাটুনের দুজন সৈনিক কমাণ্ডারের এসব আচরণের আপত্তি তোলে। তারা বলে, ‘আমাদের সঙ্গে ভয়ঙ্কর কয়েদী। লোকগুলো শত্রুবাহিনীর গুপ্তচর। যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। অযথা সফর দীর্ঘ করা ঠিক হচ্ছে না।’ কমাণ্ডার তাদের এই বলে থামিয়ে দিল যে, ‘সে দায়িত্ব আমার। গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছবো না বিলম্বে, সে তোমাদের ভাবতে হবে না। জবাবদিহি করতে হলে আমাকেই করতে হবে; তোমাদের এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।’ তারা কমাণ্ডারের জবাবে চুপসে যায়।

    এগিয়ে চলছে কাফেলা। দুপুরের পর কাফেলা যেখানে পৌঁছে, সেখানে আশপাশে অসংখ্য শকুন উড়তে ও মাটিতে নামতে-উঠতে দেখে তারা। বুঝা গেল, মৃত মানুষের লাশ আছে এখানে। চারদিকে মাটি ও বালির টিলা, বড় বড় বৃক্ষও আছে। টিলার ভেতরে ঢুকে পড়ে কাফেলা। ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠে গেছে পথ। একটি উঁচু স্থান থেকে বিশাল এক ময়দান চোখে পড়ে তাদের। তার এক স্থানে বৃত্তাকারে উঠানামা করছে অনেকগুলো শকুন। শোরগোল করে কিসে যেন মেতে আছে শকুনগুলো। কিছুদূর অগ্রসর হলে চোখে পড়ে, সেখানে কতগুলো লাশ। পচা লাশের দুর্গন্ধে বিষিয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।

    এগুলো সেই সুদানীদের লাশ, যারা রোম উপসাগরের তীরে অবস্থানরত সুলতান সালাহুদ্দীনের বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে রওনা হয়েছিল। সুলতান সালাহুদ্দীনের জানবাজ সৈনিকরা রাতের বেলা পেছন থেকে হামলা চালিয়ে এখানেই থামিয়ে দিয়েছে তাদের অগ্রযাত্রা, ব্যর্থ করে দিয়েছে তাদের অশুভ তৎপরতা। আরও সামনে মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে সুদানীদের অসংখ্য লাশ। সালাহুদ্দীন বাহিনীর হাতে পরাজিত হওয়ার পর নিহতদের লাশগুলো পর্যন্ত তুলে নেওয়ার সুযোগ পায়নি তারা।

    ○             ○             ○

  • সিরাজদ্দৌলা

    সিরাজদ্দৌলা

    ‘সিরাজদ্দৌলা’র পঞ্চম সংস্করণ অবলম্বনে পরিবর্দ্ধিত ও সংশোধিত কলেবরে এই নূতন সংস্করণ মুদ্রিত হইল।

    Calcutta Historical Soeiety কর্ত্তৃক আহূত বিচারসভায় অন্ধকূপ-হত্যা সম্বন্ধে গ্রন্থকার ইংরাজীতে যে বক্তৃতা করেন, তাহা Journal of the calcutta Historical Society. Vol. XI. Part I. Serial No. 21 পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। পূর্ব্ব পূর্ব্ব কয়েক সংস্করণে তাহা শ্রীযুক্ত বিমলাচরণ মৈত্রেয় বি-এল কর্ত্তৃক বঙ্গভাষায় অনূদিত হইয়া এই গ্রন্থের শেষভাগে মুদ্রিত হইয়াছে। এই সংস্করণে সমীচীন বোধে সেই অনূবাদের পরিবর্ত্তে মূল ইংরাজী প্রবন্ধটিই পরিশিষ্টরূপে গ্রন্থান্তে সংযোজিত হইল। আশা করি ইহাতে অনেকের কৌতূহল চরিতার্থ হইবে।

  • আরেক বউ

    আরেক বউ

    কায়রো থেকে দেড়-দু মাইল দূরবর্তী একটি অঞ্চল। এখানকার একদিকে উঁচু-নীচু বালির টিলা। অপর তিনদিকে ধু-ধু বালুকা প্রান্তর।

    আজ লাখো জনতার পদভারে মুখরিত-প্রকম্পিত এ অঞ্চলটি। চারদিক থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় এসে ভীড় জমিয়েছে অগণিত মানুষ। কেউ এসেছে উটে চড়ে, কেউ ঘোড়ায়, কেউ বা এসেছে গাধার পিঠে করে। পায়ে হেঁটে এসেছে অসংখ্য।

    চার-পাঁচদিন ধরে মানুষ আসছে আর আসছে। সমবেত হচ্ছে বিশাল-বিস্তৃত এই মরুপ্রান্তরে। কায়রোর বাজারগুলোতে লোকের ভীড় বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে জৌলুস। সরাইখানাগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

    দূর-দূরান্ত থেকে এরা এসেছে সরকারী এক ঘোষণা শুনে। মিসরী ফৌজের সামরিক মহড়া হবে এখানে। ঘোড়-সওয়ারী, শতর-সওয়ারী, ধাবমান উট-ঘোড়ার পিঠ থেকে তীরন্দাজি ইত্যাদি রণকৌশলের মহড়া প্রদর্শন করবে মিসরী সৈন্যরা।

    ঘোষণাটি প্রচারিত হয়েছে মিসরের গভর্নর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষ থেকে। তাঁর উদ্দেশ্য দুটি। এক. এতে সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার উৎসাহ পাবে। দুই. এখনও যারা সামরিক শক্তিতে সুলতান সালাহুদ্দীনকে দুর্বল মনে করে, তাদের সংশয় দূর হবে।

    এ সামরিক মহড়ার প্রতি জনসাধারণের এত আগ্রহ দেখে সুলতান সালাহুদ্দীন বেজায় খুশী। কিন্তু খানিকটা অস্থিরচিত্ত বলে মনে হচ্ছে আলী বিন সুফিয়ানকে। তিনি সুলতানের সামনে নিজের এ অস্থিরতার কথা ব্যক্ত করেছেন। জবাবে সুলতান সালাহুদ্দীন হাসিমুখে বললেন— ‘আরে, মহড়ায় অংশগ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা যদি এক লাখ হয়, তাহলে তাদের মধ্য থেকে আমরা পাঁচ হাজার সৈন্যও তো পাব।’

    ‘আমীরে মুহতারাম! আমি তো বিষয়টাকে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। আপনার ধারণা অনুযায়ী মহড়ায় অংশগ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা যদি এক লাখ হয়, তবে তাতে গুপ্তচর থাকবে অন্তত এক হাজার। পাড়া গাঁ থেকে অসংখ্য মহিলাও আসছে। তাদের বেশীর ভাগই সুদানী ও শ্বেতাঙ্গী। ফলে খৃষ্টান মহিলারা তাদের মধ্যে লুকিয়ে যেতে পারবে অনায়াসেই।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।

    ‘এ সমস্যাটা আমিও ভাল করেই বুঝি। কিন্তু তুমি তো জান, আমি যে মেলার আয়োজন করেছি, তা কত জরুরী। তোমার গোয়েন্দা বিভাগকে তুমি আরও সতর্ক কর।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।

    ‘হ্যাঁ, তা আমি করব অবশ্যই। এই মেলা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার অস্থিরতার কথা আপনাকে পেরেশান করার জন্য বলিনি। এই মেলা কি বিপদ সঙ্গে নিয়ে আসছে, আমি আপনাকে তাই শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কায়রোতে অস্থায়ী পতিতালয় খোলা হয়েছে, যা কিনা আমোদীদের দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে সারা রাত। অনেকে শহরের বাইরে তাঁবু গেড়েছে। আমার গুপ্তচররা আমাকে তথ্য দিয়েছে, তাঁবুগুলোর মধ্যে জুয়াড়ী এবং বেশ্যা মেয়েদের আস্তানাও রয়েছে। আগামীকাল মেলার প্রথম দিন। নর্তকী-গায়িকারা মেলায় অংশ নেওয়া নিরীহ লোকদের পকেট উজাড় করে নিচ্ছে।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।

    মেলা শেষ হয়ে গেলে এসব নোংরামিরও পরিসমাপ্তি ঘটবে। এখনি এসবের উপর আমি কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চাই না। মিসরের মানুষের বর্তমান নৈতিক অবস্থা ভাল নয়। নাচ-গান, বেশ্যাবৃত্তি দু-একদিনে নির্মূল করা যায় না। এ মুহূর্তে আমার প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। আমার ফৌজের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তুমি তো জান আলী! আমাদের সৈন্যের কত প্রয়োজন। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে স্পষ্ট করেই আমি একথা ঘোষণা দিয়েছি।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।

    ‘আপনার বক্তব্যে আমার দ্বিমত নেই। তবে আমীরে মুহতারাম! আমার গুপ্তচরদের দৃষ্টিতে আমাদের সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অর্ধেকই আমাদের ওফাদার নয়। আপনি ভাল করেই জানেন, এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা আপনাকে এই গদিতে দেখতে চায় না। আর অবশিষ্ট যারা আছে, তাদের মনও সুদানীদের সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের পিছনে আমি একজন করে গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছি। তারা আমাকে এদের তৎপরতা ও গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত করছে।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।

    ‘আচ্ছা, কারও কোন ভয়ঙ্কর তৎপরতা চোখে পড়েছে কি?’ কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ‘এরা আপন ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে রাতের আঁধারে বিভিন্ন সন্দেহজনক তাঁবুতে এবং পতিতালয়ে চলে যায়। দুজন কর্মকর্তা সম্পর্কে আমি এমন রিপোর্টও পেয়েছি যে, তারা নিজ ঘরে নর্তকী ডেকে এনে আসর বসায়। এ যাবত এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

    তবে আমীরে মুহতারাম! দশদিন আগে রোম উপসাগরের কূলে যে রহস্যময় পালতোলা নৌকাটি দেখা গিয়েছিল, আমার সব চিন্তা এখন তাকে নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।

    ঘটনাটি বিস্তারিত জানতে চান সুলতান সালাহুদ্দীন। আলী বিন সুফিয়ান বললেন—

    ‘রোম উপসাগরের তীর থেকে আমাদের সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নিয়ে আসার সময় সমুদ্রের প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য বিভিন্ন স্থানে দু দুজন করে সৈন্য মোতায়েন করে রাখা হয়েছিল। জেলে ও যাযাবর বেশে আমিও আমার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের কয়েকজন লোক রেখে এসেছিলাম। খৃষ্টানরা ইচ্ছে করলেই যাতে হঠাৎ করে আক্রমণ করে বসতে না পারে এবং ওদিক থেকে কোন খৃষ্টান চর যাতে মিসরে ঢুকতে না পারে, তার জন্যই ছিল আমার এ আয়োজন। কিন্তু সমুদ্রতীর অতি দীর্ঘ হওয়ার কারণে সর্বত্র নজর রাখা সম্ভব হয়নি। দশদিন আগে একস্থান থেকে একটি পালতোলা নৌকা বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল। সম্ভবত নৌকাটি কোন এক রাতের আঁধারে ঢুকে গিয়েছিল।

    নৌকাটি যেতে দেখে ঘোড়া ছুটায় আমাদের দুজন অশ্বারোহী। কিন্তু যে স্থান থেকে নৌকাটি বেরিয়েছিল, সেখানে গিয়ে তারা কিছুই দেখতে পেল না। তীরে কোন মানুষ নেই, নৌকা চলে গেছে মাঝ নদীতে। নৌকা ও পালের গঠনে তাদের মনে হয়েছে নৌকাটি মিসরী জেলেদের নয়— সমুদ্রের ওপারের হবে। আরোহীদ্বয় চারদিক ঘুরে-ফিরে কোন তথ্য বের করতে পারেনি। এ সংবাদ তারা কায়রোতে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল।’

    ঘটনার বিবরণ দিয়ে আলী বিন সুফিয়ান বললেন, ‘মেলা অনুষ্ঠানের কথা আমরা দেড় মাস ধরে প্রচার করছি। দেড় মাসে এ সংবাদ ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া এবং সেখান থেকে গুপ্তচর আগমন করা মোটেই বিচিত্র নয়। আমার তো প্রবল ধারণা, আমোদীদের সঙ্গে খৃষ্টানদের বহু গুপ্তচরও মেলায় ঢুকে পড়েছে।

    কায়রোতে মেয়ে ক্রয়-বিক্রয় এখন একটি স্বতন্ত্র পেশা। সুলতানের বুঝতে নিশ্চয় কষ্ট হবে না যে, যারা এই মেয়েদের ক্রয় করে, তারা সমাজের সাধারণ মানুষ নয়। কায়রোর বড় বড় ব্যবসায়ী, আমাদের প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারাই হল মেয়েদের খরিদ্দার। আর বিক্রি হচ্ছে যেসব মেয়ে, তাদের মধ্যে যে খৃষ্টান গুপ্তচরও রয়েছে, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই।’

    এসব রিপোর্টে সুলতান সালাহুদ্দীন বিচলিত হলেন না মোটেই। রোম উপসাগরে খৃষ্টানদের পরাস্ত করা হল প্রায় এক বছর কেটে গেছে। আলী বিন সুফিয়ান সমুদ্রোপকূলে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিছিয়ে রেখেছেন। তা শতভাগ নির্ভরযোগ্য না হলেও তিনি এ তথ্য পেয়ে গেছেন যে, খৃষ্টানরা মিসরে বহু গুপ্তচর ও সন্ত্রাসী ঢুকিয়ে রেখেছে। তবে মিসরে তাদের পরিকল্পনা কী, সে ব্যাপারে এখনও কিছু জানা যায়নি। বাগদাদ ও দামেশক থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টে জানা গেছে খৃষ্টানরা ওদিকেই বেশী চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে। বিশেষত সিরিয়ায় তারা মুসলমান শাসকদের ভোগ-বিলাস ও মদ-নারীতে মত্ত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর বর্তমানে এখনই তারা সরাসরি সংঘাতে জড়িত করার সাহস পাচ্ছে না। রোম উপসাগরে যখন সুলতান সালাহুদ্দীন হাজার হাজার সৈন্যসহ খৃষ্টানদের নৌবহরকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন, ঠিক তখন নুরুদ্দীন জঙ্গী আরবে খৃষ্টানদের সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ করে তাদেরকে সন্ধিচুক্তিতে বাধ্য করেছিলেন এবং জিযিয়া উসুল করে নিয়েছিলেন। সেই লড়াইয়ে বহু খৃষ্টান সুলতান জঙ্গীর হাতে বন্দী হয়েছিল। রেনাল্ট নামক এক খৃষ্টান সালারও ছিল তাদের মধ্যে। সুলতান জঙ্গী তাদেরকে মুক্তি দেননি। কারণ, ইতিপূর্বে খৃষ্টানরা মুসলমান কয়েদীদের শহীদ করেছিল। তাছাড়া একে একে অনেক প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করে চলেছে খৃষ্টানরা।

    সুলতান সালাহুদ্দীনের স্বপ্ন, খৃষ্টানদের হাত থেকে ফিলিস্তীন উদ্ধার করতে হবে। এবং আরব ভূখণ্ডকে ক্রুসেডারদের নাপাক পদচারণা থেকে পবিত্র করতে হবে। পাশাপাশি তিনি মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও মজবুত করতে চান। তাই একই সময়ে নানামুখী সেনা অভিযান পরিচালনা এবং শত্রুদের চতুর্মুখী আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক সৈন্য।

    সুলতানের পরিকল্পনা অনুপাতে মিসরের সেনাবাহিনীতে নতুন সেনাভর্তির গতি অনেক ধীর। এর কারণ, বিলুপ্ত সুদানী বাহিনীর সালাহুদ্দীন বিরোধী প্রোপাগাণ্ডা।

    সুলতান সালাহুদ্দীনের যে বাহিনীটি এখন আছে, তার কিছু সৈন্য মিসর থেকে সংগৃহীত। কিছু সুলতান জঙ্গীর পাঠানো। কিছু আছে, যারা ওফাদারীর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিলুপ্ত সুদানী বাহিনী থেকে এসে যোগ দিয়েছে।

    মিসরের জনগণ এখনও এ বাহিনীটিকে চোখে দেখেনি। সুলতান সালাহুদ্দীনকেও দেখেনি তারা। তাই মেলার আয়োজন করে সুলতান তার সামরিক কর্মকর্তা ও কমাণ্ডারদের আদেশ দিয়েছেন, যেন তারা মেলায় আগত সাধারণ লোকদের সঙ্গে মিশে যায় এবং সদাচার ও ভালবাসা দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করে। সুলতান তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, তোমরা জনসাধারণেরই একজন। আমাদের উদ্দেশ্য, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের রাজত্বকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত করা এবং তাকে খৃষ্টানদের অরাজকতা থেকে মুক্ত করা।

    মেলা শুরু হওয়ার আগের দিন থেকে আলী বিন সুফিয়ান সুলতানকে গুপ্তচরদের বিপদ সম্পর্কে অবহিত করতে থাকেন। তিনি বললেন, ‘আমীরে মুহতারাম! আমার মূলত গুপ্তচরদের কোন ভয় নেই। আমার আসল শঙ্কা সেই মুসলমান ভাইদের, যারা কাফিরদের গোপন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করছে। এই গাদ্দাররা না থাকলে আমাদের বিরুদ্ধে খৃষ্টানদের কোন পরিকল্পনাই সফল হত না। আমি মেলায় যেসব নর্তকীদের দেখতে পাচ্ছি, তাদেরকে আমি ক্রুসেডারদের এক একটি ফাঁদ বলে মনে করি। তবু আমার লোকেরা দিন-রাত সারাক্ষণ সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।’

    ‘তোমাদের লোকদের বলে দাও, যেন কোন গুপ্তচরকে খুন না করে। যাকেই সন্দেহ হবে, জীবন্ত ধরে নিয়ে আসবে। গুপ্তচর হল দুশমনের চোখ-কান। আর আমাদের জন্য তারা জবান। ধরে এনে কায়দা মত চাপ সৃষ্টি করতে পারলে খৃষ্টানদের অজানা পরিকল্পনার তথ্য বের করা যাবে।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।

    ○             ○             ○

    মেলা দিবসের ভোরবেলা। বিশাল-বিস্তৃত মাঠের তিন দিক দর্শনার্থীদের ভীড়ে গমগম করছে। সমরডঙ্কা বাজতে শুরু করেছে। অশ্বখুরধ্বনি এমন শোনা যাচ্ছে, যেন তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের ঊর্মিমালা ধেয়ে আসছে। ধুলোয় ছেয়ে গেছে আকাশ।

    দু হাজারেরও অধিক ঘোড়া। প্রথমটি এইমাত্র প্রবেশ করল মাঠে। আরোহী সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। তাঁর দুপার্শ্বে দুজন পতাকাবাহী। পিছনে রক্ষী বাহিনী। ঘোড়াগুলোর পিঠে ফুলদার চাদর বিছানো। প্রতিটি ঘোড়ার আরোহীর হাতে একটি করে বর্শা। বর্শার চকমকে ফলার সঙ্গে বাধা রঙিন কাপড়ের ছোট একটি ঝাণ্ডা। প্রত্যেক আরোহীর কোমরে ঝুলছে তরবারী। দুলকি চালে চলছে ঘোড়াগুলো। ঘাড় উঁচু করে বুক ফুলিয়ে বসে আছে আরোহীরা। চেহারায় তাদের বীরত্বের ছাপ। তাদের ভাবভঙ্গিতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে দর্শনার্থীদের মধ্যে। প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সকলের উপর।

    দর্শনার্থীদের একদল সম্মুখের বৃত্তের উপর দণ্ডায়মান। তাদের পিছনে একদল ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট। তাদের পিছনে যারা আছে, তারা উটের পিঠে বসা। এক একটি উট ও ঘোড়ায় দু তিনজন করে লোক বসা।

    তাদের সম্মুখে এক স্থানে একটি শামিয়ানা টানানো, যার নীচে রাখা আছে কতগুলো চেয়ার। এখানে বসেছেন উঁচু স্তরের দর্শনার্থীবৃন্দ। বড় বড় ব্যবসায়ীও আছেন এদের মধ্যে। আছেন সালাহুদ্দীন সরকারের পদস্থ অফিসার ও দেশের সম্মানীত ব্যক্তিবর্গ। কায়রোর বিভিন্ন মসজিদের ইমামদেরও দেখা যাচ্ছে এখানে। ইমামগণকে বসান হয়েছে সকলের সামনে। কারণ, সুলতান সালাহুদ্দীন ধর্মীয় নেতৃবর্গ এবং আলেমদের এতই শ্রদ্ধা করেন যে, তিনি তাদের উপস্থিতিতে তাদের অনুমতি ছাড়া বসেনও না।

    এক পার্শ্বে উপবিষ্ট সুলতান সালাহুদ্দীনের উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আল-বার্‌ক। তারই পাশে বসা অতিশয় রূপসী এক তরুণী। মেয়েটির সঙ্গে বসা ষাটোর্ধ্ব বয়সের এক বৃদ্ধ। দেখতে তাকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বলে মনে হয়। আল-বার্‌ক একাধিকবার তাকান মেয়েটির প্রতি। মেয়েটিও একবার তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে মুখ টিপে হাসে। বাঁকা চোখে দৃষ্টিপাত করে বৃদ্ধের প্রতি, সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় তার মুখের হাসি।

    দর্শনার্থীদের সম্মুখে অশ্বারোহীদের মহড়া শেষ হয়ে যায়। আসে উষ্ট্রারোহী বাহিনী। উটগুলোও ঘোড়ার ন্যায় রঙিন চাদর দ্বারা সজ্জিত। প্রত্যেক আরোহীর হাতে একটি করে লম্বা বর্শা, যার ফলার সামান্য নীচে বাঁধা পতাকার ন্যায় তিন ইঞ্চি চওড়া এবং দু ফিট লম্বা দু রঙা কাপড়। প্রত্যেক আরোহীর কাঁধে ঝুলছে একটি করে ধনুক। উটের যিনের সঙ্গে বাঁধা আছে রঙিন তূণীর। অপূর্ব এক আকর্ষণীয় ঢঙে বসে আছে আরোহীরা। অশ্বারোহীদের দৃষ্টিও সম্মুখপানে নিবদ্ধ। ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে না একজনও। দর্শনার্থীদের উট আর এই বাহিনীর উট দেখতে এক রকম হলেও সামরিক বিন্যাস, ফৌজী চলন ইত্যাদির কারণে এদেরেকে ভিন্ন জগতের ভিন্ন প্রকৃতির বলে মনে হচ্ছে।

    পার্শ্বে উপবিষ্ট রূপসীর প্রতি আবার চোখ ফেলে আল-বার্‌ক। এবার পূর্ণ চোখাচোখি হয়ে যায় দুজনে। একজনের আঁখিযুগল আটকে গেছে যেন অপরজনের চেহারায়। যাদুময়ী মেয়েটির দু চোখে বিদ্যুতের ঝলক অনুভব করে যেন আল-বার্‌ক।

    সলাজ হাসির রেখা ফুটে উঠে মেয়েটির ওষ্ঠাধরে। হঠাৎ যেন তার সম্বিৎ ফিরে আসে। তাকায় অপর পার্শ্বে উপবিষ্ট বৃদ্ধের প্রতি মুহূর্তে তার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়।

    ঘরে বউ আছে আল-বার্‌কের। চার সন্তানের বাবা। কিন্তু এ মুহূর্তে বউয়ের কথা মনে নেই লোকটির। দিব্যি ভুলে গেছে সব। মেয়েটি তার এতই কাছে বসা যে, তার রেশমী ওড়না উড়ে এসে আল-বার্‌কের বুকে ঝাঁপটা দেয় কয়েকবার। একবার নিজের হাতে সরিয়ে নিয়ে মাফ করবেন বলে ক্ষমা প্রার্থনাও করে মেয়েটি। আল-বার্‌ক মুখ টিপে হাসে—বলে না কিছুই।

    উষ্ট্রারোহীদের পিছন দিয়ে আসছে পদাতিক বাহিনী। এদের মধ্যে আছে তীরন্দাজ ও তরবারীধারী ইউনিট। এদের সকলের চলার ঢঙ এক তালের, একই রকম অস্ত্র এবং একই ধরনের পোশাক দর্শনার্থীদের মধ্যে সেই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, যা ছিল সুলতান সালাহুদ্দীনের কামনা। সৈন্যদের দেখতে শক্ত-সামর্থ, সুঠাম-সুদেহী, উৎফুল্ল ও শান্ত-সুবোধ বলে মনে হচ্ছে।

    পদাতিক বাহিনীর পিছনে আসছে মিজানীক। অনেকগুলো ঘোড়া টেনে নিয়ে আসছে সেগুলো। প্রতিটি মিনজানীক ইউনিটের পিছনে আছে একটি করে ঘোড়াগাড়ী। তাতে রাখা আছে বড় বড় পাথর ও পাতিলের মত বড় বড় বরতন। বরতনগুলো তেলের মত এক ধরনের তরল পদার্থে ভরা। মিনজানীক দ্বারা নিক্ষেপ করা হয় এগুলো। মিনজানীকের সাহায্যে একটি বরতন ছুঁড়ে মারলে তা দূরে গিয়ে ভেঙ্গে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় এবং তরল পদার্থগুলো চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার উপর নিক্ষেপ করা হয় অগ্নিতীর। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুন জ্বলে উঠে দাউ দাউ করে।

    সুলতান সালাহুদ্দীনের নেতৃত্বে উপবিষ্ট ও দণ্ডায়মান দর্শনার্থীদের সম্মুখ দিয়ে সামনে বেরিয়ে আসে এসব আরোহী ও পদাতিক বাহিনী। রাস্তা থেকে মোড় ঘুরে আবার মাঠে ফিরে এসেছেন সুলতান। সম্মুখে তার পতাকাবাহীদের ঘোড়া। ডানে-বাঁয়ে ও পিছনে রক্ষীবাহিনী। তাদের পিছনে নায়েব ও সালারদের বাহন।

    মাঠে এসেই হঠাৎ থেমে যান সুলতান সালাহুদ্দীন। এক লাফে নেমে পড়েন ঘোড়ার পিঠ থেকে। হাত নেড়ে দর্শনার্থীদের সালাম ও অভিনন্দন জানাতে জানাতে চলে যান শামিয়ানার নীচে। দাঁড়িয়ে যায় সকলে। সুলতান সালাহুদ্দীন সবাইকে সালাম করে বসে পড়েন নির্দিষ্ট আসনে।

    আরোহী ও পদাতিক বাহিনী মাঠ পেরিয়ে খানিক দূর অতিক্রম করে অদৃশ্য হয়ে যায় টিলার আড়ালে। দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে মাঠে প্রবেশ করে এক অশ্বারোহী। এক হাতে তার ঘোড়ার লাগাম, অপর হাতে উটের রশি। ঘোড়ার গতির সঙ্গে তাল রেখে একটি উটও ছুটে আসছে তার পিছনে। মাঠের মধ্যখানে এসে আরোহী হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে যায় ঘোড়াটির পিঠে। লাফ দিয়ে চলে যায় উটের পিঠে। দাঁড়িয়ে থাকে সটান। আবার লাফিয়ে চলে আসে গোড়ার পিঠে। সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাটিতে। ঘোড়া ও উটসহ এগিয়ে যায় কয়েক পা। লাফিয়ে চড়ে বসে ঘোড়ার পিঠে। তার ঘোড়া ও উট ছুটে চলছে সমান তালে। ঘোড়ার পিঠ থেকে চলে যায় উটের পিঠে। ছুটে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় একদিকে।

    খাদেমুদ্দীন আল-বার্‌ক মাথাটা সামান্য এলিয়ে দেয় বাঁ দিকে। এখন তার মুখ আর মেয়েটির মাথার মাঝে ব্যবধান দু থেকে তিন ইঞ্চি। তার প্রতি তাকায় মেয়েটি। মুখ টিপে হাসে আল-বার্‌ক। লজ্জা পায় মেয়েটি। বৃদ্ধ তাকায় দু জনের প্রতি। কপালে ভাঁজ পড়ে যায় তার।

    আচমকা ঘোড়াগাড়িতে করে নিয়ে আসা ডেকচির মত পাত্রগুলো টিলার পিছন থেকে উড়ে এসে নিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে মাঠে। একের পর এক পাত্র এসে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে আর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হচ্ছে। তেল ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। অন্তত একশত পাত্র নিক্ষিপ্ত হয় এবং তার তরল পদার্থগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

    এমন সময়ে টিলার উপর আত্মপ্রকাশ করে ছয়জন তীরন্দাজ। তারা জ্বলন্ত সলিতাওয়ালা তীর ছুঁড়ে। মাঠের বিক্ষিপ্ত তরল পদার্থের উপর এসে নিক্ষিপ্ত হয় তীরগুলো। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুন জ্বলে ওঠে। মাঠের এক হাজার বর্গগজ জায়গা জুড়ে এখন আগুন জ্বলছে।

    ঠিক এমন সময়ে একদিক থেকে তীরগতিতে ছুটে আসে চার অশ্বারোহী। কিন্তু কি আশ্চর্য! তারা আগুনের কাছে এসে থামল না। গতি হ্রাসও করল না। শাঁ শাঁ করে ঢুকে পড়ল জ্বলন্ত শিখার মধ্যে। নির্বাক অনিমেষ নয়নে তাদের প্রতি তাকিয়ে আছে দর্শনার্থীরা। লোকগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে নিশ্চিত। কিন্তু না, তারা জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মধ্যে দিব্যি দৌড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে যায় অন্যদিক দিয়ে। খুশীতে আত্মহারা হয়ে যায় দর্শনার্থীরা। আনন্দের আতিশয্যে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তারা তাকবীর ধ্বনি তোলে। আগুন ধরে গিয়েছিল দু আরোহীর কাপড়ে। তারা ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে পানির উপর লাফিয়ে পড়ে। গড়ানি খায় দু তিনবার। তাদের কাপড়ের আগুন নিভে যায়।

    এই শোরগোল, আনন্দ-উল্লাস এবং অশ্বারোহীদের বীরত্ব প্রদর্শনের দৃশ্যের প্রতি আল-বার্‌কের মন নেই। সে এর থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন। পার্শ্বের রূপসী মেয়েটিকে নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে তার সব ভাবনা-চিন্তা। সে প্রেম-সাগরে হারিয়ে যায়।

    আল-বার্‌কের প্রতি এক নজর তাকিয়ে মুচকি একটি হাসি দিয়েই আবার বৃদ্ধের প্রতি দৃষ্টিপাত করে মেয়েটি। এবার কেন যেন উঠে চলে গেল বৃদ্ধ। মেয়েটি তার গমন পথে তাকিয়ে থাকে। আল-বার্‌কের জানা ছিল, মেয়েটি বৃদ্ধের সঙ্গে এসেছে। তাই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে— ‘তোমার পিতা কোথায় চলে গেলেন?’

    ‘ইনি আমার পিতা নন— স্বামী।’ জবাব দেয় মেয়েটি।

    ‘স্বামী? তা এই বিয়ে কি তোমার বাবা-মা দিয়েছেন?’ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে আল-বার্‌ক।

    ‘না, তিনি আমায় কিনে এনেছেন।’ ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে জবাব দেয় মেয়েটি।

    ‘এখন গেলেন কোথায়?’ প্রশ্ন করে আল-বার্‌ক।

    ‘আমার প্রতি নারাজ হয়ে চলে গেছেন। তার সন্দেহ, আমি আপনার সঙ্গে প্রেম নিবেদন করছি।’ জবাব দেয় মেয়েটি।

    ‘আচ্ছা, সত্যিই কি তুমি আমার প্রতি ভালবাসার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছ?’ কৌতূহলী কণ্ঠে জানতে চায় আল-বার্‌ক।

    সলাজ হাসি ফুটে উঠে মেয়েটির ওষ্ঠাধরে। ফিসফিস করে বলে, ‘বুড়োটাকে আমার আর ভাল লাগে না; এর ব্যাপারে আমি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। এর থেকে যদি কেউ আমাকে মুক্ত না করে, তবে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার কোন পথ থাকবে না।’

    সামরিক মহড়া ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি দর্শনার্থীরা। তারা দেখেছিল শুধু সুদানী ফৌজ, যারা শ্বেতহস্তী হয়ে বসেছিল রাজকোষের উপর। তাদের কমাণ্ডাররা বাইরে বের হত রাজা-বাদশাহদের ন্যায়। সঙ্গে সেনাবহর থাকলে তারা পল্লীবাসীদের জন্য আপদ হয়ে দেখা দিত। জনগণের গরু-ছাগল ছিনিয়ে নিয়ে যেত। কারও নিকট উন্নত জাতের একটি ঘোড়া দেখলে সেটি কেড়ে নিয়ে যেত। মানুষ বুঝত, সরকার সৈন্য পুষে প্রজাদের উপর নিপীড়ন চালানোরই জন্য।

    কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীনের বাহিনী সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সুলতানের বাহিনীর একটি অংশ মহড়ার মাধ্যমে আজ অনুপম বীরত্ব প্রদর্শন করল। অপর এক অংশ সুলতানের পরামর্শে একাকার হয়ে গেছে জনতার মধ্যে। উদ্দেশ্য, জনতার সঙ্গে মিশে, কথা বলে এই ধারণা সৃষ্টি করা যে, আমরা তোমাদের ভাই, তোমাদেরই একজন। তোমাদের কল্যাণেই আমাদের আবির্ভাব; জনগণের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী অসৎ সৈন্যদের জন্য কঠোর শাস্তি ব্যবস্থা করে রেখেছেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    সুলতান সালাহুদ্দীনের সামরিক উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রধান, একান্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিতু খাদেমুদ্দীন আল-বার্‌ক এই অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক। এদিকের কিছুই তার কানে ঢুকছে না। চোখেও পড়ছে না কিছুই। পার্শ্বস্থিত মেয়েটি যাদু হয়ে জেঁকে বসেছে তার মাথায়। মেয়েটির প্রেম-সাগরে তলিয়ে গেছে সে। মন দেওয়া-নেওয়ার খেলা জমে উঠেছে দুজনের মধ্যে। মেয়েটিকে একস্থানে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলে আল-বার্‌ক। মেয়েটি বলে, ‘আমি বৃদ্ধের ক্রীতদাসী। আমি তার হাতে বন্দী হয়ে আছি। সে আমাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে।’ মেয়েটি আরও জানায়, ‘বৃদ্ধের ঘরে চারটি স্ত্রী।’

    নিজের পদমর্যাদার কথা ভুলে যায় আল-বার্‌ক। প্রেম-পাগল তরুণের ন্যায় মিলনের জন্য মেয়েটিকে এমন সব স্থানে আসতে প্রস্তাব করে, যেখানে বখাটেরা ছাড়া যায় না আর কেউ। একটি জায়গা পছন্দ হয়ে যায় মেয়েটির। শহরের বাইরে পরিত্যক্ত পুরনো এক জীর্ণ ভবন। মেয়েটিকে বৃদ্ধের কবল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয় আল-বার্‌ক। সাক্ষাতের দিন-ক্ষণ ঠিক করে আলাদা হয়ে যায় দুজন।

    ○             ○             ○

  • অপহরণ

    অপহরণ

    ১১৭১ সালের জুন মাস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজ কক্ষে উপবিষ্ট। অনুমতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে খলীফা আল-আজেদের দূত। সালাম দিয়ে বলে, ‘খলীফা আপনাকে স্মরণ করেছেন।’ বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠে সুলতান সালাহুদ্দীনের চেহারায়। ভ্রূ কুঞ্চিত করে দূতকে বললেন— ‘খলীফাকে আমার সালাম দিয়ে বলবে, জরুরী কোন কাজ থাকলে যেন তিনি আমাকে ডেকে পাঠান; অন্যথায় নয়। এ মুহূর্তে আমার এতটুকু অবসর নেই। তাঁকে আরও বলবে, আমার সামনে যে কাজ পড়ে আছে, তা হুজুরের দরবারে হাজেরী দেওয়া অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।’

    দূত ফিরে যায়। মাথা নুইয়ে কক্ষে পায়চারী করতে শুরু করেন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    ফাতেমী খেলাফতের যুগ। আল-আজেদ মিসরে এ খেলাফতের খলীফা। সে যুগের খলীফারা হতেন রাজা। জুমার খুতবায় আল্লাহ ও রাসূলের নামের পরে খলীফার নামও উচ্চারণ করতে হত। বিলাসিতা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ ছিল না। নুরুদ্দীন জঙ্গী আর সুলতান সালাহুদ্দীন যদি না থাকতেন, কিংবা তারাও যদি অপরাপর আমীর-উজীরদের ন্যায় আয়েশী ও ঈমান-বিক্রেতা হতেন, তাহলে সে যুগের খলীফারা ইসলামী সাম্রাজ্যকে বিক্রি করে খেয়েই ফেলেছিলেন।

    আল-আজেদও তেমনি এক খলীফা। মিসরের গভর্নর হয়ে আগমন করার পর তিনি সুলতান সালাহুদ্দীনকে প্রথম প্রথম বেশ কবার দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দীন বুঝে ফেলেছিলেন, খলীফা তাঁকে অযথা বারবার তলব করার উদ্দেশ্য, তাকে এ কথা বুঝানো যে, মিসরের সম্রাট, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সালাহুদ্দীন নয়—তিনি।

    খলীফা সুলতান সালাহুদ্দীনকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন। তাকে ডেকে নিয়ে নিজের কাছে বসাতেন। কিন্তু ভাবগতিক ছিল রাজকীয়। কথা বলার ভঙ্গি ছিল তার শাসক-সুলভ। সুলতান সালাহুদ্দীনকে তিনি যতবার ডেকে পাঠিয়েছিলেন, ডেকে পাঠিয়েছিলেন সম্পূর্ণ অকারণে এবং অনর্থক খোশগল্প করে কোন কাজ ছাড়াই বিদায় দিয়েছেন। এ কারণে রোম উপসাগরে ক্রসেডারদের পরাজিত করে এবং সুদানী সৈন্যদের বিদ্রোহ দমন করে সুলতান সালাহুদ্দীন খলীফাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।

    খলীফার মহলের জাঁকজমক আগুন ধরিয়ে রেখেছিল সুলতানের বুকে। সোনার তৈরি পাত্রে পানাহার করেন তিনি। মদের পিপা-পেয়ালা তাঁর হীরা-খচিত। সুন্দরী মেয়েদের দ্বারা পরিপূর্ণ তাঁর হেরেম। আরবী, মিসরী, মারাকেশী, সুদানী ও তুর্কী ছাড়াও ইহুদী-খৃষ্টান মেয়েও আছে তাঁর রঙমহলে। এ সেই জাতির খলীফা, যে জাতির দায়িত্ব ছিল বিশ্বময় আল্লাহর বাণী প্রচার করা, যে জাতি বিশ্ব কুফরী শক্তির ভয়াবহ সামরিক প্রতিরোধের মুখোমুখি।

    খলীফার আরও কয়েকটি বিষয় শূলের ন্যায় বিদ্ধ করছিল সুলতানকে। প্রথমত খলীফার ব্যক্তিগত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ছিল সুদানী, হাবশী ও কাবায়েলী। তাদের আনুগত্য ছিল সংশয়পূর্ণ। দ্বিতীয়ত বিদ্রোহী ও ক্ষমতাচ্যুত সুদানী ফৌজের কমাণ্ডার ও নায়েব সালার ছিল দরবারে খেলাফতের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি— খলীফার ডান হাত।

    সালাহুদ্দীন আইউবীর পরামর্শে আলী বিন সুফিয়ান চাকর-চাকরানী ও অন্যান্য দায়িত্বশীলদের বেশে খলীফার মহলে গুপ্তচর ঢুকিয়ে দেন। হেরেমের দুটি মেয়েকেও হাত করে তাদের উপর গুপ্তচরবৃত্তির দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাদের রিপোর্ট মোতাবেক খলীফা ছিলেন সুদানী কমাণ্ডারদের দ্বারা প্রভাবিত। খলীফা ষাট-পয়ষট্টি বছর বয়সের বৃদ্ধ। তবুও সুন্দরী মেয়েদের নাচ-গান ছাড়া রাত কাটে না তার। তার এই চারিত্রিক দুর্বলতা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতিপক্ষের মোক্ষম সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে তারা।

    ○             ○             ○

    ১১৭১ সালের ফেব্রুয়ারী কি মার্চ মাস। খলীফা আল-আজেদের হেরেমে আগমন ঘটে নতুন একটি মেয়ের। অস্বাভাবিক সুন্দরী এক তরুণী। আরবী পোশাক পরিহিত জনাচারেক লোক এসে উপহার হিসেবে মেয়েটিকে খলীফার হাতে তুলে দিয়ে যায়। দিয়ে যায় আরও মূল্যবান বেশ কিছু উপঢৌকনও।

    মেয়েটির নাম উম্মে আরারাহ। রূপের ফাঁদে ফেলে অল্প ক’দিনেই খলীফাকে বশ করে ফেলে নবাগতা এই মেয়েটি। মহলের মেয়ে গুপ্তচর মারফত ঘটনা সম্পর্কে অবগত হন আলী বিন সুফিয়ান।

    কসরে খেলাফতের এই কাণ্ড-কীর্তি সবই সুলতান সালাহুদ্দীনের জানা। কিন্তু খলীফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার শক্তি তাঁর এখনও হয়নি। পূর্বেকার গভর্নর ও আমীরগণ চলতেন খলীফার সামনে মাথা নত করে। তাদের সেই চাটুকারিতার ফলে মিসর আজ বিদ্রোহের অগ্নিগর্ভ। তাদের আমলে খেলাফত ছিল বটে, তবে ইসলামের পতাকা ছিল অবনমিত। সেনাবাহিনী ছিল ইসলামী সাম্রাজ্যের। কিন্তু সুদানী সেনাপতি রাজ্য শাসনের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন নিজের হাতে। তার সম্পর্ক ছিল খৃষ্টানদের সঙ্গে। তারই সক্রিয় সহযোগিতায় কায়রো ও ইস্কান্দারিয়ায় খৃষ্টানরা বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছিল। এই বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে ছিল অসংখ্য গুপ্তচর।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সুদানী সৈন্যদের দমন করেছিলেন ঠিক; কিন্তু বেশ ক’জন সেনাপতি রয়ে গেছে এখনও। যে কোন সময় তারা বিপদ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কসরে খেলাফতে তাদের বেশ প্রভাব।

    খেলাফতের বিলাসপূর্ণ এই গদির উপর এখনই হাত দিতে চাইছেন না সুলতান। কারণ, কিছু লোক এখনও খেলাফতের ব্যাপারে আবেগপ্রবণ। কতিপয় তো খলীফার সক্রিয় সহযোগী। তন্মধ্যে চাটুকারদের সংখ্যাই অধিক। এই চাটুকারদের মধ্যে উচ্চপদস্থ এমন কর্মকর্তাও আছেন, যাদের স্বপ্ন ছিল মিসরের গভর্ণর হওয়া। কিন্তু সেই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত এখন সুলতান সালাহুদ্দীন।

    খৃষ্টান গুপ্তচর ও বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা পরিপূর্ণ দেশ। গাদ্দারদের বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিলে খৃষ্টানদের পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কা প্রবল। তাই সুলতান সালাহুদ্দীন খেলাফতের মদদপুষ্ট শাসকবর্গকে এখনই শত্রুতে পরিণত করতে চাইছেন না।

    কিন্তু ১১৭১ সালের জুনে, একদিন খলীফা তাকে ডেকে পাঠালে তিনি যেতে পারবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন। সুলতান কক্ষে পায়চারী করছেন। দারোয়ানকে ডেকে বললেন— ‘আলী বিন সুফিয়ান, বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ, ঈসা এলাহকারী ফকীহ ও আন-নাসেরকে এক্ষুনি আমার কাছে আসতে বল।’

    ○             ○             ○

    এই ব্যক্তিগণ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর খাস উপদেষ্টা ও বিশ্বস্ত। সুলতান সালাহুদ্দীন তাদের উদ্দেশে বললেন— ‘এইমাত্র খলীফার দূত আমাকে নিতে এসে গেল। আমি যেতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছি। খেলাফতের ব্যাপারে আমি কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাই। এর প্রথম ধাপে আমি জুমার খুতবা থেকে খলীফার নাম তুলে দিতে চাই। এ ব্যাপারে আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।’

    ‘এ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। খলীফাকে মানুষ এখনও পয়গম্বর মনে করে, এতে জনমত আমাদের বিপক্ষে চলে যাবে।’ বললেন বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ।

    ‘এখনও মানুষ তাকে পয়গম্বর মনে করে। ক’দিন পর খোদা ভাবতে শুরু করবে। খুতবায় আল্লাহ-রাসূলের নামের পাশে তার নাম উচ্চারণ করে আমরাই তো তাকে পয়গম্বর ও খোদার আসনে বসিয়েছি। কি ঈসা ফকীহ! আপনার পরামর্শ বলুন।’ বললেন সালাহুদ্দীন।

    ‘আপনার মতের সঙ্গে আমিও একমত। কোন মুসলমান জুমার খুতবায় আলাহ-রাসূলের পাশাপাশি অন্য কোন মানুষের নাম সহ্য করতে পারে না। তাও আবার এমন মানুষ, যিনি মদ-নারীসহ সব রকম পাপে নিমজ্জিত। শত শত বছর ধরে খলীফাকে পয়গম্বরের মর্যাদা দিয়ে আনা হচ্ছে বলে চিরদিন তা বহাল রাখতে হবে এমন কোন কথা নেই। কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমি এমনই বুঝি। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে এ পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা আমি বলতে পারব না।’ বললেন ঈসা এলাহকারী ফকীহ।

    ‘প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত তীব্র। আর হবে আমাদের বিপক্ষে। তথাপি আমার পরামর্শ, হয়ত এই কুপ্রথার অবসান ঘটাতে হবে কিংবা খলীফাকে খাঁটি মুসলমান বানিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত করতে হবে। তবে আমার দৃষ্টিতে দ্বিতীয়টি সম্ভব হবে না।’ বললেন বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ।

    আলী বিন সুফিয়ান বললেন— ‘জনমত সম্পর্কে আমার চেয়ে আর কে ভাল জানবে? জনগণ খলীফা আল-আজেদ নামের সঙ্গে নয়— সালাহুদ্দীন আইউবী নামের সাথে পরিচিত। আমার গোয়েন্দা বিভাগের নির্ভরযোগ্য রিপোর্টে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, আপনার দু বছরের শাসনামলে জনগণ এখন বহু সমস্যার সমাধান পেয়েছে, যার কল্পনাও তারা কখনও করেনি। দেশে উন্নত কোন হাসপাতাল ছিল না। চিকিৎসার অভাবে সাধারণ রোগেও মানুষ মারা যেত। এখন উন্নতমানের সরকারী হাসপাতাল আছে। স্থানে স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। আগে চুরি-ডাকতি, হাইজ্যাক-ছিনতাইয়ের কারণে ব্যবসায়ীর নিরাপদে ব্যবসা করতে পারত না। এখন তারও অবসান ঘটেছে। অপরাধ প্রবণতা আগের তুলনায় এখন অনেক কম। মানুষ এখনদের সমস্যার সমাধানের জন্য সরাসরি আপনার শরণাপন্ন হতে পারছে। জানাতে পারছে তাদের আর্জি-ফরিয়াদ। আপনার গভর্নর হয়ে মিসর আগমনের আগে মানুষ সরকারী কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর নামে সন্ত্রস্ত থাকত সব সময়। আপনি তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন। মানুষ এখন নিজেদেরকে দেশ ও জাতির অংশ ভাবতে শিখেছে। খেলাফত থেকে তারা অবিচার আর নির্দয়তা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। আপনি তাদেরকে সুবিচার উপহার দিয়েছেন, দিয়েছেন নাগরিক অধিকার। আমি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারি,— জাতি খেলাফতের নয়— ইমারাতের সিদ্ধান্তই মেনে নেবে।’

    সুলতান সালাহুদ্দীন বললেন— ‘জাতিকে আমি সুবিচার দিতে পেরেছি কি পারিনি, তাদের অধিকার তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে পারলাম কি পারলাম না, আমি বলতে চাই না। আমি শুধু এটুকু জানি যে দেশের ঈমানদার জনসাধারণের ঘাড়ে কোন বাজে প্রথা চাপিয়ে রাখা যায় না। শিরক-কুফরী থেকে আমি জাতিকে মুক্তি দিতে চাই। দ্বীন-ধর্মের অঙ্গ বলে পরিচিত এসব কুপ্রথাকে আমি ছিন্নভিন্ন করে অতীতের আঁস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে চাই। এ প্রথা যদি বহাল থেকে যায়, তাহলে বিচিত্র কি যে, কাল-পরশু আমিও নিজের নাম খুতবায় শামিল করে নেব। বাতি থেকে বাতি জ্বলে। শিরকের এই বাতি আমি নিভিয়ে ফেলতে চাচ্ছি। কসরে খেলাফত পাপের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। সুদানী বাহিনী যে রাতে মিসর আক্রমণ করেছিল, সে রাতেও খলীফা মদ পান করে হেরেমের মেঝে বুঁদ হয়ে পড়ে ছিল। আমার কৌশল যদি ব্যর্থ হত, তাহলে সেদিনই মিসরের বুক থেকে ইসলামের পতাকা হারিয়ে যেত। সে রাতে আল্লাহর সৈনিকরা যখন ইসলাম ও দেশের জন্য শহীদ হচ্ছিল, খলীফা তখন মদ খেয়ে পড়েছিল মাতাল হয়ে।

    ‘সুদানীদের হামলা প্রতিহত করে আমি যখন তাঁকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে গেলাম, তিনি তখন মাতাল ষাঁড়ের ন্যায় ঢুলু ঢুলু কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘শাবাশ! শুনে আমি বেশ খুশী হলাম। বিশেষ দূত মারফত আমি তোমার পিতার কাছে এর মোকারকবাদ ও পুরস্কার প্রেরণ করছি।’ তখন আমি তাকে বলেছিলাম— ‘খলীফাতুল মুসলিমীন। আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি মাত্র। এ কর্তব্য আমি পালন করেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে— পিতার মনোরঞ্জনের জন্য নয়।’

    খলীফা বললেন— ‘সালাহুদ্দীন! বয়সে তুমি এখনও নবীন; কিন্তু কাজ করে দেখালে বিজ্ঞ প্রবীণের মত!’

    খলীফা আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছিলেন, যেন আমি তার গোলাম। তা ছাড়া এই ধর্মহারা লোকটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য এক শ্বেত হস্তিতে পরিণত হয়ে বসেছে।

    পকেট থেকে একখানা পত্র বের করে সুলতান সবাইকে দেখালেন এবং বললেন, ছয়-সাত দিন হল নুরুদ্দীন জঙ্গী আমাকে এ পত্রখানা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন—

    ‘খেলাফত তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দুই অধীন খলীফার উপর বাগদাদের কেন্দ্রীয় খেলাফতের প্রভাব শেষ হয়ে গেছে। আপনি লক্ষ্য রাখবেন, পাছে মিসরের খলীফা স্বাধীন শাসক হয়ে না বসেন। প্রয়োজনে তিনি সুদানী ও ক্রুসেডারদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতেও কুণ্ঠিত হবেন না। আমি ভাবছি, খেলাফত থাকবে শুধু বাগদাদে। খলীফা থাকবেন স্রেফ একজন। ‘অধীন খলীফা’ প্রথা বিলুপ্ত করা হবে। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে রেখেছে। মিসরের খলীফার রাজত্বকে যদি আপনি তার মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন, তাহলে আমি আপনাকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে যাব। সাবধানতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, মিসরের আভ্যন্তরীণ অবস্থাও অনুকূল নয়। মিসরে আরও একটি বিদ্রোহ ঘটতে যাচ্ছে। আপনি সুদানীদের উপর কড়া নজর রাখুন।

    পত্রটি পাঠ করে সুলতান সালাহুদ্দীন বললেন, আমাদের খেলাফত যে সাদা হাতী, তাতে সন্দেহ কি? আপনারা দেখছেন না, খলীফা আল-আজেদ যখন পরিভ্রমণে বের হন, তখন অর্ধেক সৈন্যকে তার নিরাপত্তার নামে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়? খলীফার চলার পথে গালিচা বিছিয়ে দেওয়ার জন্য জনসাধারণের প্রতি চাপ সৃষ্টি করা হয়। যুবতী মেয়েদেরকে খলীফার গায়ে ফুলের পাপড়ি ছিটাতে বাধ্য করা হয়।

    ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা, সম্প্রসারণ এবং জাতির উন্নয়নে যে অর্থ ব্যয় হতে পারত, সে অর্থ ব্যয় করছেন তিনি নিতান্ত বিনোদনমূলক পরিভ্রমণে। আমাদের আর সময় নষ্ট করা যাবে না। মিসরী জনগণ, এদেশের খৃষ্টসমাজ এবং অপরাপর সংখ্যালঘুদের কাছে আমাদের প্রমাণ দিতে হবে, ইসলাম রাজ-রাজড়াদের ধর্ম নয়। ইসলাম আরব মরুভূমির রাখাল-কিষাণ ও উষ্ট্ৰচালকদের সাচ্চা ধর্ম। ইসলাম মানবজাতিকে মানবতার মর্যাদাদানকারী অনুপম জীবন-ব্যবস্থা।’

    বাহাহুদ্দীন শাদ্দাদ বললেন— ‘খলীফার বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিতে গেলে আপনার নামে এই অপবাদ রটানো হতে পারে যে, খলীফাকে অপসারিত করে আপনি তার মসনদ দখল করতে চাচ্ছেন। সত্যের বিরোধিতা চিরদিন হয়েছে এবং হতে থাকবে।’

    সুলতান সালাহুদ্দীন বললেন— ‘আজ মিথ্যা ও বাতিলের শিকড় এত শক্ত হওয়ার কারণ, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধাচারণের ভয়ে মানুষ সত্য বলা ছেড়ে দিয়েছে। সত্যের বাণী আজ নিভৃতে কাঁদে।’

    ‘আমাদের শাসকরা জনসাধারণকে অনাহারে রেখে, তাদের উপর জবরদস্তি শাসন চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে গোলামীর শৃংখলে বেঁধে রেখেছেন, যে শৃংখল ভেঙ্গে মানবতার মুক্তি নিশ্চিত করেছিলেন আমাদের রাসূল (সাঃ)। আমাদের রাজা-বাদশাহগণ এতই অধঃপাতে নেমে গেছেন যে, নিজেদের ভোগ-বিলাসের স্বার্থে তারা খৃষ্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতছেন, তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছেন। আর এ সুযোগে খৃষ্টানরা ধীরে ধীরে ইসলামী সাম্রাজ্যকে হাত করে চলেছে। শুনুন শাদ্দাদ! আপনি বলেছেন, জনগণ আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে, তাই না? সাহস নিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠুন। এসব বিরোধিতাকে ভয় করলে আমাদের চলবে না।’

    সুলতান সালাহুদ্দীনের নায়েব সালার আন-নাসের বললেন, ‘বিরুদ্ধাচারণকে আমরা ভয় করি না, শ্রদ্ধেয় আমীর! আপনি আমাদেরকে রণাঙ্গনে দেখেছেন। শত্রুর বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ হয়েও আমরা নির্ভীকচিত্তে লড়াই করেছি। ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়েও জীবনপণ লড়েছি। সংখ্যায় যখন আমরা নিতান্ত নগণ্য ছিলাম, শত্রু বাহিনীর সয়লাব প্রতিরোধ তখনও করেছি। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি আপনাকে আপনারই বলা একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আপনি একবার বলেছিলেন, যে আক্রমণ বাইরে থেকে আসে, আমরা তা প্রতিরোধ করতে পারি। কিন্তু আক্রমণ যখন হয় ভেতর থেকে আর আক্রমণকারীরা হয় নিজেদেরই লোক, তখন আমরা থমকে যাই, কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকি, হায়! একি হল আল্লাহ? মোহতারাম আমীরে মেসের! দেশের শাসনকর্তাই যখন দেশের শত্রু হয়ে যাবে, আপনার তরবারী তখন কোষের ভিতরেই ছটফট করতে থাকবে।’

    সুলতান সালাহুদ্দীন বললেন— ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, নাসের! তরবারী আমার খাপের মধ্যেই তড়পাচ্ছে! স্বদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে বেরুতে চাইছে না আমার শাণিত অসি। দেশের শাসকবর্গ জনগণের মর্যাদার প্রতীক। শাসকমণ্ডলীকে আমি বরাবরই শ্রদ্ধার চোখে দেখি কিন্তু ভেবে দেখুন, তারা সেই মর্যাদা রক্ষা করছে কতটুকু? শুধু খলীফা আল-আজেদে্র কথাই বলছি না। আলী বিন সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করুন। তার গোয়েন্দা বিভাগ মসুল, হাল্‌ব, দামেশ্‌ক ও মক্কা-মদীনা থেকে যে রিপোর্ট নিয়ে এসেছে, তা হল বিলাসপ্রিয়তার কারণে যে যেখানকার গভর্নর বা শাসক; সেই সেখানকার সার্বভৌম ক্ষমতাধর হয়ে বসেছে। সালতানাতে ইসলামিয়া খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। খেলাফত এতই দুর্বল যে শাসক-গভর্নর এখন ব্যক্তিগত রাজনীতি চর্চার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

    আমি জানি, জাতির এই বিক্ষিপ্ত শক্তিগুলোকে যদি আমরা একত্রিত করতে যাই, তাহলে তা আরও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আমাদের সামনে সমস্যার পাহাড় এসে দাঁড়াবে। কিন্তু নির্ভয়ে আমি কাজ করতে চাই। আশা করি আপনারাও সাহসিকতার সঙ্গে আমাকে সহযোগিতা দিয়ে যাবেন। সালতানাতে ইসলামিয়ার এই ধস আমাদের ঠেকাতেই হবে। আপনারা যে যা পরামর্শ দিয়েছেন, আমি তার মূল্যায়ন করব। তবে এখন থেকে আমি খলীফার ডাকে তখনই সাড়া দেব, যখন জরুরী কোন কাজ থাকবে। কি কাজে ডেকে পাঠালেন, খলীফাকে আগেই আমাকে তা অবহিত করতে হবে। অন্যথায় তার ডাকে একটি মুহূর্তও আমি নষ্ট করতে চাই না। আর আপাতত আমি জুমার খুতবা থেকে খলীফা্র নাম তুলে দিচ্ছি।’

    উপস্থিত সকলে সুলতান সালাহুদ্দীনের এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং তার বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতা ও সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দেন।

    ○             ○             ○

    খলীফা আল-আজেদ তার খাস কামরায় উপবিষ্ট। দূত ফিরে এসে জানায়, সুলতান সালাহুদ্দীন বলেছেন, কোন জরুরী কাজ থাকলে তিনি আসতে পারবেন। অন্যথায় তিনি বেজায় ব্যস্ত।

    শুনে খলীফা অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। দূতকে বললেন, ‘রজবকে আসতে বল।’

    রজব খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর কমাণ্ডার। নায়েব সালারের সমান তার মর্যাদা। এক সময় ছিল মিসরের সেনাবাহিনীর অফিসার। খলীফার বডিগার্ডের কমাণ্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্তির পর সে কসরে খেলাফত ও খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীতে দেখে দেখে সুদানী হাবশীদের নিয়োগ দান করে। রজব সালাহুদ্দীন বিরোধী এবং খলীফার চাটুকারদের অন্যতম।

    খলীফার খাস কামরায় উম্মে আরারাও উপস্থিত। দূতের রিপোর্ট শুনে সে বলে ওঠল, ‘সালাহুদ্দীন আইউবী আপনার একজন নওকর বৈ নয়। অথচ আপনি তাকে মাথায় তুলে রেখেছেন। লোকটাকে আপনি বরখাস্ত করছেন না কেন?’

    ‘কারণ, তার ফল ভাল হবে না। সেনাবাহিনীর কমাণ্ড তার হাতে। ইচ্ছে করলে এ বাহিনীকে সে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে।’ কম্পিত কণ্ঠে বললেন খলীফা।

    ইত্যবসরে এসে উপস্থিত হয় রজব। মাথা ঝুঁকিয়ে খলীফাকে সালাম করে। রাগে কাঁপছেন খলীফা। ক্রুদ্ধ ও কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি পূর্ব থেকেই জানতাম, কমবখত একটা অহঙ্কারী ও অবাধ্য লোক। সালাহুদ্দীন আইউবীর কথা বলছি …….। দূত মারফত লোকটাকে আমি ডেকে পাঠিয়েছিলাম। সে এই বলে আমার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল যে, কোন জরুরী কাজ থাকলে আসব; অন্যথায় আপনার আহ্বান আমার নিকট অর্থহীন। কারণ, আমার সামনে জরুরী কাজ পড়ে আছে।’

    রাগের মাথায় বলতে বলতে হেঁচকি উঠে যায় খলীফার। তারপর প্রবল বেগে কাশি। দু হাতে বুক চেপে ধরেন তিনি। চেহারার রঙ যেন হলুদ হয়ে গেছে তাঁর। এমনি অবস্থায় তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন বদমাশটা এতটুকুও বুঝল না যে, আমি একে তো বৃদ্ধ, তার উপর হৃদরোগের রুগী; অপ্রীতিকর সংবাদ আমাকে ক্ষতি করতে পারে। আমি এখানে শরীর-স্বাস্থ্যের চিন্তায় অস্থির আর ও কিনা দেখাচ্ছে তার কাজের গরজ!’

    ‘তাকে আপনি কেন ডেকেছিলেন? আমাকে আদেশ করুন।’ বলল রজব।

    ‘ডেকেছিলাম তাকে একথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, তার মাথার উপর একজন শাসকও আছেন। তুমিই তো বোধ হয় আমাকে বলেছিলে, সালাহুদ্দীন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হতে যাচ্ছে। আমি বার বার তাকে এখানে ডেকে আনতে চাই, তাকে আদেশ করতে চাই, যেন সে আমার অনুগত থাকে। ডেকে পাঠাতে হলে জরুরী কোন কাজ থাকতে হবে, এমন তো কথা নেই!’ বুকের উপর হাত রেখে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন খলীফা।

    উম্মে আরারাহ খলীফার ঠোঁটের সঙ্গে মদের পেয়ালা ধরে বলল— আপনাকে শতবার বলেছি, মাথায় রাগ তুলবেন না। কতবার বলেছি, গোস্বা আপনার জন্য ক্ষতিকর!’

    মদের পেয়ালা শূন্য হয়ে গেলে মেয়েটি একটি সোনার কৌটা থেকে এক চিমটি তামাকচূর্ণ নিয়ে খলীফার মুখে দেয় এবং পানি পান করিয়ে দেয়। খলীফা মেয়েটির বিক্ষিপ্ত রেশমী চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে বিলি কাটতে কাটতে বললেন— ‘তুমি না হলে, আমার উপায় কি হত, বল তো? সকলের দৃষ্টি এখন আমার সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি। আমার ব্যক্তিসত্ত্বার উপর কারও এক বিন্দু নজর নেই। আমার একজন স্ত্রীর পর্যন্ত আমার প্রতি এতটুকু আন্তরিকতা নেই। এ মুহূর্তে তুমি আমার একমাত্র ভরসা। তুমি না হলে আমার উপায় ছিল না। খলীফা উম্মে আরারাহকে টেনে কাছে এনে গা ঘেঁষে বসিয়ে তার সরু কটি বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরেন।

    ‘খলীফাতুল মুসলিমীন! আপনি বড় কোমল-হৃদয় ও মহৎ মানুষ। সে কারণেই সালাহুদ্দীন আইউবী এমন গোস্তাখী করতে পারল। আপনি ভুলে গেছেন, সালাহুদ্দীন আরব বংশোদ্ভুত লোক নয়, আপনার বংশের লোক নয়। সে কুর্দী। আমি ভেবে অবাক হই, এত বড় স্পর্ধা তাকে কে দিল! তার গুণ তো শুধু এটুকুই যে, লোকটা একজন দক্ষ সৈনিক; রণাঙ্গনের শাহ্‌সাওয়ার। লড়তেও জানে, লড়াতেও জানে। কিন্তু এই গুণ এত গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, মিসরের গভর্নরী তার হাতে তুলে দিতে হবে! সুদানের এত বিশাল, এত সুদক্ষ বাহিনীটিকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিল, যেভাবে শিশুরা তাদের হাতের খেলনা ভেঙ্গে নষ্ট করে দেয়। মহামান্য খলীফা! আপনি একটু চিন্তা করুন, এখানে যখন সুদানী সেনারা ছিল, নাজি এবং ঈদরৌসের ন্যায় সালারগণ ছিল, তখন মানুষ আপনার কুকুরের সামনেও মাথা নত করত। সুদানী বাহিনীর সালার আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আপনার দ্বারে সারাক্ষণ করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত। আর এখন? এখন ডেকে পাঠালে একজন অধীন পর্যন্ত আপনার আহ্বান মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করে।’ বলল রজব।

    ‘রজব! সব দোষ তোমার।’ হঠাৎ গর্জে উঠে বললেন খলীফা।

    অকস্মাৎ পাংশু হয়ে যায় রজবের মুখ। ভয়ার্ত বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকে খলীফার প্রতি। খলীফার বন্ধন ছাড়িয়ে চকিতে সরে পড়ে উম্মে আরারাহ। খলীফা পুনরায় তাকে কাছে টেনে পূর্বাপেক্ষা অধিক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিবুক টিপে সস্নেহে বলেন— ‘কী, ভয় পেয়েছ বুঝি? আমি রজবকে বলতে চাচ্ছি, আজ দু বছর পর সে আমার কানে দিচ্ছে, আমার পুরনো বাহিনী ও তার সালার ভাল ছিল; সালাহুদ্দীনের তৈরি বাহিনী খেলাফতের পক্ষে কল্যাণকর নয়! কেন রজব! একথা কি তুমি আগেও জানতে? জানলে বললে না কেন? আজ যখন মিসরের গভর্নর তার খুঁটি শক্ত করে ফেলেছে, এখন কিনা তুমি আমাকে বলছ, সে খেলাফতের অবাধ্য!’

    ‘বিষয়টা আমি পূর্ব থকেই জানতাম। কিন্তু হুজুরের তিরস্কারের ভয়ে কখনও বলিনি। সুলতান সালাহুদ্দীনকে নির্বাচন করেছে বাগদাদের খেলাফত। আমি ভেবেছিলাম, কাজটা আপনার পরামর্শেই হয়ে থাকবে। খেলাফতের মনোনয়নের বিরুদ্ধে মুখ খোলার দুঃসাহস আমি দেখাতে পারি না। আজ আমীরে মেসেরের গোস্তাখী আর আপনার মনোকষ্ট আমাকে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে। এর আগেও একাধিকবার আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হুজুরের সঙ্গে গোস্তাখী করতে দেখেছি। বিপদ সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করা আমি আমার কর্তব্য মনে করি।’ বলল রজব।

    খলীফার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ উম্মে আরারাহ খলীফার হাতের আঙ্গুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে শিশুর ন্যায় খেলছে। এবার দু হাতে খলীফার চিবুক স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করে— ‘মনটা এবার ঠিক হয়েছে?’

    খলীফা তার চিবুক টেনে দিয়ে পুলকভরা কণ্ঠে বললেন— ‘ঔষধ-পথ্যে ততটা কাজ হয় না, যতটুকু কাজ হয় তোমার ভালবাসায়। আল্লাহ তোমাকে যে রূপ দিয়েছেন, তাই আমার সব রোগের মহৌষধ। খলীফা উম্মে আরারার মাথা নিজের বুকের উপর রেখে রজবকে বললেন— কিয়ামতের দিন যখন আমাকে জান্নাতে প্রেরণ করা হবে, তখন আমি আল্লাহকে বলব, আমি হুর চাই না— আমার উম্মে আরারাকে এনে দাও।’

    ‘উম্মে আরারাহ শুধু রূপসীই নয়— বড় বিচক্ষণও বটে। হুজুরের হেরেম ষড়যন্ত্রের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছিল। উম্মে আরারাহ এসে সব কুচক্রীর মুখে ঠুলি পরিয়েছে। এখন আপনার কসরে খেলাফতে আপনার স্বার্থ বিরোধী কোন আচরণ করার সাধ্য কারও নেই।’ বলল রজব।

    উম্মে আরারার প্রেম-পরশে নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন খলীফা। নিশ্চল মূর্তির মত উদাস বসে আছেন তিনি। রজবের এইসব কথার একটি শব্দও যেন কানে গেল না তার। তাঁর চৈতন্য ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করে উম্মে আরারাহ। বলে— ‘রজব সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রসঙ্গে কথা বলছিল। আপনি মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য শুনুন এবং সালাহুদ্দীনকে বাগে আনার চেষ্টা করুন।’

    সম্বিৎ ফিরে পান খলীফা। বলেন— ‘এ্যা, কি যেন বলছিলে রজব।’

    ‘বলছিলাম, আমি এ কারণে এতদিন মুখ বন্ধ রেখেছি যে, আমীরে মেসেরের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনি তা মেনে নেবেন না। আর যা হোক, সালাহুদ্দীন আইউবী একজন দক্ষ সেনানায়ক তো বটে!’ বলল রজব।

    ‘সালাহুদ্দীন আইউবীর এই একটি গুণই আমার নিকট পছন্দনীয় যে, যুদ্ধের ময়দানে সে ইসলামের পতাকাকে পদানত হতে দেয় না। তার মত সেনানায়কদেরই আমার বড় প্রয়োজন, যারা রণাঙ্গনে খেলাফতে ইসলামিয়ার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখে।’ বললেন খলীফা।

    ‘গোস্তাখী মাফ করবেন খলীফাতুল মুসলিমীন! সালাহুদ্দীন আইউবী খেলাফতে ইসলামিয়ার মর্যাদার জন্য লড়াই করে না, লড়াই করে নিজের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। আপনি ফৌজের সালার থেকে নিয়ে একজন সাধারণ সিপাহীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন; সালাহুদ্দীন আইউবী তাদের এই দীক্ষা প্রদান করেছে যে, লড়াই করে এমন একটি ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করবে, যার কোন সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এতে পরিষ্কার বুঝা যায়, সে এমন একটি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখছে, যার সম্রাট হবে সে নিজে। তার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন নুরুদ্দীন জুঙ্গী। সালাহুদ্দীনের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি দু হাজার অশ্বারোহী এবং সমসংখ্যক পদাতিক বাহিনী প্রেরণ করেছেন। আপনিই বলুন, তিনি কি এ সৈন্য মিসরের খলীফার অনুমতি নিয়ে প্রেরণ করেছেন? খেলাফতের কোন দূত কি আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছিল যে, মিসরে অতিরিক্ত সৈন্যের প্রয়োজন আছে কি-না? যা কিছু হয়েছে, খেলাফতকে উপেক্ষা করেই হয়েছে।’ বলল রজব।

    ‘তুমি ঠিকই বলছ রজব! এ ব্যাপারে আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। আর ওদিক থেকে আসা বাহিনীটিকে তত ফেরতও পাঠান হয়নি!’ বললেন খলীফা।

    ‘ফেরত এ জন্যে দেওয়া হয়নি যে, তাদের পাঠানোই হয়েছিল মিসরে সালাহুদ্দীনের হাতকে শক্ত করার জন্য। মিসরের পুরাতন বাহিনীকে কিষাণ আর ভিখারীতে পরিণত করার জন্য নুরুদ্দীন জঙ্গী এ বাহিনী প্রেরণ করেছেন। নাজি, ঈদরৌস, ককেশ, আবদে ইয়ায্‌দান, আবু আজর এবং এদের ন্যায় আরও আটজন সালার এখন কোথায়? হুজুর হয়ত কখনও ভেবে দেখেননি, এদের প্রত্যেককে সালাহুদ্দীন আইউবী গুপ্তভাবে খুন করিয়েছে। তাদের একটি মাত্র অপরাধ ছিল, তারা ছিলেন রণনায়ক হিসেবে সালাহুদ্দীন অপেক্ষা যোগ্য। সালাহুদ্দীন প্রচার করেছেন, গাদ্দারী ও বিদ্রোহের অপরাধে খলীফা তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।’ বলল রজব।

    ‘মিথ্যে— নির্জলা মিথ্যে। সালাহুদ্দীন আমাকে বলেছিল ঠিক যে, এরা বিশ্বাসঘাতক। আমি তাকে বলেছিলাম, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন কর, আদালতে মোকদ্দমা দায়ের কর।’ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন খলীফা।

    ‘আর মোকদ্দমা না চালিয়ে তিনি নিজেই সেই রায় প্রদান করেন, খেলাফতের মোহর ছাড়া যার কোন কার্যকারিতা নেই। ঐ হতভাগা সালারদের অপরাধ ছিল, তারা খৃষ্টান সম্রাটদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খৃষ্টানদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেশ ও দশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। বললে হয়ত আপনি বিশ্বাস করবেন না; কিন্তু বাস্তব সত্য হল, খৃষ্টানরা আমাদেরকে শত্রু মনে করে না। নুরুদ্দীন জঙ্গী আর শেরকোহর আক্রমণ-আশঙ্কায়ই কেবল তারা আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে আছে। এখন শেরকোহ নেই ঠিক, কিন্তু তার স্থান দখল করেছে সালাহুদ্দীন আইউবী। এ লোকটি মূলত শেরকোহরই হাতে গড়া। শেরকোহ তার সারাটা জীবন খৃষ্টানদের সঙ্গে লড়াই করে, ইসলামের দুশমন সৃষ্টি এবং দুশমনের সংখ্যাই শুধু বৃদ্ধি করেছে। সালাহুদ্দীনের স্থলে অন্য কেউ যদি মিসরের গভর্নর হত, তাহলে খৃষ্টান সম্রাটগণ আজ আপনার দরবারে বন্ধুরূপে আগমন করতেন। হত্যা-লুণ্ঠন হত না, আমাদেরকে এতগুলো প্রবীণ ও সুদক্ষ সেনানায়ক হারাতে হত না।’ বলল রজব।

    ‘কিন্তু রজব! খৃষ্টানরা যে রোম উপসাগর থেকে আক্রমণ করল?’ বললেন খলীফা।

    ‘এর জন্যেও সালাহুদ্দীনই দায়ী। তিনিই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন, যা প্রতিহত করার জন্যে খৃষ্টানরা আক্রমণ করতে বাধ্য হয়েছিল। সমস্যা যেহেতু তারই সৃষ্টি, তাই আক্রমণ যে হবে, তা পূর্ব থেকেই তার জানা ছিল। সেজন্য তিনি আগাম প্রতিরোধ ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন। অন্যথায় তিনি কি করে জানলেন যে, রোম উপসাগর থেকে খৃষ্টানরা আক্রমণ করবে? তিনি তো অন্তর্যামী নন! এটি ছিল তার সাজান নাটক, যে খেলায় এতীম হল হাজার হাজার শিশু, বিধবা হল অসংখ্য নারী। আর তার এ কাজে আমার উপস্থিতিতে আপনি তাকে বাহবা দিয়েছিলেন। তারপর তিনি সুদানী ফৌজকে— যারা ছিল আপনার একান্ত অনুগত— সামরিক মহড়ার নাম করে রাতের বেলা বাইরে নিয়ে যান এবং অন্ধকারে তাদের উপর তার নতুন বাহিনীকে লেলিয়ে দেন। পরে প্রচার করেন যে, নাজির ফৌজ বিদ্রোহ করেছিল; তাই তাদের এই পরিণতি বরণ করতে হয়। আপনি এত সরল-সহজ মানুষ যে, সালাহুদ্দীনের এই চাল আর প্রতারণা বুঝে উঠতে পারলেন না!’ বলল রজব।

    উম্মে আরারাহ খলীফার বুকে মাথা রেখে এমন কিছু অশ্লীল আচরণ করে যে, খলীফার তীব্র মদের নেশা জেগে ওঠে। খলীফা এখন মেয়েটির হাতের খেলনা। রজবের কোন কথাই যেন শুনতে পাচ্ছেন না তিনি। রূপসী কন্যা উম্মে আরারাকে নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে খলীফার সব ভাবনা।

    এই ফাঁকে সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি নিতান্ত অমূলক আরেকটি আঘাত হানে রজব। বলে— ‘সালাহুদ্দীন আরও একটি প্রতারণামূলক আচরণ শুরু করেছেন। সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ধরে এনে তিনি তাদের উপভোগ করেন। কয়েকদিন আমোদ-ফুর্তি করে এই বলে তাদের খুন করান যে, এরা খৃষ্টানদের গুপ্তচর। দেশবাসীর মনে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে রেখেছেন, খৃষ্টানরা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য তাদের মেয়েদেরকে মিসর প্রেরণ করেছে। খৃষ্টানরা কুলটা নারীদের লেলিয়ে দিয়ে এই জাতির চরিত্র নষ্ট করছে। আমি তো এদেশেরই নাগরিক। দেশে কী ঘটছে সবই আমার জানা। দেশের পতিতালয়গুলোতে যারা বেশ্যাবৃত্তি করছে, তারা মিসর ও সুদানী নারী। দু চারজন খৃষ্টান থাকলেও তারা গুপ্তচর নয়, এটা তাদের পেশা।’

    ‘হেরেমের তিন-চারটি মেয়েও আমাকে জানিয়েছে, সালাহুদ্দীন আইউবী ডেকে নিয়ে তাদের সম্ভ্রমহানি করেছে।’ বলল উম্মে আরারাহ।

    শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন খলীফা। বললেন— ‘আমার হেরেমের মেয়ে? তুমি এতদিন আমাকে বলেনি কেন?

    ‘বলিনি তার কারণ, এই অসুস্থ অবস্থায় আপনি সে দুঃসংবাদ সহ্য করতে পারতেন না। এখন আমার অলক্ষ্যে কথাটা মুখ থেকে ফস্‌কে বেরিয়ে গেল। হেরেমে আমি এমন ব্যবস্থা করে রেখেছি যে, এখন আর কোন মেয়ে কারও আহ্বানে মনে চাইলেই বাইরে যেতে পারবে না।’ জবাব দেয় উম্মে আরারাহ।

    ‘এক্ষুনি ডেকে এনে ওকে আমি বেত্রাঘাত করব। আমি এর প্রতিশোধ নেব!’ বললেন খলীফা।

    ‘প্রতিশোধ নিতে হবে অন্যভাবে। বর্তমানে দেশের জনসাধারণ সালাহুদ্দীনের পক্ষে। এভাবে সরাসরি প্রতিশোধ নিতে গেলে মানুষ আপনার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠবে।’ বলল রজব।

    ‘তবে কি আমাকে এই অপমান চোখ বুজে সহ্য করতে হবে?’ বললেন খলীফা।

    ‘না। আপনার অনুমতি ও সহযোগিতা পেলে আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে এমনভাবে গায়েব করে ফেলতে পারি, যেভাবে গুম করেছিলেন তিনি আমাদের প্রবীণ সালারদের।’ বলল রজব।

    ‘এ কাজ তুমি কিভাবে করবে?’ জিজ্ঞেস করেন খলীফা।

    ‘এ কাজ আমি হাশীশীদের দ্বারা করাব। তবে তারা বিপুল অর্থ দাবি করছে।’ বলল রজব।

    ‘টাকা যত প্রয়োজন আমি দেব। তুমি আয়োজন সম্পন্ন কর।’ বললেন খলীফা।

    ○             ○             ○

    দুদিন পর জুমার নামায। ঈসা এলাহকারী কায়রোর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতীবকে বলে দিয়েছেন, যেন তিনি জুমার খুতবায় খলীফার নাম উল্লেখ না করেন।

    তুরস্কের অধিবাসী এ খতীবের নাম ইতিহাসে উল্লেখিত হয়নি। সাধারণ্যে তিনি “আমীরুল ওলামা” উপাধীতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজেও বেশ কবার খুতবা থেকে এ বিদআত তুলে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এক বর্ণনায় এমনও পাওয়া যায় যে, সালাহুদ্দীন আইউবী এ খতীবেরই পরামর্শে খুতবা থেকে খলীফার নাম তুলে দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তবে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কথোপকথনের যে সব দলীল-দস্তাবেজ পাওয়া যায়, তাতে প্রমাণিত হয়, এ সাহসী পদক্ষেপের কৃতিত্বের দাবিদার তিনিই।

    শুক্রবার দিন। খতীব আমীরুল ওলামা খুতবা পাঠ করলেন; কিন্তু খলীফার নাম উল্লেখ করলেন না। মসজিদের মধ্যম সারিতে উপবিষ্ট সুলতান সালাহুদ্দীন। খানিক দূরে অপর এক সারিতে বসা আছেন আলী বিন সুফিয়ান। জনগণের প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করার জন্য জনতার মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছেন সুলতান সালাহুদ্দীনের অপরাপর উপদেষ্টামণ্ডলী ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তাবৃন্দ। আলী বিন সুফিয়ানের বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সদস্যও মসজিদে উপস্থিত। খুতবা থেকে খলীফার নাম মুছে ফেলা একটি শক্ত পদক্ষেপই নয়, খেলাফতের আইনে গুরুতর অপরাধও বটে। সুলতান সালাহুদ্দীনের নির্দেশে সে অপরাধই সংঘটিত হল আজ। খলীফা আল-আজেদ ব্যতীত খেলাফতের বহু কর্মকর্তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করলেন সে অপরাধ কম।

    নামায শেষ হল। মুসল্লীরা যার যার মত চলে গেল। উঠে দাঁড়ালেন সুলতান সালাহুদ্দীন। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন খতীবের কাছে। সালাম মোসাফাহার পর বললেন— ‘আল্লাহ আপনার সহায় হোন মহামান্য ইমাম!’

    খতীব আমীরুল ওলামা বললেন— ‘এ নির্দেশ জারি করে আপনি জান্নাতে নিজের ঠিকানা করে নিলেন।’

    মসজিদ থেকে বেরুতে উদ্যত হন সালাহুদ্দীন। কয়েক পা অগ্রসর হয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যান। আবার খতীবের নিকট গিয়ে বললেন— ‘খলীফার পক্ষ থেকে যদি আপনার ডাক আসে, তাহলে সরাসরি তার কাছে না গিয়ে আপনি আমার কাছে চলে আসবেন। আমি আপনাকে খলীফার নিকট নিয়ে যাব।’

    ‘মোহতারাম আমীরে মেসের! যদি গোস্তাখী মনে না করেন, আমি বলব মিথ্যা ও শেরেকের বিরুদ্ধে কাজ করা ও সত্য বলা যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে সে অপরাধের শাস্তি আমি একাই ভোগ করব। এর জন্য আমি আপনাকে কষ্ট দিতে যাব না। খলীফা যদি আমাকে তলব করেন, আমি একাই গিয়ে তার কাঠগড়ায় হাজির হব। মূলত আপনার নির্দেশে নয়— আল্লাহর হুকুমে আমি খুতবা থেকে খলীফার নাম বাদ দিয়েছি। আল্লাহ আমার সহায় হোন।’ বললেন খতীব।

    ○             ○             ○

  • নীলাঙ্গুরীয়

    নীলাঙ্গুরীয়

    ‘নীলাঙ্গুরীয়’ বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৫৭ সালের মাঘ মাসে। প্রকাশক শ্রীশচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রকাশ ভবন, ১৫, বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলকাতা ৭৩। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন শ্রীমনোজ বিশ্বাস। মুদ্রাকর শ্রীঅশোককুমার পাঁজা, শিবদুর্গা প্রিণ্টার্স, ১৫১ রামদুলাল সরকার ষ্ট্রীট, কলকাতা ৭০০ ০০৬। উপন্যাসটির উৎসর্গ লেখা হয়েছিল— “আমার স্নেহভাজন কনিষ্ট শ্রীহরিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে”। এই উপন্যাস সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ‘আনিসুজ্জামান’ লেখেন—

    “হাস্যরসের ছোটগল্পের পশরা নিয়ে ১৯৩০-এর দশকে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৬-১৯৮৭)। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গিয়েছিল যে, হাস্যরস তাঁর রচনার মূল উপাদান হলেও তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কারুণ্য। জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি। মানুষের স্বভাবজ খেয়ালিপনা ও আচরণগত অসংগতিতে যেমন তিনি হাসির খোরাক পেয়েছেন, তেমনি জীবনের নানা ক্ষেত্রে বিচিত্র দ্বন্ধ-সন্ধি থেকে উচ্ছ্বসিত বেদনারও সন্ধানলাভ করেছেন। তাঁর রচনায় তাই হাস্য ও করুণের এমন মেশামেশি। তাঁর অবিস্মরণীয় চরিত্র রাণু যেমন পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার নিত্যনতুন ফন্দি এঁটে আমাদের হাসির উদ্রেক করে, তেমনি তার বাল্যবিবাহের কালে শৈলেনকাকার কাছে আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার করে আমাদের চোখ অশ্রুসজল করে দেয়।

    নীলাঙ্গুরীয় (১৯৪২) বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস। এর রচনাপ্রণালি কিন্তু সম্পূর্ণতই ভিন্ন। উপন্যাসটির উপজীব্য প্রেম। কিন্তু উপন্যাসের প্রথমেই নায়কের জবানিতে লেখক প্রশ্ন উত্থাপন করেন : ‘ভালবাসা কি সব সময়েই তাহার সেই চিরন্তন রূপেই দেখা দিবে?—সেই আবেগ-বিহ্বল কিংবা অশ্রুসজল? ঘৃণা কি সব সময়েই ঘৃণা?’ তারপর কাহিনির কথক জানিয়ে দেন : ‘ভালবাসায় গরল থাকিতে পারে। অন্তত আমার বেলা তো ছিল।’ উপন্যাসটি এই গরলামৃতের কাহিনি। বস্তুত অন্যত্রও বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় প্রেমকে দেখেছেন একটি জটিল বৃত্তিরূপে। তার সঙ্গে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, পীড়নস্পৃহা—সবই জড়িয়ে থাকতে পারে।

    প্রায় সকল বিষয়ে উদাসীন ব্যারিস্টার রায়ের কনিষ্ঠ কন্যা তরুর গৃহশিক্ষকরূপে এই অভিজাত পরিবারে শৈলেনের আশ্রয়লাভ ঘটে। তরুর দিদি মীরার তত্ত্বাবধানের মধ্যে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক আভাসিত হলে শৈলেনের মন বিদ্রোহ করে। কিন্তু অচিরেই সে মীরার রহস্যপরায়ণ আচরণের মধ্যে প্রেমের দ্যোতনা উপলব্ধি করে এবং মীরার প্রতি নিজের আকর্ষণও সবিস্ময়ে আবিষ্কার করে। দুজনের সামাজিক অসমকক্ষতা সম্পর্কে দুজনেই সচেতন। তার উপরে মীরার প্রকৃতির মধ্যে আছে আভিজাত্যের অভিমান আর শৈলেনের চারপাশে রয়েছে নিজের অবস্থাবৈগুণ্যজনিত আত্মরক্ষা প্রবৃত্তির স্বরচিত দেওয়াল। ফলে আবেগ ও উচ্ছ্বাসের জায়গা প্রায়ই নিয়ে নেয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। নায়ক-নায়িকার অসাধারণ সংযম ও আত্মদমন উভয়ের মধ্যে চিরবিচ্ছেদ ঘটিয়ে উপন্যাসকে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ দান করে। মীরার সঙ্গে তার সম্পর্ককে শৈলেন বারংবার ‘ঘৃণায়-মেশানো ভালবাসা’ বলে উল্লেখ করেছে—তা নীলকান্তমণির মতোই নীল, তার মতোই খাঁটি। সে এই গরলামৃত পান করেছে, জন্মজন্মান্তর ধরে সেই গরলামৃত পান করার কামনাই ব্যক্ত করেছে—মীরার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেনি।

    মীরার চরিত্র-প্রসঙ্গে শৈলেন বলেছে :

    ওর এই খুবই কাছে আসাটাকে আমি যেমন প্রার্থনা করি, তেমনি আবার সন্দেহের চক্ষেও দেখি,—লক্ষ্য করিয়াছি মীরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে যখন খুব কাছে আসিয়া পড়ে তাহার পর হইতে অতি সামান্য একটা ঘটনাকে উপলক্ষ করিয়া—কখন বা উপলক্ষ না থাকিলেও—ঝপ করিয়া দূরে সরিয়া যায়। এই সময় জাগে তাহার সেই নাসিকার কুঞ্চন। আমাদের দু-জনের দূরত্বটা—যাহা মীরাই মিটাইয়া আনে—আবার স্পষ্ট হইয়া উঠে ৷

    মীরার আচরণের ব্যাখ্যায় তার মা বংশগতির প্রভাবের কথা বারবার বলেছেন। সেটাই হয়তো সব নয়। তার হৃদয়াবেগ ও ঔচিত্যবোধের স্পষ্ট দ্বন্দ্বের মধ্যে অনেকখানি দুর্জ্ঞেয়তা রয়ে গেছে। শৈলেনকে সে কেমনভাবে দেখেছে, তা আমরা জানতে পারি না। কেননা গোটা উপাখ্যানই শৈলেনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা।

    উপন্যাসটির তিনটি ভাগ : ‘মীরা’, ‘মীরা-সৌদামিনী’ ও ‘সৌদামিনী’। সৌদামিনী অনিল ও শৈলেনের বাল্যবন্ধু। দুজনের একজনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা গভীরতর হতে পারত। অনিল যে তাকে কামনা করেছিল, তা বোঝা যায়। শৈলেন বরঞ্চ ছিল কিছুটা উদাসীন। কিন্তু উদাসীনের প্রতিই সৌদামিনীর আকর্ষণ ছিল অধিক। একমাত্র অভিভাবক দিদিমার মৃত্যুর পরে ভাগবত হালদার উপযাচক হয়ে সৌদামিনীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে—তা কেবল পরোপকারবৃত্তির বশবর্তী হয়ে নয়। পরে সে সৌদামিনীর বিয়ে দিয়ে দেয় তার বৃদ্ধ কুটুমের সঙ্গে। অনিল তখন স্ত্রীপুত্র নিয়ে সংসারী, কিন্তু সৌদামিনীকে ভোলেনি। সে তার বৈধব্য কামনা করে এবং — মীরার প্রতি শৈলেনের ভালোবাসা নিষ্ফল হবে ধরে নিয়েই—সে শৈলেনকে বলে বিধবা সৌদামিনীকে বিয়ে করতে, নইলে তাকে আবার ভাগবতের নরকেই ঢুকতে হবে। সৌদামিনীর সঙ্গে আলাপে শৈলেন টের পায় যে, তার প্রতি সৌদামিনীর আকর্ষণ এখনো অটুট। সৌদামিনী যথার্থই বিধবা হয়, ভাগবতের আশ্রয় থেকে তার উদ্ধার হয় না, পরে সে চলে যায় সিনেমার জগতে—অনিলের কাছে তা মরণসমান। শৈলেন বলেছে, সৌদামিনী তাকে খাঁটি সোনা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সে তা নিতে পারেনি, কেননা নিখাদ সোনা নিতে হয় নিখাদ সোনা দিয়েই, শৈলেনের সুবর্ণ তো আগেই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল—মীরাকে। মীরার ভালোবাসা যে কী, সে-ব্যাখ্যা তো আগেই দেওয়া হয়েছে। মীরা শৈলেনের কাছে অনুযোগ করেছিল : ‘বলুন… আমার সর্বনাশের মধ্যে থেকে আমায় কেন জোর ক’রে টেনে নিলেন না?… কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শৈলেন আগেই দিয়েছিল : ‘আমি তোমায় সুখী করতে পারতাম না, কিন্তু আমি দুর্বল, মন স্থির করে উঠতে পারছিলাম না।’ সৌদামিনীও হয়তো একই প্রশ্ন করতে পারতো শৈলেনকে। শৈলেন হয়তো তাকে রক্ষা করার চেষ্টা না করার অপরাধ স্বীকার করে।

    নীলাঙ্গুরীয় তবু ত্রিভুজ প্রেমের উপন্যাস নয়, একান্তই মীরা-শৈলেনের প্রেমের কাহিনি। সৌদামিনীর মধ্য দিয়ে প্রেমের অন্য একটি রূপ প্রকাশিত হয়েছে মাত্র। নায়ক-নায়িকা ছাড়াও সৌদামিনী, অনিল, অম্বুরী, সরমা, তরুর চরিত্রাঙ্কনে সিদ্ধহস্তের ছাপ বিদ্যমান। মিস্টার রায় কতকটা ছাঁচে ঢালা, তবে সর্বত্র অসাধারণত্বের পরিচয় পাওয়া যায় অপর্ণা রায়ের চরিত্রে। উপন্যাসের বর্ণনা আগাগোড়াই সংযত। তবে আবেগের যথাযথ স্থানও আছে এতে। প্রায় নিরুদ্দিষ্ট পুত্রকে নিয়ে অপর্ণা দেবীর আবেগ, বৃদ্ধা ভুটানির মর্মন্তুদ হাহাকার, শৈলেনের অন্তর্জগতের কোলাহল অনিলের অসহায়ত্ববোধ—এসব তার উদাহরণ। শৈলেনের মর্মভেদী কৌতুক উপন্যাসের ট্রাজেডিকে গভীরতা দিতে সাহায্য করেছে।

    নীলাঙ্গুরীয় কেবল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নয়, বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

    উৎসর্গ

    আমার স্নেহভাজন কনিষ্ঠ

    শ্রীহরিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    ‘নীলাঙ্গুরীয়’ বইখানির একটু ইতিহাস আছে। শ্রাবণ, ১৩৪৬-এর শনিবারের চিঠিতে “কশ্চিৎ প্রৌঢ়” ‘ভালবাসা’ শীর্ষক একটি রচনা প্রকাশিত করেন। লেখক তাহাতে ভালবাসার নানা বৈচিত্র্য সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া শেষে তাঁহার পাঠকের নিজের নিজের অভিমত জানাইবার জন্য আহ্বান করেন।

    সকলেই স্বীকার করিবেন যে, মানুষের এই মনোবৃত্তিটি উপরে উপরে মোটামুটি সবল এবং নিরীহ মনে হইলেও আসলে অত্যন্ত জটিল। ‘কশ্চিৎ প্রৌঢ়ে’র আহ্বানে আমি ‘ভালবাসা’ নামক একখানি গল্প ‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশিত করি; যাহা পরে ‘বসন্ত’ নামক গল্প সংগ্রহে বাহির হইয়াছে। তাহাতে দেখিয়াছি ভালবাসার সঙ্গে মার খাওয়াইবার ইচ্ছা থাকাও বিচিত্র নয়।

    বৃত্তিটির জটিলতার আরও একটা দিক দেখাইবার ইচ্ছা থাকায় এই বইখানির অবতারণা। কতদূর সফল হইলাম বিদগ্ধ পাঠক বিচার করিবেন। আর একটা কথা,—‘নীলাঙ্গুরীয়’ কৌতুক রসের লেখা নয়। গোড়া থেকেই একটা অন্যবিধ প্রত্যাশায় থাকিয়া পাঠে বাধা জন্মাইতে পারে বলিয়া এটুকু বলিয়া দেওয়া প্রয়োজন মনে করিলাম।

    বইখানির প্রুফ দেখিয়া দিয়া সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমার চিরঋণী করিয়াছেন।

    জন্মাষ্টমী
    (১৩৪১)
    ব. ভ. ম
  • নীলাঙ্গুরীয় চলচ্চিত্র

    নীলাঙ্গুরীয় চলচ্চিত্র

    গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ‘নীলাঙ্গুরীয়’ উপন্যাসের একটি চলচ্চিত্র2 নির্মিত হয়েছিল ১৯৪৩ সালে; প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ধীরাজ ও যমুনা। এই চলচ্চিত্রে মোট পাঁচটি গান ছিল। চলচ্চিত্রটি গৃহিত হয়েছিল ‘ইন্দ্রপুরী ষ্টুডিওতে’ পরিবেশক ছিল ‘ইষ্টার্ণ টকীজ লিমিটেড্, কলকাতা।

    চরিত্র লিপি

    মি. জি, পি, রায় : ছবি বিশ্বাস
    অনিল : মাণিক
    মিসেস অপর্ণা রায় : দেববালা
    সৌদামিনী : রেণুকা
    মীরা : যমুনা
    অম্বুরী : মলিনা
    তরু : লতিকা
    সরমা : পূর্ণিমা
    শৈলেন : ধীরাজ
    রাজু : ইন্দু
    নিশীথ : জহর
    ইমানুয়েল : কানু

    অন্যান্য ভূমিকা : গায়ত্রী রায়, কৃষ্ণা, বেলা, বিভূতি গাঙ্গুলী, হরিমোহন, সুশীল রায়, রতন, নরেশ রায়, শ্যাম লাহা, কমল মিত্র, সুধীর মিত্র, সুধাংশু, রহমন, আশু বোস প্রভৃতি।

    নৃত্য পরিচালনা : রতন সেনগুপ্ত
    চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায়
    কাহিনী : বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    গীতকার : শৈলেন রায়
    সুরশিল্পী : সুবল দাশগুপ্ত
    চিত্র শিল্পী : অজয় কর
    শব্দানুলেখন : গৌরদাস
    রসায়নাগারিক : ধীরেন দাশগুপ্ত
    চিত্র সম্পাদক : সন্তোষ গাঙ্গুলী
    শিল্প নির্দেশক : তারক বসু
    ব্যবস্থাপক : সুধীর সরকার
    স্থির চিত্রশিল্পী : গোপাল ভৌমিক; সত্যেন সান্যাল
    প্রয়োজক : সুরেন্দ্র রঞ্জন সরকার

    কাহিনী

    নীলাঙ্গুরীয়র নীল দর্পণের দিকে চাইলে শৈলেন তার সারা জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়! নীল হীরকের মায়া-মুকুরে তার অতীতের দিনগুলি একটার পর একটা এসে ভিড় ক’রে দাঁড়ায়। শৈলেনের মানস-চক্ষের সম্মুখ দিয়ে ভেসে চলে তারই হারানো দিনের অবিস্মরণীয় চলচ্ছবি। — সেই ছায়া-ঢাকা পাখী-ডাকা সাঁতরাগ্রাম—যেখানে তার শৈশব অতিবাহিত হয়েছে,—সেই আঁকা-বাঁকা পথ ঘাট—ছায়াচ্ছন্ন আম কাঁঠালের বন— নির্জ্জন নদী-সৈকত—শাপলা ঘেরা পানায়-ঢাকা গাঁয়ের দীঘি—আরও কত কি! কত কি মনে পড়ে! মনে পড়ে বাল্য-সহচর অনিলকে, – মনে পড়ে শৈশবের লীলা সঙ্গিনী সৌদামিনীকে—এক ঝলক বিদ্যুতের মতই সে তার মনের এক প্রান্ত হ’তে আর এক প্রান্ত অবধি আলোক রেখা টেনে যায়!

    আর—সব স্মৃতিকে নিষ্প্রভ ক’রে যে এসে দাঁড়ায়, এক জলন্ত নক্ষত্রের মত—সে হচ্ছে মীরা।

    বিদ্যার্থীর জীবনযুদ্ধ কাকে বলে শৈলেন তা ভাল করেই জানে—কারণ সে দরিদ্র। আট দশটি ছেলে পড়িয়ে—ক্লান্ত অবসন্ন দেহ-মনে শৈলেন যখন একটার পর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার বেড়া ডিঙ্গিয়ে যাচ্ছিল—তারই একটি স্মরণীয় দিনে ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে চল্‌ল—কলকাতার বিখ্যাত ব্যারিষ্টার মিঃ রায়ের প্রথমা কন্যা মীরার সান্নিধ্যে। মীরার ছোট বোন তরুর শিক্ষকতার ভার পড়ল শৈলেনের ’পর।

    আজকের সভ্যতা, মানুষ আর মানুষের মাঝখানে অলঙ্ঘ্য প্রাচীর গ’ড়ে তুলেছে!—এ প্রাচীর ভাঙ্গতে মানুষ যতই চেষ্টা করে—প্রাচীর ততই গ’ড়ে ওঠে—তাই শৈলেন আর মীরার সান্নিধ্যকে সান্নিধ্য বলা চলে না। সেখানেও ঐ একই ব্যবধানের প্রাচীর দুজনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।—মীরার আছে আভিজাত্য, শৈলেনের যা নেই। —মীরা বিত্তশালিনী, শৈলেন কপর্দকহীন—বিশেষ ক’রে মীরারই আশ্রিত সে! — পরিশ্রমের বিনিময়ে হাত পেতে পারিশ্রমিক তাকে নিতে হয় যেমন এ বাড়ীতে তারই মত আরও নিয়ে থাকে— রাজু বেয়ারা বা ইমানুয়েল মালী।

    কিন্তু পঞ্চশর হাতে নিয়ে মনের পথে পথে যে দেবতাটির আসা যাওয়া— মানুষের গড়া বিভেদের প্রাচীর তার জন্য নয়।

    ব্যারিষ্টারের সংসারে একটু বৈচিত্র্য আছে! সাহেব বলতে যা বোঝায় গুরুপ্রসাদ রায় ঠিক তাইই—কিন্তু তাঁর স্ত্রী অর্পণা দেবীকে ভট্টচায্যি গিন্নি বললেও অতিশয়োক্তি হয় না। অথচ মিঃ রায় বিলেত যাবার আগে নাকি অৰ্পণা দেবী পুরোদস্তুর মেম সাহেবই ছিলেন। স্ত্রীর এই বিপরীত আচার বস্ত্রহারে গুরুপ্রসাদ বেদনা অনুভব করেন। অর্পণা দেবীর ব্যথাও কম নয়!— একে স্বামীর রুচি তিনি মেনে নিতে পারেন না; দ্বিতীয়তঃ তাঁর একমাত্র ছেলে বিলেতে নিরুদ্দিষ্ট, — বাগদত্তা সরমা আজও তার পথ চেয়ে!

    শৈলেন এখন ব্যারিষ্টার পরিবারে অনেকটা স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে! ব্যারিষ্টার গুরুপ্রসাদ রায় তাঁকে স্নেহের চোখে দেখেন। মীরার মা অর্পণা ও তাকে ছেলের মত স্নেহ করেন তরু ত মাষ্টারমশাই বলতে অজ্ঞান। আর মীরা! — মীরাকে সে বুঝতে পারেনি। যেন তার চোখে হেঁয়ালী—সে যেন দেখা না- দেখায় মেশা!—মীরার চোখে মাঝে মাঝে সে দেখে অনুরাগের আভাষ—কল্পনাতীত আশায় মন তার ভরে উঠে—কিন্তু স্বপ্ন তার ভেঙ্গে যায় যখন দেখে সেই দু’টা চোখেই বিপরীত দৃষ্টি-জ্বালা!— সে যেন বিদ্রূপের কশাঘাত —শৈলেনকে জর্জরিত করে তোলে!—তবু মীরার সঙ্গে তাকে পার্টিতে যেতে হয়—মোটারে বেরুতে হয়— মীরার খেয়ালের অন্ত নেই। শৈলেন বুঝতে চায় মীরা অন্য জগতের —যে জগতে ভীড় করে আছে নিশীথ ও আরো অনেকে। শৈলেন যে জগতের মীরা তার কেউ নয়। শৈলেনের মনে ধিক্কার জাগে—তার মনে হয় মীরার চোখে সে যেন এক জীবন্ত ব্যঙ্গচিত্র—যেমন ঐ ইমানুয়েল মালী জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে এক মেম-সাহেবের স্বপ্নে—যাকে জীবনে কখন পায়নি বা পাবে না। দূরের চাঁদকে হাতে ধরবার জন্যে মানুষের এ-কি পাগলামী! ইমানুয়েল আর নিজের মধ্যে সে আর পার্থক্য খুঁজে পায় না। এদিকে মিষ্টার রায় শৈলেনকে বিলেত পাঠাতে চান; শৈলেন আবার আশার স্বপ্ন দেখে। মীরাকে সে আপনার করে ভাবতে চায়, কিন্তু কি যেন একটা বাধা তাকে নিরাশ করে তোলে। মীরা কাছে এসে দূরে সরে যায়। সে যেন একটি কাঁটায় ভরা ফুল যার গন্ধ মাদকতা জাগিয়ে তোলে, অথচ হাত বাড়িয়ে তুলতে গেলেই বিপদ!

    অনিলের চিঠি পেয়ে সে একদিন গায়ে ফিরল কদিনের ছুটি নিয়ে—খানিকটা আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব ভুলতে–খানিকটা প্রাণের তাগিদে।

    অনিল এখন রীতিমত সংসারী। অনিলের স্ত্রী অম্বুরী (একথা এখানেই বলে রাখা দরকার যে এ নামটি শৈলেনের দেওয়া)—অম্বুরী তামাকের ধোঁয়ার মতই সুবাসে স্নিগ্ধ, মনোরমা—যাকে বলে, সত্যিকারের গাঁয়ের বধু। এদের মধ্যে এসে দিনগুলি শৈলেনের বেশ কেটে যাচ্ছিল; এমন সময় বহুদিন পরে আবার শৈশব-সঙ্গিনী সৌদামিনীর সঙ্গে দেখা। সৌদামিনী এখন এক শ্মশান-যাত্রী অতি বৃদ্ধের ঘরণী; অথচ এই সৌদামিনীকেই একদিন সে……সৌদামিনীর জন্যে তার মন বেদনায় করুণায় ভরে উঠলো! —এই সেই সৌদামিনী! অদৃষ্টের একি পরিহাস!

    সঙ্গে সঙ্গে আর একটি অভাবনীয় ঘটনা ঘটলো—সেটি হচ্ছে তরুকে সঙ্গে নিয়ে আকস্মিক মীরার সাঁতরায় আবির্ভাব। এ কোন আকর্ষণ—যা আজ মীরাকে তার কাছে টেনে এনেছে। শৈলেনের মনে নতুন করে আশার দোলা লাগে।

    মীরা চলে গেল। অনিল আর অম্বুরী শৈলেনকে পরিহাসে উত্তক্ত করে তুল্‌ল। শৈলেনের অন্তরের যা একান্ত গোপনীয় তা আর গোপন রইল না। কদিন পরে শৈলেন ফিরে গেল কলকাতায় কিন্তু তার মনে কাঁটার মত বিঁধে রইল সৌদামিনীর স্মৃতি। সৌদামিনীর এই দুরদৃষ্টের জন্য সেও কি দায়ী নয়? কিন্তু মীরার তুলনায় সৌদামিনী? শৈলেনের মনে নতুন করে দ্বন্দ্ব বাধল।

    কলকাতায় ফিরে শৈলেন— মীরাকে আবার নতুন রূপে দেখল। এবার তার অনুরাগ চোখে যেন দাক্ষিণ্যের সজল ছায়া—অনুরাগের নতুন মায়া। কিন্তু অপটু শৈলেন—দান চেয়ে নিতে জানে না—আভিজাত্য ভুলে মীরাও এগিয়ে আসতে পারে না। অনুরাগ থেকে অভিমান জাগে—অভিমান থেকে ঘৃণা। সুধার পাত্র গরলে ভরে ওঠে। কাছে এসে দূরে সরে যাওয়া—ধরা দিয়ে ধরা না দেওয়া শুধু এই নিয়েই দিন কেটে যায়—মীরার মনে জাগে আত্মঘাতী ক্রোধ। শৈলেনকে অপমান করবার জন্যেই নিশীথকে প্রশ্রয় দেয়—নিশীথ দেখে ফুলশয্যার স্বপ্ন—মীরার চোখে নেমে আসে আসন্ন মৃত্যুর ছায়া!—নিশীথ আর মৃত্যু—মীরার কাছে দুইই এক।

    এমন সময় অনিলের চিঠি এল— “সৌদামিনী বিধবা হয়েছে।”—শৈলেন আবার ছুটলো সাঁতরায়। অনিল বলল—তোকেই গ্রহন করতে হ’বে সদুকে। ভাগবত হালদারের অত্যাচারে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল—আমি এ যাত্রা কোনও রকমে বাঁচিয়েছি। কিন্তু এবার তুই যদি না নিস্ তা’ হ’লে সদুকে আর বাঁচান যাবে না।” শৈলেন জবাব দিল,— “ভেবে দেখি।” মীরার দাবীও যে তার কাছে আজ কম নয়। সদুকে সে বলে এলো অপেক্ষা করতে।

    এরপর কলকাতায় আর একদিনের কথা বলছি। মীরার চোখে অবিরল অশ্রুধারা ঝরে পড়ছে আর শৈলেন তার পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছে। মীরা কেঁদে বলছে, “আমি নিজেকে ঠিক করে তুলে ধরতে পারিনি আপনার সামনে, কিন্তু আপনি কেন চিনে নিলেন না।—বাইরে যা পেলেন মীরা সত্যিই কি তাই?” এ প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় মীরা শৈলেনের দিকে ব্যাকুল চোখে চেয়ে রইল।

    মীরা, সৌদামিনী দু’জনেই তার প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছে—এ প্রতীক্ষার শেষ কোথায়?

    গান

    —এক—

    আমি দেখেছি নয়ন মেলে

    পাথীর কুজনে সুষমা জাগায়ে

    (মোর) সফল সাধনা এলে।

    তব আঁখির নীবিড়-নীলে

    মোর নীল নভ ছেয়ে দিলে।

    মোরে মলয়ার সাথে মৃদুল আভাষে

    অবেশে ছুঁয়ে যে গেলে।

    তোমারি স্বপনে রচিলে—

    মোর মনেরি ফুলের বন

    (তব) কমল-আসন পাতিলে—

    (ওগো) যেখানে আমার মন।

    (মোর) প্রেমের মুকুতা দলে—

    মালা গাঁথিয়া পরিলে গলে,

    তুমি নিজের অনলে না জেনে দিয়েছ

    মোর মণি-দ্বীপ জ্বেলে।

    — দুই —

    জানি না কখন, হারায়েছি মন

    জানি না রে,

    আপনি সাধিয়া দিয়েছি তাহারে

    আপনারে, মোর আপনারে।

    ব্যাথা হ’য়ে সে যে বুকে জাগে

    ভালো লাগে তবু ভাল লাগে,

    পরাজয় মানি সে বিজয়ী লাগি

    গাঁথি শুধু জয় মালারে।

    হৃদয় মাঝারে চাহিয়া দেখেছি

    সে যে অন্তরময়

    তারি লাগি গায় তরু শাখে পাখী

    ফোটে ফুল বনময়।

    (তবু) কাছে এলে যাই দূরে সাধি

    দুরে গেলে হায় ফিরে কাঁদি।

    একি অনুরাগ? একি অভিমান?

    একি মোর ভালবাসারে!

    —তিন—

    এল মহুয়া বনে কোন বাঁশুরিয়া,

    সে যে বাঁশীর সুরে করে আকুল হিয়া

    বুঝি মোহনিয়া, মোর মোহনিয়া।

    একে চৈতি-চাঁদের রাতে পেল হাসি

    তায় মধুর নেশার বাজে বঁধুর বাঁশী

    আহা নিশুত রাতে তার-সুরের টানে

    বন-পাপিয়া গায়লো ঐ পিয়া পিয়া—

    এল মোহনিয়া মোর মোহনিয়া।

    আহা চাঁদের সাথী মোর চিকন্ কালা

    তার শুন্‌বো লো বাঁশী, আঁখি মান্‌বে না ঘুম,

    মোরা নাচ্‌বো তালে তালে বাজ্‌বে নূপুর

    রুম্ ঝুম্, রুম্ ঝুম্ ওলো রুম্ ঝুম্, রুম্ ঝুম্।

    তার গলায় দেবো গাঁথি পলার মালা

    এই বুকের মালা সইলো বুকের মালা।

    তারে হৃদয় দেব লো তার হৃদয় নিয়া

    জানে মরম নিতেলো সই মরমিয়া

    সে যে মোহনিয়া, মোর মোহনিয়া।

    —চার—

    এই রাঙ্গা মাটির দেশে এই গাঁয়ের পথের ধারে!

    আমার মনের মানুষ হ’ল কি আজ মন ভোলারে।

    ফুল জাগানো বনের লতা

    তারাও যেন কয়রে কথা।

    আমার মন রাঙ্গিয়ে গান ধরে কোন বুলবুলি

    আর চন্দনারে

    আমার মনের মানুষ হ’ল কি আজ মন ভোলারে!

    দীঘল-তরু অতল স্নেহে ফেলে শীতল ছায়া

    মায়ের মতন মন জুড়ানো আমার গাঁয়ের মায়া।

    কোন সে রাখাল বাজায় বেণু

    ধুলায় ওড়ে গোখুর রেণু

    সুনীল আকাশ মেশে হেথায় ধূসর শ্যামল মাঠের পারে

    আমার মনের মানুষ তাই হলো কি মন ভোলারে।

    —পাঁচ—

    সাত ভাই চম্পা আর বোনটি পারুল

    জাগো! জাগো ওগো বনেরি ফুল!

    শ্যামল বনের ওগো সোনার মেয়ে!

    গন্ধে তোমার গেল ভুবন ছেয়ে;

    আহা বিনি-কথার কোন আভাস দিয়ে,

    কর সুবাসে বাতাসে বিভোল ব্যাকুল।

    ভ্রমর শোনায় তোরে কী গানখানি

    শোনাও আমায় আগে গোলাপ কলি!

    কোন প্রজাপতির রাঙা পাথার ছায়ে

    রঙের স্বপন মেখে রঙিন হ’লি।

    বনের লতা ওগো লাজুক লতা

    তোমার সনে মোর অনেক কথা।

    ফুল ফোটার বেলা দিয়ে লতার দোলা

    (বলো) সে কোন কোকিল গানে হয় রে সাকুল।

    সহকারীগণ

    পরিচালনায় : নির্ম্মল চৌধুরী, অমিয় ঘোষ, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয় মুখোপাধ্যায়।
    সুর শিল্পে : গোপেন মল্লিক।
    চিত্র শিল্পে : এম, রহমান; গোপাল চক্রবর্ত্তী, দশরথ।
    শব্দানুলেখনে : সত্যেন ঘোষ।
    সম্পাদনায় : কমল গঙ্গোপাধ্যায়।
    রসায়নাগার-শিল্পে : মথুরা ভট্টাচার্য্য, দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায়, শম্ভূ সাহা, মঞ্জু, সুরেশ রায়।
    ব্যবস্থাপনায় : সুখেন চক্রবর্ত্তী।
    পোষাক পরিচ্ছদাদি : কমলালয় ষ্টোর্স লিমিটেডের সৌজন্যে।
  • মীরা

    মীরা


    মীরা

    আমার প্রশ্ন বোধ হয় একটু জটিল।—ভালবাসা কি সব সময়েই তাহার সেই চিরন্তন-রূপেই দেখা দিবে? সেই আবেগবিহ্বল কিংবা অশ্রুসজল? ঘৃণা কি সব সময়েই ঘৃণা? ভালবাসা কি একটা অভিনয়?—না, সত্য থেকে অভিন্ন একটা কিছু? …যদি তাহাই হয় তো সত্যের সেই অন্তর্বহ্নিতে সে কি, যাহা খাদ, যাহা অবান্তর, সেই, সবকিছুকেই দগ্ধ, ভস্মীভূত করিয়া দিতে সমর্থ নয়? …বেশ গুছাইয়া মনের কথাটি বলিতে পারিতেছি না; কিন্তু এও বলি—হাজার গুছাইয়া বলিলেও কি অর্থাগম হইবার সম্ভাবনা আছে আপনাদের নিকট?

    আপনাদের মস্তিষ্কের উপর কটাক্ষ করিতেছি না, দোহাই। বলিতেছি অভিজ্ঞতার কথা।—আপনারা ভালবাসেন নাই, ভালবাসা কত রূপ তাহা দেখেন নাই, ভালবাসা পাওয়া তো দূরের কথা। প্রমাণ দিবেন বিবাহের। কিন্তু এটা আমার তরফের প্রমাণ, অর্থাৎ বিবাহিত বলিয়াই ভালবাসার কিছু জানিলেন না। আপনাদের বিবাহ তো? আপনি তখন বোধ হয় প্রাণপণে পাশের পড়া লইয়া ব্যস্ত, ঘটকিনী হাঁটাহাঁটি করিতেছে, আপনার পিতা আর বাড়ির অন্যান্য পুরুষেরা কুটুম এবং গহনা যাচাই করিতেছেন, মেয়েরা পাত্রীর নাক, চোখ, কান, চুলের হ্রস্ব-দীর্ঘতা লইয়া ব্যস্ত। পাশের পড়া থেকে ফুরসত হইলে টোপর এবং পরীক্ষার ফলাফলের দুশ্চিন্তা মাথায় করিয়া আপনি সুড়সুড় করিয়া গিয়া গোটাকতক মন্ত্ৰ আওড়াইয়া আসিলেন, সংস্কৃতে যতটুকু জ্ঞান তাহাতে সেগুলি আপনার পক্ষে বিবাহের মন্ত্রও হইতে পারে, ভূতঝাড়ার মন্ত্রও হইতে পারে; এবং বাসরঘরে অশ্রাব্য বিদ্রূপ এবং অসহ্য কর্ণতাড়নায় আপনার নিজের ভূতঝাড়ার যদি ব্যবস্থা না থাকিত তো বোধহয়, কি জন্য আপনার কষ্ট করিয়া-আসা সেটা বেমালুম ভুলিয়া বসিয়া থাকিতেন।—বাঙালী ব্যবস্থাপকেরা দূরদর্শী ছিলেন,—বধু আনিবার ব্যবস্থাটা করিয়া গিয়াছেন ধুতি শাড়িতে গাঁটছড়া বাঁধিয়া। বুঝিয়াছিলেন এই সব পরীক্ষা-পাগল বরেরা উদম পাগল হইয়া নিতান্ত যদি বস্ত্র-উত্তরীয় ফেলিয়া না পালায় তো কনেকে কোনরকমে বাড়িতে আনিয়া পৌঁছাইয়া দিতে পারিবে। এই আপনাদের বিবাহ, এর মধ্যে ভালবাসার স্থান কোথায়? …হদ্দ আছে একটা নিশ্চিত্ত আরাম; চোখ কান মুদ্রিত করিয়া একটা…

    কথায় কথায় অনিলের কথা মনে পড়িয়া গেল। জীবনকে যদি কেহ দেখিয়া থাকে তো সে অনিল। তাহার দেখিবারও একটা বিশেষত্ব আছে, আপনার-আমার মত করিয়া দেখে না। বলে “ভাই, খাসা আছি। বাপ-মা, ঘটক-পুরুত, আত্মীয়-স্বজনে মিলে সমস্ত বাজার উট্‌কে অবস্থামত সেরা অম্বরী তামাক জোগাড় করে, সেজেটেজে নল্‌চেটা হাতে তুলে দিয়েছে, ভুডুক ভুডুক করে টেনে যাচ্ছি গড়া গড়া; এসা আমেজ যে প্রতি টানেই যে বুক খালি করে দিয়ে যাচ্ছে সেটুকু পর্যন্ত হুঁশ হবার ভয় নেই। এ-ধাতে, মানে এই তাকিয়া-জাপটান জাতের পক্ষে, এই ভাল; থাকুক উডঞ্চুডে ডানপিটেরা লাভ, ডিভোর্স, কোর্টশিপ ইলোপমেল্ট আরও যতসব আদাড়ে রোমান্স নিয়ে…”

    আপনাদের বিবাহ এই গড়গড়ার মাথায় অম্বুরী তামাক, অনায়াসলব্ধ একটা মিষ্টাম্বাদ, সঙ্গে একটা নেশার আমেজ। তাহাতে ভালবাসার অম্ল-তিক্ত-কটু-কষায় কোথায়? ঝোলা গুডে গলা মাতাইয়া বলা, অমৃতপান করিয়া উঠিলাম।

    তাই বলিতেছিলাম—বিবাহটাই প্রমাণ যে ভালবাসা কি তাহা জানেন না। যাহাতে না জানিতে পান সেই জন্যই আপনার শুভার্থীরা—অথবা দুইপক্ষই ধরিয়া বলা যাক—আপনাদের শুভার্থীরা আপনাদের বিবাহ দিয়া দিয়াছেন—ভালবাসার প্রতিষেধ হিসাবে। কেন এরূপ করা হয় জানি না, তবে এইটুকু জানা আছে যে, ভালবাসা গরল থাকিতে পারে। অন্তত আমার বেলা তো ছিল;—আরও কত সবার বেলা জীবনে চলতি পথে এক সময়ে যাহাদের সঙ্গে হইয়াছিল দিন কয়েকের সাক্ষাৎ।

    কণ্ঠে গরল ধারণ করা কি সবার কাজ?—সেই জন্যই বোধ হয় আপনাদের অঙ্গে বিবাহের রক্ষাকবচ আঁটা,—মন্ত্রপূত কবচ।

    ভগবান আপনাদের নিরাপদ রাখুন। আমি কিন্তু যেন জন্ম-জন্মান্তর ধরিয়া এই গরলামৃত পান করিতে পাই।

  • সৌদামিনী

    সৌদামিনী

    সৌদামিনী

    কেন যে এমনটা হইল ঠিক বলিতে পারি না, তবে খামের উপর অনিলের হস্তাক্ষর দেখিয়াই আমার সমস্ত মনে যেন একটা বিপর্যয় ঘটিয়া গেল। হইতে পারে আমার মনটা বর্তমান অবস্থা থেকে কোন দিকে মুক্তির জন্য উন্মুখ, উদগ্র হইয়াছিল বলিয়াই এমনটা হইল।—হঠাৎ অতীতের মধ্যে থেকে একটা স্মৃতির জোয়ার আসিয়া বর্তমানটাকে যেন ঠেলিয়া কোথায় লইয়া গেল। সেটা এতই অভিভূতকার, যে চিঠিটাও খুলিয়া পড়িতে এক রকম বোধ হয় ভুলিয়াই গেলাম। সিঁড়িটা যেখানে উপরে আসিয়া শেষ হইয়াছে তাহার সামনেই ছোট্ট একটি বারান্দা, বাহিরের দিকটা খোলা, নীচে প্রায় কোমর পর্যন্ত ঢালাই করা লোহার রেলিং।

    আমি মীরার ঘরের সামনে দাঁড়াইয়াছিলাম, সরিয়া গিয়া রেলিঙে ভর দিয়া সেইখানে, বাহিরে দৃষ্টি মেলিয়া দিয়া দাঁড়াইলাম।

    নীচে, বাঁ-দিকে বাগানটা দেখা যাইতেছে। কাল বিকাল থেকে এ পর্যন্ত এমন একটা অবস্থার মধ্য দিয়া কাটিয়াছে, মনে হইতেছে কত দিন বাগানটাকে দেখি নাই, যেন কত যুগ! নূতন হইয়া আজ হঠাৎ আমার সামনে আসিয়াছে। … বাগান ছাড়াইয়া রাস্তা ছাড়াইয়া রাস্তার ওপারে বাড়ি ছাড়াইয়া দৃষ্টি উর্ধ্বে উঠিল; মনটাকে লইয়া উঠিতেছে—বাড়ির পিছনে কতকগুলো গাছের জটলা, তাহারই মাঝখান থেকে গোটাতিনেক নারিকেল গাছ মাথা ঠেলিয়া উঠিয়াছে, দীর্ঘ পত্রদল সঞ্চারিত করিয়া আকাশের স্বচ্ছ নীলের গায়ে যেন সবুজের তুলি টানিয়া চলিয়াছে।

    আরও দূরে—কালের ও-প্রান্তে জাগিয়া ওঠে সাঁতরা, আমাদের কৈশোরের জীবন লইয়া—বেশ স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি—বেনে বৌয়েদের দোতলা বাড়ির সামনে তামাটে রঙের পানফলের লতা-বিছান পুকুর—নারিকেলের কাটা গুঁড়ি দিয়া তৈয়ারি পিচ্ছিল ঘাট। আমি, অনিল ভালমানুষের মত বসিয়া আছি—একটু দূরে একটা মোটা সজিনা গাছের আড়ালে দাঁড়াইয়া একটি মেয়ে, খাটো কাপড় পরা, মাথায় বেড়াবেণী, মুখের ভাবটা আমাদের চেয়েও নির্বিকার। … সদ্‌গোপদের ছোট বৌ ঘাটে বাসন মাজিতেছে—ওর উঠিয়া যাওয়ার অপেক্ষা—তাহা হইলেই আমরা পানফল-অভিযানে অগ্রসর হই। …পচা পাঁকের একটা গন্ধ উঠিয়া আসিতেছে, কেমন যেন দেশ-দেশ মাথানো গন্ধটা … ঝক্‌ঝকে বাসনের গোছাটা বাঁ-হাতে করিয়া ঘোমটার রাঙা পাড়টা নাকের ওপর পর্যন্ত টানিয়া দিয়া, বঙ্কিম ভঙ্গিতে সদ্‌গোপদের বউ উঠিয়া আসিল। কচি বউ, হদ্দ বছর তের। কি চোদ্দ বয়স। … “বামুন ঠাকুরেরা এখানে বসে যে?…” অনিলই উত্তর দিল, “এমনই বসে আছি, পুকুরের ধারটা একটু ঠাণ্ডা কিনা।”…বেলা দুপুরের রোধে মাথার চাঁদি ফাটিতেছে ওদিকে! সদ্‌গোপদের বউ ঠোঁট চাটিয়া হাসিতেছে।—“ঠাণ্ডা, না পানফল?—আমি বলে দিতে চল্‌নু জেলেগিন্নিকে।” দুই পা আগাইয়া গিয়া আবার ঘুবিয়া বলিল, “যাই?– আচ্ছা, যাব না যদি এক কাজ কর।”—আমরা উৎসুকভাবে চাহিয়া আছি … “কাজ কর মানে যদি আমার জন্যেও খানকতক ঐখানটায় ঐ পাকের মধ্যে পুঁতে রাখ—আমার জন্যে মানে ঠাকুরঝির জন্যে—আমি আবার বাসন মাজতে এসবো এক্ষুনি!”

    অনিল বলিতেছে, “তুমি আর দুপুরের তাতে আসবে কেন? সদী লুকিয়ে দিয়ে আসবেখ’ন।” সদ্‌গোপদের বৌয়ের সমস্ত মুখটা কৌতুকে আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে, চোখ ঘুরাইয়া বলিতেছে, “ও, সদুঠাকরুণ বুঝি এর মধ্যে আছেন? কোথায় তিনি? তাই তো বলি দুপুরের এমন কড়া তাত, এত ঠাণ্ডা লাগে কিসে! –”

    হাসিটা আরও উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে—“না, না; এইখানেই পুঁতে রেখো; আমি বলবুনি জেলেগিন্নিকে…”

    রাজু বেয়ারা আবার উপরে উঠিয়া ওদিকে কোথায় চলিয়া গেল। পায়ের গতি খুব নিয়ন্ত্রিত—যেন একটা ফৌজী সেপাই। মনটা লিণ্ড্‌সে ক্রেসেণ্টে ফিরিয়া আসিল। তাহার পর আবার স্মৃতির বন্যা! … অনেক দিন পরের এক দৃশ্য। আকাশ ঘিরিয়া বর্ষা নামিয়াছে, সন্ধ্যায় অনিলদের বাড়ি আটক হইয়া গেলাম। অনিলের বাবা ছাতার নীচে ভিজিতে ভিজিতে আসিয়া উঠিলেন। ছাতা মুড়িতে মুড়িতে বলিতেছেন, “আরম্ভ হ’ল—শনিতে সাত মঙ্গলে তিন, এখন সাত দিন নিশ্চিন্দি থাক।” … মজা নদীতে বাঁশের পুল এখনও বাঁধা হয় নাই, বোধ হয় কাল থেকেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হইবে, অনিলের বাবার “নিশ্চিন্দি” কথাটা আগামী ছয়-সাতটা দিনের একটা স্পষ্ট ছবি যেন ফুটাইয়া তুলিল—ওপারে স্কুল, এপারে আমাদের স্কুল-মুক্ত নিরুদ্বেগ দিনগুলো—মাঝে বর্ষার জলে টইটম্বুর মজা নদী, আর, সমস্তকে আচ্ছন্ন করিয়া অবিরাম বর্ষা—চারিদিকে কুল্ কুল্, ঝরঝর একটা সিক্ত মর্মরধ্বনি—সমস্ত দিনটা সন্ধ্যার মত একাকার, তারপরেই একেবারে অন্ধকার রাত্রি…

    অনিলের বাবা বলিলেন, “শৈল আটকে গেল বুঝি?”

    একটু একটু শীত করিতেছে, কোঁচার খুঁটটা গায়ে জড়াইয়াছি। অনিল বলিল, “ও বলছে বাড়ি যাবে।” অনিলের মা একটু যেন শিহরিয়া বলিলেন, “রক্ষে কর! কেন? খোলা মাঠে পড়ে আছে নাকি?”

    বেশ মনে পড়িতেছে অনিলের মাকে—আধবয়সী মানুষটি, প্রদীপটা বাঁ-হাতে ধরিয়া কথাটা বলিতেছেন—মুখে নথের সোনায় আর পান্না দুইটিতে, শাড়ির চওড়া রাঙা পাড়ে প্রদীপের কম্পমান আলো পড়িয়া ঝলমল করিতেছে…

    মজা নদীর ধারে বৈরাগী বাবাজীর আখড়ায় আরতির কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল—সঙ্গে তানপুরার একঘেয়ে সুরের মত বর্ষার আওয়াজটা … ব্যাঙেদের ঐকতানে গায়কদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছে। সন্ধ্যার অল্প পরেই রাত্রি নিশুতি হইয়া উঠিল।

    একই ভাবে আছি দাঁড়াইয়া। এক-একবার নিজেকে অনুভব করিতেছি, আবার স্মৃতির আলোড়নে যাইতেছি তলাইয়া; কত ছোট-বড় ঘটনার টুকরা-টাকরা স্রোতের মুখে ভাসিয়া আসিতেছে।—

    সাঁতরার বসত একরকম তুলিয়া আমরা পশ্চিমে চলিয়া গিয়াছি। আবার আসিয়াছি অনিলের বিবাহের বছর দেড়েক পরে, ওর বৌ যখন ঘর করিতে আসিয়াছে! বিবাহের সময়টা আমার পরীক্ষা ছিল, তখন আসিতে পারি নাই, অর্থাৎ সাঁতরাকে দেখিতেছি আবার ঠিক সাত বছর পরে। দেশটাকে নূতন বলিয়া বোধ হইতেছে, কতকটা প্রবাসের বিরহের জন্যও, আর কতকটা কি বলিব?—যৌবনের নবীভূত দৃষ্টিভঙ্গি?—রাস্তা, ঘাট, পুকুর, মাঠের সঙ্গে পুরানো স্মৃতির ছোপছাপ লাগিয়া আছে।

    সতের বছরও পূর্ণ হইবার আগেই অনিলের বিবাহ হয়। দুই বৎসর হইল এণ্টান্স পাস করিয়া জেলা কোর্টে চাকরি করিতেছে। দশ টাকা জলপানি পাইয়াছিল, বাপ পক্ষাঘাতে বিকলাঙ্গ হইয়া পড়ায় জলপানিটা কাজে আসিল না। পত্র লিখিয়াছিল, “শৈলেন, বিধাতা একটু রসিকতাপ্রিয় বলে আমাদের শাস্ত্রে তাঁকে পিতামহ বলে কল্পনা করা হয়েছে—আমার পড়া বন্ধ করার বন্দোবস্ত ক’রে দশ টাকা জলপানি পাইয়ে দিলেন।”

    ষোল-সতের বছরে বিবাহ আমরা—পশ্চিমের দিকের বাঙালীরা—কল্পনায়ও আনিতে পারি না, আমার বন্ধু সেই অনিলকে বিবাহিত দেখিয়া আশ্চর্য বোধ হইতেছে। কিন্তু দেখিতেছি বয়সের অনুপাতে ও ঢের বেশি উপযোগী। বৈবাহিক রহস্য লইয়া এমন অনেক কথা বলিল যাহা শুনিতে প্রথমটা আমায় রাঙিয়া উঠিতে হইল! অনিল হাসিয়া বলিল, “তুই জেণ্টলম্যান হ’য়ে গেছিস শৈল, বিপদে ফেললি দেখছি, তোকে আবার মানুষ ক’রে নিতে সময় নেবে। পশ্চিমের শুকনো হাওয়ায় তোরা সব বোদা হ’য়ে যাস…”

    সেই প্রথম দিনের কথা। সকালে গল্পচ্ছলে একটু ইতস্ততঃ করিয়া সৌদামিনীর কথা তুলিলাম। ওদের বাড়ির বাহিরে রকে বসিয়া আমাদের কথা হইতেছে। অনিল কেমন একটা মলিন হাসি হাসিল, বলিল, “ভাই সদুর কথা না তুলে পারলিনি? আমাদের বিয়ের কথা তো বলেইছি তোকে কয়েকবার যে, আমাদের মত তাকিয়ায় হেলান-দেওয়া জাতের পক্ষে বৌ জিনিসটা, গড়গড়ার মাথায় অম্বুরী তামাকের মত, সেজে দেয় অভিভাবকেরা। নিজের পছন্দয় রোমান্স ক’রে সংগ্রহ করা নয়…”

    সামনের রাস্তায় দুইটা মোটরে আর একটু হইলেই ধাক্কা লাগিত; খানিকটা বচসা, খানিকটা কথা-কাটাকাটি হইতে স্মৃতিসূত্র আবার ছিন্ন হইয়া গেল। কিন্তু আজ কি হইয়াছে, কলিকাতা আমায় ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না।

    একটু চুপ করিয়া আছি আমরা দু-জনে, তারপর অনিল আমার ডান হাতটা চাপিয়া ধরিল—চোখে একটা আতুর দৃষ্টি, বলিল, “শৈল, সৌদামিনী পড়ে রইল, তুই তুলে নে তাকে, তুই তো, ভালোবাসতিস, একটু লাজুক ছিলি এই যা…”

    রাত্রের ছবিটা খুব স্পষ্ট এখনও। নিশুতি রাত, অনিল নীচের দুয়ার খুলিয়া আমায় ওপরে তাহার ঘরে লইয়া আসিয়াছে, দিনের বেলায় বৌ দেখাইয়া আশ মেটে নাই ওর। বৌয়ের সামনেই প্রশ্ন করিল, “মুখদেখানি কি দিলি—হৃদয় নাকি?”

    ওর বৌ বেচারি জড়সড় হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। বলিলাম, “রাসকেল, আড় নেই মুখে তোর! দিলুম একটা জিনিস, একটা নতুন নাম।”

    অনিল প্রশ্ন করিল, “কি?—রাস্‌কেলের গিন্নী রাস্‌কেলী? হিংসে হয়, গালাগালটা ওর ভাগ্যে দিব্যি কাব্য হয়ে গেল।”

    বলিলাম, “না, অম্বুরী।”

    দু-জনে হাসিয়া উঠিলাম। হাসির ছোঁয়াচ লগিয়া ওর বৌও হাসিয়া আরও সঙ্কুচিত হইয়া গেল।

    বাহিরে দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া দাঁড়াইয়া আছি, হঠাৎ দূর ভবিষ্যৎ হইতে দৃষ্টি আসিয়া পড়িল সন্নিহিত বর্তমানে। —

    সংসার পরিবর্তিত ওদের। অনিল এখন বাড়ির কর্তা। তেইশ-চব্বিশ বছরের একজন যুবার যদি সংসারের কর্তা হইতে হয় তো তাহার ব্যক্তিগত জীবনেও একটা মস্ত বড় পরিবর্তন আসে, কতকটা মেঘভারাক্রান্ত দ্বিপ্রহরের মত। এই কর্তামি আর ডেলিপ্যাসেঞ্জারি মিলাইয়া অনিল যেন অনেকটা বুড়ো হইয়া গিয়াছে। তবুও অনিল, অনিলই। বিশেষ করিয়া আমি গেলে সে উচ্ছ্বসিত হইয়া ওঠে।—সেই কথায়, ভাবে উচ্ছ্বসিত অনিলকে যেন সামনে দেখিতেছি। আমি গেলে আমাদের যা বাঁধা প্রোগ্রাম, সমস্ত গ্রাম আর গ্রামের আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি,—বেনে বৌয়েদের বাড়ির সামনে পুকুরধারটায়, মজা নদীর ধারে ধারে অনন্তপুরের রাস্তা, স্কুলের ধার। একদিনেও ভালবাসি নাই স্কুলটাকে, কিন্তু এখন যে কী চমৎকার লাগিতেছে। ঠিক যেমন পুরানো মাস্টার মশাইদের কাহাকেও দেখিলে প্রীতি আর ভক্তিতে মনটা ভরিয়া উঠে আজকাল, আগে যাদের যমের মত দেখিতাম।…গা-ঢাকা হইয়া আসিল—আমরা লোক-চক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া অন্ধকারের মধ্যে, অতীতের অন্ধকারে ডুব দিয়া কি সব জিনিস খুঁজিয়া বেড়াইতেছি। সব প্রগল্‌ভতা মৌন হইয়া গিয়াছে, দু-জনেই বুঝিতেছি দু-জনো কোথায় আছে, সেখান থেকে ডাক দিয়া—একে অন্যকে ফিরাইয়া আনিতে মন সরিতেছে না। অথচ ভিতরে সঞ্চয় তখন খুব বেশি হইয়া উঠিতেছে, এক একবার কথাবার্তাও আবেগময় হইয়া উঠিতেছে। অনিল কি ভাবিয়া একবার প্রশ্ন করিয়া বসিল, “ছেলেবেলাকার বইগুলো এদিকে আর পড়েছিস শৈল?”

    খুব আশ্চর্য হইয়া ওর দিকে চাহিয়া আছি। অনিল বলিতেছে, “প’ড়ে দেখিস। দেয়াল-আলমারির পুরনো বইগুলো গুছোতে গিয়ে সেদিন আমার হাতে একটা “মনোহর পাঠ’ বলে বই পড়ল। অদ্ভুত রে! এমন মিষ্টি লাগছিল! কোথায় লাগে একটা ভাল কাব্য তার কাছে! লেখাগুলোর চারদিকে সমস্ত ছেলেবেলাটা এসে ঘিরে দাঁড়ায় কিনা। বইটাও অদ্ভুত বোধ হচ্ছিল—কোণগুলোতে আঙুলের দাগ—যেখানে-সেখানে কাঁচা হাতের নাম লেখা। হ্যাঁ, একটা পদ্য—‘পুষি আর আমি’।—একটা মেয়ে একটা বিড়ালকে বুকে চেপে রয়েছে, বেশ ছবিটা—বেশ মোটাসোটা গোলগাল মেয়েটা। নীচে পেন্সিলে কি লেখা আন্দাজ কর দিকিন।”

    আমি একটু ভাবিয়া হাসিয়া বলিলাম, “সৌদামিনী।”

    অনিল বলিল, “অনেকটা আন্দাজ করেছিল, তবে অনিল চৌধুরী চিরকালই সেয়ানা কিনা, অত ধরা-ছোঁয়া দেওগার পাত্র নয়। লাল পেন্সিলে লেখা আছে ‘সু-দা-ম’। কেউ ধরতে বা ধরিয়ে দিতে পারবে না, নামটা আইনের প্যাচ বাঁচিয়ে লিখেছি, এমন কি জাত পর্যন্ত বদলে দিয়েছি—আমাদের সখী সৌদামিনী নয়, একেবারে কৃষ্ণসখা সুদামা!”

    মজা নদীর ইউনিয়ন বোর্ডের তৈয়ারী-করা পুলের উপর বসিয়া আমাদের অনেক খানি রাত হইয়া গেল, কিন্তু ঐটুকু কথার পর অনেকক্ষণ আর কোন কথা নাই।… আবার অনিলের উচ্ছ্বাস আসিয়াছে, কি রকম একটা স্বপ্নালু দৃষ্টিতে সামনে চাহিয়া বলিতেছে, “তোর অম্বুরীকে আমাদের এই অংশের জীবনের মধ্যে টেনে নিয়ে আসতে ইচ্ছা করে শৈল। এক-একবার মনে হয় সায়েব হতাম তো বেশ হ’ত–তুই, আমি, অম্বুরী —একসঙ্গে পাশাপাশি ছেলেবেলাকার জীবনের টুকরো-টাকরা জড় ক’রে বেড়াচ্ছি!…এক-এক সময় মনে হয় ক্রীশ্চান হ’য়ে যাই; কিন্তু তাহ’লে গ্রামছাড়াই করবে সবাই মিলে, আর এ-গ্রাম দিলেও প্রাণ ধরে আমি ছাড়তে পারব না এই তোকে বলে দিলাম শৈল। একে ছেড়ে যে মরতে হবে একদিন এইটুকু মনে হ’য়ে এক-এক সময়ে মনটা উদাস ক’রে দেয়… অম্বুরীটা বেশ শৈল, কিন্তু বড় আদিম। আমাকে, অর্থাৎ ওর পুরুষটিকে কি ক’রে ঠাণ্ডা রাখবে অষ্টপ্রহর ওর এই চিন্তা; সকালে উনুন ধরান থেকে রাত্রে মশারি ফেলার মধ্যে যা কিছু ওর কাজ সবগুলোরই মুখ আমার দিকে। কষ্ট হয়, কি অসহ্য আদাম-ইভের জীবন বল দিকিনি! —ও বসে বসে আমার স্কুল ভোগের জোগাড় করে যাচ্ছে—রান্না থেকে আরম্ভ করে—আর আমি সপৌরুষে ভোগ ক’রে যাচ্চি! …”

    সাঁতরা আবার মিলাইয়া গেল। মীরা গুন্‌ গুন্‌ করিয়া গান করিতেছে, তাহারই রণন স্পষ্ট হইয়া উঠিল। মীরার সুর কানে এই প্রথম গেল। মীরার গলা খুব মিষ্ট, তবে সুরের জ্ঞান নিখুঁত নয়; কিন্তু আশ্চর্য, ভুল সুরে এমন একটা ছেলেমানুষি ভাব ফুটিয়া উঠিতেছে—লাগিতেছে ভারি মিষ্ট।

    রকে মাদুরের উপর অনিল, আমি বসিয়া, আমার কোলে অনিলের ছেলেটা, তাহার ঝাঁকড়া মাথার উপর আমার চিবুকটা চাপিয়া বসিয়া আছি। অম্বুরী আমাদের কাপড় কোঁচাইতেছে, আলনায় তুলিয়া রাখিবে। অনিল বলিতেছে, “ওগো, তুমি একেবারেই ‘আমি’, নয় যে ‘আমি-ধ্যান’ ‘আমি-জ্ঞান’ হ’য়ে রয়েছ, একটু নিজের জীবনটাও আলাদা ক’রে দেখ দিকিন। নারী পুরুষের একখানা পাঁজর খসিয়ে তোয়ের করা জানি; কিন্তু তোমার শোচনীয় অবস্থা দেখে দুঃখে আমার সব পাঁজরগুলোই খসে পড়তে চাইছে … আহা, বেচারি!… দেখ, তোমার স্বামী-দেবতার বাইরেও জগৎ আছে, গাড়ু মাজা আর কাপড় কোঁচানোর অতিরিক্তও কাজ আছে পৃথিবীতে…”

    অম্বুরী হাঁটুতে চাপিয়া কোঁচান কাপড়টা পাকাইতেছে। হাসিয়া বলিল, “আচ্ছা, তোমার ব্যাখ্যানায় কাজ নেই, আমার জন্ম জন্ম এইটকুই বজায় থাক।”

    অনিল শিহরিয়া উঠিল, বলিল, “মাফ কর, তাহ’লে এর পরের জন্মেই তুমি দয়া ক’রে অন্য পুরুষ দেখো বাপু, আমায় রেহাই দিও; আমায় আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে যে তুমি শুধু…জন্মের পর জন্ম…না বাপু, আমি এর মধ্যে নেই, ক্ষ্যামা দাও—”

    আমরা তিনজনেই হাসিয়া উঠিয়াছি, ছোট ছেলেটাও আমার মুখের দিকে ঘুরিয়া চাহিয়া যোগ দিয়াছে, অম্বুরী হাসিয়া উপর গাম্ভীর্য চাপাইয়া আমায় সাক্ষী মানিয়া অনুযোগ করিতেছে, “শুনলে ঠাকুরপো? হিঁদুর ঘরে এ রকম আদাড়ে কথা শুনেছ কখন! কি মানুষ বাপু!—আমি তো বুঝি না…”

  • মীরা-সৌদামিনী

    মীরা-সৌদামিনী


    লিণ্ড্‌সে ক্রেসেণ্টে ফিরিয়াই একটা মস্ত বড় পরিবর্তনের মধ্যে পড়িয়া গেলাম।

    যখন বাসায় পৌঁছিলাম, সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। জামা জুতা ছাড়িয়া বারান্দায় আসিয়া একটা ডেক্‌-চেয়ারে গা এলাইয়া দিলাম। সাঁতরার এই কয়টি দিনের অভিজ্ঞতা এত ঘনীভূত, আর আমার বর্তমান জীবনের অভিজ্ঞতা হইতে এত বিভিন্ন যে, মনে হইতেছে কত দূর আর কত দীর্ঘ এক প্রবাস হইতে ফিরিলাম যেন। কোন্‌টা যে প্রবাস তাহাও ঠিক বুঝিতেছি না। মনটা স্মৃতির ভারে বিষণ্ণ হইয়া আছে — সুখের স্মৃতি, আবার সৌদামিনীর স্মৃতিও। বেশি মনে পড়িতেছে সৌদামিনীর কথাই,—আহা!

    নীচে লোক কেহ নাই, বাড়িটি প্রথম করিতেছে, এসব বাড়ি করেই, আজ যেন বেশি। আমার মনের ঔদাসীন্যের জন্যই কি?

    ইমানুল আসিয়া উপস্থিত হইল; সেই রকম বিরহক্লিষ্ট, হাতে একটি ফুলের তোড়া। সেলাম করিয়া দন্ত বাহির করিয়া একটু হাসিল, প্রশ্ন করিল, “ভাল থাকছিলেন মাস্টার-বাবু?”

    বলিলাম, “ছিলাম একরকম। তোমার খবর কি ইমানুল? বাড়িতে কাউকে দেখি না যে?”

    ইমানুল বলিল, “আপনাকে আসতে দেখে ভাবলাম একটা তোড়া দিয়ে আসি। দাঁড়ান, রেখে আসি এটা অন্দরে।”

    তোড়াটা ফুলদানিতে বসাইয়া ইমানুল আমার সামনে থামে ঠেস দিয়া বসিল, বলিল, “দিদিমণিরা বাইরে গেছেন।…মদন ক্লীনার একটা কথা বললে মাস্টার-বাবু, বলে পাদ্রীকে লিখে কিছু হবে না, বলে তাকেই সোজা লেখ, সে তো সাবালিকা হয়েছে…”

    একটু উদ্বিগ্নভাবেই প্রশ্ন করিলাম, “লিখেছ নাকি?”

    ইমানুল লজ্জিতভাবে একবার আমার পানে চাহিয়া ঘাড়টা নীচু করিল। উত্তরটা বুঝিতে পারিয়া কহিলাম, “না, বলছিলাম—নিয়েছ লিখিয়ে কাউকে দিয়ে?”

    ইমানুল লজ্জিতভাবে বলিল, “ইংরিজীতে লিখতে হবে…”

    বলিলাম, “ও! তাও তো বটে, তা দোব লিখে।”

    সামান্য একটু থামিয়া ইমানুল বলিল, “মদন ক্লীনার একটা পদ্য দিয়েছে মাস্টার-বাবু, সেটাও ইংরেজীতে তর্জমা ক’রে…”

    ইমানুল বোধ হয় পদ্যটা বাহির করিবার জন্যই ফতুয়ার পকেটে হাতটা সাঁদ করাইয়াছে, এমন সময় গেটে মোটরের হর্ন বাজিয়া উঠিল। ইমানুল অপ্রতিভভাবে তাড়াতাড়ি উঠিয়া গেট খুলিতে ছুটিল।

    গাড়ি-বারান্দায় মোটর আসিয়া দাঁড়াইলে মীরা আর তরু নামিল। আমাকে দেখিয়াই মীরা তাড়াতাড়ি উঠিয়া আসিয়া প্রশ্ন করিল, “এসে গেছেন তাহ’লে আপনি? ভাবছিলাম আপনাকে গাড়ি পাঠাব। …মার সঙ্গে দেখা হয়েছে?”

    মীরার দৃষ্টি খানিকটা উদ্ভ্রান্ত, তরুও উৎকণ্ঠিতভাবে আমার পানে চাহিয়া আছে। আমি উত্তর করিলাম, “না, আমি এই আসছি, করিনি তো দেখা এখনও।…কেন?”

    “বলেনি কেউ? ভুটানী মারা যাওয়ার পর থেকে মা বড্ড বেশি…”

    বিস্মিত হইয়া বলিলাম, “মারা গেছে ভুটানী?”

    মীরা বলিল, “ইমানুল বসে ছিল না আপনার কাছে? বলেনি? উজবুক একটা; আসতেই বুঝি পোস্টকার্ড এনে হাজির করেছে? …আসুন ভেতরে! তরু তুমি জামাকাপড় ছেড়ে মার কাছে গিয়ে বস, আমি আসছি।”

    ভিতরে গিয়া ফ্যানটা খুলিয়া দিয়া মীরা একটা সোফায় বসিল। আমি সামনে একটা চেয়ারে বসিলাম। মীরা বলিতে লাগিল, “ভুটানী এক রকম হঠাৎই কাল বিকেলে মারা গেল, যদিও ও যে আর বেশি দিন নয় এটা ক্রমেই স্পষ্ট হ’য়ে আসছিল। মারা যেতে মা একেবারে আশ্চর্য রকম উতলা হ’য়ে উঠলেন, শৈলেনবাবু! ঠিক যে শোকের ভাব তা নয়; অদ্ভুত রকম একটা নার্ভাসনেস্। বাড়িতে বাবা নেই—এখনও আসেননি তিনি, পূর্ণিয়ার কেসটা নিয়ে আটকা পড়ে গেছেন—আমি যে কী অবস্থায় পড়ে গেলাম বলতে পারি না। আপনি থাকলেও একটা পরামর্শ করবার লোক পেতাম—ফোন ক’রে সরমাদি আর নিশীথবাবুকে ডেকে আনলাম। তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ ক’রে ডাক্তার রায়কে ফোন করা হ’ল। তিনি সব শুনে বললেন তাঁর আসাটাই ভুল হবে, কেন-না মার তো হয়নি কিছু, শুধু একটা ভয়ানক নার্ভাস শক্‌ পেয়েছেন, বরং এ অবস্থায় ডাক্তারকে দেখলে উটোই ফল হওয়ার সম্ভাবনা। বললেন, বরং যদি কাঁদবার ঝোঁক থাকে তো কাঁদতে দেওয়া ভাল। কিন্তু কাঁদবার ঝোঁক নয় তো, একটা যেন ভয়ংকর ভয়ের ভাব। বেশির ভাগই চুপ করে থাকেন, মাঝে মাঝে শুধু বলেন, ‘তাহ’লে আমার কি হবে?’ সে যে কী অবস্থায় কেটেছে আমাদের বলতে পারি না, শৈলেনবাবু। বাবাকে আজ সকালেই টেলিগ্রাম করেছিলাম, এখনও উত্তর পাইনি। তিনিও যে কেমন আছেন…”

    মীরা তাহার বাবার সম্বন্ধে সভয়ে উল্লেখ করিতে গিয়া হঠাৎ যেন ভাঙিয়া পড়িল। কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া গেল, চোখ একবার একটু ছলছল করিয়া উঠিয়াই স্বরবিগলিত ধারায় অশ্রু নামিল। মীরা সোফার হাতলে মুখ গুঁজিয়া কচি মেয়ের মত কাঁদিয়া উঠিল।

    ওর চব্বিশ ঘণ্টাব্যাপী নিঃসহায় ভাব, ক্লান্তি, উদ্বেগ, আর বাবার উত্তর না পাওয়ায় এই আশঙ্কা ও অভিমান সব একসঙ্গে ওকে অভিভূত করিয়া ফেলিল। কারণটা নিশ্চয়ই এই যে, এমন একজনকে কাছে পাইয়াছে যাহার উপর ওর একটা আন্তরিক নির্ভর আছে। সমবেদনায় আমার সমস্ত অন্তঃকরণ ব্যথিত হইয়া উঠিল, কিন্তু কি করি আমি?

    ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল মীরা। আমি নিরুপায়ভাবে খানিকটা চুপ করিয়া বসিয়া রহিলাম, তাহার পর নিজের চিন্তাধারা খানিকটা গুছাইয়া লইয়া বলিলাম, “মীরা দেবী, আপনি শান্ত হন। বিপদের সময় অতটা ব্যাকুল হ’লে চলে কি? মিস্টার রায়ের সম্বন্ধে কোন ভাবনা নেই; তিনি নিশ্চয়ই কাজ নিয়ে ওখান থেকে আবার অন্য কোথাও গেছেন, কাল সকাল নাগাদ খবর পাওয়া যাবে। কিংবা এও হতে পারে আপনার টেলিগ্রাম পৌঁছবার আগেই উনি বেরিয়ে পড়েছেন। আপনি স্থির হন। আর মার সম্বন্ধে আপনি একটু বেশি নার্ভাস হ’য়ে পড়েছেন। ওঁর শরীরটা দুর্বল নিশ্চয়, কিন্তু ওঁর মাথা বেশ পরিষ্কার আছে, এই আঘাতে অন্য কোন রকম ভয়ের সম্ভাবনা নেই। ওঁর সম্বন্ধে একটা ব্যবস্থা খুব দরকারী—জানি না সেটা করা হয়েছে কি না—আপনি যে রকম বিচলিত হ’য়ে পড়েছেন।”

    মীরা অনেকটা সংযত করিয়া লইয়াছে নিজেকে। আমি থামিতেই মুখটা একটু তুলিয়া সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে আমার পানে চাহিল। বলিলাম, “ওঁকে ও-ঘরটা বদলে অন্ত ঘরে আনা দরকার কয়েক দিনের জন্যে। অষ্টপ্রহর ভুটানীর সঙ্গে যে রকম ছিলেন ওখানে, তাতে…”

    ব্যাপার সামান্যই, কিন্তু মীরা যেন একটা আলোকরশ্মি দেখিতে পাইল। কৃতজ্ঞতাপূর্ণ মিনতির দৃষ্টিতে আমার পানে চাহিয়া বলিল, “আপনি বলুন ওঁকে। সত্যিই বড় ভাল হয় তাহলে।”

    বলিলাম, “আমি বলছি গিয়ে, রাজিও করাব। আপনি আসবেন কি?”

    মীরা চোখ মুছিয়া সোজা হইয়া বসিল। বলিল, “আপনি একলাই যান। যে নিজে অভিভূত হ’য়ে পড়েনি এমন লোকই থাকা দরকার ওঁর কাছে। আমার মুখে একটা আতঙ্কের ছায়া আছে, মা আমায় দেখে আরও যেন ব্যাকুল হ’য়ে ওঠেন, শৈলেনবাবু। আমি বুঝছি, অথচ…”

    নিরুপায় করুণ দৃষ্টিতে মীরা আমার পানে চাহিল। চক্ষু আবার ডবডব করিয়া উঠিতেছে! দেখিলে কষ্ট হয়, ইচ্ছা হয় নিজের হাতে মুছাইয়া দিই অশ্রুবিন্দু দুইটি।

    সেই মীরা আজ আমার কাছে এত দুর্বল হইয়া পড়িল? গভীর দুঃখই কি আসল সম্বন্ধের কষ্টিপাথর?

    বলিলাম, “তাহলে আমি একাই যাচ্ছি, সেই ভাল হবে বরং। আপনি আর ভাববেন না।”

    যে ছোট, আর স্বীয় অন্তরের খুব নিকট, তাহাকে সান্ত্বনা দিবার সময় যেমন একটা মৃদু তিরস্কারের মিশ্রণ থাকে, সেইভাবে বলিলাম, “অত উতলা হয় কখনও মানুষে? দেখুন তো!―ছিঃ!”

  • মুহাম্মদ বিন কাসিম

    মুহাম্মদ বিন কাসিম

    মেজর জেনারেল আকবর খান

    আমীর-ই-মুজাহিদীন

    মুহাম্মদ বিন কাসিম

    তরজমায়

    আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী

    ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ

    হিজরী পনের শতক উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত

    মুহাম্মদ বিন কাসিম : মেজর জেনারেল আকবর খান; আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী অনূদিত॥ ই. ফা. বা. প্রকাশনা : ১৩৪১॥ ই.ফা.বা. গ্রন্থাগার ৯২৩:১৯৭॥ বিষয় : জীবনী॥ প্ৰথম প্ৰকাশ : নভেম্বর ১৯৮৬, কার্তিক ১৩৯৩, সফর ১৪০৭॥ প্ৰকাশনায় : আবুল বাশার আখন্দ, অনুবাদ ও সংকলন বিভাগ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, বায়তুল মুকাররম, ঢাকা-২। প্রচ্ছদ : কামাল আহমেদ॥ ইলাস্ট্রেশন : কাজী শামসুল আহসান॥ মুদ্রণে : শেখ আবদুর রহিম, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন প্রেস॥ বাঁধাইয়ে : ওরিয়েন্টাল বাইণ্ডার্স ৫৯, পূর্ব বাসাবো বাজার, ঢাকা-১৭

    MUHAMMAD BIN QUASIM (The Biography of Muhammad bin Quasim) : Written in Urdu by General Akbar Khan, translated into Bengali by Abu Sayeed Muhammad Omar Ali and published by the Islamic Foundation Bangladesh. November 1986.


    যে কালো হাতের হিংস্র থাবায় জীবনের প্রথম প্রভাতেই ঝরে গেল মুহাম্মদ বিন কাসিম, কুতায়বা বিন মুসলিম, ‘আবদুল আযীয ইব্‌ন মূসা, ওমর ইব্‌ন ‘আব্দুল আযীয (র)-এর ন্যায় অনেক সম্ভাবনাময় যুবা ও তরুণের তরতাজা প্রাণ, থিতিয়ে গেল মুসা বিন নুসায়র ও তারিক বিন যিয়াদের ন্যায় বহু প্রৌঢ় ও যুবকের উৎসাহ-দীপ্ত আবেগ,—

    যে কালো হাতের বিষাক্ত ছোঁয়ায় হারিয়ে গেলেন হাসান আল-বান্না, সায়্যিদ কুত্‌ব, মুহাম্মদ ম্যালকম এক্স, ইসমা‘ঈল আল-ফারূকীর ন্যায় অনেক মনীষী—

    সেই কালো হাতের চির-ধ্বংস সাধনে প্রতিজ্ঞা-দীপ্ত তরুণদের হাতে।

    —অনুবাদক


    লেখক কর্তৃক লিখিত ও অনূদিত কয়েকটি বই

    • ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার (২য় সং)
    • ঈমান যখন জাগলো (২য় সং)
    • ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক (৩য় খণ্ড, ২য় সং)
    • ইসলামে প্রতিরক্ষা কৌশল (১ম সং) — (“মহানবী (সা)-র রণ-কৌশল” নামে ২য় সং প্রকাশের পথে
    • খালিদ বিন ওয়ালীদ (১ম সং)
    • ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক (১ম খণ্ড, প্রকাশের পথে)
    • গল্প পড়ি জীবন গড়ি (শিশু-কিশোর গ্রন্থ, ২য় সংস্করণ)
    • তাঁরা ছিলেন মানুষ (শিশু-কিশোর গ্রন্থ, ১ম সং)

    আমাদের কথা

    পৃথিবীর সমর নায়কদের ইতিহাসে মুহাম্মদ বিন কাসিম একটি অবিস্মরণীয় নাম। উমাইয়া খলীফা প্রথম ওয়ালীদের অন্যতম সিপাহসালার হাজ্জাজ ইবনে য়ূসুফের জামাতা সপ্তদশবর্ষী তরুণ যুবক মুহাম্মদ বিন কাসিম মুসলিম জাতির গৌরব। পৃথিবীর সমর ইতিহাসে এত অল্পবয়স্ক যুবকের নেতৃত্বে কোন সমরাভিযান পরিচালিত হয়েছে কি-না তা আমাদের জানা নেই। মূলত তাঁরই প্রজ্ঞা, তাকওয়া, সমর-কুশলতা ও কুরবানীর বদৌলতে এই উপমহাদেশ মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! এ বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণ সমর নেতাকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এক দিকে তাঁর অসম সাহসিকতা, বীরত্ব ও রণকূশলতা কিংবদন্তীর ন্যায় প্রচলিত, অপর দিকে তাঁর অকাল মৃত্যুর করুণ কাহিনী শোকাবহ ঘটনা হিসেবে অবিস্মরিত।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম সম্পর্কে তথ্য-নির্ভর কোন পুস্তক বাংলা ভাষায় নেই বললেই চলে। প্রখ্যাত সমর বিজ্ঞানী জেনারেল মুহাম্মদ আকবর খান প্রণীত “আমীরে মুজাহিদীন মুহাম্মদ বিন কাসিম” শীর্ষক গ্রন্থটি একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। লেখক অত্র পুস্তকে সমর-নায়ক ও রণকুশলী যোদ্ধা হিসেবে মুহাম্মদ বিন কাসিমের ঘটনা-বহুল ও তথ্যসমৃদ্ধ জীবনী তুলে ধরেছেন। লেখকের আলোচনা পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত। যুগের চাহিদা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অতি নিখুঁত-ভাবে তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবনী উপস্থাপনা করেছেন। বইটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন অধ্যাপক এ. এস. এম. ওমর আলী। তিনি একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত লেখক ও খ্যাতনামা অনুবাদক। অনুবাদের ভাষা প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য। আল্লাহ তা’আলা অনুবাদকের কলমকে আরও মযবুত করে দিন।

    ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ অতি অল্প সময়ের মধ্যে আলোচ্য পুস্তকটি প্রকাশ করত সুধী পাঠক মহলে উপহার দিতে পেরে রাহমানু’র-রাহীমের দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছে।

    ফরীদুদ্দীন মাসউদ

    পরিচালক

    অনুবাদ ও সংকলন বিভাগ

  • আভা ও তার প্রথম পুরুষ

    আভা ও তার প্রথম পুরুষ

    আভা ও তার প্রথম পুরুষ

    প্রথম প্রকাশ : নবেম্বর ১৯৮৮

    প্রকাশক: ওয়াজির হাসান, জাহাঙ্গীর ব্রাদার্স, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০

    সর্বস্বত্ব: লেখক

    প্রচ্ছদ: নাছির হাসান

    প্রকাশকের কথা

    লেখকের মৃত্যুর পর প্রথম বারের মতো আমরা পাঠকদের জন্য তাঁর অপ্রকাশিত নতুন উপন্যাস ‘আভা ও তার প্রথম পুরুষ’ দিতে পেরে আনন্দিত। সেই সাথে লেখকের অপ্রকাশিত অন্যান্য উপন্যাসগুলিও পাঠকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বই রূপে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।