Author: তাহের আলমাহদী

  • তিন

    তিন

    মাথার নিচে হাত রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বনহুর। পাশে বসে নুরী ওর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ বনহুরের আংগুলে দৃষ্টি চলে যায় তার। আনন্দধ্বনি করে ওঠে নূরীহুর, ও আংটি তুমি কোথায় পেলে?

    হাতখানা সরিয়ে নিয়ে বলেন বনহুর-উছ ওটা আংটি নয়।

    তবে কী?

    ওটা প্রীতির দান।

    প্রীতির দান। কে দিয়েছে? কেন দিয়েছে?

    নূরী, সব জানতে চেয়ো না।

    আমাকে বলতে তোমার এত আপত্তি কেন হুর। বল ও আংটি তুমি কোথায় পেলে?

    হেসে বলে বনহুর রাগ করবে না তো?

    রাগ। মোটেই না! বল তুমি ঐ আংটি কার নিকট থেকে কেড়ে নিয়েছ?

    কেড়ে নেইনি পরিয়ে দিয়েছে।

    মিথ্যা কথা, দস্যু বনহুরের আংগুলে কেউ আংটি পরিয়ে দেবে এত বড় সাহস কার আছে। সত্যি করে বল এ আংটি কোথায় পেলে?

    একটি মেয়ে আমাকে উপহার দিয়েছে। ঠাট্টা কর না হুর।

    ঠাট্টা নয় নূরী। উঠে বসলো বনহুর। আংগুলের আংটিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে।

    নূরীর মুখমণ্ডল পরিবর্তন দেখা দেয়। গম্ভীর গলায় বলে—হুর কে সে। রানী যে তোমার আংগুলো আংটি পরিয়ে দিতে পারে?

    বনহুর উঠে দাঁড়ায়—সব কথা বলা যায় না নুরী।

    নূরী আর কোন প্রশ্ন করে না। ধীরে ধীরে উঠে নিজের কক্ষের দিকে চলে যায়। অভিমানে ভরে ওঠে তার মন…একথা কি সত্য? বনহুরকে অন্য কোন নারী আংটি পরিয়ে দিতে পারে? না না, সে সবই সইতে পারে কিন্তু নতুন একঠক করে বল, ঘাবড়ে গেলে সইতে পারিনি বনহুরকে অন্য কোন মেয়ে ভালবাসবে, এ সহ্য করতে পারবে না। বনহুর যে তার, ওকে ছাড়া নূরী কাউকে বুঝে না। সে জীবনে এ একটিমাত্র পুরুষকেই চিনে এসেছে। সে হচ্ছে তার জীবনের একমাত্র সাথী। আর ভাবতে পারে না নুরী। বনহুর মিথ্যে কথা বলেছে না-না কোন নারী দস্যু বনহুরকে ভালবাসতে পারে না। সবাই তার নামে আঁতকে ওঠে। হৃদকম্প শুরু হয় তাদের কিন্তু বনহুরকে যদি একবার কোন নারী স্বচক্ষে দেখে সে কিছুতেই ভালো না বেসে পারবে না। ওর মধ্যে এমন একটি আকর্ষণ আছে যার কাছে সবাই পরাজিত হবে। সত্য কি তবে ওকে কোন নারী….না না, তা হতে পারে না। বনহুর তার। তাকে কোন নারী তার কাঝ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না…ছুটে যায় নূরী বনহুরের কক্ষে।

    বনহুর নতুন একড্রেসে সজ্জিত হচ্ছিল। নূরী ছুটে গিয়ে চেপে ধরে ওর জামার আস্তিন-বনহুর ঠিক করে বল, তুমি যা বললে তা সত্যি? হেসে ওঠে বনহুর-এরই মধ্যে এত ঘাবড়ে গেলে নূরী?

    না না, আমাকে তুমি সত্যি করে বল? হুর, আমি সব সইতে পারি কিন্তু তোমাকে হারাতে পারি না… বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে নূরীর কষ্ঠ ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে অশ্রুধারা।

    বনহুর আংগুল দিয়ে নূরীর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে অয়ধা মন খারাপ কর না নূরী।

    বনহুর, বল তুমি যা বললে, সব মিথ্যে?

    নূরী, তুমি আমার ওপর বিশ্বাস হারিও না? আমার কাছে তোমার কোন অমর্যাদা হবে না।

    বনহুরের বুকে মাথা রেখে বলে নূরী–হুর, তুমি আমার!

    বনহুর নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন হয়তো তার মনে আর একটি মুখ ভেসে উঠেছে।

    বনহুর নূরীকে লক্ষ্য করে বলেও নূরী, বল তাজকে প্রস্তুত করতে।

    নূরী বেরিয়ে যায়।

    একটু পরে ফিরে আসে—তাজ তৈরি আছে হুর।

    বনহুর নূরীর রক্তিম গণ্ডে আংগুল দিয়ে মৃদু আঘাত করে হেসে বলে–চললাম নূরী।

    নূরী শুধু ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানাল।

    টানা বারান্দা বেয়ে এগিয়ে যায় বনহুর। তারপর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বিকট আকার ব্যাঘ্র মূর্তির মুখগহ্বরে পা দিয়ে চাপ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে একটা দরজা বেরিয়ে আসে তার সম্মুখে। বনহুর বাইরে বেরিয়ে আসতেই দুজন লোক তাজকে এনে হাজির করে বনহুর একলাফে চড়ে বসে তাজের পিঠে। তাজ উলকাবেগে ছুটতে শুরু করে।

    বনের শেষ প্রান্তে গিয়ে তাজের পিঠ থেকে নেমে পড়ে বনহুর। তারপর তাজের পিঠে হাত বুলিয়ে বলে বাড়ি ফিরে যা তাজ।

    এবার বনহুর কিছুটা এগিয়ে যায়।

    ওপাশে রাস্তার উপরে একটি মোটরকার অপেক্ষা করছে। ড্রাইভার বনহুরকে দেখতে পেয়েই গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা খুলে ধরে।

    বনহুর ড্রাইভ আসনে উঠে বসতেই ড্রাইভার তার পাশে বসে। বনহুর এবার গাড়িতে স্টার্ট দেয়।

    অতি দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছিল বনহুর। চোখে আজ তার এক নতুন উন্মাদনা।

    ঘাটের অদূরে পাশাপাশি কয়েকখানা ছোট বড় নৌকা বাধা রয়েছে। ওদিকের একখানা বড় নৌকা বেশ পরিপাটি করে সাজানো, কয়েকজন মাঝি। বৈঠা হাতে বসে রয়েছে। একজন বলিষ্ঠ মাঝি দাঁড় ধরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মাথায় পাগড়ী দিয়ে তার মুখের খানিকটা অংশ ঢাকা। চোখেমুখে একটা শয়তানী ভাব উপচে পড়ছে। কিন্তু লোকটা পাগড়ী দিয়ে নিজের মুখটাকে এমনভাবে আড়াল করে রেখেছে, যাতে কেউ তার মুখ সহজে দেখতে না পায়। অন্যান্য মাঝির মাথাতেও এক একটা গামছা বাঁধা। কারও বা মাথায় একখণ্ড কাপড় জড়ানো, যেমন মাঝিদের হয়।

    এই নৌকাখানাই মনিরাদের জন্য ভাড়া করা হয়েছে, দাড়ীর বেশে যে লোকটা পাগড়ীর আড়ালে মুখটা লুকাতে চেষ্টা করছে, তবে সে ব্যক্তি অন্য কেউ নয়—শয়তান নাথুরাম এবং অন্যান্য মাঝির বেশে তারাই অনুচরবর্গ।

    অল্পক্ষণেই একদল বান্ধবীসহ মনিরার গাড়ি এসে দাঁড়ালো ঘাটের অদূরে। গাড়ি রেখে নেমে ছিল সবাই। চৌধুরী সাহেব এবং সরকার সাহেব উভয়ে এসেছেন তাদের সঙ্গে। সরকার সাহেব আংগুল দিয়ে বড় নৌকাখানা দেখিয়ে দিয়ে বলেন—চৌধুরী সাহেব, ঐ নৌকাখানা আমি মা মণিদের জন্য ভাড়া করেছি।

    চৌধুরী সাহেব নৌকা দেখে খুশি হলেন হেসে বলেন—বেশ, বেশ সুন্দর নৌকাখানা তো! বেশ বড়সড়ও সরকার সাহেব। আপনি কিন্তু ওদের সঙ্গেই থাকবেন।

    জি হ্যাঁ আমি মা-মনিদের সঙ্গেই যাচ্ছি। কথাটা বলেন বৃদ্ধ সরকার সাহেব।

    মনিরা হাত উঠিয়ে ডাকে—এই মাঝি নৌকা নিয়ে এসো।

    মাঝিগণ ব্যস্ত হয়ে নৌকা এগিয়ে আনতে লাগলো। নৌকাখানা খুব বড় হওয়ার একেবারে ঘাটের নিকটে পৌঁছল না, মাঝিরা একটা তক্তা ঘাট আর নৌকায় পেতে দিল।

    মেয়েদের আনন্দ আর ধরে না। সবাই এক এক করে তক্তা খানার ওপর দিয়ে নৌকায় গিয়ে পৌঁছল। মনিরা কিন্তু খুব ভয় হচ্ছিল সে বারবার, তক্তাখানায় পা রেখে পা সরিয়ে নেয়। চৌধুরী সাহেব এবং বৃদ্ধ সরকার সাহেব মনিরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেমন করে মনিরা নৌকায় যাবে? অন্যান্য মেয়েরা নৌকায় পৌঁছে হাসাহাসি শুরু করলো। মনিরার অবস্থা দেখে এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগলো। কেউ বলেন—মনিরা এত ভীতু। কেউ বলেন-আয় আমার হাত ধরে পার হয়ে আয় মনি। কেউ বলেন–মাঝিদের একজন পার করে নাও না।

    মনিরা নিরুপায় হয়ে তাকাচ্ছে মামাজানের মুখের দিকে।

    চৌধুরী সাহেব বলে উঠেন, ও মাঝি, ওকে হাত ধরে পার করে নাও, দেখ পড়ে না যায়।

    একজন মাঝি এগিয়ে আসতেই অন্য একজন মাঝি তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই এগিয়ে এসে মনিরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

    মনিরা সঙ্কুচিতভাবে হাতখানা এগিয়ে দিল ওর দিকে। মাঝি মনিরার হাত চেপে ধরে নির্বিঘ্নে পার করে নিল। কিন্তু মনিরা নিজের হাতে কেমন যেন একটা মৃদু চাপ অনুভব করলো। মনে মনে ভীষণ রাগ হলো মনির। মাঝির হাত থেকে হাতখানা টেনে নিয়ে নৌকায় একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

    মেয়েরা মুখ টিপে হাসলো। একজন মনিরার কাছে মুখ নিয়ে বলেন, মাঝিটার তোর জন্য বড় দরদ।

    যা, যত সব ইয়ে।

    সরকার সাহেব নৌকায় উঠে বসতেই নৌকা ছেড়ে দিল মাঝিরা।

    চৌধুরী সাহেব ঘাট থেকে হাত তুলে বলেন, বেশি রাত করো না মনিরা।

    মনিরাও হাত নেড়ে বলল, বেশি রাত করবো না মামুজান, তুমি বাড়ি যাও।

    নৌকায় বসে মেয়েদের সোক আনন্দ। কেউ বা গান গাইতে শুরু করলো, কেউ বা হাসি আর গল্পে মেতে রইল। কেউ বা মাঝিদের হাত থেকে বৈঠা নিয়ে পানি টানতে শুরু করলো।

    মনিরা কিন্তু গম্ভীর হয়ে রয়েছে। কারণ মাঝিটার আচরণ এখনও তার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কি অসভ্য ঐ মাঝিটা, একটা ছোটলোকের বাচ্চা। কেউ যে ওর হাতে হাত রাখে তাই ভাগ্য। সে কিনা তার হাতে চাপ দিল! ছিঃ বড় লজ্জার কথা, মনিরা সকলের অলক্ষ্যে একবার মাঝিটার দিকে বিষনজরে তাকায়, মাঝিটা যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি বিনিময় হতেই মনিরা রাগে অধর দংশন করলো এবং তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে।

    হাসলো মাঝিটা। দাঁড়ের ছপ ছপ শব্দের সঙ্গে তার মুখ থেকে একটি শব্দ বেরিয়ে মিলিয়ে গেল শুনা গেল না কিছু।

    সাথীরা ধরে ফেললো তাকে একটা গান শুনাতে হবে। মনিরা কিছুতেই গাইবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে গাইতেই হলো।

    বান্ধবীদের জেদে তার কোন আপত্তিই টিকলো না। মনিরার গানের সুর আর দাঁড়ের ঝুপঝাপ শব্দ মিলে এক মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি হলো। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, ঢেউয়ের বুকে দোল খেয়ে যেন এগিয়ে চলেছে।

    গোটা নৌকায় বিরাজ করছে এক অপরিসীম আনন্দ। বৃদ্ধ সরকার সাহেবও মেয়েদের সঙ্গে আনন্দে মাতোয়ারা। মনিরার গানের সুরের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন তিনি।

    হাসি গল্প আর আনন্দের মধ্যে নৌকাখানা যে অনেক দূরে এসে পড়েছে। সেদিকে খেয়াল নেই কারো।

    আকাশে পূর্ণচন্দ্র। সমত ঝিনাইদা নদীটা যেন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে। উঠেছে। যেদিকে তাকানো যায় শুধু আলোর বন্যা।

    মনিরা বলে ওঠে-সরকার চাচা এবার নৌকা ফেরাতে বলুন। সরকার সাহেবও বলে উঠলেন—তাইতো, অনেক দূরে এসে পড়েছি আমরা। মাঝি এবার তোমার নৌকা ফেরাও।

    মাঝিরা হঠাৎ কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে ছিল। নৌকাখানা যেমন চলছিল তেমনি এগুতে লাগলো বরং গতি আরও বেড়ে গেছে। মনিরা বলে ওঠে, মাঝি নৌকা ফেরাও।

    কিন্তু কই তারা যেমন দাঁড় টানছিল, তেমনি নির্বিকারভাবে কাজ করে চলেছে। নৌকা ফেরাবার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

    অদূরে দেখা গেল ঝিনাইদার বাঁক। সবাই লক্ষ্য করলো বাকের মুখে একখানা বজরা বাধা রয়েছে। বজরায় কোন আলো নেই।

    জ্যোস্নার আলোতে বজরাখানাকে একটি ভাসমান কুটিরের মত মনে হলো।

    এমন সময় নৌকার পেছনে শুনা গেল চাপা একটি কণ্ঠস্বর সব মনে, আছে তো?

    অপর একটি চাপাক—আছে হুজুর।

    পূর্বের কণ্ঠ মেয়েটিকে ঠিকভাবে চিনে রেখেছিস?

    হ্যাঁ, হুজর….।

    দাঁড়ের শব্দে কথার আওয়াজগুলো মেয়েদের বা সরকার সাহেবের কানে যায় না।

    হঠাৎ দেখা যায় বজরার দিক থেকে একখানা ছিপনৌকা তর তর করে এদিকে এগিয়ে আসছে।

    মাঝিদের ভাবসাব লক্ষ্য করে মেয়েরা আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ সরকার সাহেব বারবার বলতে থাকে মাঝি, নৌকা ফেরাও মাঝি নৌকা ফেরাও–

    কিন্তু মাঝিরা সে কথা কানেও নেয় না।

    মেয়েরা ভয়ার্তস্বরে এটা সো বলারলি শুরু করলো। কেউ বা কেঁদেই ফেললো।

    সরকার বলেন-মাঝি, তোমরা জানো না এ নৌকায় কার ভাগনী আছে? শিগগির নৌকা ফেরাও।

    ঠিক সে মুহূর্তে দাড়ী-মাঝি সরকার সাহেবের বুকের কাছে রিভলভার চেপে ধরে গর্জে ওঠে——জানি এবং তার জন্যই আমরা নৌকা বেয়ে এতদূর এসেছি। যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, তবে সবাই চুপ করে থাক। চৌধুরী সাহেবের ভাগনী মনিরাকে আমাদের চাই।

    ভীষণভাবে শিউরে উঠলো মনিরা। এবার সে বুঝতে পারলো মাঝিদের মনোভাব। কিন্তু মুখে ভয়ের ভাব না এনে বলেন—খুবতো আস্পর্ধা তোমাদের দেখছি। মনিরাকে নেওয়া যত সহজ মনে করছে তত সহজ নয়। শিগগির নৌকা ফেরাও, নচেৎ আমরা সবাই মিলে চিৎকার করবো!

    শয়তান নাথুরাম হেসে ওঠে হাঃ হাঃ হাঃ চিৎকার করবে? এই নির্জন নদীবক্ষে কে শুনবে তোমাদের কণ্ঠস্বর?

    অন্য মেয়েরা সবাই পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে গেছে। কারও মুখে কথা নেই। মনে-প্রাণে সবাই খোদাকে স্মরণ করতে থাকে। ভয়ে সকলের মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।

    সরকার সাহেব বৃদ্ধ, তবু হার মানলেন না, চিৎকার করে বলেন–শয়তান, তোমাদের চক্রান্ত আগে বুঝতে পারলে তোমাদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দিতাম।

    হুঙ্কার ছাড়ে নাথুরাম—তা যখন পারনি তখন বুড়ো বয়সে পৈতি জানটা নষ্ট কর না। সুবোধ বালকের মত নিশ্চপ বসে থাক।

    নিরস্ত্র সরকার সাহেব শুধু চিৎকার করে শাসাতে লাগলেন, তাছাড়া আর কিইবা করবেন তিনি! এতগুলো দস্যুর সঙ্গে পেরে ওঠা তার পক্ষে মুশকিল।

    মেয়েদের মধ্যে একটা হুলস্থুল শুরু হয়েছে। কেউ কাঁদছে, কেউ-বা চিল্কার করছে। কেউ বা বলছে—এটা দস্যু বনহুরের নৌকা। সে মনিরাকে

    চুরি করার জন্য এই ফন্দি এটেছে।

    মেয়েরা তো বনহুরের নামে কাপতে শুরু করলো! সেকি ভীষণ অবস্থা।

    ছিপ নৌকাখানা একেবারে নিকটে পৌঁছে গেছে।

    দু’জন বলিষ্ঠ লোক মনিরাকে জাপটে ধরলো। বাধা দিতে গেল সরকার সাহেব, সঙ্গে সঙ্গে একটা বলিষ্ঠ লোক তার নাকে ঘুষি বসিয়ে দিল। সরকার সাহেব ঘুরপাক খেয়ে পড়ে গেল নৌকায়।

    লোক দু’জন মনিরাকে শূন্যে উঠিয়ে নিল, তারপর লাফিয়ে ছিল ছিপ নৌকাখানায়। সঙ্গে সঙ্গে অন্য মাঝিগণও ছিপ নৌকায় লাফিয়ে পড়তে লাগলো।

    ওদিকে মনিরার বান্ধবীগণ ভীষণ আর্তনাদ শুরু করে দিয়েছে। বাঁচাও! বাঁচাও! দস্যু বনহুর আমাদের সর্বনাশ করলো, আমাদের মেরে ফেললো। বাঁচাও বাঁচাও…..

    মনিরাকে ছিপ নৌকায় উঠিয়ে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে চললো দস্যুগণ বজরাখানার দিকে। মনিরাও তীব্রকণ্ঠে চিৎকার করছে—বাঁচাও বাঁচাও…

    মাঝি-বেশি শয়তানের অনুচরের দল ছিপ নৌকায় দাঁড় টেনে চলেছে। ওদিকে মনিরার বান্ধবীও আহত সরকার সাহেবকে নিয়ে বড় নৌকাখানা আপন মনে এদিকে ভেসে চললো।

    ছিপ নৌকাখানা প্রায় বজরার নিকটবর্তী হয়েছে, এমন সময় সে মাঝি। যে মনিরাকে তক্তা পার করে নিতে গিয়ে তার হাতে মৃদু চাপ দিয়েছিল, সে হাতের বৈঠা নিয়ে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করে। অন্য মাঝিদের ছিপ নৌকাখানা ভীষণ একটা ঘুরপাক খেয়ে গেল।

    আচমকা এই বিপদের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না শয়তান নাথুরাম, সে রিভলভার উদ্যত করে গর্জে উঠলো কে তুই?

    মনিরা জ্যোস্নার আলোতে লক্ষ্য করলো, এ সে মাঝি কিছু পূর্বেও যে মাঝিকে সে মনে মনে অভিসম্পাত করছিল। এক্ষণে মনিরার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে, কে এ মাঝি যার প্রাণে এত দয়া? নিশ্চয়ই তাকে বাঁচানোর জন্যেই মাঝিটির এত প্রচেষ্টা।

    নাথুরাম মাঝিটার বক্ষ লক্ষ্য করে রিভলভার উদ্যত করে ধরতেই মাঝিটা চট করে সরে দাঁড়ালো, নাথুরামের রিভলভার নিস্তব্ধ নদীবক্ষে গর্জে উঠলো—শুড়ম।

    মাঝিটা নাথুরামকে পুনরায় রিভলভার উদ্যত করতে না দিয়ে ভীষণভবে আক্রমণ করলো। নাথুরাম টাল সামলাতে না পেরে ছিপ নৌকাখানার মধ্যে পড়ে গেল। মাঝি তার হাত থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিয়ে ফেলে দিল নদীবক্ষে।

    ততক্ষণে অন্য শয়তানগুলো আক্রমণ করে মাঝিটাকে। চলে ভীষণ ধস্তাধস্তি।

    ছোট্ট ছিপ নৌকাখানার উপরে সেকি তুমুল অবস্থা। ভয়ে মনিরার অবস্থা মরিয়া হয়ে উঠলো। এভাবে নৌকা ভ্রমণের জন্য নিজকে ধিক্কার দিতে লাগলো!

    সামান্য একটি ছিপ নৌকা এভাবে কতক্ষণ টিকতে পারে। বিশাল নদীবক্ষে ছিপ নৌকাখানা মোচার খোলার মত দুলতে লাগলো। মনিরা ভয়কম্পিত বক্ষে দেখছে এই বুঝি ছিপ নৌকাখানা ডুবে যায়। মনে প্রাণে সে মাঝিটার কামনা করছে। কি আশ্চর্য ওর সঙ্গে এতগুলো শয়তান পেরে উঠছে না। মাঝিটা এক একটা প্রচণ্ড ঘুষিতে নাথুরামের অনুচরগণকে নদীবক্ষে নিক্ষেপ করতে লাগলো। কিন্তু নাথুরাম হটার বান্দা নয়, সে প্রাণপণে মাঝিটাকে কাবু করার চেষ্টা করতে লাগলো।

    হঠাৎ ছিপ নৌকাখানা একপাশে কাৎ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেল নদীবক্ষে।

    কোথায় গেল মনিরা কোথায় বা নাথুরাম আর শয়তান মাঝিদের দল। . যে যেদিকে পারলে সাঁতার কেটে প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করলো।

    মনিরা তলিয়ে যাচ্ছে। সে সাঁতার কাটতে পারে না। বাঁচার কোন উপায় নেই তার। ঢক ঢক করে কিছুটা পানি খেয়ে ফেললো সে। এই ছিল তার অদৃষ্টে। হায় কেন সে আজ নৌকা ভ্রমণে বেরিয়েছিল। মৃত্যকালে একবার মনে ছিল মনিরের কথা। আর ওর মুখখানা দেখতে পেল না মনিরা। তবু বাঁচার জন্য মনিরা হাত-পা ছুঁড়ে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো।

    হঠাৎ মনিরা অনুভব করলো কেউ যেন তাকে ধরে ফেলেছে। মনিরা তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। একটা একটা খড়-কুটোও তখন তার কাছে অতি বড় সম্পদ। সে কিছু না ভেবে আঁকড়ে ধরলো শত্রু কিংবা মিত্র ভাবার সময় তখন তার নেই।

    মনিরা যখন চোখ মেলে তাকালো তখন একটা উজ্জ্বল আলো তার সামনে ছড়িয়ে ছিল। উঠে বসতে গেল অমনি একটা বলিষ্ঠ বাহ তাকে শুইয়ে দিল।

    মনিরা চমকে ফিরে তাকালো সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ আপত কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো-মনির।

    হাসলো বনহুর, কোন জবাব দিল না।

    মনিরা আনন্দের আবেগে বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরলো। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে—তুমি! এ যে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। মনির, কি করে আমি তোমার পাশে এলাম। বল, বল মনির?

    হেসে বলেন বনহুর—সে মাঝি তোমাকে আমার নিকটে পৌঁছে দিয়েছে, যে নাবিককে তুমি মনে মনে অভিসম্পাত করেছিলে।

    মনিরার চোখে একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়ে, অবাক হয়ে বলে–মনির তুমি কি করে জানলে আমি সে মাঝিকে গালমন্দ দিয়েছিলাম সে মাঝিই বলেছে।

    মনিরা আরও অবাক হয়ে বলে–সে কি করে আমার মনের কথা বলবে? জান মনির, সত্যি আমি তাকে অসভ্য বলে মনে মনে গালমন্দ দিয়েছিলাম। কিন্তু সে না হলে হায় কি যে হত। শয়তান দস্যু দল আমাকে হত্যা করতো।

    গম্ভীর কণ্ঠে বলে বনহুর হত্যা করতো না একথা সত্য তোমাকে তারা . হরণ করে এক শয়তানের হাতে সমর্পণ করতো–

    উঃ কি সর্বনেশে কথা! মনির, সে মাঝি তোমার কে?

    কি তার পরিচয়?

    সে আমার বন্ধু।

    বন্ধু? মনির আমার হয়ে তুমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিও। বেচারা আমাকে কত কষ্ট করে বাঁচিয়েছে।

    নাহলে তুমি এখন শয়তান মুরাদের হাতে গিয়ে…

    অস্ফুট ধ্বনি করে ওঠে মনিরা–মুরাদ।

    হ্যাঁ, সে মুরাদ তোমাকে হস্তগত করার জন্য অবিরত ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার টাকা সে পানির মত খরচ করেছে।

    দাঁতে দাঁত পিষে বলে মনিরা—পাষণ্ড শয়তান….মনির, তোমার মাঝি বন্ধু কত মহৎ।

    হ্যাঁ মনিরা, গরীব বলে কখনও কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করা উচিত নয়, বা অবহেলা করা ঠিক নয়। তাই বলে সবাইকে বিশ্বাস করাও ঠিক নয়।

    মনিরা বনহুরের জামার বোতাম নিয়ে নড়াচড়া করতে করতে বলে–আমি কি জানতাম ওটা ডাকাতের নৌকা। ভাগ্যিস মাঝিটা ছিল, সত্যি তার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। এক্ষণি তাকে যদি পেতাম…

    কি করতে?

    হাত ধরে মাফ চেয়ে নিতাম।

    বনহুর মনিরার হাতের কাছে হাতখানা বাড়িয়ে দেয়—সে মাঝি তোমার সামনে উপস্থিত মনিরা নাও মাফ চেয়ে নাও।

    মনিরার চোখে বিস্ময়, মুখে ফুটে ওঠে স্মিত হাসির রেখা, বলে ওঠে সে—তাই বল। হ্যাঁ, এবার বুঝেছি সব। তাই তো বলি, কোন সে মাঝি যার এত বীরত্ব।

    কই মাফ চেয়ে নিলে না আমার কাছে।

    মনিরা বনহুরের বুকে মাথা রেখে চিবুকে মৃদু টোকা দিয়ে বলে–তুমিই এবার আমার নিকটে মাফ চেয়ে নাও। কারণ, একটি যুবতীর হাতে চাপ দেওয়া কম দোষণীয় নয়।

    বনহুর আর মনিরা মিলে হাসতে থাকে। বনহুর বলেন—মনিরা, এখানে বেশিক্ষণ থাকা তোমার পক্ষে ঠিক নয়। বল এবার তোমাকে কিভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়?

    মনিরা চারদিকে তাকিয়ে বলে—এখন আমি কোথায় মনির?

    বনহুর সোজা হয়ে বসে বলে—তুমি এখন আমার গুপ্তকক্ষে বন্দী রয়েছ।

    কি বললে এটা তোমার গুপ্তকক্ষ?

    হ্যাঁ, গভীর মাটির তলায় রয়েছ এখন তুমি।

    এ তুমি কি বলছ!

    কেন, ভয় হচ্ছে নাকি?

    না।

    জান মনিরা, এখানে যদি তোমাকে চিরদিন আটকে রাখি কেউ তোমার সন্ধান পাবে না। এখানে শুধু তুমি আর আমি। মনির, তোমার জন্য আমি সব ত্যাগ করতে পারবো।

    বনহুর অন্যমনস্ক হয়ে যায়, কি যেন চিন্তা করতে থাকে।

    মনিরা বলে—কি ভাবছো!

    জবাব দেয় বনহুর—ভাবছি, তোমার মামাজান-মামীমার কথা। তারা এতক্ষণে হয়তো কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন।

    কি বললে, আমার মামুজান আর মামীমা? তোমার কেউ নন তারা? বলেন, আব্বা আর আম্মা।

    সত্য মনিরা, আব্বা আর আম্মা খুব বুঝি ভাবছেন তোমার জন্য। একদিন ঐ ঝিনাইদার বুকে হারিয়েছিল তাঁর প্রিয় পুত্র মনিরকে। আর আজ সে ঝিনাইদা হরণ করলো তাদের একমাত্র কন্যা সমতুল্যা ভাগ্নী মনিরাকে

    না, আর বিলম্ব করা উচিৎ হবে না মনিরা, চলো তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি। বনহুর উঠে দাঁড়ালো।

    মনিরাও উঠতে গেল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বসে ছিল সে।

    বনহুর পুনরায় পাশে বসে বলল—এখনও অসুস্থ বোধ করছো মনিরা?

    হ্যাঁ, মাথাটা এখনও ঝিম ঝিম করছে।

    তবে চুপ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাক। আমি এক্ষুণি আসছি।

    কোথায় যাবে মনির?

    বিশেষ একটা দরকার আছে।

    যাও! মনিরা, বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।

    বনহুর বেরিয়ে যায়।

    বনহুর বেরিয়ে যেতেই মনিরা উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঘুরেফিরে দেখতে লাগলো সব। যে কক্ষে সে শুয়েছিল সেটা একটা মাঝারি রকমের ঘর। কক্ষের দেয়াল কঠিন পাথর দিয়ে তৈরি। কোন আড়ম্বর নেই সে। কক্ষে। মেঝের এক পাশে পাথর দিয়ে তৈরি একটা খাট। খাটে দুগ্ধ ফেননিভ কোমল বিছানা, যে বিছানায় সে এতক্ষণ শুয়েছিল। মনিরা বুঝতে পারল ঐ বিছানা দস্যু বনহুরের। কক্ষের একপাশে একটা পাথরের টেবিল। ‘ টেবিলে ছোটবড় কয়েকখানা রিভলবার। ওপাশের দেয়ালে ঠেস দেওয়া রয়েছে বড় বড় ভারী গোছের দুটো রাইফেল। আর একটা টেবিলে কতকগুলো সুতীক্ষ্ণধার হোরা, অবশ্য সেগুলো সব খাপের মধ্যে আটকানো। মনিরা ধীরে ধীরে সে অস্ত্রগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে নিল। এগুলো বনহুরের ব্যবহার্য অস্ত্র। সবগুলোতে যেন তার হাতের স্পর্শ লেগে রয়েছে।

    মনিরা এগুতে লাগলো, দেখতে পেল সামনে একটি দরজা তার ওপাশেই একটা সিড়ির মত আরও নিচে নেমে গেছে। মনিরা এক পা দু’পা করে এগুতে লাগলো। সিড়ির মুখে গিয়ে অবাক হলো সে, নিচে ঠিক তার পায়ের তলায় একটা হলঘরের মত প্রকাণ্ড একটা ঘর। ঘরের মধ্যে উজ্জল আলো জ্বলছে। মনিরা অবাক হয়ে দেখলো বনহুর একটি উচ্চ আসনে বসে আছে। তার সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে কতকগুলো বলিষ্ঠ লোক, প্রত্যেকের হাতেই এক একটা রাইফেল। মাথায় পাগড়ী কানে বালা, হাতে বালা, গায়ে ফতুয়ার মত আটসাট জামা।

    মনিরা স্তব্ধ হয়ে দেখছে লোকগুলো বনহুরের কোন আদেশের প্রতীক্ষা করছে।

    কি যেন বলেন বনহুর স্পষ্ট বুঝা গেল না, ভীষণকায় লোকগুলো কুর্নিশ জানিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, তারপর সারিবদ্ধভাবে অন্ধকার অদৃশ্য হয়ে গেল।

    লোকগুলোর চেহারা দেখে মনিরার কণ্ঠনালী শুকিয়ে গিয়েছিল। ঠিক যেন একদল রাক্ষসের মধ্যে বনহুর একটি দেবমূর্তি। আশ্চর্য হলো মনিরা, এত ভয়ঙ্কর লোকগুলো বনহুরকে সিংহের মত ভয় করে।

    মনিরা এই কথা ভাবছে হঠাৎ শুনতে পেল সিঁড়িতে ভারী বুটের শব্দ।

    সম্বিৎ ফিরে এলো মনিরার, সে দ্রুত নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে ছিল।

    বনহুর কক্ষে প্রবেশ করে মনিরার পাশে গিয়ে বসলো। মনিরা নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইলো বনহুরের মুখের দিকে এই সে দস্যু বনহুর যার ভয়ে গোটা দেশ প্রকম্পমান। যার নাম স্মরণ করে সবাই আতঙ্কে শিউরে ওঠে। পুলিশমহল যাকে গ্রেপ্তারের জন্য লাখ টাকা ঘোষণা করেছে সেই দস্যু বনহুর তার পাশে। তার অতি প্রিয়জন।

    বনহুর হেসে বলল অমন করে কি দেখছো মনিরা?

    তোমার আসল রূপ।

    কেমন দেখছো?

    অনেক সুন্দর-মনির, সত্যি তুমি আমাকে ভালবাস?

    হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন মনিরা?

    বল আমার মন শুনতে চাচ্ছে।

    বাসি। মনিরা… অস্ফুট শব্দ করে বনহুরের বুকে মাথা রাখে মনিরা।

    চলো মনিরা, এবার তোমাকে রেখে আসি।

    যদি না যাই তোমার খুব অসুবিধা হবে, না।

    আমার নয়, তোমার হবে।

    কেন? কি করে আমার অসুবিধা হবে?

    মনিরা, তুমি শিশু নও। তোমার নিরুদ্দেশ লোকনিন্দার কারণ হবে। আব্বা আম্মা তোমার জন্য লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারবেন না। বল তো তখন তাদের কত কষ্ট হবে?

    মনিরা উঠে দাঁড়ায়, তারপর বনহুরের হাত ধরে বলে–চলো।

    চলতে চলতে কথা হয় দুজনের মধ্যে। মনিরা বলে—তুমি না আমার গা ছুঁয়ে শপথ করেছিলে আর দস্যুতা করবে না। পারলাম না আমার কথা রাখতে মনিরা। শয়তান নাথুরাম ভয়ঙ্কর শয়তানী শুরু করেছে।

    নাথুরাম—সে আবার কে?

    মাঝির ছদ্মবেশে যে তোমাকে হরণ করতে যাচ্ছিলো।

    শয়তান নাথুরাম!

    হ্যাঁ, সে শুধু শয়তান নয় মনিরা, সে নরপিশাচ। দেখে নিতে চাই শয়তান নাথুরামের কত বাহাদুরি! আজই খবর পেলাম জম্বুরা পর্বতের এক গুহায় তার গোপন আস্তানা রয়েছে। সেখানে নাথুরামের একটি কালি মন্দিরও আছে। মন্দিরে প্রতি অমাবস্যায় একটি কুমারী কন্যাকে বলি দেওয়া হয়।

    মনিরা আর্তনাদ করে ওঠে—উঃ কি ভীষণ কাণ্ড!

    শুধু তাই নয় মনিরা, সে আরও অনেক কিছু দুষ্কর্মের সঙ্গে লিপ্ত আছে। আমি ওকে দেখে নেব।

    বনহুরের মনোভাব আবছা অন্ধকারে দেখতে পেল না মনিরা। কিন্তু অনুভব করলো সে মনিরার হাতের মধ্যে বনহুরের বলিষ্ট হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠেছে।

    তারপর কিছুদূর নীরবে এগুলো তারা।

    এবার এক সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করলো মনিরা আর বনহুর। বেশ অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ। বনহুর মনিরাকে এঁটে ধরলো-মনিরা, সাবধানে আমার হাত ধরে চলবে। পা ফসকে গেলেই মৃত্যু।

    মনিরা বনহুরের হাত এটে ধরে চলতে লাগলো।

    চলতে চলতে হেসে বলল বনহুর-মাঝি বেচারা তোমার হাতে মৃদু চাপ দিয়েছিল বলে সে তোমার অসংখ্য অভিসম্পাত কুড়িয়েছে, আর এখন…

    যাও ঠাট্টা রাখ। মনিরা বনহুরের হাতে হাত রেখে পায়ের দিকে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে বনহুরকে জাপটে ধরলো সে। সুড়ঙ্গ পথের আবছা অন্ধকারে দেখতে পেল, সরু একটা পথ, তার নিচেই হাত দেড়েক দূরে গভীর খাদ। শিউরে উঠলো মনিরা। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল—আমি কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছি না মনির, আমাকে তুমি নিয়ে চলো।

    বনহুর হেসে বলেন—বেশ, তুমি চোখ বন্ধ করো, ওয়ান, টু, থ্রীবনহুর মনিরাকে ছোট বালিকার মত দু’হাতের উপর উঠিয়ে নিল। এবার দ্রুত চলতে লাগলো সে। মনিরা দুহাতে নিজের চোখ ঢেকে চুপ করে রইলো।

    সুড়ঙ্গের বাইরে এসে মনিরাকে নামিয়ে দিয়ে বলল বনহুর, চোখ যেন খুলে না, পড়ে যাবে।

    মনিরা বুঝতে পারলো, এখন সে বেশ প্রশস্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মেলে আনন্দসূচক শব্দ করে উঠলো-ইস, কি সুন্দর আলো-বাতাস।

    একটা মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে বনহুর আর মনিরা। একি, দিন যে। তবে যে ওখানে অত আলো জ্বলছিল! বুঝতে পারলো মনিরা ওটা মটির নিচে তাই আলোর ব্যবস্থা।

    মনিরা সামনে তাকাতে দেখতে পেল অদূরে একটি জমকালো অস্ত্র নিয়ে। দটি লোক দাঁড়িয়ে আছে।

    বনহুর লোক দুটিকে ইংগিত করতেই অশ্ব নিয়ে এগিয়ে এলো। বনহুর এবার মনিরাকে অশ্বে উঠিয়ে নিয়ে নিজেও চড়ে বসলো। হেসে বল-এর নাম কি জান?

    না।

    এর নাম তাজ।

    বহুদিন নিশীথ রাতে অশ্বখুরধ্বনি কর্ণগোচর হয়েছে। আজ স্বচক্ষে দেখলাম এবং তার পৃষ্ঠে আরোহণ করার সৌভাগ্য লাভ করলাম। সত্যি আজ আমি গর্বিত।

    তাজ এবার উল্কা বেগে ছুটতে শুরু করলো। বনহুর মনিরাকে বা হাতে এঁটে ধরে দক্ষিণ হাতে লাগাম চেপে ধরলো।

    তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো বনহুর। তারপর মনিরাকে নামিয়ে বলেন—এবার কিছুটা হাঁটতে হবে, পারবে?

    পারবো।

    কিন্তু আমি আর যাচ্ছিনে তোমার সঙ্গে ঐ যে গাড়িখানা পথের ওপরে দেখছো ওটা আমার গাড়ি। ড্রাইভার তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে!

    মনিরা।

    বল?

    আবার কখন তোমার দেখা পাব?

    যখন তোমার মন আমাকে ডাকবে, দেখবে ঠিক আমি তোমার পাশে পৌঁছে গেছি। আচ্ছা এবার যাও, আল্লাহ হাফেজ।

    মনিরা এগুতে লাগলো, আর বারবার ফিরে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। বনহুর তাজের লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

    মনিরা গাড়িখানায় পাশে পৌঁছতেই ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরলো। মনিরা আর একবার ঘুরে বনহুর আর তাজের দিকে ফিরে তাকিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলো।

    গাড়ি বারান্দায় পৌঁছতেই মনিরা নেমে ছুটে গেল অন্দর বাড়িতে। দেখতে পেল তার সমস্ত বান্ধবী, যারা নৌকায় ছিল সবাই চৌধুরী সাহেব আর মরিয়ম বেগমকে গত রাতের ঘটনাটা বুঝাতে চেষ্টা করেছে। বৃদ্ধ সরকার সাহেবের মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। সকলের মুখমণ্ডল বিষণ্ণ, মলিন।

    চৌধুরী সাহেব আর মরিয়ম বেগমের চোখে অশ্রু, তারা অবিরত কাঁদছেন।

    মনিরাকে দেখতে পেয়েই বান্ধবীরা আনন্দধ্বনি করে উঠলো। চৌধুরী সাহেব চোখের পানি মুছে এগিয়ে আসেন কোথায় গিয়েছিলে মা, কি করে ফিরে এলি? ডাকাতরা নাকি তোকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল?

    মেয়েরা একসঙ্গে বলে ওঠে—দস্যু বনহুর ছাড়া কেউ নয়। তারই ঐ কাজ, কিন্তু কি করে ফিরে এলি ভাই?

    চৌধুরী সাহেব বলেন—একটু সুস্থ হউক, সব শুনছি।

    মনিরাকে পেয়ে মরিয়ম বেগম আনন্দে অধীর হলেন। তাড়াতাড়ি গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন—ভাল ছিলে তো, মা?

    হ্যাঁ মামীমা। ভাগ্যিস এক ভদ্রলোক আমাকে ডাকাতের নৌকা থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল, তাই রক্ষা। খুব ভদ্র মহৎ ব্যক্তি তিনি। খোদর অপরিসীম দয়ায় আর তার কৃপায় এ যাত্রা পরিত্রাণ পেয়েছি।

    সব শুনে আশ্বস্ত হলেন চৌধুরী সাহেব। বান্ধবীরা মনিরাকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠলো। মরিয়ম বেগম বলেন—তোমরা বসো, আমি চানাস্তার আয়োজন করি।

    চৌধুরী সাহেব উঠে দাঁড়ালেন কাল থেকে কি যে দুশ্চিন্তায় ছিলাম, যাই পুলিশ অফিসে খবরটা জানিয়ে আসি। মিঃ হারুন তার দলবল নিয়ে হয়রান পেরেশান হচ্ছেন। তারপর সরকার সাহেবকে লক্ষ্য করে বলেন, চলুন, ওদিক হয়ে ডাক্তারখানায় যাব। আপনার আরও একটি ইনজেকশন লাগবে!

    সরকার সাহেবও উঠে দাঁড়ান—চলুন।

    সবাই বেরিয়ে যান। বান্ধবীরা একজন বলে—ভদ্রলোক কেমন দেখতে রে মনিরা?

    হেসে বলে মনিরা খুব সুন্দর। অপূর্ব।

    অন্য একটি মেয়ে বলে-বয়স খুব বেশি?

    না, খুব কম। তবে তিরিশের কাছাকাছি।

    আর একজন বান্ধবী টিপনি কাটে—খুব বড়লোক বুঝি?

    মনিরা স্বাভাবিক কষ্ঠে জবাব দেয় রাজাধিরাজ?

    প্রথম বান্ধবী চাপাকণ্ঠে বলে–সে কি বিবাহিত?

    না।

    একসঙ্গে সবাই হর্ষধ্বনি করে ওঠে—মারহাবা! আমাদের নৌকাভ্রমণ সার্থক হয়েছে তাহলে!

    একজন বলেন-মনিরার ভাগ্য বলতে হবে।

    অন্যজন বলে–শুধু ভাগ্য নয়—সৌভাগ্য।

    আর একজন বলে–ভদ্রলোক নিশ্চয়ই তার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারেন।

    হ্যাঁ, পারে।

    আমাদের হিংসে হচ্ছে কিন্তু।

    আচ্ছা তোমাদের ভাগ দেব কিছুটা করে।

    তখন আর দেখাবিনে, লুকিয়ে রাখবি সবার কাছ থেকে।

    না, তোদের দেখার কথা দিলাম।

    এমন সময় মরিয়ম বেগম চা-নাস্তা ট্রে-সহ কক্ষে প্রবেশ করেন।

    মনিরা উঠে গিয়ে মামীমার হাত থেকে চায়ের ট্রে নিয়ে নিজেই তৈরি করতে বসে।

  • চার

    চার

    সে দিন বনহুর মাধুরীর ঘরে রাত কাটিয়ে গেছে কথাটা যখন সবাই জানতে পারলো তখন মাধুরীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। ভোরে যখন অদ্ভুতভাবে জামাইবাবু স্বয়ং এসে উপস্থিত হল তখন তো আরও ঘোরর ব্যাপার। জামাই বাবু রাতের ঘটনা সব বর্ণনা করে শুনাল কিন্তু নিজের স্ত্রীর কক্ষে দস্যু বনহুর রাত্রিবাস করছিল এ যে যার-পর-নাই কেলেঙ্কারি কথা। অমন স্ত্রীকে জামাই নিমাই বাবু গ্রহণ করতে অসম্মত হলো।

    মাধুরী অনেক করে বলেন–স্বামীর পা ছুঁয়ে শপথ করলো, দস্যু হলেও সে অতি মহৎ জন মাধুরীকে সে স্পর্শ করেনি। কিন্তু মাধুরীর কথাটা জামাই নিমাই বাবু বিশ্বাস করলো না।

    শ্বশুর শাশুড়ীর কান্নাকাটি, স্ত্রী মাধুরীর চোখের জল নিমাইকে ধরে রাখতে পারলো না। সে বাগ করে চলে গেল।

    মাধুরীর জীবনে নেমে এলো এক চরম পরিণতি। চোখের পানি হলো তার সম্বল। একি হলো তার বিয়ের পর স্বামীকে না চিনতেই তাকে হারাল মাধুরী। যত রাগ গিয়ে ছিল দস্যু বনহুরের ওপর, কিন্তু তার তো কোন অপরাধ নেই, দুস্য হলেও মাধুরী তার হৃদয়ের যে পরিচয় পেয়েছে সে অতি মহান-অতি মহৎ। স্বর্গের দেবতার চেয়েও সে পবিত্র!

    মাধুরী নিজের অজ্ঞাতে বনহুরের স্মৃতিকে মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছে। তার সৌম্যসুন্দর মূর্তি হৃদয় আসনে প্রতিষ্ঠা করেছে সে। শত চেষ্টাতেও মাধুরী ভুলতে পারছে না দস্যু বনহুরের কথা। মানুষ কত হৃদয়বান হলে তবেই তার স্বভাব এমন দেবসমতুল্যা হতে পারে, সদাসর্বদা তাই ভাবে মাধুরী। মনের অর্ঘ্য দিয়ে পূজা করে তার স্মৃতিকে। ঐ একটি রাতের পরিচয় মাধুরীর জীবনে এনে দেয় বিরাট একটা পরিবর্তন। বনহুরের সুন্দর দীপ্ত মুখখানা মাধুরী কিছুতেই ভুলতে পারলো না।

    মাধুরী ছিল মনিরার সহপাঠিনী। এককালে মনিরার সঙ্গে একই কলেজে পড়তো। মাধুরী ছিল হিন্দু, মনিরা মুসলমান, কিন্তু উভয়ের মধ্যে ছিল গভীর একটা যোগাযোগ। মনিরা মাধুরীকে খুব ভালবাসত। হঠাৎ মাধুরীর বাবা দূরে শহরের অপর প্রান্তে একটি বাড়ি করে সেখানে চলে যান। সে জন্য ছাড়াছাড়ি হয় উভয়ের মধ্যে।

    সেদিন মনিরা শহরের ঐ দিকে কোন প্রয়োজনবশতঃ গিয়েছিল হঠাৎ তার মনে পড়ে মাধুরীর কথা, একবার দেখা করে গেলে মন্দ হয় না। মাধুরীর বিয়ে হয়ে গেছে খবরটা মাধুরীর একটা চিঠিতেই জানতে পেরেছিল। বাড়ির ঠিকানাটাও মাধুরী পাঠিয়েছিল তাকে।

    মাধুরীর বাড়ি খুঁজে বের করতে বেশি বিলম্ব হয় না মনিরার! গাড়ি রেখে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে ডাকে-মাধুরী-মাধুরী!

    অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর, মাধুরী ঘরে শুয়ে শুয়ে কি ভাবছিল, শুনতে পেরে ছুটে আসে। জড়িয়ে ধরে উভয়ে উভয়কে। মনিরা মাধুরীর সাদাসিধে পোশাক দেখে হেসে বলে–কিরে মাধুরী বিয়ে করলি, কিন্তু এমন কেন?

    মনিরার কথায় মাধুরীর মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন হয়ে ওঠে, কি যেন ভাবে। তারপর বলে—মনি, ঘরে চল্ সব বলছি।

    মনিরাকে সঙ্গে করে নিয়ে বাসায় মাধুরী।

    মনিরা হেসে বলে—এরই মধ্যে যে একেবারে বুড়ী বনে গেছিস মাধু, ব্যাপার কি?

    একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে মাধুরী—ভাই, বিয়ে হয়েছে সত্য, কিন্তু ও বিয়ে আমার বিয়ে নয়।

    তার মানে?

    মানে, স্বামী বলে কিছু জানি না।

    হেঁয়ালি রেখে সোজা কথা বল।

    তবে শুন্ আমার জীবনে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেছে, যদি ধৈর্য ধরে শুনিস তবে বলি।

    বল আমি শুনতে চাই। মনিরা ভালো হয়ে বসলো।

    মাধুরী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বলে-হঠাৎ আমার বাবা মামীমার নিকট থেকে একদিন একটা চিঠি পেলেন। তাতে লিখেছেন, আপনার কন্যা মাধুরীর জন্য একটি সুপাত্র পেয়েছি, যদি এক সপ্তাহের মধ্যে আসতে পার, তবে বিয়ে হবে কারণ পাত্রের মা ছেলের বিয়ে দিয়েই চলে যাব তীর্থে।

    এ দিকে ঠিক সে সময় আমার দিদিমার ভীষণ অসুখ। জানিস তো দিদিমাই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয়জন। দিদিমার অসুখের জন্য এ বিয়েতে কেউ মত দিল না, কিন্তু বাবার ইচ্ছা তিনি এখানেই আমাকে সঁপে দেব। এত ভালো ছেলে নাকি আর পাওয়া যাবে না। কাজেই বাবা শুধু আমাকে নিয়ে রামনগর চললেন।! মা কিংবা আমাদের বাড়ির কেউ যেতে পারলেন না। দিদিমার অবস্থা খারাপ কখন কি হয়।

    তারপর সেখানে পৌঁছে দুদিন কেটে গেল বিয়ের আয়োজন করতে। বাবা আমাকে নিয়ে মাসীমার ওখানেই উঠেছিল। তিনদিন পর বিয়ে হলো, কিন্তু বাসর শয্যার পূর্বেই একটা টেলিগ্রাম এসে হাজির-দিদিমার মৃতপ্রায় অবস্থা, যদি দেখার ইচ্ছে থাকে চলে এসো। বিয়ে তো হয়েই গেছে কাজেই বাবা চলে আসতে চাইলেন। আমিও কেঁদেকেটে আকুল হলাম দিদিমাকে একটিবার শেষ দেখা দেখবো।

    স্বামী রাগ করলেন তবু আমি বাবার সঙ্গে চলে এলাম। তারপর দিদিমা চলে গেল, শ্রাদ্ধ হলো, বাবা অনেক করে আমার স্বামীকে লিখলেন, কিন্তু তিনি এলেন না। রাগ তার পড়েনি। তারপর পনেরো দিন যেতে না যেতেই স্বামীর চিঠি পেলাম, আমি অমুক দিন রাতের ট্রেনে তোমাকে নিতে আসছি।

    চিঠি পেয়ে বাবা মা এবং আমিও অত্যন্ত খুশি হলাম। যাক রাগ তাহলে পড়েছে।

    যেদিন উনি আসবেন ঐদিন আমার আনন্দ আর ধরে না। আমাদের পুরোন ভৃত্যটিকে পাঠালাম স্টেশনে ওকে এগিয়ে আনতে।

    আসলেন উনি, রাত তখন তিনটে হবে। বাবা-মা তাকে আদর অভ্যর্থনা জানিয়ে গ্রহণ করলেন।

    তারপর স্বামীর সঙ্গে আমার প্রথম রাত্রি।

    মনিরা অবাক হয়ে শুনছে, ভাবছে এ আবার বলার মত কি! তবু হেসে বলেন-খুব খুশি লাগছিল বুঝি তোর?

    হ্যাঁ সে, দিনের আনন্দ আমি কোনদিন ভুলব না মনিরা। স্বামী ঘরে এল, সে আমি প্রথম তাকে ভাল করে দেখার সুযোগ পেলাম। বিয়ের দিন লজ্জায় তাকে এমন করে দেখতে পারিনি। আমি কল্পনাও করতে পারিনি আমার স্বামী এত সুন্দর। ভুলে গেলাম লজ্জা শরম স্বামীকে সাদর-সম্ভাষণ জানালাম। কিন্তু কি আশ্চর্য সে তাতে এতটুকু সাড়া দিল না।

    সেকি।

    হ্যাঁ, শুধু নির্নিমেষ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে দেখলো।

    তারপর? সে জানালো আমি বড় অসুস্থ ঘুমাবো! আমি তার ঘুমে বাধা দিলাম না। কখন যে রাত ভোর হয়ে গেছে চেয়ে দেখি পাশে সে নেই। তারপর যখন তার আসল পরিচয় পেলাম জানতে পারলাম সে আমার স্বামী নয়।

    স্তব্ধকণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি করে ওঠে মনিরা—কি বল, সে তোর স্বামী নয়!

    না।

    তারপর?

    আর তার দেখা পাইনি। ভোর হলো, আমার স্বামী স্বয়ং এসে পৌঁছলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন অন্য এক পুরুষ আমার কক্ষে রাত কাটিয়ে গেছে, তখন তিনি আর কিছুতেই আমাকে গ্রহণ করতে পারলেন না। আমি তার পা ছুয়ে শপথ করেছি, সে আমাকে স্পর্শ করে নি, তবু—

    এসব কি বলছিস মাধু! সব আমার কাছে আশ্চর্য লাগছে।

    হ্যাঁ, সব আশ্চর্য। আজ তোকে ছুঁয়েও আমি শপথ করলাম।

    এবার বুঝেছি তোর স্বামী তোকে অবিশ্বাস করেছেন।

    হ্যাঁ।

    এ তার ভারী অন্যায়। জেনে যদি কোন ভুল হয়, তার কি ক্ষমা নেই? আম আজ উঠি ভাই।

    মাধুরী বলে ওঠে গল্প করতে করতে সময় কাটলো। চা, খাবি নে?

    আজ নয়, আর একদিন আসব।

    ক্ষিপ্তের মত পায়চারী করতে করতে বলে মুরাদ নাথুরাম, তোমার মত বীর পুরুষকে যে কাবু করতে পারে সে কে হতে পারে।

    নাথুরাম মাথা চুলকায়–জুর, আমি তাকে কোনদিন না দেখলেও বুঝতে পেরেছি সে দস্যু বনহুর ছাড়া কেউ নয়।

    তোমাদের এতগুলো লোককে দস্যু বনহুর পরাজিত করে চলে গেল অথচ তোমরা কিছু করতে পারলে না?

    আমরা এজন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। দু বনহুর কখন যে আমাদের একজন মাঝিকে সরিয়ে তারই ছদ্মবেশে আমাদের নৌকায় উঠে। পড়েছিল, আমরা কেউ এতটুকু টের পাইনি।

    ওকেই তো বলে বাহাদুরের বাহাদুরি। এবার বল মেয়েটা কোথায় গেল? ডুবে মরেনি তো?

    না হুজুর, দস্যু বনহুর তাকে মরতে দেয়নি। সে সুস্থ শরীরে মামা মামীর পাশে ফিরে এসেছে।

    কথাটা কানে যেতেই মুরাদের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠলো। আনন্দসূচক শব্দ ওঠে মুরাদ-মনিরা বেঁচে আছে।

    হ্যাঁ হুজুর, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি যেমন করে হউক তাকে আপনার হাতে পৌঁছে দেবই। নইলে আমার নাম নাথুরাম সিং নয়। কিন্তু হুজুর আরও কিছু-হাতে হাত কচলায় নাথুরাম।

    মুরাদ গভীর কণ্ঠে বলে—পাবে, আরও পাবে। পাঁচ হাজার, দশ হাজার, পনের হাজার যা চাও তাই দেব, তবু ওকে চাই।

    আচ্ছা হুজুর।

    আর একটি কথা, তোমরা জেনে রাখ নাথু, যতদিন দস্যু বনহুরকে তোমরা নিঃশেষ করতে না পেরেছো, ততদিন তোমাদের কোন বাহাদুরি নেই। তাছাড়া তোমরা নিশ্চিন্ত নও। আমিও নই। কারণ, আমি জানি দস্যু বনহুর ভালবাসে মনিরাকে এবং সে কারণেই ওকে হত্যা করতে হবে। যতদিন দস্যু বনহুর জীবিত থাকবে ততদিন আমি মনিরাকে একান্তভাবে পাব না।

    ঠিক বলেছেন, বনহুরকে হত্যা না করতে পারলে আমাদের কিছুই করা সম্ভব নয়। হুজুর আজ আর বিলম্ব করতে পারি না। এক্ষুণি আমরা আস্তানায় রওনা দেব, অনুচরগণ সেখানে অপেক্ষা করছে।

    নতুন কোন খবর পেয়েছ বুঝি?

    হ্যাঁ হুজুর, মনসাপুরের জমিদার কন্যা সুভাষিণী আজ পালকী যোগে দোল পূর্ণিমায় মেলা হতে মনসাপুরে ফিরছে। মেয়েটি অতি সুন্দরী।

    মুরাদের চোখ দুটো ক্ষুধিত শার্দুলের মত জ্বলে ওঠে—তাই নাকি।

    হ্যাঁ হুজুর।

    তাহলে তো আর একটি নতুন শিকারের সন্ধান পেয়েছ। সাবাস নাথুরাম! সত্যি তুমি কাজের লোক।

    পুলিশ অফিস।

    ইন্সপেক্টার মিঃ হারুন পেছনে হাত রেখে চিন্তিতভাবে দাঁড়িয়েছিল। অদূরে কয়েকজন পুলিশ অফিসার বসে আছেন। সকলের মুখেই গভীর চিন্তার ছাপ।

    দস্যু বনহুর হাঙ্গেরী কারাগার থেকে পালিয়ে যাবার পর পুলিশ মহলে এক বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ পরিবেষ্টিত এ হাঙ্গেরী কারাগার। এ কারাগার থেকে কোন দস্যু আজ পর্যন্ত পালাতে পারেনি। পাষাণ প্রাচীরে ঘেরা, লৌহ ইস্পাতে গড়া এই হাঙ্গেরী কারাগার। ছোটখাটো চোর ডাকুর জন্য এ কারাগার নয়। যে ডাকাত বা দস্যু অত্যন্ত দুর্দান্ত তাদের জন্যই এ কারাগার। শেষ পর্যন্ত সে কারাগার থেকেও পালাল দস্যু বনহুর। পুলিশমহলে একটা আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে।

    পুলিশ সুপার পর্যন্ত ঘাবড়ে গেছেন। এতকাল তিনি বহু দস দেখে এসেছেন, কিন্তু দস্যু বনহুরের মত দস্যু তিনি দেখেন নি। কারাগারের ভেন্টিলেটরের শিক বাঁকিয়ে পালানো কম কথা নয়–এ যে অদ্ভুত কাণ্ড।

    পুলিশ মহল ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পড়েছে। শহরে বন্দরে, পথেঘাটে সকলের মুখেই এক কথা দস্যু বনহুর হাঙ্গেরী কারাগার হতে পালিয়েছে।

    ইন্সপেকটার হারুন বলে ওঠেন, দেখুন আপনারা এ দস্যু বনহুরকে যাই মনে করুন, সে ভদ্রঘরের সন্তান। মিঃ চৌধুরীর মত মহৎ ব্যক্তির সন্তান সে, কিন্তু পরিবেশ তাকে এতখানি জঘন্য করে তুলেছে।

    পুলিশ অফিসার মিঃ হোসেন বলেন একথা সত্য, শুনেছি দস্যু বনহুর নাকি অপূর্ব সুন্দর দেখতে।

    জবাব দেন মিঃ হারুন শুধু অপূর্ব সুন্দর নয় মিঃ হোসেন, অপূর্ব সুন্দর . এমন চেহারার লোক এমন হতে পারে কল্পনার অতীত।

    আর একজন অফিসার বলেন, দস্যু হবে দস্যুর মত ভয়ঙ্কর, কিন্তু তা না হয়ে হয়েছে সুন্দর। আমি শুনেছি দস্যু বনহুরের ব্যবহারও নাকি অত্যন্ত ভদ্র।

    সে বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ মিঃ কাওসার, তার ব্যবহার যদি দেখতেন কিছুতেই আপনি তাকে দস্যু বলে মেনে নিতে পারতেন না। কথাটা বলে আসন গ্রহণ করেন মিঃ হারুন। তারপর একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বলেন—হাজার সুন্দর হউক, হাজার ভদ্র হউক, তবু সে দস্যু-ডাকাত। আইনের চোখে সে অপরাধী।

    শুধু অপরাধী নয়, সে পলাতক আসামী। কথাটা বলতে বলতে কক্ষে প্রবেশ করেন প্রখ্যাত ডিটেকটিভ মিঃ শঙ্কর রাও।

    মিঃ হারুন উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করে বসান। তারপর বলেন—মিঃ রাও, কি করা যায় বলুন তো? সমস্ত শহরে-বন্দরে সব জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করেছি। যাকে সন্দেহ হবে তাকেই এরেস্ট করে হাজতে ভরবে।

    শঙ্কর রাও হেসে বলেন—শেষ পর্যন্ত দস্যু বনহুরকে ধরতে গিয়ে কত যে ভদ্রলোক হাজতে বাস করবে, তার ঠিক নেই।

    অগত্যা এ ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছি মিঃ রাও। আপনার মত অভিজ্ঞ ডিটেকটিভও দস্যু বনহুরকে গ্রেফতারে সক্ষম হলো না। কিন্তু মিঃ রাও, আবার আপনাকে নতুন করে বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য অবতীর্ণ হতে হবে।

    ইয়েস, আমি এ ব্যাপারে সব সময় প্রস্তুত আছি।

    থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ রাও। আপনাকে আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করবে।

    এমন সময় একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেকটার একখানা টেলিগ্রাম এনে মিঃ হারুনের হাতে দেয়—স্যার টেলিগ্রাম।

    মিঃ হারুন টেলিগ্রামখানা হাতে নিয়ে পড়ে দেখলেন। তারপর বলেন—আগামীকাল কমিশনার সাহেব স্বয়ং হাঙ্গেরী কারাগার দর্শনে আসছেন।

    বলে ওঠেন মিঃ কাওসার, এবার তাহলে পুলিশ মহলকে নাচিয়ে ছাড়বে।

    মিঃ নাসের বলে ওঠেন—দস্যু বনহুর শেষ পর্যন্ত কমিশনার সাহেবকেও ঘাবড়ে তুললো।

    মিঃ খালেক এতক্ষণ নিচুপ হয়ে শুনছিল। তিনি বলেন, হাঙ্গেরী কারাগার থেকে দস পালানো সরকার বাহাদুরের চরম অপমানের কথা।

    আরও কিছুক্ষণ আলোচনার পর সবাই বিভিন্ন কাজে উঠে পড়েন, সমস্ত থানায় এবং পুলিশ অফিসে ফোন করে কথাটা জানিয়ে দিল। কারণ সবারই প্রস্তুত থাকতে হবে, তিনি যেন তাদের দোষ-ত্রুটি ধরতে না পারেন।

    মনসাপুরের পথ।

    সন্ধ্যার অন্ধকার ঝাপসা হয়ে এসেছে। পাল্কী বেহারাগণ দ্রুত পা চালিয়ে চলেছে। তাদের কষ্ঠের হুম্ হুম্ শব্দে নিস্তব্ধ প্রান্তর মুখরিত হয়ে উঠেছে। আজকাল দিন সময় ভালো নয়, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি প্রায়ই লেগে আছে। পাকীটির সঙ্গে কয়েকজন বন্দুকধারী পাহারাদার চলেছে। পাকীটিতে রয়েছে মনসাপুরের জমিদার কন্যা, সঙ্গে একজন দাসীও আছে।

    নির্জন পথ।

    এতদ্রুত পা চালিয়েও পাল্কী বেহারাগণ সন্ধ্যার পূর্বে মনসাপুরে পৌঁছতে সক্ষম হলো না। পথিমধ্যেই নেমে এলো গভীর অন্ধকার। সুভাষিণী চিন্তিত কণ্ঠে বেহারাগণকে জিজ্ঞেস করলো—আর কত পথ আছে বেহারা?

    একজন বেহারা বলে ওঠে—এখনও আরও দুক্রোশ যেতে হবে দিদিমণি?

    তোমরা একটু জোরে পা চালাও। আমার কেমন ভয় লাগছে! একজন পাহারাদার বলে ওঠেকুছ ভয় নেহি দিদিমণি। হাম লোক আপকো সাথ হয়।

    আর কিছুক্ষণ চলার পর পথটা একটা বনের পাশ দিয়ে চলেছে, সে পথ দিয়ে এগিয়ে চলল তারা। কিন্তু বেশি দূর এগুতে সক্ষম হলো না। হঠাৎ একদল মুখোশপরা লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করলো। মার মার কাট কাট শব্দে স্তব্ধ বনভূমি মুখরিত হয়ে উঠলো।

    বেহারাগণ ভয়ে পাল্কী ছেড়ে যে যেদিকে পারলো ছুটে পালাল।

    বন্দুকধারী পাহারাদারগণ প্রাণপণ চেষ্টায় দস্যুদলের সঙ্গে লড়তে লাগলো, কিন্তু চারজন পাহারাদার কতক্ষণ টিকতে পারে! দস্যুদল তিনজন পাহারাদারকে হত্যা করে ফেললো। একজন বন বাদাড় ভেঙে ছুটতে লাগলো মনসাপুর অভিমুখে।

    এ দস্যুদল অন্য কেই নয়, শয়তান নাথুরামের দল। এবার নাথুরাম পাল্কীর পাশে এসে দাঁড়ালো। ভয়ে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে সুভাষিণীর মুখমণ্ডল। বৃদ্ধা দাসী হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে।

    নাথুরাম পা দিয়ে বৃদ্ধাকে সরিয়ে সুভাষিণীর হাত চেপে ধরলো। একটানে বের করে আনলো তাকে। মশালের আলোতে সুভাষিণীর দেহের অলঙ্কার ঝকমক করে উঠলো।

    নাথুরাম বিকট শব্দে হেসে উঠলোহাঃ হাঃ হাঃ একেবারে স্বর্গজয়। একগাদা অলঙ্কারের সঙ্গে অপসরী লাভ! হাঃ হাঃ হাঃ নাথুরামের হাসির শব্দে রাতের অন্ধকার খান খান হয়ে ভেঙ্গে ছিল। একজন অনুচরকে লক্ষ্য করে বলেন সে—খাদু সিং একে কাঁধে উঠিয়ে নাও।

    খাদু সিং তার বলিষ্ঠ বাহু দিয়ে যেমনি সুভাষিণীকে ধরতে গেল, অমনি বৃদ্ধা দাসী সুভাষিণীকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলো–না না, একে দেব না, একে নিতে দেব না।

    বৃদ্ধাকে টেনে ফেলে দেয় খাদু সিং। কিন্তু বৃদ্ধা তাতে ক্ষান্ত হয় না, সুভাষিণীকে হারিয়ে মনিবের নিকটে কি জবাব দিবে সে, পুনরায় উঠে জড়িয়ে ধরে সুভাষিণীর দেহটা কিছুতেই আমি সুভাষিণীকে নিতে দেব না….।

    এবার নাথুরাম বৃদ্ধাকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে মাটিতে ফেলে দেয়, তারপর বর্শার এক আঘাতে গেঁথে ফেলে ওকে।

    বৃদ্ধার কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়ে পুনরায় আদেশ করে—এবার ওকে ওঠাও।

    কিন্তু সুভাষিণীও কম মেয়ে নয়। সে খাদুর সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করলো। কিছুতেই সে বশ্যতা স্বীকার করবে না।

    হঠাৎ এমন সময় একটা খট খট শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। নাথুরাম উবু হয়ে মাটিতে কান লাগিয়ে শুনতে লাগলো। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন-খাদু, রংলাল, জগাই। তাড়াতাড়ি কর, মনে হচ্ছে কেউ ঘোড়ায় চড়ে এদিকে আসছে। তাড়াতাড়ি যুবতীকে কাঁধে উঠিয়ে নাও।

    সুভাষিণীকে এবার তিন-চার জন ধরলো। সুভাষিণী কিল-চড় লাথি দিয়ে বাধা দিতে লাগলো, কিন্তু সে নারী; কতক্ষণ নিজেকে রক্ষা করতে পারে। হাঁপিয়ে পড়েছে।

    জগাই জোর করে এবার সুভাষিণীকে কাঁধে উঠিয়ে নিল।

    ঠিক সে মুহূর্তে একটা কালো অশ্ব ছুটে আসছে বলে মনে হলো তাদের। ওরা কতক পালাতে চেষ্টা করলো, কিন্তু তার পূর্বেই অশ্বারোহী এসে ছিল সেখানে। মাত্র কয়েক মিনিট, অশ্বটা দু’পা উঠিয়ে নিজেকে সংযত করে নিল। অশ্বারোহী ততক্ষণে অশ্ব থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েছে। মাথায় কালো পাগড়ী মুখে কালো রুমাল বাঁধা। শরীরে কালো ড্রেস, এক একটা প্রচণ্ড ঘুষিতে এক একজন শয়তানকে ধরশায়ী করে চললো সে।

    জগাই তাড়াতাড়ি সুভাষিণীকে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে ছোরা বের করলো। খাদুও বর্শা উঁচিয়ে আক্রমণ করলো অশ্বারোহীকে।

    অশ্বারোহী সকলকে বীরত্বের সঙ্গে পরাজিত করে চললো।

    নাথুরাম একটু দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য লক্ষ্য করছিল, এবার সে অশ্বারোহীর বুক লক্ষ্য করে রিভলভার উচুঁ করে গুলি ছোড়ে। অশ্বারোহী মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়। নাথুরামের গুলি গিয়ে বিদ্ধ হয় অদূরস্থ বৃনে। এবার অশ্বারোহী নাথুরামকে দ্বিতীয়বার গুলি করার সুযোগ না দিয়ে আত্রণ করে। অল্পক্ষণেই নাথুরামকে পরাজিত করে তার হাত থেকে মিতভার কেড়ে নেয় অশ্বারোহী।

    নাথুরামকে পরাজিত হতে দেখে তার দলবল কে কোনদিকে পালালো ঠিক নেই। নিরস্ত্র নাথুরাম এবার উঠে দ্রুত অন্ধকারে অদৃশ্য হলো।

    অশ্বারোহী এগিয়ে এসে সুভাষিণীর সামনে দাঁড়ালো।

    সুভাষিণী এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখছিল আর থর থর করে কাঁপছিল। না জানি এ আবার কোন্ দস্যু? অশ্বারোহী এগিয়ে আসতেই সুভাষিণী ভয়কম্পিত কণ্ঠে বলেন—কে আপনি, আমাকে এভাবে রক্ষা করলেন।

    অশ্বারোহী বলেন—আমি যেই হই, আপনার মঙ্গলাকাংখী। ঠিক সময় পৌঁছতে পেরেছিলাম বলে আপনাকে বাঁচাতে সক্ষম হলাম। আসুন এবার আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দি।

    সুভাষিণী। অন্ধকারে নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকালো অশ্বারোহীর মুখের দিকে। এ আবার কোন শয়তানি করবে না তো? বিশ্বাস কি? এই নির্জন স্তব্ধ বনভূমিতে সে একা যুবতী মেয়ে। অজ্ঞাত এক পুরুষের সঙ্গে কোথায় যাবে। তবু তার ড্রেস স্বাভাবিক নয়, মুখেই বা কালো রুমাল বাঁধা কেন, সন্দেহের দোলায় দুলতে লাগলো সুভাষিণী। এই বিপদ মুহূর্তে একমাত্র বৃদ্ধা দাসী তার সম্বল ছিল, তাকেও হত্যা করেছে শয়তান ডাকাতের দল। সুভাষিণীর চোখ দিয়ে জল পর্যন্ত বের হচ্ছে না, কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেছে সে।

    অশ্বারোহী হেসে বলল—ভয় পাবার কিছু নেই আমি মানুষ। তবু সুভাষিণী তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ভাবছে, মানুষ সবাই, কিন্তু তাদের কত বিচিত্র রূপ।

    অশ্বারোহী এবার বুঝতে পারলো সুভাষিণীর মনোভাব। সে তার সঙ্গে যেতে নারাজ। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে সে তার মুখে।

    নাথুরামের অনুচরগণের হাতে ছিল জ্বলন্ত মশাল। পালাবার সময় তারা হাতের মশালগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। অশ্বারোহী উবু হয়ে একটা জ্বলন্ত মশাল হাতে উঠিয়ে নিয়ে পুনরায় সুভাষিণীর সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। তারপর নিজের মুখের রুমালটা এক টানে খুলে মশালটা উঁচু করে ধরলো।

    যুবক জানে তার চেহারায় এমন একটা আকর্ষণীয় বস্তু আছে যার কাছে সবাই নতি স্বীকার করতে বাধ্য।

    মশালের উজ্জ্বল আলোতে সুভাষিণী অশ্বারোহীকে দেখলো, কিন্তু কিছুতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারছিল না সে। একি কোন্ দেবকুমার। এত সুন্দর সুপুরুষ সে তো কোনদিন দেখেনি।

    এবার বিশ্বাস হচ্ছে। হেসে বলেন অশ্বারোহী।

    সুভাষিণী ধীরে শাস্তকণ্ঠে বলেন–চলুন।

    আসুন, ঘোড়ায় উঠতে হবে। অশ্বারোহী এগিয়ে চলে তার অশ্বের দিকে।

    সুভাষিণী তাকে অনুসরণ করে।

    অশ্বের পাশে এসে দাঁড়ালো উভয়ে। অশ্বারোহীর হস্তে তখনও জ্বলন্ত মশাল। সুভাষিণী নির্বাক আখি মেলে তখনও তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে।

    অশ্বারোহী বলেন—আসুন, আপনাকে উঠিয়ে দি।

    অশ্বারোহী সুভাষিণীকে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে দিয়ে নিজেও চড়ে বসে। সুভাষিণীর মনে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি হয়। কে এই যুবক? কি এর পরিচয়? স্বর্গের দেবতা ছাড়া এত সুন্দর মানুষ হয়? সুভাষিণী মনে প্রাণে ওকে কৃতজ্ঞতা জানায়। যার শক্তির কাছে এতগুলো দস্যু পর্যন্ত পরাজিত হলো।

    অন্ধকার ভেদ করে অশ্ব ছুটে চলেছে। অশ্বপৃষ্ঠে অশ্বারোহী কালো পোশাকধারী আর সুভাষিণী। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মনসাপুর জমিদার বাড়ি পৌঁছে গেল। কৃষ্ণপক্ষের চাদ তখন পূর্ব আকাশে ভেসে উঠেছে।

    জমিদার বাড়ির অদূরে একটা ঝোপের আড়ালে অ রেখে নেমে দাঁড়ালো অশ্বারোহী। তারপর সুভাষিণীকে অশ থেকে নামিয়ে নিল সে। অশ্বারোহী বলেন-এবার আপনি বাড়ি যেতে পারবেন নিশ্চয়ই?

    সুভাষিণী নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়েছিল অশ্বারোহীর মুখের দিকে। চাদের আলোতে ওকে শষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভুলে গেল সুভাষিণী জবাব দিতে।

    অশ্বারোহী হেসে নিজের রুমালখানা বেঁধে নেয়। তারপরে বলে ঐ আপনার বাড়ি দেখা যাচ্ছে, যান।

    সুভাষিণী এবার জবাব দেয় আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

    ততক্ষণে অশ্বারোহী অশ্ব চড়ে বসেছে।

    সুভাষিণী বলে ওঠে—একটি কথা, আপনার পরিচয়?

    অশ্বারোহী প্যান্টের পকেট থেকে একটি কাগজের টুকরা বের করে সুভাষিণীর হাতে দিয়ে বলে—এতেই পাবেন আমার পরিচয়।

    কিন্তু আবার কবে আপনার দেখা পাব?

    ঈশ্বর না করুন আবার যদি এমন বিপদে পড়েন তখন… অথ ছুটতে শুরু করেছে, শেষের কথার অংশগুলো আর শুনা যায় না!

    অশ্বারোহী অদৃশ্য হতেই সুভাষিণী বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করে। বাড়ির নিকটবর্তী হতেই দেখতে পায় তার পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন মিলে জোট পাকিয়ে হল শুরু করছে।

    মা কাঁদছেন, আরও অনেকে কাঁদছেন। কিছুসংখ্যক লোক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। সুভাষিণী বুঝতে পারে দকবল থেকে পালিয়ে এসে পাহারাদার তার পিতার নিকটে খবরটা জানিয়েছে, তাই এসব আয়োজন চলছে।

    সুভাষিণীকে সুস্থ দেহে অক্ষত অবস্থায় অলঙ্কারপূর্ণ শরীরে ফিরে আসতে দেখে সবাই অবাক হলো। মা ছুটে এসে কন্যাকে জড়িয়ে ধরলেন। পিতা ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—মা, কি করে ফিরে এলি? কি করে ডাকাতের হাত থেকে রেহাই পেলি?

    সুভাষিণী বলেন—সব বলছি, তোমরা ভিতরে এসো।

    কন্যার সঙ্গে সবাই অন্দরবাড়িতে গিয়ে বসলো!

    সুভাষিণী সব বলেন, কিন্তু কে যুবক এ এখনও জানে না। সকলের অজ্ঞাতে আলোর সামনে মেলে ধরলো কাগজের টুকরাখানা যার মধ্যে আছে তার অজ্ঞাতবন্ধুর পরিচয়। অতি সাবধানে খুলেন কাগজের টুকরাখানা। না জানি কোন রাজার ছেলে কিনা; কিংবা কোন দেবকুমার হবে সে কাগজে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভয়ার্ত কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি করে ওঠে সুভাষিণী-দস্যু বনহুর।

    কতক্ষণ যে সে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো খেয়াল নেই ওর। যে দস্যু বনহুরের নামে গোটা দেশবাসীর আতঙ্কের সীমা নেই, যে দস্যুর নামে লোকের হৃদকম্প হয়, এ সে দস্যু বনহুর! সুভাষিণী একবার নয়, শত শত বার ঐ কাগজের টুকরাখানা ছিল।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    তাজের পদশব্দ চিনতো নূরী। ভোরের দিকে তন্দ্রা এসেছে, হঠাৎ অতি পরিচিত অশ্ব-পদশব্দ। নূরীর তন্দ্রা ছুটে গেল, দ্রুতপদে বাইরে বেরিয়ে এলো সে।

    বনহুর অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়াল, নূরী ছুটে এসে ওর হাত ধরলো–সত্যি হুর, আজ আমি তোমার জন্য খুব চিন্তিত ছিলাম। মেয়েটিকে রক্ষা করতে পেরেছ?

    বনহুর চলতে চলতে জবাব দেয়—খোদার অশেষ কৃপায় পেরেছি।

    তাহলে রহমান তোমাকে একেবারে সঠিক খবরই দিয়েছিল, কি বল?

    হ্যাঁ নূরী, খবরটা ঠিক সময়ে পেয়েছিলাম বলেই মেয়েটিকে রক্ষা করতে পারলাম। কিন্তু নূরী, ঐ শয়তান অত্যন্ত বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।

    হেসে বলে নূরী—তোমার কাছে শয়তানি কতক্ষণ টিকবে? দাও না যমালয়ে বিদায় করে।

    হ্যাঁ নূরী, অচিরেই ওর সঙ্গে আমার একটা বুঝা-পড়া হবে। নাথুরামকে আমি উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব।

    নাথুরাম যে একজন দুর্দান্ত শয়তান জানে নূরী। মনে মনে শিউরে ওঠে সে। অজানা এক আশঙ্কায় দুলে ওঠে তার হৃদয়।

    উড়য়ে নীরবে এতে থাকে।

    বনহুর বিশ্রামাগারে প্রবেশ করে। নূরী ওর দেহ থেকে দস্যুর কালো ড্রেস খুলে নেয়। শয্যায় গিয়ে বসে বনহুর। হঠাৎ নূরীর দৃষ্টি চলে যায় বনহুরের ললাটে। কপালের একপাশে কিছুটা অংশ কেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আঁতকে ওঠে নূরী, একি হুর, তোমার ললাট কেটে গেছে। ইস… নূরী যত্নসহকারে হাত দিয়ে দেখতে লাগলো।

    বনহুর হেসে বলেন—ও এমন কিছু নয় নূরী। সেরে যাবে।

    নূরী রাগত কণ্ঠে বলেন—তোমার ও কিছু নয়। ইস কতটা কেটে গেছে। তাড়াতাড়ি ঔষধ এনে লাগিয়ে দেয় বনহুরের ললাটে তারপর অতি যত্নে বেধে দিতে থাকে কাপড় দিয়ে।

    বনহুর নূরীর চিবুক ধরে উঁচু করে বলেনূরী, আমার জন্য তোমার কত দরদ। কিন্তু আমি তো তোমার জন্য এতটুকু ভাববার সময় পাইনে।

    এজন্য আমি দুঃখিত নই, হুর। আমি জানি তুমি আমাকে কত ভালবাস!

    বনহুর নূরীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে বলে, এ বিশ্বাস যেন তোমার চিরদিন অটুট থাকে।

    নূরী ধীরে ধীরে বনহুরের চুলের ফাঁকে আঙ্গুল চালাতে চালাতে বলে–হুর, মনে পড়ে সে ছোটবেলার কথা, তুমি আর আমি যখন এক সঙ্গে বনে বনে ঘুরে বেড়াতুম তুমি তীর ধনু দিয়ে পাখি শিকার করতে, আর আমি ছুটে গিয়ে কুড়িয়ে আনতাম। তুমি খুশি হয়ে বলতে নূরী, কোনদিন তোকে ছাড়া কাউকে ভালবাসব না। মনে পড়ে সে কথা।

    বনহুরের চোখের সামনে ছোটবেলার দৃশ্যগুলো ভেসে উঠে একের পর এক ছায়াছবির মত।

    একদিনের দৃশ্য আজও বনহুরের মনে স্পষ্ট আঁকা আছে।

    বনহুর আর নূরী ঝরনার পানিতে সাতার কাটছিল, হঠাৎ বেশি পানিতে পড়ে যায় নূরী। স্রোতের টানে বেসে যায় সে অনেকটা দূরে। বনহুর ভুলে যায় গোটা দুনিয়া, নূরী যে তার যথাসর্বস্ব নূরীকে হারালে তার চলবে না। নূরী ছাড়া বাঁচবে না বনহুর। নিজের জীবনের মায়া বিসর্জন দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল বনহুর স্রোতের বুকে। অনেক কষ্টে নূরীকে সেদিন বাঁচাতে পেরেছিল সে। নূরীকে সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পেরে তার সেদিন কি আনন্দ! সব কথা আজ মনে পড়তে লাগলো বনহুরের।

    বনহুর নূরীর হাতখানা তার নিজের মুঠোয় চেপে ধরে বলে নূরী।

    নুরী বনহুরের চুলে হাত বুলাচ্ছিল, জবাব দেয়বল। সত্যি তুমি কত সুন্দর!

    হুর! অস্কুট ধ্বনি করে ওঠে নূরী।

    নূরী। আবেগভরা কষ্ঠ বনহুরের।

    সেদিন নৌকা ভ্রমণে মনিরার উপর হামলার কথাটা পুলিশ মহলে সাড়া জাগিয়েছিল, তাদের একমাত্র সন্দেহ এ কাজ দস্যু বনহুরের ছাড়া আর কারও নয়। কারণ বনহুর যে মনিরাকে ভালবাসে, এ কথা সবাই জেনে নিয়েছে। পুলিশ ইনসপেকটার মিঃ হারুন এবং মিঃ রাও বসে এ বিষয় নিয়েই আলোচনা করছিলেন শঙ্কর রাও বলে উঠেন–ইন্সপেকটার, আপনার কি মনে হয় দস্যু বনহুরই মনিরার ওপর হামলা করেছিল?

    হ্যাঁ, সে ছাড়া অন্য কেউ নয়। কারণ, মনিরাকে দস্যু বনহুর ভালবাসে, এ কথা একেবারে সত্য। পূর্বেও এ বিষয়ে অনেক প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

    শঙ্কর রাও বলে ওঠেন—তাহলে দস্যু বনহুরই তাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল?

    হ্যাঁ এবং সুস্থ অবস্থায় নিরাপদে তাকে পিতামাতার নিকটে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।

    পিতা-মাতা নয়, মামা-মামী।

    সরি, হ্যাঁ মামা-মামীর পাশে ফিরে এসেছে মনিরা এবং দস্যু বনহুর ছাড়া অন্য কোন বদমাইশ তাকে এভাবে সসম্মানে ফেরত পাঠাত না নিশ্চয়ই। এতেই বুঝা যায় এ দস্যু বনহুরের কাজ।

    এ সম্বন্ধে কি মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করেছিল?

    করেছিলাম, কিন্তু সন্তোষজনক কিছু জানতে পারিনি।

    রাও গম্ভীর কণ্ঠে বলেন-ইনসপেকটার, সত্যিই যদি দস্যু বনহুর মনিরাকে ভালবেসে থাকে তবে তাকে গ্রেফতারের একটা সুযোগ করে নিতে পিরবো।

    সেবার তাকে গ্রেফতারের সময় সো আমরা বিশেষভাবে জেনে নিয়েছি মিঃ রাও। আপনি সে পথ ধরেই এগুতে চেষ্টা করুন।

    ঠিকই বলেছেন ইন্সপেকটার সাহেব, দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে হলে ঐভাবেই এগুতে হবে এবং আমি আশা করি কৃতকার্য হবো।

    থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ রাও, আপনি এবার সফল হবেন বলে আমার মনে হচ্ছে।

    শঙ্কর রাও এবার কিছুক্ষণ গালে হাত রেখে ভাবলেন। তারপর বলেন ইন্সপেকটার, একটা প্রশ্ন আমার মনকে নাড়া দিচ্ছে।

    বলুন?

    মনিরাও দস্যু বনহুরকে ভালবাসে, এ কথা আপনি জানেন?

    আপনি কি বলতে চান দস্যু বনহুরের কোনই প্রয়োজন ছিল না মনিরাকে হানা দিয়ে চুরি করা, কারণ মনিরা স্বেচ্ছায় তার পাশে যেত।

    সে কথা মিথ্যে নয়, ইন্সপেকটার সাহেব।

    না, আপনি এবং আমি যা মনে করছি তা নাও হতে পারে। এক সময় হয়ত মনিরা তাকে ভালবাসতো, কিন্তু যখন তার আসল রূপ ধরা পড়েছে, যখন মনিরা জানতে পারল যাকে সে ভালবাসে সে স্বাভাবিক মানুষ নয়, সে দস্যু; তখন হয়তো তার মন ভেঙ্গে গিয়ে থাকতে পারে। ঘৃণা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

    শঙ্কর রাও বলেন—তাহলে একটা কাজ করুন মিঃ হারুন, এতে আমার কিছুটা উপকার হবে, মানে কাজের সহায়তা হবে।

    বলুন?

    মিস মনিরাসহ তার মামা চৌধুরী সাহেবকে একবার এখানে আসতে বলুন। আমি তাদের মুখে এ ব্যাপারে কয়েকটা কথা শুনতে চাই।

    বেশ, আমি এক্ষুণি ফোন করছি।

    ধন্যবাদ।

    মিঃ হারুন উঠে গিয়ে রিসিভারটা হাতে উঠিয়ে নিলেন—

    হ্যালো?

    ওপাশ থেকে ভেসে এলো চৌধুরী সাহেবের কণ্ঠকে কথা বলছেন?

    স্পিকিং মিঃ হারুন। হ্যাঁ, আমি পুলিশ অফিস থেকে বলছি। শুনুন মিঃ চৌধুরী, আপনি আপনার ভাগনী মিস মনিরাসহ দয়া করে যদি একটিবার আসেন! হা পুলিশ অফিসে…।

    চৌধুরী সাহেব বলেন নিশ্চয়ই আমি আসছি ইন্সপেক্টর। আপনি দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন। আমি মা মনিরার কাছে জেনে নেই সে এখন আমার সঙ্গে আপনার ওখানে যেতে পারবে কিনা। কারণ, ওর এক বান্ধবীর ওখানে যাবার কথা আছে। রিসিভারের মুখে হাত রেখে ডাকেন চৌধুরী সাহেব-মনিরা, মা মনিরা, একটিবার এদিকে শুনো তো?

    পাশের কক্ষ থেকে ভেসে আসে মনিরার কণ্ঠ—আসছি মামুজান।

    অল্পক্ষণেই মনিরা এসে হাজির হয়-মামুজান আমায় ডাকছো?

    হ্যাঁ মা, ইন্সপেক্টর মিঃ হারুন বলছেন এক্ষুণি তোমাকে সঙ্গে করে যেতে। তারা পুলিশ অফিসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

    ঠিক সে মুহূর্তে একটি দাড়িওয়ালা লোক কক্ষে প্রবেশ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়, চৌধুরী সাহেবের কথাগুলো কান পেতে শুনলো সে।

    মনিরা মামুর কথায় জবাব দেয়—বেশ ভালই হলো, সেখান থেকে ফেরার পথে মাধুরীর বাড়ি হয়ে আসবো।

    যাও মা, চট করে তৈরি হয়ে নাও তবে।

    মনিরা বেরিয়ে যায়।

    চৌধুরী সাহেব রিসিভারে মুখ রাখেন-হ্যালো, হ্যাঁ মনিরা যাবে। নিশ্চয় আসছি। থ্যাঙ্ক ইউ।

    দাড়িওয়ালা লোকটি কক্ষে প্রবেশ না করে পিছু হটে বেরিয়ে গেল।

    মনিরা চলে গেল নিজের কক্ষে।

    অল্পক্ষণেই তৈরি হয়ে মনিরা মামুজানের পাশে এসে দাঁড়ায়। চৌধুরী সাহেব মনিরাকে লক্ষ্য করে বলেন—মা মনিরা, তোমার হয়ে গেছে। দেখছি।

    হ্যাঁ মামুজান, চলো।

    গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন চৌধুরী সাহেব এবং মনিরা ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরে।

    চৌধুরী সাহেব আর মনিরা গাড়িতে উঠে বসে। ড্রাইভার ড্রাইভ আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দেয়।

    পুলিশ অফিসে পৌঁছতেই মিঃ হারুন নিজে এসে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে নামিয়ে নিলেন।

    মিঃ হারুন হাত বাড়ালেন—হ্যালো চৌধুরী সাহেব, বিশেষ কয়েকটি কথার জন্য আপনাকে ডেকেছি। আসুন মিস্ মনিরা।

    ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরলল, চৌধুরী সাহেব আর মনিরা নেমে

    অফিস রুমে প্রবেশ করলো।

    অফিসরুমে প্রবেশ করতেই শঙ্কর রাও উঠে দাঁড়িয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

    পাশাপাশি কয়েকখানা চেয়ারে বসলেন তাঁরা।

    মিঃ হারুন মনিরাকে জিজ্ঞেস করলেন মিস মনিরা, আপনাকে একটু কষ্ট দেব। কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই?

    বেশ করুন, এতে আমার কষ্ট কি! হেসে বলেন মনিরা।

    মিঃ হারুন মনিরার দিকে একটু ঝুকে বসলেন, তারপর বলেন—মিস মনিরা, আপনাকে যে প্রশ্ন করা হবে আশা করি তার সঠিক জবাব পাব। আচ্ছা বলুন তো যেদিন আপনি আপনার বান্ধবীগণসহ নৌকা-ভ্রমণে যান, সেদিন মাঝিদের মধ্যে কোন সন্দেহজনক ভাব লক্ষ্য করেছিলেন কি?

    না। কাউকে সন্দেহ হয় নি বা সন্দেহজনক কিছু লক্ষ্য করিনি।

    হ্যাঁ। আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় যারা আপনার ওপর হামলা করেছিল তারা দস্যু বনহুরের দল?

    মনিরা বলে ওঠে—এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি, দস্যু বনহুর আমার ওপর হামলা করেনি।

    শঙ্কর রাও বলে ওঠেন–আমি প্রথমেই অনুমান করেছিলাম, এ কাজ দস্যু বনহুরের নয়। নিশ্চয়ই এ অন্য একটি দল।

    মিঃ হারুন গভীরভাবে কিছু চিন্তা করেন, তারপর বলেন—আচ্ছা মিস মনিরা আপনাকে যে মাঝি দস্যুদল থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল, তাকে আপনি চিনতে পেরেছিলেন কি?

    না, তাকে আমি কোনদিন দেখিনি। কিন্তু সে ব্যক্তি অত্যন্ত মহৎ এবং তার দয়াতেই আমি দস্যুর হাত থেকে মুক্তি পেতে সক্ষম হয়েছি। মনিরা বনহুরের নাম গোপন করে বলল।

    মিস মনিরা, সে লোকটি যদি সত্যই মহৎঞ্জন হবে, তাহলে সে কখনও দস্যুদলে যোগ দিত না।

    চৌধুরী সাহেব বলেন—অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে অভাবের তাড়নায় মানুষ অনেক জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়।

    হ্যাঁ, সে কথা অবশ্য মিথ্যা নয়। বলেন মিঃ রাও।

    আরও কিছুক্ষণ মনিরাকে নানা প্রশ্ন করওে সন্তোষজনক কিছু জানতে পারেন না তারা।

    মিঃ হারুন এবার চৌধুরী সাহেবকে বলেন—চৌধুরী সাহেব, আপনাকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, দস্যু বনহুর আপনার পুত্র জেনেও আমরা তাকে রেহাই দিতে পারছিনে।

    চৌধুরী সাহেবের মনে যত ব্যথাই থাক গোপনে চেপে বলেন তিনি সে দোষী, কাজেই আইনের চোখে সে অপরাধী। আমার পুত্র হলেও সে ক্ষমার পাত্র নয়।

    থ্যাঙ্ক ইউ চৌধুরী সাহেব, এটাই হচ্ছে সত্য কথা। অপরাধী যতই মেহের পাত্র হউক, তাকে ক্ষমা করা চলে না। বলেন শঙ্কর রাও।

    মিঃ হারুন বলেন, এবার আসল কথা বলি চৌধুরী সাহেব।

    বলুন?

    দস্যু বনহু হাঙ্গেরী কারাগার হতে পালিয়েছে এ কথা আপনি নিশ্চয়ই জানেন?

    হ্যাঁ জানি।

    যদিও আপনি তার পিতা, তবু আপনার কর্তব্য তাকে ধরিয়ে দেওয়া।

    একটা ঢোক গিলে বলেন চৌধুরী সাহেব-হ্যাঁ।

    এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই আপনার সাহায্য পাব।

    চৌধুরী সাহেব একটু থেমে বলেন–হ্যাঁ পাবেন।

    এমন সময় ড্রাইভার একখানা কাগজ এনে মনিরার হাতে দেয়আপামণি আপনার যে কোন বান্ধবীর বাড়ি যাবার কথা ছিল সে এই চিঠিখানা পাঠিয়ে দিয়েছে।

    মনিরা কাগজখানা হাতে নিয়ে ভাজ খুলে মেলে ধরলো চোখের সামনে। মুহূর্তে মনিরার চোখ দুটো উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে ওঠে। কাগজে লেখা আছে–“মনিরা, আমি তোমার জন্য লেকের ধারে অপেক্ষা করছি”–বনহুর।

    মনিরা কাগজখানা ভাজ করে বলে ওঠে-মামুজান, আমার বান্ধবী এক্ষুণি আমাকে যেতে বলেছে, না গেলেই নয়। উঠে দাঁড়ায় মনিরা।

    চৌধুরী সাহেবও বলে ওঠেন—আমিও তাহলে চলি ইন্সপেকটার সাহেব।

    মিঃ হারুন বলেন—আপনার সঙ্গে আরও কিছু আলাপ আছে চৌধুরী সাহেব। মিস মনিরা, আপনি যেতে পারেন। আপনার মামুজানকে আমাদের অফিসের গাড়ি পৌঁছে দেবে।

    চৌধুরী সাহেব ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলেন-ড্রাইভার, মনিরাকে সাবধানে নিয়ে যেও এবং হুশিয়ার থেক।

    ড্রাইভার দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন—বহুৎ আচ্ছা হুজুর।

    মনিরা প্রফুল্ল চিত্তে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

    ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরে।

    মনিরা উঠে বসে বলে–লেকের ধারে চল।

    বহুৎ আচ্ছা আপামণি। কথাটা বলে গাড়িতে স্টার্ট দেয় ড্রাইভার। গাড়ি উকাবেগে ছুটতে শুরু করে।

    একি! গাড়ি যে লেকের পথে না গিয়ে অন্য পথে মোড় ফিরল। মনিরা শিউরে উঠলো, তীব্রকণ্ঠে বলেন—ড্রাইভার, কোথায় যাচ্ছ।

    ড্রাইভার আসন থেকে বলে ওঠে—আপামণি, ও পথ বহুৎ খারাপ আছে। ইধার বাঁকা পথে যেতে হবে।

    মনিরা চুপ করে রইলো, ড্রাইভার তাদের নতুন লোক নয়, তাকে অবিশ্বাসের কিছু নেই। কারণ সে জন্মাবধি এই শিখ ড্রাইভারকে দেখে আসছে। ওর কোলে কাঁধেই মানুষ হয়েছে মনিরা।

    কিন্তু একি! লেকের ধারে না গিয়ে একেবারে নির্জন নদীতীরে এসে গাড়ি থেমে ছিল। ড্রাইভার আসন থেকে নেমে গাড়ির দরজা খুলে ধরলো-আসুন আপামণি!

    মনিরা রাগে গজ গজ করে বলে-ড্রাইভার, এ তুমি কোথায় নিয়ে এলে? এটাই বুঝি লেকের ধার?

    হঠাৎ ড্রাইভার হেসে ওঠে–হাঃ হাঃ হাঃ মনিরা এখনও তুমি আমাকে চিনতে পারনি?

    কে! কে তুমি?

    নেমে এসো বলছি।

    না, আমি কিছুতেই নামবো না। নিশ্চয়ই তুমি সে শয়তান, নৌকায় তুমি আমাকে চুরি করে…

    হ্যাঁ আমিই সে, যাকে তুমি-ড্রাইভার মনিরার হাত ধরে ফেলে।

    মনিরা তীব্রকণ্ঠে বলে—যাকে আমি ঘৃণা করি। শয়তান! এখনও তুমি আমার পিছু লেগে রয়েছ?

    হ্যাঁ, কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি। নেমে এসো। যদি তোমার মঙ্গল চাও তবে নেমে এসো।

    নির্জন নদী তীর একটি প্রাণী ও নেই আশেপাশে। মনিরার প্রাণ কেঁপে ওঠে। বার বার কত বার বনহুর তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে, এবার আর তার রক্ষা নেই। তবু দৃঢ় কঠিন কণ্ঠে বলে সে—শয়তান আমি গাড়ি থেকে নামবো না।

    ড্রাইভার মনিরার হাত চেপে ধরে–তোমাকে নামতে হবে। বলেই মনিরার হাত ধরে টেনে গাড়ি থেকে নামিয়ে ফেলে।

    মনিরার চোখেমুখে অসহায়ের চাহনি। আজ আর তার রক্ষা নেই। কেন সে ঐ চিঠিখানা বিশ্বাস করলো? কেন সে ড্রাইভারকে বিশ্বাস করলো? কেন তার সঙ্গে একা এলো?

    ড্রাইভারের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো সে। কিন্তু ড্রাইভারের বলিষ্ঠ হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতখানা মুক্ত করে নিতে পারলো না।

    ড্রাইভার মনিরাকে নিবিড়ভাবে টেনে নিল কাছে।

    মনিরা সে মুহূর্তে প্রচণ্ড এক চড় বসিয়ে দিল ড্রাইভারের গালে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারের গাল থেকে তার নকল দাড়ি আর গোঁফ খসে ছিল। মনিরা বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো—মনির তুমি!

    ড্রাইভারের ছদ্মবেশী দস্যু বনহুর হেসে বলেন—হ্যাঁ আমি। এই বুঝি তোমার সাবধানে চলাফেরা, না?

    মনির, আমি ভাবতেও পারিনি শিখ ড্রাইভারের বেশে তুমি! সত্যি তোমার চিঠি পেয়ে আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম।

    কিন্তু যেখানেই যাও, সাবধানে যেও! আমার নামে অন্য কোন দুষ্ট লোকও তো চিঠি লিখতে পারতো।

    সত্যি আমি বড় ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বুকটা এখনও টিপ টিপ করছে।

    এখন?

    সব ভয় আমার দূর হয়ে গেছে।

    চলো নদীর ধারে গিয়ে বসি। বনহুর কথাটা বলে এগুতে থাকে। মনিরা চলে তার পাশে পাশে।

    নদীর কিনারে গিয়ে বসে ওরা।

    মনিরা বনহুরের হাতখানা নিজের হাতে নিয়ে বলে—আজ কতদিন আসনি কেন বল তো?

    কত কাজ আমার।

    মনির, এখনও তুমি মানুষ হলে না। পুলিশমহলে তোমাকে গ্রেপ্তার করতে সাড়া পরে গেছে, তোমাকে জীবিত কি বা মৃত এনে দিতে পারলে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

    জানি মনিরা, সব জানি। কিন্তু আমি তো সব সময় সকলের সামনেই বিচরণ করে বেড়াচ্ছি, ওরা কেন আমাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় না?

    মনির, ও কথা বল না। খোদা তোমাকে রক্ষা করুন। মনির, হাঙ্গেরী কারাগার তোমাকে আটকে রাখতে পরেনি, আর কেউ তোমাকে আটকে রাখতে পারবেও না।

    মনিরা!

    সত্যি তুমি কত বড়! কত সুন্দর কত মহৎ….

    অবশ্য তোমার কাছে। আচ্ছা মনিরা, তোমার যে বান্ধবীর বাড়ি যাবার কথা ছিল?

    হ্যাঁ, মাধুরীর ওখানে, কিন্তু যাব না।

    মাধুরী!

    হ্যাঁ, মাধুরী, আমার এক পুরানো বান্ধবী। বড় অসহায় বেচারী…

    কেন, কি হয়েছে তার? প্রশ্ন করে বনহুর।

    সে এক অদ্ভুত ঘটনা। থাক, তোমার শুনে কাজ নেই।

    মনিরা বলতে হবে, তোমার বান্ধবী যখন সে, তখন আমার বান্ধবী নিশ্চয়ই।

    তবে শুন।

    বল।

    মাধুরীর বিয়ে হয়েছে কিন্তু ওর স্বামীকে সে একদিনের জন্যও পায়নি।

    তার মানে?

    বলছি শুন—তারপর মাধুরীর মুখে শুনা গল্পটা মনিরা সম্পূর্ণ খুলে বলে বনহুরের নিকটে।

    স্তব্ধ নিঃশ্বাসে শুনে যায় বনহুর। মনের মধ্যে তখন তার প্রচণ্ড ঝড় বেয়ে চলেছে। মাধুরী, যার সঙ্গে তার একটি রাতের পরিচয়।

    মনিরা বলে চলেছে—সত্যি মনি, মাধুরীর জীবনটা ব্যর্থ হয়ে যাবে…

    বনহুরের চোখের সম্মুখে ভেসে উঠেছে মাধুরীর ব্যথাভরা করুণ মুখখানা।

    বনহুরকে চিন্তিত দেখে বলে মনিরা-কি ভাবছো মনির হঠাৎ তোমার কি হলো বলতো?

    বনহুর গভীর চিন্তামগ্ন অবস্থায় জবাব দেয়-উঁ।

    কি ভাবছো?

    ভাবছি তোমার সে বান্ধবীর কথা।

    হ্যাঁ, ওর জন্য সত্যি বড় দুঃখ হয়। জান মনির, মাধুরী বলেছে, যে লোকটি ওর স্বামীর পরিচয় দিয়ে ওর কক্ষে রাত যাপন করে গেছে সে নাকি দেবতার চেয়েও মহৎ!

    তাই নাকি?

    হ্যাঁ দেখতেও সে নাকি অপূর্ব, মাধুরী বলে জীবনে সে ওকে ভুলতে পারবে না কোনদিন। যতক্ষণ সে তার কথা বলেছিল কেমন যেন অভিভূতের মত বলে চলেছিল—সে সত্যি। মাধুরী ওকে ভালবেসে ফেলেছে…

    বনহুর বলে ওঠে-থাক মনিরা ও সব কথা, এবার চলল ফেরা যাক, কেমন?

    কিন্তু আমার যে ফিরতে ইচ্ছে করছে না মনির!

    হেসে বলে বনহুরবসলে ক্ষতি ছিল না মনিরা কিন্তু তোমাদের মোটর গ্যারেজের মধ্যে তোমাদের শিখ ড্রাইভার বেচারা ধুকে মরছে। মনিরা গালে হাত দিয়ে বলে ওঠে—ওমা তাই নাকি! হ্যাঁ তার হাত-পা-মুখ বেঁধে রেখে এসেছি।

    সর্বনাশ!

    তা নাহলে এই দিনের আলোয় তোমাকে পেতাম কি করে?

    মনিরা উঠে দাঁড়িয়ে বলে—এত বুদ্ধি তোমার! চললা তবে।

    চলো।

    বনহুর আর মনিরা গাড়ির দিকে এগোয়।

    মাধুরীর স্বামী নিমাই বাবুর কক্ষ।

    নিজের ঘরে শুয়ে একটা বই পড়ছিল সে, রাত একটা দেড়টা হবে। নিমাইয়ের মনে নানা দুশ্চিন্তার ঝড় বইছে। চোখে ঘুম নেই, তাই একটা বই নিয়ে তাতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করছিল।

    বাইরে ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছিলো। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়াও বইছে। গোটা বিশ্ব অন্ধকার। আজ নিমাইয়ের মনে মাধুরীর কথাই জাগছিল। এমন দিনে স্ত্রীকে কাছে পেতে কার না মন চায়। কিন্তু নিমাই ওকে গ্রহণ করতে পারে না। একটা সন্দেহের দোলা তার সমস্ত অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বই রেখে আলোটা কমিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো নিমাই, জানালাটা বন্ধ করে শোবে, ঠিক সে মুহূর্তে জানালা দিয়ে লাফিয়ে ছিল একটি কালো মূর্তি। হাতে তার উদ্যত রিভলভার নিমাই যেমনি চিৎকার করতে যাবে, অমনি কালো মূর্তি রিভলভার চেপে ধরলো ওর বুকে—খবরদার!

    নিমাই ঢোক গিলে বলে—কে তুমি!

    ছায়ামূর্তি চাপাকণ্ঠে গর্জে ওঠে-দস্যু বনহুর!

    ভয়ার্তকষ্ঠে অস্ফুট শব্দ করলো নিমাই দস্যু বনহুর?

    হ্যাঁ।

    তুমি–তুমিই আমার স্ত্রীর কক্ষে….

    হ্যাঁ আমিই, কিন্তু নিমাই বাবু আপনার স্ত্রী মাধুরীর কি অপরাধ?

    নিমাই ভয়কম্পিত কণ্ঠে বলে ওঠে—তুমিই তো তার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছ শয়তান!

    বনহুর দৃঢ়মুষ্টিতে চেপে ধরলো নিমাইয়ের গলা—শয়তান আমি নই তুমি, মিথ্যা সন্দেহে নিজের স্ত্রীকে যে ত্যাগ করতে পারে, সে শয়তানের বড়। শয়তান!

    নিমাই যন্ত্রণায় আর্তকণ্ঠে বলে ওঠে—–উঃ ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও আমার গলা! নিমাইয়ের চোখ দুটো বেরিয়ে আসে। মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে।

    বনহুর বলে—আগে বল তোমার স্ত্রীকে আর অবিশ্বাস করবে না? গলা ছেড়ে দেয় বনহুর।

    নিমাই গলায় হাতবুলিয়ে বলে—কেমন করে তাকে আমি বিশ্বাস করবো?

    দস্যু বনহুর কোনদিন মিথ্যা বলে না। তোমার স্ত্রী অতি পবিত্র, নির্মল। তাকে তুমি বিশ্বাস করতে পার।

    নিমাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বনহুরের রুমাল বাধা মুখের দিকে।

    বনহুর নিজের মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেলে।

    নিমাই কল্পনাও করতে পারেনি দস্যু বনহুরের চেহারা এত সুন্দর হবে, মুহূর্তে ওর মন থেকে ভয়ভীতি দূর হয়ে যায়। বনহুরের স্বর্গীয় দ্বীপ্তিময় দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে আর অবিশ্বাস করতে পারে না। তাকিয়ে থাকে নির্বাক নয়নে।

    হেসে বলে বনহুর—আমার কথা বিশ্বাস করতে পারলে।

    অস্ফুট কণ্ঠে বলেন নিমাই—হ্যাঁ।

    সত্যি?

    হ্যাঁ।

    তবে কালই তুমি মাধুরীর হাতে ধরে ক্ষমা চেয়ে ওকে নিয়ে এসো। যদি এর অন্যথা হয় তবে মনে রেখ-হাতের রিভলভারটা উদ্যত করে ধরে–এর একটা গুলি তোমাকে হজম করতে হবে।

    ভয়ার্ত চোখে নিমাই একবার বনহুরের মুখে আর একবার তার হাতে রিভলভারটার দিকে তাকায়।

    বনহুর তাকে ভাবার সময় না দিয়ে এক লাফে মুক্ত জানালা দিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়।

  • ছয়

    ছয়

    সুভাষিণী সেদিনের পর থেকে কেমন যেন ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছে। তার মুখের হাসি কোথায় যে মিলিয়ে গিয়েছে তার ঠিক নেই। সখীরা তাকে এমন বিষণ্ণ ভাবাপন্ন হয়ে পড়তে দেখে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। পিতামাতাও উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন, তাদের একমাত্র কন্যার হলো কি? বড় বড় ডাক্তার দেখানো হচ্ছে, কিন্তু কোন ডাক্তারই রোগ খুঁজে পাচ্ছে না। সুভাষিণীর মুখে তবু হাসি নেই। ঠিকভাবে নাওয়া খাওয়া নেই। সখীদের নিয়ে হাসি গল্প নেই, সদা সর্বদা কি যেন ভাবে সে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়—কিছু হয় নি আমার।

    একদিন সখীরা ধরে বসলো-সুভাষিণী, আজ তোকে বলতেই হবে, সে দিনের পর থেকে তোর কি হয়েছে? ডাক্তার বলেছে অসুখ নেই। নিজেও বলিস কিছু হয়নি, তবে তোর হলো কি?

    সুভাষিণী কারো কাছেই বলতে পারে না তার মনের কথা। সে একজন দস্যুকে ভালবেসে ফেলেছে তবু সে স্বজাতি নয় মুসলমান কিন্তু তার পক্ষে ওকে ভুলাও অসম্ভব। কেন—কেন তার।

    মনে ওর প্রতিচ্ছবি এমন করে গেঁথে গেছে? সে তো সভ্য সমাজের কোন লোক নয়। সে একজন দস্যু।

    সুভাষিণীকে নীরব থাকতে দেখে সখীদের একজন বলে ওঠে—কি ভাবছিস সুভা?

    ভাবছি তোরা আমার মাথাটা খাবি। সত্যি তুই আমাদের প্রশ্নের জবাব দিবি না?

    না।

    বেশ, আজ থেকে আমরা তোকে বিরক্ত করব না। কিন্তু মনে রাখিস সুভা, তুই না বললেও আমরা বুঝতে পেরেছি, একটা কিছু তোর হয়েছে।

    সেটুকুই জেনে রাখ তোরা, তাহলেই হলো।

    একদিন সুভাষিণী বাগানে বসে ভাবছে এমন সময় তার বড় দাদার বৌ চন্দ্রা দেবী এসে বসলো তার পাশে।

    সুভাষিণী ফিরে তাকিয়ে আবার সোজা হয়ে বসলো কোন কথা বলেন।। পূর্বে যে বৌদিকে দেখে তার খুশির অন্ত থাকে না আজ আর সঙ্গে কথাই বলে না সুভাষিণী। চন্দ্রা ঘনিষ্ঠ হয়ে বলেন, তারপর সুভাষিণীর একখানা হাত মুঠায় চেপে ধরে বলেন–সুভা, আজ তোকে একটা কথা আমাকে বলতে হবে। বল বলবি?

    স্থিরকণ্ঠে বলে সুভাষিণী বলার মত হলে, নিশ্চয়ই বলবো।

    আচ্ছা সুভা, তুই যে বলেছিলি কে যেন তোকে ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে ঘোড়ায় চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল?

    হ্যাঁ সে এক ভদ্রলোক।

    সুভা, এবার আমি বুঝতে পেরেছি, সে দিন ঐ ভদ্রলোক তোকে বাঁচিয়ে নিয়েছে সত্যি, কিন্তু তোর হৃদয় চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

    যাও, ঠাট্টা করো না বৌদি।

    ঠাট্টা নয় সুভা, এতদিন ঘরে সদা সর্বদা তোর বিষয় নিয়ে ভেবে দেখেছি ঠিক, এই রকম কিছু একটা হয়েছে। দেখ সুভা আমি তোর বৌদি। লক্ষী বোনটি আমার কাছে কোন কথা লুকোতে নেই।

    জানি, কিন্তু বলে কোন লাভ হবে না বৌদি।

    হবে, আমাকে বললে অনেক উপকার হবে তোর।

    একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে সুভাষিণী—তুমি যদি প্রতিজ্ঞা করো এ কথা কার কাছে বলবে না, তবে বলতে পারি।

    বল, বলবো না।

    বৌদি, তুমি যা অনুমান করেছে। তাই সত্য। যে সেদিন আমাকে ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করেছিল, সে আমার গোটা মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। তাকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারছিনে বৌদি।

    সুভাষিণী, এ কথা আমি বুঝতে পেরেছি, কিন্তু তার কোন পরিচয় জানা নেই—কে সে? কি তার নাম? সুভা, অজ্ঞাত একজনকে হঠাৎ এভাবে ভালবেসে, তুই ভুল করেছিস।

    বৌদি, তার পরিচয় আমি পেয়েছি।

    সত্যি?

    হ্যাঁ।

    কে সে?

    বৌদি, তুমি শুনলে চমকে উঠবে, ভয়ে শিউরে উঠবে। আমাকে রক্ষাকারী সে লোকটি স্বাভাবিক লোক নয়।

    তাই নাকি?

    হ্যাঁ, দস্যু বনহুর।

    বিস্ময়ভরা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে ওঠে। চন্দ্রা-দস্যু বনহুর!

    বৌদি, প্রথমেই বলেছি, এ কথা তুমি কাউকে বলবে না।

    সুভা, একি বলছিস তুই।

    বৌদি, আমি গোটা অন্তর দিয়ে ওকে ভালবেসে ফেলেছি।

    সুভা, একটা দস্যু, একটা কুৎসিত জঘন্য ব্যক্তিকে…

    না, না, বৌদি, তুমি তাকে জানো না বৌদি, তুমি তাকে জান না। বৌদি! একটি বার যদি তুমি তাকে দেখতে। দস্যু বনহুর সে মানুষ নয়দেবতা!

    এসব কি বলছিস সুভাষিণী?

    তোমাকে কি বলবো, বৌদি। আমি কিছুতেই তাকে ভুলতে পারছিনে। সুভাষিণী চন্দ্রার হাত চেপে ধরে—বৌদি, বলো কি করবো আমি?

    চন্দ্রার মুখমণ্ডল গম্ভীর থমথমে হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কি যেন ভাবে। তারপর বলে—সুভা, যাকে কোনদিন আর দেখার সুযোগ পর্যন্ত পাবি না, তাকে ভালবেসে নিজেকে বিসর্জন দিসনে।

    সুভাষিণী চন্দ্রার কোলে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বৌদি! বৌদি। চন্দ্র সস্নেহে সুভাষিণীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

    হাঙ্গেরী কারাগার পরিদর্শন করার পর পুলিশ সুপার মিঃ আহমদ স্বয়ং দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারে অবতীর্ণ হয়েছেন। ইন্সপেক্টার মিঃ হারুন অন্য কয়েকজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসারসহ গোপনে মিঃ চৌধুরীর বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছেন। সবাই আড়ালে থেকে লক্ষ্য করছেন। তারা গোপনে সন্ধান নিয়ে জানতে পেয়েছেন, দস্যু বনহুর হঠাৎ কোন কোন দিন চৌধুরী বাড়িতে আগমন করে এবং মনিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

    বেশ কয়েক রাত এভাবে তারা গোপনে পাহারা চালিয়ে চলেছে। ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছেন মিঃ আহমদ। দস্যু বনহুরের দেখা পাওয়াতে দূরের কথা, একটি প্রাণীও দেখতে পাননি তারা রাতের অন্ধকারে।

    আজ অমাবস্যা। গোটা পৃথিবী অন্ধকার। এই রাতের প্রতীক্ষায় আছে মনিরা। প্রতি অমাবস্যা রাতেই বনহুর আসতো তার কাছে। আজও আসবে সে।

    ওদিকে গুলিভরা রাইফেল আর রিভলভার নিয়ে প্রতীক্ষা করছে পুলিশ বাহিনী। মিঃ আহমদের চোখ দুটো অন্ধকারে আগুনের ভাটার মত জ্বলছে। আর জ্বলছে তার হাতের রিভলভারটি।

    গভীর রাত। মনিরা বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। আজ আসবে মনিরা। বার বার ওর ছবিখানা নিয়ে দেখছে সে। ফুলের একটি মালা সুন্দর করে গেঁথে রেখেছে, এই মালাখানা পরিয়ে দিয়ে ওকে সাদর সম্ভাষণ জানাবে মনিরা।

    এমন সময় দূরে শুনা যায় অশ্বপদশব্দ।

    মনিরার হৃদয়ে দোলা লাগে। মালাটা হাতে তুলে নিয়ে প্রতীক্ষা করে সে। বুকের মধ্যে একটা অভূতপূর্ব আনন্দের অনুভূতি নাড়া দিয়ে চলেছে।

    মিঃ আহমদের দলবলের কানেও গিয়ে পৌঁছলো এই অশ্বপদ শব্দ। প্রত্যেকেই রিভলভার আর রাইফেল উদ্যত করে প্রতীক্ষা করতে লাগলো।

    অশ্বপদশব্দ ক্রমে স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে।

    ওদিকে মনিরার হাতে ফুলের মালা—

    আর এদিকে পুলিশ বাহিনীর হাতে উদ্যত রিভলভার…

    হাস্যোজ্জল দীপ্ত মুখে তাজের পিঠে এগিয়ে আসছে দস্যু বনহুর।

  • সৈনিক বেশে দস্যু বনহুর

    সৈনিক বেশে দস্যু বনহুর

    ‘সৈনিক বেশে দস্যু বনহুর’— এটি ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের তৃতীয় গ্রন্থ। ‘দস্যু বনহুর’ বাংলাদেশী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘রোমেনা আফাজ’ সৃষ্ট একটি কথাচরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি লিখেছেন ১৩৮টি কাহিনী, যা সামগ্রিকভাবে ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাসের নামও ‘দস্যু বনহুর’। ছোটবেলা নৌদূর্ঘটনায় চৌধুরী বাড়ীর ছেলে মনির হারিয়ে যায়, দস্যু সর্দার কালু খাঁ তাঁকে কুঁড়িয়ে পান ও পরবর্তিতে তাঁকে ‘দস্যু বনহুর’ রূপে গড়ে তোলেন। গরীবের বন্ধু ও চোরাকারবারীদের চিরশত্রু দস্যু বনহুর যেমন গরীবের কাছে ছিলেন সম্মানিত, তেমনি চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীদের কাছে ছিলেন যমদূতের মত। এই সিরিজের স্লোগান হচ্ছে ‘সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর’।

    দস্যু বনহুরের সহায়ক চরিত্র হিসেবে রয়েছে রহমান ও কায়েস, তারা একাধারে বনহুরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিল— একজন জঙ্গলে অন্যজন শহরে; শহুরে স্ত্রীর নাম মনিরা ও অপরজনের নাম নূরী। মনিরার গর্ভে দস্যু বনহুরে বড় ছেলে ‘নুরুজ্জামান নূর’ এর জন্ম, যে পরবর্তীতে দেশের সৎ ও সাহসী ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। নূরীর গর্ভে ‘জাভেদ’ নামে তার একটি ছেলের জন্ম হয়, যে পিতার মতই দস্যুতা করতে ভালবাসে।

  • প্রথম পরিচ্ছেদ

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    নিস্তব্ধ রাত্রির সূচিভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে শোনা যাচ্ছে অশ্ব-পদধ্বনি খট খট খটু….তাজের পিঠে এগিয়ে আসছে দস্যু বনহুর। সর্বাঙ্গে কালো পোশাক, মাথায় কালো পাগড়ি, কোমরের বেল্টে গুলীভরা রিভলবার।

    চৌধুরী বাড়ির অদূরে এসে বনহুর তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো। তাজের পিঠে মৃদু আঘাত করে বললো–ঠিক এইখানে দাঁড়িয়ে থাকবি, বুঝলি?

    তাজ হয়তো বনহুরের কথা বুঝতে পারলো, মৃদু শব্দ করে উঠলো সে–চিঁ হিঁ।

    বনহুর অন্ধকারে সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে। বার বার তাকাচ্ছে সে চৌধুরী বাড়ির দোতলার একটি সুউচ্চ কক্ষের দিকে। মুক্ত জানালা দিয়ে কিছুটা বৈদ্যুতিক আলো বেরিয়ে এসে পড়েছে নিচের বাগানের মধ্যে। এই কক্ষটি মনিরার। যতই নিকটবর্তী হচ্ছে সে ততই মনের মধ্যে এক আনন্দের দ্যুতি খেলে যাচ্ছে-মনিরা হয়তো তার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে।

    এদিকে পুলিশ সুপার মি. আহম্মদ গুলীভরা উদ্যত রিভলবার হস্তে রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রতীক্ষা করছেন দস্যু বনহুরের।

    অদূরে একটি পাইন গাছের আড়ালে লুকিয়ে রিভলবার উদ্যত করে আছেন মি. হারুন। অন্যান্য পুলিশ কেউ বা বন্দুক, কেউ বা রাইফেল বাকিয়ে ঝোঁপের মধ্যে উবু হয়ে প্রতীক্ষা করছে। আজ দস্যু বনহুরকে জীবিত কিংবা মৃত পাকড়াও করা চাই-ই চাই।

    বনহুর একেবারে নিকটে পৌঁছে যায়। হঠাৎ তার পায়ে একটি লতা জড়িয়ে পড়ে। পড়তে পড়তে বেঁচে যায় বনহুর। কিন্তু সে সোজা হয়ে দাঁড়াবার পূর্বেই একটি গুলী সঁ করে চলে যায় তার পাশ কেটে। মুহূর্তে বনহুর বুঝতে পারে বিপদ তার সম্মুখীন। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে পড়ে সে। পর মুহূর্তেই তার মাথার উপর দিয়ে সাঁ সাঁ করে আরও কয়েকটা গুলী চলে গেল। নিস্তব্ধ রাত্রির বুকে জেগে উঠলো রিভলবার আর রাইফেলের গুলীর আওয়াজ গুড় ম-গুড় ম গুড় ম…..

    বনহুর হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে লাগলো। এখানে থাকা আর এক দণ্ড তার পক্ষে উচিত নয়। কখনও বুক দিয়ে, কখনও হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগলো সে। তখনও তার মাথার উপর দিয়ে গুলী ছুটে চলেছে।

    নিজের কক্ষে চমকে উঠলো মনিরা। হাত থেকে খসে পড়লো ফুলের মালা। নিশ্চয়ই মনিরের আগমন পুলিশ বাহিনী জানতে পেরেছে। তারা ভীষণভাবে আক্রমণ করেছে তাকে। মনিরার হৃদপিণ্ড ধক ধক করে কাঁপতে শুরু করলো। হায়। একি হলো! এতোক্ষণ হয়তো মনিরের দেহটা ধূলায় লুটিয়ে পড়েছে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে সেখানের মাটি….আর ভাবতে পারে না মনিরা। একবার ছুটে যায় জানালার পাশে, একবার এসে দাঁড়ায় মেঝের মাঝখানে। ভেবে পায় না কি। করবে সে।

    গুলীর শব্দে চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগমের নিদ্রা ছুটে যায়। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে চৌধুরী সাহেব রেলিং-এর পাশে এসে দাঁড়ান। মরিয়ম বেগম ছুটেন মনিরার কক্ষের দিকে।

    মনিরা তখন দরজা খুলে মামুজানের কক্ষের দিকে ছুটতে শুরু করেছে। মরিয়ম বেগমকে দেখতে পেয়ে মনিরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠে-মামীমা, মামীমা, একি হলো! একি হলো!

    মরিয়ম বেগম সান্ত্বনার স্বরে বলেন–ভয় নেই মা, গুলী এখানে আসবে না।

    তারপর মনিরাকে সঙ্গে করে চৌধুরী সাহেবের কক্ষে গিয়ে দাঁড়ান মরিয়ম বেগম; স্বামীকে লক্ষ্য করে বলেন–ওগো, কি হয়েছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে।

    বিস্ময়াহত চৌধুরী সাহেবও অস্ফুট কণ্ঠে বলেন–আমিও তো কিছু বুঝতে পারছিনে।

    মনিরার চোখে মুখে এক উৎকণ্ঠার ছাপ ফুটে উঠেছে। কি করবে, না বললেও নয়। নিশ্চয়ই পুলিশ বাহিনী তার মনিরের উপর হামলা চালিয়েছে। চঞ্চল কণ্ঠে বলে উঠে মনিরা-মামুজান, নিশ্চয়ই এ পুলিশের রাইফেলের শব্দ। পুলিশ আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে।

    চৌধুরী সাহেব অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করেন–পুলিশ!

    হ্যাঁ হ্যাঁ, মামুজান যাও, ওদের ক্ষান্ত করো। ওদের ক্ষান্ত করো তুমি…

    সেকি মা, পুলিশ কেন এভাবে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে গুলী ছুঁড়বে?

    মামুজান যাও, বারণ করো; বারণ করো তুমি….নইলে…নইলে সর্বনাশ হবে, সর্বনাশ হবে মামুজান….।

    মরিয়ম বেগম বাড়ির অদূরে যেখানে গুলীর শব্দ হচ্ছিলো সেদিকে তাকিয়ে বলেন–মনিরা, আমাদের ব্যস্ত হবার কিছু নেই। গুলী আমাদের বাড়ির দিকে ছুঁড়ছে বলে মনে হচ্ছে না; দেখছিস নাগুলীর শব্দ ক্রমান্বয়ে ঐদিকে সরে যাচ্ছে।

    মনিরা স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো অন্ধকারময় অদূরস্থ পাইন গাছগুলির দিকে। মনের মধ্যে ঝড় বইতে শুরু করেছে। কায়মনে খোদাকে স্মরণ করতে লাগলো, হে দয়াময়! ওকে তুমি রক্ষা করো, ওকে তুমি বাঁচিয়ে নাও প্রভু!

    মাত্র কয়েক মিনিট, হঠাৎ মনিরার কানে এসে পৌঁছলো অশ্ব-পদশব্দ খট খট খট….তবে কি মনির এ যাত্রা রক্ষা পেয়েছে! এ যে তারই অশ্বের পদশব্দ। মুহূর্তে মনিরার মুখমণ্ডল প্রসন্ন হয়ে উঠে। নিজ মনেই অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠে-বেঁচে গেছে, নিশ্চয়ই সে বেঁচে গেছে….

    মরিয়ম বেগম আশ্চর্য কণ্ঠে বলে উঠে-সেকি মনিরা, কে বেঁচে গেছে রে?

    ঐ যে ও-ও বেঁচে গেছে; শুনছো না মামীমা ওর ঘোড়ার খুরের শব্দ?

    তাইতো শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু ওটা কার ঘোড়ার খুরের শব্দ মনিরা? মরিয়ম বেগম কান পেতে শুনতে লাগলেন।

    চৌধুরী সাহেব বলেন–তাই তো, একটা ঘোড়া দ্রুত ঐদিকে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

    হ্যাঁ মামাজান, সে বেঁচে গেছে।

    কে, কার কথা বলছো, মা মনিরা? চৌধুরী সাহেব প্রশ্ন করেন।

    না না কেউ না, কেউ না মামুজান, কেউ না….মনিরা ছুটে চলে যায় নিজের ঘরের দিকে।

    কক্ষে প্রবেশ করে খোদার কাছে দু’হাত তুলে শুকরিয়া আদায় করে-হে খোদা, তুমি পাক পরওয়ার দেগার, আমার মনিরকে তুমি নিশ্চয়ই বাঁচিয়ে নিয়েছে। তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। মালাখানা হাতে তুলে নিয়ে বনহুরের ছবির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর পরিয়ে দেয় সে ছবির গলায়। নির্বাক নয়নে তাকিয়ে থাকে সে ছবিখানার দিকে।

    মি. আহম্মদের রিভলবারের গুলী লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি, তিনি দেখতে পেলেন, অন্ধকারে কেউ যেন ভূতলে পড়ে গেল। পুশিল বাহিনী মুহর্তমধ্যে ঘিরে ফেললো জায়গাটা, কিন্তু কোথায় কে! মি. আহম্মদ স্বয়ং ছুটে গেলেন যেখানে অন্ধকারে কাউকে পড়ে যেতে দেখেছিলেন। টর্চের আলো বিক্ষিপ্তভাবে ছুটাছুটি করতে লাগলো। মি. হারুন এবং মি. হোসেন টর্চের আলো ফেলে ঝোঁপ ঝাড়, বাগানের আশেপাশে দেখতে লাগলেন। সবাই সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে খুঁজে চলেছে দস্যু বনহুরকে।

    মি. আহম্মদ বলেন–ইন্সপেক্টর, আমার গুলী দস্যুটাকে ঘায়েল করেছে। নিশ্চয়ই সে মারা পড়েছে কিংবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে।

    পুলিশ বাহিনী তখনও অনুসন্ধান করে চলেছে। তাদের টর্চের আলো বিক্ষিপ্তভাবে ছুটোছুটি করছে। হঠাৎ একজন পুলিশ তীব্র চিৎকার করে উঠে-হুজুর রক্ত, হুজুর রক্ত…

    সবাই দ্রুত এগিয়ে গেলেন সেখানে। একটা পাইন ঝাড়ের পাশে খানিকটা জায়গা রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে। মি. হোসেন আনন্দধ্বনি করে উঠেন-স্যার, দস্যু নিহত হয়েছে, দস্যু নিহত হয়েছে।

    মি. হারুন জায়গাটা ভালোভাবে লক্ষ্য করে বলেন–না, সে নিহত হয়নি, সে আহত হয়েছে।

    স্যার, আপনার গুলি যে দস্যুটাকে ঘায়েল করেছে, এ সুনিশ্চয়।

    সে বেঁচে আছে, আমার গুলী খেয়েও সে বেঁচে আছে। নিহত হয়নি! নিশ্চয়ই তাহলে সে আহত অবস্থায় নিকটেই কোথাও লুকিয়ে আছে। এই মুহূর্তে তোমরা সমস্ত ঝোঁপঝাড়, বাগান তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখ। আহত অবস্থায় সে পালাতে পারেনি।

    মি. আহম্মদ যখন তার সঙ্গীদের কথাগুলো বলছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর তার বাম হস্ত চেপে ধরে তাজের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দক্ষিণ হস্তের আংগুলের ফাঁকে ঝর ঝর করে ঝরে পড়ছে তাজা রক্ত। মি. আহম্মদের গুলীটা বনহুরের বাম হস্তের মাংস ভেদ করে চলে গেছে।

    তাজ মনিবের অবস্থা হয়তো অনুভব করলো। নিঃশব্দে তাজ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বনহুর। অন্ধকারে অতিকষ্টে উঠে বসলো তাজের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করলো তাজ।

    আচমকা অশ্ব-পদশব্দে চমকে উঠেন মি. আহম্মদ ও তার দলবল। মি. হারুন চিৎকার করে উঠেন-স্যার, দস্যু বনহুরের অশ্ব-পদশব্দ। সঙ্গে সঙ্গে তার রিভলবার গর্জন করে উঠে-গুড়ুম গুডুম……

    মি. আহম্মদ রাগে-ক্ষোভে অধর দংশন করেন। সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে হুঙ্কার ছাড়েন-গ্রেপ্তার করো, গ্রেপ্তার করো। গুলী চালাও, গুলী চালাও….

    একসঙ্গে অসংখ্য রাইফেল গর্জে উঠে।

    কিন্তু তাজের খুরের শব্দ তখন অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। মনিবের বিপদ বুঝতে পেরে তাজ উলকাবেগে ছুটতে শুরু করেছে।

    পুলিশ বাহিনীর রাইফেলের গুলী আর তাজের নিকটে পৌঁছতে সক্ষম হলো না।

    ধীরে ধীরে তাজের পদশব্দ অন্ধকারে মিলে গেল।

    মি. আহম্মদ ক্ষিপ্তের ন্যায় হয়ে উঠলেন। দস্যু বনহুরের কাছে এ যেন তার চরম অপমান। হাঙ্গেরিয়া কারাগার থেকে পালিয়ে রক্ষা পেয়েছে। ভেবেছিলেন এবার তিনি দস্যু বনহুরকে জীবিত কিংবা মৃত পাকড়াও করবেনই। কিন্তু সব বিফলে গেল। এত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো।

    তিনি অফিসে ফিরে এ বিষয়ে গভীরভাবে আলোচনা করতে লাগলেন।

    মি. হারুন পুলিশ সুপারের অবস্থা দর্শনে মনে মনে হাসলেন। প্রকাশ্যে বললেন-স্যার, আপনি এতো উত্তেজিত হচ্ছেন কেন, দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও তাকে আপনি ঘায়েল করেছেন। যে দস্যুকে হাঙ্গোরিয়া কারাগার আটকে রাখতে পারেনি বা সক্ষম হয়নি, সেই দস্যু আজ আপনার হস্তে আহত-এটাও কম নয়।

    মি. হারুনের কথায় সুপার কতকটা যেন আশ্বস্ত হন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন–ইন্সপেক্টর, এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি, আমার রিভলবারের গুলী দস্যুটাকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে।

    দ্বিতীয় ইন্সপেক্টর মি. হোসেন বলেন–স্যার, এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ যে, তার জখমটা সাংঘাতিক হয়েছে। নইলে অতো রক্তপাত হতো না।

    মি. আহম্মদ যেন খুশি হলেন। দস্যুকে যদিও তিনি গ্রেপ্তার করতে পারেননি, তবু কিছুটা সান্ত্বনা পেলেন দস্যু ঘায়েল হয়েছে বলে।

    তিনি আরও কিছুক্ষণ এ বিষয় নিয়ে তাঁর দলবলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলেন। তারপর বিদায় গ্রহণ করলেন।

    কিন্তু বাসায় ফিরেও মি. আহম্মদ স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। অহরহ একটা চিন্তা তাঁকে অক্টোপাশের মত ঘিরে রেখেছিল। তিনি ভেবেছিলেন দস্যু বনহুর সবাইকে হার মানাতে পারে, হাঙ্গেরিয়া কারাগার থেকে পালাতে পারে, কিন্তু তার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে না। বাকি রাতটুকু তাঁর ছটফট করে কাটলো। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অফিসে ফোন করলেন। মি. হারুন এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার কেবলমাত্র বিশ্রামের জন্য বাড়ি যাবেন ভাবছেন, এমন সময় মি. হারুন এবং হোসেনের ডাক এলো। মি. আহম্মদ এক্ষুণি তাঁদের আহ্বান জানিয়েছেন।

    মি. হারুন এবং হোসেন অগত্যা বিশ্রামের আশা ত্যাগ করে মি. আহম্মদের বাসভবনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। মি. হারুন ও মি. হোসেন সুপারের বাসভবনে পৌঁছে আশ্চর্য হলেন। মি. আহম্মদের শরীরে তখনও গত সন্ধ্যার ড্রেস দেখে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলেন মি. হারুন এবং মি. হোসেন। ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারি করছেন মি. আহম্মদ।

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন সেলুট করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। মি. আহম্মদ গম্ভীর কণ্ঠে বলেন–ইন্সপেক্টর, এক্ষুণি মি. চৌধুরীর বাড়ির সম্মুখে যে স্থানে দস্যুটার রক্ত দেখা গিয়েছিল ঐখানে যেতে চাই। নিশ্চয়ই কোন ক্ল পাওয়া যেতে পারে। আপনারা প্রস্তুত আছেন?

    ইয়েস স্যার, আমরা প্রস্তুত।

    তবে চলুন আর বিলম্ব নয়, আমি নিজে ঐ জায়গাটা দিনের আলোয় দেখতে চাই। কথাটা বলে টেবিল থেকে হ্যাটটা তুলে মাথায় পরে নেন মি. আহম্মদ।

  • দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    বনহুরের রক্তে তাজের দেহটা ভিজে চুপসে উঠেছে। এক হস্তে তাজের লাগাম চেপে ধরে উবু হয়ে আছে বনহুর। তাজ প্রাণপণে ছুটে চলেছে।

    প্রান্তরের বুক চিরে, গহন বনের ভিতর দিয়ে ছুটছে তাজ। নিস্তব্ধ ধরণীর বুকে তাজের খুরের আওয়াজ প্রতিধ্বনি তুলছে খট খট খট……

    বনহুরকে নিয়ে তাজ আস্তানায় পৌঁছে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুজন অনুচর মশাল হস্তে এগিয়ে এল তাজের পাশে। তাজের পিঠে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্তব্ধ হয়ে গেল। একজন তীব্র চিৎকার করে উঠলো।

    নূরীও এতোক্ষণ বনহুরের প্রতীক্ষায় ছিল, তাজের খুরের শব্দে বেরিয়ে এলো সে। ছুটে গেলো তাজের পাশে, কিন্তু নিকটে পৌঁছেই আর্তনাদ করে উঠলো-উঃ! এ তোমার কি হয়েছে, হুর?

    ততক্ষণে বনহুর অনুচরদ্বয়ের সাহায্যে নিচে নেমে দাঁড়িয়েছে। নূরী তাড়াতাড়ি বনহুরের হাতের নিচে নিজের কাঁধটা এগিয়ে দিয়ে ধরে ফেলে-হুর, একি হলো?

    মৃদু হেসে বলে বনহুর-সামান্য ঘায়েল হয়েছে মাত্র– সেরে যাবে।

    সামান্য! রক্তে চুপসে গেছে তাজের দেহ, আর তুমি বলছো সামান্য ঘায়েল হয়েছে মাত্র? নূরীর সাহায্যে বনহুর নিজের বিশ্রামকক্ষে পৌঁছল।

    বনহুরকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পাশে বসলো নূরী। নিজের ওড়না দিয়ে বেশ করে ওর হাতখানা বেঁধে দিল। নূরী যখন বনহুরের হাতে পট্টি বাঁধছিল তখন তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। বনহুরের কষ্টটা যেন নূরীর হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিচ্ছিলো। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে–হুর, এবার বল কে তোমার এ অবস্থা করেছে?

    শুনে কি হবে নূরী?

    রহমানের সাহায্যে এবং তোমার সমস্ত অনুচর নিয়ে আমি তাকে উচিত শাস্তি দেব। আমি তার সর্বনাশ করবো। তোমাকে ঘায়েল করেছে যে, আমি তাকে হত্যা করবো।

    সাবাস নূরী!

    বলো, বলো! হুর, কে তোমার এ অবস্থা করেছে, বলো?

    নূরী, তোমার দীপ্ত কণ্ঠ আমার ক্ষত অনেকটা আরোগ্য করে দিয়েছে। সত্য তুমি বীরাঙ্গনা। কিন্তু এ গুলী আমাকে কে করেছে ঠিক আমিই জানিনে। নইলে দস্যু বনহুর তাকে ক্ষমা করতো না। এখনও আমার দক্ষিণ হস্ত সম্পূর্ণ সুস্থ।

    তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, না?

    মোটেই না নূরী, সামান্য কেটেছে মাত্র।

    এ আঘাত তুমি সামান্য বলতে পার না বনহুর। এখনও যেভাবে রক্তপাত হচ্ছে, তাতে বিপদ ঘটতে পারে।

    নূরী, জানি আমার শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, কিন্তু এতেও আমি দুর্বল হব না।

    বল কি হুর, ডাক্তার নিয়ে আসি। খোদা না করুন তোমার কিছু হয়ে যায়। ডাক্তার! কথাটা উচ্চারণ করে হাসে বনহুর।

    হ্যাঁ ডাক্তার। ডাক্তার না ডাকলে তোমার রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে না। দেখছো না ওড়নাখানা সম্পূর্ণ রাঙা হয়ে উঠেছে। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করা ঠিক নয় হুর।

    বনহুর পিছু ডাকে-কোথায় যাচ্ছো নূরী, শোন।

    নূরী ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে।

    নূরী রহমানের নিকট গিয়ে বললো–রহমান, বনহুরের শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত ঘটেছে। এখনও রক্ত পড়ছে। শিগৃগীর কোন ডাক্তারের ব্যবস্থা কর।

    ডাক্তার! সর্দার কি এখনই ডাক্তার ডাকতে বললো নূরী?

    না, সে বলেনি, কিন্তু ডাক্তার ডাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। যাও রহমান, আর বিলম্ব কর, হুরকে বাঁচাতেই হবে।

    কিন্তু…

    আর কিন্তু নয়। তুমি দুটো অশ্ব নিয়ে এসো, আমিও যাব তোমার সঙ্গে। ডাক্তারকে কিভাবে আনতে হবে আমিই আনব।

    বেশ। রহমান হাতে তালি দেয়-সঙ্গে সঙ্গে দুজন দস্যু এসে দাঁড়ায় সেখানে। রহমান বলে–দুটো অশ্ব তৈরি করে নিয়ে এসো।

    দস্যু দুটি চলে যায়।

    নূরী বলে–আমিও তৈরি হয়ে আসছি।

    নূরী নিজের কক্ষে প্রবেশ করে, পূর্বের ড্রেসে সজ্জিত হয়। মাথায় পাগড়ি, নাকের নিচে সরু এক ফালি গোঁফ। প্যান্ট এবং আঁটসাট একটি কোট। প্যান্টের পকেটে একটি কালো রুমাল ও একটি রিভলবার লুকিয়ে নেয় সে। তারপর আয়নার সম্মুখে দাঁড়ায়, ঠিক তখন তাকে একটি একুশ বছরের যুবকের মত লাগছিল।

    এবার নূরী বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করলো।

    বনহুর তখন বিছানায় চীৎ হয়ে শুয়ে কিছু ভাবছিল। পদশব্দে চোখ মেলে তাকায়। হঠাৎ কক্ষে অপরিচিত এক যুবককে দেখে প্রথমে আশ্চর্য হয়, পর মুহূর্তেই মৃদু হাসে।

    নূরী গম্ভীরভাবে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় বনহুরের সম্মুখে। কোন কথা বলে না সে।

    বনহুর কিন্তু নূরীকে চিনে ফেলেছে, তবু মনোভাব গোপন করে বলে–যুবক, তোমার নাম?

    নূরী তবু নিশ্চুপ।

    বনহুর দক্ষিণ হস্তে নূরীর হাত ধরে টেনে নেয় কাছে।

    নূরীর হৃদয়ে এক অভূতপূর্ব শিহরণ বয়ে যায়। আজ পর্যন্ত বনহুর নূরীকে কোনদিন এভাবে আকর্ষণ করেনি। আনন্দ আপ্লুত নূরীর দু’চোখ ছাপিয়ে পানি আসে।

    বনহুর স্নেহ-বিজড়িত কণ্ঠে বলে–এ ড্রেসে কোথায় যাচ্ছো নূরী?

    ডাক্তার ডাকতে।

    কিন্তু ডাক্তার এখানে এসে ফিরে যেতে পারবে?

    ভয় নেই, তোমার আস্তানার সন্ধান সে জানতে পারবে না। ছেড়ে দাও হুর, দেরী হয়ে গেল।

    বনহুর ওকে ছেড়ে দেয়। দ্রুত বেরিয়ে যায় নূরী। বাইরে গিয়ে দেখতে পায় রহমান দুটো অশ্ব নিয়ে অপেক্ষা করছে।

    নূরী রহমানকে লক্ষ্য করে বলে–রহমান, খুব দ্রুত কাজ করতে হবে। রাত ভোর হবার পূর্বেই ডাক্তার যেন তার নিজ বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

    আচ্ছা, তাই হবে।

    দুটি অশ্বে দুজন চড়ে বসে। অন্ধকারে অশ্ব দুটি ছুটতে শুরু করে।

    পথিমধ্যে রহমান ভেবে নেয় কোন ডাক্তারকে হলে তাদের ভালো হয়। তাই বিলম্ব হয় না। শহরের বিশিষ্ট ডাক্তার জয়ন্ত সেনের নিকটে যাওয়াই ঠিক করলো।

    বনের শেষ প্রান্তে তাদের মোটর গাড়ি প্রতীক্ষা করছিল। ঘোড়া দুটি গোপন স্থানে বেঁধে রেখে গাড়িতে উঠে বসে ওরা দুজন।

    অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গাড়ি ডাক্তার সেনের গাড়ি বারান্দায় গিয়ে পৌঁছল। রহমানই ড্রাইভ করছিল, রহমানের শরীরেও ছিল ড্রাইভারের ড্রেস। রহমান গাড়ি থেকে নেমে দরজার পাশে গিয়ে কলিং বেলে হাত রাখলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে সম্মুখে এসে দাঁড়াল একটি লোক। হয়তো বাড়ির চাকর-বাকর হবে। লোকটা জিজ্ঞাসা করলো–আপনারা কাকে চান?

    নূরী ব্যস্তকণ্ঠে বললো–ডাক্তার বাবুকে ডেকে দাও। একটু তাড়াতাড়ি, বুঝলে?

    কিন্তু তিনি তো রাতে কোন রোগী দেখেন না। লোকটি বললো।

    ডাক্তার বাবুকে ডেকে দাও, তিনি যা করেন–করবেন।

    কি বলবো? আপনারা কোথা থেকে এসেছেন?

    কিছু বলতে হবে না; শুধু বলবে, একটি যুবক আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।

    এবার লোকটা একবার যুবকের মুখে আর একবার তার গাড়িখানার দিকে তাকিয়ে চলে যায়।

    অল্পক্ষণেই পুনরায় লোকটি ফিরে এসে বলে–আসুন, ভিতরে এসে বসুন।

    নূরী লোকটার পিছু পিছু হলঘরে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর করুণ কণ্ঠে বলে–দেখ, একটু তাড়াতাড়ি ডাক্তার বাবুকে ডেকে দাও।

    এই যে এলেন বলে–আপনি বসুন। তারপর নিজ মনেই বলে চলে লোকটা-এই রাত দুপুরে রোগী। বাপরে বাপ, রাতেও একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেবে না বাবা।

    ততক্ষণে কক্ষে প্রবেশ করেন ডাক্তার সেন। মধ্যবয়স্ক গম্ভীর প্রকৃতির লোকটি। স্লিপিং গাউনের বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে এসেছেন তিনি। নূরীকে দেখে বলেন–যুবক, তুমি কি জানো না

    আমি রাতে রোগী দেখি না?

    জানি, কিন্তু এক্সিডেন্ট হয়েছে….

    এক্সিডেন্ট! যুবক, তুমি তো দিব্যি দাঁড়িয়ে আছ– তোমার কি হয়েছে?

    ডাক্তারবাবু, আমার নয়-আমার বড় ভাই এক্সিডেন্ট হয়েছে। না গেলেই নয়, দয়া করে একটিবার চলুন-চলুন ডাক্তার বাবু…নূরীর গণ্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

    কি বললে, তোমার এক্সিডেন্ট নয়? তোমার ভাই-এর-আমি যাব এই রাতদুপুরে বাইরে রোগী দেখতে!

    নূরী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ডাক্তার বাবু, না গেলেই নয়। নইলে ওকে বাঁচানো যাবে না। ডাক্তার বাবু চলুন, দয়া করে চলুন। ডাক্তার বাবু…

    অসম্ভব। রাতে আমি কোথাও যাই না।

    আপনার পায়ে পড়ি ডাক্তার বাবু, চলুন…নূরী কাঁদতে থাকে। ডাক্তারের মনে হয়তো মায়ার উদ্রেক হয়। দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলেন–এখন রাত চারটে; আর ঘণ্টা দুই কিংবা তিন পরে গেলে চলবে না?

    না, ডাক্তার বাবু না, আপনি দয়া করে এক্ষুণি চলুন। আপনার পায়ে পড়ি ডাক্তার বাবু।

    ডাক্তার সেন দেখলেন না গেলেই নয়, যুবকটি নাছোড়বান্দা হয়ে ধরেছে। এবার বলেন তিনি-রাতে কোথাও রোগী দেখি না বা কলে যাই না। ফি কিন্তু ডবল দিতে হবে।

    তাই দেব, তাই দেব ডাক্তার বাবু, কত চান আপনি?

    দু’শো টাকা দিতে হবে।

    বেশ, তাই পাবেন।

    ডাক্তার সেন বলেন, রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে?

    হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে।

    তাহলে তো রক্তের প্রয়োজন?

    রক্ত-সে চিন্তা করবেন না ডাক্তার বাবু, আমি-আমিই দেব রক্ত।

    কিন্তু রোগীকে এখানে আনতে পারলে সব বিষয়ে সুবিধা হতো।

    না না, সে রকম কোন উপায়ই নেই। রোগী অত্যন্ত কঠিন। যা-যা প্রয়োজন নিয়ে চলুন। ডাক্তার বাবু, আমার গাড়িতেই আপনাকে পৌঁছে দেব।

    বেশ, তাই হবে। কিন্তু অনেক কিছু নিতে হচ্ছে।

    তাই নিন, কোন অসুবিধা হবে না।

    ডাক্তার সেন তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং ঔষধাদি নিয়ে নূরীর গাড়িতে চড়ে বসলেন।

    ডাক্তার সেনকে নিয়ে নূরীর গাড়ি ডবল স্পীডে ছুটে চলেছে। রহমান গাড়ি চালাচ্ছে।

    ডাক্তার সেন বললেন-কত দূর হবে?

    নূরী জবাব দিল-একটু দূরেই হবে ডাক্তার বাবু। আপনি নিশ্চিন্ত হউন, কোন ভয় নেই।

    ডাক্তার সেন একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে ভালোভাবে ঠেস দিয়ে বসেন।

    গাড়ি তখন আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটে চলেছে।

    নূরী ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে রিভলবার খানা বের করে নেয়। তারপর হঠাৎ অতর্কিতভাবে চেপে ধরলো ডাক্তার সেনের পাঁজরে-ডাক্তার বাবু, ভয় নেই, কিন্তু এবার আপনার চোখে রুমাল বাধতে হবে।

    ডাক্তার সেনের হাত থেকে অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা খসে পড়লো। দুহাত তুলে ধরলো উপরের দিকে। ভয়াতুর চোখে তাকালেন নূরীর মুখের দিকে, ঢোক গিলে বলেন–যুবক, তোমার মতলব?

    নূরী স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললো…আমি আপনার কোন ক্ষতি করবো না। শুধু চোখে রুমাল বাঁধতে হবে।

    তার মানে?

    মানে, আমি আপনাকে যেখানে নিয়ে যাব সে স্থানটি অতি গোপনীয়। কাজেই আপনাকে চোখে রুমাল বাঁধতে হবে। এতে আপত্তি করলে বিপদে পড়বেন। এতে আপনার কোন অমঙ্গল হবে না।

    ডাক্তার সেনের ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন তিনি-বেশ, তাই হবে।

    নূরী একটি কালো পুরু রুমাল বের করে ডাক্তার সেনের চোখে মজবুত করে বাঁধলো। তারপর বললো–আপনি চুপ করে থাকুন, যা করতে হয় আমরাই করবো। তারপর রোগীর নিকটে পৌঁছে আপনার কাজ।

    বনের পাশে এসে গাড়ি থামলো। রহমান গুপ্তস্থান হতে অশ্ব দুটি নিয়ে এলো। তারপর একটিতে ডাক্তার এবং ঔষধের বাক্স ও রহমান চেপে বসলো। অন্যটিতে নূরী।

    ডাক্তারকে নিয়ে একেবারে বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করলো নূরী। তারপর ওর চোখের রুমাল  খুলে দিয়ে বললো–ডাক্তার বাবু, এই যে রোগী।

    প্রায় অর্ধঘণ্টা কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা থাকায় কেমন যেন ধা ধা মেরে গিয়েছিলেন ডাক্তার সেন। প্রথমে চোখ দুটো একটু রগড়ে নিলেন, তারপর তাকালেন সম্মুখে। দেখতে পেলেন সম্মুখে শয্যায় শায়িত এক যুবক। বনহুরের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাকালেন কক্ষের চারিদিকে। এ কোথায় এসেছেন কিছুই বুঝতে পারলেন না।

    নূরী বলে উঠে-ডাক্তার বাবু, এবার দয়া করে ওকে দেখুন।

    বনহুর একবার নূরী আর একবার রহমানের মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তারকে লক্ষ্য করে বললো–বসুন।

    ডাক্তার সেন এবার বনহুরের বিছানার পাশে বসলেন। বনহুরকে পরীক্ষা করে বলেন–এটা গুলীর আঘাত বলে মনে হচ্ছে?

    বনহুর জবাব দিল–হ্যাঁ, রিভলবারের গুলী লেগেছিল। তবে গুলীটা ভেতরে নেই, বেরিয়ে গেছে।

    হ্যাঁ, সেরকমই দেখছি; কিন্তু যেভাবে ক্ষত হয়েছে, প্রচুর রক্তের প্রয়োজন।

    রক্ত?

    হাঁ, প্রচুর রক্ত লাগবে।

    কিন্তু রক্ত কোথায় পাওয়া যাবে? একটু চিন্তিত কণ্ঠে কথাটা উচ্চারণ করে বনহুর।

    নূরী বলে উঠে-কেন, আমার শরীরে এখনও প্রচুর রক্ত জমা আছে। ডাক্তার বাবু, আপনি আমার রক্ত তুলে নিয়ে ওকে বাঁচান।

    তা হয় না। ডাক্তার বাবু, আপনি রক্ত ছাড়া যতটুকু পারেন করুন। রক্ত আমার লাগবে না। গম্ভীর কণ্ঠে বলে বনহুর।

    ডাক্তার সেন বলে উঠেন-তা হয় না, রক্ত লাগবেই।

    নূরী পুনরায় বলে–আমার রক্ত না নিলে আমি এক্ষুণি নিজকে বিসর্জন দেব।

    ডাক্তার সেন বলেন–বেশ, তাই হোক। এই যুবকের রক্তেই আমি আপনাকে…।

    এবার শুরু হলো চিকিৎসা।

    নূরীকে পাশের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর শরীর থেকে রক্ত নিয়ে বনহুরের শরীরে দেওয়া হলো।

    ডাক্তার সেন মনোযোগ সহকারে কাজ করে চললেন।

    হাতখানায় সুন্দর করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। আর রক্তপাত হচ্ছে না।

    কিন্তু ডাক্তার সেনের কাজ যখন শেষ হলো তখন রাত আর বেশি নেই। বনহুরের ইংগিতে রহমান একটা থলে এনে ডাক্তার সেনের হাতে দিলেন।

    বনহুর বললো–ওটাতে আপনার পারিশ্রমিক আছে; নিয়ে যান।

    ডাক্তার সেন থলে হাতে নিয়ে একটু অবাক হলেন। কারণ তাকে দু’শ টাকা বন্দোবস্ত করে নিয়ে আসা হয়েছে। দু’খানা একশত করে টাকার নোট দিলেই চলত। এখানে গুণে দেখাটাও ভদ্রতা হবে না। কাজেই থলেটা পকেটে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

    রহমান হঠাৎ তার চোখের সম্মুখে কালো রুমালখানা ধরে বললো–আসুন এটা বেঁধে দি।

    ডাক্তার সেন দেখলেন, না বেঁধে যখন কোন উপায় নেই তখন নীরবই রইলেন।

    রহমান ডাক্তারের চোখ বেঁধে হাত ধরলো-আসুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।

    ডাক্তার সেন চলতে চলতে থমকে দাঁড়িয়ে বলেন–আপনার নামটা তো বললেন না?

    বনহুর হেসে বললো–ঐ থলের মধ্যেই আমার পরিচয়। তারপর রহমানকে লক্ষ্য করে বললো–ডাক্তার সেনের যেন কোন অসুবিধা না হয় লক্ষ্য রেখ রহমান।

    আচ্ছা রাখবো।

    রহমানের হাত ধরে চলতে চলতে ডাক্তার সেনের মনে নানা কথার উদ্ভব হচ্ছে। নিশ্চয়ই এটা কোন গোপন স্থান হবে। নইলে তার চোখ এমন করে বাঁধবে কেন। যাক গে যে স্থানই হোক তার এতো মাথা ঘামিয়ে লাভ কি! টাকা দু’শ পেলেই হলো। তাছাড়া রোগীর ব্যবহার চমৎকার! কথাবার্তাগুলোও তেমনি মনোমুগ্ধকর। কিন্তু কে এই যুবক-যার চেহারা এতো সুন্দর, যার ব্যবহার এতো মহৎ, যার হৃদয় এতো উন্নত!

    ডাক্তার সেনকে নিয়ে রহমান অশ্বযোগে একেবারে ট্যাক্সির নিকটে পৌঁছল, তারপর ট্যাক্সিতে বসিয়ে প্রায় পনেরো মিনিট ডবল স্পীডে চলার পর ডাক্তার সেনের চোখের রুমাল খুলে দিলো রহমান। তখন পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে।

    অল্পক্ষণেই গাড়ি-বারান্দায় গাড়ি পৌঁছে গেল।

    ডাক্তার গাড়ি থেকে নেমে চট করে গাড়ির নাম্বার লিখে নিলেন। কিন্তু একি! এযে তারই গাড়ির নাম্বার। গাড়ির দিকে ভালো করে তাকালেন-তাই তো, এ যে তারই গাড়ি! কিন্তু ডাইভার কই! ডাক্তার সেন চিৎকার করে দারোয়ানকে ডাকতে লাগলেন-গুরু সিং, গুরু সিং…

    ততক্ষণে রহমান গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যায়।

    ইতোমধ্যে দারোয়ান এসে সেলুট ঠুকে দাঁড়ালেন–হুজুর, হামকো বোলাতে; হ্যায়!

    বেটা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলি, না? দ্যাখ তো আমার গাড়ি গ্যারেজে আছে?

    হুজুর, গাড়ি তো আভি ড্রাইভার আপকে লে আনে গেয়া।

    বল কি!

    হ্যাঁ হুজুর।

    ড্রাইভার! কোথায় ড্রাইভার? রজত, রজত….রজত ড্রাইভারের নাম।

    মনিবের ডাকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বেরিয়ে আসে রজত-স্যার, আমাকে ডাকছেন?

    হ্যাঁ, তোমাকে ডাকবো না তো আর কেউ রজত আছে?

    বলুন স্যার?

    গাড়ি নিয়ে আমাকে আনতে গিয়েছিলে?

    সেকি স্যার, আমি তো নাক ডেকে ঘুমোচ্ছি, আপনাকে কখন আনতে গেলুম!

    দারোয়ান গুরু সিং বলে উঠে-হাময়ারা চোখ আন্ধা হুয়া নেহি। তুমি গাড়ি লে-কর গিয়া নেহি?

    রজত ক্ষেপে উঠে-নেহি নেহি; আমি ঘুমিয়েছিলুম স্যার, কোথাও যাইনি। সেই সন্ধ্যায় আপনাকে রোগীর গাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি। তারপর রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়েছি। রাতে একটিবার ঘুম পর্যন্ত ভাংগেনি স্যার।

    তাহলে তুমি গাড়ি নিয়ে যাওনি?

    না স্যার, আমি যাইনি।

    যাও দেখো তো আমার গাড়ি গ্যারেজে আছে কিনা?

    কেন থাকবে না স্যার, আমি শোবার পূর্বে গাড়ি গ্যারেজে বন্ধ করে তবেই তো শুয়েছি।

    বললুম যাও।

    রজত বেরিয়ে যায়। একটু পরে ফিরে এসে বলে–স্যার গাড়ি তো গ্যারেজে নেই।

    ডাক্তার সেন আপন মনেই বলে উঠেন-একি অদ্ভুত কাণ্ড। সব যে দেখছি ভূতুড়ে ব্যাপার!

    রজত আর্তকণ্ঠে বলে উঠে-কি বলেন স্যার, সব ভূতুড়ে ব্যাপার? এ্যা, এসব স্বপ্ন দেখছি না তো?

    দারোয়ান গুরু সিং বাংলা ভালো বলতে পারে না সত্য, কিন্তু বাংলা বুঝে সে সব। ভূতের নাম শুনে আঁতকে উঠে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠে-হুজুর, কাহা ভূত?

    ডাক্তার সেন রাগতভাবে বলেন–ভূত নেহি, ভূত নেহি, তুম লোগ ভূত…

    হাম লোগ ভূত। হাম লোগ তো বহুৎ আচ্ছা আদমী। হুজুর, হাম লোগ ভূত নেহি-আদম।

    ডাক্তার সেন কারো কথা কানে না নিয়ে ল্যাবরেটরীতে প্রবেশ করেন।

    তখন পূর্ব আকাশে সূর্যোদয় হয়েছে।

    দারোয়ান এবং ড্রাইভার কোন কিছু বুঝতে না পেরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নেয়।

    ডাক্তার সেন কক্ষে প্রবেশ করে কোটের পকেট থেকে টাকার থলেটা বের করে খুলে ফেলেন, সত্যই ওতে টাকা আছে, না অন্য কিছু। থলে খুলে বিস্ময়ে হতবাক হন, কোথায় দু’শ টাকা-এক শ’ করে প্রায় পঞ্চাশখানা নোট তাড়া করে বাঁধা রয়েছে। ডাক্তার সেনের চোখ দুটো উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠেছে। থলেটা আর একবার হাতড়ে দেখলেন– একি! ছোট্ট এক টুকরা কাগজ ভাঁজ করা রয়েছে। কাগজের টুকরাখানা মেলে ধরেন চোখের সামনে। কাগজে লেখা রয়েছে–

    ডাক্তার সেন, আপনার পারিশ্রমিক

    বাবদ পাঁচ হাজার টাকা রইল। গাড়ি

    ঠিক সময় ফেরত পাবেন।

    –দস্যু বনহুর

    ডাক্তার সেন অস্ফুট শব্দ করে উঠেন-দস্যু বনহুর। তার হস্তস্থিত থলেটা খসে পড়ে ভূতলে। তিনি চিৎকার করে ডাকেন-দারোয়ান, দারোয়ান-পুলিশ-পুলিশ…..

    ছুটে আসে দারোয়ান গুরু সিং, ছুটে আসে ড্রাইভার, আরও অনেকে। সবাই একবাক্যে বলে–কি হলো স্যার? কি হলো?

    ডাক্তার সেনের দু’চোখ তখন কপালে উঠেছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন–দস্যু বনহুর-দস্যু বনহুর…

    সবাই পিছু ফিরে ছুটতে শুরু করে, কেউ বা বলে–ওরে বাবা-দস্যু বনহুর!

    এক মুহূর্তে গোটা বাড়িতে হুলস্থুল পড়ে যায়। যে যে দিকে পারে ছুটছে আর চলছে-দস্যু বনহুর! দস্যু বনহুর!

    কার গায়ে কে পড়ছে ঠিক নেই। উঠছে আর পড়ছে, আর বলছে-দস্যু বনহুর….দস্যু বনহুর….

    ডাক্তার সেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মি. হেমন্ত সেনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে ধড়ফড় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো আর চিৎকার করে বলতে লাগলো-ব্যাপার কি? কি হয়েছে?

    এমন সময় ডাক্তার সেনের স্ত্রী ছুটে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেন–বাবা কি হবে! ল্যাবরেটরীতে দস্যু বনহুর এসেছে, দস্যু বনহুর এসেছে!

    বলো কি মা, দস্যু বনহুর!

    হ্যাঁ বাবা, এখন উপায়?

    মা, তুমি ঘাবড়িও না, আমি এক্ষুণি পুলিশ অফিসে ফোন করছি। হেমন্ত পুনরায় সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়; নিজের কক্ষে ফিরে গিয়ে রিসিভারটা হাতে উঠিয়ে নেয়-হ্যালো, পুলিশ অফিস?

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন তখন পুলিশ সুপার মি. আহম্মদের ওখানে ছিলেন।

    ডিটেকটিভ মি. শঙ্কর রাও তখন কোন কাজে পুলিশ অফিসে এসেছিলেন, তিনিই ফোন ধরলেন-হ্যালো!

    ওপাশ থেকে ভেসে এলো মি. হেমন্ত সেনের কম্পিত কণ্ঠস্বর-আপনি কি ইন্সপেক্টর মি. হারুন কথা বলছেন?

    না, তিনি বাইরে গেছেন, আমি শঙ্কর রাও কথা বলছি।

    হেমন্তর গলা-আমাদের ল্যাবরেটরীতে দস্যু বনহুর হানা দিয়েছে।

    শঙ্কর রাও আশ্চর্য কণ্ঠে বলে উঠেন-দস্যু বনহুর আপনাদের ল্যাবরেটরীতে…. দাঁড়ান আমি এক্ষুণি মি. হারুনকে ফোন করছি।

    একটু শীঘ্ন করুন…

    পুলিশ সুপার মি. আহম্মদ এবং মি. হারুন ও মি. হোসেন চৌধুরী বাড়ি যাবার জন্য কেবলমাত্র দরজার দিকে পা বাড়িয়েছেন অমনি ফোনটা পিছনে বেজে উঠে-ক্রিং….ক্রিং….ক্রিং….

    মি. আহম্মদ থমকে দাঁড়িয়ে রিসিভারটা হাতে উঠিয়ে নেন। রিসিভারে কান লাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠেন-কি বললে, দস্যু বনহুর! ডাক্তার সেনের বাড়িতে দস্যু বনহুর….. আচ্ছা আমরা এক্ষুণি আসছি। রিসিভার রেখে বলে উঠেন-ইন্সপেক্টর, দেখেছেন দস্য বনহুরের সাহস! সে প্রকাশ্যে দিনের আলোতে ডক্টর সেনের ল্যাবরেটরীতে হানা দিয়েছে।

    মি. হারুন বললেন-হানা সে দেয়নি। আমি পূর্বেই বলেছিলাম দস্যু বনহুর সাংঘাতিকভাবে ঘায়েল হয়েছে। এবার দেখুন সে চিকিৎসার জন্য লোকালয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

    মি. আহম্মদ হুঙ্কার ছাড়েন-আর এক মুহূর্ত বিলম্ব নয়। চৌধুরীর ওখানে আর গিয়ে কাজ নেই। ইন্সপেক্টর, আপনি কিছু সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ-ফোর্স নিয়ে এক্ষুণি ডক্টর সেনের ল্যাবরেটরীতে গিয়ে হাজির হন। আমি মি. হোসেনকে নিয়ে অন্য পথে চললুম। মি. আহম্মদ আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে গাড়ি নিয়ে ছুটলেন।

    অর্ধঘণ্টার মধ্যেই সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স নিয়ে মি. হারুন উপস্থিত হলেন। অন্য পথে এসে হাজির হলেন পুলিশ সুপার স্বয়ং এবং মি. হোসেন। মুহূর্তে ডাক্তার সেনের বাড়ি এবং ল্যাবরেটরী পুলিশ বাহিনী ঘেরাও করে ফেলল।

    পুলিশ সুপার এবং মি. হারুন গুলীভরা রিভলভার হস্তে ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় ল্যাবরেটরীতে প্রবেশ করলেন। মি. আহম্মদ বললেন-কোথায় দস্যু বনহুর?

    ডাক্তার সেন তো অবাক! তিনি হতভম্বের মত উঠে দাঁড়ালেন। সমস্ত বাড়ি এবং ল্যাবরেটরীর চারিদিকে পুলিশ বাহিনী দেখে থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

    মি. হারুন গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলেন-দস্যু বনহুর কই?

    ডাক্তার সেন উভয়ের উদ্যত রিভলবারের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলেন–কে বললো এখানে দস্যু বনহুর আছে?

    শঙ্কর রাও-ও এসেছিলেন মি. হারুনের সঙ্গে, তিনি বলেন–আপনার পুত্র মি. হেমন্ত সেন পুলিশ অফিসে ফোন করেছিলেন।

    কিন্তু….কিন্তু এখানে তো দস্যু বনহুর আসেনি ইন্সপেক্টর।

    মি. আহম্মদ বজ্রকঠিন স্বরে বলেন–সেকি!

    স্যার, আপনারা বসুন, আমি সব বলছি।

    আমরা বসতে আসিনি ডাক্তার সেন, বলুন কোথায় দস্যু বনহুর? রাগত কণ্ঠে কথাটা বলেন মি. আহম্মদ।

    অবশ্য তার রাগ হবার কারণও আছে। তাঁর মত উচ্চপদস্থ অফিসার কোনদিন কোন দস্যুর পিছনে ধাওয়া করেছেন কিনা সন্দেহ। শুধু দস্যু বনহুর তাকে এভাবে ঘাবড়ে তুলেছে। ঐ শয়তানটাকে ধরার জন্য আজ তিনি নিজে নেমে পড়েছেন।

    মি. আহম্মদের চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। ডাক্তার সেন ভড়কে গেলেন, কণ্ঠে মিনতি মেখে বলেন–বসুন, আমি সব খুলে বলছি।

    মি. হারুন, মি. আহম্মদকে লক্ষ্য করে বলেন–স্যার, ব্যাপারটা রহস্যজনক মনে হচ্ছে।

    মি. আহম্মদ আসন গ্রহণ করলেন। ডাক্তার সেনও আর একটি চেয়ারে বসে রুমালে মুখ মুছতে লাগলেন।

    মি. হারুন, মি. হোসেন এবং অন্যান্য সকলে দাঁড়িয়ে রইলেন।

    ডাক্তার সেন রাতের ঘটনা বিস্তারিত সব বলে গেলেন এবং দস্যু বনহুরের দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা এবং সেই ছোট্ট কাগজের টুকরাখানা বের করে দেখালেন।

    সব শুনে এবং দেখে বিস্ময়ে থ’ বনে গেলেন সবাই। মি. আহম্মদ বলেন–ডক্টর সেন, আপনি কোন ক্রমেই সেই পথ চিনে নিতে পারেন নি?

    না, একে অন্ধকার রাত, তদুপরি আমার চোখ কালো কাপড়ে মজবুত করে বাঁধা ছিল। সে বাড়ি যে শহরের কোন প্রান্তে বা কোন স্থানে, আমি কিছুই বলতে পারবো না। গাড়ি থেকে নামিয়ে ওরা আমাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সে এক অদ্ভুত বাড়ি। বিরাট রাজপ্রাসাদের মত বাড়িটা। অমন সুন্দর বাড়ি আমি কোনদিন দেখিনি।

    মি. আহম্মদ বলেন–ডক্টর সেন, দস্যু বনহুরের চিঠিতে জানতে পেরেছি, সে আপনার গাড়ি ফেরত দিতে আসবে।

    শঙ্কর রাও বলে উঠেন-স্যার, সে তো নিজে আসবে না।

    হ্যাঁ, সে নিজে আসবে না; আর আসবেই বা কেমন করে; সে তো আহত। নিশ্চয়ই তার কোন অনুচর আসবে।

    শঙ্কর রাও পুনরায় বললেন-কৌশলে সেই অনুচরটিকে যদি বন্দী করা যায় তাহলে ওর মুখেই দস্যু বনহুরের আস্তানার খবর বের করে নেওয়া যাবে।

    এমন সময় বাইরে মোটরের হর্ণ শোনা যায়।

    অল্পক্ষণেই কক্ষে প্রবেশ করেন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর মি. মাকসুদ। লম্বা সেলুট ঠুকে বললেন-স্যার, আপনি আমাকে ডেকেছেন?

    মি. হারুন বললেন-না তো, আপনাকে ডাকা হয়নি!

    তবে যে ডাক্তার সেনের ড্রাইভার তার গাড়ি নিয়ে আমাকে আনতে গিয়েছিল?

    ডাক্তার সেন বিস্ময়ভরা চোখে নিজের পাশে তাকিয়ে বলেন–এই তো আমার ড্রাইভার রজত।

    মি. আহম্মদ উঠে দাঁড়ান-দেখুন ইন্সপেক্টর, শীঘ্র গাড়ির ড্রাইভারকে গ্রেপ্তার করে ফেলুন। নিশ্চয়ই ড্রাইভারের ছদ্মবেশে দস্যু বনহুরের অনুচর।

    সবাই ছুটলেন গাড়ির পাশে।

    কিন্তু গাড়ির নিকটে পৌঁছে সবাই হতবাক, গাড়িতে কোন ড্রাইভার বা কোন লোক নেই।

    কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ বাইরে তখনও গুলীভরা রাইফেল হস্তে দণ্ডায়মান ছিল। মি. হারুন তাদের জিজ্ঞাসা করলেন-এ গাড়ির ড্রাইভার কোথায় গেল দেখেছো তোমরা?

    ওদের একজন বললো–হ্যাঁ হুজুর আভি থা, লেকেন ওধার গেয়া…পেসাব-ওসাব করনে কে লিয়ে….

    কিন্তু কোথায় কে-সব জায়গা তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো-কোথায় দস্যু বনহুরের অনুচর!

    ডাক্তার সেন সকলের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন।

    মি. হারুন জিজ্ঞাসা করলেন-এটাই আপনার গাড়ি?

    ডাক্তার সেন স্থির স্বাভাবিক গলায় বললেন– হ্যাঁ, এটাই আমার গাড়ি।

    সকলের মুখেই হতাশার ছায়া ফুটে উঠে।

    দস্যু বনহুরের নিকটে এ একটি দারুণ পরাজয়।

    মি. আহম্মদ নিজের গাড়িতে উঠে বসলেন।

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন তাঁদের নিজ নিজ গাড়িতে ফিরে চললেন। সকলের মুখই গম্ভীর থমথমে, আষাঢ়ে মেঘের মতই অন্ধকার।

    এতোক্ষণে ডাক্তার সেনের মুখে হাসি ফুটলো। এক রাতেই পাঁচ হাজার টাকা আর গাড়িখানাও ফেরত পেলেন-এ কম কথা নয়!

  • তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    অবসন্ন দেহে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো নূরী, খেয়াল নেই। চোখ মেলে তাকিয়ে আশ্চর্য হলো-বনহুরের বিছানা শূন্য; বিছানায় বনহুর নেই। নূরী চিন্তিত হলো, অসুস্থ অবস্থায় কোথায় গেল সে।

    নূরী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। মন্থর গতিতে বেরিয়ে এলো বাইরে। মুক্ত আকাশের তলায় এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ দেখতে পেলো বনহুর একটি পাথরখণ্ডে বসে রহমানের সঙ্গে কি সব আলোচনা করছে।

    নূরী তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। রহমানের সঙ্গে বনহুরের কথাবার্তা শেষ হয়ে গিয়েছিল, ফিরে তাকালো বনহুর নূরীর মুখের দিকে।

    নূরী ব্যথা-কাতর মুখে বললো–হুর, একটি দিনও কি তোমার বিছানায় শুয়ে থাকতে নেই?

    চলো। বনহুর উঠে দাঁড়ায়।

    নূরী বনহুরের হাত ধরে বললো–চলো।

    তারপর ওকে সঙ্গে করে ফিরে এলো বনহুরের বিশ্রামাগারে। ওকে যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বললো নূরী-এবার বলো তো, ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও কেন তুমি শয্যা ত্যাগ করেছিলে?

    বনহুর নূরীর কথায় মৃদু হাসলো, তারপর বললো–নূরী তুমি বুঝবে না; আমার শুয়ে থাকলে চলবে কেন। তুমি তো ডাক্তার এনেই ক্ষান্ত-তারপর ওদিকের অবস্থা একবার ভেবে দেখেছ? ডাক্তার তো বাসায় ফিরে একেবারে মহা হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিলেন। পুলিশে পুলিশে তাঁর গোটা বাড়ি ছেয়ে গেছে। পুলিশ মনে করেছে-দস্যু বনহুর বুঝি তার বাড়ি গিয়ে বসে আছে।

    এতো খবর কি করে পেলে বনহুর?

    রহমান ডাক্তারকে রাখতে গিয়ে সেই ভোর থেকে ওখানেই ছিল। এতোক্ষণে ডাক্তারের গাড়ি ফেরত দিয়ে তবে এলো।

    বাপরে বাপ। রহমান তোমারই তো সহকারী।

    তারপর গোটা দুটো দিন কেটে গেল। নূরী বনহুরকে কিছুতেই বিছানা থেকে উঠতে দিল না। সদা-সর্বদা বনহুরের পাশে বসে ওর সেবাযত্ন করত নূরী। নিজ হস্তে বনহুরের ক্ষত পরিষ্কার করে দিত। নিজ হস্তে দুধের বাটি তুলে ধরত ওর মুখে। ঔষধ খাওয়াত, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াত।

    একদিন হঠাৎ বনহুরের ঘুম ভেংগে গেল, তাকিয়ে দেখতে পেল–তার শিয়রে বসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে নূরী। নূরীর একখানা হাত তখনও বনহুরের মাথায় রয়েছে। নূরী বনহুরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিক নেই।

    বনহুর ওর হাতখানা ধীরে ধীরে সরিয়ে রেখে উঠে বসলো। নূরীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কাছে একটু খানি হাসির রেখা ফুটে উঠে। করুণায় ভরে উঠলো বনহুরের মন। নূরীর গায়ে হাত রেখে ডাকলো–নূরী।

    চমকে সোজা হয়ে বসলো নূরী–ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।

    নূরী!

    বল?

    এভাবে তুমি নিজকে কষ্ট দিচ্ছো কেন?

    মৃদু হাসি নূরীর–কে বললো আমার কষ্ট হচ্ছে? হুর, তোমার সেবা করাই যে আমার জীবনের ব্রত!

    বনহুর প্রদীপের ক্ষীণালোকে নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই নূরী তাকে কত ভালবাসে, কিন্তু তার এ ভালবাসার প্রতিদানে কি দিয়েছে সে নূরীকে! বনহুরের চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে উঠে। দৃষ্টি নত করে নেয় বনহুর।

    নূরী স্বাভাবিক গলায় বলে–হুর, কি হলো তোমার?

    কিছু না নূরী।

    একটা কিছু হয়েছে যা তুমি আমার কাছে গোপন করে যাচ্ছো?

    বনহুর নিশ্চুপ।

    নূরী বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে–হুর, আজও আমি তোমাকে চিনতে পারলুম না। কোথায় যেন কি হয়েছে তোমার!

    একটি কথা তোমাকে বলবো যা তোমাকে ভীষণ আঘাত দেবে।

    তোমার জন্য আমি সব আঘাত হাসিমুখে গ্রহণ করবো। তুমি বল?

    আজ নয়, আর একদিন শুনো।

    না, আজই তোমাকে বলতে হবে হুর–বল, বল তুমি?

    নূরী, তুমি যা চাও, জীবনে হয়তো আমার কাছে তা পাবে না।

    হুর!

    হ্যাঁ নূরী, তোমার এ পবিত্র ভালবাসার বিনিময়ে আমি তোমায় কিছু দিতে পারিনি।

    প্রতিদান তো আমি চাই না হুর, তোমাকে পেয়েছি এই আমার যথেষ্ট।

    বনহুর নূরীর দীপ্ত উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। আর কিছু বলার মত খুঁজে পায় না বা সাহস হয় না তার। নূরীর অপরিসীম ভালবাসাকে বনহুর প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। তবু নূরীর মনে নেই এতোটুকু বিরক্তির আভাস বা সন্দেহের ছোঁয়াচ। বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল।

    সেই রাত্রি ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে যখন জানতে পারলো মনিরা পুলিশ সুপার আহম্মদ এবং ইন্সপেক্টর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নিয়ে আজ রাতে দস্যু বনহুরকে আক্রমণ করেছিল এবং সে আহত অবস্থায় পালিয়ে গেছে। আরও শুনলো মনিরা, তাদের বাগানের পাশে দস্যু বনহুরের রক্ত তখনও জমাট বেধে রয়েছে।

    মনিরার অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। তার মাথায় কে যেন বজ্রাঘাত করল।

    চৌধুরী সাহেব যদিও অতি কষ্টে নিজকে সংযত করে রাখলেন, তবু তাঁর মনেও দারুণ ব্যথা অনুভব করলেন। মরিয়ম বেগম তো গোপনে অশ্রুবিসর্জন করে চললেন। নামাজের কক্ষে প্রবেশ করে কোরআন শরীফ খুলে বসলেন। চোর ডাকু দস্যু যাই হোক, তবু সে তাদের সন্তান। মায়ের প্রাণ আকুল হয়ে উঠল। খোদার দরগায় মোনাজাত করতে লাগলেন হে খোদা, আমার মনিরকে তুমি মঙ্গলমত রেখ!

    মনিরা চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে চলল। না জানি ওর কোথায় গুলী লেগেছে? না জানি কেমন আছে। সে বেঁচে আছে কিনা, তাই বা কে জানে! অস্থির হৃদয় নিয়ে ছটফট করতে লাগলো। সে। বনহুরের এ দুর্ঘটনার জন্য সে–ই যেন দায়ী। কেন সে ওকে আসতে অনুরোধ জানিয়েছিল। তার সঙ্গে দেখা করবে বলেই তো আসছিল বনহুর। বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদে মনিরা। সে কান্নার যেন শেষ নেই। নিরুপায় মনিরা বনহুরের কোন সন্ধান জানে না–কোথায় থাকে সে। শহরের পূর্বের বাড়িখানা এখন আর বনহুরের নেই। পুলিশ সে বাড়িখানা দখল করে নিয়েছিল, এখন অবশ্য তার মামু চৌধুরী সাহেবের হেফাজতেই রয়েছে। তবে শহরের অন্য কোথাও যে বনহুরের কোন গোপন বাড়ি আছে, জানে মনিরা। কিন্তু কোথায় তা জানে না সে। বনহুরের এখনও দুটো নতুন মোটর গাড়ি রয়েছে। সে গাড়িগুলো শহরের সেই গোপন বাড়িখানাতেই থাকে। মনিরা অনেকদিন এ বাড়িখানার ঠিকানা চেয়েও জানতে পারেনি বনহুরের কাছে। নইলে সে এতোক্ষণ সেই বাড়িখানাতে গিয়ে হাজির হত।

    একদিন দু’দিন করে যখন প্রায় সপ্তাহ কেটে গেল, তখন মনিরার অবস্থা মর্মান্তিক হয়ে পড়লো। নাওয়া খাওয়া নেই। পাগলিনীর মত হয়ে পড়লো মনিরা। চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম চিন্তিত হলেন। যদিও তাঁদের মনেও দারুণ অশান্তি ছিলো, তবু মনিরার জন্য আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

    মনিরা দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়লো। ওর মনে সদা ভয়–আর সে বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই আসতো কিংবা কোনো সংকেত জানিয়ে দিত–আমি ভাল আছি।

    ক্রমে হতাশ হয়ে পড়লো মনিরা। সেই দিনের ফুলের মালাটা ছবির গলায় শুকিয়ে গেছে। ছবির দিকে তাকিয়ে মনিরার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।

    মনিরা ভাবে–শিশুকালে তার জীবন থেকে যে হারিয়ে গিয়েছিল, আবার কেনই বা সে ফিরে এসেছিল তাকে কি শুধু কাঁদাবার জন্যই এসেছিল ও!

    এ কথা মিথ্যে নয়, যে নারী বনহুরকে ভালবেসেছে তাকেই কাঁদতে হয়েছে। কেউ ওকে ধরে রাখতে পারেনি কোন দিন। বনহুরকে কেউ মায়ার বন্ধনে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়নি। শুধু মনিরাই নয়, দস্যু বনহুরকে ভালবেসে অনেককেই কাঁদতে হয়েছে। কিন্তু বনহুরের মনে আজও কেউ রেখাপাত করতে পারেনি একমাত্র মনিরা ছাড়া।

    তবু মনিরাকেও মাঝে মাঝে বিস্মৃত হয়ে যায় বনহুর। ভুলে যায় সে গোটা দুনিয়াকে, নিজের মধ্যে যখন চাড়া দিয়ে উঠে তার উন্মত্ত দস্যুভাব।

    মনিরা যতই বনহুরের কথা চিন্তা করে চলে ততই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর দেখা দেয় ওর শরীরে।

    মরিয়ম বেগম স্বামীকে ডাক্তার ডাকতে বলেন। চৌধুরী সাহেব তাঁর বাল্যবন্ধু ডাক্তার সেনকে কল করলেন।

    ডাক্তার সেন এলেন এবং মনিরাকে পরীক্ষা করে বললেন, অসুখ এর শরীরে নয়, মনে। কাজেই এর জ্বরটা স্বাভাবিক নয়। তবু আমি ঔষধপত্র দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি প্রেসক্রিপশন করে উঠতে যান ডাক্তার সেন।

    চৌধুরী সাহেব ডাক্তার সেনের তাড়াহুড়ো দেখে বলেন, এতো ব্যস্ত হচ্ছো কেন জয়ন্ত? অনেকদিন পর এসেছ, তবু স্বেচ্ছায় নয়, ডেকে এনেছি; অথচ চা না খেয়ে যেতে চাও?

    না ভাই, আজ আমি বিলম্ব করতে পারছিনে, দেখছো তো সন্ধ্যা হয়ে এলো। আর একদিন সকাল সকাল আসবো।

    হেসে বললেন চৌধুরী সাহেব, রাতকে এতো ভয় কেন ডাক্তার?

    ডাক্তার সেন ভয়াতুর কণ্ঠে বলে উঠলেন–রাতকে আমি খুব ভয় করি।

    তার মানে?

    সেদিন যা এক বিভ্রাটে পড়েছিলুম।

    কি হয়েছিল?

    সাংঘাতিক এক কাণ্ড! শোন তবে বলছি–কিছুদিন আগে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেছে। রাতে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়েছি, হঠাৎ তিনটে কিংবা সাড়ে তিনটে হবে একটি যুবক গাড়ি নিয়ে হাজির। সাংঘাতিক এক্সিডেন্ট; এক্ষুণি যেতে হবে। জানোই তো, আমি রাতে কোথাও যাইনে। তবু যুবক নাছোড় বান্দা। বাধ্য হয়েই গেলুম। তারপর কি জানো, সে এক বিস্ময়কর ঘটনা।

    চৌধুরী সাহেব বললেন–তোমার কাহিনীটা দেখছি বেশ রস পদ ধরনের। যাক চা খেতে খেতেই শোনা যাবে। চলো হল ঘরে যাই। তারপর বৃদ্ধ চাকর নকিবকে ডাকতে শুরু করেন তিনি–নকিব, নকিব…..

    একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে নকিব এসে দাঁড়ালো।

    চৌধুরী সাহেব ওর দিকে তাকিয়ে প্রথম আশ্চর্য কণ্ঠে বললেন–সেকি, এই গরমের দিনে কম্বল কেন গায়ে দিয়েছিস?

    কাঁপা গলায় বললো নকিব–জ্বর হয়েছে।

    তবে তুই এলি কেন?

    আপনি যে ডাকলেন!

    শোন, বাবুর্চিকে বল হলঘরে দুকাপ চা আর নাস্তা পাঠিয়ে দিতে। আর শোন এই ঔষধটা দেখছিস-এটা এক্ষুণি মনিরাকে এক দাগ খাইয়ে দে।

    আচ্ছা।

    চৌধুরী সাহেব আর ডাক্তার সেন মনিরার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

    বৃদ্ধ নকিব এবার টেবিল থেকে ঔষধের শিশি আর ছোট্ট গেলাসটা হাতে তুলে নিয়ে মনিরার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

    মনিরা খেঁকিয়ে উঠে–ভাগ হতভাগা, ঔষধ আমি খাব না।

    নকিব দাঁড়ি নেড়ে বললো–খেতেই হবে তোমাকে।

    আবার কথা বলছিস…

    নকিব তবু গেলাসে ঔষধ ঢাললো।

    মনিরা ওর হাত থেকে ঔষধ নিয়ে ঢেলে ফেললো পাশের ফুলদানিতে; তারপর বললো– আমি বলছি আমার কোন অসুখ হয়নি, তবু ঔষধ খেতে হবে।

    নকিব এক নজরে তাকিয়ে ছিল মনিরার মুখের দিকে।

    মনিরা বলে উঠে–অমন হা করে আমার মুখে কি দেখছিস শুনি?

    তোমায় দেখছি আপামনি…

    বের হয়ে যা বলছি …

    যাচ্ছি যাচ্ছি আপামনি, কিন্তু …

    আর কিন্তু নয়, শীগগির বের হয়ে যা।

    নকিব বেরিয়ে যায়, যাবার আগে আর একবার মনিরার দিকে ফিরে তাকায়।

    নকিব বেরিয়ে যেতেই, মনিরা শয্যা ত্যাগ করে চুপি চুপি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে, তারপর সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়াল দরজার আড়ালে।

    ডাক্তার সেন বলছেন–গাড়িখানা আমাকে নিয়ে শহরের এক গলিপথে গিয়ে পড়লো। ঠিক সেই মুহূর্তে পিঠে একটা ঠান্ডা কিছু অনুভব করলুম; ফিরে দেখি, যুবকটা আমার পিঠে রিভলবার চেপে ধরেছে।

    চৌধুরী সাহেব ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রতিধ্বনি করে উঠেন বল কি?

    এমন সময় নকিব চায়ের ট্রে হস্তে মনিরার পিছনে এসে দাঁড়ায়-দরজা ছাড়ুন আপামনি, চা নাস্তা নিয়ে যাব।

    চমকে সরে দাঁড়ায় মনিরা, ঠোঁটের উপর আংগুল চাপা দিয়ে বলে–চুপ! খবরদার, আমার কথা বলবিনে।

    না গো না, বলবো না। কিন্তু এখানে লুকিয়ে কি শুনছো?

    সে তুই বুঝবিনে, তুই যা।

    নকিব একবার আড়নয়নে মনিরার দিকে তাকিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে।

    ডাক্তার সেন বলে চলেছেন–আমি বিবর্ণ হয়ে গেলাম। তখন আমার মনের অবস্থা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। ধীরে ধীরে হাত তুলে বসলাম। যুবক এবার আমার চোখে একটা কালো রুমাল দিয়ে পট্টি বেঁধে দিল। আরও কিছুক্ষণ গাড়ি চলার পর আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেওয়া হল। আমি ভয়ানক ঘাবড়ে গেছি দেখে যুবক আমাকে অভয় দিচ্ছিলো, ভয় নেই, আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না।

    রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করলেন চৌধুরী সাহেব–তারপর?

    তারপর আমাকে একটি ঘোড়ায় চাপিয়ে নেওয়া হলো। যখন আমার চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো তখন দেখলুম, সুন্দর সজ্জিত একটি কক্ষমধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। বাড়িটা যে কোথায়, শহরের কোন প্রান্তে, কিছুতেই বুঝতে পারলুম না। সম্মুখে তাকিয়ে আরও আশ্চর্য হলুম–আমার সামনে শয্যায় শুয়ে এক যুবক। অদ্ভুত সুন্দর তার চেহারা। আমি তাকে ইতোপূর্বে কোথাও দেখেছি বলে মনে হলো না….

    নকিব চায়ের ট্রে হাতে দাঁড়িয়েছিল এতোক্ষণ এক পাশে। চৌধুরী সাহেব বলে উঠলেন– হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন। চা নাস্তা এনেছিস?

    হ্যাঁ! রাখব?

    রাখবি নাতো কি দাঁড়িয়ে থাকবি?

    নকিব চায়ের কাপ আর নাস্তার প্লেট টেবিলে সাজিয়ে রাখছিল। চৌধুরী সাহেব বলে উঠলেন–কম্বলটা খুলবিনে আজ?

    নকিব বলে উঠলো–বড্ড শীত করছে।

    তবে ডাক্তারকে হাতটা দেখানা। ঔষধ পাঠিয়ে দেবে।

    না, না ওসব জ্বর-ঔষধ লাগবে না সাহেব। একটু তেঁতুল গোলা পানি খেলেই সেরে যাবে।

    যা তবে এখান থেকে।

    বেরিয়ে যায় নকিব।

    চৌধুরী সাহেব নিজে একটি কাপ হাত উঠিয়ে নিয়ে বললেন– নাও আরম্ভ কর। খেতে খেতেই গল্প শোনা যাবে।

    ডাক্তার সেনও চায়ের কাপ তুলে নেন।

    চৌধুরী সাহেব বলে উঠলেন–সেকি, ওগুলো খাবে না?

    ভাই, বিকেলে পেট পুরে নাস্তা করেছি। চা টুকু খাব।

    আচ্ছা, তাই খাও।

    ডাক্তার সেন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন—

    হ্যাঁ, কি বলছিলুম যেন?

    চৌধুরী সাহেব বললেন–ইতোপূর্বে তাকে কোথাও দেখনি বলে তোমার মনে হলো….

    হ্যাঁ, তাকে কোথাও দেখিনি। যে তরুণ আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল সে বললো– এই যে রোগী-আপনি দেখুন। আমি দেখলুম, যুবকের বাম হস্তে আঘাত লেগেছে এবং আঘাতটা স্বাভাবিক নয়–গুলীর আঘাত।

    চৌধুরী সাহেব ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছেন; তিনি ডাক্তার সেনের কথায় বেশ বুঝতে পারলেন, যার কথা ডাক্তার সেন বলে চলেছেন, সে–ই তার পুত্র মনির এবং পুলিশের গুলীতে সে ই আহত হয়েছে। তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন–তারপর কেমন দেখলে তাকে?

    দেখলুম প্রচুর রক্তপাত হয়েছে তার শরীর থেকে …

    মনিরা নিজের অজ্ঞাতে কখন যে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেছে সে নিজেই জানে না, ব্যাকুল কণ্ঠে। জিজ্ঞাসা করে থামলেন কেন ডাক্তার সাহেব বলুন–বলুন…

    চৌধুরী সাহেব বিস্ময়ভরা চোখে তাকান ভগিনীর মুখে– তুমি আবার এখানে এলে কেন মা?

    ডাক্তার সেনও চশমার ফাঁকে অবাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন, মেয়েটি অসুস্থ শরীর নিয়ে কখন আবার এলো। তবু তিনি বলে চললেন.. আঘাতটা তার সাংঘাতিক হয়েছিল। কেউ তাকে গুলীবিদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল….

    মনিরা ব্যাকুল আগ্রহে বলে উঠে– তারপর ডাক্তার সাহেব? তারপর? সে ভালো আছে তো?

    ডাক্তার সেন বলতে বলতে থেমে পড়লেন। তিনি বিস্ময়ভরা গলায় বলেন চৌধুরী। সাহেব, আপনার ভগিনীকে বড় উত্তেজিত মনে হচ্ছে, ব্যাপার কি?

    পরে তোমাকে সব বলবো। তুমি বলে যাও জয়ন্ত তাকে কেমন দেখলে?

    ডাক্তার সেন চৌধুরী সাহেবের কন্ঠের উদ্বিগ্নতায় মনে মনে আশ্চর্য হলেন। তবুও তিনি বলতে শুরু করলেন–রোগী পরীক্ষা করে দেখলুম তার জন্য প্রচুর রক্তের প্রয়োজন। যে তরুণ আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল সেই রক্ত দিল। প্রচুর রক্ত সে দিল–আশ্চর্য, তরুণটি এতোটুকু ঘাবড়ালো না। তারপর আমি সুন্দর করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলুম।

    চৌধুরী সাহেব বলে উঠলেন–সে তো আরোগ্য লাভ করবে?

    এবার ডাক্তার সেনের মুখমণ্ডল কঠিন হয়ে উঠে, বলেন তিনি–চৌধুরী তুমি তার আসল পরিচয় জানো না, তাই অতো আগ্রহান্বিত হচ্ছে। আগে যদি জানতুম কে সে, তাহলে–তাহলে আমার কাছে যে মারাত্মক ইনজেকশান ছিল তারই একটি এম্পল–বাস, তাহলেই একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যেতো…

    হঠাৎ মনিরা আর্তকণ্ঠে একটা শব্দ করে উঠে–উঃ।

    ঢোক গিলে বলেন চৌধুরী সাহেব–কেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করবে ডাক্তার। সে তোমার কাছে কি অপরাধ করেছিল?

    জানো না চৌধুরী কে কে সে, যাকে অহরহ পুলিশ বাহিনী অনুসন্ধান করে চলেছে। যে দস্যুর ভয়ে আজ গোটা দেশবাসী প্রকম্পমান, যে দস্যু হাঙ্গেরিয়া কারাগার থেকে পালিয়েছে– ঐ যুবক সেই দস্যু বনহুর।

    চৌধুরী সাহেব এটা পূর্বেই অনুমান করেছিলেন। তিনি ডাক্তার সেনের কথায় এতোটুকু চমকান না। স্থির কণ্ঠে বললেন–ডাক্তার বিনা দোষে একটি সুন্দর জীবন নষ্ট করতে তোমার হাত কাঁপতো না।

    হেসে উঠেন ডাক্তার সেন–যে দস্যুকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় পুলিশের নিকটে পৌঁছাতে পারলে লাখ টাকা পুরস্কার পাওয়া যাবে, তাকে হত্যা করতে হাত কাঁপবে–কি যে বল?

    ডাক্তার, লাখ টাকা লাখ টাকা আমি তোমায় দেব, তুমি আমাকে ঐরকম একটি সন্তান এনে দিতে পার? এক লাখ দু’লাখ যা চাও তাই দেব, তবু পারবে–পারবে অমনি একটি জীবন আমাকে এনে দিতে?

    চৌধুরী তুমি দস্যু বনহুরকে চেনো না, তাই ওসব বলছো।

    ডাক্তার ওকে আমি যেমন চিনি তেমনি আর কেউ চেনে না। দস্যু বনহুর আমার সন্তান….

    চৌধুরী! ডাক্তার সেনের দু’চোখ কপালে উঠে।

    চৌধুরী সাহেব বলেন—হ্যাঁ, হ্যাঁ ডাক্তার, তোমার কাছে আমার যে সন্তানের গল্প করেছিলুম, ঐ আমার হারিয়ে যাওয়া রত্ন।

    সত্যি বলছো?

    হ্যাঁ, সত্যি বলছি।

    ডাক্তার সেন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন চৌধুরী সাহেবের মুখের দিকে।

    নকিব তখন টেবিল থেকে চায়ের কাপগুলো উঠিয়ে নিচ্ছিলো।

    ডাক্তার সেন চৌধুরী বাড়ি থেকে বিদায় গ্রহণ করে বাসায় না ফিরে সোজা চললেন পুলিশ অফিসে। দস্যু বনহুর চৌধুরী পুত্র–এতোবড় একটা কথা তিনি কিছুতেই হজম করতে পারছিলেন না! বাল্যবন্ধু হয়েও ডাক্তার সেন চললেন তাঁর ক্ষতিসাধন উদ্দেশ্যে। ভাবলেন, এই কথাটা পুলিশকে জানিয়ে কিছুটা বাহাদুরী নেবেন।

    ডাক্তার সেনকে হন্তদন্ত হয়ে পুলিশ অফিসে প্রবেশ করতে দেখে এগিয়ে আসেন মি. হারুন ব্যাপার কি ডাক্তার সেন?

    ডাক্তার সেন চাপা কণ্ঠে বলেন–একটা গোপন কথা আছে।

    কি কথা, দস্যু বনহুর আবার আপনার ল্যাবরেটরীতে এসে ছিল নাকি?

    এমন সময় ডাক্তার সেনের ড্রাইভার এসে বলে–স্যার আপনার সিগারেট কেসটা…

    ডাক্তার সেন পকেট হাতড়ে বলেন– তাইতো দাও।

    ড্রাইভার বেরিয়ে যায়। যাবার সময় তার মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠে।

    ডাক্তার সেন সিগারেট কেসটা পকেটে রেখে বলেন–দস্যু বনহুর আমার ল্যাবরেটরীতে আসেনি। কিন্তু তার চেয়েও অত্যধিক বিস্ময়কর ঘটনা।

    বলেন কি? দস্যু বনহুরের আবির্ভাবের চেয়েও বিষ্ময়কর ঘটনা?

    হ্যাঁ। চলুন কোন গোপন স্থানে গিয়ে বসি। কথাটা যাতে কেউ শুনতে না পায়।

    উঠে দাঁড়ান মি. হারুন–চলুন।

    মি. হারুন ও ডাক্তার সেন পাশের কক্ষে গিয়ে মুখোমুখি বসলেন। ডাক্তার সেন কক্ষের চারিদিকে তাকিয়ে বললেন–দেখবেন কথাটা আমি বলছি-এ কথা যেন কেউ জানতে না পারে বা প্রকাশ না পায়।

    না না, তা পাবে না, আপনি নিঃসন্দেহে বলতে পারেন।

    কারণ সে আমার বাল্যবন্ধু। হাজার হলেও আমি প্রকাশ্যে তার অন্যায় করতে পারিনে। সে তাহলে মনে ভীষণ ব্যথা পাবে।

    আপনি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন ডক্টর সেন। আপনার বিষয়ে কোন কথাই প্রকাশ পাবে না।

    সত্যি ইন্সপেক্টর আমি ভাবতেও পারিনি এটা সম্ভব। এ যে একেবারে কল্পনাতীত।

    বলুন না কি বলতে চান? এবার মি. হারুনের কন্ঠে বিরক্তির ছাপ।

    চৌধুরী সাহেবকে চেনেন তো?

    হ্যাঁ, তাঁকে না চেনে এমন জন আছে বলুন?

    চৌধুরী সাহেব আমার বাল্যবন্ধু ….

    একথা আপনি পূর্বেই বলেছেন।

    আমি তাকে অত্যন্ত ভালবাসি এবং সমীহ করি তাই..

    দেখুন যা বলতে এসেছেন তাই বলুন ডক্টর সেন। সময় আমাদের অতি অল্প কিনা!

    হ্যাঁ, সেই কথাই তো বলবো কিন্তু দেখবেন আমিই যে কথাটা বলেছি একথা যেন চৌধুরী সাহেব জানতে না পারে।

    পারবে না, পারবে না বলুন।

    দস্যু বনহুর চৌধুরী সাহেবের সন্তান। কথাটা বলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মি. হারুনের মুখের দিকে।

    কিন্তু মি. হারুনের মুখোভাবে এতোটুকু পরিবর্তন দেখা গেল না। কারণ একথা নতুন নয়। পুলিশ মহলে সবাই একথা জানেন। দস্যু বনহুর যে চৌধুরী সাহেবের একমাত্র হারিয়ে যাওয়া সন্তান মনির–একথা আজ নতুন শোনেন নি। কাজেই তিনি মৃদু হেসে বললেন–ডক্টর সেন, আপনি যে এতো কষ্ট করে এই কথা জানাতে এসেছেন এজন্য আমি দুঃখিত। কারণ একথা আমরা পূর্ব হতেই জানি।

    বিস্ময়ভরা গলায় বলে উঠেন ডাক্তার সেন–জানেন! দস্যু বনহুর চৌধুরী পুত্র–এ কথা আপনারা জানেন?

    হ্যাঁ ডক্টর সেন শহরবাসিগণ না জানলেও পুলিশ মহল একথা জানে।

    আপনারা জেনেও চৌধুরীকে কিছু বলছেন না কেন?

    পুত্রের অপরাধে পিতা অপরাধী নয় ডাক্তার সেন। আপনার পুত্র যদি খুনী হয় তার জন্য আপনাকে আমরা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাতে পারিনে। উপরন্তু সে এখন তার বাড়ির লোক নয়। আপনি আসতে পারেন।

    ডাক্তার সেনের মুখমণ্ডল মলিন বিষণ্ণ হয়ে পড়লো। মনে মনে লজ্জিতও হলেন তিনি। ভেবেছিলেন, মস্ত একটা বাহাদুরী পাবেন কিন্তু উল্টো ফল ফললো। উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার সেন… আচ্ছা, চলি তা হলে।

    আচ্ছা আসুন। মি. হারুনও উঠে দাঁড়ালেন–গুড নাইট।

    ডাক্তার সেন চলতে চলতে বলেন–গুড নাইট।

    ডাক্তার সেন গাড়ির নিকটে পৌঁছতেই ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরে। ডাক্তার সেন পিছন আসনে উঠে বসে বলেন–আমার ল্যাবরেটরীতে চললো।

    আচ্ছা। ড্রাইভার তার আসনে উঠে বসে ষ্টার্ট দেয়।

    গাড়ি ছুটে চলেছে। ডাক্তার সেনের মনে একটা গভীর চিন্তাধারা বয়ে যাচ্ছিলো। তিনি অন্যমনস্কভাবে গাড়িতে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন।

    হঠাৎ ব্রেক কষার শব্দে সম্বিত ফিরে পান ডাক্তার সেন। একি! এ যে এক অন্ধকার গলিপথ।

    ডাক্তার সেন বলেন–ড্রাইভার এ কোথায় এসে পড়েছ?

    ততক্ষণে ড্রাইভার নেমে এসেছে গাড়ির পাশে। অন্ধকারে চক চক করছে তার হস্তে কালোমত একটা কি যেন। যদিও জিনিসটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না, তবু ডাক্তার সেন বুঝতে পারলেন সেটা কি। ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠে তার মুখমণ্ডল। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন–ড্রাইভার, তোমার মতলব?

    চাপা কণ্ঠে বলে উঠে ড্রাইভার–নেমে আসুন।

    ডাক্তার সেন চমকে উঠলেন, এ তো তাঁর ড্রাইভারের গলার আওয়াজ নয়, তবে কে–কে এ লোক তাঁর ড্রাইভারের বেশে তাঁর সঙ্গে ছলনা করছে! রাগত কণ্ঠে বললেন–কে তুমি?

    অন্ধকারে একটা হাসির শব্দ শোনা যায়–আমি কে, জানতে চান?

    হ্যাঁ, বল কে তুমি?

    যার কথা এই মাত্র পুলিশ অফিসে বলে এলেন–আপনার বন্ধু-সন্তান।

    দস্যু বনহুর?

    হ্যাঁ ডাক্তার সেন, সেদিন আপনি যে ভুল করেছেন তার জন্যই প্রস্তুত হয়ে এসেছি, যদি আমার পরিচয় সেদিন জানতেন তবে একটি ইনজেকশান– তা হলেই বাস আমাকে আপনি ঠান্ডা করে দিতেন না?

    এসব তুমি কি করে জানলে?

    আপনার পাশেই তখন ছিলুম আমি, যখন আপনি চৌধুরী সাহেবের নিকট কথাবার্তা বলছিলেন–

    বল কি? কই কোথাও তো তোমাকে দেখলুম না?

    নকিব! নকিবকে দেখেছিলেন?

    তুমি–তুমিই নকিবের বেশে…

    হ্যাঁ ডাক্তার সেন। যাক যা বলার জন্য এখানে এসেছি, বলছি শুনুন।

    ঢোক গিলে বলেন ডাক্তার সেন–বল?

    আমার হাতের ক্ষত, এখনও সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়নি, এখন কি করতে হবে দেখবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, কোনো রকম চালাকি করতে গেলে মরবেন। চলুন আপনার ল্যাবরেটরীতে।

    গাড়ি যখন ডাক্তার সেনের ল্যাবরেটরীর সম্মুখে গিয়ে পৌঁছল, তখন রাত প্রায় একটা বেজে গেছে। কারণ, রাত বাড়াবার জন্যই বনহুর রাস্তার অলিগলি ঘুরেফিরে বিলম্ব করে তবেই এসেছে।

    ল্যাবরেটরীতে প্রবেশ করে ডাক্তার সেন তাঁর ঔষধের বাক্স খুললেন। তারপর বনহুরকে একটা সোফায় বসতে বলে চারিদিকে তাকালেন, মনোভাব–হঠাৎ যদি এই সময় কেউ এসে পড়তো তাহলে বনহুরকে হাতেনাতে ধরে লাখ টাকা পুরস্কার পেতেন।

    বনহুর ডাক্তার সেনের মনোভাব বুঝতে পেরে হেসে বলে ডাক্তার সেন, আপনি ডাক্তার, আপনার কর্তব্য রোগীর চিকিৎসা করে তাকে আরোগ্য করে তোলা। আপনি তার জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন। কিন্তু কোন রকম চালাকি করতে গেলে…

    না না, আমি দেখছি। ডাক্তার সেন বনহুরের হাতখানা তুলে নিয়ে পট্টি খুলতে থাকেন। ক্ষত পরীক্ষা করে বলেন– এই তো সেরে গেছে, আর সামান্য ক’দিন–তাহলেই সম্পূর্ণ সেরে যাবে। মনোভাব গোপন করে ঔষধ লাগিয়ে পুনরায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন।

    বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে একশত টাকার দু’খানা নোট বের করে টেবিলে রাখে, তারপর রিভলবার উদ্যত করে পিছু হটে বেরিয়ে যায়।

    ডাক্তার সেন হতভম্বের মত তাকিয়ে থাকেন। দস্যু বনহুর দৃষ্টির অন্তরালে অদৃশ্য হয়ে যায়।

  • চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    সুভাষিনীকে নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় পড়লো চন্দ্রাদেবী। বাড়ির আর কেউ না জানুক চন্দ্রাদেবী জানে-সুভাষিনীর কি হয়েছে। আজ কতদিন হলো সুভাষিনী ধ্যানস্থার মত স্তব্ধ হয়ে গেছে।

    সুভাষিনীর পিতা মনসাপুরের জমিদার বাবু কন্যার জন্য ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। মা জ্যোতির্ময়ী দেবীর অবস্থাও তাই। সমস্ত মনসাপুরে জমিদার কন্যার এই অদ্ভুত অসুস্থতার কথা ছড়িয়ে পড়লো। সবাই চিন্তিত হয়ে পড়লো। ডাক্তার বৈদ্য সুভাষিনীর কিছুই করতে পারলো না।

    একদিন চন্দ্রাদেবী শাশুড়ির নিকটে গিয়ে বললো–মা, সুভার জন্য এতো চিন্তা ভাবনা করে কোন ফল হবে না। ওর অসুখ শরীরের নয়–মনের। কন্যার যদি মঙ্গল চান তবে ওর বিয়ের ব্যবস্থা করুন।

    জ্যোতির্ময়ী দেবী পুত্রবধুর কথাটা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলেন–এ কথা মিথ্যে নয়। ডাক্তার বৈদ্য সবাই বলেছেন মেয়ের কোন রোগ নেই, অথচ দিন দিন সে এমন হয়ে যাচ্ছে কেন। এবার তিনি যেন অন্ধকারে আলোর সন্ধান পেলেন। হ্যাঁ, বিয়ে দিলে হয়তো ওর মনের অবস্থা ভালো হবে। স্বামীকে কথাটা তিনি জানালেন।

    জমিদার বজ্ৰবিহারী রায় কথাটা ফেলতে পারলেন না। এতোদিন তিনি এ বিষয়ে চিন্তাই করেননি। পিতা মাতা মনে করতেন তাঁদের কন্যা এখনও বালিকা রয়েছে। অবশ্য এ ধারণার কারণ ছিল অনেক। একে একমাত্র কন্যা, তারপর সুভাষিনী ছিল খুব আদুরে এবং চঞ্চলা– পিতামাতার কাছে সে ছোট্ট বালিকার মতই আব্দার করত। যাক, এবার বজ্রবিহারী রায় সুপাত্রের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করলেন।

    জমিদার কন্যা, উপরন্তু অপরূপ রূপবতী সুভাষিনীর জন্য সুপাত্রের অভাব হলো না। মাধবগঞ্জের জমিদার বিনোদ সেনের পুত্র মধু সেনের সঙ্গে সুভাষিনীর বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেল।

    সেদিন দ্বিপ্রহরে চন্দ্রাদেবী নিজের ঘরে কোন কাজে ব্যস্ত ছিল, এমন সময় সুভাষিনী তার কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিল।

    হেসে বললো চন্দ্রাদেবী–সুভা, ওকি হচ্ছে? আমাকে এভাবে ঘরে আটকাবার মানে কি?

    সুভাষিনী গম্ভীর বিষণ্ণ কণ্ঠে বললো–বৌদি, এসব তোমরা কি করছো?

    তার মানে?

    –ন্যাকামি কর না। আমি জানি, এসব তোমারই চক্রান্ত।

    সুভা বস তোর সঙ্গে কয়েকটা কথা আছে। হাত ধরে সুভাষিনীকে পালঙ্কে বসিয়ে নিজেও বসে পড়ে চন্দ্রাদেবী তার পাশে। আচ্ছা সুভা, যাকে কোনদিন পাবিনে তার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দিবি?

    এ প্রশ্ন কি তুমি আজ নতুন করছো বৌদি? তোমাকে আমি বলেছি, আমার গোটা অন্তর জুড়ে ঐ একটি মাত্র প্রতিচ্ছবি আঁকা হয়ে রয়েছে যা কোনদিন মুছবার নয়।

    সুভা, খামখেয়ালিপনার একটা সীমা আছে। বিয়ে তোকে করতেই হবে। তখন দেখবি সব ধীরে ধীরে ভুলে যাবি। তাছাড়া তুই যা তা ঘরের মেয়ে নস্–সামান্য একজন দস্যুকে ভালবাসা তোর শোভা পায় না।

    বৌদি।

    সুভা, বিয়ে তোকে করতেই হবে। বিনোদ সেনের পুত্র মধু সেনকে আমি নিজের চোখে দেখেছি। চমৎকার চেহারা, স্বভাব চরিত্র ভালো…

    চন্দ্রাদেবীর কথাগুলো সুভাষিণীর কানে পৌঁছাচ্ছিল না। সে নিশ্চুপ বসে রইল; দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রুধারা।

    যতই বিয়ের দিন এগিয়ে আসতে লাগলো, ততই সুভাষিণী মরিয়া হয়ে উঠলো। বনহুরের মুখখানা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে লাগলো তার হৃদয়পটে। সুভাষিণী এ বিয়ে কিছুতেই করবে না–যেমন করে হোক, বিয়ে তাকে বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কি করে বন্ধ করবে সে।

    বাড়ির সবাই একমত। একমাত্র বৌদি ছিল তার ভরসা সেও এখন তার বিপক্ষে। কি করে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

    সুভাষিণী জানে যাকে নাকি ধ্যান করা যায়, একদিন না একদিন তার দর্শনলাভ ঘটে। সুভাষিণী কিছু চায় না, শুধু আর একটি দিন তার দেখা পাবে, এই আশায় বুক বেঁধে প্রতীক্ষা করছে সে। সুভাষিণী বলেছিল, আবার কবে আপনার দেখা পাব? জবাবে বলেছিল বনহুর ঈশ্বর

    করুন আবার যদি এমনি কোন বিপদে পড়েন তখন ..মুহূর্তে সুভাষিণীর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠে। বিপদই তাকে বেছে নিতে হবে। পালাবে সুভাষিণী। যেদিকে তার দুচোখ যায় পালাবে সে। তাহলে এ বিয়ে থেকে ও পরিত্রাণ পাবে। …

    সুভাষিণী বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। দুর্ভেদ্য অন্ধকার গোটা পৃথিবীটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আকাশে মেঘ জমাট বেঁধে রয়েছে–এই বুঝি আকাশটা ভেংগে বৃষ্টি নামবে।

    সুভাষিণী বেরিয়ে পড়লো। কোনদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। দ্রুত এগিয়ে চললো সে। ভোর হবার পূর্বেই পিতার জমিদারী ছেড়ে পালাতে হবে, নইলে তার রেহাই নেই।

    কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অবিরাম বৃষ্টি। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সুভাষিণীর শরীরে সঁচের মত বিধতে লাগলো। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সুভাষিণী দু’হাতে বুক চেপে ধরে ছুটতে লাগলো।

    জমিদারের আদুরে কন্যা সুভাষিণী কোনদিন এতোটুকু দুঃখ সহ্য করেনি। এই রাতদুপুরে দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে সব দুঃখ ভুলে ছুটে চলেছে সে। কতদূর এসেছে কোন দিকে চলেছে, কোথায় চলেছে, কিছুই জানে না সুভাষিণী। বার বার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে সে। আবার উঠছে, আবার ছুটছে; ভাবছে কই সে যে বলেছিল, বিপদমুহূর্তে আবার তুমি আমার দেখা পাবে। কই-কই সে, কোথায় তার দেখা পাব।

    কতদূর যে এসে পড়েছে সুভাষিণী নিজেই জানে না। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ পরিষ্কার। হয়ে এসেছে। সুভাষিণী ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে একটা গাছের তলায় বসে পড়ে। অতি পরিশ্রমে বৃষ্টি আর ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে দেহটা তার অবশ হয়ে এসেছিল, অল্পক্ষণেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সুভাষিণী।

    যখন জ্ঞান ফিরলো চোখ মেলে দেখলো সে একটি বেডে শুয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে একটি নারী ও একটি পুরুষ কি সব কথাবার্তা বলছে। তাকে চোখ মেলতে দেখে মেয়েটা বলে উঠল– ডক্টর ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে।

    এবার সুভাষিণী বুঝতে পারে–সে যেখানে এখন শুয়ে রয়েছে, সেটা একটা হসপিটাল। মেয়েটার শরীরে নার্সের ড্রেস আর ভদ্রলোকটি ডাক্তার, এ কথা সে একটু পূর্বেই নার্সের মুখের কথায় জানতে পেরেছে।

    সুভাষিণী খুশি হতে পারলো না। সে তো বাঁচতে চায়নি চেয়েছিল মরতে, কিন্তু এখানে সে এলো কি করে!

    ততক্ষণ ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করেছেন। পরীক্ষা শেষ করে বলেন– আর কোন ভয় নেই। আপনি ওকে গরম দুধ খেতে দিন।

    নার্স গেলাসে খানিকটা গরম দুধ এনে সুভাষিণীকে খেতে দিল।

    সুভাষিণী মুখ ফিরিয়ে নিলো না, আমি খাব না।

    নার্স আশ্চর্য কণ্ঠে বললো–কেন খাবেন না?

    না, আমি কিছু খাবো না।

    নার্স হেসে বলে–ও বুঝতে পেরেছি। স্বামীর উপর অভিমান হয়েছে।

    স্বামী!

    হ্যাঁ, আপনার স্বামীই তো এখানে রেখে গেছেন আপনাকে।

    সুভাষিণী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নার্সের মুখের দিকে।

    নার্স বলে–আপনি দুধটুকু খেয়ে ফেলুন, কোন চিন্তা করবেন না। আপনার স্বামী এলে যাবেন।

    এবার সুভাষিণী দুধটুকু এক নিঃশ্বাসে খেয়ে হাতের পিঠে মুখ মুছে বলে–আমি আপনার কথা বুঝতে পারছিনে।

    সব বুঝতে পারবেন। আপনার স্বামী একটা চিঠি দিয়ে গেছেন আপনাকে দেবার জন্য। আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে চিঠিটা দেব।

    সুভাষিণী ব্যাকুল কণ্ঠে বলে–আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছি। কই চিঠি দিন।

    এখন নয়, পরে পাবেন।

    না, না এখনই দিন।

    কিন্তু এখন তো দেওয়া চলবে না।

    দিন আমার অনুরোধ, আপনি দিন…

    বুঝেছি স্বামীর চিঠি কিনা….দাঁড়ান এনে দিচ্ছি।

    নার্স চলে যায়। একটু পরে একটা গভীর সবুজ রং-এর মুখ আঁটা খাম এনে সুভাষিণীর হাতে দেয়।

    দুরু দুরু বক্ষে সুভাষিণী খামখানার মুখ ছিঁড়ে চিঠিটা বের করে মেলে ধরলো চোখের সামনে। মাত্র দু’লাইনে লেখা সুভাষিনী এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললো–

    তোমাকে এভাবে দেখবো ভাবতে পারিনি। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেও।

    –দস্যু বনহুর।

    সুভাষিণীর চোখ দুটো দীপ্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বার বার পড়ছে সে চিঠির দু’ছত্র লেখা। তার ডাকে এসেছিল সে। সাড়া দিয়েছিল..

    নার্স বিস্ময় বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। হেসে বললো– আপনার স্বামীর সঙ্গে রাগারাগি হয়েছে বুঝি?

    সুভাষিণী নার্সের প্রশ্নে তাকালো তার মুখে। তারপর আনমনা হয়ে যায়।

    নার্স হেসে বলে–সত্যি আপনার স্বামী-ভাগ্য। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমন তার ব্যবহার।

    অবিবাহিত নার্সের মনে হয়তো জানার বাসনা জাগে। জিজ্ঞাসা করে–চিঠিতে কি লিখেছেন উনি?

    সুভাষিণী কাগজখানা ভাঁজ করে রেখে বলে–লিখেছেন, আসতে বিলম্ব হলে আমি যেন ঘাবড়ে না যাই।

    অমন রাজপুত্রের মত স্বামী, একদণ্ড না দেখলে ঘাবড়াবার যে কথাই…

    সুভাষিণী একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে–হুঁ।

    বনহুর এসে পৌঁছতেই নূরী তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল–হুর, তুমি না বলেছিলে রাতেই ফিরে আসবে?

    সে এক অদ্ভুত কাণ্ড নূরী! চলো বলছি।

    কি এমন কাণ্ড হল? তোমার কাছে তো দিন-রাত অদ্ভুত কাণ্ডের সীমা নেই।

    ঝর্ণার ধারে গিয়ে পাশাপাশি বসে নূরী আর বনহুর। নূরী হেসে বলে–এবার বলো তোমার অদ্ভুত কাণ্ডের কথা।

    গত রাতে আমি কোথায় গিয়েছিলুম জান?

    জানি, তুমি সেই শয়তান ডাকুর সন্ধানে জম্বুর বনে গিয়েছিলে।

    হ্যাঁ, আমি নাথুরামের আড্ডার সন্ধানে জম্বুর বনে গিয়েছিলুম, কিন্তু গত রাতে সেখানে আড্ডা বসেনি। হয়তো শহরের কোন গোপন স্থানে সমবেত হয়েছে ওরা। ফিরে আসছিলুম, পথিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হলো। পথ সঙ্কীর্ণ করার অভিপ্রায়ে জম্বুর বনের ভিতর দিয়ে তাজকে চালনা করছিলুম। বন পেরিয়ে মনসা গ্রামের পাশ কাটিয়ে আসছিলুম–তখন বৃষ্টি প্রায় ধরে এসেছে; মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে গ্রামের ভিতর দিয়ে আসা ঠিক হবে না, তাজের খুরের শব্দে গ্রামবাসীর নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটতে পারে, তাই মনসাপুরের ওপাশে নাড়ুন্দি বনের ভিতর দিয়ে এগুতে লাগলুম। কিছুদূর এগিয়েছি হঠাৎ বিদ্যুতের আলোতে দৃষ্টি গিয়ে পড়লো একটা গাছের নিচে। কি যেন পড়ে রয়েছে। এগিয়ে গেলুম গাছটার দিকে। পুনরায় বিদ্যুৎ চমকালো, আশ্চর্য হলুম-বিদ্যুতের আলোতে দেখলুম একটি নারীমূর্তি পড়ে রয়েছে ভূতলে।

    তারপর?

    তারপর যখন তার আরও নিকটে পৌঁছলুম তখন আরও আশ্চর্য হলুম।

    কেন?

    মেয়েটি আমার পরিচিত।

    তার মানে?

    মানে, মনসাপুরের জমিদার কন্যা সুভাষিণী …

    সেই যুবতী, যাকে তুমি একদিন ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলে?

    হ্যাঁ।

    তারপর কি করলে?

    দেখলুম, সুভাষিণী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছে।

    তুমি বুঝি বসে রইলে তার পাশে?

    না, তাকে তাজের পিঠে উঠিয়ে নিলুম।

    সত্যি?

    তা নয়তো কি মিথ্যে? তারপর বন থেকে বেরিয়ে এলুম। ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে। একটা ট্যাক্সি ডেকে তাকে হসপিটালে ভর্তি করে দিয়ে এসেছি।

    এই বুঝি তোমার অদ্ভুত কাণ্ড?

    কেন অদ্ভুত নয়? রাত দুপুরে বনের মধ্যে একটি যুবতী মেয়ে…

    আর রক্ষাকর্তা হিসেবে হঠাৎ তোমার আবির্ভাব …

    কি জানি নূরী, সবই যেন কেমন বিস্ময়কর ব্যাপার!

    বনহুর আর নূরী কথাবার্তা বলছিল, এমন সময় রহমান আসে সেখানে–সর্দার।

    বনহুর রহমানকে দেখে বলে–এসেছো; চলো।

    নূরী প্রশ্ন করে–আবার কোথায় চললে হুর?

    পরে জানতে পারবে। এসো রহমান।

    বনহুর আর রহমান চলে যায়।

    বনহুরের দরবার কক্ষ।

    সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট দস্যু বনহুর। তার প্রধান সহচর রহমান পাশে দাঁড়িয়ে, এবং অন্যান্য অনুচর সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে–তোমরা সবাই জান আজ আমাদের দেশ এক মহাসঙ্কটময় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। প্রতিবেশী রাজ্য আমাদের রাজ্যের উপর জঘন্য হামলা চালিয়েছে।

    জানি সর্দার।

    যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। আজ আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য জান-প্রাণ দিয়ে দেশকে রক্ষা করা। শত্রুর কবল থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে বাঁচিয়ে নেওয়া। আমরা জীবন পণ সমপর্ণ করে দেশকে রক্ষা করবো।

    হ্যাঁ সর্দার।

    আমরা সব কিছু ত্যাগ করতে পারি, মাতৃভূমি রক্ষার্থে আমরা শরীরের শেষ রক্তবিন্দুও বিসর্জন দিতে পারি। বিশেষ করে আমাদের মুসলমান ভাইরা আজ মাতৃভূমি রক্ষার্থে আমরণ প্রচেষ্টা চালিয়ে চলেছে। মাতৃভূমি রক্ষার দায়িত্ব শুধু সৈনিকদের নয়, প্রত্যেকটা নাগরিকের কর্তব্য আমাদের দেহের শেষ শক্তি দিয়ে শত্রুকে হটিয়ে দেওয়া।

    সর্দার, আমরা সবাই প্রস্তুত।

    তোমাদের বেশি করে বলতে হবে না; এই দেশের সন্তান তোমরাও। তোমাদের এখন কি কর্তব্য নিজেরাই জান। আমি এই মুহূর্তে তোমাদের ছুটি দিলুম। তোমরা সবাই ইচ্ছামত মাতৃভূমি রক্ষার্থে আত্মনিয়োগ করতে পারো।

    সর্দার!

    হ্যাঁ, যত টাকা তোমাদের প্রয়োজন হয়, রহমানের নিকট চেয়ে নিও। এখন আর দস্যুতা নয়, দেশরক্ষার জন্য এখন তোমরা সকলেই ভাই ভাই। তোমাদের কারো দ্বারা কোন নাগরিকের শান্তি ভঙ্গ হবে না–এটাই আমি চাই।

    সর্দার, আপনার আদেশ শিরোধার্য।

    বনহুর কখন উঠে দাঁড়িয়েছিল, এবার দক্ষিণ পা খানা তার আসনের উপর তুলে দাঁড়ায়– এখন আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য আছে, দায়িত্ব আছে-তোমরা যে যতটুকু পারবে, দেশের জন্য উৎসর্গ করবে। আল্লাহ আমাদের সহায়।

    সমস্ত অনুচরবৃন্দ সমস্বরে চিৎকার করে উঠে–মারহাবা!

    নূরী আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল, আরও ভালোভাবে কান পাতে।

    এবার বনহুর আসন থেকে দক্ষিণ পা নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় তারপর বলে–তোমরা যেতে পার। আল্লাহ হাফেজ।

    সমস্ত দস্যুগণ বেরিয়ে যায়।

    রহমান দাঁড়িয়ে থাকে বনহুরের পাশে। কিছু যেন বলতে চায় সে।

    বনহুর বলে–রহমান, আমরা কবে যাচ্ছি?

    সর্দার, একটা কথা?

    বল?

    সর্দার আমরা সবাই যাচ্ছি, তাই বলছিলুম আপনি …

    থামলে কেন বল?

    আপনার না গেলে হয় না?

    কেন?

    কদিন আগে আপনার শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত ঘটেছে, তাই বলছিলুম ….

    রহমান, তোমার হিত-উপদেশ শুনতে চাইনে। আমি দুর্বল নই।

    সর্দার, আপনার কয়েক দিন বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল।

    রহমান, তুমি না দস্যু বনহুরের সহচর? তোমার মুখে ও কথা শোভা পায় না। বনহুর বিশ্রাম বলে কিছু জানে না।

    লজ্জিত কণ্ঠে বলে রহমান–মাফ করুন সর্দার।

    রহমান, কালই আমি যেতে চাই।

    কয়েক দিন পরে গেলে চলে না সর্দার?

    হাসালে রহমান, যুদ্ধকালে কখনও সময়কাল বিচার চলে না। এখন প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।–রহমান?

    সর্দার!

    এ কথা নূরী যেন না জানে।

    আচ্ছা।

    বনহুর বেরিয়ে আসে দরবার কক্ষ থেকে।

    নূরী আড়ালে দাঁড়িয়ে সবই শুনেছিল, রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রহর গুণছিল সে। বনহুর যুদ্ধে যাবে, হয়তো আর ফিরে নাও আসতে পারে। কিন্তু তা হয় না। নূরীও যাবে তার সঙ্গে যদি মরতে হয় দু’জন এক সঙ্গে মরবে। কিন্তু সে যে নারী, তাকে কি সঙ্গে নেবে বনহুর? যতই এই নিয়ে ভাবছে ততই নূরীর বুকের মধ্যে একটা ক্রন্দন জমাট বেঁধে উঠছে। এ গহন বনে তার একমাত্র সাথী এবং সম্বল ঐ বনহুর। দুনিয়ায় সে ওকে ছাড়া কিছু বুঝে না। বনহুরই যে তার সর্বস্ব।

    নূরী দু’হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে নীরবে চোখের পানি ফেলছিল। এমন সময় বনহুর এসে তার পাশে বসলো। একটা কাঠি দিয়ে নূরীর মাথায় টোকা মেরে ডাকল–নূরী।

    নূরী নিশ্চুপ।

    বনহুর ওর মাথায় হাত রাখলো–নূরী।

    নূরী এবার মুখ তুলে বললো–এতোবড় নিষ্ঠুর তুমি।

    হেসে বললো বনহুর–এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

    নূরী রাগতকণ্ঠে বলে উঠে–শুধু নিষ্ঠুর নও তুমি; তুমি পাথরের চেয়েও কঠিন।

    তার চেয়েও শক্ত ….

    বনহুর, আমি সব শুনেছি।

    তাহলে তো বলার আর কিছু নেই।

    পাষণ্ড! তোমার হৃদয় বলে কোন কিছু নেই।

    হৃদয়…. হাঃ হাঃ হাঃ, দস্যুর আবার হৃদয় আছে নাকি?

    বনহুর, আমি তোমাকে কিছুতেই যুদ্ধে যেতে দেব না।

    বনহুর মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে পড়ে–তাই বল। দরবার কক্ষের কথাগুলো তুমি তাহলে সব শুনে নিয়েছ?

    নূরীর রুদ্ধ কান্না এততক্ষণে যেন পথ পায়, দু’হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠে সে।

    বনহুর অবাক হয়ে ভাবে, একি মহাসঙ্কট। তবু সান্ত্বনার কণ্ঠে বলে–নূরী তুমি কি মাতৃভূমির সন্তান নও? তুমি কি চাও না দেশের মঙ্গল?

    তুমি যেও না। এ গহন বনে তুমি ছাড়া আর যে আমার কেউ নেই…

    নূরী, যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছেন। দেশ আজ মহা সঙ্কটময় মুহূর্তে উপনীত হয়েছে। এ সময় কারও উচিত নয় নিশ্চুপ হয়ে থাকা। যার যতটুকু সামর্থ্য দিয়ে দেশকে রক্ষা করা সকলের কর্তব্য।

    তাহলে আমিও যাব তোমার সঙ্গে।

    তা হয় না নূরী। তোমরা নারী, একেবারে সমর প্রাঙ্গণে যাওয়া তোমাদের চলে না। তুমি যদি মাতৃভূমি রক্ষার্থে এগিয়ে আসতে চাও, অনেক পথ আছে। রহমান এ ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করবে।

  • পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    হঠাৎ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠায় সমস্ত দেশ এক মহা সমস্যার সম্মুখীন হল। চারিদিকে শুধু মাতৃভূমি রক্ষার আকুল আহ্বান। যুবক বৃদ্ধ, নারী পুরুষ সবাই দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে চলেছে, আমরা শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দেব, তবু মাতৃভূমির এক কণা মাটি অন্য দেশকে দেব না। রণ প্রাঙ্গণে ধ্বনিত হল হাজার হাজার সৈনিকের কলকন্ঠে লা-ইলাহা ইল্লালাহ শব্দ। তার সঙ্গে গর্জে উঠলো আগ্নেয় অস্ত্রগুলি। সীমান্তের আকাশ ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। মরতে লাগলো দু’পক্ষের শত শত লোক। আহতদের আর্তনাদ আর কামানের শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো বসুন্ধরা।

    মাতৃভূমির এ আকুল আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারলো না বনহুর। মন তার অস্থির হয়ে উঠলো। এ দেশেরই সন্তান সে। জন্মভূমির এ বিপদাপন্ন অবস্থা তাকে চঞ্চল করে তুলল।

    যুদ্ধে যাবার পূর্বে মনে পড়লো মনিরার কথা। অনেক দিন তার সঙ্গে দেখা করেনি; অবশ্য এর কারণ ছিল অনেক। একে সে আহত অবস্থায় বেশ অনেকদিন শয্যাশায়ী ছিল, তারপর নানা ঝামেলায় যাওয়া হয়ে উঠেনি। পুলিশ সুপার মি. আহম্মদ এরপর থেকে চৌধুরী বাড়ির চারিপাশে গোপনে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন–এটাও একটা কারণ। তবু যে বনহুর মনিরাকে না দেখে এসেছে, তা নয়। মাঝে আরও একদিন ফকিরের বেশে এসেছিলো সে–তখন মনিরা বেশ অসুস্থ ছিলো।

    সেদিন গভীর রাতে একটা শব্দে ঘুম ভেংগে গেল মনিরার। চোখ মেলে চাইতেই আশ্চর্য হল, মুক্ত জানালার পাশে মেঝেতে দাঁড়িয়ে বনহুর। মুহূর্তে উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠলো মরি মুখমণ্ডল। ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর বুকে–মনির! মনির তুমি এসেছো? তারপর উদগ্রীব নয়নে বনহুরের শরীরের দিকে লক্ষ্য করে বলে–কোথায়, কোথায় তুমি আঘাত পেয়েছিলে মনির?

    বনহুর জামার হাতা গুটিয়ে দেখায়–ভাগ্যিস গুলীটা আমার হাতের মাংস ভেদ করে চলে গিয়েছিল। তাই আবার তোমার পাশে আসতে পেরেছি।

    মনিরা বনহুরের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতটায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে–মনির, এ জন্য আমিই দায়ী। আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, এ আমারই সৌভাগ্য। তোমাকে ফিরে পাব, এ আমি ভাবতে পারিনি। চেয়ে দেখ.. বনহুরের ছোটবেলার ছবিখানার দিকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বলে মনিরা–সেদিন তোমার জন্য যে মালাখানা গেঁথে রেখেছিলুম, আজ সে মালা শুকিয়ে গেছে।

    বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেয়; তারপর স্থির কণ্ঠে বলে–মনিরা!

    বল?

    তোমার কাছে বিদায় নিতে এসেছি।

    বিদায়! সে আবার কি?

    মাতৃভূমির ডাক এসেছে।

    তার মানে?

    আমি যুদ্ধে যাচ্ছি।

    সেকি!

    মনিরা, আমি দস্যু ডাকু, তাই বলে কি আমি এদেশের সন্তান নই? আমার জন্ম কি এদেশের মাটিতে হয়নি? আজ আমাদের মাতৃভূমির সঙ্কটময় অবস্থা। আর আমি তাঁর একজন সন্তান হয়ে নিশ্চুপ বসে থেকে দেখব?

    মনির।

    বনহুর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে–জানি তুমি ব্যথা পাবে। কিন্তু আমি আশা করি না মনিরা, তুমি আমার চলার পথে বাধার সৃষ্টি করবে।

    মনিরা বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলে উঠে–তুমি আমার কণ্ঠরোধ করে দিলে! কেন, কেন তবে এসেছিলে আমার কাছে বিদায় নিতে? না এলেই আমি তো জানতাম না কিছু।

    মনিরা!

    না, না তুমি কেন আমার মনে নতুন করে আগুন জ্বালাতে এলে! কেন তুমি আমাকে নিশ্চিন্তে থাকতে দিলে না! ছোট বেলায় যখন আমি কিছু বুঝতাম না, ভালবাসা কি জিনিস জানতাম না, তখন তুমি আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলে। ভুলে গিয়েছিলুম তোমার কথা। আবার ধূমকেতুর মত কেন এসেছিলে তবে….

    মনিরা, তুমি শিক্ষিতা, তুমি জ্ঞানবতী নারী। আজ এ সময় ওসব কথা স্মরণ করা তোমার। পক্ষে উচিত নয়। দেশের ডাকে তোমার প্রাণ কি আকুল হয়ে উঠেনি? তুমি কি চাও না তোমার মাতৃভূমির মান ইজ্জত রক্ষা হউক? আমাদের দেশের প্রতিটি যুবকের কর্তব্য সমর প্রাঙ্গণে গিয়ে। শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করা। মাতৃভূমি রক্ষার্থে জীবন সমর্পণ করা। আজ ঘরে বসে থাকার সময় নয়। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তাই দিয়ে দেশকে রক্ষা করা আজ সকলের ধর্ম। মনিরা এ ব্যাপারে তুমিও এগিয়ে আসতে পার।

    সত্যি?

    হ্যাঁ, জানো না আজ সীমান্তে আমাদের অগণিত সৈনিক ভাইরা প্রাণপণে যুদ্ধ চালিয়ে চলেছে। তাদের এ চলার পথে এখন বহু জিনিসের প্রয়োজন। টাকা পয়সা, অলঙ্কার রক্ত– যে যা পার, তাই দিয়ে সাহায্য করতে হবে। আমাদের সৈনিক ভাইদের বাহুবল মজবুত করতে হবে।

    আমার সমস্ত অলঙ্কার আমি তোমায় দেব।

    আমাকে নয় মনিরা সমর তহবিলে দান কর।

    আমি রক্ত দেব মনির।

    বেশ দিও। ব্লাড ব্যাঙ্ক আছে, সেখানে তুমি রক্ত দিতে পার।

    মনির সত্যি তুমি যুদ্ধে যাবে?

    হ্যাঁ।

    অভিজ্ঞতা আছে তোমার?

    বনহুর মনিরার প্রশ্নে হাসলো, একটু থেমে বললো– দস্যু বনহুরের অজানা কিছুই নেই, মনিরা।

    কথার ফাঁকে বনহুর মনিরা খাটের পাশে এসে বসেছিল। বনহুর ওর চিবুক ধরে উঁচু করে তোলে–তুমি আমার জীবনের এখনও কিছু জান না, মনিরা। তোমার মনির কামান চালাতেও জানে।

    হ্যাঁ, সত্যি! মনিরা শোন, আজ তোমাকে কয়েকটি কথা বলবো যা আজও কেউ জানে না।

    মনিরা বনহুরের পাশে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বলে–বল?

    চৌধুরী সাহেবের কক্ষ থেকে ভেসে আসে দেয়ালঘড়ির সময় সংকেতধ্বনি ঢং ঢং ঢং-রাত তিনটে বাজলো।

    মুনিরা একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে।

    বনহুর বলে চলে–আমি যখন সতের বছরের যুবক তখন আমার সমস্ত অস্ত্র বিদ্যা শিক্ষা শেষ হয়ে গেছে। লেখাপড়া স্কুলে ও কলেজে শেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, তবে ছোটবেলায় বাপু আমাকে নিজেই লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। বাপুর কথা একদিন তোমাকে সব বলেছি। তিনি ছিলেন শিক্ষিত। বাংলা, ইংরেজি, ফারসি সব জানতেন বাপু। আমাকেও তিনি এসব ভাষা লিখতে পড়তে এবং বলতে শিখিয়েছিলেন। সতের বছর বয়সে যখন আমি সবদিকে শিক্ষা লাভ করলাম, তখন বাপু আমাকে প্রথম একদিন সঙ্গে করে শহরে নিয়ে গেলেন। শহরে মোটগাড়ি দেখে খুব ইচ্ছা হল মোটর চালনা শিখবো। বাপু আমার বাসনা জানতে পেরে খুশি হলেন। তিনি আমার জন্য শহরে বাড়ি তৈরি করলেন; গাড়িও কিনে দিলেন–একটি নয় দু’টি। আশা আমার পূর্ণ হলো, ড্রাইভিংও শিখলুম। তবু মনের কোথায় যেন খুঁতখুঁত করতে লাগলো, আরও যেন অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। নিজ মনেই ভাবতাম আর কি শেখার আছে। যে-কোন অস্ত্র বিদ্যাই আমার জানা আছে। অশ্বচালনা থেকে মোটর চালনা সব শিখেছি। আর তবে কি বাকি? হঠাৎ মনে পড়লো, এরোপ্লেন চালনা শিখতে পারলে আমার কোন সাধই অপূর্ণ হবে না। বাপুকে একদিন মনের কথা জানালাম।

    মনিরা অবাক হয়ে শুনছে বনহুরের কথাগুলো। দু’চোখে তার বিস্ময় উজ্জ্বল দীপ্তি। অস্ফুট কণ্ঠে বললো সে–তারপর?

    বাপু কথাটা শুনে গম্ভীর হলেন, কিছুক্ষণ ভেবে বলেন–প্লেন চালনা সকলের পক্ষেই সম্ভব নয়, বনহুর।

    আমি বললুম–কেন?

    বাপু বলেন–তুমি বুঝবে না।

    আমার তখন জেদ চেপে গেছে, কেন বুঝব না। প্লেন–সেকি মানুষ চালায় না? আমিও মানুষ, নিশ্চয়ই পারবো।

    বাপু হয়তো আমার মনের কথা জানতে পারলেন। তিনি আমাকে মত দিলেন। তারপর প্লেন চালনাও শিখলাম।

    মনিরা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠে-মনির, তুমি প্লেন চালাতে পার?

    পারি।

    সত্যি তুমি কি! কি বলে যে তোমাকে অভিনন্দন জানাব।

    মনিরা তুমি হাসিমুখে বিদায় দাও, সেটাই হবে তোমার সত্যিকারের অভিনন্দন।

    মনির, যাও তুমি জন্মভূমিকে রক্ষা করে ফিরে এসো।

    বনহুর উঠে দাঁড়াল।

    স্তব্ধ নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলো মনিরা।

    সৈনিক ফরহাদের বীরত্বে সমস্ত সামরিক বাহিনী আজ গর্বিত। তার অপরিসীম সাহসিকতায় সবাই মুগ্ধ। ফরহাদের রণকৌশলে শত্রুপক্ষের বিপুল সৈন্য আজ পরাভূত হতে বসেছে। সেনাপতি নাসের আলী তাকে বিপুল উৎসাহ দান করে চলেছেন।

    যুদ্ধ চলছে।

    শত্রুপক্ষের অসংখ্য সৈন্য বিপুল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ভীষণভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে। প্রতিহত করে চলেছে মিত্র পক্ষের সৈন্যগণ।

    ফরহাদ প্রাণপণে যুদ্ধ করছে। কখনও রাইফেল হস্তে, কখনও মেশিনগান নিয়ে, কখনও বা কামানের পাশে দাঁড়িয়ে শত্রুপক্ষকে সে পরাহত করে চলেছে। তার অব্যর্থ গুলীর আঘাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে শত্রুপক্ষের সৈন্যদল।

    সেনাপতি নাসের আলী ফরহাদের বীরত্ব এবং রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে তাকে তার সৈন্যবাহিনীর ক্যাপ্টেন করে দিলেন। দক্ষ ক্যাপ্টেনের মত সৈন্য চালনা করতে লাগলো সে।

    সেদিন অতর্কিতভাবে তাদের ঘাটির উপর শত্রুপক্ষ হামলা করল। এজন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সেনাপতি নাসের আলী। তিনি হতভম্বের মত কি করবেন ভাবছেন, কিন্তু তার পূর্বেই তিনি দেখতে পেলেন তাদের কামানগুলো এক সঙ্গে গর্জে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল আর মেশিনগানের শব্দও তার সঙ্গে কানে ভেসে এলো আর ভেসে এলো ‘আল্লাহু আকবর ধ্বনি।

    সেকি ভীষণ যুদ্ধ!

    দুদিন থেকে অবিরাম গুলীবর্ষণ হচ্ছে। সেনাপতি নাসের আলী আশ্বস্ত হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তাদের সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত ছিল। তিনি একজন হাবিলদারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন– ফরহাদ কোথায়?

    হাবিলদার ব্যস্ততার মধ্যেও সুউচ্চ কণ্ঠে জবাব দিলেন–ফরহাদ সাহেব স্বয়ং কামান চালাচ্ছেন। শত্রুপক্ষ তাঁর কামানের গোলার আঘাতে পিছু হঠতে শুরু করেছে।

    সেনাপতি নাসেরের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠলো। তিনি আদেশ দিলেন–যাও, তাকে তোমরা সবাই মিলে সাহায্য কর।

    ফরহাদ অবিরাম গুলীবর্ষণ করে চলেছে। তার গোলার আঘাতে শত্রুপক্ষ অল্পক্ষণেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। এবার তারা রণেভঙ্গ দিয়ে পালাতে বাধ্য হলো! ফরহাদ তবু ক্ষান্ত হলো না, তার সৈন্যবাহিনীকে আদেশ দিল ওদের পিছু ধাওয়া করতে। নিজেও রাইফেল হস্তে অগ্রসর হল।

    শত্রুপক্ষের মেজর জেনারেল মি. মুঙ্গেরী নিহত হল। আর নিহত হলো তাদের অসংখ্য সৈন্য। অজস্র অস্ত্রশস্ত্রও হস্তগত করলো ফরহাদ।

    শত্রুপক্ষ বার বার পরাজিত হয়েও ক্ষান্ত হলো না। তারা গোপনে সন্ধান নিয়ে জানতে পারলো, ক্যাপ্টেন ফরহাদের রণ-নৈপুণ্যে আজ তারা এভাবে পরাজিত হয়ে চলেছে। কিভাবে ক্যাপ্টেন ফরহাদকে নিহত কিংবা বন্দী করা যায়, এ নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করলেন শত্রুপক্ষের সামরিক অফিসারগণ।

    বার বার অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ফরহাদের সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত করার চেষ্টা করতে লাগলো ওরা। কিন্তু কোনক্রমে পেরে উঠলো না ফরহাদের সঙ্গে।

    ফরহাদ যেন পূর্ব হতে সব জানতো এবং বুঝতে পারত, কোন দিক দিয়ে আজ শত্রুপক্ষ তাদের ঘাটির উপর হামলা চালাবে সে ভাবে প্রস্তুত থাকত সে।

    একদিন শত্রুপক্ষ কৌশলে ফরহাদের সৈন্যবাহিনীকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলল, উদ্দেশ্য ক্যাপ্টেন ফরহাদকে বন্দী কিংবা নিহত করা। অবিরাম গোলা গুলী চালিয়ে ফরহাদের সৈন্যবাহিনীকে কাবু করার চেষ্টা করতে লাগলো তারা।

    ফরহাদের সহকারী সৈনিক জব্বার খাঁও আজ ফরহাদের পাশে থেকে তাকে সাহায্য করে চলেছে। সেকি ভীষণ লড়াই! ছোট ছোট টিলার আড়ালে লুকিয়ে গুলী চালাচ্ছে ফরহাদের সৈন্যবাহিনী।

    শত্রুপক্ষ একেবারে নিকটবর্তী হয়ে পড়েছে। আজ তারা মরিয়া হয়ে লড়ছে। ফরহাদের সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করতেই হবে। ছলে বলে–কৌশলে ফরহাদকে নিহত অথবা বন্দী করতেই হবে।

    কিন্তু ফরহাদ নিপুণতার সঙ্গে সৈন্য চালনা করে চলল। জব্বার খাঁ এবং ফরহাদের রাইফেল পুনঃ পুনঃ গর্জন করে চলেছে। তারা ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের বেষ্টনী পরিষ্কার করার চেষ্টা করতে লাগলো।

    মাথার উপরে প্রচণ্ড সূর্যের তাপ। পায়ের নিচে উত্তপ্ত বালুকা রাশি, ফরহাদের সুন্দর মুখমণ্ডল রক্তাভ হয়ে উঠেছে। পরিধেয় বস্ত্র ঘামে ভিজে চুপসে গেছে। কোনদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। শত্রুসৈন্যকে সে একের পর এক নিহত করে চলেছে। অব্যর্থ তার লক্ষ্য। কখনও হামগুড়ি দিয়ে কখনও উঁচু হয়ে এগুতে লাগলো ফরহাদ ও তার সৈন্যবাহিনী।

    বুদ্ধিমান ফরহাদ অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে শত্রুপক্ষের সৈন্য বাহিনীকে একত্রিত করে ঘিরে ফেলল। কতক পালিয়ে প্রাণ বাঁচালো কতক আত্মসমর্পণ করল ফরহাদের কাছে।

    এতোবড় একটা পরাজয়ের কালিমা মুখে মেখে শত্রুপক্ষ আরও ক্ষেপে উঠল। নতুনভাবে আক্রমণ চালাবার জন্য পুনরায় প্রস্তুত হতে লাগল তারা।

    সাফল্যের বিজয়মাল্য গলায় পরে ফরহাদ যখন ফিরে গেল ঘাটিতে তখন সেনাপতি নাসের আলী, মেজর জেনারেল হাশেম খান এবং অন্যান্য সামরিক সেনানায়ক ফরহাদের সঙ্গে বুকে বুক মিলালেন। এতোবড় একটা বিজয় তাঁরা যেন আজ আশাই করতে পারেন নি।

    আজ প্রায় এক সপ্তাহ কাল অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে এসেছে ফরহাদ। তাই দু’দিনের জন্য তাকে বিশ্রামের নির্দেশ দেওয়া হল।

    ওদিকে জব্বার খাঁ কোথায় যে ডুব মেরেছে, আর তাকে খুঁজে পাচ্ছে না ফরহাদ। তবে কি সে নিহত হয়েছে? নিজের তাবুতে শুয়ে ভাবছে এসব কথা। এমন সময় জব্বার খাঁ তার তাবুতে এসে হাজির। সেলুট ঠুকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো স্যার আমি এসেছি।

    ফরহাদ ওকে দেখেই উঠে বললো কি খবর জব্বার খাঁ? কোথায় ডুব মেরেছিলে?

    জব্বার কণ্ঠস্বর নিচু করে নিয়ে বললো–স্যার শত্রু পক্ষের আহত সৈন্যদের স্তূপের মধ্যে ডুব মেরে একেবারে ওদের শিবিরে গিয়ে পৌঁছেছিলুম।

    ফরহাদ এক লাফে উঠে দাঁড়ায় তারপর?

    তারপর গোপনে ওদের পেটের খবর জেনে এসেছি। স্যার, আমাদের আর এক মুহূর্ত বিশ্রামের সময় নেই এবার জঙ্গী বোমারু বিমান নিয়ে আক্রমণ চালাবে। আজ শেষ রাতের দিকেই আক্রমণটা চালাবে জানতে পেরেছি।

    ফরহাদের বিশ্রাম শেষ হয়ে গেল। নতুন এক উন্মাদনায় চোখ দুটো তার জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠল। কালবিলম্ব না করে নিজের সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিল ফরহাদ।

    ঘাটির আশেপাশে কামান আর মেশিনগান বসিয়ে যে যার জায়গায় প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল। প্রত্যেকেই রাইফেল হস্তে গোপন স্থানে লুকিয়ে রইল।

    ফরহাদ আজ নতুন রূপ ধারণ করেছে। চোখ দিয়ে তার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। ললাটে গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠেছে। জব্বার খাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল ফিস ফিস করে কি সব অলোচনা হলো দু’জনার মধ্যে।

    জব্বার খাঁর মুখমণ্ডল বিষণ্ণ হলো। দু’চোখ তার অশ্রু ছলছল হয়ে উঠলো।

    ফরহাদ জব্বার খাঁর পিঠ চাপড়ে কি যেন বলল। তারপর বেরিয়ে গেল। ঘাটির গোপনকক্ষে বসে ওয়্যারলেসে সেনাপতি নাসেরের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ হল তার।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই জঙ্গী বোমারু বিমানগুলোও তৈরি হয়ে নিল। একটি বোমারু বিমানের ড্রাইভ আসনে গিয়ে বসলো ফরহাদ। শরীরে তার জঙ্গী বোমারু বিমানের পাইলটের ড্রেস।

    ফরহাদের সৈন্যবাহিনী প্রতিমুহূর্তে শত্রুপক্ষের বিমান আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে লাগলো। প্রাণ দিয়ে তারা লড়াই করবে। শত্রুপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য তারা প্রতিমুহূর্তে প্রস্তুত আছে। মেজর মাসুদ আর জব্বার খাঁ আজ গোলন্দাজ সৈন্য পরিচালনা করবেন।

    গভীর অন্ধকারে গোটা বিশ্ব অন্ধকার। ঘাটির আশেপাশে পরিখার মধ্যে আত্মগোপন করে রয়েছে রাইফেলধারী সৈন্যবাহিনী। শত্রুপক্ষের আক্রমণের জন্য তৈরি হয়ে আছে তারা। কামানের পাশে, মেশিনগানের ধারে, যে যার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। মৃত্যুকে তারা যেন উপহাস করে চলেছে।

    হঠাৎ নিস্তব্ধ ধরণী প্রকম্পিত করে বেজে উঠলো বিপদ সংকেত ধ্বনি। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল বিমানের শব্দ।

    মাত্র কয়েক সেকেণ্ড। মিত্রপক্ষের জঙ্গী বিমানগুলো উল্কা বেগে আকাশপথে উড়ে উঠল। একসঙ্গে জঙ্গী বিমান গুলো ধাওয়া করলো শত্রুপক্ষের জঙ্গী বোমারু বিমানগুলোকে।

    মিত্রপক্ষের বিমানের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল শত্রুপক্ষের বোমারু বিমান। তুমুল আকাশযুদ্ধ শুরু হল। দক্ষ পাইলটের মত কাজ করে চলল ফরহাদ।

    বিমান ধ্বংসী কামান আর মেশিনগানের শব্দে আকাশ বাতাস কম্পিত হয়ে উঠল। কামানের গোলার আঘাতে শত্রুপক্ষের কয়েকটি বিমানে আগুন ধরে গেল। ঘূর্ণীয়মান অগ্নিকুণ্ডের মত আকাশের বুকে জ্বলে উঠল; পরক্ষণেই বিধ্বস্ত হয়ে ভূপাতিত হল।

    ফরহাদ প্রাণের মায়া বিসর্জন দিয়ে শত্রুপক্ষের বিমানগুলো ধ্বংস করে চলল।

    প্রায় ঘণ্টা দুই আকাশযুদ্ধ চলার পর শত্রু জঙ্গী বিমানগুলো পরাজয় বরণ করে পিছন দিকে ফিরে চলল। বেশ কয়েকখানা ধ্বংস হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই।

    মিত্রপক্ষের দু’খানা বিমানও নষ্ট হল।

    যখন জানতে পারলো জব্বার খাঁ রণভূমিতে দাঁড়িয়ে আঁতঙ্কে মন তার দুলে উঠলো। ফরহাদের বিমানখানা তো বিধ্বস্ত হয়ে যায় নি?

    কিন্তু খোদার অশেষ কৃপা। শত্রু বিমানগুলোকে পরাজিত করে সাফল্যের জয়টিকা ললাটে পরে ফিরে এলো ফরহাদ তার জঙ্গী বোমারু বিমান নিয়ে। শুধু শত্রুপক্ষকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হয় নি ফরহাদ। শত্রুপক্ষের একটি ঘাটিও তারা বিধ্বস্ত করে দিয়ে এসেছে।

    ফরহাদের প্লেনখানা ফিরে আসতেই সেনাপতি নাসের আলী, মেজর জেনারেল হাশেম খান এবং আরও অন্যান্য সেনানায়ক ফরহাদকে অভিনন্দন জানালেন। সেনাপতি নাসের আনন্দে আত্মহারা হয়ে ফরহাদের সঙ্গে বুকে বুক মিলালেন।

    প্রেসিডেন্ট ফরহাদকে খেতাব দান করলেন। সেদিন সবচেয়ে বেশি খুশি হলো জব্বার খাঁ। নিভৃতে হাতে হাত মিলালো তার সঙ্গে।

    দেশ যখন মহাসঙ্কটময় অবস্থায় উপনীত হয়েছে, যুদ্ধ নিয়ে সবাই দিশেহারা এমন সময় মুরাদ নাথুরামের সাহায্য যথেচ্ছাচারণে প্রবৃত্ত হল-কোথাও লুটতরাজ, কোথাও বা নারী হরণ কোথাও বা খুনখারাবি। পুলিশ মহল এই যুদ্ধ ব্যাপারে ব্যস্ত-ত্রস্ত হয়ে উঠেছে, তারপর রোজই এখানে সেখানে রাহাজানি, লুটতরাজ, নারী হরণের সংবাদ লেগেই আছে। পুলিশ মহলের দৃঢ় বিশ্বাস-এসব বনহুরের কাজ। পুলিশ সুপারের গুলী খেয়ে সে ক্ষেপে উঠেছে।

    চারদিকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেও কিছু হচ্ছে না। শয়তান নাথুরাম আর মুরাদ ঠিকভাবে কাজ করে চলেছে। এতে করেও মুরাদের শান্তি নেই। মনিরার উপর তার কু দৃষ্টি রয়েছে। কেমন করে তাকে পাবে এ চিন্তায় অস্থির সে

    একদিন গভীর রাতে মনিরার দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। মনিরা তখনও ঘুমোতে পারেনি। বার বার বনহুরের বিদায়ক্ষণের কথাগুলো স্মরণ হচ্ছিল। নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিল সে।

    হঠাৎ দরজায় মৃদু শব্দ। মনিরার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠল। নিশ্চয়ই সে এসেছে। বলেছিল বনহুর, সুযোগ পেলেই এসে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাব। মনিরা মুহূর্ত বিলম্ব না করে দরজা খুলে দিল। সে ভাবতেও পারেনি, তার জন্য অন্য কোন বিপদ প্রতীক্ষা করতে পারে।

    মনিরা দরজা খুলতেই কক্ষে প্রবেশ করলো ভীষণ আকার দুটি লোক। লোক দুটি মনিরাকে একটি টু শব্দ করতে না দিয়েই মুখে রুমাল চাপা দিল। শুধুমাত্র একটু মিষ্টি গন্ধ, তারপর আর কিছু মনে নেই মনিরার।

    মনিবার সংজ্ঞাহীন দেহটা একটা কালো কাপড়ে ঢেকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে নিচে নেমে এলো লোক দুটি। সদর দরজার পাশে দারওয়ান ঠেস দিয়ে আছে, তার বুকে বিদ্ধ হয়ে রয়েছে একখানা সূতীক্ষ্ণধার ছোরা। তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার সাদা ধবধবে পোশাকটা।’

    গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একখানা কালো রং-এর মোটর গাড়ি অন্ধকারে মিশে রয়েছে যেন।

    লোক দুটি মনিরাকে নিয়ে গাড়িখানায় উঠে বসল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ছুটতে শুরু করল। জনহীন রাজপথ বেয়ে ছোট্ট কালো রং এর গাড়িখানা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। আকাশে অসংখ্য তারার মালা। গোটা শহরটা যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে দু’একটি মোটর এদিক থেকে ওদিকে চলে যাচ্ছে।

    বড় রাস্তা ছেড়ে একটি নির্জন অন্ধকার গলিপথে প্রবেশ করলো গাড়িখানা। আঁকাবাঁকা পথে ঘন্টাখানেক চলার পর একটি পুরানো বাড়ির সম্মুখে গাড়িখানা থেমে পড়লো।

    লোক দু’টি এবার মনিরার জ্ঞানহীন দেহটা নামিয়ে নিয়ে সেই পুরানো বাড়িটার মধ্যে প্রবেশ করলো। কয়েকটি ভাঙা চুরো ঘর এবং বারান্দা পেরিয়ে একটি সিঁড়ি আছে; সেই সিঁড়ি বেয়ে চললো তারা। তারপর উপরে বড় বড় কয়েকখানা অর্ধ ভগ্ন ঘর। ওদিকে একটি মস্তবড় ঘরের মধ্যে নীলাভ ধরনের আলো জ্বলছে। মেঝেতে দামী কার্পেট বিছানো। মাঝখানে একটি টেবিলের পাশাপাশি কয়েকখানা চেয়ার। আর তেমন কোন আসবাবপত্র নেই সে কক্ষে। টেবিলে কয়েকটা মদের বোতল আর কাঁচের গেলাস বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো। কমধ্যে একটি চেয়ারে বসে রয়েছে। মুরাদ। মদের নেশায় চোখ দুটো ওর ঢুলু ঢুলু।

    মনিরাকে নিয়ে লোক দুটি যখন মুরাদের সম্মুখে রাখলো তখন মনিরার সংজ্ঞা ফিরে আসছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো মনিরা। সব যেন কেমন এলোমেলো ঝাপসা লাগছে। কিছুক্ষণ হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসে রইল সে।

    মুরাদ ইঙ্গিত করলো লোক দুটিকে বেরিয়ে যেতে।

    লোক দুটি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

    মুরাদ টলতে টলতে এগিয়ে এলো মনিরার পাশে। মনিরার মাথার চুলে হাত রেখে মৃদু টান দিল।

    মনিরা মুখ তুলে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে ভূত দেখার মতই চমকে উঠল। চিৎকার করে বললো–মুরাদ!

    অট্টহাসি হেসে উঠলো মুরাদ–হ্যাঁ, আমি-আমি তোমার ভাবী স্বামী….

    মনিরা তখন কম্পিত পদে উঠে দাঁড়িয়েছে। মুরাদ ওকে ধরতে যায়।

    মনিরার তখন মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চট করে সরে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যায়।

    মুরাদ তার দিকে এগুতেই পুনরায় উঠে দাঁড়ায় মনিরা।

    নিঃশ্বাস দ্রুত বইছে। দাঁতে অধর দংশন করে বলে–শয়তান, তুমি আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছ?

    হেসে উঠে মুরাদ–এখনও বুঝতে পারনি? তোমার জন্যই আমার এ সংগ্রাম। হাজার হাজার টাকা আমি পানির মত খরচ করে চলেছি…

    মনিরার চোখ দিয়ে তখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। ললাটে ফুটে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

    মুরাদ বলে চলেছে–কিন্তু তোমাকে পাইনি। দস্যু বনহুর সব সাধ, সব আশা বিনষ্ট করে দিয়েছে… হাঃ হাঃ হাঃ, আজ কোথায় তোমার সেই প্রিয়তম…

    মনিরা চোখে সর্ষে ফুল দেখে–এখন তার উপায়! এ পাপিষ্ঠের হাত থেকে কি করে সে পরিত্রাণ পাবে? নিরুপায়ের মত কক্ষের চারদিকে তাকায়। কণ্ঠনালী তার শুকিয়ে আসছে। বার বার জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট দুখানা ভিজিয়ে নেয় মনিরা।

    মুরাদ এগিয়ে আসছে, চোখে লালসাপূর্ণ লোলুপ দৃষ্টি। মুখে কুৎসিত হাসি, দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসছে সে–মনিরা তোমাকে নিয়ে আমি আকাশ কুসুম গল্প রচনা করেছিলুম। সে আকাশ কুসুম স্বপ্ন আমার ধূলোয় মিশে যেতে বসেছে। আজ আমি তোমাকে পেয়েছি…না না, আর আমি তোমাকে কিছুতেই ছাড়ছি না। দস্যু বনহুরও আজ তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না… মনিরাকে ধরতে যায় মুরাদ।

    মনিরা ক্ষিপ্তের ন্যায় একখানা চেয়ার তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারে মুরাদের শরীর লক্ষ্য করে।

    মুরাদ হাত দিয়ে অতি সহজেই চেয়ারখানা ধরে ফেলে হেসে উঠে–হাঃ হাঃ হাঃ তুমি আমাকে কাবু করবে। এসো, এসো বলছি আমার বাহুবন্ধনে…

    মনিরা একটা মদের বোতল তুলে ছুঁড়ে মারে।

    মুরাদ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়। বোতলটা ওপাশের দেয়ালে লেগে সশব্দে ভেঙে যায়।

    হঠাৎ মনিরার চোখে পড়ে-টেবিলের এক পাশে একটি ছোরা পড়ে রয়েছে। কালবিলম্ব না করে টেবিল থেকে ছোরাখানা হাতে তুলে নেয় মনিরা।

    ঠিক সেই মুহূর্তে মুরাদ জড়িয়ে ধরে মনিরাকে। মনিরা সঙ্গে সঙ্গে হস্তস্থিত ছোরাখানা বসিয়ে দেয় মুরাদের বুকে।

    একটা তীব্র আর্তনাদ করে ভূতলে পড়ে যায় মুরাদ। ভাগ্যিস ছোরাখানা মুরাদের বক্ষ ভেদ করে যায় নি। বাম পার্শ্বের কিছুটা মাংস ভেদ করে গেঁথে গিয়েছিল ছোরা খানা। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে।

    সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করে একজন লোক। মনিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটাকে। দেখামাত্র চিনতে ভুল হয় না তার সেই নৌকার মাঝি ছিল লোকটা। বনহুরের মুখে শুনেছিল লোকটা নাকি শয়তান ডাকু নাথুরাম। ভয়ে শিউরে উঠে মনিরা না জানি তার অদৃষ্টে আজ কি আছে!

    লোকটা হাতে তালি দিল। সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকজন ভীষণ আকার লোক কক্ষে প্রবেশ করল। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল মুরাদকে নিয়ে।

    মনিরা দেখলো দরজা মুক্ত যেমনি সে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে অমনি একজন ধরে ফেলল তাকে। লোকটার বলিষ্ঠ হাতের চাপে মনিরার হাতখানা যেন পিষে যাচ্ছিল। লোকটা বলল সর্দার একে কি করব?

    কর্কশ কঠিন কণ্ঠে বলে উঠে শয়তান নাথুরাম–সেই অন্ধকার ঘরটায় বন্দী করে রাখ। দেখিস যেন না পালায়।

    লোকটা মনিরাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

    পিছনে শোনা যায় মুরাদের আর্তকণ্ঠ–উঃ আঃ.

  • ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ভোরে মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে মরিয়ম বেগম আশ্চর্য হন। মনিরা এতো সকাল সকাল তো কোনদিন উঠে না।

    তাছাড়া গেলোই বা কোথায়। মরিয়ম বেগম ভাবলেন সে হয়তো বাথরুমে গেছে। তাই তখনকার মত ফিরে গেলেন মরিয়ম বেগম। স্বামীকে অজুর পানি দিয়ে নিজেও নামায পড়ে পুনরায় ফিরে এলেন মনিরার কক্ষে। কিন্তু একি এখনও মনিরা ঘরে আসেনি! মরিয়ম বেগমের মনটা কেমন যেন করে উঠলো। তিনি কক্ষের চারদিকে তাকালেন। কক্ষের জিনিসপত্র ঠিক আছে-এমনকি মনিরার বিছানাটাও এলোমেলো নয়। জানালাগুলোও খিল আটা মনিরা স্বইচ্ছায় দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছে। মরিয়ম বেগম চিন্তিতভাবে ছুটলেন চৌধুরী সাহেবের কক্ষে ওগো শুনছো ঘরে মনিরা নেই।

    চৌধুরী সাহেব নামাযান্তে তসবী তেলাওয়াত করছিলেন, আশ্চর্য কণ্ঠে বলেন সেকি কথা?

    হ্যাঁ, আমি বাড়ির সব জায়গা খুঁজে দেখলুম, কোথাও সে নেই।

    বাইরে কোথাও যায়নি তো?

    না, এতো ভোরে সে কোনদিন ঘুম থেকেই উঠে না, আর আজ সে কাউকে কিছু না বলে বাইরে যাবে। ওগো, একি কাণ্ড?

    আচ্ছা দাঁড়াও ড্রাইভারকে ডাকি। দেখি বাইরে গেছে কিনা।

    এমন সময় বয় ছুটে আসে হাউ মাউ করে কাঁদছে সে ভয়াতুর কণ্ঠে বলে–স্যার খুন খুন…

    ব্যস্তকণ্ঠে বলে উঠেন চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম–খুন কে খুন হয়েছে?

    বয় কাঁপতে কাঁপতে বলে–দারওয়ান-দারওয়ান খুন হয়েছে!

    চৌধুরী সাহেব বলে উঠে–কি বলছিস তুই?

    হা স্যার, সব সত্যি বলছি। দেখবেন আসুন, দরজার পাশে দারওয়ান মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

    মি. চৌধুরী এবং মরিয়ম বেগম ছুটলেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে।

    সদর দরজার নিকটে পৌঁছে স্তম্ভিত হতবাক হলেন। বহু দিনের পুরানো দারওয়ান মংলু মিয়ার রক্তাক্ত দেহটা ভূতলে লুটিয়ে আছে। চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগমের দু’চোখ ছাপিয়ে পানি এলো; রুমালে চোখ মুছলেন চৌধুরী সাহেব।

    অল্পক্ষণেই লোকজনে বাড়ি ভরে গেল।

    মনিরার অন্তর্ধান ব্যাপারের সঙ্গে এ খুন রহস্য নিশ্চয়ই জড়িত আছে। চৌধুরী সাহেব পুলিশ অফিসে ফোন করলেন। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত এবং ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মনিরার নিরুদ্দেশ তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। কারণ, এটা চৌধুরী বাড়ির ইজ্জৎ নিয়ে ব্যাপার!

    কিছুক্ষণের মধ্যেই মি. হারুন কয়েকজন পুলিশসহ চৌধুরী বাড়িতে হাজির হলেন। সমস্ত ঘটনা শুনে মি. হারুন মৃদু হাসলেন; ভাবলেন, এ দস্যু বনহুরের কাজ ছাড়া আর কারো নয়। তিনি প্রকাশ্যে বলেন–চৌধুরী সাহেব, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কারণ, মনিরা এখন আপনার পুত্রের পাশেই রয়েছে।

    মুহূর্তে চৌধুরী সাহেবের মুখমণ্ডল রাঙা হয়ে উঠে, তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বলেন–আপনি কি বলতে চান মনির দারওয়ানকে খুন করে মনিরাকে নিয়ে পালিয়েছে?

    হ্যাঁ মি. চৌধুরী, এ কথা নির্ঘাত সত্য। আপনার পুত্র ছাড়া এ কাজ কেউ করতে পারে না।

    মিথ্যা সন্দেহ করছেন ইন্সপেক্টর সাহেব। আমার মনির কখনও নরহত্যা করতে পারে না। তাছাড়া মনিরাকে নিয়ে তার পালাবার কোন প্রয়োজনই নেই।

    মি. হারুন বলেন–চৌধুরী সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনার ভাগনী মনিরা আপনার পুত্রকে ভালবাসে।

    সেই কারণেই দারওয়ানকে খুন করার কোন দরকার ছিল না তার।

    মি. হারুন এবং চৌধুরী সাহেব কথাবার্তা বলছেন, এমন সময় ডিটেকটিভ মি. শঙ্কর রাও এসে হাজির হলেন। তিনি পুলিশ অফিসে এসে ঘটনাটা জানতে পেরে থাকতে পারেন নি, সোজা চলে এসেছেন চৌধুরী বাড়িতে।

    তিনিও ঘটনাটা বিস্তারিত শুনলেন। মি. রাও বলেন–চলুন, মনিরার কক্ষটি একবার পরীক্ষা করে দেখব।

    চৌধুরী সাহেব বলেন…কক্ষের একটি জিনিসপত্র এলোমেলো হয় নি বা কোন কিছুর চিহ্ন নেই,..

    উঠে দাঁড়ান মি. রাও-চলুন, তবু একবার দেখা দরকার।

    সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চললেন মি. হারুন, মি. রাও এবং চৌধুরী সাহেব।

    উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলেন মি. রাও উপরে উঠবার সিঁড়ি কি এই একটি?

    জবাব দিলেন চৌধুরী সাহেব হাঁ, এই একটি সিঁড়িই রয়েছে।

    তাহলে এই সিঁড়ি দিয়েই নেমে গেছে মনিরা এবং যে তাকে নিয়ে গেছে সে।

    হ্যাঁ, তাই হবে। নীরস কণ্ঠস্বর চৌধুরী সাহেবের।

    মি. রাও সকলের অলক্ষ্যে সিঁড়ির প্রত্যেকটা ধাপে লক্ষ্য রেখে এগুচ্ছিলেন। হঠাৎ তার নজরে পড়ে যায় সিঁড়ির এক পাশে একটি লেডিস স্যান্ডেল কাৎ হয়ে পড়ে আছে। মি. রাও স্যান্ডেলখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন–এটা কার?

    চৌধুরী সাহেব জুতোখানা লক্ষ্য করে বলেন–মনিরার। কিন্তু একখানা জুতো এখানে এল কি করে?

    তাইতো?

    কথার ফাঁকে তারা উপরে এসে পৌঁছে গেছেন। তখনও মনিরার স্যান্ডেলখানা মি. রাও-এর হাতে ধরা রয়েছে।

    মি. রাও স্যান্ডেলখানা বারান্দার একপাশে রেখে বলেন–মনিরা স্বইচ্ছায় কারো সঙ্গে যায় নি। তাকে কেউ বা কারা জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে।

    মি. হারুন বলে উঠেন–দস্যু বনহুর ছাড়া তাহলে এ কাজ কে করতে পারে?

    গোটা কক্ষটা তারা সুন্দরভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন। কক্ষের একটি জিনিসও স্থানচ্যুত হয়। নি। দরজা মনিরা যে স্বহস্তে খুলেছে তার প্রমাণ রয়েছে। কারণ, দরজার খিল ভাঙ্গেনি বা কোনরকম আগলা হয় নি।

    ক্রমেই ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে উঠছে।

    দস্যু বনহুরকে মনিরা ভালবাসে–এ কথা সবাই জানে।

    মনিরাকে চুরি করে নিয়ে যাবার তার কোন প্রয়োজন হবে না, মনিরা ইচ্ছা করেই যেতে পারতো। দারওয়ানকে খুন করবার কোন দরকারই নেই তাদের। তাছাড়া সিঁড়ির ধাপে মনিরার একটি স্যান্ডেলই বা পড়ে থাকবে কেন?

    আরও একটি প্রমাণ তারা পেলেন। বারান্দার মেঝেতে লক্ষ্য করে দেখল, কয়েকটি পায়ের ছাপ বেশ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। আরও দেখলেন তারা, পায়ের ছাপগুলো খালি পা এবং থেবড়ো থেবড়ো পাগুলো।

    মি. হারুন পায়ের ছাপগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্য করে বললেন–দস্যু বনহুর যেখানেই হানা দিয়েছে, আমরা লক্ষ্য করেছি, কখনও তার খালি পা ছিল না।

    মি. রাও বলেন–এ নিশ্চয়ই অন্য কোন শয়তানের কাজ। দস্যু বনহুর মনিরাকে নিয়ে যায় নি-এ সত্য।

    চৌধুরী সাহেব মাথায় হাত দিয়ে একটি সোফায় বসে পড়লেন-তাহলে উপায়?

    বার বার যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে শত্রুপক্ষ পিছু হটে গেল। পুনরায় আক্রমণের চেষ্টা তাদের মন থেকে কর্পূরের মত উবে গেল। ফরহাদের পরিচালনায় বিমানবাহিনী শত্রুপক্ষকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে।

    শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জয়ী হল মিত্রপক্ষ। পরাজয়ের কালিমা মুখে মেখে হটে পড়ল শত্রুপক্ষ। সেনাপতি নাসের আলীর আনন্দ আর ধরে না! শুধু তিনিই নন, সমস্ত সামরিক অফিসারদের মুখমণ্ডল জয়ের উল্লাসে দীপ্ত হয়ে উঠলো। সবাই একবাক্যে ক্যাপ্টেন ফরহাদের রণকৌশলের প্রশংসা করতে লাগলেন।

    কিন্তু এক আশ্চর্য ব্যাপার-সবাই যখন ক্যাপ্টেন ফরহাদের গুণগান করেছেন, তখন দেখা গেল ফরহাদ আর তাদের মধ্যে নেই! আর নেই জব্বার খা।

    এ ব্যাপার নিয়ে দেশময় একটা হুলস্থুল পড়ে গেল। সেনাপতি নাসের এবং মেজর জেনারেল হাশেম খান ও অন্যান্য সামরিক অফিসার গভীর চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

    পত্রিকায় পত্রিকায় যখন ক্যাপ্টেন ফরহাদের জয়গান প্রচারিত হচ্ছে, এমন দিনে শোনা গেল ফরহাদের নিরুদ্দেশের কথা।

    কথাটা জানতে পেরে দেশবাসী গভীর শোকাভিভূত হয়ে পড়ল। সকলের মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন হলো। নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষ তাঁকে গোপনে চুরি করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।

    দেশবাসী যখন ক্যাপ্টেন ফরহাদের নিরুদ্দেশ ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত, এমন দিনে মেজর। জেনারেল একখানা চিঠি পেলেন। চিঠিখানা পড়ে তিনি স্তম্ভিত-হতবাক হয়ে পড়লেন। চিঠিতে লেখা রয়েছে মাত্র একটি কথা–

    মাতৃভূমি রক্ষার্থে আমাদের প্রচেষ্টা

    সার্থক হয়েছে। এজন্য আমরা

    ধন্য। আপনাদের অভিনন্দন আমি সানন্দে গ্রহণ করেছি।

    -দস্যু বনহুর

    চিঠির কথা অল্পক্ষণের মধ্যেই ফোনে সমস্ত সামরিক অফিসে পৌঁছে গেল। পৌঁছল পুলিশ অফিসে প্রত্যেকটা অফিসারের কানে। সবাই নির্বাক, বিস্ময়ে স্তম্ভিত-এ যে কল্পনার অতীত”! যে দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য অহঃরহ পুলিশ বাহিনী উন্মাদের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ সুপার যাকে জীবিত কিংবা মৃত এনে দেবার জন্য লাখ টাকা ঘোষণা করেছেন, সেই দস্যু বনহুর আজ সকলের অভিনন্দন গ্রহণের পাত্র।

    কথাটা পত্রিকায় বিরাট আকারে প্রকাশ পেল।

    লোকের মুখে মুখে, পথে-ঘাটে-মাঠে সর্বত্র দস্যু বনহুরের জয়-জয়কার!

    নূরী গহন বনে বসে শুনলো সব। আনন্দে স্ফীত হয়ে উঠলো তার বুক। তার বনহুর আজ জয়ের টিকা ললাটে পরে ফিরে এসেছে। কি বলে যে সে অভিনন্দন জানাবে খুঁজে পেল না। আনন্দোচ্ছাসে গুণ গুণ করে গান গাইতে লাগলো সে। ইচ্ছে হল, হাওয়ায় ডানা মেলে ভেসে বেড়াবে-কিন্তু সে যে মানুষ! বনে বনে ঘুরে অনেক ফুল সগ্রহ করলো, ঝর্ণার পাশে বসে সুন্দর করে মালা গাঁথলো। তারপর পা টিপে টিপে প্রবেশ করলো বনহুরের বিশ্রামকক্ষে। অতি সন্তর্পণে বনহুরের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

    বনহুর বিছানায় অর্ধশায়িত অবস্থায় শুয়ে শুয়ে কি যেন ভাবছিল। শরীর ক্লান্ত, তাই কোথাও বের হয় নি সে। নূরী ঠিক তার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর চট করে মালাখানা পরিয়ে দিল সে তার গলায়।

    বনহুর মৃদু হেসে বললো–খুব যে খুশি দেখছি, ব্যাপার কি নূরী?

    নূরী হেসে বললো–হুর, আজ কি বলে তোমাকে……

    থাক, ঐ ঢের হয়েছে। বস।

    নূরী বনহুরের বিছানার একপাশে বসে পড়ে বলল–হুর, আজ তোমার জয়গানে দেশবাসী পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছে।

    কে বলল এসব কথা তোমাকে?

    কেন, রহমান–রহমান সব পত্রিকাগুলো আমাকে এনে দিয়েছে।

    তুমি পত্রিকা পড়তে শিখেছ?

    বাঃ তোমার বুঝি মনে নেই? তুমিই তো আমাকে লেখা আর পড়া শিখিয়েছ?

    এতোবড় যে পণ্ডিত হয়েছ তা জানতাম না।

    পত্রিকা পড়তে পারলেই বুঝি পণ্ডিত হয়? অভিমান-ভরা কণ্ঠস্বর নূরীর।

    বনহুর ওর চিবুক উঁচু করে ধরে ছিঃ, সামান্যতেই অমন রাগ করতে নেই। নূরী, ধরো আর যদি ফিরে না আসতুম?

    নূরী বনহুরের মুখে হাতচাপা দেয়।

    বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় রহমান দরজার ওপাশে এসে দাঁড়ায়–সর্দার!

    বনহুর গলা থেকে মালাটা খুলে পাশের টেবিলে রেখে বিছানায় সোজা হয়ে বসে বলে– এসো।

    রহমান এসে দাঁড়াতেই নূরী হেসে বলে–রহমান নয়, জব্বার খাঁ।

    সবাই হাসলো।

    রহমান বলল–সর্দার, একটি কথা আছে।

    বনহুর বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল–চলো।

    বাইরে আকাশের নিচে এসে দাঁড়ালো বনহুর আর রহমান। বনহুর জিজ্ঞাসা করলো–কি কথা রহমান?

    সর্দার সেই মেয়েটি…থেমে যায় রহমান।

    বনহুর ভ্রু কুচকে তাকায় রহমানের মুখের দিকে-কোন মেয়েটি? কি ব্যাপার?

    সর্দার, সেই যে মনসাপুরের জমিদার-কন্যা সুভাষিণীর কথা বলছি।

    কেন, হসপিটাল থেকে সে বাড়ি ফিরে যায় নি?

    গিয়েছে–কিন্তু…

    থামলে কেন, বল?

    মেয়েটি নাকি পাগল হয়ে গেছে?

    বল কি? মেয়েটি পাগল হয়ে গেছে? কিন্তু কেন?

    রহমান একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলে–সুভাষিণী এমন একজনকে ভালবাসছে, যাকে–যাকে সে কোনদিন পাবে না।

    সকলের অজ্ঞাতে নূরী একটি গাছের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিল। গোপনে সে রহমান আর বনহুরের কথাবার্তা সব শুনছিল। সুভাষিণীর নাম তার পরিচিত। গোপনে তার বিষয়ে আলোচনা শুনেই চমকে উঠছিল সে। এখন কিছুটা ঘেমে উঠে। না জানি কাকে ভালবেসেছে। আশঙ্কা জাগে মনে–তার হুরকে নয়তো। আরো ভালোভাবে কান পাতে নূরী।

    বনহুরের কণ্ঠস্বর শোনা যায়–এটাই তোমার গোপন কথা?

    হাঁ সর্দার। মেয়েটির যা অবস্থা, তাতে সে বেশিদিন বাঁচবে বলে মনে হয় না। যদি সে….পুনরায় থেমে যায় রহমান।

    বনহুর গম্ভীর গলায় বলে–থামলে কেন?

    মাথা চুলকে বলে রহমান–মানে তার ভালোবাসার পাত্রটিকে যদি না পায়, তাহলে….

    বাঁচবে না–এ তো বলতে চাচ্ছো?

    হ্যাঁ সর্দার।

    কে সে যুবক যাকে ভালবাসে? সুভাষিণীর মত সুন্দরী গুণবতী যুবতাঁকে যে উপেক্ষা করতে পারে? বল, আমি তাকে উচিত সাজা দেব।

    রহমান নীরব।

    চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে কেন?

    সর্দার, আপনি যদি একবার তার সঙ্গে দেখা করতেন, তাহলে হয়তো কাকে সে ভালবাসে, জানতে পারতেন।

    সে এখন কোথায়?

    মনসাপুরে। পিতামাতার কাছে।

    বেশ, আমি তার সঙ্গে দেখা করব–তুমি তার আয়োজন কর। আমি জানতে চাই কাকে সে ভালবাসে।

    তাকে এনে দিতে পারবেন সর্দার?

    দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই রহমান। ছলে-বলে–কৌশলে তাকে রাজি করাব। যত টাকা চায় তাই দেব। তবু যদি স্বীকার না হয়, বন্দী করে নিয়ে আসব। সামান্য ভালবাসার জন্য একটি সুন্দর ফুলের মত জীবন বিনষ্ট হতে পারে না।

    মারহাবা সর্দার। তারপর রহমান চলে যায় সেখান হতে।

    বনহুর ধীর মন্থর গতিতে ফিরে আসে নিজের কক্ষে।

    ইতোমধ্যে নূরী এসে নিজ জায়গায় বসে পড়েছিল।

    বনহুর এসে পুনরায় বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে।

    নূরী গম্ভীর মুখে বসেছিল, বলে–হুর, আজও তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারলে না!

    কেন?

    ঐ যে গোপনে কি সব আলোচনা কর?

    সব কথা তোমার শোনা উচিত নয় নূরী।

    কেন, আমি কি সব বুঝি না?

    ওসব চুরি-ডাকাতির ব্যাপার কি শুনবে….

    মিথ্যে কথা! রহমান কোন মেয়ে সম্বন্ধে তোমাকে কি সব বলছিল না?ওঃ সেই কথা? হ্যাঁ, ঐ যে মনসাপুরের জমিদার-কন্যা সুভাষিণীর সম্বন্ধে বলল রহমান। মেয়েটি নাকি পাগল হয়ে গেছে।

    আমি সব শুনেছি।

    দেখ, মেয়েটিকে বাঁচাতে হলে আমাকে একবার সেখানে যেতে হবে। জানতে হবে কাকে সে ভালবাসে। যেমন করে হোক, তার ভালবাসার পাত্রটিকে এনে দিতে হবে…..

    সব কাজেই তোমার মাথাব্যথা। আমি বুঝতে পারি না এসব।

    সে জন্যই তো বলেছিলুম সব কথা তুমি জানতে চেও না নূরী।

    নূরী আর কোন কথা না বাড়িয়ে তখনকার মত চলে যায় সেখান হতে।

    বনহুর এবার পাশ ফিরে শোয়, কিন্তু মনে তখন একটি অতি পরিচিত মুখ ভেসে উঠছে। যুদ্ধ থেকে ফিরে কয়েক দিন বেশ অসুস্থ বোধ করেছিল সে। মনিরা নিশ্চয়ই অভিমান করে বসে আছে। যেমন ভাবা অমনি বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল! ইস কতদিন মনিরাকে দেখেনি! চটপট তৈরি হয়ে নিল বনহুর। আজ সে দস্যু বনহুরের বেশে নয়, সৈনিকের বেশে সজ্জিত হয়ে তাজের পাশে এসে দাঁড়াল।

    তাজ মনিবকে পাশে পেয়ে সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে মৃদু আঘাত করতে লাগল।

    বনহুর তাজের পিঠ চাপড়ে আদর করল, তারপর উঠে বসল তার পিঠে।

    তাজ এবার উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করল।

    তাজের পিঠে বনহুর ছুটে চলেছে। মনে তার রঙিন স্বপ্নের নেশা। কতদিন পর মনিরাকে পাশে পাবে সে। বিদায় দিনে মনিরার অশ্রুসজল মুখখানা ভাসতে লাগলো তার চোখের সম্মুখে।

    ঐ দেখা যাচ্ছে চৌধুরী বাড়ির বিরাট প্রাচীর। অন্ধকারের আড়ালে বিরাট প্রাসাদের এক অংশ দেখা যাচ্ছে। আকাশে অসংখ্যা তারকারাজি। নীল শাড়ির বুকে যেন জরীর বুটিগুলো ঝিকমিক করছে। অন্ধকার নির্জন পথ।

    বনহুরের অশ্ব নিঃশব্দে চৌধুরী বাড়ির পিছন প্রাচীরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বনহুর কালবিলম্ব না করে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে প্রাচীরের উপরে উঠে বসল। হঠাৎ মনটা যেন কেমন বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। মনিরার কক্ষ অন্ধকার। জানালা দিয়ে কোনো আলোর ছটা আজ তাকে অভিনন্দন জানাল না। প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশ করলো বনহুর। তারপর দ্রুত পাইপ বেয়ে উঠে গেল উপরে। কিন্তু একি! মনিরার কক্ষের প্রত্যেকটা জানালা বন্ধ-তবে কি মনিরা এ কক্ষে থাকে না!

    বনহুর রেলিং বেয়ে বেলকুনিতে গিয়ে পৌঁছে। মনিরার দরজার পাশে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়-দরজায় তালা লাগানো। মুহূর্তে বনহুরের মুখমণ্ডল অন্ধকার হয়ে পড়ল। সেকি, মনিরা তবে গেল কোথায়! নিশ্চয়ই তাহলে মামীমার কক্ষে শুয়েছে। বনহুর পাশের কক্ষের দরজার নিকট দাঁড়িয়ে ভাবলো, তবে কি সে ফিরে যাবে? তা হয় না, মনিরাকে না দেখে ফিরে যেতে পারে না। সে। কিন্তু কি উপায়ে কক্ষে প্রবেশ করবে সে। দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই। রেলিং বেয়ে কক্ষের পিছনের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওপাশের আর একটি কক্ষ থেকে ভেসে আসছে চৌধুরী সাহেবের নাসিকাধ্বনি। বনহুর কতকটা আশ্বস্ত হল। এ কক্ষে তাহলে তার মা আর মনিরা শুয়েছে। কতদিন পর মায়ের কথা স্মরণ হতে দু’চোখে পানি এলো। আজ মা-কেও দেখবে সে।

    কক্ষে ডিমলাইট জ্বলছে। বনহুর অল্প চেষ্টাতেই জানালার শার্শী খুলে কক্ষে প্রবেশ করল। ধীরে অতি সন্তর্পণে এগুতে লাগলো কিন্তু একি! বিছানায় শুধু একটি মহিলাই শুয়ে রয়েছেন। মনিরা কই? তবে কি মনিরা অন্য কোন কক্ষে শুয়েছে? ফিরে যাবার পূর্বে মায়ের মুখখানা দেখার। প্রবল বাসনা জাগল তার মনে। প্যান্টের পকেট থেকে ম্যাচটা বের করে একটা কাঠি জ্বালাল। বনহুর। এগিয়ে ধরলো মায়ের মুখের পানে।

    হঠাৎ মরিয়ম বেগমের ঘুম ভেঙ্গে গেল, চোখ মেলেই চিৎকার করতে গেলেন তিনি, অমনি বনহুর তার মুখে হাতচাপা দিয়ে বলল–মা!

    মরিয়ম বেগম ততক্ষণে বিছানায় উঠে বসেছেন। চোখ রগড়ে বলেন–কে-কে তুই?

    বনহুর নিশ্চপ, সোজা হয়ে দাঁড়াল সে।

    মরিয়ম বেগম শয্যা থেকে নেমে দাঁড়ালেন, হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে বনহুরকে দেখে দু’পা পিছিয়ে গেলেন। বনহুরের শরীরে সম্পূর্ণ সৈনিকের ড্রেস দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

    বনহুর বুঝতে পারল, তার মা তাকে চিনতে পারেন নি। আর চিনবেনই বা কি করে। বনহুর মাথার ক্যাপটা খুলে আলোর সম্মুখে এগিয়ে দাঁড়াল। তারপর ধীরস্থির শান্ত কণ্ঠে বলল–মা, আমি তোমার সন্তান।

    মরিয়ম বেগম নিষ্পলক আঁখি মেলে তাকালেন’ বনহুরের উজ্জ্বল-দীপ্ত মুখের দিকে। কই, একে তো মনে পড়ছে না-তার মনির এটা! ফুলের মত সুন্দর একটি মুখ ভেসে উঠলো চোখের সামনে। হঠাৎ মনে পড়ল মনিরের ললাটের এক পাশে কাটা একটি দাগ ছিল। ছোটবেলায় বড় দুষ্ট ছিল মনির-গাছ থেকে পড়ে কপালটা বেশ কেটে গিয়েছিল। মরিয়ম বেগম বনহুরের ললাটে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে মরিয়ম বেগমের অস্ফুট কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এলো-বাবা মনির।

    বনহুর মায়ের বুকে মুখ গুঁজে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে ডেকে উঠল,মা, আমার মা!

    কতদিন পর পুত্রকে ফিরে পেয়েছেন মরিয়ম বেগম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন তিনি, কচি শিশুর মত বনহুরের মুখে-মাথায়-পিঠে হাত বুলাতে থাকেন। চোখ দিয়ে তার ঝরে পড়তে থাকে আনন্দ-অশ্রু। তিনি যেন হারানো রত্ন খুঁজে পেয়েছেন। খুশিতে আত্মহারা হয়ে ডাকতে থাকেন–ওগো, শুনছো, দেখে যাও, দেখে যাও কে এসেছে…..

    বনহুর মায়ের মুখে হাতচাপা দিয়ে বলে–মা, চুপ করো। চুপ করো।

    ওরে তোর আব্বাকে ডাকছি……

    না, আজ নয় মা, আজ নয়। আব্বাকে তুমি আজ ডেকো না। মা, একটি কথার জবাব দাও?

    বল, ওরে বল?

    মা, মনিরা কই? ওকে তো দেখছিনে

    মুহূর্তে মরিয়ম বেগমের মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে পড়লো। শুষ্ক কণ্ঠে বলেন–আজ প্রায় দু’সপ্তাহ হল মনিরাকে কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে বাবা।

    বনহুরের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠে-আর তোমরা চুপ করে বসে আছো!

    না রে না। পুলিশকে জানানো হয়েছে। জোর খোঁজা-খুঁজি চলছে। তোর আব্বা তো পাগলের মত হয়ে গেছেন। কি হবে বাবা, মনিরাই যে আমাদের চৌধুরী বংশের ইজ্জৎ।

    মা, তুমি যতটুকু জান খোলসা বল-কবে, কিভাবে, কোথা থেকে সে চুরি হয়ে গেছে? বনহুরের কণ্ঠে একরাশ চঞ্চলতা ঝরে পড়ল।

    মরিয়ম বেগম সংক্ষেপে সব বললেন।

    স্তব্দ নিঃশ্বাসে শুনলো বনহুর। দু’চোখে তার আগুন ঝরে পড়তে লাগল। নিঃশ্বাস দ্রুত বইছে। বার বার দক্ষিণ হস্তখানা প্যান্টের পকেটে রিভলভারের বাটে গিয়ে ঠেকছে। অধর দংশন করতে লাগলো বনহুর। সমস্ত মুখমণ্ডল তার কঠিন হয়ে উঠেছে।

    মরিয়ম বেগম পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন।

    বনহুর আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে মায়ের পায়ে সালাম করে উঠে দাঁড়াল।

    মরিয়ম বেগমের চোখ দিয়ে তখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তিনি প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন।

    বনহুর ক্যাপটা মাথায় দিয়ে একবার ফিরে তাকালো মায়ের মুখে।

    মরিয়ম বেগম কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু ততক্ষণে মুক্ত জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেছে বনহুর।

    মরিয়ম বেগম ছুটে গেলেন জানালার পাশে। অস্ফুট কণ্ঠে ডাকলেন–মনির!

    মনির ততক্ষণে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

    বনহুর যখন তাজের পিঠে চেপে বসলো, তখন দমকা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আকাশে তারকারাজিগুলো মেঘের অন্তরালে লুকিয়ে পড়েছে। অন্ধকারে তাজের কালো দেহটা মিশে গেছে। যেন।

    কিছু পূর্বেই বনহুরের মনে ছিল অফুরন্ত আনন্দ, আশা-বাসনা-মনিরার সঙ্গে সাক্ষাতের এক উদ্যম প্রেরণা। সব যেন এক নিমিষে অন্তর্ধান হয়ে গেছে। ক্রুব্ধ সিংহের মত হিংস্র হয়ে উঠল বনহুর। কে সে পিশাচ যে তার মনিরাকে হরণ করতে পারে! এ মুহূর্তে বনহুর তাকে পেলে ছিঁড়ে খণ্ড খণ্ড করে ফেলবে।

    বনহুরের অশ্ব যখন আস্তানায় গিয়ে পৌঁছল তখন পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। বনহুর পৌঁছতেই দু’জন বলিষ্ঠ লোক তাজকে ধরে ফেলল। বনহুর সোজা দরবার-কক্ষে প্রবেশ করল। ক্ষিপ্তের ন্যায় চিৎকার করে ডাকলো-রহমান! রহমান!

    রহমান দ্রুত কক্ষে প্রবেশ করে সেলুট করে দাঁড়াল-সর্দার।

    এ মুহূর্তে আমার সমস্ত অনুচরগণকে ডেকে বলে দাও-শহরে-গ্রামে, ঘাটে-মাঠে, গহন বনে সমস্ত জায়গায় তাদের ছড়িয়ে পড়তে হবে। যে যে-কোন ছদ্মবেশে যাবে। সাধু-সন্ন্যাসী, ভিখারী, অন্ধ, নাপিত, ধোপা-যে যা পারে। চৌধুরী সাহেবের মনে মনিরা চুরি হয়ে গেছে, কে বা কারা তাকে হরণ করেছে, কেউ জানে না। পুলিশ জোর তদন্ত চালিয়েও মেয়েটির কোন সন্ধান করতে পারছে না। আমি চাই তোমরা কৃতকার্য হবে। যাও, এক্ষুণি চলে যাও।

    রহমান মাথা চুলকে বলে–চৌধুরী কন্যার জন্য…মানে….

    আমার এতো মাথাব্যথা কেন, এইতো বলতে চাচ্ছো?

    তিনি বুঝি কন্যার জন্য বড় রকমের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন? কথাটা বলে রহমান।

    না, তিনি করেন নি, আমি করলুম। যে চৌধুরী কন্যার সন্ধান সর্বপ্রথম এনে দিতে পারবে সে আমার সবচেয়ে প্রিয় হবে এবং আমি তাকে লাখ টাকা পুরস্কার দেব।

    রহমান বেরিয়ে যায়।

    বনহুর ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারি করতে থাকে। গোটা রাত অনিদ্রায় চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো; ললাটে গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠেছে।

    এমন সময় নূরী কক্ষে প্রবেশ করলো। রহমান তাকে কথাটা বলেছে। নূরীর মনেও ঝড় বইতে শুরু করেছে। চৌধুরী-কন্যার জন্য তার এত দরদ কেন! লাখ টাকা পুরস্কার দেবে বনহুর কেন, কেন এতো উম্মত্ত হয়ে উঠেছে সে। বীর পদক্ষেপে বনহুরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল নূরী। বনহুরের চেহারা দেখে হঠাৎ কিছু বলতে সাহস হলো না তার। তবু একটু কেশে বলল নূরী– হুর, হঠাৎ তোমার কি হয়েছে, অমন করছো কেন?

    বনহুরের কানে নূরীর কণ্ঠ পৌঁছলো কিনা কে জানে। বনহুর দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল নিজের কক্ষে। ক্ষিপ্র-হস্তে শরীর থেকে পোশাক বদলাতে লাগল। বনহুরের চোখে-মুখে এক উম্মত্ত ভাব ফুটে উঠেছে। শিকারীর ড্রেসে সজ্জিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। পিঠের সঙ্গে রাইফেল বাঁধা। কোমরের বেল্টে গুলীভরা রিভলভার।

    নূরী এসে সম্মুখে দাঁড়ালো-কোথায় যাচ্ছো হুর?

    শিকারে।

    হঠাৎ আজ এই অসময়ে শিকারের খেয়াল হল কেন?

    অনেক দিন শিকারে যাইনি তাই।

    কিন্তু না খেয়েই যাবে? গোটা রাত বাইরে কাটিয়ে এই তো সবে ফিরলে–চলো, কিছু মুখে দিয়ে যাও।

    না, ক্ষুধা আমার পায় নি নূরী।

    তা হবে না, তোমাকে কিছু না খেয়ে এই সকাল বেলা বেরুতেই দেব না।

    নূরী!

    নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয় বনহুরের, বলে সে–চলো।

    বনহুর আর নূরী খাওয়ার কক্ষে এসে বসলো।

    বাবুর্চি টেবিলে চা-নাস্তা সাজিয়ে রাখল। নূরী খাবার এগিয়ে দিল বনহুরের সম্মুখে। বনহুর অন্যমনস্কভাবে খাবার মুখে তুলে দিতে লাগল। একটু খেয়েই উঠে পড়ল সে।

    নূরী ব্যথিত কণ্ঠে বলল–একি, কিছুই যে খেলে না হুর?

    এই তো অনেক খেয়েছি–টেবিলে ঠেস দেওয়া রাইফেলটা হাতে উঠিয়ে নেয় বনহুর।

    নূরী ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকায় বনহুরের মুখের দিকে, শত শত প্রশ্ন তার মনকে অস্থির। করে তুলছে, কিন্তু বনহুরকে কিছুই জিজ্ঞাসা করার মত অবকাশ হয় না তার।

    বনহুর নূরীর স্থির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে–আল্লাহ হাফেজ।

    বনহুর বেরিয়ে যায়।

    নূরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

  • নাথুরামের কবলে মনিরা

    নাথুরামের কবলে মনিরা

    রহস্য ধাঁচের গল্প নিয়ে রচিত “নাথুরামের কবলে মনিরা” বইটি, গল্প-চরিত্রের নানা দিক দস্যু বনহুর সিরিজ এই বইটির মাধ্যমে খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি পড়ার সময় অনেক অনেক ভাল লাগা অনুভব করছিলাম। অন্তত এই সিরিজের প্রথম বইগুলোর চেয়ে এই বইটির বর্ণনা, সংলাপ ইত্যাদি অনেক ভাল হয়েছে। বইটি আমার ভাল লেগেছে, আপনারা যারা দস্যু বনহুর সিরিজের “নাথুরামের কবলে মনিরা” বইটি পড়বেন বলে ভাবছে তাদের বলব, তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলুন, আমার বিশ্বাস আপনারও আমার মতই ভাল লাগবে!

  • প্রথম পরিচ্ছেদ

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    আজ কদিন হয় মনিরা এই অন্ধকার কক্ষে বন্দী হয়ে রয়েছে। এ কদিনের মধ্যে দু’দিন মাত্র খেয়েছে সে। আর বাকি দিনগুলো পানি ছাড়া কিছু মুখে দেয়নি। চোখ বসে গেছে। চুল এলোমেলো বিক্ষিপ্ত। ক’দিন গোসলেরও নাম করেনি সে। অবশ্য তাকে এসবের জন্য সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

    মনিরাকে এই অন্ধকার কক্ষে বন্দী করে রাখার পর প্রায়ই আসতো নাথুরাম আর তার সঙ্গী জগাই। জগাইও নাথুরামের চেয়ে কুৎসিত কম নয়। হৃদয়টাও তেমনি জঘন্য শয়তানিতে ভরা। কঠিন পাথরের মত মন। যেমন নাথুরাম তেমনি তার সঙ্গী।

    এদের দেখলেই মনিরা মুখ ফিরিয়ে নিতো। ঘৃণায় কুঞ্চিত হত তার নাসিকা। ওরা কোনো কথা জিজ্ঞাসা করলে মনিরা জবাব দিতো না। খাবার নিয়ে এলে খেত না সে। নাথুরাম কুৎসিত ইংগিতপূর্ণ তামাশা করতে ছাড়ত না। মনিরা নিশূপে শুনে যেত, কারণ সে জানে কোন কথা বলে লাভ হবে না। বরং এতে তার বিপদ আরও বাড়বে। তাই নীরবে সহ্য করে যেতো। কিন্তু এ ক’দিনের মধ্যে মনিরার চোখের পানি একটিবার শুকিয়েছে কিনা সন্দেহ।

    নাথুরাম কুৎসিত ইংগিতপূর্ণ হাসি-তামাশা করা ছাড়া মনিরার সঙ্গে কোন দুর্ব্যবহার করতে সাহসী হত না, কারণ তারা জানতো মনিরা মুরাদের ভাবী বধূ।

    মনিরাকে মুরাদের হাতে পৌঁছানোর জন্য মোটা বখশিস পেয়েছে তারা, ভবিষ্যতে আরও পাবে। নাথুরাম তার সঙ্গী জগাইকে নিষেধ করে দিয়েছে কেউ যেন মনিরার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করে।

    মনিরা দাঁতে দাঁত পিষতো। কিন্তু কি উপায় আছে। সে দুর্বল অসহায় নারী।

    মনিরা যখন বেশ কদিন না খেয়ে কাটিয়ে দিল তখন এক বুড়ীকে সঙ্গে করে নিয়ে এলো নাথু। মনিরাকে সর্বক্ষণ দেখা-শোনা আর নাওয়া-খাওয়া করানোর ভার দিল তার উপর। খুব সাবধানে কড়া পাহারায় রাখার নির্দেশ দিল নাথুরাম।

    মনিরা তবু মনে কিছুটা সাহস পেল। যা হউক বৃদ্ধা হলেও সে নারী। নাথুরাম আর জগাইয়ের হাত থেকে আপাতত রক্ষা পেল সে তাহলে।

    নাথুরাম আর জগাই বারবার বৃদ্ধাকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় একটা চাবি বুড়ীর হাতে দিয়ে বলল নাথুরাম-সতী, এই নাও চাবি, তুমি যখনই বাইরে যাবে, দরজায় তালা মেরে যাবে, দেখ মেয়েটা যেন না পালায়।

    বৃদ্ধা জবাব দিল-কি যে বলো! আমার নাম সতী, আমার নিকট থেকে মেয়ে পালাবে, অমন জীবন রাখব না।

    নাথুরাম হেসে বেরিয়ে গেল, জগাই তাকে অনুসরণ করলো।

    এতক্ষণে মনিরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো বৃদ্ধার দিকে। ঠিক বৃদ্ধা নয় বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। দাঁতও পড়েছে অনেকগুলো। দু’চারটে যা আছে তাও নড়ছে। কথা বলার সময় বেশ বুঝা গেল সেটা।

    বৃদ্ধার চুল পাকলে কি হবে। দাঁত নড়লেও কিছু আসে যায় না, তার সাজ-সজ্জা ছিল খুব। বিনুনী করে খোঁপা বাঁধা, কপালে সিঁদুরের টিপ, গালে কুমকুম, ঠোঁটে পানের রংঙের সঙ্গে লাল রং মেশানো রয়েছে। বৃদ্ধার গায়ের রং তামাটে। নাকটা বোঁচা, কেমন যেন বিদঘুঁটে চেহারা। ওকে দেখে মনিরার গা রি রি করে উঠল। যা চেহারা তার নাম আবার সতী। তবু এই নির্জন : সহায়-সম্বলহীন কক্ষে ওকেই মনিরা সাথী করে নিল।

    মনিরাকে সতী তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে বললো–কিগো, অমন করে তাকিয়ে তাকিয়ে কি দেখছ?

    মনিরা নিশ্চুপ থাকা ঠিক মনে করলো না, সেও বেশ স্বচ্ছকণ্ঠে বলল–একটু পানি দেবে আমাকে?

    বুড়ী হেসে বলল–পানি খাবে তাই আবার এত কথা। দাঁড়াও এনে দিচ্ছি।

    বুড়ী লণ্ঠন হাত বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাবার সময় দরজার তালা লাগাতে ভুলল না সে।

    মনিরা বুঝল বুড়ী খুব চালাক। একটু পর এক গেলাস পানি হাতে কক্ষে প্রবেশ করলো সতী। বাঁ হাতে লণ্ঠন, দক্ষিণ হাতে পানির গেলাস।

    মনিরা ভাবলো-বুড়ীকে কাবু করে পালানো খুব সহজ, কিন্তু কক্ষের বাইরে বলিষ্ঠ দু’জন পাহারাদার বন্দুক হাতে সতর্কভাবে পাহারা দিচ্ছে, তাদের চোখে ধুলা দিয়ে পালানো সম্ভব হবে না। তাছাড়া কক্ষটা কোথায়, শহরে না গহন বনে, মাটির নিচে না উপরে-তাও জানে না সে।

    বুড়ীর হাতে থেকে পানির গেলাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে বলে মনিরা-আচ্ছা, তোমাকে আমি কি বলে ডাকবো?

    সতী দিদি বলে ডেকো-এ নামেই সবাই আমাকে ডাকে।

    এরপর থেকে সতী বুড়ীই মনিরার খোঁজখবর নিতো। খাবার সময় হলে খাবার নিয়ে আসতো। মাঝে মাঝে চুল আঁচড়ে বেঁধে দিতো। কিন্তু বুড়ী যাওয়ার সময় লণ্ঠনটা নিয়ে যেত। তখন মনিরা অন্ধকারে প্রহর গুণতো। কক্ষে অন্য কোন আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠতো সে। অসুবিধা হত অনেক। তবু নীরবে প্রতীক্ষা করতে সতীর। দরজার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতো। এমনিভাবে আর কতদিন কাটবে!

    একদিন বুড়ীর হাত পা ধরে কেঁদেছিল মনিরা, তাকে একটু বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিল সে। কিন্তু বুড়ী বড় শক্ত। পাষাণ তার হৃদয়। হেসে বলেছিল-সাহেব ভাল হলে কত বাইরে যাবে, যেও। কত হাওয়া খাবে, খেও। তুমিই তো তাকে জখম করেছ।

    মনিরা তবু শেষ চেষ্টা করে বলেছিল, তোমাকে অনেক টাকা দেব সতী দিদি।

    বুড়ী জবাব দিয়েছিল-আমার তো টাকার কোন অভাব নেই। সাহেব আমাকে হাজার হাজার টাকা দিয়েছে। শুধু তুমি কেন, তোমার মত কত যুবতাঁকে আমি বাগে রেখেছি। তারা এখন সবাই আমার হাতের মুঠোয়। শিউরে উঠেছিল মনিরা, কিছুক্ষণ স্তব্ধ চোখে লণ্ঠনের আলোতে তাকিয়ে তাকিয়ে বুড়ীকে দেখেছিল। ভাবছিল, এর হাত থেকে বুঝি আর রক্ষা নেই।

    বুড়ি যাবার সময় আলো নিয়ে চলে যায় কেন, একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল মনিরা তাকে। বুড়ি হেসে বলেছিল-আমি বোকা মেয়ে নই। তোমার মত অমন কত যুবতাঁকে আমি বশে রেখেছি। কারও ঘরে লণ্ঠন রাখিনি।

    কেন রাখনি।

    কেন রাখিনি জান? তোমরা যদি শাড়িতে আগুন ধরিয়ে পুড়ে মর।

    বুড়ীর বুদ্ধির জোর দেখে মনিরা এত দুঃখেও হেসেছিলো। তার নিজের এতটুকু বুদ্ধিও নেই, তাহলে সেদিন সে নিজ হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতো না। হায়, কি সর্বনাশ সেদিন মনিরা করে বসেছে। এতদিনে হয়তো মনির ফিরে এসেছে। হয়তো তার সন্ধান নিতে এসে নিরাশ হৃদয় নিয়ে ফিরে গেছে। তার মামুজান আর মামীমার অবস্থা যে কি দাঁড়িয়েছে কে জানে। হয়তো পুলিশ মহল তার সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এখন সে কোথায় রয়েছে নিজেই জানে না। যে ঘরে। সে বন্দী সে ঘর খানা কোথায়-মাটির বুকে না মাটির নিচে? আজ বুড়ী এলে যেমন করে থোক এ কথা জেনে নেবে মনিরা। অসহ্য অন্ধকার-মনিরা হাঁপিয়ে উঠেছে। আলো, আলো-একটু আলো তার প্রয়োজন।

    মনিরার চিন্তাজাল বিচ্ছিন্ন করে অন্ধকারে আলোকরশ্মি ভেসে এলো। কখন যে দরজা খুলে লণ্ঠন হাতে বুড়ী এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করেনি সে।

    মনিরা বুড়ীকে দেখে উঠে দাঁড়ালো, সঙ্গে সঙ্গে ভূত দেখার মত চমকে উঠলো সে–বুড়ীর পেছনে যমদূতের মত দাঁড়িয়ে আছে মুরাদ। গায়ে জামার পরিবর্তে একটি চাদর জড়ানো।

    মনিরাকে দু’পা পিছিয়ে দাঁড়াতে দেখে বলল মুরাদ-ভয় নেই, ভূত নই মনিরা। তোমার ছোরার আঘাতে আমার মৃত্যু ঘটেনি।

    দাঁতে দাঁত পিষে বলে মনিরা-তা আমি জানি।

    জান! আমার মৃত্যু ঘটেনি, জেনে খুশি হয়েছিলে প্রিয়ে?

    মনিরা কোন জবাব দিল না।

    মুরাদ বুড়ীকে বেরিয়ে যেতে ইংগিত করলো।

    বুড়ী মেঝের একপাশে লণ্ঠন নামিয়ে রেখে বেরিয়ে যায়।

    মনিরা প্রমাদ গণে। এতক্ষণ তবু কতকটা সে আশ্বস্ত ছিল, বুড়ী বেরিয়ে যেতেই কণ্ঠতালু তার শুকিয়ে ওঠে। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয় মুখমণ্ডল। হিংস্র জন্তুর কবলে যেমন মেষশাবকের অবস্থা হয়, তেমনি অবস্থা হয় মনিরার। এই নির্জন কক্ষে আজ তাকে রক্ষা করার মত কেউ নেই। মনিরা অসহায়ের মত পিছু হটতে লাগল।

    মুরাদের মুখে কুৎসিত হাসি ফুটে উঠেছে, দু’চোখে লালসাপূর্ণ চাহনি। গম্ভীর কণ্ঠে বলল–মনিরা, তুমি যে আঘাত আমাকে দিয়েছ, তা আমি নীরবে সহ্য করেছি, অন্য কোন নারী হলে আমি তাকে হত্যা করতাম।

    মনিরা তীব্রকণ্ঠে বলল–তাই কর, তুমি আমাকে হত্যা কর শয়তান। এ বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো।

    মুরাদ অদ্ভুত একটা শব্দ করলো–তাই নাকি? কিন্তু তোমাকে হত্যা করে আমি বাঁচবো কেমন। করে! এসো লক্ষীটি আমার। মনিরা, জান তোমাকে আমি কত ভালবাসি! আমার গোটা হৃদয় জুড়ে তুমি আর তুমি। তোমাকে পাবার দুর্বিসহ জ্বালা আমার গোটা অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার শরীরে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছ তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষত হয়েছে আমার মনে। তোমাকে না পেলে আমি পাগল হয়ে যাব।

    মনিরা রুদ্ধ নিঃশ্বাসে শুনছে মুরাদের কথাগুলো। বারবার জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট দু’খানা চেটে নিচ্ছিল। চোখের দৃষ্টি অসহায়ের মত ছুটে যাচ্ছিলো দরজার দিকে। এই মুহূর্তে কেউ কি তাকে বাঁচাতে পারে না। বুড়ীটা এলেও একটু সাহস হত তার। মনে-প্রাণে খোদাকে স্মরণ করে মনিরা।

    লণ্ঠনের আবছা আলোতে মুরাদকে একটা ভয়ঙ্কর জীব বলে মনে হয় মনিরার। ক’দিনের। অনাহারে শরীর দুর্বল। কণ্ঠতালু শুকিয়ে আসছে। চোখদুটিও বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘা পড়ছে। এবার আর তার রক্ষা নেই। পাপিষ্ঠ মুরাদ আজ তাকে পাকড়াও করবেই। কিন্তু তা কিছুতেই হতে পারে না। যেমন করে তোক নিজকে ওর কবল থেকে বাঁচাতেই হবে। মনিরা মনে মনে এক বুদ্ধি আঁটলো হঠাৎ দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে বলে উঠলো-উঃ একি হল! চোখে এমন অন্ধকার দেখছি কেন, মা-মাগো-মনিরার দেহটা টলছে।

    মুরাদ হঠাৎ ভড়কে যায়। অধীর কণ্ঠে বলে ওঠে–কি হল মনিরা, কি হল তোমার? যেমনি মুরাদ ওকে ধরতে যাবে অমনি মেঝেতে পড়ে গেল মনিরা।

    মুরাদ তাড়াতাড়ি ওর মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে উচ্চকণ্ঠে ডাকল-সতী-সতী—

    সতী বুড়ী হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো–আমায় ডাকছেন বাবু?

    হ্যাঁ, দেখো সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। শিগগির পানি নিয়ে এসো।

    বুড়ী সতী দেবী ছুটলো পানি আনতে।

    মনিরা তবু নিশ্চিন্ত নয়। মুরাদের কোলে মাথা রেখে মনটা তার ভয়ে শিউরে উঠছে, তবু নীরবে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল।

    সতী অল্পক্ষণের মধ্যেই এক ঘটি পানি নিয়ে হাজির হল–এই নিন পানি।

    মুরাদ পানি নিয়ে মনিরার চোখেমুখে ঝাঁপটা দিতে শুরু করল আর বার বার ডাকতে লাগলো-মনিরা, মনিরা…..

    মনিরা কিন্তু কিছুতেই চোখ মেললো না, যদিও পানির ঝাঁপটা তার অসহ্য লাগছিল তবু নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে রইল।

    মুরাদ তখন মনিরার জ্ঞান ফিরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ঠিক তক্ষুণি কারও অশ্বপদ শব্দ শোনা গেল। মুরাদ বুড়ীকে জিজ্ঞাসা করলো–কে এলো সতী?

    সতী জবাব দেবার পূর্বেই শোনা গেল একটা কর্কশ কণ্ঠস্বর-হুজুর আমি।

    ওঃ নাথুরাম, এতদিন কোথায় ডুব মেরেছিলে নাথু?

    হুজুর, আমার অনেক কাজ। অনেক দিকে আমাকে সন্ধান রাখতে হয়। কিন্তু ওর কি হয়েছে হুজুর?

    হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। নাথু, অনেকক্ষণ পানির ছিটা দিচ্ছি, তবু জ্ঞান ফিরছে না, কি করা যায় বলতো?

    দেখি আমি। মনিরার পাশে বসে নাথুরাম।

    মনিরার অন্তর কেঁপে ওঠে। আর কতক্ষণ নিজকে এভাবে বাঁচিয়ে রাখবে, পানির ঝাঁপটা খেয়ে খেয়ে ঠান্ডা ধরে এলো। নাকের মধ্যে পানি প্রবেশ করছে। চুল ভিজে চুপষে গেছে। কাপড়ের অবস্থাও তাই। তবে সে নিশ্চুপ পড়ে আছে।

    নাথুরাম মনিরাকে পরীক্ষা করে বলল–কোন চিন্তা নেই হুজুর,জ্ঞান ফিরে আসবে।

    মুরাদ আবার ডাকল-মনিরা-মনিরা, চোখ মেলে দেখ।

    মনিরা চোখ মেলল না, যেমন ছিল তেমনি পড়ে রইল।

    নাথুরাম বলল–হুজুর, আমি বেশিক্ষণ বিলম্ব করতে পারছি না। আজ বেটা ঘুঘুটাকে ফাঁদ থেকে বের করে আমাদের জম্বুর বনের গুহায় নিয়ে যাব।

    মুরাদ প্রশ্ন করল-কার কথা বলছ, ডিটেকটিভ শঙ্কর রাওয়ের কথা বলছো?

    হ্যাঁ, তাকে আর এখানে-মানে এই শহরের বাড়িতে রাখা ঠিক নয়। লোকটা অত্যন্ত ধূর্ত, কোনক্রমে যদি বেরুতে পারে, তাহলে আর আমাদের রক্ষা থাকবে না।

    মনিরা নিশ্চুপ সবই শুনে যাচ্ছিলো। সে এখন তাহলে শহরের কোনো গোপন বাড়িতে বন্দী রয়েছে। মি. রাও তিনিও তাহলে বন্দী এবং এই বাড়িতেই কোন কক্ষে তাঁকে আটক করে রাখা হয়েছে। মনিরার মনে একটু সাহস হয়। সে তাহলে শহরের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু জন্ধুর বন তা আবার কোথায়! মি. রাওকে তাহলে জম্বুর বনে নিয়ে যাওয়া হবে। মনিরার কানে আবার আসে মুরাদের কণ্ঠস্বর….নাথু, মনিরাকেও এখানে রাখা ঠিক হবে না, কারণ এখনও আমি সম্পূর্ণ আরোগ্য হইনি, আমি ঠিকভাবে মনিরাকে দেখাশুনা করতে পারছি না। আরও কিছুদিন আমি মনিরাকে কোথাও গোপন করে রাখতে চাই।

    সেজন্য কোন চিন্তা নেই হুজুর। নাথুরামের অসাধ্য কিছুই নেই। ওকে জম্বুর বনের পাতালপুরীর কক্ষে নিয়ে রাখব।

    মুরাদের ব্যথাহত কণ্ঠস্বর-কিন্তু আমি?

    সেজন্য ভাববেন না হুজুর। আপনার ঘা শুকিয়ে গেলে আপনিও যাবেন সেখানে, কোন অসুবিধাই হবে না আপনার। সুন্দর ঘর, পরিষ্কার বিছানাপত্র সব পাবেন আমার সেই পাতালপুরীর কক্ষে।

    মুরাদ নাথুরামের কথায় খুশি হয়, আনন্দভরা গলায় বলে–সত্যি নাথুরাম তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব! যাবার সময় পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যেও আমার কাছ থেকে।

    মনিরার নাকে পানি প্রবেশ করায় বড় হাঁচি পাচ্ছিল, আর নিজকে সংযত রাখতে পারল না সে, হঠাৎ হচ্চো করে হেঁচে উঠল।

    সঙ্গে সঙ্গে নাথুরাম আর মুরাদের কথা থেমে গেল। নাথুরাম বলল–হুজুর, এবার ওর জ্ঞান ফিরে আসবে, আর কোন চিন্তা নেই। তাহলে একে কবে সরাচ্ছি হুজুর?

    মুরাদের চাপা কণ্ঠ–চুপ! জ্ঞান ফিরে এসেছে, সব জেনে ফেলবে।

    হেসে বলল নাথুরাম-ভয় পাবার কিছু নেই হুজুর, নাথুরামের সেই পাতালপুরীর গোপন কক্ষ কেউ খুঁজে পাবে না একমাত্র যম ছাড়া।

    মুরাদের হাসির শব্দ-ঠিক বলেছ। যেখানে মানুষ প্রবেশ করতে সক্ষম নয়, সেখানে যম কিন্তু অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে।

    হঠাৎ বলে উঠল বুড়ী সতী দেবী-আপনারা যাই বলুন, দস্যু বনহুর কিন্তু যমের চেয়েও ভয়ঙ্কর। সাবধানের মার নেই।

    মনিরা বুড়ীর মুখে বনহুরের নাম শুনে কেমন যেন মুগ্ধ হল। খুশি হল সে। ঠিকই বলেছে বুড়ী। বনহুরের নামে যে মধু মেশানো ছিল, সেই মধু মনিরাকে চাঙ্গা করে তোলে। ভাবে সে ভয় কি, তার মনির রয়েছে। নিশ্চয়ই সে চুপ করে বসে নেই। যেমন করে হোক তাকে খুঁজে বের করবেই। খোদার ওপর অগাধ বিশ্বাস মনিরার, তাই ইজ্জত রক্ষা করবেনই তিনি।

    মনিরা নিশ্চুপ পড়ে থেকেও বুঝতে পারল, নাথুরামের কানে কি যেন গোপনে বলল মুরাদ। নাথুরাম উঠে দাঁড়াল, তারপর বেরিয়ে গেল।

    মুরাদ এবার সতাঁকে লক্ষ্য করে বলল–এর ভিজে কাপড় পাল্টে দাও। বেশ করে চুলগুলো আঁচড়ে দেবে। ভালমত জ্ঞান ফিরলে খাবার এনে দিও, বুঝেছ?

    আপনার অত বুঝাতে হবে না বাবু, আমি সব ঠিক করে নেব।

    মুরাদ মনিরার মাথা কোল থেকে নামিয়ে রাখল, তারপর পিঠের আর হাঁটুর নিচে হাতে দিয়ে তুলে পাশের খাটে শুইয়ে দিল। মনিরা স্তব্দ নিঃশ্বাসে চুপ করে রইল।

    মুরাদ ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আর একবার বুড়ীকে তার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

    এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো মনিরা। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিল। যাক উপস্থিত বিপদ থেকে তবু রক্ষা পেল। কিন্তু এর চেয়ে আরও কঠিন বিপদ এগিয়ে আসছে তার জন্য। এত সহজেই তার নেতিয়ে পড়াও ঠিক হবে না-আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে বাঁচতে।

    ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল মনিরা, একটু পানি দাও।

    বুড়ী তাড়াতাড়ি পাশের একটি কলস থেকে গেলাসে পানি ঢেলে মনিরার মুখে তুলে ধরে বলল–খাও।

    মনিরা আস্তে আস্তে উঠে বসল, তারপর এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু খেয়ে খালি গেলাসটা ফিরিয়ে দিল বুড়ীর হাতে।

    বুড়ী সতী হেসে বলল–এইতো ভালো হয়ে গেছ। এতক্ষণ বেচারা মুরাদ সাহেব কত কি করলেন। এখন ভালো বোধ করছ তো?

    হাঁ, কিন্তু মাথাটা বোঁ বোঁ করছে, চোখে অন্ধকার দেখছি।

    আজ কদিনের মধ্যে মুখে কিছু দিয়েছ, অমন হবে না? দাঁড়াও তোমার জন্য খাবার আনতে বলি।

    বেশ, বল।

    বুড়ী দরজার কাছে গিয়ে শিস দিল। সেকি কাণ্ড, মনিরা অবাক হলো। বুড়ীর দাঁত নেই তবু শিস দেবার ঢং দেখে রাগও হল, হাসিও পেল তার।

    অমনি একজন দারোয়ান গোছের লোক এসে বুড়ীকে সালাম করে দাঁড়ালো। বুড়ী বললো–এই, শিগগির কিছু খাবার নিয়ে এসো, মেম সাহেব খাবেন।

    লোকটা বুড়ীর কাঁধের উপর দিয়ে একবার মনিরার দিকে তাকিয়ে চলে গেল।

    বুড়ী এসে বসল মনিরার পাশে।

    মনিরা বলল–সতী দিদি, তুমি এদের ঝি, তাই না?

    ছিঃ ছিঃ কি যে বল, আমি–আমি হলাম কিনা-ঐ তো সেদিন বলেছি তোমাকে।

    হাঁ, ভুলেই গিয়েছিলাম, তুমি এদের সতী দিদি। আচ্ছা লক্ষী দিদি, এই বনটা শহর ছেড়ে কতদূর?

    হেসে উঠলো বুড়ী সতী দেবী, বলল–কে বলে এটা বন? এটা বাড়ি, চোখে দেখতে পাওনা?

    বাড়ি তো দেখছি, কিন্তু কোথায়-শহরে না বনে?

    শহরে গো শহরে। কিন্তু মুরাদ সাহেব তোমাকে আজ অন্য জায়গায় চালান করবে।

    কেন?

    সে সব আমি কি জানি?

    সতী দিদি, বল না কোথায় চালান করবে?

    বললাম তো আমি জানি না।

    এমন সময় দরজা খুলে যায়, সেই দারোয়ান গোছের লোকটা থালায় খাবার নিয়ে হাজির হয়। খাবার রেখে চলে যায় সে।

    মনিরা কাপড়খানা পাল্টে কিছু খাবার মুখে তুলে দেয়। অনেক দিন পর আজ ভাল করে চুল বাঁধে সে। বুড়ী আজ খুব খুশি। মনিরা চুল বাঁধতে বাঁধতে বলে–আচ্ছা সতী দিদি, ওকে কেমন করে চিনলে?

    কাকে লো?

    ঐ যে তাকে?

    তোমার সেই দস্যুটা?

    হ্যাঁ।

    ও বাবা, তাকে চিনব না, এ শহরের কে না চেনে তাকে?

    তুমি তাকে দেখেছ কোনোদিন?

    দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বলে সতী-ও কথা বল না। দস্যু বনহুরকে দেখতে চাই না বাবা!

    কেন?

    সে নাকি যমের মত দেখতে।

    খুব ভয়ঙ্কর, না?

    তা তুমিই ভালো জানে, সে তোমাকে ভালবাসে।

    কে বলল এ কথা তোমাকে সতী দিদি?

    নাথু বলেছে।

    কি বলেছে সতী দিদি, বল না?

    ও! ঐসব আবার শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি?

    খুব!

    বলেছিল সে, দস্যু তোমাকে নাকি পিয়ার করে, ভাল বাসে, আমি যেন তোমার ওপর খুব কড়া নজর রাখি। আচ্ছা মেয়ে, তোমার কি আর কাজ ছিল না, একটা কুৎসিত লোককে ভালবাসতে গিয়েছিলে?

    কে বলল আমি তাকে ভালবাসি?

    জানি, সব বলেছে নাথু আমাকে। তুমি দস্যু বনহুরকে অনেক ভালবাস। আচ্ছা, আমাদের মুরাদ সাহেবকে ভালবাসতে পার না।

    আনমনা হয়ে যায় মনিরা। বনহুরের সুন্দর মুখখানা স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে তার চোখের সামনে।

    বুড়ী হেসে বলে–ওকে মনে পড়েছে বুঝি? ছিঃ দেখতে অমন বিদঘুঁটে লোককে আবার মনে পড়ে? ওর চেয়ে মুরাদ সাহেব কত সুন্দর-যেন যুবরাজ। ওগো, তোমার সেই কুৎসিত লোকটা কেমন দেখতে?

    আমার বনহুর?

    হ্যাঁ গো হ্যাঁ।

    তোমার নাথুর চেয়ে খারাপ দেখতে।

    গালে হাত দেয় বুড়ী–সে কি গো, এমন তোমার চেহারা আর তুমি কিনা… ছিঃ ছিঃ ছিঃ, তার চেয়ে মুরাদ সাহেবকে স্বামী করে নাও, কোন বালাই থাকবে না।

    তাই করে নেব সতী দিদি, তাই করে নেব।

    সত্যি!

    হ্যাঁ। কিন্তু আমি যা বলব তাই করবে? কতদিন একটু আলো-বাতাসের মুখ দেখি না। তুমি আমাকে বাইরে নিয়ে যাবে?

    বাইরে! সর্বনাশ, ঐ কাজটা আমার দ্বারা হবে না। বুঝেছি পালাবে তুমি!

    ছিঃ ছিঃ ছিঃ, পালাব আমি-ক খনও না। তোমাদের মুরাদ সাহেবের মত সুন্দর-সুপুরুষ লোক থাকতে আমি যাব বনহুরের মত একটি কুৎসিত লোকের কাছে? আরে থু! সত্যি দিদি, তুমি কত সুন্দর।

    নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে গর্বের হাসি হাসে বুড়ী, বলে– বয়সকালে যা রূপ ছিল, কী বলব তোমাকে।

    তা তো দেখতেই পাচ্ছি। না হলে কি আর নাথুরামের মত মানুষ তোমাকে নিয়ে ভুলেছে?

    তা সত্যি, ওর জন্যই তো স্বামীর ঘর ছেড়েছি। জোয়ানকালে ওর কি কম রূপ ছিল!

    তা দেখতেই পাচ্ছি। সুপুরুষ বটে–সত্যি দিদি, তোমার চোখের তারিফ না করে পারি না। কিন্তু দিদি, তুমি আমাকে একটু বাইরে নিয়ে চল না।

    মনিরার কথা শেষ হয় না, কক্ষে প্রবেশ করে নাথুরাম আর অন্য এক লোক। নাথু দাঁত বের করে কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে-তা আর হচ্ছে না সুন্দরী, বাইরের আলো বাতাস দেখার ভাগ্য হবে যেদিন তুমি মুরাদ সাহেবের গলায় মালা দেবে।

    মনিরার মুখমণ্ডল পাংশুবর্ণ হয়ে ওঠে। তবু গলায় জোর দিয়ে বলে–শয়তান! ভেবেছ তুমি বাঁচবে। কিন্তু মনে রেখ, তুমিও মরবে।

    অট্টহাসি হেসে ওঠে নাথুরাম–আমাকে সতী পাওনি যে, ভয় দেখিয়ে কাবু করবে। এমন কোন বীরপুরুষ নেই যে আমাকে মারতে পারে। তোমার বনহুরকে আমি পুতুল নাচ নাচাতে পারি, জান সুন্দরী?

    মনিরা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নাথুরাম তার পূর্বেই সঙ্গীটিকে ইংগিত করলো।

    সতী অবশ্য মনিরার ওপর কিছুটা সদয় হয়ে এসেছিল, হয়তো বাইরে যাবার সুযোগ পেত সে ওর সহায়তায়, কিন্তু সব নস্যাৎ হয়ে গেল। পালাবার একটা ক্ষীণ আশা এতক্ষণ যা মনিরার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল, সমূলে তা মুছে গেল। পাথরের মূর্তির মত স্থির দাঁড়িয়ে রইলো মনিরা।

    নাথুর ইংগিতে তার সঙ্গীটা ভয়ঙ্কর চোখদুটি মেলে একবার মনিরার দিকে তাকাল, তারপর কোমরের ভেতর হতে একটা ময়লা রুমাল বের করে এগিয়ে গেল মনিরার পাশে।

    ভয়ে মনিরার হৃদকম্প শুরু হলো, শিউরে উঠলো সে। নিশ্চয়ই ঐ ময়লা রুমালখানায় ঔষুধ মাখানো রয়েছে। এখান থেকে তাকে সরানোর পূর্বে অজ্ঞান করা হবে, বুঝতে পারে মনিরা। কিন্তু কি উপায় আছে-বাঁচার কোনো পথ নেই। সে নারী-দুর্বল, অসহায়। লোকটার সঙ্গে পেরে ওঠা তার পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া নাথুরামের ভয়ঙ্কর কঠিন বলিষ্ঠ বাহু দুটির দিকে তাকিয়ে মনিরা স্তব্দ হয়ে যায়।

    নাথুরাম পুনরায় ইঙ্গিত করল, লোকটা মনিরার নাকের ওপর রুমালখানা চেপে ধরলো।

    মনিরা দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজিকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করলো কিন্তু পারল না সে। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে এলো তার দেহটা। তারপর ওর আর কিছু মনে রইল না।

  • দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    বনহুরের আদেশে রহমান তার সমস্ত অনুচরকে ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিল। চৌধুরী মাহমুদ খান সাহেবের কন্যা মনিরাকে খুঁজে বের করতেই হবে। যে তাকে খুঁজে বের। করতে সক্ষম হবে, সে সর্দারের অত্যন্ত প্রিয় হবে এবং তাকে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

    বনহুরের অনুচরগণ কথাটা শুনে খুশিতে আত্মহারা হল। তেমনি অবাকও হলো তারা। চৌধুরী মাহমুদ খানের কন্যার জন্য আমাদের সর্দারের এত চিন্তা কেন? কথাটা তাদের মনে অনেক রকম প্রশ্ন জাগাল, কিন্তু কেউ সমাধান খুঁজে পেল না।

    নূরীও কথাটা শুনে অবাক হলো। ধনবান চৌধুরী মাহমুদ খানের নাম সে অনেক শুনেছে। বনহুরের আংগুলে এখন চৌধুরী কন্যা মনিরার হাতের আংটি শোভা পাচ্ছে। বনহুর নূরীকে না। দিয়েছে এমন কিছুই নেই, কিন্তু ঐ আংটিটি আজও বনহুর তাকে দিল না। আংটি সম্বন্ধে নূরীও সে জন্য আর কোন কথা বলেনি, যদিও একদিন এই আংটি সম্বন্ধে তার অনেক কৌতূহল ছিল। আজ আবার সেই আংটির কথা স্মরণ হলো তার। তবে কি এর পেছনে কোন রহস্য আছে? নূরী। লক্ষ্য করেছে-বনহুর মাঝে মাঝে নির্জনে বসে এই আংটির দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার পদশব্দে চমকে উঠতো, সজাগ হয়ে ফিরে তাকাত নূরীর দিকে।

    নূরী কিছু জিজ্ঞাসা করলে হেসে বলতো কিছু না। ।

    এর বেশি কোন দিন কিছু জানতে পারেনি নূরী। আজ সেই চৌধুরী কন্যার জন্য বনহুরের এত মাথাব্যথা কেন?

    বনহুর শিকারীর ড্রেসে সেই যে বেরিয়ে গেছে এখন সন্ধ্যা হয়ে এলো, তবু ফিরে এলো না। নূরী অস্থিরচিত্তে এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা করছে–কখন ফিরে আসবে বনহুর।

    ক্রমে রাত বেড়ে আসছেনূরী দুশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় উন্মাদিনীর ন্যায় হয়ে পড়ে। সবচেয়ে তার আপনজন বনহুর–তার ধ্যান-জ্ঞান স্বপ্ন-সাধনা সব। বনহুরকে নূরী নিজের জীবন অপেক্ষা বেশি ভালবাসে।

    এক সময় নূরী রহমানের খোঁজে বনহুরের গোপন দরবার কক্ষের দিকে এগুলো হয়তো রহমান সেখানেই রয়েছে। কিন্তু নূরী আশ্চর্য হলো-দরবারকক্ষের আশে পাশে আজ কেউ নেই। শুধু দু’জন রাইফেলধারী দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। তাদের কোন প্রশ্ন করা নিরর্থক, কারণ তারা এসবের কিছুই জানে না। নূরী বিমর্ষ মনে ফিরে এলো নিজের কক্ষে। কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে তার মন টিকলো না। আবার ছুটে গেল সে বনহুরের কক্ষে। ওর শূন্য বিছানায় বসে চোখের পানি ফেলল। বনহুরের রিভলবার খান বুকে চেপে ধরে ওর স্পর্শ অনুভব করতে চাইল।

    এমন সময় নূরীর কানে তাজের খুড়ের শব্দ এসে পৌঁছলো নিশ্চয়ই বনহুর ফিরে এসেছে। সে দ্রুত ছুটলো বাইরে।

    ক্রমে অশ্বপদশব্দ নিকটবর্তী হচ্ছে। নূরী উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল বনহুরের।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই তাজের পিঠে বনহুর এসে পৌঁছল। সঙ্গে সঙ্গে নূরী হাত বাড়িয়ে তাজের লাগাম চেপে ধরল। বনহুর ততক্ষণে নেমে দাঁড়িয়েছে।

    বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে নূরী চট করে কিছু বলতে পারল না। আজ তার কেমন যেন এক উন্মত্ত চেহারা। নূরীর সঙ্গে কোন কথা না বলেই বনহুর এগুলো দরবারকক্ষের দিকে। নূরী তাকে নীরবে অনুসরণ করল।

    দরবারকক্ষের দরজায় পৌঁছে মেঝের এক স্থানে পা দিয়ে চাপ দিল বনহুর সঙ্গে সঙ্গে দু’টি লোক ছুটে এলো–সর্দার! কুর্ণিশ করে দাঁড়াল তারা।

    বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলো–রহমান ফিরে এসেছে?

    লোক দুটির একজন জবাব দিল–না সর্দার, তারা কেউ এখনও ফিরে আসেনি।

    এলেই তাকে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করতে বলবে–যাও। বনহুর কথাটা বলে বিশ্রামকক্ষের দিকে এগুলো।

    নূরী নিশ্চুপ তাকিয়ে দেখছে।

    বনহুর যখন বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করলো তখন নূরী তার পাশে যাবে কিনা ভাবছে। মনকে সে কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না। আবার ভয়ও হচ্ছে-হঠাৎ যদি বনহুর তাকে কিছু বলে বসে। নূরী তবু কক্ষে প্রবেশ করলো।

    বনহুর কক্ষে পায়চারী করছে।

    নূরী একপাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো–হুর, আজ তোমার কি হয়েছে?

    বনহুর পায়চারী বন্ধ করে ফিরে তাকালো নূরীর দিকে, তারপর শয্যায় গিয়ে বসলো।

    নূরীঃ গিয়ে বসল তার পাশে। এমনি কতদিন বনহুর নানা কারণে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে– নূরী দিয়েছে সান্ত্বনা, মিষ্টি হাসিতে তার মনের দুশ্চিন্তা দূর করার চেষ্টা করেছে সে। আজও হেসে নূরী বলে–হুর, কি হয়েছে তোমার, বল না?

    বনহুর স্থির দৃষ্টি মেলে তাকাল নূরীর দিকে, তারপর বলল–আমার একটি জিনিস হারিয়ে গেছে।

    জিনিস হারিয়ে গেছে?

    ঠিক হারিয়ে নয়, চুরি গেছে।

    চুরি গেছে! কি এমন মূল্যবান জিনিস যার জন্য তুমি এত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছ হুর?

    সে তুমি বুঝবে না নূরী।

    হুর, তোমার মনের ব্যথা আমি সব বুঝি। এই সামান্য কথা আমি বুঝি না। কি এমন জিনিস হারিয়েছে, যার জন্য তুমি লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছো?

    কে বললো আমি লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছি?

    নূরী কোন জবাব দিল না, কারণ সে সব শুনেছে। বনহুর যে চৌধুরী কন্যার জন্য আজ উন্মাদের মত হয়ে পড়েছে, এ কথা বনহুর তাকে না বললেও অনুমানে বুঝতে পেরেছে নূরী। মনের মধ্যে তার একটা জ্বালা ধরে গেছে। সে ভাবতেও পারে না তার হুর আর কোন নারীকে ভালবাসতে পারে।

    একটা ঢোক গিলে জবাব দেয় নূরী, সত্য কোনদিন গোপন থাকে না হুর, চৌধুরী কন্যার জন্য তোমার এত দরদ কেন বলতো?

    বনহুর স্তব্ধ চোখে তাকাল নূরীর দিকে। নিঃশ্বাস যেন দ্রুত বইছে ওর। দু’চোখে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে।

    নূরী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে–তুমি কিছু না বললেও আমি সব শুনেছি, সব জানি। চৌধুরীকন্যার জন্যই আজ তুমি উন্মাদ। তোমার সেই মূল্যবান হারিয়ে যাওয়া জিনিসটি অন্য কিছু নয় সেই যুবতী।

    বনহুর নিশ্চুপ শুনে যাচ্ছে নূরীর কথাগুলো।

    নূরী আজ আর থামতে চায় না, ক্ষিপ্তের ন্যায় বলে চলে, হুর তুমি না দস্যু? দস্যু হয়ে একটা যুবতীর প্রেমে…।

    চিৎকার করে ওঠে বনহুর–নূরী।

    তুমি আমাকে ক্ষান্ত করতে পারবে না হুর। আমার গলা ছিঁড়ে ফেললেও আমার কণ্ঠ স্তব্ধ হবে না। না না, আমি তোমাকে কিছুতেই অন্য কোন নারীকে ভালবাসতে দেব না..নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে-কিছুতেই না। আমি সব সহ্য করতে পারবো হুর, কিন্তু তোমাকে হারানোর ব্যথা সহ্য করতে পারব না। আমি তোমাকে প্রাণের চেয়েও ভালবাসি।

    বনহুর গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলো পাশের দেয়ালে। নূরী তার বুকে মুখ লুকিয়ে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠল–হুর, তুমিই যে আমার জীবনের সব।

    এমন সময় বাইরে পদশব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই ভেসে এলো রহমানের কণ্ঠস্বর–সর্দার।

    নূরী তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে সরে দাঁড়াল।

    বনহুর আজ রহমানকে তার কক্ষে প্রবেশ করার আদেশ না দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল, নূরীর কানে পৌঁছল বনহুরের কণ্ঠস্বর–চলো।

    রহমান আর বনহুরের পদশব্দ মিলিয়ে যেতেই নূরী বেরিয়ে এলো, অন্ধকারে তাকিয়ে দেখলো-দু’টি ছায়ামূর্তি ওদিকে বেরিয়ে যাচ্ছে। নূরী বঝুতে পারলো, বনহুর তার সামনে এ সম্বন্ধে কোন আলোচনা করতে চায় না। তাই সরে যাচ্ছে দূরে। কিন্তু নূরীও কম মেয়ে নয়–যেমন করে হউক সেও শুনবে, রহমান কি খবর এনেছে।

    অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলল নূরী, অন্ধকারে একটা খামের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।

    বনহুর আর রহমান দরবার কক্ষের দিকে না গিয়ে সামনে একটা গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়াল।

    নূরীও হামাগুড়ি দিয়ে ঝোঁপের আড়ালে এসে লুকিয়ে পড়ল।

    বনহুর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলো–রহমান, তুমি নিজেও বেরিয়েছিলে?

    হ্যাঁ সর্দার।

    কোন সন্ধান পেলে না?

    না, আজ সারাটা দিন গোটা শহর চষে বেড়িয়েছি।

    শহরময় চষে বেড়ালেই তাকে পাওয়া যাবে না রহমান। এমন কোন গোপন স্থানে তাকে আটকে রাখা হয়েছে, যেখানে কেউ তার সন্ধান পাবে না।

    সর্দার, আমি ঝাড়ুদারের বেশে অনেক অন্দরবাড়িতেও প্রবেশ করি। গিয়েছি হোটেলে, ক্লাবে দোকানে কিন্তু কোন আভাসই পেলাম না।

    তোমার সঙ্গীরা সবাই ফিরে এসেছে?

    অনেকে এসেছে-অনেকে আসেনি। কেউ কোন সন্ধান বলতে পারছে না। ওদের ডাকব?

    না, আমার কাছে ডেকে কোন লাভ নেই। হ্যাঁ, আমিও তাকে অনেক খুঁজলাম-তুমি গিয়েছিলে ঝাড়ুদারের বেশে আর আমি গিয়েছিলাম শিকারীর বেশে।

    সে আমি দেখতেই পাচ্ছি সর্দার।

    তুমি ঘুরেছ অন্দরবাড়ি, হোটেলে, ক্লাবে আর দোকানে।

    আমি ঘুরেছি বন থেকে বনান্তরে। গহন বনের অন্তরালে পর্বতের প্রত্যেকটা গুহায়। তবু তার সন্ধান পেলাম না।

    সর্দার, আপনি বড় ক্লান্ত।

    শুধু আমি নই রহমান, তাজের পরিশ্রম আমার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। ওর সেবার জন্য করিমকে বলে দাও।

    নূরী আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। চৌধুরীকন্যার জন্য বনহুরের ব্যাকুলতা তার হৃদয়কে খান খান করে দেয়। নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে সে।

    বনহুর বলে–রহমান, অল্পক্ষণের মধ্যে আবার বেরুবো, তুমি আমার গাড়ি বড় রাস্তায় তৈরি রাখতে বল।

    আবার এক্ষুণি বের হবেন?

    হ্যাঁ। যতক্ষণ তার সন্ধান খুঁজে না পাব, ততক্ষণ আমার বিশ্রাম নেই।

    নূরী এবার বুঝতে পারে বনহুর হঠাৎ আজ এমন শিকারীর বেশে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে কোথায় গিয়েছিল? সব পরিস্কার হয়ে যায় আজ তার কাছে।

    বনহুর কক্ষে ফিরে আসে। এবার সে সুন্দর, এক সাহেবের বেশে সজ্জিত হয়। গায়ে দামী সুট, মাথায় ইংলিশ ক্যাপ, হাতে দামী সিগারেট।

    নূরী আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। এই ড্রেসে বনহুরকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। এখন কেউ তাকে দেখলে বুঝতে পারবে না সে বাঙালি। ঠিক সাহেবের মতই মনে হলো তার চেহারা।

    নূরী কিন্তু নিশ্চুপ রইল না। সে বনহুরের ড্রাইভারের বেশে সেজে আয়নার সামনে এসে। দাঁড়ালো। নিজকে নিজেই চিনতে পারে না নূরী। সত্যি আজ তার ছদ্মবেশ স্বার্থক হয়েছে।

    বনহুর কক্ষ ত্যাগ করার পূর্বেই নূরী রহমানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

    রহমান আশ্চর্যকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো– মকসুদ, তুমি এখনো গাড়িতে যাওনি? সর্দারের আদেশ পালন করনি তুমি?

    নূরী চাপাকণ্ঠে বললো–রহমান, আমি নূরী।

    সে কি, তুমি।

    হ্যাঁ, আমি আজ হুরের গাড়ি ড্রাইভ করে নিয়ে যাব।

    এত রাত-বিরাতে গাড়ি চালাতে পারবে, তুমি?

    পারবো। তুমি তো জানোই, আমি খুব ভাল মোটর ড্রাইভিং শিখেছি।

    কিন্তু সর্দার যদি জানতে পারে?

    সে ভয় তোমার নেই। তুমি শুধু আমাকে গাড়িতে নিয়ে পৌঁছে দাও।

    নূরী, এটা কি ঠিক হবে?

    যা হয় হবে, তুমি একটা অশ্ব আমার জন্য দাও।

    রহমান একজন অনুচরকে ডেকে বললো একটা অশ্ব সেখানে নিয়ে আসতে।

    নূরী যখন গাড়িতে পৌঁছল তখন ড্রাইভার আশ্চর্য হলো, বললো–কে তুমি?

    রহমান নূরীকে পৌঁছে দেবার জন্য গিয়েছিল-সে–ই সব কথা খুলে বললো, তারপর ড্রাইভারকে সরিয়ে নিল।

    নূরী ড্রাইভার আসনে চেপে বসতেই তাজের পিঠে বনহুর এসে পৌঁছল।

    বনহুরকে দেখতে পেয়েই রহমান আসল ড্রাইভারকে একটা ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ার জন্য ইংগিত করল। ড্রাইভার রহমানের কথামত আত্মগোপন করল।

    রহমান তাজের লাগাম চেপে ধরে বললো–সর্দার, তাজকে কি আবার পাঠাবো?

    না, তাজ আজ বিশ্রাম করবে।

    ততক্ষণে ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছে।

    বনহুর ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলল–নাইট ক্লাবে চলো।

    নূরী একদিন বনহুরের সঙ্গে নাইট ক্লাব দেখার জন্য এসেছিল অবশ্য ভেতরে প্রবেশ করেনি। আজ সেদিনের আসরে স্বার্থকতা উপলব্ধি করে। ভাগ্যিস সেদিন এসেছিল সে। তার নাইট ক্লাবের পথটা চিনতে কষ্ট হয় না।

    বনহুর পেছন আসনে বসে সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে। বনহুরের পরিত্যাক্ত ধুম্রকুন্ডগুলো ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে ড্রাইভারের চোখে মুখে এসে ঝাঁপটা দিচ্ছিলো। ড্রাইভার নিপ গাড়ি চালিয়ে চলেছে।

    রাত তখন দশটা বেজে গেছে। শীতের রাত-শহরের পথঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি তাদের গাড়ির পাশ কেটে চলে যাচ্ছে। ড্রাইভার সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছে। সে তো আর দক্ষ ড্রাইভার নয়। তবু গাড়ি চালনায় কোন ভুল হচ্ছে না তার।

    গাড়িখানা এক সময় নাইট ক্লাবে এসে থেমে পড়লো।

    বনহুর একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো।

    ড্রাইভার তার পূর্বেই ড্রাইভ আসন থেমে নেমে গাড়ির দরজা খুলে ধরেছিল। বনহুর নেমে যেতেই সে গাড়ির দরজা বন্ধ করে গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। এমন স্থানে দাঁড়াল সে, যেখান থেকে ক্লাবের গোটা অংশ নজরে পড়ে।

    ক্লাবের ভেতর থেকে তখন একটা ইংলিশ গানের সুর ভেসে আসছে। আর ভেসে আসছে। হাসি আর বোতলের ঠন ঠন শব্দ।

    বনহুর ক্লাবে প্রবেশ করতেই তাদের গাড়ির পাশে আর এক খানা গাড়ি এসে থেমে পড়ল। গাড়ি থেকে নামলেন দুজন ভদ্রলোক যদিও তাঁদের শরীরে স্বাভাবিক সট কিন্তু আসলে তাঁরা পুলিশের লোক-একজন মি. হারুন, অন্যজন মি. হোসেন। তাঁরাও ক্লাবে প্রবেশ করলেন।

    নূরী ড্রাইভারের বেশে সব লক্ষ্য করছে। শুধু বনহুরই তার লক্ষ্য নয়, সেও অনুসন্ধান করে দেখছে চৌধুরী কন্যার খোঁজ সে পায় কিনা।

    মি. হারুন আর মি. হোসেনের গতিবিধি নূরীর কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হয়। সে গোপনে ওদের দু’জনকে অনুসরণ করে। ক্লাবের একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলো নূরী। ক্লাবের মধ্যে কোনদিন সে প্রবেশ করেনি-অবাক হয়ে সব দেখছে। ক্লাবে এদের দেখে নূরীর চোখে ধাঁধা লেগে যায়। এখানে নারী পুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। গায়ে পড়ে ঢলাঢলি হাসাহাসি করছে। কি সব খাচ্ছে। কোথাও বা জুয়ার আড্ডা বসেছে। ওদিকে কতকগুলো মেয়ে পুরুষ এক সঙ্গে নাচছে। নূরীর মনে পড়লো, বনহুর তাকে একদিন বলেছিল ক্লাবে মেয়ে পুরুষ মিলে বলড্যান্স হয় বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখে নূরী সব।

    কিন্তু হুর কোথায়, তাকে তো দেখা যাচ্ছে না।

    যে লোক দুটির অনুসরণ করে নূরী ক্লাবে প্রবেশ করেছে, তারা ওদিকের একটা টেবিলের পাশে দু’খানা চেয়ারে বসেছেন। চার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছেন তাঁরা।

    বয় দুটো প্লেটে করে কি রেখে গেল। খেতে খেতে চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন ওরা।

    নূরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে বনহুরের অনুসন্ধান করছে। হঠাৎ তার নজর পড়লো ওদিকের একটা পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এলো বনহুর। তার পাশে একটি যুবতী। বনহুরের সঙ্গে কিছু আলাপ করছে। সে। বনহুর এগুতেই যুবতী ওর দক্ষিণ হাত ধরে বসিয়ে দিল খালি একটা চেয়ারে। তারপর টেবিলস্থ বোতল থেকে খানিকটা তরল পদার্থ ঢেলে বনহুরের দিকে এগিয়ে ধরলো।

    শিউরে উঠলো নূরী। বাঁকা চোখে একবার তাকাল-সত্যই কি হুর এ তরল পদার্থ গলধঃকরণ করবে।

    বনহুর যুবতীর হাত থেকে কাঁচপাত্রটা নিল। নূরীর হৃদয়ে প্রচণ্ড একটা হাতুড়ির ঘা পড়লো। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে সে তাকিয়ে আছে। বনহুর দস্যু-ডাকু কিন্তু মাতাল নয়। আজ থেকে সে মাতাল হবে? চৌধুরী কন্যাকে ভুলবার জন্য সে মদ খাবে অসম্ভব।

    বনহুর কাঁচপাত্রটা মুখের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। এইবার সে ঠোঁটে চেপে ধরবে-হঠাৎ নূরী দেখল তার হাত থেকে পাত্রটা মাটিতে পড়ে সশদে ভেঙে গেল।

    নূরীর মুখমণ্ডল উজ্জল দীপ্ত হলো। খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাল সে।

    সেই মুহূর্তে যুবতী নাচতে শুরু করল বনহুরের সামনে নাচছে সে। বনহুরের দৃষ্টি চক্রাকারে ক্লাবের প্রতিটি লোকের মুখে ঘুরপাক খেয়ে ফিরছে।

    হঠাৎ বনহুরকে উত্তেজিত মনে হলো যুবতী তখনও নেচে চলেছে। বনহুরের দৃষ্টি ও পাশে কয়েকটি লোকের ওপর সীমাবদ্ধ যারা এতক্ষণ গোল টেবিলটা জুড়ে জুয়ার আড্ডা দিচ্ছিল।

    নূরীও তাকালো লোকগুলোর দিকে।

    দেখতে পেল-কয়েকজন ভীষণ চেহারার লোক একটা যুবককে পাকড়াও করেছে। একজন বলিষ্ঠ লোক যুবকের জামার কলার চেপে ধরেছে।

    মারামারি বাঁধবার পূর্বলক্ষণ।

    এক মুহূর্ত বিলম্ব হলো না, ভীষণ ধস্তাধস্তি শুরু হলো, সারা কক্ষে একটা হট্টগোল ছড়িয়ে পড়ল।

    ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে বনহুর। দ্রুত পদক্ষেপে এগুলো সে ঐখানে। যুবতী বনহুরের সামনে গিয়ে পথ আগলে বাধা দিল, কিন্তু বনহুর তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল। কোন। রকম দ্বিধা না করে একজনের নাকের ওপর প্রচণ্ড ঘুষি লাগাল।

    গুন্ডাগোছের লোকগুলো এবার যুবকটাকে ছেড়ে আক্রমণ করল বনহুরকে। সবাই মিলে। একসঙ্গে বনহুরের সঙ্গে লড়াই লেগে পড়ল।

    নূরীর মুখ বিষণ্ণ হলো। হঠাৎ এমন অবস্থার জন্য সে ভীষণ ঘাবড়ে গেল। বনহুরের অমঙ্গল আশঙ্কায় আশংকিত হলো সে।

    ততক্ষণে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে গেছে কিন্তু বনহুরের সঙ্গে পেরে ওঠা সহজ ব্যাপার নয়। ওরা অন্ততপক্ষে সাত আটজনের বেশি হবে–আর বনহুর একা কিন্তু অল্পক্ষণে বনহুর সকলকে। পরাজিত করে ফেলল। কে কোনদিকে পালাবে পথ খুঁজছে এমন সময় মি. হারুন এবং মি. হোসেন রিভলবার হাতে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মি. হারুন বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলেন, খবরদার, নড়েছ কি মরেছ।

    গুণ্ডালোকগুলো হাত তুলে দাঁড়াল।

    মি. হারুন বাঁশি বাজালেন, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ ক্লাবে প্রবেশ করে গুন্ডা লোকগুলোর হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দিল।

    এবার মি. হারুন এবং মি. হোসেন নিজেদের পরিচয় দিয়ে বনহুরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। তাঁরা বারবার ধন্যবাদ জানালেন তাকে।

    অবশ্য পরিচয় দেবার পূর্বেই মি. হারুন এবং মি. হোসেনকে চিনতে পেরেছিল বনহুর। সেও হেসে তাদের অভিনন্দন জানালো। মি. হারুন বলেন–আপনার পরিচয়?

    বনহুর কিছুমাত্র না ভেবে চট করে জবাব দিল-আমি বিদেশী ব্যবসায়ী। আমার নাম মি.। প্রিন্স।

    মি. হারুন খুশি হয়ে বলেন–আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ মি. প্রিন্স। নামের সঙ্গে আপনার চেহারার মিল রয়েছে। আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ায় অনেক খুশি হয়েছি।

    মি. হোসেনও আনন্দ প্রকাশ করলেন।

    ততক্ষণে গুণ্ডা লোকগুলোকে পুলিশ পাকড়াও করে পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নিয়েছে।

    মি. হোসেন বলেন–মি. হারুন, আমার সন্দেহ হয়, এরা নিশ্চয়ই দস্যু বনহুরের অনুচর।

    মি. হোসেন বললেন–এ রকম সন্দেহের কারণ?

    দেখলেন না লোকগুলোর চেহারা ঠিক ডাকাতের মত?

    বনহুর শুনে নীরবে হাসলো।

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন বেরিয়ে যেতেই বনহুর যুবকটার পাশে এসে দাঁড়ালো গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো সে–আপনার পরিচয়।

    যুবকটার চেহারায় বেশ আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে। উজ্জ্বল দীপ্ত মুখমণ্ডল। বয়স বনহুরের। চেয়ে কম হবে। পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবী। সে হিন্দু তা বেশ বুঝা যাচ্ছে। বনহুরের দিকে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো সে আমার নাম মধু সেন। আমার পিতা মাধবগঞ্জের জমিদার বিনোদ সেন।

    বনহুর হাসলো, তারপর কঠিন কণ্ঠে বললো–আপনি একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির সন্তান, আপনি এসেছেন ক্লাবে, ছিঃ। আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি–খবরদার আর কোনদিন এ। পথ মাড়াবেন না, বুঝেছেন।

    বুঝেছি, সত্যি আপনি না থাকলে আজ…

    যান-বেরিয়ে যান ক্লাব থেকে। কোন কথাই আমি শুনতে চাইনা। আপনাদের মত লোকের। কৃতজ্ঞতাকেও আমি ঘৃণা করি।

    যুবক মধু সেন নতমস্তকে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল।

    বনহুর এবার এগুলো নিজের গাড়ির দিকে।

    ড্রাইভার পূর্বেই ড্রাইভ আসনে বসেছিল।

    বনহুর গাড়িতে চড়ে বসতেই স্টার্ট দেয়। বনহুর বলে লেকের ধারে চলো।

    ড্রাইভার অস্বস্তি বোধ করে। এত রাতে আবার লেকের ধারে কেন? ক্লাবে আসার সখ মিটলো-এবার লেকের ধারে। ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিল।

    গাড়ি ছুটে চলেছে। রাত এখন দুটোর কম হবে না। শির শিরে হিমেল হাওয়ায় ড্রাইভারের শরীরে কাঁপন লাগে, রাগ হয় বনহুরের ওপর-লেকের ধারে কি করতে যাবে সে?

    গাড়িখানা সাঁকোর উপর উঠতেই সহসা তাদের পাশ কেটে বেরিয়ে গেল আর একখানা গাড়ি। বনহুর হঠাৎ ঝুঁকে গাড়ি খানাকে লক্ষ্য করলো। তারপর ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বললো ড্রাইভার যে গাড়িটা আমাদের গাড়িকে পেছনে ফেলে চলে গেলো, ওটাকে ফলো কর।

    নূরী গাড়ি চালাতে জানে, তা বলে খুব দক্ষ ড্রাইভারের মত চালাতে জানে না। বিপদে পড়ল নূরী। তবু সে যতদূর সম্ভব স্পীডে গাড়ি চালাতে শুরু করল।

    বনহুর কি যেন ভাবলো তারপর সে ড্রাইভারের পাশে বসে হ্যাঁন্ডেল চেপে ধরল। অন্য কোনদিকে খেয়াল করার সময় নেই বনহুরের। সামনের গাড়িখানাকে ফলো করতেই হবে। কারণ। গাড়িখানার গতিবিধি তার কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হল।

    ড্রাইভার সরে বসল।

    বনহুর ডবল স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছে। উল্কাবেগে ছুটছে গাড়িখানা।

    সম্মুখস্থ গাড়িখানা তখন বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। বনহুর নাছোড়বান্দা-ঐ গাড়িকে সে ধরবেই।

    পথটা বেশ নির্জন এবং চওড়া। তাছাড়া পথের দু’পাশে লাইটপোষ্ট থাকায় গাড়ি চালাতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না।

    নূরীর মনে কিন্তু খুব ভয় হচ্ছে, না জানি হঠাৎ কোন এক্সিডেন্ট হয়ে বসে। পথের দু’ধারে বাড়িগুলো সাঁসাঁ করে সরে যাচ্ছে। হিমঝরা শীতের রাত-তাই কোন বাড়ির দরজা জানালা খোলা নেই। বাড়িগুলোও যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ঘুম পাড়ছে।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রথম গাড়িখানা বুঝতে পারলো পেছনে গাড়ি তাকে অনুসরণ করছে।

    বনহুর অতি কৌশলে নিজের গাড়িখানাকে সামনের গাড়ির সামনে এনে অবরোধ করে। ফেলল।

    সামনের গাড়িখানা উপায়ান্তর না দেখে ব্রেক করে থামিয়ে ফেলল।

    বনহুর ড্রাইভ আসন থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল।

    ততক্ষণে প্রথম গাড়ির চালকও গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়েছে।

    বনহুরকে সে–ই প্রথম আক্রমণ করল। বনহুর প্রচন্ড এক ঘুষিতে লোকটাকে ধরাশায়ী করল।

    বনহুর তক্ষণি বুঝতে পারলো–যাকে সে এই মুহূর্তে ধরাশায়ী করেছে সে নাথুরাম ছাড়া কেউ নয়। বনহুর একবার যাকে দেখতো তাকে ভুলতো না কোনদিন। নাথুরামকে তো সে কয়েকবার কাবু করেছে। তাই আজও অন্ধকারে অনুমান করে নেয়। বনহুরের রাগ আরও বেড়ে যায় শয়তান নাথুরামই তার মনিরাকে আর একবার নদীপথে নিখোঁজ করতে চেয়েছিল।

    বনহুর ঝাঁপিয়ে পড়লো নাথুরামের ওপর। দু’হাতে ওর টুটি টিপে ধরল।

    কিন্তু নাথুরামকে কাবু করা অত সহজ ব্যাপার নয়। সেও মরিয়া হয়ে বনহুরের গলা চেপে ধরল। আবার শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ।

    নূরী কোনদিন এমনভাবে বনহুরকে তার সামনে যুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখেনি। আজ ক্লাবে গুণ্ডাদের সঙ্গে লড়াই করতে দেখে নূরী স্তম্ভিত হতবাক হয়েছিল। সাত আটজন বলিষ্ঠ লোকের সঙ্গে একা বনহুর-শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো সে। এক্ষণে বনহুর নাথুরামের সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হবে, এ-তো জানেই সে। তবুও সে ভীত হয়ে পড়ছিল। বনহুরের কোন ক্ষতি হয় এই আশংকায় মনে প্রাণে খোদাকে স্মরণ করছিল সে। নূরী তখন গাড়ির পেছন আসনে বসেছিল।

    নাথুরাম আর পেরে উঠছিল না, বনহুরের প্রচন্ড ঘুষিতে তার নাক দিয়ে দর দর করে রক্ত পড়ছিলো। সে তবু মরিয়া হয়ে লড়াই করছিল আর পালাবার পথ খুঁজছিল। শয়তান নাথুরাম হঠাৎ একমুঠো ধুলো তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারলো বনহুরের চোখ লক্ষ্য করে।

    আচমকা চোখে ধুলোবালি এসে পড়ায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো বনহুর সঙ্গে সঙ্গে চোখ রগড়ে তাকাল। ততক্ষণে নাথুরাম বনহুরের দৃষ্টির আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে। বনহুর অন্ধকারে তীক্ষ্ম দৃষ্টি মেলে লক্ষ্য করতে লাগল, শুধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ল না।

    এবার এগিয়ে গেল বনহুর নাথুরামের গাড়ির দিকে। আশা আকাঙ্খায় মনটা তার দুলে উঠলো। হয়তো ঐ গাড়ির মধ্যে মনিরা থাকতে পারে। গাড়ির মধ্যে উঁকি দিয়ে আশ্চর্য হলো বনহুর। একটা লোক হাত পা মুখ বাঁধা অবস্থায় গাড়ির মেঝেতে পড়ে রয়েছে। বনহুর বিলম্ব না করে গাড়ির দরজা খুলে গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। যদিও লোকটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবুও অনুমানে বুঝে নিলো নিশ্চয়ই কোন ভদ্রলোককে শয়তান নাথুরাম বন্দী করে নিয়ে চলেছে।

    বনহুর তাড়াতাড়ি তাঁর হাত পা মুখের বাঁধন খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোকটি উঠে বসলেন, তিনি আনন্দসূচক কণ্ঠে বললেন– কে আপনি? আমাকে বাঁচালেন।

    বনহুর ভদ্রলোকটির গলার আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো এ যে প্রখ্যাত ডিটেকটিভ মি.। শঙ্কর রাওয়ের গলা। সে পকেট থেকে ছোট্ট টর্চলাইটটা জ্বেলে দেখলো তার অনুমান মিথ্যা নয়। শংকর রাওয়ের একি অবস্থা-চোখ বসে গেছে, চুল এলোমেলো, কোট প্যান্ট টাই মলিন-নোংরা।

    বনহুর মুখের দিকে তাকিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন মি. রাও-কে আপনি? আমাকে রক্ষা করলেন? এই জঘন্য অবস্থা থেকে বাঁচালেন?

    বনহুর জবাব দিল–আমি একজন ব্যবসায়ী। আমার নাম মি. প্রিন্স।

    মি. রাও বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা দু’হাত চেপে ধরলেন আপনি আমার জীবন রক্ষা করলেন, আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো মি. প্রিন্স আপনি ….

    থাক, ওসব পরে হবে। এখনও আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ নন। আসুন আমার গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দিই।

    শংকর রাওকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ড্রাইভ আসনে বসে বনহুর তারপর ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলে– ড্রাইভার, তুমি সামনের আসনে এসে বসো।

    নূরী এতক্ষণ নির্বাক পুতুলের মত স্তব্ধ হয়ে বসে বসে দেখছিল। বনহুরের প্রতি একটা অভিমান জমেছিল তার মনে, এক্ষণে তা কোথায় উড়ে গেছে। ড্রাইভারের সঙ্গে বনহুর তো কোনদিন এভাবে কথা বলে না। মনে মনে একটু আশ্চর্য হয় নূরী। পেছন আসন থেকে সামনের আসনে এসে বসে সে।

    মি. শংকর রাওকে নিয়ে বনহুর যখন গাড়িতে স্টার্ট দিল, তখন নাথুরাম মাথা তুলে একবার তাকালো। গাড়িখানা দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলে শরীরের ধুলো ঝেরে উঠে দাঁড়ালো নাথু। তখনো নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে তার। দাঁতে দাঁত পিষে গাড়িখানার দিকে চেয়ে রইলো সে।

    বনহুর গাড়ি চালাতে চালাতে বললো–মি. রাও, আপনি কোথায় যাবেন? অফিসে না বাসায়?

    মি. শংকর রাও অচেনা অজানা মি. প্রিন্সের মুখে তার নাম শুনে আশ্চর্য হলেন। বিস্ময়ভরা। কণ্ঠে বলেন–বাসায় যাব। ক্ষুধায় আমার অবস্থা শোচনীয়। আজ এক সপ্তাহের মধ্যে পানি ছাড়া। আর কিছু আমার ভাগ্যে জোটেনি। কিন্তু একটা কথা মি. প্রিন্স, আপনি আমাকে চিনলেন কি করে?

    হেসে বললো বনহুর–আপনি একজন প্রখ্যাত ডিটেকটিভ, আপনাকে চিনতে কারও ভুল। হয় না। আচ্ছা মি. রাও, আপনার উধাও ব্যাপারটা সংক্ষেপে যদি বলতেন

    ঘটনাটা সত্যি অতি বিস্ময়কর। আমি দস্যু বনহুরের চক্রজালে জড়িয়ে পড়ছিলাম।

    দস্যু বনহুর!!

    হ্যাঁ, মি. প্রিন্স, শয়তান দস্যু বনহুরকে পাকড়াও করতে গিয়ে আপনি নিজেই পাকড়াও। হয়ে পড়েছিলেন বুঝি?

    কথার ফাঁকে গাড়িখানা এসে পৌঁছে গেল মি. রাওয়ের বাসার গেটে।

    শংকর রাও গাড়ি থেকে নেমে আনন্দভরা কণ্ঠে বলেন– আসুন মি. প্রিন্স, কি বলে যে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো।

    থাকা আজ আর নামবো না, সময় পেলে আবার দেখা হবে।

    শংকর রাও বলে ওঠেন–আপনার ঠিকানা যদি দয়া করে শুনাতেন, তাহলে মি. হারুনকে নিয়ে

    ও! বেশ এই নিন। পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে বনহুর মি. শংকর রাওয়ের হাতে দেয়। তারপর গাড়িতে স্টার্ট দেয় সে।

    গাড়ি স্পীডে ছুটে চলেছে।

    পাশে বসে আছে ড্রাইভারবেশী নূরী। ওর মনে নানারকম প্রশ্নের উদ্ভব হচ্ছে। আজ সে বনহুরের সঙ্গে এসে স্বচক্ষে যা দেখল এবং অনুভব করল, তা অতি বিস্ময়কর। নূরী এসব কল্পনাও করতে পারেনি। বনহুর যে শুধু সেই চৌধুরী কন্যাকে নিয়েই উন্মত্ত রয়েছে তা নয়। বাইরের সমগ্র জগৎ জুড়ে তার কাজ। অনাবিল এক আনন্দে আপুত হয় নূরীর হৃদয়। বনহুরকে সে যতখানি গণ্ডির মধ্যে কল্পনা করেছে তার চেয়ে সে অনেক, অনেক বেশি।

    নীরবে গাড়ি চালাচ্ছিল বনহুর। রাত প্রায় শেষের পথে। শীতের কনকনে হাওয়া শার্সীর ফাঁকে প্রবেশ করছিল না সত্য কিন্তু তবু একটা জমাট ঠান্ডা নূরীকে কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। জনশূন্য পথ। পথের দু’ধারে লাইটপোষ্টের আলোগুলো নীরব প্রহরীর মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লাইটপোষ্টের আলোগুলো কেমন ঝাপসা কুয়াশাচ্ছন্ন।

    গাড়ির মধ্যে শুধু দুটি প্রাণী–বনহুর আর নূরী।

    নূরী এতক্ষণ কোন কথা না বলায় হাঁপিয়ে পড়েছিল। গাড়িতে চাপার পর থেকে সেই মুখ। বন্ধ হয়েছে, এখনও সে নিশ্চুপ।

    হঠাৎ বনহুর বলে ওঠে–তোমার সখ দেখে আমি সত্যি আশ্চর্য হলাম।

    নূরী চমকে উঠলো, বনহুর কি তাকে চিনতে পেরেছে। নিশ্চয়ই তাই হবে। একবার আড় নয়নে বনহুরকে দেখার চেষ্টা করল সে। বনহুর এবার মৃদু হাসলো–নূরী, তুমি আজ এসে ভালই করেছ। তুমি পাশে থাকায় আমি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।

    নূরী স্তকণ্ঠে অস্কুটধ্বনি করে উঠে–হুর।

    গাড়িতে যখন প্রথম স্টার্ট দিলে তখনই আমি তোমাকে চিনে নিয়েছি।

    কেন তবে তুমি আমায় নামিয়ে দিলে না?

    তোমার মনের দ্বন্দ্ব দূর হয়েছে তো?

    হুর, আমি তোমাকে কোনদিন অবিশ্বাস করিনি।

    আজ কেন তবে তুমি আমাকে অনুসরণ করেছিলে?

    নূরী বনহুরের হাতের ওপর হাত রেখে–তুমি আমাকে ক্ষমা করো হুর, না জেনে আমি তোমাকে ভুল বুঝেছি।

    নূরী!

    বল?

    জানি তুমি আমায় ভালবাস। কিন্তু তার বিনিময়ে আমি তোমাকে,

    না না হুর, আর তুমি কিছু বল না। আমি সহ্য করতে পারবো না হুর। নূরী বনহুরের কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।

    নূরীর হৃদয়ের ব্যথা বনহুরের মনে যে আঘাত করে না তা নয়। দস্যু হলেও সে মানুষ। তার চোখ দুটোও ঝাপসা হয়ে আসে।

    গাড়ি ততক্ষণে গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেছে।

    বনহুর নেমে দাঁড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে ধরে বলে–এসো।

    নূরী নেমে দাঁড়ায় বনহুরের পাশে।

    গতরাতে অফিস থেকে ফিরতে মি. হারুনের রাত প্রায় চারটে বেজে গিয়েছিল। ক্লাবের সে গুণ্ডাগুলোকে হাজতে রেখে অফিসের খাতাপত্র ঠিক করে তবেই তিনি ফিরেছিলেন। ভোরের দিকে ঘুমটা একটু জেঁকে এসেছে–এমন সময় পাশের টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো।

    মিসেস হারুন একটু সকাল সকাল উঠেছেন। তিনি স্বামীকে না জাগিয়ে নিজেই ফোন ধরলেন হ্যালো কে মি. হোসেন? পুলিশ অফিস থেকে বলছেন? ব্যাপার কি? না উনি এখনও ওঠেন নি। আপনিও তো খুব রাত করে বাড়ি ফিরেছেন, আবার এত সাত সকালে অফিসে? কি বলেন–মি. রাও ফিরে এসেছেন। সবুর করেন, উনাকে ডেকে দিচ্ছি কি আশ্চর্য। রিসিভারের মুখে হাত রেখে ডাকলেন ওগো শুনছো, শোন শোন মি. রাও নাকি ফিরে এসেছেন।

    এ্যাঁ এত চেঁচাচ্ছো কেন? পাশ ফিরে শুয়ে কথাটা বলেন মি. হারুন। মিসেস হারুন পুনরায় বলেন–ওঠো, ওঠো, শোন মি. রাও ফিরে এসেছেন।

    কি বললে, মি. রাও ফিরে এসেছেন? এক লাফে শয্যা ত্যাগ করে স্ত্রীর হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নিয়ে কানে ধরলেন– হ্যালো …. কি বলেন মি. রাও ফিরে এসেছেন। আচ্ছা আমি এখনি আসছি।

    রিসিভার রেখে উঠে দাঁড়ালেন মি. হারুন–ওগো, আমার জামা কাপড়গুলো এগিয়ে দাও তো।

    সে কি, হাত মুখ ধোবে না? নাস্তা করবে না?

    রেখে দাও তোমার হাতমুখ ধোয়া আর নাস্তা খাওয়া। কি আশ্চর্য যাকে আজ ক’দিন পুলিশ অহরহ খুঁজে বেড়াচ্ছে যার তল্লাশে সমস্ত পুলিশ বিভাগ আহার নিদ্রা বিশ্রাম ত্যাগ করেছে। এমনকি পুলিশ সুপার পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন–সে শংকর রাওয়ের আবির্ভাব-একি কম কথা?

    জামাকাপড় পরে মি. হারুন যখন পুলিশ অফিসে পৌঁছলেন তখন সকাল সাতটা বেজে গেছে। অফিসে তোক ধরছে না। মি. হারুনকে দেখে সবাই পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ালো।

    মি. হারুন কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন একটা চেয়ারের উস্কুখুস্কচুল, কোটরাগত চোখ-উত্তেজিতভাবে বসে আছেন মি. রাও। তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছেন কয়েকজন পুলিশ অফিসার।

    মি. হোসেন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। মি. হারুনকে দেখে মি. হোসেন বলেন–গুড মর্নিং মি. হারুন। আজ আমাদের সুপ্রভাত।

    মি. হারুন মি. হোসেনের সাথে হ্যান্ডশেক করে মি. রাওয়ের সামনে এসে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। তারপর শংকর রাওয়ের আপাদমস্তক লক্ষ্য করে বলেন– স্ত্রীর ঔষুধ আনতে গিয়ে কোথায় উধাও হয়েছিলেন মি. রাও?

    শংকর রাও কিছু বলার পূর্বেই বলে ওঠেন মি. হোসেন–উনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন। আমি উনার মুখে যা শুনলাম বলছি।

    বলুন?

    মি. রাওয়ের কাছে শোনা সমস্ত ঘটনা মি. হোসেন ইন্সপেক্টার মি. হারুনের কাছে বলেন। আরও বলেন–মি. রাও ভেবেছিলেন তিনি দস্যু বনহুরের অনুচরের হাতে বন্দী হয়েছিলেন। কিন্তু তা নয়। মি. রাওয়ের উধাওয়ের ব্যাপারে দস্যু বনহুর নেই বা ছিল না বরং তাকে উদ্ধার করেছে দস্যু বনহুর।

    মি. হারুন–দস্যু বনহুর আমাকে রক্ষা করেছে। আমি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। সেই মুহূর্তে সে যদি আমাকে উদ্ধার না করতো, তাহলে আমার বাঁচার কোনা আশা ছিল না।

    শংকর রাও কথাগুলো বলতে বেশ হাঁপিয়ে পড়ছিলেন। তিনি পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে, মি. হারুনের হাতে দিলেন–দস্যু বনহুর চলে যাওয়ার সময় এই কাগজখানা আমাকে দিয়ে গেছে।

    মি. হারুন কাগজখানা তুলে ধরলেন চোখের সামনে, তাতে লেখা রয়েছে মাত্র দুটি শব্দ–দস্যু বনহুর।

    মি. হারুন জিজ্ঞাসা করলেন–আপনি তার পরিচয় জানতে চাননি?

    চেয়েছিলাম, সে নিজের নাম মি. প্রিন্স বলেছিল। সত্যি মি. হারুন দস্যু বনহুরকে যুবরাজের মতই দেখাচ্ছিল।

    হ্যাঁ, সে প্রিন্সের মতই দেখতে। কথাটা বলেন মি. হারুন। তারপর একটু ভেবে বলেন– তাহলে যে দস্যু বা ডাকু আপনাকে উধাও করেছিল সে বনহুরের দলের নয়?

    না মি. হারুন, আমি এ কদিনে বেশ উপলব্দি করেছি যারা আমাকে পাকড়াও করেছিল তারা শুধু দস্যুই নয়, নারী হরণকারী দলও আমার মনে হয়, চৌধুরী কন্যাও তাদের হাতে বন্দী রয়েছে।

    অনুমানে কিছু বলা যায় না, মি. রাও। চৌধুরী কন্যাকে কেউ পাকড়াও করে নিয়ে গেছে, না সে নিজেই গেছে তার সঠিক সন্ধান এখনও হয়নি।

    মি. রাও বলেন– আমি যেসব প্রমাণ পেয়েছিলাম তাতে নিঃসন্দেহে বলতে পারি মিস মনিরাকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাছাড়া তাদের বাড়ির পুরোন দারোয়ান খুন হওয়ার। পেছনে রয়েছে একমাত্র ঐ কারণ।

    মি. রাও এমনও তো হতে পারে-বনহুর নিজে না এসে লোক দিয়ে কার্য সিদ্ধি করেছে এবং দারোয়ানকে খুন করিয়েছে। যাক সে সব কথা-এখন আপনি পূর্ণমাত্রায় বিশ্রাম গ্রহণ করুন। সুস্থ হলে কাজের কথা হবে।

    শংকর রাও বলেন–বিশ্রাম নেবার সময় কই আমার মি. হারুন, আমি এই অবস্থাতেই কাজে নামতে চাই।

    এই অসুস্থ শরীরে?

    হ্যাঁ, মি. হারুন আমার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ওরা সেখানে অপেক্ষা করবে না।

    সেই শয়তানের কথা বলছেন।

    হাঁ, যারা আমাকে এই এক সপ্তাহ তিলে তিলে শুকিয়ে মেরেছে। মি. হারুন আমি আর এক। মুহূর্ত বিলম্ব করতে চাই না। আপনারা আমাকে সাহায্য করলে আমি ওদের আস্তানা খুঁজে বের করতে পারবো।

    আনন্দভরা কণ্ঠে বলেন মি. হারুন–আমরা আপনাকে সানন্দে সাহায্য করবো, কারণ এটা আমাদেরও ডিউটি।

    তাহলে এক্ষুণি পুলিশ ফোর্সকে তৈরি হতে বলুন, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারব। কিন্তু মি. হারুন, আপনার সঙ্গে গোপনে একটা কথা আছে।

    বেশ চলুন।

    পাশের কক্ষে গিয়ে দাঁড়ালেন ওরা দুজন মুখোমুখি। মি. রাও বললেন– শয়তানদের পাকড়াও করার পর আমি ডক্টর জয়ন্ত সেনকে গ্রেপ্তার করতে চাই। কারণ, তিনি তাদের সঙ্গে জড়িত আছেন।

    মি. হারুন বলেন– আমিও অনেক দিন থেকে ঐ রকম সন্দেহ করে আসছি কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারিনি।

    আমি হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছি মি. হারুন, শুনুন তবে।

    বেশ বলুন।

    রাও স্ত্রীর ঔষুধ আনবার সময় যে ঘটনা ঘটেছিল এবং যে কারণে ডক্টর সেনকে সন্দেহ করে তিনি তার পেছনে ধাওয়া করেছিলেন– সব খুলে বলেন।

    মি. হারুন বলেন– ডক্টর সেন শুধু সেই বদমাইশদের সঙ্গেই জড়িত নেই, সে দস্যু বনহুরের সঙ্গেও জড়িত রয়েছে, নইলে এত ডাক্তার থাকতে দস্যু বনহুর আসে তার কাছে।

    এসব আলোচনা পরে হবে মি. হারুন, আপনি তৈরি হয়ে নিন।

    আমি তৈরি হয়েই এসেছি মি. রাও চলুন কোথায় যেতে হবে।

    তারপর মি. হারুন মি. হোসেনকে ডেকে পুলিশ ফোর্স নিয়ে দুটি মোটর ভ্যানকে তৈরি হতে বলেন।

    কিন্তু যখন শংকর রাও এবং পুলিশ ফোর্স সেই পুরানো বাড়িটায় গিয়ে পৌঁছলেন, তখন সে বাড়ি শূন্য হয়ে গেছে। সারাটা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পাওয়া গেলনা। তবে এটা বুঝা গেল–সকাল হবার পূর্বেও এ বাড়িখানাতে মানুষ ছিল।

    প্রত্যেকটা কক্ষে নিপুণভাবে অনুসন্ধান চালালেন মি. হারুন। শংকর রাও একটা ছোট্ট কক্ষে প্রবেশ করে বলেন–আজ এক সপ্তাহ আমাকে এই কক্ষে আটক করে রাখা হয়েছিল।

    বাড়িটা একেবারে শহরের শেষ প্রান্তে। বাইরে থেকে বাড়িটাকে ঠিক পোড়াবাড়ি বলেই মনে হয়।

    বাড়িটাতে যখন নিখুঁতভাবে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে তখন হঠাৎ একটা কক্ষের মেঝেতে একটু ফাঁক দেখা গেল। মি. হারুন তখনই পুলিশকে সেখানে শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তে আদেশ করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা সিঁড়ি বেরিয়ে পড়লো সেখানে।

    একটা পাথরের ঢাকনা দিয়ে সিঁড়ির মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মি. রাওয়ের চোখে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই সেই পাতালীপুরীর কক্ষে কোন গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে।

    মি. রাও ও অন্যান্যরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে চললেন। আশ্চর্য, মাটির তলায় একটা কক্ষ। সিঁড়িটা অবশ্য কক্ষের বাইরে একটা বারান্দাগোছের জায়গায় গিয়ে শেষ হয়েছে। তারপর কক্ষের দরজা।

    মি. রাও এবং মি. হারুন টর্চ জ্বেলে সেই কক্ষে প্রবেশ করলেন। কক্ষটা গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন।

    মি. হারুন খুব ভালভাবে লক্ষ্য করে বলেন–মি. রাও এ কক্ষেও কাউকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু সে নারী না পুরুষ?

    মি. রাও তখন টর্চের আলো জ্বেলে খুব ভালো করে দেখছিলেন, হঠাৎ বলে ওঠেন –মি. হারুন দেখুন তো এটা কি? ততক্ষণে তিনি জিনিসটা হাতে উঠিয়ে নিয়েছেন। টর্চের আলোতেই দেখলেন একগোছা চুল।

    মি. হারুন চুলগোছা হাতে নিয়ে বলেন– এ কক্ষে কোন নারী থাকতো। এই দেখুন সে চুল আঁচড়ে খসে পড়া চুলগুলো কুণ্ডলি পাকিয়ে ফেলে দিয়েছে।

    তাঁদের অনুমান সত্য। এই কক্ষেই শয়তান নাথুরাম মনিরাকে বন্দী করে রেখেছিলা চুলগোছা তারই মাথার।

    এর বেশি আর কিছু পেলেন না মি. হারুন এবং মি. রাও। শেষ পর্যন্ত বিফল মনোরথ হয়ে তাঁরা ফিরে চললেন। রাগে দুঃখে অধর দংশন করতে লাগলেন শংকর রাও।

    পাষাণ প্রাচীরে ঘেরা জম্বুর বনের একটি গুপ্তগুহায় বন্দী করে রাখা হয়েছে মনিরাকে। সেখানে পিপীলিকাও প্রবেশে সক্ষম নয়। শয়তান নাথুরাম কৌশলে এ গুপ্ত গুহ সৃষ্টি করেছিল। গহন বনের অভ্যন্তরে কঠিন পাথরের তৈরি এই জন্ধুর পর্বত।

    মনিরা এই নির্জন পর্বতের গুপ্ত গুহায় অবিরত অশ্রু বিসর্জন করে চলেছে। তার মন থেকে মুছে গেছে আশার স্বপ্ন, ধূলিসাৎ হয়ে গেছে সমস্ত বাসনা। আর কোনদিন সে লোকালয়ে ফিরে যেতে পারবে, তা কল্পনাও করতে পারে না।

    আজ প্রায় দু’সপ্তাহ হতে চললো তাকে চুরি করে এনেছে তারা। সেই রাতের কথা মনে হলে আজও শিউরে ওঠে মনিরা। নিশীথ রাতে নিদ্রাহীন মনিরা অস্থিরচিত্তে কক্ষে পায়চারী করছিল–বনহুরের চিন্তায় সে আচ্ছন্ন ছিল–এমন সময় দরজায় মৃদু টোকা পড়লো দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সে দুজন বলিষ্ঠ লোক তার নাকের ওপর একখানা রুমাল চেপে ধরে–তারপর এই নির্মম পরিণতি। যদিও আজ পর্যন্ত মুরাদ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, নাথুরাম এবং তার অনুচরগণও মনিরার দেহে হস্তক্ষেপ করতে সাহসী হয়নি, তবু সে যদি এখন কোনক্রমে মামা মামীর পাশে ফিরে যেতে পারে তাহলে কি তাঁরা আগের মত স্বচ্ছমনে গ্রহণ করবেন? তাকে তাঁরা স্নেহ করেন, মমতা করেন, ভালবাসেন হয়তো তাঁদের মনে বাধবে না, কিন্তু সমাজ–সমাজ কি তাকে আশ্রয় দেবে? কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক, তাতে কিছু আসে যায় না। মনির–তার মনির যদি তাকে বিশ্বাস না করে? হঠাৎ মনিরার চিন্তাজাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গুহায় মুখ ধীরে ধীরে এক পাশে সরে যায়, গুহায় প্রবেশ করে মুরাদ।

    মনিরার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হৃদকম্প শুরু হয় তার। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে মুখমণ্ডল। সামনে আজরাইলকে দেখলেও বুঝি এতখানি ভয় পেতো না মনিরা।

    মুরাদের চোখমুখ আজ তার কাছে অতি ভয়ংকর মনে হয়। চোখ দুটো রক্ত জবার মত লাল টকটকে। টলতে টলতে প্রবেশ করলো সে। মনিরাকে দেখতে পেয়ে জড়িতকণ্ঠে সাদর সম্ভাষণ জানাল মুরাদ–গুড নাইট মিস মনিরা!

    মনিরা কোন জবাব দিল না, সঙ্কুচিতভাবে গুহার এক কোণায় গিয়ে দাঁড়াল।

    মুরাদ হেসে বলল–এখনও তোমার লজ্জা গেল না প্রিয়ে? মনিরা এখানে তো তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না?

    এমন সময় নাথুরাম একটুকরা কাগজ ও কলম নিয়ে গুহায় প্রবেশ করলো–হুজুর, এই নিন।

    মুরাদ ফিরে তাকালো নাথুরামের দিকে, তারপর বলল–এসো।

    মনিরা জড়োসড়ো হয়ে আছে। অন্তরের ভয়ার্ত ভাব তার মুখে সুষ্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। মনিরা রাগে ক্ষোভে ভয়ে কেমন যেন হয়ে পড়েছে।

    মুরাদ এবার এগিয়ে যায় তার দিকে–এসো, এই নাও কলম, ও যা বলবে লিখে দাও চট চট। তারপর নাথুরামকে লক্ষ্য করে বলে–বল নাথু?

    নাথুরাম কর্কশকন্ঠে বলল–কি আর এমন লিখতে হবে। কথার ফাঁকে পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে এগিয়ে দেয় মুরাদের দিকে–শুধু এই কথাগুলো লিখলেই চলবে।

    মুরাদ নাথুরামের হাত থেকে সেই কাগজের টুকরাখানা নিয়ে চোখের সামনে তুলে ধরলো। পড়া শেষ করে হেসে বললো তোমার বুদ্ধি শিয়ালের চেয়েও বেশি নাথু।

    সাধে কি আর আপনার মত লোক আমাকে টাকা দেয় হুজুর।

    দিন চট করে ওটা লিখে দিন আমাকে। এখনই পাঠাতে হবে। ভোর হবার আগেই যেন ওটা পুলিশ অফিসে গিয়ে পৌঁছে।

    তুমি যা ভেবেছিলে তাই হলো। ঘুঘুটাকে ফাঁদ থেকে বের করাই ভুল হয়েছিল। তাই সে বেঁচে গেল।

    নাথুরামের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে ওঠে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে–ঘুঘুটার কোন দোষ নেই হুজুর। ওকে আমি যেভাবে পিছমোড়া করে বেঁধে গাড়ির পেছনে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছিলাম কোন ব্যাটাই ধরতে পারতো না। যদি ঐ পাজিটা আমার গাড়িখানাকে ফলো না করত।

    সে কে তাকে তুমি চিনতে পেরেছিলে নাথুরাম?

    তাকে চিনতে না পারলেও অনুমানে বুঝতে পেরেছি সে দস্যু বনহুর ছাড়া আর কেউ নয়।

    আমারও তাই মনে হয় নাথু, নাহলে তোমার মত বলবান বীর পুরুষকে কাবু করতে পারে, এমন লোক আছে?

    মনিরার হৃদয়ে এক অনাবিল শান্তির প্রলেপ ছোঁয়া দিয়ে যায়। মনির তাহলে মি. রাওকে উদ্ধার করে নিতে পেরেছে। সে তাহলে নীরব নেই। তাকেই খুঁজে ফিরছে সে। হয়তো তার কথা স্মরণ করে চোখের পানি ফেলছে। মনির ভাবছে মনিরার কথা–এ যে মনিরার কত বড় সৌভাগ্য মনির–তার মনির না জানি এখন কোথায় কি করছে। মনিরা নিজের জন্য দুঃখ করে না। যত ভাবনা ওর জন্য। তাকে খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ কোন বিপদে না পড়ে। খোদা, তুমি ওকে বাঁচিয়ে নিও।

    নাথুরামের কথায় মনিরার চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ে। নাথুরাম বলছে–মিস মনিরা দাও ওটা লিখে দাও।

    মুরাদ কাগজ দু’খানা আর কলমটা মনিরার হাতে গুঁজে দিল।–এ কথাগুলো ঐ সাদা কাগজখানায় লিখে দাও।

    মনিরা কাগজখানায় দৃষ্টি বুলিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়–না আমি কিছুতেই একথা লিখবো না।

    মুহূর্তে মুরাদ গর্জে ওঠে–কি বললে, তুমি লিখবে না?

    না!

    দাঁতে দাঁত পিষে বলে মুরাদ–তোমাকে লিখতে হবে।

    কখনো না।

    মুরাদ এবার নাথুরামের দিকে তাকালো নাথুরাম, আমি আদেশ দিলাম, তুমি যেমন করে পারো ওর কাছ থেকে লিখিয়ে নাও।

    হুজুর, আপনি একটু বাইরে যান।

    বেশ, আমি যাচ্ছি। মুরাদ গুহায় দরজার দিকে পা বাড়ায়।

    মনিরার বুক থর থর করে কেঁপে ওঠে। শিউরে ওঠে তার শরীর। মুরাদের চেয়েও মনিরা নাথুরামকে বেশি ভয় করে। মুরাদ বেরিয়ে গেলে নাথুরাম কি করে বসবে ভাবতে পারে না মনিরা।

    দুহাতে মাথার চুল টানতে থাকে মনিরা। নাথুরাম তার ভয়ংকর বলিষ্ঠ বাহু দুটি মেলে এগিয়ে যায় তার দিকে লিখবে না তুমি? বেশ! নাথুরাম এগুতে থাকে, মনিরা নাথুরামের কদাকার ভয়ংকর মুখখানার দিকে তাকিয়ে ভীতভাবে কাগজ দু’খানা হাতে তুলে নেয়।

    কলমটা ছিটকে দূরে পড়ে গিয়েছিল, ওঠা মনিরার হাতে তুলে দেয় নাথুরাম লক্ষ্মী মেয়ের মত চট করে লিখে ফেলো।

    মনিরা কাগজ নিয়ে লিখতে বসে। লেখা শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।

    নাথুরাম ডাকে–হুজুর, এবার ভেতরে আসুন।

    মুরাদ হাসতে হাসতে গুহায় প্রবেশ করে–হয়েছে?

    হ্যাঁ, এই দেখুন। মনিরার লিখিত কাগজখানা নাথুরাম মুরাদের কাছে দেয়।

    মুরাদ কাগজখানা পড়ে বলে–চমৎকার! নাথু, তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারি না।

    নাথুরাম মুরাদের হাত থেকে কাগজখানা নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলে– এবার আপনি নিশ্চিন্ত হুজুর। এই চিঠি পেলে পুলিশ আর মনিরার সন্ধান নিয়ে উঠে পড়ে লাগবে না। ওর মামা মামী নিশ্চিন্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। আমি তাহলে….

    মুরাদ জড়িতকণ্ঠে হাই তুলে বলে–এসো।

    মনিরা ক্ষিপ্তের ন্যায় বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে মুরাদের দিকে। সে যদি মুনি ঋষি হতো তাহলে তার দৃষ্টিশক্তি দিয়ে ভস্ম করে দিত মুরাদকে।

    মুরাদ মনিরার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। মনিরার দৃষ্টি তার শরীরে যেন তীর ফলকের মত গিয়ে বিধছে। গাটা যেন শির শির করে ওঠে তার। মনিরার একি মূর্তি? মুরাদ কেমন যেন। ভড়কে যায়। মদের নেশা ছুটে যায়। মনিরার নিঃশ্বাস যেন তার সমস্ত দেহে আগুন ধরিয়ে দেয়।

    মুরাদ যেন আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে পারে না। অসহ্য লাগছে ওকে। কি হলো– হঠাৎ এমন বিশ্রী লাগছে কেন? আর স্থির থাকতে পারে না মুরাদ, ধীরে ধীরে সরে পড়ে।

    মুরাদ বেরিয়ে যেতেই বিরাট পাথরের দরজাখানা গুহার মুখ বন্ধ করে ফেলে। হঠাৎ মুরাদের ভয় বা ভীতির কোন কারণ ছিল না, আসলে আজ তার মদের মাত্রা খুব বেশি হয়েছিল।

    মুরাদ চলে যেতেই মনিরা লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। কাঁদতে লাগলো ছোট্ট বালিকার মত। মাথার চুল টেনে ছিঁড়ল। ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করলো তবু তার কান্নার বিরাম নেই।

    কেঁদে কেঁদে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো মনিরা। স্বপ্ন দেখছে সে, মনিরা কাঁদছে–কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। আর কত কাঁদবে সে! হঠাৎ গুহার দরজা খুলে যায়। মনিরা চমকে উঠে বসলো। একি! গুহার দরজায় মনির দাঁড়িয়ে। তার চোখে মুখে ব্যাকুলতার ছাপ। মলিন বিষণ্ণ মুখমণ্ডল–ওষ্ঠদ্বয় শুষ্ক। তাকে দেখতে পেয়ে ওর চোখ দুটো খুশিতে দীপ্ত হয়ে ওঠে। অস্ফুট কন্ঠে ডেকে ওঠে সে–মনিরা তুমি এখানে। আর আমি তোমাকে গোটা পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছি। মনিরাও ওকে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লো। উচ্ছলকন্ঠে বলল–মনির তুমি এসেছো। ছুটে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে ওর বুকে। হঠাৎ মাটি আঁকড়ে চিৎকার করে ওঠে– মনির– মনির! ঘুম ভেঙে যায় মনিরার–তাকিয়ে দেখে কেউ নেই–কিছু নেই-শূন্য গুহার মেঝেতে সে একা শুয়ে আছে।

  • তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    হতাশ হয়ে শয্যায় শুয়ে পড়লো বনহুর। আজ কতদিন তার এতটুকু বিশ্রাম হয় নি। অহরহ। মনিরার সন্ধানে সে উল্কার মত ছুটে বেড়িয়েছে। আহার ন্দ্রিা একেবারে পরিহার করেছে সে। নূরী জোর করে চারটি খাইয়ে দেয়, তাই সে বেঁচে আছে।

    শুধু বনহুরই নয়, তার অনুচরগণও এতদিনে বিশ্রাম নেবার সুযোগ পায় নি। কেউ হোটেলের বয়ের কাজ নিয়েছে, কেউ বা ধোপা, কেউ নাপিত যে যেভাবে পারে মনিরার অনুসন্ধান করে চলছে।

    যদিও সকলের মনে ঐ একটি প্রশ্ন, চৌধুরীকন্যার জন্য দস্যু বনহুরের এত মাথাব্যথা কেন, তবু কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে বা জিজ্ঞাসা করতে সাহসী হয় না। একদিকে ভয় অন্যদিকে লাখ টাকা পুরস্কারের লোভ দস্যু বনহুরের অনুচরগণকে উন্মত্ত করে তুলেছে। সবাই আপ্রাণ চেষ্টায় চৌধুরীকন্যাকে খুঁজে চলেছে।

    এমন দিনে বনহুরের কয়েকজন অনুচর একটি যুবতাঁকে কোন লম্পট গুণ্ডাদলের কবল থেকে উদ্ধার করে এনে হাজির করলো তাদের আস্তানায়।

    অনুচর ক’জনের আনন্দ আর ধরে না। সর্দার আজ খুশি হয়ে তাদের আশাতিরিক্ত পুরষ্কার দেবেন।

    কথাটা প্রথম নূরীর কানে যায়। মনিরাকে পাওয়া গেছে জেনে সেই প্রথম ছুটে আসে বনহুরকে কিছু না জানিয়ে। কারণ মনিরার জন্য দস্যু বনহুরের মত লোক আজ কতদিন হলো উন্মাদের মত হয়ে পড়েছে। যদিও বনহুর মনিরার সম্বন্ধে নূরীর নিকট কিছু বলেনি তবু নূরী বেশ বুঝতে পারে বনহুর সেই মনিরার জন্য কত চিন্তিত।

    নূরী বনহুরের মনিরাকে আগে দেখে নেবে।

    নূরী ছুটে গেল আস্তানার বাইরে যেখানে বনহুরের অনুচরগণ মেয়েটিকে এনে জটলা পাকাচ্ছে।

    নূরী আসতেই সবাই সরে দাঁড়ালো।

    নূরী এগিয়ে গেল মেয়েটির পাশে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে মেয়েটিকে দেখতে লাগলো। যুবতীর বয়স সতের কি আঠারো হবে। ছিপছিপে মাঝারি গড়ন। গায়ের রং শ্যামলা চেহারা বিশ্রী। নাকটা চ্যাপ্টা। নূরী ওকে দেখে হাসলো এই যার রূপের ছিরি, তাকেই কিনা খুঁজে মরছে হাজার হাজার লোক। নূরী জিজ্ঞাসা করলো এই, তোমার নাম?

    মেয়েটা নূরীকে দেখে একটু আশ্বস্ত হয়েছিল। নইলে এই লোকগুলোর কার্যকলাপ তার কাছে মোটেই ভাল লাগছিল না। নূরীকে কথা বলতে দেখে খুশি হল, বলল–আমার নাম মনি।

    নূরী ওর নাম শুনে ভাবলো, এই বুঝি সেই চৌধুরীকন্যা মনিরা, ওকে বুঝি সবাই মনি বলে ডাকে। নূরীর মায়া হলো ভাবলো অযথা বনহুরকে সে সন্দেহ করে চলেছে। এমন চেহারার কোন। মেয়েকে কোন পুরুষ ভালবাসতে পারে? বনহুর লোকের কষ্ট ব্যথা সহ্য করতে পারে না,তাই বুঝি। এমন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

    নূরী মেয়েটার খাওয়া এবং বিশ্রামের আয়োজন করে চলে গেল বনহুরের কাছে।

    বনহুর তখন বিছানায় চিৎ হয়ে আকাশ পাতাল কত কি ভাবছে এমন সময় নূরী গিয়ে বসলো তার সামনে। আজ নূরীর মুখ হাস্যোজ্জল। আজ ক’দিন নূরী বনহুরের সামনে আসে, পাশে বসে কথা বলে কিন্তু ঠিক আগের মত স্বচ্ছমনে কথা বলতে পারে না। তেমনি করে আগের মত হাসতে পারে না। বনহুর তার পাশে রয়েছে তবু মনে হয় অনেক দূরে-নূরীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    আজ নূরীর মন থেকে একটা কালো মেঘ যেন কেটে গেছে। মনিরা সম্বন্ধে তার যে একটা ধারণা ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। হেসে বলল নূরীহুর, তোমার মনিকে পাওয়া গেছে।

    মনি? মনিরাকে পাওয়া গেছে!

    হ্যাঁ, তাকে আমাদের আস্তানাতেই আনা হয়েছে। এখন সে বিশ্রাম কক্ষে বিশ্রাম করছে।

    বনহুর নূরীর কথায় অত্যন্ত বিস্মিত হলো–দু’হাতে নূরীকে এঁটে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো–সত্যি? সত্যি বলছ নূরী?

    হ্যাঁ হ্যাঁ যাও, ওকে দেখে এসো।

    বনহুর লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো, তারপর ছুটলো আস্তানার দিকে।

    বনহুরকে দেখেই কয়েকজন অনুচর আনন্দ ভরা কন্ঠে বললো সর্দার চৌধুরীকন্যাকে আমরা উদ্ধার করে এনেছি।

    বনহুর বলে ওঠে–কোথায় সে?

    মেয়েদের বিশ্রামাগারে বিশ্রাম করছে।

    বনহুর আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে বিশ্রামাগারের খোঁজা পাহারাদারকে ডেকে বললো– যাকে এইমাত্র উদ্ধার করে আনা হয়েছে, তাকে পাঠিয়ে দাও।

    খোঁজা পাহারাদার চলে গেল।

    বনহুর বাইরে পায়চারী শুরু করলো। অন্য কোন ব্যাপারে হলে দরবারকক্ষে বসে তাকে। সেখানে ডেকে পাঠাতো সে। কিন্তু এ যে মনিরা–তার হৃদয়ের রাণী।

    পদশব্দে ফিরে তাকালো বনহুর খোঁজা পাহারাদারের পেছনে ঘোমটা টানা একটা নারী।

    বনহুরের চোখে মুখে একরাশ বিস্ময় ফুটে উঠল। সে দ্রুত হস্তে একটানে যুবতীর ঘোমটা সরিয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখমণ্ডল গম্ভীর বিষণ্ণ হলো। এই কি তার মনিরা। রাগে ক্ষোভে অধর দংশন করতে লাগলো। মেয়েটি বনহুরকে দেখে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বনহুর দক্ষিণ হাতে নিজের মাথার চুল টেনে ধরলো তারপর ডাকালো রহমান, রহমান।

    অনুচরদের মধ্য থেকে একজন বললো–রহমান ভাই এখনও ফেরেনি সর্দার।

    বনহুর তাকেই ডাকলো–মংলু।

    জ্বী সর্দার।

    একে জিজ্ঞাসা করো–কোথায় এর বাপ মা, আত্মীয় স্বজন পৌঁছে দিয়ে এসে সেখানে। কোন অসুবিধা যেন না হয় ওর।

    আচ্ছা সর্দার।

    বনহুর ততক্ষণে নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে চলতে শুরু করেছে।

    নূরী মেয়েটাকে পূর্বেই দেখেছে। একটা অবজ্ঞা ভাব ফুটে উঠেছে তার মনে। কতকটা আশ্বস্ত হয়েছে। তার হুরকে নিয়ে আর কোন চিন্তার কারণ নেই। কাজেই সে আর বনহুরকে অনুসরণ না করে সেই কক্ষেই বসে ছিল।

    বনহুরকে অল্পক্ষণের মধ্যেই গম্ভীর মুখে ফিরে আসতে দেখে নূরী হেসে বলে–মনিকে পেয়েছ?

    বনহুর ধপ করে শয্যায় বসে পড়ে বলে–হ্যাঁ।

    কোথায় সে?

    পাঠিয়ে দিয়েছি।

    তার বাপ মার কাছে বুঝি?

    হ্যাঁ।

    কই, তোমার মনিরাকে পেয়েও তোমার মুখে হাসি ফুটলো না আশ্চর্য। এসো ঝর্ণার ধারে যাই। নূরী বনহুরের দক্ষিণ হাত ধরে টেনে তোলে।

    ঝর্ণার ধারে গিয়ে পাশাপাশি বসে ওরা।

    নূরী বলে–দেখ হুর, কত সুন্দর স্বচ্ছ জলধারা। আমার মনে হচ্ছে, অনেকগুলো মেয়ে যেন একসঙ্গে হাসছে।

    না, কাঁদছে। কথাটা গম্ভীর ভাবাপন্ন কণ্ঠে বলে বনহুর।

    ছিঃ তুমি যেন কেমন হয়ে গেছ। এসো, আমার কোলে মাথা রেখে শোও। দেখ হুর কি সুন্দর নীল আকাশ। ঐ যেন শুভ্র বলাকাগুলো ডানা মেলে উড়ে চলেছে তোমার কি মনে হয় না আমরাও অমনি করে ডানা মেলে উড়ে যাই?

    উঁহু জানতো আমি দস্যু।

    হলেই বা।

    দস্যুর মনে কি কাব্যের রঙ লাগে? ওসব তোমাদের চোখে ভাল লাগে।

    নূরী বনহুরের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে, তারপর গুণ গুণ করে গান ধরে।

    বনহুর নীরবে তাকিয়ে থাকে পশ্চিম আকাশে অস্তাচলগামী সূর্যের ক্ষীণ রশ্মির দিকে– ভাবে, তার মনিরার জীবন সূর্যও বুঝি এমনি করে নিঃশেষ হয়ে আসছে।

    মনিরার কথা মনে পড়তেই বনহুর সোজা হয়ে বসে। এখন তার বসে থাকার সময় নয়। চঞ্চল হয়ে ওঠে বনহুর।

    নূরী উঠে বসে দু’হাতে বনহুরের গলা বেষ্টন করে বলে–ভাল লাগছে না তোমার?

    বনহুর কোন জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

    নূরী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। অভিমানে ভরে ওঠে তার মন, বনহুর ততক্ষণে সামনের দিকে পা বাড়িয়েছে।

    নিজের কক্ষে প্রবেশ করে পায়চারি করতে থাকে বনহুর। এমন সময় রহমান দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়–সর্দার, আমি এসেছি।

    ভেতরে এসো। গম্ভীর গলায় বলে বনহুর।

    রহমান ছিন্নভিন্ন মলিন বসন পরিহিত অবস্থায় ভেতরে প্রবেশ করে–সর্দার।

    বল?

    আজ আমি ভিখারীর বেশে বেরিয়েছিলাম।

    কোন সন্ধান পেয়েছ?

    পেয়েছি, কিন্তু তাতে কোনো উপকার হবে কিনা জানি না।

    বনহুর খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে প্রশ্ন ভরা ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকায় রহমানের মুখের দিকে।

    রহমান বলে–সর্দার আমি আজ ভিখারীর বেশে পুলিশ অফিসের পিছনে গিয়ে বসেছিলাম। আমাকে কেউ দেখতে পায়নি। অফিসের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। আমি যা শুনতে পেলাম, তার সারাংশ হচ্ছে এই–একটা পোড়াবাড়ির সন্ধান নাকি তারা পেয়েছিল। সে বাড়ির একটা গোপন কক্ষে চৌধুরী কন্যাকে আটক করে রাখা হয়েছিল। এখন সেখানে-মানে সেই বাড়ি শূন্য পড়ে রয়েছে, সেখানে কাউকে তারা পায়নি।

    এটুকু শুধু শুনেছিলে?

    হ্যাঁ সর্দার, পুলিশ অফিসের বাইরে থেকে শুধু ভাঙা ভাঙাভাবে এইটুকু আমার কানে এসেছিল।

    বেশ, তুমি এখন যাও, বিশ্রাম করাগে।

    রহমান বেরিয়ে যায়।

    বনহুর মুক্ত জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছু চিন্তা করে। হঠাৎ তার মুখোভাব বেশ স্বচ্ছ হয়ে আসে। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ড্রেসিংরুমে। প্রবেশ করে।

    জম্বুর বনের পথে ছোট্ট পাহাড়টির পাদমূলে একটি টিলার পাশে জটাজুটধারী ভস্মমাখা বাঘের চামড়া পরিহিত একজন সন্ন্যাসীর আর্বিভাব হয়েছে। চক্ষুদ্বয় মুদ্রিত। ললাটে চন্দনের তিলক। দক্ষিণ হাতে আশা। মুখে চাপদাড়ি। বিড়বিড় করে মন্ত্র জপ করছে।

    সে অঞ্চলের সকলেই সন্ন্যাসীর আবির্ভাবে মুগ্ধ ও আনন্দিত হয়েছে। নিশ্চয়ই এ সন্ন্যাসী মহাদেব শিবশঙ্করের কোন ভক্ত বা শিষ্য। কারণ সন্ন্যাসীর চেহারা অতীব প্রশান্তিময় পবিত্রময় প্রশান্ত ললাট উন্নত নাসিকা বিশাল বক্ষ উজ্জ্বল দীপ্ত মুখমণ্ডল। সবাই এই দেবসমতুল্য সন্ন্যাসীর।– সেবায় আত্মনিয়োগ করলো। কেউ বা ফলমূল নিয়ে হাজির হলো তার সামনে, কেউ বা ফুল নিয়ে গেল তার পূজার জন্য।

    নানা জন নানা মনোবাসনা নিয়ে সন্ন্যাসীর চরণযুগল আঁকড়ে ধরলো। কেউ সন্তান আশায়, কেউ বা মামলা মোকদ্দমার জন্য, কেউ ভালবাসা কামনায়। সন্ন্যাসীর সামনে ভক্তের দল জটলা পাকাতে লাগল।

    কথাটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই শুনল এই সন্ন্যাসীর কথা।

    একদিন মুরাদের কানেও পৌঁছল সন্ন্যাসীর আগমনবার্তা। এ কথাও সে জানতে পারল সন্ন্যাসী বাবাজীর আশীর্বাদে সকলেরই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।

    মুরাদ চিন্তা করলো–আজও সে মনিরাকে বশীভূত করতে পারল না। তার সমস্ত আয়োজন ব্যর্থ হতে চলেছে। মনিরাকে জোরপূর্বক সে আটকে রাখতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ মনিরা তাকে মনেপ্রাণে ভাল না বাসছে, ততক্ষণ তার এ আটকে রাখায় কোন সাফল্য নেই।

    একদিন রাতের অন্ধকারে আত্মগোপন করে মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীর নিকটে গেল। তখন সন্ন্যাসী একা ছিলেন। কোনো লোকজন ছিল না তার পাশে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে মুরাদ লুটিয়ে পড়ল সন্ন্যাসীর পায়ে। ভক্তি গদগদ কণ্ঠে বলল–বাবাজী বাবাজী, আমার প্রতি সদয় হোন, আমার প্রতি সদয় হোন। আমি বড় দুঃখী…..

    বারবার অনুনয় বিনয় করায় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন সন্ন্যাসী বাবাজী। শান্ত সুমিষ্ট গম্ভীর কণ্ঠে বলেন–বৎস, আমি জানি তুমি কি চাও। কিন্তু যা চাও, তা পাবার নয়! সন্ন্যাসী বাবাজী নীরব হলেন।

    মুরাদ অশ্রুবিগলিত কণ্ঠে বলে ওঠে–বাবাজী, তাহলে উপায়? বলুন, বলুন, আমি কি করে তার মন পাব?

    সন্ন্যাসী আবার নিশ্চুপ।

    গভীর রাতের অন্ধকারে মাটির প্রদীপের ক্ষীণালোক সন্ন্যাসী বাবাজীকে পাথরের মূর্তির মত স্থির মনে হচ্ছে। আশে পাশে ঝোঁপঝাড়ের মধ্য থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ।

    মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পাতাগুলো টুপটাপ করে খসে পড়ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে। শেয়ালের ডাক। মেঘশূন্য স্বচ্ছ আকাশ। অসংখ্য তারা জ্বলছে সেখানে। সন্ন্যাসী চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন–মেয়েটার নাম উচ্চারণ কর। নিঃশ্বাস বন্ধ করে নাম উচ্চারণ করবে। একবার, দু’বার, তিনবার। খবরদার! ততক্ষণ নিঃশ্বাস নেবে না।

    মুরাদ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তিনবার উচ্চারণ করলো–মনিরা…… মনিরা–মনিরা…..

    ব্যাস! আবার চোখ বন্ধ করলেন সন্ন্যাসী বাবাজী। কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়ালেন। তারপর গম্ভীর গলায় বলেন–বৎস! কন্যার নামের সঙ্গে তোমার নামের মিল রয়েছে। মুরাদ আর মনিরা।

    সন্ন্যাসীর মুখে নিজ নাম শুনে অত্যধিক বিস্মিত হলো মুরাদ। সে তো তাঁকে নিজের নাম বলেনি। ভক্তিতে নুয়ে পড়লো মুরাদ।

    সন্ন্যাসী আবার জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি তাকে স্পর্শ করেছ?

    না, সে মেয়ে নয় যেন কালনাগিনী। তার নিকটে গেলে আমি তার চোখের দিকে চাইতে পারি না। মনে হয় ওর নিঃশ্বাসে আগুন ঝরছে। সে আগুনে আমি জ্বলেপুড়ে ছাই হবার জোগাড় হই।

    বেশ।

    মুরাদ অভিমানভরা কণ্ঠে বলে–এটা বেশ! আমি তাকে ভালবাসি আর সে আমাকে বিষচোখে দেখে-এটা বেশ?

    বৎস! ঘাবড়াবার কোন কারণ নেই। তাকে তুমি পাবে। অতি নিজের করে পাবে, কিন্তু সে যাকে ভালবাসে তাকে ওর মন থেকে মুছে ফেলতে হবে।

    এ কথা আমিও ভেবেছি, কিন্তু তার কোন উপায় নেই। বাবাজী, মনিরা যাকে ভালবাসে সে দস্যু বনহুর।

    হ্যাঁ, আমি গণনায় তারই নাম খুঁজে পেয়েছি।

    বাবাজী, ঐ দস্যু বনহুরকে নিপাত করা যায় না? ওকে নিহত করতে পারলে মনিরা আমার হবে।

    হাঁ, সে কথা আমিও ভাবছি। কিন্তু বনহুরকে নিপাত করতে হলে চাই সাধনা। তাহলে তুমি অসীম শক্তি লাভ করবে।

    কি সাধনা করতে হবে বাবাজী?

    সব পরে বলব। তুমি কিছু ভেবো না। আজ যাও, আবার কাল গভীর রাতে এমন সময় এখানে আসবে। মনিরাকে সঙ্গে এনো, ওর বস্ত্রাঞ্চলের ওপর বসে তোমাকে ধ্যান-সাধনা করতে হবে।

    বাবাজী, আমি আপনাকে অজস্র অর্থ দেবো।

    সন্ন্যাসী কোনদিন অর্থলোভী হয় না। যাও আর বিলম্ব করো না, আমার ধ্যানের ব্যাঘাত হচ্ছে।

    মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীর চরণধূলি মাথায় নিয়ে ধীরে ধীরে চলে যায়।

    পরদিন আবার আসে মুরাদ।

    গোটা পৃথিবী সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে। আকাশ আজ স্বচ্ছ নয়। সন্ধ্যার পর থেকে ঝুপঝাঁপ বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। মেঘ ডাকছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, দমকা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। শীতের রাত-তদুপরি দুর্যোগময় মুহূর্ত। নিমেল হাওয়া মানুষের হাড়ে হাড়ে কাঁপন লাগায়। জন প্রাণী শূন্য পথ বেয়ে মুরাদ এসে দাঁড়াল সন্ন্যাসী বাবাজীর সামনে। বিনীত কণ্ঠে ডাকলো–বাবাজী।

    সন্ন্যাসী বাবাজীর শরীর সিক্ত হয়ে উঠছে। জটা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা পানি। বিদ্যুতের আলোতে সন্ন্যাসীকে অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। সংসারত্যাগী মানুষ, তার আবার শীত-তাপ কিছু আছে। চোখ বন্ধ করে কি যেন মন্ত্র জপ করছেন। মুরাদের কণ্ঠস্বরে চোখ মেলে তাকালেন সন্ন্যাসী বাবাজী। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলেন–সঙ্গিনী কই?

    মুরাদ হাতজোড় করে কম্পিত গলায় বলল–বাবাজী, তাকে আনতে পারলাম না। পাহাড় নড়বে তবু সে নড়বে না। জোরপূর্বক আনা যায় বাবাজী, আপনি যদি বলেন, তাকে লোক দিয়ে পাকড়াও করে আনতে পারি।

    দরকার নেই।

    তাহলে আমার সাধনা হবে না!

    হবে বৎস, তোমার দুঃখ আমার হৃদয়ে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। তুমি যাকে চাও সে তোমাকে চায় না-বড় দুঃখ।

    তাহলে কি করব?

    আমি যাব সেখানে।

    আনন্দে অস্ফুটধ্বনি করে ওঠে মুরাদ–বাবাজী!

    হ্যাঁ, আমি যাবো। কিন্তু জানো বৎস, আমি লোকের সামনে যাই না।

    আমি আপনাকে অতি গোপনে সেখানে নিয়ে যাব। বাবাজী, কি বলে যে আমি আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো।

    দরকার নেই।

    চলুন তাহলে বাবাজী?

    চলো।

    এক হাতে আশা, আর এক হাতে রুদ্রাক্ষের মালা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী বাবাজী।

    আগে চলল মুরাদ, পেছনে চললেন সন্ন্যাসী বাবাজী।

    গহন বনের মাঝ দিয়ে পাহাড় আর টিলার পাশ কেটে এগিয়ে চলেছে মুরাদ আর সন্ন্যাসী বাবাজী। বৃষ্টি থেমে এসেছে, কিন্তু মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের চমকানী এখনও থেমে যায়নি।

    মুরাদের হাতে ছিল একটা টর্চ, তারই আলোতে পথ দেখে এগুচ্ছিল তারা। প্রায় ঘণ্টা দুই চলার পর জম্বুর পর্বতের পাদমূলে গিয়ে পৌঁছল মুরাদ আর সন্ন্যাসী বাবাজী।

    ঝোঁপঝাড় আর জঙ্গলে ঘেরা জন্ধুর পর্বতের গা ঘেঁষে কিছুটা এগুলো। এই পথটুকু চলতে তাদের কষ্ট হচ্ছিল। আরও কিছুটা এগুনোর পর মুরাদ একস্থানে দাঁড়িয়ে একবার, দু’বার, তিনবার শিস্ দিল, সঙ্গে সঙ্গে একটা শব্দ হলো। দেখা গেল পর্বতের পাদমূল ধীরে ধীরে একপাশে সরে যাচ্ছে।

    অল্পক্ষণের মধ্যেই সেখানে সুন্দর একটা সুড়ঙ্গপথ বেরিয়ে এলো. দু’জন মশালধারী ভীষণাকার লোক সুড়ঙ্গমুখে দাঁড়িয়ে আছে।

    মুরাদকে দেখে তারা সরে দাঁড়ালো, সন্ন্যাসী বাবাজীকে নিয়ে মুরাদ অতি সন্তর্পণে গুহার মধ্যে প্রবেশ করল। একটি নয়, দুটি নয়-প্রায় সাতটি গুহার মুখ পেরিয়ে মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীকে নিয়ে একটি পাথরখণ্ডের নিকট দাঁড়ালো। তারপর পাশে একটি যন্ত্রে হাত রাখতেই পাথর হুড়হুড় শব্দে একপাশে সরে গেল।

    সন্ন্যাসী বাবাজী আর মুরাদ সেই গুহায় প্রবেশ করলো। গুহার মধ্যে এককোণে একটি মশাল জ্বলছিল। এক পাশে একটি দড়ির খাট। খাটে শুয়ে ছিল এক যুবতী।

    মুরাদ আর সন্ন্যাসী বাবাজীর পদশব্দে মুখ তুলে তাকালো যুবতী। মুরাদের সঙ্গে জটাজুটধারী সন্ন্যাসী দেখে সে চমকে উঠলো। ভয়ে পাংশু হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল। আলুথালু। বেশে উঠে দাঁড়াল।

    মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীকে লক্ষ্য করে বললো–এই সেই মনিরা।

    সন্ন্যাসী বাবাজী অস্কুটস্বরে বলেন–হু।

    মুরাদ ভক্তিভরে মাথা নত করে বললো–বাবাজী, সব আমি আপনাকে বলেছি, আর…..

    থাক, আর বলতে হবে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মনিরার দিকে তাকালেন সন্ন্যাসী বাবাজী। তারপর বলেন “তুমি বাইরে যাও, তোমায় যখন ডাকবো তখন ভেতরে এসো-সাধনা শুরু হবে।

    মুরাদ খুশিমনে বেরিয়ে গেল।

    সন্ন্যাসী মনিরার দিকে এগুলেন। মশালের আলোতে নিপুণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলেন। তারপর বলেন–এসো, তোমার মাথায় ফুঁ দিই।

    না। দৃঢ় কণ্ঠস্বর মনিরার।

    যুবতী, তোমাকে সে চায়–কেন ওকে তুমি পায়ে ঠেলছো?

    রুদ্ধকণ্ঠে বলে মনিরা–ওকে আমি চাই না। প্রাণ যদি যায় তবুও না!

    কিন্তু আমি এমন মন্ত্র পাঠ করে তোমায় ফুঁ দেবো তখন দেখবে সে–ই তোমার প্রিয়জন হয়ে দাঁড়াবে।

    মনিরা আকুলভাবে কেঁদে উঠলো-না না সন্ন্যাসী, আপনি আমার সর্বনাশ করবেন না। তার চেয়ে আমাকে হত্যা করুন।

    তা হয় না। সে আমাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে তবেই এখানে এনেছে। আমি তাকে ফাঁকি দিতে পারি না।

    আপনি সংসারত্যাগী মহাপুরুষ, আপনি একজন মহান ব্যক্তি, একটি নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সর্বনাশ করতে পারবেন? আপনার হৃদয় কি এতটুকু কাঁপবে না?

    যুবতী, আমি সকলেরই মঙ্গলাকাঙ্খী। তুমি কি চাও-বলতে পার?

    মনিরা যেন অন্ধকারে আলোর সন্ধান পায়। ব্যাকুলকণ্ঠে বলে–আপনি আমাকে বাঁচান…..

    সন্ন্যাসী গম্ভীরকণ্ঠে বলেন–বুঝেছি, তুমি একজনকে ভালবাস।

    হ্যাঁ বাসি।

    কে সে?

    না না, তা বলতে পারি না।

    পারতে হবে। আমি তাহলে তোমাকে তার নিকট পৌঁছে দেব।

    সত্যি?

    হ্যাঁ, বল তার নাম কি? অবশ্য তুমি না বললেও আমি যোগবলে জানতে পেরেছি। যাকে তুমি ভালবাস-সে দস্যু বনহুর।

    মনিরা অস্কুটধ্বনি করে ওঠে-সন্ন্যাসী, আপনি সবই জানেন। আমাকে এই লম্পট শয়তানের হাত থেকে বাঁচান-বাঁচান-আকুলভাবে কেঁদে ওঠে মনিরা।

    সন্ন্যাসী মনিরার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলেন–ক্ষান্ত হও। যদি আমাকে বিশ্বাস করো তবে তোমাকে তোমার প্রিয়ের নিকট পৌঁছে দিতে পারি!

    সত্যি?

    হ্যাঁ, তুমি মুরাদের সঙ্গে আমার আস্তানায় যেও, আমি তোমাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেব। আর যা বলি সেইমত কাজ করো-মুরাদের হাতে হাত রাখতে বললে রাখবে, তোমার আঁচল বিছিয়ে ওকে বসতে দেবে।

    আচ্ছা।

    মনে থাকবে সব কথা?

    থাকবে।

    সন্ন্যাসী এবার হাতে তালি দিলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো মুরাদ–বাবাজী আমাকে ডাকছেন?

    হ্যাঁ বৎস, সময় সংকীর্ণ। আমাকে শীঘ্র যেতে হবে। তার পূর্বে আমি তোমার সাধনা শেষ করতে চাই। দেখো বৎস, ওকে আমি মন্ত্রে বশীভূত করে ফেলেছি। হাত পাতো–

    মুরাদ দক্ষিণ হাত প্রসারিত করলো।

    মনিরাকে ইঙ্গিত করলো সন্ন্যাসী তার হাতের ওপর হাত রাখতে।

    মনিরা ধীরপদে এগিয়ে এসে মুরাদের হাতের ওপর দক্ষিণ হাতখানা রাখলো।

    সন্ন্যাসী বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ করতে লাগলেন।

    মুরাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এত অল্প সময়ে মনিরা এতখানি বশীভূত হয়েছে–বড় আনন্দের কথা!

    এবার সন্ন্যাসী মনিরাকে আঁচল পেতে বসতে বলে। মনিরা আঁচল পেতে বসলো। মুরাদকে বললো–বৎস, ওর আঁচলে বসো।

    মুরাদ গুরুদেবের আদেশ পালন করলো।

    কিছুক্ষণ স্ন্যাসী মন্ত্র পাঠ করার পর বলে উঠলেন–আজ সাধনা শেষ হলো না, কিছু বাকি রইলো। তুমি কাল মনিরাকে নিয়ে আমার আস্তানায় এসো, বাকিটুকু শেষ করবো। সাবধান, সাধনা শেষ হবার পূর্বে যেন মনিরাকে স্পর্শ করো না, তাহলে সব পণ্ড হয়ে যাবে–আজ সময় সংকীর্ণ-আমি চললাম।

    বাবাজী, আমি আপনাকে পৌঁছে দেব?

    দরকার হবে না।

    মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীকে গুপ্ত গুহার বাইরে পৌঁছে দেয়। বিদায়কালে বার দুই সন্ন্যাসীর চরণধূলি গ্রহণ করে সে।

    মনিরার নিখোঁজের পর চৌধুরী সাহেব এবং তার স্ত্রী মরিয়ম বেগমের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। অবিরত কাদা কাটি করে চলেছেন তাঁরা। চৌধুরী সাহেব একে ভাগনী মনিরার জন্য গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়ে পড়েছেন, তদুপরি স্ত্রীর জন্য তিনি বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

    সেদিন দ্বিপ্রহরে চৌধুরী সাহেব স্ত্রীর শিয়রে বসে তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, এমন সময় বয় এসে জানালো-স্যার, ইন্সপেক্টর সাহেব এসেছেন, আপনার সঙ্গে জরুরি দরকার আছে।

    চমকে উঠলেন চৌধুরী সাহেব, হঠাৎ এ সময়ে–কোন সন্ধান পেয়েছে কি তারা?

    মরিয়ম বেগমও উদ্বিগ্ন হলেন, বলেন–”ওগো, দেরী করো না-যাও, দেখো কি সংবাদ তাঁরা এনেছেন।

    যাচ্ছি।

    চৌধুরী সাহেব ড্রইংরুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলেন মি. হারুন এবং মি. হোসেন বসে আছেন। উভয়ের মুখমণ্ডলেই বেশ চঞ্চলতা ফুটে উঠেছে। চৌধুরী সাহেবকে দেখেই সালাম জানালেন। তারপর মি. হারুন বলেন–চৌধুরী সাহেব, অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করতে বাধ্য হচ্ছি। আপনার ভাগনী মিস মনিরার একটি চিঠি আমাদের হস্তগত হয়েছে।

    মনিরা চিঠি লিখেছে-কই-কই সে চিঠি? ব্যস্তভাবে চৌধুরী সাহেব এগিয়ে গেলেন মি. হারুনের দিকে।

    বসুন আমি দেখাচ্ছি। পকেট থেকে একটি ভাঁজকরা কাগজ বের করে বলেন–এই নিন।

    চৌধুরী সাহেব সোফায় বসে কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরেন। ধীরে ধীরে তার মুখমণ্ডল স্বাভাবিক হয়ে এলো!

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন এতক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চৌধুরী সাহেবের মুখমণ্ডল লক্ষ্য করছিলেন। এবার মি. হারুন জিজ্ঞাসা করলেন-চৌধুরী সাহেব, এই চিঠিখানা তাহলে সত্যিই আপনার ভাগনী মিস মনিরার হতের লেখা?

    হাঁ ইন্সপেক্টার।

    তাহলে আপনার ভাগনী মিস মনিরা স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগ করেছে, সে এখন আপনার পুত্র দস্যু বনহুরের পাশে সুখে দিন কাটাচ্ছে।

    চিঠিতে আপনি এখনও আপনার ভাগনীর অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকতে চান?

    চৌধুরী সাহেব এ কথার কোন জবাব দিতে পারেন না, নিশ্চুপ থাকেন।

    মি. হোসেন বলেন–একথা জানার পরও যদি আপনি ভাগনীর নিখোঁজ ব্যাপারে চাঞ্চল্য প্রকাশ করেন, তবে এতে আপনার কলঙ্ক বাড়বে।

    হ্যাঁ চৌধুরী সাহেব এখন আপনার শান্ত থাকাই উচিত। কারণ যে নারী স্বেচ্ছায় কোন পুরুষের সঙ্গে বেরিয়ে যায় বা গৃহ ত্যাগ করে, তাকে খোঁজ করা বাতুলতা মাত্র! তাছাড়া বনহুর আপনারই পুত্র। এ কথাও আপনি একদিন আমাদের নিকট বলেছেন যে, আপনার সন্তানকে মনিরা ভালবাসে। বলেন মি. হারুন?

    চৌধুরী সাহেব আনমনে বলেন–হ্যাঁ ইন্সপেক্টর সাহেব, মনিরা কি ভালবাসে।

    তাহলে তো আপনার আর ব্যস্ত হবার কারণ নেই?

    না।

    মি. হারুন উঠে দাঁড়াল–চলি তাহলে চৌধুরী সাহেব?

    চৌধুরী সাহেব নিরুত্তর, তিনি যেন পাথরের মূর্তির মতই স্তব্ধ হয়ে গেছেন।

    মি. হারুন এবং হোসেন ড্রইংরুমে থেকে বেরিয়ে যান।

    চৌধুরী সাহেব কলের পুতুলের মত ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। সিঁড়ির মুখেই উদ্বিগ্নভাবে দাঁড়িয়ে আছেন মরিয়ম বেগম। স্বামীকে নিঃশব্দে এগিয়ে আসতে দেখে বলেন–কি সংবাদ, কেন এসেছিলেন ওরা?

    চৌধুরী সাহেব কোন কথা না বলে হাতের চিঠিখানা মরিয়ম বেগমের হাতে দিলেন-পড়।

    কার চিঠি?

    মনিরার।

    মনিরার চিঠি!

    হ্যাঁ, পড়ে দেখ।

    তুমিই পড়না, আমার চোখ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এসেছে। স্ত্রীর হাত থেকে আবার চিঠিখানা নিয়ে পড়তে শুরু করেন চৌধুরী সাহেব

    “মামুজান, তোমরা আমার জন্য মনে হয় খুব চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েছ। কিন্তু আমার জন্য তোমাদের চিন্তার কোন কারণ নেই। আমি মনিরের সঙ্গে চলে এসেছি এবং এখন তার পাশে রয়েছি। “

    — তোমাদের মনিরা

    মরিয়ম বেগমের মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, খুশিভরা কণ্ঠে বলেন–মনিরাকে তাহলে কেউ ধরে নিয়ে যায়নি? খোদা তুমি আমাকে বাঁচালে।

    রাগতঃকণ্ঠে বললেন চৌধুরী সাহেব-মান-ইজ্জতের মাথা খেয়ে সে আমাদের উদ্ধার করেছে-না? ছিঃ ছিঃ ছিঃ, সব গেল, আমার কিছু আর বাকি রইলো না!

    ওগো, কেন তুমি রাগ করছ? ওরা দুজন দুজনকে ভালবাসে–এ আমাদের সৌভাগ্য।

    কলঙ্কটা কোথায় যাবে?

    কলঙ্ক! কি যে বল, কিসের কলঙ্ক? মনিরার বিয়ে মনিরের সঙ্গেই হবে, এতে আবার কলঙ্ক কিসে?

    তাই বলে এভাবে-না না, আমার সব গেল–মান-সম্মান-ইজ্জত সব গেল!

    শান্ত হও। চলো,ঘরে চলো। স্বামীর হাত ধরে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন মরিয়ম বেগম।

  • চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    পুলিশ অফিস।

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন ও অন্যান্য পুলিশ অফিসার বসে আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল। শংকর রাওও সেখানে উপস্থিত রয়েছেন।

    মনিরার ব্যাপার নিয়েই আলাপ চলছিল।

    মি. হারুন বলেন–দেখলেন তো মি. রাও, আপনি বলেছিলেন মনিরাকে জোরপূর্বক চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিন্তু আসলে সে নিজেই বাড়ি থেকে চলে গেছে, তার প্রিয়জনের সঙ্গেই গেছে এবং এখন তার সঙ্গেই আছে।

    শংকর রাও বিজ্ঞের মত মাথা দোলালেন-না, এটা আমি বিশ্বাস করি না মি. হারুন, কারণ আমি সেদিন চৌধুরী সাহেবের বাড়ির বেলকনিতে বেশ কয়েকটা পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম। তা ছাড়া মিস মনিরার স্যান্ডেল সিঁড়িতে পাওয়া গেছে।

    আপনি কি তাহলে মিস মনিরার চিঠি অস্বীকার করেন?

    হ্যাঁ করি। এমনওতো হতে পারে চিঠিখানা মিস মনিরার হাতের লেখার অনুকরণে লেখা হয়েছে!

    অসম্ভব, কারণ তার মামা চৌধুরী সাহেব ভাগনীর হাতের লেখা বেশ চেনেন।

    দেখুন মি. হারুন, মিস মনিরা যে স্বেচ্ছায় যায়নি তার আরও একটি জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ-চৌধুরী সাহেবের বাড়ির পুরানো দারোয়ানের খুন। দস্যু বনহুরের সঙ্গেই যদি সে স্বেচ্ছায় যাবে, তাহলে একটা নিরীহ লোককে কেন খুন করা হবে?

    এই সামান্য ব্যাপারটা আপনি বুঝতে পারছেন না মি. রাও? যখন তারা চৌধুরী বাড়ি থেকে পালাচ্ছিল তখন হয়তো সেই দারোয়ান বাধা দিতে গিয়েছিল। দস্যুর আবার দয়ামায়া!

    এমন সময় একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক কক্ষে প্রবেশ করেন। চোখেমুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ। ভারী পাওয়ারের চশমাটা ভালো করে চোখের ওপর তুলে দিয়ে বলেন–ইন্সপেক্টর মি. হারুন কে?

    মি. হারুন লোকটার আচমকা প্রবেশে মনে মনে রেগে গিয়েছিলেন, গম্ভীর কণ্ঠে বলেন– কি চান?

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলেন–আপনি বুঝি মি. হারুন?

    হ্যাঁ, বলুন কি দরকার?

    দেখুন, আমি মাধবগঞ্জের একজন ডাক্তার। আমার নাম নওশের আলী। গত রাতে আমাকে একজন লোক রোগী দেখার নাম করে ডেকে নিয়ে যায়। আমিও টাকার লোভে কিছু না ভেবে রোগী দেখতে যাই।

    বসুন, বসে বলুন।

    বৃদ্ধা বসে পড়ে বলতে শুরু করেন, আমাকে ওরা একটা ট্যাক্সিতে নিয়ে যায়। তারপর পায়ে হেঁটে-সে কি ভয়ংকর বন। বনের মধ্যে দিয়ে আমাকে নিয়ে ওরা যখন গন্তব্যস্থানে পৌঁছাল, তখন ভয়ে আমার কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছে। এতক্ষণে নিজের ভুল বুঝতে পারলাম, তবু নিশ্চুপ রইলাম, কারণ কিছু বলতে গিয়ে শেষে জীবনটা হারাব নাকি?

    আগ্রহভরা কণ্ঠে বলেন মি. হারুন-তারপর?

    তারপর একটা পর্বতের পাদমূলে আমাকে নিয়ে ওরা হাজির করল। সেই পর্বতের নিকটে দাঁড়িয়ে একটা লোক তিনবার শিস দিল, সঙ্গে সঙ্গে পর্বতের গায়ের একটা বিরাট পাথর এক পাশে সরে গেল।

    কক্ষের সবাই উদ্বিগ্নচিত্তে প্রৌঢ় ভদ্রলোকের কথা শুনছেন। সকলেরই চোখেমুখে বিস্ময়। মি. রাও বলেন–বলুন, তারপর কি হলো?

    দেখলাম পাথরটা সরে গিয়ে তার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো এক সুড়ঙ্গপথ।

    সেই পথের ভেতরে প্রবেশ করলেন বুঝি?

    হ্যাঁ, তবে ভেতরে প্রবেশ করে স্তম্ভিত হলাম। তাদের কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম-তারা স্বাভাবিক লোক নয়। এই যে দেশময় রাহাজানি আর লুটতরাজ চলছে, নারীহরণ চলছে, এর পেছনে রয়েছে সেই লোকগুলো। আসল কথা, তারা ডাকাতের দল এবং ওটা তাদের আস্তানা।

    আশ্চর্য! অস্কুটধ্বনি করে ওঠেন মি. হারুন।

    ভদ্রলোক আবার বলেন–আমি তাদের কথাবার্তায় আরও বুঝতে পেরেছি-সেই পর্বতটার নাম জম্বুর পর্বত এবং ঐ জায়গাটা পর্বতের দক্ষিণ কোণে। ইন্সপেক্টর সাহেব, আপনার কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ, আপনি পুলিশ ফোর্স নিয়ে সেখানে যান। তারপর পকেট হাতড়ে একটি কাগজ বের করে এগিয়ে দেন এই নিন, আমি সেই পর্বতের গুপ্ত দরজার ছবি তৈয়ার করে এসেছি, এতে পথ-ঘাটের ছবি সুন্দর করে আঁকা রয়েছে।

    মি. হোসেন বলে ওঠেন-কি রোগী দেখলেন তা তো বললেন না?

    হাঁ বলছি, একটু থেমে বলেন প্রৌঢ় ভদ্রলোক-রোগীর কোন অসুখ নয়, শরীরে ভীষণ বেদনা আর জখম। হয়তো কোথাও মারধোর খেয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি ঔষুধপত্র দিয়ে বিদায় হলাম। ওরাই আবার আমাকে রেখে গেল। কিন্তু বাড়িতে নয়-একটা নির্জন পথের ধারে আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো ওরা। এই তো ভোরবেলার কথা। আমি বাড়িতে গিয়েই ওষুধের বাক্সটা রেখে ছুটে এসেছি। ইন্সপেক্টর, আপনি ওদের পাকড়াও করার ব্যবস্থা করুন। আপনি পুলিশ ফোর্স পাঠাবার ব্যবস্থা করুন সেখানে, নইলে পালাবে ওরা।

    মি. হারুন বলেন–আপনাকেও যেতে হবে পথ দেখিয়ে দেবার জন্য!

    আমি-আমি যে বুড়ো মানুষ।

    তবে বলতে এলেন কেন? জানেন এটা পুলিশ অফিস–

    আমি এতটুকুও মিথ্যা বলিনি। কিন্তু রাত শেষ প্রহরে যাবেন, তার পূর্বে নয়।

    আপনি যেতে পারবেন না?

    আমার শরীর ভাল নয়, এইটুকু পথ এসেই হাঁপিয়ে পড়েছি।

    শংকর রাও বলেন–মি. হারুন, ইনি যা বলছেন তা সত্য। আপনি এর কথামতই কাজ করুন, কারণ আমার মনে হয় সেই দুষ্ট শয়তানের দল পালিয়ে জম্বুর পর্বতে আশ্রয় নিয়েছে।

    মি. হোসেন মি. শংকর রাওয়ের কথায় যোগ দেন–হ্যাঁ,আমারও সেই রকমই মনে হয়।

    ভদ্রলোক তার পুরা নাম ঠিকানা দিয়ে বিদায় গ্রহণ করলেন।

    ভদ্রলোক চলে যেতেই শংকর রাও বলেন–মি. হারুন, আপনি কি মনে করছেন?

    হ্যাঁ, একবার যেতেই হবে সেখানে। লোকটার কথা বোধ হয় মিথ্যা নয়। তারপর ঐ ভদ্রলোকের দেয়া ম্যাপখানা মেলে ধরলেন টেবিলে।

    মি. হারুন, মি. রাও এবং মি. হোসেনের মধ্যে ম্যাপ নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলল, তারপর উঠে পড়লেন সকলে।

    সন্ধ্যার পূর্বেই পুলিশ-ফোর্স নিয়ে তৈরি হয়ে নিলেন মি. হারুন। পুলিশদেরকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতি গোপনে জন্ধুর পর্বতের দিকে রওনা দিতে নির্দেশ দিলেন। বহু দূরের পথ এই জম্বুর পর্বত। বহু বন, ঝোঁপঝাড়, ছোট ছোট পাহাড় টিলা পার হয়ে তবেই তারা পৌঁছবে সেই পর্বতে।

    মি. হারুন আর মি. হোসেনের সঙ্গে শংকর রাও-ও চললেন। মি. হারুন টর্চলাইট ধরে পথ চিনে নিচ্ছিলেন। ম্যাপখানা এত সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছিল যে, পথ চিনে নিতে এতটুকু কষ্ট হচ্ছিল না তাদের।

    জম্বুর পর্বতের পাদমূলে পৌঁছে রেডিয়াম হাতঘড়ির দিকে তাকালেন মি. হারুন। রাত তখন। তিনটে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাঁরা এই পথ ধরে এসেছেন।

    টর্চের আলো ফেলে আর একবার ম্যাপ দেখে নিলেন মি. হারুন এবং মি. হোসেন। খুশিতে তারা আত্মহারা হলেন-ঠিক জায়গায় পৌঁছতে তাঁরা সক্ষম হয়েছেন! ম্যাপ ধরে আরও কিছুটা দক্ষিণে এগুলেন, কিন্তু কই, এখানে তো কোন সুড়ঙ্গ বা পথের চিহ্ন নেই। শুধু পাথর আর পাথরে পর্বতের গা ঢাকা রয়েছে। স্থানে স্থানে ছোট ছোট আগাছা আর ঝোঁপঝাড়। আর রয়েছে অশ্বথ বৃক্ষ ও নাম না জানা কত বড় বড় গাছ।

    মি. হারুন পর্বতের পাশে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন-হা, তাঁর পুলিশ ফোর্স এসে পৌঁছে গেছে। এক-একজন এক একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।

    মি. হোসেন এবং শংকর রাও গুলীভরা রিভলবার হাতে মি. হারুনের পেছনে একটা ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে রইলেন।

    মি. হারুন মুখের মধ্যে দুটি আংগুল দিয়ে খুব জোরে শিস দিলেন-একবার দু’বার তিন বার। হঠাৎ একটা হুড় হুড় শব্দ কানে এলো তাদের। মি. হারুন আশ্চর্য হয়ে দেখলেন-তাঁর সামনে পর্বতের গা থেকে একটি বিরাট পাথর একদিকে সরে যাচ্ছে। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল। তিনি স্পষ্ট দেখলেন-পর্বতের গায়ে একটি সুড়ঙ্গপথ বেরিয়ে এসেছে।

    মি. হারুন সুড়ঙ্গপথে গিয়ে দাঁড়ালেন, সঙ্গে সঙ্গে বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। অমনি পুলিশ ফোর্স এবং মি. হোসেন ও শংকর রাও সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করলেন।

    মি. হারুন এবং পুলিশ ফোর্স ভেতরে প্রবেশ করতেই দু’জন মশালধারী মশাল দূরে নিক্ষেপ করে ছুটে পালাল।

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন মশাল দু’টি কুড়িয়ে নিয়ে রিভলবার উদ্যত করে দ্রুতগতিতে এগুলেন, পেছনের পুলিশ ফোর্স ছড়িয়ে পড়ল সুড়ঙ্গের ভেতরে।

    অল্পক্ষণের মধ্যে দশজন ডাকাতকে তাঁরা পাকড়াও করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু নাথুরামকে। তারা ধরতে পারলেন না। নাথুরাম একটি গুপ্তগর্তে আত্মগোপন করে রইলো।

    তখন মুরাদ মনিরাকে নিয়ে সন্ন্যাসীর কাছে গিয়েছে। তাই মি. হারুনের হাত থেকে এ যাত্রা পরিত্রাণ পেল সে।

    মি. হারুন ডাকাতের দলকে পাকড়াও করে নিয়ে চললেন। পূর্ব আকাশ; তখন ফর্সা হয়ে আসছে!

    সবাই চলে যাবার পর নাথুরাম তার গুপ্ত গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো, দাঁতে দ্রুত পিষে বলল–একটি আগেও যদি জানতাম তাহলে সমস্ত পর্বতটাকে উড়িয়ে পুলিশ বাহিনীর অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে ফেলতাম। তার কর্কশ কণ্ঠের প্রতিধ্বনি গুপ্ত গুহার দেয়ালে আঘাত খেয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা সুড়ঙ্গপথে।

    মুরাদ আর মনিরা তখন জম্বুর বনের মধ্য দিয়ে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।

    সন্ন্যাসী বাবাজীর সামনে অগ্নিকুণ্ড দপ দপ করে জ্বলছে। পাশেই ধূমায়িত গাঁজার কলকেটা ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। সন্ন্যাসী দু’চোখ মুদিত অবস্থায় বিড়বিড় করে মন্ত্র পাঠ করছেন।

    সময় অতিবাহিত প্রায়, এতক্ষণেও এলো না ভক্ত মুরাদ তার প্রিয়া মনিরাকে নিয়ে।

    এমন সময় পদশব্দ শোনা যায়। একটু পরই মুরাদের উপস্থিতি জানতে পারেন সন্ন্যাসী বাবাজী! গম্ভীর স্থিরকণ্ঠে বলেন–মুরাদ, বড় বিলম্ব হয়ে গেছে, শিগগির প্রস্তুত হয়ে নাও।

    মুরাদের দু’চোখে আনন্দের দ্যুতি খেলে যায়। সত্যিই বাবাজীর অপূর্ব ধ্যানবল। তাকে না দেখেই তার নাম উচ্চারণ করেছেন। করজোরে বলে মুরাদ–বাবাজী, আদেশ করুন কি করতে হবে?

    তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াও, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

    মুরাদ স্থির হয়ে দাঁড়ায়।

    মনিরা একপাশে দাঁড়িয়ে আছে।

    সন্ন্যাসী বাবাজী আসন ত্যাগ করেন, এগিয়ে আসেন মুরাদের দিকে…হঠাৎ প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দেন তার নাকের ওপর।

    অমনি চিৎ হয়ে পড়ে যায় মুরাদ। এমন একটা অবস্থার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে যায় সে। তারপর বুঝতে পারে সন্ন্যাসী বাবাজী তার হিতাকাঙ্খী নয়।

    মুরাদ উঠে দাঁড়াবার পূর্বেই সন্ন্যাসী পুনরায় মুরাদকে আক্রমণ করেন এবং ঘুষির পর ঘুষি লাগিয়ে ওকে আধমরা করে ফেলেন।

    মুরাদের নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। ঠোঁট কেটেও রক্ত ঝরছে। মুরাদও রুখে দাঁড়াতে যায়। কিন্তু তার পূর্বেই সন্ন্যাসী হাতে তালি দেন। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ বেরিয়ে আসে পাশের ঝোঁপ-ঝাপের মধ্য থেকে। সন্ন্যাসীর ইংগিতে তারা মুরাদের হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দেয়।

    মুরাদের অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। মৃতের মুখের ন্যায় রক্তশূন্য হয়ে পড়ে তার মুখমণ্ডল। নিজেকে ধিক্কার দেয় সে। নিজে তো বন্দী হলোই, তার এত আরাধনার ধন মনিরাকেও হারালো। রাগে ক্ষোভে নিজের মাংস নিজেই চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।

    মুরাদকে নিয়ে পুলিশরা চলে যায়।

    সন্ন্যাসী মনিরার সামনে এসে দাঁড়াল-তুমি এখন কি চাও?

    মনিরা এতক্ষণ অপলক নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। মনে তার শত শত প্রশ্ন একসঙ্গে দোলা দিচ্ছিল। সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই পুলিশের লোক। সে কি ভুল করেছে? এর কাছে সব কথা খুলে বলা ঠিক হয়নি। দস্যু বনহুরকে সে ভালবাসে একথাও বলেছে সে তার কাছে। কি সর্বনাশ সে করেছে! মনে মনে ভয় পেয়ে যায় মনিরা। কোন জবাব না দিয়ে নিশ্চুপ পঁড়িয়ে থাকে।

    সন্ন্যাসী মনিরার মনোভাব বুঝতে পেরে হেসে বলেন–তুমি কোথায় যেতে চাও? মামা মামীর কাছে-না দস্যু বনহুরের পাশে।

    মনিরা মৃদুকম্পিত সুরে বলে–মামা-মামীর কাছে।

    বেশ, এসো আমার সঙ্গে।

    সন্ন্যাসী আগে আগে চলেন, মনিরা চলে পেছনে পেছনে। কিছুদূর এগুনোর পর একটি পাল্কী দেখতে পায় মনিরা।

    সন্ন্যাসী মনিরাকে পাল্কীতে উঠে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

    মনিরা পাল্কীতে বসে কতকটা আশ্বস্ত হলো। যা হউক সন্ন্যাসী যেই হউক সে তাকে তার মামা-মামীর কাছে পৌঁছে দেবে।

    কিন্তু একি! এ যে গহন বনের ভেতর দিয়ে এরা তাকে নিয়ে চলেছে।

    মনিরা উঁকি দিয়ে চারদিকে দেখলো।

    দু’জন লোক মশাল হাতে আগে আগে চলেছে। মশালের আলোতে লক্ষ্য করলো মনিরা সন্ন্যাসী তো নেই। সে তবে গেল কোথায়!

    ভোর হবার পূর্বে একটা পোড়োবাড়ীর সামনে এসে পাল্কী থেমে পড়লো। দু’জন মশালধারী মনিরাকে লক্ষ্য করে বলল–নেমে আসুন।

    মনিরা ইতস্ততঃ করতে লাগল।

    মশালধারী দু’জনের একজন বলে ওঠে-ভয় নেই, আসুন।

    মনিরার হৃদয় কেঁপে উঠল, সে আবার এক নতুন বিপদের সম্মুখীন হলো নাকি। পোড়াবাড়ির দিকে তাকিয়ে কণ্ঠনালী শুকিয়ে উঠলো তার। কিন্তু নিরুপায় সে। কি আর করবে, অগত্যা মশালধারী লোক দুটিকে অনুসরণ করল সে।

    অনেকগুলো ভাঙ্গা ঘর আর প্রাচীর পেরিয়ে একটি গুপ্ত দরজার নিকটে পৌঁছল তারা। মশালধারী দু’জন এবার দাঁড়িয়ে পড়ল। একজন বলল–ভেতরে যান।

    মনিরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পা বাড়ালো। না জানি এ আবার কোন বিপদে পড়লো সে। সন্ন্যাসী-সেও কি তার সাথে চাতুরি করল। হৃদয়টা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।

    কক্ষে প্রবেশ করে আশ্চর্য হলো মনিরা। সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি কক্ষ। এই পোড়াবাড়ির মধ্যে এমন পরিষ্কার সাজানো গোছানো ঘর থাকতে পারে, ভাবতে পারে না মনিরা। অবাক হয়ে চারদিকে তাকায় সে। মেঝেতে দামী কার্পেট বিছানো। দেয়ালে সুন্দর কয়েকখানা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। একপাশে একটি মূল্যবান খাট, খাটে দুগ্ধফেননিভ শয্যা পাতা রয়েছে, কয়েকখানা। দামী সোফা সাজানো। মনিরা অবাক হয়ে দেখছে, এই গহন বনের ভেতর একটা পোড়াবাড়ির মধ্যে এত সুন্দর একটি কক্ষ!

    হঠাৎ মনিরার নজরে পড়লো, এক পাশে একটা ছোট্ট টেবিল। টেবিলে স্তূপাকার ফলমূল। নাশপাতি, বেদানা, কমলালেবু, আংগুর আরও অনেক রকম ফল সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে।

    এসব দেখেও মনিরা খুশি হতে পারলো না। না জানি তার জন্য আবার কোন বিপদ এগিয়ে আসছে। তার জন্য এত ব্যবস্থার দরকার কি? সন্ন্যাসীর যদি মতিগতি ভালই হত, তাহলে তাকে তার মামা-মামীর নিকটে পৌঁছে না দিয়ে এখানে আনবার কারণ কি? নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দেয় মনিরা–তার অদৃষ্টে এত ছিল! চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে মনিরার। কিন্তু কেঁদে কি হবে! এতদিন কেঁদে কেঁদে চোখের পানি তার যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।

    এক সময় ভোরের আলো ফুটে উঠল।

    গাছে গাছে জেগে উঠল পাখির কলরব। মৃদুমন্দ বাতাস অজানা ফুলের সুরভি নিয়ে ছুটে এলো মুক্ত জানালাপথে। মনিরা দুগ্ধফেনিভ শয্যায় গা এগিয়ে দিল। চোখের পানি তার শুকিয়ে গেছে। ব্যথা সয়ে সয়ে হৃদয়টাও হয়ে উঠেছে পাথরের মত শক্ত।

    কত দিন এমন সুন্দর বিছানায় শোয়নি সে। গোটা রাতের অনিদ্রায় দু’চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মনিরা কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো নিজেই জানে না।

    মি. হারুন ডাকাতের দলকে গ্রেপ্তার করে খুশিতে মেতে উঠেছেন! তার জীবনে এটা এক চরম সাফল্য। মি. হোসেন এবং শংকর রাও-ও আনন্দে আত্মহারা। পুলিশ সুপার মি. আহম্মদ এই ভয়ংকর ডাকাতের দল গ্রেপ্তার হওয়ায় তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। নিজে এসে তিনি দেখলেন, জবানবন্দিও নিলেন।

    ডাকাতের দলের লোকগুলোর ভয়ংকর চেহারা দেখে এবং তাদের জবানবন্দি শুনে মি. আহম্মদ লোকগুলোকে হাঙ্গেরী কারাগারে আটকে রাখতে বললেন। বিচারের সময় আবার তাদের বের করে আনা হবে।

    মি. আহম্মদের কথামতই কাজ হলো।

    ডাকাতের দলকে হাঙ্গেরী কারাগারে প্রেরণ করার পর পরই কয়েকজন পুলিশ মুরাদকে পাকড়াও করে হাজির হলো–হুজুর, এই লোকটাও ছিল ডাকাতদের দলে।

    মি. হারুন এবং শংকর রাও অবাক হয়ে দেখলেন, এ যে খান বাহাদুর হামিদুল হকের লন্ডন ফেরত পুত্র মুরাদ!

    মুরাদের শরীরে অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেলেন তারা। একটা চোখের ওপরে কালো জখম হয়ে রয়েছে। ঠোঁট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়েছিল, এখনও তা সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়নি। চোয়ালের নিচেও একটা জখম রয়েছে।

    এমন সময় গতদিনের সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে হাজির হলেন।

    মি. হারুন এবং মি. হোসেন ও অন্যান্য পুলিশ অফিসার প্রৌঢ় ডাক্তারকে দেখে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। মি. হারুন উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন–আসুন, আসুন!

    প্রৌঢ় ডাক্তার আসন গ্রহণ করে বললেন–এবার আমার কথা কাজে এসেছে তো?

    হ্যাঁ ডাক্তার সাহেব, আপনার কথামত কাজ করে আমরা আজ এক ভয়ংকর ডাকাতদলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু আর একটা সমস্যার সামনে পড়েছি এই যুবককে নিয়ে।

    ডাক্তার তার মোটা পাওয়ারের চশমা নাকের ওপর থেকে চোখের ওপর তুলে দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে বলেন–এই সেই লোক, যাকে আমি সেই দিন চিকিৎসা করেছিলাম। আংগুল দিয়ে ওর জখমগুলো দেখিয়ে দিয়ে বলেন–এই দেখছেন সেই জখমগুলো।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোকের ওপর পুলিশ অফিসারগণের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল। এখন মুরাদ সেই ডাকাতদলের একজন বলে প্রমাণিত হওয়ায় তাকেও তারা হাজতে প্রেরণ করলেন।

    মুরাদ হাজতে যাবার পূর্বে একবার কটমট করে তাকালো। বৃদ্ধকে মিথ্যা বলতে শুনে আশ্চর্য হলো সে। বৃদ্ধকে সে কোনদিন দেখেছে বলেও মনে পড়লো না। অথচ সে বলছে তাকে চিকিৎসা করেছে। জানে প্রতিবাদ জানিয়ে কোন ফল হবে না, তাই নীরব রইল সে।

    মুরাদকে হাজতে পাঠানোর পর মি. হারুন বলেন–চলুন ডাক্তার সাহেব, পুলিশ সুপারের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দেই। সত্যিই আপনি একজন মহৎ ব্যক্তি।

    চলুন, উঠে দাঁড়ালেন প্রৌঢ় ভদ্রলোক।

    মি. হারুন মি. আহম্মদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে ঘটনাটা বিস্তারিত বলেন।

    সব শুনে এবং প্রৌঢ় ভদ্রলোকটার অসীম বুদ্ধি বল দেখে মি. আহম্মদ মুগ্ধ হলেন। তিনি। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন–আপনাকে আমরা পুরস্কৃত করব।

    হেসে বলেন প্রৌঢ় ভদ্রলোক-পুরস্কার আমি চাই না। আপনি সেই অর্থ দুষ্ট দমনে ব্যয়। করবেন। আচ্ছা, আজকের মত চলি। পুলিশ সুপারের সাথে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলেন তিনি।

    প্রৌঢ় ভদ্রলোক পুলিশ অফিস থেকে বিদায় গ্রহণ করার পর মি. হারুন এবং অন্যান্য পুলিশ। অফিসার নিজ নিজ কাজে মনোযোগ দিলেন।

    এমন সময় বয় একটা চিঠি এনে মি. হারুনের হাতে দিয়ে বলল–যে বৃদ্ধ ভদ্রলোক এইমাত্র পুলিশ অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন, তিনি এই চিঠিখানা আপনাকে দিতে বলে গেলেন।

    মি. হারুন একটু অবাক হলেন, এইতো তাঁর সঙ্গে সামনা সামনি সমস্ত কথাবার্তা হলো, আবার চিঠিতে কি লিখলেন।

    শংকর রাও বলেন–হয়তো কোনো গোপন কথা ওতে লিখে গেছেন।

    মি. হারুন দ্রুতহস্তে খামখানা ছিঁড়ে চিঠিখানা বের করে নিলেন-একি! একখণ্ড চিরকুট। তাতে লেখা রয়েছে, “আপনাদের কাজে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। অশেষ ধন্যবাদ।”

    –দস্যু বনহুর।

    মি. হারুনকে হতবাক হয়ে যেতে দেখে মি. হোসেন কাগজের টুকরাখানা হাতে নিয়ে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন-গ্রেপ্তার করো! গ্রেপ্তার করো! দস্যু বনহুর! দস্যু বনহুর।

    সমস্ত পুলিশ রাইফেল হাতে ছুটলো, কিন্তু কোথায় দস্যু বনহুর।

    পুলিশ সুপার মি. আহমদ রাগে-ক্ষোভে অধর দংশন করলেন। পূর্বে যদি এতটুকু জানতে পারতেন, তাহলে আজ তারা দস্যু বনহুরকে কিছুতেই পালাতে দিতেন না। মি. হারুন এবং অন্যান্য অফিসারের অবস্থাও তাই।

    শংকর রাও শুধু হেসে বলেন–কেন এত ব্যস্ত হচ্ছেন? দস্যু বনহুর তো আর কোন দোষ করেনি?

    মি. হারুন রাগত কণ্ঠে বলেন–দোষীকে নতুন করে দোষ করতে হয় না মি. রাও। দোষী সব সময়ই অপরাধী। সুযোগ পেলে সে ছোবল মারবেই।

    অনেক খোঁজাখুজি করেও দস্যু বনহুরকে আর পাওয়া গেল না।

    মি. হোসেন এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মি. হারুন নিজেও বেরিয়ে পড়লেন, যাকে সন্দেহ হলো তাকেই পাকড়াও করলেন।

    মি. আহমদ কড়া হুকুম দিলেন–দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করা চাই-ই।

    মি. আহমদ দস্যু বনহুরের ওপর চটে রয়েছেন, কারণ সে তাঁকে কিছুদিন আগে ভয়ানক নাকানি চুবানি খাইয়ে ছেড়েছে। তাই দস্যু বনহুর যত ভাল কাজই করুক তবু সে তার চক্ষুশূল তাছাড়া সে অপরাধী–দস্যু।

    পুলিশমহলে দস্যু বনহুরকে নিয়ে আবার একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল।

    এদিকে দস্যু বনহুরের খোঁজে পুলিশ যখন হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটি করছে তখন বনহুর নিজের আস্তানায় একটা আসনে অর্ধশায়িত অবস্থান ঠেস দিয়ে বসে আছে। পায়ের কাছে একটি নিচু আসনে বসে রয়েছে রহমান।

    বনহুর আর রহমানের মধ্যে মনসাপুরের জমিদার ব্রজবিহারী রায়ের কন্যা সুভাষিণীর অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিছুদিন পূর্বেও রহমান বনহুরের নিকটে সুভাষিণীর অসুখের

    কথা বলেছিল। বনহুর মনিরার নিখোঁজ ব্যাপার নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, যার জন্য অন্য কিছু ভাববার সময় হয় নি তার।

    আজ কিন্তু বনহুর সুস্থির থাকতে পারে না। রহমানের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনে।

    তারপর উঠে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ পায়চারী করে। ললাটে ফুটে ওঠে তার গভীর চিন্তারেখা।

    রহমান বলে ওঠে–সর্দার, মেয়েটা যাকে ভালবাসে তাকে পাওয়া অসম্ভব।

    থমকে দাঁড়িয়ে কুঞ্চিত করে বলে বনহুর–অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। আমি তো পূর্বেই বলেছি, যত অর্থ চায় দেব। নাহলে জোরপূর্বক তাকে পাকড়াও করে আনব।

    বনহুরের কথায় রহমান কোন জবাব দেয় না, শুধু তার মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটে মিলিয়ে যায়। বনহুর তা লক্ষ্য করে না।

    বনহুর পুনরায় পায়চারী শুরু করে।

  • পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    মনসাপুরের জমিদার ব্রজবিহারী রায় কাঁচারী কক্ষে বসে ধূমপান করছিলেন। ললাটে তাঁর। গম্ভীর চিন্তারেখা। তাঁর একমাত্র কন্যার অসুস্থতার জন্য আজ সমস্ত মনসাপুরে একটা অশান্তির কালো ছায়া বিরাজ করছে। কত ডাক্তার কবিরাজ এলো, সবাই বিফল হয়ে ফিরে গেছে। কেউ সুভাষিণীকে আরোগ্য করতে সক্ষম হলো না।

    ব্রজবিহারী রায়ের মনে শান্তি নেই। কন্যার অসুস্থতার জন্য তিনিও একরকম আহার নিদ্রা ত্যাগ করেছেন। স্ত্রী জ্যোতির্ময়ী দেবীর অবস্থাও তাই। সুভাষিণীর জন্য তাঁরা অবিরত অশ্রু বিসর্জন করে চলেছেন।

    আজ দুদিন হলো সুভাষিণীর অবস্থা আরও খারাপ। ব্রজবিহারী রায় কাঁচারী কক্ষে বসে কন্যা সম্বন্ধে চিন্তা করছিলেন, এমন সময় দারোয়ান এসে জানাল–বাবু, একজন ডাক্তার এসেছেন, দিদিমণিকে চিকিৎসা করতে চান।

    ব্রজবিহারী বাবু প্রথমে কথাটা কানেই নিলেন না। কারণ তার কন্যার অসুস্থতার কথা শুনা পর্যন্ত মোটা টাকার লোভে কত ডাক্তারই এলেন আর গেলেন তার ঠিক নেই। তবু তাচ্ছিল্য করে বলেন–নিয়ে এসো।

    একটু পরে ডাক্তারসহ দারোয়ান কক্ষে প্রবেশ করলো। ব্রজবিহারী বাবু দারোয়ানকে বেরিয়ে যেতে ইঙ্গিত করলেন। দারোয়ান কুর্ণিশ জানিয়ে বেরিয়ে যেতেই ব্রজবিহারী বাবু সূতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালেন ডাক্তারের দিকে।

    ডাক্তারের উজ্জ্বল দীপ্ত চেহারা ব্রজবিহারী বাবুর মনে শ্রদ্ধার রেখা টানল। বিশেষ করে প্রৌঢ় ডাক্তারের গভীর নীল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে তাকে উপেক্ষা করতে পারলেন না রায়বাবু।

    উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানিয়ে নিজের পাশে বসালেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন–আমার কন্যা সম্বন্ধে আপনি সব শুনেছেন?

    আমি শুধু শুনেছি আপনার কন্যা অসুস্থ, তাকে আরোগ্য করার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন।

    ওঃ আপনি তাহলে আমার কন্যার সম্বন্ধে না জেনেই এসেছেন?

    হ্যাঁ, আমি আপনার কন্যার রোগ সম্বন্ধে কিছু জানি না। যদি দয়া করে তার অসুখ সম্বন্ধে আমাকে বলেন তাহলে আমার পক্ষে সুবিধা হবে।

    তবে শুনুন।

    বলুন?

    ব্রজবিহারী বাবু কতটা আনমনা হয়ে পড়লেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলেন–ডাক্তার আমার ঐ একটা মাত্র মেয়ে। আজ সে মরণের পথে এগিয়ে চলেছে। যেমন করে হউক ওকে বাঁচাতেই হবে ডাক্তার। আপনি যত টাকা চান কন্যার জীবনের বিনিময়ে আমি আপনাকে তাই দেব।

    তার অসুখ সম্বন্ধে জানতে চাইছি রায়বাবু।

    বলছি, একটা ঢোক গিলেন ব্রজবিহারী রায়, চোখ দুটো তার ছলছল হয়ে ওঠে। ধীরকণ্ঠে বলেন–আজ প্রায় বছর হয়ে এলো আমার কন্যা পুষ্পগঞ্জে তার মাতুলালয়ে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে আসতে তার রাত হয়ে যায়। পাল্কী করেই ফিরছিল সে। তার সঙ্গে ছিল কয়েকজন বন্দুকধারী পাহারাদার আর একজন ঝি। পথে দস্যুর কবলে পড়ে পাহারাদারগণ নিহত হয়। ঝিটাও মারা পড়ে কিন্তু ভগবানের অশেষ কৃপায় আমার কন্যাকে একজন পথিক রক্ষা করেন।

    তারপর?

    তারপর সুভাকে সেই ভদ্রলোকই বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেন। কি জানি ডাক্তার, তারপর থেকে আমি লক্ষ্য করেছি–আমার সুভা যেন কেমন হয়ে গেছে। তার মুখে হাসি নেই, সময়মত নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। সব সময় কেমন যেন আনমনা ভাব। অনেক চিকিৎসা করলাম কিন্তু মেয়ের আমার কোন পরিবর্তন হয় না। আমার পুত্রবধূর পরামর্শে বিয়ে দেব ঠিক করলাম কিন্তু কি হল জানেন?

    বলুন?

    যেদিন বিয়ে তার আগের রাতে সুভা পালাল।

    ডাক্তার স্তব্ধ নিঃশ্বাসে শুনে যাচ্ছেন। ব্রজবিহারী রায়ের কথাগুলো তিনি মনে মনে গভীরভাবে তলিয়ে দেখছেন, ব্যথিত পিতার অন্তরের ব্যথা ডাক্তারের হৃদয়ে আঘাত করতে লাগলো বলেন–বলুন তারপর?

    কদিন তার কোন সন্ধান পেলাম না। ওর মা তো ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করলো। হঠাৎ একদিন তাকে পেলাম। কে এক জন ভদ্রলোক তাকে অজ্ঞান অবস্থায় হসপিটালে ভর্তি করে দিয়ে ছিলেন। খবর পেয়ে তাকে নিয়ে এলাম বাড়িতে কিন্তু আসার পর সে আর কারও সঙ্গে কথা বলে না। জোর করে দুটি খাওয়াতে হয়, জোর করে স্নান করাতে হয়। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কি যেন বলে বুঝা যায় না।

    ডাক্তার সোজা হয়ে বসলেন, আগ্রহভরা কন্ঠে বলেন–এখনও সে ঐ রকম অবস্থায় আছে?

    হ্যাঁ, ডাক্তার, এখনও ঠিক ঐ অবস্থায় রয়েছে। চলুন তাকে দেখবেন।

    ব্রজবিহারী রায় উঠে অন্দরবাড়ির দিকে এগুলেন। ডাক্তার তাঁকে অনুসরণ করলেন। কিন্তু মনে তার এক গভীর চিন্তা জোট পাকাচ্ছিল। এসব কথা মানে কি? জমিদার বাবু যা বলছেন তা যেন অত্যন্ত জটিল রহস্যজনক।

    ডাক্তার জমিদার ব্রজবিহারী রায়ের সঙ্গে সুভাষিণীর কক্ষে প্রবেশ করলেন।

    আঁচলে মুখ ঢেকে বিছানায় চুপ করে শুয়ে আছে একটি মহিলা। ডাক্তার বুঝতে পারলেন মহিলাটি অন্য কেউ নয়–জমিদার কন্যা সুভাষিণী।

    ব্রজবিহারী রায় এবং ডাক্তার সুভাষিণীর বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। পদশব্দে মুখের আঁচল সরালো না সুভাষিণী। যেমন শুয়ে ছিল তেমনি রইল। ডাক্তার একটু কেশে শব্দ করলেন মনে করলেন রোগী এবার নিশ্চয়ই মুখের অবারণ উন্মোচন করবে কিন্তু কই, যেমনকার তেমনি রইল সুভাষিণী।

    রায়বাবু বলেন–জোর করে তার মুখের কাপড় সরাতে হয় নইলে ও নিজে কখনও সরায় না।

    ডাক্তার বলেন–ডেকে দেখুন একবার।

    রায়বাবু কন্যার গায়ে হাত রেখে ডাকলেন–সুভা, সুভা! মা এই দেখ কে এসেছেন।

    এতটুকু নড়লো না সুভাষিণী।

    জমিদার বাবু কন্যার মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেললেন।

    চমকে উঠলেন ডাক্তার। মুখের আবরণ উন্মোচিত হওয়ায় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল সুভাষিণী। কেমন উদাস করুন চাহনি।

    ডাক্তার বিস্ময়াবিষ্টের মত তাকিয়ে রইলেন।

    ব্রজবিহারী বাবু কন্যার অবস্থা দর্শনে মুখ ফিরিয়ে নিলেন পিতৃহৃদয় ব্যথায় খান খান হয়ে যেতে লাগল। একমাত্র কন্যা এ অবস্থায় রায়বাবু অস্থির হয়ে পড়েছেন। ডাক্তারকে লক্ষ্য করে। বলেন–ডাক্তার বাবু সুভা সেরে উঠবে তো?

    ডাক্তার গভীরভাবে যেন কি চিন্তা করছিলেন। রায়বাবুর কথায় সম্বিৎ ফিরে পান, বলেন– উঃ কি বলেন?

    বললাম আমার সুভা সুস্থ হবে তো?

    হবে রায়বাবু আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি আপনাকে কথা দিলাম আপনার কন্যা সুভাকে সুস্থ করবই।

    ডাক্তার! অস্কুট ধ্বনি করে ওঠেন ব্রজবিহারী রায়।

    হ্যাঁ রায়বাবু, আমাকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন।

    ডাক্তার আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেব। আমার কন্যাকে সুস্থ করে তুলুন।

    সুভাষিণী তখন আবার মুখের আবরণ টেনে দিয়েছিল।

    ডাক্তার নিস্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ কি যেন চিন্তা করলেন, তারপর বলেন–আপনার মেয়ের কাছে সব সময় কে বেশি থাকেন বলতে পারেন?

    আমার বৌমা থাকে ওর পাশে।

    একবার যদি তাঁকে ডাকতেন আমি কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করব।

    বেশ ডাকছি। রায়বাবু কিঞ্চিৎ উচ্চকণ্ঠে ডাকলেন–বৌমা, বৌমা, একবার এদিকে এসো তো মা।

    অল্পক্ষণেই দরজার ওপাশে চুড়ির মৃদু শব্দ হলো। পর মুহূর্তেই কক্ষে প্রবেশ করেন এক বধূ। পরনে লাল চওড়া পেড়ে শাড়ি। ললাটে সিঁদুরের ফোঁটা। স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন আমাকে ডাকছেন?

    হ্যাঁ মা। ইনি ডাক্তার সুভাকে দেখতে এসেছেন। তোমাকে ইনি কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করবেন। তারপর ডাক্তারকে লক্ষ্য করে বলেন–আমার পুত্রবধূ চন্দ্রাদেবী। আপনি এর কাছে যা জানতে চান জানতে পারেন।

    চন্দ্রাদেবী নতদৃষ্টি তুলে তাকাল ডাক্তারের মুখের দিকে। ডাক্তার ব্রজবিহারী রায়কে লক্ষ্য। করে বলেন– আপনি দয়া করে একটু বাইরে যেতে পারেন কি? আমি উনাকে….

    বেশ বেশ, আমি বাইরে যাচ্ছি। ব্রজবিহারী বাবু বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

    ডাক্তার এবার তাকালেন চন্দ্রাদেবীর মুখের দিকে। তারপর গম্ভীর মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন–আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করব, তার ওপর নির্ভর করছে সুভাষিণী দেবীর চিকিৎসা। আশা করি আপনি সঠিক জবাব দেবেন।

    নিশ্চয়ই দেব।

    সুভাষিণী দেবীর নিকটে বেশি সময় আপনিই থাকেন, তাই না?

    হ্যাঁ।

    এর অবস্থা কদিন হলো এরকম হয়েছে?

    একদিন এক ডাকাতের হাতে পড়ে…

    ওসব কাহিনী আমি রায়বাবুর মুখে শুনেছি। এবার জানতে চাই, আপনার কি মনে হয় এর সম্বন্ধে?

    কিছু ভাবতে থাকে চন্দ্রাদেবী। কারণ সে জানে, যে ভদ্রলোক তাকে সেদিন ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করেছিল সে স্বাভাবিক লোক নয়–দস্যু। একথা জেনেও এতদিন সে সকলের নিকটে গোপন করে এসেছে। কিন্তু আজ ডাক্তারের সামনে আর গোপন রাখতে পারলো না। আসল কথা না বললে হয়তো এর পরিণতি খারাপ হতে পারে। কি জানি কেন অন্যান্য ডাক্তারের চেয়ে এই ডাক্তারের প্রতি বিশ্বাস জন্মালো চন্দ্রাদেবীর। তাছাড়া কোন উপায় তো নেই। সুভাষিণীকে বাঁচাতে হলে কথাটা আর গোপন রাখা চলে না।

    ডাক্তার চন্দ্রাদেবীকে নিপ দেখে জকুঞ্চিত করে বলেন–কি ভাবছেন? দেখুন, আমার নিকটে কিছু গোপন করতে চাইলে ভুল করবেন।

    না না, আমি কিছু গোপন করব না–সব বলছি।

    বসুন, একটা চেয়ার দেখিয়ে বলেন ডাক্তার–বসুন, এইখানে বসে বলুন।

    ডাক্তার নিজেও বসেন একটা চেয়ারে। ওপাশে তাকিয়ে দেখলেন তিনি সুভাষিণী পূর্বের ন্যায় চোখে মুখে কাপড় ঢাকা দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। এবার প্রশ্ন ভরা দৃষ্টি মেলে তাকালেন চন্দ্রাদেবীর মুখের দিকে, একি! চন্দ্রাদেবীর ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম চক চক করছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন বেশ ঘাবড়ে গেছে। হেসে বলেন ডাক্তার–আপনি স্বচ্ছন্দে বলুন, ঘাবড়াবার কোন কারণ নেই।

    বলছি, দেখুন ডাক্তার বাবু, আমার মনে হয় সুভা তাকে ভালবেসে ফেলেছে।

    স্বচ্ছ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন ডাক্তার–কাকে?

    একটা ঢোক গিলে বলে চন্দ্রাদেবী–যিনি সেদিন সুভাকে ডাকাতের হাত থেকে বাঁচিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন।

    মুহূর্তে ডাক্তারের হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে গেল। চমকে উঠলেন ডাক্তার। স্থিরকণ্ঠে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন কাকে ভালবেসে ফেলেছে সুভাষিণী?

    ঐ যে বললাম, সেদিন যে ভদ্রলোক ওকে ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তাকে।

    এ কথা আপনি কেমন করে জানলেন?

    আমাকে সুভা বলেছিল।

    চন্দ্রাদেবী, সুভাষিণী আপনাকে যা বলেছে খুলে বলুন দেখি?

    বলতে পারি কিন্তু …

    কিন্তু নয়–বলুন, কিছু গোপন করবেন না।

    চন্দ্রাদেবী একবার দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিল। তারপর গলার স্বর খাটো করে নিয়ে বলতে শুরু করলো–ডাক্তার বাবু সুভা বলেছে যাকে সে ভালবাসে সে স্বাভাবিক লোক নয়। সে নাকি থেমে যায় চন্দ্রাদেবী।

    ডাক্তার ব্যাকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন–বলুন বলুন?

    সে নাকি দস্যু বনহুর।

    ডাক্তারের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নত হয়ে যায়।

    চন্দ্রাদেবী বলে কি, এও কি সম্ভব। অস্ফুট কন্ঠে বলে ওঠেন ডাক্তার-না না, এ হতে পারে না–দস্যু বনহুরকে ভালবাসা অসম্ভব।

    চন্দ্রাদেবী ডাক্তারের কণ্ঠস্বরে চমকে ওঠে–বিস্ময়ভরা নয়নে তাকায় তার দিকে তারপর বলে সে–ডাক্তার বাবু আমিও ওকে একথা বারবার বলেছি যা সম্ভব নয়, তা চিন্তা করাও উচিত নয়। কিন্তু কিছুতেই সুভা তাকে ভুলতে পারছে না। ওর গোটা অন্তর জুড়ে ঐ একটি ছবি আঁকা রয়েছে–সে ঐ বনহুর। জেগেও সে তাকে স্বপ্নে দেখে। অস্ফুট স্বরে তারই নাম উচ্চারণ করে। ডাক্তার বাবু, আমি এতদিন সকলের কাছে কথাটা গোপন রেখেছিলাম কিন্তু আজ আপনার কাছে না বলে পারলাম না। আপনি যদি দয়া করে কিছু করতে পারেন।

    অন্যমনস্কভাবে ডাক্তার বলেন–হুঁ।

    চন্দ্রাদেবী তখন বলে চলে–ডাক্তার বাবু সুভার মনের যে অবস্থা, তাতে মনে হয় ও আর বাঁচবে না।

    ডাক্তার এবার দৃষ্টি তুলে ধরেন চন্দ্রাদেবীর মুখের দিকে। গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করেন। তিনি। তারপর উঠে দাঁড়ান। আচ্ছা, আজকের মত তাহলে চলি।

    ততক্ষণে ব্রজবিহারী রায় কক্ষে প্রবেশ করেন সব শুনেছেন তো?

    শুনেছি।

    আমার কন্যা আরোগ্য লাভ করবে তো?

    পরে জানাব। ডাক্তার দরজার দিকে পা বাড়ান।

    ব্রজবিহারী রায় পেছন থেকে পুনরায় বলে ওঠেন–শুনুন ডাক্তার বাবু সুভাকে কেমন দেখলেন বললেন না তো।

    থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালেন ডাক্তার। তারপর ইতস্তত করে বলেন–পরে জানতে পারবেন।

    আজ কিছুই বলবেন না?

    না।

    আবার কবে আসবেন? ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন ব্রজবিহারী রায়।

    ডাক্তার আবার ফিরে এলেন চন্দ্রাদেবী আর ব্রজবিহারী রায়ের পাশে। স্থিরকণ্ঠে বললেন– সময় হলেই আবার আসব।

    ব্রজবিহারী রায় পকেট থেকে একশ টাকার একখানা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরলেন– এই নিন আপনার ফিস।

    ডাক্তার হেসে বলেন–আজ কিছুই লাগবে না। আপনার কন্যাকে সুস্থ করতে পারলে দেবেন। কথাটা শেষ করে বেরিয়ে যান ডাক্তার।

    ব্রজবিহারী রায় আশ্চর্য কণ্ঠে বলেন–অদ্ভুত লোক! ফিস পর্যন্ত নিল না।

    চন্দ্রাদেবীও ডাক্তারের ব্যবহারে কম অবাক হয়নি। অন্যান্য ডাক্তারের চেয়ে এ ডাক্তার যেন আলাদা। ওর দৃষ্টির কাছে চন্দ্রাদেবী নিজকে সঙ্কোচিত মনে করছিল। কেন যেন একটা কথাও তার কাছে গোপন করতে পারল না। কথাটা বলা ঠিক হলো কিনা বুঝতে পারে না চন্দ্রাদেবী। শ্বশুরের কথায় কোন জবাব দিতে পারলো না সে।

    মনিরা গভীরভাবে চিন্তা করে সন্ন্যাসী তাকে এভাবে এখানে আটকে রেখেছে কেন? এতে কি লাভ তার? এখানে তাকে আটকে রাখার উদ্দেশ্য কি?

    মনিরা এখানে আসার পর এতটুকু অসুবিধা হয়নি তার। সে কিছু না চাইতেই হাতের কাছে সব পেয়েছে। এমনকি মনিরা বীণা বাজাতে পারত–একটা বীণাও সাজানো রয়েছে সেই কক্ষে। মনিরার মনে যখন অসহ্য ব্যথা জেগে উঠত তখন সে বীণা নিয়ে বসত।

    প্রায়ই নিশীথ রাতে সে বীণায় ঝংকার তুলত। এক করুণ সুরে গোটা পোড়াবাড়ি আচ্ছন্ন হয়ে যেত গহন বনের পাতায় পাতায় ঝড়ে পড়া শিশির বিন্দুর টুপটাপ শব্দের সঙ্গে বীণার সুর মিশে এক অপরূপ মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি হত।

    নিঃসঙ্গ জীবন মনিরার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল। যদিও এখানে তাকে কেউ বিরক্ত করতে আসত না। মুরাদের লালসাপূর্ণদৃষ্টি থেকে সে রক্ষা পেয়েছে, নাথুরামের কঠোর নির্যাতন থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, তবু একটা ভয় ভীতি আর আশংকা মনিরার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এখনও সে বন্দিনী। মামা মামীমার এবং আত্মীয় স্বজনের নিকটে এখনও সে অজ্ঞাত রয়েছে। কেউ তার সন্ধান জানে না।

    মনিরা ভাবে, সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই কোন পুলিশের লোক। নইলে সেদিন পুলিশ আসবে কোথা থেকে। শয়তান মুরাদকে গ্রেপ্তারই বা করে নিয়ে যাবে কেন। কিন্তু সে যদি পুলিশের লোকই হবে তবে তাকে মামা মামীর নিকটে পৌঁছে না দিয়ে এখানে আটক রাখার মানে কি! নিশ্চয়ই সে কোন অভিপ্রায়ে তাকে এই পোড়াবাড়ির মধ্যে এনে রেখেছে।

    মনিরা অসহ্য বেদনায় দগ্ধিভূত হতে থাকে।

    একদিন নিশীথ রাতে জানালার পাশে বসে করুণ সুরে বীণা বাজাচ্ছিল মনিরা। নিজের সুরে নিজেই তন্ময় হয়ে গিয়েছিল।

    কখন যে তার পেছনে সন্ন্যাসী বাবাজী এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল নেই মনিরার। আনমনে সে বীণার তারে হাত বুলিয়ে চলেছে হঠাৎ একটা হাতের স্পর্শে মনিরার ঝংকার স্তব্ধ হয়ে যায়। চমকে ফিরে তাকায় মনিরা। তাঁর কাঁধে হাত রেখে সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সন্ন্যাসীর মুখে হাসির রেখা।

    মনিরা দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। তারপর কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে সন্ন্যাসীর দিকে। সে দৃষ্টিবাণ যেন সন্ন্যাসী বাবাজীর হৃৎপিণ্ডে বিদ্ধ হয়ে যায়।

    কিন্তু কি আশ্চর্য। মনিরার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি বাণে সন্ন্যাসী এতটুকু বিচলিত হন না বরং তিনি আরও এগিয়ে আসেন মনিরার দিকে। হেসে বলেন বৎস ভয় পেয়েছ। এসো, আমার হাতের ওপর হাত রেখ।

    না।

    কেন?

    মনিরা কোন জবাব দেয় না।

    সন্ন্যাসী বলেন–তোমার বীণার সুর আমাকে টেনে এনেছে। আমার ধ্যান ভঙ্গ করে দিয়েছে। তোমার ঐ বীণার ঝংকার।

    মনিরার দু’চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বের হয়। পিছু হটতে থাকে সে। মনে মনে নিজকে ধিক্কার দেয়–কেন সে বীণা বাজাতে গিয়েছিল? কেন সে সন্ন্যাসীর ধ্যান ভঙ্গ করল? সন্ন্যাসী তখন তার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

    মনিরা শিউরে ওঠে।

    কিন্তু সন্ন্যাসী তখন এত কাছে এসে পড়েছেন যে, মনিরা আর নড়তে পারে না। চট করে মনিরার দক্ষিণ হাতখানা বলিষ্ঠ হাতের মুঠায় চেপে ধরেন সন্ন্যাসী। তারপর মৃদু হেসে বলেন– এখন?

    মনিরা চিৎকার করে ওঠে–ছেড়ে দিন। ছেড়ে দিন আমার হাত।

    সন্ন্যাসী হেসে বলেন–না, কিছুতেই না।

    মনিরা রাগে অধর দংশন করে বলে–শয়তান। সন্ন্যাসী সেজে আমার সর্বনাশ করতে এসেছ? মনিরা দু’হাতে সন্ন্যাসীর জটাজুট টেনে ধরে।

    সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসীর মাথা থেকে জটাজুট আর মুখ থেকে দাঁড়ি গোঁফ খসে পড়ে।

    মনিরা অস্ফুটধ্বনি করে ওঠে–তুমি!

  • আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

    আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

    একজন ব্যক্তি তার এক জীবনে সেই ইংরেজ আমলের খিলাফত আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্যায় হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত দেখেছেন। এই সময়টায় রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন পঞ্চাশেরও বেশি বছর। জড়িয়েছেন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনায়। পঞ্চাশ বছর কোনো মুখের কথা নয়, এ এক মহাকাল। তার জীবনটা এমন এক সুইট স্পটে ছিল, যে সময়টায় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে বড় বড় ঘটনা ঘটছে। আর তিনিও সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন সেসবে। তার এই লম্বা সময়ের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিকথাই হলো এই বই।

    আবুল মনসুর আহমদ একজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও সাহিত্যিক। এক ‘ফুড কনফারেন্স’ গল্প দিয়েই সাহিত্য জগতে অমর হয়ে আছেন। তার উপর ছিলেন মেধাবী ছাত্র, সুবক্তা ও সংগঠক। এতগুলো বৈশিষ্ট্য একসাথে যার মধ্যে আছে তার কাজ ও কর্ম ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান হবে তা খুবই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, তিনি বর্তমান ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা।

    যুক্ত ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেস আন্দোলনে, সেখানে বাঙালি নিম্নবর্গীয় মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্নে মতের মিল না হওয়ায় কংগ্রেস ছেড়ে তৈরি করেন প্রজা সমিতি আন্দোলন। যা পরে কৃষক-প্রজা সমিতি এবং আরো পরে কৃষক-প্রজা পার্টি হিসেবে কাজ পরিচালনা করে। এ পার্টি পরবর্তীতে এ কে ফজলুল হকের প্রধানমন্ত্রীত্বে নিখিল বাংলায় (পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা) সরকার গঠন করে।

    জনমানুষের রাজনৈতিক দাবি বাস্তবায়নে কৃষক-প্রজা পার্টি সরকারের অসফলতায় হতাশ হয়ে পরে যুক্ত হন মুসলিম লীগে। মুসলিম লীগ তখন ভারতবর্ষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে ভারতীয় মুসলমানদের অধিকারের আন্দোলন করছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের ভূমিকায় হতাশ হয়ে যুক্ত হন আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ)-এ। পূর্ব বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগকে হারাতে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কোয়ালিশনে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব করেন। যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

    হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি কেন্দ্রের শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বেশ কিছু দিন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তার মন্ত্রীত্বের দায়িত্বকালে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রীসভা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, তাই তিনিও বাংলার উপকারের জন্য বেশিদিন সময় পাননি। (আফসোস, এত বছর পরেও পাকিস্তান স্বাভাবিক হয়নি। আজ অবধি পাকিস্তানের কোনও মন্ত্রীসভা পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। ইমরান খানের মন্ত্রীসভা তার শেষ উদাহরণ।)

    তার এই বিস্তৃত রাজনৈতিক জীবনের ঘটনা, স্মৃতিকথা ও মতামত উঠে এসেছে প্রায় সাত শত পৃষ্ঠার এ বইটিতে। বইয়ের নাম ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ সে হিসেবে খুবই সার্থক।

    বইটিকে ইতিহাসও বলা যাবে না, আবার স্মৃতিকথাও বলা যাবে না। ইতিহাস আর স্মৃতিকথার মিশ্রণ। ইতিহাস বলা যাবে না এ কারণে, তার সময়ে এমন অনেক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে যেগুলোয় তিনি যুক্ত থাকতে পারেননি। যেসবে যুক্ত থাকতে পারেননি যেগুলো তিনি বলেননি। সেসবই বলেছেন যেসবে তিনি যুক্ত ছিলেন। আবার পুরোপুরি স্মৃতিকথাও বলা যাবে না, কারণ এতে তিনি ইচ্ছে করেই নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু এড়িয়ে গিয়েছেন। যেমন তিনি যে আসনে নির্বাচিত হলেন, নিশ্চয় তার জন্য অনেক খাটতে হয়েছে, অনেক ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সেসবের কিছুই তিনি উল্লেখ করেননি। সেগুলোই উল্লেখ করেছেন যেগুলো ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ব্যক্তির সাথে জড়িত। নিজেকে এক পাশে রেখে এক রকম নির্মোহ লেখা।

    এতে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ও এসেছে, তবে সংক্ষেপে। কারণ তিনি ততদিনে বুড়িয়ে গিয়েছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও মন্থর হয়ে গিয়েছে। তারপরেও ঘটনাবলীর হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে যে যে মতামত দিয়েছেন তা ইতিহাসের ও রাজনীতির পাঠকের জন্য অমূল্য।

    উনার লেখার ধাঁচটাও দারুণ। শুরুর শ দুয়েক পৃষ্ঠা হাস্যরসে ভরা। এমন রসাত্মক পন্থায় কথাগুলো বলেছেন বা ঘটনাগুলো তুলে এনেছেন, পাঠকের জন্য কোনো চাপই মনে হবে না। এমন করতে করতে কখন যে ঢুকে যেতে হবে পাঠের ম্যারাথন দৌড়ে বোঝাই যাবে না। মোটা বইয়ের পড়ায় একবার মন বসে গেলে তা আর উঠে না। মোটা বই পড়ার এই একটা অন্যরকম মজা।

    বইটি সকলের পড়া উচিত। সচেতন পাঠকের জন্য অবশ্যপাঠ্য। আমাদের ইতিহাস বিষয়ে আমাদের পপুলার কালচারে আমরা যা পড়ে এসেছি, যা জেনেছি সেসব থেকে দূরে গিয়ে ভিন্ন এক ডাইমেনশনে নিয়ে যাবে পাঠককে। দায়িত্ববান পাঠকের জন্য যা খুবই দরকার। মনে হবে, আমরা ইতিহাসে যা পড়েছি, যা জেনেছি তা পর্যাপ্ত নয়।

    যেহেতু এটা রাজনীতির ইতিহাসের বই, তাই এ বই নিয়ে অনেক পাঠকের অনেক মত-দ্বিমত তৈরি হবে। আসলে হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজনীতি নানা মানুষের নানা মতের জিনিস। দ্বিমত-ভিন্নমত সেখানে নিত্য বিষয়। এ ধরনের বিষয়গুলোতে এডপ্ট করে আমাদের এগিয়ে যাবার ক্ষমতা যত বেশি হবে, পাঠক হিসেবে আমাদের পরিপক্কতাও তত বাড়বে।

  • দুটি কথা

    দুটি কথা

    লেখক সম্পর্কে দুটি কথা।

    মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠকীর্তি ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ের সপ্তম সংস্করণ প্রকাশনা উপলক্ষ্যে কয়েকটি কথা বলতে হয়।

    আবুল মনসুর আহমদ-এর দীর্ঘ আশি বছরের জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। সাহিত্যের সেই দিকটা তিনি বেছে নিয়েছিলেন যেটা ছিল সবচেয়ে কঠিন–ব্যঙ্গ-সাহিত্য। সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিনায়ও স্বচ্ছন্দ্যে পদচারণা করেছেন তিনি। যে অঙ্গনেই তিনি কাজ করেছেন সেখানেই শীর্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ব্যঙ্গ-সাহিত্য বলতে গেলে উভয় বাংলায় তিনিই ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর প্রতিটি স্যাটায়ারই কালোত্তীর্ণ। সমাজপতি, ধর্মগুরু, রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী যেখানেই তিনি কোন দুর্নীতির সন্ধান পেয়েছেন সেখানেই করেছেন কশাঘাত। তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের রসাঘাত কশাঘাতে রূপ নিয়ে সমাজকে পরিশোধিত করত। এ আঘাত ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ আচার অনুষ্ঠানকেই আক্রমণ করেনি–যারা এসব প্রসঙ্গ নিয়ে মিথ্যার জাল বুনন করতেন তাদেরকেও তিনি নাস্তানাবুদ করেছেন। এসব রচনার পাঠকদের মনে হবে চরিত্রগুলো সবই চেনা। এদের কার্যকলাপও জানা।

    ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ তার দীর্ঘজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। যারা এদেশে রাজনীতি করতে আগ্রহী তাদের সকলের জন্যে এই বইটি অবশ্য পাঠ্য। এতে রয়েছে এদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। দেশীয় রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে হলে এর সঙ্গে আরও পড়তে হবে তার লেখা ‘বাংলাদেশের কালচার’, ‘শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু’, ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ ইত্যাদি বইগুলো।

    ‘রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ একজাতীয় স্মৃতিকথা আত্মজীবনী। রাজনীতির স্মৃতি এতে স্থান পেয়েছে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, ওকালতি ইত্যাদি কর্মজীবনের বহুমুখী স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘আত্মকথা’। এসবের একত্রে মিশ্রণ ঘটেছে বিশালাকারের ইংরাজি গ্রন্থ ‘End of a Betrayal’। ইংরেজি উপন্যাস সাহিত্যে তাঁর দুটি অমর কীর্তি ‘জীবন ক্ষুধা’ ও ‘আবেহায়াত’।

    রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য দফতরসমূহের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য দফতরসমূহের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সাহিত্য সম্পর্কে এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, রসসাহিত্যে আজ পর্যন্ত উভয় বাংলার কেউ তার প্রতিভার সমকক্ষ এমনকি কাছাকাছিও আসতে পারেননি। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কলকাতার খাদেম, সুলতান, দি মুসলমান, মোহাম্মদী প্রভৃতি সাপ্তাহিক ও দৈনিক কৃষক, নবযুগ ও ইত্তেহাদের সম্পাদনাকালে তিনি অনেক ক্ষণজন্মা সাংবাদিক ও সম্পাদকের গুরু, প্রশিক্ষণদাতা ছিলেন। কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, রশীদ করিম, আহসান হাবিব, ফররুখ আহমদ, খোন্দকার আবদুল হামিদ, রোকনুজ্জামান খান, কে. জি. মুস্তাফা প্রমুখ ব্যক্তিগণ কোন না কোন সময়ে তার সহকর্মী ছিলেন।

    এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে খ্যাতি, যশ, সম্মান যেমন ছিল তেমনি ছিল সামরিক শাসনকালের কারাযন্ত্রণা। সে কারণেই তিনি আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর লিখেছেন। ‘শোনা’ বা ‘পড়া নয়’। বিশাল ও বিস্তৃত কর্মজীবনে তিনি মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ নওশের আলী, খাজা নাজিমুদ্দিন, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মিঞা ইফতেখারউদ্দিন, মিঞা মাহমুদ আলী কাসুরী, জি. এম. সৈয়দ, মিঞা মমতাজ দৌলতানা, আবুল হাশিম প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন এবং ব্রিটিশ ভারত ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর ছিল ব্যক্তিগত পরিচয় ও গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল ‘তুমি তুমি’ পর্যায়ের। জাতীয় কবি নজরুলের সঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সগৌরবে লেখককে লীডার বলতেন এবং নিজেকে তাঁর শিষ্য বলতেন সেই কলকাতার কলেজ জীবন থেকেই।

    তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।

    এদেশে রাজনীতি করেছেন অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য চর্চা করেছেন অনেক মহীরূহ। সাংবাদিকতা করেছেন অনেক তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। কিন্তু এসবের সমারোহ ঘটাতে পেরেছেন কয়জন?

    সে হিসেবে আবুল মনসুর আহমদ এক ও অদ্বিতীয়।

    — মহবুব আনাম

    বিনীত আরয

    পাক-ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইখানির ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হইল।

    লেখক আজ জীবিত নাই। কিন্তু তাহার দুর্লভ সাহিত্যকর্ম জাতির সামনে চিরদিন তাহাকে স্মরণীয় করিয়া রাখিবে।

    এখন যাহারা রাজনীতি করিতেছেন এবং ভবিষ্যতে যাহারা রাজনীতির মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় নিজদিগকে উৎসর্গ করিবার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োজিত রহিয়াছেন তাহাদের সকলের জন্য আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইখানি দিগ-দর্শন হিসাবে কাজ করিবে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

    আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর উদীয়মান প্রজন্মের সামনে একটি জীবন্ত ইতিহাস। মূলত ইহা শুধু একখানি গ্রন্থ নয়–ইহা একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস বা রাজনৈতিক দলিল (পলিটিক্যাল ডকুমেন্ট)। এই ডকুমেন্ট দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং মাস্টার্স শ্রেণীতে অবশ্য পাঠ্য থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির, যাঁহারা কর্ণধার তাঁহারা এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ আজ পর্যন্ত গ্রহণ করেন নাই।

    সাধারণভাবে প্রকাশক হিসাবে নয়– দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ অর্থাৎ এই মূল্যবান পলিটিক্যাল ডকুমেন্ট আহরণের জন্য আমি আজ দেশের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদগণের নিকট জানাইতেছি বিনীত আর।

    — মহীউদ্দীন আহমদ

    ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫

    পঞ্চম সংস্করণের ভূমিকা

    ছাত্রাবস্থা হইতেই সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী এবং স্যার সৈয়দ আহমদ-এর একজন অনুসারী হিসাবে একটি বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তা এবং আদর্শে বিশ্বাসী হইয়া আমার জীবন গড়িয়া উঠিয়াছে।

    মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইখানিতে আমার আজীবনের লালিত স্বপ্ন এবং সেই চিন্তা ও আদর্শের প্রতিচ্ছবি রহিয়াছে।

    এই ঐতিহাসিক বইখানি ছাপাইবার জন্য অনেক প্রকাশক লালায়িত আছেন। আমি জানি তাহাদের সেই লালসা শুধু আর্থিক কারণে রাজনৈতিক বা জাতীয় কোন উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে নহে। কিন্তু এই বইখানি ছাপাইবার পিছনে আমার লালসা–আদর্শের, অর্থের নহে।

    বইখানির লেখক মরহুম আবুল মনসুর আহমদ আমার মনের গভীরের সেই চিন্তা ও আদর্শের সন্ধান পাইয়াছিলেন এবং সেই কারণেই জীবদ্দশায় তিনি কখনই তাহার এই অমূল্য বইখানি প্রকাশনার সুযোগ হইতে আমাকে বঞ্চিত করেন নাই।

    তাহার ইনতেকালের পর সময়ের বিবর্তনে সাময়িক পরিবর্তন হইলেও তাহার সুযোগ্য পুত্র এককালের সংগ্রামী ছাত্রনেতা, প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক এবং দেশের সর্বাধিক প্রচারিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার কলামিস্ট ভ্রাতৃপ্রতিম জনাব মহবুব আনাম তাহার সুযোগ্য পিতার মনের খবর জানিতেন বলিয়াই এই ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ প্রকাশনার দায়িত্ব এখনও পর্যন্ত আমার উপরেই রাখিয়াছেন।

    জনাব মহবুব আনাম ইচ্ছা করিলে বইখানি প্রকাশনার দায়িত্ব অন্যকে দিয়া প্রচুর অর্থ পাইতে পারেন কিন্তু তিনি তাহা করেন নাই– তাহার এই উদারতা ও মহানুভবতার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।

    —প্রকাশক

    ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯

  • গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    ‘গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র প্রথম উপন্যাস। এটি লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের মে মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় অক্টোবর ১৯৯৭ সালে এবং তৃতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের বইমেলায়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    উপন্যাসটি রচিত হয়েছে টানা, প্রায় এক হাজার অনুচ্ছেদে। অনলাইনে একসাথে এত দীর্ঘ লেখা পড়ে পাঠক ক্লান্তিবোধ করবেন, তাই আমরা বইটিকে কয়েকটি অনুচ্ছদে বিভক্ত করে প্রকাশ করেছি। অবশ্যই লক্ষ্য রাখা হয়েছে যাতে কোন পরিচ্ছেদে কাহিনী বর্ণনার ছেদ না পড়ে।

    গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    জাদুল আসাদির তাঁবুতে বিশ্রাম নিচ্ছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। শিরস্ত্রাণ খোলেননি। তাঁবুর বাইরে সশস্ত্র দেহরক্ষীরা পাহারা দিচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য রক্ষীবাহিনীর কমাণ্ডার একটু অন্যদিকে গেলেন। একজন গার্ড পর্দা ঈষৎ ফাঁক করে উঁকি দিল তাবুর ভেতর। দু’চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন সুলতান। গার্ড বাইরে দাঁড়ানো চারজন সঙ্গীর দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ করে খুলল একবার। সে চারজন দেহরক্ষী অন্যদের সাথে গল্প জুড়ে দিল।

    তাঁবুতে ঢুকল প্রথম রক্ষী। খঞ্জর হাতে নিল। বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে গেল ঘুমন্ত সুলতানের দিকে। খঞ্জর বাগিয়ে ধরে হাত উপরে তুলল। সালাহুদ্দীনের বুক লক্ষ্য করে যখন নেমে আসছিল হাত, ঠিক সে মুহূর্তে পাশ ফিরলেন তিনি। রক্ষীর আঘাত গিয়ে পড়ল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর শিরস্ত্রাণে।

    বিদ্যুৎ গতিতে দাঁড়িয়ে গেলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। নিমিষেই ঘটনা আঁচ করে নিলেন। নিজের বাছাই করা দেহরক্ষী আক্রমণ করছে দেখেও হতবাক হলেন না।

    রক্ষী শিরস্ত্রাণের পাশ কেটে মাটিতে গেঁথে যাওয়া খঞ্জর টেনে তুলছিল। পলকে পূর্ণ শক্তিতে রক্ষীর মুখে ঘুসি মারলেন সালাহুদ্দীন। মট করে হাড় ভাঙ্গার শব্দ হল। বিকট শব্দ করে চিৎ হয়ে পরে গেল রক্ষী।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবী রক্ষীর হাত থেকে ছিটকে পড়া খঞ্জর নিজের হাতে তুলে নিলেন। চিৎকার শুনে বাইরে থেকে ছুটে এল দু’জন রক্ষী।

    ‘ওকে বেঁধে ফেল।’ নির্দেশ দিলেন সুলতান।

    কিন্তু ওরা সুলতানের আদেশ অমান্য করে উল্টো তাঁকেই আক্রমণ করে বসল। একা খঞ্জর দিয়ে দুই রক্ষীর তলোয়ারের মোকাবেলা করতে লাগলেন সালাহুদ্দীন। তাঁবুর ভেতর শুরু হলো অসম এক লোমহর্ষক লড়াই।

    দু’এক মিনিটের মধ্যেই অন্য গার্ডরাও ভেতরে প্রবেশ করল। অবাক বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তারা তাকিয়ে রইল সালাহুদ্দীন ও রক্ষীদের অসম লড়াইয়ের দিকে। সম্বিত ফিরে এলে একজন এগিয়ে এসে আঘাত করল রক্ষীদের। দেখাদেখি অন্য রক্ষীরাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবার রক্ষীরা দুই দল হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করল। আপন পর পার্থক্য করতে না পেরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী।

    সংঘর্ষ থেমে গেল। দু’জন নিহত হল এই সংঘর্ষে। আহত হল কয়েকজন, পালিয়ে গেল একজন। তদন্ত শেষে দেখা গেল দেহরক্ষীদের সাতজন ছিল ঘাতক দলের সদস্য। গুমাস্তিগীন নামে খলিফা সালেহের এক কেল্লাধিপতি সালাহুদ্দীনকে হত্যার জন্য এদের নিয়োগ করেছিল।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে হত্যা করার এ ধরনের কয়েকটি প্রচেষ্টা পরপর ব্যর্থ হল। এ হত্যা পরিকল্পনার হোতা ছিল সাইফুদ্দীন। সাইফুদ্দীন ছিল সালাহুদ্দীনের চাচাতো ভাই খলিফা আস-সালেহের একজন আমীর। যে সময়ের কথা বলছি, তখন মুসলিম বিশ্বের প্রধান হলেও কার্যত ইসলামী দুনিয়া ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত। বিভিন্ন প্রদেশের গভর্ণরগণ সুলতান উপাধি ধারণ করে বলতে গেলে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। এ ঘটনার পর একদিন ভোরে সাইফুদ্দীনকে লক্ষ্য করে একটি চিঠি পাঠালেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। তাতে তিনি লিখলেন, “খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জানো না সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা।’

    চিঠিটি লিখেছিলেন তিনি ১১৭৫ সালের এপ্রিল মাসে। খলিফা সালেহ এবং সাইফুদ্দীন খৃষ্টানদের সহযোগিতায় সালাহুদ্দীনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। পরাজিত হয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেল সাইফুদ্দীন। তার তাঁবুতে পাওয়া গেল অগণিত সম্পদ। পাওয়া গেল খাঁচায় বন্ধী রঙবেরঙের পাখি, এক ঝাঁক সুন্দরী তরুণী, নর্তকী, গায়িকা। বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্র আর পিপা ভর্তি মদ।

    সালাহুদ্দীন খাঁচায় দুয়ার খুলে দিলেন, পাখীরা উড়ে গেল উন্মুক্ত আকাশে। নর্তকী, গাায়িকা আর তরুণীদের মুক্ত করে দিলেন। চিঠি লিখলেন আমীর সাইফুদ্দীনের কাছে, ‘তোমরা বেঈমানী করে খৃষ্টানদের সহযোগিতায় আমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছ। একবারও কি ভেবেছ, তোমাদের এ ষড়যন্ত্র ইসলামী বিশ্বের মানচিত্র মুছে দিতে পারে? যদি আমাকেই ঈর্ষা কর, যদি আমিই তোমাদের শত্রু হয়ে থাকি, মেরে ফেল আমায়। দু’বার সে চেষ্টাও করেছ। সফল হওনি, আবার না হয় চেষ্টা করে দেখ। এবার সফল হলে হতেও পার।

    ‘যদি নিশ্চয়তা দিতে পারো, আমাকে হত্যা করলে ইসলাম আরো গৌরবোজ্জ্বল হবে, তবে আমার মাথা কেটে তোমাদের পায়ের কাছে রেখে দিতে বলব। মনে রেখো, অমুসলিম কখনো মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না। ইতিহাস এর সাক্ষী। ফ্রান্স সম্রাট এবং রিমাণ্ডের মতো খৃষ্টানকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সহযোগিতা করছ বলে তোমরা ওদের বন্ধু। ওরা সফল হলে ওদের প্রথম শিকার হবে তোমরাই। এরপর পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের নামও মুছে যাবে।

    ‘তোমরা যোদ্ধা জাতির সন্তান। সৈন্য হওয়া তোমাদের জাতীয় পেশা। প্রতিটি মুসলমানই আল্লাহর সৈনিক। তার জন্য শর্ত কেবল ঈমান ও সৎকাজ। খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জানো না সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা। অনুরোধ করি, আমার সাথে সহযোগিতা কর। জিহাদে শরীক হও,  না হলে কমপক্ষে বিরোধীতা কোরো না। আমি তোমাদের কোন শাস্তি দেব না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।’

    —সালাহুদ্দীন আইয়ূবী।

    এ সব যুদ্ধের ফলে অজস্র যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে এসেছিল। বন্দীর সংখ্যা ছিল অগণিত। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে তিন ভাগে ভাগ করলেন। এক ভাগ যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে তাদের মুক্ত করে দিলেন। এক ভাগ দিলেন সৈন্য এবং গরীবদের। তৃতীয় ভাগ পাঠিয়ে দিলেন নিজামুল মুল্‌ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই তিনি শিক্ষা লাভ করেছিলেন। নিজের জন্য এবং জেনারেলদের জন্য কিছুই রাখেননি। বন্দীদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। কিছু অমুসলিমও ছিল, সালাহুদ্দীনের মহানুভবতায় ওরা তার আনুগত্য গ্রহণ করে সোবাহিনীতে ভর্তি হয়ে গেল।

    ইবনে সাবার ফেদাই গ্রুপ দু’বার সালাহুদ্দীনকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করেছিল। ফেদাইদেরকে ঐতিহাসিকগণ  ঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দু’-দু’বারই তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। তৃতীয় আক্রমণ হল খৃষ্টান এবং সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করার পর। সাইফুদ্দীন পালিয়ে গুপ্তঘাতক দলের সাহায্য কামনা করল।

    সালাহুদ্দীনের প্রায় একশো বছর আগে হাসান ইবনে সাবা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন উপদলের জন্ম দিয়েছিল। নিজেদের পরিচয় দিত মুসলমান হিসেবে। কিছু অলৌকিক কাজ দেখিয়ে মানুষকে অনুসারী বানাতো। সুন্দরী তরুণী, মদ, হিপটোনিজম এবং চাটুকারিতা ছিল ওদের পুঁজি। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ছিল বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ঘাতক দল। ওরা মানুষকে হত্যা করত গোপনে।

    এরা ছিল সতর্ক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং দুঃসাহসী। এরা পোশাক আশাক এবং ভাষা পরিবর্তন করে বড় বড় জেনারেলের দেহরক্ষীর চাকরী নিত। সময় সুযোগ বুঝে এমন ভাবে সারতো হত্যার কাজ, নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীকে কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যেত না। ধীরে ধীরে ইবনে সাবার দল ঘাতকদল হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে ওরা ছিল পারদর্শী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হত্যার কাজে ব্যবহার করত বিষ। সুন্দরী যুবতীরা মদের সাথে এ বিষ মিশিয়ে দিত।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে রূপসী নারী দিয়ে বা মদ খাইয়ে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। তিনি এ দুটো থেকেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেন সতর্কভাবে। ফলে আকস্মিক আক্রমণ ছাড়া তাঁকে হত্যা করার অন্য কোন পথ ছিল না। কিন্তু বিশ্বস্ত ও নিবেদিত প্রাণ দেহরক্ষীদের উপস্থিতিতে তাও ছিল অসম্ভব। সালাহুদ্দীন ভেবেছিলেন পরাজয়ের পর সালেহ এবং সাইফুদ্দীন আর মাথা তুলে দাঁড়াবে না। সম্মিলিত বাহিনীর অহমিকা চুর্ণ হবার পর সালাহুদ্দীনের সাথে টক্কর দেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সংশোধন হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল ওরা।

    বিজয়ের পর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তাঁর অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখলেন। দখল করলেন গাজাসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী— দুঃসাহসী এক যোদ্ধা, অসাধারণ এক সেনাপতি। ইসলামের শত্রুরা আজও তাকে সম্বোধন করে ‘গ্রেট সালাদীন’ বলে, মুসলমানরা স্মরণ করে জাতীয় বীর হিসাবে।

    মুসলিম মিল্লাতের ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লেখা রয়েছে তাঁর নাম। খৃষ্টান জগৎ তাঁর সাহস, বুদ্ধিমত্তা আর রণকৌশলের কথা কোনদিন ভুলতে পারবে না। ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে তাঁর জয় পরাজয়ের বিস্ময়কর কাহিনী। কিন্তু ক্রুশের ধ্বজাধারীরা মদ আর রূপের মায়াজালে যে ষড়যন্ত্রের বিস্তার ঘটিয়েছিল, নিজেদের সে সব অপকর্মের চমকপ্রদ কাহিনী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি।

    ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। মিসরের গভর্ণর এবং সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলেন সালাহুদ্দীন। তিনি ছিলেন রাজপরিবারের সন্তান। অল্প বয়সেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মনে করতেন শাসক রাজা নয়, শাসক হলো ইসলামের রক্ষক। বুদ্ধি হওয়ার পর তিনি দেখেছিলেন মুসলিম শাসকদের অনৈক্য। বিলাসপ্রিয় শাসকবর্গ সুন্দরী রমণী আর মদে আকণ্ঠ ডুবেছিল। গাদ্দারী, বিলাসিতা আর অবিশ্বাসের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যৎ।

    রাষ্ট্রের কর্ণধারদের হারেমের শোভা বর্ধন করছিল ইহুদী আর খৃষ্টান যুবতীরা। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব সুন্দরী রমনীদের রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল মানুষের ইসলামী জোশ আর স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বার আবেগ অনুভূতি।

    এ সুযোগে খৃষ্টান শাসকগণ একের পর এক ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো দখল করে নিচ্ছিল। মুসলিম শাসকবর্গ প্রজার রক্ত শুষে খৃষ্টানদেরকে বাৎসরিক কর প্রদান করত। ওদের সেনা শক্তির ভয়ে সর্বক্ষণ তটস্ত হয়ে থাকত। খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে ভোগবিলাসের হারেমে বন্দী রেখে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব দখলের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছিল।

    সালাহুদ্দীন শিক্ষা লাভ করেছিলেন নিজাম-উল-মুলক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে শিক্ষার্থীদেরকে খালেছ ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলার ব্যবস্থা ছিল। আর সে জন্যই ঘাতকদলের প্রথম শিকার ছিলেন নিজাম-উল-মুলক। রোমানদের রাজ্যবিস্তারে তিনি ছিলেন বড় বাঁধা। এ বাঁধা দূর করার জন্য তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

    সালাহুদ্দীন এখানেই সেনা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। প্রশাসনিক কাজে তাঁকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন নুরুদ্দীন জঙ্গী। মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার সকল গুণাবলী এখানেই অর্জন করেছিলেন তিনি। সালাহুদ্দীন আইয়ূবী গোয়েন্দা বৃত্তি, কমাণ্ডো অভিযান এবং গেরিলা অপারেশনকে সবচে’ বেশী গুরুত্ব দিতেন। তিনি দেখেছিলেন গুপ্তচর বৃত্তিতে খৃষ্টান জগৎ অনেক অগ্রসর। মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা আর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। সালাহুদ্দীন অত্যন্ত ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে এর মোকাবিলা করেছিলেন।

    তিনি মিসরের গভর্ণর ও সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলে শুরু হল ষড়যন্ত্র। বড় বড় জেনারেলরা এ পদের জন্য ছিল লালায়িত। তাঁরা যখন দেখল তাঁদের আশায় গুড়ে বালি, তখন ক্ষুব্ধ জেনারেলগণ ষড়যন্ত্র শুরু করল তাঁর বিরুদ্ধে।

    ওদের ধারণায় সালাহুদ্দীন একজন বালকমাত্র। এ পদের যোগ্যতা তাঁর মধ্যে নেই। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে জেনারেলদের সে ধারণা ভেঙে গেল। সালাহুদ্দীন কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। সৈন্যদের জন্য ভোগবিলাস এবং মদ নিষিদ্ধ করলেন। মনোনিবেশ করলেন ওদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে। ফলে অল্প দিনেই সেনাবাহিনী সুশৃংখল ও সুসংগঠিত হয়ে উঠল। অল্পবয়স্ক অর্বাচীন বালক বলে তাঁকে যারা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখছিল, টনক নড়ে উঠল তাদের।

    সালাহুদ্দীন খৃষ্টান শক্তির মোকাবিলার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। মুক্ত ফিলিস্তিনে শ্বাস নেয়ার দুর্মর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনীকে সে ভাবে গড়ে তুলতে লাগলেন তিনি। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘যে খোদা আমাকে মিসরের গভর্ণর করেছেন, অবশ্যই তিনি ফিলিস্তিনও মুক্ত করবেন।’ তাঁর এ ঘোষণার জন্য কেবল খৃষ্টানই নয়, খৃষ্টানপন্থী মুসলমান আমীর ওমরারাও তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়াল। বাইরের শত্রুর চাইতে ঘরের শত্রুরা হয়ে উঠল তাঁর জন্য অধিকতর বিপজ্জনক।

    নতুন গভর্ণরের অভ্যর্থনার আয়োজন করা হল। আয়োজন করলেন জেনারেল নাজি। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক তিনি। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী ছাড়াও বেসামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত। মুচকি হেসে একে একে সকলের সাথে করমর্দন করলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। কণ্ঠে স্নেহ-ভালবাসার উষ্ণ পরশ। কোন কোন অফিসারের ঠোঁটে কুটিল হাসি। দৃষ্টিতে ঘৃণা আর উপহাস। ওদের ধারণা, নুরুদ্দীন জঙ্গীর সাথে সুসম্পর্ক এবং রাজপরিবারের সন্তান বলেই সালাহুদ্দীন গভর্ণর হতে পেরেছেন। এক প্রবীণ অফিসার আরেকজনের কানে কানে বলল, ‘এখনো শিশু, আমরা পেলে পুষে নেব।’

    অনুষ্ঠানে তাঁকে শিশুই মনে হচ্ছিল। জেনারেল নাজির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন সালাহুদ্দীন। কপাল কুঞ্চিত হল ঈষৎ। করমর্দনের জন্য হাত প্রসারিত করলেন। নাজি তোষামুদে দরবারীদের মত সালাহুদ্দীনকে কুর্নিশ করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমো খেয়ে বললেন, ‘আপনার জীবন রক্ষার্থে আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও বিলিয়ে দেব। আপনি আমাদের কাছে মাননীয় জঙ্গীর আমানত।’

    ‘ইসলামের চাইতে আমার জীবনের দাম বেশী নয় সম্মানিত জেনারেল।’ সালাহুদ্দীন বললেন, ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্ত সংরক্ষণ করে রাখুন। খৃষ্টান ষড়যন্ত্রের ঘণঘটা মুসলিম বিশ্বের আকাশে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।’

    জবাবে মৃদু হাসলেন নাজি। যেন তাঁকে রূপ কথার গল্প শোননো হচ্ছে। নাজি ছিল ফাতেমী খেলাফতের সিপাহসালার। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক। সৈন্যদের সবাই ছিল সুদানের অধিবাসী। তাঁর বাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত। বলতে গেলে এরা ছিল নাজির ব্যক্তিগত সৈন্য। নাজি ছিল মুকুটহীন সম্রাট।

    তখন মুসলিম দেশগুলোর কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করছিল খৃষ্টান জগৎ। মিসর এবং আশপাশের শাসকদের জন্য নাজি ছিল এক ত্রাস। তাঁর মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রভূমি। ভেড়া দেখলে নেকড়ের যেমন দাঁত বেরিয়ে আসে, সালাহুদ্দীনকে দেখে নাজিরও তেমনি দাঁত বেরিয়ে এসেছিল। সালাহুদ্দীন তাঁর এ ক্রুর হাসির মর্ম না বুঝলেও এটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, এ শক্তিধর জেনারেলকে তাঁর প্রয়োজন।

    ‘হুজুর অনেক দূর থেকে এসেছেন। খানিক বিশ্রাম করে নিন।’ নাজি বলল।

    ‘যে কঠিন দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে, আমি তার যোগ্য নই। এ দায়িত্বভার আমার বিশ্রাম এবং নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে। প্রথমে অফিসে গেলেই কি ভাল হয় না?’

    ‘হুজুর কি আগে খেয়ে নেবেন?’ বলল একজন অফিসার।

    একটু ভেবে ওদের সাথে হাঁটা দিলেন সালাহুদ্দীন। দু’সারিতে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র গার্ডবাহিনী। ওদের হাতের অস্ত্র এবং পেশীবহুল বলিষ্ঠ দেহ দেখে তাঁর চেহারায় হেসে উঠল আনন্দের দ্যুতি। দরজার কাছে পৌঁছতেই চেহারায় এ আলো হঠাৎ নিভে গেল। তার বদলে হতাশার আঁধার এসে গ্রাস করল তাঁকে।

    দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন রূপসী তরুণী। তাদের পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে রেশম কোমল চুল। পরনে পাতলা পোশাক। হাতে ফুলের ঝুড়ি। সালাহুদ্দীনের পথে ওরা ফুল ছুঁড়তে লাগল। সাথে সাথে বেজে উঠল দফ ও রবাবের সুর ঝঙ্কার।

    থমকে দাঁড়ালেন সালাহুদ্দীন। ডানে বাঁয়ে নাজি এবং তাঁর সহকারীরা। ভারতীয় রাজরাজড়াদের মত ওরা নুয়ে তাঁকে সামনে চলার জন্য অনুরোধ করল।

    ‘সালাহুদ্দীন ফুল মাড়ানোর জন্য আসেনি।’ গমগম করে উঠল সালাহুদ্দীনের কণ্ঠ। ঠোঁটে শ্লেষের হাসি। যে হাসি দেখতে ওরা অভ্যস্ত নয়।

    ‘হুজুর চাইলে আমরা আকাশের তারা এনে দিতে পারি’ নাজি বলল।

    ‘আমাকে খুশী করতে হলে একটা জিনিসই আমার পথে ছড়ানো যেতে পারে।’

    ‘আদেশ করুন।’ মুখ খুলল নাজি’র সহকারী, ‘কোন জিনিস আপনাকে তুষ্ট করতে পারবে।’

    ‘খৃষ্টানদের লাশ।’ মৃদু হেসে বললেন সালাহুদ্দীন।

    ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল অফিসারের।

    মুহূর্তে বদলে গেল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর চেহারা। দু’ চোখ থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল আগুনের হল্‌কা। বললেন, ‘মুসলমানদের জীবন ফুলশয্যা নয়। আপনারা কি জানেন না খৃষ্টানরা মুসলিম বিশ্বকে ইঁদুরের মত কেটে টুকরো টুকরো করে চলছে?’

    তাঁর গম্ভীর কণ্ঠের ধ্বনি বদলে দিল ঘরের পরিবেশ। প্রতিটি শব্দ থেকে বিস্ফোরিত হচ্ছিল প্রচণ্ড ক্রোধ। ‘আমাদের মেয়েদের উলঙ্গ করে ওদের ইজ্জত পদদলিত করেছি বলেই আজ আমরা ফুল মাড়াতে পারছি। শুনুন, আমার দৃষ্টি আটকে আছে ফিলিস্তিনে। আপনারা কি আমার পথে ফুল বিছিয়ে মিশর থেকে ইসলামকে বিদায় করতে চাইছেন?’

    তিনি চারদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমার পথ থেকে ফুল সরিয়ে নাও। এ ফুলে পা পড়লে আমার হৃদয় কাঁটার ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। সরিয়ে দাও মেয়েদের। আমি চাই না ওদের সোনালী চুলে জড়িয়ে গিয়ে আমার তরবারী গতি হারিয়ে ফেলুক।’

    ‘হুজুরের ইজ্জত সম্মান……।’

    ‘আমাকে আর কখনো হুজুর বলবে না।’ ঝাঁঝের সাথে বললেন তিনি। মনে হল শব্দের তীব্র আঘাতে ওদের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেয়া হয়েছে। ‘তোমরা যার কালেমা পড়েছ হুজুর তো তিনি। আমি তাঁর দাসানুদাস মাত্র। সে হুজুরের জন্য আমার জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে চাই। তাঁর পয়গাম আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি। খৃষ্টান জগৎ ওই পয়গাম ছিনিয়ে নিয়ে রোম উপসাগরে ডুবিয়ে দিতে চাইছে। ডুবিয়ে দিতে চাইছে মদের দরিয়ায়। আমি বাদশা হয়ে এখানে আসিনি।’

    নাজির চোখের ইশারায় মেয়েরা ফুল কুড়িয়ে দরজা থেকে সরে গেল। দ্রুতপায়ে ভেতরে ঢুকলেন সালাহুদ্দীন। প্রশস্ত কক্ষ। ফুল দিয়ে সাজানো বিশাল টেবিল। টেবিলে নানা রকম সুস্বাদু খাবার।

    খাবারে দৃষ্টি বুলিয়ে তিনি তাকালেন সহকারী সালারের দিকে।

    ‘মিসরের সব মানুষ কি এমন খাবার খেতে পারে?’

    ‘না হুজুর’। সহকারীর জবাব, ‘গরীবরা তো এসব খাবার স্বপ্নেও দেখে না।’

    ‘তোমরা কোন্ সমাজের লোক? যারা এমন খাবার স্বপ্নেও দেখে না ওরা কি তোমাদের চেয়ে ভিন্ন জাতি?’

    সকলেই নির্বাক।

    ‘এখানে যত চাকর-বাকর এবং ডিউটিরত সেপাই রয়েছে সবাইকে ডেকে নিয়ে এসো। এ খাবার ওরা খাবে।’

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবী একটা রুটির সাথে ক’টুকরা তরকারী তুলে তড়িঘড়ি খাওয়া শেষ করলেন। এরপর নাজিকে সাথে নিয়ে হাঁটা দিলেন গভর্ণর হাউসের দিকে।

    দু’ঘন্টা পর। গভর্ণর হাউস থেকে বেরিয়ে এল নাজি। দ্রুত এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। এক লাফে ঘোড়ায় চড়ে দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল।

    রাত নেমেছে। নাজি খাস কামরায় কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুকে নিয়ে মদের আসর বসিয়েছে। নাজি বলল, ‘যৌবনের তেজ কয়েক দিনের মধ্যেই ঠাণ্ডা করে দেব। কমবখ্‌ৎ বলল কি জান? বলল, কাবার প্রভুর শপথ! মুসলিম বিশ্ব থেকে খৃষ্টানদের বিতাড়িত করে তবে আমি বিশ্রাম নেব।’

    ‘সালাহুদ্দীন আইয়ূবী? হুহ্!’ সহকারী সালারের কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর। ‘ইসলামী রাষ্ট্রের দম ফুরিয়ে গেছে সে এ খবরও জানে না। এখন তো সুদানীরা দেশ চালাবে।’

    অন্য এক কমাণ্ডার প্রশ্ন করল, ‘পঞ্চাশ হাজার ফৌজের সবাই সুদানী একথা তাঁকে বলেননি। বলেননি যে ওরা আপনার নির্দেশে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না?’

    ‘তোমার কি মাথা খারাপ এডরোস? আমি বরং তাঁকে নিশ্চয়তা দিয়েছি। বলেছি আপনারা ইশারা পেলে আমার সৈন্যরা খৃষ্টানদের ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু…’

    থেমে গেল নাজি।

    ‘কিন্তু কি?’

    ‘মিসরের লোকদেরকে ফৌজে ভর্তি করার জন্য সে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ ফৌজ এক এলাকার থাকা নাকি উচিৎ নয়। সে মিসরের লোকদেরকে আমার সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে।’

    ‘আপনি কি বললেন?’

    ‘বলেছি আপনার নির্দেশ পালন করা হবে। কিন্তু আমি তা করব না।’

    ‘তার মনমানসিকতা কেমন বুঝলেন?’

    ‘একরোখা জেদী।’

    ‘আপনার বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার সামনে সে এখনো শিশু। নতুন গভর্ণর হয়ে এলো তো! কদিন পরই পদের নেশায় পেয়ে বসবে।’

    ‘আমি তাঁর এ নেশা দূর করবো না। নেশায় নেশায় তাকে নিঃশেষ করব।’

    ওরা অনেকক্ষণ ধরে সালাহুদ্দীনকে নিয়ে কথা বলল। নতুন গভর্ণর এই মুকুটহীন সম্রাটের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে কি পদক্ষেপ নেয় হবে তাও আলোচিত হল।

    অন্যদিকে সালাহুদ্দীন তাঁর সহকারীদের বলছিলেন, ‘আমি এখানে রাজা হয়ে আসিনি। কাউকে রাজত্ব করতেও দেবো না।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমাদের সামরিক শক্তির প্রয়োজন। এখানকার সেনাবাহিনীর গঠন পদ্ধতি আমার পছন্দ নয়। পঞ্চাশ হাজর ফৌজের সবাই সুদানী। অথচ সব এলাকার লোকেরই সৈন্য হবার অধিকার আছে। এভাবে ওদের জীবনের মানও উন্নত হতে পারে। সব এলাকা থেকে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার জন্য আমি নাজিকে বলে দিয়েছি।’

    ‘নাজি কি আপনার নির্দেশ পালন করবে?’ একজন সহকারী প্রশ্ন করল।

    ‘কেন, সে কি আমার হুকুম অমান্য করবে নাকি?’

    ‘করতেও পারে। ফৌজের সর্বময় কর্তা তিনি। তিনি কারো নির্দেশ পালন করেন না, বরং অন্যকে তাঁর নির্দেশ পালনে বাধ্য করেন।’

    এ কথায় সালাহুদ্দীন একটু নীরব রইলেন। তবে তাঁর চেহারায় কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। তিনি কি ভাবছেন তা বুঝে উঠার আগেই আলী বিন সুফিয়ানকে রেখে অন্যদের বিদায় জানালেন তিনি।

    আলী মধ্য বয়সী এক চৌকস গোয়েন্দা লিডার। কুশলী, সাহসী এবং অসম্ভব বাকপটু। গুপ্তচর বৃত্তির জন্য সে বিশ্বস্ত ও নিবেদিতপ্রাণ কিছু লোককে ট্রেনিং দিয়ে পারদর্শী করে তুলেছে। তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব গোয়েন্দা দল। আকাশ থেকে তারকা ছিনিয়ে আনতে বললেও যারা পিছপা হবে না। চিন্তা চেতনার দিক থেকে সে ছিল আইয়ূবীর সমমনা। সালাউদ্দীন তাকে বাগদাদ থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন।

    ‘শুনলে আলী! এরা বলল, কারো হুকুম পালন করতে নয়, নাজি হুকুম দিতে অভ্যস্ত!’

    ‘শুনলাম তো। চিনতে ভুল না করলে বলব, লোকটি ধুরন্ধর ও বড় ধরনের ক্রিমিনাল। তার ব্যাপারে আগে থেকেও আমি কিছুটা জানি। জনগণের টাকায় লালিত সেনাবাহিনী এখন তার নিজস্ব ফৌজ। তার ষড়যন্ত্রের ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ‘সব এলাকার লোকই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার প্রয়োজন’ আপনার এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী এবং সঠিক হয়েছে। আমার তো আশংকা হচ্ছে সুদানী সৈন্যরা প্রয়োজনের সময় আপনার হুকুম অমান্য করে তারই অনুগত্য করবে। বলা যায় না, ফৌজের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি পরিবর্তন করে নাজিকে আপনার অপসারণও করতে হতে পারে।’

    ‘না, নাজির মত প্রভাবশালী ব্যক্তিকে এখনই বিরূপ করতে চাই না। এ মুহূর্তে তাঁকে অপসারণ করা ঠিক হবে না। নিজেদের রক্ত ঝরানোর জন্য আমি অস্ত্র হাতে নেইনি, আমাদের তরবারী শত্রুর জন্য। আমি আগে ভালবাসা দিয়ে তাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করব। তুমি বর্তমান সেনাবাহিনী আমাদের কদ্দুর কাজে আসবে তা-ই বোঝার চেষ্টা কর।’

    ‘আপনার ভালবাসা তাকে শুধরাতে পারবে বলে মনে হয় না’।

    সালাহুদ্দীন যা ভেবেছিলেন নাজি ততটা সহজ ছিল না। ভালবাসা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। তার সব প্রীতি এবং মমতা ছিল ক্ষমতার সাথে। ক্ষমতার প্রশ্নে সে ছিল অত্যন্ত কঠোর। মানুষ হিসাবে ছিল অসম্ভব ধূর্ত। ষড়যন্ত্র ছিল তার হাতিয়ার। কাউকে ফাঁসাতে চাইলে তার সাথে মোমের মত কোমল ব্যবহার করত। সালাহুদ্দীনের সাথে তার ব্যবহার ছিল অনুগত দাসানুদাসের মত। তার সামনে সে কখনো বসত না। সালাহুদ্দীনের প্রতিটি কথায় জি-হুজুরীর ভূমিকা পালন করত।

    নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে মিসরের সকল অঞ্চল থেকেই সেনা ভর্তি শুরু করে দিয়েছিল। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। সালাহুদ্দীনও তাকে একটু একটু পছন্দ করা শুরু করেছেন। নাজি তাকে আশ্বাস দিয়েছিল, সেনাবাহিনী আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়। ফৌজের পক্ষ থেকে নতুন গভর্ণরকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার প্রস্তাবও দিল সে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি তার এ আমন্ত্রণ মুলতবী রাখলেন।

    রাত নেমেছে। নিজের কক্ষে দু’জন কমাণ্ডার নিয়ে মদ পান করছিল নাজি। মৃদু লয়ে বাজছে সংগীতের সুর মুর্ছনা। তালে তালে নাচছে দু’জন নর্তকী। পায়ে নুপুর নেই। বে আব্রু দেহের ভাঁজে ভাঁজে মাদকতা। প্রহরী ভেতরে এসে নাজির কানে কানে কি যেন বলল।

    মদির আবেশে মত্ত নাজির আনন্দে বিঘ্ন ঘটাবার সাহস কারও ছিল না। কিন্তু এ আসর থেকে তাকে কোন্ সময় তুলে নেয়া যায় প্রহরী তা জানত।

    উঠে দাঁড়াল নাজি। প্রহরী তাকে একটি কক্ষে নিয়ে গেল। সুদানী পোশাক পরে একজন লোক বসে আছে। সাথে এক যুবতী।

    নাজিকে দেখে দু’জন উঠে দাঁড়াল। যুবতীর রূপ মাধুর্য দেখে নাজি খানিক হতভম্বের মত তাকিয়ে রইল। সে নারী শিকারী। শুধু ভোগের জন্যই নয়, বড় বড় অফিসারদের ব্লাকমেল অথবা তাদেরকে হাতে রাখবার জন্যও সুন্দরী যুবতীদের ব্যবহার করত নাজি। কসাই যেমন পশু দেখলে গোশত পরিমাণ করতে পারে, সেও প্রথম দেখাতেই বুঝত কাকে দিয়ে কোন কাজ করানো যাবে। নারী ব্যবসায়ীরা প্রায়শই তার কাছে মেয়ে নিয়ে আসত।

    বিক্রেতা যুবতীর ব্যাপারে বলল, ‘দারুণ স্মার্ট। নাচতে পারে, গাইতে পারে, মুখের মধুতে পাথরও গলিয়ে দিতে পারে।’

    নাজি ওর ইন্টারভিউ নিয়ে চমৎকৃত হল। ভাবল, একটু তৈরী করে নিলে যে কোন কাজেই ব্যবহার করা যাবে।

    দাম দস্তুর শেষে টাকা নিয়ে চলে গেল লোকটি। নাজি ওকে নিয়ে চলে এল জলসা ঘরে। নাচতে বলল তরুণীকে। দেহের বাড়তি কাপড় ফেলে দিয়ে দু’পাক ঘুরতেই হা হয়ে গেল তিন দর্শক। ফ্যাকাশে হয়ে গেল আগের দু’নর্তকীর চেহারা। নতুন মেয়েটার সামনে ওরা এখন মূল্যহীন বাসি ফুল।

    আসর ভেঙে দিল নাজি। নতুন মেয়েটাকে রেখে সকলকে বিদায় করে দিল।

    ‘নাম কি সুন্দরী?’

    ‘আমার নাম জুলি’।

    ‘তোমাকে যে দিয়ে গেল সে বলেছে, তুমি নাকি পাথর গলাতে পার। আমি তোমার সে যোগ্যতা যাচাই করতে চাই।’

    ‘কে সে পাথর?’

    ‘মিসরের নতুন গভর্ণর। যিনি একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কও।’

    ‘সালাহুদ্দীন আইয়ূবী?’

    ‘হ্যাঁ, যদি তাকে বশে আনতে পার তবে তার ওজন সমান সোনা তোমার পুরষ্কার।’

    ‘তিনি কি মদ পান করেন?’

    ‘না, মুসলমান শূকরকে যেমন ঘৃণা করে, সে মদ, নারী, নাচ, গান এবং ভোগবিলাসকে তেমনি ঘৃণা করে।’

    ‘শুনেছি আপনার কাছে এমন সব যুবতী রয়েছে যাদের দেহের যাদু নীল নদের স্রোতকেও রুদ্ধ করে দিতে পারে। ওরা কি ব্যর্থ?’

    ‘এখনও পরীক্ষা করে দেখিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এ কাজ করতে পারবে। সালাহুদ্দীনের বিশ্বাস এবং চরিত্র সম্পর্কে আমি তোমাকে বিস্তারিত বলব।’

    ‘তাকে কি বিষ খাওয়াতে হবে?’

    ‘এখন নয়। তার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। আমি চাই সে তোমার মত রূপসীর আঁচলে বাঁধা পড়ুক। এরপর তাকে আমার পাশে বসিয়ে মদ খাওয়াব। মারতে চাইলে তোমার প্রয়োজন নেই, ঘাতক দলকে দিয়ে সহজেই তা করানো যায়।’

    ‘তার মানে আপনি দুশমনি নয় বন্ধুত্ব চাইছেন?’

    জুকির বুদ্ধিমত্তায় নাজি কতক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

    ‘হ্যাঁ জুকি।’

    ওর রেশম কোমল চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল নাজি, ‘আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। এমন বন্ধুত্ব, যেন সে আমার কথায় উঠে এবং বসে। এর পর কি করতে হবে তা আমি জানি।’ থামল নাজি।

    একটু ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘একটা কথা তোমাকে বলা প্রয়োজন। সালাহুদ্দীনের হাতেও একটা চাল আছে। তোমার রূপ যৌবনের ওপর তার চাল বিজয়ী হলে তুমি বাঁচতে পারবে না। সালাহুদ্দীনও তোমায় বাঁচাতে পারবে না। তোমার জীবন আমার হাতে। এ জন্যই তোমার সাথে এত খোলামেলা কথা বলছি। নইলে আমার মত জেনারেল তোমার মত এক গনিকার সাথে এভাবে আলাপ করত না।’

    ‘অনাগত ভবিষ্যত বলে দেবে কে ধোঁকা দেয়। এবার বলুন তার কাছে আমি পৌঁছব কিভাবে?’

    ‘আমি তার সম্মানে এক সংবর্ধনার আয়োজন করতে যাচ্ছি। রাতে তার শয়ন কক্ষে তোমায় ঢুকিয়ে দেব।’

    ‘ঠিক আছে, এর পরের কাজ হবে আমার।’