Author: তাহের আলমাহদী

  • ভয়ংকর ষড়যন্ত্র

    ভয়ংকর ষড়যন্ত্র

    দীর্ঘদিন থেকে সুলতান মিসরে অনুপস্থিত। বেড়ে গেছে বিরোধীদের তৎপরতা। খ্রিস্টানরা উস্কে দিয়েছে পদচ্যুত ফাতেমী খেলাফতের অংশীদারদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন। খ্রিস্টান গোয়েন্দায় ভরে গেছে সমগ্র কায়রো। অর্থ আর নারী দেহের উষ্ণতায় নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে সুলতানের বিশ্বস্ত কয়েকজন। গোয়েন্দা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ইহুদি যুবতীদের কুটজালে ধরা ‍দিয়েছে প্রশাসনের উচ্চভিলাষী কতিপয় কর্মকর্তা। ওদের জাতীয় চেতনাবোধ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ক্ষমতার মোহে বিভোর এসব ব্যাক্তিদের হারেমের শোভাবর্ধন করছিল খ্রিস্টানদের রুপসী গোয়েন্দা যুবতীরা।

    ঘাতক দলের সদস্যরা ছিল আরও তৎপর। মিসর এখন ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের লীলাভূমি। অবস্থা এমন যে, কেবলমাত্র কোন অলৌকিক ঘটনাই মিসরকে রক্ষা করতে পারে।

    খ্রিস্টানদের সহযোগিতায় সুদানীরা মিসর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সেনাবাহিনীর এক অংশ বিদ্রোহের জন্য তৈরী। ভারপ্রাপ্ত গভর্নরের চোখে ঘুম নেই। সালাহুদ্দীন আইউবী সময়মত না এলে মিশর রক্ষা করা যাবে না। একসঙ্গে ভেতরের এবং বাইরের মোকাবিলা করা ভারপ্রাপ্ত গভর্ণরের পক্ষে সম্ভব নয়।

    খিজরুল হায়াত। দ্বীনদার এবং বিশ্বস্ত। মিসরের অর্থ সচিব। সাদামাটা জীবন পছন্দ করেন, অমায়িক। সুলতান নিজেই তাকে অর্থ সচিবের পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার সাথে মিসরের অর্থনীতি পুনঃ বিন্যাস করেছেন তিনি। এক রাতে বাইরে থেকে ফিরেছেন হায়াত। সবেমাত্র বাড়িতে পা রেখেছেন। আঁধার ফুঁড়ে ছুটে এল একটা তীর। বিধঁল খিজরুল হায়াতের পিঠে। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। উপর হয়ে পড়ে গেলেন তিনি। কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এল ব্যথাভরা চিৎকার। চিৎকার শুনে চাকর বাকররা ছুটে এল। ছুটে এল পরিবার পরিজন। ঘটনার আকস্মিকতায় থ’ হয়ে গেছে সবাই। কারও মুখে কথা নেই। মারা গেছেন খিজরুল হায়াত। একজন চাকর লক্ষ্য করল মৃত্যুর পূর্বে তিনি মাটিতে কিছু লেখার চেষ্টা করছিলেন। চাকরটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। মাটিতে লিখা মুসলেহ। ‘হ’ টা অর্ধেক লিখেছেন হত্যাকারীর পুরো নাম লিখার পূর্বেই মারা গেছেন তিনি। লিখাটা সংরখন করে লাশটা তুলে নেওয়া হল। একজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলকিসের কাছে। গিয়াস ছিলেন সুলতানের বিশ্বস্ত। আলী বিন সুফিয়ানের মত অপরাধ দমনে অভিজ্ঞ।

    সংবাদ পেয়েই ছুটে এলেন গিয়াস বিলকিস। গভীর মনযোগ দিয়ে নামটি দেখলেন। ততোক্ষণে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান মুসলেহ উদ্দিনও ছুটে এসেছেন। গিয়াস দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলেন তাকে। সন্তর্পণে মাটির লেখাটা পা দিয়ে মুছে ফেললেন।

    ‘যত তারাতাড়ি সম্ভব হত্যাকারীকে খুঁজে বের করুন।’ বললেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। ‘আগামীকাল ভোরেই আমি অপরাধীকে দেখতে চাই।’

    ‘আমি অপরাধীকে খুঁজে বের করব স্যার।‘ পুলিশ প্রধানের কন্ঠ।

    সবাই ফিরে গেলেন। রাতে গিয়াস খিজরুল হায়াতের সহকারী অফিস স্টাফসহ তার নিকটস্থ লোকদের ডেকে পাঠালেন। ওদের কাছে জানা গেল, আজ হায়াত সচিবদের এক মিটিংয়ে অংশগ্রহন করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সহকারি। মিটিংয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে সামরিক বাজেটের প্রসঙ্গ আসে। হায়াত বললেন, ‘সুলতান সুবাকে নতুন ফৌজ ভর্তি করেছেন। ওদের বেতনাদি দিতে হলে মিসরে অপ্রয়োজনীয় বাজেট কমাতে হবে।’

    এর বিরোধীতা করলেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি বললেন, ‘নতুন সৈন্য ভর্তি করার পূর্বে আমাদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। এমনিতেই সেনাবাহিনী সাদা হাতীতে পরিণত হয়েছে। মিসরের ফৌজ অশান্ত হয়ে আছে। তাদের অভিযোগ, সুবাকে প্রাপ্ত গনিমতের মাল থেকে তাদেরকে কিছুই দেওয়া হয়নি।’

    ‘আপনি কি জানেন না, গনিমতের সম্পদ ভাগ-বাটোযারা করে দেয়ার নিয়ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে?’

    হায়াত বললেন, ‘চমৎকার সিদ্ধান্ত। যারা গনিমতের জন্য যুদ্ধ করে তাদের ভেতর জাতীয় চেতনাবোধ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকে না।’

    এক পর্যায়ে এ আলোচনা বিতর্কে রূপ নিল। উত্তেজিত হয়ে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান বললেন, ‘সুলতান মিসরীয় সৈন্যদের সাথে ভাল ব্যবহার করেন না, যেমনটি করেন সিরীয় এবং তুর্কি সৈন্যদের সাথে।’

    ‘মনে হচ্ছে খ্রিস্টান এবং ফাতেমীরা আপনার মুখ দিয়ে কথা বলছে।’

    উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে মিটিং সমাপ্ত করে দেওয়া হল। অর্থ সচিবের সহকারী জানালেন, মিটিং শেষে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান স্যারের অফিসে এলেন। এখানেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হল। স্যার উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে বললেন, ‘আমি সুলতানের কাছে এ প্রসঙ্গ তুলব। বলব, আপনি ভর জলসায় সবাইকে বুঝাতে চেয়েছেন যে সেনাবাহিনী অশান্ত। আপনি বলেছেন, সুলতান সবার সাথে সমান ব্যবহার করেন না এবং গনিমতের মাল মিসরের সৈন্যদের না দিয়ে অন্য সৈন্যদের দিচ্ছেন। এছাড়া আপনি আমাকেও আপনার দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধান কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় বললেন, ‘তুমি বেঁচে থাকলে তো সুলতানকে এসব জানাবে।’

    উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে গিয়াস কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। কারণ পুলিশ বিভাগ তার অধীন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলার পূর্বে অবশ্যই প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকতে হবে। পুলিশ প্রধান বুঝলেন এ হত্যা ব্যাক্তিগত কারণে হয়নি। তিনি গোপনে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন।

                                                   

    পুলিশ প্রধান বিভিন্ন প্রমাণে যা জানলেন, তা হল, হত্যা ঘটনার দু’দিন পর মুসলেহ উদ্দীন রাতে বাসায় ফিরলেন। প্রথম স্ত্রী তাকে ডেকে নিলেন নিজের কক্ষে। তিনি ঢুকতেই স্ত্রী বিশটা আশরাফি তার সামনে রেখে বললেন, ‘খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী এ বিশ আশরাফি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।’ স্ত্রী এক টুকরা কাগজ স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। তাতে লেখা ছিল- ‘পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টুকরা স্বর্ণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু দিয়েছেন বিশ আশরাফি। আপনার স্ত্রীর কাছে দিয়ে গেলাম। আমাদের ধোকা দিয়েছেন। এখন একশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দিতে হবে। তা নয়তো একটা তীর খিজরুল হায়াতের মত আপনার হৃদপিন্ডেও গেঁথে যাবে।’

    মুসলেহ উদ্দীনের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কিছুটা সংযত হয়ে বললেন, ‘তুমি কি বলছ? ওরা কারা? কাউকে আমি কোন আশরাফি দেয়ার কথা বলিনি। বিশ্বাস কর, হায়াতের হত্যার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।’

    তুমিই হায়াতকে হত্যা করেছ। কি কারণে জানি না, তবে তুমি যে তার হত্যাকারি এতে কোন সন্দেহ নেই।’

    মুসলেহ উদ্দীনের প্রথম স্ত্রী সাবেরা। বয়স ত্রিশের কোঠায়, সুন্দরী। দেহের গাঁথুনি এখনও অটুট। পুরুষকে আকর্ষণ করার মত রূপ এখনও তার রয়েছে। মাস খানেক পূর্বে অপরূপা একজন তরুনীকে বাড়ি নিয়ে এসেছেন মুসলেহ উদ্দীন। এরপর থেকেই প্রথম স্ত্রীর কক্ষে যাওয়া বন্ধ। কয়েক দিনই তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সাবেরা, কিন্তু তিনি যাননি। তখন একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বেআইনী ছিল না। স্ত্রীরাও এতে কিছু মনে করতেন না। হত্যাকারীদের চিঠি পেয়ে ভড়কে গেলেন সাবেরা। স্বামীর অকল্যাণ কল্পনায় কেঁপে উঠল তার মন। এজন্যই তাকে ‍নিজের কক্ষে ডেকে এনেছিলেন।

    ‘মুখ বন্ধ রাখবে সাবেরা।’ গম্ভীর কন্ঠে বললেন মুসলেহ উদ্দীন। ‘এ হচ্ছে আমার দুশমনের একটা চাল। তারা তোমার এবং আমার মাঝে শত্রুতা সৃষ্ঠি করতে চাইছে।’

    ‘আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা ছাড়া তোমার মনে কি অন্য কিছু আছে?’

    ‘তোমায় আমি ভালবাসি সাবেরা। সেই প্রথম দিনের মত। তুমি কি ওদের কাউকে চিনতে পেরেছ?’

    ‘ওরা মুখোশ পরেছিল। তবে তোমার মুখোশ খুলে গেছে। তোমায় আমি চিনে গেছি।’

    স্বামী কিছু বলতে চাইছিলেন। তাকে কিছু বলতে না দিয়ে সাবেরা বলল, ‘সম্ভবতঃ তুমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করেছ। জেনে ফেলেছে সচিব। এ জন্যই গোপন আততায়ীর মাধ্যমে তাকে খুন করেছ।’

    ‘কেন আমায় মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ। কোষাগারের অর্থ আমি কেন আত্মসাৎ করতে যাব?’

    ‘তোমার না হলেও যে ফিরিংগী মেয়েটাকে বিয়ে ছাড়া সাথে রেখেছ তার প্রয়োজন আছে। তোমার মদ কেনার জন্য টাকার দরকার। যদি মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে চাও তবে বল ঘোড়াগাড়ী বোঝাই করে কি এনেছ? তোমার হারেমে প্রতিদিন নতুন নর্তকী আসছে বিনে পয়সায়? তোমার মদের আসরে যে টাকা খরচ হয় তা কোত্থেকে আসে?’

    ‘চুপ কর সাবেরা। ওরা কারা আমাকে একটু খোঁজ নিতে দাও। ইস! কি ভয়ংকর চাল চেলেছে। ক’দিন পরই সত্যি ঘটনা তুমি বুঝতে পারবে।’

    ‘না, আমি চুপ থাকব না। আমার বুকে তুমি প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ। মিসরের সব লোককে ডেকে ডেকে একথা বলব। অলি-গলিতে চিৎকার করে বলব তুমি খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী। হত্যা করেছ আমার ভালবাসা। এ হত্যার প্রতিশোধ আমি নিব।

    স্ত্রীকে অনেক অনুনয় বিনয় করে মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমাকে দু’দিন সময় দাও। দু’দিনের মধ্যেই আমি ওদের খুঁজে বের করে প্রমাণ করব হায়াতকে আমি হত্যা করিনি। পুলিশ প্রধান সন্দেহজনক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে আসল খুনীকেও পাকড়াও করতে পারবে।’

    পেরিয়ে গেল রাত। পর দিনও। মুসলেহ উদ্দিন বাড়ি ফেরেননি। ফিরিংগী মেয়েটাকেও কোথাও দেখা গেল না। সন্ধায় বাড়ি ফিরলেন মুসলেহ উদ্দিন। সোজা চলে গেলেন স্ত্রীর কক্ষে। আদুরে গলায় কথা বললেন। শোনালেন ভালবাসার কথা। সাবেরা তার ধোকার জালে পা দিতে চাইলেন না। কিন্তু জাত খেলুড়ে মুসলেহ উদ্দীনের কপট ভালবাসার ফাঁদে এক সময় ধরা দিলেন স্ত্রী।’

    ‘আমি দু’দিন পর্যন্ত ওই দু’জন কে খুঁজছি। এখনও পাইনি। আশা করি পেয়ে যাব। আমি যে হত্যাকারী নই তখন তোমায় আশ্বস্ত করতে পারব।’

    আরও অনেক কথা বললেন মুসলেহ উদ্দীন। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন সাবেরা। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। চাকর-বাকরদের ছুটি দিয়ে দিলেন। সমগ্র বাড়িতে নেমে এল কবরের নিরবতা। পাহারাদার কুকুরটাকে বাড়ির এক কোণে বেঁধে রেখে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন মুসলেহ উদ্দিন।

    মাঝ রাত। বাইরের পার্টিশন ঘেঁষে দাঁড়াল এক মুখোশধারী। তার কাঁধে পিঠে দাঁড়াল দ্বিতীয় জন। তৃতীয় ব্যাক্তি তার কাঁধে উঠে পার্টিশনের ভেতর লাফিয়ে পড়ল। খুলে দিল প্রহরীহীন ফটক। বাড়ির করিডোরে উঠে এল তিনজনে। এগিয়ে চলল বিড়ালের মত নিঃশব্দে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওরা সাবেরার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকল তিনজন। একজন হাত ছোঁয়াল সাবেরার মুখে। স্বামীর হাত ভেবে আকড়ে ধরে সে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

    কোন জবাব না দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল একজন। বেঁধে দিল হাত। পাজা কোলা করে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে কাঁধে তুলে নিল। চাকর বাকর কেউ নেই। বিনা বাধায় ওরা বেরিয়ে গেল। খানিক দূরে একটা গাছের সাথে তিনটে ঘোড়া বাঁধা ছিল। রশি খুলে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল তিনজন। বস্তা তুলে নিল একজন। মিসর পিছনে ফেলে ইস্কান্দারিয়ার দিকে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো।

    সকালে চাকর-বাকররা ফিরে এল। মুসলেহ উদ্দীন ওদেরকে সাবেরার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তন্ন তন্ন করে সারা বাড়ি খোঁজা হল। সাবেরা কোথাও নেই। এক চাকরাণীকে একান্তে ডেকে নিলেন মুসলেহ উদ্দীন। অনেকক্ষণ কথা বললেন দু’জন। এরপর তাকে নিয়ে গেলেন পুলিশের কাছে। মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমার স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার বিশ্বাস হায়াতকে ওই হত্যা করিয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি যে মুসলেহ উদ্দীনের স্ত্রী। কিন্তু পারেননি। এই চাকরাণীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।’

    পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের জবাবে চাকরাণী বলল, ‘পরশু রাতে দু’জন লোক এসেছিল। আমার মুনিব তখন ছিলেন না। দেখলাম মুখোশ পরা দু’ব্যাক্তি, ওরা বেগম সাহেবের সাথে দেখা করতে চাইল। বাড়িতে কোন পুরুষ না থাকায় আমি বললাম, এখন দেখা হবে না। ওরা বলল, ‘বেগম সাহেবের এই বিশটি আশরাফি ফেরত দিতে এসেছি।’ আমি বেগম সাহেবকে বলতেই তিনি দু’জনকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমাকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। বললেন, ‘কেউ এলে যেন তাকে সতর্ক করে দেই।’

    বাইরে থেকে আমি শুনলাম দু’জন কঠোর ভাষায় কথা বলছে আর বেগম সাহেবা অনুনয় বিনয় করছেন। তিনি আরও বললেন, আলি বিন সুফিয়ানের সহকারী হাসানকে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দেবেন। এই বিশ আশরাফি বেগম সাহেবা কিভাবে দিয়েছেন আমি জানি না। ওরা পঞ্চাশ আসরাফি দাবী করছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘তোমরা ভুল লোককে মেরেছ। হাসানকে মারতে পারনি।’

    ওরা বলল, ‘তুমি যে সময়ের কথা বলেছ ঠিক সে সময় এ লোকটি বাড়িতে ঢুকেছিল। লোকটি হাসান না অন্য কেউ আমরা দেখিনি। আমরা তীর ছুঁড়ে পালিয়ে গেছি।’

    পঞ্চাশ আশরাফি দেয়ার জন্য ওরা বেগম সাহেবাকে চাপ দিচ্ছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘আসল লোককে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দুটো সোনার টুকরা দেব।’ কিন্তু ওরা বলল, ‘যে কাজ করেছি আগে তার বিনিময় দাও, তারপর অন্য কাজ।’ বেগম সাহেবা অস্বীকার করায় ওরা বলল, ‘টাকা কিভাবে ওসুল করতে হয় আমরা জানি।’ এরপর ওরা দু’জন চলে গেল। বেগম সাহেবা আমায় ডেকে বললেন, ‘খবরদার, এসব কথা কাউকে বলবে না। আমাকে তিনি দুটো আশরাফিও দিয়েছেন। আজ সকালে তার কক্ষে গিয়ে দেখি তিনি নেই। আমার মন বলছে টাকা না দেয়ায় সে দু’জন লোকই তাকে অপহরণ করেছে।’

    পুলিশ প্রধান মুসলেহ উদ্দীনকে বসিয়ে রেখে চাকরাণীকে নিয়ে অন্য কক্ষে চলে এলেন।

    ‘এবার বল এ কথা তোমায় কে শিখিয়েছে, মুসলেহ উদ্দীন, না সাবেরা?’

    ‘এ জবানবন্দী আমার নিজস্ব।’

    ‘সত্যি করে বল সাবেরা কোথায়? কার সাথে গিয়েছে?’

    চাকরাণী ভয় পেয়ে গেল। পুলিশ প্রধানকে কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারল না। গিয়াস বললেন, ‘কিভাবে সত্যি কথা বের করতে হয় আমি জানি। তুমি এখন ফিরে যেতে পারবে না। পুলিশের শাস্তি সেলের কথা শুনেছ?’

    বিবর্ণ হয়ে গেল চাকরাণীর চাহারা। সে জানত, পুলিশের শাস্তি সেলে সত্য মিথ্যা আলাদা হওয়ার আগে দেহের হাড়গোড় আলাদা হয়ে যায়। সে কাঁদতে লাগল।

    ‘দেখুন, আমি এক গরীব মেয়ে। সত্যি কথা বললে মুনিব শাস্তি দেবেন। মিথ্যা বললে আপনারা।’

    ‘তোমার কোন ভয় নেই। তোমার নিরাপত্তার জিম্মা আমি নিচ্ছি।’

    চাকরাণী বলল, ‘হত্যার দ্বিতীয় দিন একজন মুখোশধারী এসেছিল। মুনীব বাড়ি ছিলেন না। লোকটা ছিল ফটকের বাইরে। বেগম সাহেবা ভিতরে। কি কথা হয়েছে আমরা কেউ শুনিনি। মুখোশধারী চলে গেলে বেগম সাবেরা ফিরে এলেন। হাতে ছিল একটা প্যাকেট। একরাত পর মুনীব আমাদের সবাইকে একরাতের জন্য ছুটি দিলেন।’

    ‘ইতিপূর্বেও কি সবাইকে সারা রাতের জন্য ছুটি দিয়েছিলেন?’

    ‘কখনও না। একজন ছুটিতে গেলে অন্য সবাই থাকত। আরো আশ্চর্য হল, কুকুরটাকে কখনও বেঁধে রাখা হয় না। ভয়ংকর কুকুর। অপরিচিত লোক দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ে। সে রাতে মুনিব নিজেই গেলেন কুকুরটাকে বেঁধে রাখতে।’

    ‘মুসলেহ উদ্দীনের সাথে সাবেরার সম্পর্ক কেমন ছিল?’

    ‘ইদানীং খুব খারাপ। মুনিব একটা সুন্দরী ফিরিংগী মেয়েকে বাড়ি আনার পর থেকে বেগম সাহেবার সাথে কথা বলেন না।’

    চাকরাণীকে বসিয়ে রেখে পুলিশ প্রধান উঠে গেলেন। ফিরে এলেন দু’জন সিপাই নিয়ে। সিপাইরা মুসলেহ উদ্দীনের দু’বাহু ধরে নিয়ে যেতে চাইল। প্রতিবাদ করলেন তিনি। পুলিশ প্রধান বললেন, ‘একে জেলে নিয়ে যাও। তার বাড়ি সীল করে পাহারার ব্যবস্থা কর। কাউকে বাইরে যেতে দেবে না।’

    কায়রোর উত্তরে এক সবুজ শ্যামল প্রান্তর। দুরত্ব অনেক। চারপাশে উঁচুনিচু পাহাড়। পাহাড় থেকে প্রান্তর ছুয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা ধারা। পূব আকাশ রাংগা হয়ে উঠেছে। অপহরণকারীরা ঘোড়া থামাল। নেমে এল তিনজন। বস্তার মুখ খুলে সাবেরাকে বের করে আনল। মুখের কাপড় সরিয়ে হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিল। সাবেরা অচেতন না হলেও অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করল। চিৎকার করারও শক্তি নেই। ওরা তাকে পানি পান করাল। খেতে দিল খেজুর আর রুটি। শীতল বাতাসে ওর শক্তি ফিরে এল। আচম্বিত সাবেরা উঠে দাঁড়াল। দৌড়ে টিলার আড়ালে চলে গেল। একজন মুখোশধারী ঘোড়ায় চেপে ছুটল ওর পেছনে। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল সাবেরা। মুখোশধারী তাকে ঘোড়ায় তুলে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এল।

    ‘পালিয়ে যেতে চাইলে যাও।’ বলল একজন। ‘কোথায় যাবে? এখান থেকে একজন শক্তিশালী পুরুষও এভাবে কায়রো পৌঁছাতে পারবে না।’

    সাবেরা কেঁদেকেটে ওদের গালাগালি করতে লাগল।

    ‘কায়রো ফিরে যেতে চাইলে যাও। কিন্তু ওখানে গেলেও মরবে। তোমার স্বামীই তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।’

    ‘মিথ্যে কথা।’

    ‘মিথ্যে নয়, সত্য। মজুরী হিসেবে তোমায় দিয়েছে। তোমার হাতে আমরাই আশরাফি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি তাকে বলেছ সে সচিবকে হত্যা করেছে। তুমি আরও বলেছ, এসব কথা পুলিশ প্রধানকে বলে দেবে। আগে থেকেই সে তোমার ওপর বিরক্ত। ফিরিংগী মেয়েটা তার মন দখল করে রেখেছে। মেয়েটা কে, কোথা থেকে এসেছে তোমাকে তা বলা যাবে না। পরদিন তোমার স্বামী আমাদের কাছে এল। আস্ত বেঈমান। বলেছিল কাজটা করলে পঞ্চাশ আশরাফি আর দু’টি সোনার টুকরা দেবে। কিন্তু কাজ শেষে পাঠাল বিশ আশরাফি। আমরা তোমাকে ব্যবহার করলাম। তোমার কাছে টাকা দেয়ার অর্থ যেন তুমিও ব্যাপারটা জানতে পার। বুদ্ধিটা কাজে লেগেছে। পরদিন পঞ্চাশ আশরাফি দিল। স্বর্ণের টুকরা দিল না। আমরা বললাম, ‘এখন পঞ্চাশে চলবে না। আরও বেশী দিতে হবে। না দিলে খবরটা পুলিশ প্রধানের কানে তুলে দেব।’

    তার জন্য সমস্যা ছিল ব্যাপারটা তুমি জেনে ফেলেছ। সে বলল, ‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাও। ওকে বিক্রি করে অনেক টাকা পাবে।’

    সাবেরার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সে হতভম্বের মত তিন অপহরণকারীকে দেখতে লাগল। মুখোশের মাঝখান দিয়ে দুটো করে চোখ দেখা যাচ্ছে। হিংস্র এবং ভয়ংকর। ওদের কণ্ঠে কোন হিংস্রতা ছিল না। ওরা বরং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে, এখান থেকে পালানো সম্ভব নয়।

    ‘আমি তোমাকে একবার দেখেছিলাম’, বলল একজন।

    ‘তোমার স্বামীর প্রস্তাব শুনে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে তোমাকে কত বিক্রি করা যাবে মনে মনে হিসাব করলাম। তুমি যুবতী, সুন্দরী। তোমাকে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। আমরা রাজি হলাম।’ তোমার স্বামী বলল, ‘রাতে আমার চাকর-বাকররা থাকবে না। কুকুরটাকেও বেঁধে রাখা হবে। রাতে এসে ওকে তুলে নিও।’ এ পারশ্রমিক না পেলে আমরা তাকে হত্যা করতাম। অপহরণ করতাম ফিরিংগী মেয়েটাকে। আমরা রাতে তোমাকে তুলে নিয়ে এলাম।’

    ‘তোমাকে এসব কথা বলার কারণ, তুমি স্বামীর ঘরের কথা ভুলে যাও।’ বলল দ্বিতীয় জন। ‘আমরা অসহায় কোন নারীর সম্ভ্রম নষ্ট করিনা। আমরা ব্যবসায়ী। অপহরণ এবং টাকার বিনিময়ে হত্যা করা আমাদের পেশা। তিনজন পুরুষ একজন নারীকে অপহরণ করে ভোগ করার মধ্যে কোন গর্ব নেই।’

    ‘তোমরা কি আমাকে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে বিক্রি করবে?’ কাঁপা কণ্ঠে সাবেরা জিজ্ঞেস করল। ‘শেষ পর্যন্ত এই কি হবে আমার কপালের লিখা?’

    ‘না, খারাপ কাজের জন্য জংলী এবং বেদুইন মেয়েদের ক্রয় করা হয়। তুমি সম্মানিতা গৃহ বধু। কোন আমীরের ঘরেই তুমি যাবে। আমরাও দামটা বেশী পাব। এখন কান্নাকাটি বন্ধ কর। কাঁদলে চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে বাজারে-মেয়ে হিসাবেই বিক্রি করতে হবে। এবার শুয়ে পড়। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও।’

    সাবেরা আশ্চর্য হয়েছে এতক্ষণ সময়ের মধ্যে এদের কেউ তার সাথে অশালীন আচরণ করেনি দেখে। মনে মনে স্বস্তিও পেয়েছে। রাতভর বস্তাবন্দী থেকে সমস্ত শরীর ব্যথা করছে। চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়ল ও। ঘুম ভেংগে গেল হঠাৎ। তার মাথায় চাপে আছে ভয় এবং আতংক। মনের দিক থেকে সে এ পরিণতিকে গ্রহণ করতে পারছে না। আড়চোখে তাকাল তিনজনের দিকে। ঘুমুচ্ছে ওরা। একবার ভাবল খঞ্জর বের করে ওদের হত্যা করে। বাতিল করে দিল চিন্তাটা। একা তিনজনের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চোখ পড়ল পাশে বাঁধা ঘোড়ার ওপর। পিঠে জিন বাঁধা। ও উঠে পড়ল। আলতো পায়ে এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। সূর্য নেমে গেছে টিলার ওপাশে। কায়রো কোন দিকে জানে না ও। তবুও বাঁচতে হলে পালাতে হবে ওকে। প্রয়োজনে বিশাল মরুর বিস্তারে ধুকে ধুকে মরবে, তবুও এদের হাতে সম্ভ্রম নষ্ট হতে দেবে না। আলগোছে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল সাবেরা। ছুটিয়ে দিল ঘোড়া।

    ঘোড়ার পদশব্দে তিনজনের ঘুম ভেংগে গেল। দু’জন দুটো ঘোড়ায় চেপে ছুটল তার পেছনে। টিলার বেষ্টনী থেকে বের হবার পথ জানা নেই সাবেরার। সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল এক পাহাড়। পেছনে তাকাল ও। ধাওয়াকারীরা কাছে চলে এসেছে। ঘোড়াসহ পাহাড়ে উঠতে লাগল সাবেরা। উপরে উঠে তাকাল বিপরীত দিকে, পথ পেয়ে গেল। নেমে এল নীচে। ধাওয়াকারীরাও তার পেছনে আসছে। কাছে চলে এসেছে ওরা। সামনে সমুদ্র। সমুদ্রের দিক থেকে আসছে চারজন উস্ট্রারোহী। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না ও। সাবেরা চিৎকার শুরু করলঃ ‘বাঁচাও, বাঁচাও, ডাকাতের হাত থেকে বাঁচাও।’

    ঘোড়া পৌঁছে গেল উস্ত্রারোহীদের কাছে। উস্ট্রারোহীদের দেখে মুখোশধারীরা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল। ওদের পিছু নিল উটের আরোহীরা। একজন ধনুকে তীর জুড়ে দু’জনকে লক্ষ্য করে ছুড়ল। বিঁধল এক ঘোড়ার ঘাড়ে। ঘোড়ার লাফালাফিতে পড়ে গেল সওয়ার। চার জন মিলে ওপর অশ্বারোহীকে ঘিরে ফেলল। একজনের পক্ষে চারজন তীরন্দাজের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, সে আত্মসমর্পণ করল। সাবেরা ওদের বলল, ‘এদের একজন ওপাশে রয়েছে।’ ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া আরোহীসহ তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা হল।

    এ চারজন উস্ট্রারোহী ছিল সুলতান সালাহুদ্দীনের সেনা বাহিনীর সদস্য। সাগর উপকূল এবং সমগ্র মরুভূমিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনা দল পেট্রোল ডিউটিতে রত ছিল। আচম্বিত শত্রুর আক্রমণ যেন না আসতে পারে এ জন্যই এই ব্যবস্থা। এরা কয়েক বারই বিপজ্জনক খ্রিস্টান গোয়েন্দাদের ধরে সুলতানের সামনে হাজির করেছে। সাবেরা সৈন্যদেরকে অপহরণের পুরো কাহিনী শোনাল। সে বলল, ‘উপ-রাস্ট্রপ্রধান আমার স্বামী। এ তিন ভাড়াটে খুনীদের দিয়েই তিনি অর্থ সচিবকে হত্যা করিয়েছেন। আমাকেও তুলে দিয়েছেন এদের হাতে।’

    তিন অপহরণকারীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হল। হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দুটো ঘোড়ায় করে ওদেরকে সৈন্যরা কমাণ্ডারের কাছে নিয়ে গেল। সাবেরা বসল উটের পিঠে। সূর্য ডোবার পূর্বেই এরা চার মাইল পথ অতিক্রম করল। সামনের মরুদ্যানে তাঁবু টানানো। ডিউটিরত সেনা দলের হেড কোয়ার্টার। ওরা সাবেরাকে নিয়ে গেল কমাণ্ডারের সামনে। কঠোর প্রহরায় তিন অপহরণকারীকে বসানো হল তাঁবুর বাইরে। আগামীকাল এদের কায়রো পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

                                                   

    খ্রিস্টানদের পদতলে পিষ্ট হচ্ছিল প্রিয় ফিলিস্তিন। মুসলমানদের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল পবিত্র ভূমির বালুকারাশি। দুর্দশার কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়ছিল অত্যাচারের অগ্নি বৃষ্টি। অসহনীয় নির্যাতনের দুঃসহ ব্যথায় কাৎরাচ্ছিল তৌহিদী জনতা। এমনি এক দুঃসময়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পা রাখলেন ফিলিস্তিনের মাটিতে।

    সুবাক এখন মুসলমানদের দখলে- দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ সংবাদ ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হৃদয়ে জ্বেলে দিল আশার প্রদীপ। অনাগত মুক্তির আনন্দে হিল্লোলিত হল প্রাণ। কিন্তু ওদের এ অব্যক্ত আনন্দ দুর্বিসহ বেদনা হয়ে দেখা দিল। খ্রিস্টানরা প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে দিল জেরুজালেম এবং আশপাশের জেলাগুলোর মুসলিম বসতি। এভাবেই মুসলমানদের ওপর সুবাক দুর্গ হারানোর শোধ তুলতে লাগল ওরা।

    মুসলমানদেরকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘৃণ্য তৎপরতায় মেতে ওঠা খ্রিস্টানরা সুবাকের পর ক্রাক নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ল। সালাহুদ্দীন যেন ক্রাক আক্রমণ করতে না পারে এ জন্য ক্রাকে চলল নির্বিচারে মুসলিম হত্যা। বুদ্ধির খেলায় হেরে গেছে ওরা। হাতছাড়া হয়েছে সুবাক দুর্গ। ক্রাক হাতছাড়া করা যাবে না। স্তব্ধ করে দিতে হবে সালাহুদ্দীনের অগ্রযাত্রা। ক্রাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করার পাশাপাশি তাই ওরা স্থানীয় মুসলমানদের শিরদাড়া ভেংগে দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। এখানেও খোলা হল বেগার ক্যাম্প। সামান্য সন্দেহ হলেই মুসলমানদেরকে নিক্ষেপ করতে লাগল সে ক্যাম্পে।

    ‘ফিলিস্তিন বিজয় আমাদের মহান উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্রাক থেকে নির্যাতিত মুসলমানদেরকে বের করে আনা তারচে বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।’ সুলতান সালাহুদ্দীনকে বলল গোয়েন্দা সংস্থার একজন গ্রুপ কমাণ্ডার, নাম তালাত চেঙ্গিস। তালাত একজন তুর্কী মুসলমান। সুবাক থেকে পালিয়ে যাওয়া খ্রিস্টানদের ছদ্মবেশে ক্রাকে পৌঁছে ছিল সে। ফিরে এসেছে তিন মাস পরে। গোয়েন্দা প্রধানের সামনেই তালাত সুলতানকে ক্রাকের রিপোর্ট দিচ্ছিল। ‘যে সব খ্রিস্টান সৈন্য’ লুকিয়ে ক্রাক পৌঁছেছে ওদের অবস্থা ভাল নয়। সহসা যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে পারবে না ওরা। তবে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে ওরা স্থানীয় মুসলমানদের ওপর। পুরুষদেরকে এলোপাথাড়ি গ্রেপ্তার করছে। মেয়েরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। আমরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য ওখানকার মুসলিম যুবকদেরকে গোপনে সঙ্গঠিত করতে শুরু করেছিলাম। কিছু যুবক পালিয়ে এসে ভর্তিও হয়েছে। কিন্তু চারদিকে খ্রিস্টান সৈন্য থাকায় অধিকাংশই ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আসতে পারছে না। তাছাড়া পরিবার-পরিজন ছেড়ে আসতে অনেকের অসুবিধা হচ্ছে।

    সবচে বিপদের কথা হল, কারো ওপর সন্দেহ হলেই তাকে বেগার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখনই ক্রাক আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে এ নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া আমাদের কর্তব্য।’

    এর আগে গোয়েন্দারা বলেছিল সুলতান ক্রাক আক্রমণ করলে রিমাণ্ড তার বাহিনী নিয়ে পেছন থেকে আক্রমণ করবে। সুলতানও সেনা অফিসারদের কাছে পূর্বেই এমন আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন। এ জন্য সেনা সদস্য বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল।

    সুলতান সালাহুদ্দীন তালাতকে বিদায় দিয়ে আলীকে বললেন, আবেগের দাবী হচ্ছে এ মুহূর্তে ক্রাক আক্রমণ করা। ওখানকার মুসলমানরা কি কষ্টের মধ্যে আছে আমি বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, শক্তি সঞ্চয় না করে আক্রমণ করো না। নিশ্চিত না হয়ে আক্রমণ করা যুদ্ধনীতির পরিপন্থী। আলী! আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে পুরুষদের। ইসলামের ইতিহাসে ওরা হচ্ছে নামহারা শহীদ। যে কোন জাতিকেই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এমন কোরবানী দিয়ে যেতে হয়। ওদের আব্রু, জীবন এবং ওদের দ্বীনের হেফাজতের জন্যই আমি ফিলিস্তিন শত্রুমুক্ত করতে চাই। সাধারণভাবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য আক্রমণ ও লুটপাট ছাড়া কিছুই নয়। যারা স্বীয় জাতির সন্তানদের ভুলে যায়, মুখ বুজে সহ্য করে শত্রুর নির্যাতন, তারা হয়ে যায় ডাকাত ও দস্যুদের সহযোগী। শত্রুর ওপর প্রতিশোধ না তুলে পরস্পরের সম্পদ লুণ্ঠন করে ওরা। প্রতারিত করে অন্যকে। ওদের শাসকরা গরীবের সম্পদ লুটে ভোগ বিলাসে মত্ত হয়। শত্রুরা আক্রমণ করলে অমূলক হম্বিতম্বি করে জনগণকে ধোকা দেয়। শত্রুর সঙ্গে গোপন আঁতাত করে। দেশের কোন অংশ ওদেরকে ছেড়ে দিয়ে রক্ষা করে গদী। ভোগ বিলাসের জন্যই ওরা শুষে নেয় জনগণের শেষ রক্তবিন্দু।

    অনেক জাতির শাসকগণ কেবল রাজ্য বিস্তারের মোহে যুদ্ধ করেছে। বিলাসিতার সময়টা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বইয়ে দিয়েছে রক্তের বন্যা। আজ পৃথিবী থেকে ওদের নামও মুছে গেছে। খ্রিস্টানদের মত আমরাও লড়াইকারী। কিন্তু দু’জনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে আমাদের ধর্মের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য। এসেছে আমাদের নারীদের অধিকার করে ওদের গর্ভ থেকে খ্রিস্টান জন্ম দেয়ার জন্য। আমরা আত্মরক্ষার জন্য এবং আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য লড়াই করছি। খ্রিস্টানদের এ ঝড়কে প্রতিরোধ করতে না পারলে আমরা বিবেকহীন, আত্মমর্যাদা শূন্য বলে পরিচিত হবো। আর যদি আমরা বাড়িতে বসে ওদের আক্রমণের অপেক্ষা করি তবে নিশ্চয়ই আমরা ভীত ও কাপুরুষ বলে চিহ্নিত হবো। প্রতিরোধর নিয়ম হলো, যখনি দুশমন তোমাকে হত্যা করার জন্য তরবারী কোষমুক্ত করবে, আঘাত করার পূর্বেই তোমার তলোয়ার তার শিরোচ্ছেদ করবে। সে আগামী কাল আক্রমণ করতে আসবে জানলে আজই তার মোকাবেলায় নেমে যাও যাতে সে আর আঘাত করার সুযোগ না পায়।’

    ‘নূরুদ্দীন জঙ্গীর কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায় না?’ আলী বললেন, ‘সাহায্য পেলে সাথে সাথেই আমরা ক্রাক আক্রমণ করতে পারতাম।’

    ‘না, তাঁর কাছে সবসময় এমন সৈন্য থাকা দরকার, আমরা পেছন থেকে আক্রান্ত হলে তিনি যেন ওদেরকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারেন।’ সালাহুদ্দীন বললেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার পক্ষপাতি নই, বরং গেরিলাদের পাঠিয়ে আমরা ওদের ঘুম হারাম করে দিতে পারি। আমার বিশ্বাস, আমাদের গুপ্তচর এবং গেরিলারা মিলে শত্রুর মূল উপড়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু ওখানকার নিরপরাধ মুসলমানদেরকে এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। কারণ, কমাণ্ডো বাহিনী কাজ শেষে এদিক ওদিক পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওখানকার নিষ্পাপ মুসলমান ভাই-বোনগুলো পালাতে পারবে না, তারা শত্রুর হাতে নিঃশেষ হয়ে যাবে। বিকল্প হিসেবে ওদেরকে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসা যায় কিনা দেখ। আক্রমণ করার জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে আমরা অনেক নতুন রিক্রুটও পেয়ে যাব।’

    ‘আমার মনে হয় এখানকার মুসলমানদের ব্যাপারে আমাদের পলিসি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।’ বলল খ্রিস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।

    ক্রাকের এক দুর্গে ক’জন খ্রিস্টান সম্রাট, উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মিটিং চলছিল। পরাজিত সেনাবাহিনীর দিকে তাকাতেই ওদের ক্রোধ বেড়ে যাচ্ছিল। এ পরাজয়কে ওরা বদলে দিতে চাইছিল বিজয় দিয়ে। এদের মধ্যে কেবল হরমুনই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করছিলেন। ক্রাকের মুসলমানদের ওপর চলছিল অবর্ণনীয় নির্যাতন। তিনি বললেন, ‘আপনারা এখানকার মুসলমানদের সাথে যেমন ব্যবহার করেছেন আমরাও সুবাকে তেমন করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে আমাদেরই এক গুপ্তচর মেয়ে বিপজ্জনক এক বন্দীকে পালাতে সাহায্য করেছিল। সে সুবাক দুর্গের সব কিছু দেখে গেছে। তাছাড়া সালাহুদ্দীন দুর্গপ্রাচীর যেভাবে ভেংগেছে এতে ভেতরের মুসলমানদেরও হাত ছিল। আমাদের ব্যবহারে ওরা এতটা বিরক্ত ছিল যে, জীবন বাজি রেখে ওরা সালাহউদ্দীনের সাহায্য করেছে। এরাই ছিল সালাহুদ্দীন সেনাবাহিনীর পথ প্রদর্শক।’

    ‘এ জন্যই আমরা এখানকার মুসলমানদের সাহস এবং আবেগ নিঃশেষ করার জন্য এরূপ নির্যাতন করছি।’ বলল এক সেনা কমাণ্ডার।

    ‘তার পরিবর্তে ওদেরকে আপনাদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করুন, ওরা আপনাদের সাহায্য করবে।’ বলল হরমুন। ‘আমায় অনুমতি দিলে ধর্মান্তরিত না করেই ওদেরকে খ্রিস্টানদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করব। তখন ওরা মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।’

    ‘ভুলে যাচ্ছ হরমুন!’ মুখ খুললেন সম্রাট রিমাণ্ড। ‘দু’একজন মুসলমানকে নারী দেহ আর টাকার লোভ দেখিয়ে গাদ্দারে পরিণত করা যায় কিন্তু গোটা সেনাবাহিনীকে গাদ্দার বানানো যায় না। হরমুন, ওদের ওপর নির্ভর করো না। ওদের আমরা বন্ধু বানাতে চাইনা, আমরা মুসলমানদেরকে নির্বংশ করতে চাই। কোন অমুসলিম কোন মুসলমানকে ভালবাসলে এর অর্থ হচ্ছে সে ইসলামকেই ভালবাসে। অথচ আমরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাই। ক্রাক, জেরুজালেম, ওফা এবং আদলিসা যেখানেই খ্রিস্টানদের শাসন রয়েছে সেখানেই মুসলমানদের ওপর এতটা নির্যাতন কর যেন ওরা মরে যায়। না মরলেও খ্রিস্টানদের সামনে মাথানত করে রাখে।’

    ‘মুসলমানদের সাথে এখানে যা করা হচ্ছে সালাহুদ্দীন আইউবী নিয়মিত তার খবর পাচ্ছেন।’ হরমুন বলল, ‘আপনারা তাকে ক্রাকে তাড়াতাড়ি আক্রমণ করতে বাধ্য করছেন। আপনারা ভুলে যাচ্ছেন আমাদের সেনাবাহিনী এ মুহূর্তে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত নেই।’

    ‘তবে কি এখানকার মুসলমানদেরকে মাথায় তুলে নাচব! বুঝতে পারছি না বন্দীদেরকে হত্যা না করে কেন আমরা লালন পালন করছি।’ জবাব দিলেন গে অব লুজিনাম।

    ‘কারণ মুসলমান বন্দীদের হত্যা করলে সালাহুদ্দীন আমাদের বন্দীদের হত্যা করবে। আমাদের কাছে রয়েছে ওদের তিনশ লোক, ওদের কাছে রয়েছে আমাদের তেরশ বন্দী।’

    ‘একজন মুসলমান সৈন্য হত্যার বিনিময়ে আমরা চারজন খ্রিস্টান সৈন্য হারাতে পারি না’, বললেন শাহ অগাস্টাস।

    ‘সালাহুদ্দীন আমাদের যে সব সৈন্যদের বন্দী করেছে ওরা ভীরু, কাপুরুষ। যুদ্ধ করার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব গ্রহণ করেছে। ওদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। আমাদের হাতে মরার চাইতে বরং মুসলমানদের হাতে মরাই ভাল। নিশ্চিন্তে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করার পক্ষপাতি আমি।’ একজন সেনা কমাণ্ডার দাঁড়িয়ে বলল।

    ‘স্থানীয় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে, বন্দীদের হত্যা করে আমরা কি সালাহুদ্দীনকে পরাজিত করতে পারব? এখন আমাদের সামনে সমস্যা হল সালাহুদ্দীন আক্রমণ করলে কিভাবে বাধা দেব, কিভাবে সুবাক দুর্গ পুনরুদ্ধার করব। আপনার কথামত ক্রাকের সব মুসলমানদের মেরে ফেললাম। তারপর কি হবে? শত্রু কি নিশ্চিহ্ন হবে? তারচে সালাহুদ্দীনের মত আমরাও আমাদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করছি না কেন?’ বলল একজন।

    ‘মিশরে আমাদের গোয়েন্দারা কি কাজ করছে অনুগ্রহ করে হরমুন কি বলবেন?’ বলল আরেক সেনা কমাণ্ডার।

    ‘হ্যাঁ, আমাদের গোয়েন্দারা আশানুরূপ কাজ করছে। সালাহুদ্দীন সুবাক কেল্লায়। তার অনুপস্থিতিতে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কায়রোর উপ-রাষ্ট্রপতি মুসলেহ উদ্দীন ফাতেমীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। মুসলেহ উদ্দিন সালাহুদ্দীনের বিশ্বস্ত। এখন আমাদের হাতে ফাতেমীরা গোপনে একজনকে খলিফা নির্বাচন করে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের সেনা অফিসাররা সুদানী বাহিনী তৈরী করছে। কায়রোতে সালাহুদ্দীনের ফৌজের দু’জন উপ-সেনাপ্রধান আমাদের লোক। সুদানীরা আক্রমণ করলেই ফাতেমীরা বিদ্রোহ করবে।’

    ‘ভুলে যাচ্ছ কেন, মিসরের সংবাদ পেলে সালাহুদ্দীন ক্রাক দুর্গ আক্রমণ মুলতবী রেখে ছুটে যাবে।’ বললেন রিমাণ্ড, ‘এখানেই রাখতে হবে তাকে। এমনভাবে বিরক্ত করতে হবে যেন তার সৈন্যরা মিসর যাবার পথ না পায়।’

    হরমুন বললেন, ‘আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, মিসরে তার যে ক’জন সৈন্য রয়েছে ওরা কিছু করতে পারবে না। ওদের বুঝানো হয়েছে যে, সুলতান তোমাদেরকে গনিমতের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছেন। হাজার হাজার সুন্দরী যুবতী ধরা পড়েছে, ওদেরকে সৈন্যদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করছে প্রশাসনের লোকেরা। আমি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি, গোটা সেনাবাহিনী সুদানীদের পক্ষ অবলম্বন করবে। এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য সালাহুদ্দীনকে এখানকার ফৌজ নিয়ে যেতে হবে। ততোক্ষণে কায়রো হবে ফাতেমী খেলাফতের পদানত। আমরা সালাহুদ্দীনকে আক্রমণ করব না। কায়রোতে স্থান না পেয়ে বিশাল মরুতে ঘুরে ঘুরে একদিন …

    ‘কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, খলিফার গদিও কিন্তু টিকে থাকেনি।’

    হরমুন বলল, ‘তার কারণ, ইসলামী সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থের দিকে নিবদ্ধ হল সকলের দৃষ্টি। ফলে, একে একে ছুটে যেতে থাকল বিজিত এলাকাগুলো। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা এখন আরবে অবস্থান করছি।

    প্রথম দিককার জেনারেলগণ ইসলামী রাজ্যের সীমানা যদ্দুর বিস্তৃত করেছিল, সালাহুদ্দীন আইউবী সে পর্যন্ত যেতে চাইছেন। তার সবচে বড় গুণ হচ্ছে, তিনি খেলাফত বা প্রশাসনের তোয়াক্কা করেন না। তার চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিসরের খেলাফত। তিনি তাকে পদচ্যুত করেছেন। সাহস, দূরদর্শিতা এবং সামরিক শক্তি নিজের হাতে থাকার কারণেই তিনি এমনটি করতে পেরেছেন।’

    মজলিশে পিন পতন নিরবতা নেমে এল। হরমুনই নিরবতা ভাঙল আবার, ‘বেসমারিক নেতৃত্বের লক্ষ্য ক্ষমতার মসনদ। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা অর্থ, নারী এবং মদে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুলতান তাদের এ দুর্বলতা বুঝতে পেরেছেন। আমরা কেবল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তাদেরকেই হাত করছি। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের দ্বিতীয় টার্গেট। সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে হলে তাদেরকে জনগণের কাছে হেয় করতে হবে। আমি এ কাজটিই করছি। এ ব্যাপারে আপনারা হয়ত আমার সাথে একমত হবেন না, তবুও আমি বলব, মুসলমানদের হাতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে সে।

    মুসলমানদের মানসিকতা আপনারা এখনও বুঝেননি, এ জন্যেই আমার কিছু কিছু পদক্ষেপ ও পরামর্শকে আপনারা ভাল চোখে দেখেন না। প্রশিক্ষণের সময় যদি মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে, তোমরা দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী, সিংহাসন উপহার দিলেও ওরা সৈন্য হয়ে থাকতেই পছন্দ করবে। কিন্তু যদি ওদের ভেতর আত্মপূজা, নারী লিপ্সা এবং মদে অভ্যস্ত করে দেওয়া যায় তবে আপন ধর্ম ছেড়ে দিতেও ওরা কণ্ঠিত হবে না। আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী প্রশাসনের লোকেরা দ্বিতীয় দায়িত্বটিই পালন করছে।’

    ‘তবে প্রশাসনের লোকদের মত সেনা ফৌজকে অত সহজে গাদ্দার বানানো যায় না। প্রশাসনের প্রতিটি লোকই রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সৈন্যরা সবাই তেমনটি দেখে না।’ হরমুনের কথার মাঝখানে বললেন অগাস্টাস।

    ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, তবে এটাও ঠিক, তাদের নবীর পরে খেলাফতের জন্য মুসলমানরাই পরস্পর যুদ্ধ করেছিল।’

    ‘কিন্তু জেনারেলগণ ঈমানদারীর সাথে দায়িত্ব পালন করে, এমনকি অন্য দেশ দখল করে খেলাফতের অন্তর্ভূক্ত করেছে।’

    ‘হ্যাঁ, মজাটা এখানেই। জেনারেলরা ঈমানদারীর প্রমাণ দিলেও খলিফারা তার কোন মূল্য দেয়নি, এমনকি খলিফারা তাদের সাথে ভাল ব্যবহার পর্যন্ত করেনি। ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়েছে।’

    সালাহুদ্দীন আইউবীকে যুদ্ধের ময়দানে হারানো সম্ভব নয়। কারণ, তাঁর প্রতিটি সৈন্য তাঁর মতই জানবাজ। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা এতটাই অবগত যে, মৃত্যু তাদের কোন ভীতির সৃষ্টি করে না।

    আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, তিনি শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করেন না, নিজেও লড়াই করেন। তাকে কোন খলিফা বা বেসামরিক নেতৃত্ব থেকে নির্দেশ নিতে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন পাকা মুসলমান। তাঁর কথা হচ্ছে, আমি সরাসরি খোদা এবং কোরআনের হুকুম পালন করি। আমাদের বাগদাদের গোয়েন্দারা বলেছে, নুরুদ্দীন জঙ্গী যেসব পরামর্শ পাঠিয়েছেন সালাহুদ্দীন তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রথমতঃ একজন বড় মুফতি ফতোয়া দিয়েছেন খেলাফতের কেন্দ্র থাকবে বাগদাদ। বিভিন্ন দেশের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে খলিফা সেনা প্রধানের সাথে পরামর্শ করবেন। দ্বিতীয়তঃ সামরিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খলিফা কোন হস্তক্ষেপ করবেন না। তৃতীয়তঃ খোৎবায় খলিফার নাম উচ্চারণ করা হবে না। সালাহুদ্দীন আরো নির্দেশ দিয়েছে যে, খলিফা বা তার মনোনীত কোন ব্যক্তি বা কোন কেল্লাদার বাইরে বের হলে জনগণ ফুলের তোড়া নিয়ে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না। খলিফার সম্মানে কোন শ্লোগান দেওয়া যাবে না।

    সালাহুদ্দীন আইউবীর বড় সাফল্য হল, তিনি শিয়া-সুন্নীর মতভেদ দূর করে দিয়েছেন। এখন শিয়াদের অনেকেই সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে আসীন। শিয়া আলেমদের তিনি বুঝিয়েছেন, ইসলামে নেই এমন কোন কাজ যেন তারা না করেন। এতে আমাদের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দল উপদল থাকলে আমাদের সুবিধা। এখন আমরা প্রশাসনের মধ্যে সালাহুদ্দীন এবং সেনাবাহিনীর বিরোধী মনোভাব তৈরী করছি।’

    ‘এ মনোভাব স্থায়ী করতে হবে।’ মুখ খুললেন ফিলিপ অগাস্টাস। ‘শুধু সালাহুদ্দীনই আমাদের শত্রু নয়, আমাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। আমাদের চেষ্টা হবে সালাহুদ্দীনের মৃত্যু হলে এ জাতি যেন অন্য কোন সালাহুদ্দীনের জন্ম দিতে না পারে। ওদের আকিদা বিশ্বাসে কুসংস্কার ঢুকিয়ে দাও। প্রতিটি লোকের চিন্তায় থাকবে রাজা হওয়ার স্বপ্ন। ওদেরকে বিলাসিতার গহীনে ডুবিয়ে দাও। দেখবে একজন অন্য জনের মাথা কাটছে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, একদিন এরা ক্রুশের গোলামে পরিণত হবে। ওদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ওদের ধর্ম খ্রিস্টবাদের রঙে রঙ্গীন হবে। ক্ষমতার লোভে একজন আরেকজনকে অন্যজনকে হত্যা করবে। সাহায্য চাইবে আমাদের কাছে। তখন হয়ত আমরা কেউ বেঁচে থাকব না। আমাদের আত্মা ওদের এ পরিণতি দেখে খুশি হবে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইহুদীরা নিজের যুবতী মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার কর। ইহুদীরা জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনকে নিজের মনে করে, এজন্য ওরা আমাদের দুশমন। কিন্তু সে কথা বলার সময় এটা নয়। ওদের বল, জেরুজালেম তোমাদের। শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন তোমাদেরকেই দেব। তোমরা এখন আমাদের সহযোগিতা কর। তবে ইহুদীরা অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের মানসিকতা বুঝতে পারলেই মুসলমানদের সাথে যোগ দেবে। সতর্কতার সাথে ফিলিস্তিনিদের লোভ দেখিয়ে ওদের সম্পদ এবং যুবতীদের ব্যবহার কর। বিজয় আমাদের হবেই।

                                                   

  • ভয়াল রজনী

    ভয়াল রজনী

    পাগলটাকে আর আঘাত করলো না ওসমান। জুতা খুলে মসজিদের ভেতরে ঢুকল দু’জন। ক্রুশটা এখনও তার হাতে। ভেতরে গিয়ে বললো ‘তোমার নাম কি যুবক?’

    ‘ওসমান’।

    ‘আমি মুসলমান, তুমি কখন থেকে আমার পিছু নিয়েছো?’

    ‘সারা দিন তোমার পিছনে হেঁটেছি, কিন্তু সুযোগ হয়নি’।

    ‘আমাকে কেন মারতে চাইছো?’

    ‘কারণ আমি ইসলাম এবং সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে কোন কথা সহ্য করি না’। তুমি পাগল হও আর যেই হও আমি তোমাকে হত্যা করবো’।

    ‘কিন্তু আমাকে হত্যা করলে ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের কি উপকার হবে?’

    ‘জানি না তবে ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের একজন দুশমন কমবে’।

    ‘তুমি কি যে-ই  ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের বিরোধীতা করবে তাকেই হত্যা করবে?’

    ‘অবশ্যই। সুযোগ পেলে আমি কাউকেই ছাড়বো না’।

    ‘তুমি কাকে ইসলামের বড় দুশমন মনে করো?’

    ‘অবশ্যই খৃষ্টানদের। তবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মত শক্তি এখনো আমার হয়নি। হলে তাদেরও আমি ছাড়বো না’।

    ‘ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের বিরোধীতা করলে তাদের হত্যা করতে হবে এই বুদ্ধি তোমায় কে দিয়েছে?’

    ‘কেউ এ কাজ করতে আমাকে বলেনি। আমি নিজে থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি’।

    ‘তুমি কি একাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো, নাকি তোমার সাথে আরো কেউ আছে?’

    ‘আমি একাই’

    আরো কয়েকটা প্রশ্ন করে পাগল লোকটা বললো, ‘তোমার মত একজন যুবকই আমার প্রয়োজন। তুমি নিজ থেকে এসেছো ভালই হয়েছে। ভেবেছিলাম এমন লোক পেতে আমার বেশ কষ্ট হবে’।

    ‘শোন, আমি সালাহুদ্দীনের একজন গোয়েন্দা। খৃষ্টানদের ধোকা দেয়ার জন্য পাগলের অভিনয় করছি। সফর করেছি এই পোষাকেই। তোমার সাথে কিছু কথা বলবো মন দিয়ে শোন- মনে রেখ মসজিদে হঠাৎ কেউ এসে পড়লে আমি আগের মত আজেবাজে কথা শুরু করবো পাগিলরা যেমন করে আরকি’!

    তুমি এমন ভাব করবে যেন আমার কথা মনযোগ দিয়ে শুনছো।

    যা বলার আমি দ্রুত বলছি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মুসল্লীদের মধ্যেও ওদের গুপ্তচর থাকতে পারে, এজন্য নামাযের আগেই কথা শেষ করতে হবে’।

    ওসমান কখনো গোয়েন্দা দেখেনি। ও জানতো না গোয়েন্দারা অসাধারন মেধবী হয়ে থাকে। ও অবাক হয়ে গোয়েন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সামান্য কয়েকটা প্রশ্ন করেই গোয়েন্দা লোকটি যুবককে চিনে নিয়েছে। বুঝেছে এ যুবক যথেষ্ট হুশিয়ার, বিশস্ত এবং আবেগপ্রবণ।

    ‘শোন ওসমান তোমার মত আরো কয়েকজন যুবক ও যুবতী যোগাড় করো। তাদের মন্মানসিকতাও তোমার মত হতে হবে। তাদেরকে তোমার মতই হতে হবে সাবধান ও বিশ্বস্ত। তাদের মানসিকতা তৈরী হয়ে গেলে শুরু হবে তোমাদের আসল কাজ। তোমাদেরকে প্রতিটি মুসলমাওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করতে হবে, সুলয়ান সালাহুদ্দীন বেচে আছেন এবং সুস্থ আছেন। তোমরা আরো প্রচার করবে, ক্রাক থেকে মাত্র কয়েক মাত্র কয়েক ঘণ্টার দুরত্বে অবস্থান করছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ক্রাক আক্রমনের জন্য মুসলিম বাহিনী শুধু প্রস্তুতই নয়, ওরা খৃষ্টান বাহিনীর আহার নিদ্রা হারাম করে রেখেছে। কায়রোর পরিস্থিতিও এখন পুরপুরি শান্ত। ওখান থেকে সকল ষড়যন্ত্রের মূল উপড়ে ফেলা হয়েছে’।

    ওসমানের বুকের ধুপধুপানি বেড়ে গেল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বললো, আপনি ঠিক বলছেন?

    ‘ওসমান, তোমার আর আমার স্বপ্ন এক। আমি যে স্বপ্নের বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছি আর তুমি আবেগে ভেষে বেড়াচ্ছ। এখন আর এভাবে ভেসে বেড়ালে চলবে না। আজ থেকে তুমি ভাববে, তুমিও আইয়ুবীর একজন সৈনিক। শোন আমি যা বলছি তা ঠিকই বলছি’।

    ‘আপনি সালাহুদ্দীন আইয়ুবীকে দেখেছেন?

    ‘হ্যা যুবক উনি আমাকে এখেনে পাঠিয়েছেন। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, উনি সছেন এই খবর এখানকার জনগনকে জানিয়ে দেয়া। তোমাকে দিয়েই এই কাজ শুরু হলো’।

    ‘সুলতান কখন আক্রমন করবেন? আমর তার পথ চেয়ে বসে আছি। আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তিনি বাইরে থেকে আক্রমন করলে আমরা ভেতর থেকে খৃষ্টানদের উপর ঝাপিয়ে পড়বো। আল্লাহর দোহাই লাগে, তাকে তাড়াতাড়ি আক্রমন করতে বলুন’।

    ‘বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে যুবক। প্রথমে শোন সুলতান আইয়ুবী কি বলেছেন। এরপত প্রতিটি যুবকের হৃদয়ে তা গেঁথে দাও। সুলতান বলেছেন, ক্র্যাকের মুসলিম যুবকদের বলে দাও তোমরাই ইসলামের রক্ষক। আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করতে হলে তোমাদের জিহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। তুমি তাদেরকে আমার জীবনের কাহিনী শুনাবে’।

    তিনি তার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে আরো বলেছেন, আমি প্রথম যুদ্ধ করেছি শৈশবে। একটি দুর্গে অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। নেতৃত্বে ছিলেম আমার চাচা। তিনি আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন ‘ভয় পেয়ো না। এখন ভয় পেলে ভয়ে ভয়ে কেটয়ে যাবে সারাটা জীবন। ইসলামের পতাকাবাহী হতে চাইলে এখনি পতাকা তুলে নাও। বেরিয়ে যাও দুশমনের ব্যুহ ভেদ করতে। আবার ফিরে এসো। ঝাপিয়ে পড় শত্রুর উপর’।

    সেদিন আমি ভয় পাইনি। তিনমাস অবরুদ্ধ ছিলাম। না খেয়ে থেকেছি। শেষ পর্যন্ত শত্রুর অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলাম। অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা প্রথমে খেয়েছি শত্রুর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া খাবার। দানা পানির অভাবে আমাদের যে সব ঘোড়া মরে গিয়েছিল তা পুরন করেছি শত্রুর ঘোড়া দিয়ে।

    সুলতান আরো বলেছেন, আমার জাতির সন্তানদের বলবে, শত্রু আমাদের ভালবাসার অস্ত্র দিয়ে আক্রমন করেছে। যদিও এটা মোটেও ভাল্বাসা নয়ব্রং ভালবাসার নামে প্রতারনার ফাদ মাত্র।

    ওরা জানে না প্রতারনা কি জিনিস, শুধু জানে ভালবাসার মিথ্যা অভিনয় করতে। মনে রেখ, কোন অমুসলিম মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না।

    খ্রীস্ট্রান শক্তি যুদ্ধের ময়দানে টিকতে পারে নি। ওদের সব পরিকল্পনা আমরা ধুলার সাথে মিশিয়ে দিয়েছি। ওরা এখন মুসলমান জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের হৃদয় থেকে বের করে দিতে চাইছে ইসলামী জাতীয়তাবোধ।

    সারা দুনিয়ার মুসলমান এক জাতি। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। শত্রুরা এ ভ্রাত্বের বন্ধন ছিন্ন করার উস্কানী দিচ্ছে।

    ওরা ধর্মের প্রতি প্রীতি ও ভালবাসার পরিবর্তে আমাদের কিশোর ও যুবকদের হৃদয়ে সৃষ্টি করতে চাচ্ছে পুঞ্জীভুত ঘৃনার পাহাড়। এ জন্য ওরা ব্যবহার করছে নানা রকম বিপজ্জনক অস্ত্র। ইসলামের কথা যারা বলে, ইসলামের পথে যারা চলে, তাদের ন্না অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে গালি দেওয়া হচ্ছে মোল্লা, গোড়া, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এসব বলে। এভাবে আগামী প্রজন্মের মন বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ওপর।

    মুসলিম যুবকদের বলবে, দুশমন আমাদের ওপর সর্বপ্লাবী হামলা শুরু করে দিয়েছে। সম্মুখ সমরের পাশাপাশি মানসিক চোরাগুপ্তা হামলা করছে। এর জন্য ব্যবহার করছে ভয়ংকর সব অস্ত্র। এ সব অস্ত্রের নাম হলো সম্পদের প্রতি মোহ, বিলাসিতা, আলস্য এবং দায়িত্বহীনতা।

    এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য খ্রীস্টান এবং ইহুদী শক্তি সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। ইহুদীরা নিজেদের যুবতী মেয়েদেরকে লেলিয়ে দিয়েছে তোমাদের পেছনে। তারা তোমাদের পাশবিক শক্তিকে উসকে দিচ্ছে।

    ওরা আমাদের যুবকদের হাতে তুলে দিচ্ছে নানা রকম নেশার দ্রব্য। সৃষ্টি করছে মাদকাশক্তি। কোন জাতি ধ্বংস হওয়ার জন্য এ দুটো অভ্যাসই যথেষ্ট।

    তুমি যুবকদের বলবে, পাপী মানুষের পরকালের জন্য নির্ধারিত রয়েছে নরকের কঠিন যন্ত্রণা। তুমি এ দুটো অভ্যাস পৃথিবীতেই তোমাদের জন্য নরক যন্ত্রণা নিয়ে আসবে। তোমরা যাকে আজ স্বর্গের আনন্দ ভাবছো, দু’দিন বাদে দেখবে তা আসলে জাহান্নামের শাস্তি।

    এখনি সচেতন না হলে একদিন তোমরা হবে খ্রীস্টানদের গোলাম। ওরা তোমাদের বোনদের আব্রু নষ্ট করবে। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকবে কোরানের ছেঁড়া পাতা, মসজিদ হবে ঘোড়ার আস্তাবল। চোখের সামনে তোমাদের বাড়িঘর জ্বলবে দাউ দাউ করে।

    সুলতান আরো বলেছেন, মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে চাইলে নিজের ঐতিহ্য কখনো ভুলে যেয়ো না। দুশমন একদিকে তোমাদেরকে উত্যক্ত করছে, অন্যদিকে সম্পদ আর নারীদের লোভ দেখাচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে,  মুসলমান কোন বিলাসপ্রিয় জাতি নয়। মুসলমান সম্পদের দাস হয় না, বরং সম্পদকেই তারা দাসে পরিনত করে। প্রয়োজন হলে খেজুর পাতার চাটাইতে বসে আমরা পৃথিবরী শাসন করতে পারি।

    রোম ও পারস্যের সম্রাটদের সুবিশাল প্রাসাদ আর অতুলনীয় শানশওকত ও তৈজসপত্রের চেয়ে আমাদের কাছে বেশী প্রিয় তেজী ঘোড়া আর জং হীন তলোয়ার। আমাদের মূলধন কোরআন আর হাদীস, আমাদের আসল সম্পদ ঈমান আর আমল। সহায় আমাদের আল্লাহ। বিশ্বাস ও কর্মের দৃঢ়তাই আমাদের রক্ষাকবচ।

    তুমি ওদেরকে বলবে, বিলাসদ্রব্য, সম্পদ আর নারী দেহের লোভ দেখিয়ে ওরা তোমাদেরকে গোলামীর শিকলে বাঁধতে চাইছে। তলোয়ারকে ভয় পেয়েই এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে ওরা।

    হে আমার জাতির সন্তানেরা, নিজের হাতে নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ো না।

    হে আমার জাতির সন্তানেরা, নিজের হাতে নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ো না। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাও।

    মনে রেখো, অত্যাচারী শাসক সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে। প্রতিপক্ষকে জুলুম অথবা অর্থ দিয়ে পরাভূত করতে চায়। অত্যাচারকে ভয় পেয়ো না। পা দিও না লোভের ফাঁদে।

    তোমরাই জাতির ভবিষ্যত। আমরা অতীত হয়ে গেছি। জাতির অস্তিত্ব এখন নির্ভর করছে তোমাদের হাতে। তোমরা সচেতন হলে জাতি বাঁচবে, তোমরা ঘুমিয়ে থাকলে জাতি মারা যাবে।

    শত্রু তোমাদের মন-মানসিকতার সোনালী ঐতিহ্য অপবিত্র চিন্তা ধারার কালো নেকাবে ঢেকে দিতে চায়। ওরা চায় পৃথিবরীর বুক থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। এর মোকাবেলায় চাই অফুরন্ত সাহস আর হিম্মত।

    তোমরা যদি সাহসের সাথে সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকতে পারো বুকের ভেতর, আর প্রতিটি মুহুর্ত সে স্বপ্নকে বুকে নিয়ে নির্ভয়ে পথ চলতে পারো, দেখবে, প্রতিটি সূর্যোদয় তোমাদের জন্য সফল ও বিজয়ের বার্তা বয়ে আনবে।

    তোমাদেরকে ভয় পায় বলেই এ কুটিল পথ বেছে নিয়েছে ওরা। শুরু করেছে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। মুমীন ঈমান বিকিয়ে দেয় না বলেই তো অস্ত্রের লড়াইতে নামতে হয় ওদের। কিন্তু যদি তোমাদের ঈমানী চেতনা নষ্ট করা যায় তবে আর অস্ত্রের লড়াইকে প্রয়োজন কি?

    মনে রেখো, যে হৃদয়ে ঈমানের আগুন নেই সে দেহে ওদের আঘাত করারও প্রয়োজন নেই। কারণ, কোন দেহ কাঠামোর সাথে ওদের কোন বিরোধ নাই, ওদের বিরোধ তো বিশ্বাসের সাথে, ঈমানের সাথে, তাওহীদের সাথে।

    তোমাদের হিরন্ময় বিশ্বাস ও চেতনার বিনাশ সাধনই ওদের একমাত্র টার্গেট। সে টার্গেটে পৌঁছার জন্যই ওদের এতসব সাংস্কৃতিক হামলা।

    দুঃখের বিষয়, প্রাণে না মেরেও যে আমাদের হত্যা করা যায় এ কথা ওরা বুঝলেও আমরা সহজে বুঝতে চাই না। তাই মুসলমানদের মত জীবন যাপন করা করেও আমরা মুসলমান বলে দাবী করতে পারি নিজেদেরকে।

    হে যুবক বন্ধুরা, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ, ভবিষ্যতে ওদের প্রতিটি কাজের ওপর নিবদ্ধ রেখো তোমাদের সজাগ দৃষ্টি। তাহলেই দেখতে পাবে ওদের প্রতিটি কাজের পেছনে এক অন্তর্গুঢ় লক্ষ্য রয়েছে। আর সে লক্ষ্যটি হচ্ছে তোমাদের ইসলামী চেতনার বিনাশ সাধন করা, ধর্মীয় ভাবধারার প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। তোমরা যে মিশনারী জাতি, তোমাদের ওপর যে খেলাফতের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে সে কথা তোমাদের ভুলিয়ে দেয়।

    বেঈমানরা তোমাদেরকে কি অবস্থায় নিয়ে এসেছে তা তো আজ নিজেরাই দেখতে পাচ্ছো। হে আমার যুবক বন্ধুরা, তোমরা মানসিকভাবে ওদের গোলামীর নিগড়ে একবার বন্দী হলে সমগ্র মুসলিম জাতিরও একই পরিণতি হবে। কারণ, মুসলিম উম্মাহ আর কিছুই নয়, সে তো তোমাদের সমষ্টি মাত্র।

    সময়ের এক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আজ তাই তোমাদের কাছেই আমি আকুল আহবান জানাচ্ছি, এসো, সংকীর্ণতা পরিহার করো। ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে বাঁচানোর কোন চিন্তা মনেও এনো না, সেটা হবে আত্মহত্যার শামিল। জোট বাঁধো, ঐক্যবদ্ধ হও, এক হয়ে রুখে দাঁড়াও শত্রুর বিরুদ্ধে’।

    সুলতানের বাণী শোনানোর পর মুসলিম গোয়েন্দাটি এবার ওসমান সালেমকে তার কাজ ও কর্মপদ্ধতি কি হবে সে বিষয়ে বলতে লাগল।

    ‘আমাদের প্রধান সেনাপতি বলেছেন, আবেগ তাড়িত হয়ে কোন কাজ করো না। কেবল আবেগ দিয়ে সময়ের গতিকে রোধ করা যায় না। সব সময় খেয়াল রাখবে, আবেগ যেন দূরদর্শীতার উপর বিজয়ী না হয়।

    কখনো এত্তজিত হবে না। সংযম এবং সতর্কতার সাথে কাজ করবে। এই সংযম ও সতর্কতাই বিজয়ের চাবিকাঠি।

    আমার আরও দু’জন সঙ্গী বিভিন্ন রূপ নিয়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে।

    এবার শোন তোমার কাজ কি হবে। এ মুহুর্ত থেকে বিশ্বস্ত মুসলমানদের বাড়িতে গোপনে তীর, ধনুক এবং বর্শা তৈরী করে লুকিয়ে রাখবে।

    যুবক, বৃদ্ধ, কিশোর সবাইকে অস্ত্রের ট্রেনিং নিতে হবে। তবে সাবধান, এ কাজ করতে হবে গোপনে। শত্রুরা যেন কোন মতেই তোমাদের প্রস্তুতির টের না পায়।

    ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে নারীদেরকেও অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেবে। জেহাদ কেবল পুরুষের জন্যই নয়, নারী পুরুষ সবার জন্য ফরজ।

    ইহুদী মেয়েদের কথা যেন কেউ কানে না তোলে। তাদের কোনো কথা বিশ্বাস করবে না। ওরা মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করার জন্য এবং জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য নানা কৌশলে নানা কথা প্রচার করবে।

    সন্দেহ করতে পারে এমন কোন কথা ওদের সাথে বলবে না। কারও সাথে ঝগড়াঝাটি করবে না। ফালতু ঝগড়ায় জড়িয়ে নিজেদের শক্তি ও সময় অপচয় করবে না।

    প্রথমে সঙ্গঠিত হয়ে একজনকে নেতা নির্বাচন করে নিও। প্রত্যেকের তৎপরতা নেতার নজরে থাকবে। তার অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো পদক্ষেপ নেবে না। নেতা বানাবে এমন একজনকে, যে পরহেজগার, যে তোমাদের মধ্যে সবচে ত্যাগী, নির্লোভ আর বিচক্ষণ।

    শত্রুর গতিবিধির ওপর ভালভাবে লক্ষ্য রাখবে। তুমি কি করছো সেটা বড় কথা নয়, শত্রু কি করছে সেটাই বড় কথা। কারণ শত্রুর ক্ষমতা ও শক্তি খর্ব করার ওপর নির্ভর করছে তোমার বিজয়।

    প্রতিপক্ষ আগামীকাল কি পদক্ষেপ নেবে তা যদি তুমি আজ জানতে না পারো তবে তার আগামীকালের অগ্রযাত্রাকে কিছুতেই তুমি প্রতিহত করতে পারবে না। ফলে নিজে কি করছো তা যেমন তোমানের নখদর্পনে থাকবে ঠিক একই ভাবে শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপও তোমাদের নখদর্পনে থাকতে হবে’।

    সূর্য ডুবো ডুবো। মসজিদের পেশ ইমামা এলেন। তাকে দেখে ক্রশ হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল পাগলা। মসজিদের ভেতর তার কণ্ঠ ভেসে এল, ‘মুসলমান! ক্রুশের আশ্রয়ে এসো। তোমাদের ইসলাম মরে গেছে’।

    ওসমানের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন বৃদ্ধ ইমাম।

    ‘এখানে কি করছিলে’ ঝাঝের সাথে ওসমানকে প্রশ্ন করলেন ইমাম।

    ‘ওকে ভেতরে বসিয়ে রেখেছিলে কেন? কেন তাকে শেষ করে দাওনি? তোমার দেহে কি মুসলিম পিতার রক্ত নেই? আমি বৃদ্ধ না হলে ওকে জীন নিয়ে পালিয়ে যেতে দিতাম না’।

    ‘ওকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই আমি ওর পিছু নিয়েছিলাম’।

    ইমামকে খঞ্জর দেখিয়ে বললো ওসমান। ‘আল্লাহর শোকর ও আমার আঘাত ক্রুশ দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছে। লোকটা পাগল নয়। ইহুদী বা খ্রিষ্টানও নয়। ও মুসলমান। সুলতান সালাহুদ্দীনের বাণী নিয়ে এসেছে’।

    ইমামকে সুলতানের পয়গাম শুনিয়ে ওসমান বললো, ‘আমি এর বাস্তবায়ন করবো। আজ সন্ধ্যা থেকৈই নেমে পড়বো কাজে’।

    একটু ভেবে নিয়ে ওসমান আবার বললো, ‘কিন্তু আমাদের একজন নেতা প্রয়োজন। আপনি কি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন? ভেবে দেখুন! সরকার জানতে পারলে প্রথমেই নেতার মস্তক উড়িয়ে দেবে’।

    ‘আমি এ জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকব মসজিদে দাঁড়িয়ে এমন কথা কি বলতে পারি? তবে আমি নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য কি না সে ফয়সালা করবে জাতি’।

    ‘আমি মসজিদের এ পবিত্র অংগনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, আমার জীবন, সন্তান-সন্ততি এবং ধন-সম্পদ ইসলামের জন্য উৎসর্গ করে দেবো’।

    সামান্য বিরতি নিয়ে তিনি আবেগের সাথে বললেন, ‘প্রিয় সন্তান, সালাহ উদ্দীন সালাহুদ্দীনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা গভীরভাবে মনে গেঁথে নাও। তিনি ঠিকই বলেছেন, যুবকরাই হচ্ছে দ্বীন এবং জাতির ভবিষ্যত রক্ষক। ইচ্ছে করলে এর আশার আলো জ্বালাতে পারে আবার ইচ্ছে করলে সমাজকে আঁধারেও ঢেকে দিতে পারে’।

    তিনি আরো বললেন, ‘কোন মুসলমান যুবক যখন কোনো ইহুদী বা খ্রিষ্টান যুবতীর দিকে তাকিয়ে থাকে তখন সে এ কথা ভাবে না যে, তার বোনও অন্যের কু দৃষ্টির শিকার হতে পারে।

    প্রিয় যুবক! খোদার এই ঘরে দাঁড়িয়ে আজ এই মুহুর্ত থেকে প্রতিজ্ঞা করো, সালাহ উদ্দীনের পয়গাম কার্যকরী করার জন্য জীবনপণ চেষ্টা করবে’।

                                                   

    নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে গেল ওসমান। বাড়ি গিয়েই ছোট বোন আল নূরকে নিরালায় ডেকে নিল। তাকে শোনাল সুলতান সালাহুদ্দীনের বাণী।

    বলল, ‘বোন! আমাদের দ্বীন এবং জাতি তোমার কাছে অনেক বড় ত্যাগের প্রত্যাশী। তুমি অন্তপুরবাসী নারী –আজ থেকে এ চিন্তা ছেড়ে দাও। মুসলিম নারীদের জেহাদের জন্য প্রস্তুত কর’।

    ওসমান তাকে আরো বলল, ‘আমি তোমাকে খঞ্জর এবং তীর, ধনুক ও তলোয়ারের ব্যবহার শিখাবো। তবে কাজ করতে হবে খুব সাবধানে, কেউ যেন সন্দেহ করতে না পারে আমরা কি করছি’।

    আজ নূর আবেগে ওসমানের হাত চেপে ধরল।

    ‘আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ভাইয়া।

    আমার বান্ধবীরাও দেশ এবং জাতির জন্য কি করা যায় সে ভাবনায় বেশ কিছুদিন যাবত অস্থির। আমরা তো এতকাল পুরুষের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম, এবার ভাবছিলাম আমরাও কিছু করতে পারি কি না’।

    ওসমান বললো, ‘সুলতান এবং মুসলিম বাহিনীর ব্যাপারে এতদিন আমরা যা শুনেছি সব মিথ্যা, সব গুজব। প্রতিটি মুসলমানের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের কানে সঠিক খবর পৌঁছে দিতে হবে। তবে মনে রেখো, মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট গাদ্দার এবং খ্রিষ্টানদের গোয়েন্দাও রয়েছে’।

    কয়েকটা বাড়ির উল্লেখ করে ওসমান বললো, ‘আগে এসব বাড়ির মেয়েদের হাত করে নাও। এরপর সতর্কতার সাথে তাদেরকে বলো, তোমাদের পুরুষগুলি জাতির সাথে গাদ্দারী করছে। ওদের বলো, খ্রিষ্টান এবং ইহুদী মেয়েদের ভালবাসার অভিনয় নিরেট প্রতারণা মাত্র। এ হচ্ছে আমাদের জাতির বিরুদ্ধে এক ধরনের ফাঁদ’।

    ‘রিনিকে এখানে আসতে বারন করবো? তোমার সাথেও তো ওর সম্পর্ক রয়েছে’। বলল আল নুর।

    ‘ওকে যা বলার আমিই বলবো। তুমি কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেল

    বে, শেষে আবার ঝামেলায় পড়ে যাই’।

    ‘ঠিকই বলেছেন, ও ভীষণ বুদ্ধিমতি এবং সতর্ক’।

    ‘ওকে কিছু বলার দরকার নাই, যা বলার আমি নিজেই বলবো’।

    ওস্মান নিজের ঘর থেকে কাজ শুরু করে দিল।

    রিনি একজন খৃস্ট্রান যুবতী।সুন্দরী। ওসমানদের বাড়ির অল্প দূরে ওদের বাড়ি। রিনির পিতা বর্তমানে এখানকার পুলিশ প্রধান। ওর পুরো নাম রিনি আলেকজেণ্ডার। রিনি আল নুরের বন্ধু। কিন্তু ওসমানকে দেখলে ওরচোখে মুখে আনন্দের দ্যুতি হেসে উঠতো। ওসমান এড়িয়ে চলতো তাকে।তার ধারনা খৃস্ট্রান মেয়েটা এখানে গোয়েন্দাগিরি করতে আসে। তবে ও যেন ওসমানকে সন্দেহ না করে করে এ জন্য কখনও কখনও তার সাথে হাসি ঠাট্টাও করতো।

    ওসমান ভাবলো, এখন রিনিকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করা উচিত। ছোট বোনকে সামরিক ট্রেনিং দিতে হবে, রিনিকে তা জানানো যাবে না।

    রিনিকে কিভাবে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করবে এ নিয়ে ওসমান সারাদিন ভাবল। গভীর ভাবনা চিন্রাত পর একটা বুদ্ধি এল তার মাথায়।

    পরদিন ওসমান আল নূরকে ডেকে বললো, ‘রিনি যখন আমাদের বাড়িতে আসে তখন তুমি তাকে কোন ছুতো দেখিয়ে বাইরে নিয়ে যেও। এভাবে কয়েকদিন এড়িয়ে চললে দেখবে একদিন ও নিজে থেকেই এখানে আসা বন্ধ করে দেবে’।

  • ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

    ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

    ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

    দেখা গেছে যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা আদর্শগত—তা ফলাফল ও পরিণতির দিক দিয়ে যতই গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবাত্মক প্রমাণিত হোক না কেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আকর্ষণীয় হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রচণ্ড উদ্দীপনাময় কার্যাবলী তার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দার্শনিক তত্ত্ব  বুঝবার জন্য দর্শন বিদ্যা সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং উক্ত বিদ্যা অর্জন ও তাতে পাণ্ডিত্য লাভ করা আবশ্যক। কিন্তু সামরিক ঘটনাবলী এই জন্য চিত্তাকর্ষক হয় যে, সকলেই জানতে চায় যুদ্ধক্ষেত্রে জাতীয় বীরবৃন্দ আত্মোৎসর্গ, বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কি কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন এবং স্বদেশ ও স্বজাতির জন্য কিভাবে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন! এই সব কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলী ও কুরবানীর উপ্যাখ্যান পাঠ করে অন্তরের মাঝে এই মর্মে আবেগ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় যেন আমরাও এভাবে আমাদের দেশ ও জাতির কাজে লাগতে পারি।

    মজার ব্যাপার এই যে, কাহিনী যতটা লোমহর্ষক, ভয়াবহ ও রক্তাক্ত হয় ততটা হৃদয়গ্রাহী এবং চিত্তাকর্ষকও হয়।

    যেহেতু যুদ্ধের কাহিনী হৃদয়গ্রাহী ও আবেগোদ্দীপক হয়ে থাকে সেজন্য এর পাঠকচক্রও বিস্তৃত হয় এবং জাতির প্রতিটি অংশ ও শ্রেণী এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। আজকাল রাষ্ট্রের হেফাজত ও নিরাপত্তার যিম্মাদারী কেবল সেনাবাহিনীর উপরই বর্তায় না, আধুনিক সমরশাস্ত্রের কারণে এতে জাতির প্রতিটি সদস্যই সমান অংশীদার হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে দেশের প্রতিরক্ষার প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষার ইতিহাস অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

    প্রতিরক্ষার ইতিহাস

    কিন্তু আমরা যখন প্রতিরক্ষার ইতিহাস অধ্যয়ন করতে শুরু করি তখন অসংখ্য প্রশ্ন সামনে এসে দেখা দেয়। যেমন :

    ১. কোন দেশের পাহাড় পর্বত, রেল-লাইন, রাস্তা-ঘাট, গিরিপথ, প্রান্তর-ময়দান, বন-জঙ্গল, দুলদুলে স্থান ও নদী-নালা প্রতিরক্ষা স্ট্রাটেজীতে কিরূপ গুরুত্ব রাখে এবং বিজেতার বিজয় এবং পরাজিতের পরাজয়ের উপর ঐ সব প্রতিবন্ধকতা কিংবা সহজ সাধ্যতার (আসানীর) কি প্রভাব পড়ে?

    ২. একটি বিশাল সাম্রাজ্যের বিরাট বাহিনী প্রতিপক্ষের একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর কাছে কেন পর্যুদস্ত হয় এবং কি সেই রহস্য যা একটি বাহিনীর চলনভঙ্গি (Movement) প্রতিপক্ষের যাবতীয় কূট-কৌশলকে পণ্ড করে দেয়?

    ৩. কেন অমুক সিপাহসালার খ্যাতিমান ও প্রশংসাধন্য?

    যিনি ইতিহাসের এই অংশ অধ্যয়ন করেন তিনি এসব প্রশ্ন এবং এ ধরনের আরো অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে পারেন না।

    এসব প্রশ্নের জওয়াব উপাখ্যান কিংবা কিস্‌সা-কাহিনীতে পাওয়া যাবে না। এজন্য এমন সব বই-পুস্তকের প্রয়োজন যা এসব প্রশ্নের সমাধান দিতে পারে। অবশ্য এই সব গ্রন্থকে নতুন পারিভাষিক জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে যাতে করে পাঠকের ধ্যান-ধারণা এসব পরিভাষা আয়ত্ত করতে গিয়ে মূল বিষয় থেকে বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে কিংবা সাহিত্যিক ও শৈল্পিক সূক্ষ্মতা ও খুঁটিনাটির আবর্তে জড়িয়ে না পড়ে। এধরনের পরিভাষা প্রণয়ন এবং তার ব্যবহার এ-জাতীয় গ্রন্থ লেখকদের মনোবল দমিয়ে দেয়। কোন জাতি-গোষ্ঠী ততক্ষণ পর্যন্ত বিজয়ী কিংবা খ্যাতিমান হতে পারেনি যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সমর ক্ষেত্রে অবতরণ করে স্বীয় ইতিহাসকে আপন রক্ত-আখঁরে লিখেছে এবং কোন জাতি-গোষ্ঠী ততক্ষণ পর্যন্ত এমনটি করার যোগ্য হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সমর ক্ষেত্রের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হয় এবং এই অবহিতি প্রতিরক্ষা স্ট্রাটেজী ও সমরশাস্ত্র সম্পর্কে যথাযথ পরিচিতি লাভের পরই কেবল হাসিল হতে পারে।

    উপমহাদেশের ইতিহাসই ধরুন না কেন! রামায়ণ ও মহাভারতের যুগ। সে সময় ভারতবর্ষকে গোটা বিশ্বে বুদ্ধিমত্তা, প্রাচুর্য ও সভ্যতার শীর্ষে স্থান দেওয়া হ’ত। তার নিকট তখন আছে অশ্বারোহী বাহিনী, বিরাট হস্তীবাহিনী আর আছে সর্বোত্তম রথযান। তথাপিও সে বিশ্বজয়ীর আসন লাভে সক্ষম হয়নি। প্রশ্ন জাগে, এমনটি কেন হ’ল? ভারতবর্ষের ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের কাহিনী তখন বিশ্বময় লোকের মুখে মুখে ফিরছে। ফলে আলেকজাণ্ডার ভারত অভিমুখী হন যাতে করে উজ্জ্বল এই হীরক খণ্ডটিকে তিনি তাঁর রাজমুকুটের শোভা বর্ধনে ব্যবহার করতে পারেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি কিছু সংখ্যক সেনা সহযোগে ভারতবর্ষের দিকে অগ্রসর হন এবং শেষাবধি রাজা পুরুর সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ বাঁধে।

    পুরুর ছিল বিশাল সেনাবাহিনী। আর ছিল অসংখ্য হাতী, অশ্বারোহী সৈন্য ও লৌহবর্মে আবৃত বীর রাজপুত পদাতিক বাহিনী। তাঁর সমরাস্ত্র শত্রুর মুকাবিলায় সর্বোত্তম না হলেও একেবারে নিকৃষ্টও ছিল না। সাধারণ লোকের মধ্যে বিশেষ করে রাজপুত যুবকদের মধ্যে ত্যাগের সীমাহীন প্রেরণাও বিদ্যমান ছিল; বীরত্ব ও শৌর্যবীর্য তাদের শিরায় শিরায় মিশে ছিল। পুরুষ তো দূরের কথা, তাদের মহিলারাও মৃত্যুকে ভয় পেত না। কিন্তু রণক্ষেত্র যখন উত্তপ্ত হ’ল, দেখা গেল অভিজ্ঞ ও পারদর্শী পুরু যুবক আলেকজাণ্ডারের নিকট পরাজিত হয়েছেন। এমনটি কেন হ’ল? পুরুর পঙ্গপালের ন্যায় বিরাট বাহিনী আলেকজাণ্ডারের মুষ্টিমেয় ও স্বল্প সংখ্যক অশ্বারোহীর নিকট কেন পরাজিত হ’ল? এর কারণ ছিল এই যে, আলেকজাণ্ডার তাঁর শত্রুর দুর্বলতা কোথায় তা আঁচ করে নিয়েছিলেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এই নওজোয়ান তাঁর পিতা ফিলিপের পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অতি উন্নত মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি সেনাবাহিনী পেয়েছিলেন। ঐ বাহিনী সংখ্যায় বিরাট বড় ছিল না। কিন্তু ফিলিপ সেটাকে এমনভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন যে, সেই বাহিনীর একটি অংশ যাকে তিনি “রিসালা” (অশ্বারোহী বাহিনী) বলতেন,—এতখানি যোগ্য ও দক্ষ ছিল যে, তা তাঁর সিপাহসালারের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে এমন বিদ্যুৎগতিতে বাস্তবায়িত করতে পারত যে, শত্রু তার আক্রমণের তীব্রতা সহ্য করতে পারত না। ঐ রিসালার সমর-নৈপুণ্য ছিল সেই তীরের মত যা একজন অভিজ্ঞ তীরন্দাযের হাত দিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে শত্রুর বক্ষ ভেদ করে তাকে চিরতরে খতম করে দেয়। স্থূলদৃষ্টিতে যে সম্পর্ক রয়েছে তীর ও তার নিশানা অর্থাৎ প্রতিপক্ষের দেহের সাথে—ঠিক সেই সম্পর্ক রয়েছে একটি সর্বোত্তম অশ্বারোহী বাহিনী (রিসালা) ও তার প্রতিপক্ষ বাহিনীর সাথে যার উপর এই অশ্বারোহী বাহিনী আপন সুযোগ্য সিপাহসালারের নেতৃত্বে হামলা করে এবং প্রতিপক্ষের কাতার কে কাতার তছনছ করে দেয়। অনন্তরে ঠিক যে মুহুর্তে রাজা পুরুর পদাতিক বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে গ্রীক ফৌজকে পিছু হটতে বাধ্য করছিল ঠিক সেই মুহর্তে আলেকজাণ্ডারের অশ্বারোহী বাহিনী প্রচ্ছন্নভাবে অতর্কিতে নদী পার হয়ে পুরুর বাহিনীর পশ্চাদ্দেশ থেকে তার মধ্যখানে উদিত হয়। এই বিদ্যুৎগতিসম্পন্ন গ্রীক অশ্বরোহী বাহিনীর আক্রমণের প্রতিক্রিয়া এই হ’ল যে, পুরুর বাহিনী এর মুকাবিলার তীব্রতা সহ্য করতে পারল না। অন্য কথায়, পুরুর অশ্বারোহী বাহিনী এবং হস্তি বাহিনীকে এমন ট্রেনিং দেওয়া হয়নি যে, তারাও তৎক্ষণাত একত্রিত হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের আক্রমণের গতি পরিবর্তন করতে পারে। পুরুর সেনাবাহিনীর অধিনায়কত্ব ন্যস্ত ছিল ঢিলা হাতে। গ্রীক আক্রমণের তীর তাঁর বক্ষে গিয়ে বিঁধে এবং আলেকজাণ্ডারের সংক্ষিপ্ত ফৌজ প্রবল ভারতীয় বাহিনীকে পরাজিত ও পর্যুদস্ত করে দেয়।

    এটি এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা যেখানে প্রতিরক্ষা বিষয়ক যোগ্যতাকে সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

    আলেকজাণ্ডারের ন্যায় সম্রাট হ্যানিবলও প্রতিরক্ষামূলক যোগ্যতাকে সঠিক এবং কার্যকর পন্থায় ব্যবহার করে রোমক বাহিনীকে ত্ৰিবিয়া এবং কীনের রণক্ষেত্রে পরাজিত করেন, যদিও রোমকদের সৈন্য সংখ্যা ছিল বিরাট ও বিপুল এবং তাদের কাছে অসংখ্য অশ্বারোহী সৈন্যও ছিল। এর মুকাবিলায় হ্যানিবলের অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা ছিল এক-চতুর্থাংশেরও কম। এতদসত্ত্বেও হ্যানিবল উক্ত দু’টি যুদ্ধে তাঁর ছোট্ট অশ্বারোহী বাহিনীকে এমনি সফলতার সঙ্গে ব্যবহার করেন যে, রোমক সৈন্যদের পরাজিত হয়ে পালাতে হয়।

    এখন প্রশ্ন জাগে, এতবড় বিজয় লাভের পরও কেন হ্যানিবল রোম জয় করতে পারলেন না? শেষ পর্যন্ত তিনি কেবলমাত্র ব্যর্থ হয়েই ফিরেন নি বরং ধ্বংসপ্রাপ্ত হন। এমনটি কেন হ’ল? এর কারণ দু’টি :

    (ক) হ্যানিবল অতঃপর যথাসময়ে সাহায্যকারী বাহিনী পাঠান নি, আবার যথেষ্ট পরিমাণ সমরাস্ত্র ও রসদ-সম্ভারও পৌঁছাবার ব্যবস্থা করেন নি। যাও পাঠিয়েছিলেন তা সময়মত পৌঁছে নি।

    (খ) হ্যানিবল যেখানে স্বীয় ফৌজের প্রতিরক্ষামূলক যোগ্যতাকে তার প্রতিপক্ষের মুকাবিলায় সর্বোত্তম করে গড়ে তুলেছিলেন সেখানে তিনি এটা চিন্তা করেন নি যে, তাঁর শেষ লক্ষ্যস্থল কি এবং এর পাথেয় কি হওয়া উচিত।

    তাঁর শেষ লক্ষ্যস্থল ছিল রোমের কেল্লাগুলো জয় করা। কিন্তু সে গুলো জয় করার জন্য তাঁর নিকট সমরাস্ত্রের ঘাটতি ছিল। অন্য কথায় তিনি পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন নি এবং সমর- শাস্ত্রের আবশ্যকীয় বিষয়গুলোর ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করেন নি বিধায় তাঁকে ব্যর্থতা বরণ করতে হয়েছে।

    উল্লিখিত যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনার পিছনে আমার উদ্দেশ্য এই যে, যখন রাষ্ট্র, জনসাধারণ কিংবা সিপাহসালার বিস্তারিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে তাড়াহুড়ো কিংবা স্থূলদৃষ্টিতে দেখে তখন তাদেরকে ব্যর্থতা বরণ করতে হয়।

    ১৯১৪ ঈসায়ীতে জার্মানী যখন ফ্রান্সের উপর হামলার ইচ্ছা করল তখন জার্মান সম্রাট কাইজারের সিপাহসালার জেনারেল মলিটিকের জন্য বিরাট ও উত্তম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী সরবরাহ করা হয়। কিন্তু জার্মানীর সমর পর্যালোচকগণ সুক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে অনেকগুলো দিকের উপর চিন্তা-ভাবনা করলেও এই বিরাট ও বিশাল বাহিনীর প্রতিরক্ষামূলক গতিবিধির গুরুত্বের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ দেন নি। বিশেষ করে তাঁরা এটি চিন্তা করে দেখেন নি যে, যদি যুদ্ধক্ষেত্র প্রাকৃতিক অথবা অন্যবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে দু’টো মোর্চাতেই ছড়িয়ে পড়ে এবং শত্রুর ডান ও বাম পার্শ্বের উপর হামলা করে তাকে তার মোর্চা থেকে বহিষ্কার করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে তখন জার্মান সেনাপতিকে কি করতে হবে? এই ভ্রান্তির পরিণাম এই হ’ল যে, যখন মিত্রবাহিনী মোর্চা বন্দী করে তাকে থামিয়ে দিল তখন তারা অঘোরে জীবন দিতে শুরু করে। এত মূল্যবান জীবন কুরবানী তারা বেশীক্ষণ দিতে পারে নি (আর তা দেওয়াও সম্ভব নয়) বিধায়, তারা শেষ পর্যন্ত থেমে পড়ে।

    মিত্রশক্তিও জার্মানদের এই সমরশাস্ত্র ও রণনীতির প্রতিক্রিয়া সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে না দেখেই এর পুনরাবৃত্তি করে। ফলে মিত্রশক্তিকেও সীমাহীন জীবনহানির সম্মুখীন হতে হয়। যেহেতু জার্মানী (মিত্রশক্তির তুলনায়) একটি ছোট্ট দেশ, সে জন্য সে বেশীক্ষণ কুরবানী দিতে পারেনি! তাই শেষ পর্যন্ত সে অবসন্ন ও পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে।

    যেহেতু জার্মানী ছাড়া সারা বিশ্বের প্রতিরক্ষা পর্যালোচকগণ শেষ বিজয়ের নেশায় ছিলেন মত্ত, সেহেতু তারা বিশ্বযুদ্ধের পর এই ভুল তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন যে, আগামী যুদ্ধগুলো মোর্চার আড়াল নিয়েই লড়া হবে এবং এভাবে কয়েক বছরের সামরিক দীর্ঘসূত্রিতা তথা দীর্ঘ দিন যাবত পরিচালিত যুদ্ধের কারণে যে রাষ্ট্রের নিকট সমর-সম্ভার কম হবে স্বভাবতই সে হেরে যাবে।

    প্রকৃতপক্ষে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ এবারও অবস্থার সঠিক পরিমাপ করতে ব্যর্থ হন। ফ্রান্স মেজিনিউ লাইন বানায়। বেলজিয়াম ও হল্যাণ্ড মোর্চাবন্দীতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে। কিন্তু ১৯৩৯ ঈসায়ীতে জার্মানী যেহেতু পূর্বকৃত ভুল ধরতে পেরেছিল তাই সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার সংস্কারিত ও পরিশুদ্ধ নমুনা-মাফিক খুবই সাফল্যের সঙ্গে লড়ে। যদি মিত্রশক্তিও এই যুদ্ধের সঠিক ফলাফল অনুধাবন করতে পারত তাহলে তারা দেখতে পেত যে, জার্মানীর ১৯১৪-১৮ ঈসায়ীর হামলা ছিল সম্রাট হ্যানিবল অথবা অন্য কোন আক্রমণকারীর সেই হামলা মাফিক যে মেঠো জেতা তো জিতেছে, কিন্তু মযবুত দুর্গ-প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলবার মত যথেষ্ট সমর-সম্ভার যার ছিল না। যেখানে অতীতে ভারতবাসী হাতির সাহায্যে দুর্গ ভাঙত সেখানে আরবীরা ভাঙত মিনজানীক নামক প্রস্তর নিক্ষেপকারী কামান দ্বারা। জার্মানী ১৯৪০ ঈসায়ীতে ট্যাংক নির্মাণ করে। এর আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক যদিও বৃটেন, কিন্তু সে এই মা’সূম বাচ্চাকে জার্মানীর হাতে বিক্রয় করে দেয় এবং জার্মানী একে দ্বিতীয় বিশ্ব-সমরে ব্যবহার করে। এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রতিরক্ষা কৌশলের মূলনীতি যথার্থই প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ—

    ১. লড়াই সাধারণত একটি বড় এলাকায় হয়ে থাকে যেখানে সৈন্যদল সুদৃঢ় কেল্লা এবং মোর্চা ইত্যাদির উপর হামলা করে। তখন যে ফৌজ প্রতিরক্ষামূলক গতিবিধির যোগ্যতাকে যথারীতি কায়েম রাখে তারাই প্রতিপক্ষের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। ১৯১৪-১৮ ঈসায়ীর লড়াই থেকে সাধারণত প্রতিরক্ষা পর্যালোচকগণ এজন্য ভুল শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন যে, শেষ বছরগুলোতে বিশ্বযুদ্ধ একটি কেল্লা ধ্বংসকারী লড়াইয়ের রূপ নিয়েছিল। আর যখন মিত্রশক্তির ফৌজ ট্যাংক, তোপখানা ও বিমান বহরের সাহায্যে জার্মানীর ফৌজী শক্তিকে দুর্বল করে দিয়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে তখনই তারা সম্মুখ পানে এগিয়ে যায়। এরপরও এই সব প্রতিরক্ষা পর্যালোচকগণ সঠিক সিদ্ধান্ত উদ্ভাবনে ব্যর্থ হন। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধের ময়দানে হুঁশিয়ার ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী সিপাহসালার স্বীয় শত্রু মোর্চার উপর হামলা করবার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল অংশের উপর কার্যকর আঘাত হেনে তাকে পেছপা করতে পারেন।

    ২. যে ফৌজের সিপাহসালার শত্রু ফৌজের মুকাবিলায় উত্তম গতিবিধির যোগ্যতা হাসিল করেন অর্থাৎ যিনি আপন গতিশীল ও সচল ফৌজকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে গিয়ে শত্রুর উপর প্রচণ্ড বেগে ও পূর্ণ শক্তিতে হামলা করতে পারেন—বিজয় ও সাফল্য তাঁরই পদচুম্বন করে।

    যে ফৌজ সচল ও সক্রিয়— ট্যাংক, মোটর, অশ্বারোহী বাহিনী, বিমান এবং অন্যান্য সমরাস্ত্র— যেমন তোপখানা, এটম বোম ইত্যাদি যার অন্তর্ভুক্ত এবং এই সব সমরাস্ত্রের সঠিক ব্যবহার যে জানে, সাফল্য সাধারণত তাদেরই সাথী হয়। কেননা এই সব সমরাস্ত্র আক্রমণের পথে প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে এবং কেল্লা দখল করার কাজে সাফল্যের সাথে ব্যবহার করা যেতে পারে। এভাবে শত্রুকে সচল ও সক্রিয় থেকে অচল ও নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে এবং তার সাহস ও মনোবল দুর্বল করা যেতে পারে।

    এখন আমি আপনাদের সামনে মুহাম্মদ বিন কাসিমের কয়েকটি যুদ্ধ তুলে ধরব যাতে করে আমরা ঐ সুযোগ্য ও সফল জেনারেলের সমর কৌশল বুঝিয়ে দিয়ে সমরশাস্ত্রের মূলনীতির গুরুত্ব সঠিকভাবে উদ্ভাসিত করতে পারি।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের বুনিয়াদী সমরনীতি

    মুহাম্মদ বিন কাসিমকে আপনারা গল্প-কাহিনীর মাধ্যমে অবশ্যই জানেন। কিন্তু এখন আমরা এই যোগ্যতম জেনারেলকে তাঁর আসল রূপে পেশ করছি যাতে তাঁর প্রদর্শিত সামরিক কলা- কৌশল ও কর্মপন্থা থেকে উপকৃত হওয়া যায়। আমরা এই গ্রন্থে আপনাকে পারিভাষিক জটিলতার মধ্যে জড়াব না, বরং আমরা আমাদের দাবীকে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী দ্বারা প্রমাণ করব এবং এভাবে সেই প্রতিরক্ষাগত শিক্ষা আপনার মস্তিষ্কে গেঁথে দেব যা ঐ সব ঘটনার মধ্যে নিহিত রয়েছে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবনী পাঠে আপনি অনুভব করবেন যে, সমরশাস্ত্রের এই অভিজ্ঞ জেনারেল প্রতিরক্ষা বিষয়ক নীতি বাস্তবায়নে কারো মুখাপেক্ষী হন নি, বরং অত্যন্ত নির্ভীক ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রে একক ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কৰ্মপদ্ধতি অবলম্বন করে শত্রুর প্রতিরক্ষা কূটচাল ব্যর্থ করে দিয়েছেন। তিনি স্বীয় বাহিনী নিয়ে সেই স্থানেই পৌঁছেছেন যে স্থান সম্পর্কে শত্রুর ধারণা ছিল যে, আরব বাহিনীর পক্ষে সেখানে পৌঁছা মোটেই সম্ভব নয়।

    সমরশাস্ত্রের এই মূলনীতিকে এই অটুট মনোবলসম্পন্ন, নির্ভীক ও যোগ্য সিপাহসালার শত্রুর নৈতিক দুর্বলতা কিংবা ভীরুতার কারণে নতুন রূপে ও নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজিয়েছেন।

    প্রতিরক্ষার অগ্রগতিমূলক ইতিহাস

    ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, সর্বাগ্রে ফিরআওন নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠন করেন। এ প্রায় খৃস্ট-পূর্ব বিশ শতাব্দীর আগের ঘটনা। ফিরআওন স্বীয় মিসরীয় ফৌজ (যা প্রধানত যঙ্গী ও হাবশী সেনা নিয়ে গঠিত ছিল)-এর সাহায্যে প্রথমে লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থানরত জাতি-গোষ্ঠীকে পদানত করেন। অতঃপর আসিরিয়, ব্যাবিলনীয়, ফিনিকীয়, গ্রীস প্রভৃতি দেশের সরকার- গুলোকে পরাস্ত করে আপন আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করেন।

    প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, যুদ্ধক্ষেত্রে ঐসব ফৌজী সিপাহীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সোজা পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হ’ত। প্রথম কাতারের পর দ্বিতীয় কাতার, অতঃপর তৃতীয় ও চতুর্থ কাতার। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্ভবত তাই ছিল যা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কার্যকর। অর্থাৎ সশস্ত্র লোকদের একটি দেওয়াল খাড়া করে দেওয়া হ’ত যা শত্রুর হামলার সময় একটি লৌহ প্রাচীরের কাজ দিত। এর ভেতর দিয়ে শত্রুর পদাতিক কিংবা অশ্বারোহী বাহিনী প্রবেশ করে একে ছিন্ন ভিন্ন করতে পারত না। যুদ্ধের সময় এই ফৌজ আক্রমণ ও পশ্চাদ্ধাবন করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হ’ত। তারা সড়ক ঢালাইকারী ইঞ্জিনের ন্যায় শত্রু সৈন্যকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সম্মুখে অগ্রসর হ’ত। শত্রু সৈন্যের প্রতিরোধকে যখন এভাবে পিষে ফেলা হ’ত তখন ময়দানও পরিষ্কার হয়ে যেত। সেই যুগের ফৌজ ছিল অধিকাংশই পদাতিক; অধিনায়ক কেবল আরোহী হতেন। অবশ্য সেই যোদ্ধাও আরোহী হতেন যিনি ঘোড়া, রথ, হাতী অথবা উষ্ট্রপৃষ্ঠে আরোহণ করে শত্রু ফৌজের শৃংখলা বিক্ষিপ্ত ও বিনষ্ট করার কাজে নিয়োজিত থাকতেন। তখন একটি পদাতিক বাহিনীতে সাধারণত চার হাযার সৈন্য থাকত।

    মেসিডোনিয়ার রাজা ফিলিপস্ (Philips) তাঁর ফৌজকে নতুন প্রশিক্ষণ দেন। তিনি পদাতিক ফৌজের ছোট ছোট রেজিমেন্টগুলোকে ছোট ছোট অধিনায়কদের নেতৃত্বে দিয়ে দেন। পদাতিক বাহিনীর একটি রেজিমেন্টে ছয় হাযার সৈন্য থাকত। ফিলিপ্‌স পুত্র আলেকজাণ্ডার পদাতিক বাহিনীর এই সংখ্যা বাড়িয়ে বার হাযারে উন্নীত করেন।

    যুদ্ধক্ষেত্রে লড়বার জন্য আলেকজাণ্ডার পদাতিক বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যে, প্রথম কাতারের সৈন্যরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘন নিবিড় হয়ে থাকত। প্রতিটি জওয়ানের নিকট ছ’ফুটের মত লম্বা ভালা থাকত যার মস্তক সংলগ্ন থাকত লৌহশলাকা নির্মিত অস্ত্ৰ।

    দ্বিতীয় কাতারের সিপাহীদের নিকট পয়লা কাতারের সিপাহীদের চাইতে অধিকতর লম্বা ভালা থাকত, যা পয়লা কাতারের লোকদের কাঁধের উপর দিয়ে সামনে বের হয়ে থাকত। এভাবেই তৃতীয় কাতারের ভালা পয়লা এবং দ্বিতীয় কাতারের সিপাহীদের ভালার চাইতে অধিকতর লম্বা হ’ত। শেষ কাতারের সিপাহীদের নিকট যে বল্লম থাকত তা প্রায় চব্বিশ ফুট লম্বা হ’ত। এভাবে আলেকজাণ্ডার তাঁর বাহিনীকে এমন একটি লৌহ প্রাচীররূপে খাড়া করতেন যা সচল হয়ে আগেও অগ্রসর হ’তে পারত। এটা ছিল বল্লমের এমন একটি জঙ্গল যার ভেতর দিয়ে মানুষ কিংবা অন্য কোন পশুর পক্ষে অতিক্রম করাটা ছিল প্রায় অসম্ভব।

    এতদ্ভিন্ন ফিলিপ্‌স আরোহী বাহিনী অর্থাৎ রিসালা তৈরী করেন যারা পৃথকভাবে নয় বরং সংঘবদ্ধভাবে শত্রুর উপর হামলা করতে পারত। এটাই ছিল সেই হাতিয়ার যার সাহায্যে আলেকজাণ্ডার ভারতবর্ষের রাজা পুরুকে পরাজিত করেন। তিনি লৌহবেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত এই হিন্দু রাজার হাতী, রথ, ঘোড়া ও বলদসমূহের ঘেরাওকে ভেঙে-চুরে তছনছ করে দিয়েছিলেন। যদি পুরু তাঁর ফৌজের পশ্চাদ্ভাগকেও সুরক্ষিত করতেন এবং তাঁর হাতী ও রথকে হামলার পর অথবা হামলাকালীন সময়ে নতুন নতুন দিক-অভিমুখে ঘুরাবার ব্যবস্থা রাখতেন তাহলে আলেকজাণ্ডার কি বিজয়ী হতে পারতেন? এটি এমন একটি প্রশ্ন যার জওয়াব বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার পর অকাট্য ‘না’ ছাড়া আর কিছুই হবে না।

    ফিলিপ্‌সই ‘মিনজানীক’ আবিষ্কার করেছিলেন।

    ইসলাম-পূর্ব আমলে রোমক ফৌজের সংগঠন ও বিন্যাস

    গ্রীকদের পর যখন রোমকরা ক্ষমতা লাভ করল তখন তারা পদাতিক বাহিনীর কাতার এভাবে বিন্যস্ত করেন :

    (ক) প্রথম কাতারে তারা যুবক ও তরুণদের এনে দাঁড় করান।

    (খ) দ্বিতীয় কাতারে এমন সব লোক এনে দাঁড় করান যাদেরকে আমরা অর্ধবয়সী বলতে পারি তা বয়সের বিচারে হোক অথবা— অভিজ্ঞতার দিক দিয়েই হোক।

    (গ) তৃতীয় কাতারে তারা সমর কুশলী ও রণনিপুণ বীরদেরকে এনে দাঁড় করান।

    এই বিন্যাসের দ্বারা সম্ভবত তাদের এই অভিপ্রায় ছিল যে, অভিজ্ঞ সিপাহী যুবকদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে। তাছাড়া অনভিজ্ঞ তরুণ সিপাহীরা ঘাবড়ে গিয়ে কিংবা রক্তপাত ও হানাহানির ভীতিকর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে পৃষ্ঠ প্রদর্শনের সুযোগ পাবে না।

    পদাতিক বাহিনীর সামনে আরোহী বাহিনী থাকত। তাদের নিকট হাতিয়ার হিসাবে থাকত তলোয়ার ও বল্লম। এই পদাতিক বাহিনী গোটা পল্টনের মুহাফিজ (রক্ষক) হ’ত।

    ইসলাম-পূর্ব আমলে ইরানী ফৌজের সংহতি বিশ্বাস

    ইরানী ফৌজের বিন্যাসও প্রায় এমনটিই হ’ত। ইসলামের সূচনা-পর্বের কিছুকাল পূর্বে ইরানী ও রোমকরা নিজ নিজ ফৌজকে বিভিন্ন রেজিমেন্টে ভাগ করেছিল। একটি রেজিমেন্টের সৈন্য সংখ্যা হ’ত দশ থেকে বার হাযার। রোমক রেজিমেন্টের অধিনায়ককে বলা হ’ত “বাৎরীক”। বাৎরীকের অধীনে দু’জন অধিনায়ক “তুমার খান” নামে আভহিত হতেন এবং প্রতি তুমার খানের অধীনে পাঁচ হাযার সিপাহী এবং পাঁচ জন “তুনজারিয়া” থাকতেন। প্রতি তুনজারিয়া এবং “কূস” দু’শ পদাতিক সৈন্যবিশিষ্ট হতেন। কুসের অধীনে চারজন “কুমতারাহ” এবং কুমতারাহর অধীনে কয়েকজন “দামরাখ” থাকতেন। প্রতি দামরাখের অধীনে থাকত দশজন সৈনিক।

    উপরিউক্ত ব্যবস্থাপনায় একটি বাহিনী একক থাকার পরিবর্তে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। কেননা প্রতিটি খণ্ড নিজ নিজ অধিনায়কের অধীনেই লড়াই করত।

    রোমকরা গ্রীকদের অনুকরণ করে আরোহী বাহিনীকে একটি আলাদা বাহিনী হিসাবেই রাখে। কিন্তু তারাও যুদ্ধক্ষেত্রে আরোহী বাহিনীকে পদাতিক বাহিনীর সামনে এনে দাঁড় করায় যাতে এরা পদাতিক বাহিনীর দেখাশুনা করতে পারে। ইরানীরা সূচনাকালে তাদের ফৌজকে এভাবে বিন্যস্ত করে যে, প্রতিটি রেজিমেন্টের সিপাহসালারকে—যিনি আমীর শ্রেণীর হতেন, “মীর-ই- মীরান” নামে ডাকা হ’ত।

    মীর-ই-মীরানের অধীনে চারজন অফিসার থাকতেন যাকে “আস্পাহাদ” বলা হ’ত। আস্পাহাদের অধীনে চারজন “মারযুবান” থাকতেন এবং প্রত্যেক মারযুবানের অধীনে থাকতেন চারজন অধিনায়ক আর প্রত্যেক অধিনায়কের অধীনে আরোহী বাহিনীর দশজন ও পদাতিক বাহিনীর পাঁচজন সৈনিক থাকতেন। তাদের হাতিয়ার ছিল তলোয়ার, নেযা, বল্লম, মিনজানীক এবং তীর। রোম এবং ইরানে নিয়ম ছিল যে, বৎসরে একবার নির্দিষ্ট সময়ে সকল ফৌজ বাদশাহ কিংবা সর্বাধিনায়কের সম্মুখ দিয়ে এভাবে অতিক্রম করতেন যে, সর্বাগ্রে সর্বাধিনায়ক সওয়ার হতেন। তাঁর পাশাপাশি একজন ক্রীতদাস থাকত। সর্দার তাঁর যেরা, খোদ, দস্তানা, চার আয়না এবং জওশন পরিহিত থাকতেন এবং অশ্বপৃষ্ঠে লৌহ চাদর ঘেরার ন্যায় পড়ে থাকত। একে “বরকিস্তাওয়ান” বলা হ’ত। সর্দারের পর তাঁর ফৌজ সকল প্রকার অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাস্তা অতিক্রম করত। আরোহী বাহিনীর সৈনিকের থাকত ঢাল, নেযা, গুর্য, রশি, তুবরা, লৌহ নির্মিত মিনজানীক, বাগডোর (ঘোড়া বাঁধবার জন্য), নাগের থলি, সূচ, কাঁচি, হাতুড়ী (ঘোড়ার পায়ে নাল মারার জন্য), কাড়, লুবনা সওয়া, তূণীর, কম্বল (মুড়ি দেবার জন্য), চড়ানো কামান এবং দুটো ফালতু কামান। প্রতিটি আরোহীর ক্রীতদাসের নিকট একটি ফালতু তূণীর থাকত। এই প্রদর্শনী থেকে জানা যেত, আরোহী, অধিনায়ক এবং তাদের ক্রীতদাসের নিকট সাজ-সরঞ্জাম সঠিক অবস্থায় আছে কি না।

    এই সব অবস্থা বর্ণনা করার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, যদিও ভারতীয় ও ইরানীদের বন্ধুত্ব অনেক কাল অটুট ছিল, কিন্তু ভারতীয় ফৌজের নিয়ম-শৃংখলার উপর ইরানী ফৌজের শাসন- শৃংখলার গভীর প্রভাব পড়েনি—যদিও সমরাস্ত্র নির্মাণে ভারতীয়রা অনেক অগ্রসর ছিল। ভারতীয় ফৌজ স্বীয় ভূখণ্ড থেকে বহির্গত হয়ে বহিঃরাষ্ট্রের উপর আক্রমণোদ্যত হয়নি বিধায় তারা অপরের সমরশাস্ত্র অনুধাবন করবার কষ্ট স্বীকারে যেমন রাযী হয়নি, তেমনি তাদের বন্ধুত্ব থেকে উপকৃত হতেও চেষ্টা করেনি—এমতাবস্থায় যে, কয়েকজন রাজার দরবারে ইরানী ও আরব বংশোদ্ভূত লোকেরা অধিনায়ক পদে চাকুরীও করত।

    ইসলাম-পূর্ব আমলে আরব ফৌজ

    ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব জাতি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। তাদের কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিল না। কখনো যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখা দিলে গোত্রের লোকেরা নিজ নিজ হাতিয়ার এবং যার যার সওয়ারীসহ যুদ্ধ করবার জন্য বেরিয়ে পড়ত। খোলা ময়দানই হ’ত তাদের যুদ্ধক্ষেত্র। আর যে গোত্রের নিকট ভাল ঘোড়া কিংবা উষ্ট্রারোহী ও যোদ্ধা অধিক সংখ্যায় থাকত সেই গোত্রই অন্যদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। অশ্বারোহী সৈন্যের নিকট তলোয়ার, বল্লম, তীর ধনুক ইত্যাদি অস্ত্র থাকত।

    অবশ্য আরবদের কতিপয় পরিবার যারা ইরান সীমান্তে বসতি স্থাপন করেছিল—তারা বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করে নিয়ে ছিল।

    তারা ছিল ‘তুব্বা’-র বাদশাহ হামীর গোত্রের রঈসকুল এবং “মুনযির” সুলতানগণ। মুনযির গোত্রের বাদশাহদের রাজধানী ছিল “হীরা”।

    মরুবাসী আরবদের সমর-পদ্ধতি ছিল একই ধরনের অর্থাৎ অতর্কিতে হামলা করা কিংবা রাত্রিকালে আকস্মিকভাবে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। এতে যদি তাৎক্ষণিক জয়লাভ ঘটে যায় তাহলে লুটপাট করে নিজ আবাস স্থলে ফিরে আসা। অন্যথায় দুই একটা সংঘর্ষের পরই উভয়পক্ষ পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যেত। যুদ্ধের প্রথম অথবা দ্বিতীয় দিন উভয় পক্ষের ফৌজ যখন সজ্জিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যেত তখন যুদ্ধক্ষেত্রকে উত্তপ্ত করে তোলার জন্য দু’পক্ষের এক একজন দুঃসাহসী আরোহী কিংবা পদাতিক সৈনিক নিজ নিজ প্রতিপক্ষকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে এগিয়ে আসার জন্য চীৎকার করে আহ্বান জানাত। এই যুদ্ধ চলাকালে উভয় ফৌজই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে এ দু’জনের রণনৈপুণ্য প্রত্যক্ষ করত। এদের একজন নিহত হবার পর তার বাহিনীর অন্য কেউ নিহতের বদলা নেবার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হ’ত। কোন সময় এমনও হ’ত যে, যখন এক পক্ষের ফৌজ দেখতে পেত যে, তাদের বীরযোদ্ধা পরাভূত হতে চলেছে তখন তাদের গোটা ফৌজ কিংবা তার কিছু অংশ প্রতিপক্ষের উপর হামলা করে বসত। কখনো এমন হ’ত যে, একজন নামকরা সর্দার দ্বন্দ্ব যুদ্ধে মারা যাবার পর পর তার ফৌজ হার মেনে পালিয়ে যেত। খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা) শত্রুর উপর ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করবার জন্য প্রায়ই শত্রুর নামকরা সর্দারকে স্বীয় যোগ্য ও বীর অশ্বারোহী সৈনিকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লাগিয়ে পরপারে পাঠিয়ে দিতেন। কয়েকবার তিনি নিজেও দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অবতরণ করেছেন।

    ফৌজী বিন্যাস ও সংগঠনে আঁ-হযরত (সা)-এর নতুন উদ্ভাবন

    আঁ-হযরত (সা) মুজাহিদদেরকে নতুনভাবে প্রশিক্ষণ দান করেন। তিনি তাদেরকে শুধু সমরাস্ত্র ব্যবহার করার ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ করে তেলেন নি, বরং রাত দিন চলে সাধারণ সড়ক পথ কিংবা দূরতিক্রম্য রাস্তা দ্রুততার সঙ্গে পার হবার যোগ্যও বানিয়ে দেন। তিনি ফৌজী রেজিমেন্টকে নিজ অধিনায়কের নেতৃত্বাধীনে বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে লড়ার কৌশল শিক্ষা দেন। তিনি ফৌজের চলাচল ও গতি-বিধিকে (শান্তিকালীন কিংবা যুদ্ধকালীন যে কোন সময়েই হোক) এমনি সুশৃঙ্খল বানিয়ে দেন যে, মুসলিম ফৌজ তাদের সিপাহসালারের মৌখিক নির্দেশ কিংবা ইশারা-ইঙ্গিতে বিভিন্ন ধরনের ফৌজী কুটচাল মাফিক সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধভাবে চলাচল করতে পারত।

    তিনি মুজাহিদদেরকে ছোট-বড় কোম্পানী ও প্লাটুনে ভাগ করেন। অতঃপর এইসব ছোট ছোট প্লাটুনকে মিলিত করে এমনভাবে একাত্ম করেন যে, যুদ্ধ অথবা শান্তিকালীন সময়ে তারা নিয়ম-শৃঙ্খলার সাথেই জীবন যাপন করত। যখন মুজাহিদবৃন্দ জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ্‌র জন্য জমায়েত হ’ত তখন রসূল (সা) (অতঃপর খুলাফায়ে রাশেদীনও) এই জমায়েত পরিদর্শন করতেন। দুর্বল ও অল্পবয়স্ক মুজাহিদকে ফিরিয়ে দেওয়া হ’ত। বাকী যারা থাকত তাদেরকে নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হ’ত। যুদ্ধের অনুশীলন ধারাবাহিকভাবে করানো হ’ত। কেবল সেই দিনই নয় বরং ছাউনী থেকে যাত্রা শুরু করার পরও শত্রুর মুকাবিলায় ও সংঘর্ষকালীন সময় এই প্রশিক্ষণ ধারা অব্যাহত থাকত। যখনই মওকা মিলত—যুদ্ধক্ষেত্রেও সমস্ত মুজাহিদকে বরাবরের ন্যায় সামরিক নির্দেশাদি প্রদান করা হ’ত।

    মুজাহিদ ভর্তি এবং গণীমতের মাল বণ্টন পদ্ধতি

    মুসলমানদের সর্বপ্রথম সিপাহী (মুজাহিদ) ছিলেন মুহাজিরগণ। কিন্তু মদীনায় আগমনের পর অনেক আনসার এতে শামিল হন। পরবর্তীকালে মক্কা বিজয় পর্যন্ত অধিক সংখ্যক মুজাহিদই ছিলেন মদীনার অধিবাসী। অতঃপর বিভিন্ন গোত্রের সাহাবী (রা) এবং নও-মুসলিম জিহাদের উদ্দেশ্যে ইসলামী পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। আঁ-হযরত (সা) স্বয়ং এই ফৌজের নেতৃত্ব দিতেন। তাঁর অধীনে বিভিন্ন সেনানায়ক থাকতেন। আঁ-হযরত (সা) এবং হযরত আবূ বকর (রা)-এর যুগে যখন যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং শত্রু বাহিনীর সংখ্যা বাড়ল তখন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীর সংখ্যাও বাড়ানো হ’ল। এই সব মুজাহিদকে রসূল (সা) আপন আপন গোত্র ও পরিবার অনুযায়ী ভাগ করে দেন। তখনো কোন নিয়মিত বাহিনী ছিল না। যখন প্রয়োজন দেখা দিত তখন রসূলুল্লাহ (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদীন মসজিদে খুতবা প্রদানের মাধ্যমে জিহাদের জন্য স্বেচ্ছাসেবক আহ্বান করতেন। এদের কোন বেতন কিংবা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হ’ত না, শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও বেহেশত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হ’ত। অবশ্য জয়লাভের পর গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) বিশেষ মূলনীতির ভিত্তিতে তাদের মধ্যে বন্টন করা হ’ত। এ ছিল জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধন কিংবা লাভালাভের প্রশ্ন এর সাথে কখনো জড়িত ছিল না। বংশ ও গোত্র অনুসারে বাহিনীকে ভাগ করে দেওয়া হ’ত। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, বনী উমাইয়া আমলে বসরার সেনাদলের পাঁচটি ভাগ ছিল যাকে ‘খুম্মাস’ বলা হ’ত। প্রতিটি ভাগের (  অংশ) মধ্যে একটি গোত্র নিম্নলিখিত গোত্রগুলোর মধ্য থেকে হ’ত :

    ইয্‌দ, তামীম, বকর, ‘আবদুল কায়স, আহ্‌ল-ই-আলিয়া (অর্থাৎ কিনানা, কুরায়শ, ইয্‌দ, সুজায়লা, খাছআম, কায়স, আয়লানের সকল পরিবার, মুযায়না)। কুফার অধিবাসীদেরকে আহ্‌ল-ই-মদীনা বলা হ’ত। অবশ্য সকল অবস্থায় আরোহী এবং পদাতিক বাহিনী আলাদা আলাদা হ’ত। এসব আরোহী ও পদাতিক বাহিনীকে পরস্পরের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হ’ত না।

    প্রতিটি এক-পঞ্চমাংশের উপর এই সব গোত্রের আমীর-উমারা থেকে একজনকে আমীর বা সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হ’ত। এই পন্থা গোটা বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। বাহিনীর অধিনায়ক পদে সাধারণত সাহাবা কিংবা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কাউকে মনোনীত করা হ’ত।

    হযরত উমর (রা)-এর ফৌজী সংগঠনও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি

    হযরত উমর (রা)-এর খিলাফত আমলে সবুজ শ্যামল এলাকা অবধি ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হলে আমীরুল-মু’মিনীন ঘোষণা দেন যে, বিজিত এলাকায় মুজাহিদরা কৃষিকর্মে লিপ্ত হবে না, জায়গা-জমিও খরিদ করবে না এবং স্থায়ীভাবে বসবাসও করবে না। কেননা এতে তারা আরামপ্রিয় ও সুবিধাভোগী হয়ে উঠবে। অবশ্য জীবিকার প্রয়োজন সম্মুখে রেখে তিনি এই ঘোষণাও দেন যে, প্রতিটি আমীর ও সিপাহী এবং তাদের সন্তানদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেওয়া হ’ল। এটাও একটা বিখ্যাত ঘটনা যে, হযরত উমর (রা) ইরাক থেকে প্রত্যাবর্তনকালে এই মর্মে নির্দেশ জারী করেছিলেন যে, মুসলিম ফৌজকে সেখান থেকে এমন এক জায়গায় স্থানান্তরিত করা হোক যেখানকার মৌসুম ও পরিবেশ হেজাযের অনুরূপ। স্থানটি ছিল কুফা। পরবর্তীকালে কুফা ফৌজী ক্যাম্প থেকে সৈন্য ছাউনি এবং সৈন্য ছাউনি থেকে বিরাট বড় শহর, অতঃপর দারুল-খুলাফা বা রাজধানীতে পরিণত হয়।

  • কেরী সাহেবের মুন্সী

    কেরী সাহেবের মুন্সী

    কেরী সাহেবের মুন্সী

    ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ একটি জীবনীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস, এটি রচনা করেছেন প্রমথনাথ বিশী। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে, আশ্বিন, ১৩৬৫ বঙ্গাব্দে। বইটির মূল উপজীব্য উইলিয়াম কেরী ও রামরাম বসুর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগের কলকাতা শহরের ইতিহাস ও ইংরেজ-বাঙালি সম্পর্কের জটিল সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এই উপন্যাসটির জন্য তিনি ১৯৬০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিলেন।

    বর্তমান সংস্করণে ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’র শ্রাবণ ১৪১৪ বঙ্গাব্দ প্রকাশিত চতুর্বিংশ মুদ্রণের অনুসরণ করা হয়েছে; এই সংস্করণটি মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট,  কলকাতা ৭০০ ০৭৩ হইতে এস. এন. রায় কর্তৃক প্রকাশিত ও অটোটাইপ, ১৫২ মানিকতলা মেন রোড, কলকাতা-৭০০ ০৫৪ হতে তপন সেন কর্তৃক মুদ্রিত। প্রচ্ছদপট এঁকেছিলেন আশু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং চয়নিকা প্রেস থেকে মুদ্রিত।

    উৎসর্গ

    শ্রীদেবেশচন্দ্র রায়

    প্রীতিভাজনেষু

    লেখকের বক্তব্য

    বছর পনেরো আগে রামরাম বসুর জীবন নিয়ে কিছু একটা লিখবার ইচ্ছা হয়, তখন ধারণা ছিল না যে তা ঠিক কি আকার ধারণ করবে। তার পরে বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করে বিস্মিত হয়ে গেলাম। রামরাম বসু প্রসঙ্গে উইলিয়াম কেরীকে পেলাম। বুঝলাম যে যে-সব মহাপ্রাণ ইংরেজ এদেশে এসেছেন, উইলিয়াম কেরী তাঁদের অগ্রগণ্য। কেরীর ধর্মজীবন, ধর্মপ্রচারে আগ্রহ, বাংলা গদ্য সৃষ্টিতে নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় অভিভূত করে দিল আমাকে। তখন ধীরে ধীরে কেরী ও রামরাম বসুকে অবলম্বন করে কাহিনীটি রূপ গ্রহণ করে উঠল।

    এই কাহিনীকে পাঠক ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে গ্রহণ করবেন কিনা জানি না, করলে আমার আপত্তির কারণ নেই। ১৭৯৩ থেকে ১৮১৩ সালের ইতিহাস এর কাঠামো। জ্ঞানত কোথাও ইতিহাসের সত্য থেকে বিচ্যুত হইনি। কেবল একটি বিষয়ে কিছু স্বাধীনতা নিয়েছি, দ্বারকানাথ ঠাকুরের বয়স কিছু বাড়িয়ে দিয়েছি! আর কিছুই নয়, রবীন্দ্রনাথের পিতামহকে কাহিনীর মধ্যে আনবার লোভ সম্বরণ করতে পারি নি।

    ইতিহাসের সত্য ও ইতিহাসের সম্ভাবনা ঐতিহাসিক উপন্যাসকারের উপাদান। ইতিহাসের সত্য অবিচল, তাকে বিকৃত করা চলে না। ইতিহাসের সম্ভাবনায় কিছু স্বাধীনতা আছে লেখকের। সত্যের অপব্যবহার করি নি, সম্ভাবনার যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছি।

    দুই শ্রেণীর নরনারীর চরিত্র আছে উপন্যাসখানায়, ঐতিহাসিক আর ইতিহাসের সম্ভাবনা-সঞ্জাত। কেরী, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, টমাস, রামমোহন, রাধাকান্ত দেব প্রভৃতি ঐতিহাসিক চরিত্র। রেশমী, টুশকি, ফুলকি, জন স্মিথ, লিজা, মোতি রায় প্রভৃতি ইতিহাসের সম্ভাবনা-সঞ্জাত অর্থাৎ এসব নরনারী তৎকালে এইরকমটি হত বলে বিশ্বাস। এখানে যেমন কিছু স্বাধীনতা আছে, তেমনি ভুলের সম্ভাবনাও বর্তমান। ভুল না করে স্বাধীনতার সুযোগ গ্রহণে লেখকের ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে ক্ষমতা কতটা প্রকাশ পেয়েছে জানি না।

    পাত্রপাত্রীর উক্তিকে লেখকের মন্তব্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সে-সব উক্তি পাত্রপাত্রীর চরিত্রের সীমানার মধ্যেই সত্য, তাদের সত্যের সাধারণ রূপ বলে গ্রহণ করলে লেখকের প্রতি অবিচার করা হয়। বলা বাহুল্য, কোন ধর্ম কোন সম্প্রদায় বা কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্য এ গ্রন্থের নয়। তার চেয়ে উচ্চতর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে লেখক। একটা সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বের কয়েকটি বিশেষ নরনারীর সুখদুঃখের লীলাকে অবলম্বন করে নির্বিশেষ মানবসমাজের সুখদুঃখের লীলাকে অঙ্কন লেখকের উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে এমন দাবি করি না—কিন্তু উদ্দেশ্য ও ছাড়া আর কিছু নয়।

    আরও একটা কথা বুঝলাম বিষয়ে প্রবেশ করে আর কাহিনীটা লিখতে গিয়ে— কলকাতা শহরের প্রাচীন অংশের প্রত্যেক পথঘাট, অট্টালিকা, উদ্যান, প্রত্যেক ইষ্টকখণ্ড বিচিত্র কাহিনীরসে অভিষিক্ত। এ শহরের একটি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আছে যা ভারতের প্রাচীন শহরগুলোর ব্যক্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র। ভারতের প্রাচীন ও নবীন যুগের সীমান্তে অবস্থিত এই শহর। এর অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও না ভালবেসে পারা যায় না একে, কারণ এ আমার সমকালীন। সমকালীনতার দাবি এ শহরের সকলের প্রতি। ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’রও ঐ দাবি—তদধিক কোন ঐশ্বর্য এর আছে মনে হয় না। অলমিতি—

    প্র.

    ৭ই মে, ১৯৫৮

    সেকালের পথঘাটের বর্তমান নামধাম

     

    সেকাল একাল
    বেরিয়াল গ্রাউণ্ড রোড পার্ক স্ট্রীট।
    এসপ্লানেড বর্তমান ইডেন গার্ডেন।
    নঈ তলাও পার্ক স্ট্রীট ও চৌরঙ্গীর মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের পুকুর।
    ঝাঁঝরি তলাও রোড কিড স্ট্রীট।
    বিজিতলাও লোয়ার সারকুলার রোড ও চৌরঙ্গীর মোড়ের উত্তর-পশ্চিম কোণের পুকুর।
    জানবাজার রোড সুরেন ব্যানার্জি রোড।
    কসাইটোলা স্ট্রীট বেন্টিঙ্ক স্ট্রীট।
    রোপওয়াক মিশন রো।
    দি অ্যাভিনিউ বহুবাজার স্ট্রীট।
    এসপ্লানেড রোড গঙ্গার ধার চাঁদপাল ঘাট থেকে শুরু হয়ে সোজা পূর্বদিকে চৌরঙ্গী রোড পর্যন্ত; বর্তমান রাজভবনের দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমমুখী দুটি প্রধান ফটক পার হয়ে এসপ্লানেড ঈস্ট ও চৌরঙ্গীর সংযোগস্থল পর্যন্ত।
    ট্যাঙ্ক স্কোয়ার লালদিঘি।
    ওল্ড মিশন চার্চ লালবাজার স্ট্রীট ও মিশন নোর মোড়ের দক্ষিণে অবস্থিত।
    সেন্ট জনস্ চার্চ কাউন্সিল হাউস স্ট্রীট ও হেস্টিংস স্টীটের মোড়ের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত।
    ওল্ড ফোর্ট বর্তমান পূর্ব রেলওয়ের প্রধান কার্যালয়,  কলকাতার কালেকটরেট ও জি পি ও-র উত্তর দিকের কিছু অংশ জুড়ে পুরাতন কেল্লা অবস্থিত ছিল।

     

     

     

  • আবারও সংঘাত

    আবারও সংঘাত

    ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত রোদের তীব্রতা ছড়িয়ে সূর্য উঠল ক্রাক দুর্গের চারপাশে। মরুভূমির বালুতে ছড়িয়ে পড়ল প্রচণ্ড উত্তাপ। সংকল্পে অটল উভয় বাহিনী। খৃষ্টানরা শপথ নিয়েছে মেরীর নামে, এবার আইয়ুবিকে তারা কিছুতেই রেহাই দেবে না, জীবন নিয়ে ফিরতে দেবে না আইয়ুবীর একজন সৈনিককেও। সংকল্পে অটল সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীও। তাঁর শপথ, যে কোন মূল্যে ক্রাক দুর্গ সে দখল করবেই। ক্রাকের মুসলমানদের ওপর যে জুলুম করা হচ্ছে তার অবসান ঘটাতে না পারলে তাঁর আত্না কিছুতেই শান্তি পাবে না।

    সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খৃস্টানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ ক্রাকের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানলেন। তীব্রগতিতে ঝাপিয়ে পড়লেন দুর্গ রক্ষীদের ওপর। তাঁর ক্ষীপ্রতা ও দুঃসাহস দেখে স্তম্ভিত গয়ে গেল খৃস্টান সৈন্যরা। সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদের তীর প্রাচীর রক্ষীদের গায়ে আঘাত হানার আগ পর্যন্ত খৃস্টানরা বুঝতেই পারল না, তারা আক্রান্ত হয়েছে।

    গোয়েন্দা বিভাগ সুলতান আইয়ুবীকে আশ্বাস দিয়েছিল, তিনি দুর্গে আঘাত হানলে ক্রাক শহরের মুসলমানরা ভেতর থেকে সহায়তা দেবে তাদের। সুলতান আইয়ুবীর যে সব কমান্ডো আগেই শহরে প্রবেশ করেছিল। তারাও ভেতর থেকে দুর্গের দেয়াল ভেঙে সুলতানের অভিযানকে সফল করতে সহায়তা দেবে।

    ক্রমাগত চারদিন বিরতিহীন লড়াই চললো উভয় পক্ষে। জয়-পরাজয় এখনো অনিশ্চিত। সুলতান যত তীব্র থেকে তীব্রতর করছে আঘাত, প্রতিরোধও ততই তীব্র হচ্ছে।

    অবরোধের পঞ্চম দিন। গোয়েন্দা এসে সুলতান আইয়ুবীকে সংবাদ দিল, ‘কয়েকজন মুসলমান ভেতর থেকে শহরের দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আফসোস! সফল হওয়ার আগেই তারা সবাই শহীদ হয়ে গেছে। এদের মধ্যে কয়েকজন মেয়েও ছিল। সবচে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এদের মধ্যে একজন খৃস্টান মেয়েও ছিল। গোয়েন্দা আরও জানালো, তাদের এ বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। এ দলের মধ্যে একজন মুসলমান খৃস্টানদের গুপ্তচর ছিল। সে এ অভিযানের সংবাদ খৃস্টানদের জানিয়ে দেয়ার ফলেই শত্রুরা গোপনে ওঁৎ পাতার সুযোগ পায় এবং দলটি দেয়ালের কাছে পৌঁছলে অতর্কিতে তাদের ঘেরাও করে ফেলে। মুজাহিদরা প্রাণপণ মোকাবেলা করে একে একে সকলেই শহীদ হয়ে যায়, কিন্তু কেউ ময়দান ছাড়েনি। তাদের অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর খৃস্টানরা আরো সতর্ক হয়ে যায় এবং শহরের প্রতিটি গলিতে গোয়েন্দা লাগিয়ে দেয় যাতে মুসলমানদের যে কোন তৎপরতা সম্পর্কে তারা জানতে পারে। ফলে এখন ভেতর থেকে দেয়াল ভাঙার আশা করা বৃথা।’

    এ খবরে মুসলমানদের আশা নৈরাশ্যে রূপান্তরিত হওয়ার উপক্রম হল। ঘটনা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। খৃস্টানরা যখন মুসলমান যুবক ও যুবতীদের লাশগুলো সনাক্ত করতে পারল তখন টাটা বুঝতে পারলো, মুসলমান যুবক ও যুবতীরা জীবন বাজি রেখে আইয়ুবীকে মদদ দিতে এক পায়ে খাড়া। তারা তখন মুসলমানদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশী চালালো। মুসলিম যুবক-যুবতীদের এলোপাথারি ধরাপাকড় শুরু করলো। ধরাপাকড়ের সময় তারা মেয়েদেরকেও রেহাই দিল না। কেবলমাত্র বুড়োদেরকেই তারা নিজেদের ঘরে থাকার সুযোগ দিল। যুবকদেরকে ধরে এনে পাঠাল বেগার ক্যাম্পে আর যুবতীদেরকে দুর্গের সেনা ব্যারাকে নিয়ে বন্দী করে রাখলো। এই মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মহত্যা করে সম্ভ্রম বাঁচালো, বাকীরা শিকার হলো সৈনিকদের অত্যাচার ও দুর্ব্যবহারে।

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গোয়েন্দার রিপোর্ট মনোযোগ দিয়ে শোনলেন। দুঃখ ও বেদনায় হাহাকার করে উঠলো তার হৃদয়। মুসলমানদের এমন কঠিন মূল্য ও কুরবানীর জন্য তাঁর নিজেকেই দায়ী বনে মনে হলো। মনে হলো, সে যদি এ অভিযান শুরু না করতো তবে শহরের মুসলমানদের এখুনি এ দুঃসহ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।

    নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদদের আত্মত্যাগের এ কাহিনী শুনে তিনি মনে মনে বললেন, এই দুঃখজনক ঘটনা পেরেছে কেবল একজন মুসলমানদের গাদ্দারীর কারণে। একজন গাদ্দার মুসলিম মুজাহিদদের এত বড় একটি দলকে অবলীলায় ধংস করে দিল। তিনি আফসোস করে বললেন, মুসলমানদের মধ্যে সবসময় এমন কিছু লোক থাকে যারা আল্লাহর পথে জীবন কুরবানী করে জীবনকে সফল করতে চায়। আবার কিছু মুসলমান এমনও থাকে যারা আল্লাহর ওপর তাদের যে ঈমান আছে সেই ঈমানকে কাফেরের পদতলে বিসর্জন দিয়ে জীবনকে বুরবাদ করে দেয়। স্বার্থের ফাঁদে আটকে পড়ে তারা ইসলামকে ক্ষতি করতে চায়। এই গাদ্দাররাই ইসলামের ইতিহাসের সবচে বড় দুশমন।

    গাদ্দারদের কথা মনে হতেই সুলতান আইয়ুবীর চেহারায় ফুটে উঠল সীমাহীন ক্রোধের আগুন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে অন্য হাতে আঘাত করে বললেন, ‘যে কোন মূল্যে অনতিবিলম্বে ক্রাক দখল করতে হবে। আমি সেইসব গাদ্দারদের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে চাই। যাদের গাদ্দারীর কারণে জাতি বার বার জিল্লতির গর্তে পড়ে যায়।’

    সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা সংস্থার অফিসার জাহেদার তাবুতে প্রবেশ করলো। সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আজ রাতেই আমি চূড়ান্ত আঘাত হান্তে চাই। ক্রাকের পিছন দিকের কোন্ অংশ সবচে দুর্বল আমার জানা দরকার। এ ব্যাপারে তোমার পরামর্শ কি?’

    ‘যে কোন পদক্ষেপের একটা অর্থ থাকা দরকার।’ জাহেদা বললো, ‘চূড়ান্ত আঘাত হানার সময় এখনো আসেনি বলেই আমি মনে করি। সম্ভবত আরো কিছু দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

    ‘কেন, কেন এমনটি মনে হচ্ছে তোমার! তুমি কি কোন নতুন খবর পেয়েছ?’ সুলতান আইয়ুবীর প্রশ্ন।

    ‘আপনি যে সফলতার আশা নিয়ে শত্রুদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন তাতে আপনি পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। শত্রুরা এখনো যথেষ্ট মজবুত। চূড়ান্ত হামলার আগে তাদের মানসিকভাবে আঘাত করা দরকার।’

    জাহেদান কথা বলেছিল নির্ভীকভাবে। সুলতান আইয়ুবী তাঁর সমস্ত অধস্তনদের বলে রেখেছিলেন, তারা যেন তাকে বাদশাহ মনে করে কুর্নিশ না জানায়। কখনও কোন পরামর্শ দিতে চাইলে বীরত্বের সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়েই দেয়। আর সমালোচনার কিছু থাকলে তাও যেন তারা খোলাখুলি বলে ফেলে। জাহেদান সেই নির্দেশ অনুসারেই সাহসিকতার সাথে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করল।

    জাহেদান গোয়েন্দা বিভাগের উর্ধতন অফিসার। তাদের চোখ-কান সজাগ সতর্ক থাকে। গোয়েন্দাদের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, তারা অন্ধকারেও দেখতে পায় এবং দূরবর্তী শত্রুর কানাঘুষা শুনতে পায়।

    সুলতান আইয়ুবী গোয়েন্দাদের মতামতের যথেষ্ট মূল্য দিতেন। তিনি জানতেন, গোয়েন্দাদের রিপোর্ট ছাড়া কোন যুদ্ধেই বিজয় অর্জন করা যায় না। আর যে সময় খৃস্টানরা মুসলিম রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরে গোয়েন্দাদের জালের মত ছড়িয়ে রেখেছে সে সময় গোয়েন্দাদের প্রয়োজন তা আরো অনেক বেশি। সুলতান আইয়ুবীর এখন প্রয়োজন অসাধারণ প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও পরীক্ষিত গোয়েন্দা। এ বিষয়টি তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন দক্ষ ও বিশ্বস্ত এক বিশাল গোয়েন্দা বাহিনী। এ ব্যাপারে তিনি পূর্ণ সফলতা লাভ করেছিলেন।

    এ বাহিনীর হাসান বিন আব্দুল্লাহ ও জাহেদানের মতামতকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তাদের তৎপরতা ও সুচিন্তিত পরামর্শের ফলেই তিনি খৃস্টানদের অনেকগুলো আঘাত ব্যর্থ করে দিতে পেরেছেন।

    গোয়েন্দাদের তৎপরতার ফলেই তিনি জানতে পেরেছিলেন, খৃস্টানরা ক্রাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার সাথে সাথে দুর্গের বাইরে মরুভূমিতে অনেক সৈন্য লুকিয়ে রেখেছে। মুসলমানরা চূড়ান্ত আঘাত হানার সাথে সাথে ওরা পেছন থেকে এসে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

    জাহেদান বললো, ‘মরুভূমি ও পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা খৃস্টান সৈন্যদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে খৃস্টানরা এবার কেল্লার বাইরে যুদ্ধ করতে চায়। তাদের কোন ব্যবস্থা না করেই কেল্লা অবরোধ করায় শত্রুরা যথেষ্ট লাভবান হয়ে গেল।’

    ‘তারা কি এরই মধ্যে আমাদের কোন বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে বসেছে?’ সুলতান সালাহউদ্দিন অস্থির হয়ে প্রশ্ন করেন।

    ‘না এখনো করেনি। তবে তাদের তৎপরতা দেখে বুঝতে পারছি, তারা আমাদের দুর্বল অংশে আঘাত করার জন্য আজ সন্ধ্যা নাগাদ রওনা হয়ে যাবে।’ জাহেদান উত্তর দিল, ‘খবর পেয়েছি, খৃস্টান অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহীরা থাকবে এ অভিযানে। পদাতিক বাহিনীকে তারা খুব কম ব্যবহার করবে। তারা আমাদের ডান ও বাম দিক থেকে আক্রমণ চালাবে। খৃস্টানদের এক বিশাল বাহিনী এ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। অসম্ভব নয়, এতে আমাদের অবরোধ ভেঙে যাবে।’

    ‘আমি তোমাকে ও তোমার গোয়েন্দা বিভাগকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি, যারা এ সংবাদ নিয়ে এসেছে।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আমি জানি আমি যে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি তা বড় কঠিন ও ভয়াবহ। তবু আমি তোমাদের সকলকে আশ্বাস দিচ্ছি, খৃস্টান সৈন্যরা আমাদের যে শূন্য স্থান পূরণ করতে ও অবরোধ ভাঙতে আসছে, আমি তাদেরকে সেই শূন্য স্থানেই নির্মূল করে দেব। আল্লাহ আমাদের নেগাহবান। যদি তোমাদের মাঝে কোন গাদ্দার না থাকে তবে আল্লাহ তোমাদেরকে অবশ্যই বিজয় দান করবেন।’

    একজন সালার বললেন, ‘যদি আপনি আদেশ দেন তবে আমাদের সংরক্ষিত সৈন্যদের একটি বাহিনী খৃস্টানদের পৌঁছার পূর্বেই সেখানে পাঠিয়ে দেই। তাহলে অবরোধের শূন্য স্থান পূরণ হয়ে যাবে এবং খৃস্টানদের আক্রমণ ও পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’

    সুলতান আইয়ুবীর মুখে কোন অস্থিরতা ও দুর্ভাবনার সামান্যতম ভাবও প্রকাশ পাচ্ছিল না। তিনি জাহেদানকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার রিপোর্ট সম্পূর্ণ সত্যি হলে তুমি কি আমাকে আরো কিছু তথ্য দিতে পারবে? তুমি কি বলতে পারবে খৃস্টান সৈন্যরা কোন সময় আক্রমণস্থলে পৌঁছবে?’

    ‘এরই মধ্যে তারা তাদের গোপন আস্তানা গুটিয়ে রওনা হয়ে গেছে। তাদের অগ্রাভিযান খুবই দ্রুত।’ জাহেদান উত্তরে আরো বলল, ‘তাদের সাথে কোন তাবু বা খাদ্যশস্য আসছে না, তা পরে আসবে। মনে হয় তারা রাস্তায় কোথাও বিশ্রাম নিবে না। যদি তারা এ গতিতে আস্তে থাকে তবে তারা মধ্য রাতের সামান্য আগে বা প্রে এসে পৌঁছে যাবে।’

    ‘আল্লাহ করুক তারা যেন রাস্তায় কোথাও না থামে।’ সুলতান আইয়ুবি বললেন, তারা তো ক্লান্ত, অভুক্ত ও পিপাসার্ত ঘোড়া ও উট নিয়ে যুদ্ধ করবে না। সমারাঙ্গনে এসে পশুগুলোকে বিশ্রাম ও খাবার দেবে। সেই সুযোগে তারা দেখতে পাবে, আমরা যে অবরোধ করে রেখেছি তার মাঝে কোথাও কোন ফাঁক আছে কি না।’

    সুলতান আইয়ুবী সালারদের বললেন, খৃস্টানরা আমাদের ফাঁদে পড়তে আসছে।’

    তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘কেল্লার পেছন দিকে আমরা অবরোধের যে ফাঁক রেখেছি সে স্থান আরও ফাঁক করে দাও। দু’পাশে দান ও বামের বাহিনীকে জানিয়ে দাও, তাদের ওপর পিছন থেকে আক্রমণ আসছে। তারা যেন তাদের বাহিনীকে আরও দৃঢ় ও সতর্ক করে নেয় এবং শত্রুদেরকে যেন মাঝখানে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়। আর কোন তীরন্দাজ যেন আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তীর না চালায়।’

    এরপর সুলতান রিজার্ভ পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের কয়েকটি দলে ভাগ করলেন। তাদের নির্দেশ দিলেন, ‘সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাহতে তোমরা অবরোধের দুর্বল স্থানের যতটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছে যাবে, কিন্তু নিজেদের অবস্থান যেন দুশমন টের না পায়। তোমরা লক্ষ্য করেছো। যেখানে আমরা অবরোধ দুর্বল রেখেছি সে এলাকাটা সমান ময়দানও নয়, মরুভূমিতে মত বালুকা প্রান্তরও নয়। সে অঞ্চল টিলা, উপত্যকা ও গিরিখাদে পরিপূর্ণ। সহজেই তোমরা সেখানে আত্মগোপন করতে পারবে।’

    সুলতান আইয়ুবী টহল গ্রুপের কমান্ডারকে ডাকলেন। বললেন, ‘খৃস্টান বাহিনীর পিছনে যে খাদ্যদ্রব্য ও রসদপত্র আসছে তা রাতেই রাস্তায় লুট করতে হবে।’ তিনি তাকে আরও কিছু জরুরী আদেশ দিয়ে তাবু থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। সঙ্গে নিলেন কয়েকজন সালারকে। চললেন রণক্ষেত্রের দিকে।

    সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আত্মতুষ্টিতে বিভোর হওয়ার মত লোক ছিলেন না। তিনি সমস্ত পরিকল্পনা আবার খতিয়ে দেখলেন এবং অবরোধকে কেল্লার কাছ থেকে আরেকটু দূরে সরিয়ে নিতে বললেন। তিনি যুদ্ধরত অফিসারদের বললেন, ‘খৃস্টানদের অধিকার থেকে দুর্গ মুক্ত করা সহজ নয়। প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ টিকিয়ে রাখতে হবে।’

    তিনি বললেন, দুর্গের প্রাচীরের ওপর থেকে বৃষ্টির মত তীর বর্ষণ করছে খৃস্টানরা। এ তীর বৃষ্টি ভেদ করে কেল্লার দরোজা পর্যন্ত পৌছা অসম্ভব। তিনি মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসতে বললেন। কারণ, এ তীরের মোকাবেলায় পালটা আক্রমণ করার কোন যুক্তি ছিল না।

    সুলতান আইয়ুবী কেল্লার প্রধান ফটকের লড়াইয়ের অবস্থা দেখতে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। প্রচণ্ড উৎসাহ, উদ্দীপনা আত্নবিশ্বাস নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল ফটকের মুজাহিদরা। একদল মুজাহিদ তখন বিপুল বিক্রমে দ্রুত কেল্লার প্রাচীরের ওপরে তীর বর্ষণ করে যাচ্ছিল। ছয়টি মেনজানিক আগুন ছুঁড়ে মারছিল প্রাচীরের ওপর। দেয়ালের ওপরে যেখানে তীর ও অগ্নি বর্ষণ হচ্ছিল সেখানে কোন খৃস্টান সৈন্য দেখা যাচ্ছিল না। দেয়াল ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। সুলতান আইয়ুবী দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এসব।

    তাঁর প্রায় চল্লিশজন সৈন্য হাতে বর্শা ও কোদালি নিয়ে দেয়ালের দিকে দ্রুত ছুটে গেল এবং দেয়ালের পাশে গিয়ে পৌঁছালো। কেল্লার প্রাচীর মাটি ও পাথরের গাথুনী দিয়ে তৈরি। তারা দেয়াল ভাঙা শুরু করলো। তাদের নিরাপদ রাখার জন্য কেল্লার ওপরে তীর ও অগ্নিবর্ষণ অব্যাহত রাখলো মুজাহিদরা, যাতে কেল্লার ওপর উঠে শত্রুরা তীর বর্ষণ করতে না পারে এবং কেল্লার দেয়াল ভাঙায় বাঁধা সৃষ্টি না হয়।

    মুজাহিদদের এই সাহস ও তৎপরতা দেখে সুলতান আইয়ুবী বলে উঠলেন, ‘সাবাস! সাবাস মুজাহিদ!’

    সহসা দুর্গের প্রাচীরের ওপর চিৎকার শোনা গেল। সুলতানের চোখ সেই স্থানে নিবদ্ধ হলো, যেখানে আইয়ুবীর নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদরা দেয়াল ভাঙছিল। তিনি দেখলেন, অসংখ্য খৃস্টান সৈন্যের মাথা ও কাঁধ দেখা যাচ্ছে। তাদের হাতে বড় বড় বালতি ও ড্রাম। তীর বৃষ্টির ফাঁক গলে তারা প্রাচীরের ওপর উঠে এল এবং বালতি ও ড্রামে কাঠ ভিজিয়ে তাতে আগুন দিয়ে তা ছুঁড়ে মারতে লাগল নিচে। প্রজ্জ্বলিত কাঠ ও জ্বলন্ত অঙ্গার সেইসব মুজাহিদের ওপর গিয়ে পড়ছিল, যারা নিচে দেয়াল ভাঙছিল। মুজাহিদরা আরো এগিয়ে গিয়ে তীর বর্ষণ শুরু করলে অসংখ্য খৃস্টান আহত হলো সে তীরের আঘাতে। দেয়ালের ওপর ছুটে আসা তীরে মুজাহিদদের তীরন্দাজ বাহিনীর কিছু লোকও আহত এবং শহীদ হয়ে গেলেন।

    শেষে উভয় দিক থেকে এমনভাবে তীর বর্ষণ হতে লাগলো, যেন বাতাসে তীরের জাল বিছিয়ে রাখা হয়েছে। জানবাজ মুজাহিদরা তখনও দেয়াল ভাঙছিল।

    দেয়াল ভাঙা কোন সহজ ব্যাপার ছিল না। কারণ কেল্লার দেয়াল যেমন চওড়া তেমনি মজবুত। এদিকে দেয়ালের ওপর থেকে এই জানবাজদের ওপরে তীর বর্ষণ করা সম্ভব ছিল না বলে তাদের ওপরে জ্বলন্ত কাঠ বর্ষিত হচ্ছিল। কিন্তু এই কাঠ বর্ষণের কাজও সহজ ছিল না। যারাই এগিয়ে আসতো এ কাজে তারাই মুসলিম তীরন্দাজদের তীরের নিশানায় পরিণত হতো।

    ওপরে যখন প্রবল তীর বৃষ্টি হচ্ছিল তখনও নিচে প্রজ্জ্বলিত আগুন এড়িয়ে দেয়াল ভাঙায় অটল ছিল মুজাহিদরা। কিন্তু আগুন যখন তাদের ঘিরে ধরল তখন আর সেখানে টিকতে পারল না। মুজাহিদদের অনেকেই তখন এর মাঝে অগ্নিদগ্ধ হয়ে শাহাদত বরণ করলেন। বাকীরা দৌড়ে ফিরে এলো মূল বাহিনীর কাছে। অনেকের কাপড়ে আগুন লেগে গিয়েছিল, পথের মাঝে মুখ থুবরে পড়ে গেল তাদের কেউ কেউ। কেউবা ফিরতে গিয়ে দুশমনের তীরের আঘাতে লুটিয়ে পড়লো মাঝপথে। বলতে গেলে এভাবে মুজাহিদদের প্রায় সকলেই শহীদ হয়ে গেলেন।

    পাঁচিলের ওপরে পরিখা থাকায় খৃস্টানরা বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। মুসলিম বাহিনী সামান্য পিছিয়ে খৃস্টানদের তীরের আওতার বাইরে চলে এল।

    লড়াই চলছিল মূল ফটককে কেন্দ্র করে। খৃস্টান বাহিনীর দৃষ্টি মুসলমানদের মূল বাহিনীর দিকে, মুসলমানরা তাকিয়ে ছিল খৃস্টানদের দিকে। হঠাৎ মুসলমানরা দেখতে পেল ফটকের অনেক দূর থেকে দশজন মুজাহিদ দেয়াল ঘেঁষে শত্রুদের দৃষ্টি এড়িয়ে ফটকের দিকে এগিয়ে আসছে। শত্রুর দৃষ্টি যাতে তাদের দিকে না পড়তে পারে সে জন্য মুসলমানরা আবার এগিয়ে এল এবং পুনরায় পূর্ণ উদ্যমে তীর বৃষ্টি শুরু করল। দশজনের মুজাহিদ দলটি এই সুযোগে দেয়ালের সাথে সেঁটে গিয়ে দ্রুত ফটকের পাশে পৌঁছে গেল। ওখানে পৌঁছে তারা দ্রুত দেয়ালের পাথর খুলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা অনেকগুলো পাথর খুলে দেয়ালের গায়ে বেশ বড় রকমের একটি গর্ত তৈরি করে ফেললো।

    খৃস্টানরা টের পেয়ে আবার আগুনের গোলা ছুঁড়তে শুরু করল নিচে। কিন্তু এবার সে সব গোলা মুজাহিদদের তেমন ক্ষতি করলে পারল না। কারণ বিপদ দেখলেই ওরা দেয়ালের গর্তে সেঁধিয়ে গিয়ে আত্নরক্ষা করলে লাগল। দু’জন অগ্নি নিক্ষেপকারী ড্রামের আড়াল নিয়ে ঝুঁকে মুজাহিদদের দিকে আগুনের মশাল নিক্ষেপ করতে চাইল, অকস্মাৎ মুসলিম বাহিনীর তীর এসে বিদ্ধ করল তাদের। খৃস্টান সৈন্য দু’জন বিকে তীরের আঘাত খেয়ে পিছনে পড়ার পরিবর্তে দেয়াল থেকে ছিটকে সামনের দিকে পড়ল। তাদের শরীরের বাড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল ড্রামটি এবং মুহূর্তে আগুনের স্তুপে পরিণত হলো আশেপাশে পুরো এলাকা। সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য দু’জন সেই অগ্নিকুন্ডে পড়ে ভস্ম হয়ে গেল, সে সাথে মুজাহিদ দশজনও হারিয়ে গেল সেই বিশাল অগ্নিকুন্ডে

    সুলতান আইয়ুবী ঘোড়া হাকিয়ে দ্রুত কমান্ডারের কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমাদের ওপরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। ইসলামের ইতিহাস এইসব জানবাজদের নাম সবসময় স্মরণ করবে যারা আল্লাহর নামে অগ্নিকুন্ডে ঝাপিয়ে পড়তেও পিছপা হয়নি। এখন তোমরা এ পথ ছেড়ে দাও এবং পিছু সরে আসো। এত তাড়াতাড়ি তীর ও সৈনিক নিঃশেষ করবে না। খৃস্টানরা এই কেল্লার জন্য এত বেশি আত্নত্যাগ করছে যার কোন ধারণাই আমরা করতে পারি না। আমরাও এত বেশি কুরবানী দিব যার ধারণা খৃস্টানদের কাছে নেই।’

    কমান্ডার বললো, ‘আরেকটু চেষ্টা করলেই এখান দিয়ে দেয়াল ভাঙা যাবে আর আমরা এই পথে আপনাকে কেল্লার ভেতরে নিয়ে যেতে পারবো।’

    ‘আল্লাহ তোমার আশা পূরণ করুন।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘তোমার মুজাহিদদেরকে বাঁচিয়ে রাখো। খৃস্টানরা এখন বাইরে থেকে আক্রমণ চালাবে। তোমাকে সম্ভবত বাইরেও যুদ্ধ করতে হবে। অবরোধ সুদৃঢ় রাখো। চোখ-কান খোলা রেখে খানিক জিরিয়ে নাও, আমরা খৃস্টানদের এবার ক্ষুধা-তৃষ্ণার সাথে লড়াই করতে পাঠাবো।’

    সৈন্যদেরকে পিছনে সরিয়ে আনলেন কমান্ডার। কমান্ডার সুলতান আইয়ুবীকে বললো, ‘আপনার অনুমতি পেলে আমি শহীদদের লাশগুলো উঠিয়ে আনতে চাই।’

    ‘হ্যাঁ! সুলতান আইয়ুবি বললেন, ‘নিয়ে আসো। কোন শহীদের লাশ যেন বাইরে পড়ে না থাকে।’

    সুলতান আইয়ুবী চলে এলেন ওখান থেকে। এই জানবাজ সৈন্যরা যেভাবে তাদের বন্ধুদের লাশগুলো উঠিয়ে আনলো, সেও এক কল্পনাতীত দৃশ্য। বন্ধুদের লাশ উঠাতে গিয়ে শাহাদাতের নজরানা পেশ করলো আরো কয়েকজন জানবাজ মুজাহিদ।

    সুলতান আইয়ুবী অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি এমনভাবে চলাফেরা করলেন যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে তিনি কোথায় আছেন। তিনি তাঁর বাহিনী থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন। একাধিক টিলা, উঁচু প্রান্তর ও গিরিপথ পার হয়ে তিনি এক টিলার ওপর ঘোড়া থেকে নামলেন এবং সাবধানে শুয়ে পড়লেন যাতে শত্রুরা তাকে দেখতে না পায়। টিলার ওপর থেকে তিনি কেল্লা ও শহর দেখতে পাচ্ছিলেন। অন্যদিকে প্রায় মাইলখানেক বিস্তৃত অঞ্চল নজরে ভাসছিল তাঁর। তিনি সাবধানে টিলার প্রতিটি এলাকা গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন এবং ঘুরে ফিরে সবকিছু দেখলেন।

    এই গভীর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান করতে করতে সূর্য ডুবে গেল। তিনি সেখানেই অবস্থান করতে থাকলেন। সন্ধ্যার একটু পর তাঁকে সংবাদ দেয়া হলো, নির্দেশ মোতাবেক তীরন্দাজ ও পদাতিক বাহিনী আসছে। তিনি গুপ্তচরকে বললেন, ‘বাহিনীকে সাবধানে আত্নগোপন করতে বলো আর কমান্ডারদেরকে বলো আমার সাথে অবিলম্বে দেখা করতে।’

    বিভিন্ন গ্রুপের কমান্ডাররা বাহিনীকে লুকিয়ে রেখে দেখা করলো এসে সুলতানের সাথে। সুলতান আইয়ুবী পথ-নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে নিজ নিজ বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

    রাত ক্রমে বাড়তে থাকলো। মরুভূমিতে নেমে এল নিশুতি প্রহর। চারদিক সুনসান নীরবতা। মাঝ রাতের দিকে এই নিস্তব্ধ নীরবতা ছাপিয়ে দূর থেকে ভেসে এল সম্মিলিত অশ্বখুরের মৃদু কিন্তু বলিষ্ঠ শব্দ। উন্মাতাল প্লাবন কোন বাঁধ ভেঙে ছুটে আসতে শুরু করলে যেমন শব্দ হয় অনেকটা সে রকম। শব্দ ক্রমে জোরালো হতে থাকল।

    সুলতান সে শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়েছিলেন অপলক নেত্রে। আকাশে ছিল ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। নরম জোসনায় ব্যপ্ত ছিল সমগ্র চরাচর। অনেকক্ষণ ধরে সুলতান শুনছেন সম্মিলিত অশ্ব খুরধ্বনি। অস্পষ্টতা থেকে সে শব্দ একসময় স্পষ্ট হলো। স্পষ্ট শব্দ ক্রমে আরো জোরালো হলো, কিন্তু এই ফকফকা জোসনায়ও কোন বাহিনী নজরে এল না তাঁর। ইয়িনি নিবিষ্ট মনে তাকিয়েছিলেন উন্মুক্ত মরুভূমির দিকে। বুঝতে পারছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই ধেয়ে আসা বাহিনী তাঁর দৃষ্টিসীমায় আঘাত হানবে।

    অবশেষে একসময় তাঁর অন্তহীন প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। দূর দিগন্তে চলন্ত রেখা ফুটে উঠলো। ক্রমে সে রেখা বড় হতে থাকলো। একসময় খৃস্টান বাহিনীর অশ্বারোহী দলটি টিলা ও উচ্চভূমি অঞ্চল পেরিয়ে এল। তাদের পিছনে এল উষ্ট্রারোহী দলও। এদের সৈন্য সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন তিন হাজারের কম। তবে সে সময়ের ঘটনা প্রবাহের যা বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে দশ থেকে বারো হাজারের মত বলে উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ ঐতিহাসিক।

    বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন প্রসিদ্ধ খৃস্টান সম্রাট রিমান্ত। সে এই আক্রমণের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ের আড়ালে তাবু টানিয়ে অপেক্ষা করছিল। তার পরিকল্পনা ছিল ভোর রাতে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বাহিনীর ওপর সে অতর্কিত আক্রমণ চালাবে। কচুকাটা করবে আইয়ুবীর ঘুমন্ত প্রতিটি সৈনিককে। বার বার আইয়ুবী খৃস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করেছিল, এবার তার প্রতিশোধ নেবে রিমান্ত। চিরতরে মিটিয়ে দেবে আইয়ুবীর যুদ্ধের সাধ।

    খৃস্টান সৈন্যরা ঘোড়া ও উটের পিঠ থেকে নেমে এলো নিচে। ঘোড়ার সাথে বাঁধা ঘোড়ার আহার্য দানার ব্যাগ ঘোড়ার সামনে ঝুলিয়ে দিল। আরোহীদের আদেশ দেয়া হলো সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে। রিমান্ত বললো, ‘মা মেরীর সন্তানেরা। তোমাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হতে চলেছে। খৃস্টান জাতির সম্মান ও মর্যাদার বৃদ্ধি করার জন্য আল্লাহ তোমাদের মনোনীত করেছে। তোমরা মুসলমানদের ওপর আঘাত হানবে অতর্কিতে। ওরা যখন হাতিয়ার রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। তোমরা আক্রমণ চালাবে একদল নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর। ফলে তেমন কোন মোকাবেলার সম্মুখীন তোমাদের হতে হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আমি শুধু চাই, তোমরা এওম্ন দ্রুত ও তীব্র আঘাত হানবে, যাতে দুশমন কোনরকম প্রতিশোধের সুযোগ না পায়।’

    সুলতান আইয়ুবী এবং তাঁর পর্যবেক্ষকগণ খৃস্টান সৈন্যদলকে ভালভাবেই লক্ষ্য করছিল। এতবড় বাহিনী দেখে আইয়ুবী ঠিক বুঝলো, খৃস্টানরা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে।

    ভোর রাত। আদম সুরাত হেলে পড়েছে আকাশের একদিকে। চাঁদ পশ্চিম দিগন্তে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। মধ্যরাতের উজ্জ্বল আলো এখন অনেকটা ম্রিয়মান। সারা রাত কুয়াসজা ঝরে সে আলো আরো ফিকে করে দিয়েছে। মরা জোসনায় এখন আর সবকিছু আগের মত স্পষ্ট দেখাও যায় না।

    সে অস্পষ্ট আলোতেই সুলতান দেখলেন খৃস্টান বাহিনী তৎপর হয়ে উঠেছে। ঢিলেঢালা ভাব কাটিয়ে ওরা তৈরী হচ্ছে যুদ্ধের জন্য। অশ্বারোহীরা চেপে বসছে ঘোড়ায়। ওদের হাতে বর্শা ও তলোয়ার। ওরা সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালো। রিমান্ত দেখলেন তার বাহিনী প্রস্তুত। বললেন, ‘যিশুর সৈনিকরা, সামনে বাড়ো।’

    নড়ে উঠলো বাহিনী। ঘোড়াগুলো পা তুললো সামনের দিকে, ঠিক এই সময় আইয়ুবী বললেন, ‘তীর ছুঁড়ো।’

    সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো মুজাহিদদের তীর বর্ষণ। আইয়ুবীর হুকুম মত প্রথম পশলা গেল পিছন সারির ওপর দিয়ে। ঘোড়ার পিঠেই মুখ থুবড়ে পড়লো খৃস্টান সৈনিকদের সে সারিটি। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘোড়ার পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল নিচে।

    বিরতি ছাড়াই ছুটে এল দ্বিতীয় পশলা। আঘাত করল সাওয়ারহীন ঘোড়াগুলোকে। গায়ে তীর বিদ্ধ হতেই লাগামহীন ঘোড়াগুলো ছুট লাগালো এদিক ওদিক। ডানে, বায়ে, সারির মাঝখান দিয়ে, যেদিক পারলো ছুটলো উর্ধ্বশ্বাসে। বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়লো পুরো বাহিনী জুড়ে। বাহিনীর সামনে থেকে খৃস্টান কমান্ডার বুঝতেই পারলো না, ব্যাপারটা কি? কেন এত বিশৃংখলা?

    সে রাগের মাথায় চিৎকার করে গালাগালি শুরু করে দিল। এর পরের আঘাতটা এল উটের বহরের ওপর। ঘোড়ার মতই উটগুলোও দৌড় লাগালো দিশেহারা হয়ে। ফলে মুহূর্তে সমস্ত সেনাবাহিনীতে ছড়িয়ে পড়ল সীমাহীন আতংক।

    এরপর কখনো তীর ছুটে আসতে লাগলো ডান দিক থেকে, কখনো বাম দিক থেকে, কখনো পেছন থেকে। দলে দলে খৃস্টান ফৌজ তীরবিদ্ধ হতে লাগল। তাদের আর্ত চিৎকার প্রভাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিল। যখন ভোরের আলো ফুটে উঠল পাহাড় ও টিলার ফাঁক-ফোকর তখন রিমান্ত পরিষ্কার বুঝতে পারল, খৃস্টান বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর কঠিন বেষ্টনীর মধ্যে আটকা পড়ে গেছে।

    সে জানতে পারল না, কি পরিমান মুসলমান সৈন্য এ অভিযানে অংশ নিয়েছে! তাদের সংখ্যা কি খুবই বেশি? তার মনে হলো, জীবনের অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে তার। জীবনে অনেকবারই মুসলমানদের মুখোমুখি হয়েছে রিমান্ত, কিন্তু এতটা অসহায় অ অনিশ্চয়তা আর কখনো তাকে গ্রাস করেনি। এ যেন এক অবধারিত মৃত্যু ফাঁদ। যে পথে তারা এই গিরি অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল সে পথ আগলে রেখেছে মুজাহিদরা। ডানে-বায়ে পাহাড়ে টিলায় মুসলিম তিরন্দাজ বাহিনী। পাহাড় ও টিলার ফোঁকড় গলে সামনে বেরিয়ে যাবার যে সংকীর্ণ পথ, সে পথও মুজাহিদদের দখলে। খোলা ও সমতল জায়গায় দাঁড়িয়ে মুসলিম তীরন্দাজদের নিশানা হওয়া ছাড়া যেন এখন তাদের আর কিছুই করার নেই।

    রিমান্ত যে পথে এসেছিল সে পথে ফিরে যাওয়ার জন্য একবার ছুটে গেল সেদিকে, কিন্তু মুজাহিদদের প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হলো। যাবার চেষ্টা করলো সংকীর্ণ পথে সামনের দিকে বেরিয়ে যাওয়ার, কিন্তু তাড়া খেয়ে সেখান থেকেও ফিরে এল বাঘের মুখে পড়া ভয়ার্ত হরিনীর মত। ময়দানের মাঝখানে ছুটে এলেই পাহাড়, টিলার পাথর অ ঝোপের আড়ালে থেকে ছুটে আসতো ঝাঁক ঝাঁক তীর।

    মুজাহিদদেরকে আগেই আইয়ুবী সবকিছু বুঝিয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘রিমান্ত আসছে বিপুল শক্তি নিয়ে এবং চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য। অতএব তাকে তোমাদের সেভাবেই অভ্যর্থনা জানাতে হবে।’

    সুলতানের কথায় মুজাহিদরা এই আক্রমণকে সানন্দে গ্রহণ করার মানসিকতা নিয়েই প্রস্তুত হয়েছিল। ফলে রিমান্তের বাহিনীর বিশালতা দেখে তারা মোটেও ঘাবড়ে যায়নি।

    অবরোধকারী মুজাহিদরা এবার খৃস্টানদের সামনে যাওয়ার পথ থেকে সরে গেল। বিজয়ের আশা ছেড়ে ওই পথে পালিয়ে যাওয়ার জন্য রিমান্ত ঘোড়া ছুটালো। পাথর ও ঝোপের আড়ালে বসে মুজাহিদরা যখন দেখলো ধূলির মেঘ তুলে খৃস্টানরা ছুটছে বেস্টনী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তখন তারা সংকেত পাঠালো বেস্টনীর বাইরের মুজাহিদদের কাছে। প্রস্তুত হয়েই ছিল মুজাহিদরা। ধূলার মেঘ নিয়ে যখন অশ্বারোহী দল সেই ফাঁক গলে পরবর্তী বেস্টনীতে বেরিয়ে এল, দু’পাশ থেকে মুজাহিদরা টুটে পড়ল তাদের ওপর। তারা কোথা দিয়ে কেমন করে আক্রান্ত হলো, এ কোথা বুঝার আগেই চোখের পলকে বিপুল সংখ্যক খৃস্টান সৈন্য ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। খৃস্টান সৈন্যরা অনুভব করলো, তারা খাঁচায় বন্দী শিকারের মত অসহায়। এগুনোর পথ রুদ্ধ দেখে আবার পিছনে হটলো ওরা, চলে এল মাঠের ঠিক মধ্যিখানে।

    সমতল এলাকাটি ছিল বেশ বড়সড়। মাঝখানের অনেকটা অংশ দু’পাশের পাহাড় থেকে মারা তীরের আওতার বাইরে থাকায় ওখানে আশ্রয় নিল ওরা।

    সুলতান আইয়ুনী এই যুদ্ধের পরিচালনা ও তদারক নিজেই করছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর কৌশল এবারও তাদেরকে ভয়, আতঙ্ক এবং নিরাশার অন্ধকারে ছুঁড়ে মারল। তারা যেদিকেই যায় দেখতে পায় সামনে বাঁধার পাহাড়। মধ্যিখানের ওই নিরাপদ অঞ্চলটুকু থেকে সামান্য এদিক ওদিক হলেই পাশ থেকে ছুটে আসতো ঝাঁক ঝাঁক তীর।

    খৃস্টান সেনাপতি রিমান্ত তার বাহিনীকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ে চড়ার নির্দেশ দিল। হঠাৎ একযোগে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ওরা ছুটল পাহাড়ের দিকে। কিন্তু মুজাহিদদের তীর বৃষ্টি সব কটি দলকেই আবার ফেরত পাঠাল মাঠের মাঝখানে। সুলতান আইয়ুবীর কমান্ডাররা তাঁর নির্দেশ অনুসারে সামনাসামনি যুদ্ধ করার কোন সুযোগই দিল না খৃস্টানদের।

    বেলা গড়িয়ে চলল। রোদের উত্তাপ বাড়ল। সূর্য উঠে এল মাথার ওপর। খৃস্টানদের ঘোড়াগুলো ক্ষুধা অ পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। সৈনিকরা হয়ে পড়ল ক্লান্ত অ বিপর্যস্ত। তারা চারণভূমি অ পানির সন্ধানে তৎপর হল। দুপুর পর্যন্ত কোন রসদ পৌঁছলো না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল রিমান্ত। কমান্ডারদের ডেকে বৈঠকে বসল। বলল, ‘খাদ্য শস্য তো সকালেই এসে যাওয়ার কথা ছিল!’

    কয়েকজন অশ্বারোহী রসদ নিয়ে আসা বাহিনীর খবর নেওয়ার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মুসলমান তীরন্দাজদের হাতে মারা পড়ল। কিন্তু যদি তারা জীবিত বেরিয়েও যেতে পারতো, তবু কোনদিন আর তাদের রসদ সামগ্রী নিয়ে আসা বাহিনীর সাক্ষাৎ পেতো না তারা। কারণ রাতের অন্ধকারেই সুলতানের পাঠানো টহল বাহিনী পথিমধ্যে তাদের পাকড়াও করে। তাদের অভিযান ছিল খুবই সফল। রসদবাহী দলটিকে তারা সহজেই ঘায়েল করতে সক্ষম হয়। কাফেলার রক্ষীদের হত্যা করে রাতের অন্ধকারেই তারা খৃস্টানদের সমস্ত রসদপত্র কব্জা করে নিয়ে আসে মুজাহিদ শিবিরে।

    দুপুরের একটু পর সুলতান আইয়ুবী তার সংরক্ষিত সৈন্যদলকে ডেকে পাঠালেন এবং রিমান্তের বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে রাখার নির্দেশ দিতে রাত থেকে যে বাহিনী যুদ্ধ করছিল তাদের নিয়ে তাবুতে ফিরে গেলেন।

    যদি মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা খৃস্টানদের সমানও হতো তবু তিনি সামনাসামনি খৃস্টানদের আক্রমণ করে নিঃশেষ করে দিতেন তাদের। কিন্তু বাহিনী স্বল্পতার জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত রইলেন সুলতান। তিনি মুজাহিদ বাহিনীর শক্তি ও সৈন্য অপচয় করতে চান না। তাই শত্রু সেনাদেরকে তিনি আতংকিত ও ব্যতিব্যস্ত রাখলেন ঠিকই কিন্তু তাদের জীবন বায়ু নিভিয়ে দেয়ার জন্য কোন বেপরোয়া পদক্ষেপ ও চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়ালেন না। বরং বাঘ যেমন বাগে পাওয়া শিকার নিয়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকে তেমনি তিনিও ময়দানে দুশমনকে সম্পূর্ণ বেষ্টনীর মধ্যে রেখে টিলা ও পাহাড় অঞ্চলের ঝোপের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে রইলেন। তিনি জানতেন, যতই সম্য অতিবাহিত হবে খৃস্টানরা ধীরে ধরে অকেজো হয়ে যাবে।

    কিন্তু খৃস্টানদের এভাবে অবরোধ করে রাখতে গিয়ে তাদের নিজেদেরেও যতেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছিল। খৃস্টানদের বৃহৎ শক্তিকে বেঁধে রাখতে গিয়ে সুলতানও তার সমস্ত রিজার্ভ আটকে ফেলেছিলেন। এখন এসব সৈন্যদেরকে আর অন্য কোন কাজে ব্যবহার করার সুযোগ থাকল না।

    সুলতান আইয়ুবী রিমান্তের বাহিনীকে আটক করার পর তানুতে ফিরে এসে মূল বাহিনীকে শহর অবরোধ আরো কঠোর ও জোরালো করার আদেশ দিলেন। খৃস্টানরা আর বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পেল না। প্রতিদিন কোন না কোন স্থানে মুজাহিদদের আক্রমণ হতেই থাকলো। এভাবেই অতিবাহিত হতে লাগলো একেকটা দিন। সুলতান আইয়ুবী শহর ও কেল্লার চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। কোন স্থান থেকেই দেয়াল ভাঙার কোন সুযোগ দেখা যাচ্ছিল না।

    অবরোধ করার পর ষোল দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। সন্ধ্যার সময় সুলতান নিজের তাবুতে বসে অফিসার ও সহকর্মীদের সাথে কথা বলছিলেন। আলোচনা হচ্ছিল কেল্লায় প্রবেশ করার কি উপায় বের করা যায় এই নিয়ে। সুলতানের এক দেহরক্ষী তাবুর ভেতরে প্রবেশ করে সংবাদ দিল, ‘সুদান থেকে এক দূত এসেছে।’

    আইয়ুবী বললেন, ‘তাকে জলদি ভেতরে নিয়ে এসো।’

    রক্ষী বেরিয়ে যেতেই সুলতান স্বগতোক্তি করে বললেন, ‘আল্লাহ করুন যেন সংবাদ ভাল হয়।’

    কাসেদ ভেতরে এলে সুলতান সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পারলেন। সে কোন সংবাদ বাহক নয়, একটি সেনাদলের কমান্ডার! সুলতান আইয়ুবী অস্থির হয়ে বললেন, ‘কি খবর, তুমি কি কোন সুসংবাদ নিয়ে এসেছো?’

    কমান্ডার না সূচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললো, ‘প্রধান সেনাপতি যে সুসংবাদ প্রত্যাশা করছেন তেমন কোন সুখবর এখনো আনতে পারিনি, কারন সুদানে এখনও আমাদের বিজয় অর্জিত হয়নি। আবার এ কারণে সংবাদ খারাপও নয় যে, আমরা এখনও পরাজিত হইনি এবং পিছুও হটিনি।’

    ‘তার মানে পরাজয় অ পিছু হটার আলামত দেখা যাচ্ছে, তাই না?’ সুলতান প্রশ্ন করলেন।

    ‘অনেকটা সে রকমই।’ কমান্ডার উত্তরে বললো, ‘এ অবস্থায় এখন আমরা কি করব এ ব্যাপারে আপনার আদেশ জানার জন্যই আমি এসেছি। আমাদের এখন সেনা সাহায্য ভীষণ প্রয়োজন। যদি আমাদের এই প্রয়োজন পূরণ না হয় তবে পিছু হটা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না আমাদের।’

    সুলতান আইয়ুবী ময়দানের বিশদ বিবরণ শোনার আগেই তার জন্য খাবার আনলেন এবং বললেন, ‘তুমি খেতে থাকো এবং খেতে খেতে ময়দানের খুঁটিনাটি সব আমাকে খুলে বলো।’

    সুলতান আইয়ুবীর অনুপস্থিতিতে তাঁর ভাই তকিউদ্দিন মিশরের শাসক রূপে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি মিশর ও সুদানের সীমানার কাছে ফেরাউনের শাসনকালের কিছু ধ্বংসাবশেষের খবর পান। খৃস্টানরা তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য জঘন্য ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। তারা প্রচার করে যে, ‘এসব প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ দখল করার জন্য সুদান শিঘ্রই মিশর আক্রমণ করতে যাচ্ছে।’

    এ গুজন শোনার পর তিনিই আগ বাড়িয়ে সুদান আক্রমণ করার সংকল্প ঘোষণা করলেন। তাঁর সেনাপতি অ উপদেষ্টাগণ তাকে তাঁর ভাই সুলতান আইয়ুবীর অনুমতি নিয়ে আক্রমণ করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু তকিউদ্দিন বললেন, ‘ভাই এখন ক্রুসেডের বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন, এ অবস্থায় আমি তাঁকে বিরক্ত করতে চাই না।’ এই বলে তিনি সুদানের ওপর আক্রমণ করে বসলেন।

    তকিউদ্দিন আবেগের উন্মাদনায় আক্রমণ করে বসলেন ঠিকই কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য যে বিচক্ষণতা অ দক্ষতা থাকা দরকারর তা তার ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, বিচক্ষণতা থাকলে তিনি এই অনাহুত যুদ্ধে জরিয়েও পড়তেন না! যাই হোক, যখন তকিউদ্দিন দেখলেন যুদ্ধের অবস্থা সুবিধের নয় তখন তিনি এই কমান্ডারকে ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। একজন কাসেদ না পাঠিয়ে কমান্ডারকে পাঠানোর কারণ, সে যুদ্ধ ক্ষেত্রের সবিশেষ বর্ণনা সুলতান আইয়ুবীর কাছে বুঝিয়ে বলতে পারবে।

    সুলতান আইয়ুবী আগেই এই যুদ্ধের খবর পেয়েছিলেন। শুধু এতটুকু জানতে পেরেছিলেন, তকিউদ্দিন সুদানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।

    কমান্ডার সুলতান আইয়ুবীকে শোনাল যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ। বললো, ‘তকিউদ্দিন বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু আবেগ ও উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে সুদাম আক্রমণের আদেশ দিয়েছিলেন।’

    সুলতান জানতেন, তকিউদ্দিনের চেতনা ও আবেগ সুলতান আইয়ুবীর থেকে ভিন্ন ছিল না, ভিন্ন ছিল দুই ভাইয়ের বিচার-বিবেচনা ও বিচক্ষণতা। তকিউদ্দিন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা সৎ উদ্দেশ্যে এবং ইসলামী প্রেরণা থেকেই নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছিলেন। নিজের গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট এবং উপদেষ্টাদের মতামতের ওপর পূর্ণ গুরুত্ব ও খেয়াল দেননি।

    তিনি শুধু সেই রিপোর্টের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যাতে সুদানীদের ট্রেনিং নেওয়া এবং আক্রমণের প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। তকিউদ্দিন শত্রুদেরকে প্রস্তুত হওয়ার আগেই বশীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু এর শেষ পরিণাম কি তা জানার চেষ্টা করেননি। সুদানীদের সামরিক শক্তি কেমন ও কত বেশি তাও খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করেননি তিনি। বুঝতে চেষ্টা করেননি, তারা যুদ্ধে কত শক্তি প্রয়োগ করবে এবং কত শক্তি রিজার্ভ রাখবে। তাদের কি পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম আছে তারও খবর নেননি। জানতে চাননি তাদের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী কত? তার চেয়েও বড় কথা, ময়দানে কি ধরণের প্রতিরোধের মোকাবেলা তাকে করতে হনে সে কথা না জেনেই তিনি আক্রমণের হুকুম দিয়েছিলেন। এমনকি মিশরের রাজধানী থেকে সে অঞ্চল কর দূরে এবং কেওম করে সেখানে নিজেদের রসদপত্র পাঠাবেন এর কিছুই না ভেবেই তিনি এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

    সুদানীরা তকিউদ্দিনের বাহিনীকে সীমান্তে কন বাঁধা প্রদান করল না। তারা তাকে সুদান সীমান্ত থেকে দূর পর্যন্ত ভেতরে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিল। শেষে এমন এক স্থানে এনে ফেললো, যেখানে নিষ্ঠুর মরুভূমি তাদের মৃত্যুর জন্য ভয়াল ফাঁদ পেতে রেখেছে। যেখানে প্রাণের কোন অস্তিত্ব নেই, নেই এক ফোটা পানির ব্যবস্থা।

    তকিউদ্দিনের বাহিনী প্রকৃতপক্ষে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর রণ কৌশল অনুযায়ী যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার এবং সংখ্যায় কম হয়েও শত্রুর বড় বড় বাহিনীকে তছনছ করে দেয়ার সামর্থ্য রাখতো। তবে এ জন্য কুশলী সেনানায়কের নেতৃত্বের প্রয়োজন। এ সৈন্যদলকে শুধুমাত্র সুলতান আইয়ুবীই কমান্ড ও ব্যবহার করতে পারতেন।

    সুলতান আইয়ুবী সম্মুখ যুদ্ধের সংঘর্ষ সবসময় এড়িয়ে চলতেন। তিনি সৈন্যদের প্রস্তুত করেছিলেন কমান্ডো লড়াইয়ের উপযুক্ত করে। ক্ষিপ্রতা, গতিশীলতা ও অতর্কিতে আঘাত হানা *** এ বাহিনীর কোন জুড়ি ছিল না। কিন্তু তকিউদ্দিন কৌশলবিহীন শুধু সৈন্য সমাবেশ করে যুদ্ধ করায় অভ্যস্ত ছিলেন। এ বাহিনীতে দক্ষ, পরীক্ষিত ও জানবাজ সৈন্য ছিল। কিন্তু তাদের সঠিক ব্যবহার করার নেতা একমাত্র সুলতান আইয়ুবীই ছিলেন।

    সুদানে আক্রমণ করা মানে, সুলতান আইয়ুবীর এক বিরাট বাহিনীকে বেহুদা বন্দী করে রাখা। খৃস্টানরা এটাই চাচ্ছিল। আর এ জন্যই তারা এরকম চাল চেলেছে। তকিউদ্দিনের বাহিনীকে কৌশলে সুদানের গভীর অভ্যন্তরে নিয়ে তাদের মনোপুত স্থানে কার্যত বন্দী করে রেখেছে। আর তাদের ওপর সুলতান আইয়ুবীর কৌশল অবলম্বন করে রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ চালাচ্ছে। তকিউদ্দিন উট, ঘোড়া এবং সৈন্যদের জন্য এক ফোটা পানিও পাচ্ছে না কোথাও।

    কমান্ডো বাহিনীর সালার অবস্থার নাজুকতা উপলব্ধি করে এক সময় বললো, ‘আমাদেরকে আপনি মরুভুতিতে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিন। আমরা মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের মত সরে পড়বো। এরপর অতর্কিত হামলার মোকাবেলায় আমরাও ওদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাবো এবং কাছ থেকেই ছিনিয়ে আনবো আমাদের খাদ্য ও পানীয়।’

    কিন্তু তকিউদ্দিন এতে বাহিনী সংকোচিত হয়ে পড়বে বলে আশংকা করলেন। ভাবলেন, এতে কেন্দ্রীয় কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। ফলে, তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং এ ধরনের চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিতে বললেন তাকে।

    যখন রসদপত্র বা খাদ্যশস্যের প্রশ্ন উঠে তখন তাদের মনে জেগে ওঠে অজানা শংকা। তারা বর্ডার থেকে এত দূরে চলে এসেছে যে, স্বাভাবিক অবস্থায়ও এখানে রসদ পৌছতে কয়েক দিন লেগে যাওয়ার কথা। আর এখন তো রাস্তায় রসদ বহর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ষোলআনা। যে কোন জায়গায়, যে কোন সময় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা আছে। এ আতংকজনক অবস্থায় পথ চলা নিরাপদ নয় বলেই বহরের প্রতিটি সৈনিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

    কমান্ডো বাহিনীর এ আশংকা অচিরেই সত্য প্রমাণিত হলো। একদিন তারা খবর পেলো, তাদের খাদ্যশস্যবাহী বহর আক্রান্ত হয়ছে এবং শত্রুরা সমস্ত খাদ্যশস্য, রসদপত্র ও বাহনের জন্য নিয়ে আসা পশু লুট করে নিয়ে গেছে। এ ঘটনার পর কমান্ডো বাহিনীর প্রধান আবারো তকিউদ্দিনের কাছে তার প্রস্তাব পেশ করল। কিন্তু তকিউদ্দিন এ প্রস্তাব তো গ্রাহ্যই করলেন না বরং এ জন্য তাকে তিরষ্কার করলেন। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও তকিউদ্দিনের সাথে তার বাকবিতণ্ডা হলো এবং তকিউদ্দিন তাকে কড়া ধমক লাগালেন।

    কমান্ডার বললো, ‘আমরা আপনার নেতৃত্বে যুদ্ধ করতে এসেছি, যুদ্ধ করবো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শত্রুরা রাতের আঁধারে এসে আমাদের খাদ্যশস্য লুট করে নিয়ে যাবে আর আমরা তা চুপ করে দেখবো। লড়াইয়ের স্বার্থে আপনাকে কোন পরামর্শ দিতে পারবো না।’

    তকিউদ্দিন ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘তুমি সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছো। তোমার কাছ থেকে আমার যুদ্ধ করা শিখতে হবে না।’

    কমান্ডার উত্তরে বললো, ‘আমাকে মাফ করবেন, আপনি সুলতান তকিউদ্দিন, সুলতান সালাহউদ্দিন নন। আমরা যুদ্ধ করতে শিখেছি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে নয়। সিপাহসালার হিসেবে তিনি আমাদেরকে যুদ্ধ করতে শিখিয়েছেন আমরা সে ভাবেই যুদ্ধ করতে চাই। সা জীবন আমরা কমান্ডো ট্রেনিং পেয়েছি। আমরা শিখেছি কি করে শত্রুর পেটের মধ্যে ঢুকে তাদের পেট কেটে বেরিয়ে আসতে হয়। আপনার সৈন্যরা ক্ষুধায় মরছে আর তাদের খাবার ও রসদপত্র শত্রুরা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা শত্রুদের রসদ ছিনিয়ে নিয়ে নিজের সৈন্যদেরকে পেট ভরাতে অভ্যস্থ।’

    তকিউদ্দিনের চোখে পানি এসে গেল। তিনি জানতেন কমান্ডার কি প্রেরণা ও আবেগ নিয়ে কথা বলছে। রাগের পরিবর্তে তার মাঝেও এসে ভর করলো আবেগ। তিনি সেই আবেগ দমন করে বললেন, ‘আমি সেই জাতি বারিতালাকে ভয় করি। নিজে নিরাপদ অবস্থানে থেকে আমি এই জানবাজদের কি করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেই বলো?’

    ‘এ কথা আপনার আগেই ভাবা উচিত ছিল। এভাবে আপনার আক্রমণ করা উচিত হয়নি। কিন্তু এখন আর এ কথা ভেবে লাভ নেই। আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আল্লাহর নামে জীবন কুরবানী করতে ভয় পায়। মুজাহিদ যতবেশী মৃত্যুর কাছাকাছি হয় ততই সে আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করে। আমরা এখন দুশমনদের ফাঁদে পড়ে আছি। এ অভিযানে আমরা যদি বিজয় অর্জন করতে না পারি তবে শাহাদাতের গৌরব থেকে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না।’

  • মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তৎকালীন ভূ-রাজনীতি

    মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তৎকালীন ভূ-রাজনীতি

    মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তৎকালীন ভূ-রাজনীতি

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী

    সমরশাস্ত্র, সমরাস্ত্র এবং সে যুগের অবস্থাদির একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া চিত্র তুলে ধরার পরে আমরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবন নিয়ে আলোচনা করছি।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের পূর্ণ নাম ইমদাদ উদ্দীন মুহাম্মদ। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম।

    শৈশবাবস্থায়ই পিতার স্নেহ-ছায়া মাথার উপর থেকে উঠে যায়। তাঁর মা একজন সুশিক্ষিতা মহিলা ছিলেন। তিনি শিশুর নৈতিক ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণ নিজেই দেন এবং মসজিদে লেখাপড়া শেখান। মুহাম্মদ ঘোড়ায় চড়া, দৌড়াদৌড়ি এবং সমরশাস্ত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তাই তাঁর মা তাঁকে তাঁর খালার নিকট পাঠিয়ে দেন। তাঁর খালা ছিলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের স্ত্রী। সম্পর্কের দিক দিয়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মুহাম্মদের খালু এবং আপন চাচা হতেন। সেখানে তিনি তাঁর আগ্রহের নিবৃত্তি ঘটাবার মওকা পাবেন—এটাই ছিল তাঁর মায়ের ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ প্রথম জীবনে একজন শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত ঝোঁক ছিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন ও ব্যবস্থাপনার দিকে। ফলে সে যুগে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা ও জীবিকার্জনের মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও তিনি পুলিশের চাকুরী গ্রহণ করেন। শীঘ্রই পুলিশ বিভাগে তিনি তাঁর যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর এ প্রতিভা দৃষ্টে খলীফা ‘আবদুল মালিক তাঁকে সামরিক বিভাগে অফিসার হিসেবে নিয়োগ করেন যাতে তিনি সেনাবাহিনীকে সুশৃংখল ব্যবস্থাপনার অধীনে নিয়ে আসতে পারেন। এ বিষয়ে ইতিপূর্বেও আমরা আলোচনা করেছি।

    হেজাযে ‘আবদুল্লাহ বিন যুবায়র (রা) উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে (তাদের অত্যচার ও অনাচারের কারণে) বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন করে রেখেছিলেন। এই বিদ্রোহ উমাইয়া খিলাফতের জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ‘আবদুল মালিকের পূর্ববর্তী দু’জন খলীফা খুবই দুর্বল থাকায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে অরাজকতা ও বিশৃংখলা দেখা দেয়। শক্ত হাতে এই বিশৃংখলা দমনের প্রয়োজন ছিল যাতে অন্য কেউ মাথা তুলতে সাহসী না হয় এবং এ দৃষ্টান্ত থেকেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

    ‘আবদুল মালিক হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে যোগ্য বিবেচনা করে তার উপরই একাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন। হাজ্জাজ স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ বিন কাসিমকে খুবই আদর ও স্নেহ করতেন। তিনি তাঁর দূরদৃষ্টি দ্বারা পরিমাপ করতে পেরেছিলেন যে, এই বালক একদিন অবশ্যই যোগ্যতম মুজাহিদ হিসেবে পরিগণিত হবেন। তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে অল্প বয়স থেকেই সমরশাস্ত্রে অভিজ্ঞ করে তুলবার জন্য যুদ্ধ ও সংঘর্ষের প্রতিটি পর্যায়ে নিজের সঙ্গে রাখেন যেন সে সমরশাস্ত্রকে হাতে কলমে আয়ত্ত্ব করে নিতে পারে।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কৌশলে ‘আবদুল্লাহ বিন যুবায়র (রা)- এর দু’পুত্র হামযা এবং হাবীবকে স্বপক্ষে টেনে নেন। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য তিনি কোথাও কঠোরতা—আবার কোথাও কোমলতার আশ্রয় নেন এবং সত্বরই তা দমন করতে সক্ষম হন। হাজ্জাজও ‘আবদুল মালিককে রাজনৈতিক কূটকৌশল অবলম্বনের এবং উদার ব্যবহার দ্বারা হেজাযবাসীদের অন্তর জয় করার উপদেশ দেন। অনন্তর ‘আবদুল মালিক হেজায এলাকায় পানির ন্যায় দু’হাতে টাকা ছড়ান। ফলে কেবল হেজাযেই নয়, বরং সিরিয়া এলাকায়ও শান্তি ফিরে আসে। রোম সম্রাট, যিনি সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এ অবস্থাদৃষ্টে স্বীয় অপবিত্র বাসনা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন।

    এই সাফল্যে হাজ্জাজের খ্যাতি দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। ইরাকে গোলযোগ দেখা দিলে ‘আবদুল মালিক হাজ্জাজকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান। ইরাকের গোলযোগ খুবই বিপজ্জনক রূপ পরিগ্রহ করেছিল। তাওয়াবীন (অনুতপ্ত ও অনুশোচনাকারী), যারা ইমাম হুসায়ন (রা)-কে কুফায় আহ্বান করে অগণিত শত্ৰু পরিবেষ্টিত অবস্থায় একাকী ছেড়ে গিয়েছিল—এখন তারাই বনু উমাইয়াদেরকে সিংহাসন চ্যুত করার উদ্দেশ্য নিয়ে শহীদ ইমামের হত্যাকারীদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের কৃত্রিম মহড়া দিচ্ছিল। তাওয়াবীনগণ হাজ্জাজের হাতে চরম মার খেয়ে ‘আবদুর রহমান বিন আশ’আছকে তাদের শিখণ্ডী নিযুক্ত করে সারা দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে থাকে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাদের এ হাঙ্গামা কঠোরভাবে দমন করেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম নানা প্রতিকূল অবস্থার ভেতরও আপন পিতৃব্যের সাথে থেকে অনেক কিছুই শেখেন। সে যুগে মুসলিম ফৌজ তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে রাখতেন। ফলে মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর খালাতো বোন হাজ্জাজের একমাত্র কন্যার সাথে শৈশব কাটান। তাদের দু’জনের শৈশব ও বাল্যের এই বন্ধুত্বই বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রেম ও ভালবাসায় পরিণত হয়। কূফার চতুর্দিকে শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হলেই হাজ্জাজের দৃষ্টি মুসলিম রাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে পড়ে। একদা ভারতের রাজা দাহির আরব বণিকদের বাণিজ্য কাফেলা লুট করে। হাজ্জাজ মাকরানের গভর্নর সাঈদ বিন আসলাম বিন যার‘আকে রাজা দাহিরের নিকট পাঠান যাতে বিষয়টির একটি নিষ্পত্তি করা যায়। কেননা সে সময় খুরাসানে মুসলিম ফৌজ জিহাদে মশগুল ছিল এবং হাজ্জাজ সেই চিন্তায় ছিলেন বিভোর। এদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিমও নিশ্চিন্ত ও নিরূপদ্রব জীবনে হাঁপিয়ে উঠেন। জিহাদের উদ্দেশ্যে খুরাসান, খাওয়ারিয্‌ম ও তুর্কিস্তান অভিমুখে রওয়ানা হন তখন মুহাম্মদ বিন কাসিমও এই খ্যাতিমান জেনারেলের সঙ্গী হন। সেখানে তিনি তাঁর মেধা, প্রতিভা, সাহসিকতা, বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের এমনই পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন যে, সেনাপতি কুতায়বা তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে স্বীয় সহকারী নিযুক্ত করেন।

    স্বীয় সহকারী হিসাবে ৯২ হিজরীতে কুতায়বা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে হাজ্জাজের নিকট একটি জরুরী পরামর্শের জন্য পাঠান। নিরাপদ ও শান্তি এলাকায় অগ্রাভিযান কোন দিক থেকে করা হবে—সে বিষয়ে হাজ্জাজ ও কুতায়বার মধ্যে ভিন্নমত সৃষ্টি হচ্ছিল বলে অনুমিত হয়। কুতায়বা এবং হাজ্জাজ বসরা থেকে রওয়ানার পূর্বে একটি পরিকল্পনার উপর ঐক্যমতে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিপাহসালার কুতায়বাকে নিজ যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে এতখানি প্রভাবিত করেন যে, তিনি তাঁর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। আর এই পরিবর্তনের কারণেই শত্রু পরাজিত হয়। কিন্তু হাজ্জাজ তাঁর অনুমতি ছাড়া পরিকল্পনা পরিবর্তন করায় কুতায়বার উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। তিনি কুতায়বার নিকট এ ব্যাপারে কৈফিয়ত তলব করেন। জবাবে কুতায়বা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে হাজ্জাজের কাছে পাঠিয়ে দেন—যাতে করে তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে এই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার পরিবর্তনের কারণগুলো সম্বন্ধে বুঝিয়ে বলতে পারেন এবং আরও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের ব্যাপারে অনুমতি চাইতে পারেন। কেননা সকলেই হাজ্জাজের কঠোরতার কারণে আতংকিত ছিল। কুতায়বা সমীচীন মনে করেন যে, এ ব্যাপারটি চাচা-ভাতিজা মিলিতভাবে নিষ্পত্তি করুন, অধিকন্তু হাজ্জাজ তাঁর ভাতিজার যোগ্যতা সম্পর্কেও অবহিত হোন। শেষ পর্যন্ত চাচা-ভাতিজার মোলাকাত খুবই মধুর ও চিত্তাকর্ষক হয়। চাচা ছিলেন আত্মগর্বী বিখ্যাত জেনারেল। এতদ্ভিন্ন তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে তাঁর শাগরিদ ও মকতবের ছাত্র ভেবেছিলেন। এদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিম তখনও ষোল-সতের বছর বয়সের তরুণ মাত্র। তবু তিনি অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী, অটুট মনোবল সম্পন্ন, শান্ত ও স্থির মস্তিষ্ক এবং যুক্তিবাদী বক্তা হিসাবে প্রমাণিত হন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মুহাম্মদ বিন কাসিমের সুদূরপ্রসারী প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজের পরাজয় স্বীকার করেন এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রস্তাব সমর্থন করে তাকে পুনরায় কুতায়বার কাছে পাঠিয়ে দেন এবং তাকে একটি চিঠিও দেন। ঐ চিঠিতে হাজ্জাজ কুতায়বাকে লিখেন যে, তিনি যেন মুহাম্মদ বিন কাসিমকে বসরায় ফেরত পাঠিয়ে দেন। কেননা ঠিক তখনই ‘উবায়দুল্লাহ্‌র—যাকে হাজ্জাজ রাজা দাহিরের নিকট পাঠিয়ে ছিলেন, তার হত্যার খবর কুফায় এসে পৌঁছে। সে সময় হাজ্জাজ মুহাম্মদ বিন কাসিমকে কুতায়বার নিকট পাঠাতে যাচ্ছিলেন। হাজ্জাজ তখন রাজা দাহিরকে পর্যুদস্ত করবার জন্য মুহাম্মদ বিন কাসিমকেই নির্বাচিত করে ফেলেন।

    প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার উপর আলোচনা-সমালোচনা হাজ্জাজের মনের উপর খুবই প্রভাব ফেলেছিল। তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের সম্পর্কে তাঁর শৈশবকাল থেকেই আশান্বিত ছিলেন বটে, তবে তাঁর ভেতর এই অতিরিক্ত উন্নতি লক্ষ্য করে তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন এবং খুবই আনন্দিত হন। কেননা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার যে স্বপ্ন তিনি এতদিন মনে মনে এঁকে রেখেছিলেন তার সত্যায়ন এভাবে দেখতে পান যে, একদিক থেকে কুতায়বা দুনিয়ার সর্বাধিক জনবহুল এলাকা চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, আর অন্য দিক দিয়ে তাঁর যুবক ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ বিন কাসিম জিহাদের পতাকা উড্ডীন করে ভারতবর্ষ পদানত করে কুতায়বার সাথে মিলিত হচ্ছে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম খাওয়ারি থেকে ফিরে এলে হাজ্জাজ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে খলীফার দরবারে পাঠান যাতে এই প্রতিশ্রুতিশীল সমরনায়ক আরব রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে সিন্ধুতে অভিযান পরিচালনার যৌক্তিকতা খোদ আমীরুল মু’মিনীনকে বুঝাবার সুযোগ পান।

    হাজ্জাজ খলীফাকে এও লিখে দিয়েছিলেন যে, আমীরুল-মু’মিনীন যত অর্থ বায়তুল মাল থেকে এই অভিযানের জন্য ইরাকের শাসনকর্তাকে কর্জস্বরূপ দেবেন—তার দ্বিগুণ অর্থ বায়তুল মালে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এমন সময় দামিশকে পৌঁছান যখন সেখানে যুদ্ধ ও খেলাধূলার বার্ষিক প্রতিযোগিতামূলক মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। মুহাম্মদ বিন কাসিম খলীফার দরবারে হাযির হন। হাজ্জাজের পত্র পাঠের পর খলীফা দীর্ঘক্ষণ ধরে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেন। অতঃপর তাঁকে সম্বোধন করে বলেন, “প্রথমে কিছু চিত্তাকর্ষক খেলাধুলায় অংশ গ্রহণ কর। আর যদি সাহস হয় তাহলে প্রতিযোগিতামূলক যুদ্ধে ও অবতরণ কর। এতে লোকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাতিজাকে দেখবার সুযোগ পাবে। আর তুমিও তোমার অশ্বারোহণের ক্ষিপ্রতা ও তলোয়ারবাজীর নৈপুণ্য দেখাতে পারবে।”

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এই আনুষ্ঠানিক ও সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অসন্তষ্ট হন। তাঁর অন্তরের লালিত আকাঙ্ক্ষা অন্তরেই থেকে গেল। কেননা খলীফা তখন পর্যন্ত সিন্ধুর উপর হামলা, তার গুরুত্ব ও সমর পরিকল্পনার উপর আলোচনা করার কোন সুযোগই তাকে দেন নি। দামিশকের কৃত্রিম যুদ্ধের আখড়ায় সুলায়মান বিন আবদুল মালিক তাঁর বন্ধু বান্ধব সহ উপস্থিত ছিলেন। সুলায়মান তাঁর মুসাহিবদের তলোয়ারবাজী, নেযাবাজী ও বর্শা লড়াইয়ের অপূর্ব দক্ষতায় খুবই গর্বিত ছিলেন। তাঁর আশা ছিল, ওয়ালীদ বিন ‘আবদুল মালিকের পর তিনি খলীফা হবেন, যদিও ওয়ালীদ তাঁর পুত্রকেই খলীফা বানাতে চাইতেন।

    সুলায়মানের দলবল আখড়ায় নেমে তাদের মুকাবিলায় অবতরণের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। যে-ই সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুকাবিলায় নামছিল সেই পরাজিত হ’চ্ছিল। সুলায়মানের বন্ধু-বান্ধব একের পর এক প্রতিযোগিতায় অবতরণ করছিল। কিন্তু খলীফা ঐ সব ক্রীড়াশৈলীতে খুশী হতে পারছিলেন না।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এ সব কিছুই নেহায়েত অধৈর্যের সঙ্গে অবলোকন করছিলেন। শেষাবধি তিনি ময়দানে সুলায়মানের ঐ তলোয়ারবাজের মুকাবিলায় এগিয়ে আসেন—যে উপর্যুপরি কয়েক বছর যাবত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হচ্ছিল এবং কেউই তার মুকাবিলায় এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছিল না। এ দুই প্রতিযোগীর মধ্যে ছিল আসমান-যমীনের ফারাক। সুলায়মানের মুসাহিব সর্বোত্তম অশ্ব, উন্নত মানের সমরাস্ত্র ও লৌহবর্মে সজ্জিত ছিল। এদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের ঘোড়া ছিল মামুলী ধরনের। আর তাঁর সাজ-সামানও সফরের কারণে জীর্ণ-শীর্ণ দেখাচ্ছিল। লোকেরা এই অখ্যাত নওজোয়ানকে আখড়ার সর্বাধিক অভিজ্ঞ যোদ্ধার মুকাবিলায় নামতে নিষেধ করে। যাই হোক, মুকাবিলা হ’ল এবং মুহাম্মদ বিন কাসিম তাতে জয়ী হলেন। তলোয়ার যুদ্ধের পর নেযাবাজীর মুকাবিলায়ও মুহাম্মদ বিন কাসিম অপরাজিত থাকেন।

    খলীফা সব কিছুই দেখছিলেন। সেখানেই তিনি মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে সিন্ধু গমনরত বাহিনীর সিপাহসালার নিযুক্তির ঘোষণা দেন। তিনি হাজ্জাজের পত্রটিও সজোরে পাঠ করবার নির্দেশ দেন এবং প্রকাশ্যে জিহাদ ঘোষণা করেন। খলীফা সন্ধ্যা-বেলা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে দরবারে ডেকে পাঠান এবং সে সুযোগে তাঁকে তাঁর চাচার (হাজ্জাজের) প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সকলের সামনে তুলে ধরার মওকা দেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম এ দায়িত্ব সুন্দর ও সুচারুরূপে পালন করেন। আমীরুল মু’মিনীন খুবই খুশী হন এবং তাঁকে খেলাত দ্বারা সম্মানিত করেন।

    দামিকশ্‌ক থেকে প্রায় দু’হাযার মুজাহিদ নিয়ে তিনি বসরা পৌঁছেন। বসরা পৌঁছুতেই তাঁর চাচা আপন কন্যাকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম এবার আপন বাহিনী তৈরীতে মনোনিবেশ করেন। এটা ছিল সেই সময় যখন ‘আবদুল মালিকের ফৌজ মিসর, সিরিয়া ও তুর্কিস্তানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ক্ষতচিহ্নও খুব একটা নিরাময় হয়ে ওঠেনি। এমতাবস্থায় মুজাহিদদের একত্রে সমাবেশ খুব একটা সহজ কাজ ছিল না।

    অতএব এই অতিরিক্ত অভিযান পাঠানো থেকে ‘আবদুল মালিকের সুদৃঢ় ইচ্ছা-শক্তি, ধীর-স্থির মিযাজ ও উন্নত মানের মনোবলের পরিচয় পাওয়া যায় এবং বোঝা যায়, নামকরা খলীফা কত সত্বর সমস্ত অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর কাবু জমিয়ে বাইরের অব্যাহত বিজয়ের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন এবং জিহাদের ন্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের স্পৃহাকে মুসলমানদের মধ্যে পুনরায় কিভাবে জাগিয়ে তুলেছিলেন।

    হাজ্জাজের অবদান কেবল উমাইয়া হুকূমতের জন্যই নয় যে, তিনি তাদের ভেঙে পড়া ফৌজকে ধসে যাওয়া ও বিবর্ণ হওয়ার হাত থেকে সজীব করে তুলে একটি বিশ্ববিজয়ী ফৌজে রূপান্তরিত করেছিলেন, বরং তাঁর অবদান গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্যও বটে যে, তিনি মুসলমানদের মধ্যে জিহাদী প্রেরণা ও উদ্দীপনাকে পুনরায় অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তিনি মুসলমানদেরকে দ্বিতীয়বারের মত একটি সুশৃঙ্খল জাতিগোষ্ঠীতে পরিণত করেন। এ অবস্থা সৃষ্টিতে কিছু কঠোর ও নির্মম ব্যবস্থা তিনি নেন। অবশ্য তাঁর এই কঠোর আচরণ সে ধরনেরই কঠোর ও নির্মম আচরণের ন্যায় যা কোন অচল অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে কিংবা ছেঁটে ফেলার মুহূর্তে একজন অভিজ্ঞ সার্জন করে থাকেন, এই উদ্দেশ্যে যেন অন্যান্য সুস্থ অঙ্গ-প্রতঙ্গে রোগ সংক্রামিত হতে না পারে এবং অসুস্থ রোগী রোগের হাত থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। সে যুগের অবস্থা সম্পর্কে ন্যায় ও ইনসাফের দৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে যে, তৎকালীন অবস্থার মুকাবিলা করে পরিস্থিতি আয়ত্তাধীনে আনবার জন্য কার্যকর কৌশল ও প্রয়াসের সঙ্গে জোর-যবরদস্তীরও দরকার ছিল।

    সে যাই হোক, মুহাম্মদ বিন কাসিম খুবই যোগ্য উস্তাদের কাছে সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন। এই সঙ্গে তিনি কোমল ও কঠোর ব্যবহারের উপকারিতা ও অপকারিতার সঠিক পরিমাপ করতেও শেখেন। এ দু’টি বিষয় তিনি কোন মাদ্রাসা কিংবা কোন মকতব থেকে শেখেননি বরং যুদ্ধক্ষেত্রে লাভ করে কর্মক্ষেত্রে তা পরীক্ষা করেন।

    এই অল্প বয়সেই তিনি নিজের উপর এতখানি আস্থাশীল ছিলেন যে, হাজ্জাজ ও কুতায়বার মত খ্যাতিমান অধিনায়কদের সামনে স্বীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সম্পৰ্কীয় মতামত অত্যন্ত নিৰ্ভীক ভাবে প্রকাশ করেন। তিনি চিন্তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, ভাষার ক্ষেত্রে নির্ভীক এবং দৈহিক ও শারীরিক দিক দিয়ে পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি বিলাসিতাকে পসন্দ করতেন না। সৈনিক জীবনের জন্য যে সব অভ্যাস ও স্বভাবের দরকার—তার সম্মান ও কদর বুঝতেন। হাজ্জাজের শিক্ষানবীশী করার ফলে তিনি ফৌজের শাসন-শৃংখলা, প্রশিক্ষণ, বিন্যাস এবং মূলনীতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

    অশ্বারোহণ, তলোয়ারবাজী, অপরিসীম ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, মনোবল, সাহসিকতা ও বীরত্বের ন্যায় মহামূল্যবান সম্পদের কিছু তো তাঁর প্রকৃতিগতই ছিল। অনুশীলন ও চর্চার ফলে সেগুলোর ঔজ্জ্বল্য আরো বৃদ্ধি পায়। ফলে একজন সর্বাধিনায়ক হওয়া তাঁর পক্ষে বিস্ময়কর কিছু ছিল না বরং এমনটিই হওয়াই তাঁর দরকার ছিল এবং তিনি তা হয়েও ছিলেন।

    সর্বাগ্রে মুহাম্মদ বিন কাসিমের যুগে সিন্ধুর অর্থাৎ রাজা দাহিরের এলাকার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বিবরণ পেশ করা প্রয়োজন মনে করছি। এতে আমরা ঐসব সমস্যা চিহ্নিত করতে পারব, এই মহান মুসলিম সিপাহসালার তাঁর প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক মূলনীতি, শাসন-শৃংখলা ও সমরশাস্ত্রের পন্থা-পদ্ধতি কার্যকর করতে গিয়ে যেগুলোর সম্মুখীন হয়ে ছিলেন এবং অত্যন্ত সাফল্যের সাথে তার সমাধানও করেছিলেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের পূর্বে ঐ এলাকা ছিল গ্রীক ও পারসিকদের অনুরাগ ও উচ্চাশার ক্রীড়াক্ষেত্র। ধাতব দ্রব্য, তলোয়ার, উত্তম মদ, উন্নত মানের কাপড়, স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত গহনা-পত্র প্রভৃতির ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঐ এলাকা সমগ্র এশিয়া ও য়ুরোপের মধ্যে বিখ্যাত ছিল। এই বাণিজ্য কেন্দ্রটি দখল করবার উদ্দেশ্যে আলেকজাণ্ডার ভারতবর্ষে আক্রমণ পরিচালনা করেন। কিন্তু তাঁর ফৌজ শতদ্রু নদী পার হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে অস্বীকার করে এবং তিনি সিন্ধুনদের পথ ধরে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ঐ সময় তিনি সিন্ধুনদের (মিহরান) পাড়ে একটি বন্দর গড়ে তোলেন এবং তার নাম রাখেন পাটাল।

    অনেক ঐতিহাসিক সিন্ধু সমেত ঐ এলাকাকে যা কেপমুন্‌ থেকে মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃত—মিহরান নামে অভিহিত করেন। শুধু সিন্ধু এলাকা থেকে নয় বরং গোটা ভারতবর্ষ থেকেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে খতম করে দিয়েছিল এবং এখান কার অধিকাংশ রাজার ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অবতরণের পূর্বে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং ব্রাহ্মণ্য শক্তি ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরকে সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে বহিষ্কার করতে শুরু করে। বৌদ্ধরা বর্মা, তিব্বত, সিন্ধু এবং পেশাওয়ারের দিকে স্থানান্তরিত হতে থাকে।

    যে যুগে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুর উপর হামলা করেন সে যুগে সিন্ধুর রাজা দাহির এবং তাঁর সহযোগী রাজন্যবর্গ ও অধিকাংশ সর্দার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। সিন্ধু, মুলতান প্রভৃতি এলাকার প্রজাবৃন্দও ছিল প্রধানত হিন্দু। অনেক বৌদ্ধও ছিল। তবে এদের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ব্যবহার ছিল খুবই খারাপ। অবশ্য সিন্ধুনদের পশ্চিম তীরের এলাকা— যা দাদু, জ্যাকবাবাদ, বেলুচিস্তান, মাকরান, খারান, লাসবেলা প্রভৃতি নামে পরিচিত, সেখানকার অধিকাংশ সহযোগী রাজন্যবর্গ ও প্রজাকুল ছিল বৌদ্ধধর্মের অনুসারী।

    বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী করদ রাজন্যবর্গের এবং প্রজাবৃন্দের অধিকাংশ‍ই ছিল জাট ও মিও জাতিগোষ্ঠিভুক্ত। ব্রাহ্মণ্যকুল এদেরকে জাতি হিসেবে ব্রাহ্মণ ও রাজপুতদের তুলনায় নীচু শ্রেণীর মনে করত। জাট ও মিও জাতি খুবই বীর ও যুদ্ধবাজ ছিল। এরাই আলেকজাণ্ডারকে বিব্রত ও ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল এবং এরাই প্রথমে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সর্বাধিক বিরোধী ছিল। অবশ্য পরবর্তীকালে তারা সহযোগীর ভূমিকা গ্রহণ করে। এই জাটেরাই সুলতান মাহমুদ গযনবীকে সোমনাথ থেকে ফিরবার পথে বেশ খানিকটা বিব্রত করেছিল। এদের এই অপকর্মের শাস্তি দানের জন্যই মূলত পরবর্তী বছরই তাঁকে পুনরায় সিন্ধুর উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে হয়।

    এ যুগের কিছু আগে ইরানের সাসানী হুকুমত দুর্বল হতেই তারা বিভিন্ন রাজন্যবর্গের নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয় এবং সে সময়ই সাসানী বংশের শাহযাদা বাহরাম গোরের বিয়ে জনৈকা হিন্দু রাজকুমারীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। এ ভাবেই সে দেশে গোদরহন বংশের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বলা হয় যে, বাহমনাবাদ এই বংশেরই আবাদকৃত শহর। ইরানী ও ভারতীয়দের মধ্যকার এই ঐক্য ২২৬ ঈসায়ী থেকে ৬৫০ ঈসায়ী পর্যন্ত খুবই নিবিড় ছিল।

    ৬২০ ঈসায়ীতে সিন্ধু এলাকার রাজা ছিলেন রায়সহিংস। রাজা রায় চাচ নামীয় একজন ব্রাহ্মণকে তাঁর পরামর্শদাতা নিযুক্ত করেন। চাচ সায়িজ নামক জনৈক গরীব ব্রাহ্মণের সন্তান ছিলেন। তিনি (চাচ) ছিলেন খুবই সুপুরুষ, ধী-শক্তিসম্পন্ন ও যোগ্য। ৬৩০ ঈসায়ীতে রাজা রায়-এর মৃত্যু হলে তাঁর তরুণী সুন্দরী বিধবা স্ত্রী রাণী শুদ্ধানী চাচের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। অতঃপর চাচ নিজেকে সিন্ধুর রাজা বলে ঘোষণা করেন। চিতোরে সে সময় রাজা মহতরাজ রাজত্ব করছিলেন। তিনি ছিলেন রাজা রায়ের ভাই। স্বাভাবিকভাবেই চাচের রাজা হওয়া এবং তাঁর মৃত ভাই-এর বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করা মহতরাজের বিরক্তি উৎপাদন করে। তিনি রাজা চাচের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা করেন। কিন্তু যুদ্ধে রাজা মহত মারা যান এবং পরিণামে রাজা চাচ রাজা হিসেবে ৪০ বছর যাবত অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে রাজ্য শাসন করেন। তাঁর সাম্রাজ্য বিপাশা নদীর তীর ধরে বাবীহ, মুলতান, সিন্ধু প্রভৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

    ৬৭০ ঈসায়ীতে রাজা চাচের মৃত্যু হলে তদস্থলে তাঁর ভাই চন্দ্ৰ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৬৭৮ ঈসায়ীতে রাজা চন্দ্র মারা গেলে চাচের কনিষ্ঠ পুত্র দাহির সিংহাসনে উপবেশন করেন। দাহির রাজা হয়েই জ্যোতিষীদের নির্দেশ মুতাবিক আপন বোনকে বিয়ে করেন। রাজার এই নৈতিকতা বিরোধী কর্মে তাঁর প্রজাকুল খুবই ক্ষুব্ধ হয়; কিন্তু রাজার ভয়ে নীরব থাকে।

    রাজা দাহিরের করদ রাজ্যসমূহ

    রাজা দাহিরের অধীনে নিম্নোক্ত করদ রাজ্যসমূহ ছিল :

    রাজন্যবর্গের নাম রাজধানী
    রাজা জাহীম বুদ্ধ দেবল
    রাজা সুমানা নীরূনকোট
    রাজা বিজওয়া (রাজা চন্দ্রের পুত্র) সহওয়ান
    লৌহানা সম্প্রদায়ের রাজা বাহমনাবাদ
    বুদ্ধ (রাজা দাহিরের পুত্র) সিবী

    রাজা দাহিরের রাজধানী ছিল আলোর।

    বিখ্যাত কেল্লা

    আওজ, মিথিলো, হ্রদ, সোরাই, দেবল, নীরূন, সিবী, বাহমনাবাদ, বেলা, স্কালিন্দার ও মুলতান।

    সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ

    রাজা দাহিরের সাম্রাজ্য নিম্নোক্ত প্রদেশগুলোতে বিভক্ত ছিল :

    (১) আরোর : (আলোর) সিন্ধু এবং হিন্দের রাজধানী।

    (২) সুস্তান : বুদ্ধিয়া, ঝানকান, কোহিস্তান, রেজিয়ান (সিবী অথবা সিব্বী), সীমান্ত মাকরান।

    (৩) কারওয়ান : কায়কান (কালাত), হাস, তুরান।

    (৪) ব্রাহ্মণাবাদ : দেবল, নীরূন, লোহানা, মুখ্যাপত, সুমানা।

    (৫) স্কালিন্দা : চাচপুর, সুওয়ারিয়া, জাজপুর, ডোহিস্ত, বাবীনা।

    (৬) মুলতান : ব্রহ্মাপুর, ইশতিহার ও কুম্ভ, দক্ষিণ কাশ্মীর, সুখাকুৰ্দ।

    প্রাকৃতিক বিভাগ

    প্রাকৃতিক দিক দিয়ে রাজা দাহিরের সাম্রাজ্য নিম্নোক্ত ভাগে বিভক্ত ছিল :

    ১. উত্তর এলাকা : বর্তমান বেলুচিস্তান এবং (বেলুচিস্তানী ইউনিয়ন) যা নদী তীর থেকে উঁচু। এটি পার্বত্য এলাকা; এ এলাকায় শীতকালে প্রচণ্ড শীত পড়ে। এ এলাকায় প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা রয়েছে। তবে পানীয় জলের পরিমাণ খুব কম। বেশীর ভাগ এলাকা ঊষর ও বসতিহীন। সে যুগে পাহাড় খুব ঘন ঝোপঝাড় ও বৃক্ষপূর্ণ ছিল।

    ২. মধ্য এলাকা : সেই অংশ যাকে সিন্ধুনদ উর্বরতা দান করে। সিন্ধুনদের কিছু অংশকে মেহরান এবং কিছু অংশকে বুঘ বলা হ’ত। এখানে পানি প্রচুর জমি খুবই উর্বর ও শস্য-শ্যামল।

    যখন নদীতে প্লাবন আসত তখন ঐ প্লাবনের পানি দ্বারা প্রচুর পরিমাণে গম, জোয়ার, পন্না ইত্যাদি উৎপন্ন হ’ত। অবশ্য মশার উপদ্রবের কারণে এখানে জ্বরের প্রকোপ ছিল বেশী।

    ৩. মরু এলাকা অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা : এখানে ও পানির স্বল্পতা ছিল। কুয়ার পানিও ছিল লবণাক্ত। এটা ছিল আরবের মরু এলাকার অনুরূপ।

    ৪. সিন্ধুনদের নিকট তীরবর্তী সেই অংশ যা চড়াই পূর্ণ ছিল : এটা ছিল লালাজ নামে পরিচিত। আজকাল এ অংশের বিখ্যাত শহর লারকানা, দাদু প্রভৃতি। এ এলাকা খুবই উর্বর ও শস্য-শ্যামল ছিল। তবে আবহাওয়া ছিল খুবই আৰ্দ্ৰ। এসব মানুষ ও জীব-জানোয়ার উভয়ের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে আরবদের জন্য ছিল খুবই কষ্টকর। কেননা আরবরা ছিল মরু এলাকার বাসিন্দা। আর মরু এলাকার আবহাওয়া সাধারণত শুষ্ক হয়ে থাকে।

    আরবদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সিন্ধুর বাণিজ্য শহর

    আরব সিপাহীরা সিন্ধুর নানাবিধ ধাতব পদার্থ, তলোয়ার, কাপড়, কর্পূর, তেল, নীল, নারকেল, খাদ্য-দ্রব্য, খেজুর, ইক্ষু, আম, কয়লা, গম, লেবু ও চাউলের খুবই প্রশংসা করেছেন।

    সিন্ধুর সেই এলাকা যাকে আজকাল কাশমূর বলে, জ্যাকবাবাদের একটি তহসীল ছিল। এখানকার চামড়া শিল্প ছিল খুবই বিখ্যাত। এই এলাকা তখন বুদ্ধিয়া নামে পরিচিত ছিল। কাযাওয়ার (খফদার কালাতে অবস্থিত) ছিল তুরানের রাজধানী এবং আঙ্গুর, আনারস, সেব, নাশপাতি ইত্যাদি ফলের জন্য খুব বিখ্যাত ছিল। অবশ্য কাযাওয়ারের পানি সম্পর্কে আরবদের অভিযোগ ছিল যে, এই পানি পান করলে দেহ ফুলে যায়। এ শহর খোরাসান ও বসরার পথের সংযোগ স্থলে হবার কারণে একটি প্রসিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

    মাহমূদ গযনবী এই রাজ্যকে ভারতবর্ষ আক্রমণের পথে প্রতিবন্ধক জেনে একেবারে ধ্বংস করে দেন যাতে করে শত্রুর বিপদাশঙ্কা চিরদিনের তরে তিরোহিত হয়ে যায়। এখন এ শহর আবার গুরুত্ব লাভ করছে। কেননা এর আশেপাশে খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

    ইরাক ও সিন্ধুর মধ্যবর্তী শাহী সড়ক

    স্থলপথ— (১) ইরাক থেকে কিরমান, কসর কন্দ, পহলপুর, আস্কা, ওয়ার্কা, পন্ধগোর, (একে ফেজপুর এবং ভাজপুর নামেও ডাকা হয়), কীযকান (কালাত)—এখান থেকে কোয়েটার পথে কান্দাহার, অতঃপর দেবল। (২) কমরকুন্দ : কীয মাকরানের রাজধানী (কীয মাকরান—কীযে কিওয়ান)।

    নৌপথ— বাগদাদ থেকে বস্‌রা, খার্ক উপদ্বীপ, লাওয়ান, চিনান, হরমুয, নারা, দেবল।

    বিভিন্ন প্রকার জীব-জানোয়ার

    ইরান প্রভৃতি দেশের সঙ্গে এই রাজ্যের ব্যবসায়-বাণিজ্য ছিল। এখানে দুই কুঁজওয়ালা উটের খুব চাহিদা ছিল। কৃষকেরা খুব আগ্রহ ভরে পরিশ্রম ও যত্ন সহকারে বহুল পরিমাণে তা পালতো। সিন্ধুর বাসিন্দারা আরবী ঘোড়া নিয়ে এসে নিজেদের দেশে উত্তম জাতের ঘোড়া পয়দা করত। এখানকার গাভী এবং মহিষও খুব প্রসিদ্ধ ছিল। ইরান, সিরিয়া ও ইরাকে এর খুব চাহিদা ছিল।

    এ-ব্যবসায় ছিল জার্ট ও মিওদের হাতে। মুহাম্মদ বিন কাসিম জাট অধিবাসীদের একটি অংশকে কিরমান ও বসরায় জীব-জানোয়ারের বংশ বৃদ্ধির জন্য পাঠিয়ে দেন। তারা সেখানে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানেও তাদের বংশধর সেখানেই বাস করছে। এজন্য এই এলাকায় বোঝা বহনের উত্তম জাতের পশু আজও অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়।

    মৌসুমী আবহাওয়া

    আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, পাহাড়ী অর্থাৎ উত্তর এলাকায় শীতকালে মৌসুম শুষ্ক এবং খুবই ঠাণ্ডা হ’ত। এই মৌসুমে সাধারণত বরফপাত ও বৃষ্টি হয়ে থাকে। মাকরান ও বেলার প্রান্তর এলাকা খুবই শুষ্ক এবং গ্রীষ্ম মৌসুমে খুবই গরম। এখানে দিনের বেলা সফর করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

    সিন্ধু উপত্যকায় শীত মৌসুমে ঠাণ্ডা পড়ে। কিন্তু এতটা নয়, যতটা হলে খারাপ লাগতে পারে। তথাপিও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিম্ন এলাকায় মৌসুম খুবই গরম ও আর্দ্র থাকে। বর্ষাকালের পশুর মধ্যে এক ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। একে আজকাল ‘সারা’ বলা হয়। এ রোগ খুবই ধ্বংসাত্মক। মানুষও অধিকাংশ সময় জ্বর-জ্বালা ও আমাশয় রোগে আক্রান্ত হয়।

    ভারতীয় ফৌজে সমরাস্ত্র

    সিন্ধী ফৌজের নিকট উন্নত ধরনের তলোয়ার ছিল। তীর, ধনুক, বর্শা, ভালা এবং ঢাল ছাড়াও প্রায় সমস্ত সৈনিকের নিকটই সাধারণত লৌহ বর্ম থাকত। সিন্ধুতে রথের প্রচলন ছিল। অসংখ্য স্যাঁতসেঁতে নদী-নালা থাকার কারণে ফৌজে হাতীর সংখ্যা ছিল প্রচুর। এসব হাতীকে আক্রমণ ও দুর্গ ভেঙে ফেলার কাজে ব্যবহার করা হ’ত।

    সিন্ধী অশ্বারোহী বাহিনীর কাছে সাধারণত তলোয়ার ও খঞ্জর থাকত। নেযা কিংবা বল্লমের রেওয়াজ খুব কম ছিল। আরোহী বাহিনী ঘোড়া কিংবা হাতীর পিঠে আরোহণ করত।

    ভারতীয় সৈনিক

    ভারতীয় সৈনিকরা আত্মোৎসর্গী ও নির্ভীক হ’ত। কিন্তু দুর্বল ও অযোগ্য সিপাহসালারের কারণে তাদের এই সাহসিকতা, বীরত্ব ও আত্মোৎসর্গের প্রেরণা অনেক সময় ভীষণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াত।

    ভারতীয় সিপাহসালার

    ভারতীয় সিপাহসালাররা বিলাসী ও আরামপ্রিয় ছিল। অবশ্য স্বীয় মর্যাদা রক্ষার্থে জীবনের বাজী ধরাকে তাঁরা নিজ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত মনে করত। সেনাপতির পদ সাধারণত শাহী প্রভাব ও সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল ছিল। এ ধরনের অধিনায়কের সামরিক যোগ্যতা ছিল খুবই নীচু মানের।

    প্রতিরক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি

    নিজেদের দুর্গের মযবুতী, রসদ-সম্ভার ও সমরাস্ত্রের প্রাচুর্যের কারণে ভারতীয় সেনারা খুবই অহংকারী ছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষিপ্রতা, বিদ্যুৎবেগে হামলা এবং কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই অগ্রাভিযান পরিচালনা ইত্যদি জাতীয় সমস্যা নিয়ে তারা কখনো গভীরভাবে মাথা ঘামায় নি। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এই যে, যেহেতু আমরা কেল্লার মধ্যে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ হয়ে বসে থাকতে পারি, তাই আক্রমণকারীরা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে একদিন না একদিন পালিয়ে যাবেই।

    হামলা

    ঐসব কেল্লার ভিতরে অবস্থান করে তারা শত্রুর উপর চরকীর সাহায্যে পাথর নিক্ষেপ ও রেণ্ডীর তেলে ভেজা জ্বলন্ত মশাল ছুড়ে মারত। এ ধরনের অন্যান্য পন্থায়ও তারা হামলাকারীদের উপর অগ্নিবৃষ্টি বর্ষণ করত।

    সিন্ধীরা হাতীর সাহায্যেও শত্রুর উপর আক্রমণ করতে জানত। হাতীগুলোকে লৌহ-বর্ম দিয়ে সুরক্ষিত করা হ’ত। হাতীর শুড়ের সঙ্গে দু’দিক দিয়ে তলোয়ার বেঁধে দেওয়া হ’ত এবং হাতী শুড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আক্রমণ করে শত্রু ব্যুহ তছনছ করে ফেলত। এমনি ধরনের দু’ধারী তলোয়ারকে ‘কর্ণেল’ নামে অভিহিত করা হ’ত। এসব হাতীর শুড়কে সাধারণত রেশমী গেলাফ দ্বারা আচ্ছাদিত করে শত্রুর তলোয়ারের কোপ থেকে রক্ষা করা হ’ত।

    প্রতিটি হাতীর সঙ্গে প্রায় ৫০০ পদাতিক ও আরোহী সৈনিক মোতয়েন করা হ’ত। হাতী শত্রু ব্যুহে ঢুকে পড়ে বিশৃংখলা সৃষ্টি করত এবং সৈনিকরা শত্রুর উপর তলোয়ার নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তাদের কচু কাটা করে ছাড়ত।

    প্রায় এমনি ধরনের পন্থা পাশ্চাত্যের দেশগুলো বিশ্বযুদ্ধে অবলম্বন করে ছিল। অর্থাৎ ট্যাংকের আড়ালে ও ছত্র ছায়ায় তাদের পদাতিক বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ত।

    সিন্ধী ফৌজ

    লড়াইয়ের মুহূর্তে বিভিন্ন সর্দার এবং রাজা নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে জমায়েত হ’ত। প্রকৃতপক্ষে এই ফৌজ সামগ্রিকভাবে সুসংহত, সুশৃংখল ও একাত্ম হতে পারত না। কেননা প্রতিটি সেনাবাহিনীতেই অশ্বারোহী বাহিনী, উষ্ট্রারোহী বাহিনী, হস্তী বাহিনী, পদাতিক সৈন্য থাকত যারা ছোট ছোট কোম্পানী ও ব্যাটেলিয়ানে বিভক্ত হয়ে লড়ত। অধিকাংশ সময় এমনও হয়েছে যে, ভারতীয় ফৌজে সাকুল্যে ২০ হাজার ঘোড় সওয়ার, ২০ হাজার উষ্ট্রারোহী, পাঁচশ’র মত হাতী এবং ৫০ হাজারের মত পদতিক বাহিনী থাকত, কিন্তু এরা ছোট ছোট গ্রুপে নিজ নিজ সর্দারের অধীনে বিভক্ত থাকার কারণে চরম মুহূর্তে পরস্পর থেকে ছিটকিয়ে পড়ত। রাজা দাহিরও এ ভুল করেছিলেন। তিনি তাঁর ফৌজকে সমবেত করতে চেষ্টা করেননি। এ ভুলের পরিণতি ও ফলাফল কি হয়েছিল তা আমরা যুদ্ধের ঘটনাবলীতে দেখব। এখানে আমরা বলতে চাই যে, শাসন-শৃংখলা, ব্যবস্থাপনা, বিন্যাস, প্রশিক্ষণ, চলাচল ও গতিবিধির যোগ্যতাকে যে অধিনায়ক সঠিকভাবে ব্যবহার করেন তিনি হামেশাই সফল হন।

    এটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে, রাজা দাহির নদী পথে নৌ-মাধ্যম ব্যবহার করেন নি। তিনি সিন্ধুনদের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশকে পরস্পরের সঙ্গে মেলাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, বরং তাঁর রাজধানীকেও সিন্ধুনদের দুটি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত করে রেখেছিলেন।

    ফারুকী (রা) খিলাফত আমলে সিন্ধু এলাকার গোয়েন্দা রিপোর্ট

    “সেখানকার পানি অগভীর, ফল বিস্বাদ এবং চোরেরা সাহসী ও বীর পুরুষ। ফৌজ যদি কম হয় তাহলে নষ্ট হয়ে যাবে আর বেশী হলে না খেয়ে মারা যাবে।”

    হযরত ‘উছমান (রা)-এর খিলাফত যুগে জনৈক আরববাসীর একটি পত্র:

    “আরে! তুমি মাকরান যাবে কি নিয়ে আসবার জন্য? সেখানে আছেই বা-কি! এটা এমন জায়গা যেখানে না যুদ্ধের মজা আছে, না আছে ব্যবসা-বাণিজ্যের। ওখানকার লোক ক্ষুধার্ত, আর অল্প-স্বল্প যা কিছু স্থান (সেনাছাউনী) আছে তা খুবই বিপজ্জনক।”

    রাজা দাহিরের রাজ্যের কতিপয় মশহূর শহর

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের হামলার গুরুত্ব উপলব্ধি করবার জন্য সে সব শহরের সাথে পরিচিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন যে সব শহর তখনো ছিল এবং যে-গুলোর কিছু কিছু এখনো বিদ্যমান আছে।

    ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এ অভিযান খুবই গুরুত্বের দাবীদার। আরবরা এ এলাকার উপর তিন শ’ বছরেরও অধিক কাল শাসন-কর্তৃত্ব চালায় এবং এ এলাকাকে ইসলামী রঙে এমনভাবে রঞ্জিত করে যে, তার প্রভাব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও অত্যন্ত সন্তোষজনক রূপে বিদ্যমান ছিল। মুহাম্মাদ বিন কাসিমের অভিযানের পর উক্ত এলাকার ইতিহাস অধ্যয়ন থেকে প্রমাণিত হয়, ‘ইসলাম তলোয়ারের জোরে বিস্তার লাভ করেছে’ শত্রুদের এ প্রচার-প্রোপাগাণ্ডা কত ভ্ৰান্ত ও ভিত্তিহীন। মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের হামলার সামনে ব্রাহ্মণদের জাতিভেদ প্রথা এবং অস্পৃশ্যদের সাথে তাদের নির্যাতনমূলক ব্যবহারের খারাপ দিকগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং ভারতীয় জাতিগোষ্ঠি দেখতে পায় উদারতা, সহিষ্ণুতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ঈমানদারী কাকে বলে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম বসরা থেকে সিন্ধু অভিমুখে রওয়ানা হন। বসরা ছিল ইরানের শাসনকর্তার রাজধানী। বর্তমানেও এটি ইরাকের একটি মশহূর শহর। পথিমধ্যে এরপর শীরায পড়ে। এটি তেজারতী কাফেলার বিখ্যাত কেন্দ্র এবং ইরানে অবস্থিত। বর্তমানেও এর গুরুত্ব যথেষ্ট, তবে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে এখন খুব বেশী প্রসিদ্ধ নয়। এখান থেকে রাজা দাহিরের রাজ্যের সীমারেখা শুরু হয়।

    ১. ফীরোযপুর

    ফীরোযপুর বা ভাজপুর যাকে আজকাল “পাঞ্জুগোর” বলা হয়—বর্তমানে মাকরান রাজ্যের রাজধানী। পায়ে চলা কাফেলা আজও এই রাস্তা দিয়ে মাকরান থেকে খেজুর নিয়ে আসে। শহরের আবহাওয়া বাকী এলাকার চেয়ে মাঝামাঝি রকমের এবং বেশ আরামদায়ক।

    ২. আরমল

    সম্ভবত ইহা সেই শহর যা আজকাল দীবেজী নামে পরিচিত। কোন কোন ঐতিহাসিকের ধারণা, মুহাম্মদ বিন কাসিম এখান দিয়েই নদী পার হয়েছিলেন এবং এই রাস্তা ধরেই আজকাল পায়ে চলা কাফেলা কালাত ও কোয়েটা গমন করে। এ রাস্তা দিয়েই আজকাল পশম, দুম্বা ও বকরী সাবেক বেলুচিস্তান থেকে আসে।

    ৩. দেবল

    রাজা দাহিরের আমলে এ শহর ছিল একটি বিখ্যাত বন্দর নগরী। অনুমান করা হয় যে, সেখানে আজকাল ‘ঘারো1’ নামে একটি ছোট পল্লী বিদ্যমান এবং ১৯৪৭ ঈসায়ীর পূর্বে এখানে যথেষ্ট পণ্য-সামগ্রী সমুদ্র পথে ইরান ও বাহরাইন থেকে আমদানী-রফতানী হ’ত। এখানকার হিন্দু বণিকেরা খুব ধনী ছিল। এখন আর এ শহরের অস্তিত্ব নেই।

    ঘারোর ব্যাপারে অনুমান এ জন্য যে, ঐতিহাসিকেরা একে কুম্ভ নদীর নিকটবর্তী লিখেছেন এবং এ নদীকে সিন্ধুনদের শাখা বলেছেন। বর্তমানে এটি হায়দারাবাদের দক্ষিণ দিকে ৭৫-৮০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। এখানে রাজা দাহিরের যুগেও বেশীর ভাগ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী বণিক অবস্থান করত। এ নদী শত শত বছর ধরে নদী বাহিত পলিমাটির দ্বারা ভরাট হয়ে গেছে।

    8. নীরূন

    এখানে একটি মযবুত দুর্গ ছিল। এটা ছিল রাজা সুমানার রাজধানী। এ দুর্গ নদী পথে এবং সুস্তান, তুরান এবং মাকরানের স্থল পথে হবার কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দাদু এবং দুহালিয়া ছিল এর নিকটবর্তী কেল্লাঘেরা শহর। এখানকার রাজাসহ অধিকাংশ অধিবাসীই ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

    ৫. সহওয়ান অথবা জীবন

    এটা রাজা চন্দ্রের পুত্র রাজা বজ্রের রাজধানী ছিল। এ শহর রাজা দাহিরের চাচা তাঁর পুত্রকে এ-জন্য দিয়েছিলেন যাতে সে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এলাকার করদ রাজাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে রাখে। কিন্তু এখানকার বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী অধিবাসীরা বজ্ৰ ও তার ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট ছিল।

    তাই যুদ্ধ কালে তারা সঙ্গত কারণেই তাদের রাজার সঙ্গে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়নি। মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন ইসলামী মূলনীতি অনুযায়ী তাদের উপাসনালয়ের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করেন এবং তাদের ধর্মীয় পুরোহিতদের সাথে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেন তখন আশেপাশের বাসিন্দারা স্বতস্ফূর্তভাবে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে এবং তাঁর অগ্রাভিযানেও সহায়তা প্রদান করে।

    ৬. সহওয়ান

    যদি আমরা কোটরী থেকে কোয়েটার দিকে রেলপথে যাই তাহলে এ শহর পথে পড়বে। আজকাল এটি সিন্ধুর দাদু জেলায় অবস্থিত। মুহাম্মদ বিন কাসিমের হামলার সময় কুম্ভনদী এ শহর থেকে ১০ মাইল দূরত্বে ছিল। আজকাল এখানে একটি রেলওয়ে স্টেশন আছে।

    ৭. সীম অথবা সিব্বী

    আজকাল এটা সিব্বী নামে পরিচিত। কচ্ছ নদীর একটি শাখার উপর ছিল এর অবস্থান। রাজা কাকার পুত্র বুদ্ধ এখানকার করদ রাজা ছিলেন। এটি বুদ্ধিয়া এলাকার কেন্দ্র ছিল। আজকাল শীত মৌসুমে বেলুচিস্তানের রাজধানী এখানে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে।

    ৮. সিবী

    সিবী থেকে মুহাম্মদ বিন কাসিম তন্দাবীল, ইশহার, জাহ্‌ম এবং কোটালের শহরগুলো জয় করতে করতে ঠাঠ গিয়ে পৌঁছেন। ঠাঠকে আজকাল ঠাঠ্‌টা বলা হয়। এ শহর পরবর্তীকালে (মুসলিম শাসকদের আমলে) রাজধানীও ছিল। এখানে আবিষ্কৃত বহু বিখ্যাত ধ্বংসাবশেষ এর ঐতিহ্যমণ্ডিত অতীতের সাক্ষ্য দিচ্ছে।

    ৯. সাকেরাহ

    আজকাল মীরপুর সাকরো নামে পরিচিত। এখানে বহুদিন পর্যন্ত মুহাম্মদ বিন কাসিমের ছাউনী ছিল। এর নিকট দিয়েই মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুনদ পার হয়েছিলেন। এ এলাকা খুবই উর্বর।

    ১০. ভেট

    সিন্ধু নদের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি খুব উর্বর ও জনবহুল এলাকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনুর্বর ও ঊষর এলাকায় পরিণত হয়েছে।

    ১১. নারানী অথবা নারায়ণ

    এর অবস্থান সম্ভবত নওয়াব শাহ ও খায়েরপূরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল। গোরী, ওয়াহ অথবা জয়পুরও এই অঞ্চলেই কোথাও ছিল।

    ১২. রাওর, আরোর বা আলোর

    রাজা দাহিরের রাজধানী ছিল। অনুমানের উপর ভিত্তি করে একে রোহড়ীও বলা যেতে পারে। রাজা দাহিরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ফেনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। এ শহরের আলোচনা আমরা আগামীতে করব।

    ১৩. সুকরালীদ

    মেদ-এর পুল; আজকাল শুক্কুর নামে পরিচিত। শুক্কুরের পুল বর্তমানেও প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঈসায়ী ৭১২ সনের জুন মাসে মুহাম্মদ বিন কাসিম এই পুল দিয়ে সিন্ধুনদ পার হয়েছিলেন।

    ১8. বাহারো

    এর অবস্থান এখন অজানা। সে যুগের বিখ্যাত শহর এবং কেল্লা ছিল। দহলীলা ও কেল্লাবন্দ একটি বিখ্যাত শহর ছিল।

    ১৫. বাহ্মনাবাদ অথবা বাহমনওয়া

    লোহানা সম্প্রদায়ের রাজার রাজধানী। সম্ভবত বর্তমান নারা নদীর তীরে ছিল এর অবস্থান। মীর খাসের নিকটে কোথাও এই বসতি থাকা সম্ভব। প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এ শহর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা কাথিয়াওয়াড় এবং গুজরাটের প্রান্তর পথে এ শহর ছিল তত্ত্বাবধায়ক। এ গুরুত্ব বর্তমানে মীরপুর খাস লাভ করেছে।

    ১৬. বাহরা

    বাহরার দিকে মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন পুনরায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন ৯ই অক্টোবর, ৭১২ ঈসায়ীতে পার্শ্ববর্তী এলাকার মিঠাল, সুমাসনও, লোহানা সুইটাসের বাশিন্দারা নিজেরা স্বতঃস্ফুর্তভাবেই তাঁর অধীনতা স্বীকার করে নেয়।

    ১৭. স্কালিন্দাহ

    মুলতানের রাস্তায় একটি মশহূর কেল্লা ছিল।

    ১৮. মুলতান

    এটি একটি বিরাট প্রদেশের রাজধানী ছিল। মুহাম্মদ বিন কাসিম এখানে বিরাট পরিমাণ গুপ্তধন পান। মুলতানের নিকট শিখা নামে একটি বিরাট কেল্লা ছিল। আজকাল মুলতান একটি বিরাট বড় শহর।

    ১৯. বাবিয়া

    মুলতান থেকে মুহাম্মদ বিন কাসিম বিপাশা নদীর তীরে অবস্থিত বাবিয়ার দিকে অগ্রসর হন এবং ফিরবার পথে ভীলম্যান অর্থাৎ গুজরাটের কাথিয়াওয়াড়-এর দিকে যান।

  • সিন্ধুর উপর হামলার কারণ

    সিন্ধুর উপর হামলার কারণ

    বোম্বাই সমুদ্রোপকূলে হামলা

    ১৫ হিজরীতে ‘উছমান বিন ‘আস কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। আরব বণিকেরা বোম্বাই-এর বন্দর গানখানায় এবং সিন্ধুর অন্তর্গত দেবলে বাণিজ্য উপলক্ষ্যে যেত। কিছু সংখ্যক দস্যু ও লুটেরা কয়েকবার এসব বণিকদের মালপত্র লুট করে। এদেরকে শায়েস্তা করবার জন্য শেষ পর্যন্ত ‘উছমান ইব্‌ন ‘আসকে একটি নৌ-বহর দিয়ে পাঠান হয়। ঐ অভিযানে নৌ-বহরের জীবন কিংবা সম্পদের কোন ক্ষতি হয়নি, তবুও হযরত ওমর (রা)-এর বিনা অনুমতিতে তা পাঠাবার কারণে ‘উছমানকে কৈফিয়তের সম্মুখীন হতে হয়। হযরত ওমর (রা) নৌ-অভিযানের বিরোধী ছিলেন।

    ভারতবর্ষের উপর হামলা

    ২২ হিজরীতে মুসলিম মুজাহিদবৃন্দ ইরান জয় করে আরও সম্মুখে অগ্রসর হন এবং মাকরান, কিরমান ও সুস্তানের সীমান্তরেখা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেন।

    মাকরানের শাসনকর্তা সিন্ধুর রাজার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। এতদসত্ত্বেও মুসলিম সেনাপতি ইবনে ‘আমের সম্মিলিত শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেন। ইবনে ‘আমের এসব যুদ্ধের বিবরণ দরবারে খেলাফত পাঠিয়ে দেন। এতে তিনি ঐ এলাকা সম্পর্কে লিখেন, “এই পাহাড়ী ও ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় বিরাট সেনাদল চলাফেরা করতে পারে না। এখানে পানীয় জল ও রসদ- সামগ্রীরও দারুণ অভাব।” এই প্রেক্ষিতে হযরত ওমর (রা) মুজাহিদদের অগ্রাভিযান বন্ধ করে দেন।

    ৪৪ হিজরীত মুহাল্লাব বিন আবী সফরা কাবুলের রাস্তা দিয়ে খায়বার গিরিপথ জয় করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য মুসলিম ফৌজের বিজয়ের দরজা খুলে দেন। বলা হয় যে, ফিরবার পথে মুসলিম ফৌজ কায়কান (কালাত) এবং কান্দাবীল (কান্দাহার), যাকে গান্দারীও বলা হ’ত, বিধ্বস্থ ও পদানত করে।

    সিন্ধু আক্রমণের কারণ

    ৭৫ হিজরীতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছাকাফী বসরার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি সাঈদ বিন আসলাম বিন যুর’আকে মাকরান সন্নিহিত এলাকার শাসক নিযুক্ত করেন। এ-এলাকার বনী আসার কবীলার সর্দার মুহাম্মদ আলাফী বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সাঈদ সঙ্গে সঙ্গে উক্ত বিদ্রোহ দমন করেন। কিন্তু মুহাম্মদ আলাফী তার বহু সৈন্য-সামন্তসহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং রাজা দাহিরের আশ্রয়াধীনে বসতি স্থাপন করেন। এখান থেকে তিনি উপর্যুপরি আরব বণিক এবং আরব এলাকাগুলোর উপর আক্রমণ চালাতে থাকেন এবং হত্যা ও ধ্বংসের বিভীষিকা কায়েম করেন।

    হাজ্জাজ মুহাম্মদ আলাফীকে দমন করতে ব্যর্থ হয়ে আলাফী গোত্রের সর্দার সুলায়মানকে, যিনি সে সময় আরবে ছিলেন, হত্যা করেন। এতে মুহাম্মদ আলাফী অনুগত হবার পরিবর্তে আরও উগ্র হয়ে উঠেন। অবশেষে হাজ্জাজ মুহাম্মদ আলাফীকে ফেরত পাঠাবার জন্য রাজা দাহিরের কাছে দাবী জানান। রাজা দাহির সে দাবী মানতে শুধু অস্বীকৃতিই জানাননি—বরং তিনি হাজ্জাজের প্রেরিত মুসলিম দূতকেও হত্যা করেন। হাজ্জাজ মুহাম্মদ আলাফীর বিরুদ্ধে ফৌজ পাঠান। আলাফী রাজা দাহিরের সহায়তায় ঐ ফৌজকে পরাজিত করেন। ফৌজের সদস্যদের সংখ্যাল্পতাই ছিল এ পরাজয়ের অন্যতম কারণ। অবশ্য ফৌজের অধিনায়কের দ্বারা কতিপয় প্রতিরক্ষাগত ত্রুটিও সংঘটিত হয়। খলীফার বাহিনী খেলাফতের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পর তখন শাম ও তুর্কিস্তানের দিকে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। বায়তুলমালেও অর্থ সংকট চলছিল। ফলে হাজ্জাজকে বাধ্য হয়েই চুপ থাকতে হয়। তিনি মুহাম্মদ বিন হারূন এবং বুদায়লের পরাজয় যেমন কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না, তেমনি এর বদলাও নিতে পারছিলেন না।

    রাজা দাহিরের অগ্রাভিযান

    রাজা দাহিরের নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে, আরবদের জন্য তিনি স্থলপথ বন্ধ করে দিয়েছেন। এবার তিনি তাদের নৌ-বাণিজ্যও খতম করবার দৃঢ় সংকল্প নেন। সে সময় লঙ্কায় (সরন্দীপ) যাকে আরবরা “সীলন” নামে অভিহিত করত, আরবদের বেশ বড় রকমের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। সেখানে তাদের বেশ বড় রকমের বসতিও গড়ে উঠেছিল। সীলন (সিলোন)-এর জনপ্রিয়তার কারণ ছিল সেখানকার রাজার সঙ্গে মুসলিম খলীফার বিশেষ বন্ধুত্ব। কোন কোন ঐতিহাসিক তো এতদুর পর্যন্ত লিখেছেন যে, সীলনের রাজা মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন।

    মুসলিম বণিকদের একটি দল যখন সীলন থেকে হজ্জের উদ্দেশ্যে এবং ব্যবসার পণ্য-সামগ্রী নিয়ে জাহাজযোগে রওয়ানা হন তখন তাদের সঙ্গে কিছু বিধবা মহিলা ও য়াতীম শিশু ছিল। ঐসব মহিলার আত্মীয়-স্বজন জাহাজ ডুবিতে মারা গিয়েছিল। সরন্দীপের রাজা য়াতীম শিশু ও বিধবা মাহিলাদেরকে উপহার-সামগ্রী এবং আর্থিক সাহায্য দিয়ে কাফেলার সঙ্গে হেজাযে পাঠিয়েছিলেন, সেই সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শন-স্বরূপ তিনি বেশ কিছু উপঢৌকনও খলীফার জন্য পাঠিয়েছিলেন। এই কাফেলা সমুদ্র পথে দেবলের কাছে পৌঁছুলে কাফেলার যাবতীয় মালপত্র লুট করা হয় এবং লোকদেরকে বন্দী করে রাজা দাহিরের নিকট তাঁর রাজধানীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কয়েদীদের মধ্যে খারবু কবীলার একজন য়াতীম বালিকা ছিল। সে অত্যন্ত সুকৌশলে আপন রক্তে একটি চিঠি লিখে হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে পাঠিয়ে দেয়। চিঠিটা ছিল খুবই মর্মস্পর্শী। চিঠি পড়া মাত্রই হাজ্জাজ রাগে ও উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠেন। চিঠিটি এমন সময়ে তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছেছিল যখন তিনি নির্দেশনামাসহ মুহাম্মদ বিন কাসিমকে কুতায়বার নিকট পাঠাচ্ছিলেন।

    আমরা এখানে একটি কাহিনী উল্লেখ করতে চাই যার স্মরণে আজ পর্যন্ত ঐ সব বিধবা ও য়াতীম সম্পর্কে সিন্ধুবাসীদের হৃদয়-মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে।

    সিন্ধুনদের মাঝখানে একটি ছোট উপদ্বীপ রয়েছে যাকে রোহড়া বলে এবং শুক্কুরের সেতু মূল স্থলভাগের সাথে মিলিত করে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময় একে সুকরালীদ বলা হ’ত। এই ছোট্ট উপদ্বীপটিতে একটি অনাবাদী ঘর রয়েছে। এই ঘর সম্পর্কে প্রসিদ্ধি এই যে, রাজা দাহির আরবের মুসলিম কুমারীদেরকে এখানে বন্দী করে রেখেছিলেন। রাজা দাহিরের কর্মচারীরা যখন তাদের সতীত্ব-সম্ভ্রম নষ্ট করার অসৎ উদ্দেশ্যে উক্ত ঘরে প্রবেশ করতে উদ্যত হয় তখন সেখানে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে রাজার সকল কর্মচারী মারা যায়। এরপর যারাই সে ঘরে প্রবেশ করতে চেষ্টা করেছে তারাই মারা গেছে। ধারণা করা হয় যে, আরব বন্দিনীরাও উক্ত ঘরেই নিহত হয়ে থাকবে।

    জনশ্রুতি এইরূপ যে, প্রায় ১৩০০ বছর যাবত সে ঘরে কেউই প্রবেশ করেনি। ঘরের ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। কাহিনীর সকল বিবরণীই যে সত্য তেমন কথা বলা যায় না। তবে উক্ত কাহিনী থেকে মুসলিম নারীদের মর্যাদা ও সম্ভ্রমবোধ সম্পর্কে সিন্ধুর বর্তমান অধিবাসীদের অনুভূতি অনায়াসে আঁচ করা যায়।

    উক্ত উপদ্বীপেই ছিল রাজা দাহিরের রাজধানী রাওর। এটা ছিল দুর্গের মত। এর সকল প্রাচীরই ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু এঘরটি এখনো টিকে থেকে রাজা দাহিরের কেল্লার ধ্বংসাবশেষের উপর যেন বিলাপ করছে এবং ভবিষ্যত বংশধরদেরকে মুসলিম বালিকাদের সম্ভ্রমবোধ, সাহসিকতা, আত্মোৎসর্গ ও কর্মকৌশলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছে—চরম অবস্থায় কিভাবে ঐসব উচ্চমনা ও পবিত্র রমণীদের একজন বালিকা প্রতিনিধি হাজ্জাজকে নিজেদের বিপদের ব্যাপারে অবহিত করেছিল এবং এরপর সময় মত সাহায্য না আসা সত্ত্বেও হতাশা ও নিরাশাকে কাছে ঘেঁষতে না দিয়ে নিজেদের সতীত্ব-সম্ভ্রম ও ব্যক্তি-সত্তার হেফাজত করেছিল।

    রাওর কেল্লা

    জনশ্রুতি আছে যে, রাজা দাহিরের রাজধানী যদিও রাওর ছিল, কিন্তু রাওর মহলের বাইরে ছিল কেল্লা, যাকে আলোর বা (আরোড়) বলা হ’ত। রাওরে একটি ছোট্ট কেল্লার মত শহর ছিল। শাহী মহল এবং মন্ত্রীদের বাসাবাড়ী সেখানেই ছিল।

    আপনি যদি পূর্ব নারা নদীর দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে অগ্রসর হন তাহলে নদীর উজান দিকে একটি পুল পাবেন। আপনি যদি পুল থেকে পশ্চিম দিকে দু’মাইলের মত অগ্রসর হন তাহলে সেখানকার বাসিন্দারা আপনাকে একটি বড় মত গৃহাঙ্গণ দেখাবে। তাদের ধারণা মতে, এখানে মুহাম্মদ বিন কাসিমের শিবিরের লোকেরা সালাত আদায় করত এবং এর আশেপাশেই শিবির ও ছাউনী ছিল। এখন আপনি যদি সেখানে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকান, তাহলে আপনি একটি ছোট্ট পাহাড় পদ্ম ফুলের মত উপরের দিকে প্রস্ফুটিত দেখতে পাবেন। জনসাধারণের ভাষ্য অনুযায়ী আলোর দুর্গ, ফৌজের ছাউনী এবং শহর এখানেই ছিল। এর শাসনকর্তা ছিলেন রাজা দাহিরের ছোট ভাই রাজা গোপী। রাওর প্রাসাদ জয় করার পর মুহাম্মদ বিন কাসিম এ দুর্গও জয় করেন। এখন পর্যন্ত তার কিছু ধ্বংসাবশেষ উক্ত পাহাড়ের উপর বিদ্যমান আছে।

    অভিযানের প্রস্তুতি

    হাজ্জাজ একদিকে জরুরী ভিত্তিতে অভিযান প্রেরণের অনুমতি প্রার্থনা করে মুহাম্মদ বিন কাসিমের মাধ্যমে খলীফার কাছে দরখাস্ত পাঠান এবং অন্যদিকে মাকরানের শাসনকর্তা ‘উবায়দুল্লাহ্ কে লিখে পাঠান যেন তিনি স্বয়ং রাজা দাহিরের কাছে গিয়ে ঐ সমস্ত কয়েদীদের মুক্ত করে দেবার দাবী জানান।

    কিন্তু রাজা দাহির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেন। এতে মুহাম্মদ বিন আলাফীরও হাত ছিল। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ প্রথম দিককার ব্যর্থতার কারণ বেশ ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। দামিশ্‌ক থেকে প্রায় দু’হাজার মুজাহিদ বসরা এসেছিল। বসরার পার্শ্ববর্তী এলাকায় আরও প্রায় দু’হাজার মুজাহিদ পাওয়া গেল। এরপর তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে শীরায গিয়ে অবস্থান করতে নির্দেশ দেন—যাতে করে সেখানে সিরিয়া ও ইরাক থেকে আরও মুজাহিদ পাঠানো যায়, আর এই মধ্যবর্তীকালীন সময়ে মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় ফৌজের শৃংখলা ও ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক করে নিয়ে এবং তাদেরকে সমরশাস্ত্রের মূলনীতি মুতাবিক তা’লীম দিয়ে একটি বিরাট অভিযানের জন্য প্রস্তুত করে নিতে পারেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় শ্বশুর ও পিতৃব্য হাজ্জাজের নিকট থেকে ফৌজ সুসংগঠিত ও সুশৃংখল করার কৌশল আয়ত্ত্ব করেছিলেন এবং এ বিষয়টা তাঁর মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিল যে, ফৌজকে পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু হতে হবে। অধিকন্তু আরবদের সাফল্য ছিল অশ্বারোহী বাহিনীর বিদ্যুৎ গতির উপর নির্ভরশীল। মুহাম্মদ বিন কাসিম বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ঐ সব মুজাহিদকে অনেকগুলি প্লাটুনে সুসংগঠিত করেন। তাদের উপর বিভিন্ন পদাধিকারী অফিসার নিযুক্ত করেন। এ ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে ছ’ মাস লেগে গেলেও মুহাম্মদ বিন কাসিম ঐ দিনগুলোকে অযথা নষ্ট করেননি। তিনি গুপ্তচর ও ঘোড়সওয়ারের মাধ্যমে সিন্ধুর রাস্তা-ঘাট, দুর্গ ও রাষ্ট্রীয় অবস্থাদি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অবহিত হন। প্রথম অভিযানে ভারতীয় দুর্গ এবং হস্তীবাহিনী আরবদেরকে পেরেশান করেছিল। কিভাবে এর প্রতিবিধান করা যায় সে ব্যাপারে তিনি চিন্তা-ভাবনা করেন এবং স্বীয় সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের আলোকে ফৌজের সামরিক মহড়ার ব্যবস্থা করেন।

    এতদ্ভিন্ন তিনি ভারতীয় রোগ-ব্যাধি—যেমন জ্বর, আমাশয় ইত্যাদির জন্য ঔষধ-পত্র সঙ্গে নেন। ৭১১ ঈসায়ীতে এই ফৌজ তৈরী হয়ে গেলে হাজ্জাজ দুর্গ-বিধ্বংসী যন্ত্র ও অন্যান্য ভারী যুদ্ধাস্ত্র বসরা থেকে নৌ-বহরের মাধ্যমে সিন্ধুর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। ঐসব মালপত্র দেবল বন্দরের পরিবর্তে সোম মিয়ানী নামক অখ্যাত, কিন্তু বেশ সুন্দর—একটি বন্দরে নামানো হয়।

    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে সমস্ত লোক প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে গভীরভাবে পড়াশোনা করেছেন তাঁরা জেনে থাকবেন যে, মিত্র বাহিনী ফৌজের চলাচল ও গতিবিধির ক্ষেত্রে বর্তমান যুগের ট্রেনিংপ্রাপ্ত গ্রাজুয়েট বৃটিশ মিলিটারী স্টাফ অফিসাররা বৈদ্যুতিক তার, ওয়ারলেস, আধুনিক নৌ-বহর ও বিমানের সহায়তা সত্ত্বেও কি কি ভুল করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বৃটিশ ফৌজ যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বসরা পৌঁছে তখন ভারী সামান জাহাজে চাপানো ছিল এবং সেসব নামানোর জন্য যে ক্রেন (Crane) আনা হয়েছিল তা ছিল ভারী মাল-পত্রের নীচে। ফলে এই নৌ-জাহাজকে পুনরায় বোম্বাই পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং তাকে পুনরায় ঠিক-ঠাক করে সামান চাপিয়ে বসরা পাঠান হয়। এই বৃটিশ ফৌজের সাথে আমরা ছিলাম। আমরা যখন দ্বিতীয়বার বসরা পৌঁছলাম তখন জানতে পারলাম যে, অশ্বারোহী বাহিনী ও গোলন্দাজ বাহিনীর ঘোড়া নামাবার জেটি তৈরী করা সম্ভব হয়নি। কেননা এর কিছু আসবাবপত্র বোম্বাইয়ে যে জাহাজে উঠানো হয়েছিল, ইঞ্জিন খারাপ হবার কারণে সে জাহাজ বসরা পৌঁছুতে পারেনি। ফলে ঘোড়াগুলোকে জাহাজের উপর থেকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং আমরা উপকূলে পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে উপকূলের দিকে সাঁতরে আসা ঘোড়াগুলোকে পাকড়াও করতে থাকি। বাকী থাকল যুদ্ধাস্ত্র, যেমন— জীন, তলোয়ার, রাইফেল ইত্যাদি,—সেগুলোকেও ছোট ছোট নৌকায় বোঝাই করে কূলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়।

    কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিমের মিনজানীক ‘আছম’–যা পাঁচ শ’ মানুষের সাহায্যে চালান হ’ত এবং সেটা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় পাথর এবং অন্যান্য ভারী সামান নৌ-বহর মারফত ভিন দেশের শত্রু এলাকায় যথাসময়ে সুন্দর ও সুষ্ঠভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনুরূপভাবে পদাতিক ফৌজকেও নৌ-বহরের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্যস্থলে নিয়ে আসা হয়।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় স্থল-বাহিনীকে দ্রুত গতিতে লম্বা দূরত্ব অতিক্রম করবার যোগ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর বাহিনীতে আনুমানিক ছ’হাজার আরোহী অর্থাৎ ঘোড়-সওয়ার এবং ছ’হাজার উষ্ট্রারোহী ছিল। এদের সঙ্গে প্রায় তিন হাজার ভারবাহী উটও ছিল। ঐ ফৌজ দেখলে মনে হয়, মুহাম্মদ বিন কাসিম দেবল বিজয় পর্যন্ত শত্রুদের কোন মযবুত কেল্লা তাঁর পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে—তেমনটি চিন্তা করেন নি।

    কুযপুর-পাঞ্জগোর ছিল মাকরানের রাজধানী। এই দুর্গ মুহাম্মদ বিন কাসিম কয়েক মাসের অবরোধের পর জয় করেন। এবং এখানে বসে কুযপুর থেকে দেবলের দুরুহ রাস্তা পার হবার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরী করেন। পাঞ্জগোরের যুদ্ধে মুহাম্মদ বিন কাসিম এটা জানতে পেরেছিলেন যে, মামুলী দুর্গ জয় করবার জন্য ও পদাতিক ফৌজের দুর্গ বিধ্বংসী অস্ত্রের দরকার পড়বে যা সেখানে বর্তমান ছিল না।

    প্রকৃতি কাসবেলা (লাসবেলা) এলাকাকে পশ্চিম থেকে আগত হামলাকারীদের জন্য একটি বিশেষ প্রতিবন্ধক করে রেখেছিল। এসব এলাকা ছিল ছোট ছোট পাহাড় দ্বারা—যা মাত্র কয়েক শ’ ফুট উঁচু—সাঁটানো। এসব পাহাড় কেয়ার পাহাড় শ্রেণীর শাখা-প্রশাখা মাত্র এবং এ উপত্যকায় বর্ষাতি নালাগুলো বেশ গভীর এবং প্রান্তরে বেশ প্রশস্ত হয়ে প্রবাহিত হ’ত। এসব নালা বৃষ্টির সময় খুবই বিপজ্জনক হ’ত। এসব পাহাড় ও নালা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রসারিত ছিল। পাহাড়ের উপর ঘন জঙ্গলের আচ্ছাদন ছিল এবং উপত্যকায় বিশেষ বিশেষ নালার ভেতর খননকৃত কুয়া এবং পাহাড়ী ঝর্ণা ছাড়া অন্যত্র পানি ছিল খুবই দুষ্প্রাপ্য। বর্ষাতি পুকুরগুলোর পানি খুবই লবণাক্ত হ’ত। সাধারণ কুয়ার পানি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে অভ্যাসগত কারণে মিঠা লাগলেও বিদেশী মুসাফির ও পর্যটকদের কাছে তা ছিল নোন্‌তা। ঐ পানি পান করলে পেট খারাপ হ’ত। ফলে আমাশয় ও দাস্তের অভিযোগ সেখানে ছিল একটি সাধারণ ব্যাপার।

    যদিও আজকাল সে এলাকার জঙ্গল খুব তাড়াতাড়ি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু চিহ্ন দৃষ্টে মনে হয়, কোন এক যুগে ঐ এলাকা দুরতিক্রম্য এবং কাঁটাপূর্ণ ঝোপঝাড়ে পূর্ণ ছিল। আরব, তুর্কী, ইরানী, তুর্কী, পাঠান এবং মোগল আক্রমণকারীরা সেখানকার যুদ্ধবাজ বাসিন্দাদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচবার জন্য ঐ ঝোপ-ঝাড় জ্বালিয়ে দিয়েছিল যাতে করে শত্রুরা লুকিয়ে আড়াল থেকে আক্রমণকারী ফৌজের উপর হামলা চালাতে না পারে।

    সিন্ধুতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের যুদ্ধ

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজ যখন বেলার দিকে অগ্রসর হয় তখন স্থানীয় লোকেরা এবং ভারতীয় ফৌজ (যার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের মত) তাদেরকে প্রতিরোধ করতে শুরু করে। হিন্দু সেনাপতি স্বীয় ফৌজকে সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে রেখেছিলেন। ফৌজের বিভিন্ন প্লাটুন ও কোম্পানী নদী-নালা ও পাহাড়ী জঙ্গল থেকে অতর্কিতে বেরিয়ে এসে আরব ফৌজের উপর আক্রমণ চালাত এবং আরব ফৌজ তাদের উপর পাল্টা আঘাত হানার আগেই তারা জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেত।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের সৌভাগ্য যে, ভারতীয় সেনাপতি পরিশ্রমী ও সাহসী ছিলেন না। অধিকন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন কুযপুর থেকে রওয়ানা হন তখন তিনি তাঁর এই অগ্রাভিযানের কথা একেবারে গোপন রাখেন। ফলে ভারতীয় ফৌজ আরবীয় ফৌজের উপর তখনই হামলা শুরু করে যখন তিনি বেলার একেবারে নিকটে পৌঁছে গেছেন। এতদ্‌সত্ত্বেও ভারতীয় ফৌজ বেশ দৃঢ়তার সাথে লড়াই শুরু করে। ফলে আরবীয় ফৌজ, যার ভেতর অধিকাংশই ছিল আরোহী এবং মাল ও সামানবাহী, খুবই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে এবং তাদের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।

    অতঃপর মুহাম্মদ বিন কাসিমের জন্য মাত্র দু’টো রাস্তাই খোলা ছিল:

    1. বর্তমান রাস্তা ছেড়ে দিয়ে উপকূল বরাবর তুলনামূলক খোলা প্রান্তর দিয়ে লড়াই করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া;
    2. শত্রু বাহিনীর অবস্থান-স্থল বেলা দুর্গের উপর হামলা করা এবং এভাবে দুশমনকে একস্থানে একত্র হয়ে লড়বার জন্য উৎসাহিত করা। কেননা গেরিলা ধরনের লড়াই আরব ফৌজকে—বিশেষ করে এর রসদবাহী ফৌজকে—বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

    গেরিলা তীরন্দায লুকিয়ে থেকে রসদবাহী পশু এবং মুজাহিদদের উপর বড় রকমের আঘাত হেনে চলেছিল। অনন্তর স্বীয় অভীষ্ট লক্ষ্য হাসিলের জন্য মুহাম্মদ বিন কাসিম এ-চাল চালেন যে, স্বীয় ফৌজের অগ্রগামী বাহিনীর গতিকে সিপাহী সিংহের (Spai Singh) ফাঁড়ির নিকট থেকে আগোর (Aghor) বন্দরের দিকে ফিরিয়ে দেন। এমনটি করার পূর্বে তিনি স্বীয় গুপ্তচর মারফত রটিয়ে দেন যে, আরব ফৌজ এখন উপকূল ভাগ দিয়ে অগ্রসর হবে এবং সেখানে আরব নৌ-বহর তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এখবর তিনি বেশ দৃঢ়তা সহকারে ও সুকৌশলে শত্রুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।

    এরপর তিনি স্বীয় ফৌজকে দু’অংশে বিভক্ত করেন। বড় অংশের নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ বিন হারুনকে এবং নির্বাচিত একটি কোম্পানী, যার সংখ্যা হবে হাজারের মত, নিজের সঙ্গে নেন এবং রাতের বেলা তাদেরকে নিয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে পড়েন। বড় অংশ নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্ধেক রাত্রির পূর্বে, যখন গোটা বিশ্ব-প্রকৃতি চন্দ্রালোকিত, অগ্রযাত্রা শুরু করে এবং দিনের বেলায়ও ধীরে সুস্থে সে যাত্রা অব্যাহত রাখে।

    ভারতীয় সেনাপতি এই সামরিক চালে হেরে যান। তিনি যেই শুনলেন যে, আরব ফৌজ প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হবার চিন্তা করছে, অমনি তিনি স্বীয় ফৌজকে একত্র হবার নির্দেশ দেন, যাতে করে আরব ফৌজকে খোলা ময়দানে বের হবার পূর্বেই পরাজিত ও ধ্বংস করে দেওয়া যায়। এ সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে তিনি সাধারণ নিরাপত্তা নীতিকে লঙ্ঘন করেন অর্থাৎ দুর্গে খুবই স্বল্প সংখ্যক সৈন্য রেখে যান। কেননা তাঁর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, তিনি খুব সত্বর আরব ফৌজকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দুর্গে ফিরে আসবেন।

    মোট কথা, আরব ফৌজের অগ্রযাত্রার কথা শুনতেই ভারতীয় সেনানায়ক তাৎক্ষণিকভাবে রাতের বেলায়ই স্বীয় গেরিলা ফৌজের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য দুর্গ থেকে বেরিয়ে পড়েন যাতে করে তিনি তার সমগ্র ফৌজকে একত্র করতে পারেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের গুপ্তচর তাঁকে মুহুর্তের খবর মুহূর্তেই দিয়ে চলছিল। যা-হোক, হিন্দু সেনাপতি তার অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। কেননা তিনি তার পদাতিক বাহিনীকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং ভোর বেলার পরিবর্তে আরব ফৌজের মধ্য-রাত্রিতে অগ্রযাত্রার খবর শুনে তিনি আরও দ্রুততার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন যাতে স্বীয় কোম্পানী দ্বারা দু’দিক থেকে আক্রমণ করে মুহাম্মদ বিন কাসিমের আগোর বন্দরের দিকে অগ্রসর হবার পথ রোধ করতে পারেন। বেলা দুর্গের পদাতিক ফৌজকে তিনি এ উদ্দেশ্যেই নিজের সঙ্গে নেওয়া সমীচীন মনে করেন। কেননা তাঁর ফৌজের অধিকাংশ‍ই গোটা এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। ফলে তার ধারণা ছিল যে, তার গেরিলা পদাতিক ফৌজ একত্র করতে সময় লাগবে। তাই যথা সত্বর দ্রুত আরব ফৌজের উপর কার্যকর আঘাত হানতে তিনি দুর্গের পদাতিক ফৌজকে সঙ্গে নেওয়া জরুরী মনে করেন। আসলে তিনি তখন মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রতিরক্ষা চালে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর চলাচল ও গতিবিধি গোপন রেখে প্রতিটি বিষয়ে উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন। মুহাম্মদ বিন হারূনের সাথেও তাঁর ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। মুহাম্মদ বিন হারুনের ভালভাবেই জানা ছিল যে, সংবাদ পাওয়া মাত্রই তাকে দুর্গের দিকে ফিরে এসে মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে মদদ দিতে হবে। এ দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য তিনি ফয়সালা করেন যে, তার ফৌজের কিছু অংশ রিজার্ভ ফৌজ হিসাবে শত্রুর মুকাবিলায় ছেড়ে যাবেন যারা লড়াই করতে করতে পিছু হটবে এবং হটতে হটতে নিজেদের বড় মূল ফৌজের সঙ্গে মিলিত হবে। ওদিকে হিন্দী ফৌজ সঠিক পরিমাপ করতে পারেনি, আরব সেনাপতির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা কি! যা-হোক, চাঁদ যখন অস্তমিত হচ্ছিল এবং ভোরের শুকতারা উদিত হচ্ছিল ঠিক তখন মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় অশ্বারোহী বাহিনী সমেত দুর্গের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেন। ঘোড়াগুলো তখন লুকিয়ে ফেলা হয় এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের দুরন্ত বাহিনী পায়ে হেঁটে দুর্গের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। যদিও দুর্গটি ছিল মাটি নির্মিত—তথাপি হামলা করার সময় সতর্কতা অবলম্বনের দরকার ছিল।

    দুর্গের অধিবাসীরা সারাদিনের ক্লান্তিতে ছিল অবসন্ন। তাদের সেনাপতিও তখন চলে গিয়েছিল। অপরদিকে আরব সেনাপতিও তখন চলে গিয়েছিলেন। আরব ফৌজ তাদের থেকে প্রতি মুহূর্তে দূরে সরে যাচ্ছিল বলে তারা অলস ও অসতর্ক হয়ে পড়েছিল। কিছু পাহারাদার ঘুমিয়ে ছিল। আর কিছু ছিল আধা জাগ্রত। তারা নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে অর্ধ-নিমীলিত নেত্রে থেকে থেকে “হোঁ-শি-য়া-র! খবর-দা-র!” ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে যাচ্ছিল।

    চাঁদ ডোবার মুহুর্তে মুহাম্মদ বিন কাসিম বাছাই করা কিছু দুঃসাহসী সৈনিকসহ দুর্গ প্রাচীরের উপর আরোহণ করেন এবং বিশেষ কোন প্রতিরোধ ছাড়াই দুর্গের দরজা খুলে দেন। খোলা দরজা পেয়ে অবশিষ্ট সৈনিকও দুর্গাভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে এবং মুহাম্মদ বিন কাসিম সহজেই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন।

    চারিদিকে ভোরের আলো ফুটে উঠছিল, এমনি সময় মুহাম্মদ বিন কাসিম তিনজন দুঃসাহসী সৈনিকের মাধ্যমে মুহাম্মদ বিন হারূনকে ফিরে আসবার জন্য নির্দেশ পাঠান। সেখানে তখন ভীষণ লড়াই চলছিল এবং হিন্দী ফৌজ অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করছিল।

    ইতিমধ্যে দুর্গ থেকে পালিয়ে গিয়ে কিছু হিন্দী সৈন্য তাদের সেনাপতির নিকট দুর্গ বিজিত হবার দুঃসংবাদ প্রদান করে। এখবর সেনাপতি ও হিন্দী সৈনিকদের কাছে বজ্রাঘাত তুল্য মনে হয়। তারা তাদের শেষ ভরসাটুকুও এতে খুইয়ে বসে। তবু সেনাপতি শেষ বারের মত সিদ্ধান্ত নেন, শত্রুর হাত থেকে দুর্গটি তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে সম্ভ্রম রক্ষা করতে হবে। তিনি তার সমস্ত ফৌজকে দুর্গের দিকে ফিরে যাবার নির্দেশ দেন এবং স্বয়ং অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দুর্গের দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হন যাতে তড়িৎ গতিতে দুর্গটি অবরোধ করা যায় এবং অবশিষ্ট আরব ফৌজ মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজের সাথে, যারা দুর্গ মধ্যে অবস্থান করবে, মিলিত হতে না পারে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম দুর্গের উপর থেকে সব কিছু লক্ষ্য করছিলেন এবং সে অনুযায়ী উপস্থিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরী করছিলেন। তিনি ভারতীয় ফৌজের চলাচল ও গতিবিধি থেকে তাদের সেনাপতির অভিপ্রায় যখন বুঝতে পারলেন তখনই মুহাম্মদ বিন হারুনের মাধ্যমে হিন্দী ফৌজের উপর আঘাত হানবার পরিকল্পনা নেন। এ পরিকল্পনা তিনি প্রথম থেকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনাক্রমে ঠিক করে রেখেছিলেন। ভাগ্যক্রমে ভারতীয় ফৌজ পুনরায় ভুল করে আরব ফৌজের জালে ধরা পড়বার জন্য ছুটে আসছিলে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের পরিকল্পনা নিম্নোক্ত বিষয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল:

    1. পলাতক হিন্দী সৈন্যরা তাদের সেনাপতিকে অবহিত করে থাকবে যে, দুর্গে বিজয়ী আরব ফৌজের সংখ্যা খুবই কম।
    2. ভারতীয় সিপাহ্‌সালারের মেযাজে ক্ষিপ্রতা থাকলেও তিনি তার ব্যক্তিগত মান-সম্ভ্রমের উপর অযথা গুরুত্ব আরোপ করবেন।
    3. হিন্দী ফৌজ বিক্ষিপ্ত থাকার দরুন ছোট ছোট দলে বিভক্ত থাকবে এবং তাদের সেনাপতি ধৈর্য্যহারা হবার কারণে তাদেরকে তাড়াহুড়ার ভেতরে ছোট ছোট দলে বিভক্ত অবস্থায়ই আক্রমণের নির্দেশ দেবেন।

    এই প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ বিন কাসিম ফয়সালা করলেন:

    1. তিনি হিন্দী ফৌজের মনোযোগ দুর্গ দখল করার দিকে ঘুরিয়ে দেবেন।
    2. মুহাম্মদ বিন হারুন তার ফৌজের বিরাট অংশকে তিনভাগে ভাগ করবেন। যেমন:

    ক. একটি কোম্পানী রিজার্ভ ফৌজ হিসাবে হিন্দী ফৌজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে দুর্গের দিকে পিছু হটবে। রসদবাহী তাদের সঙ্গে থাকবে, কিন্তু প্রতিটি মুজাহিদ এমনভাবে লড়ে যাবে যাতে দুশমন এ কোম্পানীর শক্তি সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত হতে না পারে।

    খ. বাকী ফৌজকে দু’ অংশে ভাগ করে দেওয়া হবে। উষ্ট্রারোহীদের সংক্ষিপ্ত পথে দ্রুততার সঙ্গে দুর্গের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।

    গ. অশ্বারোহী কোম্পানী উপত্যকা ও নালাগুলোর ভেতর দিয়ে পার হয়ে কেল্লার দক্ষিণ দিক থেকে এমন সময় হামলা করবে যখন দুশমন পুরোপুরি ময়দানে অবতরণ করেছে।

    যে সময় আরব অশ্বারোহী বাহিনী শত্রুর উপর আক্রমণোদ্যত হবে তখন উষ্ট্রারোহী বাহিনীও অন্য দিক থেকে তাদের উপর অতর্কিতে হামলা করবে। এভাবে ভারতীয় ফৌজকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলা হবে।

    অপর দিকে হিন্দু সেনাপতির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ছিল নিম্নরূপ:

    ক. যখন মুসলিম ফৌজ (অর্থাৎ রসদবাহী রিজার্ভ ফৌজ) লাক চৌকীর (Luck Chouki) মুজাহিদ কেল্লার নিকট পৌঁছুবে তখন হিন্দী ফৌজ আরব ফৌজকে এভাবে ঘেরাও করে ফেলবে যে, তারা তাদেরকে পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক থেকে বাহ্যত দুর্গের দিকে অগ্রসর হতে দেবে। কেননা সে-স্থানে তিনি তার পদাতিক ফৌজ এবং তীরন্দায বাহিনীকে আরবী ফৌজের অপেক্ষায় গুপ্ত ঘাটিতে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

    খ. হিন্দী সেনাপতি কিছু হিন্দী অশ্বারোহী কোম্পানীকে দুর্গ অবরোধের জন্য রেখে বাকী কোম্পানীগুলোকে কয়েকটি প্লাটুনে ভাগ করে নেন যাতে তারা আরব ফৌজের উপর বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে।

    হিন্দী ফৌজ এই তাড়াহুড়োর ভেতর নিজেদের সংবাদ আদান-প্রদানের দিকে মনোযোগ দেয়নি। উভয় ফৌজই নিজ নিজ সিপাহ্‌সালারের পরিকল্পনা মুতাবিক অগ্রসর হচ্ছিল। আরব সেনাপতি কৌশলের সঙ্গে স্বীয় অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহী বাহিনীর বড় প্লাটুনগুলোকে গোপন রাস্তায় নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছিয়ে দেন। হিন্দী সিপাহ্‌সালার এদের এ সামরিক চাল ও গতিবিধি সম্পর্কে আদৌ জানতে পারেনি।

    বেলা তিন প্রহর। যদিও হিন্দী ফৌজের অধিকাংশ অংশই গেরিলা হামলা বন্ধ করে দিয়েছিল, তথাপি মুসলিম ফৌজ (রিজার্ভ ও রসদবাহী) নকশার উপর নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লড়তে লড়তে এবং পিছু হটতে হটতে বেলা দুর্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। আরবী ফৌজ লাক চৌকীর ঘাঁটির নিকট পৌঁছলে গুপ্তচর তাদেরকে হিন্দী ফৌজের ওঁৎ পেতে থাকা অংশ সম্পর্কে অবহিত করে। ফলে আরবী ফৌজ হিন্দী বাহিনীর উপর ঝড়ের বেগে ঝাপিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর মুসলিম ফৌজ সেসব পাহাড় দখল করে ফেলে এবং তাদের সিপাহসালারের নির্দেশের অপেক্ষা করতে থাকে।

    মাগরিবের সময় ঘনিয়ে আসছিল। আরব ফৌজের বিভিন্ন সেনানায়ক তাদের সিপাহসালারের নির্দেশের অপেক্ষা করছিলেন। নির্দেশ পেতেই রিজার্ভ ফৌজ আস্তে আস্তে বেলা দুর্গের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। হিন্দী অশ্বারোহী বাহিনী আরব ফৌজের ধীর ও হাল্কা গতিকে তাদের ভীত ও সন্ত্রস্ত হবার কারণ বলে ধরে নিয়েছিল। অতএব হিন্দী অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী তাদের উপর তিন দিক থেকে হামলা করে বসে। যদিও রিজার্ভ ফৌজ খুবই দুর্বল ছিল, তবু তারা অত্যন্ত নির্ভীক ও বীরত্বের সঙ্গে লড়তে থাকে। প্রচণ্ডভাবে লড়াই চলছিল, এমনি মুহূর্তে হিন্দী ফৌজের উপর দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে আরব অশ্বারোহী বাহিনী ঝড়ের বেগে ঝাপিয়ে পড়ে। হিন্দী সেনাপতি স্বীয় অশ্বারোহী বাহিনীকে একত্র করে আরব অশ্বারোহী বাহিনীর উপর পাল্টা হামলা করেন। যুদ্ধ কয়েকদিক থেকে জোরেশোরে চলছিল, হিন্দী ফৌজ খুব সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করছিল, এমন সময় মুহাম্মদ বিন কাসিম অতর্কিতে উষ্ট্রারোহী বাহিনী নিয়ে হিন্দী ফৌজের উপর হামলা করে বসেন। নতুন এ হামলা ছিল অত্যন্ত জোরালো ও মারাত্মক। ফলে হিন্দী ফৌজের সিপাহ্‌সালার আহত হন এবং তার বাহিনীর পদস্খলন ঘটে। আরব ফৌজ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে হিন্দী ফৌজের পশ্চাদ্ধাবন করে এবং ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়। হিন্দী ফৌজের শোচনীয় পরাজয়ের পর মুহাম্মদ বিন কাসিম আহত হিন্দী সৈন্যদেরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। তাদের মধ্যে তাদের সেনাপতিও ছিলেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম হিন্দু ফৌজের আহত সৈনিকদের সেবা-শুশ্রুসার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং সমস্ত যুদ্ধ বন্দীদেরকে অস্ত্রমুক্ত করবার পর মুক্তি দেন। সে সঙ্গে আহত সৈনিকদেরকেও নিরাময় ও সুস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি দেন। এদের মধ্যে হিন্দী সেনাপতিও ছিলেন। সেনাপতিকে মুহাম্মদ বিন কাসিম বিশেষ সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে স্বীয় ফৌজ থেকে দূরে সরিরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে আসেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের মনুষ্যত্ব এবং আহত দুশমনের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন হিন্দী সৈনিকদের মনে গভীর রেখাপাত করে। আরব ফৌজের মধ্যে বিরাজিত সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব দৃষ্টে তারা যারপর-নাই মুগ্ধ হয়। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন তো সন্তুষ্ট চিত্তে মুসলমানই হয়ে যায়।

    দেবলের উপর হামলা

    মুহাম্মদ বিন কাসিম বেলা দুর্গে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করার পর এমন সময় দেবলের দিকে অগ্রসর হন যখন তাঁর ভারী অস্ত্রশস্ত্র সূময়ানীতে সামুদ্রিক নৌ-বহরের সাহায্যে পৌঁছুতে যাচ্ছিল। এসব সাজ-সরঞ্জাম পৌঁছে গেলে তিনি একটি মহরত ও শক্তিশালী কোম্পানীর রক্ষণাধীনে ভারী সরঞ্জামগুলো নিজের কাছে আনিয়ে নেন। দেবল শহরের পাশে খুবই মযবুত প্রাচীর ছিল। এর চতুর্দিকের খালে পানি ভরতি ছিল। এ শহরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি বিখ্যাত মন্দিরও ছিল। মন্দিরের গুম্বজ উচ্চতায় ছিল চল্লিশ ফুটেরও বেশী। গুম্বুজের উপরে একটি লাল ঝাণ্ডা সর্বদা পতপত করে উড়ত। সাধারণ মানুষ এবং মন্দিরের পূজারীদের সাধারণ বিশ্বাস ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত এ পতাকা সগৌরবে উড্ডীন থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ শহর কেউ জয় করতে পারবে না।

    শহরের ভেতর বেশুমার রসদ-সামগ্রী মওজুদ ছিল। অতএব অবরুদ্ধ নগরবাসীদের কয়েক মাস পর্যন্ত ভেতরে বসে কাটিয়ে দেবার মত ব্যবস্থা ছিল। অপরদিকে অবরোধকারীরা বিরাট অসুবিধার সম্মুখীন হয়। কেননা শহর কিংবা পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে রসদ সংগ্রহের কোন ব্যবস্থা ছিল না।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের গুপ্তচরেরা তাঁকে অবহিত করেছিল যে, দেবলের বেশীর ভাগ অধিবাসী বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। এসব লোক ব্যবসায়ী এবং খুবই ধার্মিক তবে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধধর্মের ভিক্ষু ও পুরোহিতদের মাঝে বেশ শত্রুতা রয়েছে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম সুময়ানী বন্দর থেকে নিজেদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র নিয়ে ৯২ হিজরীর জুম’আর দিন দেবলের সামনে গিয়ে পৌঁছেন এবং চতুর্দিক থেকে এমনভাবে অবরোধ সৃষ্টি করেন যাতে দেবলবাসীদের কাছে কোন প্রকার সাহায্য কিংবা রসদসামগ্রী পৌঁছুতে না পারে। কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত হবার পরও দেবলবাসীরা বাইরে বেরিয়ে আরব ফৌজের মুকাবিলা করার প্রতি কোন উৎসাহ প্রকাশ করেনি। অবশ্য যখন কোন আরব সৈনিক দুবাবার আড়ালে শহর প্রাচীরের নিকটে পৌঁছুতে চেষ্টা করত অমনি হিন্দী ফৌজ রেড়ীর তৈলসিক্ত জ্বলন্ত মশাল নিক্ষেপ করে তাদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিত। আরব মিনজানীক “উরূস”-এর সাহায্য বড় বড় পাথর বৃষ্টিধারার মত বর্তানো হয়, কিন্তু অবরুদ্ধ শহরবাসীদের উপর বাহ্যত এর কোন প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি।

    শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ বিন কাসিম গোলন্দাজ ইউনিটের অধ্যক্ষ জওয়াহিবাহ্‌কে মূর্তির মন্দিরের গুম্বজ লক্ষ্য করে গোলা নিক্ষেপ করবার নির্দেশ দেন যাতে মন্দিরের উপর উড্ডীয়মান পতাকা ভূপাতিত করা যায়। নিক্ষেপের সময় যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম দেখলেন যে, গোলা গুম্বুজের উপর দিয়ে যাচ্ছে তখন তিনি উরূস-এর সম্মুখবর্তী পায়া এমনভাবে কেটে দেওয়ার জন্য জওয়াহিবাহ্‌কে নির্দেশ দেন যাতে করে গোলার ট্রিজেক্টরী (Trejectory) কিছু নীচু এবং সোজা হয়ে যায়। এমনটি করায় দ্বিতীয় গোলা ঠিকমত নিশানায় গিয়ে লাগে এবং লাল ঝাণ্ডা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

    হিন্দুরা এটাকে তাদের জন্য একটা কুলক্ষণ হিসাবে ধরে নেয় এবং দুর্গের বাইরে বেরিয়ে মরবার এবং মারবার সিদ্ধান্ত নেয়। হিন্দী ফৌজ তলোয়ারের শপথ নিয়ে দুর্গের বাইরে বের হলে মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় অধিনায়কদের দৃঢ়তার সাথে পিছু হটবার নির্দেশ দেন। হিন্দুরা তাদের আকীদামাফিক এটাকেই তাদের জয় মনে করে আবেগ-উৎসাহে আরব ফৌজের পশ্চাদ্ধাবন করতে থাকে। মুহাম্মদ বিন কাসিম যেই বুঝতে পারলেন যে, এরা তাদের দুর্গ থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে এসেছে ঠিক তখনি স্বীয় অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে হিন্দী ফৌজের উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে বসেন। এতে বহু হিন্দী সৈনিক মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শেষ পর্যন্ত হিন্দী ফৌজ অস্ত্র সমর্পণ করে এবং সন্ধির আবেদন জানায়। এখানেও মুহাম্মদ বিন কাসিম একজন যোগ্য মুসলিম সেনাধ্যক্ষের কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে শত্রুর প্রতি দয়া, মনুষ্যত্ব, সহিষ্ণুতাও ঔদার্যমূলক আচরণ করেন।

    দেবল বিজয় ও সন্ধি চুক্তি

    হাবীব বিন মাসলামা আরব সিপাহ্‌সালারের পক্ষে নিম্নোক্ত চুক্তিপত্রটি লিখেন : “হাবীব বিন মাসলামা খলীফাতু’ল-মুসলিমীন-এর পক্ষ থেকে দেবল অধিবাসী সর্বসাধারণকে, চাই তারা খ্রীস্টান হোক, অগ্নি উপাসক, কিংবা য়াহুদী, উপস্থিত কিংবা অনুপস্থিত, তাদের জানমাল, আত্বীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, উপাসনালয় এবং শহরের নিরাপত্তা প্রদান করছেন। তোমরা এই নিরাপত্তার আওতায় ততক্ষণ পর্যন্ত থাকতে পারবে যতক্ষণ পর্যন্ত এই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকবে। তোমরা জিয্‌য়া ও খারাজ (রাজস্ব) যত দিন পর্যন্ত দিতে থাকবে, আমাদের উপর ততদিন পর্যন্ত এই প্রতিজ্ঞা পালন করাও বাধ্যতামূলক হবে।”

    বেলা ছিল একটি ছোট পল্লী। কিন্তু দেবল ছিল রাজা দাহিরের খুবই বিখ্যাত শহর ও বন্দর। বৌদ্ধধর্মের পুরোহিত, আমীর-উমারা, তাদের যুবতী স্ত্রী—সকলেই মুসলিম ফৌজের উন্নত ও পবিত্ৰ চাল-চলন, ভদ্রতা ও সংবেদনশীলতাদৃষ্টে বিস্মিত হয়ে যায়। তাদের কল্পনায়ও আসে নি যে, তারা (বিজয়ী সৈনিকদের) লুটপাটের হাত থেকে বেঁচে যাবে। কেননা সে-যুগে বিজয়ী ফৌজ পরাজিত শহরগুলোতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালাত এবং ধন-সম্পদ ও সতীত্ব-সম্ভ্রম লুণ্ঠন করত।

    শহরটি তলোয়ারের জোরে বিজিত হয়েছিল। তাই শহরবাসীদের নিকট থেকে রাজস্ব গ্রহণ জরুরী ছিল। শহরের সাধারণ নাগরিকবৃন্দ, যাদের অধিকাংশই ছিল ধনী ব্যবসায়ী, দেখতে না দেখতেই বিরাট অঙ্কের অর্থ নযরানা হিসাবে পেশ করে। এর ভেতর থেকে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মুহাম্মদ বিন কাসিম ঋণ পরিশোধের জন্য প্রথম কিস্তী হিসাবে বায়তুল মালে পাঠিয়ে দেন। অবশিষ্টাংশ সেনাবাহিনীর মধ্যে বিতরণ করেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের নামে রাজা দাহিরের পত্র

    আরব ফৌজের সদাচরণ এবং বীরত্বের কাহিনী দেখতে না দেখতেই চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাজা দাহির এতদ্‌শ্রবণে খুবই ক্রোধান্বিত হন এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমকে নিম্নোক্ত পত্র লিখেন:

    “এই পত্র দ্বারা আমি তোমাকে জানিয়ে দিতে চাই যে, দেবল শহর, যা জয় করতে তোমাকে খুবই কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, আসলে একটি মামুলী বাণিজ্য শহর বৈ ছিল না যার নিরাপত্তা ও হেফাজতের জন্য আমরা সাধারণ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলাম এবং সেখানকার বণিকদের হেফাজতের জন্য আমরা অল্পই রক্ষী-ফৌজ মোতায়েন রেখেছিলাম।

    “আমাদের চোখে উক্ত শহরের তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না। তাই তা রক্ষার জন্য কোন দুর্গ যেমন নির্মাণ করিনি, তেমনি সেখানে কোন শক্তিশালী সেনাবাহিনীও আমরা রাখিনি। অতএব বণিক ও কারিগরদের বস্তীসম একটি শহর জয় করার মধ্যে তোমাদের উল্লাসের কোন কারণ নেই। আমরা যদি তার হেফাজতের জন্য রাজার মত কোন বাহাদুর সেনাপতিকে পাঠাতাম তাহলে তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করার মজাটা টের পেতে! সে তোমাদের সব বাহাদুরী ধূলিস্মাৎ করে দিত। এ দুনিয়াতে কেউ বাহাদুর সেনাপতি রাজাকে মুকাবিলা করতে পারে না। বিজয় সব সময়ই তার পদচুম্বন করে। তার তলোয়ার যে কোন বীরপুরুষের পানির পিয়াস মিটিয়ে দিতে পারে। যখন তা খাপ থেকে বের হয় তখন চতুর্দিকে ধ্বংসলীলার তাণ্ডব সৃষ্টি করে এবং শত্রুকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছিয়ে দেয়।

    “তা ছাড়াও আমাদের কাছে আরও আত্মোৎসর্গীত বীর রাজা বর্তমান আছেন। তাঁদের ভিতর কাশমূর রাজ্যের রাজা খুবই শক্তিমান—যার অমিততেজা ফৌজ এবং অপরিমেয় শক্তি ও প্রভাবের সামনে ভারতের বড় বড় শাসকরাও মাথা নুইয়ে দিয়েছে। তুরান এবং মাকরানের শাসকদ্বয়ও আনুগত্য স্বীকার করে নিজেদের সৈন্যসামন্ত সব কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দিয়েছে।

    “যখন এই বিজয়ী রাজা লোক-লশকর এবং একশত হাতীসহ স্বীয় শ্বেত হস্তীর পৃষ্ঠে আরোহণ করে যুদ্ধে বের হন তখন পদাতিক ও আরোহী সৈনিক পুরুষেরা তাঁর মুকাবিলায় টিকতে পারে না। আমি কিন্তু তোমার যৌবন ও বোকামির প্রতি দয়াপরবশ হয়ে এমন বাহাদুর সৈনিক পুরুষকে তোমার মুকাবিলায় পাঠাইনি। কেননা তুমি তাঁর সামনে অঘোরে প্রাণ দিতে। দুনিয়ার কোন ফৌজ আমাদের সাম্রাজ্যের কোন একটি কোণেও প্রবেশ করবার স্পর্ধা রাখে না। অতএব তোমাদের নিরাপত্তা এতেই নিহিত যে, তোমরা নিজেদের দেশে ফিরে যাও এবং আমাদের রোষাগ্নি থেকে নিজেদের রক্ষা কর।”

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের জওয়াব

    মুহাম্মদ বিন কাসিম দাহিরের দীর্ঘ পত্রের জওয়াব মাত্র কয়েক শব্দের মধ্যে দেন: “এ ধরনের বাহাদুর পুরুষের সাহস ও শক্তি পরীক্ষার জন্য আমি যথা সত্বর রওয়ানা হচ্ছি।” এই পত্রের সাথেই তিনি তাঁর ফৌজকে নীরূনের দিকে অগ্রসর হবার হুকুম দেন।

    নীরূন2 বিনা প্রতিরোধেই মুহাম্মদ বিন কাসিমের হস্তগত হয়। প্রজাকুলের সন্তুষ্টি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে স্বীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার উপর আমল করার সাহস আরও বাড়িয়ে দেয়। অতএব নীরুনে কয়েকদিন অবস্থান করার পর তিনি সহ্‌ওয়ানের দিকে অগ্রসর হলে লাহরাজ নামক শহরের অধিবাসীবৃন্দ অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে তার আনুগত্য স্বীকার করে।

    অতঃপর এখানকার ঠাকুর, জাট ও মায়দ প্রমুখ শ্রেণী ও জাতিগোষ্ঠী মুহাম্মদ বিন কাসিমের সহযোগী হতে শুরু করে। এদের মধ্যে কতক এমনও ছিল যারা নিজেরাই স্বতস্ফূর্তভাবে ইসলাম কবুল করে। কতক নিজ নিজ ধর্মে থেকেও এই নওজোয়ান মহান আরব সেনাপতির আনুগত্য স্বীকার করে নেয়।

    এসব হিন্দী সহযোগী রাজা দাহিরকে পরাজিত করবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।3

    সহওয়ান অভিমুখে অগ্রাভিযান

    সহ্‌ওয়ানের শাসনকর্তা ছিলেন রাজা বজ্র। সহ্ওয়ান শহরের আজ আর সে খ্যাতি নেই। এর আশেপাশের যমীন আজও অত্যন্ত উর্বর। এখানকার অধিবাসীবৃন্দ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল। রাজাকে তারা পসন্দ করত না। রাজা বজ্র শহরের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। না জানি শহরের অধিবাসীরাই তাঁকে হত্যা করে বসে—এই আশংকায় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সাথী-সঙ্গীদের নিয়ে রাজা কাকার কাছে গিয়ে আশ্রয় নেন। রাজার বজ্রের পলায়নে প্রজাবৃন্দ দুর্গের দরজা উম্মুক্ত করে দেয় এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে। এখান থেকে মুহাম্মদ বিন কাসিম চুনা, নায়ারকোট এবং খফদার হয়ে সীসেম অর্থাৎ সিবীর দিকে অগ্রসর হন।

    সিবীর রাজা কাকা

    রাজা কাকার পূর্বপুরুষ গঙ্গা অববাহিকা থেকে আগমন করেছিল। এরা ছিল সেই সব লোক যাদেরকে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হবার কারণে সেখান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই রাজাও রাজা দাহিরের করদ মিত্র ছিলেন।

    রাজা কাকার নিকট তাঁর সহধর্মীরা দেবল ও নীরুন প্রভৃতি স্থান থেকে এসেছিল এবং সকলেই তাকে আরবদের সঙ্গে সন্ধি করবার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তাদের পরামর্শে কান দেবার প্রয়োজন মনে করেন নি। রাজা কাকা সীসেম থেকে বহির্গত হয়ে হিলয়ানের দিকে অগ্রসর হন এবং বজ্রকে বলেন যে, তিনি সিবী থেকে দূরে মুহাম্মদ বিন কাসিমের মুকাবিলা করে তাকে পরাজিত করতে চান। কতক ঐতিহাসিক এখানে হিলয়ানের স্থলে বাজানের নাম উল্লেখ করেছেন।

    রাজা দাহির এক বিরাট বাহিনী বজ্রের সাহায্যে পাঠিয়ে দেন যেন তারা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে ডান দিক ও পশ্চাদ্দিক থেকে হামলা করে বজ্রকে জয়ী হতে সাহায্য করে। এ বাহিনীর আগমনে বন্ধান কিংবা (হিলয়ান) এলাকার লোকেরা রাজা কাকার নিকট আবেদন জানায় যেন তাদেরকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের উপর হামলা করে তার ফৌজকে ধ্বংস ও বরবাদ করবার সুযোগ দেওয়া হয়। রাজা কাকা আনন্দের সঙ্গে তাদের আবেদনে সাড়া দেন। অতএব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, বজ্র শাহী ফৌজ নিয়ে সিবী চলে যাবেন এবং রাজা কাকা সেখানকার ছোট ছোট ঠাকুর ফৌজ একত্র করে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে লড়বেন।

    হিয়ানের ঠাকুরগণ রাজা কাকাকে বলে যে, তারা মুহাম্মদ বিন কাসিমের উপর রাতের বেলা অতর্কিত আক্রমণ করবে এবং ভোরবেলা যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম ক্লান্ত-শ্রান্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকবেন তখন রাজা কাকা যেন তাঁর উপর স্বীয় ফৌজ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। রাজা কাকা তাদের এই প্রস্তাব মেনে নেন। রাত্রিবেলা হিলয়ানের ঠাকুর মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজের উপর হামলা করবার জন্য বের হয়। কিন্তু ভোর হলে তারা এই দেখে বিস্মিত হয় যে, তারা আরব ফৌজের দিকে অগ্রসর হবার পরিবর্তে ভুল নালা দিয়ে সফর করার কারণে সিবীর নিকটে গিয়ে পৌঁছেছে।

    রাজা কাকার গুপ্তচরেরা যখন তাকে এখবর দিল তখন তিনি ধারণা করলেন যে, এসব লোক তাকে ধোকা দিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমের হাতে তুলে দিতে চায়। তাহলে কি তারা নীরুন, দেবল প্রভৃতি স্থানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিলে গেছে?

    কাকার মনে এধরনের নানাবিধ কল্পনার উদয় হওয়া একান্তই স্বাভাবিক ছিল এবং এজন্য তিনি ভীষণ পেরেশানও ছিলেন। কেননা তারা ব্রাহ্মণদের জোর-যবরদস্তী এবং রাজা দাহিরের কর্মপন্থাতে খুশী ছিল না। রাজা দাহির ছিলেন কঠোর প্রকৃতির শাসক এবং ভীষণ অহঙ্কারীও। তাঁর ধারণা সম্ভবত এই ছিল যে, আরব ফৌজ অন্যান্য বিজয়ী সেনাদলের মত জয়লাভের পর নিজেদের বাড়ী-ঘরে ফিরে যাবে।

    রাজা কাকা সিবী থেকে এজন্যই চলে এসেছিলেন যেন বজ্র থেকে আলাদা হয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক অনুমান করে উপযোগী ফয়সালা করতে পারেন। এদিকে ঠাকুর ফৌজ আকস্মিকভাবে রাস্তা ভুলে যাওয়াকে অশুভ চিহ্ন হিসাবে ধরে নেয়। সিদ্ধান্ত হয় যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে সন্ধি করে তারা তাঁর সাথে মিশে যাবে।

    রাজা বজ্র নিজেই নিজেকে সিবীর দুর্গে বন্দী করে ফেলেছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম উক্ত কেল্লা অবরোধ করেন। কয়েক দিন পরেই বজ্রের মনে ভয় দেখা দেয় যে, প্রজাকুল মনের দিক দিয়ে তার সঙ্গে নেই। অতএব তিনি বিশ সহস্র বাছাইকৃত রাজপুত অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দুর্গ থেকে অত্যন্ত গোপনে বেরিয়ে পড়েন এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের উপর অতর্কিতে হামলা করে বসেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজ চতুর্দিক দিয়ে দুর্গ অবরোধ করবার জন্য ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। সেজন্য এই বিরাট হিন্দী ফৌজের জোরদার ও তীব্র আক্রমণ আরব ফৌজের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিম ছিলেন নির্ভীক ও দূরদর্শী অধিনায়ক। তিনি তাঁর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা মুতাবিক বিক্ষিপ্ত ফৌজকে একত্রিত হবার নির্দেশ দেন এবং যথা-সম্ভব সত্বর সেনানায়কদের এ পরিকল্পনার উপর আমল করবার তাকীদ দেন। বস্তুত তিনি এক্ষেত্রে তাঁর অনুকরণযোগ্য খ্যাতনামা অধিনায়ক খালিদ (রা) বিন ওয়ালীদেরই হুবহু নকল করেন অর্থাৎ তিনি তাঁর বাহিনীর মধ্য ভাগকে পেছনে সম্মুখ ভাগের দিকে হটে যাবার এবং ডান ব্যুহ ও বাম ব্যুহকে দৃঢ়তার সঙ্গে লড়বার হুকুম দেন। অর্থাৎ তাঁর সেনাব্যুহ দ্বিতীয়ার চাঁদের রূপ ধারণ করে।

    প্রচণ্ড হাতাহাতি লড়াই চলছিল। হিন্দী ফৌজের সংখ্যাধিক্যের কারণে আরবদের বেশ ক্ষতি হচ্ছিল। মুহাম্মদ বিন কাসিম এসব কিছুই লক্ষ্য করছিলেন। যখন তিনি দেখতে পেলেন যে, তাঁর সেনাবাহিনীর অবশিষ্ট বিক্ষিপ্ত অংশ সুশৃংখল হয়ে শত্রুর পশ্চাদ্দিকে অগ্রসর হচ্ছে তখন তিনি গোটা ফৌজকে একযোগে হামলা করবার নির্দেশ দেন।

    হিন্দী ফৌজ তাদের পশ্চাদ্দেশে হামলা হতে দেখে ঘাবড়ে যায়। বজ্র তার নিজের ফৌজকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও হতে দেখে ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যান। এতে হিন্দী ফৌজ মনোবল হারিয়ে বসে এবং সকলেই পিছন ফিরে কুম্ভ নদীর দিকে পালাতে শুরু করে। এমতাবস্থায় খুব কম সংখ্যক সৈন্যই আরব ফৌজের হাত থেকে জীবন রক্ষা করতে সমৰ্থ হয়। বহু সৈন্য হতাহত এবং যথেষ্ট সংখ্যক বন্দী হয়। বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুহাম্মদ বিন কাসিমের হস্তগত হয়। মুহাম্মদ বিন কাসিম যুদ্ধলব্ধ (মালে গণীমত) মালামালের সঙ্গে অনেক গোলামও ইরাকে পাঠান। এসব গোলাম ছিল যুদ্ধবন্দী। এরপর মুহাম্মদ বিন কাসিম সালূজ এবং কান্দাবীল অর্থাৎ কান্দাহারের দিকে অগ্রসর হন। সেখানকার অধিবাসীরা সকলেই ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তারা সন্তুষ্ট চিত্তে মুহাম্মদ বিন কাসিমের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। এখানে মুহাম্মদ বিন কাসিমের কাছে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশ আসে, ‘রাজা দাহিরের দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে পরাজিত কর।’ কেননা তখন মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজের পশ্চাদ্দেশ (Rear) এবং বাম ব্যুহ (Left-Flank) শত্রুর হামলার হাত থেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল এবং হামলারত আরব ফৌজ এবং ইরাকের মাঝখানে আর কোন দুশমন তখন অবশিষ্ট ছিল না।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম নীরূন ফিরে আসেন, যাতে করে তিনি সিন্ধুনদ (বর্তমান ঠাঠের নিকটে) পার হতে পারেন। এখানে এসে তিনি দেবল ফৌজকে বিশ্রাম গ্রহণ কিংবা আহতদের সেবা-শুশ্রুষা করারও সুযোগ দেন নি। তিনি ছোট ছোট প্লাটুন নদের পশ্চিম কিনারে কয়েক দিকে পাঠান, যাতে করে ছোট ছোট রাজন্যবর্গকে পদানত করা যায়। এক্ষেত্রে আশহিয়ার, সূরনা বেটের রাজা মূকা প্রমুখের নাম করা যায়। মুহাম্মদ বিন কাসিম অনুভব করেন যে, তাদেরকে পদানত করা অগ্রাভিযানের পূর্বেই জরুরী। যা-হোক ঐসব রাজা আরবদের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। অবশ্য ভুট্টোর রাজা রাসেল বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন এবং রাজা দাহিরের নিকট সাহায্যের আবেদন জানান।

    বজ্র রাজা দাহিরের নিকট পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি বিরাট একটি বাহিনীকে তাঁর পুত্র জয়সিংহের অধীনে গোথ নদীর (এটি সিন্ধু নদীর একটি শাখা) তীরে ঘেঁষে বেট দুর্গের দিকে পাঠান এবং নিজে এক বিরাট বাহিনী নিয়ে সিন্ধুনদের কিনার দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। তিনি মুসলিম ফৌজের মুখোমুখি ছাউনী ফেলেন এবং বিভিন্ন স্থানে চৌকী কায়েম করেন যাতে করে আরব ফৌজ সিন্ধু নদের তীরে অবতরণ করতে না পারে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম দূত মারফত একটি চিঠি রাজা দহিরাকে লিখে পাঠান। তাতে নিম্নরূপ পয়গাম ছিল :

    ১. সমস্ত আরব কয়েদীকে সম্মানের সাথে মুক্তি দাও।

    ২. রক্তপণ ও ক্ষতিপূরণ আদায় কর।

    ৩. তোমাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিচ্ছি। তা কবুল কর, অন্যথায় জিযয়া এবং রাজস্ব দিতে সম্মত হও।

    ৪. অস্বীকৃতির ক্ষেত্রে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।

    এ পত্রের উত্তর রাজা দাহির কড়া ভাষায় দেন এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমকে দূতের মাধ্যমে কুকুরের ন্যায় মরণ বরণের পয়গাম পাঠান।

    রাজা দাহির স্বীয় বাহিনী এবং রাজা জয়সিংহের বাহিনী পাঠিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি বিরাট বাহিনী সিন্ধুনদের তীরে এ উদ্দেশ্যে পাঠান যেন তারা সূস্তান ও তুরানে ত্রাসের সৃষ্টি করে। সিপাহ্‌সালার নিযুক্ত করা হয় রাজা গোপীকে। আমরা প্রথমেই লিখেছি যে, এ-দু’জন রাজা দাহিরের পক্ষ থেকে বুদ্ধিয়ার গভর্নর ছিলেন। তারা সিন্ধুনদের তীরবর্তী বাগরূরের নিকট অবস্থান নেন। এসব বাহিনীর অগ্রাভিযান নিম্নরূপ অবস্থার সৃষ্টি করে:

    ১. বেট-এর রাজা জাহীন এবং রাজা রাসেলের সাহায্যের জন্য বহু লোক একত্রিত হয়। অনন্তর রাজা রাসেল রাজা মুকার উপর হামলা করবার জন্য অগ্রাভিযান পরিচালনা করেন।

    ২. বহুলোক বুদ্ধিয়া এলাকায় রাজা রামচন্দ্রের শুভাকাঙ্ক্ষীতে পরিণত হয় এবং বাগরূর নিকট জমা হয়ে তার ফৌজে যোগদান করে।

    ৩. কিন্তু অনেক ঠাকুর এমনও ছিল, যারা অন্তর দিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে চাইত। তাই তারা মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে এসে মিলিত হয়।

    রাজা দাহিরের এই প্রতিরক্ষা চালের মুকাবিলায় মুহাম্মদ বিন কাসিম খুবই দ্রুতগতিতে পাল্টা চাল দেন। তিনি প্রথমেই জাট, মায়দ এবং ঠাকুর ফৌজকে সুসংগঠিত করে তাদেরকে সত্বর আপন ছাঁচে ঢেলে নেন। তিনি এ বাহিনীর সেনানায়কদের সঙ্গে উপদেষ্টা হিসাবে আরব অধিনায়ক নিয়োগ করেন, যাতে করে তারা সর্বাধিনায়কের মুখপাত্র হিসাবে সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।

    নিজের কিছু ফৌজকে নীরুনে ছেড়ে মুহাম্মদ বিন কাসিম বিদ্যুদ্গতিতে রাজা রামচন্দ্রের দিকে অগ্রসর হন। রাজা দাহির যে সব সমরাস্ত্র ও রসদ-সম্ভার রাজা রামচন্দ্রের সাহায্যে পাঠিয়েছিলেন, আকস্মিকভাবে তা মুহাম্মদ বিন কাসিমের হস্তগত হয়, যদিও এটা ছিল একান্তই অপ্রত্যাশিত। মুহাম্মদ বিন কাসিম এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নীরূনে পাঠিয়ে দেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এভাবে স্বীয় বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। কিছু অশ্বারোহী কোম্পানী এবং কিছু উষ্ট্রারোহী প্লাটুনকে তিনি বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দেন, যাতে তারা সেসব লোককে— যারা রাজা রামচন্দ্রের সাহায্যের জন্য একত্রিত হচ্ছে, মেরে তাড়িয়ে দেয়। অবশিষ্ট ফৌজ নিয়ে তিনি নিজে রামচন্দ্রের দিকে অগ্রসর হন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের এই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা যদিও সঠিক ছিল, কিন্তু একেবারে বিপদমুক্ত ছিল না। তথাপি ফল তা-ই হ’ল, যা মুহাম্মদ বিন কাসিম পূর্বাহ্নেই অনুমান করে রেখেছিলেন। অর্থাৎ রাজা রামচন্দ্র প্রথমে স্বীয় ফৌজকে গুছিয়ে নিয়ে সিন্ধু নদের তীর বেয়ে অগ্রসর হন, কিন্তু যখন তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের অগ্রসর হবার খবর শুনলেন এবং ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে আরব ফৌজের সংখ্যা অনেক বেশী বলে জানতে পারলেন—তখন তার নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মে যে, তার ফৌজ নিশ্চিতভাবেই আরব ফৌজের ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে যাবে। অগত্যা তিনি দ্রুতগতিতে সিন্ধুনদের অপর পারে চলে যান এবং পাড়ে উঠে সমস্ত নৌকা জ্বালিয়ে দেন, যাতে মুহাম্মদ বিন কাসিম তার পশ্চাদ্ধাবন করতে না পারেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এই সংবাদ জানতে পেয়ে একটি মামুলী কোম্পানী একজন সেনানায়কের তত্ত্বাবধানে রেখে রাত্রিবেলা অত্যন্ত সঙ্গোপনে বেটের দিকে অগ্রসর হন। সাথে সাথে এই কোম্পানীর অধিনায়ককে নির্দেশ দিয়ে যান, ‘যেসব সিন্ধী আনুগত্য কবুল করবে তাদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেবে।’

    মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজা জয়সিংহের মুকাবিলার জন্য এত দ্রুততার সঙ্গে অগ্রসর হন যে, তিনি (জয়সিংহ) হতভম্ব হয়ে পড়েন। কেননা জয়সিংহের গুপ্তচরেরা তাকে আগেই এই সংবাদ দিয়েছিল যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজা রামচন্দ্রের মুকাবিলায় ব্যস্ত রয়েছেন। সেজন্য তিনি এবং রাজা রাসেল তাদের সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে বেট জয় করার ফন্দি আঁটছিলেন। কিন্তু যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন এবং অপরদিকে রাজা মুকাও অগ্রাভিযান করলেন, তখন রাজা জয়সিংহ ঘাবড়ে গিয়ে পিছু হটে যান এবং রাজা দাহিরের ফৌজের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হন। ঐ সময় মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজের মধ্যে মহামারী দেখা দেয়। বহু ঘোড়া ও উট এতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সৈন্যরাও জ্বর ও বাতে আক্রান্ত হয়। এই মহামারী মুহাম্মদ বিন কাসিমকে খুবই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করে। অগত্যা তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট জরুরী সাহায্য ও ঔষধ চেয়ে পাঠান।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাৎক্ষণিকভাবে দু’হাজার অশ্বারোহী সৈনিক এবং বেশ কিছু উট ও ঘোড়া পাঠিয়ে দেন। তিনি এক প্রকার সিরকা রুটিতে ভিজিয়ে সে রুটি রোদে শুকিয়ে নেন। এই রুটি পুনরায় পানিতে ভিজালে সিরকায় পরিণত হ’ত এবং এই সিরকা জ্বর ও বসন্ত রোগের প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করত। হাজ্জাজ এই রুটি বহুল পরিমাণে মুহাম্মদ বিন কাসিমের নিকট পাঠিয়ে দেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম নিজেও নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। তিনি সেখানকার বাসিন্দাদের বিরাট সংখ্যায় আরব ফৌজে ভর্তি করে নিয়েছিলেন। এসব লোক ভর্তি হবার মুহূর্তে তাদের ঘোড়া, তলোয়ার, ভালা প্রভৃতি নিজেদের সঙ্গে নিয়ে আসত। তারা যুদ্ধে তাদের অবদানের বিনিময়ে বেতন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে অংশ পেত। অতি অল্প দিনেই এই জাতীয় ফৌজের সংখ্যা বেড়ে কয়েক হাজারে গিয়ে পৌঁছে। মুহাম্মদ বিন কাসিম একদিকে অটুট মনোবল ও দূরদর্শিতার সঙ্গে শত্রুর মুকাবিলায় অগ্রসর হচ্ছিলেন। অন্যদিকে রাজা দাহির মহামারী সম্পর্কে অবগত হয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে বলে পাঠান, “এখনো সময় আছে; ফিরে যাওয়া তোমাদের জন্য কল্যাণকর। কথা দিচ্ছি, আমি তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করব না।”

    সিন্ধুনদের ছাউনী এবং ফৌজের মুকাবিলা

    মুহাম্মদ বিন কাসিম জবাবে বলেন, “খুব সত্বর আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হবার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে আসছি।”

    রাজা তারবার্তা পাঠিয়ে স্বয়ং শিকার ও আনন্দভ্রমণে মত্ত হয়ে যান এবং রাজা রাসেল ও জয়সিংহকে একটি বাহিনী দিয়ে শত্রুর মুকাবিলায় প্রেরণ করেন। তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা তাদের বাহিনী নিয়ে সিন্ধুনদের তীর ধরে সতর্কতার সঙ্গে টহল দিয়ে বেড়াবে, যেন আরব ফৌজ সিন্ধু পার হতে না পারে।

    শত্রু ছাউনীর নিকট দিয়ে সিন্ধুনদ পার হবার জন্য মুহাম্মদ বিন কাসিম কয়েকবার ছোট ছোট প্লাটুন পাঠান। কিন্তু প্রত্যেকবারই হিন্দী ফৌজ আরব ফৌজকে মেরে তাড়িয়ে দেয়। এতদসত্ত্বেও মুহাম্মদ বিন কাসিম উপর্যুপরি প্লাটুনের পর প্লাটুন পাঠাতে থাকেন এবং বারবার ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও তার মনোবল এতটুকু ভেঙে পড়েনি।

    রাজা কাকা এবং রাজা মুকার পরামর্শে এবার তিনি বহু আরব সৈন্য নিঃশব্দ গতিতে সাক্লা (মীরপুর সারা) এবং এর অগ্রবর্তী এলাকাতে স্থানান্তরিত করেন। জয়সিংহের সঙ্গী এ ধারণায় কাল ক্ষেপণ করেন যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম নীরূনেই অবস্থান করছেন। প্রকৃতপক্ষে জাট এবং ঠাকুরদের সংখ্যা প্রতিদিনই এমনভাবে বেড়ে চলছিল যে, রাজা দাহিরের গুপ্তচরেরা মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা শক্তির হ্রাস-বৃদ্ধির সঠিক পরিমাপ করতে পারে নি। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাক্লাগামী ফৌজ কেবলমাত্র রাত্রিকালেই সফর করত, যাতে করে কেউ তাদের চলাচল ও গতিবিধি টের না পায় এবং দিনের উত্তপ্ত রৌদ্রের সফরজনিত ক্লান্তি থেকেও তারা মাহফুজ থাকে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম দু’টি প্রবেশপথ বেছে নেন। তন্মধ্যে একটি সাক্লার নিকট সিন্ধুনদের তীরে। অনুমান করা চলে যে, এ দু’টি প্রবেশপথকে আজকাল ‘আল্লাহ রাখখো’ এবং ‘মারহ’ প্রবেশপথ বলা হয়। এদু’টি সাকার পশ্চিমে এবং শাহবন্দের উত্তরে অবস্থিত।

    এখানে মুহাম্মদ বিন কাসিম নতুন একটি ফর্মুলা উদ্ভাবন করেন। তিনি অনেকগুলো নৌকা সিন্ধুনদের পশ্চিম তীরে একত্রিত করে একটির সাথে অন্যটিকে শক্তভাবে বেঁধে দেন। অতঃপর একরাত্রে কয়েকজন সাঁতারুকে নদীর ওপারে পাঠিয়ে অগ্রভাগের নৌকা, যেটির সাথে মযবুত রশি বাঁধা ছিল—পূর্ব কিনারে জুড়ে দেন। আকস্মিকতাই বলুন বা যোগ্যতাই বলুন—সিন্ধুনদের উপর একটি পুল তৈরী হয়ে যায় এবং তার উপর দিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিম ফৌজসহ বিদ্যুদ্গতিতে নদী পার হয়ে পূর্ব পাড়ে গিয়ে পৌঁছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রাজা দাহিরের ফৌজ অভিমুখে অগ্রসর হন। রাজা দাহির তখন ফৌজের সাথে ছিলেন না। রাজা রামচন্দ্র যেই শত্রুর পার হবার কথা জানতে পারলেন অমনি রাজা রাসেলকে একটি বাহিনীসহ মুহাম্মদ বিন কাসিমের মুকাবিলায় পাঠিয়ে দেন এবং নিজে ফৌজের অবশিষ্টাংশ নিয়ে বাহমনাবাদের দিকে চলে যান।

    রাজা দাহির সেখানে মুসলিম ফৌজের মুকাবিলায় অবতরণ না করে স্বীয় রাজধানীর দক্ষিণ দিকে একটি দুর্গে মুকাবিলা করার সিদ্ধান্তে নেন। কেননা উক্ত দুর্গের নিকটে পৌঁছতে হলে শত্রুকে একটি বিরাট দুলদুলে এলাকা অতিক্রম করতে হবে। এই দুলদুলে এলাকা হচ্ছে শাহদাদপুরের পার্শ্ববর্তী এলাকা, যাকে মুক্ষী ডাণ্ড স্কীমের অধীনে ১৯৪৫ সালে সরকার পরিষ্কার করে চাষ ও কর্ষণযোগ্য জমিতে রূপান্তরিত করেছেন এবং এখন সেখানে বেশ ভাল রকমের ফসলাদি উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম মানের কার্পাস তুলা এবং গম উল্লেখযোগ্য।

    রাজা রাসেলের মুকাবিলায় মুহাম্মদ বিন কাসিম ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আলী ছাকাফীকে পাঠিয়ে দেন এবং নিজে সমগ্র ফৌজ এবং ভারী সাজ-সরঞ্জাম একত্রিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। রাসেল এবং ‘আবদুল্লাহ্‌র মধ্যে মাহম নামক স্থানে প্রচণ্ড লড়াই সংঘটিত হয়, এতে রাসেল পরাজিত হন। তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নিকট অস্ত্র সমর্পণ করেন এবং ভবিষ্যতে বিশ্বস্ত থাকবেন বলে শপথ করেন। শেষ পর্যন্ত মুকা, রাসেল এবং কাকা এই তিনজন রাজা মুহাম্মদ বিন কাসিমের অধীনে লড়াই করবার জন্য একত্রিত হলেন।

    রাজা রাসেলের সাম্প্রতিককালের সকল অবস্থা জানা ছিল। তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে যথাসত্বর সম্মুখে অগ্রসর হবার পরামর্শ দেন, যাতে তাঁর ফৌজ দুলদুলে এলাকা অতিক্রম করে নিরাপদে জয়পুর (এটি রাওরের দক্ষিণে অবস্থিত ছিল) পৌঁছতে পারে। রাজা রাসেলের পথ প্রদর্শন এবং সুব্যবস্থাপনায় মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজ বিশেষ কোন বাধা ছাড়াই জয়পুরে গিয়ে পৌঁছে।

    রাজা দাহির এ খবর শুনে মুকাবিলার জন্য দুর্গের বাহিরে খোলা ময়দানে বেরিয়ে আসেন। তাঁর ফৌজের সংখ্যা ছিল দেড় লক্ষেরও অধিক এবং তারা উন্নতমানের সমরাস্ত্রে সজ্জিত ছিল। জয়পুরের উত্তরে কুরিওয়াহ নদীর দক্ষিণ প্রান্তরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের আরব ফৌজে প্রায় পাঁচ হাজার অশ্বারোহী এবং পাঁচ হাজার উষ্ট্রারোহী ছিল। সেই সাথে ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজারের মত ঠাকুর, মায়দ এবং জাট সৈনিক। এদের কাছে রাজা দাহিরের ফৌজের মত না ছিল উন্নতমানের সমরাস্ত্র—আর না ছিল হাতী। অবশ্য মুহাম্মদ বিন কাসিম হিন্দু আরোহী বাহিনীকে স্বীয় পরিকল্পনা মাফিক ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন। আর তাঁর গোটা ফৌজ ছিল একদেহ, একপ্রাণ, সুশৃঙ্খল এবং সুসংগঠিত। নীচে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি চিত্র পেশ করা যাচ্ছে। এর দ্বারা উভয় ফৌজ কিভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছিল, তা বুঝতে সুবিধা হবে (ছবি পরের পৃষ্ঠায়)।

    রাজা দাহিরের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ছিল স্বীয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল। মনে হয় যে জয়সিংহের অশ্বারোহী বাহিনীকেও তিনি তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং হেফাজতের জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। আক্রমণের দায়িত্ব তিনি জাহীনের হাতে সোপর্দ করেছিলেন। জাহীন ছিলেন আত্মোৎসর্গী সাহসী একজন অফিসার। কিন্তু তার ফৌজ বিভিন্ন সর্দারের অধীনে ছিল বলে সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল ছিল না।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম ক্রদিসের সামরিক নীতির উপর স্বীয় ফৌজকে বিন্যস্ত করেছিলেন। হিন্দী অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণকে ব্যর্থ করে দেবার জন্য তিনি স্বীয় ফৌজের সামনে খন্দক (পরিখা) খনন করে নিয়েছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম যেহেতু তাঁর ফৌজের মনোবলের উপর পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন—সেজন্য তিনি নিজে আক্রমণের ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হবার পরিবর্তে রাজা দাহিরের ফৌজের হামলার অপেক্ষা করতে থাকেন।

    সর্দার জাহীন ঠাকুর অশ্বারোহী কোম্পানী দিয়ে হামলা করেন। কিন্তু তার সব হামলাই খন্দকের কারণে ব্যর্থ হয়ে যায়। খন্দকের আড়াল থেকে আরব তীরন্দাযগণ হিন্দী ফৌজের বিরাট ক্ষতিসাধন করে। ফলে হিন্দী ফৌজের মধ্যে কিছুটা হুড়াহুড়ি ও হৈ চৈ-এর সৃষ্টি হয়। ঠিক তখনি দক্ষিণ ও বাম বাহুর মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করে বসে এবং খন্দকের কারণে তারা যারপরনাই অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে। অবস্থা দৃষ্টে রাজা দাহির তাঁর গোটা বাহিনীকে একযোগে হামলা করবার নির্দেশ দেন, যাতে করে তারা আরবদের হামলা প্রতিরোধ করবার পর বাকী আরব ফৌজকে দলে পিষে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে।

    আরব ফৌজের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা মুতাবিক হিন্দী ফৌজের ভেতর যখন গোলমাল ও হৈ চৈ লক্ষ্য করা গেল ঠিক তখনই আবূ সাবির হামদানী এবং রাজা রাসেল লম্বা চক্কর কেটে হিন্দী ফৌজের পেছনে গিয়ে উপস্থিত হন এবং তাদের কেরোসিন তৈলে পূর্ণ জ্বলন্ত তীর নিক্ষেপকারী তীরন্দায বাহিনী তীর এবং তৈলের পিচকারীর সাহায্যে হস্তিযুথের উপর জ্বলন্ত মশাল নিক্ষেপ করতে থাকেন। আকস্মিকভাবেই একটি জ্বলন্ত তীর রাজা দাহিরের হাতীর শুড়ের রেশমী চাদরে গিয়ে গাঁথে এবং তাতে আগুন ধরে যায়। এই আগুনের কারণে হাতী ঘাবড়ে গিয়ে পালাতে থাকে। সাধারণ সৈনিকেরা মনে করল যে, রাজা দাহির তার নিজের জীবন বাঁচাতে কেটে পড়ছেন।

    আবূ সাবিরের হামলার সঙ্গে সঙ্গেই মুহাম্মদ বিন যিয়াদ, রাজা মুকা এবং রাজা কাকার অশ্বারোহীবৃন্দ রাজা দাহিরের ফৌজের দক্ষিণ ও বাম ব্যুহের উপর হামলা করে বসে। এই হামলার সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষিণ অগ্রবর্তী বাম বাহুর ফৌজও একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

    রাজা দাহিরের মত্যু

    রাজা দাহির মাহুতকে নির্দেশ দেন হাতীকে নদীর দিকে নিয়ে যাবার জন্যে। এখানে এসে হাতী পানির ভেতর শুয়ে পড়ে। রাজা দাহির সঙ্গে সঙ্গে হাতীর পিঠে থেকে নেমে পড়েন এবং ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হন। এমনি সময়ে রাজা দাহিরের পশ্চাদ্ধাবনরত একজন আরব অশ্বারোহী তাঁকে আক্রমণ করে এবং একই আঘাতে ধড় থেকে তাঁর মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। দাহিরের ফৌজ পরাজিত হয়। ৭১৩ খৃস্টাব্দের জুন মাসে ১০ই রমযান তারিখে এ ঘটনা ঘটে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের এ যুদ্ধে এত সহজে জয়লাভ করবার অন্যতম কারণ ছিল এই যে, রাজা রাসেল রাজা দাহিরের সেনা সন্নিবেশ ও বিন্যস্তকরণের গূঢ় রহস্য সম্পর্কে তাঁকে পূর্বাহ্নেই অবহিত করেছিলেন। আরব ফৌজ তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত ছিল। অবশ্য যুদ্ধে শত্রুর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়াও খুবই জরুরী।

    রাজা জয়সিংহ পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ আলোর গিয়ে দুর্গের দ্বার বন্ধ করে দেন। সেখানে রাজা দাহিরের স্ত্রী রাণী বাঈ,—যিনি রাজার আপন বোনও ছিলেন, পূর্ব থেকেই অবস্থান করছিলেন।

    অগ্রাভিযান

    মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজা দাহিরের রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতেই রাজা জয়সিংহ শহর রক্ষার ভার স্বীয় ভ্রাতা রাজা গোপীকে সোপর্দ করে নিজে বাহ্মনাবাদ গমন করেন। রাজা গোপীও জয়সিংহের যাবার পর বেশীক্ষণ শহরে অবস্থান করেন নি। তিনি দহলীলার দুর্গে গিয়ে দুর্গদ্বার বন্ধ করে দেন।

    বাহ্মনাবাদের উপর হামলা।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম তৎক্ষণাৎ বাহ্মনাবাদের দিকে অভিযাত্ৰা শুরু করেন। পথিমধ্যে দহলীলা ও বাহরোরের দুর্গও জয় করে নেন। রাজা গোপী এখান থেকে কাথিওয়াড়ের দিকে পালিয়ে যান। বাহ্মনাবাদে বিশেষ কোন যুদ্ধ হয়নি।

    স্কালিন্দার অভিমুখে অগ্রাভিযান

    মুহাম্মদ বিন কাসিম অতঃপর বাবিয়া জয় করেন। এটি শতদ্রু নদীর তীরে অবস্থিত। এখানকার রাজা কস্ক মুহাম্মদ বিন কাসিমের খুবই বিশ্বস্ত সহযোগী প্রমাণিত হন। বাবিয়া থেকে মুহাম্মদ বিন কাসিম স্কালিন্দার দিকে অগ্রসর হন। এ শহরও তিনি খুব সহজেই জয় করেন।

    মুলতানের দিকে অগ্রাভিযান এবং মুলতান বিজয়

    স্কালিন্দা থেকে মুহাম্মদ বিন কাসিম মুলতানের দিকে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে পড়ে সিক্কা দুর্গ, দুর্গাধিপতি ছিলেন রাজা বজ্রের দৌহিত্র। তিনি প্রথমে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মুহাম্মদ বিন কাসিমের মুকাবিলা করেন। অতঃপর দুর্গমধ্যে অবরুদ্ধ হয়েও বীরত্বের সঙ্গে লড়ে যান। সতের দিনের ভীষণ যুদ্ধের পর শেষাবধি তিনি অস্ত্র সমর্পণ করেন। এই রাজা খুবই সাহসিকতা এবং কার্যকর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে লড়াই চালালেও মুহাম্মদ বিন কাসিমের কয়েক গুণ ফৌজের মুকাবিলা করতে পারেন নি। তিনি পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করেন এবং আশেপাশের এলাকাকে এমনভাবে ধ্বংস ও বরবাদ করে দেন যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় ফৌজের রসদ-সামগ্রীর জন্য ভীষণ অসুবিধার সম্মুখীন হন। হিন্দী ফৌজ বেশীর ভাগ ধন-সম্পদ মুলতান দুর্গে নিয়ে গিয়েছিল।

    মুলতানের শাসনকর্তাও নিজেকে দুর্গমধ্যে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও দুর্গ অবিজিতই থেকে যায়। এদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিম রসদ-সম্ভারের ঘাটতির কারণে দারুণ অসুবিধায় পড়েন। দূর্গ-প্রাচীরে মিনজানীক নিক্ষেপ করা হয়। দুবাবা এবং কাব্‌শ ও ছোড়া হয়, কিন্তু দুর্গ-প্রাচীরের দৃঢ়তার মুখে সবকিছু হার মানে।

    শেষাবধি রাজা কস্ক নিরাপত্তা প্রার্থনার জন্য আগত মন্দিরের পূজারীদের নিকট থেকে জেনে নেন—মুলতান শহরের প্রয়োজনীয় পানি কোথা থেকে আসে। যদি পানির সে নহর বন্ধ করে দেওয়া যায় তাহলে লোকে পানীয় জলের অভাবে বাধ্য হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনুগত্য স্বীকার করে নেবে। মুহাম্মদ বিন কাসিম শহরের পানি বন্ধ করে দেন এবং পরিণতিতে শহরের অধিবাসীরা আনুগত্য স্বীকার করে নেয়।

    এখানে একটি মজার ঘটনা পাঠক সমীপে পেশ করা যেতে পারে। মুলতানের বিখ্যাত মন্দিরের যেসব পূজারী পানির নহরের সন্ধান দিয়েছিল তারা মুহাম্মদ বিন কাসিমের কাছে এই শর্তে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেছিল যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম তাদের মন্দির যদি স্পর্শ না করেন তাহলে তারা এমন একটি গুপ্তধনের সন্ধান দেবে, যার ভেতর মন্দিরে সঞ্চিত ধনরত্নের চেয়েও অনেক বেশী ধন-দৌলত রয়েছে। মুহাম্মদ বিন কাসিম তাদের এ শর্ত মঞ্জুর করেন। প্রকৃতই উক্ত গুপ্ত ধনভাণ্ডার থেকে এত বিপুল পরিমাণে ধন-সম্পদ উদ্ধার করা হয় যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযানের জন্য খলীফার নিকট থেকে কর্জ স্বরূপ যে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন, তার চাইতেও এটা ছিল কয়েক গুণ বেশী। মুহাম্মদ বিন কাসিম এসব ধন-সম্পদ হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট পাঠিয়ে দিয়ে স্বীয় কর্জ মুনাফাসহ পরিশোধ করে দেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের রাওর প্রত্যাবর্তন

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এবার রাওরের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং একটি বাহিনী ঝিলাম নদীর তীরে অবস্থিত ব্রহ্মপুর শহরের দিকে পাঠান। এই বাহিনী কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সাফল্য নিয়ে প্রত্যাবর্তন করে।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ওফাত এবং ভীলম্যানের উপর হামলা—অধিকন্তু খলীফা ওয়ালীদ বিন ‘আবদুল মালিকের ওফাত—নতুন খলীফা নির্বাচন এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের গ্রেফতারী

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ৯৫ হিজরীতে ইনতিকাল করেন। ঐ বছরেই মুহাম্মদ বিন কাসিম গুজর ও ভীলদের বিরুদ্ধে ভীলম্যানের দিকে অভিযান প্রেরণ করেন। ভীলম্যান সিন্ধু সীমান্তের কাথিওয়াড় রাজ্য সংলগ্ন একটি রাজধানী, যার সিংহাসন ছিল কুযাজ (বর্তমান জয়পুর)। মুহাম্মদ বিন কাসিম এটা জয় করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন—এমন সময় তিনি খলীফা ওয়ালীদ বিন ‘আবদুল মালিকের ইনতিকালের খবর পান। খলীফার ইনতিকাল হয়েছিল ৯৬ হিজরীর জুমাদিউছ-ছানী মাসে। তদস্থলে সুলায়মান বিন ‘আবদুল মালিক খলীফা নির্বাচিত হন। নতুন খলীফা য়াযীদ বিন মুহাল্লাবকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং সেই সঙ্গে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে গ্রেফতার করবার নির্দেশ দেন। সুলায়মান কুতায়বা বিন মুসলিমকেও হত্যা করেন।

    মুসা বিন নুসায়র

    সুলায়মানের ক্রোধ-বহ্নির হাত থেকে স্পেন বিজয়ী মুসা বিন নুসায়রও শেষরক্ষা পান নি। মুসার পুত্র ‘আবদুল আযীযকেও সুলায়মানের নির্দেশে হত্যা করা হয়। এভাবে অল্প দিনের মধ্যেই ইসলামী দুনিয়া কয়েকজন বিখ্যাত বীর ও বিজয়ী সেনানায়ক এবং যোগ্যতম প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সেনাপতির খিদমত থেকে বঞ্চিত হয়।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের গ্রেফতারী

    মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর গ্রেফতারীর নির্দেশনামা অত্যন্ত ধৈর্য ও স্থৈর্যের সঙ্গে শোনেন এবং নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন:

    “লোকেরা আমাকে বিনষ্ট করে দিল। কোন্ যুবককে তারা বিনষ্ট করল? তাকেই, যে তাদের সংকট মুহূর্তে ও বিপদকালে কাজে এসেছিল এবং সীমান্তকে সুদৃঢ় ও অক্ষুণ্ণ রাখতে যে ছিল খুবই উপযোগী।”

  • সংক্ষিপ্তসার

    সংক্ষিপ্তসার

    সংক্ষিপ্তসার

    প্রতিরক্ষামূলক শিক্ষা, উত্থাপিত অভিযোগসমূহ এবং এর জওয়াব

    এখানে সর্বাগ্রে এই প্রশ্ন দেখা দেয় যে, এটি কি চাচা (হাজ্জাজ) এবং ভাতিজা (মুহাম্মদ বিন কাসিমের) একক সিদ্ধান্ত (تهور) ছিল না যে, এত বড় মহারাজার বিরুদ্ধে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হলেন? যার ফৌজ সর্বতোভাবে অস্ত্রসজ্জিত ছিল, যার রাজ্য ছিল খুবই সম্পদশালী, আর তাঁর রাজধানীর মুহাফিজ ও তত্ত্বাবধায়ক ছিল মযবুত দুর্গ; আর মুসলিম বাহিনী এসেছিল তাদের স্বদেশ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে যেখানে সাহায্য ও রসদ-সম্ভার পৌঁছানো ছিল এক দুরূহ ব্যাপার।

    এ প্রশ্নের জওয়াবে আমরা মশহুর প্রতিরক্ষা পর্যালোচক লীড ল হার্ট-এর গ্রন্থ থেকে তাঁর মতামত উদ্ধৃত করছি।

    “এসব সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে একটি তত্ত্ব প্রমাণিত হয়েছে যে, ফৌজের বিরাটত্ব কিংবা দামী ও মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্র প্রকৃতপক্ষে ততখানি গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতখানি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে থাকেন এগুলোকে হুকুমতের আমীর উমারা ও জেনারেলগণ। অর্থাৎ এসব লোক তাদের প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের শক্তির পরিমাপ ফৌজের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করে থাকেন। তথাপি এটাও স্বাভাবিক ব্যাপার যে, জনসাধারণ ঐ সব নেতারই মতামত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একই সুরে কথা বলে থাকে। কারণ সংখ্যা শক্তির ভিত্তিতে শক্তির পরিমাপ করা খুবই সহজ, কিন্তু সেনাবাহিনীর যোগ্যতার পরিমাপ করা তত সহজ নয়। এ সংখ্যার ভিত্তিতেই সরকার জনসাধারণকে প্রভাবিত করে ফৌজের সংখ্যা বৃদ্ধি করবার জন্য রাযী করিয়ে নেয় এবং এভাবে জনসাধারণের কাছ থেকে সর্বপ্রকার ট্যাক্সের বর্ধিত হার নির্বিবাদে আদায় করে থাকে।

    “বস্তুতপক্ষে কোন দেশের প্রতিরক্ষাগত সঠিক ভারসাম্য নির্ভর করে তার ফৌজের যোগ্যতার উপর এবং এই যোগ্যতা ফৌজের অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার, তার চলাচল ও গতিবিধি, সহ্য ক্ষমতা, একাগ্রতা, শৃঙ্খলা ও বিন্যাসের মত কয়েকটি জটিল বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল। ফৌজের অধিনায়ক যদি উপযুক্ত যোগ্যতার অধিকারী না হন তাহলে ফৌজ হবে সেই রেলগাড়ীর মত, যার ইঞ্জিন বেকার ও অথর্ব।”

    আমরা যখন উপরিউক্ত বর্ণনার সঙ্গে মুহাম্মদ বিন কাসিম সম্পর্কিত ঘটনাবলীর তুলনা করি তখন মূল বিষয়টি বুঝে নিতে আর কোন অসুবিধা হয় না।

    আমরা যদি রসূল করীম (সা)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের দিকে মনোনিবেশ করি তাহলে আমাদের এ সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল বলে মনে হয়। আর রসূল (সা)-এর প্রতিরক্ষা কৌশলের ঘটনাবলী লীডল হার্ট-এর গ্রন্থ রচনার আগেই সংঘটিত হয়েছিল।

    সমরনীতিতে মুহাম্মদ বিন কাসিম আঁ-হযরত (সা)-এর পরিপূর্ণ অনুসরণ করেছেন। তিনি মুজাহিদবৃন্দকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মনোবল-সম্পন্ন, নির্ভীক এবং একদেহ একপ্রাণে পরিণত করেন। তিনি তাদের মধ্যে খুদী তথা ব্যক্তিত্বের অনুভূতি জাগ্রত করেন। জিহাদী প্রেরণা সৃষ্টি করে তাদেরকে ঐকান্তিক কুরবানীর জন্য তৈরী করেন। আঁ-হযরত (সা) বদরে যুদ্ধের পূর্বে স্বীয় ফৌজকে এমনিভাবেই সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল করে তুলেছিলেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ জেনারেল ও উন্নতমানের রাজনীতিবিদের মত ভাবী ঘটনাবলী, তার ফলাফল ও পরিণতি সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে স্বীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি তাড়াহুড়ার আশ্রয় যেমন গ্রহণ করেন নি, তেমনি অহমিকাবোধ কিংবা গর্বের শিকারও হননি। এটাই একমাত্র কারণ যে, আবেগের বশবর্তী হয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিম তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণ ও পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে সিন্ধুর রাজধানীর দিকে অগ্রসর হননি; বরং তিনি ছয় মাস শীরাযে অবস্থান করে প্রথমে নিজের ফৌজকে সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত করে গড়ে তুলেন। তিনি প্রতিটি বিজয়ের পর প্রতিটি বিষয়ের পরিমাপ এবং তুলনামূলক বিচার-বিবেচনা করে তবে সম্মুখে অগ্রসর হন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের হামলার ব্যাপারে দ্বিতীয় আপত্তি

    দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম মাকরানের কুযপুর অর্থাৎ পাঞ্জগোর শহর জয় করলেন তখন কেন বুদ্ধিয়া, তুরান এবং সূস্তান জয় করবার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হলেন না। অধিকন্তু এটা কি তাঁর নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল না যে, কয়েদীদের যথাসত্বর মুক্তি দিতেন এবং রাজা দাহিরকে তার কৃতকার্যের শাস্তি প্রদান করতেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম-এর গৃহীত কর্মপন্থা সঠিক ছিল

    যদিও এসব প্রশ্ন বিবেচনাযোগ্য, তবে এগুলোর জওয়াব দেবার পূর্বে মূল ঘটনাবলীকে প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রনীতি এবং সমরশাস্ত্রের মূলনীতির উপর পরখ করে দেখাই সমীচীন হবে। সিন্ধু অভিযানে রওয়ানা হবার পূর্বে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মুহাম্মদ বিন কাসিমকে ঐ সব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন, যা হযরত ওমর এবং হযরত ‘উছমান (রা)-এর খিলাফত আমলে উক্ত দেশে জিহাদ পরিচালনার ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছিল। অতএব প্রাথমিক যুগে যে সমস্ত কারণে মুসলমানদের পরাজয় ঘটেছিল— মুহাম্মদ বিন কাসিম সে সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। আর এ কারণেই তিনি পাঞ্জগোর অবস্থান করে গুপ্তচরের মাধ্যমে বেলা ও দেবল পর্যন্ত মধ্যবর্তী এলাকার রাস্তা, পাহাড় পর্বত ইত্যাদির অবস্থা যথাযথভাবে এবং পরিপূর্ণরূপে জেনে নিয়েছিলেন। পাঞ্জগোর থেকে বেলা প্রায় দু’শ মাইল দূরত্বে অবস্থিত, যদিও এ দূরত্ব সোজাসুজিভাবে ১৫০ মাইলের বেশী হবে না। কিন্তু পানীয় জলের অভাব ছিল সর্বত্র এবং জঙ্গলের কারণে রাস্তা ছিল দূরতিক্রম্য। অতএব প্রতিরক্ষা নীতির দৃষ্টিতে অপরিহার্য ছিল যুদ্ধের পূর্বে সে দেশের অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত হওয়া। আঁ-হযরত (সা) বদর যুদ্ধের পূর্বে কয়েকবারই বদরের রণক্ষেত্র খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেছিলেন।

    আজকালকার প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক কিংবা জেনারেল হয় নিজে স্বয়ং বিমানে আরোহণ করে যুদ্ধ এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন অথবা তাঁর জন্য বিমান থেকে সমস্ত এলাকার ছবি তুলে একটি বিরাট মানচিত্র তৈরী করা হয় এবং চিত্রপটে অভিজ্ঞ ব্যক্তি জেনারেলের জন্য খুবই বিস্তৃত রিপোর্ট তৈরী করেন, যাতে করে তিনি পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, নদী-নালা, রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট, মাঠ-ময়দান প্রভৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্য লাভ করতে পারেন। এই রিপোর্ট পাঠ করেই মানচিত্রের সাহায্যে জেনারেল তার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরী করেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর এবং নির্ভীক অশ্বারোহী ছিল, যাদের মাধ্যমে তিনি ঐসব এলাকার চড়াই-উৎরাই এবং অন্যান্য বাধা-বিপত্তি সব জেনে নেন। এক্ষেত্রে তিনি স্থানীয় পথ-প্রদর্শকদেরও কাজে লাগান। নেপোলিয়নের উক্তি: “যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভের জন্য সময়-জ্ঞান একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। আমার সাফল্যের অন্যতম বিরাট রহস্য এই যে, আমি সব সময় ধৈর্য ও স্থৈর্যের সঙ্গে উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষা করেছি। আর এমনটি করা খুব সহজ কাজ নয়। কেননা এর জন্য চাই ইস্পাত-কঠিন হাদয়।”

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের সামনে ছিল দু’শ মাইলেরও অধিক অত্যন্ত বিপজ্জনক জঙ্গল। এসব জঙ্গলের বাসিন্দারা ছিল মুসলিম ফৌজের জানের দুশমন।

    তাদের কাছে বিরাট এবং উন্নত মানের অস্ত্রধারী ফৌজ ছিল। এমতাবস্থায় তাদেরকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে নিক্ষেপ করাটাই ছিল যুক্তিযুক্ত, যাতে করে মুসলিম ফৌজ বেলা পর্যন্ত আকস্মিকভাবে পৌঁছে যেতে পারে। ঘটনা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, শত্রু সে সময় কিছুই করেনি। এমতাবস্থায় মুসলিম ফৌজ বেলার আশেপাশে পৌঁছে যায়। আরমান ও বেলা বিজিত হয় এবং মুহাম্মদ বিন কাসিম ২৫ হাজারের মত শত্রু সৈন্যকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দেন। এর পর তিনি আহত শত্রুর দেখাশোনা ও সেবাযত্ন করেন। কেবল সাধারণ সৈনিকদেরই নয়—বরং তাদের সেনাপতিকেও তিনি সসম্মানে মুক্তি দেন; শত্ৰু ফৌজের সমরাস্ত্র ও রসদ-সম্ভার হস্তগত করাকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, মুহাম্মদ বিন কাসিম সে যুগের স্থানীয় প্রচলিত যুদ্ধনীতি কেন অনুসরণ করেন নি, অর্থাৎ আহত ও অন্যান্য যুদ্ধবন্দীকে কেন হত্যা কিংবা গোলামে পরিণত করেন নি? তাঁর এই কোমল আচরণ কি তাঁর দুর্বলতার পরিচায়ক নয়?

    একথা নিশ্চিত সত্য যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমের এই সহানুভূতিপূর্ণ ও উদার ব্যবহার তাঁর শত্রুকেও বিস্ময়ের মাঝে নিক্ষেপ করেছিল। ব্রাহ্মণদের কাছে যারা ছিল অস্পৃশ্য ও নিচু জাতির লোক বলে পরিচিত, তারা মুসলমানদের নিকট মানবেতর এবং নিকৃষ্টতম ব্যবহার পাবারই ধারণা করেছিল। কিন্তু কার্যত দেখা গেল, সব কিছুই তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে সংঘটিত হচ্ছে। ব্রাহ্মণ এবং রাজপুত তাদের চেয়ে হেয়তর জাতির লোকদের খেদমত করাটাকে তাদের মর্যাদার পরিপন্থী বলে মনে করত। কিন্তু মুসলিম মুজাহিদবৃন্দ আহত যুদ্ধবন্দীদের নিঃস্বার্থভাবে সমগ্র দেহমন দিয়ে খেদমত করে। সিন্ধুর অধিবাসীবৃন্দ ঐদিন ইসলামী সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নমুনা প্রথম বারের মত দেখতে পায়। তারা মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর প্রতি নিঃশঙ্কচিত্ত ও ভয়-ভীতিহীন দেখতে পায়, আর যুদ্ধের পর দেখতে পায় একে অন্যের সর্বোত্তম সহমর্মী ও বন্ধু হিসাবে। তাদের (মুসলমানদের) মধ্যে না জাতিগত ভেদাভেদ ছিল, না ছিল জাঁক-জমক ও অহঙ্কারের সামান্যতম চিহ্ন। এটি ছিল প্রথম কার্যকর আঘাত, যা মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজা দাহিরের হুকুমতের উপর হেনেছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম যদি যুদ্ধবন্দীদেরকে গোলামে পরিণত করতেন এবং তাদেরকে ইরাকে পাঠিয়ে দিতেন তাহলে তাদের দেখা-শোনা ও তত্ত্বাবধানের জন্য ফৌজের কিছু অংশকে ব্যস্ত রাখতে হ’ত। ফলে তাঁর ছোট ফৌজ স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ত। আর যুদ্ধবন্দীদেরকে সঙ্গে নিয়ে ইরাক যেতে হলেও নানা অসুবিধা দেখা দিত। বন্দীরা মুসলিম ফৌজের দ্রুত চলাচলে সেই ভারী লৌহ জিঞ্জীরের ভূমিকা পালন করত, যা পা জড়িয়ে থাকে। এমতাবস্থায় মুহাম্মদ বিন কাসিম অত্যন্ত দূরদর্শিতা ও কৌশলের সাথে কর্ম সম্পাদন করে একদিকে নিজের ফৌজের শক্তি বহাল রাখেন এবং অন্যদিকে শত্রুর অন্তরও জয় করেন।

    বেলা যুদ্ধক্ষেত্রে মুহাম্মদ বিন কাসিম আঁ-হযরত (সা)-এর ন্যায় স্বীয় দুশমনকে ভীত-চকিত করে এতটা সন্ত্রস্ত ও হত-বিহ্বল করে দেন যে, তারা তাঁরই (মুহাম্মদ বিন কাসিমের) প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা মুতাবিক চলতে থাকে। এখানে বদর, উহুদ, খন্দক, হুদায়বিয়া প্রভৃতি যুদ্ধের কথা ধরা যেতে পারে। আঁ-হযরত (সা) প্রত্যেক বারই এমন প্রতিরক্ষা কৌশল অবলম্বন করেন যে, তাতে শত্রুর প্রতিরক্ষা বেকার হয়ে পড়ে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, বদর যুদ্ধে কুরায়শ আঁ-হযরত (সা)-এরই নির্বাচিত যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করায় তাদের অশ্বারোহী কোম্পানী—যার অধিনায়ক ছিলেন খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ, একেবারে অথর্ব ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। খন্দক যুদ্ধেও খালিদ বাজিতে হেরে যান এবং হুদায়বিয়া প্রান্তরেও পরাজয় যখন অবধারিত তখন তিনি আঁ-হযরত (সা)-এর পদ চুম্বন করেন এবং মুসলমান হয়ে যান। সেই হযরত খালিদ (রা) মুসলমান হবার পর কোন যুদ্ধেই আর কখনও পরাজিত হননি এবং দুনিয়ার প্রবল পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য তাঁর হাতেই বিধ্বস্ত হয়।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম হিন্দী সেনাপতিকে তাঁরই নির্মিত ফাঁদে ফেলে বাঁদর নাচ নাচান। অতঃপর তাকে স্বীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা মাফিক একটি জায়গায় টেনে এনে তার উপর এমনই কার্যকর আঘাত হানেন যে, গোটা হিন্দী বাহিনী বিধ্বস্ত ও বরবাদ হয়ে যায়।

    কিন্তু এই ধ্বংসের পর তিনি ইসলামের সহিষ্ণুতা, উদারতা, সমবেদনা, সংবেদনশীলতা প্রভৃতি গুণের মলম লাগিয়ে সিন্ধুবাসীদেরকে তার প্রেমানুরাগীতে পরিণত করেন। তিনি সামরিক ও রাজনৈতিক দু’টো বিজয় একই সঙ্গে লাভ করেন। রাজার বড় বড় জেনারেল মুকা, রাসেল প্রমুখ মুহাম্মদ বিন কাসিমের অনুগত ভৃত্যে পরিণত হন।

    এ ধরনের যুদ্ধাবস্থা সম্পর্কে বৃটিশ প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক লীল হার্ট লিখেছেন: “অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, কেবলমাত্র আক্রমণের দ্বারা শত্রুর উপর জয় ও সাফল্য লাভ সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা নীতি নয়, বরং শত্রুর উপর সাফল্য লাভ করবার জন্য কয়েকটি পন্থাই ব্যবহার করা যায়। অবশ্য গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সে সব পন্থার ভেতর থেকে উপযোগী পন্থা ইখতিয়ার করাই সিপাহ্‌সালারের কর্তব্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, শত্রুকে ধোঁকা দিয়ে তার পৌঁছুবার পূর্বেই নির্দিষ্ট মোর্চা কব্জা করে নিতে হবে [এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, বদর যুদ্ধের মোর্চা— যা আঁ-হযরত (সা) কব্জা করেছিলেন—গ্রন্থকার ]। আর শত্রু যদি মযবুত ও সুদৃঢ় মোর্চার অধিকারী হয় তাহলে কোন-না-কোন চালে ও কৌশলে তাকে উক্ত মোর্চা পরিত্যাগে বাধ্য করতে হবে [উদাহরণত, মুহাম্মদ বিন কাসিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হবার ভান করে হিন্দী সেনাপতিকে স্বীয় প্রতিরক্ষা চালে বন্দী করেন এবং তাকে কেল্লা পরিত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেন—গ্রন্থকার]। অথবা শত্রু ফৌজের উপর এমন অবস্থায় হামলা করতে হবে যখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে—হয় নিজেদের ফৌজকে মার্চ করাতে অথবা নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে ব্যস্ত [এর উদাহরণ, হিন্দী সেনাপতির দুর্গ থেকে বহির্গত হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া এবং পুনরায় নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফৌজকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে লড়াই করা। এই সুযোগেই মুহাম্মদ বিন কাসিম হিন্দী ফৌজের উপর হামলা করে তাকে ধ্বংস করে দেন।—গ্রন্থকার]। এমত অবস্থায় শত্রু ফৌজকে সক্রিয় হবার মুহূর্তেই পাকড়াও করা হয় অথবা তার এতটা সময় মেলে না যে, সে নতুন কোন মোর্চা পরিপূর্ণভাবে সুদৃঢ় করতে পারে। তাই তার উপর জয়লাভ করতে বেগ পেতে হয় না।”

    যদি হিন্দী সেনাপতি স্বীয় প্রতিরক্ষা নীতির উপর স্থির মস্তিষ্কে সক্রিয় থাকতেন তাহলে খুব সম্ভব মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় অভিষ্ট লক্ষ্য হাসিলে কামিয়াব হতে পারতেন না। এ ধরনের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অত্যন্ত বিখ্যাত উদাহরণ য়ূরোপের বিখ্যাত সমর-বিশেষজ্ঞ হ্যানিবল এবং ফীস-এর মধ্যকার যুদ্ধগুলো। হ্যানিবল উপর্যুপরি জয়লাভের মাধ্যমে রোমান রাষ্ট্র এবং ইটালীয় ফৌজকে ভীষণ রকমে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু ফীস উক্ত পদ্ধতিতেই লড়াই করতে থাকেন। তিনি হ্যানিবলকে এমন সুযোগ দেন নি যে, তিনি তার ফৌজের সঙ্গে কোন নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে লড়াই করে যাবেন। তিনি (ফীস) সাফল্যের সঙ্গে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করতে থাকেন এবং যখনই সুযোগ মিলত হ্যানিবলের সাহায্যকারী বাহিনী, রসদ-সম্ভার এবং রসদবাহী বাহিনীর উপর বিদ্যুদ্গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং সেগুলো ধ্বংস করে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। শেষাবধি ফীস যেখানে রোমক ফৌজের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে হ্যানিবলও কার্থেজীয় ফৌজকে অক্ষম ও নিষ্ক্রিয় করে ছেড়েছিলেন।

    কুলবার হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে যে পর্যালোচনা করেছেন তা এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

    “প্রকৃত সত্য এই যে, হিটলার ভেবে দেখনে নি—এই বিশ্বযুদ্ধের হৃদপিণ্ড কোথায়, যেখানে কার্যকর ও মারাত্মক আঘাত হেনে শত্রুকে খতম করে দেওয়া যায়। হিটলার এটা মনে করেন নি যে, তাঁকে বার্লিন থেকে লণ্ডন পানে গতি ফেরাতে হবে এবং জার্মানীর জন্য মস্কোকে খতম করা লণ্ডনকে খতম করার পূর্বে অপরিহার্য নয়। ১৯৪০ ঈসায়ীতে এ যুদ্ধের সূচনা তো তিনি সঠিকভাবেই করেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি নেপোলিয়ানকে অনুকরণ করেন, অর্থাৎ এক্ষেত্রে দু’জন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেন।”

    লড়াই-এর সঠিক গতিমুখ দ্বারা কি বোঝায়, তা আমরা এখানে পরিষ্কার করে দিতে চাই। এ গতিমুখ প্রকৃতপক্ষে সেই গতিমুখ নয়, যেখান থেকে হামলাকারী স্বীয় ফৌজকে অগ্রসর করেছে। কেননা প্রতিরক্ষা ও সামরিক অবস্থাদির কারণে এ গতিমুখের সংজ্ঞা বারবার বদলে থাকে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এ গতিমুখ দ্বারা সেই দিক বোঝায় না যে দিক দিয়ে হামলাকারী ফৌজ তার রসদবাহী পশু, সমরাস্ত্র এবং বিবিধ সাহায্য-সামগ্রী নিয়ে আসে, বরং এই গতিমুখ দ্বারা সেই দিককে বোঝানো হয়, যেদিক হামলাকারীর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার দৃষ্টিতে যুদ্ধের প্রাণস্বরূপ। বর্তমান বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর অবশ্য কর্তব্য ছিল, সর্বাগ্রে ইংল্যাণ্ডকে খতম করা। এতে বৃটিশ নৌ-শক্তিও ধ্বংস হয়ে যেত। কেননা যতদিন পর্যন্ত বৃটিশ নৌবহর নিরাপদ থাকত, ইংলণ্ড তার নিজের এবং সহযোগী মিত্রশক্তির ফৌজকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে গিয়ে জার্মানীর বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খুলে দিতে পারত। অবস্থা ছিল হিটলারের অনুকূলে এবং তিনি ছিলেন একটি বন্য ষাঁড়ের মত গোলাকার আখড়ার ভেতর—যেখানে এবং যে দিকেই তিনি চাইতেন হামলা করতে পারতেন। যুদ্ধের গতিমুখ পরিবর্তন করা সম্পর্কে নেপোলিয়ান লিখেছেন:

    “যুদ্ধের গতিমুখ (যদি এটা জানা যায় যে, এ দিকটি ভুল) বাধ্য হয়ে পরিবর্তন করা অত্যন্ত কষ্টকর ব্যাপার। এটা শুধুমাত্র একজন অত্যন্ত যোগ্য ও উপযুক্ত জেনারেলই সাফল্যের সঙ্গে করতে পারেন। আর যে জেনারেল ইচ্ছাকৃতভাবে ( বাধ্য না হয়ে) গতিমুখ পরিবর্তন করেন তিনি এমন একটি বিরাট ভুল করেন যা আর শোধরানো যায় না। এমনতর জেনারেলকে জেনারেল বলা যায় না।

    “হিটলার এই গতিমুখকে বাধ্য হয়ে পরিবর্তন করেন নি, বরং তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই তা করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধেও হেরে গিয়েছিলেন।”

    বেলা যুদ্ধেও হিন্দী সেনাপতি বুঝেন নি তার যুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি এবং তার দুশমন কি চাচ্ছে? অতএব তিনিও নিজের ফৌজকে আরব ফৌজের বিরুদ্ধে এমন অবস্থায় লড়িয়েছেন যখন তারা অনেকগুলো খণ্ডে বিভক্ত ছিল এবং প্রতিটি খণ্ড আবার এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত ছিল।

    দেবল বিজয়ের শিক্ষা

    এখানে প্রশ্ন জাগে যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজা দাহিরের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্য বসরা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন, অথচ দেবল ও নীরুন জয় করবার পর তিনি সূস্তান, তুরান এবং বুদ্ধিয়াতে অহেতুক সময় নষ্ট করতে থাকলেন এবং নিজ মিশনকে পরিপূর্ণ রূপ দেবার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হলেন না। এর কারণ কি এবং তাঁর এ লড়াইয়ের প্রতিরক্ষামূলক শিক্ষাটাই বা কি?

    সর্বপ্রথম যে শিক্ষাটা আমরা পাই—তা হ’ল রাজা দাহিরের সেই চিঠি যা তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে লিখেছিলেন। এর থেকে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, “শত্রু কে কখনোই খাটো করে দেখতে নেই।” এই সর্বজনজ্ঞাত উক্তির উপর রাজা দাহির আমল করেন নি। রাজা দাহির ২৫ হাযার ফৌজ বেলায় পাঠান। এ ফৌজ পরাজিত হয়। তথাপি তাঁর মস্তিষ্ক থেকে গর্ব ও ঔদ্ধত্যের ভূত নামেনি। দেবল যখন তাঁর হস্তচ্যুত হয় তখনও তিনি অবস্থা সম্পর্কে সঠিক পরিমাপ করতে ব্যর্থ হন।

    দ্বিতীয় যে শিক্ষা আমরা পাই তাহ’ল এই যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম উক্ত দুর্গ জয় করবার সঠিক পরিমাপ করেই উপযোগী সমরাস্ত্র যেমন, মিনজানীক, আরূস ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।

    তৃতীয় শিক্ষা এই যে, শত্রুর সঙ্গে কঠোর ব্যবহারের পরিবর্তে কোমল ও সদয় আচরণ এবং তাদের ধর্ম সম্পর্কে সহিষ্ণু ও উদার ব্যবহার এমন একটি কর্মপদ্ধতি, যা ছিল হাদীছ পাক-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই কর্মপদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে মুহাম্মদ বিন কাসিম বৌদ্ধ ধর্মের সমস্ত অনুসারী, জাট ও মায়দদেরকে স্বীয় সমর্থক ও সহযোগীতে পরিণত করেন। এটি ছিল রাজা দাহিরের জন্য একটি বিরাট নৈতিক পরাজয়, যার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সময়ের ব্যবধান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম শুরু থেকেই রাজা দাহিরের ফৌজ, অর্থ, বিত্ত, সমরোপকরণের আধিক্য ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক পরিমাপ করে নিয়েছিলেন। একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ গুণে গুণে হিসেব করে ফেলেছিলেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপের পূর্বে পথের চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে পরিমাপ করে নিয়েছিলেন।

    রাজা দাহিরের রাজধানীকে সিন্ধুনদ দু’ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। অথচ তা নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য রাজা দাহির সিন্ধুনদের কোথাও পুল ইত্যাদি নির্মাণ করেন নি।

    সিন্ধুনদের পূর্ব এলাকা ছিল উর্বর এবং এ এলাকায় বড় বড় শহর আবাদ ছিল। যেহেতু এখানে হিন্দু ধর্মের অনুসারীদেরই ছিল সংখ্যাধিক্য, তাই এদের প্রতি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মনের দিক দিয়ে প্রসন্ন ছিল না। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল জাট ও মায়দ প্রভৃতি, যাদেরকে রাজপুত, বিশেষ করে বর্ণ হিন্দুরা—(ব্রাহ্মণ) খুবই অবজ্ঞার চোখে দেখত।

    পশ্চিম কিনারে ছিল বুদ্ধিয়ার রাজধানী, যা ছিল রাজা দাহিরের একটি করদ রাজ্য। এ এলাকার বাসিন্দারাও হয় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী, নয়ত অগ্নিপূজক ছিল। এখানে রাজপুত সৈনিক ছিল খুবই কম। আর যারা ছিল তারা রাজার আত্মীয়-স্বজনের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত ছিল। শাসক গোষ্ঠির লোকদেরকে রাজা দাহির গভর্নর (শাসনকর্তা) হিসাবে সূস্তান, বুদ্ধিয়া, তুরান প্রভৃতি রাজ্যে মোতায়েন করে রেখেছিলেন। যেহেতু এসব শাসক খুবই অহঙ্কারী এবং উদ্ধত ছিলেন, সেজন্য জনসাধারণ তাদের প্রতি বেজায় অসন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু রাজা দাহিরের শক্তি ও প্রতিপত্তির সামনে তারা ছিল অসহায়। মুহাম্মদ বিন কাসিমের ধর্মীয় উদারতা ও সহিষ্ণুতা ঐ সব লোকের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল গভীরভাবে।

    যদি মুহাম্মদ বিন কাসিম নীরূন থেকে সিন্ধুনদ পার হয়ে চলে যেতেন তাহলে:

    ক. রাজা দাহিরের সাম্রাজের পশ্চিমাংশের সহযোগী ও মিত্র রাজা এবং ঠাকুর মুহাম্মদ বিন কাসিমের পশ্চাদ্দেশে হামলা করে বসরা ও দেবলের মধ্যবর্তী যাতায়াতের রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে দিতেন।

    খ. মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সম্মুখ দিকে রাজা দাহিরের বেশুমার ফৌজের মুকাবিলা করতে হ’ত এবং পশ্চাদ্ভাগে আরব ফৌজের উপর মিত্র করদ রাজন্যবর্গের ফৌজের চাপ গিয়ে পড়ত। ফলে আরব ফৌজ দু’টি ভারী শক্তিশালী ফৌজের মাঝে দারুণ বেকায়দায় পড়ত, বিশেষ করে পরাজয়ের ক্ষেত্রে, যখন তাঁর পশ্চাদ্ভাগে সিন্ধুনদের রাস্তা বন্ধ হয়ে যেত।

    উপরে যে সব দলীল-প্রমাণ উল্লেখ করা হ’ল—তার বিরুদ্ধে যে কেউ সেনাপতি তারিকের স্পেন আক্রমণের কথা বলতে পারেন। এক্ষেত্রে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, সেখানে প্রতিরক্ষার রূপ ছিল ভিন্ন। উপযোগী কোন স্থানে তারিকের জীবনী লিখতে গিয়ে ইনশা-আল্লাহ আমরা এতদ্‌সম্পর্কে আলোচনা করব।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম পশ্চিম এলাকা দখল করার পর রাজা দাহিরের ফৌজ অর্ধেকেরও কম হয়ে যায়। উপরন্তু তিনি স্বীয় ফৌজে জাট, ঠাকুর, মায়দ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক ভর্তি করা শুরু করেন। অর্থাৎ যেখানে রাজা দাহিরের ফৌজ সংখ্যার দিক দিয়ে হ্রাস পেল, সেখানে মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজ সংখ্যার দিক দিয়ে বেড়ে গেল। এমতাবস্থায় মুহাম্মদ বিন কাসিম লোভী হয়ে উঠেন নি, বরং শাসন-শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষণ ও বিন্যাসের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। সিন্ধী লোকদের ভেতর থেকেই তিনি সর্বোত্তম লিপিকার গোয়েন্দা, গুপ্তচর, দুঃসাহসী সিপাহী, পথ-প্রদর্শক প্রভৃতি পসন্দমত বাছাই করে নেন।

    এ বিষয়টি মুহাম্মদ বিন কাসিমের হৃদয়-মনে খুব ভাল করেই গাঁথা ছিল যে, আরব থেকে উট এবং উৎকৃষ্ট ঘোড়া বারবার নিয়ে আসা অসম্ভব। সিন্ধুনদের পশ্চিম এলাকায় সওয়ারীর জানোয়ার খুব বেশী সংখ্যায় পাওয়া যেত। অতএব তিনি এ এলাকা থেকে জানোয়ার সংগ্রহ করে শুধু নিজস্ব ঘাটতিই পূরণ করেন নি, দুশমনকেও এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে দেন।

    এতদ্ভিন্ন এ এলাকায় আরব সৈনিকদের জন্য প্রয়োজনীয় শুষ্ক ফলমূল, বালি প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। এতে আরব সৈনিকদের বোঝা অনেকটা হ্রাস পেল এবং তারা নিজেদের দ্রুতগতি ও ক্ষিপ্রতা বজায় রাখতে সক্ষম হ’ল। নিজস্ব স্বাদ ও রুচি মাফিক যুদ্ধক্ষেত্রে আহার্য-দ্রব্য পাওয়া একটি বিরাট নেয়ামত।

    রাজা দাহিরের সংকীর্ণ দৃষ্টি ও অদূরদর্শিতার কারণে মুহাম্মদ বিন কাসিম নির্বিঘ্নে এ এলাকা পদানত করতে অগ্রসর হন। সিন্ধু নদের উপর এমন কোন পুল ছিল না, যার সাহায্যে রাজা দাহির নিজের ফৌজ পূর্ব কিনার থেকে পশ্চিম কিনারে সত্বর স্থানান্তর করতে পারতেন। ফলে মুহাম্মদ বিন কাসিমের দক্ষিণ ও পশ্চাদ্ভাগ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফায়দা—যা মুহাম্মদ বিন কাসিম পশ্চিম কিনার জয়ের মাধ্যমে লাভ করেছিলেন, তা হ’ল রাজা দাহিরকে আলস্যের মাঝে নিক্ষেপ। রাজা দাহিরের ধারণা ছিল যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম এই এলাকায় লুটপাট করে ইরাকে ফিরে যাবেন। রাজা দাহির হিন্দু ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাঁর পরামর্শদাতা ও উপদেষ্টা ছিল ব্রাহ্মণ ও রাজপুত। তারা মনে করেছিল যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয়ের কারণে বৌদ্ধ জনগণ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, কিংবা এতটা কমযোর হয়ে যাবে যে, তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উপর হিন্দুরা খুব সহজেই দখল জমাতে পারবে। সম্ভবত এ জাতীয় কল্পনা ও ধ্যান-ধারণার মাঝেই রাজা দাহির ডুবে গিয়েছিলেন। তাই মুহাম্মদ বিন কাসিমের মুকাবিলায় পশ্চিম কিনারে তেমন কোন ব্যবস্থাই তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত নেন নি যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মদ বিন কাসিম উক্ত এলাকা পদানত করেছিলেন।

    উক্ত এলাকা জয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভাবী বংশধরদের জন্য একটি নতুন ধরনের ফৌজ সৃষ্টি করেন। এটি ছিল আর্মার্ড কোর। রাজা এবং ঠাকুর মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন তারা আর আগের মত আলাদা আলাদা স্বায়ত্তশাসিত ছিল না, বরং মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রথমে তাদেরকে আঁ- হযরত (সা) বর্ণিত শাসন-শৃঙ্খলার ছাঁচে ঢেলে সাজান। অতঃপর তাদেরকে বিন্যস্ত করে স্বীয় ফৌজের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। সাম্য-ভ্রাতৃত্ব, সংবেদনশীলতা, প্রেম-ভালবাসা এবং ত্যাগের মলম তিনি ছ্যুৎ-অচ্ছুৎ এবং জাতপাতের নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত লোকদের দিলের উপর লাগিয়ে দেন। এখানে সেবার অর্থ প্রতিশ্রুতির গালভরা বুলি ছিল না। মুহাম্মদ বিন কাসিম হযরত ওমর (রা)-এর প্রতিষ্ঠিত নীতির ভিত্তিতেই সৈনিক এবং তাদের পরিবার-পরিজনের মাসিক ভাতা নির্ধারণ করে দেন। এই নীতির উপর পরবর্তীকালেও কম-বেশি আমল করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামের প্রচলিত রীতি-নীতি যখন মোগল শাসনামলে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়, তখন তার আঙ্গিক কাঠামোও পরিবর্তিত হয়ে যায়।

    অবশ্য ফ্রান্স এবং পরে বৃটিশ সরকার মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে জীবিত করেন। বৃটেন হিন্দী আর্মার্ড অশ্বারোহী বাহিনী এবং পল্টন বানিয়ে ভারতবর্ষকে মোগল এবং মারাঠাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়।

    লর্ড ক্লাইভ ইণ্ডিয়ান আর্মীর সংস্কার সাধন করেন। তবে অধিককাল ভারতবর্ষে অবস্থানের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় জাতপাতের রঙে রঞ্জিত হয়ে যান এবং এমন একটি ভুলের শিকার হন, যা তার সৃষ্ট ইণ্ডিয়ান আর্মীর ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। এই ধ্বংসাত্মক কাজে লর্ড কিচেনার তাকে সাহায্য করেছিলেন।

    একথার দ্বারা আমরা এই বোঝাতে চাচ্ছি যে, তারা আর্মার্ড কোরের অধিনায়কত্ব হিন্দী অফিসারদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বৃটিশ অফিসারদের হাতে তুলে দেন। ফলে হিন্দী অফিসার এবং বৃটিশ অফিসারদের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। আমি যেহেতু ফৌজে আর্মার্ড হিসাবে ভর্তি হয়েছিলাম, সেহেতু আমি ভেতর থেকে এই বিপ্লব সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সুযোগ পাই। পেটের জন্যই হোক কিংবা পরাধীনতার কারণেই হোক—অসহায় ছিলাম আমরা। প্রকৃত সত্য এই যে, হীনমন্যতাবোধ ভারতীয় অফিসারদের মধ্যে সে সময় আরও বেশী বৃদ্ধি পায়, যখন বৃটিশ অফিসাররা বলতে শুরু করেন যে, “ভারতীয়রা উন্নতমানের সৈনিক হতে পারে, কিন্তু ভাল অধিনায়ক হতে পারে না। এজন্য হিন্দুস্তানী অফিসারদেরকে ফৌজে উচ্চপদে দেওয়া যেতে পারে না।4” এ ধরনের কর্মপদ্ধতির যে পরিণতি ঘটেছিল, এখানে তা বলার প্রয়োজন নেই। রাজা দাহিরের ফৌজে গভর্নরের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা বৌদ্ধ রাজা ও ঠাকুরদের পসন্দনীয় ছিল না। ধর্মপালনের ক্ষেত্রেও তারা পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না। ফৌজের মধ্যে জাতিগত বৈষম্য আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার ভিত্তিমূলকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল।

    এ শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেও মুসলমানদেরকে কয়েকটি দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে এবং তা তাদের ব্যক্তিত্বে, অহংবোধে এবং জিহাদী আবেগ-স্পৃহায় কঠিন আঘাত হেনেছে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রতিরক্ষা নীতি অর্থাৎ স্বীয় দক্ষিণ, বাম ও পশ্চাদ্ভাগকে শত্রুর হামলা থেকে নিরাপদ করার নীতি অনুকরণ করেন নেপোলিয়ন—যখন তিনি অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনা করেন।

    জেনারেল মাড ১৯১৭ ঈসায়ীতে তুরস্কের বিরুদ্ধে উক্ত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা অনুসরণ করেন, অর্থাৎ তিনি টাইগ্রীস (দজলা) ও ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীকে স্বীয় অগ্রাভিযানরত ফৌজের মুহাফিজে পরিণত করেন। তুর্কীরা রাজা দাহিরের মতই ঐ দু’টো নদীর না পুল বানিয়েছিল, না জাহাজ চলাচলের জন্য উন্নত কোন ব্যবস্থাই উদ্ভাবন করেছিল। এর পরিণতি তাদের এভাবে ভোগ করতে হয়েছিল যে, ইরাক-ই-আরব তাদের থেকে চিরদিনের মত হাত ছাড়া হয়ে যায়। তুর্কীরাও প্রতিরক্ষা কৌশলের নীতি ভুলে গিয়ে আরবদেরকে তাদের তুলনায় হেয়তর ভেবেছিল। মজার ব্যাপার এই যে, তারপরও তারা এই আশা নিয়ে বসে ছিল যে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে আরবরা তুর্কীদের সঙ্গী হবে, তাদের সমর্থন দেবে। কিন্তু ইংরেজরা উল্লিখিত কার্যকর কৌশলের সঙ্গে কাজ করে এবং অর্থবিত্ত ও প্রোপাগাণ্ডা দ্বারা আরবদেরকে নিজেদের পক্ষে টেনে নেয়।

    সিবী যুদ্ধের শিক্ষা

    ক. সিবীর যুদ্ধে যখন সিন্ধী ফৌজের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, জনসাধারণ তাদের পেছনে নেই, তখন ব্যক্তিগত বীরত্বের ভিত্তিতে এবং আত্মোৎসর্গের প্রকাশ ঘটাবার লক্ষ্যে তারা শেষাবধি লড়ে গেলেও তাদের মনোবল কিন্তু ভেঙে যায়। এ লড়াই থেকে এটা পরিষ্কাররূপে প্রতিভাত হয় যে, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজা বজ্র তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এসব লোক জোশে উদ্দীপ্ত হয়ে এবং সাহসিকতার সঙ্গে লড়েছে। কিন্তু যেই রাজা বজ্র দুর্বলতা প্রদর্শন করেছেন অমনি সিন্ধী ফৌজও উৎসাহ ও মনোবল হারিয়ে ফেলেছে।

    খ. একটি সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত ফৌজ যত অল্প-সংখ্যকই হোক না কেন, সাধারণত একটি বিরাট সংখ্যক বিশৃঙ্খল ফৌজের উপর জয়লাভ করে থাকে। এ ধরনের বিশাল সেনাবাহিনী বস্তুতপক্ষে ভেড়ার পালের মত যা বিনা কারণে ভয় পেয়ে পালাতে উদ্যত হয় এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।

    গ. যে ফৌজ প্রতিরক্ষা নীতির আওতাধীন লড়াই করে তারা অটুট ইচ্ছাশক্তির সঙ্গেই লড়াই করে এবং তাদের অধিনায়ক শত্রুর সামনে তাদেরকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে এমন এক স্থানে লড়বার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন যেখানে সে দুশমনের উপর মারাত্মক ও কার্যকর আঘাত হেনে তাকে পরাজিত করতে পারে।

    সিবীর যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধের আল-আলামীন ফ্রন্টের যুদ্ধের সঙ্গে বেশ খানিকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। ঐ যুদ্ধে মিত্রশক্তি জেনারেল রোমেলের বিজয়ী বাহিনীকে তাদের মোর্চা পর্যন্ত অগ্রসর হবার সুযোগ দেয়। অতঃপর তাদের উপর এমনই পাল্টা আঘাত হানে যে, তারা হতভম্ব হয়ে যায়।

    নীরূন ছাউনী

    রাজা দাহির দ্বিতীয়বারের মত তাঁর দিবা নিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন এবং কিছু ফৌজ রাজা রামচন্দ্র প্রমুখের নেতৃত্বাধীন এই উদ্দেশ্যে পাঠান যে, তারা বুদ্ধিয়া, সূস্তান এবং তুরান-এর জনসাধারণকে উস্কে দিয়ে তাদের পতাকাতলে এনে দাঁড় করাবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও তারা কয়েকটি ভুল করে বসেন। যেমন, তারা মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাফল্যের গোপন রহস্য অনুসন্ধান করেনি কিংবা তা উপলব্ধি করবারও চেষ্টা করেনি। তাছাড়া প্রতিরক্ষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে উক্ত ফৌজের অধিনায়ক নির্বাচনও সঠিক হয়নি। কেননা এ দু’জন অধিনায়ক দুর্বলচেতা হবার কারণে—জনসাধারণের মাঝে নিজেদের মর্যাদা খুইয়ে বসেছিলেন। এছাড়া রাজা দাহিরের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাও ছিল ভুল। তাঁর সেই পন্থাই অবলম্বন করা দরকার ছিল, যে পন্থা রাশিয়াতে স্টালিন ১৯৪০–৪৪ সালে জার্মান ফৌজের বিরুদ্ধে অবলম্বন করেছিলেন। অর্থাৎ একটি বিশাল জানবায ফৌজ গোটা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে বিজয়ী সেনাবাহিনীকে গেরিলা ধরনের যুদ্ধের মাধ্যমে এতটা পেরেশান ও বিব্রত করে তোলা উচিত ছিল, যাতে করে আরব ফৌজ সে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। এই সাফল্যের গোপন রহস্য সাধারণ গণমানুষের অন্তর-মানস জয় করে তাদেরকে একটি অটুট মনোবল-সম্পন্ন সশস্ত্র ফৌজে পরিণত করার মধ্যে নিহিত ছিল। রাজা দাহির এই প্রতিরক্ষা নীতি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন নি।

    যাই হোক, যে বিপদ রাজা গোপী মুহাম্মদ বিন কাসিমের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন, মুহাম্মদ বিন কাসিম অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে তার মুকাবিলা করেন অর্থাৎ তিনি বিদ্যুদ্গতিতে হামলা করে সিন্ধী ফৌজকে মেরে তাড়িয়ে দেন।

    নদী পার

    সিন্ধু নদ পার হতে মুহাম্মদ বিন কাসিম অত্যন্ত কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি দাহিরের ফৌজের অধিনায়কদেরকে জানতে দেন নি, শেষাবধি তিনি কোথা দিয়ে, কিভাবে এবং কখন সিন্ধুনদ পার হচ্ছেন। বারবার সে জায়গায়—যেখানে তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, শত্রু মনে করছে যে এখান দিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমের ফৌজ সিন্ধুনদ পার হবে—সেখানে তিনি ছোট ছোট আরবীয় প্লাটুন দ্বারা হামলা করান, যাতে করে রাজা দাহিরের তামামতর মনোযোগ সে অংশেই কেন্দ্রীভূত থাকে। কিন্তু এই সঙ্গে তিনি নিজের জন্য সেই স্থানই বাছাই করে নেন যেখান দিয়ে তিনি সাফল্যের সঙ্গে সিন্ধুনদ পার হতে সক্ষম হন।

    এই প্রতিরক্ষা নীতি মিত্রবাহিনীর সুপ্রীম কমাণ্ডার জেনারেল আইজেন হাওয়ার অনুসরণ করেছিলেন; অর্থাৎ তিনি হিটলারকে আগাগোড়া এই বিশ্বাস জন্মিয়ে দেন যে, মিত্রবাহিনী ইংলিশ চ্যানেলের (English Channel)-এর উপকূল ভাগে আক্রমণ করবে এবং উক্ত উপকূল ভাগে উপর্যুপরি তিনি কয়েকবার প্রচণ্ড আক্রমণ করেন, যাতে জার্মানদের নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মে যে, পাল্টা আঘাত উক্ত জায়গায়ই হবে। কিন্তু মিত্রবাহিনী উল্লিখিত স্থানের পরিবর্তে ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে সফল হামলা পরিচালনা করে দ্বিতীয়বার য়ূরোপে প্রবেশ করে। যদি মিত্র বাহিনী এ ধরনের প্রতিরক্ষা চাল না চালত তাহলে তাদেরকে বিরাট মূল্যের কুরবানী দিতে হ’ত। অতএব প্রতিটি সিপাহ্‌সালারের অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, তিনি তাঁর প্রতিপক্ষকে এমনভাবে অসতর্ক ও বেখবর রাখবেন, যেন সে প্রতিরোধের যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে সক্ষম না হয়। মিত্রবাহিনী ফ্রান্সে অবতরণ করার পর হিটলার ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। জার্মান ফৌজ যদিও মিত্র বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়, কিন্তু তখন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। শেষাবধি হিটলার পরাজিত হন। এভাবেই রাজা দাহির সেনাপতি রাজা রাসেল মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু পার হওয়া সম্পর্কে যখন জানতে পারলেন তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। রাসেল বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন, কিন্তু শেষাবধি পরাজয়বরণ করেন।

    জয়পুর যুদ্ধের শিক্ষা

    এ যুদ্ধ থেকে যে শিক্ষা পাই তা হ’ল এই যে, ছোট্ট সুশৃঙ্খল একটি দল—যার চলাচল ও গতিবিধির যোগ্যতা রয়েছে, সে যখন এই চলাচল ও গতিবিধিকে একটি উত্তম প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা মুতাবিক কার্যকর করে তখন এই ছোট্ট দলটি বড় বড় দলকেও অসহায় বানিয়ে দেয়।

    এ যুদ্ধে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সামনে কোন লক্ষ্য কাজ করেছিল?

    এ প্রশ্নের উত্তর এই যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম এমন পরিকল্পনা তৈরী করেছিলেন যেন এর সাহায্যে রাজা দাহিরকে খতম করবার সঙ্গেই তিনি তার ফৌজের উপর কার্যকর আঘাতও হানতে পারেন। অতএব সর্বপ্রথম তিনি হিন্দী রাজার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা উপলব্ধি করবার পর তার ফৌজের বিন্যাস সম্পর্কে অবহিত হন। এর থেকে তিনি তার ফৌজী বিন্যাসের দুর্বলতা কোথায় তাও জানতে পারেন। অর্থাৎ রাজা দাহির তাঁর হাতীগুলোকে শত্রুর উপর হামলা করবার পরিবর্তে নিজের কৃতিত্ব প্রকাশের জন্য কিংবা সে সবকে নিজের ব্যক্তিগত হেফাজতের জন্য মোতায়েন করেছিলেন। এসব হাতী রাজা দাহিরের ট্যাংক ফৌজের স্থলে ছিল। ফলে তিনি এর ভুল ব্যবহার করেন। এতদ্ভিন্ন তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকেও নিজের হাতীগুলোর সামনে এনে খাড়া করেন। অথচ অশ্বারোহী বাহিনী, যার স্থান দখল করেছে বর্তমানে বিমান ও ট্যাংক বাহিনী, সে যুগেও ফৌজের মুখ্য ভূমিকা পালন করত। এ বাহিনী সিপাহ্‌সালারকে শত্রুর চলাচল ও গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত করত, তার ফৌজের বিভিন্ন ব্যুহের দেখাশোনা করত এবং সুযোগ মিলতেই বিদ্যুৎ গতিতে শত্রু ফৌজের উপর আক্রমণোদ্যত হ’ত। মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় অশ্বারোহী বাহিনীকে এ ধরনের দায়িত্ব সোপর্দ করেছিলেন।

    জয়পুরের যুদ্ধের সঙ্গে খালিদ (রা) বিন ওয়ালীদ-এর ইয়ারমুক যুদ্ধ এবং আলেকজাণ্ডারের ইযবেলা যুদ্ধের সাদৃশ্য ছিল। আলেকজাণ্ডারের ইযবেলা যুদ্ধের বিন্যাস নিম্নে প্রদর্শিত চিত্রে দেখান হ’ল:

    আলেকজাণ্ডার এটা জেনে নিয়েছিলেন যে, দারার সম্ভাব্য সাফল্যের রহস্য কোথায়। অতএব তিনি তাঁর সর্বোত্তম অশ্বারোহী কোম্পানীসহ ইরানী ফৌজের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান থেকে দারার উপর এমন সময় অতর্কিতে হামলা করেন যখন তাঁর দ্রুতগতিসম্পন্ন অশ্বারোহী বাহিনী ও পদাতিক ফৌজ ইরানীদের উপর তীব্র আক্রমণ চালিয়ে তাদের সার্বিক মনোযোগ নিজেদের দিকে টেনে রেখেছিল। দারার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ইরানী ফৌজ মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশই গ্রীক সৈন্যের তলোয়ারের মুখে যুদ্ধক্ষেত্রে চিরদিনের তরে গা এলিয়ে দেয়।

    যে ভাবে দারার মৃত্যুর পর ইরানী হুকুমতের পক্ষ থেকে আলেকজাণ্ডারকে প্রতিরোধ করবার মত আর কেউ ছিল না, তেমনি জয়পুর সমরক্ষেত্রে রাজা দাহিরের মৃত্যুর পর আরব বাহিনীর সাথে সিন্ধী বাহিনীর যে সব লড়াই অথবা মুকাবিলা হয়েছে সে সবের তেমন কোন গুরুত্বই আর রইল না। মুহাম্মদ বিন কাসিম একটি কার্যকর আঘাতেই রাজা দাহিরের হুকুমত খতম করে দেন।

    এতদসত্ত্বেও মুহাম্মদ বিন কাসিম একটি বিষয়ে লক্ষ্য রেখেছিলেন, যদিও রাজা দাহির মারা গেছেন, কিন্তু তার সাম্রাজ্যের রাজধানী আরোর এখনও তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অতএব তিনি জয়চান্দ এবং রাজা গোপীর পশ্চাদ্ধাবনের পরিবর্তে আরোর জয়ের স্থির সিদ্ধান্ত নেন। অনন্তর তিনি বিদ্যুৎ গতিতে তার দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হন এবং সত্বরই তা জয় করে সিন্ধু সাম্রাজ্যের বিজয়ী অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হন। বাহ্মনাবাদ, স্কালিন্দা, সিককা, মুলতান নিজের থেকেই পাকা ফলটির মত তাঁর বিজয়ী আঁচলে পতিত হয়।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষাংশ সম্পর্কে জেনারেল ফুলার নামক বৃটিশ প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক এবং ইঙ্গারসোল (Ingersole) নামক আমেরিকান বিশেষজ্ঞ জেনারেল আইজেন হাওয়ারের নিম্নোদ্ধৃত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করেন অর্থাৎ আইজেন হাওয়ার তাঁর এক সরকারী রিপোর্টে লিখেছিলেন:

    “বার্লিন সম্পর্কে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে, এখন এটা আর খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা শহর নয়। আমার দৃষ্টিতে প্রতিরক্ষাগত প্রয়োজনগুলোর রাজনৈতিক চাহিদার উপরই অধিক গুরুত্ব ছিল। যেখানে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জার্মান রাজধানীর উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে চাচ্ছিল—সেখানে আমার প্রতিরক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এই যে, শত্রু শক্তি যখন মরণ-দশায় ধুকছে তখন তাকে আগে-ভাগে খতম করে দেওয়াই ভাল। কেননা আমি আমার সামরিক শক্তি বিধ্বস্ত ও বিরান বার্লিনের উপর ব্যয় করার পরিবর্তে তা শত্রুশক্তির উপর ব্যয় করবার পক্ষপাতী ছিলাম।”

    জেনারেল ফুলার (Fuller) এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন: “যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিরক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গির উপর শত্রুর সেই অবস্থার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার না থাকে যাকে মরণ দশায় আখ্যায়িত করা যায় তাহলে তা আর কখন হবে? আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিরক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গি এই পরিস্থিতিতেও যদি গুরুত্ব না দেয় তাহলে যুদ্ধ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে মানিয়ে নেবার কি একটি মেশিন মাত্র নয়!”

    জেনারেল আইজেন হাওয়ারের ভুলের মাশুল দিচ্ছে আজ গোটা দুনিয়া। এক্ষেত্রে জেনারেল ফুলারের অভিমতের যথার্থতার ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

    যদি মুহাম্মদ বিন কাসিমও শত্রুর শক্তি ধ্বংস করবার জন্য বাহ্মণাবাদের দিকে ধাওয়া করতেন তাহলে খুবই আশংকা ছিল যে, হিন্দু রাজন্যবর্গ সাহায্যকারী সেনা পাঠিয়ে এবং আরোরকে নিজেদের আশ্রয়কেন্দ্র বানিয়ে কঠোর প্রতিরোধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতেন। আরোর ছিল একটি উপদ্বীপে অবস্থিত। এটি জয় করবার জন্য খুবই জটিল প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হ’ত। কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিদ্যুদ্গতিসম্পন্ন ক্ষিপ্রতা হিন্দুদেরকে সুযোগ দেয়নি যে, তারা মায়দের পুল ধ্বংস করে দেবে। এই পুলের মাধ্যমেই মুহাম্মদ বিন কাসিম আরোরের উপর চড়াও হতে পেরেছিলেন।

    যদি জেনারেল আইজেন হাওয়ার বার্লিন দখল করতেন তাহলে আজ বার্লিন দু’অংশে বিভক্ত হ’ত না এবং বার্লিন নিয়ে আজকের এই জটিল ও সমস্যাসংকুল পরিস্থিতিরও উদ্ভব ঘটত না।

    শক্তি ও বিজ্ঞান

    মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত পন্থার মাধ্যমে শক্তির পরিবর্তে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার (অর্থাৎ বিজ্ঞানের) ব্যবহার করতেন। যেখানে রাজা দাহির স্বীয় হস্তীযুথ নিয়ে গর্বিত ছিলেন সেখানে হস্তীযুথের ধ্বংস সাধনের জন্য মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় অশ্বারোহী বাহিনীর সওয়ারদের ক্ষিপ্রগতি এবং উন্নত ধরনের তীরন্দাযীর সাহায্য গ্রহণ করেন। তিনি রাজা দাহিরের হস্তীযুথের উপর কেরোসিন তৈলে সিক্ত তুলার জ্বলন্ত পিণ্ড তীরের সাহায্যে নিক্ষেপ করেন। হাতী কেবল আগুনকেই ভয় পায়, আর মুহাম্মদ বিন কাসিম হাতীর এই দুর্বলতাকে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন।

    আমরা তৈলসিক্ত জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড ব্যবহারের দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করছি। তৈলসিক্ত অগ্নিপিণ্ডের গোপন রহস্য যতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের নিকট সুরক্ষিত ছিল ততদিন দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদের মুকাবিলায় দাঁড়াতে পারে নি। জয়পুর যুদ্ধের অবস্থা আমরা লিখেছি। এখন আমরা ফরাসী ঐতিহাসিক ও প্রখ্যাত লেখক ডি. জায়েন ওয়েলের পর্যবেক্ষণ পেশ করছি। তিনি ১২২৪ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং সম্রাট সেন্ট লুই-এর সঙ্গী ছিলেন। লুই ছিলেন য়ুরোপীয় ক্রুসেড নাইট বাহিনীর অধিনায়ক যিনি সপ্তম ক্রুসেড যুদ্ধে গোটা মুসলিম বিশ্বের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। এই ক্রুসেড বাহিনী ১২৪৮ খৃস্টাব্দে ফ্রান্স ভূখণ্ড থেকে রওয়ানা হয় এবং ১২৪৯ খৃস্টাব্দের জুন মাসে মিসরে গিয়ে পৌঁছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মিসরকে (যা ইসলামী হুকুমতের মধ্যে বিশিষ্ট ক্ষমতার অধিকারী ছিল) খতম করে বায়তুল মুকাদ্দাসকে পুনরায় অধিকার করা। এ যুদ্ধ মনসূরা নামক স্থানে সংঘটিত হয়।

    ফ্রান্স সম্রাজ্ঞীর অনুরোধে ডি. জয়েন ওয়েল উক্ত ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন। তিনি খুব সহজ সরল ভাষায়, উপদেশপূর্ণ ভঙ্গীতে এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গেই উক্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন। আমরা তা থেকে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু ঘটনা আমাদের মতের সমর্থনে উদ্ধৃত করছি। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য তৈলসিক্ত জ্বলন্ত তীর ব্যবহারের প্রকৃতি ও বাস্তবতা তুলে ধরা, যাকে উক্ত লেখক ‘গ্রীক-অগ্নি’ নামে অভিহিত করেছেন। এর আবিষ্কারক যে মুসলমান তা তিনি স্বীকার করেন নি। আরবরা যখন তাদের মিনজানীকের সাহায্যে উক্ত আগুনকে ক্রুসেডার বাহিনীর কাষ্ঠ নির্মিত মিনারের উপর, যাকে দুবাবা কিংবা কাব্‌শ বলাই সঙ্গত— প্রথমবার আকস্মিকভাবে নিক্ষেপ করল এবং সেটিকে জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে দিল—তখন উক্ত লেখক সে সম্পর্কে এভাবে লিখেছেন (এটি ছিল সেই যুগ যখন বিরাট সংখ্যক ক্রুসেডার বাহিনী মিসরীয় ফৌজকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল):

    “এক রাত্রে আমরা আমাদের মিনারায় (Tower) বসে শত্রুর আনাগোনা ও যাতায়াত পথের প্রতি নজর রাখছিলাম। এমন সময় আরবদেরকে একটি ইঞ্জিন (মিনজানীক) চালু করতে দেখলাম, যার সাহায্যে তারা চক্রাকারে গ্রীক অগ্নি-গোলক আমাদের উপর নিক্ষেপ করতে থাকল। সেই অগ্নি-বৃষ্টির অব্যাহত ধারাদৃষ্টে আমার মনিব বিখ্যাত বীর ও খ্যাতনামা নাইট ওয়াল্টার অব একবরী চীৎকার করে বললেন:

    “হায় খোদা! আমরা আজ এমন এক ভয়াবহ বিপদের মাঝে নিক্ষিপ্ত যা আমরা অদ্যাবধি দেখিনি। যদি আমরা আমাদের জীবন বাঁচাবার খাতিরে ঐসব দুবাবাকে ছেড়ে দিই তাহলে আমাদেরকে ভীরু আখ্যা দেওয়া হবে। কেননা আমরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য (অর্থাৎ রাস্তা পাহারা দেওয়া) পরিত্যাগ করছি।

    “হে প্রভো! তুমিই বল, তুমি ভিন্ন এই বিপদ ও বেইয্‌যতির হাত থেকে কে আমাদের বাঁচাতে পারে? আমরা করজোড়ে তোমার নিকট মিনতি জানাচ্ছি, তুমিই আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন কর, তুমিই আমাদের সাহায্যকারী ও রক্ষক হও।

    “এর পর যে-ই না আমাদের উপর ঐসব অগ্নি-গোলা পড়তে লাগল অমনি আমরা মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম, যাতে নিক্ষিপ্ত গোলা আমাদের গায়ে না লাগে। প্রথম অগ্নি-গোলা আরবদের গোপন পথে টহল দানকারী দু’টি দুবাবার মধ্যে এসে পড়ে। আমাদের বাহিনীর অগ্নিনির্বাপক প্লাটুন তাৎক্ষণিকভাবে তা নেভাতে শুরু করল। আরব সৈন্যরা ঐসব ক্রুসেডারদের উপর তীর বর্ষণ করে। কিন্তু তারা ঐসব নিক্ষিপ্ত তীরের হাত থেকে নিরাপদ থাকে। কেননা বাহিনীর হেফাজতের জন্য আমরা সম্রাটের নির্দেশে এসব দুবাবার সামনে দু’টি রক্ষী-ব্যুহ (wing) বানিয়েছিলাম।

    “ঐ সব গ্রীক অগ্নি-গোলক মদের পিপার মত মোটা ছিল। নিক্ষিপ্ত গোলার মাঝ থেকে আগুন বিরাট এক শিখার আকারে বেরিয়ে আসত এবং এর ভেতর থেকে এমনই এক ভীতিকর ও ভয়াবহ আওয়াজ বের হ’ত যে, মনে হ’ত—বিদ্যুৎ চমকের পর মেঘের প্রচণ্ড বজ্রনাদ ধ্বনিত হচ্ছে। উড্ডয়ন মুহূর্তে গোলার আকৃতি একটি ভীতিপ্রদ সর্পাকৃতির রূপ ধারণ করত। এই গোলার আলো এত তীব্র ছিল যে, রাত্রিবেলা সমস্ত সেনাছাউনী দিবালোকের ন্যায় আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আরবরা মিনজানীককে আমাদের খুবই কাছাকাছি দুবাবার আড়ালে নিয়ে এসেছিল। এর পর তারা দিনের বেলায়ও আমাদের উপর অগ্নি-বর্ষণ করছিল। তারা আমাদের সে দু’টি দুবাবা, সিসিলীর সম্রাট ছিলেন যেগুলোর রক্ষক, জ্বালিয়ে দেয়। এতে সম্রাট সেন্ট লুই তাঁর সমস্ত সহযোগী ব্যারন এবং নাইটদের কাছে আবেদন জানান, যেন তারা নিজেদের জাহাজ থেকে যে যতটা পারেন কাঠ দেন যাতে করে নতুন দুবাবা বানানো যেতে পারে। … … এরপর আরব বাহিনী তাদের সমস্ত মিনজানীক, যার সংখ্যা ছিল ষোলটির মত—সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে অবশিষ্ট দুবাবাগুলোও পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।…”

    ডি. জয়েন ওয়েলের পুস্তক পাঠে জানা যায়, কী ভাবে তৈলসিক্ত জ্বলন্ত তীরের সঠিক ও অব্যর্থ ব্যবহার দ্বারা মিসরীয়রা ক্রুসেডের সপ্তম আক্রমণ অভিযানকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল। তারা কেবল তাদের দুবাবাই জ্বালায় নি বরং তাদের নৌ-বহরও জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছিল; সম্রাট লুইকে বন্দী করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে মুক্তিপণের বদলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। সবচেয়ে বেশী প্রশংসনীয় ও বিস্ময়কর ব্যাপার হ’ল এই যে, এই মিসরীয় ফৌজের অধিনায়ক ছিলেন একজন মিসরীয় রমণী। ইনি ছিলেন মরহুম বাদশাহ আল-মালিকু’স-সালিহ্‌র সহধর্মিণী। মনসূরা যুদ্ধে সাম্রাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী প্রথম যুবরাজ শাহাদাত লাভ করেন। বাদশাহ্ কিছুটা পুত্র শোকে আর কিছুটা অসুখে পড়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন। কিন্তু নির্ভীক এবং দূরদর্শী মুসলিম শাহযাদী শুজাউদ্দুর বাদশাহ্‌র মৃত্যু সংবাদ গোপন রাখেন যতক্ষণ না তিনি ক্রুসেডার বাহিনীকে পরিপূর্ণরূপে পরাজিত ও পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হন।

    এ ইতিহাস পাঠ করলে আমরা মুসলিম জাতির অটুট ইচ্ছা-শক্তি ও অদম্য মনোবল সম্পর্কে জানতে পারি। বাদশাহ কিংবা সিপাহ্‌সালার যদি শাহাদত বরণও করতেন তবু তারা শত্রুকে পরাভূত না করে ক্ষান্ত হ’ত না। উল্লিখিত মুসলিম মহিয়সী নারীর গৌরবময় কর্মকাণ্ড মুসলিম ইতিহাসের একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। আমি ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে উক্ত শাহযাদীর বীরত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর উল্লেখ করেছি।

    তৈলসিক্ত জ্বলন্ত তীরের গোপন রহস্য জনৈক সিরীয় শত্রুপক্ষের নিকট ফাঁস করে দেয়। কিন্তু এর ব্যবহার পরের লড়াইগুলোতে কম হয়েছে। অবশ্য ১৯৩৯-৪৫ ঈসায়ীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই অস্ত্রটিই অগ্নিশিখা নিক্ষেপক (Flame Thrower) রূপে আবির্ভূত হয়। সৈনিকরা এগুলোকে হাতে টেনে অথবা ট্যাংকের সাহায্যে চালায়। বিমানের সাহায্যে আগুন বোমারূপেও এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

    মিনজানীক কালক্রমে তোপখানার তোপ এবং মর্টারের রূপ নেয়। মোটকথা, জাগ্রত জাতি-গোষ্ঠী আগুনের একটি পোশাকে আবৃত করে একে দুশমনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। মিনজানীকের উপর পর্যালোচনা করতে গেলে অবরোধ এবং দুর্গজয়ের কথা এসে যায়। বৃটিশ প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক জেনারেল টুকার বলেন:

    “আদি কাল থেকে দুর্গ জয়ের জন্য একটি মূলনীতিই প্রয়োগ করা হচ্ছে, যদিও এ মূলনীতিকে কার্যকর করতে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত আধুনিক পন্থা অনুসরণ করা হয়েছে, আর সে মূলনীতিটি হ’ল, দুর্গ-বিধ্বংসী সমরাস্ত্রের ব্যবহার।

    “যে সিপাহ্‌সালার শত্রু দুর্গের উপর হামলা করার পূর্বে নিজের ফৌজকে দুর্গ-বিধ্বংসী সমরাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত করেনি, তার আক্রমণ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।”

    অপর প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক লীড্‌ল হার্ট এ সম্পর্কে লিখেছেন: “যদি আক্রমণরত বাহিনীর অধিনায়ক অবরুদ্ধ শত্রু বাহিনীর উপর হামলা করে তাদের আত্মরক্ষা মোর্চা ভেঙে ফেলার যোগ্যতা না রাখেন তাহলে দুশমনকে অবরোধ করে বসে থাকা তার জন্য অর্থহীন।”

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ঐসব মূলনীতিকে যে অতি সুন্দরভাবে বাস্তবায়িত করেছিল—ইতিহাস তার সাক্ষী।

    কেবল আত্মরক্ষার তাগিদ

    মোটকথা, যে জাতি-গোষ্ঠী সিমেন্ট, লোহা কিংবা প্রস্তর নির্মিত প্রাচীরের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে বাঁচতে চায় তাদেরকে সব সময়ই ব্যর্থতা বরণ করতে হয়। রাজা দাহির স্বীয় ফৌজের কোম্পানীগুলোকে—যা সব সময় তাঁর প্রতিপক্ষ ফৌজের তুলনায় সংখ্যা ও সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী ছিল, দুৰ্গবন্দী হয়ে লড়বার নির্দেশ দেন। রাজা দাহির তাঁর দুর্গের দৃঢ়তা, রসদ- সত্তার ও সমরাস্ত্রের প্রাচুর্য এবং স্বীয় ফৌজের ত্যাগের ব্যাপারে গর্বিত ছিলেন। এ কারণে বারবার পরাজিত হবার পরও তিনি একজন জুয়াড়ীর মতই আচরণ করতে থাকেন, কিন্তু নিজের অজ্ঞতা ও বোকামীর জন্য প্রতিবারই পরাস্ত হন। রাজা দাহির এবং তাঁর উপদেষ্টাগণ বারবার ধারণা করতে থাকেন যে, আরব ফৌজ ক্ষুধা ও অনাহারের কারণে অবরোধ ছেড়ে দিয়ে নিজেদের দেশে পাড়ি জমাবে। কিন্তু প্রত্যেকবারই হিন্দী ফৌজ আরব ফৌজের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করে। প্রশ্ন জাগে, এমনটি কেন হ’ল?

    এর কারণ এই যে, রাজা দাহির শুরু থেকেই তাঁর ফৌজের ভেতর হীনমন্যতাবোধের সৃষ্টি করেন। অন্য কথায়, রাজা নিজেই তাঁর সৈনিকদের খুদী তথা অহংবোধকে মিটিয়ে দিয়েছিলেন অর্থাৎ তিনি হিন্দী সিপাহীদেরকে কেবল আত্মরক্ষার তা’লীমই দিয়েছিলেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, শত্রুকে সর্বাগ্রে আঘাত হানা আত্মরক্ষার সর্বোত্তম নীতি। প্রকৃতি কেবল রাজা দাহিরের সঙ্গেই এমন আচরণ করেনি, বরং আমরা যখনই ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টে দেখি, দেখতে পাই—প্রকৃতি তাঁর মত সবার সাথেই ঐ একই আচরণ করেছে। দূরে যাবার দরকার নেই, ১৯১৪-১৮ ঈসায়ীর বিশ্বযুদ্ধে বেলজিয়াম এবং ডেনমার্ক খুবই শানদার ও সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণ করেছিল। কিন্তু তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই জার্মানীর তোপের মুখে মস্তক নুইয়ে দেয়। ১৯৩৯-৪৫ ঈসায়ীর বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ফ্রান্স মেজিনু লাইনের উপর কোটি কোটি পাউণ্ড ব্যয় করে এবং এতে কয়েক বছর লেগে যায়। ঐ মোর্চাকে তারা দুর্ভেদ্য করে তৈরী করেছিল। আমাকেও (গ্রন্থকারকে) সেই সিমেন্ট এবং লৌহ নির্মিত শহরের নিরাপত্তা বিধানে মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু যখন জার্মান ট্যাংকের প্লাবন সম্মুখে অগ্রসর হ’ল তখন এসব মোর্চা ঠিক তেমনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল যেমনভাবে বিরাট ঝড়-তুফানে বড় বড় রক্ষ জড়ে-মূলে উৎপাটিত হয়।

    জার্মানী এ শিক্ষা কেবল ফ্রান্সকেই নয় বরং গোটা মিত্রশক্তিকেই পুনরায় শিখিয়ে দেয় যে, যে জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ইটের জবাব পাথর দিয়ে দেবার অদম্য ইচ্ছা থাকে না—তারা কেবল আত্মরক্ষামূলক লড়াই লড়ে বেঁচে থাকতে পারে না।

    কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, যেই জার্মানী দুনিয়াকে শেখাল “সর্বাগ্রে আক্রমণ পরিচালনাই আত্মরক্ষার সর্বোত্তম নীতি”—য়ুরোপ জয় করবার পর সেই জার্মানী নিজেই আটলান্টিক প্রাচীর (Altantic Wall) নির্মাণ করে আলস্যের মাঝে গা এলিয়ে দিল। হিটলার বার বার য়ুরোপকে ধমক দিতেন, ‘যে কেউই য়ুরোপ সীমান্তের নিকটবর্তী কদম রাখবে, আমরা তাকেই ধ্বংস করে দেব।’ কিন্তু এবারও প্রকৃতি সেই ফয়সালাই শোনাল যা ইতিপূর্বেও সে শুনিয়েছিল। তবে হাঁ, এতটুকু পার্থক্য ছিল যে, প্রথমবার হিটলার আক্রমণকারী হবার কারণে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু এবার নিজকে অবরুদ্ধ করে ফেলবার কারণে তিনি কেবল পরাজিতই হলেন না, ইহজগত থেকেও চির জনমের মত বিদায় নিলেন।

    এক্ষেত্রে একটি কথা আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে নেওয়া দরকার যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন দেখলেন, শত্রু ফৌজের সংখ্যাধিক্য তাঁর জন্য সিন্ধুনদ অতিক্রমের ক্ষেত্রে বড় রকমের প্রতিবন্ধক, তখন তিনি উদ্ভাবনী শক্তির সাহায্যে নৌকা দ্বারা একটি পুল সিন্ধুনদের অনুকূল কিনারে তৈরী করলেন। অতঃপর রাতারাতি একে স্রোতের অনুকূলে ভাসিয়ে দিয়ে তার শেষ প্রান্ত অপর পাড়ে বেঁধে দিলেন। এ ধরনের পুল তৈরীর দৃষ্টান্ত প্রতিরক্ষার ইতিহাসে খুব কমই মেলে। জেনারেল উইংগেট বার্মায় এ ধরনের পুল তৈরী করলে দুনিয়ার সব পত্র-পত্রিকা তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় মেতে উঠেছিল।

    আফসোস হয় যে, মুসলিম বিশ্ব মুহাম্মদ বিন কাসিমের মত খ্যাতনামা একজন জেনারেলের জীবনেতিহাস এখন পর্যন্ত সঠিক-ভাবে সাধারণ্যে তুলে ধরতে পারেনি।

    সিপাহ্‌সালার এবং তাঁর দায়িত্ব

    হিন্দী রাজা যখন থাকবেন না তখন হিন্দী ফৌজও লড়াই পরিত্যাগ করবে—মুহাম্মদ বিন কাসিম এই রাজনৈতিক রহস্যের কথাও বিস্মৃত হন নি। আরব ফৌজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, আঁ-হযরত (সা) মুতার যুদ্ধে প্ৰথমে যায়দ (রা) বিন হারিছাকে সিপাহ্‌সালার মনোনীত করেন এবং বলেন: তিনি শহীদ হলে হযরত জাফর বিন আবু তালিব এবং জাফর শহীদ হলে ‘আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) সিপাহ্‌সালার হবেন, আর ‘আবদুল্লাহ্ও যদি শহীদ হয়ে যান, তাহলে মুসলমানরা নিজেদের মধ্য থেকে যে কাউকে সিপাহ্‌সালার নির্বাচিত করে নেবে। ‘আবদুল্লাহ্ শাহাদাতে সেনানায়কগণ খালিদ বিন ওয়ালীদকে তাদের সিপাহ্‌সানার মনোনীত করেন এবং শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। শেষাবধি রোমক সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে চলে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রথমবারের মত আঁ-হযরত (সা) প্রতিরক্ষা নীতিতে ঢুকিয়ে দেন। আজকের পাশ্চাত্য বিশ্ব অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এ নীতি অনুসরণ করছে।

    এ দু’টি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বুঝিয়ে বলার অবকাশ রাখে না। মুহাম্মদ বিন কাসিমের মুকাবিলা করতে গিয়ে হিন্দী সিপাহ্‌সালার যখন মারা যান তখন হিন্দী ফৌজ যুদ্ধের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিমকে যখন খলীফার নির্দেশে কয়েদ করা হ’ল তখনও আরব ফৌজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অটুট মনোবলের মধ্যে কোনরূপ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি।

    সেনাপতিকে কোথায় অবস্থান করা উচিত

    সেনাপতিকে লড়াইয়ের মুহূর্তে কোথায় অবস্থান করা উচিত? মুহাম্মদ বিন কাসিমের অধিনায়কত্ব থেকে জানা যায়, তিনি প্রত্যেকবার সেখানেই অবস্থান করতেন, যেখান থেকে শত্রুর চলাচল ও গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। হতে পারে যে, এই অবহিতি তাঁর নিজের ব্যক্তিগত দেখাশোনার কিংবা তাঁর সেনানায়কদের প্রেরিত লিপি অথবা গুপ্তচরদের প্রেরিত তথ্যাদির উপর নির্ভর করত।

    তিনি ভয় কাকে বলে জানতেন না। নির্ভীকতার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দূরদর্শী এবং সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে কাজ করতেন। খুন-যখম তাঁর আবেগকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উস্কে দিতে পারত না। প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা একবার স্থিরীকৃত হয়ে গেলে অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি তা বাস্তবায়িত করতেন।

    অপরদিকে তাঁর প্রতিপক্ষ রাজা দাহির প্রকৃতপক্ষে কখনো যুদ্ধক্ষেত্রেই আসেন নি। বিপদ-আপদ থেকে দূরে থাকাটাই তিনি পসন্দ করতেন। তাঁর সরকার সে সব খবরের উপরই নির্ভর করত, যা বিভিন্ন সূত্র থেকে কখনো-সখনো সংগৃহীত হ’ত। এমত দৃষ্টিভঙ্গির উপর মতামত দিতে গিয়ে জেনারেল ফুলার বলেন:

    “যে ব্যক্তি নাটকে মঞ্চস্থিত পর্দার পেছনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অভিনেতাকে নির্দেশ দেন, ঠিক তারই মত নির্দেশ প্রদানকারী কাউকে আমরা সত্যিকার অর্থে জেনারেল বলতে পারি না; বরং প্রকৃত জেনারেল তিনিই যিনি স্বয়ং যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে অন্যান্য অভিনেতাকেও যুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। অতএব একজন জেনারেল (সিপাহ্‌সালার)-এর দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সেই মুতাবিক নির্দেশ জারী করাতেই শেষ হয়ে যায় না, বরং তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য হ’ল, তিনি জানতে চেষ্টা করবেন, তাঁর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ও নির্দেশাদি যথাযথ অনুসরণ ও পালন করা হচ্ছে কিনা যদি পালন করা না হয় তাহলে তার কারণ কি এবং কতদূর পর্যন্ত উক্ত নির্দেশের ভেতর রদ-বদল করা সম্ভব।

    নেপোলিয়ন এ সম্পর্কে বলেছেন: “সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে লোকে কেবলমাত্র নিজেদের কষ্ট-ক্লেশই দেখতে পায়, শত্রুর কষ্ট-ক্লেশের দিকে দৃকপাতও করে না। এটি করা অবশ্য কর্তব্য। এছাড়া এটাও জরুরী যে, সিপাহ্‌সালার তার নিজের যোগ্যতার উপর আস্থা রাখবেন।

    “উদাহরণত, উত্তর আফ্রিকার লড়াইয়ে জার্মান জেনারেল রোমেল লড়াইয়ের উভয় দিক নিয়েই গভীর চিন্তা-ভাবনা করেন। তাঁর নিজের কষ্ট-ক্লেশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষ বৃটিশ অধিনায়কের বিপদগুলোরও সঠিক পরিমাপ করেন। কিন্তু বৃটিশ অধিনায়ক জেনারেল ক্যানিংহাম কেবল নিজের কষ্ট-ক্লেশই অনুভব করেন। কেননা যখন জেনারেল রোমেল তার পশ্চাদ্দেশে এসে বীর শীফারজানের নিকটবর্তী রসদবাহী ও অন্যান্য ব্যবস্থা-সামগ্রীর উপর হামলা চালিয়ে তা তছনছ করে দেন তখন তিনি (ক্যানিংহাম) এতখানি দিক্‌ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি এও ভুলে গিয়েছিলেন—তাঁর ফৌজও জেনারেল রোমেলের ফৌজের পশ্চাদ্দেশে রয়েছে এবং তার জন্যও তো অনুরূপ কষ্ট-ক্লেশ অপেক্ষা করছে যে ধরনের কষ্ট-ক্লেশের মুখোমুখি হতে হচ্ছে স্বয়ং জেনারেল ক্যানিং- হামকে। অবস্থা যদি সত্যি তাই হয়—তাহলে বলতেই হয় যে, জেনারেল ক্যানিংহামের রীতি ও আচরণ একজন যোগ্য অধিনায়কসুলভ ছিল না।

    “জেনারেল অকিনলেক কিন্তু এ ধরনের অবস্থার কারণে বিভ্রান্ত হন নি। তিনি জেনারেল ক্যানিংহামের অসুবিধাগুলোর সাথে শত্রুর বিপদ-মুসিবত সম্পর্কেও সঠিক পরিমাপ করতে সক্ষম হন। সাহসিকতা, বীরত্ব ও মনোবলের সঙ্গে তিনি এমন রীতি অবলম্বন করেন যার জন্য তিনি ফৌজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হন।

    সামনে গিয়ে জেনারেল ফুলার উল্লিখিত বর্ণনার সমর্থনে মার্কিন প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক আলেকজাণ্ডার ক্লিফোর্ড-এর যে পর্যালোচনা উদ্ধৃত করেছেন, নিম্নে তা দেওয়া গেল:

    “জেনারেল রোমেল তার ফৌজকে চোখের পলকে যুদ্ধক্ষেত্রের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবার যোগ্যতার অধিকারী হন—এজন্য যে, তিনি নিজেই সরাসরি তাদের অধিনায়কত্ব করছিলেন। তিনি সঠিকভাবে পরিমাপ করে নিয়েছিলেন যে, যে-ভাবে নৌ-বাহিনীর অধিনায়ক (এডমিরাল) স্বয়ং জাহাজে আরোহণ করে স্বীয় নৌ-বহরের যথাযোগ্য গতিবিধি ও চলাচলকে সক্রিয় করে শত্রুর নৌ-বহরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন ঠিক তেমনি প্রান্তর-সমুদ্রে স্থলবাহিনী প্রধানের জন্যও নিজের ফৌজকে নিজেই নেতৃত্ব দান করা কর্তব্য। এমতাবস্থায় তিনি নিজেই স্বয়ং সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হবার কারণে স্বীয় ট্যাংক কোম্পানীকে (সেকালের অশ্বারোহী বাহিনী– গ্রন্থকার) শত্রু কোম্পানীর সঙ্গে সরাসরি কিংবা আহরিত তথ্যানুযায়ী উপযোগী পন্থায় লড়িয়ে থাকেন। এ সব অবস্থায় তিনি স্বীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন এবং তাঁর নির্দেশাদি অধিনায়কদের নিকট খুব সংক্ষিপ্ত সময়েও স্বল্প বিরতির মাঝেই পৌঁছে যায়। আর তাঁর অধীনস্থ সেনানায়কদের সে সব নির্দেশকে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করতে পারেন। এতদ্ভিন্ন যদি শত্রুর কোন সামরিক চালের কারণে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তাহলে তিনি তাঁর প্রথম নির্দেশের মাঝে উপযোগী পরিবর্তন সাধনও করতে পারেন। অর্থাৎ জার্মান সেনানায়কদের নিকট যখন তাদের সেনাপতি জেনারেল রোমেলের নির্দেশ পৌঁছে যেত, তখন বৃটিশ সেনাপতির কাছেও যুদ্ধ-ক্ষেত্রের খবর পৌঁছুত না। কেননা বৃটিশ অধিনায়ক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে পশ্চাদ্দেশে অবস্থান করতেন। এ পরাজয়ের কারণ এটা ছিল না যে, জার্মান জেনারেল বৃটিশ জেনারেলের চেয়ে বেশী যোগ্য ছিলেন; বরং এর কারণ ছিল এই যে, তাদের (বৃটিশ জেনারেলদের) প্রশিক্ষণ ছিল অতি প্রাচীনকালের। বৃটিশ জেনারেলদের পরিকল্পনা এবং কর্মপন্থা ১৯১৪-১৮ ঈসায়ীর মোর্চার লড়াইয়ের অনুরূপ ছিল। তাঁরা বিস্তৃত ও প্রশস্ত রণক্ষেত্রে ট্যাংকের সঠিক চলাচল ও গতিবিধির পন্থা সম্পর্কে অজ্ঞ ও অনবহিত ছিলেন।”

    এখন যদি আমরা সিন্ধুর লড়াই-এর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করি তাহলে মুহাম্মদ বিন কাসিম এবং রাজা দাহিরের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে নিম্নরূপ পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে।

    জেনারেল রোমেল এই আরব বংশোদ্ভূত জেনারেল মুহাম্মদ বিন কাসিমের ন্যায় স্বীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে নির্দেশ জারী করতেন। তাঁর দূরদর্শী চক্ষু যুদ্ধের অবস্থাসমুহ নিজের থেকেই দেখতে পেত। ডাক-হরকরা তাঁর নিকট প্রতি মুহূর্তের সংবাদ নিয়ে আসত। ফলে তিনি তাঁর শত্রুর প্রতিরক্ষা চাল এবং সামরিক কূটকৌশলকে মাত করে দিতে সক্ষম হন।

    যেখানে মুহাম্মদ বিন কাসিম বিপদ-আপদকে আদৌ গ্রাহ্যের মধ্যে না এনে সকল অবস্থা নিজের চোখেই দেখতেন, সেখানে (যদি আমরা ঐতিহাসিকদের সে সব বর্ণনা বিশ্বাস নাও করি যে, রাজা দাহির হাতীর হাওদায় বাঁদী, নর্তকী ও পানপাত্র নিয়ে উপস্থিত ছিলেন) রাজা দাহির অবস্থান করতেন তাঁর ফৌজ থেকে অনেক দূরে—অনেক পেছনে।

    যদি বেলা রণক্ষেত্রে তিনি তাঁর সেনাপতির নিকট নাও পৌঁছে থাকেন, তাহলে তাঁকে আমরা এভাবে ক্ষমা করতে পারি যে, তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের শক্তি ও যোগ্যতার সঠিক পরিমাপ করতে পারেন নি। মুহাম্মদ বিন কাসিম ছিলেন তখন ১৯ বছরের এক তরুণ, যাঁর নিকট মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য ছিল। আর সে সব সৈন্যের হাতিয়ার হিন্দু সৈনিকদের তুলনায় অতি সাধারণ মানের ছিল। কিন্তু যখন বেলার পরে দেবল এবং পরে নীরুন, সহওয়ান ও সিব্বী পর্যন্ত বিজিত হয়ে গেল তখনও আরাম-আয়েশে তাঁর ব্যস্ত থাকাটা মোটেই ক্ষমার যোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন তিনি জানতে পারলেন যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুনদ পার হবার স্বপ্নে বিভোর।

    এ ব্যাপারে আত্মপ্রশংসার জন্য নয় বরং শিক্ষা গ্রহণের জন্য আমি আমার স্মৃতিকথা এখানে পেশ করছি।

    ঈসায়ী ১৯৪৯ সাল। ভারতীয় ফৌজ কাশ্মীরে প্রবেশ করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিল। আমার উপর উক্ত ফ্রন্টের বিরাট একটি অংশের যিম্মাদারী সোপর্দ করা হয়। আমি রাওয়ালপিণ্ডি পৌঁছে দেখতে পেলাম:

    ১. আমাদের বৃটিশ সেনাপতি—যিনি বিগত দু’বছরের মধ্যে একবারের জন্যও ঝিলাম নদীর অপর পাড়ে পা রাখেন নি, সে সময় যুদ্ধরত ফৌজ থেকে কমপক্ষে চারশ’ মাইল দূরে নিজ বাংলোয় অবস্থান করছেন।

    ২. অবশিষ্ট জেনারেলগণও রাওয়ালপিণ্ডি কিংবা মারীর হোটেলগুলোতে অবস্থান করছেন।

    ৩. জেনারেলগণ ছাড়াও নিম্ন র‍্যাংকের বিরাট সংখ্যক অফিসার উল্লিখিত জায়গাগুলিতে আরামের সঙ্গে বসে ম্যাপ দেখে দেখে সৈনিকদের দিয়ে যুদ্ধ করাচ্ছেন।

    কাশ্মীর উপত্যকার জঙ্গলগুলোতে না ছিল রাস্তা, না ছিল তার কিংবা টেলিফোন। নদীনালা ও পর্বতশ্রেণী যাতায়াত ও সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যবস্থাকে খুবই দুরূহ ও কষ্টসাধ্য করে রেখেছিল। সংবাদ যদিও পৌঁছত তবে তা এত দেরীতে যে, তখন আর তার কোন গুরুত্বই থাকত না। বলা যেতে পারে যে, আজকালের ওয়ারলেসের যুগে এসব বাধা কোন বাধাই নয়। এর উত্তর এই যে, আমাদের বাহিনীর কাছে যে ওয়ারলেস সেট ছিল, তা ছিল একদম মান্ধাতার আমলের, যার উপর উচ্চতা, তুষারপাত এবং বাতাসের তীব্রতা গভীর প্রভাব ফেলত এবং দীর্ঘ দূরত্ব বা ত্রুটির জন্য কিংবা কমজোরীর কারণে কোন বার্তা পরিপূর্ণ ও সঠিকভাবে পৌঁছুত না; এমন কি সংবাদ আদান-প্রদানের ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটাও বিস্ময়কর কিছু ছিল না।

    কিন্তু এ দুর্বলতা যদি নাও থাকত তবু একটি বড় অসুবিধা এই ছিল যে, তখন যে গুপ্ত-সংকেত (Code) কিংবা পন্থা আমরা ব্যবহার করতাম তার মৌলিক নীতি পাক-ভারতে একই ছিল। কেননা উভয় প্রতিপক্ষের (হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তান) সৈনিকেরা একই স্কুল এবং একই মূলনীতির অধীনে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ফলে কোড (Code) তখন বস্তুতপক্ষে আর কোড অর্থাৎ গোপন রহস্য ছিল না।

    কম্যাণ্ড হাতে নিতেই যখন আমি আমার হেড কোয়ার্টারকে সম্মুখে অগ্রসর হবার জন্য বললাম, তখনই আমাকে অনেকগুলো বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হল। যাই-হোক, এটা নিশ্চিত যে, পাকিস্তানী ফৌজকে পুঞ্ছ ও শ্রীনগর থেকে এজন্য হটে আসতে হয় যে, ফৌজের অধিনায়ক তখন কয়েকশ’ মাইল পেছনে বিলাস-ব্যসনে মত্ত ছিলেন। এ ছাড়া ফৌজ যেমন তখন সময়মত প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা পায়নি, তেমনি পায়নি নেতৃত্ব। তাদের কাছে না ছিল রসদ-সম্ভার, আর না ছিল সমরাস্ত্র। বিশেষত তাদের নিকট কার্তুজেরও পরিমাণ ছিল খুবই কম।

    আমি প্রথমবার পুঞ্ছ নদীর ধারে অবস্থিত ৯০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর গেলাম এবং আমার অধীনস্থ অফিসারবৃন্দকে সেখানে একত্র করলাম। পুঞ্ছ নদীর উপত্যকা উক্ত পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের পদতলে অবস্থিত। আমি চাইলাম যে, সেখান থেকে সবাইকে পরিষ্কারভাবে এবং সুস্পষ্ট ভাষায় নিৰ্দেশ দিই।

    আমি তিরাখীল থেকে উক্ত পাহাড় পর্যন্ত রত্রিবেলা পায়ে হেঁটে সফর করেছিলাম। উভয়ের মাঝে দূরত্ব ছিল প্রায় ১২ মাইল। আমাকে পথিমধ্যে ৫ হাজার ফুট উঁচু দু’টি পাহাড়ে আরোহণ করে এবং নদী-নালা অতিক্রম করেই সেখানে পৌঁছুতে হয়েছিল। এ সফর আমি মাগরিব থেকে শুরু করে অর্ধেক রাত্রির কিছু পর পর্যন্ত সময়ের মাঝে সম্পন্ন করেছিলাম এবং নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে ক্লান্তি ও অবসন্নতার কারণে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। ইতিমধ্যে উপজাতীয় বাহিনীগুলোর সর্দারবৃন্দ, যারা নিজেদেরকে ‘জেনারেল’ বলে অভিহিত করতেন—উল্লিখিত স্থানে পৌঁছে যান এবং অভ্যাস মাফিক সজোরে কথা-বার্তা বলতে শুরু করেন। এতে সেখানকার ব্রিগেডিয়ার সাহেব তাদেরকে পশতু ভাষায় আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে আস্তে এবং নিম্নস্বরে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন। কেননা তাদের জেনারেল সাহেব কেবলই এসে পৌঁছেছেন এবং এখন তিনি শুয়ে ঘুমুচ্ছেন। একথা শুনেই ঐসব উপজাতীয় সর্দার বলেন, “আপনি আমাদেরকে ধোঁকা দেবেন না। আপনি আমাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছেন আর আমরাও এসে গেছি। দু’বছরের বেশী হয়ে গেল, এর ভেতর কি কোন জেনারেল এ এলাকায় এসেছেন? কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার ছাড়া অন্যরা কি তাদের নিজ নিজ ক্যাম্পে আরামের ঘুম ঘুমুচ্ছেন না? … আজকের যুগের কোন জেনারেল রাতভর পায়ে হেঁটে এতদূর এসেছেন—এমন কথাও কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?” এরপর ভোরবেলা তারা আমাকে সশরীরে তাদের মাঝে উপস্থিত দেখে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমার নিকট ক্ষমা চান এবং তাদের স্বতস্ফূর্ত উল্লাস প্রকাশ করেন। এর বিপরীতে ভারতীয় ফৌজের জেনারেল এবং তাদের অধিনায়কবৃন্দ ঠিক যুদ্ধক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিলেন। আমরা যদি আলোচ্য পর্যালোচনাসহ সমগ্র বিষয়টি নিয়েই পর্যালোচনা করে দেখি তাহলে একথা আমাদেরকে মেনে নিতেই হবে যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ভিত্তিতে কাশ্মীরে যা কিছুই হয়েছে তা আমাদের আশার বাইরে ছিল না এবং এর ফলাফল ও পরিণতি তাই হয়েছে যা হওয়া উচিত ছিল। কেননা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ ফৌজের সঙ্গে না থেকে কয়েকজন অধিনায়ক তাদের থেকে দূরে বহু পেছনে অবস্থান করছিলেন।

    আমরা শিক্ষা গ্রহণ করব—কেবল এজন্যই আমি এসব লিখলাম যাতে করে আমার জাতির অধিনায়কবৃন্দ ভবিষ্যতে এ জাতীয় ভুলের পুনরাবৃত্তি করে আমার দেশের সার্বিক স্বার্থ বিনষ্ট না করেন।

    আঁ-হযরত (সা) সব সময় স্বীয় ফৌজের নেতৃত্ব যুদ্ধক্ষেত্রেই করেছেন। হযরত আবু বকর (রা)-ও সেই কর্মপন্থাই অনুসরণ করেছেন। যখনই তিনি সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন তখনই তাদের অধিনায়ক নিযুক্ত করে তাদেরকে সে ধরনের দিক-নির্দেশনাই দিয়েছেন। তেমনি মার্কিন জেনারেল পেটি য়ুরোপে, বৃটিশ জেনারেল মন্টোগোমারী আফ্রিকায় এবং য়ুরোপে নিজ নিজ বাহিনীর সঙ্গেই ছিলেন। খালিদ (রা) বিন ওয়ালীদ, মুহাম্মদ বিন কাসিম, মূসা বিন নুসায়র, তারিক বিন যিয়াদ প্রমুখ বিখ্যাত জেনারেলও প্রতিরক্ষাশাস্ত্রের এই মূলনীতির উপর আমল করেছেন। তৈমুর লং, সুলতান সলীমের মত বিজয়ীরা একেবারে যুদ্ধের ময়দানে গিয়েই সৈন্য পরিচালনা করেছেন।

    আজকালকার যুদ্ধ চলাচল ও গতিবিধির যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ট্যাংক ও উড়োজাহাজ আজ অশ্ব ও উষ্ট্রারোহীর স্থান দখল করেছে। আঁ-হযরত (সা)-এর যুগেই খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু আঁ-হযরত (সা)-এর দূরদর্শী চক্ষু চলাচল ও গতিবিধির গুরুত্বকে ফৌজের জন্য খুবই অপরিহার্য ভেবেছেন এবং আরববাসীকে অশ্বারোহণ, তীরন্দাযী, দূর-দূরান্তের সফর, ঘোড়দৌড়, কষ্ট সহিষ্ণুতা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হবার জন্য সব সময়ই উপদেশ দিয়েছেন। প্রতিরক্ষা শাস্ত্রের এই মূলনীতি সেযুগের তুলনায় আজকের যুগে একান্তই অপরিহার্য। কেননা এ যুগের জনসাধারণ আরামপ্রিয়তার দিকেই বেশী ঝুঁকে রয়েছে। কষ্ট-সহিষ্ণুতা, কঠোর পরিশ্রম ও সহনশীলতার মত গুণাবলী ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে।

    অটুট সংকল্প ও ধৈর্য

    সিপাহ্‌সালারের মধ্যে সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও অসাধারণ ধৈর্য শক্তি থাকা যারপরনাই জরুরী। সিপাহ্‌সালারের মধ্যে যদি অটুট সংকল্প কিংবা আত্মবিশ্বাস না থাকে তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি তাঁর সৈনিকদেরকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াতে পারবেন না এবং তাঁর ফৌজকে এমন কোন কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক গতিবিধির ব্যাপারেও অণুপ্রাণিত করতে ভরসা পাবেন না যার ভেতর বিপদ-আপদ কিংবা ধৈর্যের পরীক্ষা রয়েছে। উদাহরণত, মুহাম্মদ বিন কাসিমের যদি স্বীয় ফৌজের উপর এবং বিশেষ করে নিজের উপর বিশ্বাস না থাকত তাহলে তিনি সিবীর যুদ্ধক্ষেত্রে চন্দ্রাকৃতির প্রতিরক্ষা চাল, যা দুর্বলের জন্য একান্তই বিপজ্জনক, রাজা বজ্রের মত ধীর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কখনো প্রয়োগ করতে পারতেন না। তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী দ্বারাই রাজার তিনশত হাতীর উপর হামলা করে বসেছিলেন এবং প্রত্যেকবারই নির্ভীকভাবে লড়াই করেছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ কৌশলও ঠিক করে নিয়েছিলেন। তাঁর ভেতর যদি অটুট সংকল্প ও ধৈর্য না থাকত তাহলে তিনি কখনো এতখানি সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারতেন না।

    যুদ্ধে সংবাদ আদান-প্রদানের গুরুত্ব

    সিপাহ্‌সালারেরই কেবল নয় বরং প্রত্যেক অধিনায়কেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য হ’ল,—কেবল শত্রুরই নয়, বরং নিজ ফৌজের প্রতিটি প্লাটুনের চলাচল ও গতিবিধি সম্পর্কেও অবহিত থাকা। রাজা দাহির প্রত্যেক বারই এ ভুল করেছেন যে, তিনি তাঁর বাহিনীকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে অলস ও গাফিল হয়ে বসে রয়েছেন। অপরদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিমই শুধু নয়, হাজ্জাজ বিন ইউসুফও সিন্ধু বিজয়ের প্রতিদিনের কার্যবিবরণী বরাবর চেয়ে পাঠাতেন। এটা ছিল তাঁর উন্নত ও প্রশংসনীয় ব্যবস্থাপনা যে, প্রত্যেক আরব সিপাহ্‌সালারের প্রেরিত চিঠি-পত্রাদি হাজ্জাজ এক সপ্তাহ থেকে দশ দিনের ভেতরেই বসরায় পেয়ে যেতেন।

    গেরিলা যুদ্ধের গুরুত্ব

    ফিনল্যাণ্ডের মত ছোট্ট একটি রাষ্ট্রের গেরিলারা রাশিয়ার মত একটি বিশাল সাম্রাজ্যের সরকারকে পেরেশান ও বিব্রত করে তুলেছিল এবং রাশিয়ার গেরিলারা জার্মানীর বিজয়ী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে ছেড়েছিল। চীনা গেরিলা বাহিনী সরকারের সাহায্য নিয়ে মার্শাল চিয়াং-কাই-শেক-কে চীন থেকে বহিষ্কার করে দিল। এর পর থেকেই গেরিলা বাহিনীকে লোকে অপরাজেয় ভাবতে শুরু করে। প্রশ্ন জাগে, হিন্দী গেরিলারা কেন বাজিতে হেরে গেল? এর জওয়াব খুবই পরিষ্কার। এটা ছিল হিন্দী অধিনায়কেরই ভুল, যিনি গেরিলাদেরকে এক স্থানে একত্র করে নড়িয়েছেন। বস্তুতপক্ষে এক স্থানে সমবেত হয়েও তারা লড়তে পারেনি। কেননা মুহাম্মদ বিন কাসিমের অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহী বাহিনী তাদের খণ্ডগুলোকে এক এক করে পাকড়াও করেছিলেন।

    ম্যাসিনা এবং স্পেনিশ গেরিলা

    গেরিলা যুদ্ধ-পদ্ধতি কেবল সাম্প্রতিককালেই সম্মান, শ্রদ্ধা ও খ্যাতি লাভ করেনি বরং আমরা যখন নেপোলিয়নের লড়াইগুলোর কথা অধ্যয়ন করি তখনও জানতে পারি যে, ফ্যারাডিয়া ভোলো (Faradia Volo)– যিনি স্পেনিশ গেরিলাদের সর্দার ছিলেন, নেপোলিয়নের বিখ্যাত জেনারেল ম্যাসিনা (Massina)-কে ক্যালব্রিয়ার এলাকায় কতই না বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিলেন।

    নেপোলিয়ন এবং রাশিয়ান গেরিলা

    রাশিয়ান গেরিলারা নেপোলিয়নকে—যখন তিনি মস্কো থেকে বিজয়ী বেশে দেশে ফিরে যাচ্ছিলেন, ভীষণ যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে। মস্কো থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে ফরাসী সেনাবাহিনীর উপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের জান-মালের ভীষণ ক্ষতি সাধন করে। আমরা বরং বলতে পারি যে, ঐসব গেরিলাই নেপোলিয়নের মর্যাদায় এবং তাঁর ফৌজের উপর এমন কার্যকর আঘাত হানে যে, নেপোলিয়নের বাহিনী—যারা প্রথমে ছিল য়ুরোপ বিজয়ী, একটি পরাজিত শক্তিতে পরিণত হয়।

    গেরিলাদের বিরুদ্ধে তুর্কী ফৌজ

    ১৯১২ ঈসায়ীতে বলকান যুদ্ধে মান্টেন্সরোর ছোট পার্বত্য রাজ্যের গেরিলারা তুর্কীদেরকে বারবার যন্ত্রণা দেয়। এর অর্থ অবশ্য এ নয় যে, তুর্কী সেনাবাহিনী খুবই দুর্বল ছিল। কেননা বিশাল সার্বিয়া রাজ্যের বিরাট শক্তিশালী সেনাবাহিনীকেও তুর্কীদের হাতে শেষাবধি নাকানি-চুবানি খেতে হয়েছিল।

    স্পেন এবং গেরিলা

    ১৭৫৯ ঈসায়ীতে ফ্রান্সে মুরগণ স্পেনীয়দেরকে খুবই বিব্রতকর অবস্থার মাঝে নিক্ষেপ করেছিল। স্প্যানিশ বাহিনী মূরদের পশ্চাদ্ধাবন্ করতে মাইলের পর মাইল ছুটে যেত এবং ধারণা করত যে, সামনের খেজুর বনেই আমরা তাদেরকে ধরে ফেলব। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা ফাঁকা ও শূন্য ছাউনী ছাড়া আর কিছুই পেত না।

    রাশিয়া ও গেরিলা

    ১৮৭৬-৭৭ ঈসায়ীতে রাশিয়া মুসলিম রাষ্ট্র তুর্কমানের উপর হামলা করে। রাশিয়ানরা খুব ধুমধাম ও বিরাট শান-শওকতের সাথে সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং কেন্দ্রীয় শহর হাশিম দখল করে নেয়। কিন্তু শহর ছিল ফাঁকা। তুর্কমানেরা আশেপাশের পাহাড়গুলিতে আত্মগোপন করেছিল। তারা হঠাৎ হাশিমে অবস্থানরত রাশিয়ান ফৌজকে এমনভাবে বিব্রত করে তোলে যে, শেষ পর্যন্ত তারা শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। তুর্কমান গেরিলারা সুযোগ পেলেই রাশিয়ার রসদ-সম্ভারবাহী কাফেলা লুট করে নিত। ফলে রাশিয়ান ফৌজকে রসদের ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে সেখান থেকে ফিরে যেতে হয়।

    ওয়াযিরীস্তানের গেরিলা এবং ইণ্ডিয়ান আর্মী

    ১৯৩৬-৩৯ ঈসায়ীতে ওয়াযিরীস্তানের উপজাতীয় এলাকায় বৃটিশ ভারতীয় সরকার এবং উপজাতীয়দের মধ্যে যে লড়াই সংঘটিত হয়—আমি (গ্রন্থকার) তাতে শরীক ছিলাম। ফকীর ইপি ছিলেন উপজাতীয় গেরিলা বাহিনীর অধিনায়ক। তার অধীনে কোন সময়ই চারিশতের অধিক উপজাতি একত্রিত হয়নি। এর বিপরীতে ইণ্ডিয়ান আর্মীর সদস্যসংখ্যা ছিল চল্লিশ হাজারের মত এবং এই ফৌজ ছিল গোরা, গুর্খা, সীমান্তের বিখ্যাত (পাঠান) পল্টন এবং আর্মার্ড কোরের সমষ্টি। কামান এবং বিমানও এতে শামিল ছিল। ঐসব উপজাতীয়দের আচরণ ছিল এমনি যে, আজ তারা বন্নুর নিকটবর্তী অঞ্চলে অতর্কিত আক্রমণ চালান, কিছুদিন পর আবার মীর আলীতে গিয়ে হাযির হ’ল; তারপর রিযক প্রভৃতি স্থানে আবার তাদের আবির্ভাব ঘটল। ইণ্ডিয়ান আর্মী কয়েক শ’ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে যখন হামলাকারীদের কাছে গিয়ে পৌঁছুত তখন দেখা যেত, তারা সেই পাহাড়ী এলাকা থেকে ধোঁয়ার মত মিলিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও আবার ভেসে উঠেছে। এভাবে উক্ত উপজাতীয়রা কয়েক বছর ধরে বৃটিশ ভারতীয় বাহিনীকে বিব্রত করে রেখেছিল।

    কিভাবে গেরিলা বাহিনীর মুকাবিলা করা যায়

    জেনারেল ব্যাল্‌ফ সম্পর্কে পাশ্চাত্যের জনৈক প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক লিখেছেন যে, তিনি নেপোলিয়নের প্রায় সম-মতাবলম্বী ছিলেন। তিনি বলেন:

    “এশিয়ায় যুদ্ধ পরিচালনার সময় সেখানকার গেরিলাদের বিরুদ্ধে অটুট সংকল্প ও নির্মম হৃদয়ের পরিচয় দিতে হবে, যাতে করে ভয়, সন্ত্রাস এবং সিপাহ্‌সালারের অটুট সংকল্প তাদের সকল আশা-ভরসাকে হতাশা ও নিরাশায় পরিণত করে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ক্রিয়াকাণ্ড শুরু করতে হবে খুবই ত্বরিত গতিতে এবং অত্যন্ত আচম্বিতে। এতে করে গেরিলারা কোন পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগই পাবে না। আর একবার যদি তারা পরাজিত হয় তাহলে তাদের মনোবল ভেঙে পড়বে।

    “ভয়, ত্রাস এবং কঠিনতম শাস্তিই এসব উপজাতীয়দের সঠিক প্রতিষেধক—যারা কখন বিজয়ী দলের সাথে গিয়ে মিশবে সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এসব লোক ভয় পেলে গেরিলাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়।”

    জেনারেল টুকার এবং গেরিলা

    ওয়াযিরীস্তান এলাকার যুদ্ধে আমি (গ্রন্থকার) নিজে আরও একটি পন্থা কার্যকর হতে দেখেছি। ১৯৩৭ ঈসায়ীতে উপজাতীয়রা বান্নু থেকে রিযমুকগামী সড়কে কয়েকবার সফল হামলা চালিয়ে ইণ্ডিয়ান আর্মীকে (অর্থাৎ আমাদেরকে) খুবই বিব্রত করে তুলেছিল। সড়কের সর্বাধিক বিপজ্জনক অংশের হেফাজতের দায়িত্ব দেওয়া হয় টুকার নামক একজন ইংরেজ কর্নেলকে। ইনিই পরবর্তীকালে জেনারেল টুকার নামে পরিচিত হন। তাঁর লিখিত গ্রন্থাদির উল্লেখ আমরা কয়েকবারই করেছি।

    টুকার কয়েকদিন তাঁর ফৌজ নিয়ে রাত-দিন টহল দিতে থাকেন। সে সময় রসদবাহী লরী বহরের উপর উপজাতীয়রা সাফল্যের সঙ্গে হামলা চালিয়ে কয়েকবারই তা লুট করে নেয়। এ সম্পর্কে কর্নেল টুকারকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষত এজন্য যে, কর্নেল টুকার সাধারণ প্রচলিত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার বদলে কিছু নতুন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।

    কিছুদিন পর খবর পাওয়া গেল যে, কর্নেল টুকার উপজাতীয়দেরকে তাদেরই ছড়ানো-বিছানো জালে আটকে এমন শিক্ষা দিয়েছেন যা তারা কোনদিনই ভুলতে পারবে না অর্থাৎ উপজাতীয়দের এত বেশী জীবন হানি ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে যার উদাহরণ সীমান্ত যুদ্ধগুলোতে সাধারণত পাওয়া যায় না। অথচ কর্নেল টুকারের ফৌজের একজন সদস্যও এতে আহত হয়নি। লোকদের বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, এটা কি করে সম্ভব হ’ল।

    কর্নেল টুকার প্রচলিত নির্ধারিত নিরাপত্তামূলক টহলদানের পন্থা ছেড়ে দিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে রাতে ও দিনে স্বীয় ফৌজকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে দেন। এসব গ্রুপের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা দিনের বেলা দূরবীন লাগিয়ে উপজাতীয়দের চলাচল ও গতিবিধি খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। এসময় আকস্মিকভাবে উপজাতীয়দের কোন দল তাদের হাতের মুঠোয় এসে গেলেও তাদের উপর হামলা করবে না।

    রাতে টুকারের বাহিনী উপজাতীয় বাহিনীর পেছনে পেছনে ছায়ার মত ফিরত এবং তাদের গতিবিধির উদ্দেশ্য বুঝতে চেষ্টা করত এবং ক্যাম্পে ফিরে এসে সে সম্পর্কে রিপোর্ট করত। কিন্তু তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা সাধারণ রাস্তা দিয়ে কিংবা এমন কোনভাবে যাবে না, যাতে শত্রুরা তাদের উদ্দেশ্য ধরে ফেলতে পারে। এভাবে কর্নেল টুকার কেবল উক্ত এলাকা সম্পর্কেই একটা স্বচ্ছ ধারণা স্বীয় মস্তিষ্কে গেঁথে নেন নি, বরং উপজাতীয়দের কর্মপন্থা সম্পর্কেও বেশ ভালভাবে ওয়াকিফহাল হন।

    টুকার তাঁর বিভিন্ন প্লাটুন প্রদত্ত রিপোর্ট থেকে জেনে নিয়েছিলেন যে, উপজাতীয়রা সড়কের একটি পুল বারূদের সাহায্যে উড়িয়ে দিয়ে সেখানে রসদবাহী লরী থামাতে চায়। যেই লরী থামবে অমনি তারা ইণ্ডিয়ান আর্মীর জরুরী ও মূল্যবান সাজ-সরঞ্জাম লুটে নেবে এবং বাকি মাল-সামানে আগুন লাগিয়ে পাহাড়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাবে।

    উপজাতীয়রা খুব সতর্কতার সাথে কয়েকদিন যাবত পুল ধ্বংসের ব্যাপারে কাজ করে। এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোন পুল ছিল না। সেজন্য উপজাতীয়দের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, টহলদানকারী বাহিনী স্বাভাবিকভাবে সড়কের উপর দিয়ে চলে যাবে এবং তারা তাদের পরিকল্পনায় সফল হবে। অনন্তর হ’লও তাই অর্থাৎ সড়কের উপর দিয়ে সশস্ত্র গাড়ী অতিক্রম করে গেল। কেউ এতটুকু সন্দেহও করল না। অবশ্য টুকারের বাহিনী অনুমান করে নিয়েছিল যে, চূড়ান্ত হামলা হবে আগামীকাল রাত্রে অর্থাৎ মটর কনভয় আসবার আগের রাতে।

    নির্ধারিত রাতে ঐসব লোক ঘাসের তৈরী বেণী নিয়ে আসে যাতে করে বারূদে অগ্নি সংযোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। যদি কোন কারণে বারূদের ফিতা বেকারও হয়ে যায়, তাহলেও যেন কোন অসুবিধা না হয়।

    এ কাজ কিভাবে সম্ভব হ’ল

    পুলের আশেপাশে তারা পাথর এবং শিলাখণ্ড কয়েক দিন থেকেই জড়ো করতে শুরু করে দেয়। এর দ্বারা তারা বুঝাতে চাচ্ছিল যে, তারা সড়ক এবং পুলের মেরামতের জন্য এসব জড়ো করছে। কয়েক জায়গায় তারা ভূমিও খনন করেছিল। তারা সেই সঙ্গে সঙ্গোপনে পুলের তলায়ও গর্ত খনন করে এবং তার ভেতর মাটি ভরে দেয়, যাতে করে শেষ রাতে সহজেই মাটি সরিয়ে তার ভেতর বারূদ ভর্তি করে বিনা বাধায় পুলটি উড়িয়ে দিতে পারে। তারা পুল থেকে বেশ দূরে দূরে ঘাস জ্বালাতে থাকে, যাতে বোঝা যায় যে, সর্দির হাত থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যেই সড়ক নির্মাণরত শ্রমিকেরা আগুন জ্বালাচ্ছে।

    একদিকে উপজাতীয়রা এই ব্যবস্থা নিল, অন্যদিকে টুকার স্বীয় প্লাটুনগুলোর জন্য অন্য ব্যবস্থা নিলেন। তিনি তাঁর ফৌজকে বণ্টিত করলেন এভাবে যে, যখন উপজাতীয়রা পুত্র থেকে সরবে অমনি একটা না একটা প্লাটুনের জালে পড়বে। বিশেষ প্লাটুন ছাড়া অন্য কারো গুলী চালাবার হুকুম ছিল না; বরং শত্রুর উপর খোখরী (গুর্খা খঞ্জর), সঙ্গীন এবং অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দিলে বোমা ব্যবহারের অনুমতি ছিল। সবচেয়ে দূরে গোলন্দাজ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছিল, যারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সব জায়গার দূরত্ব মেপে রেখেছিল এবং এক একটি জায়গার এক একটি বিশেষ নাম দিয়েছিল যাতে করে কামানের গোলা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওয়ারলেসের সাহায্যে শত্রুর উপর নিক্ষেপ করা যায়। যে-ই না উপজাতীয়রা ঘাস জ্বালাবার সময় দিয়াশলাই জ্বালিয়েছে অমনি টুকারের লুকায়িত প্লাটুন তাদের উপর সার্চ লাইট গোলা নিক্ষেপ করে এবং সেই সাথে মেশিনগানের গুলীও বর্ষণ করে। কয়েকজন উপজাতি সেখানেই মারা যায়। যারা বেঁচে ছিল তারা পিছু হটতেই অপর প্লাটুনের সঙ্গীনের শিকারে পরিণত হয়। যে সব লোক কেবল লুটতরাজ করবার জন্য গ্রাম থেকে বেরিয়ে এই আশায় আত্মগোপন করেছিল যে, রসদবাহী নরী আসা মাত্রই হামলা করবে–তারা ভীত-বিহ্বল হয়ে গ্রামের দিকে পালাতে থাকে। কিন্তু কামানের সার্চলাইট গোলার আলোতে তারা পরিষ্কার দৃষ্টিগোচর হয় এবং গ্রাম অবরোধকারী ফৌজের হাতে ধরা পড়ে।

    কর্নেল টুকারের এই প্রতিরক্ষা কার্যক্রম ঐ এলাকার উপজাতীয়দের অনেকদিন পর্যন্ত নিশ্চুপ করে রাখে। বিশেষত এজন্য যে, উপজাতীয়দের যে সব লোক আহত হয়েছিল কিংবা মারা গিয়েছিল উপজাতীয়দের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও আমরা তাদের উঠিয়ে নিয়ে যেতে দেইনি। উপরন্তু আমরা ঐ সব আহত ও নিহতদের মাধ্যমে জানতে পারি, গেরিলা অভিযানকারী এসব লোক কোন্ উপজাতির এবং কোন্ গ্রামের অধিবাসী ছিল।

    মেহমন্দ এবং ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট

    এই প্রসঙ্গে আরো একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য, যেখানে মেহমন্দ উপজাতি এবং ইণ্ডিয়ান আর্মীর মধ্যে সংঘর্ষ বেধেছিল।

    ১৯৩৫ ঈসায়ীতে মেহমন্দ উপজাতি বৃটিশ ভারত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং যুদ্ধ শুরুও হয়ে যায়। এই বিশৃঙ্খলার কয়েক মাস আগেই কেবল আমার (গ্রন্থকারের) কোম্পানী বার্ষিক প্রশিক্ষণ মহড়ার উদ্দেশ্যে উক্ত এলাকায় চার সপ্তাহ কাটিয়ে এসেছিল। তখন উপজাতীয় মালিক (সর্দার) আমাদের দাওয়াত করতে ক্যাম্পে এসেছিল এবং আমরা তার মেহমানদারীর স্বাদও উপভোগ করেছিলাম। সে সময় আমাদের কল্পনায় কিংবা চিন্তা-চেতনায়ও আসেনি যে, অল্প দিন পরেই আমরা পুনরায় এই এলাকায় যুদ্ধ করতে আসব। কোথায় এ অবস্থা যে, পল্টনের এক কোম্পানী শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে উক্ত এলাকায় ভয়-ভাবনাহীনভাবে ঘুরল-ফিরল আর কোথায় এ অবস্থা যে, একটি পরিপূর্ণ বিগ্রেড, যার সাহায্যে কামানবাহী গোলন্দাজ ইউনিট এবং উড়োজাহাজ প্রভৃতিও প্রস্তুত ছিল, গীলানাঈ গিরিপথের পারে কয়েকটি সংঘর্ষের পর তবে যেতে পেরেছিল। গীলানাঈ পার হবার পরও আমাদের অগ্রাভিযান অব্যাহত থাকে। একদা রাত্রি অতিক্রান্ত হবার পর ভোরবেলা দেখতে পেলাম, আমাদের ক্যাম্পের চারিদিককার টেলিফোনের তার কেটে দেওয়া হয়েছে এবং স্থানে স্থানে ইশতিহার লটকে দেওয়া হয়েছে। এসব ইশতিহার আমাদের টহলদানকারী প্লাটুন ভোরবেলা গুছিয়ে নিয়ে আসল। এসব ইশতিহার ছিল আমার নামে এবং এতে আমাকে বলা হয়েছিল উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই না করতে। অন্যথায় তারা আমাকে মৃত্যুমুখে পাঠিয়ে দেবে। এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ঐসব লোকের জানা ছিল যে, কোন্ কোন্ ফৌজ এই ব্রিগেডে শামিল আছে এবং তারা কোথায় কোথায় অবস্থান করছে।

    কতকগুলো কারণে ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার সাহেব কয়েকদিনের জন্য অগ্রাভিযান মুলতবী রাখেন। প্রতি রাত্রেই বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে উপজাতীয় বাহিনী আমাদের ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত নির্ভীকভাবে হামলা করত এবং এটা প্রকাশ করতে চাইত যে, রাত্রের রাজত্ব উপজাতীয়দের হাতে। উল্লিখিত মেহমন্দ উপজাতির সুবেদার হিকমত খান আমার সিনিয়র সুবেদার ছিলেন। তিনি এসব হামলা প্রতিরোধের জন্য আমাকে যে পরামর্শ দেন তা ছিল খুবই সাদাসিধে, কিন্তু খুবই নির্ভীক এবং সাহসিকতাপূর্ণ। তাকে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে পেশ করি। তার পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আমার চাকুরী হুমকির সম্মুখীন হবে এবং দুর্নাম হবে আমার অতিরিক্ত পাওনা। কিন্তু যেহেতু হিকমত খানের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল এবং তার যোগ্যতার ব্যাপারেও আমার পরিপূর্ণ আস্থা ছিল সেজন্য আমি যে কোন অবস্থার সম্মুখীন হতে রাযী হই।

    সুবেদার হিকমত খানের পরিকল্পনা ছিল সাদাসিধে। তিনি তিন রাত্রি তার নির্বাচিত জওয়ানদের নিয়ে টহল দিয়ে উপজাতীয় লোকেরা যে যে পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে এসেছে, সেগুলো দিনের বেলা সনাক্ত করে নেন এবং তার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা স্থির করে আমার পরামর্শ চান। আমি তার পরিকল্পনায় খুব কমই সংশোধন করি এবং অনুমোদনের জন্য ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সামনে পেশ করি।

    সন্ধ্যা হতেই এই ক্ষুদ্র প্লাটুন বেরিয়ে পড়ে। অর্ধেক রাত্রির পর উপজাতীয়রা শিবিরের উপর গুলী চালাতে আসে। ভোর চারটা পর্যন্ত কয়েক জায়গায় তারা গুলী চালায়। অতঃপর তারা ফিরে যায়। তাদের নিয়ম ছিল যে, তারা সবাই রাত্রিকালে হামলা চালিয়ে অবশেষে এক জায়গায় একত্র হ’ত এবং পরের দিনের কর্মসূচী স্থির করত। তারা প্রথমে নিশ্চিত হয়ে যেত যে, তাদের কোন সাথী আহত হয়নি কিংবা পথ হারিয়ে ফেলেনি। এর পর তারা দু’টি ভিন্ন পথে ফিরে যেত। পূর্ব রাত্রে চাঁদ উঠেছিল। উপজাতীয়রা যখন ঐসব আত্মগোপনরত বাহিনীর নিকট দিয়ে যাচ্ছিল তখন তারা তাদের উপর হালকা মেশিনগানের সাহায্যে হামলা চালায়। এতে তারা পিছু হটে যায় যাতে করে অন্য পথ ধরে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তারা পিছু হটতেই লুকায়িত অপর প্লাটুন তাদের উপর বোমা ও সঙ্গীনের সাহায্যে হামলা করে। কিছু হাতাহাতি লড়াইও হয়। উপজাতীয়দের অনেকেই মারা যায়। আহত ও নিহতদের থেকে জানা যায় যে, এসব লোকের অধিকাংশই ছিল আফগানিস্তান এলাকার, যারা আমাদের ফেতনাবাজ লোকদেরকে তাদের সঙ্গে টেনে নিয়েছিল। বাকী লোকেরা জীবনের মায়ায় বিপদের ভয়ে তাদের সহযোগী সেজেছিল। উপজাতীয়দের উপর এই শাস্তির গভীর প্রভাব পড়ে।

    উল্লিখিত দৃষ্টান্ত থেকে এটা পরিষ্কার যে, গেরিলাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি ভীষণ জরুরী:

    ১. অধিনায়কের ভেতর অটুট সংকল্প থাকতে হবে এবং তিনি শাস্তি কিংবা পুরুস্কারের জন্য তৈরী থাকবেন।

    ২. প্রতিটি জওয়ানের মধ্যে ধৈর্য ও স্থৈর্যের সঙ্গে অনিবার্যভাবেই সাহসিকতাও থাকতে হবে।

    ৩. গেরিলাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বাহিনীকে সাধারণত হাতাহাতি যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

    ৪. গেরিলারা শত্রুর বিরুদ্ধে উন্নতমানের গোয়েন্দাগিরি করে। অতএব তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত যে-কোন কার্যক্রম গোপন রাখতে হবে এবং কার্যক্রম গ্রহণকারী বাহিনীর জন্য স্বল্প থেকে স্বল্পতর সময়ের পূর্বে নির্দেশ জারী করতে হবে। তারপরও দেখতে হবে যে, গেরিলারা কোনভাবে তা জানতে পেরেছে কি না।

    ৫. ত্বরিত গতি ও কঠোরপ্রাণা হওয়া যে সব সিপাহী ও অফিসারের জন্য অপরিহার্য তাদেরকেই গেরিলাদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঠাতে হবে।

    ৬. উল্লিখিত বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের কেবল নিজের উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকলেই চলবে না, স্বীয় সঙ্গী-সাথীদের উপরও তার পুরো আস্থা থাকতে হবে।

    সামরিক গতিবিধির যোগ্যতা

    শত্রুর বিরুদ্ধে যখন ফৌজ পাঠানো হয় তখন সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগ এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায় যে, ফৌজকে যে কাজের জন্য পাঠানো হচ্ছে সে কাজের যোগ্যতা তাদের আছে কিনা।

    এই যোগ্যতার পরিমাপ ফৌজের পরিমাণ, সমরাস্ত্র, পরিবহন, রসদ-সম্ভার, ফৌজের প্রতিটি অংশের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহায়তা এবং সমরাস্ত্র ও রসদের দৈনন্দিন ঘাটতি পূরণ ব্যবস্থা থেকে করা হয়। উদাহরণত, যদি ফৌজের কোন একটি অংশও কমযোর হয় তাহলে গোটা ব্যবস্থাই ভেস্তে যাবে। যে অধিনায়ক এ প্রয়োজন-গুলোকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখেন না—তার ব্যর্থতা অনিবার্য।

    ১৯৩৯-৪৫ ঈসায়ী সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার যখন রাশিয়ার উপর হামলা করেন তখন তিনি রাশিয়ার আবহাওয়া ও মৌসুম এবং তার রাস্তাঘাট সম্পর্কে সঠিক পরিমাপ করেন নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সেখানে ভীষণ ঠাণ্ডা ও তুষারপাতের কারণে ট্যাংক ও বিমান যে ব্যবহার করা যায় না এবং সড়কগুলো বৃষ্টি কিংবা বরফ গলবার পর যে অত্যন্ত খারাপ এবং পিচ্ছিল হয়ে ওঠে সে সম্পর্কে তিনি অবহিত হন নি। তাঁর অদূরদর্শিতার কারণে জার্মানীর বিজয়ী ফৌজকে ভীষণ প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

    রাশিয়ান ফৌজও ফিনল্যাণ্ডে ঐ একই ভুলের কারণে চরমভাবে নাকানী-চুবানী খায়। কিন্তু আমরা যখন মুহাম্মদ বিন কাসিমের অভিযান সম্পর্কে চিন্তা করি তখন দেখতে পাই যে, তিনি পূর্বাহ্নেই তাঁর অভিযানের প্রতিটি দিক সম্পর্কে অত্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করেছেন। উদাহরণত, লম্বা দূরত্ব, দূরতিক্রম্য রাস্তা, বিভিন্ন ধরনের এলাকা, কোথাও খাদ্যের প্রাচুর্য, কোথাও আহার্য ও পানীয় দ্রব্যের অপ্রতুলতা, কোথাও সুপেয় পানির প্রাচুর্য ইত্যাদি দিক সম্পর্কে তিনি পূর্বাহ্নেই ভেবে নিয়ে কর্মসূচী নির্ধারণ করেছেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের অভিযানের সাফল্য তাঁর অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহী বাহিনীর উপর ছিল নির্ভরশীল অর্থাৎ এ জন্য দরকার ছিল তাঁর ভাল জাতের ঘোড়া ও উটের। তিনি যথাসময়ে তা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। তাঁর ফৌজের সংখ্যা ছিল কম। তিনি এই ঘাটতি পূরণের জন্য তাঁর বাহিনীতে সিন্ধী যুবকদের ভর্তি করেন। তিনি তাঁর ফৌজের ভারসাম্য বজায় রেখে তাদের চলাচল ও গতিবিধির যোগ্যতা বহাল রাখেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম স্থল ও নৌ—উভয় ধরনের পরিবহনই যথাযথভাবে ব্যবহার করেন। তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে রাজা দাহিরের ফৌজের পশ্চাদ্দেশে অথবা দেশের যেখানেই ইচ্ছা সেখানেই সাফল্যের সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

    অতএব যিনিই সিপাহ্‌সালার হোন—তার জন্য অবশ্য কর্তব্য হ’ল, যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার পূর্বে স্বীয় ফৌজের প্রতিটি দিক সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম কেবলমাত্র অশ্বারোহী বাহিনী কেন সঙ্গে নিলেন

    এখানে প্রশ্ন জাগে, মুহাম্মদ বিন কাসিম কেবল অশ্বারোহী ফৌজকে কেন সঙ্গে নিলেন? এর কারণ হ’ল এই যে, তাঁকে কয়েক হাযার মাইল পথ সফর করতে হবে বিধায় তাঁর ফৌজের অশ্বারোহী বাহিনীকেই কেবল তিনি সঙ্গে নেন—যে বাহিনী আধুনিক কালের ট্যাংক বাহিনীর মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিল, আর উষ্ট্রারোহী বাহিনী ছিল মোটর আরোহী বাহিনীর মর্যাদায়।

    মুহাম্মদ বিন কাসিমের মুকাবিলা ছিল রাজা দাহিরের হস্তী বাহিনী, হিন্দী ঘোড়সওয়ার এবং পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে। কিন্তু হিন্দী ফৌজ সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ছিল না। কেননা তাদের প্রশিক্ষণ বিশেষ কোন মূলনীতির আওতায় হ’ত না। এ যেন ছিল এক বিশাল জনসমাবেশ, যারা রাজার প্রতি তাদের স্বাভাবিক আনুগত্যের কারণে জীবন নিয়ে খেলতে তথা যুদ্ধ করতে এসেছিল। নিজের বীরত্বে তারা খুব আস্থাবান ছিল। এটা ছিল সে ধরনেরই গ্রুপ, যাদের সম্পর্কে নেপোলিয়ন বলেছেন:

    “দু’জন মামলুক তিনজন ফরাসী অশ্বারোহী সৈনিককে অনায়াসে পরাস্ত করতে পারে। এই হিসাবে ১০০ জন মামলুক (অর্থাৎ আলজিরীয় অশ্বারোহী সৈনিক)-এর সাথে যদি ১০০ জন ফরাসী অশ্বারোহী সৈনিকের মুকাবিলা হয় তাহলে আমার মতে তারা সমকক্ষ হবে। কিন্তু মামলুকদের সংখ্যা যদি তিনশত করে দেওয়া হয় এবং তাদেরকে তিনশত ফরাসী অশ্বারোহী সৈনিকের মুকাবিলায় এনে দাঁড় করানো হয়, তাহলে ফরাসী অশ্বারোহী কোম্পানী নিশ্চিতরূপেই জয়ী হবে। এ সংখ্যা যদি আরো বাড়িয়ে দেওয়া যায় এবং একদিকে এক হাযার ফরাসী অশ্বারোহী সৈনিক এবং অন্যদিকে পনের’শ মুসলিম অশ্বারোহী সৈনিক হয় তাহলে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, প্রত্যেকবারই মামলুক-মুসলমানদের পরাজয় হবে।

    “আমার এরূপ ভাষ্যের কারণ হ’ল, মামলুকরা বীর-বাহাদুর এবং সর্বোত্তম লড়াকু সৈনিক বটে। ব্যক্তিগত শৌর্য-বীর্যের দিক দিয়েও তারা একজন ফরাসী সৈনিকের তুলনায় আমার মতে শ্রেষ্ঠতর। কিন্তু যেহেতু তাদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই, বিন্যাস নেই, তাই তারা একত্রে সংবদ্ধ ভাবে লড়াই করতে জানে না। এ জন্যই তাদের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে—তাদের লড়াই করবার দক্ষতাও সামগ্রিকভাবে ততই হ্রাস পেতে থাকে।

    “তবে হ্যাঁ, যদি মামলুকদেরকে সুশৃঙ্খল ও সুসংহত করা যায় তাহলে তারা—যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে অশ্বারোহণে পটু, কঠোর প্রাণা এবং সৈনিক বৃত্তিতে আগ্রহী—বিশেষ করে যখন তাদের ঘোড়াগুলোও সর্বোত্তম মানের হয়ে থাকে—খুবই বিপজ্জনক ও শক্তিশালী ফৌজে পরিণত হতে পারে।”

    আমাদের ধারণায় আরব ও হিন্দী উভয় জাতিরই অশ্বারোহী সৈনিক ব্যক্তিগতভাবে শৌর্য-বীর্যে সমমানের ছিল। কিন্তু আরব সৈনিকরা ছিল সুশৃঙ্খল, সুসংহত ও সুবিন্যস্ত। অপরপক্ষে হিন্দী সৈনিকরা ছিল এসব গুণাবলী থেকে বঞ্চিত।

    এই ঠাকুর এবং জাটরাই যখন মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতাকাতলে সুসংবদ্ধ হয়ে লড়াই করে তখন তারাও একটি বিজয়ী দলে পরিণত হয়। বৃটিশ অফিসারগণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এই একই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটান। মোগল ও মারাঠা ফৌজ নিৰ্ভীক ও সাহসী বীরযোদ্ধা ছিল বটে, কিন্তু সুসংহত ও সুসংবদ্ধ ছিল না এবং তাদের সামরিক যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজেও লাগানো হয়নি। অপরদিকে ইংরেজ অফিসারগণ ভারতীয় যুবকদের ছোট ছোট প্লাটুনে সুসংহত ও সুসংগঠিত করে সেই প্লাটুনগুলোকে বড় কোম্পানীর সাথে জুড়ে দেন। এভাবে তারা ভারতীয় যুবকদের দিয়ে একটি উন্নত ধরনের সেনাবাহিনী গঠন করেন। এই ভারতীয় সেনাবাহিনী দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম লড়াকু ফৌজ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাল অধিনায়ক পেলে ভারতীয় সৈনিক বিশ্বের যে কোন সৈনিকের চেয়ে যে কম যায় না—তা তারা হাতে কলমে প্রমাণ করে দেখিয়েছে।

    সামরিক বাহিনীতে অহংবোধ এবং জাতীয় প্রেরণা থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে ‘লীড্‌ল হার্ট’ বর্ণিত একটি ঘটনা প্রণিধানযোগ্য।

    “১৯১৫ ঈসায়ীতে জার্মানীর ক্রমবর্ধমান শক্তিদৃষ্টে ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ড, জার্মান কর্তৃক আক্রান্ত হলে, একে অপরকে পারস্পরিক সামরিক সাহায্য প্রদানের প্রশ্নে চিন্তা-ভাবনা করছিল। এক আলোচনা বৈঠকে বৃটিশ প্রতিনিধি স্যার হেনরী উইলসন ফরাসী প্রতিনিধি জেনারেল ফো (Foch)-কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমাদের সরকার জানতে চান, যুদ্ধ দেখা দিলে ফ্রান্স আমাদের কাছে কি পরিমাণ সাহায্যকারী ফৌজ চাইতে পারে? আমাদের সরকার এটা জানতে চান এইজন্য যে, বৃটিশ সরকারের কাঁধে আরও বহুবিধ দায়িত্ব ও কর্তব্যের বোঝা রয়ে গেছে।’ এর জওয়াবে জেনারেল ফো বলেন, ‘সাহায্য হিসেবে আমরা তখন কেবলমাত্র একজন বৃটিশ সৈনিকই চাইব।’ জেনারেল ফো-র জবাব বিদ্রুপাত্মক ছিল না, বরং তিনি বেশ ভালভাবেই জানতেন যে, ঐ একটি বৃটিশ নাগরিকের জীবন রক্ষার্থে ইংলণ্ড তার সমস্ত শক্তি ফ্রান্সের সাহায্যার্থে নিয়োজিত করবে।”

    এ বর্ণনার সপক্ষে দলীল-প্রমাণ পেশ করবার দরকার নেই। কেননা আমরা সবাই জানি যে, ১৯১৪-১৮ ঈসায়ীর বিশ্বযুদ্ধ একটি মাত্র লোকের হত্যার রক্তপণ আদায়ের দাবীকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল।

    আমাদের উপলব্ধিতে একথা আসে না যে, কোন কোন ঐতিহাসিক কি করে হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে জালিম এবং নিষ্ঠুর আখ্যা দিলেন, যখন তিনি তাঁর নাগরিকের রক্তপণ আদায় তথা আপন কওম ও মিল্লাতের অহঙ্‌বোধ বাঁচিয়ে রাখবার জন্যই রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুর উপর হামলা করেছিলেন এজন্য যে, রাজা দাহির মুসলিম মহিলাদের অসম্মান ও মুসলিম বণিকদের হত্যা করিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি মুসলিম দূতকে কেবল অপমানই করেন নি, বরং তাকে হত্যাও করেছিলেন। অতএব সিন্ধুর উপর মুহাম্মদ বিন কাসিম কেবল বাহানাবাজীর আশ্রয় নিয়ে হামলা করেন নি, বরং মুসলিম জাতির মান ও সম্ভ্রম রক্ষার জন্যই তা করেছিলেন। যদি এই বাস্তব সত্য স্বীকার করে নিতে কারুর আপত্তি থাকে তাহলে তিনি নিম্নোক্ত ঘটনাবলী সম্পর্কে কি রায় দেবেন?

    ১. আবিসিনিয়ার (ইথিওপিয়া) বাদশাহ থিওডোর একজন ইংরেজ নাগরিককে কোন অপরাধের কারণে বন্দী করলে বৃটিশ গভর্নমেন্ট উক্ত নাগরিককে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি দানের আবেদন জানায়। থিওডোর তাকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করলে বৃটিশ ১৮৬৮ ঈসায়ীতে আবিসিনিয়াকে আক্রমণ করে বসে।

    ২. ১৮৬০ সালে চীনের সঙ্গে বৃটেনের যুদ্ধ ঐ একই কারণে সংঘটিত হয়।

    ৩. ১৮৬৩ সালে ফরাসীরা এ ধরনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েই হাওয়াসের উপর চড়াও হয়েছিল।

    এসব দৃষ্টান্তের সাথে সেসব সরকার জড়িত যাদেরকে আজকাল শান্তির রক্ষক (?) বলে অভিহিত করা হয়। অথচ আমরা যখন ঐ একই পাল্লায় মুহাম্মদ বিন কাসিমের হামলাকে মাপি, তখন ভিন্নমত পোষণ করা হয়। কী অদ্ভুত বৈপরিত্য!

    মন্ত্রীবর্গ এবং প্রতিরক্ষা স্টাটেজী

    ফিল্ড মার্শাল রবার্টসন বলেন: “আজকাল যুদ্ধের পূর্বে এবং যুদ্ধ চলাকালেও ফৌজের জেনারেল হেড কোয়ার্টার প্রকৃতপক্ষে কমাণ্ডার-ইন-চীফের দফতরে থাকে না, বরং তা মন্ত্রীদের দফতরে গিয়ে ওঠে। অর্থাৎ আজকাল মন্ত্রীদের দফতরেই অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত এবং প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জন্ম নেয় এবং সেখানেই অভিযানের প্রতিটি দিকের খুঁটিনাটি সম্পর্কে গভীর আলাপ-আলোচনা হয়ে থাকে এবং সেখানেই রাজনীতিবিদরা প্রতিটি সমস্যার চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা প্রদান করেন। আর সেনাপতির দায়িত্ব হচ্ছে কেবল সে সব ফয়সালা তথা পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করা।”

    অতীতকালে রাজা-বাদশারা এ কাজটি নিজেরাই সম্পাদন করতেন। মন্ত্রী এবং জেনারেল তাঁদের পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করতেন। আজ অন্যেরা তাদের স্থান দখল করে নিয়েছে।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এই মূলনীতির উপরই কাজ করেন এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমকে ফৌজ, সমরাস্ত্র, রসদ, পরিবহন, চিকিৎসা-সামগ্রী, অর্থকড়ি—সর্বোপরি প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে সিন্ধুর দিকে প্রেরণ করেন। তাঁকে বিদায় করে দেবার পরও তিনি বিবিধ ব্যবস্থা সম্পন্ন করার কাজে ব্যাপৃত থাকেন, যাতে করে মুহাম্মদ বিন কাসিম কোন জিনিসের ঘাটতি অনুভব না করেন। তিনি দিক-নির্দেশনা দেন বটে, তবে উপস্থিত কর্মপন্থা গ্রহণের বিষয়টি মুহাম্মদ বিন কাসিমের উপরই ছেড়ে দেন।

    যেভাবে সেই মহান শিক্ষক নিজেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদরূপে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, ঠিক তেমনি প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ ধরনের দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখা।

    জিহাদ প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয এবং কোন মুসলমানই এ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। আমরা স্যার উইস হেগ-এর Cambridge History-র তৃতীয় খণ্ড পড়েছি। আফসোসের বিষয় যে, তাতে এই সম্মানিত গ্রন্থকার ইসলামী জিহাদ-এর ব্যাখ্যায় ন্যায়-বিচার ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন নি।

    এই সম্মানিত লেখক স্যার উইলিয়াম ম্যুরের ধ্যান-ধারণার উল্লেখ করেছেন এবং উইলিয়াম ম্যুর জিহাদ-দর্শন, জিযয়া এবং বিজিত জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে মুসলমানদের আচার-ব্যবহারের যে পর্যালোচনা করেছেন তিনি তাঁর সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। এ ধ্যান-ধারণা যে কতখানি ভিত্তিহীন তা আমরা সেসব আহকাম থেকে প্রমাণ করব, যেসব আহকাম আঁ-হযরত (সা), হযরত আবূ বকর (রা) এবং অন্যান্য খলীফা অভিযানে পাঠাবার প্রাক্কালে তাঁদের অধিনায়কদেরকে প্রদান করেছিলেন।

    কুরআন মজীদ নিউ টেস্টামেন্টের মত কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়। এই পবিত্র গ্রন্থ সংস্কার কিংবা সংশোধনের কোন প্রয়োজন নেই এবং অদ্যাবধি এমন অপচেষ্টা কেউ করেও নি। এজন্য এই প্রশ্নও ওঠে না যে, মুসলিম ‘আলিম-উলামা কুরআন মজীদের আহকামে কোন রকমের হেরফের করে থাকবেন।

  • ইসলামের যুদ্ধ-বিধান

    ইসলামের যুদ্ধ-বিধান

    ইসলামের যুদ্ধ-বিধান

    আঁ-হযরত (সা)-এর পথ-নির্দেশ

    আঁ-হযরত (সা) যুদ্ধভিযানে প্রেরণের পূর্বে অধিনায়ক ও অধীনস্থ ফৌজকে তাকওয়া ও আল্লাহ ভীতির উপদেশ দান করতেন। তাদেরকে বলতেন:

    ১. আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে অগ্রসর হও এবং যারা কাফির—আল্লাহ্‌র সঙ্গে কুফরী করে, আল্লাহ্‌র রাস্তায় তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর।

    ২. যুদ্ধে কারুর সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে না।

    ৩. যুদ্ধলব্ধ সম্পদের খেয়ানত করবে না।

    ৪. লাশ বিকৃত করবে না অর্থাৎ যুদ্ধে আহত কিংবা নিহতদের নাক, কান ইত্যাদি কাটবে না।

    ৫. কোন বৃদ্ধ, শিশু, নারী কিংবা অক্ষম পুরুষকে হত্যা করবে না।

    ৬. যুদ্ধের আগে শত্রুর সামনে এই তিনটি শর্ত পেশ করবে:

    ক. ‘ইসলাম কবুল কর।’ যদি তারা ইসলাম কবুল করে তবে তাদের উপর হাত উঠাবে না।

    খ. যদি তারা জিয্‌য়া প্রদানের মাধ্যমে আনুগত্য স্বীকার করে তাহলে তাদের জীবন ও সম্পদের বেলায় কোন রকমের বাড়াবাড়ি কিংবা সীমা লঙ্ঘন করবে না।

    গ. যদি তারা উল্লিখিত শর্তাদি মেনে নিতে অস্বীকার করে তাহলে আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধ কর।

    ৭. কথা বলার ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি অনুসরণ কর।

    ৮. যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর।

    ৯. শত্রু যদি অস্ত্র সমর্পণ করে এবং মুখ কিংবা অঙ্গভঙ্গী সহকারে নিরাপত্তা-প্রার্থী হয়, তাহলে তাদের উপর হাত উঠাবার আর কোন অধিকার তোমাদের থাকবে না।

    ১০. বিজয়ের নেশায় কিংবা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সীমা অতিক্রম করবে না।

    খুলাফা-ই-রাশিদীন উল্লিখিত নির্দেশাবলী অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলেছেন এবং অন্যদেরকেও তা মেনে চলতে বাধ্য করেছেন।

    নাজরানবাসীদের সঙ্গে কৃত চুক্তিপত্র

    এখন আমরা সেই সন্ধিপত্র আপনাদের কাছে পেশ করছি যা নাজরানবাসীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আঁ-হযরত (সা) মঞ্জুর করেছিলেন।

    “নাজরানের খৃস্টান অধিবাসী এবং তাদের প্রতিবেশীরা (যারা খৃস্টানদের সঙ্গে উক্ত এলাকায় বসবাস করত) আল্লাহ্‌র আশ্রয় নিল এবং আল্লাহ্‌র রসূল মুহাম্মদ (সা) তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তাদের জীবন, বিত্ত-সম্পদ, জায়গা-জমি-স্থাবর হোক কিংবা অস্থাবর, উট ও অন্যান্য প্রাণীকুল, তাদের দূত, ধর্মীয় চিহ্নাদি যেখানে যে অবস্থায় আছে ঠিক সে অবস্থায়ই রক্ষা করা হবে। তাদের কোন অধিকার ক্ষুণ্ন করা হবে না কিংবা কোন ধর্মীয় চিহ্নের পরিবর্তন সাধন করা যাবে না। তাদের কোন ধর্মযাজককে তাদের পদ থেকে অপসারণ করা হবে না, গির্জার কোন সেবায়েতকেও তার কাজ থেকে সরানো যাবে না। তার আওতায় যা কিছু আছে, তা বেশীই হোক কিংবা কমই হোক, ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না। জাহিলিয়া যুগের কোন হত্যা কিংবা প্রতিজ্ঞার ব্যাপারে তাদের কোন যিম্মাদারী নেই। সামরিক বিভাগে যোগদান করতে তাদেরকে বাধ্য করা যাবে না। কোন শত্রু বাহিনীকে তাদের ভূমি নষ্ট কিংবা ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না (অর্থাৎ বহিঃশত্রুর হাত থেকেও তাদের রক্ষা করা হবে)। যদি এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে অধিকারের দাবী উত্থাপন করে তাহলে উভয়ের মাঝে ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে। নাজরানবাসী অত্যাচারী হবে না, অত্যাচারিতও হবে না। এক ব্যক্তির অপরাধের জন্য অন্য ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করা হবে না। এই সন্ধিপত্রে যা কিছু আছে তার জন্য আল্লাহ্‌র জামানত এবং রসূল (সা)-এর যিম্মাদারী রইল যতদিন পর্যন্ত আল্লাহর হুকুম আসে এবং তারা এর শুভাকাঙ্ক্ষী থাকে এবং চুক্তিপত্রে লিখিত শর্তসমূহ পালন করে।”

    হযরত আবূ বকর (রা)-এর নির্দেশসমূহ

    হযরত আবূ বকর (রা) জিহাদের জন্য যখন সেনাবাহিনী প্রেরণ করতেন, তখন সেনাবাহিনীর অধিনায়ককে নিম্নোক্ত নির্দেশাদি প্রদান করতেন:

    ১. নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করবে না।

    ২. লাশ বিকৃত করবে না।

    ৩. পাদ্রী বা ধর্মযাজককে উৎপীড়ন করবে না এবং তাদের মঠ ও উপাসনালয় ধ্বংস করবে না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

    ৪. ফলবান বৃক্ষ কাটবে না, শস্যক্ষেত জ্বালাবে না।

    ৫. জনবসতি ধ্বংস করবে না।

    ৬. পশুপাল ধ্বংস করবে না।

    ৭. প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।

    ৮. যারা আনুগত্য স্বীকার করবে—তাদের জানমালকে ঠিক সেরূপ সম্ভ্রমের চোখে দেখবে যেরূপ একজন মুসলমানের জান মালকে দেখা হয়।

    ৯. যুদ্ধলব্ধ সম্পদের খেয়ানত করবে না।

    ১০. যুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না।

    দেবলবাসীদের জন্য হাবীব বিন মাসলামার প্রতিজ্ঞাপত্ৰ

    এখন আমরা সেই সুলেহনামা (সন্ধিপত্র) লিপিবদ্ধ করছি যা দেবলবাসীদের জন্য হাবীব বিন মাসলামা লিখেছিলেন।

    “হাবীব বিন মাসলামা এবং দেবলবাসীদের মধ্যে—চাই তারা খৃস্টান হোক, অগ্নি উপাসক হোক অথবা য়াহুদী, উপস্থিত হোক কিংবা অনুপস্থিত—এ প্রতিজ্ঞাপত্র সাধারণভাবে প্রযোজ্য। আমি তোমাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করছি। তোমাদের জীবন, সম্পদ, আত্মীয়-পরিজন, উপাসনালয় এবং তোমাদের শহর প্রাচীরের জন্য এ নিরাপত্তা দেওয়া হ’ল। তোমরা ততদিন পর্যন্ত নিরাপদ, যতদিন পর্যন্ত এ প্রতিজ্ঞায় অটল থাকবে এবং জিয্‌য়া ও রাজস্ব আদায় করতে থাকবে।”

    এতদসত্ত্বেও কয়েকজন ঐতিহাসিক এবং কর্নেল হেগও মুহাম্মদ বিন কাসিম সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি হিন্দী ফৌজের অস্ত্র সমর্পণের পরও হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালান, হিন্দুদের মন্দির ভূপাতিত করেন, মহিলাদেরকে অসম্মান করেন ইত্যাদি। অথচ এটা প্রকৃত সত্যের অপলাপ ছাড়া কিছু নয়। মজার ব্যাপার এই যে, এই কর্নেল হেগই তাঁর পুস্তকের অন্যত্র বলেছেন, “মুহাম্মদ বিন কাসিম ইসলামী রেওয়াজ ও বিধান উপেক্ষা করে হিন্দুদের প্রতি ধর্মীয় সহমর্মিতা ও উদার সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেন এবং তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করেন।”

    উক্ত পুস্তকে কর্নেল হেগ এ মর্মে খলীফা হারুন-অর-রশীদকেও বিদ্রূপ করেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্র আল-মামুনকে খুরাসান, তাবিলিস্তান, কাবুলিস্তান, সিন্ধু এবং হিন্দুস্তান এলাকা দান হিসাবে প্রদান করেন। অথচ (তাঁর ধারণা মুতাবিক) হিন্দুস্তান হারুন-অর-রশীদের সাম্রাজ্যের অন্তর্গত কখনোই হয়নি। মুহাম্মদ বিন কাসিম তা জয়ই করেননি। খলীফা তদীয় পুত্রকে এমন কিছু দান করেন, যা তাঁর ছিল না। কিন্তু কর্নেল হেগ ভুলে গেছেন যে, রাজা দাহির সিন্ধু নদের পূর্ব প্রান্তের এলাকাকে হিন্দ্ নামে ডাকতেন। অতএব আরব ঐতিহাসিকগণও একে হিন্দুস্তান নামেই অভিহিত করেছেন।

    হযরত আলী (রা)-এর দিক-নির্দেশনা

    হযরত ‘আলী (রা)-এর একটি চিঠি থেকে খুলাফায়ে রাশিদীনের আমলে প্রচলিত ইসলামী হুকুমতের শাসন-শৃঙ্খলা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। হযরত ‘আলী (রা) আল্লাহ্‌র রসূলের খলীফা হিসাবে কতটা স্থির-মস্তিষ্ক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিরূপ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন তা এই চিঠি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।

    হযরত ‘আলী (রা)-এর চিঠি উদ্ধৃত করবার পূর্বে আমরা স্পষ্ট করে দিতে চাই যে, এর দ্বারা আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি?

    ১. আমরা আমাদের অতীত ভুলে গেছি। আমাদের মহান মুসলিম খলীফাগণ তাঁদের আমীর-উমারা এবং জনসাধারণের কাছ থেকে কি আশা পোষণ করতেন এবং কেন করতেন তা আমাদের অবশ্যই জানা উচিত।

    ২. খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগের পর হুকুমতের রঙ এবং রাষ্ট্রীয় ও সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। খলীফা একজন স্বেচ্ছাচারী সম্রাটে পরিণত হন। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই জোয়ার-ভাটা কেন?

    ৩. এটা কি সম্ভব নয় যে, উল্লিখিত অবস্থা ও কারণগুলো সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে আমরা আমাদের ঐ সব দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণ করব, যেগুলোর ব্যাপারে আমরা বিতৃষ্ণ এবং যা চীৎকার করে করে বলছে, ‘এমনটি যদি না কর তাহলে বহু বিপদ, যা তোমাদেরকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে—পরবর্তীকালে প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

    ৪. আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোন জাতি যখন অবনতি ও অধঃপতনের দিকে যেতে থাকে তখন তাদের গতি হয় দ্রুততর এবং তারা লাঞ্ছনার গভীরে পৌঁছেও সজাগ হয় না; বরং মন্দের পাঁকে অসহায়ভাবে নিমজ্জিত হতে থাকে। ধ্বংসের এ ধারা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যতক্ষণ না সেই জাতির মধ্যে এমন কিছু নেতা বা পথপ্রদর্শক জন্ম নেন, যারা তাদেরকে পুনরায় অহংবোধ ও ব্যক্তিসত্তার দিকে টেনে নিয়ে যান।

    খলীফা ‘আবদুল মালিক ও তাঁর পুত্র ওয়ালীদের যুগে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, মুহাম্মদ বিন কাসিম, কুতায়বা বিন মুসলিম, মুসা বিন নুসায়র এবং খোদ খলীফা ‘আবদুল মালিক এবং ওয়ালীদ ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব, যাঁরা মুসলমানদের মধ্যে পুনরায় প্রাণ স্পন্দন সৃষ্টি করেন এবং জিহাদের গুরুত্বকে আবার নতুন করে সর্ব সমক্ষে তুলে ধরেন।

    ৫. এই চিঠির প্রতিটি শব্দ মূলত অত্যন্ত অর্থপূর্ণ এবং আমাদের জন্য আলোক-বর্তিকাস্বরূপ। কতই না ভাল হ’ত যদি হযরত ‘আলী (রা)-এর এই চিঠির মর্মানুযায়ী বনু উমায়্যা তাদের শাসনকালকে ঢেলে সাজাত।

    যা-হোক, হযরত ‘আলী (রা)-এর সেই চিঠি—যা তিনি আল্লাহ্‌র রসূলের খলীফা হিসাবে মিসরের তৎকালীন গভর্নর মালিক আশতারকে লিখেছিলেন, আমরা এখানে উদ্ধৃত করছি।

    “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম,

    আস্‌সালামু ‘আলায়কুম,

    “জেনে রাখ হে মালিক! আমি তোমাকে এমন একটি দেশের শাসক করে পাঠাচ্ছি, যারা অতীতে ন্যায়নীতি ও জুলুম-দুর্নীতি— উভয় স্তরই অতিক্রম করে এসেছে। লোকে তোমার কার্যকলাপকে সেভাবে পরীক্ষা করবে, যেভাবে তুমি নিজে তোমার পূর্বেকার লোকদের কার্যকলাপ পরীক্ষা করে থাক এবং সেভাবে তারা তোমার সম্পর্কে একটা রায় কায়েম করবে, যেভাবে তুমি তাদের সম্পর্কে কায়েম করে থাক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, জনসাধারণ কেবল সেসব শাসক ও কর্মচারীকে ভাল জানে যারা সৎকাজ করে। আর জনসাধারণ কর্তৃক প্রদত্ত রায় হ’ল—তোমার কার্যকলাপ ভাল কি মন্দ তারই মাপকাঠি। সেজন্য সবচেয়ে মূল্যবান যে সম্পদ তুমি আশা করতে পার, তা হ’ল সৎকর্ম। স্বীয় প্রবৃত্তিকে সংযত রাখ, নিষিদ্ধ বস্তুর হাত থেকে বেঁচে থাক। কেননা কেবল পরহেজগারী অবলম্বন করেই ভাল ও মন্দের মধ্যে তুমি পার্থক্য নিরূপণ করতে পার।

    জনসাধারণের প্রতি ভালবাসা

    “তুমি তোমার অন্তরে জনসাধারণের প্রতি ভালবাসার প্রেরণা লালন কর এবং একে লোকদের প্রতি দয়া ও সহৃদয়তার মাধ্যম বানাও। তাদের সঙ্গে পশুর মত আচরণ কর না এবং তাদের ধন-সম্পদের উপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত ক’র না। মনে রেখ, জনসাধারণের মধ্যে দু’ধরনের লোক রয়েছে : হয় তারা তোমার ঈমানী ও দীনী ভাই অথবা (আল্লাহ্‌র বান্দা হিসাবে) তোমারই মত মানুষ (যদিও তারা ভিন্নধর্মী) আর মানুষ হিসাবে নিশ্চয়ই তারাও তোমার ভাই। তাদের ভেতর দুর্বলতা যেমন থাকবে—তেমনি থাকবে ভুলত্রুটি ঘটবারও আশঙ্কা। কতক মানুষ অপরাধী হবে। তুমি তাদেরকে ক্ষমা করবে যেমন তুমি চাও আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করুন। মনে রেখ, শাসক হিসাবে তুমি যেমন তাদের উপর রয়েছ—তেমনি তোমার উপর এবং আমাদের সকলের উপর রয়েছেন আল্লাহ্—যিনি তোমাকে এজন্য গভর্নর পদে নিযুক্তি দিয়েছেন যাতে তুমি তোমার অধীনস্থ লোকদের দেখাশুনা করতে পার এবং পূরণ করতে পার তাদের প্রয়োজন। তাদের জন্য তুমি যা করবে তারই ভিত্তিতে তোমার (সবকিছুকে) বিচার করা হবে।

    আল্লাহ্-ভীতি

    “আল্লাহ্‌র মুকাবিলায় নিজকে দাঁড় করিও না। কেননা আল্লাহ্‌র ক্রোধাগ্নি থেকে নিজেকে বাঁচাতে তুমি সমর্থ নও, আর তুমি তাঁর রহম, করম ও ক্ষমার গণ্ডী থেকে বাইরে বেরিয়ে যাবার ক্ষমতাও রাখ না। কাউকে ক্ষমা করার জন্য আফসোস ক’র না। আর কাউকে যদি শাস্তি দিতেই হয় তজ্জন্য উল্লসিত কিংবা পুলকিত বোধ ক’র না। নিজের ক্রোধকে উদ্দীপ্ত হবার সুযোগ দিও না; কেননা এর দ্বারা উপকার লাভের কোনই সম্ভাবনা নেই।

    “আমি তোমাদের মালিক ও শাসক এবং এজন্য তোমাদেরকে আমার নির্দেশের সামনে মাথা নত করতে হবে—এমন কথা কখনো বল না। এটা তোমার আত্মাকে কলুষিত ও তোমার ঈমানকে দুর্বল করে দেবে এবং সারাদেশে অশান্তি ও অরাজকতার সৃষ্টি করবে। ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্ব তোমার ভিতর গর্বের সৃষ্টি করতে পারে। তাই নিজের ভেতর যখনই গর্ব ও অহংকারের এতটুকু আলামত দেখতে পাবে তখনি গোটা সৃষ্টিজগতের বুকে আল্লাহ্‌র অপার শান ও কুদরতের দিকে দৃষ্টিপাত করবে। দেখবে এই সৃষ্টিজগতে তোমার এতটুকু কর্তৃত্বও নেই। এই আচরণ তোমার ভ্রষ্ট মেধাকে ভারসাম্য দান করবে এবং তোমাকে শান্তি ও তৃপ্তি দেবে। মনে রেখ, আর সাবধান থেকো। কখনই নিজেকে আল্লাহ্‌র মহান শান ও মর্যাদার সামনে দাঁড় করাবে না এবং তাঁর ন্যায় সার্বভৌমত্বের অনুকরণও করতে যাবে না। কেননা যারাই আল্লাহ্‌র সঙ্গে বিদ্রোহাত্মক আচরণ করেছে এবং যারাই মানুষের উপর জুলুম ও নিপীড়ন চালিয়েছে আল্লাহ্, তাদেরই ধ্বংস করে ছেড়েছেন।

    হক্‌কুল ইবাদ (বান্দার অধিকার)

    “স্বীর্য কার্যকলাপ দ্বারা হক্‌কুল্লাহ্‌র এবং হক্‌কুল-’ইবাদের প্রতি সম্মান দেখাবে। স্বীয় সঙ্গী-সাথী ও আত্মীয়-স্বজনকেও এর শিক্ষা দেবে। এ না করলে তুমি নিজের প্রতি ও মানবতার প্রতি অবিচার করবে এবং আল্লাহ্ ও গোটা মানব সমাজ তোমার দুশমনে পরিণত হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে দুশমন বানায় তার আশ্রয় কোথাও নেই; তাকে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বলে ততক্ষণ গণ্য করা হবে, যতক্ষণ না সে তওবা করে এবং আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হয়। কোন কিছুই মানুষকে আল্লাহ্‌র বরকত থেকে ততটা বঞ্চিত করে না আল্লাহ্‌র রোষাগ্নি ও ক্রোধবহ্নিকে ততটা প্রলম্বিত করে না যতটা করে জুলুম। আর তা এজন্য যে, আল্লাহ জুলুমের ফরিয়াদ এবং জালিম ও অত্যাচারীকে পাকড়াও করবার জন্য প্রস্তুত থাকেন।

    সাধারণ জনগণ

    “রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাজে ইনসাফ ও সুবিচার কর, একে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নাও। জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন কর, কেননা জনগণের অতৃপ্তি ও অসন্তোষ সংখ্যালঘিষ্ঠ সুবিধা- ভোগী ও বিত্তশালী লোকদের তৃপ্তি ও সন্তোষকে নষ্ট করে দেয়। পক্ষান্তরে বিত্তশালী লোকের অতৃপ্তি ও অসন্তোষ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের প্রাচুর্যের মধ্যে অনায়াসে হারিয়ে যায়। মনে রেখ, মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী শ্রেণী বিপদ ও সংকটকালে তোমার ডাকে সাড়া দেবে না। তারা ন্যায়নীতি ও ইনসাফের রাস্তা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করবে এবং নিজেদের প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশী চাইবে। তাদের সঙ্গে যে সদয় আচরণ করেছ এবং তাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছ সেজন্য তারা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে না। জনসাধারণই যে কোন দেশ ও রাষ্ট্রের এবং যে কোন মিল্লাত ও মযহাবের স্থিতি ও শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। তারাই শত্রুর সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করে। অতএব সাধারণ গণ-মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করবে এবং তাদের কল্যাণের প্রতি সর্বাধিক মনোযাগ দেবে।

    সাধারণ দোষত্রুটিগুলি উপেক্ষা কর

    “এমন সব ব্যক্তিকে দূরে রাখবে যারা অপরের দোষ-ত্রুটি ও ছিদ্রান্বেষণে সদাব্যস্ত। সাধারণ মানুষ কিন্তু মানবীয় দুর্বলতা থেকে মুক্ত নয়। তাই শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তির জন্য সেসব উপেক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। অন্যের যে ত্রুটি বা দুর্বলতা গোপনীয় রয়েছে তা দিবালোকে টেনে এনো না; বরং যা প্রকাশ পেয়েছে তা দূর করার চেষ্টা কর। আল্লাহ্‌ই অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞাত এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা তাঁরই হাতে। জনগণের দুর্বলতাগুলো যথাসম্ভব উপেক্ষা কর তাহলে আল্লাহ তোমার সেই সব দুর্বলতা ঢেকে দেবেন, যা জনগণের দৃষ্টি থেকে আড়ালে রাখতে তুমি চিন্তিত। জনগণ ও সরকারের মাঝে বিরাজিত ঘৃণার গ্রন্থিগুলো খুলে দিও না এবং ঐ সমস্ত কারণ দূরীভূত করো, যা উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত তিক্ততার সৃষ্টি করতে পারে। নিজেকে এমন সব কার্যকলাপ থেকে নিরাপদ রাখো যা তোমার জন্য শোভনীয় কিংবা সমীচীন নয়। যদি কেউ তোমার নিকট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে তাহলে সেগুলোর প্রমাণ সংগ্রহ করতে তুমি তাড়াহুড়োর আশ্রয় নিও না। কেননা চোগলখোররা বন্ধুর ছদ্মবেশেই অন্যকে ধোকা দেয়।

    উপদেষ্টা নির্বাচন

    “কোন কৃপণকে কখনও তোমার উপদেষ্টা করো না। কেননা সে তোমার ঔদার্য ও দানশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং তোমাকে দারিদ্র্যের ভীতি প্রদর্শন করবে। ভীরু ও কাপুরুষের পরামর্শও নেবে না। কেননা সে তোমার অটুট সংকল্প ছিনিয়ে নিতে চাইবে (অর্থাৎ তোমাকে সংকল্পচ্যুত করবে)। লোভী ব্যক্তির মতামতও নেবে না, কেননা সে তোমার ভেতর লোভের সঞ্চার করবে এবং তোমাকে একজন অত্যাচারী শাসকে পরিণত করবে। কার্পণ্য, ভীরুতা এবং লোভ মানুষকে আল্লাহ্ উপর তাওয়াক্কুল করা থেকে বিরত রাখে।

    “নিকৃষ্টতম মন্ত্রণাদাতা তারাই, যারা কোন জালিম ও অত্যাচারী শাসকের উপদেষ্টা ও মন্ত্রণাদাতা হিসাবে কাজ করেছে এবং তাদের সকল অন্যায় ও অপকর্মকে সমর্থন করেছে। কখনই এমন সব লোককে পরামর্শদাতা করবে না, যারা জালিমদের সহযোগী ছিল এবং তাদের অনাচার ও অত্যাচারে শরীক ছিল। তুমি এমন লোককে পরামর্শদাতা কর, যে প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী, পাপাচার ও অন্যায়-অপকর্ম থেকে মুক্ত এবং যে কোন জালিমের জুলুমে কিংবা কোন পাপীর পাপকর্মে কখনো সাহায্য বা সহযোগিতা করেনি। এ সমস্ত লোক কখনো তোমার বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না বরং সর্বদা তোমার শক্তি ও সংহতির উৎস হিসাবে কাজ করবে। এরাই হবে তোমার সত্যিকারের বন্ধু ও দোস্ত। এ ধরনের লোককে তোমার ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে বন্ধু হিসাবে গণ্য করবে। এদের ভেতর আবার অগ্রাধিকার দেবে তাদেরকেই, যারা স্বভাবতই সততার পূজারী। সততার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করবে—এজন্য তোমাকে যত বেশী মূল্যই দিতে হোক না কেন কিংবা তোমার ধৈর্যের পক্ষে তা যতই প্রাণান্তকর হোক না কেন।

    ভাল-মন্দের পার্থক্য

    “নেককার ও আল্লাহ্-ভীরু লোকদেরকে তোমার নৈকট্য দেবে। যে কোন বিষয় তাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবে। তারা যেন কখনো তোমায় তোষামোদ না করে এবং তুমি যা করনি সে বিষয়ে চাটুকারিতার আশ্রয় না নেয়। কেননা তোষামোদ ও চাটুকারিতা বিনয়ী ও নম্র মানুষের মধ্যেও অহংকারের সৃষ্টি করে। ভাল ও মন্দের সাথে একই আচরণ করবে না। এটা ভাল মানুষকে ভাল কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে এবং মন্দ লোককে মন্দ কাজে আরো উৎসাহিত করবে। যার যেমন কর্ম তাকে তেমন প্রতিদান দেবে। মনে রেখ—কল্যাণ, ন্যায়, সুবিচার এবং সেবার দ্বারা শাসক ও শাসিতের মাঝে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। লোকের ভেতর তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও কল্যাণকামী তৈরী কর। কেননা তাদের কল্যাণ কামনাই তোমাকে বিপদ-আপদ ও সমস্যা-সংকটের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। তাদের কল্যাণ কামনার বিনিময় হবে তোমার উপর তাদের আস্থা বৃদ্ধি আর অকল্যাণ ও অসদাচরণের বিনিময় হবে তোমার প্রতি শত্রুতা।

    পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য

    “আমাদের পূর্বপুরুষদের উত্তম ঐতিহ্য অর্থাৎ ঐক্য, সংহতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করাকে কখনো পরিত্যাগ করবে না এবং এমন কিছুর সূত্রপাত কিংবা সূচনা করবে না যা তাদের ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা বিনষ্ট করে। উত্তম ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাকারীরা তাদের পুরস্কার পেয়ে গেছেন। ঐ সব ঐতিহ্য যদি আহত কিংবা বিনষ্ট হয় তাহলে তোমরাই তার জন্য দায়ী হবে। হামেশা জ্ঞানী-গুণী ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা দ্বারা লাভবান হবার চেষ্টা কর এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি ও কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের থেকে বারবার পরামর্শ নিতে চেষ্টা কর। এতে করে তুমি রাষ্ট্রে শান্তি ও কল্যাণের আবহাওয়া বহাল রাখতে পারবে, যা তোমার পূর্ববর্তিগণ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

    জনগণের বিভিন্ন শ্রেণী

    “মনে রেখ, জনগণ বিভিন্ন শ্রেণীর সমষ্টি এবং এদের একের উন্নতি অন্যের উন্নতির উপর নির্ভরশীল। তাই এক শ্রেণী অন্য শ্রেণী থেকে সম্পর্কহীন হয়ে থাকতে পারে না। আমাদের ফৌজ—যা আল্লাহ্‌র সৈনিকদের নিয়ে গঠিত, আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসকবৃন্দ, তাদের দফতরসমূহ, আমাদের বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা, বিচারকবৃন্দ, আমাদের রাজস্ব বিভাগ এবং অন্যান্য শাখার কর্মচারীবৃন্দ—এককথায়, বিভিন্ন বিভাগ ও বিভিন্ন শ্রেণীর লোক নিয়েই আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সংগঠিত ও পরিচালিত। জনগণের ভেতর মুসলিম নাগরিক এবং যিম্মী প্রজা রয়েছে। এদের ভেতর ব্যবসায়ী, শিল্পী, কারিগর, কর্মী, বেকার, ধনী, দরিদ্র প্রভৃতি শ্রেণীর মানুষ রয়েছে। আল্লাহ পাক এদের সবার জন্যই আলাদা আলাদা অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং ঐশী-গ্রন্থে তা সুরক্ষিত করে রেখেছেন।

    “আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে সেনাবাহিনী জনগণের নিরাপত্তা বিধানে একটি দুর্গের ভূমিকা পালন করে। সাম্রাজ্যের শান-শওকত ও মর্যাদা রক্ষা করে তারাই। ধর্মের সম্ভ্রম তারা বজায় রাখে এবং রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা তারাই বহাল রাখে। সেনাবাহিনী ব্যতিরেকে যেমন একটি দেশ চলতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া একটি সেনাবাহিনীও টিকতে পারে না। আমাদের সৈনিকেরা শত্রুর মুকাবিলায় শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে। কেননা আল্লাহ্ পাক তাদেরকে স্বয়ং নিজেদের জন্যই যুদ্ধ করবার সৌভাগ্য দান করেছেন (অর্থাৎ তারা এমন কোন ভাড়াটে সেনাবাহিনী নয়, যাদেরকে অন্যের স্বার্থ রক্ষার্থে যুদ্ধ করতে হয়)। কিন্তু তাদেরকে নিজেদের সমস্ত প্রয়োজন নিজেদেরই পূরণ করতে হয়, আর সেজন্যই তারা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব খাত থেকে প্রদত্ত বেতনের মুখাপেক্ষী। সৈনিক এবং সেনাবাহিনী বহির্ভূত সাধারণ শ্রেণীর আপামর মানুষ যারা রাজস্ব প্রদান করে থাকে, এতদুভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজনীয়। বিচার বিভাগীয় এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসারবৃন্দ এবং তাদের কর্মচারীকুলের মধ্যেও সহযোগিতা প্রয়োজন। কাযী দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিধিকে প্রয়োগ করে থাকেন। অর্থ ও রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীবৃন্দ রাজস্ব সংগ্রহ করেন। প্রশাসনিক বিভাগ তার নিয়োজিত অফিসার ও কর্মচারীর সাহায্যে নাগরিক জীবনের শৃঙ্খলা রক্ষা করেন। এরপর আছে বণিককুল, যারা রাষ্ট্রের আমদানী বৃদ্ধি করেন। এরাই বাজার ও ব্যবসা-কেন্দ্র পরিচালনা করেন এবং এরা (চাইলে) অন্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশী হক্‌কুল-’ইবাদ আদায় করতে পারেন। এ ছাড়া গরীব ও প্রয়োজন মুখাপেক্ষী অভাবী ও দরিদ্র শ্রেণীর লোকও রয়েছে। এদের লালন-পালন করা অন্যান্য শ্রেণীর জন্য ফরয (বাধ্যতামূলক কর্তব্য)। আল্লাহ্‌ প্রতিটি লোককেই খেদমত করবার উপযোগী মওকা দিয়েছেন। সব লোকের অধিকার রয়েছে রাষ্ট্রের উপর। জনকল্যাণকে সামনে রেখে এদের জন্য প্রয়োজনীয় কৰ্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। এটি এমন একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব, যা কোন শাসকই পরিপূর্ণরূপে পালন করতে পারেন না—যতক্ষণ না তিনি এ ক্ষেত্রে নিজের অন্তর থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা পান এবং আল্লাহ্‌র নিকট সাহায্যপ্রার্থী হন। এটা তার পক্ষেই সম্ভব, যিনি এই অবশ্যকরণীয় ও পালনীয় দায়িত্বটি নিজের কাঁধে উঠিয়ে নিতে পারেন এবং তা পালন করতে গিয়ে যে সব কষ্ট ও অসুবিধা দেখা দেবে তা ধৈর্যের সাথে মুকাবিলা করার মত সৎসাহসের অধিকারী হন।

    “ফৌজে ঐ সব লোকের মঙ্গল ও স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে, যারা তোমার মতে আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূল (সা)-এর উপর গভীরভাবে বিশ্বাসী, যারা ক্রোধের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ঠাণ্ডা মাথায় অভিযোগ শ্রবণ করতে পারেন, যারা দুর্বলকে সাহায্য এবং শক্তিশালীকে পরাভূত করতে পারেন এবং যারা যে কোন পরিস্থিতিতে বিচলিত কিংবা উত্তপ্ত হন না।

    “যে সব পরিবার খ্যাতি, বিশ্বস্ততা এবং গৌরবোজ্জ্বল অতীতের অধিকারী—তাদেরকে নৈকট্য দান করবে এবং সাহসী বীর, সত্যবাদী, দানশীল এবং উত্তম স্বভাববিশিষ্ট লোকদেরকে নিজের দিকে টেনে নেবে। কেননা এসব লোকই সমাজ ও রাষ্ট্রের সৌন্দর্য।

    জনগণের সঙ্গে সদাচরণ

    “লোকের সঙ্গে ঠিক সেরূপ ব্যবহার করবে—যেরূপ ব্যবহার তুমি তোমার শিশু সন্তানের সাথে করে থাক। যদি তাদের উপর কোন অনুগ্রহ করে থাক তাহলে সেজন্য তাদেরকে খোটা দিও না। এমত আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি জনসাধারণকে তোমার প্রতি কল্যাণকামী করে তুলবে। তাদের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগ দেবে। তুমি তাদেরকে সাধারণভাবে যে সাহায্য প্রদান করেছ, সেটাকে যথেষ্ট মনে ক’র না। কেননা সময় বিশেষে তাদের একটি মামুলী প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ দিলেও তাদের জীবন আরাম ও প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। নিশ্চিত জেনে রেখ, এসব লোক তোমাকে প্রয়োজন মুহূর্তে কখনো ভুলে যাবে না।

    সেনাপতি নির্বাচন ও এতদ্‌সম্পর্কিত বিষয়

    “সেনাপতি হিসাবে তুমি এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করবে, যিনি আপন লোকদের সাহায্য করাকে নিজের জন্য অবশ্য কর্তব্য মনে করেন; যিনি তার অধীনস্থ লোকদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন, তাদের পরিবার-পরিজনদের দেখাশোনার ব্যাপারেও প্ৰয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। মোটকথা, তার আচার-আচরণ এমন হবে যে, গোটা সেনাবাহিনী যেন শোকে ও আনন্দে, হর্ষ ও বিষাদে তাঁকে নিজেদেরই আপন লোক হিসাবে মনে করে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রতি এই একাত্মতা তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে অধিকতর শক্তি যোগাবে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে সর্বদা ভালবাসার সম্পর্ক কায়েম রাখবে, যাতে তারা হামেশাই তোমার প্রতি প্রীত থাকে। বাস্তব সত্য এই যে, শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিদের প্রকৃত আনন্দ ও তৃপ্তি এখানেই যে, দেশে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রীতি ও ভালবাসার সম্পর্ক বজায় রয়েছে। জনগণের আন্তরিকতাপূর্ণ আবেগের প্রকাশ এই প্রীতি ও ভালবাসা থেকেই ঘটে, আর শাসকদের নিরাপত্তা এর উপরই নির্ভরশীল। তোমার উপদেশ তাদের কোন উপকারেই আসবে না, যতক্ষণ না তুমি সাধারণ সৈনিক ও অফিসার উভয়ের প্রতি স্নেহশীল ও দয়াপরবশ হবে। তা হলে সরকারের কোন কর্মপন্থাই তাদের কাছে কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক মনে হবে না এবং একে বানচাল করতেও তারা পরস্পরের সহযোগী হবে না।

    “তাদের প্রয়োজনসমূহ সর্বদা পূরণ করতে থাকবে এবং তাদের সেবা ও আনুগত্যের প্রশংসা করবে। এমন আচরণ বীর সৈনিকদেরকে অধিকতর বীরত্বব্যঞ্জক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করবে এবং ভীরুদেরকেও সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।

    “অন্যের আবেগের সাথে আন্তরিকভাবে শরীক হতে চেষ্টা ক’র এবং একের ভুলকে অন্যের প্রতি নিক্ষেপ ক’র না। যে পুরস্কৃত হবার উপযোগী তাকে পুরস্কার প্রদানে দ্বিধা করবে না। তুমি এমন কোন ব্যক্তিকে অনুগৃহীত করবে না, যে কোন কাজ করে না, কেবল খান্দানী মান ইযযতের আশ্রয় নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়। কোন ব্যক্তিকে তার কৃতিত্বপূর্ণ কর্ম সম্পাদনের বিনিময়ে প্রাপ্য পুরস্কার থেকে কেবল এই অজুহাতে বঞ্চিত করবে না যে, সে সমাজের নীচু শ্রেণী থেকে এসেছে।

    প্রকৃত নেতৃত্ব

    “যদি কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সন্দেহে নিপতিত হও তাহলে দিক-নির্দেশনার জন্য আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের দিকে ধাবিত হও। আল্লাহ্ যে সমস্ত লোককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে চান তাদের প্রতি তাঁর নির্দেশ হ’ল, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর এবং ঐ ব্যক্তির আনুগত্য কর যিনি তোমাদের মধ্য থেকে শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন হয়েছেন। যদি কখনো কোন বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয় তবে তা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।’ আল্লাহ্‌র দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ তাঁর প্রেরিত গ্রন্থের প্রতি ফিরিয়ে দেওয়া এবং রসূলের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ তাঁর হাদীছের অনুসরণ করা।

    কাযীউ’ল-কুযাত (চীফ জাস্টিস) মনোনয়ন

    কাযীদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে কাযীউ’ল-কুযাত মনোনীত করবে। তিনি এমন ব্যক্তি হবেন, যিনি পারিবারিক চিন্তা-ভাবনা দ্বারা পীড়িত নন, যাঁকে ভয় দেখানো যায় না, যিনি কারো ধমকের ভয়ে ভীত নন, যিনি বারবার ভুল করেন না কিংবা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেন না, যিনি একবার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা থেকে সরে যান না, যিনি আত্মকেন্দ্রিক নন, যিনি সকল ঘটনার আনুপূর্বিক বিবরণ না জেনে ফয়সালা প্রদান করেন না, যিনি প্রতিটি সন্দেহমূলক বিষয়কে সতর্কতার সঙ্গে মেপে দেখেন এবং সমস্ত কথাকে গভীরভাবে ভেবে-চিন্তে তবেই ফয়াসালা দেন, যিনি উকিল কিংবা আইনজীবীর পেশকৃত সাক্ষ্য-প্রমাণের উপর জিদ করেন না, যিনি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি গ্রন্থি ধৈর্যের সাথে পরখ করেন, যিনি স্বীয় ফয়সালার ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে নিরপেক্ষ থাকেন, যাঁকে খোশামোদ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যিনি স্বীয় মর্যাদার কারণে গর্বিত নন। এমন লোক পাওয়া কিন্তু সহজ নয়। একবার এই পদের জন্য উপযুক্ত লোক পাওয়া গেলে তাকে নিযুক্তি দানের পর এমন একটা যুক্তিসঙ্গত সম্মানী প্রদান করবে, যদ্দ্বারা তিনি আরাম-আয়েশের সঙ্গে তাঁর মর্যাদা মাফিক জীবন ধারণ করতে পারেন এবং লোভ-লালসা থেকে ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন। তুমি তোমার দরবারে তাঁকে এমন উচ্চাসন প্রদান করবে, যা পাবার কথা কেউ ভাবতেও পারে না।

    অধীনস্থ কাযী মনোনয়ন

    বেশ ভালভাবে অবহিত হও যে, কাযী মনোনয়নের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রকমের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কেননা এটাই এমন একটা উচ্চ মর্যাদা যা লাভ করে ভাগ্যান্বেষী আত্মকেন্দ্ৰিক লোকেরা অবৈধভাবে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের প্রত্যাশী হয়। অন্যান্য কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন এবং চিন্তা-ভাবনা করে অগ্রসর হওয়া উচিত। ঐ সমস্ত কর্মকর্তাকে তাদের পদে ততক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী করা উচিত নয়, যতক্ষণ না তাদের শিক্ষা লাভের কাল (প্রবেশনারী পিরিয়ড) তোমার নিকট সন্তোষজনক বিবেচিত হয়। দায়িত্বপূর্ণ পদে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা কোনরূপ প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে কখনো লোক মনোনীত করবে না। কেননা তা বেইনসাফী ও মন্দের দিকে তোমাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।

    উচ্চপদের জন্য এমন অভিজ্ঞ লোক নির্বাচন কর, যার ঈমান শক্তিশালী এবং যিনি উচ্চ বংশজাত। এ ধরনের লোক সহজে লোভের শিকার হবে না, বরং অন্যের চিরন্তন ও স্থায়ী কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রেখে স্বীয় দায়িত্ব পালন করে যাবে। এসব কর্মকর্তাদের বেতন বাড়িয়ে দাও, যাতে তারা নিশ্চিন্তে ও নিরুদ্বেগে জীবন যাপন করতে পারে। এতে তারা কখনো তাদের অধীনস্থ লোকদের উপার্জনের উপর নিজেদের প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তে কোন রূপ ট্যাক্স বসাবে না এবং তোমার নির্দেশ অমান্য করার কিংবা রাষ্ট্রীয় অর্থকড়ি অহেতুক ও অযথা অপচয়ের কোন অজুহাতও তাদের থাকবে না। অতঃপর তাদের অজ্ঞাতে তাদের উপর বিশ্বস্ত, সৎ ও যোগ্য লোক তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত কর। আশা করা যায় যে, তাদের ভেতর জনকল্যাণের প্রতি সত্যিকারের আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। কিন্তু যেই তাদের কারোর উপর অবিশ্বস্ততার অভিযোগ উত্থাপিত হবে এবং তোমার গোপন তত্ত্বাবধায়ক ও উক্ত অভিযোগের সত্যতা সমর্থন করবে, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান কর। সে শাস্তি দৈহিক হবে এবং তা নির্দিষ্ট স্থানে ও সাধারণ্যে হতে হবে।

    কৃষি ও রাজস্ব বিভাগ

    রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে যারা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন পূরণে রাজস্ব প্রদান করে থাকে তাদের কল্যাণ সুরক্ষিত হয়। রাজস্ব দাতাদের কল্যাণ ও প্রাচুর্যের উপরই অপরাপর শ্রেণী তথা গোটা জাতির কল্যাণ নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে রাজস্বের উপরই গোটা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে। রাজস্বের কৃষি জমির উর্বরতার প্রতি দৃষ্টিদান ও এর সংরক্ষণ অধিক গুরুত্ববহ। জমির উপযুক্ত সংরক্ষণ ও উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি ছাড়া রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি হয় না। জমির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের ব্যাপারে কৃষককে সাহায্য না করে যে শাসক রাজস্ব চেয়ে বসেন, তিনি কৃষককুলের উপর তাদের সহ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে থাকেন এবং দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করেন। এ ধরনের অত্যাচারী শাসকের অধীনে দেশ বেশীদিন চলতে পারে না। যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, অনাবৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে কিংবা ভূমির অনুর্বরতা অথবা প্লাবনের কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং এই প্রেক্ষিতে কৃষকরা করের পরিমাণ কমানোর জন্য আবেদন করে তাহলে তাদের আবেদন অনুযায়ী করের পরিমাপ কমিয়ে দাও, যেন তারা তাদের অবস্থা সামলে নিতে পারে। এতে রাজস্বে ঘাটতি দেখা দেবে; তুমি তার পরওয়া করবে না। কেননা রাষ্ট্রের সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য ফিরে এলে তুমি এই ক্ষতি পুষিয়ে নেবার এবং দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মান-মর্যাদা উন্নততর করার সুযোগ পাবে। তখন তুমি বিশ্বে একজন প্রশংসাধন্য ব্যক্তিতে পরিণত হবে এবং জনসাধারণ তোমার ন্যায় ও সুবিচারপূর্ণ অনুভূতির প্রশংসা করবে। এর পরিণতিতে তারা তোমার উপর যে আস্থা স্থাপন করবে তাতে তোমার এবং সমগ্র জাতির শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তোমার বিপদের দিনে জনসাধারণই স্বেচ্ছাকৃতভাবে তোমার সাহায্যে এগিয়ে আসবে।

    যত বেশী পরিমাণে চাও, যমীনে লোক বসতি স্থাপন কর। কিন্তু জমির অবস্থা উন্নয়নে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না কর তাহলে তাদের মধ্যে অতৃপ্তি ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে। কৃষকদের ধ্বংসের কারণ ঐসব শাসক, যারা যে কোন মূল্যে কেবল সম্পদ আহরণে ব্যস্ত থাকে এই ভয়ে যে, না-জানি কখন আবার সরকারের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যায়। এরা সেই সমস্ত লোক—যারা উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত এবং অতীত ঘটনাবলী থেকে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করে না।

    অফিস ব্যবস্থাপনা (সচিবালয়)

    সরকারী অফিস এবং সেখানে আসীন সচিবদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখ এবং তাদের মধ্যকার সর্বোত্তম লোকদেরকে সরকারের গোপনীয় চিঠিপত্র ও লিখিত নির্দেশাদি নির্বাহের কাজে মনোনীত কর। সর্বোত্তম লোক তারাই, যারা যোগ্য এবং পরিপূর্ণ বিশ্বস্ত, যারা কখনো তাদের পদমর্যাদার অবৈধ সুযোগ নিয়ে তোমাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে না, নিজেদের দায়িত্ব পালনে গাফলতি কিংবা অলসতার আশ্রয় নেবে না, রাষ্ট্রীয় চুক্তিপত্রের খসড়া প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বহিঃশক্তির প্রলোভনের শিকার হবে না, তোমার স্বার্থ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, তোমাকে সঠিক ও যথার্থ সাহায্য করতে ব্যর্থ হবে না এবং তোমাকে চিন্তা-ভাবনা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে বাঁচাতে পারবে। স্রেফ ধারণার ভিত্তিতে লোক নির্বাচন করবে না। কেননা বাস্তবে এমন বহু লোক আছে, যারা প্রকৃতই বিশ্বস্ততা ও যোগ্য প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত, কিন্তু নিজেদের লম্বা চওড়া দাবী ও গালভরা বুলি দ্বারা শাসকের সামনে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণে সচেষ্ট থাকে। তাদেরকে উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই কোন কাজে নিযুক্ত করা যেতে পারে। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে হতে হবে। সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে কাউকে কোন পদে নিযুক্ত করার আগে খেয়াল রাখবে, সে লোকের ভেতর প্রভাবশালী এবং ঈমানদারীর দিক দিয়েও মশহুর কিনা। এ ধরনের নির্বাচনই আল্লাহ্‌র নিকট এবং শাসকের নিকট সমভাবে পসন্দনীয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি শাখায় এমন একজনকে প্রধান নিয়োগ করা দরকার, যাকে কোন পরিস্থিতিই পেরেশান করতে পারবে না, এমনকি বিক্ষোভ সৃষ্টিকারী লোকেরাও।

    মনে রাখবে, তোমার কর্মচারী ও সচিবদের মধ্যে যে সব দুর্বলতা রয়েছে, তা তুমি দেখেও যদি না দেখার ভান কর, তাহলে তোমার আমলনামা তোমার বিরুদ্ধেই লেখা হবে।

    বাণিজ্য ও শিল্প

    শিল্পকর্মে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত লোকদের জন্য উপকারী ও ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর এবং বিজ্ঞোচিত পরামর্শ দ্বারা তাদেরকে সাহায্য কর। তাদের কতক লোক শহরে অবস্থান করে আর কতক লোক এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মালমাত্তা ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে ফেরী করে বেড়ায়। এভাবে তারা স্বহস্তে উপার্জিত অর্থ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য রাষ্ট্রীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এই পেশার সাথে জড়িত লোকেরা শান্তি ও নিরাপত্তা পসন্দ করে। বরং বলা চলে, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। দেশের প্রান্তে প্রান্তে যাও এবং এই দলটি সম্পর্কে ব্যক্তিগত জানাজানির সম্পর্ক সৃষ্টি কর। তাদেরকেও জানতে চেষ্টা কর। মনে রাখবে, এদের মধ্যেও এমন লোভী লোক রয়েছে যারা কায়কারবারে বিশ্বস্ত নয়। তারা খাদ্যশস্য, আহার্য দ্রব্য জমা করে এবং ভীষণ চড়ামূল্যে বিক্রয় করতে চেষ্টা করে।

    তাদের এই আচরণ জনসাধারণের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই দুরাচারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করা শাসকের সুনামের পক্ষে কলঙ্কস্বরূপ। খাদ্য-শস্য গুদামজাতকরণ থেকে তাদেরকে বিরত রাখবে। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) তা করতে নিষেধ করেছেন। খেয়াল রাখবে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য সুলভে সম্পন্ন হয়। মাপ-জোখের ক্ষেত্রে যাতে সুবিচার রক্ষিত হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখবে। পণ্যদ্রব্যের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তোমার সতর্কীকরণের পরও যদি কেউ তোমার নির্দেশ অমান্য করে এবং সম্পদ গুদামজাতকরণের মত অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে যথোপযুক্ত শাস্তি দেবে।

    গরীবদের অধিকার

    “সতর্ক ও সাবধান হও এবং আল্লাহকে ভয় কর—যখন গরীবদের সমস্যা তোমার সামনে পেশ করা হয়। তাদের কোন বন্ধু নেই, সহায় নেই, আশ্রয় নেই। তারা বড় নিঃস্ব; তাদের মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত। তারা যুগের আবর্তন-বিবর্তনের শিকার। তাদের ভেতর এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা নিজের ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই না করে বরং ভাগ্যের নিকট আত্মসমর্পণ করেছে এবং শত দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও কারো কাছে হাত পাতে না। আল্লাহর ওয়াস্তে এদের অধিকারের হেফাজত কর। কেননা এদের দায়িত্ব রয়েছে তোমারই উপর। বায়তুলমালের একটি অংশ তুমি এদের অবস্থার উন্নয়নে নিয়োজিত কর। তারা দূরে অথবা নিকটে যেখানেই থাকুক না কেন—তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তোমার উপর—তোমার কোন ব্যস্ততাই যেন তাদের কল্যাণ চিন্তাকে তোমার মস্তিষ্ক থেকে দূরে সরিয়ে দিতে না পারে। কেননা তাদের অধিকার সম্পর্কে তোমার নিস্পৃহ মনোভাবের পক্ষে কোন ওযরই আল্লাহ্‌র দরবারে গৃহীত হবে না। তাদের স্বার্থকে তোমার স্বার্থ চিন্তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে কর না এবং নিজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির গণ্ডী থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করে দিও না। সে সব লোককে চিনে রাখ, যারা গরীবদের ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তোমাকে অনবহিত রাখে।

    “তোমার নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভেতর থেকে এমন কিছু লোক বাছাই করে নাও, যারা কোমল হৃদয়, আল্লাহ্‌ভীরু এবং যারা গরীবদের অবস্থা সম্পর্কে তোমাকে যথাযথ অবহিত রাখবে। এ সব গরীব লোকের জন্য এমন ব্যবস্থা কর যাতে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ্‌র সামনে তোমাকে কোন ওযর পেশ করতে না হয়। কেননা এরাই তোমার সদয় ও সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার পাবার বেশী হকদার। সবার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করে আল্লাহ্‌র নিকট পুরস্কার প্রার্থী হও। তাদের ভেতর যে সব বৃদ্ধ রুযী-রোজগারের সামর্থ্য রাখে না এবং ভিক্ষাবৃত্তির দিকেও যাদের কোন প্রবৃত্তি নেই, তাদের প্রয়োজন পূরণকে তুমি তোমার পবিত্ৰ দায়িত্ব ও কর্তব্য জ্ঞান কর। এই অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন সাধারণভাবে শাসকদের নিকট কষ্টকর মনে হয়। কিন্তু সেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী জনপ্রিয়, যারা দূর দৃষ্টিসম্পন্ন, নম্র হৃদয় ও মুত্তাকী—প্রকৃত অর্থে তারাই একাগ্রতার সঙ্গে ঐ সব দায়িত্ব পালনে ব্রতী হয়।

    সাধারণ বৈঠক

    কাজের ফাঁকে ফাঁকে মজলুম এবং দরিদ্র শ্রেণীর লোকের সঙ্গে সাধারণ বৈঠকে মিলিত হবে এবং ‘আল্লাহ্ তোমার সাথে আছেন’—এই অনুভূতি নিয়েই তাদের সঙ্গে খোলা মন নিয়ে কথাবার্তা বলবে। সে সময় তুমি তোমার ফৌজ, পাহারাদার, দেওয়ানী বিভাগের অফিসার, পুলিশ অথবা বার্তা সংস্থার কর্মচারী—কাউকেই কাছে থাকতে দেবে না, যাতে করে দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের পক্ষে তাদের কোন প্রতিনিধি তাদের অভিযোগ নিঃশঙ্কচিত্তে এবং দ্বিধাহীনভাবে তোমার কাছে বলতে পারে। আমি আল্লাহ্‌র রাসূলকে বলতে শুনেছি: এমন কোন জাতি-গোষ্ঠী কিংবা দল উচ্চতর মর্যাদা লাভ করতে পারে না যাদের সবল দুর্বলের ব্যাপারে তার দায়িত্ব পালন করে না। প্রশান্তচিত্তে সহ্য কর যদি দুর্বল কোন শক্ত কথাও তোমাকে বলে ফেলে। যদি সে সহজ-সরল ভাষায় তোমার কাছে তার অবস্থা বর্ণনা করতে সক্ষম না হয় তবু বিরক্তি বোধ ক’র না। তাহলে আল্লাহ্ তোমার জন্য স্বীয় রহমত ও করুণার উৎসমুখ খুলে দেবেন। তুমি তাদের যা কিছু দিতে পার—অসংকোচে তা দিয়ে দাও। তুমি যা তাদের দিতে পার না, অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তা তাদের জানিয়ে দাও।

    “এমন কতকগুলো বিষয় আছে যেগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। সেরেস্তার মহুরীদের অভিযোগ দূর করবার জন্য তোমার অফিসারদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত থাক। খেয়াল রাখবে—যেদিন তোমার নিরীক্ষণের জন্য কোন আর্জি কিংবা দরখাস্ত দাখিল করা হবে, সেদিনই যেন সে সম্পর্কিত তথ্যাদি তোমার জানা হয়ে যায়—চাই কি তোমার অফিসার মাঝখানে আড় হয়ে দাঁড়াতে যতই চেষ্টা করুক। প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিনেই শেষ করে ফেল। কেননা আগামী দিন তোমার সামনে আরও অনেক কাজ এসে হাযির হবে।

    নিয়মিত ‘ইবাদত

    নিজের সর্বোত্তম মুহুর্তগুলোকে আল্লাহ্‌র সমীপে হাযির হবার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখ, যদিও তোমার প্রতিটি মুহূর্ত সে উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। তবে পূর্বশর্ত হ’ল, জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত মুহূর্তগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদেরই সেবায় নিয়োজিত করতে হবে। নির্ধারিত সালাত আদায়ে দিনরাত নিজেকে মশগুল রেখ এবং পরিপূর্ণ নিবেদিত-চিত্ততা হাসিল করতে যতটা সম্ভব নিজের সালাতকে ক্লান্তিকর ও একঘেয়েমী থেকে মুক্ত রাখ। যখন তুমি সালাতে ইমামতি কর তখন সালাতকে এতটা দীর্ঘ করবে না, যাতে করে জামা’আতে শরীক অন্যান্য লোকের কষ্ট হয় কিংবা মুসল্লীদের ভেতর বিরক্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এতে সালাতের যে গুণগত প্রভাব, তা নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া জামা’আতে এমনও লোক থাকতে পারে, যারা অসুস্থ কিংবা যাদেরকে সালাত শেষে অন্যান্য জরুরী কাজে মনোনিবেশ করতে হবে।

    “য়ামান যাবার নোটিশ পেয়ে আমি যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম: আমাকে সেখানে কিভাবে সালাতে ইমামতি করতে হবে? তখন তিনি বললেন, ‘এভাবে যেভাবে তোমাদের ভেতরকার সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটি আদায় করে।’ ঈমানদারদের আরামের দিকে খেয়াল রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন কর।

    সন্ধি ও চুক্তি

    “উল্লিখিত বিষয়গুলো আমল করবার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি কথা তোমার স্মৃতিতে গেঁথে নাও : নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন রাখবে না। নিজেকে জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন রাখা তাদের অবস্থা সম্পর্কে নিজেকে বেখবর রাখারই নামান্তর। এটা শাসকের মনে ভুল দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয় এবং তাকে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয়, ভুল ও বিশুদ্ধ এবং হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের অযোগ্য করে তোলে।

    “আসল কথা, তোমার ভেতর দু’টি বিষয়ের একটি থাকতেই হবে; হয় তুমি বিচারক, নয়ত অবিচারক। যদি তুমি বিচারক হও তাহলে তুমি নিজেকে লোকের সঙ্গে সম্পর্কহীন রাখবে না; বরং তাদের কথা ও অভিযোগ শুনবে এবং তাদের প্রয়োজনসমূহ পূরণ করবে। আর তুমি যদি বিচারক না হও তাহলে লোকেরাই তোমার থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখবে। নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার মধ্যে কোন্ কল্যাণটা আছে বল? মোটকথা, জনগণ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা কোন ভাল কথা নয়। বিশেষ করে লোকের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা যখন তোমার একটি অপরিহার্য দায়িত্ব (ফরয)। তোমার নিয়েজিত পদাধিকারী লোকদের জুলুম, অত্যাচার ও বেইনসাফীর কথা শ্রবণ করা তোমার জন্য বিরক্তিকর হওয়া উচিত নয়। তুমি বেশ ভাল করে বুঝে নাও যে, তোমার আশেপাশে যেসব লোক রয়েছে তারা তাদের পদমর্যাদা দ্বারা অবৈধ ফায়দা লুটতে চাইবে। অন্যের প্রাপ্য তারা নিজেরা হাসিল করতে চাইবে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কাজ করবে। তাদের এ ধরনের প্রবণতাকে দাবিয়ে দেওয়াকে তুমি তোমার নিয়মিত রুটিনে পরিণত কর। তুমি কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিকে একখণ্ড ভূমিও দেবে না। এটা তোমাকে অন্যের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে অনেকাংশে বিরত রাখবে। আল্লাহ্ ও তদীয় বান্দা মানুষের অসন্তুষ্টি থেকে তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ।

    “আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য না করে পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তোমার আত্মীয়-বান্ধবের মধ্যে কেউ যদি কোন আইন ভঙ্গ করে তাহলে নির্ধারিত আইন অনুযায়ী তাকেও শাস্তি দাও—চাই তা তোমার ব্যক্তিসত্তার জন্য যতই কষ্টকর হোক। তোমার এই নীতি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। যদি কখনো লোকে তোমার সম্পর্কে সন্দেহ করে যে, তুমি কোন বিষয়ে তাদের প্রতি অবিচার করেছ তাহলে সে বিষয়ে তোমার ধ্যান-ধারণা তাদের সামনে পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধর এবং তাদের সন্দেহের অপনোদন কর। এভাবে তোমার মস্তিষ্ক ইনসাফ ও সুবিচারের রঙে রঞ্জিত হবে এবং লোকে তোমাকে ভালবাসতে থাকবে। এতে করে তাদের আস্থা অর্জনের পথ খোলাসা হবে।

    নির্বিকার ও নিস্পৃহ মানসিকতা সমীচীন

    “এ বিষয়ে তুমি খেয়াল রাখবে যে, দুশমনের পক্ষ থেকে আগত সন্ধির আবেদন তুমি প্রত্যাখ্যান করবে না—বরং গ্রহণ করবে। কেননা আল্লাহ্ এতে খুশী হবেন। সন্ধি ও সমঝোতা ফৌজের জন্য সন্তোষের বিষয়। তা তোমার দুশ্চিন্তাকে কম করে দেবে এবং দেশে শান্তি ও নিরাপত্তার আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু খবরদার! যে মুহুর্তে সন্ধিপত্রে দস্তখত দেবে, তখন সতর্ক ও সজাগ থাকবে। কেননা কতক দুশমন প্রতিপক্ষকে শুধু ধোঁকা দেবার জন্য সন্ধির শর্তাবলী পেশ করে থাকে। মিথ্যা আশ্বাসের উপর যখন প্রতিপক্ষ নড়বার প্রস্তুতি ছেড়ে দেয় তখন সে তার উপর দ্বিতীয়বার হামলা করে। অতএব তোমাকে মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। শত্রুর কথা বেশী মাত্রায় বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। তবে সন্ধিপত্রের আওতাধীনে তুমি যদি কিছু যিম্মাদারী কবুল করে থাক তাহলে ঈমানদারীর সাথে তা পালন করবে। সন্ধিপত্র একটি ওয়াদা। বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার উপর কায়েম থাকতে হবে। যদি কখনো কোন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হও তাহলে যে কোন মূল্যে তা পালন করতে হবে। কেননা প্রতিজ্ঞা পূরণের চেয়ে উত্তম বস্তু আর নেই। অমুসলিমরাও এটা স্বীকার করে। তারাও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলাফল ও মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। কখনো নিজ যিম্মাদারী আদায়ের ক্ষেত্রে ওযর তালাশ করো না। কখনো প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করো না, কখনো শত্রুকে ধোঁকা দিও না। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ আল্লাহ্‌র বিরোধিতারই শামিল। প্রকাশ্য বদকার ছাড়া অনুরূপ কাজ কেউ করে না।

    “তবে এমন কোন প্রতিজ্ঞা কর না, যেখান থেকে পরবর্তীকালে সরে আসতে তোমাকে ওযর কিংবা বাহানা পেশ করতে হয়। কখনো ওয়াদা থেকে ফিরে যেও না কিংবা তা ভঙ্গও কর না। ভয় পেয়ে ওয়াদা ভঙ্গ করবার চেয়ে ধৈর্যের সঙ্গে ভাল ফলাফল ও উত্তম পরিণতির জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

    রক্তপাত

    “অন্যায় রক্তপাত থেকে বিরত থাক। এর চেয়ে ক্ষতিকর জিনিস আর কিছুই হতে পারে না। সজ্ঞানে রক্তপাত রাষ্ট্রের জীবনী শক্তিকে কমিয়ে দেয়। হাশরের ময়দানে মানুষকে সর্বপ্রথম রক্তপাতজনিত অপরাধের জওয়াবদিহি করতে হবে। অতএব সতর্ক ও সাবধান হও। রক্তপাতের মাধ্যমে সরকারের শক্তি বৃদ্ধির কোশেশ কোরো না। এটা শেষতক দেশকেই ধ্বংস করবে এবং অন্যের হাতে তা তুলে দেবে। আমার এবং আমার মহান স্রষ্টার দরবারে অন্যায় প্রাণহানির কোন ওযর শোনা হবে না।

    “হত্যা করা একটি অপরাধ—যার শাস্তি মৃত্যু। যদি হুকুমতের পক্ষ থেকে কোন লঘু পাপ ও অপরাধের কারণে কোন ব্যক্তিকে দৈহিক সাজা দিতে গিয়ে তার মৃত্যু হয় তাহলে ঐ মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের কিসাসের দাবীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্ন উঠিয়ে কখনো আড়াল করে ফেল না।

    শেষ হেদায়েত

    “নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কোন কাজ করবার জন্য তাড়াহুড়া কর না। আর যখন সঠিক মুহূর্ত এসে যাবে, তখন কোন কাজ মূলতবী রেখো না। জিদের বশবর্তী হয়ে কোন ভুল কাজ কর না। ভুল ধরা পড়া মাত্রই তা শুধরে নিতে আলস্যের আশ্রয় নিও না। প্রতিটি কাজ যথার্থ ও সঠিক মুহূর্তে কর এবং প্রতিটি বস্তুকেই তার উপযুক্ত স্থানে রাখ। যখন গোটা জাতি কোন মতের উপর ঐক্যবদ্ধ হয় তখন তুমি তোমার একক রায়কে তার উপর চাপিয়ে দিও না। নিজের উপর যে যিম্মাদারী অর্পিত হয় তা পালন করতে কখনো আলস্যের আশ্রয় নিও না। কেননা জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে তোমার প্রতি। তুমি যার সঙ্গে যে ব্যবহার করবে তার জন্য তোমাকেই জওয়াবদিহি করতে হবে। অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে এতটুকু পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর না। ক্রোধ সংবরণ কর এবং হাত ও মুখকে সংযত রাখ। অন্যথায় তুমি কেবল তোমার অশান্তিই বাড়াবে।

    “সেসব মূলনীতির গভীর অধ্যয়ন তোমার জন্য অপরিহার্য, যেসব মূলনীতি তোমার পূর্ববর্তী শাসকদেরকে পথ প্রদর্শন করেছে। আল্লাহ্‌র কিতাবের বিধান, নবী করীম (সা)-এর নির্দেশ এবং যা কিছু আমার কর্মপন্থা থেকে লাভ করেছ—তা গভীরভাবে অনুধাবন করবে। যে পথ-নির্দেশনা আমি তোমাকে দিয়েছি এবং যার উপর আমল করবার ওয়াদা তুমি করেছ—তার উপর সুদৃঢ় থাকতে তুমি সাধ্যমত চেষ্টা করবে। আমি তোমাকে তাকীদ করছি যে, তুমি কখনো তোমার প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনার সামনে ঝুঁকে পড়বে না এবং নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন থেকে পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে না।

    “আমি সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কুদরত ও অসীম রহমতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং তোমাকে আমার সঙ্গে দু’আ করবার দাওয়াত জানাচ্ছি। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে এই তওফীক দেন যেন আমরা আমাদের মর্যিকে তার মর্যির সাথে জুড়ে দিতে পারি। তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর এবং তাঁর সৃষ্টির অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকার যোগ্য বানিয়ে দেন। মানবতা যেন আমাদের হাড়ছাড়া না হয় এবং আমাদের পুণ্য-কর্ম যেন চিরস্থায়ী হয়। আমি আল্লাহ্ দরবারে তাঁর রহমতের পূর্ণতা দানের আবেদন জানাচ্ছি এবং দু’আ করছি যেন তিনি তোমাকে এবং আমাকে সে তওফীকই দেন এবং তাঁরই পথে শাহাদত লাভের মর্যাদা দান করেন। নিঃসন্দেহে আমাদেরকে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

    “আমি আল্লাহর রসূল এবং রসূলের পরিবারবর্গের উপর দরূদ ও সালাম প্রেরণ করছি।”

  • পরিশিষ্ট

    পরিশিষ্ট

    পরিশিষ্ট

    মুহাম্মদ বিন কাসিম এবং পাশ্চাত্যের প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক

    আমরা এই সংক্ষিপ্তসার আপনাদের সামনে এজন্য পেশ করছি, যাতে আমরা এবং আপনারা উল্লিখিত শিক্ষা থেকে ভালভাবে এবং পরিপূর্ণরূপে উপকৃত হতে পারি।

    যেসব বন্ধু সমর-বিজ্ঞানে (Military Science) দৃঢ় সংকল্প মুজাহিদের ভূমিকা পালনে আগ্রহী—তারা যেন মুহাম্মদ বিন কাসিমের কার্যাবলী এবং প্রতিরক্ষা কৌশল (Strategy) ও সমরক্ষেত্রে ব্যুহ রচনার কলা-কৌশল (War tactics)-এর মূলনীতিগুলো ভালভাবে হৃদয়পটে গেঁথে নিতে পারেন। এতে তাঁরা ইসলামী বিশ্বের সত্যিকার মুজাহিদরূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে নিতে পারবেন।

    আমরা নিম্নোদ্ধৃত মূলনীতিগুলো সার-সংক্ষেপ হিসাবে প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষকদের ঐসব নির্দেশাদি থেকে গ্রহণ করেছি, যে সব নির্দেশ ১৯৩৯-৪৫ ঈসায়ীর যুদ্ধ থেকে শুরু করে মাঝে মাঝে বিরতি সহ বিভিন্ন সময়ে লণ্ডনের যুদ্ধ অফিস (War Office) থেকে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছিল। এগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে আপনার সামনে ইসলামী প্রতিরক্ষা শাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর মর্যাদা আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠবে এবং আপনি জানতে পারবেন যে, ইসলামের প্রতিরক্ষা নীতিগুলো ১৯৩৯-৪৫ ঈসায়ীতে এবং পরবর্তীতেও অনড় ও অটল রয়েছে এবং এখনও আছে। আপনি এও বুঝতে পারবেন যে, মুহাম্মদ বিন কাসিম আঁ-হযরত (সা) অনুসৃত প্রতিরক্ষা কৌশলের মূলনীতিগুলোর ভক্ত ও অনুরক্ত ছাত্র ছিলেন বলেই এত অল্প বয়সে এতবড় নামকরা বিজয়ী জেনারেল হতে পেরেছিলেন।

    সাধারণ সমর নীতি (General Principles of War)

    আমরা আশা করি, মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ইতিহাস পড়বার পর আপনার সামনে সুস্পষ্টরূপে প্ৰতিভাত হয়ে গেছে যে, কোন জাতিগোষ্ঠীর বিজয়ী কিংবা বিজিত জাতিতে পরিণত হওয়া তার সেনাবাহিনীর মধ্যে কতিপয় জরুরী ও অপরিহার্য গুণাবলী থাকা কিংবা না থাকার উপরই নির্ভরশীল। যেমন—

    ১. ফৌজের সিপাহ্‌সালার এবং তার অধীনস্থ সেনানায়কদের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে সঠিকভাবে সৈন্য পরিচালনা করবার মত গুণ আছে কি না।

    ২. ফৌজের ভেতর লড়াই করবার যোগ্যতা ও দৃঢ় সংকল্প আছে কি না।

    ৩. ফৌজেকে উন্নতমানের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে কি না।

    ৪. ফৌজের ভেতর আইন-শৃঙ্খলাগত এমন কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কিনা, যা যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন মুহূর্তে দুর্বলতার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে।

    ৫. ফৌজের সমরাস্ত্র তার প্রতিপক্ষের অনুপাতে মানসম্মত এবং নির্ভরযোগ্য কি না।

    ৬. ফৌজের অফিসার ও সৈনিকবৃন্দ অস্ত্র-শস্ত্র সঠিক ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার যোগ্যতা রাখে কি না।

    অধিনায়কত্ব (Leadership)

    প্রধান সেনাপতির নেতৃত্বদানের ক্ষমতা তাঁর ব্যক্তিগত মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে থাকে। তবে তাঁর উপর তাঁর অধীনস্থ সেনানায়কদের আস্থা থাকা অপরিহার্য। আর এই নির্ভরতা ও আস্থা ক্রয়যোগ্য জিনিস নয়। একজন অধিনায়ক এই আস্থা ও নির্ভরতা তখনই লাভ করতে পারেন যখন তাঁর অধীনস্থ সেনানায়কগণ তাঁর যোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা, সংবেদনশীলতা, সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তি, স্থৈর্য ও সংহতি, সাহসিকতা, মানবতা, ভয়-ভীতিশূন্যতা প্রভৃতি গুণকে গভীরভাবে পরখ করে তবে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। যদি তারা তাঁকে নিজ দায়িত্ব পালনে গাফলতি করতে দেখে কিংবা নিজের উপর নিজের আস্থা থাকার ক্ষেত্রে শিথিল দেখতে পায় তাহলে তাঁর উপর তাদের আস্থাও শিথিল হয়ে পড়ে।

    অধিনায়ক নিজের উপর কেবল তখনই আস্থা স্থাপন করতে পারেন, যখন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যূহ রচনার কলাকৌশল তথা প্রতিরক্ষার মূলনীতিগুলো ভালভাবে আয়ত্ত করে নিতে সক্ষম হন। এসব মূলনীতি অদৃশ্য জগত থেকে জানা যাবে না; বরং প্রতিটি অধিনায়কের জন্য অপরিহার্য যে, যদি তিনি সেসব মূলনীতি যুদ্ধক্ষেত্রে শেখার সুযোগ না পেয়ে থাকেন তাহলে প্রতিরক্ষা ইতিহাস ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ভূগোল অধ্যয়ন করে যেন তা ভালভাবে শিখে নেন। সৌভাগ্যবশত তিনি যদি যুদ্ধক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকেন, তাহলে শান্তিকালীন সময়ে পুস্তক পাঠের মাধ্যমে সে অভিজ্ঞতাকে যেন আরো ধারালো করে তোলেন। এমনটি করলে তিনি প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত মূলনীতিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করার পদ্ধতি শিখে যাবেন। যুদ্ধক্ষেত্র অধিনায়কের জন্য একটি পরীক্ষাস্থল। এই পরীক্ষায়, নেপোলিয়নের ভাষায়, কেবল তিনিই কৃতকার্য হতে পারেন, যিনি তার প্রতিরক্ষাগত যোগ্যতাকে গভীর অধ্যয়ন-অভিজ্ঞতা এবং চিন্তা-ভাবনা দ্বারা শানিত করে রাখেন। নেপোলিয়ন বলেছেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে আমার সাফল্যের গোপন রহস্য কোন দৈববাণীর ফল নয়; বরং আমার সাফল্যের রহস্য এই যে, প্রতিটি যুদ্ধের পূর্বেই আমি সে বিষয়টির প্রতিটি দিক গভীরভাবে ভেবে দেখি। যদি কোন বিষয় আমার অভিজ্ঞতায় না থাকে তাহলে আমি প্রতিরক্ষার ইতিহাস থেকে সে ব্যাপারে সাহায্য গ্রহণ করে থাকি।”

    অধ্যয়ন এবং গভীর চিন্তা-ভাবনা থেকে একটি বিশেষ পন্থায় অধিনায়কের ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনার জগত গড়ে ওঠে। এর কারণ এই যে, তিনি কেবল স্বীয় ফৌজের নেতৃত্ব দানের জন্য কৌশল উদ্ভাবন করেন না বরং সেই সাথে স্বীয় শত্রুর বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোর সঠিক তুলনামূলক বিচার করে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাও তৈরী করেন। চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণাকে সুশৃঙ্খল রূপদান প্রতিটি অধিনায়কের জন্য অপরিহার্য। আর এ কাজ কেবল সুবিন্যস্তভাবেই আঞ্জাম দেওয়া যেতে পারে। প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সহজ ও কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং অধ্যয়নের উপরই নির্ভরশীল।

    যুদ্ধের মূলনীতি (Principle of War)

    প্রতিরক্ষা ইতিহাস থেকে এটা পরিষ্কাররূপে প্রতিভাত যে, সফল ও কৃতি অধিনায়কদের বিজয় কতিপয় মূলনীতির কাছে আত্মসমর্পণের উপর নয় বরং সেগুলোকে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রয়োগ করার উপরই নির্ভর করে।

    এসব মূলনীতি প্রতিবারের ঘটনার নিরিখে নির্ধারিত হয়ে থাকে। অভিজ্ঞতা এবং প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ইতিহাস অধ্যয়নের ভিত্তিতে একজন যোগ্য ও সচেতন জেনারেল ঐসব ঘটনা থেকে প্রত্যেক বারই কার্যকর ও ফলপ্রসূ দিক-নির্দেশনা পেয়ে থাকেন এবং সেই অনুযায়ী প্রতিরক্ষানীতি সঠিক পন্থায় প্রয়োগ করে থাকেন। নিম্নে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির উল্লেখ করা গেল।

    লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল (Maintenance of Object)

    প্রতিটি অধিনায়ক—চাই তিনি বিশাল বাহিনীর অধিনায়ক হোন কিংবা ক্ষুদ্র কোম্পানীর সেনানায়ক, তাঁর সর্বপ্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য হ’ল, তিনি তাঁর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সঠিকভাবে অনুধাবন করার পর কোন কারণেই তা হাসিল করা থেকে সরে আসবেন না, বরং অটুট সংকল্প ও সংহতির সঙ্গে তা হাসিল করার জন্য কোশেশ করবেন।

    সমাবেশ (Concentration)

    সৈন্য সমাবেশের পেছনে প্রতিরক্ষা নীতির দিক দিয়ে উদ্দেশ্য থাকে এই যে, সিপাহ্‌সালার তাঁর ফৌজের বড় বড় অংশগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্রের সেই নির্ধারিত স্থানে এবং নির্ধারিত সময়ে একত্র করবেন, যেখানে এবং যে সময়ে তিনি শত্রুর উপর পরিপূর্ণ বিজয় লাভের আশা করেন।

    কেবল মানুষের সংখ্যাশক্তি নয়, বরং নীতি, সমরাস্ত্র, রসদ-সম্ভার, সরকারী বাহিনী, রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রভৃতিও সৈন্য সমাবেশের অন্তর্ভুক্ত।

    অন্য কথায়, এ শক্তির সবটুকুই জেনারেল তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে সেই স্থানে একত্র করবেন, যেখানে তাঁর শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত।

    প্রতিরক্ষাগত সংকোচন (Economy of Force) ও আক্রমণ এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ও সৈনাপত্য সম্পর্কে যিনি অভিজ্ঞ, তিনি প্রতিরক্ষাগত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে তা অর্জনের জন্য ছোট ছোট প্লাটুন ও কোম্পানীকে শত্রু ফৌজের বিরুদ্ধে লড়িয়ে থাকেন এবং অবশিষ্ট ফৌজকে রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে সংরক্ষিত রাখেন। এটা ঠিক সেরূপ—যেরূপ প্রতিটি মানুষ যৌবনের উপার্জন থেকে কিছু অংশ বার্ধক্য, অসুস্থাবস্থা অথবা দৈব দুর্ঘটনার জন্য বাঁচিয়ে রাখেন।

    শত্রুকে পরাভূত ও পর্যদস্ত করবার জন্য তার উপর সর্বাগ্রে হামলা করতে হবে। শত্রু প্রথমে হামলা করলে তার সাহস ও মনোবল বেড়ে যায় এবং সে ধারণা করে বসে যে, দুশমনের উপর নিজ পরিকল্পনা মাফিক সঠিক সময়ে ও নির্ধারিত জায়গায় সে কার্যকর আঘাত হানতে পেরেছে।

    আত্মরক্ষা নীতির উপর আমল করলে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ দীর্ঘকাল চালাতে থাকলে সাধারণত ফৌজের ভেতর হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়।

    অতর্কিত আক্রমণ (Surprise)

    আক্রমণকারী সিপাহ সালারের জন্য চূড়ান্ত ফলাফল লাভের ক্ষেত্রে অতর্কিত আক্রমণ একটি মোক্ষম অস্ত্র। এ ধরনের আক্রমণে শত্রুর মনোবল ও ধ্যান-ধারণার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং স্বল্প প্রাণহানির দ্বারাই শত্রুকে পরাভূত ও পর্যুদস্ত করা যায়।

    হেফাজত (Security)

    যতক্ষণ পর্যন্ত সিপাহ্‌সালার উপযোগী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন না করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি শত্রুর উপর অতর্কিত হামলা চালাতে পারেন না কিংবা তার হাত থেকে আত্মরক্ষা ও করতে পারেন না।

    অতএব দুশমনকে পরাজিত করবার জন্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা খুবই জরুরী, যাতে করে শত্রুর অসতর্কতার সুযোগে তাকে পাকড়াও করে একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া যায়।

    পারস্পরিক সহযোগিতা (Co-operation)

    যতক্ষণ না ফৌজের সকল সেনানায়ক, অতঃপর অধিনায়ক, অতঃপর রাষ্ট্রের মন্ত্রীবর্গ জনসাধারণের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত শত্রুর বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ জয়লাভ সম্ভব নয়। যেমন মোটরের চাকা যতক্ষণ পর্যন্ত সচল ও সক্রিয় না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল মোটরের ইঞ্জিন ঐ গাড়ীকে উদ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে পারে না।

    চলাচল ও গতিবিধির যোগ্যতা (Mobility)

    যে ফৌজের চলাচল ও গতিবিধি তার প্রতিপক্ষের তুলনায় শ্ৰেষ্ঠতর, সে ফৌজ তার দুশমনের প্রতিটি সামরিক চালকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।

    এখন আপনি উপরোল্লিখিত মূলনীতিগুলোকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের কর্মপন্থা ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করলে পরিষ্কার দেখতে পাবেন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে তিনি সবগুলো মূলনীতিকেই কার্যকরী করেছেন।

    তবে তিনি সবকিছুই একাকী করেন নি; বরং একজন পারদর্শী তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে বিভিন্ন কাজ বিভিন্ন জনের উপর সোপর্দ করেছেন। অতঃপর সবাই মিলে একাত্ম হয়ে গোটা কাজটি সম্পন্ন করেছেন। যেহেতু সেনানায়কবৃন্দ ছাড়াও গোটা ফৌজের উপর তাঁর পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা ছিল, তাই তাঁর বাহিনী ছোট হওয়া সত্ত্বেও বিশাল শত্রু বাহিনীকে পরাভূত করতে পেরেছে।

    অন্য কথায়, মুহাম্মদ বিন কাসিম আমাদেরকে শিখিয়ে দেন যে, যে অধিনায়ক আক্রমণ ব্যুহ রচনার কৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং যিনি কেবল নিজের উপরই আস্থা রাখেন না, বরং আপন সেনানায়কবৃন্দ ও গোটা ফৌজের উপরও আস্থা রাখেন, তিনি যখন দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিকল্পনা করেন, অতঃপর দৃঢ়সংকল্প হয়ে তা অনুসরণ করেন এবং স্বীয় পরিকল্পনার গোপন রহস্য শত্রু থেকে প্রচ্ছন্ন রেখে নির্ধারিত স্থানে এবং নির্ধারিত সময়ে স্বীয় ফৌজের সাহায্যে একই সঙ্গে সংঘবদ্ধ অতর্কিত হামলা চালান, সাধারণত সাফল্য তাঁর পদ চুম্বন করেই থাকে।

    প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা (Plan)

    মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুনদ পার হবার পরিকল্পনা অত্যন্ত সহজ, সরল ও কার্যকর পদ্ধতিতে তৈরী করেছিলেন। তিনি পূর্বাহ্নে দুশমনের মনে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মান যে, তিনি এমন জায়গা দিয়ে সিন্ধু পার হবেন, যেখানে পানি কম। সেজন্য রাজা দাহিরের ফৌজ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে সব জায়গারই হেফাজত করতে থাকে। কিন্তু ইবন কাসিম সিন্ধুনদের বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে শেষাবধি গভীর পানির একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে নেন। তারপর অত্যন্ত প্রচ্ছন্নভাবে নৌকা তৈরী করেন। নৌকা তৈরী হয়ে গেলে সেগুলো একত্রে বেঁধে দেন। অতঃপর এক রাতেই পুল তৈরী করে গোটা সেনাবাহিনী সমেত সিন্ধু পার হন। রাজা দাহির বিষয়টি তখন জানতে পারেন, যখন আরব ফৌজ তার উপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে—অর্থাৎ মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রথমে এই মর্মে তাঁর লক্ষ্য স্থির করেন যে, তিনি রাজার ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়ে তাকে পরাজিত করবেন। অতঃপর আনুষঙ্গিক অবস্থা অর্থাৎ সিন্ধু পার হবার রাস্তা, সেখানকার জমি, রাজা দাহিরের রক্ষক ফৌজ প্রভৃতির সঠিক পরিমাপ করে সম্মুখপানে অগ্রসর হন।

    রাজা দাহির যখন রাজা গোপীর অধীনে একটি বিশাল সেনাবাহিনী সিন্ধুনদের পারে পাঠিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমের পশ্চাদ্দেশে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালান এবং সেই সঙ্গে রাজা বেট-এর বিরুদ্ধে অপর একটি বাহিনী পাঠান তখন মুহাম্মদ বিন কাসিম স্বীয় লক্ষ্য হাসিল অর্থাৎ সিন্ধুনদের অপর পারে গিয়ে রাজা দাহিরকে পরাজিত করার লক্ষ্যে স্বীয় ফৌজের সর্বোত্তম পরিমাপের সামরিক গতিবিধির যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে পশ্চাদ্দেশের বিপদ দূরীভূত করেন। রাজা গোপীর বিরুদ্ধে তিনি নিজেই তাঁর ফৌজের একটি বড় অংশ নিয়ে অগ্রসর হন। সেই সাথে অশ্বারোহী বাহিনীর কয়েকটি কোম্পানী বিভিন্ন স্থানে—যেখানে বিপদ খুবই প্রকট আকারে দেখা দেওয়ার আশংকা ছিল— বিদ্যুৎ গতিতে পাঠিয়ে দেন। ফৌজের বিশাল অংশের সঙ্গে ঐ সব কোম্পানীর পরিপূর্ণ যোগাযোগ ছিল। যেহেতু সেনানায়কবৃন্দের উপর সিপাহ্‌সালারের এবং সিপাহ্‌সালারের উপর সেনানায়কদের আস্থা ছিল, তাই রাজা গোপীর সেনাবাহিনী কোনরূপ লড়াই ব্যতিরেকেই ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। এর পর মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর সামরিক গতিবিধিকে স্বীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাদির মাধ্যমে এমনই গোপন রাখেন যে, যখন তিনি তাঁর ফৌজ নিয়ে রাজা জয়চাঁদ এবং তাঁর সহযোগী রাজা রাসেলের দিকে অগ্রসর হন, তখন তারা উভয়েই এই আকস্মিক হামলায় পর্যুদস্ত হয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম, আলেকজাণ্ডার এবং নেপোলিয়ন

    যোগ্যতার দিক দিয়ে উপরোল্লিখিত তিনজন জেনারেলকে আমরা একই কাতারে দেখতে পাই। তিনজনই নিজ নিজ শাস্ত্ৰে অভিজ্ঞ, নির্ভীক, দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী এবং বীর অধিনায়ক ছিলেন। ভয় তাঁদের কাছে ঘেষতেই পারত না।

    মহান আলেকজাণ্ডার

    সৌভাগ্যবশত আলেকজাণ্ডারের নিকট তাঁর পিতা ফিলিপ সর্বোত্তমভাবে শিক্ষিত একটি ফৌজ এবং ধনসম্পদে পরিপূর্ণ একটি রাজকোষ রেখে গিয়েছিলেন। সম্রাট ফিলিপের মৃত্যুর পর তাঁর জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ছিল এবং তাদের অন্তর ছিল দেশপ্রেমে ভরপুর। আলেকজাণ্ডারের সাথে দার্শনিক শ্রেষ্ঠ এ্যারিস্টটলের মত পরামর্শদাতাও ছিলেন। গ্রীকদের মনোবলও ছিল বিরাট। কিন্তু শেষাবধি অনেকগুলো বিজয়ের পর আলেকজাণ্ডারের ফৌজ তাঁর প্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আলেকজাণ্ডারকে পাশ্চাত্য বিশ্ব ‘মহান আলেকজাণ্ডার’ উপাধি দিয়েছে বটে, তবে এমন একজন জেনারেল—যিনি তাঁর ফৌজকে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা থেকে সরিয়ে রাখতে অক্ষম—তিনি কি করে ‘মহান অধিনায়ক’ উপাধি পেতে পারেন, তা অবশ্যই বিবেচনাসাপেক্ষ।

    হতভাগ্য নেপোলিয়ন

    নেপোলিয়ন আলেকজাণ্ডারের চাইতে বেশী প্রশংসা পাবার যোগ্য। কেননা উত্তরাধিকারসূত্রে না তিনি অর্থবিত্ত পেয়েছিলেন, না পেয়েছিলেন সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ফৌজ। তাঁর জাতিও সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল ছিল না। তবে তাদের মধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম জাতি হবার মত আবেগ ও উদ্দীপনা বিদ্যমান ছিল। আর সেজন্য নেপোলিয়ন অল্প সময়ের মধ্যে একটি সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ফৌজ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

    এই ফৌজের মাধ্যমে বিজয়ের পরিধি বিস্তৃত হবার সাথে সাথে সমগ্র জাতি সম্পদশালী হয়ে ওঠে। ফলে তাদের মধ্যে আরামপ্রিয়তা দেখা দেয়। এমনকি স্বয়ং নেপোলিয়নও বিলাসপরায়ণ ও আরামপ্রিয় ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন। তাঁর এই আচরণ অধীনস্থ লোকদেরকে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত করে তোলে! আস্তে আস্তে অধিনায়কবৃন্দ এবং তাদের সৈনিকেরাও প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হয়। তারা তাদের প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনা পূরণের নিমিত্তে লুটপাট এবং অন্যান্য দুষ্কর্মে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী স্বাভাবিক-ভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

    নেপোলিয়ন দিগ্বিজয়ী তৈমুরকে অনুকরণ করতে গিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন এবং মস্কো পর্যন্ত রাশিয়ানদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যান। কিন্তু প্রাকৃতিক দুশমন—সর্দি ও বরফপাত—তাঁর আরামপ্রিয় ফৌজের কাল হয়ে দাঁড়ায়। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ তৈমুর বরফ-গুলীর তীব্রতা সহ্য করতে পেরেছিলেন, কিন্তু যুবক নেপোলিয়ন ও তাঁর ফৌজ তা সহ্য করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন।

    সেজন্য আমরা নেপোলিয়নকে ‘মহান শ্রেষ্ঠ অধিনায়ক’ হিসাবে মেনে নিতে পাশ্চাত্য বিশ্বের সঙ্গে একমত নই।

    মহান বিজয়ী মুহাম্মদ বিন কাসিম

    এবার মুহাম্মদ বিন কাসিমকে দেখুন। তিনি মাত্র কয়েক হাজার মুজাহিদ, যারা বিভিন্ন কারণে জিহাদ পরিচালনার অনেকগুলো সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল—সঙ্গে নিয়ে জিহাদে বের হয়েছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম সেই যুগে অধিনায়ক হন—যখন ইসলামী বিশ্ব ছিল একটি বিরাট বিপ্লবের শিকার। মুসলিম খলীফা খুবই কষ্টের সঙ্গে তাঁর দেশবাসীকে সঠিক পথে এনেছিলেন বটে, তবে সঠিক অর্থে শান্তি-শৃঙ্খলা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম বিভিন্ন স্থান এবং বিভিন্ন গোত্র থেকে মুজাহিদ সংগ্রহ করেন। তিনি তাদেরকে কেবল সামরিক প্রশিক্ষণ‍ই দেন নি—বরং সঠিক অর্থে তাদেরকে মুজাহিদরূপে গড়ে তুলেছিলেন। আর তাও করেছিলেন মাত্র কয়েক মাসের ভেতর। তাঁর নিকট টাকা-পয়সা ছিল সীমিত। ছোট একটি বাহিনী নিয়ে দূর-দূরান্তরে যাত্রা। শত্রু দেশের বাসিন্দারাও ছিল তাঁর কট্টর শত্রু। কেননা তারা মুসলমানদেরকে ম্লেচ্ছ ও অপবিত্র জ্ঞান করত। এতদ্‌সত্ত্বেও এই মহান জেনারেল কেবলমাত্র একজন বিজেতা ভূমিকাই পালন করেন নি—বরং আঁ হযরত (সা)-এর সত্যিকার শাগরিদ হিসাবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি দুশমনকে কেবল নৈতিক ও পার্থিব দিক দিয়েই পরাজিত করেন নি, বরং মানসিক দিক দিয়েও পরাজিত করে তাদেরকে আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর সংশ্রবে এসে সিন্ধুর অনেক অধিবাসী নিজে থেকেই মুসলমান হয়ে যায়। এভাবে ইসলামের সাথে তাদের চিরন্তন সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের ছায়াতলে তারা দলে দলে আশ্রয় নেয়। এ কারণেই আমরা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে বিশ্বের মহান শ্রেষ্ঠ অধিনায়কদের মধ্যে গণ্য করি। বিজয় তাঁকে আত্মগর্বী ও উদ্ধত স্বেচ্ছাচারীতে পরিণত করতে পারেনি, সম্পদ তাঁকে বৈষয়িক করে তুলতে পারেনি, প্রবৃত্তি তাঁর উপর শাসন চালাতে পরে নি; বরং বিজয় যতই তাঁর পদচুম্বন করেছে, ঈমান ও আমলের দিকে দিয়ে তিনি ততই উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছেন এবং একজন নজীরবিহীন মু’মিন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেষাবধি তিনি দুর্ভাগ্যজনক পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। কিন্তু যখন তাঁকে বন্দী করা হ’ল এবং নিজের মৃত্যু সম্পর্কে তিনি স্থির নিশ্চিত হয়ে গেলেন—এমন মৃত্যু যা ছিল বিনা দোষে এবং অকারণে—তখনো এই মর্দে মুজাহিদ তাঁর এতটুকু অসন্তোষ প্রকাশ করেন নি, অভিযোগের একটি বাক্যও তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় নি; বরং এরূপ ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর বিরোধীদের উদ্দেশ্যে নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন:

    “লোকে আমাকে নষ্ট করে দিল। কোন্ যুবককে নষ্ট করল? সেই যুবককে যে তাদের বিপদের দিনে কাজে লেগেছিল এবং সীমান্তের দৃঢ়তা বিধানে যে ছিল উপযোগী।”

    ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন।

    দুশমন

    বি. দ্র. : উপরের চিত্রটি বর্তমান পুস্তকের ৫২ পৃষ্ঠার “ছাউনী এবং পদ্ধতি” শিরোনামের অধীনে ১ম প্যারার নীচে যাবার কথা ছিল। ব্লকটি যথাস্থানে দিতে না পারায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পাঠক আমাদের এই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি ক্ষমা করবেন বলে আশা করি। — অনুবাদক!

  • দূর্গপতন

    দূর্গপতন

    যে রাতে আলী বিন সুফিয়ান সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে বলছিলেন, যুদ্ধ থেকে আগত সেনাবাহিনী মিশরে অবস্থানরত সৈন্যদের ওপর রেগে আগুন হয়ে আছে, সেই রাতে এক রহস্যময় পীর কায়রো থেকে বহু দূরে একটি খেজুর বাগানে তাবু টানিয়ে বসেছিলেন। তার একটা নিয়ম ছিল, তিনি দিনের বেলা এবং চাদনী রাতে কারো সাথে দেখা করতেন না। অন্ধকার রাত তার কথা বলার ও সাক্ষাতের সময়। তার মাহফিল অসংখ্য মোমবাতির আলোয় এমনভাবে সাজানো হতো, যেখানে আলো-আধারীর রহস্যময় এক জগত তৈরী হয়ে যেতো। সেই আলোর প্রভাব উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে যাদুর মত কাজ করতো। –

    তিনি যেখানে তাবু টানিয়ে দলবল নিয়ে বসেছিলেন, তার অদূরেই গ্রামের ভক্তকুল বসেছিল তাজিমের সাথে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মিশরীয় মুসলমান, কিছু ছিল সুদানী হাবশী। সেই গ্রামে একটি মসজিদ ছিল। মসজিদের ইমাম ছিলেন একজন শান্তশিষ্ট নিরীহ আলেম। এক যুবক দু’মাস যাবত তার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করতে আসতো। যুবকের নাম মাহমুদ। সে দূরের একটি গ্রাম থেকে আসতো। পড়ার প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ।

    তবে তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ ছিল, সেই গ্রামের একটি মেয়ের প্রতি। মেয়েটির নাম সাদিয়া।

    সাদিয়াও ভালবাসতো মাহমুদকে। প্রায় প্রতিদিনই মাহমুদের আসার পথে এক উপত্যকার ঢালে মেয়েটি বকরী চড়াতো এবং মাহমুদ এলে তাকে তার বকরীর দুধ পান করতে দিতো।

    গ্রাম থেকে দূরে সেই নির্জন চারণভূমিতেই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সাদিয়া সেখানে তার চারটি বকরী ও দুটি উটকে তখন পানি পান করাচ্ছিল। মাহমুদ পিপাসায় কাতর হয়ে পানি পান করার জন্য এগিয়ে গেল মেয়েটির কাছে। সাদিয়া তার হাতে পানি তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথেকে এসেছেন?’

    ‘আমি!’ বলল মাহমুদ, অই ওদিক থেকে।

    যাবেন কোথায়?”

    মাহমুদ উল্টো দিকে ইশারা করে বলল, ওদিকে।

    সাদিয়া মাহমুদের কথা শুনে হেসে উঠল, বারে! জায়গার কোন নাম নেই?”

    নাম দিয়ে কি করবে তুমি? এ দুনিয়ার সবটাই আল্লাহর, আর আমি তার খলিফা। মানে, এ দুনিয়াটাই আমার। ফলে আমার যেখানে খুশি সেখানে যাবো, তাতে তোমার কি?’ মাহমুদের এমন আজব উত্তরে খিলখিল করে হেসে উঠল সাদিয়া।

    ‘হাসলে কেন?”

    “তওবা, তওবা! সাদিয়া তার দু’গালে মৃদু চাপড় দিয়ে বললো, তাইতো! কত বড় আস্পর্ধা আমার! ছোটখাট কোন দেশের বাদশার সামনে হাসাই যেখানে বেয়াদবী, সেখানে দুনিয়ার সম্রাটের পাশে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি! না, না, এ মহা অন্যায়। হুজুর আমাকে মাফ করে দিন। ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাত জোড় করল সাদিয়া।

    এবার হেসে উঠল মাহমুদও, বাহ! আমাকে একেবারে সম্রাট বানিয়ে দিলে!’

    এভাবেই ওদের প্রথম আলাপ পরিচয় হয়। মাহমুদ মুসলমান শুনে সাদিয়া তার সাথে অন্তরঙ্গ ব্যবহার করে। খুশি। হয়। তার চোখে মুখে সে খুশির ঝিলিক দেখতে পায় মাহমুদ। ঠোঁটে দেখতে পায় লাজরাঙা মধুর হাসি। দু’জনেরই দু’জনকে ভাল লেগে যায়। আলাপ জমে ওঠে।

    মাহমুদের কথা শুনতে খুব ভাল লাগছে সাদিয়ার। ও তার বলার ভঙ্গিতে মুসলিম সৈন্যদের সম্পর্কে আগ্রহ ও সমর্থন প্রকাশ পাচ্ছিল। .

    সে যখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সম্পর্কে প্রশ্ন করলো, তখন মাহমুদ তার উচ্ছসিত প্রশংসা করলো। সাদিয়া জানতে চাইলো, যিনি,আকাশ থেকে নেমে এসেছেন এবং মৃতকে জীবিত করতে পারেন সেই পীরের চেয়েও কি তিনি বেশি কামেল ও মহাপুরুষ?

    সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী কোন মৃতকে জীবিত করতে পারেন না। উত্তরে বলল মাহমুদ, তিনি পৃথিবী থেকে অন্ধকার ও অশান্তি দূর করে মানুষকে শান্তি ও আলোতে নিয়ে আসেন।

    সাদিয়া বললো, তবে যে শুনেছি, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী একজন খুনি। তিনি নাকি হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর। সুযোগ পেলেই তিনি মানুষ হত্যা করেন?

    তোমাকে কে বললো তিনি লোকজনকে হত্যা করেন?

    ‘আমাদের গ্রাম দিয়ে যে সব পথিক যাওয়া আসা করে তাদের মুখে শুনেছি। তারা বলে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব খারাপ লোক। তার দীলে কোন রহম নেই। এমনিতে সে নাকি খুব ভালো ভালো কথা বলে। আমাদের মত নামাজ রোজাও করে। কিন্তু হিংস্রতাই নাকি তার সব ভাল কাজ বরবাদ করে দিয়েছে।’

    তোমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব কি বলেন?’ মাহমুদ প্রশ্ন করলো।

    তিনি অন্য রকম বলেন, বলল সাদিয়া। তিনি বলেন সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী ইসলামের আলো সমগ্র মিশর ও সুদানে বিকশিত করতে এসেছেন। আর ইসলামই আল্লাহর একমাত্র সত্য দ্বীন।

    সাদিয়ার কাছ থেকেই সে জানতে পারলো, তাদের গ্রামে ইদানিং এমন সব লোক আসা যাওয়া করে, যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও তাদের আচার আচরণে ইসলামের নমুনা পাওয়া যায় না। তারা এমন সব কথা বলে, যাতে মানুষের মনে ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে যায়। তারা বলে, সমাজ ও সভ্যতা কখনো এক জায়গায় বসে থাকে না। সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবন যাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদেরও সময়ের সাথে এগিয়ে যেতে হবে। শুধু ইসলাম নিয়ে বসে থাকলে হবে না।

    আমার এক চাচা জিজ্ঞেস করেছিল, কেন হবে না?’

    তারা বললো, “কেমন করে হবে? আপনি কি কোরআনের কোন শব্দ পাল্টাতে পারবেন? যদি না পারেন তবে পুরোনো কোরআনকে জীবন বিধান মেনে নিয়ে আপনি কি করে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলবেন?

    চাচা বললেন, “তাহলে কি আমরা কোরআন ছেড়ে দিব, ইসলাম ছেড়ে দিব”?

    ‘না, না, তা ছাড়বেন কেন? আমরা কি তাই বলেছি। আমরা কি মুসলমান নই? আমরা কোরআন পড়বো, নামাজ রোজাও করবো। কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্যসহ দুনিয়াবী কাজে ইসলামকে টেনে এনে অপবিত্র করবো না। রাজনীতিতে ইসলামকে জড়াবো না। তাহলে ইহকালও রক্ষা পাবে, পরকালও রক্ষা পাবে। রাসূল যখন দুনিয়ায় এসেছিলেন তখন তিনি সে সময়ের আলোকে জীবন ধারণ করেছেন, আমরাও আমাদের সময়ের দাবীকে উপেক্ষা করতে পারি না, এ কথাই আমরা বলতে চাচ্ছি।”

    ‘সময়ের দাবী কি?” চাচা জিজ্ঞেস করেছিলেন।

    সময়ের দাবী হচ্ছে, এখন মানুষ অনেক সভ্য হয়েছে। পাঁচশো বছর আগে মানুষ যেমন বর্বর ছিল এখন আর তেমন নেই। এমন অনেক সমস্যা আছে যা আমরা আলাপ আলোচনা করে সমাধান করতে পারি। এ জন্য অহেতুক যুদ্ধের কোন দরকার পড়ে না। দুশমন বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে তা ফিরিয়ে দেয়া অনুচিত। দিলে তাতে নিজেরই ক্ষতি হয়। মারামারিতে কখনো এক পক্ষ মরে না, দু’পক্ষই মারা পড়ে তাতে। তাই কারো সাথে শক্রতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব এ নীতি গ্রহণ করে অশান্তির পরিবেশ থেকে ফিরে আসাই এখন সময়ের দাবী।”

    মাহমুদ সাদিয়ার সাথে আলাপ করে অনেক কিছুই জানতে পারলো। বুঝলো, ইসলামের পক্ষে যারা কাজ করছে তাদের চরিত্র হননের কাজে নেমেছে দুশমন। আর কেউ না জানুক, মাহমুদ তো জানে সুলতান আয়ুবীর মনে মানুষের জন্য কী অপরিসীম দরদ নিজের জীবন বিপন্ন করে আইয়ুবী এত যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন তা কেবল মানুষ ও মানবতার কল্যাণের জন্য। ধন-দৌলত বা অন্য কিছুর জন্য তাঁর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোন দরকার নেই।

    সাদিয়াকে সে বলল, সাদিয়া, তুমি যা শুনেছো সবই ৷ ভুল। ইসলামের দুশমনদের মিথ্যা প্রচারণা। যারা এসব কথা বলেছে তারা মুসলমান কি অমুসলমান আমার জানা নেই। হয়তো জন্মসূত্রে তারা মুসলমান। কিন্তু মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই কেউ মুসলমান হয়ে যায় না। তুমি জানো, নূহ নবীর সন্তান কেনান ইসলাম গ্রহণ করেনি। ফলে নবীর সন্তান হয়েও সে মুসলমান হতে পারেনি। অন্য দিকে হাজার হাজার কাফের ইসলামের নীতি ও আদর্শকে গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে।

    আজকে যারা ইসলামের শত্রুদের চক্রান্তে পড়ে কোরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে কথা বলছে, যতই তারা নামাজ রোজা করুক, নিজেদের মুসলমান বলে দাবী করুক, তারা যে ইসলামের স্বপক্ষ শক্তি নয় এতে কোন সন্দেহ নেই! ইসলামের বিপক্ষ শিবিরে অবস্থান করে এবং ইসলামের বিপক্ষ শিবিরে থেকে কেউ মুসলমান থাকতে পারে বলে আমার জানা নেই। মোনাফিকদের অবস্থান নাকি কাফেরের চাইতেও নিচে। কাল হাশরের মাঠে এদেরকে মুসলমানের দলে রাখা হবে, না মোনাফিকের দলে, সে চিন্তা আমার নয়, যারা এ কাজ করছে তারাই করুক। আমি শুধু বলবো, এরা এখন যা করছে তা ইসলামের জন্য ক্ষতিকারক।

    কিন্তু খুন খারাবি তো আসলেই খারাপ। তুমি কি মারামারি সমর্থন করে?

    সাদিয়া তুমি তো জান পৃথিবীতে মহানবী (স) এর চেয়ে দয়ালু কোন মানুষ আজ পর্যন্ত আসেননি এবং ভবিষ্যতেও আসবেন না। কেবল মিত্র নয়, নিজের আত্মীয়স্বজন নয়, সঙ্গী সাহাবী নয়, পৃথিবীর সব মানুষকে ভালবাসতেন তিনি। এমনকি শক্রকেও। তাইতো তাঁকে কাহিনী ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। যে বুড়ি প্রতিদিন তাঁর চলার পথে কাঁটা দিত, অসুখের সময় তাকেও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন রাসূল। তুমি কি খুনি বলে ঘৃণা করবে। এই মহামানবকে?’

    মাহমুদের কথায় অবাক হয় সাদিয়া, কেন? তাঁকে ঘৃণা করবো কেন? তিনি তো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মানুষ। শুধু মুসলমানরাই নয়, অনেক অমুসলমানও তাঁকে শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে।”

    মাহমুদ বলে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী যেমন মানুষ হত্যা করে, যুদ্ধ করে, তিনিও জীবনে তেমনি অসংখ্য যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করলেই কেউ খুনি হয় না, বরং যুদ্ধ করে মানবতার শক্রদের বিনাশ না করলে অন্যায় হয়। আইয়ুবীও তেমনি মানবতার শক্ৰদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ইসলামের দুশমনরা তাই তাঁকে দেখতে পারে না, তাঁকে খুনি, সন্ত্রাসী বলে সমাজে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়।’

    মাহমুদের কথায় সাদিয়ার মনের সব সন্দেহ দূর হয়ে যায় |

    মাহমুদ বলে, ‘চলি সাদিয়া। আল্লাহ চাইলে আবার আমাদের দেখা হবে।’

    মাহমুদের মিষ্টি ব্যবহার এবং তার ব্যক্তিত্ব সাদিয়ার কোমল মনে গভীর রেখাপাত করে। মাহমুদের ভাষার মাধুর্য ও চিন্তার স্বচ্ছতায় বিস্ময়বোধ করে সে। আবারো তার সাথে কথা বলার জন্য অধীর হয়ে উঠে তার মন। বলে, “আমি প্রতিদিন বেশির ভাগ সময় এখানেই বকরী ও উট চরাতে আসি। যদি এ পথে কখনো আসেন দেখা করে গেলে খুশি হবো।’

    ‘অবশ্যই তোমার সাথে দেখা করবো আমি।’ বলল মাহমুদ।

    মাহমুদ সাদিয়ার হৃদয়ে এক অশান্ত ঢেউ তুলে চলে গেল সেখান থেকে। একাকী, পেরেশান অবস্থায় সাদিয়া তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘কে তুমি যুবক? কোথেকে এলে তুমি আমার মনোবীণায় সুর বাজাতে! আমার হৃদয় সাগরে অশান্ত ঢেউ জাগাতে? তোমার পোষাকপরিচ্ছদ এ অঞ্চলের মত হলেও তোমার চেহারা, তোমার আকৃতি, তোমার কথা বলার ভঙ্গি বলে, তুমি এ অঞ্চলের কেউ নও।

    সাদিয়ার সন্দেহ সত্য ছিল। মাহমুদ বিন আহমদ কোন পল্লী এলাকার মানুষ ছিল না। সে ছিল আলেকজান্দ্রিয়া শহরের বাসিন্দা। আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের একজন চৌকস কর্মী। কয়েক মাস ধরে তার দায়িত্ব পড়েছে সীমান্ত এলাকায়। সেই থেকে সে এই পল্লী অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    নিজের পরিচয় সে যথেষ্ট গোপন রেখেছিল। তার সাথে আরও কয়েকজন গোয়েন্দা এ অঞ্চলে কাজ করছে। তারাও বিভিন্ন বাহানায় ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামে গ্রামে। মাঝেমধ্যে তারা একত্রে মিলিত হয়। তারা যে সব খবর সংগ্রহ করতে পারে তা নিয়মিত এক সার্থীকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় কায়রো। এভাবেই আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দারা সীমান্ত এলাকায় এক অদৃশ্য গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

    সাদিয়াদের পাশের গ্রামের দু’টি মসজিদের ইমামের ব্যাপারে সে এরই মধ্যে সন্দেহজনক খবর পেয়েছে। জানা গেছে, ওই দুই মসজিদে নতুন ইমাম এসেছে। আগে এই দুই মসজিদে কোন বাঁধাধরা ইমাম ছিল না। গ্রামের মরুকবীদের যিনি যখন উপস্থিত থাকতেন তিনিই নামাজ পড়াতেন।

    নতুন ইমাম এসে জিহাদের বিরুদ্ধে ওয়াজ শুরু করল। কুরআনের আয়াত পাঠ করে তার ভুল তাফসীর ও ব্যাখ্যা দিতে লাগল। রহস্যময় পীরকে তারা সত্য বলে প্রচার করল এবং পীরের সাথে দেখা করে ফয়েজ ও বরকত লাভের উপদেশ দিতে লাগল জনগণকে। মাহমুদ এই ইমাম দু’জনের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কায়রো রিপোর্ট পাঠিয়েছে।

    সাদিয়ার কাছ থেকে জানতে পারল তাদের গ্রামের ইমাম সুলতান আইয়ুবীর ভক্ত এবং ইসলামের নিশানবাহী। এ খবর শুনে সে খুব খুশি হলো। মনে মনে ভাবল, সাদিয়ার তথ্য কতটা সঠিক একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

    সে সাদিয়াদের গ্রামের মসজিদে গিয়ে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করলো। ইমাম সাহেবকে মাহমুদ বললো, ‘আমি ধর্মীয় জ্ঞান লাভের জন্য উস্তাদ খুঁজে বেড়াচ্ছি। আপনি কি কষ্ট করে আমাকে একটু দ্বীনি তালিম দেবেন?

    ইমাম সাহেব মাহমিদের প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে বললেন, যুবক, তোমার প্রস্তাব আমি সানন্দে কবুল করলাম। দ্বীনি তালিম নেয়ার প্রতি তোমার আগ্রহ দেখে আমি খুবই খুশি হয়েছি। ইচ্ছে করলে তুমি কাল থেকেই তালিম নিতে আসতে পারো।

    পরের দিন থেকেই মাহমুদ নিয়মিত ইমামের কাছে তালিম নিতে শুরু করল।

    ইমাম সাহেব মসজিদে একাই থাকতেন। ইসলামের সঠিক শিক্ষা জনগণের মধ্যে প্রচার করায় পীরপন্থী লোকেরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। মুসল্লীদেরকে উত্তেজিত করতে লাগল তারা। তিনি অনুভব করলেন, মুসল্লীদের উত্তেজিত করার এ কাজে খৃস্টানদের অনুচররাও সক্রিয়। ক্রমেই অবস্থার অবনতি ঘটতে লাগল। এক সময় জীবনের নিরাপত্তা নিয়েই শংকিত হয়ে পড়লেন তিনি। ভাবলেন, এখন তার একজন সঙ্গী দরকার।

    একদিন তিনি মাহমুদকে বললেন তুমি ইচ্ছা করলে এখানেই থাকতে পারো। তাতে তোমার পড়াশোনার সুবিধা হবে।’

    মাহমুদের পক্ষে সারাদিন মসজিদে আটকে থাকা সম্ভব ছিল না। সে ইমাম সাহেবকে বললো, দু’তিন দিন পর পর বাড়ী যাওয়ার সুযোগ পেলে এখানে থাকতে আমার আপত্তি নেই।’

    ইমাম সাহেব একটু হাসলেন এবং জানতে চাইলেন, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’

    মাহমুদ ইমাম সাহেবের কাছে তার আসল ঠিকানা বলল না। সে বেশ দূরের সীমান্তবতী একটি গ্রামের নাম বলে দিল।

    ইমাম সাহেব এবার জোরে হেসে ফেললেন এবং আস্তে করে বললেন মাহমুদ বিন আহমদ আমি তোমার বুদ্ধিমত্তায় ও তৎপরতায় খুবই খুশি। দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের প্রত্যেকেরই এমন সজাগ ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আমি আগেই শুনেছিলাম, আলেকজান্দ্রিয়ার মুসলমানরা দায়িত্বের ব্যাপারে খুবই নিষ্ঠাবান ও নির্ভরশীল হয়। তোমাকে দেখে এর সত্যতার প্রমাণ পেলাম।”

    মাহমুদ এমন চমকে উঠলো যে, ভয় পেয়ে সে দাঁড়িয়ে গেল। সে মনে করল, ইমাম সাহেব ক্রুসেডের চর এবং তার কাছে তার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে। সে মুহুর্তে আকস্মিক হামলা মোকাবেলা করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেল। ইমাম সাহেব কথা শেষ করলেও সে একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল এবং পেরেশান হয়ে ইমাম সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো, কোন দিক থেকে প্রথম আঘাতটা আসবে।

    ইমাম সাহেব তাকে বেশীক্ষণ এই সন্দেহের রাজ্যে থাকতে দিলেন না। তিনি বললেন, আমি অনুভব করছি, কমপক্ষে তোমার কাছে আমার গোপনীয়তা রক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আমিও তোমার মত আইয়ুবীর গোয়েন্দা বিভাগের একজন সামান্য খাদেম। তোমার যে সব সঙ্গী সাখী এ অঞ্চলে কাজ করছে তাদের প্রায় সকলকেই আমি চিনি। অবশ্য আমি জানি, আমাকে তোমরা কেউই চেনো না। কারণ, শক্রদের ওপর দৃষ্টি রাখার সাথে সাথে আমাদের গোয়েন্দাদের তৎপরতার ওপরও দৃষ্টি রাখা আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্ব পালনের জন্যই ইমাম হিসাবে এখানে আছি।’ –

    কিছু মনে করবেন না, আপনি যে পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করছেন তাতে আপনার আরো হুশিয়ার হওয়া উচিত। মাহমুদ আশ্বস্ত হয়ে বললো, ‘আমার কাজে আপনি খুশি হয়েছেন, কিন্তু আমার সামনে আপনি নিজেকে যেভাবে উন্মুক্ত করে দিলেন তাতে আমি খুশি হতে পারিনি। একটু অসতর্কতাই শত্রুর কাছে আপনার পরিচয় ফাঁস করে দিতে পারে।”

    আমি অসতর্ক নই মাহমুদ, আমি তোমার পরিচয় জানি।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তোমার কাছে আমার আসল রূপ প্রকাশ করার। আমার আরও দু’জন সঙ্গী ছদ্মবেশে এখানে জনসাধারণের সাথে মিশে আছে। আমার আরও লোকের প্রয়োজন। তুমি আমার কাছে চলে আসায় ভালই হয়েছে।

    এই গ্রামে শক্রদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তুমি হয়তো সে পীর সম্পর্কে শুনেছো, যে অজ্ঞাত ভবিষ্যতের খবর বলতে পারে আর মৃতদের জীবিত করতে পারে বলে গুজব ছড়াচ্ছে। এই গ্রামও সেই গুজবে মেতে উঠেছে। আমি গ্রামবাসীদের বলেছি, এসব মিথ্যা প্রচারণা, মৃত লাশের মধ্যে কেউ প্রাণ দিতে পারে না।”

    কিন্তু গুজব যাদুর মত ছড়িয়ে পড়ায় লোকেরা আমার কথায় কান দিচ্ছে না, আমার বিরুদ্ধে এখানে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। আমি এখন আরো সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি। ইদানিং তাই আর মসজিদ থেকে বেশি বের হই না। এ ব্যাপারেই তোমাকে আমার পাশে দরকার।

    আমার এখন সঙ্গী প্রয়োজন। এখানকার যে সব লোককে ধোঁকায় ফেলে বিপথগামী করা হচ্ছে তাদেরকে ইসলামের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যই এ সঙ্গী দরকার আমার। তোমাকে একটা ঘটনার কথা বলি, পনেরো বিশ দিন আগে রাতে আমার কাছে দু’জন লোক আসে। আমি তখন হুজরাখানায় একা ছিলাম। লোক দু’জনের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। তারা আমাকে হুমকি দিয়ে বললো, এখান থেকে চলে যাও।

    আমি বললাম, কোথায় যাবো! আমার যে কোন ঠিকানা নেই।’

    তারা বললো, যদি এখানে থাকতে চাও তবে তালিম দেয়া বন্ধ করো আর সেই পীরের কথা বলো, যিনি আকাশ থেকে খোদার সঠিক দ্বীন নিয়ে এসেছেন।

    আমি মুখোশপরা ওই আগন্তুক দু’জনের সাথে মোকাবেলা করতে পারতাম। অন্ত্র আমি সবসময় সাথেই রাখি। কিন্তু আমি দু’জনের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের হত্যা করলে কিংবা নিজে আহত বা নিহত হলে তো আর সমস্যা মিটে যাবে না। আমি তাই খুব ধীরস্থিরভাবে চিন্তাভাবনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বললাম, ঠিক আছে, আজ থেকে তোমাদের কথা মতই চলবো। আমাকে নিজেদেরই একজন মনে করতে পারো এখন থেকে।

    তারা বললো, এ ওয়াদা মত চললে তুমি তোমার কাজের যথাযোগ্য পুরস্কার পাবে। তোমাকে আর হত্যা করার দরকার হবে না। তার বদলে তুমি পাবে ধন-দৌলত, অঢেল স্বর্ণমুদ্রা।

    ‘তারপরে কি আপনি আপনার ওয়াজের স্টাইল পাল্টে ফেলেছেন?” মাহমুদ প্রশ্ন করে।

    যতটুকু পারা যায়। ইমাম সাহেব বললেন, “আমি এমনভারে কথা বলি যাতে দু’কুলই রক্ষা পায়। স্বর্ণমুদ্রা লাভের আশায় নয়, সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই এ কৌশল গ্রহণ করতে হয়েছে আমাকে।

    তিনি আরো বললেন কি করে তোমাদের খবর দেবো এ নিয়ে আমি পেরেশান ছিলাম। তোমাকে ও তোমার সাখীদের খুঁজে বেড়াতে বাইরে গেলে তাতে সবারই জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যেতো। এ জন্য আল্লাহ নিজেই তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যেদিন থেকে আমার কাছে তুমি তালিম নেয়া শুরু করেছো সেদিন থেকেই আমার মস্তবড় একটা দুর্ভাবনা দূর হয়ে যায়।’

    ‘আপনি কি রাতে একাই থাকেন?”

    ‘হ্যাঁ, পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় আমার একা থাকা ঠিক হচ্ছে না। তার চেয়ে তুমি কেউ কিছু মনে করবে না।

    জ্বি, আপনি ঠিকই বলেছেন।

    গ্রামে দুশমনের তৎপরতা খুবই বেড়ে গেছে। এদের মোকাবেলা করার জন্য আমার এখন শক্তির প্রয়োজন। গ্রামে আমার কিছু ভক্ত আছে, ওরা আমার সাথে সহযোগিতা করবে। এদিকে তোমরা থাকায় সে শক্তি আরো বৃদ্ধি পেলো। কিন্তু অবস্থা যা তাতে বড় ধরনের বাহিনী দরকার হতে পারে। তাহলেই আমি বিপদে পড়ে যাবো। সীমান্তের কোন রক্ষী কমাণ্ডারের ওপর বিশ্বাস বা ভরসা করা এখন ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। শক্ররা স্বর্ণমুদ্রা ও সুন্দরী নারী দিয়ে তাদের হাত করে রেখেছে। তারা মাসিক বেতন নেয় আমাদের সরকার থেকে আর কাজ করে শক্রদের।”

    সেদিন থেকে মাহমুদ বিন আহমদ তার কাছেই থেকে গেল। ইমাম সাহেব তাঁর কয়েকজন ভক্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন মাহমুদের।

    কিছু দিন ধরে মিশরের পল্লী অঞ্চলে শুরু হয়েছে এক নতুন ফেতনা। গ্রামের অশিক্ষিত মূৰ্খ লোকদের কুসংস্কারকে কেরামতি দেখিয়ে সে কোমলমতি সরল লোবগুলোর ঈমান ক্রয়ের চেষ্টা করছে। ব্যবসাটা যথেষ্ট লাভজনক ; কেবল ভক্তি আর শ্রদ্ধাই নয়, দেদার মালকড়িও আসছে এতে।

    এই পীর কোথাও আস্তানা গাড়ে না। আজ এখানে, কাল ওখানে ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের লোকেরা তার পথের দিকে চেয়ে থাকে উন্মুখ হয়ে। একজন আরেকজনকে বলে, বড় কামেল পীর, আহা! কী দ্বীনদার, কত পরহেজগার। তিনি মানুষের মনের কথা পর্যন্ত বলে দিতে পারেন।’

    আহা! শুধু তাই নাকি, উনি তো মানুষের ভবিষ্যতও দেখতে পারেন!

    শুনেছি উনার কাছে গিয়ে কিছু বলতে হয় না? মানুষের চেহারা দেখেই নাকি সব কিছু বুঝে ফেলেন উনি। বলে দেন তার বিপদের কথা? অসুখ নিয়ে গেলে কিছু জিজ্ঞেস না করেই অসুধ দিয়ে দেন? আরেকজন জানতে চায়।

    ‘তো আর বলছি কি! তিনি মানুষের ভূত-ভবিষ্যত সব দেখেন, সব বলতে পারেন।

    আমি তো শুনেছি তিনি মৃতকেও জীবিত করে দিতে পারেন | কেউ দেখে, কেউ না দেখেই এ পীরের ভক্ত হয়ে যায়। গ্রামের সরল মানুষগুলো তার কেরামতির কথা এমন অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, এতটা ভয় ও ভক্তি তারা আল্লাহর কালামকেও করে না। তার কথার সত্যাসত্য যাচাই করার প্রয়োজনও মনে করে না কেউ। লোকজনের বিশ্বাস, এ পীর আকাশ থেকে নেমে এসেছে। খোদার সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ। তার কাছে যা চাওয়া যাবে তাই পাওয়া যাবে।

    পথিকরা পথ চলতে চলতে গল্প করতো এ পীরের পীর সাহেব কি কি কেরামতি দেখিয়েছে। অন্যজনই বা পেছনে পড়ে থাকবে কেন, সে আরো অবাক করা কাহিনী শোনাতো তাকে। এভাবে এ পীরের কেরামতির অদ্ভুতসব কাহিনী মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল সীমান্ত এলাকার সর্বত্র।

    কিছু লোক তাকে নবীর মত মানতে শুরু করল। কেউ বললো, ইনি বৃষ্টি দিতে পারেন। এভাবে আজগুবী গল্পে ভরে গেল দেশ-গ্রাম।

    তারা পীর সাহেবকে এমন ভক্তি শ্রদ্ধা করতো যে, পীর পারতো। এমনকি নিজের জীবনটা দিয়ে দিতেও প্রস্তুত ছিল কেউ কেউ।

    এ যাবত কেউ পীরের বিশ্বাস ও আকিদা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করেনি। কারণ গ্রামের এ সব অশিক্ষিত মানুষরা তখনও আদিম যুগের মতই অন্ধ বিশ্বাসে বাস করত। তারা বিদ্যাবুদ্ধি থেকে বঞ্চিত ছিল বলে, যে তাদেরকে একটু আশার বাণী শোনাতে পারতো তার সামনেই সিজদায়পড়ে যেত।

    এই জনগণের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। তাদের পূর্ব অভাবে সে আলোর আভা দিনে দিনে স্নান হয়ে গিয়েছিল। বাপ মুসলমান ছিল বলে তারা নিজেদেরও মুসলমান মনে করতো, কিন্তু ইসলামের সঠিক ধারনা না থাকায় যে যা বুঝায় তাকেই তারা ইসলাম বলে মনে করতে থাকে।

    এসব গ্রামে মসজিদ ছিল। আল্লাহর ঘর কাবার দিকে ফিরে পাচ ওয়াক্ত নামাজও আদায় করতো অনেকে। কিন্তু ইসলামের সঠিক আকিদা ও বিশ্বাসকে জানার ও বুঝার জন্য কোন চেষ্টা ওদের ছিল না।

    যেমন সমাজ তেমনি ছিল তাদের ইমাম। ইমাম সাহেব তার ইমামতি ঠিক রাখার জন্য এবং লোকদের ভক্তি শ্রদ্ধা আদায় করার জন্য নানা রকম আজগুবী ও অমূলক কথা শোনাতো মুসল্লিদের। ইমাম তাদের বললো, কুরআন এক মহাপবিত্র কিতাব, সাধারণ মানুষের উচিত নয় তা স্পর্শ করা। কুরআন পড়বেন ইমাম সাহেবরা। ইমামরা যা বলবেন, সাধারণ মানুষের উচিত সেই মত কাজ করা। তাহলেই পাবে। এটাই ইসলামের পথ, এ পথেই রয়েছে তাদের ইহ ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ।

    এই ইমাম সাহেবরা মানুষকে শোনাতো অদৃশ্য জগতের কথা। পরকালের নানা শাস্তি ও বিপদের কথা। তারা মানুষকে বলতো, সবকিছুরই একটা গোপন দিক আছে, আর ইসলামের যে গোপন তত্ত্ব তা কেবল ইমাম সাহেবই জানেন। মৃত্যুর পর তোমরা এক অনন্ত জীবনে প্রবেশ করবে। এ দুনিয়ার সুখ আসল সুখ নয়, পরকালের জীবনই মানুষের আসল জীবন। সেই জীবনে সফলতা লাভ করতে হলে তোমাদেরকে ইমাম সাহেবের কথা মতো চলতে হবে।’

    এসব ইমামরা মানুষের মনে আল্লাহর ভয় না ঢুকিয়ে ইমামের ভয় ঢুকাতো। তারা এসব শিখেছিল সেই মহা ক্ষমতাবান পীর সাহেবের কাছ থেকে। এভাবে এই মূখ দুর্বল করে ফেলে। ফলে মানুষ ইমামদের ভয় করতে শিখল, ধর্মকে ভয় করতে শিখল। ইমামরা তাদের সত্য মিথ্যা যা বলতো, তারা তা সবই বিশ্বাস করতো।

    এসব ভণ্ড ইমাম ও ইমামদের নেতা সেই ভণ্ড পীরের পাল্লায় পড়ে তারা নানা অমূলক কথা বিশ্বাস করতে লাগল। তারা বিশ্বাস করতো, অদৃশ্য শক্তি ক্ষেপে গেলে মরুভূমিতে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়। বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ অদৃশ্য শক্তির আর্তনাদ ও কান্নার শব্দ। মানুষের রোগ-ব্যাধি হয় জীন-ভূতের নজর থেকে। সাধারণ মানুষ এই অদৃশ্য শক্তিকে দেখতে পায় না। কেবল ইমাম ও পীরই পারেন এইসব ভূতপেত্নী ও অদৃশ্য শক্তিকে বশ করতে, তাদের খুশি করতে।

    এভাবে একদল প্রতারক লোক মানুষের রোগ ব্যাধির চিকিৎসক হয়ে গেল। কোন হুজুর কয়টা ভূত তার কজায় রেখেছে তার ওপর নির্ভর করতো তার মর্যাদা।

    আল্লাহর চেয়ে এই সব অজ্ঞাত শক্তির ভয়েই মানুষ বেশি ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো। যে যতো গায়েবের ভয় দেখাতে পারতো মানুষ তার কথাই বেশি করে বিশ্বাস করতো। ফলে গ্রামের এসব অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত মানুষের অন্তরে ইসলামের মূল বিশ্বাস ছিল খুবই দুর্বল।

    এই পীর ও পীরভক্ত ইমামরা মানুষকে কুসংস্কার ও অন্ধ। বিশ্বাসে এমনভাবে নিমগ্ন করে ফেলল, যার প্রভাব থেকে লোকজনকে মুক্ত করা এবং ইসলামের সত্য সঠিক পথে নিয়ে চাইতে পারে এ কথা তাদের জানা ছিল না। তারা বরং সেই পীর ও ইমামের আশায় বসে থাকতো, যে তার বকরীর গায়ে ফু দিলে বকরী দুধ বেশি দেবে, যার ফু দেয়া পানি খেলে তার অসুখ সেরে যাবে, যে ছুয়ে দিলে বন্ধ্যা নারীর সন্তান হবে এবং যাকে গাছের প্রথম খেজুরগুলো দিয়ে দিলে রুজি রোজগার বেড়ে যাবে।

    সে যুগে দেশের সীমানা আজকের মত এত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা থাকতো না। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী তার সাম্রাজ্যের সীমানা একটি কাগজের ওপর একে নিয়েছিলেন। তিনি হিসাব করে দেখলেন ধমীয় গোমরাহীর এই উৎপাত সীমান্ত অঞ্চলেই বেশি।।

    রাষ্ট্রীয় সীমানার ব্যাপারে আইয়ুবী অবশ্য অন্য রকম ধারনা পোষণ করতেন। তিনি বলতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের স্থায়ী সীমারেখা বলে কিছু নেই, যেখানে ইসলামী শাষন ব্যবস্থা চালু আছে সেটা ইসলামী রাষ্ট্র, আর যেখানে মানব রচিত মতবাদ চালু আছে সেটা অনৈসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য, তার অধিবাসী এবং শাসক যদি মুসলমান হয় তবুও।

    মিশরের সীমান্তবতী গ্রামগুলোতে সুযোগ পেলেই খৃষ্টানরা সরাসরি আক্রমণ চালাতো। একদিন সে আক্রমণ বন্ধ করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু করল। ইসলামী আদর্শের ঈমানী চেতনা নষ্ট করার জন্য তারা এক ব্যক্তিকে পীর বানিয়ে পাঠিয়ে দিল সেই সীমান্তবর্তী গ্রামাঞ্চলে। এ আগ্রাসনের উদ্দেশ্য ছিল দুটাে, প্রথমত মুসলমানদের আকিদা নষ্ট করা। দ্বিতীয়ত নিজস্ব মতবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা।

    খৃষ্টানদের প্রধান আক্রোশ ছিল কোরআনের ওপর। কারণ, কুরআন জিহাদকে মুসলমানের ওপর ফরজ করে দিয়েছে। মানুষের ওপর জুলুম, অত্যাচার হলে তা থেকে তাদের বাচানোর জন্য মুসলমানরা যে লড়াই করে, কোরআন তাকেই জিহাদ বলেছে। কোরআন মুসলমানদের ওপর এই জিহাদকে ফরজ, মানে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে।

    যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদদের মধ্যে যে প্রচণ্ড আবেগ ও অনুপ্রেরণা দেখা যায়, তা কুরআনের এ ঘোষণারই ফল। অনুভূতি নিয়েই আসে। এ অনুভূতি তাদের অন্তরে জ্বলজ্বল করে জুলতে থাকে বলেই তারা হতে পারে এত বেপরোয়া, এত দুঃসাহসী। প্রাণের কোন মায়া নেই তাদের, কারণ কোরআন তাদের বলে দিয়েছে, মোজাহিদ কোনদিন মরে না। যে আল্লাহ তাকে তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, লড়াই করতে করতে যুদ্ধের মাঠ থেকে জীবনের চূড়ান্ত কাছে। এদের বলা হয় শহীদ। আরেক দল যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে গাজী হয়ে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়। ময়দান থেকে ওরা ফেরে শাহাদাতের গৌরব লাভের অপূর্ণ আকাঙ্খা নিয়ে।

    গনিমতের মাল তাদের জন্য হালাল কিন্তু তারা গনিমতের মালের আশায় তারা কখনও যুদ্ধ করে না। অন্য দিকে খৃস্টানরা যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায়। যুদ্ধ জয়ের চেয়ে লুটপাটের দিকেই তাদের নজরটা থাকে বেশি।

    সেই রহস্যময় পীর সম্পর্কে সীমান্তের গ্রামগুলোতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, আকাশ থেকে এসেছেন তিনি খোদার দ্বীন নিয়ে এসেছেন তিনি। তিনি মৃতকে জীবিত করতে পারেন। মানুষের সেবা করার জন্য সঙ্গী সাখী নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

    যারা তাকে দেখেছে তারা বলে, হুজুরের দাড়ি উজ্জ্বল সাদা, গায়ের রং ফর্সা, মাথার চুল লম্বা ও ঢেউ খেলানো। তার টানা টানা চোখে যেন চাদের আলো, দাত মুক্তার মত। স্বচ্ছ। বীরের মত টান টান সিনা আর বলিষ্ঠ শরীর।

    হুজুরের সাথে থাকে উটের লম্বা বহর আর অনেক খাদেম। মানুষ ভক্তি ভরে হুজুরকে যে নজরানা দেয় সে সব বহন করে এ উটের কাফেলা। তিনি শহর-বন্দরে যান না, দুঃখী মানুষের সেবা করার জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। গ্রামের পাশে তাবু খাটিয়ে কয়েকদিন সেখানে থাকেন। আশপাশের গ্রামের লোকদের দুঃখ দূর করে চলে যান অন্য এলাকায়।

  • ফেরাউনের গুপ্তধন

    ফেরাউনের গুপ্তধন

    ফেরাউনের গুপ্তধন

    ১১৭৪ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। কায়রো থেকে আঠারো মাইল দূরে এক জায়গায় এসে তিনটি উট দাঁড়িয়ে পড়ল। প্ৰত্যেক উটের ওপর একজন করে আরোহী, তাদের শরীর ও মুখ নেকাবে ঢাকা। একজন আরোহী পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল। তারপর কাগজটির ভাঁজ খুলে গভীর মনযোগ দিয়ে দেখে সঙ্গীদের বললো, “এই সে জায়গা!’

    সে সঙ্গীদের সামনে অগ্রসর হওয়ার ইশারা করে নিজেও এগিয়ে গেল। ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র সঙ্গীরাও তাদের উট সামনে বাড়ালো।

    সামনে দুটি টিলা মুখোমুখি দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে। দুই টিলার মাঝখানে চিকন একটি রাস্তা। রাস্তাটি এতই সরু, একটি উট কোনরকমে যেতে পারে ওই পথে।

    তিনজনই লাইন ধরে উটসহ ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরের অবস্থাও একই রকম। দু’পাশে সুউচ্চ দেয়াল। মনে হয়, কোন পাহাড়ি টিলা নয়, মানুষের তৈরী কোন শক্ত পাঁচিল। পাঁচলটি অনেক দিনের পুরোনো এবং এখানে ওখানে ভাঙা। সেই ভাঙা দিয়ে তাকালে দেখা যায় সীমাহীন বালির সমুদ্র এবং পাহাড়।

    অঞ্চলটি তিন-চার মাইলব্যাপী বিস্তৃত। টিলা এবং পাহাড়গুলো কোথাও লম্বা, কোথাও গোল। সর্বত্র ছোট বড় অসংখ্য টিলা ও পাহাড়ের ছড়াছড়ি। তার মাঝে অল্প কিছু সমতল উপত্যকা।

    টিলা ও পাহাড়ে দেবদারু গাছের মত কিছু খাঁড়া স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো এত উঁচু এবং খাঁড়া যে, মনে হয়, কোথাও কোথাও তা হাজার ফিট উঠে গেছে।

    সূর্য্য অস্ত যাওয়ার এখনও অনেক বাকী। অথচ এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে এখানে, আধাঁর ক্রমেই গ্ৰাস করছে এলাকাটি। স্তম্ভগুলো ভূতের আকৃতি নিতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, অসংখ্য ভূত এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

    টিলার খাঁড়া পাহাড়গুলো দূর্গম। যেমন উঁচু তেমন দেয়ালের মত একটানা খাঁড়া। মনে হয়, দিনের বেলায়ও কোথাও কোথাও সূর্যের আলো প্রবেশ করে না।

    এই ভূতুড়ে দুৰ্গম পাহাড়ি রাস্তায় অনেক দিন মানুষের পা পড়েনি। কোন কালে কেউ-প্ৰবেশ করেছিল কিনা তাও ঠিক বুঝা যায় না। ‘মনে হয়, এর ভেতরে কখনও কেউ প্ৰবেশ করার দুঃসাহস করেনি।” ঘাড় ফিরিয়ে সঙ্গীদের বলল ওদের দলনেতা।

    ‘কেন করবে? ভেতরে প্রবেশ করার প্রয়োজন হলে তবে তো করবে? মরুভূমিতে যাত্রীদের শুধু পানির প্রয়োজন হয়। এমন শুকনো নিরস বালির পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা যেখানে দিনের আলোও ঠিকমত পড়ে না সেখানে পানি খুঁজতে আসবে কোন পাগলে?”

    এক সঙ্গী জবাব দিল নেতার প্রশ্নের। আরেকজন বলল, ‘জায়গাটা চলাচলের কোন পাশেও পড়ে না। বহু দূর দিয়ে যাওয়ার সময় কোন কাফেলার চোখে পড়লে বলে, কায়রো এখনো আঠারো মাইল দূরে রয়েছে। এই দূরত্ব মাপার কাজ ছাড়া এই মৃত্যু উপত্যকা কোন দিন কারো কাজে লেগেছে?’

    লোক মুখে এই এলাকা সম্পর্কে কিছু ভয়ংকর গল্প প্রচলিত আছে। এলাকাটাকে কেউ বলে মৃত্যু উপত্যকা, কেউ বলে শয়তানের পাহাড়। লোকজন বলাবলি করে, এই অঞ্চলে শয়তানের প্ৰেতাত্মারা বাস করে। অভিশপ্ত শয়তানকে যখন আল্লাহ আকাশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তখন শয়তান নাকি এখানে এসে অবতরণ করেছিল। তারপর থেকে শয়তানের প্রেতাত্মারা এই অঞ্চলটিকে তাদের স্থায়ী ঘাঁটি বানিয়ে নেয়।

    এই অঞ্চল সামরিক দিক থেকেও এমন কোন গুরুত্বপূৰ্ণ স্থান নয় যে, সৈন্যদের তা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে, ফলে কখনো কোন সৈন্য বা সেনাবাহিনীও এর ভেতরে প্রবেশ করেনি।

    অঞ্চলটি শুধু দুৰ্গম নয়, নানা কুসংস্কারপূর্ণ গল্পের কারণে ভীতিপ্ৰদও। ফলে মানুষজন কখনো বালুকারাশিতে পরিপূর্ণ এই মৃত্যু উপত্যকায় আসতে সাহস পায়নি; মরুভূমির হিংস্র প্রাণী ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই। এই প্রথম তিনজন আগন্তুক এই ভয়ংকর অঞ্চলে প্রবেশ করল। এখানে তাদের কতটা বিপদের মোকাবেলা করতে হবে তার কোন পরোয় করল না তারা।

    পায়ে সংকীর্ণ পথে এগিয়ে চলল। কারণ, উট তিনটি নিরূপায়। তাদের চালক যেখানে তাদের চালিয়ে নিয়ে যায় সেখানে তাদের যেতেই হবে।

    হাজার হাজার বছর আগের পুরোনো একটি নকশা আছে এই অভিযাত্রীদের কাছে। নকশাতে যে জায়গার চিত্র আকা তার সাথে এলাকাটি হুবহু মিলে যায়। শুধু একটি রেখা সামান্য সন্দেহের সৃষ্টি করে। রেখাটি একটি নদীর। কিন্তু তারা প্রচুর ইতিহাস ঘেটে দেখেছে, কোন কালেও এখানে কোন নদী ছিল না।

    বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জায়গাটি এক নজর ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্যই তাদের আজকের এ অভিযান।

    কিছু দূর এগুনোর পর, তারা দেখতে পেল অপেক্ষাকৃত একটি নিচু অঞ্চল লম্বালম্বিভাবে এগিয়ে গেছে। অঞ্চলটি দুই টিলার মধ্যবতী সংকীর্ণ রাস্তা থেকে বেশি দূরে নয়।

    একটি ফোকড় গলে সংকীর্ণ জায়গা দিয়ে বেড়িয়ে এল অভিযাত্রী দল। এখন তারা সেই দীর্ঘ নিচু অঞ্চলটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অঞ্চলটি পাশে দশ বারো গজের বেশি নয়।

    দলনেতা উটের ওপর থেকে নেমে এল নিচে। হেঁটে নিচু অঞ্চলের বালিয়াড়ির মধ্যে নেমে গেল। সঙ্গী দু’জন উটের ওপর বসে থেকে দেখতে লাগল নেতার কাজকর্ম।

    মাঝামাঝি এসে দলনেতা নিচু হয়ে একমুঠো বালি তুলে নিল হাতে। গভীর মনযোগ দিয়ে পরীক্ষা করল। হাতের বালি ফেলে দিয়ে লম্বা করে দৃষ্টি মেলে দিল বালির সমুদ্রে। খুশিতে ভরে উঠল তার হৃদয়-মন। সে নিশ্চিত, শত শত বছর আগে এখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো। এই নিম্নাঞ্চল নিশ্চয়ই কোথাও আটকে না গিয়ে কোন গতিপথ ধরে নীলনদের দিকে চলে গেছে।

    সে ফিরে এল উটের কাছে। সঙ্গী আরোহীদের আশ্বস্ত করে বললো, “আমরা ঠিক জায়গায়ই এসে পৌঁছেছি।”

    এই আরোহীদের দলনেতা ইটালীর মার্ক লী। সে নিজে এবং সঙ্গী দুজনও খৃস্টান। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর বিশ্বস্ত কমান্ডার আহমদ দারবীশ গোপনে খৃস্টানদের সাথে হাত মিলিয়ে ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্সের কবর অনুসন্ধানে পাঠিয়েছে এদের।

    নকশা অনুযায়ী ঠিক জায়গাতেই এসে পৌঁছেছে ওরা। এই মৃত্যু উপত্যকাতেই আছে ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্সের কবর।

    এতে আরোহীদের খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু মার্ক লী খুশি হতে পারলো না। অঞ্চলটি লম্বা এবং প্রস্থ উভয় দিকেই কয়েক মাইল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে কয়েক হাত লম্বা একটি কবর খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়।

    মার্ক লী তার সঙ্গীদের বললো, “এই সে জায়গা, নিজেকে খোদা বলে দাবী করত যে ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্স, তার শেষ আশ্রয়স্থল। তাকিয়ে দেখো এর বিপুল বিস্তৃতি। আহমদ, দরবীশ ও হরমন আমাদেরকে এক ব্যর্থ অভিযানে পাঠিয়ে দিয়েছে। এত বড় এলাকা চষে একটি কবর খুঁজে বের করা কেবল কঠিন নয়, বলতে গেলে অসম্ভব। তারা আমাদেরকে দিয়ে এমন এক অসাধ্য সাধন করতে চায়, হাজার বছর ধরে চেষ্টা করেও মানুষ যা জয় করতে পারেনি।”

    সঙ্গীরা অভিযানের গুরুত্ব অনুধাবন করে কেমন বিমর্ষ ও চিন্তিত হয়ে পড়ল। এ অভিযানে তাদের ব্যক্তিগত কোন আগ্ৰহ ছিল না। তারা চাচ্ছিল ফিরে যেতে। কিন্তু কমাণ্ডারকে এমন কোন পরামর্শ দেয়ার সাহস ছিল না তাদের। তারা তো হুকুমের গোলাম। মার্ক লী এক কঠিন হৃদয়ের কমাণ্ডার। সহজে হার মানার পাত্র সে নয়। নিজের বুদ্ধি ও সাহসের ওপর যথেষ্ট আস্থা নিয়েই কাজ করে সে। কাজের সময় অহেতুক বাগড়া দেয়াকে সে পছন্দ করে না।

    আগে আগে যাচ্ছে মার্ক লী, পেছনে সঙ্গী দু’জন। ওরা যত এগুলো ততই ওরা দেখতে পেলো পার্বত্য অঞ্চলের রূপ ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। এখানকার মাটির রঙ ঘন বাদামী। কোথাও তা পাল্টে গিয়ে দেখা যাচ্ছিল খয়েরী, কোথাও বা লাল মেটে-রঙ।

    বালির পাহাড়ের পাশেই কোথাও ছোট্ট একটু উপত্যকা। তার পাশেই হয়ত কোন টিলা সোজা খাঁড়া হয়ে উঠে গেছে উপরের দিকে।

    ধীর পায়ে এগুচ্ছে দলটি। এগুচ্ছে আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিচ্ছে আশপাশের পরিবেশ।

    হঠাৎ ডান দিকে টিলার মাঝখানে একটি ফাটল নজরে পড়ল মার্কালীর। দেখে মনে হয় কোন প্রবল ভূমিকম্প এসে দেয়াল ফাঁক করে দিয়ে গেছে।

    মার্ক লী ফাটলটির কাছে এসে বাইরে চোখ রাখল; দেখল, সে ফাটল একটি সরু গলি তৈরী করেছে। গলিটি বহুদূর পৰ্যন্ত চলে গেছে, এত দূর যে শেষ মাথা দেখা যায় না।

    গলিটিতে প্ৰবেশ করার সিদ্ধান্ত নিল মার্ক লী। কিন্তু গালিটি এতই চিকন যে, ওই পথে উট নিয়ে প্ৰবেশ করা কষ্টকর।

    মার্ক লী কোন বাধাই মানলো না, সে তার উট সেই ফাটলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।

    উটের হাঁটু দুই পাশের দেয়ালে ঘষা খাচ্ছে। মার্ক লী নিজের পা গুটিয়ে উটের পিঠের ওপর তুলে দিল। অন্য আরোহীরাও তাই করল।

    আরোহীর নির্দেশে এগিয়ে যাচ্ছে উট, তাতে দেয়ালের গায়ে বার বার ঘষা খাচ্ছে তার শরীর। উটের হাঁটুর বাড়ি ও গায়ের ঘষার ফলে দেয়ালের মাটি নিচে খসে পড়ছে।

    ফাটলের দু’পাশের দেয়াল অনেক উঁচু। উটের ধাক্কা খেয়ে কেঁপে উঠতে লাগল সে দেয়াল। আরোহীদের মনে হতে লাগল, এই বুঝি তা ভেঙে ওদের ঘাড়ের ওপর পড়বে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তেমন কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।

    একবার যদি তাতে ধ্বস নামে। তবে আরোহীসহ পিষে যাবে সবাই। তাই, মার্ক লীসহ সবাই খুব সাবধানে অগ্রসর হতে লাগল।

    পথটা ক্রমেই উপরের দিকে উঠে গেছে। যথেষ্ট সতর্কতার সাথে অনেকটা পথ এগুনোর পর ওরা দেখতে পেল, দূরে, অনেক উপরে টিলার দুই পাশ এক হয়ে মিশে গেছে।

    দুপাশের দেয়াল উঁচু থাকায় ওদের পথটা ছিল অন্ধকার, তবে উপরের দিকে আলো দেখা যাচ্ছে। এ থেকে তারা বুঝতে পারলো, দিনের আলো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আর যেখানে পথটা শেষ হয়েছে তারপরে নিশ্চয়ই প্ৰশস্ত কোন উপত্যকা আছে।

    গলি ক্রমশঃ সুড়ঙ্গের আকার ধারণ করলো। উটের পায়ের শব্দ ধ্বনি-প্ৰতিধ্বনি তুলে ভীতিকর আওয়াজে রূপান্তরিত হলো। এতেও মার্ক লী থামলো না, সঙ্গীদের নিয়ে এগিয়েই চললো।

    এক সময় অন্ধকার কমে গিয়ে আলোর বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করল। মার্ক লী বুঝল, সুড়ঙ্গ শেষ হয়ে এসেছে প্ৰায়। একটু পরেই তারা সুরঙ্গের মুখে গিয়ে উপস্থিত হল।

    উটের পিঠে থাকায় সুড়ঙ্গের মুখের সমতল জায়গাটি তারা হাতের নাগালের মধ্যে পেয়ে গেল সহজেই। তারা নেমে এল সেখানে। কিন্তু উটকে উপরে তোলা তত সহজ হলো না। অনেক কসরত করে, রশি দিয়ে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে অনেক কষ্টে উটকে টেনে আনা হল।

    মানসিক চাপ ও শারীরিক কসরতের কারণে সবাই খুব কাহিল হয়ে পড়েছিল। তিনজনই বসে পড়ল মাটির ওপর।

    একটু সুস্থির হয়ে নজর বুলালো আশপাশে। দেখলো সেখানে একটি বড় দুর্গের দেয়াল এখনো মাথা খাঁড়া করে দাঁড়িয়ে আছে।

    মার্ক লী দুর্গটির কাছে গেল। এটি কোন মানুষের সৃষ্ট দুর্গ ছিল না, বরং এ ছিল প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এক কেল্লা। চারপাশের পাহাড়ের আকৃতি এমন ছিল যে, বাইরের দিকটা ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। ফলে, চারদিক থেকে আবদ্ধ হয়ে এলাকাটি দুর্গের রূপ নিয়েছে। পাহাড়ের উঁচু নিচু চূড়াগুলোকে মনে হচ্ছিল দুর্গের গম্বুজ।

    মার্কলী সঙ্গীদেরকে উটগুলো সেখানেই বসিয়ে দেয়ার জন্য বলল।

    উটগুলো বসিয়ে দেয়ার পর ওরা পায়ে হেঁটে দুর্গ এলাকাটা ঘুরে দেখতে শুরু করলো।

    পাহাড় ঘেরা দুর্গটা গোলাকার। পা টিপে টিপে হাঁটতে হচ্ছে ওদের। কারণ, বালি মিশ্ৰিত মাটিতে পা দিলেই ঢালুর দিকে হড়কে যাচ্ছিল পা। কোন চলাচলের রাস্তা ছিল না ওখানে। এই বালি ও মাটিই প্ৰমাণ করছে, শত শত বছর ধরে কোন পা পড়েনি এখানে।

    আগে আগে চলছে মার্কালী, সঙ্গীরা তার পিছনে। হঠাৎ প্ৰাণ ছ্যাৎ করে উঠল মার্ক লীর। সে কথা বলতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠনালী স্তব্ধ হয়ে গেছে তার। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে, পা দুটো যেন মাটির সাথে গেথে গেছে।

    সঙ্গীরাও থমকে দাঁড়াল। মার্ক লী কেন দাঁড়িয়েছে বুঝার চেষ্টা করছে তারা। মার্ক লী যেদিকে অবাক করা চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকে তাকাল তারা। দেখল, সামনে, এখান থেকে সোজা নিচের দিকে পাহাড়েরই একটা অংশের ওপাশে একটা মন্দির দাঁড়িয়ে আছে।

    মার্কলী বলল, “ওটা কি কোন মন্দিরের চূড়া।”

    ‘চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত একটা মন্দির দেখেও আপনি জিজ্ঞেস করছেন!’ সঙ্গীদের চোখে অজানা আশার ঝিলিক খেলে গেল।

    ওরা পাহাড়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে পা টিপে টিপে চলছিল। বাম দিকে বহু দূর খাঁড়া নেমে গেছে পাহাড়ের শক্ত দেয়াল। ওদিকে তাকালে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। অনেক নিচে দেখা যায় এবড়ো থেবেড়ো বালি ও পাথরের স্তুপ। পা পিছলে কোন রকমে সেখানে একবার গড়িয়ে পড়লে হাড়গোড় ছাতু হয়ে যাবে। তাই খাদের উল্টো দিক দিয়ে পা টিপে টিপে এগুচ্ছিল ওরা।

    রাস্তাটা ভয়ানক দুৰ্গম। বিপদজনকভাবে সরু ও খাঁড়াভাবে নেমে গেছে বেশ কিছুটা পথ। মার্ক লীর সঙ্গীদের বুকটা দুরুদুরু করে উঠল। একজন তো তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলে, “আপনি কি মনে করেন, ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্সের লাশ এই বিপদসংকুল পথ দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?’

    ‘আহমদ দরবেশের নক্সা তো তাই বলে,’ মার্ক লী বললো, ‘যে পর্যন্ত আমি নকশা বুঝতে পেরেছি। তাতে যাওয়ার রাস্তা এটিই। রিম্যান্সের লাশের বাক্সটি হয়তো অন্য কোন পথে নেয়া হয়েছে। হয়ত পাহাড়ের খাঁজের ভেতরে সুরঙ্গ পথ থাকতে পারে। সে সব গোপন পথের সন্ধান পরে করবো। আগে নকশার নির্দেশ মত কত দূর যাওয়া যায় দেখতে চাই।”

    “এ ধরনের অভিযানে গোপন পথই সাধারণত অভিযাত্রীকে তার ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। প্রকাশ্য রাস্তা দিয়ে কেউ গুপ্তধন বয়ে বেড়ায় না।” এক সঙ্গী তার মতামত ব্যক্ত করল।

    “আমারও মনে হয় যে, গোপন রাস্তা দিয়েই সম্রাটের লাশ বহন করা হয়েছে। আমাদের তা খুঁজে পেতে হবে। তাহলেই কেবল তার কবর পর্যন্ত যাওয়ার আশা করতে পারি আমরা।”

    “তোমাদের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করছি না। তবে মনে রাখতে হবে, শত শত বছর ধরে প্রাকৃতিক ঝড়ঝঞা এবং বাতাসের তোড়ে পৃথিবীর মানচিত্র অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এতকাল পর সে সব গোপন রাস্তা আদৌ আছে কি নেই, তাই তো আমরা জানি না! আমি তোমাদের নিয়ে অন্ধের মত মরুভূমিতে সুই খুঁজতে চাই না। তারচেয়ে নিশানা ধরে এগিয়ে দেখতে চাই এই সব নকশা আসলেও কোন কাজের কিনা? নকশা ঠিক থাকলে কবর পর্যন্ত আমরা পৌঁছেও যেতে পারি।” বলল মার্ক লী।

    “যদি বেঁচে থাকি!” হতাশ কণ্ঠে বলল তার এক সঙ্গী।

    ‘কোন সন্দেহ নেই।” মার্ক লী বললো, ‘তবে কবর খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকলে আমাদের আর কোন অভাব থাকবে না।’

    একটা পাথরের সাথে রশি বেঁধে, রশি ধরে ঝুলে তারা অনেক কষ্টে সেই বিপদজনক পথটুকু পার হয়ে এল।

    আস্তে আস্তে রাস্তার প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়তে লাগল। কিছু দূর নিচে নামার পর রাস্তা আবার ওপর দিকে উঠতে শুরু করল।

    এখন তারা পাহাড়ের এমন জায়গা পাড়ি দিচ্ছিল, যেখানে দুটি পাহাড় একত্রে মিশে চূড়ার দিকে এগিয়ে গেছে এবং সেখান থেকে আবার শুরু হয়েছে বিপদজনক ঢাল। মার্ক লী সেখানে পৌঁছে ঢাল বেয়ে সোজা নিচে না নেমে বাম দিকের পাহাড়ে আরোহণ করতে লাগলো।

    প্ৰায় একশো গজের মত উপরে উঠার পর তাদের সামনে একটি সুড়ঙ্গ পথ চোখে পড়লো। মার্ক লী সঙ্গীদের নিয়ে সেই সুড়ঙ্গ পথে ঢুকে পড়ল। পথটি ক্রমশ: নিচের দিকে চলে গেছে।

    সুড়ঙ্গ পথে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেল ওরা। তারপর সহসাই সুড়ঙ্গ শেষ গেল এবং তারা ছোট একটুখানি ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে এল।

    ফাঁকা জায়গায় এসেই তারা সামনে তাকিয়ে দেখতে পেল দূর দূরান্ত পর্যন্ত পাহাড়ের অসংখ্য ছোট বড় স্তম্ভ আকাশের দিকে মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভগুলো নিরেট পাথরের এবং পরস্পর গায়ের সাথে লাগানো। প্রতিটি স্তম্ভ থেকেই অসংখ্য চোখা মাথা বেরিয়ে আছে। দৃশ্যটা খুবই ভীতিজনক। এসব স্তম্ভ না মাড়িয়ে সামনে এগুনোর আর কোন পথ নেই। অথচ তা মাড়াতে গেলে হাত-পা জখম হওয়ার আশংকা ষোল আনা।

    খুবই সতর্কতার সাথে কঠিন পাথরের ফাঁক গলে ওরা ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগলো। কয়েকবার বাঁক ঘুরে ডানদিকে আবার একটু খোলা জায়গা পেল ওরা। জায়গাটুকু গোলাকার। একটা মঞ্চের মত। এখানকার আবহাওয়াই শুধু নয়, পায়ের নিচের মাটিও অসম্ভব গরম বোধ হলো। আশপাশের পাহাড়গুলোতে শেষ বিকেলের রোদ চমকাচ্ছে।

    মার্ক লী অনুভব করলো, এখানকার মাটিতে এমন কোন ধাতু মিশ্ৰিত আছে যে কারণে এলাকাটা উত্তপ্ত হয়ে আছে। গোল মঞ্চসদৃশ এই উপত্যকার চারদিকই পাহাড় ঘেরা। এক পাশে কয়েক গজ লম্বা একটি ফোঁকড়া। ওরা সেই ফোঁকড়ের কাছে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে তিনজনই পিছনে সরে এল। ওরা দেখল, ফোঁকড়ের মুখ পর্যন্ত অনেক গভীর ও বিশাল এক খাদ। খাদের তলদেশে উত্তপ্ত বালুকা রাশি চমকাচ্ছে এবং সেখান থেকে একেবেঁকে কম্পমান ধোঁয়া উঠে আসছে উপর দিকে। ইটের ভাটায় আগুন জ্বালাবার সময় যে কালো ধোঁয়া বেরোয় এর ধোঁয়া তেমন কালো নয়, বরং ডায়িং ফ্যাক্টরীর বাম্পের মত সাদা।

    এই গভীর খাদের মাঝখানে একটি প্রাকৃতিক দেয়াল। দেয়ালটি চওড়ায় মাত্র এক গজ, নিচে উপরে সমান চওড়া। যদি মার্ক লীদের ওপারে যেতেই হয় তবে এ প্রাচীর পার হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। দু’পাশের পাহাড়চূড়া এত উঁচু যে তা টপকানোর প্রশ্নই উঠে না।

    মার্কালীর মনে হল, সে এখন পুলসিরাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই পথটুকু পার হতে পারলেই সামনে বেহেশত। বেহেশতে তাকে যেতেই হবে এবং পঞ্চাশ গজের মত দীর্ঘ এই দেয়াল পার হতে হবে তাকে।

    মার্ক লীর এক সাথী বললো, “এই দেয়ালের ওপর দিয়ে যাওয়ার চেয়ে আমাকে আত্মহত্যার অন্য কোন উপায় বলে দিন।’

    ‘গুপ্তধনের ভান্ডার রাজপথে পড়ে থাকে না!” মার্ক লী বললো, “আমাদের এ রাস্তা পার হতেই হবে।’

    “কিন্তু টুপ করে নিচের জাহান্নামে গিয়ে পড়লে ওই গুপ্তধন খাবে কে?” অপর সঙ্গী বললো।

    “আমরা কি পবিত্র ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করিনি, ইসলামের ধ্বংস সাধনের জন্য আমরা এ জীবন উৎসর্গ করবো?” মার্ক লী বললো, ‘যুদ্ধের ময়দানে কি আমাদের সঙ্গীরা অকাতরে প্রাণ দিচ্ছে না?”

    ‘লড়াইয়ের ময়দানে জান দেয়া আর বেহুদা আগুনে ঝাপ দেয়া এক কথা নয়। আমরা ইচ্ছে করলেই এখান থেকে ফিরে গিয়ে আহমদ দারবীশকে বলতে পারবো, শত শত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখন আর নকশার রাস্তা খুঁজে পাওয়ার কোন উপায় নেই। সে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে নদী ছিল সেখানে ধুধু বালি ও পাহাড়ী প্রান্তর। আর নক্সার যেখানে পাহাড়ী উপত্যকা দেখানো হয়েছে সেখানে এখন কিছুই নেই।”

    “কিন্তু আমি কাপুরুষ হতে পারবো না। মিথ্যা কথাও বলতে পারবো না। এই দেয়াল আমার মনেও ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমি সে ভয় তাড়িয়ে দিয়েছি। তোমরাও ভয় ডর মুছে ফেলো মন থেকে। এ প্রাচীর বেয়ে আমি ওপারে যাবোই। আমাকে সঙ্গ না দিলে তোমরা ক্রুশের কাছে প্রতারক বলে সাব্যস্ত হবে। আর প্রতারকদের শাস্তি খুব বেদনাদায়ক হয়। আমি আগে আগে যাচ্ছি, তোমরা আমাকে অনুসরণ করো। মাথা চক্কর দিলে বা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে বসে পড়ে আত্মরক্ষা করবে। এমনভাবে বসে যাবে, যেন ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছে। সাহস ফিরে এলেই আবার এগুতে থাকবে।”

    সহসা সেই গরম বাতাস জোরে বইতে শুরু করল। বালি উড়তে লাগলো। সেই সাথে খাদের ভেতর থেকে ভেসে এল মেয়েদের কান্নার স্বর। যেন দু’তিনজন নারী এক সাথে কান্না জুড়ে দিয়েছে।

    মার্কলী ও তার সঙ্গীরা কান খাঁড়া করে শুনতে লাগলো সে কান্নার ধ্বনি। কান্না শুরু হয়েছিল মিহি সুরে বিলাপের মত, এখন তার পরিবর্তে ভেসে আসতে লাগল বিকট আওয়াজ। মার্ক লী ও তাঁর সঙ্গীরা ভয় পেয়ে গেল।

    ‘এই জাহান্নামে কোন মানুষই বেঁচে থাকতে পারে না। নিশ্চয়ই এসব প্রেতাত্মার কাণ্ড!” ভয়ে ভয়ে বলল এক সঙ্গী।

    ‘না, এ কোন মানুষের কান্না নয়।’ মার্ক লী বললো, “কোন প্ৰেতাত্মা বা কোন জীবিত প্রাণীর স্বরও নয়! এটা বাতাসের খেলা। বাতাস একটু জোরে বইতে শুরু করায় কোথাও আঘাত খেয়ে ঐ সুরের সৃষ্টি হয়েছে। বাঁশিতে যেমন বাঁশরিয়া ফু দিয়ে সুর তোলে, তেমনি কোথাও এমন কোন ছিদ্র বা সুড়ং আছে যাতে বাতাস ঢুকে এ রকম সুর ও আওয়াজ তুলছে। বাতাস যত জোরে বইবে সুর তত বিকট হবে। এতে ভয় পাবার কিছু নেই।’

    মার্ক লীর কথাই সত্যি, এ অঞ্চলের বিভিন্ন টিলার মধ্যে লম্বা লম্বা সুডুং ছিল। বাতাস সে সুডুংগুলোর এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতো। যখন এ বাতাস তোছরাভাবে বইতো তখনি এ ধরনের ধ্বনি শোনা যেতো। দমকা বাতাস প্রবল বেগে বইতে শুরু করলে মনে হতো প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করছে একদল ডাইনী।

    নিচে গভীর ও বিস্তৃত খাদ। চারপাশে ভয়ালদৰ্শন উলঙ্গ পাহাড় আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো কান্নার আওয়াজ যে কাউকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মার্ক লীকে তা ভীত সন্ত্রস্ত করতে ব্যর্থ হলো।

    কিন্তু তার সাথীদের উপর ভীতি এমন প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করল যে, মার্ক লীর এত কথার পরও তাদের মন থেকে সে ভয় দূর হলো না। তারা এই আওয়াজকে বাতাসের কারসাজি বলে মানতে পারছিল না। তাদের মনে হচ্ছিল, পাশেই কোথাও নারী ও প্ৰেতাত্মারা ক্ৰন্দন করছে। যে কান্নার ধ্বনি তারা নিজ কানে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। মার্ক লীর যুক্তিতর্ক এ সত্যকে আড়াল করতে পারছে না।

    বাতাস প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছিল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল কান্নার কোরাস।

    বাতাসের তোড়ে উড়ে আসা ধুলোবালির ঝাপটা লাগছিল ওদের চোখে মুখে। সেই সাথে ছিল স্নায়ুতন্ত্রে আঘাতকারী কুয়াশা রঙের ধোঁয়া। জমিন থেকে উড়ে আসা হালকা ধুলোবালির মেঘ আর ধোঁয়ার কারণে বেশি দূর দৃষ্টি যাচ্ছিল না। মার্ক লী ও তার সঙ্গীরা এই প্রাকৃতিক দুৰ্যোগ মাথায় নিয়ে ওভাবেই ওখানে দাঁড়িয়ে রইল।”

    বেশ কিছুক্ষণ ওখানে অপেক্ষা করার পরও মার্ক লী যখন দেখল দুৰ্যোগ মোটেই কমছে না। তখন সে সঙ্গীদের বলল, “এখানে বেশীক্ষণ থাকলে তোমরা পাগল হয়ে যাবে। এর থেকে নিস্তার পেতে চাইলে ওপারে চলো।”

    এই দুর্যোগের মধ্যেই মার্ক লী দেয়ালের উপর প্রথম পা রাখল। দুর্যোগের ফলে একটা সুবিধা হলো তার, ভয়াবহ খাদের নিচ পর্যন্ত দৃষ্টি গেলে মাথায় যে চক্কর দিত। তার হাত থেকে বেঁচে গেল সে।

    মার্ক লী পা দিয়েই বুঝল, দেয়ালটি খুবই কাঁচা এবং দুর্বল। প্রাচীরের বালি ও মাটির মধ্যে পা দেবে গেলো তার। কিন্তু তাতে তার সংকল্পে কোন বিঘ্ন ঘটলো না। সে তার দ্বিতীয় পাটিও তুলে আনলো প্রাচীরের ওপর। নিজের অজান্তেই নিচের দিকে দৃষ্টি চলে গেল তার। খাদের গভীরতার কথা মনে হতেই আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো সর্ব শরীর। কিন্তু তলদেশ চোখে না পড়ায় ভয়কে সে তাড়িয়ে দিতে পারলো।

    মার্ক লী কয়েক কদম এগিয়ে গেল। ক্ৰন্দনের আওয়াজ আরও বেড়ে গেল মনে হয়। এখন তার পায়ের নিচে ভঙ্গুর দেয়াল, দুই পাশে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন গভীর খাদ। ডানে-বায়ে ধরার মত কোন কিছু নেই। প্রবল বাতাসের ঝাপটা লাগছে মার্ক লীর গায়ে। দমকা হাওয়ার ধাক্কায় একদিকে কাত হয়ে যাচ্ছে শরীর। দেহের ওজন মনে হচ্ছে কমে যাচ্ছে।

    সে ঘাড় ঘুরিয়ে সাথীদের বললো, “ভয় নেই, সাহস করে পা রাখো, দেখবে আমার মতই চলতে পারছো! ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে অগ্রসর হও! নিচের দিকে মোটেই তাকাবে না। মনে মনে কল্পনা করো, তোমরা মাটির উপর দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে চলছো।’

    সঙ্গী দু’জন অসহায়ভাবে একে অন্যের দিকে তাকাল। মার্ক লীকে ছাড়া একাকী ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতেও ভয় হচ্ছিল ওদের, আবার মার্ক লীর মত দেয়াল পাড়ি দিতেও ওদের বুক দুরুদুরু করে কাঁপছিল।

    মার্ক লীর তাগাদা পেয়ে একজন অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মত দেয়ালের উপরে পা তুলে দিল। তার দেখাদেখি অন্যজনও। উঠে এল প্রাচীরের ওপর। কয়েক কদম এগুনোর পর যখন সে। বুঝতে পারল দেয়ালের ওপর উঠে এসেছে তখনই একজনের গা কাঁপুনি শুরু হল। কাঁপতে কাঁপতেই কয়েক কদম অগ্রসর হয়ে গেল লোকটি। তারপর দুলতে দুলতে যখন মনে হলো সে পড়ে যাচ্ছে, দেয়ালের ওপর বসে পড়ে আঁকড়ে ধরল।

    সঙ্গীর অবস্থা দেখে অন্যজনের মনেও এ ভয় সংক্রামিত হল, সাথে সাথে কাঁপতে কাঁপতে সেও বসে পড়ল প্রাচীরের ওপর। অবস্থাটা এখন আরো নাজুক হয়ে উঠল। সামনে এখনো অনেক পথ বাকী, পেছনে ফিরে যাবে সে উপায়ও নেই, কারণ দেয়াল এতই সংকীর্ণ যে এখানে ঘুরে বসার ঝুঁকিও নিতে পারছে না। উপায়ান্তর না পেয়ে সঙ্গী দু’জন স্থবির হয়ে মরার মত পড়ে রইল দেয়ালের ওপর।

    মার্ক লী তাদের মনোেবল বাড়াতে চাইল। বলল, “ঠিক আছে, তোমাদের আর উঠে দাঁড়াবার দরকার নেই। হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আস।”

    ওরা সম্মোহিতের মত মার্ক লীর হুকুম তামিল করল। প্ৰায় অর্ধেক পথ এগিয়ে এসেছে ওরা। মাঝামাঝি পৌঁছে, মার্ক লী দেখলো, মাঝখানে দেয়াল একটু ভাঙ্গা ও নিচের দিকে ঢালু হয়ে গেছে। সেখানে চওড়া এত কম যে, দাঁড়িয়ে থেকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। এবার মার্ক লীও বসে পড়লো।

    সঙ্গীরা বসে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছিল, সে তাদের মত বসলো না। ঘোড়ার আরোহীরা যেভাবে দুই, ঠ্যাং দুই দিকে বুলিয়ে দিয়ে বসে সেভাবে দেয়ালের দুদিকে পা বুলিয়ে বসলো সে। দেয়ালের চওড়া ক্রমশ কমে আসছিল। মার্ক লী দুহাত দুদিকে দিয়ে লেংড়া মানুষের মত ঘষটে ঘষটে আস্তে করে নিচে নেমে গেল এবং ভাঙা অংশটুকু পার হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তাকে অনুসরণ করে তার এক সাথীও পার হয়ে এল ভাঙা অংশ। কিন্তু তৃতীয়জন ভাঙা জায়গায় নামতে গিয়ে হঠাৎ পিছলে গেল। তাল সামলাতে গিয়ে পাশ থেকে ছুটে গেল তার হাত। ভয় ও আতংকে আর্ত চিৎকার করে উঠল লোকটি, মার্ক লী আমাকে ধরো।”

    কিন্তু তার কাছে এগিয়ে যাওয়ার সময় পেল না কেউ। তার আগেই সে একদিকে ছিটকে পড়ল। “বাঁচাও” বলে বুক ফাটা একটা আর্ত চিৎকার শুধু শুনতে পেল ওরা, কিন্তু তাকে আর দেখতে পেল না। সেই চিৎকারের শব্দ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে গোল এবং ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এক সময় মিলিয়ে গেল।

    তারা তার পতনের শব্দ শোনার জন্য কান পেতে রইল, কিন্তু তেমন কোন শব্দ শুনতে পেল না। বাতাসে ভেসে বেড়ানো নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকারের নিচে চাপা পড়ে গেল তার পতনের শব্দ। মার্ক লী নিচে তাকালো, কিছুই দেখা গোল না।

  • উপকূলে সংঘর্ষ

    উপকূলে সংঘর্ষ

    উপকূলে সংঘর্ষ

    আলীর গোয়েন্দা বাহিনীর তিন সদস্য ইমরান, রহিম, রেজাউল। আক্রায় এসেছিল ওরা শত্রুর গতিবিধি ও পরিকল্পনা জানতে। এরই মধ্য অনেক তথ্য ওরা সংগ্রহও করেছে। দলনেতা ইমরানের কাছে এমন কিছু তথ্য এলো যা এখনি সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী ও সুলতান আইয়ুবীকে জানানো দরকার। ওরা আক্রা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো, এমন সময় হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল রহিম।

    যখন রহিমের রিপোর্ট করার কথা, তখন সে না আসায় তাকে খুঁজতে গিয়েছিল ইমরান। গিয়ে জানলো, যে বাড়িতে সে থাকতো এবং তার মালিকের কাজ করতো সেখান থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

    কেন রহিমকে বরখাস্ত করা হয়েছে এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিল না কেউ। রহিমকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল ইমরান। একজন গোয়েন্দা যে কোন সমস্যা প্রথমে তার দলনেতাকে জানাবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু রহিম তা করেনি। কিন্তু কেন? তবে কি রহিম শত্রুর হাতে? এসব চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো ইমরানের মাথায়।

    কমান্ডার হিসেবে রহিমের সন্ধান নেয়া তারই দায়িত্ব। একবার ভাবলো, রেজাউলের সাথে যোগযোগ করে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, পরস্থিতি না বুঝে রেজাউলের সাথে দেখা করতে যাওয়াও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে সে আর রেজাউলের ওখানে গেল না।

    ইমরান শংকিত হলো এই ভেবে, যদি রহিম গ্রেফতার হয়েই থাকে তবে তা মারাত্বক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই অবস্থায় চাপে পড়ে দুই বন্ধুর সন্ধান বলে দিতে পারে রহিম। তখন তাদেরও ধরা পরতে হবে। এই চিন্তায় ইমরানকে অস্থির করে তুললো।

    একজন গোয়েন্দার ধরা পড়া বা মারা যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু ভয় ও চিন্তার কারণ, সে তার অন্যান্য সাথীদের নাম বলে দিলে পুরো মিশনকেই ধ্বংসের মুখে পড়ে যায়।

    যে গোপন তথ্যের জন্য তারা এখানে এসেছিলো, তা তাদের হাতে এসে গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরে পড়া দরকার। শেষ মুহূর্তে এসে এ ধরণের একটা সমস্যা পুরো মিশনকেই শেষ করে দিতে পারে।

    একদিকে আত্মরক্ষা করে নিরাপদে আক্রা থেকে বেরিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে বন্ধুকে খুঁজে বের করার কঠিন দায়িত্ব- কোনটা করবে ইমরান? কিভাবে করবে? এক সুকঠিন দায়িত্বের বোঝা তাড়া করতে লাগলো ইমরানকে।

    সূর্য ডুবে যাওয়ার এখনও কিছুটা দেরী। রেজাউল আস্তাবলের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। চারটি ঘোড়া এসে আস্তাবলের মুখে থামলো। একজন আরোহী ঘোড়ার পিঠে লাশের মত একজনকে ফেলে রেখেছিল। তার সামনেই তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামানো হলো। নামানোর পর লোকটিকে দেখেই রেজাউলের শরীরের সমস্ত রক্ত ঠান্ডা হীম হয়ে গেল। এ লোক আর কেউ নয় তারই সহযোগী, বন্ধু রহিমের। তার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।

    আরোহীদের সবাইকে চেনে রেজাউল। সবাই অফিসার। রহিমকে নামানোর পর এক অফিসার রেজাউলকে ডাকলো। এই অফিসার রেজাউলকে বেশ পছন্দ করতো, তাকে ডাকতো ফ্রান্সিস বলে। অফিসারের ডাক শুনে বাস্তবে ফিরে এল রেজাউল। দৌড়ে গেল অফিসারের কাছে। কিন্তু তার পা তখন চলতে চাচ্ছিল না। সে ভাবছিল, তাকেও কি গ্রেফতার করা হবে।

    ‘এই চারটি ঘোড়া ভেতরে নিয়ে যাও।’ অফিসার রেজাউলকে বললো, ‘সহিসকে বুঝিয়ে দিয়ে এসে বন্দীকে ওই কামরাই নিয়ে চলো।’ রহিমকে দেখিয়ে বললো অফিসার।

    রেজাউলকে যখন ফ্রান্সিস বলে ডাকলো, তখন সে ভাবলো, রহিম তাদের বিষয়ে এখনো কিছু বলেনি। এ খৃস্টান অফিসার এখনও তাকে সহিস ফ্রান্সিস বলেই জানে। এই ভেবে সে একটু সাহস ফিরে পেল।

    রেজাউল অফিসারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই বন্দী কে? এ লোক কি চুরি করেছে?’

    ‘এ বেটা সালাহউদ্দিন আইয়ূবীর গোয়েন্দা!’ তিরস্কারের ভঙ্গিতে বললো অফিসার, ‘এখন এই গোপন কুঠুরীতে পড়ে গোয়েন্দাগিরি করবে। যাও, ঘোড়া নিয়ে যাও।’

    এই ফাঁকে রেজাউল ও রহিম একে অন্যের চোখে চোখ রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়। চোখে চোখে কথা হয় তাদের। ধরা পড়লে চোখের ইশারায় কিভাবে কথা বলতে হবে সে সংকেত তাদের আগেই ঠিক করা ছিল।

    যদি কোনদিন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, পরস্পর কথাও বলতে পারবে না, তখন ইশারায় অন্যকে পালিয়ে যাওয়ার যে সংকেত দেয়ার কথা, রহিম রেজাউলকে সে সংকেত দিল। কিন্তু রেজাউল তার উল্টো অর্থ করে বসল। সে ভাবল, এখন পালিয়ে যাওয়ার সংকেত দেয়ার মানে হচ্ছে, রহিম আমাদের পরিচয় এখনো ফাঁস করেনি। ফলে সে পালিয়ে না গিয়ে রহিমকে উদ্ধার করার কোন সুযোগ সৃষ্টি হয় কিনা সে জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।

    যদিও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য প্রচন্ড ঝুঁকি ছিল তবু সঙ্গীর কথা চিন্তা করে সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না। কারণ সে জানতো, এ ধরা পড়ার মানে কি এবং এর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে।

    বন্দীশালায় একজন গোয়েন্দার ওপর কেমন উৎপীড়ন হয় তা তার অজানা নয়। সে জানে, উদ্ধার করা সম্ভব না হলে রহিমকে এখন মরতে হবে। কিন্তু মরাটাই বড় কথা নয়, এ মৃত্যু যে কত বড় যন্ত্রণাদায়ক সে কথা ভেবেই শিউরে উঠল তার শরীর।

    রেজাউল এও জানতো, রহিমকে এখন যে কামরায় রাখা হবে সেখান থেকে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হব

    ইমরান গির্জা সংলগ্ন এক কামরায় অস্থির চিত্তে পায়চারী করছে আর চিন্তা করছে, রহিম নিখোঁজ হয়ে গেল কোথায়? এখন তাকে আমি কোথায় খুঁজে বেড়াবো?

    এমন সময় কামরার দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। রেজাউল প্রবেশ করলো ভেতরে। সে ভেতরে এসেই দরজা বন্ধ করে, ভীত কন্ঠে ফিসফিস করে বললো, ‘রহিম ধরা পড়েছে।’

    সে যেমন দেখেছে ইমরানকে সব খুলে বললো। শেষে বললো, ‘সে এখনো আমাদের কথা কিছু বলেনি।’

    ‘যদিও বলেনি কিন্তু টর্চার সেলে গেলেই বলে দেবে।’ ইমরান বললো, ‘সেই দোজখের নির্যাতনে মুখ বন্ধ রাখা সহজ ব্যাপার না।’

    অবস্থা ভয়াবহ জটিল। এ অবস্থায় কি করা যায় তা নির্ধারনের দু’জনে পরামর্শে বসলো। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। তারা এখনই বেরিয়ে যাবে, না রহিমকে মুক্ত করার চেষ্টা করবে?

    রেজাউল বললো, ‘আমাদের সামনে সংকটটি খুবই স্পর্শকাতর ও জটিল। এ মূহুর্তে সামান্য ভুল আমাদের জন্য মারাত্বক বিপদ ডেকে আনবে।’

    ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো এবং একটা ভুল এরই মধ্য আমরা করেও ফেলেছি। ভুলটা হলো, আমরা একটু বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। গোয়েন্দা বিভাগের কর্মীদের অসীম ধৈর্য ও সহ্যগুনের প্রয়োজন। আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছু করা আমাদের সাজে না।’

    ‘যদি নিজেদের কোন সাথী বিপদে পড়ে?’

    ‘যদি তাকে সাহায্য করতে গেলে অন্যদেরও ফেঁসে যাওয়ার ভয় থাকে, তবে তাকে সাহায্য করতে যাওয়া বোকামী। রেজাউল, আবেগের বশে চলার সময় এটা নয়।’

    ইমরানের কথায় রেজাউলের আবেগে মোটেও ভাটা পড়লো না। সে জেদের সাথে বললো, ‘রহিমের মত সুন্দর ও সাহসী বন্ধুকে বন্দী রেখে আমরা পালাতে পারি না। তাকে মুক্ত করার চেষ্টা আমি অবশ্যই চালাবো।’

    ‘অসম্ভব!’ ইমরান বললো, ‘এমন ভয়ঙ্কর সংকল্প ত্যাগ করো, নইলে আমরা উভয়েই বিপদে পড়বো। সবচেয়ে বড় কথা, যে তথ্যের জন্য আমরা এখানে এসেছিলাম, তা আমরা পেয়ে গেছি। সবার আগে এ তথ্য পৌঁছানো আমাদের জন্য ফরজ।’

    রেজাউল বললো, ‘আমি যেখানে থাকি সেখানেই রহিমকে রাখা হয়েছে। ফলে তাকে মুক্ত করার একটা চেষ্টা করার সুযোগ আছে আমার। এ সুযোগ না থাকলে আমি কোন অনুরোধ করতাম না। আমাকে অন্তত একটা দিন সময় দাও, যদি এর মধ্য সফল না হই তবে আমার আর কোন আফসোস থাকবে না। নইলে তার মৃত্যুর জন্য আজীবন কষ্ট হবে আমার।’

    ‘কিন্তু তুমি কিভাবে একটা বাহিনীর মুখের গ্রাস কেড়ে নেবে?’

    রেজাউল বললো, ‘আমি একা ঠিকই, কিন্তু সেখানে এরই মধ্য অনেকে আমার বন্ধু হয়ে গেছে। তাদের সাহায্য আমি পাবো। যদি তার কাছে একবার পৌঁছাতে পারি, তবে তাকে মুক্ত করার পথ একটা পেয়েই যাবো আশা করি।’

    ‘কিন্তু যদি ব্যর্থ হও, যদি নিজেও ধরা পড়ে যাও দুশমনের হাতে?’

    ‘যদি আমি ধরা পড়ি, তুমি তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যাবে এখান থেকে। আমাদের মুক্ত করার জন্য বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবে না। যে তথ্য পাচার করা দরকার সেই গোপন তথ্য সবই তোমার কাছে আছে। তুমি পালাতে পারলেই আমাদের মিশন সফল হয়ে যাবে। আমি রহিমকে ছাড়া যাবো না। ওর জন্য আমাকে ছেড়ে দাও।’

    ইমরান আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকল। রহিমের জন্য তার যে মায়া ছিল না বা কষ্ট হচ্ছিল না, তা নয়। কিন্তু কর্তব্য-চিন্তা তাকে কঠোর করে তুলেছিল। ইমরানকে দুর্বল হতে দেখে রেজাউল এবার বলল, ‘ঠিক আছে, আমার কথা শোন। রহিমের মুক্তির যদি কোন উপায় না দেখি , তবে রাতেই আমরা বের হয়ে যাবো। তুমি সজাগ থেকো, আমি তার খবর নিয়ে রাতের যে কোন সময় এসে তোমাকে রিপোর্ট করে যাবো। ওকে মুক্ত করার কোন সম্ভাবনা থাকলেই কেবল আমি অপেক্ষা করবো, নইলে তোমার সঙ্গী হবো।’

    ‘ঠিক আছে, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, আমি ঘোড়ার ব্যবস্থা করে রাখছি।’

    রেজাউল তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। রাস্তায় পথ চলার সময়ও তার মাথায় রহিমের মুক্তির চিন্তাই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছিল। রহিমকে মুক্ত করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। সে কোন সাধারণ চোর ডাকাত ছিল না, সে ছিল এক রাষ্ট্রীয় অপরাধী। সেনানিবাসের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বন্দী সে। কিন্তু রেজাউলের আবেগ তাকে দুঃসাহসী ও বেপরোয়া করে তুলল। আর সেই আবেগের বশে সে তার মূল দায়িত্বও ভুলে গেল।

    ইমরানের দায়িত্ব ছিল ঘোড়ার ব্যবস্থা করা। কিন্তু ঘোড়ার ব্যবস্থা করাও সহজ হলো না। পাদ্রীর বডিগার্ডদের ঘোড়া সেখানে থাকে ঠিকই, কিন্তু পাহারাদারদের দৃষ্টি এড়িয়ে সেখান থেকে ঘোড়া চুরি করা ছিল বলতে গেলে অসম্ভব।

    তখন পর্যন্ত রহিমকে কয়েদখানায় পাঠানো হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে গোয়েন্দা বিভাগের দুই পাষন্ড অফিসারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দারা ধরা পড়লে তাদের কাছ থেকে তথ্য ও গোপন কথা আদায় করাই প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায়। সবাই জানে, গোয়েন্দারা কখনও একা থাকে না, তাদের একটি সংঘবদ্ধ দল থাকে। একজন ধরা পড়লে তার কাছে থেকেই তার সাথীদের সন্ধান পাওয়া যায়।

    রহিমের কাছ থেকে এ সকল তথ্য আদায় করার জন্য তাকে এক কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘একজন গোয়েন্দা হিসেবে অনেক গোপন খবরই তোমার জানা থাকার কথা। বলো, আমাদের কি কি গোপন খবর তুমি সংগ্রহ করেছো?’

    রহিম উত্তরে বললো, ‘আমি তোমাদের কোন গোপন বিষয়ই জানি না।’

    ‘বণিকের মেয়ের সাথে তোমার কেমন সম্পর্ক ছিল?’

    ‘আমাদের দু’জনের মধ্য গভীর ভালবাসার সম্পর্ক রয়েছে।’

    ‘রয়েছে নয়, বলো, ছিল। কখন তুমি এলিসাকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা করো?’

    ‘আলিসার বিয়ে এক বৃদ্ধ অফিসারের সাথে হতে যাচ্ছিল, সে কারণে সে বাড়ী থেকে পালিয়েছিল এবং আমাকেও সঙ্গে নিয়েছিল।’

    ‘তুমি কি জানো, তুমি কেমন করে ধরা পড়লে?’

    ‘না!’ রহিম উত্তর দিল, ‘আমি শুধু এটুকুই জানি, আমি ধরা পড়েছি।’

    ‘তুমি আরও অনেক কিছুই জানো।’ এক অফিসার বললো, ‘সব কথা বলে দাও, তোমাকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না।’

    ‘আমি এটুকুই জানি, আমি আমার দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পুর্ণ অসচেতন হয়ে পড়েছিলাম। তার ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এখন আমি আমার পাপ ও কর্তব্যে অবহেলার শাস্তি ভোগ করবো। তোমরা আমাকে যে ধরণের কষ্ট ও শাস্তি দিতে চাও, দিতে পারো, আমি হাসি মুখেই আমার পাপের শাস্তি গ্রহন করবো।’

    ‘তোমার দীলে কি এখনো আলিসার জন্য ভালবাসা আছে?’

    ‘হ্যাঁ, এখনও আছে।’ রহিম বললো, ‘আর চিরকাল থাকবে। আমি তাকে সঙ্গে কায়রো যেতে চেয়েছিলাম, সেখানে ইসলামী বিধান মতে সংসার গড়তে চেয়েছিলাম।’

    ‘আমি যদি বলি, সে তোমার সাথে প্রতারণা করেছে, তুমি তা মানবে?’

    ‘না।’ রহিম বললো, ‘যে আমার জন্য তার পিতা-মাতা ও বাড়িঘর ত্যাগ করতে পারে, সে কখনও ধোঁকা দিতে পারে না। বরং তাকে অন্য কেউ ধোঁকা দিয়েছে।’

    ‘যদি আমি আলিসাকে তোমার সামনে হাজির করি, তবে কি তুমি বলবে, তোমার সাথে আক্রাতে আর কতজন এসেছে? এখন তারা কোথায় আছে?’

    রহিম চুপ করে রইল, এ প্রশ্নের কোন জবাব দিল না।

    তাকে আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তুমি কি বলবে, তুমি এখান থেকে কোন কোন গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছে?’

    এবারও রহিম নিরুত্তর। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এক অফিসার এগিয়ে এসে তার মাথা উপরে তুলে ধরলো। রহিমের দুই চোখে তখন টলমল করছে অশ্রু।

    অফিসার বারবার একই প্রশ্ন করল, কিন্তু সে এর কোন জবাব দিল না। সে অস্বীকার করে এ কথা বলল না যে, আমার কোন সঙ্গী সাথী নেই। আবার কে কোথায় আছে সে কথাও বলল না। স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিল, তার ভেতর চরম টানাপোড়েন চলছে। সে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। সে এ প্রশ্নের জবাব দেবে কি দেবে না, দিলে কি দেবে ঠিক করতে পারছে না। তার চেহারা বলছিল, আলিসার জন্য এখনো সে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে।

    ‘তোমাকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে।’ এক অফিসার বললো, ‘আমরা চেয়েছিলাম তোমার কষ্ট কমাতে। এ জন্য তোমাকে একাধিকবার সুযোগ দেয়া হয়েছে। বার বার একই প্রশ্ন করার পরও তুমি কোন জবাব দাওনি। কিন্তু কি করে একজন বেয়াড়া গোয়েন্দার কাছ থেকে কথা আদায় করতে হয় সে কথা তোমার অজানা থাকার কথা নয়। তবু যখন তুমি কথা বলছো না, বাধ্য হয়ে আমাকে সে পথই ধরতে হবে। শেষ পর্যন্ত তুমি যখন একটি হাড় ও মাংসের স্তুপ হয়ে যাবে তখন আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না। তুমি বাঁচবে কি মরবে আমার সে চিন্তা করার দরকার নেই। তবে যদি এখনো উত্তর দিয়ে দাও, তবে অনেক কষ্টের হাত থেকে বেঁচে যাবে তুমি। আর আলিসার কথা যদি জানতে চাও তো বলি, আলিসা চায় না তুমি এত তাড়াতাড়ি দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাও। তোমার সাথে এই যে ভাল ব্যবহার করা হচ্ছে এটাও অনেকটা আলিসার জন্যই।’

    ‘রাজ সাক্ষীকে ক্ষমা করার একটা বিধান দুনিয়া জোড়াই চালু আছে। ইচ্ছে করলে সে সুযোগ তুমি নিতে পারো। তাহলে আলিসার একটা ইচ্ছা পূরণ করার অবকাশ পাবো আমরা। তোমাকে নিয়ে ঘর বাধার যে স্বপ্ন আলিসা দেখছে, তার সে স্বপ্ন পূরণ হবে। আলিসাকে যদি তুমি চাও তবে সে সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’

    অফিসার বলে চললো, ‘এটা কয়েদখানা নয়। তুমি এখন একজন অফিসারের কামরায় আছো। যদি তুমি চিন্তা করার সময় চাও তবে আজ রাত তোমাকে এখানেই রাখা হবে।’

    রহিম নিরব, নিস্তদ্ধ। বোবা চোখ মেলে সে ফ্যালফ্যাল করে অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল।

    অফিসারদেরও তেমন ভয় ছিল না যে, সে পালিয়ে যাবে। উঠানে ও সামনে সব সময় পাহারাদার থাকে। তাছাড়া সামরিক এলাকার কড়া পাহারা থেকে পালিয়ে ও যাবেই বা কোথায়?

    এক অফিসার তার সঙ্গীকে বললো, ‘কেন তুমি অযথা সময় নষ্ট করছো। একে গোপন ঘরে নিয়ে যাও। লোহার উত্তপ্ত শলাকা তার গায়ে লাগাও, দেখবে সে সব কথাই গড়গড় করে বলে দিচ্ছে। যদি তাতেও কাজ না হয় তবে ক্ষুধা ও পিপাসায় ফেলে রেখো দু’একদিন।’

    অন্য অফিসার তাকে ইশারায় কামরার বাহিরে আসতে বললো। দুজনই বাইরে এলে সে বললো, ‘আমার পরীক্ষা অন্যরকম বন্ধু। এ কথা ভুলে যেওনা, এরা মুসলমান। তুমি এ পর্যন্ত কতজন মুসলমানের কাছ থেকে গোপন তথ্য বের করেছ? তুমি কি জান, এই কমবখত জাত একবার যদি মুখ বন্ধ করে তবে মরে যাবে, তবুও মুখ খুলবে না। এ বেটা তো বলেই দিয়েছে, সমস্ত উৎপীড়ন ও শাস্তি তার গোনাহের সাজা হিসেবে গ্রহন করে নিবে।’

    ‘এ বেটা দেখছি পাকা মুসলমান!’

    ‘হ্যাঁ, একে টর্চার সেলে নিলেও সে বলবে, আমি কিছু জানি না। আমার উদ্দেশ্য ওকে হত্যা করা নয়, আমার শুধু জানা দরকার, তার সাথীরা কে কোথায় আছে? আর জানা দরকার, মিশরে আমাদের আক্রমণ করার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে তথ্য সে জানে কি না।’

    ‘ওর বাবারও তা জানা সম্ভব নয়।’ অন্য অফিসার বললো, ‘হাইকমান্ডের মুষ্টিমেয় অফিসার ছাড়া এ বিষয়ে আর কেউই অবগত নয়। এই গোয়েন্দা বণিকের মেয়ের ভালবাসায় বন্দী হয়ে আছে, তার তো দুনিয়ার আর কোন খবরের দরকার নেই। আমার তো এ কথাও বিশ্বাস হচ্ছে না, আলিসাই তাকে গ্রেফতার করিয়েছে। কারণ, সে এখনও এই উজবুকের প্রেমে পাগল হয়ে কান্নাকাটি করছে।’

    অফিসার তাকে নিয়ে কামরার বাহিরে এল। বললো, ‘বুদ্ধু, আলিসাকেই আমি এ ব্যাপারে ব্যবহার করতে চাই। আলিসাকে আজ এই কামরাতেই এনে রাখা হবে। আমি আশা করি, যে গোপন রহস্য আমরা কয়েকদিন চেষ্টা করেও স্বীকার করাতে পারবো না, আলিসার মত যুবতী মেয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেই গোপন খবর জেনে নিতে পারবে।’

    ‘একটা মেয়ের উপর এতটা ভরসা করা কি ঠিক হবে?’ সন্দেহের সুর সঙ্গী অফিসারের কন্ঠে।

    ‘এখনও তোমার মনে সন্দেহ কাজ করছে। শোন, তুমি তো এখনও সব কথা শোনইনি। আলিসা ফিরে এসে যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা জানতে পারলে বুঝতে, আলিসা কতটা কাজের। এ বন্দীর কাছ থেকে কথা বের করার দায়িত্ব যেহেতু আমাদের দু’জনের, তাই সব কথা তোমার জানা দরকার।

    আলিসা ঐ লোকটাকে গভীরভাবে ভালবাসতো। একজন নির্যাতীত খৃষ্টান ও উদ্বাস্তু পরিচয়ে লোকটা তাদের কাছে আশ্রয় নেয়। পরিচয়ের সময় এ যুবক তার নাম বলে, ‘ইলিমোর’।

    আলিসার বাবা কমান্ডার ওয়েস্ট মেকর্ডের সাথে মেয়ের বিয়ে পাকা করলে মেয়ে ওই বিয়েতে বেঁকে বসে। কমান্ডার মেকর্ডকে আলিসা ‘বুড়ো ভাম’ বলে গালি দেয় এবং অপমান করে।

    বাপ চাচ্ছিল কমান্ডারকে মোটা ঘুষ হিসেবে কন্যা দান করতে। কিন্তু সুদর্শন যুবক ইলিমোরের প্রেমে পড়ে মেয়ে তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে বসল।

    মেকর্ড যুবককে খুন করার হুমকি দিলে ঘটনা জটিল আকার ধারণ করে। নিরুপায় হয়ে ওরা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পালিয়ে যাওয়ার সময় যুবকটি যখন অনুভব করল, এখন আর ধরা পড়ার সম্ভাবনা নেই, তখন রাতে বিশ্রামের সময় সে তার আসল পরিচয় ফাঁস করে দেয় আলিসার কাছে। আলিসাকে সে বলে, ‘আমি ইলিমোর নই, আমার নাম রহিম। আমি একজন মুসলমান এবং আইয়ুবীর গোয়েন্দা।’

    আলিস মনে করেছিল, ইলিমোর তামাশা করছে। কিন্তু এ যুবক তাকে বিশ্বাস করায়, সে মোটেও হাসি তামাশা করছে না, বাস্তবিকই মুসলমান এবং তার নাম রহিম।

    রহিম জানতো না, আলিসার মনে মুসলমানদের প্রতি প্রচন্ড ভয় এবং ঘৃণা জমা হয়ে আছে। খুব শিশুকাল থেকেই এই ভীতি ও ঘৃণা জন্ম নিয়েছিল তার মনে। রহিমের এ কথাও জানা ছিল না, সে একজন অন্ধ খৃষ্ট ভক্ত ও খৃষ্ট ধর্মের একনিষ্ট অনুসারী। তার ধর্মপ্রীতি এত প্রবল যে, এ জন্য সে দুনিয়ার সব কিছু ত্যাগ করতে পারে।

    আলিসা যখন বুঝলো, তার প্রেমিক তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তখন তার হৃদয়ে ভয়ের এক শিহরণ বয়ে গেল। তার মনে হলো, যে লোক ভালবাসার নামে প্রতারণা করতে পারে, সে লোক পারে না এমন কোন অপকর্ম নেই। এ ধরণের লোক কখনো বিশ্বস্ত হতে পারে না।

    এ লোক একবার তাকে কায়রো নিয়ে যেতে পারলে তার ভাগ্যে কি ঘটবে কল্পনা করে শিউরে উঠল আলিসা। সে শুধু নিজেই তাকে ভোগ করবে, অন্যের দ্বারা তাকে নষ্ট করবে না এর নিশ্চয়তা কি?

    যে লোক তাকে মিথ্যা কথা বলে ঘর থেকে বের করতে পারে সে লোক সাধ মিটে গেলে যদি তাকে অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেয় তাহলে কি করতে পারবে আলিসা?

    শিশুকাল থেকে মন-মগজে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ও খারাপ ধারণা জমা ছিল, সেই সব ভয়ংকর দৃশ্য আলিসার সামনে ভেসে উঠতে লাগল। প্রেমিকের বিরুদ্ধে বিষিয়ে উঠল তার মন।

    আলিসার মনে মুসলমান প্রেমিকের চেয়ে ধর্মের প্রতি ভালবাসা প্রবল হয়ে উঠল। রাতে তার প্রেমিক ঘুমিয়ে গেলে ঘৃণাভরে তাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে এল আলিসা।

    তার মনে তখন প্রতিশোধের দাউ দাউ আগুন। প্রতিশোধ স্পৃহায় তার চেহারা তখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। সে এ কথা একবারও ভাবল না, আক্রা ফিরে গেলে তার বাবা তার সাথে কেমন ব্যবহার করবে? ভাবল না, সেই বুড়ো অফিসার আবার হামলে পড়বে তাকে বিয়ে করার জন্য। তার মনে তখন একটাই চিন্তা, একটাই শপথ, যে করেই হোক মুসলমানদের অনিষ্ট করতে হবে। সর্বাবস্থায় তাদের শত্রু মনে করতে হবে। ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য ক্রুশের নামে শপথ নিল সে।

    আলিসা ছিল খুব সাহসী ও চতুর মেয়ে। পালাবার ব্যাপারে সে এক নিখুঁত পরিকল্পনা তৈরী করল। রহিমকে তার মনোভাব কিছুই জানতে না দিয়ে সেও শুয়ে পড়ল তার সাথে। রহিম যখন গভীর ঘুমে মগ্ন তখন আলিসা ঘোড়ার ওপর আরোহন করে এমন চুপিসারে পালিয়ে আসে যে, রহিম তার কিছুই টের পায়নি।

    যে পথে গিয়েছিল সেই পথেই ফিরে এলো আলিসা। ভোর হওয়ার আগেই আক্রা এসে পৌঁছলো। বাবার কাছে গিয়ে সব অপরাধ স্বীকার করে রহিম সম্পর্কে সব কথা বলে দিলো তাকে।

    তার পিতা তখনই কমান্ডার ওয়েস্ট মেকর্ডকে এই ঘটনাটি জানালো। কমান্ডার তিনজন সৈন্য সাথে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল রহিমের সন্ধানে।

    সকালে ঘুম থেকে জেগে রহিম দেখে ঘোড়াসহ আলিসা উধাও। অগত্যা সে মরুভূমি থেকে লোকালয়ে পৌঁছার জন্য পায়ে হেঁটেই রওনা দিল। কিন্তু পায়ে হেঁটে সে আর কতদুর যাবে? মেকর্ড-এর হাতে অচিরেই ধরা পড়লো সে। এখন সেই প্রেমিক গোয়েন্দা আমাদের হাতে।’

    ‘কিন্তু রহিম জানে না, আলিসা তাকে ধোঁকা দিয়েছে?’

    ‘না। এ জন্যই আমি এখন আলিসাকে ব্যবহার করতে চাই। আমি রহিমকে খুব ভাল খাবার খেতে দেবো এবং আরাম আয়েসে রাখবো যাতে সে বিভ্রান্ত হয়।’

    সেনানিবাসের অফিসার্স কোয়ার্টার। সকল চাকর-বাকর ও লোকজনের মুখে একই কথা, একজন মুসলিম গোয়েন্দা ধরা পড়েছে। রেজাউলও ফ্রান্সিস পরিচয়ে সেই চাকরদের সঙ্গে আছে। অন্যদের সাথে সেও সমান তালে মুসলিম গোয়েন্দাকে গালমন্দ করে যাচ্ছে।

    সে গালমন্দ করছে, আর জোরে জোরে চিৎকার করে বলছে, ‘এই গোয়েন্দাকে ফাঁসি দেয়া হোক। আর তা না হলে তাকে ঘোড়ার পিছনে বেঁধে ঘোড়া ছুটানো হোক।’

    রেজাউল জানে রহিম এখনও সেই কামরাতেই আছে। রেজাউলের মত অন্যরাও বন্দীকে কয়েদখানায় পাঠানো হচ্ছে না দেখে আশ্চর্য হচ্ছিল। বাবুর্চীখানার এক লোক বললো, ‘কয়েদীকে আজ অফিসারের খাবার দেয়া হবে।’

    যখন সে সত্যি সত্যি কয়েদীর জন্য অফিসারের খাবার নিয়ে গেলো তখন সকলেই একে অন্যের মুখের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো।

    রেজাউলের বিস্ময় তখন চরমে। সে বাবুর্চীখানার লোককে এক সময় আড়ালে পেয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘এর মানে কি? মুসলমান গোয়েন্দাকে এত জামাই আদর করা হচ্ছে কেন? যে খাবার আমাদের ভাগ্যে জুটে না সে খাবার দেয়া হচ্ছে কয়েদীকে! তবে কি এ লোক আসলে কোন গোয়েন্দা নয়?’

    ‘কি বলছো তুমি! তুমি তো জানো না, এ বড় ভয়ংকর গোয়েন্দা!’ চাকর তার বিদ্যা জাহির করে বললো, ‘অফিসার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন, আমি নিজে তার মুখ থেকে শুনেছি, এ কয়েদীকে কেবল ভাল খাবারই দেয়া হবে না, তার জন্য নাকি রুপসী কোন মেয়েও জোগাড় করা হয়েছে। খাওয়া দাওয়ার পর সেই মেয়েকে তার কামরায় পাঠিয়ে দেয়া হবে।’

    ‘বলো কি!’ চোখে মুখে চরম বিস্ময় ফুটিয়ে বললো রেজাউল।

    ‘হ্যাঁ, এই মেয়ে নাকি গোয়েন্দার পেট থেকে কথা বের করবে।’ বলল চাকর।

    রহিমের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আলিসাকে নিয়ে তার কামরার দিকে এগিয়ে গেল অফিসার দু’জন। কামরার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। আলিসাও দাঁড়াল তাদের সাথে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল অফিসারের দিকে।

  • সর্প কেল্লার খুনী

    সর্প কেল্লার খুনী

    সর্প কেল্লার খুনী

    দামেশকে সুলতান আইয়ুবী বীর বেশে প্রবেশ করলেন, সঙ্গে মাত্র সাতশ অশ্বারোহী। কি করে এই স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এমন বিপুল বিজয় সাধন করলেন তিনি, সে এক বিষ্ময়ের ব্যাপার। এ ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে ছিল সুলতান আইয়ুবীর জান-কবুল অগ্রগামী সৈন্যদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা। এ জান-কবুল অগ্রগামী বাহিনী ছিল সেসব গোয়েন্দাদের, যাদের কেউ কেউ বণিকের বেশে, কেউ নিরিহ পথচারী সেজে, কখনো একাকী, কখনো দু’জন, কখনো তিন বা চার জনের ছোট ছোট দলে দামেশকে প্রবেশ করেছিল। দামেশকের সাধারণ মানুষের সাথে একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিল তারা। কুলি-মজুর থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, পথচারী, এমনকি ছাউনিতেও ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছিল এসব গোয়েন্দারা। পরিবেশ পরিস্থিতিকে সুলতান আইয়ুবীর অনুকূলে আনার জন্য জনমতকে প্রভাবিত করা এবং সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য সুলতানের পক্ষে আছে তাদেরকে সংগঠিত করাই ছিল তাদের মূল কাজ।

    এভাবে সুলতানের আগমনের পূর্বেই দামেশকের পরিস্থিতি তারা সুলতানের স্বপক্ষে নিয়ে আসে। সুলতান আইয়ুবী দামেশকের ফটকে পৌঁছলে সুলতানের জন্য দামেশকের দরজা খুলে দেয়ার যে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয় জনগণের পক্ষ থেকে, মূলত তারাই সে চাপের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এসব গোয়েন্দাদের প্রায় সবাই ছিল চৌকস ও বুদ্ধিদীপ্ত। আলী বিন সুফিয়ান গোয়েন্দাগিরিতে ঝানু এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শীদের বাছাই করে এ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। যে কোন ধরনের পরিস্থিতে ঠান্ডা মাথায় কাজ করার জন্য
    পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেয়েছিল এরা সুলতানের কাছ থেকে।

    প্রতিটি গোয়েন্দাই ছিল সব ধরনের অস্ত্র ব্যাবহারে অভ্যস্ত এবং সব রকমের বিপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পটু। তারা কেবল বুদ্ধিদীপ্ত এবং বিচক্ষণই ছিল না, তারা দুঃসাহসী এবং বেপরোয়াও ছিল। আল্লাহর কাছে জীবন বিলিয়ে দেয়ার উদগ্র কামনা ছিল সবার অন্তরে। শাহাদাত লাভের জন্য তাদের প্রতিটি অন্তর ছিল উদগ্রীব।

    তাই তারা অবলীলায় এমন সব ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারতো, যা সাধারণভাবে কেউ চিন্তা করতেও ভয় পেতো। এ আবেগ শুধু সামরিক ট্রেনিং দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন হতো নৈতিক প্রশিক্ষণ।

    আলী তার বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এমনভাবে তৈরি করতেন, যাতে তাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস জন্মে, দ্বীনের প্রতি সৃষ্টি হয় অপরিসীম ভালবাসা ও মহব্বত। হৃদয় ভরপুর থাকে শাহাদাতের তামান্নায়।

    ইসলামের জন্য নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে শরীক হতে হতো তাদের। এ চেতনার কারনেই এসব অভিযানে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়তো জেহাদের আবেগময় জযবা নিয়ে। এমনি একদল নিবেদিতপ্রাণ যুবকদের নিয়েই সুলতান আইয়ুবী তার কমান্ডো বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। সুলতান আইয়ুবী তার বাহিনী নিয়ে দামেশক যাত্রা করার আগেই বাছাই করা এ কমান্ডো ও গোয়েন্দাদের দামেশক যাত্রা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওরা রওনা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হলে তাদের সামনে এক আবেগময় ভাষণ দিলেন তিনি।

    ভাষণের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বললেন, ‘যদি দামেশকের সেনাবাহিনী মোকাবেলার জন্য ময়দানে নেমে আসে, তাহলে তোমাদের প্রতি আমার নির্দেশ রইল, শহরের মধ্যে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দেবে। উত্তেজিত জনগণকে নিয়ে ছুটে আসবে ফটক প্রাঙ্গণে। ভেতর থেকে গেট খুলে দিতে চেষ্টা করবে শহরের।’

    জনমতকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এদের কোন জুড়ি ছিল না। সুলতানের পক্ষের লোকদের সংগঠিত করে সুবিশাল জঙ্গী মিছিলের মাধ্যমে খলিফার অনুগত লোকদের মনে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করে, সুলতান ফটকে
    পৌঁছার আগেই সুলতানের এসব জানবাজ কমান্ডো ও গোয়েন্দারা শহরের অবস্থান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

    এক ফরাসি কথাশিল্পী তার কাহিনীতে এ যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সুলতান আইয়ুবীর যুদ্ধবাজ কমান্ডোরা স্বাভাবিক মানুষ ছিল বলে মনে হয় না। ইসলামের ধর্মীয় আবেগ তাদের উন্মাদ বানিয়ে ফেলেছিল! নইলে জেনেশুনে এভাবে হাসতে হাসতে মরণ সাগরে ঝাঁপ দিতে পারতো না ওরা। জেহাদী জযবা এক ধরণের মানসিক রোগ। পতঙ্গ যেমন আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ছুটে যায়, এ রোগে ধরলে মানুষও তেমনি ছুটে যায় মরণ সাগরে ঝাঁপ দিতে।

    তাঁর হয়তো জানা নেই, এ জেহাদী জযবাই একজন মানুষকে মুজাহিদে রূপান্তরিত করে। এ আবেগের সাথে পরিচয় নেই বলেই ফরাসি লেখক তাকে ‘ধর্মীয় উন্মাদনা’ ও ‘মানসিক রোগ’ বলে খাটো করে দেখছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, মুসলমানদের কাছে এ আবেগ বা জযবার মূল্য কত! এর স্বাদ কত মধুর ও তৃপ্তিদায়ক! প্রকৃত মুসলমানের জীবন তো ধন্য হয় এই আবেগ ও জযবাকে সম্বল করেই!

    এ জানবাজ গোয়েন্দাদেরই নেতা আলী বিন সুফিয়ান। তার দুই সহকর্মী হাসান বিন আব্দুল্লাহ ও জায়েদানকে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজ হাতে। যুদ্ধ কৌশলে তারা এতটাই পারদর্শী ও দক্ষ হয়ে উঠে যে, এখন সেনানায়করাও তাদের কাছে শিখতে পারবে। আলী তাদেরকেই পাঠিয়েছিলেন দামেশকে।

    সুলতান আইয়ুবী দামেশক রওনা হবার আগে বললেন, ‘আলী, কায়রোর আভ্যন্তরীণ অবস্থা ভাল না। এ অবস্থায় কায়রোকে অরক্ষিত রেখে অভিজানে বের হওয়া আমার সাজে না। কিন্তু ওস্তাদ জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর আহাজারী এবং মিল্লাতের দুর্দিন ডাকছে আমাকে। আমি চাই, আমি যে কয়দিন কায়রোতে অনুপস্থিত থাকবো, তুমি থাকবে কায়রোতে। খ্রিস্টান ক্রীড়নকদের হাত থেকে দামেশকে মুক্ত করে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এর হেফাজতের জিম্মা থাকবে তোমার ওপর। মিশরে খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের তৎপরতা আশংকাজনক হারে বেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে কারণে তোমাকে খুবই হুশিয়ার থাকতে হবে।

    এ কারণেই সুলতানের সাথে অভিযানে আসতে পারেন নি আলী। পরিবর্তে সুলতানকে সামগ্রিক সহায়তাদানের জন্য হাসান বিন আবদুল্লাহকে আগেই দামেশকের পথে পাঠিয়ে দিলেন। দামেশকের সুলতানের জানবাজ গেরিলা ও গোয়েন্দাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো এই হাসান বিন আবদুল্লাহ।

    খ্রিস্টানদের তল্পীবাহক কতিপয় স্বার্থপর আমীর ষড়যন্ত্র করে জঙ্গীর নাবালক সন্তান আল মালেকুস সালেহকে খলিফা ঘোষণা করলে মুসলিম মিল্লাতের স্বার্থে জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী সুলতান আইয়ুবীকে দামেশক অভিযানের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। এ আবেদনে সাড়া দিয়ে সুলতান যখন দামেশক এসে পৌঁছলেন তখন সেখানকার বেশীর ভাগ সৈন্যই কমান্ডার তাওফীক জাওয়াদের সেনা কমান্ডে ছিল। খলিফার দেহরক্ষী রেজিমেন্ট, পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী অবশ্য তার নেতৃত্বে ছিল না। এরা ছাড়া মূল সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যই সেনাপতি জাওয়াদের নেতৃত্বে সুলতান আইয়ুবীর আনুগত্য কবুল করে নিলে সুলতান এসব সৈন্যদেরকে তার নিজ বাহিনীর সাথে একীভূত করে নিলেন।

    দামেশকে আইয়ুবীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তথাকথিত খলিফা এবং তার মন্ত্রণাদাতা ওমরারা দামেশক ছেড়ে পালিয়ে গেল। তাদের সাথে গেল তাদের প্রতি অনুগত সৈন্য ও খলিফার দেহরক্ষী বাহিনী।

    তাদের ভয় এবং আশংকা ছিল, সুলতানের আইয়ুবীর সৈন্যরা তাদের পিছু ধাওয়া করবে। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী তা করলেন না। সেনাপতিদের কেউ কেউ পালিয়ে যাওয়া খলিফা ও আমীরদের পিছু ধাওয়া করার অনুমতি চাইলে তিনি তাদের বারণ করলেন।

    তারা আশংকা প্রকাশ করে বললো, ‘কিন্তু ওরা আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে বাইরের সাহায্য নিয়ে অভিযান চালাতে পারে!’

    আরেকজন বললো, ‘খ্রিস্টানরা তো ওদের সাহায্য করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে!’

    সুলতান আইয়ুবী ওদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি কখনও অন্ধকারে পথ চলি না। আপনারা অস্থির হবেন না। ওরা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং কারা কারা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে আমি তা দেখতে চাই। আমার চোখ ও কান ওদের সাথেই সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করছে!

    ঐ হতভাগারা এত তাড়াতাড়ি আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে পারবে না। আমি শুধু দেখতে চাই, ক্রুসেড বাহিনীর দৃষ্টি কোন দিকে? তারা কি মিশরের দিকে নজর দেয়, না দামেশকের দিকে, ওটাই এখন দেখার বিষয়।’

    সুলতানের কথার উপর আর কথা চলে না, তাই সবাই চুপ করে গেল। সুলতান খানিক বিরতি দিলেন। একটা গুমোট নিস্তব্ধতা বয়ে গেল সবার উপর দিয়ে।

    নিস্তব্ধতা ভাঙলেন সুলতান নিজেই। বললেন, ‘সম্ভবত ওরাও অপেক্ষা করছে, আমি কি পদক্ষেপ নেই তা দেখার জন্য। এমনও হতে পারে, তারা আমার চাল বুঝেই তাদের চাল চালবে। অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আপনারা নিয়মিত সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকুন, পুরোদমে যুদ্ধের মহড়া চালাতে থাকুন। সময় এলে গাদ্দার আমীরদের শায়েস্তা করার জন্য আমি ওদেরকে আপনাদের হাতেই তুলে দেবো।’

    সুলতান আইয়ুবী যাদেরকে তাঁর চোখ ও কান বলেছিলেন, তারা আর কেউ নয়, আলীর গোয়েন্দা বিভাগের সেই জানবাজ বাহিনী। এদের অধিকাংশই মিশরের বাসিন্দা, তবে সবাই নয়, এ অঞ্চলের বেশ কিছু সদস্য আছে এ দলে।

    খলিফা আল মালেকুস সালেহ ও তাঁর আমীর ওমরারা দামেশক থেকে পালানোর সময় তাদের সাথে সুলতানের এসব গোয়েন্দাদের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। এই পলাতকদের সংখ্যা মোটেই কম ছিল না।

    সমস্ত আমীর, উজির, কিছু জমিদার, প্রশাসনের অনেক অফিসার ও করমছারি, যারা খলিফার পক্ষে ছিল, সবাইকেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন আইয়ুবী। পলাতকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যার মত পালিয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেন আলীর গোয়েন্দারা। তারা সহজেই মিশে যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের সাথে।

    খলিফা আল মালেকুস সালেহ ও তার পোষ্য আমীররা প্রতিশোধের জন্য কি ধরণের তৎপরতা চালায় এটা দেখাই তাদের উদ্দেশ্য। সেই সাথে খ্রিস্টানরা তাকে কেমন সাহায্য দেয়, কিভাবে দেয় তাও লক্ষ্য করার দায়িত্ব ছিল তাদের উপর। হাসান বিন আবদুল্লাহ নিজের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করে সুলতান বা আলীর সাথে পরামর্শ ছাড়াই এসব গোয়েন্দাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে পলায়নপর লোকদের সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সে ভাল করেই জানতো, তার এই সিদ্ধান্ত এক সময় অবশ্যই সুফল বয়ে আনবে। পরে সুলতানকে এ ব্যাপারে অবহিত করলে তিনি খুবই খুশী হন এবং সন্তোষ প্রকাশ করে তার পিঠ চাপড়ে দেন।

    এ গোয়েন্দাদেরই একজন মাজেদ বিন মুহাম্মদ হেজাযী। অত্যন্ত সুপুরুষ ও সুন্দর চেহারার যুবক। শারীরিক গঠন মাঝারী, তবে সুগঠিত। আল্লাহ তার মুখে এমন মাধুর্য দান করেছিলেন যে, তার কথা যাদুর মত প্রভাব বিস্তার করতো।

    গোয়েন্দাদের প্রায় সবাই দক্ষতা ও গুণাবলীতে একই রকম হলেও মাজেদ বিন মুহাম্মদ ছিল বিস্ময়কর ব্যাতিক্রম। তার নৈপুণ্য ও দক্ষতা ছিল অতুলনীয়।

    গোয়েন্দাদের প্রায় সবাই সুন্দর ও সুগঠিত স্বাস্থের অধিকারী ছিল। তাদের এ সুন্দর স্বাস্থ্য ও লাবণ্যের একটি বিশেষ কারণ ছিল, তারা কেউ নেশা করতো না, অলস এবং আরামপ্রিয় জীবন যাপন করতো না। নিয়মিত ব্যায়াম এবং শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের কারণে তাদের চেহারায় সব সময় প্রশান্তির প্রলেপ মাখা থাকতো। তাদের চরিত্রের দৃঢ়তা, ইস্পাতের মতো অনড়, অটল মনোবল এবং প্রবল ও অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তির মূলে ছিল ইসলাম। ইসলামী আদর্শের পরিপূর্ণ জ্ঞান ও অনুশীলন তাদেরকে দিয়েছিল এক অনড় দৃঢ়তা। তাদের কথা ও কাজে প্রকাশ পেতো সে দৃঢ়তার ছাপ।

    মাজেদ বিন মুহাম্মদ হেজাযী কাজে কর্মে তার সঙ্গীদের চাইতেও চৌকশ এবং ইস্পাত কঠিন ছিল। হৃদয় ছিল চেহারার চাইতেও অনুপম সুন্দর আর মহৎ। এরুপ সৌন্দর্য নিয়েই সে দামেশক থেকে পালাচ্ছিল। একটি আরবী ঘোড়ার ওপর বসেছিল সে। তার কোমরে ঝুলছিল সুদ্রিশ তলোয়ার। ঘোড়ার জিনের সাথে বাঁধা ধারালো বর্শা চমকাচ্ছিল রোদের কিরণ লেগে। ঘোড়া এগিয়ে যাচ্ছিল ধীর গতিতে। আর সে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিল দূর দিগন্তে।

    একাকী পথ চলছে মাজেদ হেজাযী। যাচ্ছে হলবের দিকে। পথে অনেক লোকই চোখে পরলো তার। অনেকে তার মতো হলবের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে একজনকেও বেছে নিতে পারলো না, যার সাথে পথ চলা যায়, যাকে সফর সঙ্গী করা যায় নিঃশঙ্ক চিত্তে।

    সে মনে মনে একজন সম্ভ্রান্ত সহযাত্রী খুঁজছিল। খুঁজছিল এমন সহযাত্রী, যে তার মিশনের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে। এমন সহযাত্রী সে-ই হতে পারে, যে লোক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার, আমীর বা খলিফা আল মালেকুস সালেহর নিকতাত্তিয়, বন্ধু বা আপনজন।

    খলিফা আল মালেকুস সালহকে খুঁজে ফিরছিল তার চোখ ও মন। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস ও করলো, খলিফা কোন দিকে গেছে জানে কিনা। কিন্তু কেউ খলিফার কোন সন্ধান দিতে পারলো না।

    সে ভালো মতোই জানতো, আল মালেকুস সালেহ তার পিতা নূরুদ্দিন জঙ্গীর গুণ বা সাহস কোনটাই পায়নি। খলিফার গুণ–বৈশিষ্ট্যের কোন ছিটেফোঁটা নেই তার মধ্যে। সে এগারো বছরের এক চঞ্চল বালক মাত্র। তাকে খ্রিস্টানদের চক্রান্তে সুযোগ সন্ধানী ও লোভী আমীররা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাজ্যের সিংহাসনে বসিয়েছে। নামে মাত্র খলিফা বালিক সালেহ, প্রকৃত শাসক সেই স্বার্থবাদী আমীররা।

    সে চিন্তা করে দেখলো, এ নাবালক খলিফার পক্ষে একা কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। কোথায় যেতে হবে, কি করতে হবে, তাই তো তার জানা থাকার কথা নয়!

    ক্ষমতা হারা হলেও সে ঘোষিত খলিফা। ফলে চক্রান্তকারীরা কিছু করতে চাইলে অবশ্যই তাকে সামনে রাখবে। নিশ্চয়ই এখনো সে আমীর, উজির এবং সভাষদবর্গ পরিবেষ্টিত হয়েই পথ চলছে। আর সে কাফেলার সাথে আছে রাজকীয় ধন-দৌলত ও অর্থসম্পদ বোঝাই উটের সারি।

    মাজেদ হেজাযী মনে মনে ভাবছিল, যদি সে কাফেলার সন্ধান পাই, তবে আল মালেকুস সালেহের ভক্ত হয়ে সেই কাফেলার সাথে যুক্ত হয়ে যাবো।

    একবার সে কাফেলার দেখা পেলে কি করতে হবে জানা আছে তার। কি করে অচেনা লোকের আপন হওয়া যায়, কি করে তাদের মনের কথা বের করে আনা যায়, সেসব কৌশল অন্যদের চাইতে ভালই রপ্ত করেছে সে।

    কিন্তু কোথায় সে কাফেলা? তার শূন্য দৃষ্টি বার বার এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করলো। কিন্তু কাঙ্খিত কাফেলা, নিদেনপক্ষে সঙ্গী করার মতো পছন্দসই কোন ব্যক্তিকেও সে খুজে পেল না।

    সামনে পাহাড়ী এলাকা। পাহাড়ের পাদদেশে শস্যক্ষেত ও ফলের বাগান। একটু বিশ্রামের আশায় সেই বাগানের এক গাছের নিচে বসলো মাজেদ।

    অল্প দূরে এক জায়গায় দুটি ঘোড়া দেখতে পেল। ওদিকে তাকাতেই তার একটু উপরে সবুজ ঘাসের উপর একজন লোককে শুয়ে থাকতে দেখলো। দৃষ্টি আরেকটু উপরে তুলতেই তার নজর পড়লো একটি মেয়ের উপর। মেয়েটিও তার মতো শুয়ে আছে।

    ওখান থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সে গাছের নিচে শুয়ে পড়লো। শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবছে, হঠাৎ একটি ঘোড়া বিকট শব্দে ডেকে উঠলো।

    সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো ঘোড়ার পাশে শায়িত লোকটি। উঠে বসতেই তার নজর পড়লো মাজেদ হেজাযীর উপর। মাজেদ হেজাযীও ঘোড়ার ডাক শুনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছিল সেদিকে, চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের। লোকটির পোশাক পরিচ্ছদ বলছিল, সে কোন খান্দানী বংশের লোক।

    মনে হয় সে লোক ও মনে মনে কোন পছন্দসই সফর সঙ্গী খুঁজছিল। মাজেদ হেজাযীকে দেখে তার পছন্দ হয়ে গেল এবং ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো।

    মাজেদ হেজাযী সাড়া দিল তার ডাকে। সে শোয়া থেকে উঠে ওদের দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে অপরিচিতের সাথে মুছাফাহ করলো।

    মেয়েটিও ততক্ষণে উঠে বাসেছে। ওর বয়স বেশী নয়। দেখলে মনে হয়, কৈশর উত্তীর্ণ এক নবীন যুবতী। লাবণ্য ও সৌন্দর্য মাখামাখি হয়ে লেপ্টে আছে মেয়েটির অঙ্গ জুড়ে। গলায় হীরের হার। পোশাকে জৌলুসের ছাপ। এরা যে সাধারণ কেউ নয়, তা কাউকে বলে দিতে হয় না।

    লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মাজেদ এক পলক তাকিয়েই বুঝে ফেললো, এরা কারা।

    ‘তুমি কে?’ লোকটি জিজ্ঞেশ করলো, ‘তুমি কি দামেশক থাকে আসছো?’

    ‘হ্যাঁ, আমি দামেশক থেকেই এসেছি!’ মাজেদ বললো, ‘কিন্তু এখন দেয়ার মতো কোন পরিচয় নেই। ভাগ্যই এখন একমাত্র পরিচয়। তার কন্ঠ থেকে একরাশ হতাশা ঝড়ে পড়লো। হতাশ কন্ঠেই সে প্রশ্ন করলো, ‘আপনারা কোথায় যাবেন?’

    ‘মনে হয় আমরা একই পথের পথিক!’ লোকটি মুচকি হেসে উত্তর দিলো, ‘ধরো, তোমারই মতো মঞ্জিলহীন মুসাফির!’

    কথা বলতে বলতে লোকটি ভাল করে মাজেদ হেজাযীর দিকে। বললো, ‘আমি কি ধরে নেবো, ভাগ্যই তোমার মতো যুবককে আমাদের সংগী বানিয়ে দিয়েছে।’

    ‘অপরিচিত যাকে-তাকে সঙ্গী করা ঠিক নয় সাহেব। বিশেষ করে যার সাথে এমন সুন্দরী মেয়ে থাকে, আর সে মেয়ের গলায় থাকে এমন মূল্যবান হার!’ মেয়েটির গলার দিকে ইঙ্গিত করলো সে।

    লোকটি এতে মোটেও বিব্রত না হয়ে বললো, ‘তোমার মতো সঙ্গী পাওয়া আসলেও ভাগ্যের ব্যাপার। বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী সঙ্গী বিপদের বন্ধু। সাহস কেমন আছে জানি না, তবে বুদ্ধি যে সতেজ তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’

    এবার মাজেদ হেজাযীও হেসে দিল। বললো, ‘আপনি কি করে আমাকে আস্থাভাজন ভাবলেন, আমি খারাপ লোকও তো হতে পারি।’

    ‘সে তোমার চেহারাতেই লেখা আছে। শোন, আমাদের মতো তুমিও আইয়ুবীর তাড়া খেয়ে দামেশক ছেরেছো। বিপদগ্রস্ত লোকেরা সব সময়ই একে অন্যের সহায়ক হয়। বলতে পারো, আইয়ুবীই আমাদের পরস্পরকে বন্ধু বানিয়ে দিয়েছে।’

    ‘এটা আপনি ঠিকই বলেছেন। অবশ্যই আমরা একে অন্যকে সাহায্য করবো। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, জীবন দিয়ে হলেও আমি আপনাদের সাহায্য করবো।’

    ‘আইয়ুবী কি আমাদের তাড়া করতে পারে? তুমি কি তেমন কোন আভাস পেয়েছো?’

    ‘তাড়া করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার সাথে সৈন্য খুবই কম বলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য পাঠাতে পারে নি। শহরের নিয়ন্ত্রণ আয়ত্তে এলেই সে আমাদের খুঁজে বের করার জন্য চারদিকে সৈন্য পাঠিয়ে দিবে।’

    ‘খুবই দুশ্চিন্তার কথা।’

    ‘কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা!’

    ‘কি?’

    ‘একটু আগে আমি রাস্তায় দুটো লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। শুনেছি ওরা ডাকাতের হাতে মারা গেছে। দামেশক থেকে পলাতক লোকদের ওপর হামলা করতে শুরু করেছে ডাকাতরা, এটা খুবই ভয়ের কথা। কারণ, আমরা যারা পালাচ্ছি, তার সবাই পরস্পর বিচ্ছিন্ন। অনেকেই সহায় সম্পদ সঙ্গে নিয়ে পালাচ্ছি। ডাকাতদের জন্য এ এক সুবর্ণ সুযোগ। আমাদের জান-মাল ছিনিয়ে নেয়ার এ সুযোগ ওরা হাত ছাড়া করবে বলে মনে হয় না।’

    মাজেদের কথা শুনে মেয়েটির আকর্ষণীয় চেহারা হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সে তার সঙ্গীর দিকে তাকালো ভয়ার্ত ও করুণ চোখে। লোকটির অবস্থাও ভালো নয়। তার মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে দুশ্চিন্তার ছায়া পড়লো।

    ‘তুমি তো আমাদের বড় দুর্ভাবনায় ফেলে দিলে যুবক।’

    ‘না, না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তবে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা দরকার। সাবধান থাকলে অনেক বিপদই এড়ানো যায়।’

    ‘কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আইয়ুবী আর ডাকাতদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উভয়েই লুটেরা, খুনী এবং নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী। এদের কারো মধ্যেই দয়ামায়ার চিহ্নও নেই!’

    ‘ঠিক বলেছেন। ইনি আপনার কি হয়?’ মেয়েটির দিকে ইশারা করে জানতে চাইল মাজেদ।

    ‘ও আমার স্ত্রী।’

    ‘দামেশকে আর কয়জন স্ত্রী ছেড়ে এসেছেন?’ মাজেদ হেজাযী আবার জিজ্ঞেস করলো।

    ‘চার জন।’

    ‘আল্লাহর হাজার শুকুর যে, আপনি আপনার পঞ্চম স্ত্রীকে নিয়ে নিরাপদে শহর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে পেরেছেন!’

    ‘তিরস্কার করছো! আমি তো তাও একজন স্ত্রী সঙ্গে এনেছি, কিন্তু তুমি তো তাও আনো নি!’

    ‘কোন নারীকে নিয়ে শর ছাড়ার মতো অবস্থা আর নেই। তাছাড়া …’

    লোকটি তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি আইয়ুবীর সৈন্যদের কি অবস্থায় দেখে এসেছো? তারা কি শহরে লুটতরাজ শুরু করে দিয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ, মাজেদ হেজাযী বললো, ‘ সেখানে এখন ভয়ানক লুটপাট চলছে। আমি…’

    ‘দামেশকের কোথায় তোমার বাড়ি? সেখানে তুমি করতে?’

    ‘সে পরিচয় আমি কাউকে বলতে চাই না।’

    ‘বুঝেছি, তুমি আমাদের বিশ্বাস করতে পারছো না। ঠিক আছে, আস্থা না এলে বলার দরকার নেই। তবে বললেও তোমার কোন ক্ষতি আমাদের দিয়ে হতো না।’

    ‘না, না, কি বলছেন আপনি। আমি মোটেই আপনাদের অবিশ্বাস করছি না। আমার পরিচয় শুনতে আপনাদের ভাল লাগবে না বলেই আমি ইতস্তত করছি।’

    ‘কি যে বলো। তুমি যা তাই তোমার পরিচয়। নিজের আসল পরিচয় প্রকাশে কোন রকম হীনমন্যতা থাকা উচিৎ নয় কারো। তুমি নিঃসঙ্কোচে তোমার পরিচয় বলতে পারো, আমরা কিছুই মনে করবো না।’

    ‘আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর একজন সালার।’

    সঙ্গে সঙ্গে লোকটার মুখের হাসি অদৃশ্য হয়ে গেলো। কম্পিত কন্ঠে বললো, ‘আমাদের সাথে যে টাকাকড়ি আছে সব নিয়ে যাও। কিন্তু আমাদের কোন ক্ষতি করো না। তোমার কাছে আমি করজোড়ে প্রার্থনা করছি, আমাদের ওপর রহম করো, দয়া করে একটু প্রাণ ভিক্ষা দাও।’

    মাজেদ হেজাযী হো হো করে হেসে উঠলো। বললো, ‘অর্থ, সম্পদ ও নারীর চিন্তা মানুষকে কাপুরুষ ও দুর্বল বানিয়ে দেয়। আমি বেঁচে থাকতে কেউ আপনাদের গায়ে আঁচড়ও দিতে পারবে না। আর সম্পদের কথা বলছেন? এ সম্পদ আপনাদের। কেউ তা ছিনিয়ে নিতে চাইলে এ তলোয়ার তার জবাব দেবে। আসলে আপনাদের কাছে এখনো আমার আসল পরিচয় বলতেই পারিনি।’

    ‘মুহতারাম! আমাকে বলুন আপনি কে? দামেশকে আপনি কি পদে ছিলেন এবং আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

    ‘আমি সত্যি কথাই বলেছি, আমি আইয়ুবীর সৈন্য ঠিকই, তবে পলাতক। আসলে আমি জঙ্গীর সৈন্য। তিনি আমাকে আইয়ুবীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। জঙ্গীর নুন খেয়েছি আমি, আজ মরহুম জঙ্গীর পুত্রের এ দুর্দিনে তার পাশে না দাঁড়ালে নিমকহারামী হবে। তাই আইয়ুবীর ওখান থেকে পালিয়ে এসেছি। এবার আপনার পরিচয় বলুন। আশা করি আপনার অন্তরঙ্গ হিতৈষী ও জানবাজ রক্ষক হিসাবে আমার মতো আর কাউকে পাবেন না। আমরা উভয়েই একই নৌকার যাত্রী। এখন থেকে আপনাদের যে কোন বিপদে আমাকে আপনাদের পাশেই পাবেন।’

    ‘আমি দামেশকের শহরতলীর এক জমিদার। দরবারে আমার যথেষ্ট প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ছিল। রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা এবং যুদ্ধ পলিসি নির্ধারণে আমার মতামতের গুরূত্ত অনেক। খলিফার রক্ষী বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিয়োগ দিয়েছি আমি। তিনি আমাকে তার একান্ত আপনজন বলেই ভাবতেন। আমার বেরুতে একটু দেরী না হলে তার সাথে একত্রে যাওয়ার কথা ছিল আমার।’

    ‘কি সৌভাগ্য আমার! খলিফার একজন অন্তরঙ্গ বন্ধুর সেবা করার সুযোগ পাচ্ছি আমি! আপনি কি এখন তার কাছেই যাচ্ছেন?’

    ‘হ্যাঁ, খলিফা আল মালেকুস সালেহ সঙ্গী সাথীদের নিয়ে হলব গিয়ে উঠবেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকেও হলব পৌঁছতে বলেছেন তিনি।’

    ‘আমিও হলবেই যাচ্ছিলাম। তিনি ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হলবই এখন তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান।’

    ‘তোমাকে পেয়ে আমার খুবই উপকার হলো। জমিদারীর সবকিছু দামেশকে ফেলে এলেও সোনাদানা ও হীরা-জহরত যথেষ্টই সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বিদেশে মান সম্মান, প্রতিপত্তি সবই তো কিনতে হবে এ অর্থের বিনিময়ে! আফসোস হচ্ছে আমার চার বিবির জন্য! ওদেরকে চাকর-বাকরের হাতে রেখে এসেছি। কিন্তু লুটপাট শুরু হলে এ চাকররাই আমার বাড়ি লুট করবে না, তার নিশ্চয়তা কি?’

    ‘ও নিয়ে এখন আফসোস করে লাভ নেই। ছোট বিবিকে সঙ্গে আনতে পেরেছেন, এও কি কম কথা!’

    ❀ ❀ ❀

  • চারদিকে চক্রান্ত

    চারদিকে চক্রান্ত

    চারদিকে চক্রান্ত

    খলিফা আল মালেকুস সালেহ ও খৃস্টান সামরিক উপদেষ্টারা উইণ্ডসারের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় মিলিত হয়েছেন। উইন্ডসার খৃস্টান সম্রাট রিমাণ্ডের দূত হয়ে এসেছেন হলবে। নৈশভোজের পর আছে জমজমাট নৃত্যানুষ্ঠান। সবাই সমবেত হয়ে অপেক্ষা করছিল উইণ্ডসারের জন্য। তার আসার সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কেন তিনি বিলম্ব করছেন দেখার জন্য অবশেষে মেহমানখানায় লোক পাঠানো হলো।

    একটু পর।

    উইণ্ডসারকে ডাকতে যাদের পাঠানো হয়েছিল ফিরে এল তারা। উইণ্ডসার নয়, তার বদলে তাদের সাথে আসরে এসে পৌঁছলো উইণ্ডসারের লাশ।

    উইণ্ডসারের অপেক্ষায় এতক্ষণ যারা পথ চেয়ে বসেছিল, হতবিহ্বল হয়ে পড়লো তারা। কেমন করে তিনি নিহত হলেন, কেন হলেন, কিছুই তারা বুঝতে পারলো না। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই থ’ বনে গেল।

    লাশ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল খৃস্টান উপদেষ্টা ও সামরিক অফিসাররা। তারা উইণ্ডসারকে খুবই বিজ্ঞ এবং ক্ষমতাধর অফিসার হিসাবে জানতো। এ ঘটনাকে তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারলো না।

    ক্ষিপ্ত খৃষ্টানরা খলিফা আল মালেকুস সালেহ, তাঁর আমীর, উজির ও সামরিক অফিসারদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে লাগলো। পারে তো তাদের ধরে মারে, এমনি অবস্থা। যে অকথ্য ভাষায় গালাগালি হচ্ছিল, অন্য সময় হলে হয়তো খলিফার সামরিক অফিসাররা ঝাঁপিয়ে পড়তো তাদের ওপর। কিন্তু এ আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওরা বিহ্বল ও ভেঙ্গে পড়লো। প্ৰতিবাদের সব ভাষা হারিয়ে ওরা বোবা পাথর হয়ে গেল।

    শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় তারা ভীত-সন্ত্রস্তও হয়ে পড়লো। কারণ, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মোকাবেলায় তারা খৃষ্টানদেরকে নিজেদের অভিভাবক ও রক্ষক মনে করতো। তাদের ওপর ভরসা করেই তারা আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খৃস্টান সম্রাটের দূত হত্যার ফলে তারা নিজেদের জীবন নিয়েই শঙ্কিত হয়ে পড়লো।

    গদিচ্যুত খলিফা ও আমীররা ছিল মেরুদণ্ডহীন। খৃস্টানদের তোষামোদী করার মধ্যেই খুঁজে ফিরতো নিজেদের স্বার্থ ও সাফল্য। খৃস্টানরা যখন যা বলতো তাই মেনে নিত মাথা নত করে।

    এ ঘটনায় স্বার্থপর মুসলিম নেতাদের অবস্থা খুবই করুণ হয়ে উঠল। কোন বড় রকমের অপরাধ করলে চাকর-বাকররা যেমন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে, এরাও তেমনি দাঁড়িয়ে রইল ক্ষিপ্ত খৃস্টানদের সামনে।

    কেউ কোন প্ৰতিবাদ না করায় এক সময় কমে এল গালাগালির তোড়। খৃস্টানদের এক সামরিক অফিসার বললো, ‘সন্ধ্যায় ফটক বন্ধ হয়ে গেছে। অতএব খুনী রাতের মধ্যে শহর থেকে বেরোতে পারবে না। সকাল হওয়ার আগেই খুনীকে খুঁজে বের করো। প্রয়োজন হলে শহরের প্রতিটি ঘরে তল্লাশী চালাও। পুরো সেনাবাহিনীকে লাগাও এ কাজে।”

    আরেক খৃস্টান অফিসার ধমক দিয়ে বললো, “হা করে দেখছো কি? যাও, মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ঘরে ঘরে তল্লাশী চালাও। তাদের সাথে এমন ব্যবহার করো, যেনো আতংকগ্ৰস্ত মানুষ ভয়ে স্বেচ্ছায় খুনীকে তুলে দেয় সৈন্যদের হাতে।’

    ‘জী! জী! যাচ্ছি।’ এক মুসলমান আমীর বললো, ‘আমি সৈন্যদের এখুনি আদেশ দিয়ে দিচ্ছি, ভোরের আগেই যেনো খুনীকে পাকড়াও করা হয়। সমস্ত শহরে যেন এখনি ছড়িয়ে পড়ে সেনাবাহিনী।’

    ‘না, তা হয় না!’ এক কেল্লাধিপতি বললো, ‘এমন হতে পারে না। তল্লাশী শুধু সেই বাড়ীতেই নেয়া যেতে পারে, যার ওপর সন্দেহ করা যায়। সাক্ষী নেই, প্রমাণ নেই, অভিযোগ নেই, অথচ শহরের অভিজাত ও সন্ত্রান্ত ঘরগুলোতে আচানক গজবের মত টুটে পড়বে সেনাবাহিনী, তা হয় না।’

    এতগুলো গণ্যমান্য অফিসার, খৃস্টানদের সামরিক উপদেষ্টা, আমীর-ওমরা এবং স্বয়ং খলিফা যেখানে উপস্থিত ও নিরব, সেখানে কেউ রিমান্ডের সামরিক অফিসারের হুকুম অমান্য করতে পারে এবং এমন জোরের সাথে তার প্রতিবাদ করতে পারে, এ কথা কেউ কল্পনাও করেনি। সকলেই বিস্মিত হয়ে তাকালো তার দিকে। দেখলো, এ বলিষ্ঠ কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে হেম্মাত দুর্গের অধিপতি জুরদিকের কণ্ঠ থেকে।

    ইতিহাস জুরদিকের পুরো নাম উল্লেখ করেনি। তার সম্পর্কে শুধু এটুকুই বলেছে, ‘তিনি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বন্ধু ছিলেন।’

    কিন্তু এটা সে সময়ের কথা, তখনো তিনি সুলতান আইয়ুবীর বন্ধু হননি। আস সালেহের অনুগত সৈন্য এবং একটা দুর্গের প্ৰধান হিসাবেই এ ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তিনি। সম্মিলিত বাহিনীর পরামর্শ সভারও তিনি সদস্য ছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যেসব পরিকল্পনা তৈরী হচ্ছিল, তাতে তারও অংশ ছিল উল্লেখযোগ্য।

    কিন্তু মুসলমানদের ‘জাত’ ধরে যখন খৃস্টানরা গালাগালি করছিল, তখন তার মধ্যে জেগে উঠলো স্বজাত্যবোধ। রাতের আঁধারে ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানের ঘরে হানা দেয়ার কথা শুনে আর চুপ থাকতে পারলেন না। বললেন, ‘এখানকার অধিকাংশ পরিবার মুসলিম। তারা সবাই পর্দানশীন। আমি তাদের বেইজ্জতি সহ্য করতে পারবো না। এসব ভদ্র ও পর্দানশীন ঘরে সৈন্যরা বেপরোয়া তল্লাশী চালালে তাতে আমাদেরই সন্মানের হানি ঘটবে।’

    ‘খুনী এ শহরেই আছে।’ এক খৃস্টান ক্ষীপ্ত কষ্ঠে বলল, ‘প্রয়োজনে আমরা সমস্ত শহর তছনছ করে ফেলবো, প্ৰতিশোধ নেবো।’

    ‘উইণ্ডসার ছিলেন উচ্চ সামরিক অফিসার, তার খুনের বদলা নিতে গিয়ে কারো ইজ্জত সম্মানের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই আমাদের।’ আরেক উত্তেজিত খৃস্টানের কণ্ঠ।

    ‘তাহলে তোমাদের অফিসারের খুনের জন্য আমাদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের ঘর তল্লাশীরও কোন প্রশ্ন আসে না। উইণ্ডসার কত বড় অফিসার ছিলেন তা নিয়ে আমারও কোন পরোয়া নেই।’ জুরদিক রাগে কাপতে কাঁপতে বললেন।

    ‘জুরদিক! তুমি চুপ করো।’ কিশোর খলিফা আদেশের সুরে বললেন, ‘এ সামরিক মেহমানরা বহু দূর থেকে আমাদের সাহায্য করতে এসেছেন। তুমি কি মেহমানদারীও ভুলে গেছে? অকৃতজ্ঞ হয়ো না!! খুনীকে আমাদের ধরতেই হবে।” খলিফার সমর্থনে আরো অনেকেই কণ্ঠ উচ্চকিত করলো।

    ‘আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে থাকতে পারি এবং আছিও।” জুরদিক বললো, “কিন্তু নিজের জাতির বিরুদ্ধে যেতে পারি না। খলিফাতুল মুসলেমিন! যদি আপনি দেশের নাগরিকদের অপমান ও পেরেশান করেন। তবে নাগরিকরা আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। আপনি সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যে রণক্ষেত্র তৈরী করছেন সেটা অকেজো হয়ে যাবে।”

    “আমরা কোন জাতির পরোয়া করি না।” রিমাণ্ডের সামরিক উপদেষ্টা বললো, “আমরা খুনীদের খুঁজে বের করবোই। তারা যে বাড়ীতেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদেরকে পাকড়াও করে শুলে চড়াবো। এ হত্যাকাণ্ড নিশ্চয়ই সালাহউদ্দিন আইয়ুবী চালিয়েছে। তার পোষা কুকুরদের কখনো ক্ষমা করবো না আমরা।’

    “হে, আমার বন্ধুগণ!” জুরদিক বললেন, “তোমাদের মাত্র একজন অফিসারের খুন তেমন কোন বড় ব্যাপার নয়। তোমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যা করতে বহুবার বহু চেষ্টা করেছ। এই সেদিনও ফেদাইনদের পাঠিয়েছিলে তাকে খুন করতে। আমার জানা মতে তারা চার চার বার প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছ।

    তোমরা তাকে হত্যা করতে পারোনি, সে ভিন্ন ব্যাপার। সেটা তোমাদের অযোগ্যতা বা অদক্ষতা। আমি তোমাদের সে প্ৰচেষ্টাকে অন্যায় বলবো না। শত্রু যারই হোক, তারা একে অপরকে হত্যা করার চেষ্টা করেই থাকে। যদি উইণ্ডসারকে সুলতান আইয়ুবীই হত্যা করে থাকে, তবে পার্থক্য শুধু এই, তোমরা আইয়ুবীকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, আর তিনি তোমাদের অফিসারকে হত্যা করতে সফল হয়েছেন। তোমরাও তার এমন অনেক অফিসারকে হত্যা করেছো। কিন্তু তিনি জনগণকে সে জন্য হয়রানী ও কোন পেরেশানিতে ফেলেননি।”

    কিন্তু জুরদিকের এ বক্তৃতায় কোনই কাজ হলো না, না এতে খৃস্টানরা সন্তুষ্ট হলো, না মুসলমানদের বিবেক জাগ্রত হলো। বরং সমস্ত মুসলমান আমীর ও অফিসাররা একযোগে জুরদিকের বিরুদ্ধে কথা বলতে লাগলো। তারা খৃস্টানদের অসন্তুষ্ট করতে চায় না। কিন্তু জুরদিক সকলের সম্মিলিত মতামতকে উপেক্ষা করে তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

    তিনি বললেন, “ভদ্রতা ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে অন্যায়ভাবে নাগরিকদের হয়রানী করার কোন অধিকার নেই আমাদের। তোমরা সবাই বললেই একটা অন্যায় ন্যায় হয়ে যাবে না। সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে তাদের জান-মাল ও ইজত-আব্রুর হেফাজত করার শপথ নিতে হয়েছে আমাকে। সে শপথের কসম, বিনা ওয়ারেন্টে আমি শহরের কোন ঘরেই তল্লাশী চালাতে দেবো না।”

    “তবে কি আমরা মনে করবো, তুমি এ খুনের সাথে জড়িত?” এক খৃস্টান বললো, ‘আমার সন্দেহ হচ্ছে, ‘তুমি আইয়ুবীর বেতনভুক কৰ্মচারী!’

    ‘হলবের কোন বাড়ীতে অন্যায়ভাবে তল্লাশী চালানোর প্রতিবাদ করার অর্থ যদি হয় সে খুনী, তবে এ অপবাদ মাথায় নিতে আমার কোন আপত্তি নেই।” জুরদিক বললেন, “এবং এ কারণে কেউ যদি আমাকে আইয়ুবীর কর্মচারী ভাবে, তার সে ভাবনা দূর করার জন্য কোন অন্যায় আবদার রক্ষা করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

    “আমি যতক্ষণ এখানে আছি ততক্ষণ আমার আদেশই চলবে।” খৃস্টান এক সামরিক অফিসার বললো।

    ‘তোমাদেরকে আমরা ভাড়া করেছি আমাদের সহযোগিতা করার জন্য। এ জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিকও দেয়া হয়েছে তোমাদের।” জুরদিক বললেন, “এখানে আমাদের আদেশই চলবে। কোন ভাড়াটিয়ার আদেশ মেনে চলতে শিখিনি আমরা।”

    রাগে বিকৃত হয়ে গেল খৃস্টান অফিসারদের চেহারাগুলো। দাঁতে দাঁত চেপে একজন বললো, “আমরা এখানে তোমাদের চাকর হিসাবে আসিনি, এসেছি উপদেষ্টা হিসাবে। আমাদের উপদেশ মেনে চলতে তোমরা বাধ্য।”

    “এটা আমার দেশ। আমরা মুসলমান। অবস্থা আমাদের আপোষে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। যদি তুমি নি:স্বাৰ্থভাবে এখানে আমাদের সাহায্য করার জন্য এসে থাকো, তবে আমি তোমার সঙ্গে আছি। কিন্তু আমি সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই, আমার জাতির ওপর কোন নিপীড়নমূলক জুলুম চালানো হলে আমি তার প্রতিশোধ নেবো।”

    সুস্থভাবে আলোচনার কোন পরিবেশ ছিল না সেখানে। এই বাকবিতণ্ডা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য দু’জন প্রভাবশালী আমীর জুরাদিককে ধরে টেনে হিঁচড়ে কামরার বাইরে নিয়ে গেল।

    জুরাদিককে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর খৃষ্টানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অন্য এক আমীর বললো, দয়া করে আপনারা আমার কথা একটু শুনুন। অবস্থা যা, তাতে জুরাদিককে অসন্তুষ্ট করা যাবে না। এ ব্যক্তিকে জোর করে বশ করা সম্ভব নয়। তার কেল্লার সমস্ত সৈন্য তার ইশারায় জীবন দিয়ে দিতেও পিছপা হবে না। শক্তি নয়, তাকে কৌশলে কাবু করতে হবে। আপনারা যদি একটু ধৈর্য ধরেন, তবে তা খুব কঠিন হবে না।’

    তারপর সে খৃস্টানদের সামনে তার পরিকল্পনা তুলে ধরলো। খৃস্টানরা নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে জুরাদিককে আবার ভিতরে নিয়ে আসতে বললো। সে এলে তাকে বলা হলো, “ঠিক আছে, জনগণকে হয়রানী করা হবে না। তবে খুনীদেরকে খুঁজে বের করারও প্রচেষ্টা চলবে।”

    জুরদিক বললেন, “ঠিক আছে। বাড়াবাড়ি না করলে আমি নিজেও চেষ্টা করবো খুনীকে পাকড়াও করতে।”

    তিন চারদিন পর জুরদিক হলব থেকে যাত্রা করলেন। তিনি তার কেল্লা হেম্মাতে যাচ্ছিলেন। তিনি শহরে থাকা অবস্থায় তার উপস্থিতিতেই খুনীদের ব্যাপারে অনেক অনুসন্ধান ও তল্লাশী চালানো হয়। কিন্তু তার নিষেধ অগ্রাহ্য করে কোন ঘরেই ব্যাপক তল্লাশী চালানো হয়নি দেখে তৃপ্ত মনেই যাচ্ছিলেন তিনি।

    খৃস্টানরা সেদিনের অপমানের কথা ভুলেনি। তারা জুরদিকের দিকে লক্ষ্য রাখছিল। আর অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মনে মনে নানা রকম ফন্দি আটছিল।

    জুরদিকের সঙ্গে ছিল দশ বারো জন রক্ষী যোদ্ধা। তারাও জুরদিকের মত অশ্বাপূষ্ঠে সমাসীন। মরুভূমির বালিয়াড়ি মাড়িয়ে ওরা পাহাড়ী এলাকায় উঠে এল। চারপাশের পাহাড় চূড়া ও উঁচু-নিচু টিলার মাঝখান দিয়ে সরু পাহাড়ী রাস্তা এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে। জুরাদিকরা এগিয়ে চললো সেই সংকীর্ণ পথ ধরে।

    সামনে জুরদিক, পেছনে রক্ষী সেনারা সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ কোথেকে ছুটে এলো দুটি তীর। বিদ্ধ হলো জুরদিকের ঘোড়ার মাথায়।

    তীর দুটো জুরদিককে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হলেও হঠাৎ ঘোড়া লাফিয়ে উঠে মাথা তোলায় অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন জুরাদিক।

    দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাগলা ঘোড়ার মত বেসামাল ভঙ্গিতে এলোপাথাড়ি ছুটতে লাগলো ঘোড়া। ছুটে এলো আরও দুটো তীর।

    জুরদিকের ভাগ্যই বলতে হবে, এবারও নিশানা ব্যর্থ হলো দুশমনের, তীর দুটো আগের মতই আঘাত করলো ঘোড়ার গায়ে।

    শূন্যে লাফিয়ে পড়লো ঘোড়া, পিঠ থেকে আরোহীকে ফেলে দেয়ার জন্য শুরু করলো প্ৰচণ্ড দাপাদাপি। ডাইনে বায়ে পা জুড়ে সামাল দিতে চাইল মরণযন্ত্রণা।

    জুরদিক অশ্বারোহণে ছিলেন অসম্ভব পটু। তিনি ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়লেন। মুহুর্তে নিজেকে ছুড়ে দিলেন এক পাথরের আড়ালে।

    পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল রক্ষীরা। তারপর ক্ষিপ্ৰগতিতে ছুটল তীরের উৎস সন্ধানে। মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়লো এদিক-ওদিক।

    দু’জন করে পাঁচটি দলে ভাগ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ওরা।

    এলাকাটা এমন জটিল, কাউকে খুঁজে পাওয়া বা ধরা খুবই মুশকিল। জুরদিক বুঝলো, এটা ভাড়াটে খুনীর কাজ। নিশ্চয়ই তাকে হত্যা করার জন্য এদেরকে খৃস্টানরা লেলিয়ে দিয়েছে।

    ওই ঘটনার পর থেকে খৃস্টানরা জুরাদিককে সুলতান আইয়ুবীর বন্ধু বলে সন্দেহ করতে লাগলো। তারা জানে, জুরদিক সাহসী এবং বীর যোদ্ধা। তাকে হত্যা করতে হলে প্রফেশনাল খুনীদেরই নিয়োগ করতে হবে।

    জুরদিক সন্তৰ্পনে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে উঠে গেলেন এক টিলার ওপরে। ওখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে মেলে ধরলেন দৃষ্টি। অসংখ্য ছোট ছোট টিলা আর বিবৰ্ণ প্ৰান্তর ছাড়া কোন জন মানুষের ছায়াও চোখে পড়ল না তাঁর।

    রক্ষীরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আততায়ীদের খুঁজে ফিরছিল। হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলল, “জলদি এদিকে ছুটে আসো সবাই! আমি ওদের দেখে ফেলেছি। ধরতে হলে ওদের ঘিরে ফেলতে হবে।”

    চিৎকার শুনে অন্য রক্ষীরা ছুটলো সেই দিকে। একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়েছিল তিনজন লোক। সবাই মুখোশ পরা। কিন্তু তাদের কাছে কোন তীর ধনুক নেই।

    একটু দূরে পাহাড়ের এক খাঁজে তিনটি ঘোড়া ছিল। কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে পালানোর কোন চেষ্টা করেনি তারা।

    মুখোশের কারণে ওদের চেহারা দেখা যাচ্ছিল না, শুধু দেখা যাচ্ছিল চোখ দুটোর নড়াচড়া। তাদের ধরে নিয়ে এসে জুরদিকের কাছে হাজির করা হলো। “তোমাদের ধনুক ও তীর কোথায়?” জুরদিক প্রশ্ন করলেন।

    “আমাদের কাছে কোন তীর ধনুক নেই, অস্ত্র বলতে শুধু তলোয়ার আছে।” একজন বললো।

    ‘শোন।’ জুরদিক শান্ত কন্ঠে বললেন, ‘তোমাদের চারটি তীরই লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে, আমাকে হত্যা করতে পারেনি। তোমাদের কপাল খারাপ, তোমরা ধরাও পড়ে গেছে। এখন অযথা মিথ্যা বলে নিজেদের অপরাধ আর বাড়িও না!”

    “তীর!” ওরা আশ্চর্য হয়ে বললো, “আমরা কারো ওপর তীর চালাইনি, আমরা নিরীহ মুসাফির! একটু বিশ্রামের জন্য এখানে থেমে ছিলাম। আবার যাত্রা করতে যাবো এমন সময় এই লোকেরা আমাদের ঘেরাও করে ধরে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।”

    জুরদিক হেসে বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে শত্রু মনে করি না। যদি তা করতাম। তবে তোমাদের তিনজনের গর্দান এতক্ষণে মাটিতে গড়াগড়ি যেত। আমি জানি, তোমরা ভাড়াটে খুনী। আমাকে শুধু বলো, আমাকে হত্যার জন্য তোমাদের কে পাঠিয়েছে? তোমরা সত্য কথা বলে এখান থেকে চলে যাও, তোমাদের কিছুই বলা হবে না।”

    দুই মুখোশধারী কসম করে বললো, “আমরা জানিনা কে বা কারা আপনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। এ ব্যাপারে আমাদের কোন ভূমিকা নেই, আমরা নিরপরাধ।”

    কিন্তু তৃতীয় মুখোশধারী কোন কথা বললো না, সে নিরবে তাকিয়ে রইল জুরদিকের দিকে।

    “তোমরা বোকামী করে নিজেদেরকে বিপদে ফেলো না।” জুরদিক বললেন, “অন্যের জন্য নিজের প্রাণ হারাতে যেয়ো না। আমি তো বলেছি, আমি তোমাদের কোন শাস্তি দেবো। না। সত্য কথা বললে এখনই তোমাদের মুক্ত করে দেবো।’

    মুখোশধারীরা তবুও ইতস্তত: করতে লাগলো, কেউ মুখ খুললো না।

    “এদের মুখোশ খুলে দাও।” জুরদিক তার রক্ষীদের বললেন, “এদের দেহ তল্লাশী করো, সব হাতিয়ার কেড়ে নাও।”

    দুই মুখোশধারী চোখের পলকে তলোয়ার টেনে বের করে দ্রুত পিছনে হটে গেল। তৃতীয় মুখোশধারী ছুটে গিয়ে লুকালো তাদের পিছনে। কারণ তার কাছে তলোয়ারও ছিল না।

    জুরদিক হো হো করে হেসে বললেন, “তোমরা কি এতগুলো রক্ষীর মোকাবেলা করতে চাও? একজনের তো আবার তলোয়ারও নেই! যাক, আমি তোমাদেরকে আরও একবার সুযোগ দিচ্ছি এবং এটাই তোমাদের জন্য সর্বশেষ সুযোগ। এরপর আমি বাধ্য হবো তোমাদের ওপর রক্ষীদের লেলিয়ে দিতে। ওরা তোমাদের হাড্ডি-মাংস এক করে দিলে আমাকে দোষ দিও না!”

    রক্ষীরা তাদের ঘিরে রেখেছিল। ওদের একজন বললো, “আমরাও শেষ বারের মত বলছি, আমরা কেউ তোমাদের ওপর তীর চালাইনি। যে কাজ আমরা করিনি জীবনের মায়ায় তা স্বীকার করলে আসল অপরাধীরা নিস্কৃতি পেয়ে যাবে। আমাদেরকে খুন করলেও তাতে তোমার কোন লাভ হবে না।” রক্ষী কমাণ্ডার তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কি জানি কি সন্দেহ হলো, সে টান মেরে তৃতীয় মুখোশধারীর মুখোশ খুলে ফেললো।

    তার কাছে কোন তলোয়ার ছিল না। মুখোশ খুলে যেতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তার চেহারা। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল। মুখোশের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক সুন্দরী যুবতীর মুখ।

    জুরদিক বললেন, “ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো।”

    দুই মুখোশধারীই বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে পিছনে ঘুরে মেয়েটির পাশে দণ্ডায়মান রক্ষীর বুকে তলোয়ার ধরে চ্যালেঞ্জের সুরে বললো, যতক্ষণ আমাদের কাছে সব কথা খুলে না বলবে এবং আমাদের সমস্ত কথা না শুনবে, ততক্ষণ এই মেয়ে কারো কাছে যেতে পারবে না।”

    আরা আরো বললো, ‘আমরা জানি, তোমাদের হাতে আমাদের মরতে হবে। আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোমরা এনেছো তাতে আমাদেরকে তোমরা ছাড়বে না। তবে আমরাও তোমাদের বলতে চাই, এই মেয়েকে তোমরা জীবিত পাবে না। আর অন্তত তোমাদের অর্ধেক লোক এই সংঘর্ষে শেষ হয়ে যাবে।”

    জুরদিক তখনও শান্ত। তিনি মুখোশধারীদের লক্ষ্য করে বললেন, “তোমরা আমার কাছে আর কি শুনতে চাও? আমার কথা তো আমি পরিস্কার করেই বলেছি, তোমরা ভাড়াটে খুনী, আর এই মেয়েটাকে তোমরা পেয়েছো কাজের অগ্রিম হিসাবে।”

    “তোমার দুটি কথাই ভুল।” এক মুখোশধারী বললো, “আমরা যদি অপরাধী হই তবে সে অপরাধ হচ্ছে, একজন খৃস্টান গোয়েন্দা ও তার সহকারী এক খৃস্টান মেয়েকে আমরা হত্যা করেছি। এটাকে আমরা কোন গোনাহের কাজ মনে করি না। আমাদের দুর্ভাগ্য, পালানোর পথে আমরা তোমাদের হাতে ধরা পড়লাম। কিন্তু আমরা খুশী এই কারণে, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। এক নির্যাতীত মুসলিম বোনকে খৃস্টানদের কবল থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি।”

    “তোমার এ গল্প সত্য হলে আমাকে বলো, তোমরা কে, কোথেকে এসেছে এবং কোথায় যাচ্ছে?”

    “আমরা হলব থেকে এসেছি এবং আমাদের গন্তব্য এখন দামেশক।”

    ‘উইণ্ডসার ও খৃস্টান মেয়েটিকে কি তোমরাই হত্যা করেছো?” জুরদিক জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু আমার ওপর তীর চালালে কেন তোমরা? আমি তোমাদের শত্ৰু না বন্ধু তাই বা জানলে কি করে?”

    “আমি আগেও বলেছি, আমরা তোমার ওপর তীর চালাইনি, তবে তোমাকে আমি ভালমতই চিনি। তোমার নাম জুরাদিক এবং তুমি হেম্মাত দুর্গের অধিপতি।’ মুখোশধারী বললো, “আর এটাও ভাল করে জানি, তুমি সুলতান আইয়ুবীর শত্রু। কিন্তু তাই বলে তোমাকে হত্যা করার কোন প্রয়োজন পড়েনি আমাদের।

    আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। তারই সাহায্যে আমরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হবো। লড়াইয়ের ময়দানে হয় তোমরা খুন হবে নয়তো আত্মসমৰ্পণ করে বন্দীত্ব বরণ করবে আমাদের। শক্রকে না জানিয়ে আমরা কারো ওপর আঘাত করি না।

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হাসান বিন সাব্বাহ বা শেখ মান্নান নন। তিনি চ্যালেঞ্জ করে যুদ্ধ করেন, চুরি করে কাউকে হত্যা করেন না।

    উইণ্ডসার ও তার সঙ্গী মেয়েটি খুন হয়েছে নিজের দোষে। ওরা আমাদের চ্যালেঞ্জ না করলে ওদের আমরা হত্যা করতাম না। ওদের খুন হওয়ার পেছনে সুলতান আইয়ুবীর কোন আদেশ বা ইচ্ছা ছিল না।”

    সে জুরদিকের ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো, অনতিদূরে ঘোড়াটি মরে পড়ে আছে। তার মাথা ও গায়ে এখনো বিধে আছে আততায়ীর বিষাক্ত তীর।

    মুখোশধারী জুরাদিককে লক্ষ্য করে বললো, “আমরা যে তীর ছুড়িনি তা যদি প্রমাণ করতে চাও তাহলে তোমাদের যে কেউ ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে যাও। আমাদের দু’জনের কোন একজনের হাতে তীর-ধনুক দাও। এরপর যত খুশী তীরবেগে অশ্ব চালাও, ডাইনে ও বায়ে এঁকে বেঁকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করো, আমাদের যাকে বলবে সে ছুটন্ত অশ্বপৃষ্ঠ থেকে একটি মাত্র তীর ছুড়বে। যদি সে তীর মিস হয় তবে আমাদের গর্দান উড়িয়ে দিও, আমাদের কোন আপত্তি থাকবে না। আমরা এমন তীরন্দাজ নই, কোন টার্গেটে তীর ছুড়লে তা ব্যর্থ হবে। আমরা তীর ছুড়লে এখন আমাদের কথা শোনার জন্য তুমি আর বেঁচে থাকতে না।”

    “তুমি দেখছি অসাধারণ সৈনিক!” জুরদিক বললেন, “তুমি কি সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীতে আছো?”

    ‘সে প্রশ্ন করার কোন অধিকার নেই তোমার।” মুখোশধারী বললো, “তুমি কি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যদলের লোক ছিলে না? তুমি কি ইসলামী জেহাদে বীর মুজাহিদ হিসাবে লড়াই করোনি? সামান্য কেল্লার অধিপতি হওয়ার লোভ তোমার মাথা এমনভাবে বিগড়ে দিয়েছে, এখন তুমি নিজেকে চিনতে পারছো না, তোমার জাতিকে চিনতে পারছে না। ক্ষমতা ও সম্মানের লোভে যে লোক নিজের আত্মার হাহাকার শুনতে পায় না, আমার পরিচয় দিয়ে তার কি কাজ? কাফেরদের সাথে যে নিজের ভবিষ্যত জুড়ে দিয়েছে, সে লোক ইসলামের মুজাহিদদের চিনবে কি করে!” জুরদিক স্তব্ধ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো মুখোশধারীর দিকে। তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। বিষাক্ত তীরের চেয়েও বক্তার কথার তীর তার বুক যেন ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। মুখোশধারী থামতেই জমাট নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই টিলার চূড়ায়। বাতাসের হাহাকারের ফিসফিসানি শুনতে পেলেও জুরদিকের আত্মার ক্ৰন্দন ও হাহাকার কেউ শুনতে পেল না।

    “তুমি গাছের সেই বিচ্ছিন্ন ডাল, যে ডালের ভাগ্যে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরা ছাড়া কোন গতি নেই।” অপর মুখোশধারী বলল, “তুমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নও যে, সুলতান আইয়ুবী তোমাকে হত্যা করার জন্য পেরেশান হবেন। তোমাকে মেরে ফেলে মুক্তি দিয়ে লাভ নেই, বরং সারা জীবন বেঁচে থেকে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্য করলেই তোমার উচিৎ সাজা হবে। যে খৃস্টানদের পুতুল হয়ে কাজ করছে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সে খৃস্টানরাই তোমাকে হত্যা করবে।”

    “তুমি হলবে গিয়েছিলে শরাব পান করতে, আমোদ-ফুর্তি করতে। গিয়েছিলে এ মেয়ের নাচ দেখে চোখ সার্থক করতে।” প্রথম মুখোশধারী বললো, “কিন্তু একবারও ভাবলে না, এই নর্তকীরা কারা!”

    মুখোশধারীর পেছন থেকে এবার কথা বলে উঠল মেয়েটি, “আমি এক মুসলিম মেয়ে। আমাকে জোর করে ধরে এনে খৃষ্টানরা তাদের আসরে আমাকে নাচতে বাধ্য করেছে, আমার শরীর নিয়ে খেলেছে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, আমি আপনাদেরই এক হতভাগী মেয়ে। আপনারা এতই আত্মবিস্মৃত ও নির্লজ্জ হয়ে গেছেন, নিজের কন্যাকে নষ্ট করতেও আপনাদের বিবেকে বাঁধে না, একটু ঘূণাবোধও জাগে না।’

    মেয়েটির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। সে উদগত কান্নার গমক সামলে আবার মুখ খুললো, “আমি খৃস্টানদের সাথে সাত আট বছর কাটিয়ে এসেছি। দেখেছি তাদের, যাদের আপনারা বন্ধু বানিয়ে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারলে গর্ববোধ করেন। আমি তাদের অন্তরের সেইসব গোপন কথা শুনেছি, যা কোনদিন আপনাদের কানে আসে না। তাদের সে অট্টহাসি শুনেছি আমি, যা আপনারা শুনতে পান না। ওরা বন্ধুত্বের কথা বলে মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়। এক মুসলমানকে লেলিয়ে দেয় অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর আপনারা যখন তাদের উস্কানিতে পরম্পর যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন তারা মদের পেয়ালা হাতে নিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আর আমাদের বলে, ‘নাচো সুন্দরী, নাচো!’

    পাহাড়ের মতই স্তব্ধ অটল পাথর হয়ে গেছেন জুরাদিক। তার কণ্ঠে কোন ভাষা নেই, চোখে পলক নেই, অঙ্গে নেই জীবন্ত মানুষের স্বাভাবিক নড়াচড়া।

    রক্ষীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এমন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন জাদরেল ব্যক্তিত্ব কি করে লোকগুলোর এ রূঢ় তিরস্কার নিরবে সহ্য করছেন?

    গভীর চিন্তার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন স্মৃতি ভেসে উঠছিল মনের পর্দায়। মনে পড়লো, রিমাণ্ডের সামরিক উপদেষ্টাদের সাথে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের কথা। হলবের ঘরে ঘরে তল্লাশীর বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়ানোর কথা। খলিফা এবং আমীরদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া অগ্রাহ্য করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা।

    তিনি শান্ত, ভদ্র ও নম্র সুরে মুখোশধারীদের বললেন, “আমি তোমাদেরকে আমার কেল্লায় নিয়ে যেতে চাই”

    ‘কয়েদী বানিয়ে?”

    জুরদিক সকলকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “না! মেহমান হিসাবে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, তোমাদের তলোয়ার তোমাদের কাছেই থাকবে।”

    নিশ্চিন্ত মনে ঘোড়ায় চড়ে বসলো সবাই। জুরদিকের ঘোড়া মারা গিয়েছিল, তিনি এক রক্ষীর ঘোড়া নিয়ে তাতে উঠে বসলেন। কাফেলা এগিয়ে চললো হেম্মাত দুর্গের দিকে।

    কাফেলা সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। সরু রাস্তা ধরে দু’তিনটি টিলা অতিক্রম করার পর অকস্মাৎ দুটো ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল। সকলেই চাইল শব্দের উৎসের দিকে। দেখা গেল এক টিলার আড়াল থেকে বেরিয়ে দুটো ঘোড়া তীব্ৰ বেগে হলবের দিকে ছুটে পালাচ্ছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাদের সাথে রয়েছে তীর ও ধনুক।

    ‘এরাই সম্ভবত তোমাদের খুনী।’ বললো এক মুখোশধারী।

    সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধাওয়া করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো ওরা।

    মুখোশধারীরাও ছুটলো তাদের পেছনে। দু’জনই কোষবদ্ধ তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছে। মেয়েটিও সঙ্গী হলো কাফেলার।

    রক্ষীরা ঘোড়া ছুটিয়ে ছুটছিল তাদের পিছনে। সবাইকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল দুই মুখোশধারী।

    সামনে বালির টিলা, টিলার ওপারে বাঁক নিয়েছে রাস্তা। পালিয়ে যাওয়া আরোহীরা মোড় ঘুরে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। ধাওয়াকারীরা এখনো বেশ পেছনে।

    মুখোশধারী দু’জন তীব্ৰ গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দূরত্ব অনেক কমিয়ে এনেছিল। কিন্তু তখনো আততায়ীরা ধরা ছোয়ার বাইরে।

    মোড় ঘুরেই আততায়ী দু’জন গতি কমিয়ে আনলো ঘোড়ার। কাঁধ থেকে ধনুক নামিয়ে ধনুকে তীর জুড়ে পিছু ধাওয়াকারীদের ওপর তীর চালাল। ধাওয়াকারীরা তখনো তীরের আওতার বাইরে, তাই লক্ষ্যভ্ৰষ্ট হয়ে গেল তীর। কিন্তু পিছু ধাওয়াকারীদের জন্য তা বিপদ ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

    মুখোশধারী দু’জন ধাওয়াকারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। টিলার কারণে ওদের দেখতে পায়নি আততায়ী। মোড় ঘুরেই ওরা ওদের সামনে পড়ে গেল। মাত্র কয়েক গজের ব্যবধান। দু’পক্ষই পরস্পরকে দেখে ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে গেল। আততায়ী দু’জন তীর চালাতে চেষ্টা করলো, কিন্তু মুখোশধারীরা তাদের সে সুযোগ দিল না। একজন ঝাপিয়ে পড়ে এক আততায়ীর ঘোড়ার পিছনে তলোয়ারের কোপ বসিয়ে দিল।

  • গোপন বিদ্রোহী

    গোপন বিদ্রোহী

    গোপন বিদ্রোহী

    সে রাতটি ছিল যদিও অমাবশ্যার, কিন্তু মিশরের আকাশ ছিল আয়নার মত স্বচ্ছ। আকাশে হীরার মত জ্বলজ্বল করছিল অসংখ্য তারা। কোনটি উজ্জ্বল, আবার কোনটি অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল। কোনটি খাঁটি মোতির মত চমকাচ্ছে।

    কায়রো শহর গভীর নিদ্রায় মগ্ন। কেউও ভাবতেও পারেনি, কায়রোর এই শান্তিপ্রিয় ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপরই এক সময় শুরু হয়ে যাবে কিয়ামতের বিভীষিকা।

    কায়রোর সেনাবাহিনী ও শহর রক্ষীরা ঘুমিয়ে ছিল। শুধু জেগে ছিল কতিপয় টহলদার সৈনিক। কিন্তু তারা জেগে থাকলেও সতর্ক ছিলনা। প্রতিদিনের মত নিশ্চিন্তে বসে বসে গল্পগুজব করছিল। হাতিয়ারগুলো পড়েছিল একপাশে, অবহেলায়।

    সীমান্ত রক্ষীরাও নির্বিকার। উত্তাপ ও উত্তেজনাহীন। একটি সাদামাটা দিন পার করে ক্যাম্প-খাটে ঘুমিয়ে পড়েছে। নীলনদ সংলগ্ন ফাঁড়ির ডিউটিরত দুই প্রহরী শুধু এখনও পথে। নদীর তীর ধরে এগিয়ে চলেছে ওদের ঘোড়াগুলো। ঘোড়ার উপর বিরহ কাতর চিত্তে বসে আছে দুই প্রহরী। এগিয়ে যাচ্ছে ওরা বণিক দলের সুন্দরী মেয়েদের কাছে।

    পাশের ক্যাম্পটি এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কাছাকাছি। সে ফাঁড়ির সিপাইদেরও দায়িত্ব সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু শান্তিময় নিরুপদ্রপ সময় সৈন্যদের অলস ও অকর্মণ্য বানিয়ে দিয়েছিল, ফলে দায়িত্বের ব্যাপারে কেউ সচেতন ছিল না।

    কয়েকটি নৌকা বোঝাই সুদানী হাবশী সৈন্য প্রবেশ করল মিশরের মাটিতে। দুই ক্যাম্পের চার টহল সৈনিক তখন ডুবে আছে চার সুন্দরীর প্রেম সাগরে।

    জোহরা ও তার সাথী নর্তকী তাদের তাঁবুতে শুয়েছিল। সঙ্গের পুরুষরা প্রকাশ্যে নিদ্রা গেলেও ভেতরে ভেতরে সবাই ছিল সজাগ, উৎকর্ণ ও সতর্ক। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছে, আজকের রাতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপর থেকে নির্দেশ এসেছে, ‘রাতে আহাম্মকের মত ঘুমিয়ে না থেকে সবাই সতর্ক থেকো।’

    ওদের উপর আরও নির্দেশ এসেছে, ‘বাইরের কোন লোককে নদীর পারে আসতে দেবে না। পাহাড়ি অঞ্চলের ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেবেনা কাউকে। যদি কেউ যেতে চায় তবে তাকে ধরে এনে বন্দী করে রাখবে।’ বনিক ও বাদক উভয় দলের জন্য এই একই হুকুম ছিল।

    অন্ধকার রাত। চাঁদ নেই আকাশে, মেঘও নেই। মেঘমুক্ত প্রকৃতি তারার আলোয় ঈষৎ আলোকিত। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে সবাই। অনেকক্ষন পর এক বাজনাদার উঠে বসলো বিছানায়। তাঁবু থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ভাল করে পরখ করে দেখলো। ক্যাম্পের চারদিকে চক্কর দিল একবার। এরপর জোহরা ও নর্তকী যে তাঁবুতে শুয়েছিল, ওখানে গেল। তাঁবু ফাঁক করে উঁকি দিল ভেতরে, কিন্তু কিছুই দেখা গেল না।

    লোকটি এদিক ওদিক চাইলো আবার। না, কেউ কোথাও নেই। চট করে ভেতরে ঢুকে গেল লোকটি। অন্ধকারে হাতড়িয়ে দেখলো বিছানায়। মনে হলো, যা সন্দেহ করেছিল তাই ঘটেছে।

    আগুন জ্বালালো সে। দেখলো জোহরা নেই, সে পালিয়েছে। অন্য মেয়েটি গভীর ঘুমে অচেতন। শুয়ে আছে এলোমেলো অবস্তায়। বাজনাদার তাকে আর জাগালো না। এ মেয়েকে জাগিয়ে কি লাভ? জোহরা কোথায় গেছে এ মেয়ের চাইতে ওইতো বেশী জানে। নিশ্চিত, পাশের ক্যাম্পের কমান্ডারের কাছে গেছে জোহরা। এ ছাড়া সে আর কোথায় যাবে?

    জোহরা পালিয়েছে, এটা তেমন ভয়ের ছিলনা। কিন্তু ভয়ের কারন হলো, জোহরা যখন ফিরে আসবে তখন কমান্ডারও চলে আসতে পারে। প্রহরীদের না দেখলে কমান্ডার তাদের খোঁজাখুঁজি করবে। এমনও হতে পারে সে নদীর তীরে চলে যেতে পারে।

    যে খবর এতদিন বাইরের দুনিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছে, লুকিয়ে রাখা হয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে, সে খবর ফাঁস হয়ে যেতে পারে মুহূর্তে!

    বাজনাদার তার দুই সাথীকে জাগালো। তাদেরকে জানালো, ‘জোহরা পালিয়েছে। নিশ্চয়ই সে ওই ক্যাম্পের কমান্ডারের কাছে গেছে।’

    ‘বলো কি! যদি সে কমান্ডারকে নিয়ে ফিরে আসে!’

    ‘তা আসতেই পারে। চলো এক কাজ করি। নদীর তীর থেকে দূরে ওদের আসার পথে ওঁৎ পেতে থাকি। যদি কমান্ডার মেয়েটার সঙ্গে চলে আসে এবং আমাদের গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে দু’জনকেই ধরে আমাদের কমান্ডারের কাছে পৌঁছে দেবো।’

    ‘তাই ভালো, চলো। যদি প্রয়োজন পড়ে তবে দু’জনকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেবো, কিন্তু কিছুতেই এ গোপনীয়তা ফাঁস হতে দেবো না।’ আরেকটু উৎসাহ নিয়ে বললো সঙ্গী।

    পাহাড়ের সেই দুর্গম অঞ্চল। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় নিরেট এক পাথরের জগৎ, কিন্তু ভিতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে পাহাড়ী অঞ্চলটি দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। এলাকাটি দুর্গম বলে সেখানে মানুষের কোন যাতায়াত নেই। লোক চলাচলের পথ থেকেও অঞ্চলটি বেশ দূরে।

    জনশ্রুতি আছে, এখানে ফেরাউনের প্রেতাত্বারা বাস করে। ফেরাউন যাদের হত্যা করেছিল তাদের প্রেতাত্বারাও নাকি বাস করে এখানেই। লোকেরা একথাও বলে, এ দু’ধরনের প্রেতাত্বারা মাঝে মধ্যেই এখানে যুদ্ধ বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ে। কোন লোক এ এলাকায় ঢুকে পড়লে সে আর অক্ষত বেরিয়ে আসতে পারে না। তার শরীর থেকে সব মাংস উধাও হয়ে যায়। কংকাল ছাড়া আর কিছুই থাকেনা তার শরীরে।

    বহুদিন আগের কথা। এ পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন পাহাড় কেটে ফেরাউনদের বড় বড় মূর্তি বানানো হয়েছিলো। নিচ থেকে পাহাড় খুঁড়ে তার মধ্যে তৈরী করা হয়েছিল রাজকীয় মহল। এসব মহলে ছিল বড় বড় কামরা।

    দীর্ঘদিন এ কামরাগুলোতে কোন মানুষ প্রবেশ করেনি। মহলগুলোও ছিল জনমানব শুন্য। প্রহরীদের দৃষ্টি এড়িয়ে এ কামরাগুলোতেই এসে আশ্রয় নিল সুদানী কুচক্রীরা।

    যে রাতের ঘটনা, সে রাতে মাটির তলার এ মহল ও কামরাগুলোতে ছিলও আলোর ছড়াছড়ি। হাজার হাজার হাবশী সেনার পদভারে সরগরম হয়ে উঠেছিল গোটা পার্বত্য অঞ্চল। এ পাহাড়শ্রেণীর এক জায়গায় চারদিকে পাহাড় বেষ্টিত এক বিশাল মাঠ। মাঠটি ছিল মনোরম সবুজ ঘাসে ভরা।

    ওখানে সমবেত করা হলো সুদান থেকে আনা নিগ্রো হাবশী যোদ্ধাদের। সবাই এসে সমবেত হলে হাবশীদের ধর্মগুরু চিৎকার করে বললো, ‘উঁচু স্বরে কথা বলো না কেউ। একটু পরই তোমাদের সামনে হাজির হবেন তোমাদের ভগবান। মনের মধ্যে ভক্তি ও বিশ্বাস দৃঢ় করো। ভয় করো তার আক্রোশকে।’

    ভয় ও আশংকায় কানে কানে কথা বলতেও ভুলে গেল লোকগুলো। সবচেয়ে বড় পাহাড়টার দিকে মুখ করে বসে ছিল ওরা। পাহাড়টির নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত খোদাই করা এক বিশাল মূর্তি। আবু সাম্বালের মূর্তি বলে পরিচিত এটা। হাবশীদের বলা হলো, ‘এটাই তোমাদের ভগবানের মূর্তি। আজ এ মূর্তি মানুষের রূপ নিয়ে সবার সামনে উপস্থিত হবে।’

    সহসা মেঘের গর্জনের মত গুরুগম্ভীর গর্জন ভেসে এলো। হাবশীরা আগে থেকেই চুপ করে ছিল। এ গর্জন শোনার পর তাদের নিঃশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে গেল। এরপরই ভেসে এলো আরও একটি আওয়াজ, ‘ভগবান জেগে উঠছেন। সামনের পাহাড়ের দিকে থাকাও।’

    গুরুগম্ভীর জোরালো কণ্ঠের ধ্বনি। পাহাড়ে ও উপত্যকায় এ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো বার বার।

    এরপরই আকাশে দেখা গেলো দুটো উড়ন্ত অগ্নিশিখা। শিখা দুটো পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেল এবং পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেলো। সাথে সাথে সেখান থেকে ছড়িয়ে পরলো সহস্র আগুনের টুকরো। এ অগ্নিশিখায় আলোকিত হয়ে উঠলো আবু সাম্বালের মূর্তি।

    মূর্তির মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়লো আলো। দেখা গেলো, সে বিশাল মূর্তির চোখ মিটমিট করছে। তার মুখ বারবার খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, সবারই মনে হলো, মূর্তির মুখ ডানে বায়ে দুলছে।

    হাবশীগুলোর ধর্মগুরু ভক্তিতে সিজদায় পড়ে গেলো। তার দেখাদেখি সিজদায় লুটিয়ে পড়লো মাঠে সমবেত হাজার হাজার নিগ্রো সৈন্য।

    ধর্মগুরু একটু পর সিজদা থেকে মাথা তুলে বললো, ‘সবাই ভগবানের কাছে মন খুলে প্রার্থনা করো।’

    লোকগুলো সিজদা থেকে মাথা তুললো। দু’হাত প্রসারিত করে প্রার্থনা জানাতে লাগলো ওরা।

    ধর্মগুরু উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, ‘হে আগুন ও পানির খোদা! মরুভূমির তপ্ত বালুর খোদা! নদীতে পানি দেয়ার খোদা! আমরা তোমাকে দেখেছি। তুমি আমাদের বলে দাও, তোমার পদতলে আমরা কত মানুষ বলি দেবো। পুরুষ দেবো, না নারী দেবো?’

    ‘একটি পুরুষ ও একটি নারী।’ পাহাড়ের দিক থেকে শব্দ হলো, ‘তোমরা এখনও আমাকে দেখোনি। আমি মানুষের রূপ নিয়ে তোমাদের সামনে আসছি। যদি তোমরা আমার শত্রুদের শেষ না করো, তবে তোমাদের সকলকে এ পাহাড়ের পাথর বানিয়ে রাখবো। তোমরা চিরদিন রৌদ্রে পুড়তে থাকবে। তোমাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করবে, মরুভুমির বালু তাদের রক্ত চুষে নেবে। তোমরা অপেক্ষা করো, একটু পরই আমি দর্শন দেবো তোমাদের।’

    সারা মাঠে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। অগ্নিশিখা ধিরে ধিরে কমে আসতে লাগলো। পাহাড়ের মধ্যে হাবশীদের ধর্মীয় সঙ্গীত বেজে উঠলো। বহু লোকের সমবেত কণ্ঠের এ সঙ্গীত। এ সঙ্গীত শুধু তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই বাজানো হয়। কণ্ঠের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজছিল ঢোল তবলা, এটাই রীতি। নীচে বসে হাজার হাজার হাবশী মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনছিল এ সঙ্গীত। চারদিকে পাহাড় বেষ্টিত খোলা মাঠে বসে রাতের এ আবছা অন্ধকারে গান শুনতে শুনতে ওদের মনে হচ্ছিল, ওরা কোন অদৃশ্যলোকে পৌঁছে গেছে। অপার্থিব কোন জগত থেকে ভেসে আসছে হৃদয় মথিত করা গান।

    জোহরা বসেছিল কমান্ডারের তাঁবুতে। তার কণ্ঠে উচ্ছসিত আবেগের জোয়ার। সে কমান্ডার কে বলছিলো, ‘যদি আমি তোমাকে না দেখতাম তবে সারা জীবন নেচে গেয়ে, অন্যের মনতুষ্টি করেই হয়তো কাটিয়ে দিতাম। তোমাকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে, আমি এক বাপের আদরের মেয়ে, কোন অসভ্য নির্লজ্জ নর্তকী নই। যদি আজ হঠাৎ কোন কারণে তুমি মারা যাও, মনে করবো আমার বাবা মারা গেছেন। আমি আবার নতুন করে এতিম হয়ে যাবো। যারা আমাকে নর্তকী হিসাবে ভাড়া এনেছিল তাদের সাথে আমার লেনদেন শেষ হয়ে গেছে। ওরা হয়তো আমাকে আমার মালিকের হাতে ফিরিয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু আমি আর তার কাছেও ফিরে যেতে চাই না। এখন থেকে আমি এখানেই থাকবো। আমি আমার বাবার কাছে থাকবো।’

    ‘দুর পাগলী! এটা সেনা ক্যাম্প না! এখানে তো তোকে রাখা যাবে না।’

    ‘যদি আমাকে এখানে রাখতে অসুবিধা হয়, তবে আমাকে তোমার গ্রামের বাড়ী পাঠিয়ে দাও।’ জোহরা জেদ ধরে বললো, ‘যদি আশ্রয় দিতে না পারো তবে আমাকে মেরে ফেলো, কিন্তু আমাকে ফিরে যেতে বলো না, কিছুতেই আমি আর ফিরে যাবো না।’

    ‘না জোহরা, অবুঝ হয়ো না। এমন জেদ করো না, যা রক্ষা করা আমার সাধ্যের অতীত।’ কমান্ডার বললো, ‘এখন তুমি বাড়ী ফিরে যাও। আমি ওয়াদা করছি, তোমাকে তোমার বাড়ী পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবো। তুমি তোমার কায়রোর ঠিকানা দিয়ে যাও আমাকে। যখন আমি ছুটি পাবো তখন তোমাকে সেখান থেকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে যাবো।’

    কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না জোহরা। অবশেষে অনেক বলে কয়ে জোহরাকে ফেরত যেতে রাজি করালো কমান্ডার।

    কিছুক্ষণ পর। কমান্ডার দুটো ঘোড়া প্রস্তুত করে জোহরাকে বললো, ‘চলো, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’

    ঘোড়ার উপর চড়ে বসলো ওরা। চলতে শুরু করলো ঘোড়া।

    জোহরা কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘রাতের অন্ধকারে এখানে এত নৌকা আসে আসে কেন? দিনের বেলা তো এত নৌকা দেখি না!’

    ‘কি! নৌকা?’ কমান্ডার আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন দিক থেকে আসে?’

    ‘ঐ দিক থেকে।’ সে সুদানের দিকে ইঙ্গিত করলো।

    ‘তুমি জানলে কি করে?’

    ইদানিং রাতে আমার ঘুম আসে না। কখনো কখনো মাঝ রাতে বিছানা থেকে উঠে তাঁবুর বাইরে গিয়ে বসে থাকি। আপনার এখান থেকে বিদায় নিয়ে প্রথম যেদিন নদী পারের ক্যাম্পে গিয়ে উঠলাম, কিছুতেই ঘুম আসছিল না। রাতে পালিয়ে আপনার কাছে ছুটে এলাম। ভোর রাতে আপনি যখন আমাকে পৌঁছে দিলেন, ফিরে দেখি সেই ক্যাম্পের এক লোক না ঘুমিয়ে বসে আছে।

    আমাকে সে জেরা করলো, কোথায় গিয়েছিলাম, কেন গিয়েছিলাম, ইত্যাদি। আমি নদীর পাড়ে হাঁটতে গিয়েছিলাম বলে তাকে এড়িয়ে গেলাম।

    সে আমাকে শাসিয়ে বললো, তাকে না জানিয়ে যেনো ক্যাম্পের বাইরে কোথাও না যাই।

    কিন্তু পরদিন ঘুম না আসায় মাঝ রাতে তাঁবুর বাইরে এলাম। দেখলাম, ওখানকার কাণ্ডকারখানা। প্রথম রাতে দেখলাম তিনটি, পরের রাতে দু’টি বিরাট বিরাট পাল তোলা নৌকা এসে কূলে ভিড়লো। নৌকার সাদা পাল রাতের অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

    নৌকাগুলো নদীর পাড়ে লাগলে বহু লোকের গুঞ্জন শোনা গেল। আমি অন্ধকারে লুকিয়ে এগিয়ে গেলাম নদীর ঘাটের দিকে। তাকিয়ে সব দেখলাম।’

    ‘কি দেখলে?’ বিস্মিত কমান্ডার প্রশ্ন করলো।

    ‘দেখলাম নৌকা থেকে বহু লোক নেমে এল। এরপর তারা গাছের তল দিয়ে হেঁটে সোজা পাহাড়ের দিকে চলে গেল এবং পাহাড়ের মধ্যে সবাই অদৃশ্য হয়ে গেল।’

    ‘তুমি কি আমাদের দু’জন সিপাইকে টহল দিতে দেখোনি?’ কমান্ডার জিজ্ঞেস করলো, ‘তারা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে টহল দেয়। তাদের ডিউটি থাকে এই নদীর পাড়ে।’

    ‘না।’ জোহরা উত্তর দিলো, ‘আমি কখনও কোন সিপাইকে এখানে ডিউটি করতে দেখিনি। দিনের বেলা দু’জন সিপাই আসে, কাফেলার ক্যাম্পেই তারা আহার-নিদ্রা করে। একদিন আমি এক সিপাইকে একটি মেয়ের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখেছি। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল।’

    জোহরার জানা ছিল না সীমান্তে কি কাণ্ডকারখানা চলছে আর কি হতে যাচ্ছে। সীমান্ত প্রহরীদের দায়িত্ব সম্পর্কেও তার কোন জ্ঞান ছিল না। তার এটাও জানা ছিল না, রাতে বা দিনে সুদানীদের নৌকা এদিকে আসা উচিত কি অনুচিত। সে সরল মনে যে প্রশ্ন করেছে, কমান্ডারের জন্য তার মধ্যে ছিল ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ খবর। জোহরা যা বলেছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে সে অত্যন্ত জরুরি ও অতি গোপনীয় এক তথ্যই সরবরাহ করেছে।

    জোহরার কথায় কমান্ডার চমকে সজাগ হয়ে উঠলো। জোহরাকে বললো, ‘এসো, আজ এ নদীর পাড়েই ঘুরে বেড়াই।’ তারা নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছলো। নদীর তীর ধরে পাশাপাশি ধীরে ধীরে চলতে লাগলো ওরা। কমান্ডারের দৃষ্টি নদীর উপরে ছুটে বেড়াতে লাগলো। ওরা পথ চলছিল নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে। রাস্তাটা বৃক্ষের ছায়ায় বেশ অন্ধকার। হঠাৎ নদীর মাঝে একটু আলোর আভা দেখা গেল। মনে হল কোন লণ্ঠনের আলো। পরে আরও একটি আলো দেখা গেল। পরে অকস্মাৎ দুটো আলোই এক সঙ্গে নিভে গেল।

    এদিকে নদীর কূলেও একটি আলো জ্বলে উঠেই সঙ্গে সঙ্গে আবার নিভে গেল। কমান্ডার কোথাও প্রহরীদের দেখতে পেলো না।

    কমান্ডার নদীর তীর থেকে একটু উপরে যেখানে প্রহরীদের সেন্ট্রি রুম, সেখানে গেল। নাম ধরে ডাকলো সিপাইদের, কিন্তু কোথাও তাদের কোন সাড়া নেই। কমান্ডার আবারও উচ্চস্বরে ডাকলো, তবুও কোন উত্তর পাওয়া গেল না।

    জোহরাকে নিয়ে কমান্ডার সতর্কতার সাথে আবার নিচে নেমে এলো।

    সামনের নদীতে দুটো নৌকার সাদা পাল দেখা যাচ্ছে। কমান্ডার অধীর হয়ে উঠলো। তার সাথে যে জোহরা নামের একটি মেয়ে আছে সে কথাও বেমালুম ভুলে গেল।

    সে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। জোহরাও তার পেছন পেছন ঘোড়া ছুটালো। কমান্ডার ছুটছে আর সিপাইদের ডেকে যাচ্ছে চাপা স্বরে।

    ডিউটিতে আসা সৈন্য দু’জন তখন পাহাড়ের আড়ালে অভিসারে মত্ত। হঠাৎ তাদের কানে কমান্ডারের ডাক পৌঁছলো। তারা দ্রত সেখান থেকে উঠে ছুটে গেল যেখানে তাদের ঘোড়া রেখেছিল, সেখানে। যেখানে তাদের ঘোড়া বাঁধা ছিল সেখানে গিয়ে দেখলো দুটো ঘোড়াই গায়েব হয়ে গেছে। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো। তাকিয়ে দেখলো, দূরে কারা যেন তাদের ঘোড়া নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

    কমান্ডারের ঘোড়া আগে, জোহরার ঘোড়া পিছনে, দু’জনেই ছুটছে সমানে। হঠাৎ অন্ধকার থেকে কে যেন বললো, ‘তুমি যাদের ডাকছো তারা অনেক আগে চলে গেছে।’

    ‘তোমরা কে?’ কমান্ডার জিজ্ঞেস করলো, ‘সামনে এসো।’

    ‘আমরা মুসাফির মানুষ।’

    অন্ধকার থেকে দুটো ঘোড়া কমান্ডারের দিকে এগিয়ে এলো। কমান্ডার তলোয়ার বের করলো।

    ‘রাতে কোন মুসাফিরের অশ্বে আরোহন এবং সীমান্তে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরির মানে জানো তোমরা?’ কমান্ডার ওদের চ্যালেঞ্জ করলো।

    ওরা কমান্ডারের কাছে এসে থেমে গেল। একজন বললো, ‘ওদিকে দেখুন, ওরা আসছে।’ যখনই কমান্ডার সেদিকে তাকিয়েছে, লোক দু’জন হঠাৎ আক্রমন করে বসলো তার উপর। ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিতে চাইল ঘোড়া থেকে। পতন ঠেকাতে হাতিয়ার ফেলে ঘোড়ার পিঠ খামচে ধরলো কমান্ডার।

    লোক দু’জন জাপটে ধরলো তাকে। এমন শক্ত ভাবে চেপে ধরলো, তার নড়ারও ক্ষমতা রইল না। একজন দ্রত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল কমান্ডারকে। এরপর ছুটল মেয়েটার উদ্দেশ্যে। দ্রুত তাকেও বেঁধে ফেলল। যে লোক কমান্ডারকে ধরে রেখেছিল সে ঘোড়াকে তারা দিল এগিয়ে যাবার জন্য।

    ঘোড়া যখন চলতে শুরু করলো, ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো কমান্ডারের। অন্ধকারের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল আরও একজন। সে কমান্ডারের ঘোড়ায় চড়ে বসে তাকে ধরে থাকলো।

    জোহরা চিনতে পারলো, এরা সেই বাজনাদার, যারা তাকে ভাড়া করে এনেছিল। আসলে এরা ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদানী কমান্ডো সৈন্য। কমান্ডারের ডাক–চিৎকারে ওরা সতর্ক হয়ে গিয়েছিল এবং অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জোহরা ও কমান্ডারকে আটক করতে সক্ষম হলো।

    প্রহরীদের ঘোড়া এরাই চুরি করেছিল। সেই ঘোড়ায় চড়ে কমান্ডার ও জোহরাকে নিয়ে এগিয়ে চললো ওরা।

    তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো, ‘এদেরকে জীবিত নিয়ে চলো। উপর থেকে আদেশ আছে, কোন সন্দেহজনক লোক পেলে জীবিত ধরে নেয়ার।’

    কমান্ডার জোহরাকে নিয়ে ওরা পাহাড়ের দিকে রওনা দিলো। নদীর ঘাট থেকে রওনা হবার সময় কমান্ডার দেখলো, নৌকার মধ্য থেকে কালো হাবশীরা দল বেঁধে নেমে আসছে। সঙ্গে প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী।

    দুর্ভেদ্য দুর্গের মত পাহাড়ী অঞ্চলের হাজার হাজার হাবশী অপলক চোখে তাকিয়ে আছে আবু সাম্বালের মূর্তির দিকে। ধীরে ধীরে উড়ন্ত আলোর শিখাগুলো নিভে এলো। ধর্মীয় সঙ্গীতের মোহময় সুর ক্রমাগত বেজে চলেছে। সেই সুরের মূর্ছনা আঘাত হানছে হাবশীদের হৃদয়তন্ত্রীতে। যাদুর মত তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে রক্ত কণিকায়। সে প্রভাবে উদ্বেলিত ও উত্তেজিত হয়ে উঠছে ওদের হৃদয়গুলো। অন্তরে খেলা করছে অজানা শিহরনের বিমুগ্ধ স্রোত।

    যে অল্প ক’জন হাবশী নিজ চোখে ভগবানকে দেখার দুর্লভ সৌভাগ্য পাচ্ছে, নিজেকে তাদের একজন ভেবে গর্ব ও অহংকারে স্ফীত হয়ে উঠছে বর্বর হাবশীদের বুকগুলো। ওরা নিজেদেরকে এখানে অনুপস্তিত হাবশীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সৌভাগ্যবান ভাবতে লাগলো।

    এক সময় থেমে গেল পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তোলা সঙ্গীতের সেই সুর। তখনি পাহাড়ের উপর আবার দেখা গেল বিদ্যুতের চমক। মনে হলো আকাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে সোনালী বিদ্যুতের কণা। এক সময় তা আবার এসে স্থায়ী হলো মূর্তির সম্মুখভাগে। আলোয় আলোময় হয়ে গেল মাথার উপরের আকাশ।

    আবু সাম্বালের মূর্তির ওপর কোত্থেকে এলো এই আলো, কেউ জানতে পারলো না। মনে হচ্ছিল, অপার্থিব এ আলো ঠিকরে পড়ছে আবু সাম্বালের মূর্তি থেকে। নিজের আলোতেই তার চেহারা আলোময় হয়ে উঠেছে।

    হঠাৎ আলো নিভে গেল! একটু পর আবার যখন সেখানে আলো ফুটলো, দেখা গেল, আবু সাম্বালের মুখ দিয়ে একজন লোক বেরিয়ে এসে মূর্তির বিশাল ঠোঁটের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে।

    তার পিছনে এসে দাঁড়াল আরও চারজন লোক। ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা লোকগুলোর শরীর। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীরই সেই চাদরের নিচে। শুধু মুখগুলো আবরণ মুক্ত। সামনের লোকটিকে সম্রাটের মত দেখাচ্ছিল। তার মাথায় রাজ মুকুট। রাজ মুকুটের ওপর সাপের এক বিশাল ফণা। সেই ফণা থেকে আগুনের হল্কা বেরুচ্ছে। সে আগুনের হল্কার আলো এসে পড়ছে সম্রাটের গায়ের ওপর।

    কোত্থেকে কেমন করে এই আলো আসছে কেউ বুঝতে পারল না। কিন্তু সেই আলো তার গায়ের তারকাখচিত কাপড়ে যখন পড়ছিল, তখন তা চমকাচ্ছিল দ্যুতি ছড়িয়ে।

    তার এক হাতে বর্শা ও অন্য হাতে খোলা তলোয়ারও চমকাচ্ছিল। সাদা চাদর পরা লোকগুলো তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।

    পিনপতন নীরবতা মাঠ জুড়ে। ভয় আর মুগ্ধতার আবেশে নিথর হয়ে আছে লোকগুলো।

    সেই নিরবতা খান খান হয়ে গেল পেছনের চার সাদা চাদরওয়ালার গুরুগম্ভীর উচ্চ রবে, ‘ভগবান নেমে এসেছেন মাটির পৃথিবীতে! খুব ভাল করে দেখে নাও তাকে। তারপর সিজদায় লুটিয়ে পড়ে প্রার্থনা করো তার কাছে।’

    মাঠের দশ হাজার হাবশী সৈন্য একসাথে সিজদায় পড়ে গেল।

    একটু পর আবার শোনা গেল গুরুম্ভীর ধ্বনি, ‘মাথা উঠাও, ভাল করে দেখে নাও ভগবানকে।’

    সেজদা থেকে মাথা তুলল লোকগুলো। ভক্তিমাখা চোখে তাকালো ভগবানের দিকে।

    ভগবান তার তলোয়ার উর্ধে তুলে ধরে পাথরের সাথে আটকে রাখা অদৃশ্য রশির মই বেয়ে মূর্তির পায়ের পাতায় এসে দাঁড়াল। তার দেখাদেখি নেমে এলো তার সঙ্গীরাও। উপস্তিত লোকগুলোর মনে হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে ওরা উড়ে পাতালে নেমে এসেছে।

    মূর্তির পায়ের পাতা দুটো বিশাল এবং উঁচু মঞ্চের মত দেখাচ্ছিল মাঠ থেকে। যেমন মঞ্চ বানানো হয় কোন মাঠে সভা করার সময়। লোকগুলো বসেছিল সেই মঞ্চের সামনে। সারা মাঠ ছিল অন্ধকার। কিন্তু ভগবান ও তার সঙ্গীদের ওপর কোত্থেকে যেন কোমল আলো এসে পড়ছিল। সেই আলোয় সৈনিকরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল তাদের।

    এ সময় সবাইকে বিস্মিত ও অবাক করে চারজন অপ্সরী সেই আলোতে প্রবেশ করলো। তাদের পরণে পাতলা ঘাগরা। পিঠে পরীর মত দুই ডানা। মাথার চুলগুলো খোলা। মেয়েরা পরীর মত উড়ার ভঙ্গিতে ভগবানের চারপাশে নৃত্যের তালে তালে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যেতো আবার খনিক বাদে ছুটে আসতো নাচতে নাচতে। নাচের তালে তালে উড়তো ওদের মাথার চুল, পরীর ডানা।

    পাহাড়ে যখন ভগবানের এই খেলা ও লীলা চলছিল ঠিক সে সময় চারজন লোক কমান্ডার ও জোহরাকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো।

    তারা পর্বতের ভেতর ফেরাউনদের তৈরী মহলের এক কামরায় ওদের বন্দী করে রেখে একজনকে বাইরে পাঠিয়ে দিল। একটু পর সে অন্য একজনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো বন্দীদের কাছে।

    ‘এ লোক মিশরের বর্ডার ক্যাম্পের কমান্ডার আর মেয়েটি আমাদের ভাড়া করা নর্তকী। যখন আমাদের নৌকা থেকে হাবশীরা তাদের মালসামান ও রসদপত্র নামাচ্ছিল, তখন নদীর পাড়ে ওদের পেয়ে ধরে নিয়ে এসেছি।’ নবাগত লোকটিকে বললো সে।

    কমান্ডার ও জোহরাকে ভাল করে দেখলো লোকটি। তার মুখে ফুটে উঠলো হাসি। বললো, ‘তুমি এদেরকে ঠিক সময়েই নিয়ে এসেছো। এই জংলী হাবশীরা মানুষের কোরবানীর জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। আমরাও আলকিন্দির আদেশে ঘোষণা দিয়েছি, ভগবানের আদেশ মত একজন পুরুষ ও একজন নারীকে কোরবানী দেয়া হবে।’ আমার ওপর হুকুম ছিল, ‘যেখান থেকে পারো একটি পুরুষ ও একজন নারীকে ধরে এনে দাও।’ আমি এখন মানুষ খোঁজার বিপদ থেকে বেঁচে গেলাম। ভালই হলো। তোমরা এক কঠিন সমস্যার সমাধান করে দিয়েছো, এ জন্য তোমাদের ধন্যবাদ।’

    ‘মনে হচ্ছে আমরা সফল হবো, কারন প্রতিটি কাজেই আমরা ভাগ্যের সহায়তা পাচ্ছি। এত সহজে কোরবানি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি।’ বললো অন্যজন।

    একজন বললো, ‘হাবশীদের খুব শখ ছিল তাদের ভগবানকে দেখার। তাদের সে শখও পূরণ হয়েছে।’

    ‘আমরা হাবশীদের ভগবানকে কি কৌশলে দেখিয়েছি, তা যদি দেখতে, তবে তুমিও তার ভক্ত হয়ে যেতে।’

    ‘দেখার বড় লোভ ছিল, কিন্তু তা আর পারলাম কই? নিশ্চয়ই খুব জমকালো অনুষ্ঠান হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ, পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল এন্ডারসনের ওপর। ওর কাজকর্ম তো তুমি জানোই, সব কাজই সে নিখুঁত দক্ষতার সাথে করে।

    প্রথমে সামনের পাহাড় থেকে দু’টি তীর নিক্ষেপ করে। তীর দুটোতে ছিল অগ্নিশিখা। তীর দুটো যেখানে পড়ে সেখানে এবং তার আশেপাশে আগেই তেল ও পেট্রোল জাতীয় বস্তু ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তীর দুটো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আগুন ধরে গেল। মূর্তির মুখ আলোকিত হয়ে উঠল তাতে। এন্ডারসন কেমন করে জানিনা, সে আলোয় এমন একটি ভাব এনে দিল, মনে হলো, মূর্তিটি হাসছে, নড়াচড়া করছে। আলোর কারসাজিতে আমরাও দেখলাম, মূর্তিটির চেহারা ডানে বায়ে নড়াচড়া করছে।’

    ‘এরপর কি হলো? হাবশীদের মাঝে এর কি প্রতিক্রিয়া দেখা গেল?’ আগ্রহের সাথে জানতে চাইল সে।

    ‘তারা সবাই সিজদায় পড়ে গেল। এদিকে আস্তে আস্তে আলো নিভে গেল। আমরা আবার পেট্রোল ঢাললাম পাহাড়ে, মূর্তির গায়ে। হাবশীরা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে বসে কাঁপছিল। অন্ধকারে আমরা আলকিন্দিকে পোশাক পরিয়ে মূর্তির কোলে বসিয়ে দিলাম। তার সঙ্গী হলো চারজন।

    মূর্তির উপরে ‘সামেন’ পাহাড় থেকে অত্যন্ত সফল ভাবেই আলো নিক্ষেপ করা সম্ভব হয়েছিল। নিচে থেকে সামেন পাহাড়ের অগ্নিশিখা দেখতে পাচ্ছিল না কেউ, একটি বিরাট আয়নার সাহায্যে সেই আলো ফেলা হলো মূর্তির ওপর। আলোর কিরণে আলোকিত মূর্তি দেখে মনে হচ্ছিল, এ আলো মূর্তির নিজস্ব আলো।

    তারপর আলকিন্দি যখন ভগবান সেজে দেখা দিল তখন আমাদের মেয়েরা স্বর্গের অপ্সরী সেজে তার চারপাশে এমনভাবে নাচলো, মনে হলো আমরা তখন স্বর্গেই আছি। তার সামনে দিয়ে সবাই নত হয়ে হেঁটে যাবে। তাদেরকে বলতে হবে, ভগবান স্বয়ং যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন।’

    ‘বন্দী কমান্ডার ও জোহরাকে কি আজই কোরবানি করা হবে?’

    ‘সে সিদ্ধান্ত হাবশীরাই নেবে। সম্ভবত তারা দু’চারদিন তাদেরকে পেলে পুষে বশ মানাবে। তাদের কিছু ধর্মীয় নিয়ম পদ্ধতি পালন করাবে।’

    তাদের কথার মাঝখানেই কিছু লোকের পদধ্বনি ও হাসির শব্দ কানে এল। ওরা তাকিয়ে দেখলো, আলকিন্দি ও তার চার সাথী এগিয়ে আসছে।

    আলকিন্দি কাছে এলে ওরা বললো, ‘একজন পুরুষ ও একজন নারীকে হঠাৎ হাতে পাওয়া গেছে। এ দু’জনকেই বলীর জন্য হাবশীদের হাতে সমর্পণ করা যেতে পারে।’

    আলকিন্দি জিজ্ঞেস করলো না, মানুষ দু’টি কে বা কারা। সে মাথা থেকে রাজমুকুট নামিয়ে বন্দীরা যে কামরায় ছিল সেখানে প্রবেশ করল। কমান্ডার ও জোহরা বন্দী অবস্থায় চুপচাপ বসেছিল সেখানে। কমান্ডারের পরণে সামরিক পোশাক ছিল না, আলকিন্দি তাকে চিনতে পারল না। কিন্তু কমান্ডার আলকিন্দিকে ঠিকই চিনতে পারল।

    কামরার বাইরে লোক দু’জন যখন ওদের নিয়ে আলাপ করছিল তখনও কয়েকবারই কমান্ডার আল কিন্দির নাম শুনে ছিল। তাকে দেখতে পেয়ে তাই কমান্ডার খুব অবাক হয়নি, কিন্তু তিনি এখানে কি করছেন সে বুঝতে পারল না।

    আলকিন্দি কামরা থেকে বেরোতে বেরোতে বলল, ‘ঠিক আছে, ওদেরকে হাবশীদের ধর্মীয় নেতার কাছে তুলে দাও।’

    আল কিন্দির এ কথায় কমান্ডার নিশ্চিত হয়ে গেল, তাকে ও জোহরাকে কোরবানী দেয়ার ফায়সালা চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

    আল কিন্দি বেরিয়ে গেলে একজন বললো, ‘কমান্ডারের ভাগ্যটাই খারাপ, নইলে বলীর পাঠা সেই হতে যাবে কেন?’

    ‘আরে রাখো, এ তো সবে শুরু। এই বলী যখন হাবশীদের পাগল করে তুলবে রক্তের জন্য, তখন তো কায়রোর সব কমান্ডারই বলীর পাঠা হয়ে যাবে।’ বললো তার সঙ্গী। এ কথা শুনে সঙ্গীটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

    ❀ ❀ ❀

  • পাপের ফল

    পাপের ফল

    পাপের ফল

    মেয়েদের সাথে ভেতরের কামরায় বসে কথা বলছিলেন শামস বখত ও সাদ বখত। বডিগার্ড এসে খবর দিল, ‘কাজী সাহেব এসেছেন।’ মেয়েদের বসিয়ে রেখে দুই ভাই ড্রইং রুমে চলে এলেন কাজী সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য। মধ্য বয়সী লোক কাজী আবুল ফজল ইবনুল খাশিব। হারান প্রদেশের প্রধান কাজী তিনি, গুমাস্তগীনের খুব প্রিয়ভাজন ব্যক্তি। ওদের প্রবেশ করতে দেখেই কাজী সাহেব উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘শুনলাম হলব থেকে দূত এসেছে! সে নাকি খাসা উপহারও এনেছে?’

    ‘হ্যাঁ!’ সাদ বখত বললেন, ‘কেল্লা প্রধান শুয়ে আছেন বলে দূতকে আমরা এখানেই বসিয়ে রেখেছি। উনি উঠলেই ওখানে পাঠিয়ে দেবো।’

    ‘ভাল করেছো! আমি খলিফার পাঠানো উপহার দুটোই দেখতে এসেছি।’ ইবনুল খাশিব চোখ টিপে বললেন, ‘ওগুলো এক নজর দেখিয়ে দাও না আমায়।’

    দুই ভাই কাজীর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে ভালই জানতো! গুমাস্তগীনের উপর তার কি রকম প্রভাব তাও অজানা ছিল না ওদের। মেয়ে দু’টিকে না দেখালে সে যে ঝামেলা করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই ঝামেলা এড়াতে শামস বখত মেয়ে দু’জনকে তার সামনে এন দেখালেন। কাজী মেয়েগুলোকে যখন দেখলো তখন তার চোখে অবাক করা ঘোর লেগে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘বাহবা, তোফা! তোফা! এত সুন্দরী!’ শামস বখত মেয়ে দু’টিকে আবার ভেতরের কামরায় পাঠিয়ে দিলেন। কাজী বললেন, ‘এদেরকে আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি নিজেই ওদেরকে গুমাস্তগীনের কাছে নিয়ে যাব।’ তার চোখে তখন শয়তান নাচছে।

    ‘আপনি কাজী মানুষ!’ শামস বখত বললেন, ‘জাতির কাছে আপনার মর্যাদা গুমাস্তগীনের চেয়েও উর্ধে। আপনার হাতে রয়েছে ন্যায় বিচারের মানদন্ড। একি বলছেন আপনি!’

    ‘তুমি তো এক সামরিক বোকা পাঠা।’ কাজী সাহেব হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘তুমি নগর জীবনের স্বাদ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ, আনাড়ি! এসব তুমি বুঝবে না। সেই কাজী বা বিচারক মরে গেছে, যাদের হাতে আল্লাহর আইন, ইনসাফ ও ন্যায়দন্ড ছিল। তারা শাসককে ভয় করতো না, ভয় করতো শুধু আল্লাহকে। বরং শাসকগোষ্ঠীই ভয় পেতো কাজীদের, কখন জনসাধারণের ওপর অন্যায়-অবিচারের জন্য তাদের ধরে বসে! এখন শাসকরা তাকেই কাজী বানায়, যারা সরকারের অন্যায়-অবিচারকেও জায়েয বলে ঘোষনা দিতে পারে। আইনকে নয়, শাসককে খুশী রাখাই এখন কাজীদের কাজ। ভুলে যাচ্ছো কেন, আমি আল্লাহর মনোনীত কাজী নই, আমি কাজী হয়েছি আমার শাসক সম্মানিত গুমাস্তগীনের ইচ্ছায়।’

    ‘এ জন্যই তো তোমাদের মন মগজে এখন কুফরী বাসা বেঁধে আছে।’ সাদ বখত বললেন, ‘তোমার আর দোষ কি, শাসকই যেখানে ঈমান বিক্রি করে বসে আছে সেখানে তার কাজী তো ঈমান নিলামে তুলবেই! তোমার মত কাজীও আজ রাসূলের উম্মত, এটাই জাতির দূর্ভাগ্য। তোমাদের মত কাজীদের প্রশ্রয় পেয়েই আমাদের শাসক ও আমীররা আজ মেয়েদের সম্ভ্রম ও সতীত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার পায়।’

    তিনি আরো বললেন, ‘এ মেয়েরা তোমার মতই কোন মুসলমান ঘরের কন্যা! নিজের কন্যাদের সাথে কেউ অশালীন ব্যবহার করে?’

    সেনাপতি শামস বখত যত গুরুত্ব দিয়েই কথাগুলো বলুক না কেন, কাজীর মনে তা কোন রেখাপাত করলো না। কাজী তার কথাকে হাসি ঠাট্টা দিয়ে উড়িয়ে দিতে চাইলো। শয়তান তাকে এতদূর অগ্রসর করে দিল যে, সে সেনাপতিকে তিরষ্কার করতেও ছাড়লো না। হেসে বললো, ‘হিন্দুস্তানী মুসলমানরা যে এত নিরস জানতাম না। তোমরা ভারতবর্ষ ছেড়ে এখানে মরতে এলে কেন?’ কাজীর এ তিরষ্কারে সত্যি সত্যি আহত হলেন শামস বখত। গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘শোন কাজী! আমাকে তিরষ্কার করো আর যা-ই করো, আমার কথাগুলো একটু মন লাগিয়ে শোনো! আমি তোমাকে শুধু এ জন্যই সম্মান করছি, তুমি একজন বিচারক। কিন্তু ভুলে যেওনা, তুমি আমার অধীনস্ত একজন কমান্ডার ছিলে! এই তো তোমার পরিচয়! শুধু তোষামোদ ও চাটুকারিতার জোরে তুমি এই পদে উন্নিত হয়েছো। আমি তোমার সম্মানকে অক্ষুন্ন রেখেই বলছি, আমরা কেন হিন্দুস্তান থেকে এসেছি তা শুনে নাও।

    ছয়শ বছর আগে মুহাম্মদ বিন কাশিম নামে এক যুবক তার এক মুসলিম বোনের আর্ত চিৎকার শুনে সুদূর আরব থেকে ভারতের মাটিতে পদার্পন করে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন। নারীর ইজ্জত ও সতীত্বকে মুসলমান কতটা গুরুত্ব দেয় সেই যুবকের আবেগের দিকে তাকালে তা তুমি বুঝতে পারতে! তুমি কি জান, ভারতবর্ষ এখান থেকে কত দূরে ও কোথায়? তুমি অনুমান করতে পারো, ঐ যুবক কেমন করে তার সৈন্য বাহিনী উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে গিয়ে পৌছেঁছিলো? তুমি তো নিজেও একজন সৈনিক ছিলে! চিন্তা করতে পারো, কেন্দ্র থেকে এত দূরে, কোন রকম সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার যেখানে কোন সুযোগ নেই, খাদ্য ও রসদের কান ব্যবস্থা নেই, সেখানে কোন প্রেরণা ও শক্তি বলে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন? শুধু ছুটে যাননি, যুদ্ধ করে সেখানে বিজয় লাভ করেছিলেন?

    স্থূল কামনা বাসনা ত্যাগ করে এর প্রকৃত রহস্যটা একটু বুঝতে চেষ্টা করো! তিনি এমন সব অসুবিধা ও বাঁধা অতিক্রম করে বিজয় লাভ করেছিলেন, যেখানে বিজয়ের কথা চিন্তাই করা করা যায় না! তিনি শুধু বিজয় লাভই করেননি, তিনি ভারতবাসীর মনও জয় করেছিলেন। আর কোন প্রকার অত্যাচার ও আগ্রাসন ছাড়াই সেই কুফরিস্তানে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

    আমরা কেন এখানে এসেছি এবার সেই কথা বলি।

    যিনি এক বোনের সম্ভ্রম বাঁচাতে ও ইসলামের আলো জ্বালাতে হিন্দুস্তান গিয়েছিলেন আল্লাহর সেই মুজাহিদদের মৃত্যুর পর এলো তাদেঁর উত্তরসূরীদের যুগ। ধীরে ধীরে তাদের ঈমানী চেতনায় ঘুণ ধরলো। মানবতা ও সভ্যতার বাহকরা হয়ে পড়লো অলস ও বিলাসপ্রিয়। এমন লোকেরা ক্ষমতায় চলে এলো, যারা মুসলিম নামধারী কিন্তু ইসলামের অনুসারী নয়। স্বার্থান্ধ বাদশাহদের হাতে ভুলুন্ঠিত হলো মুজাহিদদের আদর্শ। ইসলাম সীমিত হয়ে পড়লো মানুষের ব্যক্তিগত আচার আচরণ। আবার অন্যায় ও অবিচার চেপে বসলো মানুষের কাঁধে। মানবতা হলো বিপর্যস্ত।

    ক্রমে আরো অবনতি ঘটলো সেখানকার। হিন্দু রাজারা অথর্ব মুসলমান শাসকদের ওপর প্রধান্য বিস্তার করলো, যেমন এখানে খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ইসলামী শাসনের বিলোপ ঘটলো। মুসলিম সাম্রাজ্য ক্রমশঃ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে লাগলো। যখন আমরা যুবক হলাম, সেখানকার মুসলিম শাসনের অবস্থা দেখে দুঃখ ও হতাশায় ছেয়ে গেল আমাদের মন। মুহাম্মদ বিন কাশিম ও তাঁর সাথীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে ইসলাম বিতাড়িত। বিশ্ব ইসলামী খেলাফতের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তারা শুধু আরবের কেন্দ্রীয় শাসন মুক্ত নয়, ইসলামের সামাজিক ন্যায়নীতি থেকেও মুক্ত হয়ে গেল। সামাজিক সুবিচার ও শান্তি থেকে বঞ্চিত মানুষের আত্মার ক্রন্দন আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। আমরা যোদ্ধা বংশের সন্তান। এসব অনাচার ও অশান্তি যখন আমাদের সহ্যের সীমা অতিক্রম করলো, মুহাম্মদ বিন কাশিমের মত আরেকজন সেনাপতির সন্ধানে আমরা দুই ভাই দেশ ছাড়লাম।

    আমরা হিন্দুস্তানের সেই নির্যাতীত মানুষের দূত, যারা ব্যাকুল চিত্তে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে কাশিমের মত এক ত্রাণকর্তার।

    আরবের সাথে ভারতের মুসলমানদের যে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, ভ্রাতৃত্বের দাবী নিয়ে আবার তা জোড়া দিতে এসেছি আমরা। আমরা যখন সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গীর সাথে দেখা করলাম, তিনি বললেন, ‘এখন আমরা হিন্দুস্তানের দিকে কেমন করে অগ্রসর হই? তাকিয়ে দেখো, আরবের ভূমি ভরে গেছে বিশ্বাসঘাতক ও গাদ্দারে। কয়েকটা দিন সবুর করো, এসো এই আরবকে গাদ্দার মুক্ত করে সাচ্চা মুজাহিদদের হাতে তুলে দেই এই শাসনভার। তারপর তোমাদের নিয়ে আমি ছুটে যাব ভারতের সেই মজলুম ভাইদের পাশে।’ কিন্তু আরবে এত বেশী গাদ্দার তৈরী হয়ে গেছে আমাদের জানা ছিল না। নুরুদ্দিন জঙ্গী এক সেক্টরে দুশমনকে পরাজিত করতে না করতেই আরো পাঁচ জায়গায় বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠে। গাদ্দারদের মোকাবেলা করতে গেলে আঘাত হানে কাফের খৃস্টানরা। খৃস্টানদের মোকাবেলা শুরু করলে মাথা তুলে দাঁড়ায় গাদ্দাররা।

    এই করে করেই তিনি নিঃশেষ হয়ে গেলেন। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করলো খৃস্টানরা। তাদের মোকাবেলায় জেহাদের ঝান্ডা তুলে ধরলেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। এসব দেখে শুনে আমাদের আফসোস ও দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হলো। ভারতের ভূখন্ডে মুসলমানদের উপরে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে হিন্দুরা, আর এ ভূখন্ডে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে খৃস্টানরা। মরহুম জঙ্গী আমাদেরকে তাঁর সামরিক বিভাগে ঠাঁই দিয়েছিলেন। যখন গুমাস্তগীন, সাইফুদ্দিন ও আজিম উদ্দিনরা গোপনে খৃস্টানদের সাথে আঁতাত করলো, তখন সুলতান জঙ্গী আমাদের দু’ভাইকে গুমাস্তগীনের সৈন্য বিভাগে পাঠিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য, আমরা যেন তাঁর ওপরে সতর্ক দৃষ্টি রাখি। সে গোপনে কি করে, কাদের সাথে যোগাযোগ রাখে এসব দেখার জন্যই আমরা এখানে আছি। নিশ্চয় ভারতবর্ষ থেকে আমরা কেন এখানে এসেছি এ প্রশ্নের জবাব পেয়েছো তুমি?’

    ‘অর্থাৎ তোমরা দুই ভাই এখানে গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছো?’ কাজী ইবনুল খাশিবের কন্ঠ থেকে ব্যঙ্গাত্মক সুর ভেসে এলো।

    ‘কাজী! আমার কথা বুঝতে চেষ্টা করো।’ শামস বখত ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো, আমাদের মুসলমান আমীররা সেই বীর মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, যারা খৃস্টানদের নাগপাশ থেকে মুসলমানদের মুক্ত ও রক্ষা করতে চায়। আজকের দূত মারাত্মক সংবাদ বহন করে এনেছে।’

    তিনি চিঠির সারমর্ম তাকে শুনিয়ে বললেন, ‘গুমাস্তগীনের ওপর তোমার প্রভাব রয়েছে, তুমি তাকে বাঁধা দিতে পারো। তুমি যদি আমাদের সাথে একমত হও, তবে এসো, আমরা গুমাস্তগীনকে বুঝাই, তাকে আমাদের মতে ফিরিয়ে আনি। এসো, গাদ্দারদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেয়ে সুলতান আইয়ুবীর সাথে মিলে যাওয়ার জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করি। তা না হল তাকে এমন পরাজয় বরণ করতে হবে, যার বেদনা তাকে সারা জীবন ভোগ করতে হবে। এমনও হতে পারে, তাকে সারা জীবন কারাগারে বন্দী কাটাতে হবে। এখনও চিন্তা করার সময় আছে।’

    ‘তার আগে আমি তোমাদের দুই ভাইকে সারা জীবনের মত কারারুদ্ধ করবো।’ কাজী ইবনুল খাশিব বললো, ‘মেয়ে দুটিকে আমার কাছে দিয়ে দাও।’ কাজী সেই কামরার দিকে পা বাড়ালো, যেখানে মেয়ে দু’টি বসে ছিল।

    সাদ বখত তার পথ আগলে দাঁড়ালো। সে সাদ বখতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে ক্ষীপ্ত সাদ বখত রাগে তার মুখে জোরে এক ঘুঁষি মারলো। প্রচন্ড ঘুঁষি খেয়ে উল্টে পড়ে গেল কাজী ইবনুল খাশিব। শামস বখত সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি তার একটি পা কাজীর গলার উপরে চেপে ধরলেন। কাজী কিছুক্ষণ ছটফট করে ঠান্ডা হয়ে গেল। মারা গেল কাজী। কাজীকে হত্যা করার কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছিল না এ দুই ভাইয়ের। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাই ঘটে গেল।

    দুই ভাই চিন্তা করে দেখলো, এখন গ্রেফতার হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই তাদের। শামস বখত তার দুই অফিসারকে ডাকলেন। একজনকে বললেন, ‘জলদি চারটি ঘোড়া প্রস্তুত করো।’ অন্য জনকে বললেন, ‘ঘোড়া প্রস্তুত হলে মেয়েদেরকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিও।’ তিনি দ্রুত সাদ বখতের সাথে কিছু জরুরী আলাপ সারলেন। ততক্ষণে চারটি ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে সেখানে হাজির করা হলো। অন্য অফিসার মেয়েদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন শামস বখতের দরজায়। ঘোড়া ও মেয়েদের প্রস্তুত দেখে দুই ভাই এগিয়ে গেলেন সেখানে। শামস বখত মেয়েদের বললেন, ‘তোমাদের সাথে আর আলাপ করার সময় নেই। জলদি ঘোড়ায় চড়ে বসো। আমার লোক তোমাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেবে।’

    মেয়েরা পরিস্থিতির নাজুকতা বুঝতে পারল। তারা কথা না বাড়িয়ে দ্রুত গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসলো। দু’জন বিশ্বস্ত কমান্ডোকে তীর-ধনুক ও তলোয়ার নিয়ে অপর দু’টি অশ্বে আরোহন করতে নির্দেশ দিলেন সেনাপতি শামস বখত। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম তামিল করলো ওরা। এরপর সেনাপতি শামস বখত ও তার ভাই সাদ বখত তাদের সাথে করে কেল্লার ফটক পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন। সেনাপতির নির্দেশে প্রহরীরা কেল্লার ফটক খুলে দিল। পুরো দলটিকে নিয়ে তিনি কেল্লার বাইরে বেরিয়ে এলেন।

    প্রহরীদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে এসে তিনি তাদের চারজনকে বিদায় জানালেন। দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাদের বললেন, ‘তোমরা সোজা সুলতান আইয়ুবীর কাছে চলে যাবে। ওখানে পৌঁছে বলবে, আমি পাঠিয়েছি তোমাদের।’

    গুমাস্তগীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতো কমান্ডোরা। চারটি ঘোড়া প্রাণপ্রণে ছুটে চললো আর রিস্তানের দিকে। সেনাপতি দু’জনেরও ওদের সাথেই পালিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু কি চিন্তা করে ওরা আবার দূর্গে ফিরে এলো।

    গুমাস্তগীন ততক্ষণে জেগে উঠেছিল। সেনাপতির মহল খালি থাকায় খালিফার দূত ওখান থেকে বেরিয়ে চলে এলো গুমাস্তগীনের মহলে। মহলের প্রহরী গুমাস্তগীনকে খবর দিল, ‘এক দূত আপনার সাথে সাক্ষাত করতে চায়।’ গুমাস্তগীন বললো, ‘ঠিক আছে, তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।’

    দূত ভেতরে প্রবেশ করলে গুমাস্তগীন তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কে তুমি? কোত্থেকে এসেছো?’

    দূত তার পরিচয় দিয়ে বললো, ‘আমি মহামান্য খলিফা আল মালেকুস মালেহের দরবার থেকে এসেছি।’ সে খলিফার চিঠির কথা বললো এবং সঙ্গে যে সব উপহার সামগ্রী নিয়ে এসেছে সেগুলোর কথাও বললো গুমাস্তগীনকে।

    শামস বখত ও সাদ বখত ফিরে এসে গুমাস্তগীনের মহলে গেল। গুমাস্তগীন তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়ে দুটি কোথায়?’

    শামস বখত জবাব দিলেন, ‘ওরা নিরাপদ স্থানে চলে গেছে।’

    গুমাস্তগীন রক্ত চক্ষু মেলে ক্ষীপ্ত কন্ঠে বললেন, ‘তার মানে?’

    ‘তার মানে খুব সোজা। এ দুই মেয়ে ছিল মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমি চাইনি ওদের ইজ্জত নষ্ট হোক। তাই আমি ওদেরকে এমন স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছি, যেখানে তাদের ইজ্জত-আবরু রক্ষা পাবে।’

    গুমাস্তগীন রাগে তার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। দূত বললো, ‘শুধু তাই নয়, এ দু’জন মিলে আপনার কাজীকেও খুন করে ফেলেছে!’

    ‘হোয়াট?’ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গুমাস্তগীন তার প্রহরীদের ডাকলো। বললো, ‘এদের পাকড়াও করো।’ দূতকে নিয়ে গুমাস্তগীন সেনাপতি শামস বখতের বাসায় গেলো। দেখলো, সত্যি, সেখানে কাজীর লাশ পড়ে আছে। দূত পাশের কামরায় বসে সেনাপতিদের সাথে কাজী সাহেবের যে বদানুবাদ ও আলোচনা শুনেছিল, সে সব কথা গুমাস্তগীনকে খুলে বললো। গুমাস্তগীন সেনাপতি শামস বখত ও তার ভাই সাদ বখতকে সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন।

    হারানের দূর্গ থেকে বের হয়ে চার অশ্বারোহী যখন প্রানপণে ছুটছিল সুলতান আইয়ুবীর দিকে, সুলতান আইয়ুবী তখন হাসান বিন আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘এখনও হারানের সেনাপতিদের কাছ থেকে কোন সংবাদ এলো না?’

    সেনাপতি শামস বখত ও সেনাপতি সাদ বখতের সংবাদের জন্য সুলতান আইয়ুবী যখন পেরেশান, ওরা তখন কাজী ইবনুল খাশিবের হত্যা এবং আস সালেহের দরবার থেকে নিয়ে আসা দুই মেয়েকে দূর্গ থেকে বের করে দেয়ার অপরাধে কারাগারে বন্দী। ঠিক সে সময় আস সালেহের আর একজন দূত মুসাল দূর্গের অধিপতি গাজী সাইফুদ্দিনের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। গাজী সাইফুদ্দিন খেলাফতের অধীনে মুসাল প্রদেশ ও তার আশেপাশের এলাকার শাসক ছিলেন। কিন্তু নুরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে মুসালের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষনা দেন।

    সাইফুদ্দিন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বংশের লোক হলেও তার বিরোধী ছিলো। সাইফুদ্দিন নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করায় মুসাল আর ইসলামী সাম্রাজ্যের অংশ রইল না। নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তিনি সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে পরিচালিত জোটে যোগ দিয়েছিলেন।

    তার ভাই আজিম উদ্দিন একজন দক্ষ ও পরীক্ষিত জেনারেল। সাইফুদ্দিনের সেনা বাহিনীর হেড অব দ্যা কমান্ড এই আজম উদ্দিন। অন্যান্য মুসলিম আমীরদের মতই সাইফুদ্দিনও ছিলো ভোগ বিলাস প্রিয় এক শাসক। তার হেরেমেও ছিল দেশী বিদেশী সুন্দরী মেয়ের ছড়াছড়ি। ছিল নর্তকী ও গায়িকার দল।

    এ ছাড়া তার ছিল পাখী পোষার এক অদ্ভুত শখ। অসংখ্য মেয়ের মত অসংখ্য পাখীতে ভরা ছিল তার মহল। রং-বেরংয়ের বিচিত্র পাখী খাঁচায় সাজিয়ে তাদের সাথে গল্প করতো সে। সুন্দরী নারী ও রং বেরংয়ের পাখী, দুটোই ছিল তার আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম। আজিম উদ্দিনের সামরিক যোগ্যতা ও নৈপূন্যের ওপর আস্থা ছিল তার। তার আশা ছিল, সুলতান আইয়ুবীকে পরাজিত করে তার রাজ্য আরো বাড়িয়ে দিতে পারবে আজিম উদ্দিন। এই আশায় সাইফুদ্দিন ও হারান দূর্গের অধিপতি গুমাস্তগীন এবং তথাকথিত খলিফা আল মালেকুস সালেহের মত খৃস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতো। খৃস্টানরা সাইফুদ্দিনকে আশ্বাস দিয়েছিলো, সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তারা তাকে সামরিক সাহায্য দিবে যাবে।

    এভাবে সুলতান আইয়ুবীর অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছলো, তার বিরুদ্ধে মুসলানদেরই তিনটি শক্তি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো।

    হলবে আল মালেকুস সালেহ, হারানে গুমাস্তগীন ও মুসালে সাইফুদ্দিন। এই তিনটি মুসলিম শক্তির কেউ কারো চেয়ে কম ছিল না, সামরিক বিচারে এদের কাউকে উপেক্ষা করার মতও ছিল না। এ তিনটি বৃহৎ শক্তি ছাড়াও এদের প্রভাবাধীন ছোট ছোট শেখদের রাজ্য, মুসলিম নবাবদের পরগনার সংখ্যা ছিল অসংখ্য। এরাও সবাই এই তিন শক্তির সাথে ঐক্যজোটে শামিল হয়েছিল। তারা সবাই ঐক্যজোট হয়েছিল বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই একে অন্যকে ভয় করতো।

    স্বার্থের ঐক্য তাদের মানসিক দূরত্ব ঘুচাতে পারেনি। তারা কেউ চায়নি, অন্যেরা তার চেয়ে বেশী শক্তিশালী হোক। তাদের অবস্থা ছিল সেই পুকুরের মাছের মত, যেখানে ছোট বড় সব মাছ একত্রে থাকে ঠিক, কিন্তু ছোট মাছগুলো সব সময় বড় মাছগুলোকে ভয় পায়। কোন সুযোগে কে তাকে গিলে ফেলে এই ভয়ে তটস্ত থাকে সব সময়। আর আশা করে, বেঁচে থাকলে সেও একদিন বিশাল মাছ হবে।

    সুলতান আইয়ুবী তার ছড়িয়ে দেয়া গোয়েন্দাদের মাধ্যমে বিরোধীদের এ অনৈক্যের সব খবরই নিয়মিত পেয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি কোন বিপদের ঝুঁকি নিতে রাজী ছিলেন না বলে সব সময়ই এ সত্যও স্বরণে রাখতেন, তাঁর সামনে তিনটি বড় সামরিক শক্তি দাঁড়িয়ে আছে। তারা আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে। যে কোন মুহূর্তে ওরা একা একা বা এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তার বাহিনীর উপর।

    এ কথাও সব সময় মনে রাখতেন, এ তিনটি বাহিনীর সেনাপতি, কমান্ডার ও সৈন্যরা সবাই মুসলমান। তাদের সামরিক শিক্ষা, নৈপূন্য ও বীরত্বও একই ধরনের। এ গুনগুলো ওরা মুসলমান বলেই পেয়েছে। এসব গুন ও যোগ্যতা আল্লাহ অন্য কোন জাতিকে দেননি।

    চার-পাঁচ গুন খৃস্টান বাহিনীকে এ মুসলিম বাহিনীর যে কোন দল পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। সেই খৃস্টানরা যতই উন্নত সামরিক অস্ত্র, লৌহ বর্ম, শিরস্ত্রান ও তাজাদম ঘোড়াই ব্যবহার করুক না কেন, তাতেও তাদের পরাজিত হওয়ার কোন আশংকা নেই। সুলতান আইয়ুবী হলব অবরোধ করে মর্মে মর্মে এ সত্য উপলব্ধি করেছেন। এটাই প্রথম ঘটনা, যেখানে মুসলিম সৈন্য মুসলিম সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

    হলব শহরের মুসলমান জনসাধারণ ও সৈন্যরা যেখানে যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছে, শহরের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে যেভাবে জীবন উৎসর্গ করেছে, তার নজীর শুধু মুসলমানই দেখাতে পারে। এই বীরত্বের কথা সুলতান আইয়ুবী তার মন থেকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না।

    সুলতান আইয়ুবীর কেবলি মনে পড়ছে, তিনি ‘মুসলমান হয়ে মুসলমানদের ওপর অভিযান চালিয়েছেন’, এই অপবাদের কথা।

    আব্বাসীয় খেলাফতের এক আমীর এ অপবাদ ছড়াচ্ছিল। তাকে মিশর থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল খৃস্টানদের সাথে যোগসাজশের অভিযোগে। অথচ প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন রূপ।

    সুলতান আইয়ুবী খৃস্টানদের কবল থেকে ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার অভিযানে বেরোলে খৃস্টানদের পদলেহী শাসকরা তার পথ আগলে দাঁড়ায়। ফলে তিনি বাধ্য হন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে।

    এ সত্য গোপন করে তার বিরুদ্ধে ইসলামী জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ অপবাদ ছড়াচ্ছিল দুশমন। ক্ষমতার লোভে অন্ধ শাসকরা এভাবেই চেষ্টা করছিল ইসলামী জনতাকে জেহাদের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে।

    মুসলমানদের প্রথম কেবলা এখানে কাফেরের অধীন, সুলতান আইয়ুবী কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছিলেন না। জেরুজালেমকে শত্রুমুক্ত করার চিন্তা অহর্ণিশ ঘুরপাক খেতো তার মাথায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপের পিছনে কাজ করতো এই চিন্তা। এ চিন্তা কখনো তাকে এক জায়গায় শান্তিতে বসতে দেয় নি।

    পথের প্রতিটি বাঁধা সরিয়ে তিনি কেবল সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। দুশমনের বাঁধা, গাদ্দারের গাদ্দারী তার পথ রোধ করতে পারেনি কখনো। তার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে ছিল জেরুজালেমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দুর্মর আকাঙ্খা।

    ইহুদীদের পরিকল্পনাও তার অজ্ঞাত ছিল না। তিনি ভালমতই জানতেন, ইহুদীরা ধুরন্ধর ও অসম্ভব কূটকৌশলী। এমন ধুরন্ধর জাত পৃথীবিতে আর দ্বিতীয়টি নেই। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছিলেন, কেন পবিত্র কোরাআন একমাত্র ইহুদীদেরকেই মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু বলে ঘোষনা করেছে।

    তারা কখনো সম্মুখ যুদ্ধে উপস্থিত হয় না। যুদ্ধের ময়দানে তারা লেলিয়ে দেয় মাথা মোটা খৃস্টানদেরকে। বিনিময়ে তাদের দেয় অঢেল আর্থিক সুবিধা। এই সুবিধার পরিমাণ চিন্তা ও কল্পনারও অতীত। এভাবেই খৃস্টনদের বন্ধুত্ব ক্রয় করে নিয়েছে ওরা। আর এই বন্ধুত্বের উসিলায় তাদের বিবেক এবং মাথাগুলোও তারা কিনে নিয়েছে।

    খৃস্টানরা এখন বিশ্বময় দৃশ্যতঃ সবচেয়ে বেশী বিত্ত বেসাতের মালিক। ইহুদীরা তাদের শুধু এই সম্পদই দান করেনি, তাদের অসাধারণ সুন্দরী, রূপসী মেয়েদেরকেও তুলে দিয়েছে ওদের হাতে। এই মেয়েরা কেবল রুপে গুণেই অনন্যা নয়, ইহুদীদের জাতীগত কুটবুদ্ধি এবং চাতুর্যেও এরা অতুলনীয়া।

    খৃস্টানদের জাতীগতভাবে কব্জা করার পর এবার এসব মেয়েদের ওরা লেলিয়ে দিচ্ছে গাদ্দার মুসলিম আমীরদের পেছনে। নিজেরা না এসে ওদের পাঠাচ্ছে খৃস্টানদের মাধ্যমে। সেই সাথে সেই একই লোভ, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রলোভন!

    এ ষড়যন্ত্রের কথা যখনই মনে হয় তখনই সুলতান আইয়ুবী কাতর হয়ে পড়েন। খৃস্টানরা তাদের পেছনে ছায়ার মত লেগে আছে। উচ্চ পদস্থ সামরিক আফিসার, দুর্ধর্ষ সেনা কমান্ডার, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজ্যের আমীর ওমরা, এমন কে নেই, যাদের পেছনে ওরা লাগেনি! এরা শত্রুর বেশে আসে না, আসে বন্ধুর বেশে। ফলে ওদের মোকাবেলা করা কত যে দূরূহ তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে! কত ভাবে ও কত কায়দায় যে ওরা মুসলমানদেরকে মুসলমানের বিরুদ্ধে কাজে লাগায় তার কোন ইয়ত্তা নেই।

    যাদের টোপ গেলাতে পারে না, তাদের কাজে লাগায় একভাবে, যারা টোপ গেলে তাদের অন্যভাবে। মোট কথা, ওদের নজরে পড়লে কারো রেহাই নেই। আজ মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধের উস্কানী দিচ্ছে তাদেরই নিয়োজিত লোকজন। তাদেরই নীলনকশায় মুসলমানরা পরষ্পরের বিরুদ্ধে তাক করেছে অস্ত্র।

    এমন কঠিন সময়ে সব সময় চোখ-কান খোলা না রাখলে পতন অনিবার্য। সুলতান আইয়ুবী তাই তার বাহিনীকে সদা সতর্ক ও সর্বদা প্রস্তুত অবস্থায় রেখেছেন। সামরিক বিভাগকে তিনি এমন ট্রেনিং দিয়েছেন এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে এমন সচল রেখেছেন, দুশমনের যে কোন চাল ও পরিকল্পনা চাইতে যা সবসময় অধিক কার্যকর ও ফলপ্রসু। ফলে শত্রুরা কোন ময়দানেই মুজাহিদদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তারা তাদের মেধা, মনন, শ্রম ও যোগ্যতাকে এমনভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিল যে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য লাভের হকদার হয়ে উঠেছিল তারা।

    মুসাল প্রদেশে গিয়ে পৌঁছলো হলবের দূত। সঙ্গে তার সুলতান আল মালেকুস সালেহের চিঠি ও উপহার সামগ্রী। এখানেও উপহার হিসাবে পাঠানো হয়েছে অন্যান্য সামগ্রীর সাথে হারানের মত দুই সুন্দরী মেয়েকে।

    হারান কেল্লার অধিপতি গুমাস্তগীনের কাছে পাঠানো মেয়ে দুটিকে সেনাপতি শামস বখত ও সাদ বখত নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের পাঠাতে গিয়ে হত্যা করেছিলেন কাজী ইবনুল খাশিবকে। আর সেই অপরাধে নিজেরা বরণ করেছিলেন করাগারের বন্দী জীবন। কিন্তু মুসালের গভর্ণর সাইফুদ্দিন তার উপহার ও পয়গাম ঠিকমতই পেয়েছিলো। মেয়ে দুটি তার অন্দর মহলের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুললো। হলবের দূত তাকেও সে রকম চিঠিই দিলো, যে রকম চিঠি গুমাস্তগীনকে দিয়েছিলো।

    তাতে আরো উল্লেখ ছিল, ‘খৃস্টানরা হলববাসীদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরন করেনি। ওরা একবার যেহেতু ধোঁকা দিয়েছে, আবারো দিতে পারে। ফলে তাদের আশ্বাসের ওপর ভরসা করা যায় না।

    আবার চারদিকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন, তাদের বন্ধুত্ব সরাসরি অস্বীকার করাও এ মুহূর্তে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার উত্তম পন্থা হলো, নিজেরা পরষ্পর ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও ঐক্যবদ্ধভাবে সুলতান আইয়ুবীর ওপর আক্রমণ চালানো। সাফল্যের সম্ভাবনা দেখলে তারা যে তাদের দুয়ার খোলা রাখবে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু রিস্ক নিয়ে তারা আমাদের বিজয়ী করতে আসবে না।

    সুলতান আইয়ুবী এখন আর রিস্তান পর্বতের দূর্গম শৃঙ্গের ওপর তাঁবু টানিয়ে বসে আছেন। ভাল খেলোয়াড়ও খেলতে খেলতে এক সময় ভুল করে বসে। পাগল গাছের মাথায় চড়ে ভাবে, কেউ আর তার নাগাল পাবে না। আমাদের জন্য এ এক মহা সুযোগ! আমরা একসাথে তাঁকে আক্রমণ করলে আর খৃস্টানরা একটু সহায়তা করলে তাকে সহজেই পরাস্ত করা সম্ভব।

    আমি তো মনে করি, তার সাথে যুদ্ধ করার ও প্রয়োজন হবে না, কেবল অবরোধ করে বসে থাকলে একদিন খাদ্যাভাবেই ধরাশায়ী হয়ে যাবে।

    এ চিঠিতেও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সেখানে বরফ গলতে শুরু করেছে। গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, সুলতান আইয়ুবীর সামরিক শৃংখলা বরফ গলা পানির প্রবাহে তছনছ হয়ে গেছে। আমাদের ঐক্যজোটের তিন শরীক একত্রে সামরিক অভিযান চালালে, পাহাড়ী প্রান্তরেই সুলতান আইয়ুবীকে পরাজিত ও চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারবো।’

    চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ‘গুমাস্তগীনকেও অনুরূপ চিঠি দেয়া হয়েছে। আশা করি আমাদের ঐক্যবদ্ধ সামরিক জোটকে কার্যকরী করতে আপনিও সচেষ্ট হবেন। সময় নষ্ট না করে আপনার সৈন্য বাহিনী ঐক্যজোটের কমান্ডে নিয়ে আসুন, যাতে সুলতান আইয়ুবীকে পরাজিত করে আমরা আমাদের নিজ নিজ রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি।’ সাইফুদ্দিন এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে তার ভাই আজিম উদ্দিন, দু’জন সিনিয়ার জেনারেল এবং মুসালের সম্মানিত খতিব ইবনুল মাখদুম কাকবুরীকে ডেকে পাঠালেন। সকলে সমবেত হলে তিনি খলিফার চিঠি সবার সামনে পুনরায় পাঠ করলেন। এরপর তিনি সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনারা সকলেই জানেন, আমরা সুলতান আইয়ুবীর বিরোধী। তার আনুগত্য করার কোন ইচ্ছে আমাদের নেই। আমার দেহের শিরায় যে রক্ত প্রবাহিত, তার দেহের শিরাতেও ঠিক একই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। এখন আপনারা বলুন, এ পত্রের আমি কি জবাব দেবো?’

    ‘এ ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা কি?’ জানতে চাইলেন খতীব ইবনুল মাখদুম কাকবুরী। ‘আমার ইচ্ছে, প্রকাশ্যে এই ঐক্যজোটে যোগ দেয়া। কিন্তু শর্ত থাকবে, যে এলাকা আমাদের সৈন্য দ্বারা বিজিত হবে সে এলাকা আমাদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। সেখানে অন্য কেউ আধিপত্যের দাবী করতে পারবে না।’

    এক সেনাপতি বললো, ‘আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারচেয়ে উত্তম আর কোন সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আমাদের সৈন্যরা যে এলাকা জয় করবে, সে এলাকার হকদার আপনি, এতে কারো কোন আপত্তির প্রশ্ন উঠতে পারে না।’

    ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খৃস্টান ও সুদানীদের পরাজিত করতে পারলেও আমাকে পারবে না। কারন আমাদের উভয়ের শরীরে একই রক্তধারা প্রবাহিত এবং আমি তার যুদ্ধ কৌশল ভাল করেই জানি।’ বললো সাইফুদ্দিন।

    অপর এক সেনাপতি বললো, ‘আপনি আপনার সৈন্য বাহিনী ঐক্যবদ্ধ জোটে শামিল করে দিন কিন্তু সৈন্য পরিচালনার কমান্ড আপনার হাতেই রাখবেন। আপনি আপনার সৈন্য বাহিনীকে এমনভাবে পরিচালনা করবেন, যেন আমাদের সফলতা হলব ও হারানের থেকে সম্পূর্ন পৃথক থাকে।’

    ‘শাহানশাহে মুসাল! আমি আপনার আদেশের ওপর জীবন কোরবানী করে দেবো।’ প্রথম সেনাপতি বললো, ‘আমরা আপনাকে এই মুসলিম সাম্রাজের শাহানশাহ বানিয়ে দেবো, যে স্বপ্ন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী দেখছেন।’

    ‘গাজী সালাহউদ্দিনের মাথা এনে আপনার পদতলে রেখে দেবো।’ বললো অপর সেনাপতি, ‘তার সৈন্য বাহিনীকে আর রিস্তানের পাহাড়ী এলাকা থেকে বেরই হতে দেবো না। আপনি সত্বর যুদ্ধ যাত্রার আদেশ দিন। আমাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধ যাত্রার জন্য সম্পূর্ন প্রস্তুত হয়ে আছে।’

    দুই সেনাপতিই উচ্ছাস ও আগ্রহে টইটম্বুর। কার চেয়ে কে বেশী তাবেদারী ও খোশামুদি করতে পারে তার যেন প্রতিযোগিতা চলছিল। সেনাপতি আজিম উদ্দিন চুপচাপ বসে শুনছিলো ওদের বক্তব্য। খতীব ইবনুল মাখদুম কখনও সেনাপতিদের মুখের দিকে, আবার কখনো সাইফুদ্দিনের মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলেন ওদের মনোভাব।

    ‘আজিম উদ্দিন, তোমার কি ধারনা?’ সাইফুদ্দিন তাঁর ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘আপনার এই সিদ্ধান্তে আমরা একমত, আমরা সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।’ আজিম উদ্দিন বললো, ‘কিন্তু আমাদের সেনাপতিদের এমন আবেগপ্রবণ কথা শোভা পায় না, যেমন আমাদের দুই সেনাপতি বলেছেন। সুলতান আইয়ুবীকে এতটা হালকভাবে দেখা কোন অভিজ্ঞ সেনাপতির কাজ নয়।

    আমি বলছি না, সুলতান আইয়ুবীকে আমরা পরাজিত করতে পারবো না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, যিনি অল্প ক’জন সৈন্য নিয়ে খৃস্টানদের বহুগুণ সৈন্যের মোকাবেলা করে তাদের পরাজিত করেছেন, যিনি মরুভূমির সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের বরফ ঢাকা প্রান্তরে যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করতে পারেন, যিনি সম্রাট রিমান্ডের সৈন্য বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছেন, তিনি বরফ গলা পানি প্রবাহের মধ্যেও ভালমতই যুদ্ধ করতে পারবেন, এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই।

    আমাদের আগেই খুশী হওয়ার কোন কারন নেই। শক্রকে কোন সময় দুর্বল ভাবতে হয় না। আপনি নিজেই চিন্তা করুন, যাঁর সঙ্গে আপনি যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন, তার সামরিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কেমন? চিন্তা করুন সেই যুদ্ধের ময়দানের কথা, যেখানে কেবল তার সৈন্যরাই যুদ্ধ করবে না, জিততে হলে আপনাকেও সেখানে যুদ্ধ করতে হবে। তার সৈন্যদের মোকাবেলায় আপনার সৈন্যরা সে ময়দানে যুদ্ধ করতে কতটা বেশী পারঙ্গম, সেটাও আপনাকে চিন্তা করতে হবে।’

    এরপর আজিম উদ্দিন সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদের যোগ্যতা ও গুণের প্রশংসা শুরু করলো। সুলতান আইয়ুবীর রণকৌশল সম্পর্কে আলোচনা করলো বিজ্ঞ সেনাপতির মতো।

    এরপর যে ময়দানে যুদ্ধ হচ্ছে সে ময়দানের অবস্থার ওপর আলোকপাত করে বললো, ‘বরফ গলতে শুরু করেছে এবং বসন্তের ঋতুতে প্রবল বর্ষনের সম্ভাবনাও আছে। এ বৎসর বৃষ্টি একটু দেরিতেই হচ্ছে। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যরা এখনও তাঁবুতেই আছে। কিন্তু ঘোড়া তো আর তাঁবুর মধ্যে নেই। এ সময় তাদের সামরিক অশ্বগুলো নিশ্চয় পর্বতের গুহায় ও গাছের নিচে আছে। উট ও ঘোড়া এ অবস্থায় বেশীক্ষণ সবল ও সুস্থ থাকে না।

    আমরা এ আশাও করতে পারি, আইয়ুবীর সৈন্যরা পাহাড়ী অঞ্চলের ভয়ংকর শীতে থাকতে থাকতে বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছে। আবার এ কথাও খেয়াল রাখতে হবে, যদি আমাদের সৈন্য হলব ও হারানের সৈন্যদের সাথে মিশিয়ে ফেলি, তবে সুলতান আইয়ুবী আমাদের সকলকে অবরোধ করে ফেলতে পারে।

    বিশেষ করে এ কথাও স্মরণ রাখা দরকার, মুসলমান সৈন্যরা যখন অন্য মুসলিম বাহিনীর সামনা-সামনি হবে, তখন এমনও হতে পারে, তারা পরষ্পর যুদ্ধ করার পরিবর্তে আপোষে মিলেও যেতে পারে।

    তারা একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার উন্মুক্ত করবে, কিন্তু সেই তলোয়ার সহসাই আবার কোষবদ্ধও হয়ে যেতে পারে। রক্ত প্রবাহের পরিবর্তে এক অন্যের সাথে মেতে উঠতে পারে কোলাকুলিতে।’

    ‘আজিম উদ্দিন!’ সাইফুদ্দিন তার কথার মাঝখানে বলে উঠলেন, ‘তুমি একজন সৈনিক! তুমি শুধু রক্ত, তীর ও তলোয়ারের চমক সম্পর্কেই চিন্তা করতে পারো, বাকী খবর আমার কাছে শুনে নাও। যুদ্ধের চাল আমারাও কম জানি না। মুসলমান সৈনিককে কেমন করে মুসলমানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করানো যায় শিখে নাও আমার কাছ থেকে।

  • তুমুল লড়াই

    তুমুল লড়াই

    তুমুল লড়াই

    হলব, হারান ও মুশালের সেনাবাহিনী মার্চ করে রণাঙ্গণে ছুটে আসছিল। এদিকে সুলতান আইয়ুবীর পক্ষে কায়রো থেকে যে সাহায্য আসার কথা, তাও যে কোন সময় এসে পৌঁছে যেতে পারে। শত্রুদের আক্রমণ আগে হয়, নাকি মিশর থেকে সৈন্য সাহায্য আগে এসে পৌঁছে, এটাই এখন দেখার বিষয়। এ নিয়েই অধীর ছিলেন সুলতান। কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন, কায়রোর সাহায্য ছাড়া শত্রুর এ তুমুল অভিযান ঠেকানো যাবে না। কিন্তু সাহায্য আসার আগেই যদি আক্রমণ এসে যায়, তাহলে! এ নিয়েই চরম উৎকণ্ঠা ও পেরেশানীতে ভুগছিলেন তিনি। সময় কাটাচ্ছিলেন নানা রকম চিন্তা ভাবনা ও পরিকল্পনায়। বুদ্ধির শেষ শক্তিটুকুও ব্যয় করছিলেন এ কাজে। যদি সাহায্য আসার আগেই শত্রু আক্রমণ করে বসে, তবে এ সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে কেমন করে যুদ্ধ চালাবেন তার অসম্ভব সব পরিকল্পনা শোনাচ্ছিলেন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের। তাদের নির্দেশ দিয়ে বলছিলেন, ‘কমান্ডো বাহিনীকে পূর্ণ মাত্রায় প্রস্তুত ও সতর্ক রাখো। কখন সাহায্য এসে পৌঁছবে জানা নেই আমাদের, কিন্তু এদিকে আক্রমণ দ্রুত এগিয়ে আসছে। কমাণ্ডো বাহিনী দিয়েই তাদের আক্রমণ ঠেকাতে হবে।’

    সুলতানের পেরেশানী দেখে এক সেনাপতি বললেন, ‘আল্লাহর যা মঞ্জুর তাই হবে। এটা তো দুর্গ নয় যে, আমরা অবরোধের মধ্যে পড়ে যাবো। আমরা পাহাড়ের টিলা ও উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমনভাবে যুদ্ধ করবো, যেন দুশমন সহসা আমাদের দুর্বলতা টের না পায়।’

    অধিকাংশ সেনাপতি এবং কমাণ্ডোরাও এ নিয়েই ভাবছিলেন। বাইরে প্রকাশ না করলেও ভেতরে সবার মাঝেই বিরাজ করছিল টান টান উত্তেজনা।

    সন্ধ্যার লালিমা মুছে গেল। পাহাড়ের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁবুগুলো ঢেকে গেল রাতের আধাঁরে। দেখতে দেখতে রাত গভীর হলো। মুজাহিদরা শুয়ে পড়লো যে যার তাঁবুতে। যাদের ডিউটি ছিল তাঁবু পাহারার, তারা চলে গেল ডিউটিতে। কিন্তু অস্থিরতা ও পেরেশানীর কারণে কেউ ভালমত ঘুমাতে পারলো না। সেনাপতিদের তাঁবুর মধ্যে রাতভর প্রদীপ জ্বলতে থাকল। না ঘুমিয়ে যুদ্ধের নকশা এঁকে চললেন তারা। সুলতানের তাঁবুতেও প্রদীপ জ্বলছিল। তিনি ময়দান ও সেই পার্বত্য এলাকার নকশা আঁকলেন, যেখানে মনে মনে মোকাবেলা করবেন বলে ঠিক করেছেন।

    রোজার সেহরী খাওয়ার জন্য নাকারা বেজে উঠলো। সৈন্যরা দ্রুত গিয়ে শামিল হলো দস্তরখানে। সুলতানও এসে ওদের সাথে যোগ দিলেন। ঠিক সে সময় দু’জন সংবাদবাহক দু’দিক থেকে এসে পৌঁছলো সুলতাদের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে দু’টি খবরই তিনি এক সাথে পেয়ে গেলেন।

    প্রথম কাসেদ জানালো, ‘কায়রোর সৈন্য সাহায্য এসে গেছে। আজ ভোরেই আপনি ওদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করতে পারবেন।’

    দ্বিতীয় কাসেদ বললো, ‘শত্রু সৈন্য রণাঙ্গণ থেকে মাত্র আট-দশ মাইল দূরে এসে অবস্থান নিয়েছে। সম্ভবতঃ আগামী কাল ওরা আমাদের ওপর চড়াও হবে।’

    সুলতান তার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে জানতে চাইলেন শত্রুর সর্বশেষ গতিবিধির খবর। গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল কমাণ্ডার শত্রুর গতিবিধির বর্ণনা দিতে গিয়ে বললো, ‘শত্রুরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এক দল সামনে, দ্বিতীয় দল নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মাঝখানে রয়েছে, তৃতীয় দল অনেক পেছনে থেকে অনুসরণ করছে তাদের।’

    সুলতান আইয়ুবীর যা জানার দরকার ছিল, তা জেনে গেছেন। তিনি গোয়েন্দা বিভাগের কমাণ্ডারকে বললেন, ‘তুমি গিয়ে কমাণ্ডো দলের কমাণ্ডার ও কায়রো থেকে আসা সেনাদলের হাইকমাণ্ডকে জলদি ডেকে আনো। তাদের বলবে, আমি তাদেরকে আমার সাথেই সেহরী খাবার দাওয়াত দিয়েছি।’

    গোয়েন্দা বিভাগের কমাণ্ডার বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দু’হাত উপরে তুলে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন। উপস্থিত সৈন্যরাও হাত তুলল তাঁর সাথে। মোনাজাত শেষ করে তিনি বললেন, ‘তোমরা খাওয়া শুরু করো, আমি ওদের সাথে পরে বসবো।’

    তিনি নিজের তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং ওরা এসে পৌঁছার আগেই দু’রাকাত নফল নামাজ সেরে নিলেন। নামাজ শেষে তিনি আবার আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছেন, এ সময় কমান্ডো দলের কমান্ডার এসে পৌঁছলো। তার একটু পরেই কায়রো থেকে আসা বাহিনীর সালার এসে ঢুকল তাঁবুতে।

    সেহরীর সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল, সুলতান মেহমানদের সামনে সেহরীর খাবার পরিবেশন করার হুকুম দিলেন। খেতে খেতেই ওদের সাথে আলাপ শুরু করলেন সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী। প্রশ্ন করলেন, ‘কায়রো থেকে কত সৈন্য নিয়ে এসেছো?’

    সালার সৈন্যের পরিমান অবহিত করলো সুলতানকে। প্রয়োজনের তুলনায় এ সাহায্য সেনার পরিমাণ কমই ছিল, কিন্তু তাতে মোটেও বিচলিত হলেন না সুলতান। সংকট মুহুর্তে এটাকেই তিনি আল্লাহর রহমত মনে করলেন। বললেন, ‘আর অস্ত্রশস্ত্র?’

    কায়রো থেকে আনা অস্ত্রশস্ত্রের বিবরণ শুনে সুলতানের মন প্রশান্তিতে ভরে গেল। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল যথেষ্ট পরিমান ছোট-বড় মিনজানিক কামান, আর সেই সাথে গোলা বারুদও ছিল প্রচুর।

    সাহায্য হিসাবে আসা সৈন্যের পরিমাণ কম হলেও এরা সবাই ছিল চৌকস যোদ্ধা। পুরো বাহিনী থেকে বাছাই করে গঠন করা হয়েছিল এ বাহিনী। অভিযানের আগে ওদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। পরিমাণে অল্প হলেও ময়দানে ওরা কি ভয়ংকর তুফান সৃষ্টি করতে পারবে, জানতেন সুলতান। তাঁর শুধু একটিই আফসোস হলো, এ এলাকার পাহাড় ও টিলার প্রতিটি খাজের সাথে ওদের পরিচয় করানোর সময় পেলেন না তিনি।

    ইতিমধ্যে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হাসান বিন আবদুল্লাহও এসে পৌঁছলেন সেখানে। তিনি বললেন, ‘এইমাত্র হলব থেকে আমার এক গোয়েন্দা এসেছে। সে খবর এনেছে, খৃস্টানরা সম্মিলিত বাহিনীর তিনটি গ্রুপকেই তীর-ধনুক, গোলা-বারুদ এবং পাঁচশ করে ঘোড়া সাহায্য হিসাবে পাঠিয়েছে। গোয়েন্দা বলেছে, সে ওদের অভিযানে বেরিয়ে পড়তে দেখে এসেছে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, গোলা বারুদের ড্রামে উটের পিঠ বোঝাই হয়ে আছে। তবে কাফেলার সৈন্যদের মধ্যে কোনরকম উত্তেজনা ও সতর্কতার ভাব নেই। তারা পথ চলছে এলোমেলো ভাবে, নিরুদ্বিগ্ন মনে। খৃষ্টানরা ওদেরকে কয়েকটি করে মিনজানিক কামানও দিয়েছে। বুঝা যাচ্ছে, শত্রুরা এ যুদ্ধে প্রচুর মিনজানিক কামানও দিয়েছে। বুঝা যাচ্ছে, শত্রুরা এ যুদ্ধে প্রচুর মিনজানিক কামান ব্যবহার করবে। তাদের সাথে প্রচুর গোলা বারুদ এবং অগ্নি নিক্ষেপকারী তীরও রয়েছে।

    খাওয়ার পর সুলতান আইয়ুবী কমান্ডো দলের কমান্ডারকে কাছে ডাকলেন। তাকে বললেন, ‘তোমাকে তো সবকিছু আগেই বুঝিয়ে বলেছি। এখন তোমার কাজ কি করে আঞ্জাম দেবে সেটা তুমিই ভাল বুঝবে। তবে পরিকল্পনার সময় মনে রাখবে, যে পর্যন্ত শত্রুরা আক্রমণ না করে, সে পর্যন্ত তাদের ওপর কোন অতর্কিত আক্রমণ চালাবে না। সংবাদ অনুযায়ী তারা সোজা হেম্মাতের পর্বতশ্রেণী ধরে এগিয়ে আসছে। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে তাদের গতি থেমে যাবে। আমি চাই না তারা ওভাবে মাঝপথে বাঁধাপ্রাপ্ত হোক। তোমাদের জানা দরকার, আমি পাল্টা আক্রমণ করতে চাই না। শত্রুরা আমার আক্রমণ বুঝতে পারবে তখনি, যখন আমি পিছন থেকে তাদের ওপর কেয়ামতের ঝড় তুলবো। আমার এ কথা তোমরা খেয়াল রাখবে।’

    তিনি তাকে আরো বললেন, ‘আমাদের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হবে তখন, যখন শত্রুরা পিছন আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। তারা তখন ভয়ে এদিক-ওদিক পালাতে চেষ্টা করবে। তোমরা লক্ষ্য রাখবে, এ পাহাড়ী এলাকা থেকে যেন শত্রুদের একটি সৈন্যও পালিয়ে যেতে না পারে। তাদের অধিকাংশকে জীবিত ধরে বন্দী করবে। কারণ তারা মুসলমান। যখন ওরা তোমাদের হাতে বন্দী হবে, তখন তারা হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝতে পারবে। অন্তত আমি তাই আশা করি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে এসে যারা তীর ছুঁড়বে এবং আমাদের তীরে বিদ্ধ হয়ে মারা যাবে, তাদের মৃত্যু আমরা ঠেকাতে পারবো না।’

    তিনি কমাণ্ডারকে আরো বললেন, ‘তোমরা এ খবরও পেয়েছো, শত্রুরা প্রচুর গোলা-বারুদ বোঝাই করে সঙ্গে করে নিয়ে আসছে। এগুলো ব্যবহার করার সুযোগ ওদের দেয়া যাবে না। তোমরা দশ-বারো জন দক্ষ কমাণ্ডো নিয়ে ছোট ছোট কয়েকটি গ্রুপ তৈরী করো। তাদের দায়িত্ব হবে গোলা-বারুদের স্তুপে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া। দিনের বেলা ওরা ভাল করে দেখে নেবে গোলা বারুদের স্তুপ কোথায় আছে। তারপর রাতে চুপিসারে ওখানে পৌঁছে আগুন ধরাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, শত্রুরা এখনও নদীর কাছে আসেনি। তোমরা তোমাদের ঘোড়াগুলোকে দানাপানি খাইয়ে প্রস্তুত করে রাখো। নিজেদের মশকগুলোও পূর্ণ করে রাখো পানি দিয়ে। আবহাওয়া এখানে খুব ঠান্ডা। এটা মরুভূমিও নয় যে, কেউ এখানে পিপাসায় মরে যাবে। তবুও এটা যুদ্ধ পলিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, পানির অভাব সৈন্যদের দিশেহারা করে ফেলে।’

    কমাণ্ডারকে বিদায় করে তিনি কায়রো থেকে আসা সৈনিকদের সালারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তোমরা সবসময় মনে রাখবে, এটা মিশরের মরু অঞ্চল নয়। এখানকার পার্বত্য অঞ্চলে শীত খুব বেশী। সূর্য উঠলেও শরীর গরম হয় না। দিনের বেলায়ও শরীর গরম করতে হয় ছুটাছুটি করে। ‘সুযোগ মত আঘাত হানো, আর যে কোন দিকে পালিয়ে যাও’ এই পলিসিতে এখানে তোমাদের যুদ্ধ করতে হবে। এখানে লুকানোর যথেষ্ট সুযোগ ও জায়গা আছে। কি করে অতর্কিত আক্রমন করে দ্রুত পালিয়ে আসতে হয় সে প্রশিক্ষণ তোমরা পেয়েছো। কিন্তু তোমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এখানে ময়দান খুবই সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ। মরুভূমিতে তোমরা কয়েক মাইল চক্কর দিয়ে শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালাতে, ইচ্ছেমত পায়তারা করার জন্য সীমাহীন প্রান্তর পেয়ে যেতে। কিন্তু এখন এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টিলার মাঝখানে সীমাবদ্ধ ময়দানে তোমাদেরকে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। এখন আর সে সময় নেই যে, তোমাদেরকে পাহাড়ী অঞ্চলের প্রতিটি টিলা ও সমতলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। তাই এখানে নিজের বুদ্ধি বিবেককে সর্বোত্তম কাজে লাগাতে হবে তোমাদের। তীরন্দাজদেরকে পাথরের আড়ালে থেকেই নিশানা ঠিক করতে বলবে। আর ঘোড়াসওয়ারদের বলবে, ওরা যেন ওদের ঘোড়াগুলোকে কখনও উঁচু স্থানে নিয়ে না যায়। এখানে চড়াই উৎরাই এত বেশী যে, বার বার ওপর-নিচ করতে গেলে ঘোড়াগুলো দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’

    তিনি মিশর থেকে আগত সৈন্যদের সংরক্ষিত অবস্থায় রাখলেন। তাদের নেতৃত্ব দিলেন সুলতাদের সাথে অবস্থানকারী সেনা অফিসারদের হাতে। কারণ এসব সেনাপতিদের হাতেই ছিল বর্তমান যুদ্ধের বিস্তারিত প্ল্যান ও নকশা।

    ❀ ❀ ❀

    পাহাড়ের চূড়ায় ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়লো আজানের সুমধুর সুর। সুলতান আইয়ুবী পোশাক পাল্টে তাঁবুর ভেতরই ফজরের সুন্নত আদায় করলেন। তারপর কোষমুক্ত তরবারী তুলে নিলেন হাতে। সুলতানের হাতের মুঠিতে এখন খাপ মুক্ত তলোয়ার। তিনি নিবিষ্ট মনে তলোয়ারের ধার ও চমক দেখতে লাগলেন। সহসা উদ্বেলিত আবেগে নড়ে উঠলো তার হৃদয়তন্ত্রী। তিনি তলোয়ার খাপে ভরে কেবলার দিকে মুখ করে হাত তুললেন আকাশের দিকে। চোখ বন্ধ করে আল্লাহর দরবারে মিনতিমাখা স্বরে বলতে লাগলেন, ‘হে মহান রাজাধিরাজ, হে সর্বশক্তিমান! যদি এ যুদ্ধে আমার পরাজয়ে তুমি সন্তুষ্ট হও, তবে তাতেই আমি রাজি-খুশী। আর যদি এ যুদ্ধে তুমি আমাকে সফলতা দান করো, তবে তা হবে তোমার অপার করুণা। সে ক্ষেত্রে তোমার দরবারে জানাই লাখো শুকরিয়া। আজ এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, যারা তোমার প্রিয় হাবীব রাসূলে মকবুলের উম্মত বলে দাবী করছে নিজেদের। অথচ ইসলামের দুশমনদের প্ররোচনায় তারাই আজ ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে। যদি আমার ফয়সালা তোমার দৃষ্টিতে না-জায়েজ হয়, তবে হে আল্লাহ! তুমি তোমার কুদরতি মদদে তা আমাকে জানিয়ে দাও। আমি আমার তলোয়ার খাপে পুরে সরে দাঁড়াবো এ লড়াই থেকে। কারণ তুমি তো আমার অন্তরের খবর জানো, জানো আমার এ লড়াই বীরের খেতাব অর্জন বা রাজ্য জয়ের জন্য নয়!

    আমি তো শুধু ঐসব নারী ও শিশুদের আত্মার ক্রন্দন শুনে ছুটে এসেছি ময়দানে, যাদের মান ও সম্ভ্রম লুট করা হয়েছে কেবল এই অপরাধে যে, তারা তোমার রাসূলের উম্মত ছিল। হে আল্লাহ, আমাকে তোমার অসহায় বান্দাগণ ডাকছে। ডাকছে সেইসব বনি আদম, যারা মুসলমান হওয়ার অপরাধে কাফেরদের হাতে এখনো কঠিন উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে। আমি তো অস্ত্র ধরেছি তোমার দ্বীনের শ্রেষ্ঠত্ব ও তোমার প্রিয় হাবীবের উম্মতের মান-সম্ভ্রম রক্ষা করতে। কেবল এ জন্যই আমি অনবরত মরুভূমি, অরণ্য, আর পাহাড়ে, পর্বতে মাথা কুটে মরছি। আমি এগিয়ে চলেছি ইসলামের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসকে কাফেরদের অবৈধ অধিকার থেকে মুক্ত করতে, ওখানকার নিগৃহীত মুসলমানদের জান-মাল ও ইজ্জত বাঁচাতে। রাসূলের উম্মতেরই কিছু লোক আমার এ অগ্রযাত্রার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। হে প্রভু! তুমি আমাকে ইঙ্গিতে বলে দাও, তাদের রক্ত প্রবাহ করা আমার জন্য বৈধ না অবৈধ! হে আল্লাহ! আমি পথভ্রষ্টদের কাতারে শামিল হতে চাই না। যা সঠিক, যা সত্য, যা তোমার পছন্দ তুমি আমাকে সে পথে পরিচালিত করো। তোমার আলোর ইশারা দেখাও প্রভু। আর যদি আমার পথই সঠিক হয়ে থাকে, তবে আমাকে শক্তি দাও, সাহস দাও, ধৈর্য ও হিম্মত দান করো।’

    তিনি সিজদায় পড়ে গেলেন এবং এ অবস্থায় অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলেন। এক সময় মাথা তুললেন তিনি। দাঁড়িয়ে সহসা তিনি দৃপ্ত পায়ে বাইরে চলে এলেন। তাঁর চলার ভঙ্গিতে ছিল বলিষ্ঠতা ও গাম্ভীর্য। তিন দৃঢ় পদক্ষেপে সেখানে যাচ্ছিলেন, যেখানে অন্যান্য সেনা কমাণ্ডার ও সৈন্যরা জামায়েতে নামাজের জন্য একত্রিত হয়েছিল। ততক্ষণে নামাজের জামায়াত দাঁড়িয়ে শামিল হয়ে গেলেন জামাতে। তাঁর এক পাশে তাঁর বাবুর্চি ও অন্য পাশে এক কমাণ্ডারের আর্দালী এসে দাঁড়িয়ে গেল জামাতে।

    নামাজ শেষ করে সুলতান আইয়ুবী হিম্মাত পর্বতশ্রেণীর চূড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। রাস্তায় পর পর চারজন কাসেদের দেখা পেলেন তিনি। তারা মৌখিকভাবে সংবাদ পেশ করল সুলতানের কাছে। এরা ছিল তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্য। এদের দায়িত্ব ছিল হারান, হলব ও মুশালের সম্মিলিত বাহিনীর গতিবিধি ও তৎপরতার সংবাদ বয়ে আনা। এ কাজ রাত দিন অনবরত চলছিল। সুলতান আইয়ুবি কাসেদদের বিদায় দিয়ে এগিয়ে চললেন। তার সঙ্গে ছিলেন সেনাপতি শামস বখত। তাঁর ভাই শাদ বখতকে সুলতান অন্যত্র নিয়োগ করে ছিলেন।

    ‘শত্রুদের সম্পর্কে যে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আপনার কি মনে হয়, আমরা এ সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে পারবো?’শামস বখত জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘আমার কাছে এটা কোন সমস্যাই নয় যে, শত্রুরা কত সৈন্য এনেছে ও আমাদের কাছে কত সৈন্য আছে।’সালাহউদ্দীন আইয়ুবী উত্তর দিলেন, ‘আমি অস্থির হচ্ছি শুধু এই ভেবে, শত্রুরা এখনও কেন আক্রমণ চালাচ্ছে না। আমাদের ঐ মুসলমান ভাইদের কাছে খৃষ্টান উপদেষ্টা ও গোয়েন্দা আছে। খৃষ্টানরা কি এতই আনাড়ী হয়ে গেল যে, তারা জানতেও পারলো না, মিশর থেকে আমাদের সাহায্য আসছে, আর আমরা সাহায্য ছাড়া যুদ্ধ করতে পারবো না? যদি শত্রুরা তৎপর হতো তবে হয়তো এ সমস্যার একটা সমাধান বেরিয়ে আসতো। শত্রুরা কেন এভাবে এসে বসে আছে, আর আমাদেরকে এত সময় দিচ্ছে যে, আমরা সাহায্য পর্যন্ত পেয়ে গেলাম, তাই আমার বুঝে আসছে না। আমরা তাদের গতিবিধির খবর পেয়ে যাচ্ছি, আমাদের সামরিক অশ্বগুলোকে পানি পান করাতে পারছি; এ সুযোগ ওরা কেন দিচ্ছে তাই ভাবছি আমি। আমার সন্দেহ হচ্ছে, শত্রুরা এমন কোন চাল চালবে, যা হয়ত আমরা চিন্তু করতে পারছি না। আমার অবাক লাগছে এ জন্য, এরা তো এখানে খেল তামাশা করতে আসেনি।’

    ‘যতদূর আমি এদের সম্পর্কে জানি, এদের কাছে কোন চাল নেই।’শামস বখত বললেন, ‘আল্লাহর উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে, আল্লাহই তাদের মন ও মস্তিষ্কে মোহর মেরে দিয়েছেন। কারণ তারা হকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তাদের চোখের ওপর পর্দা পড়ে গেছে। আমি তাদের আচরণে কোন গভীর ও ভয়ংকর বিপদ আছে বলে মনে করি না।’

    ‘ভাই শামস বখত! সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আমারও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা আছে, কিন্তু আমি অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তবটাই দেখে থাকি। সত্যের ওপর মিথ্যাও কখনো কখনো বিজয়ী হয়। যখন সত্যের অনুসারীরা বাতিলের কাছে নতজানু হয় অথবা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভূল করে, বিজয় তাদের কাছ থেকে পালিয়ে যায় অনেক দূরে। সত্য সব সময় চায় কোরবানী, যদি আমরা কোরবানী দিতে প্রস্তুত থাকি তবে সত্যের জয় অবশ্যই হবে। বাতিলের যে শক্তি আছে, তার মোকাবেলা আমরা যুদ্ধের ময়দানেই করবো। আমাদের দৃষ্টি সব সময় সত্যের দিকে সদা সতর্ক রাখতে হবে। সেই সাথে শরীর ও মনের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করতে হবে সত্যকে বিজয়ী করার জন্য। এর পরে যা ঘটে তা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এখন আমাদের যেমন আনন্দিত হওয়া উচিত নয়, তেমনি হতাশ হওয়ারও কোন কারণ নেই।’

    তিনি অশ্বপৃষ্ঠ থেকে অবতরণ করলেন। সেনাপতি শামস বখত, দু’জন উপদেষ্টা ও রক্ষীরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সুলতানের দেখাদেখি তারাও সবাই অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে পড়লেন। সেনাপতি শামস বখত এবং দু’জন উপদেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি উঁচু পাহাড়ী টিলায় পৌঁছলেন। টিলার উল্টো পাশে তাঁদের সামনে এক বিরাট সমতল উপত্যকা। উপত্যকাটি পর্বত শৃঙ্গের পাশ দিয়ে সামনে প্রশস্ত হয়ে এগিয়ে গেছে। সামনের উপত্যকাটির মতই তাদের পিছনেও সমান্তরাল উচ্চ ভূমি। তার মাঝ দিয়ে একটি গিরিপথ এগিয়ে গেছে এঁকেবেঁকে। টিলার পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মিশেছে সামনের উপত্যকায়। বিশাল মাঠের মত খোলা উপত্যকাটি এতক্ষণ লুকিয়েছিল এই টিলার আড়ালে। সুলতান ও তাঁর সঙ্গীরা টিলায় উঠে দাঁড়াতেই তাঁদের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই খোলা ময়দান। তাঁরা তাকিয়ে দেখলো, অদূরে ময়দানের মাঝে শত শত তাঁবু টানানো। একদিকে সৈন্যদের ঘোড়ার সারি বাঁধা। সিপাইরা সেখানে ঘোরাফিরা করছে। কেউ কেউ শুয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের দেখে হচ্ছিল, তাদের মনে এমন কোন ভয় নেই যে, তাদের ওপর কোন বাহিনী কখনো আক্রমণ করে বসতে পারে। যদি তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতো হবে তাদের তাঁবু মাটিতে পড়ে থাকতো। তাদের অশ্বপৃষ্ঠে জীন আঁটা থাকতো। ‘এই বাহিনীর সেনাপতি ও কমাণ্ডারদেরেকে আমি যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তোমরা তিনজন তা আবার শুনে নাও।’সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এমনও হতে পারে, তোমাদের আগেই আমি মারা যেতে পারি। যুদ্ধ শুরু হবার শুরুতেই যদি আমি মারা যাই তবে যুদ্ধের দায়িত্বভার তোমরা গ্রহণ করবে। আমি তাদেরকে বলে দিয়েছি, তোমরা তাঁবু টানিয়ে থাকতে পারো, অবসর অবস্থায় তোমরা ঘোরাফেরাও করতে পারো, কিম্বা এদিক-ওদিক বসে বা শুয়ে থাকতে পারো, কিন্তু তাঁবুতে তোমরা সব সময় অস্ত্র প্রস্তুত রাখবে আর ঘোড়ার পিঠে জীন এঁটে রাখবে। শত্রুর গোয়েন্দারা তোমাদের দেখছে। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও, তোমরা শত্রুদের কোন খবর রাখো না। যখন শত্রু সৈন্য উপস্থিত হবে, তখন তোমরা এমন ভাব করবে, যেন খুব ভয় পেয়ে গেছো। তোমরা সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করবে না। শত্রু যদি তোমাদের আক্রমণ করে উপত্যকায় চলে আসে, তখন তোমরা যুদ্ধ করতে করতে আস্তে আস্তে পিছু হটে যাবে, যাতে তাদের পুরো সৈন্যদল এ উপত্যকায় এসে যায়। তারপর তারা যখন আমাদের ঘেরাওয়ের মধ্যে আটকে যাবে তখন শত্রুদের পিছু হটার সুযোগ দিও।

    সুলতান আইয়ুবী দুই সমান্তরাল উপত্যকার মাঝামাঝি গিরিপথের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘আমি আমার এ সৈন্যদের বলে দিয়েছি, তারা যেন এ গলির মধ্যে এসে আবার ফিরে যায়। তাদেরকে কোথায় একত্রিত হতে হবে সে স্থানও বলে দিয়েছি। তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে সে জায়গা দেখিয়ে বললেন, ‘এ দলগুলোকে শত্রুদের পিছনে যেতে হবে। এ উপত্যকায় আমরা শত্রুদের অভ্যর্থনার জন্য যে ব্যবস্থা করে রেখেছি, তা তোমরা জানো। বন্ধুগণ! তোমরা স্মরণ রেখো, এখানে আমাদের কোন অঞ্চল অথবা কোন দুর্গ জয় করা লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু শত্রুদেরকে অসহায় ও নিষ্ক্রিয় করা, যাতে তারা আমাদের পথ থেকে সরে দাড়াঁয়।

    আমি মুসলমান ভাইদেরকে দুশমন ভাবতে লজ্জাবোধ করি; কিন্তু অবস্থার চাপে আজ তাই করতে বাধ্য হচ্ছি। আমি এদের ধ্বংস করতে চাই না, চাই নিরস্ত্র করতে। আমি নির্দেশ দিয়ে রেখেছি, যতদূর সম্ভব অধিক সংখ্যক শত্রকে জীবিত বন্দী করতে। যুদ্ধ বন্দী হিসেবে আটকানোর পর আমি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করবো, তোমরা মুসলমান, তোমরা আল্লাহর সৈনিক। তোমাদের বাদশাহ তোমাদেরকে ইসলামের শত্রুদের খেলার পুতুল বানাতে চাচ্ছে।’

    সেনাপতি শামস বখত বললেন, ‘কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে সে জাতির মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দাও’খৃষ্টানরা এখন এ নীতিকে সফলভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

    ‘মুসলমান জাতির দৃষ্টান্ত বারুদের মত।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এ জাতির আবেগে ঈমানী আগুন জ্বালাতে হবে। তাদের আবেগের উত্তপ্ত বারুদের স্তুপে যদি কোন রকমে একবার ঈমানী আগুনের ছোঁয়া লাগানো যায়, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বোমার মত বিস্ফোরণ ঘটবে। মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে, বিলাসপ্রিয় রাজা বাদশা আর সাধারণ জনগণ সবার মাঝেই এ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। মানুষের আবেগ বারুদের চাইতেও তীব্রতর হয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে। যদি কখনো জাতীয় জীবনে তেমন বিস্ফোরণ ঘটে তবে দুনিয়ার কোন শক্তির সাধ্য নেই তাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে। যদি তাদের আবেগের ঘরে এ আগুন জ্বালানো না যায়, তবে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াভহ পরিণতি। তখন এ জাতির আর কোন সহায় থাকবে না। খৃষ্টানরা তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে। জাতির নেতা ও আমীররা রাজ্য ও ক্ষমতার লোভে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাবে মৃত্যু ধ্বংসের দিকে। তারা একে অপরকে ধোঁকা দিয়ে নিজেই মুসলিম সাম্রাজ্যের বাদশাহ হতে গিয়ে ধ্বংস হবে নিজেরা, ধ্বংস করবে মিল্লাতকে। আমি এদের রাজ্য লিপ্সা ও ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সঠিক ইসলামের পথে আনার চেষ্টা করছি মাত্র। আমার সামনে ইসলামের সুরক্ষা ও বিস্তার ঘটানো ছাড়া আর কোন কাজই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

    ❀ ❀ ❀

    হিম্মাত পর্বত শ্রেণীর অল্প দূরেই হারানের দুর্গ। দুর্গাধিপতি গুমাস্তগীন নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি তার সেনাপতি ও ছোট বড় কমাণ্ডারদের একত্রিত করে বললেন, ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খৃষ্টানদের পরাজিত করতে পারেন, কিন্তু যখন তিনি তোমাদের সামনে আসবেন, আমর বিশ্বাস, তখন শিয়ালের সকল চালই ব্যর্থ হয়ে যাবে। তিনি এ দেশের লোক নন, কুর্দিস্তানের বাসিন্দা। তোমরা আরব, পাক্কা মুসলমান। তিনি যত বড় ধূর্ত ও প্রতারকই হোক না কেন, তার প্রতারণার ফাঁদে আমরা পা দিতে পারি না। তিনি এদেশ দখল করে এ অঞ্চলের বাদশাহ হতে চান। আমি তার যুদ্ধের কলা-কৌশল তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি।

    তাঁর কাছে বর্তমানে খুব অল্প সৈন্য আছে। তিনি সেই সামান্য সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের বেষ্টনীর মধ্যে পড়ে আছেন। একটু আগে গোয়েন্দা জানিয়েছে, তার সৈন্যরা তাঁবুর মধ্যে শুয়ে আরাম করছে। তাদের ঘোড়াগুলোও যুদ্ধের অবস্থায় নেই। এটা দুই কারণে হতে পারে, এক. তাঁর হয়ত বিশ্বাস, আমরা তাঁকে পরাজিত করতে পারবো না। অথবা তাঁর ধারণা, আমরা তার ওপর আক্রমণ করারই সাহস পাবো না। কিছুদিন পর তিনি আমাদের কাছে আপোষের জন্য দূত পাঠাতে পারেন। কিন্তু আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমরা তাঁর সঙ্গে কোন আপোষ মীমাংসা করবো না। তিনি তো এখন আমাদের হাতে বন্দী। যদি তাকে জীবিত দেখাতে না পারি তবে তাঁর লাশ তোমাদেরকে অবশ্যই দেখাবো। তোমাদের সৈন্যদের বলে দাও, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইমাম মেহেদী নন, কোন পয়গম্বরও নন। আর তার সেনাবাহিনীতে কোন জ্বীন-ভূতও নেই। আমরা তার সৈন্য বাহিনীকে অতর্কিত আক্রমণ করে শেষ করে দেবো। তাদের কাউকে পালানোর সুযোগ দেবো না।’

    তিনি তাঁর শ্রোতাদের উত্তেজিত করে নিজের বিশ্রাম কক্ষে চলে গেলেন। তার বিশ্রাম কক্ষ মানে রাজ প্রসাদের মত জমকালো এক তাঁবু। সে বিশাল কামরা জুড়ে বিছানো ছিল রঙিন গালিচা। গালিচার ওপর শাহী পালঙ্ক পাতা। পালঙ্কের পাশে মদের সুরাহী ও সুদৃশ্য পিয়ালা সাজিয়ে রাখা। ভেতর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল রাজ মহলের কামরা। আশেপাশে আরো অনেক তাঁবু, যেগুলো সৈন্যদের তাঁবু থেকে পৃথক ও মনোরমভাবে সুসজ্জিত ছিল। এগুলোতে নাচ-গানের মেয়েরা থাকতো। এসব তাঁবুর পাহারায় পাহারাদার নিযুক্ত ছিল।

    গুমাস্তগীন ভাষণ শেষ করেই দ্রুত তার কামরায় ঢুকে গেলেন। তিনি ভেতরে প্রবেশ করতেই লাইন ধরে সুন্দরী মেয়েরা খাবারের সাজানো ডালি হাতে ভেতরে প্রবেশ করলো। গুমাস্তগীনের ইঙ্গিত পেয়ে ওরা খাবার পরিবেশন শুরু করলো। মদের সুরাহী এলো। গুমাস্তগীন নয়জন মেহমানকে সাথে নিয়ে খেতে বসলেন।

    নয়জন মেহমানই খাবার প্লেটের ওপর যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লো। তারা গোস্তের বড় বড় টুকরো হাতে নিয়ে গ্রোগ্রাসে গিলতে শুর করলো। সেই সাথে মদও পান করতে লাগলো পানির মত। মদের প্রভাবে খাওয়া শেষ হবার আগেই ওদের চোখে নেশার ঘোর লেগে গেল। চোখগুলো হয়ে উঠল রক্তের মত লাল।

    তিন চারজন যুবতী তাদের পিয়ালায় মদ ঢেলে দিচ্ছিল। ওরা খাচ্ছিল আর সুযোগ পেলেই মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছিল। কেউ মেয়েদের বাহু ধরে টেনে নিজের কোলে বসাতে চাচ্ছিল। এভাবে খাওয়া ও মেয়েদের উত্যক্ত করার কাজ একই সাথে চলতে থাকে। ওমাস্তগীন তাদের এ অসভ্য আচরণ দেখে হাসতে থাকেন। কিন্তু সে হাসিতে আনন্দ না বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছিল, ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না।

    খাওয়ার পর্ব শেষ হলে গুমাস্তগীন মেয়েদের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন এবং মেহমানদের সাথে গল্প-গুজবে মেতে উঠলেন। এক সময় বললেন, ‘এখন আর গল্প করার সময় নেই। এখন তোমাদের যেতে হবে সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর কাছে। খবরদার, এবারের আঘাত যেন শুন্যে না যায়।’

    ‘আপনি যদি আমাদেরকে থামিয়ে এ মেহমানদারীতে আটকে না রাখতেন, তবে এতক্ষণে আপনি শুনতে পেতেন, সালাহউদ্দীন আইয়ুবী আর এ দুনিয়ায় নেই।’এক ব্যক্তি বললো।

    এরা ছিল হাসান বিন সাবাহার সেই নয় ফেদাইন খুনী, যাদেরকে তাদের মুর্শিদ শেখ মান্নান ত্রিপলী থেকে সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিল। এরা প্রকাশ্যে মানুষ হিসেবে পরিচিত হলেও স্বভাবে ছিল বন্য পশুরও অধম। তারা প্রত্যেকে তাদের ডান হাতের মাঝের আঙ্গুল কেটে দশ ফোটা রক্ত পিয়ালায় রেখে তার সঙ্গে মদ ও হাশিশ মিশিয়ে পান করে নিলো। তারপর তারা গুমাস্তগীনেকে স্বাক্ষী রেখে শপথ করলো, ‘সুলতান আইয়ুবীকে এ যাত্রায় হত্যা করবো আর হত্যা করতে না পারলে কেউ জীবিত ফিরে আসবো না।’

    শেখ মান্নান তাদেরকে দুনিয়াত্যাগী দরবেশের পোশাকে পাঠিয়েছিল। তাদের হাতে ছিল তসবীহ, গলায় ছিল কোরআন। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা যেন এই পোশাকে, এই ভঙ্গিতেই সুলতান আইয়ুবীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়। সুলতাতের কাছে তাদের বক্তব্য হবে, মুসলমানের বিরুদ্ধে যেন কোন মুসলমান যুদ্ধ না করে। তারা বিবাদমান উভয় দলের মধ্যে আপোষ করার দায়িত্ব নেবে এবং শালিসী করতে গিয়ে এক গোপন বৈঠকে তারা সুলতান আইয়ুবীকে হত্য করবে।

    শেখ মান্নান পথটি ভালই বেছে নিয়েছিল। কারণ সুলতান আইয়ুবী ধার্মিক ব্যক্তিদেরকে সমাদরে পাশে বসাতেন ও তাদের কথা আগ্রহের সাথে শুনতেন। তার দ্বিতীয় দুর্বলতা ছিল, কেউ মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার দায়িত্ব নিলে তিনি তাকে স্বাগত জানাতে কখনো কার্পন্য করতেন না। কারণ তিনি মনে করতেন, এতে খৃষ্টানদের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও আক্রমণের সুযোগই নষ্ট হবে।

    আপোষ রফার জন্য তিনি নিজেও হলব ও অন্যান্য স্থানে দূত পাঠিয়েছিলেন, যারা অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিল। কিন্তু এখন এই জোব্বা পরা সুফী মানুষগুলো, যারা জোব্বার ভেতরে খঞ্জর ও তলোয়ার লুকিয়ে তাকে ধোঁকা দিতে আসছে, তাদেরকে সরল বিশ্বাসে সহজেই সাদর অভ্যর্থনা জানাবেন, এমনটি আশা করা মোটেই অন্যায় ছিল না। আর তিনি এমনটি করলে তাকে তারা সহজেই হত্যা করতে পারবে, এ বিশ্বাসও তাদের ছিল। ত্রিপোলী থেকে যাত্রা করে তারা সোজা হারানে গিয়ে পৌঁছেছিল। গুমাস্তগীনকে তার খৃষ্টান উপদেষ্টারা বলেছিল, সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে আসা এ নয় ফেদাইন খুনীকে যেন তিনি সহযোগিতা করেন। এ জন্যই তিনি তাদেরকে সঙ্গে করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধ না করেই যদি সুলতানকে হত্যা করা যায় তবে সে চেষ্টাই আগে করা উচিত।

    তাদের বিদায় জানাতে গিয়ে গুমাস্তগীন বললেন, ‘আমি তোমাদের সাফল্য কামনা করছি। কিন্ত সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সম্পর্কে তোমাদের যথেষ্ট হুশিয়ার থাকতে হবে। তোমরা যে সুফীর বেশ ধরেছ তাতে তার সন্দেহ হতে পারে। কারণ কয়েকবার হত্যা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তিনি এখন আরও সতর্ক থাকবেন। তাঁর সাথে আরও দু’জন হুশিয়ার ব্যক্তি আছে, একজন আলী বিহ সুফিয়ান ও অন্যজন হাসান বিন আবদুল্লাহ। এরা প্রথম দৃষ্টিতেই মানুষের অন্তরের কথা পর্যন্ত পড়ে নিতে পারে। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী আমি জানতে পেরেছি। যদিও আলী বিন সুফিয়ান এখন কায়রোতে অবস্থান করছেন কিন্তু হাসান বিন আবদুল্লাহ তাঁর কাছেই আছে।

    সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে আগন্তুক দেখা করতে এলে একাধিক সেনাপতি ও হাসান বিন আবদুল্লাহ তাদেরকে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন। যদি তাদের সন্দেহ হয় তবে তারা দেহ তল্লাশীও নিতে পারে।

    সুলতান আইয়ুবী বা হাসান বিন আবদুল্লাহর মনে এমন ধারণা আসতেই পারে, তোমাদের এ প্রস্তাবের পেছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে। নয়তো হঠাৎ আজ তোমাদের মনে এ আপোষের চিন্তা এলো কেন? আইয়ুবী আরও জিজ্ঞেস করতে পারেন, যে প্রশ্নের কোন সদুত্তর তোমরা দিতে পারবে না। তাতে তোমাদের মুখোশ খুলে যাবে। তিনি নিজে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। ধর্ম ও ইতিহাসে তার গভীর পাণ্ডিত্যের কথা সবার জানা। তাছাড়া তোমাদের মুখে দাড়ি ছাড়া দরবেশীর আর কোন চিহ্ন নেই। তোমাদের চার জনেরই দাড়ি এখনও ছোট। তাতে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে, মাত্র মাসখানেক আগে থেকে তোমরা দাড়ি বাড়ানো শুরু করেছো। তোমাদের চেহারায় মদ হাশিশের নেশা এখনও লেগে আছে। তোমাদের চেহারায় পবিত্রতার এমন কোন লেশ মাত্রও নেই, যা দেখে তিনি প্রভাবিত হবেন। বিদায় জানানোর মুহুর্তে এ কথাগুলো তোমাদের বলে দেয়া আমি জরুরী মনে করেছি। আশা করি আমার এ স্পষ্ট উচ্চারণে তোমরা কেউ অসন্তুষ্ট হওনি।’

    কথাগুলো শুনে নয়জনের একজনও কোন প্রতি উত্তর করলো না। তবে তাদের নেতা বললো, ‘হ্যাঁ, আমরা আপনার প্রত্যেকটি কথায় একমত! যদি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আমাদেরকে সুফী দরবেশ মনে করে আপ্যায়ন করেন, সম্মান করেন এবং তাঁর তাঁবুতে ডেকে নিয়ে যানি, তবে আমার এ সাথীরা তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আমাদের কারোরই সুফী দরবেশদের আদব কায়দা ভাল করে জানা নেই। এ অবস্থায় আপনি কোন পরামর্শ দিলে আমরা তা বিবেচনা করে দেখতে পারি।’

    ‘আমার মাথায় খুবই সহজ ও ঝুঁকিহীন পদ্ধতি আছে।’

    গুমাস্তগীন বললেন, ‘আমি তোমদেরকে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সাজিয়ে হিম্মাত পর্বত শ্রেণীতে পাঠাতে চাই। তার রক্ষীবাহিনীতে খুব বাছাই করে লোক নিয়োগ করা হয়। নিয়োগের আগে তাদের বংশ পরিচয়ও নেয়া হয়। সে কারণে তোমরা যাওয়ার সাথে সাথেই রক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ পাবে, তা মনে করো না। অবশ্য একটি কাজ করলে সফল হওয়ার সম্ভানা আছে। গোয়েন্দা জানিয়েছে, দামেশকের লোকেরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পক্ষে বিরাট উদ্দীপনা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য আসছে। সুলতান আইয়ুবী সে সব স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে নিচ্ছেন। তোমরা এ সুযোগ নিতে পারো।’

    তিনি একটি কাঠের বাক্স খুললেন। তার মধ্য থেকে নতুন পোশাক বের করে ফেদাইনদের বললেন, ‘তোমরা এই পোশাক পরে সুলতান আইয়ুবীর কাছে যেও। এটা তাঁর রক্ষীবাহিনীর পোশাক। তোমাদের একজনের হাতে সুলতান আইয়ুবীর পতাকা থাকবে। অন্য আটজনের হাতে লাঠির সাথে সেনাবাহিনীর পতাকা থাকবে। তোমরা সোজাসুজি সুলতান আইয়ুবীর কাছে যেতে চাইবে। কিন্তু তাঁর রক্ষীরা তোমাদের বাঁধা দিলে তোমরা আবেগ ও উদ্দীপনার সাথে বলবে, আমরা স্বেচ্ছাসেবক, দামেশক থেকে এসেছি। আমরা সুলতান আইয়ুবীর রক্ষী দলে ভর্তি হতে চাই। এ জন্য আমরা তার রক্ষী দলের পোশাক পর্যন্ত তৈরী করে নিয়ে এসেছি। সুলতান আইয়ুবীর হেফাজতের জন্য আমরা আমাদের জীবন কোরবান করতে চাই। আমাদেরকে সুলতান আইয়ুবীর রক্ষী দলে অথবা কমাণ্ডো বাহিনীতে ভর্তি করে নাও। তারা গড়িমসি করলে বলবে, আমরা কিছুতেই ফিরে যাবো না। কিন্তু শেষ পর্যন্তও তোমাদেরকে সুলতানের কাছে যেতে না দিলে অনুনয় বিনয় করে বলবে, আমরা অনেক দূর থেকে বড় আশা নিয়ে এসেছি। আমাদেরকে অন্তত একবার সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দাও, তিনি আমাদের আর্জি মঞ্জুর না করলে আর তোমাদের বিরক্ত করবো না।

    আমি তোমাদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তিনি আবেগের বড় মূল্য দেন। তিনি তোমাদের সাথে অবশ্যই সাক্ষাৎ করবেন। লাঠির মাথায় পতাকা জড়ানো বর্শা তো তোমাদের হাতেই থাকবে। যদি তিনি বাইরে সাক্ষাৎ দেন, তবে তোমরা ঘোড়া ছুটিয়ে তার কাছে যাবে। কিন্তু অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নামবে না। কাছে গিয়ে বর্শা দিয়ে দেহ ঝাঝরা করে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে আসবে। তোমরা সকলেই তো জীবন বাজী রেখে শপথ করেছো। আমার মনে হয় সাহস ও বুদ্ধি খাঁটিয়ে কাজ করতে পারলে তোমরা সকলেই জীবিত ফিরে আসতে পারবে। আমার বিশ্বাস, সুলতান আইয়ুবীকে ক্ষত-বিক্ষত দেখলে তার সৈন্যদের মাঝে নৈরাশ্য নেমে আসবে। যুদ্ধ করার পরিবর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। যখন সৈন্যরা হতবিহবল হয়ে ভাবতে থাকবে, এমনটি কি করে ঘটলো, কি হলো, কি ব্যাপার এবং এ নিয়ে হৈ চৈ করতে থাকবে তখন তোমরা ঘোড়া ছুটিয়ে নির্বিঘ্নে চলে আসতে পারবে। আমি তোমাদেরকে এমন তাজাদম আরবী ঘোড়া দিচ্ছি, যেগুলোর পিছু ধাওয়া করা বাতাসের পক্ষেও অসম্ভব।’

    ‘এটা তো খুবই চমৎকার পরিকল্পনা!’ফেদাইন খুনীদের সরদার উৎসাহিত হয়ে বললো, ‘আমাদের সেই সাথী হতভাগারা আনাড়ী ও কাপুরুষ ছিল। কি লজ্জার কথা, তারা শয়ন অবস্থায় পেয়েও তাকে হত্য করতে পারলো না, উল্টো তাঁরই হাতে মারা গেল। আর যারা বেঁচে গেল তারা ধরা পড়লো। এখন আমরা যাচ্ছি, যদি আমরা তার শিরচ্ছেদ করতে নাও পারি, তবে একথা অবশ্যই শুনতে পাবেন, সুলতান আইয়ুবী আর জীবিত নেই।’

    ‘আর আমি যদি তাঁকে হত্যা করে ফিরে আসতে পারি তবে? তবে….’এক ফেদাই হেরেমের সুন্দরী মেয়েদের দিকে ইশারা করে শয়তানী হাসি হেসে বললো, ‘ওই সুন্দরীকে আমার চাই।’

    গুমাস্তগীনও শয়তানী হাসি হেসে বললেন, তোমাদের মধ্যে যেই জীবিত ফিরে আসুক, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে খুন করে আসতে পারলে আমি তাকে এমন পুরস্কার দেবো, যাতে তার দীল ঠাণ্ডা হয়। খৃষ্টানরা তাকে যে পুরস্কার দেবে তার থেকে অনেক বেশী ধন-সম্পদ আমি তাকে দেব, যে ধন-সম্পদের কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। আর তোমাদের মধ্যে যে সুলতান আইয়ুবীর শির কেটে আনতে পারবে, তাকে তার পছন্দ মত দু’টি সুন্দরী মেয়ে চিরদিনের মত দান করে দেবো।’

    ফেদাইনদের চোখগুলো লোভে বড় হয়ে গেল। সেখানে খেলা করতে লাগল চিকচিকে অসভ্য উল্লাস। তারা খুশীতে চিৎকার দিয়ে উঠল এবং হো হো করে হাসতে লাগলো। গুমাস্তগীন তাদের ধমক দিয়ে বললেন, ‘থামো। আগে কাজ পরে পুরস্কার। এসো তোমাদেরকে দামেশক থেকে হিম্মাত পর্বতশৃঙ্গের দিকে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেই। তোমরা এখান থেকে বেরিয়ে ঘুরপথে দূর দিয়ে ঘুরে দামেশকের রাস্তায় গিয়ে পৌঁছবে। কিন্তু লক্ষ্য রাখবে, রাস্তায় কেউ তোমরা কে এবং কোত্থেকে আসছো জিজ্ঞেস করলে শুধু এ কথাই বলবে, আমরা দামেশক থেকে আসছি। এখন যুদ্ধের ময়দানে যাচ্ছি। কারণ রাস্তায় তোমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গোয়েন্দা ও কমাণ্ডো বাহিনীর সামনে পড়বে। যাও, এখন বিশ্রাম করো, রাতে যাত্রা করবে।’

    ‘রাতে! কেন, এখন রওনা করা যায় না?’এক ফেদাইন জিজ্ঞেস করলো।

    ‘না, দিনের বেলা এখান থেকে রেরোনো ঠিক হবে না।’গুমাস্তগীন উত্তর দিলেন, ‘তোমাদেরকে অনেক রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। দু’দিন পর গিয়ে পৌঁছবে সেখানে। আস্তে ধীরে পথ চলবে। ঘোড়াগুলোকে কিছুতেই ক্লান্ত করবে না। ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়লে পালানো সময় বিপদে পড়ে যেতে পারো।’

    গুমাস্তগীন কাঠের বাক্স থেকে পোশাক বের করে ওদের হাতে দিতে দিতে বললেন, ‘নাও, পরে দেখো গায়ে ঠিকমতো লাগে কিনা!’এরপর আস্তাবলের দারোগাকে ডেকে বললেন, ‘একটু আগে যে ঘোড়াগুলোকে আমি বেছে আলাদা করে রেখেছি, এদের জন্য সে নয়টি ঘোড়া নিয়ে এসো।’

    মাঝ রাতের পর নয়জন অশ্বারোহী ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সোজা দামেশকের পথে রওয়ানা হলো। অগ্রবর্তী অশ্বারোহীর হাতে সুলতান আইয়ুবীর পতাকা, অন্য আটজনের বর্শার ফলকের মাথায় সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীর ছোট ছোট পতাকা জড়ানো।

    গুমাস্তগীন যে দিন তার সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের সামনে উত্তেজিত ভাষণ দিয়েছিলেন, সে দিনেরই ঘটনা। হলবে সাইফুদ্দিনও তার সৈন্যদের সামনে অনুরূপ আগুন ঝরা ভাষণ দান করলেন।

    সাইফুদ্দিনের ভাষণ শেষে সৈন্যদের সামনে উঠে দাঁড়ালেন হলবের সেনাপতি। ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তিনি বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর বজ্রকণ্ঠে সৈন্যদের বললেন, ‘এই সেই সালাহউদ্দিন, যিনি গত বছরও হলব অবরোধ করেছিলেন। তোমরাই এ সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও তাঁর অপরাজেয় বাহিনীকে বিতাড়িত করেছিলে। কাবার প্রভূর কসম! সুলতান সালাহউদ্দিন ও তাঁর বাহিনী যে দূর্গ বা শহর অবরোধ করে, জয় ছিনিয়ে না নেয়া পর্যন্ত তারা ক্ষান্ত হয় না। সেই তিনি কেন হলব জয় করতে পারলেন না? কেন অবরোধ উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন? কারণ তোমরা সিংহ! তোমরা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করার সৈনিক! তোমরা শহর থেকে বাইরে বেরিয়ে তাঁর ওপর যে আক্রমণ চালিয়েছিলে, তিনি সে আক্রমণ সহ্য করতে পারেননি। বিজয় তাদেরই হয়, যাদের আল্লাহ বিজয় দান করেন। আর আল্লাহ তাদেরই বিজয় দান করেন, যাদের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি তোমাদের ওপর ছিল বলেই তোমরা সেদিন বিজয়ী হয়েছিলে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ওপর আল্লাহ কেমন করে খুশী থাকবেন? তিনি তো ডাকাত! লুটেরা! তিনি অবৈধভাবে দামেশকের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছেন। তার দাপটের কাছে মানুষের জান-মাল নিরাপদ নয়, নিরাপদ নয় নারীর সম্মান ও ইজ্জত। তার কারণেই আমাদেরকে দামেশক ছেড়ে হলবে আসতে হয়েছে। হে আল্লাহর সৈনিক! মুসলমান হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছো, আইয়ুবীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার সময় এ কথা চিন্তা করার কোন অবকাশ নেই। ওই মুসলমান কাফেরের চেয়েও খারাপ, যে মুসলমানের দেশ কেড়ে নিয়ে সেখানে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে। এ জালেম আমাদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। আর কুরআন জালেমের বিরুদ্ধে জেহাদ করাকে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ করে দিয়েছে। তাই তোমাদের যদি দেশের ওপর মায়া থাকে, নিজের ওপর মায়া থাকে আর নিজের বুকে থাকে ঈমানী আগুন, তাহলে জালেম আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জেহাদ করা, তাকে হত্যা করে দেশ এবং জাতিকে রক্ষা করা তোমাদের ওপর ফরজ হয়ে গেছে।

    হে খেলাফতের রক্ষীরা! তোমাদের শত্রু খৃষ্টানরা নয়, তোমাদের শত্রু এখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও তাঁর সৈন্য বাহিনী। খৃষ্টানদেরকে মুসলমানের শত্রু তিনিই বানিয়েছেন। নূরুদ্দিন জঙ্গী জাতির ওপরে সবচে বড় অবিচার করে গেছেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে মিশরের আমীর করে। অথচ এ ব্যক্তি সামান্য একটি সেনাদলের কমাণ্ডার হওয়ারও যোগ্য ছিল না। আমি তাকে আমার বাহিনীতে সাধারণ সৈন্য হিসেবেও রাখবো না।

    বন্ধুরা! ‘পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে’আইয়ুবীর এখন সেই পাখা গজিয়েছে। মৃত্যুই তাকে টেনে নিয়ে এসেছে এ পাহাড়ী অঞ্চলে। এখন তাঁর সামনে আছে তোমাদের উদ্যত তলোয়ার ও বর্শা। সামনে আছে তোমাদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী। আর তাঁর পিছনে নিরেট পাহাড় ও পার্বত্য অঞ্চল।

    তোমাদের এ বিশাল বাহিনী তার গুটিকয় সৈন্যের সামনে যখন যাবে, আমার আফসোস হচ্ছে, পিঁপড়ের মত পিষে মারার জন্য অনেকেই তার কোন সৈন্য ভাগে পাবে না।

    বন্ধুরা আমার! তোমাদেরকে হলব অবরোধের প্রতিশোষ নিতে হবে। প্রতিশোষ নিতে হবে তার জুলুম ও বর্বরতার। এখন যদি তোমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে সেই পাহাড়ী প্রান্তরে পিষে মারার জন্য ছুটে না যাও, তবে মনে রেখো, এই অহংকারী জালেম আবারও সোজা হলবের পথ ধরবে। কারণ তাঁর দৃষ্টি হলবের দিকেই নিবদ্ধ হয়ে আছে। তিনি তোমাদেরকে তার গোলাম বানাবে, তোমাদের বোন ও বেটিরা তার সেনাপতিদের হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে, যদি তোমরা এটা না চাও, তবে এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি আমার এ কথার গুরুত্ব বুঝতে না পারো, তবে তাকাও নূরুদ্দিন জঙ্গীর মাসুম সন্তানের দিকে। যে নূরুদ্দিন জঙ্গী সারাটা জীবন মিল্লাতের সেবায় কাটালো, বলো, কি অপরাধ করেছিল তার নাবালেগ সন্তান? কেন তাকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হতে হলো? কে করলো তার এতবড় সর্বনাশ? তাকাও মুশালের আমীর সাইফুদ্দিনের দিকে। তাকাও হারানোর দুর্গাধিপতি গুমাস্তগীনের দিকে। কেন সবাই আজ আইয়ুবীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে? কেবল আইয়ুবী হকের পথে আছে আর অন্য সবাই মিথ্যাবাদী? আইয়ুবী! তুমি আর কতো ধোঁকা দেবে আমাদের? নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আর কতো রক্ত ঝরাবে মুসলমানের? সালাহউদ্দিন! ক্ষমতার নেশায় ইসলামের তিন-তিনটি শক্তির বিরুদ্ধে একত্রে মাথা তুলতে গিয়ে যে বোকামী তুমি করেছো, এবার তার মাশুল দিতে হবে। তোমাকে দলিত-মথিত করার জন্য ওই দেখো যুদ্ধের ময়দানে ছুটে আসছে মুসলমানদের সম্মিলিত সামরিক শক্তি।

    বন্ধুরা আমার! জাতির গাদ্দারকে পিষে মারার এ অভিযানে তোমরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকার পাত্র নও, এ কথা তোমাদের প্রমাণ করতে হবে। দেশ, জাতি ও ঈমানের স্বার্থে আপন ভাইদের গলায় ছুরি চালাতেও তোমাদের কারো হাত কাপবে না, আমি কি তোমাদের কাছে এ আশা করতে পারি?’

    সৈন্যরা ততক্ষণে তেতে আগুন হয়ে উঠেছে। ভেতরে সবার মনে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন। সেনাপতির প্রশ্নের জবাবে সৈন্যরা আবেগ ও উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে সমস্বরে ধ্বনি তুললো, ‘আইয়ুবীর গোলামী, মানি না মানবো না; বুকের ভেতর জ্বলছে আগুন, নিভবে পেলে আইয়ুবীর খুন; আইয়ুবীর খুন চাই, আইয়ুবী তোর রক্ষা নাই!’সৈনিকদের গগন বিদারী শ্লোগানে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো।

    সাইফুদ্দিন হাত ইশারায় সৈন্যদের থামতে বললেন। তাদের শোরগোল একটু কমলে তিনি বললেন, ‘কেবল শ্লোগান দিলে হবে না। এ মুহূর্তে আমাদের কি করণীয় সে সম্পর্কে আলেমদের ফতোয়া শোন।’তিনি দু’জন আলেমের ফতোয়া সৈন্যদের সামনে পড়ে শোনালেন। ফতোয়ায় বলা হলো, ‘আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জেহাদ করা প্রতিটি সক্ষম মুসলমানের জন্য ফরজ। যারা যুদ্ধ করবে, যুদ্ধের সময় তাদের কারো রোজা রাখার দরকার নেই।’

    এ ফতোয়ায় সৈন্যরা খুবই খুশী হলো। সাইফুদ্দিন বললেন, ‘আমরা সে সময় আক্রমণ চালাবো, যখন সালাহউদ্দিনের সৈন্যরা রোজা রেখে দুর্বল হয়ে পড়বে। আমাদের পরের মঞ্জিল হবে দামেশক। কারণ অপরিসীম সম্পদ ও অর্থ পড়ে আছে সেখানে। দু’দিন পর সে সব সম্পদ হবে তোমাদের।’

    একদিকে সম্মিলিত বাহিনী তাদের প্রস্তুতি শেষ করে তৈরী হচ্ছিল যুদ্ধের জন্য। অন্যদিকে সুলতান আইয়ুবী তার সৈনিকদেরকে আট-দশ জনের ছোট ছোট কমাণ্ডো গ্রুপে ভাগ করে তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যুদ্ধের পরকিল্পনা। সুলতান আইয়ুবী তাঁর সৈন্যদেরকে কোন উত্তপ্ত ভাষণ দিয়ে বা আবেগময় কথা বলে তাদের উত্তেজিত করার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তাঁর দৃষ্টি শুধু ঐ জমিনের ওপর স্থির ছিল, যে ময়দানে তাঁকে যুদ্ধ করতে হবে। সে ময়দানের উঁচু-নিচু টিলা-টক্কর থেকে কিভাবে অধিক থেকে অধিকতর সুবিধা লাভ করতে পারবেন, তাই শুধু চিন্তা করছিলেন তিনি। তিনি কথা বলছিলেন সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট ভাষায়। আর এসব কথা বলছিলেন কেবল তাঁর জুনিয়র ও সিনিয়র কমাণ্ডারদের সাথে। তার প্রতিটি কথাতেই ছিল বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়।

    তিনি কেবল তখনই একটু বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, যখন তাঁর ফিলিস্তিনী মুসলমান ভাইদের কথা স্মরণ হয়।

    তাদের উদ্ধারের পথে বাঁধা হয়ে আছে আজ তারই স্বজাতি মুসলমানরাই মুসলমানদের অগ্রগতির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এ কথা স্মরণ হলেই তিনি বেদনায় বিমর্ষ হয়ে পড়েন। আফসোস‍! এ সমস্যার কোন সহজ সমাধান নেই। আপোষ-মীমাংসার জন্য দূত পাঠিয়ে এ জন্য তিনি নিজেকে লজ্জিতও করেছেন। তাই এখন যুদ্ধ ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

    তিনি মিশর থেকে আসা সৈন্য সাহায্য কিভাবে ব্যবহার করবেন সে পরিকল্পনা সমাপ্ত করেছেন। এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন শত্রুর আত্রমণের। শত্রুর পথপানে চেয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে জ্বালা ধরে গেল। তিনি তার উপদেষ্টাদের বললেন, শত্রুরা হয়ত চাচ্ছে, আমি পাহাড়ী এলাকার বাইরে গিয়ে ওদেরকে আক্রমণ করি। কিন্তু আমি পাহাড়ী এলাকা ছাড়তে একদম প্রস্তুত নই।’

    সুলতান আইয়ুবী যদি চাইতেন, তবে তিনি তাঁর কমাণ্ডো বাহিনী দিয়ে শত্রুদের ক্যাম্প এরই মধ্যে তছনছ ও ধ্বংস করে দিতে পারতেন। তাঁর যুদ্ধের এটা একটা বিশেষ পদ্ধতি। কিন্তু এবারই প্রথম তিনি তাঁর এ বিশেষ পদ্ধতিটি ব্যবহার করেননি। কমাণ্ডো বাহিনীকে তিনি সজ্জিত করে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, শত্রুরা কোন চালে যুদ্ধ করতে চাচ্ছে। এ জন্য তিনি গভীর মনযোগের সাথে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করে চলেছেন।

    দামেশক। সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী নেই, কিন্তু তাঁর শৌর্য বীর্য নিয়ে ঝলসে উঠলেন তাঁর বিধবা স্ত্রী। যুদ্ধের ময়দানে যেতে পারেননি তিনি, যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। তার মতে এ যুদ্ধ সুলতান আইয়ুবীর নয়, এ যুদ্ধ সমগ্র জাতির। তিনি আরও মনে করেন, কোন ক্ষুদ্র ময়দানে এ যুদ্ধ সীমাবদ্ধ নয়, যুদ্ধ চলছে সমগ্র দেশে। অতএব তিনি যেখানে আছেন সেখানে থেকেই এ যুদ্ধে ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন।

  • উমরু দরবেশ

    উমরু দরবেশ

    উমরু দরবেশ

    ইসহাকের গাঁয়ের বাড়ী। নিজের বাড়ীতেই তার একাধিক ঘোড়া ছিল, সেখান থেকে দু’টো ঘোড়া প্রস্তুত করা হলো। ইসহাকের গ্রেফতারীর খবর শুনে গ্রামের লোকজন জমা হয়েছিল সেখানে। ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যা প্রস্তুত হয়ে যখন ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করলো তখন বিকেল। গ্রামের লোকজন সুদানী কমান্ডারের কথা বিশ্বাস করে ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে কমান্ডারের সাথে বিদায় জানালো।

    দিন থাকতে থাকতেই তারা দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল পার হয়ে এলো। তারা যখন সে অঞ্চলের শেষ প্রান্তে, তখন সন্ধ্যার লালিমা মুছে গিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে মরুভূমিতে পড়তেই অন্ধকার ফিকে হয়ে এলো। রাতের প্রথম প্রহর। বিরতিহীনভাবে তারা পথ চলছে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে ক্ষুদ্র এক কাফেলা। তিন জন মাত্র যাত্রী, তাও আবার দু’জন মেয়ে। ক্ষুদ্র কাফেলা নিয়ে মরুভূমিতে পথ চলা খুবই বিপদজনক, কিন্তু সেদিকে কারো খেয়াল নেই। বালিয়াড়ি মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কাফেলা। নিরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। রাস্তায় কোথাও কেউ নেই।

    এক অচেনা পুরুষের সাথে এগিয়ে চলেছে দুই পর্দানসীন মহিলা। স্বামীর চিন্তায় বিভোর ইসহাকের স্ত্রী। আহত বাপের কথা ভাবছে কিশোরী কন্যা। দুনিয়ার আর কোন খেয়াল নেই ওদের। চোখে কোন নিদ্রা নেই। অন্তরে নেই কোন ভয়। পার্বত্য অঞ্চলের মহিলা হওয়ায় অশ্বারোহণেও ওদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সে অঞ্চলের প্রতিটি নারী পুরুষ শিশুকাল থেকেই ঘোড় সাওয়ার ও তীরন্দাজী শিখে রাখে। পুরুষের মত সে অঞ্চলের নারীরাও সমান দুঃসাহসী।

    তিনটি ঘোড়াই মরুভুমি ধরে এগিয়ে চলেছে। কমান্ডারের মন প্রফুল্ল। তার আনন্দের কারণ, ছলনা করে দুই মুসলিম পর্দানসীন মহিলাকে সে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসতে পেরেছে।

    ❀ ❀ ❀

    পচাগলা লাশের পাশে ইসহাক তার কামরায় বসেছিল। এ লাশ রাখা হয়েছিলো তাকে অসুস্থ ও দুর্বল করার জন্য। কিন্তু ইসহাকের এ নিয়ে কোন বিকার ছিল না। তার শারীরিক অনুভূতি হারিয়ে গিয়েছিল। সে লাশের সাথে এমনভাবে কথা বলত, যেন লাশটি জীবিত। লাশের দুর্গন্ধের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল।

    দৈহিক চেতনা না থাকলেও আত্মার ও চিন্তার শক্তি তার নষ্ট হয়নি। সে ভেবে দেখল, আজ সারাদিন তাকে কামরার বাইরে নেয়া হয়নি। সন্ধ্যার পরও কেউ তাকে বিরক্ত করতে আসেনি। সে খুবই অবাক হলো। এমন বিশ্রাম দেয়ার মানে কি? কেন আজ কোন নির্যাতন করা হলো না? তবে কি সুদানি সেনাপতি নিরাশ হয়ে গেছে? এখন তাহলে ওকে নিয়ে ওরা কি করবে? কামরায় শুয়ে বসে এসবই ভাবছিল সে।

    ❀ ❀ ❀

    কমান্ডার মেয়ে দু’জনকে সাহস ও শক্তি জোগানোর জন্য ওদের সাথে গল্প জুড়ে দিল। সে ইসহাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওদের শোনাচ্ছিল বীরত্ব ও সাহসের গল্প। মা ও মেয়ে খুব আগ্রহ সহকারে শুনছিল ওর কথা।

    সুদানী সেনাপতিকে তার সঙ্গের অফিসার বললো, ‘আপন কন্যা ও স্ত্রীর অপমান কি কেউ সহ্য করতে পারে? আমার বিশ্বাস, কমান্ডার ওদের দু’জনকে নিয়ে আসছে।’

    ‘আমি ইসহাককে বলবো, যতক্ষণ তুমি এবং তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা সুদানী বাহিনীতে যোগ না দেবে, ততক্ষণ তোমার স্ত্রী ও কন্যাকে মুক্তি দেয়া হবে না। তাঁদের ওপরও তোমার মতোই নির্যাতন চালানো হবে। আশা করি, এতে করে ইসহাক তার মত পাল্টাতে বাধ্য হবে,’ বললো সেনাপতি।

    ‘সকাল নাগাদ আমাদের কমান্ডারের ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে,’ অফিসার বললো।

    ‘হয়তো তার আগেও এসে যেতে পারে,’ সেনাপতি বললো, ‘এ লোক খুব হুশিয়ার।’

    রাত। কারাগারের সেই সিপাহী, যে কমান্ডারের পর ইসহাকের বাড়ীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলো, সে একাকি মরুভূমির বালির টিলা একের পর এক অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি রাস্তা অতিক্রম করে ফেলেছে। বিরামহীন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেই পার্বত্য অঞ্চলের দিকে। আকাশে চাঁদ নেই। উন্মুক্ত মরুভূমির রাতের স্বচ্ছতা সম্বল করে পথ চলছে সে। চাঁদ না থাকলেও তারকার আলোতে পথ চলতে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। বেশি দূর দেখা যায় না, তবে কোথাও কোন আওয়াজ হলে তা অনেক দূর থেকেও ভেসে আসে।

    আনমনে পথ চলছে সে, হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার পদধ্বনি কানে এলো। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। খেয়াল করে দেখল, সামনের দিক থেকে একাধিক ঘোড়া এগিয়ে আসছে প্রহরী এক বালির টিলার পেছনে ঘোড়া সমেত লুকিয়ে পড়লো।

    একটু পর পদধ্বনি আরো স্পষ্ট হলো, সেই সাথে ভেসে এলো ওদের কথার আওয়াজ। প্রহরী টিলার আড়ালে বসে ওঁৎ পেতে দেখল তিনটি ঘোড়া ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সে তলোয়ার হাতে নিলো।

    ওরা আরো খানিকটা এগিয়ে এলো। এখন সে কমান্ডারের কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ইসহাকের ব্যাপারেই আলাপ করছে কমান্ডার। কমান্ডারের কণ্ঠ শুনেই প্রহরী চিনতে পারলো তাকে। ওই তো সেনাপতির পাঠানো কমান্ডার! তাহলে নিশ্চয়ই সাথের দু’জন দরবেশ ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যা!

    প্রহরী ভাবছিল, দরবেশের বাড়ী গিয়ে সে ওদের হুশিয়ার করবে। কমান্ডার যে এত তাড়াতাড়ি ওদের বের করে নিয়ে আসতে পারবে, তা ছিল তার ধারণার বাইরে। সে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সংঘর্ষ ছাড়া এখন ওদের মুক্ত করার কোন পথ নেই। কিন্তু মুশকিল হলো, যাদের সে মুক্ত করতে চাচ্ছে, তারা জানেই না সে ওদের হিতাকাঙ্ক্ষী। লড়াই শুরু হলে মেয়ে দু’জনও তার প্রতিপক্ষে লড়বে। কারণ এরা পাহাড়ী নারী। লড়াইকে ওরা ভয় পায় না। একা তিনজনের বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া বোকামী। তার ওপর পুরুষটি কোন সাধারণ লোক নয়, একজন চৌকস কমান্ডার। কিন্তু এ ছাড়া যে আর কোন গত্যন্তর নেই! সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, সে লড়বে। নিশ্চয়ই ভাগ্য তাকে সহায়তা করবে। কারণ সে এক দরবেশ মানুষের পরিবারকে রক্ষা করতে যাচ্ছে। দরবেশের দোয়ার কি কোন মূল্য নেই!

    ওরা প্রহরীর একদম কাছে চলে এসেছে। তারার আলোয় সে ওদের ভাল করে লক্ষ্য করলো। কমান্ডার ওদের নিয়ে নিশ্চিত মনে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে কোন সতর্কতার ভাব নেই। তলোয়ারটি অবহেলায় তার কোমরে ঝুলছে। মেয়েদের সাথে কোন তলোয়ার নেই, সারা শরীর ও মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা থাকায় খঞ্জর আছে কি না তাও স্পষ্ট বুঝা গেল না।

    ওরা ওকে অতিক্রম করে গেল। ঘোড়াসহ আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো প্রহরী। এক মুহূর্তে ভাল করে দেখে নিল ওদের অবস্থান। তারপর পিছু ধাওয়া করে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। তার অশ্বের পদধ্বনি কমান্ডারকে চমকে দিল। সে থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল পিছন ফিরে। সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার বের করে পিছনে ঘুরলো। মুহূর্তে কমান্ডারের কাছে পৌঁছে গেল প্রহরী। তার ঘোড়ার গতি ছিল তীব্র। ছুটন্ত অবস্থায় ঘোড়ার ওপর থেকে কমান্ডারকে এমন জোরে আঘাত করলো, ডান হাত কেটে পড়ে গেল কমান্ডারের।

    ঘোড়া ঘুরিয়ে সে আবার ফিরে এলো কমান্ডারের কাছে। কমান্ডারের তখন আর লড়াই করার ক্ষমতা নেই। সে চিৎকার করে দয়া ভিক্ষা চাইল, কিন্তু প্রহরী তার ঘাড়ে আবারো তলোয়ারের আঘাত করলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল কমান্ডার।

    সঙ্গের একমাত্র পুরুষ মানুষটি ধরাশায়ী হওয়ায় পর্দানসীন মা ও মেয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। ইসহাকের স্ত্রী মেয়েকে বললো, ‘পালাও! ডাকাত মনে হচ্ছে।’

    প্রহরী ঘোড়া নিয়ে তাঁদের পথ আটকে দাঁড়ালো এবং বললো, ‘এখানে কোন ডাকাতের দল নেই, আমাকে ভয় পেয়ো না। আমিই বরং তোমাদেরকে এক ডাকাত ও প্রতারকের হাত থেকে রক্ষা করলাম। এক বন্দীকে দেখতে গিয়ে তোমরা নিজেরাই বন্দী হয়ে পড়ো, তা আমি চাই না। এখন আর কারাগারে যাওয়ার দরকার নেই। তোমরা তোমাদের গ্রামের বাড়ীতে ফিরে যাও। আমাকেই যদি ভয়, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমাদের সাথে যাচ্ছি না। যতক্ষণ তোমাদের নিরাপদ মনে না করবো, ততক্ষণ তোমাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে আমি তোমাদের অনুসরণ করবো। আরো বলছি, এখানে আর কেউ নেই, আমি একাই তোমাদেরকে এক ভয়ঙ্কর বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলাম। এ লোক বন্দী দরবেশ ইসহাকের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য তোমাদের অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করতে চেয়েছিল।’

    মা ও মেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল! কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বুঝতে পারলো না। অনেকক্ষন পর্যন্ত মা-মেয়ে ওভাবেই ওখানে স্তব্ধ বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেষে ইসহাকের স্ত্রী বললো, ‘কি বলছেন আপনি? আমরা যে এর কিছুই বুঝতে পারছি না! আসল ব্যাপারটা কি খুলে বলুন তো?’ প্রহরী কমান্ডারের ঘোড়ার লাগাম তার ঘোড়ার জীনের সাথে বেঁধে বললো, ‘আগে আপনাদের বাড়ি চলুন, ওখানে গিয়েই সব বলবো। মরুভূমিতে রাত কাটানো নিরাপদ নয়।‘ ওরা ফিরে চললো বাড়ীর দিকে। ইসহাকের স্ত্রী বিস্ময় ও কৌতূহল দমন করতে না পেরে একটু পর বললো, ‘তিনি কি আসলেই বন্দী এবং আহত?’

    ‘হ্যাঁ, তিনি এখন কারাগারেই আছেন। না, তিনি আহত ছিলেন না, তবে তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে। সে নির্যাতনের ধকল সয়ে তিনি এখনো কিভাবে বেঁচে আছেন সে রহস্য আমার জানা নেই। আমরা বিশ্বাস করি, তার কাছে আল্লাহর অলৌকিক শক্তি আছে।‘

    ‘তার ওপর এ অকথ্য নির্যাতনের কারণ কি?’

    ‘তাকে সুদানী সেনাবাহিনীতে নিতে চাইছে সরকার। তাকে বলা হচ্ছে, তুমি বললেই তোমার পাহাড়ি এলাকার মুসলমানরা সুদানী সৈন্য বাহিনীতে ভর্তি হবে। সরকার চাচ্ছে, তিনি এবং তার কবিলার লোকেরা সুদান সরকারের আনুগত্য স্বীকার করুক। কিন্তু তিনি তা মানছেন না।‘

    ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন। কিন্তু কমান্ডার আমাদের কেন নিতে এসেছিল?’

    প্রহরী উত্তরে বললো, ‘তার সামনে তোমাদের সম্ভ্রম নষ্ট করার হুমকি দিয়ে তাকে শর্ত মানতে বাধ্য করাতে চাচ্ছিল সরকার। যাকে আমি হত্যা করেছি, সে এক ফৌজি কমান্ডার। এ উদ্দেশ্যেই সেনাপতি তোমাদেরকে নিতে পাঠিয়েছিল তাকে। আমি বিষয়টি জেনে তার পিছনে লেগেছিলাম। আমি খুশি যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।‘

    ‘তুমি কে?’ ইসহাকের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি মুসলমান?’

    ‘আমি সে কারাগারের প্রহরী।‘ সে উত্তর দিল, ‘না, আমি মুসলমান নই।‘

    ‘তবে কেন তুমি এ ঝুঁকি নিতে গেলে? আমাদের জন্য তোমার এমন সমবেদনার কারণ কি?’

    ‘তার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তাতে তার মরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বেহুশও হননি। আমি এবং আমার সঙ্গীদের বিশ্বাস, তার কাছে অলৌকিক শক্তি আছে। তিনি মুক্ত হতে পারলে সে শক্তি দিয়ে আমাদের ভাগ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন। কিন্তু তাকে মুক্ত করার কোন উপায় এখনো আমরা বের করতে পারিনি। এর মধ্যেই তোমাদের সর্বনাশ করার জন্য সেনাপতি ষড়যন্ত্র করছে জানতে পেরে আমরা তা বানচাল করার সিদ্ধান্ত নেই। এ কারনেই আমি এখানে ছুটে এসেছি।‘ প্রহরী বললো।

    ‘মানুষের ভাগ্য একমাত্র আল্লাহই পরিবর্তন করতে পারেন। ভাগ্য পরিবর্তনের অলৌকিক ক্ষমতা কোন মানুষের নেই। তিনি এমন ওয়াদা করতে পারেন না। আর যদি তিনি এমনটি বলে থাকেন তাহলে ভুল বলেছেন।’ বললো ইসহাকের স্ত্রী।

    ‘কি বলছেন আপনি!’ প্রহরী বললো, ‘তার অলৌকিক ক্ষমতা তো আমি নিজের চোখে দেখেছি! এই যে আমাকে দেখুন, আমি মুসলমান নই। কারাগারের সামান্য এক প্রহরী। আমার এমন সাহস বা শক্তি নেই, যা নিয়ে আমি গর্ব করতে পারি। কিন্তু দেখুন, কি দুঃসাহসিক কাজ করলাম? আমাদের সেনাপতির মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়ার শক্তি আমি কোথায় পেলাম? কি করে সামান্য প্রহরী হয়ে নিজের কমান্ডারকে খুন করলাম? আপনারা ছিলেন তিনজন, তারপরও কি করে আমি আপনাদের আক্রমণ করার সাহস পেলাম? এসবই তার গায়েবী শক্তি। তিনি সত্যি অলৌকিক ক্ষমতাধর। আপনি কেন তাকে আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছেন?’

    ইসহাকের স্ত্রী এই অন্ধ বিশ্বাসী লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। কি করে সে এ বিশ্বাস ভাঙবে বুঝতে পারলো না।

    সকাল বেলা। ইসহাকের বাড়ীর সামনে চারটি ঘোড়া এসে থামলো। ঘোড়া থেকে নেমে দরজার কড়া নাড়ল ইসহাকের বিবি। ইসহাকের বাবা দরজা খুলে সামনে পুত্রবধু, নাতি ও তাঁদের সাথে আরও একজন অপরিচিত লোককে দেখে খুবই আশ্চর্য হলেন। হা করে তিনি তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে।

    ‘হাঁ করে দেখছ দাদু? আমাদের ঢুকতে দাও।’

    নাতনীর কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে সরে দাঁড়ালেন তিনি। ভেতরে ঢুকে বুড়োর প্রশ্নের জবাবে আবারো সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত বলতে হলো প্রহরীকে। শুধু বললো না, কারাগারে ইসহাকের ওপর কি নির্যাতন হচ্ছে।

    ইসহাকের বাবা তৎক্ষণাৎ কবিলার লোকদের ডেকে পাঠালেন। লোকেরা জড়ো হলে প্রহরী তাদেরকে বললো, ‘পাহাড়ী অঞ্চলের সমস্ত মুসলমান সুদানের সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে সুদান সরকার ইসহাককে মুক্তি দিতে রাজী হয়েছে। শর্ত একটাই, তোমাদের সবাইকে সুদানের আনুগত্য কবুল করতে হবে।’

    লোকেরা বললো, ‘ইসহাক কি বলেছে?’

    ‘ইসহাক তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তোমরা আমাকে জীবনে শেষ করে ফেললেও আমি আমার জাতির সাথে গাদ্দারি করতে পারবো না, কাউকে তোমাদের আনুগত্য কবুল করতেও বলবো না।’

    শুধু ইসহাকের কবিলা নয়, এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর পাহাড়ী অঞ্চলের সমস্ত মুসলমানরাই উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সুদান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়লো ওরা। একজন বললো, ‘এটা আল্লাহর জমিন! এখানে নাস্তিক সুদান সরকারের আধিপত্য চলবে না। আমরা ইসহাকের ওপর অত্যাচারের বদলা নেবো।’

    ‘আমরা কারাগারে আক্রমন চালিয়ে ইসহাককে মুক্ত করে আনবো।’ বললো অন্য একজন।

    ‘তোমরা তা পারবে না।’ প্রহরী বললো, ‘জেলখানা বড়ই দুর্ভেদ্য, সেখান থেকে কাউকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।’

    ‘তুমি কারাগারের প্রহরী, তুমি আমাদের সাহায্য করলে আমরা নিশ্চয়ই তাকে মুক্ত করতে পারবো।’ ইসহাকের বাবা বললেন।

    ‘আমি গরীব ও সাধারন এক প্রহরী মাত্র।’ সে বললো, ‘আমি আপনার বেটাকে মুক্ত করতে কিইবা সাহায্য করতে পারবো? তাকে আমি সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। তার এক নগন্য ভক্ত হিসাবে আমি আমার জীবনও দিতে তার জন্য বিলিয়ে দিতে পারি। এতে যদি আপনাদের কোন উপকার হয়, আমি প্রস্তুত। শুধু আমার গরীব পরিবারকে আপনারা একটু দেখবেন।’

    ‘তুমি যদি সত্যি তার ভক্ত হয়ে থাকো তবে তার আদর্শকে গ্রহন করো। তাহলে তুমি আমাদের সবার ভাই হয়ে যাবে। ভাইয়ের জন্য এমন কোন কোরবানী নেই, যা আমরা করতে পারিনা। মুসলমান হয়ে যাও, আর এখানে চলে আসো।’ ইসহাকের বাবা তাকে বললেন, ‘আমাদের এ পাহাড়ী অঞ্চলই আমাদের দুনিয়ার জান্নাত। এখানে পানির ঝর্ণাধারা আছে, আছে শস্য-শ্যামল মাঠ ও নানা রকম ফলের গাছ। এখানকার মাটি এমন ফসল দেয়, যে কৃষিকাজ করে না, সেও ক্ষুধার্ত থাকে না। এটা আমাদের ওপর আল্লাহর এক বিশেষ রহমত। এ পাহাড়ী এলাকা আমাদের কেল্লা! আমাদের দুর্গ! আমরা এখানে সবাই স্বাধীন। তুমি তোমার পরিবার পরিজন নিয়ে আমাদের এখানে চলে আসো, তোমার ভাগ্য বদলে যাবে।’

    এ প্রস্তাব প্রহরীর খুবই মনপূত হলো। সে এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ইসহাকের বাবার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে ইসলাম কবুল করলো সে। বুড়ো তাকে সন্তানের মর্যাদা দিয়ে তার কাছেই রেখে দিলেন।

    ভোরের সূর্য অনেক উপরে উঠে এসেছে। সুদানী সেনাপতি অধীর আগ্রহে কমান্ডারের জন্য প্রতীক্ষা করছিল, কিন্তু তার কোন খবর নেই। ক্রমশঃ সময় গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল, তবু দেখা নেই কমান্ডারের। শংকিত হয়ে উঠলো সেনাপতি, তার কি কোন বিপদ হলো? নাকি সে পথ হারিয়ে ফেলেছে?

    অনেক ভেবেচিন্তে শেষে সেনাপতি তার এক অফিসারকে ডাকলো। বললো, ‘কমান্ডার যে পথে গেছে সে পথে যাও, প্রয়োজন হলে ইসহাকের বাড়ী পর্যন্ত চলে যাবে। তারা রওনা না করলে তাদেরকে দ্রুত পাঠিয়ে দেবে, আর পথে থাকলে তাড়াতাড়ি আসতে বলবে। তুমি ওদের সাথে আসার অপেক্ষা না করে খবর নিয়ে আগেই চলে আসবে।’

    ইসহাক একা পড়েছিল কামরায়। কামরায় পচা লাশ গলে মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কারাগারের প্রহরীরা, যারা কারাগারের দুর্গন্ধে অভ্যস্থ ছিল, তারাও ইসহাকের কামরার কাছ ঘেঁষতো না বিশ্রী গন্ধের ভয়ে। এক প্রহরী নাকে কাপড় বেঁধে ইসহাকের কাছে গিয়ে বললো, ‘আরে আহাম্মক! এ দুর্গন্ধ কেমন করে সহ্য করছো? এরা তোমাকে যা মানতে বলে, মেনে নাও আর এখান থেকে বিদায় হও। এ মরার গন্ধে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।’

    ‘আমার কোন দুর্গন্ধ লাগছে না।’ ইসহাক বললো, ‘এ তো মরা লাশ নয়, শহীদ! শহীদরা মরে না। আমি রাতে ওর সাথে কত গল্প করি!’

    ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ। প্রহরী বললো, ‘লাশের এমন দুর্গন্ধে কেউ পাগল না হয়ে পারে!’

    ইসহাক হেসে বললো, ‘হবে হয় তো বা!’

    সে লাশের পাশে বসে হৃদয়ের সমস্ত আবেগ ঢেলে পবিত্র কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতে লাগলো।

    দিন গড়িয়ে রাত এলো। তারপর সে রাতও অতীত হয়ে গেল। প্রত্যুষে ফিরে এলো সেনাপতির পাঠানো অফিসার। এক দিনেই তার বয়স যেন বেড়ে গেছে দশ বছর। চেহারা বিবর্ণ, মলিন। এক দিকে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি, অন্যদিকে বর্ণনার অতীত চাক্ষুস এক মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা। সে যা দেখে এসেছে তা বর্ণনা করার ভাষা ছিল না তার।

    সেনাপতি বললো, ‘কি হয়েছে খুলে বলো!’

    ‘পথে মরুভূমির মাঝামাঝি গিয়েছি, মাথার ওপর শকুন চক্কর দিচ্ছিল। এলাকাটা উঁচুনিচু বালুর টিলায় পরিপূর্ণ। আরেকটু এগুতেই দেখতে পেলাম এক স্থানে শকুন মরা খাচ্ছে। মরার পাশে পড়ে আছে তলোয়ার, তার জুতা, ছেঁড়া কাপড়। লাশটি কার চেহারা দেখে চেনার উপায় নেই। কেবল বীভৎস নয়, জঘন্য, কদাকার। আমার মনে সন্দেহ জাগলো। ভয় হলো, এটা আমাদের কমান্ডারের লাশ নয় তো! কৌতূহলের বশে লাশের কাছে এগিয়ে গেলাম। তাড়া করতেই শকুনরা সরে গেল একটু দূরে। তার খঞ্জর ও কোমরবন্ধ দেখে নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ, এটা আমাদের পাঠানো কমান্ডারেরই লাশ। আমি কতক্ষণ থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিভাবে, কেন তিনি মারা গেলেন সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি পাহাড়ী অঞ্চলের দিকে আরো কিছু পথ এগিয়ে গেলাম। বালিতে তার ঘোড়ার পদচিহ্ন খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেলাম, তার ঘোড়া পাহাড়ী অঞ্চলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। ফিরতি পথে তার সাথে ছিল আরো দু’টো ঘোড়া। এতে প্রমাণ হয়, তিনি ইসহাকের পরিজনদের সাথে নিয়েই ফিরছিলেন। আমি কমান্ডারের লাশ পেলেও তার সাথীদের লাশ পাইনি। তার মৃত্যুর কারণ আমার কাছে স্পষ্ট নয়। ইসহাকের লোকেরা তাকে হত্যা করলে গ্রামেই করতে পারতো, আর তাকে বিশ্বাস না করলে তার কন্যা ও বিবিকে ওর সাথে আসতে দিত না। পথে এক কিশোরী ও এক নারী আমাদের কমান্ডারকে হত্যা করবে, এমনটা কল্পনাও করা যায় না। তাহলে কে তাকে হত্যা করলো? কোন ডাকাত দল পড়েছিল ওদের ওপর, তেমন কোন প্রমাণও পাইনি। সেই থেকে আমি অস্থির।’

    সুদানী সেনাপতি বললো, ‘এ নিয়ে এত উতলা হওয়ার কিছু নেই। নিশ্চয়ই সব কিছুই আমরা জানতে পারবো। সে অঞ্চলে আমাদের যে গোয়েন্দারা কাজ করছে তারা ওই অঞ্চলেরই মুসলমান। সংবাদ সংগ্রহে তারা বেশ দক্ষ। ইসহাক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তারাই সরবরাহ করেছিল। সে অঞ্চলে ইসহাকের অসম্ভব প্রভাব প্রতিপত্তির খবরও তারাই দিয়েছে। একটু সবুর করো, সব খবরই আমরা পেয়ে যাবো।’

    হলও তাই। সন্ধ্যার পর দুই গোয়েন্দা এসে উপস্থিত হলো সেনাপতির কাছে। তারা জানালো, ‘কমান্ডার ইসহাকের মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ঠিকই রওনা দিয়েছিল। আপনার কারাগারের এক সিপাহী তাকে হত্যা করে মেয়ে দু’জনকে তাদের বাড়ীতে পৌঁছে দেয়।’

    ‘আমাদের কারাগারের প্রহরী! কি নাম তার?’

    ‘তার নাম ইরাজ মেহের।’ গোয়েন্দারা বললো সেনাপতিকে।

    সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যা সুদান সরকারের কাছে তুলে ধরলো। সরকার এ নিয়ে পরামর্শ করলো তাদের খৃস্টান উপদেষ্টাদের সাথে। খৃস্টান উপদেষ্টারা পরামর্শ দিল, ‘এ ব্যাপারে তোমরা নীরব থাকো। এ নিয়ে মুসলমানদের ওপর অভিযান চালানোর বোকামী করো না। তাদেরকে অন্য কোন ভালো পদ্ধতিতে বন্ধু বানাতে চেষ্টা করো। খুব বেশী হলে তোমরা গোপনে শুধু সেই সিপাহীকে হত্যা করতে পারো, যে তোমাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। তাতে মুসলমানরা বুঝবে, তোমাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায় না। যদি ইসহাক তোমাদের শর্ত গ্রহণ না করে, তবে অন্য মুসলমান কয়েদীদের মানাও, আর ইসহাকের ওপর উৎপীড়ন অব্যাহত রাখো।’

    ইসহাকের ওপর নির্যাতন চলতেই থাকলো। সেনাপতি তার ওপর কমান্ডার হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নির্যাতনের মাত্রা এতই বাড়িয়ে দিল যে, জ্ঞান হারাল ইসহাক।

    রাতে সে বেহুশ হয়ে পড়েছিল এক কুঠরির মধ্যে। যখন জ্ঞান ফিরলো, কুঠরি অন্ধকার। কামরার বাইরে মশাল জ্বলছে। ইসহাক পাশ ফিরে শুতে গেল, তার হাত গিয়ে পড়লো কারো শরীরে। সে মনে করলো, এটা সেই লাশ, যা কয়েক দিন ধরে পড়ে আছে কামরায়। কিন্তু একটু পর তার মনে হলো, কেউ যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সে ভাবলো, হয়ত মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটেছে তার। তার শরীর অবশ লাগছিল, তাই সে আর উঠে দেখতে চেষ্টা করলো না, আসলেই কামরায় কোন মানুষ আছে কিনা?

    একটু পর কামরায় কারো নড়ে উঠার শব্দ হলো। এবার চমকে উঠলো ইসহাক। চোখ মেলে সে চাইলো কামরার ভেতর। বাইরে থেকে আসা আবছা আলোয় সে পরিষ্কার দেখতে পেলো, তার পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে এবং সে লোকটিই নড়াচড়া করছে। ইসহাক লোকটির মুখের উপর ঝুঁকে তার দিকে গভীরভাবে তাকালো। না, এটা কোন লাশ নয়, একজন জ্যান্ত মানুষ। আর এটা তার সেই কামরাও নয়, যেখানে বারবার তাকে রাখা হতো। এটা অন্য কোন কামরা। ইসহাকের মনে হলো, লোকটিও এতক্ষন বেহুশ ছিল, ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরছে। একটু পর লোকটিও চোখ খুললো। অন্ধকারের মধ্যেই ইসহাক তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কে তুমি?’

    লোকটি ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘উমরু দরবেশ!’

    ‘ও, হো! উমরু দরবেশ!’ ইসহাক অভিভূত হয়ে বললো, ‘আমি ইসহাক!’

    সুলতান আইয়ুবী এ পর্যন্ত বলে একটু দম নিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এরা একে অপরকে ভাল করেই চিনতো। উমরু দরবেশও আমার একটি সেনাদলের কমান্ডার ছিল। সেও পাহাড়ী অঞ্চলের মুসলমান কবিলার লোক। উমরু দরবেশ ইসহাকের সাথে একই অভিযানে যুদ্ধবন্দী হয়। ইসহাকের নাম শুনেই সে উঠে বসলো।

    ‘তোমাকে কি শর্ত দিয়েছে?’ ইসহাক জিজ্ঞেস করলো।

    ‘বলছে, তুমি আলেম ও হুজুর সেজে দেশে যাও।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘লোকদের নছিহত করো, তাদের বুঝাও, সুলতান আইয়ুবী দেশ ও ইসলামের শত্রু। আরও বলছে, আমরা তোমাকে ট্রেনিং দিয়ে দেবো, তোমাকে রাজার হালে রাখবো। আর আমাদের রঙমহলের যে সুন্দরী মেয়েকে পছন্দ করো তাকে চিরকালের জন্য উপহার দিয়ে দেবো তোমাকে।’

    উমরু দরবেশ জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার কাছ থেকে কোন শর্ত আদায় করতে চাচ্ছে?’

    ‘তারা বলছে, তোমরা সম্প্রদায়ের সমস্ত মুসলমানদের সুদান সরকারের অনুগত করে দাও।’ ইসহাক উত্তর দিল, ‘তার বিনিময়ে আমাকে আমাদের এলাকার আমীর বানিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এরা পাহাড়ী মুসলমানদের সুদানী সেনাবাহিনীতে শামিল করতে চায়।’

    ‘আমার মনে হয়েছিল, তোমার উপর ওপর খুব নির্যাতন করছে ওরা।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘জানি না আমাদের দু’জনকে কেন একই কামরায় বন্দী করলো। সম্ভবতঃ এতে কোন মঙ্গল নিহীত আছে। আমিও চাচ্ছিলাম, তোমার সাথে আমার দেখা হোক। আমি একটি পথ চিন্তা করেছি; সে কাজ করার আগে তোমার সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। ভালই হলো, তুমি আমার কাছে এসে গেছো।’

    ‘কি চিন্তা করেছো?’

    ‘তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো, এরা আমাদের ছাড়বে না।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘আমরা আর কতদিন নির্যাতন সহ্য করবো? এভাবে হয়তো আরো দু’চার দিন বেঁচে থাকবো, কিন্তু মরণ আমাদের এখানেই হবে। এখানে আরও কিছু সুদানী মুসলমান বন্দী বেঁচে আছে। কেউ না কেউ তাদের জালে আটকাবেই। আমি ভয় পাচ্ছি, আমাদের সাথীদের প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দেবে। পথ একটাই, তা হলো, এদের শর্ত মেনে নেয়া। আমার ইচ্ছা তুমিও এদের শর্ত মেনে নাও। তারপর মুক্ত হয়ে নিজের এলাকায় গিয়ে বিশ্রাম নাও। নয়তো সুযোগ মতো রাতের আঁধারে সেখান থেকে পালিয়ে মিশর চলে যেও। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।

    এদিকে আমি তাদের কথা মেনে নেই। তারা আমাকে যে শিক্ষা দেয়, তাই গ্রহণ করি। তাদের নির্দেশ মত বহুরূপী সেজে চলে যাই নিজের কবিলার কাছে। তারপর তারা যেন সুদানীদের কোন চক্রান্তে না পড়ে সে জন্য তাদের হুশিয়ার করি। যদি আমি তাদের সাথী হতে পারি, তবে আমি তোমাকে এখান থেকে বের করার চেষ্টা করবো।’ সে আরো বললো, ‘এমনও তো হতে পারে, আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের কবিলার ওপর সুদানীরা আক্রমণ করে বসবে!’

    ইসহাক বললো, ‘পাহাড়ী মুসলমানরা সহজে অস্ত্রসমর্পন করার মত নয়।’

    ‘কিন্তু সৈন্যদের শক্তির কাছে কতদিন ওরা টিকে থাকতে পারবে?’

    ‘আমাদের কোরবানী ওদের ঈমানকে মজবুত করবে।’ উমরু দরবেশ বলল, ‘কিন্তু বেরোতে পারলে আমরা মিশর থেকে কমান্ডো সাহায্য পাবো। বর্তমানে আমাদের প্রয়োজন, দু’জনের অন্ততঃ একজনের এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া। যদি আমরা দু’জনই তাদের শর্ত মেনে নিয়ে বের হতে পারি, তবে আরও ভাল হয়।‘

    ‘আমি এখন কারাগারেই থেকে যাই।’ ইসহাক বললো, ‘তুমি একাই তাদের ধোঁকা দাও। আমরা দু’জনই যদি এক সাথে তাদের শর্ত মেনে নেই, তবে তাদের সন্দেহ হতে পারে। তারা চিন্তা করবে, দু’জন রাতে একই কামরায় থেকে এ পরিকল্পনা করেছে। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে, ‘আমি এদের উৎপীড়ন সহ্য করতে থাকি, তুমি মুক্ত হয়ে যাও।’

    সকালে কারাগারের দরজা খোলা হলো। এক সেপাই বর্শা দিয়ে ইসহাকের গায়ে খোঁচা মেরে ধমক দিয়ে বললো, ‘এই উল্লুক, উঠ।’

    ইসহাক উঠলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেল প্রহরী। সঙ্গে সঙ্গে কামরার দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

    কিছুক্ষন পর কামরায় ঢুকল আরেক সুদানী অফিসার। সে উমরু দরবেশকে বললো, ‘আজও যদি তুমি অস্বীকার করো, তবে আমি কল্পনা করতে পারি না, তোমার শরীরে কি পরিমাণ শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু আমরা তোমাকে মরতে দেবো না। তুমি এ দুনিয়াতেই দোজখ দেখতে পাবে। প্রতিদিন মরবে, প্রতিদিন বাঁচবে।’

    ‘আমাকে কোন ভালো জায়গায় নিয়ে চলো।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘আমাকে একটু সুস্থ মাথায় ভাবতে দাও, এখানে আমি কিছুই চিন্তা করতে পারছি না।’

    ‘তুমি চাইলে আমি তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারি।’ অফিসার বললো, ‘তুমি সেখানে জান্নাতের পরীদের সাথে খেলা করবে। যদি তারপরও অস্বীকার করো, তবে যতদিন বেঁচে থাকবে, শুধু কপাল চাপড়াবে আর আফসোস করবে। পরে কেঁদে বললেও আর তোমাকে বিশ্বাস করা হবে না, সুযোগ দেয়া হবে না।’

    উমরু দরবেশ যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বললো, ‘আমি আর এ অত্যাচার সইতে পারছি না।’

    ‘তাহলে বলো, আমাদের শর্ত কবুল করেছো?’

    ‘না, তা হবে না। আগে আমাকে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে দাও। কিসে আমার কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ আমাকে হিসাব করে দেখতে হবে। যে দিকে পাল্লা ভারী হবে আমি সেদিকেই যাবো।’

    সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে গেল সেই সুরম্য কামরায়, ইসহাককে আগে যেখানে রাখা হয়েছিল। একটু পর ডাক্তার এলো। তার শরীর পরীক্ষা করে ঔষধ দিল। উন্নতমানের খাবার দিল। আর ওদিকে সুদানী সেনাপতি ইসহাকের শরীর গুড়ো করছিল।

    রাতে সেনাপতি এলো উমরু দরবেশের কাছে। বললো, ‘তুমি কি আমাদের শর্ত মানতে রাজী আছো?’

    উমরু দরবেশ বললো, ‘তোমরা তোমাদের ওয়াদা ঠিক রাখবে তো?’

    ‘বিলকুল। ওতে আমাদের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। বিনিময় ছাড়া কে কাজ করে, বলো? তুমি আমাদের খুশি করবে, আমরা তোমাকে খুশি করবো।’

  • টার্গেট ফিলিস্তিন

    টার্গেট ফিলিস্তিন

    টার্গেট ফিলিস্তিন

    উমরু দরবেশ, আশী ও দুই কমান্ডো পাহাড়ী অঞ্চল ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছে। তারা যাচ্ছে সুদানের রাজধানী খার্তুমের দিকে। তখনো তীব্র গতিতে ছুটছে তাদের ঘোড়া। উমরু দরবেশ ঘোড়ার গতি না কমিয়ে সেই ছুটন্ত অবস্থাতেই সহযাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বললো, ‘আমাদের খুব জলদি সেখানে পৌঁছতে হবে। আশী! তুমি ক্লান্ত বোধ করলে আমার পিছনে এসে বসতে পারো! কারণ অল্প সময়ে আমি দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিতে চাই। ওদের কোন গোয়েন্দা আমাদের আগেই সেখানে পৌঁছে যাক, তা আমি চাই না। এমন কিছু ঘটে গেলে তার যে খেসারত দিতে হবে, তা আমি সইতে পারবো না।’

    উমরু দরবেশের এ আশঙ্কা অমূলক ছিল না। সুদানের এক গোয়েন্দা তখন রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যাচ্ছিল সুদানের রাজধানী খার্তুমের দিকে। চোখের সামনে সঙ্গীদের সবাই ধরা পড়ে যেতে দেখে জনতার ভীড় থেকে এই গোয়েন্দা এক পা, এক পা করে নিরাপদ দূরত্বে সরে এসেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল। আলী বিন সুফিয়ানের লোকেরা টের পেয়ে তাকে ধাওয়া করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের ধোঁকা দিয়ে কৌশলে যে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

    যখন সে বুঝতে পারলো, ধাওয়াকারীদের এ যাত্রা খসাতে পেরেছে, তখনি তার মনে চিন্তা জাগলো, ওরা জানে আমি খার্তুম যাবো। সাবধান করবো সুদান সরকারকে। ফলে খার্তুম পৌঁছার আগ পর্যন্ত ওরা আমাকে ধাওয়া করবে। এ কথা মনে হতেই সে খার্তুমের পথ ছেড়ে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল ঘোড়ার মুখ। উদ্দেশ্য, ধাওয়াকারীদের চোখে ধূলো দিয়ে ঘুর পথে খার্তুমের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

    অনেক পথ ঘুরে খার্তুমের পথ ধরায় সে যে উমরু দরবেশের দল থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে এ তথ্য তার জানা ছিল না। জানা ছিল না, ভিন্ন এক মিশন নিয়ে আশী এবং উমরু দরবেশও ছুটে চলেছে খার্তুমের পথে।

    ছুটে চলেছে সুদানী গোয়েন্দা। সঙ্গীবিহীন একাকী পথ চলছে সে। মনের ভেতর তোলপাড় করছে কত কথা! গতকাল উমরু দরবেশের অভিনয় দেখে ভাবছিল, মিশন শুধু সফলই নয়, আশাতীত সাফল্যের খবর দিতে পারবে সে সুদানী সরকারকে। বলবে, শুধু পাহাড়ী অঞ্চল নয়, সারা দেশেই উমরু দরবেশের এ ভেলকিবাজী দেখানো উচিত। অথচ কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে এখন সে খার্তুমই যাচ্ছে, কিন্তু সাফল্যের পরিবর্তে তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে নিজেদের শোচনীয় ব্যর্থতার খবর। তাদের গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে এ সংবাদ সে কোন মুখে শোনাবে সরকারকে! এ সংবাদ পেয়ে সরকার বাহাদুর কেমন ব্যবহার করবে তার সাথে!

    পথ চলছে সুদানী গোয়েন্দা। তার সব ক্ষোভ ও রাগ গিয়ে পড়লো আশীর ওপর। নিশ্চয়ই এ বিপর্যয়ের পেছনে উমরু দরবেশের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধন রয়েছে। উমরু দরবেশকে বিশ্বাস করা যায় না বলেই তো আশীকে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ মেয়ে কি এতই আনাড়ী যে, সে এ ষড়যন্ত্রের কিছুই টের পেলো না! নাকি আশী নিজেও জড়িয়ে পড়েছে এ ষড়যন্ত্রের সাথে! সে সিদ্ধান্ত নিল, উমরু দরবেশ এবং আশীর ব্যাপারে তার সন্দেহের কথাও সে সরকারকে জানাবে।

    একই ঘটনার জের ধরে খার্তুম ছুটে যাচ্ছে দুই ভিন্ন কাফেলা। একদল ভাবছে, সেনাপতিকে মিথ্যা সংবাদ জানিয়ে ইসহাককে তারা মুক্ত করবে, পারলে সুদানের কারাগার থেকে ছিনিয়ে আনবে তাদের সহযোগী বন্ধুদের। অন্যজন ভাবছে, একবার খার্তুম পৌঁছে নেই, উমরু দরবেশ ও আশীকে কারাগারের ভাত না খাইয়ে ছাড়ছি না এবার।

    আল্লাহর জ্যোতির রহস্য দেখার অদম্য আগ্রহ মানুষের চোখেমুখে খেলা করছিল। আলী বিন সুফিয়ানের পেছন পেছন দল বেঁধে মশালের আলোতে পাহাড় চূড়ায় উঠছিল লোকগুলো। আলী বিন সুফিয়ানের সাথে তাঁর কমান্ডো এবং সেই ইমাম সাহেবও ছিলেন, যিনি উমরু দরবেশের কাহিনী শুনিয়েছিলেন তাঁকে।

    পাহাড়ের চূড়ায় আলীর কমান্ডোরা দুই গোয়েন্দাকে বেঁধে অপেক্ষা করছিল। মশাল নিয়ে লোকজনকে উপরে আসতে দেখলো তারা। এক কমান্ডো নিজের হাতের মশাল উঁচু করে ধরলো, যাতে লোকেরা তাদের দেখতে পায়।

    ঘটনার আকস্মিকতায় ধৃত দুই গোয়েন্দা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। প্রথমে ভেবেছিল, তারা ভূতের পাল্লায় পড়েছে। কিন্তু লোকজনকে পাহাড়ে চড়তে দেখেই হুশ হলো তাদের। একজন আলীর কমান্ডোদের বললো, ‘আমাদের সাথে চলো। তোমরা যা চাবে তাই দেব। দয়া করে আমাদের ছেড়ে দাও।’

    ‘তোমরা কি সব মুসলমানকেই গাদ্দার মনে করো? চাইলেই যে কারো ঈমান কিনে নেয়া যায়, দুনিয়া এতই সহজ!’ উত্তরে বললো এক কমান্ডো।

    ‘দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও দোজখের আগুনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তোমরা নিজের জাতিকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিলে। প্রতারণার জাল বিছিয়ে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছিলে নিজের ভাই-বেরাদার ও কওমকে। আগে এর বদলা উশুল করি, তারপর তোমাদের আবেদন বিবেচনা করা যাবে।’ বললো অপর কমান্ডো।

    ‘ঐ যে, ওরা আসছে!’ এক গোয়েন্দা ভয়ে চেঁচিয়ে বললো, ‘লোকজন আমাদেরকে হাতের নাগালে পেলে পাথর মেরেই হত্যা করে ফেলবে। আমাদের ওপর রহম করো। মৃত্যু বড় কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক। আমাদের বাঁচাও, বিনিময়ে তোমরা যা চাও তাই দেবো। বলো তো, সারা জনম গোলাম হয়ে থাকবো তোমাদের, তবু আমাদের বাঁচাও! আমাদের কাছে অনেক সোনা-দানা আছে, আমাদেরকে ওপাশ দিয়ে নিচে নিয়ে চলো, সব তোমাদের দিয়ে দেবো।’

    মশাল যত উপরে উঠছিল, দুই বন্দীর আতংক ও অস্থিরতা ততই বেড়ে যাচ্ছিল। বন্দীদের সব অনুনয় বিনয় বিফলে গেলে শেষে একজন বললো, ‘তাহলে অন্তত এটুকু দয়া করো, তোমাদের কাছে তলোয়ার আছে, সেই তলোয়ার দিয়ে আমাদের গর্দান উড়িয়ে দাও, তবু আমাদেরকে জনতার আক্রোশ থেকে বাঁচাও।’

    ‘জনতার আক্রোশ থেকে নয়, আল্লাহর আক্রোশ থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করো। যে পাপ ও অপরাধ তোমরা করেছো, আল্লাহ তোমাদের কি কঠিন শাস্তি দেবেন, সেই চিন্তা করো আগে।’

    মশাল নিয়ে জনতা তাদের কাছে এসে থামলো। আলী বিন সুফিয়ান কমান্ডোদের এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন, যাতে জনতা ওদেরকে হাতের নাগালের মধ্য না পায়। লোকজন ওদের চার পাশ ঘিরে দাঁড়ালো। বন্দী দু’জন দুই হাটুর ফাঁকে এমনভাবে মুখ লুকালো, যেন কেউ ওদের মুখ দেখতে না পায়। ভীড় বেশী দেখে আলী বিন সুফিয়ান বললেন, ‘হাত ধরাধরি করে সবাই আরো পেছনে সরে যাও, ঘেরাও আরো বড় করো, যাতে সবাই দেখতে পারে।’

    কমান্ডোরা জনতার ভীড়কে আরো পেছনে ঠেলে দিল। এরপর এক কমান্ডার হাতের মশাল বন্দীদের সামনে দুই পাথরের ফাঁকে আটকে দিয়ে এসে দাঁড়াল দুই বন্দীর পেছনে। দুই হাতে মাথার চুল ধরে ঝটকা টানে জনতার সামনে উন্মুক্ত করে দিল তাদের চেহারা। জনগণ লোক দু’জনকে দেখে খুবই বিস্মিত হলো, কারণ তারা দু’জনই এ এলাকার লোক।

    ‘এই সেই তুরের তাজাল্লি দেখানোর লোক।’ আলী বিন সুফিয়ান লোকদের বুঝিয়ে বললেন, ‘এরা কিভাবে সেই জ্যোতি তৈরী করতো এখন নিজেরাই তা তোমাদের করে দেখাবে।’

    তাঁর হাতের ইশারায় কমান্ডোরা দুই বন্দীকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। বললো, ‘জনতার আক্রোশ থেকে বাঁচতে চাইলে যা বলছি জলদি করো। নইলে তোমাদেরকে জনতার হাতে ছেড়ে দিতে আমরা বাধ্য হবো। আর যদি আমাদের কথা মত কাজ করো, তাহলে তাদের আক্রোশ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবো আমরা।’

    ওরা পাথরের ওপর ওদের ঢেলে দেয়া পেট্রোলের দিকে তাকালো। এখনো তা শুকিয়ে যায়নি। কাছেই পড়ে আছে সেই পাত্রটি, যেটিতে রাখা ছিল সেই তেল।

    তাদের একজন এগিয়ে সেই তেলের ওপর মশাল ছোঁয়াতেই দপ করে জ্বলে উঠল আগুন।

    আলী বিন সুফিয়ান পাত্রটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘এই পাত্রে সেই জ্বালানি তেল ভর্তি ছিল, যে তেল আমি আগে কাপড়ে ঢেলে দেখিয়েছি। সেই তেল এখানে ঢেলে দেয়া হয়েছে। আমি আমার চারজন লোককে সন্ধ্যার আগেই এখানে গোপনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তারা এখানে এসে লুকিয়ে থাকায় উমরু দরবেশের এ লোকেরা ওদের দেখতে পায়নি। গতকালের মতই এরা অপেক্ষা করছিল, কখন উমরু দরবেশ মশাল উঁচিয়ে ইশারা করবে। উমরু দরবেশের ইশারা পেলেই এরা পাথরের ওপর ঢেলে রাখা এই তেলের উপর আগুন ধরিয়ে দিত। আর তোমরা সেই আলোকে তুরের তাজাল্লি মনে করে বিভ্রান্ত হয়ে বাড়ী ফিরে যেতে। কিন্তু আজ আমার লোকেরা আগুন লাগানোর আগেই এদের বেঁধে ফেলায় উমরু দরবেশ বার বার মশাল নাড়ার পরও পাহাড়ের চূড়ায় তোমরা কোন আলো দেখতে পাওনি।’

    ‘এরা ছিল তিনজন।’ এক কমান্ডো বললো, ‘এদের অন্য একজন আমাদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে এসে নিহত হয়, তার লাশ গাছের নিচে পড়ে আছে।’

    আলী বিন সুফিয়ানের ইশারায় নিহত লোকের লাশও সেখানে টেনে নিয়ে এলো কমান্ডোরা। আলী বিন সুফিয়ান ধৃত গোয়েন্দাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা এ জনপদের মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করার মিশন নিয়ে সুদানের কাফের সরকারের পক্ষ থেকে এখানে কাজ করছিলে, একথা অস্বীকার করতে পারবে? বলো, আমি কি মিথ্যা বলছি?’

    ‘আমাকে ক্ষমা করুন!’ একজন ভীত কম্পিত স্বরে বললো, ‘আপনি যা বলেছেন তা বিলকুল সত্যি।’

    ‘তোমরা কি এ এলাকার মুসলমান নও?’

    ‘হ্যাঁ।’ দু’জনই মাথা নত করে সম্মতি জানালো।

    ‘খৃস্টান ও সুদানী কাফেররা কি তোমাদেরকে এ কাজের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়নি?’

    ‘হ্যাঁ, তারাই দিয়েছে।’

    ‘আর তোমরা তোমাদের জাতিকে ধোঁকা দিয়ে এবং নিজের ধর্মকে ধ্বংস করে তাদের কাছ থেকে ভাতা ও পুরস্কার নাও?’

    ‘হ্যাঁ। আমরা এর বিনিময়ে পুরস্কার ও ভাতা পেয়ে থাকি।’

    একজন উত্তর দিল, ‘তবে আজ থেকে তওবা করছি, জীবনে আর কখনো এমনটি করবো না। আপনি দয়া করে এবারের মত আমাদের ক্ষমা করে দিন।’

    অপর জন বললো, ‘আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। আমরা ওয়াদা করছি, এরপর থেকে জাতির জন্য, ধর্মের জন্য আমরা আমাদের জীবনকে বিলিয়ে দেবো।’

    এ সময় অকস্মাৎ এক ব্যক্তি জনতার ভিতর থেকে ছুটে এসে তলোয়ারের আঘাতে দুই বেঈমানের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিৎকার করে উঠল, ‘বেঈমান, এখনো ভন্ডামী!’ এরপর তলোয়ার আলীর পায়ের কাছে রেখে দিয়ে বললো, ‘যদি আমি অপরাধী হয়ে থাকি, যদি সবার কাছে আমি খুনী হয়ে থাকি, তবে এ তলোয়ার দিয়েই আমাকে হত্যা করা হোক।’

    গাদ্দারদের মাথা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, আলীর পায়ের কাছে পড়ে ছিল লোকটির রক্তাক্ত তলোয়ার, আলী তাকালেন ইমাম সাহেবের দিকে।

    ইমাম সাহের ভরাট ও দরাজ কন্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এ লোক খুনী নয়। এই হত্যা শরিয়তে জায়েজ!’

    আলী বিন সুফিয়ান এবার উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখনও কি কারো মনে কোন প্রকার সন্দেহ আছে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করার নাম করে এরা তোমাদের ঈমানকে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছিল?’

    সমস্বরে সবাই বললো, ‘না। আল্লাহর হাজার শোকর যে, আপনি সময় মত এসে আমাদেরকে গোমরাহীর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।’

    ভোর রাত। এক স্থানে ঘোড়া থামালেন উমরু দরবেশ। আলী এবং কমান্ডোদের বললো, ‘খানিক বিশ্রাম নিয়ে নাও। ঘোড়াগুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ওদেরও একটু বিশ্রাম প্রয়োজন।’

    রাজধানীর পথে ছুটে চলা সুদানী গোয়েন্দা মধ্য রাত পর্যন্ত একটানা পথ চললো। শেষে ঘুম আর ক্লান্তির কাছে পরাজিত হয়ে এক জায়গায় থেমে গেল বিশ্রামের জন্য। তাঁবু টানিয়ে শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লো সে। এ গোয়েন্দার তো আর জানা ছিল না, উমরু দরবেশ তার আগেই সদলবলে যাত্রা করেছে রাজধানী খার্তুমের দিকে। জানা থাকলে এমন বিশ্রামের কথা হয়তো সে চিন্তাও করতো না।

    ফজরের নামাজ পর্যন্ত বিশ্রাম নিল উমরু দরবেশের দল। সূর্য উদয়ের সাথে সাথেই কাফেলা নিয়ে তিনি আবার যাত্রা শুরু করলেন। উমরু দরবেশ ছিলেন একজন জাত সৈনিক। কমান্ডোরাও তাই। ফলে দুর্গম পথের কষ্ট সহ্য করা তাদের জন্য নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু আশী মেয়ে মানুষ। তার ওপর নবীন বয়স। প্রতিপালিত হয়েছে শাহী মহলের আদর সোহাগ ও বিলাসিতায়। যদিও কষ্ট সহ্যের ট্রেনিং ছিল কিন্তু তা কেবল ট্রেনিং পর্যন্তই, কোন দিন তার মুখোমুখি হতে হয়নি।

    বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছে কাফেলা। রোদের উত্তাপ গায়ে এসে কামড় বসাতে শুরু করেছে, আশীর দিকে তাকালেন উমরু দরবেশ। তার চেহারায় রাত জাগার ক্লান্তি, মুখটা মলিন। মেয়েটির এ বিমর্ষ রূপ দেখে মায়া হলো উমরু দরবেশের। বললো, ‘আশী! তোমার সুন্দর মুখখানা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে।’

    ‘এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়িনি তো!’ আশীর সংক্ষিপ্ত জবাব।

    ‘তাছাড়া, তোমার তো রাত জাগার অভ্যাস নেই, তাই দু’চোখে লেগে আছে ক্লান্তি ও ঘুমের ঘোর। এক কাজ করো, তুমি চলে এসো আমার ঘোড়ার পিঠে, তাতে কষ্ট একটু লাঘব হবে।’ আশী একটু হাসলো, কিন্তু মুখে কিছু বললো না।

    একটু পর। আশীর চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছিল। ঘুমিয়ে পড়লে ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে পারে। উমরু দরবেশ আবারও বললো, ‘আশী! তোমার ঘোড়া ছেড়ে চলে আসো। আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখো, তাহলে পড়বে না ঘোড়া থেকে।’

    আশী এবারও হাসলো, ম্লান হাসি। কিছু দূর গিয়ে এক কমান্ডো উমরু দরবেশকে বললো, ‘মেয়েটা তো পড়ে যাবে!’

    উমরু দরবেশ নিজের ঘোড়া নিয়ে গেলেন আশীর ঘোড়ার পাশে এবং লাগাম টেনে ধরে থামিয়ে দিলেন তার ঘোড়া। আশী জেগে উঠলো। উমরু দরবেশ বললো, ‘আমার সামনে এসে বসো।’

    ‘আমি কারো সাহায্য চাই না।’ আশী বললো, ‘আমিই বরং সাহায্য করবো তোমাদের। আমাকে আমার অঙ্গীকার পূরণ করতে দাও। আমার মা-বাবার হত্যা ও আমার মান সম্ভ্রম নষ্টের প্রতিশোধ নিতে হবে আমাকে। আমি জেগে থাকার চেষ্টা করছি।’

    ঘোড়া আবার চলতে লাগলো। কিছু দূর গিয়ে এক সময় আশী ঠিকই ঘুমিয়ে পড়লো। উমরু দরবেশ পাশেই ছিলেন, নইলে মাটিতে পড়ে যেত আশী।

    তিনি ঘোড়া থামিয়ে আশীকে কিছু না বলেই তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের ঘোড়ার সামনে বসিয়ে দিলেন। এক কমান্ডো তার ঘোড়ার জ্বীনের সাথে আশীর ঘোড়া বেঁধে নিল। আবার যাত্রা করলো কাফেলা।

    ঘোড়া ছুটছে পূর্ণ গতিতে। আশী এবার আর ঘুমকে তাড়াতে চেষ্টা করলো না। সে মাথাটি আস্তে করে উমরু দরবেশের বুকে ঠেকিয়ে গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়লো।

    আশীর খোলা চুল উমরু দরবেশের চোখে মুখে আঘাত হানছিল। দেহ ও চুলের ঘ্রাণ আছড়ে পড়ছিল তার নাসারন্ধ্রে। কিন্তু এমন চুল ও দেহের পরশ তাঁর মনের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি, যেমন এক যুবতী ও যুবকের মনে প্রভাব ও ক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাঁর মনে আশীর সেই কথা গুলো বাজতে লাগলো, ‘তোমার কোলে বসে আমার ছোট বেলায় বাবার কোলে বসার আনন্দ ও নিরাপত্তার কথা মনে পড়ছে। আজ যেমন তুমি আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আগলে রেখেছিলে, সেদিনও আমার বাবা আমাকে এমনিভাবে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বুকে চেপে রেখেছিল।’

    আশী কিছুদিন আগে যখন এ পথে পাহাড়ী অঞ্চলে যাচ্ছিল তখন মরুভূমিতে রাতে নেকড়ে বাঘের ডাক শুনে ভয়ে উমরু দরবেশের বুকে লাফিয়ে পড়ে এ কথা বলেছিল। উমরু দরবেশের মনে এখন সে কথাগুলোই নীরবে বার বার ভেসে উঠছিল। উমরু দরবেশের মনে হলো, সে তাকে আরো বলছে, ‘উমরু দরবেশ! আমি মুসলমানের মেয়ে, আমাকে আর খৃস্টানদের হাতে তুলে দিও না। আমার চোখের সামনে রক্ত! রক্ত! রক্ত! সে রক্ত আমার বাবার! সে রক্ত আমার মায়ের! বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র মাটিতে মিশে আছে সে রক্ত। উমরু দরবেশ! তোমার শিরাতে কি হাশেম দরবেশের রক্ত বইছে না? তাহলে তোমাকে সে রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে হবে, যে রক্ত বাইতুল মুকাদ্দাসের মাটি একদিন চুষে নিয়েছিল আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে। তোমাকে ফিলিস্তিনের সম্মান ও সম্ভ্রম ডেকে বলছে, হে আল্লাহর বান্দা! হে আখেরী নবীর খোশ-নসীব উম্মত! তোমাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসকে মন থেকে মুছে ফেলো না! জীবন তো কল্যাণের পথে ব্যয় করার জন্যই! সেই প্রথম কেবলাকে নাপাক দুশমনের হাত থেকে উদ্ধার করো। ওরে হাশিম দরবেশের বেটা! এ কাজে তুমি যদি এগিয়ে না যাও তবে মরেও যে তুমি শান্তি পাবে না!’

    উমরু দরবেশের ঘোড়ার গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। কমান্ডোরাও গতি বাড়ালো তাদের ঘোড়ার। বাতাসের বেগে ছুটছে ঘোড়াগুলো। এক কমান্ডো তার ঘোড়া নিয়ে গেল উমরু দরবেশের কাছে। বললো, ‘উমরু দরবেশ! সামনে কোন ফাঁড়ি থেকে ঘোড়া বদলানোর যদি সুযোগ থাকে তবে কিছু বলতে চাই না। আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে ঘোড়াগুলোকে এভাবে শেষ করা উচিৎ হবে না! বলি কি! দয়া করে একটু আস্তে চালান!’

    উমরু দরবেশ কমান্ডোর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ঘোড়ার গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনলেন। বললো, ‘আল্লাহ জাল্লে শানুহু আমাদের সঙ্গে আছেন। ঘোড়া ক্লান্ত হবে না।’

    তাদের কথার শব্দ এবং গতিতে ছন্দপতন ঘটায় আশীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে ভীত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম!’

    ‘ভালই ঘুমিয়েছো!’ উমরু দরবেশ বললো, ‘আরো ঘুমুবে?’

    ‘না, আর কোন ঘুমের প্রয়োজন নেই আমার। তোমার স্পর্শ আবার আমার মনে নতুন করে ঈমানী জোশ পয়দা করে দিয়েছে। এখন আমি আগেই চাইতেও তীব্র গতিতে ছুটতে পারবো।’

    ‘তাহলে যাও! নিজের ঘোড়ায় আরোহণ করো। ইনশাআল্লাহ সন্ধ্যা নাগাদ আমরা পৌঁছে যেতে পারবো।’

    আলী বিন সুফিয়ান সেই গ্রামে গেলেন, যে গ্রামে উমরু দরবেশ প্রথম রাতে কেরামতি দেখিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করেছিল। তিনি তার কমান্ডো বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেন, তারা যেন সমস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং উমরু দরবেশের ভিলকিভাজীর মুখোশ উন্মোচন করে আসল তথ্য জনগনকে অবহিত করে। গোয়েন্দা বাহিনী গ্রামের সাধারণ মানুষের পোশাকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো এবং উমরু দরবেশের ভন্ডামী ধরা পড়ার কাহিনী লোকজনকে বলে বেড়াতে লাগলো। ইমাম সাহেব তার মুসল্লীদের সামনে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে উজ্জীবিত করে তোললেন মুসল্লীদের। তিনি বললেন, ‘সুদানীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তোমাদের প্রস্তুত ও সতর্ক থাকতে হবে। সামরিক অভিযানে ব্যর্থ হয়ে ওরা এখানকার মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। আমাদের ঈমান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারো নেই। আমরা এ পাহাড়ী অঞ্চলকে স্বাধীন মুসলিম রাজ্য মনে করি। এখানে দীর্ঘকাল ধরে যে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শাসন চালু আছে তাই বহাল থাকবে। যদি এখানে নতুন করে কোন গাদ্দার ও গোয়েন্দা পয়দা হয়, তাহলে তাদের করুণ ও দুঃখজনক পরিণতির জন্য তারা নিজেরাই দায়ী থাকবে।’

    আলী বিন সুফিয়ান বিরাট ঝুঁকি নিয়ে এ অঞ্চলে পা দিয়েছিলেন। আল্লাহর রহমতে এবং তাঁর বিচক্ষণ ও সাহসী পদক্ষেপের ফলে অল্পতেই এ ষড়যন্ত্রের মূল উৎপাটিত হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ান এবার তার কমান্ডো বাহিনীকে দু’ভাগে বিভক্ত করলেন।

    ❀ ❀ ❀

    সুদানের কারাগার থেকে মুক্ত করে ইসহাককে একটি সুন্দর বাড়ীতে রাখা হয়েছিল। তাঁকে সেখানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হতো। তার সেবাযত্নের জন্য ছিল পর্যাপ্ত দাসদাসী। লোকজন তাকে যথেষ্ট সম্মান ও সমীহ করতো। নির্যাতন তো দূরের কথা, কেউ আর নতুন কোন প্রস্তাব নিয়ে এসে তাকে বিরক্তও করতো না! মনে মনে বেশ স্বস্তি অনুভব করলেন তিনি।

    রাতের খাওয়া দাওয়ার পর ইসহাক তার কামরায় একাকী বসেছিলেন। ভাবছিলেন উমরু দরবেশের কথা। সে এখন কি করছে? সেকি ফাঁকি দিতে পেরেছে সুদানীদের? নাকি ওদের হাত থেকে মুক্ত হতে গিয়ে নতুন করে বিপদের জড়িয়ে পড়েছে? তাঁর গোপন ইচ্ছা ফাঁস হয়ে গেলে তাঁর ভাগ্যে কি ঘটবে মনে হতেই শিউরে উঠলেন তিনি।

    ইসহাক এখন কি করবেন সে কথাই চিন্তা করছিলেন। তিনি তাঁর সামনে দু’টি নতুন বিপদ দেখতে পেয়ে আঁৎকে উঠলেন। প্রথমতঃ উমরু দরবেশ কারাগারের কঠিন শাস্তির ভয়ে সুদানীদের খেলনায় পরিণত হতে পারে। দ্বিতীয়তঃ উমরু দরবেশ তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ধরা পড়তে পারে ওদের হাতে। দুই অবস্থাতেই ইসহাকের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে। উমরু দরবেশের কথা ভাবতে গিয়ে এ আশংকা মনে উদয় হতেই এক ধরণের ভয়, শিহরণ ও ব্যস্ততা অনুভব করলেন তিনি। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘরময় পায়চারী করতে লাগলেন। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন, উমরু দরবেশের জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। যা করার তার নিজেকেই করতে হবে। ইসহাক নিজস্ব পরিকল্পনায় পালানোর কথা ভাবতে লাগলেন। কিন্তু কিভাবে পালাবেন তার কোন পথ খুঁজে পেলেন না।

    সুদানীদের জন্য তিনি এক মূল্যবাদ কয়েদী! সে জন্য সুদান সরকার তার ওপর কড়া পাহারার ব্যবস্থা রেখেছে। উমরু দরবেশ তাঁর কাছ থেকে পৃথক হওয়ার সময় বলেছিল, সুদানী মুসলমানদেরকে সুদান সরকারের অনুগত বানানোর প্রস্তাবে রাজি হলে সরকার তাকে মুক্ত করে দেবে। তাহলে উমরু দরবেশ কি এখন মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করার কাজ করে যাচ্ছে! ইসহাক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিল। ভাবছিল, এ জাহান্নাম থেকে মুক্তির তবে কি কোন পথ নেই? সূর্য অস্ত গিয়েছে খানিক আগে। চারজন অশ্বারোহী সুদানের রাজধানী খার্তুমে প্রবেশ করলো। ডানে বায়ে না তাকিয়ে ওরা সোজা সামরিক হেডকোয়ার্টারে গিয়ে থামলো। উমরু দরবেশ জানেন, কোথায় যেতে হবে ও কার সঙ্গে দেখা করতে হবে। তাকে নতুন চিন্তাধারার ট্রেনিং এখানেই দেয়া হয়েছিল। রক্ষীদের কাছে পৌঁছেই উমরু দরবেশ বললো, ‘জলদি আমাকে সেনাপতির কাছে পৌঁছে দাও।’

    রক্ষী কমান্ডার দ্রুত তাকে সেনাপতির কাছে নিয়ে গেল।

    ‘ব্যর্থ হয়ে ফিরেছ নাকি সফল হয়েছ?’ উমরু দরবেশকে দেখতে পেয়েই সেনাপতি প্রশ্ন করলো।

    ‘ভাল সংবাদ এর কাছেই শোনো!’ উমরু দরবেশ আশীর দিকে ইশারা করে বললো, ‘হয়তো আমার কথা তোমার বিশ্বাস নাও হতে পারে।’

    ক্লান্তি ও অবসাদে কামরায় প্রবেশ করেই আশী পালংকের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে পড়লো। উমরু দরবেশের কথা শুনে মদির কটাক্ষ হেনে তৃপ্তির হাসি হেসে বললো, ‘ভনিতা রাখো তো দরবেশ! সব কিছু দ্রুত খুলে বলো। এখনো অনেক কাজ বাকী আছে, জলদি করো। কারন আমাদের হাতে সময় বেশী নেই।’

    ‘আমাদের মিশন এত তাড়াতাড়ি সফল হবে, এমন আশা আমাদের মোটেই ছিল না।’ উমরু দরবেশ বললেন। তিনি কিভাবে কি করেছেন সব খুলে বললেন। কেমন করে ভেজা কাপড়ে আগুন ধরালেন, কেমন করে তুরের তাজাল্লি দেখালেন, সব।

    ‘আর তাঁর কথা বলার সময় সম্মোহনের যে আবেগ তৈরী হতো, সবকিছু জানা না থাকলে আমিও তো মজে যেতাম!’ আশী উমরু দরবেশের কাজের প্রশংসা করতে গিয়ে অভিভূত কন্ঠে বললো, ‘লোকেরা তাঁর কথা মুগ্ধ বিস্ময়ে গিলতো। মনে হতো, লোকগুলোর আলাদা কোন অস্তিস্ব নেই, সবকিছু নিস্প্রাণ, নির্জীব। কেবল প্রাণময় সত্তা উমরু দরবেশ। সে যদি রহীমকে বলতো, তোমার নাম রাম, লোকগুলো হয়তো তাই বিশ্বাস করতো।’

    ‘কেন, কেউ কি এ পর্যন্ত আপনাকে আমাদের সাফল্যের সংবাদ দেয়নি?’ উমরু দরবেশ প্রশ্ন করলেন।

    ‘না! কেউ আসেনি!’ সুদানী সেনাপতি বললো, ‘আমি তো তোমাদের নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম তোমাদের মিশনের খবর শোনার জন্য।’

    উমরু দরবেশ এ কথা শুনে একটু আশ্বস্ত হলেন। যাক, এখনও সে গোয়েন্দা এসে পৌঁছেনি, যে আলীর গোয়েন্দাদের চোখে ধূলো দিয়ে জনতার মধ্য থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। উমরু দরবেশ সেনাপতির কথা বিশ্বাস করলো। কারণ সে গোয়েন্দা জানতো না উমরু দরবেশ খার্তুমের পথ ধরেছে। ফলে তার চলার গতি সেই আবেগ ও শঙ্কা কাজ করেনি, যে ভয় তাড়িত করেছে উমরু দরবেশদের। সমান গতিতে আসলেও তার এসে পৌঁছতে সময় লাগার কথা। কারণ তাড়া খেয়ে সে নিশ্চয়ই সোজা পথে আসবে না। ঘুর পথে আসতে গেলে সময় তো একটু বেশী লাগবেই।

    উমরু দরবেশ সুদানী গোয়েন্দার আগমন বিলম্বে খুশী হলো। সবাইকে বোকা বানিয়ে ইসহাককে নিয়ে সরে পড়ার এটাই সুযোগ। ওই গোয়েন্দা এসে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে আসল ঘটনা জানাজানি হয়ে যাবে। তখন উমরু দরবেশের ভাগ্যে আগের মত আর কারাগারের জীবনও জুটবে না। একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর কোন শাস্তিই বরাদ্দ করে না এমন অপরাধীর জন্য।

    ‘এখন আমার ইসহাকের প্রয়োজন।’ কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই উমরু দরবেশ বললো, ‘আমি সেখানকার মুসলমানের মগজ ধোলাই করেছি। আমি তাদের সুদান সরকারের অনুগত হতেও রাজী করাতে পেরেছি। আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে তাদের মনে ঘৃণা ও শত্রুতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। তাদের অন্তরে আমি এ ধারনা বদ্ধমূল করতে পেরেছি যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ফেরাউনের উত্তরসুরী। এখন প্রয়োজন সুদানের সুদানের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য তাদেরকে ডাক দেয়া। এ ডাক কেবল সেই দিতে পারে, যে সেখানকার মুসলমানের আস্থাভাজন ও বিশ্বাসী নেতা। যদি তেমন কাউকে দিয়ে একবার সেখানকার মুসলমানদের এ আহবান জানাতে পারেন, আমার বিশ্বাস, সে এলাকা পুরোপুরি আপনাদের করায়ত্বে এসে যাবে। আমি জানি এবং যাচাই করেও দেখেছি, তাদের একমাত্র বিশ্বস্ত নেতা ইসহাক। সে ছাড়া আর এমন কেউ নেই, যার ডাকে তারা বিনা প্রশ্নে সাড়া দেবে।’

    ‘কিন্তু ইসহাককে কে বোঝাবে?’ সুদানী সেনাপতি বললো, ‘আমি তো তাকে সে এলাকার আমীর করার লোভও দেখিয়েছি। তাকে এমন কঠিন শাস্তি দিয়েছি, যে শাস্তি ঘোড়াও সহ্য করতে পারে না। আশীকে পাঠিয়েছিলাম তাকে বশ করতে, সেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।’

    ‘এখন আমাকে চেষ্টা করতে দিন।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘তাকে কারাগার থেকে বের করে সেই কামরাতে আনুন, যেখানে আপনি তাকে এবং আমাকে একদিন রেখেছিলেন। আপনি তার শত্রু, কিন্তু আমি তার সঙ্গী এবং বন্ধু।’

    ‘তুমি কি আশী কি দিয়ে আরেকবার চেষ্টা করবে?’ সুদানী সেনাপতি বললো।

    ‘না!’ উমরু দরবেশ বললো, ‘এখন আমি আমার কথার যাদুতে তাকে বাধ্য করবো। আমি তার ওপর সেই সম্মোহন বিদ্যা প্রয়োগ করবো, যে বিদ্যার কারণে আমার বংশ দরবেশ বংশ হিসাবে পরিচিত। কেবল একটি রাত, আশা করি সূর্য উঠার আগেই সে আমার জালে বন্দী হবে। আমি বেশী সময় নিতে চাই না। সে এলাকায় আমার অনুপস্থিতি দীর্ঘ হলে তাদের ঘোর কেটে যেতে পারে। ঘোর কাটার আগেই আমি তাদের শোনাতে চাই সে আহবান, যে আহবান শোনানোর জন্য আপনারা এতকাল ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আপনি জানেন, সেখানে মিশরের গোয়েন্দা রয়েছে। আমি সেখানে যে যাদু চালিয়েছি সে যাদুর প্রভাব নষ্ট করা মত সুযোগ আমি মিশরী গোয়েন্দাদের দিতে চাই না।’

    সুদানী সেনাপতি উমরু দরবেশের দুই সঙ্গী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। উমরু দরবেশ বললো, ‘এরা আমার দুই মুরীদ! এরা আমার এমন ভক্ত হয়ে গেছে যে, বাড়ীঘর ছেড়ে মরার আগ পর্যন্ত আমার খেদমতে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় চলে এসেছে। ভেবে দেখলাম, কাজকর্ম করানোর জন্য দু’একজন লোক সঙ্গে থাকলে ভালই হয়। তাই ওদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দিয়েছি।’

    উমরু দরবেশের সেই কাংখিত কামরায় নিয়ে আসা হলো ইসহাককে। সেনাপতি নিজে ইসহাকের সাথে দেখা করে বললো, ‘আমি তোমাদের জাতীয় প্রেরণা ও বিশ্বাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। তোমার এক বন্ধু উমরু দরবেশ তোমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি আশা করি, তোমাদের সাক্ষাৎ প্রীতিপ্রদ হবে।’

    ‘আমাকে কারাগারের জঘন্য পরিবেশে রাখো, তারচেয়ে জঘন্য নরকের পরিবেশে রাখো অথবা তোমাদের মহলেই রাখো, অত্যাচার করো বা লোভ দেখাও, আমাকে আমার পথ থেকে এক চুলও সরাতে পারবে না।’ ইসহাক বললো, ‘তুমি আমাকে মৃত্যুকূপে নিয়ে যাও অথবা রাজপ্রাসাদে, আমি ঈমান বিক্রি করবো না। বন্ধুত্ব আর শত্রুতা সবই আমার কাছে সমান। সব কিছুর ওপর থাকবে আমার বিশ্বাস, আমার ঈমান।’

    সুদানী সেনাপতি হেসে দিল, কামরায় প্রবেশ করলো উমরু দরবেশ। উমরু দরবেশকে দেখেই ইসহাক বলে উঠলো, ‘তোমার চেহারাই বলে দিচ্ছে, তুমি এ কাফেরদের কাছে তোমার ঈমান বিক্রি করে দিয়েছো। তোমার স্বাস্থ্য, তোমার চেহারা ও চোখ বলছে, তুমি খুব আরামেই আছো। আমার সঙ্গে কেন দেখা করতে চাও?’

    ‘আমি তোমার চেহারায় আমার মত মুক্তির আনন্দ ও চমক দেখতে চাই।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘একটু আমাকে বলার সুযোগ দাও, কিছুক্ষণের জন্য তোমার মন, তোমার বুদ্ধি আমার কাছে সঁপে দাও। ধৈর্য ও শান্ত মনে আমার কথা শোনো! তাতে তোমার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে না। আমি তোমার ঈমান কিনতে আসিনি। ঈমান নিয়ে ব্যবসা আমি করি না। আমি তোমার বন্ধু, তোমার মঙ্গলাকাংখী। কিসে তোমার কল্যাণ, কিসে অকল্যাণ, কিসে মঙ্গল, কিসে অমঙ্গল- এটুকুই শুধু আমি তোমার সাথে খোলাখুলি ও অন্তরঙ্গ পরিবেশে আলাপ করতে চাই।’

    এ আলাপের সময় সুদানী সেনাপতি পাশেই দাঁড়িয়েছিল। ইসহাক তাদের এক মূল্যবান কয়েদী। তার ব্যাপারে কোন রকম ঝুঁকি নিতে রাজী নয় সেনাপতি। উমরু দরবেশও একসময় কয়েদী ছিল। উমরু দরবেশ ধোঁকাও তো দিতে পারে! তাদের দু’জনকে এক কামরায় গোপন আলাপের সুযোগ দেয়া সমীচিন মনে হলো না সেনাপতির। তাই এ আলাপের সময় সে পাশে দাঁড়িয়েই রইলো।

    এ আলাপের জায়গাটি কারাগার ছিল না। কিন্তু তাই বলে নিরাপত্তাহীনও ছিল না। চারজন পাহারাদার নিযুক্ত আছে এ বাড়ীতে। দু’জন প্রহরী সামনের ফটকে, অন্য দু’জন পিছনের সংকীর্ণ দরজায়। তাদের সাথে আছে বর্শা ও তলোয়ার। আরো আছে তীর ধনুক। ইচ্ছে করলেই কেউ পালিয়ে যেতে পারবে এমন নয়। উমরু দরবেশ ও ইসহাক এখান থেকে পালিয়ে যাবে এমন কোন ভয় বা আশঙ্কা ছিল না সেনাপতিরও।

    উমরু দরবেশ চাচ্ছিলেন সেনাপতি সেখান থেকে চলে যাক, কিন্তু যাওয়ার কোন লক্ষণই দেখা গেল না সেনাপতির হাবভাবে। তার উপস্থিতিতে উমরু দরবেশ ইসহাককে খোলাখুলি কিছু বলতেও পারছে না, ওদিকে যে কোন সময় পাহাড়ী গোয়েন্দা এসে সবকিছু ফাঁস করে দিতে পারে। ভেতরে ভেতরে প্রচন্ডভাবে অস্থির হয়ে পড়লেন উমরু দরবেশ।

    আশী গোসল ও বিশ্রামের জন্য পাশের কামরায় চলে গিয়েছিল। সে চলে এলে হয়তো সুদানী সেনাপতিকে সরানোর একটা কায়দা বের করতে পারতো। কিন্তু তার এদিকে আসার নামগন্ধও নেই। সুদানী সেনাপতি শিকড় গেড়ে বসে আসে এক আসনে। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে মূল্যবান কয়েকটি ঘণ্টা। হয়তো সে গোয়েন্দা শহরের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। সে এসে পড়লেই সমস্ত ব্যাপারটা তালগোল পাকিয়ে যাবে।