Author: তাহের আলমাহদী

  • দ্বিতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদ নগরীর পত্তন

    দ্বিতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদ নগরীর পত্তন

    দ্বিতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদ নগরীর পত্তন

    অষ্টাদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকের কথা।

    দিল্লির তখ্‌তে তখন মুঘল সম্রাট ঔরংজেব। কিন্তু ১৬৮০ থেকেই তিনি দাক্ষিণাত্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। কুড়ি বছর ধরে তিনি মূলত দাক্ষিণাত্যেই অবস্থান করছিলেন। রাজধানী দিল্লি থেকে তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে বিস্তৃত সাম্রাজ্যের বহু অংশেই অরাজকতা দেখা দিয়েছে, শান্তিশৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। এককালের পরাক্রান্ত সাম্রাজ্যের পতন প্রায় আসন্ন। কেন্দ্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ অঞ্চল থেকেই মুঘল সম্রাটের কাছে রাজস্ব পাঠানো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দাক্ষিণাত্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছে। সম্রাট ঔরংজেবের চরম দুরবস্থা। একদিকে বয়সের ভার, অন্যদিকে নিদারুণ অর্থকষ্ট ও যুদ্ধের ধকল— সব মিলে বৃদ্ধ সম্রাট শুধু ক্লান্ত নন, প্রায় বিধ্বস্তও।

    অবশ্য তাঁর এই দুর্দশার জন্য ঔরংজেব প্রধানত নিজেই দায়ী। বছরের পর বছর দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধ করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সৈন্যবলের অপচয়, তার কোনও রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ছিল না। অনেকটা জেদের বশেই তিনি এই অর্থহীন ও অন্তহীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। গোঁড়া সুন্নি মুসলমান হয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যের দুই স্বাধীন শিয়া রাজ্যের— বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা— অস্তিত্ব সহ্য করতে পারছিলেন না। এই দুই রাজ্যকে শায়েস্তা করতে তিনি কুড়ি বছর ধরে দাক্ষিণাত্যে পড়ে রইলেন। আর ওদিকে রাজধানী দিল্লির তথা সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছিল। ঔরংজেবের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ যে তাঁর অপরিণামদর্শিতার পরিচায়ক, এ-বিষয়ে প্রায় সব বিশিষ্ট ঐতিহাসিকই সহমত।1

    মুঘল সাম্রাজ্যের ও সম্রাটের যখন এই দুরবস্থা তখন একমাত্র ভরসা ছিল সুবে বাংলা। সাম্রাজ্যের চারদিকে যখন অরাজকতা, অবক্ষয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, সম্রাটকে রাজস্ব পাঠাতে চরম অনীহা এবং কার্যত বন্ধ, তখন বাংলাই একমাত্র উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বস্তুতপক্ষে, সপ্তদশ শতক ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে সুবে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ সুবা (প্রদেশ) হিসেবে গণ্য হত। বাংলার উর্বর জমি, বিভিন্ন রকমের ও অপর্যাপ্ত কৃষিজ পণ্য এবং সস্তা অথচ উৎকৃষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা—সব মিলে সুবে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি অত্যন্ত মূল্যবান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই বাংলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আর বাংলা যেহেতু সবদিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, বাংলায় একমাত্র সোনা-রুপো ছাড়া অন্য কিছুর বিশেষ চাহিদা ছিল না। ফলে বাংলা থেকে যারা পণ্য রফতানি করত, তাদের সবাইকে— সে ইউরোপীয় বা এশীয় বণিক যেই হোক না কেন— এ সব পণ্য কেনার জন্য বাংলায় সোনা-রুপো বা নগদ টাকা পয়সা নিয়ে আসতে হত।2

    বস্তুতপক্ষে, সপ্তদশ শতকে বাংলার প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল। সমসাময়িক বিদেশি পর্যটক ও ফারসি ঐতিহাসিকরা এ নিয়ে অনেক মন্তব্য করেছেন। রিয়াজ-উস-সলাতিনের লেখক গোলাম হোসেন সলিম বাংলাকে জিন্নৎ-অল-বিলাদ বা ‘প্রদেশসমূহের মধ্যে স্বর্গ’ বলে অভিহিত করেছেন।3 মুঘল সম্রাট ঔরংজেব নাকি বাংলাকে বলতেন ‘জাতীয় স্বর্গ।’4 সব মুঘল ফরমান, পরওয়ানা বা সরকারি নথিপত্রে বাংলাকে ‘ভারতবর্ষের স্বর্গ’ বলে উল্লেখ করা হত। কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ (Jean Law) লিখেছেন ওটাই বাংলার যথার্থ অভিজ্ঞান।5 বাংলার সমৃদ্ধিতে আকৃষ্ট হয়ে এবং এখান থেকে ধনরত্ন আহরণ করার জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভিন্ন দেশ থেকে বহু লোকের সমাগম হত বাংলায়। ধনরত্নের লোভ ছেড়ে তারা সহজে বাংলা থেকে বিদায় নিতে পারত না। ১৬৬০-এর দশকে ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ে (Bernier) মন্তব্য করেছেন:6

    … the rich exuberance of the country… has given rise to a proverb… that the kingdom of Bengal has a hundred gates open for entrance, but not a single one for departure.

    স্বাভাবিকভাবে, এই বাংলাই ছিল বাদশাহ ঔরংজেবের একমাত্র আশাভরসা— যেখান থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় হবে এবং তা দিয়ে দাক্ষিণাত্যে তাঁর যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দেবে। কিন্তু তাঁর সে প্রত্যাশা পুরোপুরি সফল হল না। শাহজাদা মহম্মদ আজিমুদ্দিন তখন বাংলার সুবাদার। তিনি বাংলায় আসেন ১৬৯০ সালে। তিনি ঔরংজেবের তখন জীবিত জ্যেষ্ঠপুত্র প্রথম বাহাদুর শাহের পুত্র— অর্থাৎ ঔরংজেবের পৌত্র। ইতিহাসে তিনি আজিম-উস-শান নামেই সমধিক পরিচিত। আজিম-উস-শান রাজস্ব আদায়ে তেমন তৎপর ছিলেন না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল— বাংলা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ ধন আহরণ করা— যা দিয়ে তিনি ঔরংজেবের আসন্ন মৃত্যুর পর দিল্লির মসনদ দখল করার লড়াইয়ে যোগ দিতে পারবেন।7 ফলে বাংলা থেকে রাজস্ব আদায় ও সম্রাটকে দাক্ষিণাত্যে অর্থজোগান দেবার ব্যাপারে আজিম-উস-শানের তেমন উৎসাহ ছিল না। তাই সম্রাট খোঁজ করছিলেন এমন একজন দক্ষ ও বিশ্বাসী ব্যক্তির যিনি বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারবেন এবং তাঁকে দাক্ষিণাত্যে নিয়মিত অর্থ পাঠাবেন। ভাগ্যক্রমে তিনি এমন একজনের সন্ধানও পেয়ে গেলেন, যাঁর তখন নাম ছিল মহম্মদ হাদি।

    কে এই মহম্মদ হাদি?

    ঔরংজেব যখন মহম্মদ হাদিকে বাংলার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেন, তখন তিনি হায়দরাবাদের দেওয়ান ও ইয়েলকোণ্ডালের ফৌজদার। এ কাজে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন ও সম্রাটের নজরে পড়েন। ঔরংজেব মহম্মদ হাদিকে বাংলার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করে তাঁকে করতলব খাঁ উপাধি দিয়ে ১৭০০ সালের নভেম্বরে বাংলায় পাঠান। করতলব বাংলায় আসেন ওই বছরের ডিসেম্বরে। বাংলার দেওয়ান পদের সঙ্গে তিনি মখসুদাবাদের ফৌজদার পদেও নিযুক্ত হন।8

    এই করতলব খাঁ ওরফে মহম্মদ হাদি জন্মসূত্রে কী ছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। স্যার যদুনাথ সরকার মনে করেন, তিনি জন্মলগ্নে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং খুব সম্ভবত দক্ষিণ ভারতীয় ব্রাহ্মণ।9 তবে তিনি যে ব্রাহ্মণ ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ফারসি ইতিহাস মাসির-উল-উমারাতে তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন বলে উল্লেখ আছে।10 খুব অল্প বয়সেই তাঁকে কিনে নেন হাজি শফি ইস্পাহানি নামে এক পারসিক অভিজাত ব্যক্তি। হাজি সাহেব তাঁকে নিজের পুত্রের মতো বড় করে তোলেন এবং তাঁকে মহম্মদ হাদি নাম দেন। হাজি শফি বিভিন্ন সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন পদে নিযুক্ত ছিলেন, যেমন দেওয়ান-ই-তান (তান মানে তলব বা মাইনে), বাংলার দেওয়ান ও দাক্ষিণাত্যের দেওয়ান ইত্যাদি।11

    হাজি শফি সম্ভবত ১৬৯০ সালে মুঘল রাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে পারস্য দেশে ফিরে যান। মহম্মদ হাদিও তাঁর মনিবের সঙ্গে ওদেশে চলে যান। কিন্তু হাজির মৃত্যুর পর তিনি আবার ভারতবর্ষে ফিরে আসেন এবং বেরার প্রদেশের দেওয়ান আবদুল্লা খুরাসানির অধীনে কার্যভার গ্রহণ করেন।12 যেহেতু হাজি শফি এবং আবদুল্লা খুরাসানি দু’জনেই দেওয়ান ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করে মহম্মদ হাদি কিছুদিনের মধ্যেই রাজস্ব ব্যাপারে অত্যন্ত অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন এবং হায়দরাবাদের দেওয়ান হিসেবে যথেষ্ট কৃতকার্য হন। তাই অতি সহজেই তিনি মুঘল সম্রাট ঔরংজেবের নজরে পড়েন এবং সম্রাট তাঁকে বাংলার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না।

    বাংলার দেওয়ানপদে করতলব খাঁর নিযুক্তি তৎকালীন সুবাদার শাহজাদা আজিম-উসশানের মোটেই মনঃপূত হয়নি। এতদিন তিনি নিজেই বাংলার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন— দেওয়ানির দেখাশোনাও তিনিই করতেন। এখন হঠাৎ করতলব খাঁ উড়ে এসে জুড়ে বসায় তিনি খুবই অসন্তুষ্ট কিন্তু যেহেতু করতলবকে স্বয়ং সম্রাট ঔরংজেব নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন, শাহজাদা আজিম মুঘল বাদশাহের পৌত্র হওয়া সত্ত্বেও করার কিছু ছিল না। এখানে মনে রাখা দরকার মুঘল শাসনব্যবস্থায় সুবাদার ও দেওয়ান দু’জনেই সম্রাটের দ্বারা নিযুক্ত হতেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের নিজের শাসন পরিচালনা করতেন। সুবাদার ছিলেন সাধারণ শাসনব্যবস্থা ও সৈন্যবাহিনীর প্রধান, দেওয়ান ছিলেন রাজস্ববিভাগের দায়িত্বে। তাঁর প্রধান কর্তব্য ছিল রাজস্ব সংগ্রহ। তিনি কিন্তু সুবাদারের অধীন ছিলেন না, সোজা মুঘল সম্রাটের কাছেই ছিল তাঁর দায়বদ্ধতা। এহেন অবস্থায় দেওয়ান করতলব খাঁর আগমনে শাহজাদা আজিম খুবই মুশকিলে পড়ে যান কারণ রাজস্ব বিভাগের ওপর তার আর কোনও কর্তৃত্বই থাকল না। ফলে দিল্লির বাদশাহি মসনদের জন্য আসন্ন গৃহযুদ্ধে যোগ দেবার জন্য বাংলা থেকে প্রয়োজনীয় অর্থভাণ্ডার সংগ্রহ করার পথে করতলব খাঁ প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠবে— এটা শাহজাদা সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন। তাই প্রথম থেকেই তিনি করতলব খাঁর প্রতি বিরূপ ছিলেন।

    করতলব বাংলায় এসেই সোজা রাজধানী জাহাঙ্গিরনগরে (ঢাকা) চলে গেলেন এবং সুবাদার আজিম-উস-শানের সঙ্গে দেখা করলেন। তারপরই তিনি দেওয়ানি কাজে মনোনিবেশ করলেন। প্রথমেই তিনি রাজস্ব বিভাগের সব কর্মচারীকে তাঁর অধীনে এবং সুবাদার শাহজাদা আজিমের আওতার বাইরে নিয়ে এলেন। তারপর তিনি রাজস্ব বিভাগে বিভিন্ন সংস্কার সাধন করেন, যাতে রাজস্ব বৃদ্ধি পায় এবং রাজস্বের অপচয় বন্ধ হয়। এ কাজে তিনি খুবই সাফল্য লাভ করেন যার ফলে প্রথম বছরেই তিনি মুঘল সম্রাট ঔরংজেবকে দাক্ষিণাত্যে এক কোটি টাকা পাঠাতে সমর্থ হন।13

    এতে আজিম-উস-শান আরও ক্ষেপে গেলেন এবং করতলব খাঁকে একেবারে সরিয়ে দেবার জন্য মতলব ভাঁজতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নগদি সৈন্যদের (ভাড়াটে সৈন্য যারা নগদ টাকার বিনিময়ে সৈন্যবাহিনীতে কাজ করে) সর্দার আবদুল ওয়াহিদকে বশ করে করতলব খাঁকে হত্যা করার চক্রান্ত করেন। নগদি সৈন্যরা বেশ কিছুদিন তাদের বেতন পায়নি বলে ক্ষুব্ধ ছিল। রাজস্ব বিভাগ থেকেই এই বেতন দেওয়া হত। তাই এজন্য করতলব খাঁকেই দায়ী করা হল এবং চক্রান্তে ঠিক করা হল যে মাইনে আদায় করার ভান করে নগদি সৈন্যরা করতলব খাঁকে রাস্তায় ধরবে এবং হইচই লাগিয়ে দেবে। ওই গণ্ডগোলের মধ্যে সুযোগ বুঝে করতলবকে হত্যা করা হবে।14

    করতলব খাঁ রোজই সকালে সুবাদারের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, কিন্তু তিনি খুব সতর্ক থাকতেন, কখনও একা যেতেন না— সব সময় সশস্ত্র হয়ে কিছু বিশ্বাসী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করতেন। একদিন সকালবেলা তিনি যথারীতি সুবাদারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় হঠাৎ আবদুল ওয়াহিদের নেতৃত্বে নগদি সৈন্যরা করতলবকে ঘিরে ফেলে তাদের বেতন দাবি করতে লাগল এবং প্রচণ্ড গণ্ডগোল শুরু করে দিল। করতলব কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না, তিনি নগদি সৈন্যদের নিয়ে সোজা সুবাদারের কাছে চলে গেলেন। তিনি জানতেন এ চক্রান্ত সুবাদারেরই। তাই তিনি সোজা গিয়ে সুবাদারকে বললেন: ‘আপনিই আমাকে হত্যা করার জন্য এ চক্রান্ত করেছেন। মনে রাখবেন সম্রাট আলমগির খুব দূরে নন [তিনি সবই জানতে পারবেন]। এ রকম জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে সম্রাটের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পায়। সাবধান! আমার প্রাণহানি করলে আপনিও প্রাণে বাঁচবেন না।’15

    শাহজাদা আজিম-উস-শান করতলবের সাহস দেখে ও ঔরংজেবের শাস্তির ভয়ে খুব ঘাবড়ে গেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে একদিকে আবদুল ওয়াহিদ ও তাঁর সৈন্যদের ডেকে প্রচণ্ড ধমক দিলেন এবং তাদের কৃতকার্যের জন্য শাস্তি প্রদানের ভয় দেখালেন। অন্যদিকে ভালমানুষের মতো এ ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানতেন না বলে করতলবের কাছে সাফাই গাইলেন এবং ভবিষ্যতে করতলবের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি দিলেন। করতলব ফিরে এসে সব নথিপত্র তলব করলেন এবং নগদি সৈন্যদের সব প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে তাদের বরখাস্ত করে দিলেন। অন্যদিকে ওয়াকিয়ানবিশকে দিয়ে সব ঘটনার বিবরণ বাদশাহের কাছে পাঠিয়ে দিলেন, নিজেও সমস্ত ঘটনার কথা লিখে সম্রাটকে জানান। সব খবর পেয়ে ঔরংজেব সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদা আজিমকে কড়া ভাষায় লিখে পাঠান: ‘করতলব খাঁ সম্রাটের একজন পদস্থ কর্মচারী। ওর শরীরের বা সম্পত্তির যদি বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়, তা হলে মনে রাখবে আমি তার শোধ তোমার ওপরই তুলব।’16

    আসলে করতলব খাঁর ওপর ঔরংজেবের ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। যেহেতু একমাত্র করতলবই তাঁকে নিয়মিত অর্থ জোগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাই তিনি তাঁর ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এসব কারণে সুবাদার আজিম-উস-শান তাঁর পৌত্র হলেও, তিনি করতলবের ওপর আজিমের কোনও আঘাত বা বিদ্বেষ সহ্য করতে রাজি ছিলেন না। এ সত্যটা করতলব খাঁও উপলব্ধি করেছিলেন এবং তাই সুবাদার আজিমকে উপেক্ষা করতে কোনওরকমের দ্বিধা বোধ করেননি। বাংলায় আসার অল্প কিছুদিন পরেই, বিশেষ করে তাঁর প্রতি আজিম-উস-শানের বিরূপতা দেখে, করতলব ঔরংজেবকে জানান, যে তিনি বাংলায় আসাতে কিছু লোক খুবই অসন্তুষ্ট এবং তারা নানাভাবে সম্রাটকে তাঁর প্রতি বিরূপ করে তোলার চেষ্টা করছে। সেজন্য তিনি ঔরংজেবকে অনুরোধ জানান তিনি যেন তাঁর জায়গায় অন্য লোক নিয়োগ করেন। বোঝাই যাচ্ছে, এ বিষয়ে সম্রাট কিছু না করলে তিনি পদত্যাগ করতে চান। ঔরংজেব সঙ্গে সঙ্গে লিখে পাঠালেন:17

    আপনার বক্তব্য আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। দেওয়ান ও ফৌজদার হিসেবে আপনার পুরোপুরি ক্ষমতা— তাতে কারও হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। আপনার বিরুদ্ধে কারও কোনও অভিযোগই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আপনার ওপর আমার যে আস্থা এবং বিশ্বাস সে বিষয়ে আপনি সন্দেহ করছেন কেন? কোনও শয়তানের অভিসন্ধিই সফল হবে না। আল্লা আমাদের এইসব শয়তানের হাত থেকে নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন।… আপনার প্রতি আমার আস্থার কথা মনে রাখবেন, আমার নির্দেশগুলি খেয়াল রাখবেন, মনে কোনও শঙ্কা রাখবেন না। আরও বেশি মন দিয়ে রাজস্ব আদায় করে যান।

    ঔরংজেব সত্যিই করতলব খাঁর ওপর খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন, বিশেষ করে তাঁর যোগ্যতা ও সততা দেখে ১৭০৪ সালে তিনি তাঁকে লেখেন: ‘একই ব্যক্তি হয়ে আপনি বাংলা ও বিহারের দেওয়ান, ওড়িষ্যার নাজিম ও দেওয়ান। আপনার পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও-সব অঞ্চলে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে এত কাজ করতে পারতাম না। একমাত্র আল্লার প্রসাদধন্য কোনও ব্যক্তিই এত যোগ্যতার অধিকারী হতে পারে।’18

    সে যাই হোক, করতলব খাঁ কিন্তু আজিম-উস-শান সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে পারছিলেন না। তাঁর ভয় হল শাহজাদা সুযোগ পেলেই আবার তাঁর প্রাণহানির চেষ্টা করতে পারেন। তাই তিনি সুবাদার থেকে দূরে কোথাও তাঁর দেওয়ানি কার্যালয় সরিয়ে নিতে মনস্থ করলেন। এজন্য তিনি গঙ্গা (ভাগীরথী) তীরবর্তী মখসুদাবাদকে বেছে নিলেন। অনেক ভেবেচিন্তেই তিনি মখসুদাবাদকে দেওয়ানির পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বলে সিদ্ধান্ত করেন।19 ওটা বাংলার প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বলে ওখান থেকে বাংলার প্রায় সব অংশের ওপর সুষ্ঠুভাবে নজর রাখা যাবে। সেদিক থেকে ঢাকার চেয়ে মখসুদাবাদের অবস্থান অনেক বেশি উপযোগী। তা ছাড়া, করতলব যেহেতু মখসুদাবাদের ফৌজদারও ছিলেন, সেজন্য তিনি ঢাকার চেয়েও ওখানে অনেক বেশি নিরাপদ ছিলেন। ওখানে তিনিই কর্ণধার, মুঘল অমাত্যদের মধ্যে ঢাকাতে তার স্থান ছিল দ্বিতীয়, সুবাদারের ঠিক পরে। মখসুদাবাদে তিনিই প্রধান। এখানে দেওয়ানি কার্যালয় সরিয়ে নেবার স্বপক্ষে তিনি হয়তো এটাও ভেবেছিলেন যে ওখান থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির ওপর নজরদারি করাও অনেকটা সুবিধেজনক হবে। এ সময় কোম্পানিগুলি গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছিল।20

    স্থানটি নির্বাচন করে সুবাদার শাহজাদা আজিম-উস-শানের অনুমতি না নিয়েই, দেওয়ানি কার্যালয়ের সব আমলা-কর্মচারীদের নিয়ে করতলব খাঁ মখসুদাবাদে চলে এলেন। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে তিনি ঢাকা থেকে বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কারদের তাঁর সঙ্গে করে মখসুদাবাদ নিয়ে এলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন বাংলায় জগৎশেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মানিকচাঁদও।21 ওখানে কাছারি ও অন্যান্য যাবতীয় বিভাগের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করে তিনি ওখান থেকেই দেওয়ানির কাজকর্ম পরিচালনা করতে শুরু করে দিলেন। এখানে লক্ষ করার বিষয়, তিনি সুবাদারকে না বলে, এমনকী তাঁর অনুমতি না নিয়েই, মখসুদাবাদে দেওয়ানি স্থানান্তরিত করতে পেরেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন তাঁর ওপর সম্রাট ঔরংজেবের অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস আছে। শাহজাদা তাঁর বিরুদ্ধে সম্রাটের কাছে নালিশ করলেও কোনও ফল হবে না।

    করতলব খাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করার কিছুদিন পরেই ঔরংজেব আজিম-উস-শানকে বাংলা ছেড়ে বিহারে চলে যাবার নির্দেশ দেন। পুত্র ফারুখশিয়রকে ঢাকায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে রেখে শাহজাদা আজিম সপরিবারে পাটনায় আশ্রয় নেন এবং সেখানে থাকাই স্থির করেন। সম্রাটের অনুমতি নিয়ে তিনি নিজের নামানুসারে পাটনার নতুন নামকরণ করেন আজিমাবাদ। অনুমান, তিনি ঢাকা ছেড়ে পাটনা যান ১৭০৩ সালে।22 এর ফলে ঢাকায় সুবাদারের উপস্থিতি আর থাকল না, মখসুদাবাদই সুবার সব কাজকর্মের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠল। এ ভাবে মখসুদাবাদে প্রথমে দেওয়ানি কার্যালয় স্থাপিত হল এবং পরে এটাই সুবার প্রাদেশিক সরকারের কেন্দ্র হয়ে উঠল।

    এখানে স্বাভাবিকভাবেই কৌতুহল জাগতে পারে, করতলব খাঁ মখসুদাবাদে দেওয়ানি স্থানান্তরিত করার আগে জায়গাটা কেমন ছিল? গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজ-উস-সলাতিন থেকে জানা যায়, মখসুস খান নামে এক ব্যবসায়ী প্রথম জায়গাটির উন্নতিসাধন করেন। আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিতে একজন মখসুস খানের নাম পাওয়া যায়, যিনি একজন মুঘল অমাত্য হিসেবে ষোড়শ শতকের শেষদিকে বাংলা ও বিহারে রাজকর্মে নিযুক্ত ছিলেন। মুখসুস খান ওখানে একটি সরাই নির্মাণ করেন এবং স্থানটি তাঁর নামানুসারে মখসুদাবাদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।23 ডাচ পর্যটক ভ্যালেন্টাইনের (Valentijn, ১৬৫৮-৬৪) ম্যাপে মখসুদাবাদকে গঙ্গার দুই শাখার মধ্যবর্তী একটি দ্বীপ হিসেবে দেখানো হয়েছে।24 ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায় লিখেছেন যে মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রবাদ আছে যে সুলতান হোসেন শাহের সময় মুখসূদন দাস নামে এক নানকপন্থী সন্ন্যাসী তাঁকে অসুখ থেকে সুস্থ করে তোলায় তিনি তাঁকে ওই স্থান দান করেন এবং ওই সন্ন্যাসীর নামানুসারে ওই স্থানটির নাম হয় মুখসুদাবাদ বা মখসুদাবাদ।25 মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলে কাশিমবাজারের মতো মখসুদাবাদও কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে এবং সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেটা আরও বাড়তে থাকে। ফলে এখানে শাসনবিভাগের একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়, যেটার উল্লেখ পাওয়া যায় ইংরেজ কোম্পানির এজেন্ট স্ট্রেনশ্যাম মাস্টার (Streynsham Master) ও উইলিয়াম হেজেসের (William Hedges) লেখায়।26

    মখসুদাবাদে দেওয়ানি স্থানান্তরিত করে করতলব খাঁ রাজস্ববিভাগের সংস্কার ও রাজস্ববৃদ্ধিতে মনোযোগ দেন। সব ঠিকঠাক করে বাংলার রাজস্ব নিয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে সম্রাট ঔরংজেবের কাছে যাবেন স্থির করলেন। কিন্তু রাজস্বের হিসেব দাখিল করার জন্য প্রধান কানুনগো দর্পনারায়ণের সই দরকার ছিল। তিনি তাঁর প্রাপ্য তিনলক্ষ টাকা না দিলে সই করতে অস্বীকার করলেন। করতলব খাঁ এক লক্ষ টাকা দিতে রাজি হলেন। বাকিটা দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে এসে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন কিন্তু দর্পনারায়ণ তাতে রাজি হলেন না। করতলব খাঁ অগত্যা দ্বিতীয় কানুনগো জয়নারায়ণকে দিয়ে সইসাবুদ করিয়ে দাক্ষিণাত্যের দিকে রওনা হলেন। বাদশাহি দরবারে পৌঁছে তিনি সম্রাট ঔরংজেব ও তাঁর মন্ত্রীদের প্রচুর পরিমাণ নগদ টাকা ও বাংলা থেকে আনা নানা দুর্লভ সামগ্রী উপহার দিলেন। আর রাজস্বের সব হিসাবপত্র বাদশাহের প্রধান দেওয়ানের কাছে পেশ করলেন।27

    বাদশাহের দেওয়ান হিসাবপত্র পরীক্ষা করে অত্যন্ত প্রীত হলেন এবং করতলব খাঁর কাজকর্মের, বিশেষ করে রাজস্ব বৃদ্ধি করার জন্য, ভূয়সী প্রশংসা করেন। সম্রাট ঔরংজেব করতলব খাঁর ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বহুমূল্য পোশাক, পতাকা, নাগরা ও তরবারি উপহার দিলেন। সর্বোপরি তিনি তাঁকে মুর্শিদকুলি খান উপাধিতে ভূষিত করলেন এবং তাঁর উপাধি অনুসারে মখসুদাবাদের নাম মুর্শিদাবাদ করার অনুমতি দিলেন। মুর্শিদকুলি মুখসুদাবাদে এসে নতুন নাম মুর্শিদাবাদ চালু করলেন এবং সেখানে একটি বাদশাহি টাঁকশালও স্থাপন করেন।28

    কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মুর্শিদকুলি ঠিক কবে মখসুদাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদ নাম চালু করলেন অর্থাৎ ঠিক কবে থেকে মুর্শিদাবাদের পত্তন হল? স্যার যদুনাথ সরকার এক জায়গায় বলছেন ১৭০২ সালের ২৩ ডিসেম্বর সম্রাটের কাছ থেকে করতলব খাঁ মুর্শিদকুলি উপাধি পান।29 তা যদি হয়, তা হলে দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে এসে তিনি মখসুদাবাদের নতুন নাম মুর্শিদাবাদ চালু করেছিলেন ১৭০৩ সালের আগে নয় কারণ দাক্ষিণাত্য থেকে মখসুদাবাদ ফিরতে তো দু’-তিন মাস সময় অবশ্যই লেগেছিল। অন্যত্র স্যার যদুনাথ লিখেছেন (একই প্রবন্ধে) যে করতলব খাঁ মখসুদাবাদে তাঁর দেওয়ানি কার্যালয় স্থানান্তরিত করার অনেক বছর পরে মুঘল সম্রাটের অনুমতি নিয়ে তিনি মখসুদাবাদের নামকরণ করেন মুর্শিদাবাদ।30 কিন্তু তিনি নির্দিষ্টভাবে কোন সালের কথা বলেননি। তারিখ-ই-বংগালা ও রিয়াজ-উস-সলাতিনের বিবরণ অনুযায়ী যে মুর্শিদাবাদের প্রতিষ্ঠা ১৭০৪ সালে। আধুনিক গবেষক আবদুল করিমও মনে করেন যে মুর্শিদাবাদের পত্তন হয় ১৭০৪ সালেই। মনে হয় এটাই ঠিক কারণ মুর্শিদকুলি যখন দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরছেন তখন ইংরেজ কোম্পানির কটকের ভারতীয় প্রতিনিধি (ভকিল—vakil) তাঁর সঙ্গে কটকে দেখা করেন এবং সেটা ১৭০৪ সালের গোড়ার দিকেই। তা ছাড়া মুর্শিদাবাদের টাঁকশালে প্রথম যে মুদ্রা তৈরি হয় তাতেও ১৭০৪ সালই লেখা ছিল। সুতরাং সব দিক থেকে বিবেচনা করে মনে হয় মুর্শিদাবাদের পত্তন হয়েছিল ১৭০৪ সালেই।31

  • তৃতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ : নবাবি আমল

    তৃতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ : নবাবি আমল

    তৃতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ : নবাবি আমল

    নবাবি আমলেই মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ, এ কথা সর্বতোভাবে স্বীকার্য। নবাবি আমল বলতে অবশ্য আমরা স্বাধীন নবাবি আমলের কথাই বলছি অর্থাৎ মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজদ্দৌল্লা পর্যন্ত, তার মানে পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত। তারপর মুর্শিদাবাদে কিছুদিন নবাব অধিষ্ঠিত ছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু সে নবাবরা ইংরেজদের হাতের পুতুল ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। ফলে মুর্শিদাবাদের গৌরবময় দিনের অবসান সিরাজদ্দৌলার পর থেকেই। পলাশির পর ইংরেজরা পর্যায়ক্রমে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয় এবং মুর্শিদাবাদের পরিবর্তে কলকাতা হয়ে ওঠে বাংলার প্রাণকেন্দ্র। ফলে ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে মুর্শিদাবাদ।

    মুর্শিদকুলি খান

    মুর্শিদকুলি শুধু মুর্শিদাবাদ শহরের পত্তনই করেননি, এর উন্নতিকল্পে তাঁর অবদান অনেকখানি। অবশ্য এখানে বলা প্রয়োজন, তখনকার বাংলা তথা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মুর্শিদকুলির সহায়ক হয়েছিল যার ফলে তিনি মুর্শিদাবাদকে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। আমরা আগেই দেখেছি যে মুর্শিদকুলি একই সঙ্গে মুঘল সম্রাট ঔরংজেবের বিশেষ বিশ্বাসভাজন ও প্রীতিভাজন হয়ে উঠেছিলেন যার ফলে স্বয়ং সম্রাটের পৌত্র ও বাংলার সুবাদার শাহজাদা আজিম-উস-শানকে উপেক্ষা করেই তাঁর দেওয়ানি কার্যালয় ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, ঔরংজেব যখন আজিম-উস-শানের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে (মুর্শিদকুলির প্রতি বিরূপতা ও তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য) তাঁকে বাংলা ছেড়ে পাটনা চলে যাবার নির্দেশ দিলেন, তখন শাহজাদা আজিম তাঁর পুত্র ফারুখশিয়রকে বাংলায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে রেখে পাটনা চলে গেলেন। কিন্তু সম্রাট ঔরংজেব ফারুখশিয়রকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন মুর্শিদকুলির পরামর্শমতো রাজকার্য চালান।16 ফলে কার্যত মুর্শিদকুলিই বাংলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদও বাংলায় প্রাদেশিক সরকারের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হল। তাই স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদেরও গুরুত্বও অনেক বেড়ে গেল এবং মুর্শিদাবাদ শহরের বিস্তৃতি ও প্রতিপত্তি সমান তালে বৃদ্ধি পেতে লাগল।

    বস্তুতপক্ষে ১৭০৭ সালে সম্রাট ঔরংজেবের মৃত্যু পর্যন্ত মুর্শিদকুলিই ছিলেন বাংলার সর্বেসর্বা। ঔরংজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সম্রাট হলেন প্রথম বাহাদুর শাহ। তিনি পুত্র আজিম-উস-শানকে আবার বাংলার সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত করলেন। কিন্ত আজিম দিল্লিতে তাঁর পিতার কাছেই থাকতে লাগলেন এবং তাঁর পুত্র ফারুখশিয়রকে নায়েব সুবাদার করে বাংলার শাসনভার তাঁর ওপরই ন্যস্ত করলেন। প্রথম বাহাদুর শাহের রাজত্বের প্রথমদিকে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে মুর্শিদকুলিকে বাংলার ‘ডেপুটি গভর্নর’(সুবাদার) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আজিম-উস- শান তাঁর বহুদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু মুর্শিদকুলির ওপর বদলা নেবার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তাঁর বৃদ্ধ ও দুর্বল পিতা সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহের ওপর তাঁর প্রভাব খাটিয়ে মুর্শিদকুলিকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করলেন। মুর্শিদকুলিকে দাক্ষিণাত্যের দেওয়ান করে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ফলে পুরো দু’বছর, ১৭০৮ থেকে ১৭০৯, তাঁকে বাংলার বাইরে কাটাতে হল।24

    কিন্তু ১৭১০ সালে আবার মুর্শিদকুলিকে বাংলার দেওয়ান করে ফিরিয়ে আনা হল। এর প্রধান কারণ শাহজাদা আজিম-উস-শান বুঝতে পেরেছিলেন যে দিল্লির মসনদের জন্য যে লড়াই আসন্ন, এবং যাতে তিনি নিজে একজন প্রধান অংশগ্রহণকারী হবেন, তাতে যত বেশি সংখ্যক মুঘল মনসবদার ও অমাত্যদের সমর্থন লাভ করতে পারবেন, ততই তাঁর শক্তিবৃদ্ধি হবে। সেজন্য তিনি মুর্শিদকুলির সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে ফেলে তাঁকে নিজের দলে আনার চেষ্টা করলেন। এর ফলেই মুর্শিদকুলি বাংলার দেওয়ান পদে পুনরায় নিযুক্ত হতে পারলেন। আর কাগজে কলমে তখনও বাংলার সুবাদার রইলেন আজিম-উস-শান।30

    তারপর দিল্লিতে চলল রাজনৈতিক পালাবদলের খেলা। সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর (১৭১২) যে গৃহযুদ্ধ শুরু হল, তাতে আজিম-উস-শান নিহত হলেন এবং সম্রাট হলেন জাহান্দার শাহ।৪ তাঁর পরে সম্রাট হলেন ফারুখশিয়র (১৭১৩)। তিনি তাঁর শিশুপুত্র ফরখুন্দা শিয়রকে কাগজে কলমে বাংলার সুবাদার পদে নিযুক্ত করেন এবং মুর্শিদকুলি হলেন বাংলার ডেপুটি সুবাদার। শেষ পর্যন্ত সম্রাট ফারুখশিয়র ১৭১৬/১৭ সালে মুর্শিদকুলিকে জাফরখান নাসিরি উপাধি দিয়ে বাংলার সুবাদার পদে অভিষিক্ত করেন। ১৭২৭ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত মুর্শিদকুলি একাদিক্রমে বাংলার সুবাদার ও দেওয়ান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এভাবে তিনি ১০ বছরের বেশি বাংলার সর্বোচ্চ পদাধিকারী হিসেরে শাসন করে গেছেন। এটা সাধারণ মুঘল শাসনব্যবস্থার যে রীতিনীতি ছিল তার সম্পূর্ণ এবং একমাত্র ব্যতিক্রম। একমাত্র মুর্শিদকুলিই সুবাদার ও দেওয়ান এ দুটি পদের অধিকারী হতে পেরেছিলেন।32 স্যার যদুনাথ সরকার লিখেছেন যে মুর্শিদকুলি ১৭১৭ সালে বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত হন কিন্তু আব্দুল করিম তাঁর গবেষণায় দেখাবার চেষ্টা করেছেন যে সালটা আসলে ১৭১৬, ১৭১৭ নয়। মনে হয় আব্দুল করিমের বক্তব্যই সঠিক।33

    সে যাই হোক, একাধারে বাংলার দেওয়ান ও সুবাদার পদে মুর্শিদকুলির নিযুক্তি মুর্শিদাবাদের ইতিহাসেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ঢাকার বদলে মুর্শিদাবাদই এখন বাংলার রাজধানীতে পরিণত হল। তাই স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদ হয়ে উঠল বাংলার প্রাণকেন্দ্র, রাজতন্ত্র ও শাসনযন্ত্রের সব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এ অবস্থা চলল সিরাজদ্দৌলা পর্যন্ত, অর্থাৎ পলাশির যুদ্ধ অবধি। তারপরই বাংলায় স্বাধীন নবাবি আমলের পরিসমাপ্তি। তারপরের নবাবরা মূলত ইংরেজদের ক্রীড়নক ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। ইংরেজরাও ধীরে ধীরে কলকাতাকে সব ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রস্থল করে তুলল। ফলে মুর্শিদাবাদ স্বাধীন নবাবি আমলের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

    মুর্শিদকুলিই বাংলায় নিজামত বা নবাবির প্রতিষ্ঠাতা। দিল্লির মুঘল বাদশাহদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, তিনি শুধু নিয়মিত বাংলার রাজস্ব দিল্লিতে পাঠিয়ে দিতেন। দিল্লিতে তখন ডামাডোল, একের পর একজন দিল্লির মসনদ দখল করছেন, মুর্শিদকুলি কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। দিল্লিতে যিনিই বাদশাহ হচ্ছেন, মুর্শিদকুলি তাঁকেই রাজস্ব পাঠাচ্ছেন, কোনওরকমের ভেদাভেদ না করে। তিনি জানেন, বাংলার রাজস্ব ছাড়া দিল্লির কোনও বাদশাহেরই চলবে না। তাই তাঁরা কেউই মুর্শিদকুলিকে ঘাঁটাতে যাবেন না, বাংলায় তিনি যা করতে চাইবেন, তাই করতে পারবেন। এভাবেই তিনি বাংলায় নিজামত এবং স্বাধীন নবাবি প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর পর বাংলার অন্য নবাবরাও তাঁর নীতি অনুসরণ করে বাংলা থেকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠিয়েছেন, দিল্লিও বাংলা নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি। নবাব আলিবর্দি খানের রাজত্বের প্রথম কয়েক বছর অবধি নিয়মিত এ রাজস্ব পাঠানো হয়েছিল। মনে হয় ১৭৪০-এর দশকের প্রথম কয়েক বছরের পর, সম্ভবত মারাঠা আক্রমণের জন্য, এ রাজস্ব পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।34

    ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি কার্যালয় স্থানান্তরিত করার পর থেকেই একদিকে যেমন সেখানে লোক সমাগম বেড়ে যায় তেমনই অন্যদিকে শাসনকার্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন দফতরের জন্য নির্মাণকার্যও শুরু হয়ে যায়। মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমিদারদের আমলারা, দেওয়ানি কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সব কানুনগো ও অন্যান্য কর্মচারীরা সবাই ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে আসে। তা ছাড়া বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কার-মহাজনও, যাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান জগৎশেঠ পরিবার, নতুন সুযোগের সন্ধানে ঢাকা থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন।35 এ ছাড়াও, মুর্শিদকুলির রাজস্ব বিভাগের সংস্কারের ফলে যে নতুন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী শ্রেণির আবির্ভাব হয় মুর্শিদাবাদ তাদেরও প্রধান আস্তানা হয়ে ওঠে।36 শুধু তাই নয়, মুর্শিদাবাদ প্রথমে দেওয়ানি কার্যালয় ও পরে রাজধানী হওয়ার ফলে তার গুরুত্ব এতই বেড়ে যায় যে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিও মুর্শিদাবাদের সন্নিকটে, কাশিমবাজারে, তাদের কুঠিগুলিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করে, যদিও অবশ্য তাদের কাছে কাশিমবাজার কুঠিগুলির প্রয়োজনীয়তা কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্র সংগ্রহের জন্য।

    দেওয়ানির পরে যখন মুর্শিদকুলিকে বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত করা হল, তখন মুর্শিদাবাদই বাংলার রাজধানীতে পরিণত হল। ফলে সেখানে শুধু রাজকর্মচারী নয়, ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার থেকে শুরু করে নানারকম অসংখ্য লোকের আনাগোনাও শুরু হয়ে গেল এবং এদের মধ্যে অনেকেই নতুন রাজধানীতে তাদের আস্তানা পাতল। এভাবে মুর্শিদাবাদ বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত্তম শহর হয়ে উঠল। শুধু ভারতীয় বা এশীয় বণিকরা নয়, অনেক বিদেশি বণিকরাও মুর্শিদাবাদে ঠাঁই করে নিল। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আর্মানিরা। মুর্শিদাবাদের পার্শ্ববর্তী সৈয়দাবাদে তারা নিজেদের একটি বসতি স্থাপন করে সেখানে একটি গির্জাও প্রতিষ্ঠা করল।37 ফরাসিরাও এখানে একটি কুঠি তৈরি করে।38 তা ছাড়া মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি কাশিমবাজার বাংলার বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে এশিয়া ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী, সওদাগর, ব্যাঙ্কার-মহাজনদের শুধু নয়, প্রায় সব প্রধান ইউরোপীয় কোম্পানিরও বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে।39 এসব কারণে মুর্শিদাবাদের গুরুত্বও অনেক বেড়ে যায়।

    মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি কার্যালয় নিয়ে আসার পরে স্বাভাবিক কারণেই মুর্শিদকুলি বিভিন্ন দফতরের জন্য নির্মাণকার্য শুরু করে দেন। রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন সলিম জানাচ্ছেন, দুঘরিয়ার ঊষর ও নির্জন প্রান্তরে মুর্শিদকুলি একটা প্রাসাদ, দেওয়ানখানা (Board of Revenue), খালসা খাজাঞ্চিখানা (Court of Exchequer) প্রভৃতি তৈরি করেন।40 তা ছাড়া ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের সুবিধের জন্য তিনি একটি সরাইখানা তৈরি করেন, তার মধ্যে একটি মসজিদও। তিনি যখন বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত হন এবং মুর্শিদাবাদ বাংলার রাজধানীতে পরিণত হয়, তখন সেখানকার নির্মাণকার্য স্বভাবতই অনেক বেড়ে যায়। তিনি মুর্শিদাবাদে একটি টাঁকশালও স্থাপন করেন এবং সেখানে যে মুদ্রা তৈরি হত তাতে লেখা থাকত ‘মুর্শিদাবাদ টাঁকশালে তৈরি’।41 তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে মুর্শিদাবাদের পূর্ব প্রান্তে তাঁর খাস তালুকে তিনি একটি খাজাঞ্চিখানা, একটি কাটরা ও মসজিদ এবং বিরাট একটি জলাশয় নির্মাণ করেন। ওই মসজিদের সিঁড়ির তলায় তিনি নিজের সমাধিক্ষেত্রও বানিয়ে নেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ঐখানে সমাধিস্থ করা হয়।42 এটি ‘জাফর খানের কাটরা’ নামে পরিচিত।

    মুর্শিদকুলির সময় মুর্শিদাবাদের নানারকমের উৎসব ও জাকজমক ছিল দেখবার মতো। তার মধ্যে একটি ছিল পুণ্যাহ, চৈত্র মাসের শেষে জমির রাজস্ব আদায় শেষ হওয়ার পর বৈশাখের প্রথমদিকে হত পূণ্যাহ। ওইদিন মুর্শিদাবাদে সব জমিদাররা বা তাদের প্রতিনিধিরা হাজির হত। মহাসমারোহে চলত পুণ্যাহের উৎসব।43 বাংলা থেকে দিল্লিতে রাজস্ব পাঠানোর ব্যাপারটাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রত্যেক বছরই মুর্শিদকুলি রাজস্ব বাবদ নগদ ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা করে পাঠাতেন। তা ছাড়াও খালসা জমি থেকে প্রাপ্ত আয় এবং বাংলা থেকে বহুবিধ চিত্তাকর্ষক জিনিসপত্র রাজস্বের সঙ্গে যেত। এ সবই দু’শোটি শকটে বোঝাই করে ছ’শো অশ্বারোহী ও পাঁচশো পদাতিক সৈন্যের পাহারায় মুর্শিদকুলি নিজে মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। তবে সবচেয়ে বড় জাঁকজমক দেখা যেত হজরত মহম্মদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে। এটা হত রবি-উল-আওয়াল মাসের পয়লা তারিখ থেকে বারো তারিখ পর্যন্ত। এ ক’দিন নবাব মুর্শিদাবাদ ও নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে জ্ঞানীগুণী, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধুসন্ত, ফকির, শেখ, সৈয়দ, ইত্যাদি বিভিন্ন স্তরের লোকজনকে মজলিসে নেমন্তন্ন করে সবাইকে পানাহারে আপ্যায়িত করতেন। শুধু তাই নয়, ওই ক’দিন ভাগীরথীর দক্ষিণে লালবাগ থেকে পশ্চিম তীরের উত্তরে শাহিনগর পর্যন্ত নদীর দু’ধারেই হাজার হাজার চিরাগবাতি দিয়ে সাজানো হত। ওই সব চিরাগের আলোতে মসজিদ, মিনার, গাছপালায় কোরানের শ্লোক ও নানাবিধ কবিতা ফুটে উঠে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হত। মুর্শিদকুলির নির্দেশে নাজির আহমেদ চিরাগের আলো জ্বালাবার জন্য প্রায় এক লক্ষ লোক নিয়োগ করতেন। সন্ধের সময় একবার তোপধ্বনি করে আলো জ্বালাবার সংকেত দেওয়া হত এবং সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার চিরাগবাতি জ্বলে উঠে এক অপূর্ব সুন্দর বাতাবরণের সৃষ্টি করত। রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন সলিমের ভাষায় ‘producing an illusion as if a sheet of light had been unrolled, or as if the earth had become a sky studded with stars’.

    মুঘলধারা অনুসরণ করে মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদে নবাবি দরবারও শুরু করেন। বলা বাহুল্য এ দরবারে রাজ্যের অমাত্যরা শুরু করে ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী, বিদেশি পর্যটক, ইউরোপীয় কোম্পানিরগুলির প্রতিনিধিরা নিয়মিত উপস্থিত হতেন। মুর্শিদকুলির রাজস্ব ও শাসনবিভাগের সংস্কারের ফলে বাংলায় শুধু নতুন এক ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার-মহাজন শ্রেণির আবির্ভাব হয়নি, নতুন এক বড় বড় জমিদার শ্রেণি ও একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও উদ্ভব হয়। এদের মধ্যে অনেকেরই নবাবি দরবারে যাতায়াত ছিল। এ দরবারের জাঁকজমক পরবর্তী নবাবদের সময় অনেক বেড়ে যায়। যেহেতু মুর্শিদকুলি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, সেজন্য ধর্মের প্রতিপালনেও তিনি যথেষ্ট নজর দিতেন, যেটা তাঁর পরে বাংলার নবাবদের মধ্যে বিশেষ দেখা যায়নি। রোজ কোরানপাঠ ও মালাজপ করার জন্য তিনি আড়াই হাজার কোরানে পারদর্শী ব্যক্তি ও তসবি (মালাজপক) নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর নিজের রসুইখানা থেকে রোজ দু’বেলা এদের খাবার পরিবেশন করা হত।44

    যতদূর জানা যায়, তাতে মনে হয় মুর্শিদকুলির সময় মুর্শিদাবাদের সাধারণ লোকদের অবস্থা বেশ ভালই ছিল। এখানে প্রথমে দেওয়ানি ও পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে নানারকমের নির্মাণকার্য এবং ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী, জমিদার, অমাত্য এ সবের আনাগোনার ফলে কাজকর্মের এবং আয়ের পথও বেশ সুগম হয়। তা ছাড়া মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদ থেকে (সারা বাংলা থেকেও বটে) বাইরে চাল রফতানি একদম বন্ধ করে দেন। অথচ বহুদিন থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে, এমন কী লোহিত সাগর ও পারস্য সাগর অঞ্চলেও, বাংলা থেকে চাল রফতানি হত।45 যাই হোক, মুর্শিদকুলি চাল রফতানি বন্ধ করার ফলেই সম্ভবত তাঁর সময় মুর্শিদাবাদে চালের দাম ছিল, গোলাম হোসেন সলিমের তথ্য অনুযায়ী, টাকায় ৫ থেকে ৬ মণ, যদিও সলিমুল্লা বলছেন, টাকায় ৪ মণ। সে অনুপাতে অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও ছিল সস্তা। ফলে রিয়াজের লেখক বলছেন, মুর্শিদাবাদের লোকেরা তখন মাসে এক টাকা খরচ করলেই পোলাও, কালিয়া খেতে পারত। এটা হয়তো অত্যুক্তি, যদিও এ থেকে অনুমান করা যায় সাধারণ লোকদের অবস্থা বেশ স্বচ্ছলই ছিল।46

    এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মুর্শিদকুলির আমলে বাঙালি হিন্দুদের অবস্থার বেশ উন্নতি হয়। মুসলমান রাজত্ব হলেও তিনি বিশেষ করে রাজস্ব বিভাগে বাঙালি হিন্দুদেরই শুধু নিযুক্ত করেছিলেন। তার অন্যতম কারণ অবশ্য বাঙালি হিন্দুরা যেমন ফারসি ভাষা আয়ত্ত করেছিল, তেমনি রাজস্বের ব্যাপারেও তাদের বেশ দক্ষতা ছিল। তা ছাড়া মুর্শিদকুলির ধারণা ছিল হিন্দুরা রাজস্বের হিসেবে গরমিল করলে বা তা আত্মসাৎ করলে তিনি তাদের কড়া শাস্তি দিতে পারবেন, যেটা মুসলমান কর্মচারী হলে তাঁর পক্ষে করা অসুবিধেজনক ছিল। শাস্তির ভয়ে হিন্দুরা তহবিল তছরূপ বা রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে কোনওরকমের অবহেলা করবে না। তারিখ-ই-বংগালার লেখক সলিমুল্লা লিখছেন:47

    Murshed Kuli Khan employed none but Bengally Hindoos in the collection of revenues, because they are most easily compelled by punishment to discover their malpractices, and nothing is to be apprehended from their pusillanimity.

    বলা বাহুল্য, মুর্শিদাবাদে সদর দেওয়ানি কার্যালয় অবস্থিত হওয়ার ফলে উক্ত কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে যারা উচ্চপদস্থ, তাদের মধ্যে অনেকেই মুর্শিদাবাদেই বসবাস করতে শুরু করে। তাতে মনে হয় মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যায় সাম্প্রদায়িক অনুপাতে অনেকটা ভারসাম্য দেখা যায়। রিয়াজের লেখক বলছেন এ সময় মুর্শিদাবাদের জনসাধারণ নবাবদের কল্যাণে দিল্লি তথা উত্তর ভারতের লোকদের সঙ্গে মেলামেশা ও কথাবার্তা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেদের চালচলন, কথাবার্তা ও ব্যবহারে দিল্লি ও উত্তর ভারতের লোকদের মতো অনেকটা পরিশীলিত হয়ে ওঠে, যেটা বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে দেখা যায় না।48

    সুজাউদ্দিন

    মুর্শিদকুলির মৃত্যুর (১৭২৭) পর তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর দৌহিত্র সরফরাজ খান বাংলার মসনদে বসেন। কিন্তু তাঁর বৃদ্ধ পিতা সুজাউদ্দিন খান, যিনি তখন উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর বা ছোট নবাব ছিলেন, মুর্শিদকুলির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মসনদের লোভে মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে আসেন এবং মুর্শিদকুলির প্রাসাদ চেহেল সুতুনে (‘palace of forty pillars’—চল্লিশ স্তম্ভের প্রাসাদ— মুর্শিদকুলির তৈরি) নিজেকে বাংলার সুবাদার বা নবাব হিসেবে ঘোষণা করেন। সরফরাজ কিন্তু এটা মোটেই মেনে নিতে চাননি এবং সুজাউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। তাঁর চরিত্রের যতই দোষ থাক, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মাতৃভক্ত। তাঁর মা, সুজাউদ্দিনের পত্নী, জিন্নতউন্নেসা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা ও গুণবতী মহিলা। তাই স্বামী সুজাউদ্দিনের উচ্ছৃঙ্খল চরিত্র ও নারী সম্ভোগে চরম আসক্তি দেখে তাঁর ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে স্বামীকে ছেড়ে তাঁর পিতার কাছে চলে আসেন। কিন্তু সরফরাজ যখন তাঁর পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে চাইলেন, তখন তাঁর দিদিমা, মুর্শিদপত্নী নাসিরা বানু বেগম, ও মা জিন্নতউন্নেসা তাঁকে তা থেকে এই বলে নিবৃত্ত করলেন যে সুজাউদ্দিন বৃদ্ধ হয়েছেন, বেশিদিন রাজত্ব করতে পারবেন না। তাই কিছুদিনের মধ্যে সরফরাজ নবাব হতে পারবেন— সুতরাং শুধু শুধু রক্তক্ষয়ের প্রয়োজন নেই। সরফরাজ দিদিমা ও মায়ের কথা মেনে নিয়ে, পিতা সুজাউদ্দিনকে নবাব/সুবাদার হিসেবে স্বীকার করে নিলেন।49

    মসনদে বসার কিছুদিনের মধ্যেই সুজাউদ্দিন শুধু ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দিলেন না, সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদ দরবারকে নতুন করে সাজিয়ে জাঁকজমক পূর্ণ করে তুলতে লেগে গেলেন। বয়স হয়ে গেলেও তিনি জীবনের আনন্দসম্ভোগ ছেড়ে দিতে একেবারেই রাজি ছিলেন না। বরং নবাব হওয়ার পর ক্ষমতা ও অর্থের অধিকারী হয়ে তাতে আরও ডুবে গেলেন। তাঁর আনুষঙ্গিক হিসেবে তিনি মুর্শিদাবাদকে ঢেলে সাজাতে চাইলেন। মুর্শিদকুলির তৈরি প্রাসাদ ও অন্যান্য ইমারত ছোট ছোট বলে তাঁর একেবারে পছন্দ ছিল না। তাই তিনি মুর্শিদকুলির প্রাসাদ ভেঙে একটি প্রশস্ত প্রান্তরে বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তা ছাড়াও তিনি একটি অস্ত্রাগার, একটি অত্যুচ্চ তোরণ, একটি দেওয়ানখানা (revenue court), চল্লিশটি স্তম্ভের ওপর চেহেল-সুতুন নামে একটি প্রাসাদ (palace of forty pillars), একটি ব্যক্তিগত দফতর (private office– খিলওয়াত খানা), একটি জুলুসখানা (reception hall) ও একটি খালিসা কাছারি (court of exchequer— ফরমানবাড়ি) নির্মাণ করেন। শুধু তাই নয়, মুর্শিদকুলির সময়কার রাজস্ব বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী নাজির আহমেদকে ফাঁসিতে ঝোলাবার পর মুর্শিদাবাদের অদূরে ভাগীরথী তীরে তিনি যে মসজিদ ও উদ্যান নির্মাণ শুরু করেছিলেন, সুজাউদ্দিন সেটা সম্পূর্ণ করেন। সেখানেও তিনি প্রাসাদ, জলাশয় ইত্যাদি নির্মাণ করেন এবং তাঁর নাম দেন ফরাহবাগ বা ফর্হাবাগ। সেখানে তিনি সারা বছর পিকনিক ও নানারকমের আনন্দ উৎসব করতেন। আর বছরে একবার তাঁর দরবারের উচ্চপদস্থ ও শিক্ষিত কর্মচারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করতেন।50

    সরফরাজ

    নবাব সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর (১৭৩৯) সরফরাজ নবাব হলেন। যদিও সমসাময়িক কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেছেন যে তিনি তাঁর পিতার মতোই নারীসম্ভোগ ও বিলাসব্যসনে লিপ্ত ছিলেন,51 তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলি খান কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য কথা লিখছেন। ইউসুফ আলির ভাষ্য অনুযায়ী সরফরাজের ভোগবিলাসের প্রতি কোনও আসক্তি ছিল না, তিনি নিয়মিত দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন।52 সে যাই হোক, তাঁর সময় মুর্শিদাবাদ দরবারে বিশেষ জাঁকজমকের ব্যবস্থা তেমন দেখা যায় না। তাঁর পিতার মতো প্রাসাদ, ইমারত ইত্যাদি নির্মাণও তাঁর রাজত্বে চোখে পড়ে না। এর প্রধান কারণ অবশ্য তিনি মাত্র বছরখানেকই রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। তিনি মসনদে বসার পরই সুজাউদ্দিনের দরবারের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী তিন অমাত্য/পারিষদ, যাঁদের ‘ত্রয়ী’ বলা হয়— দেওয়ান আলমচাঁদ, ব্যাঙ্কার জগৎশেঠ ফতেচাঁদ ও সৈয়দ আহমেদ— এবং যাঁদের হাতে নবাব সুজাউদ্দিনের সময় বাংলার শাসনক্ষমতাই চলে গেছল, তাঁরা সরফরাজকে সরিয়ে আলিবর্দিকে বাংলার নবাব করার ষড়যন্ত্র করেন। আলিবর্দি, যাঁকে সুজাউদ্দিন বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন, গিরিয়ার যুদ্ধে (১৭৪০ সালে) সরফরাজকে পরাজিত ও নিহত করে বাংলার মসনদ দখল করে নেন।

    আলিবর্দি খান

    আলিবর্দির শাসনকালে মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার ওপর দিয়ে বিরাট ঝড় বয়ে যায়। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত মারাঠারা প্রায় প্রত্যেক বছরই বাংলায় লুঠতরাজ চালায়। তাই আলিবর্দি মারাঠা আক্রমণ প্রতিহত করতে তাঁর রাজত্বের অনেকটা সময়ই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। তা ছাড়া, এ সময় তাঁকে বিহারে আফগান বিদ্রোহেরও সম্মুখীন হতে হয়। ফলে তাঁর সময় মুর্শিদাবাদ দরবারের জাঁকজমক তেমন চোখে পড়ে না। মারাঠা আক্রমণের ঢেউ মুর্শিদাবাদেও আছড়ে পড়ে। যেহেতু মারাঠাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল টাকাকড়ি ও ধনসম্পত্তি সংগ্রহ করা এবং যেহেতু রাজধানী মুর্শিদাবাদে নবাব ও তাঁর ধনী অমাত্যরা ছাড়াও বহু বড় বড় ধনী ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ীদের আবাস, তাই মারাঠাদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মুর্শিদাবাদ। ফলে এ সময় মুর্শিদাবাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ব্যাহত হয়, কারণ মারাঠাদের লুঠতরাজের ভয়ে বড় ব্যাঙ্কার-মহাজন-ব্যবসায়ী মুর্শিদাবাদ ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যেত এবং এ কারণে মুর্শিদাবাদে নগদ টাকা ও ধার জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। দু’-একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে।

    ১৭৪২ সালের ৭ জুন কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠিয়ালরা কলকাতায় জানাচ্ছে যে মারাঠা আক্রমণের ভয়ে জগৎশেঠরা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে গেছেন, তাই কোনও শরাফ বা মহাজনই মুর্শিদাবাদে থাকা নিরাপদ মনে করছে না। একমাত্র জগৎশেঠরা ফিরে এলে তারা নিশ্চিন্ত বোধ করবে। ফলে মুর্শিদাবাদের বাজারে নগদ টাকার যথেষ্ট অভাব দেখা দিয়েছে, ধার পাওয়াও দুষ্কর হয়ে উঠেছে। তাই নবাব আলিবর্দি জগৎশেঠকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।53 ১৪ জুন কাশিমবাজার থেকে কুঠিয়ালরা জানাচ্ছে, জগৎশেঠ ফিরে এসেছেন, তা দেখে অন্য ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কারও, তাই বাজারে টাকার আর কোনও অভাব নেই।54 আবার ১৭৪৩ সালে মারাঠা আক্রমণের আশঙ্কায় জগৎশেঠরা যখন মুর্শিদাবাদ থেকে পালালেন, তখন ওই বছর জুন মাসে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি থেকে জানাচ্ছে যে ‘এখানে কোনও ধার পাওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে কারণ জগৎশেঠরা শহর ত্যাগ করার ফলে বাজারে নগদ টাকার নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছে।’55 আবার ২ জুলাই তারা লিখছে, ‘জগৎশেঠ ফতেচাঁদ মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন এবং কাশিমবাজারে এখন টাকার প্রাচুর্য, ধার পাওয়াও অনেক সহজ।’56 ১৭৪২ সালে মীর হাবিবের প্ররোচনায় মারাঠারা মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করে লুঠতরাজ চালায়, জগৎশেঠের বাড়ি থেকে তারা মূল্যবান জিনিসপত্র ছাড়াও নগদ ২ কোটি টাকা লুঠ করে নিয়ে যায় (মুজাফফরনামার লেখক করম আলির ভাষ্য অনুযায়ী ৩ লক্ষ)।57

    তবে মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের অর্থনীতি ও শিল্পবাণিজ্যে এক বিরাট বিপর্যয় দেখা দেয় বলে অনেক ঐতিহাসিকের যে অভিমত, তা কিন্তু অনেকাংশেই অতিরঞ্জিত।58 মারাঠা আক্রমণ ও লুঠতরাজ কিছুটা বিপর্যয় ঘটিয়েছিল সন্দেহ নেই, তবে সেটা সাময়িক এবং কোনও কোনও অঞ্চলেই শুধু সীমাবদ্ধ ছিল। মারাঠারা বাংলা ও মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করত বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়— বর্ষা শুরু হবার আগেই তারা বাংলা থেকে ফিরে যেত এবং বর্ষা শেষ হবার পর আবার ফিরে আসত। ফলে বাংলার কৃষক কারিগররা মারাঠারা চলে যাবার পর তাড়াতাড়ি তাদের কাজকর্ম শুরু করে দিত আবার মারাঠারা ফিরে আসার আগে ফসল তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেত। তা ছাড়া মারাঠারা মোটামুটি একটি নির্দিষ্ট পথ ধরেই আক্রমণ করতে আসত এবং সে পথের দু’ধারেই শুধু লুঠতরাজ চালাত।59 ফলে মারাঠা আক্রমণ মুর্শিদাবাদ তথা বাংলায় দীর্ঘস্থায়ী কোনও বিপর্যয় ঘটাতে পারেনি।60

    ১৭৫১ সালে মারাঠাদের সঙ্গে আলিবর্দির চুক্তি হয়ে যাবার পর বাংলা তথা মুর্শিদাবাদে মারাঠা আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আলিবর্দি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারলেন এবং দরবারের জাঁকজমকের দিকে নজর দিলেন। এ সময়কার একটি পুণ্যাহের বিবরণ দিয়েছেন তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলি। সেদিন চারশোর বেশি ব্যক্তিকে, যাদের মধ্যে জমিদার, অমাত্য, রাজকর্মচারী সবাই ছিল, আলিবর্দি তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী খেলাত বা সম্মান পোশাক প্রদান করেন। তারপর সবাইকে ভুরিভোজে অ্যাপ্যায়িত করা হয়। ওইদিন নবাব তাঁর প্রাসাদে সোনা দিয়ে মোড়া খুঁটির ওপর লাগানো, সোনার সুতো দিয়ে এমব্রয়ডারি করা সামিয়ানার তলায় স্বর্ণখচিত সিংহাসনে বসে জমিদারদের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব গ্রহণ করেন।61

    মারাঠা আক্রমণ সত্ত্বেও আলিবর্দির সময় যে মুর্শিদাবাদের যথেষ্ট উন্নতি ও বিস্তার হয়েছিল, তার প্রমাণ মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলির বিবরণ থেকে পাওয়া যায়। করম আলি লিখেছেন:62

    The city of Bengal [i.e. Murshidabad] in his reign extended over 12 kos [24 miles] in length and 7 kos [14 miles] in breadth; in addition to this, many rich men had built pleasure-houses outside the city. Twelve persons were entitled to play the naubat morning and evening. Many kinds of people, high and low, and all classes of artisans and men of all skill and letters were assembled in this city.

    বস্তুতপক্ষে প্রায়-সমসাময়িক ফারসি ইতিহাস থেকে জানা যায় যে মারাঠাদের বছরে ১২ লক্ষ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শান্তি কিনে নেবার পর আলিবর্দি বাংলা থেকে মারাঠা আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন মুছে দেবার প্রতি খুবই যত্নবান হয়ে পড়েন। জনৈক ফারসি ঐতিহাসিকের মন্তব্য, আলিবর্দি এ কাজ করেছেন ‘with judgement and alacrity and to the repose and security of his subjects, and never after-wards deviated in the smallest degree from those principles’.63

    সিরাজদ্দৌল্লার পনেরো মাসের স্বল্প রাজত্বেও মুর্শিদাবাদে জাঁকজমক ও বৈভবের কোনও ঘাটতি ছিল না। নবাবদের প্রাসাদ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের জন্য মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এ প্রাসাদ হীরাঝিলের প্রাসাদ নামে পরিচিত হয়। আলিবর্দির সময়কার মতো তাঁর সময়েও মুর্শিদাবাদ দরবারে এবং রাজপ্রাসাদে মহাসমারোহে হোলি ও অন্যান্য উৎসব পালিত হত। তাঁর কাছে হোলি উৎসবের এমনই আকর্ষণ ছিল যে ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের সন্ধি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) করেই তিনি তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদ এসে মনসুরগঞ্জের প্রাসাদে হোলিতে মেতে ওঠেন।64

    মুর্শিদাবাদের নবাব ও বণিকরাজাদের (merchant princes) সঞ্চিত ধনসম্পদ প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। মুর্শিদকুলির সময় থেকে আলিবর্দির রাজত্বের প্রথম দিক অর্থাৎ ১৭৪০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত দিল্লিতে মুঘল বাদশাহের কাছে রাজস্ব বাবদ বছরে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা পাঠিয়েও নবাবের কোষাগারে প্রচুর অর্থ সঞ্চিত হত। শুধু নবাব নন, তাঁর আত্মীয় পরিজন ও অমাত্যরাও বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছিল। মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলির ভাষ্য অনুযায়ী আলিবর্দি-কন্যা ও ঢাকার নবাব নওয়াজিস মহম্মদের পত্নী ঘসেটি বেগমের মোতিঝিল প্রাসাদ থেকে সিরাজদ্দৌল্লা তাঁকে বিতাড়িত করার পর সেখান থেকে হিরে জহরত বাদ দিয়েই নগদ ৪ কোটি টাকা ও ৪০ লক্ষ মোহর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এক কোটি টাকা মূল্যের সোনা-রুপোর নানা বাসনও মোতিঝিল থেকে সিরাজ কবজা করেছিলেন।65 এতে অত্যুক্তি থাকলেও অনেকটাই সত্য আছে বলে মনে হয়।

    পলাশিতে সিরাজদ্দৌল্লার পরাজয়ের পর ইংরেজরা মুর্শিদাবাদে নবাবের কোষাগারে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিল যে ওখানে শুধুমাত্র সোনা-রুপো মিলে ২ কোটি টাকা সঞ্চিত ছিল। তা ছাড়াও, তারিখ-ই-মনসুরীর লেখকের মতে, নবাবের হারেমে লুকোনো যে ধনসম্পদ ছিল, সোনা, রুপো, হিরে, জহরত মিলে তার মূল্য কম করে ৮ কোটি টাকা।66 মুর্শিদাবাদের বণিকরাজা জগৎশেঠদের ব্যবসার মূলধনই ছিল আনুমানিক ৭ কোটি (William Bolts)67 থেকে ১৪ কোটি টাকার (N. K. Sinha)68 মতো আর তাদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল ৫০ লক্ষ টাকা।69 পলাশিতে ইংরেজ বিজয়ের পর রবার্ট ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ দেখে প্রায় হতবাক। তিনি লিখেছেন:70

    The city of Murshidabad is as extensive, populous and rich, as the city of London, with this difference that there are individuals in the first possessing infinitely greater property than any of the last city.

    একটি অনুমান অনুযায়ী ১৭৬০-এর দশকে লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল ৭৫০,০০০-এর মতো।71 ক্লাইভের বক্তব্য যদি ঠিক হয়, তা হলে তখন মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যাও ওরকমই ছিল।

    এখানে উল্লেখযোগ্য, ১৭৭২ সালে লন্ডনে একটি পার্লামেন্টারি কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ক্লাইভ বলেছিলেন:72

    Consider the situation in which the victory at Plassey had placed me! A great prince was dependent on my pleasure; an opulent city lay at my mercy; its richest bankers bid against each other for my smiles; I walked through vaults which were thrown open to me alone, piled on either hand with gold and jewels! Mr. Chairman, at this moment I stand astonished at my moderation.

    এ থেকে স্পষ্ট যে ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ নবাবদের কোষাগারে সঞ্চিত ধনসম্পদ দেখে একেবারে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন।

  • চতুর্থ অধ্যায় : বণিকরাজা

    চতুর্থ অধ্যায় : বণিকরাজা

    চতুর্থ অধ্যায় : বণিকরাজা

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের যে সমৃদ্ধি তাতে ওখানকার বণিকরাজাদের (mer-chant princes) অবদান অনস্বীকার্য। এই বণিকরাজারা একাধারে সওদাগর, ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কার, মহাজন-—সব কাজই এঁরা করতেন। এঁরা শুধু প্রভূত ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন না, বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি ও মুর্শিদাবাদ দরবারে এঁদের প্রভাব ছিল প্রবল। এঁদের রাজকীয় আচার আচরণ ও জীবনযাত্রা দেখে অনেক ইউরোপীয় পর্যটক এঁদের ‘বণিকরাজা’ হিসেবেই গণ্য করতেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের শেষ তিন দশকে বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতি এবং সে জন্যই কিছুটা বাংলার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এঁরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসেও এঁদের গুরুত্ব অনেকখানি। আবার অন্যদিকে পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে এঁদের ভূমিকাও নিতান্ত নগণ্য নয়। এই বণিকরাজাদের মধ্যে জগৎশেঠদের মূল আস্তানা ছিল মুর্শিদাবাদে; অন্য দু’জনের মধ্যে উমিচাঁদের কলকাতা আর আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের হুগলি। তবে যেহেতু এই বণিকরাজাদের মুর্শিদাবাদের দরবারে নিত্য আনাগোনা ছিল, সেজন্য এই তিনজন বণিকরাজাকেই মুর্শিদাবাদের লোক বলে গণ্য করা যেতে পারে।

    বণিকরাজাদের মধ্যে জগৎশেঠরা অষ্টাদশ শতকের প্রায় গোড়া থেকেই বাংলার অর্থনীতিতে বিশিষ্ট ভূমিকা নিতে শুরু করেছিলেন, উমিচাঁদ ১৭৩০-র দশক থেকে আর খোজা ওয়াজিদ ১৭৪০-র দশক থেকে। বাংলার বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রশাসনে এই তিন বণিকরাজারা মিলে একাধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার টাকার বাজার ছিল এঁদেরই হাতে এবং এঁরাই একদিকে শিল্পবাণিজ্য ও অন্যদিকে নবাব সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতেন। মুর্শিদাবাদের নবাবদের আনুকূল্যে বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের একচেটিয়া ব্যবসা ও অন্যান্য বেশ কিছু বাণিজ্যিক সুযোগসুবিধা করায়ত্ত করে এঁরা বাংলার শিল্পবাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির সঙ্গেও ছিল তাঁদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। কোম্পানিগুলি এঁদের মাধ্যমে শুধু যে রফতানি পণ্য সংগ্রহ করত তা নয়। তারা এঁদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা ধার করে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালাত। এঁদের কাছেই তারা ইউরোপ থেকে পাঠানো সোনা রুপো বিক্রি করে নগদ টাকা জোগাড় করত। তবে এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে এই বণিকরাজাদের উত্থান, প্রভাব ও প্রতিপত্তির প্রধান সোপান ছিল মুর্শিদাবাদ নবাবদের দাক্ষিণ্য। নবাবদের আনুকূল্যেই এঁরা এতটা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।

    এই বণিকরাজাদের মধ্যে সবদিক থেকে অগ্রগণ্য ছিলেন জগৎশেঠরা। এঁদের বলা হয় ‘Rothchilds of the East’। রাজস্থানের মারওয়ার অঞ্চলের নাগর থেকে এঁদের পূর্বপুরুষ হীরানন্দ শাহু ভাগ্যান্বেষণে ১৬৫২ সালে পাটনা চলে আসেন। তাঁর সাত পুত্রের জ্যেষ্ঠ মানিকচাঁদ তখনকার বাংলার রাজধানী ঢাকায় এসে মহাজনি ব্যবসা শুরু করেন। এঁরা ছিলেন শ্বেতাম্বর জৈন।46

    ঢাকায় মানিকচাঁদের সঙ্গে নবাগত দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। মুর্শিদকুলি যখন বাংলার তৎকালীন সুবাদার আজিম-উস-শানের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ১৭০৪ সালে দেওয়ানি দফতর ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন, তখন তার সঙ্গে মানিকচাঁদও ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। তখন থেকেই মুর্শিদকুলির আনুকূল্যে জগৎশেঠদের উন্নতির শুরু—তাঁদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁদের রমরমা এই মানিকচাঁদ ও তার উত্তরসূরী ফতোচাঁদের সময়। ১৭১৪ সালে মানিকচাঁদের মৃত্যু হওয়ার পর তাঁর ভাগ্নে ফতেচাঁদ গদিতে বসেন। ফতেচাঁদের সময়ই জগৎশেঠরা প্রভাব ও প্রতিপত্তির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছয়। সম্ভবত মুর্শিদকুলির অনুরোধে মুঘল সম্রাট ১৭২২ সালে ফতেচাঁদকে ‘জগৎশেঠ’ (Banker of the World) উপাধিতে ভূষিত করেন। এই উপাধি বংশানুক্রমিক।

    প্রায় তিরিশ বছর ধরে বাংলার বাণিজ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব বিস্তার করে জগৎশেঠ ফতেচাঁদ ১৭৪৪ সালে মারা যান। তাঁর উত্তরাধিকারী হন তাঁর দুই পৌত্র জগৎশেঠ মহতাব রায় ও মহারাজা স্বরূপচাঁদ। ১৭৬৩ সালে মীরকাসিমের আদেশে গঙ্গাবক্ষে তাঁদের সলিল সমাধি হয়।48 বাংলায় জগৎশেঠদের বিপুল আয়, প্রচও ক্ষমতা ও বিশেষ মর্যাদার কতগুলো উৎস ছিল। সেগুলি হল: মুর্শিদাবাদ ও ঢাকার টাঁকশালে মুদ্রা তৈরির প্রায় একচ্ছত্র অধিকার, বাংলার রাজস্বের দুই-তৃতীয়াংশ জমা নেওয়ার অনুমোদন, মুদ্রা বিনিময়ের হার ধার্য করার ক্ষমতা ও সুদে টাকা ধার দেওয়ার মহাজনি ব্যবসা। বাংলার সুবাদার মুর্শিদকুলির প্রচ্ছন্ন সমর্থনে জগৎশেঠরা ১৭২০ সাল নাগাদ টাঁকশালের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। তার প্রমাণ মেলে ১৭২১ সালে লেখা কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের চিঠি: ‘…Futtichund having the entire use of the mint, no other shroff dare buy an ounce of silver.’50

    ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বেশ কিছুদিন ধরেই টাঁকশালে মুদ্রা তৈরির অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছিল। এই মর্মে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠিকে কোম্পানি অনেকবার নির্দেশ পাঠায় তারা যেন নবাবের কাছ থেকে এ জন্য অনুমতি জোগাড় করার চেষ্টা করে। কাশিমবাজার কাউন্সিল নবাবের দরবারের গণ্যমান্য অমাত্যদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করে। কিন্তু ওটা যে হওয়ার নয় তা বুঝতে পেরে তারা ফোর্ট উইলিয়ামকে জানাল যে: “We are informed that while Futtichund is so great with the Nabab, they [the English] can have no hopes of that Grant, he alone having the sole use of the mint nor dare any other shroff or mer- chant buy or coin a rupee’s worth of silver.’65

    টাঁকশালে মুদ্রা তৈরির একচেটিয়া অধিকার জগৎশেঠদের আয়ের একটি বড় উৎস ছিল। তার ফলে তাঁরা সে অধিকারে অন্য কাউকে ভাগ বসাতে দিতে কোনওমতেই রাজি ছিলেন না। যে কোনও মূল্যেই তাঁরা এটা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এমনকী, ১৭৪৩ সালে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠিয়ালরা লিখছে যে জগৎশেঠ ফতেচাঁদ যতদিন জীবিত আছেন, ততদিন ইংরেজদের অন্য কারও পক্ষে টাঁকশালে মুদ্রা তৈরি করার অনুমতি পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ বাংলার নবাব ও মুর্শিদাবাদ দরবারে তাঁর এমনই প্রভাব যে তিনি যা চাইবেন তার অন্যথা হবে না।73 ফলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির খুবই মুশকিল হত। তারা বাংলার রফতানি পণ্য কেনার জন্য ইউরোপ থেকে যেসব সোনা-রুপো নিয়ে আসত (প্রায় সবটাই রুপো) সেগুলোর বেশিরভাগই জগৎশেঠদের কাছে বিক্রি করতে হত কারণ এগুলোর বিনিময়ে তাদের স্থানীয় মুদ্রা সংগ্রহ করতে হত এবং তা দিয়েই রফতানি পণ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হত। আর যেহেতু জগৎশেঠদের হাতেই টাঁকশালের কর্তৃত্ব, তাদের আমদানি করা রুপো জগৎশেঠদের কাছে বিক্রি করা ছাড়া কোনও উপায় তাদের ছিল না। শুধু তাই নয়, জগৎশেঠরা যে দাম দিতেন, সেটাই তাদের নিতে হত। বলা বাহুল্য সে দাম বাজারের দামের চেয়ে কমই হত। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির পক্ষে এ ব্যবস্থা মেনে নিতেই হত কারণ তারা এ দেশে পণ্য কেনার জন্য যে রুপো নিয়ে আসত, জগৎশেঠদের ছলচাতুরির জন্য তারা সেগুলি দিয়ে টাঁকশালে মুদ্রা তৈরি করতে পারত না। অথচ দাদনি বণিকদের মাধ্যমে রফতানি পণ্য সংগ্রহ করার জন্য তাদের নগদ টাকার খুবই প্রয়োজন হত।74

    জগৎশেঠদের প্রভূত আয়ের আরেকটি বড় উৎস ছিল বিভিন্ন রকমের মুদ্রার বিনিময়ের হার বা বাট্টা ধার্য করার অধিকার। বাংলার নবাবদের সঙ্গে শেঠদের এমনই ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁদের ওপর ও বাংলার টাকার বাজারে এঁদের এমনই প্রভাব ছিল যে (যার অন্যতম প্রধান কারণ, তাঁরা নবাবদের প্রয়োজনে বরাবরই অর্থ সাহায্য করে গেছেন) তাঁরা নবাবদের দিয়ে তাদের সুবিধামতো বিনিময়ের হার ধার্য করাতে পারতেন। তখনকার বহু নথিপত্রে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।75 তা ছাড়া এ সময় বাংলায় নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্নরকমের মুদ্রা আসত, বাংলায়ও ছিল নানা রকমের মুদ্রা। বাজারে কিন্তু এসব চলত না। সব রকমের মুদ্রাকেই সিক্কা টাকায় পরিবর্তিত করতে হত—এ জন্য দিতে হত বাট্টা। এ বাট্টার হার ঠিক করত জগৎশেঠরা, তাঁদের লাভের অঙ্ক মাথায় রেখে। ফলে বাট্টা থেকেও তাঁদের প্রচুর লাভ হত। জগৎশেঠরা পুরনো বা অন্য প্রান্ত থেকে আসা সব মুদ্রা টাঁকশালে পাঠিয়ে নতুন চলতি মুদ্রায় (সিক্কা) পরিবর্তিত করতেন আর এই মুদ্রা পরিবর্তন করার জন্য তাঁরা বাট্টা নিতেন। সেটা থেকে তাঁদের আয় হত প্রচুর। লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের (Luke Scrafton) অনুমান অনুযায়ী (১৭৫৭ সাল) জগৎশেঠরা বছরে ৫৮ লক্ষ টাকার মতো মুদ্রা তৈরি করত এবং এ বাবদ তাদের বার্ষিক আয় হত ৩-১/২ লক্ষ টাকা।76 এ ছাড়াও দেশি ও বিদেশি মুদ্রা বাংলায় চলতি সিক্কা টাকায় বিনিময় করে দেওয়ার জন্য শেঠদের প্রচুর আয় হত। তাঁরা নবাবের প্রাপ্য রাজস্বও জমা নিতেন। জমিদার ও আমিলরা তাঁদের কাছে ভূমি রাজস্ব জমা দিত। তা ছাড়াও যারা রাজস্ব আদায়ের নিলাম কিনত, শেঠরা তাদের জামিনও হতেন, অবশ্যই লাভের বিনিময়ে।

    জগৎশেঠদের বার্ষিক আয়ের আরেকটি সোজা রাস্তা ছিল চড়া সুদের মহাজনি ব্যবসা। তারা ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিকে বার্ষিক শতকরা ১২ টাকা হারে টাকা ধার দিতেন। বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য এসব কোম্পানিরা ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো, বিশেষ করে রুপো, নিয়ে আসত ঠিকই। কিন্তু ইউরোপ থেকে জাহাজ আসতে অনেক সময় দেরি হত। আবার এসব রুপো সোজাসুজি টাঁকশালে নিয়ে গিয়ে সেগুলি থেকে মুদ্রা তৈরি করা সম্ভব হত না কারণ টাঁকশাল ছিল জগৎশেঠদের কর্তৃত্বে। বাজারে বা জগৎশেঠদের কাছে এসব রুপো বিক্রি করে নগদ টাকা জোগাড় করতে সময় লাগত অনেক। এদিকে রফতানি পণ্য জোগাড় করতে টাকার খুব প্রয়োজন হত কারণ ঠিক সময় এসব পণ্য সরবরাহ করার জন্য দাদনি বণিকদের আগাম টাকা দিয়ে চুক্তিবদ্ধ করতে না পারলে পরে অনেক বেশি দামে এসব পণ্য কিনতে হত। আর ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো পাঠালেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল না। ফলে কোম্পানিগুলির প্রায় সবসময় নগদ টাকার ঘাটতি হত। সে জন্য বাজার থেকে তারা টাকা ধার করতে বাধ্য হত এবং মূলত তারা জগৎশেঠদের কুঠি থেকেই এই টাকা ধার করত, যদিও তারা কলকাতার দাদনি বণিক বা কাশিমবাজারের কাটমা পরিবারের কাছ থেকেও টাকা ধার করত।77

  • পঞ্চম অধ্যায় : পলাশি

    পঞ্চম অধ্যায় : পলাশি

    পঞ্চম অধ্যায় : পলাশি

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের সম্যক বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। তা না করলে এই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মুর্শিদাবাদেই এ ষড়যন্ত্রের উদ্ভব, বিকাশ ও রূপায়ণ। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে পলাশি বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে শুধু নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পলাশিতে ইংরেজদের বাংলা বিজয় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্থাপন করে। বাংলা থেকেই এবং বাংলার অর্থভাণ্ডার দিয়েই ইংরেজরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের প্রভুত্ব বিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা। সেজন্য তারা কেন এবং কী ভাবে পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলা জয় করে, তার আলোচনা করা প্রয়োজন।

    স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে শুধু নয়, এস. সি. হিল (১৯০৫) থেকে শুরু করে অধুনা পিটার মার্শাল (১৯৮৭), ক্রিস বেইলি (১৯৮৭), রজতকান্ত রায় (১৯৯৪) প্রমুখের গ্রন্থেও78 সিরাজদ্দৌল্লা এবং পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব সম্বন্ধে কতগুলি বক্তব্য স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে দেখা যায়। সাধারণভাবে এ বক্তব্যগুলি হল—পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের বিশেষ কোনও ভূমিকা ছিল না; সিরাজদ্দৌল্লা এতই দুশ্চরিত্র, দুর্বিনীত ও নিষ্ঠুর ছিলেন যে তাতে রাজ্যের অমাত্যবর্গ শুধু নয়, সাধারণ মানুষও নবাবের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই তাঁকে অপসারণ করতে মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বদ্ধপরিকর হয় এবং এ কাজ সম্পন্ন করতে তারা ইংরেজদের সামরিক শক্তির সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশায় তাদের ডেকে আনে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় একটি ‘আকস্মিক’ ঘটনামাত্র, এর পেছনে তাদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ (মার্শালের ভাষায় ‘no calculated plottings’) ছিল না। মুর্শিদাবাদ দরবারে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে তারা মাঠে নেমে পড়ে এবং নবাবের অমাত্যদের সঙ্গে সিরাজকে হঠিয়ে মীরজাফরকে নবাব করার পরিকল্পনায় সামিল হয়।

    সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয় হয় যে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের যে বিবাদ ও সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে তিনি শেষ পর্যন্ত বাংলার মসনদও হারালেন, তার জন্য মূলত দায়ী তিনিই। আবার পলাশির ব্যাখ্যা হিসেবে যুক্তি দেখান হয়ে থাকে যে সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হয়ে তাঁর আচরণ ও ব্যবহারে প্রভাবশালী অমাত্যবর্গকে তাঁর প্রতি বিরূপ করে তোলার ফলে বাংলায় যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ‘সংকট’ দেখা দেয়, তার পরিণতিই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব। ইদানীং এটাও প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে প্রাক্‌-পলাশি বাংলায় রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ‘সংকটও’ [বিশেষ করে কে. এন. চৌধুরী (১৯৭৮), পিটার মার্শাল (১৯৮০, ’৮৭)] দেখা দিয়েছিল এবং এই ‘উভয় সংকট’ থেকে বাংলাকে উদ্ধার করার জন্যই যেন ইংরেজরা ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও’ বাংলা জয় করে। কোনও কোনও ঐতিহাসিক আবার ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করতে গিয়ে প্রাক-পলাশি বাঙালি সমাজের একটি দ্বিধাবিভক্ত চিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় যত্নবান। এঁদের বক্তব্য, পলাশির প্রাক্কালে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলিম শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় মুসলিম নবাবের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য ইংরেজদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।

    উপরোক্ত বক্তব্যগুলি কতটা সঠিক এবং তথ্য ও যুক্তিনির্ভর, তার সূক্ষ্ম এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। গত দু’দশকেরও বেশি ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে, বিশেষ করে ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (India Office Records, British Library, London) রক্ষিত ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র ও ‘প্রাইভেট পেপারস’ এবং হল্যান্ডের রাজকীয় আর্কাইভসে (Algemeen Rijksarchief, The Hague) সংরক্ষিত ডাচ কোম্পানির দলিল দস্তাবেজ ও কাগজপত্রে (যেগুলি এর আগে পলাশির প্রেক্ষিতে কেউ দেখেননি বা ব্যবহার করেননি) যেসব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি এবং তার পাশাপাশি আগের নানা তথ্য ও সমসাময়িক ফারসি ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে আমরা ওপরের বক্তব্যগুলি খণ্ডন করেছি।

    আমাদের মূল বক্তব্য, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল ইংরেজরাই, ভারতীয়রা নয়। ইংরেজরা বেশ পরিকল্পিতভাবেই একাজ সম্পন্ন করে এবং নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে তারা মুর্শিদাবাদ দরবারের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে তাদের পরিকল্পনায় সামিল করে। শুধু তাই নয়, পলাশির যুদ্ধের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে যাতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকে। তবে এটাকে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের দোষ স্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল হবে। নবাবের দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটা অংশ সিরাজদ্দৌল্লার ওপর বিরূপ হয়ে একটা চক্রান্ত করার চেষ্টা করছিল, একথা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমরা যে বক্তব্যের ওপর জোর দিচ্ছি তা হল, ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং খুব সম্ভবত তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই চক্রান্ত পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে নবাবের পতন ঘটাতে পারত না।

    বিচার্য বিষয়

    আলোচনার সুবিধের জন্য বিষয়গুলি আর একটু বিশদভাবে বলা প্রয়োজন। প্রথম, ঐতিহাসিকরা (এবং বেশিরভাগ সমসাময়িক লেখকরাও বটে) সহমত যে নবাব হওয়ার আগে সিরাজদ্দৌল্লা এতই নির্মম, নিষ্ঠুর এবং দুশ্চরিত্র ছিলেন যে সবাই আলিবর্দির পরে সিরাজের নবাব হওয়ার সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। সিরাজের এই ‘কদর্য’ চরিত্র অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকে শুধু নয়, সাধারণ মানুষকেও তাঁর প্রতি বিরূপ করে তুলেছিল। কাশিমবাজারের তদানীন্তন ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ লিখেছেন: ‘Before the death of Alivardi Khan, the character of Siraj- uddaula was reputed to be worst ever known. In fact he had distinguished himself not only by all sorts of debaucheries but by a revolting cruelty.’79 দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বক্তব্য, ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে সিরাজের যে বিবাদ ও সংঘর্ষ হয়েছিল তার জন্য সিরাজদ্দৌল্লাই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। এ সংঘর্ষের কারণ আলোচনা করতে গিয়ে এস. সি. হিল নবাবের উদ্দেশ্য বা কারণ এবং নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ এই দু’ভাগে ভাগ করেছেন। হিলের মতে এ সংঘর্ষের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ হল সিরাজদ্দৌল্লার ‘দম্ভ’ এবং ‘অর্থলিপ্সা’। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজের যেসব অভিযোগ— ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও দুর্ভেদ্যকরণের প্রচেষ্টা, দস্তক বা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিপত্রের যথেচ্ছ ও বেআইনি অপব্যবহার এবং নবাবের অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয়দান— সেগুলিকে হিল সাহেব ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।80

    তৃতীয়ত, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বক্তব্য, পলাশি ভারতীয়দেরই ষড়যন্ত্র (ক্রিস বেইলির ভাষায় ‘Indian-born conspiracy’)। এর পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ ছিল না। প্রথমদিকে ইংরেজদের লক্ষ্য ছিল ‘খুবই সীমিত’ কিন্তু তারা যখন উপলব্ধি করল যে মুর্শিদাবাদ দরবারে একটি বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাতে উৎসুক, তখন তাদের লক্ষ্য আস্তে আস্তে প্রসারিত হল।81 সাধারণভাবে পলাশির ষড়যন্ত্রের জন্য প্রধানত মীরজাফরকেই দায়ী করা হয়। মীরজাফরই বিশ্বাসঘাতক—নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে বাংলার মসনদ অধিকার করার মতলবে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে পলাশি চক্রান্তে যোগ দেন— এ মত বহুল প্রচারিত। বাংলায় মীরজাফর নামটাই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। এখনও ওই নাম বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক শব্দ।

    চতুর্থত, প্রাক্‌-পলাশি বাংলায় অভ্যন্তরীণ ‘সংকটের’ কথাও বলা হয়ে থাকে। আগে এই ‘সংকটকে’ শুধু রাজনৈতিক ‘সংকট’ হিসেবে দেখা হত। কিন্তু ইদানীং এর সঙ্গে অন্য একটি মাত্রাও যোগ করার চেষ্টা হয়েছে—বলা হচ্ছে এটা অর্থনৈতিক ‘সংকট’ও বটে। রাজনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয় যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার বাণিজ্যিক-ব্যাঙ্কিং শ্রেণি, জমিদার ও অভিজাতবর্গের সঙ্গে নবাবের যে শ্রেণিগত জোটবদ্ধতা গড়ে উঠেছিল এবং যা মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার নিজামতকে স্থায়িত্ব দিয়েছিল, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর তা ভেঙে পড়ে। আর অর্থনৈতিক সংকটের লক্ষণ হিসেবে নির্দেশ করা হচ্ছে— অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি, শিল্পবাণিজ্যের অধোগতি, ব্যবসায়ী/মহাজন শ্রেণির আর্থিক দুরবস্থা, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম এবং ইংরেজ কোম্পানির রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণে ঘাটতি, ইত্যাদি। এ সবগুলিকে ১৭৪০-র দশকে যে ক্রমাগত মারাঠা আক্রমণ হয়েছিল তাঁর ফলশ্রুতি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।82

    আবার অধুনা বলা হচ্ছে, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত যে হিন্দু-জৈন মহাজন-ব্যাঙ্কিং ও ব্যবসায়ী শ্রেণির শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, তার প্রেক্ষিতেই পলাশি বিপ্লবের ব্যাখ্যা করা সমুচিত। হিল সাহেব অবশ্য অনেকদিন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে তাদের সঙ্গে উপরোক্ত শ্রেণির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।83 কিছুদিন আগে ব্রিজেন গুপ্ত দেখাবার চেষ্টা করেছেন, বাংলার সঙ্গে ইউরোপীয় সমদ্র বাণিজ্যের ফলে হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। এই বিশেষ শ্রেণিই বাংলায় ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রধান সহায়কের (‘catalytic agent’) কাজ করেছিল।’84 আর এখন পিটার মার্শাল, ক্রিস বেইলি প্রমুখ ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে ইউরোপীয়দের সঙ্গে বাংলার হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ওপর জোর দিচ্ছেন— বলছেন, তাঁর ফলে উভয়ের স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এবং সে কারণেই হিন্দু-জৈন মহাজন-ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়।85 অর্থাৎ সেই ‘কোলাবোরেশন থিসিসের’ ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই থিসিসের মূল প্রতিপাদ্য, ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে বাংলায় হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের, বিশেষ করে ইংরেজদের, স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় এবং সেজন্যই এরা ইংরেজদের সঙ্গে পলাশির ষড়যন্ত্রে সামিল হয়। বিশদভাবে বলতে গেলে এ বক্তব্য মোটামুটি এরকম: অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় বাণিজ্যেরই বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা, ইউরোপীয়রাই বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি রফতানি বাণিজ্য করছিল এবং ফলে তারাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি ধনসম্পদ (রুপো, টাকাকড়ি) আমদানি করত। আর এই বাণিজ্যের ফলে হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বেশ লাভবান হতে থাকে এবং সে কারণেই তাদের সঙ্গে ইংরেজদের একটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্রিস বেইলি এমন কথাও বলছেন যে বাংলায় ‘ব্যবসায়ী-ভূস্বামীদের স্বার্থ ইউরোপীয়দের ভাগ্যের সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছিল যে কলকাতা থেকে ইংরেজদের তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা তারা সহ্য করতে পারছিল না এবং সেজন্যই পলাশির ঘটনা ঘটল’।86

    সবশেষে এবং একদিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রাক-পলাশি বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত চিত্র। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের বক্তব্য, পলাশি যুদ্ধের প্রাক্‌কলে বাংলার সমাজ হিন্দু এবং মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত ছিল। মুসলমান নবাবের অত্যাচারে জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা মুসলমান শাসন থেকে মুক্তি চাইছিল, তাই তারা ইংরেজদের স্বাগত জানাতে উৎসুক ছিল। এ মতবাদের প্রধান প্রবক্তাও এস. সি. হিল। ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার যে সংঘর্ষ বাধে, হিলের মতে তাঁর অন্যতম ‘সাধারণ’ কারণ মুসলমান শাসকদের প্রতি হিন্দুদের অসন্তোষ। স্যার যদুনাথ সরকার সোজাসুজি এ ধরনের কথা না বললেও উদ্ধৃতি দিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, মূলত হিন্দুরাই মুসলমান শাসনের অবসান চাইছিল। ব্রিজেন গুপ্ত বাংলার দ্বিধাবিভক্ত এই সমাজের কথা বলতে গিয়ে প্রায় হুবহু হিলের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন।87

  • ষষ্ঠ অধ্যায় : বেগম বৃত্তান্ত

    ষষ্ঠ অধ্যায় : বেগম বৃত্তান্ত

    ষষ্ঠ অধ্যায় : বেগম বৃত্তান্ত

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে নবাব-বেগমদের কথা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যক্তিত্বসম্পন্না, বুদ্ধিমতী, বিজ্ঞ মহিলা—তাঁদের স্বামীদের প্রয়োজনমতো রাজকার্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংকটের সময় যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার কেউ কেউ ছিলেন কুটিল, কুচক্রী ও স্বার্থান্বেষী। শুধু তাই নয়, কারও কারও ব্যক্তিগত চরিত্রও খুব একটা নিষ্কলঙ্ক ছিল না। নিজেদের অভীষ্ট সিদ্ধ করার জন্য এঁরা অনেকটা নীচে নামতেও দ্বিধা করতেন না। তাই বলা যায় যে মুর্শিদাবাদ বেগমদের মধ্যে একদিকে খুব উঁচু আদর্শের মহিলাকে যেমন দেখা যায়, তেমনি সাক্ষাৎ মেলে একেবারে বিপরীত চরিত্রের নারীর। এখানে আমরা এই দুই বিপরীত মেরুর কয়েকজন বেগমদের বৃত্তান্ত আলোচনা করব।

    জিন্নতউন্নেসা

    জিন্নতউন্নেসা ছিলেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর একমাত্র কন্যা এবং পরবর্তী নবাব সুজাউদ্দিনের পত্নী। সিয়রের লেখক ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর আরেকটি নাম ছিল, নাফিসা। কিন্তু রিয়াজ-উস-সলাতিনে নাফিসাকে সরফরাজের ভগিনী বলেই বলা হয়েছে।88 সমসাময়িক সব ফারসি ইতিহাস থেকেই জানা যায় যে মুর্শিদকুলির অন্য কোনও স্ত্রী বা রক্ষিতা ছিল না। বাংলার পরবর্তী কিছু নবাবের মতো তাঁর কোনও হারেমও ছিল না। মুর্শিদকুলি তাঁর একমাত্র পত্নীর প্রতিই বিশ্বস্ত ছিলেন। সে যাই হোক, তিনি যখন দাক্ষিণাত্যে ছোট রাজকর্মচারী ছিলেন, তখনই তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে সুজাউদ্দিনের বিবাহ দেন। সুজা তাঁর শ্বশুরবাড়িতে পরিবারের সদস্য হিসেবে বাস করতে আরম্ভ করেন। এর কিছুদিন পরে মুর্শিদকুলি বাংলার দেওয়ান ও পরে বাংলার সুবাদার পদেও অধিষ্ঠিত হলেন। তখন তিনি জামাতা সুজাউদ্দিনকে উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর বা ছোট নবাব হিসেবে নিযুক্ত করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করল। দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে সুজাউদ্দিন মুর্শিদাবাদ ছেড়ে উড়িষ্যা চলে গেলেন।

    শাসক হিসেবে সুজাউদ্দিন জনপ্রিয় ছিলেন, বেশ দয়ালু এবং উদার স্বভাবেরও। কিন্তু নারীর প্রতি ছিল তাঁর অসম্ভব দুর্বলতা, নারী সম্ভোগে তাঁর আসক্তি ছিল প্রবল। জিন্নতউন্নেসা ধর্মভীরু ও উদারচেতা ছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু তেজস্বীও। তাই স্বামীর এমন চরিত্রস্খলন তিনি মেনে নিতে পারেননি। তা ছাড়া তাঁর পিতার প্রতি স্বামীর বিরূপ মনোভাবও তিনি সহ্য করতে পারেননি। তাই স্বামী সুজাউদ্দিনকে ছেড়ে তিনি পুত্র সরফরাজকে নিয়ে পিতার কাছে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। সেখানে তিনি ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের মধ্যে জীবন কাটাতে থাকেন।

    মুর্শিদকুলির কোনও পুত্র সন্তান ছিল না। জামাতা সুজাউদ্দিনের ওপর তিনি মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে বুঝতে পেরে তিনি তাঁর দৌহিত্র, কন্যা জিন্নতউন্নেসার পুত্র, সরফরাজকে মসনদে তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করবেন স্থির করে দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে অনুমোদন আনার চেষ্টা করলেন। এদিকে সুজাউদ্দিন এখবর পেয়ে তাঁর পরামর্শদাতা দুই ভ্রাতা হাজি আহমেদ ও আলিবর্দি খানের সঙ্গে আলোচনা করে দিল্লিতে বাদশাহের কাছে দূত পাঠালেন বাংলার দেওয়ানি ও নিজামতে তাকে অধিষ্ঠিত হওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য। তারপর যেই তিনি খবর পেলেন যে মুর্শিদকুলি মৃত্যুশয্যায়, তখনই তিনি আলিবর্দি খান ও সৈন্যসামন্তদের নিয়ে কটক থেকে মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রা করেন। পথিমধ্যেই তিনি মুর্শিদকুলির মৃত্যু সংবাদ89 পান এবং মুর্শিদাবাদ পৌঁছবার আগেই বাদশাহের অনুমতিও এসে যায়। মুর্শিদাবাদ এসে তিনি সোজা মুর্শিদকুলির প্রাসাদ চেহেল সুতুনে ওঠেন এবং নিজেকে বাংলার নবাব হিসেবে ঘোষণা করেন।90

    এ খবর পেয়ে সরফরাজ তাঁর পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। কিন্তু তাঁর মা জিন্নতউন্নেসা ও দিদিমা, মুর্শিদকুলির বেগম নাসিরা, দু’জনেই সরফরাজকে তা থেকে বিরত করার চেষ্টা করলেন। সরফরাজ এ দু’জনেরই নয়নের মণি ছিলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন:91

    Your father is old; after him, the subadari as well as the country with its treasure would devolve on you. To fight against one’s own father is cause of loss in this world and in the next as well as ignominy. It is meet that till the lifetime of your father, you should remain con-tented with the Diwani of Bengal.

    সরফরাজ যেহেতু কোনওদিনই এঁদের মতামত অগ্রাহ্য করেননি এবং সবসময় এঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখিয়েছেন, তাই তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে এঁদের কথা মেনে নিলেন এবং সুজাউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকলেন। তিনি তাঁর পিতাকে বাংলার নবাব হিসেবে মেনে নিলেন। এ ঘটনা থেকে মুর্শিদ-বেগম নাসিরা বানু ও সরফরাজের মা, সুজাউদ্দিনের বেগম, জিন্নতউন্নেসার বিচক্ষণতা ও মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায়।

    এরপর সুজাউদ্দিন জিন্নতউন্নেসার কাছে গিয়ে তাঁর পূর্বকর্মের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন এবং বেগমের ক্ষমা ভিক্ষা করেন। বেগম জিন্নতউন্নেসা তাঁকে ক্ষমা করে দেন। নবাব হয়ে সুজাউদ্দিন সরফরাজ বা তাঁর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র টাকি খানকে বিহারের ছোট নবাব পদে নিযুক্ত করতে চাইলেন। কিন্তু জিন্নতউন্নেসা তাঁর একমাত্র পুত্রকে কাছ ছাড়া করতে রাজি হলেন না। আবার টাকি খানকেও ওই পদে নিযুক্ত করতে তিনি আপত্তি জানালেন। বাধ্য হয়ে সুজাউদ্দিন বেগমের ইচ্ছা মেনে নিলেন। এ থেকে বোঝা যায় সুজাউদ্দিনের ওপর জিন্নতউন্নেসার কতটা প্রভাব ছিল।

    যা হোক শেষ পর্যন্ত, মনে হয় অনেকটা জিন্নতউন্নেসার ইচ্ছেতেই, আলিবর্দি খানকে বিহারের ডেপুটি গভর্নর করে পাঠানো হবে স্থির হল। বেগম মনে করতেন তিনিই মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত নিজামতের প্রকৃত উত্তরাধিকারী এবং সুজাউদ্দিন তাঁর অধীনেই রাজ্যশাসন করার অধিকার পেয়েছেন। তাই তিনিই প্রথমে আলিবর্দিকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে খেলাত দিয়ে বিহারের ছোট নবাব পদে নিযুক্ত করলেন। তাঁর পর সুজাউদ্দিন আলিবর্দিকে খেলাত প্রদান করে বিহারের ছোট নবাব বলে ঘোষণা করলেন।92 এ ঘটনা থেকেও স্পষ্ট, জিন্নতউন্নেসা কতটা বিজ্ঞা, বিচক্ষণ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্না ছিলেন, এবং তিনি রাজ্যশাসনেও কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

    এর পরের ঘটনাবলী জিন্নতউন্নেসার পক্ষে খুবই নিদারুণ হয়েছিল। আলিবর্দি সুজাউদ্দিনের সময়কার শক্তিশালী ত্রয়ীর (triumverate)—হাজি আহমেদ, আলমচাঁদ ও জগৎশেঠ, যাঁরা সুজাউদ্দিনের বকলমে বাংলা শাসন করতেন—সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর বেগম জিন্নতউন্নেসার পুত্র নবাব সরফরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। গিরিয়ার যুদ্ধে (১৭৪০) সরফরাজ আলিবর্দির বাহিনীর মুখোমুখি হন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে করতেই তিনি প্রাণ বিসর্জন দেন।93 এভাবে একমাত্র পুত্রের মৃত্যু জিন্নতউন্নেসার কাছে কতটা মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক হয়েছিল তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।

    যুদ্ধ জেতার দু’দিন পরে আলিবর্দি মুর্শিদাবাদ শহরে পদার্পণ করলেন এবং মসনদে বসার আগেই জিন্নতউন্নেসার কাছে তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বেগমকে তিনি জানালেন যে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেবেন এবং যথাসাধ্য তাঁর আজ্ঞা বহন করে চলবেন। জিন্নতউন্নেসা পুত্রশোকে এতই কাতর ছিলেন যে তিনি উত্তরে আলিবর্দিকে কোনও কথাই বললেন না।94 নবাব হয়ে আলিবর্দি তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যার স্বামী নওয়াজিস মহম্মদকে ঢাকার ছোট নবাব পদে নিযুক্ত করেন। নওয়াজিস জিন্নতউন্নেসাকে তাঁর প্রাসাদ ছেড়ে ঢাকায় তাঁর কাছে তাঁর পালিতা মা হিসেবে এসে থাকতে রাজি করালেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর ঘরসংসারের সব দায়িত্বও জিন্নতউন্নেসার হাতে দিয়েছিলেন এবং এ ব্যাপারে তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন। বেগম নওয়াজিসকে জিজ্ঞেস না করে বা তাঁর অনুমতি না নিয়েও নিজের পছন্দমতো সব কাজ করার অধিকারও পেলেন। তবে নিজের সম্মান ও আভিজাত্য বজায় রেখে তিনি সবসময় পর্দার অন্তরাল থেকেই নওয়াজিসের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন।95

    বেগম জিন্নতউন্নেসার উদারতা ও মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায় আরও একটি ঘটনা থেকে। তিনি সরফরাজের এক রক্ষিতার গর্ভজাত পুত্র আগা বা আকা বাবাকে দত্তক নেন। সরফরাজ যেদিন গিরিয়ার যুদ্ধে নিহত হন, সেদিনই আগা বাবার জন্ম হয়। হয়তো এজন্যই শোকাতুরা বেগমের আগার প্রতি করুণার উদ্রেক হয় এবং তিনি তাঁকে দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। আগা বেগমের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন, বেগমের বার্ধক্যে একমাত্র সান্ত্বনা। আগার সঙ্গে তিনি নওয়াজিস মহম্মদের ভাই সৈয়দ আহমেদের এক কন্যার বিবাহ দিতে উৎসুক হয়ে ওঠেন। সৈয়দ আহমেদ প্রথমে এ প্রস্তাবে রাজি হননি কিন্তু শেষ পর্যন্ত নওয়াজিস মহম্মদ ও তাঁর স্ত্রী ঘসেটি বেগমের পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন, কিন্তু নবাব পরিবারের নানা দুর্ঘটনার জন্য এই বিবাহ সম্পন্ন হয়নি বলেই মনে হয়।96

    ঘসেটি ও নওয়াজিস দু’জনেই জিন্নতউন্নেসাকে খুবই সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। মুর্শিদকুলির খাসতালুক ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি তিনি একাই ভোগ করেছেন। নওয়াজিস মহম্মদ বা আলিবর্দি কখনও তাতে হাত দেননি। শুধু তাই নয়, আলিবর্দি এবং নওয়াজিস তাকে এতই সমীহ এবং সম্মান করতেন যে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তাঁর সামনে তারা নতজানু হয়ে অভিবাদন জানাতেন এবং তিনি বলার পরই শুধু তারা তাঁর সামনে আসন গ্রহণ করতেন।97

    জিন্নতউন্নেসা কতদিন জীবিত ছিলেন, কবে তাঁর মৃত্যু হয়, সে সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না। তবে মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের আধ মাইলের মতো উত্তরে আজিমনগরে তিনি যে মসজিদ নির্মাণ করেন, তাঁর ধ্বংসাবশেষ অনেক দিন দেখা গেছে। কথিত আছে, এ ধ্বংসাবশেষের পাশেই তাঁর মৃত্যুর পর তাকে সমাধিস্থ করা হয়।98

  • সপ্তম অধ্যায় : শিল্পবাণিজ্য

    সপ্তম অধ্যায় : শিল্পবাণিজ্য

    এই গ্রন্থে আমাদের আলোচ্য বিষয় মূলত নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ শহরের ইতিহাস হলেও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের শিল্প বাণিজ্যের কথা স্বভাবতই এসে পড়ে কারণ নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের যে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি দেখা গেছে তার একটি প্রধান কারণ মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের শিল্পবাণিজ্যে বিরাট অগ্রগতি— যা এর আগে বা পরে কখনও দেখা যায়নি। এই শিল্পবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বড় বড় সব ব্যবসায়ী, সওদাগর, মহাজন, প্রভৃতি মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারেই তাদের আস্তানা করেছিল এবং সেখান থেকেই তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করত। এসব ব্যবসায়ী, সওদাগরদের মধ্যে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের লোক তো ছিলই, এমনকী ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিও এখানে তাদের কুঠি তৈরি করেছিল। এরা মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের প্রধান দু’টি শিল্পবাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল— এ দু’টি হল, কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্র।

    কাঁচা রেশম(Raw Silk)
    সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বিভিন্ন এশীয়/ভারতীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও ইউরোপীয় কোম্পানিরা বাংলা থেকে যে-সব পণ্য রফতানি করত, তার অন্যতম প্রধান ছিল কাঁচা রেশম। পণ্য রফতানির মোট যে মূল্য, সেদিক থেকে বস্ত্র রফতানির পরেই রেশমের স্থান। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বহু দিন ধরেই বাংলা থেকে রেশম রফতানি করছিল, ইউরোপীয়রা এ ব্যবসা শুরু করে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে। তার আগে ইংরেজ ও ডাচরা পারস্যদেশ ও চিন থেকে ইউরোপে রেশম রফতানি করত।১ কিন্তু যখন তারা দেখল যে বাংলা থেকে রেশম রফতানি করতে পারলে অনেক লাভজনক হবে, তখন তারা এদিকে নজর দিল। ইংরেজ কোম্পানি ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে কুঠি স্থাপন করে বাংলা থেকে ইউরোপে রেশম রফতানি করার ওপর জোর দিল।২ ১৬৭০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে ইংরেজদের রেশম বাণিজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে এবং মাঝেমধ্যে কিছুটা ওঠানামা করলেও এ বাণিজ্য ১৭৩০-এর দশক পর্যন্ত ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এই দশকেই সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছয়। তার পরের দুই দশকে— ১৭৪০ ও ১৭৫০— অবশ্য তাতে ভাঁটা পড়ে যায়। ডাচ কোম্পানিও সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে রেশম রফতানি শুরু করে। তবে ইংরেজদের সঙ্গে তফাত, ডাচরা বাংলার রেশম শুধু ইউরোপে নয়, জাপানেও তারা তা রফতানি করত। বস্তুতপক্ষে জাপানে রেশম রফতানি তাদের আন্তঃএশীয় বাণিজ্যের একটি প্রধান অঙ্গ ছিল। ১৬৭০-র দশক পর্যন্ত ডাচরা হল্যান্ডে বেশির ভাগ পারস্যদেশের রেশমই রফতানি করত, আর বাংলা ও চিনদেশের রেশম প্রধানত জাপানে। কিন্তু ওই শতকের শেষ দুই দশকে এই প্যাটার্ন সম্পূর্ণ পালটে যায়। একদিকে জাপানের বাণিজ্যে এ সময় ভাটা পড়ে এবং অন্যদিকে বাংলার রেশম চিন বা পারস্যদেশের রেশমের চাইতে একটু নিম্নমানের হলেও, অনেক সস্তা তাই তারা এখন শুধু বাংলার রেশম হল্যান্ডে রফতানি করতে শুরু করল।৩

    ইউরোপের রেশমশিল্পে সাধারণত ইতালির রেশমই ব্যবহার করা হত। কিন্তু ওই রেশমের মূল্য ছিল অত্যধিক। কিন্তু যখন দেখা গেল যে বাংলার রেশম ইতালির রেশমের বদলে ইউরোপের রেশমশিল্পে সহজেই ব্যবহার করা যেতে পারে এবং তাতে খরচ অনেক কম পড়বে, তখন ইউরোপে বাংলার রেশমের চাহিদা বেশ বেড়ে গেল এবং কোম্পানিগুলিও বাংলা থেকে রেশম রফতানি করে প্রচুর মুনাফা করতে লাগল। দু’-একটি উদাহরণ থেকে এই লাভের পরিমাণ আন্দাজ করা যেতে পারে। ১৬৫৩-৫৪ সালে ডাচরা বাংলা থেকে রেশম রফতানি করে শতকরা প্রায় দু’শো শতাংশ লাভ করে। ইংরেজ কোম্পানির ক্ষেত্রেও লাভের পরিমাণ ছিল ওরকমই। ১৬৯৫-৯৬ সালে মার্থা নামের জাহাজ বাংলা থেকে যে রেশম ইংল্যান্ডে রফতানি করে, তাতে কোম্পানির মোট মুনাফা হয় শতকরা আড়াইশো ভাগ। তবে এই লাভের পরিমাণ সব সময় এক রকম হত না, কখনও বেশি, কখনও কম হত।৪ সে জন্য অন্যান্য দেশের রেশমের তুলনায় কিছুটা নিম্নমানের হলেও, বাংলার রেশমের ইউরোপে বেশ চাহিদা ছিল। এ প্রসঙ্গে ফরাসি পর্যটক বার্ণিয়ে’র মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে:৫

    The (Bengal) silks are not certainly so fine as those of Persia, Syria, Sayd and Barut, but they are of a much lower price; and I know from indisputable authority that, if they were well selected and wrought with care, they might be manufactured into most beautiful stuffs.

    এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, শুধু ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি নয়, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সওদাগর ব্যবসায়ীরা বাংলার রেশমের উৎপাদন কেন্দ্র ও বাজারগুলিতে ভিড় জমাত। বস্তুত কোম্পানিগুলি ভারতবর্ষে আসার অনেক আগে থেকেই এসব ব্যবসায়ীরা বাংলা থেকে স্থলপথে ভারতবর্ষের ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম রফতানি করত। এদের মধ্যে গুজরাটিরাই ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠী। তা ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে ছিল মধ্য এশিয়া, মুলতান, লাহোর, আগ্রা, বেনারস, হায়দরাবাদ, গোরখপুর প্রভৃতি অঞ্চলের সওদাগর গোষ্ঠী। এরা অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ রেশম রফতানি করেছে, পলাশির আগে পর্যন্ত বাংলার রেশমের বাজারে এদেরই অনেক বেশি প্রাধান্য ছিল, ইউরোপীয়দের নয়। পলাশির পরে চিত্রটা সম্পূর্ণ পালটে যায়। ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে এশীয়/ভারতীয় বণিকরা বাংলার রেশমের বাজার থেকে প্রায় উৎখাত হয়ে যায়। তাদের রেশম রফতানির পরিমাণও প্রায় তলানিতে এসে ঠেকে।৬

    রেশমের উৎপাদন ও রেশমশিল্পের সংগঠন
    এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে বাংলায় রেশম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল। ১৬৭৬ সালে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির অধ্যক্ষ স্ট্রেনশ্যাম মাস্টার (Streynsham Master) লিখেছেন যে ওই অঞ্চলের প্রায় পুরোটাতেই তুঁত গাছের চাষ হত। এই তুঁতের পাতাই রেশম পোকার প্রধান খাদ্য।৭ তুঁত গাছের চাষই ছিল তখন মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত চিত্র। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবনে রেশমের উৎপাদন ও বাণিজ্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় এখানকার একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদবাক্যে— ‘তুঁতের চাষ নিজের পুত্রসন্তানের চাইতেও অনেক বেশি সম্পদ ও সুখের আকর’।৮ বলা বাহুল্য, রেশম উৎপাদন, রেশমশিল্পের সংগঠন ও বাণিজ্য এ অঞ্চলের বহু মানুষেরই রুজি রোজগারের উপায় করে দিয়েছিল। এখানে অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে অন্য কিছু কিছু অঞ্চলেও, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের রংপুরে, নদীয়ার কুমারখালি ইত্যাদি জায়গায় রেশমের উৎপাদন হত। তবে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলই ছিল রেশমের সর্বপ্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। শুধু তাই নয়, গুণগত মানের দিক থেকেও ওই অঞ্চলের রেশমই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট।

    রেশমের মোট বার্ষিক উৎপাদন সম্বন্ধে সঠিক কোনও তথ্য পাওয়া দুষ্কর। ফরাসি পর্যটক টাভার্নিয়ে জানিয়েছেন যে ১৬৬০ ও ১৬৭০-এর দশকে বাংলার রেশম উৎপাদনের মোট পরিমাণ ছিল ২২,০০০ গাঁট, প্রত্যেক গাঁটরিতে ১০০ পাউন্ড করে রেশম। এ পরিসংখ্যান নিয়ে অবশ্য ইদানীং সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ টাভার্নিয়ে বলছেন, এ সময় ডাচরা বাংলা থেকে বছরে ৬০০০-৭০০০ গাঁটরি রেশম রফতানি করত। তা ঠিক নয়। আসলে তারা বছরে এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণ রেশম রফতানি করেছে। ডাচ কোম্পানির রেকর্ডস থেকে এটা সুস্পষ্ট।৯ কিন্তু আমরা যদি বাংলা থেকে এশীয়/ভারতীয় বণিকদের রেশম রফতানির হিসেব দেখি, তা হলে টাভার্নিয়ের দেওয়া বাংলায় রেশম উৎপাদনের পরিমাণে কিছুটা অত্যুক্তি থাকলেও তা সম্পূর্ণ অবাস্তব নয়। ১৭৫১ সালে যখন মারাঠা আক্রমণে বাংলার রেশমশিল্পের উৎপাদন বেশ কিছুটা ব্যাহত হয়, তখনও এশীয়/ভারতীয় বণিকদের বাংলা থেকে রেশম রফতানির পরিমাণ ছিল ২৪,০০০ মণের মতো।১০ সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মধ্য-অষ্টাদশ শতকেও বাংলায়, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে, বিপুল পরিমাণ রেশমের উৎপাদন হত।

    রেশম শিল্পকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—কাঁচা রেশমের উৎপাদনের জন্য তুঁতের চাষ এবং তারপর রেশম তৈরির প্রণালী। তাই এ শিল্প আংশিক কৃষিভিত্তিক, আংশিকভাবে পারিবারিক কুটিরশিল্প। কৃষকরা অন্যান্য শস্যের সঙ্গে তুঁতের চাষও করত। এই তুঁতগাছের গাছের পাতা খাইয়ে চাষির বাড়িতে গুটিপোকার লালনপালন করা হত। সাধারণত চাষিবাড়ির পুরুষরা মাঠে তুঁতগাছের চাষ করত আর বাড়ির মেয়েরা রেশম গুটিপোকার লালনপালন করত। এ গুটিপোকার লালনপালনের জন্য আলাদা ও বিশেষ রকমের ঘর তৈরি করতে হত। এরকম ঘরের দৈর্ঘ্য হত ২৪ ফুট, প্রস্থ ১০ ফুট, উচ্চতা ৯ ফুট, এবং তাতে ৩ ফুট উঁচু একটি মাচা থাকত। মাটির মোটা দেয়াল করতে হত আর দেয়ালের ওপরের দিকে দুটো জানলা, খড়ের পুরু ছাদ। ওরকম ঘরে ২০০ কাহন বা মোট ২,৫৬,০০০ গুটিপোকা গোবর দিয়ে ভাল করে লেপা ডালাতে করে মাচার ওপরে রাখা যেত। পোকামাকড় যাতে ডালায় আসতে না পারে তার জন্য মাটির রেকাবিতে জল দিয়ে তাঁর ওপর বাঁশের খুঁটির ওপর মাচাটা রাখা হত। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে দরকার হত সুতো কাটার জন্য মাদুর, ছুরি, তুঁতের পাতা নিয়ে আসার জন্য ঝুড়ি, গুটিপোকা রোদে দেওয়ার জন্য কয়েকটি চটের ব্যাগ আর মাটির রেকাবিগুলি মাঝেমাঝেই জলভরতি করে রাখার জন্য কয়েকটি কলসি। এই সবগুলি জিনিস করতে উনবিংশ শতকের প্রথমদিকে খরচ পড়ত ৫০ থেকে ৬০ টাকার মতো।১১ মধ্য অষ্টাদশ শতকে মনে হয় আরও কম খরচে সবটাই হয়ে যেত।

    এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে রেশম উৎপাদন সম্বন্ধে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায় ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে, তাঁর আগে নয়। তবে অষ্টাদশ শতকের ক্ষেত্রেও এসব তথ্য প্রযোজ্য কারণ তাঁর মধ্যে উৎপাদন পদ্ধতিতে বিশেষ হেরফের হয়নি। উৎপাদনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে গুটিগুলিকে দিনে দু’বার তুতের পাতা খেতে দিতে হত এবং পরের দু’পর্যায়ে ৬ বা ৮ ঘণ্টা অন্তর এটা করতে হত। গুটিপোকা থেকে যখন রেশমের সুতো কাটার সময় হত তখন ‘they turn from a greenish-cream to a mellow light orange colour… with a transparent streak down the back, passing, as it is observed, the emission from tail to head, which forms the silk’.১২ তারপর গুটি পোকাগুলিকে মাদুরে রেখে রোদে ও হাওয়ায় দেওয়া হয় আর রাত্রে ঢাকা দিয়ে রাখা হত। গুটিপোকাগুলি প্রায় ৫৬ ঘণ্টা ধরে রেশমের সুতো বার করতে থাকত। চার পাঁচদিন পর পোকাগুলি তাঁর থেকে কাটিম দিয়ে সুতো বার করার জন্য উপযোগী হত। তখন গৃহস্থ চাষি সেগুলিকে পাইকার বা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিত কিংবা নিজের বাড়িতে পোকাগুলি সেদ্ধ করে রেশমের সুতো তৈরি করত।১৩

    রেশমসুতোর কাটনিরা গুটিপোকা থেকে যে সুতো তৈরি করত তার নাম পাটানি (pattaney) বা পাটনি (putney)। এতে মিহি এবং মোটা দু’রকমের সুতোই মেশানো থাকত। সুতো কাটার ব্যাপারে মেয়েরাই অগ্রবর্তী ভূমিকা নিত এবং এ ব্যাপারে তাদের দক্ষতা ছিল অসাধারণ। ১৭৫০-র দশকে রবার্ট ওরম মন্তব্য করেছেন যে:১৪

    The women wind off raw silk from the pod of the worm. A single pod of raw silk is divided into twenty different degrecs of fineness, and so exquisite is the feeling of these women, that whilst thread is running through their fingers so swiftly that their eyes can be of no assistance, they will break it off exactly as the assortments change, at once from the first to the twentieth, from nineteenth to the second.

    ১৮০৭ সাল নাগাদ বুকাননও (Buchanan) রেশমের সুতো কাটার ব্যাপারে মেয়েদের দক্ষতা ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।১৫

    রেশমের বাজার
    অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে, বাংলার রেশমের বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। এর কারণ, শুধু ভারতবর্ষ নয়, এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে ব্যবসায়ীরা রেশম কিনতে বাংলায়, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে আসত। তা ছাড়াও ক্রেতাদের মধ্যে ছিল ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, ভারতীয়/এশীয় ব্যবসায়ীরাই বাংলার রেশমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করত, ইউরোপীয়রা নয়। আবার দেশীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে গুজরাটিরাই ছিল সবচেয়ে বড় ক্রেতা। উৎকৃষ্ট মানের রেশম হলে দামের তোয়াক্কা না করেই তারা সেই রেশম কিনে নিত। বাংলার রেশমের বাজারে তাদের এমনই প্রভাব এবং প্রতিপত্তি ছিল যে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে দামি যে রেশম তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘গুজরাটি সিল্ক’।১৬ উত্তর ভারতের অর্থনীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের সিল্কের বাজার। এটা ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারী জন কেনের (John Kenn) লেখা থেকে স্পষ্ট। ১৬৬১ সালে তিনি জানাচ্ছেন:১৭

    According as this silk sells in Agra, so the price of silk in Kasimbazar riseth and falleth. The exchange of money from Kasimbazar to Patna and Agra riseth and falleth as the said silk findeth a vent in Patna and Agra.

    মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের কাঁচা রেশমের বাজারে এশীয়/ভারতীয় ব্যবসায়ীদের এমনই দাপট ছিল যে অনেকটা তাদের কেনাকাটার ওপরেই বাজারে দাম ওঠানামা করত, ইউরোপীয়রা এ বাজারে প্রায় নীরব দর্শক হয়েই থাকত। কোম্পানির কর্মচারীদের লেখা থেকেই তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৭৩৩ সালে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি জানায় যে কাঁচা রেশমের দাম নির্ভর করছে বাজারের এশীয়/ভারতীয়দের চাহিদা অনুযায়ী, এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের ক্ষমতায় কুলোবে না। এটা সম্পূর্ণ তাদের আয়ত্তের বাইরে।১৮ এর এগারো বছর পরেও (১৭৪৪) অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। কোম্পানির কাশিমবাজার কাউন্সিল কলকাতায় লিখছে যে কাঁচা রেশমের দাম অনেক বেড়ে গেছে কিন্তু এ ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ অসহায় কারণ কাঁচা রেশমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা তাদের ক্ষমতার বাইরে।১৯ অবশ্য এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে বাজারে কাঁচা রেশমের দাম এশীয়/ভারতীয় সওদাগরদের চাহিদা ছাড়াও আরও কয়েকটি কারণে ওঠানামা করত। যেমন প্রাকৃতিক কারণ। বেশি বৃষ্টিতে বা খরার জন্য রেশমের উৎপাদন অনেকটা ব্যাহত হত এবং তাতে বাজারে কাঁচা রেশমের দামও বেড়ে যেত। তা ছাড়া মারাঠা আক্রমণের জন্যও (১৭৪২-৫১) রেশম উৎপাদন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোম্পানির নথিপত্রে তাঁর প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে ঐতিহাসিকরা মারাঠা আক্রমণের নেতিবাচক ফলাফলের ওপর বড় বেশি জোর দিয়েছেন বলে মনে হয়।২০ যদিও এটা অস্বীকার করা যায় না যে মারাঠা আক্রমণ রেশমের উৎপাদনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটিয়েছিল, কিন্তু বাংলা থেকে এ সময়কার রেশম রফতানির পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে যে মারাঠা আক্রমণে রেশমশিল্প বা বাণিজ্যে খুব বেশি একটা প্রভাব পড়েনি। তাঁর সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে প্রায় দশ বছর ধরে ক্রমাগত মারাঠা আক্রমণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও ১৭৫১ সালে এশীয় বণিকরা বাংলা থেকে ২৪,০০০ মণের মতো কাঁচা রেশম রফতানি করেছে।২১ মারাঠা আক্রমণের ফলে যদি রেশমশিল্প ও বাণিজ্য বিপর্যস্ত হয়ে থাকত, তা হলে এত বিশাল পরিমাণ কাঁচা রেশম রফতানি করা কোনওমতেই সম্ভব হত না।

    এশীয়/ভারতীয় বণিকরা মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের বিভিন্ন উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে তাদের প্রয়োজনমতো রফতানির জন্য কাঁচা রেশম কিনত। মাঝে মাঝে অবশ্য তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বা পাইকারদের মাধ্যমেও রেশম সংগ্রহ করত। বলা বাহুল্য, এইসব বণিকদের অনেকেই মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে নিজেদের আস্তানা করেছিল। কিন্তু ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি প্রধানত কাঁচা রেশম সংগ্রহের জন্য ওই অঞ্চলে নিজেদের কুঠি স্থাপন করলেও, ভাষাগত অসুবিধের জন্য তারা উৎপাদকদের কাছ থেকে বা বাজার থেকে সরাসরি রেশম কিনতে পারত না। তার জন্য স্থানীয় রেশম ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করতে হত। মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে অবশ্য এরকম সওদাগরের কোনও অভাব ছিল না। এদের মধ্যে স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ী যেমন ছিল, তেমনি ছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক সওদাগর ব্যবসায়ী। এরা মূলত রেশম ও রেশমিবস্ত্র ব্যবসায়েই লিপ্ত ছিল।

    ১৭৫৩ সালে ইংরেজ কোম্পানি কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্র সরবরাহের জন্য যে ৪২ জন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি করে তাঁর মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১২ জন ছিল বাংলার বাইরের— প্রধানত গুজরাট, রাজস্থান, পাঞ্জাব এবং উত্তর ভারতের লোক। আবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ থেকে শুরু করে তেলি পর্যন্ত সব জাতের মানুষ ছিল।২২

    কোম্পানিগুলি সাধারণত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে রেশম সরবরাহের জন্য দাদনি বণিকদের সঙ্গে চুক্তি করে নিত কারণ এ সময়েই সবচেয়ে ভাল পাটনি বাজারে আসত। অনেক দর কষাকষির পর রেশমের দাম ও কত পরিমাণ রেশম সরবরাহ করতে হবে তা ঠিক হত। কোম্পানি তখন বণিকদের মোট দামের শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ টাকা অগ্রিম বা দাদন বাবদ দিত। এ টাকার জন্য কোম্পানি বণিকদের কাছ থেকে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করত কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে চেষ্টা সফল হত না। কারণ মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের বণিকরা বেশ জোটবদ্ধই ছিল। তাদের পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তারা প্রায়শই কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত এবং কোম্পানির নির্দেশ অগ্রাহ্য করতে সমর্থ হত। এটা আমরা আগের একটি অধ্যায়ে বিশদভাবে দেখিয়েছি।২৩

    তবে চুক্তির সময় কীরকম দামে বণিকরা রেশম সরবরাহ করবে তা ঠিক হয়ে গেলেও মাঝে মধ্যে তারা দাম নিয়ে কোম্পানির সঙ্গে বাক্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ত। সমসাময়িক নথিপত্র থেকে একটি ঘটনার উল্লেখ করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার বোঝা যাবে। ১৭৪৫ সালের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ইংরেজ কোম্পানির দাদনি বণিকেরা একটি নির্দিষ্ট হারে রেশম সরবরাহ করবে বলে চুক্তি করে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে তারা কোম্পানিকে জানিয়ে দেয় যে রেশমের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের পক্ষে পূর্বনির্ধারিত দামে রেশম সরবরাহ করা কোনও মতেই সম্ভব হবে না, রেশমের দাম বাড়াতেই হবে। কাশিমবাজার কাউন্সিল বণিকগোষ্ঠীর (‘assembly of merchants’) সঙ্গে বৈঠক করে তাদের বাগে আনার বিফল চেষ্টা করল। বৈঠকের পর কাউন্সিল যা লিখেছে তা থেকে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের রেশম বাণিজ্য সম্বন্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। কাউন্সিল বলছে:২৪

    We told them (merchants) the price being already agreed, it was not in our power to alter it, and if they would not undertake the invest-ment we must look out for other merchants that would, to which they replied we might do as we pleased, but they were sure no merchants could contract cheaper than themselves, who had been bred up in silk business from their childhood, but they could not give us their labour without some profit of which they saw no prospect at the price we kept.

    এ থেকে স্পষ্ট যে কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদের বণিকগোষ্ঠীর একটি বিশেষত্ব ছিল যে তারা সাধারণত কোনও একটি নির্দিষ্ট পণ্য সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ (specialist) ব্যবসায়ী, ছোটবেলা থেকে তারা এ পণ্যের কাজ কারবারেই অভিজ্ঞতা অর্জন করে এ পণ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যেই লিপ্ত হত। এ অঞ্চলের বণিকরা সাধারণত রেশম এবং রেশমিবস্ত্রের ব্যবসাতেই নিযুক্ত থাকত। এদের মধ্যে অনেকে শুধু রেশমের ব্যবসা করত, আবার অনেকে শুধু রেশমিবস্ত্রের। কেউ কেউ অবশ্য দু’টো পণ্যের বাণিজ্যই করত। এদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য, এরা মোটামুটি ভাল মুনাফা না হলে কাউকে পণ্য সরবরাহ করতে আগ্রহী হত না এবং এদের পঞ্চায়েত বেশ শক্তিশালী ছিল।

    ইংরেজ কোম্পানি মুর্শিদাবাদ কাশিমবাজার থেকে পণ্য সংগ্রহের জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভর করত কাশিমবাজারের কাটমা পরিবারের ওপর। অষ্টাদশ শতকের তিরিশের দশকে এ পরিবারের কয়েকজনই কোম্পানির ‘প্রধান বণিক’ (chief merchant) হিসেবে কাজ করেছে। এদেরই একজন বলাই বা বলরাম কাটমা, কোম্পানির ‘প্রধান বণিক’ নিযুক্ত হয় ১৭৩৭ সালে। ১৭৪০-এ যখন কোনও একটি কারণে নবাব তাঁকে বন্দি করে রাখেন, তখন কোম্পানি চোখে অন্ধকার দেখে কারণ ‘if some of that family [Katma] will not assit us on this occasion, we find it on several Tryalls impossible to get any of our other merchants to agree for more silk or piece-goods.’২৫

    কোম্পানিগুলি বাংলা থেকে ইউরোপে যে কাঁচা রেশম পাঠাত, অনেক সময় সে রেশম ইউরোপের তাতে ব্যবহার করা মুশকিল হত। কারণ এগুলো গোটানো বা কুণ্ডলী করা থাকত না। এসব অসুবিধে দূর করার জন্য কোম্পানিগুলি, বিশেষ করে ডাচরা, কাশিমবাজারে কারখানা (karkhana) স্থাপন করে এ কাজের জন্য উপযুক্ত কারিগর নিযুক্ত করত। বাংলার শিল্প জগতে একদিক থেকে এটি একটি অভিনব সংযোজন। এর আগে কোনও ব্যক্তিগত বা বেসরকারি মালিকানার প্রতিষ্ঠানে এরকম নতুনত্ব দেখা যায়নি। অবশ্য মুঘল যুগের কারখানার কথা আমরা জানি। তবে এসব কারখানা মূলত বাদশাহি প্রতিষ্ঠান। এখানে বাদশাহ ও আমির ওমরাহদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রই শুধু তৈরি হত, সাধারণ মানুষের বা বাজারের জন্য নয়। নবাবি আমলে ঢাকায় এরকম কারখানা ছিল, যেখানে সবচেয়ে বিলাসবহুল, উৎকৃষ্ট ও দামি মসলিন তৈরি হত।২৬ সে যাই হোক, ডাচ কোম্পানিই প্রথম ইউরোপের তাঁতগুলোর উপযুক্ত করে রেশমিসুতো কাটাবার ও ভাল করে গুটিয়ে রফতানি করার জন্য ১৬৫৩ সালে কাশিমবাজারে একটি কারখানা স্থাপন করে। তার জন্য কোম্পানি একটি চালা (shed) তৈরি করে, যাতে ৩,০০০ কারিগর কাজ করতে পারত। এদের পুরো কাজে লাগালে বছরে ১,৫০০ গাঁটরি উৎকৃষ্ট মানের রেশম তৈরি করা যেত। কিন্তু কোম্পানি তা সব সময় করে উঠতে পারত না। অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে ইউরোপে রেশমের চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ায় ডাচ কোম্পানি ১৭১৫ সালে চালাটি আরও বাড়ায় যাতে ৪,০০০ কারিগর একসঙ্গে কাজ করতে পারে।২৭ ইংরেজ কোম্পানিও এরকম কারখানা তৈরি করে কিন্তু সেখানে ৩০০-র বেশি লোক একসঙ্গে কাজ করতে পারত না, তাই কাশিমবাজার কাউন্সিল ১৭৫৫ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখে কারখানাটি বড় করা দরকার, তাই চালাটা আরও বাড়াতে হবে এবং তাঁর জন্য অর্থ মঞ্জুর করতে। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল তাতে রাজি না হওয়ায় কারখানার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি।২৮

    রেশমিবস্ত্র
    কাঁচা রেশম ছাড়াও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ সিল্কের কাপড় তৈরি হত এবং তাঁর অধিকাংশই ভারতবর্ষ এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে শুধু নয়, ইউরোপেও রফতানি হত। মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার যেহেতু বাংলায় রেশম উৎপাদনের সবেচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল, সেজন্য স্বাভাবিক ভাবেই উৎকৃষ্ট সিল্পের কাপড়ও এখানেই তৈরি হত। সঙ্গে সঙ্গে সিল্ক-সুতি মেশানো কাপড়ও। এই দু’রকম কাপড়েরই প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল। ঐতিহাসিকরা বলেন:

    The neighbourhood of Murshidabad is the chief seat of manufacture of wove silk: taffeta, both plain and flowered, and many other sorts of inland commerce and for exportation, are made there abundantly, than at any other places where silk is wove.

    এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সিল্ক কাপড়ের কাজ-কারবার যারা করত, তারা ওতেই বিশেষজ্ঞ ব্যবসায়ী। অন্যান্য ব্যবসায়ীরা সাধারণত এরকম কাপড় কেনাবেচা করত না। কোম্পানির নথিপত্র থেকে এটা স্পষ্ট। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৭৪৪ সালে কাশিমবাজার থেকে যে পরিমাণ রেশমিবস্ত্র সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়, তা করতে হলে এখানকার কুঠিয়ালরা জানায়, মুর্শিদাবাদ-সৈয়দাবাদে যে সব অভিজ্ঞ ও বড় বড় ব্যবসায়ী এই পণ্যই শুধু সরবরাহ করে, তাদের সাহায্য একান্ত দরকার। এদের মধ্যে আছে গোঁসাইরাম, রাম সিং, রামনাথ ইচ্ছানাথের মতো ধনী ও এ পণ্যে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। তারাই প্রধানত সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের সিল্কের কাপড় সরবরাহ করতে পারে। অন্যান্য ব্যবসায়ীরা সাধারণত এই পণ্যে কাজ-কারবার করতে চায়না। কোম্পানি গোঁসাইরাম প্রমুখ ব্যবসায়ীর সঙ্গে রেশমিবস্ত্র সরবরাহের জন্য চুক্তি করতে চায় কিন্তু ওই সব ব্যবসায়ীরা অগ্রিমের জন্য জামিন দিতে অস্বীকার করে। তারা বলে যে এতে বাজারে তাদের সুনাম নষ্ট হবে। কাশিমবাজার কাউন্সিল কলকাতায় লেখে যে এরা খুবই ধনী এবং সিল্কের কাপড়ে বিশেষ ব্যবসায়ী। সিল্কের কাপড় সরবরাহ করার জন্য ওদের সঙ্গে তাড়াতাড়ি চুক্তি না করলে এরা হাতছাড়া হয়ে যাবে, ফরাসি ও ডাচ কোম্পানি এদের লুফে নেবে। ফলে ইংরেজ কোম্পানির পক্ষে ইংল্যান্ড থেকে যে পরিমাণ রেশমিবস্ত্র পাঠানোর জন্য নির্দেশ এসেছে, তা কার্যকর করা সম্ভব হবে না। অবশেষে কোম্পানি জামিন ছাড়াই ওই সব রেশমিবস্ত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়।৩০

    সিল্ক কাপড়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল ‘টাফেটার’ (tafettas বা taffaties) আর এটা প্রধানত কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলেই বেশি তৈরি হত। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি ইউরোপে যে রেশমিবস্ত্র রফতানি করত, তার একটা বড় অংশই টাফেটা। ডাচরা আবার এটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও জাপানে রফতানি করত। শুধু ইউরোপীয়রা নয়, এশীয় বণিকরাও মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে বেশ ভাল পরিমাণ ‘টাফেটা’ রফতানি করত। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে বাংলা থেকে ইউরোপীয়রা নয়, এশীয় বণিকরাই সবচেয়ে বেশি রেশমিবস্ত্র রফতানি করত, যার মধ্যে টাফেটা অন্যতম। নীচে প্রদত্ত সারণি থেকে এটা পরিষ্কার।

    সারণি ৭.১

    এশীয় বণিক ও ইউরোপীয়দের রেশমিবস্ত্র রফতানির বার্ষিক গড়

    ১৭৫০/৫১-১৭৫৪/৫৫

    এশীয়রা ইউরোপীয় কোম্পানি
    বছর (সংখ্যা) ডাচরা ইংরেজরা মোট ইউরোপীয়
    (সংখ্যা) (সংখ্যা) (সংখ্যা)

    ১৭৫০/৫১ ১২৪,৬৭৫ ১২,৮৯০ ১২,৭৬০ ২৫,৬৫০
    ১৭৫১/৫২ ৯২,৪৭৫ ৩৯,৬২৮ ২০,০৪১ ৫৯,৬৬৯
    ১৭৫২/৫৩ ৮৯,৯৭৮ ২৭,৭৭৭ ৩২,৬১৫ ৬০,৩৯২
    ১৭৫৩/৫৪ ৭৮,৯৭৮ ২৯,০২৯ ২৪,৬৬৩ ৫৩,৬৯২
    ১৭৫৪/৫৫ ৭৫,০৬২ ৪০,৮৮৩ ৩৪,১৬০ ৭৫,০৪৩
    মোট সংখ্যা ৪৫৭,১৬৮ ১৫০,২০৭ ১২৪,২৩৯ ২৭৪,৪৪৬
    বার্ষিক গড় ৯১,৪৩৪ ৩০,০৪১ ২৪,৮৪৮ ৫৪,৮৮৯
    [সূত্র: এশীয় বণিকদের রফতানি, BPC, vol. 44, Consult. 19 June 1769; ডাচ রফতানি হল্যান্ডের রাজকীয় মহাফেজখানা (Algemeen Rijksarchief) থেকে সংগৃহীত তথ্য থেকে হিসেব করে বার করা হয়েছে; ইংরেজ কোম্পানির রফতানি K. N. Chaudhuri-র বই (Trading World) থেকে নেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।]

    এই পরিসংখ্যানে অবশ্য ফরাসিদের রফতানির পরিমাণ ধরা হয়নি কারণ এ বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর। তবে P.J. Marshall এর বক্তব্য অনুসরণ করে, যে ফরাসিদের রফতানির পরিমাণ ডাচ বা ইংরেজদের রফতানির অর্ধেক হওয়ারই সম্ভাবনা,৩১ আমরা অনুমান করতে পারি যে, ডাচ ও ইংরেজদের রফতানির বার্ষিক গড় যখন যথাক্রমে ৩০,০৪১ ও ২৪,৮৪৮ তখন ফরাসিদের বার্ষিক গড় রফতানি ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০-এর বেশি হতে পারে না। তা যদি হয়, তা হলে ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রেশম রফতানির মোট বার্ষিক গড় ৬৭,০০০ থেকে ৭০,০০০-এর বেশি হতে পারে না (ওপরের সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে ডাচ ও ইংরেজদের রফতানির বার্ষিক গড় ৫৪,৮৮৯)। অথচ ওপরের সারণি থেকে আমরা দেখছি যে এশীয় বণিকদের রেশমিবস্ত্র রফতানির বার্ষিক গড় ৯১,৪৩৪। সুতরাং কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে রেশমিবস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের চেয়ে এশীয় বণিকরাই অনেক বেশি এগিয়ে ছিল।৩২

    কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে কাঁচা রেশম উৎপাদন ও এই শিল্পের সঙ্গে অনেক কৃষক/কারিগর যেমন যুক্ত ছিল, তেমন রেশমিবস্ত্র তৈরি করার জন্যও অনেক তাঁতি ও কারিগরের প্রয়োজন ছিল। সমসাময়িক নথিপত্র থেকে জানা যে এ অঞ্চলে এমন তাঁতি ও কারিগরের কোনও অভাব ছিল না। এদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা কিন্তু সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে বাজারে যখন সিল্কের কাপড়ের প্রচুর চাহিদা ছিল, কাঁচা মালেরও খুব একটা অভাব যখন চোখে পড়ে না, তখন আন্দাজ করা যেতে পারে যে এদের অবস্থাও খুব একটা খারাপ ছিল না। তাঁতিরা সাধারণত তিনটে রঙের ‘টাফেটা’ বুনত— পাকা সবুজ, হালকা সবুজ ও নীল। এই তিন রকম কাপড় বুনতে কোন খাতে কত খরচ হত, তাঁতি কত পেত এবং বিশেষ করে পুরো খরচের শতকরা কত তাঁতির লাভ থাকত সে সম্বন্ধে একটি তালিকা আমি পেয়েছি। পরের পাতায় সেটি উদ্ধৃত করা হল।

    আমরা আগেই বলেছি বাংলা থেকে যে বিপুল পরিমাণ কাঁচা রেশম রফতানি হত, তাঁর অধিকাংশই কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে, এবং ইউরোপীয় কোম্পানি তথা ভারতীয়/এশীয় বণিকরা সবাই এতে লিপ্ত ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ রেশম রফতানিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কাদের— ইউরোপীয়দের না ভারতীয়/এশীয় বণিকদের? এতদিন ঐতিহাসিকদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে বাংলা থেকে রফতানি বাণিজ্যে ইউরোপীয়দেরই মুখ্য ভূমিকা— তারাই বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করত। তা যদি হয়, তা হলে কাঁচা রেশমের রফতানিতেও তারা ছিল অগ্রগণ্য, কারণ বাংলা থেকে যে দু’টি প্রধান রফতানি পণ্য (মোট মূল্য এবং পরিমাণগতভাবে), তা হল বস্ত্র ও কাঁচা রেশম। সুতরাং ওপরের বক্তব্য অনুযায়ী কাঁচা রেশমের রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দেরই প্রধান ভূমিকা। অন্তত কে, এন, চৌধুরী (১৯৭৮), ওম প্রকাশ (১৯৮৫, ১৯৯৮), পিটার মার্শাল (১৯৭৮, ১৯৮৭), ক্রিস বেইলি (১৯৮৭) প্রমুখের গবেষণা গ্রন্থ থেকে এ ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক।৩৩

    তবে প্রশ্ন, এ ধারণা কি সঠিক? আমরা অস্বীকার করছি না যে বাংলার সমুদ্র বাণিজ্যে ইউরোপীয়রা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু তা বলে একথা বলা যায় না যে বাংলার সামগ্রিক বহির্বাণিজ্যে তারা এশীয় বণিকদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল কারণ এতে সমুদ্র বাণিজ্যের সঙ্গে স্থলপথে বহির্বাণিজ্যের ব্যাপারটাও থাকছে। অনেকদিন ধরেই বাংলা থেকে স্থলপথে বহিবাণিজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিকদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে (বিশেষ করে নীলস স্টিনসগার্ড (Niels Steensgaard), অশীন দাশগুপ্ত প্রমুখের লেখায়),৩৪ মুঘল, পারসিক ও অটোমান (Ottoman) এই তিনটি বিশাল সাম্রাজ্যের পতনের পর এবং তাঁর ফলে সুরাটের মতো আন্তর্জাতিক ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের পতন হওয়ায় স্থলপথে বাণিজ্য প্রচণ্ড মার খায়। এরকম চিন্তাধারার অন্যতম কারণ, ভারতবর্ষ/বাংলা থেকে স্থলপথে বাণিজ্য সম্বন্ধে কোনও তথ্য পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর, যেখানে ইউরোপীয় বাণিজ্য সম্বন্ধে বেশ সহজেই পরিসংখ্যানগত তথ্য ইউরোপের মহাফেজখানাগুলি থেকে সংগ্রহ করা যায়। অবশ্য এর সঙ্গে ও-সব ঐতিহাসিকদের মধ্যে ইউরোপ কেন্দিক (Eurocentric) মানসিকতাও হয়তো কিছুটা কাজ করেছে।

    সারণি ৭.২
    কাশিমবাজারে টাফেটা তৈরীর খরচ, ১৭৫৬
    [টাকা, আনা, পাই]

    Taffeta Cost of Silk Winding Cost Twisting Cost Patash
    & Straw agent Blue & other Other Dyes Tying Broken Threads Weaving Total Cost Weaver’s Profit in Percentage of Total Cost
    Pucca Green 6.10 0.4.6 0.4.0 0.2.0 0.10.6 3.12.6 0.1.0 1.4.0 13.0.6 9.6
    Pale Greem 6.10 0.4.6 0.4.0 0.2.0 0.10.6 3.11.0 0.1.0 1.4.0 9.15.0 12.5
    Blue 6.10 0.4.6 0.4.0 0.2.0 0.10.6 0.1.0 1.4.0 9.4.0 13.5
    [সূত্র: Fact. Records, Kasimbazar, vol 12, 15 Jan. 1756; BPC, vol. 28,f. 386. 22 Jan. 1756]
    আমরা কিন্তু এখন বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে দেখাতে পারছি যে কাঁচা রেশম রফতানির ক্ষেত্রে এশীয়রা ইউরোপীয়দের চাইতে, বলতে গেলে, বেশ কয়েক যোজনই এগিয়ে ছিল। এজন্য প্রথমে দেখা যাক, বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানি মধ্য-অষ্টাদশ শতক নাগাদ বাংলা থেকে কী পরিমাণ রেশম রফতানি করত। ইংরেজ কোম্পানির ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ১৭৪৫-৪৬ থেকে ১৭৪৯-৫০, এই পাঁচ বছরে তাদের রেশম রফতানির বার্ষিক গড় ১,২০০ মণ আর পরের পাঁচ বছরে অর্থাৎ ১৭৫০-৫১ থেকে ১৭৫৪-৫৫ পর্যন্ত বার্ষিক গড় ১,১৪৬ মণ। আর ডাচ কোম্পানির ক্ষেত্রে ১৭৪০-৪১ থেকে ১৭৪৪-৪৫-এ পাঁচ বছরে বার্ষিক গড় ছিল ৮৯৭ মণ আর ১৭৫০-৫১ থেকে ১৭৫৪-৫৫ পর্যন্ত তা ছিল ৯৬৯ মণ।৩৫ ফরাসিদের রফতানি সম্বন্ধে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি তবে পিটার মার্শালের অভিমত অনুসারে তাদের রফতানির পরিমাণ ইংরেজ ও ডাচদের রফতানির অর্ধেক মতো হবে (যদিও তা আরও কম হওয়ার সম্ভাবনা) ধরে নিলে, তার বার্ষিক গড় পরিমাণ হবে ৫০০ মণের মতো। অর্থাৎ ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসিদের সম্মিলিত রফতানির বার্ষিক গড় পরিমাণ দাঁড়ায় (ইংরেজদের ১,৫০০ মণ, ডাচদের ১,০০০ মণ, ফরাসিদের ৫০০ মণ ধরে) খুব বেশি হলে ৩,৫০০ মণ।৩৬ তা যদি হয়, এ সময় এশীয় বণিকদের রফতানির পরিমাণ কতটা ছিল তা দেখতে হবে।

    আমার সৌভাগ্য যে আমি কাশিমবাজার থেকে ১৭৪৯-১৭৬৭, এই দীর্ঘ উনিশ বছরের এশীয় বণিকদের রেশম রফতানির সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান উদ্ধার করতে পেরেছি। এই তালিকাটি ১৭৬৯ সালে কাশিমবাজারের ‘কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট’ অলডারসে (W. Aldersey) মুর্শিদাবাদের বাদশাহি শুল্কবিভাগের (seir customs house) রসিদপত্র থেকে তৈরি করেছিলেন।৩৭ যেহেতু এশীয় বণিকদের রেশম রফতানির জন্য মুর্শিদাবাদের শুল্কবিভাগে শুল্ক জমা দিতে হত, সেজন্য এই তালিকায় এশীয় বণিকরা কী পরিমাণ রেশম রফতানি করছে, তার পরিমাণ, মূল্য এবং কত শুল্ক দিচ্ছে সবই আছে। এতে স্পষ্ট করে বলা আছে যে এই তালিকায় শুধু এশীয় বণিকদের রফতানিই ধরা হয়েছে, অন্য কারও নয়। আমরা এখানে ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত এশীয় বণিকদের রফতানির পরিমাণ ও তার মূল্য তুলে ধরেছি। তারপর কয়েকবছরের যে হিসেব তা দেওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ তখন রফতানির পরিমাণ অনেক কমে গেছে।

    সারণি ৭.৩

    কাশিমবাজার থেকে এশীয়/ভারতীয় বণিকদের কাঁচা রেশম রফতানি, ১৭৪৯-৫৮ মোট পরিমাণ ও মূল্য

    বছর পরিমাণ(মণ) মূল্য (টাকা)
    ১৭৪৯ ২০,০৩৭ ৫৬,১০,৪২৩
    ১৭৫০ ১৯,৫৭১ ৫৪,৭৯,৭৮৬
    ১৭৫১ ২৩,৭৪০ ৬৬,৪৭,০৯৫
    ১৭৫২ ১৭,৬১৫ ৪৯,৩২,২২১
    ১৭৫৩ ১৮,০৫৩ ৫০,৫৪,৮৪০
    ১৭৫৪ ১৫,২৪৯ ৪২,৬৯,৫৯৪
    ১৭৫৫ ১২,২৬৯ ৩৪,৩৫,৩১০
    ১৭৫৬ ৭,৬৩৫ ২১,৩৭,৭৬২
    ১৭৫৭ ২১,৩৪৭ ৫৯,৭৭,০৪৫
    ১৭৫৮ ১৮,১৯২ ৫০,৯৩,৬৩৪
    এই তালিকার তলায় সংকলক অলভারসে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছেন:

    The above account indicates only the Trade on which Duties were really paid to the pachotra daroga [Royal Customs House] but besides this there was formerly carried on a very considerable trade in these articles by Juggutseats House and others who had interests with the Nizamat for these goods to pass Duty free…. The above is the trade of Natives only on which duties have been paid.

    [সূত্র: Bengal Public Consultations, Range 1, vol. 44, 19 June 1769]

    ওপরের সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে যে ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৮, এ দশ বছরে এশীয়/ভারতীয় বণিকরা মোট ১,৭৩,৭০৮ মণ কাঁচা রেশম রফতানি করেছে অর্থাৎ এসময় তাদের রফতানির বার্ষিক গড় ছিল ১৭,৩৭১ মণ। আর ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির মোট রফতানির বার্ষিক গড় ৩,৫০০ মণের বেশি নয়। সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সিল্ক রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের চাইতে এশীয়/ভারতীয় বণিকদের রফতানির পরিমাণ অনেক বেশি ছিল— অন্ততপক্ষে চার পাঁচগুণ বেশি। আর তাই যদি হয়, তা হলে এশীয়/ভারতীয় বণিকরাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি সোনা-রুপো/টাকাপয়সা আমদানি করত, ইউরোপীয়রা নয়। কারণ বাংলায় পণ্য কিনতে গেলে সব ব্যবসায়ী-সওদাগরকেই নগদ টাকা বা সোনা-রুপো নিয়ে আসতে হত। বাংলায় তা ছাড়া অন্য কোনও জিনিসের চাহিদা ছিল না। মধ্য অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বারবার একথা বলেছেন। এরকম এক কর্মচারী, উইলিয়াম বোল্টস (William Bolts), লিখেছেন যে বাংলার পণ্য কেনার জন্য অসংখ্য ব্যবসায়ী বাংলায় আসত, ‘with little else than money or bills [of exchange]’৩৭ এবং সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন যে ‘the inland importation into Bengal always far exceeded the whole importation by sea from Europe and the gulfs of Arabia and Persia.’৩৮ আরেকজন কর্মচারী যিনি পরে বাংলার গভর্নরও হয়েছিলেন, হ্যারি ভেরেলষ্ট (Harry Verelst) বলেছেন যে ‘the whole amount of the trade of the Provinces [of Bengal] was a clear gain to them by an exchange of their produce for bullion’ এবং ‘there flowed every year an increase of specie equal to the Amount of the export of the Country’.৩৯ অন্য আরেক কর্মচারী, লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন (Luke Scrafton), জানিয়েছেন যে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য সওদাগর ‘used to resort to Bengal with little else than ready money or bills to purchase the produce of the Provinces’.৪০

    বাংলা থেকে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল থেকে, কাঁচা রেশম রফতানির ক্ষেত্রে ভারতীয়/এশীয় বণিকদের যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য ছিল সেটা সমসাময়িক বহু তথ্য থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত। সদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি কাশিমবাজারের এক গুজরাটি সিল্ক ব্যবসায়ীর গোমস্তা ছিলেন এবং তিনি নিজেও তিরিশ বছর ওই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৭৫০-র দশকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে মুর্শিদাবাদে তখন দশ জন সওদাগর ছিল যারা বছরে ১৩,০০০ থেকে ২০,০০০ মণ পর্যন্ত সিল্ক রফতানি করত।৪১ বাংলায় ডাচ কোম্পানির অধ্যক্ষ লুই টেইলেফারট (Louis Taillefert) ১৭৬৩ সালে লিখেছেন যে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিক থেকে লাহোর ও মুলতান অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের গোমস্তারা মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার থেকে সিন্ধ কেনার পরিমাণ অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে।৪২ তা ছাড়া উইলিয়াম বোল্টস, হ্যারি ভেরেলস্ট, লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন প্রমুখ জোর দিয়ে বলেছেন যে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীদের অসংখ্য ‘ক্যারাভ্যান’ (caravan) বাংলায় পণ্য, বিশেষ করে বস্ত্র ও রেশম, কেনার জন্য নিত্য আসা যাওয়া করত। কিন্তু উত্তর পলাশি পর্বে এ চিত্র সম্পূর্ণ পালটে যায়। ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে ভারতীয়/এশীয় বণিকরা পিছু হঠতে বাধ্য হয় এবং ধীরে ধীরে তাদের স্থলপথের বাণিজ্যে ভাঁটা পড়তে থাকে এবং ক্রমশ তা প্রায় বিলীন হয়ে যায়।

    রেশম শিল্পের পাশাপাশি আরও কিছু ছোটখাটো শিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল হাতির দাঁতের কারুশিল্প (ivory carving)। এই শিল্পের উৎপত্তি নবাবি আমলে। তার আগে এর অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় না। এর উৎপত্তি সম্বন্ধে একটি গল্প বহুল প্রচলিত। মুর্শিদাবাদের এক নবাব একটি কান-খুঁচুনি (ear-pick) তৈরি করতে বলেন এবং সে অনুযায়ী ঘাসের তৈরি একটি কান-খুঁচুনি বানানো হলে সেটা তাঁর একেবারেই পছন্দ হয়নি। কারণ একমাত্র হাতির দাঁতের তৈরি জিনিসই নবাবের মর্যাদার উপযোগী। তখন এ কাজের জন্য দিল্লি থেকে এক ওস্তাদ কারিগরকে আনা হল। তিনি যখন এ কাজ করছিলেন তখন এক হিন্দু ভাস্কর বা খোদাইকার দেয়ালের একটি ফুটো দিয়ে জিনিসটা কীভাবে করা হচ্ছে সেটা দেখে নেয় এবং কীভাবে এটা করতে হয় সে কৌশল শিখে ফেলে। এই ভাস্কর তার ছেলে তুলসীকে কৌশলটি শিখিয়ে দেয়। তুলসী খাটেম্বের (Khatember) এ কাজে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠে এবং নবাব তাকে পনেরো টাকা মাস মাইনেতে দরবারে নিযুক্ত করেন। নবাব ও দরবারের জন্য তুলসী হাতির দাঁতের নানারকম জিনিসপত্র তৈরি করত। অষ্টাদশ শতকে মুর্শিদাবাদের হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম ভারতবর্ষের অন্য যে কোনও অঞ্চলের চাইতে অনেক বেশি সুনাম অর্জন করেছিল। দিল্লি, বেনারস প্রভৃতি অঞ্চলে মুর্শিদাবাদের এই শিল্পের অনুকরণে জিনিসপত্র তৈরি হত।৪৩

    হাতির দাঁতের কারুশিল্পে প্রধানত জীবজন্তুর মূর্তি— হাতি, ঘোড়া, উট, ইত্যাদি; নৌকা, পালকি, গোরুর গাড়ি, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, বিয়ের মিছিল, শিকারের চিত্র, চিরুনি, লাঠি, খেলনা, ছুরির বাঁট, কলমদান, দোয়াতদান, আয়নার ‘ফ্রেম’ (কাঠামো), এসব ছিল উল্লেখযোগ্য। মীরজাফরের বেগম বিধবা মুন্নি বেগম ওয়ারেন হেস্টিংসের স্ত্রীকে হাতির দাঁতের তৈরি একটা চেয়ার ও ছোট টেবিল উপহার দিয়েছিলেন। এ দু’টি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মূল্যবান বস্তু হয়ে উঠেছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে হাতির দাঁতের কারুশিল্প ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও রফতানি হত। দেশের ভেতরে এই শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাবরা, তাঁদের অমাত্য ও অন্যান্য অভিজাতবর্গ এবং ধনী শ্রেষ্ঠীরা। নবাব এবং দরবারের রমরমা যখন অস্তমিত, তখন কিছুদিন কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের ইউরোপীয় কোম্পানির কর্মচারীরা এই শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু রেশম শিল্প ও বাণিজ্যের অবনতির ফলে কোম্পানিগুলির এজেন্টরা ওই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ায় হাতির দাঁতের কারুশিল্পেও দুর্দিন ঘনিয়ে আসে। হাতির দাঁতের কারুশিল্পের জন্য হাতির দাঁত আসত শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রাম থেকে, যেখানে তখন হাতি শিকার করা হত। তা ছাড়া বোম্বাই থেকে কলকাতা হয়ে আফ্রিকার হাতির দাঁতও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে আসত।৪৪

    সূত্রনির্দেশ ও টীকা
    ১. Glamann, Dutch-Asiatic Trade, pp. 112-113; K.N. Chaudhuri, Trading World, pp. 343-47; S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, pp. 178-80; Om Prakash, Dutch Company, pp. 208-09.

    ২. S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, p. 179.

    ৩. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 119-200.

    ৪. Glamann, Dutch-Asiatic Trade, p. 122; Om Prakash, Dutch Company, pp. 187, 196, 199; S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, p. 181.

    ৫. Bernier, Travels, p. 439.

    ৬. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 220-21.

    ৭. Streynsham Master, The Diaries of…, vol. 2. p. 28.

    ৮. H.R. Ghosal, Economic Transition, p. 57, f.n. 126-এ উদ্ধৃত।

    ৯. Tavernier, Travels, vol. II, p. 2; K. N. Chaudhuri, Trading World, p. 354; Om Prakash, Dutch Company, p. 57.

    ১০. BPC, Range 1, vol. 44, Annex. to Consult., 19 June 1769,

    ১১. J. Geoghegan, Silk in India, pp. 15-16; D. H. W. Speed, ‘Notes on the Culture of Silk in Bengal’, in Transactions of Agricultural and Horticultural Society of India, vol. III. 1837, pp. 14-15. ১২৮০ টি গুটিপোকায় এক কাহন (kahan) বা ১৬ পণ। গোবর দিয়ে লেপে নিলে ডালাগুলি অনেক বেশি টিঁকত এবং গোবরের গন্ধে পোকামাকড়ও কম আসত।

    ১২. D. H. W. Speed, ‘Notes on the Culture of Silk’, pp. 22-23.

    ১৩. J. Geoghegan, Silk in India, pp. 6-7, 15-16.

    ১৪. Robert Orme, Historical Fragments, p. 412.

    ১৫. F. Buchanan, Bhagalpur, p. 613.

    ১৬. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, p. 225.

    ১৭. B. M. Addl. Mss. 34,123; Wilson, Early Annals, vol. 1. p. 376.

    ১৮. C & B. Abstr., vol. 3, f. 337, para. 36, 26 Dec. 1733.

    ১৯. Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, Consult. 23 Jan. 1744.

    ২০. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 299-303.

    ২১. BPC, Range 1, vol. 44, Annex. to Consult., 19 June 1769.

    ২২. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, p. 241, f.n. 82.

    ২৩. এ বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়।

    ২৪. Fact. Records, Kasimbazar, vol. 7, Consults., 19 Jan., 28 Feb. 1745.

    ২৫. Ibid, vol. 6, Consults., 10 March 1742; S. Chaudhury From Prosperity to Decline, p. 239.

    ২৬. John Taylor, ‘Dhaka Cloth Production’, Home Misc., 456F; S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, p. 145-46.

    ২৭. Om Prakash, European Commercial Enterprise, p. 174; Dutch Company, p. 217.

    ২৮. Factory Records, Kasimbazar, vol. 12, Consults, 7 Aug. 27 Aug. 1755.

    ২৯. Colebrook and Lambert, Remarks on Husbandry, p. 170.

    ৩০. BPC, Range 1, vol. 17, f. 66, 23 April 1744; Factory Records, Kasimbazar, vol. 6, 19 April 1744.

    ৩১. P. J. Marshall, Bengal, p. 66.

    ৩২. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 208-210.

    ৩৩. K. N. Chaudhuri, Trading World; Om Prakash, Dutch Company: European Commercial Enterprise; P. J. Marshall, East Indian Fortunes; Bengal; C. A. Bayly, Indian Society.

    ৩৪. Niels Steensgaard, Asian Trade Revolution; Ashin Das Gupta, Indian Merchants and the Decline of Surat.

    ৩৫. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, Table 8.2 and Table 8.3, pp. 251-52.

    ৩৬. Ibid, pp. 251-253; f. n. 114, p. 253.

    ৩৭. BPC, Range 1, vol. 44, Consults., 19 June 1769.

    ৩৮. William Bolts, Considerations, p. 200.

    ৩৯. Harry Verelst to Court of Directors, 2 April 1769, BPC, Range 1, vol. 24, f. 324.

    ৪০. Luke Scrafton, Reflections, p. 20.

    ৪১. Proceedings of the Board of Trade, 13 March 1791, quoted in N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, pp. 111-12.

    ৪২. Taillefert’s ‘Memorie’, HR. 246, f. 141, 17 Nov. 1763.

    ৪৩. O’Malley, Murshidabad District Gazetteer, p. 140; K. M. Mohsin, A Bengal District in Transition, pp. 74-75.

    ৪৪. Ibid., pp. 75-76.

  • অষ্টম অধ্যায় : সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

    অষ্টম অধ্যায় : সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবে ওই অঞ্চলের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কথা এসে পড়বে। এই সব দিকগুলির সম্যক বিশ্লেষণ প্রয়োজন কারণ আমরা দেখতে পাব, এই সব দিক থেকেই মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল বেশ কিছু বিশেষত্ব ও নতুনত্বের দাবি করতে পারে এবং সে দাবি খুবই যৌক্তিক। সপ্তদশ শতকে যে সব বৈশিষ্ট্য মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের তথা বাংলার ইতিহাসে দেখা যায়, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে তাতে অনেক পরিবর্তন আসে। সেগুলি সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে প্রতিফলিত।

    সমাজ
    নবাবি যুগে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের সমাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, বহু জাতি ও বহু ধর্মাবলম্বী মানুষের সমাবেশ। এরকম ঠিক এর আগে কখনও দেখা যায়নি। মুর্শিদকুলি যখন ১৭০৪ সালে দেওয়ানি কার্যালয় ঢাকা থেকে সরিয়ে মখসুদাবাদে (মুর্শিদাবাদে) নিয়ে আসেন তখন ওই দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত সব কর্মচারী মুর্শিদাবাদে চলে আসে, সঙ্গে আসে বেশ কিছু ব্যাঙ্কার-মহাজন ও সওদাগর—এদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ। তারপর যখন মুর্শিদকুলি ১৭১৬/১৭ সালে বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত হলেন এবং মুর্শিদাবাদই বাংলার নতুন রাজধানী হল, তখন ঢাকা থেকে সব রাজকর্মচারী এবং অমাত্য ও অভিজাতবর্গও মুর্শিদাবাদে এসে বসবাস শুরু করল। এদের মধ্যে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিল। তা ছাড়া নতুন সুযোগের সন্ধানে বহু ব্যবসায়ী-সওদাগর-মহাজনও ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে মুর্শিদাবাদে আস্তানা করল। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আর্মানি বণিকগোষ্ঠী। এমন কী তারা মুর্শিদাবাদের সৈয়দাবাদে নিজেদের একটি উপনিবেশও (কলোনি) স্থাপন করে। মুর্শিদকুলির রাজস্ব ও শাসনসংক্রান্ত সংস্কারের ফলে একদিকে যে নতুন এক বাণিজ্যিক শ্রেণি এবং অন্যদিকে এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়, তাদের অধিকাংশের আবাসস্থলও ছিল মুর্শিদাবাদ। তাছাড়া তখন বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানির অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্রও ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে। তাই নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের সমাজকে ‘কসমোপলিটান’ (cosmopolitan) বললে অত্যুক্তি হবে না।

    বলা বাহুল্য, সামাজিক স্তরবিন্যাসে মুর্শিদাবাদের সমাজে সর্বোচ্চ ছিল অভিজাত শ্রেণি। মুর্শিদাবাদ সুবে বাংলার রাজধানী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদ অভিজাতবর্গ ও তাদের আশ্রিত ব্যক্তিদের বাসস্থল হয়ে ওঠে। রিয়াজ-উস-সলাতিনের লেখক গোলাম হোসেন লিখেছেন, মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার নবাবদের নীতি ছিল দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিজাতদের আমন্ত্রণ করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসা।১ তার সঙ্গে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্যায়নের জন্য যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, তাতে প্রায় সব নবাবই যুক্ত ছিলেন। ফলে অনেক অভিজাত ব্যক্তি মুর্শিদাবাদে পদার্পণ করেন। এ সব নানা কারণে মুর্শিদাবাদে অভিজাত শ্রেণির বহু মানুষের সমাবেশ হয়। এই অভিজাতরা সাধারণত দুই সম্প্রদায়ের, হিন্দু ও মুসলমান। মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়। বস্তুতপক্ষে, মুর্শিদাবাদের মুসলমানদের মধ্যে শিয়াদেরই ছিল প্রাধান্য। ফারসি ইতিহাস তারিখ-ই-মনসুরীর লেখক মন্তব্য করেছেন: ‘in Murshidabad the Shias, are, by the blessing of God, the reigning sect’.২ অন্যদিকে মুর্শিদকুলি বাঙালি হিন্দু ছাড়া আর কাউকে রাজস্ববিভাগে নিযুক্ত করতেন না, ফলে প্রচুর হিন্দু রাজকর্মচারী মুর্শিদাবাদে বাস করত।৩ এ প্রসঙ্গে এটাও বলা দরকার যে, মুর্শিদকুলির সংস্কারের ফলে যে নতুন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয় তাদের অধিকাংশই হিন্দু। তাই মুর্শিদাবাদের দরবারে হিন্দুদের যে বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।

    মুর্শিদাবাদের সমাজে ও শ্রেণিবিন্যাসে অভিজাত শ্রেণির পরই ছিল ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক শ্রেণির স্থান। এদের অনেকে দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে মুর্শিদাবাদের সমাজে জায়গা করে নিয়েছিল। ১৭৩০-এর দশকে নবাব সুজাউদ্দিনের সময় জৈন কবি নিহাল সিংহ মুর্শিদাবাদে আসেন এবং তাঁর ‘বংগাল দেশ কী গজল’ কবিতায় গঙ্গাতীরবর্তী রাজধানীর ও ব্যবসায়কেন্দ্রের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী-বাণিজ্যিক শ্রেণির পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:৪

    বসতী কাসমবাজার, সৈদাবাদ খাগড়া সার।

    রহতে লোক গুজরাতীক, টোপীবাল জেতী জাতীক।

    আরব আরমনী আংগরেজ, হবসী হুরমজী উলাংদেজ।

    সীদী ফরাসীস আলেমান সৌদাগর মুর্গল পাঠান।।

    শেঠী কুংপনী কী জোর দমকে লাগে লাখ কিরোর।

    অর্থাৎ কবি নিহাল কাশিমবাজার, সৈয়দাবাদ ও খাগড়ায় বিভিন্ন বণিকগোষ্ঠীর উপস্থিতির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন কারণ এটা মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। আর এই বণিকগোষ্ঠীর মধ্যে হরেক দেশ ও জাতির লোক—গুজরাটি, আরব, আর্মানি, ইংরেজ, হাবসি, হুরমজি অর্থাৎ পার্সি, ওলন্দাজ (ডাচ), সিদ্দি, ফরাসি ও পাঠান-মোগল।

    শুধু তাই নয়, সমসাময়িক ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক ও ফরাসি নথিপত্রেও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে বিভিন্ন প্রান্তের বহু সওদাগরগোষ্ঠীর কার্যকলাপের কথা সবিস্তারে বলা হয়েছে। ফরাসি সূত্র থেকে জানা যায় যে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গুজরাটি, আর্মানি, মিরজাপুরি, গোরখপুরি প্রমুখ বণিকগোষ্ঠী খুবই সক্রিয় ছিল।৫ মুর্শিদাবাদের ‘পাচোত্রা’ দারোগার দপ্তরে শুল্ক জমার হিসেব থেকে দেখা যায়, লাহোর এবং মুলতান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা পণ্য রফতানি বাবদ শুল্ক জমা দিত।৬ ইংরেজ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস লিখেছেন:৭

    A variety of merchants of different nations and religions, such as Cashmeerians, Multanys, Patans, Sheikhs, Sunniasys, Paggayahs, Betteas and many others used to resort to Bengal.

    এই সব সওদাগরদের মধ্যে অনেকেই মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে তাদের বসতি স্থাপন করেছিল এবং স্থায়ীভাবেই এখানে বসবাস করত। বিশেষ করে যে সব সওদাগর পরিবার রাজস্থান, গুজরাট বা উত্তর ভারত থেকে আসত। তারা মুর্শিদাবাদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিল। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত অনেক মারওয়ারি পরিবার। জগৎশেঠরা এসেছিল মারওয়ারের নাগর থেকে অষ্টাদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে। মুর্শিদকুলির সঙ্গে এই পরিবারের মানিকচাঁদ মুর্শিদাবাদে আসেন এবং তারপর থেকে এঁরা মুর্শিদাবাদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান। তেমনি দুধোরিয়া পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা হুজুরীমল কাপড়ের ব্যবসা করতে রাজস্থানের বিকানির থেকে এসে মুর্শিদাবাদে স্থায়ী আস্তানা করেন।৮ এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে।

    এ সব বড় বড় সওদাগর ছাড়াও মুর্শিদাবাদে অনেক ছোট ছোট ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব ছিল, যারা নানা রকমের ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকত। এরকম একটা গোষ্ঠী ‘সন্ন্যাসীরা’। এরা একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক। সদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্য অনুযায়ী (খুব সম্ভবত পলাশির সময়কার অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে) কয়েকশো সন্ন্যাসী মুর্শিদাবাদ থেকে মিরজাপুরে কাঁচা রেশম রফতানি করত এবং বছরে ওই রফতানির পরিমাণ ছিল এক হাজার মণ।৯ এর পাশাপাশি মুর্শিদাবাদে অন্য একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দেখা মেলে— তারা হচ্ছে খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ী। মুর্শিদাবাদ একটি শহর, তাই তার বাসিন্দাদের জন্য প্রচুর খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হত। ১৭৮৩-৮৪ সালের একটি আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী মুর্শিদাবাদে রোজ ৫,০০০ হাজার মণ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন ছিল।১০ তা যদি হয়, মধ্য অষ্টাদশ শতকে শস্যের চাহিদা আরও বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক কারণ ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের পর এবং কোম্পানির দেওয়ানি লাভ ও কলকাতায় প্রায় সব অফিস-কাছারি নিয়ে যাওয়ায় মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যা ১৭৮৩-৮৪ সালে বেশ কমে যায়। যা হোক, আমাদের আলোচ্য সময়ে দৈনিক ৫,০০০ মণ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হত ধরে নিলেও এই বিশাল পরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করত বিশেষ একটি গোষ্ঠী—যারা খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ে লিপ্ত ছিল। সে হিসেবে মুর্শিদাবাদে এদের একটি বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল।

    এই খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের সম্বন্ধে নীচে উদ্ধৃত একটি বর্ণনা পাওয়া যায়:১০

    All the grain business is carried on by four tribes, the Cuyar, Buccali, Ujinea and Moorcha. They are managed by a few of the most rich and opulent of each tribe and no instance will ever occur of their underselling each other or ever deviating from the plans of combination

    ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির নাম দেখে অনুমান করা যায় যে এরা মূলত রাজস্থানের বাসিন্দা ছিল। ‘মুরচা’ ও ‘কুয়ার’রা সম্ভবত উত্তর-পশ্চিম রাজস্থানের শৈখাবতীর লোক, ‘উজিনিয়ারা’ উজ্জয়নের ব্রাহ্মণ। ওপরের উদ্ধৃতি থেকে খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলি হল, এদের গোষ্ঠীগত সংহতি এবং গোষ্ঠীগুলির ওপর দলপতি বা সর্দারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা। এরা খাদ্যশস্য মজুত করত ভগবানগোলাতে—সেখানে তাদের অনেকগুলি গোলা ছিল। বলা বাহুল্য, সুযোগ বুঝে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদে খাদ্যশস্যের অভাব দেখা দিলে, ব্যবসায়ীরা শস্যের দাম বাড়িয়ে দিত এবং প্রচুর মুনাফা করে নিত।১১

    মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ীরা একটি মিশ্র বা ‘হেটেরোজেনাস’ গোষ্ঠী—এদের মধ্যে একদিকে বড় বড় সওদাগর, ব্যাঙ্কার, অন্যদিকে ছোটখাট ব্যবসায়ী, যাদের মধ্যে খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ী, সন্ন্যাসী ও ছোট ছোট ব্যাপারী (peddlers) সবাই ছিল। ব্যাঙ্কার মহাজনদের মধ্যে বাঙালি, অবাঙালি সবাই অন্তর্ভুক্ত। অবাঙালিদের মধ্যে বিশেষ করে গোষ্ঠী, জ্ঞাতি এবং জাতপাতের প্রশ্ন বড় করে দেখা যেত। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল ওসওয়াল (Oswal) সম্প্রদায়ের জৈন। এদের কাজ কারবার দেখার জন্য এরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর লোকদেরই নিযুক্ত করত। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ জগৎশেঠরা। শেঠদের গোমস্তারা সবাই তাঁদের নিজেদের আত্মীয়, জ্ঞাতি বা সম্প্রদায়ের লোক।১২ এটা অবশ্য আর্মানিদের ক্ষেত্রে আরও বিশেষ করে প্রযোজ্য। তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোক ছাড়া কাউকেই প্রায় গোমস্তা বা এজেন্ট নিযুক্ত করত না। বাংলায় আর্মানিদের কাজকর্মের বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।১৩ সামাজিক দিক থেকে এ সব ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করত। এদের বিয়ে, সাদি, সামাজিক মেলামেশাও নিজেদের গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, ধর্মীয় ব্যাপারে তো বটেই। সবাই প্রায় নিজেদের মহল্লাতেই বসবাস করত।

    অভিজাত শ্রেণি, ব্যবসায়ী-সওদাগর ছাড়া মুর্শিদাবাদের অন্য যারা বাসিন্দা, তাদের মধ্যে অন্যতম, যারা বৃত্তিমূলক (professional) কাজে নিযুক্ত ছিল। আবার এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে শাসন, রাজস্ব ও আইন বিভাগে মাঝারি ও নীচের দিকের কর্মচারী। মুর্শিদাবাদ নিজামতে, দেওয়ানিতে, সদর দেওয়ানি আদালতে, ফৌজদারি আদালতে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে মাঝারি ও নিম্নস্তরে বহু কর্মচারী নানা পদে অধিষ্ঠিত ছিল। সাধারণভাবে বেশির ভাগ দপ্তরেরই প্রধান পদে মুসলমান কর্মচারী, বাকি সব পদে বেশিরভাগই হিন্দু কর্মচারী থাকত। কবি ভারতচন্দ্র নবাব ও রাজাদের দরবারের নিচুতলার কর্মচারী ও বিভিন্ন বৃত্তিধারী লোকজনের তালিকা দিয়েছেন। তাতে বৈদ্য, হস্তগণনাকারী, লেখক, খাজাঞ্চি, উকিল, ‘বাজে জমি’ দপ্তরের প্রধান, সময়রক্ষক, নাকিব, এমন সব বৃত্তিমূলক ব্যক্তির নাম আছে। এদের স্ত্রীরা এদের সম্বন্ধে যে বর্ণনা দিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে এদের বেশির ভাগই হিন্দু।১— এই তালিকা থেকে অনুমান করা যায় যে পেশাদারি লোকদের আয় ও তাদের সামাজিক মর্যাদায় বেশ তারতম্য ছিল।

    বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী ছাড়াও বিভিন্ন পেশায় লিপ্ত বহু লোকের আবাস ছিল মুর্শিদাবাদে। এদের মধ্যে বৈদ্য ও কবিরাজরা সমাজে বেশ মর্যাদা ভোগ করত। উচ্চপদস্থ মুসলমান কর্মচারীদের কাছে এদের খুব কদর ছিল এবং মুসলমান হেকিমের চেয়ে এদের চিকিৎসার ওপর তাদের ভরসা ছিল অনেক বেশি।১৫ এ ছাড়া মুর্শিদাবাদের সমাজে হিন্দু পুরোহিত, মুসলমান মোল্লা, মৌলভি ও অন্যান্য ধর্মগুরুরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সিয়রের লেখক গোলাম হোসেন খান লিখেছেন যে মুর্শিদাবাদের নবাবরা এদের মুর্শিদাবাদে এসে বসবাস করার জন্য আহ্বান জানাতেন এবং তাদের নানারকম উপহার ও সুযোগ সুবিধা দিতেন।১৬ ভারতচন্দ্র তার সময়কার বাদশাহি/রাজকীয় নগরীর অধিবাসীদের পেশাগত যে বর্ণনা দিয়েছেন, মুর্শিদাবাদ সম্বন্ধে তা প্রযোজ্য। তিনি লিখেছেন:১৭

    কায়স্থ বিবিধ জাতি দেখে রোজগারি।

    বেনে মণি গন্ধসোনা কাঁসারি শাঁখারি।।

    গোয়ালা তামুলী তিলি তাঁতী মালাকার।

    নাপিত বারুই কুরী কামার কুমার।।

    আগরি প্রভৃতি আর নাগরী যতেক।

    যুগি চাষা ধোবা চাষা কৈবৰ্ত্ত অনেক।।

    সেকরা ছুতার নুড়ী ধোবা জেলে গুঁড়ী।

    চাঁড়াল বাগদী হাড়ী ডোম মুচী শুঁড়ী।।

    কুরমী কোরঙ্গা পোদ কপালি তিয়র।

    কোল কলু ব্যাধ বেদে মালী বাজিকর।।

    এ ছাড়া অবশ্য দিনমজুর ও অন্য খেটেখাওয়া মানুষও ছিল মুর্শিদাবাদে। মনে হয় কাজকর্মের সন্ধানে এরা আশপাশের গ্রামাঞ্চল থেকেই আসত। নবাবের সৈন্যবাহিনীতে প্রচুর সাধারণ সৈন্যও ছিল। নবাবি আমলে অনেক স্থানীয় ব্যক্তিকেও সৈন্যবাহিনীতে নেওয়া হত। রিয়াজের লেখক জানিয়েছেন যে আলিবর্দির যে সব সৈন্যের মুর্শিদাবাদে বাড়ি তারা ঘরে ফেরার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকত। সুতরাং আমরা বলতে পারি মুর্শিদাবাদের সমাজে অভিজাত থেকে শুরু করে সাধারণ স্তরের মানুষও পাশাপাশি বাস করত এবং সমাজ ছিল বহু জাতি, বর্ণ, গোষ্ঠী ও ধর্মাবলম্বীর এক সংমিশ্রণ।

    অর্থনীতি
    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ উন্নত ছিল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সপ্তদশ শতকে, বিশেষ করে এই শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, বাংলা থেকে দিল্লি, আগ্রা ও উত্তর ভারতের অন্যত্র যে ধন নিষ্ক্রমণ হত, তা নবাবি আমলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। মুর্শিদকুলি আসার আগে পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, সবাই মুঘল বাদশাহি পরিবারের লোক বা মুঘল দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলেই ওই পদে নিযুক্ত হতেন। সুবাদার শাহ সুজা (১৬৩৯-৬০) ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র। আরেক সুবাদার, শায়েস্তা খান (দুবার, ১৬৬৪-৭৮ এবং ১৬৭৯-৮৮) ছিলেন সম্রাট ঔরংজেবের পিতৃব্য এবং অন্য এক সুবাদার আজিম-উস-শান (১৬৯৭-১৭১২) ছিলেন ঔরংজেবের পৌত্র। অন্য সুবাদাররাও অনেকেই মুঘল দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এঁরা, বিশেষ করে মুঘল পরিবারের সদস্যরা, বাংলা ছাড়তে চাইতেন না কারণ এখানে ধনসম্পদ আহরণের অফুরন্ত সুযোগ। তাই মুঘলনীতির ব্যতিক্রম করে তাঁরা তিন বছরের অনেক বেশি সময় বাংলায় সুবাদার হিসেবে থেকে গেছেন। এঁরা বাংলা থেকে যে ধনসম্পদ আহরণ করতেন তার সবটাই প্রায় বাংলার বাইরে দিল্লি, আগ্রা ও উত্তর ভারতে নিয়ে যেতেন। ফলে বাংলা থেকে এই ধন নিষ্ক্রমণের ধারা সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল। এই সব সুবাদার, মনসবদাররা কী পরিমাণ ধন আহরণ করে বাংলার বাইরে নিয়ে যেতেন তার একটা ধারণা করা যেতে পারে কয়েকজনের দৃষ্টান্ত থেকে। শায়েস্তা খান ১০ বছরে ৯ কোটি টাকা, খান জাহান বাহাদুর খান এক বছরে ২ কোটি এবং আজিম-উস-শান ৯ বছরে ৮ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন।১৮

    নবাবি আমলে বাংলা, অবশ্যই মুর্শিদাবাদ থেকে, এই বিপুল ধন নিষ্ক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এখন আর সুবাদাররা দিল্লি থেকে নিযুক্ত মনসবদার নন, মুর্শিদকুলি বাংলায় প্রায় স্বাধীন নিজামত প্রতিষ্ঠা করেছেন। দিল্লি থেকে বাংলায় মুঘল মনসবদার বা অন্য উচ্চপদস্থ কর্মচারী পাঠানও এখন বন্ধ হয়ে গেল। স্থানীয় বাসিন্দারাই এখন নিজামতের সব পদে নিযুক্ত হল। ফলে বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের প্রশ্নই রইল না। নবাবরা বা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা বাংলায় ধন আহরণ করা বন্ধ করে দিলেন ঠিক তা নয়। যা ধনসম্পদই তাঁরা আহরণ করে থাকুন না কেন, তা বাংলাতেই থেকে গেল, তাতে বাংলার ধনসম্পদই বৃদ্ধি পেল। ১৭৪০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত নবাবরা বাংলা থেকে প্রতি বছর ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার মতো রাজস্ব দিল্লিতে পাঠাতেন। তা ছাড়া বাংলার প্রায় সব নবাবই প্রচুর অর্থ ব্যয় করে মুর্শিদাবাদে নানা প্রাসাদ, মসজিদ, সমাধিভবন প্রভৃতি নির্মাণ করেন। এ সবকিছু করেও নবাবরা যে পরিমাণ ধনসম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন, তা দেখে অবাক হতে হয়।

    পলাশিতে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাভূত করে ইংরেজরা মুর্শিদাবাদের কোষাগারে গিয়ে নবাবের সঞ্চিত ধনসম্পদ দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র সোনা-রুপো নিয়ে ওখানে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ কোটি টাকা। ক্লাইভ লিখেছেন যে নবাবের কোষাগারে ঢুকে অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন, সোনা ও হিরে-জহরত দুধারে স্তূপীকৃত হয়ে আছে।১৯ আমরা আগেই বলেছি, তারিখ-ই-মনসুরীর লেখক জানিয়েছেন যে নবাবের হারেমে লুকোনো যে ধনসম্পদ ছিল, সোনা, রূপো, হিরে, জহরত মিলে তার মূল্য কম করে ৮ কোটি টাকা।২০ আর মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলির ভাষ্য অনুসারে, সিরাজদ্দৌলা ঘসেটি বেগমকে মোতিঝিল প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করে সেখান থেকে হীরে জহরত বাদ দিয়েই নগদ ৪ কোটি টাকা ও ৪০ লক্ষ মোহর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ১ কোটি টাকা মূল্যের সোনা, রুপোর নানা বাসনপত্রও সিরাজ মোতিঝিল থেকে উদ্ধার করেছিলেন।২১ এসব তথ্যে হয়তো কিছুটা অত্যুক্তি আছে কিন্তু তা হলেও এ থেকে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে।

    নবাব, মনসবদার বা অন্যান্য অভিজাতবর্গ শুধু নয়, নবাবি আমলে ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগর প্রভৃতি শ্রেণি প্রচুর ধনসম্পদ আহরণ ও সঞ্চয় করেছিল। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত জগৎশেঠ পরিবার। সামান্য মহাজন থেকে তাঁরা ভারতবর্ষ তথা এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাঙ্কার হয়ে ওঠেন। তাঁদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা, আর ব্যবসার মূলধনই ছিল কম করে ৭ কোটি টাকা, কারও কারও মতে ১৪ কোটি টাকা।২২ জগৎশেঠরা ছাড়াও মুর্শিদাবাদে তখন আরও দু’জন বণিকরাজা ছিলেন, উমিচাঁদ ও খোজা ওয়াজিদ। এঁদের সম্পদের বা সঞ্চিত অর্থের কোনও তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তা যে বেশ ভাল পরিমাণের হবে সেটা অনুমান করা যায়। কারণ উমিচাঁদ সোরা, আফিং-এর প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করতেন। তা ছাড়াও ছিল তাঁর টাকা লেনদেনের ব্যবসা। খোজা ওয়াজিদ বিহারের অর্থনীতি প্রায় কব্জা করে নিয়েছিলেন, সোরা এবং আফিং-এর ব্যবসাও ছিল তাঁর কুক্ষিগত। এ ছাড়া তিনি সমুদ্রবাণিজ্যেও লিপ্ত ছিলেন, তাঁর কমপক্ষে ৬টি বাণিজ্যতরী ছিল। এ সব তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যে মুর্শিদাবাদের বণিকরাজারা প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন।

    বণিকরাজারা ছাড়াও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে বহু ব্যাঙ্কার-মহাজন, সওদাগর এসে ভিড় জমিয়েছিল। নবাবি আমলে এখানকার কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তুঙ্গে। এ সব পণ্যের চাহিদা শুধু ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে নয়, ইউরোপেও ছিল প্রচুর। ফলে শিল্পবাণিজ্যের তখন রমরমা। জৈন কবি নিহাল সিংহ লিখেছেন, বালুচরে কাঁসার হাট বসে, সেখানে অনেক রকম ভাল ভাল বাসন বিক্রি হয়। বহু ঘর তাঁতিরও বাস সেখানে, তারা নানারকমের কাপড় বোনে। কাশিমবাজার, সৈয়দাবাদ ও খাগড়ায় অনেক লোকের বাস, বিভিন্ন দেশের, জাতির ও ধর্মের। রেশমের ও রেশমি বস্ত্রের কারবার জমজমাট। দিল্লির সঙ্গেই যেন মুর্শিদাবাদ টেক্কা দেয়—‘জৈসা দিল্লিকা বাজার, তৈসা চৌক গুলজার’।২৩ বাজারে টাকার অঢেল আমদানি, ধারের কোনও অসুবিধেই নেই। বাজারে যে টাকার অভাব নেই, টাকার আমদানি যে বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা ১৭৪০ সালের একটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি তাদের রফতানি পণ্য কেনার জন্য বাংলার টাকার বাজার থেকে প্রায়ই টাকা ধার করতে বাধ্য হত এবং তারা ধার করত প্রধানত জগৎশেঠদের কাছ থেকে। সুদের হার ছিল শতকরা ১২ টাকা। এ হার কমাবার জন্য কোম্পানিগুলি অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিফল হয়। ১৭৪০ সালে ইংরেজরা মুর্শিদাবাদে জগৎশেঠদের কুঠিতে গিয়ে সুদের হার কমাবার জন্য আবার অনুনয় বিনয় করে। জগৎশেঠ সেটা মঞ্জুর করেন এবং পরের দিন থেকে সুদের হার শতকরা ১২ টাকা থেকে নেমে শতকরা ৯ টাকা হয়ে যায়। এটা টাকার বাজারে জগৎশেঠদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ সন্দেহ নেই। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হয় তখন বোধ হয় বাজারে টাকার আমদানি ছিল প্রচুর, ধার সহজলভ্য। তাই হয়তো জগৎশেঠরা এক কথায় সুদের হার কমিয়ে দেন।২৪

    এ প্রসঙ্গে নবাব আলিবর্দির সময়, ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত, প্রায় প্রতি বছর যে মারাঠা আক্রমণ হয়েছে, মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনীতিতে তার কতটা প্রভাব পড়েছিল তা আলোচনা করা প্রয়োজন। আমরা আগেই বলেছি, মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে এই আক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এমন বক্তব্য সঠিক বলে মনে হয় না। অর্থনীতি যেটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা সাময়িক এবং কয়েকটি জায়গায় সীমাবদ্ধ। এর কোনও দীর্ঘকালীন প্রভাব মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনীতিতে পড়েনি। মারাঠারা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়, মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট পথেই বাংলায় লুঠতরাজ করতে আসত। ওই সব অঞ্চলের কৃষক-তাঁতি-কারিগর প্রমুখ বর্ষার আগে, মারাঠারা চলে গেলে, নিজেদের কাজকর্ম শুরু করে দিত আবার শীতকালে, মারাঠারা আসার আগে, তাদের ফসল/উৎপাদন সব গুছিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে যেত। মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় মারাঠা আক্রমণের ভয়ে জগৎশেঠ ও অন্যান্য ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগররা কিছুদিন মুর্শিদাবাদ ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতেন এবং মারাঠাদের মুর্শিদাবাদ আক্রমণের সম্ভাবনা চলে গেলে আবার তাঁরা মুর্শিদাবাদে ফিরে আসতেন। মাঝে মাঝে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বাজারে টাকার অভাব দেখা দিত কিন্তু সেটা একেবারেই সাময়িক। জগৎশেঠ এবং অন্যান্যরা মুর্শিদাবাদে ফিরে এলে ব্যবসা-বাণিজ্যে আবার রমরমা দেখা দিত, বাজারে টাকারও কোনও অভাব থাকত না। মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে মারাঠা আক্রমণের ফলে যে কোনও অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়নি তার প্রমাণ, এ সময়েও ওই অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা রেশম ও রেশমি কাপড় রপ্তানি হয়েছিল। যে অর্থনীতিতে ওই পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হতে পারে, তা মারাঠা আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েছিল এ কথা বলা যায় না।২৫

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের সাধারণ লোকের অবস্থা মোটামুটি ভালই ছিল মনে হয়। প্রথমে দেওয়ানি কার্যালয় ও পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ায়, এবং মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে কাঁচা রেশম ও রেশমি কাপড়ের ব্যবসার জন্য ওই অঞ্চলে কাজকর্ম এবং আয়ের পথও বেশ সুগম হয়। তা ছাড়াও নবাবদের নানা স্থাপত্যকর্মের ফলে বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়। আসলে মুর্শিদকুলি অভিজাতবর্গ, দেশি সওদাগর, বিদেশি বণিক, হিন্দু কর্মচারী ও জবরদস্ত জমিদারদের সামলে ও তাদের নিয়ে বাংলায় নিজামতের যে কাঠামোটি তৈরি করেন এবং পরে অন্য নবাবরা যেটা বজায় রেখেছিলেন তাতে সলিমুল্লা, গোলাম হোসেন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা সুবে বাংলাকে ‘দার-উল-আমন’ বলতে দ্বিধা করেননি। আর এই ‘দার-উল-আমনে’র রাজধানী হিল মুর্শিদাবাদ। হয়তো সাধারণ লোকের কথা ভেবেই মুর্শিদকুলি বাংলা থেকে চাল রফতানি বন্ধ করে দেন এবং সে কারণেই সম্ভবত চালের দাম অনেক কমে যায় ও তাতে সাধারণ মানুষের খুব সুবিধা হয়। রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন বলেছেন এ সময় মুর্শিদাবাদে চালের দাম ছিল টাকায় ৫ থেকে ৬ মণ, যদিও সলিমুল্লা লিখেছেন, টাকায় ৪ মণ। সে অনুপাতে অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও ছিল সস্তা। ফলে, গোলাম হোসেন সলিম জানাচ্ছেন, তখন মাসে এক টাকা খরচ করলেই লোকে পোলাও, কালিয়া খেতে পারত। এটা হয়তো অত্যুক্তি, যদিও এ থেকে অনুমান করা যায় যে সাধারণ লোকের অবস্থা বেশ স্বচ্ছলই ছিল।২৬

    নবাব সুজাউদ্দিনের সময়েও মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার আর্থিক অবস্থা বেশ উন্নতই ছিল। সিয়রের লেখক ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন খান সুজাউদ্দিনের শাসনকাল সম্বন্ধে লিখেছেন যে বাংলা তখন ‘came to enjoy so much prosperity as to exhibit everywhere an air of plenty and happiness’.২৭ ১৭৮৯ সালে ইংরেজ কোম্পানির রাজস্ববিভাগের কর্মচারী, জন শোর (John Shore), মন্তব্য করেছেন যে আলিবর্দির শাসনকালের শেষ কয়েকবছর বাদ দিয়ে মুর্শিদকুলি থেকে মীরকাশিমের রাজত্বকালের মধ্যে, একমাত্র সুজাউদ্দিনের সময়েই দেশের উন্নতিসাধন করাটা মুর্শিদাবাদের নিজামতের প্রধান লক্ষ্য ছিল।২৮ কবি নিহাল সিংহ এই সময় মুর্শিদাবাদে আসেন এবং সুজাউদ্দিনের রাজত্বকালে পৌরাণিক রাম রাজ্যের লক্ষণ দেখতে পান: ‘নাহি জোর অর জুলম্যাঁন, নাঁহি বাটমৈ বটপার, নাঁহি চোর চেটকবার।’ তাই সকল প্ৰজাই সুখী। দুঃখীর দেখা পাওয়াও ভার হয়ে ওঠে। ‘ইহবিধ রহৈ রেয়ত সুখী, দেখা কোউ নাঁহি দুঃখী’।২৯

    নবাব আলিবর্দি খানের আমলে মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনৈতিক অগ্রগতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল সন্দেহ নেই তবে সেটা সাময়িক। ১৭৫১ সালে মারাঠাদের কাছ থেকে শান্তি কেনার পর আলিবর্দি সর্বশক্তি ও মনপ্রাণ দিয়ে রাজ্যের উন্নতিসাধনে উঠে পড়ে লাগেন। তিনি যে এ কাজে যথেষ্ট সফল হয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে মুর্শিদাবাদ শহরের বিস্তৃতি ও শ্রীবৃদ্ধিতে দেখা যায়। মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলি লিখেছেন যে আলিবর্দির শাসনকালের শেষদিকে মুর্শিদাবাদ শহর প্রচুর বিস্তার লাভ করে— দৈর্ঘ্যে ২৪ মাইল, প্রস্থে ১৪ মাইল তখন শহরের আয়তন। তা ছাড়াও অনেক ধনী ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কার শহরের প্রান্তে তাদের বাগানবাড়ি তৈরি করে।৩০ নগরায়ণের এই যে চিত্র, তা থেকে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ও অগ্রগতির প্রমাণ পাওয়া যায়। পলাশির পর রবার্ট ক্লাইভ প্রথম মুর্শিদাবাদ দেখে বিস্ময়ে হতবাক। তিনি মন্তব্য করেছেন যে মুর্শিদাবাদ লন্ডনের মতোই বিরাট, প্রচুর লোকবসতি এবং লন্ডনের মতোই ধনী শহর। তফাত শুধু এই যে লন্ডনের চেয়ে মুর্শিদাবাদে অনেক বেশি ধনী লোক যাদের ধনসম্পদ লন্ডনের যে কোনও ধনী বাসিন্দার চাইতে অনেক অনেক বেশি।৩১

    সংস্কৃতি ও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক
    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদকে বহু জাতি, বিভিন্ন র্ধম ও বর্ণের মানুষের মিলনক্ষেত্র বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। মুর্শিদাবাদে প্রথম দেওয়ানি ও পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে দেশবিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ মুর্শিদাবাদে এসে ঠাঁই নেয়। আবার মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের প্রধান উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের সওদাগর-ব্যাঙ্কার-মহাজন এসে ভিড় জমায় এখানে। এদের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল হিন্দু-জৈন ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগর, অন্যদিকে তেমনই দেখা যায় তার সঙ্গে ছিল শিয়া মুসলমান সম্প্রদায়। এরকম একটি জায়গায় বহু জাতি, বহুবর্ণ ও বহু ধর্মাবলম্বীর সমাবেশ ইতিহাসে খুবই বিরল। এর জন্য অবশ্য মূলত মুর্শিদাবাদের নবাবদের উদারনীতিই অনেকটা দায়ী। সব ধর্ম ও জাতি সম্পর্কে সহনশীলতা ও উদারতা মুর্শিদাবাদের নবাবদের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। ফলে মুর্শিদাবাদে নবাবদের আমলে যে কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দেখা যায়, তা যে কোনও শহরের পক্ষেই গর্বের বিষয়।

    আসলে মুর্শিদকুলির সময় থেকে মুর্শিদাবাদের নবাবরা উদারতা ও সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করেন। হয়তো তাঁদের ধারণা ছিল এতেই রাষ্ট্রের মঙ্গল ও উন্নতি হবে। তাই নিজেরা শিয়া মুসলমান হয়েও সুন্নি মুসলমান, হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তাঁরা কোনও বৈষম্যমূলক আচরণ করেননি। মুর্শিদকুলির সময় থেকেই হুগলি ও মুর্শিদাবাদ শিয়াদের বড় উপনিবেশ হয়ে ওঠে। বাংলায় জগৎশেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মানিকচাঁদ জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েও মুর্শিদকুলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন। মূলত তাঁরই আকর্ষণে মানিকচাঁদ তাঁর সঙ্গে ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদ চলে আসেন। পলাশির আগে পর্যন্ত এই জগৎশেঠ পরিবারই মুর্শিদাবাদ নিজামতের সবচেয়ে বড় সমর্থক ও হিতাকাঙক্ষী বলে পরিচিত ছিল। আবার মুসলমান হয়েও মুর্শিদকুলি শাসনবিভাগের প্রায় সর্বত্র, বিশেষ করে রাজস্ববিভাগে, হিন্দুদেরই নিয়োগ করেছিলেন। এর পেছনে হয়তো তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের স্বার্থ—রাজস্ব আদায়ে যাতে কোনও রকমের গাফিলতি না হয়। কিন্তু তা হলেও এর ফলে নবাবি আমলে একটি ধারার (tradition) সৃষ্টি হয়— হিন্দুরা শুধু সাধারণ কর্মচারী নয়, অনেক উচ্চপদেও নিযুক্ত হয়। বলতে গেলে নবাবি আমলে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রে হিন্দুদেরই ছিল প্রায় একচ্ছত্র প্রাধান্য।

    তা বলে মুর্শিদাবাদে শুধু শিয়া, সুন্নি বা হিন্দুদের বাস ছিল তা নয়। ছিল আরও অনেক জাতি ও ধর্মের মানুষের। আমরা আগেই বলেছি, মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে আরব, আর্মানি, ইংরেজ, হাবসি, পার্সি, ওলন্দাজ, সিদ্দি, ফরাসি, পাঠান, মোগল, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, লাহোরি, মুলতানি— সবাই এসে জড়ো হত নানা কাজে, ব্যবসায় কেনাবেচা করতে, বিশেষ করে রেশম ও রেশমিবস্ত্র সংগ্রহ করতে। ফলে এত বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের লোক পাশাপাশি থাকার ফলে পরস্পরের মেলামেশা ও আদানপ্রদানের মাধ্যমে একটি ‘কসমোপলিটান’ (cosmopolitan) সংস্কৃতির উদ্ভব হয় মুর্শিদাবাদে। একদিকে হিন্দু ও জৈন মন্দির, মুসলমান মসজিদ অন্যদিকে আর্মানি ও খ্রিস্টানদের গির্জা—সবকিছুর সহাবস্থান। কবি নিহাল সিংহ লিখেছেন, মুর্শিদাবাদে ভাল ভাল দেবমন্দির ও ধর্মশালা আছে, তার গা ঘেঁষেই উঠেছে সুন্দর সব মসজিদ ও মিনার। অসংখ্য যতী, যোগী, ভক্ত, প্রভৃতি নানা বেশে এখানে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়।৩২

    আছ দেহরে পোষাল, সিবকৈ ধাম অরু ধ্রুমশাল,

    মসজিদ মুনারে মকাম, ক্যা ক্যা বনৈ হৈ কমঠান,

    জোগী জতী নাথ অলেখ, জংগম ভকত নানা ভেখ?

    এদিকে ধর্মনিষ্ঠ নবাব মুর্শিদকুলি শহরে মাদ্রাসা ও বাজার বা কাটরা পাশাপাশি খুলে দেন। নবাবি মুর্শিদাবাদে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর আরাধনা একসঙ্গে শুরু হয়। উৎসবের দিনে মাহিনগর, লালবাগ প্রভৃতি এলাকায় প্রজানির্বিশেষে খাওয়ানো, দান খয়রাত চলত, এলাকাগুলিও জমজমাট হয়ে পড়ত। আরেকদিকে নবাব সাহেব নিজের হাতে কোরান নকল করতেন আর সেই কোরান বিলি করা হত নামজাদা জায়গায়—মক্কা, মদিনা ও কারবালায়, এবং বাংলার পাণ্ডুয়ায়, গাজিসাহেবের আস্তানায়। নিজে শিয়া হয়েও মুর্শিদকুলি সুন্নি আলিমদের সঙ্গে ‘বহস’ করতে ভালবাসতেন। সব মিলে মুর্শিদাবাদ সব ধর্ম ও সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। এ ধারা পলাশি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের নানা পালাপর্বণ, উৎসব, সমারোহে বিভিন্ন ধর্ম সংস্কৃতির সমন্বয় চোখে পড়ে। মহরমের সময় ভাটিয়ালি গায়করা শোকগাথা গাইত।৩৩ শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা একই মসজিদে পাশাপাশি নমাজ পড়ত। হিন্দুদের হোলি উৎসবে মুসলমানরাও যোগ দিত। শুধু সাধারণ প্রজা নয়, নবাবরাও হোলি উদযাপন করতেন। নবাব শহমৎ জঙ্গ (ঢাকার নবাব নওয়াজিস মহম্মদ খান) শওকত জঙ্গের (তিনি তখন পাটনা থেকে এসেছিলেন) সঙ্গে মুর্শিদাবাদের মোতিঝিল প্রাসাদে সাতদিন ধরে হোলি উৎসব পালন করেন। এমন কী সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের চুক্তি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) সম্পাদন করেই তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদ ফিরে তাঁর প্রাসাদ হীরাঝিলে হোলির উৎসবে মেতে ওঠেন।৩৪ শুধু তাই নয়, নবাবরা প্রচুর অর্থব্যয় করে হিন্দুদের দেওয়ালি উৎসবও পালন করতেন।৩৫ মুর্শিদাবাদে মারাঠাদের তৈরি মন্দিরের পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল আলিবর্দির মসজিদ। এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। বরানগরের মন্দিরচত্বর এবং মাস্তিরাম আওলিয়ার আখড়া সামনাসামনি অবস্থান করছিল। এই এলাকাতেই রানি ভবানী শ্যাম রায়ের মন্দির তৈরি করেন। বেরাভাষা বলে মুর্শিদাবাদের শিয়াদের একটি প্রাচীন উৎসব আসলে হিন্দুদের গঙ্গাপূজার মুসলিম সংস্করণ।৩৬

    হিন্দু মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেও মুর্শিদাবাদে সম্প্রীতি বজায় ছিল। নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদে এদের মধ্যে কোনও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের দৃষ্টান্ত পাওয়া দুষ্কর। এই দুই সম্প্রদায় বাংলায় বহুদিন ধরে সৌহার্দ্যের মধ্যে পাশাপাশি বাস করে এসেছে। এডওয়ার্ড সি. ডিমক [Edward C. Dimmock, Jr.] একটি মননশীল প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য পড়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি কোনওরকম ‘গভীর বিদ্বেষে’র পরিচয় পাওয়া যায় না।৩৭ শুধু তাই নয়, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এই দুই ধর্মসংস্কৃতির সমন্বয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এ সময় মুসলমানরা হিন্দুমন্দিরে পুজো দিচ্ছে আর হিন্দুরা মুসলমানদের দরগাতে সিন্নি দিচ্ছে— এটা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এই দুই ধর্ম আর সংস্কৃতির মিলন প্রচেষ্টা থেকেই সত্যপীরের মতো নতুন ‘দেবতা’র জন্ম— যে ‘দেবতা’ হিন্দু মুসলমান উভয়েরই উপাস্য। কবি ভারতচন্দ্রের ‘সত্যপীর’ কবিতা এ মিলন প্রক্রিয়ার প্রকৃষ্ট প্রতিফলন।৩৮ মুর্শিদকুলির সমসাময়িক রামেশ্বর ভট্টাচার্যের ‘সত্যনারায়ণ’ কাব্যে ‘এরপর আমি রহিম এবং রাম দুজনের উপাসনাই করব। রাম এবং রহিম ঈশ্বরের দুই নাম—মক্কাতে তিনি রহিম আর অযোধ্যায় রাম’৩৯ এমন কথা আছে। এরকম অভিব্যক্তিই দেখা যায় মধ্য-অষ্টাদশ শতকের মুসলিম কবি ফৈজুল্লা’র সত্যপীর কবিতায়— ‘যে রাম, সেই রহিম’।৪০ ভারতচন্দ্রেও প্রায় তারই অনুরণন: ‘পুরানের মত ছাড়া কোরাণএ কি আছে। ভাবি দেখ আগে হিন্দু মুসলমান পাছে।’৪১ বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মুর্শিদাবাদের নাগরিক জীবনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

    সূত্রনির্দেশ ও টীকা
    ১. রিয়াজ-উস-সলাতিন, quoted in Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations in the Town of Murshidabad’, Indian Historical Review, 1976, p. 313.

    ২. তারিখ-ই-মনসুরী, Journal of the Asiatic Society of Bengal, pt. 1, (1869), p. 100.

    ৩. সলিমুল্লা, তারিখ-ই-বংগালা, f. 36-37, quoted in Abdul Karim, Murshid Quli, p. 68.

    ৪. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ. ৩০৬-৩১০৷

    ৫. L’Achney to Chevalier, 27 May 1768, quoted in Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations’, p. 315.

    ৬. Ibid., p. 315.

    ৭. William Bolts, Considerations, p. 200

    ৮. J. H. T. Walsh, History of Murshidabad, p. 246.

    ৯. সদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবৃতি, Board of Trade—Commercial, 13 March 1789, quoted in Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations’, p. 323.

    ১০. Pott’s letter to Governor General, 12 Feb., 15 Feb., Board of Revenue, quoted in Gautam Bhadra, Ibid., p. 323. পট এরকম বর্ণনা লেখেন ১৭৮৮ সালে কিন্তু এটা তিন চার দশক আগের অবস্থা সম্বন্ধেও সমান প্রযোজ্য কারণ এইটুকু সময়ের ব্যবধানে অবস্থার বিশেষ হেরফের হয়েছিল বলে মনে হয় না।

    ১১. Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations’, p. 324.

    ১২. জগৎশেঠদের জন্য দেখুন, S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 109-116.

    ১৩. আর্মানিদের জন্য, S. Chaudhury, ‘Trading Network of a Traditional Diaspora— Armenians in Bengal Trade, c. 1600-1800’, paper presented at the XIIIth International Economic History Congress, Buenos Aires, July 2002.

    ১৪. ভারতচন্দ্র, গ্রন্থাবলী, পৃ. ২৮৮-৯২।

    ১৫. Tapan Raychaudhuri, Bengal under Akbar and Jahangir, p. 198.

    ১৬. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭০

    ১৭. ভারতচন্দ্রের গ্রন্থাবলী, পৃ. ২২৯।

    ১৮. J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, vol. II, p. 413; S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, pp. 210, 239, 247.

    ১৯. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 126-এ উদ্ধৃত।

    ২০. তারিখ-ই-মনসুরী, trans. H. Blockmann, JAS, no. 2, 1867, pp. 95-96.

    ২১. মুজাফ্‌ফরনামা, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, p. 72.

    ২২. Willam Bolts, Considerations, p. 158; J. H. Little, Jagatseth, p. XVII.

    ২৩. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ. ৩০৬-৩১০।

    ২৪. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, p. 112.

    ২৫. Ibid, pp. 112-13; 299-302.

    ২৬. রিয়াজ, পৃ. ২৮০-৮১

    ২৭. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ ২৮০।

    ২৮. Minute of Sir John Shore, W. K. Firminger, ed., Fifth Report, vol. II p. 9.

    ২৯. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ. ৩০৬-৩০৭।

    ৩০. মুজাফ্‌ফরনামা, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, p. 58.

    ৩১. J. H. little, House of Jagatseth, p. 2.

    ৩২. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ. ৩০৬, ৩০৯।

    ৩৩. তারিখ-ই-মনসুরী, Journal of the Asiatic Society of Bengal, pt. 1 (1869), pp. 100-111.

    ৩৪. Karam Ali, Mazaffarnamah, ff. 86a-86b; J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, pp. 49, 72.

    ৩৫. সিয়র, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪৪, Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations’ p. 335-এ উদ্ধৃত।

    ৩৬. তারিখ-ই-মনসুরী, quoted in Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations’, p. 335.

    ৩৭. Edward C. Dimmock, K, Jr., ‘Hinduism and Islam in Medieval Bengal’, in Rachel van M. Baumer, ed., Aspects of Bengali History and Society, p. 2.

    ৩৮. D. C. Sen, Bengali Language, pp. 396-97; ভারতচন্দ্র, সত্যপীরের কথা।

    ৩৯. রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য, সত্যনারায়ণ, এন. এন. গুপ্ত সম্পাদিত, পৃ. ১১।

    ৪০. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, পৃ. ৪২৩।

    ৪১. ভারতচন্দ্রের গ্রন্থাবলী, পৃ. ৪০২।

  • নবম অধ্যায় : স্থাপত্য

    নবম অধ্যায় : স্থাপত্য

    বাংলার স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাসে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের স্থাপত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুর্শিদকুলি যখন ঢাকা থেকে মখসুদাবাদে তাঁর দেওয়ানি কার্যালয় স্থানান্তরিত করেন ও মখসুদাবাদের নামকরণ করেন মুর্শিদাবাদ, তখনও সেটা ছিল প্রায় অজ গ্রাম। কিন্তু বিভিন্ন শাসন দপ্তরের প্রয়োজন অনুযায়ী ঘরবাড়ি, অফিস কাছারি নির্মাণ শুরু হয়ে যায় প্রথম থেকেই। তারপর মুর্শিদাবাদ যখন বাংলার রাজধানী হল তখন এসব নির্মাণ কার্য আরও অনেকগুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, মুর্শিদাবাদের সব নবাবই নানারকমের ইমারত, প্রাসাদ, মসজিদ তৈরি করতে ভালবাসতেন এবং এটা তাদের প্রায় ‘হবি’তে পরিণত হয়েছিল। তাই মুর্শিদকুলি থেকে আরম্ভ করে সুজাউদ্দিন, আলিবর্দি, এমন কী সিরাজদ্দৌল্লাকে নানারকমের স্থাপত্যকর্ম নির্মাণ করতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, এই ধারা মীরজাফর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যার প্রমাণ মীরজাফরের পত্নী মুন্নি বেগমের তৈরি স্থাপত্যগুলি। পরের নবাবদের মধ্যেও কেউ কেউ এটা বজায় রেখেছিলেন। এ সব নির্মাণ কার্যে নবাবদের মানসিকতাই শুধু সাহায্য করেনি, তাঁদের যে অফুরন্ত ধনসম্পদ ছিল তা এসব কাজের খুবই সহায়ক হয়েছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবরা শুধু নতুন নতুন ভবন ও উদ্যান তৈরি করে মুর্শিদাবাদকে সুন্দর করার চেষ্টা করেননি। নিজামতের কর্মচারী, শ্রেষ্ঠী ও অমাত্যবর্গও প্রাসাদ, ভবন, বাগানবাড়ি, মন্দির, মসজিদ, প্রভৃতি নির্মাণ করে মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্যবৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছেন। তাই এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিকের মতে মুর্শিদাবাদ কখনও কখনও ভারতের রাজধানী দিল্লিকেও হার মানাত।১ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, নবাবি আমলের স্থাপত্যগুলি আজ বেশিরভাগই প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত।

    মুঘল যুগে বাদশাহি স্থাপত্যের শিল্পশৈলীর সর্বোৎকৃষ্ট নির্দশন দেখা যায় ঢাকায়। কিন্তু এই শিল্পরীতি যানবাহন ও যাতায়াতের অসুবিধের জন্য, এবং স্থাপত্যকর্মীর অভাবে বাংলার গ্রামাঞ্চলে বিস্তার লাভ করেনি। তাই বাংলার বেশির ভাগ অঞ্চলেই প্রাক-মুঘল যুগের স্থাপত্যশৈলীই অনুসৃত হয়। অবশ্য পরবর্তীকালে কিছু কিছু অঞ্চলে, যেখানে মুঘল শাসন বেশ কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানকার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মুঘল শৈলী অনুসরণ করে প্রাসাদ ও ভবন নির্মাণ করেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে মুঘল শৈলীর সঙ্গে স্থানীয় শৈলী ও শিল্পরীতির সংমিশ্রণও হয়েছে। কিছু কিছু স্থাপত্যে প্রাক-মুঘল যুগের ইটের দেওয়ালে খচিত শৈলীর নিদর্শনের পাশাপাশি মুঘল শৈলীর নিদর্শন— যেমন গম্বুজও, দেখা যায়। মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যশিল্পে এই সংমিশ্রণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এখানে আমরা নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট স্থাপত্যগুলির পর্যালোচনা করব।

    কাটরা মসজিদ
    মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যকর্মের অন্যতম নিদর্শন কাটরা মসজিদ। নবাব মুর্শিদকুলি খান ১৭২৩ সালে এটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং শরীর ভেঙে গেছে বুঝতে পেরে তিনি নিজের সমাধি নির্মাণ করে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তাতে একটি মসজিদ ও কাটরা বা বাজারও থাকবে। এই কাটরা বা বাজার থেকেই ‘কাটরা মসজিদ’ নাম। সমাধি, মসজিদ ও কাটরা স্থাপনের জন্য শহরের পূর্বদিকে খাস তালুকের কাছের একটি স্থান বেছে নেওয়া হয়। মোরাদ ফরাস নামে একজন সাধারণ অথচ বিশ্বস্ত কর্মচারী এই কাজের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হন। প্রচলিত ভাষ্য অনুযায়ী মোরাদ কাছাকাছি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে সে সব উপকরণ দিয়ে সমাধি ভবন তৈরি করেন। সলিমুল্লার তারিখ-ই-বংগালা গ্রন্থে হিন্দু মন্দির ভাঙার কথা থাকলেও গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজ-উস-সলাতিনে কিন্তু এটা নেই। মন্দির ভেঙে সেসব জিনিস দিয়ে কাটরা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি বিখ্যাত রাধামাধবের হিন্দু মন্দির ও অন্য কয়েকটি মন্দিরের খরচপত্র ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিষ্কর জমি দান করেছিলেন। এ ছাড়া কাটরা মসজিদের নির্মাণে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলি সব একই রকমের। বিভিন্ন মন্দির ভেঙে এসব উপকরণ সংগ্রহ করা হলে তাতে এরকম মিল বা সঙ্গতি থাকত না।২

    কাটরা মসজিদ একটি চতুর্ভুজাকৃতি উঁচু প্রাঙ্গণে অবস্থিত। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৪০ ফুট, প্রস্থ ২৫ ফুট আর এতে ৫টি গম্বুজ ছিল। মুর্শিদকুলির নির্দেশমতো মসজিদের দরজায় সিঁড়ির নীচে একটি ছোট ঘর তৈরি করা হয়। এখানেই মুর্শিদকুলিকে সমাধিস্থ করা হয়। মসজিদের দরজায় যেতে গেলে চৌদ্দটি বড় বড় সিঁড়ি বেয়ে যেতে হয়। দরজা পার হয়ে প্রায় ১২০ ফুট দূরে মসজিদ। গম্বুজগুলি ধাতু দিয়ে তৈরি। মসজিদের দরজায় খুব বড় কালো পাথরের তৈরি চৌকাঠ। ভেতরের দিকে একটি বৃহৎ কক্ষ। তার দেওয়ালের চারদিকে ধনুকাকৃতি খিলান (arch) তির্যকভাবে অবস্থিত। মসজিদ এবং চত্বরের চতুর্দিকে দোতলায় অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষ যেখানে মুর্শিদকুলির সময় সাতশো’ ‘করি’ বা কোরান পাঠক কোরান পাঠ করত। মসজিদের সঙ্গে মিনার, চৌবাচ্চা এবং ইঁদারাও তৈরি করা হয়।

    অনেকে মনে করেন যে কাটরার মসজিদ ঢাকায় তৈরি মুর্শিদকুলির মসজিদের, যা ‘করতলব খানের মসজিদ’ হিসেবে পরিচিত, অনুকরণ।৩ আবার কেউ কেউ বলেন যে এটি মক্কার মসজিদের অনুকরণে তৈরি।৪ আবার মসজিদের ভেতরের বৃহৎ কক্ষের দেওয়ালে তির্যকভাবে তৈরি যে সব ধনুকাকৃতি খিলান (arch), এই শৈলী দক্ষিণ ভারতীয় বলেও কেউ কেউ মনে করেন। তবে এটা হয়তো ঠিক নয় কারণ এই বিশেষ শৈলী মুঘল যুগের বাংলায় খুবই প্রচলিত ছিল।৫

    কাটরা মসজিদের সঙ্গে জাহানকোষা নামক কামানের নাম যুক্ত হয়ে আছে। কাটরার পূর্বদিকে একটি অশ্বত্থ গাছের দুটি কাণ্ডের মাঝখানে এই কামান রক্ষিত বলে বোধহয়। এখানেই মুর্শিদকুলির কামানগুলিও রাখা হয় বলে জানা যায়। সে জন্য এ জায়গাটিকে আজও সাধারণ লোকেরা তোপখানা বলে। জাহানকোষা কামানটি লম্বায় প্রায় ১২ হাত, বেড় তিন হাতেরও বেশি। এর মুখের বেড়টি ১ হাতের ওপর। আগুন লাগার ফুটোটির ব্যাস দেড় ইঞ্চি। কামানটি মুঘল সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে ইসলাম খাঁর সুবাদারির সময় জাহাঙ্গিরনগরের (ঢাকা) দারোগা শের মহম্মদের নির্দেশে ও হরবল্লভ দাসের তত্ত্বাবধানে জনার্দন কর্মকার নামক শিল্পী নির্মাণ করেন। এটির ওজন ২১২ মণ, এতে বারুদ লাগে ২৮ কিলো।৬

    মুবারক মঞ্জিল
    মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলার নবাব হন। তিনি ছিলেন দক্ষ কিন্তু আয়েসি ও শৌখিন লোক। শহর মুর্শিদাবাদের রাজসিক বোলবোলাও তাঁর আমলেই বাড়ে। নিত্যনতুন প্রাসাদ নির্মাণ করা তাঁর হবি ছিল। কুচ করে যেখানে তিনি আসতেন, সেখানে মহল তৈরি করতেন, নাম দেওয়া হত মুবারক মঞ্জিল। মুর্শিদকুলির তৈরি ‘চল্লিশ স্তম্ভের প্রাসাদ’ বা চেহেল সুতুনে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে নারাজ ছিলেন। ঘরগুলো বাড়িয়ে তিনি এই প্রাসাদের রদবদল করেন। সরকারি নানা বিভাগের জন্য বাড়িঘর তৈরি হয়— দিওয়ানখানা, খিলাতখানা, ফরমান বাড়ি, খালসা কাছারি, আরও কত কী! শুধু তাই নয়, মুর্শিদকুলির আমলের রাজস্ববিভাগের নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী উচ্চপদস্থ কর্মচারী নাজির আহমেদ মুর্শিদাবাদের অদূরে ভাগীরথীর তীরে দাহাপাড়াতে যে মসজিদ ও উদ্যান নির্মাণ শুরু করেছিলেন, সুজাউদ্দিন তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাবার পর অসমাপ্ত মসজিদ ও উদ্যানের কাজ সম্পূর্ণ করেন। সেখানেও তিনি প্রাসাদ, জলাশয় ইত্যাদি নির্মাণ করেন এবং তার নাম দেন ফর্হাবাগ বা ফররাজবাগ (আনন্দ-উদ্যান)। এখানে তিনি সারা বছর পিকনিক ও নানা রকমের আনন্দ উৎসব করতেন আর বছরে একবার তাঁর দরবারের উচ্চপদস্থ ও শিক্ষিত কর্মচারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করতেন।৭

    মোতিঝিল
    মোতিঝিলের বিখ্যাত প্রাসাদের নির্মাতা নবাব আলিবর্দি খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিস মহম্মদ খান ওরফে শহমত জঙ্গ, আলিবর্দির দুহিতা ঘসেটি বেগমের স্বামী। মোতিঝিল অর্থাৎ Lake of Pearls— মুক্তোর ঝিল। মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুরের প্রাসাদের দেড় মাইল দক্ষিণ পূর্বে এই সুন্দর জায়গাটির অবস্থান দেখে এবং অশ্বপদাকৃতি ঝিল এর তিনদিক ঘিরে থাকায় নওয়াজিস মহম্মদ এখানে তাঁর নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিনি ঢাকার শাসনকর্তা বা ছোট নবাব পদে নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু আলিবর্দি খান যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতেন তখন মুর্শিদাবাদ রক্ষা করার ভার তাঁর বেগম ও নওয়াজিসের ওপরই থাকত। তাই তিনি বেশির ভাগ সময়েই মুর্শিদাবাদে থাকতেন। তাঁর বিশ্বস্ত সহকারী হোসেন কুলি খানের ওপর ঢাকার শাসনভার ন্যস্ত থাকত। নওয়াজিস অত্যন্ত বিলাসী ও আমোদপ্রিয় লোক ছিলেন। মুর্শিদাবাদের মধ্যে নিজের বাসভবনে সব সময় থাকতে তাঁর ভাল লাগত না। তাই ১৭৪৩ সালে তিনি মোতিঝিলের প্রাসাদ নির্মাণ করেন।৮ পরে প্রাসাদের পশ্চিম দিকে তোরণদ্বার নির্মাণ করে তাকে সুরক্ষিত করেন। তারই কাছে ১৭৫০/৫১ সালে একটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও অতিথিশালাও নির্মিত হয়। মসজিদ ও অতিথিশালার জন্য নওয়াজিস প্রচুর অর্থব্যয় করতেন।৯

    বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের বহু ভগ্নস্তূপ থেকে মার্বেল ও অন্যান্য জিনিসপত্র এনে মোতিঝিলের প্রাসাদ তৈরি করা হয়। প্রাসাদটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত, ভাগগুলি (চত্বর) পরস্পরের অল্প ব্যবধানে। প্রত্যেকটি ভাগ দুটি বৃহৎ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। প্রাচীরগুলি প্রত্যেক দিকেই ঝিলের জল স্পর্শ করত। নওয়াজিস মোতিঝিলের প্রাসাদেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। গান, বাজনা, নানা বিলাসবহুল প্রমোদ তাঁর খুব প্রিয় ছিল। নানা নর্তকী ও বাইজি এনে এখানে তিনি মজলিস বসাতেন এবং আত্মীয়পরিজন নিয়ে এখানে থাকতেই তিনি ভালবাসতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ঘসেটি বেগম সমস্ত ধনরত্ন নিয়ে মোতিঝিলেই বাস করতে থাকেন। সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হয়ে ঘসেটি বেগমকে বিতাড়িত করে মোতিঝিল দখল করেন এবং সব ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন।১০

    মোতিঝিল প্রাসাদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনা জড়িয়ে আছে।১১ ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লা মোতিঝিল থেকেই পলাশি অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন বলে যে অভিমত, তা সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ তখন তিনি নিজের প্রাসাদ হীরাঝিলেই থাকতেন। ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ ইংরেজ কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানি হস্তান্তর করার জন্য নবাবের সঙ্গে আলোচনা করতে এসে মোতিঝিলে ছ’দিন কাটিয়েছিলেন। আবার কোম্পানি দেওয়ানি পাওয়ার পর ১৭৬৬ সালের এপ্রিল মাসে ক্লাইভ এখানে এসেছিলেন এবং এ প্রাসাদেই কোম্পানি প্রথম পুণ্যাহ করে। এ উৎসবে নবাব নজমদৌল্লা যথোচিত পোশাক পরিচ্ছদ পরে মসনদে বসেছিলেন, পাশে দেওয়ানের (কোম্পানির) প্রতিনিধি রূপে ক্লাইভ। উপস্থিত ছিলেন জগৎশেঠ, রেজা খান ও মুর্শিদাবাদের অমাত্য ও অভিজাতবর্গ। ওয়ারেন হেস্টিংস যখন নবাব নাজিমের দরবারে কোম্পানির রাজনৈতিক এজেন্ট ছিলেন (১৭৭১-৭৩), তখন তিনি মোতিঝিলের প্রাসাদেই থাকতেন। মোতিঝিলে শেষ পুণ্যাহ হয় ১৭৭২ সালে। তারপরেই রাজস্ব বিভাগ কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। মোতিঝিল কোম্পানি বাগ নামেও পরিচিত কারণ এটা বেশ কিছুদিন কোম্পানির দখলে ছিল। ১৮৭৬ সালে এটা আবার নবাবকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।১২

    হীরাঝিল
    হীরাঝিলের প্রাসাদ নির্মাণ করেন সিরাজদ্দৌল্লা। তখনও তিনি যুবরাজ, নবাব হননি। ফর্হাবাগ থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে মাইল খানেক দূরে, জাফরাগঞ্জের উল্টোদিকে এই প্রাসাদ। মুঘল সম্রাট শাজাহানের মতো সিরাজদ্দৌল্লারও সৌন্দর্যপ্রীতি ছিল এবং সেজন্যই তিনি এই প্রাসাদ তৈরি করেন বলে মনে করা হয়। প্রাসাদের সঙ্গে তিনি একটি কৃত্রিম ঝিলও তৈরি করেন, ঝিলের নাম হীরাঝিল (Lake of Diamonds)। ঝিলের নাম অনুসারে প্রাসাদের নাম হয় হীরাঝিল প্রাসাদ। ঝিলের দু’দিক পাথর দিয়ে বাঁধানো। গৌড়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে নানা রকম পাথর এনে এই ভবন তৈরি হয়। এটি প্রধানত ইঁট দিয়ে তৈরি কিন্তু জায়গায় জায়গায় পাথর বসিয়ে সিরাজ এর সৌন্দর্যবৃদ্ধির চেষ্টা করেন। প্রাসাদের একটি অংশ এমতাজ মহল। এটা এত বিশাল ছিল যে এতে তিনজন ইউরোপীয় ‘নরপতি’ থাকতে পারতেন বলে অনেকের ধারণা।১৩

    কথিত আছে যে সিরাজদ্দৌল্লা যখন প্রাসাদটি তৈরি করছিলেন তখন একদিন নবাব আলিবর্দি সপারিষদ এটি দেখতে আসেন। তিনি যখন বিভিন্ন প্রকোষ্ঠ ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন তখন সিরাজ তাঁকে একটি প্রকোষ্ঠে বন্ধ করে রাখেন এবং নবাবকে জানান যে তিনি মুক্তি পেতে পারেন যদি হীরাঝিল প্রাসাদের নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে ও তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি কিছু আয়ের ব্যবস্থা করে দেন। বৃদ্ধ নবাব বরাবরই সিরাজকে আস্কারা দিয়ে এসেছেন, এবারও তাকে বিমুখ করলেন না। তিনি এ-বাবদ সিরাজকে হীরাঝিলের কাছেই একটি বাজার বা গঞ্জ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিলেন। গঞ্জ থেকে বার্ষিক আয় হত ৫ লক্ষ টাকার ওপর। সিরাজের নাম মনসুর-উল-মুলক থেকে এ গঞ্জের নাম হয় মনসুরগঞ্জ। হীরাঝিলের প্রাসাদকেও অনেকে মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ বলে উল্লেখ করে থাকেন।১৪

    হীরাঝিলের প্রাসাদ তৈরি হওয়ার পর সিরাজদ্দৌল্লা সেখানেই বাস করতে থাকেন। নবাব হওয়ার পরেও তিনি কেল্লায় না থেকে হীরাঝিল থেকেই রাজকার্য চালাতেন। এই প্রাসাদের সঙ্গে বহু স্মৃতি বিজড়িত। এখানেই তিনি বিখ্যাত সুন্দরী ও নর্তকী ফৈজিকে এনে আমোদপ্রমোদে মত্ত হন। পরে ফৈজির বিশ্বাসঘাতকতায় নিদারুণ আঘাত পেয়ে তাঁকে প্রাসাদের একটি কক্ষে বন্ধ করে রাখেন, সেখানে তাঁর মর্মন্তুদ মৃত্যু হয়। আবার এই প্রাসাদেই সিরাজ তাঁর প্রিয়তমা পত্নী লুৎফুন্নেসার সঙ্গে বাস করতেন। এখান থেকেই তিনি পলাশি অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন আবার পলাশিতে পর্যুদস্ত হয়ে এখানেই ফিরে এসে লুৎফুন্নেসা ও শিশুকন্যাকে নিয়ে রাত্রের অন্ধকারে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করেন। সিরাজের পালানোর খর পেয়ে মীরজাফর হীরাঝিলের প্রাসাদ দখল করেন। এদিকে ক্লাইভ এসে মোরাদবাগে আস্তানা নেন। তারপর হীরাঝিল বা মনসুরগঞ্জের প্রাসাদেই মীরজাফরের রাজ্যাভিষেক হয়। প্রাসাদের বিশাল হলে ক্লাইভ মীরজাফরের হাত ধরে এনে মুর্শিদাবাদের তখ্‌ত মোবারকে বসালেন। মসনদে বসিয়ে ক্লাইভ তাঁকে এক পাত্র মোহর নজরানা দিলেন। তারপর দরবারের অমাত্য ও অভিজাতবর্গ নতুন নবাবকে নজরানা দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন।

    হীরাঝিল প্রাসাদের ধনাগারে সিরাজদ্দৌল্লার কী পরিমাণ ধনরত্ন সঞ্চিত ছিল তার একটা ধারণা করা যেতে পারে মীরজাফর, ক্লাইভ প্রমুখ যখন সেই ধনাগার লুণ্ঠন করেন, তা থেকে। লুণ্ঠনের সময় মীরজাফর, ক্লাইভ ছাড়াও ওয়ালস, ওয়াটস, লাশিংটন, দেওয়ান রামচাঁদ এবং মুন্সি নবকৃষ্ণ প্রভৃতি উপস্থিত ছিলেন। জানা যায়, সিরাজের এই কোষাগারে ১ কোটি ৭৬ লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা, ৩২ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা, দুই সিন্দুক অমুদ্রিত স্বর্ণপিণ্ড, ৪ বাক্স অলঙ্কারের ব্যবহারোপযোগী হিরে, জহরত ও ২ বাক্স অখচিত চুনী, পান্না প্রভৃতি দামি পাথর ছিল। এ অনুমান হয়তো অত্যুক্তি কিন্তু কিছুটা যে সত্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ ছাড়াও কেউ কেউ বলেন যে হীরাঝিল প্রাসাদের অন্তঃপুরে আরেকটি লুকোনো ধনাগার ছিল এবং তাতে ৮ কোটি টাকার মতো ধনরত্ন সঞ্চিত ছিল। এর খবর ইংরেজরা পায়নি। এই ধন মীরজাফর, তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী আমির বেগ খান, রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এটাও নেহাৎ আজগুবি গল্প নয়। কারণ যে রামচাঁদ পলাশি যুদ্ধের সময় মাসিক ৬০ টাকা বেতনে কাজ করতেন, দশ বছর পরে তিনি মারা যাওয়ার সময় তাঁর নগদ ও হুণ্ডিতে ৭২ লক্ষ টাকা, ৪০০টি বড় বড় সোনার ও রুপোর কলসি থাকার উল্লেখ দেখা যায়। তার মধ্যে ৮০টি সোনার, বাকি রুপোর। তা ছাড়াও তাঁর ১৮ লক্ষ টাকার জমিদারি ও ২০ লক্ষ টাকার জহরতও ছিল। নবকৃষ্ণ সে সময় মাসিক ৬০ টাকা বেতনে চাকরি করতেন কিন্তু তিনি নাকি তাঁর মায়ের শ্রাদ্ধে ৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন। মীরজাফরের স্ত্রী মুন্নি বেগমও খুব সম্ভবত এই লুঠের টাকাতেই অগাধ সম্পদের মালিক হন। তাঁর যাবতীয় হিরে, জহরত এই লুণ্ঠন থেকেই পাওয়া।১৫ নবাব হয়ে মীরজাফর প্রথমে হীরাঝিল প্রাসাদেই থাকতেন। কিছুদিন পর তিনি ভাগীরথীর পূর্ব তীরে কেল্লার মধ্যে আলিবর্দির ভবনে চলে আসেন।

    ইমামবারা-মদিনা
    মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত স্থাপত্য ইমামবারা নির্মাণ করেছিলেন সিরাজদ্দৌল্লা। মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের কাছেই উত্তরদিকে সিরাজ ইমামবারার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কথিত আছে যে তিনি নিজের মাথায়/হাতে করে ইট, পাথর বয়ে এনে ইমামবারার কাজ শুরু করেন। কারও কারও মতে নির্মাণকার্যে শুধু মুসলমান কারিগর ও শ্রমিকদের নিয়োগ করা হয়েছিল, হিন্দুদের নয়। ইমামবারার মাঝখানে ‘মদিনা’। মদিনার জন্য ৬ ফুটের মতো জমি খুঁড়ে তাতে মক্কা (কারও কারও মতে কারবালা) থেকে আনা মাটি দিয়ে ভর্তি করা হয়। তার ওপরে ছোট চতুষ্কোণ একটি ভবন তৈরি করা হয়। তাতে একটি গম্বুজ ও চারটি ছোট মিনার। মহরমের সময় সারা দিন রাতই মদিনাতে কোরান পাঠ করা হত। উত্তর ও দক্ষিণের ঘরগুলো গুদাম ঘর ও কর্মশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। মহরমের সময় কয়েকশো লোক রাত্রে ইমামবারা ও মদিনাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার কাজে ব্যস্ত থাকত। ওই সময় প্রত্যেকটি কক্ষেই ঝাড়লণ্ঠন, দেওয়াল বাতি প্রভৃতি জ্বালানো হত, এবং তাতে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হত। সিরাজদ্দৌল্লা বহুমূল্য বস্ত্রাদি দিয়ে ইমামবারা ও মদিনা সাজিয়েছিলেন। পরে নবাব মীরকাসিম নগদ টাকার জন্য সব বিক্রি করে দেন। সিরাজের সাধের ইমামবারাটি ১৮৪২ সালে বাজি পোড়ানোর সময় পুড়ে যায়। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও ১৮৪৬ সালে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। রক্ষা পায় শুধু মদিনা।১৬

    রিয়াজ-উস-সলাতিনের লেখক গোলাম হোসেন সলিম ইমামবারা দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন:১৭

    Its praise is beyond description; its equal is not to be found in the whole of Hindustan. Although at present one-tenth of it does not exist, yet a remnant of it is a fair specimen of the original edifice.

    মুর্শিদাবাদের বর্তমান ইমামবারাটি ১৮৪৮ সালে তখনকার নিজামতের দেওয়ান সৈয়দ সাদিক আলি খানের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়। এটি আগের ইমামবারার সামান্য উত্তর দিকে। পুরনো মদিনা যথাস্থানেই রাখা হয়। নতুন ইমামবারাতে একটি নতুন মদিনা তৈরি করা হয়। নতুন ইমামবারা তৈরি করতে ৬ লক্ষ টাকার বেশি খরচ হয়। এটি লম্বায় ৬৮০ ফুট, প্রস্থে নানা জায়গায় বিভিন্ন মাপের হলেও মাঝখানে ৩০০ ফুট। এটি তৈরি করতে ১১ মাস মাত্র সময় লেগেছিল। সাদিক আলি খান পেশায় ইঞ্জিনিয়ার না হলেও পুরো নির্মাণ কার্যের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান করেছিলেন। সব কারিগর ও শ্রমিকদের মজুরি ছাড়াও খাবার দেওয়া হত যাতে তারা দিনরাত কাজ করতে পারে। ইমামবারা তৈরি হওয়ার পর সব কর্মীকেই শাল, দোশালা প্রভৃতি পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে একেক সময় মুর্শিদাবাদের অলিতে গলিতে এসব বহুমূল্য পোষাক পরা লোকদের খুবই দেখা যেত।১৮

    খোশবাগ
    ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে লালবাগের কাছে দক্ষিণ দিকে যে উদ্যান বাটিকা তার নাম খোশবাগ অর্থাৎ সুখস্বর্গ (garden of happiness)। এই উদ্যান আসলে একটি সমাধি ক্ষেত্র। এই সমাধিক্ষেত্রে আলিবর্দি, সিরাজদ্দৌল্লা, লুৎফুন্নেসা বেগম এবং সম্ভবত আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসার সমাধিও অবস্থিত। নবাব আলিবর্দি তাঁর জননীকে সমাধিস্থ করার জন্য এই উদ্যান তৈরি করেন। খোশবাগের সমাধিভবনে প্রধানত দুটি চত্বর— প্রথমটি প্রবেশ দ্বার থেকে শুরু, দ্বিতীয়টি প্রথমটির পশ্চিম দিকে। এই দ্বিতীয় চত্বরে প্রবেশ করার জন্য আরও একটি প্রবেশদ্বার। প্রাচীর বেষ্টিত এই সমাধি স্থানটির উত্তর দিকে একটি উঁচু স্থানে ১৭টি সমাধি আছে। মূল সমাধি গৃহের মধ্যস্থলে সাদা ও কালো পাথরের তৈরি যে সমাধি, সেটি নবাব আলিবর্দির। তার পূর্বদিকে সিরাজদ্দৌল্লার সমাধি। পলাশির যুদ্ধে পরাভূত সিরাজকে হত্যা করে তার ছিন্নভিন্ন দেহ হাতির পিঠে মুর্শিদাবাদ প্রদক্ষিণ করাবার পর এখানে এনে সমাধিস্থ করা হয়। সিরাজের সমাধির দক্ষিণে তাঁর পায়ের নীচে তাঁর প্রিয়তমা বেগম লুৎফুন্নেসার সমাধি।

    আলিবর্দি তাঁর জননীর মৃত্যুর পর এই সমাধিস্থলে তাঁকে সমাধিস্থ করে এই উদ্যানবাটিকার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভাণ্ডারদহ ও নবাবগঞ্জ নামক দুটি গ্রামের থেকে প্রাপ্য রাজস্ব বরাদ্দ করেন। এর পরিমাণ ছিল মাসিক ৩০৫ টাকা। সিরাজদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর অন্যান্য বেগমদের সঙ্গে লুৎফুন্নেসাকেও ঢাকায় নির্বাসিত করা হয়। সেখানে ৭ বছর কাটাবার পর অনেকটা ক্লাইভের বদান্যতায় তাঁকে মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানো হয় এবং কিছুদিনের মধ্যে খোশবাগের সমাধি ক্ষেত্র তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। এর জন্য তিনি মাসিক ৩০৫ টাকা করে পেতেন। লুৎফুন্নেসার জীবিতাবস্থাতেই তাঁর কন্যা উম্মত জহুরার মৃত্যু হয়। সেজন্য লুৎফুন্নেসার মৃত্যুর পর উম্মত জহুরার কন্যা খোশবাগ সমাধিক্ষেত্রের তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব তাঁদের ওপর দেওয়ার জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে আর্জি পাঠান। হেস্টিংস তা মঞ্জুর করেন। তাঁদের মৃত্যুর পর সেই বংশের লোকরা খোশবাগের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায়।১৯

    ফর্হাবাগ, রোশনিবাগ
    নবাব সুজাউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন, বিলাসপ্রিয় ও সৌন্দর্যের ভক্ত। তাই মুর্শিদকুলির তৈরি প্রাসাদ চেহেল সেতুন বা অন্যান্য স্থাপত্যে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। নিজের পছন্দমতো বহু স্থাপত্য, উদ্যান ইত্যাদি তৈরি করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি বোধ হয় ফর্হাবাগ বা সুখকানন। এটি মুর্শিদাবাদের দাহাপাড়াতেই, ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে, রোশনিবাগের কিছুটা উত্তরে। এই বাগানটি ও তাতে একটি মসজিদ প্রথম তৈরি করতে শুরু করেন মুর্শিদকুলির নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী এক কর্মচারী—নাজির আহমেদ। সুজাউদ্দিন নবাব হয়ে নাজিরের মৃত্যুদণ্ড দেন কিন্তু ওই বাগান ও মসজিদের নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন। ফর্হাবাগের সৌন্দর্যকরণে সুজা কোনওরকম কার্পণ্য করেননি। মসজিদ ছাড়াও এখানে নানা সুন্দর প্রমোদ অট্টালিকাও তিনি তৈরি করেন। বাগানে নানারকমের ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হয়। অসংখ্য ফোয়ারা এ বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।২০

    ফর্হাবাগের কাছেই রোশনিবাগ বা আলোর উদ্যান (garden of light)। এটি নবাব সুজাউদ্দিনের সমাধি। রোশনিবাগ উদ্যানের সামনে নবাবরা আলোকোৎসব করতেন বলে এর নাম রোশনিবাগ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। রোশনিবাগের বর্তমান সমাধিভবনের উত্তরদিকে এর প্রবেশদ্বার। সেটি অতিক্রম করে কয়েক পা গেলে সুজাউদ্দিনের সমাধি। প্রায় ৩ হাত উঁচু একটি বিশাল ভিতের ওপর সমাধিটি। পুরনো সমাধিটি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন সমাধিটি তৈরি হয়। সমাধিভবনটির দৈর্ঘ্য ১৪ হাত, প্রস্থ ১৩ হাত। মুর্শিদাবাদে এত বড় সমাধি আর একটিও নেই।২১

    জাফরাগঞ্জ
    জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ ভাগীরথীর তীরে, মুর্শিদাবাদ কেল্লা থেকে আধ মাইল উত্তরে অবস্থিত। মীরজাফর মসনদে বসার আগে এখানেই থাকতেন। তাই এটি মীরজাফরের প্রাসাদ হিসেবেও পরিচিত। সম্ভবত তাঁর নাম অনুসারেই এর নাম জাফরাগঞ্জ। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে এর নামকরণ হয় মুর্শিদাবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদকুলি জাফর খানের নাম অনুসারে। সে যাই হোক, মীরজাফর নবাব হওয়ার পর মনসুরগঞ্জে সিরাজদ্দৌল্লার হীরাঝিল প্রাসাদে বসবাস করতে শুরু করেন এবং তাঁর পুত্র মীরণকে জাফরাগঞ্জের ভবন দিয়ে দেন। এই জাফরাগঞ্জেই সিরাজকে হত্যা করা হয়, এটিই সিরাজের বধ্যভূমি। তাই যে ভবনে সিরাজের নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়, তাকে মুর্শিদাবাদবাসীরা ‘নেমকহারামের দেউরি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এই প্রাসাদেই ইংরেজদের সঙ্গে মীরজাফর ও মীরণের গুপ্তসন্ধি হয় এবং ওয়াটস বোরখা পরে লুকিয়ে পাল্কি করে এখানে মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে আসেন। জাফরাগঞ্জেই মীরজাফর, মীরণ ও মীরজাফরের বংশধরদের সমাধি। মীরজাফর পত্নী মুন্নি বেগমের সমাধিও এখানে।২২

    জগৎশেঠের প্রাসাদ
    জগৎশেঠদের প্রাসাদ ছিল মহিমাপুরে। এখন তার বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই, প্রায় সবটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত। অথচ জগৎশেঠদের এই প্রাসাদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার ইতিহাসের বহু স্মরণীয় ঘটনা বিজড়িত। এই প্রাসাদে বসেই বাংলায় দু-তিনটে রাষ্ট্রবিপ্লবের পরিকল্পনা করা হয়েছিল কারণ শেঠরা ছাড়া বাংলায় কোনও রাজনৈতিক পালাবদল সম্ভব ছিল না। পলাশি যুদ্ধের পর ইংরেজদের পক্ষে ওয়াটস ও ওয়ালস চুক্তির শর্তানুযায়ী কী ভাবে টাকাপয়সার লেনদেন হবে তা নিয়ে মীরজাফর ও দুর্লভরামের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় বসেন এই প্রাসাদেই। কয়েকদিন পরে আবার ক্লাইভ, ওয়াটস, স্ক্র্যাফ্‌টন, মীরণ, দুর্লভরাম মীরজাফরকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আসেন এবং জগৎশেঠের সামনে লেনদেন সম্পর্কে কথাবার্তা পাকা করেন। উমিচাঁদ তাঁর অংশ প্রাপ্তির আশায় ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। সভা শেষ হলে ক্লাইভ স্ক্র্যাফ্‌টনকে জানালেন যে এবার উমিচাঁদকে প্রতারণার কথা ফাঁস করা যেতে পারে। স্ক্র্যাফ্‌টন বাইরে এসে উমিচাঁদকে দেশীয় ভাষায় জানান যে লাল কাগজের চুক্তিটি জাল, তিনি নবাবের ধনসম্পদের কিছুই পাচ্ছেন না। এতে নাকি উমিচাঁদ মুর্ছা যান এবং তিনি পাগল হয়ে যান। তবে আমরা দেখিয়েছি যে এটা মোটেই সঠিক নয়।২৩

    এ ছাড়া, মুর্শিদাবাদে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। মীরজাফরের পত্নী মুন্নি বেগম একটি সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করেন। চকবাজারে এটি তৈরি করা হয় বলে একে চক মসজিদ বা মুন্নি বেগমের মসজিদও বলা হয়। সৈয়দাবাদের আর্মানিরা ১৭৫৮ সালে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন। তখনই এটি তৈরি করতে খরচ হয় ২ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা। এর পূর্বদিকে আরেকটি গির্জা তৈরি হয়েছিল ১৬৬৫ সালে। সেটি নষ্ট হয়ে গেলে নতুন গির্জাটি তৈরি হয়। হীরাঝিলের কাছে ছিল মোরাদবাগ প্রাসাদ। পলাশির যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদে এসে ক্লাইভ এখানে অবস্থান করেন এবং মীরণ এসে তাঁকে মনসুরগঞ্জ বা হীরাঝিলের প্রাসাদে মীরজাফরের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারেন হেস্টিংস মুর্শিদাবাদ দরবারে ইংরেজ প্রতিনিধি হয়ে আসার পর মোরাদবাগের প্রাসাদেই থাকতেন। বাংলার ইংরেজ গভর্নর ভ্যানসিটার্ট মীরজাফরকে সরিয়ে মীরকাশিমকে নবাব করবার জন্য যখন মুর্শিদাবাদে আসেন, তিনিও তখন এই প্রাসাদে ওঠেন।২৪

    সবশেষে, হাজারদুয়ারি। এই ইমারতটি অবশ্য স্বাধীন নবাবি আমলের নয়। তা হলেও মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যের কথা বলতে গেলে হাজারদুয়ারির কথা বাদ দেওয়া যায় না। এটিই মুর্শিদাবাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইমারত। তাই খুব সংক্ষেপে এটির একটু বিবরণ দিচ্ছি। ভাগীরথীর তীরে মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুরের এই বিশাল প্রাসাদ। ইতালীয় ভাস্কর্যের অনুকরণে এটির নকশা করেন ‘বেঙ্গল কোর অফ ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর জেনারেল ডানকান ম্যাকলিয়ড (Duncan Mcleod)। তাঁর তত্ত্বাবধানে এটির নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়। ১৮২৯ সালে এর ভিত্তি স্থাপন হয় এবং নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ হয় ১৮৩৭ সালে। এটি ত্রিতল ইমারত, শীর্ষে একটি গম্বুজ দিয়ে পরিবৃত। এর হাজারটি দরজা বলে নাম হাজারদুয়ারি। যে চত্বরে এটি অবস্থিত তার নাম নিজামত কিল্লা। এর মধ্যে প্রাসাদ ছাড়াও ইমামবারা, মদিনা, ঘড়িঘর, তিনটি মসজিদ এবং অনেকগুলি কক্ষ।২৫

    সূত্রনির্দেশ ও টীকা
    ১. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১৮

    ২. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, pp. 172-73.

    ৩. Ibid., p. 172.

    ৪. A. H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, p. 276.

    ৫. Ibid.

    ৬. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ২৩।

    ৭. রিয়াজ, পৃ. ২৯০-৯১; তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭৩।

    ৮. O’ Malley, Bengal Distict Gazetteers, Murshidabad, pp. 209-10.

    ৯. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ৯৬-৯৭।

    ১০. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, pp. 186-87; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ৯৫-৯৯।

    ১১. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, p. 188.

    ১২. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১০০; P. C. Majumdar, Musnad of Murshidabad, pp. 188-89;

    ১৩. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, p. 206; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১০৫.

    ১৪. A. H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, pp. 277-78.

    ১৫. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১০৭-১০৮; P. C. Majumdar, Musnud, pp. 207-208; A. H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, pp. 277-78.

    ১৬. A. C. Campbell, Glimpses of Bengal, pp. 333-34; J. H. T. Walsh, A History of Murshidabad District, pp. 44-45; P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, pp. 118-19.

    ১৭. রিয়াজ, পৃ. ২৮-২৯।

    ১৮. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, pp. 120-21.

    ১৯. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১৪৩-৫০; P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, pp. 198-99; A. H. Dani, Muslim Architecture in Begal, p. 277.

    ২০. রিয়াজ, পৃ. ২৯০-৯১, তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭৫-৭৬।

    ২১. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, p. 199; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ২৫-২৮।

    ২২. A. H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, p. 277; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১৫৩-৫৪।

    ২৩. P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, p. 153: S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 119-20.

    ২৪. J. H. T. Walsh, A History of Murshidabad District, p. 75; P. C. Majumdar, Musnud of Murshidabad, pp. 208, 233.

    ২৫. A. H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, p. 273.

  • দশম অধ্যায় : উপসংহার

    দশম অধ্যায় : উপসংহার

    স্বাধীন নবাবি আমল মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কী ঐশ্বর্যে, আঁকজমকে, রাজনৈতিক স্থিরতায়, শিল্পবাণিজ্যের অগ্রগতিতে, শান্তিশৃঙ্খলায়, সাংস্কৃতিক বিকাশে মুর্শিদাবাদ এইসময় উন্নতির চরম শীর্ষে পৌঁছেছিল। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে যখন অস্তমান মুঘল সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলই রাজনৈতিক অরাজকতা ও অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ে বিপর্যস্ত, তখন কিন্তু এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাংলা তথা রাজধানী মুর্শিদাবাদ। এই সময় বাংলার নবাবদের পরিচালনায় একটি সুস্থ শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল এবং সব নবাবই— মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত সবাই— সেটি যথাযথভাবে রূপায়িত করেন। ফলে বাংলা তথা মুর্শিদাবাদে শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল, কোনও অস্থিরতা ছিল না, অরাজকতাও নয়। মুর্শিদাবাদের নবাবরা এমন রাজনৈতিক ও আর্থিক নীতি অনুসরণ করেন যাতে শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ় হয়, রাজনৈতিক স্থিরতা বজায় থাকে ও আর্থিক অগ্রগতি হয়। এই উন্নতিতে অবশ্য মুর্শিদাবাদের নবাবদের সঙ্গে হাত মেলায় শাসক শ্রেণির ওপরতলার একটি গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে নবাবদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। বস্তুতপক্ষে বাংলার পূর্বতন রাজধানী ঢাকা বা এমনকী প্রাচীন রাজধানী গৌড়েও বোধহয় নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদের মতো সব স্তরে এতটা শ্রীবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

    অষ্টাদশ শতকের একেবারে গোড়াতেই মুঘল সম্রাট ঔরংজেব মহম্মদ হাদি নামক তাঁর এক বিশ্বস্ত ও দক্ষ কর্মচারীকে, যিনি তখন হায়দরাবাদের দেওয়ান ছিলেন, দেওয়ান করে ও করতলব খাঁ উপাধি দিয়ে বাংলায় পাঠান। উদ্দেশ্য, করতলব বাংলার রাজস্ব বিভাগকে সুবিন্যস্ত করে বাংলা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করবেন এবং তা নিয়মিত ঔরংজেবকে দাক্ষিণাত্যে পাঠাবেন। বৃদ্ধ সম্রাট তখন দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে কুড়ি বছর ধরে জর্জরিত ও আর্থিক অনটনে ব্যতিব্যস্ত। বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই তাঁকে রাজস্ব পাঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অসহায় ঔরংজেবের একমাত্র ভরসা করতলব খাঁ ও বাংলার রাজস্ব। করতলব সম্রাটকে নিরাশ করেননি। তিনি বাংলার রাজস্ব বিভাগের সম্পূর্ণ সংস্কার করে মুঘল সম্রাটকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠিয়ে গেছেন। কিন্তু করতলব রাজধানী ঢাকায় এসে দেখলেন, তখনকার সুবাদার ঔরংজেবের পৌত্র শাহজাদা আজিম-উস-শান নতুন দেওয়ানের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট নন কারণ এতদিন তিনি একচ্ছত্রভাবে বাংলার ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা ভোগ করছিলেন। করতলব এসে তাতে বাধার সৃষ্টি করবে। করতলবের প্রতি তাঁর অনীহা প্রায় শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। এমনকী তিনি করতলবের প্রাণনাশের চেষ্টাও করেন যদিও তা ব্যর্থ হয়।

    করতলব বুঝতে পারেন যে ঢাকায় তিনি নিরাপদ নন। সর্বোপরি, ঢাকায় সুবাদার আজিম-উস-শানের উপস্থিতিতে তিনি তাঁর অভীষ্ট সিদ্ধ করতে পারবেন না, স্বাধীনভাবে কাজ করা তো দূরের কথা। তাই তিনি দেওয়ানি কার্যালয় ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত করলেন মখসুদাবাদে। এজন্য তিনি আজিম-উস-শানের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি কারণ তিনি জানতেন সম্রাট ঔরংজেব তাঁর ওপর খুবই সন্তুষ্ট, বিশেষ করে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার করে তিনি সম্রাটকে নিয়মিত অর্থ পাঠাতেন, এজন্য। করতলবের পক্ষে মখসুদাবাদকে বেছে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। এটিকে তাঁর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান মনে করার কারণ এটি বাংলার প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ফলে এখান থেকে বাংলার প্রায় সব অংশের ওপরই সুষ্ঠুভাবে নজর রাখা যাবে, যা জাহাঙ্গিরনগর (ঢাকা) থেকে সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া যেহেতু তিনি মখসুদাবাদের ফৌজদারের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, সেজন্য তিনি ওখানে অনেক বেশি নিরাপদ। তিনি হয়তো এটাও ভেবেছিলেন যে গঙ্গা তীরবর্তী মখসুদাবাদ থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির ওপর ভালভাবে নজরদারি করা যাবে কারণ এই সময় তারা গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছিল। ১৭০৪ সালে মখসুদাবাদে দেওয়ানি স্থানান্তরিত করে তিনি দাক্ষিণাত্যে সম্রাট ঔরংজেবের কাছে বাংলার রাজস্ব ও নজরানা নিয়ে হাজির হলেন। সম্রাট সানন্দে এতে অনুমতি দিলেন। তাঁকে মুর্শিদকুলি খান উপাধি দিয়ে তাঁর নামানুসারে মখসুদাবাদের নতুন নামকরণ, মুর্শিদাবাদ, করতে দিতে সাগ্রহে রাজি হলেন। এভাবেই মুর্শিদাবাদের উৎপত্তি।

    ১৭০৭ সালে ঔরংজেবের মৃত্যুর সময়ই মুর্শিদকুলি বাংলার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। ঔরংজেবের মৃত্যুর পরও তিনি দিল্লির মুঘল সম্রাটকে নিয়মিত বাংলার রাজস্ব পাঠাতে ভোলেননি। দিল্লির বাদশাহি মসনদে যিনিই বসুন না কেন, মুর্শিদকুলির নীতিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। মুঘল বাদশাহরাও নিয়মিত অর্থ পেয়ে খুশি, বাংলা নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন বা সামর্থ্য কোনওটাই তাঁদের ছিল না। ফলে মুর্শিদকুলি নিজের ইচ্ছেমতো বাংলার শাসন চালাতে পেরেছিলেন, দিল্লি থেকে কোনওরকমের হস্তক্ষেপ বা প্রতিবন্ধকতার প্রশ্ন ওঠেনি। মুঘল শাসনকাঠামোর রীতি ভেঙে ১৭১৬/১৭ সালে মুর্শিদকুলিকে দেওয়ানের সঙ্গে সুবাদারের পদেও নিযুক্ত করা হল। ফলে এতদিন ধরে যে রীতি চলে আসছিল—সব উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও মনসবদারদের দিল্লি থেকেই বাংলায় পাঠান হত— তার এখন সম্পূর্ণ অবসান হল। মুর্শিদকুলি এখন নিজের পছন্দমতো লোককে রাজকার্যে নিযুক্ত করতে লাগলেন— তাঁর নিজের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় লোকদেরই প্রাধান্য দিলেন। তাতে এতদিন বাইরে থেকে আগত মনসবদার ও অন্য উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বাংলা থেকে যে ধন নিষ্ক্রমণ করত, তা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর থেকে বাংলা থেকে আহরিত ধনসম্পদ বাংলাতেই থেকে গেল এবং বাংলার ধনভাণ্ডার বৃদ্ধির সহায়ক হল।

    তা ছাড়াও মুর্শিদকুলির শাসনতান্ত্রিক ও রাজস্ব বিভাগের সংস্কারের ফলে বাংলায় এক নতুন মধ্যবিত্ত, ব্যাঙ্কিং-বাণিজ্যিক শ্রেণি ও বড় বড় জমিদার সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হল। এরা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এদের বেশিরভাগেরই মুখ্য কর্মস্থল মুর্শিদাবাদ হওয়াতে, তার উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধিতে এদের যথেষ্ট অবদান ছিল। নবাব হিসেবে মুর্শিদকুলিও তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কিছুটা শাসনবিভাগের প্রয়োজনে, কিছুটা মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে তিনি অনেক প্রাসাদ, ইমারত, মসজিদ ও ঘরবাড়ি তৈরি করেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই মুর্শিদাবাদ প্রায় অজ পাড়াগাঁ থেকে প্রাণবন্ত একটি শহরে পরিণত হল। শুধু তাই নয়, নতুন রাজধানীর নবাবি দরবারে নানারকম জাঁকজমকেরও ব্যবস্থা করেন মুর্শিদকুলি। এই দরবারে একদিকে যেমন বড় বড় ব্যাঙ্কার-মহাজন, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন অভিজাতবর্গ অন্যদিকে অনেক বিদেশি, বিশেষ করে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির প্রতিনিধির, নিত্য আনাগোনা ছিল। নানা ধর্মীয় উৎসবে মুর্শিদকুলি সাধুসন্ত, ফকির, শেখ, সৈয়দ প্রভৃতি বিভিন্ন স্তরের লোকদের আপ্যায়িত করতেন এবং মুর্শিদাবাদকে হাজার হাজার আলোকমালায় সাজিয়ে তুলতেন।

    পরবর্তী নবাব সুজাউদ্দিন রাজ্যশাসনের ভার—জগৎশেঠ, দেওয়ান আলমচাঁদ ও হাজি আহমেদ—এই ত্রয়ীর ওপর ছেড়ে দিলেও নিজে মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্যায়নে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন। শৌখিন, বিলাসপ্রিয় এই নবাবের মুর্শিদকুলির নির্মিত প্রাসাদ ও ইমারতগুলি ছোট বলে মোটেই পছন্দ হয়নি। তাই তিনি নতুন নতুন প্রাসাদ, ভবন, উদ্যানবাটিকা নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। সিয়রের লেখক গোলাম হোসেন থেকে শুরু করে ইংরেজ কোম্পানির রাজস্ব অধিকর্তা স্যার জন শোর পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন যে সুজাউদ্দিনের সময় বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। এরপর নবাব সরফরাজ মাত্র কিছুদিন রাজত্ব করেছিলেন— আলিবর্দির হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। মারাঠা আক্রমণ সত্ত্বেও আলিবর্দির রাজত্বের শেষদিকে বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের প্রভূত উন্নতি হয়। মারাঠাদের কাছ থেকে শান্তি কিনে নেবার পর তিনি মারাঠা আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন মুছে দিতে বদ্ধপরিকর হন এবং তাতে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেন। তার প্রমাণ হিসেবে মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলি জানিয়েছেন যে ওই সময় মুর্শিদাবাদ শহর অনেক বিস্তার লাভ করে। আলিবর্দির রাজত্বের শেষদিকে মুর্শিদাবাদ দরবারের জাঁকজমক ছিল দেখবার মতো। তখন পুণ্যাহের দিনে যে মহোৎসব হত, তা প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে। সিরাজদ্দৌল্লার পনেরো মাসের রাজত্বেও মুর্শিদাবাদের বৈভব ও জাঁকজমকে কোনওরকমের ঘাটতি ছিল না। আলিবর্দির নবাবি প্রাসাদ থাকা সত্ত্বেও তিনি মনসুরগঞ্জে নিজের পছন্দমতো বিশাল হীরাঝিল প্রাসাদ নির্মাণ করেন।

    মুর্শিদাবাদের নবাবদের ধনভাণ্ডারে যে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ সঞ্চিত ছিল তা ভাবলে অবাক হতে হয়। এ সম্পদ কিন্তু তাঁরা সঞ্চয় করেছিলেন দিল্লিতে প্রত্যেক বছর (১৭৪০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত) ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাঠাবার পর। পলাশির যুদ্ধের পর ক্লাইভ মুর্শিদাবাদের কোষাগারে সঞ্চিত ধনরত্ন দেখে হতবাক হয়ে যান। এই ধনাগারে সোনা রুপো মিলে ২ কোটি টাকার মতো সঞ্চিত ছিল। তা ছাড়া বলা হয় যে সিরাজদ্দৌল্লার হারেমে যে ধনসম্পদ লুকোনো ছিল তার পরিমাণ কম করে ৮ কোটি টাকার মতো। শুধু তাই নয়, মুর্শিদাবাদের অভিজাতবর্গের যা সঞ্চয় ছিল তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আলিবর্দির কন্যা ও ঢাকার ছোট নবাব নওয়াজিস মহম্মদের পত্নী ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ থেকে সিরাজদ্দৌল্লা নাকি ৪ কোটি টাকা ও ৪০ লক্ষ মোহর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। মুর্শিদাবাদের ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগরদের সম্পদের পরিমাণও কিংবদন্তি হয়ে আছে। জগৎশেঠদের ব্যবসার মূলধন ছিল ৭ কোটি টাকা এবং ধনসম্পদ ১৪ কোটি টাকার মতো। মুর্শিদাবাদ দেখে ক্লাইভ মন্তব্য করেছিলেন যে শহরটি লন্ডনের মতোই জনবহুল— লন্ডনের সঙ্গে তফাত শুধু এই যে মুর্শিদাবাদে এমন কিছু লোক আছে যারা লন্ডনের যে কোনও বাসিন্দার চাইতে অনেক অনেক বেশি ধনী।

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের শ্রীবৃদ্ধিতে শ্ৰেষ্ঠী-মহাজন-ব্যাঙ্কার-সওদাগরদেরও যথেষ্ট অবদান ছিল। মুর্শিদাবাদ একদিকে সুবে বাংলার রাজধানী, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র। ফলে শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও ধর্মের ব্যবসায়ী-সওদাগর-মহাজনরা এখানে এসে জমায়েত হত। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তিন বণিকরাজা—জগৎশেঠ, উমিচাঁদ ও আর্মানি খোজা ওয়াজিদ। এঁদের বণিকরাজা বলা হয় এই কারণে যে এঁরা সওদাগর-ব্যাঙ্কার হলেও এঁদের জীবনযাত্রা ও ধরনধারণ ছিল রাজাদের মতো। এঁদের মধ্যে জগৎশেঠদের স্থায়ী আস্তানা ছিল মুর্শিদাবাদে, বাকিদের নয়। কিন্তু যেহেতু এঁরা তিনজনই মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং যেহেতু এঁদের রমরমা মুর্শিদাবাদের নবাব ও তাঁর দরবারের আনুকূল্যেই, এঁদের বেশির ভাগ সময়ই কাটত মুর্শিদাবাদে। তাই মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে এই বণিকরাজাদের কথা এসে পড়বেই।

    বাংলায় জগৎশেঠদের আদিপুরুষ মানিকচাঁদ মুর্শিদকুলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরামর্শদাতা ছিলেন। মুর্শিদকুলি যখন ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি স্থানান্তরিত করেন, তখন তাঁর সঙ্গে মানিকচাঁদও ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদ চলে আসেন। তারপর তাঁকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নবাবের দাক্ষিণ্যে জগৎশেঠরা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যান। মানিকচাঁদের উত্তরাধিকারী ফতেচাঁদ মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বংশপরম্পরায় জগৎশেঠ (সারা দুনিয়ার ব্যাঙ্কার) উপাধি পান। সিরাজদ্দৌল্লার আগে পর্যন্ত সব নবাবদের সঙ্গেই জগৎশেঠদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেটাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা আস্তে আস্তে বাদশাহি টাঁকশালে মুদ্রা তৈরির একচ্ছত্র অধিকার প্রায় কুক্ষিগত করে নেয়। নবাবি আমলে রাজস্বের দুই-তৃতীয়াংশ জমা নেবার অধিকারও ছিল তাঁদের। এ ছাড়া বাট্টার হার নির্ধারণ করা থেকে ঋণের জন্য সুদের হার নির্ণয় করা পর্যন্ত সবকিছুই তাঁদের করায়ত্ত ছিল। শুধু বাংলা বা মুর্শিদাবাদ নয়, সমগ্র উত্তর ভারতে টাকার বাজারে তাঁদের এমনই প্রতিপত্তি ছিল যে ইংরেজ কোম্পানির অনুরোধে তাঁরা একদিনেই সুদের হার শতকরা ১২ টাকা থেকে কমিয়ে শতকরা ৯ টাকা করে দিয়েছিলেন। তাঁদের এই ফতোয়া সমগ্র উত্তর ভারতেই কার্যকরী হয়েছিল। ইংরেজ কোম্পানির সরকারি ঐতিহাসিক রবার্ট ওরম থেকে শুরু করে বাংলায় ডাচ কোম্পানির সব ডাইরেক্টরা লিখেছেন যে জগৎশেঠরা তখনকার দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যাঙ্কার ছিলেন। শেঠদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার মতো। সিয়রের লেখক মন্তব্য করেছেন যে তাঁদের ধনসম্পদের কথা বলতে গেলে মনে হবে রূপকথা। আর এক বাঙালি কবি লিখেছেন, গঙ্গা যেমন শতমুখে জলরাশি এনে সমুদ্রে ফেলে তেমনি করে অজস্র ধনরত্ন এসে জমা হয় শেঠদের কোষাগারে।

    শেঠদের মতো অন্য দুই বণিকরাজার— উমিচাঁদ ও খোজা ওয়াজিদ— ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার উৎসও ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের আনুকূল্য। উমিচাঁদ ও তাঁর ভাই দীপচাঁদ পাটনার দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে বিহারের সেরা ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার প্রায় কুক্ষিগত করে নেন। তা ছাড়া উমিচাঁদ খাদ্যশস্য ও আফিংয়ের ব্যবসাও একচেটিয়া করার চেষ্টা করেন। আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদ বিহারের প্রায় সমগ্র অর্থনীতিকেই নিজের একচেটিয়া করে নেন। বিহারের সোরা ও আফিং-এর একচেটিয়া ব্যবসা এবং সুবে বাংলায় লবণ-এর ব্যবসায় একচ্ছত্র অধিকার ছিল তাঁর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের মূল স্তম্ভ। তার যে বিরাট প্রভাব ও প্রতিপত্তি, এবং তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের যে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি তার অন্যতম কারণ মুর্শিদাবাদের নবাবদের এবং দরবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। নবাবকে তাঁর প্রয়োজনে ওয়াজিদ সাগ্রহেই অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন, কখনও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। আলিবর্দি তাঁকে ফখর-উৎ-তুজ্জার (বণিকদের গর্ব) উপাধি দিয়েছিলেন।

    বণিক রাজাদের পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনায় বেগমদের কথাও এসে যায়। এই বেগমদের মধ্যে বেশ কয়েকজনই নানাভাবে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে বেশ কিছুটা প্রভাব ফেলেছিলেন, কখনও ভাল, কখনও বা মন্দ। এঁদের কেউ কেউ ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্না, উদারচেতা ও সাহসী। আবার কেউ কেউ চাতুর্য, শঠতা ও খলচরিত্রের মূর্ত প্রতীক। মুর্শিদকন্যা ও সুজাউদ্দিনের বেগম জিন্নতউন্নেসা প্রথম দলের। স্বামী উড়িষ্যার ছোট নবাব সুজাউদ্দিনের নারীসম্ভোগে প্রচণ্ড রকমের আসক্তি দেখে তিনি তাঁকে ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। আবার এই সুজাউদ্দিনই যখন মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর মসনদ দখল করার জন্য সসৈন্যে মুর্শিদাবাদে হাজির হন এবং যখন মুর্শিদকুলির ইচ্ছানুযায়ী নবাব পদে অভিসিক্ত, জিন্নতউন্নেসা ও সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ পিতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত, তখন এই জিন্নতউন্নেসাই পুত্র সরফরাজকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করেন। সুজার শাসনকালে অবশ্য জিন্নতউন্নেসার অভিপ্রায় অনুযায়ীই অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকরী হত।

    আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসার প্রভাব যে মুর্শিদাবাদের রাজনীতি ও শাসনপ্রক্রিয়ায় বেশ মঙ্গলদায়ক ও ইতিবাচক হয়েছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি যে শুধু নিজের জীবন ও সম্মান বিপন্ন করে যুদ্ধক্ষেত্রেও স্বামী আলিবর্দির পাশে থেকেছেন তা নয়, স্বামীর অনুপস্থিতিতে রাজকার্যও পরিচালনা করতেন। হতাশা ও প্রয়োজনের সময় তিনি স্বামীকে সাহস দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। কিন্তু তাঁর দুই কন্যা—ঘসেটি ও আমিনা বেগম—ছিলেন ভিন্ন চরিত্রের। ঘসেটি ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, চক্রী ও শ্লথ চরিত্রের। নিজে মসনদ দখল করার জন্য তিনি সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে চক্রান্ত করেছিলেন। সঙ্গে দোসর তাঁর গুপ্ত প্রণয়ী ও তাঁর মৃত স্বামী নওয়াজিস মহম্মদের বিশ্বস্ত সহকারি হোসেন কুলি খান। আবার তাঁর ছোট বোন আমিনা বেগমের সঙ্গে যখন হোসেন কুলি অবৈধ প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন, তখন ঘসেটি আমিনার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ভাগ্যের পরিহাস, মীরণের নির্দেশে দু’জনকেই গঙ্গাবক্ষে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। এই দু’জনের উজ্জ্বল ব্যতিক্রম সিরাজ-পত্নী লুৎফুন্নেসা। পলাশির পরে শত্রুদের হাত থেকে পলায়মান স্বামীকে তিনি একা ছাড়েননি, সমস্ত বিপদ মাথায় নিয়ে শিশুকন্যার হাত ধরে তিনি স্বামীর অনুগামিনী হয়েছেন। পরে আমৃত্যু স্বামীর সমাধির পরিচর্যা করেছিলেন। অন্যদিকে মীরজাফরের পত্নী মুন্নি বেগম ছিলেন মুর্শিদাবাদের বেগমদের মধ্যে সবচেয়ে ধুরন্ধর। স্বামীর মৃত্যুর পরও বহুদিন ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো ইংরেজদের সঙ্গে ভাব করে তিনি বকলমে মুর্শিদাবাদের নবাবি চালিয়েছিলেন।

    মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ পলাশি। পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব সম্বন্ধে এতদিনের যে বক্তব্য—পলাশির পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ ছিল না’, এটা একটা প্রায় ‘আকস্মিক ঘটনা’, ইংরেজরা প্রায় ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও’ বাংলা বিজয় করতে বাধ্য হয়’, বাংলার ‘অভ্যন্তরীণ সংকটই’ ইংরেজদের ডেকে আনে, ইত্যাদি— মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। পলাশি চক্রান্তের মূল নায়ক ইংরেজরাই। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মদত ছাড়া পলাশির ষড়যন্ত্র বা বিপ্লব কোনওভাবেই সম্ভব হত না। তারাই দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটি গোষ্ঠীকে একদিকে নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে, অন্যদিকে কাকুতি-মিনতি করে তাদের (ইংরেজদের) চতুর ‘পরিকল্পনায়’ সামিল করিয়েছিল। আসলে ওই সময় ইংরেজদের পক্ষে বাংলা বিজয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল কারণ তখন কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য, যেটা ১৭৩০-র দশক ও ১৭৪০-র দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত রমরমিয়ে চলছিল, এক তীব্র সংকটের সম্মুখীন হয়। ফরাসিদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য ও আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের নেতৃত্বে হুগলি থেকে দেশীয়দের সমুদ্র বাণিজ্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে ইংরেজ বাণিজ্য প্রচণ্ড মার খেতে শুরু করে। সেই ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার ও তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য ছলে-বলে-কৌশলে বাংলা বিজয় ছাড়া ইংরেজদের আর কোনও পথ খোলা ছিল না।

    ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা কাজে নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদে শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও বহু লোকের সমাগম হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে স্থায়ী আস্তানা করে নেয়। এভাবে বহু জাতি, বর্ণ ও ধর্মের মানুষের সমাবেশের ফলে ওখানে একটি ‘কসমোপলিটন’ সমাজ গড়ে ওঠে। জৈন কবি নিহাল সিংহ সুন্দরভাবে এ সমাজের বর্ণনা দিয়েছেন। সামাজিক স্তরবিন্যাসে এখানে ওপরের তলায় ছিল অভিজাত ও অমাত্যবর্গ, বড় বড় ব্যাঙ্কার-মহাজন ও শ্রেষ্ঠীরা। মাঝখানে নানারকমের পেশা ও বৃত্তিতে নিযুক্ত এক ধরনের মধ্যবিত্ত ও ছোটখাট ব্যবসায়ী আর তলার দিকে কারিগর, দিনমজুর ইত্যাদি নিম্নবিত্তের মানুষ। অর্থনীতির দিকে থেকে নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে যে শ্রীবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা এর আগে অন্য কোথাও চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলের রেশম ও রেশমিবস্ত্রের শিল্প ও বাণিজ্যে নবাবি আমলেই সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছিল। মারাঠা আক্রমণের ফলে মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনীতি খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বলে যে অভিমত তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। অর্থনীতিতে মারাঠা আক্রমণের নেতিবাচক প্রভাব নিশ্চয় পড়েছিল তবে তা সাময়িক এবং কোনও কোনও অঞ্চলেই শুধু সীমাবদ্ধ ছিল, তার কোনও সুদূরপ্রসারী প্রভাব অর্থনীতিতে পড়েনি। মারাঠা আক্রমণের বছরগুলোতেও এশীয় ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে যে বিশাল পরিমাণ কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্র রফতানি করেছে তাই তার প্রমাণ। এ প্রসঙ্গে এতদিনের যে বক্তব্য— ইউরোপীয়রাই সবচেয়ে বেশি পণ্য (কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্র সমেত) রফতানি করত এবং ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি টাকাপয়সা, সোনা-রুপো আমদানি করত— তা যথার্থ নয়। নবাবি আমলে এশীয়/ভারতীয় বণিকরাই সবচেয়ে বড় রফতানিকারক ছিল, ফলে তারাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি টাকাপয়সা, সোনা-রুপো আনত, ইউরোপীয়রা নয়।

    সংস্কৃতির দিক থেকেও নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদ খুবই উন্নত ছিল। বহু জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ পাশাপাশি বাস করত এখানে। ফলে পরস্পরের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান হত। মুর্শিদাবাদ হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, শিয়া, সুন্নি, আর্মানি ও ইউরোপীয় খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। তার ফলে মুর্শিদাবাদে একটি উদার ও মিশ্র সংস্কৃতির (composite culture) আবির্ভাব হয়। এই সময় হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও বজায় ছিল, কোথাও কোনও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি। শিয়া, সুন্নিরাও পাশাপাশি শান্তিতে বাস করত। মুর্শিদাবাদের নবাবরা মুসলমান হলেও রাজকার্যে হিন্দুদেরই ছিল প্রাধান্য। এতে নবাবদের উদার মনোভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়। এই নবাবরা হিন্দু উৎসব হোলি এবং দেওয়ালি সাড়ম্বরে পালন করতেন। হিন্দুদের মুসলমানদের দরগায় সিন্নি দেওয়া বা মুসলমানদের হিন্দু মন্দিরে পুজো দেওয়া প্রায় স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বস্তুত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এই দুই ধর্মসংস্কৃতির সমন্বয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এই মিলনপ্রচেষ্টা থেকেই সত্যপীরের মতো ‘দেবতা’র জন্ম— যে ‘দেবতা’ হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই পূজ্য।

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নতুন নতুন প্রাসাদ, ইমারত, মসজিদ, উদ্যানবাটিকা প্রভৃতি নির্মাণ করা নবাবদের প্রায় ‘হবি’তে পরিণত হয়েছিল। একদিকে এঁদের মানসিকতা ও সৌন্দর্যপ্রীতি, অন্যদিকে কোষাগারে প্রচুর ধনসম্পদ নতুন নতুন স্থাপত্য নির্মাণের সহায়ক হয়েছিল। মুর্শিদকুলির তৈরি কাটরা মসজিদ মুর্শিদাবাদের অন্যতম আকর্ষণ। মোটামুটি এই সময় থেকেই মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যশিল্পে মুঘল শৈলীর সঙ্গে স্থানীয় শৈলী ও শিল্পরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। শৌখিন ও বিলাসপ্রিয় নবাব সুজাউদ্দিনের মুর্শিদকুলির প্রাসাদ ‘চেহেল সুতুন’ ছোট বলে পছন্দ হয়নি। তাই তিনি নিজের পছন্দমতো প্রাসাদ, ইমারত, উদ্যানবাটিক নির্মাণ করেন। তাঁর তৈরি উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি—ফর্হাবাগ বা সুখকানন। আলিবর্দি খানের জামাতা ও ঘসেটি বেগমের স্বামী, নওয়াজিস মহম্মদ, মোতিঝিলের বিখ্যাত প্রাসাদ তৈরি করেন। ওদিকে সিরাজদ্দৌল্লা মসনদে বসার আগেই হীরাঝিল বা মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ নির্মাণ করে সেখানে বাস করতে থাকেন। ইমামবারাও তাঁর তৈরি। নবাবরা আবার তাঁদের সমাধিস্থলও তৈরি করে রাখতেন। আলিবর্দি, সিরাজদ্দৌল্লা, লুৎফুন্নেসা সবার সমাধিই খোশবাগে। মীরজাফর থাকতেন জাফরাগঞ্জের প্রাসাদে। এখানেই তাঁর, মীরণ ও তাঁদের বংশধরদের সমাধি। দুঃখের বিষয়, মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যকর্মগুলির বেশিরভাগই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত, খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে।

    পলাশির পর থেকেই মুর্শিদাবাদের গুরুত্ব কমতে থাকে। সিরাজদ্দৌল্লার পর মীরজাফর নতুন নবাব হলেও ইংরেজদের হাতের পুতুলমাত্র। ১৭৬০ সালে মীরকাশিম নবাব হয়ে মুঙ্গেরে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেলেন। ১৭৬৩-তে মীরজাফর আবার নবাব হন। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি দেওয়ানি পেল। ১৭৬৬ সালে ক্লাইভ দেওয়ান হয়ে মুর্শিদাবাদে পুণ্যাহ করলেন। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস ইংরেজদের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার জন্য দেওয়ানি ও খালসার সব বিভাগগুলি কলকাতা নিয়ে গেলেন। ফলে মুর্শিদাবাদ থেকে বহু কর্মচারী কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হল। রাজধানী হিসেবে মুর্শিদাবাদের যেটুকু গুরুত্ব ছিল, ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট (Regulating Act) পাশ হওয়ার পর কলকাতা ইংরেজ গভর্নর জেনারেলের সদর দফতর হওয়ায় তাও নষ্ট হয়ে গেল। মুর্শিদাবাদের টাঁকশাল ১৭৯৯ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবে বাংলার রাজধানী থেকে মুর্শিদাবাদ শুধুমাত্র একটি জেলাশহরে পরিণত হয়। স্বাভাবিকভাবে মধ্য-অষ্টাদশ শতকে যে মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যা ছিল আনুমানিক দশ লক্ষ, তা ওই শতকের শেষদিকে অনেকটাই কমে যায়। ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষও অবশ্য তার একটি অন্যতম কারণ।

  • নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

    নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

    নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

    ORIGINAL SOURCES (মূল সূত্র)

    A. MANUSCRIPT SOURCES (পাণ্ডুলিপি)

    1. India Office Records, British Library, London
      • Bengal Public Consultations
      • Bengal Letters Received
      • Bengal Secret and Military Consultations
      • Coast and Bay Abstracts
      • Despatch Books
      • European Manuscripts
      • Factory Records
      • Home Miscellaneous Series
      • Mayor Court’s Records, Calcutta
      • Original Correspondence
      • Orme Manuscripts
    2. ALGEMEEN RIJKSARCHIEF, THE HAGUE, NETHERLANDS
      • Verenigde Oostindische Compagnie (VOC)
      • Overgekomen brieven en papiers and Inkomend briefbook, 1720-57 (Select Volumes)
      • Hoge Rgering van Batavia, 246 (Taillefert’s ‘Memorie’, 17 Nov. 1763)
    3. Stadsarchief Antwerpen, Antwerp, Belgium
      • General Indische Compagnie (The Ostend Company), 5768

    B. PRINTED SOURCES (মুদ্রিত আকরগ্রন্থ)

    1. PERSIAN WORKS (ফারসি গ্রন্থ)
      • Gholam Hossein Khan, Seir Mutaqherin, vol. II, trans. Haji Mustafa, Second Reprint, Lahore, 1975.
      • Gulam Husain Salim, Riyaz-us-Salatin, trans. Maulavi Abdus Salam, Calcutta, 1904.
      • Inayat Allah, Ahkam-i-Alamgiri.
      • Karam Ali, Muzaffarnamah, in J. N. Sarkar, Bengal Nawabs, Calcutta, 1952.
      • Salimullah, Tarikh-i-Bangala, trans. Gladwin, Calcutta, 1788.
      • Shah Nawaz Khan, Maasir-ul-Umara, trans., H. Beveridge, Calcutta, 1952.
      • Tarikh-i-Mansuri, trans., H. Blochmann, Journal of the Asiatic Society. no. 2, 1867.
      • Yusuf Ali Khan, Tarikh-i-Bangala-i-Mahabatjangi, trans. Abdus Subhan, Calcutta, 1982.
    2. WORKS IN EUROPEAN LANGUAGES (ইউরোপীয় ভাষায় লেখা গ্রন্থ)
      • (A) Published sources
        • Datta, K. K., ed., Fort William—India House Correspondence, vol. I (1748-56), Delhi, 1956.
        • Firminger, W. K., ed., The Fifth Report from the Select Committee of the House of Commons of the Affairs of the East India Company, 1812, 3 vols., Calcutta, 1917-18.
        • —, Historical Introduction to the Fifth Report, Calcutta, 1917.
        • Hill, S. C., Bengal in 1756-57, 3 vols., London, 1905.
        • Martin, Francois, Memories de Francois Martin, 1665-1696, ed., A. Martineau, Paris, 1931.
        • Records of Fort St. George: Diary and Military Consultations, Madras, 1912-25.
        • Sinha, N. K., ed., Fort William—India House Correspondence, vol. V (1767-9), Calcutta, 1959.
        • Wilson, C. R., ed., The Early Annals of the English in Bengal, 3 vols., London, 1895-1917.
        • Yule, H., ed., The Diary of William Hedges, 3 vols., London, 1887-9.
        • Van Dam, Pieter, Beschrijvinge vande Oost-Indische Compagnie, ed., F.W. Stapel & others, 4 books in 7 parts, The Hague, 1927-54.
      • (B) Travellers’ Account, Memoirss. etc. (পর্য্যটকদের বিবরণ, স্মৃতিকথা ইত্যাদি)
        • Bernier, F., Travels in the Mogul Empire, 1656-1658, ed. A. Constable, Oxford, 1934.
        • Bolts, William, Considerations on Indian Affairs, London, 1772.
        • Bowrey, Thomas, A Geographical Account of Countries Round the Bay of Bengal, 1669-1679, ed., R. C. Temple, Cambridge, 1905.
        • Dow, Alexander, History of Hindostan, vol. III, London, 1770.
        • Orme, Robert, Historical Fragments of the Mogul Empire, London, 1805.
        • —, History of the Military Transactions of the British Nation in Indostan, 3 vols., London, 1803.
        • Scrafton, Luke, Reflections on the Government of Indostan, London, 1763.
        • Stavorinus, J. S., Voyage in the East Indies, trans. S. H. Wilcoke, 3 vols., London, 1798.
        • Tavernier, Jean-Baptiste, Travels in India, 1640-1667, trans. V. Ball, London, 1889.
        • Vansittart, H., A Narrative of the Transactions in Bengal from 1760-1764, London, 1766.
        • Verelst, H., A View of the Rise, Progress and Present State of the English Government in Bengal, London, 1772.
        • Watts, William, Memoirs of the Revolution in Bengal, London, 1760.
      • (C) Secondary works (প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ)
        • ১. বাংলা
          • অনিরুদ্ধ রায়, মধ্যযুগের ভারতীয় শহর, কলকাতা, ১৯৯৯
          • আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, ঢাকা, ১৯৭৭।
          • অক্ষয়কুমার মৈত্র, সিরাজদৌল্লা, কলিকাতা, ১৮৯৮।
          • কমল বন্দ্যোপাধ্যায়, মুর্শিদাবাদ থেকে বলছি, ১ম খণ্ড, কলিকাতা, ১৩৮০।
          • তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়, পলাশীর যুদ্ধ, কলিকাতা, ১৯৫৩।
          • নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, কলিকাতা, ১৯০২।
          • —, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, কলিকাতা, ১৯০৩।
          • —, জগৎশেঠ, কলিকাতা, ১৯১২।
          • প্রতিভারঞ্জন মৈত্র, মুর্শিদাবাদ চর্চা, কলিকাতা, ১৩৮০।
          • রজতকান্ত রায়, পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ, কলকাতা, ১৯৯৪।
          • ভারতচন্দ্র, সত্যপীরের কথা, ভারতচন্দ্র গ্রন্থাবলী, কলিকাতা, ১৯৬৩।
          • সোমেন্দ্রলাল রায়, মুর্শিদাবাদের কথা ও কাহিনী, কলিকাতা, ১৯৬০৷
          • শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, সিরাজদ্দৌল্লা, কলিকাতা, ১৯৪২।
          • শ্রীপারাবাত, মুর্শিদকুলী খাঁ, কলিকাতা, ১৯৯০।
        • ইংরেজি
          • Arasaratnam, S., Merchants, Companies and Commerce on the Coromandel Coast, 1650-1740, New Delhi, 1986.
          • —, ‘The Indian Merchants and their Trading Methods’, Indian Economic and Social History Review, 3 (1966), 85-95.
          • Bagchi, A. K., The Political Economy of Underdevelopment, Cambridge, 1982.
          • —, ‘Reflections on Patterns of Regional Growth in India during the Period of British Rule’, Bengal Past and Present, XCV, 1976.
          • Banerjee, B. N. The Begams of Bengal, Calcutta, 1945.
          • Bayly, C. A., The Imperial Meridian: The British Empire and the World, 1780-1830, London, 1988.
          • —, Indian Society and the Making of the British Empire, Cambridge, 1987.
          • Bandyopadhyay, Sekhar, From Plassey to Partition, Orient Longman, 2004.
          • Bayly, C.A., and Sanjay Subrahmanyam, ‘Portfolio Capitalists and the Political Economy of Early Modern India’, Indian Economic and Social History Review, 25, 4 (1988), 403-24.
          • Bence-Jones, M., Clive of India, London, 1974.
          • Bhadra, Gautam, ‘The Role of Pykars in the Silk Industry of Bengal, 1765-1830’, Studies in History, 3, no. 2 (1987), 137-85; 4, nos. 1 & 2 (1988), 1-35.
          • —‘Social Groups and Relations in the Town of Murshidabad, 1765-1793’ Indian Historical Reveiw, pp. 312-38, 1976.
          • Bhattacharya, Bhaswati, ‘Between Fact and Fiction: Khoja Gregory Alias Gurgin Khan’, in Circumbulations in South Asian History, Essays in Honour of D. H. A. Kolff, Leiden, 2003, pp. 134-158.
          • Bhattacharya, S., The East India Company and the Economy of Bengal from 1704 to 1740, London, 1954.
          • Boxer, C. R., The Dutch Seaborne Empire, New York, 1965.
          • Bruijn, J. R., F.S. Gaastra and I. Schoffer, Dutch-Asiatic Shipping, 3 vols., The Hague, 1979-87.
          • Calkins, P. B. ‘The Formation of a Regionally Oriented Ruling Group in Bengal, 1700-1740’, Journal of Asian Studies, vol. XXIX, no. 4 (August 1970), 799-806.
          • —, ‘The Role of Murshidabad as a Regional and Sub-Regional Centre in Bengal’, in R. L. Park, ed., Urban Bengal, East Lansing, 1969.
          • Campbell, Glimpses of Bengal, Calcutta, 1907.
          • Chandra, Satish, ed., The Indian Ocean: Explorations in History, Commerce and Politics, New Delhi, 1985.
          • Chatterjee, Kumkum, Merchants, Politics and Society in Early Modern India, Bihar: 1733-1820, Leiden, 1996.
          • —, ‘Trade and Durbar Politics in the Bengal Subah, 1733-1757’, Modern Asian Studies, 26 (1992), 233-73.
          • Chatterjee, Tapan Mohan, The Road to Plassey, Bombay, 1960.
          • Chaudhuri, K. N., Asia before Europe, Cambridge, 1990.
          • —, Trade and Civilization in the Indian Ocean: An Economic History from the Rise of Islam to 1750, Cambridge, 1985.
          • —, The Trading World of Asia and the English East India Company, Cambridge, 1978.
          • —, ‘India’s International Economy in the Nineteenth Century’, Modern Asian Studies, II (1968).
          • —, ‘The Structure of the Indian Textile Industry in the Seventeenth and Eighteenth Centuries’, Indian Economic and Social History Review, XI (June-Sept. 1974), 127-82.
          • Chaudhury, Sushil, and Michel Morineau, eds., Merchants, Companies and Trade: Europe and Asia in Early Modern Era, Cambridge, 1999.
          • Chaudhury, Sushil, ‘Trading Networks of a Traditional Diaspora, Armenians in Indian Trade’, paper presented at the XIII International Economic History Congress, Buones Aires, Argentina, July 2002 and now being published.
          • —, ‘Armenians in Bengal Trade, circa. mid-Eighteenth Century’, paper presented at the International Seminar on ‘Armenians in Asian Trade, 16th-18th Century’, Paris, October 1998. Now being published by MSH, Paris.
          • —, ‘The Inflow of Silver to Bengal in the Global Perspective, c. 1650-1757’, paper presented at the XIIth International Economic History Congress, Madrid, August 1998, Session B-6, ‘Monetary History in Global Perspective, 1500-1808’, and now published in Global Connections and Monetary History, ed., Flynn, et al, Ashgate, 2003.
          • —, ‘Was there a Crisis in Mid-Eighteenth Century Bengal?‘, in Rethinking Early Modern India, ed., Richard B. Barnett, New Delhi, 2002.
          • —, The Prelude to Empire: Plassey Revolution of 1757, New Delhi, 2000.
          • —, From Prosperity to Decline: Bengal in the Eighteenth Century, New Delhi, 1995.
          • —, ‘International Trade in Bengal Silk and the Comparative Role of Asians and Europeans, circa. 1700-1757’, Modern Asian Studies, 29, 2, (1995), 373-86.
          • —, ‘European Companies and Bengal Textile Industry in the Eighteenth Century: The Pitfalls of Applying Quantitative Techniques’, Modern Asian Studies, 27, 2 (May 1993), 321-40.
          • —, ‘Sirajuddaula and the Battle of Plassey’, History of Bangladesh, vol. 1, Dhaka, 1992, 93-130.
          • —, ‘Trade, Conquest and Bullion: Bengal in the mid-Eighteenth Century’, Itinerario, vol. 15, no. 2 (1991), 21-32.
          • —, ‘Khwaja Wazid in Bengal Trade and Politics,’ Indian Historical Review, vol. XVI. nos. 1-2, 137-48.
          • —, ‘The Imperatives of Empire—Private Trade, Sub-Imperialism and the British Attack on Chandernagore, March 1757’, Studies in History, vol. VIII, no. 1 (Jan.-June 1992), 1-12.
          • —, ‘General Economic Conditions in Nawabi Bengal, 1690-1757’, History of Bangladesh, vol. 2, Dhaka, 1992, 30-66.
          • —, ‘European Trading Companies and Bengal’s Export Trade, 1690-1757’, History of Bangladesh, vol. 2, Dhaka, 1992, 183-224.
          • —, ‘Continuity or Change in the Eighteenth Century? Price Trends in Bengal, circa. 1720-1757’, Calcutta Historical Journal, vol. XV., nos. 1-2 (July 1990-June 1991), 1-27.
          • —, ‘Sirajuddaullah, English Company and the Plassey Conspiracy—A Reappraisal’, Indian Historical Review, vol. XXIII, nos. 1-2 (July 1986-Jan. 1987), 111-34.
          • —, ‘Merchants, Companies and Rulers: Bengal in the Eighteenth Century’, Journal of the Economic and Social History of the Orient, vol. XXXI (Feb. 1988), 74-109.
          • —, Trade and Commercial Organization in Bengal, 1650-1720, Calcutta, 1975.
          • —, ‘The Rise and Decline of Hughli—A Port in Medieval Bengal’, Bengal Past & Present, (Jan.-June 1967), 33-67.
          • Chicherov, A. I. India: Economic Development, Moscow, 1971.
          • Colebrook, H. T., Remarks on the Husbandry and Commerce of Bengal, Calcutta, 1804.
          • Curley, David, ‘Fair Grain Markets and Mughal Famine Policy in Eighteenth Century Bengal,’ Calcutta Historical Journal, 2 (1977), 1-26.
          • Dani, A.H., Muslim Architecture in Bengal, Dacca, 1961.
          • Das Gupta, Ashin, Merchants of Maritime India, Varorium, 1994.
          • —, Indian Merchants and the Decline of Surat, c. 1700-1750, Wiesbaden, 1979.
          • —, ‘Trade and Politics in 18th Century India’, in D. S. Richards, ed., Islam and the Trade of Asia, Oxford, 1967.
          • —, and M.N. Pearson, eds., India and the Indian Ocean, 1500-1800, Calcutta, 1987.
          • Datta, K.K., Alivardi and His Times, 2nd edn., Calcutta, 1963.
          • —, Survey of India’s Social Life and Economic Conditions in the Eighteenth Century, 1707-1813, Calcutta, 1961.
          • —, Studies in the History of Bengal Suba, 1740-1760, Calcutta, 1936.
          • Dimock, Edward C. Jr., ‘Hinduism and Islam in Medieval Bengal’, in Rachel van M. Baumer, ed., Aspects of Bengali History and Society, Honolulu, 1975.
          • Eaton, Richard M., The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760, Delhi, 1994.
          • Edwardes, Michael, The Battle of Plassey and the Conquest of Bengal, London, 1963.
          • —, Plassey: The Founding of an Empire, London, 1969.
          • Feldbaeck, Ole, ‘Cloth Production and Trade in Late Eighteenth Century Bengal’, Bengal Past & Present, vol. LXXXVI (July-Dec. 1967), 124-41.
          • Foster, William, ‘Gabriel Boughton and the Trading Privileges in Bengal’, Indian Antiquary, 40 (1911).
          • Furber, Holden, Rival Empires of Trade in the Orient, 1600-1800, Minneapolis and Oxford, 1976.
          • —, ‘Asia and West as Partners before “Empire” and After’, Journal of Asian Studies, 28 (1969).
          • —, John Company at Work, Cambridge, 1961.
          • —, Bombay Presidency in the mid-Eighteenth Century, Bombay, 1965.
          • Furber, Holden, and Kristof Glamann, ‘Plassey: A New Account from the Danish Archives’, Journal of Asian Studies, vol. XIX, no. 2 (February 1960).
          • Gaastra, F. S., “The Dutch East India Company and its Intra-Asian Trade in Precious Metals’, in W. Fischer, R.M. McInnis and J. Schneider, eds., The Emergence of a World Economy, pt. I, 1500-1800, Wiesbaden, 1986, 97-112.
          • Ghoshal, H. R., Economic Transition in the Bengal Presidency, 1793-1833, Patna, 1950.
          • Glamann, Kristof, Dutch Asiatic Trade, 1620-1740, Copenhagen, The Hague, 1958.
          • —, ‘Bengal and the World Trade about 1700’, Bengal Past & Present, vol. LXXVI, no. 142 (1957), 30-9.
          • Gupta, Brijen K., Sirajuddaullah and the East India Company, 1756-57, Leiden, 1962.
          • Habib, Irfan, ‘Merchant Communities in Pre-Colonial India,’ in J. D. Tracy, ed., The Rise of Merchant Empires: Long Distance Trade in the Early Modern Period, 1350-1750, Cambridge, 1990, 371-99.
          • —, ‘Studying a Colonial Economy—Without Perceiving Colonialism’, Modern Asian Studies, 19, 3 (1985), 355-81.
          • —, ‘The Technology and Economy of Mughal India’, Indian Economic and Social History Review, vol. XXVII, no. 1 (Jan.-March 1980), 1-34.
          • —, ‘Changes in Technology in Mughal India’, Studies in History, II, 1, 15-39.
          • —, Potentialities of Capitalistic Development in the Economy of Mughal India’, Journal of Economic History, 29 (March 1969).
          • —, The Agrarian System of Mughal India, Bombay, 1963.
          • Hill, S. C., Three Frenchmen in Bengal, London, 1905.
          • Hossain, Hameeda, The Company Weavers of Bengal, Delhi, 1988.
          • Irwin, J. and P. R. Schwartz, Studies in Indo-European Textile History, Ahmedabad, 1966.
          • Karim, Abdul, Murshid Quli and His Times, Dacca, 1963.
          • Khan, A. M., The Transition in Bengal, Cambridge, 1969.
          • Krishna, Bal, Commercial Relations between India and England, London, 1924.
          • Kumar, Dharma, ed., The Cambridge Economic History of India, vol. 2.
          • Little, J. H., The House of Jagat Seths, Calcutta, 1956.
          • Marshall, P. J., Bengal—The British Bridgehead, Cambridge, 1987.
          • —, East Indian Fortunes, Oxford, 1976.
          • —, ‘Private British Investment in Eighteenth Century Bengal, Bengal Past & Present, 86 (1967), 52-67.
          • Majumdar, P. C., The Musnud of Murshidabad, Murshidabad, 1905
          • Mclane, John, R., Land and Local Kingship in Eighteenth Century Bengal, Cambridge, 1993.
          • Meilink-Roelofz, M. A. P., Asian Trade Revolution and European Influence in the Indonesian Archipelago between 1500 to about 1630, The Hague, 1962.
          • Mitra, D. B., The Cotton Weavers of Bengal, Calcutta, 1978.
          • Mohsin, K. M., A Bengal District in Transition: Murshidabad, Dacca, 1973.
          • Moosvi, Shireen, The Economy of Mughal Empire, Delhi, 1987.
          • —, ‘The Silver Influx, Money Supply, Prices and Revenue Extraction in Mughal India’, Journal of the Economic and Social History of the Orient, XXX (1988), 47-94.
          • Nichol, J. D., ‘The British in India, 1740-63: A Study of Imperial Expansion into Bengal’, unpublished Ph. D. thesis, University of Cambridge, 1976.
          • Pearson, M. N., Merchants and Rulers in Gujarat, Berkeley and Los Angeles, 1976.
          • Perlin, Frank, ‘Proto-Industrialization and Pre-Colonial South Asia’, Past and Present, 98 (1983), 30-95.
          • —, ‘Pre-Colonial South Asia and Western Penetration in the Seventeenthto Nineteenth centuries: A Problem of Epistemological Status’, Review, 4(1980).
          • Prakash, Om, The European Commercial Enterprise in Pre-Colonial India, Cambridge, 1998.
          • —, ‘On Estimating the Employment Implications of European Trade for Eighteenth Century Bengal Textile Industry—A Reply’, Modern Asian Studies, 27, 2 (1993), 341-56.
          • —, The Dutch East India Company and the Economy of Bengal, Princeton, 1985.
          • —, ‘Asian Trade and European Impact: A Study of the Trade from Bengal, 1630-1729’, in Blair Kling and M. N. Pearson, eds., The Age of Partnership: Europeans in Asia before Dominion, Honolulu, 1979.
          • —, ‘Bullion for Goods: International Trade in the Economy of Early Eighteenth Century Bengal’, Indian Economic and Social History Review, XIII (1976), 159-87.
          • Ray, Aniruddha, The Marchant and the State: The French in India, 2 vols., New Delhi, 2004.
          • Ray, Indrani, ‘Dupleix’s Private Trade in Chandernagore’, Indian Historical Review, I (1974), 279-94.
          • —, ‘The French Company and the Merchants of Bengal, 1680-1730’, Indian Economic and Social History Review, 7 (1970).
          • Ray, Rajat Kanta, ‘Colonial Penetration and Initial Resistance: The Mughal Ruling Class, the English East India Company and the Struggle for Bengal’, Indian Historical Review, 12 (July 1985-Jan. 1986). 1-105.
          • Raychaudhuri, T. and Irfan Habib, eds., The Cambridge Economic History of India, vol. 1, Cambridge, 1982.
          • Richards, J. F., Precious Metals in Late Medieval and Early Modern Worlds, Durham, 1983.
          • —, ‘Mughal State Finance and the Pre-Modern World Economy’, Comparative Studies in Society and History, 23 (1981).
          • Sarkar, J. N., ed., History of Bengal, vol. II, Dhaka, 1948.
          • —, trans. and ed., Bengal Nawabs, Calcutta, 1952.
          • Saxe, Elizabeth Lee, ‘Fortune’s Tangled Web: Trading Networks of English Enterprises in Eastern India, 1657-1717’, unpublished Ph.D. Dissertation, Yale University, 1979.
          • Seth, M. J., Armenians in India from Earliest Times to the Present Day, Reprint, Calcutta, 1973.
          • Sinha, N. K., The Economic History of Bengal, 3 vols., Calcutta, 1958-65.
          • —, ed., History of Bengal, 1757-1905, Calcutta, 1967.
          • Steensgaard, Niels, ‘Asian Trade and World Economy from the 15th to the 18th Centuries’, in T. R. de Souza, ed., Indo-Portuguese History, New Delhi, 1984.
          • —, The Asian Trade Revolution of the Seventeenth Century, Chicago, 1974.
          • Subrahmanyam, Sanjay, The Portugese Empire in Asia, London, 1992.
          • —, The Political Economy of Commerce: Southern India, 1500-1650, Cambridge, 1990.
          • Taylor, J., A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca, Calcutta, 1840.
          • Thompson, Virginia M., Dupleix and His Letters, 1742-54, New York, 1933.
          • Tracy, J. D., ed., The Rise of Merchant Empires, Cambridge, 1990.
          • Van Leur, J. C., Indonesian Trade and Society, The Hague, 1955.
          • Van Santen, H. W., De Verenigde Oost-Indische Compagnie in Gujarat en Hindusthan, 1620-60, Leiden, 1982.
          • Walsh, J. H. T., A History of Murshidabad District, Calcutta, 1902.
          • Wallerstein, Immanuel, The Modern World System, II: Mercantilism and the Consolidation of the World Economy, 1600-1750, New York, London, 1980.
          • Wink. Andre, ‘Al-Hind: India and Indonesia in the Islamic World-Economy, c. 700-1800’, in Itinerario, Special Issue, The Ancient Regime in India and Indonesia, 1988, 33-72.
  • সূর্য দীঘল বাড়ী

    সূর্য দীঘল বাড়ী

    সূর্য দীঘল বাড়ী

    বাংলা সাহিত্যের সার্থক উপন্যাসগুলোর অন্যতম আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’; উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।

    কুসংস্কার, দারিদ্র্যতা, সামাজিক অবহেলা ও ধনী-শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ জনপদের মহিলা জয়গুণের জীবনযুদ্ধের কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ উপন্যাসে।

    বাংলা ১৩৫০ সনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অবিভক্ত ভারতের বাংলায় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ‘পঞ্চাশের আকাল’ নামে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ প্রাণ হারায়। যারা কোনমতে শহরের লঙ্গরখানায় পাত পেতে বাঁচতে পেরেছিল তাদেরই একজন একালের সময় স্বামী পরিত্যক্ত জয়গুন। সঙ্গে তার মৃত প্রথম স্বামীর ঘরের ছেলে ও দ্বিতীয় স্বামীর ঘরের মেয়ে। আরো আছে মৃত ভাইয়ের স্ত্রী-পুত্র। তারা গ্রামে ফিরে এসে এমন এক খন্ড জমিতে ঘর তৈরী করে যেটি অপয়া ভিটে বলে পরিচিতি ছিল। জীবনযুদ্ধে যখন সে প্রাণপণ লড়ছে তখন তার প্রতি গায়ের মোড়লের দৃষ্টি পড়ে। দ্বিতীয় স্বামীও তাকে আবার ঘরে তুলতে চায়। সে কারো প্রস্তাবেই সায় দেয় না। কিন্তু এ দুজনের সাক্ষাত ঘটে এবং মোড়ল তার প্রতিযোগীকে হত্যা করে। ঘটনার একমাত্র দর্শক হিসেবে জয়গুনকেও মূল্য দিতে হয় অন্যভাবে।

    …এই কাহিনীর বিচিত্রতার মধ্যে মূল বিষয় একটিই; তা হচ্ছে কুসংস্কার, সম্পদ, ধর্ম, প্রতিপত্তি, সামাজিক বাধা-নিষেধ, এমনকি জাতীয়তাবোধ- এ সব কিছুকেই কাজে লাগিয়ে শ্রমজীবী ক্ষুধার্ত মানুষকে ক্রমাগত শোষণ।

    ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন মসিহ উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। সরকারি অনুদান প্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, জহিরুল হক, কেরামত মাওলা, এটিএম শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রটি প্রধান চরিত্র ‘জয়গুন’– এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথমে ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে তিনি অভিনয়ে অস্বীকৃতি জানান। এবং তাঁরই প্রস্তাবে ‘জয়গুন’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডলি আনোয়ারকে নির্বাচন করা হয়।

    চলচ্চিত্রটির শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেন– ডলি আনোয়ার – জয়গুন; রওশন জামিল – শফির মা; জহিরুল হক – গদু প্রধান; আরিফুল হক – খলিল; কেরামত মাওলা – করিম বক্স; এটিএম শামসুজ্জামান – জোবেদ ফকির; সৈয়দ হাসান ইমাম – ইমাম; ফখরুল হাসান বৈরাগী – লেদু; নাজমুল হুদা বাচ্চু – ডাক্তার রমেশ; সেতারা বেগম – লালুর মা; সুফিয়া – আঞ্জুমান; ইলোরা গহর – মায়মুন; সজিব – কাসু এবং লেনিন – হাসু।

    এই চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন আলাউদ্দীন আলী।

    চলচ্চিত্রটি ১৯৮০ সালে পশ্চিম জার্মানীতে অনুষ্ঠিত ২৯তম ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফিল্ম ডুকার্ট’ স্বর্ণপদক লাভ করে। এছাড়া একই উৎসবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র ‘মানবিক আবেদনে’র জন্য আন্তর্জাতিক ইভানজ্যালিক্যাল (প্রোটেস্ট্যান্ট) সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যাথলিক সংস্থা কর্তৃক দুটি বেশেষ পুরস্কার লাভ করে।

    পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ১৯৮০ সালের ‘নবম ফিগুয়েরা দ্য ফজ’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের ‘প্রিক্‌স ডন কুইকজোট’ পুরস্কার লাভ করে। একই বছর ২২তম কার্লোভিভেরি (চেকোশ্লোভাকিয়া) চলচ্চিত্র উৎসবে ডিপ্লোমা লাভ করে।

    ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ মোট আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। পুরস্কারগুলো হল–

    • শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র – মসিহউদ্দিন শাকের (প্রযোজক)।
    • শ্রেষ্ঠ পরিচালক – শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের।
    • শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী – ডলি আনোয়ার।
    • শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য – শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের।
    • শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রহণ – আনোয়ার হোসেন।
    • শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা – সাইদুল আনাম টুটুল।
    • শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী – ইলোরা গহর ও সজিব।
    • শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী (বিশেষ শাখায়) – লেনিন।

    এছাড়া ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালে ছয়টি বিভাগে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সংস্থা (বাচসাস)’ পুরস্কার লাভ করে।

    উৎসর্গ

    বাবার স্মৃতির উদ্দেশে

  • এক পরিচ্ছেদ

    এক পরিচ্ছেদ

    এক পরিচ্ছেদ

    আবার তারা গ্রামে ফিরে আসে। পেছনে রেখে আসে স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, মা-বাপ, ভাই-বোন। ভাতের লড়াইয়ে তারা হেরে গেল।

    অনেক আশা, অনেক ভরসা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে তারা শহরের বুকে পা বাড়িয়েছিল। সেখানে মজুতদারের গুদামে চালের প্রাচুর্য, হোটেলে খাবারের সমারোহ দেখে দেখে তাদের জিভ শুকিয়ে যায়। ভিরমি খেয়ে গড়াগড়ি যায় নর্দমায়। এক মুঠো ভাতের জন্যে বড়লোকের বন্ধ দরজার ওপর মাথা ঠুকে ঠুকে পড়ে নেতিয়ে। রাস্তার কুকুরের সাথে খাবার কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়। দৌলতদারের দৌলতখানার জাঁকজমক, সৌখিন পথচারীর পোশাকের চমক ও তার চলার ঠমক দেখতে দেখতে কেউ চোখ বোজে। ঐশ্বর্যারোহীর গাড়ীর চাকায় নিষ্পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় কেউ বা।

    যারা ফিরে আসে তারা বুকভরা আশা নিয়ে আসে বাঁচবার। অতীতের কান্না চেপে, চোখের জল মুছে তারা আসে, কিন্তু মানুষের চেহারা নিয়ে নয়। তাদের শিরদাঁড়া বেঁকে গেছে। পেট গিয়ে মিশেছে পিঠের সাথে। ধনুকের মত বাকা দেহ শুষ্ক ও বিবর্ণ। তবুও তারা ভাঙা মেরুদণ্ড দিয়ে সমাজ ও সভ্যতার মেরুদণ্ড সোজা করে ধরবার চেষ্টা করে। ধুকধুকে প্রাণ নিয়ে দেশের মাটিতে প্রাণ সঞ্চার করে, শূন্য উদরে কাজ করে সকলের উদরের অন্ন যোগায়। পঞ্চাশের মন্বন্তরে হুঁচোট খাওয়া দেশ আবার টলতে টলতে দাঁড়ায় লাঠি ভর দিয়ে।

    দুটি ছেলে-মেয়ের হাত ধরে জয়গুনও গ্রামে ফিরে আসে। বাইরের ছন্নছাড়া জীবন। এতদিন অসহ্য ঠেকেছে তার কাছে। কতদিন সে নিজের গ্রামে ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করেছে, স্বপ্ন দেখেছে। ছায়া-সুনিবিড় একখানি বাড়ী ও একটি খড়োঘর তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে কতদিন! কিন্তু বৃথাই ডেকেছে। তার সে বাড়ী, সে ঘর আর তার নয় এখন। দুর্ভিক্ষের মহাগ্রাসে কোথায় গেল বাড়ী আর কোথায় গেল ঘর। বেচে নিঃশেষ করে দিল উদরের জ্বালা মেটাতে।

    জয়গুন গ্রামে আসে একটি মাত্র আশা নিয়ে। ছাড়া ভিটে আছে একটা। সে তার আট আনা অংশের মালিক। বাকী আট আনার অংশীদার তার নাবালেগ ভাই-পো শফি। শফিকে নিয়ে শফির মা-ও আসে। তাদেরও মাথা গুঁজবার ঠাঁই নেই। শেষে স্থির হয়—এই ছাড়া ভিটেটার ঝোপ-জঙ্গল সাফ করে দু-ভিটিতে দুখানা ঘর তুলে আবার তারা সংসার পাতবে।

    কিন্তু এটা যে সূর্য-দীঘল বাড়ী!

    জয়গুন ও শফির মা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়।

    পূর্ব ও পশ্চিম সূর্যের উদয়াস্তের দিক। পূর্ব-পশ্চিম প্রসার। বাড়ীর নাম তাই সুর্য-দীঘল বাড়ী। সূর্য-দীঘল বাড়ী গ্রামে কচিৎ দু’একটা দেখা যায়। কিন্তু তাতে কেউ বসবাস করে না। কারণ, গায়ের লোকের বিশ্বাস সূর্য-দীঘল বাড়ীতে মানুষ টিকতে পারে না। যে বাস করে তার বংশ ধবংস হয়। বংশে বাতি দেয়ার লোক থাকে না। গ্রামের সমস্ত বাড়ীই উত্তর-দক্ষিণ প্রসারী।

    সূর্য দীঘল বাউরি ইতিহাস ভীতিজনক। সে ইতিহাস জয়গুন ও শফির মা-র অজানা নয়।

    সে অনেক বছর আগের কথা। এ গ্রামে হাতেম ও খাদেম নামে দুই ভাই ছিল। ঝগড়া করে ভাই-ভাই ঠাঁই-ঠাঁই হয়ে যায়। খাদেম আসে সূর্য-দীঘল বাড়ীটায়। বাড়ীটা বহুদিন থেকেই খালি পড়ে ছিল।

    এখানে এক সময়ে লোক বাস করত, সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা বংশ রক্ষা করতে পেরেছিল কিনা কেউ জানে না। তবুও লোকের ধারণা, সূর্য-দীঘল বাড়ীতে নিশ্চয়ই বংশ লোপ পেয়ে থাকবে। নচেৎ এরকম বিরান পড়ে থাকবে কেন?

    যাই হোক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে খাদেম এসে সূর্য-দীঘল বাড়ীতে বসবাস আরম্ভ করে। কিন্তু একটি বছরও ঘুরল না। বর্ষার সময় তার একজোড়া ছেলে-মেয়ে পানিতে ডুবে মারা গেল। সবাই বুঝতে পারল—বংশ নির্বংশ হওয়ার পালা শুরু হল এবার। বুড়োরা উপদেশ দিলেন বাড়ীটা ছেড়ে দেয়ার জন্য। বন্ধু-বান্ধবরা গালাগালি শুরু করল—আল্লার দুইন্যায় আর বাড়ী নাই তোর লাইগ্যা। সূর্য-দীগল বাড়ীতে দ্যাখ কি দশা অয় এইবার।

    খাদেমের মনেও ভয় ঢুকে গিয়েছিল। সাতদিনের মধ্যে ঘর-দুয়ার ভেঙ্গে সে অন্যত্র উঠে যায়। জয়গুনের প্রপিতামহ খুব সস্তায়, উচিত-মূল্যের অর্ধেক দিয়ে তার কাছ থেকে বাড়ীটা কিনে নেয়। উত্তরাধিকারের সেই সূত্র ধরে জয়গুন ও শফি এখন এ বাড়ীর মালিক।

    ঐ ঘটনার পর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। এতদিনের মধ্যে আর কোন লোক ভুলেও এ বাড়ীতে আসেনি। আকালের সময় জয়গুন ও শফির মা এ বাড়ীটাই বিক্রী করতে চেয়েছিল। কিন্তু সূর্য-দীঘল বাড়ী কেউ কিনতে এগোয়নি। তখন এ বাড়ীটা বিক্রী করতে পারলেও জয়গুনের স্বামীর ভিটেটুকু রক্ষা করা যেত; ছেলে-মেয়ের বাপ-দাদার কবরে আজ আবার বাতি জ্বলত।

    বহুদিনের পরিত্যক্ত বাড়ী। সর্বত্র হাঁটুসমান ঘাস, কচুগাছ, মটকা ও ভাট-শেওড়া জন্মে অরণ্য হয়ে আছে। বাড়ীর চারপাশে গোটা কয়েক আমগাছ জড়াজড়ি করে আছে। বাড়ীর পশ্চিম পাশে দুটো বড়া বাশের ঝাড়। তা ছাড়া আছে, তেতুল, শিমুল ও গাবগাছ। গ্রামের লোকের বিশ্বাস—এই’গাছগুলোই ভূত-পেত্নীর আড্ডা।

    অনেকদিন আগের কথা। সন্ধ্যার পর গদু প্রধান সোনাকান্দার হাট থেকে ফিরছিল। তার হাতে একজোড়া ইলিশ মাছ। সুর্য-দীঘল বাড়ীর পাশের হালট দিয়ে যেতে যেতে সে শুনতে পায়-অই পরধাইন্যা, মাছ দিয়া যা! না দিলে ভালা অইব না।

    প্রথমে গদু প্রধান ভ্রূক্ষেপ করেনি। পরে যখন পায়ের কাছে ঢিল পড়তে শুরু করে, তখন তার হাত থেকে মাছ দুটো খসে পড়ে যায়। সে ‘আউজুবিল্লাহ’ পড়তে পড়তে কোনো রকমে বাড়ী এসেই অজ্ঞান।

    রহমত কাজী রাত দুপুরের পর তাহাজ্জদের নামাজ পড়বার জন্যে ওজু করতে বেরিয়ে ফুটফুটে জোছনায় একদিন দেখেছে সূর্য-দীঘল বাড়ীর গাবগাছের টিকিতে চুল ছেড়ে দিয়ে একটি বউ দুপা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক দৃষ্টিতে সে চেয়ে দেখছিল। চোখের পলক ফেলে দেখে আর সেখানে বউ নেই। একটা ঝড়ো বাতাস উত্তর-পশ্চিম কোণাকুণি করম আলী তার বাড়ীর ওপর দিয়ে চলে গেল। পরের দিনই করম আলী হাজীর ‘পুতের বউ’ কলেরায় মারা যায়। দু’দিন পরে তার হালের তিনটা তরতাজা গরু কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে খতম।

    আরও অনেকের সাথেই নাকি অনেক বেশে ভূতের দেখা হয়েছে। সুর্য-দীঘল বাড়ীর ভুতের গল্পের অন্ত নেই। তাই দিন-দুপুরেও পারতপক্ষে এ বাড়ীর পাশ দিয়ে কেউ হাঁটে না।

    বাড়ীটার বড় আকর্ষণ একটা তালগাছ। এত উঁচু তালগাছ এ গায়ের লোক আর কোথাও দেখেনি। কত শিশুর পরিচয় হল তালগাছটির সঙ্গে। তারা বুড়ো হল, জীবন-লীলা সাঙ্গ করল। তাদের কত উত্তরপুরুষও গেল পার হয়ে। কিন্তু তালগাছটি তেমনি দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মত। কালের সাক্ষী হয়ে শত ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা উঁচু করে।

    তালগাছটি এ-এলাকার গর্বের বস্তু। চর-অঞ্চলে বিশেষ করে বক্তবলীর চরে গেলে কথায় কথায় যখন কুল-কৌলীন্যের তক ওঠে, তখন এখানকার লোক এ তালগাছটির নজির দেখায়। কেউ কেউ নিজেদের বনেদীপনা জাহির করে। তারা এরকম করে বলে—আমরা অইলাম গিয়া সাবেক মাড়ির ভর্নলোক, বুঝলানি মিয়া? আমাগো ঘর বহুত পুরানা। ঐ আসমাইন্যা তালগাছটা সাক্ষী। দেহাও দেহি, অত বুড়া আর ডাগর গাছ একটা তোমাগ মুল্লুকে? ও হো, ঠন ঠন। তোমাগ এইদিগের বড় তালগাছ আমাগ গেরামের খাজুর গাছের হমান। আমাগড়া সেই মইযখালির হাটের তনে দেহা যায়। তোমাগড়া অত বড় অইব ক্যামনে? এইত হেদিনের চর এইডা। এইহানে আগে আছিল গাঙ। তোমরা অইলা চরুয়া ভূত—বাইল্যা মাডির তরমুজ, ইত্যাদি।

    অপর পক্ষ রাগ করে না। তারা সব সময় এ সাবেক মাটির বাসিন্দাদের কৌলীন্য স্বীকার করে। বহু টাকা খরচ করেও এদের ছেলে-মেয়ের সাথে সম্বন্ধ করতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করে। এখানকার বহু কালো কুৎসিত মেয়ে চরের সম্পন্ন গৃহস্থের ঘরে বিকিয়ে যায় এ কারণেই।

    জয়গুন ও শফির মা সাত-পাঁচ ভেবে এ বাড়ীতে বাস করার আশা ছেড়েই দিয়েছিল। ছেলেমেয়ের অমঙ্গল আশকা করেই নিরস্ত হয়েছিল বিশেষ করে। কিন্তু একদিন এক নামকরা ফকির—জোবেদ আলী এ সঙ্কট থেকে তাদের উদ্ধার করে। সুর্য-দীঘল বাড়ীর চারকোণে চারটা তাবিজ পুঁতে এসে সে জানিয়ে দেয়—এই বার চউখ বুইজ্যা গিয়া ওড বাড়ীতে। আর কোন ডর নাই। ধুলাপড়া দিয়া ভূত-পেত্নীর আচ্ছা ভাইঙ্গা দিছি। চাইর কোণায় চাইড্যা আলীশান আলীশান পাহারাদারও রাইখ্যা আইছি। সব আপদ-বিপদ ওরাই ঠেকাইব। বাড়ীর সীমানার মইদ্যে ভূত-পেত্নী; জিন-পরী, ব্যারাম-আজার—কিছু আইতে পারব না।

    জয়গুন ও শফির মা খুশী হয় ফকিরের ওপর। শফির মা তার ভিক্ষার ঝুলি খালি করে সোয়া সের চাল দেয় তাকে। জয়গুন দেয় সোয়া পাঁচ আনা পয়সা। কিন্তু ফকিরের মন ওঠে না। শফির মা অনুনয় করে—আমরা গরীব-কাঙ্গাল মানু। এই এর বেশী আর কি দিতে পারি?

    —বাড়ীতে যখন ঠিকঠাক অইবা তখন একটা পিতলের কলসী দিও। আর হোন, তোমাগ বাঁশ ঝাড়ে বড়্‌ড়া বাঁশ দ্যাখলাম। এক জোড়া বাঁশ দিও আমারে অরে দিলে আখেরে কাম দিব।

    জয়গুন ও শফির মা আপত্তি করে না।

    ফকির আবার বলে—হোন, আর এক কথা। বচ্ছর বচ্ছর কিন্তু পাহারা বদলাইতে অইব। যেই চাইরজন এইবার রাইখ্যা গেলাম, হেইগুলা কমজোর অইয়া যাইব সামনের বচ্ছর। বোঝতেই পার, দিনরাইত ভূত-পত্নীর লগে যুদ্ধ করা কি সোজা কাণ্ড!

    সূর্য-দীঘল বাড়ী মানুষের হাত লেগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। জয়গুন ও শফির মা আজেবাজে গাছ-গাছড়া বিক্রি করে টাকার আমদানী করে। তাতে অন্ধকার বাড়ীটায় আলোর আমদানীও হয় বেশ। নিজেদের ঝড়ের বাঁশ কেটে খুঁটি হয়। খড়ের চালা ও পাটখড়ির বেড়া নিয়ে দু’ভিটেয় দু’খানা ঘর ওঠে। ঘর নয় ঠিক—ঝুপড়ি। রোদ-বৃষ্টি ঠেকানোর আদিম ব্যবস্থা।

    বছর বছর পাহারাদার বদলিয়ে তিনটি বছর কেটে গেল সূর্য-দীঘল বাড়ীতে। কোনো বিপদ-আপদ আজ পর্যন্ত আসেনি। ম্যালেরিয়া জ্বর ছাড়া অসুখ-বিসুখও হয়নি ছেলেমেয়েদের। এ জন্যে ফকিরের দোষ দেয়া যায় না। ম্যালেরিয়া জ্বর কোন বাড়ীতে

    এবার আবার পাহারাদার বদলাবার সময় হয়েছে। একদিন জয়গুনের ঘরে বসে শফির মা বলে—ফকিরের যে আর দ্যাহা মিলে না আইজকাইল। হেইযে কবে আইয়া গেছে। আর একবার হাত-হপনেও দাহা দিয়া গেল না, আমরা বাঁইচ্যা আছি না মইরা গেছি। কেমনতরো মানু। এদিকে বছর যে ঘুইরা গেল। কলসীডা না দেওনে বেজার অইছে বুঝিন্‌।

    ফকিরকে তাদের প্রতিশ্রুত পেতলের কলসী দেয়া হয়নি এ পর্যন্ত। সাত-স্বপনেও তার দেখা না পাওয়ার কারণ এটা নয়। কারণ অন্য একটা। জয়গুন ছাড়া আর কেউ তা জানে না।

    কলসীর তাগাদা দিতে ফকির মাঝে মাঝে আসত। জয়গুন ও শফির মা নিজেদের উপস্থিত অক্ষমতা জানিয়ে কিছুদিন সবুর করবার অনুরোধ জানাত। শফির মা বাড়ী থাকলে কখনো লাউ-কুমড়ো, কখনো শসা-বেগুন—যখনকার যা নিয়ে সে খুশী মনে ফিরে যেত। শফির মা বাড়ী না থাকলে সেদিন জয়গুনের ঘরের দোরগোড়ায় যেন শিকড় গেড়ে বসত সে। উঠবার নামও করত না। কোনোদিন সে বলত—এক খিলি পান দ্যাও বেয়ান।

    জয়গুনকে ‘বেয়ান’ আর হাসুকে ‘জামাই’ বলতে শুরু করেছিল সে। প্রথম থেকেই লোকটার কথাবার্তা, ভাবগতিক জয়গুনের কাছে সুবিধের মনে হয়নি। সামান্য একটা পেতলের কলসীর জন্যে এত ঘন ঘন কেন সে আসে? ‘বেয়ান’ বলে এত ঘনিষ্ঠতাই বা করতে চায় কেন? কি মতলব?

    জয়গুনের মনে সন্দেহ। কিন্তু কিছু বলার উপায় ছিল না। যে লোকটা এত উপকার করল, তাকে কটু কথা বলতেও বাধে।

    জয়গুন একটা আস্ত পানে সুপারী, চুন ও খয়ের দিয়ে এগিয়ে দিত। ফকির বলত, বেয়াইরে খিলি বানাইয়া দিলে বুঝিন জাইত যায়, না? কত দিন খোশামুদ কইর‍্যাও তোমার আতের এক খিলি পান খাইতে পারলাম না। মইরা গেলেও হায়-আফসোস থাকব।

    জয়গুন কোন উত্তর দিত না।

    পান খেতে খেতে ফকির নানা রকমের কথা বলতে শুরু করত। কখনো কোনো প্রশ্ন করে উত্তরের জন্য হা করে থাকত। উত্তর না পেয়ে আবার শুরু করত। মাঝে মাঝে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠত লাগামছাড়া হাসি। জয়গুন এ অস্বস্তিকর হাসি-ঠাট্টায় জ্বলে উঠত মনে মনে। পিছ-দুয়ার দিয়ে এক সময়ে সরে পড়ত।

    একদিন রাত্রে বৃষ্টি মাথায় করে কোথা হতে ফকির এসে হাজির। জয়গান পান খেতে বসেছিল। ফকিরের আগমনে সে একটু সচকিত হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়ে দুটি ঘুমিয়ে পড়েছে। শফির মা-ও বাড়ী নেই আজ।

    ফকির দরজার ওপর বসে পান চিবোতে চিবোতে এক সময়ে বলে—বেয়ানের আতের পান খাইতে কি মুলাম! এক্কেরে মুখের সাথে মিশা যায়। যেই আতের পান এত মুলাম, হেই আতখানও না জানি কেমুন। শরীলখানও বুঝিন তুলতুল করে তুলার মতন।

    ফকির হাসে। জয়গুনের সমস্ত শরীর কাটা দিয়ে ওঠে। শক্ত একটা কিছু বলতে চায়। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না।

    —দেহি না, বেয়ান! বলতে বলতে সে এগোয়—দেহি না তোমার নরম আতহানে কি লেহা আছে।

    জয়গুন পিছিয়ে যায়। বেড়ার সাথে গিয়ে ঠেকে।

    —দেহি না আতহান। নওল মুরগীর মতন পলাও ক্যান! ছিঃ ছিঃ!

    ফকির হাত বাড়াতেই জয়গুন হাতের কাছের চুনের ঘট্‌টা ছুঁড়ে দেয় ফকিরের মুখের ওপর। চেঁচিয়ে ওঠে—কুত্তার পয়দা! বাইর অ, বাইর অ ঘরতন।

    এ ব্যাপারের পর জোবেদ আলী ফকির আর তার চুন-কালির মুখ সূর্য-দীঘল বাড়ীতে দেখায়নি।….

    জয়গুন শফির মার কথার উত্তর দেয়—বেজার অইলে অউক গিয়া। দিমু না কলসী, কাম নাই আর পাহারাদারের।

    শফির মা জয়গুনের ভাবান্তরের কারণ খুঁজে পায় না। জয়গুন এমন অকৃতজ্ঞ হল কেমন করে? আর পাহারাদার ছাড়া সূর্য-দীঘল বাড়ীতে থাকবার সাহসই বা তার কোত্থেকে হল?

  • দুই পরিচ্ছেদ

    দুই পরিচ্ছেদ

    দুই পরিচ্ছেদ

    পাশাপাশি পিঁড়ে বিছিয়ে বসে দুটি ভাইবোন—হাসু ও মায়মুন। জয়গুন পান্তা বেড়ে ছেলে ও মেয়ের সামনে দুটো থালা এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা নিয়ে বসে। মায়মুন আড়চোখে হাসুর থালার দিকে চায়। রোজ সে এমনি চেয়ে দেখে। রোজই হাসুকে বেশী করে খেতে দেয় মা। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস তার হয় না। জয়গুন বুঝতে পেরে নিজের পাতের একমুঠো ভাত দিয়ে বলে—বিছমিল্লা বুইল্যা মোখে দে। দেখবি এই দুগগায়ই প্যাট ভইরা যাইব।

    —বিছমিল্লা।

    হাসুও বলে—বিছমিল্লা।

    প্যাচপেচে পান্তাভাত পোড়া মরিচ মেখে কালো করে নেয়। খেতে খেতে জয়গুন সারাদিনের কাজের ফরমাস করে যায় মায়মুনকে। ঘর ঝাট দেয়া, থালাবাসন মাজা, পানি আনা ইত্যাদি।

    —ভাত আছে আর, মা? হাসু বলে।

    ভাতের হাঁড়িটা হাসুর থালার ওপর উপুড় করে ঢেলে জয়গুন বলে—খাইয়া নে, পরাণ ঠাণ্ডা অইব।

    শুধু পানিতে থালা ভরে যায়। মায়মুনের পাতে তার আবাটা ঢেলে দিয়ে লবণ দিয়ে। ঘেঁটে চুমুক দেয় হাসু।

    খাওয়ার পরে জয়গুন পানের ডিবা নিয়ে বসে। পেট ভরে দুটি ভাত খেতে না পেলেও পানটা একটু মুখে দিলে তবু ভালো লাগে।

    হাসু কোষার পানি সেচে ডাকে—মা, শিগগির। গাড়ী কইলাম আইয়া পড়ল বইল্যা।

    জয়গুন বাশের চোঙা থেকে পঁচটা টাকা বের করে নেয়। এই টাকা কটিই তার মুলধন। ময়মনসিং থেকে সন্তায় চাল এনে সে গায়ে বিক্রি করে। এই করে টাকা প্রতি এক সের সোয়া সের মুনাফা হয় প্রতি খেপে। আচঁলে সব ক’টি টাকা বেঁধে চটের দুটো ঝুলি হাতে বেরিয়ে পড়ে সে তারপর।

    দশ বছরের মেয়ে মায়মুন। কিন্তু সাত বছরের বেশী বলে মনে হয় না। হাঁটতে গেলে পাক খেয়ে পড়ে যাবে মনে হয়। একা একা কাজ করতে ভালো লাগে না ওর। কিন্তু কাজের কোনোটা বাকী রাখলে চুল এক গাছও মাথায় থাকবে না, সে জানে। শীর্ণ শরীরটাকে টেনেটুনে কোনো রকমে মাজা-ঘসা করে, বদনা ভরে ভরে সাত আটবারে পানির কলসীটা ভরে সে।

    আজ হাঁস দুটো ছাড়তে গিয়ে খাঁচার নিচে ডিম দেখে মায়মুনের আনন্দ আর ধরে না। তাদের হাঁস ডিম দিয়েছে আজ নতুন। কি সাদা আর বড় বড়! দুহাতে দুটো ডিম নিয়ে সে নাচতে আরম্ভ করে। লাফাতে লাফাতে সে বাইরে আসে। দৌড়ে যায় শফির মা-র ঘরে। ডাকে—মামানি গো, অ-মামানি, দাহ কি সোন্দর আণ্ডা। আমাগ আঁসে পাড়ছে। উল্লাস যেন সে ধরে রাখতে পারে না।

    —দেহি দেহি বলে মামী হাত পেতে ডিম দুটো নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। তারপর হেসে বলে—ভালো আণ্ডা অইত। পয়লা বারের অইলেও ডাঙর-ডোঙর অইছে! আষ্ট পয়সা কইর‍্যা বেচতে পারবি এক একটা।

    —না গো মামানি, এই আণ্ডা বেচ্‌তাম না।

    —খাবি?

    —ওহোঁ। বাচ্চা ফুডাইমু।

    —বেইশ, বেইশ! মামী উৎসাহ দিয়ে বলে।

    ডিম দুটো তুষের হাঁড়ির মধ্যে রেখে মায়মুন বাড়ীর এদিক ওদিক খুঁজে গাছের শুকনো ডাল ভাঙে। আজ তার কাজ করতে খারাপ লাগে না। আর দিনের চেয়ে অনেক বেশী লাকড়ি যোগাড় করে ফেলল সে।

    বিকেলবেলা মায়মুন বড়শী নিয়ে তেঁতুলতলা গিয়ে বসে। যাবার আগে আণ্ডা দুটো আর একবার দেখে যায় দুই চোখে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ও বসে থাকে বড়শী নিয়ে। পিঠালী সব শেষ। হয়ে যায়। কিন্তু মাছ ওঠে মাত্র একটা টেংরা, তিনটে পুঁটি আর কয়েকটা ডানকানা। মাছগুলো যেন ওর চেয়েও চালাক হয়ে গেছে।

    সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঘরে সঁঝবাতি দেখিয়ে আবার নিবিয়ে দেয় মায়মুন। আবছা অন্ধকারে বসে মাছ কয়টা কুটে লবণ দিয়ে রাখে।

    রাত ন’টা দশটা পর্যন্ত অন্ধকারে ওকে একা বসে থাকতে হয় প্রায়ই। মায়মুনের বড় ভূতের ভয়। কোনো কোনো দিন সে শফির মার ঘরে গিয়ে কেচ্ছা শোনে। তার পান ছেঁচে দেয়। কিন্তু আজ সে দুপুর বেলা বেরিয়ে গেছে, এখনো ফেরেনি। ভিক্ষে করে খায় সে। মাঝে মাঝে বাড়ীও আসে না। মায়মুন দোরের ঝাপ বন্ধ করে দিয়ে চুপ-চাপ পড়ে থাকে।

    রাত গোটা নয়ের সময় হাসু আর হাসুর মা আসে। শব্দ পেয়ে মায়মুন মাথার ওপর থেকে কাঁথা সরিয়ে ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে।

    মায়মুন এবার লাফ দিয়ে ওঠে। খুশীতে আটখান হয়ে সে বলে—মা, মা, আমাগ আঁসে আণ্ডা পাড়ছে। বলতে বলতে সে বের করে আনে ডিম দুটো। হাসু খুশী হয়ে ওঠে। হাতে নিয়ে দেখে, কী সুন্দর সাদা আর বড়।

    হাসু বলে—কাইল অই আণ্ডা বিরান খাইম মা,পান্তা ভাত দিয়া।

    —ই–স! বাচ্চা ফুডাইমু আমি। প্রতিবাদ করে বলে মামুন।

    জয়গুন বলে—ওহোঁ। পয়লা দিনের আণ্ডা। আণ্ডা দুইডা জুম্মার ঘরে দিয়া আবি নামাজের দিন।

    ভাই-বোন দুজনেরই মুখের হাসি মিলিয়ে যায়।

    জয়গুন তাড়াতাড়ি চুলো ধরায়। রাতের জন্য মুঠ মেপে ছয়মুঠো ও ভোরের জন্য আরো ছয়মুঠো চাল নিয়ে সে হাঁড়ি বসায় চুলোর ওপর। ছেলেকে হুকুম দেয় কয়েকটা কুমড়ো পাতা তুলে আনতে। নিজে সে যায় না। বাচ্চা-কাচ্চার মা, রাত-বিরাতে গাছের ফল-পাতা ছিঁড়তে নেই।

    ভাত ফুটিয়ে মায়মুনের ধরা মাছ কয়টা রাঁধতে দেরী হয় না।

    তিনটি বাসনে ভাত বাড়ে জয়গুন, আর আন্দাজ করে—হাঁড়িতে কতটা আছে। ফেনটাও ভাগাভাগি করে নেয়। খেতে খেতে হাসু বলে—ফেনডাত খুব ঘন মা, মিডা মিডা লাগে।

    —নয়া আউশ যে। এর লাইগ্যাইত আউশ চাউল আনলাম। দরেও হস্তা। ফেনডাও অয় ভালা। কিন্তু ভাতে বাড়ে না এক্কেরেই। অ্যাঁরে হাসু, নারাণগঞ্জে চাউল কি দর দেখলিরে আইজ?

    —ট্যাহায় দেড় সের, মা।

    —কি পোড়ার দ্যাশ দ্যাখ দেহি! উত্তুরে এডুক হস্তা না অইলে হুকাইয়া তেজপাতা অইয়া যাইতাম না? আইজ আড়াই সের ভাও আনলাম। আমন চাউল দুইসের কইরা।

    –আমি একদিন তোমার লগে উত্তুরে যাইমু মা।

    —ওহোঁ কাম কামাই দিয়া তোমার উত্তুরে যাওনের দরকার নাই বাজান।

    খাওয়া শেষ হলে জয়গুন হাঁড়ির ভাতগুলোতে পানি ঢেলে রাখে। ছেলেমেয়ের জন্যে তেলচিটে একটা লম্বা বালিশ নামিয়ে দেয়। হাসু ও মায়মুন শুয়ে পড়ে। জয়গুন পানের ডিবাটা নিয়ে বসে এবার। আজ আর পানের ডিবা নেয়ার কথা মনে ছিল না তার। গাড়ীর মধ্যে ছমুর মা-র কাছ থেকে চেয়ে একবার মুখে দিয়েছে একটু। আর সারা দিনের মধ্যে সে পান খায়নি। তবু হাসু অনুযোগ দেয়—পান খাওয়া ছাইড়্যা দ্যাও, মা। পান আর আনতাম না আমি। চাইর পয়সা কি কম?

    পান খাওয়া সে অনেক কমিয়েছে। চার পয়সার পানে দু’দিন যায় আজকাল। পান চিবোতে চিবোতে সে সারাদিনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতে চেষ্টা করে।

    রাত অনেক হয়েছে। কুপিটা নিবিয়ে সে শুয়ে পড়ে।

  • তিন পরিচ্ছেদ

    তিন পরিচ্ছেদ

    তিন পরিচ্ছেদ

    আজকের ডিম দুটো মায়মুনের। সে বাচ্চা ফুটাবে। মা রাজী হয়েছে। সারা রাত তার ভাল ঘুম হয়নি। তার ছোট মনে কত কল্পনা জেগেছে। হাঁসের বাচ্চা হবে, সেগুলো বড় হবে, ডিম দেবে—ফকফকে সাদা ডিম। সেই ডিমের থেকে আবার বাচ্চা হবে। নানা রঙের হাসে তাদের খাঁচা ভরে যাবে। স্বপ্নেও সে দেখে রঙ-বেরঙুের হাসের সারি চলেছে ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে। ডিম কুড়িয়ে কুড়িয়ে সে একটা হাঁড়ি ভরে ফেলেছে।

    সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে হাঁস দুটো ছাড়তে যায়। ঠিক ঠিক দুটো ডিমই পেড়েছে আজো। ডিম দুটো তুলে সে তুষের হাঁড়ির মাঝে রেখে দেয় আলাদা করে। সেখানে আগের দু’দিনের আরো চারটে রাখা হয়েছে। এক দুই করে গুণে দেখে মায়মুন একবার। তারপর হাঁস দুটো ছেড়ে দিয়ে সে চেয়ে থাকে। দু’তিনবার ডানা ঝাপটা মেরে হাঁস দুটো ভেসে যায় ধানক্ষেতের দিকে। মায়মুনের চোখ তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। হাত-মুখ ধুয়ে মায়মুন ঘরে আসে। ডিম দুটো সে বুকের সাথে চেপে ধরে খুশীতে। জয়গুন বলে—অই রহম কইরা ধইরা রাখলে অই বাচ্চা অইব? বেবাকগুলা আণ্ডা লইয়া আয় আমার কাছে। বাছাই কইরা দেই। যেই আণ্ডাডা লম্ফা, হেইডায় অইব আঁসা, আর যেইডা গোল হেইডায় অইব অসী, গোল দেখে দুটো ডিম বেছে মায়মুনের হাতে দিয়ে সে আবার বলে—অই পাড়ায়। গিয়া দ্যাখ, কেউর মুরগীর উমে দিতে পারস যদি। হাসুও যা ওর লগে। তোর আর এই বেলা কামে যাওন লাগত না।

    এ কথায় রীতিমত খুশী হয়ে ওঠে হাসু।

    জয়গুন আরো বলে—দুফরে যাবি জুম্মার ঘরে। আণ্ডা চাইড্যা দিয়া আবি।

    —চাইডা অই! হাসু আশ্চার্য হয়ে যায়—তুমি না হেদিন কইলা, পয়লা দিনের কেবল?

    —দুইড্যা আণ্ডা জুম্মার ঘরে কেমন কইর‍্যা দেই, পাগল? এক আলির কমে—

    –আমরা খাইমু না বুকিন একটাও?

    —তুই আছস তোর প্যাট লইয়া।

    খেয়ে দেয়ে সবাই বেরিয়ে পড়ে।

    বর্ষার সময় বাড়ীর চারদিকে থাকে পানি। বিলের মাঝে একটা দ্বীপের মতো যেন। এ সময়ে নৌকা ছাড়া চলবার উপায় থাকে না। তারা সকলে তাদের কোষায় চড়ে ওপাড়ায় যায়। জয়গুন নামে মোড়ল বাড়ীর ঘাটে। সেখানে সে মাঝে মাঝে মোড়লদের ধান ভানে, চিড়া কোটে, ঘর লেপে দেয়।

    হাসু ও মায়মুন পাড়াময় ঘুরে শেষে দিয়ে এল ডিম দুটো।

    সাতদিন পরে বসবে সোনা চাচীর মুরগী। তার ফুটবে চৌদ্দটা ডিম। তবু সে বলেছিল—দুটো বাচ্চা হলে তাকে একটা দিতে হবে। অনেক কাকুতি-মিনতি করায় শেষ পর্যন্ত সে রাজী হয়েছে।

    গ্রামের মসজিদ। জুম্মার নামাজ হচ্ছে। হাসু বাইরে দাঁড়িয়ে দেখে। সব লোক এক সঙ্গে উঠছে, বসছে, সেজদা দিচ্ছে। হাসুর কেমন ভয় হয়। তারও নামাজের বয়স হয়েছে। সে ভাবে- বারো বছরের হলেই তো নামাজ পড়তে হয়।

    নামাজ শেষ হলে হাসু গামছায় বাধা ডিম কয়টা নিয়ে এগোয়। একজন নামাজী শিরনি বিলিয়ে দিচ্ছিল সকলের মধ্যে। গামছা খুলে হাসু তার হাতে দিয়ে দেয় ডিম কয়টা।

    ইমাম সায়েবের চোখে এড়ায় না। তিনি ডেকে বলেন—নিয়া আস আণ্ডা কয়ডা এদিকে।

    কাছে যেতে আবার বলেন-যাও, দিয়া আস গিয়া আমার এখানে। কে দিল হে?

    —ঐযে ঐ ছ্যাঁড়া। আঙুল দিয়ে দেখায় সে।

    একজন বলে—সূর্য-দীগল বাড়ীর।

    আর একজন বলে চিনেন না হুজুর? জব্বর মুন্সীর পোলা।

    ইমাম সায়েব চমকে ওঠেন—ও-ওই! তওবা! তওবা! হারাম! হারাম!

    তিনি ডিম কয়টার দিকে জনীর নির্দেশ দিয়ে বলেন—নিয়া যাও জলদি আমার কাছ থ্যাইকা। মসজিদের মধ্যে কে আনল এই আণ্ডা? ফিরাইয়া দ্যাও অহুনি। বেপর্দা আওরতের চীজ। ছি! ছি! ছি!—তার চোখে মুখে ঘৃণার তীব্রতা ফুটে ওঠে।

    একজন ইজিগাত করে—একলা একলা সে ময়মনসিংহ যায় টেরেনে কইর‍্যা। কী হিম্মত!

    ইমাম সাহেব বলেন—দেখলা মিয়ারা, ইমানদারকে খোদাওদ করিম হারাম থ্যাইকা কি ভাবে হেফাজত করেন।

    আর একজন বলে—জব্বর মুন্সী কত পরহেজগার আছিল। খোদার এমন পিয়ারা আছিল। আর তার পরিবার

    হাসু রেগে ওঠে মনে মনে। একবার ইচ্ছে হয়—দেয় ছুঁড়ে ডিম কয়টা ইমামের মুখের ওপর। কিন্তু সাহস হয় না। ডিম ক’টা নিয়ে সে বেরিয়ে আসে।

    কোষাটাকে সে জোরে বেয়ে নিয়ে যায়। আজ অনেকগুলো ট্রেন ও স্টীমার ফাঁক গেল। দুটোর জাহাজ ধরা চাইই চাই। দুটো মোট পেলেও ছানার কাজ হবে।

    দুটোর জাহাজ, আর বিকেল পাঁচটার ট্রেন ধরে সে আসে বাজারে। ডিম চারটে সে বিক্রি করেই ফেলবে। কেন দেবে সে মসজিদে? মা জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে, জুম্মার। ঘরে দেয়া হয়েছে।

    ডিম ক’টা সাত আনায় বেচে সে পাঁচ আনায় চারগাছা কাচের চুড়ি কেনে মায়মুনের জন্যে, আর নিজের কোমরে পয়সা বেধে রাখবার জালি কেনে একটা। বাকি দু’আনার এক আনায় কোনে একটা চরকি ও এক আনায় চারটে তিলের কদমা।

    সন্ধ্যার দিকে সে কোষ ভিড়ায় একটা বাড়ীর ঘাটে। চারদিকে চেয়ে সে চুপিচুপি ডাকে–কাসু, অ-কাসু!

    বছর সাতেকের একটি ছোট্ট ছেলে লাফিয়ে এসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে। হাসু ওকে কোলে তুলে নেয়। তারপর ওর মুখে একটা কদমা দিয়ে বলে—দ্যাখ, কেমুন মিষ্ট। এই চরকিডাও তোর লাইগ্যা আনছি। দ্যাখ, কেমুন সোন্দর ঘোরে।

    কাসু খুশী হয় খুব। হাসু বলে—যাবি তুই আমার লগে? মা তোর লাইগ্যা কত কান্দে দিন-রাইত!

    –ক্যার মা?

    —তোর মা। আমার মা।

    —হুঁ, মিছা কথা।

    —না বলদ, সত্যই।

    মা-র কথা শুনে কাসু যেন কেমন হয়ে যায়। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তার চোখ টলটল করে। কাসু কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সে জানে, তার মা মরে গেছে। বাপ তো। সেই কথাই বলে সব সময়।

    —যাইমু তোমার মা-র কাছে—কাসু বলে।

    —আমার মা যে তোর মা অয়, বলদ।

    —কে? কেডারে অইহানে? কাসর বাপ করিম বক্‌শ চিৎকার করে ওঠে। তেড়ে আসে লাঠি হাতে-খাড়া হারামির পয়দা, কানকথা দিতে আইছস আমার পোলারে!

    কাসুকে কোল থেকে নামিয়ে বাকী কদমা তিনটে ওর হাতে দিয়ে প্রাণভয়ে দৌড় দেয় হাস। কোটা ঠেলে দিয়ে চড়ে বসে। প্রাণপণে বেয়ে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।

    কাসুর বাপ করিম বক্‌শ পানির কিনারা পর্যন্ত এসে বাধা পায়। চেঁচিয়ে বলে—আবার এই মাহি পাও বাড়াইলে আড্ডি গুড়া কইর‍্যা ফ্যালাইমু। মানুষ চিন না বজ্জাতের বাচ্চা!

    তারপর এদিক ওদিক চেয়ে কয়েকটা মাটির ডেলা নিয়ে ছুঁড়তে থাকে ওর দিকে। একটা ডেল। এসে হাসুর পিঠের ওপর পড়তেই সে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে যায়। কোষার আবডালে থেকে আত্মরক্ষা করতে থাকে। করিমবক চলে যেতেই কোমায় চড়ে জোরে লগির খোচ দেয়।

    কাসুদের বাড়ী থেকে শব্দ শোনা যায়, সাথে সাথে গর্জনও হারামজাদা, কদমা দিয়া ভুলাইতে আইছস। আবার আইলে বাপের মরণ দেহাইয়া ছাইড়্যা দিমু।

    আবার শোনা যায়—চরকি! দ্যাখ অহন চরকিবাজি কেমুন লাগে।

    হাসুর চোখে পানি আসে। পিঠের ব্যথার কথা ভুলে যায় সে। কাসু যে তারই ভাই, এক মা-র পেটের ভাই। হোক না বাপ ভিন্ন। কিন্তু মা-তো একজনই। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, সে আর ঐ মুখো হবে না। তার জন্যেই কাসু আজ মার খাচ্ছে।

    মোট বয়ে আজ ছ’আন পেয়েছে হাসু। বাড়ী এসেই মা-কে দেয় তিনটে দু’আনি।

    মা বলে—এই পাইলি আইজ?

    —গেলাম তো দুফরের পর, আরঅ? বলেই হাসু বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। মায়মুনকে ডাকে—দেইকা যা মায়মুন, কি আনছি।

    নতুন কিছু দেখবার জন্যে মামুনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাসু চুড়ি চারগাছা ওর হাতে পরিয়ে দেয়। মায়মুনের মুখ আনন্দে ভরে যায়।

    জয়গুন বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেয়ে বলে—চুড়ি কিনলি, পয়সা পাইলি কই?

    —আইজ পথে যাওনের কালে একটা পোকা পাইয়া গেলাম। আমতা আমতা করে হাসু।

    —চুড়ি তোমারে কে কিনতে কইছে? রাগতস্বরে বলে জয়গুন। হাসু কোন উত্তর দেয় না। তার এই চুপ করে থাকাটা জয়গুনকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে—খাইতে নাই হইতে রাঙ্গা পাডি। আইজ রাইতে ভাত নাই তোর কপালে।

    মায়মুন মুখ কালো করে দূরে সরে যায়। হাসু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই থাকে।

    জয়গুন আবার বলে—আণ্ডা কই?

    —জুম্মার ঘরে দিয়া দিছি। বলেই হাসু শিউরে ওঠে।

    –জুম্মার ঘরে! তুমি বুঝছ, আমি কিছুই জানমু না? মোড়ল বাড়ীর তন বেবাক হুইন্যা আইছি। হুজুর ফিরাইয়া দিছেন আণ্ডা।

    হাসুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। চাপে পড়ে সত্য কথাটাই বলে সে-–বেইচ্যা ফ্যালাইছি।

    –পয়সা দে।

    –চুড়ি কিনছি, পয়সা রাহনের জালি আর—

    জয়গুন এবার বেরিয়ে আসে বাঘিনীর মত।

    —আর কাসুর লাইগ্যা চরকি আর কদ্‌মা।

    বাঘিনীর তেজ মিলিয়ে যায় শুধু একটা নামে। কি মধুর নাম! কাসু! রাগের মাঝে বাৎসল্যের হঠাৎ আবির্ভাব সে সহ্য করতে পারে না। সরে যায় সেখান থেকে।

    খাওয়ার সময় আবার তাদের কথা হয়। মা বলে-কাসু কতহানি ডাঙর অইছে রে?

    —মায়মুনের মত অত বড় অইছে।

    একটা নিশ্বাস বেরিয়ে আসে। হাসু ও মায়মুন চকিত হয়ে মার দিকে চায়। হাসু এবার অন্য কথা পাড়ে-তুমি আর বাইরে যাইও না, মা। মাইনষে কত কতা কয়, বেপর্দা–

    ছেলের পাকামি দেখে জয়গুন ধমক দেয়—বাইরে যাইমু না! ঘরে আইন্যা কে মোখের উপর তুইল্যা দিব?

    —আমি যা পাই। না পাইলে না খাইয়া মইরা যাইমু। হেই অ ভালা, ত মাইনষের কত আর সয় না।

    হাসু সারাদিনে দশ বারো আনা পায় মোট বয়ে। এ দিয়ে তিনটি প্রাণীর এক বেলাও চলে না। জয়গুন বাধ্য হয়েই ঘরের বার হয়েছে আজ অনেক দিন। সে বাড়ী বাড়ী ঘর লেপে, ধান ভানে, চিড়া কোটে। সস্তায় চাল কিনতে যায় উত্তরে। গাড়ীতে করে যায়, ভাড়া লাগে না। গায়ের লোকের কথায় তার গা জ্বালা করে। তাদের নিষেধ মেনে চললে না খেয়ে শুকিয়ে মরতে হবে, সে জানে।

    জয়গুন এবার বলে—খাইট্যা খাইমু। কেওরড়া চুরি কইর‍্যাও খাই না, খ’রাত কইরাও খাই না। কউক না, যার মনে যা’—

    কঠিন তার কণ্ঠস্বর।

    কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হয়—সে খোদার কাছে পাপ করছে। বাড়ীর বার হয়ে খোলা রাস্তায় সে পুরুষদের মাঝ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। গাড়ীতে কত বেগানা মানুষের মাঝে বসে সে চলে। বেপর্দা মেয়েলোকের কি আজাব হয়, সে জানে। তার প্রথম স্বামী-হাসুর বাপ মুনশী ছিল। পুঁথি পড়ে শোনাত দোজখের শাস্তির বিবরণ। পুঁথির কয়েকটা লাইন তার আজো মনে পড়ে–

    মুখের ছুরত যার পুরুষে দেখিবে,
    বিছা, বিচ্ছু, জোঁকে তারে বেড়িয়া ধরিবে।
    যে চুল দেখিবে তার পুরুষ অচিন,
    সাপ হইয়া দংশিবে হাশরের দিন।
    যে নারী দেখিবে পর-পুরুষের মুখ,
    শকুনি গিরধিনী খাবে ঠোকরাইয়া চোখ।

    জয়গুন শিউরে ওঠে। সাপ, বিছা, জোঁক …! তার প্রথম স্বামীর মুখখানাও মনে পড়ে যায়। কী সুন্দর চাপদাড়ি-শোভিত মুখখানা জব্বর মুনশীর। বেহেস্ত-দোজখের কত কথাই সে বলত! বেহেস্তে কত সুখ! আর দোজখ! দোজখের নামে আর একবার আঁতকে ওঠে সে। তার বিশ্বাস, হাশরের দিন জব্বর মুনশী কিছুতেই তাকে তার বেপর্দার জন্য নিজের স্ত্রী বলে স্বীকার করবে না।

    তারপর তার মনে পড়ে করিম বশের কথা। জব্বর মুনশীর মৃত্যুর পর জয়গুন তার মান-ইজ্জতের ভার দিয়েছিল তার ওপর। কিন্তু সে তা রাখতে পারেনি। দুর্ভিক্ষের বছর বিনা দোষে সে জয়গুনকে তালাক দেয়।

    পুত্র সে হাতের লাঠি বংশের চেরাগ।
    কন্যা সে মাথার বোঝা কুলে দেয় দাগ।

    সমাজের এই নীতি-নির্দেশে তিন বছরের ছেলে কাসু রয়ে গেল করিম বকশের কাছে। আর মায়মুন ও কোলের মেয়েটির পরিত্যক্তা মায়ের কোল ছাড়া আর কোথাও আশ্রয় রইলো না।

    কোলের মেয়েটি দুর্ভিক্ষের বছর মারা যায়।

    হাসু ও মায়মুনকে নিয়ে ভেসেই চলছিল জয়গুন। কিন্তু নিজের চেষ্টায় অকুল পাথারে কূল সে পায়। লজ্জাশরম বিসর্জন দিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজে। তাকে বাঁচতে হবে, ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে হবে—এই সঙ্কল্প নিয়ে আকালের সাথে পাঁচ বছর সে লড়াই করে আসছে।

    আরো অনেক কিছু ভাবছিল জয়গুন। ছেলের ডাকে তার ধ্যান ভেঙে যায়।

    —তুমি খাও না, মা?

    ছেলেমেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মমতায় তার বুক ভরে ওঠে।

    দুটি কচি মুখ। এদের বাঁচাতেই হবে। ধর্মের অনুশাসন সে ভুলে যায় এক মুহূর্তে। জীবনধারণের কাছে ধর্মের বারণ তুচ্ছ হয়ে যায়, মিথ্যে হয়ে যায় তার কাছে।

  • চার পরিচ্ছেদ

    চার পরিচ্ছেদ

    চার পরিচ্ছেদ

    রেল-রাস্তার ধারে মা-কে নামিয়ে দিয়ে হাসু কোষা ডুবিয়ে রাখে। কেউ নিয়ে যেতে পারে। এই ভয়ে সে তার ওপর কচুরি ঢাকা দিয়ে রাখে। এ ব্যাপারে খুবই হুঁশিয়ার সে। কারণ, বর্ষার দিনে কোষাটা তাদের চলাফেরার একমাত্র সম্বল।

    হাসু গাড়ীর দেরী বুঝে রেল-রাস্তা ধরে দক্ষিণমুখি পথ নেয় নারায়ণগঞ্জের দিকে। রেল ও স্টীমারের বড় স্টেশন সেখানে। আজ তিন মাইল রাস্তা হেঁটেই যেতে হবে। আর সব দিন গাড়ীর পা-দানের ওপর দাঁড়িয়ে হাতল ধরে দিব্যি এতটা রাস্তা সে পার হয়ে যায়।

    জয়গুন ফতুল্লা স্টেশনে এসে দাঁড়ায়। ট্রেন আসার অনেক দেরী। সে এদিক ওদিক খুঁজে দুজন সাথী যোগাড় করে নেয়।

    নয়টার ট্রেন আসে দশটারও পরে। এখানে এক মিনিটের বেশী দাঁড়ায় না গাড়ী। ভিড়ের মাঝে সঙ্গিনীদের সাহায্যে জয়গুন কোনো রকমে উঠে পড়ে। মেঝেতে একটু জায়গা নিয়ে থলে বিছিয়ে বসে। জয়গুনের সাথী দুটি—গেদির মা, লালুর মা-ও বসে নিচে। গেদির মা-র সাথে পাঁচ বছরের গেদি। লালুর মা বিরক্ত হয়, বলে—মাইয়াহান বাড়ীতে রাইক্যা আইতে পার না, গেদির মা?

    —বাড়ীতে কার কাছে রাহি বইন?

    —ভিড়ের মইদ্যে নিজেরই চলন দায়, তুমি আবার–

    —তুমি কি ফ্যালাইয়া দিতে কও মাইয়াডারে! গেদির মা রুষ্ট হয়ে বলে।

    —না, না, হেইডা কইমু ক্যাঁ? কইছিলাম তোর কষ্ট দেইক্যা।

    —কষ্ট অইলে আর কি করমু বইন? অদিষ্টে কষ্ট থাকলে খণ্ডাইব কে?

    —এক কাম কর না? মাইয়াডার বিয়া দিয়া দে!

    —মোডে পাঁচ বচ্ছর বয়স। এত শিগগিরেই!

    —এই আর কি এমুন? মাইয়াডাও খাইতে লইতে পারব, তুইও নিভাবনায় থাকবি।

    জয়গুন রাস্তাঘাটে সংকুচিত হয়ে থাকে। সে কথা বড় কয় না। এখনও লজ্জাকে সে জয় করে উঠতে পারে নি। তার কান অন্য দিকে। ওপাশে আলোচনা হচ্ছে—দেশ স্বাধীন হবে, চাল সস্তা হবে, এই সব।

    চার-পাঁচজন যাত্রীর মধ্যে তখন আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। জনকয়েক একটা বাংলা খবরের কাগজের দিকে ঝুঁকে আছে। বাকী সবাই শুনছে ওপাশের আলোচনা।

    একজন বলে—এই বচ্ছর আহালের নমুনা দেহা যায়। চাউলের দর একই চোডে আটতিরিশ অইছে।

    আর একজন সায় দিয়ে বলে—আহাল অইব না আবার! মানুষ কি আর মানুষ আছে? পাপের ডুইবা গেছে দ্যাশ। দেইক্যে মিয়ার আধা মানুষ মইরা যাইব এই বার। পাপ, পাপে বাপেরেও ছাড়ে না।

    অন্য একজন বলে—পঞ্চাশ সনের চাইয়া বড় আহাল অইব এই বার।

    একজন প্রতিবাদ করেনা মিয়া, দ্যাশ স্বাদীন অইব। আর দুখু থাকব না কারুর, হুনছি আমি। স্বাদীন আইলে চাউলও হস্তা অইব। আগের মত ট্যাকায় দশ সের।

    —ও মশাই আপনের খবরিয়া কাগজে কি লেখছে? জোরে জোরে পড়েন না, হুনি।

    যে লোকটি খবরের কাগজ পড়ছিল, সে জোরে পড়তে আরম্ভ করে, ১৫ই আগস্টের মধ্যে ভারতবাসীর হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হইবে–

    —ও মশাই, ওড়া কার ছবি? একজন জিজ্ঞেস করে।

    —জিন্নাহ সাবের। খবরের কাগজের পাঠক বলে।

    আবার তর্ক। একজন বলে, জিন্না সাবই রাজা অইব। খুব বড় মাথা লোকটার।

    অন্য দিক থেকে আর একজন বলে—গান্ধী অইব এই দেশের রাজা।

    এ নিয়ে কিছুক্ষণ তর্ক চলে। মাঝ থেকে একজন বলে—সুভাষ বসু থাকলে সে-অই রাজা অইতেন।

    —আইচ্ছা মামু, স্বাদীন অইলে খাজনা দিতে অইবনি?

    -না, না, খাজনা দিলে আবার স্বাদীন অইল কি?

    অপর একজন বলেনা মিয়া, রাজার খাজনা মাপ নাই, দিতেই অইব।

    জয়গুন মন দিয়ে শোনে সব কথা। একটি কথাই তার ভালো লাগে, আশা জাগে মনে-চাল সস্তা হবে, কারো কোন কষ্ট থাকবে না।

    —হাসুর মা!

    জয়গুন তাকায়। লালুর মা বলে—মোখ বুইজ্যা বইয়া আছ যে, এই দিকে কত কি অইয়া গেল।

    –কি? উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে জয়গুন।

    —আমার লালুর বিয়া ঠিক কইর‍্যা ফেললাম। এই দ্যাহো বউ।

    লালুর মা গেদিকে আরো কাছে টেনে নেয়।

    জয়গুন একটু হাসে শুধু। লালুর মা বলে—বউ কেমন অইব দ্যাখ দেহি।

    —ভালা। জয়গুনের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

    লালুর মা খুশী হয়। সে গদির মা-কে বলে—-গয়নার লাইগ্যা অমন কইর‍্য না গো। আমি কইছি—কানে কানফুল, নাকে নাকফুল আর বালি, আতে বয়লা, পায়ে ব্যাকখাড়ু দিমু। তয় রূপার দিতে পারতাম না, বইন।

    -ওহো, হেইডা অইব না। তুমি বেবাক কেমিকল আর বেলী দিয়া চালাইতে চাও। না বইন, রূপার একপদ জিনিস দিতেই অইব। আর গলার অড়কল আর কোমরের নাবীসঙগ। আমার গাদা মাইয়া। নাবীসঙ্গ না অইলে কেমুন দাহা যাইব।

    ঢাকা স্টেশন। লোক নামে, লোক ওঠে। ভিখারীও ওঠে নানা রকমের কানা, খোড়া, বোবা। একজন অন্ধ করুণ সুরে বলে যায়–

    যে জন করিবে দান অন্ধ মিসকিনে
    বকশিশ পাইবে সেই হাশরের দিনে।।
    এক পয়সা যেই দিবে খুশী খোশালিতে।
    সত্তুর পয়সা পাইবে আল্লার রহমতে।।
    বরকত হইবে তার রুজি-রোজগারে।
    বাল-বাচ্চা জিন্দা রবে সুখের সংসারে॥

    আ—ল্লা–হ!

    অন্ধ হাত পাতে—দ্যান বাবা একটা পয়সা।

    একজন যাত্রী বলে—এক পয়সা কি আর আছে বাপু?

    মসজিদের চাদার জন্য আসে লোক। রীতিমত বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করে–জয়নগর মসজিদের জন্য দান করুন। এর ফল পাবেন কেয়ামতের দিন, পুলসেরাতের দিন। এই টাকায় বেহেস্তে ফুল-বাগিচা হবে, দালান-বালাখানা হবে।

    দুএক পয়সা কেউ দেয়, অনেকেই দেয় না। কেউ বলে—এদের এই একটা পেশা।

    গাড়ী চলতে আরম্ভ করলে লালুর মা আবার মুখর হয়ে ওঠে—নাবীসঙ্গ দিতে পারতাম না। বিয়াইন, গলার অড়কলও না। তয় খাড়ু না দিয়া পায়ের বুনঝুনি দিমু বউরে, ছোড বউ আমার আঁটব ঝুনঝুন কইর‍্যা!

    জয়গুন ভাবছিল অনেক কিছু। সে নিজের ছেলের বিয়ে দেবে—বউ আসবে ঘরে। মেয়ের বিয়ে দেবে—পরের বাড়ী যাবে সে। লালুর মার শেষ কথায় সে একটু হাসে।

    —হে অইলে শাওন মাসের পয়লা দিয়া-অই বিয়া অইব। কি কও বিয়াইন?

    গেদির মা একটু চিন্তা করে বলে—ওহো, শাওন মাস আমার মাইয়ার জর্মমাস।

    —হে অইলে পরের মাসে?

    —পরের মাসে? না না। ভাদ্র মাসে বিলাই পার করে না ঘরতন। আর আমি বুঝিন। মাইয়া পার করুম? কী যে তোমার আক্কল!

    —সত্য অইত। আমার মনেই আছিল না ভাদ্র মাস। হে অইলে পরের মাসেই অইব, কেমুন গো?

    গেদির মা রাজী হয়।

    একটা ছেলে সুর করে বলে যাচ্ছে–

    খেয়ে যান মজার নাশতা,
    নিয়ে যান সস্তা সস্তা,
    এক আনায় দুই বস্তা।

    ছেলেটার ছড়া বলার ভঙ্গী আর বস্তার বিরাটত্ব দেখে যাত্রীরা সব হো-হো করে হেসে ওঠে। কেউ কেউ দু’একটা প্যাকেট কিনে চানাচুরের মজাটাও পরখ করে। লালুর মা দুই পয়সা দিয়ে একটা প্যাকেট কিনে ভাবী বউকে দেয়। গেদি খুশী হয়।

    একটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। গাড়ী একটা স্টেশনে থামতেই জয়গুন, লালুর মা ও গেদির মা নেমে পড়ে। ময়লা কাপড়ে ভিখারী ভেবে টিকেট কালেক্টর দেখেও দেখে না। এখান থেকে বাজার কিছু দূরে, প্রায় এক মাইল। লালুর মা তার বউকে কোলে করে নিয়ে বেয়ানকে সাহায্য করে।

    বাজারে এসে তিনজনে তিন রকমের চাল কেনে তারা। কিন্তু একই দরের—টাকায়। আড়াই সের করে।

    তারপর বাজার থেকে বেরিয়ে তারা গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করে। ফিরে যাওয়ার গাভী আবার বিকেল চারটায়।

    গাড়ীর সময় আন্দাজ করে তারা ওঠে। রওয়ানা দেয়ার আগে তিনটা বুলির চাল মিশিয়ে ছয়টা ঝুলির মধ্যে ভরে। ঝুলিতে এক রকমের অনেক চাল দেখলে রেল-বাবুরা সন্দেহ করে, টিকেট চায়। এ রকম করে মিশিয়ে ভিক্ষার চাল বলে চালিয়ে দেয় তারা। টিকেটও লাগে না।

    গেদিকে স্টেশনের বাইরে তিনটা বালির পাহারায় রেখে তারা তিনজন তিনটা ঝুলি হাতে স্টেশনে আসে। কিন্তু সদর দরজা দিয়ে নয়, রেলের লাইন ধরে ধরে। টিকেট কালেক্টরকে এড়িয়েই যেতে চায় সব সময়। কিন্তু এত সাবধানতা সত্ত্বেও বাকী তিনটে ঝুলি নিয়ে আসার সময় প্ল্যাটফরমে রেল পুলিশ তাদের আটকায়। বলে—দেখি, দেখি।

    সকলের মুখ শুকিয়ে যায়। লালুর মা বলে—ভিক্‌কার চাউল।

    সেপাই চাল দেখে বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বলে ভিক্‌ক্যার চাওয়াল, এতনা! হামি কুছু বোঝে না! চল্‌ থানামে। জানতি নেহি এক জিল্লাকা চাওয়াল দুসরা জিন্নামে যানে হুকম নেহি আছে?

    লালুর মা সাহসী। বলে—ছাইড়া দাও, সিপাইজী।

    সেপাই বলে—তব্‌ আয় হামার ছঙ্গে।

    প্ল্যাটফরম থেকে দূরে গিয়ে সেপাই প্যান্টের বিরাট পকেট খুলে ধরে। বলে—দে হামার পাকিট ভরদে। রেশন মে চাওয়াল মিলতে আছে না, খালি খুদ।

    লালুর মা তিনটা ঝুলির থেকে মুঠ ভরে আধ সের খানেক চাল সেপাইর দুই পকেটে ঢেলে দেয়। সেপাই এবার ছেড়ে দেয়।

    জয়গুন পরিশ্রান্ত, ট্রেনের দুলানিতে ঝিমুনি আসে। কাঠের সাথে মাথা ঠেকিয়ে সে ঘুমিয়েই পড়ে। গাড়ী গেন্ডারিয়া স্টেশন ছাড়লে গেদির মার ধাক্কায় তার ঘুম ভাঙে।

    তাড়াতাড়ি তারা ঝুলিগুলোর মুখ দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধে। ট্রেনের হুইসল বাজে। ফতুল্লা স্টেশন এসে যাবে এক্ষুণি। তারা ঝুলি হাতে জানালা দিয়ে মুখ বাড়ায়! হাসু কোষাটা পানি থেকে তুলে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। নির্ধারিত স্থানে কুল গাছটার কাছে গাড়ী আসতেই তারা সবক’টি ঝুলি জানালা দিয়ে দুপদাপ বাইরে ফেলে দেয়।

    ফতুল্লা স্টেশনে নেমে তারা কুলগাছতলায় আসে। হাসু ঝুলিগুলো কুড়িয়ে জড়ো করেছে। এক জায়াগায়। মা-কে দেখে বলে—আইজ গাড়ী বড় দেরী করল, মা? বেইল ঘরে যায় যায়, এমুন সময় আমি আইছি।

    -কই আর এমুন দেরী?

    জয়গুন ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে সময়ের টের পায়নি। আটটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ।

    –কি দর আনলা মা চাউল?

    —আড়াই সের ভাও। কিন্তুক দর যেন চড়া চড়া ঠেলরে। তুই কত পালি, বাজান?

    —বার আনা। আমি কিন্তু দুই পয়সার চিনাবাদাম খাইছি, মা। এই কয়ড়া আলছি মায়মুনের লাইগা।

    জগনের মন প্রসন্ন হয় ছেলের ওপর। সে বলে—জলদি কইর‍্যা চল, যাই।

  • পাঁচ পরিচ্ছেদ

    পাঁচ পরিচ্ছেদ

    পাঁচ পরিচ্ছেদ

    বয়সের সাথে সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তন হয়। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে করিম বকশের মেজাজ ঠাণ্ডা না হলেও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে বৈকি। তা না হলে তার শড়কির হাতল ঘুণে ধরতে পায়? চার বছর বোধ হয় লাঠিটায়ও তেল মাজা হয়নি। তেলের দামও বেড়েছে, আর লাঠির দরকারটাও কমেছে অনেক। মাটির ওপর পুরানো লাঠিটা ঠুকতে ঠুকতে তার নিজের ও লাঠির বিগত শৌর্যের কথা মনে পড়ে। পেতলে মুঠি-বাধা এই লাঠিটা যৌবন-কাল থেকেই তার পথচলার সাথী। কারণ, মেজাজের জন্যে শত্রু কম ছিল না তার। তাই বুড়োর মত লাঠি হাতে সে চলত। এমন কি ঘুমোবার সময় পাশেই থাকত লাঠিটা। লাঠিটা হাতে নিলেই তার একদিনের কথা মনে পড়ে।

    দুপুর রাত্রে যাত্রাগান শুনে এসেছিল সে। মেহেরনের দরজা খুলে দিতে দেরী হয়েছিল। তাকে হাতের এই লাঠিটা দিয়েই সে মেরেছিল। গর্ভবতী মেহেরন সে আঘাত সহ্য করতে পারেনি। তারপর গলায় রশি বেঁধে গাবগাছে লটকিয়ে সে রেহাই পেয়েছিল। হাজারখানেক টাকা অবশ্য খরচ করতে হয়েছিল এ-ব্যাপারে।

    তার আরো মনে হয় আজকাল, লাঠিটা হয়তো হাশরের দিন তার বিরুদ্ধেই সাক্ষী দেবে খোদার কাছে।

    মেহেরন করিম বকশের প্রথম স্ত্রী।

    তারপর সে জয়গুনকে বিয়ে করে। তার ওপরও তার বাহুবলের কসরত চলে ছয় বছর। তার শরীরের কোনো অঙ্গ বোধ হয় তার প্রহারের কাছে রেহাই পায়নি।

    জয়গুনের শাশুড়ী সান্ত্বনা দিত—ওয়াতে কি অইছে বউ! মরদগুনে যেই পিডে মারব, হেই পিড বিস্তে যাইব। যেই আতে, যেই পায় মারব, বেবাক বিস্তে যাইব। তুই বুঝিন কাডুরিয়ার বউর কিচ্ছা হোনস নাই? তয় হোন : রসুল-করিম একদিন বিবি ফাতেমারে কইল-”অমুক জাগায় এক কাডুরিয়া থাকে। তার বউ আট বিস্তের বড় বিস্তে যাইব।” বিবি ফাতেমা জিগাইল—”ক্যান যাইব?” রসুল করিম কইল—”যাও, গিয়া দেইখ্যা আহ একদিন।” বিবি ফাতেমা কাডুরিয়ার বাড়ী গিয়া দ্যাহে কি, ওমা! ঘরের দুয়ারে হাজাইয়া থুইছে দাও, লাডি, ঠ্যাঙ্গা, দড়ি। বিবি ফাতেমা কাডুরিয়ার বউরে জিগাইল—”অত লাঠি ঠ্যাঙ্গা এমুন কইর‍্যা রাখছে কে?” সে জ’ব দিল—”আমি।” জিগাইল, “ক্যাঁ?” সে জব দিল—”যদি সোয়ামীর খেডমতে তিরুডি অয়, তয় এই লাঠি দিয়া আমারে পিডাইব। কামের সময় কোতায় লাডি বিচরাইব? এই এর লাইগ্যা আতের কাছে আইন্যা রাখছি। জিগাইল, “দাও রাখছ ক্যাঁ?” জব দিল—”যদি মনে লয় কাটব।”

    —দ্যাখ, কেমুন জননা আছিল। জয়গুনের শাশড়ী মাথা নাড়ত।

    জয়গুন এ কেচ্ছা বহু আগেই শুনেছে। মুসলমান ঘরের বউ এ কেচ্ছা শোনেনি, তা অস্বাভাবিক।

    জয়গুন হয়তো সহ্য করত। কিন্তু করিম বক্‌শ তাকে সে সুযোগ দেয়নি।

    বছর দুই আগে করিম বক্‌শ আবার বিয়ে করেছে। তবে আঞ্জুমনের কপাল ভালো। আগের সে মেজাজ আর নেই। বিশেষ করে পয়লা ঘরের ছেলে রহিম বক্‌শ বাপের অত্যাচারে শ্বশুর বাড়ী উঠে যাওয়ার পর, তার মেজাজ অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে।

    কিন্তু বাহুবল যত কমেছে, বাক্যবল তত নয়। ঝগড়া আর প্যানপ্যানিটাই আজকাল আছে। প্রতিপক্ষ ঝগড়ায় পিছপাও নয় বলে, খেতে বসতে ঝগড়া হয়। দিন বড় বাদ যায় না। যে দিন বাদ যায়, সেদিন পাড়ার সবাই সচকিত হয়। একজন আরেক জনকে জিজ্ঞেস করে—করিম বক্‌শ বুঝি বাড়ীতে নাই আইজ?

    সেদিন আঞ্জুমন এক বেদেনীর কাছ থেকে মেয়ের অসুখের জন্য কিসের তাবিজ রাখছিল! করিম বক্‌শ হাট থেকে এসে দেখেই আগুন। জিজ্ঞেস করে—কিয়ের তাবিজ, আঁ? আমারে টোনা করবি নি?

    তার এই এক অকারণ সন্দেহ।

    আঞ্জুমন রেগে যায়, বলে–হ, টোনা করমু। ভেড়া বানাইয়া রাখমু তোমারে।

    —হারামী! বৈতাল মাগি! বলে সে উঁচু করে পুরানো লাঠিটা।

    —আত উডাইও না কইতে আছি। খইয়া পড়ব আত। কুড়-কুষ্ঠ অইব।

    করিম বক্‌শ লাঠিটা নামায়। তারপর বলে—জয়গুন তো তোর মতন আছিল না। মাইর্যা চাবড়া কইরা ফেলাইলেও উই করত না। আর তোর গায়ে ফুলের টোহা না দিতেই–

    জয়গুনকে ছেড়ে দেয়ার পর কাসুকে নিয়ে করিম বক্‌শ বিব্রত হয়েছিল। একদিন করিম বকশের এক নিঃসন্তান বোন এসে কাসুকে নিয়ে যাওয়ায় সে নিশ্চিন্ত হয়।

    কাসু ফুপুর বাড়ীতে এক রকম ভালোই ছিল।

    কিছুদিন আগে ফুপু মারা যাওয়ার পর করিম বক্‌শ তাকে নিজের বাড়ী নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ বাড়ীর ঝগড়াটে আবহাওয়ায় এসে কয়েক দিনেই সে মনমরা হয়ে গেছে। এখানে আদর করে কেউ কোলে নেয় না তাকে। ডাকেও না কেউ। এখানে কারো মুখেই হাসি নেই। তাই ওর নিজের হাসিও কোথায় মিলিয়ে গেছে। কারো মুখের দিকে চেয়েই সে ভরসা পায় না। শুধু একজনকেই তার পছন্দ হয়েছে। সে হাসু। তার এখানে আসবার পর সে তিনদিন এসেছে। কিছুদিন ধরে তারও দেখা নেই।

    হাসুর দেওয়া কদমা করিম বক্‌শ পানিতে ফেলে দিয়েছিল। চরকিটা ভেঙে দিয়েছিল পায়ের তলায় ফেলে। কাসুকেও থাপ্পড় মেরেছিল পিঠের ওপর। ঐ দিন থেকেই কাসু আরো মুষড়ে পড়ে। করিম বক্‌শ সেদিন তাকে একটা মাটির ঘোড়া কিনে দিয়েছিল! কাসু তা ছোঁয়নি।

    হাসু আর আসবে না, তার ছোট মনেই সে অনুমান করেছিল সেদিন। হাসুর আসার পথের দিকে চেয়ে তার দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

    করিম বক্‌শ ঐ দিন থেকেই হুঁশিয়ার হয়েছে। হাসুকে তার সন্দেহ হয়। ছোঁড়াটা ভারী ফেরেববাজ। ফুসলি দিয়ে কাসুকে নিয়ে যেতে পারে এই তার ভয়। তাই সে যেখানে যায়, প্রায় সাথে সাথেই রাখে কাসুকে। বড় ছেলেটা শ্বশুর বাড়ী পালিয়েছে। কাসুই এখন একমাত্র ভরসা।

    খেত-পাথারে জোয়ারের পানি আসার সাথে সাথে করিম বক্‌শের মনে আসে এক জোয়ার। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সে কোঁচ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মাঠে মাঠে! তার ঐ এক ঝোঁক। তার যৌবনের হিংস্র স্বভাবের অবশিষ্ট এই মাছ শিকার। কয়েকদিনের চেষ্টাও অনেক সময় বিফলে যায়। তবু তার ধৈর্যের অভাব নেই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে সে ধান খেতের ভেতর মাছের সন্ধান করে বেড়ায়।

    এ বছর তার সুবিধা হয়েছে আরো। আউশ ধান পেয়েছে মণ সাতেক। এ ধানে প্রায় আমন ধর ধর হবে। কারণ ছেলে ও ছেলেবৌ চলে যাওয়ায় খাবার লোক কমেছে। গাই দুই সের দুধ দেয়। আট আনা করে রোজ একটাকা পাওয়া যায়। সুতরাং তার আর ভাবনা নেই। সারাদিনে সে শুধু বাজারে গিয়ে দুধ বেচে! কাজ আরো আছে বটে। কিন্তু মাছ ধরার নেশায় সে সব কাজের খেয়ালই হয় না। ছেলে থাকতে সব কাজ সে-ই করত।

    তিনদিন অবিরাম বৃষ্টিপাতের পর আজ দুপুরের দিকে রোদ উঠেছে। ভাত খাওয়ার পর করিম বক্‌শ ডাকে—ফুলির মা, এক ছিলিম তামাক দাও দেহি জলদি। বাতাসের রাগ নাই আইজ। মাছ দ্যাখতে সুবিধা অইব।

    আঞ্জুমন কয়ে আগুন দিয়ে ফু দিতে দিতে আসে। করিম বকশের হাতের কোটায় কঙ্কেটা বসিয়ে দিয়ে বলে—আর তো কাম নাই তোমার। পাডের জাগডা দ্যাখছ?

    —হুঁ, দেখমু হনে আইজ। নিরাগ বাতাসে আইজ চকে যা মাছ দ্যাহা যাইব! —

    বাটনা বাইট্টা রাহুম হে-অইলে, কি কও?

    করিম বক্‌শ খোঁচাটা নীরবে সহ্য করে। মাছ সে চার-পাঁচ দিনেও একটা পায় না। তাই এ টিটকারী।

    কোঁচ-যুতি হাতে সে নৌকায় ওঠে। পাশের বাড়ীর হারুনকে ডেকে নেয় নৌকা বাইতে। কাসুকেও রেখে যায় না বাড়ীতে।

    এদিকের পানি কালো, তাই স্বচ্ছ। মাছ মারতে অসুবিধা। শিকারী মাছ দেখবার আগেই, মাছ শিকারীকে দেখতে পেয়ে পালায়।

    দাড়া-পথ বেয়ে তারা খালের ধারের একটা ধান খেতে ওঠে। নদীর পানি খাল দিয়ে। এসে এখানকার পানি ঘোলা করে রাখে।

    করিম বক্‌শ নিশ্চুপ ওঁত পেতে থাকে। চারিদিকে চোখ বুলায় একটা ধান গাছ নড়ে কিনা। কখনও কোঁচ নিয়ে, কখনও যুতি হাতে নিয়ে সে তাক করে।

    মাছের কোন লক্ষণ না পেয়ে হাতের ইশারায় সে আর এক খেতের দিকে নৌকা চলাবার নির্দেশ দেয়।

    এক জায়গায় কয়েকটা ধান গাছ নড়ে ওঠে। আর যায় কোথা! ঝররর ঝপ! কোঁচ দিয়ে কোপ দেয় করিম বক্‌শ।

    আরো অনেক লোক জমা হয়েছিল মাছ মারতে। একজন বলে আইজ আর মিয়াবাই খালি আতে যাইব না, বোঝতে পারছি।

    করিম বক্‌শ কোঁচটা তুলে নিরাশ হয়। বলে—দুশশালা! আইজ যাত্রাডাই খারাপ। আর কেওর কোঁচের নিচে পড়তে পারলি না? আমারডার নিচেই–

    —কি মিয়া, কাছিম নাহি? একজন জিজ্ঞেস করে।

    —আর কইও না মিয়া। আইজ যাত্রাড়াই খারাপ।

    —যাত্রা খারাপ! ক্যাঁ? বউর মোখ দেইক্যা যাত্রা কর নাই মিয়া?

    হারুন ও কাসু দু’জনেই উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল। হারুন নিজের মাথা থেকে মাথলাটা। কাসুকে দিয়ে বলে—ঘাম দিছেরে, ইস! মাথলাডা মাথায় দে, রউদ লাগব না।

    আরো কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে যখন আর মাছের সাড়া পাওয়া যায় না, তখন করিম বক্‌শ বলে—কি জানি এইরম আইতাছে ক্যান। তোরা কাপড় উড়া কইর‍্যা পিন্দা নে, দেহি কি অয়।

    করিম বক্‌শ নিজেও গামছা পরে লুঙ্গি ছাড়ে। লুঙ্গির দিক পালটিয়ে নিয়ে আবার পরে।

    এবার করিম বক্‌শ এক চাক গজার মাছের পোনার পেছনে লাগে। কিন্তু গজারটা খুবই চালাক। পোনার কাছাকাছিও ঘেঁষে না। মাছটা বড়ই হবে খুব, করিম বক্‌শ অনুমান করতে। পারে। পোনাগুলিও বড় হয়েছে। অনেকক্ষণ পরে পরে এক সঙ্গে ভেসে ওঠে। এক জায়গায় থাকলেও কথা ছিল। এই এখানে দেখা যায়, তারপর আর নেই। কোথায় গেল? কোথায় গেল? করিম বক্‌শ এদিক-ওদিক তাকায়। কিছুক্ষণ পরে ভুস করে ভেসে ওঠে। করিম বক্‌শ মুখে কিছু না বলে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। হারুন আস্তে আস্তে অনুসরণ করে।

    পোনাগুলি খেতের পর খেত পার হয়ে চলেছে। ঘোলাপানি ছেড়ে আসে কালো পানিতে। করিম বক্‌শ তবুও হাল ছাড়ে না।

    এবার একটা জলা খেত পার হয়ে পোনাগুলি ধানখেতে ঢোকে। করিম বক্‌শ কেঁচটা রেখে যুতি হাতে নিয়ে আবার মনোযোগ দেয়। পেছনে হাত দেখিয়ে নৌকার গতি মন্থর করার নির্দেশ দেয়। নিজেও সে নুয়ে এক হাতে ধানগাছের গোছা ধরে নৌকার গতিরোধ করে।

    কাসু!

    হাসুর ডাক। করিম বক্‌শ চমকে ওঠে। চেয়ে দেখে সে জয়গুনের বাড়ীর কাছাকাছি এসে পড়েছে।

    জয়গুন, মায়মুন ও হাসু দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে, এদিকে জয়গুন এখন গাছের আড়ালে চলে গেছে।

    কাসু ডাক শুনে দাঁড়িয়েছিল। করিম বক্‌শ বলে—ব’ হারামজাদা। বইয়া পড়! পইড়া যাবি।

    তারপর হারুনের কাছ থেকে লগি নিয়ে জোর ঠেলায় সে নৌকা ছুটায় বাড়ীর দিকে।

    জয়গুন চেয়ে থাকে যতক্ষণ নৌকাটা দেখা যায়। কাসুকে তিন বছরের রেখে সে এসেছিল। এখন সে বড় হয়েছে। কথা বলতে শিখেছে। কিন্তু দূর থেকে মুখখানা আদৌ দেখা গেল না। এখন বড় হয়ে সে মুখখানা কেমন হয়েছে, অনেক চেষ্টা করেও মনে মনে তা গড়তে পারে না জয়গুন।

  • ছয় পরিচ্ছেদ

    ছয় পরিচ্ছেদ

    ছয় পরিচ্ছেদ

    ১৫ই আগষ্ট শুক্রবার, ১৯৪৭ সাল।

    হাসু মা-কে মোড়ল পাড়ায় নামিয়ে দিয়ে রেল-রাস্তার পাশে আসে। রোজ সেখানে কোষা ডুবিয়ে রেখে সে কাজে যায়।

    রাস্তায় উঠেই সে চমকে ওঠে। চারদিক থেকে চিৎকারের ধ্বনি শোনা যায়। হিন্দু-মুসলমানে কাটাকাটি শুরু হল না ত!

    রেল-রাস্তা ধরে সে ভয়ে ভয়ে পা ফেলে। মারামারি বাধলে কোন কাজই হবে না আজ। গত বছর এমন দিনে মারামারি বেধেছিল। পনেরো দিন সে ঘরের বার হতে পারেনি। তিনদিন না খেয়ে কাটাতে হয়েছে।

    একটা গাড়ী আসছে নারায়ণগঞ্জ থেকে। ইঞ্জিনের সামনে একটা নিশান পতপত করছে। বাতাসে। সবুজ রঙের বড় নিশান। মাঝে চাঁদ ও তারা।

    গাড়ীর মাঝেও চিৎকার। চারদিকের চিৎকারে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে উঠেছে। গাড়ীটা কাছাকাছি আসতে স্পষ্ট বোঝা যায়—

    আজাদ পাকিস্তান—জিন্দাবাদ!

    কায়েদে আজম—জিন্দাবাদ!

    হাসুর গা রোমাঞ্চিত হয় আনন্দে। সে চেয়ে থাকে। গাড়ীর প্রত্যেকটি লোক আনন্দ-চঞ্চল। অনেকের হাতেই নিশান। বাইরে মুখ বাড়িয়ে নিশান নেড়ে তারা চিক্কার করছে। প্রত্যেক কামরায় ঐ একই আওয়াজ।

    হাসু হাত উঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে আওয়াজ তোলে ঐ সাথে।

    মানুষের বিরাট মিছিল চলছে শহরের রাস্তা দিয়ে। হিন্দু-মুসলমান ছেলে বুড়ো—সবাই আছে মিছিলে।

    হাসু দাঁড়িয়ে দেখছিল। মিছিল সে বহু দেখেছে। কিন্তু এরকম আর দেখেনি। একজন কাগজের একটা নিশান ওর হাতে দিয়ে দাড় করিয়ে দেয় লাইনে। হাসু মিছিলের সাথে মিশে যায়। কাজের কথা তার মনেই হয় না।

    মিছিল শহরের সমস্ত রাস্তা ঘোরে। চিৎকার করে জানায় স্বাধীনতার বার্তা।

    মিছিল ভাঙে দেড়টায়। হাসু তাড়াতাড়ি স্টেশনে আসে। মেল স্টীমার এখনও আসেনি। হাসুর ভাগ্য ভালো। আর দিন আসে একটার মধ্যেই।

    তিনটার সময় মেল আসে। জাহাজের সামনে ঠিক ছাদের ওপর উড়ছে সবুজ নিশান। জাহাজের ডেকে লোক ঠাসাঠাসি হয়ে আছে। ছাদেও উঠেছে অনেক লোক, সেখান থেকে আওয়াজ ওঠে–

    পাকিস্তান জিন্দাবাদ!

    কায়েদে আজম—জিন্দাবাদ!

    পাড়ের থেকে একদল তাদের ধ্বনির প্রতিধ্বনি করে। জাহাজখানা যেন কেঁপে ওঠে। সমস্ত মিলে একটা নতুন অনুভূতির সঞ্চার হয় হাসুর মনে।

    দুটো মোট বয়ে আজ দশ আনা পায় হাসু। অন্য দিন দর কষাকষি হয়। তিন আনা বড় জোর চার আনার বেশী মোট পিছু দিতে চায় না। কিন্তু আজ আর পয়সার দিকে যেন খেয়াল নেই কারো।

    আজ আর কাজ করবে না হাসু।

    পথে আসতে আসতে সে দেখে, শহরের প্রত্যেক বাড়ীতে নিশান উড়ছে বড় বড়। সে তার হাতের কাগজের নিশানটার দিকে চায়, আবার চায় দুই পাশে। ডানে হিন্দু পাড়া, বাঁয়ে মুসলমান পাড়া। সব বাড়ীতেই আজ সবুজ নিশান।

    হাসু বাড়ী আসে। চিৎকার করে সে গলা ভেঙেছে আজ। ভাঙা গলায় সে সমস্ত দিনের কথা বলে যায় মা-র কাছে। জয়গুন হাসুর হাত থেকে নিশানটা নিয়ে দেখে আর শুনে যায়। হাসুর কথা এক মনে।

    হাসু বলে—আর আমাগ কষ্ট অইব না, কেমুন গো, মা? মাইনষে কওয়াকওয়ি করতে আছে ঘাডে পথে। দ্যাশ স্বাদীন অইল। এইবার চাউল হস্তা আইব। মানুষের আর দুখ থাকব না।

    —হুঁ। জয়গুন সায় দেয়। সে-ও সেদিন গাড়ীতে শুনেছে, দেশ স্বাধীন হবে। ভাত-কাপড় সস্তা হবে। কেউ না খেয়ে মরবে না।

    জয়গুনের সুখের স্বপ্ন আজ সফল হলো। সত্যি সত্যি স্বাধীনতা এল আজ।

    হাসু বলে—টাউনে আইজ বেবাক বাড়ীতে নিশান ওড়তে আছে, মা। কি সোন্দর বড় বড় নিশান! তুমি একটা বানাইয়া দ্যাও, মা।

    জয়গুন হাতের নিশানটা দেখিয়ে বলে—এই যে আছে একটা। আর দিয়া কি অইব?

    —এইড়া যে এক্কেরেই ছোড়। গাছের ডাইলে বাইন্দা উপরে তুলতাম, মা। গেরামের বেবাক মাইনষে দ্যাখতে পাইব। টাউনে কত বড় বড় নিশান ওড়তে আছে আইজ!

    জয়গুন ঘরে যায়। একটা গাঁটরি নামায় মাচার ওপর থেকে। লাল কাপড়ের একটা টুকরো বের করে হাসুকে দেখায়।

    উহুঁ, রাঙ্গায় অইব না, মা। এই রহম কচুয়া অওয়ন চাই। হাতের নিশানটা দেখিয়ে প্রতিবাদ করে হাসু।

    —ক্যাঁ? রাঙ্গায় দোষ কি? কী সোন্দর খুনী রঙ! মীরপুরের শাহ সাবের দরগায় দেইক্যা আইলাম লাল নিশান।

    —টাউনের এক বাড়ীতেও রাঙ্গা নিশান দ্যাখলাম না। বেবাক এই রহম কচুয়া।

    আসমানী রঙ্গে অইব?

    —উহুঁ, কইলাম যে এই রঙ। তোর লাইগ্যা এই রঙ বানাইলে পারি অহনে। জয়গুন রাগ করে। সে আর একটা গাঁটরির জন্যে উঠতেই হাসু খুশী হয়।

    গাঁটরি খোলে জয়গুন। পুরাতন কাপড়ের গাঁটরি। কালিঝুলি মেখে বিশ্রী হয়ে গেছে টরিটা। খুলতে খুলতে তার হাত অবশ হয়ে আসে। বুকের ভেতর স্পন্দন বেড়ে যায় অসম্ভব রকম। জীর্ণ পুরাতন কাপড় ভাজ করে করে সাজান। জয়গুনের বিগত জীবনের অনেক কাহিনী কাপড়গুলোর মধ্যে পুঞ্জীভূত। ভাঁজ খুলতে খুলতে তার স্মৃতির ভাঁজও খুলে যায়। এই টুপিটা তার প্রথম স্বামীর—হাসুর বাপের। ঢোলা পাঞ্জাবীটাও তার। জয়গুনের চোখে ভাসে, কিশতি টুপি মাথায় পাঞ্জাবী গায়ে জবর মুনশীর চেহারাখানা।…এই বোম্বাই শাড়ীটা তার প্রথম বিয়ের। ঘোমটা-টানা বধু জীবনের সুমধুর স্মৃতি এখন শুধু ব্যথাই দেয়।…এই ছোট্ট জামাটা কাসুর। এই জামা আর কানটুপিটা ছোট খুকীর।

    জয়গুনের চোখ আর বাধ মানে না। চোখের পানিতে গঁাটরির কাপড়গুলো ভিজে ওঠে।

    ছোট খুকী!

    তখন দুর্ভিক্ষ সবে দেখা দিয়েছে। দুর্নামের ভয়ে স্বামী পরিত্যক্তা জয়গুন তখনও ঘরের বার হয়নি। খেতে না পাওয়ায় তার বুকে দুধ ছিল না। দুধের শিশু দুধ না পেয়ে শুকনো পাটখড়ির মত হয়েছিল। শেষে ধুকতে ধুকতে একদিন মারা গেল। তাকে কবর দিতে কাফনের কাপড় জোটেনি। এই বোম্বাই শাড়ীটার অর্ধেক দিয়ে কাফন পরিয়ে যখন কবরে নামান হয় তখন জয়গুন বিলাপ করতে করতে বলেছিল—”আইজ তোরে বউ সাজাইয়া দিলাম।”

    জয়গুন আর ভাবতে পারে না। একমাত্র সবুজ বোম্বাই শাড়ীটার অবশিষ্ট পাটটা হাসুর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সে কাপড়গুলোর মধ্যে মুখ লুকায়।

    হাসু ও মায়মুন অবাক হয়ে চেয়েছিল মা-র দিকে। তারা কিছু বুঝতে না পেরে শাড়ীর পাটটা নিয়ে বেরিয়ে যায়।

    মায়মুন সুঁই নিয়ে আসে। সাদা কাপড়ের চাঁদ ও তারা কেটে নিশানের মাঝে জুড়ে দেয়।

    বেশ সুন্দর নিশান হয়েছে। ঠিক সায়েব বাড়ীর নিশানটার মত। মায়মুন উৎফুল্ল হয়। হাসুর চোখে-মুখে হাসি ফোটে।

    জয়গুন যখন বাইরে আসে, তখন হাসু আম গাছে উঠে নিশানটা বেঁধে দিয়েছে। মায়মুন ও শফি চেয়ে আছে ওপর দিকে। গাছের থেকে হাসু ডাকে—মায়মুন! শফি! আমি যা কই আমার লগে লগে আওয়াজ করবি, কেমন?

    শফি বলে—কি কইমু?

    —পাকিস্তান—জিন্দাবাদ!

    হাসুর সাথে গলা মিলিয়ে শফি ও মায়মুন আওয়াজ তোলে। জয়গানের মনে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে কথাগুলো।

    জয়গুন নিশানটার দিকে তাকায়। সবুজ নিশান নতুন জীবনের আভাস দিয়ে যায়। মনে জাগে বাঁচবার আশা।

  • সাত পরিচ্ছেদ

    সাত পরিচ্ছেদ

    সাত পরিচ্ছেদ

    চারদিকে আনন্দকোলাহল। মায়মুন ডাকে—মা, চান ওঠছে বুঝিন, ঈদের চান।

    মায়মন দৌড়ে যায় বাড়ীর পশ্চিম দিকে। শফি এসে দাঁড়ায় এর পাশে। পশ্চিম দিগন্তের রঙিন মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ওরা তন্ন তন্ন করে খোঁজে চাদ। জয়ন এসে যোগ দেয়।

    মায়মুন বলে—কই মা?

    —অই সাঁকুয়া তারাডার কাছ দিয়া দ্যাখ। ওডার নিচে দিয়াই দ্যাহা যায় হগল বচ্ছর।

    —অই, ঐ যে দ্যাহা গেছে, ঐ ঐ ঐ! শহি লাফিয়ে ওঠে আনন্দে, মায়মনকে টেনে আঙুল দিয়ে দেখায়—ঐ যে তারাডার একটু নিচে। কালা মেঘড়ার পাশে।

    মায়মুন দেখতে পেয়ে আনন্দে হাত তালি দেয়। জয়গুন এখনও দেখতে পায়নি। সে বলে—আমাগ কি হেই দিন আছে! তোগ নতুন চউখ। তোর দ্যাখতে পাবি।

    —তুমি অহনও দ্যাহ নাই মা! মায়মুন এবার মাকে দেখাতে চেষ্টা করে। জয়গুন দেখতে পায় অনেক পরে। ভক্তিতে সে মাথা নোয়ায়, দু’হাত তুলে মোনাজাত পড়ে।

    —এক্কেরে কাচির মতন চিকন এইবারের চান। সিদা অইয়া ওঠছে। আর হগল বচ্ছরের মতন কাইত অইয়া ওড়ে নাই। মোনাজাত সেরে বলে জয়গুন।

    চাঁদটা মেঘের আড়ালে চলে গেলে জয়গুন আবার বলে—চুল, ইফতার খুলি গিয়া।

    শফির মার ঘরের কাছে যেতে সে ডাকে—চান দেখলিনি, হাসুর মা?

    —হ বইন। দ্যাখলাম। বড় ছোড এইবারের চান।

    তোরাই দ্যাখ বইন, তোগ চইখ দিছে খোদায়। আমার একটা চউখ, হেইডাও বুঝিন বুইজ্যা গেল।

    শফির মা নিশ্বাস ছাড়ে। এমনিতেই সে লবেজান। তার ওপর রোজা রেখে সে বিকালের দিকে খুবই কাহিল হয়ে যায়। সে আবার বলে—চাইর-পাঁচদিন পরে ছাড়া আমি দ্যাকতে পারমু না। চান্ডা সিয়ানা অউক। আ-গো হাসুর মা,—এইবার কোন মুহি কাইত অইয়া ওঠছে গো চান? দহিণমুহি?

    —এইবারে সোজাসুজিই ওঠছে বইন। ব্যাকা-ত্যাড়া ওড়ে নাই। লক্ষণ ভালা, না?

    -হ বইন, আর আহাল অইব না এইবার দেহিস। যা কইলাম যদি না ফলে তহন। কইস, কানা বুড়ী কি কইছিল।

    শফির মা’র কুঁচকে যাওয়া শুকনো কালো মুখখানা খুশীতে ভরে ওঠে। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে সে মুখখানা দেখে জয়গুনেরও ভরসা হয়। ভবিষ্যদ্বাণীর মতই বিশ্বাস করে শফির মা’র কথাগুলো।

    শফির মা বলে—হেই আকালের বচ্ছর পঞ্চাশ সনে দক্ষিণ মুহি কাইত অইয়া ঈদের চান উঠছিল। আমি নিজে দেকছি। চউখ তুহা তাজা আছিল। আমি দেইক্যা কইছিলাম তহন—এইবার না জানি কি আছে কপালে।

    —দক্ষিণ মুহি কাইত অইয়া ওঠলে অকাল অইবই। বুড়া-বুড়ীর কাছে হুনছি, দক্ষিণ মুহি কাইত অইয়া চান যদি সমুদ্রের ওপরে নজর দেয়, তয় বান ডাইক্যা দ্যাশ—দুইন্নাই তলাইয়া যায়। দেখলি না অই বাচ্ছর কেমুন–

    —কত বচ্ছর পর এইবার সিদা ওঠছে চান। খোদা বাঁচানেওয়ালা।

    এফতারের সময় উৎরে গেছে। জয়গুন ঘরের দিকে পা দেয়। মায়মুন বলে—উত্তর মহি কাইত অইয়া ওঠলে কি অয় মা?

    —মড়ক লাগে। কলেরা-বসন্ত অয়। মানুষ মইর‍্যা সাফ অইয়া যায়।

    মায়মুন শিউরে ওঠে।

    ওজু করে জয়গুন ঘরে যায়। শেষ রোজার ইফতারের জন্য আজ একটু আলাদা আয়োজন—চার ফালি শশা ও এক খোরা গুড়ের শরবত। আর সব দিন এক মগ সাদা পানি সামনে কারে সে বসে থাকত বেলা ডুবে যাওয়া পর্যন্ত! এমন করে খাবার সামনে নিয়ে ইফতারের জন্য বসে থাকা অনেক পুণ্যের কাজ, সে জানে। মসজিদের আজান ইফতারের সংকেত জানালে সে এক ঢোক পানি খেয়ে রোজা ভাঙত।

    জয়গুন একচুমুক শরবত খেয়ে মায়মুনের সামনে ঠেলে দেয় বাটিটা। মায়মুন বাটিটা নিয়ে চুমুক দিতেই জয়গুন বলে—মজা পাইয়া বেবাকহানি খাইয়া ফেলাইস না আবার। তোর মিয়াভাইর লাইগ্যা থুইয়া দিস।

    শশার এক ফালি মায়মুনের হাতে দিয়ে জয়গুন এক ফালি তুলে নেয়। বাকী দুই ফালি রেখে দেয় হাসুর জন্যে।

    শশা চিবোতে চিবোতে সে গত কয়েক বছরের কথা মনে করে। পঞ্চাশ সনের পর থেকে সে এ রকম পুরো তিরিশ রোজা রাখতে পারেনি। চার বছর পর এবার তিরিশ রোজা পুরিয়ে তার মনে শান্তির অবধি নেই। কিন্তু গত বছরগুলির চিন্তাও তাকে পেয়ে বসে। পঞ্চাশ সনে একটা রোজাও রাখা হয়নি। তার পরের বছর ছয়টা, তার পরে পাচটা এবং গত বছর সাতটা রোজা ভাঙা হয়েছে—সে মনে করে রেখেছে! জয়গুন হিসেব করে দেখে, এ কয় বছরে সে দু’ কুড়ি আটটা রোজা ভেঙেছে। নামাজ-রোজা সম্বন্ধে অনেক খুঁটিনাটি তার জানা। প্রথম স্বামী জরূর মুনশীর দৌলতেই তা সম্ভব হয়েছে। সে জানে, রমজানের একটা রোজা ভাঙলে তার বদলে তিনকুড়ি রোজা রাখতে হয় তবেই গোনা মাফ হয়।

    জয়গুন হিসেব করতে চেষ্টা করে। আগেও সে করেছে কয়েকবার। একটা রোজার জন্যে ষাটটা হ’লে দুকুড়ি আটটার জন্য কতদিন রোজা রাখতে হয়। সে হিসেব করতে গিয়ে মাথা গুলিয়ে ফেলে। একশো পর্যন্ত সে ভালোমত গুনতে পারে না। এককুড়ি’ ‘দুই কুড়ি ‘ করে সে হিসেব করে। সুতরাং সে ক্ষান্ত হয়। কিন্তু তবুও সে আন্দাজ করে নিয়েছে অনেক বছর, হয়ত বা বাকী জীবনভর রোজা রেখেও সে আটচল্লিশ দিনের রোজা শোধ করতে পারবে না। সে আরো জানে, একটা রোজার জন্যে আশী হোক দোজখের আগুনে পুড়তে হবে। এক একটা হোক ইহকালের আশী বছরের সমান।

    জয়গুনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে নামাজ সেরে তসবীহ নিয়ে বসে। তসবীহ জুপা এক সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। তার আবার মনে হয়, কেন? সে-ত জীবনভর রোজা রেখেই চলেছে। রোজা ছাড়া আর কি? বারো মাসের একদিনও সে পেট ভরে খেতে পায় না। ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত আধপেটা খেয়ে থাকে। পেট ভরে কবে সে শুধু দু’টো ভাত খেয়েছে তার মনে পড়ে না। পঞ্চাশ সনের কথা মনে হয়। একটা রোজাও রাখা হয়নি। রোজা রাখার কথা মনেও হয়নি। এক বাটি ফেনের জন্যে ছেলেমেয়ে নিয়ে কত জায়গায়, কত বাড়ীতে বাড়ীতে তাকে ঘুরতে হয়েছে। এক বাটি খিচুড়ির জন্যে শারখানায় লাইন ধরতে হয়েছে। কখনও ঘণ্টার পর ঘন্টা আধ-হাঁটু কাদার মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েছে। মাথার ওপর বৃষ্টি পড়েছে, রোদ জ্বলেছে। তার বেশী জ্বলেছে পেটের মধ্যে। যখন যেখানে যতটুকু পেয়েছে, খেয়েছে। পেট ভরেনি। পানি খেয়ে খেয়ে পেট ভরেছে। তার পরের বছরগুলিও চলেছে অতি কষ্টে। ছেলেমেয়েকে খাইয়ে কতদিন উপোস করতে হয়েছে। মাঝে মাঝে সারারাত সারাদিন কেটেছে একটা দানাও পড়েনি পেটে। রমজান মাসের রোজার চেয়েও যে ভয়কর এ রোজা। রমজানের একমাস দিনের বেলা শুধু উপোস। কিন্তু তার বারোমেসে রোজার যে অন্ত নেই।

    কিন্তু তবুও জয়গুনের শান্তি নেই, সাত্বনা সে পায় না। তার অন্যায়ের জন্য সে খোদার। কাছে প্রার্থনা করে।

    হাসু আসে রাত আটটায়। মোট বয়ে বারো আনা পেয়ে সে চার আনা দিয়ে একটা নারকেল নিয়ে আসে। জয়গুন দেখে রাগ করে—তোর আর আৰুল অইব কোনদিন! অত পয়সার নাইকল কিনতে গেলি ক্যান?

    —ঈদের দিন এট্টু শিন্নিও খাই না?

    —নাইকল বেগর আর শিন্নি অয় না! নোয়াবের পো নোয়াব! নাইকল বেগরই – পাকাইমু আমি। অইড়া বেইচ্যা ফালাবি কাইল।

    হাসু ক্ষুণ্ণ হয়। বলে—থাউক আর শিন্নি রানতে অইব না, পান্তা ভাত আর মরিচ-পোড়া – খাওয়া কপাল। বচ্ছরের একটা দিন আর শিন্নি খাইয়া কি অইব!

    জয়গুন চুপ করে। খানিক পরে আবার বলে—পরাণে খাইতে চায়, খাও। পয়সা কামাই করবা, খাইবা, আমার কি? দুই দিন বাদে যহন হকাইয়া তেজপাতা হইয়া যাইবা, তহন বোঝবা শিন্নির মজা!

    খাওয়ার পর জয়গুন বাশের চোঙাটা নামায়। পয়সা রাখবার একমাত্র আঁধার এ চোঙাটা। মাটির ওপর ঢালে সমস্ত পয়সা। আনি, দুয়ানি, সিকি আলাদা আলাদা সাজিয়ে হিসেব করে। হাসুর আজকের আট আনাসহ মোট তিন টাকা দশ আনা। চাল কিনতে হবে। তেল, মরিচ, আরো অনেক কিছুই নেই। অনেক কিছুর মধ্যে লবণটা না কিনলেই চলে না। লবণ একটু বেশীই লাগে তার সংসারে। পান্তা ভাত খেতেই বেশী খরচ হয় লবণ।

    হাসু বলে—একটা টুপি কিনার পয়সা দিবা, মা? কাইল ঈদের ময়দানে কি মাথায় দিয়া যাইমু?

    —তোর টুপি কিনন লাগত না। টুপি একটা দিমু তোরে, তয় কাসুর লাইগ্যা একটা

    হাসু সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলে—ওর একটা টুপি কিনতে আর কত লাগব? এই বড় জোর পাঁচ আনা, ছয় আনা।

    মায়মুন একটু এগিয়ে মার দিকে চেয়ে ডাকে—মা।

    —কি? থাইম্যা গেলি ক্যান? ক’।

    পরিহিত কাপড়ের একটা ছেঁড়া জায়গা দেখিয়ে মায়মুন বলে—দ্যাহ মা, কেমুন ছিঁড়্যা গ্যাছে। ঈদের দিনে বেড়াইতে যাইমু না?

    মেয়ের আবদার বুঝে রাগ হয় জয়গুনের। সে বলে—কি? কাপোড়?

    —হ!

    —হ! কাপোড়! কাপোড় দিয়া কবর দিমু তোরে শয়তান। ধাক্কা দিয়ে মায়মুনকে সরিয়ে ভেঙচিয়ে ওঠে জয়গুন।

    হাসু মায়মুনের দিকে তাকায়। ব্যথায় তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

    মায়মুন তাড়া খেয়ে শুয়ে পড়েছে। জয়গুন ডাকে—হাসুর গামছাটা পিন্দা কাপোড় খুইল্যা দে মায়মুন, সিলাইয়া দেই। কাইল রাইত গোয়াইলে সোডা দিয়া ধুইয়া দিমুহনে।

    জয়গুন সুঁই-সুতা নিয়ে বসে। নিজের ও মায়মুনের কাপড়ে জোড়াতালি লাগায়। হাসু ও মায়মুন ঘুমিয়ে পড়েছে। মশার যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে। জয়গুন ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে মশা তাড়ায়।

    সেলাই সারতে অনেক রাত হয়। রাত্রির নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ডাহুক ‘কোয়াক—কোয়াক’ করে ওঠে। চারদিকে পশুপাখীর ঘুম-কাতর সারা পাওয়া যায়। ঘরের হাঁস দু’টোও প্যাঁক প্যাঁক করে আবার ঠোঁট লুকায় পালকের মধ্যে। জয়গুন ভাবে—পইখ-পাখলার এক ঘুম হয়ে গেল।

    জয়গুন কুপিটা নিবিয়ে মায়মুনের পাশ দিয়ে শুয়ে তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। অভ্যাসবশ মায়মুনও মা-র গলার ওপর একখানা হাত লতিয়ে দেয় ঘুমের ঘোষ। জয়গুনের বুক স্নেহে ভিজে ওঠে। সে ভাবে এ মেয়েটি কোন দিন তার কাছে আদর পায় না। আবদার করলে কিলথাপ্পড় খায়। কাপড় তার একখানা। তাও তালি দিয়ে দিয়ে এতদিন চলেছে। কিন্তু কাল ঈদ—বছরের সেরা দিন। এ কাপড়ে লজ্জা নিবারণ করা চলে, কিন্তু কুটুম্ব-বাড়ী যাওয়া চলে না। আর কুটুম্ব আছেই বা কে?

    হাসুর চাচা আছে দু’জন। কিন্তু তারা হাসুর মৃত্যুই কামনা করে। জব্বর মুনশীর মৃত্যুর পর তার ভাগের তিন বিঘা জমি আর ঘরখানা পর্যন্ত হাসুর চাচা দু’জন জোর করে ভোগ-দখল করছে। এগুলোর আশা জয়গুন ছেড়েই দিয়েছে। হাসু বড় হয়ে যদি কোনদিন আদায় করতে পারে।

    জয়গুন আবার ভাবে—হাসু ও মায়মুনের কপালে কুটুম্ব-বাড়ীর এক মুঠো ভাত লেখা নেই।

    জয়গুন মায়মুনের চুলের মাঝে হাত দেয়। আঙুলের সাথে জড়িয়ে আসে এক গোছা চুল।

    মায়মুন কোন কিছুর আবদার করলে বা কোন অন্যায় করলে সে চুল ধরে টান মারত। টানতে টানতে সে-ই আলগা করে দিয়েছে চুলগুলো। চুলগুলোর জন্যে তার মায়া হয়। চুলের মুঠি ধরে টানাটানি না করলে তার চুল এতদিন হয়ত কোমর অবধি লম্বা হত।

    জয়গুন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, মায়মুনকে আর সে মারধর করবে না। অন্ততঃ তার চুল ধরে আর সে টানাটানি করবে না। মেয়ে বলে মায়মুনকে এতদিন সে অনাদর করেই আসছে। কিন্তু আর না। হাসু কোলের আর মায়মুন পিঠের—তাতো নয়! দু’জনকেই সে পেটে ধরেছে। আর মেয়ে হলেও মায়মুন লক্ষ্মী। সে বাইরে গেলে মায়মুনই সব কাজ করে। গায়ে এতটুকু জোর না থাকলেও কোন কাজ সে বড় ফেলে রাখে না।

    মায়মুনের জন্যে আর কোন দিন জয়গুন এমন করে ভাবেনি। আজ হাসু ও মায়মুন তার চোখে সমান হয়ে গেছে।

    অল্প কয়েকটা মাত্র চুল মায়মুনের মাথায়। বাদরের লোমের মত লালচে। যত্ন ও তেলের অভাবে জট পাকিয়ে গেছে। জয়গুন অন্ধকারে মাথা হাতড়ে উকুন মারে। উকুনে গিজগিজ করছে মাথা। রাত্রে রাত্রে এমনি করে মেরে সে কমিয়ে রেখেছে। নয় তো উকুনের আণ্ডা-বাচ্চায় এতদিন মাথা ছেয়ে যেত। তার নিজের মাথায় উকুন টিকতে পারে না। নানা চিন্তা-ভাবনায় মাথা গরম থাকে বলেই বোধ হয়।

    অনেক রাত হয়েছে। উকুন বাছতে বাছতে মায়মুনের মাথায় হাত রেখেই জয়গুন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

  • আট পরিচ্ছেদ

    আট পরিচ্ছেদ

    আট পরিচ্ছেদ

    খুরশীদ মোল্লা গ্রামের ফুড কমিটির সেক্রেটারী। ঈদের দিন ভোর হওয়ার সাথে সাথে তার বৈঠকখানার বাইরে জড় হয় অনেক লোক। কেউ কেউ ভেতরেও আসে।

    খুরশীদ মোল্লা একটু দেরীতেই ঘুম ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে চৌকির উপর এসে বসে। তার মুখে বিরক্তির স্পষ্ট আভাস সবার চোখেই ধরা পড়ে। গ্রামের মোড়ল কাজী খলিল বক্‌শ ও গদু প্রধান চৌকির ওপর সেক্রেটারীর পাশে বসে পড়ে।

    খুরশীদ বলে—দেখুন তো কি ঝঞঝাট। ভোর না হতেই বাড়ী মাথায় করে তুলেছে। সব। ঈদের দিন এই উৎপাত কার ভাল লাগে? চিনি এসেছে মাত্র কমণ, আর গ্রামে লোক হচ্ছে দু’হাজার! এক তোলা করেও পড়বে না মাথা পিছু।

    কাজী খলিল বক্‌শ উপস্থিত একজনকে উদ্দেশ করে বলে—কিরে লেদু, চিনি দিয়া কি করবি? তারপর নিজে নিজেই বলে—ভাত জোটে না, চিনি খায়। বাহার ব্যাটা! হেই-যে মাইনষে কইছিল—ঘর নাই, দুয়ার দিয়া হোয়।

    লেদু মিয়া টিপ্পনী কাটতে পটু। ভেতরে ভেতরে গরম হয়ে বলে—আমাগ মতন গরীব মাইনষের আবার ঈদ কি? ঈদ অইল আপনে লাইগ্যা, বড়মিয়া সাব। হ্যা-হ্যা-হ্যা।

    কাজী মোড়ল প্রাকুটি করে। আস্তে আস্তে সে সেক্রেটারীকে বলে—এ হারামজাদাকে এক কণা চিনিও দিতে পারব না, কইয়া রাখলাম।

    গদু প্রধান এতক্ষণে কথা বলে—কি মোল্লার পো, চা অইব নি? তারপর নিজেই হাঁক দেয়—ওরে নসুয়া, চা দিয়া যা দুই কাপ।

    রোজ ভোরে খুরশীদ মোল্লার বাড়ীতে তাগাদা দিয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস তার। ভুলেও তার একদিন বাদ যায় না। রোজার মাসে মুখ বন্ধ ছিল বলে এক মাস মোল্লা গদু প্রধানের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল। মুখ খোলার সাথে সাথেই তার আগমনে খুরশীদ মোল্লা বিরক্ত হয়। সে খলিল বকশের দিকে চেয়ে বলে—আপনি খাবেন না, কাজীর পো?

    —হ, খাইমু। খাইমু না ক্যান? তুমি ত বাজান চিনির রাজা।

    খুরশীদ হাঁক দেয়—তিন কাপ—তিন কাপ কারো চা।

    খলিল বক্‌শ বলে—আর যা কর কর—আমার ছয় সের চাই-অই। এইডুক না অইলেই অইব না। তুমি জ্ঞাত আছ, এক পাল পৈষ্যের সংসার আমার।

    গদু প্রধান বলে–আমার পাঁচ সের আগে রাইক্যা, তারপর ভাগ কর। পাঁচ সের না পাইলে ফাডাফাডি আছে তোমার লগে।

    —কাকে রেখে কাকে দেই? আচ্ছা, দেখা যাবে। এ পাঁয়তারা আর কদ্দিন ভালো লাগে, বলুন! বিনে পয়সার চাকরি! ইচ্ছে হয় ছেড়ে দিই এই মুহূর্তে।

    -না না, ছাড়বা ক্যাঁ? তুমি না অইলে–

    -ব্যাপার দেখুন না। এই খাটছি, তবু নাম নাই। সবাই বলে চোর।

    —কোন শালা কয়? দেইক্যা নেই তার গর্দানে কয়ডা মাথা।

    চা আসে। তিনজন তিনটা বাটি নিয়ে চুমুক দেয়। জমিদারের পাইক এসে এক টুকরো কাগজ সামনে ধরে। খুরশীদ মোল্লা পড়ে একটু ব্যস্ত হয়ে বলে—ভবানীবাবু বাড়ী এসেছেন নাকি? আর কে কে এসেছেন?

    —না, তিনি একলাই আইছেন! দিন চাইরে থাকবেন। চা খাওনের লাইগ্যা তাই

    —আচ্ছা,আচ্ছা, তোমাকে বলতে হবে না আর। মাত্র পাঁচ সের ত? তুমি যাও। আমি নিজেই দিয়ে আসব খন। এই ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমি আসব।

    চা শেষ করে খুরশীদ মোল্লা দোয়াত কলম নিয়ে উবু হয়ে বসে। দুই টুকরো কাগজে দু’টো পারমিট লিখে খলিল বক্‌শ ও গদু প্রধানের হাতে দিয়ে বলে—চার সের করে লিখে দিলাম আপনাদের। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বারদের দিতে হবে আবার।

    বাইরের লোক এতক্ষণে উতলা হয়ে গেছে। কেউ কেউ চলেও গেছে এর মধ্যে।

    এবার খুরশীদ মোল্লা উঠে তাদের উদ্দেশ করে বলে আমি কি করতে পারি, বল তোমরা। গভরমেন্ট মোটে সাপলাই দেয় না, তার আর হ্যা শোন অল্প কিছু চিনি আছে হাতে। মাথা পিছু এক তোলা করেও পড়বে না। তার চেয়ে বরং এক কাজ করলে হয়, আবার যখন চিনি আসবে, তার সাথে মিলিয়ে ভাগ করে দেওয়া যাবে।

    একজন আর একজনকে বলে—চল যাইগা। এই সব না দেওয়ার ছল-চক্কর। এইহানে হতৃতা ধইরা থাকলে জামাত পাওয়া যাইব না।

    সব লোক সরতে আরম্ভ করে। খুরশীদ মোল্লা আবার বলে—কি করবে আর। গুড় কিনে নাও গে।

    একজন বলে—গুড়ের সের দ্যাড় টাকা। আমরা কি অত পয়সার গুড় কিন্যা খাইতে পারি মিয়া সাব? রেশনের চিনি অইলে তয়—

    কথা শেষ না হতেই আর একজন বলে—আপনেরাই ঈদ করেন। আপনে দিন দিছে। খোদায়—ঈদ করতে দিছে।

    কথাগুলি কোন রকমে হজম করে খুরশীদ মোল্লা অন্দরে যায়। এক্ষুণি জমিদার বাড়ী যাওয়া তার দরকার।

    হাসু এতক্ষণ দাঁড়িয়েই ছিল। সে এবার বাজারের পথ ধরে।

    বাজারের একটা জায়গায় সারি সারি গুড়ের হাড় ও জ্বালা সাজিয়ে দোকানদাররা বসেছে। আজ এদিকে খুব ভিড়। মাছি মৌমাছিও ভিড় করেছে গুড়ের ওপর। কয়েকটা ভিখারী ছেলে গুড় কেনার নামে এ-মাথা থেকে ও-শাথা পর্যন্ত সমস্ত হাড়ার গুড় চেখে বেড়াচ্ছে। এক দোকানীর তাড়া খেয়ে একটি আধ-পাগলা ভিখারি ছেলে বলছে—এমন কর ক্যান? ঈদের দিন এটটু মিড়া মুখ করি, মিয়া ভাই। হি-হি-হি।

    দোকানীরা খরিদ্দারের সাথে দর কষাকষি করে, গুড় মেপে দেয় আবার মাঝে মাঝে গামছা নেড়ে মাছি তাড়ায়।

    হাসু একটা হাঁড়ি থেকে আঙুল দিয়ে একটু গুড় নিয়ে বলে—একটু কড়া জ্বলের। দ্যাট্টাকা কইরা দিবানি? হে অইলে দ্যাও এক পোয়া।

    —উহুঁ। এক টাকা বারো আনার এক আধলাও কম না।

    পেছন থেকে একজন হাসুকে টান দেয়। সে হাসুদের প্রতিবেশী কেরামত। সে বলে—মিডাই না কিন্যা চিনি লইয়া যা। এই দ্যাখ আমিও কিনলাম। দুই টাকা কইরা চিনি। মিডাইর তন ভালা বরকত দিব।

    —কোন ঠাঁয়?

    —লতিফ মোল্লার দোকানে। খুরশীদ মোল্লার ভাই লতিফ মোল্লা। পিছ-দুয়ার দিয়া যা চুপচাপ।

    হাসু বলে—ওঃ ড় কুমুডির চিনির এই দশা! হেইত আমরা কই, চিনিগুলা কই যায়?

    —আর কইস না। ব্যালাক চালাইয়া ব্যাডা ফুইল্যা গেল।

    হাসু একটু চিন্তা করে বলে—থাউকগা, মিডাই কিন্যা লইয়া যাই।

    হাসু বাজার নিয়ে বাড়ী আসে।

    খেতে বসে হাসু ও মায়মুন। খাওয়ার সময় সুড়ুত সুড়ুত শব্দ হয় ওদের মুখে।

    হাসু বলে—শিন্নি পানসা অইয়া গেছে মা, মিডা হয় নাই এক্কেরেই।

    জয়গুন বলে—যেমন গুড় তেমন মিড়া। তিন পোয়া চাউল এক পোয়া গুড়। মিডা অইব কেমনে?

    —নাইকল দেওনে তবু একটু সোয়াদ আইছে, না মা?

    —হ। আলা চাউল অইলে দেখতি কেমুন মজা অইত! সিদ্ধ চাউলে আর কি অইব?

    —আরেট্টু দ্যাও, মা।

    —উহুঁ, অহন আর না। ঈদগার তন আইয়া খাবি।

    —ঈদের দিনও এটটু মনাচ্ছি মতন খাইমু না?

    —তোগই পেট আছে, অ্যাঁ?

    আর কেঅর নাই? শফিডারে এটটু দিয়া আইতে অইব। ও ঘরে যে কিছুই পাক অয় নাই।

    হাসু এবার চুপ করে। মায়মুনের পাতেরটা শেষ হয়ে গেছে। সে আঙুল দিয়ে তখনও চাটছে থালাটা।

    জয়গুন বলে—অহন আত ধো। তুই দ্যাখতে আছি বাসন ভাইঙ্গা খাইতে চাস।

    মায়মুন লজ্জিত হয়। থালায় পানি ঢেলে সে হাত ধুয়ে উঠে পড়ে।

    জয়গুন হাসুকে বলে—মাচার উপরতন কালা কাপড়ের গাট্টি নে। ওড়ার ভিতরে একটা টুপি আছে। ওড়া তুই নে, আর নতুন কাসুরে দিয়া আয়।

    —আমি পারতাম না মা। হাসু বলে।

    –ক্যাঁ।

    ঐ দিনের চরকি দিতে যাওয়ার বিপদের কথা হাসু মা-কে বলেনি।

    সে বলে—আমি ঈদগায় যাইমু, মা। নামাজের ওকত অইয়া গেছে। তুমি আর কেই বে দিয়া

    —আর কারে পাডাই? তুই-ই যাওনের কালে এটটু ঘুইর‍্যা ওইহান অইয়া দিয়া আয়।

    হাসু আর গোপন রাখতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেলে সেদিনের সব কথা।

    জয়গুন অসহায়ের মত তাকায় ছেলের মুখের দিকে। শেষে বলে—আগে কস নাই ক্যাঁ? এত পয়সার টুপিড়া ফ্যালাইয়া দিমু? তোর মাতায়ও লাগব না।

    —কানা মামানীরে দিয়া পাড়াইয়া দ্যাও।

    কথাটা জয়গুনের পছন্দ হয়। শফির মা বুড়ো মানুষ। সে নিয়ে গেলে করিম বক্‌শ লজ্জায় কিছু বলবে না হয়তো। রাখতে পারে। তা ছাড়া ঈদের দিন। খুশীর দিনে সে হয়ত রাগ করবে না।

    হাসু গাঁটরি খোলে। বাপের কিশতি টুপিটা বের করে মাথায় দেয়। টুপিটা অনেক বড় হয়েছে। কান পর্যন্ত ডুবে যায় টুপির মধ্যে।

    জয়গুন হাসুর দিকে এক নজর চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। সে আর তাকাতে পারে না।

    হাসু গামছাটা কাঁধে ফেলে কোষায় চড়ে। শফির মা এবং শফিও ওঠে কোষায়। হাসকে ঈদগার রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে শফির মা শফিকে নিয়ে করিম বকশের বাড়ীতে যাবে। এখন যাওয়াই ভালো। করিম বক্‌শ এখন বাড়ীতে নেই। নামাজ পড়তে গিয়েছে নিশ্চয়ই।

    শফির মা টুপিটা দিয়ে নিরাপদেই ফিরে আসে।

    জয়গুন খুটে খুটে জিজ্ঞেস করে কাসুর কথা।

    —টুপিডা ঠিক অইল নি মাতায়?

    —হ, টুপিডা মাথায় দেওনে এমন সেদর দেহাইল কাসুরে! কি কইমু তোমারে—যেন একটা পরীর বাচ্চা!

    শফির মা আবার বলে—সময় বুইঝা গেছিলাম গো। করিম বকশা বাড়ীতে আছিল না। নামাজ পড়তে গেছিল। ওর বউরে তালিম দিয়া আইছি। টুপি যে তুমি দিছ, তা হে কইব না। হে কইব, হে-ই কিন্যা দিছে।

    জয়গুন নিশ্চিন্ত হয়। তার ভয় ছিল করিম বক্‌শ হয়তো ছেলেটাকে মারতে শুরু করবে।

    শফির মা বলে—করিম বকশের বউ মানুষ ভালা, খুব হাসিখুশী। আমারে পিঁড়ি দিল বসবার। নিজেই এই এত বড় একটা আস্ত ধলডোগ পান ঘেঁইচ্যা দিল।

    জয়গুন বলে—কাসু কিছু কইল?

    —উহুঁ। ও আমার মোখের দিগে চাইয়া আছিল! এক্কেরে এতিমের মতন—যেন বাপ-মা নাই।

    –তুমি কোলে নিলা না?

    —নিলাম। আমার কোলের তন আর কি নামতে চায়! এক্কেরে বুকের লগে মিশ্যা, আছিল। তারপর কত কোস্তাকুস্তি কইর‍্যা কান্দাইয়া নামাইয়া থুইয়া আইলাম। কি জানি, করিম বক্‌শ আইলে আবার কি কাণ্ড কইরা ফালায়।

    জয়গুন একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করবার চেষ্টা করে।

  • নয় পরিচ্ছেদ

    নয় পরিচ্ছেদ

    নয় পরিচ্ছেদ

    জয়গুন ও হাসু আজ সকাল সকালই বেরিয়ে গেছে।

    মায়মুন হাঁস দুটো খাঁচা থেকে বের করে পানিতে ছেড়ে আসে।

    এবার সে হাঁসের বাচ্চা দুটো বের করে ঘরের মেঝের ওপর ছেড়ে দেয়। নিজেও হাত দুটো মাটিতে রেখে উপুড় হয়ে চেয়ে থাকে। হলুদ রঙের বাচ্চা দুটো কেমন সুন্দর হাঁটে আর চিপচিপ করে। মায়মুনের আনন্দ হয়।

    কাল,মায়মুন বাচ্চা দুটো নিয়ে এসেছে। সোনাচাচী বলে দিয়েছে—আমারে এক আলি আণ্ডা দিবি। আমারে না খাওয়াইলে পাতিহিয়ালে ধইর‍্যা লইয়া যাইব তোর আঁস, কইয়া রাখলাম।

    মায়মুন স্বীকার করে এসেছে। সোনা চাচীকে প্রথম দুই দিনের ডিম সে দেবে। তাকে আগে না খাইয়ে নিজেরা ছোবেও না ডিম।

    কাল বাচ্চা দুটোকে নিয়ে আসার পর থেকে মায়মুন এগুলোকে নিয়েই কাটিয়ে দেয়। কখনও মাটির ওপর ছেড়ে দেয়, আবার কখনো বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। রাতে শুতে যাওয়ার সময়ও সে বাচ্চা দুটো কাছ ছাড়া করতে চায় না।

    জয়গুন ধমক দিয়ে বলে—সুখে থাকতে ভূতে কিলায়? খাঁচার নিচে রাইখ্যা আয় জলদি। না’ লে চুল ছিঁড়া ফ্যালাইমু ট্রাইন্যা।

    মায়ের ধমকের কাছে মায়মুন এতটুকু হয়ে যায়।

    বাচ্চাদুটো খাঁচার নিচে রেখেই সে শুয়ে পড়ে। কিন্তু তার ঘুম আসে না। অনেক রাত পর্যন্ত সজাগ থেকে সে শুনতে পায় বাচ্চা দুটোর ডাক। মাঝে মাঝে চিপচিপ করে ওঠে ওগুলো। শিশুর কান্নায় অসহায় মায়ের মত অবস্থা হয় মায়মুনের।

    মা চলে যাওয়ার পর মায়মুনের পূর্ণ স্বাধীনতা। এবার তাকে বলবার কেউ নেই। বাচ্চা দুটোকে খাঁচার মধ্যে রেখে সে উঠানের দক্ষিণ পাশে লাউ মাচার নিচে একটা জায়গা বেছে নেয়। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে চৌকা একটা গর্ত করে। পানি ঢেলে সেটাকে ভরে। তারপর বাচ্চা দুটোকে ছেড়ে দেয় তার মধ্যে।

    হাঁসের বাচ্চা দুটোর নতুন অভিজ্ঞতা। জন্মাবার পর এই প্রথম তারা পানির পরশ পায়। সেজন্যে পানিতে ছেড়ে দিতেই ভয় পেয়ে ওপরে উঠে আসে। মায়মুন ভাবে—দু’দিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। বড় হাঁসের মতই সঁতরাবে তখন।

    মায়মুন গতটার চারদিকে কতগুলো লম্বা পাটখড়ি পুঁতে দেয়। এমনি ভাবে লাউ মাচার। সমান উঁচু করে সে একটা বেড়া বানিয়ে ফেলে। চিল বা বাজ ছো মেরে নিয়ে যেতে না পারে, সে জন্যে এ সতর্কতা।

    মায়মুন বাড়ীর চারপাশ ঘুরে ছোট বড় নানা রকমের শামুক কুড়িয়ে আনে। দা দিয়ে সেগুলোর খোসা ছাড়ায়। তারপর কুচি কুচি করে কাটতে কাটতে গান গায়–

    শামুক খাজারে, আমার বাড়ী আয়,

    কুচি কুচি শামুক দিমু হলদি দিমু গায়,

    ওরে শামুক খাজারে।

    তোর বাড়ী অনেক দূরে, সাত পাক ঘুইরে ঘুইরে

    আমার বাড়ী আয়।

    শফি এসে পাশে দাঁড়ালে মায়মুনের গান বন্ধ হয়ে যায়।

    শফি বলে—এগুলা দিয়া কি করবি?

    মায়মুন কিছু না বলে হাঁসের বাচ্চা দুটো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

    —দে আমি কাইট্যা দেই।

    —উহু আমিই পারি কত কাটতে।

    মায়মুন একটা পাতায় করে কুচি কুচি করে কাটা শামুক নিয়ে বাচ্চা দুটোর সামনে ধরে। বাচ্চা দুটো কয়েকবার ঠোঁট দিয়ে নেড়ে খেতে শুরু করে।

    শফি বলে—বাহ খাইতে শিখছে রে! কেমন ক্যাং ক্যাৎ কইরা খায়! দ্যাখ চাইয়া।

    —দেখছি।

    মায়মুন বসে বসে দেখে।

    শফি বলে—আমারে একটা বাচ্চা দিবি?

    —ইশ!

    —পয়সা দিমু আষ্ট খান।

    —উহু এক ট্যাহা দিলেও না।

    —ফুলঝুরি দিমু। আর চুলের কিলিপ।

    মায়মুন বলে—উহু সাত রাজার ধন মাণিক্য দিলেও না।

    —না দিলে চুরি কইর‍্যা লইয়া যাইমু তোর আঁস, কইয়া রাখলাম।

    মায়মুন এবার চেঁচিয়ে ওঠে—মামানি, ও মামানি, দ্যাখ তোমার পোলা কেমুন লাগাইছে। তারপর হাঁসের বাচ্চা রাখবার গর্ত থেকে পানি ছিঁটিয়ে দেয় শফির চোখেমুখে।

    শফির মা-ও শফিকে ডাক দেয়—অ্যাঁরে শফি, কি শুরু করলি? আমি আইলে ঠ্যাঙ ভাঙুম কিন্তু।

    —না মা, ফাঁকিজুকি দিলাম আমি।

    কলাগাছের ভেলায় চড়ে শফি ও মায়মুন মোড়লদের ছাড়া ভিটয় যায় লাকড়ি কুড়াতে। শফি জঙ্গলের ভেতর দিকে নিয়ে যায় মায়মুনকে। শফি গাছে উঠে শুকনো ডাল ভেঙে নিচে ফেলে। মায়মুন কুড়িয়ে জড়ো করে এক জায়গায়।

    শফি গাছে চড়তে বেশ ওস্তাদ। এক গাছের ডাল বেয়ে সে আর এক গাছে চলে চায়। মায়মুন বলে—আর ওই মুহি যাইও না শফি ভাই, ওই গাবগাছে—

    —কি ঐ গাবগাছে?

    —আলেক মোড়লের বউ গলায় দড়ি দিছিল ঐ গাবগাছে, তুমি বুঝিন জান না?

    —হেতে কি অইছে?

    —উঁহু, আমার ডর করে। তুমি নাইম্যা আহ হবিরে। শফি গাছ থেকে নেমে বলে—মায়মুন চাইয়া দ্যাখ দেহি, ঐ দিক ঐ গাবগাছে কালা একটা কি দ্যাহা যায়।

    মায়মুন ঐ দিকে না চেয়েই ওগো মাগো বলে শফিকে জড়িয়ে ধরে। শফি জোরে হেসে ওঠে। বলে—আরে কিছু না, ফাঁটকি একদম ফাঁটকি। দিনে-দুপরে কিয়ের ডর? চাইয়া দ্যাখ। দ্যাখ না ছেড়ি। কিছুই না, চউখ মেল এইবার।

    মায়মুন তবু চোখ খোলে না।

    শফি ওকে কোলে তুলে ভেলার কাছে নামিয়ে দেয়। মায়মুন এতক্ষণে চোখ মেলে। সে বলে তুমি কি ফাজিল। খামাখা ডর দেহাইলা।

    শফি হাসে হিঁ-হিঁ করে।

    মায়মুন বলে—তুমি গিয়া লাকড়ি লইয়া আহ। আমি আর যাইতে পারতাম না।

    শফি বাগানে যায়। শুকনো ডালগুলো একটা লতা দিয়ে বেঁধে মাথায় করে নিয়ে আসে। তারপর বাড়ী এসে দুটো ভাগ করে। নিজের ভাগের থেকে কয়েকটা ডাল মায়মুনকে দিয়ে। বলে—তোরা মানুষ বেশী। এই কয়ডা বেশী নে তোরা।

    বিকেল বেলায় মায়মুন তেঁতুল তলায় বড়শী নিয়ে বসে। তার কোলের কাছে হাঁসের বাচ্চা লুটো। আবার শফি এসে জোটে সেখানে। একটা ছিল ওর বড়শীর কাছে ছুঁড়ে শফি তেঁতুল গাছের আবডালে পালায়।

    মায়মুন কিছু দেখতে না পেয়ে দাঁড়াতেই হেসে ওঠে শফি— হিঁ-হিঁ-হিঁ!

    মায়মুন বলে—তুমি বড় শয়তান। চাইঙ্গা মারলা ক্যান?

    —কই চাইঙ্গা! মাছে ডাফ দিল ছেঁড়ি। জবর মাছ অইবরে! বোয়াল মাছ।

    মায়মুন মাথা নেড়ে বলে—হুঁ, বোয়াল মাছ।

    —হ রে হ। কি মাছ পাইছস?

    —কিচ্ছুই না। একটা তিঁত পুডিও না।

    —কিছুই না?

    —উঁহু।

    শফি আশ্চর্য হয়। তারপর গম্ভীরভাবে বলে—তোর বড়শীতে কার জানি মোখ লাগছে রে! কেও নষ্ট না করলে এমুন অয়? আমার মনে অয়, কেও ডিঙ্গাইয়া গেছে তোর ছিপ। হেই-এর লাইগ্যা মাছ ওঠতে আছে না।

    মায়মন শফির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

    শফি বলে—পোড়াইয়া নে আগুনে। ঠিক অইয়া যাইব।

    শফি ও মায়মুন মাটির হাতায় আগুন নিয়ে বড়শীটা পোড়া দেয়।

    তারপর একসঙ্গে সুর করে বলে—

    বড়শী পুড়ি, বড়শী পুড়ি,

    ট্যারা পড়শীর মোখ পুড়ি,

    মাছ ধরমু দুই কুড়ি॥

    লোয়ার বড়শী সুতার ডোর

    পুঁডি পাবদা, শিং মাগুর॥

    বড়শী আমার প্যাদা

    ধইরা আনব ভ্যাদা–

    ভ্যাদা মাছে ক্যাদা খায়,

    পুডি মাছে পান চাবায়।

    অ-হো-হো হি-হি-হি-হি!

    শফি ও মায়মুন দুজনে হেসে লুটোপুটি। শফি মাটি খুঁড়ে কেঁচো তুলে দেয়। মাছ কেঁচোর টোপ খায় ভাল।

    মায়মুন আবার বড়শী নিয়ে বসে।

    সন্ধ্যার পর সে শফির মা’র ঘরে যায়।

    শফির মা বলে—আমার পানডা ছেইচ্যা দে তো, ময়ম। তুই ভালা ছেঁচতে পারস। শফি পারে না। ও দিলে কোনদিন খর বেশী অয়, আবার কোনদিন চুনা বেশী পড়ে।

    প্রশংসায় মায়মুন খুশী হয়। কলাপাতায় জড়ানো পান খুলতে খুলতে মায়মুন বলে—কতটুকু নিমুগো, মামানি?

    —আধ খান নে। তয় অডুকে গাল ভরে না। গাল না ভরলে কি পান খাইয়া সুখ আছে? কিন্তু কি করমু আর। গাছের পাতা, হেই-এর যে দাম! হোনলে মাথা ঘোরে। দুইডা পান

    একটা পয়সা। আগে এক পয়সায় এক বিড়া পাওয়া যাইত।

    মায়মুন ঠনর ঠনর করে পান ছেচতে আরম্ভ করে।

    শফির মা আবার বলে—আইজকাইল বেবাক জিনিসই আক্রা। আগে এক টাকায় আধামণ চাউল মিলত। আমার বয়সেই দেখছি। আর অহন বেবাক জিনিসের উপর তন খোদার রহমত উইট্টা গেছে। আগে এক টাকার বাজার কিনলে এক মরদের এক পোঝা অইত আর অহন এক টাকার বাজার আতের তালুতে লইয়া বোম্বাই শহর যাওয়ন যায়।

    শফির মা বলেই চলে—তোর মামু একটা ইলশা মাছ আনছিল দুই পয়সা দিয়া কিন্যা। তহন শফি অয় নাই। মফি আমার পেড়ে। এই এত বড় মাছটা। হেইডার একজোড়া আণ্ডা যা অইছিল—এই এক বিঘৎ লমফা। তখন আমার বুক জুইড়্যা ওর ভাই বইনে চাইর জন। কত খুশী অইছিল হেই আণ্ডা দেইখ্যা!

    শফির মা আর পুরাতন স্মৃতি ঘাটতে সাহস পায় না। সে সব সময় ভুলে থাকতেই চেষ্টা করে। কিন্তু কথায় কথায় বা একা বসে থাকলে যখন সে স্মৃতি এসেই পড়ে, তখন সে আর সহ্য করতে পারে না। বিনিয়ে বিনিয়ে বিলাপ করতে শুরু করে। তার এই পঞ্চাশ বছর বয়সে সে নয় সন্তানের জননী। কিন্তু একমাত্র শফিই বেঁচে আছে—বাকী আটটির চারটি আঁতুড়েই শেষ হয়। এটি কলেরায় আর একটি বসন্তে মারা যায়। আর একটি—তার নাম মফি, শফির দুই বছরের বড় ছিল—দুর্ভিক্ষের বছর সে কোথায় হারিয়ে গেল! শফির মা আজও এ ছেলেটির আশা ছাড়ে নি। তার ধারণা মফি এখনও বেঁচে আছে।

    মাঝে মাঝে শফির মা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলে—আমার ওরা বাঁইচ্যা থাকলে এই দশা আমার? আইজ আমি খরাত কইর‍্যা খাই! ওরা বাঁইচ্যা থাকলে আমার বাদশাই কপাল আছিল। ওরা কামাই করত। ও বউ আইত ঘরে। ওরা রাইন্দা-বাইড়া সামনে ধরত। সোনার খাটে বইস্যা, রূপার খাটে পাও রাইখ্যা আমি সব দ্যাখতাম আর হুকুম করতাম। নাতি-নাতকুড় ঘিরা বইত চাইর পাশে। ক্যাচম্যাচ করত কিচ্ছা হোননের লেইগ্যা।

    শফির মা-র চোখ দিয়ে দরদর করে পানি গড়িয়ে পড়ে। মায়মুন দেখে আশ্চর্য হয় না। কারণ, এ আজ নতুন নয়। কখন সে কাঁদবে আর কখন কাঁদবে না—কেউ বলতে পারে। না। মায়মুন ছেচনীর থেকে ছেচা পান তুলে ধরে। শফির মা মুখে দেয়।

    মায়মুন এবার বলে—একখান কিচ্ছা কও না, মামানি?

    —না লো। আইজ আর পরাণড় ভালা ঠেকে না।

    মায়মুন আর অনুরোধ করে না। শফির মা বলে—তুই একটু দেইখ্যা আয় তো শফি কি দিয়া কি রানদে। কয়ডা কলমীর শাক রানব আর ভাত। কাইল ভাত ফুটছিল কম। চাউল চাউল ভাত গিল্যা গিল্যা খাইছি। দাঁতদন্ত না থাকা আর এক জ্বালা।

    মায়মুন রান্না ঘরে যায়। চুলোর ওপর বসানো ভাতের হাঁড়ি থেকে কয়েকটা ভাত। তুলতে তুলতে শফিকে বলে—একটা শোলক ভাঙ্গাও দেহি শফি ভাই–

    মাছ করে ঝক ঝক ছোট্ট এক ঝিলে

    একটা মাছে টিপ দিলে বেবাকগুলা মিলে।

    ইশ, জবর শোলক ত। এইডা শিখা রাখছি কুট্টিকালে—ঝিল অইল আঁড়ি আর মাছ অইল ভাত! কেমুন? অইছে? এই বার একটা মাছে টিপ দিয়া দ্যাখ দেখি ফোটলনি?

    মায়মুন একটা ভাতে টিপ দিয়ে বলে—অইয়্যা গেছে। দ্যাখত কেমুন মজা! একটা ভাতে টিপ দিলে বুঝা যায় ফোটলনি না ফোটল না।

    —আর একটু ফোটতে দে। মা আবার শক্ত ভাত খাইতে পারে না।

    —কাইল তুমি শক্ত শক্ত চাউল চাউল ভাত রানছিলা, মামানি কইছে। ভাত রানতেও জান না?

    —আমি জানি না, কে জানে রে? টিক্কাদার সাবের বাসায় এতকাল পাক করলাম আমি। আইজ তুই আমারে হিগাইতে আইছস?

    রান্না সেরে শফি ও মায়মুন ঘরে এলে শফির মা বলে—তোর মা অহনো আইল না, ময়মন? রাইত যে অনেক অইল!

    বাইরে চ্যাবর চার পায়ের শব্দ শোনা যায়। উঠানে কাদার মধ্যে দিয়ে কে যেন আসছে।

    শফির মা ডাকে—হাসুর মা?

    —হ ভাজ, আমি অই।

    —আহো আমার ঘরে।

    জয়গুন এসে দরজায় দাঁড়ায়। শফির মা বলে—তোর হায়াত আছে। অনেক দিন বাছবি তুই। এই এটটু আগেই তোর নাম নিছিলাম।

    —অহন যাই বইন। আখা ধরাইতে অইব আবার।

    -আইচ্ছা যাও। আখা ধরাইয়া এটটু এদিকে আইও, তোমার লগে কতা আছে।

    —কি কতা?

    —পরে কইমু। অহন যাও চাউল কি দর আনলাগে?

    —দুই সের, বইন। দর চইড়া গেছে। আর যা মছিবত আইজ কাইল। টারেনে যা মানুষের ভিড়। জেরের এই দুই কিস্তি ধইর‍্যাই এই রহম। আগে এমন ভিড় আছিল না।

    জয়গুন পাক চড়িয়ে শফির মার ঘরে আসে। শফির মা বলে—কয়দিন ধইরা একটা কথা কইমু কইমু করতে আছি। কিন্তু সময় মত এটটু একখানে বইতে পারি না। তুমি থাকলে আমি থাকি না, আমি থাকলে আবার তোমার দাহাই মিলে না।

    —কি কতা?

    —কই, সবর কর। পান খাইলে একটু খা, ঐ দ্যাখ তোর পিছে পাতার মধ্যে।

    জয়গুন পান খেতে খেতে বলে–কি কতা এই বার কও দেখি ভাজ।

    —রাখ না, কই। আমার এই কাপড়ভা একটু তালি দিয়া দিবি। আমি আবার সুঁইয়ে সূতা গাঁথতে পারি না। ছাই, চউখটা এক্কেবারে গেছে।

    —আইচ্ছা।

    —ছিঁড়া কাপড় পিন্দা বাইরে যাইতে লজ্জা করে। তুই একটু সিলাইয়া দিলে তবু বেড় দিয়া পিনতে পারমু। তোর আতে সিলাইডা অয় ভালা।

    –শফিরে দিয়া পাড়াইয়া দিও। এই এর লাইগ্যা বোলাইছিলা? জয়গুন উঠতে উদ্যত হয়।

    —না, আরো কত আছে, ব’।

    -কও কি কতা।

    –ফকিরের লগে তোর দেহা অয় না, আঁ? তোরা ত কত দূরে দূরে যাস। একদিনও চউখে পড়ে না?

    –উঁহু।

    —দ্যাখ দেখি কেমুন বে-য়াক্কেইল্যা! কতদিন গুজারিয়া গেল, বাড়ীর পাহারা আর বদলাইয়া দিয়া গেল না। আমার ত রাইতে ঘুমই আহে না ডরে। তুইও আমল দিবি না।

    —উহুঁ, পাহারা বদলাইতে অইব না আর। পাহারা না ছাই। ফুক্কা দিয়া টাকা নেওনের ছল—চক্কর।

    —ছল-চক্কর! তুই যে কী কস্! আইচ্ছা সূর্যু-দীগল বাড়ীতে থাকতে তোর কি পরাণে ডর-ভয় লাগে না?

    জয়গুন আবার উঠতে উদ্যত হয়।

    শফির মা বাধা দেয়—ব’। আদত কথা তো অহনো কই নাই।

    —কী আদত কতা, কও।

    —তোরে আগেও কয়বার আমি কইছিলাম। তুই আমার কতা ঠেইল্যা দিলি।

    —ঠেলমু না কি করুম?

    —এইডা কি ঠেলুনের মত কতা!

    –তয় কি?

    —তোর ভাই বাইচ্ছা থাকলে তার কতা ঠেলতে পারতি? ধইরা বাইন্ধা কবে তোর নিকা দিয়া দিত।

    —তুমি মোখ বোজ দেহি। তোমার ঐ এক বুলি আমার আর কানে সয় না।

    —হেইয়া সইব ক্যাঁ? আমি তোর ভালার লেইগ্যা কই কি না। বয়স ত অহনো তিরিশ অয় নাই। অহনো গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা-কাচ্চা পেড়ে ধরনের বয়স আছে।

    জয়গুন শ্রান্ত। সে মুখ নিচু করে বসে থাকে।

    শফির মা বলে—দু পরধান মানুষ ভালা। তার পাঁচটা বলদ, তিনডা গাই। দশ মরাই ধান পায় বচ্ছর। জাগা-জমিনের ইসাব-কিতাব নাই। কাম আছে মানি। তয় আমি কই, যেইখানে কাম আছে হেইখানে ভাতও আছে। আর তোর ত একলা কাম করতে অইব না। আগের তিন জননা আছে পরধানের। চাইড্যা পোলার বৌ আছে। এক্কেরে সোনার বাগিচা হাজাইয়া রাখছে। ওরাই বেবাক কাম করব! তুই হুকুম দিয়া খাডাবি।

    জয়গুনের মুখ ছাই-এর মত ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে কিছু বলতে পারে না।

    শফির মা আবার বলে—পরধান কাইলও আমারে ধরছিল। আমি কইলাম, পোলা আর মাইয়াড়ার লেইগ্যাই যত মুস্কিল। হে কইল, তা পোলা আর মাইয়াডারে আমার বাড়ীতে লইয়া আইলেই ত অয়। কত মানুষ খাইয়া বাচে আমারডা। দুইডায় আর কি অইব! এইবার বিবেচনা কইরা তুই মোখ ফুইটা একটু হুঁ করলেই অইয়া যায়। সুখে থাকবি, কইয়া দিলাম।

    খড়ের আগুনের মত দপ করে জ্বলে ওঠে জয়গুন—হুঁহ, আমারে তাড়াইতে পারলে লুইট্যা-লাপইট্যা ফলার কইর‍্যা খাইতে পারবা। তা মনেও জাগা দিও না, কইয়া দিলাম।

    —তোবা! তোবা! তোর চীজ ছুঁইলে যেন আত খইয়া পড়ে, তোগ গাছের একটা পাতা ছিঁড়লে যেন রাইত না পোয়ায় আমাগ।

    জয়গুন যেমন জ্বলে উঠেছিল, শফির মা-র কথায় আবার নিবে যায়। সে তার স্বাভাবিক কণ্ঠে এবার বলে—না বইন, বিয়া ত দুই খানেই অইল। অনেক দ্যাখলাম, অনেক শিখলাম, আর না। পোলা মাইয়ার মোখ চাইয়া আর পারুম না, মাপ করো। পোলা আর মাইয়াডার বিয়া দেইখ্যা যেন চউখ বুজতে পারি, দোয়া কইরো।

    শফির মা নিরাশ হয়ে বলে—তোর ময়মনের বিয়া দে এইবার। একটা সম্বন্ধ আছে আতে।

    —না, এত শিগগির কি অইল! যাউক আর দুই বচ্ছর।

    —না, না। মাইয়া তোর বিয়ার লায়েক অইছে। আর ঘরে রাখন ঠিক না।

    জয়গুন একটু চিন্তা করে বলে—কোথায় সম্বন্ধ আছে?

    —সদাগর খাঁরে তুই ত চিনসই। তার নাতি-সোলেমানের ব্যাডা, নামড়া যেন কি! ভুইল্যা গেলাম বুঝিন, অহো মনে পড়ছে, ওসমান। ওসমান।

    -ওঃ, ওসমান। ওসমান ত বিয়া করছে!

    করছিল। বউ মইরা গেছে চৈত মাসে ভেদের ব্যারামে।

    —কিন্তু পোলার বয়স যে অনেকখানি।

    —তোর মাইয়াড়ার বয়সই কম কি।

    —কম না? আমার মাইয়ার বয়স মোড়ে দশ, ধরতে গেলে দুধের মাইয়া আমার।

    —দুধের মাইয়া! কি যে কস তোরা ছাই-মুণ্ডু। মাইয়ারা এই বয়সে বাচ্চা বিয়ায়। আমার মা-র এগারো বছরের কালে আমার জর্ম অয়।

    শফির মার সাথে কথায় পেরে ওঠে না জয়গুন। সে বলে—আইচ্ছা ভাইব্যা চিন্তা দেহি। পরে কইমু। নছিবে যদি ঐখানে ভাত লেইখ্যা থাকে, তয় অইব। কার কোনখানে দানাপানি লেহা আছে, খোদা জানে। অহন যাই। ওদিকে আবার ভাতের আঁড়ি না ভাইঙ্গা চালায়।

    বাইরে নামতেই চোখে পড়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। সে চারদিকে চেয়ে বলে—উত্তরে আর পুবে যে মেঘা করছে, ভাজ! আইজ বুঝিন আসমান শুদ্ধ ভাইঙ্গা পড়ব। আইজ আর উপায় নাই। এই বষাকালডা ভিজতে ভিজতে গেল। তোমার ঘরের চাল ত ভালা আছে। আমার চালে ছনই নাই।

    —আমার চালে আর কই আছে? হেই কবে, গেল বচ্ছরের আগে ঠিক করছিলাম। তব বিষ্টি পড়ে ছয় সাত জায়গায়।

    —কি করমু আর! কপালে আছে ভিজতে অইব, ভিজমুই। পাচটা ট্যাকাও একখানে করতে পারলাম না। ঘরের চাল ছাওয়াই কি দিয়া। উদর লইয়া আর পারলাম না। উদরেই যায় বেবাক টাকা।

    গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে। জয়গুন ধরে যায়। মায়মুন রান্না শেষ করেছে।

    —চালাক কইর‍্যা ভাত খা তোরা। আসমানের দিগে চাইছিলি? কাউয়ার আণ্ডার মতন কালা অইছে আসমান। আইজ আবার ঘরের মধ্যে সোত ছুটব। খাইয়া লইয়া উত্তরমুখি বিছানা সরা।

    অসংখ্য ছিদ্রপথে বৃষ্টির পানি ঝরতে থাকে ঘরের ভেতরে। তা ছাড়া দক্ষিণে বাতাসের জন্য বৃষ্টির ঝাপটা দক্ষিণ দিকটায় লাগে বেশী। তাড়াতাড়ি খেয়ে তারা বিছানা সরায় উত্তর দিকে।

    জয়গুন বলে—একটা কাঁথাও পাইড়্যা নেগ্যা। তারপর কুঁকড়ি মুকড়ি অইয়া শুইয়া থাক ভাই-বইনে।

    বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করে জোরে। সত্যি সত্যি আকাশটাই ভেঙে পড়ছে যেন। এশার নামাজ পড়ে ছেলেমেয়ের শিয়রের কাছে তসবী হাতে বসে জয়গুন। সে তসবীর দানা গুণছে কি সময় গুণছে বোঝা যায় না। অনেকক্ষণ পরে বৃষ্টির বেগ কমে। কিন্তু বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয় না একেবারে। এখন যে রকম অলস বর্ষণ শুরু হয়েছে, তাতে সারা রাতেও বৃষ্টি থামবার কোন লক্ষণ দেখা যায় না। জয়গুন কাঁথার ওপর হাত দিয়ে দেখে, কথাটা ভিজে গেছে। সে এক পাশে শুয়ে পড়ে।

    হাসু হঠাৎ জেগে উঠে বলে—পায়ের কাছটা একদম ভিজ্যা গেছে, মা।

    —তুই অহনো ঘুমাস নাই?

    –উহুঁ।

    –আত-পা কাঁকড়ার মত গুডিসুডি মাইরা পইড়া থাক।