সাত পরিচ্ছেদ

চারদিকে আনন্দকোলাহল। মায়মুন ডাকে—মা, চান ওঠছে বুঝিন, ঈদের চান।

মায়মন দৌড়ে যায় বাড়ীর পশ্চিম দিকে। শফি এসে দাঁড়ায় এর পাশে। পশ্চিম দিগন্তের রঙিন মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ওরা তন্ন তন্ন করে খোঁজে চাদ। জয়ন এসে যোগ দেয়।

মায়মুন বলে—কই মা?

—অই সাঁকুয়া তারাডার কাছ দিয়া দ্যাখ। ওডার নিচে দিয়াই দ্যাহা যায় হগল বচ্ছর।

—অই, ঐ যে দ্যাহা গেছে, ঐ ঐ ঐ! শহি লাফিয়ে ওঠে আনন্দে, মায়মনকে টেনে আঙুল দিয়ে দেখায়—ঐ যে তারাডার একটু নিচে। কালা মেঘড়ার পাশে।

মায়মুন দেখতে পেয়ে আনন্দে হাত তালি দেয়। জয়গুন এখনও দেখতে পায়নি। সে বলে—আমাগ কি হেই দিন আছে! তোগ নতুন চউখ। তোর দ্যাখতে পাবি।

—তুমি অহনও দ্যাহ নাই মা! মায়মুন এবার মাকে দেখাতে চেষ্টা করে। জয়গুন দেখতে পায় অনেক পরে। ভক্তিতে সে মাথা নোয়ায়, দু’হাত তুলে মোনাজাত পড়ে।

—এক্কেরে কাচির মতন চিকন এইবারের চান। সিদা অইয়া ওঠছে। আর হগল বচ্ছরের মতন কাইত অইয়া ওড়ে নাই। মোনাজাত সেরে বলে জয়গুন।

চাঁদটা মেঘের আড়ালে চলে গেলে জয়গুন আবার বলে—চুল, ইফতার খুলি গিয়া।

শফির মার ঘরের কাছে যেতে সে ডাকে—চান দেখলিনি, হাসুর মা?

—হ বইন। দ্যাখলাম। বড় ছোড এইবারের চান।

তোরাই দ্যাখ বইন, তোগ চইখ দিছে খোদায়। আমার একটা চউখ, হেইডাও বুঝিন বুইজ্যা গেল।

শফির মা নিশ্বাস ছাড়ে। এমনিতেই সে লবেজান। তার ওপর রোজা রেখে সে বিকালের দিকে খুবই কাহিল হয়ে যায়। সে আবার বলে—চাইর-পাঁচদিন পরে ছাড়া আমি দ্যাকতে পারমু না। চান্ডা সিয়ানা অউক। আ-গো হাসুর মা,—এইবার কোন মুহি কাইত অইয়া ওঠছে গো চান? দহিণমুহি?

—এইবারে সোজাসুজিই ওঠছে বইন। ব্যাকা-ত্যাড়া ওড়ে নাই। লক্ষণ ভালা, না?

-হ বইন, আর আহাল অইব না এইবার দেহিস। যা কইলাম যদি না ফলে তহন। কইস, কানা বুড়ী কি কইছিল।

শফির মা’র কুঁচকে যাওয়া শুকনো কালো মুখখানা খুশীতে ভরে ওঠে। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে সে মুখখানা দেখে জয়গুনেরও ভরসা হয়। ভবিষ্যদ্বাণীর মতই বিশ্বাস করে শফির মা’র কথাগুলো।

শফির মা বলে—হেই আকালের বচ্ছর পঞ্চাশ সনে দক্ষিণ মুহি কাইত অইয়া ঈদের চান উঠছিল। আমি নিজে দেকছি। চউখ তুহা তাজা আছিল। আমি দেইক্যা কইছিলাম তহন—এইবার না জানি কি আছে কপালে।

—দক্ষিণ মুহি কাইত অইয়া ওঠলে অকাল অইবই। বুড়া-বুড়ীর কাছে হুনছি, দক্ষিণ মুহি কাইত অইয়া চান যদি সমুদ্রের ওপরে নজর দেয়, তয় বান ডাইক্যা দ্যাশ—দুইন্নাই তলাইয়া যায়। দেখলি না অই বাচ্ছর কেমুন–

—কত বচ্ছর পর এইবার সিদা ওঠছে চান। খোদা বাঁচানেওয়ালা।

এফতারের সময় উৎরে গেছে। জয়গুন ঘরের দিকে পা দেয়। মায়মুন বলে—উত্তর মহি কাইত অইয়া ওঠলে কি অয় মা?

—মড়ক লাগে। কলেরা-বসন্ত অয়। মানুষ মইর‍্যা সাফ অইয়া যায়।

মায়মুন শিউরে ওঠে।

ওজু করে জয়গুন ঘরে যায়। শেষ রোজার ইফতারের জন্য আজ একটু আলাদা আয়োজন—চার ফালি শশা ও এক খোরা গুড়ের শরবত। আর সব দিন এক মগ সাদা পানি সামনে কারে সে বসে থাকত বেলা ডুবে যাওয়া পর্যন্ত! এমন করে খাবার সামনে নিয়ে ইফতারের জন্য বসে থাকা অনেক পুণ্যের কাজ, সে জানে। মসজিদের আজান ইফতারের সংকেত জানালে সে এক ঢোক পানি খেয়ে রোজা ভাঙত।

জয়গুন একচুমুক শরবত খেয়ে মায়মুনের সামনে ঠেলে দেয় বাটিটা। মায়মুন বাটিটা নিয়ে চুমুক দিতেই জয়গুন বলে—মজা পাইয়া বেবাকহানি খাইয়া ফেলাইস না আবার। তোর মিয়াভাইর লাইগ্যা থুইয়া দিস।

শশার এক ফালি মায়মুনের হাতে দিয়ে জয়গুন এক ফালি তুলে নেয়। বাকী দুই ফালি রেখে দেয় হাসুর জন্যে।

শশা চিবোতে চিবোতে সে গত কয়েক বছরের কথা মনে করে। পঞ্চাশ সনের পর থেকে সে এ রকম পুরো তিরিশ রোজা রাখতে পারেনি। চার বছর পর এবার তিরিশ রোজা পুরিয়ে তার মনে শান্তির অবধি নেই। কিন্তু গত বছরগুলির চিন্তাও তাকে পেয়ে বসে। পঞ্চাশ সনে একটা রোজাও রাখা হয়নি। তার পরের বছর ছয়টা, তার পরে পাচটা এবং গত বছর সাতটা রোজা ভাঙা হয়েছে—সে মনে করে রেখেছে! জয়গুন হিসেব করে দেখে, এ কয় বছরে সে দু’ কুড়ি আটটা রোজা ভেঙেছে। নামাজ-রোজা সম্বন্ধে অনেক খুঁটিনাটি তার জানা। প্রথম স্বামী জরূর মুনশীর দৌলতেই তা সম্ভব হয়েছে। সে জানে, রমজানের একটা রোজা ভাঙলে তার বদলে তিনকুড়ি রোজা রাখতে হয় তবেই গোনা মাফ হয়।

জয়গুন হিসেব করতে চেষ্টা করে। আগেও সে করেছে কয়েকবার। একটা রোজার জন্যে ষাটটা হ’লে দুকুড়ি আটটার জন্য কতদিন রোজা রাখতে হয়। সে হিসেব করতে গিয়ে মাথা গুলিয়ে ফেলে। একশো পর্যন্ত সে ভালোমত গুনতে পারে না। এককুড়ি’ ‘দুই কুড়ি ‘ করে সে হিসেব করে। সুতরাং সে ক্ষান্ত হয়। কিন্তু তবুও সে আন্দাজ করে নিয়েছে অনেক বছর, হয়ত বা বাকী জীবনভর রোজা রেখেও সে আটচল্লিশ দিনের রোজা শোধ করতে পারবে না। সে আরো জানে, একটা রোজার জন্যে আশী হোক দোজখের আগুনে পুড়তে হবে। এক একটা হোক ইহকালের আশী বছরের সমান।

জয়গুনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে নামাজ সেরে তসবীহ নিয়ে বসে। তসবীহ জুপা এক সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। তার আবার মনে হয়, কেন? সে-ত জীবনভর রোজা রেখেই চলেছে। রোজা ছাড়া আর কি? বারো মাসের একদিনও সে পেট ভরে খেতে পায় না। ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত আধপেটা খেয়ে থাকে। পেট ভরে কবে সে শুধু দু’টো ভাত খেয়েছে তার মনে পড়ে না। পঞ্চাশ সনের কথা মনে হয়। একটা রোজাও রাখা হয়নি। রোজা রাখার কথা মনেও হয়নি। এক বাটি ফেনের জন্যে ছেলেমেয়ে নিয়ে কত জায়গায়, কত বাড়ীতে বাড়ীতে তাকে ঘুরতে হয়েছে। এক বাটি খিচুড়ির জন্যে শারখানায় লাইন ধরতে হয়েছে। কখনও ঘণ্টার পর ঘন্টা আধ-হাঁটু কাদার মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েছে। মাথার ওপর বৃষ্টি পড়েছে, রোদ জ্বলেছে। তার বেশী জ্বলেছে পেটের মধ্যে। যখন যেখানে যতটুকু পেয়েছে, খেয়েছে। পেট ভরেনি। পানি খেয়ে খেয়ে পেট ভরেছে। তার পরের বছরগুলিও চলেছে অতি কষ্টে। ছেলেমেয়েকে খাইয়ে কতদিন উপোস করতে হয়েছে। মাঝে মাঝে সারারাত সারাদিন কেটেছে একটা দানাও পড়েনি পেটে। রমজান মাসের রোজার চেয়েও যে ভয়কর এ রোজা। রমজানের একমাস দিনের বেলা শুধু উপোস। কিন্তু তার বারোমেসে রোজার যে অন্ত নেই।

কিন্তু তবুও জয়গুনের শান্তি নেই, সাত্বনা সে পায় না। তার অন্যায়ের জন্য সে খোদার। কাছে প্রার্থনা করে।

হাসু আসে রাত আটটায়। মোট বয়ে বারো আনা পেয়ে সে চার আনা দিয়ে একটা নারকেল নিয়ে আসে। জয়গুন দেখে রাগ করে—তোর আর আৰুল অইব কোনদিন! অত পয়সার নাইকল কিনতে গেলি ক্যান?

—ঈদের দিন এট্টু শিন্নিও খাই না?

—নাইকল বেগর আর শিন্নি অয় না! নোয়াবের পো নোয়াব! নাইকল বেগরই – পাকাইমু আমি। অইড়া বেইচ্যা ফালাবি কাইল।

হাসু ক্ষুণ্ণ হয়। বলে—থাউক আর শিন্নি রানতে অইব না, পান্তা ভাত আর মরিচ-পোড়া – খাওয়া কপাল। বচ্ছরের একটা দিন আর শিন্নি খাইয়া কি অইব!

জয়গুন চুপ করে। খানিক পরে আবার বলে—পরাণে খাইতে চায়, খাও। পয়সা কামাই করবা, খাইবা, আমার কি? দুই দিন বাদে যহন হকাইয়া তেজপাতা হইয়া যাইবা, তহন বোঝবা শিন্নির মজা!

খাওয়ার পর জয়গুন বাশের চোঙাটা নামায়। পয়সা রাখবার একমাত্র আঁধার এ চোঙাটা। মাটির ওপর ঢালে সমস্ত পয়সা। আনি, দুয়ানি, সিকি আলাদা আলাদা সাজিয়ে হিসেব করে। হাসুর আজকের আট আনাসহ মোট তিন টাকা দশ আনা। চাল কিনতে হবে। তেল, মরিচ, আরো অনেক কিছুই নেই। অনেক কিছুর মধ্যে লবণটা না কিনলেই চলে না। লবণ একটু বেশীই লাগে তার সংসারে। পান্তা ভাত খেতেই বেশী খরচ হয় লবণ।

হাসু বলে—একটা টুপি কিনার পয়সা দিবা, মা? কাইল ঈদের ময়দানে কি মাথায় দিয়া যাইমু?

—তোর টুপি কিনন লাগত না। টুপি একটা দিমু তোরে, তয় কাসুর লাইগ্যা একটা

হাসু সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলে—ওর একটা টুপি কিনতে আর কত লাগব? এই বড় জোর পাঁচ আনা, ছয় আনা।

মায়মুন একটু এগিয়ে মার দিকে চেয়ে ডাকে—মা।

—কি? থাইম্যা গেলি ক্যান? ক’।

পরিহিত কাপড়ের একটা ছেঁড়া জায়গা দেখিয়ে মায়মুন বলে—দ্যাহ মা, কেমুন ছিঁড়্যা গ্যাছে। ঈদের দিনে বেড়াইতে যাইমু না?

মেয়ের আবদার বুঝে রাগ হয় জয়গুনের। সে বলে—কি? কাপোড়?

—হ!

—হ! কাপোড়! কাপোড় দিয়া কবর দিমু তোরে শয়তান। ধাক্কা দিয়ে মায়মুনকে সরিয়ে ভেঙচিয়ে ওঠে জয়গুন।

হাসু মায়মুনের দিকে তাকায়। ব্যথায় তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

মায়মুন তাড়া খেয়ে শুয়ে পড়েছে। জয়গুন ডাকে—হাসুর গামছাটা পিন্দা কাপোড় খুইল্যা দে মায়মুন, সিলাইয়া দেই। কাইল রাইত গোয়াইলে সোডা দিয়া ধুইয়া দিমুহনে।

জয়গুন সুঁই-সুতা নিয়ে বসে। নিজের ও মায়মুনের কাপড়ে জোড়াতালি লাগায়। হাসু ও মায়মুন ঘুমিয়ে পড়েছে। মশার যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে। জয়গুন ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে মশা তাড়ায়।

সেলাই সারতে অনেক রাত হয়। রাত্রির নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ডাহুক ‘কোয়াক—কোয়াক’ করে ওঠে। চারদিকে পশুপাখীর ঘুম-কাতর সারা পাওয়া যায়। ঘরের হাঁস দু’টোও প্যাঁক প্যাঁক করে আবার ঠোঁট লুকায় পালকের মধ্যে। জয়গুন ভাবে—পইখ-পাখলার এক ঘুম হয়ে গেল।

জয়গুন কুপিটা নিবিয়ে মায়মুনের পাশ দিয়ে শুয়ে তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। অভ্যাসবশ মায়মুনও মা-র গলার ওপর একখানা হাত লতিয়ে দেয় ঘুমের ঘোষ। জয়গুনের বুক স্নেহে ভিজে ওঠে। সে ভাবে এ মেয়েটি কোন দিন তার কাছে আদর পায় না। আবদার করলে কিলথাপ্পড় খায়। কাপড় তার একখানা। তাও তালি দিয়ে দিয়ে এতদিন চলেছে। কিন্তু কাল ঈদ—বছরের সেরা দিন। এ কাপড়ে লজ্জা নিবারণ করা চলে, কিন্তু কুটুম্ব-বাড়ী যাওয়া চলে না। আর কুটুম্ব আছেই বা কে?

হাসুর চাচা আছে দু’জন। কিন্তু তারা হাসুর মৃত্যুই কামনা করে। জব্বর মুনশীর মৃত্যুর পর তার ভাগের তিন বিঘা জমি আর ঘরখানা পর্যন্ত হাসুর চাচা দু’জন জোর করে ভোগ-দখল করছে। এগুলোর আশা জয়গুন ছেড়েই দিয়েছে। হাসু বড় হয়ে যদি কোনদিন আদায় করতে পারে।

জয়গুন আবার ভাবে—হাসু ও মায়মুনের কপালে কুটুম্ব-বাড়ীর এক মুঠো ভাত লেখা নেই।

জয়গুন মায়মুনের চুলের মাঝে হাত দেয়। আঙুলের সাথে জড়িয়ে আসে এক গোছা চুল।

মায়মুন কোন কিছুর আবদার করলে বা কোন অন্যায় করলে সে চুল ধরে টান মারত। টানতে টানতে সে-ই আলগা করে দিয়েছে চুলগুলো। চুলগুলোর জন্যে তার মায়া হয়। চুলের মুঠি ধরে টানাটানি না করলে তার চুল এতদিন হয়ত কোমর অবধি লম্বা হত।

জয়গুন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, মায়মুনকে আর সে মারধর করবে না। অন্ততঃ তার চুল ধরে আর সে টানাটানি করবে না। মেয়ে বলে মায়মুনকে এতদিন সে অনাদর করেই আসছে। কিন্তু আর না। হাসু কোলের আর মায়মুন পিঠের—তাতো নয়! দু’জনকেই সে পেটে ধরেছে। আর মেয়ে হলেও মায়মুন লক্ষ্মী। সে বাইরে গেলে মায়মুনই সব কাজ করে। গায়ে এতটুকু জোর না থাকলেও কোন কাজ সে বড় ফেলে রাখে না।

মায়মুনের জন্যে আর কোন দিন জয়গুন এমন করে ভাবেনি। আজ হাসু ও মায়মুন তার চোখে সমান হয়ে গেছে।

অল্প কয়েকটা মাত্র চুল মায়মুনের মাথায়। বাদরের লোমের মত লালচে। যত্ন ও তেলের অভাবে জট পাকিয়ে গেছে। জয়গুন অন্ধকারে মাথা হাতড়ে উকুন মারে। উকুনে গিজগিজ করছে মাথা। রাত্রে রাত্রে এমনি করে মেরে সে কমিয়ে রেখেছে। নয় তো উকুনের আণ্ডা-বাচ্চায় এতদিন মাথা ছেয়ে যেত। তার নিজের মাথায় উকুন টিকতে পারে না। নানা চিন্তা-ভাবনায় মাথা গরম থাকে বলেই বোধ হয়।

অনেক রাত হয়েছে। উকুন বাছতে বাছতে মায়মুনের মাথায় হাত রেখেই জয়গুন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।