Author: তাহের আলমাহদী

  • দ্বিতীয় অধ্যায়

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    পিতৃপুরুষের শিকড়ের সন্ধান

    আমার পিতৃপুরুষের আদি বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রসুল্লাবাদ গ্রামে অবস্থিত। এই বংশের উৎপত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে দিল্লির একটি ঘটনা মনে পড়ে। ১৭৩৯ সালে দিল্লিতে ঘটনাটি ঘটে। ওই বছর পারস্যের সম্রাট নাদির শাহ কর্নালের যুদ্ধে মোগল সম্রাটকে পরাজিত করে দিল্লি অধিকার করেন। দিল্লিতে কিছু দুষ্ট লোক নাদির শাহ গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হয়েছেন গুজব রটিয়ে পারস্যের কিছু সৈন্যকে আক্রমণ করে। ক্রুদ্ধ হয়ে নাদির শাহ তার সৈন্যদের শিশু-নারী-পুরুষনির্বিশেষে দিল্লির সব অধিবাসীকে খুন করার আদেশ দেন। হাজার হাজার দিল্লিবাসী এই আক্রমণে নিহত হয়। মোগল সম্রাট বাধ্য হয়ে নাদির শাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণের শর্ত ছিল দুটি। প্রথমত, মোগল সম্রাটের সব সম্পদ যেখানে রক্ষিত, সেই ভাণ্ডারের চাবি নাদির শাহর হাতে তুলে দিতে হবে। নাদির শাহ ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর, হীরাসহ বহু মূল্যের অলংকার পারস্যে পাঠিয়ে দেন। দ্বিতীয় শর্ত ছিল মোগল সম্রাটের কনিষ্ঠ কন্যা–যার কুমারী নাম ছিল জাহান আফরোজ বেগম, তার সঙ্গে নাদির শাহর কনিষ্ঠ পুত্র জাহদুল্লাহ মির্জার বিয়ে দিতে হবে। ২৬ মার্চ ১৭৩৯ তারিখে দিল্লিতে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়ের কাজি নাদির শাহর ওপর একটি ছোট প্রতিশোধ নিতে চান। তিনি দাবি করেন, বর ও কনের পূর্বপুরুষদের পরিচয় বর্ণনার পর তাদের বিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে কনের পরিচয় দেওয়া হলো। পরিচয় শুরু হলো তৈমুর লং এবং চেঙ্গিস খান থেকে। তাদের ধারাবাহিকতায় জহিরউদ্দিন বাবর পর্যন্ত পরিচয় দেওয়া হলো। এরপর ভারত দখলের পর ১২ জন মোগল সম্রাটের নাম উল্লেখ করা হলো। দ্বাদশ মোগল সম্রাটের নাম ছিল মোহাম্মদ শাহ রঙ্গিলা, তিনি ছিলেন কনের পিতা। রঙ্গিলা শব্দটি ছিল তার ছদ্মনাম। এই নামে তিনি কবিতা লিখতেন। কনের পরিচয়ের পর বরের পরিচয় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। পারস্যের পক্ষ থেকে বলা হলো, বর হচ্ছেন সম্রাট নাদির শাহর পুত্র। এরপর প্রশ্ন করা হলো নাদির শাহর পিতা কে ছিলেন? জবাবে বলা হলো, Nadir Shah is a son of the sword.’ তরবারির জোরে তিনি রাজা হয়েছেন। তার কোনো বংশপরিচয় নেই। যখন প্রশ্ন করা হলো নাদির শাহর পিতামহ কে ছিলেন? তখন জবাব দেওয়া হলো যে তাদের সব পূর্বপুরুষ ছিলেন তরবারির সন্তান (Son of the sword)।

    রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা বামুন খাঁ ছিলেন নাদির শাহর মতো। তাঁর পিতৃপুরুষের কোনো পরিচয় নেই। বামুন শব্দটির অর্থ ব্রাহ্মণ। সাধারণত হিন্দু থেকে যারা মুসলমান হতেন, তাঁরা খাঁ উপাধি ধারণ করতেন। বামুন খাঁ নামের অর্থ হলো যে একজন ব্রাহ্মণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে খাঁ উপাধি ধারণ করে এ বংশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু এই ব্রাহ্মণের নিশ্চয়ই সংস্কৃত নাম ছিল। সে নাম কী তা কেউ জানে না। উপরন্তু কোন শ্রেণির ব্রাহ্মণ তিনি, কোথা থেকে তিনি রসুল্লাবাদ এসেছেন–এসবই অবগুণ্ঠনে ঢাকা।

    এখানে অনেক প্রশ্ন ওঠে। প্রথম প্রশ্ন হলো সত্যি সত্যিই বামুন খাঁ বলে কেউ ছিলেন কি না, যিনি হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। খাঁ বংশের সবাই বিশ্বাস করে যে বামুন খাঁ বাস্তবে ছিলেন এবং তিনি হিন্দু ছিলেন। এই বিশ্বাসের পক্ষে কিছু যুক্তি রয়েছে।

    প্রথম যুক্তি হলো বামুন খাঁ এবং তাঁর উত্তরসূরিরা সুদের ব্যবসা করতেন। ইসলাম ধর্মে সুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাজেই খাঁটি মুসলমানদের পক্ষে সুদের ব্যবসা করা সম্ভব ছিল না। যেহেতু বামুন খাঁ হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছিলেন, সেহেতু তিনি সুদের ব্যবসা করতে পেরেছেন।

    দ্বিতীয়ত, খাঁ বাড়িতে অনেক হিন্দু প্রথা প্রচলিত ছিল। ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত খাঁ বাড়ির বেশির ভাগ সন্তানই পিতাকে বাবা বলে সম্বোধন করত। এদের অনেকেই ধুতি পরত।

    তবে এখানে আরও দুটি নতুন প্রশ্ন ওঠে। প্রথম প্রশ্ন হলো ব্রাহ্মণেরা শাস্ত্রচর্চা করতেন। তাদের জন্য সুদ গ্রহণের ওপরে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ছিল। এর উত্তর হতে পারে, বামুন খাঁ যত দিন হিন্দু ছিলেন, তত দিন সুদের ব্যবসা করেননি। সুতরাং মুসলমান হওয়ার পরে হিন্দুধর্মের নিষেধাজ্ঞা তাঁর ওপর বলবৎ ছিল না।

    দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো তিনি ব্রাহ্মণ হলে কী তাঁর পদবি এবং কোথায় তাঁর আদি আবাস ছিল। তাঁর মূল পদবি সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। তবে আদি আবাস সম্বন্ধে কিছু আভাস পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, তিনি হাওর অঞ্চলে ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান ছিলেন। তাঁর আদি নিবাস সম্ভবত নেত্রকোনা কিংবা সুনামগঞ্জের কোনো হাওরে ছিল। এই উক্তির সমর্থনে আমার বাবার একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন নেত্রকোনা অথবা সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল থেকে বামুন খাঁর পিতৃবংশের একজন প্রতিনিধি এসেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বামুন খাঁর বংশধরদের বংশতালিকা প্রণয়ন করা। তবু শুধু এ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বামুন খাঁ ব্রাহ্মণ ছিলেন–এ তথ্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন।

    এ বিষয়ে খাঁ বাড়ির সদস্যরা কোথায় বিয়ে করেছেন, সে সম্পর্কে তথ্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। মধ্যযুগের মুসলিম বাংলায় যেসব অভিজাত পরিবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করেছিলেন, তারা তাদের কন্যাদের অনুরূপ শরিফ পরিবারে বিয়ে দিতেন। কোনোমতেই তারা নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের কাছে তাদের কন্যা বিয়ে দিতে রাজি হতেন না। কিন্তু ব্রাহ্মণ থেকে যারা মুসলমান হতেন, তাঁদের শরিফ পরিবারের সমকক্ষ বলে বিবেচনা করা হতো। এ ধরনের পরিবারের সঙ্গে বিয়েতে কোনো আপত্তি ছিল না। যদি আমরা খাঁ বাড়ির বউদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করি, তাহলে দেখা যাবে বেশির ভাগই ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন স্থানের অভিজাত পরিবারের সন্তান। প্রায় দুই শ বছর ধরে খাঁ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছেন ফরদাবাদ মুন্সিবাড়ির মেয়ে, কসবা উপজেলার মাধবপুর গ্রামের মিয়া বাড়ির মেয়ে, রূপসদী সাব (সাহেব) বাড়ির মেয়ে, বড়িকান্দির দেওয়ান বাড়ির মেয়ে, মোচাকান্দার খন্দকার বাড়ির মেয়ে ইত্যাদি। এসব বিয়েশাদি থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে সম্ভবত বামুন খাঁ একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন, অন্যথায় শরিফ পরিবারের মুসলিম মেয়েদের তার পরিবারে বিয়ে হতো না।

    বামুন খাঁ কবে রসুল্লাবাদে বসতি স্থাপন করেছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ তথ্য নেই। তবে বামুন খাঁর পরবর্তী বংশধরদের সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে তার রসুল্লাবাদ আগমনের সময়সীমা সম্পর্কে একটি ধারণা করা যেতে পারে। এ সম্পর্কে তথ্য রেখাচিত্র ২.১-এ দেখা যাবে।

    রেখাচিত্র ২.১

    বামুন খাঁ থেকে ছাদত আলী খাঁ পর্যন্ত বংশতালিকা

    বামুন খাঁ (জন্ম : ১১৭১ বঙ্গাব্দ বা আনুমানিক ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দ)

    দুলাল খাঁ (জন্ম : ১১৯১ বঙ্গাব্দ বা আনুমানিক ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)

    সমন খাঁ (জন্ম : ১২২১ বঙ্গাব্দ বা আনুমানিক ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দ)

    সবদর আলী খাঁ (জন্ম : ১২৪৬ বঙ্গাব্দ বা আনুমানিক ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দ)

    ছাদত আলী খাঁ (জন্ম : ১২৭১ বঙ্গাব্দ বা আনুমানিক ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দ)

    তথ্যসূত্র : ছাদত আলী খাঁর কবরের প্রস্তরলিপি

    এঁদের সবাই রসুল্লাবাদ পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত রয়েছেন। তবে ছাদত আলী খাঁর পূর্বপুরুষদের কবরের কোনো চিহ্ন নেই এবং কোনো প্রস্তরলিপিও নেই। পারিবারিক কবরস্থানে ছাদত আলী খাঁর কবরের ওপর প্রস্তরলিপি পাওয়া গেছে। সেই প্রস্তরলিপিতে লেখা হয়েছে ছাদত আলী খাঁর জন্ম। ১২৭৩ বঙ্গাব্দে (১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মৃত্যু ১৩৪০ (১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) বঙ্গাব্দে।

    সাধারণত জনসংখ্যাতত্ত্বে প্রতি প্রজন্মের বয়সকাল ২৫ বছর অনুমান করা হয়ে থাকে। এই অনুমানের ভিত্তিতে আমরা ছাদত আলী খাঁর পূর্বপুরুষদের সময়কাল নির্ধারণ করতে পারি। ছাদত আলী খাঁর জন্মের তারিখের ভিত্তিতে হিসাব করলে তার পিতা সবদর আলী খাঁর জন্ম হয়েছিল ১২৪৬ বঙ্গাব্দের কাছাকাছি সময়। সবদর আলী খাঁর পিতা সমন খার জন্মতারিখ হবে ১২২১ বঙ্গাব্দের কাছাকাছি। সমন খাঁর পিতা দুলাল খাঁর জন্ম হয়েছিল ১১৯৬ বঙ্গাব্দের কাছাকাছি সময়ে। তাঁর পিতা বামুন খার জন্মতারিখ ১১৭১ বঙ্গাব্দের কাছাকাছি হওয়ার কথা, যা ছিল ইংরেজি সাল ১৭৬৪ খ্রিব্দাব্দ।

    এই হিসাব অনুসারে পলাশীর যুদ্ধের সাত বছর পর বামুন খাঁর জন্ম হয়। ওই সময়টা ছিল বাংলায় রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলায় ইংরেজদের আধিপত্য ঘটে এবং ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ান হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলার সার্বভৌম অধিপতিরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৫৭ থেকে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত ইংরেজ শাসকেরা রাজস্ব আদায়ের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা করে। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলায় জমিদারি প্রথা প্রবর্তন করা হয়। ১৭৯৩ সালে বামুন খাঁর বয়স ২২-এর কাছাকাছি হওয়ার কথা। সম্ভবত এই সময়ের কাছাকাছি কোনো সময়ে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তার কোনো কারণ জানা যায় না।

    অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দু মুসলমান শাসকদের অত্যাচারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হন। উদাহরণস্বরূপ পঞ্চদশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃপুরুষদের অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যায়। কথিত আছে, একজন হিন্দু সেনানায়ক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে মোহাম্মদ তাহির খান নাম গ্রহণ করেন। তিনি পীরআলী নামে পরিচিত ছিলেন। কথিত আছে, তিনি রমজান মাসে রোজা রেখেছিলেন এবং দিনের বেলা বসে দরবার করছিলেন। দরবারে এক ব্যক্তি কিছু লেবু পীরআলীকে উপহার দেন। পীরআলী লেবুর গন্ধ গ্রহণ করেন এবং লেবুর সুগন্ধের প্রশংসা করেন। সেই সময়ে কামদেব এবং জয়দেব নামে দুজন ব্রাহ্মণ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বললেন, ‘ঘ্রাণং অর্ধ ভোজনং’ (ঘ্রাণ নিলে অর্ধেক খাওয়া হয়ে যায়)। যেহেতু পীরআলী লেবুর ঘ্রাণ গ্রহণ করেছেন, সেহেতু তিনি অর্ধেক লেবু খেয়ে ফেলেছেন। তাই তার উপবাস ভেঙে গেছে। এই বক্তব্যে পীরআলী ব্রাহ্মণদের ওপরে খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং কয়েক দিন পর ব্রাহ্মণদের তাঁর সভায় আমন্ত্রণ জানান। ব্রাহ্মণেরা যখন সভায় উপস্থিত হন, তখন সেখানে অনেক বকরি আর গোমাংস রান্না করা হচ্ছিল। ব্রাহ্মণেরা যখন সভায় উপস্থিত হলেন, তখন চুলার ওপর রন্ধনরত মাংসের ঢাকনা খুলে দেওয়া হয়। পুরো সভাস্থল মাংসের গন্ধে ভরপুর হয়ে ওঠে। পীরআলী তখন দাবি করলেন, যারা মাংসের ঘ্রাণ গ্রহণ করেছে, তারা সবাই গোমাংস খেয়েছে। সুতরাং তারা আর হিন্দু থাকতে পারবে না। কামদেব ও জয়দেবকে বাধ্য হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হয়। অনেক ব্রাহ্মণ সভাস্থল থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু সমাজে তারা পতিত হয়ে হয়ে যান। এ ধরনের ব্রাহ্মণেরা পীরআলী ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পীরআলী ব্রাহ্মণদেরই বংশধর ছিলেন। হতে পারে বামুন খাঁ এ ধরনের কোনো মুসলমান জমিদারের হাতে পড়ে তার কৌলীন্য হারান এবং বাধ্য হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

    অনেকে সন্দেহ করেন, মুসলমান জমিদারদের খামখেয়ালিপনার জন্য বামুন খাঁ মুসলমান হননি। তিনি সম্ভবত জমিদারদের অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন। অন্যথায় প্রশ্ন ওঠে সুদের ব্যবসা করার মতো অর্থ তিনি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এ অনুমানের পক্ষে আরেকটি যুক্তি হলো বামুন খাঁর আদিগোষ্ঠীর লোকেরা তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও তার সন্তানসন্ততির সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়েছে। হয়তো এমনও হতে পারে তিনি কোনো জমিদারের অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং সেই অর্থ দিয়ে তার বাপের বাড়ির আর্থিক সমস্যা দূর করেন। পরে ধরা পড়ে গেলে তিনি বাধ্য হয়ে মুসলমান হন।

    মুসলমান হওয়ার পর তিনি আর হাওর অঞ্চলে থাকেন না। তিনি চলে আসেন মেঘনা নদী পার হয়ে নবীনগর উপজেলায়। সারণি-২.১-এ ১৮৭২ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে মোট জনসংখ্যায় মুসলমানদের হারসংক্রান্ত তথ্য দেখা যাবে।

    সারণি-২.১

    বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে মোট জনসংখ্যায় মুসলমানদের হার

    প্রশাসনিক অঞ্চল মোট জনসংখ্যায় মুসলমানদের হার
    নবীনগর থানা ৭১.৩%
    ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা ৫৩.৩৭%
    কুমিল্লা সদর মহকুমা ৬৯.৪৬%
    সুনামগঞ্জসহ সিলেট মহকুমা ৪৯.১%
    কিশোরগঞ্জ মহকুমা ৫৯.৮%
    নেত্রকোনাসহ ময়মনসিংহ সদর ৬২.২২%

    উৎস : Census of Bengal 1872

    ১৮৭২ সালে যে হারে মুসলমান জনসংখ্যা এ অঞ্চলগুলোতে ছিল, অনুমান করা যায় ১০০ বছর আগেও একই ধরনের হার বিদ্যমান থাকা স্বাভাবিক। নবীনগর থানায় আশপাশের অঞ্চলের চেয়ে মুসলমান জনসংখ্যার হার অনেক বেশি ছিল। রসুল্লাবাদ গ্রামে হিন্দু ছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এখানে প্রায় ২০ শতাংশ লোক হিন্দু ছিল। এই হিন্দুদের মধ্যে কিছু অভিজাত পরিবার যথা (পাল, আচার্য) ইত্যাদি উচ্চবর্ণের পরিবার ছিল, বাকি সবাই ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু। এদের অনেকেই জেলের কাজ করত। মেঘনা নদী থেকে একটি খাল তিতাস নদীর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। এই খালটি ‘যোবনাই নদী’ নামে পরিচিত। এই নদী দিয়ে জেলেরা নদী ও জলাভূমি থেকে মাছ ধরত। কয়েকটি পরিবার স্বর্ণকার ছিল। এদেরকে বণিক পরিবার বলা হতো। এ ছাড়া কয়েকটি পরিবার কাঠের মিস্ত্রির কাজ করত। এরা সূত্রধর নামে পরিচিত ছিল। এ ছাড়া নাপিত, ধোপা ইত্যাদি কাজও অনেক হিন্দু পরিবার করত। তবে ভারত বিভাগের পর হিন্দুদের অনেক পরিবারই ভারতে অভিবাসন করে। বর্তমানে রসুল্লাবাদ গ্রামে মোট জনসংখ্যায় হিন্দুদের অনুপাত ১০ শতাংশের বেশি হবে না। তবে বামুন খাঁ রসুল্লাবাদ গ্রাম কেন নির্বাচন করেন, সে সম্বন্ধে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। রসুল্লাবাদ গ্রাম মেঘনার অপর পার থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। সুতরাং হাওর অঞ্চলের কোনো জমিদারের পক্ষে বামুন খাঁকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এ অঞ্চলে অভিযান চালানো কঠিন ছিল।

    রসুল্লাবাদ গ্রাম নির্বাচনের আরেকটি কারণ হতে পারে এখানে কোনো শরিফ মুসলমান বংশ ছিল না। এই গ্রামে তখন অধিকাংশ মানুষই ছিল গরিব চাষি। এই গরিব চাষিদের একটি কন্যাকে তিনি বিয়ে করেন এবং রসুল্লাবাদ গ্রামের এক প্রান্তে তার বসতি স্থাপন করেন। খাঁ বাড়ি রসুল্লাবাদ গ্রামের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এ বাড়ির পাশ দিয়ে একটি খাল মেঘনা নদী থেকে তিতাস পর্যন্ত গেছে। এ খালটির পাশে বামুন খাঁ তার আবাস স্থাপন করেন।

    বামুন খাঁ মহাজনি ব্যবসা করে সচ্ছল ছিলেন। তার একটিমাত্র ছেলে ছিল, যার নাম ছিল দুলাল খাঁ। তিনি তাঁর বাবার মতো মহাজনের কারবার করতেন। মহাজনের ব্যবসা তখন অত্যন্ত লাভজনক ছিল। ইংরেজ শাসকেরা জমির খাজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে সেই খাজনার ভিত্তিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম করেন। সুতরাং যখনই কোনো প্রাকৃতিক দুর্বিপাক দেখা দিত, তখন খাজনা দেওয়ার জন্য কৃষকদের অর্থাভাব দেখা দিত। এই অর্থাভাব মেটানোর একমাত্র উপায় ছিল মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ হারে ঋণ গ্রহণ করা। অনেক কৃষকই এই ঋণ পরিশোধ করতে পারতেন না এবং এঁদের জমিজমা মহাজনরা দখল করে নিতেন। এভাবে দুলাল খাঁ আরও ধনী হয়ে ওঠেন। দুলাল খারও একটি ছেলে ছিল। তার নাম ছিল সমন খাঁ। তিনিও বাবার মতো মহাজনি ব্যবসা করে অনেক অর্থ উপার্জন করেন।

    দুলাল খাঁ অথবা সমন খাঁ এ দুজনের একজনের সময় থেকে খাঁ বাড়িতে সন্ধ্যায় ঘৃতের প্রদীপ জ্বালানো হতো। সে সময় লোকে বিশ্বাস করত যে লাখ টাকার ওপর যাদের অর্থ রয়েছে, তাঁদের ঘরে লক্ষ্মী ধরে রাখার জন্য ঘৃতের প্রদীপ জ্বালাতে হবে। লক্ষণীয়, হিন্দুদের এই প্রথা খাঁ বাড়িতে চালু ছিল। এঁদের ঐশ্বর্য চূড়ান্ত পর্যায়ে যায় সবদর আলী খাঁর সময়ে। সবদর আলী খাঁ শুধু মহাজনি ব্যবসাই করতেন না, তিনি রসুল্লাবাদ গ্রামের বেশির ভাগ জমির মালিক ছিলেন। আশপাশের গ্রামে তালুকদারিতেও অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন।

    সবদর আলী খাঁ ফরদাবাদ গ্রামে মুন্সিবাড়ির সম্ভবত মুন্সি রুকনুদ্দিনের মেয়েকে বিয়ে করেন। ফরদাবাদ শব্দটির উৎপত্তি হয় ফরিদউদ্দিন মুন্সির নাম থেকে। এই মুন্সিই ফরদাবাদ গ্রাম স্থাপন করেন। কথিত আছে, সবদর আলী খাঁর স্ত্রীর গায়ের রং কালো ছিল। সে জন্য সবদর আলী খাঁ কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ ছিলেন। এই কুলীন স্ত্রীর গর্ভে তার ছয় ছেলে হয়। এঁরা হলেন (১) ছাদত আলী খাঁ, (২) উলফত আলী খাঁ, (৩) কামাল উদ্দিন খাঁ, (৪) তোজাম্মল আলী খাঁ, (৫) মোয়াজ্জেম আলী খাঁ ও (৬) রেসালত আলী খাঁ। কিন্তু তিনি স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত ছিলেন না। গ্রামের কুমারী মেয়েদের পেছনে ঘুরে বেড়াতেন। একপর্যায়ে গ্রামের মধ্যপাড়ার ছামেদের নেছা নামে সাধারণ ঘরের এক মেয়েকে বিয়ে করেন এবং এ তথ্য পরিবারের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু তার প্রথমা কুলীন স্ত্রী এ তথ্য জানতে পেরে ওই বউকে নিজে ঘরে এনে তোলেন এবং এদের খাঁ বাড়ির পাশে নিচু ভূমিতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ওই স্ত্রীর গর্ভে সবদর আলী খাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে হয়। এঁরা কেউই লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাননি। এঁদের খাঁ বাড়ির সম্পত্তির অংশও দেওয়া হয়নি। ওই পরিবারকে খাঁ বাড়ির অধিকাংশ সদস্য রক্ষিতার পরিবার হিসেবে গণ্য করে থাকে। এ নিয়ে ছামেদের নেছার পক্ষ থেকে কখনো কোনো আপত্তি করা হয়নি।

    ১৮৫০ থেকে ১৯২০-এই ৭০ বছর ছিল খাঁ বাড়ির সর্বোচ্চ আর্থিক সচ্ছলতার সময়। একই সঙ্গে তখন চলছিল মহাজনি কারবার, তালুকদারি এবং চাষবাস। রসুল্লাবাদ গ্রামের তালুকদারির খাজনা ছিল ১৯০০ সালের দিকে বছরে ১ হাজার ৭০০ টাকা। এ খাজনা জমিদারকে দিতে হতো। এর বাইরে যে খাজনা আদায় হতো, সেটা তালুকদারের থাকত। এ ছাড়া ১৩টি গ্রাম নিয়ে আরেকটি তালুকদারি ছিল। এই তালুকদারির বার্ষিক খাজনা ছিল বছরে ৫১০০ টাকা। এই তালুকের মধ্যে যেসব গ্রাম অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাদের মধ্যে রয়েছে কাঁঠাইল্যা, খুররা, কড়ইবাড়ি, বড় শিকানিকা, ছোট শিকানিকা, দাল্লা, মোল্লা, কালঘরা, লোড়ি, গোপালপুর ও দামলা (শাহপুরের কাছে)। খাঁ বাড়ির তালুকদারি ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ছিল। প্রতিবছর কাঁঠাইল্যাতে পুণ্যাহ (বাৎসরিক খাজনা আদায়ের প্রথম দিনের অনুষ্ঠান) অনুষ্ঠিত হতো। এ সম্পর্কে তথ্যসমূহ দিয়েছেন আমার মরহুম চাচাতো ভাই আনোয়ার আলী খাঁন।

    প্রথম দিকে খাঁ বাড়ির আয়ের সিংহভাগ আসত মহাজনি ব্যবসা থেকে। রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে মহাজনি ব্যবসার আকার হ্রাস পায়। এর কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথম কারণ ছিল শরিফ মুসলমান পরিবারে বিয়ে করার পর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশা করত যে এরা ইসলাম ধর্মের মূল নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। ইসলাম ধর্মে সুদের ব্যবসার স্থান ছিল না। দ্বিতীয়ত, দেশে মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জমে উঠছিল। খাঁ বাড়ির কর্তারা এ ধরনের বিবাদে জড়িত হতে উৎসাহী ছিলেন না। সবশেষে প্রথম চার প্রজন্ম ধরে খাঁ বাড়িতে একটিমাত্র পুত্রসন্তান ছিল। একজনের পক্ষে বিরাট বড় সুদের ব্যবসা সামাল দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই আস্তে আস্তে মহাজনি ব্যবসা থেকে খাঁ বাড়ির আয় কমে যায়। খাঁ বাড়ির অধিকাংশ আয় আসে জমি চাষ এবং তালুকদারি থেকে। বিংশ শতাব্দীতে খাঁ বাড়ির সন্তানেরা প্রজাদের রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য মহাজনি ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁরা ঋণ সালিসি বোর্ডের নেতৃত্ব দেন এবং সাধারণ কৃষকদের মহাজনের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি দেন।

    সমৃদ্ধির সময়ে খাঁ বাড়ি ছিল একটি যৌথ পরিবার। বামুন খাঁ থেকে সবদর আলী খাঁ পর্যন্ত যেহেতু পরিবারের ছেলে মাত্র একজন ছিল, সেহেতু যৌথ পরিবারে একসঙ্গে থাকায় কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু সবদর আলী খাঁর ছয় ছেলে হওয়ার পর যৌথ পরিবার নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

    মূল খাঁ বাড়ি প্রায় তিন বিঘার ওপরে স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে এক বিঘার মতো জমিতে একটি বড় পুকুর, পারিবারিক কবরস্থান এবং খালের তীরবর্তী রাস্তা অবস্থিত ছিল। দুই বিঘার মধ্যে আবাস গড়ে তোলা হয়েছিল। যেহেতু সে সময়ে ছেলেমেয়েরা অল্প বয়সে বিয়েশাদি করত, সেহেতু ১৯০০ সালের পরে এদের অনেকেরই নাতি-নাতনির জন্ম হয়। এই পরিবেশে খাঁ বাড়িতে স্থানাভাব দেখা দেয়। ছয় ভাইয়ের জন্য উপযুক্ত ঘর এবং বৈঠকখানা নির্মাণ করতে হয়েছে। বাড়িতে ছয় ভাই ও পিতার জন্য কমপক্ষে সাতটি ঘোড়া ছিল। খাবার এবং চাষের জন্য গরু ও বলদ ছিল, ছাগল ছিল। এদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এদের খাবারের জন্য খড়ের গাদা তৈরি করতে হয়েছে। এসব মিলে বাড়িতে তীব্র স্থানাভাব দেখা দেয়।

    প্রথম দিকে বাড়ির অভিভাবকেরা সমস্যাটি বুঝতে পারেননি। অতি জনাকীর্ণ হয়ে পড়ার ফলে বাড়িতে নিরাপত্তার সমস্যা দেখা দেয়। বাড়িতে প্রায়ই আগুন লাগে। প্রথমে অগ্নিকাণ্ডকে দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয় কিন্তু আগুন নেভানোর কয়েক মাসের মধ্যে আবার দ্বিতীয়বার লাগে এবং ঘন ঘন আগুন লাগতে শুরু করে। দুই-তিন বছরের মধ্যে বাড়িতে সাতবার আগুন লাগে। কেউ কেউ বলেন যে শত্রুরা আগুন লাগিয়েছে। তবে অনেকেরই ধারণা, অতি জনাকীর্ণ হওয়ার ফলেই এতবার আগুন লেগেছে। আগুনে অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক মূল্যবান সম্পদ এবং কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব ছিল না। যদিও ছেলেরা আস্তে আস্তে যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের পরিবার গড়ে তুলছিলেন, তবু ছয় ভাই একই সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতে চান। কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে পুরোনো বাড়িতে ছয় ভাইয়ের স্থান সংকুলান হবে না। সুতরাং একটি নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে হবে।

    এ নতুন বাড়ির স্থান নির্বাচন করা হয় পুরোনো বাড়ির পাশে যে খাল ছিল সেই খালের অপর পাড়ে। এখানে প্রায় ১৮ বিঘা চাষের জমিতে খাঁ বাড়ি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। চাষের জমিকে আবাসযোগ্য করার জন্য ছয় বিঘার ওপর একটি বিরাট দিঘি খনন করা হয়। এই দিঘির চারপাশে ছয় ভাইয়ের আবাসের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হয়। এই দিঘি কাটাতে এবং চাষের জমিকে বাসযোগ্য করার জন্য মাটি ফেলতে কয়েক বছর সময় লাগে। মাটি ফেলার পর বাসস্থানের জায়গায় সবাই আম, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছের চারা রোপণ করে। ১৯৩০-এর দশকে দুই ভাইয়ের অংশে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এক অংশে পাকা দেয়ালের ওপর টিনের চাল দেওয়া হয়। আরেক অংশে দালান নির্মাণ করা হয়। নির্মিত দালানে নির্মাণের তারিখ ১৯৩৬ সাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই দুই ভাই ছাড়া আর বাকি কেউ নতুন বাড়িতে আবাস নির্মাণ করতে পারেননি। তার কারণ হলো তখন খাঁ বাড়িতে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে গেছে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছাদত আলী খাঁ ১৯৩৩ সালে মারা যান। এর ফলে তার বংশধরেরা নতুন বাড়ি নির্মাণ করেননি। তার অন্য ভাইয়েরা নতুন বাড়ি নির্মাণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। দিঘির পাড়ের চার ভাইয়ের অংশ এখনো শূন্য পড়ে আছে।

    খাঁ বাড়ির ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন আসে উনিশ শতকের শেষ দিকে। সবদর আলী খাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছাদত আলী খাঁ কসবা উপজেলার মাধবপুর গ্রামে খোদা নেওয়াজ খাঁর কন্যা বেগম উমদাতুননেছাকে বিয়ে করেন। খোদা নেওয়াজ খাঁর পরিবার মিয়াবাড়ি নামে পরিচিত। কথিত আছে যে মিয়াবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার অনুগত সেনাপতি মোহন লালের এক বংশধর। পলাশীর যুদ্ধের পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মাধবপুর গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। শোনা যায়, সেই গ্রামে এখনো ফেব্রুয়ারি মাসে মোহন লালের বংশধরের ইসলাম গ্রহণের স্মৃতি স্মরণ করে মেলা বসে। এই বংশের একজন অংশীদারের নাম ছিল গোলাম নবী। তাঁর একমাত্র মেয়ে ছিল রাহাতুননেছা বেগম। এই মেয়েকে বিয়ে করে কিশোরগঞ্জের হায়বতনগর এবং জঙ্গলবাড়ীর জমিদার বংশের ছেলে খোদা নেওয়াজ খাঁ মাধবপুরে ঘরজামাই হয়ে আসেন। খোদা নেওয়াজ খাঁ ঈশা খাঁর বংশের দশম প্রজন্মের সদস্য ছিলেন। খোদা নেওয়াজ খাঁর পাঁচ ছেলে ছিল। তিনি তাদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য ঢাকা শহরে পাঠান। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ফতেদাত খাঁ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর সেরেস্তাদার হিসেবে বিচার বিভাগে কাজ করেন। তাঁর অন্য ছেলেরা স্কুলের পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করতে পারেননি। কাজেই তারা গ্রামেই থেকে যান। এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন ইমদাদ খা। যার ডাকনাম ছিল মিন্টু মিয়া। তিনি ছিলেন দরবেশ। তাঁকে ছোটবেলায় তাঁর একমাত্র বোন উমদাতুননেছা লালন-পালন করেছেন। তাই তিনি বোনের অত্যন্ত অনুগত ছিলেন। দরবেশ হয়ে যাওয়ার পর তিনি প্রায়ই দীর্ঘদিনের জন্য উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে দর্গাসমূহ জিয়ারত করার জন্য চলে যেতেন। তারপর অনেক দিন পরে ফিরে এসে রসুল্লাবাদের বোনের বাড়িতে থাকতেন। তিনি মাধবপুরের পৈতৃক বাড়িতে থাকা পছন্দ করতেন না। রসুল্লাবাদ গ্রামের লোকের বিশ্বাস, এমদাদ খাঁর অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। সে জন্য জীবদ্দশাতেই লোকজন তাকে শ্রদ্ধা করত। ১৯৩৫ সালে তিনি রসুল্লাবাদে মারা যান। খাঁ বাড়ির কবরস্থানে তিনি সমাহিত আছেন। রসুল্লাবাদ গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করেন যে রাতের অন্ধকারে কবরস্থানে এই দরবেশ উঠে দোয়া-দরুদ পড়েন। অনেকে দাবি করেন যে জোনাকির আলোতে অন্ধকার রাতে তাঁকে কবরস্থানে দেখা যায়। অনেকে এসব কেরামতিতে বিশ্বাস করেন, আবার অনেকে বিশ্বাস করেন না।

    ছাদত আলী খাঁর বিয়ের পর তার শ্বশুর তাঁকে বললেন, ‘বাবা, তোমাদের ব্যবসা এবং তালুকদারি থেকে তোমরা অবশ্যই এখন সচ্ছল। কিন্তু যখন ছয় ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাবে, তখন তোমাদের এই সচ্ছলতা থাকবে না। কাজেই তোমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। কী প্রস্তুতি নিতে হবে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, ‘ছেলেদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। শুধু ছেলেদের শিক্ষিত করলেই হবে না, ছাদত আলী খাঁর যেসব কনিষ্ঠ ভাই স্কুলে যাওয়ার বয়সের মধ্যে রয়েছেন, তাদেরকেও লেখাপড়া শেখাতে হবে।

    এর পরের প্রশ্ন হলো কোথায় পড়ানো হবে? ১৮৯৬ সালে নবীনগরে একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু এই স্কুল হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত এবং এসব স্কুলের মান সর্বোচ্চ পর্যায়ের নয়। খোদা নেওয়াজ খাঁ পরামর্শ দিলেন রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির ছেলেদের পড়াশোনা করার জন্য ঢাকা শহরে পাঠাতে হবে।

    ১৮৭৪ সালে মুহসীন ফান্ড থেকে বার্ষিক ১০ হাজার টাকা অনুদান নিয়ে ঢাকায় সরকারি মাদ্রাসা উদ্বোধন করা হয়। ১৮৭৫ সালে এই মাদ্রাসায় অ্যাংলো পার্সিয়ান ডিপার্টমেন্ট চালু করা হয়। যেখানে আরবি ও ফারসি শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং পাশ্চাত্য কলাবিদ্যা ও বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হতো। ১৮৮২ সালে প্রথমবারের মতো এ বিভাগ থেকে ছাত্ররা এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ স্যার আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী, বিচারপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ এবং খ্যাতিমান লেখক এস এম তৈফুর এই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। খাঁ বাড়ির ছেলেদের রসুল্লাবাদে পড়াশোনা না শিখিয়ে ঢাকায় মাদ্রাসায় পড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ছাদত আলী খাঁ।

    রসুল্লাবাদ থেকে ঢাকায় যাতায়াত তখন কষ্টসাধ্য ছিল। রসুল্লাবাদ থেকে তিন মাইল দূরে মানিকনগরে স্টিমার ভিড়ত। এই স্টিমার নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকায় যেত। স্টিমার ধরার জন্য নৌকায় করে মানিকনগর স্টিমারঘাটে গিয়ে স্টিমারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। নদীপথের বিভিন্ন সমস্যার জন্য স্টিমার সময় মতো চলাচল করতে পারত না। অনেক সময় স্টিমার ঘাটে দু-তিন দিনও বসে থাকত হতো। তাই ঢাকা রসুল্লাবাদ থেকে অনেক দূরে ছিল। সেখানে নিয়মিত বাসস্থান ছাড়া পড়শোনা করা সম্ভব ছিল না। উনিশ শতকের শেষ দিকে ৩ অথবা ৪ নম্বর রোকনপুরে একটি বাসা ভাড়া করা হয়। এই বাসায় রান্না করার জন্য কাজের বুয়া নিয়োগ করা হয়। ছেলেদের তামাক খাওয়ানোর জন্য হুক্কা এবং তামাক পরিবেশনের জন্য খিদমতগার নিয়োগ করা হয়। একই বাড়ি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে খাঁ বাড়ির কর্তৃপক্ষ ভাড়া দিয়ে ব্যবহার করেছে। তখন বাড়ির দাম এত সস্তা ছিল যে বাড়িটি কেনা অত্যন্ত সহজ ছিল। তবু বাড়িটি কেনার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

    এই পর্যায়ে সবদর আলী খাঁর ছেলেদের সম্পর্কে কিছু তথ্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রথম ছেলে ছাদত আলী খাঁর তিন ছেলে ছিল। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ফজলে আলী খাঁ (ডাকনাম মাকু মিয়া)। তিনি ছিলেন আইনজীবী। কিন্তু মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। দ্বিতীয় পুত্রের নাম আমীর আলী খাঁ। তিনি ছিলেন খাঁ বাড়ির প্রথম গ্র্যাজুয়েট ও আইনজীবী। তৃতীয় ছেলের নাম ছিল মাহবুব আলী খাঁ (মবু মিয়া)। তিনি কসবা উপজেলার রাজনীতিবিদ তফাজ্জল আলীর ভগ্নি ছালেহা খাতুনকে বিয়ে করেন। তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ইন্টার্নশিপ শেষ করার সময় তার শ্বশুরের টাইফয়েড হয়। শ্বশুরের চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি নিজেই টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তাঁর কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না।

    ছাদত আলী খাঁর প্রথম কন্যার নাম ছিল ছালেহা খাতুন। তাঁকে পার্শ্ববর্তী রতনপুর গ্রামে সৈয়দ আলীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। এই সৈয়দ সাহেবের পূর্বপুরুষ হজরত শাহজালালের সঙ্গে সেনাপতি হিসেবে সিলেটে আগমন করেন। তার উত্তর পুরুষ মোহাম্মদ ফয়েজ কলকাতায় দায়রা জজ ছিলেন। তিনি রতনপুর গ্রামে বিয়ে করেন এবং ২২টি তালুকের মালিক হন। তাঁর শ্বশুরবাড়ির একজন বিখ্যাত সন্তানের নাম হলো নওয়াব কে জি ফারুকি, যাকে ব্রিটিশ সরকার নওয়াব অব রতনপুর উপাধি দিয়েছিলেন। অবশ্য রতনপুরের জমিদারি তার ছিল না। ছাদত আলী খাঁর দ্বিতীয় কন্যার নাম ছিল আছিয়া খাতুন। তাঁর বিয়ে হয় কালঘরা গ্রামের ফজলে আলীর সঙ্গে। ফজলে আলী ছিলেন নবীনগরের প্রথিতযশা আইনজীবী আবদু মিয়া সাহেবের ভাগিনা। তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর পদের জন্য মনোনীত হন এবং প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিশ একাডেমিতে গমন করেন। কিন্তু পুলিশ একাডেমির নিয়মানুবর্তিতা এবং কড়াকড়ি তার পছন্দ হয়নি। তাই তিনি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্বগ্রামে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে জমির চাষবাস করাতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন মানুষ। তিনি বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করতেন, ছিপ দিয়ে মাছ ধরতেন এবং বেশ সচ্ছল জীবনযাপন করতেন।

    ছাদত আলী খাঁর তৃতীয় কন্যার নাম মাছিয়া খাতুন। তাঁর বিয়ে হয় রতনপুর গ্রামে সৈয়দ আসিব আলীর সঙ্গে। সৈয়দ আসিব আলী সৈয়দ আলী সাহেবের ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন। রতনপুর গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা অন্তর্জালের মতো ছড়িয়ে ছিল। রতনপুর গ্রামে তাই একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে–

    রতনপুর গ্রামখানি মধ্যে মধ্যে খাল,

    বাপে-পুতে ভায়রা, মায়ে-ঝিয়ে জাল।

    সৈয়দ আসিব আলী চাঁদপুরে মুন্সেফ কোর্টের সেরেস্তাদার ছিলেন।

    সর্বকনিষ্ঠ মেয়ে মুছিয়া খাতুনের বিয়ে হয় শাহবাজপুর গ্রামে। তাঁর স্বামীর নাম ছিল রেজায়ে রাব্বী। তিনি পুলিশ বিভাগে কাজ করতেন এবং পঞ্চাশের দশকে মুন্সিগঞ্জ জেলার কোর্ট ইন্সপেক্টরের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

    সবদর আলী খাঁর দ্বিতীয় ছেলের নাম ছিল উলফত আলী খাঁ। উলফত আলী খাঁ রূপসদীর ‘সাববাড়ি’তে বিয়ে করেন। তিনি ঢাকায় ইংরেজি পড়তে যান। তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ঢাকা কলেজে এফএ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে পাস করেছিলেন কি না সে সম্পর্কে জানা যায় না। কোনো চাকরি-বাকরি না করে তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সাদত আলী খাঁ ভালো ইংরেজি জানতেন না। তখন জেলার বেশির ভাগ উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন ইংরেজ। খাঁ বাড়ির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব উলফত আলী খাঁনের ওপর দেওয়া হয়। তিনি ভালো শিকারি ছিলেন। জেলা পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাকে শিকারের জন্য দাওয়াত দিতেন। বাড়িতে তাঁদের জন্য খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এমনকি অনেকের জন্য নাচগানেরও ব্যবস্থা করতেন। এর ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কর্মরত অনেক প্রশাসকের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এককালে এসডিও ছিলেন টি এস এলিস। এলিস সাহেব উলফত আলী খাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে শিকার করতেন। এলিস সাহেব পরে কুমিল্লা জেলার জেলা জজ হন এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস ছিলেন। চিফ জাস্টিস থাকাকালীন অস্থায়ী গভর্নর হিসেবেও কাজ করেছেন। অস্থায়ী গভর্নর থাকাকালীন এলিস সাহেবের সঙ্গে উলফত আলী খাঁর নাতি হাবিবুল্লা খাঁর সঙ্গে দেখা হয়। উলফত আলী খাঁ তখন মৃত কিন্তু এলিস সাহেব তার নাতির কাছে তার দাদার ভূয়সী প্রশংসা করেন। উলফত আলী খাঁ অল্প বয়সে মারা যান।

    উলফত আলী খাঁর তিন ছেলে ছিল। প্রথম ছেলে আবদুস শাকুর খাঁ অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নবীনগর থানার তৎকালীন ওসি তাঁর পিতার বন্ধু ছিলেন এবং তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যাকে শাকুর খাঁর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে শাকুর খাঁকে লিটারেট কনস্টেবল পদে পুলিশের চাকরিতে ঢুকিয়ে দেন। স্ব-উদ্যোগে লেখাপড়া শিখে শাকুর খাঁ পুলিশের অতিরিক্ত এসপি পর্যন্ত পদোন্নতি লাভ করেন। এসপি পদে পদোন্নতি পাওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় ছেলে শামসুদ্দিন খান রসুল্লাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তৃতীয় ছেলে মুসলেহ উদ্দিন খাঁ আয়কর আইনজীবী ছিলেন এবং ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। উলফত আলী খাঁর একমাত্র কন্যা সাজু বিবির বিয়ে হয় মুরাদনগর উপজেলার আজিজুর রহমান অ্যাডভোকেটের সঙ্গে। তিনি পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

    সবদর আলী খাঁর তৃতীয় ছেলের নাম ছিল কামাল উদ্দিন খান। কামাল উদ্দিন খান ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হননি। তিনি দুই বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষে। তার এক ছেলে এবং তিন মেয়ে ছিল। তার বড় ছেলে মহিউদ্দিন খান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। তিনি কুমিল্লা জুরিবোর্ডের সদস্য ছিলেন।

    এ ছাড়া স্থানীয় স্কুলে পড়াতেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর কামালউদ্দিন খান রসুল্লাবাদ গ্রামে একটি সাধারণ পরিবারে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে তাঁর একটি ছেলে হয়, যার নাম ছিল জালালউদ্দিন খান। অতিরিক্ত আদর দিয়ে তাঁকে মানুষ করা হয়। তবে লেখাপড়ায় তার কোনো আগ্রহ ছিল না। পিতা মারা যাওয়ার পর জমি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তবে দীর্ঘ জীবন লাভ করায় শেষ দিকে আর্থিক দুরবস্থার সম্মুখীন হন।

    সবদর আলী খাঁর চতুর্থ পুত্রের নাম ছিল তোজাম্মল আলী খাঁ। তিনি বড়িকান্দিতে দেওয়ান বাড়িতে বিয়ে করেন। তার কয়েকটি ছেলেমেয়ে হয়। তাঁর স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ বাপের বাড়ি বেড়াতে যান। বাপের বাড়ি থেকে রসুল্লাবাদ ফেরার পথে মেঘনা নদীতে এক ঝড়ে পরিবারের সব সদস্য মারা যায়। তোজাম্মল আলী খাঁ তাঁদের সঙ্গে ছিলেন না। তাই তিনি বেঁচে যান। তিনি আর বিয়ে করেননি। তাঁর প্রধান শখ ছিল খাওয়াদাওয়া। আজীবন নিজে খাওয়াদাওয়া করে যেমন আনন্দ পেতেন, তেমন অন্যদের খাইয়ে তিনি চরম তৃপ্তি পেতেন।

    সবদর আলী খাঁর পঞ্চম ছেলের নাম মোয়াজ্জেম আলী খাঁ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেছিলেন এবং কুমিল্লা জুরিবোর্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৩৯ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৭ বছর একনাগাড়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।

    সবদর আলী খাঁর ষষ্ঠ ছেলে রেসালত আলী খাঁ। তিনি বিএ পাস করেন এবং নোয়াখালী শিক্ষা দপ্তরের সচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন। নোয়াখালীতে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রীর এক ভাইপো ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ সাদেক। পরবর্তীকালে তিনি ফরিদপুর শিক্ষা দপ্তরে কাজ করেন। অবসর গ্রহণ করে তিনি রসুল্লাবাদে ১৯৩৬ সালে পাকা দালান নির্মাণ করে বসবাস করা শুরু করেন। তাঁর ছিল দুই পুত্র। প্রথম পুত্র কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্কশাস্ত্রে বিএ অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি কাজে যোগ দেন। তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের যুগ্ম সচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর ছোট ভাই লুৎফে আলী খাঁন এমবিবিএস পাস করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। রেসালত আলী খাঁর একমাত্র কন্যা খুকির সঙ্গে পুলিশ বিভাগের একজন বড় দারোগার বিয়ে হয়েছিল।

    বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই খাঁ বাড়িতে অনেক পরিবর্তনের সূচনা হয়। খাঁ বাড়ির আর্থিক সচ্ছলতার মূলে ছিল সুদের ব্যবসা, তালুকদারি ও চাষবাস। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই খাঁ বাড়ির অনেক অংশীদারই সুদের ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের শিক্ষিত ছেলেরা সুদের ব্যবসা পছন্দ করতেন না।

    ১৯৩০-এর দশকে বিশ্ববাজারে মহামন্দা দেখা দেয়। এই মহামন্দার সময়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম খুবই কমে আসে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ সময়কালে চালের দাম ৫৪ শতাংশ কমে যায়। এবং ১৯৩৩-৩৪ সালে পাটের দাম প্রায় ৫৭ শতাংশ কমে যায়। এই সময়ে তাই চাষিদের পক্ষে মহাজনদের ঋণ শোধ করা কোনোমতেই সম্ভব ছিল না। তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বামপন্থী কৃষকনেতাদের নেতৃত্বে মহাজনি প্রথার বিপক্ষে আন্দোলন গড়ে ওঠে। কৃষকদের মহাজনদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঋণ সালিস ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য দাবি ওঠে। ১৯৩৫ সালে Bengal Agricultural Debtors Act পাস করা হয়। ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঋণ সালিসি বোর্ড স্থাপন করা হয়। খাঁ বাড়ির দুজন সন্তান ফজলে আলী খাঁ ও আমীর আলী খাঁ ঋণ সালিসি বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব নেন এবং চাষিদের ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেন। আগে থেকেই মহাজনি ব্যবসা থেকে খাঁ বাড়ির আয় একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। অথচ পরিবারের জনসংখ্যা অতি দ্রুত বাড়তে থাকে। চাষবাস এবং তালুকদারির আয় থেকে আগের সচ্ছলতা বহাল রাখা সম্ভব ছিল না। খাঁ বাড়ির অধিকাংশ সদস্যই ছেলেমেয়েদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য উদ্যোগ নেন। তবে ১৯৫০-এর দশকের আগপর্যন্ত মেয়েদের লেখাপড়ার বিশেষ কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। খাঁ বাড়ির মেয়েরা সাধারণত বাড়িতেই লেখাপড়া শিখতেন। ১৯৫০-এর দশকে তাঁদের কেউ কেউ প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করে উচ্চতর লেখাপড়া শুরু করেন।

    ১৯৪০-এর দশক থেকে খাঁ বাড়ির সন্তানেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে বসবাস করা শুরু করেন। বামুন খার পরবর্তী নবম প্রজন্মের ছেলেদের বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে একটি সমীক্ষা করা হয়েছে। এই সমীক্ষার ফলাফল সারণি ২.২-এ দেখা যাবে।

    সারণি-২.২

    সবদর আলী খাঁর সন্তানদের প্রপৌত্র ও প্রপৌত্রীদের অবস্থান

    সবদর আলী খাঁর পুত্রের নাম বিদেশে স্থায়ী আবাস ঢাকায় স্থায়ী আবাস রসুল্লাবাদ গ্রামে আবাস মোট
    সাদত আলী খাঁ ১১
    তোজাম্মল আলী খাঁ
    উলফত আলী খাঁ
    রেসালত আলী খাঁ
    মোয়াজ্জেম আলী খাঁ
    কামাল উদ্দিন খাঁ
    মোট = ১৩ ১৩ ৩০

    ওপরের সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে, সবদর আলী খাঁর পুত্রদের ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রপৌত্র ও প্রপৌত্রীরা রসুল্লাবাদ গ্রামে বাস করে। রসুল্লাবাদ গ্রামে বামুন খাঁর বংশ বর্তমানে প্রায় অবলুপ্তির পথে। যে চারজন বংশধর আর্থিক দুরবস্থার জন্য রসুল্লাবাদে বসবাস করছেন, তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতি উন্নত হলে হয়তো রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ি (যা পুরোনো ও নতুন বাড়ি মিলে প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপরে অবস্থিত) সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে। দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, গ্রাম ছেড়ে শহরে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে তাদের অভিবাসন ঘটছে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা শহর থেকে দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন ঘটছে। বিদেশে অভিবাসন এখনো শেষ হয়নি। যারা এখনো ঢাকা শহরে আছেন, তাঁদের অনেকেরই সন্তানসন্ততি বিদেশে চলে যাবে। বামুন খাঁর বংশধরেরা রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়িতে না থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

  • তৃতীয় অধ্যায়

    তৃতীয় অধ্যায়

    রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির কুশীলব

    ঊনবিংশ শতাব্দীতে রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ি তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এলাকায় সুপরিচিত ছিল। তাদের তালুকদারি ছিল, চাষের অনেক জমি ছিল এবং একসময় সুদের ব্যবসা করে তারা প্রচুর অর্থ কামাই করেছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির পরিচিতি আরও ব্যাপক হয়। এই পরিচিতি শুধু অর্থের ওপরে নির্ভরশীল ছিল না, রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির পরিচয় তিনভাবে গড়ে ওঠে। প্রথমত, রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির কোনো কোনো সদস্য রাজনীতিতে যোগ দেন। তাঁদের অনেকেই ত্রিপুরা জেলায় রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হন। দ্বিতীয়ত, রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির অনেক সদস্য তাঁদের পেশাগত স্বীকৃতি লাভ করেন। এঁদের কেউ উকিল ছিলেন, কেউ ডাক্তার ছিলেন, কেউ অধ্যাপক ছিলেন, আবার কেউবা ব্যাংকার ছিলেন। তৃতীয়ত, রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির সদস্যরা সরকারি চাকরিতে সাফল্যের জন্য পরিচিতি লাভ করেন। তাঁদের অনেকেই সরকারের উচ্চ পদে কাজ করেছেন। কাজেই রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির সত্যিকারের অবদান বুঝতে হলে এঁদের মধ্যে যারা বিখ্যাত ছিলেন, তাঁদের জীবনকথা বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। এঁদের মধ্যে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির জীবনী নিচে তুলে ধরা হলো।1

  • চতুর্থ অধ্যায়

    চতুর্থ অধ্যায়

    চতুর্থ অধ্যায়
    নবীনগরের প্রেক্ষাপট

    নবীনগর নামের উৎপত্তি এবং তাৎপর্য সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। এক ঘরানার ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, নবীনগর শব্দটি নবীন গড়–এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে।2 গড় শব্দের অর্থ হলো কেল্লা অথবা দুর্গ। নবীনগরে এ ধরনের কোনো কেল্লা বা দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় না। নবীন নামের কোনো রাজপুত্র বা জমিদারেরও খোঁজখবর পাওয়া যায় না। সুতরাং নবীন গড় থেকে নবীনগরের উৎপত্তি–এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না।

    দ্বিতীয় ঘরানার ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, নবীনগরের নাম মুসলমানদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মরণে রাখা হয়েছে। নবীনগর থানায় ১৮৮২ সালে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৭৫ হাজার ৭২২ জন। হিন্দুদের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার ৩৯৪ জন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৭১.৪ শতাংশ ব্যক্তি ছিলেন মুসলমান। আর মাত্র ২৮.৬ শতাংশ ব্যক্তি ছিলেন হিন্দু। এই অঞ্চলে মুসলমান প্রাধান্য ছিল। নবীনগর থানার গ্রামের নামসমূহ বিশ্লেষণ করলে তিন ধরনের গ্রামের নাম দেখা যায়। প্রথমত, হিন্দুধর্মীয় নায়কদের নামে ছিল অনেক গ্রাম। যেমন : গোপালপুর, শ্রীরামপুর, শ্যামগ্রাম, ভোলাচং ইত্যাদি। আবার অনেক গ্রাম ছিল মুসলমানদের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের নামে। যেমন : নবীনগর, আলমনগর, আলিয়াবাদ, ইব্রাহিমপুর, রসুল্লাবাদ ইত্যাদি। আর কিছু গ্রামের নাম ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ওপর করা হয়েছে। যেমন : কণিকাড়া, বগডহর ইত্যাদি। সুতরাং নবীনগর নাম নবীর নামে করা হয়েছিল, এই অনুমানই স্বাভাবিক।

    তবে ১৮৭২ সালে নবীনগর শহর কিংবা থানার নাম সরকারি কাগজপত্রে পাওয়া যায় না। ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে নবীনগর থানার নাম লেখা হয়েছে গৌরীপুরা। এটি অবশ্যই একটি হিন্দু নাম এবং এই নামে শুধু থানা বা শহর পরিচিত ছিল না, এই নামে একটি দেওয়ানি আদালতও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে গৌরীপুরার নাম নবীনগরে পরিবর্তিত হয়। থানার নাম, শহরের নাম এবং দেওয়ানি আদালতের নাম নবীনগর হয়ে যায়। সম্ভবত এই অঞ্চলে মুসলমানদের প্রাধান্য লক্ষ করে ব্রিটিশ শাসকেরা এই নাম পরিবর্তন করেন।3

    ১৮৯৪ সালে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পিতা জগদ্বন্ধু দত্ত কসবার আদালত থেকে নবীনগর আদালতে সেরেস্তাদার হিসেবে বদলি হলে তিনি পিতার সঙ্গে পড়াশোনার জন্য নবীনগরে আসেন। ১৮৯৪ সাল থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছর একনাগাড়ে তিনি নবীনগরে ছিলেন। ১৮৯৪ সালে নবীনগরের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, নবীনগর ক্ষুদ্র বুড়ি নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। নবীনগর স্কুলের দালানের পূর্ব দিকে নদী, তার পূর্ব দিকে শস্যভরা মাঠ, বর্ষায় সেই মাঠ জলমগ্ন হইয়া যাইত। বর্ষাকালে চতুর্দিকের মাঠ জলমগ্ন হইলে ছোট বড় সব রকমের নৌকা পাল তুলিয়া যাতায়াত করিত। এই দৃশ্য আজও আমার মনে আঁকা আছে। পূর্ববঙ্গে পল্লীগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতি মনোহর ছিল, এই সৌন্দর্যের মধ্যে। আমি বর্ধিত হইয়াছি।

    ধীরেন দত্তের মতে, নবীনগর গ্রাম বুড়ি নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। বর্তমানে নবীনগরের জনসাধারণ এই বুড়ি নদীকে তিতাস নদ বলে থাকে। আসলে তিতাস নদ বুড়ি নদী থেকে স্বতন্ত্র। বুড়ি নদী গোমতি নদীর একটি শাখানদী এবং এই নদীটি কণিকাড়ার মধ্য দিয়ে নবীনগরের পাশ দিয়ে নবীনগরসংলগ্ন মনতলা গ্রামের উত্তর দিকে প্রবাহিত তিতাস নদে পড়েছে। তিতাস নদ সরাইল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিক থেকে মনতলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিত্রী নামক গ্রামের পাশে মেঘনা নদীতে পড়েছে। এখন বুড়ি নদী মৃত। এই নদী দিয়ে বন্যার সময়ে যে স্বচ্ছ জলরাশি নবীনগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো, এখন আর তা হয় না। পলি পড়ে এই নদী প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়। ড্রেজার দিয়ে খনন করে কোনো রকমে এখনো লঞ্চ চলাচল করে।

    জলাভূমিতে অবস্থিত নবীনগরের জমি খুবই উর্বর ছিল। এখানে বেশির ভাগ অঞ্চলে ধান এবং পাট প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। তবে বন্যার সময়ে অনেক অঞ্চলের ফসল একেবারেই তলিয়ে যেত। ধীরেন দত্ত লিখেছেন, ‘ত্রিপুরা জেলায়, বিশেষ করিয়া নবীনগরে, খাদ্যদ্রব্যের দাম অত্যন্ত সস্তা ছিল। দুধের সের তত্ত্বালে ২/৩ পয়সা, ৪ পয়সার মাছ কিনিলে দশজনের একটি পরিবারের পক্ষে তাহা প্রচুর ছিল। বহু পরিবার অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটাইত। ধীরেন দত্তের লেখা পড়ে মনে হয় তখন সমাজে ধনবৈষম্য ছিল প্রকট। যাদের অবস্থা সচ্ছল ছিল, তারা অতি সস্তায় ভালো খাবার খেতে পারত। কিন্তু যারা গরিব ছিল (যাদের মধ্যে বহু পরিবার অন্তর্ভুক্ত) অনশনে-অর্ধাশনে দিন কাটাত। ১৯৩০-এর দিকে নবীনগরের স্মৃতিচারণা করেছেন শামসুন নাহার খান। তিনি লিখেছেন :

    নদী তীরের স্থানগুলি যেমন ধীরে ধীরে সমৃদ্ধি লাভ করে, কোন এক অতীতে তেমনি করে নিশ্চয়ই তিতাস নদীটির তীরেও ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল জনবহুল একটি লোকালয়-নবীনগর। নদীটি ছিল তখন উচ্ছল নব যৌবনা তরুণী। নদীভিত্তিক নবীনগরে তখন পাশের গ্রাম গ্রামান্তর হতে আমদানী হতো প্রচুর খাদ্য সম্ভার, গড়ে উঠলো হাট বাজার।4

    টাটকা মাছ, নির্ভেজাল দুধ, আর নির্ভেজাল ঘৃতের জন্য নবীনগরের তখন যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। দূর দূরান্ত হতে সাহেব বাবুগণ বেড়াতে এসেছেন প্রাণ ভরে মাছ দুধ খাবার লোভে। আর এখন সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিতাস গেছে বুড়িয়ে, মাছ গেছে পালিয়ে, অমৃতসম ঘৃতও গেছে ফুরিয়ে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে নিরঙ্কুশ মুসলিমপ্রাধান্য সত্ত্বেও নবীনগরে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন শিক্ষিত হিন্দুরা। এ সম্পর্কে শামসুন নাহার খান। লিখেছেন :

    তখন আমাদের সময়ে নবীনগরের সমস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন শিক্ষিত হিন্দুগণ। মুসলমান সমাজে শিক্ষার প্রচলন ছিল তখন খুব কম। গ্রামের অধিকাংশ মুসলমান ছিল চাষী, মুটে, মজুর। তারা হিন্দু জমিদার বাড়ীতে খেটে খাওয়া মাঝি, মাল্লা, দারোয়ান।5

    হিন্দু মহাজনগণ তখন ব্যবসায় বাণিজ্য করে হয়েছেন লক্ষপতি। আর মুসলমান অশিক্ষিত চাষী ভাইয়েরা হিন্দু মহাজনদের কাছ হতে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পরিশোধে অপরাগ হয়ে ঋণের দায়ে ভিটে মাটি হারিয়ে হয়েছে পথের ভিখারী। এমনি করে তখন মুসলমান সমাজের একটি বিরাট অংশ হিন্দু মহাজনদের উৎপীড়নে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছিল।

    বর্ণ হিন্দুরা শুধু মুসলমানদেরকেই অস্পৃশ্য মনে করতেন না, হিন্দু সমাজের যারা খেটে খাওয়া মানুষ, তাদেরকেও অস্পৃশ্য গণ্য করত। এ প্রসঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন :

    হিন্দু সমাজের যাহারা কায়িক পরিশ্রম করিত তাহারাই ছিল অস্পৃশ্য। সমাজের যাহারা সম্পদস্রষ্টা তাহারাই ছিল অবহেলিত। হিন্দু সমাজের ভিতর মৎস্যজীবীদের (কৈবর্ত শ্ৰেণী), যাহারা সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদস্রষ্টা বলা যাইতে পারে। কিন্তু আমি ছোটবেলায় দেখিয়াছি, সেইসব লোককে আমরা ‘গাবর’ এই অবহেলাসূচক ভাষায় আখ্যা দিয়াছি। সেই সময়ে আরও লক্ষ্য করিয়াছি, সাহা সমাজের ভিতর যাহারা কায়িক পরিশ্রম করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিয়াছে, অর্থাৎ যাহারা সামান্য পণ্যদ্রব্য গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে নিয়া গ্রামবাসীর নিকট বিক্রয় করিত, তাহারা ছিল সেই সমাজের ‘গাওয়াল’। তাহাদিগকে আমরা সর্বদা অবহেলার চক্ষে দেখিয়াছি। সমাজের ভিতর এক শ্রেণীর লোক ছিল জল-অনাচরণীয়, যাহারা জল স্পর্শ করিলে জল অশুদ্ধ হইয়া যাইত। আর এক শ্রেণীর লোক ছিল যাহারা জল-অনাচরণীয় নহে। চাষ ছিল যাহাদের ব্যবসা, অর্থাৎ যাহারা ছিল সম্পদস্রষ্টা, তাহাদিগকে আমরা ঘৃণা করিয়াছি। সমাজের উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ বিবাহে শূদ্র শ্রেণীর এক সম্প্রদায় ‘পাটে ধরার’ কাজ করিত অর্থাৎ বর এবং কনেকে প্রশস্ত পিড়িতে বসাইয়া সাতবার প্রদক্ষিণ করাইত। ইহা ঘৃণ্য কাজ বলিয়া ধারণা ছিল। সেই শূদ্র সমাজের লোক আমাদের গ্রামের এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে এই কাজ করিবে না বলিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আমি লক্ষ্য করিয়াছি, সমাজের উচ্চস্তরে যাহারা তাহাদের এই কার্যের জন্য শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর হন। এই শূদ্রদের অনেকেই এই কার্যের জন্যে জাকর (Service tenure) জমি অর্থাৎ বিনা খাজনায় জমি দখল করিত। সমাজের উচ্চস্তরের লোকেরা এই জমি হইতে তাহাদিগকে উচ্ছেদ করিয়া দেন।6

    নবীনগরের সমাজ উনবিংশ শতাব্দী থেকে প্রতিপত্তিশালী জমিদারদের প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো। জমিদারেরা সমাজে দুই ধরনের কুপ্রথা প্রবর্তন করেন। এ প্রসঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন :

    তাহারা তাহাদের যে কোন উৎসবে ঢাকা হইতে বাঈজি আনিয়া নাচের জলসা করিত, আর তাহার সহিত সব রকম মাদকদ্রব্যের যথেচ্ছ ব্যবহার হইত। তাহাতে সমাজের নৈতিক অধঃপতনের দৃশ্য দেখিতে পাইয়াছি।7

    দ্বিতীয় কুপ্রথা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন :

    হিন্দু সমাজজীবনে বহু কুপ্রথা বিদ্যমান ছিল। ঘাটুর (Dancing boy) প্রচলন ছিল। অশিক্ষিত হিন্দু-মুসলমান উভয়েই এই কুপ্রথার সমর্থক ছিল। বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। তবু সমাজ সত্যের মর্যাদা দিত, সে মর্যাদা আজ সম্পূর্ণ তিরোহিত হইয়াছে।8

    জমিদারেরা শুধু খারাপ রীতিই প্রবর্তন করেননি, তাঁরা যাত্রাগান এবং কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। এ প্রসঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন :

    অপরপক্ষে নবীনগরে যাত্রাগান শুনিয়াছি। ‘প্রহ্লাদ-চরিত্র’, ‘ধ্রুব’ ও ‘প্রবীর-পতন’–যাত্রাগান শুনিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। প্রহ্লাদের একনিষ্ঠা, সত্যের প্রতি মর্যাদা, নীতিরক্ষার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ পরবর্তীকালে আমার মহৎ উপকার করিয়াছে। এছাড়া কবিগানের প্রচলন ছিল, হরি আচার্যের কবির দল বিখ্যাত ছিল। তাহারা যদিও শিক্ষিত ছিল না, তাহারা ছিল স্বভাব-কবি কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকাল এই কবিগানের প্রচলন কমিয়া আসিয়াছে।9

    নবীনগরে যাত্রা ও থিয়েটার দুটিই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পূজার সময়ে প্রতিবছর এখানকার পেশাদার ব্যক্তিরা থিয়েটার করতেন। সেই থিয়েটারে নবীনগরের দেওয়ানি আদালতে ব্যবসায়রত উকিলরা অংশ নিতেন। এ ছাড়া স্কুলের শিক্ষক এবং হিন্দু ভদ্রলোকেরাও অংশ নিতেন।

    পরবর্তীকালে নবীনগরে পেশাদার থিয়েটার মঞ্চের আবির্ভাব ঘটে। এই পেশাদার থিয়েটার প্রবর্তনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল মদন মিয়ার। তিনি নবীনগর ইউনিয়ন কাউন্সিলের সভাপতি ছিলেন। তাঁর থিয়েটারের দল দীপালি নাট্যসংঘ নামে পরিচিত ছিল। এই নাট্যসংঘ সামাজিক এবং পৌরাণিক কাহিনি অভিনয় করত। পৌরাণিক কাহিনির অভিনয়ের জন্য মদন মিয়া অনেক অর্থ ব্যয়ে বেশ কিছু দৃশ্যপট তৈরি করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে হিন্দু ভদ্রলোকরা ভারতে অভিবাসন করেন। এতেও দীপালি নাট্যসংঘের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি। তাঁরা ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর নবীনগরে থিয়েটার করতেন এবং থিয়েটারের দল নিয়ে অন্যান্য উপজেলাতেও বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ করতেন। মদন মিয়া ১৯৬৫ সালের দিকে মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পরে ড. আমজাদ হোসেন দীপালি নাট্যসংঘের নাটক পরিচালনা করতেন এবং ১৯৭০-এর দশকেও এই নাট্যসংঘের কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়।

    ঊনবিংশ শতাব্দীতে নবীনগরে বেশ কয়েকজন অসাধারণ সংগীতজ্ঞ জন্মগ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা। তিনি নবীনগর থানার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আলাউদ্দিন খাঁর বংশের লোকেরা বিশ্বাস করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সমর্থক সিরাজউদ্দিন খাঁ নামে একজন সেনাপতি শিবপুর গ্রামে নয়নিকা নামে একজন স্থানীয় কন্যাকে বিয়ে করেন এবং জমিজিরাত কিনে শিবপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেনাপতি সিরাজউদ্দিন খাঁর ছেলে সবদর হোসেন খাঁ কৃষিকাজের চেয়ে সংগীতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি সেতার বাজাতেন। তাঁর তিন ছেলে ছিল। আফতাব উদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ ও আয়েত আলী খাঁ। আলাউদ্দিন খাঁর প্রথম ওস্তাদ ছিলেন তাঁর ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ। আফতাব উদ্দিন খাঁ একজন অসাধারণ প্রতিভাবান সংগীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে পাখিদের ডেকে আনতে পারতেন। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সংগীতশিক্ষা লাভ করার পর ১০ বছর বয়সে আলাউদ্দিন খাঁ পালিয়ে গিয়ে একটি যাত্রাদলে গান শেখেন। সেখানে ড. কেদারনাথ নামে একজন চিকিৎসক তাঁর সংগীতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান এবং সেখানে নুলো গোপাল নামে একজন সংগীতজ্ঞের কাছে আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতশিক্ষা শুরু করেন। নুলো গোপাল প্লেগে মারা গেলে তিনি কলকাতায় সানাই, নাকোয়ারা, তিকোয়ারা, জগঝম্পা, পাখোয়াজ, মৃদঙ্গ, তবলা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। তিনি ওস্তাদ আহম্মদ আলী খাঁর কাছে পাঁচ বছর সরোদশিক্ষা লাভ করেন। এরপর তিনি উত্তর ভারতের রামপুর রাজ্যে তানসেন ঘরানার ওস্তাদ ওয়াজি খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রামপুরের নবাবের সুপারিশে তাঁকে মধ্যপ্রদেশের মাইহার রাজ্যের মহারাজ ব্রিজনাথের দরবারে সংগীতজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই মাইহার থেকেই তাঁর প্রতিভার সুখ্যাতি ভারত এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। তার শিষ্যদের মধ্যে ওস্তাদ আলী আকবর খা, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, খাদেম হোসেন খান, ওস্তাদ মীর কাশেম খান, রওশন আরা বেগম, অন্নপূর্ণা দেবী, ওস্তাদ ফুলঝুরি খান, ওস্তাদ খুরশিদ খান, ওস্তাদ আশীষ খান, ওস্তাদ ধ্যানেশ খান, পণ্ডিত যতীন ভট্টাচার্য, পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী, পান্নালাল ঘোষ, ইন্দ্রনীল ভট্টচার্য এবং সরণ রানী উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আলাউদ্দিন আলী খাঁর ভাই ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁ এবং তার দুই ভ্রাতুস্পুত্র ওস্তাদ আবেদ হোসেন খাঁ ও ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাও সংগীতজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।10

    নবীনগরে দ্বিতীয় সংগীত ঘরানার প্রবর্তক ছিলেন মনমোহন দত্ত। ১২৮৪ বঙ্গাব্দে তিনি নবীনগর থানার সাতমোরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মনমোহন গ্রাম্য স্কুল এবং ছাত্র বৃত্তি স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। তাঁর স্বহস্তে লেখা নীলা রহস্য নামক বই থেকে দেখা যায়, তিনি ইংরেজি ভাষার সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত গান মলয় সংগীত নামে পরিচিত। মলয় শব্দের অর্থ হলো উদ্যান, বাগান বা দখিনা বাতাস। যে গানের সুর মানুষের মনে দখিনা বাতাসের আমেজ এনে দেয়, সে গানই হলো মলয় সংগীত। তিনি ছিলেন লোককবি লালন ফকিরের ভাবশিষ্য। তাই পৃথিবীর সকল ধর্মেই ঈশ্বরের সন্ধান করেছেন। একটি গানে এই বক্তব্যকে তিনি সুন্দর করে লিখেছেন :

    হরি তোমায় জানতে গিয়ে, পড়েছি এক বিষম গোলে।

    আসল কথার ঠিক পাইনা তার, শুনি কেবল যে যা বলে।

    পুরাণে কয় এরুপ সেরুপ, কে জানে তার কিবা কোন্ রুপ,

    বেদান্তে কয় অরুপ স্বরুপ, ঘটে পটে সর্বস্থলে।

    বাইবেলে কয় ঈশার পিতা, আর যত হয় সবই মিথ্যা,

    ঠিক পাইনা তার কোন কথা, কোন্ কথা রয়েছে মূলে।

    কোরাণে কয় ঠিক দূরস্ত, বটে মহম্মদের দোস্ত।

    হয়ে গেল অমন হেস্তনেস্ত, পড়ে মস্ত কথার ভুলে।

    গৌরাঙ্গে কয় কৃষ্ণরাধা, বৌদ্ধ বুদ্ধের কথা,

    নাস্তিকে কয় ঈশ্বর মিথ্যা আপনি জগৎ চলে।

    ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রথম সংগীতগুরু ও বড় ভাই আফতাব উদ্দিন ছিলেন মনমোহন দত্তের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মনমোহন দত্ত গান লিখতেন আর আফতাব উদ্দিন সেসব গানে সুর দিতেন। এইভাবে নবীনগর থানায় ওস্তাদি গান এবং লোকজ গানের সুন্দর সংমিশ্রণ গড়ে ওঠে।

    তবে সবাই লোকজ গানে বিশ্বাস করত না। মুসলমানদের মধ্যে অনেকে গানবাজনাকে হারাম মনে করত। তারা শরিয়ত অনুসারে জীবনযাপনের চেষ্টা করত। তবে মুসলমানদের মধ্যেও দলাদলি ছিল। কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা নিয়ে মৌলভিদের মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব দেখা দিত। এর ফলে বড় বড় আলেম ওলামাদের মধ্যে বাহাস’ অনুষ্ঠিত হতো। সব সময় বাহাস’ শান্তিপূর্ণ হতো না, অনেক সময়ে সামান্য বিষয়ে (যথা : আরবি শব্দ দোয়াল্লিনের উচ্চারণ জোয়াল্লিন হবে কি না) ঝগড়াঝাটি এমনকি খুনোখুনির ঘটনা পর্যন্ত ঘটত। মুসলমানদের মধ্যে লোকজ গানের ভক্ত ছাড়াও আরেক ধরনের বিশ্বাসী ছিল, যারা গানবাজনার মাধ্যমে কোরআন শরিফের চর্চা করতেন। বীরগাঁও গ্রামে আবুল খয়ের রফিকুল ইসলামের পিতা একজন পীর ছিলেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের দোতারা বাজিয়ে কীর্তন এবং ভাটিয়ালির সুরে কোরআন তেলওয়াত করতে উৎসাহিত করতেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এলাকার সুন্নি আলেমরা তাঁর সঙ্গে বাহাসের ব্যবস্থা করেন। আলেমরা বলেন, আপনি তো জানেন ইসলাম ধর্মে গান গাওয়া হারাম। কীভাবে আপনি কোরআন শরিফের পবিত্র বাণী ভাটিয়ালি এবং কীর্তনের সুরে আপনার শাগরেদদের দিয়ে গাওয়ান। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আপনাদের যারা শাগরেদ তারা লেখাপড়া জানে এবং তারা ভদ্রলোকের ছেলে। আমার যারা শাগরেদ তারা চাষাভুষা জেলের ঘরের সন্তান। আরবি জানা দূরে থাক, তারা বাংলাও জানে না। তাদেরকে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাই আমি গানের ব্যবস্থা করি। যদি এই ব্যবস্থাও না করতে দেন, তাহলে এরা কোনোমতেই মুসলমান হতে পারবে না। তাঁর এই যুক্তিতে সুন্নি মৌলভি সাহেবেরা তাঁকে মাফ করে দেন। নবীনগরে একসঙ্গে হিন্দু মৌলবাদ, ইসলামি মৌলবাদ এবং লোকধর্ম বিরাজ করেছে। এদের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব ছিল না। বিশেষ করে যারা ধর্মান্ধ মুসলমান ছিলেন, তাঁদের শিষ্য নবীনগর থানার বাইরেও ছিল। এরা নবীনগর থানার বাইরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অংশ নিয়েছে। কিন্তু সব উত্তেজনা সত্ত্বেও নবীনগর থানায় কখনো বড় ধরনের দাঙ্গা ঘটেনি। সব সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করেছে।

    নবীনগরের গর্ব ছিল নবীনগর উচ্চ ইংরেজি স্কুল। ১৮৯০-এর দিকে নবীনগরে একটি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। স্কুলগৃহটি প্রথমে কাঁচা ঘর ছিল, তা আগুনে পুড়ে গেলে পাকা করে তৈরি করা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, সম্ভবত ১৮৯৮ সালে এই মধ্য ইংরেজি স্কুলটিকে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। স্কুলের রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে যে ১৮৯৬ সালে নবীনগর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জানাচ্ছেন, এই বিদ্যালয় স্থাপনে নবীনগরের তৎকালীন সাহা জমিদারগণ এবং উকিল মহোদয়গণ, বিশেষ করিয়া মরহুম আব্দু মিঞা সাহেব, সক্রিয় অংশগ্রহণ। করিয়াছিলেন। মরহুম আব্দু মিঞা সাহেব ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, তবু ইংরাজি শিক্ষার বিস্তার হউক ইহাই তাহার প্রাণের আকাঙ্ক্ষা ছিল।11

    আব্দু মিয়ার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল মুন্সি আব্দুস সোবহান। তাঁর পিতা ছিলেন মুরাদনগর অঞ্চলের ঢাকার নবাবের তালুকদার। তাঁর বাড়ি মুন্সি বাড়ি নামে এলাকায় খ্যাত ছিল। আব্দু মিয়ার যখন বয়স সাত বছর, তখন তার ছোট বোন। ও মাকে রেখে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। আদু মিয়ার পক্ষে পৈতৃক বাসস্থান থেকে দূরে গিয়ে ইংরেজি শিক্ষা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি বাংলা ভাষাতেই শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল মুরাদনগর থানার ধামঘর ইউনিয়নের ভুবনগড় গ্রামে। তিনি দেখতে পান যে মুরাদনগর ও নবীনগর থানার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা ব্রিটিশদের প্রচলিত আইন সম্পর্কে ভালো না জানার ফলে সংখ্যালঘু হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের হাতে অত্যাচারিত হচ্ছে।

    উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ইংরেজি না জানলে উকিলদের পক্ষে মক্কেলদের অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। ১৮৩৫ সালে ইংরেজশাসিত ভারতবর্ষে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়। এর আগে রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। সুতরাং তখন যারা ওকালতি করতেন, তাঁদের ফারসি ভাষা জানতে হতো। ফরাসি ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি জানা যথেষ্ট উকিল। পাওয়া যেত না। তাই অনেক উকিলই ফারসি এবং বাংলায় আইন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে ওকালতি করতেন। বেশির ভাগ ফৌজদারি আদালতে প্রধান বিচারক থাকতেন একজন ইংরেজ আইসিএস অফিসার। তাদের পক্ষে বাংলায় সাক্ষ্য এবং সওয়াল জবাব বোঝা কষ্টকর ছিল। তাদেরকে বোঝানোর জন্য মোক্তাররা বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত ভাষায় আদালতের কাছে বক্তব্য পেশ করতেন। এ ধরনের বক্তব্য সম্পর্কে একটি ছড়া রয়েছে। ছড়াটি নিম্নরূপ :

    আনসার আলী মনসুর আলী

    বিগেন টু দ্য মারামারি আন্ডার দ্য বটগাছ

    আনসার আলী মারল বাড়ি অন দ্য হেড অব মনসুর আলী

    আনসার আলী ফাইট মনসুর আলী ডাইড।

    আনসার আলী মনসুর আলীর ঝগড়াকে এ ধরনের ভাষায় আদালতে পেশ করা হতো। তবে দেওয়ানি আদালতে সব মুন্সেফই ছিলেন ভারতীয়। তাঁদের বেশির ভাগই বাংলা জানতেন। তাই বাংলা ভাষায় আইন শিক্ষা লাভ করে ওকালতি করা সম্ভব ছিল। আব্দু মিঞা বাংলা ভাষাতে যতটুকু সম্ভব আইনশিক্ষা লাভ করেন। তাঁর পৈতৃক আবাস ভুবনগড় থেকে স্থল ও জলপথে প্রায় সতেরো মাইল দূরে অবস্থিত নবীনগর আদালতে আইনের ব্যবসা শুরু করেন।

    উকিল হিসেবে তিনি খুবই সফল হন। উপরন্তু তালুকদারির মুনাফার আয় নিয়ে তিনি একজন সচ্ছল মুসলমান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে তিনি বুঝতে পারেন, ইংরেজি ভাষা না জানলে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষাবিস্তারের জন্য নবীনগরে উচ্চ ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ ও জমি দান করেন এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার তিন কন্যা ও চার ছেলে ছিল। তার জ্যেষ্ঠ কন্যা আফিয়া খাতুনের সঙ্গে তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল হালিম চৌধুরীর বিয়ে হয় এবং তাঁদের সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন। কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, নাদেরা বেগম প্রমুখ প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী। তার ছেলেরা ও বংশধরেরাও বেশির ভাগই কৃতবিদ্য ছিলেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ করে তাঁর পৌত্র এ কে এম সাদেক সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তাঁর এক প্রপৌত্র আবদুল্লাহ ইউসুফ হারুন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে কয়েকবার সদস্য নির্বাচিত হন।

    ১৮৯৮ সালে নবীনগর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন ভুবন মোহন সরকার। কিছুদিন এই স্কুলে কাজ করার পর তিনি নবীনগর থেকে চলে যান। এরপর নবীনগর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন প্যারি মোহন রায়। তাঁর বাড়ি ছিল সিলেট শহরে। বয়সে যুবক হলেও তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নবীনগর স্কুলটি গড়ে ওঠে। প্যারি মোহন রায়ের পর নবীনগর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন চারুচন্দ্র ঘোষ। তাঁর সম্পর্কে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, তাহার অনাড়ম্বর জীবন, অমায়িক, মধুর চরিত্র, কর্তব্যনিষ্ঠা, ত্যাগব্যঞ্জক চেহারা আজও ভক্তির সহিত স্মরণ করি। তাঁহার নিকট আমি অনেক নৈতিক শিক্ষা লাভ করিয়াছিলাম। তিনি একটি ‘হিতসাধনী সভা’ স্থাপন করিয়াছিলেন। তাহার আমি একজন সভ্য ছিলাম। আমি এই হিতসাধনীর সভ্য হিসাবে একটি শপথ গ্রহণ করি–’চিকিৎসক কর্তৃক উপদিষ্ট না হইলে কখনও কোনো মাদকদ্রব্য গ্রহণ করিব না।’ এই শপথ পরবর্তীকালে আমার মহৎ উপকারে আসিয়াছে।12

    চারুচন্দ্র ঘোষের প্রধান শিক্ষকতাকালে নবীনগর স্কুল থেকে পাস করে উপেন্দ্রকুমার রায় ১৯০৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি মেধাতালিকায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেন এবং ২০ টাকা বৃত্তি পেয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর সহপাঠী শ্রী মধুকরচন্দ্র পাল ১০ টাকার বৃত্তি পান। ১৯০৪ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নবীনগর স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। সেই বছর তার বিশিষ্ট বন্ধু তারাভূষণ পাল ১০ টাকা বৃত্তি পেয়ে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। ১৯০৪ সাল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনগর স্কুলের ছাত্ররা প্রায়ই মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। প্রায় ১০০ বছর ধরে প্রতিবছরই বোর্ডে মেধাতালিকায় স্থান না পেলেও প্রবেশিকা পরীক্ষায় কমপক্ষে দু-তিনজন ছাত্র প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হতো।

    নবীনগরে কোনো শিল্প ছিল না। শুধু কিছু সরকারি অফিস ছিল। এর ফলে একে ছোট শহর হিসেবে গণ্য করা হতো। ১৯৫০-এর দশকে নবীনগরে একটি দেওয়ানি আদালত ছিল। নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুরে ইউনিয়ন কাউন্সিলগুলোকে তদারকি করার জন্য এখানে একটি সার্কেল অফিসারের অফিস ছিল। ছিল একটি থানা। স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের একটি অফিস ছিল। কুমিল্লা জেলা বোর্ড পরিচালিত একটি দাঁতব্য চিকিৎসালয় ছিল। এই দাঁতব্য চিকিৎসালয়ে একজন এলএমএফ পাস করা ডাক্তার পদস্থ করা হতো। এর বাইরে উপেন বাবু নামে একজন এমবিবিএস ডাক্তার নবীনগরে ছিলেন। নবীনগরে একটি পশুচিকিৎসালয় ছিল। ছিল একটি ডাকঘর। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা ইন্সপেক্টরের অফিস ও থানা কৃষি অফিস ছিল। নবীনগরে বালকদের জন্য উচ্চবিদ্যালয় ছাড়াও বালিকাদের জন্য মধ্যপর্যায়ের একটি বিদ্যালয় ছিল, যার নাম ইচ্ছাময়ী বালিকা বিদ্যালয়। এ ছাড়া একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। চারটি মসজিদ ছিল। হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা ছিল প্রায় সমান সমান। মুসলমানরা হিন্দু জমিদারদের ভয়ে নবীনগর গ্রামে কোরবানি উপলক্ষে গরু জবাই করতেন না। পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলমানরা আশপাশের গ্রামে গরু কোরবানি দিয়ে নবীনগরে মাংস নিয়ে আসত। গ্রামে রাস্তাঘাট খুবই কম ছিল। বাড়িঘর অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হতো কিন্তু কোনো উঁচু বেড়া দেখা যেত না। সর্বত্র খোলামেলা ছিল। নবীনগরে পঞ্চাশের দশকে বিনোদনের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সাধারণের জন্য কোনো পাঠাগার ছিল না। শুধু অফিসারদের জন্য একটি ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবে একটি রেডিও ছিল। এই রেডিও ব্যাটারি দিয়ে চালাতে হতো। ব্যাটারি লঞ্চ থেকে চার্জ করা হতো। ছোটবেলায় কখনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে আমরা ক্লাবে রেডিওতে তার খবর শুনতে যেতাম। এই রেডিও ছাড়া নবীনগরে আর কোনো রেডিও ছিল না। ক্লাবে নিয়মিত কোনো খবরের কাগজ রাখা হতো না। নবীনগরে নিয়মিত চারটি দৈনিক আসত। একটি দৈনিক আমাদের বাসায় আসত, আরেকটি দৈনিক আসত স্কুলে। তৃতীয় গ্রাহক ছিলেন ডা. উপেন্দ্র বাবু, যিনি কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকা রাখতেন। চতুর্থ গ্রাহক ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার প্যারী বাবু। তিনি দৈনিক ইত্তেফাঁক রাখতেন। তার দোকানেই পত্রিকা পাঠকদের সবচেয়ে বড় ভিড় হতো। নবীনগরে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। সত্তরের দশকে এখানে প্রথম বিদ্যুৎ আসে। বাংলাদেশের জন্মের পরই নবীনগরের শান্ত জীবনে পরিবর্তন আসে।

  • পঞ্চম অধ্যায়

    পঞ্চম অধ্যায়

    পঞ্চম অধ্যায় : শৈশব ও কৈশোর : ১৯৪৪-১৯৫৯

    জন্মদিন

    সরকারের নথি অনুসারে আমার জন্মদিন ২ আগস্ট, ১৯৪৪ সাল। আমার প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রত্যয়নপত্রে এই জন্মতারিখ লিপিবদ্ধ আছে। এই হিসাবের ভিত্তিতেই আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দিই এবং এর ভিত্তিতে ৫৭ বছর বয়স পূর্তিতে আমি ২০০১ সালে ১ আগস্ট সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করি। কিন্তু আমার বাবা-মা সব সময়ই বলতেন যে এটি আমার জন্মতারিখ মোটেও নয়। মায়ের মতে শ্রাবণ মাসে আমার জন্ম হয়নি। আমার জন্ম হয়েছিল হাড়কাঁপানো শীতে। কাজেই কোনোমতেই আগস্ট মাসে আমার জন্ম হয়নি। তাহলে আমার জন্মদিন নিয়ে এমন অঘটন কেন ঘটল?

    আমার মা বলতেন, কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন নবীনগর স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক বাবু বিহারীলাল চক্রবর্তী। তখন নাকি ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখে প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীর সাড়ে ১৪ বছর বয়স না হলে সে বছর পরীক্ষা দেওয়া যেত না। অর্থাৎ আগস্টের পর কারও জন্ম হলে তাকে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য আরও এক বছর বসে থাকতে হবে। প্রধান শিক্ষক বিধাতাকে অগ্রাহ্য করে কেরানি বাবুকে হুকুম দিলেন এর জন্মদিন ২ আগস্ট লিখে দাও। তাই আমার জন্মদিন ২ আগস্ট।

    হিন্দুদের একটি সুবিধা আছে। বেশির ভাগ সচ্ছল হিন্দুই তাদের সন্তানদের কুষ্ঠি তৈরি করে। কুষ্ঠিতে সঠিক জন্মদিন লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু মুসলমানদের কোনো কুষ্ঠি নেই। তাই মুসলমানদের জন্মদিন অনেকাংশেই সঠিক হয় না।

    তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বেশির ভাগ নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলমান ঘরে জন্মদিন পালন করা হতো না। জন্মদিন নিয়ে তাই কোনো আগ্রহও ছিল না। তবে সম্প্রতি জন্মদিন নিয়ে অনেক ঘটা বেড়েছে। তাই আমার মেয়ে একদিন আমার মাকে পাকড়াও করে আমার সঠিক জন্মতারিখ বলার জন্য। আমার মা অনেক চিন্তা করে বলেন সে সময়ে প্রচণ্ড শীত ছিল, সম্ভবত সেটা ডিসেম্বরের শেষ দিক ছিল এবং খুব সম্ভব তারিখটা ছিল ২৫ ডিসেম্বর। আমার মেয়ে ২৫ ডিসেম্বর তারিখে আমার জন্মোৎসব পালনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু আমি কোনোমতেই ২৫ ডিসেম্বরকে আমার জন্মদিন হিসেবে মানতে রাজি নই। ২৫ ডিসেম্বর আরও দুজন মহাপুরুষের জন্মতারিখ। যিশুখ্রিষ্টের জন্মতারিখ ২৫ ডিসেম্বর উদ্‌যাপন করা হয়ে থাকে। অথচ পণ্ডিতেরা বলছেন যিশুখ্রিষ্টের জন্ম ২৫ ডিসেম্বর হয়নি। যিশুর জন্মতারিখ নির্ণয়ে একটি বড় সমস্যা হলো যিশুর জন্মের পর প্রথম ৪০০ বছরে তাঁর জন্মদিন উদযাপিত হয়নি, কেননা রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টধর্ম বেআইনি ছিল। পণ্ডিতেরা বলছেন যে যিশুর সম্ভাব্য জন্মতারিখ হচ্ছে ২০ মে, ২১ মার্চ, ১৫ এপ্রিল, ২০ অথবা ২১ এপ্রিল। অর্থাৎ শীতকালে যিশুর জন্ম হয়নি। ২৫ ডিসেম্বর সূর্যদেবতার জন্মদিন। এই সূর্যদেবতার জন্মদিনকে যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন হিসেবে চালু করা হয়েছিল।6

    মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দাবি করতেন যে তাঁর জন্ম হয়েছে ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তাঁর জীবনীকার স্ট্যানলি ওয়ালপার্ট দেখিয়েছেন যে এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। ১৮৮৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর জিন্নাহ করাচির মাদ্রাসাতুল ইসলামে ভর্তি হন। এই মাদ্রাসার নিবন্ধনের খাতা থেকে দেখা যায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভাইয়ের জন্মতারিখ হলো ২০ অক্টোবর ১৮৭৫। পরবর্তীকালে জিন্নাহ এ-সম্পর্কিত সব তথ্যই পরিবর্তন করলেন। মুহাম্মদ আলীর স্থলে লিখলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভাইকে ছোট করে লিখলেন জিন্নাহ। মাদ্রাসায় জিন্নার জন্মসাল ছিল ১৮৭৫। জিন্নাহ তা প্রায় ১৪ মাস কমিয়ে ১৮৭৬ সালে নিয়ে এলেন। জন্মতারিখ ২০ অক্টোবরের স্থলে ২৫ ডিসেম্বর নির্ধারণ করলেন।

    ২৫ ডিসেম্বর যিশুখ্রিষ্ট বা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মদিন ছিল না। ২৫ ডিসেম্বর আমার জন্মদিনও নয়। দুর্ভাগ্যবশত আমার জন্মতারিখ সম্পর্কে কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। আমার পিতাও আমার জন্মতারিখ সঠিকভাবে স্মরণ করতে পারেননি। তবে আমার বাবা-মা এবং অন্য মুরব্বিরা আমার জন্ম সম্পর্কে দুটি বিষয়ে একমত ছিলেন। প্রথমত, আমার জন্ম হয়েছিল শীতকালে। তখন প্রচণ্ড শীত ছিল। দ্বিতীয়ত, আমার জন্ম হয়েছিল হজে আকবরির দিন। নবীনগরের কাজী সাহেব আমার জন্মের পর আজান দিয়েছিলেন এবং তিনিই হজে আকবরির স্মরণে আমার নাম আকবর আলি খান রাখার প্রস্তাব দেন।

    হজে আকবরি প্রতিবছর পালিত হয় না, যে বছর হজের দিন শুক্রবার হয়, সেই হজ হজে আকবরির হজ হয়। হজে আকবরি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সৌদি রাজপরিবারের অনুষ্ঠান। ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে সব হজই হলো হজে আকবরি বা বড় হজ। এছাড়া অনেক মুসলমান কাবা শরিফে ওমরা করেন। ওমরাকে ছোট হজ বলা হয়ে থাকে।

    হজে আকবরির সূত্র ধরে আমার জন্মতারিখ সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছি। সেসব তথ্য সারণি ৫.১-এ দেখা যাবে।

    সারণি ৫.১

    জিলহজ মাস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য, ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ

    খ্রিষ্টাব্দ ১ জিলহজ ও বার আরাফাতের দিন এবং বার কোরবানির দিন এবং বার
    ১৯৪৩ ২৮ নভেম্বর, সোমবার ৭ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ৮ ডিসেম্বর, বুধবার
    ১৯৪৪ ১৭ নভেম্বর, শুক্রবার ২৫ নভেম্বর, শনিবার ২৬ নভেম্বর, রোববার
    ১৯৪৫ ৬ নভেম্বর, মঙ্গলবার ১৪ নভেম্বর, বুধবার ১৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার

    উৎস : https://www.al-habib.info/islamic-calendar/global-islamic-calendar year-1943-ce.htm

    সারণি ৫.১ থেকে দেখা যাচ্ছে ১৯৪৩, ১৯৪৪ বা ১৯৪৫ সালে আরাফাতের দিন ছিল মঙ্গলবার, শনিবার ও বুধবার আর কোরবানির দিন ছিল যথাক্রমে বুধবার, রোববার ও বৃহস্পতিবার। দেখা যাচ্ছে ১৯৪৪ সালে ১৩৬৩ হিজরি জিলহজ মাসের প্রথম দিন শুক্রবার ছিল। খ্রিষ্টান পঞ্জিকাতে তারিখটি ছিল ১৭ নভেম্বর। ১৭ নভেম্বর তারিখ আমার জন্মদিন হয়ে থাকলে তা আমার বাবা-মা ও মুরব্বিদের বর্ণনার সঙ্গে একেবারে অভিন্ন। দিনটি ছিল নভেম্বরের শেষ দিকে। ওই সময়ে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শীত পড়ে। হজে আকবরি ছিল রাজপরিবারের অনুষ্ঠান। হজে আকবরিতে সৌদি বাদশাহকে প্রত্যেক হাজিকে উপহার দিতে হতো। সৌদি বাদশাহ ইচ্ছা করলে ১ জিলহজ শুক্রবার হলে হজে আকবরি পালন করতে পারেন। তবে এটি হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মনে হয় ২ আগস্ট বা ২৫ ডিসেম্বরের চেয়ে ১৭ নভেম্বর আমার জন্মদিন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে মোটামুটিভাবে আমার জন্ম ১৯৪৪ সালের নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাসে হয়েছে বলে মনে হয়।

  • ষষ্ঠ অধ্যায়

    ষষ্ঠ অধ্যায়

    ষষ্ঠ অধ্যায়
    কলেজজীবন : ১৯৫৯-১৯৬১

    ঢাকা কলেজ

    প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করার পর উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য নবীনগরের বাইরে যেতে হয়। নবীনগরে তখন কোনো কলেজ ছিল না। এ সময়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করেন সনাতনদা। সনাতন সাহা আমার বড় চাচা ফজলে আলী খাঁর মুহুরি ছিলেন। পরে তিনি সমবায় বিভাগে কাজ করেন। বড় চাচা নবীনগর সমবায় ব্যাংকের সম্পাদক ছিলেন। বড় চাচা মারা যাওয়ার পর আমার বাবা সমবায় ব্যাংকের সম্পাদক হন। সনাতনদা বাবার সঙ্গেও কাজ করেন এবং তারপর সমবায় বিভাগে পদোন্নতি পেয়ে নবীনগরের বাইরে চলে যান। কিন্তু সনাতনদা আমৃত্যু আমাদের পরিবারের সব সদস্যের খোঁজখবর নিতেন এবং সবাইকে তাঁর ক্ষমতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। আমরা যেসব আত্মীয়স্বজনকে চিনতাম না, সনাতনদা তাঁদেরও চিনতেন এবং তাঁদের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতেন। শুধু আমাদের পরিবারেরই নয়, সমবায় বিভাগের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক ছিল। সনাতনদা যখন সমবায় বিভাগের থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা, তখন সমবায় বিভাগের সারা প্রদেশের নিবন্ধক ছিলেন সলিমুল্লাহ ফাহমি নামের একজন জ্যেষ্ঠ সিএসএস কর্মকর্তা। তার গুণাবলির পরিচয় পেয়ে সলিমুল্লাহ ফাহমি অনেক বিষয়ে তার ওপরে নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। আমরা যে রকম তাঁকে সনাতনদা বলে ডাকতাম, তেমনি সলিমুল্লাহ ফাহমির ছেলেমেয়েরাও তাঁকে সনাতনদা বলে ডাকতেন।

    সৌভাগ্যবশত আমার প্রবেশিকা পরীক্ষা যখন শেষ হয়, তখন ঢাকায়। আমার চাচাতো ভাইদের আর্থিক সচ্ছলতা আসে। শকুদা তখন মেজর হিসেবে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন এবং খুলনায় একটি জুট মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। আরেক চাচাতো ভাই মন্টুদা (মোস্তাফিজুর রহমান খান) তখন ঢাকার এডিশনাল এসপি। মিল ব্যারাকে থাকতেন এবং তার আম্মা তার সঙ্গে থাকতেন। তাঁর ছোট ভাই শহীদদা (আমান উল্লাহ খান) এসো (Esso) নামক একটি তেল কোম্পানির কোভিন্যানটেড অফিসার হিসেবে কাজ করতেন এবং বকশীবাজারে সস্ত্রীক সংসার পেতে বাস করতেন। সবচেয়ে ছোট ভাই ঝুনুদা (আহসান উল্লাহ খান) তখন বিলাত যাওয়ার বৃত্তি পেয়ে গেছেন এবং বিলাত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বড় ভাই শকুদা ছাড়া আর চার ভাই দ্বিতীয় ভাই আনুদার সঙ্গে জয়কালী মন্দিরে এক বাড়িতে থাকতেন। প্রত্যেক ভাই আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আনুদা জয়কালী মন্দিরের বাড়ি ছেড়ে এলিফ্যান্ট রোডের রওশন মঞ্জিল নামে একটি একতলা বাড়িতে চলে আসেন। এই একতলা বাড়িতে একটি শোবার কক্ষ আর একটি ড্রয়িংরুম ছিল। শোবার কক্ষে আনুদা, ভাবি ও তাদের একমাত্র ছেলে লুডু থাকত আর ড্রয়িংরুমে আমি থাকতাম। রান্নাঘরের পাশে একটু জায়গা ছিল, যেখানে আমার পড়ার টেবিল এবং বইপত্র রাখা হতো। সনাতনদা-ও তখন অবসর গ্রহণ করে আনুদার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আনুদা তখন গণস্বাস্থ্য বিভাগে নলকূপের ‘বাকেট’ (Bucket) সরবরাহ করতেন। এই বাকেট সরবরাহ করার জন্য আনুদার বাসা থেকে সামান্য দূরে একটি টিনের ঘরে বাকেট কারখানা স্থাপন করা হয়। সনাতনদা সেই কারখানাতেই থাকতেন। তবে আমরা সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করতাম।

    প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সনাতনদা আমাকে ঢাকায় আনুদার বাসায় নিয়ে যান। এলিফ্যান্ট রোডের কাছেই ছিল ঢাকা কলেজ এবং কলেজ হিসেবে সেটি তখন সারা পূর্ব পাকিস্তানে সুপ্রতিষ্ঠিত। তখন ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়া সহজ ছিল। বিজ্ঞান বিভাগে যারা প্রথম শ্রেণিতে প্রবেশিকা পাস করত, তাদের ভর্তি ছিল নিশ্চিত। কলা এবং বাণিজ্য বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ৫০ শতাংশের ঊর্ধ্বে যারা নম্বর পেত, তাদের সহজেই ভর্তি করা হতো। নবীনগর স্কুল থেকে আমার সঙ্গে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করে আমার বন্ধু মোজাম্মেল হক। সে-ও ঢাকা কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হয়।

    আমার মা আমার কলা বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন যেন আমি বিজ্ঞান পড়ে হয় প্রকৌশল, নয় চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি লাভ করি। কিন্তু কলা বিষয় পড়ার জন্য আমার আগ্রহের ফলে তিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর আপত্তি প্রত্যাহার করেন। তখন কলা বিভাগের ১০টি পত্র ছিল বাধ্যতামূলক। দুটি পত্র বাধ্যতামূলক বাংলা, দুটি পত্র বাধ্যতামূলক ইংরেজি। ছাত্ররা পছন্দমতো তিনটি বিষয় বেছে নিত। আমি বেছে নিয়েছিলাম তর্কশাস্ত্র বা লজিক, ইতিহাস, পৌরনীতি এবং অর্থনীতি। আরেকটি বিষয় বাধ্যতামূলক ছিল না, তবে ওই বিষয়ে যে নম্বর পাওয়া যেত, তা থেকে ৬০ নম্বর বাদ দিয়ে বাকি নম্বর মোটের সঙ্গে যোগ করা হতো। এর ফলে যারা বাধ্যতামূলক বিষয়ে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির নম্বর পেত না, তারা এ অতিরিক্ত নম্বর যোগ করে উচ্চতর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পারত। অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে আমি বেছে নিই বাংলা সাহিত্য।

  • সপ্তম অধ্যায়

    সপ্তম অধ্যায়

    সপ্তম অধ্যায়
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল সার্ভিস ১৯৬১–১৯৬৭

    সলিমুল্লাহ মুসলিম হল

    কলেজ পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। প্রথম প্রশ্ন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয় নিয়ে পড়ব। আমার মুরব্বিরা উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখায় না পড়ে কলা শাখায় পড়ায় আমার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। এবার উচ্চমাধ্যমিকের পর সবাই একবাক্যে উপদেশ দিলেন যে আমি যেন অর্থনীতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় আমি তর্কশাস্ত্র, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং বাংলা সাহিত্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাই। এই চারটি বিষয়ের মধ্যে আমি ইতিহাসকে বেছে নিই। এর কারণ হলো আমি বই পড়তে ভালোবাসতাম। সব ধরনের বই-ই আমি পড়তাম। অর্থনীতির গণ্ডি সীমিত, এখানে ছোট ছোট সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, বেশির ভাগ সমস্যাই বর্তমান কালের। ইতিহাস শুধু বর্তমানে সীমাবদ্ধ নয়, মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই পড়ানো হয় না। এখানে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও পড়তে হয়। মুরব্বিদের উপদেশ অগ্রাহ্য করে আমি প্রায় জোর করে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হই।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে বিলাতের আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আগে একটি হলে ভর্তি হতে হতো। হল নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ছিল না। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সবচেয়ে সুন্দর হল ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। বিরাট এলাকাজুড়ে মুসলিম স্থাপত্যকে অনুকরণ করে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল নির্মাণ করা হয়। তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের সব ভালো ছাত্র সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ভর্তি হতো। অবশ্য যারা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করত, তারা ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলকে পছন্দ করত। কারণ এ দুটি হল ছিল কার্জন হলের পাশে। কার্জন হলে বিজ্ঞান বিভাগসমূহের ক্লাস হতো, তাদের গবেষণাগারও ছিল কার্জন হলে। তাই এ দুটি হলে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা থাকতে পছন্দ করত। আমি যখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, তখন এলিফ্যান্ট রোডের আনুদার বাসায় শহীদদার স্ত্রী বীথি ভাবি বেড়াতে আসেন। আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ভর্তি হব শুনে তিনি বলেন, ‘শুনেছি এই হলে দারুণ আড্ডা হয়। যারা নতুন ভর্তি হয়, তারা চারজন এক রুমে থাকে। চারজন রুমমেট গল্প-গুজব করেই সময় কাটায়, পড়াশোনা হয় না।’ তারপর তিনি বললেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট তাঁর পিতার বন্ধু। তিনি তাঁকে অনুরোধ করবেন, যাতে প্রথম বর্ষেই আমাকে এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ করা হয়।

    সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে তিন ধরনের কক্ষ ছিল। এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ, দুই শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ ও চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল যখন প্রথম চালু হয়, তখন হলে যথেষ্টসংখ্যক ছাত্র ছিল না। তাই অনেক ছাত্র চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে একা থাকত। পরে যখন ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যায়, তখন বাধ্য হয়ে চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে চারজন এবং দুই শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে দুজন ছাত্রকে বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু অনেক উচ্ছল ছাত্র ছিল যারা হল কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষকে এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে পরিণত করে একা থাকত। এ সম্পর্কে আমাদের প্রভোস্ট মজহারুল হক সম্পর্কেও গুজব ছিল। মজহারুল হক সাহেব চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে একা থাকতেন। তার কক্ষে যখনই কোনো নতুন ছাত্রকে বরাদ্দ দেওয়া হতো, তখন তিনি ছাত্রকে ভয় দেখাতেন, যাতে ছাত্র নিজেই দেনদরবার করে অন্য কক্ষে চলে যায়। কথিত আছে একবার এক ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মজহারুল হকের কক্ষে বরাদ্দ দিয়ে পাঠায় এবং তাকে বলে সে যেন মজহারুল হককে ভয় না করে। মজহারুল হকের বন্ধুরা এই বার্তা তার কাছে পৌঁছে দেন। মজহারুল হক তৎক্ষণিক প্রস্তুতি নেন। তিনি রুমের একটি চৌকির ওপরে আরেকটি চৌকি তুলে দেন। নতুন বরাদ্দ পাওয়া ছাত্র এসে দরজায় ধাক্কা দিলে মজহারুল হক দরজা খুলে এক চৌকির ওপর রাখা আরেক চৌকি দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি একতলায় থাকবেন, না দোতলায় থাকবেন? এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন তিনি মাতাল। ছাত্রটি ভয় পেয়ে যায়। সে আর কক্ষে ঢোকেনি। পরে তদবির করে অন্য কক্ষে বরাদ্দ নেয়।

    ভর্তির জন্য সাক্ষাৎকার দিতে গেলাম হলের প্রভোস্ট ড. মজহারুল হকের কক্ষে। একজন দীর্ঘদেহী ব্যক্তিত্ব। চলনে-বলনে সাহেবিয়ানার ছাপ। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছ। আমি বললাম, হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, তোমাকে একটি এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আমার বন্ধু ব্যারীর মেয়ে ফোন করেছিল (বীথি ভাবির আব্বা আবদুল বারী মালিক তখন রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার বন্ধুরা বারীকে ব্যারী বলে ডাকত)। সাধারণত আমরা প্রথম বর্ষের ছেলেদের এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ দিই না। তবে তোমাকে দেওয়া যায় কি না, সেটা পরীক্ষা করার জন্য আমি পশ্চিম হাউসের হাউস টিউটর আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে অনুরোধ করেছি। তুমি কাল সকালে তাঁর সঙ্গে দেখা করো।

    এরপর তিনি বেল বাজান। বেলের শব্দ শুনে পিয়ন এলে তাকে তিনি বলেন, ‘হেড ক্লার্ককে আসতে বলো।’ হেড ক্লার্ক আসার পর তিনি বললেন, ‘এই ছেলেকে ওয়েস্ট হাউসের হাউস টিউটরের অফিস কক্ষ কোথায় তা দেখিয়ে দিন।’

    আমি মইজুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে তার কক্ষে এলাম। মইজুদ্দিন বললেন, ‘তোমার বাড়ি তো রসুল্লাবাদ।’ আমি উত্তর দিলাম, ‘জি’। তিনি বললেন, ‘তোমার ছোট চাচা মাহবুব আলী খাঁ আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। তিনি মারা গেছেন, তুমি আমাকে চাচা বলে ডাকবে।’

    পরদিন হাউস টিউটরের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাকে ওয়েস্ট হাউসের নিচতলায় বাথরুমের পাশে একতলায় একটি এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ করেন। এই কক্ষে আমি দুই বছর ছিলাম। অনার্স পরীক্ষার বছর সব ছাত্রকেই এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই সূত্রে আমি তৃতীয় বছর পশ্চিম হাউসের দুইতলার সর্ব পশ্চিম এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ পাই। যারা অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেত, তাদের এমএ পড়ার বছরটিতে এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ দেওয়া হতো। আমি তাই একই কক্ষে দ্বিতীয় বছর অবস্থান করি। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আমি মাত্র তিন মাস সময় ছাড়া বাকি সময় এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে থেকেছি। আমি যখন হলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন আমাকে তিন মাস একটি দুই শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে থাকতে হয়েছিল। যারা অনার্স পরীক্ষা দিত, তাদের কমপক্ষে তিন মাসের জন্য এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ দিতে হতো। একজন তৃতীয় বর্ষের অনার্স ক্লাসের ছাত্রের জন্য আমাকে তিন মাস দুই শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে থাকতে হয়েছিল। এক শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে আমার অবাধ স্বাধীনতা ছিল। বিছানা অগোছালো থাকত, বইপত্র যেখানে-সেখানে পড়ে থাকত। আমার কক্ষে সাধারণত আড্ডা বসত না। রাতে আমি অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারতাম। তবে দুই শয্যা কিংবা চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে বেশি রাতে পড়াশোনা করলে সহপাঠীদের। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটত।

    সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্র থাকাকালে আমি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টায় ঘুম থেকে উঠতাম। ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে চলে যেতাম ক্যানটিনে। সেখানে চা-নাশতা খেয়ে রুমে ফিরে এসে গোসল করতাম। তারপর সাড়ে ১০টা-১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ক্লাস থাকত। ক্লাসের শেষে বের হয়ে মধুর ক্যানটিনে চা-শিঙাড়া ইত্যাদি খেতাম এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তখন আড্ডা দিতাম। দুপুরের ক্লাস শেষ হয়ে গেলে আমি হলে ফিরে আসতাম। তখন হলের ডাইনিং রুমে অনেক রাতে সব সময় খাবার থাকত না। হলের ডাইনিং রুম সকাল সাড়ে ৯টায় খোলা হতো। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ ছাত্র তাদের খাবার খেত। আমি সাধারণত দেড়টা থেকে আড়াইটার মধ্যে খেতে আসতাম। তখন অনেক সময় মাছ অথবা গোশত, যা ছিল প্রধান। খাবার, তা শেষ হয়ে যেত। আমাদের তখন দুটি ডিম ভাজি করে দেওয়া হতো। খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নেওয়ার পর আমি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম পাঠাগারে পড়ার জন্য।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার তখন একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। ওই পাঠাগারে বিভিন্ন বই আমি পড়তাম। পাঠ্যবই সবই পাওয়া যেত কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সব পাতা পাওয়া যেত না। অনেক ছাত্র নোট করার জন্য বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ব্লেড দিয়ে কেটে নিয়ে যেত। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুসারে বইটি পাঠাগারে রয়েছে, সেহেতু বইটির কোনো নতুন কপি সংগ্রহ করা হতো না। ব্লেডে কাটা পাতা উদ্ধার করার জন্য আমরা আগের বছরের ছাত্রদের ওই বিষয়ের ওপরে নোট খুঁজতাম। অনেক নোটে হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলোর অনেক তথ্য পাওয়া যেত। মধ্যযুগের ইতিহাস সম্বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই চুরি হয়ে যায়। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে বইটি ছিল। আমি তার কাছ থেকে বইটি এক সপ্তাহের জন্য ধার নিয়ে পুরো বইটি একটি খাতার মধ্যে কপি করে রাখি।

    পাঠাগার থেকে রাত সাড়ে ৮টা-৯টায় হলে ফিরে আসতাম এবং খাওয়ার জন্য ডাইনিং হলে যেতাম। রাতের বেলায়ও অনেক সময় খাবার পাওয়া যেত না। হলের বাবুর্চিরা দুটি ডিম ভাজি করে খাওয়াত। হলে অনিয়মিত খাওয়াদাওয়ার জন্য আমার পেটের অসুখ লেগে ছিল। অনেকে হলের নিয়মিত খাবার খেয়েও পেটের সমস্যায় ভুগত। তাদের জন্য রোগীর পথ্য বা সিককাপ রান্না করা হতো। বেশির ভাগ সময়ে এই সিককাপে শিং অথবা মাগুর মাছ এবং কাঁচকলা থাকত। আমার পেট খারাপ হলেও আমি সিককাপ খেতাম না। যারা নিয়মিত সিককাপ খেত, তাদের নিয়ে আমরা ঠাট্টা করতাম।

    সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের রান্নার মান ছিল ভালো। সমস্যার মধ্যে ছিল দুটি। একটি হলো তেল বেশি করে দেওয়া হতো। দ্বিতীয়টি হলো ঝালও বেশি হতো। তবে এ ধরনের খাবার আমরা তখন পছন্দ করতাম। প্রতি সপ্তাহে একটি উন্নত মানের ডিনার দেওয়া হতো। মাসে একটি বড় ডিনার দেওয়া হতো। এই ডিনারে অনেক সময় প্রভোস্ট অথবা হাউস টিউটররা থাকতেন। একটি বার্ষিক ডিনার অনুষ্ঠিত হতো। এখানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনেক সময়ে আসতেন ছোট লাট, উপাচার্য অথবা রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত কোনো বিশেষ কর্মকর্তা। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন একবার বার্ষিক ডিনারে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদ হাসান। তিনি অত্যন্ত হাস্যরসিক ছিলেন এবং তাঁর বক্তৃতার সময় পুরো ডাইনিং হলে হাসির রোল পড়ে গিয়েছিল।

    হলে ডিনার খাওয়ার পর রাত ১০টার দিকে বন্ধুবান্ধবের খোঁজখবর নিতাম। কয়েকজন বন্ধু একত্র হলে গান শোনার জন্য চলে যেতাম হলের রেডিও রুমে। গান শোনা শেষ হলে পাঁচ-সাতজন বন্ধু মিলে হল থেকে বেরিয়ে যেতাম চা খাওয়ার জন্য। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পাশে আজাদ পত্রিকার অফিস ছিল। আজাদ পত্রিকার আশপাশে অনেক চায়ের দোকান ছিল। আমরা গিয়ে একটি চায়ের দোকানে বসে চা খেতাম এবং গল্পসল্প করতাম। রাত ১২টা সাড়ে ১২টার দিকে আমরা হলে ফিরে আসতাম। হলে ঢুকতে হতো প্রধান দরজা দিয়ে। এই দরজায় একজন দারোয়ান থাকত। হলে ঢুকে আমরা যে যার কক্ষে চলে যেতাম। কক্ষে ফেরার পর আমার পড়াশোনা শুরু হতো। প্রায় রাত তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত পড়াশোনা করতাম। এরপর ঘুমাতে যেতাম।

  • অষ্টম অধ্যায়

    অষ্টম অধ্যায়

    অষ্টম অধ্যায়
    একাডেমিতে শিক্ষানবিশকাল
    অক্টোবর ১৯৬৭-সেপ্টেম্বর ১৯৬৮

    ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক সময় আমি সিভিল সার্ভিসে নিয়োগপত্র পাই। পত্রটি স্বাক্ষর করেন ১৯৫৪ ব্যাচের পূর্ব পাকিস্তানি সিএসপি কর্মকর্তা এম মাহবুবুজ্জামান। এ চিঠিতে আমাদের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে কী ধরনের কাপড়চোপড় নিয়ে যেতে হবে, সে সম্পর্কে একটি তালিকা দেওয়া হয়। এই তালিকায় ঘোড়ায় চড়ার জন্য প্যান্ট এবং জুতা থেকে শুরু করে টেনিস-র্যাকেট, টেনিসের ড্রেস, স্যুট, ডিনার জ্যাকেট ইত্যাদি অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের জানানো হয়, একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর সরকার প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে বিশেষ অনুদান দেবে। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই আমাকে অনেক কিছু কিনতে হবে। আমার হাতে তখন টাকা নেই। আমার বড় চাচাতো ভাই মেজর (অব.) শওকত আলী খাঁন আমাকে এক হাজার টাকা উপহার দেন। আনুদা ৫০০ টাকা এবং শহীদদা ৫০০ টাকা উপহার দেন। এই দুই হাজার টাকা দিয়ে আমি কেনাকাটা করে লাহোর যাওয়ার প্রস্তুতি নিই।

    ১৯৬৭ সালের সিএসপিপিএফএস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ

    এই ব্যাচে মোট প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৫ জন। তার মধ্যে ৩৪ জন ১৫ অক্টোবর ১৯৬৭ সালে লাহোরে অবস্থিত সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে যোগ দেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বিদেশে ছিলেন এবং মাস তিনেক পরে তিনি যোগদান করেন। এই কর্মকর্তাদের পরিচয় নিচে লিপিবদ্ধ করা হলো—

    1. ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন শাহেদ সাদুল্লাহ। তাঁর পিতা এ এম সাদুল্লাহ আইপিএস কর্মকর্তা ছিলেন এবং আমরা যখন পরীক্ষা দিই, তখন তিনি কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ছিলেন। শাহেদ সাদুল্লাহ ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি এমএ পরীক্ষা না দিয়ে সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শাহেদ। সাদুল্লাহ কক্সবাজারের এসডিও ছিলেন। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেন এবং ১৬ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে সেকশন অফিসার হিসেবে বদলি হয়ে যান। তিনি বিয়ে করেন একজন বাঙালি মেয়েকে। তবে তাদের প্রথম সন্তান কানে শুনতে পেত না। তাই কন্যার চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদ থেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেন; শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো চাকরি না পেয়ে পিআইএর নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রেষণে লন্ডনে বদলি হন। এই পদে ৮-১০ বছর কাজ করার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং যুক্তরাজ্যে অভিবাসন করেন। তিনি লন্ডনের একটি পাকিস্তানি উর্দু পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এখন তিনি যুক্তরাজ্যেই আছেন।
    2. দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন মরহুম মিজানুর রহমান। যিনি শেলী ডাকনামে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্র ছিলেন এবং পাকিস্তান ছাত্র শক্তির একজন নেতা ছিলেন। তিনি সিএসএস পরীক্ষা দেবেন। কি না, এ সম্পর্কে দ্বিধান্বিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৬৭ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যাপক গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরীর গবেষণা সহকারী হিসেবে ইসলামাবাদ সচিবালয়ে কাজ করেন। অধ্যাপক চৌধুরী ছিলেন ইয়াহিয়া খানের অতি কাছের উপদেষ্টা। তাই মিজানুর রহমান শেলীও বিতর্কিত হন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের একটি বৃত্তি নিয়ে বিলাতে যান এবং স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি পরে ঢাকায় ফিরে আসেন। তাঁকে সিভিল সার্ভিসে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি সমাজকল্যাণ বিভাগের পরিচালক পদে নিযুক্ত হন। এই পদে থাকাকালীন তাঁর কিছু কার্যকলাপ নিয়ে বিতর্ক হয়; রাগ করে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। সিডিআরবি (Centre for Development Research, Bangladesh) নামে একটি পরামর্শক সংস্থা স্থাপন করেন এবং এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স নামে একটি গবেষণামূলক সাময়িকী প্রকাশ করেন। আগস্ট, ২০১৯ সালে তিনি মারা যান।
    3. ব্যাচে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন মরহুম এ বি এম আবদুশ শাকুর। তিনি মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁর প্রবেশিকা পরীক্ষার সার্টিফিকেটে বয়স কম করে দেখানো হয়েছিল। আসলে তিনি এ ব্যাচের গড় কর্মকর্তাদের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়। তবে তার চেয়েও বয়সে বড় কর্মকর্তা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে ১৯৬৭ সালে এসেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বান্দরবানের এসডিও ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি এডিসি ছিলেন। এরপর তাঁর চাকরি চলে যায়। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি চাকরি ফিরে পান এবং পটুয়াখালী জেলার ডেপুটি কমিশনার হন। তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি একজন জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং প্রথম আলোর বর্ষসেরা বই পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ২০১৩ সালে মারা যান।
    4. বাঙালিদের মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন ড. শাহ মোহাম্মদ ফরিদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে বিএ অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় এবং এমএ ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি সংস্থাপনসচিব, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব ছিলেন। মুখ্য সচিব থাকাকালীন তিনি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং উৎকেন্দ্রিক ছিলেন। ড. মিজানুর রহমান শেলী কৌতুক করে বলতেন, ‘Neither a friend, nor a foe, but a Farid’. শাহ ফরিদ লোকজনের উপকার করতেন এবং তাদের কাছ থেকে প্রতিদান প্রত্যাশা করতেন। তাঁর কাছ থেকে সামান্য উপকার পেয়েছে, এমন ব্যক্তির কাছেও তিনি প্রতিদান চাইতেন; প্রতিদান না পেলে তার বিরুদ্ধে বলতেন। দুষ্টু লোকেরা বলে, তাঁর কাছে সিভিল সার্ভিস ছিল একটি লেনদেনের প্রতিষ্ঠান।
    5. বাঙালিদের মধ্যে পঞ্চম স্থানে ছিলাম আমি (গ্রন্থকার)।
    6. বাঙালিদের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন খসরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরগঞ্জের এসডিও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ময়মনসিংহের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। এরপর তিনি ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ছিলেন। তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল থেকে এমপিএ এবং সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি দীর্ঘদিন লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ২০১৬ সালে মারা যান এবং তাঁর মৃত্যুর পর স্বাধীনতা পুরস্কারে সম্মানিত হন।
    7. বাঙালিদের মধ্যে সপ্তম স্থান অধিকার করেন মামুনুর রশীদ। তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে মনোনীত সদস্য ও পাকিস্তান সরকারের সচিব আবদুর রশীদের দ্বিতীয় ছেলে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীকালে ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের সচিব এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছিলেন। চাকরির শেষ বছরে তার বিরুদ্ধে বয়স জালের অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং তিনি পদত্যাগ করেন।
    8. বাঙালিদের মধ্যে অষ্টম স্থান অধিকার করেন কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে বিএ অনার্স ও এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি লাভ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসডিও ছিলেন এবং তিনি সেখানে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধের পর তিনি কুমিল্লার ডেপুটি কমিশনার হন। তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় পরিষদ সচিবালয়ের সচিব ছিলেন। তিনি সবশেষে বাংলাদেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন।
    9. বাঙালিদের মধ্যে নবম স্থান অধিকার করেন এ কে শামসুদ্দিন। তিনি রসায়নশাস্ত্রে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি লাভ করেন এবং সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার আগে পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে কাজ করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সিরাজগঞ্জের এসডিও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকার জন্য পাকিস্তান বাহিনী তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
    10. বাঙালিদের মধ্যে দশম স্থান অধিকার করেন আবদুল হামিদ চৌধুরী। তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত কৃতী ছাত্র ছিলেন। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য-প্রশাসক ছিলেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনীতিবিষয়ক যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, খাদ্যসচিব এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন।
    11. বাঙালিদের মধ্যে একাদশ স্থান অধিকার করেন ওয়ালিউল ইসলাম। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যশোরে বাংলাদেশের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি অস্ট্রেলিয়ায় জুটমিল করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজারের কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়; সড়ক, জনপথ ও রেল পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি দীর্ঘদিন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের জন্য স্থানীয় উপদেষ্টা হিসেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউএসএআইডের সঙ্গে কাজ করেছেন।
    12. বাঙালিদের মধ্যে দ্বাদশ স্থান অধিকার করেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। তিনি ভূমিসচিব ছিলেন। সচিবের পদমর্যাদায় যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি এই সেতু সম্পূর্ণ করে চালু করেন। তাঁর এই অবদানের জন্য ব্রিটিশ ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাকের তিনি নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মন্ত্রীর পদমর্যাদাসহ উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় ইব্রাহীম মেমোরিয়াল ডায়াবেটিক হাসপাতালের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি।
    13. পূর্ব পাকিস্তান থেকে সিএসপিতে ত্রয়োদশ স্থান অধিকার করেন সৈয়দ রেজাউল হায়াত। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সড়ক ও রাজপথ বিভাগের সচিব ছিলেন। ২০১২ সালে। তিনি মারা যান।
    14. সারা পাকিস্তানে ব্যাচের চতুর্থ স্থান অধিকার করেন ইকতিদার আহমদ চৌধুরী। তিনি একজন প্রকৌশলী ছিলেন। সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার আগে যুক্তরাজ্য থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করছিলেন। সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর তাঁর বেতন প্রায় ৭৫ শতাংশ হ্রাস পায়। জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনামলে সিএসপি তুলে দেওয়া হয়। ইকতিদার আহমদ চৌধুরী তখন পদত্যাগ করেন এবং বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন।
    15. সারা পাকিস্তানে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন আমিনুল্লাহ চৌধুরী। তাঁর পিতা রেলওয়ে সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং অনেক দিন চট্টগ্রামে কাজ করেছেন। আমিনুল্লাহ চৌধুরী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি এবং বিএল ডিগ্রি অর্জনের পর লন্ডনে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। লন্ডন থেকে তিনি বাণিজ্যিক আইনে এলএলএম ডিগ্রি পাওয়ার পর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেন। তিনি পাঞ্জাব সরকারের মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও সচিবালয়ে চাকরিজীবনের প্রায় পুরোটাই অতিবাহিত করেছেন। তিনি সচিবের পদমর্যাদায় পাকিস্তান সিভিল এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। সে সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নওয়াজ শরিফ। তিনি পারভেজ মোশাররফকে বরখাস্ত করার জন্য ষড়যন্ত্র করে তাঁকে শ্রীলঙ্কা সফরে পাঠান এবং তার অনুপস্থিতিতে তার বরখাস্তের আদেশ জারি করেন। পারভেজ মোশাররফ করাচি ফিরে আসতে চাইলে তার বিমানকে করাচি বিমানবন্দরে। নামতে বাধা দেওয়া হয়। এর ফলে পারভেজ মোশাররফের অনুগত সেনাবাহিনী বিমানবন্দর দখল করে এবং পারভেজ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক শাসন জারি করে। আমিনুল্লাহ চৌধুরীকে জেলে পাঠানো হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন। সিভিল সার্ভিসের ওপর তার রচিত বই Practical Administrator সমাদৃত হয়েছে। তিনি ২০১৩ সালে মারা যান।
    16. সারা পাকিস্তানে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেন তারেক সুলতান। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ও এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি প্রায় পুরো চাকরিজীবন পাঞ্জাব প্রদেশের জেলা প্রশাসন এবং সচিবালয়ে অতিবাহিত করেন। তিনি পাঞ্জাবের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব (উন্নয়ন) ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে তিনি ইসলামাবাদে সচিবের দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের সচিবের পদমর্যাদা দিয়ে লাহোর স্টাফ কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করার পর তাঁকে পাঞ্জাব পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য নিয়োগ করা হয়। তিনি ২০১৮ সালে মারা গেছেন।
    17. সারা পাকিস্তানে সপ্তম স্থান অধিকার করেন সায়েদুল্লাহ জান। তিনি সীমান্ত প্রদেশের হাইকোর্টের এক বিচারপতির সন্তান। তিনি সীমান্ত প্রদেশের মাঠপর্যায়ে কাজ করেন এবং সীমান্ত প্রদেশের মুখ্য সচিব নিযুক্ত হন। পরে তিনি পাকিস্তানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব হিসেবে কাজ করেন। তিনি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে মারা যান।
    18. সারা পাকিস্তানে অষ্টম স্থান অধিকার করেন এম আবদুল্লাহ। তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। ধর্মের বিষয়ে তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। তিনি সিভিল সার্ভিসকে নৈতিক আচরণবিধির ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে চান। তিনি খাইবার পাখতুনখোয়াতে মুখ্য সচিব ছিলেন। বর্তমানে তিনি পেশোয়ারে অবসর যাপন করছেন।
    19. সারা পাকিস্তানে দশম স্থান অধিকার করেন আলী কাজিম। তিনি লাহোর গভর্নমেন্ট কলেজের একজন তুখোড় ছাত্র ছিলেন। তিনি লাহোর গভর্নমেন্ট কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সেখানে তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিলেন। আলী কাজিম পাঞ্জাব সরকারের জেলা পর্যায়ে এবং সচিবালয়ে কাজ করেন। তিনি পাঞ্জাবের গভর্নরের সচিব নিযুক্ত হয়েছিলেন। এ সময়ে সরকারের সঙ্গে মতানৈক্য হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি লাহোরের একটি বিখ্যাত আইন ব্যবসাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। সম্প্রতি তিনি সম্পূর্ণ অবসর নিয়ে লাহোরের বাইরে একটি গ্রামে বাস করছেন।
    20. সারা পাকিস্তানে একাদশ স্থান অধিকার করেন সৈয়দ মেহেদী। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের কৃতী ছাত্র এবং ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপকও ছিলেন। অধ্যাপক হিসেবে তার প্রিয় ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন। নওয়াজ শরিফকে, যিনি পরবর্তীকালে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি পিএসপিতে যোগ দেন এবং ১৯৬৭ সালে সিএসপির জন্য মনোনীত হন। তিনি পাঞ্জাবের জেলা প্রশাসনে একজন নামকরা কর্মকর্তা ছিলেন। নওয়াজ শরিফ যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি তাকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নিযুক্ত করেন। মুখ্য সচিব হিসেবে তিনি ছিলেন নওয়াজ শরিফের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা। পারভেজ মোশাররফের বরখাস্ত হওয়ার ষড়যন্ত্রে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং এ জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
  • নবম অধ্যায়

    নবম অধ্যায়

    নবম অধ্যায়
    রাজশাহীতে শিক্ষানবিশকাল
    অক্টোবর ১৯৬৮ — নভেম্বর ১৯৬৯

    সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণার্থীদের নানা বিষয়ে পড়ানো হতো। কিন্তু প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণার্থীকে দক্ষ করা নয়; মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচিত কর্মকর্তাদের অফিসার হওয়ার উপযুক্ত করা। সিভিল সার্ভিসের সমালোচকেরা দাবি করতেন যে একাডেমিতে প্রশিক্ষণার্থীদের উন্নাসিক কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তোলা হতো। সাধারণ মানুষের জন্য তাদের কোনো উৎসাহ ছিল না। আমার মনে হয় এ সমালোচনাটি ঠিক নয়। দুর্বিনীত কর্মকর্তা সৃষ্টির জন্য কোনো একাডেমির প্রয়োজন হয় না, যেখানেই একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়, সেখানেই কর্মকর্তারা কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই জালেম হয়ে ওঠেন। এই প্রসঙ্গে Lord Acton-এর বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে, ‘Power corrupts and absolute power corrupts absolutely.’ কাছে মনে হয় সিভিল সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ছিল ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বের জন্য কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করা।

    ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে লাহোর একাডেমির কর্মসূচিসমূহ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে আমরা ঢাকায় ফিরে আসি। ঢাকায় তখন সার্ভিসেস অ্যান্ড জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের উপসচিব ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ, যিনি পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ঢাকায় পৌঁছার পরদিন সকালে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাদের পোস্টিং অর্ডার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমাকে রাজশাহী জেলার শিক্ষানবিশ অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছে। আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমি রাজশাহী যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। বিমানে করে তখন ঈশ্বরদী পর্যন্ত যাওয়া যেত। ঈশ্বরদী থেকে ট্রেন অথবা গাড়ি করে রাজশাহী যেতে হতো। ঢাকার বন্ধুবান্ধব পরামর্শ দিল যেন। আমি ডেপুটি কমিশনারের কাছে ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহী যাওয়ার জন্য একটি জিপ পাঠানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ করে একটি তারবার্তা পাঠাই। ঈশ্বরদীতে নেমে আমি কোথাও জিপ দেখতে পাইনি। সৌভাগ্যবশত পিআইএ ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহী পর্যন্ত যাত্রীদের জন্য একটি মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করেছিল। আমি অগত্যা সবশেষে কোনো রকমে ওই মাইক্রোবাসে স্থান করে নিলাম। ঘণ্টা তিনেক পরে গাড়ি রাজশাহী সাহেববাজার পিআই এ অফিসে হাজির হয়। গাড়ি থেকে নেমে দেখি একটি সরকারি জিপ দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামার পর এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন। যে আমার নাম আকবর আলি খান কি না? আমি হ্যাঁ বলাতে তিনি পরিচয় দেন যে তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট নাজির আবদুর রহিম। তিনি এসেছেন আমাকে সার্কিট হাউসে নিয়ে যাওয়ার জন্য। গাড়িতে বসতেই তিনি বললেন, ডেপুটি কমিশনার তাঁকে পিআইএ অফিস থেকে আমাকে সার্কিট হাউসে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি রাজশাহীর বাইরে সফরে গেছেন এবং সন্ধ্যার পর তিনি শহরে ফিরবেন। ফিরেই তিনি আমাকে ফোন করবেন। আমার সঙ্গে তাকে একটি জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

    আমি রাজশাহী সার্কিট হাউসে এসে নামলাম। সার্কিট হাউসে তখন দুটি অংশ ছিল। একটি অংশে ছিল পাঁচটি কামরাসহ একটি ভবন। একটি কামরা ড্রয়িং কাম ডাইনিং হিসেবে ব্যবহৃত হতো আর চারটি কামরা ছিল শয়নকক্ষ। সার্কিট হাউসের নতুন ভবন ছিল দ্বিতলবিশিষ্ট। দ্বিতল ভবনে চারটি কক্ষ ছিল। তার মধ্যে একটি কক্ষ ছিল ভিভিআইপিদের জন্য। নিচের তলায় ছিল একটি কনফারেন্স রুম এবং একটি ডাইনিং রুম ও একটি শয়নকক্ষ। এই শয়নকক্ষটিতেই থাকতেন আমার পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণার্থী হাবিবুন নবী আশিকুর রহমান, তিনি মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে চলে গেছেন। তাঁর শূন্য কক্ষটি আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়। কক্ষটিতে একজনের থাকার জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছিল। এমনকি বাথরুমের পাশে জিনিসপত্র রাখা এবং সাজসজ্জার জন্য একটি ছোট কক্ষও ছিল। পরে সার্কিট হাউসে আরও দুটি তলা বাড়ানো হয়েছে। তবে এই কক্ষটি ২০০১ সাল পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল।

    সার্কিট হাউসে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ডেপুটি কমিশনার খন্দকার আসাদুজ্জামানের টেলিফোন কল আসে। তিনি বলেন, ‘তুমি এসেছ ভালো হয়েছে। আজ রাতে তুমি আমার সঙ্গে ডিনার খাবে। অ্যাসিস্ট্যান্ট নাজির রহিম তোমাকে আমার বাসায় নিয়ে আসবে। আমি রাত আটটার দিকে ডিসির বাংলোয় যাই। তিনি তখন কনফিডেনশিয়াল রুমে বসে কাজ করছিলেন। আমি যাওয়ার পর খাওয়াদাওয়া হয়। টেবিলে আমাদের সঙ্গে আরও যোগ দেন মিসেস আসাদুজ্জামান এবং তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। খেতে খেতে আসাদুজ্জামান আমার বাড়ি কোথায়, বাবা কী করেন এ ধরনের পরিচিতিমূলক প্রশ্নগুলো সেরে নেন। তারপর বলেন, ‘তুমি আমার জন্য ঠিক সময় এসে পৌঁছেছ। ঠিক সময় কেন তা আমি বুঝতে পারিনি, তাঁর দিকে তাকাতেই বললেন, ‘ঠিক সময় এ জন্য যে আমার নওগাঁর মহকুমা প্রশাসক। মহীউদ্দীন খান আলমগীর পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে গেছে। আগামী পরশু দিন সে নওগাঁ থেকে চলে যাবে। অথচ গত তিন দিন ধরে নওগাঁ মহকুমায় আত্রাই নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে। মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত এবং সেখানে সুষ্ঠুভাবে রিলিফ কাজ পরিচালনার দরকার রয়েছে। তুমি কাল ভোরে নওগাঁ চলে যাবে এবং সেখানে গিয়ে ত্রাণের সব দায়িত্ব বুঝে নেবে।

    আমি সবে রাজশাহীতে এসেছি। সার্কিট হাউস এবং ডিসির বাংলো ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। আমার ইচ্ছা করছিল যে যদি এই সফর অন্তত দু-দিন পেছানো যায়। আমি বললাম, ‘স্যার, বন্যাদুর্গত অঞ্চলে কাজ করতে হলে টিএবিসি (টাইফয়েড, এমিবিক, বেসিলারি, কলেরা) প্রতিষেধক নেওয়া উচিত। আমি গত দু-তিন বছর টিএবিসি নিইনি। যদি অনুমতি দেন, তাহলে টিএবিসি নিয়ে দিন দুয়েক পরে আমি নওগাঁ যাই।’

    আসাদুজ্জামান বললেন, না, তোমাকে কালকেই যেতে হবে। তোমাকে কাল ভোর পাঁচটার সময় টিএবিসি ইনজেকশন দেওয়া হবে। ভোর ছযটার সময় তোমাকে জিপে করে নাটোরে নিয়ে সান্তাহারগামী ট্রেনে তুলে দেওয়া হবে (রাজশাহী থেকে সরাসরি সান্তাহার যাওয়া যেত না, ট্রেন বদল করে সান্তাহার যেতে অনেক সময় লাগত)। তিনি সহকারী নাজিরকে ডাকলেন এবং বললেন রাজশাহী মিউনিসিপ্যালটির কোনো ভ্যাকসিনেটরের সঙ্গে যাতে যোগাযোগ করে সকাল পাঁচটায় আমাকে টিএবিসি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন সকালে রহিম ঠিক পাঁচটার সময় এসে হাজির। আমাকে টিএবিসি ইনজেকশন নিতে হলো। এখানে উল্লেখ করতে হয় যে রাজশাহীর সহকারী নাজির রহিম খুবই করিতকর্মা ছিল। বস’দের আদেশ সে যেকোনো মূল্যে প্রতিপালন করত। বঙ্গবন্ধু যখন রাষ্ট্রপতি, তখন রহিম গণভবনের নেজারতে চাকরি পায় এবং সেখানে নেজারতের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করে। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে রাজশাহীতে ফেরত পাঠানো হয়। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের নাজির হিসেবে সে অবসর গ্রহণ করে।

    আমি নাশতা খেয়ে নাটোরের উদ্দেশে রওনা হলাম। টিএবিসি ইনজেকশন নিলে আমার জ্বর উঠত। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নাটোর পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার জ্বর উঠতে শুরু করে। ট্রেনে যখন উঠি, তখন দেহে ১০০ থেকে ১০১ ডিগ্রি তাপমাত্রা। এই জ্বর নিয়ে আমি সান্তাহারে নামি। সান্তাহার স্টেশনে নওগাঁর এসডিও ম্যালেরিয়া নির্মূল বিভাগের একটি গাড়ি রিকুইজিশন করে আমার জন্য পাঠিয়ে দেন। এই গাড়ি আমাকে নওগাঁ সড়ক ও রাজপথ বিভাগের পরিদর্শন বাংলোতে নিয়ে আসে। বিকেলবেলায় মহীউদ্দীন খান আলমগীর তার বাড়িতে খাওয়ার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানান। সন্ধ্যায় যখন তাঁর বাড়িতে আমি যাই, তখন তিনি অফিসের শেষ কাজকর্ম করছিলেন। আমাকে ডাইনিং রুমে নিয়ে গিয়ে সেখানে আমার জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী বললেন তাদের কয়েকটি ফেয়ারওয়েলে যেতে হবে। আমার জ্বর। তাই বেশি রাত পর্যন্ত সজাগ থাকা সম্ভব নয়। আমি যেন তাঁর বাড়ির খাবার খেয়ে রাতে রেস্টহাউসে গিয়ে বিশ্রাম করি। পরদিন সকালে তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবেন।

    আমি তাদের সাফল্য কামনা করি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি এসডিওর অফিসে যাই। সেখানে ত্রাণের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানি, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পত্নীতলা ও মহাদেবপুর থানা দুটি। নওগাঁ থেকে মহাদেবপুর হয়ে পত্নীতলা যাওয়ার যে সড়ক আছে, তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এখন পত্নীতলা যেতে হলে পাহাড়পুরের পাশ দিয়ে একটি বিকল্প সড়কে উঠে অনেক ঘুরে পত্নীতলা যাওয়া যাবে। আমি এ বিকল্প সড়ক দিয়ে পত্নীতলায় রওনা হয়ে যাই। সেখানে সার্কেল অফিসারকে খুঁজে বের করি এবং তাঁর সঙ্গে নৌকায় করে বন্যা-উপদ্রুত অঞ্চলে যাই। এই অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, তবে কেউ মারা যায়নি। আমি দেখতে পাই যে ওই অঞ্চলের জন্য যথেষ্ট ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। সুতরাং ত্রাণ কার্যক্রম সঠিকভাবে চলছে।

    আমি রাতে নওগাঁ শহরে ফিরে আসি। পরের দিন আবার একই সড়ক। দিয়ে আমি পত্নীতলায় যাই। সেখান থেকে সড়ক দিয়ে আমি মহাদেবপুর পর্যন্ত পৌঁছি। সেখানে নৌকা করে আমি আবার বন্যাদুর্গত অঞ্চল ঘুরতে যাই। বিকেলবেলা আমি নওগা ফিরে আসি। সেদিন সন্ধ্যায় ডেপুটি কমিশনার ফোন করেন দুদিন পর তিনি নওগাঁ আসছেন। এই দুদিন আমি প্রত্যেক দিনই রিলিফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করছিলাম। এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছিলাম। দুদিন পর ডেপুটি কমিশনার নওগাঁ আসেন। তখন বন্যার পানি নেমে গেছে। তিনি রিলিফের কাজকর্ম দেখে সন্তুষ্ট হন এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের হাতে রিলিফের দায়িত্ব দিয়ে আমাকে নিয়ে রাজশাহী ফিরে আসেন। প্রায় দিন সাতেক পর আমি রাজশাহীতে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করি।

    আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ব

    প্রশিক্ষণার্থীদের জেলা প্রশাসনে সংযুক্ত করা হতো জেলা প্রশাসনের কাজকর্ম শেখার জন্য। আমাকে প্রথমেই অনেকগুলো বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমাকে ইংলিশ বিভাগের অফিসার ইনচার্জ করা হয়। ইংলিশ বিভাগের দায়িত্ব ছিল ডেপুটি কমিশনারের অফিসের সব সাধারণ চিঠিপত্রের জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এই বিভাগের দায়িত্বে থাকতেন ডেপুটি কমিশনারের অফিসের হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিনি ডেপুটি কমিশনারের অফিসে যেসব চিঠিপত্র আসত, সেসব চিঠিপত্র ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্ধারিত বিভাগে পাঠাতেন। আমি তিন-চার দিন তার সঙ্গে বসে এ কাজটি করা দেখি। আমাকে ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অফিসার ইনচার্জ করা হয়। প্রতি মাসে জেলার সব উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে একটি সভা হতো। এই সভার কার্যপত্র উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত অফিসার কর্তৃক তৈরি করা হতো। তিনি সভার সিদ্ধান্তগুলোও লিপিবদ্ধ করতেন।

    আমাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ শেখার জন্য সপ্তাহে দুদিন রাজশাহী সদর এসডিওর অফিসে কাজ করতে হতো। মাস দুয়েক পর আমাকে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আমি সদর এসডিওর আদালতে পুলিশ ফাইল এবং জেনারেল ফাইলের কাজ করতাম। এখানে সব মামলা রুজু করা হতো এবং বিচারের জন্য প্রস্তুত মামলাগুলো ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে বিতরণ করা হতো, আসামিদের জামিন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। মহকুমার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ও মহকুমার সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য এই কাজটি ছিল অত্যাবশ্যক। আমি কয়েক মাস এ কাজটি করি। এর ফলে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে আমার দায়িত্বের জন্য সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ লাভ করি।

    এ ছাড়া ট্রেজারিতে প্রশিক্ষণের জন্য আমাকে সপ্তাহে কমপক্ষে এক দিন। ট্রেজারি অফিসারের সঙ্গে বসতে হতো। তখন রাজশাহীতে ট্রেজারি অফিসার ছিলেন আবদুর রহিম নামের একজন ইপিসিএস অফিসার। তিনি ছিলেন ১৯৫৯ ব্যাচের সিএসপি আবদুস সালাম এবং আবদুস সামাদের বড় ভাই। তিনি ট্রেজারির বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। আমার আরেকটি দায়িত্ব ছিল জেলা জজদের আদালতে বিচারের সময় উপস্থিত থেকে তিনটি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ শুনে তা লিপিবদ্ধ করা এবং সাক্ষ্য আইনের কোন ধারায় তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তা মার্জিনে উল্লেখ করা। জেলা জজ তা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হলে প্রাদেশিক সরকারকে তা জানিয়ে দিতেন। আমার ওপর তখন এত কাজ অর্পিত হয়েছিল যে এ কাজটি আমি সম্পন্ন করা দূরে থাকুক, শুরুই করতে পারিনি। কিছুদিন পরপর বিভাগের দায়িত্ব পরিবর্তন করা হতো। আমাকে লাইব্রেরি এবং LAO (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অফিসার)-এর দায়িত্ব ছাড়া আর সব বিভাগের দায়িত্ব কমপক্ষে এক মাসের জন্য দেওয়া হয়। আমি এনডিসি (নেজারত ডেপুটি কালেক্টর) এবং আরডিসির (রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর) দায়িত্বও পালন করেছি।

    এসব আনুষ্ঠানিক কাজের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছিল অনেক বেশি। অনানুষ্ঠানিকভাবে আমি ছিলাম আমার ডেপুটি কমিশনারের একান্ত সচিব। ডেপুটি কমিশনারের অফিসে ঢুকতে হলে আমার অফিস দিয়ে ঢুকতে হতো। ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার জন্য যখন কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তি আসতেন, তখন তিনি আমার রুমে বসে অপেক্ষা করতেন। এভাবেই রাজশাহীর আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা কামারুজ্জামানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে আমার অফিসে এসে বসতেন। আমি তাকে ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতাম। ডেপুটি কমিশনার যখন রাজশাহীর বাইরে কোনো প্রকল্প বা অফিস পরিদর্শনে যেতেন, তখন তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। কীভাবে অফিস পরিদর্শন করতে হয়, সে সম্পর্কে প্রথম সবক আমি খন্দকার আসাদুজ্জামানের কাছ থেকেই পাই। আবার ডেপুটি কমিশনার যখন রাতে বোয়ালিয়া ক্লাবে যেতেন, তখনো তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। প্রায় সারা দিনই আমাকে ডেপুটি কমিশনারের পাশে থাকতে হতো। এর ফলে আমার ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনারদের চেয়েও বেশি ছিল। নাটোরে তখন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন ১৯৬৫ ব্যাচের আখতার আলী। ডিসি অফিসে নাটোরের কোনো ফাইল আটকে গেলে তিনি আমাকে ফোন করতেন। আমি বেশ কিছু ক্ষেত্রে তার সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলাম।

  • দশম অধ্যায়

    দশম অধ্যায়

    দশম অধ্যায়
    হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক

    আমি হবিগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ১৯৬৯ সালের ৩ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করি। হবিগঞ্জ তখন ছিল সিলেট জেলার একটি মহকুমা। বাংলাপিডিয়া থেকে দেখা যায়, সিলেট জেলার একটি মহকুমা হিসেবে ১৮৭৪ সালে হবিগঞ্জ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত মহকুমা প্রশাসক পদে। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের এবং আসাম সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের পদায়ন করা হতো। যখনই আইসিএস অফিসার পাওয়া যেত না, তখন আসাম সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মহকুমা প্রশাসক পদে নিয়োগ করা হতো। ১৯৪৭ সালের আগে সিলেট জেলার কর্মকর্তাদের সিলেট জেলার মহকুমা প্রশাসক পদে নিয়োগে কোনো বাধা ছিল না। এর ফলে বেশির ভাগ সময়ই সিলেট জেলার কর্মকর্তারাই মহকুমা প্রশাসক নিযুক্ত হতেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর একই জেলার কর্মকর্তাদের ওই জেলার মহকুমা প্রশাসক বা জেলা প্রশাসক নিয়োগ বন্ধ করা হয়। এর ফলে সিলেট জেলার জনগণের মধ্যে বাইরের জেলার মহকুমা প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসকের নিয়োগ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়। বহিরাগত প্রশাসকদের তারা ফরেনার’ বলে অভিহিত করত এবং অনেক ক্ষেত্রেই এদের পক্ষে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। সংগ্রহ করা কষ্টকর হতো।

    ১৮৮৪ থেকে ১৯৪৭–এই ৬৩ বছর ধরে অনেক আইসিএস অফিসার হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে কাজ করেছেন। তবে তাদের মধ্যে একজন কর্মকর্তার নাম সত্তরের দশকেও জনমনে বেঁচে ছিল। এই নামটি হলো এম খুরশিদ। তিনি একজন পাঠান আইসিএস অফিসার ছিলেন। ১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে আসেন। ওই সময় বাংলা প্রদেশেও বেশ কয়েকজন মুসলমান কর্মকর্তা মুসলমান প্রজাদের স্বার্থরক্ষায় ও তাদের অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে এন এম খান (নিয়াজ মোহাম্মদ খান) ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, আজিজ আহমদ চাঁদপুরে এবং এইচ এম ইছহাক সিরাজগঞ্জে জনপ্রিয় মহকুমা প্রশাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। এম খুরশিদ হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক থাকাকালীন ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ করেছেন। তবে শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন না, তার সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবও তাঁকে জনমনে বিশেষ আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। কিংবদন্তি সূত্রে জানা যায় যে একবার এক সচ্ছল কৃষক রাগের মাথায় তার ছোট ভাইকে খুন করে ফেলেন। পুলিশ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার আগেই আসামি খুরশিদের বাসভবনে এসে তার পায়ে ধরে বলে, রাগের মাথায় সে খুন করে ফেলেছে। খুরশিদ সাহেব যেন তাকে মাফ করে দেন। খুরশিদ সত্যি তাকে মাফ করে দেন। পুলিশকে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে দেননি। অবশ্য তিনি ছোট ভাইয়ের ওয়ারিশদের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। খুরশিদ পরে সিলেট জেলার ডেপুটি কমিশনার ছিলেন এবং পাকিস্তান সরকারের প্রতিরক্ষাসচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তান খুরশিদকে পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। অবশ্য রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর সাফল্য ছিল সীমিত।

    আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ডিসেম্বর ১৯৭১-এই ২৪ বছর চার মাস সময়। পরিসরে প্রায় ২৮ জন কর্মকর্তা হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৩ জন কর্মকর্তা এসডিওর অনুপস্থিতিতে সাময়িক দায়িত্ব পালন করেছেন। সিএসপি কর্মকর্তারা এই মহকুমার দায়িত্বে ছিলেন ১১ বছর ১১ মাস। আর প্রাদেশিক সার্ভিসের কর্মকর্তারা ছিলেন ১২ বছর ৫ মাস। এর মধ্যে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন ৯ জন। এই ৯ জন সিএসপি কর্মকর্তা হলেন : ১৯৫২ ব্যাচের মফিজুর রহমান, ১৯৫৪ ব্যাচের জাফর ইকবাল, ১৯৫৬ ব্যাচের কাজী জালাল আহমদ, ১৯৫৬ ব্যাচের এম আই কে খলিল, ১৯৫৯ ব্যাচের শফিউল আলম, ১৯৬২ ব্যাচের এ কে এম শামসুল হক খান, ১৯৬৫ ব্যাচের ড. মোহাম্মদ আবদুর রশিদ, ১৯৬৫ ব্যাচের ফরিদউদ্দিন আহমদ এবং ১৯৬৭ ব্যাচের আকবর আলি খান। শামসুল হক খান ছাড়া আর সব কর্মকর্তাই দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব পদে কাজ করেছেন। শামসুল হক খান ১৯৭১ সালে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক থাকাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে শাহাদতবরণ করেন।

    হবিগঞ্জে জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার নিয়োগাদেশ ১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসের ২৩-২৪ তারিখের দিকে জারি করা হয়। ওই সময় হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি সিএসপি অফিসার ফরিদউদ্দিন আহমদ। তাঁর পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার বিশেষ তাড়া ছিল, তাই ঢাকা থেকে আদেশ জারি হওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ডেপুটি কমিশনারকে অবিলম্বে তাঁর হাতে দায়িত্বভার তুলে দেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। সিলেটের ডেপুটি কমিশনার আমাকে রাজশাহীতে তারবার্তা পাঠান যে আমি যেন যোগদানের সময় না নিয়ে সরাসরি হবিগঞ্জে যোগ দিই। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলি হলে সরকারি কর্মচারীরা প্রচলিত নিয়মে যোগদানের সময় পেতেন। আমি রাজশাহী থেকে হবিগঞ্জ যাওয়ার আগে ঢাকায় আত্মীয়স্বজন এবং বাড়িতে মা-বাবার দোয়া নেওয়ার বাসনা করি। আমার পক্ষে তাই সিলেটের ডিসির নির্দেশিত তারিখে যোগ দেওয়া সম্ভব ছিল না। আমি তাই তাকে জানিয়ে দিই আমি ৩ ডিসেম্বর হবিগঞ্জে যোগ দেব।

    আমি ১৯৬৯ সালের ২ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা থেকে ট্রেনে হবিগঞ্জ রওনা। হই। ঢাকা থেকে আখাউড়া আসার পর সিলেটগামী কোচগুলোকে খুলে নতুন ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিকেলের দিকে আখাউড়া থেকে আস্তে আস্তে মনতলা স্টেশনে পৌঁছাই। মনতলা ছিল হবিগঞ্জ মহকুমার অংশ। ট্রেনে। হবিগঞ্জ মহকুমায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ভূপ্রকৃতি ভিন্ন রূপ ধারণ করে। পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে ট্রেন চা-বাগান অঞ্চলে প্রবেশ করে। ছোটবেলা থেকে আমি চা খাই কিন্তু চা-বাগান এর আগে আমি কখনো দেখিনি। তেলিয়াপাড়া অঞ্চল দিয়ে ঢুকে শাহজীবাজার হয়ে শায়েস্তাগঞ্জে এসে ট্রেন থামে। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে দুভাবে হবিগঞ্জ যাওয়া যেত। প্রথমত, সড়কপথে মোটরগাড়ি কিংবা স্কুটারযোগে হবিগঞ্জ যাওয়া যেত। দ্বিতীয়ত, রেলপথে হবিগঞ্জে যাওয়া যেত কিন্তু ট্রেনে যেতে হলে হবিগঞ্জগামী ট্রেনের জন্য শায়েস্তাগঞ্জে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। আমাকে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসডিওর জিপ পাঠানো হয়।

    আমি জিপে করে রাতের বেলা হবিগঞ্জে এসডিওর বাসভবনে উপস্থিত হই। রাতেই ডেপুটি কমিশনারের বাসায় ফোন করি। আমাকে জানানো হয় ডেপুটি কমিশনার বর্তমানে সফরে আছেন এবং আগামীকাল সফর থেকে ফিরে এলে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। ৩ ডিসেম্বর আমি দায়িত্বভার গ্রহণ করি। আমার প্রথম কাজ ছিল ট্রেজারির দায়িত্ব গ্রহণ। রাজশাহীতে ট্রেজারিতে প্রশিক্ষণের সময় বারবার এ কথা জোর দিয়ে শেখানো হয়েছে যে ট্রেজারির দায়িত্ব গ্রহণের সময় সবকিছু ভালোভাবে মিলিয়ে দেখে দায়িত্ব নিতে হবে। যদিও ট্রেজারির দায়িত্ব অনেক কমে গিয়েছিল; তবু আফিম থেকে বন্দুক, সোনার গয়না, স্ট্যাম্প ইত্যাদি অনেক কিছু ট্রেজারিতে থাকত। দু-তিনজন সহকারী কর্মকর্তা নিয়ে প্রায় সারা দিন ধরে সবকিছু মিলিয়ে আমি ট্রেজারির দায়িত্ব গ্রহণ করি।

    ততক্ষণে অফিসের সময় শেষ হয়ে গেছে। ওই সময় ছিল রোজার মাস। আমি রোজা ছিলাম। বাসায় গিয়ে ইফতারের জন্য অপেক্ষা করছি। এমন সময় সিলেট থেকে ডেপুটি কমিশনারের টেলিফোন এল। তিনি বললেন, ‘তুমি এসে পড়েছ, খুব ভালো হয়েছে। এই মুহূর্তে তেলিয়াপাড়া ইপিআর ক্যাম্পে একটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল রাতে দুষ্কৃতকারীরা ওই ক্যাম্পে একজন পশ্চিম পাকিস্তানি বিডিআর সৈনিককে মেরে ফেলেছে। ইপিআর এতে খুব অসন্তুষ্ট এবং তারা প্রতিশোধ নিতে চায়। তারা আশপাশের গ্রামের লোকজনকে ঢালাওভাবে ধরতে চায় এবং কোনো বাধা এলে আগুন দিয়ে বসতি পুড়িয়ে দেওয়ার, প্রয়োজনে গুলি করার পরিকল্পনা করছে। তিনি জানালেন ইপিআরের লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিছুক্ষণের মধ্যে তেলিয়াপাড়ার উদ্দেশে রওনা হবেন। ডিসি সাহেব আমাকে পরামর্শ দিলেন আমি যেন ইফতার করে সোজা তেলিয়াপাড়া ইপিআর ক্যাম্পে চলে যাই এবং সেখানে গিয়ে যাতে কোনো অপ্রীতিকর কিছু না ঘটে, সে ব্যবস্থা করি। আমি সঙ্গে সঙ্গে চুনারুঘাট থানার সার্কেল অফিসারকে ফোন করি এবং তাঁকে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ওই এলাকার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে তার অফিসে বসিয়ে রাখার জন্য অনুরোধ করি। আমি ইফতার শেষে চুনারুঘাট চলে যাই এবং সেখান থেকে সার্কেল অফিসার, ওসি এবং ইউনিয়ন কাউন্সিলের কর্মকর্তাসহ সরাসরি ইপিআর ক্যাম্পে যাই। আমি ইপিআর ক্যাম্পে যাওয়ার ঘণ্টা আধেকের মধ্যে ইপিআরের লেফটেন্যান্ট কর্নেল এক জিপভর্তি সৈন্যসহ আবির্ভূত হন। তিনি এসে এলাকার লোকদের খুব গালাগালি করেন। তিনি বলেন, এলাকার লোকজন অধিকাংশই স্মাগলার এবং ভারতের চর–এদের শাস্তি দিতে হবে। আমি বললাম, দোষীদের অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে। তারপর সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখতে চাইলাম। ইপিআরের বর্ণনা অনুসারে চার-পাঁচজন লোকের বিরুদ্ধে নালিশ ছিল। আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে বললাম যে এদের আমি অবশ্যই ধরব এবং আজই জেলে নিয়ে যাব। এই বলে আমি ওসিকে দুবৃত্তদের ধরার জন্য আদেশ দিলাম। ওসি এবং ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে বলা ছিল যে ইপিআর যাদের বিরুদ্ধে নালিশ করবে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে অ্যারেস্ট করা হবে। তবে তাদের অ্যারেস্ট করে ইপিআরের হাতে দেওয়া হবে না। এদের পুলিশের হাতে দেওয়া হবে। পুলিশের ধৃত আসামি হলে এদের জামিন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মহকুমা প্রশাসকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে অবিচারের সম্ভাবনা খুবই কম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসামিদের ধরে আমি হবিগঞ্জ জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। লেফটেন্যান্ট কর্নেলের কোনো নালিশের অবকাশই ছিল না। তিনি তা মেনে নিলেন এবং তিনি সিলেট ফিরে গেলেন। সব ঝামেলা মিটিয়ে রাত প্রায় দুইটার দিকে আমি হবিগঞ্জ পৌঁছাই এবং সাহরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

    পরদিন সকাল আটটার দিকে আমার ঘুম ভাঙে। নয়টার দিকে কাপড়চোপড় পরে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হই, তখন একজন পিয়ন। এসে জানায়, চাকলাপঞ্জি চা-বাগানের ম্যানেজার আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য বসে আছেন। বাসার অফিসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যানেজার এসে নিজের পরিচয় দিলেন এবং বললেন তাকে ২০ হাজার টাকার চেক দিতে হবে। আমি প্রশ্ন করলাম যে আমি কোথা থেকে চেক দেব? তিনি বললেন, স্যার, আপনি বোধ হয় জানার সময় পাননি হবিগঞ্জে তিনটি চা-বাগান শত্রু সম্পত্তি হিসেবে সরকার অধিগ্রহণ করেছে এবং হবিগঞ্জের মহকুমা প্রশাসককে এই শত্রু সম্পত্তির ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিযুক্ত করেছে। আপনার প্রথম কাজ হলো এই চা-বাগানগুলো চালু রাখা এবং এ চা-বাগানগুলোর শ্রমিকেরা যাতে তাদের মজুরি ও অন্যান্য পাওনা যথাসময়ে পায়, তা নিশ্চিত করা। কোনো অবস্থাতেই শ্রমিক অসন্তোষ হতে দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয় দায়িত্ব হলো চা বাগানগুলো যাতে যথাযথভাবে পরিচালিত হয় এবং মুনাফা করতে পারে, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

    চুনারুঘাট থানার চাকলাপঞ্জি চা-বাগান ছাড়া আরও দুটি চা-বাগান শত্রু সম্পত্তি হিসেবে অধিগ্রহণ করা হয়। এদের একটি ছিল বাহুবল থানায় অবস্থিত বৃন্দাবন চা-বাগান। এই বাগানের যিনি ম্যানেজার ছিলেন, তাঁকে দিয়েই এই বাগান চালু রাখা হয়। মাধবপুর থানায় বৈকুণ্ঠপুর নামে আরেকটি চা-বাগান অধিগ্রহণ করা হয়। সেখানে কোনো নিয়মিত ম্যানেজার ছিল না। তাই প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা তোফায়েল আহমদ চৌধুরীকে এই বাগানের ম্যানেজার নিযুক্ত করা হয়। এই বাগানগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য আমি বাগানগুলো পরিদর্শনের কর্মসূচি গ্রহণ করি। মহকুমা প্রশাসকের অনেক দায়িত্বের সঙ্গে চা-বাগান পরিচালনার অতিরিক্ত দায়িত্ব আমাকে প্রায় ৯ মাস বহন করতে হয়। অনেক তদবিরের পর পাকিস্তান শত্রু সম্পত্তি বোর্ড এই বাগান পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।

    হবিগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক হিসেবে আমার স্মৃতি কালক্রম অনুসারে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের আলোচনায় ঘটনার ওপরে বেশি জোর থাকে, বিশ্লেষণের পরিমাণ হয় কম। আমি মহকুমা প্রশাসক হিসেবে যা শিখেছি, তা বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তাই আমি নিম্নলিখিত শিরোনামে আমার অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ করতে চাই–

    (১) ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা (২) মহকুমা হাকিম এবং পুলিশের সম্পর্ক (৩) ভূমি রাজস্বব্যবস্থা। (৪) বুনিয়াদি গণতন্ত্রভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা (৫) ত্রাণ কার্য (৬) মহকুমা প্রশাসন এবং শিক্ষাব্যবস্থা (৭) মিত্রপক্ষের গুলি

    (১) ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা : ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার ওপরে কর্তৃত্ব ছিল মহকুমা হাকিমের ক্ষমতার প্রধান উৎস। তাই রাজশাহীতে প্রশিক্ষণের সময় আমি ফৌজদারি মামলা পরিচালনা সম্বন্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিই। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি আইনও ভালোভাবে পাঠ করি। তার ফলে ফৌজদারি আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে আমার কোনো দ্বিধা ছিল না। যেসব সিএসপি কর্মকর্তা ফৌজদারি বিচার সম্পর্কে ভালো করে প্রশিক্ষণ নেননি, তাঁদের পক্ষে আদালত পরিচালনা করা ছিল শক্ত। এঁরা আদালতে বসতে চাইতেন না এবং আদালতের কাজ প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ছেড়ে দিতেন। এর ফলে মহকুমার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। এ ধরনের কর্মকর্তারা যখন বাধ্য হয়ে আদালতে বসতে হতো, তখন তারা আদেশ লেখার জন্য প্রধানত আদালতের পেশকারদের ওপর নির্ভর করতেন। অনেক মহকুমা হাকিম পেশকারদের ওপর এত নির্ভরশীল ছিলেন যে তাঁরা এজলাসে বসে বলতেন আমার পেশকার এত ভালো পরামর্শ দেয় যে ফৌজদারি কার্যবিধি আইন দেখারও কোনো প্রয়োজন মনে করি না। পেশকাররা হাকিমকে শুধু আইনগত পরামর্শই দিতেন না, তাঁরা ইংরেজ আইসিএস অফিসারদের বাংলা সাক্ষ্য-প্রমাণ ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরে সহায়তা করতেন। এর ফলে ব্রিটিশ ভারতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অন্যতম নিয়ন্ত্রক হন পেশকার। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত বইয়ে এ রকম একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ পেশকারের কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।

    পেশকারেরা এজলাসে বসে ঘুষ নিত। তাদের দুষ্কর্ম বন্ধ করা অনেক সময় হাকিমদের ক্ষমতার বাইরে চলে যেত। আমার পিতা ছিলেন একজন আইনজীবী। তাঁর কাছে গল্প শুনেছি যে একবার একজন ব্রিটিশ আইসিএস অফিসার পেশকারের দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি আদেশ দেন আদালতে প্রবেশ করার সময় কোনো আমলা কোনো অর্থ নিয়ে আসতে পারবে না এবং যাওয়ার সময়ও তার পকেটে কোনো অর্থ থাকা চলবে না। যদি কোনো আমলা অর্থসহ আদালতে ধরা পড়ে, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হবে। এই আইসিএস অফিসারের এজলাসে বসেই পেশকার দুটি আধুলি ঘুষ নেয়। আধুলি দুটি মাটিতে পড়ে যায় এবং টুং করে আওয়াজ হয়। হাকিম টের পান যে ঘুষ বিনিময় হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ পুলিশ ডেকে আনেন এবং এই অর্থ উদ্ধার করে পেশকারকে গ্রেপ্তার করার জন্য আদেশ দেন। পুলিশ আধুলি দুটি তন্নতন্ন করে খোঁজে কিন্তু কোথাও আধুলি পাওয়া যায় না। ইতিমধ্যে পেশকার একটি ইস্তফাপত্র তৈরি করে হাকিমকে দেন। ইস্তফাপত্রে তিনি লেখেন যে গত দুই দশকের অধিক কাল ধরে তিনি সব হাকিমকে সন্তুষ্ট করে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং রায় বাহাদুর উপাধির জন্য সুপারিশ পেয়েছেন। কেউ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেননি। অথচ প্রমাণ ছাড়া বর্তমান হাকিম তাকে জনসমক্ষে ঘুষখোর বলে। হেনস্তা করেছেন। এ অবস্থা তার পক্ষে মানা সম্ভব নয়, তাই তিনি পদত্যাগ করতে চান। হাকিম তখন পেশকার ছাড়া আর সবাইকে তার কক্ষের বাইরে চলে যেতে আদেশ দেন। এরপর তিনি পেশকারকে বলেন যে পেশকারের দুর্নীতি নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই। তাঁর কৌতূহলের বিষয় হলো আধুলি দুটি কোথায় এবং কীভাবে উধাও হয়ে গেল। যদি পেশকার এই গোপন তথ্যটি তাঁকে জানান, তাহলে তিনি কখনো পেশকারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। পেশকার মহকুমা হাকিমের সামনে রাখা দোয়াত তুলে ধরেন। দেখা যায় দোয়াতের নিচে দুটি আধুলি। ম্যাজিস্ট্রেট যখন উত্তেজিত হয়ে পুলিশ ডাকছিলেন, সেই সময়ে পেশকার আধুলি দুটি ম্যাজিস্ট্রেটের দোয়াতের নিচে লুকিয়ে ফেলেন। এ ধরনের পেশকারদের শাস্তি দেওয়ার কোনো সহজ উপায় নেই।

    আমি যখন মহকুমা হাকিমের দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন আমার আদালতের পেশকার ছিলেন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি অত্যন্ত যোগ্য ছিলেন। আমার পূর্ববর্তী এক মহকুমা হাকিম প্রকাশ্য আদালতে বলতেন যে তার মতো পেশকার থাকলে ফৌজদারি কার্যবিধিমালার দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। অবশ্য তাঁর সম্পর্কে নানা কানাঘুষা ছিল। পেশকারদের ঘুষের উৎস দুটি। একটি উৎস হলো ম্যাজিস্ট্রেট যে আদেশ দেন, সে আদেশের অনুলিপি অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবীদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন হয়। তখন ফটোকপির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই পেশকারকে ঘুষ দিয়ে হাতে লেখা কপি সংগ্রহ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। দ্বিতীয় উৎস হলো মক্কেলকে মামলায় জিতিয়ে দেওয়া। যেখানে হাকিম ঘুষ খায়, সেখানে পেশকার হাকিমের সঙ্গে মিলে মক্কেলদের কাছ থেকে টাকা খায়। তবে যেখানে হাকিম ঘুষখোর নয়, সেখানেও পেশকার টাকা খায়। সে মক্কেলদের বলে, যদি রায় তার অনুকূলে

    যায়, তাহলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় পেশকাররা আদালতের রায় কী হবে, সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুমান করতে পারতেন। সামান্যসংখ্যক মামলায় তাদের অনুমান ভুল হলে মক্কেলদের টাকা ফেরত দিয়ে দিলে আর কোনো সমস্যা হতো না। এ ধরনের ঘুষখোর পেশকাররাই বিচারব্যবস্থার ওপর জনমনে সম্পূর্ণ অনাস্থার সৃষ্টি করে। আমি জ্যেষ্ঠতম পেশকারের বদলে দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ পেশকারকে আমার আদালতে নিয়োগ দিই। সৌভাগ্যবশত রাজস্ব বিভাগের হেড অ্যাসিস্ট্যান্টের পদ খালি ছিল। এই পদে আমার পেশকারকে নিয়োগ করি। দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ পেশকার মনে করে যে তাকে ছাড়া তরুণ হাকিমের চলার কোনো উপায় নেই। সুতরাং সে প্রকাশ্যে ঘুষ খাওয়া শুরু করে। একদিন আমি এজলাসে থাকাকালীন সে একজন আইনজীবীর কাছ থেকে টাকা নেয়। আমি তৎক্ষণাৎ তাকে বদলি করি এবং তৃতীয় জ্যেষ্ঠ পেশকারকে আমার আদালতে নিয়োগ করি। মাসখানেক পরে এই তৃতীয় জ্যেষ্ঠ পেশকারও এজলাসে ঘুষ খায়। হবিগঞ্জে তখন আর কোনো পেশকার ছিল না যে মহকুমা হাকিমের পেশকারের কাজ চালাতে পারে। খাসকামরায় গিয়ে আমি পেশকারকে ডেকে পাঠাই। তাকে আমি বলি সে যে ঘুষ খায়, এ নিয়ে আমার মনে সন্দেহ নেই। তবে যদি আমার আদেশের অনুলিপি দেওয়ার জন্য অফিসের পর তাকে কাজ করতে হয়, তাহলে সে যদি মজুরি হিসেবে কিছু অর্থ গ্রহণ করে, সেটা আমি সহ্য করতে পারি; কিন্তু যদি আমার নাম ব্যবহার করে কোনো ঘুষ খাওয়া হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সে আমার পায়ে ধরে প্রতিশ্রুতি দেয় সে। কখনো আমার নাম ব্যবহার করে ঘুষ খাবে না। এ ধরনের অভিযোগ আমি হবিগঞ্জে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে শুনতে পাইনি। দেশের সুবিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু বিচারব্যবস্থাকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র করলেই হবে না, হাকিম-পেশকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

    হবিগঞ্জে ফৌজদারি আদালতে প্রধানত মোক্তাররা মামলা পরিচালনা করতেন। এখানে খুব অল্পসংখ্যক বিএল ডিগ্রিধারী উকিল মামলা করতেন। মহকুমা হাকিমের এখানে মোক্তারদের ভিড় লেগে থাকত প্রধানত আসামিদের জামিনের জন্য। মোক্তাররা বিচারকদের সন্তুষ্ট করতে চাইতেন, যাতে তার মক্কেলদের জন্য জামিন পেতে পারেন। হবিগঞ্জ শহরে কলকারখানা খুব একটা ছিল না। অথচ মহকুমায় প্রচুর অপরাধ সংঘটিত হতো। এ অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য যে আদালত, সে আদালতেই ভিড় হতো বেশি। তাই শহরের অধিকাংশ মানুষ ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত কঠোরভাবে নিরীক্ষণ করত।

    বর্তমানকালের ম্যাজিস্ট্রেটদের তুলনায় ষাটের দশকের ম্যাজিস্ট্রেটরা জামিনের ব্যাপারে অনেক উদার ছিলেন। বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করে, আদালতে পাঠায়, তাদের বেশির ভাগ ব্যক্তিকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অথচ পাকিস্তান আমলে ম্যাজিস্ট্রেটরা ৫৪ ধারায় পাঠানো ব্যক্তিদের জামিন দিয়ে দিতেন, যদি না তার বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো প্রমাণ পুলিশ দাখিল করতে পারত। আমার মনে আছে যে আমি হবিগঞ্জে ৫৪ ধারায় পুলিশ প্রেরিত ব্যক্তিদের একজন ব্যক্তি ছাড়া আর সবাইকে জামিন দিয়েছিলাম। একজন ব্যক্তি, যাকে জামিন দিইনি, সে ছিল আমার আত্মীয়। তার নাম শাহ আলম চৌধুরী। সে আমার মামা অলি আহমদ চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র। অর্থাভাবে তাকে মাদ্রাসায় পড়তে পাঠানো হয়; কিন্তু মাদ্রাসাশিক্ষা তাকে মোটেও আকৃষ্ট করেনি। সে প্রায়ই মাদ্রাসা থেকে পালাত এবং বিভিন্ন জায়গায় ছোটখাটো অপরাধ করত। ধরা পড়লে আমার মামা তাকে জামিনে ফেরত নিয়ে আসতেন। শাহ আলম যখন খবর পায় যে আমি হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক, তখন সে ট্রেনে করে হবিগঞ্জে আসে এবং ৫৪ ধারায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আমি তাকে আদালতে দেখে চিনতে পারি এবং তাকে জেলে পাঠানোর আদেশ দিই। এই খবর আমার মামার কাছে পৌঁছায়। তিনি হবিগঞ্জে আসেন এবং খোঁজ নেন আমি কোন দিন সফরে যাব। তিনি সেই দিন আদালতে আমার সেকেন্ড অফিসারের কাছে শাহ আলমের জামিনের দরখাস্ত দেন এবং তার কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে আমি যত দিন হবিগঞ্জের এসডিও আছি, তত দিন তাকে কোনোমতেই হবিগঞ্জে আসতে দেওয়া হবে না। সেকেন্ড অফিসার জামিন দিয়ে দেন এবং পরদিন সকালে আমার কাছে সমস্ত ঘটনাটি বর্ণনা করেন। আমি তাকে নির্দেশ দিই যে। ভবিষ্যতে যদি সে কখনো হবিগঞ্জে আসে, তাহলে তার বিরুদ্ধে যেন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

    মহকুমা প্রশাসকের পক্ষে খুব বেশিসংখ্যক ফৌজদারি মামলা নিষ্পন্ন করা সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ মামলার বিচার করতেন প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এঁদের কেউ কেউ অত্যন্ত সৎ এবং যোগ্য ছিলেন। কিন্তু অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যেত। উপরন্তু অনেকেই ন্যায়বিচারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের যে কঠোর পরিশ্রম করা প্রয়োজন, তা করতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। ম্যাজিস্ট্রেটদের কাজ তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্ট মহকুমা হাকিমের পরিদর্শন করার বিধান রয়েছে। প্রথম পরিদর্শন রিপোর্ট বিস্তারিতভাবে করা হলে পরবর্তী পরিদর্শন রিপোর্টগুলো অধিকতর সহজ হয়। আমি প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিটি ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্ট পরিদর্শন করতাম।

    হবিগঞ্জে এসডিও ছাড়া আরও তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। এর মধ্যে দুজন ছিলেন পূর্ণকালীন ম্যাজিস্ট্রেট এবং একজন ছিলেন সাম্মানিক ম্যাজিস্ট্রেট। পরবর্তীকালে এই সাম্মানিক ম্যাজিস্ট্রেটের জায়গায় একজন ল ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়। ল ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেটরা শুধু বিচার করতেন, তাদের নির্বাহী দায়িত্ব দেওয়া হতো না। তবে হবিগঞ্জে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা এত বেশি ছিল যে এই তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মহকুমা হাকিমের পক্ষে তা কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল না। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসডিওকে সহায়তা করার জন্য শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাদের হবিগঞ্জে পাঠাতেন। আমার সময় দুজন শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাকে হবিগঞ্জে পাঠানো হয়। সুষ্ঠু এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের কাজের তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন রয়েছে। পাকিস্তানে এসডিও এই তত্ত্বাবধায়কের কাজ করতেন। তবু মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এই দায়িত্ব বর্তেছে জেলা জজদের ওপর। তাঁদের নিজেদের এত মামলা সামলাতে হয় যে তাঁদের পক্ষে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু তদারক করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করা সত্ত্বেও মামলা নিষ্পত্তি বাড়ছে না।

    (২) মহকুমা হাকিম এবং পুলিশের সম্পর্ক : ব্রিটিশ ভারতে পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহকুমা হাকিমরা। দীর্ঘদিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের পুলিশের ওপর কর্তৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। তবে পুলিশের সম্প্রসারণ এবং আইপিএস কর্মকর্তাদের নিয়োগের ফলে পুলিশের ওপর ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্তৃত্ব আস্তে আস্তে কমতে থাকে। যদিও ১৯৩৫ সালের পুলিশ। রেগুলেশনস অব বেঙ্গলে ম্যাজিস্ট্রেটদের পুলিশের ওপরে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিল, তবু বিভিন্ন নির্বাহী আদেশে এই ক্ষমতা পাকিস্তান আমলে অনেক কমে যায়। ১৯৬০-এর দশকে এই ক্ষমতা মূলত মহকুমা হাকিম এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের থানা পরিদর্শন করার ক্ষমতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সালাউদ্দিন আহমেদ যখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন, তখন থানা পরিদর্শন সম্পর্কে একটি পরিদর্শন ম্যানুয়েল প্রকাশ করেন। এই ম্যানুয়েলে থানা পরিদর্শনে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশ ছিল। আমি মহকুমা হাকিম থাকাকালীন আটটি থানা প্রতিবছর কমপক্ষে একবার পরিদর্শনের কর্মসূচি গ্রহণ করি। এই কর্মসূচি অনুসারে আমি প্রতিটি থানা পরিদর্শন করি।

    ষাটের দশকে দারোগারা আপাতদৃষ্টে ম্যাজিস্ট্রেটদের অনুগত ছিলেন। প্রকাশ্যে তারা কখনো দ্বিমত পোষণ করতেন না। কিন্তু পুলিশের কাজ একমাত্র পুলিশই করতে পারে, আর কেউ নয়। কার্যত দারোগারা নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা ম্যাজিস্ট্রেটদের আদেশের তোয়াক্কাই করতেন না। দারোগাদের সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে যে সবচেয়ে যোগ্য দারোগা তারাই, যারা দুই পক্ষ থেকেই ঘুষ খান এবং দুই পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখতে পারেন। ধরুন একটি মামলায় একজন ব্যক্তি খুন হলো। এই ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাশা খুনির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হবে। দারোগা নিহত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঘুষ নিতেন এবং অতি দ্রুত চার্জশিট দাখিল করতেন। আসামিপক্ষের লোকজন মামলা থেকে খালাস চায়, তারা দারোগার সঙ্গে যোগাযোগ করে। দারোগা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আত্মীয়দের কাছ থেকে যে ঘুষ নিয়েছেন, তার চেয়েও বেশি ঘুষ আসামির তদবিরকারীদের কাছে দাবি করেন। তারা বাধ্য হয়ে ঘুষ দেয়। এই ঘুষ পেয়ে সে যে চার্জশিট দাখিল করে, সেখানে অনেক ফাঁক রেখে দেয়। সব সাক্ষীর নাম উল্লেখ করে না, সব আলামত নথিভুক্ত করা হয় না। এর ফলে আদালতে মামলা উঠলে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। দারোগা সব দোষ চাপিয়ে দেন বিচারকদের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনকে সান্ত্বনা দেন যে তিনি চার্জশিট দেওয়া সত্ত্বেও ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে ছেড়ে দিয়ে অন্যায় কাজ করেছেন।

    অন্যদিকে আসামিপক্ষের লোকজন দারোগার কাজে খুবই সন্তুষ্ট হন। আমি যখন থানা পরিদর্শনে যেতাম, তখন হবিগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেটরা যেসব ওয়ারেন্ট জারি করেছেন অথচ এক মাস সময় পার হওয়ার পরও যেসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তাদের তালিকা নিয়ে যেতাম। তালিকা ধরে কোন কোন আসামির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করতাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ মিথ্যা কথা বলত। অল্প কিছু ক্ষেত্রে তারা আসামিকে ধরে দু-চার দিনের মধ্যে পাঠিয়ে দিত।

    এ ছাড়া যেসব বন্দুকের লাইসেন্সের নবায়ন করা হতো না, সেগুলো চিহ্নিত করে দারোগাকে ব্যবস্থা নিতে বলা হতো। এই ক্ষেত্রে অবশ্য আদেশ যথাযথভাবে প্রতিপালিত হতো। মামলা-মোকদ্দমার বিষয় ছাড়া একটি বড় বিষয় ছিল আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ। এ ব্যাপারে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে সহযোগিতা করত এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের আদেশ মেনে চলত। বর্তমানে এ ব্যাপারেও পুলিশ এখন তাদের কর্মকর্তাদের বাইরে অন্য কারোর নিয়ন্ত্রণ মানে না। এর ফলে পুলিশি জুলুম সম্পর্কে অনেক নালিশ শোনা যায়।

    (৩) ভূমি রাজস্বব্যবস্থা : ১৯৫৪ সালে জমিদারি ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহকুমা হাকিম জমিদারদের মাধ্যমে খাজনা আদায় করতেন। জমিদারি প্রথা তুলে দেওয়ার পর প্রতিটি মহকুমার ভূমি রাজস্বব্যবস্থার প্রধান হন মহকুমা হাকিম। তাঁকে সহায়তা করার জন্য প্রতিটি সার্কেলে একজন ভূমি রাজস্বের সার্কেল অফিসার নিয়োগ করা হয়। ভূমি রাজস্বের আদায় সন্তোষজনক ছিল না। তবে হবিগঞ্জে অনেক চা-বাগান ছিল এবং চা-বাগান থেকে রাজস্ব যথাযথভাবে আদায় করা হতো। ভূমি রাজস্ব ছাড়া এই অফিসের আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। প্রথমত, হবিগঞ্জ মহকুমায় অনেক জলাভূমি ছিল এবং এই জলাভূমিতে প্রচুর মাছ উৎপাদিত হতো। প্রতিটি বিল নিলামে দেওয়া হতো এবং নিলামে যিনি সর্বোচ্চ টাকা দিতেন, তিনি এক বছরের জন্য বিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেতেন। এই বিলের ডাক নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা হতো। কোথাও কোথাও বিলের মাছ ধরা নিয়ে মারামারি হতো। এর ফলে বড় বিলগুলোর নিলাম এসডিওকে পরিচালনা করতে হতো। দ্বিতীয়ত, হবিগঞ্জের পূর্বাঞ্চলে বনভূমি এবং চা বাগান অবস্থিত ছিল। সংরক্ষিত বনভূমি এবং চা-বাগানের সীমানা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে মতবিরোধ ছিল। চা-বাগান এবং বনভূমি অঞ্চল ও এর বাইরে অন্যান্য অঞ্চলে সরকারের অনেক খাসজমি ছিল। সরকারের আদেশ ছিল খাসজমি ভূমিহীনদের কাছে ইজারা দিতে হবে। বাস্তবে অধিকাংশ খাসজমি গ্রামের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা দখল করে রাখতেন। এর ফলে খাসজমি বিতরণে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

    সার্কেল অফিসারের নিচে ছিল তহশিল অফিস। এই তহশিল অফিসে ভূমির সমস্ত রেকর্ড রাখা হতো এবং খাজনা আদায়সহ সব কাজই তহশিল অফিসের মাধ্যমে করতে হতো। সার্কেল অফিসারদের দায়িত্ব ছিল এসব তহশিল অফিস যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা। তবে বেশির ভাগ সার্কেল অফিসারই ছিলেন বয়স্ক। তাঁরা এ কাজ সঠিকভাবে করতেন না। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে তহশিলদাররা ঠিক সময়ে অফিসে আসতেন না। আমার মনে আছে মাধবপুর থানায় একবার বেলা দুইটার সময় আমি একটি তহশিল অফিস পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখতে পাই তহশিল অফিস তালাবদ্ধ। আমি তৎক্ষণাৎ তহশিলদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করি। তবে সরকারি কার্যবিধি অনুসারে তদন্ত পরিচালনায় অনেক সময় লাগত। এর ফলে আমি এসডিও থাকাকালীন এই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। ডিসির অফিসে কিন্তু মহকুমা পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার পদ ছিল না। হেড অ্যাসিস্ট্যান্টের সহায়তায় এসডিওকে সব কাজ করতে হতো।

    (৪) বুনিয়াদি গণতন্ত্রভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনাঃ ১৮৭০-এর দশকে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। স্থানীয় সরকারের তত্ত্বাবধান করতেন মহকুমা হাকিম এবং তাঁর অধীন সার্কেল অফিসার। ১৯৬০-এর দশকে আইয়ুব খান স্থানীয় সরকারকে বুনিয়াদি গণতন্ত্র নামকরণ করেন। বুনিয়াদি গণতন্ত্র ব্যবস্থায় দুটি নতুন উপাদান ছিল। প্রথমত, নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের সদস্যরা দেশে রাষ্ট্রপতি এবং কেন্দ্রীয় সংসদ ও প্রাদেশিক সংসদের সদস্যদের নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে গণ্য হন। তাই তাত্ত্বিকভাবে দেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উৎস হয় ইউনিয়ন কাউন্সিলসমূহ। দ্বিতীয়ত, ইউনিয়ন কাউন্সিলের আর্থিক সামর্থ্য ছিল অত্যন্ত সীমিত। তাই তারা বিশেষ কোনো কাজকর্ম করতে পারত না। আইয়ুব খান পল্লি পূর্ত কর্মসূচি চালু করেন এবং পূর্ত কাজের জন্য জেলা কাউন্সিল, থানা কাউন্সিল এবং ইউনিয়ন কাউন্সিলকে স্বতন্ত্রভাবে অর্থ বরাদ্দ দেন। সরকারি অর্থের লোভে বেশির ভাগ ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যরা সরকারের সমর্থক হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে নির্বাচনে পাস করা অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়ায়।

    বুনিয়াদি গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে স্থানীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা ছিল একটি বড় সমস্যা। সাধারণত এসডিওরা বন্দুকের লাইসেন্স নবায়ন এবং ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে চাদা আদায় করতেন। এ ছাড়া বড়লোকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতেন। অনেক ক্ষেত্রে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রির ওপর চাঁদা তোলা হতো। এই ধরনের চাঁদার মাধ্যমে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, বাঁধ নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি ভালো কাজ হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে জনমনে অসন্তোষ ছিল। ১৯৬৯ সালে সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চাঁদা তুলতে নিষেধ করেন। আমি এই নিষেধ মেনে হবিগঞ্জে থাকাকালীন কোনো চাঁদা তুলিনি। হবিগঞ্জে আমি দুটি বিষয়ের ওপরে জোর দিয়েছিলাম। প্রথমত, হবিগঞ্জের হাওর এলাকায় অনেক নিচু জমি ছিল। এসব অঞ্চলে শীতকালে লো-লিফট পাম্প (Low lift pump) ব্যবহার করা গেলে বোরো ধান উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। সরকার তাই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মাধ্যমে লো-লিফট পাম্প সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এই পাম্প পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ৫০ জন কৃষকের একটি গ্রুপ তৈরি করতে হতো। কাজেই শুধু পাম্প দেওয়াটাই যথেষ্ট ছিল না, গ্রুপ সৃষ্টি করতে হতো আগে। সমবায়, কৃষি বিভাগ, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কাজের সমন্বয় করতেন সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন)। আমি সার্কেল অফিসারদের জানিয়ে দিই, যিনি যত বেশি সেচযন্ত্র বসাতে পারবেন, তার মূল্যায়ন তত ভালো হবে। জেলা কৃষি উন্নয়ন কমিটি প্রতিটি উপজেলার প্রয়োজন বিবেচনা করে লো-লিফট পাম্প বরাদ্দ করতেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে উপজেলাসমূহ বরাদ্দ করা পাম্প ব্যবহার করতে পারত না। আমি সিলেটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাই, হবিগঞ্জ মহকুমার বাইরে যদি কোনো মহকুমা হাকিম জানান যে তার জেলায় কোনো পাম্প ব্যবহার করা যাবে না, তবে তিনি সে পাম্প অতিরিক্ত বরাদ্দ হিসেবে হবিগঞ্জকে দিতে পারেন। হবিগঞ্জে এই পাম্প ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হবে। আমি দুই বছর অন্যান্য মহকুমা থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০০টি অব্যবহৃত পাম্পের বরাদ্দ পাই। সার্কেল অফিসার (উন্নয়নের সঙ্গে) ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ করে আমি এই পাম্পগুলো ব্যবহারের ব্যবস্থা করি। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার এই কাজের খুবই প্রশংসা করেন। দ্বিতীয়ত, রাস্তাঘাট, খাল, বিদ্যালয়, পাঠাগার ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণের। জন্য সরকারের কাছ থেকে প্রচুর বরাদ্দ পাওয়া যেত। এই বরাদ্দের টাকা সব সময়ে সঠিকভাবে ব্যয় করা হতো না। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের যোগসাজশে সার্কেল অফিসাররা অর্থ আত্মসাৎ করতেন। কাজেই এসব অবকাঠামো নির্মাণে নিবিড় তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যেসব সার্কেল অফিসারের বদনাম ছিল, তাদের এলাকায় সব নির্মাণকাজ ঘন ঘন নিরীক্ষণ করতে হতো। এর ফলে কাজের মান হয়তো কিছুটা উন্নত করা গেছে কিন্তু দুর্নীতি একেবারে নির্মূল করা সম্ভব ছিল না। এ ধরনের দুর্নীতি ৫০ বছর পরও অব্যাহত রয়েছে।

    (৫) ত্রাণকার্য : পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক সরকারে ত্রাণকাজের জন্য একজন রিলিফ কমিশনার ছিলেন। কিন্তু জেলা পর্যায়ে ত্রাণকাজের জন্য। কোনো ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না। সরকারের কোনো কাজের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকলে সেই কাজের দায়িত্ব জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহকুমা হাকিমকে নিতে হতো। তাই হবিগঞ্জে ত্রাণকাজের দায়িত্ব ছিল। আমার ওপর। হবিগঞ্জ বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। হাওর এলাকায় প্রতিবছরই বর্ষাকালে বিশাল জলরাশি জমত। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলে খোয়াই, সুতাং, কলকলিয়া ইত্যাদি নামে কতগুলো পাহাড়ি নদী ছিল। বেশি বৃষ্টি হলে এই পাহাড়ি নদীগুলোতে বন্যা হতো। বিশেষ করে খোয়াই নদীতে প্রায়ই বন্যা হতো। খোয়াই নদীর দুপাশে বাঁধ ছিল কিন্তু বন্যায় এ বাঁধ ভেসে যেত। যেখানে বাঁধ ভেসে যেত, সেখানে গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে যেত এবং ফসল নষ্ট হতো। কাজেই গোটা বর্ষাকালে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসনকে খোয়াই নদীর বন্যার সমস্যা নিয়ে তটস্থ থাকতে হতো।

    ১৯৭০ সালের মে মাসে সুনামগঞ্জের কয়েকটি পাহাড়ি নদীতে ঢল নামে। সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক সরকারের কাছে ত্রাণ মঞ্জুরি প্রার্থনা করেন। সুনামগঞ্জকে ত্রাণ দেওয়া হয়। সুনামগঞ্জের পানি গড়িয়ে কিশোরগঞ্জে যায়। কিশোরগঞ্জ মহকুমা হাকিমও ত্রাণ দাবি করেন। সেখানেও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিশোরগঞ্জের পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। কিশোরগঞ্জের মহকুমা হাকিমের অনুকরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা প্রশাসকও তাঁর মহকুমার জন্য ত্রাণ বরাদ্দ দাবি করেন। তাঁকেও ত্রাণ দেওয়া হয়। হবিগঞ্জের মধ্য দিয়েও বন্যার পানি প্রবাহিত হয়েছে, হবিগঞ্জ থেকে কোনো ত্রাণ না চাওয়ায় কোনো সাহায্যও দেওয়া হয়নি। হবিগঞ্জের ত্রাণ না চাওয়ার কারণ আমি। তৎকালীন রিলিফ কোডে লেখা ছিল যদি কোনো অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না হয়, তাহলে সেখানে ত্রাণ বরাদ্দ চাওয়া সঠিক কাজ নয়। আমি হবিগঞ্জের বানিয়াচং এবং লাখাই থানায় স্পিডবোটে করে হাওর অঞ্চলে যাই। সেখানে সবাই বলে, যে পরিমাণ পানি বেড়েছে, তা প্রতিবছরই বর্ষার সময় বাড়ে। ত্রাণ দেওয়ার মতো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি। আমার এ সিদ্ধান্তে হবিগঞ্জের রাজনীতিবিদেরা অসন্তুষ্ট হন। সমালোচনা করে তারা বলেন যে চাইলেই যেখানে সাহায্য পাওয়া যেত, সেখানে সাহায্য না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়।

    এরপর জুন মাসে একদিন রাতের বেলা হইচই শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। খোঁজ নেওয়ার জন্য আমার বাংলোর বাইরে লোক পাঠাই এবং তাঁরা। এসে খবর দেন খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে গেছে। তবে শহরের দিকে বাধ ভাঙেনি। শহরের উল্টো দিকের বাঁধ ভেঙেছে। তাই সেখান থেকে আর্তজনতার চিৎকার ভেসে আসছে। আমি তৎক্ষণাৎ জিপ নিয়ে আমার বাসা থেকে বৃন্দাবন কলেজের অধ্যক্ষের বাসায় যাই এবং তাকে তুলে নিয়ে কলেজের হোস্টেলে যাই। হোস্টেলে ছাত্রদের ঘুম থেকে তুলে রিলিফ কাজে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। ছাত্ররা উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে আসে। আমি থানার দারোগাকে কতগুলো নৌকা সাময়িক ভিত্তিতে অধিগ্রহণের জন্য আদেশ দিই। দারোগা ত্রিশ-চল্লিশটি নৌকা হাজির করে। আমি চিড়া-মুড়ি এবং গুড় কেনার জন্য টাকা দিই। নাজির রাতের বেলা দোকানদারদের দোকান খুলতে বাধ্য করে এবং খাদ্যদ্রব্যসমূহ ক্রয় করে। চিড়া, মুড়ি এবং গুড় ছাত্রদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যেন নৌকায় করে উঁচু জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সকালের নাশতার জন্য চিড়া, মুড়ি এবং গুড় দেওয়া হয়। এভাবে সূর্য ওঠার আগেই ত্রাণকাজ শুরু হয়ে যায়।

    পরদিন সকালে স্পিডবোটে করে আমি বন্যা-উপদ্রুত অঞ্চলে যাই এবং সেখানে প্রত্যেক পরিবারের জন্য গম বরাদ্দ করি। সরকারের সাধারণ নিয়ম হলো কোনো এলাকায় দুর্যোগ ঘটলে সেই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের তালিকা তৈরি করবেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য। এই তালিকা ইউনিয়ন ভিত্তিতে একত্র করে মহকুমা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। তারপর মহকুমা প্রশাসন ত্রাণের পরিমাণ নির্ধারণ করেন। এতে কমপক্ষে সাত থেকে দশ দিন সময় লেগে যেত। এ ক্ষেত্রে যেহেতু বন্যার্তদের তালিকা তৈরির ভার ছাত্রদের হাতে দেওয়া হয়, সেহেতু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তালিকা হয়ে যায়।

    অন্যদিকে সরকারের সাধারণ নিয়মে সরকারের গুদাম থেকে ত্রাণের পণ্য ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যদের উঠিয়ে আনতে হতো। সব সময় এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকত না। তাই ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যরা ত্রাণ বিতরণের আগে একটি অংশ যাতায়াতের খরচ বাবদ কেটে রাখতেন। বরাদ্দ করা পুরো ত্রাণ উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাত না। এই ক্ষেত্রে কিন্তু সম্পূর্ণ ত্রাণই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা পেয়ে যান। এর ফলে এলাকার জনগণ খুবই সন্তুষ্ট হন। এই বন্যার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন অ্যাডমিরাল আহসান। অ্যাডমিরাল সাহেব খোয়াই নদের বন্যা-উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শনের জন্য এক প্রোগ্রাম করেন। এ খবর খবর শুনে সিলেট জেলার ডেপুটি কমিশনার তিন-চারটি স্পিডবোটসহ হবিগঞ্জে উপস্থিত হন। গভর্নর সাহেব হবিগঞ্জ শহরে এসে স্পিডবোটে ওঠেন। স্পিডবোটে করে তিনি শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত যান। পথে বিভিন্ন জায়গায় জনসমাবেশ ঘটে। গভর্নরের প্রশ্নের উত্তরে উপস্থিত জনগণ জানায় যে হবিগঞ্জে খোয়াই নদের বন্যার ক্ষেত্রে এ ধরনের ত্রাণ তৎপরতা অভূতপূর্ব। তারা গভর্নরকে বলেন, হবিগঞ্জের এসডিও যে দ্রুততার সঙ্গে এ কাজ সুষ্ঠুভাবে করেছেন, তা এর আগে কোনো দিনও হয়নি। তারা এসডিও জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেয়। গভর্নর সাহেব এতে খুবই সন্তুষ্ট হন এবং আমাকে খুঁজে বের করে তার পাশে বসিয়ে লোকজনের দাবিদাওয়ার কথা শোনেন। এই ত্রাণকাজের সাফল্যের জন্য ডেপুটি কমিশনার সাহেব খুবই সন্তুষ্ট হন।

    (৬) মহকুমা প্রশাসন এবং শিক্ষাব্যবস্থা : বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থা তদারকির জন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি থানায় শিক্ষা বিভাগের অফিস রয়েছে। তেমনি মহকুমা ও জেলায়ও শিক্ষা অফিস ছিল। তবে এসব অফিস শুধু নৈমিত্তিক দায়িত্ব পালন করতে পারত। কোনো জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় এদের কোনো সামর্থ্য ছিল না। ষাটের দশকে সরকার পরিচালিত প্রবেশিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইন্টারমিডিয়েট এবং স্নাতক পরীক্ষায় ব্যাপক নকল শুরু হয়। শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষমতা ছিল না। পরীক্ষা পরিচালনা করত জেলা প্রশাসন। সৌভাগ্যবশত হবিগঞ্জে তখন পর্যন্ত গণহারে টোকাটুকি শুরু হয়নি। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হতো। সে জন্য সরকার মহকুমা প্রশাসকদের স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দিত। উপরন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো। এই কাজ সঠিকভাবে করা হয়েছে কি না, সেটা দেখার সামর্থ্যও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের ছিল না। কাজেই শিক্ষা বিভাগের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা মহকুমা প্রশাসনের একটি দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। আমি যখন হবিগঞ্জের এসডিও, তখন হবিগঞ্জ মহকুমায় প্রায় ৪০টি স্কুল ছিল। এ স্কুলগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। এসব স্কুল পরিদর্শন করাও সহজ ছিল না। অথচ প্রায় প্রতিটি স্কুলেরই কোনো না কোনো সমস্যা লেগে থাকত। এ বিষয়ে এসডিওকে সাহায্য করার জন্য কোনো অতিরিক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীও দেওয়া হয়নি। আমি যখন হবিগঞ্জে ছিলাম, তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার করিম ইকবাল হবিগঞ্জ সফরে এসেছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মহকুমা প্রশাসক হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? আমি তাকে উত্তরে বলেছিলাম যে বিধিবদ্ধ দায়িত্বের বাইরে অন্য বিভাগের অতিরিক্ত কাজই হলো সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা বিভাগের সমস্যাগুলো আমি তার কাছে তুলে ধরি এবং তিনি একমত হন। তিনি বলেন, এ সম্পর্কে তিনি চিফ সেক্রেটারির কাছে লিখবেন। বর্তমানে সরকার প্রতিটি জেলায় শিক্ষার জন্য একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের পদ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এ সত্ত্বেও শিক্ষা সমস্যার উপযুক্ত সমাধান হয়েছে বলে মনে হয় না।

    (৭) মিত্রপক্ষের গুলি : সরকারি কর্মকর্তারা বিধি মোতাবেক তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা ধরে নেন যে দায়িত্ব পালন করাই তাদের কাজ। দায়িত্ব পালনের ফলে যে লক্ষ্য অর্জনের কথা, সেটা হয়েছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সরকারের কর্মকর্তাদের নয়। অথচ সরকারি কর্মকর্তারা যদি তাদের কাজের মূল্যায়ন নিজেরা করেন, তাহলে অনেক কিছু শিখতে পারেন। আমি যেখানেই কাজ করেছি, সেখানেই আমার কাজের প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি। এবং প্রয়োজনীয় তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে নতুন জ্ঞান লাভ করেছি।

    হবিগঞ্জে আমি যখন যাই, তখন মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের স্লোগান ছিল উন্নয়নের জন্য কাজ করো, কিন্তু উন্নয়নের কাজের ফল সব সময় ভালো হয় না। অনেক সময়ে উন্নয়নের জন্য করা কাজ অনুন্নয়ন ঘটায়। এ বিষয়ে আমার মনে প্রথম সন্দেহ জন্মে হবিগঞ্জে মহকুমা হাকিম থাকাকালে। তখন হবিগঞ্জে ফৌজদারি আদালতে মামলার সংখ্যা বেড়ে চলছিল। এতে ডেপুটি কমিশনার এবং আমি উভয়ই উদ্বিগ্ন ছিলাম। তখন আদালতে মোটামুটি তিন ধরনের মামলা ছিল। প্রথমত, ব্যক্তি উদ্যোগে রুজু করা মামলা। দ্বিতীয়ত, জেনারেল রেজিস্ট্রার (জিআর) মামলা, যেখানে পুলিশের রুজু করা মামলার বিচার করা হতো। তৃতীয় ধরনের মামলা ছিল নন জেনারেল রেজিস্ট্রার বা বিবিধ প্রকৃতির মামলা। পরীক্ষা করে দেখা গেল, হবিগঞ্জে প্রায় ৫০০-এর মতো এ ধরনের মামলা রয়েছে। এই ৫০০ মামলার মধ্যে প্রায় ২০০ মামলা করা হয়েছে দুধে পানি মেশানোর জন্য। এই মামলাগুলো করা হয় পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯-এর অধীনে। দুধে পানি মেশানোর জন্য শাস্তির বিধান। পাকিস্তান পেনাল কোডে ২৭৩ ও ২৭৪ ধারাতেও রয়েছে। তবে পেনাল কোড অনুসারে দুধে পানি মেশালেই অপরাধ হবে না, দুধে ক্ষতিকর জিনিস মেশালে অপরাধ হবে। পেনাল কোডে দুধে পানি মেশানোর জন্য কোনো সর্বনিম্ন সাজা নির্ধারিত হয়নি। ম্যাজিস্ট্রেট সর্বাধিক ছয় মাসের জেল অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা করতে পারবেন। কিন্তু সর্বনিম্ন কী সাজা ম্যাজিস্ট্রেট দেবেন, তা ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর নির্ভর করত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট দোষী ব্যক্তিকে আধুলি বা এক টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দিতেন।

    ১৯৫৮ সালে যখন পাকিস্তানে সামরিক শাসন হয়, তখন দেশে দুধের অভাব থাকায় দুধে পানি মেশানো বেড়ে যায়। সামরিক কর্তৃপক্ষ এই সমস্যার একটি চিরস্থায়ী সমাধান চান। আইনজ্ঞরা পরামর্শ দিলেন বর্তমান আইনে দুধে পানি মেশালে খুবই নগণ্য শাস্তি হয়। এর ফলে মামলা করেও কোনো লাভ হয় না। এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সাজা থাকা উচিত। তাই পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ জারি করে বিধান করা হয় যে কেউ দুধে পানি মিশিয়েছে তা প্রমাণিত হলে তাকে কমপক্ষে ১৫০ টাকা জরিমানা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুধে কোনো কিছু মেশালেই তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে; যে দ্রব্যটি মেশানো হবে, তার ক্ষতিকর হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুধে যে কোনো কিছু মেশানো হলেই তা এই আইনের অধীনে অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

    হবিগঞ্জের আদালতে তখন দুধে পানি মেশানোর জন্য প্রায় ২০০টি মামলা অনিষ্পন্ন ছিল। দুধে পানি মেশানো হলে সেই দুধের একটি নমুনা শিশিতে ভরে মহাখালীতে রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হতো। এই নমুনা পরীক্ষা করে যদি রাসায়নিক পরীক্ষক প্রত্যয়ন করেন যে দুধে কোনো কিছু মেশানো হয়েছে, তাহলেই এ মামলার আসামির শাস্তি হবে। এই প্রেক্ষাপটে রাসায়নিক পরীক্ষকের বিরুদ্ধে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নমুনা ফেলে রাখার অভিযোগ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নালিশ করি। অনেক চিঠি লেখালেখির পর হঠাৎ একদিন দেখতে পাই যে ৫০টি মামলার রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এসেছে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হয়েছে যে দুধে পানি মেশানো হয়েছে। আমি আসামিদের তলব করি। আসামিরা আদালতে উপস্থিত হলে সরকারপক্ষের কোর্ট ইন্সপেক্টর আমাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে এ মামলাগুলো পেনাল কোডের অধীনে করা হয়নি। এ মামলাগুলো করা হয়েছে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্সের অধীনে। সুতরাং তাদের প্রত্যেককে কমপক্ষে ১৫০ টাকা করে জরিমানা করতে হবে। ১৫০ টাকা জরিমানা অত্যন্ত বেশি ছিল। কারণ, ১৯৭০ সালে এই অঙ্ক পূর্ব পাকিস্তানে বার্ষিক মাথাপিছু আয়ের প্রায় ৪৬ শতাংশ ছিল। এ ধরনের জরিমানা দেওয়ার ক্ষমতা এদের অনেকেরই ছিল না।

    আমি বললাম, যেহেতু আইনে সর্বনিম্ন জরিমানার বিধান আছে, সেহেতু ১৫০ টাকা জরিমানা করা ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। ৫০ জন দুধ বিক্রেতাকে ১৫০ টাকা করে জরিমানা করা হলো। মনে মনে ভাবলাম যে এর ফলে নিশ্চয়ই দুধ বিক্রেতারা সতর্ক হবে এবং দুধে পানি মেশানো কমে যাবে। সত্যি সত্যি এটা ঘটছে কি না, তা জানার জন্য আমার মনে কৌতূহল জাগে। আমি হবিগঞ্জ কলেজের একজন শিক্ষক এবং খাদ্য বিভাগের একজন। কর্মকর্তাকে বাজারে এর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ করি। তারা জানাল, এই জরিমানার পর পৌরসভার স্যানিটারি ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীরা প্রত্যেক দুধ বিক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত ঘুষ দাবি। করছেন। তারা ভয় দেখাচ্ছেন যে ঘুষ না দিলে দুধের নমুনা পরীক্ষার জন্য। পাঠিয়ে দেবেন। তারা এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে একবার দুধে পানি আছে প্রমাণিত হলে পাগলা মহকুমা হাকিম তাদের ১৫০ টাকা জরিমানা করবেন। দুধ বিক্রেতারা দুধে পানি মেশাচ্ছিল। তাই তারা স্যানিটারি বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয় এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য দুধের মধ্যে পানির পরিমাণ আরেকটু বাড়িয়ে দেয়। সর্বনিম্ন জরিমানা করে দুধে পানি মেশানো কমেনি, দুধে পানি মেশানো বেড়ে গেছে। দুধে পানি মেশানো কমাতে হলে দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে। দুধের উৎপাদন না বাড়লে খাঁটি দুধের দাম অনেক বেশি রাখতে হবে; অন্যথায় স্বল্প মূল্যে বাজারের চাহিদা মেটানো যাবে। সুতরাং আইন করে এই সমস্যার কোনো সমাধান করা সম্ভব ছিল না।

    পরবর্তীকালে জেনেছি, এই ধরনের ব্যাপারকে ‘মিত্রপক্ষের গুলি’ বলা হয়ে থাকে। মিত্রপক্ষের গুলি’র ধারণাটির জনক হলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। ‘মিত্রপক্ষের গুলি’র অর্থ হলো যে আক্রমণ শত্রুপক্ষের তরফ থেকে আসে না, মিত্ররাই নিজেদের মিত্রকে আক্রমণ করে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ইরাক অভিযানের সময় ইরাকি সৈন্যদের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সৈন্য মারা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সব সৈন্য মারা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের গুলিতে, যারা মার্কিন সৈন্যদের ইরাকি সৈন্য বলে ভুল করে গুলি চালায়। আমি লক্ষ করি যে শুধু আইনের ক্ষেত্রেই মিত্রপক্ষের গুলি চলছে না; উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট।

    ১৯৭০ সালের শেষ দিকে একদিন বিকেলবেলা আমি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে শায়েস্তাগঞ্জের নিকটস্থ একটি রাজস্ব অফিস পরিদর্শন করছিলাম। আমি যখন রাজস্ব অফিসের কাগজপত্র পরীক্ষা করছি, তখন দেখতে পেলাম একদল লোক অফিসের সামনে জড়ো হয়েছে। আমি অনুমান করলাম সম্ভবত রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে এরা এসেছে। পরিদর্শন শেষে আমি বেরিয়ে এলাম এবং উপস্থিত জনতাকে জিজ্ঞেস করলাম তারা কী চান? তাঁরা বললেন, ‘হুজুর, আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি একবার দেখে যান। আমি তাড়াতাড়ি হবিগঞ্জ ফিরে যেতে চাইছিলাম। তাই আমি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন এড়াতে চাইলাম। তবে তাদের অনুনয়-বিনয়ের ফলে আমি স্কুলটি দেখতে রাজি হলাম। রাজস্ব অফিস থেকে অল্প দূরেই ছিল স্কুলটি। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই যে স্কুলের দালানের ছাদ ধসে গেছে।

    গ্রামের মাতবরেরা উন্নয়নের কাহিনি আমাকে শোনাল। এ স্কুলে প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার শিশুদের পড়াশোনা চলছিল। এলাকার লোকজন চাদা তুলে একটি টিনের ঘরে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করে। দুই বছর আগে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা এলাকায় আসেন এবং গ্রামের লোকজনকে জানান যদি গ্রামের লোকজন নির্মাণ ব্যয়ের ২০ শতাংশ প্রদান করেন, তাহলে সরকার ৮০ শতাংশ ব্যয় বহন করবে। তারা গ্রামবাসীকে উপদেশ দিলেন যে টিনের ঘরটি বিক্রি করে দিলে এই ২০ শতাংশ অর্থ অনায়াসে পাওয়া যাবে। গ্রামের লোকেরা রাজি হলো, টিনের ঘরটি বিক্রি করে দেওয়া হলো। থানা শিক্ষা অফিসার দালান নির্মাণের জন্য একজন ঠিকাদার নিয়োগ করলেন। দালান নির্মাণের কাজ ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে সম্পন্ন হয়। সর্বশেষ পর্যায়ে ছাদ ঢালাই করা হয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় ঢালাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাদটি ধসে পড়ে। মহানুভব সরকার স্কুল নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ করার আগে এখানে টিনের ঘরে একটি স্কুল ছিল; কিন্তু সরকারের বরাদ্দ ব্যয় করার পর এখন কোনো স্কুল নেই। প্রথম সমস্যা হলো কী জন্য তা ঘটেছে, তা নির্ণয় করা। দুর্নীতি দমন ব্যুরো নির্দেশ দিয়েছে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রকৌশলীরা ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষা করার আগে এখানে কোনো কাজ করা যাবে না। সাম্প্রতিক বন্যায় এ অঞ্চলে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। স্কুলটি পুনর্নির্মাণের ব্যয় গ্রামবাসীর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়, তারা এ সমস্যার সমাধান চায়। আমার কাছে এর কোনো সমাধান ছিল না। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম যে কমপক্ষে দু-তিন। বছরের আগে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এই ঘটনার আগে আমি বিশ্বাস। করতাম যে সরকার থেকে সম্পদ বরাদ্দ করা সম্ভব হলেই শুধু আমলাতন্ত্রের উদ্যোগে উন্নয়নের বেশির ভাগ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেল যে এটি সম্ভব নয়। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায় যে জনগণ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

    এসব ঘটনা থেকে গণপ্রশাসনে ‘মিত্রপক্ষের গুলি সম্পর্কে আমি চিন্তাভাবনা শুরু করি। পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকারে কাজ করার সময় এ ধরনের ঘটনা আরও অনেক দেখতে পাই। এসব ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই ঘটেনি– ভারত, পাকিস্তান ও চীনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ চার দশকের চিন্তাভাবনার পর আমি Friendly Fires, Humpty Dumpty Disorder; and Other Essays বইটি লিখি।

    তবে আমি শুধু মিত্রপক্ষের গুলি’র তত্ত্বেই বিশ্বাস করি না, এই ধারণাকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমি হবিগঞ্জে একটি বড় প্রকল্পের বিরোধিতা করি। খোয়াই নদের বন্যায় হবিগঞ্জের প্রশাসন ও জনগণ অতিষ্ঠ ছিল। তাই দীর্ঘদিন ধরে তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে একটি সুষ্ঠু প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড খোয়াই নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি উপযুক্ত প্রকল্প প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি বিদেশি পরামর্শক কোম্পানিকে নিয়োগ করে। এই পরামর্শক কোম্পানি অভিমত প্রকাশ করে যে খোয়াই নদের পাশে সংকীর্ণ বাধ। দেওয়া হলে, তা দিয়ে বন্যার সময়ে পানি আটকে রাখা সম্ভব নয়। এসব বাঁধ দুর্বল এবং জনগণ বিভিন্ন কাজে এসব বাঁধ ব্যবহার করার ফলে অনেক স্থানেই এরা দুর্বল হয়ে পড়ে। কাজেই নদের তীর থেকে একটু দূরে শক্ত করে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বাঁধের ভেতরে যেসব বাড়িঘর এবং জমি থাকবে, তাদের বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যাবে না। কিন্তু বাঁধের বাইরে অবস্থিত কৃষিজমি এবং আবাদসমূহ বন্যার ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকবে। এই বাঁধ নির্মাণ করার জন্য জমি হুকুম দখলের প্রয়োজন। জমি হুকুমদখলের কাজ করত জেলা প্রশাসন।

    সিলেটের জমি হুকুমদখলের বিভাগ এ সম্পর্কে সমীক্ষার জন্য তাদের কর্মকর্তাদের পাঠান। কিন্তু এলাকার জনগণ এই কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেয়। তখন আমাকে এ অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যাটি সমাধানের জন্য অনুরোধ করা হয়। আমি তখন পরামর্শকদের রিপোর্ট পড়ি। এই রিপোর্ট পড়ে আমার মনে দুটি সন্দেহ জাগে। প্রথমত, পরামর্শক ধরে নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভূমির কোনো সমস্যা নেই। অথচ এই অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার একটি। কাজেই ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ অবশ্যই হ্রাস করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি পরামর্শক প্রস্তাব করেন খোয়াই নদের পানি ব্যবহার করে এই অঞ্চলে সেচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু শীতকালে যখন সেচের প্রয়োজন, তখন খোয়াই নদে খুবই অল্প পানি থাকে। এই পানি দিয়ে কোনোমতেই এই অঞ্চলে কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা সম্ভব নয়। জনসাধারণের সঙ্গে সভা করে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে এ প্রকল্প সংশোধন করতে হবে, অন্যথায় এর বাস্তবায়ন মানুষের জন্য দুর্দশা ডেকে আনবে। পরবর্তীকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য জনসাধারণের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। আমি জনগণের দাবি তুলে ধরি। অনেক তর্কবিতর্কের পর তিনি প্রকল্পটি সংশোধন করতে এবং ছোট করতে রাজি হন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে খোয়াই বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যার সমাধান হয়নি। অনেক চাষের জমি অকৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সরকারের বিরাট বিনিয়োগের কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। তাই প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পেই ‘মিত্রপক্ষের গুলি’র সম্ভাবনা সম্পর্কে সজাগ থাকার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে প্রণয়ন না করা হলে, বাস্তবায়ন না করা হলে এবং বাস্তবায়নের পর পরিচালনা না করা হলে প্রকল্প কখনোই টেকসই হবে না।

  • একাদশ অধ্যায়

    একাদশ অধ্যায়

    একাদশ অধ্যায়
    মুক্ত হবিগঞ্জ

    ৭ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭১

    ৭ মার্চ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। রমনা রেসকোর্স ময়দানে সেদিন অপরাহ্নে বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার ডাক দেন। তিনি ঘোষণা করেন যে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরিচালনা করতে হবে। প্রথমে ঘোষণা করা হয়েছিল যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিও ও টিভিতে প্রচারিত হবে। রেডিও-টিভির স্থানীয় প্রশাসন এই ভাষণ প্রচারের ব্যবস্থা ঠিকই করেছিল কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে সরাসরি প্রচার করতে দেয়নি। পরবর্তীকালে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ প্রশমিত করার জন্য বঙ্গবন্ধুর রেকর্ড করা ভাষণ প্রচার করা হয়।

    তখন হবিগঞ্জ মহকুমায় তিনটি টিভি ছিল। একটি ছিল শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রে টিলার ওপরে ম্যানেজারের বাংলোতে আর দুটি ছিল চা-বাগানের উঁচু টিলার ওপরে অবস্থিত দুই চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে। অবশ্য রেডিও অনেক ছিল। রেডিওতে আমরা তাঁর বক্তৃতা শোনার চেষ্টা করছিলাম। যদিও তাঁর বক্তৃতা সরাসরি শুনতে পাইনি, তবু তাঁর বক্তব্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা তাই পরের দিন খবরের কাগজে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশসমূহ পাঠ করি এবং এগুলো বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করি।

    বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ছিল যেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় প্রশাসন কর্মসূচি নির্ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্ব সমন্বিত বা ঐক্যবদ্ধ ছিল, সেখানে প্রশাসন চালানো ছিল সহজ। হবিগঞ্জে স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সব নেতা কর্মী ঐকমত্য ছিলেন। তবে তাদের নেতারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না। হবিগঞ্জে জাতীয় সংসদের তিনজন সদস্য ছিলেন। এঁরা তিনজনই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হন। তবে এঁদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল। মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ মোস্তফা আলী জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকা হবিগঞ্জ ও লাখাই থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি আশা করতেন যে যেহেতু তিনি দলের সভাপতি ও নির্বাচিত প্রতিনিধি, সেহেতু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে। তবে বাহুবল, চুনারুঘাট ও মাধবপুর নির্বাচনী এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মানিক চৌধুরী। তিনি ছিলেন বয়সে তরুণ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। তাঁর সঙ্গে অন্যান্য দলের সম্পর্ক ছিল খুবই খারাপ।

    তৃতীয় জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ রব। তিনি বানিয়াচং-নবীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সরকারি কর্মচারীদের সমস্যা বুঝতেন। তাই তার পরামর্শ নেওয়া ছিল আমার জন্য সহজ। ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে তাঁর খুবই সুসম্পর্ক ছিল। আমার সবচেয়ে বড় চাচাতো ভাই মেজর শওকত আলী খাঁন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল রব একই ব্যাচে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে আমি তাকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতাম। তিনিও আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। তাঁর উপস্থিতির ফলে সৈয়দ মোস্তফা আলী এবং মানিক চৌধুরীর দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে আমার পক্ষে প্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল রবের সঙ্গে আমার বিশেষ সম্পর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে স্বাধীনতার পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা খসরুজ্জামান চৌধুরী লিখেছেন :

    Akbar Ali Khan was lucky. his was an area not accessible by the army. He was lucky because he had one elected representative who was a retired army Colonel. This gentleman was Lt. Col. M. A. Rab who was elected on Awami League ticket. A staunch supporter of Bangalee nationalism and the rights for the Bangalees. Lt. Col. M. A. Rab (He is now a Major General and is a full time Managing Director of the Freedom Fighters Welfare Trust) had never been looked upon favourably by the ruling army clique. Akbar Ali Khan was lucky to get his support, advice and active cooperation.7

    লেফটেন্যান্ট কর্নেল রব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপসেনাধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং নীরবে তিনি তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। দীর্ঘদিন তাঁকে বড় ধরনের কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে আমার মনে ক্ষোভ ছিল। ১৯৯৬ সালে যখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন, তখন কিবরিয়া সাহেব অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তার বাড়িও রব সাহেবের নির্বাচনী এলাকায়। তিনি রব সাহেবের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য যখন মনোনয়ন চাওয়া হয়, তখন আমি কিবরিয়া সাহেবকে অনুরোধ করি যেন তিনি রব সাহেবের নাম প্রস্তাব করেন। জবাবে কিবরিয়া সাহেব বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশে ছিলেন না। আমি যেহেতু তার সঙ্গে কাজ করেছি, সেহেতু তাঁর নাম আমার পক্ষে প্রস্তাব করাই শোভনীয় হবে। অর্থমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে আমি তার নাম প্রস্তাব করি। অর্থসচিব হিসেবে আমি জাতীয় পুরস্কার কমিটির সদস্য ছিলাম। আমি তার মনোনয়নের পক্ষে মৌখিক বক্তব্য পেশ করি। কমিটি তাঁর নাম স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করে। তবে কমিটির সভাপতি আমাকে বলেন, তাদের সব সুপারিশ প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেন না। কাজেই যদি রব সাহেবের পুরস্কার নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে আমাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি এবং এই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অনুরোধ করি। জনাব রবকে সে বছর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

    ৭ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রশাসন চালু ছিল ঠিকই কিন্তু ২৫ মার্চ পর্যন্ত সবাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। যেহেতু হবিগঞ্জে কোনো সেনানিবাস ছিল না, সেহেতু এখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি। ঢিলেঢালাভাবে প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছিল।

  • দ্বাদশ অধ্যায়

    দ্বাদশ অধ্যায়

    দ্বাদশ অধ্যায়
    আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধ

    ১ মে ১৯৭১ থেকে জুলাই প্রথম সপ্তাহ ১৯৭১

    ১ মে ১৯৭১। এদিন সকালবেলা জিপে করে ভারতীয় সীমান্তে অবস্থিত চা বাগান থেকে আমরা আগরতলা সার্কিট হাউসে উপস্থিত হই। সেখানে কেয়ারটেকারকে আমাদের দুজনের জন্য কক্ষ বরাদ্দ করতে অনুরোধ করি। কেয়ারটেকার জানান যে আমাদের দুজনকে একটি কক্ষ সর্বাধিক দু-তিন। দিনের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে। তারপর বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের এই সার্কিট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করা যাবে না। কেননা ইতিমধ্যে দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আগরতলা আসছেন। তিনি আমাদের সকালের প্রাতরাশের ব্যবস্থা করেন এবং বলেন বাংলাদেশ থেকে আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আগরতলা থাকার ব্যবস্থা করার দায়িত্বে রয়েছেন ত্রিপুরা রাজ্যের শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মি. কে পি দত্ত। তিনি আগরতলায় ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এবার তিনি সরকারি কর্মকর্তাদেরও ব্যবস্থা করবেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মি. দত্ত এসে উপস্থিত হন। তিনি নিজেও সিলেট জেলার সন্তান। দেশভাগের পর ত্রিপুরায় অভিবাসন করেছেন। তিনি আমাদের বলেন, আমাদের থাকার ব্যবস্থা তিনি করেছেন। তবে যে বাড়িতে আমরা থাকব, সে বাড়ির মালিক দুপুরবেলা তাঁর বাড়িতে আসবেন।

    তিনি আমাদের সার্কিট হাউস থেকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। সে বাড়িতে বাংলাদেশ থেকে আগত অনেক উদ্বাস্তু থাকতেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কবরী। দুপুরে খাওয়ার সময় কবরী আমাদের খাদ্য পরিবেশন করেন। দুপুরের খাবারে মাছ, ভাত, ডাল এবং কাঁঠালের তরকারি ছিল। দুপুরের খাওয়ার পর আমরা যখন বিশ্রাম করছি, তখন ত্রিপুরা কংগ্রেসের নেতা প্রিয়দাস চক্রবর্তী এ বাড়িতে উপস্থিত হন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। আগরতলায় বাড়ি ছাড়াও আগরতলার বাইরে একটি বাগানবাড়ি ছিল। তার স্ত্রী ছিলেন একজন মহিলা সাংসদ এবং মুক্তিযুদ্ধের কিছুদিন পর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের মন্ত্রীও হয়েছিলেন। বাগানবাড়িটি ছিল আগরতলা বিমানবন্দরের মাইল দুয়েকের মধ্যে।

    আমরা আমাদের জিপে করে প্রিয়দাস চক্রবর্তীর গাড়িকে অনুসরণ করে সেই বাগানবাড়িতে উপস্থিত হই। বাড়িটিতে পাঁচটি কক্ষ ছিল। সামনের কক্ষে ছিল তিনটি চৌকি। আমি আর রকিব সেই কক্ষে এসে ঠাই নিলাম। বাড়িটি ছিল আগরতলা থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার রাস্তার পাশে। রাস্তার পাশে অনেক গাছ লাগানো হয়েছিল, বাড়িটি ছিল ভেতরে। সেখানে পানি পান করার জন্য একটি কুয়া ছিল। সেই কুয়া থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা হতো। স্নান এবং অন্যান্য কাজের জন্য একটি মাঝারি আকৃতির পুকুর ছিল। পুকুরে একটি পাকা ঘাট ছিল। সেই ঘাটে আমরা গোসল করতাম। আমরা মি. চক্রবর্তীকে আশ্বাস দিই যে একটি কামরাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। ৩ মে হোসেন তৌফিক ইমাম তাঁর পরিবারসহ সাবরুম মহকুমা থেকে আগরতলায় আসেন। তার পরিবারের জন্য দুটি কামরা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর আমাদের ব্যাচমেট খসরুজ্জামান চৌধুরী আগরতলায় আসেন। প্রথমে তিনি আমাদের সঙ্গে বাড়ির সামনের কক্ষটিতে থাকতেন। পরে খসরুজ্জামান চৌধুরীর পরিবার এসে যোগ দিলে তিনি আরেকটি কক্ষ দখল করেন। সবশেষে তৌফিক ইমামের স্ত্রীর ভাই আগরতলায় এসে আশ্রয় নেন। তিনিই সর্বশেষ কক্ষটি দখল করেন। এভাবে প্রিয়দাস চক্রবর্তীর বাড়িটি একটি শরণার্থীশিবিরে পরিণত হয়।

    আগরতলা আসার পরদিন আমি ও রকিব আগরতলার বিএসএফ সদর দপ্তরে কর্নেল রবের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতার আরও অনেক কাহিনি শুনতে পাই। ৩ মে আমরা সীমান্ত অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে যাই। সেখানে তখন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে উঠছিল। এ সফরের সময় কর্নেল রেজা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) বাহারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। মেজর বাহার জানান, ২৮ মার্চ তারিখে তিনি কসবা সীমান্ত দিয়ে ভারতে আসছিলেন। সেখানে তিনি শুনতে পান সীমান্তে গণি মিয়া নামে একজন সচ্ছল চাষির খড়ের গাদার মধ্যে একজন সেনা কর্মকর্তা লুকিয়ে আছেন। তিনি সেই সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য গণি মিয়ার বাড়ি যান। খড়ের গাদা থেকে বেরোনোর পর মেজর বাহার চিনতে পারেন যে ব্যক্তিটি হচ্ছেন গোঁফছাঁটা কর্নেল এম এ জি ওসমানী। তিনি তাঁকে স্যালুট দিলেন এবং অনুরোধ করলেন ভারতে যাওয়ার জন্য। কর্নেল ওসমানী বললেন, ভারতে গেলে তারা তাকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করবে না। সুতরাং তিনি ভারতে যেতে চান না। মেজর বাহার ভারতে গিয়ে বিএসএফের কর্মকর্তাদের তাঁকে অভ্যর্থনা করে ভারতে নিয়ে আসার অনুরোধ করেন। বিএসএফের কমান্ডাররা তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে ভারতে নিয়ে যান। মেজর বাহার বললেন, গার্ড অব অনার পেয়ে ওসমানী সাহেবের চেহারা একেবারে ভিন্ন হয়ে যায়। তিনি এমন ভাব করছিলেন যেন তার সঙ্গে আমার আদৌ কোনো পরিচয় নেই। অন্যান্য বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের মধ্যেও কর্নেল ওসমানীর প্রতি অনুরাগ দেখা যায় না। তারা তাঁকে ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর স্মারক বলে গণ্য করতেন। বাংলাদেশ সরকার মনোনীত সর্বাধিনায়ক হিসেবে কর্নেল ওসমানীর আদেশ সবাই মানলেও বেশির ভাগ অফিসারই তাকে পছন্দ করতেন না।

    আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।8 তবে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মুজিবনগর সরকার একটি কেন্দ্রীভূত সরকার হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ সরকারের নামে অফিস গড়ে ওঠে। যাদের সঙ্গে তখনো কলকাতাস্থ মুজিবনগর সরকারের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুজিবনগর সরকার আগরতলা সরকারকে একটি উপকেন্দ্র হিসেবে মেনে নেয়। এই উপকেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন সংসদ সদস্য এম আর সিদ্দিকী ও জহুর হোসেন চৌধুরী। এই সংসদ সদস্যরা আগরতলায় কর্নেল চৌমুহনী নামে একটি স্থানে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের একটি অফিস স্থাপন করেন। এই অফিসের কাজ ছিল বাংলাদেশ থেকে আগত সাংসদ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের থাকার ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে আগরতলায় যারা পালিয়ে আসছিলেন, তাঁদের কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। নিরাপত্তার কারণে আগরতলার প্রশাসন তাদের পরিচয়পত্র দেখতে চাইত। এই অফিস বাংলাদেশ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের পরিচয়পত্র দিত।

    এইচ টি ইমাম আগরতলায় আসার পর বাংলাদেশ সরকারের আরেকটি অফিস খোলা হয়। এই অফিসই ছিল ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান যোগসূত্র। এইচ টি ইমাম সরাসরি ত্রিপুরা রাজ্যের চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য যোগাযোগ করতেন। তাঁর অধীন কর্মকর্তারা ত্রিপুরা রাজ্যের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দেনদরবার করতেন। প্রথম দিকে এই সরকারের প্রশাসন এবং অর্থের দায়িত্বে ছিলেন কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ এবং বাকি সব বিষয় আমি দেখতাম। মাসখানেক পর খসরুজ্জামান চৌধুরী এই অফিসে যোগ দিলে তাঁকে অর্থের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং আমাকে তথ্য সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    আগরতলায় অফিস গুছিয়ে বসার আগেই রকিব এবং আমার জন্য মৌলভীবাজার থেকে জরুরি তলব আসে। মে মাসের ৫ তারিখে আমাদের অবিলম্বে মৌলভীবাজার যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। মৌলভীবাজারে তখন পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশ করেনি, তবে যেকোনো মুহূর্তে যে প্রবেশ করতে পারে, এমন আশঙ্কা ছিল। মৌলভীবাজার ট্রেজারিতে তখন ২ কোটি টাকা ছিল। ট্রেজারির চাবি ছিল মৌলভীবাজারের সেকেন্ড অফিসারের কাছে। তাকে যখন ট্রেজারির চাবি দিতে বলা হলো, তখন তিনি পালিয়ে যান। আমাদের ডাকার উদ্দেশ্য ছিল এই সেকেন্ড অফিসারকে খুঁজে বের করে তার কাছ থেকে ট্রেজারির চাবি উদ্ধার করা। আমরা রাতে মৌলভীবাজারের মনু চা-বাগানে পৌঁছাই। ততক্ষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল গ্রেনেড দিয়ে ট্রেজারির ভল্ট ভেঙে ফেলে এবং সেখান থেকে টাকা নিয়ে আসে কিন্তু এই টাকার কোনো হিসাব করা যায়নি। পরদিন সকালে আমরা চা-বাগানের ভেতরের রাস্তায় পোড়া পাকিস্তানি মুদ্রার নোট পড়ে থাকতে দেখেছি। আমরা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মৌলভীবাজারের চা-বাগান থেকে ভারতে চলে আসি।

    সে সময় আমাদের কাছে আরেকটি সমস্যা তুলে ধরা হয়। যুদ্ধের কারণে সিলেটের চা-বাগান থেকে চা চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো সম্ভব ছিল না। তাই সব বাগানেই অনেক চা জমে ছিল। আশা করা হচ্ছিল পরিস্থিতি উন্নত হলে এই চা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পাকিস্তানে পাঠানো হবে। পশ্চিম পাকিস্তানে যে চা ব্যবহৃত হতো, তার অধিকাংশ যেত পূর্ব পাকিস্তান থেকে। যদি সিলেটের চা বাগানের চা ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে পাকিস্তানিরা চা পাবে না এবং তাদের বাগানগুলোর আর্থিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই সীমান্তের চা বাগানের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চা ভারতে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজে আমরা শ্রীমঙ্গল চা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হাসানের সহায়তা চাই। হাসানও তখন আমাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। আমরা ভারতে চা রাখার জন্য একটি গুদাম খুঁজে বের করি এবং এই গুদামে ট্রাকে করে চা আনা হতো। আমরা ৫-৬ মে পর্যন্ত এ কাজটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। পরে দেখা গেল যে এই চা এনে তা ভারতের বাজারে বিক্রি করার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ভারতে চা বিক্রির জন্য ভারত সরকারের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। যে গুদামে চা রাখা হতো, সেখানে দীর্ঘদিন চায়ের মান অক্ষুণ্ণ থাকত না। অনুমতি পেতে দেরি হওয়ায় অনেক চা-ই নষ্ট হয়ে যায়। আমরা আশা করেছিলাম, চা বিক্রি করে বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব বাড়ানো যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

    ৯-১০ মে তারিখ থেকে আমি এবং রকিব আগরতলায় অফিস করতে থাকি। অফিসে অনেক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়। তাঁদের দুঃখের কাহিনি শুনি। এই সময়ে আগরতলায় একটি পরিবারের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিবারটির কর্তার নাম ছিল এইচ এন চক্রবর্তী। তাঁর পৈতৃক বাসস্থান ছিল সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ গ্রামে। দেশ বিভাগের পর তিনি আগরতলায় চলে আসেন এবং দুটি চা-বাগান স্থাপন করেন। তিনি দিল্লিতে প্রবাসী একটি বাঙালি পরিবারের কন্যাকে বিয়ে করেন। আগরতলায় ছেলেমেয়েসহ একটি বিরাট বাড়িতে তিনি থাকতেন। তিনি যখন আমাদের খবর পান, তখন তৌফিক ইমাম, রকিবউদ্দিন, খসরুজ্জামান এবং আমাকে প্রায়ই তাঁর বাড়িতে খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করতেন। আহার সামগ্রীর মধ্যে থাকত বড় বড় মাছ, খাসি এবং মোরগের মাংস। আগরতলা শহরের সেরা মিষ্টির দোকান থেকে দই, মিষ্টিও পরিবেশন করা হতো। আমার জন্য এই খাওয়ার চেয়েও আরও একটি বড় আকর্ষণ ছিল এইচ এন চক্রবর্তীর বাড়িতে। তিনি শুনতে পান যে আমি চেইন স্মোকার। হবিগঞ্জে থাকতে আমি বিদেশি সিগারেট খেতাম। কিন্তু এখন অর্থাভাবে ভারতে চার মিনার সিগারেট খাচ্ছি। এ কথা শোনার পর আমি তার বাড়িতে গেলেই তিনি প্রতিবার আমাকে এক কার্টন বিদেশি সিগারেট দিতেন। এই দান গ্রহণ করতে গিয়ে আমার চোখে জল আসত।

    তিনি আমাদের তার চা-বাগানে নিয়ে যান। একবার সেখানে তিনি আমাদের সবার জন্য বনভোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। অবশ্য তার চা বাগানের মান ছিল সিলেটের চা-বাগানের তুলনায় অনেক নিচে। উৎপাদিত চায়ের মান ভালো না হওয়ায় ভারতের বাজারে এর খুব একটা চাহিদা ছিল না। বাগান বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকেরা বেকার হয়ে যাবে–এই ভয়ে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের মালিকদের বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দিত। এই ভর্তুকি দিয়েই এসব বাগান চলছিল। চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা কোনো কোনো শরণার্থী বাংলাদেশিরা পছন্দ করতেন না। তাঁরা কানাঘুষা করতেন যে চক্রবর্তী এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সেবাযত্ন করে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তাঁদের কাছে বিভিন্ন তদবির নিয়ে হাজির হবেন। আমার কাছে কখনো তা মনে হয়নি। ভারতে যে কটি পরিবার বিভিন্নভাবে আমাদের সাহায্য করেছে, তাতে তাদের কোনো স্বার্থ ছিল না।

    ৫০ বছর হলো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তৌফিক ইমাম, রকিব, খসরু এবং আমি–আমরা ৫০ বছরে বাংলাদেশে অনেক উঁচু পদে কাজ করেছি কিন্তু কখনো ভারতীয় বন্ধুদের কাছ থেকে কোনো তদবিরের অনুরোধ পাইনি। এইচ এন চক্রবর্তী ও প্রিয়দাস চক্রবর্তী আজ বেঁচে নেই। মি. কে পি দত্ত বেঁচে আছেন কি না, জানি না। মুক্তিযুদ্ধের পর শুনতে পেয়েছি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকায় সন্তুষ্ট হয়ে ভারত সরকার তাকে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে (আইএস) মনোনয়ন দিয়েছিল।

    এপ্রিলের ১০-১১ তারিখে হেনা বুজি তার বড় মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আগরতলায় আমার বাসভবনে উপস্থিত হন। হেনা বুজি আমার বড় চাচার জ্যেষ্ঠ কন্যা। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। বিয়ের সময় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সুপারিটেনডেন্ট ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তাকে পাকিস্তান। পুলিশ সার্ভিসে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালে তিনি পাবনার এসপি ছিলেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে কলকাতা ডেপুটি হাইকমিশনারের অফিসে পাসপোর্ট এবং ভিসাসংক্রান্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রথম সচিব পদে পদস্থ করেন। এ ধরনের কর্মকর্তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে গোয়েন্দার কাজও করতে হয়। ২৬ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করলে সারা দেশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। কলকাতায় তখন ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের ১৯৪৯ ব্যাচের কর্মকর্তা এম হোসেন আলী। তিনি এবং মিশনের প্রথম সচিব রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, তৃতীয় সচিব আনোয়ারুল করিম চৌধুরী, তৃতীয় সচিব নজরুল ইসলাম, তৃতীয় সচিব মাকসুদ আলী এবং সুপারিনটেনডেন্ট সাইদুর রহমানসহ বাংলাদেশ সরকারে যোগ দেন। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ১৭ এপ্রিল তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। মি. চৌধুরীর ছোট মেয়ে ছাড়া পরিবারের আর সব সদস্য তখন ঢাকায় ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অবশ্যই তার পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নেবে। এই ভয়ে চৌধুরী সাহেব খুবই উৎকণ্ঠিত ছিলেন। রেডিওতে চৌধুরী সাহেবের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হেনা বুজি আমাদের পৈতৃক বাড়ি নবীনগর থানার রসুল্লাবাদ গ্রামে চলে যান। সেখান থেকে ভারতে যাওয়ার পথ খুঁজতে থাকেন।

    মে মাসের প্রথম দিকে নবীনগরে খবর চলে যায় যে আমি আগরতলায় আছি। হেনা বুজি আগরতলায় আমার কাছে চলে আসতে চান। তাঁকে এই কাজে সহায়তা করে আমার ছোট ভাই কবিরের বন্ধু মোমিন। সে হেনা বুজি এবং তার দুই সন্তানসহ নৌকাযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে কুমিল্লার সংযোগকারী রাস্তা পার হয়ে বহু কষ্টে আগরতলা সীমান্তে পৌঁছায়। আগরতলায় পৌঁছে বাংলাদেশ সরকারের অফিসে যায় এবং সেখান থেকে আমার বাসার ঠিকানা জোগাড় করে উপস্থিত হয়। আমি তো হেনা বুজি এবং তাঁর ছেলেমেয়েদের দেখে একেবারে অবাক হয়ে যাই। প্রিয়দাস চক্রবর্তীর বাড়ির একটি কামরা খুলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

    পরদিন ভোরে আমি হেনা বুজিকে নিয়ে এইচ এন চক্রবর্তীর বাড়িতে যাই। তাঁর বাসার টেলিফোন থেকে রফিক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি আমাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর তিনি জানান। যে পরদিন আগরতলা থেকে হেনা বুজি এবং তার দুই সন্তানের জন্য তিনটি বিমানের টিকিট এয়ার ইন্ডিয়া অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আমাকে টিকিটগুলো সংগ্রহ করতে বলেন এবং হেনা বুজি ও তার সন্তানদের আগরতলার বাসায় লুকিয়ে থাকতে উপদেশ দেন। রফিক চৌধুরীর পরামর্শ অনুসারে তারা আমাদের বাসায় লুকিয়ে ছিল। তাদের জিপে করে আগরতলা বিমানবন্দরে প্লেনে তুলে দিয়ে আসি। হেনা বুজি বারবার আমাকে বলছিলেন আগরতলায় কষ্ট না করে কলকাতায় চলে আসার জন্য। কলকাতায় ভাই বোন এক বাসাতেই থাকা যাবে।

    মোমিনের কাছ থেকে নবীনগরে পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচার সম্পর্কে বিভিন্ন বিবরণ শুনলাম। যেহেতু এই অঞ্চল দিয়ে মুক্তিবাহিনী চলাফেরা করছিল, সেহেতু পাকিস্তান বিমানবাহিনী নবীনগরে বোমা ফেলে। একটি বোমা আমাদের উঠানে বিস্ফোরিত হয়। আমার মা-বাবা ভয় পেয়ে যান। বাবা তখন অসুস্থ। কয়েকজন লোক ধরাধরি করে বাবাকে তিতাস নদে নৌকায় তোলেন। আমাদের পরিবার নবীনগর থেকে তিন মাইল দূরে বিলের মধ্যে অবস্থিত আমাদের মামার বাড়ি কণিকাড়া গ্রামে চলে যান।

    পাকিস্তানের সমর্থকেরা নবীনগর থানা দখল করে থানায় তখন তাদের দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছে। আমাদের বাসা ছিল থানায় উল্টো দিকে। আমাদের বাসায় ৫০টির মতো ভেড়া ছিল। নবীনগর স্কুলের হেডক্লার্ক রাধারমণ বাবুর ভেড়ার পাল ছিল। আমার ছোট ভাই জি এম জিয়াউদ্দিন খান ভেড়া পছন্দ করত। রাধারমণ বাবু জিয়াউদ্দিন খানকে দুটি ভেড়া উপহার দেন। এই ভেড়া দম্পতি থেকে ভেড়ার বংশ বাড়তে থাকে। ১৯৭১ সালে প্রায় ৫০টি ভেড়া আমাদের বাড়িতে ছিল। ওই সময় আমাদের বাড়িতে কোনো মেহমান গেলে মোরগের বদলে ভেড়া জবাই করা হতো। তবু ভেড়ার সংখ্যা কমছিল না। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভেড়ার খবর পেয়ে তাদের খাওয়ার জন্য নির্বিচার হত্যা শুরু করে। ১৫-২০ দিনের মধ্যেই এই ভেড়ার পাল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মোমিন জানাল যে আমার মা আমার জন্য খুবই কান্নাকাটি করেন এবং প্রায়ই রাতে আমাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেন। তিনি আমার জন্য মুরগির রোস্ট, বড় রুই মাছ ভাজি এবং এক বোতল খাঁটি ঘি পাঠিয়ে দিয়েছেন। এগুলো খেতে খেতে মায়ের কথা মনে পড়ায় আমার চোখে পানি আসছিল।

    মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমাকে মাহবুবুল আলম চাষী এবং ড. ত্রিগুণা সেনের সঙ্গে শিলচর যেতে হয়েছিল। ড. ত্রিগুণা সেনের জন্ম হয়েছিল সিলেট শহরে ১৯০৫ সালে। তিনি সিলেট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। কলেজে থাকাকালীন তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দারা তাঁর ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন এবং শেষ মুহূর্তে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করেন। তাঁর পরিবার গোয়েন্দাদের তৎপরতা লক্ষ করে আতঙ্কিত হয়ে তাঁকে কলকাতা থেকে জার্মানিগামী একটি জাহাজে তুলে দেন। ত্রিগুণা সেন জার্মানিতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দেশে ফিরে এসে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং জেল খাটেন।

    জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯৪৬ সালে তিনি ডিব্ৰুগড় বিদ্যুৎ সরবরাহ করপোরেশনে চাকরি নেন। ১৯৫৫ সালে তিনি যাদবপুর প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ের র‍্যাক্টর নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে যাদবপুর প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। তিনি ১৯৫৬ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হন এবং ১০ বছর এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং এই পদে থাকাকালীন তিনি কোঠারি শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভারতে নতুন শিক্ষানীতির প্রবর্তন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি খনি, আকরিক ধাতুসমূহ এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে নির্ধারণের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তবে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে খুবই বিশ্বাস করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংহত করার জন্য তিনি ড. সেনের সাহায্য চান। ড. সেন আগরতলায় আসেন। তিনি আগরতলায় বাংলাদেশের তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতে চান। এ ব্যাপারে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সাহায্য চান। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন কর্মকর্তাকে তাঁকে সহায়তার জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়। একজন কর্মকর্তা হলেন মাহবুবুল আলম চাষী, আরেকজন কর্মকর্তা ছিলাম আমি।

    মাহবুবুল আলম চাষী বাংলাদেশে অতি সুপরিচিত নাম। ১৯৪৯ সালে তিনি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন এবং ১৯৬৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের উপসচিবের মর্যাদা নিয়ে ঢাকায় দূতাবাসসমূহের সঙ্গে সংযোগের জন্য স্থাপিত অফিসে প্রধান হিসেবে যোগ দেন। তিনি এই পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় একটি আদর্শ খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আগরতলায় চলে আসেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পররাষ্ট্রসচিব হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তাঁর ক্রিয়াকাণ্ড বিতর্কিত হয়ে পড়ে। তিনি খন্দকার মোশতাকের প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠীর একজন নেতা হিসেবে চিহ্নিত হন। তবে আগরতলায় যখন তিনি ত্রিগুণা সেনের সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন তাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক শুরু হয়নি। মাহবুবুল আলম চাষীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সখ্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে দুজনই সহপাঠী ছিলেন। ১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু বেইজিংয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে যান, তখন মি. ও মিসেস মাহবুবুল আলম তাকে খুবই যত্ন করেন। তাদের আতিথেয়তার কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘বেগম মাহাবুব ও মাহাবুবের আদর আপ্যায়নের কথা কোনো দিন ভুলতে পারি নাই।

    ড. ত্রিগুণা সেন একটি গাড়িতে এবং মাহবুবুল আলম চাষী ও আমি একটি জিপ নিয়ে রওনা হই। ড. ত্রিগুণা সেন মাহবুবুল আলম চাষী এবং আমাকে তার গাড়িতে তুলে নেন। আমাদের জিপে ড. ত্রিগুণা সেনের সঙ্গীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আগরতলা থেকে পাহাড়ে ঘেরা উঁচু নিচু সড়ক ধরে আমাদের গাড়ি প্রথমে কৈলাশহরের দিকে যায়। কৈলাশহরে ভারতের এক ব্রিগেড সৈন্য অবস্থান করছিল। এখানে একটি বিমানবন্দরও রয়েছে। রাস্তা দিয়ে গেলে ত্রিপুরা রাজ্যের নয়নাভিরাম রূপ দেখা যায়। চলতে চলতে ত্রিগুণা সেন। বাংলাদেশের বামপন্থী নেতাদের সম্বন্ধে খোঁজ করছিলেন। বেশির ভাগ নেতা সম্বন্ধেই জবাব দেন মাহবুবুল আলম চাষী। তাঁর আলোচনা থেকে অনুমান করা মোটেও শক্ত ছিল না যে ড. ত্রিগুণা সেনের একটি দায়িত্ব হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যেসব তরুণ পালিয়ে আসছে, তারা যেন বামপন্থী নেতৃত্বের কবলে না পড়ে। সে জন্য তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে সবল করার ওপর জোর দেন। কৈলাশহরে ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার ও ডেপুটি কমিশনার রাজ্যসভার সদস্য ত্রিগুণা সেনকে যে ধরনের অভ্যর্থনা দেন, সে ধরনের অভ্যর্থনা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের কখনো রাজনীতিবিদদের দিতে দেখিনি। এমনকি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ ধরনের আচরণ দেখতে পাইনি। ভারতে গণতান্ত্রিক চেতনা অত্যন্ত বদ্ধমূল ছিল। তাই সেনা কর্মকর্তারা সব সময়ই রাজনৈতিক নেতাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন।

    ড. সেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ইয়ুথ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে। এই ইয়ুথ ক্যাম্পের সঙ্গে বাইরের শরণার্থীদের যোগাযোগ রাখার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। কৈলাশহর থেকে আমরা করিমগঞ্জে যাই। সেখানে শিলচরের ডেপুটি কমিশনার ত্রিগুণা সেনকে স্বাগত জানান। করিমগঞ্জের পর আমরা শিলচর ডাকবাংলোতে যাই। সেখানে রাতটা কাটাই, পরদিন সকালে ত্রিগুণা সেনের সঙ্গে আমাদের সভা হয়। সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে আগরতলা থেকে শিলচর পর্যন্ত ভূখণ্ডে কয়েকটি ইয়ুথ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। এই ইয়ুথ ক্যাম্পের টাকাপয়সা বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এগুলোর তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে আমাকে। ড. ত্রিগুণা সেন শিলচর থেকে বিমানে দিল্লি চলে যান। তবে তার সঙ্গে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ সরকার আগরতলার জন্য একটি স্বতন্ত্র ইয়ুথ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা না করে সারা দেশের জন্য একটি সংগঠন স্থাপন করেন। ওই সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাহবুবুল আলম চাষী মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আমাকেও মুজিবনগর সরকারের উপসচিবের দায়িত্ব দিয়ে কলকাতা বদলি করা হয়।

    মে মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ত্রিপুরা রাজ্যের শরণার্থীদের অবস্থা দেখার জন্য আগরতলা আসেন। এ ছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তিনি সভা করেন। তাঁর আগরতলা সফর ছিল মাত্র এক দিনের। সকালে এসে তিনি শরণার্থীশিবির ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেখা করে রাতে আগরতলা গভর্নরের বাসভবন রাজভবনে আসেন। তার অফিস থেকে খবর দেওয়া হয় যে তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে চান। আগরতলায় ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক একসময় ছিলেন কিন্তু মে মাসের শেষ দিকে এঁদের প্রায় সবাই কলকাতা চলে যান। একমাত্র খাঁটি বুদ্ধিজীবী ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান। বুদ্ধিজীবীদের ঘাটতি পূরণ করা হলো সরকারি আমলাদের দিয়ে। সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে চারজন সিএসপি অফিসার যোগ দিলেন। এরা হলেন হোসেন তৌফিক ইমাম, কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ, খসরুজ্জামান চৌধুরী এবং আমি। সভা শুরু হওয়ার প্রায় ৪৫ মিনিট আগে আমরা রাজভবনে পৌঁছে যাই। সেখানে আমাদের একটি ছোট কক্ষে বসানো হয়। ওই কক্ষটি ব্যবহার করছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর একজন একান্ত সচিব। একান্ত সচিব উত্তর প্রদেশ থেকে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের একজন সদস্য। তাঁর চাকরিতে ছয় বছরের অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে আমাদের অভিজ্ঞতা পাঁচ বছরের। আইএস কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সিএসপি কর্মকর্তাদের সমগোত্রীয় বলে গণ্য করত। কাজেই অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে আমাদের জমে গেল। ওই সময় একজন অর্ডারলি ছয়-সাতটি কালো বাক্স নিয়ে হাজির হয়। একান্ত সচিব জানালেন, এ বাক্সগুলোতে বাংলাদেশ সম্পর্কে সর্বশেষ ব্রিফ রয়েছে। আজ রাতে মিসেস গান্ধী এগুলো পড়বেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তিনি ঘুমান কখন? একান্ত সচিব বললেন, এই দুর্যোগের সময় তার ঘুম খুবই কম হয়। তিনি বাংলাদেশ নিয়ে একেবারে বিভোর হয়ে আছেন।

    মিসেস গান্ধীর সঙ্গে ভারতের তথ্য বিভাগের প্রতিমন্ত্রী নন্দিনী সৎপথীও ছিলেন। খসরুজ্জামান চৌধুরী তার ডায়েরির ভিত্তিতে এই সভার নিম্নরূপ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন :

    It is in this context I must mention the visit of Mrs. Indira Gandhi and Nandini Satpathy, Indian Minister of State for Information to Broadcasting to Agartala. In those days the question of recognition of Bangladesh was a very prominent issue. The Indian population had been persistently demanding such recognition from the government. I distinctly remember that when Mrs. Indira Gandhi came, she invited all of us to meet her at one place in Agartala. The meeting was quite brief. Mrs. Indira Gandhi spoke for a few minutes and explained the position of the Indian Government vis-a-vis of the struggle. I distinctly remember myself and Akbar Ali was sitting by her side. Since Mrs. Gandhi wanted to have our reaction in brief, it was Akbar Ali who wanted to know about recognition from Mrs. Gandhi. Akbar Ali’s question was when Indian Government was going to recognise Bangladesh, Mrs. Gandhi had been sitting almost casually and when Akbar Ali put this question, she straightened up bit and gave him a long look. She posed a counter question to Akbar Ali asking him what he would gain by such recognition. Akbar Ali was not to be daunted and explained how such recognition will boost up the morale of the evacuees and other Bengalees apart from giving a stamp of regularity to the provisional government of Bangladesh. Mrs. Gandhi again had a long look at Akbar Ali and this time started addressing him as a young man. She looked into distance and closed her eyes and commented that the world was very harsh and any decision to be taken would have to be made after analysing the pros and cons. I still remember what she said that day. She addressed Akbar Ali and said, ‘Young man, this world is very harsh. You can get away by doing everything if you do not admit that you have done it’. She went of the explain that by according recognition India would simply expose itself. Then she will become exposed to the whole world and here may be forces which will take it as a pretext for going out openly for the atrocities committed by Pakistanis in Bangladesh. Mrs. Gandhi asserted that the stamp of legality given by Indian recognition will not carry much value and India would not be in a position to supply the freedom fighters with arms and ammunitions. She admitted that temporarily the movement will get a boosting up as a result of such recognition but in the long run this may weaken the cause of Bangladesh in spite of helping it. She also elaborated on various legal and technical difficulties which prevented India from according a formal recognition to the government of Bangladesh. Mrs. Gandhi held a view that India could help the freedom fighters better with arms and ammunitions without formal announcing it through recognition wholly, in fact, they had already granted such recognition by allowing the Pakistan Deputy High Commission, which had defected in favour of Bangladesh, to function in a full-fledged manner on the soils of India. She opened her eyes again and finished her statement by saying there is a right time for the right decisions. I can assure you that the recognition will be accorded as soon as the time is ripe for such recognition. Incidentally, this was completely in keeping with the public stand of Mrs. Gandhi to the Indian people whom she always consoled by saying that the Indian government was all out for the Bangladesh cause but recognition could be given only when time was ripe.9

    বাংলাদেশের স্বীকৃতি সম্বন্ধে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে যে আলোচনা হয়, তা খসরুজ্জামান চৌধুরী বিস্তারিতভাবে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন। তবে দুটি বিষয় তিনি উল্লেখ করেননি। একটি বিষয় হলো মিসেস গান্ধী তাঁর আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের বামপন্থী নেতারা (মতিন, আলাউদ্দিন ইত্যাদি) মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কী ষড়যন্ত্র করছে, সে সম্পর্কে ভারতীয় গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে বলেন। তিনি বারবার জোর দেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব যেন কোনোমতেই বামপন্থীদের হাতে না যায়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে যাতে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সংস্রব না ঘটে, সে ব্যাপারে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান। দ্বিতীয়ত, মিসেস গান্ধী বলেন, ভারতের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের গ্রহণ করা সম্ভব নয়। যদি শরণার্থীরা দীর্ঘদিন থাকে, তাহলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনগোষ্ঠীতে পরিবর্তন আসবে। এর ফলে ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে। সুতরাং জোর দিয়ে তিনি বলেন যে শরণার্থীদের সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য যা কিছু করতে হয়, তা তিনি করতে বদ্ধপরিকর।

    প্রথমে আমরা তিনজন সিএসপি কর্মকর্তা একসঙ্গে বাস করছিলাম। ২৮ মে তারিখে খসরুজ্জামান চৌধুরী মেঘালয় রাজ্য থেকে আগরতলায় এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। এই চারজন কর্মকর্তা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে বাস করছিলাম। যদিও আমাদের খাবার দুটি মেসে রান্না হতো। একটি রকিব ও আকবর আলি খানের মেস, আরেকটি হোসেন তৌফিক ইমামের মেস। তবু মেস পরিচালনায় তৌফিক ইমাম সাহেবের স্ত্রী বেগম ইসমাত ইমাম আমাদের সাহায্য করতেন। তাঁর বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে আমাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। তৌফিক ইমাম সাহেব অফিসের শত কাজকর্ম সত্ত্বেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া যাতে ঠিকমতো চলে, তার ওপর জোর দিতেন। তাঁর বড় ছেলে জামিল (তানভীর ইমাম) মোটেও পড়াশোনা করতে চাইত। একদিন তৌফিক ইমাম পড়াশোনা না করার জন্য তার ছেলের কান মলে দেন। ছেলে তখন কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাংলাদেশে পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই। পাশের রুমে তিনজন আঙ্কেল শুয়ে আছে। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্র ছিল এবং সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কাজ করছিল। এরা এখন ভেরেন্ডা ভাজছে। কাজেই পড়াশোনা করে কোনো লাভ হবে না। তৌফিক ইমাম তবু ছেলেকে পড়াশোনার জন্য চাপ দেন। তৌফিক ইমামের চেষ্টা বিফল হয়নি। পরবর্তীকালে তাঁর ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাস করেছে এবং বর্তমানে সে জাতীয় সংসদের একজন সদস্য।

    খসরুজ্জামান চৌধুরী আগরতলায় আসার পর বেশির ভাগ সময়ই উদ্বিগ্ন থাকতেন। এই উদ্বেগের কারণ হলো তার স্ত্রী এবং তার শিশুপুত্র। এদেরকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ফেলে মেঘালয়ে চলে যান। এরা প্রায় দুই। সপ্তাহ আমার মা-বাবার সঙ্গে আমার মাতুলালয় কণিকাড়া গ্রামে ছিলেন। কিন্তু খসরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেননি। তারা ঢাকায় চলে যান কিন্তু ঢাকায় যেকোনো সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ার ভয় ছিল। খসরুজ্জামান চৌধুরী তার স্ত্রীকে আগরতলায় আসার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি খসরুজ্জামান চৌধুরীর বন্ধু। আনোয়ারুল হক নিলুর সঙ্গে আগরতলা রওনা দেন। কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে তিনি ১০ জুন ভারতে প্রবেশ করেন। খসরুজ্জামান চৌধুরীর পরিবার অবশেষে একত্র হয়।

    মিসেস খসরুজ্জামান চৌধুরীর কাছ থেকে আমি আমার মা-বাবার সংবাদ পাই। আমার বাবা তখন খুবই অসুস্থ এবং আমার মা আমার জন্য কান্নাকাটি করেন। এ সময়ে আমার ছোট ভাই জি এম জেড খান, যে ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্রিনলেজ ব্যাংকে অফিসার হিসেবে কাজ করছিল, তাকে প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন সিটি ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (যা অবস্থিত ছিল ফিলিপাইনে) পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তার জন্য তত দুশ্চিন্তা ছিল না। আমার ছোট ভাই কবিরউদ্দিন খান মা-বাবার সঙ্গে ছিল। যদিও পাকিস্তান বাহিনীর হাতে পড়লে তার অসুবিধা হতে পারত। তবু মা-বাবাকে দেখাশোনার জন্য সে কণিকাড়া গ্রামেই থেকে যায়। একপর্যায়ে রাজাকাররা তাকে খুবই বিরক্ত করা শুরু করলে তখন সে বাধ্য হয়ে আগরতলায় আমার কাছে চলে আসে। কিন্তু তখন আমি আগরতলা ছেড়ে কলকাতা চলে গেছি। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কবির তাই আবার মা-বাবার কাছে চলে যায়। কবিরের সঙ্গে আম্মা খাঁটি গাওয়া ঘি এবং মোরগের রোস্ট পাঠিয়েছিলেন। রকিবউদ্দিন এগুলো রেখে দেন এবং খেয়ে নেন। পরে কলকাতায় দেখা হলে তিনি আমাকে এ খবর দেন।

    জুন মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানেই মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়, সেখানেই তারা আক্রমণ করে। পক্ষান্তরে মুক্তিবাহিনীকে নতুন করে সংগঠিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ২৪ জুন ১৯৭১ তারিখে পাঁচটি অঞ্চল নিয়ে আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। প্রতিটি জোনে অবস্থানরত নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই পরিষদকে মন্ত্রিপরিষদের নীতি নির্দেশাবলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারদের অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্ব। দেওয়া হয়। অঞ্চলভিত্তিক কমান্ডাররা আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদের সভাপতিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারদের অঞ্চলভিত্তিক অবস্থান ছিল নিম্নরূপ—

    1. পার্বত্য চট্টগ্রাম : ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ইপিআর ও অন্যান্য
    2. চট্টগ্রাম ও ফেনী : মেজর জিয়াউর রহমান–অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
    3. কুমিল্লা অঞ্চল : মেজর খালেদ মোশাররফ–চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
    4. সিলেট (পূর্ব): মেজর সফিউল্লাহ– দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
    5. সিলেট (উত্তর) : মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত-ইপিআর ও অন্যান্য
    6. কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট : ক্যাপ্টেন নোয়জেস উদ্দিন–ইপিআর ও অন্যান্য
    7. ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর : মেজর নাজমুল হক–ইপিআর ও অন্যান্য
    8. সৈয়দপুর-পার্বতীপুর : ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন–৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
    9. নবাবগঞ্জ-রাজশাহী : ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী–ইপিআর ও অন্যান্য।
    10. কুষ্টিয়া-যশোর : মেজর আবু ওসমান চৌধুরী–ইপিআর ও প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
    11. খুলনা-বরিশাল : মেজর মো. জলিল মিয়া।10

    যেহেতু ভারতীয় বাহিনী এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিল না, সেহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ড ছিল সীমিত। এই সময়ে গেরিলাযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত বাহিনী সেনাবাহিনীর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী যুদ্ধ শুরু করে।

    ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের মনোবল যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, তার জন্য একটি শক্তিশালী বেতার কেন্দ্র বাংলাদেশ সরকারের অধীনে। ন্যস্ত করে। কলকাতার বালিগঞ্জে একটি অস্থায়ী রেকর্ডিং স্টুডিও স্থাপন করা হয় এবং রাজশাহী সীমান্তের পলাশীর আম্রকাননে পঞ্চাশ কিলোওয়াট গতিসম্পন্ন ট্রান্সমিটার থেকে কলকাতায় রেকর্ড করা অনুষ্ঠানসমূহ প্রচার করা হতো।11

    ১৯৭১ সালের ২৫ মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে এই বেতার কেন্দ্র চালু হয়। এই বেতারে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সাফল্যের কাহিনি ফলাও করে প্রচার করা হতো। প্রথম দিন থেকেই এম আর আখতার মুকুল ঢাকার কুট্টিদের ভাষায় পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিদিন দারুণভাবে আক্রমণ করতে শুরু করেন। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা, ভারতে অবস্থানরত শরণার্থীরা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন চরমপত্র’ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতেন। এই বেতারে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, ডি এল রায়, অতুল প্রসাদ, গোবিন্দ হালদার, সিকান্দার আবু জাফর, আবদুল লতিফ, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, হরলাল রায়, আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রমুখ গীতিকারের উদ্দীপনামূলক গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের দ্বারা প্রচারিত হতো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে।

    জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশ সরকারকে নতুন করে গড়া হয়। কেন্দ্রীয় সরকারকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারে নতুন নতুন সচিবের পদ সৃষ্টি করা হয়। এইচ টি ইমাম জুন মাসের শেষ দিকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কলকাতা যান। সেখানে তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে বদলি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৌফিক ইমাম তাঁর পরিবারকে আগরতলা থেকে কলকাতায় স্থানান্তরের জন্য দুই সপ্তাহের সময় চান। তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব হিসেবে আমাকে পদস্থ করতে অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে কলকাতায় বাংলাদেশ সরকারে পদস্থ হই। সম্ভবত ১০ থেকে ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে কোনো এক সময়ে আমি কলকাতাতে উপস্থিত হই। বিমানবন্দরে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন কামাল সিদ্দিকী ও ওয়ালিউল ইসলাম। কলকাতায় তখন নকশাল বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয়। দমদম থেকে পার্ক সার্কাসে যাওয়ার পথে মানিকতলা অঞ্চল দিয়ে যেতে হয়। এই অঞ্চলের রাস্তার পাশে পোড়া দোকানপাট দেখা যায়। তারা আমাকে বলেন দুদিন আগে এ অঞ্চলে নকশালদের সঙ্গে সিআরপির বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। এই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামরুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুল খালেক আগরতলা সফরে যান। তাঁরা খসরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে নির্বাচন করেন এবং তদনুসারে খসরুজ্জামান চৌধুরীর কলকাতায় বদলির আদেশ হয়। আমি কলকাতায় পৌঁছার দু-এক দিন আগেই খসরুজ্জামান চৌধুরী সপরিবার কলকাতায় পৌঁছান। আগরতলায় শুধু পড়ে রইলেন কাজী রকিব। কাজকর্ম নিয়ে তিনি খুবই ব্যস্ত ছিলেন, তবু একা একা থাকতে তার খুব ভালো লাগত না। অফিসের কাজে যখন কলকাতা যেতেন, তখন তাঁর এই মনোভাব টের পাওয়া যেত।

  • ত্রয়োদশ অধ্যায়

    ত্রয়োদশ অধ্যায়

    ত্রয়োদশ অধ্যায়
    কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ

    মধ্য জুলাই ১৯৭১-ডিসেম্বর ১৯৭১

    কলকাতায় একনাগাড়ে ছিলাম প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস। বদলি হয়ে জুলাইয়ের মাঝামাঝি যখন কলকাতায় এলাম, তখন অনেক মুক্তিযোদ্ধাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকেই আশা করেছিলেন যে বর্ষাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে দুটি কারণে টিকতে পারবে না। প্রথমত, পাকিস্তানি সেনারা সাঁতার জানে না। সুতরাং, বর্ষাকালে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল পানিতে ডুবে গেলে তারা চলাফেরা করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা জলাভূমিতেই বড় হয়েছে। সুতরাং এখানে লুকিয়ে থেকে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অনায়াসে আক্রমণ করতে পারবে। বাস্তবে দেখা গেল বর্ষাকালে পাকিস্তান। সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যন্ত্রচালিত নৌযান দিয়ে তারা পুরো। দেশ পাহারা দিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ফলে এই সময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

    আবাস

    কলকাতায় আমি এসে উঠি আমার চাচাতো বোন হেনা বুজির ৪ নম্বর পার্ক সার্কাস অ্যাভিনিউয়ে সোহরাওয়ার্দী ভবনে। দেশ বিভাগের আগে এই ভবনে থাকতেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সোহরাওয়ার্দী। তাঁর একমাত্র সন্তান ছিলেন আইসিএস কর্মকর্তা ইকরাম উল্লাহর পত্নী শায়েস্তা ইকরাম উল্লাহ। তার মৃত্যুর পর শায়েস্তা ইকরাম উল্লাহ বাড়িটির মালিক হন। পাকিস্তান সরকার তার কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে একজন প্রথম সচিব ও একজন তৃতীয় সচিবকে দুটি ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করেছে। ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন। কলকাতা পাকিস্তান দূতাবাসের প্রথম সচিব রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। নিচের তলায় থাকতেন আমাদের ব্যাচমেট পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিম চৌধুরী। আনোয়ারুল করিম চৌধুরীর বাড়ি আমরা আসার আগেই শরণার্থীশিবিরে পরিণত হয়েছে। দোতলায় আর আই চৌধুরীর বাড়িতে চারটি কামরা ছিল। একটি কামরায় থাকতেন আর আই চৌধুরী এবং তার পরিবারের ছেলেমেয়েরা। আর দুটি কামরায় থাকতেন মিসেস চৌধুরীর বন্ধু সাজেদা চৌধুরী, তাঁর স্বামী পুত্র-কন্যা ও ভাইসহ। কামরার বাইরে বারান্দায়ও অনেককে শুতে হতো। আরেকটি কামরা হেনা বুজি ভেবেছিলেন আমাকে ও কামাল সিদ্দিকীকে থাকতে দেবেন। কিন্তু খসরুজ্জামান চৌধুরী তার স্ত্রী ও শ্যালককে নিয়ে আসার পর কামরাটি তাঁকে দিয়ে দেওয়া হয়। আর যে দুটি কামরা ছিল, তার একটি কামরা ছিল স্টোর রুম। যেখানে সব জঞ্জাল রাখা হতো। আর ছাদের ওপরে একটি রুমে চাকররা থাকত। খন্দকার আসাদুজ্জামান এসে তার। পরিবারসহ চাকরদের কক্ষে থাকা শুরু করেন। ওপরে টিন দিয়ে তিনি। কক্ষটিকে একটু সম্প্রসারিত করেন। এই কক্ষটি ছিল অসম্ভব গরম।

    স্টোর রুমটির ছাদ ছিল নিচু। সেখানে কোনো ফ্যান লাগানো সম্ভব ছিল না। কক্ষটির পরিসরও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। দুটি চৌকি সেখানে ঢোকানো সম্ভব হয়েছিল। আর ছিল একটি চেয়ার, আর একটি স্ট্যান্ড ফ্যান লাগানো হয়েছিল। রুমটি এত গরম ছিল যে স্ট্যান্ড ফ্যানের বাতাসে মোটেও ঠান্ডা হতো না। আমি যখন কলকাতায় আসি, তখন শ্রাবণের শেষ দিক। ভাদ্র মাসে গরম সবচেয়ে বেশি হয়। ওই সময়টায় রাত তিন-চারটা পর্যন্ত ওই কক্ষে ঘুমানো অসম্ভব ছিল। আমি এবং কামাল সিদ্দিকী রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে ১০টার দিকে রুমে ঢুকতাম। সবাই মনে করত আমরা ঘুমাতে গেছি। আসলে ঘণ্টাখানেক গল্পসল্প করে আমরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতাম। পার্ক সার্কাসের এই বাড়িতে পাকিস্তানি রাজাকাররা হামলা করতে পারে–এই ভয়ে সন্ধ্যার দিকে গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হতো। কামালের পিঠে চড়ে প্রতি রাতে আমি গেট টপকাতাম। কামাল এরপর নিজে গেট টপকাত। এরপর আমরা চলে যেতাম রাস্তার অপর পাড়ে, যেখানে পার্ক সার্কাসের ময়দান অবস্থিত। এই ময়দানে শারদীয় মেলা হতো। মেলার অধিকাংশ দোকান সারা রাত খোলা থাকত। মেলায় ক্রেতারা রাত তিন-চারটা পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে এসে জিনিস কিনতেন। আমরা মেলায় হাঁটতাম, খিদে পেলে ফুচকা খেতাম। অনেক সময় শীতল পানীয় দিয়ে তৃষ্ণা মেটাতাম।

    কামাল সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর মোনায়েম খানের ওপর যে হামলা হয়, কামাল সিদ্দিকী তার আসামি ছিলেন। তিনি পুলিশের হুলিয়া থেকে বাঁচার জন্য তখন সলিমুল্লাহ হলে মান্নান ভূঁইয়ার রুমে আশ্রয় নেন। তবে তার সঙ্গে তখনো আমার বন্ধুত্ব হয়নি। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় কলকাতায়। এসে। পাশাপাশি দুই চৌকিতে ঘুমাতে গিয়ে। বেশির ভাগ বিষয়েই আমরা একমত ছিলাম। তবে কোনো কোনো বিষয়ে মতভেদও ছিল। মতভেদ এই বন্ধুত্বকে কখনো শিথিল করেনি। আমার সব বিপদ-আপদে আমাকে রক্ষা করার জন্য সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কামাল সিদ্দিকী। সারা জীবন তিনি আমার উপকারই করেছেন, আমি অতি অল্প প্রতিদানই দিতে পেরেছি। তাঁর কাছে আমার ঋণের শেষ নেই।

    আহার

    সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ে হেনা বুজি বিনে পয়সায় আমাদের আহারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার বাড়িতে তখন প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতি বেলায় খাবার খেত। প্রত্যেক বেলায় খাবারের মেনু ছিল অভিন্ন। প্রতি বেলায় থাকত ভাত, গরুর মাংস, সবজি এবং ডাল। আমরা রাতের বেলা সাধারণত বাসাতেই খেতাম কিন্তু দিনের বেলায় অফিস অঞ্চলে খেয়ে নিতাম। তখন কলকাতায় খাবার ছিল অত্যন্ত সস্তা। দুটি শিক কাবাব, দুটি নান ও এক কাপ চা খেতে কলকাতার ফুটপাতে ১৪ আনা খরচ পড়ত। যেদিন কাবাব খেতে ইচ্ছে করত না, সেদিন রাস্তার আশপাশের রেস্টুরেন্ট থেকে তামিলনাড়ুর খাদ্য দোসা অথবা স্যান্ডউইচ খেতাম। রাতে খাবার একঘেয়ে লাগলে কখনো কখনো আমরা পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। সেখানে বিরিয়ানি খাওয়া হতো, সঙ্গে সঙ্গে গানও শোনা যেত। আগস্ট মাসের পর কামাল সিদ্দিকীর আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কামাল সিদ্দিকীর বড় ভাই মহসিন সিদ্দিকী তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রকৌশলশাস্ত্রে ডক্টরেট করছিলেন। দেশে থাকতে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক মোটেও ভালো ছিল না। কামাল সিদ্দিকী ছিলেন পিকিংপন্থী, মহসিন সিদ্দিকী ছিলেন মস্কোপন্থী। তাই দুই ভাইয়ের মধ্যে ঠোকাঠুকি লেগেই ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মহসিন সিদ্দিকী তার ছোট ভাইয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি এটাসেটা (odd jobs) করে ওয়াশিংটনে অতিরিক্ত অর্থ অর্জন করেন এবং কামাল সিদ্দিকীকে ডলার পাঠান। সেই অর্থ কামাল সিদ্দিকী তার দুর্গত বন্ধুদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। কোনো কোনো দিন সে অর্থ দিয়ে তিনি আমাদের খাওয়াতেন। এবং সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। কলকাতায় থাকতে আমরা বার চারেক সিনেমা দেখতে গিয়েছি। তবে কলকাতায় বাংলাদেশের সব শরণার্থীর জীবন একই ধরনের ছিল না। যারা দেশ থেকে টাকা লুটপাট করে নিয়ে এসেছিল, তাদের অনেকে কলকাতায় চূড়ান্ত বিলাসিতা করেছে। বগুড়ার ট্রেজারি থেকে লুট করা অর্থ নিয়ে এসে একজন অভিনেতা কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলের বার’ একদিন সম্পূর্ণরূপে নিজের জন্য ভাড়া করেছিলেন। তিনি মুম্বাইয়ে গিয়ে বিলাসবহুল হোটেলে রাত কাটিয়েছেন। এ ধরনের অতি অল্পসংখ্যক বাংলাদেশি শরণার্থী সব শরণার্থী সম্পর্কে অনেকের মনে কলঙ্কিত ধারণার জন্ম দেন।

    মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ

    আমাকে আগরতলা থেকে কলকাতায় বদলি করা হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব হিসেবে। তৌফিক ইমামকে প্রথমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব। নিযুক্ত করা হয়। তিনি তার পরিবারের স্থানান্তরের জন্য আগরতলায় ফিরে যান। তাঁর ফিরে আসার আগপর্যন্ত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তিনি আমাকে দায়িত্ব দেন। মন্ত্রিপরিষদ সভার জন্য কিছু কার্যপত্রও তৈরি করা হয়। সভার সময় নির্ধারণ করা হয় রাত ১০টায়। আমি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কক্ষে অনুমতি নিয়ে ঢুকি। কিন্তু মন্ত্রিসভার সদস্যরা সভার কার্যপত্রে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। তাঁরা প্রত্যেকে বিভিন্ন সাংসদের অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। রাত যখন ১২টা বাজে, তখনো তাঁদের আলোচনা চলছে। একসময় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের এই সভা আরও কয়েক ঘণ্টা চলবে। এগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত রেকর্ড করার প্রয়োজন নেই। সুতরাং আপনি বাড়ি চলে যান।

    আমি বাড়ি ফিরে আসি। এর পরের সপ্তাহেই তৌফিক ইমাম সাহেব ফিরে আসেন এবং তিনি মন্ত্রিপরিষদ সভার সিদ্ধান্ত রেকর্ড করা শুরু করেন। কোনো কোনো দিন রাত তিন-চারটা পর্যন্ত এই সভা অনুষ্ঠিত হতো। তৌফিক ইমাম সাহেব পুরো সময় সভায় থাকতেন এবং তা রেকর্ড করতেন। জুলাই ১৯৭১ এর প্রথম দিকে ১৯৫৯ ব্যাচের সিএসপি এবং সিলেটের ডেপুটি কমিশনার আবদুস সামাদ সাহেব কলকাতায় উপস্থিত হন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্থাপনের আগে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সব কাজকর্ম করা হতো সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর দপ্তর থেকে। কিন্তু মন্ত্রিসভা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে প্রতিরক্ষার সব কাজ সর্বাধিনায়কের দপ্তর থেকে করা সম্ভব নয়। সে জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব পদের জন্য যথেষ্ট জ্যেষ্ঠ কোনো কর্মকর্তা পাওয়া যাচ্ছিল না। ১০ জুলাই ১৯৭১ সালে আবদুস সামাদকে প্রতিরক্ষাসচিব নিযুক্ত করা হয়। তাঁর মন্ত্রণালয়ে দুটি উপসচিবের পদ ছিল। একটি পদের জন্য তিনি আমাকে চান, অন্য পদের জন্য সিলেটের বন সংরক্ষক এস এ ইমামকে চান। তাঁর অনুরোধে আমাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের জন্য বিশেষ সেল স্থাপন করা হয়। এই সেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. বেলায়েত হোসেন ও সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাহিদ, সাংবাদিক আল-মুজাহিদী ও নজরুল ইসলামকে বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিসের স্থান নির্ধারণ করা হয় ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের টিনশেডের একটি কক্ষে। সেখানে আমাদের প্রত্যেককে একটি টেবিল ও একটি চেয়ার দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তার জন্য একটি টাইপরাইটার ও একজন টাইপিস্ট দেওয়া হয়।

    প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়

    প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে পুরোপুরি কাজ শুরু করে এবং ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুজিবনগরে কাজ করে। প্রায় সাড়ে তিন মাস আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছি। এই সময় আমি মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগ যেসব উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে, সে সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। ভারতে যেসব নিয়মিত বাহিনী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করছিল, তাদের খাওয়াদাওয়া, অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে দেওয়া হতো। কিন্তু বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে প্রায় সর্বত্রই অনেক মুক্তিযোদ্ধা দায়িত্ব পালন করতেন। এঁদের খাওয়াদাওয়া, অস্ত্রশস্ত্র–এগুলো ভারতীয় সরকার সব সময় দিত না। এঁদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্ব।

    এখানে দুটি ঘটনার উল্লেখ করি। একটি ঘটনা হলো অক্টোবর মাসে মাঠপর্যায় থেকে খবর আসে, বিভিন্ন স্থানে অনিয়মিত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের রাতে ঘুমানোর জন্য প্রয়োজনীয় কম্বল নেই। মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো পাঁচ হাজার কম্বল এসব বাহিনীর কাছে পাঠানো হবে। এ নির্দেশ যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আসে, তখন প্রতিরক্ষাসচিব আমাকে ডেকে বললেন, ‘পাঁচ হাজার কম্বল কিনে মেঘালয়ের তুরাতে পাঠিয়ে দাও। আমি বললাম, ‘কোনো টেন্ডার নেই, কোনো এস্টিমেট নেই, কীভাবে আমি পাঁচ হাজার কম্বল কিনব?’ প্রতিরক্ষাসচিব বললেন, ‘এটা যুদ্ধাবস্থা। এখানে কোনো টেন্ডার লাগে না। তুমি লোকজনকে জিজ্ঞেস করে হিসাব করো পাঁচ হাজার কম্বলের দাম কত হতে পারে। সে টাকার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে হাতে হাতে রিকুইজিশন নিয়ে যাও।’ রিকুইজিশন নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে গেলে আমাকে টাকা দিয়ে দেওয়া হয়। সেই টাকা নিয়ে কয়েকজন বন্ধুবান্ধবসহ বড় বাজারে যাই এবং কম্বল দেখে পছন্দ হলে কোথাও পাঁচ শ কম্বল, কোথাও সাত শ কম্বল–এ রকম করে কম্বল কিনতে কিনতে পাঁচ হাজার কম্বল কিনে এগুলোকে থিয়েটার রোডের অফিসে আনার ব্যবস্থা করি। অন্যদিকে ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন। আমি তাকে বলি যে কম্বলগুলো মেঘালয়ের তুরাতে পাঠাতে হবে। সে বলল, তুমি কম্বলগুলো গাড়িতে ভরে সরাসরি ফোর্ট উইলিয়ামে নিয়ে আসো। সেখানে আমি তার কাছে কম্বল হস্তান্তর করি। এই সময় ভারতীয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমাকে চা খেতে দেন। চা খেতে খেতে তিনি বলেন, তোমরা বাঙালিরা পশ্চিম পাঞ্জাবিদের আক্রমণ ঠিকই প্রতিহত করছ। কিন্তু আমরা পূর্ব পাঞ্জাবের লোকেরা পশ্চিম পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। বাঙালিদের রক্ষা করার জন্য পাঞ্জাবিরা পাঞ্জাবিদের মারছে। এ কাজ কতটুকু সঠিক তা জানি না।

    তেমনি আরেকটি ঘটনা ঘটে প্রতিরক্ষাসচিব যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে এসে আমাকে একটি আদেশ দেন। সেই আদেশে তিনি লেখেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মাঠে অনেক ভালো যুদ্ধ করছে। কিন্তু এই যুদ্ধ সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ বাংলাদেশ বেতারে প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে না। যদি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে উঁচু মানের টেপ রেকর্ডার পাঠানো যায়, তাহলে সেনাবাহিনীর যুদ্ধের অনেক বাস্তব বিবরণ তুলে ধরা সম্ভব হবে। আমাকে অবিলম্বে ২০টি টেপ রেকর্ডার কিনে শিলিগুড়িতে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। আমি কম্বলের পদ্ধতি অনুসরণ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করি। চৌরঙ্গিতে গিয়ে টেপ রেকর্ডারের দোকান থেকে উন্নত মানের টেপ রেকর্ডার কিনে থিয়েটার রোডে নিয়ে আসি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই টেপ রেকর্ডারগুলো শিলিগুড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই টেপ রেকর্ডারগুলোও কতটুকু কাজে লেগেছে, তা জানি না। তবে আমরা আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি।

    প্রায় ৫০ বছর পর সেই স্মৃতি রোমন্থন করলে আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। ৫০ বছর আগে বিনা টেন্ডারে অনেক কারিগরি তথ্য না জেনেও যে সিদ্ধান্ত দ্রুততার সঙ্গে নিতে পেরেছি, আজকে ৫০ বছর পরে আমরা কি একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারব? অবিশ্বাস, হিংসা-বিদ্বেষ আজকের আমলাতন্ত্রকে অনেক খাটো ও খর্ব করে দিয়েছে।

    এ সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও দুটি কাজ করে। প্রথমত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রথম ব্যাচে ১০০ জন অফিসার প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই শিক্ষানবিশ অফিসারদের বাছাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রতিরক্ষাসচিব আবদুস সামাদকে। তিনি বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত আঞ্চলিক অফিসগুলোতে যান এবং সেখানে সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করেন। বিভিন্ন সময় তিনি তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মীদের তার বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন। সাতক্ষীরা সীমান্তে টাকি শহরে যে ইন্টারভিউ হয়েছিল, তাতে আমি সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। দুই মাসের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। তাই প্রতিরক্ষাসচিব অনেক সময়ই কলকাতায় থাকতে পারতেন না।

    আরেকটি বিষয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তান সমর্থকদের ভয় পাওয়ানোর জন্য এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে দুই-তিন মাস সময়ে এ ক্ষেত্রে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।

  • চতুর্দশ অধ্যায়

    চতুর্দশ অধ্যায়

    চতুর্দশ অধ্যায়
    স্বাধীন বাংলাদেশ
    ১ জানুয়ারি ১৯৭২-সেপ্টেম্বর ১৯৭৩

    ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ

    ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীনতার আনন্দ অনেক ম্লান হয়ে আসে যখন সংবাদ আসে যে বদর বাহিনীর সহযোগিতায় পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের পূর্বমুহূর্তে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী নিধনের তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে। সারা দেশ স্তম্ভিত হয়ে যায়, তবু জীবন থেমে থাকে না। স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়।

    সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসন গড়ে তোলা। প্রথম জেলা প্রশাসক মনোনীত হন ওয়ালিউল ইসলাম। যশোর সেনানিবাস পতনের পর ৯ ডিসেম্বর পূর্বাহ্নে যশোর কালেক্টরেটে জনাব ওয়ালিউল ইসলামের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জেলা প্রশাসনের যাত্রা শুরু হয়। এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার ১৭টি জেলায় জেলা প্রশাসক নিয়োগ করে। এই নিয়োগগুলো ছিল নিম্নরূপ:1

    (১) শামসুল হক, ইপিসিএস, কুষ্টিয়া। (২) সৈয়দ আবদুস সামাদ, সিএসপি, চট্টগ্রাম। (৩) আকবর আলি খান, সিএসপি, সিলেট। (৪) খসরুজ্জামান চৌধুরী, সিএসপি, ময়মনসিংহ। (৫) মামুনুর রশীদ, সিএসপি, বরিশাল। (৬) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ, সিএসপি, কুমিল্লা। (৭) কামাল উদ্দীন সিদ্দিকী, সিএসপি, খুলনা। (৮) কাজী লুফুল হক, ইপিসিএস, পাবনা। (৯) জহুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, ইপিসিএস, রাজশাহী। (১০) বিভূতিভূষণ বিশ্বাস, ইপিসিএস, পটুয়াখালী। (১১) এম ইসহাক, ইপিসিএস, টাঙ্গাইল। (১২) আবদুল মোমেন, ইপিসিএস, ফরিদপুর। (১৩) জে এন দাস, ইপিসিএস, নোয়াখালী। (১৪) মোহাম্মদ আশরাফ, ইপিসিএস, পার্বত্য চট্টগ্রাম। (১৫) আবদুল লতীফ ভূইয়া, ইপিসিএস, বগুড়া। (১৬) আমানত উল্লাহ, ইপিসিএস, দিনাজপুর। (১৭) এম আবুল কাশেম, ইপিসিএস, রংপুর।

    ঢাকা জেলায় প্রথমে ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ করা হয়নি। পরবর্তীকালে নাটোরের মহকুমা প্রশাসক কামাল উদ্দীনকে এই জেলার ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ করা হয়। আমাকে ১৯ ডিসেম্বর সিলেটের ডেপুটি কমিশনার পদে যোগ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আদেশ দেওয়া হয়। যে কর্মকর্তা আমাকে আদেশটি দেন, তিনি জানান প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে অবিলম্বে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে গেলাম। প্রধানমন্ত্রী সিলেটের ডেপুটি কমিশনার নিযুক্ত হওয়ায় আমাকে অভিনন্দন জানান। এরপর তিনি বলেন, সিলেটের ডেপুটি কমিশনার হিসেবে তার জন্য আমাকে একটি বিশেষ কাজ করতে হবে। বিশেষ কাজটি কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে আবদুস সামাদ আজাদকে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করতে হবে। আবদুস সামাদ আজাদ তার নিজের লোক। সিলেট যাওয়ার আগে তিনি আমাকে আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

    আমি কিছুক্ষণ পর আবদুস সামাদ আজাদের শয়নকক্ষে উপস্থিত হই। তিনি তখন থিয়েটার রোডের দোতলার একটি কক্ষে থাকতেন। তাঁর কাছে যাওয়ার পর তিনি আমাকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানান এবং বলেন, সিলেট জেলাতে আমার অনেক কাজ করতে হবে। কী কাজ করতে হবে প্রশ্ন করায় তিনি বললেন, ‘দাঁড়ান এখনই বলছি।’ বলে একটি কাগজ নিলেন। সেই কাগজে সিলেট থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নামের তালিকা লিখলেন। এরপর যারা তার সমর্থক, তাঁদের নামের পাশে টিক চিহ্ন দিলেন। যারা তার সমর্থক, নন, তাঁদের নামের পাশে ক্রস মার্ক দিলেন। তিনি বললেন, যারা তার সমর্থক তাদের অনুরোধ রাখতে হবে আর যারা তার সমর্থক নন, তাঁদের অনুরোধ রাখার আগে তাঁর সমর্থকদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর তিনি আরেকটি তালিকা তৈরি করলেন। সেই তালিকায় কিছু রাজনৈতিক নেতার নাম ছিল। তিনি বললেন, এই তালিকায় যাদের নাম আছে, তাঁরা দেওয়ান ফরিদ গাজীর গুন্ডা। এঁদেরকে যত তাড়াতাড়ি পারেন জেলে ঢোকাবেন। অন্যথায় জেলায় শান্তি স্থাপিত হবে না। তিনি আমার সাফল্য কামনা করলেন।

    আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। আমার মনে প্রশ্ন জাগল, যে আশা নিয়ে আবদুস সামাদ আজাদ আমাকে সিলেট নিতে চাচ্ছেন, সে আশা পূরণ করা আমার জন্য সঠিক হবে কি না। আমরা যখন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দিই, তখন আমাদের ধারণা দেওয়া হয়েছিল দেশের আইন এবং বিধির ভিত্তিতে আমাদের জেলা প্রশাসন পরিচালনা করতে হবে। এখানে কে সন্তুষ্ট হলো আর কে অসন্তুষ্ট হলো, সেটা বড় কথা নয়; কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানের ব্যবস্থা অচল মনে হলো। আমি যদি সিলেটে গিয়ে আবদুস সামাদ আজাদের নির্দেশমতো কাজ না করি, তাহলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করবেন এবং প্রধানমন্ত্রী আমাকে সিলেট থেকে বদলি করে দেবেন। আর যদি আবদুস সামাদ আজাদের হাতের পুতুল হিসেবে আমি কাজ করি, তাহলে আমার ডেপুটি কমিশনার হওয়ার কোনো অর্থ হয় না। যতই এ সম্পর্কে ভাবতে থাকি, ততই আমি উত্তেজিত হতে থাকি। যাঁদের কাছ থেকে এ বিষয়ে পরামর্শ নিতাম, তারা তখন কলকাতায় নেই। ওয়ালিউল ইসলাম যশোরে ডেপুটি কমিশনার পদে যোগ দিয়েছেন। কামাল। সিদ্দিকী খুলনায় ডেপুটি কমিশনার পদে যোগ দেওয়ার জন্য চলে গেছেন। কাজী রকিবউদ্দিন কুমিল্লায় ডেপুটি কমিশনার হিসেবে কাজ করছেন। এঁদের কারও সঙ্গেই পরামর্শ করার কোনো উপায় ছিল না।

    এদিকে আমাকে সিলেট যাওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছিল। আমি সম্ভবত ২১ বা ২২ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডাক বহনকারী বিমানে করে কলকাতা থেকে রওনা হই। বিমানটি প্রথমে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি যায়। সেখান থেকে অরুণাচল প্রদেশের একটি বিমানবন্দরে নামি। তারপর মিজোরামে একটি বিমানবন্দরে নামি। মিজোরাম থেকে শিলচর যাই। শিলচরে যখন পৌঁছি, তখন প্রায় বিকেল চারটা। আমাদের বিমানবন্দরে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে আলোচনা করে জানি, সিলেট যেতে হলে শিলচর থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তা করতে হবে। অন্যথায় আমি আগরতলায় যেতে পারি। সেখান থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি সিলেট যেতে পারি।

    আমি আগরতলা চলে গেলাম। সেখানে রকিব যে বাসা ভাড়া করেছিল, সে বাসায় গিয়ে উঠলাম। তারপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায় আগরতলা থেকে সিলেটে যাওয়ার রাস্তা তখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। তাই আমাকে শিলচর ফিরে যেতে হবে অথবা আমি আগরতলা থেকে ঢাকায় যেতে পারি। ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমি আগরতলা থেকে ঢাকা গেলাম। ঢাকায় গিয়ে প্রথমে আনুদার বাসায় যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি যে আমার ছোট ভাই জসিম তখন। ঢাকায় ফিরে এসেছে। কাছেই ধানমন্ডিতে জসিমের বাসা। আমি জসিমের সঙ্গে চলে গেলাম। আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নিলাম। কেউ প্রাণে মরেনি কিন্তু নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাবা-মা তখনো নবীনগরে ফিরে যাননি, কণিকাড়ায় আমার মামাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অনেক বন্ধুবান্ধব এবং শুভানুধ্যায়ী মারা গেছেন। এসব দুঃখের কাহিনি শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই। আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় সিলেট যাওয়ার ইচ্ছা আমার অনেক কমে যায়। আমি সচিবালয়ে যাই। আমাকে। তৎক্ষণাৎ সিলেট যেতে বলা হয়। কিন্তু সিলেট যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা হয় না। আমি শেষ পর্যন্ত সিলেট যাইনি।

    সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলা

    সচিবালয়ে তখন বিশৃঙ্খলা চলছে। নুরুল কাদের খান তখন সংস্থাপনসচিব। সংস্থাপনসচিব হিসেবে তিনি তার পছন্দমতো লোকদের ইচ্ছেমতো পদোন্নতি দিচ্ছেন। তাঁর বড় ভাই একজন সার্কেল অফিসার (রাজস্ব বিভাগ) ছিলেন। পাকিস্তান শাসনামলে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজ করেছেন। হঠাৎ তাকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করে সার্কেল অফিসার রেভিনিউ থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর আগে এ ধরনের পদোন্নতি কাউকে দেওয়া হয়নি। ঢাকা শহরে ডেপুটি কমিশনার পদে নিয়োগ করা হয় নাটোরের মহকুমা প্রশাসক কামাল উদ্দিন আহমদকে। ঢাকায় তখন পাকিস্তানিদের অনেক বড় বড় বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এ বাড়িগুলো দখল করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ অভিযানে সহায়তা করেন ঢাকার ডেপুটি কমিশনার। ১৬ ডিসেম্বরের পর যারা মুক্তিবাহিনীর আদৌ সদস্য ছিলেন না, তাঁরা নিজেদের মুক্তিবাহিনীর সদস্য বলে দাবি করেন। এই ধরনের নকল মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিভিশন’ নামে পরিচিত হন। অনেক পরিত্যক্ত বাড়ি ঢাকার ডেপুটি কমিশনারের সহযোগিতায় সামরিক এবং বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা দখল করে নেন। সাধারণ মানুষের বাড়িঘর লুট করা হয়। আমার ছোট ভাই জসিম। ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে চাকরি করত। তার বাসায় একজন উর্দু ভাষাভাষী অফিসার থাকত। এই উর্দু ভাষাভাষী অফিসারকে ধরার নাম করে যখন তাদের কেউ বাসায় ছিল না, তখন বাসায় হামলা করে জসিমের বিদেশি টেলিভিশন ও টেপ রেকর্ডার লুট করে নিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারদের সুস্পষ্ট আশ্বাস সত্ত্বেও এগুলো পুনরুদ্ধার করার কোনো ব্যবস্থাই করা যায়নি। এ ধরনের লুটপাটের পরিস্থিতিতে আমার সিলেটের ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করার ইচ্ছা একেবারেই উবে যায়।

    আমি বঙ্গভবনে হোসেন তৌফিক ইমামের সঙ্গে কাজ করতে থাকি। ইতিমধ্যে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ডেপুটি কমিশনার সৈয়দ আহমদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হন। এর ফলে সিলেটে নতুন ডেপুটি কমিশনার নিয়োগের অত্যাবশ্যকীয়তা থাকে না। আমি সাত দিনের ছুটির জন্য একটি দরখাস্ত দিয়ে বাড়ি চলে যাই। আমরা ঢাকা থেকে ছোট ভাই জসিমের গাড়িতে করে কুমিল্লা হয়ে কোম্পানীগঞ্জ যাই। কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর রাস্তার যুদ্ধে বিশেষ ক্ষতি হয়নি। তবে রাস্তা ছিল অত্যন্ত খারাপ। তবু এই রাস্তা দিয়ে আমরা নবীনগর পর্যন্ত যাই। নবীনগরে গিয়ে দেখতে পাই বাবা-মা ফিরে এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে কয়েক দিন কাটিয়ে আমি আবার ঢাকায় ফিরে আসি।

  • পঞ্চদশ অধ্যায়

    পঞ্চদশ অধ্যায়

    পঞ্চদশ অধ্যায়
    উপসংহার

    আমার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে একটি সাদাসিধা বালকের বড় হওয়ার কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। বালকটির জন্ম হয়েছিল নবীনগর থানার জলাভূমিতে। বাইরের জগতের সঙ্গে এ ভূমির যোগাযোগ ছিল ক্ষীণ। কয়েকটি লঞ্চ সার্ভিস এই থানা সদরকে যুক্ত করেছিল দেশের রাজধানী এবং মহকুমা শহরের সঙ্গে। এ অঞ্চলে ফসল হতো প্রচুর, জলাশয়গুলো ছিল মাছে ভরা। তবু সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে দরিদ্রদের আর্থিক পরিস্থিতি ছিল দুঃখভারাক্রান্ত। দারিদ্র্য সত্ত্বেও এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবন ছিল সমৃদ্ধ। বিশ্ববিখ্যাত সুরকার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং তাঁর পূর্বপুরুষ ও উত্তর পুরুষদের বাসস্থান ছিল নবীনগর থানার শিবপুর গ্রামে। এই থানারই সাতমোড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন মলয়সংগীত রচয়িতা মনমোহন দত্ত। এই থানাতেই ৭০ শতাংশ লোক ছিল মুসলমান এবং তাদের ধর্মগুরুরা ছিলেন ধর্মান্ধ। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর প্রধান গোলাম আযমের পূর্ব পুরুষসহ এখানে ছিল মৌলবাদী আলেমদের আড্ডা। এখানে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের শোষণ করতেন হিন্দু জমিদারেরা। এখানে শোষণ ছিল, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছিল প্রচুর, আশপাশের থানাগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও অনেক হয়েছে। তবে নবীনগর থানায় গত ১০০ বছরে কোনো উল্লেখযোগ্য দাঙ্গা হয়নি। বরং মৌলবাদীদের সঙ্গে সঙ্গে এখানে সমন্বয়বাদী মুসলিম ধর্মপ্রচারকেরাও ঠাঁই পেয়েছেন। তারা মনের আনন্দে দোতারা বাজিয়ে কোরআন শরিফের সুরা স্রষ্টার উদ্দেশে নিবেদন করেছেন।

    ছেলেটি বই পড়তে ভালোবাসত। দৌড়ঝাঁপ বা খেলাধুলা তার পছন্দ ছিল না। বালকটি ছিল কল্পনাবিলাসী এবং অন্তর্মুখী। বালকটি বই পছন্দ করত কিন্তু ভালো বই পাওয়া ছিল তার জন্য অত্যন্ত কঠিন। একমাত্র পাঠাগার ছিল নবীনগর হাইস্কুলে। পাঠাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত শিক্ষক তাকে বেশি বই পড়তে দিতে চাইতেন না। শিক্ষকদের ধারণা ছিল পাঠ্যবই পড়াই যথেষ্ট। পাঠ্যের বাইরের বই (যাকে আউট বই বলা হতো) পড়ে খুব লাভ হয় না। বই পড়ার জন্য বালকটি বই বিক্রেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে। বইয়ের দোকানে বসে যেসব ‘আউট বই’ পাওয়া যেত, সেগুলো সে পড়েছে; কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। যেখানে যা কিছু লিখিত পাওয়া যেত, সবই সে পড়ার চেষ্টা করেছে। এমনকি মুদিদোকান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষার পুরোনো খাতা সের দরে কিনে এনে পড়েছে। পয়সার অভাবে বাইরের বই কেনা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সামান্য টাকা নিয়ে সে বাড়ি থেকে ১০ মাইল দূরে শ্রীঘর বাজারে পুরোনো বই কিনতে গিয়েছিল। শ্রীঘর বাজার ছিল ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গরু-ছাগল, হাঁস-মোরগের বাজার। সেই বাজারের একটি বড় অংশে পুরোনো বই বিক্রি হতো। এই বাজার থেকে বই কিনে এনে সে পড়েছে। তার জন্য ভালো বইয়ের অভাব অনেক কমে যায়, যখন সে ঢাকায় কলেজে পড়তে যায়। ঢাকা কলেজ লাইব্রেরি, কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি, ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে পরিচালিত পাঠাগার, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির মতো পাঠাগারে যখন খুশি সে যেতে পারত। বৃত্তির টাকা দিয়ে সিনেমা পত্রিকা থেকে শুরু করে দর্শনশাস্ত্রের দুরূহ বইও নিজের পয়সায় কিনে পড়ার চেষ্টা করত। বালকটির এই পড়ার অভ্যাস কখনো কমেনি। যখন যেখানেই সে কাজ করুক না কেন, সময় পেলেই সে বই পড়ত। স্বল্পমূল্যে অনেক পুরোনো বিদেশি বই কিনেছে, আবার চড়া দামে অনেক নতুন বইও কিনেছে।

    আমি মূলত ‘bookworm’ বা গ্রন্থকীট। আমি স্বজ্ঞানে লেখক হতে চাইনি, পাঠকই থাকতে চেয়েছি। লেখক হতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়। পাঠকের কাজ অনেক সহজ। তাই আমি বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে পড়াশোনা করেছি, কিন্তু কোনো বই লিখিনি। যখন আমি বই লেখা শুরু করি, তখন আমার বয়স ৫০ অতিক্রম করেছে। দুটি কারণে আমি পাঠক থেকে লেখক হই।

    পড়তে পড়তে আমি দেখতে পাই যে বিভিন্ন প্রশ্নে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। অনেক প্রশ্নের কোনো জবাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমি সেসব প্রশ্ন সম্পর্কে চিন্তা করা শুরু করি। চিন্তা করতে করতে আমি অনেক ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছি। আমার মনে হয় যে অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে আমারও কিছু বক্তব্য দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু বিষয়গুলো ছকবাঁধা গৎ-এর মধ্যে পড়ে না। অবশ্যই ইতিহাস সম্বন্ধে মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে; অবশ্যই অর্থনীতি সম্বন্ধে প্রশ্ন জেগেছে; প্রশ্ন জেগেছে লোকপ্রশাসন সম্পর্কে প্রশ্ন জেগেছে সুশাসন সম্পর্কে প্রশ্ন জেগেছে দেশের রাজনীতি সম্পর্কে প্রশ্ন জেগেছে সাহিত্য সম্পর্কে; আবার প্রশ্ন জেগেছে দেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কে। যেকোনো বিষয়ে যখনই মনে হয়েছে আমার নিজস্ব কিছু বক্তব্য আছে, সেখানেই আমি কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। আমার নিজস্ব কোনো বক্তব্য না থাকলে আমি অন্যের বক্তব্য প্রচার করার জন্য কোনো বই লিখিনি।

    বই লেখার আমার দ্বিতীয় কারণ হলো অনেক বই পড়তে আমার ভালো লাগত। আমার এই ভালো লাগাটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করত। বিশেষ করে যখন দ্বিতীয় দফায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়তে গেলাম, তখন অর্থনীতির অনেক তত্ত্ব আমাকে আলোড়িত করে। অর্থনৈতিক তত্ত্বের সৌন্দর্য রয়েছে। আমার ইচ্ছা করে এই সৌন্দর্য সবার সঙ্গে উপভোগ করি। বিশেষ করে যেসব অর্থনীতিবিদ অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের ধারণা সাধারণ পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিই। তবে বই পণ্ডিতদের জন্য লিখি অথবা সাধারণ পাঠকদের জন্য লিখি না কেন; সর্বত্রই বই লেখার পেছনে আমার অনেক বছরের চিন্তা ও ভাবনা রয়েছে।

    তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে পদত্যাগ করার পর আমাকে কয়েক হাজার সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমের কাছে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া দৈনিক পত্রিকা এবং সাময়িকীতে কলাম লিখতে হয়েছে। বেশ কয়েকজন প্রকাশক এসব সাক্ষাৎকার এবং কলাম থেকে লেখা নির্বাচন করে বই প্রকাশের জন্য আমাকে অনুরোধ করেছেন। আমি এ ধরনের প্রস্তাবে কখনো রাজি হইনি। সাক্ষাঙ্কার এবং কলামে আমি যা বলেছি, সেগুলো শুধু তঙ্কালীন পরিবেশে প্রযোজ্য। কিন্তু আমি আমার বইয়ে যা লিখেছি, তা আমার বিশ্বাস অনুসারে সর্বকালেই সত্য।

    আমি কোনো গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক–এ ধরনের বই প্রকাশ করিনি। আমি শুধু প্রবন্ধের বই লিখেছি। প্রবন্ধের বইও যে পাঠক এত আগ্রহের সঙ্গে পড়েন, সেটা আমার জানা ছিল না। আমার শুধু একটি দোষ ছিল, আমি কিশোর বয়সে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা গোগ্রাসে গিলেছি। এর প্রভাবে আমার অনেক গবেষণাগ্রন্থও লেখা হয়েছে রম্যরচনার ঢঙে। এই ঢঙটি আমার লেখাকে সাধারণ পাঠকের কাছে নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত আমার একটি বইয়েরও শুধু প্রথম মুদ্রণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সবচেয়ে কম যে বইটি বিক্রি হয়েছে, তারও দুটি মুদ্রণ বেরিয়েছে। আমার লেখায় পাঠকদের এ আগ্রহের ফলেই আমি এখনো লিখে যাচ্ছি।

    পণ্ডিতদের জন্যই লিখি বা সাধারণ পাঠকদের জন্য লিখি না কেন, সব বইয়ের পেছনে রয়েছে অনেক বছরের চিন্তা ও ভাবনা। বনলতাকে নিয়ে দুটি বই লিখেছি। বনলতাকে নিয়ে চিন্তা শুরু করি ১৯৬৮ সালে। এ সম্পর্কে প্রথম বই (অন্ধকারের উৎস হতে) প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। এরপর চাবিকাঠির খোঁজে প্রকাশিত হয় ৪৬ বছর পর ২০১৪ সালে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা শুরু করি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে। ভাবনা ও দুর্ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রকাশিত হয় ৫৮ বছর পর–২০১৯ সালে। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা শুরু করি ১৯৮০ সালে। ডিসকভারি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে–প্রায় ১৬ বছর পর। বাংলাদেশের প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি ১৯৬৮ সালে। এ সম্পর্কে বই প্রকাশিত হয় ৪৭ বছরের গবেষণা শেষে ২০১৪ সালে।

    ১৯৯৬ সালে আমি বাংলাদেশের অর্থসচিব নিযুক্ত হই। বাংলাদেশের বাজেট সম্পর্কে আমার বই প্রকাশিত হয় ১৫ বছর পর ২০১১ সালে। বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য সম্পর্কে গবেষণা শুরু করি ১৯৮০ সালে। ২৯ বছরের গবেষণার পর এ সম্পর্কে বই প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। Friendly Fires, Humpty Dumpty Disorder12 সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করি ১৯৬৮ সালে। ৪২ বছরের গবেষণার পর ২০১০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। পরার্থপরতার অর্থনীতির প্রশ্নগুলো নিয়ে ১৯৭৯ সাল থেকে চিন্তা শুরু করি। ৩১ বছরের গবেষণার পর বইটি প্রকাশিত ২০০০ সালে। ২০০৩ সালে। বিশ্বব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর সুশাসন সম্পর্কে গবেষণা শুরু করি। ১৪ বছরের গবেষণার পর ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় অবাক বাংলাদেশ। লেবিট ও ডুবনার আজব ও জবর আজব অর্থনীতিনিয়ে প্রথম বই প্রকাশ করে ২০০৫ সালে। এ বিষয়ে আমার বই প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। অল্প কিছু বিষয়ে প্রতিবেদন লেখা হয়েছে তিন-চার বছরের গবেষণায়। অন্যত্র আমার সব বই ই দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে রচিত।

    বই থেকে আমি যেমন শিখেছি, আমার নিজের জীবন থেকেও আমি শেখার চেষ্টা করেছি। সরকারের কাজ করতে গিয়ে উন্নয়ন তত্ত্বের অনেক দুর্বলতা আমার চোখে পড়ে। আমি দেখতে পাই, সরকার কীভাবে জনগণের উপকার করতে গিয়ে জনগণের অপকার করে। আমি আরও দেখতে পাই, বিদেশি দাতাগোষ্ঠী এবং কায়েমি স্বার্থবাদীরা যেখানে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রয়োজন, সেখানে সংস্কার করার চেষ্টা করে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কার করলে চলবে না, বৈপ্লবিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের সরকারের কর্মকাণ্ডে আমি গ্রেসাম বিধির ব্যামো লক্ষ করি। গ্রেসাম বিধি হলো Bad money drives out good money.’ তেমনি বাংলাদেশ প্রশাসনে দুষ্টের পালন হচ্ছে আর শিষ্টের লালন হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমি দুটি বই লিখি। বই দুটির নাম হলো : Friendly Fires, Humpty Dumpty Disorder, and Other Essays;  Gresham’s Law Syndrome and Beyond13.

    পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একসময় আমি কাজ করেছি। বন্যা এবং সুপেয় পানির সরবরাহ সম্পর্কে আমি দুটি প্রবন্ধ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য লিখেছি এবং এ দুটি লেখা সংক্ষিপ্ত আকারে ন্যাচারাল রিসোর্সের্স ফোরাম নামে একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।14 কিছুদিন আগে প্রথম আলোতে আমি প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে একটি লেখা লিখেছিলাম, যেটি সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। প্রায় ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশের পানির সমস্যা সম্পর্কে যেসব চিন্তাভাবনা করেছি, তা নিয়ে এখন একটি নতুন বই লেখার কথা চিন্তা করছি।15 তেমনি ইতিহাস সম্পর্কে আমি যা লিখেছি, তার সমর্থনে গত ৫০ বছর ধরে অনেক নতুন তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। মনে সাধ আছে বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে আরেকটি বই লিখব। তবে শেষ পর্যন্ত এই বইগুলো লেখার কাজ সমাপ্ত করতে পারব কি না, সে। বিষয়ে আমি এখনো নিশ্চিত নই।

    আমার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে আমার জীবনের প্রথম ২৯ বছরের ঘটনাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। তবে ১৯৪৪ সালে আমার জন্ম থেকে এ বইয়ের মূল ঘটনা শুরু হলেও এ বইয়ে আনুমানিক ২০০ বছরের পারিবারিক ইতিহাসও বিবৃত হয়েছে। এই ইতিহাস বাংলাদেশের বেশির ভাগ উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মুসলমানের পারিবারিক ইতিহাস থেকে ভিন্ন। বামুন খাঁ নামে একজন ব্রাহ্মণ হিন্দু এই বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। সুদের ব্যবসা করে এরা বড়লোক হয়, তালুকদার হয় এবং গ্রামের অধিকাংশ জমির মালিক হয়। তবু এই পরিবার গ্রামের লোকদের শুধু শোষণই করেনি, গ্রামে হাইস্কুল স্থাপন করেছে, গ্রামে তিনটি খেলার মাঠ করে দিয়েছে, গ্রামে বাজার স্থাপন করেছে, স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারা গ্রামের মানুষের সুখ দুঃখের ভাগীদার হয়েছে। ২০০ বছর পর বামুন খাঁর পরিবার এখন আর। গ্রামে আবদ্ধ নয়। প্রায় ১৩০ বছর ধরে এরা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বংশের শতকরা ৫ ভাগ সদস্যও এখন রসুল্লাবাদ গ্রামে নেই।

    প্রথম ২৯ বছর বয়সে আমার জীবনে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ঘটনা হলো বিএ অনার্স ও এমএ পরীক্ষায় খুব উঁচু নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাইনি। আমার আগে পাঁচ বছর ধরে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন, তাঁদের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের কাজ করেছেন এবং পরবর্তীকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দিয়েছেন। আমার ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয়নি। তার কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি এবং বিভাগীয় রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ওসমান গণি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক করতে রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে ইতিহাস বিভাগে ড. আবদুল করিম তাঁর প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য তার ছাত্রকে আমার চেয়ে অনেক কম নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক করে নিজের প্রতিপত্তি জাহির করতে চান। যখন সিএসএস পরীক্ষার ফরম দাখিল করেছি বলে আমাকে ইন্টারভিউতে কোনো প্রশ্ন না করে ইন্টারভিউ বোর্ড আমাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর খুব রাগ হয়েছিল। অবশ্য এখন আর সেই রাগ নেই। পরে জেনেছি এ ধরনের ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ঘটেছে। কামরুদ্দীন আহমদ জানাচ্ছেন, ১৯৩৫-৩৬ সালের দিকে মহিউদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ইতিহাস বিভাগের সুপারিশে তাকে বিভাগের একজন প্রভাষক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু তার চাকরি সাত দিনও টেকেনি। তার কারণ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংসদীয় আসনে তখন নির্বাচিত হয়েছেন ফজলুর রহমান। মহিউদ্দিন আহমদ খান সাহেব আবদুল খালেকের শ্যালক। খালেক সাহেব ফজলুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ফজলুর রহমান সাত দিনের মধ্যে মহিউদ্দিন আহমদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকের পদ থেকে তাড়িয়ে দেন। সাময়িকভাবে অসুবিধা হলেও মহিউদ্দিন আহমদ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে নিযুক্ত হন।16 হাবিবুর রহমান শেলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পর তাঁকে ইতিহাস বিভাগে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি যেহেতু বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সে জন্য এক মাস পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। প্রতিবাদ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে পান-বিড়ির দোকান দেন। অবসরপ্রাপ্ত সচিব সুলতান-উজ জামান খান জানাচ্ছেন যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলেন। তখন ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান (ড. মাযহারুল হক) তাঁকে বলেন, যেহেতু তিনি সিএসএস পরীক্ষা দিয়েছেন, সেহেতু তাঁকে নেওয়া যাবে না। তার বদলে যাকে চাকরি দেওয়া হয়, তিনিও সিএসএস পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু বিভাগীয় প্রধান এবং যিনি চাকরি পেয়েছেন উভয়েই নোয়াখালী জেলার, সেহেতু তাদের ক্ষেত্রে তথাকথিত আইন প্রয়োগ করা হয়নি।17

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণযুগে যখন এ ধরনের অবিচার ঘটেছে, সেহেতু মোনেম খান-ওসমান গণিশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে চাকরি না দেওয়াটা মোটেও কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। তবু দুটি কারণে আমার খুবই মানসিক যন্ত্রণা হয়। প্রথম কারণ হলো আমি ইতিহাস বিভাগের অনেক শিক্ষকের চেয়ে ইতিহাস ভালো জানতাম (হামবড়া মনে হলেও কথাটি একেবারে মিথ্যা নয়)। বক্তৃতা দেওয়া ছিল আমার শখ। কাজেই ইতিহাস পড়তে পড়তে আমি কল্পনা করতাম আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কীভাবে ইতিহাস পড়াব। দুর্ভাগ্যবশত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পাওয়ায় আমার এ স্বপ্ন কোনো দিনই সফল হয়নি।

    দ্বিতীয়ত, চাকরি না পাওয়ায় আমার জীবনে একটি বড় দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আমি একদিকে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা ভাবতাম। অন্যদিকে আমি বিলাসী জীবনযাপন করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমি চেইন স্মোকার হয়ে যাই। সিগারেটের জন্য আমার প্রচুর টাকা লাগত। আমি বিদেশি বই কিনি। তার জন্য আমার টাকা লাগত। আমি ভালো খাবারদাবার পছন্দ করতাম, তার জন্য আমার টাকা লাগত। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পাওয়ায় এসবই আমার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সহৃদয় আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় আমি সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার আগপর্যন্ত টিকে ছিলাম। তখন আমি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, হয় আমার বামপন্থী রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া উচিত, নয় আমার বিলাসবহুল জীবন প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নেমে আসা উচিত। আমি শ্রেণিচ্যুত হতে রাজি হইনি, আবার বাম রাজনীতির প্রতি আনুগত্যও ছুঁড়ে ফেলতে পারিনি। এই দ্বন্দ্ব আমাকে সারা জীবন ভুগিয়েছে।

    এই সময়ে আমার জীবনের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ। আমি ছিলাম পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য। সিএসপি ছিল পাকিস্তানের স্টিল ফ্রেম। সিএসপিরাই এক হাজার মাইলের ব্যবধানে। অবস্থিত দুটি অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণকে এক রাষ্ট্রে ধরে রেখেছিল। তবু আমি এই স্টিল ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যেতে দ্বিধাবোধ করিনি। তার কারণ হলো মানুষের তৈরি আইনের ওপরেও আইন রয়েছে। সেটি হলো খোদার আইন বা প্রকৃতির আইন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে নৃশংসতার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের দখল প্রলম্বিত করেছিল, তা পৃথিবীর যেকোনো আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের আইনবহির্ভূত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার কোনো দায়িত্ব আমার ছিল বলে আমি মনে করি না।

    ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি রাতে যখন ঘুমাতে যেতাম, তখন প্রায়ই মনে প্রশ্ন জাগত বিদ্রোহ করে আমি ঠিক কাজ করেছি তো? সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতর থেকে উত্তর পেতাম যে আমি সঠিক কাজ করেছি। এ প্রসঙ্গে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের কথা আমার মনে পড়ত। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে যখন বামপন্থীরা ফ্যাসিস্ট সরকার উৎখাতের জন্য লড়াই শুরু করে, তখন শুধু স্পেনের লোকজনই এতে যোগ দেননি, এ সংগ্রামে বিদেশ থেকে অনেক স্বেচ্ছাসেবী এসে মরণপণ সংগ্রাম করেছেন। বিলাতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ক্রিস্টোফার কডওয়েল (Christopher Caudwell) তাঁর সহকর্মীদের বাঁচাতে গিয়ে ফ্যাসিস্টদের গুলিতে নিহত হন। বামপন্থীদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী ব্রিগেড গড়ে ওঠে। এই ব্রিগেডে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও রাশিয়া থেকে স্বেচ্ছাসেবকেরা দলে দলে যোগ দেন। যদি বাইরের দেশের লোকেরা স্পেনকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করতে পারে, তাহলে আমার নিজের দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য যদি আমি আমার দায়িত্ব পালন না করি, তাহলে আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুখ দেখাব। কীভাবে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর প্রতিদিনই আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সব প্রজন্মের মানুষ এ ধরনের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায় না। আমি পেয়েছি, অংশ নিয়েছি এবং আমি নিজে ধন্য হয়েছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বসে মনে করতাম যে এ ধ্বংসাবশেষ সাময়িক কিন্তু দেশের স্বাধীনতা চিরন্তন। স্বাধীন দেশে অবশ্যই আমরা সমৃদ্ধির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাব।

    ১৯৭৩ সালে আমি যখন কানাডিয়ান কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে কানাডায় যাই, তখন আমার চাকরির মাত্র ছয় বছর পূর্ণ হয়েছে। ছয় বছরের চাকরিজীবন অতি স্বল্প সময়ের। সব আমলাই চাকরিতে সফল হতে চান। অনেকে সফল হন, অনেকে হন না। এর কারণ কী? আমলাতন্ত্রে শুধু কঠোর পরিশ্রম, কাজে নিষ্ঠা, সহকর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য সদিচ্ছা থাকলেই হয় না; সরকারি চাকরিতে ভাগ্যের বা নিয়তির ভূমিকা রয়েছে। যাদের কপাল ভালো, তারা অনেক সময় ফাঁকি দিয়ে সফল হতে পারেন, আর যাদের কপাল খারাপ, তারা শত চেষ্টা করেও সফল হতে পারেন না।

    আমি এসডিও থাকাকালীন দুটি ঘটনা ঘটেছিল, যার যেকোনো একটিতে আমি অসফল প্রমাণিত হতে পারতাম। প্রথম ঘটনাটি হলো হবিগঞ্জে আনসার ক্যাম্পের রাইফেল স্কুলছাত্রদের দ্বারা লুট হওয়া। সেদিন আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। আমার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি সত্ত্বেও রাইফেল লুট হওয়ার জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আমার মনে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, যদি আমি থাকতাম এবং এ ঘটনা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারতাম, তাহলে নিশ্চয়ই আমি অসফল কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত হতাম।

    তেমনি আরেকটি ঘটনা ঘটে, যেখানে জলবসন্তের টিকা দেওয়ার জন্য একজন পীর সাহেব ও তাঁর খলিফাঁদের গ্রেপ্তার করে টিকা নিতে বাধ্য করেছিলাম। কাজটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে করা হয়েছিল। যদি গোপনীয়তা ফাস হয়ে যেত, তাহলে হয়তো আমি অসফল কর্মকর্তা প্রমাণিত হয়ে যেতাম। প্রত্যেক প্রশাসকের জীবনেই এ ধরনের মুহূর্ত আসে। কেউ কেউ অধিকাংশ সমস্যায় উতরে যান, আবার কেউ কেউ পারেন না। এতে এঁদের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। প্রত্যেক প্রশাসককেই যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।

    জীবনযাপন করাই যথেষ্ট নয়, জীবন থেকে শেখার প্রয়োজন রয়েছে। জীবন নিয়ে বীক্ষণ করতে হবে। চিন্তা করলে দেখতে পাব আমরা কেউই সম্পূর্ণ সৎ নই। প্রত্যেকের মধ্যেই কমবেশি মুনাফেকি রয়েছে। পরিবেশবিষয়ক সংগ্রামী নেতা Paul Watson লিখেছেন, ‘Everybody is a hypocrite. You cannot live on this planet without being a hypocrite.’ পৃথিবীতে শতভাগ লোক মুনাফেক নয়, আবার শতভাগ লোক সৎ-ও নয়। সততা ও মুনাফেকির আলপনায় চলছে মানুষের জীবন।

    টীকাপুঞ্জ (Glossary)

    • আইএএস Indian Administrative Service
    • আইসিএস Indian Civil Service
    • আইসিডিসিআরবি International Centre For Diarrhoeal Disease Research, Bangladesh
    • ইপিআর East Pakistan Rifles
    • ইপিসিএস East Pakistan Civil Service
    • এজিজি Agent to Governor General
    • এডিসি Additional Deputy Commissioner
    • এপিএ Assistant Political Agent
    • এলএও Land Acquisition Officer
    • এএমএফ Licentiate Medical Fellow
    • এলএলএম Master of Laws
    • ওসি Officer In charge of Police Station (Popularly known as Bara Darogha)
    • কে ফোর্স Khaled Mosharaf Force
    • ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড Criminal Procedure Code
    • জেড ফোর্স Ziaur Rahman Force
    • টিএবিসি Typhoid, Amoebic, Bacillery and Cholera
    • ডিসি Deputy Commissioner
    • পিএফএস Pakistan Foreign Service (Pakistan)
    • পেনাল কোড Penal Code
    • পিএ Political Agent
    • বিসিএল Bachelor of Civil Laws
    • বিসিএস Bangladesh Civil Service
    • বিএলএফ Bangladesh Liberation Forces
    • সিও Circle Officer
    • সিপিসি Civil Procedure Code
    • এসডিও Sub-divisional Officer
    • এসডিপিও Sub- divisional Police Officer

  • আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আকবর আলি খান রচিত আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি গ্রন্থটি লেখকের অর্থনৈতিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর নিবিড় গবেষণার নির্যাস। প্রবন্ধ গুলোর বিষয়বস্তু কৌতুহল উদ্দীপক যা পাঠকে আগ্রহী করবে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে পৌষ ১৪১৯ (জানুয়ারি ২০১৩); প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন, ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫, বাংলাদেশ; প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন প্রতিথযশা শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী, তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন অশোক কর্মকার। এই গ্রন্থে রয়েছে ১০টি প্রবন্ধ; প্রতিটিতে লেখক ভিন্ন বিষয় আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধগুলি অর্থনীতি, সুশাসন আর সমাজ সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করে যায় নিরন্তর। উন্মোচিত করে চিন্তার এক নতুন দিগন্ত। গভীর বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ প্রবন্ধগুলিতে যেমন লেখক নিজস্ব বিশ্লেষণ ছাড়াও বিভিন্ন পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ গুলোকে বিন্যস্ত করেছেন নিপূণভাবে।

    হতাশাগ্রস্থ বিজ্ঞান নামে অভিহিত অর্থনীতি ছিল একদিন সমাজবিজ্ঞানের দুয়োরানি। অথচ অর্থনীতিই আজকের সমাজবিজ্ঞানের সম্রাজ্ঞী। এর আওতা শুধু চাহিদা-জোগান বা রুটি-রোজগারেরর মতো আটপৌরে সমস্যায় সীমিত নয়। অর্থনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইনশাস্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইতিহাস, সংগঠন ও সিদ্ধান্ত তত্ত্বে এবং সমাজতত্ত্বের সব শাখায়। জন্ম, বিবাহ, ধর্ম, এমনকি ভাষা নিয়ে গবেষণায়ও প্রয়োগ করা হচ্ছে অর্থনীতির সূত্র। দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির বিকাশমান মাত্রা ও নতুন ধারাসমূহের বৈভন এখনো বাংলা ভাষায় প্রতিফলিত হয়নি। বাংলায় অর্থনীতি এখনো মান্ধাতা আমলের পাঠ্যবিষয় ও বাম-ডানির তরজায় সীমাবদ্ধ। গতানুগতিক গণ্ডির বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে এ বই।

    প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তু বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক। একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ‘ভেগোলজি ও অর্থনীতি।’ দুটি প্রবন্ধে অর্থনীতিতে অনভিপ্রেত পরিণাম ও মিত্রপক্ষের গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। দুটি প্রবন্ধের উপজীব্য বিশ্বায়ন। সুখ ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে পর্যালোচনা দেখা যাবে একটি নিবন্ধে। তথ্য অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ‘সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি’তে। একটি প্রবন্ধে জন্মদিনের অর্থনীতি ও আরেকটি প্রবন্ধে সরকারের অপচয় নিয়ে বিশ্লেষণ রয়েছে। নির্ভেজার গবেষণামূলক এই বই লেখা হয়েছে সহজ ভাষায়, বৈঠকি মেজাজে।

    বইটির অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখক নিজে কোন সিদ্ধান্ত দেন নি বরং নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে গেছেন যেটা সবচেয়ে মুগ্ধ করবে পাঠককে। পরস্পর বিরোধী তত্ত্বগুলিকে বিশ্লেষণ করে গেছেন এমনভাবে যে, যে কোন একটা পড়লে মনে হয় এটাই ঠিক। এইখানেই লেখকের স্বার্থকতা। তিনি পেরেছেন, নিরপেক্ষ থাকতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারটা পাঠককেই দিয়েছেন। একটা একটা প্রবন্ধ শেষে পাঠক উদ্দীপ্ত হয় সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আরও জ্ঞানার্জন করতে।

    আজব ও জবর আজব অর্থনীতি বইটি অর্থনীতির একাডেমিক কোনো বই নয়। বইটি গতানুগতিক গণ্ডীর বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে। অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা কম যেমন— সামষ্টিক অর্থনীতি, বিভিন্ন বিষয়ের উপর অর্থনীতির প্রভাব এগুলো সহজভাবে জানার জন্য বইটি মন্দ নয়।

    উৎসর্গ

    আমার পরম স্নেহের ছোট ভাই

    জি এম জিয়াউদ্দিন খান

    কবীর উদ্দিন খান

    এবং

    তাঁদের সহধর্মিণী

    মাকসুদা খান

    আনোয়ারা খান

  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    ভূমিকা

    বিংশ শতাব্দী অর্থনীতির দিগ্বিজয়ের যুগ। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও অর্থনীতি ছিল সমাজবিজ্ঞানের দুয়োরানি। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উনবিংশ শতাব্দীর বুদ্ধিজীবী কার্লাইল অর্থনীতির নাম দিয়েছিলেন dismal science বা হতাশাগ্রস্ত বিজ্ঞান। রিকার্ডো ও ম্যালথুসের ভুবনে অর্থনীতির লৌহকঠিন নিগড়ে শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রায় অগ্রগতির স্বপ্ন ছিল একটি আলেয়া। এমনকি উৎপাদনশীলতার নাটকীয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা উপলব্ধি সত্ত্বেও কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদীব্যবস্থার ধ্বংসের দুঃস্বপ্নে ছিলেন বিভোর। বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদেরাই প্রথম মানুষের অপরিসীম অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরেন এবং ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির প্রহেলিকাসমূহের সমাধানের উদ্যোগ নেন। বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে মাথাপিছু আয়ের অব্যাহত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞানে সম্রাজ্ঞীর আসনে অধিষ্ঠিত হলো। অর্থনীতি শুধু রুটি-রোজগারের ও চাহিদা-জোগানের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকল না। অর্থনৈতিক পদ্ধতি সব ধরনের সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে ছড়িয়ে পড়ল। এতেই শুরু হলো অর্থনীতির দিগ্বিজয়।

    নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের অবদানের ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করলে এ পরিবর্তনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য নোবেল স্মারক পুরস্কার প্রদান শুরু করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ৪৪ বার এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। একই পুরস্কার একাধিক ব্যক্তিকে দেওয়ার ফলে এখন পর্যন্ত ৭১ জন সমাজবিজ্ঞানী অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে ১২ জন রয়েছেন, যারা অর্থনৈতিক সূত্র অর্থনীতির বাইরে অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানে প্রয়োগ করেছেন অথবা অর্থনীতির সঙ্গে অন্য সমাজবিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এদের মধ্যে চারজন আদৌ অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। হারবার্ট এ সাইমন ছিলেন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, ড্যানিয়েল ক্যায়নেম্যান একজন মনস্তত্ত্ববিদ, রবার্ট আউম্যান হচ্ছেন গণিত বিশারদ ও এলিনর অস্ট্রম ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। রবার্ট ফগেল ও ডগলাস নর্থ ইতিহাসে অর্থনৈতিক তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ করেছেন; সমাজতাত্ত্বিক সমস্যা বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদ গ্যারি এস বেকার অসাধারণ সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন; অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন রবার্ট আউম্যান ও টমাস সি শেলিং; আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রেখেছেন জেমস বুকানন ও রোনাল্ড কোস, অর্থনৈতিক সংগঠন নিয়ে কাজ করেছেন অলিভার উইলিয়ামসন, এলিনর অস্ট্রম ও হারবার্ট সাইমন। মনস্তাত্ত্বিক অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন ভারনন এল স্মিথ ও ড্যানিয়েল ক্যায়নেম্যান। এর বাইরে তথ্য অর্থনীতি বিমা, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন আলোকপাত করেছে। এ বিষয়ে আরও পাঁচজন অর্থনীতিবিদকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে (স্টিগলিজ, আকেরলফ, স্পেন্স, ভিকরি ও মিরলেস)। এখনো নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি, এমন অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পদ্ধতি প্রয়োগের কাজ চলছে। ধর্ম থেকে পরিবেশ, কারিগরি পরিবর্তন থেকে নৃতত্ত্ব–সর্বত্র অর্থনীতির বিজয় পতাকা উড়ছে। ব্যয়-উপকার বিশ্লেষণ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

    দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির এসব অর্জন বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই পৌঁছায়নি। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলায় অনেক প্রবাদপ্রতিম অর্থনীতিবিদ জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে এঁরা (সম্ভবত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মোহে) বাংলা ভাষায় লেখার তাগিদ অনুভব করেননি। দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষায় অর্থনৈতিক পরিভাষার দৈন্য রয়েছে। তৃতীয়ত, জন্মগতভাবে বাঙালিরা বামপন্থী। বাংলায় অর্থনীতি নিয়ে যা প্রকাশিত হয়, তার সিংহভাগই হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে ডান-বামের তরজা আর খিস্তি-খেউর। আজ যাকে মূল ধারার অর্থনীতি বলা হয় সে সম্পর্কে বাংলায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নেহাত অপ্রতুল।

    ১৯৭৩ সালে কানাডার কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু করি। তখন থেকেই নতুন অর্থনৈতিক তত্ত্বসমূহের বাংলায় উপস্থাপনের তাগিদ অনুভব করছিলাম। তবে সময় করে উঠতে পারিনি। যখন কাজটি হাতে নিলাম, তখন শারীরিক বিভিন্ন অসামর্থ্য দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুসারে অর্থনীতির নতুন তথ্যসমূহ উপস্থাপনের জন্য ২৫ থেকে ৩০টি প্রবন্ধ লিখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কাজ কত দিনে বা আদৌ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে কি না জানি না। আংশিক যতটুকু করতে পেরেছি, তা এ বইয়ে উপস্থাপিত হলো। ভবিষ্যতে সময় ও সুযোগ পেলে এ বিষয়ে আরও লেখার ইচ্ছে রয়েছে।

    এ সংকলনে ১০টি প্রবন্ধ রয়েছে। বিষয়বস্তু অনুসারে প্রবন্ধগুলো পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। তিনটি প্রবন্ধের বিষয় হচ্ছে অনভিপ্রেত পরিণামের (unintended consequences) অর্থনীতি। কবিগুরুর ভাষায়, অনভিপ্রেত পরিণামের নির্যাস হচ্ছে, ‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।’ এ ঘটনা অর্থনীতিতে হরহামেশাই ঘটছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আনুষ্ঠানিক গবেষণা করেছেন তরুণ মার্কিন অর্থনীতিবিদ স্টিভেন ডি লেভিট। তিনি স্টিফেন জে ডুবনারের সহযোগিতা নিয়ে Freakonomics ও Superfreakonomics নামে দুটি বই লিখেছেন। গ্রন্থ দুটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে অনভিপ্রেত পরিণামের বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ শীর্ষক নিবন্ধে। একই ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ‘মিত্রপক্ষের গুলি’ নিবন্ধে। লেভিট ও ডুবনার অনভিপ্রেত পরিণামের নজির দেখিয়েছেন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মিত্রপক্ষের গুলির পটভূমি আরও বিস্তৃত। এখানে অনভিপ্রেত পরিণামের উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ যুক্ত হয়েছে। প্রবন্ধটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। প্রবন্ধটিতে অপচয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণের বাস্তব ও দার্শনিক সমস্যাসমূহ এবং অপচয়রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

    বিশ্বায়ন নিয়ে দুটি প্রবন্ধ রয়েছে এ সংকলনে। একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে বিশ্বায়নের ইতিহাস ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্বায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যা এখনো অসম্পূর্ণ। তাই বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়সমূহও তুলে ধরা হয়েছে। একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে বিশ্বায়নের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

    শিল্প বিপ্লবের অনেক আগে থেকেই সমাজবিজ্ঞানীরা মানুষের জীবনে সুখের ভূমিকা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। আদি পর্যায়ে অর্থনীতিবিদেরা মানুষের সুখ পরিমাপের চেষ্টা করলেও নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতির আত্মপ্রকাশের পর অর্থনীতিতে সুখ বিষয়টি নির্বাসিত হয়েছে। অতিসম্প্রতি সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে সুখ সম্পর্কে অনেক বিতর্ক চলছে। এই প্রসঙ্গে সুখ ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাসমূহের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছে।

    গত চার দশকে তথ্য অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘ দিন ধরে লালিত অনেক ধারণাকে নাড়া দিয়েছে। ‘সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি’ শীর্ষক নিবন্ধে তথ্য অর্থনীতির মৌলিক অবদানসমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে।

    সমাজবিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত সত্যের সন্ধান করছেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সত্য আর মিথ্যার ফারাক করা অত্যন্ত শক্ত। ‘ভেগোলজি ও অর্থনীতি : না সত্য মিথ্যা’ শীর্ষক নিবন্ধে অর্থনীতির পদ্ধতিগত দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। জন্মদিনের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে এ সংকলনে। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে বিভিন্ন মিথ্যা প্রচারণার ভিত্তিতে বাজার গড়ে ওঠে।

    সবশেষে এই বইয়ে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। এখানে সিভিল সমাজ সম্পর্কে তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বাংলাদেশের সিভিল সমাজের অনন্যতা ও দুর্বলতাসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

    প্রায় দুই বছর ধরে বইটি লেখা হয়েছে। এ সময়ে অনেক শুভানুধ্যায়ী ও আত্মীয়স্বজন আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁদের সবার সাহায্য ছাড়া কাজটি সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। আমার শাশুড়ি জাহানারা রহমান, আমার সহধর্মিণী হামীম খান ও আমার মেয়ে নেহরীন খান বইটি লেখার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেছেন ও নানাভাবে সহায়তা করেছেন। আমার ছোট ভাই জি এম জিয়াউদ্দিন খান বইটি লেখার সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে ও বইটির প্রুফ দেখতে সাহায্য করেছে। আরেক ছোট ভাই কবীর উদ্দিন খান অনেক সাংসারিক ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে বইটি লেখার কাজ সহজ করেছেন। সুদূর আমেরিকা থেকে ডক্টর এহসানুর রহমান (ভাইয়া), বীণা আপা ও সেলিম ভাই (জনাব এ কে এন আহমেদ) নানাভাবে সহায়তা করেছেন ও উৎসাহ দিয়েছেন। এদের সবার কাছে আমার ঋণের সীমা নেই।

    এই মুহূর্তে বিশেষভাবে স্মরণ করি আমার সদ্য প্রয়াত খালাতো ভাই সাইদুর রহমান সাচ্চুকে, যে আমার শারীরিক অসামর্থ্যকে সহনীয় করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছে। সব সময় হাসিমুখে সহায়তা করার জন্য ধন্যবাদ জানাই আতাউল মাসুদ, গোলাম হোসেন, আহমদ আলি, জিয়াউল আনসার ও ফরহাদ উল্লাহ পেরুকে। বইটি লেখার কাজ অনেকাংশে সহজ করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের পরিচালক মামুনুর রশীদকে জানাই বিশেষ কৃতজ্ঞতা। আমার শিক্ষকতা-সহায়ক চন্দন রায় কম্পিউটারের কাজে নানাভাবে সহায়তা করেছে। তাকে ধন্যবাদ জানাই।

    বইটি প্রকাশনার ব্যাপারে প্রথমার পক্ষ থেকে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন মতিউর রহমান ও সাজ্জাদ শরিফ। তাদের ধন্যবাদ জানাই। বইটি প্রকাশনায় বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন জাফর আহমদ রাশেদ ও তার সহকর্মীরা। তাঁদের জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

    গুলশান, ঢাকা আকবর আলি খান

    ডিসেম্বর ২০১২

  • ‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ অর্থনীতি

    ‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ অর্থনীতি

    ‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ অর্থনীতি

    সত্তরের দশকে বাংলাদেশে মাত্র তিনজন অধ্যাপক ছিলেন যাঁরা প্রত্যেকে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এঁরা সম্মানসূচক ডিগ্রিধারী ছিলেন না; এঁদের তিনজনই কষ্ট করে অভিসন্দর্ভ রচনা করে ডিগ্রি লাভ করেন। এঁদের মধ্যে মিলের চেয়ে বৈসাদৃশ্য ছিল অনেক বেশি। এঁরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয় পড়াতেন। এঁদের আচার-আচরণেও তেমন মিল ছিল না। এঁদের বাড়ি ছিল তিনটি ভিন্ন জেলায়। তবু এঁদের তিনজনের একই পরিণতি ঘটে। এঁরা তিনজনই দুর্নীতির দায়ে জেল খাটেন (তিনজনই দাবি করেছেন যে এঁরা নির্দোষ)। এরপর বাংলাদেশে ‘ডাবল পিএইচডির’ (হয়তো দুর্নীতি দমন কমিশনের ভয়ে) আর খবর পাওয়া যায়নি। সংখ্যাতত্ত্বের সূত্র অনুসারে বাংলাদেশে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি নিলে দুর্নীতির দায়ে জেল খাটার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লিখিত তিনজন অধ্যাপকই পরলোকগমন করেছেন। যদি ইতোমধ্যে কেউ ডাবল পিএইচডি অর্জনের চেষ্টা করেন, তবে তার জেলে যাওয়ার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

    ১. সহগমন (Corelation) বনাম কার্যকরণ (Causation)

    এখানে সংখ্যা ঠিকই আছে তবে তত্ত্ব নেই। ডাবল পিএইচডিরা দল বেঁধে জেলে গেলেই পিএইচডি ডিগ্রির জন্য এঁরা দুর্নীতি করেছেন, এ সূত্র প্রমাণিত হয় না। এমনও হতে পারে যে এ তিনজন অধ্যাপকই গরিব ঘরের সন্তান। কাজেই উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অর্থের লোভ সামলাতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে দোষটা দুটি পিএইচডির নয়। মূল সমস্যা হলো, তাঁদের সামাজিক পরিবেশ। আবার এমনও হতে পারে, যারা ডাবল পিএইচডি করেন, তাঁরা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তাঁরা নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। তাই তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসে। এখানেও কারণ হলো উচ্চাভিলাষ, দুটি পিএইচডি নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ডাবল পিএইচডির সঙ্গে দুর্নীতির কার্যকারণ সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা না করা যাবে, ততক্ষণ এ ধরনের সম্পর্ক কাকতালীয় বলেই বিবেচিত হবে।

    আরেকটি উদাহরণ বিবেচনা করুন। জাপানিরা খুব কম চর্বিযুক্ত খাবার খায়। এদের মধ্যে হৃদ্‌রোগীর সংখ্যা অতি নগণ্য। ইংরেজ ও মার্কিনরা গবগব করে চর্বি গেলে। এদের মধ্যে হৃদ্‌রোগের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। বেশি চর্বি খেলে হার্টের ব্যামো হয়, এই অনুমানটি উপরিউক্ত তথ্য সমর্থন করে। কিন্তু সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা বলছেন, ফরাসিরাও অনেক চর্বি খায়। অথচ মার্কিন বা ইংরেজদের চেয়ে এদের হৃদ্‌রোগ অনেক কম হয়। সংখ্যার ভিত্তিতে তাই হৃদ্‌রোগ আর স্নেহজাতীয় পদার্থের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

    একই সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, জাপানিরা লাল মদ কম খায়। তাদের হৃদ্‌রোগের হার কম। আবার ইতালিয়ানরা প্রচুর লাল মদ খায়, অথচ এদের মধ্যে ইংরেজ বা মার্কিনদের তুলনায় হৃদ্‌রোগের হার কম। ইংরেজ আর মার্কিনরা প্রচুর লাল মদ পান করে এবং তাদের হৃদরোগে ভোগার হার সর্বোচ্চ। তাই লাল মদের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্কও প্রতিষ্ঠা করা গেল না।

    তবে এই সমীক্ষা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যারা জাপানি, ফরাসি বা ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলে তাদের তুলনায় ইংরেজি ভাষায় যারা কথা বলে তাদের মধ্যে হৃদ্‌রোগের হার অনেক বেশি। তাহলে কি ধরে নেব যে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের জন্যই ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হৃদয়ঘটিত ব্যামো অনেক বেশি। যত যুক্তিই দেখান না কেন, ডাক্তারদের কাছে এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য করতে হলে প্রথমে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে হৃদ্‌রোগের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের ব্যাখ্যা কল্কে পাবে না।

    তবু সবকিছুর সহজ ব্যাখ্যা সব সময় সম্ভব হয় না। এই উদাহরণটি বিবেচনা করুন। অর্থনীতিতে যখন মন্দা দেখা দেয়, তখন পরিবারের সদস্যরা চাকরি হারায়। পরিবারের আয় কমে যায়। তাই বাড়ির কর্তা ও গিন্নিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করতে হয়। মন্দার সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাই দেখা যায় দামি গাড়ি, ব্যয়বহুল পোশাক বা দামি সেন্টের চাহিদা কমে যায়। অথচ মন্দা দেখা দিলেই লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায়। গত শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন মহামন্দা দেখা দেয়, তখন লিপস্টিক বিক্রি পঁচিশ শতাংশ বেড়ে যায়। পরবর্তীকালেও যখন মন্দা দেখা দেয়, তখনি লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায়। অনেকে বলছেন লিপস্টিকের বিক্রি-বৃদ্ধিকে মন্দার একটি পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আবার অনেকে বলছেন এ সহগমনের কোনো তাৎপর্য নেই (The Economist, January 24th 2009)।

    ওপরের উদাহরণগুলি থেকে দেখা যাচ্ছে যে শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে সত্য জানা যাবে–এ অনুমানের কোনো ভিত্তি নেই। সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে মহা বিরক্ত হয়ে অনেকে বলছেন : Lies, Damn lies and Statistics (মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও সংখ্যাতত্ত্ব)। এঁদের মতে, সংখ্যাতত্ত্ব ডাহা মিথ্যার চেয়েও বিপজ্জনক।

    ২. গোয়েন্দাগিরিতে সংখ্যাতত্ত্ব

    সংখ্যাতত্ত্বের দুর্বলতা সত্ত্বেও অনেক অর্থনীতিবিদেরই সংখ্যাতত্ত্বে আস্থায় কখনো চিড় ধরেনি। অতিসম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক স্টিভেন ডি লেভিট (Steven D. Levitt) প্রখ্যাত সাংবাদিক স্টিফেন জে ডুবনারের (Stephen J. Dubner) সহযোগিতা নিয়ে Freakonomics ও Super freakonomics দুটি বই লিখেছেন। একজন অর্থনীতিবিদ আর সাংবাদিকের জুটি বাধার কারণ হলো অর্থনীতিবিদের যত বক্তব্য আছে তত জোরালো ভাষা নেই। আর সাংবাদিকের কলমের জোর থাকলেও অর্থনীতি ও সংখ্যাতত্ত্বের মতো খটোমটো বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সীমিত। সংখ্যাতত্ত্বের সাফাই গাইতে গিয়ে লেভিট ও ডুবনার (২০০৯, ১৬) লিখেছেন, ‘Some people may argue that statistics can be made to say anything, to defend indefensible causes or tell pet lies. But the economic approach aims for the opposite: to address a given topic with neither fear nor favor, letting numbers speak the truth’. (কিছু লোক যুক্তি দেখান যে সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে যা ইচ্ছে করা যায়, অগ্রহণীয় বক্তব্য সমর্থন করা যায় এবং পছন্দমতো মিথ্যে বলা যায়। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণের লক্ষ্য হলো এর বিপরীত, ভয়ে বা কাউকে অনুরাগ দেখানোর জন্য নয়, সোজাসুজি সংখ্যার ভিত্তিতে সত্যকে তুলে ধরা)।

    ফ্ৰিকনোমিকস ও সুপার ফ্ৰিকনোমিকস বই দুটির তাত্ত্বিক লেভিট মনে করেন, উপযুক্ত উপাত্ত পাওয়া গেলে সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে যেকোনো সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব। এমনকি প্রতারক, ঠকবাজ ও অপরাধীদের খুঁজে বের করা সম্ভব। দুটি ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে গোয়েন্দাগিরিতে তারা সংখ্যাতত্ত্বের জ্ঞান প্রয়োগ করেছেন : (১) শিকাগো স্কুল বোর্ডের পরীক্ষায় নকলে সহায়তাকারী শিক্ষকদের শনাক্তকরণ, (২) জাপানে ঐতিহ্যবাহী সুমা কুস্তিতে পাতানো প্রতিযোগিতা উদঘাটন।

    নকলে সহায়তাকারী শিক্ষকদের শনাক্তকরণ

    ১৯৯৬ সালের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে স্কুলের ছাত্রদের মূল্যায়ন তাদের শিক্ষকেরা নিজেরাই করতেন। অভিভাবক ও স্কুল বোর্ডকে খুশি করার জন্য তারা তাদের ছাত্রদের বেশি নম্বর দিতেন, এতে ছাত্রদের স্কুলে কী রকম পড়ানো হচ্ছে তা বিচার করা সম্ভব ছিল না। স্কুল বোর্ড তাই ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষাবর্ষের শেষে ছাত্রদের একটি বাইরের পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে। এ পরীক্ষা চালু করার পর শিক্ষা বোর্ড সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যেসব শিক্ষকের ছাত্ররা অস্বাভাবিক উচ্চ হারে পরীক্ষায় ফেল করবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। শিকাগোতে এমন অনেক শিক্ষক ছিলেন, যাঁদের ছাত্রদের মান ছিল অত্যন্ত নিচু। এ ধরনের শিক্ষকেরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে খারাপ ছাত্রদের খাতা পরীক্ষা করার জন্য কম্পিউটারে জমা দেওয়ার আগে তাড়াতাড়ি করে তাদের ভুল উত্তর মুছে সঠিক উত্তর লিখে দিতেন। শিক্ষকদের এহেন কীর্তিকলাপের গুজব শুনে ২০০২ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক লেভিট গবেষণার জন্য ৩০ হাজার ছাত্রের পরীক্ষার খাতা সংগ্রহ করেন। কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা যায়, যেসব শিক্ষক ছাত্রদের খাতা জাল করেন তারা একই শ্রেণীর অনেকগুলি খাতায় পর পর বেশ কয়েকটি প্রশ্নের একই উত্তর দেন। এর ভিত্তিতে কোন কোন শ্রেণীতে নকল হয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব। এ খবর শুনে শিকাগো শিক্ষা বোর্ড লেভিটকে নকলবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু কোন ক্লাসে নকল হয়েছে তা অনুমান করা গেলেও প্রমাণ করা সোজা নয়। কারণ এ ধরনের নকলের কোনো সাক্ষ্য নেই। একটি উপায় হলো বোর্ডের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সন্দেহভাজন শ্ৰেণীগুলির আবার পরীক্ষা নেওয়া। নকল হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট শ্ৰেণীগুলোর দ্বিতীয় পরীক্ষার ফলাফল প্রথম পরীক্ষার (যেখানে নকলের জন্য নম্বর বেড়েছে) চেয়ে লক্ষণীয়ভাবে খারাপ হবে। তবে নকল ধরার পরীক্ষা বলে প্রকাশ্যে এ পরীক্ষা নিতে গেলে শিক্ষকেরা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারেন। পক্ষান্তরে উদ্দেশ্য না জানিয়ে পরীক্ষা নিলে শিক্ষকেরা যুক্তি দেখাবেন, ছাত্ররা দ্বিতীয় পরীক্ষাটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি–এই কারণে ফল খারাপ হয়েছে। তাই যেসব শ্রেণীতে নকল হয়নি সে ধরনের কিছু ক্লাসেও একই পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে প্রথম পরীক্ষায় যেসব ক্লাসে নকল হয়নি সেসব ক্লাসের ছাত্ররা গড়ে প্রথম পরীক্ষার অনুরূপ বা বেশি নম্বর পেয়েছে। অথচ যেসব ক্লাসে নকল হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়, সেসব ক্লাসের ছাত্ররা প্রথম পরীক্ষার চেয়ে দ্বিতীয় পরীক্ষায় অনেক কম নম্বর পেয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, এসব ক্লাসে নকল হয়। এর ভিত্তিতে ১২ জন শিক্ষককে জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষককে সতর্ক করা হয়।

    ঐতিহ্যবাহী সুমো কুন্তিতে পাতানো প্রতিযোগিতা

    প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে সুমো কুস্তি জাপানিদের একটি প্রিয় ক্রীড়া। এই কুস্তি জাপানিদের শিন্টো ধর্মের আচার হিসেবে স্বীকৃত। সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুমো কুস্তিগিরেরা লাখ লাখ ডলার কামাই করেন। উচ্চ আয়ের সম্ভাবনা থাকায় এ ক্রীড়ার প্রতি অনেকেই আকৃষ্ট হন। কিন্তু এই উচ্চ আয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের মাত্র ৬৬ জন কুস্তিগিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। প্রথম ৪০ জন কুস্তিগির প্রত্যেকে বছরে কমপক্ষে ১ লাখ ৭০ হাজার ডলার কামাই করেন। অথচ ৬৭তম স্থান। অধিকারী কুস্তিগিরের বার্ষিক আয় মাত্র ১৫ হাজার ডলার। প্রথম ৬৬টি জন। কুস্তিগিরের মধ্যে থাকতে হলে প্রতি দুই মাস অন্তর ১৫টি কুস্তি লড়তে হয়। এর মধ্যে কমপক্ষে আটটি কুস্তিতে জিততে হয়। প্রথম ১৪টি কুস্তির মধ্যে যারা আটটি বা তার বেশি কুস্তিতে জয় লাভ করেন, ১৫তম কুস্তিতে হারলেও তাঁদের কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু কিছু কিছু কুস্তিগির প্রথম ১৪টি কুস্তির সাতটিতে জয় লাভ করেন। সর্বশেষ অর্থাৎ ১৫ নম্বর কুস্তিতে হেরে গেলে তাঁরা তাঁদের সর্বোচ্চ মর্যাদা হারান। এই ধরনের খেলাতে যারা সাতটি খেলায় জিতেছেন তারা ইতিমধ্যে আটটি খেলায় বিজয়ীদের উৎকোচ দিয়ে কুস্তি জেতা নিশ্চিত করেন। এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে আটটি কুস্তিতে বিজয়ীর কোনো লোকসান হয় না। অথচ সাতটি খেলায় বিজয়ীদের বড় ধরনের লাভ হয়। ১৯৯০-এর প্রথম দিকে ডেভিড বেঞ্জামিন নামে একজন লেখক এই ধরনের পাতানো কুস্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু জাপানিরা তখন তার এ বক্তব্য আমলে নেয়নি। ১৯৯৬ সালে দুজন সুমো কুস্তিগির পাতানো খেলা ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ করেন। অল্প কদিনের মধ্যে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে এঁরা দুজনেই মারা যান।

    ২০০২ সালে লেভিট ও তাঁর সহকর্মী মার্ক ডুগান সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে সাতটি কুস্তিতে জয় লাভ করে যেসব কুস্তিগির ১৫ নম্বর কুস্তিতে অংশ নেন, তাঁরা ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে জয় লাভ করেন। অথচ সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্ভাবনা অনুসারে এঁদের ৪৮.৭ শতাংশ বিজয়ী হতে পারেন। এতে প্রমাণিত হয় যে সুমো কুস্তিতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। কিন্তু জাপানি কর্তৃপক্ষ সরাসরি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। এ ধরনের অভিযোগ ছাপানোর জন্য জাপানি আদালত ২০০৭ সালে একটি জাপানি কাগজকে জরিমানা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাপানি শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে যে কুস্তিগিরদের সেলফোনের খুদে বার্তা বিশ্লেষণ করে পাতানো কুস্তির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০১১ সালে মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কুস্তির ফলাফল বাতিল ঘোষিত হয়। (Economist, February 12, 2011, 36) অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সংখ্যাতত্ত্বের কাছে প্রতারক কুস্তিগিরদের হার মানতে হলো।

  • মিত্রপক্ষের গুলি

    মিত্রপক্ষের গুলি

    মিত্রপক্ষের গুলি
    অনভিপ্রেত পরিণামের অর্থনীতি

    ১. ভূমিকা

    সরকারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে প্রখ্যাত রক্ষণশীল ব্রিটিশ দার্শনিক এডমুন্ড বার্ক লিখেছেন, ‘সরকার হচ্ছে মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য মানুষের প্রজ্ঞায় সৃষ্ট একটি উদ্ভাবন’ (a contrivance of human wisdom to provide for human wants)। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাছে চাহিদা মেটানোর দাবি করার অধিকার সব মানুষের রয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তাই অনুমান করা হয় যে সরকার নাগরিকদের কল্যাণের জন্য যত অর্থ ব্যয় করবে, যত ব্যবস্থা নেবে, যত দৌড়ঝাঁপ করবে, ততই মানুষের উপকার হবে। বাস্তবে দেখা যায় যে সরকার অনেক সময় ভালো কাজ করতে গিয়ে অনিষ্ট করে বসে। প্রাচীন চৈনিক দার্শনিক লাও জু বলতেন, মানুষের কল্যাণের জন্য সরকার যত আইন করবে, যত বিধিনিষেধ আরোপ করবে মানুষ ততই গরিব হবে। এই মতের প্রতিধ্বনি করে মার্কিন রসিক উইল রজার্স লিখেছেন, ‘We should not blame the government for not doing something. It is when they do something they become dangerous’ (সরকার কিছু না করলে তাকে দোষ দেবেন না। শুধু সরকার যখন কিছু করে তখনই তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে)। সাম্প্রতিক কালে সব ডানপন্থী রাজনীতিবিদ বিশ্বাস করেন, সরকারই হলো আসল সমস্যা, সরকার মোটেও কোনো সমাধান নয়। রক্ষণশীল অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান লিখেছেন, ‘Many people want the government to protect the consumers. A much more urgent problem is to protect the consumer from the government’ (অনেকে চান যে সরকার ভোক্তাদের রক্ষা করুক। এর চেয়েও অনেক জরুরি সমস্যা হচ্ছে সরকারের খপ্পর থেকে ভোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখা)।

    সরকারের ক্রিয়াকাণ্ড নিয়ে বিতৃষ্ণা শুধু উগ্র ডানপন্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এ ধরনের ধারণা উদারনৈতিক ও আমূল পরিবর্তনের প্রবক্তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেনের অর্থনীতিতে অবদান স্মরণ করা যেতে পারে। সারা জীবন তিনি দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। তবু তাঁর সাম্প্রতিক রচনায় তিনি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ২০০১ সালে ‘নেহরু বক্তৃতা’য় সেন (২০০৫) মিত্রপক্ষের গুলি বা friendly fire ধারণাটি (concept) অর্থনীতিতে প্রবর্তন করেন। এই লফজটি (term) তিনি ধার করেছেন মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছ থেকে। সেনাবাহিনী সাধারণত শত্রুকে তাক করে গুলি চালায়। কিন্তু অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়; যুদ্ধের কুজ্ঝটিকায় শত্রু-মিত্র ঠাহর করা শক্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অনেক সৈন্য তাদের সপক্ষের যোদ্ধাদের তাক করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ ধরনের গুলিই হচ্ছে মিত্রপক্ষের গুলি। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন মিত্রপক্ষের ওপর হামলা ঘটে তেমনি সরকারের উদ্যোগে অনেক ব্যবস্থা গৃহীত হয়, যা অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর উপকারের বদলে অপকার করে। এ ধরনের ব্যবস্থাকেই অধ্যাপক সেন মিত্রপক্ষের গুলি বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    সাধারণত অর্থনীতিবিদেরা সরকারের ব্যর্থতাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে থাকেন : (১) কর্ম সম্পাদন না করার জন্য ব্যর্থতা (Errors of Omission), এবং (২) কর্ম সম্পাদনের ব্যর্থতা (Erors of Commission) (এন কুগার, ১৯৯০)। ধরুন, দেশের রাস্তাঘাট ঠিকমতো মেরামত করা হলো না। এটি হবে প্রথম ধরনের ব্যর্থতা। সরকার যদি ভুল মুদ্রানীতি অনুসরণ করে, এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি হবে দ্বিতীয় ধরনের ব্যর্থতা। কিন্তু মিত্রপক্ষের গুলি এ দুই ধরনের ব্যর্থতার কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। মিত্রপক্ষের গুলির ক্ষেত্রে সরকার কাজটি ঠিকই করে। এখানে কর্ম সম্পাদনে ব্যর্থতা নেই। কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে যে কাজটি সম্পন্ন করা হয় তার পরিণাম হয় ক্ষতিকর ও ঋণাত্মক। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকার দারিদ্র্য নিরসনের জন্য যেসব প্রকল্প গ্রহণ করে তা অনেক সময় দারিদ্র্যকে আরও ব্যাপক ও দুঃসহ করে তোলে।

    প্রশ্ন উঠতে পারে, আসলে যুদ্ধক্ষেত্রে বা সরকারি কর্মকাণ্ডে মিত্রপক্ষের গুলি কি সত্যি সত্যি ব্যাপক, না এমন ধরনের দুর্ঘটনা, যা কালেভদ্রে ঘটে? যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা নেহাত ফেলনা নয়। এখানে কয়েকটি সংখ্যা উল্লেখ করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড ও স্টাফ কলেজের একজন বিশেষজ্ঞের হিসাব অনুসারে যুদ্ধে সেনাবাহিনীর ২ থেকে ২০ শতাংশ সৈন্য মিত্রপক্ষের গুলিতে হতাহত হয়। প্রথম মহাযুদ্ধে ৭৫ হাজার ফরাসি সৈন্য মিত্রপক্ষের গুলির শিকার হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে কমপক্ষে ৬ হাজার মিত্রপক্ষের হামলার ঘটনা ঘটে। যদি প্রতিটি ঘটনায় গড়ে পাঁচজন করে সৈন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে কমপক্ষে ৩০ হাজার সৈন্য মিত্রপক্ষের আক্রমণের শিকার হয়। এই সংখ্যা বিবেচনা করলে সামরিক অভিযানে মিত্রপক্ষের হামলার গুরুত্ব অস্বীকার করার জো নেই। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডেও মিত্রপক্ষের হামলা ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। অমর্ত্য সেন (২০০৫, ২১১) তাই বলছেন, ‘It is extremely important to study the issue of friendly fire’ (মিত্রপক্ষের হামলার বিষয়টি সম্পর্কে অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি)।

    এই নিবন্ধটির মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে মিত্রপক্ষের গুলির ব্যাপকতা, কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করা। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বড় অসুবিধা হলো যে মিত্রপক্ষের গুলির ওপর যথেষ্ট উপাত্ত এখনো সংগৃহীত হয়নি। এই নিবন্ধে তাই প্রথমে মিত্রপক্ষের গুলি সম্পর্কে তিনটি দেশের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে এর কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করা হবে। নিবন্ধটি চারটি খণ্ডে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম খণ্ডে রয়েছে ভূমিকা। দ্বিতীয় খণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও ভারতে মিত্রপক্ষের গুলি সম্পর্কে কতিপয় ঘটনা আলোচনা করা হবে। তৃতীয় খণ্ডে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিত্রপক্ষের গুলি সম্পর্কে কয়েকটি উদাহরণ বর্ণনা করা হয়েছে। সর্বশেষ খণ্ডে পূর্বে উল্লেখিত ঘটনা সমীক্ষাগুলির ভিত্তিতে মিত্রপক্ষের গুলির কারণ ও সমাধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

  • সুখের লাগিয়া

    সুখের লাগিয়া

    সুখের লাগিয়া
    সুখ ও অর্থনীতি

    ১. ভূমিকা

    দেশটির নাম সুখস্থান।

    এ রাজ্যে ১০০ জন সুদর্শন যুবক বাস করে। এরা প্রত্যেকে বছরে ১ কোটি টাকা আয় করে। এদের ধনুর্ভঙ্গপণ যে এরা কেউ বিয়ে করবে না। তাই এদের কোনো স্ত্রী নেই। তবে তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে একজন করে চাকরানি রয়েছে। প্রতি চাকরানি বছরে ১ লাখ টাকা বেতন পায়। এ রাজ্যে আর কোনো মানুষ নেই। এ দেশে মোট জাতীয় উৎপাদ হচ্ছে ১০১ কোটি টাকা। এদের মাথাপিছু আয় হলো ৫০.৫ লাখ টাকা।

    হঠাৎ এ রাজ্যে মদন দেব তশরিফ আনলেন। স্বঘোষিত চিরকুমার যুবকদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তিনি তাদের প্রেমের বাণে বিদ্ধ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ১০০ জন যুবক তাদের নিজ নিজ চাকরানির প্রেমে পড়ে গেল ও তাদের বিয়ে করে ফেলল। চাকরানিরা বহুদিন ধরে তাদের মনিবদের আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করছিল। তাই মদন দেবের কল্যাণে বিয়ে হওয়াতে তারা মহাখুশি। তারা বিয়ের আগে যত কাজ করত, নিজের সংসারে তার চেয়ে অনেক বেশি খেদমত করে, যাতে স্বামীরা আগের চেয়ে বেশি সুখে থাকে। স্বামীরাও স্ত্রীদের যত্নে মহাসন্তুষ্ট। তারা তাদের ব্যাংকে বলে দিয়েছে যে স্ত্রীরা তাদের স্বামীর আয়ের অর্ধেক টাকা ব্যাংক থেকে মাসে মাসে তুলতে পারবে। ফলে স্ত্রীরা নিজেদের ইচ্ছমতো দেদার খরচ করছে।

    রাজ্যে সবার সুখ বেড়ে গেছে। অথচ রাজ্যের সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা বলছেন, রাজ্যে বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৫০.৫ লাখ থেকে ৫০ লাখে নেমে গেছে। বিয়ে করার আগে চাকরানিরা বেতন পেত। যদিও স্ত্রী হওয়ার পর একই কাজ তারা আরও অনেক ভালোভাবে ও দরদ দিয়ে করছে, তবু তারা বেতন পায় না। তবে বেতনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা স্বামীরা স্ত্রীদের দিচ্ছে। কিন্তু স্ত্রীকে স্বামীর দেওয়া অর্থ জাতীয় আয়ে অন্তর্ভুক্ত হয় না। অথচ গৃহস্বামী চাকরানিকে যে বেতন দেয়, তা জাতীয় আয়ের অংশ। কাজেই সুখস্থান রাজ্যে চাকরানিরা গৃহস্বামীদের বিয়ে করায় রাজ্যের সকলের সুখ বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও মোট জাতীয় উৎপাদ ও মাথাপিছু আয় কমে গেছে।

    ধরুন, এক বছর পর এ রাজ্যের ১০০ দম্পতি তাদের বিবাহবার্ষিকীতে নিজেদের নতুন গাড়িতে চড়ে বেড়াতে গেল। ফেরার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় ১০ জন স্ত্রী মারা যায়। ১০ জন স্বামী প্রত্যেকে একটি করে পায়ের আঙুল হারায়। আরও ২০ জন হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে যায়। সারা বছর রাজ্যের সবাই দুঃখে কাঁদে। এক বছর পর রাজ্যের সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা জানালেন যে রাজ্যে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে; কারণ, ১০ জন স্ত্রী মারা যাওয়াতে জনসংখ্যা কমেছে (এ সময়ে কোনো বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়নি) অথচ সব পুরুষ জীবিত থাকায় (ও কোম্পানি অসুস্থদের পুরো বেতন দেওয়ায়) মোট জাতীয় উৎপাদ কমেনি; বরং বেড়েছে। কেননা, হাসপাতালে মৃতদের সৎকারকারীদের এবং গাড়ি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানগুলির আয় বেড়েছে। অর্থনীতির ভোজবাজিতে মানুষের দুর্দশা বাড়লেও জাতীয় আয় বেড়ে গেল।

    পরের বছর রাজ্যে গুজব রটল যে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো রাস্তার ঠিকাদারদের দুর্নীতি। এতে রাজ্যে প্রচণ্ড রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা দিল। সেনাবাহিনী-প্রধান ক্ষমতা দখল করে নিল। সেনাবাহিনী রাজ্যের সবাইকে অতিরিক্ত রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করল। রাজ্যে মাথাপিছু আয় ২০ শতাংশ বেড়ে গেল। যদিও রপ্তানি-আয়সহ রাজ্যের মোট উৎপাদের ৫০ শতাংশ সেনাপ্রধান ও তার নয়জন স্যাঙাত আত্মসাৎ করে। এর ফলে রাজ্যের ৯০ শতাংশ লোকের আয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। তার মানে গড় আয়ের ভিত্তিতে মানুষের সুখ বেড়েছে। কিন্তু ৯০ শতাংশ লোকের মাথাপিছু আয় ও সুখ কমে গেছে। শুধু ১০ ভাগ লোকের আয় বেড়েছে। এ রাজ্যে এখন কারও পৌষ মাস আর কারও সর্বনাশ।

    এভাবে দেখা গেল, সুখস্থান রাজ্যে মানুষের সুখ যখন বাড়ছে মাথাপিছু আয় তখন কমে যাচ্ছে; আর যখন দুঃখ বাড়ছে তখন মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে। এ অদ্ভুত কাণ্ড অবশ্য সুখস্থানের সর্বনেশে নিয়মকানুনের জন্য ঘটছে না। দোষ সুখস্থানের নয়, সমস্যা হলো জাতীয় আয় প্রাক্কলনের পদ্ধতিটাতেই রয়েছে অনেক ফাঁক। পৃথিবীর সব দেশেই বর্তমানে মোট জাতীয় উৎপাদের হিসাব নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। ২০০৮ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সারকোজি মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদের তাৎপর্য নিয়ে এতই সন্দিহান হয়ে পড়েন যে তিনি জীবন-কুশলতার সূচক হিসেবে জাতীয় আয়ের উপযোগিতা পরীক্ষা করে পরামর্শ দেওয়ার জন্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজের (২০০৮) নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। অমর্ত্য সেন এ কমিশনের উপদেষ্টা ছিলেন। এই কমিশন জাতীয় উৎপাদের তিনটি দুর্বলতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রথমত, সব উৎপাদ ও সেবা সঠিক মূল্যে সব সময় জাতীয় উৎপাদের অন্তর্ভুক্ত হয় না। দ্বিতীয়ত, পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে গিয়ে পরিবেশের অথবা সমাজের যে ক্ষতি হয় তা বিবেচনায় না নেওয়াতে জাতীয় উৎপাদের পরিমাণ অতিরঞ্জিত করা হয়। সবশেষে, জাতীয় উৎপাদের হিসেবে শুধু অর্থের পরিমাণের ওপর জোর দেওয়া হয়; কিন্তু জীবন কুশলতার মান সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। জীবনযাত্রার গুণগত মান বিশ্লেষণ করার জন্য জাতীয় উৎপাদের বিষয়-নির্ভর (objective) পরিমাপই যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির মনোনির্ভর (subjective) মূল্যায়নও প্রয়োজন। স্টিগলিজ কমিশনের সুপারিশ হলো যে জীবন-কুশলতা পরিমাপ করার জন্য শুধু জাতীয় উৎপাদের হিসাব করলেই চলবে না। সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে ব্যক্তিদের মনোনির্ভর মূল্যায়নও বিবেচনা করতে হবে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে মোট জাতীয় সুখ পরিমাপ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভুটান সরকার মোট জাতীয় সুখ বৃদ্ধিকে তাদের জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলিতেও সরকারের উদ্যোগে সুখ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে।

    নাগরিকদের সুখ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সম্প্রতি যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে তা বিংশ শতাব্দীর মূলধারার অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঊনবিংশ শতকে অবশ্য উপযোগবাদী (utilitarian) দার্শনিকদের মধ্যে সুখ পরিমাপ করার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ দেখা গিয়েছিল । এজওয়ার্থের মতো কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ আশা করেছিলেন যে মানুষের সুখ পরিমাপক যন্ত্র (hedonometer) আবিষ্কার করাও সম্ভব হবে। (ফ্রে ও অলিয়েস ফ্রঁটজার, ২০০২)। বিশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে লায়োনেল রবিন্স ও জন হিকসের মতো অর্থনীতিবিদেরা প্রমাণ করলেন যে উপযোগ বা মানুষের হিতের ক্রমবাচক বা ordinal (কোনটা আগে ও কোনটা পরে) মূল্যায়ন সম্ভব হলেও সংখ্যাবাচক বা cardinal (তুলনামূলকভাবে কোনটি কত বেশি) মূল্যায়ন সম্ভব নয়। ব্যক্তিভেদে উপযোগের মূল্যায়নে প্রভেদ ঘটে। কাজেই একাধিক ব্যক্তির উপযোগ (যা ভিন্ন ভিন্ন) একসঙ্গে যোগ করা অযৌক্তিক। তাই ব্যক্তির সুখ সম্পর্কে গবেষণা অর্থনীতির মূল স্রোতোধারাতে পরিত্যক্ত হয়। শুধু মনস্তত্ত্ববিদেরা এ বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যান (ক্যায়নেম্যান, ড্যানিয়েল ও এলেন বি ক্রুগার, ২০০৬)। যদিও অর্থনীতিবিদেরা মনস্তত্ত্ববিদদের এসব গবেষণা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেন। অতি সম্প্রতি অর্থনীতিবিদেরা মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলির ভূমিকা সম্পর্কে ক্রমশ সজাগ হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে, ২০০২ সালে মনস্তত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল কায়নেম্যানকে (Daniel Kahneman) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের পর সুখ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদেরা নতুন করে চিন্তাভাবনা করেছেন।

    বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো সুখ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদেরা দুই দশক ধরে যেসব গবেষণা করছেন, তার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা। এই বিশ্লেষণ থেকে সুখ অথবা মানুষের জীবন-কুশলতা বাড়ানোর জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাগুলি চিহ্নিত করা সম্ভব। প্রবন্ধটি সাতটি খণ্ডে বিভক্ত। দ্বিতীয় খণ্ডে সুখের পরিমাপের প্রচলিত পদ্ধতির তাৎপর্য ও দুর্বলতাগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে দেশভেদে সুখবোধের তারতম্য সম্পর্কে সমীক্ষার ফলাফল আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ খণ্ডে ব্যক্তিগত সুখ ও আয়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেকোনো সময়ে আয় ও সুখের মধ্যে সুস্পষ্ট ধনাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। অথচ সময়ের পরিসরে মাথাপিছু আয় বাড়লেও সুখ বাড়ছে না। প্রবন্ধের এই খণ্ডে এ প্রহেলিকার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পঞ্চম খণ্ডে সুখের সঙ্গে সমষ্টিগত স্থিতিশীলতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে, দেখানো হয়েছে যে বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের সুখকে প্রভাবিত করে। ষষ্ঠ খণ্ডে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সুখের সম্পর্কের কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সর্বশেষ খণ্ডে এই নিবন্ধের বক্তব্যগুলির সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্যের ভিত্তিতে মানুষের সুখ বাড়ানোর জন্য অর্থনৈতিক নীতিমালায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন সে সম্পর্কেও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

  • ভেগোলজি ও অর্থনীতি

    ভেগোলজি ও অর্থনীতি

    ভেগোলজি ও অর্থনীতি
    ‘না মিথ্যা, না সত্য’

    বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা অর্জনের জন্য কোন ধরনের গুণাবলির প্রয়োজন, সে সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। পল জনসন (১৯৮৮) ১৩ জন বুদ্ধিজীবী নিয়ে Intellectuals নামে একটি বই লিখেছেন। এই বইয়ের নির্ঘষ্টে বুদ্ধিজীবীদের নিম্নোক্ত গুণাবলি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে : মাদকাসক্তি, পরিবারের প্রতি ঔদাসীন্য, সমকাম, মুনাফেকি, প্রতারণা, কৃতঘ্নতা, নিষ্ঠুরতা ও অসহিষ্ণুতা। তবে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য এত সব বদ খাসিয়তের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য দুটি গুণই যথেষ্ট। প্রথমত, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হতে হলে আড্ডাবাজ হতে হবে। ডেনমার্কের রাজপুত্র ছাড়া যেমন হ্যামলেট নাটক সম্ভব নয়, তেমনি আড্ডাবাজ না হয়ে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর শিরোপা অর্জন অকল্পনীয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হতে হলে ‘ভেগোলজি’তে পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। ভেগোলজির অস্পষ্টতাতেই বাঙালি মনীষার দীপ্তি ঘূর্তি লাভ করে।

    আজ্ঞা ও ভেগোলজি দুটি বিষয়েই পারদর্শী হিসেবে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন পরিমল রায়। স্বর্গীয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক। তার বড় গুণ হলো, তিনি ছিলেন মহা আড্ডাবাজ। সঙ্গে সঙ্গে ভেগোলজি সম্পর্কেও ছিল তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান। সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেকে গুলের আলমগীর বা গুলমগীর বলে দাবি করেছিলেন। অনুরূপভাবে পরিমল রায়ের খেতাব হওয়া উচিত বাবায়ে ভেগোলজি।

    রায়ের আড্ডার সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু দেশ বিভাগের ডামাডোলে তিনি ঢাকা থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য হন। একপর্যায়ে তিনি দিল্লিতে ডেরা বাঁধেন। সেখানে আড্ডার বিবরণ অশোক মিত্র (২০০৩, ৩৮) তার আত্মজীবনী আপিলা চাপিলা বইয়ে লিখেছেন। তবে জীবিকার প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত তিনি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে চাকরি নেন। কিন্তু ঢাকার আড্ডা দিল্লিতে স্থানান্তর সম্ভব হলেও পঞ্চাশের দশকে নিউ ইয়র্কে বাঙালি কায়দায় আড্ডা বসানো সম্ভব ছিল না। দুঃখ করে শিষ্য অশোক মিত্রকে তিনি নিউ ইয়র্ক সম্পর্কে লিখলেন, ‘অশোক এ দেশে গরুতেও থাকে না।’ আড্ডাবিহীন নিউ ইয়র্কে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।