ভেগোলজি ও অর্থনীতি
‘না মিথ্যা, না সত্য’

বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা অর্জনের জন্য কোন ধরনের গুণাবলির প্রয়োজন, সে সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। পল জনসন (১৯৮৮) ১৩ জন বুদ্ধিজীবী নিয়ে Intellectuals নামে একটি বই লিখেছেন। এই বইয়ের নির্ঘষ্টে বুদ্ধিজীবীদের নিম্নোক্ত গুণাবলি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে : মাদকাসক্তি, পরিবারের প্রতি ঔদাসীন্য, সমকাম, মুনাফেকি, প্রতারণা, কৃতঘ্নতা, নিষ্ঠুরতা ও অসহিষ্ণুতা। তবে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য এত সব বদ খাসিয়তের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য দুটি গুণই যথেষ্ট। প্রথমত, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হতে হলে আড্ডাবাজ হতে হবে। ডেনমার্কের রাজপুত্র ছাড়া যেমন হ্যামলেট নাটক সম্ভব নয়, তেমনি আড্ডাবাজ না হয়ে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর শিরোপা অর্জন অকল্পনীয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হতে হলে ‘ভেগোলজি’তে পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। ভেগোলজির অস্পষ্টতাতেই বাঙালি মনীষার দীপ্তি ঘূর্তি লাভ করে।

আজ্ঞা ও ভেগোলজি দুটি বিষয়েই পারদর্শী হিসেবে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন পরিমল রায়। স্বর্গীয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক। তার বড় গুণ হলো, তিনি ছিলেন মহা আড্ডাবাজ। সঙ্গে সঙ্গে ভেগোলজি সম্পর্কেও ছিল তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান। সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেকে গুলের আলমগীর বা গুলমগীর বলে দাবি করেছিলেন। অনুরূপভাবে পরিমল রায়ের খেতাব হওয়া উচিত বাবায়ে ভেগোলজি।

রায়ের আড্ডার সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু দেশ বিভাগের ডামাডোলে তিনি ঢাকা থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য হন। একপর্যায়ে তিনি দিল্লিতে ডেরা বাঁধেন। সেখানে আড্ডার বিবরণ অশোক মিত্র (২০০৩, ৩৮) তার আত্মজীবনী আপিলা চাপিলা বইয়ে লিখেছেন। তবে জীবিকার প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত তিনি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে চাকরি নেন। কিন্তু ঢাকার আড্ডা দিল্লিতে স্থানান্তর সম্ভব হলেও পঞ্চাশের দশকে নিউ ইয়র্কে বাঙালি কায়দায় আড্ডা বসানো সম্ভব ছিল না। দুঃখ করে শিষ্য অশোক মিত্রকে তিনি নিউ ইয়র্ক সম্পর্কে লিখলেন, ‘অশোক এ দেশে গরুতেও থাকে না।’ আড্ডাবিহীন নিউ ইয়র্কে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।