» » বাংলাদেশে সিভিল সমাজ

বাংলাদেশে সিভিল সমাজ
বাস্তবতার সন্ধানে একটি ধারণা

১. ভূমিকা

আজকাল সুশীল শব্দটির যত্রতত্র আকছার অপপ্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো উৎসাহী আমলা ‘সিভিল সারভেন্ট’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে লিখছেন ‘সুশীল সেবক’। এখানে একসঙ্গে দুটি অপরাধ করা হচ্ছে। প্রথমত, ‘সিভিল সার্ভেন্ট’-এর প্রতিশব্দ রূপে ‘সুশীল সেবক’ ব্যবহার বাংলাদেশ সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধানের বাংলা পাঠ চূড়ান্ত। সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদে ‘সিভিল পোস্ট’-এর স্থলে ‘অসামরিক পদ’ শব্দ-যুগল ব্যবহৃত হয়েছে। সংবিধানে চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে ‘সিভিল’ অর্থ হলো ‘অসামরিক’; কোনো অবস্থাতেই ‘সুশীল’ নয়। ‘সার্ভেন্ট’ শব্দটি সংবিধানে ব্যবহৃত হয়নি। তবে সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে সার্ভিস শব্দের স্থলে ‘কর্ম’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে। তাই সংবিধান অনুসারে ‘সিভিল সার্ভেন্ট’-এর প্রতিশব্দ হবে ‘অসামরিক কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তি।

দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মচারীদের সুশীল সেবক বর্ণনা করা একটি ডাহা মিথ্যা প্রচারণা। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে প্রায়ই বলা হতো যে এরা ‘neither Indian, nor civil, nor service’। অর্থাৎ এরা ‘ইন্ডিয়ান’ নয় (এর বেশির ভাগ কর্মকর্তাই ইংরেজ ছিলেন, ভারতীয় নয়); মোটেও সিভিল’ নয় (এঁদের অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত উদ্ধত) এবং এদের মধ্যে সার্ভিসের লেশমাত্রও ছিল না, (এঁরা সেবা করতেন না; প্রজাদের শাসন করতেন)। বাংলাদেশে ‘সিভিল সারভেন্ট’দের সম্পর্কেও একই মন্তব্য প্রযোজ্য। যারা ‘সিভিল সারভেন্ট’দের সুশীল সেবক বলে জাহির করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সুশীল শব্দটির সবচেয়ে ব্যাপক অপপ্রয়োগ হচ্ছে সুশীল সমাজ শব্দগুচ্ছে। ইংরেজি ‘সিভিল’ শব্দটির অনেক অর্থ রয়েছে। শব্দটির অর্থ শুধু ভদ্র, অমায়িক, বিনয়ী বা সুশীল নয়। ‘সিভিল কোর্টের’ পরিভাষা হলো ‘দেওয়ানি আদালত’। ‘সিভিল ওয়ারের’ অর্থ সুশীল যুদ্ধ নয়, গৃহযুদ্ধ। তেমনি ‘সিভিল ম্যারেজ’কেও কেউ সুশীল বিবাহ বলে না।

সুশীল শব্দটির সংজ্ঞা নিয়ে গোপাল ভাঁড়ের একটি চমৎকার কাহিনি রয়েছে। গল্পটি নিম্নরূপ : গোপাল একদিন রাজসভায় এসে বলল, ‘মহারাজ, আজ একজন সুশীল বালকের দেখা পেয়েছি।‘’

মহারাজ বললেন, ‘তুমি কী করে বুঝলে সে সুশীল বালক?’

গোপাল বলল, ‘বাপ আর ছেলে মাঠে কাজ করছিল। কিছুক্ষণ কাজ করার পর ছেলে বাবাকে বলল, ‘বাবা, তুমি একটু দূরে সরে যাও, আমি এখন গাঁজা টানব। গুরুজনের সামনে কখনো গাঁজা টানা উচিত নয়।‘’ এবার আপনিই বলুন, ‘ছেলেটি সুশীল কি না?’

সিভিল সমাজের লোকেরা গাঁজা-ভাং নিয়ে নেশা করে কি না জানি না। তবে তারা অনেক কাজ করে যা সুশীল লোকেরা করে না। এরা হরতাল করে, পিকেটিং করে, এমনকি কখনো কখনো পুলিশকে ঢিল-পাটকেল মারে। এরা অনেক সময় সমাজের মূল স্রোতোধারার বিপক্ষে বিদ্রোহ করে। তবু কেন তাদের সুশীল সমাজ বলা হয়?

‘সিভিল সোসাইটির’ সংজ্ঞা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে প্রাচীনকাল থেকে এ সম্পর্কে দুটি ধারণা দেখা যায়। প্রথমত, ‘সিভিল সোসাইটির’ লক্ষ্য সুসমাজ প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, এর একটি বড় উপাদান হলো Civility, যার সহজ বাংলা অনুবাদ হলো ‘ভদ্রতা ও সৌজন্যমূলক আচরণ’। সম্ভবত এ দুটি কারণেই বাংলায় সুশীল সমাজ ধারণাটি চালু হয়েছে। তবে এখানে একটি বড় ভুল করা হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সংজ্ঞা অনুসারে Civility-এর অর্থ ভদ্রতা নয়। ক্যারোলিন এম ইলিয়টের (২০০৬, ১৭) মতে, ‘Civility implies tolerance, the willingness of individuals to accept disparate political views and social attitudes.’ (সিভিলিটি হচ্ছে সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক মত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে ভিন্নমত গ্রহণের ক্ষমতা)। সুশীল শব্দটি এ ক্ষেত্রে তাই একেবারেই অচল। উপরন্তু সিভিল সমাজ শুধু গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদর্শের। ছিটেফোঁটাও নেই, এমন সংগঠনও সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। কারমেন। মালেনা ও ভলকার্ট ফন হেনরিখ (২০০৭, ৩৪১) তাই প্রশ্ন তুলেছেন যে, সব সিভিল সমাজই ‘সিভিল’ নয়, অনেক uncivil civil society বা দুঃশীল সুশীল সমাজও রয়েছে। সিভিলিটি একটি আদর্শ, বাস্তবতা নয়। বাস্তব জীবনে সিভিল সমাজে অনেক অগণতান্ত্রিক ও ধর্মান্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা সহিংস, সমাজে বিদ্বেষ ছড়ায় এবং গোপনে জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়। তালিবান বা গোরক্ষা সমিতিকে কি সিভিল সমাজ বলা যায়? অন্যদিকে এদের সিভিল সমাজ থেকে বাদ দিতে গেলে চিন্তা, বিবেক ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিয়ে মৌলিক অধিকার খর্ব করার প্রশ্ন উঠবে।

দোষটা শুধু পরিভাষার নয়। সিভিল সমাজ’ ধারণাটিই গোলমেলে। আধুনিক যুগে দার্শনিক হেগেল ‘সিভিল সমাজের ভূমিকার ওপর প্রথম গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি মনে করেন যে আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার এত শক্তিশালী হয়ে পড়েছে যে এখানে ব্যক্তির ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তাই ব্যক্তিরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে পরিবার ও রাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন সমিতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এসব সংগঠনই হচ্ছে সিভিল সোসাইটি। হেগেল মনে করতেন যে সিভিল সোসাইটি যে রকম রাষ্ট্রের খবরদারি করে, রাষ্ট্রেরও তেমনি সুশীল সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।

একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত হবে কি না। ডানপন্থীরা দাবি করেন যে যেহেতু বাজার ব্যক্তিগত অধিকারের পক্ষে, সেহেতু বাজারসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলি সিভিল সমাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। সমালোচকেরা দাবি করেন যে বাজারও ব্যক্তিকে শোষণ ও বঞ্চনা করে। বাজারের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিকে লড়তে হয়। প্রায় সোয়া দুই শ বছর আগে অ্যাডাম স্মিথ (২০০৩, ১৭৭) লিখেছিলেন, ‘People of the same trade seldom meet together, even for merriment and diversion, but the conversation ends in a conspiracy against the public, or in some contrivance to raise prices.’ (একই ব্যবসায়ে কর্মরত ব্যক্তিরা কদাচিৎ একত্র হয়; এমনকি হাসি-ঠাট্টা বা আমোদের জন্যও নয়। তারা যখনই পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে তখনই তারা জনগণের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র করে অথবা দাম বাড়ানোর ছুতা খুঁজে বের করে।) বণিকদের সংগঠনগুলি জনগণের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই বণিকদের সংগঠন সিভিল সোসাইটিতে অন্তর্ভুক্ত করা অনুচিত।

এসব বিতর্ক বিবেচনা করে সিভিল সমাজের আন্তর্জাতিক সংগঠন Civicus World Alliance for Citizen participation for you. Y1695 নিম্নরূপ সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন : ‘The arena outside of the family, the state and market where people associate to advance common interests.’ (সিভিল সমাজ হচ্ছে পরিবার, রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে প্রভাবের ক্ষেত্র, যেখানে ব্যক্তিরা তাদের অভিন্ন স্বার্থগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগঠিত হয়।)। এর মধ্যে রয়েছে (গির্জার মতো) ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন, বিতর্ক সমিতি, স্বাধীন গণমাধ্যম, উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি (academia), সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের সংগঠন, তৃণমূল সমাজসেবী বা সমবায় সংগঠনগুলি, পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলি, বেসরকারি সংগঠন বা এনজিও, লিঙ্গ, পরিবেশসহ বিভিন্ন দাবিসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন এবং রাজনৈতিক দল। সিভিল সমাজের প্রভাবের ক্ষেত্র হচ্ছে পরিবার, রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে জনসাধারণের অংশ যেখানে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় হয় ও লেনদেন ঘটে। এ ধরনের সম্পর্কের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

সিভিল সমাজ ধারণাটি নিয়ে একটি বড় অসুবিধা হলো, এখানে একই মোড়কে তিনটি ধারণা রয়েছে। মাইকেল এডোয়ার্ডের (২০১১) ভাষায়, সিভিল সমাজ হচ্ছে একই সঙ্গে লক্ষ্য, লক্ষ্য অর্জনের উপায় এবং লক্ষ্য ও উপায় সম্পর্কে কুশীলবদের পারস্পরিক ভাব বিনিময় ও সম্পর্ক স্থাপনের কাঠামো। সিভিল সমাজের লক্ষ্য হচ্ছে এর আদর্শগুলির বাস্তবায়ন। এসব আদর্শ সম্পর্কে অ্যারিস্টটল থেকে টমাস হবস পর্যন্ত দার্শনিকেরা লিখেছেন (জিন এল কোহেন ও অ্যান্ড্রু আরাতো, ১৯৯৭)। এ লক্ষ্যগুলি হচ্ছে রাজনৈতিক সম-অধিকার, বিরুদ্ধ মতবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধের নিষ্পত্তি। সিভিল সমাজের লক্ষ্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা। সিভিল সমাজ বিশ্বাস করে ভালো সরকার কখনো সৎ প্রতিবেশীর বিকল্প হতে পারে না। কাজেই ভালো সরকার যথেষ্ট নয়। প্রতিবেশীদের মধ্যেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সমাজে সবাইকে মিলেমিশে থাকতে হবে। এসব লক্ষ্য আদর্শিক। বাস্তব জীবনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব আদর্শ অচল। তবে সিভিল সোসাইটির একটি লক্ষ্য নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই। সব সিভিল সোসাইটিই চায় রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং এই লক্ষ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা খর্ব করা। নীরা চন্দক (২০০৭, ৬০৮) এর ভাষায়, ‘The concept of civil society highlighted one basic precondition of democracy: state power has to be monitored, engaged with and rendered accountable through intentional and engaged citizen action.’ (সিভিল সমাজের ধারণাটি গণতন্ত্রের একটি পূর্বশর্তের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে : উদ্দেশ্যমূলক অঙ্গীকার নিয়ে নাগরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে রাষ্ট্রশক্তির পরিবীক্ষণ, ব্যবহার ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ।)।

সিভিল সমাজে লক্ষ্য অর্জনের উপায় হচ্ছে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সমিতি বা সংগঠনগুলি। এ ধরনের সংগঠনগুলিই বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর দাবিদাওয়া। বাস্তবায়নের জন্য জনমত গড়ে তোলে। এরাই সিভিল সমাজের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে সব স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনই সিভিল সমাজের আদর্শে বিশ্বাস করে না। এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান সমাজে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মান্ধ বা বর্ণবাদী ও জাতপাতভিত্তিক সংগঠনগুলির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্য একই ধরনের নয়। এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। তাই এদের মতবিনিময় ও পারস্পরিক লেনদেনের জন্য একটি কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। এই কাঠামোকে public sphere বা গণক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে। রাষ্ট্র, বাজার আর পরিবারের বাইরে যে সমাজ রয়েছে তার পুরোটাই হলো গণক্ষেত্র। এই গণক্ষেত্রের জন্ম অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এর আগে ব্যক্তিরা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করত; তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল সীমিত। অষ্টাদশ শতকে শিল্পোন্নত দেশগুলির শহরগুলিতে মোড়ে মোড়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছে সস্তায় কফি বিক্রয়ের জন্য কফি হাউস গজিয়ে ওঠে। এসব দোকানে কফির সঙ্গে সঙ্গে আড্ডাও জমে ওঠে। ভিন্নমতের মানুষের মধ্যে মতবিনিময় শুরু হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্লাবগুলি গড়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক বিতর্ক জমে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়। এদের মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক হয় আরও জমজমাট। গণক্ষেত্র একটি রঙ্গমঞ্চ, যেখানে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে জনমত গড়ে ওঠে। দার্শনিক হাবেরমাসের ভাষায় এই গণক্ষেত্র ব্যক্তির এলাকা ও রাষ্ট্রের এলাকার মধ্যে সমঝোতার সেতুবন্ধ গড়ে তোলে। এভাবেই গণক্ষেত্র সিভিল সমাজের কাঠামো গড়ে তোলে। সিভিল সমাজে সাফল্য তখনই কার্যকর হয়, যখন লক্ষ্য, উপায় ও কাঠামোর মধ্যে সহযোগ ঘটে।

পণ্ডিতেরা বলছেন যে ইংরেজি সিভিল সমাজ ধারণা এত ব্যাপক যে বর্তমানে এ ধরনের ধারণা ব্যাখ্যার জন্য সিভিল শব্দটি নেহাতই অপ্রতুল। স্পষ্টতই বাংলা সুশীল শব্দটি ইংরেজি সিভিল শব্দটির ভাব প্রকাশে একেবারেই অনুপযুক্ত। কেউ কেউ সিভিল সমাজের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘নাগরিক সমাজ ব্যবহার করছেন। নাগরিক সমাজ শব্দগুচ্ছ নিঃসন্দেহে সুশীল সমাজের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অর্থবহ। তবে নাগরিক সমাজ শব্দগুচ্ছের মধ্যে সিভিল সমাজের লক্ষ্য, উপায় ও কাঠামোর ধারণা ফুটে ওঠে না। উপরন্তু, নাগরিক সমাজ বললে মনে হয়, এটি একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ। প্রকৃতপক্ষে, অজস্র স্বার্থগোষ্ঠী সিভিল সমাজকে বিভক্ত করে রাখে। নাগরিক সমাজ অভিব্যক্তিও এ ক্ষেত্রে লাগসই নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সিভিল সমাজের কোনো বাংলা প্রতিশব্দ না খুঁজে মূল ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করাই বাঞ্ছনীয়। টেবিল-চেয়ারের মতো বিদেশি শব্দ বাংলায় হরহামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই সিভিল শব্দটি বাংলা ভাষায় ব্যবহারে কোনো লজ্জার কারণ নেই। তবে যদি একান্তই বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে হয়, তবে সিভিল সমাজকে রাষ্ট্র, বাজার ও পরিবারবহির্ভূত সমাজ’রূপে বর্ণনা করা যেতে পারে।

২. সিভিল সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে তত্ত্ব

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘সিভিল সমাজ’-এর ভূমিকা সম্পর্কে প্রথমে বক্তব্য তুলে ধরেন হেগেল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিশ্লেষণে এর সার্থক প্রয়োগ করেন ফরাসি রাজনীতিবিদ ও ঐতিহাসিক অ্যালেক্সিস দ্য তোকভিল (Alexis de Tocqueville, 1805-59)। তিনি সরাসরি সিভিল সমাজ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেননি। তবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন। এসব সংগঠনই হচ্ছে সিভিল সোসাইটির মৌলিক উপাদান।

ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তোকভিল দুই বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। তিনি মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিভিত্তিক বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অন্তর্নিহিত শক্তি হচ্ছে সারা দেশে ছড়ানো স্থানীয় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলি। এসব সংগঠনই রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কেভিল মনে করেন যে ব্যক্তির অধিকার রক্ষার জন্য গণতন্ত্র যথেষ্ট নয়। অনেক সময় সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলির অধিকার হরণ করে। এই ধরনের পরিস্থিতিকে তিনি tyranny of the majority বা সংখ্যাগুরুর স্বেচ্ছাচার বলে অভিহিত করেছেন (ডোনাল্ড জে মালেজ, ২০০২)। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানগুলি এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তোকভিল তাই মনে করেন যে তৃণমূলে জনগণের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠন ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যাবে না।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে সিভিল সমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক আন্তনিও গ্রাশি (Antoneo Gramsci, 1891-1937)। তিনি ফ্যাসিস্ট কারাগারে বসে সাংকেতিক ভাষায় তাঁর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন। তাই তাঁর বক্তব্যের মধ্যে অনেক অস্পষ্টতা দেখা যায়। মোটা দাগে তিনি সমাজে দুটি সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন। একটি হলো hegemony বা আধিপত্য। আরেকটি হচ্ছে। domination বা বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ। আধিপত্য নাগরিকদের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সম্মতি সৃষ্টির কাজটি করে সিভিল সমাজ। আর বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র ও সিভিল সমাজ পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে আবার প্রতিদ্বন্দ্বীও হতে পারে। সমগ্রতাবাদী (totalitarian) রাষ্ট্র তাই সিভিল সমাজকে গ্রাস করতে চায়। আবার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সিভিল সমাজ রাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্রে শ্রমিকশ্রেণী রাষ্ট্রের বিপক্ষে সেসব ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করে। গ্রামশির মতবাদের সমর্থকেরা মনে করেন যে সিভিল সোসাইটিই রাষ্ট্র ও বাজারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

গ্রাম্‌শির বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে সিভিল সমাজ কখনো মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করে আবার কখনো সংঘাতের সৃষ্টি করে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সিভিল সমাজের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এক ঘরানার দার্শনিকেরা বলছেন যে সিভিল সমাজের ভূমিকা হচ্ছে সমাজে ঐকমত্য সৃষ্টি করা। প্রতিদ্বন্দ্বী ঘরানার দার্শনিকেরা বলছেন, সিভিল সমাজের কাজ হচ্ছে সংঘাতের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করা।

প্রথম ঘরানার প্রধান প্রবক্তা হলেন জারগান হাবেরমাস (Jurgen Habemas, জন্ম ১৯২৯)। সমাজবিজ্ঞানে তার একটি বড় অবদান হলো জনমত গঠনে গণক্ষেত্র বা public sphere-এর ভূমিকার বিশ্লেষণ। তাঁর মতে, গণক্ষেত্রে সিভিল সমাজের যে অংশ সক্রিয় রয়েছে তাদের মধ্যে যুক্তিবাদী ভাব-বিনিময় (communicative rationality) এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম-অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের (discourse ethics) ভিত্তিতে সমাজের মধ্যে ঐকমত্য (consensus) গড়ে ওঠে। সিভিল সমাজে যুক্তির ভিত্তিতে ঐকমত্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন যথোপযুক্ত কাঠামো।

হাবেরমাসের বিশ্লেষণে একটি আদর্শ ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার যোগাযোগ ক্ষীণ। সমাজের চালিকা শক্তি যুক্তি নয়, ক্ষমতা। সংবিধান ও আইনকানুন না মানলে এসব দলিল নিছক কাগজ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের স্বভাব পরিবর্তন করা যায় না।

মিশেল ফুঁকোর (Michel Foucault, 1926-84) বক্তব্য হলো : সমাজ ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না, সমাজের চালিকা শক্তি হলো সংঘাত। এই সংঘাত হচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। সাধারণত হাবেরমাসের মতো চিন্তাবিদেরা সংঘাতকে সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করে থাকে। এই ধরনের মতবাদ খণ্ডন করে ফুঁকোর সমর্থকেরা লিখছেন, ‘There is mounting evidence, however, that social conflicts produce themselves the valuable ties that hold modern democratic societies together and provide them with the strength and cohesion they need, that social conflicts are the true pillars of democratic society (Hirschman 1994, 206). Governments and societies that suppress conflict do so at their own peril. … In a Foucauldian interpretation, suppressing conflict is suppressing freedom, because the privilege to engage in conflict is part of freedom.’ (ক্রমবর্ধমান সাক্ষ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক সংঘাতগুলিই গণতন্ত্রকে একত্রে বেঁধে রাখার জন্য মূল্যবান বন্ধনগুলি সৃষ্টি করে, এরাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় শক্তি ও সংহতি জোগায়; এরাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আসল খুঁটি। যেসব সরকার ও সমাজ এসব সংঘাতকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করে। …ফুঁকোর ব্যাখ্যা অনুসারে সংঘাত দমন করতে গেলে স্বাধীনতাকে খর্ব করা হবে কারণ সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার অধিকার স্বাধীনতার অংশ। বেন্ট ফ্লাইবর্গ, ১৯৯৮, ২২৮-২৯)। সংঘাতকে অস্বীকার করে যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে তা কখনো টেকসই হয় না। জোর করে সংঘাত দমন করলে সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যা পরে আরও তীব্রতর আকারে ফিরে আসে।

তবে ফুকোর সিভিল সমাজতত্ত্বের একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। সিভিল সমাজে সংঘাত দুই ধরনের। একটি হলো সিভিল সমাজের সঙ্গে বাইরের সংঘাত। এ সংঘাত রাষ্ট্র ও সিভিল সমাজের মধ্যে চলে। এর ভালো দিক রয়েছে, কেননা সিভিল সমাজ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচার খর্বিত করে। আরেকটি সংঘাত হলো অভ্যন্তরীণ। এ সংঘাত চলে সিভিল সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে। প্রথম ধরনের সংঘাত সমাজে পরিবর্তনের অগ্রদূত। দ্বিতীয় ধরনের সংঘাত সিভিল সমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় করে। যদি সিভিল সমাজের মধ্যে বড় ধরনের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সংঘাতের মাধ্যমে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব হয় না।

সিভিল সমাজ সম্পর্কে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলির পর্যালোচনা করলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে সামাজিক পরিবেশ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতভেদে সিভিল সমাজের ভূমিকা ভিন্ন হয়। এখানে এক তত্ত্ব দিয়ে সব ধরনের সিভিল সমাজের বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।

বিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে সিভিল সমাজ নিয়ে নতুন আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের দুটি অঞ্চলে রাজনীতিতে সিভিল সমাজের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। একটি অঞ্চল হলো রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ। এখানে কমিউনিস্ট শাসন আমলে সব ধরনের রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড দমন করা হয়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা যখন এসব দেশে ভেঙে পড়ে তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। তাই এখানে সিভিল সমাজ রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে। দ্বিতীয়ত, ল্যাটিন আমেরিকার সেনাশাসিত দেশগুলির রাজনীতিতে সিভিল সমাজ অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এখানেও কারণ একই। এসব দেশে সেনাশাসন রাজনীতি নিষিদ্ধ করে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। গির্জা-সংগঠনগুলি সিভিল সমাজে অত্যন্ত সক্রিয়। তাই এসব দেশে সিভিল সমাজ রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়। উপরিউক্ত দুটি উদাহরণ থেকে দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশে বিরাজনীতিকরণের মাত্রা বেশি, সেসব দেশের রাজনীতিতে সিভিল সমাজের ভূমিকা তত ব্যাপক।

রাজনীতিতে সিভিল সমাজের ভূমিকা নিয়ে সিভিল সমাজ তত্ত্বের মধ্যেই একটি স্ববিরোধিতা রয়েছে। তত্ত্ব অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলি সিভিল সমাজের অংশ। পক্ষান্তরে, সিভিল সমাজের অবস্থান রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে। অথচ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল কি সিভিল সমাজের বাইরে, না ভেতরে? এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো সরকারের বাইরে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব অস্তিত্ব আছে কি না। যেসব দেশে দলপ্রধান ও সরকারপ্রধান সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি সেখানে দলের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে সরকারি দলও সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। তবে বাংলাদেশের মতো কোনো কোনো দেশে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের মধ্যে সব প্রভেদ তুলে দেওয়া হয়। এসব দেশে সরকারি দল সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত নয়। এ ধরনের সরকার গোটা সিভিল সমাজকে বিরোধী দল বলে গণ্য করে ও সিভিল সমাজকে অনুগত গৃহপালিত সংগঠনে পরিণত করতে চায়। সিভিল সমাজ মাথা তুলতে চাইলে তাকে দমন করতে এরা নির্মমভাবে খঙ্গহস্ত।

উন্নয়নশীল দেশে সিভিল সমাজের প্রবক্তারা অনেকেই তোকভিলের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। তাঁরা মনে করেন যে অগণতান্ত্রিক উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সিভিল সমাজের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিভিল সমাজ। ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য উদার হস্তে অর্থ বিনিয়োগ করছে। দাতাদের অর্থানুকূল্যে বিভিন্ন দেশে হরেক রকম সিভিল সমাজ সংগঠন গড়ে উঠছে। এরা দেশের মাটিতে গজায়নি। এদের বাইরে থেকে এনে দেশের মাটিতে প্রোথিত করা হয়েছে। স্টাইলস (২০০২ ক) এ ধরনের সিভিল সমাজের নাম দিয়েছেন ফরমায়েশি সিভিল সমাজ বা Civil society by design। এ ধরনের সিভিল সমাজের কর্মকাণ্ড তৃণমূলের মানুষেরা নিয়ন্ত্রণ করে না। এদের কর্মসূচি নির্ধারণ করে বিদেশি দাতারা। এ প্রসঙ্গে একটি ইংরেজি আপ্তবাক্য স্মরণ করা যেতে পারে : ‘He who pays the piper plays the tune.’ (বাঁশি কোন সুরে বাজবে সেটা নির্ভর করে বাঁশিওয়ালাকে যিনি বেতন দেন তার মর্জির ওপর)।

৩. বাংলাদেশে সিভিল সমাজ

বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। এনজিও বা বেসরকারি সংগঠনগুলি সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। তবে বাংলাদেশে অনেক ধরনের এনজিও রয়েছে। কোনো কোনো এনজিওর সদস্যসংখ্যা ১০০-এর কম। আবার ব্র্যাকের মতো এনজিও-ও রয়েছে, যার সদস্যসংখ্যা কয়েক লাখ এবং যা বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও হিসেবে পরিগণিত। ছোট ও বড় সিভিল সংগঠনকে একত্রে যোগ করে কোনো অর্থবহ তথ্য পেশ করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের (২০০৬) একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার এনজিও ছিল যার অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় (অনুমান করা হয়, হাজার বিশেক এনজিও সক্রিয়। এদের মধ্যে হাজার দুয়েক এনজিও বৈদেশিক সাহায্যের জন্য নিবন্ধনপ্রাপ্ত।)। বাংলাদেশে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ গ্রামে কমপক্ষে একটি এনজিওর উপস্থিতি রয়েছে। তাই শুধু এনজিওর সংখ্যার ভিত্তিতে এনজিওর গুরুত্ব বোঝানো যাবে না।

অন্যদিকে তত্ত্ব অনুসারে সমবায় সমিতিগুলি সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় পৌনে দুই লাখ সমবায় সমিতি আছে। সিভিল সমাজের তত্ত্ব অনুসারে সমবায় সমিতিগুলিকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠন হিসেবে সিভিল সমাজের সংগঠন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এ অনুমান বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও খাপ খায় না। বাংলাদেশে কমপক্ষে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সমবায় সমিতিগুলি সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত, সরকার কর্তৃক অর্থায়িত ও সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এরা কোনো অভিধাতেই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নয়, এগুলি সমবায় বিভাগের এক ধরনের শাখা। উপরন্তু, এদের বেশির ভাগ দেউলিয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। এদের সিভিল সমাজ সংগঠন হিসেবে গণ্য করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ফারহাত তাসনিম (২০০৭) তাঁর অভিসন্দর্ভে ২০০৭ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত সিভিল সংগঠনের সংখ্যা ২,৫৯,৭৭৬ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এই সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। তাসনিমের এই তালিকায় ১,৮৯,৮৪৭ সমবায় সমিতি অন্তর্ভুক্ত। সমবায় সমিতিগুলি বাদ দিলে সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা হবে প্রায় ৭০ হাজার। এই হিসাবের মধ্যে ৪৫ হাজার ৫০৮টি সমাজকল্যাণ সংগঠন রয়েছে, যার অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ দিলে বাংলাদেশে সিভিল সংগঠনের সংখ্যা বড়জোর হাজার পঞ্চাশ হতে পারে। তবে শুধু এই সংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনের বিস্তৃতি পরিমাপ করা যাবে না। এর ভেতর অনেক এনজিও রয়েছে যাদের শত শত শাখা রয়েছে। এনজিও-সংক্রান্ত সমীক্ষার ভিত্তিতে এ কথা স্পষ্ট, বাংলাদেশে শতভাগ শহরে ও কমপক্ষে ৯০ শতাংশ গ্রামে একটি সিভিল সমাজ সংগঠন রয়েছে।

সারণি ১০.১-এ ১০০ বছর ধরে বাংলাদেশে সিভিল সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা যাবে। এই সারণির উপাত্তগুলি ৫০৪টি প্রতিষ্ঠানের নমুনা জরিপের ভিত্তিতে সংগৃহীত হয়েছে।

সারণি ১০.১
বাংলাদেশে সিভিল সংগঠনগুলির প্রতিষ্ঠার সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ, ১৯১০-২০০৬
সময়মোট সিভিল সংগঠনের সংখ্যা১৯১০-২০০৬ সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মোট সংগঠনের শতাংশক্রমপুঞ্জীভূত শতাংশ
১৯১০-৩৪
১৯৩৫-৩৯০.২০.২
১৯৪০-৪৪০.২০.৪
১৯৪৫-৪৯০.৪০.৮
১৯৫০-৫৪১.০১.৮
১৯৫৫-৫৯১.৮
১৯৬০-৬৫১৫৩.০৪.৮
১৯৬৫-৬৯১০২.০৬.৮
১৯৭০-৭৫৩৮৭.৬১৪.৪
১৯৭৫-৮০৪০৮.০২২.৪
১৯৮০-৮৪৭০১৩.৮৩৬.২
১৯৮৫-৮৯৬৭১৩.৩৪৯.৫
১৯৯০-৯৫৫০৯.৯৫৯.৫
১৯৯৫-৯৯৯০১৭.৮৭৭.২
২০০০-২০০৬১১৫২২.৮১০০
সূত্র : ফারহাত তাসনিম (২০০৭, ১০৪)

সারণি ১০.১ থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের বেশি সিভিল সমাজ সংগঠনের জন্ম হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সময়কালে প্রায় ৪৩ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৫০ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠন ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়ে সিভিল সমাজ সংগঠনের বিস্তৃতির একটি বড় কারণ হলো, ১৯৯০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর সিভিল সমাজের ধারণা দাতাদের আনুকূল্য লাভ করে। ১৯৯০-এর দশকের আগেই বাংলাদেশে বেসরকারি সংগঠনগুলির প্রসার ঘটে। তবে ১৯৯০-এর পর বাংলাদেশে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলি নতুন ধরনের কার্যকলাপ শুরু করে। এ ধরনের কার্যকলাপ civic advocacy বা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবির সপক্ষে নাগরিক প্রচারণা নামে পরিচিত। কোনো কোনো সিভিল সমাজ সংগঠন অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে এ ধরনের কাজ শুরু করে। আবার কোনো কোনো সংগঠন নিজেদের শুধু প্রচারকাজেই নিয়োজিত রাখে। তবে এ ধরনের কাজের সঙ্গে বেসরকারি সংগঠনগুলি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের (২০০৬, ১৫) একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে এনজিওদের ৪২ শতাংশ তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করে এবং ৯৩ শতাংশ বেসরকারি সংগঠন তাদের সদস্যদের মধ্যে তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে চেতনা সৃষ্টির চেষ্টা করে। তবে এনজিওগুলি সব সময়ে ইচ্ছা করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছা না থাকলেও ঘটনাচক্রে এরা সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ প্রশিকা নামক সংগঠনটির অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে। পশু চিকিৎসকের অভাবে প্রশিকার গবাদি পশুপালন-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কর্মসূচি ব্যাহত হয়। পশু চিকিৎসায় সরকারি বিভাগের ছিল একচেটিয়া অধিকার। প্রশিকাকে পশু চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য বাধ্য হয়ে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবারে লিপ্ত হতে হয়।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে সিভিল সংগঠনগুলি বিভিন্ন দাবিদাওয়া উপস্থাপন করে রাজনৈতিক পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারীদের সংগঠন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কোনো কোনো সংগঠন বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে দক্ষতা। দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দুর্নীতির ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ, মানব অধিকারের ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফেমা বা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং গ্রুপ, সুশাসনের ক্ষেত্রে সুজন ও সুপ্র, পরিবেশের ক্ষেত্রে বেলা বা বাংলাদেশ পরিবেশ আইন সমিতি, বাপা বা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ইত্যাদি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম করা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। আবার সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (২০০৬-০৮) বিভিন্ন সংস্কারের দাবিদাওয়া নিয়ে এ ধরনের সংগঠনগুলি অত্যন্ত সোচ্চার ছিল।

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও কার্যকর এবং এদের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক। এই মূল্যায়নের কয়েকটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত সিভিল সমাজের ভূমিকা সব সময়ে কার্যকর নয়। যখন সমাজে বিরাজনীতিকরণ ঘটে বা স্বৈরাচারী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করে, তখন সিভিল সমাজের প্রাধান্য বেড়ে যায়। এর ফলে এরশাদ শাসনের শেষ দিকে ও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির প্রাধান্য বেড়ে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক সরকারের শাসনকালে তাদের ভূমিকা সীমিত থাকে, কেননা রাজনৈতিক দলগুলিই জনসমর্থন গড়ে তুলে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি তাদের ক্ষুদ্র গণ্ডির দাবিদাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। এদের অতি ক্ষুদ্র অংশ রাজনৈতিক দাবিদাওয়াতে আগ্রহী। সারণি ১০.২-এ সিভিল সমাজ সংগঠনের দাবিদাওয়া সম্পর্কে একটি সমীক্ষার ফলাফল দেখা যাবে।

সারণি ১০.২
সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির দাবিদাওয়ার বিশ্লেষণ
কোন ধরনের সিভিল সমাজ সংগঠন কত শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহী
দাবির বিষয়অর্থনৈতিকশিক্ষা ও সংস্কৃতিদাবি আদায়ের জন্য সংগঠনকল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য সংগঠনমোট
পল্লী উন্নয়ন২০.৭৬.১২৪.১১৬
নারীর ক্ষমতায়ন২৫১২.২১২.৫৫৪.৫৩১
স্থানীয় দাবিদাওয়া২০.৭৬.১২৫২৭.২১৮
শিক্ষা ও স্বাক্ষরতা৩২.৮৮১.৬৫০৬২.৫৪৪
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা৪৬.৬৫৭.১৫০৬৬.৫৪৬
আইনি, রাজনৈতিক ও মানব অধিকার১২.১২০.৪২৫২৮.৬১৭
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন৬৫.৫২৮.৬৩৭.৫৫৭.৬৪৪
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতা২৬.৭৩৬.৭৫০৪২.৯৩০
উৎস : ফারহাত তাসনিম (২০০৭, ১৫৬)

৫০০টি সিভিল সমাজ সংগঠনের একটি জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের মাত্র ১৭ শতাংশ সংগঠন আইনি, রাজনৈতিক ও মানব অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। অথচ ৪৬ শতাংশ সংগঠন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সেবা প্রদান করে। ৪৪ শতাংশ সংগঠন সদস্যদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করতে আগ্রহী। শিক্ষা ও সাক্ষরতা কর্মসূচিতে উৎসাহী ৪৪ শতাংশ সংগঠন। সারণি ১০.২ থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের সিভিল সমাজ সংগঠনের কাছে সদস্যদের রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা সবচেয়ে কম জনপ্রিয় কর্মকাণ্ড। কাজেই বাংলাদেশে সিভিল সমাজের প্রাণবন্ত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে যা বলা হয়, তা বহুলাংশে অতিকথন। এর একটি বড় কারণ হলো, বাংলাদেশে বেসরকারি সংগঠনগুলি অতি সতর্কতার সঙ্গে বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।

এক দিক থেকে এনজিও বা বেসরকারি সংগঠনগুলি বাংলাদেশে সিভিল সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। ২ কোটির বেশি নাগরিক এনজিওগুলির কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। আবার এনজিওগুলিই হচ্ছে বাংলাদেশের সিভিল। সমাজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বিশ্বব্যাংকের (২০০৬) এক সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে যে এনজিওগুলির ৯২ শতাংশ শাখার মূল কার্যক্রম হচ্ছে ঋণ প্রদান। এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঋণ কার্যক্রম। পরিচালনা করে টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা (ডেভিন, ২০০৩, ২২৭ ২৪২)। নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্য মহৎ। তবে এর একটি বড় অসুবিধা হলো, সফল ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যাবশ্যক। সিভিল সমাজের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে সমাজকে পরিবর্তন করা এবং প্রয়োজনে তাই সিভিল সমাজ দেশে অস্থিতিশীলতা। সৃষ্টিতে পিছপা হয় না। অথচ এনজিওগুলির জন্য এ ধরনের অস্থিতিশীলতা তাদের দাদন ব্যবসায়ের জন্য ক্ষতিকারক। উপরন্তু এনজিওগুলি সরকারের অর্থায়নে অনেক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সরকারের মন জুগিয়ে চলতে হয়। গত এক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেসব এনজিও সরকারের বিরাগভাজন হয় সরকার অত্যন্ত কঠোরভাবে তাদের দমন করে। এ প্রসঙ্গে প্রশিকা ও গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে। তাই বাংলাদেশে অধিকাংশ এনজিও সচেতন ও অচেতনভাবে স্থিতাবস্থার বড় রক্ষক হয়ে দাঁড়ায়। তাই এনজিওগুলির সিভিল সমাজের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ কি না, সে সম্পর্কে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে (স্টাইলস, ২০০২, ১৪১)।

সিভিল সমাজ শক্তি সঞ্চার করে নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে। বাংলাদেশের সিভিল সমাজ বিভক্ত ও অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত। এ প্রসঙ্গে স্টাইলস (২০০২, ১১০) যথার্থই লিখেছেন, ‘The degree of penetration of civil society by politicians is extreme … labor unions, professional associations, university groupings, chambers of commerce, and of course newspapers are identified primarily for their political affiliations… Advancement in most professions is based in large part upon signing oneself to the political leaning of one’s superior or joining the relevant association or coalition. Even NGOs have been the target of partisan co-optation… (সিভিল সমাজে রাজনীতিবিদদের অনুপ্রবেশের মাত্রা চরম ।…শ্রমিক ইউনিয়ন, পেশাজীবী সংগঠনগুলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন্দল, বণিক সমিতি ও সংবাদপত্রগুলি। সবকিছুই রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত…বেশির ভাগ পেশায় অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পছন্দের রাজনীতিতে অথবা। সংগঠনে বা মোর্চায় যোগদান…এমনকি এনজিওগুলিও দলে ঠাই খোঁজে।)। রাজনীতির ভিত্তিতে বিভক্ত সিভিল সমাজের পক্ষে পরিবর্তনের অর্থবহ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। হাবেরমাসের মতে, সিভিল সমাজ আইনের শাসনের পক্ষে ঐকমত্য গড়ে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতি বিচারব্যবস্থাকেও বিতর্কিত করে তুলেছে। এ ধরনের পরিবেশে হাবেরমাসের কল্পিত গণক্ষেত্রে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জনমত গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে অধিকাংশ সিভিল সমাজ সংগঠন একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তি ক্ষয় করছে। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদের শক্তি অত্যন্ত সীমিত। ৫০০ সিভিল সমাজ সংগঠনের জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, ৮৬ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ১ হাজারের কম। ৬৫ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ১০০-এরও কম (ফারহাত তাসনিম, ২০০৭, ১৪৩)। বড় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলি হচ্ছে এনজিও যারা দাবিদাওয়া আদায়ের চেয়ে দাদনের ব্যবসায়ে অধিকতর আগ্রহী। এই অবস্থাতে ক্ষুদ্র সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তনে নেতৃত্ব প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশের একটি বড় দুর্ভাগ্য হলো যে বাংলাদেশে সিভিল সমাজের পাশাপাশি ‘অ-সিভিল সমাজও (Uncivil society) অতি দ্রুত বেড়ে চলেছে। অ-সিভিল সমাজের মধ্যে রয়েছে মাস্তান, চাঁদাবাজসহ হরেক রকমের দুবৃত্ত। স্থানীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করার জন্য। মাস্তানরা বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্রযন্ত্র ও স্থানীয় রাজনীতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। এরা শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেই শোষণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে জোর খাঁটিয়ে ও ভয় দেখিয়ে এরা ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনৈতিক দলগুলি মাস্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বিপন্ন হয় গণতান্ত্রিক শাসন। তৃণমূল পর্যায়ে ‘অ-সিভিল সমাজ’ই হচ্ছে সিভিল সমাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। সম্প্রতি ছাত্রসংগঠনগুলিতে ব্যাপক দুবৃত্তায়নের ফলে সিভিল সমাজ আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একসময় ছাত্রসমাজের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। ছাত্রসংগঠনসমূহ। সিভিল সমাজের জন্য একটি বড় শক্তি হতে পারত। অথচ এখন। বাংলাদেশের অধিকাংশ ছাত্রসংগঠন দুবৃত্তদের আখড়ায় ও রাজনৈতিক দলসমূহের তল্পিবাহকে পর্যবসিত হয়েছে (ডেভিড লুইস, ২০১১)। ছাত্র সমাজের একটি বড় অংশ ‘অ-সিভিল’ সমাজের অশুভ শক্তিসমূহকে মদদ জোগাচ্ছে।

বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির আরেকটি দুর্বলতা হলো দুর্নীতির বিস্তার। তাসনিম (২০০৭, ২০২)) তাঁর অভিসন্দর্ভে নির্বাচিত তিন বছরে (২০০১, ২০০৬ ও ২০০৭) মোট ১৮ মাসে সিভিল সমাজ সংগঠন সম্পর্কে তিনটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের বিশ্লেষণ করেন। এই বিশ্লেষণে সিভিল সমাজ সংগঠনের অনিয়ম সম্পর্কে ১২২টি সংবাদ পাওয়া যায়। গড়ে প্রতি ১৪ দিনে একটি করে এনজিওর অনিয়ম সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ৬৯টি ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। সব ধরনের সিভিল সমাজ সংগঠনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে শ্রমিক সংগঠনের বিপক্ষে। দুর্নীতির অভিযোগের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিসংক্রান্ত সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি। দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সমবায় থেকে পেশা-গোষ্ঠীর সংগঠন–সব ধরনের সিভিল সমাজ সংগঠন সম্পর্কেই। অনেক সময় এ ধরনের সংগঠনগুলি প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁদের পরিবারের কুক্ষিগত। এসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কাজে সব সময় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র থাকে না। সামগ্রিকভাবে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির ভাবমূর্তি অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আশপাশের দুনিয়াকে বদলানোর আগে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির নিজেদের শোধরাতে হবে ।

৪. বাংলাদেশে সিভিল সমাজের সম্ভাবনা

বিগত আট দশকে বাংলাদেশে সিভিল সমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি আপাতবিরোধী প্রবণতা দেখা যায়। পাকিস্তানের শাসনআমলে সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু আইনজীবী, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের পেশাজীবী সংগঠনগুলি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি সারা দেশকে মুক্তির স্বপ্নে উত্তাল করেছিল। স্বাধীনতার পর সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে; তবে তাদের কার্যকারিতা ও উচ্ছ্বাস অনেক হ্রাস পেয়েছে। স্বাধীনতার আগে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির সম্পদ ছিল সীমিত। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিদেশি দাতাদের আনুকূল্যে অনেক সিভিল সমাজ সংগঠনই সচ্ছলতা অর্জন করেছে। তবে দাতাদের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। অনেক সংগঠনের কাছে স্থিতিশীল পরিবেশে দাদনের ব্যবসা বেশি লোভনীয় মনে হয়েছে। হালুয়া-রুটির লোভ সিভিল সমাজের দলীয়করণ ত্বরান্বিত করেছে। সিভিল সমাজ দুর্নীতির কবল থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি এক অর্থে ব্যতিক্রমধর্মী, যা সিভিল সমাজ সম্পর্কে কোনো তাত্ত্বিক আদলের সঙ্গে মোটেও মেলে না। বাংলাদেশে সিভিল সমাজের এত বেশি রাজনীতিকরণ ঘটেছে যে এরা প্রতিনিয়ত তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এদের পক্ষে সমাজে ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তোকভিলের সামাজিক পুঁজির মডেল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অচল। সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির সম্পর্ক এতই তিক্ত যে এ ধরনের সমাজে গণক্ষেত্রে বা public sphere-এ জনমত গঠন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে গ্রাশি ও ফুঁকো আশা প্রকাশ করেছিলেন যে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সিভিল সমাজ শক্তিধর রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে খর্ব করে ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করবে। প্রকৃতপক্ষে এ দেশে সিভিল সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।

সব দুর্বলতা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির কয়েকটি বড় অর্জন রয়েছে। সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এরা ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা সম্প্রসারণে অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছে। সামরিক শাসন আমলে এরা গণতন্ত্রের সমর্থনে জনমত গড়ে তুলেছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে সিভিল সমাজ শক্তিশালী হয়নি; দুর্বল হয়েছে। রাজনীতি সিভিল সমাজগুলিকে একে অপরের কাছ থেকে ও সমাজের মূল স্রোতোধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে এরা রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে রাজনৈতিক দলগুলিকে অগ্রহণীয় করে তুলছে। এদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এ অবস্থায় অনেকেই ভাবছেন যে সিভিল সমাজ বাংলাদেশে রাজনীতির বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে কি না। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিভিল সমাজকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার একটি সচেতন প্রয়াসও দেখা গিয়েছিল। তবে তা সফল হয়নি। তার একটি বড় কারণ হলো, সিভিল সমাজ ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে আর রাজনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় সংগঠনের বিকল্প হতে পারে। যেমন অনেক মোমবাতি একটি বড় প্রদীপের বিকল্প হতে পারে। কিন্তু সব সময় তা সম্ভব হয় না। বড় গাছ কাটার জন্য দরকার কুড়ালের। নরুন বা সুই দিয়ে কি কুড়ালের কাজ করা যাবে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা করা যাবে না। দলীয় ভিত্তিতে বিভক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি বাংলাদেশে রাজনীতিতে বিকল্প ধারার সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট নয়।

এই প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশে আদৌ কোনো সিভিল সমাজ আছে কি? অবশ্যই বাংলাদেশে অনেকগুলি সিভিল সমাজ সংগঠন রয়েছে। এরা অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতা (মহিলাদের অধিকার) সৃষ্টিতে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছে। তবে সিভিল সমাজ সংগঠন থাকলেই সিভিল সমাজ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সিভিল সমাজের উপস্থিতির একটি বড় শর্ত হলো, সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার জন্য একটি কাঠামো থাকতে হবে যেখানে সর্বনিম্ন কিছু বিষয়ে ঐকমত্য থাকবে। বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের কাঠামোর অনুপস্থিতি সুস্পষ্ট। এমনকি সব এনজিও মিলে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এডাব (অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ) নামে এনজিওগুলি যে জাতীয় সংগঠনটি ছিল তা-ও ভেঙে গেছে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন কারমেন মালেনা ও ভলকার্ট ফন হেনরিখ (২০০৭, ৩৪৯-৬০)। তাঁদের বক্তব্য হলো, পৃথিবীর সব দেশেই সিভিল সমাজ রয়েছে–এ ধরনের অনুমান করা ঠিক হবে না। তারা লিখেছেন, ‘In every country there exists actors, organizations and activities that meet the defined criteria of civil society. In some cases, however, the concept of civil socirty had little resonance. Actors see themselves belonging to a particular organization, sector or movement, but have no sense of belonging to civil society per se.’ (প্রতিটি দেশেই এমন ধরনের কুশীলব, সংগঠন ও কার্যাবলি রয়েছে যা সিভিল সমাজের জন্য নির্ধারিত শর্তগুলি পূরণ করে, তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ ধারণার ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কুশীলবরা নিজেদের বিশেষ প্রতিষ্ঠান, খাত বা আন্দোলনের প্রতি অনুগত মনে করে। যদিও এমনিতে তাদের সিভিল সমাজে অংশীদারির কোনো চেতনা নেই।)। যেখানে সংগঠনগুলির সিভিল সমাজ ধারণার প্রতি আনুগত্য নেই, সেখানে সিভিল সমাজ একটি আদর্শ মাত্র, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না। এসব ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ বাস্তবতার সন্ধানে একটি ধারণার (a concept in search of reality) রূপ ধারণ করে।

বাংলাদেশে সিভিল সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা সীমিত হলেও বিগত শতকের ষষ্ঠ থেকে নবম দশক পর্যন্ত কার্যকর সিভিল সমাজ ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে বাংলাদেশে সিভিল সমাজের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে, অথচ সিভিল সমাজের সংহতি ও চেতনার দ্রুত হ্রাস ঘটেছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অনেক সিভিল সমাজ সংগঠন আছে। তবে কার্যকর সিভিল সমাজ আছে কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে।

স্পষ্টতই বাংলাদেশে সিভিল সমাজ যে প্রত্যাশা জাগিয়েছে তা পূরণ করতে এই সমাজ সমর্থ নয়। এতে হতাশ হওয়া ঠিক হবে না। সিভিল সমাজ অকার্যকর হলেও অনেক সিভিল সমাজ সংগঠন নতুন চেতনা জাগিয়েছে ও নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। সিভিল সমাজ সংগঠনের দায়িত্ব স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সব সময় সম্ভব হবে না। যত দিন সমাজে ব্যক্তির অধিকার ও সৃজনশীলতা বিপন্ন হবে, তত দিন সিভিল সমাজের ধারণা মানুষকে বারবার আকৃষ্ট করবে। মাইকেল এডোয়ার্ডস যথার্থই F163699, ‘It remains compelling because it speaks to the best in us–the collective, creative and values-driven core of the active citizen–calling on the best in us to respond in kind to create societies that are just, true and free.’ (সিভিল সমাজের ধারণা, আমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম এবং নাগরিকদের মধ্যে সৃজনশীল, মূল্যবোধ-তাড়িত ও যৌথ চেতনায় উদ্বুদ্ধ তাদের কাছে অপ্রতিরোধ্য থেকে যাবে এবং আমাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ তাদের ন্যায়, সত্য ও স্বাধীনতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে উদ্দীপ্ত করবে)। লাভ-লোকসানের প্রত্যাশায় নয়, মানুষের অন্তরের তাগিদই তাদের সিভিল সমাজে টেনে আনবে। এ ধরনের মানুষদের কথা স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে।’

উল্লেখিত রচনাবলি (Works Cited)

  • ইলিয়ট, ক্যারোলিন এম (Carolyn M. Elliot)। ২০০৩। Civil Society and Democracy: A Reader. New Delhi: Oxford University Press.
  • এডোয়ার্ডস, মাইকেল (Edwards, Michael). ২০১১। Civil Society, http:/www.infed.org/association/civil_society.htm.
  • কোহেন, জিন এল এবং অ্যান্ড্রু আরাতু (Jean L. Cohen and Andrew Arato)। ১৯৯৭। Civil Society and Political Theory. Cambridge: MIT Press.
  • চন্দক, নীরা (Chandoke, Neera)। ২০০৭। Civil Society, Development in Practice. Vol. 17. No 4/5 (August 2007), 607-614.
  • ডেভিন, জোসেফ (Devine, Joseph)। ২০০৩। The Paradox of Sustainability: Reflections on NGOs in Bangladesh’. Annals of the American Academy of Political and Social Science. Vol. 590 (November, 2003), 227-242.
  • তাসনিম, ফারহাত (Tasnim, Farhat)। ২০০৭। Civil Society in Bangladesh: Vibrant but not vigilant. Unpublished Ph.D. dissertation submitted to University of Tsukuba, Japan.
  • ফ্লাইবর্গ, বেন্ট (Flyvbjerg, Bent) ১৯৯৮। Habermas and Foucault : Thinkers for Civil Society’. The British Journal of Sociology. Vol. 49. No. 2 (lune 1998), 210-233.
  • বিশ্বব্যাংক (World Bank) ২০০৬। Economics and Governance of NonGovernmental Organizations in Bangladesh. Bangladesh Development Series. Dhaka: World Bank.
  • মালেজ, ডোনাল্ড জে. (Maletz, Donald J.) । 2002 । ‘Tocqueville’s Tzranny of the Majority Reconsidered’. The Journal of Politics. Vol. 64. No. 2 (August, 2002), 741-763.
  • মালেনা, কারমেন ও ভলকার্ট ফন হেনরিখ (Malena, Carmen and Volkhart Finn Heineich) । 2009 । ‘Civil Society: a proposed methodology for International Comparative Research’. Development in Perspective. Vol. 17 No. 3 (June, 2007), 338-352.
  • লুইস, ডেভিড (Lewis, David) 2008 Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society. New Delhi: Cambridge University Press.
  • স্টাইলস, কেন্ডাল ডাবলু (Stiles, Kendall w)। ২০০২ ক। Civil Society by Design. Westpor: Connectiut: Praegar. — । ২০০২। খ ‘International Support for NGOs in Bangladesh: Some unintended consequences’. World Development . Vol. 30. No. 5. (2002), 835-846
  • স্মিথ, অ্যাডাম (Smith, Adam) I 2000 (পুনর্মুদ্রন)। The Wealth of Nations. New York: Bantam Dell.