Author: তাহের আলমাহদী

  • সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি

    সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি

    সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি
    অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তথ্যের ভূমিকা

    সুবলচন্দ্র মিত্র তাঁর সরল বাঙ্গালা অভিধান-এ সুকতলা শব্দটির নিম্নরূপ সংজ্ঞা দিয়েছেন : ‘জুতার ভিতরে তলার উপরকার চামড়াবিশেষ’। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জর্জ স্টিগলারের (১৯৬১, ১৯৮২) কল্যাণে পাদুকার অন্তর্দেশ থেকে সুকতলা অর্থনীতির তত্ত্বের জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। স্টিগলার নিজে সুকতলা বা shoe-leather শব্দটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু সমঝদাররা অধ্যাপক স্টিগলার কর্তৃক উদ্ভাবিত তথ্যের অর্থনীতির নাম দিয়েছেন সুকতলার অর্থনীতি।

    ১. সুকতলার অর্থনীতি

    প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির একটি অপরিহার্য পূর্ব-অনুমান এই যে ক্রেতা কোনো খরচা ছাড়াই বাজারের সব পণ্য সম্পর্কে সব তথ্য জানে। এর ফলে কোনো বিক্রেতা বাজারের সর্বনিম্ন দামের চেয়ে বেশি দাম হাঁকলে ক্রেতারা সটকে পড়বে। অর্থনৈতিক তত্ত্ব তাই ভবিষ্যদ্বাণী করে যে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্য সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হবে। অর্থনীতির ভাষায় বাজারে বিদ্যমান এ দামকে বলে সমস্থিতি (equilibrium) মূল্য। তত্ত্ব বলছে, সব বিক্রেতা একই সমস্থিতি মূল্যে পণ্য বিক্রয় করবে । অথচ এ বিষয়ে তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোনো মিল নেই। একই মানের সমরূপ নাইকির জুতো বা অ্যাডিডাস ব্রান্ডের টি-শার্ট বা লিভাই কোম্পানির জিন্স ভিন্ন ভিন্ন দোকানে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হয়। একই পণ্যের দাম সব দোকানে এক হয় না। ক্রেতারা এ কথা জানে। তবু বেশি দামে সমরূপ পণ্য বিক্রিতে কোনো অসুবিধা হয় না।

    প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একই পণ্যের দামের ভিন্নতা গতানুগতিক অর্থনৈতিক তত্ত্বের জন্য একটি প্রহেলিকা। স্টিলার (১৯৬১, ১৯৮২) হচ্ছেন প্রথম অর্থনীতিবিদ, যিনি এই প্রহেলিকার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, পণ্যের মূল্যের দুটো উপাদান রয়েছে। একটি হলো সমস্থিতি মূল্য; অপরটি হলো পণ্যটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ব্যয়। দেখা যায়, একই পণ্য ঢাকার গুলশানের দোকানপাটের তুলনায় বঙ্গবাজারে অনেক কম দামে বেচা হয়। অথচ গুলশান বাজারে বেশি দাম দিয়ে একই পণ্য কেনার লোকের অভাব নেই। এর কারণ হলো, কোথায় একই পণ্য কম দামে পাওয়া যায়। তা জানতে হলে অনুসন্ধান করতে হবে। দাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হলে দোকান থেকে দোকানে হেঁটে খোঁজ নিতে হবে। এই ধরনের অনুসন্ধান করতে গিয়ে জুতার সুকতলা ক্ষয় হয়ে যাবে। ফলে জুতা বেশি দিন টিকবে না। নতুন জুতা কেনার জন্য বাড়তি খরচ হবে। তবে কম দামে পণ্য বা সেবা কেনার বাড়তি খেসারত শুধু জুতা কেনার জন্য দিলেই চলবে না। অনুসন্ধান করার জন্য সময়ের প্রয়োজন। যাদের আয় বেশি তাদের সময়ের দামও বেশি। তাই তারা সস্তা পণ্যের খোঁজে সময় নষ্ট না করে বেশি দামে পণ্য বা সেবা কিনে অবসরে অতিরিক্ত সময় কাটাতে পছন্দ করেন। যাদের আয় কম তাদের সময়ের দামও কম। তাই তাঁরা অল্প কম দামে জিনিস কেনার জন্য অনেক সময় ব্যয় করতে দ্বিধা বোধ করেন না। তারা অনেক দূরের বাজারে সস্তা পণ্য কেনার জন্য হেঁটে যাবেন, দোকান থেকে দোকানে খুঁজবেন এবং যত সময়ই লাগুক না কেন সবচেয়ে সস্তা দামে জিনিসটি কিনবেন। মূল্য ও পণ্যের মান সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য যে বাড়তি খরচ এবং শারীরিক ও মানসিক কষ্ট করতে হয়, অর্থনীতিবিদেরা তারই নাম দিয়েছেন সুকতলার ব্যয় (shoe-leather cost)।

    অনেকে আশা করেছিলেন যে ইন্টারনেটের নাটকীয় সম্প্রসারণের ফলে বাজারে না ঘুরেও অতি সহজে ক্রেতারা ইন্টারনেট থেকে দাম সম্পর্কে সব তথ্য পেয়ে যাবে। তাই ক্রেতারা বেশি দামে কোনো জিনিস কিনবে না এবং এর ফলে বাজারে একই পণ্যের বিক্রেতাদের মধ্যে দামের ফারাক কমে যাবে। বাস্তব জীবনে তা-ও ঘটেনি। এর একটি বড় কারণ হলো যে, সব ক্রেতা বাজার সম্পর্কে সমান ওয়াকিবহাল নন। ফলে বাজারে পণ্যের দামে তারতম্য থেকে যায়। মাইকেল আর বে, জন মরগান ও পেট্রিক শেল্টনের (২০০৬) একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে ১৯০১ থেকে ২০০৫ সময় কালে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাজারেই একই পণ্য এক দামে বেচা হয়নি। অর্থাৎ বিক্রেতাভেদে মূল্যের ফারাক হ্রাসের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।

    তথ্য-অর্থনীতি সম্পর্কে গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনীতিবিদেরা আশা করেছিলেন যে সুকতলা ক্ষয় (সময়সহ অনুসন্ধানের আনুষঙ্গিক ব্যয়) সম্পর্কে তথ্য জানা গেলে বাজারের দাম সম্পর্কে কোনো রহস্য থাকবে না। যেহেতু ক্রেতাভেদে সুকতলা ব্যয় ভিন্ন হয়। সুকতলার ব্যয়ের তারতম্যের জন্য বাজারে একই পণ্য ভিন্ন দামে বিক্রি হতে পারে।

    কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়ল। ক্রেতা ও বিক্রেতা কখনো সব তথ্য জানে না। দেখা গেল যে, অনেক ক্ষেত্রেই বিক্রেতারা যা জানে ক্রেতারা কখনো তা জানে না, আর ক্রেতাদের অনেক গুমর বিক্রেতাদের কাছে অজানা থেকে যায়। অর্থনীতিবিদেরা এ পরিস্থিতির নাম দিয়েছেন information asymmetry বা অপ্রতিসম তথ্য। যেখানে তথ্য সম্পর্কে উভয় পক্ষের (যথা ক্রেতা-বিক্রেতার) জ্ঞান সমান নয়, সেখানেই তথ্যের অপ্রতিসাম্য দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে যিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি কুক্ষিগত করবেন তিনিই বাজারে ফায়দা লুটবেন। বাজার-অর্থনীতিতে তথ্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাই স্টিভেন ডি লেভিট ও স্টিফেন জে ডুবনার (২০০৫, ৬৭) লিখেছেন, ‘Information is a beacon, a cudgel, an olive branch, a deterrent, depending on who wields it and how. Information is so powerful that the assumption of information even if the information does not actually exist, can have a sobering effect.’ বাজারে তথ্যের বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে। তথ্য কখনো পণ্য ও মূল্য সম্পর্কে সংকেত (beacon) হিসেবে কাজ করে। আবার তথ্য কখনো লাঠালাঠি বা দর-কষাকষির অস্ত্র (cudgel)। তথ্য কখনো কখনো ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসন করে (olive branch)। আবার তথ্যই হচ্ছে বাজারে এক পক্ষের প্রাধান্যের প্রতিরোধক (deterrent)। বাজারে তথ্যের কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে কার কাছে তথ্য রয়েছে এবং সে কীভাবে তা প্রয়োগ করছে। তথ্য এত শক্তিশালী যে তথ্য না থাকলেও তথ্য সম্পর্কে অনুমানও বাজারে হিতকর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

    অর্থনীতির বিভিন্ন কুশীলবের ক্ষেত্রে তথ্যের অপ্রতিসাম্যের প্রভাব তুলে ধরেছেন তিনজন মার্কিন অর্থনীতিবিদ। এঁরা তিনজনই অর্থনীতিতে অবদানের জন্য ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এরা হলেন জর্জ একারলফ (George Akerlof), মাইকেল স্পেন্স (Michael Spence) এবং জোসেফ ই স্টিগলিজ (Joseph E. Stiglitz)।

    জর্জ একারলফ (২০০১) একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বাজারে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে অপ্রতিসম তথ্যের প্রভাব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, তথ্যের অপ্রতিসাম্যের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় পুরোনো গাড়ির বাজারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুরোনো গাড়িকে লেমন’ বা লেবু বলা হয়ে থাকে। পুরোনো গাড়িকে লেবু বলার দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, লেবু হচ্ছে একটি সস্তা ফল, যা নেহাতই তুচ্ছ। সমাজের যাচ্ছেতাই লোকদের বা নিম্ন বর্গের নাগরিকদেরও তাই লেবু বলা হয়ে থাকে। কাজেই বাজে মাল অর্থে পুরোনো গাড়িকে লেবু বলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, লেবু টক এবং লেবু খেলে অনেকক্ষণ মুখে বিস্বাদ থেকে যায়। পুরোনো গাড়ি কিনলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঠকতে হয় এবং এই তিক্ততা ক্রেতার মনে অনেক দিন থাকে। যে কারণেই হোক, ক্রেতারা পুরোনো গাড়ি কেনাকে লেবুর মতো অপ্রিয় মনে করে।

    পুরোনো গাড়ির কোনো সমস্যা আছে কি না এবং থাকলে সমস্যার প্রকৃতি কী তা শুধু বিক্রেতাই জানে। কিন্তু ক্রেতা এ সম্পর্কে অন্ধকারে। তথ্যের অভাবে ক্রেতার পক্ষে এ বাজারে তার জন্য সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। এখানে বাজার অনুপস্থিত বা বিকৃত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, পুরোনো গাড়ির বাজার-অর্থনীতির একটি প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন সমস্যা। এ ধরনের মূল্যায়ন মোটেও সঠিক নয়। টিম হারফোর্ড (Tim Harford, ২০০৬, ১১৩) যথার্থই লিখেছেন, ‘What Akerlof described is not a market where some people get ripped off; it is much more serious than that. He described a market that should exist and simply doesn’t because of the corrosive force of inside information.’ (একারলফ এমন একটি বাজারের কথা বলছেন না, যেখানে কোনো কোনো ক্রেতা প্রতারিত হয়; যদিও বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন একটি বাজারের কথা বলছেন, যার অস্তিত্ব থাকা উচিত; কিন্তু ভেতরের লোকদের গোপন তথ্য অপব্যবহারের ক্ষয়কারী প্রভাবের ফলে এ বাজার একেবারেই অনুপস্থিত)।

    আসলে এটি হচ্ছে একটি ব্যাপক সমস্যা। অপ্রতিসম তথ্যের প্রভাব বাজারে বিভিন্ন আকারে দেখা যায়। নিচে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো :

    • বিমার বাজারে প্রভাব : যথেষ্ট তথ্যের অভাবে ক্রেতারা বিমা কোম্পানিকে প্রতারণা করতে পারে।
    • ব্যাংক ব্যবসাতে প্রভাব : আমানতকারীরা ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞানের জন্য আমানত হারাতে পারে অথবা তথ্যের অভাবে অযোগ্য ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দিয়ে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
    • শ্রমবাজারে প্রভাব : নিয়োগকারী চাকরিপ্রার্থীর উপযুক্ততা সম্পর্কে বা শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে যথেষ্ট জানে না। তাই অনুপযুক্ত লোক নিয়োগ দিয়ে ঠকার সম্ভাবনা আছে।
    • ভাগ চাষের ওপর প্রভাব : ভালো ভাগচাষি নির্বাচিত হলে বেশি ফিরতি পাওয়া যায় অথচ অপ্রতুল তথ্যের কারণে উপযুক্ত ভাগচাষি নির্বাচন সম্ভব হয় না। অপ্রতুল তথ্যের ভিত্তিতে সব চুক্তির ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
    • সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব : সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ঋণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উন্নয়নশীল দেশে অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে ঋণের কার্যকর বাজার নেই বা বাজার অনেক দুর্বল। কাজেই এসব ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক সমাধান কাজ করে না। তবে তথ্য না থাকলে বাজার সব সময় একেবারে অকার্যকরও হয়ে যায় না; বাজারের কার্যকারিতা কমে যায়।

    অপ্রতিসম তথ্যের ক্ষেত্রে দুভাবে বাজার কাজ করতে পারে। একটি পদ্ধতি হলো, যাদের কাছে তথ্য রয়েছে তারা যাদের কাছে তথ্য নেই তাদের সংকেত দিয়ে বাজারে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। এই পদ্ধতি মাইকেল স্পেন্সের (২০০১) সংকেত (signaling) তত্ত্ব নামে পরিচিত। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, বাজারে যাদের কাছে তথ্য আছে তারা, যাদের কাছে তথ্য নেই তাদের তথ্য দিয়ে প্রণোদনা (incentive) সৃষ্টি করতে পারে। এ দ্বিতীয় পদ্ধতির প্রধান প্রবক্তা হলেন জোসেফ ই স্টিগলিজ।

    স্পেন্সের সংকেত-তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য পুরোনো গাড়ির বাজারের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, বাজারে লক্কড় গাড়ি কিনে বারবার ঠকে গিয়ে ক্রেতারা পুরোনো গাড়ি কেনা বন্ধ করে দিল। এ অবস্থায় পুরোনো গাড়ি বেচতে হলে বাজারে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে হবে। ক্রেতাদের আশ্বাস দিতে হবে, তাদের ঠকানো হবে না। এবং তাদের সব সঠিক তথ্য জানানো হবে। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতারা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তবে শুধু বিজ্ঞাপন ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে। তাই বিক্রেতারা শহরের নামীদামি এলাকায় বাহারি শো-রুম বা বিক্রয়কেন্দ্র খুলতে পারে। এতে ক্রেতারা ভাববে, যে প্রতিষ্ঠান এত পয়সা খরচ করে চটকদার দোকান সাজিয়েছে সে দু-চারটি বাজে গাড়ি গছিয়ে সটকে পড়বে না। যদি প্রতিষ্ঠানটি তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তার আর ক্রেতার অভাব থাকে না। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর জন্য সময় লাগতে পারে। তেমনি শ্রমবাজারে যেসব শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী সহজে চাকরি পেতে চায়, তারা সর্বোচ্চ মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে নিয়োগকর্তাকে তার যোগ্যতা সম্পর্কে সংকেত প্রদান করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে শিক্ষা উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, শিক্ষা ব্যক্তির সহজাত (inherent) গুণাবলি সম্পর্কে সংকেত প্রদান করে ।

    স্পেন্সের তত্ত্ব অনুসারে যাদের কাছে তথ্য রয়েছে তারা নিজেরাই বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে অন্য পক্ষকে তথ্য জানিয়ে সংকেত প্রদান করে। স্টিগলিজ (২০০১) বলছেন যে যাদের কাছে তথ্য নেই, তারা, যাদের কাছে তথ্য রয়েছে তাদের সঠিক তথ্য প্রদানের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ চিকিৎসা-বিমার সমস্যা বিবেচনা করা যেতে পারে। যারা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত তাদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ধরনের রোগীদের সংখ্যা কমাতে পারলে বিমার খরচ খুবই কমে যাবে। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধিতে কারা আক্রান্ত তা শুধু রোগীরাই জানে। তারা বিমা কোম্পানির ডাক্তারদের কাছে তাদের রোগ লুকিয়ে রাখে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের বাদ না দিতে পারলে বিমার প্রিমিয়াম এত বেড়ে যাবে যে অপেক্ষাকৃত সুস্থ-সবল ব্যক্তিরা বিমার জন্য এত চড়া দাম দিতে চাইবে না। এতে প্রিমিয়ামের হার আরও বেড়ে যাবে এবং বিমা ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হবে। এর একটি সমাধান হতে পারে, চিকিৎসা ব্যয় বিমা কোম্পানি ও বিমা-গ্রহীতার মধ্যে ভাগাভাগি করা। স্বল্প চিকিৎসা-ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিমা কোম্পানি উচ্চ হারে ব্যয় বহন করবে। চিকিৎসা-ব্যয় বেশি হলে রোগীর হিস্‌সা বাড়বে। এ ক্ষেত্রে যাদের দুরারোগ্য ব্যাধি রয়েছে তাদের খরচ বেশি হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিরুৎসাহিত করা যাবে। এ সমস্যাকে বিরূপ নির্বাচন (adverse selection) বলা হয়ে থাকে। তথ্যের অপ্রতুলতার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকদের সবচেয়ে কম দামে বিমা-সুবিধা প্রদান হচ্ছে বিরূপ নির্বাচন। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকির ভিত্তিতে প্রিমিয়ামের তারতম্য করে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। প্রিমিয়ামের হারের তারতম্য করে বিমা কোম্পানি গ্রাহকদের তথ্য প্রদানে উৎসাহিত করতে পারে।

    মাইকেল স্পেন্স ও জোসেফ স্টিগলিজ প্রমাণ করেছেন যে তথ্যের অভাব সত্ত্বেও বাজার কাজ করে। তবে তার অর্থ এই নয় যে বাজার পরিপূর্ণরূপে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, বিমা বাজারে নৈতিক ঝুঁকির (moral hazard) সমস্যা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিমার উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি হ্রাস করা। কিন্তু বিমার ফলে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়ে যায়। গাড়ির চালকেরা বিমা না থাকলে সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালায়। বিমা থাকলে তারাই বেপরোয়া গাড়ি চালায় আর মনে মনে ভাবে যে দুর্ঘটনা হলে খেসারত দেবে বিমা কোম্পানি। এ ধরনের মনোভাব থাকলে বিমা-ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করবে না।

    তাত্ত্বিক দিক থেকে তথ্য-অর্থনীতি কতগুলি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। প্রথমত, অনুমান করা হতো যে অপ্রতুল তথ্যের ফলে বাজারে লেনদেন খরচ বাড়ে। অপরিপূর্ণ তথ্য সত্ত্বেও বাজারের অদৃশ্য হাত ঠিকই কাজ করে। তবে স্টিগলিজ মনে করেন যে তথ্যের অভাবে বাজারে অ্যাডাম স্মিথের কল্পিত অদৃশ্য হাতের অস্তিত্ব নেই কিংবা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাতের মতো অসার। তথ্য-অর্থনীতি শুধু সুকতলার খরচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক খরচ করেও অনেক সময় তথ্য পাওয়া যায় না। তথ্য ছাড়া বা অপূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতে অনেক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। বাজারের সঙ্গে তাই সব সময় বাস্তবতার যোগাযোগ থাকে না। চাহিদা ও জোগান বাজারের বড় নিয়ামক হলেও একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়। তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে বাজার গড়ে না উঠলে চাহিদা আর জোগানের সমস্থিতির প্রশ্নই ওঠে না। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের সমস্যা কত ব্যাপক? এ সম্পর্কে স্টিগলিজের (২০০১, ৪৮৬) জবাব নিম্নরূপ : ‘Perhaps most importantly, under the standard paradigm, markets are Pareto-efficient, except when there one of a limited number of market failures occurs. Under the imperfect information paradigm, markets are almost never Pareto-efficient.’ (হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রচলিত তাত্ত্বিক কাঠামোতে বাজার সব সময়ই (অর্থনীতিবিদ) প্যারেটোর নিরিখে সবচেয়ে দক্ষ। শুধু কালেভদ্রে বাজার ব্যর্থ হলে এটি ঘটে না। অপূর্ণাঙ্গ তথ্যের তাত্ত্বিক কাঠামোতে, বাজার প্রায় কখনোই প্যারেটোর নিরিখে দক্ষ নয়।) অপূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক বাজারে তাই সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতা কার্যকর হয় না।

    দ্বিতীয়ত, তথ্য-অর্থনীতির প্রবক্তারা বাজার-মৌলবাদীদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। তারা এ কথা মানতে রাজি যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের ব্যাপক ব্যর্থতা থাকতে পারে। তবে সরকার ব্যর্থ হলেই বাজার সফল হবে, এর নিশ্চয়তা নেই। তাই তথ্য-অর্থনীতি ঘরানার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বাজারভিত্তিক সমাধানগুলি উন্নয়নশীল দেশসমূহে কাজ করবে না; কারণ, এসব দেশে অনেক ক্ষেত্রে বাজার নেই এবং অনেক ক্ষেত্রে বাজার থাকলেও তা অত্যন্ত দুর্বল। এর ফলে বহুজাতিক দাতা সংস্থাগুলির দাওয়াই উন্নয়নশীল দেশগুলির সমস্যার সমাধান করেনি বরং তাকে জটিল করেছে। এসব দাওয়াই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মন্দাকে তীব্রতর করে কোটি কোটি মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়। বাজারভিত্তিক সমাধান দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারের হিড়িক থামানোর জন্য স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও সুদের হার বাড়ানোর পরামর্শ দেয়। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে বড় বড় কলকারখানা দেউলিয়া হয়ে যায়। অভূতপূর্ব বেকার সমস্যা ও মূল্যস্ফীতি এমন আতঙ্কের সৃষ্টি করে যে বৈদেশিক বিনিয়োগ দ্রুত পালিয়ে যায়। একই ধরনের ধারণা রাশিয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। বলা হয় যে সমাজতন্ত্রের শৃঙখল রাশিয়ার অর্থনীতিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সব প্রতিষ্ঠানকে চটজলদি বিরাষ্ট্রীয়করণ করা গেলেই উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটি ঘটল; রাশিয়াতে দারিদ্র্যের হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেল আর বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে বেশির ভাগ কলকারখানা চলে গেল মাস্তানদের দখলে। এর প্রধান কারণ হলো বাজার না থাকলে বা বাজার দুর্বল হলে বাজারভিত্তিক সমাধান উপকার করে না, বরং অপকার করে।

    প্রশ্ন ওঠে, এত সব দুর্বলতা সত্ত্বেও মূলধারার অর্থনীতির বিশ্লেষণ এখনো চাহিদা আর জোগানের সূত্রের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে আছে কেন? নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতিকে কেন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে না? এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সব ধরনের বাজারে তথ্যের অপ্রতুলতা বা অপ্রতিসাম্য একই ধরনের নয়। যেমন ধরুন, মাছের বাজারে বা চালের বাজারে যে তথ্য পাওয়া যায় তা চাহিদা-জোগানভিত্তিক বিশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট। তাই গতানুগতিক অর্থনীতিক বিশ্লেষণ পুরোপুরি বাতিলের দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, যেসব বাজারে তথ্যের অপূর্ণাঙ্গতার মাত্রা কম, সেখানেও গতানুগতিক পদ্ধতি কাজ করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, গতানুগতিক পদ্ধতি শ্রম, বিমা, অর্থ ও মুদ্রার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজারের জন্য লাগসই নয়।

    স্টিগলিজের (২০০১, ৫২৪) মতে, অর্থনীতির মূল ধারাতে নব্য ধ্রুপদি বিশ্লেষণ টিকে থাকার একটি বড় কারণ হলো, এই ধরনের ব্যাখ্যা কায়েমি স্বার্থবাদীদের মদদ জোগায়। স্বচ্ছতা কায়েমি গোষ্ঠীগুলির মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। করপোরেশনগুলির ব্যবস্থাপকেরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে তাদের দুষ্কর্ম ঢেকে রাখার জন্য অবগুণ্ঠন সৃষ্টি করে। যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে মন্দা দেখা দেয় তখন শিল্পোন্নত দেশগুলি অর্থনীতিতে স্বচ্ছতার জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠে। কিন্তু নিজেদের দেশে যখন মন্দা দেখা দেয় তখন অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে। সব ধরনের তথ্যের ক্ষেত্রে সবার সমান প্রবেশাধিকার না থাকলে অনেক সময় বাজার গড়ে ওঠে না বা কার্যকরভাবে কাজ করে না। তবে এ প্রক্রিয়া কাজ করে নীরবে।

    ২. অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্যক্তির ভূমিকা

    অর্থনীতিতে ব্যক্তির অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা রয়েছে। বাজার তাঁকে সন্তুষ্ট না করলে তিনি বিশেষ বাজার থেকে বের হতে পারেন। তিনি বাজারে লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। আবার তিনি তাঁর মুনাফা বাড়ানোর জন্য জুতার সুকতলা ক্ষয় করে তথ্য সংগ্রহ করে সবচেয়ে সুবিধাজনক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু রাজনীতিতে ভোটারদের অধিকার অনেক সীমিত। কোনো দেশে বাস করলে সে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নেই। অবশ্য গণতান্ত্রিক দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে নির্বাচন হয়। তবে শুধু নির্বাচনের দিনটিতেই (যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়) ভোটাররা এক দিনের বাদশাহ হন। আর নির্বাচন ছাড়া অন্য সময় জনগণের সার্বভৌমত্ব দুবৃত্তদের সর্বময় কর্তৃত্বে রূপান্তরিত হয়। তাই সুকতলা ক্ষইয়ে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনীতিতে নিষ্ক্রমণের সুযোগ নেই। অর্থাৎ রাজনীতিতে অসম আচরণ, প্রতারণা বা বৈষম্য থেকে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এদের প্রতিরোধ করতে হবে। তাই রাজনীতিতে শুধু সুকতলা নয়, গোটা জুতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়।

    ৩. জুতার রাজনীতি

    জুতার রাজনীতি তাত্ত্বিকেরা আবিষ্কার করেননি। পরিস্থিতির উত্তাপে জুতার রাজনীতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নেয়। শুধু জুতাই রাজনৈতিক প্রতিবাদের একমাত্র অস্ত্র নয়। প্রতিবাদের ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ডিম (বিশেষ করে পচা ডিম) বা পাই (pie) নামধারী পিঠার মতো সামগ্রীও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করার সবচেয়ে জনপ্রিয় অস্ত্র হচ্ছে পাদুকা। জুতা সব সময় সঙ্গেই থাকে। অন্য কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে হলে তা আগে থেকে জোগাড় করতে হয়। জুতার ক্ষেত্রে এ বালাই নেই। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় জুতাকে কলুষিত গণ্য করা হয়; কেননা, হিন্দুদের জন্য গরুর চামড়া ও মুসলমানদের জন্য শূকরের চামড়া অপবিত্র। তাই কাউকে জুতা দেখালে বা মারলে তা অত্যন্ত হীন অপমান হিসাবে গণ্য করা হয়। গত দশকে জুতা নিক্ষেপের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে :

    • ২০০৮ সালে ইরাকি সাংবাদিক মুন্তাদার আলজায়েদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের দিকে পর পর দুবার জুতা নিক্ষেপ করেন। তবে বুশ বা দিকে ঝুঁকে পড়ায় তার গায়ে লাগেনি।
    • ২০০৮ সালে সিন্ধু প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী আরবাব গোলাম রহিম ও ২০১০ সালে পাকিস্তানর রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি জুতা নিক্ষেপের শিকার হন।
    • ভারতে ২০০৯ সালে জুতা নিক্ষেপে আক্রান্ত হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম ও বিরোধী দলের নেতা এল কে আদভানি।
    • ২০০৯ সালে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমেদ নেজাদকে লক্ষ্য করে পাদুকা নিক্ষিপ্ত হয়।
    • ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়বাওয়ের দিকে জুতা ছোঁড়া হয়।

    এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল বুশকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ। সাংবাদিক মুন্তাদার আলজায়েদি জুতা ছুঁড়ে রাতারাতি একজন জীবন্ত কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত হন। অবশ্য ঘটনার পর তাঁকে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। বুশকে হামলার জন্য তাঁর তিন বছরের জেল হয়েছে। সাজা মওকুফ হওয়ায় তিনি নয় মাস পর মুক্ত হন। বর্তমানে তিনি ইরাকে এতিমদের জন্য একটি বেসরকারি ফাউন্ডেশন চালাচ্ছেন। বুশ অপমানিত হলেও এ নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য করলেন না। মজার ব্যাপার হলো, ঘটনাটি শুধু রাজনৈতিক থাকল না। তুরস্কের বেয়দান নামে এক জুতা কারখানা দাবি করল যে আলজায়েদি যে জুতা ছুঁড়েছিল তা তাদের কোম্পানির জুতা। তারা এ জুতার নাম দিল ‘বুশ শু’। এই ব্রান্ডের জুতা বিক্রি প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে গেল। প্রথম বছরে প্রায় ৪ লাখ জোড়া বুশ শু বিক্রয় হলো।

    সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে এ কথা অনুমান করা ঠিক হবে না যে জুতা সব সময়ই অপমানের প্রতীক। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় জুতা নিয়েই আত্মমর্যাদার জন্য লড়াই করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো দেশপ্রেমিকেরা। ঝগড়াটি ছিল জুতা নিয়ে নয়, জুতার ধরন নিয়ে। ইংরেজদের বক্তব্য ছিল, পশ্চিমা ধরনের বুট পরে অফিস-আদালতে যাওয়া যাবে, কিন্তু বাঙালিদের তালতলার চটি পরে অফিস-আদালতে যাওয়া যাবে না। চটি জুতা খুলে বাইরে রেখে অফিসে ঢুকতে হবে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সব সময়ই তালতলার চটি পরতেন। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ২৮ জানুয়ারি বিদ্যাসাগর মহাশয় চটি জুতা পায়ে দিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটির অফিসে ঢুকতে গেলে তাঁকে জুতা খুলতে বলা হয়। বিদ্যাসাগর অপমানিত বোধ করে বাড়ি ফিরে যান। অবশ্য তিনি ক্রোধে কারও প্রতি চটি জুতা ছুঁড়ে মারেননি। ভেবেচিন্তে এশিয়াটিক সোসাইটির সম্পাদক Blanford সাহেবকে লিখলেন : ‘Having had occasion to visit the Library of the Asiatic Society of Bengal, I called on 28th January last, and as I wore native shoes, I was not admitted, unless I would have my shoes behind, I felt so much affronted that I came back without an expostulation. …Besides if persons so wearing the shoes of the English pattern, though coming on foot, could be admitted with shoes on, I could not make out why persons of the same status in life and under similar circumstances should not be admitted, simply because they happened to wear native shoes.’ (ইন্দ্র মিত্র, ২০০০, ৭২১)।

    সাহেবরা জবাব দিলেন যে ভারতীয় প্রথা হচ্ছে, জুতা বাইরে রেখে ঘরে ঢুকতে হয়। বিদ্যাসাগর প্রত্যুত্তরে বললেন, যে ঘরে ফরাশে বসতে হয় সেখানে বাইরে জুতা রাখা রেওয়াজ। যে ঘরে চেয়ারে বসতে হয় সেখানে জুতা বাইরে রাখার দরকার নেই। যদি বুট নিয়ে ঢোকা যায়, তবে চটি জুতা নিয়ে প্রবেশ বিধেয় না হওয়ার কোনো কারণ নেই। পাদুকা সম্পর্কে মহা বিতর্কে সাহেবরা শেষ পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের যুক্তি মেনে নেন। এ সময় বিদ্যাসাগর সংস্কৃতে নিম্নোক্ত শ্লোকটি রচনা করেন :

    বিদ্বত্বঞ্চ জুততঞ্চ নৈব তুল্যং কদাচন।

    স্বদেশে পূজ্যতে বিদ্যা জুতা সর্বত্র পূজ্যতে॥

    (বিনয় ঘোষ, ১৯৯৩, ৩৫৫)।

    বিদ্যা ও জুতার তুলনা চলে না। বিদ্যার পূজা চলে স্বদেশে আর জুতা সর্বত্র পূজ্য। আজ একবিংশ শতাব্দীতে জুতা মর্যাদার প্রতীক নয়। স্বদেশি ও বিদেশি জুতার প্রভেদ ঘুচে গেছে। জুতা আজ অপমানের আর প্রতিরোধের অস্ত্র।

    যেখানে সুকতলা ক্ষয় করেও সমাধান মেলে না, সেখানেই শুরু হয় জুতার রাজনীতি। রাজনৈতিক অসন্তোষ পরিমাপ করার জন্য বিলাতের সাপ্তাহিক Economist একটি নতুন সূচক উদ্ভাবন করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে Shoe Thrower’s Index বা জুতা ছোঁড়ার সূচক (The Economist, February ১২, ২০১১)। এই সূচক নিম্নরূপে পরিমাপ করা হয়ে থাকে : (১) ২৫ বছর বা তার কম বয়সী জনসংখ্যার মোট জনসংখ্যায় হিস্‌সা (সূচকে ওজন ৩৫ শতাংশ) (২) কত বছর ধরে সরকার ক্ষমতায় আছে (সূচকে ওজন ১৫ শতাংশ) (৩) দুর্নীতি (সূচকে ওজন ১৫ শতাংশ), (৪) গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি (সূচকে ওজন ১৫ শতাংশ) (৫) মাথাপিছু আয় (সূচকে ওজন ১৫ শতাংশ), (৬) লেখায় ও মতপ্রকাশে বাধানিষেধ (সূচকে ওজন ৫ শতাংশ), এবং (৭) ২৫ বয়সের কম মোট জনসংখ্যা (সূচকে ওজন ৫ শতাংশ)। এই সূচকে অনুমান করা হয়েছে যে এর প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে রাজনৈতিক অসন্তোষের ধনাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক অসন্তোষ সহজে ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই যেখানে জনসংখ্যায় তরুণদের হিস্সা বেশি, সেখানে সহিংস রাজনীতির আশঙ্কা বেশি। শুধু হিস্সা নয়, তরুণদের মোট সংখ্যাও একটি নিয়ামক। অনুরূপভাবে একই দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে, দুর্নীতির মাত্রা উঁচু হলে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করলে অসন্তোষ বাড়ে। মজার ব্যাপার হলো, মাথাপিছু আয় বাড়লেও অসন্তোষ বাড়ে, কেননা এসব দেশে মানুষের প্রত্যাশা দ্রুত বাড়তে থাকে। ইকোনমিস্ট আরব লিগের ১৭টি সদস্য-রাষ্ট্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিমাপ করার জন্য জুতা ছোঁড়ার সূচক প্রাক্কলন করেছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সারণি ৫.১-এ দেখা যাবে।

    সারণি ৫.১

    জুতা ছোঁড়ার সূচকের পরিমাণ যেখানে বেশি, সেখানে রাজনৈতিক অসন্তোষের সম্ভাবনা তত বেশি। ইকোনমিস্ট-এর সূচক অনুসারে মধ্যপ্রাচ্যে কাতার, কুয়েত ও যুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে স্থিতিশীল। আর সর্বাধিক অস্থিতিশীল হচ্ছে ইয়েমেন, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া ও ইরাক। তবে অপেক্ষাকৃত অস্থিতিশীল রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও জর্ডান। আগামী দিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাবে, রাজনৈতিক অসন্তোষ সম্পর্কে এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী কতটুকু নির্ভরযোগ্য। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী ধধাপে টেকে না।

    ৪. উপসংহার

    সুকতলার অর্থনীতি আমাদের শিখিয়েছে যে অর্থনীতিতে অনেক সিদ্ধান্ত অজ্ঞতার ভিত্তিতে নিতে হয়। তবে লেনদেনে উভয় পক্ষের জ্ঞানের মধ্যে তারতম্য থাকে। যে লেনদেনটি সম্পর্কে বেশি জানে, সে, যে কম জানে তাকে ঠকানোর চেষ্টা করে। কাজেই বাজারভিত্তিক অর্থনীতিকে কার্যকর করতে হলে তথ্যের অপ্রতিসাম্য-ভিত্তিক প্রতারণা কমাতে হবে। কাজটি শক্ত, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। সব তথ্যের অপ্রতিসাম্য দূর করা না গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কমানো যাবে। জুতার রাজনীতির উৎস শুধু তথ্যের অপ্রতিসাম্য নয়। এখানেও কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীদের ক্ষমতার তারতম্য রয়েছে। ক্ষমতা কেউ ছাড়তে চায় না। সুকতলার অর্থনীতির কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাধান মিললেও জুতার রাজনীতির হিল্লে সহজে হবে বলে মনে হয় না।

    আপাতদৃষ্টিতে সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি দুটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা মনে হতে পারে। তবে গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে এ কথা স্পষ্ট হবে যে সমস্যা দুটির উৎস অভিন্ন। যেখানেই তথ্যের অবাধ প্রবাহ বিঘ্নিত হয় সেখানেই সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতির সমস্যা প্রকট হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিবিড় সংযোগ রয়েছে। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তথ্যের অবাধ প্রবাহ বন্ধ করে, যাতে সরকারের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা না বাঁধতে পারে। পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণকে সরকারি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য অবাধ তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ দিতে হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারও জনগণের দাবিদাওয়া জানতে চায়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশে জুতার রাজনীতির প্রয়োজন নেই; কারণ, সরকার নিজেই জনগণের দাবিদাওয়া পূরণ করতে চায়। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য সচেষ্ট থাকে। স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক পরিবেশে অর্থনীতিতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ গুরুত্ব লাভ করে। অর্থনীতিতে তাই সুকতলার ব্যয় কমে আসে।

    অনেক সমাজবিজ্ঞানীই মনে করেন যে গণতন্ত্র হচ্ছে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিষেধক। তথ্যের অবাধ প্রবাহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করে। অধ্যাপক সেন (১৯৯৯) তাই মনে করেন যে গণতান্ত্রিক দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। গণতান্ত্রিক দেশে খাদ্যাভাব দেখা দিলে তা লুকিয়ে রাখা যায় না। কাজেই যখনই দুর্ভিক্ষের অশনিসংকেত দেখা দেবে তখনই এ সমস্যা সমাধানের দাবিতে জনমত গড়ে উঠবে। গণতান্ত্রিক সরকারকে যেভাবেই হোক খাদ্য সংগ্রহ করে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এ দায় নেই। এ ধরনের সরকার দুর্ভিক্ষের খবর চেপে রাখে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় না। গত ছয় দশকে চীনের সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতা তুলনা করলেই এ প্রবণতা বোঝা যাবে। ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর ভারতে খাদ্যাভাব কখনো কখনো দেখা দিলেও কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। যেভাবেই হোক ভারত সরকারকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। অথচ অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও চীনে ১৯৫৮-৬২ সময়কালে দুর্ভিক্ষে ৩ কোটি লোক মারা যায়। ১৯৪৩ সালে বাংলার মহামন্বন্তরে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ। সেনের মতে, চীনে গণতন্ত্র থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। ভেতর ও বাইরের জনমতের চাপে চীন সরকার পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আরও তৎপর হতে বাধ্য হতো। গণতন্ত্র ভারতে দুর্ভিক্ষের সমস্যার সমাধান করেছে। জুতার রাজনীতির পক্ষে এটি করা সম্ভব ছিল না।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষক। অপ্রতিসম তথ্যের ভিত্তিতে বাজারে যেসব বিচ্যুতি ঘটে তা অপসারণের জন্য রাষ্ট্র উদ্যোগ নিয়ে থাকে। তথ্য যত সুলভে পাওয়া যাবে বাজারে প্রতিযোগিতা তত বাড়বে।

    এই প্রেক্ষিত থেকে গণতন্ত্র শুধু একটি বিমূর্ত আদর্শ নয়। গণতন্ত্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের একটি কার্যকর হাতিয়ারও বটে। নিঃসন্দেহে সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতির অনেক সমস্যার সমাধান গণতন্ত্রের পক্ষে সম্ভব। প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্র এসব সমস্যার সমাধান করছে না কেন?

    গণতন্ত্রের অবশ্যই বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন করতে হলে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অথচ গণতন্ত্র নিজেই এই মুহূর্তে সমস্যায় জর্জরিত। এই প্রসঙ্গে অ্যান্টনি গিডেন্স (১৯৯৯, ৭১) যথার্থই লিখেছেন, “The crisis of democracy comes from its not being democratic enough.’ (গণতন্ত্রের সংকটের মূল কারণ হচ্ছে গণতন্ত্র নিজেই যথেষ্ট গণতান্ত্রিক নয়।) কথাটা হেঁয়ালির মতো শোনালেও এটিই হলো সত্য। গণতন্ত্রের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু বিশ্বব্যাপী রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শী ও স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডের ফলে গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। রাজনীতির ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় অনেক গণতান্ত্রিক দেশে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে হাজির হচ্ছে না।

    বিশ্বব্যাপী রাজনীতিকে আজ অবজ্ঞা ও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বিভিন্ন দেশে রাজনীতি সম্পর্কে যেসব মূল্যায়ন দেখা যায়, তার কয়েকটি নমুনা নিচে উদ্ধৃত হলো:

    • There is nothing so bad that politics cannot make it worse. (পৃথিবীতে এমন কোনো মন্দ নেই, যা রাজনীতির পাল্লায় পড়ে আরও খারাপ হবে না)।
    • In politics, the truth is strictly optional and that also seems to be true in parts of media. (রাজনীতিতে সত্য হচ্ছে নেহাত ঐচ্ছিক, কোনো কোনো গণমাধ্যম সম্পর্কেও এ উক্তি প্রযোজ্য)। Never believe anything in politics until it has been officially denied (যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারিভাবে অস্বীকার না করা হয়, ততক্ষণ রাজনীতিতে কোনো গুজবে কান দেবেন না)।
    • There is no distinctly native American criminal class except Congress. (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস ছাড়া কোনো মার্কামারা অপরাধী শ্ৰেণী নেই)।
    • The reason that economy is in such a mess is that politicians care far more about keeping their jobs than about helping you to keep yours. (অর্থনীতির বেহাল অবস্থার কারণ হলো, রাজনীতিবিদেরা আপনার চাকরি বাঁচানোয় সহায়তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত নিজের চাকরি টিকিয়ে রাখতে)।

    ওপরের উদ্ধৃতিগুলি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের সামান্য নমুনা মাত্র। এ ধরনের অজস্র উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। বিভিন্ন সমীক্ষাতেও দেখা যাচ্ছে, যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশেই ভোটাররা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের নিয়ে সুখী নন। অথচ ভোটাররা চাইলেই রাজনৈতিক পদপ্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন ও যোগ্যতম প্রার্থীদের নির্বাচন করতে পারেন। তবু ভোটাররা কেন বারবার অনুপযুক্ত প্রার্থীদের নির্বাচন করছেন? এতে প্রমাণিত হয়, সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য তথ্য প্রয়োজনীয় হলেও তা যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে এবং তাকে কায়েমি স্বার্থের প্রভাবমুক্ত হতে হবে।

    উল্লেখিত রচনাবলি (Works Cited)

    1. একারলফ, জর্জ এ (Akerlof, George A)। ২০০১। ‘Behaviorial Macroeconomics and Macroeconomic Behavior’. Nobel Memorial Lecture. Stockholm: Nobel Foundation.
    2. গিডেন্স, অ্যান্টনি। (Giddens, Anthony)। ১৯৯৯। The Third Way. Camridge: Polity Press.
    3. ঘোষ, বিনয়। ১৯৯৩ (পুনর্মুদ্রণ)। বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ। কলকাতা : ওরিয়েন্ট লংমেন্স লিমিটেড।
    4. বে, মাইকেল আর; জন মরগ্যান ও প্যাট্রিক শল্টেন (Baye, Michael R; John Morgan and Patrick Sholten)। ২০০৬। ‘Information, Search and Price dispersion’, Indiana: Kelley School of Business.
    5. মিত্র, ইন্দ্র। ২০০০। করুণা-সাগর বিদ্যাসাগর। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
    6. লেভিট, স্টিভেন ডি এবং স্টিফেন জে ডুবনার (Levitt, Steven D. and Stephen, J. Dubner). ২০০৫। Freakonomics. New York: Harper Collins.
    7. স্টিগলার, জর্জ (Stigler, George)। ১৯৬১। The Economics of Information’. The Journal of Political Economy, June, 1961. –। ১৯৮১। ‘The Process and Progress of Economics’. Nobel Memorial Lecture. Stockholm: Nobel Foundation.
    8. স্টিগলিজ, জোসেফ ই (Stiglitz, Joseph E)। ২০০১। Information and the change in the Paradigm in Economics’. Nobel Memorial Lecture. Stockholm: Nobel Foundation.
    9. সেন, অমর্ত্য (Sen, Amartya)। ১৯৯৯। Development as Freedom. New York: Alfred A. Knopf.
    10. স্পেন্স, মাইকেল এ (Spence, Michaek A.)। ২০০১। Signalling in Retrospect and the informational structure of market’. Nobel Memorial Lecture. Stockholm: Nobel Foundation.
    11. হারফোর্ড, টিম (Harford, Tim)। ২০০৬। The Underground Economy. London: Little Brown Book Company.
  • শুভ জন্মদিন

    শুভ জন্মদিন

    শুভ জন্মদিন
    জন্মদিনের অর্থনীতি ও রাজনীতি

    ১. ভূমিকা

    রবীন্দ্রনাথের ভাগিনেয়ী সরলাদেবী চৌধুরানী তাঁর আত্মজীবনী জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থে লিখেছেন, “মেজমামী বিলেত থেকে ফিরে আসার পর থেকে ‘জন্মদিন’ বলে একটা ব্যাপারের সঙ্গে পরিচয় হল আমাদের–সে বিলাতী ধরনে সুরেন বিবির জন্মদিন উৎসব করার উপলক্ষে। তার আগে এ পরিবারে ‘জন্মদিন’ কেউ কারো জন্য করে নি (২০০৯, ৫৪)।” মেজো মামি অর্থাৎ প্রথম ভারতীয় আইসিএস সত্যেন ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ১৮৭৭ সালে প্রথমবার বিলেতে যান। সঙ্গে ছিল পাঁচ বছরের ছেলে সুরেন ও চার বছরের কন্যা ইন্দিরা (যার ডাক নাম ছিল বিবি)। ১৮৮০ সালে তিনি পুত্র-কন্যা নিয়ে ফিরে আসেন। ফেরতযাত্রায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেন স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দেবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সরলাদেবীর বিবরণ থেকে প্রতিভাত হয় যে বাংলাদেশে বিলেতি কেতায় জন্মদিনের চল হয় ১৮৮০ সাল বা তার কিছু পর। এর আগে কারও কারও জন্মদিনে জন্মতিথির পূজা হয়েছে। কিন্তু জন্মদিন উৎসব ছিল বাঙালিদের অজানা। জন্মদিন পালিত হতো দেবতাদের (যেমন জন্মাষ্টমী) অথবা প্রেরিত পুরুষদের (যেমন বড়দিন ও ঈদে মিলাদুন্নবি) এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদশাহদের। দেবতা ও পয়গম্বররা হচ্ছেন অমর। আর বাদশাহরা যখন গদিতে থাকতেন তখন নিজেদের অমর গণ্য করতেন। তবে মরণশীল মানুষের জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি করা হতো না।

    মনে করা হয়, ভারতের সাধারণ মানুষ দুটি কারণে জন্মদিন নিয়ে হই হুল্লোড় করত না। প্রথমত, উনবিংশ শতাব্দীতে অধিকাংশ ভারতীয় ছিল দরিদ্র। তাই অধিকাংশ লোকেরই জন্মদিনের রেস্ত ছিল না। তবে এ যুক্তি দুটি কারণে দুর্বল। অভিজিৎ ভি ব্যানার্জি ও এসথার ডাফলো (২০১১) সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, অতিদরিদ্ররাও জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির জন্য উৎসব ও পালাপার্বণে নিজেদের ক্ষমতা না থাকলেও (ধারদেনা করে বা আধপেটা থেকে) দরাজ হাতে খরচ করতে দ্বিধা বোধ করে না। তাই অর্থাভাবে জন্মদিনের উৎসব বন্ধ হয়ে থাকার সম্ভাবনা কম। দ্বিতীয়ত, গরিব দেশে সবাই দরিদ্র নয়। এসব দেশে অনেক সচ্ছল পরিবার রয়েছে। তারাও প্রাক ব্রিটিশ বাংলায় জন্মদিন পালনে উৎসাহ দেখায়নি। তাই অর্থাভাবের কারণটি খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না।

    জন্মদিন উদ্যাপিত না হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ুর প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। শিয়রে অপেক্ষমাণ যমদূত নিয়ে জন্মদিনের মাতামাতির কথা অধিকাংশ মানুষই চিন্তা করতে পারত না। সারণি ৬.১-এ ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশে ও যুক্তরাজ্যে গড় আয়ুর প্রত্যাশার তুলনামূলক চিত্র দেখা যাবে।

    সারণি ৬.১

    ১৮২০ সালে ভারতে গড় আয়ুর প্রত্যাশা ছিল মাত্র ২১। ১৯০০ সালে ভারতে মানুষ গড়ে ২৪ বছর বাঁচত। এই সময় শিশুমৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত বেশি। তাই এক জন্মদিন থেকে আরেক জন্মদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকাটাই ছিল একটি বড় ঝক্কি। অবশ্য বিলাতের পরিস্থিতি ছিল অনেকটা ভিন্ন। সেখানে ১৮২০ সালে গড় আয়ুর প্রত্যাশা ছিল ভারতের প্রায় দ্বিগুণ (অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০ বছর)। বিলাতে তাই উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে জন্মদিনের রেওয়াজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিলাতের অনুকরণে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর মতো বিলেতফেরতরা বাংলাদেশে জন্মদিন চালু করেন।

    জন্মদিন নিয়ে আমার ঔৎসুক্যের প্রধান কারণ হলো, আমি আমার জন্মদিন কবে জানি না। অথচ আমার দুটি জন্মদিন আছে। আমার সরকারি জন্মদিন হচ্ছে ২ আগস্ট ১৯৪৪। এই তারিখ জন্মদিন হিসেবে আমার প্রবেশিকা পরীক্ষার সনদে লেখা রয়েছে। এই তারিখের ভিত্তিতেই আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দিই এবং সরকার থেকে অবসর গ্রহণ করি। আমার মা, যিনি আমার জন্মদিন সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানতেন, বারবার জোর দিয়ে বলতেন যে তারিখটি একেবারেই ভুল। মায়ের মতে, আমার জন্ম শ্রাবণ-ভাদ্রে নয়, আমার জন্ম হাড়-কাঁপানো শীতে। তাহলে আমার জন্মদিন নিয়ে এমন অঘটন কেন ঘটল? আমার মা বলতেন, কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন আমার প্রধান শিক্ষক বাবু বিহারীলাল চক্রবর্তী। তখন নাকি প্রবেশিকা পরীক্ষার বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখে সাড়ে চৌদ্দ বছর বয়স না হলে সে বছর পরীক্ষা দেওয়া যেত না। ডিসেম্বরে জন্মদিন হলে পরীক্ষার জন্য এক বছর বসে থাকতে হবে। হেডমাস্টার বিধাতাকে অগ্রাহ্য করে কেরানি বাবুকে হুকুম দিলেন, ‘এর জন্মদিন ২রা আগস্ট লিখে দাও।’ আমার মায়ের হিসাবে আমার জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর। এই দ্বিতীয় দিনটিই আমার আপনজনেরা মাঝেসাঝে পালন করে থাকে।

    আমার মায়ের হিসাব ঠিক হলে আমি মহাপুরুষদের জন্মদিনে ভূমিষ্ঠ হয়েছি। বলা বাহুল্য, একই দিনে যিশুখ্রিষ্ট ও পাকিস্তানের জনক জিন্নাহর জন্ম হয়। এক স্কুলের ছাত্রকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, মহাপুরুষের লক্ষণ কী? ছাত্রটি জবাব দিয়েছিল, মহাপুরুষ হতে হলে ছুটির দিনে জন্ম হতে হয়। ছাত্রটি অবশ্য চিন্তা করেনি যে ২৫ ডিসেম্বরের ছুটির দিনে জন্ম হওয়াতে যিশু প্রেরিত পুরুষ হননি, বরং যিশুর জন্ম হওয়াতেই ওই দিনটিতে ছুটি পালন করা হয়। ছোটবেলায় অত শত বুঝতাম না। বরং ২৫ ডিসেম্বরের ছুটির দিনে জন্ম হওয়াতে ছোটবেলায় আমার মনে অনেক অহংকার ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য জন্মদিন নিয়ে আমার মনে কয়েকটি প্রশ্ন জাগে। বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো জন্মদিন নিয়ে এসব প্রশ্নের আলোচনা।

    প্ৰথম খটকা আমার মনে জাগে, আমার মা কীভাবে মনে রেখেছেন আমার সঠিক জন্মদিন কবে। আমার কোনো কুষ্ঠি নেই। আমার জন্মতারিখ কোথাও লেখা নেই। আমার বাবা এতটুকু মনে করতে পারতেন যে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য আমার বয়স বাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু ডিসেম্বরের কোন তারিখে আমার জন্ম তিনি তা স্মরণ করতে পারেননি। ২৫ ডিসেম্বর আমার প্রকৃত জন্মদিন কি না, এ নিয়ে আমার মনে সংশয় দেখা দিলে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যিশুখ্রিষ্ট ও পাকিস্তানের জনক জিন্নাহর জন্য সত্যি সত্যি ২৫ ডিসেম্বর ছিল কি না। একটু গবেষণা করলেই বোঝা গেল, আমার সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়। গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে আমার জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু ২৫ ডিসেম্বর যে যিশু ও জিন্নাহর বানানো জন্মদিন, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই প্রবন্ধের দ্বিতীয় খণ্ডে পঁচিশে ডিসেম্বর নিয়ে যেসব প্রচারণা রয়েছে তা বিশ্লেষণ করা হবে।

    দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, শুধু আমার জন্মদিন নয়, ভারত ও বাংলাদেশে জন্মদিন সংক্রান্ত তথ্যগুলি আদৌ নির্ভরযোগ্য কি না। এ প্রসঙ্গে ভারতে ২ হাজার ৪৫৬ জন আইএএস (IAS) কর্মকর্তার ও বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৯১ জন প্রাক্তন ছাত্রের জন্মদিন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে দক্ষিণ এশিয়াতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যক্তিদের ঘোষিত জন্মতারিখ এখনো নির্ভরযোগ্য নয়। প্রবন্ধের তৃতীয় খণ্ডে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

    প্রবন্ধটির চতুর্থ খণ্ডে সর্বনিম্ন বয়ঃসীমার রাজনৈতিক বিবেচনাগুলি আলোচিত হয়েছে। শুধু চাকরিতে নয়, শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনেক সময় সর্বনিম্ন বয়ঃসীমা নির্ধারণ করা হয়। এ ধরনের বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা এ খণ্ডে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

    প্রবন্ধটির পঞ্চম খণ্ডে জন্মদিন নিয়ে যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সর্বশেষ খণ্ডে এ প্রবন্ধের মূল বক্তব্যগুলি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়েছে এবং কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে।

  • সরকারের অপচয়

    সরকারের অপচয়

    সরকারের অপচয়
    রাজনৈতিক অর্থনীতি

    ১. ভূমিকা

    প্রখ্যাত মার্কিন রসিক উইল রজার্সকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি কীভাবে এত মজার মজার ঘটনা খুঁজে বের করেন। উইল রজার্স জবাব দেন, কাজটি খুবই সোজা; আমার কিছুই করতে হয় না। যা করার সরকার তার লোকলস্কর নিয়ে নিজেই করে। আমি শুধু সরকারের কাজ পর্যবেক্ষণ করি। তারপর বিন্দুমাত্র রং না চড়িয়ে যা ঘটে তা-ই বলি। তাতেই সবাই হাসতে থাকে। উইল রজার্সের বক্তব্য অনুসারে যত দিন পৃথিবীতে সরকার নামক প্রতিষ্ঠানটি থাকবে, তত দিন হাসির ঘটনার অভাব হবে না। রসিকপ্রবরের এ বক্তব্য একই সঙ্গে ঠিক ও বেঠিক। ঠিক এ জন্য যে প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর সব সরকারের দ্বারাই অসংখ্য তামাশা ঘটছে। বেঠিক এজন্য যে সরকারের সব কৌতুকপ্রদ কাণ্ড-কীর্তি হাসির ঘটনা নয়। যারা এসব কৌতুকের শিকার তাদের জন্য এসব তামাশা অনেক ক্ষেত্রেই মর্মান্তিক বিয়োগান্ত নাটক। সম্পদের অভাবে সরকার অনেক দুঃখী মানুষের সর্বনিম্ন পর্যায়ের অধিকার ও সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করতে পারে না। অথচ অপচয়ের জন্য সরকারের অর্থের অভাব হয় না। এ কথা ভাবতেও একই সঙ্গে হাসি পায় ও রাগ হয়।

    সরকারি অর্থের অপচয় সব দেশেই কম-বেশি ঘটে। তবে যেসব দেশে সরকার ধনী, সেসব দেশে পেল্লায় অপচয়ের সম্ভাবনা বেশি। অপচয়ের কথা উঠলেই প্রথমে উইল রজার্সের জন্মভূমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম মনে পড়ে। শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু সরকারি অপচয়ের উদাহরণ তুলে ধরছি।

    ক) নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু চিকিৎসা বিভাগে গবাদিপশুর মূত্রত্যাগের অভ্যাস সম্পর্কে একটি গবেষণা প্রকল্পে মার্কিন সরকার ৩ মিলিয়ন ডলার বা ২৫ কোটি টাকা অনুদান প্রদান করে। যেকোনো প্রাণীর জন্য মূত্র ত্যাগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের প্রকল্পে সরকারের অনুদান মোটেও অস্বাভাবিক নয়। তবে এ প্রকল্পের অস্বাভাবিক বিষয় হলো, গবেষণার প্রতিপাদ্য ও তার ফলাফল। গবেষকেরা জানতে চান যে গরু নদী পার হওয়ার সময়, না নদীতে নামার আগে প্রশ্রাব করে না নদী পার হওয়ার পর করে। ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গবেষণাটি শেষ হওয়ার পর জানা গেল যে প্রকল্পে নিযুক্ত অধিকাংশ পর্যবেক্ষক গরুগুলি কখন নীরবে মূত্র ত্যাগ করে, তা ঠাহর করতে পারেনি (দুষ্ট লোকেরা বলে যে গবেষকদের অনেকে বান্ধবীদের নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলেন যে গরু কী, করছিল সেদিকে তারা খেয়াল রাখতে পারেননি। আবার অনেক গবেষক নদীর ধারেকাছেও যাননি।)। সুতরাং এ সম্পর্কে কিছু জানতে হলে আরেকটি প্রকল্পের প্রয়োজন হবে। বলা বাহুল্য, প্রকল্পটি ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি অপচয়ের নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে সিনেটর প্রক্সমায়ার স্মারক পুরস্কারে ভূষিত হয়।

    খ) ২০০৫ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ক্যাটরিনা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলে আঘাত হানে। এ সময় মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ লাখ দুর্গত ব্যক্তিকে সাহায্য দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯ লাখ উপকারভোগী ছিল ভুয়া। হিসাব করে দেখা গেছে, এ ধরনের ভুয়া সাহায্য প্রাপকেরা ২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ত্রাণের অর্থ দিয়ে অনেকে বিদেশে প্রমোদভ্রমণে গিয়েছে। এমনকি ত্রাণের পয়সায় একজন অস্ত্রোপচার করে লিঙ্গ পরিবর্তন করেছে।

    গ) সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাককে যে সাহায্য দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ১৩ বিলিয়ন ডলার অপচয় করা হয়েছে। অতিরিক্ত ৭.৮ বিলিয়ন ডলার লাপাত্তা হয়ে গেছে। এভাবে শ্যাম চাচা বা আংকেল স্যামের মোট গচ্চা গেছে ২০.৮ বিলিয়ন ডলার বা ১৮ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের বার্ষিক স্থূল উৎপাদের দ্বিগুণের বেশি।

    ঘ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট দক্ষিণ চীনে পতিতাদের কীভাবে দায়িত্বের সঙ্গে স্বল্প মাত্রায় মদ্য পান করতে হয়, সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ২৬ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৮৩ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। প্রকল্প-প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে চীনে এ গবেষণায় লব্ধ জ্ঞান পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

    ঙ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যেসব সরকারি কেনাকাটা করা হয় তার প্রায় অর্ধেকই ভুয়া ও প্রতারণামূলক। সরকারি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে জুয়া খেলার দেনা শোধ করা হয়েছে। মদ কেনা হয়েছে, (বান্ধবীদের) সোনার অলংকারের দাম শোধ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি অর্থে নৈশভোজ আয়োজিত হয়েছে। ডাক বিভাগের এক নৈশভোজে মাথাপিছু খরচ হয়েছে ১৬৭ ডলার বা প্রায় ১৪ হাজার টাকা।

    চ) যারা কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের নির্দেশে কৃষিজমি পতিত রাখে, তাদের ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের ভর্তুকি দেওয়া হয়। উপশহর এলাকায় যারা লনে ঘাস লাগায়নি তারাও এ সুবিধা দাবি করে ভর্তুকি পেয়েছে।

    এ ধরনের অপচয়ের অজস্র উদাহরণ রয়েছে। এখানে একটি বিক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ চিত্র মোটেও পূর্ণাঙ্গ নয়। তবু ওপরের উদাহরণগুলি থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে মার্কিন সরকারের কর্মকাণ্ডে বিপুল অপচয় রয়েছে। প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি আল গোর দাবি করতেন যে মার্কিন সরকারের ব্যয়ের ৪৮ শতাংশই অপচয় হয়ে থাকে (স্ট্যানবেরি উইলিয়াম ও ফ্রেড টমসন, ১৯৯৫, ৪১৮)।

    বাংলাদেশে অপচয়ের পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব না থাকলেও এর ব্যাপকতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনপ্রিয় প্রবাদ হলো, ‘সরকার কি মাল দরিয়া মে ঢাল’। অনুমান করি, সরকারের মাল এত তছরুপ হয় যে স্থলে তা লুকিয়ে রাখার জায়গা পাওয়া যায় না, তাই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ব্রিটিশ শাসকেরা দক্ষিণ aforico 990 fagyst af PWD (Public Works Department) (2/68 অপচয় ও দুর্নীতি দূর করতে পারেনি। তাই উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ব্রিটিশ শাসকেরা ঠাট্টা করে বলতেন PWD-এর পূর্ণ নাম হলো Plunder Without Danger বা নির্ভয়ে লুট করো (মুন, পেন্ডেরেল, ১৯৮৯, ৮১৯)। স্মরণ করা যেতে পারে যে বর্তমানে প্রকৌশল-সংক্রান্ত যত মন্ত্রণালয় রয়েছে (যথা : সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেলপথ, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন) সবই ছিল সে-সময় গণপূর্ত বিভাগের আওতায়।

    অপচয়ের ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে একটি বড় তফাত রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অপচয় অভিন্ন। উন্নত দেশগুলিতে দুর্নীতি ছাড়া অন্যান্য কারণেও অপচয় ঘটে । নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবাদিপশুর মূত্রাভ্যাস নিয়ে গবেষণাতে দুর্নীতি ঘটেনি, তবে অপচয় ঘটেছে। অথচ বাংলাদেশে যেখানেই অপচয়ের অভিযোগ ওঠে, সেখানেই দুর্নীতি ঘটে। দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার ২০১১ সালের ৬ অক্টোবর তারিখের নিম্নলিখিত প্রতিবেদনটি বিবেচনা করুন : ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকার গত বছর বেশ ঘটা করে দেশের ৩৮টি জেলায় যে এক কোটি পাঁচ লাখ এনার্জি সেভিং বাল্ব বিনা মূল্যে বিতরণ করেছিল এর ৮০ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে বাতি জ্বালানোর এক সপ্তাহের মধ্যে। জলে গেছে ১০৩ কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই ভেস্তে গেছে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সাধের প্রকল্পটির প্রথম পর্ব। অথচ প্রতিটি বাতির আয়ুষ্কাল ছিল ১০০০০ ঘণ্টা যা এক নাগাড়ে চললেও ৪১৬ দিন পর্যন্ত টিকে থাকার কথা। অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে নিম্ন মানের বাল্ব কেনার কারণেই এ কাণ্ড ঘটেছে। রাজধানীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় কালের কণ্ঠএর সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমন কথা। এখানে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। প্রকল্পটির দোষে নয়, বরং দুর্নীতির জন্য সরকারের অর্থের নয়-ছয় ঘটল। আরেকটি ঘটনা বিবেচনা করুন। সপ্তম সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদ কমিটি জানায় যে বেশ কয়েকজন সিভিল সার্জন হাসপাতালের জন্য বৈদ্যুতিক বাল্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বাজারের খুচরা দামের চেয়ে সাড়ে ছয় গুণ থেকে ২৫ গুণ বেশি দামে কিনেছে (বিশ্বব্যাংক, ২০০০, ২৩) এ ধরনের ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। বিশ্বব্যাংকের (২০০০) প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৭-৯৮ সময়কালে সরকারি হিসাব কমিটি (Public Accounts Committee) ৪৯৭টি নিরীক্ষা-আপত্তি নিষ্পত্তি করে। এসব আপত্তির আর্থিক সংশ্লেষ ছিল ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। ওই সময়ে বিবেচনাধীন আপত্তির সংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার ৪১২। ৪১৭টি নিরীক্ষা আপত্তিতে যদি ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা জড়িত থাকে, তবে ৫৬ হাজারের বেশি আপত্তির আর্থিক সংশ্লেষ যে বিপুল হবে তা অতি সহজেই অনুমেয়। এ হিসাব করা হয়েছিল ২০০০ সালে। এখন তা অনেক বেড়ে গেছে। তবে নিরীক্ষায় সরকারি অপচয়ের অতি ক্ষুদ্র অংশ ধরা পড়ে। যথাযথ অনুমোদন নিয়ে অপচয় হলে তাকে সরকারি নিরীক্ষায় অপচয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না। নিরীক্ষাতে শুধু সরকারি খরচের অনিয়ম সম্পর্কে জানা যায়। কিন্তু সরকারের সম্পদের সব অপচয় নিরীক্ষা-প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। কাজেই অপ্রতুল উপাত্ত সত্ত্বেও এ কথা অনুমান করা মোটেও শক্ত নয় যে বাংলাদেশে সরকারি অপচয় অবিশ্বাস্যভাবে বিপুল।

    বিশ্বব্যাপী সরকারের ভূমিকা সম্প্রসারিত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে। যদিও উগ্র ডানপন্থী নেতারা দাবি করছেন যে তারা সরকারের ব্যয় হ্রাস করছেন, আসলে স্বাস্থ্যসেবা, বেকার ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বৃদ্ধির ফলে সরকারের ব্যয় অতি দ্রুত বাড়ছে। ২০০৯ সালে শিল্পোন্নত দেশগুলির স্কুল জাতীয় উৎপাদের ৩৯.৮ শতাংশ ব্যয় করেছে সরকার। অথচ ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছিল ৮ শতাংশ; যুক্তরাজ্যে, ১০ শতাংশ; ফ্রান্সে, ১৫ শতাংশ; সুইডেনে ৬ শতাংশ। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে সরকারের ব্যয় ছিল স্কুল জাতীয় উৎপাদের ১১.৩ শতাংশ। তবে অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে যে শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় দ্রুত বাড়বে। সরকারের ব্যয় যত বাড়বে সরকারের অপচয়ও তত বাড়তে থাকবে। এই প্রেক্ষিতে সরকারের অপচয় নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।

    সরকারে অপচয়ের ব্যাপকতার তুলনায় সমস্যাটি নিয়ে অত্যন্ত অপ্রতুল গবেষণা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারের অপচয়ের গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি। বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য দুটি। প্রথমত, সরকারি অপচয়ের মূল সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা। দ্বিতীয়ত, সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজে বের করা। প্রবন্ধটি চার ভাগে বিভক্ত। উপক্রমণিকার পর দ্বিতীয় খণ্ডে সরকারের অপচয়ের সংজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে বিভিন্ন প্রকারের অপচয় চিহ্নিত করা হয়েছে। সর্বশেষ খণ্ডে এই নিবন্ধের মূল বক্তব্যগুলি চিহ্নিত করে সরকারি অপচয়ের সমাধান সম্পর্কে সুপারিশ করা হয়েছে।

  • বিশ্বায়ন

    বিশ্বায়ন

    বিশ্বায়ন
    একটি সমীক্ষা ও কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন

    ১. পটভূমি

    একজন রসিক ব্যক্তিকে বিশ্বায়নের উদাহরণ দিতে বলা হয়েছিল। তিনি যে উদাহরণটি দেন তা ছিল অত্যন্ত বেরসিক; কেননা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একটি মর্মান্তিক বিয়োগান্ত ঘটনা। তবু উদাহরণটি অত্যন্ত লাগসই। তিনি বললেন, রাজকুমারী ডায়ানার মৃত্যু বিশ্বায়নের একটি চমৎকার উদাহরণ। তাকে প্রশ্ন করা হলো যে ডায়ানার মৃত্যুর সঙ্গে বিশ্বায়নের কী মিল রয়েছে? তিনি বললেন, এ ঘটনায় একজন ইংরেজ রাজকন্যা তাঁর মিসরীয় ছেলে বন্ধুর সঙ্গে ফরাসি দেশে সুড়ঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। তারা একটি জার্মান গাড়িতে চড়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িটির ইঞ্জিন ছিল ওলন্দাজদের তৈরি। গাড়িটি চালাচ্ছিল একজন বেলজিয়াম চালক, যে স্কচ (স্কটল্যান্ডের) হুইস্কি খেয়ে মাতাল ছিল। গাড়িটির পেছন পেছন জাপানি মোটরসাইকেলে চড়ে ছুটে আসছিল একদল ইতালিয়ান চিত্রসাংবাদিক। আহত ডায়ানার চিকিৎসা করলেন একজন মার্কিন চিকিৎসক। তিনি ব্রাজিলের তৈরি ওষুধ ব্যবহার করেন। বিল গেটসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সংবাদ পাঠান একজন মার্কিন নাগরিক । আপনি সম্ভবত এ খবর কম্পিউটারে পড়ছেন, যাতে ব্যবহার করা হয়েছে তাইওয়ানে প্রস্তুত ‘চিপস। এই কম্পিউটারের মনিটর সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা সংযোজন করে। এটি বহন করে আনছিল ভারতীয় লরিচালকেরা। পথিমধ্যে ইন্দোনেশীয় জলদস্যুরা লুট করে। এ মাল নামিয়ে আনে সিসিলির নাবিকেরা। জাহাজ থেকে ট্রাকে করে এ মাল বহন করে আনে মেক্সিকোর বেআইনি অভিবাসীরা। এই হলো বিশ্বায়নের উদাহরণ। বর্ণনাটি সর্বাংশে সত্য না হলেও হরহামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। ছোট এই সংবাদটিতে কমপক্ষে জড়িয়ে রয়েছে ১৪টি দেশের মানুষ। এই খবর যখন ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রায় ২০০টি দেশে মাতম শুরু হয়। মৃত্যুর পর ডায়ানা যত লোকের আবেগমিশ্রিত সম্মান লাভ করেন, তার অতি ক্ষুদ্র অংশও ট্রয়ের হেলেন, মিসরের ক্লিওপেট্রা বা ভারতের মমতাজ মহলের কপালে জোটেনি। তারও একটি বড় কারণ হলো বিশ্বায়ন।

    বিশ্বায়ন শব্দটি ইংরেজি Globalization শব্দের বাংলা রূপান্তর । Globalization শব্দটি চয়ন করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদের অধ্যাপক থিয়োডর লেভিট (Theodore Levitt)।১৯৮৩ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ’তে তিনি ‘The Globalization of Markets’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে কারিগরি পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী ভোক্তারা সমরূপ হয়ে উঠছে। তাই সাংস্কৃতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সারা পৃথিবীতে পণ্যের বাজার বিশ্বায়িত হচ্ছে। বিংশ শতকের শেষ দুই দশকে বিশ্বায়নের ধারণা অর্থনীতি থেকে সংস্কৃতি, পণ্য বিপণন থেকে রাজনীতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

    বিশ্বায়ন শব্দটির প্রচলন বিংশ শতকের শেষ পাদে হলেও, প্রক্রিয়াটির জন্ম হয়েছে অনেক আগে। কেউ কেউ বলেন, ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, কলম্বাসের অনেক আগেই বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়ার জন্ম হয়েছে। এঁদের মতে, বিশ্বায়নের উৎস খুঁজতে হবে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে যখন ‘রেশম সড়ক দিয়ে চীনের সঙ্গে ভারত, পারস্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য শুরু হয়। ভেদি মরু-পথ গিরিপর্বত যে দুঃসাহসী বণিকেরা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, তাঁরাই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার স্রষ্টা। যারা এ মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন, তাঁরা বলছেন যে কলম্বাসের অভিযানের আগে বিশ্বের দুটি মহাদেশের অস্তিত্ব সম্পর্কে পুরোনো জগতের লোকেরা আদৌ জানত না। বিশ্বকে জানার আগে বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে–এ অনুমান সঠিক নয়।

    কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার শুধু ভূগোলের আয়তন ও জ্ঞানের পরিধিই বাড়ায়নি; এই ঘটনা মানুষের ইতিহাসে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডগুলির মধ্যে পারস্পরিক বিনিময়ের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এ ঘটনা ইতিহাসে কলম্বিয়ান বিনিময় বা Columbian Exchange নামে পরিচিত। দুজন অর্থনীতিবিদের মতে, এ বিনিময়ের তিনটি উপাদান রয়েছে–Diseases, Food and Ideas-ব্যাধি, খাদ্য ও ধ্যানধারণা (নাথান নান ও ন্যান্সি কিয়ান, ২০১০, ১৬৩)।

    পুরোনো দুনিয়া থেকে যে মানুষেরা নতুন ভূখণ্ডে আসে, তারা নতুন দুনিয়াতে নিয়ে এল পুরোনো দুনিয়ার রোগবালাই, জীবাণু আর ভাইরাস। ইউরোপিয়ানরা আমেরিকাতে আসার আগে আমেরিকার দুটি মহাদেশে গুটিবসন্ত ছিল না, কারও হাম হতো না, জলবসন্ত ছিল অজানা, কারও ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফাস বা টাইফয়েড হতো না, ডিপথেরিয়া ছিল না। ছিল না কলেরা, দ্রুত সংক্রামক প্লেগ, আরক্ত জ্বর, ঘুংড়ি কাশি বা হুপিং কাশি ও ম্যালেরিয়া। যেহেতু এসব রোগ আমেরিকাতে তখন পর্যন্ত দেখা যায়নি, সেহেতু এসব রোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় অধিবাসীদের কোনো প্রতিরোধক্ষমতাই ছিল না। পুরোনো জগতের মানুষের সঙ্গে এসব রোগ আমেরিকায় এল । রোগগুলো অতি দ্রুতবেগে আমেরিকার দুটি মহাদেশেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। আমেরিকার পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ ও আমেরিকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সহিংস লড়াইয়ের ছায়াছবি দেখে অনেকেই মনে করেন যে ইউরোপিয়ানরা আদিবাসীদের গুলি করে হত্যা করেছে। এ ধরনের ঘটনা অবশ্যই কোথাও কোথাও ঘটেছে, তবে অস্ত্রের আঘাতে অতি অল্পসংখ্যক রেড ইন্ডিয়ান মরেছে, বেশির ভাগ মৃত্যুর কারণ হলো পুরোনো দুনিয়া থেকে আমদানিকৃত রোগ ও মহামারি। জেরেদ ডায়মন্ড (১৯৯৯, ২১০) এ প্রসঙ্গে যথার্থই লিখেছেন, ‘Far more Native Americans died in bed from Eurasian germs than on the battlefield from European guns and swords. (যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপিয়ানদের বন্দুক ও অস্ত্রের আঘাতে যত আদিবাসী আমেরিকান মারা গেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিছানায় শুয়ে ইউরেশীয় জীবাণু সংক্রমণে মরেছে)। এ অনুমান মোটেও ঠিক নয় যে ইউরোপিয়ানদের আবির্ভাবের আগে আমেরিকা একটি জনবিরল শূন্যভূমি ছিল। কলম্বাস আসার আগে আমেরিকাতে আদিবাসীর সংখ্যা কত ছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তবে জনসংখ্যার সর্বনিম্ন প্রাক্কলন হচ্ছে ৮০ লাখ আর সর্বোচ্চ প্রাক্কলন অনুসারে কলম্বাস-পূর্ব আমেরিকাতে ১১ কোটি লোক বাস করত। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে ইংল্যান্ডে এ সময়ে মোট জনসংখ্যা ছিল ২০ থেকে ২৫ লাখ এবং সে হিসাবে ৮০ লাখ জনসংখ্যাও নেহাত ফেলনা নয়। ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কারের ১০০ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে নতুন রোগবালাইয়ে ৮০ থেকে ৯৫ ভাগ আদিবাসী আমেরিকান মারা যায়। আমেরিকার দুটি মহাদেশ প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে।

    পুরোনো দুনিয়া নতুন দুনিয়াতে এত রোগ ছড়ালেও নতুন দুনিয়া পুরোনো জগতে, মাত্র একটি রোগ পাঠিয়েছিল। এই রোগটি হলো সিফিলিস। স্পেনের নাবিকেরা প্রথমে এ রোগ ইউরোপে ছড়ায়। আমেরিকা আবিষ্কারের ১০ বছরের মধ্যেই সিফিলিস ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকা ও ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে ইউরোপে সিফিলিসে আক্রান্ত রোগীরা অল্পদিনের মধ্যে মারা যেত। কিন্তু পুরোনো জগতের মানুষেরা শরীরে সিফিলিসের দ্রুত বিস্তৃতি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অর্জন করে। এতে রোগের প্রসার না কমানো গেলেও সিফিলিসে মৃত্যুর হার হ্রাস পায়। তাই প্রাচীন জগতের জনসংখ্যা পরিবর্তনে নতুন জগতের রপ্তানিকৃত জীবাণুর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য।

    বিনিময় শুধু জীবাণুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নতুন ও পুরোনো দুনিয়ার মধ্যে শস্যের বীজ ও গৃহপালিত পশুর বিনিময়ও ঘটেছে। এ বিনিময়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে পুরোনো দুনিয়া বা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা। আমেরিকা থেকে চারটি প্রধান খাদ্য শস্যের বীজ আসে। শস্য চারটি হচ্ছে : গোল আলু, মিষ্টি আলু, ভুট্টা ও কাসাভা। এই চারটি ফসলের বড় আকর্ষণ হচ্ছে যে এরা প্রান্তিক বা অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে ফলে। আলু আয়ারল্যান্ডে প্রধান খাদ্যশস্যে পরিণত হয়। প্রাচীন জগতের সর্বত্র আলু ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যার জন্য বাড়তি পুষ্টির জোগান দেয়। কৃষির ঐতিহাসিক এরিক জোনসের (১৯৮৮, ১৪৩) মতে, চীনের শুষ্ক অঞ্চলে নতুন দুনিয়া থেকে আমদানিকৃত ভুট্টা চাষের ফলেই চীনে বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের সরবরাহ সম্ভব হয়েছে। ভুট্টা শুধু চীন, ভারত বা পাকিস্তানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; আফ্রিকাতে কেনিয়া, লেসোথো, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ের মতো অনেক দেশ খাদ্যের জন্য ভুট্টার ওপর নির্ভরশীল। কাসাভার শেকড় আফ্রিকা মহাদেশে একটি প্রধান খাদ্যশস্য। আলু, ভুট্টা ও কাসাভা চাষ করার ফলেই পুরোনো দুনিয়াতে ৩০০ বছর ধরে দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান সম্ভব হয়েছে। উপরুন্তু রোগবালাইয়ে শূন্য হয়ে যাওয়া নতুন দুনিয়াতে বাড়তি জনসংখ্যা পাঠানোর ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য পুরোনো জগতে জমির ঘাটতি মেটানো সম্ভব হয়েছে।

    নতুন দুনিয়াতে পুরোনো জগৎ থেকে অনেক গৃহপালিত পশু আনা হয়। আমেরিকাতে প্রাক-কলম্বাস যুগে অতি স্বল্প-সংখ্যক গৃহপালিত জন্তু (যথা আলপাকা, গিনিপিগ, লামা ও টার্কি ছিল, যাদের অর্থনৈতিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। অথচ পুরোনো বিশ্ব থেকে আমেরিকাতে গরু ছাগল, হাঁস মোরগ, ঘোড়া, উট, শূকর, ভেড়া, মৌমাছি ও বিড়াল আমদানি করা হয়। তেমনি আনা হয় ধান, গম, যব, কলা, ইক্ষু থেকে শুরু করে নানান জাতের ফল ও সবজি। তবে এগুলি আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের উপকৃত করেনি। এসব পণ্য পুরোনো জগতের অভিবাসীদের ভোগে লেগেছে অথবা তারা এসব পণ্য পুরোনো জগতে রপ্তানি করে অর্থ কামিয়েছে।

    নতুন দুনিয়া শুধু পুরোনো দুনিয়াতে খাদ্যের পরিমাণই বাড়ায়নি, খাদ্যের বৈচিত্র্যও বাড়িয়েছে। এশিয়া মহাদেশ, আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নতুন দুনিয়ার একটি বড় সওগাত হলো মরিচ। ষোড়শ শতকের আগে দক্ষিণ এশিয়াতে মরিচ ছিল অজানা। তরকারিতে ঝাল দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো গোলমরিচ। ঐতিহাসিকেরা বলছেন, ভারতে প্রথম মরিচ আসে ১৫৪২ সালে অর্থাৎ শের শাহের রাজত্বকালে (১৫৪০-৪৫)। তবে মরিচের ব্যবহার ভারতে রাতারাতি ছড়িয়ে পড়েনি। সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) সভাসদ আবুল ফজল (১৯৯৭, ১ম খণ্ড, ৬১-৬৮) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আইন-ই আকবরীতে বাদশাহের প্রিয় খাদ্যের রন্ধনপ্রণালি সম্পর্কে বিশদ তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু তাতে কোথাও মরিচের উল্লেখ নেই। যেমন ধরুন, বাদশাহের জন্য শাকের রন্ধনপ্রণালি ছিল নিম্নরূপ : ১০ সের পালং শাক, দেড় সের ঘি, এক সের পেঁয়াজ, আধা সের টাটকা আদা, সাড়ে পাঁচ মাশা (প্রায় আধা তোলা) গোলমরিচ ও অর্ধেক মাশা (১/২৪ তোলা) এলাচি দারুচিনি। দেখা যাচ্ছে বাদশাহ ঝাল শাক পছন্দ করতেন। কিন্তু গোলমরিচ দিয়ে শাক ঝাল করতে হতো। বাদশাহি হেঁশেলে তখন মরিচ ঢোকেনি। মরিচ ব্যবহার তাই সম্ভব ছিল না। আইন-ই আকবরীতে বর্ণিত কোনো খাদ্যেই মরিচ দেওয়া হতো না। এতে মনে হয় যে যখন আইন-ই আকবরী লেখা শেষ হয় (১৫৯৮) তখন পর্যন্ত মরিচের কদর ছিল সীমিত। সম্ভবত দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে মরিচের জয়যাত্রা শুরু হয় সপ্তদশ শতকে। এখন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মরিচ উৎপাদিত হয় ভারতে। দ্বিতীয় স্থান চীনের, তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান আর চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আজ মনে হয় মরিচ ছাড়া বাঙালি রান্না অসম্ভব। অথচ ষোড়শ শতক পর্যন্ত বাঙালিদের পূর্বপুরুষদের মরিচ ছাড়াই খাদ্য গলাধঃকরণ করতে হয়েছে। খাদ্যে নতুন জগতের আরেকটি বড় অবদান হলো টমেটো। বাঙালি রন্ধনে এর ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিংশ শতাব্দীতে। নতুন জগৎ থেকে আমদানিকৃত ফলের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে পেঁপে, আনারস ও পেয়ারা। রবার ও কুইনাইনের মতো অত্যাবশ্যক পণ্য এসেছে আমেরিকা থেকে।

    নতুন জগৎ পুরোনো দুনিয়াকে মাত্র দুটি খারাপ জিনিস দিয়েছে। একটি সিফিলিস, আরেকটি তামাক। সিফিলিসের সমস্যা বোধগম্য কারণে লুকিয়ে রাখা হয়। আর তামাকের ক্ষতিকর দিক এখনো সবাই বুঝে উঠতে পারেনি। পুরোনো দুনিয়ার মানুষেরা আমেরিকাতে অনেক লুটপাট করেছে এবং অনেক আদিবাসীকে খুন করেছে। তবে এসব খুনোখুনি প্রাচীন জগতের ইতিহাসেও অনেক ঘটেছে। নতুন জগতের সবচেয়ে মারাত্মক দুষ্কর্ম হলো অজানিতে রোগজীবাণু পাচার। এতে যে ক্ষতি হয়েছে তা কোনো দিনই পূরণ করা যাবে না। বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়ার এই প্রথম পর্বে পুরোনো জগতের একটি অংশও আমেরিকার মতো মর্মান্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন জগতে ফসল, বিশেষ করে ইক্ষু উৎপাদনের জন্য আফ্রিকা থেকে বলপূর্বক হরণ করে নিয়ে আসা হয় দাসদের।

    ঘোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বিশ্বায়নের এই প্রথম অঙ্ক অভিনীত হয়। এর লাভ-ক্ষতি হিসাব করতে গিয়ে ঐতিহাসিক ডেভিড এস ল্যান্ডেজ (১৯৯৮, ১৭০) লিখেছেন, ‘Oceanic migrations, then voluntary and involuntary [slaves] brought much death into the world and much woe. But also riches and opportunities for the Europeans, whether leavers or stayers. (সমুদ্র অতিক্রম করে অভিবাসন, যার কিছুটা ছিল স্বেচ্ছায় আর কিছুটা ছিল অনৈচ্ছিক (দাস), পৃথিবীতে অনেক মৃত্যু ও দুঃখ বয়ে আনে। সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসী ও অনভিবাসী ইউরোপিয়ানদের জন্য নিয়ে আসে ধনসম্পদ ও সুযোগ।)। তবে যা ঘটেছে। তার সবটাই পরিকল্পিত ছিল না। অনেক কিছু ঘটেছে যা আগে থেকে চিন্তা করাও সম্ভব ছিল না।

    বিশ্বায়নের ইতিহাস তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ের শুরু ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বাসের নতুন দুনিয়া আবিষ্কার থেকে। মোটামুটিভাবে এই পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ১৭০০ সালে। প্রায় ২০০ বছর ধরে নতুন ও পুরোনো পৃথিবীর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘর্ষে উত্তর ইউরোপের রাষ্ট্রগুলির নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ডে বিশ্বের প্রথম শিল্প বিপ্লবের সূচনা ঘটে। শিল্প বিপ্লবের যে বীজ বিশ্বায়নের প্রথম পর্যায়ে অঙ্কুরিত হয় দ্বিতীয় পর্যায়ে তাই প্রস্ফুটিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের সময়সীমা হিসেবে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৮৯ বা তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবলুপ্তি পর্যন্ত সময়কালকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই সময়ের ইতিহাসে তিন ধরনের প্রবণতা লক্ষণীয়। প্রথমত, অভূতপূর্ব উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে শিল্পোন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু আয়ের নাটকীয় বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে উন্নত দেশগুলিতে বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানে অসাধারণ অগ্রগতি দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রমবৃদ্ধিশীল ধনবৈষম্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। তৃতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের আর দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এসব দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

    সারণি ৮.১-এ ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত সময়কালে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধির প্রবণতাগুলি দেখা যাবে।

    সারণি ৮.১
    উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির প্রবণতা
    খ্রিষ্টাব্দ বর্তমানে উন্নত দেশগুলির মাথাপিছু আয় (১৯৯০ সালের আন্তর্জাতিক ডলারে) বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলির মাথাপিছু আয় (১৯৯০ সালের আন্তর্জাতিক ডলারে) উন্নত দেশগুলির মাথাপিছু আয়/উন্নয়নশীল দেশগুলির মাথাপিছু আয়
    ১০০০ ৪০৫ ৪২৯

    ০.৯৪৪

    ১৫০০ ৭০৪ ৫৩৫

    ১.৩১৫

    ১৬০০ ৮০৫ ৫৪৮

    ১.৪৬৮

    ১৭০০ ৩০২ ৫৫১

    ১.৬৩৭

    ১৮২০ ১১৩০ ৫৭৩

    ১.৯৭২

    ১৯৯৮ ২১৪৭০ ৩১০২

    ৬.৯২১

    উৎস: অ্যাংগাস ম্যাডিসন (২০০০, ৪৬)

    দ্রষ্টব্য :

    • উন্নত দেশের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও জাপান।
    • উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে রয়েছে জাপান বাদে এশিয়া, আফ্রিকার, ল্যাটিন আমেরিকার সব দেশ এবং রাশিয়াসহ সমগ্র পূর্ব ইউরোপ।

    সারণি ৮.১ থেকে দেখা যাচ্ছে, কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কারের আগে আজকের উন্নয়নশীল দেশগুলির মাথাপিছু আয় বর্তমানে উন্নত দেশগুলির মাথাপিছু আয়ের চেয়ে গড়ে প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি ছিল। ষোড়শ শতকের গোড়াতেই এই প্রবণতা উল্টে যায়। ফলে উন্নত দেশগুলির মাথাপিছু আয় বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলির মাথাপিছু আয় ছাড়িয়ে যায়। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু আয় বাড়ে ২৭৯ শতাংশ। একই সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মাথাপিছু আয় বেড়েছে মাত্র ৩৩.৫ শতাংশ। অথচ ১৮২০ থেকে ১৯৯৮ সময়কালে উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু আয় বাড়ে ১৯০০ শতাংশ; উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বাড়ে মাত্র ৭২৩ শতাংশ। উপরিউক্ত সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে যে যদিও ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের পর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির প্রবণতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তবে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে আজকের উন্নত দেশগুলির প্রবৃদ্ধির হার পূর্ববর্তীকালের তুলনায় দ্রুত হলেও পরবর্তীকালের তুলনায় ছিল শ্লথ । ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের পর এ প্রবৃদ্ধির হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। নতুন দুনিয়া হতে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে লুষ্ঠিত সম্পদ (যার পরিমাণ অ্যাংগাস ম্যাডিসনের মতে, ২ হাজার ৭০৮ টন সোনা ও ৭২ হাজার ৮২৫ টন রুপা) ও উপনিবেশগুলি থেকে অর্থ পাচার এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করলেও এর মূল চালিকা শক্তি ছিল কারিগরি পরিবর্তন ও পুঁজিবাদী-ব্যবস্থার উদ্ভব। এই পর্যায়ে উৎপাদনশীলতার অসাধারণ বৃদ্ধিই ইতিহাসে শিল্প বিপ্লব নামে পরিচিত। শিল্প বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ের উৎপাদনশীলতা মার্ক্স ও অ্যাঙ্গেলসের মতো সমাজবিজ্ঞানীকেও অভিভূত করে। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁরা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে লিখলেন, It has been the first to show what man’s activity can bring about.’ (বুর্জোয়া সভ্যতা প্রথম দেখাল মানুষ কত বড় বড় কাজ করতে পারে।)। ১৮৪৮ সালে যে উৎপাদনশীলতা ছিল অচিন্তনীয়, আজ তা বাস্তব। পুঁজিবাদী-ব্যবস্থার সৃজনশীলতার অতি ক্ষুদ্র অংশ মার্ক্স ও অ্যাঙ্গেলস তাদের জীবদ্দশায় দেখতে পেয়েছেন। তবু তারা সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার আত্মঘাতী প্রবণতা রয়েছে। উপরন্তু মার্ক্সের উত্তরসূরিরা আরও বললেন যে পুঁজিবাদী সভ্যতার ভিত্তি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ। মুষ্টিমেয় দেশ বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে শোষণের নাগপাশে আবদ্ধ করে রেখেছে। তারা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলি পুঁজিবাদের অবসান ঘটাবে।

    মার্ক্সের অনুসারীদের কোনো কোনো অনুমান সঠিক প্রমাণিত হলেও তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী ধোপে টেকেনি। উপনিবেশ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির লড়াই ছিল অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান চালিকা শক্তি। এই পর্যায়ে দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। প্রথমত, মাথাপিছু আয়ের পরিমাপে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলির বৈষম্য ক্রমেই বাড়তে থাকে। তাই অনুমান করা হয় যে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের ফলে এই ব্যবধান বেড়েই চলেছে। আর দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়নশীল দেশগুলি এই শোষণ ও বঞ্চনার বিপক্ষে বিদ্রোহ করবে।

    দ্বিতীয়ত, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলিতে সর্বহারাদের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আশা করা হচ্ছিল যে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পুঁজিবাদ হেরে যাবে। প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবাদের অবসানে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলির মধ্যে মুরুব্বি-মক্কেল সম্পর্কের (patron client relationship) কাঠামো ভেঙে পড়বে। আশা করা হচ্ছিল যে বিশ্বে পুঁজিবাদের অবসান হবে।

    বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটল। পুঁজিবাদী দেশগুলিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হলো। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে জনতার রুদ্ররোষে বার্লিন নগরে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধসে পড়ে। পুঁজিবাদের নিরঙ্কুশ বিজয় ঘোষণা করে এককালীন মার্ক্সিস্ট তত্ত্ববিদ মেঘনাদ দেশাই (২০০২, ৩০৩) লিখলেন, ‘There is no rival mode of production on the horizon as a viable alternative. Capitalism is the only game in the town.’ (সম্ভবপর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে [আমাদের চিন্তার] দিগন্তে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদন-ব্যবস্থা নেই। পুঁজিবাদই হচ্ছে শহরে [অর্থাৎ আমাদের ভুবনে] একমাত্র খেলা)।

    পুঁজিবাদের বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৯০-এর দশক থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো গড়ে ওঠে। এই কাঠামো বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্থলে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করে। নাটকীয় কারিগরি পরিবর্তন দূরকে নিকট করে এবং সারা বিশ্বকে সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ করে। শুরু হয় বিশ্বায়নের তৃতীয় পর্ব। বস্তুত, আগের পর্যায়ে বিশ্বায়ন শব্দটি ব্যবহার করা হতো না, বিশ্বায়নের স্থলে বলা হতো আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বা international economy। বিশ্বায়ন বা Globalization শব্দটি ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ব্যবহার করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক থিয়োডর লেভিট (১৯৮৩)।

  • বিশ্বায়ন বাঙালির সত্তার অন্বেষা

    বিশ্বায়ন বাঙালির সত্তার অন্বেষা

    বিশ্বায়ন বাঙালির সত্তার অন্বেষা
    একদিন বাঙালি ছিলাম রে

    ১. উপক্রমণিকা

    একুশ শতকের শুরুতে লন্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একজন অজ্ঞাতনামা ইংরেজ পত্র লেখেন, ‘Being British is about driving a German car to an Irish pub for a Belgian beer, then travelling home, grabbing an Indian curry or a Turkish kebab on the way, to sit on Swedish furniture and watch American shows on a Japanese TV. And most British thing of all? Suspicion of anything foreign.’ (faltat To মানে হচ্ছে জার্মান গাড়িতে চড়ে আইরিশ গুঁড়িখানায় বেলজিয়ান বিয়ার পান, তারপর বাড়ি ফেরার পথে ভারতীয় ঝোল-তরকারি বা তুর্কি কাবাব তুলে নিয়ে, বাড়িতে গিয়ে সুইডিশ আসবাবে বসে জাপানি টিভিতে আমেরিকান অনুষ্ঠান দেখা। ব্রিটিশ হওয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ কী? বিদেশি সবকিছু নিয়ে খুঁতখুঁত করা)। পত্রলেখকের খেদ, বিদেশি সবকিছুর জন্য ইংরেজদের সহজাত অনীহা সত্ত্বেও ব্রিটেনে সর্বস্তরে বিদেশি প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের দুঃখ শুধু ইংরেজদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এ ধরনের আক্ষেপ পৃথিবীর সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় গানে শোনা যায়:

    তোমরা একতারা বাজাইয়ো না

    দোতারা বাজাইয়ো না

    একতারা বাজাইয়ো না, ঢাক-ঢোল বাজাইয়ো না

    গিটার আর ব্যাঞ্জো বাজাও রে।

    একতারা বাজাইলে মনে পইড়া যায়

    আমার একতারা বাজাইলে মনে পইড়া যায়

    একদিন বাঙালি ছিলাম রে

    একদিন বাঙালি ছিলাম রে॥

    আকস্মিকভাবে আবির্ভূত হয়ে বিশ্বায়ন সারা পৃথিবীতে ভাঙা-গড়ার খেলা শুরু করেছে। অথচ কেউই জানে না বিশ্বায়ন আমাদের কোথায় নিয়ে চলছে । সমাজতত্ত্ববিদ অ্যান্টনি গিডেন্স (১৯৯৯, ৬-৭) যথার্থই লিখেছেন, ‘We live in a world transformation affecting almost every aspect of what we do. For better or worse, we are being propelled into a global order that no one fully understands but which is making its effects felt upon all of us.’ (আমরা একটি রূপান্তরের জগতে বাস করছি, যা আমাদের কর্মের ভুবনে সবকিছু প্রভাবিত করছে। ভালো হোক বা মন্দ হোক, আমাদের এমন এক বিশ্বব্যবস্থায় টেনে নেওয়া হচ্ছে, যার সম্বন্ধে আমরা অনেক কিছু জানি না, অথচ যার প্রভাব আমরা স্পষ্টভাবে অনুভব করছি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে কিছুই ঘটেনি, অথচ ভেতরে ভেতরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পরিবার, রাষ্ট্র, ঐতিহ্য–সবই রূপান্তরিত হচ্ছে।)

    তবে সর্বত্র একই ধরনের সত্তার রূপান্তর ঘটছে না। স্থানভেদে রূপান্তরের প্রকৃতি ভিন্ন হয়। রূপান্তরের প্রক্রিয়া নির্ভর করে প্রধানত দুটি উপাদানের ওপর। প্রথমত, ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিবেশ, যা জাতিসত্তার মূল কাঠামো গড়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, বাইরের অভিঘাত মোকাবিলায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে কী ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। বর্তমান প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো বাঙালি সত্তার বিবর্তনের প্রবণতাগুলি চিহ্নিত করা। নিবন্ধটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে বাঙালির সত্তা নির্মাণে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিবেশের প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে বাঙালিরা কীভাবে বাইরের অভিঘাত মোকাবিলা করেছে তা সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শেষ খণ্ডে এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্যগুলি তুলে ধরা হয়েছে।

    ২. বাঙালি-সত্তা বিনির্মাণে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বাতাবরণ

    মা-বাবা যখন সন্তানের নাম রাখেন, তাঁরা আশা করেন যে তাঁদের সন্তান তার নামের যথার্থতা প্রমাণ করবে। দেশের নামের সঙ্গেও কি একই ধরনের প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে? হয়তো থাকে। ডেভিড এস স্নসন (David S. Slawson) লিখেছেন, ‘Names are an important key to what a society values. Anthropologists recognize naming as one of the chief methods for imposing order on perception.’ (নামগুলি হচ্ছে সমাজ কী চায় তা উন্মোচনের একটি চাবি। নৃতত্ত্ববিদেরা তাই নামকরণকে মানুষের ইন্দ্রিয়ানুভূতি সুবিন্যস্তকরণের একটি প্রধান পদ্ধতিরূপে গণ্য করে থাকেন।)।

    দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের নাম কখন এবং কে রেখেছিলেন, ইতিহাস তার হদিস দিতে পারে না। জাতি বা উপজাতি হিসেবে বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে ৬০০ থেকে ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের লেখা ঐতরেয় আরণ্যক-এ (দাশগুপ্ত, ২০০৪, ২৯)। ভূখণ্ড হিসেবে বঙ্গের নাম পাওয়া যায় কৌটিল্যের (খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী) অর্থশাস্ত্রে। তবে বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে ইতিহাস কোনো আলোকপাত করতে পারেনি। ঐতিহাসিক উপাদানের অভাবে যে প্রশ্নের জবাব ঐতিহাসিকেরা দিতে পারেননি, তা সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে ভাষাভিত্তিক বিশ্লেষণে। এ ক্ষেত্রে দুই ধরনের মতবাদ দেখা যায়।

    কেউ কেউ ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ‘বঙ্গ’ শব্দটি ‘গঙ্গা’ শব্দের অপভ্রংশ হতে পারে। গঙ্গাবিধৌত ভূমিখণ্ড হচ্ছে ‘বঙ্গভূমি’ (মুখোপাধ্যায়, ২০০০, ৬)। তবে এ মতবাদের দুটো দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, গঙ্গা শব্দটি বঙ্গ শব্দটির চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গঙ্গা আবহমান কাল ধরে পবিত্রতায় অভিষিক্ত। বঙ্গ নামের সঙ্গে গঙ্গার সম্পর্ক থাকলে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলিতে অবশ্যই তা জোর দিয়ে বলা হতো। এ ধরনের কোনো প্রমাণ দেখা যাচ্ছে না। পক্ষান্তরে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলি বাংলা অঞ্চলের অধিবাসীদের ‘দস্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দ্বিতীয়ত, গঙ্গা-অববাহিকা শুধু বাংলা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। বিহার ও উত্তর প্রদেশে গঙ্গার তীরে রয়েছে অনেক পবিত্র তীর্থস্থান। বঙ্গ ও গঙ্গা–শব্দ দুটির সম্পর্ক তাই অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না।

    দ্বিতীয় মতবাদ হলো, বঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি তিব্বতি ভাষা থেকে। এই ভাষায় ‘বঙস’ শব্দের অর্থ আর্দ্র ও জলাভূমি (দাশ, ১৯৬৯, ১)। অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের নাম বাইরের লোকেরাই দিয়ে থাকেন। যেমন হিন্দুধর্মের নামকরণ তাদের শাস্ত্রগুলি করেনি, করেছে ভিনদেশি যবনরা। সিন্ধু নদের দেশের মানুষদের ধর্মের নাম দেওয়া হয় হিন্দু।

    হিমালয়ের চূড়ায় বসে তিব্বতের অধিবাসীরা পর্বতমালার নিচে ও দক্ষিণে অবস্থিত বিশাল জলাভূমির নাম দিয়েছে বাংলা। তবে বঙ্গ শব্দের উৎস গঙ্গা শব্দেই হোক আর ‘বঙস’ শব্দেই হোক, এর বক্তব্য কিন্তু অভিন্ন। মোদ্দা কথা হলো, বাংলাদেশ হচ্ছে নদ-নদীর দেশ, জলাভূমির, দেশ, বানভাসির দেশ, বিল-বাওড়-হাওরের দেশ। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের ভাষায়, এটি হচ্ছে ভাটির দেশ। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই বাংলাদেশ বহিরাগতদের কাছে পরিচিত। অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে এই ভূখণ্ডের বাংলাদেশ নামে পরিচিতি এসেছে মুসলমান শাসকদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ঐক্য থেকে। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশ ধারণাকে মূর্ত করেছে পঞ্চদশ শতকের ভাষাগত ঐক্য। অবশ্যই মুসলমান শাসন ও বাংলা ভাষার বিকাশ বাঙালি চেতনাকে শাণিত ও ঋদ্ধ করেছে।

    বাংলাদেশের নাম মুসলমান শাসনের আগেই বহিরাগতদের কাছে পরিচিত ছিল। দক্ষিণ ভারতের রাজা রাজেন্দ্র চোল বাংলাদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ১০১২ থেকে ১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে রাজত্ব করেন। অনুমান করা হয়, ১০১২ থেকে ১০২৪ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে তার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ আক্রমণ করে। এই অভিযানের কাহিনি বিবৃত হয়েছে রাজেন্দ্র চোলের তিরুমলয় (Tirumulai) শিলালিপিতে। এ অভিযান সম্পর্কে শিলালিপিটিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে বর্ণনার নিম্নরূপ ইংরেজি অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক কে কে নীলকান্ত শাস্ত্রী : ‘…after having forcibly attacked Ranasura, Vangladesa where rain water never stopped (and from which) Govindrachandra fled, having descended (from his) male elephant, elephants of rare strength, women and treasure (which he seized) after having been pleased to frighten strong Mahipala on the field of hot battle (with the noise of) conches (got from the deep sea), uttiraladam (on the shore of expansive ocean) producing pearls; and the Ganges whose waters bearing fragrant flowers dashed against the bathing places.’ (তিনি [অর্থাৎ রাজেন্দ্র চোলের সেনাপতি] বলপূর্বক রণসুর আক্রমণের পর এলেন বাংলাদেশে, যেখানে বিরতিহীন বৃষ্টি পড়ে, যেখানে গোবিন্দচন্দ্র তাঁর মরদ হাতির পিঠ থেকে নেমে পালালেন এবং বাজেয়াপ্ত করা হলো, অসাধারণ শক্তিশালী গজগুলি, ললনাদের ও মণিমাণিক্য এবং উত্তর রাঢ়ে বা উত্তরিলদামে যা বিশাল সমুদ্রের তীরে অবস্থিত] উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রে [গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত] অজস্র শঙ্খের ধ্বনিতে শক্তিশালী মহীপালকে ভয় দেখিয়ে জয় করা হয়। এখানে মুক্তা উৎপাদিত হয় এবং গঙ্গার স্রোতোধারায় ভেসে চলে সুরভিত পুষ্পসমূহ, যা স্নানের ঘাটের ওপর আছড়ে পড়ে) (উদ্ধৃত, মজুমদার, ১৯৬৩, ১৩৮)। তিরুমলয় শিলালিপির কোনো কোনো অংশের অনুবাদ নিয়ে মতদ্বৈধতা থাকলেও এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে বাংলাদেশ নামটি (শুধু বঙ্গ বা বঙ্গাল নয়) কমপক্ষে এগারো শত বছরের পুরোনো; অবিরল বারিধারায় স্নাত এই দেশ; এখানে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে সুগন্ধি ফুল আছড়ে পড়ে।

    জলাভূমির প্রতিবেশই হচ্ছে বাংলার ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় সত্য। নীহাররঞ্জন রায় যথার্থই বলেছেন, ‘বাংলার ইতিহাস রচনা করিয়াছে বাংলার ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদী । এই নদ-নদীগুলিই বাঙলার প্রাণ।’ (রায়, ১৪০০, ৭২) পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, জলাভূমি হচ্ছে জৈব-বৈচিত্র্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রতিবেশ। এই ভৌগোলিক বাতাবরণই বাংলাকে দিয়েছে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। আবার কখনো কখনো প্রলয়ংকরী বন্যা, খরা, ঝড় ও জলোচ্ছাস বিপর্যস্ত করেছে এই জলাভূমির জনজীবন। পেলব পলিমাটিতে গড়া সমতটে প্রমত্ত নদ-নদীর উদ্দাম লীলায় হারিয়ে গেছে অজস্র জনপদ, অসংখ্য কীর্তি ও শস্যশ্যামল প্রান্তর। বাঙালি ভালোবেসে নদীর নাম দিয়েছে মধুমতী, ইছামতী, চিত্রা, কপোতাক্ষ, কলকলিয়া আরও কত কি! তেমনি আবার নদীর রুদ্র রূপকে বর্ণনা করেছে কালনি, মাথাভাঙ্গা, কীর্তিনাশা, ভৈরব, আগুনমুখা, ডাকাতিয়া ইত্যাদি নামে। এ প্রাকৃতিক পরিবেশ শুধু বাঙালির আর্থিক ভাগ্যই নিয়ন্ত্রণ করেনি, এ পরিবেশ বাঙালির সমাজ গড়েছে, সৃষ্টি করেছে–কবি জীবনানন্দ যাকে বলেছেন–আমার এ বাঙ্গালীর মন।

    জলাভূমির প্রতিবেশে বাংলার গ্রামীণ বসতিগুলি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের বসতির তুলনায় সুস্পষ্ট ভিন্ন আদলে বিকশিত হয়েছে। মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ পিটার জে বারতুচি বাংলাদেশের গ্রামকে ‘ছলনাময়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ওলন্দাজ ঐতিহাসিক ভেলেম ভান সেলে (২০০৯, ৯) বাংলাদেশের গ্রামীণ বসতি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘They are not clustered around a central square, protected by defensive walls or united in the maintenance of joint irrigation works. Instead they consist of scattered homesteads and small hamlets (para) perched on slightly elevated plots that become islands when moderate floods occur.’ (এই গ্রামগুলো বাইরে থেকে দেয়াল দিয়ে সংরক্ষিত একটি কেন্দ্রীয় চত্বর ঘিরে বসতি নয়; এরা যৌথ সেচকার্যের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঐক্যবদ্ধ নয়। পক্ষান্তরে গ্রামগুলোতে রয়েছে ছড়ানো-ছিটানো বাড়িঘর এবং ছোট ছোট পাড়া। এরা কিছুটা উঁচু জমিতে স্থাপিত এবং এরা ছোটখাটো বন্যাতেই দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।) নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমি (খান, ২০০৪) বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা গ্রন্থে বাংলাদেশের গ্রামগুলিকে ‘উন্মুক্ত গ্রাম’ (open village) বলে বর্ণনা করেছি। প্রতি-তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের গ্রামগুলো হচ্ছে ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঙ্ঘবদ্ধ’ (corporate) গ্রাম। এ ধরনের গ্রাম একই সঙ্গে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। উন্মুক্ত গ্রামে শুধু সামাজিক সংযোগ ঘটে, কিন্তু প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক দায়িত্ব থাকে অত্যন্ত সীমিত।

    তৃণমূলে গ্রামীণ সংগঠনের দুর্বলতা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে অভিশাপ। গ্রামীণ সংগঠনের দুর্বলতার ফলে এখানে প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে অতি প্রাচীনকাল থেকেই প্রবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ গড়ে উঠেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের জন্য এখানে সনাতন হিন্দুধর্ম শিকড় গাড়তে পারেনি। প্রথাগত সনাতনত্ব কখনো বাঙালির ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ খর্ব করতে পারেনি। তাই ধর্ম সম্পর্কেও বাঙালি দাবি করতে পারে : ‘আমি তাই ভাই করি। যখন চাহে এ মন যা/ করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা’। আরও বলতে পারে : ‘আমি অনিয়ম উচ্ছঙ্খল/ আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল’। বাঙালির ধর্মে ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে যুক্ত হয়েছে মানবতাবাদ। দেবতার চেয়ে মানুষ বাঙালির কাছে অনেক বড়। তাই তো কবি লিখেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই’।

    দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে অধিবাসীদের জীবনে গ্রামীণ সংগঠনের প্রাধান্যের ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ও তার আদর্শ সনাতন হিন্দুধর্মের বলয়ের বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অথচ প্রবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালিরা এ দেশে ইসলাম আগমনের অনেক পূর্ব থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান ও আউল-বাউলের মতো লোকায়ত ধর্মসাধনায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে। এই উপমহাদেশে ব্রাহ্মণ্যবাদের সবচেয়ে বেশি প্রতিপত্তি দেখা যায় দক্ষিণ ভারতে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক ব্যাশাম (১৯৫৯, ১৯১) যথার্থই লিখেছেন যে শক্তিশালী গ্রামীণ সংগঠনের সক্রিয় বিরোধিতার ফলে দক্ষিণ ভারতে সনাতন হিন্দুধর্ম থেকে বিচ্যুতি সম্ভব হয়নি। একই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি (খান, ২০০৪) বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা গ্রন্থে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে গ্রামীণ সংগঠনের দুর্বলতার ফলে বাংলার বদ্বীপ অঞ্চলের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বহিরাগত পীর-দরবেশদের আধ্যাত্মিক শক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। অথচ গ্রামীণ সংগঠনের প্রতিপত্তির ফলে ভারতের মুসলমান শাসনের মূল কেন্দ্রগুলিতে হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া ও খাজা মইনুদ্দিন চিশতির মতো পীর-দরবেশদের পক্ষেও অনুরূপ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়নি।

    জলাভূমির এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ শুধু বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার আচরণকেই প্রভাবিত করেনি। এর স্বাক্ষর দেখা যায় বাংলার কবিতায়, তার চিত্রকলায়, তার স্থাপত্যে, তার সংগীতে। বাংলা কবিতার ঐশ্বর্য তার মহাকাব্যে নয়, তার গীতিকবিতায়। বাংলার মন্দির ছোট ও সংকীর্ণ। এখানে ভুবনেশ্বর, খাজুরাহো বা দাক্ষিণাত্যের মতো মন্দির-শহর গড়ে ওঠেনি। পক্ষান্তরে বাংলার গর্ব পটুয়াদের চিত্রের পটভূমি অত্যন্ত সংকীর্ণ। এখানে। অজন্তা-ইলোরার মতো চিত্র, সারনাথের বুদ্ধমূর্তি, দাক্ষিণাত্যের নটরাজমূর্তি এবং এলিফেন্টার ভাস্কর্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাঙালির এসব বৈশিষ্ট্য ও অর্জনের পেছনে রয়েছে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ।

    তবে আবহমান কাল থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করলেও তার রাজনৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, এখানে সামাজিক পুঁজির নিদারুণ ঘাটতি রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডি পুটনামের (১৯৯৩, ১৬৭) মতে, সামাজিক পুঁজি হচ্ছে পারস্পরিক আস্থার প্রথাসিদ্ধ আচরণের ও সামাজিক সম্পর্ক-জালের মতো সংগঠনের বিশেষত্বগুলি, যা সমন্বিত কার্যকলাপ সহজ করে সামাজিক কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।

    মানুষ একে অপরকে যত বিশ্বাস করবে সামাজিক পুঁজি তত বাড়বে। গুণগত ঐতিহাসিক তথ্য ও সমকালীন পরিমাণগত উপাত্ত এ ধারণাকে সমর্থন করে। সামাজিক পুঁজির অপ্রতুলতার ফলেই বাংলাদেশ অঞ্চলে বৃহৎ সাম্রাজ্য খুব অল্প ক্ষেত্রেই টেকসই হয়েছে। অধিকাংশ সময়েই খণ্ডরাজ্য ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক নিয়তি। নাথ, রাত, খড়গ, চন্দ্র, বর্মণ, পট্টিকেরা ও ভদ্র বংশের মতো ছোট রাজ্যগুলিই বারবার বাংলাদেশের মাটিতে বুনো ফুলের মতো ফুটেছে ও ঝরে পড়েছে। বাংলায় বারবার মাৎস্যন্যায়ের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। মোগল ঐতিহাসিক আবুল ফজল বাংলাকে ‘বুলঘকখানা’ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এসবের পেছনে রয়েছে সামাজিক পুঁজির ঘাটতি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো বাংলাদেশের মানুষের পারস্পরিক আস্থা কম। ১৯৯৯-২০০১ সময়কালে পরিচালিত একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে মাত্র ২৩.৫ শতাংশ মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ ৭৬.৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে এ ধরনের আস্থা নেই। বিশ্বের ৮০টি দেশে এ সমীক্ষা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে পারস্পরিক আস্থার হার ৮০টি দেশের গড় হারের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কম (খান, ২০১১, ১১৩)। একমাত্র সান্ত্বনা হলো এই যে ফ্রান্সে মাত্র ২২.২ শতাংশ মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে। ফ্রান্স। দীর্ঘদিন ধরে এই পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতির মাশুল দিয়েছে । ফ্রান্সের অধিবাসীদের মতো বাংলাদেশের মানুষেরাও সৃজনশীল, তবে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন, উৎকেন্দ্রিক ও অগোছালো।

    একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একটি বড় প্রশ্ন হলো, সামাজিক পুঁজির এ অপ্রতুলতা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আজকের বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব কি না। সামাজিক পুঁজি শুধু রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্যই অত্যাবশ্যক নয়। ভৌত ও মানবিক পুঁজির মতো সামাজিক পুঁজিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জরুরি। ফ্রানসিস ফুকুয়ামা তাঁর Trust গ্রন্থে চীন, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে পারস্পরিক আস্থার সুফল চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন (ফুকুইয়ামা, ১৯৯৬)। পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে একটি শুভচক্রের জন্ম দেয়। আস্থার সুফল আরও আস্থার সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে সযত্নে লালিত অবিশ্বাস ও অনাস্থা কি সহজে অতিক্রম করা সম্ভব হবে? হয়তো সবটুকু করা যাবে না। তবু আশার আলো যে একেবারে নেই তা বলা যাবে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে মানুষ বারবার ভুল করতে করতে ঠেকে শেখে (নর্থ, ১৯৯০)। এ রকম ঠেকে শেখার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসেও ঘটেছে। পাল রাজবংশের উদ্ভবের আগে প্রায় ৫০ বছর ধরে রাজনৈতিক নৈরাজ্য বিরাজ করে। প্রাচীন ভারতে নৈরাজ্যকে মাৎস্যন্যায় বা মাছের মতো অবস্থা বলে বর্ণনা করা হতো। মাছের ভুবনে বড় মাছ যেমন ছোট মাছ গ্রাস করে, তেমনি অরাজক পরিস্থিতিতে দুর্বল জনগোষ্ঠী বড় লোকদের শিকার হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রজারা বা প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করে। খালিমপুর তাম্রশাসনে তাই লেখা হয়েছে : ‘তারপরে ছিলেন গোপাল। তিনি সমস্ত রাজাদের মাথার মণির মতো ছিলেন। মাৎস্যন্যায় অর্থাৎ অরাজকতা দূর করার জন্য প্রজারা তাকে রাজা নির্বাচিত করেছিলেন। পূর্ণিমা রাতের জ্যোৎস্নার অতিরিক্ত সাদা রং তার স্থায়ী কীর্তির অনুকরণ করতে পারত।’ (শাস্ত্রী, ১৯৯২, ১০৩)।

    বাংলার ইতিহাসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঐক্য অনেক দিন টিকেছে; আবার অনেক সময় ঐক্য অতি অল্প সময়ে উবে গেছে। তবে পালরা প্রায় ৪০০ বছর রাজত্ব করেছে। এই রাজনৈতিক ঐক্যই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। তার কারণ, পালরা ছিল পরমতসহিষ্ণু ও উদার। তাই বৌদ্ধ হয়েও পালদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থন শতাব্দীর পর শতাব্দী অটুট রাখা সম্ভব হয়েছে। পালদের ইতিহাস প্রমাণ করে যে শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; উদারনৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হয় না। আজ ১৪১৮ বঙ্গাব্দের উষালগ্নে দাঁড়িয়ে বারবার মনে প্রশ্ন জাগছে, আমরা আমাদের অতীত থেকে কি কিছু শিখছি না, ভবিষ্যতেও কি অতীতের ভুলগুলো বারবার পুনরাবৃত্তি করতে থাকব? দার্শনিক জর্জ সান্তায়ানা (George Santayana) যথার্থই লিখেছেন, ‘Those who do not remember the past are condemned to repeat it.’ (ইতিহাস থেকে যারা শিখে না তারা একই ভুল বারবার করে থাকে।)

    ৩. বাইরের অভিঘাতের মোকাবিলায় কৌশল

    কবি লিখেছেন, এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা। এতক্ষণ ভঙ্গের কথা বললাম, এখন বাংলার ইতিহাসের রঙ্গের কথা বলি। বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রঙ্গ হলো এর ইতিহাসের স্ববিরোধী প্রবণতাগুলি। বাঙালি সব সময়ই নিজেকে অন্যান্য জাতের তুলনায় শ্রেয় মনে করে। এই অভিব্যক্তির প্রকাশ দেখা যায় উনবিংশ শতাব্দীতে, যখন বাঙালিরা দাবি করত, ‘What Bengal thinks today, the rest of India thinks tomorrow.’ এই প্রত্যয়েরই প্রকাশ দেখতে পাই সপ্তদশ শতকের কবি আব্দুল হাকিমের রচনায়। তিনি লিখেছেন :

    যে সব বঙ্গেত জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী।

    সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি॥

    দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।

    নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে ন যায়॥

    বাঙালিরা মনে করে যে তাদের কৃষ্টি, আচার-অনুষ্ঠান, তাদের শিল্প সাহিত্য-সংগীত ও তাদের জীবনযাত্রা একান্তই তাদের নিজস্ব সৃষ্টি। এগুলি ষোলো আনাই বাঙালির সম্পত্তি, এতে অন্য কারও কোনো অবদান নেই। ভালো করে তলিয়ে দেখলে এ কথা স্পষ্ট হবে যে আমরা যাকে একান্তই বাঙালির নিজস্ব বলে মনে করি, তাদের অধিকাংশেরই স্ফুরণ ঘটেছে বাইরের জগতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়। যা কিছু খাঁটি বাঙালি বলে আমরা বড়াই করি, তার অধিকাংশই গড়ে উঠেছে বাইরের উপাদানের সঙ্গে সংমিশ্রণে ।

    প্রথমে পয়লা বৈশাখের কথা বলি। পয়লা বৈশাখ বঙ্গাব্দের নববর্ষ। ভারতের সর্বত্র কিন্তু বৈশাখ বছরের প্রথম মাস নয়। শকাব্দ বা বিক্রম সংবর্ত যারা অনুসরণ করেন তাঁদের জন্য পয়লা চৈত্র নববর্ষ। তাই উত্তর প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান, বিহার, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রে বৈশাখ বছরের দ্বিতীয় মাস। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, গুজরাটি পঞ্জিকায় বৈশাখ সপ্তম মাস। বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত বাংলার পণ্ডিতেরা নেননি। সম্রাট আকবর বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেন ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। তবে এ সনের হিসাব শুরু হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর, অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ বা ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে। কেননা এই সনকে ভিত্তি করেই সম্রাটের সম্মানে চালু হয়েছিল তারিখে ইলাহি (সম্রাটের সন)। তবে নতুন সন প্রবর্তনের প্রণোদনায় শুধু সম্রাটের অমরত্বের মোহই ছিল না, এর পেছনে বাস্তব আর্থিক তাগিদ ছিল। ভারতের মুসলমান শাসকেরা চান্দ্রমাস-ভিত্তিক হিজরি সন অনুসরণ করে খাজনা আদায় করতেন। অথচ ফসল ফলত সৌরচক্র অনুসারে। চান্দ্র সনে সৌর সনের চেয়ে ১১ দিন কম। ঘূর্ণমান পঞ্জিকার ভিত্তিতে রায়তদের খাজনা দিতে অসুবিধা হতো। তাই ৯৬৩ হিজরিতে প্রবর্তিত তারিখে ইলাহিকে ভিত্তি করে চালু হলো বাংলা সন। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, বছর শুরু হবে হিজরি সনের প্রথম মাস মহরম থেকে। সে বছর মহরম ছিল বৈশাখ মাসে। কিন্তু তখন বাংলায় প্রচলিত শকাব্দের প্রথম মাস ছিল চৈত্র। সম্রাটের হুকুমে চৈত্র প্রথম মাসের মর্যাদা হারাল। উপরন্তু বাংলা সনের ভিত্তি সৌর বছর হওয়াতে প্রতি ৩৩ বছর পর বাংলা সন হিজরি সনের এক বছর পেছনে পড়তে থাকে।

    ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা সন হিন্দু কিংবা মুসলমান কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। হিজরি পঞ্জিকায় কোনো পরিবর্তন মুমিন মুসলমানদের জন্য বেদাত। পৌত্তলিক সৌর সনও অগ্রহণীয়। আর তারিখে ইলাহির প্রবর্তক শেরেকের দোষে দুষ্ট। অন্যদিকে সনাতনপন্থী হিন্দুদের পক্ষে যবনদের পঞ্জিকা মেনে নিয়ে চৈত্রের পরিবর্তে মহরম মাসের অনুকরণে বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে মেনে নেওয়া অনাচার। তবু বাংলা সন টিকে গেল। বাঙালি কবি সযত্নে বৈশাখকে আবাহন করলেন, ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো’। এ সন হিন্দুরও নয়, মুসলমানেরও নয়। এ পঞ্জিকা উভয়ের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের মিশেল। এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, এটি বাঙালির প্রয়োজন মিটিয়েছে। তাই এটি স্বদেশি না বিদেশি, তা নিয়ে বাঙালি মাথা ঘামায়নি।

    পরস্পরবিরোধী শক্তির সমন্বয় সাধনায় বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো বাংলা ভাষা। জন্মলগ্নেই এ ভাষার টুটি চেপে ধরেছে সমাজপতি ও ধর্মীয় নেতারা। হিন্দু ব্রাহ্মণরা বিশ্বাস করতেন যে সংস্কৃত হচ্ছে দেবতাদের পবিত্র ভাষা। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা কলুষিত। এ ভাষায় ধর্মের পবিত্র বাণী চর্চা নিষিদ্ধ। শাস্ত্রকারের বিধান দিলেন,

    অষ্টাদশ পুরাণাণি রামস্য চরিতানি চ

    ভাষায় মানব শ্রুত্বা রৌরব নরকং ব্ৰজেৎ।

    অর্থাৎ রামায়ণ এবং অষ্টাদশ পুরাণের কথা কেউ বাংলায় শুনলে রৌরব নরকে যেতে হবে। অন্যদিকে মুসলমান আলেম-ওলামারা ফতোয়া দিলেন যে কোরআন-হাদিসের পবিত্র বাণী বাংলা ভাষায় চর্চা করলে নির্ঘাত দোজখে যেতে হবে। সপ্তদশ শতকের কবি শেখ মুত্তালিব তাই লিখেছেন :

    মুসলমানি শাস্ত্রকথা বাঙ্গালা করিলুঁ

    বহু পাপ হৈল মোর নিশ্চয় জানিলুঁ।

    কিন্তু ব্রাহ্মণ ও ওলামাদের বাধা টেকেনি। মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলি বাংলায় অনূদিত হলো। আলেমদের ফতোয়া অগ্রাহ্য করে মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলি বাংলায় ভাষান্তরিত হলো। হিন্দু মুসলমানের প্রাণের ভাষা হিসেবে বাংলা আত্মপ্রকাশ করল। সংস্কৃত ও পালি শব্দভান্ডারের সঙ্গে আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি শব্দ যোগ করে এর জয়যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের দেশের ইংরেজি, ফরাসি ও পর্তুগিজ ভাষা একে আরও ঋদ্ধ করল । সমন্বয় ও সংমিশ্রণের মাধ্যমে বাংলা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষার মর্যাদা অর্জন করল।

    বাঙালিদের আরেকটি গর্বের বিষয় হলো তাদের রন্ধনপ্রণালি । আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে বাঙালির রন্ধনশৈলী আবহমান কাল থেকে গড়ে উঠেছে। এ ধারণা মোটেও সঠিক নয়। আজকের বাঙালি রান্নার প্রধান উপকরণ হচ্ছে মরিচ। মরিচকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় : (১) লংকামরিচ ও (২) গোলমরিচ। লংকা বা লাল মরিচ আমেরিকা থেকে ভারত ও এশিয়ার পুরোনো ভুবনে আসে। আবুল ফজলের আইন-ই আকবরী থেকে দেখা যাচ্ছে যে সম্রাট আকবরের জন্য যে রান্না হতো তাতে কোনো লাল মরিচ ব্যবহার করা হতো না, কেননা লাল মরিচ তখনো ভারতে পৌঁছায়নি। সম্রাট আকবরের জন্য গোলমরিচ দিয়ে শাক রান্না হতো। ভেবে দেখুন, পোড়া লাল মরিচ দিয়ে সম্রাটকে যদি এক বেলা শাক খাওয়ানো যেত, তাতে কত বড় ইনাম পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল! চিন্তা করে দেখুন, সোনার বাংলায় আমাদের পূর্বপুরুষেরা গোলমরিচ-যুক্ত বা মরিচবিহীন রান্না মাছ সারা জীবন গলাধঃকরণ করেছেন। গোলাম মুরশিদ জানাচ্ছেন, ‘সতেরো শতকের আগে লঙ্কা মরিচের প্রচলন বঙ্গদেশে বা ভারতবর্ষে হয়নি’ (২০০৮, ৪৯৮)। আলু, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি এখন হেঁশেলে গড়াগড়ি যাচ্ছে। অথচ এরা গত কয়েক শতাব্দী ধরে বাইরে থেকে এসেছে। বাঙালির প্রিয় রসগোল্লার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে উনবিংশ শতকে। কেউ বলেন, রসগোল্লা পর্তুগিজদের অবদান; আবার কেউ কেউ বলেন, রসগোল্লা এসেছে উড়িষ্যা থেকে। তবে রসগোল্লা বঙ্গজ–এ দাবি এখন পর্যন্ত কেউ করছেন না। মিনিকেট চালের ভাতের সঙ্গে ফুলকপির ভাজি আর টমেটো সহযোগে তেলাপিয়া মাছের ঝাল ঝোল খেয়ে ঢেকুর তুলে কোনো বাঙালি যদি মনে করে যে তার খাদ্য চিরায়ত বাঙালি ঐতিহ্যের অঙ্গ, তবে সে ভুল করবে। কালের বিবর্তনে বাঙালির রান্না বিভিন্ন দেশের উপাদান নিয়ে মুখরোচক হয়ে উঠছে। এতে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।

    এবার পোশাকের কথা বলি। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সবচেয়ে পছন্দের পোশাক হলো ‘পাঞ্জাবি’। নাম থেকেই বোঝা যায় এতে বাঙালিত্ব নেই। আশার কথা, বাঙালি মেয়েদের অনেকেই এখনো শাড়ি পরেন, তবে এ শাড়ি আবহমান বাংলার শাড়ি নয়। বাংলার চিরাচরিত শাড়ি সম্পর্কে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই লিখেছেন, ‘আমাদের স্ত্রী লোকেরা যে কাপড় পরে, তাহা না পরিলেও হয়।‘’ ‘পেটিকোট এবং ব্লাউজ-বিহীন একমাত্র শাড়ি-সর্বস্ব পোশাক’ সম্পর্কে বলা হতো ‘দশ হাত কাপড়ে স্ত্রীলোক লেঙটো’। এ অবস্থা থেকে বাঙালি রমণীদের উদ্ধার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৌদি ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। তিনি মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের পারসি মহিলাদের কাছে বিলাতি ধাচে ব্লাউজ পেটিকোটসহ পশ্চিম ভারতীয় কায়দায় শাড়ি পরা রপ্ত করেন। সভ্যভাবে শাড়ি পরার কায়দা প্রবর্তন করে তিনি বঙ্গ ললনাদের আব্রু রক্ষা করেন (মুরশিদ, ২০০৮, ৪৭৮)। কাজেই আজকের শাড়িও বাঙালির একান্ত নিজস্ব পোশাক নয়।

    ৪. উপসংহার

    সাহিত্য থেকে সংগীত, দর্শন থেকে চিত্রকলা সর্বত্র বাঙালি দেশজের সঙ্গে বহিরাগত উপাদানের সমন্বয়ের সাধনা করেছে। সমাজতত্ত্ববিদ বিনয় সরকার বলেছেন, ‘এক হিসাবে আধুনিক বাংলা সাহিত্য আগাগোড়া প্রায় সবই পাশ্চাত্য (বিশেষত বিলাতি) সাহিত্যের নকল। যেখানে নকল দেখা যায় না সেখানে আছে প্রভাব।‘’ বিনয় সরকারের এই উক্তিতে অবশ্যই অতিরঞ্জন রয়েছে। তবু এ মূল্যায়নকে একেবারে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

    তবে দেশজ উপাদানের সঙ্গে বাইরের প্রভাবের সমন্বয় শুধু শিল্প, সাহিত্য বা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। এ ধরনের সমন্বয় সংগীতের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। বেহালা-হারমোনিয়ামের মতো বাদ্যযন্ত্র পশ্চিম থেকে এসেছে। অনেক গানে, বিশেষ করে কোনো কোনো রবীন্দ্রসংগীতে পাশ্চাত্য সংগীতের অনুরণন শোনা যায়, রবীন্দ্রসংগীতের ওপর বিলাতি গানের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মুরশিদ যথার্থই লিখেছেন, ‘…বিলাতে তিনি যে ফোক সং শুনেছিলেন এবং শিখেছিলেন, সেসব গান হলো কথাপ্রধান। সুরে সুরে অনেক কথা বলে যাওয়ার মতো। বাংলায় কীর্তন ও বাউল গান ছাড়া এ ধরনের কথাপ্রধান গান ছিল না। বাংলা গানে সুর কথাকে ছাপিয়ে যেতো। রবীন্দ্রনাথ বিলেতি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কথাপ্রধান গান লিখলেন।’ (২০০৮, ৩৩৪)। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের অবদান সুবিদিত। তবে বাঙালি লেখকেরা তাদের গুরু ভারতচন্দ্রের মান রেখেছেন। তারা বিদেশি শব্দ ব্যবহার করে তাদের লেখাকে অনেক রসাল করেছেন এবং প্রসাদগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের সৃজনশীল আত্তীকরণের অজস্র উদাহরণ বাঙালি জীবনের সব ক্ষেত্র থেকেই দেওয়া যেতে পারে। বাঙালি কূপমণ্ডুক নয়। বাঙালিরা তাদের মনের বাতায়ন কখনো বন্ধ করে রাখেনি।

    ঐতিহাসিকদের পশ্চাদমুখী ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বা a prophet looking backwards রূপে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। অতীতের প্রবণতা থেকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রক্ষেপণ সম্ভব। তবে একই সঙ্গে বর্তমানে যেসব পরিবর্তন ঘটছে তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুটি পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, বিশ্বায়ন পরকে আপন না করলেও দূরকে নিকট করেছে। যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লবের ফলে বাইরের জগতের যেকোনো পরিবর্তনের প্রভাব অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কাজেই বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশ্বই শুধু আমাদের কাছে আসছে না। আমরাও বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছি। এই মুহূর্তে প্রায় ৭৫ লাখ বাংলাদেশি দেশের বাইরে নববর্ষের দিন কাটাচ্ছে। হয়তো পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ তাদের কপালে জুটছে না। তবু পয়লা বৈশাখ তাদের হৃদয়ে দীপ্যমান। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশকে বাইরের জগতের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। জাত্যভিমানের চোরাবালিতে বাঙালিদের আজ মুখ লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অতীত ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই বিশ্বের সঙ্গে বাঙালির এত নিবিড় বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য বাঙালিরা কখনো বাইরের জগৎকে বর্জন করেনি। আবার বাঙালিরা বাইরের জগতের কাছে তাদের সত্তাও কখনো বিকিয়ে দেয়নি। বাঙালি অনুকরণে বা হনু-করণে বিশ্বাস করে না। বাঙালির সাধনা বৈশ্বিকের সঙ্গে স্থানিকের সমন্বয়। এই সমন্বয়ের মাধ্যমেই বাঙালি পরিবর্তন সত্ত্বেও তার সত্তা বাঁচিয়ে রেখেছে। বাইরের অন্ধ অনুকরণ বা বিশ্বায়নের সঙ্গে সংঘাত কোনোটিই বাঙালির ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। বাইরের সঙ্গে ভেতরের সমন্বয়ের সাধনা বাংলার ইতিহাসের একটি বড় শক্তি।

    বাঙালির জীবনে দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন হলো সাম্প্রতিক কালে বাংলার ভৌগোলিক পরিবেশের অস্বাভাবিক পরিবর্তন। এককালে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘বাঙালীর ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙালী বাঁচিবে না।’ আজ জীবিত থাকলে তিনি বলতে বাধ্য হতেন, বাঙালীর ভূগোল বাঁচাইতে হইবে, অন্যথায় বাঙালী বাঁচিবে না। অতুল রূপরাশি নিয়ে পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো হারিয়ে গেছে বাংলার অসংখ্য নদ-নদী। শুকিয়ে যাচ্ছে ভাটি অঞ্চলের বিল, হাওর ও বাওড়। বাঙালির ভৌগোলিক অস্তিত্বের প্রতি হুমকি আসছে সব দিক থেকে। বাংলার দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চলের দিগন্তে আজ জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত। উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বারবার অবরুদ্ধ হচ্ছে; অববাহিকার উজানে চলছে স্পর্শকাতর বনাঞ্চল ধ্বংসের দক্ষযজ্ঞ। এহেন অতি নাজুক ৫৫ হাজার বর্গমাইলে ১৬ কোটির বেশি মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও মনে রাখা দরকার যে বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করে আমাদের বাঁচতে হবে। এখানে টিকে থাকার প্রথম শর্ত হলো নিজের শক্তিতে বলিয়ান হওয়া। আজ তাই বাঙালির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শক্তিশালী সংগঠন। অথচ বাঙালির প্রবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের তোড়ে প্রতিষ্ঠানগুলি বারবার ভেসে যাচ্ছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির অস্তিত্ব অর্থহীন। অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাঙালি আজকের বিশ্বে টিকে থাকতে পারবে না। পাল শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পাই যে গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত উদারনৈতিক ও পরমতসহিষ্ণু রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেক দিন টিকে থাকতে পারে। প্রশ্ন হলো গোপালের নির্বাচনের মতো ঐকমত্যের রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি সম্ভব হবে কি?

    অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাঙালিরা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেশজ ও বহিরাগত সংস্কৃতির মধ্যে অপূর্ব সমন্বয় করেছে। অথচ রাজনীতির ক্ষেত্রে তার অন্তর্দ্বন্দ্বগুলি নিরসন করতে পারেনি। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লরেন্স জিরিং (১৯৯২, ১) ঠিকই লিখেছেন, ‘Bangladesh is a country challenged by contradictions.’ (বাংলাদেশ স্ববিরোধিতায়– জর্জরিত একটি দেশ)। এই স্ববিরোধিতার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বটি চলছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে গোষ্ঠীস্বার্থের এবং ঐক্যের সঙ্গে বিভক্তির। এই দ্বন্দ্বের সুচারু নিরসনের ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের বাঙালির ইতিহাসের গতিধারা।

    উল্লেখিত রচনাবলি (Works Cited)

    • খান, আকবর আলি। ২০১১। অন্ধকারের উৎস হতে। ঢাকা : পাঠক সমাবেশ। ––। ২০০৪। বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা। ঢাকা: বাংলা একাডেমী।
    • গিডেন্স, অ্যান্টনি (Giddens, Anthony) ১৯৯৯। Runaway World. London: Profile Books.
    • জিরিং, লরেন্স (Ziring, Lawrence)। ১৯৯২। Bangladesh From Mujib to Ershad. Dhaka: University Press Ltd.
    • দাশ, আশা। ১৯৬৯। বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি। কলকাতা: ক্যালকাটা বুক হাউস।
    • দাসগুপ্ত, বিপ্লব। ২০০৪। বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষা। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং।
    • নর্থ, ডগলাস সি (North, Douglas C.)। ১৯৯০। Institutions, Institutional Change and Economic Performance. New York: Cambridge University Press.
    • পুটনাম, রবার্ট ডি (Putnam, Robert D.)। ১৯৯৩। Making Democracy Work. Princeton: Princeton University Press.
    • ফুকুয়ামা, ফ্রানসিস (Fukuyama, Francis)। ১৯৯৫। New York: Simon and Schuster
    • ব্যাশাম, এ. এল. (Basham A. L.)। ১৯৫৯। The Wonder That Was India. New York: Grove Press.
    • মজুমদার, আর. সি. (Majumdar R. C) (সম্পাদিত)। ১৯৬৩। History of Bengal. vol.1, Dhaka: University of Dhaka.
    • মুখোপাধ্যায়, ব্রতীন্দ্রনাথ। ২০০০। বঙ্গ, বাঙালী ও ভারত। কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স।
    • মুরশিদ, গোলাম। ২০০৮। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। ঢাকা: অবসর।
    • রায়, নীহাররঞ্জন। ১৪০০ বঙ্গাব্দ। বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব। কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং।
    • শাস্ত্রী, অশোক চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯২। পাল অভিলেখ সংগ্রহ। কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ।
    • সরকার, বিনয়। ২০০৩। বিনয় সরকারের বৈঠকে। কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং।
    • সেন্দেল, ভেলেম ভান (Willem Van Schendal)। ২০০৯। A History of Bangladesh. Delhi: Cambridge University Press.
  • বাংলাদেশে সিভিল সমাজ

    বাংলাদেশে সিভিল সমাজ

    বাংলাদেশে সিভিল সমাজ
    বাস্তবতার সন্ধানে একটি ধারণা

    ১. ভূমিকা

    আজকাল সুশীল শব্দটির যত্রতত্র আকছার অপপ্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো উৎসাহী আমলা ‘সিভিল সারভেন্ট’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে লিখছেন ‘সুশীল সেবক’। এখানে একসঙ্গে দুটি অপরাধ করা হচ্ছে। প্রথমত, ‘সিভিল সার্ভেন্ট’-এর প্রতিশব্দ রূপে ‘সুশীল সেবক’ ব্যবহার বাংলাদেশ সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধানের বাংলা পাঠ চূড়ান্ত। সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদে ‘সিভিল পোস্ট’-এর স্থলে ‘অসামরিক পদ’ শব্দ-যুগল ব্যবহৃত হয়েছে। সংবিধানে চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে ‘সিভিল’ অর্থ হলো ‘অসামরিক’; কোনো অবস্থাতেই ‘সুশীল’ নয়। ‘সার্ভেন্ট’ শব্দটি সংবিধানে ব্যবহৃত হয়নি। তবে সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে সার্ভিস শব্দের স্থলে ‘কর্ম’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে। তাই সংবিধান অনুসারে ‘সিভিল সার্ভেন্ট’-এর প্রতিশব্দ হবে ‘অসামরিক কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তি।

    দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মচারীদের সুশীল সেবক বর্ণনা করা একটি ডাহা মিথ্যা প্রচারণা। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে প্রায়ই বলা হতো যে এরা ‘neither Indian, nor civil, nor service’। অর্থাৎ এরা ‘ইন্ডিয়ান’ নয় (এর বেশির ভাগ কর্মকর্তাই ইংরেজ ছিলেন, ভারতীয় নয়); মোটেও সিভিল’ নয় (এঁদের অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত উদ্ধত) এবং এদের মধ্যে সার্ভিসের লেশমাত্রও ছিল না, (এঁরা সেবা করতেন না; প্রজাদের শাসন করতেন)। বাংলাদেশে ‘সিভিল সারভেন্ট’দের সম্পর্কেও একই মন্তব্য প্রযোজ্য। যারা ‘সিভিল সারভেন্ট’দের সুশীল সেবক বলে জাহির করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

    সুশীল শব্দটির সবচেয়ে ব্যাপক অপপ্রয়োগ হচ্ছে সুশীল সমাজ শব্দগুচ্ছে। ইংরেজি ‘সিভিল’ শব্দটির অনেক অর্থ রয়েছে। শব্দটির অর্থ শুধু ভদ্র, অমায়িক, বিনয়ী বা সুশীল নয়। ‘সিভিল কোর্টের’ পরিভাষা হলো ‘দেওয়ানি আদালত’। ‘সিভিল ওয়ারের’ অর্থ সুশীল যুদ্ধ নয়, গৃহযুদ্ধ। তেমনি ‘সিভিল ম্যারেজ’কেও কেউ সুশীল বিবাহ বলে না।

    সুশীল শব্দটির সংজ্ঞা নিয়ে গোপাল ভাঁড়ের একটি চমৎকার কাহিনি রয়েছে। গল্পটি নিম্নরূপ : গোপাল একদিন রাজসভায় এসে বলল, ‘মহারাজ, আজ একজন সুশীল বালকের দেখা পেয়েছি।‘’

    মহারাজ বললেন, ‘তুমি কী করে বুঝলে সে সুশীল বালক?’

    গোপাল বলল, ‘বাপ আর ছেলে মাঠে কাজ করছিল। কিছুক্ষণ কাজ করার পর ছেলে বাবাকে বলল, ‘বাবা, তুমি একটু দূরে সরে যাও, আমি এখন গাঁজা টানব। গুরুজনের সামনে কখনো গাঁজা টানা উচিত নয়।‘’ এবার আপনিই বলুন, ‘ছেলেটি সুশীল কি না?’

    সিভিল সমাজের লোকেরা গাঁজা-ভাং নিয়ে নেশা করে কি না জানি না। তবে তারা অনেক কাজ করে যা সুশীল লোকেরা করে না। এরা হরতাল করে, পিকেটিং করে, এমনকি কখনো কখনো পুলিশকে ঢিল-পাটকেল মারে। এরা অনেক সময় সমাজের মূল স্রোতোধারার বিপক্ষে বিদ্রোহ করে। তবু কেন তাদের সুশীল সমাজ বলা হয়?

    ‘সিভিল সোসাইটির’ সংজ্ঞা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে প্রাচীনকাল থেকে এ সম্পর্কে দুটি ধারণা দেখা যায়। প্রথমত, ‘সিভিল সোসাইটির’ লক্ষ্য সুসমাজ প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, এর একটি বড় উপাদান হলো Civility, যার সহজ বাংলা অনুবাদ হলো ‘ভদ্রতা ও সৌজন্যমূলক আচরণ’। সম্ভবত এ দুটি কারণেই বাংলায় সুশীল সমাজ ধারণাটি চালু হয়েছে। তবে এখানে একটি বড় ভুল করা হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সংজ্ঞা অনুসারে Civility-এর অর্থ ভদ্রতা নয়। ক্যারোলিন এম ইলিয়টের (২০০৬, ১৭) মতে, ‘Civility implies tolerance, the willingness of individuals to accept disparate political views and social attitudes.’ (সিভিলিটি হচ্ছে সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক মত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে ভিন্নমত গ্রহণের ক্ষমতা)। সুশীল শব্দটি এ ক্ষেত্রে তাই একেবারেই অচল। উপরন্তু সিভিল সমাজ শুধু গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদর্শের। ছিটেফোঁটাও নেই, এমন সংগঠনও সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। কারমেন। মালেনা ও ভলকার্ট ফন হেনরিখ (২০০৭, ৩৪১) তাই প্রশ্ন তুলেছেন যে, সব সিভিল সমাজই ‘সিভিল’ নয়, অনেক uncivil civil society বা দুঃশীল সুশীল সমাজও রয়েছে। সিভিলিটি একটি আদর্শ, বাস্তবতা নয়। বাস্তব জীবনে সিভিল সমাজে অনেক অগণতান্ত্রিক ও ধর্মান্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা সহিংস, সমাজে বিদ্বেষ ছড়ায় এবং গোপনে জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়। তালিবান বা গোরক্ষা সমিতিকে কি সিভিল সমাজ বলা যায়? অন্যদিকে এদের সিভিল সমাজ থেকে বাদ দিতে গেলে চিন্তা, বিবেক ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিয়ে মৌলিক অধিকার খর্ব করার প্রশ্ন উঠবে।

    দোষটা শুধু পরিভাষার নয়। সিভিল সমাজ’ ধারণাটিই গোলমেলে। আধুনিক যুগে দার্শনিক হেগেল ‘সিভিল সমাজের ভূমিকার ওপর প্রথম গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি মনে করেন যে আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার এত শক্তিশালী হয়ে পড়েছে যে এখানে ব্যক্তির ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তাই ব্যক্তিরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে পরিবার ও রাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন সমিতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এসব সংগঠনই হচ্ছে সিভিল সোসাইটি। হেগেল মনে করতেন যে সিভিল সোসাইটি যে রকম রাষ্ট্রের খবরদারি করে, রাষ্ট্রেরও তেমনি সুশীল সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।

    একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত হবে কি না। ডানপন্থীরা দাবি করেন যে যেহেতু বাজার ব্যক্তিগত অধিকারের পক্ষে, সেহেতু বাজারসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলি সিভিল সমাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। সমালোচকেরা দাবি করেন যে বাজারও ব্যক্তিকে শোষণ ও বঞ্চনা করে। বাজারের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিকে লড়তে হয়। প্রায় সোয়া দুই শ বছর আগে অ্যাডাম স্মিথ (২০০৩, ১৭৭) লিখেছিলেন, ‘People of the same trade seldom meet together, even for merriment and diversion, but the conversation ends in a conspiracy against the public, or in some contrivance to raise prices.’ (একই ব্যবসায়ে কর্মরত ব্যক্তিরা কদাচিৎ একত্র হয়; এমনকি হাসি-ঠাট্টা বা আমোদের জন্যও নয়। তারা যখনই পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে তখনই তারা জনগণের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র করে অথবা দাম বাড়ানোর ছুতা খুঁজে বের করে।) বণিকদের সংগঠনগুলি জনগণের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই বণিকদের সংগঠন সিভিল সোসাইটিতে অন্তর্ভুক্ত করা অনুচিত।

    এসব বিতর্ক বিবেচনা করে সিভিল সমাজের আন্তর্জাতিক সংগঠন Civicus World Alliance for Citizen participation for you. Y1695 নিম্নরূপ সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন : ‘The arena outside of the family, the state and market where people associate to advance common interests.’ (সিভিল সমাজ হচ্ছে পরিবার, রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে প্রভাবের ক্ষেত্র, যেখানে ব্যক্তিরা তাদের অভিন্ন স্বার্থগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগঠিত হয়।)। এর মধ্যে রয়েছে (গির্জার মতো) ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন, বিতর্ক সমিতি, স্বাধীন গণমাধ্যম, উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি (academia), সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের সংগঠন, তৃণমূল সমাজসেবী বা সমবায় সংগঠনগুলি, পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলি, বেসরকারি সংগঠন বা এনজিও, লিঙ্গ, পরিবেশসহ বিভিন্ন দাবিসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন এবং রাজনৈতিক দল। সিভিল সমাজের প্রভাবের ক্ষেত্র হচ্ছে পরিবার, রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে জনসাধারণের অংশ যেখানে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় হয় ও লেনদেন ঘটে। এ ধরনের সম্পর্কের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

    সিভিল সমাজ ধারণাটি নিয়ে একটি বড় অসুবিধা হলো, এখানে একই মোড়কে তিনটি ধারণা রয়েছে। মাইকেল এডোয়ার্ডের (২০১১) ভাষায়, সিভিল সমাজ হচ্ছে একই সঙ্গে লক্ষ্য, লক্ষ্য অর্জনের উপায় এবং লক্ষ্য ও উপায় সম্পর্কে কুশীলবদের পারস্পরিক ভাব বিনিময় ও সম্পর্ক স্থাপনের কাঠামো। সিভিল সমাজের লক্ষ্য হচ্ছে এর আদর্শগুলির বাস্তবায়ন। এসব আদর্শ সম্পর্কে অ্যারিস্টটল থেকে টমাস হবস পর্যন্ত দার্শনিকেরা লিখেছেন (জিন এল কোহেন ও অ্যান্ড্রু আরাতো, ১৯৯৭)। এ লক্ষ্যগুলি হচ্ছে রাজনৈতিক সম-অধিকার, বিরুদ্ধ মতবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধের নিষ্পত্তি। সিভিল সমাজের লক্ষ্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা। সিভিল সমাজ বিশ্বাস করে ভালো সরকার কখনো সৎ প্রতিবেশীর বিকল্প হতে পারে না। কাজেই ভালো সরকার যথেষ্ট নয়। প্রতিবেশীদের মধ্যেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সমাজে সবাইকে মিলেমিশে থাকতে হবে। এসব লক্ষ্য আদর্শিক। বাস্তব জীবনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব আদর্শ অচল। তবে সিভিল সোসাইটির একটি লক্ষ্য নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই। সব সিভিল সোসাইটিই চায় রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং এই লক্ষ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা খর্ব করা। নীরা চন্দক (২০০৭, ৬০৮) এর ভাষায়, ‘The concept of civil society highlighted one basic precondition of democracy: state power has to be monitored, engaged with and rendered accountable through intentional and engaged citizen action.’ (সিভিল সমাজের ধারণাটি গণতন্ত্রের একটি পূর্বশর্তের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে : উদ্দেশ্যমূলক অঙ্গীকার নিয়ে নাগরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে রাষ্ট্রশক্তির পরিবীক্ষণ, ব্যবহার ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ।)।

    সিভিল সমাজে লক্ষ্য অর্জনের উপায় হচ্ছে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সমিতি বা সংগঠনগুলি। এ ধরনের সংগঠনগুলিই বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর দাবিদাওয়া। বাস্তবায়নের জন্য জনমত গড়ে তোলে। এরাই সিভিল সমাজের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে সব স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনই সিভিল সমাজের আদর্শে বিশ্বাস করে না। এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান সমাজে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মান্ধ বা বর্ণবাদী ও জাতপাতভিত্তিক সংগঠনগুলির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

    স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্য একই ধরনের নয়। এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। তাই এদের মতবিনিময় ও পারস্পরিক লেনদেনের জন্য একটি কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। এই কাঠামোকে public sphere বা গণক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে। রাষ্ট্র, বাজার আর পরিবারের বাইরে যে সমাজ রয়েছে তার পুরোটাই হলো গণক্ষেত্র। এই গণক্ষেত্রের জন্ম অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এর আগে ব্যক্তিরা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করত; তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল সীমিত। অষ্টাদশ শতকে শিল্পোন্নত দেশগুলির শহরগুলিতে মোড়ে মোড়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছে সস্তায় কফি বিক্রয়ের জন্য কফি হাউস গজিয়ে ওঠে। এসব দোকানে কফির সঙ্গে সঙ্গে আড্ডাও জমে ওঠে। ভিন্নমতের মানুষের মধ্যে মতবিনিময় শুরু হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্লাবগুলি গড়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক বিতর্ক জমে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়। এদের মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক হয় আরও জমজমাট। গণক্ষেত্র একটি রঙ্গমঞ্চ, যেখানে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে জনমত গড়ে ওঠে। দার্শনিক হাবেরমাসের ভাষায় এই গণক্ষেত্র ব্যক্তির এলাকা ও রাষ্ট্রের এলাকার মধ্যে সমঝোতার সেতুবন্ধ গড়ে তোলে। এভাবেই গণক্ষেত্র সিভিল সমাজের কাঠামো গড়ে তোলে। সিভিল সমাজে সাফল্য তখনই কার্যকর হয়, যখন লক্ষ্য, উপায় ও কাঠামোর মধ্যে সহযোগ ঘটে।

    পণ্ডিতেরা বলছেন যে ইংরেজি সিভিল সমাজ ধারণা এত ব্যাপক যে বর্তমানে এ ধরনের ধারণা ব্যাখ্যার জন্য সিভিল শব্দটি নেহাতই অপ্রতুল। স্পষ্টতই বাংলা সুশীল শব্দটি ইংরেজি সিভিল শব্দটির ভাব প্রকাশে একেবারেই অনুপযুক্ত। কেউ কেউ সিভিল সমাজের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘নাগরিক সমাজ ব্যবহার করছেন। নাগরিক সমাজ শব্দগুচ্ছ নিঃসন্দেহে সুশীল সমাজের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অর্থবহ। তবে নাগরিক সমাজ শব্দগুচ্ছের মধ্যে সিভিল সমাজের লক্ষ্য, উপায় ও কাঠামোর ধারণা ফুটে ওঠে না। উপরন্তু, নাগরিক সমাজ বললে মনে হয়, এটি একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ। প্রকৃতপক্ষে, অজস্র স্বার্থগোষ্ঠী সিভিল সমাজকে বিভক্ত করে রাখে। নাগরিক সমাজ অভিব্যক্তিও এ ক্ষেত্রে লাগসই নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সিভিল সমাজের কোনো বাংলা প্রতিশব্দ না খুঁজে মূল ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করাই বাঞ্ছনীয়। টেবিল-চেয়ারের মতো বিদেশি শব্দ বাংলায় হরহামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই সিভিল শব্দটি বাংলা ভাষায় ব্যবহারে কোনো লজ্জার কারণ নেই। তবে যদি একান্তই বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে হয়, তবে সিভিল সমাজকে রাষ্ট্র, বাজার ও পরিবারবহির্ভূত সমাজ’রূপে বর্ণনা করা যেতে পারে।

    ২. সিভিল সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে তত্ত্ব

    আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘সিভিল সমাজ’-এর ভূমিকা সম্পর্কে প্রথমে বক্তব্য তুলে ধরেন হেগেল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিশ্লেষণে এর সার্থক প্রয়োগ করেন ফরাসি রাজনীতিবিদ ও ঐতিহাসিক অ্যালেক্সিস দ্য তোকভিল (Alexis de Tocqueville, 1805-59)। তিনি সরাসরি সিভিল সমাজ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেননি। তবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন। এসব সংগঠনই হচ্ছে সিভিল সোসাইটির মৌলিক উপাদান।

    ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তোকভিল দুই বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। তিনি মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিভিত্তিক বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অন্তর্নিহিত শক্তি হচ্ছে সারা দেশে ছড়ানো স্থানীয় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলি। এসব সংগঠনই রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কেভিল মনে করেন যে ব্যক্তির অধিকার রক্ষার জন্য গণতন্ত্র যথেষ্ট নয়। অনেক সময় সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলির অধিকার হরণ করে। এই ধরনের পরিস্থিতিকে তিনি tyranny of the majority বা সংখ্যাগুরুর স্বেচ্ছাচার বলে অভিহিত করেছেন (ডোনাল্ড জে মালেজ, ২০০২)। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানগুলি এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তোকভিল তাই মনে করেন যে তৃণমূলে জনগণের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠন ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যাবে না।

    বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে সিভিল সমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক আন্তনিও গ্রাশি (Antoneo Gramsci, 1891-1937)। তিনি ফ্যাসিস্ট কারাগারে বসে সাংকেতিক ভাষায় তাঁর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন। তাই তাঁর বক্তব্যের মধ্যে অনেক অস্পষ্টতা দেখা যায়। মোটা দাগে তিনি সমাজে দুটি সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন। একটি হলো hegemony বা আধিপত্য। আরেকটি হচ্ছে। domination বা বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ। আধিপত্য নাগরিকদের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সম্মতি সৃষ্টির কাজটি করে সিভিল সমাজ। আর বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র ও সিভিল সমাজ পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে আবার প্রতিদ্বন্দ্বীও হতে পারে। সমগ্রতাবাদী (totalitarian) রাষ্ট্র তাই সিভিল সমাজকে গ্রাস করতে চায়। আবার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সিভিল সমাজ রাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্রে শ্রমিকশ্রেণী রাষ্ট্রের বিপক্ষে সেসব ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করে। গ্রামশির মতবাদের সমর্থকেরা মনে করেন যে সিভিল সোসাইটিই রাষ্ট্র ও বাজারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

    গ্রাম্‌শির বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে সিভিল সমাজ কখনো মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করে আবার কখনো সংঘাতের সৃষ্টি করে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সিভিল সমাজের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এক ঘরানার দার্শনিকেরা বলছেন যে সিভিল সমাজের ভূমিকা হচ্ছে সমাজে ঐকমত্য সৃষ্টি করা। প্রতিদ্বন্দ্বী ঘরানার দার্শনিকেরা বলছেন, সিভিল সমাজের কাজ হচ্ছে সংঘাতের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করা।

    প্রথম ঘরানার প্রধান প্রবক্তা হলেন জারগান হাবেরমাস (Jurgen Habemas, জন্ম ১৯২৯)। সমাজবিজ্ঞানে তার একটি বড় অবদান হলো জনমত গঠনে গণক্ষেত্র বা public sphere-এর ভূমিকার বিশ্লেষণ। তাঁর মতে, গণক্ষেত্রে সিভিল সমাজের যে অংশ সক্রিয় রয়েছে তাদের মধ্যে যুক্তিবাদী ভাব-বিনিময় (communicative rationality) এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম-অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের (discourse ethics) ভিত্তিতে সমাজের মধ্যে ঐকমত্য (consensus) গড়ে ওঠে। সিভিল সমাজে যুক্তির ভিত্তিতে ঐকমত্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন যথোপযুক্ত কাঠামো।

    হাবেরমাসের বিশ্লেষণে একটি আদর্শ ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার যোগাযোগ ক্ষীণ। সমাজের চালিকা শক্তি যুক্তি নয়, ক্ষমতা। সংবিধান ও আইনকানুন না মানলে এসব দলিল নিছক কাগজ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের স্বভাব পরিবর্তন করা যায় না।

    মিশেল ফুঁকোর (Michel Foucault, 1926-84) বক্তব্য হলো : সমাজ ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না, সমাজের চালিকা শক্তি হলো সংঘাত। এই সংঘাত হচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। সাধারণত হাবেরমাসের মতো চিন্তাবিদেরা সংঘাতকে সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করে থাকে। এই ধরনের মতবাদ খণ্ডন করে ফুঁকোর সমর্থকেরা লিখছেন, ‘There is mounting evidence, however, that social conflicts produce themselves the valuable ties that hold modern democratic societies together and provide them with the strength and cohesion they need, that social conflicts are the true pillars of democratic society (Hirschman 1994, 206). Governments and societies that suppress conflict do so at their own peril. … In a Foucauldian interpretation, suppressing conflict is suppressing freedom, because the privilege to engage in conflict is part of freedom.’ (ক্রমবর্ধমান সাক্ষ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক সংঘাতগুলিই গণতন্ত্রকে একত্রে বেঁধে রাখার জন্য মূল্যবান বন্ধনগুলি সৃষ্টি করে, এরাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় শক্তি ও সংহতি জোগায়; এরাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আসল খুঁটি। যেসব সরকার ও সমাজ এসব সংঘাতকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করে। …ফুঁকোর ব্যাখ্যা অনুসারে সংঘাত দমন করতে গেলে স্বাধীনতাকে খর্ব করা হবে কারণ সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার অধিকার স্বাধীনতার অংশ। বেন্ট ফ্লাইবর্গ, ১৯৯৮, ২২৮-২৯)। সংঘাতকে অস্বীকার করে যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে তা কখনো টেকসই হয় না। জোর করে সংঘাত দমন করলে সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যা পরে আরও তীব্রতর আকারে ফিরে আসে।

    তবে ফুকোর সিভিল সমাজতত্ত্বের একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। সিভিল সমাজে সংঘাত দুই ধরনের। একটি হলো সিভিল সমাজের সঙ্গে বাইরের সংঘাত। এ সংঘাত রাষ্ট্র ও সিভিল সমাজের মধ্যে চলে। এর ভালো দিক রয়েছে, কেননা সিভিল সমাজ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচার খর্বিত করে। আরেকটি সংঘাত হলো অভ্যন্তরীণ। এ সংঘাত চলে সিভিল সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে। প্রথম ধরনের সংঘাত সমাজে পরিবর্তনের অগ্রদূত। দ্বিতীয় ধরনের সংঘাত সিভিল সমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় করে। যদি সিভিল সমাজের মধ্যে বড় ধরনের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সংঘাতের মাধ্যমে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব হয় না।

    সিভিল সমাজ সম্পর্কে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলির পর্যালোচনা করলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে সামাজিক পরিবেশ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতভেদে সিভিল সমাজের ভূমিকা ভিন্ন হয়। এখানে এক তত্ত্ব দিয়ে সব ধরনের সিভিল সমাজের বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।

    বিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে সিভিল সমাজ নিয়ে নতুন আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের দুটি অঞ্চলে রাজনীতিতে সিভিল সমাজের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। একটি অঞ্চল হলো রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ। এখানে কমিউনিস্ট শাসন আমলে সব ধরনের রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড দমন করা হয়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা যখন এসব দেশে ভেঙে পড়ে তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। তাই এখানে সিভিল সমাজ রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে। দ্বিতীয়ত, ল্যাটিন আমেরিকার সেনাশাসিত দেশগুলির রাজনীতিতে সিভিল সমাজ অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এখানেও কারণ একই। এসব দেশে সেনাশাসন রাজনীতি নিষিদ্ধ করে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। গির্জা-সংগঠনগুলি সিভিল সমাজে অত্যন্ত সক্রিয়। তাই এসব দেশে সিভিল সমাজ রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়। উপরিউক্ত দুটি উদাহরণ থেকে দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশে বিরাজনীতিকরণের মাত্রা বেশি, সেসব দেশের রাজনীতিতে সিভিল সমাজের ভূমিকা তত ব্যাপক।

    রাজনীতিতে সিভিল সমাজের ভূমিকা নিয়ে সিভিল সমাজ তত্ত্বের মধ্যেই একটি স্ববিরোধিতা রয়েছে। তত্ত্ব অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলি সিভিল সমাজের অংশ। পক্ষান্তরে, সিভিল সমাজের অবস্থান রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে। অথচ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল কি সিভিল সমাজের বাইরে, না ভেতরে? এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো সরকারের বাইরে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব অস্তিত্ব আছে কি না। যেসব দেশে দলপ্রধান ও সরকারপ্রধান সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি সেখানে দলের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে সরকারি দলও সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। তবে বাংলাদেশের মতো কোনো কোনো দেশে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের মধ্যে সব প্রভেদ তুলে দেওয়া হয়। এসব দেশে সরকারি দল সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত নয়। এ ধরনের সরকার গোটা সিভিল সমাজকে বিরোধী দল বলে গণ্য করে ও সিভিল সমাজকে অনুগত গৃহপালিত সংগঠনে পরিণত করতে চায়। সিভিল সমাজ মাথা তুলতে চাইলে তাকে দমন করতে এরা নির্মমভাবে খঙ্গহস্ত।

    উন্নয়নশীল দেশে সিভিল সমাজের প্রবক্তারা অনেকেই তোকভিলের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। তাঁরা মনে করেন যে অগণতান্ত্রিক উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সিভিল সমাজের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিভিল সমাজ। ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য উদার হস্তে অর্থ বিনিয়োগ করছে। দাতাদের অর্থানুকূল্যে বিভিন্ন দেশে হরেক রকম সিভিল সমাজ সংগঠন গড়ে উঠছে। এরা দেশের মাটিতে গজায়নি। এদের বাইরে থেকে এনে দেশের মাটিতে প্রোথিত করা হয়েছে। স্টাইলস (২০০২ ক) এ ধরনের সিভিল সমাজের নাম দিয়েছেন ফরমায়েশি সিভিল সমাজ বা Civil society by design। এ ধরনের সিভিল সমাজের কর্মকাণ্ড তৃণমূলের মানুষেরা নিয়ন্ত্রণ করে না। এদের কর্মসূচি নির্ধারণ করে বিদেশি দাতারা। এ প্রসঙ্গে একটি ইংরেজি আপ্তবাক্য স্মরণ করা যেতে পারে : ‘He who pays the piper plays the tune.’ (বাঁশি কোন সুরে বাজবে সেটা নির্ভর করে বাঁশিওয়ালাকে যিনি বেতন দেন তার মর্জির ওপর)।

    ৩. বাংলাদেশে সিভিল সমাজ

    বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। এনজিও বা বেসরকারি সংগঠনগুলি সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। তবে বাংলাদেশে অনেক ধরনের এনজিও রয়েছে। কোনো কোনো এনজিওর সদস্যসংখ্যা ১০০-এর কম। আবার ব্র্যাকের মতো এনজিও-ও রয়েছে, যার সদস্যসংখ্যা কয়েক লাখ এবং যা বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও হিসেবে পরিগণিত। ছোট ও বড় সিভিল সংগঠনকে একত্রে যোগ করে কোনো অর্থবহ তথ্য পেশ করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের (২০০৬) একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার এনজিও ছিল যার অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় (অনুমান করা হয়, হাজার বিশেক এনজিও সক্রিয়। এদের মধ্যে হাজার দুয়েক এনজিও বৈদেশিক সাহায্যের জন্য নিবন্ধনপ্রাপ্ত।)। বাংলাদেশে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ গ্রামে কমপক্ষে একটি এনজিওর উপস্থিতি রয়েছে। তাই শুধু এনজিওর সংখ্যার ভিত্তিতে এনজিওর গুরুত্ব বোঝানো যাবে না।

    অন্যদিকে তত্ত্ব অনুসারে সমবায় সমিতিগুলি সিভিল সমাজের অন্তর্ভুক্ত। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় পৌনে দুই লাখ সমবায় সমিতি আছে। সিভিল সমাজের তত্ত্ব অনুসারে সমবায় সমিতিগুলিকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠন হিসেবে সিভিল সমাজের সংগঠন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এ অনুমান বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও খাপ খায় না। বাংলাদেশে কমপক্ষে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সমবায় সমিতিগুলি সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত, সরকার কর্তৃক অর্থায়িত ও সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এরা কোনো অভিধাতেই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নয়, এগুলি সমবায় বিভাগের এক ধরনের শাখা। উপরন্তু, এদের বেশির ভাগ দেউলিয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। এদের সিভিল সমাজ সংগঠন হিসেবে গণ্য করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

    ফারহাত তাসনিম (২০০৭) তাঁর অভিসন্দর্ভে ২০০৭ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত সিভিল সংগঠনের সংখ্যা ২,৫৯,৭৭৬ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এই সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। তাসনিমের এই তালিকায় ১,৮৯,৮৪৭ সমবায় সমিতি অন্তর্ভুক্ত। সমবায় সমিতিগুলি বাদ দিলে সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা হবে প্রায় ৭০ হাজার। এই হিসাবের মধ্যে ৪৫ হাজার ৫০৮টি সমাজকল্যাণ সংগঠন রয়েছে, যার অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ দিলে বাংলাদেশে সিভিল সংগঠনের সংখ্যা বড়জোর হাজার পঞ্চাশ হতে পারে। তবে শুধু এই সংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনের বিস্তৃতি পরিমাপ করা যাবে না। এর ভেতর অনেক এনজিও রয়েছে যাদের শত শত শাখা রয়েছে। এনজিও-সংক্রান্ত সমীক্ষার ভিত্তিতে এ কথা স্পষ্ট, বাংলাদেশে শতভাগ শহরে ও কমপক্ষে ৯০ শতাংশ গ্রামে একটি সিভিল সমাজ সংগঠন রয়েছে।

    সারণি ১০.১-এ ১০০ বছর ধরে বাংলাদেশে সিভিল সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা যাবে। এই সারণির উপাত্তগুলি ৫০৪টি প্রতিষ্ঠানের নমুনা জরিপের ভিত্তিতে সংগৃহীত হয়েছে।

    সারণি ১০.১
    বাংলাদেশে সিভিল সংগঠনগুলির প্রতিষ্ঠার সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ, ১৯১০-২০০৬
    সময় মোট সিভিল সংগঠনের সংখ্যা ১৯১০-২০০৬ সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মোট সংগঠনের শতাংশ ক্রমপুঞ্জীভূত শতাংশ
    ১৯১০-৩৪
    ১৯৩৫-৩৯ ০.২ ০.২
    ১৯৪০-৪৪ ০.২ ০.৪
    ১৯৪৫-৪৯ ০.৪ ০.৮
    ১৯৫০-৫৪ ১.০ ১.৮
    ১৯৫৫-৫৯ ১.৮
    ১৯৬০-৬৫ ১৫ ৩.০ ৪.৮
    ১৯৬৫-৬৯ ১০ ২.০ ৬.৮
    ১৯৭০-৭৫ ৩৮ ৭.৬ ১৪.৪
    ১৯৭৫-৮০ ৪০ ৮.০ ২২.৪
    ১৯৮০-৮৪ ৭০ ১৩.৮ ৩৬.২
    ১৯৮৫-৮৯ ৬৭ ১৩.৩ ৪৯.৫
    ১৯৯০-৯৫ ৫০ ৯.৯ ৫৯.৫
    ১৯৯৫-৯৯ ৯০ ১৭.৮ ৭৭.২
    ২০০০-২০০৬ ১১৫ ২২.৮ ১০০
    সূত্র : ফারহাত তাসনিম (২০০৭, ১০৪)

    সারণি ১০.১ থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের বেশি সিভিল সমাজ সংগঠনের জন্ম হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সময়কালে প্রায় ৪৩ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৫০ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠন ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়ে সিভিল সমাজ সংগঠনের বিস্তৃতির একটি বড় কারণ হলো, ১৯৯০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর সিভিল সমাজের ধারণা দাতাদের আনুকূল্য লাভ করে। ১৯৯০-এর দশকের আগেই বাংলাদেশে বেসরকারি সংগঠনগুলির প্রসার ঘটে। তবে ১৯৯০-এর পর বাংলাদেশে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলি নতুন ধরনের কার্যকলাপ শুরু করে। এ ধরনের কার্যকলাপ civic advocacy বা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবির সপক্ষে নাগরিক প্রচারণা নামে পরিচিত। কোনো কোনো সিভিল সমাজ সংগঠন অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে এ ধরনের কাজ শুরু করে। আবার কোনো কোনো সংগঠন নিজেদের শুধু প্রচারকাজেই নিয়োজিত রাখে। তবে এ ধরনের কাজের সঙ্গে বেসরকারি সংগঠনগুলি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের (২০০৬, ১৫) একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে এনজিওদের ৪২ শতাংশ তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করে এবং ৯৩ শতাংশ বেসরকারি সংগঠন তাদের সদস্যদের মধ্যে তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে চেতনা সৃষ্টির চেষ্টা করে। তবে এনজিওগুলি সব সময়ে ইচ্ছা করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছা না থাকলেও ঘটনাচক্রে এরা সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ প্রশিকা নামক সংগঠনটির অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে। পশু চিকিৎসকের অভাবে প্রশিকার গবাদি পশুপালন-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কর্মসূচি ব্যাহত হয়। পশু চিকিৎসায় সরকারি বিভাগের ছিল একচেটিয়া অধিকার। প্রশিকাকে পশু চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য বাধ্য হয়ে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবারে লিপ্ত হতে হয়।

    গত দুই দশকে বাংলাদেশে সিভিল সংগঠনগুলি বিভিন্ন দাবিদাওয়া উপস্থাপন করে রাজনৈতিক পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারীদের সংগঠন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কোনো কোনো সংগঠন বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে দক্ষতা। দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দুর্নীতির ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ, মানব অধিকারের ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফেমা বা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং গ্রুপ, সুশাসনের ক্ষেত্রে সুজন ও সুপ্র, পরিবেশের ক্ষেত্রে বেলা বা বাংলাদেশ পরিবেশ আইন সমিতি, বাপা বা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ইত্যাদি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম করা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। আবার সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (২০০৬-০৮) বিভিন্ন সংস্কারের দাবিদাওয়া নিয়ে এ ধরনের সংগঠনগুলি অত্যন্ত সোচ্চার ছিল।

    সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও কার্যকর এবং এদের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক। এই মূল্যায়নের কয়েকটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত সিভিল সমাজের ভূমিকা সব সময়ে কার্যকর নয়। যখন সমাজে বিরাজনীতিকরণ ঘটে বা স্বৈরাচারী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করে, তখন সিভিল সমাজের প্রাধান্য বেড়ে যায়। এর ফলে এরশাদ শাসনের শেষ দিকে ও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির প্রাধান্য বেড়ে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক সরকারের শাসনকালে তাদের ভূমিকা সীমিত থাকে, কেননা রাজনৈতিক দলগুলিই জনসমর্থন গড়ে তুলে।

    দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি তাদের ক্ষুদ্র গণ্ডির দাবিদাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। এদের অতি ক্ষুদ্র অংশ রাজনৈতিক দাবিদাওয়াতে আগ্রহী। সারণি ১০.২-এ সিভিল সমাজ সংগঠনের দাবিদাওয়া সম্পর্কে একটি সমীক্ষার ফলাফল দেখা যাবে।

    সারণি ১০.২
    সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির দাবিদাওয়ার বিশ্লেষণ
    কোন ধরনের সিভিল সমাজ সংগঠন কত শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহী
    দাবির বিষয় অর্থনৈতিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি দাবি আদায়ের জন্য সংগঠন কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য সংগঠন মোট
    পল্লী উন্নয়ন ২০.৭ ৬.১ ২৪.১ ১৬
    নারীর ক্ষমতায়ন ২৫ ১২.২ ১২.৫ ৫৪.৫ ৩১
    স্থানীয় দাবিদাওয়া ২০.৭ ৬.১ ২৫ ২৭.২ ১৮
    শিক্ষা ও স্বাক্ষরতা ৩২.৮ ৮১.৬ ৫০ ৬২.৫ ৪৪
    স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ৪৬.৬ ৫৭.১ ৫০ ৬৬.৫ ৪৬
    আইনি, রাজনৈতিক ও মানব অধিকার ১২.১ ২০.৪ ২৫ ২৮.৬ ১৭
    অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ৬৫.৫ ২৮.৬ ৩৭.৫ ৫৭.৬ ৪৪
    সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতা ২৬.৭ ৩৬.৭ ৫০ ৪২.৯ ৩০
    উৎস : ফারহাত তাসনিম (২০০৭, ১৫৬)

    ৫০০টি সিভিল সমাজ সংগঠনের একটি জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের মাত্র ১৭ শতাংশ সংগঠন আইনি, রাজনৈতিক ও মানব অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। অথচ ৪৬ শতাংশ সংগঠন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সেবা প্রদান করে। ৪৪ শতাংশ সংগঠন সদস্যদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করতে আগ্রহী। শিক্ষা ও সাক্ষরতা কর্মসূচিতে উৎসাহী ৪৪ শতাংশ সংগঠন। সারণি ১০.২ থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের সিভিল সমাজ সংগঠনের কাছে সদস্যদের রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা সবচেয়ে কম জনপ্রিয় কর্মকাণ্ড। কাজেই বাংলাদেশে সিভিল সমাজের প্রাণবন্ত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে যা বলা হয়, তা বহুলাংশে অতিকথন। এর একটি বড় কারণ হলো, বাংলাদেশে বেসরকারি সংগঠনগুলি অতি সতর্কতার সঙ্গে বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।

    এক দিক থেকে এনজিও বা বেসরকারি সংগঠনগুলি বাংলাদেশে সিভিল সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। ২ কোটির বেশি নাগরিক এনজিওগুলির কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। আবার এনজিওগুলিই হচ্ছে বাংলাদেশের সিভিল। সমাজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বিশ্বব্যাংকের (২০০৬) এক সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে যে এনজিওগুলির ৯২ শতাংশ শাখার মূল কার্যক্রম হচ্ছে ঋণ প্রদান। এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঋণ কার্যক্রম। পরিচালনা করে টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা (ডেভিন, ২০০৩, ২২৭ ২৪২)। নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্য মহৎ। তবে এর একটি বড় অসুবিধা হলো, সফল ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যাবশ্যক। সিভিল সমাজের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে সমাজকে পরিবর্তন করা এবং প্রয়োজনে তাই সিভিল সমাজ দেশে অস্থিতিশীলতা। সৃষ্টিতে পিছপা হয় না। অথচ এনজিওগুলির জন্য এ ধরনের অস্থিতিশীলতা তাদের দাদন ব্যবসায়ের জন্য ক্ষতিকারক। উপরন্তু এনজিওগুলি সরকারের অর্থায়নে অনেক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সরকারের মন জুগিয়ে চলতে হয়। গত এক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেসব এনজিও সরকারের বিরাগভাজন হয় সরকার অত্যন্ত কঠোরভাবে তাদের দমন করে। এ প্রসঙ্গে প্রশিকা ও গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে। তাই বাংলাদেশে অধিকাংশ এনজিও সচেতন ও অচেতনভাবে স্থিতাবস্থার বড় রক্ষক হয়ে দাঁড়ায়। তাই এনজিওগুলির সিভিল সমাজের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ কি না, সে সম্পর্কে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে (স্টাইলস, ২০০২, ১৪১)।

    সিভিল সমাজ শক্তি সঞ্চার করে নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে। বাংলাদেশের সিভিল সমাজ বিভক্ত ও অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত। এ প্রসঙ্গে স্টাইলস (২০০২, ১১০) যথার্থই লিখেছেন, ‘The degree of penetration of civil society by politicians is extreme … labor unions, professional associations, university groupings, chambers of commerce, and of course newspapers are identified primarily for their political affiliations… Advancement in most professions is based in large part upon signing oneself to the political leaning of one’s superior or joining the relevant association or coalition. Even NGOs have been the target of partisan co-optation… (সিভিল সমাজে রাজনীতিবিদদের অনুপ্রবেশের মাত্রা চরম ।…শ্রমিক ইউনিয়ন, পেশাজীবী সংগঠনগুলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন্দল, বণিক সমিতি ও সংবাদপত্রগুলি। সবকিছুই রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত…বেশির ভাগ পেশায় অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পছন্দের রাজনীতিতে অথবা। সংগঠনে বা মোর্চায় যোগদান…এমনকি এনজিওগুলিও দলে ঠাই খোঁজে।)। রাজনীতির ভিত্তিতে বিভক্ত সিভিল সমাজের পক্ষে পরিবর্তনের অর্থবহ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। হাবেরমাসের মতে, সিভিল সমাজ আইনের শাসনের পক্ষে ঐকমত্য গড়ে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতি বিচারব্যবস্থাকেও বিতর্কিত করে তুলেছে। এ ধরনের পরিবেশে হাবেরমাসের কল্পিত গণক্ষেত্রে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জনমত গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।

    বাংলাদেশে অধিকাংশ সিভিল সমাজ সংগঠন একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তি ক্ষয় করছে। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদের শক্তি অত্যন্ত সীমিত। ৫০০ সিভিল সমাজ সংগঠনের জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, ৮৬ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ১ হাজারের কম। ৬৫ শতাংশ সিভিল সমাজ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ১০০-এরও কম (ফারহাত তাসনিম, ২০০৭, ১৪৩)। বড় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনগুলি হচ্ছে এনজিও যারা দাবিদাওয়া আদায়ের চেয়ে দাদনের ব্যবসায়ে অধিকতর আগ্রহী। এই অবস্থাতে ক্ষুদ্র সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তনে নেতৃত্ব প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন।

    বাংলাদেশের একটি বড় দুর্ভাগ্য হলো যে বাংলাদেশে সিভিল সমাজের পাশাপাশি ‘অ-সিভিল সমাজও (Uncivil society) অতি দ্রুত বেড়ে চলেছে। অ-সিভিল সমাজের মধ্যে রয়েছে মাস্তান, চাঁদাবাজসহ হরেক রকমের দুবৃত্ত। স্থানীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করার জন্য। মাস্তানরা বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্রযন্ত্র ও স্থানীয় রাজনীতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। এরা শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেই শোষণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে জোর খাঁটিয়ে ও ভয় দেখিয়ে এরা ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনৈতিক দলগুলি মাস্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বিপন্ন হয় গণতান্ত্রিক শাসন। তৃণমূল পর্যায়ে ‘অ-সিভিল সমাজ’ই হচ্ছে সিভিল সমাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। সম্প্রতি ছাত্রসংগঠনগুলিতে ব্যাপক দুবৃত্তায়নের ফলে সিভিল সমাজ আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একসময় ছাত্রসমাজের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। ছাত্রসংগঠনসমূহ। সিভিল সমাজের জন্য একটি বড় শক্তি হতে পারত। অথচ এখন। বাংলাদেশের অধিকাংশ ছাত্রসংগঠন দুবৃত্তদের আখড়ায় ও রাজনৈতিক দলসমূহের তল্পিবাহকে পর্যবসিত হয়েছে (ডেভিড লুইস, ২০১১)। ছাত্র সমাজের একটি বড় অংশ ‘অ-সিভিল’ সমাজের অশুভ শক্তিসমূহকে মদদ জোগাচ্ছে।

    বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির আরেকটি দুর্বলতা হলো দুর্নীতির বিস্তার। তাসনিম (২০০৭, ২০২)) তাঁর অভিসন্দর্ভে নির্বাচিত তিন বছরে (২০০১, ২০০৬ ও ২০০৭) মোট ১৮ মাসে সিভিল সমাজ সংগঠন সম্পর্কে তিনটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের বিশ্লেষণ করেন। এই বিশ্লেষণে সিভিল সমাজ সংগঠনের অনিয়ম সম্পর্কে ১২২টি সংবাদ পাওয়া যায়। গড়ে প্রতি ১৪ দিনে একটি করে এনজিওর অনিয়ম সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ৬৯টি ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। সব ধরনের সিভিল সমাজ সংগঠনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে শ্রমিক সংগঠনের বিপক্ষে। দুর্নীতির অভিযোগের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিসংক্রান্ত সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি। দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সমবায় থেকে পেশা-গোষ্ঠীর সংগঠন–সব ধরনের সিভিল সমাজ সংগঠন সম্পর্কেই। অনেক সময় এ ধরনের সংগঠনগুলি প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁদের পরিবারের কুক্ষিগত। এসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কাজে সব সময় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র থাকে না। সামগ্রিকভাবে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির ভাবমূর্তি অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আশপাশের দুনিয়াকে বদলানোর আগে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির নিজেদের শোধরাতে হবে ।

    ৪. বাংলাদেশে সিভিল সমাজের সম্ভাবনা

    বিগত আট দশকে বাংলাদেশে সিভিল সমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি আপাতবিরোধী প্রবণতা দেখা যায়। পাকিস্তানের শাসনআমলে সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু আইনজীবী, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের পেশাজীবী সংগঠনগুলি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি সারা দেশকে মুক্তির স্বপ্নে উত্তাল করেছিল। স্বাধীনতার পর সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে; তবে তাদের কার্যকারিতা ও উচ্ছ্বাস অনেক হ্রাস পেয়েছে। স্বাধীনতার আগে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির সম্পদ ছিল সীমিত। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিদেশি দাতাদের আনুকূল্যে অনেক সিভিল সমাজ সংগঠনই সচ্ছলতা অর্জন করেছে। তবে দাতাদের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। অনেক সংগঠনের কাছে স্থিতিশীল পরিবেশে দাদনের ব্যবসা বেশি লোভনীয় মনে হয়েছে। হালুয়া-রুটির লোভ সিভিল সমাজের দলীয়করণ ত্বরান্বিত করেছে। সিভিল সমাজ দুর্নীতির কবল থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করতে পারেনি।

    বাংলাদেশের সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি এক অর্থে ব্যতিক্রমধর্মী, যা সিভিল সমাজ সম্পর্কে কোনো তাত্ত্বিক আদলের সঙ্গে মোটেও মেলে না। বাংলাদেশে সিভিল সমাজের এত বেশি রাজনীতিকরণ ঘটেছে যে এরা প্রতিনিয়ত তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এদের পক্ষে সমাজে ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তোকভিলের সামাজিক পুঁজির মডেল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অচল। সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির সম্পর্ক এতই তিক্ত যে এ ধরনের সমাজে গণক্ষেত্রে বা public sphere-এ জনমত গঠন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে গ্রাশি ও ফুঁকো আশা প্রকাশ করেছিলেন যে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সিভিল সমাজ শক্তিধর রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে খর্ব করে ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করবে। প্রকৃতপক্ষে এ দেশে সিভিল সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।

    সব দুর্বলতা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির কয়েকটি বড় অর্জন রয়েছে। সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এরা ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা সম্প্রসারণে অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছে। সামরিক শাসন আমলে এরা গণতন্ত্রের সমর্থনে জনমত গড়ে তুলেছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে সিভিল সমাজ শক্তিশালী হয়নি; দুর্বল হয়েছে। রাজনীতি সিভিল সমাজগুলিকে একে অপরের কাছ থেকে ও সমাজের মূল স্রোতোধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে এরা রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে।

    বাংলাদেশে সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে রাজনৈতিক দলগুলিকে অগ্রহণীয় করে তুলছে। এদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এ অবস্থায় অনেকেই ভাবছেন যে সিভিল সমাজ বাংলাদেশে রাজনীতির বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে কি না। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিভিল সমাজকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার একটি সচেতন প্রয়াসও দেখা গিয়েছিল। তবে তা সফল হয়নি। তার একটি বড় কারণ হলো, সিভিল সমাজ ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে আর রাজনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় সংগঠনের বিকল্প হতে পারে। যেমন অনেক মোমবাতি একটি বড় প্রদীপের বিকল্প হতে পারে। কিন্তু সব সময় তা সম্ভব হয় না। বড় গাছ কাটার জন্য দরকার কুড়ালের। নরুন বা সুই দিয়ে কি কুড়ালের কাজ করা যাবে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা করা যাবে না। দলীয় ভিত্তিতে বিভক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিভিল সমাজ সংগঠনগুলি বাংলাদেশে রাজনীতিতে বিকল্প ধারার সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট নয়।

    এই প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশে আদৌ কোনো সিভিল সমাজ আছে কি? অবশ্যই বাংলাদেশে অনেকগুলি সিভিল সমাজ সংগঠন রয়েছে। এরা অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতা (মহিলাদের অধিকার) সৃষ্টিতে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছে। তবে সিভিল সমাজ সংগঠন থাকলেই সিভিল সমাজ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সিভিল সমাজের উপস্থিতির একটি বড় শর্ত হলো, সিভিল সমাজ সংগঠনগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার জন্য একটি কাঠামো থাকতে হবে যেখানে সর্বনিম্ন কিছু বিষয়ে ঐকমত্য থাকবে। বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের কাঠামোর অনুপস্থিতি সুস্পষ্ট। এমনকি সব এনজিও মিলে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এডাব (অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ) নামে এনজিওগুলি যে জাতীয় সংগঠনটি ছিল তা-ও ভেঙে গেছে।

    দ্বিতীয় প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন কারমেন মালেনা ও ভলকার্ট ফন হেনরিখ (২০০৭, ৩৪৯-৬০)। তাঁদের বক্তব্য হলো, পৃথিবীর সব দেশেই সিভিল সমাজ রয়েছে–এ ধরনের অনুমান করা ঠিক হবে না। তারা লিখেছেন, ‘In every country there exists actors, organizations and activities that meet the defined criteria of civil society. In some cases, however, the concept of civil socirty had little resonance. Actors see themselves belonging to a particular organization, sector or movement, but have no sense of belonging to civil society per se.’ (প্রতিটি দেশেই এমন ধরনের কুশীলব, সংগঠন ও কার্যাবলি রয়েছে যা সিভিল সমাজের জন্য নির্ধারিত শর্তগুলি পূরণ করে, তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ ধারণার ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কুশীলবরা নিজেদের বিশেষ প্রতিষ্ঠান, খাত বা আন্দোলনের প্রতি অনুগত মনে করে। যদিও এমনিতে তাদের সিভিল সমাজে অংশীদারির কোনো চেতনা নেই।)। যেখানে সংগঠনগুলির সিভিল সমাজ ধারণার প্রতি আনুগত্য নেই, সেখানে সিভিল সমাজ একটি আদর্শ মাত্র, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না। এসব ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ বাস্তবতার সন্ধানে একটি ধারণার (a concept in search of reality) রূপ ধারণ করে।

    বাংলাদেশে সিভিল সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সিভিল সমাজ সংগঠনের সংখ্যা সীমিত হলেও বিগত শতকের ষষ্ঠ থেকে নবম দশক পর্যন্ত কার্যকর সিভিল সমাজ ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে বাংলাদেশে সিভিল সমাজের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে, অথচ সিভিল সমাজের সংহতি ও চেতনার দ্রুত হ্রাস ঘটেছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অনেক সিভিল সমাজ সংগঠন আছে। তবে কার্যকর সিভিল সমাজ আছে কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে।

    স্পষ্টতই বাংলাদেশে সিভিল সমাজ যে প্রত্যাশা জাগিয়েছে তা পূরণ করতে এই সমাজ সমর্থ নয়। এতে হতাশ হওয়া ঠিক হবে না। সিভিল সমাজ অকার্যকর হলেও অনেক সিভিল সমাজ সংগঠন নতুন চেতনা জাগিয়েছে ও নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। সিভিল সমাজ সংগঠনের দায়িত্ব স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সব সময় সম্ভব হবে না। যত দিন সমাজে ব্যক্তির অধিকার ও সৃজনশীলতা বিপন্ন হবে, তত দিন সিভিল সমাজের ধারণা মানুষকে বারবার আকৃষ্ট করবে। মাইকেল এডোয়ার্ডস যথার্থই F163699, ‘It remains compelling because it speaks to the best in us–the collective, creative and values-driven core of the active citizen–calling on the best in us to respond in kind to create societies that are just, true and free.’ (সিভিল সমাজের ধারণা, আমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম এবং নাগরিকদের মধ্যে সৃজনশীল, মূল্যবোধ-তাড়িত ও যৌথ চেতনায় উদ্বুদ্ধ তাদের কাছে অপ্রতিরোধ্য থেকে যাবে এবং আমাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ তাদের ন্যায়, সত্য ও স্বাধীনতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে উদ্দীপ্ত করবে)। লাভ-লোকসানের প্রত্যাশায় নয়, মানুষের অন্তরের তাগিদই তাদের সিভিল সমাজে টেনে আনবে। এ ধরনের মানুষদের কথা স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে।’

    উল্লেখিত রচনাবলি (Works Cited)

    • ইলিয়ট, ক্যারোলিন এম (Carolyn M. Elliot)। ২০০৩। Civil Society and Democracy: A Reader. New Delhi: Oxford University Press.
    • এডোয়ার্ডস, মাইকেল (Edwards, Michael). ২০১১। Civil Society, http:/www.infed.org/association/civil_society.htm.
    • কোহেন, জিন এল এবং অ্যান্ড্রু আরাতু (Jean L. Cohen and Andrew Arato)। ১৯৯৭। Civil Society and Political Theory. Cambridge: MIT Press.
    • চন্দক, নীরা (Chandoke, Neera)। ২০০৭। Civil Society, Development in Practice. Vol. 17. No 4/5 (August 2007), 607-614.
    • ডেভিন, জোসেফ (Devine, Joseph)। ২০০৩। The Paradox of Sustainability: Reflections on NGOs in Bangladesh’. Annals of the American Academy of Political and Social Science. Vol. 590 (November, 2003), 227-242.
    • তাসনিম, ফারহাত (Tasnim, Farhat)। ২০০৭। Civil Society in Bangladesh: Vibrant but not vigilant. Unpublished Ph.D. dissertation submitted to University of Tsukuba, Japan.
    • ফ্লাইবর্গ, বেন্ট (Flyvbjerg, Bent) ১৯৯৮। Habermas and Foucault : Thinkers for Civil Society’. The British Journal of Sociology. Vol. 49. No. 2 (lune 1998), 210-233.
    • বিশ্বব্যাংক (World Bank) ২০০৬। Economics and Governance of NonGovernmental Organizations in Bangladesh. Bangladesh Development Series. Dhaka: World Bank.
    • মালেজ, ডোনাল্ড জে. (Maletz, Donald J.) । 2002 । ‘Tocqueville’s Tzranny of the Majority Reconsidered’. The Journal of Politics. Vol. 64. No. 2 (August, 2002), 741-763.
    • মালেনা, কারমেন ও ভলকার্ট ফন হেনরিখ (Malena, Carmen and Volkhart Finn Heineich) । 2009 । ‘Civil Society: a proposed methodology for International Comparative Research’. Development in Perspective. Vol. 17 No. 3 (June, 2007), 338-352.
    • লুইস, ডেভিড (Lewis, David) 2008 Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society. New Delhi: Cambridge University Press.
    • স্টাইলস, কেন্ডাল ডাবলু (Stiles, Kendall w)। ২০০২ ক। Civil Society by Design. Westpor: Connectiut: Praegar. — । ২০০২। খ ‘International Support for NGOs in Bangladesh: Some unintended consequences’. World Development . Vol. 30. No. 5. (2002), 835-846
    • স্মিথ, অ্যাডাম (Smith, Adam) I 2000 (পুনর্মুদ্রন)। The Wealth of Nations. New York: Bantam Dell.
  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    Author: তাহের আলমাহদী
    ভূমিকা

    পলাশির যুদ্ধ ও বিপ্লবের প্রায় আড়াইশো বছর পরেও এই ঘটনা বাঙালির জাতীয় জীবনকে আজও আলোড়িত করে, অথচ এর ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির এখনও অভাব দেখা যায়। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের অনুকরণ করে পলাশির ব্যাখ্যা করে চলেছি, নিতান্ত একতরফাভাবেই। তাই এতদিন পরেও পলাশির যুদ্ধ ও বিপ্লবকে বৃহত্তর ইতিহাসের পটভূমিকায় সংস্থাপিত করে ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারায় জাতীয় ইতিহাস নির্ণয় করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সেই তাগিদ থেকেই এই গ্রন্থের অবতারণা। বস্তুতপক্ষে, পলাশি বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে শুধু নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পলাশিতে ইংরেজদের বাংলা বিজয় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। বাংলা থেকেই এবং বাংলার অর্থভাণ্ডার দিয়েই ইংরেজরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের প্রভুত্ব বিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা। সেজন্য ইংরেজরা কেন এবং কীভাবে বাংলা জয় করল তার সম্যক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

    স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে শুধু নয়, এস. সি. হিল (১৯০৫) থেকে শুরু করে অধুনা পিটার মার্শাল (১৯৮৭), ক্রিস বেইলি (১৯৮৭), রজতকান্ত রায় (১৯৯৪) প্রমুখের গ্রন্থেও সিরাজদ্দৌল্লা, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব সম্বন্ধে কতগুলি বক্তব্য স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে দেখা যায়। সাধারণভাবে এ-বক্তব্যগুলি হল, পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের বিশেষ কোনও ভুমিকা ছিল না। সিরাজদ্দৌল্লা এতই দুশ্চরিত্র, দুর্বিনীত এবং নিষ্ঠুর ছিলেন যে তাতে রাজ্যের অমাত্যবর্গ শুধু নয়, সাধারণ মানুষও নবাবের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই তাঁকে অপসারণ করতে মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বদ্ধপরিকর হয় এবং এ কাজ সম্পন্ন করতে তারা ইংরেজদের সামরিক শক্তির সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশায় তাদের ডেকে আনে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় একটি ‘আকস্মিক’ ঘটনামাত্র, এর পেছনে তাদের কোনও পূর্ব-পরিকল্পনা (মার্শালের ভাষায় ‘no calculated plottings’) ছিল না। মুর্শিদাবাদের দরবারে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে তারা মাঠে নেমে পড়ে এবং নবাবের অমাত্যদের সঙ্গে সিরাজকে হঠিয়ে মীরজাফরকে নবাব করার পরিকল্পনায় সামিল হয়।

    সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয় যে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের যে সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে তিনি শেষপর্যন্ত বাংলার মসনদ পর্যন্ত হারালেন, তার জন্য মূলত দায়ী তিনিই। আবার পলাশি বিপ্লবের ব্যাখ্যা হিসেবে যুক্তি দেখানো হয়ে থাকে যে, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হয়ে তাঁর আচরণ ও ব্যবহারে প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠীকে তাঁর প্রতি বিরূপ করে তোলার ফলে বাংলায় যে অভ্যন্তরীণ ‘সংকট’ দেখা দেয়, তার পরিণতিই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব। ইদানীং এটাও প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে প্রাক্-পলাশি বাংলায় রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ‘সংকট’ও (বিশেষ করে কে. এন. চৌধুরী, ১৯৭৮; মার্শাল, ১৯৮০; ৮৭) দেখা যাচ্ছিল এবং এই উভয় ‘সংকট’ থেকে বাংলাকে উদ্ধার করার জন্যই যেন ইংরেজরা ‘অনিচ্ছাসত্ত্বেও’ বাংলা জয় করে। কোনও কোনও ঐতিহাসিক আবার ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করতে গিয়ে প্রাক্-পলাশি বাঙালি সমাজের একটি দ্বিধাবিভক্ত চিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় যত্নবান। এঁদের বক্তব্য, পলাশির প্রাক্‌কালে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলিম শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় মুসলিম নবাবের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য ইংরেজদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।

    আমরা কিন্তু এখানে বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছি যে ওপরের প্রায় সব বক্তব্যগুলিই অসার, মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। গত দু’দশকের বেশি ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে, বিশেষ করে ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (India office Records, British Library, London) রক্ষিত ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র ও ‘প্রাইভেট পেপারস’ এবং হল্যান্ডের রাজকীয় আর্কাইভসে (Algemeen Rijksarchief, The Hague) সংরক্ষিত ডাচ কোম্পানির দলিল দস্তাবেজ ও কাগজপত্রে (যেগুলো পলাশির প্রেক্ষিতে আগে কেউই দেখেননি বা ব্যবহার করেননি) যে-সব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি এবং তার পাশাপাশি আগের জানা তথ্য ও সমসাময়িক ফারসি ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে আমরা ওপরের বক্তব্যগুলি খণ্ডন করেছি। আমরা দেখিয়েছি, প্রাক্‌-পলাশি বাংলায় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক, কোনওরকমের ‘সংকট’ই ছিল না। তাই বাংলার অভ্যন্তরীণ ‘সংকটে’র ফলেই পলাশি বিপ্লব হয়েছিল, এ অভিমত গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এটাও দেখিয়েছি, মধ্য অষ্টাদশ শতকে, পলাশির প্রাক্‌কালে, বাঙালি সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে মোটেই দ্বিধাবিভক্ত ছিল না। সুতরাং এই দ্বিধাবিভক্ত সমাজই পলাশির অন্যতম কারণ, এ বক্তব্যও অচল।

    অবশ্য অনেকদিন আগেও কোনও কোনও বাঙালি ঐতিহাসিক, নাট্যকার, প্রমুখ ওপরের বক্তব্যগুলির, বিশেষ করে সিরাজদ্দৌল্লা সম্বন্ধে, বিরোধিতা করেছেন, যেমন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (সিরাজদ্দৌল্লা), শচীন সেনগুপ্ত (সিরাজদ্দৌল্লা) (নাটক), প্রভৃতি। তবে এগুলি জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষিতে লেখা, তথ্যের চেয়ে ভাবাবেগই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। তা ছাড়া তাঁদের পক্ষে বিদেশের বিভিন্ন আর্কাইভসে গবেষণা করাও সম্ভব ছিল না। ষাটের দশকে ব্রিজেন গুপ্ত ওপরের কিছু কিছু বক্তব্য খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু সবগুলি প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি। অন্যদিকে কালীকিঙ্কর দত্ত মূল প্রশ্নগুলিকে প্রায় এড়িয়েই গেছেন। তাই আমরা এখানে যা বলতে চেয়েছি তা সম্পূর্ণ নতুন এবং তথ্যভিত্তিক।

    এখানে আমাদের মূল বক্তব্য, পলাশির ষড়যন্ত্রে ও বিপ্লবে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল ইংরেজরাই, ভারতীয়রা নয়। ইংরেজরা বেশ পরিকল্পিতভাবেই এ-কাজ সম্পন্ন করে, এবং নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে তারা মুর্শিদাবাদ দরবারের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে তাদের পরিকল্পনায় সামিল করে। শুধু তাই নয়, পলাশি যুদ্ধের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে যাতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকে। তবে এটাকে দেশীয় চক্রান্তকারীদের দোষ স্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল হবে। নবাবের দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটা অংশ সিরাজদ্দৌল্লার ওপর বিরূপ হয়ে একটা চক্রান্ত করার চেষ্টা করছিল, এ-কথা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমরা যে-বক্তব্যের ওপর জোর দিচ্ছি তা হল, ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং খুব সম্ভবত তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই চক্রান্ত পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে নবাবের পতন ঘটাতে পারত না।

    তবে এটা মনে রাখা প্রয়োজন, পলাশি বিপ্লব ও ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় যে উদ্দেশ্য কাজ করেছে, তা কোম্পানির নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ নয়। বস্তুত, লন্ডন থেকে কোম্পানির পরিচালক সমিতি এরকম পরিষ্কার কোনও নির্দেশ কখনও দেয়নি। আসলে ইংরেজদের বাংলা বিজয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থেই। এই কর্মচারীরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এদেশে আসত একটি মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে—এখানে ব্যক্তিগত বাণিজ্যের মাধ্যমে অল্প সময়ে প্রচুর ধনোপার্জন করে দেশে ফিরে তোফা আরামে বাকি জীবনটা কাটাবে বলে। কোম্পানির কর্মচারীদের এই ব্যক্তিগত বাণিজ্যের রমরমা ছিল ১৭৩০-এর দশক থেকে ১৭৪০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কিন্তু তারপরে এই ব্যবসা-বাণিজ্য চরম সংকটের সম্মুখীন হয়—বিশেষ করে ফরাসিদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য ও আর্মানি বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে। তার ওপর বাংলার নবাবদের মধ্যে এই প্রথম তরুণ ও বেপরোয়া নবাব সিরাজদ্দৌল্লা মসনদে বসার পরে ঘোষণা করলেন যে তিনি ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের বে-আইনি ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য ও তাদের দস্তকের (যা দিয়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করা যেত) যথেচ্ছ অপব্যবহার বন্ধ করে দিতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং এই কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করতে একদিকে সিরাজদ্দৌল্লাকে এবং অন্যদিকে ফরাসি ও আর্মানিদের হঠানো অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেজন্যেই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব, যাতে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ইংরেজরা কুক্ষিগত করতে পারে এবং ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের আবার শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে পারে।

    মোট এগারোটি অধ্যায়ে আমরা আমাদের বক্তব্যগুলি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। প্রথমেই ‘ভূমিকা’-তে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় সম্বন্ধে আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে নবাবি আমলে বাংলার রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা। পরের অধ্যায়ে সিরাজ-চরিত নিয়ে যে-সব ফারসি ও ইউরোপীয় বৃত্তান্তের ওপর সাধারণত নির্ভর করা হয়, সেগুলির দোষত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে পলাশির প্রেক্ষিতে বাংলায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি ও এশীয় বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে দেখানো হয়েছে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে ইউরোপীয় বাণিজ্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এ সময়, এমনকী মধ্য-অষ্টাদশ শতকেও, বাংলা থেকে এশীয়/ভারতীয় বণিকদের রফতানির পরিমাণ সব ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির সম্মিলিত মোট রফতানির চেয়েও অনেক বেশি ছিল। ফলে এশীয় বণিকরাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি সোনা-রুপো আমদানি করত, ইউরোপীয়রা নয়। পরবর্তী অধ্যায়ে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ ও সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট ও মূল কারণগুলি নির্দেশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব কেন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে ষষ্ঠ অধ্যায়ে। এখানে বলা হয়েছে বাংলায় কোনও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট তখন ছিল না, সমাজও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েনি, আর ‘কোলাবোরেশন’ থিসিসও অচল। সপ্তম অধ্যায়ে আছে পলাশি চক্রান্তের সূচনা, বিকাশ ও রূপায়ণের সম্যক বিশ্লেষণ। তার পরের অধ্যায়ে ষড়যন্ত্রের মূল নায়কদের, ইংরেজ ও দেশীয় দু’তরফেরই, বিস্তৃত পরিচিতি, কার্যকলাপ ও চক্রান্তে তাদের ব্যক্তিগত ভূমিকার বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। নবম অধ্যায়ে ইংরেজরা কীভাবে ষড়যন্ত্র পাকা করে ফেলে, মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পরেও তাড়াতাড়ি বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য ইংরেজদের যে অস্থিরতা, মীরজাফরকে একদিকে প্রচ্ছন্ন ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে অন্যদিকে কাকুতিমিনতি করে নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য পীড়াপীড়ি, এ-সব ইংরেজদের লেখা থেকেই দেখানো হয়েছে। আর পলাশির পরে ইংরেজরা কীভাবে বাংলায় অর্থনৈতিক লুণ্ঠন শুরু করে দেয়, কীভাবে উত্তর-পলাশি পর্বে তারা বাংলা থেকে বিরাট ধন নিষ্কাশণের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং কীভাবে তারা বাংলার অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় তার বিস্তারিত আলোচনা আছে দশম অধ্যায়ে। শেষ অধ্যায়ে উপসংহার—এই গ্রন্থের মূল বক্তব্য ও বিশ্লেষণের সংক্ষিপ্তসার।

  • প্রাক্‌-পলাশি বাংলার রূপরেখা

    প্রাক্‌-পলাশি বাংলার রূপরেখা

    প্রাক্‌-পলাশি বাংলার রূপরেখা

    অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে, নবাবি আমলে, বাংলার শ্রীবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।1 বস্তুতপক্ষে, সুবে বাংলা প্রায় দু’শো বছর ধরে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ সুবা (প্রদেশ) হিসেবে গণ্য হয়েছে। বাংলার উর্বর জমি, বিভিন্ন রকমের অপর্যাপ্ত কৃষিজ পণ্য, অসংখ্য নিপুণ তাঁতি ও অন্যান্য কারিগর, উন্নত বাণিজ্যিক ও আর্থিক সংগঠন এবং সস্তা অথচ উৎকৃষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা—সব মিলে সুবে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি অত্যন্ত মুল্যবান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই বাংলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আর বাংলা যেহেতু সবদিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, বাংলায় একমাত্র সোনা-রুপো ছাড়া অন্য কিছুর বিশেষ চাহিদা ছিল না। ফলে বাংলা থেকে যারা পণ্য রফতানি করত, তাদের সবাইকে—সে ইউরোপীয় বা এশীয় বণিক যেই হোক না কেন—এ-সব পণ্য কেনার জন্য বাংলায় সোনা-রুপো বা নগদ টাকাপয়সা নিয়ে আসতে হত।2

    মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে যখন অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে অরাজকতা, অবক্ষয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে বাংলা কিন্তু তখন এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এখানে তখন বাংলার নবাবদের পরিচালনায় একটি সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার ফলে শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল, কোনও অস্থিরতা ছিল না, অরাজকতাও নয়। বাংলার নবাবরা এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করেন যাতে শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ় হয় এবং বাংলার আর্থিক অগ্রগতি হয়। বাংলার এই উন্নতিতে নবাবদের সঙ্গে হাত মেলায় শাসক শ্রেণীর ওপরতলার একটি গোষ্ঠী।3

    আসলে ১৭০০ সালে মুর্শিদকুলি খান যখন বাংলার দেওয়ান পদে নিযুক্ত হয়ে আসেন এবং পরে যখন তিনি সুবাদার পদেও নিযুক্ত হন, তারপর থেকেই বাংলার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। মুর্শিদকুলির নিয়োগের ফলে বাংলায় যে এক নতুন ধরনের প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালু হয় শুধু তাই নয়, এর ফলে বাংলার সমগ্র রাজনৈতিক কাঠামোতেও বিরাট পরিবর্তন আসে। মুঘল সম্রাট ঔরংজেব একটি মূল উদ্দেশ্য নিয়ে মুর্শিদকুলিকে বাংলায় পাঠান—মুর্শিদকুলি এসে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করে বাংলার রাজস্ব বৃদ্ধি করবেন এবং তা থেকে সম্রাটকে নিয়মিত ও যথেষ্ট রাজস্ব পাঠাবেন। সম্রাট ঔরংজেব তখন দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত— অর্থাভাবে জর্জরিত—সাম্রাজ্যের অন্য কোনও অংশ থেকে রাজস্ব বিশেষ আসছে না—এ অবস্থায় ঔরংজেবের একমাত্র ভরসা বাংলা ও মুর্শিদকুলি। মুর্শিদকুলি ঔরংজেবকে নিরাশ করেননি। বাংলার রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার করে তিনি ঔরংজেবকে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত অর্থ পাঠিয়েছেন। একদিকে মুর্শিদকুলির রাজস্ব ও শাসনতন্ত্রে সংস্কারের ফলে বাংলার রাজনৈতিক ও ভূমিব্যবস্থার কাঠামোতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়। ছোট ছোট জমিদারির অবসান ঘটিয়ে বড় জমিদারির আবির্ভাব হয়। বড় জমিদাররা এখন নতুন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মুর্শিদকুলির সংস্কারের ফলে বাংলায় নতুন এক ব্যাঙ্কিং ও বাণিজ্যিক শ্রেণীর উদ্ভব হয় যারা পরে বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

    ঔরংজেব মুর্শিদকুলির ওপর এতই সন্তুষ্ট হন যে, তিনি তাঁকে বাংলায় নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করার স্বাধীনতা দেন। মুর্শিদকুলিও এ সুযোগ কাজে লাগান। তিনি সম্রাটের পৌত্র এবং বাংলার সুবাদার আজিম-উস্‌-শানকে অগ্রাহ্য করে ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে মক্‌সুদাবাদে (পরে নিজের নামানুসারে মুর্শিদাবাদ নাম দেন) দেওয়ানি স্থানান্তরিত করেন। ১৭১৭ সালে তিনি বাংলায় সুবাদার পদেও নিযুক্ত হন। মুঘল রীতির ব্যতিক্রম করে এই প্রথম বাংলার ইতিহাসে সুবাদারি ও দেওয়ানি একই ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হল। এর পর থেকে বাংলার নবাবরা প্রায় স্বাধীনভাবেই বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। দিল্লির সঙ্গে প্রত্যক্ষ আর কোনও যোগাযোগই থাকল না। বাংলা শুধু নামেমাত্র মুঘল সম্রাটের অধীনে রইল, কার্যত বাংলার ওপর সম্রাটের আধিপত্য শেষ হয়ে গেল। নবাবরা বছর বছর দিল্লিতে রাজস্ব পাঠিয়ে সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের দায় সারতেন।

    বস্তুতপক্ষে, ১৭১৩ সালের পর উত্তর ভারত থেকে বাংলায় উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায় এবং তার ফলে দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও ছেদ পড়ে।4 এরপর থেকে মুর্শিদকুলি ও তাঁর উত্তরসূরিদের আর দিল্লি থেকে পাঠানো রাজকর্মচারীদের দেশের শাসনযন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নই থাকল না। এর ফলে বাংলার নবাবদের নিজেদের ইচ্ছেমতো এবং পছন্দমতো কর্মচারী নিয়োগ করার পথে কোনও বাধা রইল না। তাঁরা বাংলায় অবস্থানকারী মুঘল মনসবদার শ্রেণী এবং নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্য থেকে পছন্দসই লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করতে লাগলেন। তার ফলে বাংলায় এক দৃঢ় ও শক্তিশালী নিজামতের প্রতিষ্ঠা হল এবং নবাবরা সর্বশক্তিমান হয়ে উঠলেন। উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা এখন আগের মতো আর দিল্লির দিকে না তাকিয়ে নবাবকেই একমাত্র হর্তাকর্তা হিসেবে মেনে নিল এবং নবাবের সন্তুষ্টিবিধান ও তাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্য সচেষ্ট থাকল। এতে নবাবের শক্তিবৃদ্ধি হল এবং সবাই নবাবের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে উঠল।

    রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় ক্ষমতাবিন্যাসের চেহারায়ও বেশ কিছু পরিবর্তনের সূচনা হল। নবাবি আমলের আগে বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মুঘল মনসবদার শ্রেণী ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ দিল্লির সঙ্গে ছিল তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে, নবাবি আমলে, তাদের গুরুত্ব অনেক কমে গেল কারণ দিল্লি থেকে কোনওরকম মদতের আশা তাদের ছাড়তে হল। ফলে তারা স্থানীয় লোকদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতে বাধ্য হল। স্থানীয়দের মধ্যে জমিদার এবং ব্যাঙ্কিং ও বণিক শ্রেণী, যারা আগের জমানায় বিশেষ কোনও গুরুত্ব পায়নি, তারা এখন নতুন ক্ষমতা বিন্যাসের প্রেক্ষিতে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে লাগল এবং নতুন শাসকগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল।

    তবে এই নতুন সমঝোতাকে কয়েকটি বিশেষ শ্রেণীর জোটবদ্ধতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আবার এই সমঝোতাকে একটি সুদৃঢ় ও নিশ্চিদ্র জোট হিসেবে গণ্য করাও ভুল হবে। আসলে এটি কিছু স্বার্থপ্রণোদিত ব্যক্তিবিশেষের জোটবন্ধন—যারা নবাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছিল। নবাবও দিল্লি থেকে বিচ্ছিন্ন এইসব মুঘল মনসবদার, স্থানীয় ভূস্বামী, সওদাগর ও ব্যাঙ্কারদের বাংলার শাসন ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ও আর্থিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির কাজে লাগিয়েছিলেন। তবে এখানে মনে রাখা দরকার যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক (শ্রেণীভিত্তিক নয়) এই শাসক গোষ্ঠীর শক্তির উৎস ছিলেন একমাত্র নবাবই। তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার একমাত্র উপায় ছিল নবাবের দাক্ষিণ্যের মাধ্যমে। তাই নবাবকেই তারা বাংলার সর্বোচ্চ শক্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। ফলে এই নতুন ক্ষমতা বিন্যাসের যে কাঠামো তৈরি হয়, তাতে নবাবের স্থান ছিল সর্বোচ্চে—তার তলায় ব্যক্তিসমষ্টির জোট—যারা সম্পূর্ণভাবে নবাবের ওপর নির্ভরশীল। এতে শ্রেণীগত জোটবদ্ধতার কোনও অবকাশ ছিল না। ক্ষমতা ও সম্পদ ভাগ-বাঁটোয়ারা করে ভোগ করার জন্য নবাবের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীর কিছু ব্যক্তিবিশেষের একেবারে ব্যক্তিগত স্তরেই এই সমঝোতা হয়েছিল। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক কোনও ভিত্তি বা বুনিয়াদ এই নতুন শক্তিজোটের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।

    এই নতুন শক্তিজোট যে নিতান্তই ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, তার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নিদর্শন জগৎশেঠ পরিবার। নবাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ফলেই জগৎশেঠরা সামান্য মহাজন থেকে ধীরে ধীরে বাংলা তথা ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্কার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পেরেছিল। নবাবদের সঙ্গে নিবিড় ব্যক্তিগত সম্পর্কই যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে জগৎশেঠদের উন্নতি ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সোপান ছিল তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ, পলাশি বিপ্লবের পর বাংলার নবাব যখন ইংরেজদের ক্রীড়নকে পরিণত হলেন এবং জগৎশেঠদের প্রতি কোনওরকম দাক্ষিণ্য দেখানো আর সম্ভব হল না, তখন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জগৎশেঠরা আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষ থেকে ভূপাতিত হলেন। আবার এই নতুন ক্ষমতাবিন্যাসে ব্যক্তিগত সম্পর্কই যে সবচেয়ে বড় উপাদান, তার প্রমাণ হাজি আহমেদ ও আলিবর্দির উত্থানের মধ্যে দেখা যায়। এই ভ্রাতৃদ্বয়ের কেউই প্রভাবশালী জমিদার বা মনসবদার শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কিন্তু যেহেতু এঁদের সঙ্গে নবাব সুজাউদ্দিনের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, নবাব এঁদের দু’জনকেই শাসনবিভাগের উচ্চপদে নিয়োগ করেন। তা ছাড়া এই নতুন শক্তিজোট কোনও অবিচ্ছেদ্য বা নিশ্ছিদ্র সংগঠনের রূপ নেয়নি—মাঝেমধ্যেই নানা টানাপোড়েনে এতে ফাটল দেখা দিয়েছে। মুর্শিদকুলি থেকে শুরু করে সিরাজদ্দৌল্লা পর্যন্ত বার বার এটা দেখা গেছে।5 তবে বলা বাহুল্য, নিজামতের সঙ্গে নতুন শাসকগোষ্ঠীর জোটবদ্ধতার ভিত্তি যাই হোক না কেন, এর ফলে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে, নবাবি আমলে, বাংলায় রাজনৈতিক স্থিরতা ও শক্তিশালী নিজামতের উদ্ভব সম্ভব হয়েছিল।

    মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর (১৭২৭) তাঁর উত্তরসূরিরা তাঁর মূল নীতিগুলি মোটামুটি অনুসরণ করেছিলেন। ফারসি ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সুজাউদ্দিনের রাজত্বকালে (১৭২৭-৩৯) ‘শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজমান’ ছিল। সিয়র-উল-মুতাখারিনে-র লেখক গোলাম হোসেন খান মন্তব্য করেছেন, সুজাউদ্দিনের সময় এতই সমৃদ্ধি দেখা গেছে যে চারদিকে প্রাচুর্য ও সুখের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল।6 আবার ১৭৮৯ সালে ইংরেজ কোম্পানির ভূমিরাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা স্যার জন শোর (Sir John Shore) বলেছেন যে আলিবর্দির শাসনকালের শেষ কয়েক বছর বাদ দিলে, মুর্শিদকুলি থেকে মীরকাশিমের সময় পর্যন্ত একমাত্র সুজাউদ্দিনের রাজত্বকালেই নবাবি শাসনের মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতি।7 সুজাউদ্দিনের পর তাঁর পুত্র সরফরাজ নবাব হলেন কিন্তু নিজের শক্তি সংহত করার আগেই আলিবর্দি খানের কাছে যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। আলিবর্দি ১৭৪০ সালে নতুন নবাব হন। ফারসি ঐতিহাসিকরা তাঁর রাজত্বের (১৭৪০-৫৬) গৌরবোজ্জ্বল বর্ণনা দিয়েছেন। গোলাম হোসেন খানের মতে এ সময় চারদিকেই দেশের উন্নতি হয়েছিল। ‘নবাব তাঁর প্রজাদের মঙ্গলের জন্য এতই সতর্ক ছিলেন যে তাঁর সময় প্রজারা সুখস্বাচ্ছন্দ্যেই ছিল।’8 তবে আলিবর্দির রাজত্বের প্রথম দিকে প্রায় দশ বছর ধরে (১৭৪২-৫১) মারাঠারা প্রায় প্রত্যেক বছর বাংলা আক্রমণ ও লুঠ করতে অভিযান চালিয়েছে। তা ছাড়া এ সময় আফগান বিদ্রোহও হয়। আফগানদের দমন করে ও মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি (১৭৫১) করার পর আলিবর্দি ‘দেশের ও প্রজাদের উন্নতিকল্পে বিশেষ যত্নবান হন ও সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দেন।’9

    ফারসি ইতিহাসগ্রন্থ মুজাফ্‌ফরনামা থেকে আলিবর্দির রাজত্বের শেষদিকে রাজধানী মুর্শিদাবাদ শহরের যে বিস্তৃতি ও সমৃদ্ধির কথা জানা যায়, তা থেকে স্পষ্ট যে নবাব আলিবর্দি মারাঠা আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন সম্পূর্ণভাবে মুছে দিতে পেরেছিলেন।10 আসলে, বাংলায় মারাঠা আক্রমণের যে নেতিবাচক প্রভাব, তার ওপর ঐতিহাসিকরা বড্ড বেশি জোর দিয়েছেন। তার মধ্যে অনেক অত্যুক্তি দেখা যায়। বলা বাহুল্য, মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলার কোনও কোনও অঞ্চলের অর্থনীতি কিছুটা বিপর্যস্ত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এটা ছিল সাময়িক ব্যাপার এবং কোনও কোনও বিশেষ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। বাংলার যে সামগ্রিক অর্থনীতি তার ওপর মারাঠা আক্রমণের কোনও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েনি।11

    বস্তুতপক্ষে, প্রাক্-পলাশি আমলে বাংলার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বেশ মজবুতই ছিল। নবাবি আমলে আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বের পরিমাণও। বাংলার উৎপন্ন পণ্যের চাহিদা এবং বাজারও সম্প্রসারিত হয়। বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ও তা থেকে প্রচুর মুনাফার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখে ভারতবর্ষের ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুধু নয়, এমনকী ইউরোপ থেকেও অসংখ্য সওদাগর ও ব্যবসায়ী বাংলায় আসে। ১৭৫৬-৫৭ সালে একজন ইউরোপীয় পর্যটক বাংলা দেখে লেখেন: ‘বাংলার অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যের পরিমাণ বেশ বড় আকারেরই কারণ এখানে পারসিক, আবিসিনিয়ান, আরব, চিনা, গুজরাটি, মালাবারি, তুর্কি, ইহুদি, আর্মানি এবং এশিয়ার অন্যান্য সব প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য করতে আসে।’12

    আসলে, সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার ঐশ্বর্য ও বাংলায় জিনিসপত্রের সস্তাগণ্ডার বাজার প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। ফারসি ঐতিহাসিকরা বাংলার নামকরণ করেছিল ‘জিন্নত-উল-বিলাদ’13 বা ‘প্রদেশগুলির মধ্যে স্বর্গ।’ মুঘল সম্রাট ঔরংজেব বাংলাকে ‘জাতীয় স্বর্গ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। সব মুঘল ফরমানেই বাংলাকে ‘ভারতবর্ষের স্বর্গ’14 বলে উল্লেখ করা হত। কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠিয়াল জাঁ ল’ (Jean Law) বলেছেন, ‘এটা বাংলার যথার্থ অভিজ্ঞান’।15 ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ে (Bernier) ১৬৬০-এর দশকে মন্তব্য করেছেন ‘বাংলা এতই সম্পদশালী যে প্রবাদ আছে বাংলায় ঢোকার দরজা অসংখ্য কিন্তু বেরুবার দরজা একটিও নেই।’16 আবার অষ্টাদশ শতকের সত্তরের দশকে আরেকজন পর্যটক ও ঐতিহাসিক, আলেকজ্যান্ডার ডো (Alexander Dow), লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দাঁড়িপাল্লা বাংলার অনুকূলেই ভারী ছিল এবং তখন বাংলাই ছিল একমাত্র পাত্র (sink) যেখানে সোনাদানা এসে শুধু জমত, তার কিছুমাত্র কখনও বেরুত না।’17

    বলা বাহুল্য, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা ছিল প্রাচুর্যের দেশ। জিনিসপত্রের দাম ছিল সস্তা, ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক সস্তা। ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্রে এ-কথা বার বার দেখা যায়। লন্ডনে কোম্পানির পরিচালক সমিতি (Board of Directors) ১৭৩৫ সালে লিখছে যে ‘সারা ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাই যে সবচেয়ে সস্তাগণ্ডার দেশ শুধু তাই নয়, সারা ভারতের মধ্যে এটাই সবচেয়ে প্রাচুর্যে ভরা।’18 প্রাক্‌-পলাশি আমলের কথা বলতে গিয়ে ঐতিহাসিক ডো মন্তব্য করেছেন যে, ওই সময় ‘বাংলা ছিল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী ও জনবহুল দেশ। এখানকার কৃষিব্যবস্থা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। একদিকে সমাজের উঁচুস্তরের লোকজন ও বণিক সম্প্রদায় প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী। অন্যদিকে সাধারণ কৃষক বা কারিগরেরাও প্রাচুর্য ও সুখশান্তিতে জীবনযাপন করছিল।’19 এর কারণ, ডো জানাচ্ছেন, ‘বাংলার নবাবরা দেশের নাড়িনক্ষত্র ভালভাবে জানতেন, ফলে তাঁরা শাসনযন্ত্রের মাধ্যমে অত্যাচারী বা নিপীড়নকারী হয়ে ওঠেননি। তাঁরা জানতেন তাঁদের নিজেদের ক্ষমতা ও শক্তির উৎস হল প্রজারা, তাদের সমৃদ্ধি ও হিতাহিতের ওপরই নির্ভর করে আছে নবাবদের অস্তিত্ব।’20

    বাংলার উপরোক্ত প্রেক্ষাপটেই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের উদ্ভব, বিকাশ ও পরিণতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে পরের অধ্যায়গুলিতে।

  • সিরাজ চরিত-কথা

    সিরাজ চরিত-কথা

    সিরাজ চরিত-কথা

    সিরাজদ্দৌল্লার চরিত্র সম্বন্ধে প্রায়-সমসাময়িক সব ঐতিহাসিক ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ঐকমত্য দেখা যায়। যে-সব তথ্যের ওপর নির্ভর করে এ-সব বক্তব্য, বর্তমান অধ্যায়ে সেগুলি আমরা বিশদভাবে আলোচনা করেছি। সিরাজ চরিত্রের সমর্থন আমাদের উদ্দেশ্য নয় এটা স্পষ্ট করে বলা দরকার। শুধু যে-সব তথ্যের ভিত্তিতে সিরাজচরিত্র বর্ণনা করা হয়, তার সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রায়-সমসাময়িক সব ফারসি ইতিহাসে এবং ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদের লেখায় এটা পরিষ্কার যে তরুণ যুবক হিসেবে সিরাজদ্দৌল্লা এমনই নিষ্ঠুর, দুর্বিনীত, নির্দয় এবং দুশ্চরিত্র ছিলেন যে সবাই তাঁর নবাব হওয়ার সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাঁর ভীতিপ্রদ স্বভাবের জন্য শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এমনকী উচ্চবর্গের শাসকশ্রেণীও তাঁর প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেছিল। ফারসি ঐতিহাসিকদের মধ্যে সিয়রে-র লেখক গোলাম হোসেন খান সিরাজের দুশ্চরিত্রের নিন্দায় সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। সিরাজ সম্বন্ধে তিনি নানা কটূক্তি করেছেন—‘অজ্ঞ অর্বাচীন যুবক’, ‘যে পাপপুণ্যের বা ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য করে না’, ‘দয়ামায়াহীন উদ্ধত ব্যবহার’, ‘রূঢ়ভাষী ও হৃদয়হীন’, ‘অহংকার ও অজ্ঞতায় যার মাথা বিগড়েছে’, ‘যৌবন, ক্ষমতা ও আধিপত্যের নেশায় যে আত্মহারা’, ইত্যাদি।21 রিয়াজে-র গ্রন্থকার গোলাম হোসেন সলিমও সিরাজ চরিত্রের কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে সিরাজ ‘বদমেজাজি ও রূঢ়ভাষী’ ছিলেন এবং তিনি ‘সব অভিজাত ব্যক্তি ও সেনাপতিদের ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতেন।’22

    শুধু ফারসি ঐতিহাসিকরা নন, তদানীন্তন প্রায় সব ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরাও সিরাজদ্দৌল্লার ব্যক্তিগত চরিত্রের অনুরূপ চিত্র দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ (Jean Law)। তিনি সিরাজের ‘জঘন্যতম চরিত্র’ এবং ‘লম্পট ও নিষ্ঠুর স্বভাবের’ উল্লেখ করেছেন।23 ইংরেজ কুঠিয়াল লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনও (Luke Scrafton) লিখেছেন, সিরাজদ্দৌল্লা ‘সর্বদাই লাম্পট্য ও অতিরিক্ত মদ্যপানে ডুবে থাকেন, তাঁর ইয়ার দোস্তরাও অতি নিকৃষ্ট স্তরের মানুষ’। সিরাজ সম্বন্ধে তিনি এটাও বলেছেন যে, তাঁর ‘কথাবার্তা, আচরণ বদমেজাজি ও হিংস্র ধরনের এবং তিনি ছিলেন নির্দয়, লোভী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী।’24 সমসাময়িক অন্য কয়েকটি ইউরোপীয় আখ্যানেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়।

    সুতরাং তরুণ যুবক হিসেবে, বিশেষ করে নবাব হওয়ার আগে, সিরাজদ্দৌল্লা যে নির্দয়, নিষ্ঠুর ও অসচ্চরিত্র ছিলেন তা তাঁর অন্ধ সমর্থকও অস্বীকার করতে পারবেন না। কারণ এ চিত্রটাই প্রায় সব ফারসি ইতিহাস ও ইউরোপীয়দের লেখায় দেখা যায়। তবে বিষয়টি বিচার-বিবেচনার আগে তাঁর ছোটবেলা থেকে নবাব হওয়া পর্যন্ত তাঁর জীবনটার প্রতি দৃষ্টিপাত করা দরকার। মির্জা মহম্মদ সিরাজদ্দৌল্লা ছিলেন নবাব আলিবর্দির তৃতীয় কন্যা আমিনা বেগম ও আলিবর্দির ভাই হাজি আহমেদের পুত্র জৈনুদ্দিন আহমেদের ঔরসে জাত পুত্র অর্থাৎ নবাব আলিবর্দির নাতি। আলিবর্দির প্রথম কন্যা মেহের উন্নিসার (ঘসেটি বেগম) বিয়ে হয়েছিল হাজি আহমেদের বড় ছেলে নওয়াজিস মহম্মদের সঙ্গে। দ্বিতীয় কন্যার স্বামী ছিলেন আলিবর্দির আরেক ভাইপো পুর্ণিয়ার নবাব সৈয়দ আহমেদ।25

    ১৭৩৩ সালে আলিবর্দি বিহারের ছোট নবাব (deputy governor) পদে নিযুক্ত হওয়ার ক’দিন আগে সিরাজের জন্ম হয়। তাঁর জন্মের পরেই আলিবর্দি এত উচ্চপদে নিযুক্ত হওয়ায় তিনি তাঁর মাতামহের বিশেষ স্নেহ ও আদরের পাত্র হয়ে ওঠেন। গোলাম হোসেন খান লিখেছেন যে ‘আলিবর্দি তাঁর বাড়িতেই সিরাজের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।’ মুজাফ্‌ফরনামা,-র লেখক করম আলি জানাচ্ছেন:26

    আলিবর্দি সিরাজের জন্ম থেকেই তাঁর প্রতি এমন স্নেহান্ধ ছিলেন যে এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে কাছছাড়া করতেন না। তিনি তাঁকে রাষ্ট্রনীতি, শাসনকার্য ও শাসক-অভিজাত জীবনের নানা গুণাবলী শেখাতেন। সিরাজের প্রতি তাঁর স্নেহ এমনই অন্ধ ছিল যে সিরাজের সমস্ত অপকীর্তিকে তিনি যেন দেখেননি বা শোনেননি এমন ভাব করতেন।… সিরাজের চিন্তা ছাড়া তাঁর একটি মুহূর্তও কাটত না।

    বলা বাহুল্য, এ ধরনের প্রশ্রয়ের ফল ভাল হয় না। মাতামহের অত্যধিক আদরযত্ন, অপরিসীম স্নেহ ও মনোযোগ বালক সিরাজদ্দৌল্লার চরিত্রকে নষ্ট করেছিল। সে ক্রমেই হয়ে উঠল এক অসংযত স্বভাবের দুর্বিনীত যুবক। তার ওপর সিরাজের অন্ধ অনুগত চাটুকারেরও অভাব ছিল না। তারা তাঁর সব খামখেয়ালিতে সায় দিয়ে ও মিথ্যা স্তবস্তুতি করে তাঁর অহমিকায় ইন্ধন জোগাত। তাই প্রথম যৌবনে সিরাজ নানা স্বেচ্ছাচারিতা করেও বৃদ্ধ আলিবর্দির সমর্থন ও স্নেহ থেকে বঞ্চিত হননি। বরঞ্চ আলিবর্দি নানাভাবে তাঁকে তোষণ করার চেষ্টা করতেন।27

    নবাব আলিবর্দি তাঁর প্রিয় দৌহিত্রকে অল্পবয়সেই ঢাকার রাজকীয় নৌবাহিনীর অধ্যক্ষপদে নিযুক্ত করেন। এমনকী সামরিক অভিযানের সময়েও বৃদ্ধ নবাব সিরাজকে তাঁর সান্নিধ্যে রাখতেন। ১৭৪০-৪১ সালে উড়িষ্যা অভিযানেও সিরাজকে তিনি সঙ্গে নেন। ১৭৪৬ সালে মির্জা ইরেজ খানের কন্যার সঙ্গে খুব ধূমধাম করে তিনি সিরাজের বিয়ে দেন। এই অনুষ্ঠানের বিলাসবহুল আড়ম্বর ছিল দেখার মতো। ১৭৪৮ সালে সিরাজের পিতা জৈনুদ্দিন আহমেদ নিহত হলে আলিবর্দি সিরাজকে বিহারের ছোট নবাব পদে নিযুক্ত করেন। অবশ্য রাজা জানকীরাম হন তাঁর সহকারী। নামে সহকারী হলেও আসলে জানকীরামই শাসনকার্য চালাতেন। ১৭৪৯ সালের ডিসেম্বরে আলিবর্দি মারাঠাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে মেদিনীপুর অভিযান করেন এবং সিরাজকে বালেশ্বরে পাঠান সেখান থেকে মারাঠাদের বিতাড়িত করার জন্য। ইতিমধ্যে মেহদি নিসার নামে নবাবের এক বিতাড়িত ও বিক্ষুব্ধ সেনাপতির প্ররোচনায় সিরাজ জানকীরামকে তাড়িয়ে বিহারের স্বাধীন নবাব হওয়ার চেষ্টা করেন। এই প্রচেষ্টা অবশ্য বিফল হয় এবং শীঘ্রই জানকীরামের সঙ্গে তাঁর মিটমাট হয়ে যায়। বৃদ্ধ নবাব আলিবর্দি বরাবরের মতো এবারও তাঁর প্রিয় নাতিকে ক্ষমা করে দেন। ১৭৫২-এর মে মাসে তিনি সিরাজদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করলেন। তাঁর মৃত্যুর (৯ বা ১০ই এপ্রিল ১৭৫৬) পর সিরাজদ্দৌল্লা ১৫ই এপ্রিল ১৭৫৬-তে রাজ্যভার গ্রহণ করেন।28

    ওপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে তরুণ নবাব রাজকার্যে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ছিলেন না। যুদ্ধাভিযান ও শাসনকার্য দুই বিষয়েই অত্যন্ত নবীন বয়স থেকে মাতামহের সান্নিধ্য ও শিক্ষায় তাঁর বেশ কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমরা সিরাজ-চরিত্রকে মহান বলার কোনও চেষ্টাই করব না, তবে তাঁকে যতটা খারাপ বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়, তা কতখানি সত্যনির্ভর তার বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করব শুধু। সিরাজদ্দৌল্লা সত্যিসত্যিই ‘ভিলেন’ জাতীয় নিকৃষ্ট জীব ছিলেন কি না তা বিচার করার আগে যাঁরা তাঁর সম্বন্ধে এ অভিযোগ করেছেন তাঁদের সম্যক পরিচয় জানা একান্ত প্রয়োজন। এ-প্রসঙ্গে এটা মনে রাখা দরকার যে, বেশির ভাগ ফারসি ইতিহাসই পলাশির প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর পরে লেখা, যখন ওইসব ঘটনাবলী সম্বন্ধে উক্ত লেখকদের স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। তা ছাড়া, আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, ফারসি ইতিহাসগুলির বেশির ভাগই লেখা হয়েছিল, ওইসব লেখকদের ইংরেজ ‘প্রভু’ বা ‘মনিবদের’ আদেশে বা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাই এগুলিকে সে যুগের ঐতিহাসিক তথ্যের প্রকৃত সূত্র হিসেবে গণ্য করা যায় কি না তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায়। সিরাজদ্দৌল্লাকে ‘ভিলেন’ বা ‘দুর্বৃত্ত’ প্রতিপন্ন করা গেলে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করা সহজ হয় অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বলা যায় যে ইংরেজরা বাংলা জয় করে এক স্বেচ্ছাচারীর হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছে। এতে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের একটা যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা মিলবে। ফলে পলাশি ষড়যন্ত্রের চক্রান্ত করা সত্ত্বেও ইংরেজদের ভূমিকা ততটা নিন্দনীয় হবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতেই যারা সিরাজকে উচ্ছৃঙ্খল, স্বেচ্ছাচারী29, নির্দয় ও চরিত্রহীন বলে চিত্রায়িত করেছে, সেই সব সূত্রের যথার্থ বিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন।

    প্রথমেই সিয়র-প্রণেতা গোলাম হোসেন খানের ব্যাপারটাই দেখা যাক। ইনি ছিলেন সে যুগের সবচেয়ে বিশিষ্ট ঐতিহাসিক এবং সিরাজ চরিত্রের সবচেয়ে কট্টর সমালোচক। প্রথমে তিনি নবাব আলিবর্দির হাজি বা বাড়ির সরকার ছিলেন। পরে ১৭৪৯ সালে সিংহাসনের জন্য সিরাজদ্দৌল্লার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী পুর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৭৫৬-এর অক্টোবরে সিরাজের সঙ্গে যুদ্ধে শওকত জঙ্গ নিহত হওয়া পর্যন্ত তিনি পুর্ণিয়াতে ছিলেন। প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন গোঁড়া ইংরেজ-ভক্ত এবং সিরাজ-বিরোধী। করম আলির ভাষায়, ‘ইংরেজদের বন্ধু’ হিসেবে ‘তাদের জন্য ওকালতি করায়’ তিনি সিরাজদ্দৌল্লার চাকরি খুইয়েছিলেন, কিন্তু পরে ‘মীরকাশিমের রাজত্বকালে ইংরেজদের মিত্র হিসেবে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক ও অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন।’30 ইংরেজদের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব আর তাদের চাটুকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি লেখেন—‘এই জাতির (ইংরেজ)… শক্তি, সাহস ও মনোবলের কোনও তুলনা হয় না’ বা ‘এই জাতির সেনাপতিরা অত্যন্ত দক্ষ, সতর্ক ও সব ব্যাপারে অভিজ্ঞ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এরা অসম সাহসী।’

    অন্যদিকে প্রাক্-পলাশি ঘটনাবলীর বর্ণনায় সিরাজের প্রতি গোলাম হোসেনের বিরূপ মনোভাব অত্যন্ত পরিষ্কার। বিন্দুমাত্র বিচার বিশ্লেষণ না করেই তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন মন্তব্য করেন যে, সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের সঙ্গে বিবাদ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। পরবর্তী একটি অধ্যায়ে আমরা সবিশেষ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি যে সিরাজের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক।31 অবশ্য সিরাজের বিরুদ্ধে গোলাম হোসেনের আক্রোশ সম্পূর্ণ অমূলক নয়। তাঁর ইংরেজ-প্রীতি ও পক্ষপাতদুষ্ট কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নবাব তাঁকে সপরিবারে বাংলা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।32 গোলাম হোসেনই শওকত জঙ্গকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযান করার আগে কিছুটা সময় নিতে এবং বর্ষার পর ইংরেজদের সঙ্গে জোট বেঁধে এ-ব্যাপারে অগ্রসর হতে কারণ শোনা যাচ্ছে যে ইংরেজরা সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযান করতে চায়।’33

    শুধু তাই নয়, সিরাজদ্দৌল্লাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে তিনি অযৌক্তিকভাবে এমনও ইঙ্গিত করেছেন যে ইংরেজদের সঙ্গে সংঘর্ষের জন্য সিরাজই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। তিনি লিখেছেন যে ‘নবাব কারও পরামর্শ গ্রহণ করতেন না কিংবা কারও মতামতও জানতে চাইতেন না। তা না হলে তাঁর ছোটখাটো মন্ত্রী এবং সেনাপতিদের সঙ্গে আলোচনা করে অতি অল্প কথায় এ বিরোধের [ইংরেজদের সঙ্গে] নিষ্পত্তি করা যেত, যুদ্ধের কোনও প্রয়োজনই হত না’।34 কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, গোলাম হোসেন নিজেই পরে তাঁর ওপরের বক্তব্যের ঠিক উল্টোটাই লিখেছেন যে নবাব তাঁর সভাসদদের সঙ্গে কী করা যায় তা নিয়ে পরামর্শ করেন এবং বিশদ আলাপ আলোচনার পর দরবারের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মতামত অনুযায়ী তাঁর কর্মপন্থা স্থির করেন।35 তা ছাড়া গোলাম হোসেনের বক্তব্য, কাশিমবাজারে ইংরেজ কুঠির পতনের পর নবাব ইংরেজদের বাংলা থেকে বহিষ্কার করা স্থির করেই কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন।36 এটা যে সম্পূর্ণ অসত্য তা শুধু নয়, এতে নবাবের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে তাঁর ইংরেজ-প্রীতি এবং সিরাজ-বিরোধী মনোভাবের আরও জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যখন তিনি আলিনগরের চুক্তি ভেঙে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখেন:37

    এই জাতি [ইংরেজ] কোনও সঙ্গত কারণ ছাড়া কারও সঙ্গে বিরোধ বাধায় না। সম্ভবত কোনও গুরুত্বপূর্ণ কারণে নবাবের সঙ্গে বিরোধ করা ছাড়া তাদের কোনও উপায় ছিল না।… অবশ্য এ-বিষয়ে আমার কাছে সঠিক কোনও তথ্য নেই তবে মনে হয় সম্ভবত নবাব [শর্ত অনুযায়ী] টাকাপয়সা দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং অকারণ দেরি করছিলেন।

    এই উক্তি থেকে স্পষ্টতই লেখকের পক্ষপাতিত্ব বোঝা যায়। সিরাজের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ এত তীব্র ছিল যে নবাবের কাছ থেকে দয়ালু ব্যবহার পেয়েও সিরাজের নিন্দা করতে তাঁর এতটুকু বাধেনি। গোলাম হোসেনের ঘনিষ্ঠ পুর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পরেও সিরাজদ্দৌল্লা মোহনলালকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন গোলাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের কোনও অনিষ্ট না হয়, তাঁদের যেন যথেষ্ট অর্থ সাহায্য ও অনুমতিপত্র দেওয়া হয়, তাঁরা যাতে ‘নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে’ চলে যেতে পারেন।38 কিন্তু কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, গোলাম হোসেন সিরাজের এই সদয় ব্যবহারের জন্য ধন্যবাদ পর্যন্ত জানাননি। সিরাজের বদান্যতায় বেনারস পৌঁছে তিনি তাঁর মামা ও ভাইদের সঙ্গে (তাঁদেরও কোনও ক্ষতি সিরাজ করেননি) সঙ্গে মিলিত হন। এ-প্রসঙ্গে তিনি পরে লেখেন যে তাঁরা ‘নবাবের মতো অত্যাচারীর হাত থেকে ভাগ্যক্রমে মুক্তি’ পেয়েছিলেন।39 তিনি এমন অভিযোগও করেছেন যে সিরাজদ্দৌল্লা জগৎশেঠকে ‘সুন্নত’ (circumcision) করার ভয়ও দেখিয়েছিলেন।40 এটা অত্যন্ত গুরুতর অপবাদ অথচ আশ্চর্যের কথা, সমসাময়িক কোনও ফারসি গ্রন্থে বা কোনও ইউরোপীয় বিবরণে এরকম কিছুর উল্লেখ বা ইঙ্গিত পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

    গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজ-উস্‌-সলাতিন প্রকাশিত হয় ১৭৮৬ সালে এবং এটি রচিত হয় তাঁর ইংরেজ ‘মনিব’ জর্জ উডনির (George Udni) নির্দেশে, যিনি ‘এই অধম ব্যক্তিকে’ ওই গ্রন্থ রচনা করতে ‘আদেশ’ দেন। সিয়রে-র গ্রন্থকারের মতো এই লেখকও ইংরেজদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন এবং এজন্য সিরাজ তাঁকে রাজ্য থেকে বহিষ্কৃত করেছিলেন।41 ইংরেজদের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব ও তাদের চাটুকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি লেখেন:42

    তারা [ইংরেজরা] কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করতে এমনই বদ্ধপরিকর যে নিজেদের প্রাণসংশয় করেও তাতে অবিচল থাকে। মিথ্যাবাদীকে তারা সমাজে বরদাস্ত করে না। তারা উদার, বিশ্বস্ত, সহনশীল ও সম্মানিত ব্যক্তি। প্রতারণা কাকে বলে তা তারা জানে না। শঠতা ব্যাপারটাই তাদের কাছে অজানা।

    করম আলির মুজাফ্‌ফরনামা ১৭৭২ সালের পরে লেখা এবং বহু ভুলভ্রান্তিতে ভরা ও ইংরেজদের অনুকূলে সমান পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি ঘোড়াঘাটের ফৌজদার ছিলেন কিন্তু সেখানে না থেকে বেশির ভাগ সময়ই পুর্ণিয়াতে কাটাতেন। শওকত জঙ্গের পতনের পর তিনি কারারুদ্ধ হন এবং ঘোড়াঘাটের ফৌজদারি থেকে বিচ্যুত হন। সিরাজ তাঁকে পাটনাতে নির্বাসিত করেন। ইংরেজদের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব ও তাদের চাটুকারিতা তাঁর নিম্নোক্ত মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ‘আল্লার ইচ্ছা যে ফরাসিরা [ইংরেজদের দ্বারা] বাংলা থেকে বিতাড়িত হোক।’43 এ ধরনের বক্তব্য বিচার করলে করম আলির বিবরণের যাথার্থ্য সম্বন্ধে সন্দেহ থেকে যায়।

    ইউরোপীয়দের মধ্যে জঁ ল’ ১৭৬৩ সালে তাঁর স্মৃতিকথা (Memoir) লেখেন। নিজের হতাশা ও বাংলা বিজয়ে ইংরেজদের কূটনৈতিক চালের মোকাবিলা করতে নিজের অক্ষমতা ও ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি সমস্ত ঘটনার জন্য প্রধানত সিরাজদ্দৌল্লাকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। ইংরেজদের কলকাতা থেকে বিতাড়ন করার পর যখন সিরাজ মুর্শিদাবাদে ফিরে এলেন, জাঁ ল’ তখন তিক্তসুরে মন্তব্য করেন, ‘স্বৈরাচারী [নবাব] এখন [যুদ্ধে] জয়ী হয়ে ফিরে এসেছেন।’44 তিনি সিরাজ সম্বন্ধে এমনও লেখেন যে ‘এই মাথা গরম তরুণের রাজ্যশাসন করার কোনও ক্ষমতা নেই।’45 তাঁর বক্তব্য, ‘শওকত জঙ্গকে লোকে যতটা ভালবাসে, সিরাজকে ততটাই ঘৃণা করে’, ঐতিহাসিক সত্যের বিকৃতি। গোলাম হোসেন খানও এমন কথা বলার মতো অতটা বাড়াবাড়ি করেননি।46 সিরাজের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাব স্পষ্ট বোঝা যায় যখন তিনি লেখেন, ‘সিরাজকে পদচ্যুত করার জন্য [পুর্ণিয়াতে] একটি যড়যন্ত্র হয়েছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে রামনারায়ণ তাতে যোগ না দেওয়ায় তা সফল হতে পারেনি।’47 তাঁর বলার ভঙ্গিতে বোঝা যায় তিনি এতে স্পষ্টতই নিরাশ হয়েছিলেন। হয়তো নিজের ব্যর্থতা ঢাকতেই তিনি এমন কথা পর্যন্ত বলেছেন যে ‘ইংরেজরা নবাবকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করুক এটাই তিনি বিশেষ করে চান।’48 এইসব বক্তব্য থেকে সিরাজের প্রতি জাঁ ল’-র বিরূপ মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    তা ছাড়া ল’-র বিবরণে অনেক ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতি দেখা যায়। সিরাজ ‘ইউরোপীয়দের প্রবল ঘৃণা করতেন’—তাঁর এই মন্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।49 সিরাজ চন্দননগরের ফরাসি কুঠির প্রধান রেনল্টকে (Renault) জানিয়েছিলেন যে, আহমদ শাহ আবদালির বাংলা আক্রমণের আশঙ্কায় তাঁকে ইংরেজদের সঙ্গে সন্ধি (আলিনগরের সন্ধি, ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) করতে হল। কিন্তু এ-ঘটনাকে বিকৃত করে জাঁ ল’ লিখেছেন যে ‘এটা নিজের [সিরাজের] কাপুরুষতাকে ঢাকা দেওয়ার অজুহাত ছাড়া আর কিছু নয়।’50 অন্যদিকে মুর্শিদাবাদ দরবারের চক্রান্তে তাঁকে সাহায্য না করার জন্য তিনি মোহনলালকে ‘পাজি, বদমায়েস’ আখ্যা দিচ্ছেন অথচ একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে ‘একমাত্র মোহনলালই জগৎশেঠদের সঙ্গে পাল্লা দেবার সামর্থ্য রাখেন’ এবং আরও বলছেন যে ‘আমাদের দুর্ভাগ্য তিনি [মোহনলাল] এই সংকটপূর্ণ সময়ে কিছুদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ।’51 সর্বোপরি, তাঁর মন্তব্য, মীরজাফর ‘সাহসী ও অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি’ সত্যি তো নয়ই, বরঞ্চ ফারসি ঐতিহাসিকদের বিবরণের সম্পূর্ণ বিপরীত।

    এভাবে ব্যাখ্যা করে দেখা যায় লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের বক্তব্যও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। সিরাজদ্দৌল্লা ‘কলকাতায়, ইংরেজদের আক্রমণ করে অত্যন্ত অবিচার ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছেন’ বলে তাঁর যে উক্তি তা সিরাজ-বিরোধী মনোভাবেরই পরিচায়ক এবং এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।52 স্ক্র্যাফ্‌টন যেহেতু পলাশি চক্রান্তের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন এবং মুর্শিদাবাদে এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম, তাই এটা স্বাভাবিক যে তিনি নবাবকে ‘ভিলেন’ প্রতিপন্ন করে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন।

    যাই হোক, আমাদের আলোচ্য আকরগ্রন্থ ও সূত্রগুলিতে ইংরেজদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও সিরাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ পেলেও তরুণ বয়সে সিরাজদ্দৌল্লা যে নিষ্ঠুর, অত্যাচারী ও বেপরোয়া মানুষ ছিলেন তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর এই চরিত্র কি নবাব হওয়ার আগের? এবং এই প্রসঙ্গে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের সংঘাতের বা পলাশি যুদ্ধের আগেকার ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করতে গেলে নবাব হওয়ার আগেকার সিরাজ চরিত্রের ‘অন্ধকার দিক’ বিচার করা কি সত্যিই প্রয়োজনীয় বা প্রাসঙ্গিক? কেউ যদি তর্কের খাতিরে বলেন যে তা প্রয়োজন, তা হলে মনে রাখা দরকার বাংলার প্রায় সব নবাবই নির্মম, অত্যাচারী ও দুশ্চরিত্র ছিলেন। মুর্শিদকুলি খানের নিষ্ঠুরতা ও হৃদয়হীন স্বভাব প্রবাদস্বরূপ ছিল। সুজাউদ্দিন ও সরফরাজ দু’জনেই দুশ্চরিত্র ও নির্দয় ছিলেন। মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার সব নবাবই স্বৈরাচারী ছিলেন। তা যদি হয়, তা হলে শুধু সিরাজের বিরুদ্ধেই এমন অভিযোগ কেন? সেটা ইংরেজ বিজয়কে যৌক্তিক সমর্থন দেওয়ার জন্যই কি?

    এখানে এটা পরিষ্কার করে বলা দরকার যে নবাব হওয়ার আগে সিরাজচরিত্রের ‘অন্ধকার দিক’ সম্বন্ধে এখানে কোনও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে না। জরুরি প্রশ্ন হল: নবাব হওয়ার পরেও কি তাঁর স্বভাবচরিত্র ও ব্যবহার একইরকম ছিল? লক্ষণীয় ব্যাপার হল সিরাজচরিত্রের ‘অন্ধকার দিক’ সব বিবরণেই তাঁর নবাব হওয়ার আগেকার ঘটনা সম্বন্ধে। নবাব হওয়ার পর সিরাজচরিত্রের নিন্দাসূচক কোনও প্রত্যক্ষ তথ্য বা নিদর্শন পাওয়া দুষ্কর। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে এই যে আলিবর্দির মৃত্যুর পরে মসনদে বসার পর সিরাজের স্বভাবচরিত্রে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল।

    এটা নাটকীয় মনে হলেও এমন পরিবর্তন যে সম্ভব এবং অনেকে তা আশা করেছিল সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং জাঁ ল’। তিনি স্পষ্ট বলছেন যে সিরাজের যে-চরিত্র তিনি এঁকেছেন, তা হল ‘আলিবর্দি খানের মৃত্যুর আগের’। তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ: ‘সব লোক খুশি মনে বলে যে তিনি [সিরাজদ্দৌল্লা] একদিন [নবাব হওয়ার পরে?] ভাল লোক হয়ে যাবেন।’ তাঁর নিজেরও এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ ছিল যেজন্য তিনি লিখছেন: ‘[ঢাকার] তরুণ নবাব নওয়াজিস মহম্মদ খান53 সিরাজের চেয়ে কম বদলোক ছিলেন না কিন্তু পরে তিনি সবার চোখের মণি হয়ে ওঠেন।’54

    আলিবর্দির মৃত্যুর পরে সিরাজদ্দৌল্লা রাজ্যভার গ্রহণ করার পর তাঁর ব্যবহার ও আচার আচরণ কেমন ছিল তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। প্রথমে, তিনি নবাব হয়েই যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হলেন, সেগুলির তিনি কীভাবে সম্মুখীন হলেন? বিশেষত তাঁর দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ও মসনদের দাবিদার ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা তিনি কীভাবে করলেন? তাঁর সুবিদিত বেপরোয়া স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিনি কি অদূরদর্শিতা বা অপরিণত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন? এ সবেরই উত্তর না, এ ধরনের কিছুই তিনি করেননি। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে সমঝোতা করতে তিনি এমন কূটনৈতিক চাল দিয়েছিলেন যে, তারিখ-ই-বাংগালা-ই-মহবৎ-জঙ্গী-র লেখক ইউসুফ আলি খান তার তারিফ না করে পারেননি। উক্ত লেখক এই মর্মে লিখেছেন যে, বহুলোক যারা আগে ঘসেটি বেগমকে সমর্থন করত, তারা সিরাজের ‘আপোসমূলক নীতি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটাবার প্রচেষ্টায় সন্তুষ্ট হয়ে’ বেগমের দল ছেড়ে সিরাজের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।55 শওকত জঙ্গ অবশ্য আরও অনেক শক্তিশালী ও বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই নিজের তখত্ বজায় রাখতে সিরাজ তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হন ও তাঁকে পর্যুদস্ত করেন।

    কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটসের (William Watts) ভাষা প্রয়োগ করে বলা যায় যে সিরাজ ছিলেন ‘ঐশ্বৰ্য্য ও শক্তির গর্বে মত্ত’ এক যুবক। কিন্তু তাঁর পনেরো মাস রাজত্বকালে তাঁর অপরিণত বুদ্ধি, পাগলামি বা নির্দয় ব্যবহারের কোনও নজির নেই। কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে তাঁর আচরণ ও তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কে প্রথমে তিনি অস্ত্রধারণ না করে শান্তিপূর্ণভাবে কূটনৈতিক চালের আশ্রয় নেন। পরে সে-চেষ্টা ব্যর্থ হলে কূটনীতির সঙ্গে কাশিমবাজারে ইংরেজ কুঠির বিরুদ্ধে অভিযান করে শক্তি প্রদর্শন করেন। জাঁ ল’ জানাচ্ছেন যে, সিরাজ ফরাসিদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেছেন ও তাদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব দেখিয়েছেন। স্পষ্টতই তাদের সঙ্গে ব্যবহারে বা সম্পর্কে সিরাজ কখনও বদমেজাজ বা চরম নিষ্ঠুরতা দেখাননি। তবে নবাব হিসেবে তিনি ইউরোপীয় সমেত সবাইকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে তিনিই ‘মনিব’ এবং কারও ঔদ্ধত্য তিনি সহ্য করবেন না। ওয়াটস বলছেন, নবাব হিসেবে তাঁর প্রত্যাশা ও দাবি যে, সবাই তাঁর আজ্ঞা বা আদেশ যথারীতি পালন করবে। এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যে তরুণের বিরুদ্ধে ‘উগ্রমেজাজ ও চরম নিষ্ঠুরতার’ অভিযোগ প্রায় সব বিবরণেই দেখা যায়, কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির পতনের পর নবাব হিসেবে তিনি ইংরেজদের প্রতি ব্যবহারে ‘বদান্যতা ও মানবিকতার’ পরিচয় দিয়েছিলেন।56 ইংরেজদের সম্পূর্ণ অসহায় পেয়েও কোনও লুঠতরাজ, হত্যা বা নিষ্ঠুরতার আশ্রয় কিন্তু সিরাজ নেননি।

    লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের মতো ব্যক্তির কাছ থেকেও এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নবাব হওয়ার পরে সিরাজচরিত্রে একটা আমূল পরিবর্তন আসে। যদিও স্ক্র্যাফ্‌টন প্রথমে সিরাজকে ‘অতিরিক্ত পানাসক্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন, পরে অবশ্য তিনি নিজেই তাৎপর্যপূর্ণভাবে সংযোজন করেন যে, আলিবর্দির মৃত্যুশয্যায় কোরাণ ছুঁয়ে সিরাজ শপথ করেন যে তিনি ‘জীবনে আর কোনওদিন মদ্যস্পর্শ করবেন না’ এবং সেই শপথ তিনি ‘অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।’57 এটা খুবই অর্থবহ কারণ যে-যুবক অত্যধিক মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল সে যে এত সহজে দীর্ঘদিনের বদ-অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারল এবং মৃত্যুপথযাত্রী মাতামহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আজীবন রক্ষা করেছে, তার পক্ষে ইচ্ছে করলে নিজের স্বভাবচরিত্র সংশোধন ও পরিবর্তন করতে পারা অত্যাশ্চর্য কিছু নয়। এই কারণে মনে হয় নবাব হওয়ার আগে সিরাজের চরিত্র যেমনই থাকুক না কেন, রাজ্যভার গ্রহণ করার পর তাঁর চরিত্রে পরিবর্তন একেবারে অসম্ভব কিছু নয়।

    এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার, যেটা আমরা আগেও বলার চেষ্টা করেছি, যে সিরাজচরিত্রের (নবাব হওয়ার আগে বা পরে) দোষগুণ বিচার করা মোটেই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য, এ-বিষয়ে যে-সব ঐতিহাসিক তথ্য ও সূত্রের ওপর নির্ভর করা হয়, সেগুলির পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা, তাদের স্ববিরোধ ও উদ্দেশ্যমূলক বিকৃতি দৃষ্টিগোচরে আনা এবং সেগুলির বিচার-বিশ্লেষণ করা। আমাদের প্রচেষ্টা, যে তথ্যগুলির ওপর ভিত্তি করে সিরাজদ্দৌল্লাকে ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখানো হয়, এবং ইংরেজদের সঙ্গে সংঘাত, মুর্শিদাবাদ দরবারের শক্তিশালী গোষ্ঠীর মধ্যে নবাবের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও বিরূপতা এবং শেষ পর্যন্ত পলাশির পরিণতি (ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশের জন্য মূলত সিরাজকেই দায়ী করা হয়), সে-সব তথ্যগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা কতদূর তা যাচাই করা। যে বক্তব্যের ওপর আমরা জোর দিয়েছি, তা হল নবাব হওয়ার আগে সিরাজচরিত্র যতই দাম্ভিক, অসংযত ও উচ্ছৃঙ্খল হোক না কেন, নবাবের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর সে স্বভাবের অনেক পরিবর্তন হয়েছিল। দয়ামায়াহীন উগ্র স্বভাব বা পাগলামির কোনও লক্ষণ কিন্তু তখনকার আচরণে পাওয়া যায় না। নবাব হিসেবে সিরাজদ্দৌল্লা কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিরোধীদল এমনকী ইউরোপীয়দের প্রতিও কোনও নির্মম অত্যাচার করেননি বা উগ্র মেজাজ দেখাননি। অবশ্য নবাবি ক্ষমতা পেয়ে কিছুটা উদ্ধত ও মেজাজি ভাব তাঁর মধ্যে দেখা গেছে। অর্থাৎ সিরাজের দোষত্রুটি ছিল ঠিকই। প্রধান দোষ, দৃঢ় সিদ্ধান্তের অভাব, অস্থিরমতি ও সংকট মুহূর্তে দিশাহারা অবস্থা। তবে মনে রাখা দরকার, তখনও তিনি মাত্র ২৩-২৪ বছরের যুবক। যথেষ্ট পরিণতবুদ্ধি নন এবং তার ওপর ক্ষমতা ও পদগর্বে গরীয়ান। বিভিন্ন শত্রুকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে যাওয়াটাই তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল। তারা যাতে একজোট হয়ে তাঁর বিরোধিতা করতে না পারে সেই অত্যাবশ্যক সাবধানতা তিনি অবলম্বন করেননি। এই অক্ষমতা ও শেষমুহূর্ত পর্যন্ত স্থির সংকল্পের অভাব তাঁর পতন ডেকে এনেছিল।

  • ইউরোপীয় কোম্পানি ও এশীয় বণিক সম্প্রদায়

    ইউরোপীয় কোম্পানি ও এশীয় বণিক সম্প্রদায়

    ইউরোপীয় কোম্পানি ও এশীয় বণিক সম্প্রদায়

    পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের প্রেক্ষিত সম্যক অনুধাবন করতে হলে প্রাক্-পলাশি বাংলার শিল্পবাণিজ্য, বিশেষ করে বহির্বাণিজ্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বাংলায় এশীয় বণিকদের এ সময় কী ভূমিকা তাও জানা দরকার। প্রথমটি সম্বন্ধে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকলেও, দ্বিতীয়টি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান এতদিন অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, যে-কারণে ঐতিহাসিক মহলে প্রচলিত ধারণা ছিল যে, ওই সময় বাংলা থেকে রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এশীয় বণিকদের ভূমিকা ছিল নিতান্তই গৌণ। কিন্তু এখন আমাদের হাতে এমন তথ্যপ্রমাণ এসেছে যা দিয়ে উক্ত বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করা অনেকটা সহজসাধ্য হবে।

    প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলায় ইউরোপীয়দের উপস্থিতি এবং তাদের বাণিজ্য বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে বেশ বড় রকমের পরিবর্তন ঘটায়, যার ফলে ইংরেজদের পক্ষে বাংলা বিজয় অনেক সহজসাধ্য হয়ে যায়। তাই ‘বণিকের মানদণ্ড’ কী ভাবে ‘রাজদণ্ডরূপে’ দেখা দিল তা সম্যক উপলব্ধি করতে হলে বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির হিসেবনিকেশ করা প্রয়োজন।22 সঙ্গে সঙ্গে এ সময় বাংলায় এশীয় বণিকদের ভূমিকা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তাও বিচার করে দেখা দরকার। এভাবে প্রাক্-পলাশি যুগের বাণিজ্যের জগতে বাংলার বাণিজ্যের ভূমিকা নির্ণয় করা সম্ভব হবে।

    এটা মোটামুটিভাবে এখন সবার জানা যে পঞ্চদশ শতকের শেষে ভাস্কো ডা গামা (Vasco da Gama) উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) হয়ে ইউরোপ থেকে এশিয়া/ভারতবর্ষে আসার সোজা সমুদ্রপথ আবিষ্কার করার ফলে ইউরোপ ও ভারতবর্ষের মধ্যে সোজাসুজি সমুদ্রবাণিজ্য সম্ভব হল। বলা বাহুল্য, এ-বিষয়ে পর্তুগিজরাই পথ প্রদর্শক এবং তারাই প্রথম এশিয়া/ভারতবর্ষ থেকে সোজা ইউরোপে মশলাপাতি রফতানি করতে শুরু করে। ষোড়শ শতক ও সপ্তদশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত এশিয়া থেকে ইউরোপে মশলাপাতি রফতানির বাণিজ্যে পতুর্গিজদেরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। ইউরোপে মশলার যে বিরাট বাজার এবং পতুর্গিজরা এশিয়া থেকে মশলা রফতানি করে যে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করছিল তাতে প্রলুব্ধ হয়ে ইংরেজ ও ওলন্দাজরা (Dutch) এশিয়াতে বাণিজ্য করার জন্য কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করে। এইভাবে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পত্তন হয় ১৬০০ সালে, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৬০২ সালে। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি এই দুটি কোম্পানি এশীয় বাণিজ্যে পর্তুগিজদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় এবং ক্রমে ক্রমে পতুর্গিজ বাণিজ্য তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় ইংরেজ ও ডাচরা বাংলায় কুঠি স্থাপন করে বাণিজ্য শুরু করে— ইংরেজরা হুগলিতে, ডাচরা চুঁচুড়াতে। হুগলি ছিল ষোড়শ শতকের শেষদিক থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলার সবচেয়ে বড় বন্দর।27 ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পত্তন হয় পরে। এই কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্য শুরু করে ১৬৮০-এর দশকে। অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির মধ্যে অস্টেন্ড এবং ডেনিস কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্য শুরু করে অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে কিন্তু তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল খুবই নগণ্য।

    একেবারে প্রথম দিকে ইংরেজ ও ডাচ কোম্পানির মূল লক্ষ্য ছিল এশিয়া থেকে মশলাপাতি সোজা ইউরোপে রফতানি করা। এই মশলাপাতির প্রধান উৎস ছিল পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের তথাকথিত মশলাদ্বীপগুলি (Spice Islands)—আজকের ইন্দোনেশিয়ার জাভা, সুমাত্রা, বোর্নিও প্রভৃতি অঞ্চল ও মালাক্কা ইত্যাদি। কোম্পানিগুলি ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো, বিশেষ করে রুপো, নিয়ে ওই অঞ্চলে মশলা কিনতে যায়। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে ভাস্কো ডা গামার আগে আমেরিকা আবিষ্কৃত হয় এবং সেখানে, বিশেষ করে, দক্ষিণ আমেরিকায় প্রচুর রুপোর খনি পাওয়া যায়। সে-সব খনি থেকে ইউরোপে তখন প্রচুর রুপো আসতে থাকে। সে রুপো নিয়ে এসে এশিয়াতে বাণিজ্য করতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির খুব সুবিধে হয়ে গেল। কোম্পানিগুলি মশলাদ্বীপে গিয়ে দেখল সেখানে সোনা-রুপোর চাহিদা তেমন নেই, সবচেয়ে বেশি চাহিদা ভারতীয় মোটা ও সস্তা কাপড়ের। ফলে তারা নজর দিল ভারতের দিকে, সোনা-রুপো দিয়ে ভারত থেকে সস্তা কাপড় কিনে সেগুলো মশলাদ্বীপে নিয়ে গিয়ে তার বিনিময়ে মশলা সংগ্রহ করার জন্য। ভারতে তাদের প্রথম নজরে এল করমণ্ডল বা মাদ্রাজ উপকূল—যেখানে সস্তা ও মোটা কাপড় যথেষ্ট পরিমাণে সংগ্রহ করা যাবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে করমণ্ডলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ ও নিরন্তর যুদ্ধবিগ্রহের ফলে সেখানে বাণিজ্য করা শুধু অসুবিধাজনক ও বিপজ্জনক হয়ে পড়ল না, অনিশ্চিতও হয়ে দাঁড়াল, কাপড়চোপড়ের দামও অনেক বেড়ে গেল। তাই করমণ্ডলের বাণিজ্য ছাড়তে তারা বাধ্য হল।

    তখন কোম্পানিগুলি বাংলার দিকে নজর দিল। তারা আবিষ্কার করল, বাংলার সঙ্গে বাণিজ্য করার অনেক সুবিধে। বাংলায় অপর্যাপ্ত সস্তা ও মোটা কাপড় সংগ্রহ করা সম্ভব। এ-সব কাপড় অন্যান্য জায়গার কাপড়ের তুলনায় অনেক সস্তাই শুধু নয়, এগুলির মান অন্যান্য জায়গার কাপড়ের তুলনায় অনেক উৎকৃষ্টও। দ্বিতীয়ত, বাংলা কাঁচা রেশমের অফুরন্ত ভাণ্ডার। এই রেশম যেমন উন্নত মানের, তেমনি দামেও অনেক সস্তা। ইউরোপে এই রেশমের চাহিদা হবে প্রচুর, কারণ পারস্য বা চিনদেশের রেশমের তুলনায় এর দাম অনেক কম, মানও বেশ উন্নত। এতদিন পারস্য ও চিনদেশের রেশমই ইউরোপের চাহিদা মেটাত, সে-জায়গায় বাংলার রেশম খুবই ভাল বিকল্প হতে পারে। তৃতীয়ত, বাংলার সোরার প্রচুর চাহিদা হবে ইউরোপে কারণ সেখানে তখন গৃহযুদ্ধ ও এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই ছিল। সোরা গোলাবারুদ তৈরি করার সবচেয়ে বড় উপাদান। বাংলার সোরা যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট তা শুধু নয়, দামেও বেশ সস্তা। তা ছাড়া, জাহাজের তলদেশে লোহার পরিবর্তে সোরা রেখে জাহাজকে সমুদ্রবাহী করা যাবে, কারণ তলদেশে ভারী পদার্থ রেখেই সমুদ্রে জাহাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে হত। লোহা দিয়ে সে-কাজ করলে সেটা একেবারেই লাভজনক হত না, অথচ তার পরিবর্তে সোরা দিয়ে এ-কাজ করলে, সেই সোরা ইউরোপে বিক্রি করে বেশ ভাল মুনাফাই করা যাবে। তাই সব দিক থেকে ইউরোপে সোরা রফতানি খুব লাভজনক। এ-সব কারণে কোম্পানিগুলি বাংলায় বাণিজ্য করতে আগ্রহী হল এবং বিপুল উৎসাহে বাণিজ্য শুরু করে দিল।28

    তবে ১৬৭০-এর আগে বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্য তেমন উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ৭০-এর দশকে হঠাৎ ইউরোপে বাংলার কাঁচা রেশমের চাহিদা প্রচুর বেড়ে যায়, যার ফলে বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্য কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৬৮০-এর দশকে যখন ইউরোপে এবং ইংল্যান্ডে বাংলার কাপড়ের চাহিদা হঠাৎ প্রচণ্ড বেড়ে যায়, তখন থেকেই আসলে বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে। ইউরোপে বাংলার কাপড়ের হঠাৎ যে বিরাট চাহিদা দেখা যায় তার অন্যতম কারণ ওইসব দেশের মানুষের মধ্যে রুচির এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এর আগে ইউরোপ বা ইংল্যান্ডে বাংলা তথা ভারতের সস্তা ও মিহি কাপড় পরার চল বিশেষ ছিল না। এ-সব কাপড় গরিব ও খুব সাধারণ লোকদের পরিধেয় ছিল, যারা দামি লিনেন বা ওখানকার অন্য ভাল কাপড় কিনতে পারত না। ভারতীয়/বাংলার কাপড় সস্তা বলে শবদেহের আচ্ছাদন হিসেবেই বিশেষ করে ব্যবহার করা হত। কিন্তু ৮০-র দশকে হঠাৎ বাংলা তথা ভারতীয় কাপড় ব্যবহার করা সমগ্র ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। শুধু অভিজাত লর্ড বা লেডিরা নয়—ঠাকুর, চাকর, ঝি, সবাই ভারতীয়/বাংলার কাপড় না পরলে ইজ্জত থাকছে না বলে ভাবতে শুরু করল। ফলে ইউরোগে ও ইংল্যান্ডে ভারতীয়, বিশেষ করে, বাংলার কাপড়ের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে গেল এবং কোম্পানিগুলিও তাই প্রচুর পরিমাণে বাংলার কাপড় ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে রফতানি করতে শুরু করল।34 এইভাবে ১৬৮০-এর দশক থেকে বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তা বজায় থাকে। এশিয়ার মধ্যে বাংলাই কোম্পানিগুলির বাণিজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা থেকে এই ইউরোপীয় বাণিজ্যে অবশ্য মুখ্য অংশ নেয় ডাচ ও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফরাসি কোম্পানি ১৭৩০-এর দশকে ডুপ্লের (Dupleix) অধীনে কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। অন্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির ভূমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। পলাশি বিপ্লবের পরে অবশ্য চিত্রটা সম্পূর্ণ পালটে যায়। ইংরেজরা বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের আয়ত্তের মধ্যে এনে ধীরে ধীরে অন্যান্য ইউরোপীয় এবং এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাংলার বাণিজ্যজগৎ থেকে হঠিয়ে দেয় এবং সবটাই নিজেদের কুক্ষিগত করে ফেলে।36

    অবশ্য সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ও অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুই দশক পর্যন্ত বাংলা থেকে ডাচ বাণিজ্য ইংরেজ বাণিজ্যের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে ইংরেজ বাণিজ্যে অগ্রগতি হতে থাকে। ১৭৩০-এর দশকের প্রথম থেকে ওই বাণিজ্য অনেক বেড়ে যায় এবং ১৭৪০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরে তা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছয়। কিন্তু ১৭৫০-এর দশকের প্রথমার্ধে তাতে ভাটা পড়ে, বাণিজ্যের পরিমাণ কিছুটা কমে যায় তবে এই হ্রাসের পরিমাণ খুব বেশি নয়। ১৭৩০ থেকে ১৭৫৫ পর্যন্ত বাংলা থেকে ইংরেজ কোম্পানির রফতানি বাণিজ্যের বার্ষিক মোট গড়মূল্য ৩৫ লক্ষ টাকার মতো। ১৭৫০-এর দশকের প্রথমার্ধে ইংরেজদের বাণিজ্যে যে পরিমাণ ঘাটতি দেখা যায়, ওই সময় ডাচদের বাণিজ্যে প্রায় সমপরিমাণ বৃদ্ধি ঘটে। ফলে বাংলা থেকে ইউরোপীয়দের রফতানি বাণিজ্যের মোট পরিমাণে আগের তুলনায় বিশেষ তারতম্য কিছু হয়নি। ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছর ডাচদের ইউরোপে রফতানি বাণিজ্যের বার্ষিক মূল্যের গড় দাঁড়ায় ২৩ লক্ষ টাকার মতো আর ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যত্র তাদের রফতানি মিলে বার্ষিক গড়মূল্য ছিল ৩০ লক্ষ টাকার মতো। নীচের সারণি (সারণি ১) থেকে ১৭৩০ থেকে ১৭৫৫ সালের প্রত্যেক দশকের প্রথম পাঁচ বছরের ইংরেজ ও ডাচ বাণিজ্যের তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যাবে।

    সারণি ১
    ১৭৩০-১৭৫৫ সালের প্রত্যেক দশকের প্রথম পাঁচ বছরে ইংরেজ ও ডাচ বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ও তার বার্ষিক গড় মূল্য (টাকায়)
    বছর ইংরেজ বাণিজ্য
    ইউরোপ ও এশিয়ার রফতানি গড়মূল্য
    ডাচ বাণিজ্য
    ইউরোপে রফতানির বার্ষিক গড়মূল্য
    ইউরোপ ও এশিয়ায় রফতানির বার্ষিক গড়মূল্য
    ১৭৩০/৩১—১৭৩৪/৩৫ ১৩,৪৬,৯৭৩ ২৩,২৬,৩৭৮ ৩৩,৮৮,৩০২
    ১৭৪০/৪১—১৭৪৪/৪৫ ১৫,৯৩,৭০৫ ২৩,১৭,১৮০ ৩৮,৪২,৮৫৬
    ১৭৫০/৫১—১৭৫৪/৫৫ ২২,৭৮,২০৪ ২৯,৮৬,৭৩৬ ৩২,৫৩,১৯০

    [সূত্রনির্দেশ: ডাচ কোম্পানির রফতানির পরিসংখ্যান হল্যান্ডের ‘হেগ’ শহরের রাজকীয় মহাফেজখানায় (Algemeen Rijksarchief) রক্ষিত ডাচ কোম্পানির রেকর্ডস থেকে সংগৃহীত এবং সেগুলির ওপর নির্ভর করে রফতানির পরিমাণ হিসেব করা হয়েছে। ইংরেজ কোম্পানির রফতানির পরিসংখ্যান কে. এন. চৌধুরীর ‘ট্রেইডিং ওয়ার্লড’ থেকে, এক বছর করে পেছিয়ে, নেওয়া হয়েছে। বিনিময়ের হার ৮ টাকায় এক ব্রিটিশ পাউন্ড, ১.৫ ডাচ গিল্ডারে ১ টাকা]

    এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এতদিন ঐতিহাসিক মহলে বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে বাংলা থেকে রফতানি বাণিজ্যে ইউরোপীয়দেরই ছিল মুখ্য ভূমিকা—তারাই বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করত।37 কিন্তু ইদানীং আমরা সন্দেহাতীতভাবে দেখাতে পেরেছি যে এমনকী অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগেও বাংলা থেকে এশীয়দের রফতানি বাণিজ্য ইউরোপীয়দের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। বস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে এশীয়দের রফতানির বার্ষিক গড়মূল্য মোটামুটি ৯০ থেকে ১০০ লক্ষ টাকার মতো আর সেক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের মোট রফতানির পরিমাণ গড়ে বার্ষিক ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার বেশি নয়।38 কাঁচা রেশমের রফতানির ক্ষেত্রে এশীয়দের ভূমিকা আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ—ইউরোপীয়দের চেয়ে তারা এক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে ছিল। ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৩ এই পাঁচ বছর বাংলা থেকে এশীয়দের রেশম রফতানির গড় মূল্যের পরিমাণ ৫৫ লক্ষ টাকা, আর ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত (যখন নানা কারণে বাণিজ্য কিছুটা ব্যাহত হয়েছে) তার পরিমাণ ৪১ লক্ষ টাকা। অন্যদিকে ওই সময় (১৭৫০ থেকে ১৭৫৫) ইউরোপীয়দের মোট রেশম রফতানির বার্ষিক গড়মূল্য ১০ লক্ষ টাকারও কম। অর্থাৎ প্রাক্-পলাশি আমলে বাংলা থেকে এশীয়দের রেশম রফতানির পরিমাণ ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রেশম রফতানির চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি ছিল।39

    এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিষয়, সব ব্যবসায়ীদেরই তখন—সে ইউরোপীয়ই হোক বা এশীয়ই হোক—বাংলা থেকে রফতানি পণ্য সংগ্রহের জন্য বাইরে থেকে নগদ টাকা বা সোনা-রুপো নিয়ে আসতে হত। বাংলায় সোনার চাহিদা তেমন ছিল না—রুপোরই ছিল একমাত্র চাহিদা। এর মুখ্য কারণ বাজারে রৌপ্য মুদ্রারই শুধু প্রচলন ছিল। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি অবশ্য কিছু কিছু গরম ও মোটা কাপড়, কিছু ধাতব জিনিসপত্র যেমন দস্তা, লোহা, টিন, এ-সব নিয়ে আসত বাংলায় বিক্রি করার জন্য। কিন্তু তাদের পরিমাণ ও মোট মূল্য ছিল নিতান্ত সীমিত। ডাচ কোম্পানি বাংলায় যা আমদানি করত, তার শতকরা ৮৭.৫ ভাগই ছিল সোনা-রুপো বা নগদ টাকা। ইংরেজদের ক্ষেত্রে তার পরিমাণ শতকরা প্রায় ৯০ থেকে ৯৪ ভাগ।40 এর প্রধান কারণ বাংলা ছিল স্বনির্ভর, বাইরে থেকে মূল্যবান বিশেষ কিছু আমদানির প্রয়োজন তার ছিল না। ফলে বাংলায় বিদেশি পণ্যের বাজার ছিল অত্যন্ত সীমিত। ইউরোপে উৎপন্ন বা তৈরি কোনও পণ্যের চাহিদা বাংলায় তেমন ছিল না, ইউরোপও কোনও জিনিস বাংলায় এনে সস্তা দামে দিতে পারত না কারণ সেখানে উৎপাদনের খরচ ছিল অনেক বেশি।

    কিন্তু পলাশির পরে ইউরোপ ও ইংল্যান্ড থেকে রুপো ও নগদ টাকাপয়সা আসা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে ইংরেজ কোম্পানি মাছের তেলে মাছ ভাজা শুরু করল। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা বাংলায় বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে লাগল—বাংলার রাজস্ব, নানা উপঢৌকন, উপহার ও ঘুষ ইত্যাদির মাধ্যমে।41 আর এই অর্থ দিয়েই ইংল্যান্ডে রফতানির জন্য বাংলায় পণ্যসংগ্রহ করতে শুরু করল। ইংল্যান্ড ও ইউরোপ থেকে আর সোনা-রুপো আনার কোনও প্রয়োজনই হল না। ফলে, এতদিন ধরে বাংলার উৎপন্ন পণ্যের বিনিময়ে বাংলায় যে অজস্র সম্পদ, সোনা-রুপো আসত, তা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। উত্তর-পলাশি যুগে ডাচ ও অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির বাংলা থেকে রফতানি বাণিজ্য অনেক কমে গেল—ইংরেজরা তাদের ও এশীয় ব্যবসায়ীদের কোণঠাসা করে রাখল। যেটুকু ইউরোপীয় বাণিজ্য তাও চলছিল, তার জন্য ইউরোপ থেকে রুপো আনার প্রয়োজন হল না। ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলায় নানাভাবে অর্জিত অর্থ দিয়েই তার জন্য কেনাকাটা চলল। আর এই কর্মচারীরা ইউরোপীয়দের তাদের দেওয়া অর্থ ইউরোপে ‘বিল অফ এক্সচেঞ্জে’ বা হুন্ডির মাধ্যমে সংগ্রহ করত এবং এভাবে এখানে বেআইনিভাবে অর্জিত অর্থ ইউরোপ/ইংল্যান্ডে পাচার করতে থাকল। এখানে স্মর্তব্য, যা আমরা আগেও বলেছি, অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলার রফতানি বাণিজ্যে ইউরোপীয়রা মুখ্য ভূমিকায় ছিল না—এশীয়দের রফতানি তাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ফলে ইউরোপীয়রাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি সোনা-রুপো বা নগদ টাকা আমদানি করেনি, করেছে এশীয়রা। কিন্তু পলাশির পরে ইংরেজদের দৌরাত্ম্যে এশীয় বণিকদের রফতানি বাণিজ্য ভীষণ কমে যায়। ফলে বাংলায় তাদের আমদানি করা রুপো আর টাকাপয়সার জোয়ারেও ভাঁটা পড়ে, যার নিট ফল প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলায় ধনসম্পদ আসার যে জোয়ার চলছিল, তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।42

    এশীয় বণিকরা যে বাংলায় ইউরোপীয়দের চেয়েও অনেক বেশি সোনা-রুপো এবং নগদ টাকাপয়সা নিয়ে আসত, তা মধ্য অষ্টাদশ শতকে বাংলায় ছিলেন এমন কয়েকজন ইংরেজ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীর বয়ান থেকে স্পষ্ট জানা যায়। এঁদের মধ্যে একজন উইলিয়াম বোল্টস (William Bolts)। তিনি লিখেছেন, ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক সওদাগর বাংলায় ব্যবসা করতে আসত এবং তারা বাংলায় পণ্য কেনার জন্য ‘শুধু টাকাপয়সা, সোনা-রুপো বা হুন্ডি’ নিয়ে আসত। তাঁর আরও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য, ‘বাংলায় এশীয় বণিকদের মাধ্যমে যে-পরিমাণ সোনা-রুপো ও টাকাপয়সা আসত, তা ইউরোপ থেকে বা পারস্য ও আরব উপসাগরের সমুদ্রপথে আসা সোনা-রুপো ও নগদ টাকার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।45 আরেকজন ইংরেজ কর্মচারী হ্যারি ভেরেলস্ট (Harry Verelst) জানাচ্ছেন, ‘বাংলার পণ্যের বিনিময়ে বাংলায় আসত সোনা-রুপো এবং এভাবে যত বেশি পণ্য বাংলা থেকে রফতানি হত, তত পরিমাণ ধনসম্পদই প্রত্যেক বছর বাংলায় আসত।46 অন্য এক কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন বলছেন, ‘এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বণিকরা শুধু নগদ টাকাকড়ি ও সোনা-রুপো দিয়ে বাংলায় রফতানি পণ্য কিনতে আসত।’47 এ-সব বৃত্তান্ত থেকে এটা স্পষ্ট যে মধ্য অষ্টাদশ শতকেও এশীয় বণিকরা বাংলায় সোনা-রুপো ও টাকাকড়ি আমদানিতে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল, ইউরোপীয়রা নয়। এবং সবাইকেই বাংলা থেকে রফতানি পণ্য কেনার জন্য বাইরে থেকে সোনা-রুপো ও নগদ টাকাকড়ি নিয়ে আসতে হত।48

  • সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজ কোম্পানির সংঘাত

    সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজ কোম্পানির সংঘাত

    সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজ কোম্পানির সংঘাত

    বহুদিন ধরে ঐতিহাসিকরা বলার চেষ্টা করছেন যে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার যে-সংঘর্ষ (১৭৫৬-৫৭) বাধে, তার জন্য মূলত দায়ী নবাব সিরাজদ্দৌল্লাই। এই মতের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা এস. সি. হিল (S. C. Hill, 1905), যদিও এই বক্তব্যই বেশ চাতুর্যের সঙ্গে এবং খুব সূক্ষ্মভাবে (সোজাসুজি নয়) অধুনাতম গ্রন্থেও পরিবেশিত হয়েছে। উক্ত সংঘর্ষের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে হিল বলছেন, সিরাজদ্দৌল্লার ‘আত্মম্ভরিতা’ (vanity) এবং ‘অর্থলিপ্সাই’ (avarice) এ সংঘর্ষের মুখ্য কারণ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের যে কতগুলি নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল, হিল সাহেব সেগুলিকে ‘ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য’ নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ বলে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন।39নবাব হওয়ার আগে হয়তো সিরাজদ্দৌল্লা কিছুটা দাম্ভিক ছিলেন কিন্তু নবাব হওয়ার পরে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর আচরণে বা সম্পর্কে এমন কোনও ঘটনা বা তথ্য দেখানো মুশকিল যাতে প্রমাণিত হয় যে সিরাজের দাম্ভিকতাই ইংরেজের সঙ্গে তাঁর বিরোধের অন্যতম কারণ। আর খোদ ইংরেজ কর্মচারীদের লেখা থেকেই সহজে দেখানো যায় যে সিরাজের অর্থলিপ্সা যদি থেকেও থাকে, তা কিন্তু কোনওভাবেই এ-সংঘর্ষের জন্য দায়ী নয়। অন্যদিকে আমাদের কাছে এমন তথ্যপ্রমাণ আছে যা থেকে দেখানো যাবে যে, যদি কোনও একটি কারণকে এ-সংঘর্ষের জন্য দায়ী করা যায় তবে তা হল কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির গভর্নর রজার ড্রেকের (Roger Drake) কঠিন ও অনমনীয় মনোভাব। হিল কিন্তু এ-সংঘর্ষে ড্রেকের ভূমিকা সম্বন্ধে আশ্চর্যরকমের (সুবিধেজনকও বটে) নীরব!

    অধুনা ঐতিহাসিকদের মধ্যে যদিও পিটার মার্শাল বলছেন যে, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল নবাবের সঙ্গে ‘মিটমাট করার জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি’ তবু তিনি এবং অন্যান্যরা এখনও প্রচ্ছন্নভাবে এ-সংঘর্ষের জন্য সিরাজদ্দৌল্লাকেই বেশি করে দায়ী করেছেন।41

    ইদানীং ঐতিহাসিকরা বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলার চেষ্টা করছেন যে, অষ্টাদশ শতকের প্রথম থেকে বাংলায় নবাবের সঙ্গে সামরিক অভিজাতশ্রেণী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও জমিদারদের মধ্যে যে নতুন শ্রেণীগত জোটবদ্ধতা (new class alliance) তৈরি হয়েছিল এবং যা মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি খান পর্যন্ত বাংলায় নবাবি শাসনের মূল ভিত্তি, সিরাজদ্দৌল্লার সময় তা ভেঙে পড়ে।49 তার ফলেই তরুণ নবাবের সময় বাংলার রাজনৈতিক জীবনে ‘সংকট’ ঘনীভূত হয়। আর সেই সুযোগেই ইংরেজরা বাংলায় নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। এটা ঠিকই, ১৭৫৬-৫৭ সালে বাংলায় যে ‘সংকটে’র কথা বলা হয় তা সম্যক উপলব্ধি করতে গেলে, বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে যে-সম্পর্ক তা ভাল করে বুঝতে হবে। এ-সম্পর্ক আবার অনেকটা নির্ভর করত একদিকে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির নিজস্ব অর্থাৎ কোম্পানির তরফে যে-সব ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যদিকে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার সমৃদ্ধি বা অবনতির ওপর। কিন্তু যে-সব বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে সংঘর্ষের উৎপত্তি, সেগুলি ভাল করে বিশ্লেষণ করা দরকার, যাতে এ-সংঘর্ষের প্রকৃত কারণগুলি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।

    কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির অধ্যক্ষ জাঁ ল’ লিখেছেন যে নবাব আলিবর্দি খানের মৃত্যুর আগে থেকেই ইংরেজদের প্রতি সিরাজদ্দৌল্লার বিরূপ মনোভাব ছিল।50 কিন্তু এ বক্তব্য মোটেই সঠিক নয়। এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সিরাজদ্দৌল্লা যখন নবাব হলেন, তখনও ইংরেজদের প্রতি তাঁর কোনও বিরূপতা ছিল না, কোনও শত্রুতামূলক মনোভাবও নয়। সাধারণভাবে ইউরোপীয়দের প্রতি, ইংরেজসমেত, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলিবর্দির মতোই। দু’জনেরই এদের প্রতি মনোভাব দক্ষিণ ভারত এবং কর্ণাটকের ঘটনার প্রেক্ষিতেই আবর্তিত হত। দক্ষিণ ভারতে যা ঘটছিল, সেখানে কীভাবে ইংরেজ ও ফরাসিরা রাজনীতির দাবাখেলায় মেতে উঠেছিল এবং কীভাবে স্থানীয় শাসকদের তাদের হাতের পুতুল করে তুলছিল, সে সম্বন্ধে আলিবর্দি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁর ভয় ছিল, ইউরোপীয়রা বাংলায়ও সে-খেলায় মেতে উঠতে পারে। তাই তারা যাতে বাংলায় তার পুনরাবৃত্তি করতে না পারে তার জন্য তিনি সচেষ্ট ও বদ্ধপরিকর ছিলেন।51 জাঁ ল’ বলছেন, আলিবর্দি ইংরেজ ও ফরাসিদের সমান সন্দেহের চোখে দেখতেন। তবে বৃদ্ধ নবাব বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলায় ফরাসিদের তুলনায় ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অনেক বেশি ছিল— সুতরাং ফরাসিদের চেয়ে তারাই বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।53 সিরাজদ্দৌল্লার উপলব্ধিও ছিল তাই। এটা এক অজ্ঞাতনামা ইংরেজ লেখকের পাণ্ডুলিপি থেকে সুস্পষ্ট: ‘নতুন নবাব তাঁর রাজ্যে ইউরোপীয়দের শক্তিবৃদ্ধিতে শঙ্কিত বোধ করছিলেন এবং তা হ্রাস করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এদের মধ্যে যেহেতু ইংরেজরাই বেশি শক্তিশালী, তাই তিনি ন্যায্যভাবে [just policy] প্রথমে তাদের দমন করতে অগ্রসর হলেন।’55

    হলওয়েল (Holwell) অবশ্য লিখেছেন যে আলিবর্দি অনেকদিন ধরে ইউরোপীয়দের অস্ত্রসম্ভার ও দুর্গ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছিলেন এবং মৃত্যুশয্যায় সিরাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইংরেজদের প্রথম শায়েস্তা করতে এবং তাদের কোনও দুর্গ বা সৈন্যসামন্ত রাখতে না দিতে।58 কিন্তু হলওয়েলের দেওয়া তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। কলকাতার ‘অন্ধকূপ হত্যার’ যে-কাহিনী তার জনক তিনিই। তাঁর সত্যবাদিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধে অনেক ইংরেজ কর্মচারীই সন্দিহান ছিল। নিজের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য মিথ্যা ও ভুল তথ্য পরিবেশন করতে বা তথ্যকে বিকৃত করতে তিনি বেশ অভ্যস্ত ছিলেন। অন্য ইংরেজ কর্মচারীদের লেখা থেকে প্রমাণ করা যায় যে আলিবর্দির মৃত্যুশয্যায় সিরাজের প্রতি নির্দেশ একেবারেই আজগুবি গল্প। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটস, যিনি মুর্শিদাবাদ দরবারের হাঁড়ির খবরও রাখতেন, জানিয়েছেন যে তিনি বা ওই কুঠির কেউ, এমনকী স্থানীয় লোকজনরাও মৃত্যুশয্যায় আলিবর্দির সিরাজের প্রতি নির্দেশের কথা শোনেননি।59 ওই কুঠির দ্বিতীয় প্রধান ম্যাথু কোলেট (Mathew Collet) হলওয়েলের বক্তব্যকে ‘একেবারেই আজগুবি গল্প’ (spacious fable) আখ্যা দিয়েছেন।60 এখানে স্মর্তব্য, এঁরা দুজনেই কাশিমবাজারে ছিলেন বলে পাশে মুর্শিদাবাদ দরবারে রোজ যা ঘটত, তার সবকিছুরই খবর রাখতেন। তাঁরা কিছু জানতেন না অথচ হলওয়েল কলকাতায় বসে কী করে সব জানলেন? ইংরেজ কোম্পানির আরেকজন কর্মচারী, রিচার্ড বেচার (Richard Becher) লিখেছেন: ‘ইংরেজরা এমন অনেক কাজ করেছে যার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের ওপর রেগে গেছিলেন। তাদের প্রতি বিরূপ হওয়ার জন্য আলিবর্দির শেষ উপদেশের কোনও প্রয়োজনই ছিল না।61

    আগেই বলা হয়েছে প্রথমদিকে সিরাজ ইংরেজদের প্রতি একেবারেই শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন না। সিরাজ মসনদে বসার অনেক আগেই আলিবর্দি ইংরেজদের দেওয়া এক পরোয়ানায় জানিয়েছিলেন যে, সিরাজদ্দৌল্লা সবসময় আলিবর্দির সমক্ষে ইংরেজদের প্রশংসা করতেন এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য শুভকামনা করতেন।62 ১৭৫২ সালের মে মাসে আলিবর্দি সিরাজদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন আর ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই হুগলির ফৌজদার ও আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের পরামর্শে ইংরেজরা সিরাজের সঙ্গে দেখা করেন। ফোর্ট উইলিয়ামের নথিপত্র থেকে জানা যায়, সিরাজ ‘ইংরেজদের প্রতি ডাচ বা ফরাসিদের চেয়েও বেশি সৌজন্য দেখান এবং যথেষ্ট হৃদ্যতামূলক আচরণ করেন।’63 নবীন যুবরাজের সহৃদয় ব্যবহারের খবর পেয়ে কোম্পানির পরিচালক সমিতি লন্ডন থেকে ফোর্ট উইলিয়ামে লিখে পাঠায় (২৩ জানুয়ারি ১৭৫৪) যে ‘তারা যেন ইংরেজদের প্রতি সিরাজদ্দৌল্লার এই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের সুযোগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের আরও উন্নতি করে।’64 আবার আরেকটি চিঠিতে পরিচালক সমিতি জানাচ্ছে (২৪ নভেম্বর, ১৭৫৪), সিরাজ অন্য ইউরোপীয়দের চেয়ে ইংরেজদের প্রতি অনেক বেশি প্রসন্ন বলে মনে হচ্ছে এবং এটাকে যেন কাজে লাগানো হয়।65

    সাধারণভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে সিরাজ নবাব হওয়ার পর তখনকার রীতি অনুযায়ী ইংরেজরা তাঁকে কোনও নজরানা বা উপঢৌকন দেয়নি বলে তিনি ইংরেজদের ওপর অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু এটা বোধহয় ঠিক নয়। ইংরেজরা একটি চিঠি লিখে সিরাজকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং নতুন নবাবের কাছ থেকে অনুগ্রহ ও নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিলেন। এ চিঠি বেশ সাদরেই গৃহীত হয়েছিল। তরুণ নবাব দরবারে ইংরেজদের ‘ভকিল’ (vakil) বা প্রতিনিধিকে জানিয়ে দেন যে তিনি ইংরেজদের প্রতি তাঁর মাতামহ আলিবর্দির চেয়েও বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবেন।66 আসলে ইউরোপীয়দের প্রতি আলিবর্দির নীতি ছিল ‘ঋজু অথচ অন্যায্য নয়’ (rigid rather than unjust)। যাতে তাঁর প্রবল আপত্তি ছিল তা হল, ইউরোপীয়রা নবাবের অধীন নয়—স্বাধীন, নবাবের তারা তোয়াক্কা করে না এমন মনোভাব। জাঁ ল’ জানাচ্ছেন, ‘আলিবর্দি কিন্তু ভালভাবেই জানতেন ঠিক কখন এবং কীভাবে এদের সমঝে দেওয়া প্রয়োজন যে তিনিই বাংলার হর্তাকর্তা। তিনি চেয়েছিলেন যে ইউরোপীয়রা কেউই বাংলায় দুর্গ তৈরি করে নিজেদের সুসংহত না করে।’67 তিনি দরবারে এ-সব কোম্পানির প্রতিনিধিদের বলতেন—‘তোমরা সওদাগর, তোমাদের দুর্গ তৈরি করার প্রয়োজনটা কী? আমার রাজ্যে তোমাদের এমন কোনও শত্রু নেই যাকে তোমরা ভয় করতে পার।’ তিনি আরও বলছেন, ‘আলিবর্দি যদি আর কিছুদিন সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতেন, তা হলে তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউরোপীয়দের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এত বৃদ্ধ ও এমন অসুস্থ ছিলেন যে তাঁর উত্তরসূরিকেই সেই কাজ করতে এগিয়ে আসতে হল।’68 সিরাজদ্দৌল্লা প্রথম থেকেই ইউরোপীয় এবং ইংরেজদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন। জাঁ ল’ লিখেছেন, সিরাজ ফরাসিদের প্রতি বেশ সন্তুষ্টই ছিলেন। তারাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে রায়দুর্লভ ও মোহনলালের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলত।69

    কিন্তু সিরাজদ্দৌল্লার নবাব হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে, দু’পক্ষের স্বার্থের মধ্যে সংঘাতের ফলে, বিরোধ অপরিহার্য হয়ে উঠল। আসলে আলিবর্দির মৃত্যুর ঠিক আগে সিরাজ ইংরেজদের কিছু কাজকর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন কারণ এগুলির মাধ্যমে নবাবের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছিল। ইউরোপে যুদ্ধ বাধার আশঙ্কায় এবং আলিবর্দির মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদে মসনদ নিয়ে বিরোধ অবধারিত ভেবে ইংরেজ ও ফরাসিরা উভয়েই প্রায় প্রকাশ্যে তাদের দুর্গগুলি সংস্কার ও সংহত করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলিবর্দি অত্যন্ত অসুস্থ এবং অন্যদিকে দিল্লি থেকে মুঘল সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী বাংলার বকেয়া রাজস্ব আদায় করতে অভিযান করবে এমন আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সিরাজ আপাতত ইংরেজ ও ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা মুলতুবি রাখতে বাধ্য হলেন।70

    সিরাজদ্দৌল্লার ইংরেজদের প্রতি বিরূপ হওয়ার আরও গভীর কারণ ছিল। তিনি আশঙ্কা করেন যে ইংরেজরা তাঁর সিংহাসন প্রাপ্তির বিরোধিতা করতে পারে। তিনি যখন ১৭৫৬-এর এপ্রিলে নবাব হলেন তখন তাঁর সন্দেহ হয় যে ইংরেজরা মসনদে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মদত দিচ্ছে। এ-সন্দেহ কিন্তু একেবারে অমূলক নয়। বস্তুত ইংরেজরা প্রথম থেকে প্রায় ধরেই নিয়েছিল, সিরাজের পক্ষে নবাব হওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির প্রধান রেনল্ট বা জা ল’র লেখা থেকে এবং অন্যান্য বেশ কিছু ইউরোপীয় তথ্য থেকেও জানা যায় যে ইংরেজরা সিরাজের বিরুদ্ধে একটা মতলব ভাঁজছিল এবং সিরাজের বিরুদ্ধ-গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। রেনল্ট স্পষ্ট জানাচ্ছেন, ‘ঘসেটি বেগমের দলকে মসনদ দখলের দৌড়ে কেউ আটকাতে পারবে না এবং সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য, এই স্থির বিশ্বাসে ইংরেজরা ঘসেটি বেগমের সঙ্গে [সিরাজের বিরুদ্ধে] চক্রান্ত শুরু করেন।’71 জাঁ ল’-ও লিখছেন যে অন্য অনেকের মতো ইংরেজরাও ভেবেছিল, ‘সিরাজদ্দৌল্লা কখনও নবাব হতে পারবেন না, এবং তাই তারা কোনও কাজে তাঁর দ্বারস্থ হত না। শুধু তাই নয়, তারা তাঁর সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগই রাখত না।’ এ-সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য: 72

    it was in the effervescence of these troubles that the English gave Siraj-uddaula reason for complaint against them. Always led away by the idea that he would not have sufficient influence to get himself recognised as subahdar they carried on a correspondence with the Begum (Ghaseti)…. It is even said that they had an understanding with the Nawab of Purnea (Shaukat Jung).

    ইংরেজরা যে সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিল তা অন্য একটি ফরাসি সূত্র থেকেও জানা যায়। তাতে বলা হয়েছে যে, লেখকের বিশ্বাস, ইংরেজরা ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের সঙ্গে সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তে যোগ দেয়।73 এখানে উল্লেখ্য, শওকত জঙ্গও ঘসেটি বেগমের মতো মসনদের দাবিদার হিসেবে সিরাজের প্রতিপক্ষ ছিলেন। হলওয়েল নিশ্চিত ছিলেন যে সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগমের জেতার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল।74 এমনকী ইংরেজ গভর্নর ড্রেকও যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে সিরাজদ্দৌল্লা ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে সফল হতে এবং আদৌ নবাব হতে পারবেন কি না।75 সিয়র-উল-মুতাখারিনে-র লেখক ও শওকত জঙ্গের পরামর্শদাতা গোলাম হোসেন খান সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য শওকত জঙ্গকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন।76 কোম্পানির কর্মচারী রিচার্ড বেচার লিখেছেন যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের ওপর রেগে যাওয়ার যথেষ্ট ইন্ধন জুগিয়েছিল।77

    ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজদ্দৌল্লার নির্দিষ্ট অভিযোগগুলি যথার্থ কি না তা বিচার করার আগে তাঁর আত্মম্ভরিতা ও অর্থলিপ্সা, যা সিরাজ-ইংরেজ সংঘর্ষের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তার দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। সিরাজ যদি সত্যিই দাম্ভিক হতেন এবং তাঁর দাম্ভিকতাই যদি বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে থাকে, তা হলে তাঁর দুই প্রবল শত্রু ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গকে পরাভূত করার পরই তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। মসনদে বসার ক’দিন পরে তিনি রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে অর্পণ করার অনুরোধ জানিয়ে কলকাতায় চিঠি দেন। কৃষ্ণদাস ৫৩ লক্ষ টাকা মূল্যের ধনসম্পদ নিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। খুব সম্ভবত তাঁর পিতা রাজবল্লভ ইংরেজদের যোগসাজশে ওই ধনসম্পদ সমেত তাঁকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমের বিশ্বস্ত অনুচর—তাঁর মৃত স্বামী নওয়াজিস মহম্মদ ঢাকার নবাব থাকার সময় রাজবল্লভ প্রথমে একজন সহকারী ছিলেন, পরে তিনি ঢাকার রাজস্ববিভাগের দায়িত্ব পান। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছিল এবং যখন এ-সব হিসেবপত্র পরীক্ষার কাজ চলছিল, তখন রাজবল্লভ ইংরেজদের কাছে তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাস ও পরিবারের জন্য কলকাতায় আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কৃষ্ণদাস কলকাতা পৌঁছোন ১৩ মার্চ ১৭৫৬—আলিবর্দির মৃত্যুর প্রায় মাসখানেক আগে।78

    কয়েক সপ্তাহ পরে, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর ইংরেজদের লিখে পাঠান, ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লাকে সুসংহত ও দুর্ভেদ্য করার জন্য যেন নতুন করে কিছু করা না হয় এবং ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামে যে প্রাচীর ও অপসারণীয় সেতু (draw bridge) সম্প্রতি বানিয়েছে তা যেন ভেঙে ফেলা হয়। ইংরেজ গভর্নর ড্রেক সিরাজের চিঠিকে শুধু উপেক্ষাই করেননি, পত্রবাহক মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারামের ভাই নারায়ণ সিংকে ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশকারী ও গুপ্তচর অপবাদ দিয়ে কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দেন।79 অথচ তখনকার কলকাতার সবচেয়ে ধনী ও সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী উমিচাঁদই নারায়ণ সিংকে পরিচয়পত্র দিয়ে ড্রেকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সিরাজদ্দৌল্লার দ্বিতীয় চিঠির উত্তরে ড্রেক যা লিখেছিলেন তাতে ইউরোপের সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ যদি ভারতবর্যে বিস্তার লাভ করে, সেক্ষেত্রে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নবাবের সাধ্যে কুলোবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।80 এ-চিঠি পেয়ে সিরাজের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হল যে ইউরোপীয়রা, বিশেষ করে ইংরেজরা, দক্ষিণ ভারতে মাত্র কয়েক বছর আগে যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেছিল, বাংলায় তারা তার পুনরাবৃত্তি করতে পারে। নারায়ণ সিং-এর কলকাতা থেকে বহিষ্কারের খবর পেয়ে ওয়াটস শঙ্কিত হয়ে লিখেছেন: ‘যে মুহূর্তে আমি নারায়ণ সিং-এর ব্যাপারটি জানতে পারলাম, তখনই আমি নবাবের উচ্চপদাধিকারী এই কর্মচারীকে এভাবে অপমান করার ফল কী হতে পারে তা ভেবে আতঙ্কিত হলাম কারণ তরুণ নবাবকে ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে কিঞ্চিৎ বেসামাল মনে হয় এবং তাঁর প্রত্যাশা তাঁর আদেশ লোকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে।’81 জাঁ ল’-ও জানাচ্ছেন যে ‘ইংরেজরা নবাবের দূতকে অপমান করেছে এবং নবাবের চিঠির উত্তরে বেশ চড়া (offensive) জবাব দিয়েছে।’82 হুগলির ডাচ কুঠির কুঠিয়ালরাও লিখেছেন যে নবাবের মতো শক্তিশালী বিপক্ষকে ‘এমনভাবে সোজাসুজি অগ্রাহ্য করে [ইংরেজরা] হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছে।’83

    বস্তুতপক্ষে পুর্ণিয়া রওনা হওয়ার (১৬ মে ১৭৫৬) আগে সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের মতো ফরাসিদেরও আলিবর্দির শেষ অসুস্থতার সুযোগে তাদের কেল্লার সংস্কার ও সংহত করার জন্য যে-সব নির্মাণকার্য করেছিল, সেগুলি ভেঙে ফেলতে বলেন। ফরাসিরা জাঁ ল’-র পরামর্শে, ইংরেজদের মতো ঔদ্ধত্য না দেখিয়ে, নবাবের পত্রবাহককে বেশ সৌজন্য দেখায় এবং তাকে দিয়ে রিপোর্ট করায় যে ফরাসিরা বেআইনি কিছু করেনি। নবাব ২০ মে নাগাদ রাজমহলে এ-খবর পেয়ে বেশ সন্তুষ্ট হন।84 এদিকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল বুঝতে পারে নারায়ণ সিংকে কলকাতা থেকে ওভাবে বহিষ্কার করার ফলে নবাবের সঙ্গে সম্পর্কে বেশ তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে। তাই কাশিমবাজারে ওয়াটসকে নির্দেশ দেওয়া হল, তা যেন না হয় তার জন্য আগে থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে। ওয়াটস তড়িঘড়ি দরবারে নবাবের ঘনিষ্ঠ লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।85 কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, ড্রেকের চিঠিতে সম্ভাব্য ফরাসি আক্রমণের বিরুদ্ধে নবাব ইংরেজদের রক্ষা করতে পারবেন কি না তা নিয়ে নবাবের ক্ষমতার ওপর কটাক্ষপূর্ণ ইঙ্গিত ছিল এবং মনে হয় সিরাজ তাতে খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। আবার এমন একটা সময় এ-সব ঘটনা ঘটল যখন সিরাজদ্দৌল্লা তাঁর এক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, ঘসেটি বেগমকে, কাবু করে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী শওকত জঙ্গের সঙ্গে মোকাবিলা করতে যাচ্ছিলেন। ফলে, অন্য সময় এ-সব ঘটলে সিরাজের ওপর যা প্রতিক্রিয়া হত, সে-সব এ সময় ঘটায় তার প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি জোরালো হয়ে দেখা দিল।86

  • পলাশি বিপ্লবের অনিবার্যতা

    পলাশি বিপ্লবের অনিবার্যতা

    পলাশি বিপ্লবের অনিবার্যতা

    পলাশি বিপ্লব কেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সে-সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল—মুসলমান শাসনের নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দুরা মুসলমান নবাবের শাসনের অবসান কামনা করছিল।65

     আবার অনেকের বক্তব্য, পলাশি আসলে হিন্দু-জৈন সওদাগর ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং মহাজন শ্রেণীর দ্বারা সংগঠিত বিপ্লব। কারণ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে এদের স্বার্থ এমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল যে, সিরাজদৌল্লা ইউরোপীয়দের, বিশেষ করে ইংরেজদের, বাংলা থেকে তাড়িয়ে দেবে, এটা এরা মোটেই মেনে নিতে পারেনি।68 আরেক দল ঐতিহাসিক বলছেন, একদিকে ‘বাংলার অভ্যন্তরীণ’ সংকট অন্যদিকে নবাব যেভাবে শাসকগোষ্ঠীর গণ্যমান্য অমাত্যদের বিরূপ করে তুলেছিলেন যার জন্য নবাবকে গদিচ্যুত করতে তারা ইংরেজদের সাহায্য চেয়েছিল—দুটো ব্যাপারই ইংরেজদের পলাশির ষড়যন্ত্রে/বিপ্লবে টেনে এনেছিল।69 কিন্তু আমরা এখানে দেখাব যে উপরোক্ত বক্তব্যগুলির কোনওটাই গ্রহণযোগ্য নয়। ইংরেজদের বাংলাবিজয়ের পেছনে সবচেয়ে জোরালো যে-উদ্দেশ্য কাজ করেছে, তা হল কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের স্বার্থরক্ষা, যেটা ঠিক প্রাক্-পলাশি সময়ে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল।

    দ্বিধাবিভক্ত সমাজ

    প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, এ বক্তব্যের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা এস. সি. হিল।76 তিনি বলেছেন, মধ্য-অষ্টাদশ শতকে বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ দ্বিধাবিভক্ত ছিল। মুসলমান শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমান নবাবের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য কোনও ত্রাণকর্তার প্রত্যাশায় অধীর হয়ে পড়েছিল এবং ইংরেজদের জানিয়েছিল সাদর অভ্যর্থনা। হিল সাহেব তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে দু’জন সমসাময়িক ইউরোপীয়র—জাঁ ল’ এবং কর্নেল স্কটের (Scott)— লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। জাঁ ল’ বলেছেন: ‘হিন্দু রাজারা [জমিদাররা] মুসলমান শাসনকে ঘৃণার চোখে দেখত। প্রখ্যাত ব্যাঙ্কার জগৎশেঠরা, যাদের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, না থাকলে সিরাজদৌল্লা যে বিপ্লবে বিতাড়িত হন, তারপরে তারা হিন্দু রাজত্ব কায়েম করত।’87 অন্যজন, কর্নেল স্কট তাঁর বন্ধু মি. নোবলকে লিখেছেন: ‘হিন্দু রাজারা এবং রাজ্যের হিন্দুরা মুসলমান শাসনের নিপীড়নে ক্ষুব্ধ। তারা গোপনে এর পরিবর্তন চাইছিল এবং এই অত্যাচারী শাসনের অবসানের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।’88 এ-সব বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে হিলের সিদ্ধান্ত: ‘মুসলমান শাসকের বিরুদ্ধে হিন্দুদের অসন্তোষ ছিল। তা থেকে অব্যাহতির আশায় তারা গোপনে সম্ভাব্য মুক্তিদাতার অপেক্ষা করছিল।’89

    হিলকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে আরেকজন ঐতিহাসিক অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপ তুলে ধরায় যত্নবান। তিনি লিখছেন: ‘ইংরেজদের ধারণা ছিল, হিন্দুরা মুসলিম নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য শুধু প্রস্তুতই ছিল না, তারা মুসলমান শাসনের অবসান ঘটাতে ইংরেজদের সাহায্য নিতেও আগ্রহী ছিল।’90 সুতরাং দেখা যাচ্ছে উক্ত দু’জন ঐতিহাসিকেরই বক্তব্য, প্রাক্-পলাশি বাংলায় সমাজ ছিল দ্বিধাবিভক্ত। হিন্দুরা মুসলিম শাসনকে ঘৃণার চোখে দেখত এবং তার হাত থেকে অব্যাহতি চাইছিল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে সমাজের কোনও দ্বিধাবিভক্ত চেহারা (যার ফলে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করা যায়) চোখে পড়ে কি না তা দেখার আগে সমাজের এই দ্বিধাবিভক্ত রূপচিত্রণের পেছনে ইউরোপীয়দের বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য কাজ করেছে কি না তা বিচার করে দেখা উচিত।

    বস্তুতপক্ষে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে অনেক ইউরোপীয়ই বাংলা বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিল এবং এ জয় অনায়াসলভ্য বলে মনে করত। তাদের লেখা থেকেই তাদের এ মনোভাব পরিষ্কার বোঝা যায়। সুতরাং বাংলা বিজয় যেখানে মুখ্য উদ্দেশ্য, তখন সে অবাধ বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণে যদি তারা বাংলার দ্বিধাবিভক্ত সমাজের চেহারা খুঁজে বার করতে চায়, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাঁ ল’ বা স্কটের মন্তব্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতই মনে হয় এবং সে-কারণেই এগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া এ-প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, পলাশি শুধু হিন্দুত্বের দ্বারা সংগঠিত বিপ্লব নয়—এটি মূলত ইংরেজদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল, যাতে তারা শাসকশ্রেণীর একটি শক্তিশালী অংশকে সামিল করতে পেরেছিল। এর মধ্যে হিন্দু যেমন ছিল, তেমনি মুসলমানও। এখানে স্মর্তব্য, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় আরও দুটি বিপ্লব হয়েছিল—১৭২৭ এবং ১৭৩৯-৪০ সালে, যখন শাসকশ্রেণীর দুই সম্প্রদায়েরই অভিজাতবর্গ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থানুযায়ী ও অভিপ্রায় অনুসারে নবাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নয়। সুতরাং ওই দুটি বিপ্লবের সময়ে যদি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কোনও প্রশ্ন না উঠে থাকে, তা হলে ১৭৫৬-৫৭ সালেও সে-প্রশ্নের অবতারণা অবান্তর।

    এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে, আলিবর্দি তথা সিরাজদ্দৌল্লার সময় অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদার হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিক মহলে প্রাক্-পলাশি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপ অবাধ স্বীকৃতি পেয়েছে। লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (ব্রিটিশ লাইব্রেরি) ওরম সংগ্রহ (Orme Collection) ও হল্যান্ডের রাজকীয় মহাফেজখানায় (Algemeen Rijksarchief) ঠিক প্রাক্-পলাশি বাংলার উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদারদের দুটি তালিকা আমরা পেয়েছি। প্রথমটিতে (রবার্ট ওরমের তালিকা) দেখা যাচ্ছে আলিবর্দির সময় (১৭৫৪-তে) দেওয়ান, ‘তান-দেওয়ান’, ‘সাব-দেওয়ান’, বক্সি প্রভৃতি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদের মধ্যে ছয়টিই হিন্দুরা অলংকৃত করছে—একমাত্র মুসলিম বক্সি ছিল মীরজাফর। আবার ১৯ জন জমিদার ও রাজার মধ্যে ১৮ জনই হিন্দু।91 বাংলায় ওলন্দাজ কোম্পানির প্রধান ইয়ান কারসেবুমের (Jan Kerseboom) তালিকাতেও (১৭৫৫ সালের) নায়েব দেওয়ান উমিদ রায়ের নেতৃত্বে হিন্দুদেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য।92 ১৭৫৪-৫৫ সালের এই যে চিত্র, নবাব সিরাজদ্দৌল্লার সময় তার কোনও পরিবর্তন হয়নি। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুসলমান রাজত্বে হিন্দুরা মুসলমানদের চাইতেও বেশি সুবিধেজনক অবস্থায় ছিল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি রাজ্যের প্রশাসনিক শাসনযন্ত্রে হিন্দু প্রাধান্য এত বেশি ছিল যে রবার্ট ওরম মন্তব্য করেছেন: 93

    তাঁর [আলিবর্দির] রাজত্বকালে হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল অপরিসীম। শাসনযন্ত্রের প্রতিটি বিভাগেই এটা লক্ষ করা যায়। তারা এত যত্ন ও দক্ষতার সঙ্গে সব বিভাগের কাজকর্ম পরিচালনা করত যে তাদের অজান্তে বা তাদের হাত দিয়ে ছাড়া কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজই হত না।

    সিরাজদ্দৌল্লার সময় সর্বক্ষেত্রে এই হিন্দু প্রাধান্য আরও বেড়ে যায়। তরুণ নবাবের সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন মোহনলাল। প্রকৃতপক্ষে সিরাজের ওপর মোহনলালের প্রভাবই ছিল সর্বাধিক। ইউসুফ আলির তারিখ-ই-বাংগালা-ই-মহবৎজঙ্গী-র ভাষায় মোহনলাল ছিলেন নবাবের সবচেয়ে বড় ভরসা (firm pillar)। মোহনলালের মতো ‘বিধর্মী’কে এত বেশি প্রাধান্য দেবার জন্য তিনি সিরাজের ওপর বিরক্ত ছিলেন।94 ওরমও লিখেছেন: ‘মোহনলাল সিরাজের মন্ত্রী না হলেও সব মন্ত্রী মিলে যে ক্ষমতার অধিকারী, তার চেয়েও মোহনলালের প্রভাব অনেক বেশি।95 সুতরাং এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাক্-পলাশির বাঙালি সমাজ হিন্দু-মুসলমান এ-সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, এ-কথা বিশ্বাস করা কঠিন।

    বাংলার সমাজ যদি সত্যিই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ত, তা হলে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য ও ফারসি ইতিহাসে তার প্রতিফলন অবশ্যই দেখা যেত। কিন্তু সেরকম কোনও নির্দিষ্ট ইঙ্গিত তৎকালীন সাহিত্য বা ইতিহাসে দেখা যায় না। সমাজের উঁচুতলায় কিছুটা টানাপোড়েন নিশ্চয়ই থাকতে পারে, জমিদার ও শাসকশ্রেণীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই চলতেই পারে। কিন্তু সেগুলি হিন্দু-মুসলমান এই বিভেদমূলক চেতনা থেকে উদ্ভূত নয়, তার মূল শ্রেণীগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সংঘাত। বাংলায় হিন্দু, মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের বিশেষ করে সাধারণ মানুষ বহুদিন ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের মধ্যে পাশাপাশি বাস করে এসেছে। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে লেখা কবি ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল কাব্যে আছে, হিন্দু সওদাগর লক্ষ্মীন্দরকে সর্পদেবতা মনসার হাত থেকে বাঁচাতে লোহার খাঁচায় বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, তাতে মা মনসাকে দূরে রাখার জন্য অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে একটি কোরাণও রাখা ছিল।96 আবার প্রায় এই সময় রচিত বেহুলাসুন্দর কাব্যে দেখা যায়, এক হিন্দু সওদাগরের পুত্রলাভের কামনায় ব্রাহ্মণরা কোরাণের সাহায্য নিচ্ছে এবং সওদাগরকে আল্লার নাম করতে বলছে। উক্ত কাব্যেই আছে, ব্রাহ্মণরা কোরাণ দেখে সওদাগরের বাণিজ্যযাত্রার শুভদিন নির্ণয় করছে। সওদাগরও ব্রাহ্মণদের নির্দেশ অনুযায়ী আল্লার নাম নিতে নিতে বাণিজ্যযাত্রা করছে, যেন এ নির্দেশ বেদশাস্ত্রেই লেখা আছে।97

    সাধারণ মানুষের মধ্যে এই দুই ধর্ম ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের যে প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরে চলছিল, অষ্টাদশ শতকেও তা বজায় ছিল। সমাজের উঁচুতলাতেও দুই ধর্মসংস্কৃতির সমন্বয় চোখে পড়ে। নবাব শহমৎ জঙ্গ (নওয়াজিস মহম্মদ খান) শওকত জঙ্গের (যিনি তখন পাটনা থেকে এসেছিলেন) সঙ্গে মুর্শিদাবাদের মতিঝিলে সাতদিন ধরে হোলি উৎসব পালন করেন। সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের চুক্তি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) সম্পাদন করেই তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদ ফিরে তাঁর প্রাসাদে হোলি উৎসবে মেতে ওঠেন।98 শুধু তাই নয়, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এই দুই ধর্মসংস্কৃতির সমন্বয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এ সময় মুসলমানরা হিন্দু মন্দিরে পুজো দিচ্ছে আর হিন্দুরা মুসলমানদের দরগাতে ‘সিন্নি’ দিচ্ছে—এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এই দুই ধর্ম আর সংস্কৃতির সমন্বয় প্রচেষ্টা থেকেই সত্যপীরের মতো নতুন ‘দেবতা’র জন্ম—যে ‘দেবতা’ দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই পূজ্য। কবি ভারতচন্দ্রের সত্যপীর কবিতা এ মিলন প্রক্রিয়ার প্রকৃষ্ট প্রতিফলন।99 অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে রচিত শ্যামসুন্দর গাজির পুঁথি-তে আছে যে এক হিন্দু দেবী স্বপ্নে গাজির সামনে আবির্ভূত হন এবং তাঁর ইচ্ছানুযায়ী পরের দিন সকালে গাজি ব্রাহ্মণদের সহায়তায় সব হিন্দু আচার মেনে দেবীর পূজা করেন। হিন্দুরা সামাজিক, এমনকী ধর্মীয় ব্যাপারেও, মুসলমানদের মতামত গ্রহণ করত এবং তাদের সহায়তা কামনা করত।100 ১৭৩২ সালের একটি বাংলা দলিলে, যাতে গোঁড়া বৈষ্ণব ধর্মের ওপর সহজিয়া ধর্মের বিজয় প্রতিফলিত হয়, দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের সঙ্গে কয়েকজন মুসলমানও তাতে সই করেছে।101 এডওয়ার্ড সি. ডিমক (Edward C. Dimmock, Jr) একটি সুচিন্তিত প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগের (পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত) বাংলা সাহিত্য পড়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি কোনওরকম ‘গভীর বিদ্বেষে’র পরিচয় পাওয়া দুষ্কর।102 দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা ও বোঝাপড়ার চমৎকার নিদর্শন অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কবি ফৈজুল্লার সত্যপীর কবিতা—যেখানে ‘যে রাম, সেই রহিম’ এমন অভিব্যক্তি সোচ্চার।103 সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য থেকে যে সব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কোনও পরিচয় মেলে না।

  • ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

    ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

    ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

    ঐতিহাসিকদের মধ্যে, এমনকী সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থেও, পলাশি চক্রান্তে ইংরেজদের ভূমিকা সম্পর্কে আশ্চর্যরকম ঐকমত্য দেখা যায়। এঁদের বক্তব্য, পলাশি সম্বন্ধে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ ছিল না; এই চক্রান্তের উদ্ভব বা ক্রমবিকাশে ইংরেজদের কোনও ভূমিকা নেই; মুর্শিদাবাদ ‘দরবারের অন্তর্দ্বন্দ্বই ইংরেজদের অনিবার্যভাবে বাংলার রাজনীতিতে টেনে এনেছিল।101’ কিন্তু পলাশির প্রাক্‌কালে যে-সব ঘটনাবলী এবং আমাদের কাছে যে-সব নতুন তথ্যপ্রমাণ আছে তার সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে স্পষ্টত দেখা যাবে, ইংরেজরাই পলাশির মূল ষড়যন্ত্রকারী। সিরাজদ্দৌল্লাকে সরিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার ব্যাপারে তারাই সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ নিয়েছিল এবং তারাই স্থানীয় চক্রান্তকারীদের উৎসাহ জুগিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পলাশি যুদ্ধের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে যাতে প্রধান প্রধান দেশীয় চক্রান্তকারীরা শেষপর্যন্ত ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকে। আমাদের এ-বক্তব্যকে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের দোষস্খলনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল হবে। মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ তরুণ নবাব সিরাজদ্দৌল্লার প্রতি বিরূপ হয়ে একটা চক্রান্ত করছিল, এটা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু যে-বক্তব্যে আমরা জোর দিচ্ছি তা হল, ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং খুব সম্ভবত, ইংরেজদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ ষড়যন্ত্র পূর্ণ রূপ নিয়ে নবাবের পতন ঘটাতে পারত না। মসিয়ে জাঁ ল’ পরিষ্কার জানাচ্ছেন ইংরেজরা কীভাবে দরবারের অভিজাতবর্গের একটি গোষ্ঠীর নবাবের প্রতি বিরূপতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং বুদ্ধিমানের মতো ঠিক ঠিক জায়গায় টাকা ছড়িয়ে দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাত করেছিল।

    তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে আমাদের কাছে যে তথ্যপ্রমাণ আছে, তা অনেক সময় কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক। ষড়যন্ত্রের উন্মেষে কে কখন কাকে প্রথম যোগাযোগ করে তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন দাবি এবং প্রতিদাবি আছে। আবার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত একই ব্যক্তির বয়ানে স্ববিরোধিতা দেখা যায়। অন্য দিকে, এ-সব ক্ষেত্রে সচরাচর হয়ে থাকে, অনেকে আবার ষড়যন্ত্রের খেলায় নিজের ভূমিকা বড় করে দেখাবার জন্য অন্যদের ভূমিকাকে গৌণ করে দেখাবার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট।103 কিন্তু এ-সব সত্ত্বেও খুব সতর্কতার সঙ্গে তথ্যপ্রমাণগুলির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে ষড়যন্ত্রের কীভাবে উন্মেষ হচ্ছে এবং তা কীভাবে দানা বাঁধছে এবং কীভাবে তার বিকাশ হচ্ছে, পলাশি বিপ্লব ত্বরান্বিত করতে কে বা কারা সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে পড়েছিল এবং শেষপর্যন্ত বিপ্লব সংঘটিত করে কীভাবে সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে মীরজাফরকে মসনদে বসানো হল—তার একটি মোটামুটি সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে।

    বাংলায় তথা ভারতবর্ষে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়টা ছিল যুদ্ধবিগ্রহ, অন্তহীন সুযোগ ও দুর্নীতি এবং নিরন্তর পরিবর্তনের যুগ। ওয়াটস তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন: ‘নবাবের দরবারের অন্তর্কলহ দিন দিন বাড়ছে। সবাই নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী নয়—পুরো দরবারই দুর্নীতিগ্রস্ত।’ লিউক স্ক্র্যাফ্‌টুন আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা করে জানাচ্ছেন: ‘আমার মনে হয় টলেমি (Ptolemy) যখন ফারসালিয়া (Pharsalia) যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মিশরে রাজত্ব শুরু করেন, তখন তাঁর দরবারের যা অবস্থা ছিল তার সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার দরবারের তুলনা করা যেতে পারে, অর্থাৎ দরবারের উঁচুতলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত সবাই যথেচ্ছ ভ্ৰষ্টাচারে লিপ্ত এবং সবাই বিশ্বাসঘাতক। সুতরাং এ ক্ষেত্রে রোমান সম্রাট সিজার যা করেছিলেন, ক্লাইভের উচিত তাই করা অর্থাৎ রাজ্যটি জয় করে নেওয়া। পুরনো নবাবকে হঠিয়ে নতুন কাউকে নবাব করা যাতে রাজ্যের প্রজারা সুখে থাকতে পারে।104

    কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, তখনকার দিনে ভারতীয়দের মতো ইউরোপীয়রাও (ইংরেজরাও বটে) সমান দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। তারা তৎকালীন অবস্থার ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিল এবং কোনওরকম ন্যায়নীতি বা বিবেকদংশনের তোয়াক্কা না করে দরবারের অমাত্যদের নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলভুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। জাঁ ল’ লিখেছেন যে ইংরেজদের বৃত্তান্ত পড়লে প্রত্যয় জন্মাতে পারে যে ফরাসিরা নানা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে নবাবের দরবারের অমাত্যদের তাদের দলে টেনে নিয়েছে। কিন্তু সত্য ঘটনা হল, ল’ সাফাই গাইছেন, ইংরেজরাই ভ্ৰষ্টাচারের মাধ্যমে পুরো দরবারকেই হাত করে নেয়। তিনি অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে এটাও স্বীকার করেছেন যে, ইংরেজদের মতো ফরাসিরাও দুর্নীতির সাহায্যে দুর্নীতি রোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু উৎকোচের মাধ্যমে অমাত্যদের দলে টানার প্রতিযোগিতায় ইংরেজরা ফরাসিদের চাইতে অনেক এগিয়ে ছিল। এই ব্যর্থতার অনেকখানি অবশ্য তাঁর এবং সে জন্যই সাফাই গাইবার সরে বলছেন, ‘ইংরেজরা অবশ্য বরাবর আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অর্থসামর্থ্য নিয়োগ করতে পেরেছিল।105

    বস্তুতপক্ষে ইংরেজদের হুগলি আক্রমণের (৯ জানুয়ারি ১৭৫৭) পর থেকে জাঁ ল’-র মুর্শিদাবাদ থেকে বহিষ্কার (১৬ এপ্রিল ১৭৫৭) পর্যন্ত দরবারের অভিজাতবর্গকে নিজ নিজ দলে টানার জন্য ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। জাঁ ল’ এবং ওয়াটস দু’জনেই অকপটে স্বীকার করেছেন যে তারা উৎকোচ দিয়ে দরবারের অমাত্যদের বশীভূত করার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও উভয়েই এর জন্য দোহাই দিয়েছেন, দরবারের ভ্ৰষ্টাচারকে, যেখানে উৎকোচ ছাড়া কিছুই হয় না।106 ল’র তুলনায় ওয়াটসের হাতে টাকাকড়ি ছিল অনেক বেশি এবং তা দিয়ে শুধু দরবারের গণ্যমান্যদেরই ইংরেজরা দলে টানেনি, এমনকী মুৎসুদ্দিদেরও হাত করেছিল। এ-কাজে ওয়াটসের প্রধান সহায়ক ছিলেন উমিচাঁদ। ওয়াটস ১১ এপ্রিল একটি চিঠিতে ক্লাইভকে লিখছেন: ‘নবাবের অমাত্যদের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকেই আমাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন কারণ তাদের আমরা (টাকাকড়ি দিয়ে) সন্তুষ্ট করতে পারিনি। উমিচাঁদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠকের পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে কিছু খরচাপাতি করে হলেও ওইসব ব্যক্তিদের আমাদের দলে টানা একান্তভাবে উচিত।107’ ফলে যেখানে জাঁ ল’ সিরাজদ্দৌল্লার দরবারের খবরাখবরের জন্য শুধুমাত্র গুপ্তচরদের ওপর নির্ভর করতেন, সেখানে ওয়াটস ও উমিচাঁদের যৌথপ্রচেষ্টায় ইংরেজরা নবাবের প্রভাবশালী অমাত্যদের হাত করতে পেরেছিল। এদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার—চন্দননগর আক্রমণের সময় যাঁর সহযোগিতা ইংরেজদের পক্ষে খুবই কার্যকর হয়েছিল। ইংরেজদের তুলনায় ফরাসিদের অর্থভাণ্ডারের দৈন্যের জন্য ল’-কে দরবারের চুনোপুঁটিদের হাত করে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল এবং তারাই শেষপর্যন্ত ফরাসিদের ডুবিয়েছিল।

    সে যাই হোক, মুর্শিদাবাদ দরবারে অসন্তোষ এবং দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও ক্লাইভ এবং ওয়াটসন যখন মাদ্রাজ থেকে সৈন্যসম্ভার নিয়ে কলকাতায় পৌঁছোন, তখনও কিন্তু যড়যন্ত্রের কোনও আভাস পাওয়া যায় না। আসলে ফোর্ট সেন্ট জর্জ (মাদ্রাজ) কাউন্সিল ক্লাইভ ও ওয়াটসনের নেতৃত্বে অভিযাত্রী সৈন্যদলকে বাংলায় পাঠাবার সময় যে নির্দেশ দিয়েছিল (১৩ অক্টোবর ১৭৫৬) তার মধ্যেই পলাশি চক্রান্তের বীজ নিহিত ছিল। এই নির্দেশের মধ্যেই অভিযানের উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘শুধু কলকাতা পুনরুদ্ধার এবং যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায়,’ অভিযাত্রীদলের উদ্দিষ্ট হবে না, ‘বাংলার নবাবের অত্যাচারে বিক্ষুব্ধ বা নবাব হওয়ার মতো উচ্চাভিলাষী কোনও শক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে যেন তারা গোপন আঁতাত করার চেষ্টা করে।108’ উপরোক্ত নির্দেশের শেষদিকের অংশটুকুর তাৎপর্য বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। বলা বাহুল্য, এতেই ষড়যন্ত্রের সদর দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হল। মাদ্রাজ থেকে রওনা হওয়ার আগেই ক্লাইভ লিখছেন, সিরাজদ্দৌল্লা ‘দুর্বল শাসক’ এবং ‘তাঁর দরবারের বেশির ভাগ লোকই তাঁর প্রতি বিরূপ109’ দরবারের মধ্যে এই যে অসন্তোষ তা দিয়েই, ক্লাইভের ভাষায়, ‘ইংরেজরা রাজনীতির দাবাখেলায় বাজিমাৎ করেছিল110’ এবং এভাবেই তারা ষড়যন্ত্র পাকা করে পলাশিতে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটিয়েছিল।

    ক্লাইভ বাংলা অভিযান সম্বন্ধে যখন তাঁর পিতাকে লিখছেন, ‘এ-অভিযান সার্থক হলে আমি বিরাট কিছু করতে পারব,111’ তখন তিনি নিশ্চয়ই কল্পলোকে বাস করছিলেন না। তিনি এবং ওরম (Ome) কর্নেল স্কটের বাংলা বিজয়ের বিশদ পরিকল্পনার কথা জানতেন—এই পাণ্ডুলিপিটি মাদ্রাজেই ছিল। ১৭৪৯-৫০ সালে ক্লাইভ যখন কলকাতায় এসেছিলেন, তখন বাংলার অগাধ ঐশ্বর্য তাঁর মনে প্রচণ্ড দাগ কেটেছিল। মনে মনে নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, আর্কটের যুদ্ধের পর তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার এক সহযোগী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, বাংলায় যদি যুদ্ধ লাগে, তা হলে ক্লাইভ রাতারাতি খুব বড়লোক হয়ে যাবেন।112 এ-সবের পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রাজের উপকূল অঞ্চলের পরিস্থিতির জন্য বাংলা থেকে কোম্পানি তাঁকে সরিয়ে নিতে পারে বলে ক্লাইভের যে উদ্বেগ, তা সহজেই বোধগম্য।

    নবাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা অসন্তোষ ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত পরিমণ্ডল তৈরি করতে পারে হয়তো কিন্ত ষড়যন্ত্র দানা বাঁধার পক্ষে এবং তা সফল করতে আরও পর্যাপ্ত কারণের প্রয়োজন ছিল। সে জন্যই দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করার দরকার ছিল। অংশত সেটা আবিষ্কার করার জন্যই ইংরেজরা হুগলি আক্রমণ করে (৯ জানুয়ারি ১৭৫৭)। ফোর্ট উইলিয়ামের চিঠি থেকে (৩১ জানুয়ারি ১৭৫৭) তা সুস্পষ্ট113:

    নবাবের সৈন্যদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করা এবং বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর লোকজনকে আমাদের দলে যোগদানে উৎসাহিত করার জন্য হুগলি আক্রমণ এবং দখল করা এতটা জরুরি হয়ে পড়েছিল।…এতে আমাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে।

    ১৭৫৭ সালের মার্চ মাসে যখন ইংরেজরা চন্দননগর অবরোধ নিয়ে ব্যস্ত, তখনও ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের সিলেক্ট কমিটি কাশিমবাজারে উইলিয়াম ওয়াটসকে নির্দেশ দিচ্ছে, ‘জগৎশেঠ পরিবার আমাদের পক্ষ যাতে সমর্থন করে তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা’ চালিয়ে যেতে।114

    পলাশি বিপ্লবে ইংরেজদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে (এবং কিছুটা প্রচ্ছন্নভাবে এ বিপ্লবে ফরাসিদের এবং তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও হতাশা ঢাকতে গিয়ে) জাঁ ল’ মন্তব্য করেছেন যে সবাই নবাবের পরিবর্তন চাইছিল এবং অনেকেরই ধারণা হয়েছিল যে ওটা শীঘ্রই হবে। তাঁর নিজের ধারণা ছিল, তিন-চারশো ইউরোপীয় সৈন্য এবং অল্প সংখ্যক তেলেঙ্গা সৈন্য এ কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। যদি ফরাসিরা এরকম একটি বাহিনীর সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার শত্রুদের হাত মিলিয়ে দিতে পারত, তা হলে ফরাসিরাই বাংলার মসনদে সিরাজের পরিবর্তে অন্য কাউকে বসাতে পারত। অবশ্য সে ব্যক্তি পুরোপুরি তাদের পছন্দের লোক নাও হতে পারত। সে ব্যক্তিকে অবশ্যই জগৎশেঠ, মুসলিম অভিজাতশ্রেণী ও হিন্দু রাজন্যবর্গের পছন্দসই হতে হত।115 কিন্তু ফরাসিরা কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্বন্ধে বিশেষ ওয়াকিবহাল ছিল না— ঘটনাক্রমও যতটা ইংরেজদের অনুকূলে ছিল, ফরাসিদের পক্ষে ততটা নয়।

    শওকত জঙ্গের পরাজয়ের পর এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ইংরেজরাই একমাত্র শক্তি যারা বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। কিন্তু জাঁ ল’ বলছেন, এর জন্য ইংরেজদের প্রয়োজন ছিল মর্শিদাবাদের দরবারে নবাবের বিরুদ্ধে একটি দল তৈরি করা যার মাধ্যমে এ-বিপ্লব সম্ভব হতে পারে। ব্যাপারটা কিন্তু অত সহজ ছিল না। কারণ জগৎশেঠরা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে ইংরেজদের ততটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। জগৎশেঠরাই ইংরেজদের সাহায্য করতে পারত এবং কিছুটা সময় দিলে তাঁরাই দরবারে সিরাজ-বিরোধী একটি দল তৈরি করতে পারত এবং শেষপর্যন্ত, এমনকী ইউরোপীয়দের সাহায্য ছাড়াই, সিরাজদ্দৌল্লাকে সরিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাতে পারত। কিন্তু তার জন্য বেশ কিছুটা সময়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ততদিন অপেক্ষা করা ইংরেজদের পোষাত না। এ ছাড়া হিন্দু বলে জগৎশেঠদের বেশ কিছুটা শঙ্কা এবং ভয়ও ছিল যাতে তারা নিজেরা বিপদের মুখে না পড়ে। তাদের উৎসাহ ও উস্‌কে দিতে ইংরেজদের দিক থেকে প্রয়োজন ছিল নবাবের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কিছু একটা করা। কিন্তু তারা তা করেনি। সিরাজদ্দৌল্লাকে পুরোপুরি নিজের দলে টানতে ব্যর্থ হয়ে জাঁ ল’ এমন অবধি বলছেন যে ‘আমি শুধু দেখতে চাই ইংরেজরা সিরাজদ্দৌলাকে একেবারে পর্যুদস্ত করে ছেড়েছে।116

    পলাশি ষড়যন্ত্রের উদ্ভব সম্বন্ধে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে ১৭৫৭-এর এপ্রিলের প্রথমদিক পর্যন্ত এ চক্রান্ত একেবারেই দানা বাঁধেনি। জাঁ ল’ অবশ্য বলছেন যে ১৭৫৬-এর সেপ্টেম্বরের শেষদিকে শওকত জঙ্গকে শায়েস্তা করার জন্য সিরাজদ্দৌল্লা মুর্শিদাবাদ থেকে পুর্ণিয়া অভিমুখে যাত্রা করার আগেই সিরাজের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র হয়েছিল। মীরজাফরসহ অভিজাত সামরিক গোষ্ঠীর কয়েকজন এতে জড়িত ছিলেন। এঁরা ঠিক করেছিলেন যে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে শওকত জঙ্গের যুদ্ধে সৈন্যবাহিনীর একাংশ নিষ্ক্রিয় থাকবে। কিন্তু ল’ জানাচ্ছেন (এবং আশ্চর্য, বেশ কিছুটা হতাশার সুরে) বিহারের নায়েব সুবা রাজা রামনারায়ণ তাতে যোগ না দেওয়াতে পুরো জিনিসটাই ভেস্তে যায়।117 ফারসি ইতিহাস সিয়র থেকেও জানা যায় যে এরকম একটা ষড়যন্ত্রের চেষ্টা হচ্ছিল—মীরজাফর শওকত জঙ্গকে নাকি একটি চিঠির মাধ্যমে সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং তাঁর কাছ থেকে মসনদ ছিনিয়ে নিতে উসকানি দিয়েছিলেন। উক্ত লেখক এটাও জানাচ্ছেন যে, মীরজাফর এবং অন্য কয়েকজন সৈন্যাধ্যক্ষ শওকত জঙ্গকে সিরাজের বিরুদ্ধে তাঁদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে গণ্য করছিলেন।118 কিন্তু ষড়যন্ত্র কোনও বাস্তবরূপ নেওয়ার আগেই ভেস্তে যায়। অবশ্য অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে নবাবের বিরুদ্ধে এরকম চক্রান্ত বেশ কয়েকবারই হয়েছিল। কিন্তু তার অধিকাংশই দানা বাঁধার আগেই ব্যর্থ হয়ে যায়। সুতরাং মীরজাফর পলাশির আগে শওকত জঙ্গের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা করলেও তার খুব একটা গুরুত্ব নেই।

    তবে পলাশির প্রাক্‌কালে মুর্শিদাবাদ দরবারে অসন্তোষের চাপা আগুনের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। ইংরেজরা এই অসন্তোষের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্র পাকা করে। ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের খবর বাংলায় পৌঁছুতেই ইংরেজদের আশঙ্কা হল, ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের সঙ্গে ফরাসিদের আঁতাত হবার সম্ভাবনা প্রবল। তার ফলে তারা ষড়যন্ত্রকে বাস্তবরূপ দিতে মরিয়া হয়ে উঠল। জাঁ ল’ লিখছেন, সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠানোটা ইংরেজদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল (had become an absolute necessity) এবং সেই কারণেই তার আগে ফরাসিদের বিতাড়ন করাটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে চন্দননগর দখল করার পর বিপ্লব অনেক সহজসাধ্য হয়ে যাবে। অবশ্য ল’ এটাও বলেছেন যে, ফরাসিদের না তাড়িয়েও ইংরেজরা নবাবের শত্রুদের সঙ্গে যোগসাজস করে বিপ্লব সংঘটিত করতে পারত কারণ এই শত্রু দলে ছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার অনেক প্রভাবশালী ও গণ্যমান্য ব্যক্তি।119

    অবশ্য আমরা আগেই বলেছি জাঁ ল’-র দেওয়া তথ্য সবসময় নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয় না। তবে এটা ঠিক দরবারের অভিজাতবর্গের মধ্যে বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি (সবাই নয়, ল’ যা বলছেন) বিপ্লব সংঘটিত করতে আগ্রহী ছিল এবং এরা সম্ভবত ইংরেজদের সঙ্গে তলায় তলায় যোগসাজশও করছিল। কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত কেউই প্রকাশ্যে বিপ্লবের বা ষড়যন্ত্রের সমর্থনে এগিয়ে আসেনি, সবাই বেড়ার ধারে অপেক্ষা করে ছিল। আর ইংরেজরা তাদের প্রকাশ্যভাবে ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে পীড়াপীড়ি করছিল। পরে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে আমরা তা দেখাব। ক্লাইভকে লেখা ১১ এপ্রিলের চিঠিতে ওয়াটস পরিষ্কার জানাচ্ছেন যে নবাবের অমাত্যদের অধিকাংশ ইংরেজদের বিরুদ্ধে এবং তারা ফরাসিদের শক্তির জয়গান করছে।120 আর স্ত্র্যাফ্‌টন ওয়ালসকে (Walsh) ৯ এপ্রিল লিখছেন, ফরাসিরা নবাবের ঘনিষ্ঠ কিছু লোককে ঘুষ দিয়ে হাত করেছে, ফলে তারা ইংরেজদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ফরাসিদের বর্তমান অর্থাভাবের জন্য তাদের ধরে রাখতে পারছে না। এই সুযোগে ইংরেজরা কিছু খরচাপাতি করে এদের দলে টানতে সক্ষম হচ্ছে।121 সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মুর্শিদাবাদ দরবারে পরস্পরবিরোধী দুটি গোষ্ঠী বিরাজ করলেও এবং দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের নবাবের প্রতি অসন্তোষ থাকলেও, তখনও পর্যন্ত ষড়যন্ত্র বিশেষ দানা বাঁধেনি।

    ইংরেজরা যে দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে একটি ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটাতে শুধু আগ্রহী নয়, ব্যস্ত হয়েও পড়েছিল তা ক্লাইভের বিশ্বস্ত অনুচর জন ওয়ালসকে লেখা স্ক্র্যাফ্‌টনের ৯ এপ্রিলের চিঠিতে সুস্পষ্ট। স্ক্র্যাফ্‌টন লিখছেন122:

    ঈশ্বরের দোহাই, একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের এগুতে হবে….ঘটনা স্রোত যদি অন্যদিকে যায় [বিরোধের দিকে?] সেটা ভেবে এখন থেকে আমাদের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। মি. ওয়াটসকে এ-ব্যাপারে একটু ইঙ্গিত ও কিঞ্চিৎ উৎসাহ দিলেই তিনি একটি দল তৈরি করতে লেগে যাবেন যেটা বিপদের সময় আমাদের কাজে লাগবে। কোম্পানির অনুগত একজন নবাবকে [বাংলার মসনদে] বসাতে পারলে ব্যাপারটা কোম্পানির পক্ষে কী গৌরবজনকই না হবে!…আর পরে [ভবিষ্যতে] আমাদের পক্ষে মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারে এ আশঙ্কায় এখন থেকে আমাদের তৈরি থাকতে হবে এবং সে জন্য এমন ব্যবস্থা নেওয়া দরকার যাতে আমার প্রিয় পুরনো পরিকল্পনাটি (my old favourite scheme) সফল হতে পারে।

    আসলে এ সময়ে বা তার কাছাকাছি সময়ে ইংরেজরা উমিচাঁদের সহায়তায় পলাশির ষড়যন্ত্রের কিছুটা বাস্তবরূপ দিতে সক্ষম হয়। উমিচাঁদের বুদ্ধিমত্তা ও বিবেচনাশক্তির ওপর ওয়াটসের তখন অগাধ আস্থা ছিল এবং তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল উমিঁচাদ এ ব্যাপারে ইংরেজদের যথাসাধ্য সাহায্য করবেন। ওয়াটস ১১ এপ্রিল ক্লাইভকে লেখেন: ‘উমিঁচাদ এবং আমি একটি বিষয় নিয়ে অনেকবার আলোচনা করেছি। বিষয়টি আপনার কাছে কীভাবে ব্যক্ত করব বুঝতে পারছি না। স্ক্র্যাফ্‌টনকে বিষয়টি সম্বন্ধে খুলে বলেছি এবং তাঁর কাছ থেকে জানলাম যে আমি আর উমিচাঁদ যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি তাতে আপনার এবং মেজরের [ওয়াটসন] অনুমোদনের অভাব হবে না।123 বলা বাহুল্য, এখানে পলাশি বিপ্লবের পরিকল্পনার কথাই বিধৃত হয়েছে।

    পলাশির ষড়যন্ত্র যে কিছুটা দানা বাঁধছে তার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ওয়ালসকে লেখা স্ত্র্যাফ্‌টনের ১৮ এপ্রিলের চিঠিতে। এতে আছে যে স্ক্র্যাফ্‌টন উমিঁচাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে উমিচাঁদ তাঁকে বলেন যে, নবাব যদি কোনওভাবে আলিনগরের চুক্তি (৯ জানুয়ারি ১৭৫৭) ভঙ্গ করেন, তা হলে ইংরেজদের উচিত নবাবকে হঠিয়ে ইয়ার লতিফ খানকে মসনদে বসানো। উমিচাঁদ নাকি এটাও জানান যে, ইয়ার লতিফ একজন যোগ্য ব্যক্তি, সচ্চরিত্র এবং জগৎশেঠদের সমর্থনপুষ্ট।124 এর দিন দুয়েক পরে আবার স্ক্র্যাফ্টন ওয়ালসকে জানান যে, নবাব ইংরেজদের প্রতি বিরূপ হয়েছেন, দরবার থেকে তাদের ‘ভকিল’কে বার করে দিয়েছেন এবং মীরজাফরকে পলাশি অভিমুখে যাত্রা করার আদেশ দিয়েছেন। এরপর স্ক্র্যাফ্‌টন যা লিখেছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।125

    ঈশ্বরের দোহাই, নবাবকে আমাদের এখনকার মতো শান্ত করা দরকার [কারণ] এখনও সব ব্যবস্থা পাকা হয়নি [things are not yet ripe]। উমিচাঁদ জগৎশেঠদের কাছে গেছেন। জগৎশেঠ কেন আগেই উমিচাঁদকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তা আমি জানি। কারণটা হল, আমরা যেন ইয়ার লতিফকে নবাব করি, তাঁর এই ইচ্ছের কথা উমিচাঁদকে জানাবার জন্য….আমাদের ধীরেসুস্থে এগুতে হবে যাতে আমাদের সাফল্য সুনিশ্চিত হয় [Let us strike slow and steady that we may strike sure]।

  • চক্রান্তের মূল নায়করা

    চক্রান্তের মূল নায়করা

    চক্রান্তের মূল নায়করা

    পলাশি চক্রান্তের উদ্ভব ও বিকাশ সম্যক উপলব্ধি করতে হলে, এই চক্রান্তের মূল নায়কদের সম্পূর্ণ পরিচয় ও তাদের ধ্যানধারণা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হওয়া একান্ত প্রয়োজন। আমাদের প্রতিপাদ্য, যেহেতু ইংরেজরাই পলাশি ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা এবং তাদের সক্রিয় সমর্থন ও উৎসাহ ছাড়া পলাশির চক্রান্ত পরিপূর্ণতা লাভ করে বিপ্লব ঘটাতে পারত না116, তাই ইংরেজদের মধ্যে যারা মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল তাদের নিয়ে প্রথমে আলোচনা করব, পরে দেশীয় ষড়যন্ত্রীদের। ইংরেজদের মধ্যে যে তিনজন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন উইলিয়াম ওয়াটস, লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন ও রবার্ট ক্লাইভ।

    উইলিয়াম ওয়াটস

    ওয়াটস ছিলেন কাশিমবাজার কুঠির প্রধান। যেহেতু কাশিমবাজারের অনতিদূরেই রাজধানী মুর্শিদাবাদ, তাই তিনি নবাবের দরবারে ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনিধিও ছিলেন। ফলে, বাংলায় ইংরেজদের মধ্যে তাঁরই সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল দরবারের সব খোঁজখবর রাখার। তা ছাড়া, এই সময় বাংলায় ইউরোপীয়দের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির প্রধান হিসেবে বাংলার তিন প্রধান বণিকরাজার (merchant prince)—জগৎশেঠ পরিবার, খোজা ওয়াজিদ ও উমিচাঁদ—সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ কাশিমবাজার ছিল তখন বাংলার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র—বিশেষ করে বাংলার দুই প্রধান রফতানি পণ্যের—কাঁচা রেশম ও বস্ত্র—উৎপাদন ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে। তা ছাড়া খুব সম্ভবত দরবারে ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সঙ্গে দরবারের প্রধান প্রধান রাজপুরুষের—মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, প্রমুখ—ভাল রকম যোগাযোগই ছিল। ফলে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাবার পক্ষে ইংরেজ কর্মচারীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। ক্লাইভের বিশ্বস্ত অনুচর ওয়ালসকে লেখা লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি থেকে তার প্রমাণ মেলে। আমরা আগেই দেখেছি, স্ক্র্যাফ্‌টন লিখেছেন, ক্লাইভ যদি ওয়াটসকে একটু ইঙ্গিত ও উৎসাহ দেন তা হলে ওয়াটস সঙ্গে সঙ্গে ‘একটি ‘দল’ [party] [নবাবের বিরুদ্ধে] গড়তে লেগে যাবেন।117’ তিনি আরও জানাচ্ছেন যে ক্লাইভ ওয়াটসকে ইংরেজদের সমর্থনে দরবারে একটি চক্র তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। এতেই পলাশি ষড়যন্ত্রের সুত্রপাত।118

    স্ক্র্যাফ্‌টনের লেখা থেকে জানা যায়, বাংলায় বহুদিন থাকার ফলে এখানকার রাজনীতি, ভাষা ও রীতিনীতি সম্বন্ধে ওয়াটসের যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি জন্মেছিল।119 তাতে ইংরেজদের খুব সুবিধে হয়েছিল কারণ তাদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন যাঁর এই দেশ ও এখানকার লোকজন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা ছিল এবং যিনি দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সোজাসুজি যোগাযোগ করে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটানো সম্ভব কি না সে সম্বন্ধে তাদের চিন্তাভাবনা যাচাই করে নিতে পারেন। ওয়াটসই ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে পরামর্শ দেন যে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সুসংহত ও দুর্ভেদ্য করার কাজ চালিয়ে যেতে কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে নবাব আলিবর্দি ব্যাপারটা খেয়ালই করবেন না। তিনি কাউন্সিলকে এ-ভরসাও দিয়েছিলেন যে, তিনি এ-বিষয়ে সজাগ থাকবেন এবং এটা নিয়ে নবাবের সঙ্গে কোনও ঝামেলা হলে তার জন্য কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে তা তিনি দেখবেন।126 আবার ইংরেজরা যখন চন্দননগর আক্রমণ করার কথা ভাবছিল এবং কীভাবে এতে এগুনো যাবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছিল, তখন ওয়াটসই সমস্যার সমাধানে সাহায্য করলেন। তিনি নিজেই লিখেছেন:127

    As Mr. Watts was on the spot, watched every motion of the Suba [Sirajuddaullah], knew exactly the character of his courtiers and prin- cipal Ministers, and had the most certain Intelligence of everything that passed, he continued to represent the Necessity of attacking Chandernagore.

    ওয়াটস ঘটনাস্থলে থাকার ফলে নবাবের কাজকর্মের ওপর নজর রাখতে পারতেন এবং দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চালচলন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহালও ছিলেন। দরবারে যে সব ঘটনা ঘটত সব তাঁর নখদর্পণে ছিল। তাই তিনি বারবার চন্দননগর আক্রমণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সবিস্তারে এটাও জানিয়েছেন কীভাবে তিনি নবাবের মুৎসুদ্দিকে ঘুষ দিয়ে নবাবের নামে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে লেখা চিঠির এমন বয়ান করিয়েছিলেন যাতে ওই চিঠির অর্থ দাঁড়ায় যে নবাব ইংরেজদের চন্দননগর আক্রমণ করার অনুমতি দিচ্ছেন।128

    পলাশি ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশে ইংরেজদের মধ্যে ওয়াটসই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনিই উমিচাঁদের সাহায্যে দরবারের বিক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট রাজপুরুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ধীরে ধীরে তাদের অনেককে ইংরেজদের দলে টেনে আনতে সমর্থ হন। রবার্ট ওরম লিখছেন যে সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠানোর ব্যাপারে দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাজিয়ে দেখার জন্য ওয়াটসই উমিচাঁদকে কাজে লাগান এবং এর ফলেই ইয়ার লতিফ ওয়াটসের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করতে চান। ওয়াটস তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে উমিচাঁদকেই ইয়ার লতিফের কাছে পাঠান। লতিফ উমিচাঁদকে তাঁর বাসনার কথা জানান—সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে তিনি নিজে নবাব হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ওরম যদিও বলছেন যে, মীরজাফর আর্মানি বণিক খোজা পেট্রুসের মারফত তাঁর প্রস্তাব ওয়াটসকে জানান, ওয়াটস নিজে কিন্তু তাঁর পিতাকে পরে লিখেছেন যে তিনি নিজেই মীরজাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে ষড়যন্ত্রে সামিল করেছিলেন।129

    কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ নবাবের দরবারের রাজনীতি এবং ইংরেজদের অভিসন্ধি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। সেই ল’ পলাশি চক্রান্তে ওয়াটসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার যথাযথ বর্ণনা দিয়েছেন:130

    দরবারে ইংরেজদের সপক্ষে ছিল তাদের অস্ত্রবল, সিরাজদ্দৌল্লার ভুলত্রুটি, শেঠদের অমিত প্রভাব ও সূক্ষ্ম কূটনীতি। তা ছাড়াও তাদের পক্ষে ছিল নবাবের সৈন্যবাহিনীর প্রায় সব সেনাপতি ও দরবারের প্রায় সব অমাত্য, এমনকী মুৎসুদ্দি ও ওয়াকিয়ানবিশরাও। এই সবগুলি শক্তিকে একত্রিত করে তাদের চালাবার জন্য ওয়াটসের মতো এমন একজন সুচতুর ব্যক্তি যখন ছিলেন, তখন ইংরেজরা কি না করতে পারত।

    ওয়াটস কীভাবে পলাশি বিপ্লবের পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করেছিলেন তার বর্ণনা নিজেই দিয়েছেন:131

    তিনি [ওয়াটস] বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ আলোচনার কথা সবিস্তারে [কর্তৃপক্ষকে] জানিয়েছেন। তা ছাড়াও নবাবের তখনকার অবস্থা, তাঁর কাছাকাছি প্রধান অমাত্যদের চিন্তাভাবনা, শক্তিসামর্থ্য, ধ্যানধারণা ও কামনাবাসনার কথাও বিশদভাবে জানানো হয়েছে। সঙ্গে এটাও যে [আমাদের] পরিকল্পনা [সিরাজের বদলে মীরজাফরকে মসনদে বসানো] সফল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এটা করতে গেলে যে-সব বাধা বিপত্তি আসতে পারে এবং তা কী করে প্রতিহত করা যেতে পারে তাও তিনি জানিয়েছেন।

    তবে ওয়াটস বিচক্ষণ বলে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চেয়েছিলেন। মীরজাফরকে নবাব করার প্রস্তাবে ক্লাইভ ও সিলেক্ট কমিটির উত্তর আসার জন্য যখন তিনি অপেক্ষা করছিলেন, তখন ক্লাইভকে লেখেন, তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করে ক্লাইভ যেন অন্য কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ না করেন। কারণ তিনি ঘটনাস্থলে আছেন বলে এবং দরবারের হালচালের সব খবর রাখেন বলে ‘আমাদের’ (ইংরেজদের) পরিকল্পনা রূপায়ণ করা যাবে কিনা এবং তা কী করে সুসম্পন্ন করা যাবে, সে সম্বন্ধে তিনিই সবচেয়ে ভাল বোঝেন।132 পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ও কাউন্সিল তাঁকে সরকারিভাবে ধন্যবাদ জানান।133 ক্লাইভও লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে লেখেন যে ওয়াটসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা না বললে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না।134

  • পলাশি অভিমুখে : ইংরেজ পরিকল্পনা

    পলাশি অভিমুখে : ইংরেজ পরিকল্পনা

    পলাশি অভিমুখে : ইংরেজ পরিকল্পনা

    পলাশির ষড়যন্ত্র পাকা হয়ে যাওয়ার পরও কিন্তু পলাশি বিপ্লবের পথ খুব সহজ বা সোজা ছিল না। ইংরেজরা অস্থির হয়ে পড়েছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিপ্লব ঘটাতে। তাই সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে সমন্বয় করা এবং তা সংগঠিত করার দায় বর্তায় তাদের ওপরই কারণ দেশীয় ষড়যন্ত্রীদের ওপর খুব একটা ভরসা করা যাচ্ছিল না। ওয়াটস বেশ চতুর ও বিচক্ষণ বলে দেশীয় চক্রান্তকারীদের অবস্থাটা ভাল বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি লিখেছেন:128

    এদের কাছ থেকে খুব বেশি আশা করা ঠিক নয়। বড় জোর যুদ্ধ বাধলে এরা নিরপেক্ষ থাকবে, তার বেশি নয়। আমরা যদি সফল হই, এরা তার ফায়দা তুলবে। আর আমরা হারলে এরা যেমন ছিল তেমনই থাকবে। আমাদের সঙ্গে যে এদের কোনও সম্পর্ক ছিল তা বুঝতেই দেবে না।

    মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত (৫ জুন ১৭৫৭) হওয়ার পরও কিন্তু সিলেক্ট কমিটি বিপ্লব ত্বরান্বিত করার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। ১১ জুন কমিটি বিস্তারিত আলোচনা করল—‘তখনই সোজা মুর্শিদাবাদ অভিমুখে অভিযান করা সমুচিত হবে, না মীরজাফরের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত খবর এবং কার্যোদ্ধারে কী ভাবে এগুনো যাবে সে-সম্বন্ধে তাঁর কাছ থেকে খসড়া পরিকল্পনা পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে।’ আলাপ-আলোচনার পর কমিটি সিদ্ধান্ত নিল যে:135

    মীরজাফরকে মসনদে বসাবার যে পরিকল্পনা সেটা সফল করার জন্য এর চেয়ে সুবর্ণসুযোগ আর আসবে না কারণ আর বেশি দেরি করলেই সিরাজদ্দৌল্লা ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটা জেনে ফেলতে পারেন। আর তা হলে নবাব তখন মীরজাফরকে কোতল করবেন এবং ফলে আমাদের পুরো পরিকল্পনাই বানচাল হয়ে যাবে। তখন আমাদের পক্ষে এদেশের সঙঘবদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে একাই লড়াই করা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না।

    বস্ততপক্ষে মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পরই ওয়াটস ক্লাইভ ও সিলেক্ট কমিটিকে নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান করার জন্য পীড়াপিড়ি করতে থাকেন।136 ১২ জুন তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে পালাবার আগে ক্লাইভকে আবার তাড়াতাড়ি অভিযান করার জন্য অনুরোধ জানান কারণ ‘সামান্যতম দেরি হলেই আমাদের সর্বনাশ হতে পারে।’137 এদিকে তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেল। ৯ জুন নাগাদ138 নবাব মীরজাফরকে বক্সির পদ থেকে বরখাস্ত করেন, ফলে নবাবের সঙ্গে মীরজাফরের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় এবং এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যা স্ক্র্যাফ্‌টনের মতে, ইংরেজদের সব আশা-আকাঙক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারত। নিজের প্রাণনাশের ভয়ে মীরজাফর দরবারে যাওয়াই বন্ধ করে দিলেন। তিনি ক্লাইভকে লিখে পাঠালেন যে এই মুহূর্তে নবাবের বিরুদ্ধে ক্লাইভের অভিযান ছাড়া অন্য কিছু তাকে বাঁচাতে পারবে না।139

    সিরাজদ্দৌল্লা যথারীতি মীরজাফরের বিরুদ্ধে কোনও চরম ব্যবস্থা নিতে দোনামনা করতে লাগলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ শুভার্থীরা তাঁকে বোঝাতে চাইল যে মীরজাফরের যোগসাজশেই ইংরেজরা মুর্শিদাবাদ অভিযান করার পরিকল্পনা করছিল। তাই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াই উচিত। কিন্তু দরবারে মীরজাফরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী সিরাজকে আপাতত মীরজাফরের সঙ্গে একটা রফা করা ও পরে সুযোগ বুঝে তাঁকে একহাত নেওয়ার পরামর্শ দিল। ফলে দু’জনের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হয়ে গেল। দুজনেই কোরাণ নিয়ে শপথ করলেন—সিরাজের দিক থেকে মীরজাফরের প্রাণনাশের কোনও চেষ্টা হবে না আর মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত তিনি নবাবের জন্য লড়াই করে যাবেন। এর পর ‘দু’জনে হাসিমুখে পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিলেন কিন্তু মনে মনে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণা নিয়ে গেলেন।’ এখানেই সিরাজদ্দৌল্লা মস্ত বড় ভুল করে বসলেন, মীরজাফরকে বরাবরের মতো নিস্তব্ধ না করে দিয়ে। এ প্রসঙ্গে স্ক্র্যাফ্‌টনের মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য:140

    If the Soubah (Sirajuddaulla) erred before in abandoning the French, he doubly erred now, in admitting a suspicious friend…to continue in charge of a great body of troops, when self-defence would have taught him to make use of for his own preservation.

    জাঁ ল’-রও অভিমত, সিরাজদ্দৌল্লা ছাড়া অন্য যে-কোনও কেউ, যার মনের জোর আছে, এ সময় মীরজাফর, রায়দুর্লভ এবং শেঠদের কারাগারে বন্দি করে রাখত। এঁদের এভাবে জব্দ করা গেলে ইংরেজরা খুব সম্ভবত আর মুর্শিদাবাদের দিকে এগুতে সাহস করত না।141

    এদিকে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে মীরজাফরের আপাত বোঝাপড়ার ফলে মীরজাফর ইংরেজদের চোখে সন্দেহের পাত্র হয়ে দাড়ান। তাই ওয়াটস লিখছেন যে মীরজাফর নবাবের সঙ্গে আবার হাত মেলাবার ফলে, যদিও তাদের মধ্যে সত্যিকারের কোনও বোঝাপড়া হয়নি, তাঁর ওপর ভরসা করা যায় কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এর পরের ঘটনাক্রম থেকে দেখা যাবে যে এ-সন্দেহ খুব অমূলক নয়।’142 কিন্তু তার মধ্যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে অভিযান করার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। মুর্শিদাবাদ রওনা হওয়ার আগে ক্লাইভ হুগলির ফৌজদার আমিরুল্লাকে ১২ জুন লিখলেন যে সন্ধির শর্তগুলি যাতে পালিত হয় তা দেখার জন্য ইংরেজ বাহিনী রাজধানীর দিকে অভিযান শুরু করছে।143 চিঠি পেয়েই আমিরুল্লা ক্লাইভকে জানালেন যে ‘নবাবের সঙ্গে শেষ যখন তাঁর দেখা হয় তখনও নবাব ইংরেজদের প্রতি তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সদিচ্ছার কথা বলেছেন এবং চুক্তির শর্তাবলী পালন করতে তাঁর সম্মতির কথা জানিয়েছেন। ব্যাপারটা অত গুরুত্বপূর্ণ বলেই তাতে কিছুটা দেরি হয়তো হচ্ছে। কিছু বদলোকের প্ররোচনায় ক্লাইভের পক্ষে এরকমভাবে হঠাৎ একটা অভিযান করা নিতান্তই অনুচিত।’144

    কিন্তু ইংরেজদের পরিকল্পিত পলাশির বিপ্লব ত্বরান্বিত করতে তাদের কিছু একটা অজুহাত দেখাবার প্রয়োজন ছিল। তাই ক্লাইভ ১৩ জুন সিরাজদ্দৌল্লাকে লিখলেন যে, যেহেতু নবাব চুক্তির শর্তাবলী পালন করেননি এবং যেহেতু তিনি আগের প্রতিশ্রুতি আপনার শত্রু আমার শত্রু, আমার শত্রু আপনার’145 না মেনে ফরাসি নৌ সেনাপতি বুসির [Bussy] সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন, সেজন্য তিনি মুর্শিদাবাদ অভিমুখে অভিযান করছেন। মুর্শিদাবাদের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনে ব্যাপারটি তুলে ধরা হবে, তাদের সুবিচারের জন্য।146 সিরাজ কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিক থেকে বারবার জানিয়েছেন যে আলিনগরের সন্ধির চুক্তির শর্তগুলি বরাবরই মেনে চলা হয়েছে এবং তাঁর দিক থেকে কোনও বিচ্যুতি কখনও হয়নি। তিনি ইংরেজদের এটাও বারবার পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, তারা মুর্শিদাবাদ অভিমুখে অভিযান শুরু করলে তা চুক্তিভঙ্গের সামিল হবে।147 মুর্শিদাবাদ থেকে ওয়াটসের পালানোর পর নবাব ক্লাইভ ও ওয়াটসন দু’জনকে জানালেন যে এটা তাঁদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং চুক্তি ভাঙার উদ্দেশ্যেরই পরিচায়ক।

    ক্লাইভ যখন মুর্শিদাবাদ অভিযান শুরু করেন তখনও পর্যন্ত মীরজাফরের কাছ থেকে শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কোনও চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে মীরজাফরের সাক্ষাৎ পরিচয়ই ছিল না। তিনি ১৯ জুন কাটোয়া দখল করলেন। সেখানে ‘নিদারুণ অস্বস্তি’র মধ্যে তাঁকে দু’দিন কাটাতে হয়। কারণ তখনও পর্যন্ত মীরজাফর বা তাঁর সঙ্গীদের কাছ থেকে কোনও খবর বা নির্দেশ কিছুই পাওয়া যায়নি। খবর যখন পৌঁছুল তখন দেখা গেল যে, ওয়াটসের মন্তব্য অনুযায়ী, তাতে সন্তোষজনক বা পরিষ্কারভাবে কিছুই বলা নেই।148 ফলে ক্লাইভ বেশ ভীত ও হতাশ হয়ে পড়লেন। তিনি সিলেক্ট কমিটিকে লিখলেন যে মীরজাফরের কাছ থেকে কোনও রকমের স্পষ্ট সংকেত না পেয়ে তিনি ‘খুবই উদ্বিগ্ন।’ তিনি আরও লিখলেন যে মীরজাফর ইংরেজদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করলেও যেভাবে তিনি সতর্কতার সঙ্গে এগুতে চাইছেন তাতে পুরো ব্যাপারটাই ভেস্তে যাবার আশঙ্কা। একইভাবে তিনি কমিটিকে জানালেন যে, তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে মীরজাফর যাতে ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দেন তার একটা শেষ চেষ্টা তিনি করছেন। কমিটিকে এটাও জানানো হল, মীরজাফর তাঁর সঙ্গে যোগ না দিলে তিনি নদী পেরোবেন না। কোনওরকমে আট-দশ হাজার মন খাদ্যশস্য জোগাড় করতে পারলে তার সঙ্গে কাটোয়ায় যা তাদের হাতে এসেছে, সব মিলিয়ে বর্ষা পর্যন্ত ওখানে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। তারপর প্রয়োজন হলে মারাঠারা বা বীরভূমের রাজা বা এমনকী দিল্লির উজির গাজিউদ্দিন খান কারও না কারও সঙ্গে সমঝোতা করে কার্যোদ্ধার করা যাবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটিকে লিখছেন যে, তাঁর ইচ্ছা খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোনো যাতে ইংরেজ বাহিনীর কোনও বড় রকমের ক্ষতি না হয় ‘কারণ এই ফৌজ অক্ষত থাকলে আমাদের বর্তমান পরিকল্পনা সফল না হলেও ভবিষ্যতে যে-কোনও সময় বিপ্লব সংগঠিত করার শক্তি আমাদের বজায় থাকবে।’149

    এ থেকে বোঝা যায় মীরজাফর ও তাঁর সঙ্গীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে মসনদ থেকে হঠাতে ইংরেজদের শেষপর্যন্ত সাহায্য করতে এগিয়ে না এলেও, ইংরেজরা অন্য কারও সহায়তায় এ-কাজ সম্পন্ন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হত না এবং সেই অন্য কেউ দরবারের বিশিষ্ট অমাত্যই যে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। ইংরেজদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যে কেউ হলেই চলত। আসলে তখনও পর্যন্ত ক্লাইভ মীরজাফর সম্বন্ধে ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। তাই তিনি সিলেক্ট কমিটির কাছে জানতে চাইলেন যদি মীরজাফর সাহায্য করতে এগিয়ে না আসেন তা হলে কী করা যাবে।150 তবে বিপ্লব ঘটাতে তিনি এতই উদগ্রীব ছিলেন যে মীরজাফরের ওপর আশা পুরোপুরি ছাড়তে পারেননি এবং তাঁকে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে যোগ দিতে বারবার প্ররোচিত করতে লাগলেন। কাটোয়া থেকে ১৯ জুনও তিনি মীরজাফরকে লিখলেন:151

    আপনার পক্ষে বিশেষ করে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেও আপনি খুব একটা গা করছেন না দেখে আমি খুবই উদ্বিগ্ন হচ্ছি। এ ক’দিনের মধ্যে আমি যখন ফৌজ নিয়ে অভিযান করছি তখন আমি ঠিক কী করব বা কী ব্যবস্থা নেব সে-সম্বন্ধে আপনার কাছ থেকে কোনও ইঙ্গিত বা নির্দেশ পাইনি। আপনার কাছ থেকে কোনও সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই অবস্থান করব আর এগুব না। আমার মনে হয় অতি সত্বর আমার ফৌজের সঙ্গে আপনার যোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

    ওপরের এই চিঠি থেকে স্পষ্ট, ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাবার জন্য কতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মীরজাফর ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা কিন্তু এ-ব্যাপারে পুরো মনস্থির করে ইংরেজদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েননি—তাঁরা দোনামনা করছিলেন। ২১ জুনও ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটির কাছে জানতে চাইলেন, এ-অবস্থায় তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফর যদি শুধু নিরপেক্ষ থাকতে চান, তার বেশি কিছু করতে রাজি না হন, তা হলে তিনি কী করবেন তা নিয়ে খুব চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর ভয় হল ইংরেজরা যদি নবাবকে আগে আক্রমণ করে তা হলে তাদের সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসবে না এবং ফলে ইংরেজ ফৌজ নবাবের সঙ্গে যুদ্ধে আটকে পড়বে। সুতরাং ওই অবস্থায় গাজিউদ্দিন খান বা মারাঠাদের বাংলা অভিযান করার জন্য আমন্ত্রণ জানানোই উচিত হবে।152

    সে যাই হোক, সিলেক্ট কমিটিকে লেখা ক্লাইভের চিঠি ২৩ জুন আলোচনা করা হল। কমিটির দুই সদস্য, রজার ড্রেক ও রিচার্ড বেচার, মত দিলেন যে ক্লাইভ যা আশঙ্কা করছেন তার খুব একটা ভিত্তি নেই। কমিটি সিদ্ধান্ত নিল: ‘নবাবের সঙ্গে নতুন কোনও চুক্তির কথা ভাবা উচিত হবে না। আমাদের শক্তি যদি থাকে এবং সুযোগ যদি আসে, তা হলে এখনই আমাদের নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান করা যুক্তিযুক্ত হবে।’ কমিটি এটাও স্থির করল যে আর বেশি দেরি করলে ইংরেজদের শক্তি দিন দিন কমে যাবে, অন্যদিকে নবাবের শক্তি বৃদ্ধি হবে, কারণ নবাব তখন চারদিক থেকে তাঁর অনুগত সৈন্যদের জড়ো করে ফেলতে পারবেন। তাই কমিটি ক্লাইভকে নির্দেশ দিল, যদি ক্লাইভ মনে করেন যে যুদ্ধে ইংরেজদের সাফল্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে তা হলে তাড়াতাড়ি নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে। অবশ্য কমিটির কোনও সংশয়ই ছিল না যে, নবাবকে যদি তাড়াতাড়ি আক্রমণ করা যায় তা হলে সাফল্য আসবেই।153

  • পলাশির পরিণাম : সুদূরপ্রসারী প্রভাব

    পলাশির পরিণাম : সুদূরপ্রসারী প্রভাব

    পলাশির পরিণাম : সুদূরপ্রসারী প্রভাব

    প্রায়-সমসাময়িক ঐতিহাসিক করম আলি পলাশির পরিণতি খুব সংক্ষেপে ব্যক্ত করেছেন: ‘পলাশির পরে ইংরেজরা বাংলায় তাদের নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।’1 মঁসিয়ে জাঁ ল’-ও বলেছেন যে পলাশি সমগ্র বাংলাকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।2 এমনকী ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্টন ঠিক পলাশি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেই, যখন মীরজাফর মসনদেও বসেননি, মন্তব্য করেছেন যে এখন ‘সারা বাংলা আমাদের হাতের মুঠোয়।’150 বস্তুতপক্ষে সম্প্রতি দেখানো হয়েছে যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে নবাবি আমলে বাংলায় যে আর্থিক ও শিল্পবাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি দেখা গেছে, পলাশির পর তা ধীরে ধীরে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। এই শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজ কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের দৌলতে বাংলার অর্থনৈতিক অবক্ষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়।154 এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় প্রায়-সমসাময়িক ঐতিহাসিক ও পর্যটক আলেকজ্যান্ডার ডো-র (Alexander Dow) লেখায়। তিনি লিখেছেন: ‘যে দিন থেকে বাংলা বিদেশিদের অধীনে চলে যায় সেদিন থেকেই বাংলার অর্থনৈতিক অধোগতির সূত্রপাত।’155 এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পলাশির পর বাংলায় এক ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’ শুরু হয়ে যায়, যার চরিত্র ছিল অত্যন্ত নির্মম। রাজনৈতিক দিক থেকে বলা যায় যে, পলাশির পর ইংরেজরা বাংলায় পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে এবং এখান থেকেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ সুগম হয়।156

    পলাশির পর ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে অবাধ লুঠপাটের সব দরজা খুলে যায় এবং তারাও দু’হাতে লুঠতরাজ শুরু করে দিল বলে একজন বিশিষ্ট ঐতিহাসিকের যে বক্তব্য তাতে কোনও অতিরঞ্জন নেই।157 পলাশির পরেই যে লুঠ শুরু হয় তার অনুরূপ কিছু পৃথিবীর ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জোর করে অগাধ টাকাপয়সা ও ধনরত্ন আদায় করে নেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা গেছে। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা বাংলা থেকে এভাবে সংগৃহীত অপরিমেয় ধনসম্পদ সব বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দেয় এবং এভাবে শুরু হয় বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের এক অবাধ প্রক্রিয়া। এই ধন নিষ্ক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ে এবং তার ফলে দেশের ও মানুষের অবস্থা অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়ে। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ পলাশি-উত্তর ৪২-৪৩ বছরে বাংলা থেকে কী বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ বাংলার বাইরে চলে যায় তার সঠিক হিসেব দেওয়া সম্ভব নয়, যদিও এ-সম্বন্ধে কিছুটা আন্দাজ মাত্র করা যেতে পারে। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা নানা উপায়ে বাংলা থেকে প্রচুর ধনসম্পদ আহরণ করেছিল। ধন নিষ্ক্রমণের সঠিক হিসেব করতে গেলে এ-সবগুলি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।158

    এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কোনও কোনও বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মনে করেন যে কোম্পানির কর্মচারীদের (যারা ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল) অপরাধী ধরে নিয়ে তাদের সর্বজনীন একটা নিন্দার পাত্র বলে গণ্য করা সমুচিত হবে না। সেই যুগের মাপকাঠি দিয়ে তাদের বিচার করতে হবে; তাদের নৈতিকতাহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিসমষ্টি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও অনুচিত। মনে রাখতে হবে, তারা ভারতবর্ষে এসেছিল প্রধানত ধনসম্পদ আহরণ করে ধনবান হওয়ার জন্য আর তা ছাড়া ইংরেজ জাতির যদি কিছু হিতসাধন করা যায় তার জন্য। তারা যা করছে তা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কি না সে-প্রশ্ন নিয়ে আদৌ মাথা ঘামায়নি এবং তারা যা করছে তা নিয়েও তাদের কোনও অলীক ধারণা ছিল না।159 এ-বক্তব্য নিয়ে তর্ক না তুলেও এটা বলা অনুচিত হবে না যে, ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের নানা কাজকর্মের ফলে ভারতের ইতিহাসে বিশেষ করে তার অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়েছিল তার সম্যক বিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন।

    কোম্পানি ১৭৫৭ থেকে ১৭৬০-এর মধ্যে মীরজাফরের কাছ থেকে ২ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা পেয়েছিল।160 তা ছাড়া মীরজাফর কোম্পানির কর্মচারীদের নগদ পুরস্কার ও দান হিসেবে ৫৯ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে পলাশি কোম্পানির কর্মচারীদের দ্রুত ব্যক্তিগত লাভের অনেক পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ সালের মধ্যে কোম্পানির কর্মচারীরা বাংলায় রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে মীরজাফর ও অন্যান্যদের কাছ থেকে আনুমানিক ১ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা পেয়েছিল। এই টাকার মধ্যে কিন্তু বিপ্লব সংগঠিত করে কোম্পানির নিজস্ব লাভের পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত নয়। ওই সময়ের মধ্যে এর পরিমাণ নগদ ৮ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা এবং ভূমিরাজস্ব বাবদ ৫৬ লক্ষ টাকা।161

    পলাশি বিপ্লবের ফলে ব্যক্তিগতভাবে ক্লাইভই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিলেন। তবে বিপ্লবের ফলে ব্রিটিশ ফৌজের সাধারণ স্তরের একজন সৈনিকও কম করে ২৪,০০০ টাকা করে পেয়েছিল।162 পলাশি যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ক্লাইভ তাঁর পিতাকে লেখেন যে মীরজাফর তাঁকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মোট ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা দিতে সম্মত হয়েছেন এবং তাঁর বদান্যতায় ওই টাকা পেলে ‘আমি দেশে গিয়ে এমন আরামে থাকতে পারব যা কোনওদিন কল্পনাই করতে পারিনি।’163 কোম্পানির আরেক কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্টন লিখেছেন যে, পলাশির ফলে ‘ইংরেজ জাতির ৩০ লক্ষ পাউন্ড লাভ হয়েছিল।’ তা ছাড়া বাংলার নবাবের কাছ থেকে যা টাকা পাওয়া গেছে ‘তার সবটাই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে চলে এসেছে, কারণ বাংলায় যে টাকাটা পাওয়া গেছে তা দিয়ে চিন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ছাড়াও সারা ভারতবর্ষের বাণিজ্যই আমরা তিন বছর চালিয়েছি, ইংল্যান্ড থেকে এক আউন্স রুপোও নিয়ে আসার প্রয়োজন হয়নি।’164 এ-সব নগদ টাকা ছাড়াও কোম্পানিকে যে ভূখণ্ড দেওয়া হয়েছিল তা থেকে, ক্লাইভের অনুমান অনুযায়ী, বছরে আয়ের পরিমাণ হবে ১২ লক্ষ টাকা।165

    পলাশির পরে কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের হাতে এভাবে অঢেল টাকাপয়সা আসার ফলে কোম্পানিকে আর ইংল্যান্ড থেকে রুপো বা নগদ টাকাপয়সা নিয়ে এসে বাংলা থেকে রফতানি পণ্য কিনতে হয়নি। বাংলায় সংগৃহীত অর্থ দিয়ে শুধু বাংলার বাণিজ্য নয়, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের, এমনকী চিনদেশের সঙ্গে বাণিজ্য এবং কোম্পানির অন্যান্য খরচপত্র মেটানোও সম্ভব হয়েছিল। প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলায় পণ্য সংগ্রহের জন্য যে পরিমাণ টাকার দরকার হত, তার প্রায় শতকরা আশি থেকে নব্বই ভাগই ইংল্যান্ড থেকে সোনা-রুপো হিসেবে আসত। কিন্তু পলাশির পর ইংল্যান্ড থেকে সোনা-রুপো আসা একদম বন্ধ হয়ে গেল। কোম্পানির যাবতীয় বাণিজ্য ও খরচপত্র বাংলার রাজস্ব ও কোম্পানি এবং তার কর্মচারীদের বাংলায় সংগৃহীত অর্থেই চলত। এভাবেই বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের সূত্রপাত হল।166 বস্তুতপক্ষে, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ এই দশ বছরে বাংলা থেকে রফতানি পণ্যের মোট যে মূল্য তা থেকে বাংলায় আমদানি পণ্যের মোট মূল্য বাদ দিয়ে পণ্যসামগ্রী ও সোনা-রুপো মিলিয়ে যে ধন নিষ্ক্রমণ হয়েছিল তার পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৪ কোটি টাকা।167

    জেমস গ্যান্টের (James Grant) হিসেব অনুযায়ী ১৭৮৬ সালে বাংলা থেকে যে পরিমাণ ধন নিষ্ক্রমণ হয় তার পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। এই হিসেবে অবশ্য বাংলা থেকে ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে যে পরিমাণে অর্থ চলে যাচ্ছিল তা ধরা হয়নি। কোম্পানির পরিচালক সমিতির হিসেব অনুযায়ী এর পরিমাণ বছরে ২০ লক্ষ টাকা।168 হোল্ডেন ফারবারও (Holden Furber) অন্যভাবে হিসেব করে গ্যান্টের মতোই সিদ্ধান্ত করেছেন যে, সমগ্র ভারতবর্ষকে ধরে ১৭৮৩-৮৪ থেকে ১৭৯২-৯৩ পর্যন্ত এই ধন নিষ্ক্রমণের পরিমাণ বছরে ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকার মতো।169 ইরফান হাবিব কিন্তু মনে করেন, পণ্যসামগ্রীর ক্রয়মূল্য ধরে হিসেব করলেও ওই হিসেব নিতান্তই কম। তাঁর অনুমান, ১৭৮০ ও ১৭৯০-এর দশকে বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে বাৎসরিক যে ‘ট্রিবিউট’ বা অর্থ যেত তার পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকার মতো।170 যদি তাই হয়, তবে এ-বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকতে পারে না যে এর আগের দু’ দশকে অর্থাৎ ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে ধন নিষ্ক্রমণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি ছিল কারণ তখনই বাংলায় কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসা, উপঢৌকন ও দপ্তরের (নানা উপরি পাওনা) মাধ্যমে প্রচর অর্থ সংগ্রহ করেছিল এবং তার প্রায় সবটাই বিভিন্ন পথে বাইরে চলে যেত। বাংলার নবাব ও অন্যান্যদের কাছ থেকে কর্মচারীরা নানাভাবে যে অর্থ আদায় করত তার কোনও হিসেবপত্র নেই। ফলে এ ভাবে যে অর্থ সংগৃহীত হয় তার পরিমাণ সম্বন্ধে কোনও সঠিক ধারণা করা সম্ভব নয়। তবে যে-সব অর্থপ্রাপ্তির রসিদপত্র পাওয়া যায় তা থেকে এটা বলা যায় যে, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সালের মধ্যে (যখন উপহার, পারিবারিক দস্তুর, ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিল) ইংরেজরা শুধু ব্যক্তিগত ভাবেই যে অর্থ পেয়েছিল তার মোট পরিমাণ আনুমানিক ৫ কোটি টাকার মতো হবে।171

    কোম্পানির কর্মচারীদের আয়ের সবচেয়ে লোভনীয় উৎস ছিল ব্যক্তিগত ব্যবসা। তারা বেপরোয়াভাবে যে বিশাল পরিমাণ অন্তর্বাণিজ্য করতে শুরু করল তা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। এটা তাদের প্রাপ্ত উপহার, দান, দস্তুর প্রভৃতির চেয়েও দেশের পক্ষে অনেক বেশি ক্ষতিকারক ছিল। তাদের এভাবে দেশের অন্তর্বাণিজ্যকে কুক্ষিগত করাটা দেশের ‘অর্থনীতি লুঠে’র সামিল বলে গণ্য করা চলে। তা ছাড়া এর ফলে যে-সব ভারতীয় ও এশীয় বণিক প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলার বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তারা আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল এবং এভাবে বাংলার সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যগত স্থলপথে বহির্বাণিজ্য নষ্ট হয়ে যায়।172 ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে কোম্পানির কর্মচারীরা কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিল তার কোনও সঠিক হিসেব দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা শুধু কোম্পানির কয়েকজন কর্মচারী তাদের নিজস্ব ব্যবসার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ রোজগার করেছিল তার একটা আন্দাজ দিতে পারি যা থেকে সাধারণভাবে কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করত তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।

    মুর্শিদাবাদ দরবারের ইংরেজ প্রতিনিধি সাইকস (Sykes) মুর্শিদাবাদ ও অন্যান্য জেলায় সোরা, কাঠ ও রেশমের একচেটিয়া ব্যবসা করে দু’বছরে ১২ থেকে ১৩ লক্ষ টাকা রোজগার করেছিলেন প্রতি বছরে।173 আরেকজন কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস (William Bolts) ব্যক্তিগত ব্যবসা করে ৬ বছরে ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন। কোম্পানির কর্মচারীরা এভাবে যে পরিমাণ টাকাপয়সা উপার্জন করত তার প্রায় সবটাই বিলস অব এক্সচেঞ্জ (Bills of Exchange) বা হুণ্ডির মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও ইউরোপে পাঠিয়ে দিত। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টারি কমিটির একটি অনুমান অনুযায়ী কোম্পানির কর্মচারীরা পলাশি বিপ্লবের পর এক দশকে ইংরেজ ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির ওপর হুণ্ডির মাধ্যমে প্রতি বছর ৮০ লক্ষ টাকা ইংল্যান্ড ও ইউরোপে পাঠিয়েছিল। এই হিসেবের মধ্যে অবশ্য কোম্পানির কর্মচারী নয় এমন ইংরেজ ও ইউরোপীয়দের চিন দেশে রফতানির মূল্য ধরা হয়নি। সেখানে রফতানি পণ্য বিক্রি করে টাকাটা সোজা ইংল্যান্ড বা ইউরোপে পাঠিয়ে দেওয়া হত। ১৭৮৩ সালের একটি পার্লামেন্টারি কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী একজন ইংরেজ ব্যবসায়ী এভাবে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা ইংল্যান্ডে পাঠায়। কোম্পানির অনেক কর্মচারী আবার হিরে রফতানির মাধ্যমে বাংলা থেকে টাকা পাচার করত—হিরেগুলি চোরাইচালান করা হত ইউরোপে।174

    শুধু ইংরেজ কোম্পানি নয়, বাংলায় অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিরও পলাশির পরে ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো এনে বাংলায় রফতানি পণ্য কেনার প্রয়োজন হত না। প্রাক্-পলাশি যুগে ইংরেজদের মতো তাদেরও ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো/নগদ টাকাপয়সা এনে বাংলায় পণ্যসংগ্রহ করতে হত। কিন্তু পলাশির পরে ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের সংগৃহীত অর্থ এ-সব কোম্পানিকে দিত যা দিয়ে কোম্পানিগুলি বাংলায় পণ্য কিনত আর ওই অর্থের সমপরিমাণ টাকা হুণ্ডির মাধ্যমে এ-সব কর্মচারীদের নামে ইউরোপে চলে যেত। ফলে কোম্পানিগুলিকে আর ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো আনতে হত না। এটা বাংলা থেকে একরকম ধন নিষ্ক্রমণেরই সামিল। ১৭৬৮ সালেও কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল জানিয়েছিল যে, ডাচ ও ফরাসিদের তহবিলে টাকা উপচে পড়ছে যা দিয়ে আগামী তিন বছর তাদের রফতানি পণ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য খরচ সহজেই মেটানো যাবে।175 বারওয়েলের (Barwell) অনুমান অনুযায়ী ১৭৫৬ ও ১৭৬৭ সালের মধ্যে ডাচ ও ফরাসিদের মাধ্যমে যে অর্থ ইউরোপে চালান যায় তার পরিমাণ কম করে ৯৬ লক্ষ টাকা।176

    প্রাক্-পলাশি বাংলা থেকে ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছর ইংরেজ ও ডাচ কোম্পানির রফতানির মোট মূল্য প্রতি বছর গড়ে ৬২ লক্ষ টাকার মতো ছিল।177 এর সঙ্গে ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয়দের বাণিজ্য যোগ করলে গড়মূল্য বছরে ৭০ লক্ষ টাকার মতো দাঁড়ায়। এই রফতানি বাণিজ্যের পণ্যসংগ্রহের জন্য প্রায় পুরো টাকাটাই ইউরোপ থেকে সোনা-রুপোর মাধ্যমে আনতে হত।কিন্তু পলাশির পরে বাংলায় এই সোনা-রুপোর আমদানি একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এবং এটা বাংলা থেকে যে ধন নিষ্ক্রমণ হয় তার একটা বড় অংশ। ইংরেজ কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী (যিনি পরে বাংলার গভর্নরও হয়েছিলেন) ভেরেলস্ট (Verelst) মন্তব্য করেছেন যে ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সালের মধ্যে বাংলায় সোনা-রুপো আসা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এখান থেকে ধনসম্পদ বাইরে চলে যাওয়া—এই দুটো মিলে বাংলার ৬ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার লোকসান হয়।178 একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী পলাশির পর এক দশকে বাংলা থেকে কোম্পানিগুলির সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ইউরোপীয় ও ইংরেজদের হিরের চোরাচালান ও চিনদেশে রফতানি বাদ দিয়ে যে ধনসম্পদ বাইরে চলে যায় তার মূল্য হবে ১৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। বাংলার রাজস্ব বছরে ২ কোটি ২৪ লক্ষ ধরে পলাশির পর এক দশকে বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের পরিমাণ দাঁড়ায় বার্ষিক রাজস্বের ৬১ শতাংশ। এটা রক্ষণশীল অনুমান। প্রকৃতপক্ষে ৬৬ শতাংশের মতো হবে।179 সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পলাশির পর বাংলা থেকে এক বিশাল আকারের ধন নিষ্ক্রমণ শুরু হয় এবং তাতে বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।

    কোনও কোনও ঐতিহাসিক কিন্তু বাংলা থেকে এই যে ধন নিষ্ক্রমণ এবং তার ফলে অর্থনীতিতে যে অবক্ষয় দেখা যায় তা স্বীকার করতে নারাজ। এঁদের বক্তব্য, এর জন্য প্রথমে চাই ‘ধন-নিষ্ক্রমণের একটি যথার্থ সংজ্ঞা এবং এই নিষ্ক্রমণের যে পরিমাণ তার সঙ্গে বাংলার মোট আয়ের (income) একটা তুলনামূলক হিসেব।’180 বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণ ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন রকমের অনুমান ও মতামত আছে। একটি মত হচ্ছে, এই নিষ্ক্রমণের ফলে বাংলার সম্পদের ৫ থেকে ৬ শতাংশ লোকসান হয়। আবার অন্য একটি মতে সম্পদ শুধু একতরফা স্থানান্তরিত হওয়ায় ভারতীয় অর্থনীতিতে অবক্ষয় দেখা গেছে, এ-কথা বলা যায় না।181 এই মতের সপক্ষে যুক্তি, কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের ইউরোপে অর্থ পাঠাবার তাগিদের ফলে একদিকে রফতানি অনেক বেড়ে যায় এবং এ-রফতানির প্যাটার্নেও অনেক পরিবর্তন হয়। আরও যুক্তি, বাংলায় ইংরেজ শাসনের প্রবর্তন না হলে ইংল্যান্ড থেকে আমদানি বস্ত্রের প্রতিযোগিতার সামনে বাংলা থেকে মিহিবস্ত্রের রফতানি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকলেও, রেশম ও আফিং-এর রফতানির পরিমাণ খুব কমই থেকে যেত এবং তা বাড়ার কোনও সম্ভাবনাই থাকত না। তা ছাড়া নীল রফতানির প্রশ্নই আসত না।182 এ-সব যুক্তি দেখিয়ে বলা হচ্ছে যে কোম্পানির সরকার কর বাবদ কৃষক ও কারিগরদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ আদায় করছিল, তার একটা অংশ কোম্পানি এভাবে (রফতানি বৃদ্ধি করে) তাদের ফেরত দেয়। আর প্রাক্-পলাশি বাংলার শ্রীবৃদ্ধিতে যে-সব দেশীয় বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কার-মহাজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, উত্তর-পলাশি যুগে তাদের পতনের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, কোম্পানির আমলে যে-সব নতুন সুযোগসুবিধের সৃষ্টি হয় তাতে এক নতুন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী শ্রেণীর উদ্ভব হয় এবং এরাই পূর্বতন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ীর অভাব পূরণ করে, ফলে তেমন কিছু ক্ষতি আসলে হয়নি।183

    কিন্তু ওপরের যুক্তিগুলি গ্রহণ করা কঠিন। এ-ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্য মনে রাখা দরকার তা হচ্ছে, উত্তর-পলাশি পর্বে ইংল্যান্ড থেকে কোনও সোনা-রুপো না এনেই বাংলা থেকে সব পণ্য সংগ্রহ করে রফতানি করা হয়েছে, যা আগে কখনও হয়নি৷ ইরফান হাবিব184 একটি প্রবন্ধে এ-বিষয়ে বলেছেন যে, পলাশির পরে ভারতবর্ষ থেকে যে পরিমাণ অর্থ বাইরে চালান করা হয়েছিল, তার সব যদি একদিকে জেমস গ্র্যান্ট ও জন শোরের (John Shore) প্রদত্ত185 বাংলার মোট জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে এবং অন্যদিকে ব্রিটেনে ব্রিটিশ জাতীয় আয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তা হলে এদেশ থেকে ধন নিষ্ক্রমণের প্রভাব সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকবে না। এই থেকেই স্পষ্ট হবে ধন নিষ্ক্রমণ ভারতীয় অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্রিটেনকে কতটা সমৃদ্ধ করেছিল। ইংরেজ কোম্পানি বাংলার রফতানি পণ্য প্রায় কুক্ষিগত করার ফলে, ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য বাদ দিলে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য যে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না।186 উত্তর-পলাশি পর্বে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলার চিরাচরিত স্থলবাণিজ্য প্রচণ্ড মার খায় অথচ মধ্য-অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত স্থলপথে বাংলার এই বহিবাণিজ্যের পরিমাণ ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রফতানি বাণিজ্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশিই ছিল।187

    আবার উত্তর-পলাশি পর্বে বাংলার রফতানি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যায় বলে যে-বক্তব্য তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতদিন প্রাক্‌-পলাশি যুগে বাংলার রফতানি বাণিজ্য বলতে আমাদের দৃষ্টি সাধারণত ইউরোপীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতীয় ও অন্যান্য এশীয় বণিকরা বাংলা থেকে যে রফতানি বাণিজ্য করত তা আমরা ধর্তব্যের মধ্যে নিইনি, মুখ্যত এই কারণে যে এ-বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ও তথ্য ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং তেমন কোনও পরিসংখ্যানও আমাদের হাতে ছিল না। কিন্তু এখন আমরা তথ্যপ্রমাণ ও পরিসংখ্যান দিয়ে এটা দেখাতে পেরেছি যে, মধ্য-অষ্টাদশ শতকেও বাংলা থেকে বস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে এশীয়রা ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল। শুধু তাই নয়, বাংলা থেকে এশীয় বণিকদের কাঁচা রেশম রফতানির পরিমাণ ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রফতানির চার-পাঁচগুণ বেশি ছিল। এই তথ্যগুলি মনে রাখলে উত্তর-পলাশি পর্বে রফতানি বৃদ্ধির ফলে পূর্বতন এশীয় রফতানি বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে ক্ষতি হয়েছিল তা পুষিয়ে দিয়েছিল বলে যে-বক্তব্য তা অসার হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, পলাশির পরে অনেক সুযোগসুবিধে সৃষ্টি হওয়ায় নতুন এক ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উদ্ভব হয় বলে যে বক্তব্য, সে-সম্বন্ধে এটা বলা যায় যে, এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কোনও তুলনাই হয় না। প্রাক্-পলাশি এবং উত্তর-পলাশি এই দুই পর্বের মধ্যে আসমান-জমিনের ফারাক। আগে শিল্পবাণিজ্যের যে সুস্থ ও অনুকূল পরিবেশ ছিল তা দেশীয় ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কারদের উদ্ভব ও শ্রীবৃদ্ধির যথেষ্ট সহায়ক ছিল। কিন্তু উত্তর-পলাশি পর্বে কোম্পানির শাসনকালে তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, তার ফলে এ সময় জগৎশেঠ, খোজা ওয়াজিদ বা উমিচাঁদের মতো কোনও বণিকরাজার আবির্ভাব হয়নি বা ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে আসা কোনও প্রভাবশালী সওদাগরও আর চোখে পড়ে না। এমনকী নবাবি আমলের বড় বড় দাদনি বণিকদের মতো (যেমন কলকাতার শেঠ ও বসাক, কাশিমবাজারের কাটমা পরিবার, ইত্যাদি) কারও সাক্ষাৎও মেলে না।188 এদের মধ্যে অনেকেই কোম্পানিগুলির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করতে পারত, কোম্পানির সঙ্গে এদের সম্পর্ক ছিল সমানে-সমানের। কিন্তু পলাশির পরে যে বণিক ব্যাঙ্কার-গোষ্ঠীর উদ্ভব হয় তাদের বেশির ভাগই ছিল কোম্পানির বশংবদ এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কোম্পানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল—যা প্রাক্-পলাশি যুগের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

    অন্যদিকে উত্তর-পলাশি পর্বে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা কৃষক, তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের কাছ থেকে কর বাবদ যা আদায় করেছিল তার একটা অংশ তাদের অন্যভাবে (রফতানি বাণিজ্যের উন্নতি ঘটিয়ে) ফিরিয়ে দিয়েছিল বলে যে যুক্তি, তা এ সময় তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা যে অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছিল, তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি। পলাশির পরবর্তী সময় এরা তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার ও শোষণ চালায় এবং তার ফলে বাংলার সুপ্রাচীন সব শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।এতে তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে, তাদের দুঃখদুর্দশার সীমা থাকে না। অথচ নবাবি আমলে তাঁতিদের এতটা স্বাধীনতা ছিল যে, তারা ইচ্ছেমতো কাপড় তৈরি করতে পারত এবং তারা এই কাপড় তাদের ইচ্ছেমতো যে-কোনও ক্রেতাকে বিক্রি করতে পারত। কিন্তু পলাশির পর তাদের এই স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা তাঁতি-কারিগরদের ওপর নিজেদের ‘প্রভুত্ব’ স্থাপন করে।তারা তাঁতিদের বাধ্য করল তাদের নির্দেশ মতো শুধু যে ধরনের ও যে পরিমাণ কাপড় তারা বুনতে বলবে তাই তাঁতিদের বানাতে হবে, তার অন্যথা করা চলবে না। এজন্য তাদের খুশিমতো দাম তারা তাঁতিদের নিতে বাধ্য করত, যদিও ওই দাম খোলা বাজারের দামের চেয়ে অনেক কমই হত। কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের গোমস্তারা তাদের ‘প্রভু’দের সাহায্যে, বলতে গেলে, এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর একদিকে শারীরিক নির্যাতন ও নানা নিপীড়ন এবং অন্যদিকে মাত্রাহীন শোষণ চলতে থাকে। এদের এখন একেকজন নির্দিষ্ট গোমস্তার কাছে নাম লেখাতে বাধ্য করা হল। একজন তাঁতি যে গোমস্তার কাছে নাম লেখাতে বাধ্য হল, সে সেই গোমস্তা ছাড়া অন্য কারও জন্য কাপড় বুনতে পারবে না, এ নিয়ম চালু হল। আবার এক গোমস্তার খাতায় নাম লেখানো তাঁতিকে অন্য গোমস্তার কাছে ‘ক্রীতদাসের’ মতো ‘হাতবদল’ও করা হত।

    প্রাক্-সমসাময়িক একটি পাণ্ডুলিপির অজ্ঞাতনামা এক ইংরেজ লেখক মন্তব্য করেছেন যে তাঁতি-কারিগরদের (উত্তর-পলাশি যুগে) দুর্দশা বর্ণনাতীত।189 ১৭৬৯ সালে কোম্পানির এক কর্মচারী, রিচার্ড বেচার, যিনি প্রাক্-পলাশি বাংলায় ছিলেন, অন্য এক কর্মচারী, ভেরেলস্টকে লেখেন: ‘কোম্পানি দেওয়ানি পাওয়ার (১৭৬৫) পর থেকে এ দেশের লোকজনের অবস্থা আগের চেয়ে (প্রাক্-পলাশি) অনেক খারাপ হয়েছে…. আমার বিশ্বাস এ-বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যে ভাবে এখন কোম্পানির রফতানি পণ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে’ এবং ‘প্রতিবছর কোনও সোনা-রুপো আমদানি না করেই যে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ বাইরে চালান করা হচ্ছে, তাতেই এদেশের এমন দুরবস্থা।190 ভেরেলস্ট191 এবং বোল্টস192 স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, বাংলার আর্থিক দুর্দশার সূত্রপাত উত্তর-পলাশি যুগে। শুধু তাই নয়, প্রায় সমসাময়িক ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার ডো’-ও মন্তব্য করেছেন যে বাংলার দুর্ভাগ্য ও দুর্দশার শুরু, সিরাজদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর বাংলায় যে-সব রাজনৈতিক বিপ্লব ও পরিবর্তন হয় তা থেকেই।193

    অবশ্য কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলছেন যে যদিও বাংলা থেকে বেশ বড় রকমের ধন নিষ্ক্রমণ হয়েছিল তাকে শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষের শোষণ হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না—সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে ইউরোপীয় এবং ইংরেজদের বিভিন্ন কর্মপ্রচেষ্টা ও উদ্যোগ ভারতীয় অর্থনীতির উন্নতির সহায়ক হয়েছিল। এটাও বলা হয় যে ইংরেজদের ও ইউরোপীয়দের এ-সব প্রচেষ্টার ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে অর্থনৈতিক যোগসূত্র অনেক ঘনীভূত হয়। এটাও হয়তো সম্ভব যে এদের বিভিন্ন প্রচেষ্টার ফলে ১৭৮৩ থেকে ১৭৯৩-এর মধ্যে ভারতবর্ষের ধনসম্পদ হ্রাস হওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধিই পেয়েছিল। এই যুক্তিও দেখানো হয় যে ইংরেজ ও ইউরোপীয়রা বাংলা থেকে বস্ত্র রফতানি বন্ধ করলে বাংলার তাঁতি ও কাটুনিদের (spinners) এক ষষ্ঠাংশ বেকার হয়ে যেত।194 কিন্তু এ-সবই শুধু জল্পনা-কল্পনা ও অনুমানমাত্র, কোনওটাই তথ্যপ্রমাণ দিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য করে পরিবেশিত হয়নি। অন্যদিকে এখন আমরা দেখাতে পেরেছি যে নবাবি আমলে বাংলার বস্ত্র ও রেশমের রফতানি বাণিজ্যের যে শ্রীবৃদ্ধি এবং যার সিংহভাগই এশীয় বণিকদের হাতে ছিল (ইউরোপীয়দের নয়), অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যায়। তার ফলে বাংলার অসংখ্য তাঁতি, কাটনি ও অন্যান্য কারিগররা শোচনীয় দুর্দশার মধ্যে পড়ে। সুতরাং বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি ও মানুষের যে ক্ষতি হয় তা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের আগমনের ফলে যে স্বল্প লাভ হয় তা দিয়ে পূরণ হয়েছিল এ-কথা কিছুতেই বলা যায় না।

    পলাশির রাজনৈতিক প্রভাব তার অর্থনৈতিক পরিণতির চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে মীরজাফর ও ইংরেজদের মধ্যে যে চুক্তি হয় তা অনেকটা রক্ষণশীল (conservative)। এতে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের আলিনগরের যে চুক্তি হয়েছিল (৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) তার বাইরে নতুন বা গুরুত্বপূর্ণ কোনও শর্ত ছিল না।195 কিন্তু এ-বক্তব্য মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। আসলে এই চুক্তিতে এমন কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সংযোজিত হয় যাতে নবাবের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। নবাবকে ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত করা হয়েছিল, তাঁর সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়ে তাঁকে পুরোপুরি ইংরেজদের ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়।196

    মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তির যে শর্ত, ‘ইংরেজদের শত্রু আমার শত্রু, তা সে ভারতীয় বা ইউরোপীয় যেই হোক না কেন,’ তা শুধু সম্পূর্ণ নতুন নয়, খুব গুরুত্বপূর্ণও বটে। এটা নবাবের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপও বটে। এর ফলে নবাব ইংরেজদের ওপর নির্ভরশীল একটি পতলে পর্যবসিত হন এবং তাতে প্রয়োজনে, ইংরেজদের সঙ্গে বনিবনা না হলে, ফরাসি বা অন্য কোনও ইউরোপীয় বা এমনকী কোনও ভারতীয় শক্তির সঙ্গেও আঁতাত করার কোনও স্বাধীনতা তাঁর আর থাকল না। পলাশির কিছুদিন পরেই মীরজাফর এটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছিলেন। তা ছাড়া, চুক্তির অন্য আরেকটি শর্ত—নবাবকে ফরাসিদের ও তাদের সব সম্পত্তি ইংরেজদের হাতে সমর্পণ করতে হবে এবং তাদের বাংলা থেকে বরাবরের মতো বহিষ্কার করতে হবে—ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব ও ফরাসিদের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও আঁতাতের সম্ভাবনাকে একেবারে নির্মূল করে দেয়। তার ফলে ইংরেজদের শক্তিবৃদ্ধিতে বা বাংলার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপের যে প্রচেষ্টা তাতে বাধা দেওয়ার কোনও ক্ষমতাই নবাবের থাকল না। তিনি অসহায় দর্শকে পর্যবসিত হলেন।

    তা ছাড়াও, চুক্তির আরেকটি শর্ত অনুযায়ী যখনই নবাবের ইংরেজ ফৌজের সাহায্য প্রয়োজন হবে, তখন তাঁকে এই ফৌজের সব খরচপত্র বহন করতে হবে। এতে বাংলায় পাকাপাকিভাবে ইংরেজ ফৌজ বহাল রাখার একটা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল এবং ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব কিছু করার মতো সাহস ও শক্তি হারালেন। শুধু তাই নয়, এই ফৌজ পরে বাংলার আশেপাশে ইংরেজদের প্রতিপত্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। তাই পলাশির ঠিক পরেই ক্লাইভ লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে লেখেন: ‘আমার দৃঢ় ধারণা বাংলায় আপনাদের যে উপনিবেশ গড়ে উঠছে তার গুরুত্ব চিন্তা করে আপনারা যে শুধু তাড়াতাড়ি বেশি সংখ্যক সৈন্যসামন্ত এবং উপযুক্ত কর্মচারী পাঠাবেন তা নয়, এখানকার শাসন চালানোর জন্য যোগ্য তরুণদের পাঠাতে ভুলবেন না।’197 তিনি যে বাংলার শাসন পরিচালনার জন্য উপযুক্ত তরুণদের চেয়ে পাঠালেন, তা থেকে মনে হয়, অদূর ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে তিনি সেটা ভালভাবেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। সবশেষে, চুক্তিতে অন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল। তাতে মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি হুগলির নীচে কোনও দূর্গ তৈরি করবেন না। এটা নবাবের সার্বভৌমত্বের ওপর ইংরেজদের হস্তক্ষেপের সামিল এবং এতে সামরিকভাবে নবাবকে একেবারে পঙ্গু করে দেওয়া হল। ওই শর্তের ফলে নবাবের পক্ষে কোনও কারণেই আর ইংরেজদের চ্যালেঞ্জ জানাবার অবকাশ থাকল না এবং এর পরেই ইংরেজরা কলকাতায় বিশাল দুর্গ তৈরির ব্যবস্থা করল।198

    পলাশি বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় ১৭৭২ সালে একটি পার্লামেন্টারি কমিটির সামনে ক্লাইভের সাক্ষ্য থেকে:199

    পলাশির যুদ্ধজয় আমাকে কী অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছিল তা একবার চিন্তা করে দেখুন।একজন নবাব আমার অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল; একটি সমৃদ্ধ নগরী আমার দাক্ষিণ্যপ্রার্থী; এই নগরীর ধনীশ্রেষ্ঠ মহাজন ও সওদাগরেরা আমাকে খুশি করতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। [নবাবের] কোষাগার শুধু আমার জন্যই খুলে দেওয়া হয়েছে—আমি দু’পাশের স্তূপীকৃত সোনা ও হিরে-জহরত দেখে যাচ্ছি। সভাপতি মহাশয়, এই মুহূর্তে আমি আমার বিনয় দেখে বিস্মিত হচ্ছি।

    সুতরাং ওপরের তথ্যপ্রমাণ ও বিশ্লেষণ থেকে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পলাশির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফলাফল বাংলার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক হয়েছিল। পলাশির পরেই ইংরেজরা বাংলার আর্থিক সম্পদ করতলগত করে ও বাংলায় তাদের রাজনৈতিক প্রভত্বের বিস্তার করে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলেই একদা সমৃদ্ধ বাংলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত।

  • উপসংহার

    উপসংহার

    উপসংহার

    পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলিতে যে-সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ ও বিচারবিশ্লেষণের সমাবেশ করা হয়েছে তা থেকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সিদ্ধান্ত করা যায় যে, ইংরেজদের বাংলা বিজয় কোনওক্রমেই ‘আকস্মিক’ বা ‘অনিচ্ছাকৃত’ ঘটনা নয়। পলাশির বিপ্লব বাংলার অভ্যন্তরীণ কোনও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটের ফলও নয়। এটাকে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে নবাবের বিরোধের ফলে উদ্ভূত ঘটনাও বলা যায় না। অনুরূপভাবে, পলাশি সম্বন্ধে ‘কোলাবোরেশন’ থিসিসও অচল—যাতে বলা হয়, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে (বিশেষ করে ইংরেজদের সঙ্গে) বাংলার ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার শ্রেণীর স্বার্থ এমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল যে তারা, নবাব বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করবেন, এটা কোনওমতেই সহ্য করতে পারেনি এবং সেজন্যই নবাবকে তাড়াতে তারা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। আসলে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থেই ইংরেজদের বাংলা বিজয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এইসব কর্মচারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে প্রভূত ধনোপার্জন করা এবং তা নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে তোফা আরামে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাকি জীবন অতিবাহিত করা। কিন্ত মধ্য-অষ্টাদশ শতকে এই ব্যক্তিগত বাণিজ্য চরম সংকটের সম্মুখীন হয় এবং ফলে এই বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক কমে যায়। আর এই ব্যক্তিগত বাণিজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্যই কোম্পানির কর্মচারীরা সাব-ইম্পিরিয়ালিজম (sub-imperialism) বা স্বায়ত্ত-সাম্রাজ্যবাদের আশ্রয় নেয়। অর্থাৎ তারা নিজেদের কার্য ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাংলায় কোম্পানির আর্থিক ও সামরিক শক্তিকে কাজে লাগায় এবং তার ফলেই ইংরেজদের বাংলা বিজয় সম্ভব হয়।

    ইংরেজরাই যে মূলত পলাশি বিপ্লব সংগঠিত করেছিল সে-বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ক্লাইভ এবং ওয়াটসনকে বাংলায় পাঠাবার সময় মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিল যে-নির্দেশ তাঁদের দিয়েছিল তার মধ্যেই পলাশি বিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল এবং তাতেই ষড়যন্ত্রের সদর দরজা খুলে গিয়েছিল। অবশ্য এ-কথা অস্বীকার করা যায় না যে, মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নবাবের বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত করার চেষ্টা করছিল। তবে এ-ব্যাপারে যেটা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য তা হল, ইংরেজদের মদতেই এই চক্রান্ত চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং তাদের সক্রিয় অংশ ছাড়া এই ষড়যন্ত্র পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটাতে পারত না। ইংরেজরাই নবাবের বিরুদ্ধে দরবারের অমাত্যদের একটা বড় অংশকে নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে তাদের নিজেদের পরিকল্পিত বিপ্লব সফল করতে ওই অভিজাতবর্গকে নিজেদের দলে টেনে আনে। পলাশি যুদ্ধের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তারা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল, যাতে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে মসনদ থেকে হঠানোয় স্থিরসংকল্প থাকে। তা ছাড়া পলাশি বিপ্লবের পরিকল্পনা যাতে তাড়াতাড়ি সফল করা যায় তার জন্য ইংরেজরাই ভারতীয় যড়যন্ত্রকারীদের চেয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। সুতরাং এটা ঠিক নয় যে, পলাশির ষড়যন্ত্র ‘দেশীয় ষড়যন্ত্র’। স্থানীয় চক্রান্তকারীরা ইংরেজদের পরিকল্পনার পুরো ছকের তাৎপর্য উপলব্ধিই করতে পারেনি এবং সেই নির্বুদ্ধিতার জন্য অচিরেই তাদের বিরাট মূল্য দিতে হয়েছিল। নতুন বিজেতাদের হাতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ধনেপ্রাণে মারা পড়ল, ভবিষ্যতের কোনও আশাও রইল না।

    এ-প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—মুর্শিদাবাদ দরবারের প্রভাবশালী একটি বেশ বড় অংশ নবাবের বিরুদ্ধে গেল কেন এবং কেনই বা তারা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলাল? তার মূল কারণ, খামখেয়ালি ও দুঃসাহসী তরুণ সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ায় উপরোক্ত অমাত্যগোষ্ঠী শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই গোষ্ঠীতে ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার, জমিদার ও অভিজাত সেনানায়করাও ছিল। এরাই নবাবি আমলে এতদিন সম্পদ পুঞ্জীভবনে লিপ্ত ছিল। সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর এরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে যে এদের অবিরত সম্পদ আহরণের মূল উৎসগুলি সিরাজ বন্ধ করে দিতে পারেন এবং ফলে এদের বৈভবের পথে তিনি এক মূর্তিমান বাধা।

    ব্যাপারটা একটু বিশদ করে বললে বুঝতে সুবিধে হবে। জগৎশেঠদের বিপুল ঐশ্বর্য নানারকম একচেটিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের ফলে সঞ্চিত হয়েছিল। এগুলি হল, টাঁকশালের প্রায় একচ্ছত্র অধিকার, পুরনো মুদ্রাকে নতুন মুদ্রায় পরিবর্তিত করার একচেটিয়া ব্যবসা, বাট্টা নিয়ে অন্য জায়গার মুদ্রা বিনিময় করা, রাজস্ব আদায়ের অধিকার ইত্যাদি। সিরাজের পূর্ববর্তী বাংলার নবাবরাই এই বিশেষ সুযোগসুবিধেগুলি তাঁদের ব্যক্তিগত দাক্ষিণ্য ও অনুগ্রহ হিসেবে জগৎশেঠদের প্রদান করেছিলেন এবং এগুলির মাধ্যমেই শেঠদের বিপুল সমৃদ্ধি। ঠিক এভাবেই উমিচাঁদ পেয়েছিলেন সোরা, শস্য ও আফিং-এর একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার। আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের লবণ ও সোরার একচেটিয়া ব্যবসাও নবাবের দাক্ষিণ্যে। সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর এইসব বণিকরাজাদের আশঙ্কা হল যে, তাঁরা নবাবদের দাক্ষিণ্যে এতদিন যে-সব সুযোগসুবিধে ভোগ করছিলেন এবং যার জন্য তাঁদের এত সমৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে, সেগুলি থেকে সিরাজ এখন তাঁদের বঞ্চিত করতে পারেন। মীরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লতিফের মতো অভিজাত সেনানায়ক ও ভূস্বামী শ্রেণী, যাঁদের সঙ্গে ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার শ্ৰেণীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তাঁরাও শঙ্কিত হলেন যে, তাঁদের পক্ষে অনুকূল ক্ষমতার যে কায়েমী ব্যবস্থা চলে আসছে তরুণ নবাব তার আমূল পরিবর্তন করতে পারেন। এক কথায় বলতে গেলে, মুর্শিদাবাদ দরবারের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, যার মধ্যে বণিক-ব্যাঙ্কার থেকে জমিদার ও অভিজাত সেনানায়ক পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল, সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের সমৃদ্ধি অক্ষুন্ন ও অব্যাহত রাখার পক্ষে বিপজ্জনক বাধা হতে পারে ভেবে আশঙ্কিত হয়ে পড়ে।

    তাদের আশঙ্কা যে খুব অমূলক নয় এবং তাদের সামনে যে বিপদ তার স্পষ্ট সংকেত পাওয়া গেল মীরবক্সির পদ থেকে মীরজাফরের অপসারণ, রাজা মাণিকচাঁদের কারাদণ্ড এবং সর্বোপরি বাংলা থেকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ হাকিম বেগের বিতাড়নের মধ্যে। একদিকে এই সব ঘটনা এবং অন্যদিকে নতুন ও উদীয়মান একটি গোষ্ঠীর—যার মধ্যে মোহনলাল, মীর মর্দান, খাজা আব্দুল হাদি খান প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং যাঁরা এখনও পর্যন্ত সম্পদ পুঞ্জীভবনে লিপ্ত হয়ে পড়েননি—সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেওয়াললিখন স্পষ্ট দেখতে পেল। হাকিম বেগকে অপসারণ করায় এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সিরাজ নবাব আলিবর্দির একান্ত ঘনিষ্ঠ অমাত্যদের ওপরও আঘাত হানতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না। হাকিম বেগ ছিলেন আলিবর্দির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং মুর্শিদাবাদের পরাক্রমশালী ‘পাচোত্রা দারোগা’ (শুল্ক বিভাগের দারোগা)। তাঁর ক্ষমতার প্রধান উৎস ছিল আলিবর্দির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। নানারকমের জোরজুলুম ও একচেটিয়া ব্যবসা করে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কুখ্যাত হয়ে ওঠেন। এত প্রভাবশালী ও পূর্ববর্তী নবাব আলিবর্দির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এমন একজন অমাত্যকে সিরাজদ্দৌল্লা দেশ থেকে বিতাড়ন করায় দরবারের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

    আবার মীরবক্সির পদ থেকে মীরজাফরের অপসারণের ফলে ওই গোষ্ঠীর মনে নবাবের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহই রইল না। রায়দুর্লভ কোনও মতেই মেনে নিতে পারলেন না যে মোহনলাল তাঁর কাজকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করবেন। অন্যদিকে খাজা আব্দুল হাদি খান মীরজাফরের পদে নিযুক্ত হওয়ায় স্বভাবতই তা তাঁর অসহ্য মনে হয়েছিল। জগৎশেঠ ও অন্য দুই বণিকরাজা উমিচাঁদ ও খোজা ওয়াজিদের আশঙ্কা হল তাদের বিপুল উপার্জনের প্রধান উপায় একচেটিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে এবং যে বিশেষ সুযোগসুবিধেগুলি তাঁরা এতদিন ভোগ করে আসছিলেন সেগুলি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। তরুণ ও বেপরোয়া নবাব সিরাজদ্দৌল্লা থাকলে তাঁদের কায়েমী স্বার্থ ও ক্ষমতার সৌধ বিনষ্ট হয়ে যাবে। সেজন্য সিরাজকে হঠানো দরকার, যাতে তাঁদের সম্পদ পুঞ্জীভবনের উপায়গুলি রুদ্ধ না হয়ে যায়, যাতে মোহনলাল ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে যে নতুন গোষ্ঠীর আবির্ভাব হচ্ছে তাদের হাতে ক্ষমতা চলে না যায়, যাতে নবাবের ঘনিষ্ঠ এই নতুন গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ওপর আঘাত হানতে না পারে।

    তা সত্ত্বেও ইংরেজদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া পলাশির বিপ্লব সম্ভব হত না। সিরাজদ্দৌল্লার উত্থান ইংরেজদের পক্ষেও বিপজ্জনক ছিল, বিশেষ করে, ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের স্বার্থের দিক থেকে, যদিও কোম্পানির দিক থেকে ততটা নয়। তরুণ নবাব কোম্পানির কর্মচারীদের অসদুপায়ে অর্থোপার্জনের যে কল্পতরু— একদিকে বেআইনিভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য অন্যদিকে দস্তকের যথেচ্ছ অপব্যবহার—তার মূল ধরে সজোরে নাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের বিপুল উপার্জনের এই দুটি সহজ পথ থেকে সরে আসতে কোনওমতেই রাজি ছিল না। তার ওপর সিরাজ এ-সব অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুললেন এমন সময় যখন কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য এক নিদারুণ সংকটের সম্মুখীন। তরুণ নবাব ইংরেজদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি আগেকার নবাবদের মতো দস্তকের অপব্যবহার বা কর্মচারীদের বেআইনি ব্যক্তিগত বাণিজ্য কোনওটাই বরদাস্ত করবেন না। এ-সব কর্মচারীরা এশীয় বণিকদের কাছে দস্তক বিক্রি করত যা দেখিয়ে এশীয় বণিকরা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করতে পারত। দস্তক বিক্রি করে কোম্পানির কর্মচারীরা প্রচুর উপার্জন করত। তবে নবাব এটা বন্ধ করে দিতে পারেন বলে তারা খুব একটা ভয় পায়নি—তাদের আরও অনেক বেশি ভয়ের কারণ ছিল নবাব যদি তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। সেটা নিয়েই তারা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। কারণ বাংলায় তাদের ধনোপার্জনের সবচেয়ে বড় উপায় ছিল এই ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য। তাই তাদের কাছেও সিরাজদ্দৌল্লা ছিলেন বিপজ্জনক। ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ও ক্লাউন্সিলের সদস্যসহ কোম্পানির সব কর্মচারীই ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে ধনসম্পদ আহরণের এমন লোভনীয় উপায় বন্ধ করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক ছিল না। সুতরাং তারা সবাই নবাবকে হঠাতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠল।

    অবশ্য ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল যে মুর্শিদাবাদ দরবারের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তাদের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনায় সামিল করতে না পারলে বিপ্লব করা সম্ভব হবে না। এই কারণেই কলকাতা আসার কিছুদিন পরে এবং চন্দননগরের পতনের আগেই ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটির সঙ্গে একযোগে কাশিমবাজারে উইলিয়াম ওয়াটসকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন যথাসাধ্য চেষ্টা করে যান যাতে জগৎশেঠ পরিবার আমাদের স্বার্থের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন।’ তা ছাড়াও নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ সদস্যদের সমর্থন ও সাহায্য পাওয়ার জন্য ইংরেজরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দরবারের অধিকাংশ অমাত্যই ছিল চুপচাপ, সুযোগের সন্ধানে—পলাশিতে ইংরেজ বিজয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা যাকে বলে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, কিছুমাত্রও এগিয়ে আসেনি। খুব সম্ভবত তাদের পরিকল্পনা ছিল, শেষপর্যন্ত যে-দল জিতবে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া অর্থাৎ ইংরেজরা নবাবকে পরাজিত ও বহিস্কৃত করলে একমাত্র তখনই তারা ইংরেজদের স্বাগত জানাবে কারণ নবাব ইংরেজদের মতো তাদেরও স্বার্থের পরিপন্থী। কিন্তু পাছে নবাবের জয় হয় এবং সেক্ষেত্রে তাঁর রোষানলে পড়ার ভয়ে প্রায় কেউই সামনাসামনি ইংরেজদের সমর্থন করতে এগিয়ে আসেনি।

    অন্যদিকে ইংরেজদের পক্ষে নবাবের বিরুদ্ধে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না কারণ এই নবাব রাজত্ব করতে থাকলে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের, যেটা তখন খুবই সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল, পুনরুদ্ধার কোনওমতেই সম্ভব ছিল না। একমাত্র সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে পারলে তা সম্ভব হবে। তাই সিরাজদ্দৌল্লার পর কে নবাব হবে বা কে হলে ভাল হয় তা নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা ছিল না। ভালমন্দ যে কেউ নবাব হলেই চলবে, যদি সে সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। সেইজন্য যখন ইয়ার লতিফকে নবাব পদে প্রার্থী হিসেবে পাওয়া গেল, তার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু না জেনে বা খোঁজখবর না নিয়ে তারা তাঁকে লুফে নিল। এমনকী ক্লাইভ ইয়ার লতিফের প্রার্থীপদ অনুমোদন করলেও লতিফ হিন্দু না মুসলমান, ব্যক্তি হিসেবে ভাল না মন্দ, এ-সব কিছুই জানতেন না। তারপর যখন ইংরেজরা জানল যে মীরজাফর নবাব হতে আগ্রহী তখন সঙ্গে সঙ্গে তারা ইয়ার লতিফকে বাতিল করে তাঁকেই নবাব পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করল। কারণ, মীরজাফর যোগ্যতর ব্যক্তি বলে নয়, তিনি ইয়ার লতিফের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী, নবাবের প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ এবং অনেক বেশি জোরালো প্রার্থী। অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি জগৎশেঠদের খুব কাছের লোক। ইংরেজরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিল যে, জগৎশেঠদের অনুমোদন ছাড়া বাংলায় কোনও বিপ্লব সম্ভব নয় এবং সেজন্যই তাদের ইয়ার লতিফকে ছেড়ে মীরজাফরকে প্রার্থী করতে হল। আবার এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে ইংরেজরা পলাশি বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য শুধু নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ অমাত্যদের ওপর নির্ভর করে বসে ছিল না। সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাতে তারা এতটাই আগ্রহী এবং অস্থির হয়ে পড়েছিল যে, যদি কোনও কারণে মুর্শিদাবাদের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সাহায্যে তারা বিপ্লব সংগঠিত করতে না পারে, তা হলে তারা বাংলা বিজয়ের জন্য মারাঠা অথবা দিল্লির বাদশাহের প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল।

    সুতরাং আমাদের চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, ইংরেজদের এবং মুর্শিদাবাদ দরবারের অমাত্যদের একটা বড় অংশের, উভয়ের স্বার্থেই, সিরাজদ্দৌল্লার সিংহাসনচ্যুতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল এবং সেজন্যই পলাশি বিপ্লব। ইংরেজরাই পলাশি চক্রান্তের মূল উদ্যোক্তা, ষড়যন্ত্রে তাদেরই মুখ্য ভূমিকা। তারাই নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে তাদের পরিকল্পিত বিপ্লবের ষড়যন্ত্রে টেনে আনে এবং এভাবে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটায়। সেই পতনে শেষপর্যন্ত কারা এবং কী পরিমাণ লাভবান হয়েছিল ভারতবর্ষের পরবর্তী দু’শো বছরের ইতিহাস তার সাক্ষী।

  • নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

    নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

    নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি
    ORIGINAL SOURCES (মূল সূত্র)

    A. MANUSCRIPT SOURCES (পাণ্ডুলিপি)

    1. India Office Records, British Library, London
      • Bengal Public Consultations
      • Bengal Letters Received
      • Bengal Secret and Military Consultations
      • Coast and Bay Abstracts
      • Despatch Books
      • European Manuscripts
      • Factory Records
      • Home Miscellaneous Series
      • Mayor Court’s Records, Calcutta
      • Original Correspondence
      • Orme Manuscripts
    2. ALGEMEEN RIJKSARCHIEF, THE HAGUE, NETHERLANDS
      • Verenigde Oostindische Compagnie (VOC)
      • Overgekomen brieven en papiers and Inkomend briefbook, 1720-57 (Select Volumes)
      • Hoge Rgering van Batavia, 246 (Taillefert’s ‘Memorie’, 17 Nov. 1763)
    3. Stadsarchief Antwerpen, Antwerp, Belgium
      • General Indische Compagnie (The Ostend Company), 5768

    B. PRINTED SOURCES (মুদ্রিত আকরগ্রন্থ)

    1. PERSIAN WORKS (ফারসি গ্রন্থ)
      • Gholam Hossein Khan, Seir Mutagherin, vol. II, trans. Haji Mustafa, Second Reprint, Lahore, 1975.
      • Gulam Husain Salim, Riyaz-us-Salatin, trans. Maulavi Abdus Salam, Calcutta, 1904.
      • Karam Ali, Muzaffarnamah, in J. N. Sarkar, Bengal Nawabs, Calcutta, 1952.
      • Salimullah, Tarikh-i-Bangala, trans. Gladwin, Calcutta, 1788.
      • Yusuf Ali Khan, Tarikh-i-Bangala-i-Mahabatjangi, trans. Abdus Subhan, Calcutta, 1982.
    2. WORKS IN EUROPEAN LANGUAGES (ইউরোপীয় ভাষায় লেখা গ্রন্থ)
      • (A) Published sources
        • Datta, K. K., ed., Fort William—India House Correspondence, vol. I (1748-56), Delhi, 1956.
        • Firminger, W. K., ed., The Fifth Report from the Select Committee of the House of Commons of the Affairs of the East India Company, 1812, 3 vols., Calcutta, 1917-18.
        • —, Historical Introduction to the Fifth Report, Calcutta, 1917.
        • Hill, S.C., Bengal in 1756-57, 3 vols., London, 1905.
        • Martin, Francois, Memories de Francois Martin, 1665-1696, ed., A. Martineau, Paris, 1931.
        • Records of Fort St. George: Diary and Military Consultations, Madras, 1912-25.
        • Sinha, N. K., ed., Fort William—India House Correspondence, vol. V (1767-9), Calcutta, 1959.
        • Wilson, C. R., ed., The Early Annals of the English in Bengal, 3 vols., London, 1895-1917.
        • Yule, H., ed., The Diary of William Hedges, 3 vols., London, 1887-9.
        • Van Dam, Pieter, Beschrijvinge vande Oost-Indische Compagnie, ed., F.W. Stapel & others, 4 books in 7 parts, The Hague, 1927-54.
      • (B) Travellers’ Account, Memoirss. etc. (পর্য্যটকদের বিবরণ, স্মৃতিকথা ইত্যাদি)
        • Bernier, F., Travels in the Mogul Empire, 1656-1658, ed. A. Constable, Oxford, 1934.
        • Bolts, William, Considerations on Indian Affairs, London, 1772.
        • Bowrey, Thomas, A Geographical Account of Countries Round the Bay of Bengal, 1669-1679, ed., R.C. Temple, Cambridge, 1905.
        • Dow, Alexander, History of Hindostan, vol. III, London, 1770.
        • Orme, Robert, Historical Fragments of the Mogul Empire, London, 1805.
        • —, History of the Military Transactions of the British Nation in Indostan, 3 vols., London, 1803.
        • Scrafton, Luke, Reflections on the Government of Indostan, London, 1763.
        • Stavorinus, J. S., Voyage in the East Indies, trans. S. H. Wilcoke, 3 vols., London, 1798.
        • Tavernier, Jean-Baptiste, Travels in India, 1640-1667, trans. V. Ball, London, 1889.
        • Vansittart, H., A Narrative of the Transactions in Bengal from 1760-1764, London, 1766.
        • Verelst, H., A View of the Rise, Progress and Present State of the English Government in Bengal, London, 1772.
        • Watts, William, Memoirs of the Revolution in Bengal, London, 1760.
      • (C) Secondary works (প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ)
        • (১) বাংলা
          • আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, ঢাকা, ১৯৭৭।
          • অক্ষয়কুমার মৈত্র, সিরাজদৌল্লা, কলিকাতা, ১৮৯৮।
          • কমল বন্দ্যোপাধ্যায়, মুর্শিদাবাদ থেকে বলছি, ১ম খণ্ড, কলিকাতা, ১৩৮০।
          • তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়, পলাশীর যুদ্ধ, কলিকাতা, ১৯৫৩
          • নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, কলিকাতা, ১৯০২।
          • —, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, কলিকাতা, ১৯০৩।
          • —, জগৎশেঠ, কলিকাতা, ১৯১২।
          • প্রতিভারঞ্জন মৈত্র, মুর্শিদাবাদ চর্চা, কলিকাতা, ১৩৮০।
          • ভারতচন্দ্র, সত্যপীরের কথা, ভারতচন্দ্র গ্রন্থাবলী, কলিকাতা, ১৯৬৩।
          • সোমেন্দ্রলাল রায়, মুর্শিদাবাদের কথা ও কাহিনী, কলিকাতা, ১৯৬০।
          • শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, সিরাজদ্দৌল্লা, কলিকাতা, ১৯৪২।
          • শ্রীপারাবাত, মুর্শিদকুলী খাঁ, কলিকাতা, ১৯৯০।
        • (২) ইংরেজি
          • Arasaratnam, S., Merchants, Companies and Commerce on the Coromandel Coast, 1650-1740, New Delhi, 1986.
          • —, ‘The Indian Merchants and their Trading Methods’, Indian Economic and Social History Review, 3 (1966), 85-95.
          • Bagchi, A. K., The Political Economy of Underdevelopment, Cambridge, 1982.
          • —, ‘Reflections on Pattems of Regional Growth in India during the Period of British Rule’, Bengal Past and Present, XCV, 1976.
          • Bayly, C. A., The Imperial Meridian: The British Empire and the World, 1780-1830, London, 1988.
          • —, Indian Society and the Making of the British Empire, Cambridge, 1987.
          • Bayly, C.A., and Sanjay Subrahmanyam, ‘Portfolio Capitalists and the Political Economy of Early Modern India’, Indian Economic and Social History Review, 25, 4 (1988), 403-24.
          • Bence-Jones, M., Clive of India, London, 1974.
          • Bhadra, Gautam, ‘The Role of Pykars in the Silk Industry of Bengal, 1765- 1830’, Studies in History, 3, no. 2 (1987), 137-85; 4, nos. 1 & 2 (1988), 1-35.
          • Bhattacharya, S., The East India Company and the Economy of Bengal from 1704 to 1740, London, 1954.
          • Boxer, C. R., The Dutch Seaborne Empire, New York, 1965.
          • Bruijn, J. R., F. S. Gaastra and I. Schoffer, Dutch-Asiatic Shipping, 3 vols., The Hague, 1979-87.
          • Calkins, P. B. ‘The Formation of a Regionally Oriented Ruling Group in Bengal, 1700-1740’, Journal of Asian Studies, vol. XXIX, no. 4 (August 1970), 799-806.
          • —, ‘The Role of Murshidabad as a Regional and Sub-Regional Centre in Bengal, in R. L. Park, ed., Urban Bengal, East Lansing, 1969.
          • Chandra, Satish, ed., The Indian Ocean: Explorations in History, Commerce and Politics, New Delhi, 1985.
          • Chatterjee, Kumkum, Merchants, Politics and Society in Early Modern India, Bihar: 1733-1820, Leiden, 1996.
          • —, ‘Trade and Durbar Politics in the Bengal Subah, 1733-1757’, Modern Asian Studies, 26 (1992), 233-73.
          • Chatterjee, Tapan Mohan, The Road to Plassey, Bombay, 1960.
          • Chaudhuri, K, N., Asia before Europe, Cambridge, 1990.
          • —, Trade and Civilization in the Indian Ocean: An Economic History from the Rise of Islam to 1750, Cambridge, 1985.
          • —, The Trading World of Asia and the English East India Company, Cambridge, 1978.
          • —, ‘India’s International Economy in the Nineteenth Century’, Modern Asian Studies, II (1968).
          • —, ‘The Structure of the Indian Textile Industry in the Seventeenth and Eighteenth Centuries’, Indian Economic and Social History Review, XI (June-Sept. 1974), 127-82.
          • Chaudhury, Sushil, and Michel Morineau, eds., Merchants, Companies and Trade: Europe and Asia in Early Modern Era, Cambridge, 1999.
          • Chaudhury, Sushil, ‘Trading Networks of a Traditional Diaspora, Armenians in Indian Trade’, paper presented at the XIII International Economic History Congress, Buones Aires, Argentina, July 2002 and now being published.
          • —, ‘Armenians in Bengal Trade, circa. mid-Eighteenth Century’, paper presented at the International Seminar on ‘Armenians in Asian Trade, 16th-18th Century’, Paris, October 1998. Now being published by MSH, Paris.
          • —, ‘The Inflow of Silver to Bengal in the Global Perspective, c. 1650- 1757’, paper presented at the XIIth International Economic History Congress, Madrid, August 1998, Session B-6, ‘Monetary History in Global Perspective, 1500-1808’, and now published in Global Connections and Monetary History, ed., Flynn, et al, Ashgate, 2003.
          • —, ‘Was there a Crisis in Mid-Eighteenth Century Bengal?’, in Rethinking Early Modern India, ed., Richard B. Barnett, New Delhi, 2002.
          • —, The Prelude to Empire: Plassey Revolution of 1757, New Delhi, 2000.
          • —, From Prosperity to Decline: Bengal in the Eighteenth Century, New Delhi, 1995.
          • —, ‘International Trade in Bengal Silk and the Comparative Role of Asians and Europeans, circa. 1700-1757’, Modern Asian Studies, 29, 2 (1995), 373-86.
          • —, ‘European Companies and Bengal Textile Industry in the Eighteenth Century: The Pitfalls of Applying Quantitative Techniques’, Modern Asian Studies, 27, 2 (May 1993), 321-40.
          • —, ‘Sirajuddaula and the Battle of Plassey’, History of Bangladesh, vol. 1, Dhaka, 1992, 93-130.
          • —, ‘Trade, Conquest and Bullion: Bengal in the mid-Eighteenth Century’, Itinerario, vol. 15, no. 2 (1991), 21-32.
          • —, ‘Khwaja Wazid in Bengal Trade and Politics, Indian Historical Review, vol. XVI. nos. 1-2, 137-48.
          • —, ‘The Imperatives of Empire—Private Trade, Sub-Imperialism and the British Attack on Chandernagore, March 1757’, Studies in History, vol. VIII, no. 1 (Jan.-June 1992), 1-12.
          • —, ‘General Economic Conditions in Nawabi Bengal, 1690-1757’, History of Bangladesh, vol. 2, Dhaka, 1992, 30-66.
          • —, ‘European Trading Companies and Bengal’s Export Trade, 1690-1757’, History of Bangladesh, vol. 2, Dhaka, 1992, 183-224.
          • —, ‘Continuity or Change in the Eighteenth Century? Price Trends in Bengal, circa, 1720-1757’, Calcutta Historical Journal, vol. XV., nos. 1-2 (July 1990-June 1991), 1-27.
          • —, ‘Sirajuddaullah, English Company and the Plassey Conspiracy—A Reappraisal’, Indian Historical Review, vol. XXIII, nos. 1-2 (July 1986-Jan. 1987), 111-34.
          • —, ‘Merchants, Companies and Rulers: Bengal in the Eighteenth Century’, Journal of the Economic and Social History of the Orient, vol. XXXI (Feb. 1988), 74-109.
          • —, Trade and Commercial Organization in Bengal, 1650-1720, Calcutta, 1975.
          • —, ‘The Rise and Decline of Hughli-A Port in Medieval Bengal’, Bengal Past & Present, (Jan.-June 1967), 33-67.
          • Chicherov, A. I. India: Economic Development, Moscow, 1971.
          • Colebrook, H. T., Remarks on the Husbandry and Commerce of Bengal, Calcutta, 1804.
          • Curley, David, ‘Fair Grain Markets and Mughal Famine Policy in Eighteenth Century Bengal, Calcutta Historical Journal, 2 (1977), 1-26. Das Gupta, Ashin, Merchants of Maritime India, Varorium, 1994.
          • —, Indian Merchants and the Decline of Surat, c. 1700-1750, Wiesbaden, 1979.
          • —, ‘Trade and Politics in 18th Century India’, in D. S. Richards, ed., Islam and the Trade of Asia, Oxford, 1967.
          • —, and M.N. Pearson, eds., India and the Indian Ocean, 1500-1800, Calcutta, 1987.
          • Datta, K.K., Alivardi and His Times, 2nd edn., Calcutta, 1963.
          • —, Survey of India’s Social Life and Economic Conditions in the Eighteenth Century, 1707-1813, Calcutta, 1961.
          • —, Studies in the History of Bengal Suba, 1740-1760, Calcutta, 1936.
          • Dimock, Edward C. Jr., ‘Hinduism and Islam in Medieval Bengal’, in Rachel van M. Baumer, ed., Aspects of Bengali History and Society, Honolulu, 1975.
          • Eaton, Richard M., The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760, Delhi, 1994.
          • Edwardes, Michael, The Battle of Plassey and the Conquest of Bengal, London, 1963.
          • —, Plassey: The Founding of an Empire, London, 1969.
          • Feldbaeck, Ole, ‘Cloth Production and Trade in Late Eighteenth Century Bengal’, Bengal Past & Present, vol. LXXXVI (July-Dec. 1967), 124-41.
          • Foster, William, ‘Gabriel Boughton and the Trading Privileges in Bengal’, Indian Antiquary, 40 (1911).
          • Furber, Holden, Rival Empires of Trade in the Orient, 1600-1800, Minneapolis and Oxford, 1976.
          • —, ‘Asia and West as Partners before “Empire” and After’, Journal of Asian Studies, 28 (1969).
          • — John Company at Work, Cambridge, 1961.
          • —, Bombay Presidency in the mid-Eighteenth Century, Bombay, 1965.
          • urber, Holden, and Kristof Glamann, ‘Plassey: A New Account from the Danish Archives’, Journal of Asian Studies, vol. XIX, no. 2 (February 1960).
          • Gaastra, F.S., ‘The Dutch East India Company and its Intra-Asian Trade in Precious Metals’, in W. Fischer, R.M. McInnis and J. Schneider, eds., The Emergence of a World Economy, pt. I, 1500-1800, Wiesbaden, 1986, 97-112.
          • Ghoshal, H. R., Economic Transition in the Bengal Presidency, 1793-1833, Patna, 1950.
          • Glamann, Kristof, Dutch Asiatic Trade, 1620-1740, Copenhagen, The Hague, 1958.
          • —, ‘Bengal and the World Trade about 1700’, Bengal Past & Present, vol. LXXVI, no. 142 (1957), 30-9.
          • Gupta, Brijen K., Sirajuddaullah and the East India Company, 1756-57, Leiden, 1962.
          • Habib, Irfan, ‘Merchant Communities in Pre-Colonial India, ‘ in J. D. Tracy, ed., The Rise of Merchant Empires: Long Distance Trade in the Early Modern Period, 1350-1750, Cambridge, 1990, 371-99.
          • —, ‘Studying a Colonial Economy—Without Perceiving Colonialism’, Modern Asian Studies, 19, 3 (1985), 355-81.
          • —, ‘The Technology and Economy of Mughal India’, Indian Economic and Social History Review, vol. XXVII, no. 1 (Jan.-March 1980), 1-34.
          • —, ‘Changes in Technology in Mughal India’, Studies in History, II, 1, 15 39.
          • —, Potentialities of Capitalistic Development in the Economy of Mughal India’, Journal of Economic History, 29 (March 1969).
          • —, The Agrarian System of Mughal India, Bombay, 1963.
          • Hill, S.C., Three Frenchmen in Bengal, London, 1905.
          • Hossain, Hameeda, The Company Weavers of Bengal, Delhi, 1988.
          • Irwin, J. and P. R. Schwartz, Studies in Indo-European Textile History, Ahmedabad, 1966.
          • Karim, Abdul, Murshid Quli and His Times, Dacca, 1963.
          • Khan, A. M., The Transition in Bengal, Cambridge, 1969.
          • Krishna, Bal, Commercial Relations between India and England, London, 1924.
          • Kumar, Dharma, ed., The Cambridge Economic History of India, vol. 2.
          • Little, J. H., The House of Jagat Seths, Calcutta, 1956.
          • Marshall, P. J., Bengal—The British Bridgehead, Cambridge, 1987.
          • —, East Indian Fortunes, Oxford, 1976.
          • —, ‘Private British Investment in Eighteenth Century Bengal, Bengal Past & Present, 86 (1967), 52-67.
          • Mclane, John, R., Land and Local Kingship in Eighteenth Century Bengal, Cambridge, 1993.
          • Meilink-Roelofz, M. A. P., Asian Trade Revolution and European Influence in the Indonesian Archipelago between 1500 to about 1630, The Hague, 1962.
          • Mitra, D. B., The Cotton Weavers of Bengal, Calcutta, 1978.
          • Mohsin, K. M., A Bengal District in Transition: Murshidabad, Dacca, 1973.
          • Moosvi, Shireen, The Economy of Mughal Empire, Delhi, 1987.
          • —,’The Silver Influx, Money Supply, Prices and Revenue Extraction in Mughal India’, Journal of the Economic and Social History of the Orient, XXX (1988), 47-94.
          • Nichol, J. D., ‘The British in India, 1740-63: A Study of Imperial Expansion into Bengal’, unpublished Ph. D. thesis, University of Cambridge, 1976.
          • Pearson, M. N., Merchants and Rulers in Gujarat, Berkeley and Los Angeles, 1976.
          • Perlin, Frank, ‘Proto-Industrialization and Pre-Colonial South Asia’, Past and Present, 98 (1983), 30-95.
          • —, ‘Pre-Colonial South Asia and Western Penetration in the Seventeenthto Nineteenth centuries: A Problem of Epistemological Status’, Review, 4(1980).
          • Prakash, Om, The European Commercial Enterprise in Pre-Colonial India, Cambridge, 1998.
          • —, ‘On Estimating the Employment Implications of European Trade for Eighteenth Century Bengal Textile Industry-A Reply’, Modern Asian Studies, 27, 2 (1993), 341-56.
          • — The Dutch East India Company and the Economy of Bengal, Princeton, 1985.
          • —, ‘Asian Trade and European Impact: A Study of the Trade from Bengal, 1630-1729’, in Blair Kling and M. N. Pearson, eds., The Age of Partnership: Europeans in Asia before Dominion, Honolulu, 1979.
          • —, ‘Bullion for Goods: International Trade in the Economy of Early Eighteenth Century Bengal’, Indian Economic and Social History Review, XIII (1976), 159-87.
          • Ray, Indrani, ‘Dupleix’s Private Trade in Chandernagore’, Indian Historical Review, I (1974), 279-94.
          • —, ‘The French Company and the Merchants of Bengal, 1680-1730’, Indian Economic and Social History Review, 7 (1970).
          • Ray, Rajat Kanta, ‘Colonial Penetration and Initial Resistance: The Mughal Ruling Class, the English East India Company and the Struggle for Bengal’, Indian Historical Review, 12 (July 1985-Jan. 1986). 1-105.
          • Raychaudhuri, T. and Irfan Habib, eds., The Cambridge Economic History of India, vol. 1, Cambridge, 1982.
          • Richards, J. F., Precious Metals in Late Medieval and Early Modern Worlds, Durham, 1983.
          • —, ‘Mughal State Finance and the Pre-Modern World Economy’, Comparative Studies in Society and History, 23 (1981).
          • Sarkar, J. N., ed., History of Bengal, vol. II, Dhaka, 1948.
          • —, trans. and ed., Bengal Nawabs, Calcutta, 1952.
          • Saxe, Elizabeth Lee, ‘Fortune’s Tangled Web: Trading Networks of English Enterprises in Eastern India, 1657-1717’, unpublished Ph.D. Dissertation, Yale University, 1979.
          • Seth, M. J., Armenians in India from Earliest Times to the Present Day, Reprint, Calcutta, 1973.
          • Sinha, N. K., The Economic History of Bengal, 3 vols., Calcutta, 1958-65.
          • —, ed., History of Bengal, 1757-1905, Calcutta, 1967.
          • Steensgaard, Niels, ‘Asian Trade and World Economy from the 15th to the 18th Centuries’, in T. R. de Souza, ed., Indo-Portuguese History, New Delhi, 1984.
          • —, The Asian Trade Revolution of the Seventeenth Century, Chicago, 1974.
          • Subrahmanyam, Sanjay, The Portugese Empire in Asia, London, 1992.
          • —, The Political Economy of Commerce: Southern India, 1500-1650, Cambridge, 1990.
          • Taylor, J., A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca, Calcutta, 1840.
          • Thompson, Virginia M., Dupleix and His Letters, 1742-54, New York, 1933.
          • Tracy, J.D., ed., The Rise of Merchant Empires, Cambridge, 1990.
          • Van Leur, J. C., Indonesian Trade and Society, The Hague, 1955.
          • Van Santen, H. W., De Verenigde Oost-Indische Compagnie in Gujarat en Hindusthan, 1620-60, Leiden, 1982.
          • Wallerstein, Immanuel, The Modern World System, II: Mercantilism and the Consolidation of the World Economy, 1600-1750, New York, London, 1980.
          • Wink, Andre, ‘Al-Hind: India and Indonesia in the Islamic World- Economy, c. 700-1800’, in Itinerario, Special Issue, The Ancient Regime in India and Indonesia, 1988, 33-72.
  • নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    বাংলার ইতিহাস তথা উপমহাদেশের ইতিহাসকে জানতে চাইলে মুর্শিদাবাদকে বাদ তো দেয়া যাবেই না, বরং এ শহরটার গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। এ শহরের পরাজয় দিয়ে বাংলা তথা ভারতবর্ষে শুরু হয়েছিল ইংরেজদের শাসন।

    মুর্শিদাবাদ নগরী। এক করুণ-রঙিন ইতিহাস লগ্ন হয়ে আছে সে নগরীর পরতে পরতে। নবাব মুর্শিদকুলি খান ১৭০৪ সালে এই নগরীর পত্তন করেন। সে হিসেবে ২০০৪ সালে মুর্শিদাবাদের তিনশো বছর পূর্ণ হল। এ উপলক্ষেই বর্তমান গ্রন্থের অবতারণা। মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত বেশির ভাগ প্রামাণিক গ্ৰন্থই একশো বছর বা তার আগে লেখা। গত কয়েক দশকেও এই নগরী নিয়ে বেশ কিছু বই ও কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার সবগুলিতেই মুর্শিদাবাদের খণ্ড খণ্ড চিত্র, সামগ্রিক চিত্র ঠিক কোথাও পাওয়া যায় না।

    মুর্শিদাবাদের তিনশো বছর পূর্তি উপলক্ষে এর ইতিহাসের প্রতি, বিশেষ করে স্বাধীন নবাবি আমলে এই শহরের প্রসঙ্গে, নতুন ভাবে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন আছে। লেখক প্ৰায় চার দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে যে-সব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের এই সার্বিক ইতিহাস রচনা করেছেন। লেখক এই সত্যের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, নবাবি আমলই মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ। মুর্শিদাবাদে তিন বণিকরাজার কার্যকলাপ, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব কেন হল, তার সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যা, এ নগরীর বেগমদের সম্বন্ধে আকর্ষণীয় বিবরণ এবং মুর্শিদাবাদের শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের আকরভিত্তিক বিশ্লেষণ গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণ।

    এ শহর, সিরাজ-উদ-দৌলা, মীরজাফর, জগৎশেঠ ইত্যাদি অনেককে নিয়ে অনেক তথ্য অনেক গুজব আছে। এমনকি এমন কিছু বইও আছে যেখানে লেখা আছে, ইংরেজরা আসলে বাংলা দখল করতে চায়নি। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে না চাইতেও সেটা হয়ে গেছে। এ বইতে অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী সেসব গুজবকে অসংখ্য রেফারেন্স দিয়ে নাকচ তো করেছেনই সঙ্গে ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, মুর্শিদাবাদের উত্থান ইত্যাদি নানা দৃষ্টিকোণ দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

    অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী বাংলার স্বাধীন নবাবি আমলের রাজধানী মুর্শিদাবাদের রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন। যে রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ পুরো ভারতবর্ষের ইতিহাসের বাঁক বদলে দিয়েছিল।

    আওরঙ্গজেব তাঁর বিশ্বস্ত দেওয়ান করতলব খাঁকে হায়দরাবাদের দেওয়ানের পদ থেকে নিয়ে এসে বাংলা সুবার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন। তখন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর এবং সুবাদার সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-শান। রাজস্বসহ আরও নানা ইস্যুতে আজিমের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় করতলব খাঁর। বলা হয়, করতলব খাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আজিম-উস-শান। চৌকস করতলব খাঁ সম্রাটের প্রিয়ভাজন ছিলেন। কারণ দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে বিধ্বস্ত আওরঙ্গজেবের তখন পয়সার প্রধান উৎস বাংলা সুবা। সেই বাংলা থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাঠান করতলব খাঁ।

    বুদ্ধিমান করতলব খাঁ রাজস্ব বিভাগ ও কর্মচারীদের নিয়ে মকসুদাবাদে চলে এলেন। ইতোমধ্যে সম্রাট খুশি হয়ে করতলব খাঁকে মুর্শিদকুলি খান উপাধি দিয়েছেন। বাদশাহের অনুমতিক্রমে মখসুদাবাদের নামকরণ করলেন করলেন মুর্শিদাবাদ। ১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী হয়ে গেল মুর্শিদকুলির মুর্শিদাবাদ।

    মুর্শিদকুলি খানের উত্থানের কাহিনি বিস্ময়কর। তিনি জন্মেছিলেন হিন্দু বামুনের ঘরে। ছোটবেলায় ক্রীতদাস হিসেবে তাকে কিনে নেন একজন ইরানি ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ী রাজস্বব্যবস্থা ভালো বুঝতেন। আবারও, হাতবদল হয় মুর্শিদকুলির মালিকানা। এবার একজন ফারসি অভিজাতের অধীনস্থ হন তিনি। আরও ভাল ভাবে শেখার সুযোগ হয় খাজনা আদায়ের কাজকর্ম। এভাবেই রাজস্ব বিভাগে দক্ষতা অর্জন করেন মুর্শিদকুলি। যা পরবর্তীতে তার জীবনে চরম সৌভাগ্য বয়ে এনেছিল।

    মুর্শিদকুলি বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি জানতেন দিল্লির বাদশাকে নজরানা দিয়ে তুষ্ট করলেই চলবে। তিনি রাজস্বব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তার আমলে বাংলার বড় বড় পদ-পদবিধারী প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু। মুর্শিদকুলি মনে করতেন রাজস্ব আদায়ে মুসলমান কর্মীরা ফাঁকি দিতে পারে। তাই তিনি হিন্দুদের নিযুক্ত করেছিলেন। তার আমলে বাংলার উনিশটি বৃহৎ জমিদারির আঠারোটি ছিল হিন্দু জমিদারদের। অর্থাৎ, বাংলায় ধনাঢ্য মানুষ বেশির ভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল। তাহলে মুসলমানদের আর্থিক দুরবস্থার জন্য ব্রিটিশরা কতখানি দায়ি তা নিয়ে আরও আলাপ-আলোচনা হতে পারে। কারণ নবাবি আমলেই দেখা যাচ্ছে, ধন-সম্পদের মালিকানায় হিন্দু সম্প্রদায় এগিয়ে।

    মুর্শিদকুলি জাহাঙ্গীরনগর থেকে মুর্শিদাবাদে চলে আসার সময় সেখানকার কিছু সম্পদশালী বণিক পরিবারকে নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল জগৎশেঠ (এটি কোনো নাম নয়, উপাধি)। রাজস্থানের এই পরিবারটি সরকারের তথা নবাব মুর্শিদকুলির পৃষ্ঠপোষকতায় লাখ লাখ টাকা উপার্জনের সুযোগ পায়। একজন ইংরেজি ব্যবসায়ী উল্লেখ করেছেন, সেই আমলে জগৎশেঠের বার্ষিক আয় ছিল ৫৬ লাখ টাকা! পুরো উত্তর ভারতের আর্থ-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক এই পরিবারটি প্রয়োজনে বাংলার নবাবসহ দিল্লির বাদশাকে টাকা ধার দিত এবং বাংলা সরকারের টাকশালের দায়িত্বে ছিল।

    উঁমিচাদ আরও একজন ধনবান ব্যবসায়ী। ঐতিহাসিকরা এদের মার্চেন্ট কিং বা বণিক রাজা বলে অভিহিত করেছেন। এরা ব্যবসায়ী হলেও রাজার মতো জীবনযাপন করতেন। পরোক্ষভাবে সুবা এরাই পরিচালনা করতেন। যে-কোন সিদ্ধান্ত যা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতিকূলে যেতে পারে, এমন কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বাংলার কোন নবাবের ছিল না। মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত সকল নবাব এই বণিক রাজাদের তোয়াজ করে চলতেন। কিন্তু প্রথমবারের মত এসব বণিকরাজকে বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নিতে অস্বীকার করেন তরুণ নবাব সিরাজ।

    সিরাজউদ্দৌলা নবাব হওয়ার পর ইংরেজরা প্রথামাফিক নজরানা পাঠায়নি। যখন তিনি যুবরাজ, একবার কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠি পরিদর্শনে গেলে তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেখায়নি কোম্পানির কর্তারা। উপরন্তু, সম্রাট ফররুখশিয়ারের দেওয়া বিনা শুল্কে ব্যবসা করার ফরমানের অপব্যবহার করে ইংরেজরা কর ফাঁকি দিচ্ছিল এবং আলিবর্দির জীবদ্দশায় তারা দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করে। যা ছিল নিষিদ্ধ। মোটকথা, কিছু সমস্যা আলিবর্দির আমলেই তৈরি হয়েছিল। যা তিনি সমাধান করেননি বা করতে চাননি। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়েই সিরাজ কোম্পানিকে নিজের দুশমনে পরিণত করে।

    সিরাজকে একদল ঐতিহাসিক চূড়ান্ত মন্দ লোক হিসেবে দেখাতে চান। বুঝাতে চান তরুণ সিরাজ ছিল অপরিপক্ব ও অযোগ্য। কিন্তু সুশীল চৌধুরী দেখিয়েছেন সিরাজ যথেষ্ট বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি বুঝতেন কোম্পানিকে শায়েস্তা করতে ব্যর্থ হলে কোম্পানি তাকে শায়েস্তা করবে। মির জাফরকে বিশেষ ভরসা তিনি করতেন না। তাই দেখতে পাই পলাশির প্রান্তরে মীর মদনের মৃত্যু হলে বাধ্য হয়ে তিনি মীর জাফরের পায়ের সাথে নিজের মুকুট রেখে তার সাহায্য চান। অনভিজ্ঞতাই হয়তো সিরাজের কাল হয়েছে।

    বহিঃস্থ শত্রু চিহ্নিত করতে সফল সিরাজ ব্যর্থ হন ঘরের শত্রু যেমন– বড় খালা ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ ও জগৎশেঠের ষড়যন্ত্র বুঝতে। এমনকি ফরাসিদের সাথে মিত্রতার সর্বোচ্চ ফায়দা তুলতে সিরাজের ব্যর্থতা তার পরাজয় ত্বরান্বিত করেছে।

    মুর্শিদাবাদের বেগমদের নিয়ে লিখেছেন সুশীল চৌধুরী। তখনকার রাজনীতিতে নারীদের বুদ্ধি কীভাবে বাংলার ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল তার কিছু বর্ণনা পেয়েছি। বিশেষত, মীর জাফরের মুন্নি বেগম তো অতুলনীয়, যাকে ক্লাইভের মতো ব্যক্তি ‘মা’ উল্লেখ করে চিঠি লিখেছিল!

    উৎসর্গ

    আমার ছোটভাই

    অকালপ্রয়াত সলিলকান্তি চৌধুরীর

    স্মৃতির উদ্দেশে

    ঋণ স্বীকার

    এই বই লেখার ব্যাপারে আমার স্ত্রী, মহাশ্বেতা, আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্য ছাড়া এটা লেখা সম্ভব হত না। বহরমপুরের ‘ইতিহাস পরিক্রমা’ মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত অনেকগুলি ছবি দিয়ে কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। অধ্যাপক গৌতম ভদ্র কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। এ বইয়ের জন্য ন্যাশন্যাল লাইব্রেরি ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়্যালের কর্তৃপক্ষ কিছু ছবি ব্যবহার করবার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। শ্রীমতী সুস্মিতা দুধোরিয়া কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে আমাকে সাহায্য করায় উপকৃত হয়েছি। এই বইয়ের ব্যাপারে শ্রী শ্রীরাম সিং এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে আমার অনেক উপকার করেছেন। আনন্দ পাবলিশার্স অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বইটি প্রকাশনার ব্যবস্থা করায় আমি কৃতজ্ঞ।

    সংকেত সূচি

    BPC Bengal Public Consultations
    Beng. Letters Recd. Bengal Letters Received
    C & B Abstr. Coast and Bay Abstracts
    DB Despatch Books
    Fact. Record Factory Records
    FWIHC Fort William-India House Correspondence
    HB Hughli to Batavia
    Home Misc. Home Miscellaneous
    HR Hoge Regering van Batavia
    OC Original Correspondence
    Orme Mss. Orme Manuscripts
    Mss. Eur. European Manuscripts
    NAI National Archives of India
    VOC Verenigde Oost-Indische Compagnie
    Journals
    BPP Bengal Past and Present
    CHJ Calcutta Historical Journal
    IESHR Indian Economic and Social History Review
    IHR Indian Historical Review
    JAS Journal of Asian Studies
    J. As. S Journal of Asiatic Society
    JEH Journal of Economic History
    JESHO Journal of the Economic and Social History of the Orient
    MAS Modern Asian Studies
  • প্রথম অধ্যায় : ভূমিকা

    প্রথম অধ্যায় : ভূমিকা

    প্রথম অধ্যায় : ভূমিকা

    এ বছর, ২০০৪ সালে মুর্শিদাবাদ তিনশ’ বছরে পদার্পণ করল। ১৭০৪ সালে মুর্শিদকুলি খান মুর্শিদাবাদ শহরের পত্তন করেন। সে অনুযায়ী এ বছরই মুর্শিদাবাদের তিনশ’ বছর। এ উপলক্ষেই এই গ্রন্থের অবতারণা। সাধারণভাবে একটি শহর বা নগরের কোনও প্রতিষ্ঠাতা থাকে না, স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই শহর বা নগরের উৎপত্তি হয়। এর ব্যতিক্রম হাতে গোনা যায়। যেমন সেন্ট পিটারের প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহর। মুর্শিদাবাদও এই ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে। এতদিন আমরা জানতাম, জোব চার্ণকই কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৬৯০-র ২৪ আগস্ট তিনিই এই শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। তাই বহুদিন ধরে এই দিনটি কলকাতার জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। ১৯৯০ সালে বেশ সাড়ম্বরে কলকাতার তিনশ’ বছর পূর্তি উৎসবও হয়ে গেল। কিন্তু অতি সম্প্রতি মহামান্য কলকাতা হাইকোর্ট দ্বারা নিযুক্ত পাঁচজন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক সহমত হয়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, জোব চার্ণককে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা বলা যায় না, ২৪ আগস্টও কলকাতার জন্মদিন নয়। তবে মুর্শিদাবাদ প্রসঙ্গে এ ধরনের প্রশ্ন ওঠার কোনও অবকাশ নেই কারণ মুর্শিদকুলি খান যে ১৭০৪ সালে মুর্শিদাবাদ শহরের পত্তন করেন সে বিষয়ে যথেষ্ট প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায়।

    মুর্শিদাবাদ ও এই অঞ্চল নিয়ে অনেক বইই লেখা হয়েছে। তবে তার মধ্যে বেশ কিছু ভাল বই প্রায় একশ’ বছর বা তারও আগে লেখা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: নিখিলনাথ রায় মুর্শিদাবাদ কাহিনী (১৮৯৭), মুর্শিদাবাদের ইতিহাস (১৯০২), জগৎশেঠ (১৯০৫); J. H. T. Walsh, A History of Murshidabad District (1902); P. C. Majumdar, The Musnud of Murshidabad (1905); A. C. Campbell, Glimpses of Bengal (1907) ইত্যাদি। গত কয়েক দশকেও মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে: B. N. Banerjee, Begams of Bengal; K. K. Datta, Alivardi and His Times; Abdul Karim, Murshid Quli and His Times; J. H. Little, The House of Jagat Seths; K. M. Mohsin, A Bengal District in Transition: Murshidabad; প্রতিভারঞ্জন মৈত্র, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, মুর্শিদাবাদ চর্চা; সোমেন্দ্র চন্দ্র নন্দী, বন্দর কাশিমবাজার, The Life and Times of Kanto Babu ইত্যাদি। তা ছাড়াও Philip Calkins, গৌতম ভদ্র প্রমুখ মুর্শিদাবাদ নিয়ে সুচিন্তিত কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। কিন্তু এ সবগুলিতেই মুর্শিদাবাদের শুধু খণ্ড খণ্ড চিত্র পাওয়া যায়। মুর্শিদাবাদের একটি সামগ্রিক চিত্র কোথাও ঠিক নেই।

    তাই মুর্শিদাবাদের তিনশ’ বছর উপলক্ষে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের প্রতি, বিশেষ করে স্বাধীন নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ শহরের প্রসঙ্গে, নতুন করে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন আছে। গত প্রায় চার দশক ধরে সমুদ্র বাণিজ্যের ইতিহাস, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির বাংলায় ব্যবসা-বাণিজের গতিপ্রকৃতি, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বাংলার ইতিহাস ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি ও আর্কাইভসে, বিশেষ করে লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরি (British Library, India Office Records) এবং হল্যান্ডের রাজকীয় আর্কাইভস (Algemeen Rijksarchief), যেসব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি তার ভিত্তিতে মুর্শিদাবাদের সার্বিক ইতিহাস রচনা করার তাগিদ অনুভব করেছি। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে এই গ্রন্থের অবতারণা। আর মুর্শিদাবাদের তিনশ’ বছরে পদার্পণই এই গ্রন্থ রচনার সর্বোৎকৃষ্ট সময়। আশা করি তা মনে রাখলে এই গ্রন্থ রচনার ক্ষুদ্র প্রয়াস সার্থক বলে বিবেচিত হবে। এখানে নবাবি আমল বলতে আমাদের আলোচনা স্বাধীন নবাবি আমলেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। অর্থাৎ মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজদ্দৌল্লা এবং পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত, মোটামুটি ১৭০৪ সাল থেকে ১৭৫৭ সাল। তারপরেও মুর্শিদাবাদের নবাবরা ছিলেন বটে তবে মীরজাফর থেকে আরম্ভ করে সবাই ইংরেজদের ক্রীড়নক ছাড়া আর কিছু নয়। তাছাড়া মুর্শিদাবাদের যা কিছু গৌরব এবং শ্রীবৃদ্ধি, সবটাই স্বাধীন নবাবি আমলে। তারপর ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে আস্তে আস্তে মুর্শিদাবাদের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে, কলকাতাই সব কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। পলাশির পর থেকেই মুর্শিদাবাদের এই অবনমনের সূত্রপাত। তাই এই বইতে শুধু মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগের কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

    মোট দশটি অধ্যায়ে আমার বক্তব্যগুলি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। প্রথমেই ‘ভূমিকা’-তে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় সম্বন্ধে আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে মুর্শিদাবাদের পত্তনের ইতিবৃত্ত। এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে এবং কেন মুর্শিদকুলি খান ঢাকা থেকে দেওয়ানি কার্যালয় মখসুদাবাদে নিয়ে আসেন এবং তাঁর নিজের নাম অনুযায়ী নতুন নামকরণ করেন মুর্শিদাবাদ। বিভিন্ন তথ্যের সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে ১৭০৪ সালেই যে মুর্শিদাবাদের পত্তন তাও এখানে প্রতিষ্ঠিত। পরের অধ্যায়ে মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজদ্দৌল্লা পর্যন্ত বিভিন্ন নবাবরা কীভাবে মুর্শিদাবাদের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি করার চেষ্টা করেন তার সম্যক বিশ্লেষণ। বস্তুতপক্ষে, নবাবি আমলই মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। বহু তথ্যের সমাবেশে এখানে তাই প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছি। চতুর্থ অধ্যায়ে আছে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে বণিকরাজাদের (merchant princes) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার তিন বণিকরাজা— জগৎশেঠ, উমিচাঁদ ও খোজা ওয়াজিদ— মুর্শিদাবাদে নবাবি দরবারের অন্যতম সদস্য ছিলেন। নবাবদের সঙ্গে এঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। নবাবদের আনুকূল্যেই এঁরা বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতির প্রায় সবটাই কুক্ষিগত করে নেন। শুধু তাই নয়, বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতেও এঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধিতে এঁদের অবদান অনস্বীকার্য।

    পঞ্চম অধ্যায়ে পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। পলাশি বাদ দিয়ে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনা করা যায় না। বিশেষ করে এতদিন পর্যন্ত পলাশির যে ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকরা দিয়ে এসেছেন— কেন এই ষড়যন্ত্র, কে বা কারা এর মূল নায়ক, এতে ইংরেজদের ভূমিকা কী, ইত্যাদি— তা সত্যি যুক্তিগ্রাহ্য কিনা তা নতুন করে বিচার করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ এর মধ্যে অনেক নতুন তথ্য, বিবরণগত শুধু নয় পরিসংখ্যানগতও বটে, আমরা ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে আবিষ্কার করতে পেরেছি যার ভিত্তিতে এতদিনের বক্তব্যগুলি অসার বলে প্রমাণ করা যায়। সংক্ষেপে এ বক্তব্যগুলি হল— পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ ছিল না, তাদের বাংলা বিজয় নেহাতই ‘আকস্মিক ঘটনা’, প্রায় ‘অনিচ্ছাকৃত’। বাংলার ‘অভ্যন্তরীণ সংকটই’ ইংরেজদের বাংলায় ডেকে আনে, পলাশি ‘ভারতীয়দেরই ষড়যন্ত্র’, ইত্যাদি। এখানে আমরা এই সব বক্তব্যগুলি খণ্ডন করে দেখিয়েছি যে পলাশি চক্রান্তের মূল নায়ক ইংরেজরাই। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মদত ছাড়া পলাশি সম্ভব হত না। তারাই একদিকে নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে, অন্যদিকে প্রায় কাকুতিমিনতি করে নবাবের দরবারের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীকে তাদের ‘বিপ্লবে’র পরিকল্পনায় সামিল করিয়েছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন, ইংরেজদের পক্ষে বঙ্গবিজয় এত অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল কেন এবং যে প্রশ্নের কোনও উত্তর এতদিন কেউ দিতে পারেননি, আমরা তা এখানে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ১৭৩০-র দশক থেকে ১৭৪০-র দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার রমরমা চলছিল। এরা এই ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এদেশে আসত। কিন্তু ১৭৪০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৭৫০-র দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কর্মচারীদের এই ব্যক্তিগত বাণিজ্য প্রচণ্ড মার খায়। তার কারণ ফরাসিদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য ও আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের নেতৃত্বে হুগলি থেকে দেশীয় বণিকদের সমুদ্র বাণিজ্যের সঙ্গে ইংরেজদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইংরেজ কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের পুনরুদ্ধার ও তাকে আবার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল এবং সেজন্যই পলাশির ষড়যন্ত্র।

    ষষ্ঠ অধ্যায়ে মুর্শিদাবাদের বেগমদের বৃত্তান্ত। এঁদের চারিত্রিক বৈপরীত্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কেউ কেউ স্বামীর পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন শুধু নয়, স্বামীর অনুপস্থিতিতে রাজকার্যও পরিচালনা করেছেন। স্বামীর বিপদের সময় তাঁর পাশে থেকে তাঁকে সাহস ও উৎসাহ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও উচ্চাকাঙক্ষা চরিতার্থ করার জন্য যে কোনও পন্থা অবলম্বন করতে দ্বিধা করেননি। জিন্নতউন্নেসা, শরফুন্নেসা, ঘসেটি বেগম, আমিনা বেগম, লুৎফুন্নেসা, মুন্নি বেগম প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করে তাই এখানে দেখানো হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়ে মুর্শিদাবাদের শিল্পবাণিজ্যের বিশ্লেষণ। মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল বাংলায় কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে ভারতবর্ষ ও এশিয়া ছাড়াও ইউরোপে এই দুটি পণ্যের বিরাট চাহিদা ছিল। ফলে নবাবি আমলে এই দুটি পণ্যের উৎপাদন এবং বাণিজ্যের দ্রুত অগ্রগতি হয়। এশীয়/ভারতীয় বণিক এবং ইউরোপীয়রা বাংলা থেকে প্রচুর পরিমাণে এই পণ্য দুটি রফতানি করত। এতদিন ঐতিহাসিকদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে এই রফতানি বাণিজ্যে মুখ্য ভূমিকা ছিল ইউরোপীয়দের, তারাই এই দুটি পণ্য সবচেয়ে বেশি রফতানি করত। কিন্তু আমরা বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে এখানে দেখিয়েছি যে এতে এশীয়/ভারতীয়দের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তারাই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে এই দুটি পণ্য রফতানি করত, ইউরোপীয়রা নয়। বস্তুতপক্ষে, কাঁচা রেশমের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এশীয়/ভারতীয়দের রফতানির পরিমাণ সমস্ত ইউরোপীয় কোম্পানি মিলে যে মোট রফতানি তার চার থেকে পাঁচগুণ বেশি।

    মুর্শিদাবাদের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আলোচনা অষ্টম অধ্যায়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা কাজকর্ম উপলক্ষে বহু জাতি, বর্ণ ও ধর্মের লোকরা এসে মুর্শিদাবাদে বসবাস করত। তারপর পরস্পরের পাশাপাশি বাস করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান হত স্বাভাবিকভাবেই। ফলে মুর্শিদাবাদে একটি ‘কসমোপলিটান’ (cosmopolitan) সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের অর্থনীতিও বেশ উন্নত ছিল। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দিল্লি-আগ্রা থেকে আগত মনসবদার ও অভিজাতবর্গ বাংলা থেকে যে ধন নিষ্ক্রমণ করত, মুর্শিদকুলির আমল থেকে তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলার ধনসম্পদ বাংলাতে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদেই, সঞ্চিত হত। ১৭৪০-র দশকের প্রথমদিক পর্যন্ত নবাবরা দিল্লিতে নিয়মিত রাজস্ব পাঠাতেন। তা সত্ত্বেও এঁদের কোষাগারে যে পরিমাণ ধনরত্ন সঞ্চিত হয়েছিল তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। মারাঠা আক্রমণে এ সময় বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বলে যে বক্তব্য তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। সাধারণ মানুষের অবস্থা মোটামুটি বেশ ভালই ছিল বলে ফারসি ঐতিহাসিকরা মন্তব্য করেছেন। জৈন কবি নিহাল সিংহও এটা সমর্থন করেছেন।

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য—হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনওভাবেই ব্যাহত হয়নি। সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কোনও ঘটনা এসময় ঘটেনি। বরং এই দুই ধর্ম-সংস্কৃতির যে সমন্বয় প্রক্রিয়া তা ওই সময়েই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়। এ মিলন প্রক্রিয়া থেকেই ‘সত্যপীরের’ মতো নতুন ‘দেবতা’র উদ্ভব, যে ‘দেবতা’ দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই পূজ্য। এ সময় হিন্দুরা মুসলমানদের দরগাতে ‘সিন্নি’ দিচ্ছে বা মুসলমানরা হিন্দু মন্দিরে পুজো দিচ্ছে—এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবরা মহা আড়ম্বরে হোলি, দেওয়ালি প্রভৃতি হিন্দু উৎসব পালন করতেন, তাতে কোনও প্রশ্ন কখনও ওঠেনি। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও এই দুই ধর্মসংস্কৃতির মিলন প্রক্রিয়ার প্রতিফলন একদিকে মুসলমান কবি ফৈজুল্লা ও অন্যদিকে হিন্দু কবি ভারতচন্দ্রের ‘যে রাম, সেই রহিম’ এমন অভিব্যক্তিতে।

    নবম অধ্যায়ে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যের বর্ণনা। বাংলার স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। নবাবদের আমলে মুর্শিদাবাদের স্থাপত্য এক নতুন মাত্রা পায়। মুঘল শৈলীর সঙ্গে বাংলার স্থানীয় শৈলীর সংমিশ্রণ হয় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজদ্দৌল্লা পর্যন্ত সব নবাবেরই প্রাসাদ, ইমারত, মসজিদ, সমাধিভবন, ইত্যাদি নির্মাণ করা প্রায় ‘হবি’তে পরিণত হয়েছিল। একদিকে নবাবদের এই মানসিকতা, অন্যদিকে তাঁদের হাতে অফুরন্ত ধনরত্ন থাকায় মুর্শিদাবাদে একের পর এক নতুন নতুন প্রাসাদ, মসজিদ, উদ্যানবাটিকা প্রভৃতি নির্মিত হয়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুর্শিদকুলির কাটরা মসজিদ ও খোশবাগের সমাধিক্ষেত্র, সুজাউদ্দিনের ফৰ্হাবাগ, নওয়াজিস মহম্মদের মোতিঝিল প্রাসাদ, সিরাজদ্দৌল্লার হিরাঝিল বা মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ, ইমামবারা ও মদিনা, মুন্নি বেগমের চৌক মসজিদ ইত্যাদি। পরিতাপের বিষয়, এগুলির মধ্যে বেশিরভাগই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। শেষ অধ্যায়ে উপসংহার— এই গ্রন্থের মূল বক্তব্য ও বিশ্লেষণের সংক্ষিপ্তসার।