» » চক্রান্তের মূল নায়করা

চক্রান্তের মূল নায়করা

পলাশি চক্রান্তের উদ্ভব ও বিকাশ সম্যক উপলব্ধি করতে হলে, এই চক্রান্তের মূল নায়কদের সম্পূর্ণ পরিচয় ও তাদের ধ্যানধারণা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হওয়া একান্ত প্রয়োজন। আমাদের প্রতিপাদ্য, যেহেতু ইংরেজরাই পলাশি ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা এবং তাদের সক্রিয় সমর্থন ও উৎসাহ ছাড়া পলাশির চক্রান্ত পরিপূর্ণতা লাভ করে বিপ্লব ঘটাতে পারত না[১], তাই ইংরেজদের মধ্যে যারা মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল তাদের নিয়ে প্রথমে আলোচনা করব, পরে দেশীয় ষড়যন্ত্রীদের। ইংরেজদের মধ্যে যে তিনজন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন উইলিয়াম ওয়াটস, লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন ও রবার্ট ক্লাইভ।

উইলিয়াম ওয়াটস

ওয়াটস ছিলেন কাশিমবাজার কুঠির প্রধান। যেহেতু কাশিমবাজারের অনতিদূরেই রাজধানী মুর্শিদাবাদ, তাই তিনি নবাবের দরবারে ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনিধিও ছিলেন। ফলে, বাংলায় ইংরেজদের মধ্যে তাঁরই সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল দরবারের সব খোঁজখবর রাখার। তা ছাড়া, এই সময় বাংলায় ইউরোপীয়দের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির প্রধান হিসেবে বাংলার তিন প্রধান বণিকরাজার (merchant prince)—জগৎশেঠ পরিবার, খোজা ওয়াজিদ ও উমিচাঁদ—সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ কাশিমবাজার ছিল তখন বাংলার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র—বিশেষ করে বাংলার দুই প্রধান রফতানি পণ্যের—কাঁচা রেশম ও বস্ত্র—উৎপাদন ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে। তা ছাড়া খুব সম্ভবত দরবারে ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সঙ্গে দরবারের প্রধান প্রধান রাজপুরুষের—মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, প্রমুখ—ভাল রকম যোগাযোগই ছিল। ফলে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাবার পক্ষে ইংরেজ কর্মচারীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। ক্লাইভের বিশ্বস্ত অনুচর ওয়ালসকে লেখা লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি থেকে তার প্রমাণ মেলে। আমরা আগেই দেখেছি, স্ক্র্যাফ্‌টন লিখেছেন, ক্লাইভ যদি ওয়াটসকে একটু ইঙ্গিত ও উৎসাহ দেন তা হলে ওয়াটস সঙ্গে সঙ্গে ‘একটি ‘দল’ [party] [নবাবের বিরুদ্ধে] গড়তে লেগে যাবেন।[২]’ তিনি আরও জানাচ্ছেন যে ক্লাইভ ওয়াটসকে ইংরেজদের সমর্থনে দরবারে একটি চক্র তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। এতেই পলাশি ষড়যন্ত্রের সুত্রপাত।[৩]

স্ক্র্যাফ্‌টনের লেখা থেকে জানা যায়, বাংলায় বহুদিন থাকার ফলে এখানকার রাজনীতি, ভাষা ও রীতিনীতি সম্বন্ধে ওয়াটসের যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি জন্মেছিল।[৪] তাতে ইংরেজদের খুব সুবিধে হয়েছিল কারণ তাদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন যাঁর এই দেশ ও এখানকার লোকজন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা ছিল এবং যিনি দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সোজাসুজি যোগাযোগ করে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটানো সম্ভব কি না সে সম্বন্ধে তাদের চিন্তাভাবনা যাচাই করে নিতে পারেন। ওয়াটসই ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে পরামর্শ দেন যে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সুসংহত ও দুর্ভেদ্য করার কাজ চালিয়ে যেতে কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে নবাব আলিবর্দি ব্যাপারটা খেয়ালই করবেন না। তিনি কাউন্সিলকে এ-ভরসাও দিয়েছিলেন যে, তিনি এ-বিষয়ে সজাগ থাকবেন এবং এটা নিয়ে নবাবের সঙ্গে কোনও ঝামেলা হলে তার জন্য কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে তা তিনি দেখবেন।[৫] আবার ইংরেজরা যখন চন্দননগর আক্রমণ করার কথা ভাবছিল এবং কীভাবে এতে এগুনো যাবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছিল, তখন ওয়াটসই সমস্যার সমাধানে সাহায্য করলেন। তিনি নিজেই লিখেছেন:[৬]

As Mr. Watts was on the spot, watched every motion of the Suba [Sirajuddaullah], knew exactly the character of his courtiers and prin- cipal Ministers, and had the most certain Intelligence of everything that passed, he continued to represent the Necessity of attacking Chandernagore.

ওয়াটস ঘটনাস্থলে থাকার ফলে নবাবের কাজকর্মের ওপর নজর রাখতে পারতেন এবং দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চালচলন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহালও ছিলেন। দরবারে যে সব ঘটনা ঘটত সব তাঁর নখদর্পণে ছিল। তাই তিনি বারবার চন্দননগর আক্রমণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সবিস্তারে এটাও জানিয়েছেন কীভাবে তিনি নবাবের মুৎসুদ্দিকে ঘুষ দিয়ে নবাবের নামে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে লেখা চিঠির এমন বয়ান করিয়েছিলেন যাতে ওই চিঠির অর্থ দাঁড়ায় যে নবাব ইংরেজদের চন্দননগর আক্রমণ করার অনুমতি দিচ্ছেন।[৭]

পলাশি ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশে ইংরেজদের মধ্যে ওয়াটসই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনিই উমিচাঁদের সাহায্যে দরবারের বিক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট রাজপুরুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ধীরে ধীরে তাদের অনেককে ইংরেজদের দলে টেনে আনতে সমর্থ হন। রবার্ট ওরম লিখছেন যে সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠানোর ব্যাপারে দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাজিয়ে দেখার জন্য ওয়াটসই উমিচাঁদকে কাজে লাগান এবং এর ফলেই ইয়ার লতিফ ওয়াটসের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করতে চান। ওয়াটস তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে উমিচাঁদকেই ইয়ার লতিফের কাছে পাঠান। লতিফ উমিচাঁদকে তাঁর বাসনার কথা জানান—সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে তিনি নিজে নবাব হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ওরম যদিও বলছেন যে, মীরজাফর আর্মানি বণিক খোজা পেট্রুসের মারফত তাঁর প্রস্তাব ওয়াটসকে জানান, ওয়াটস নিজে কিন্তু তাঁর পিতাকে পরে লিখেছেন যে তিনি নিজেই মীরজাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে ষড়যন্ত্রে সামিল করেছিলেন।[৮]

কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ নবাবের দরবারের রাজনীতি এবং ইংরেজদের অভিসন্ধি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। সেই ল’ পলাশি চক্রান্তে ওয়াটসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার যথাযথ বর্ণনা দিয়েছেন:[৯]

দরবারে ইংরেজদের সপক্ষে ছিল তাদের অস্ত্রবল, সিরাজদ্দৌল্লার ভুলত্রুটি, শেঠদের অমিত প্রভাব ও সূক্ষ্ম কূটনীতি। তা ছাড়াও তাদের পক্ষে ছিল নবাবের সৈন্যবাহিনীর প্রায় সব সেনাপতি ও দরবারের প্রায় সব অমাত্য, এমনকী মুৎসুদ্দি ও ওয়াকিয়ানবিশরাও। এই সবগুলি শক্তিকে একত্রিত করে তাদের চালাবার জন্য ওয়াটসের মতো এমন একজন সুচতুর ব্যক্তি যখন ছিলেন, তখন ইংরেজরা কি না করতে পারত।

ওয়াটস কীভাবে পলাশি বিপ্লবের পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করেছিলেন তার বর্ণনা নিজেই দিয়েছেন:[১০]

তিনি [ওয়াটস] বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ আলোচনার কথা সবিস্তারে [কর্তৃপক্ষকে] জানিয়েছেন। তা ছাড়াও নবাবের তখনকার অবস্থা, তাঁর কাছাকাছি প্রধান অমাত্যদের চিন্তাভাবনা, শক্তিসামর্থ্য, ধ্যানধারণা ও কামনাবাসনার কথাও বিশদভাবে জানানো হয়েছে। সঙ্গে এটাও যে [আমাদের] পরিকল্পনা [সিরাজের বদলে মীরজাফরকে মসনদে বসানো] সফল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এটা করতে গেলে যে-সব বাধা বিপত্তি আসতে পারে এবং তা কী করে প্রতিহত করা যেতে পারে তাও তিনি জানিয়েছেন।

তবে ওয়াটস বিচক্ষণ বলে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চেয়েছিলেন। মীরজাফরকে নবাব করার প্রস্তাবে ক্লাইভ ও সিলেক্ট কমিটির উত্তর আসার জন্য যখন তিনি অপেক্ষা করছিলেন, তখন ক্লাইভকে লেখেন, তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করে ক্লাইভ যেন অন্য কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ না করেন। কারণ তিনি ঘটনাস্থলে আছেন বলে এবং দরবারের হালচালের সব খবর রাখেন বলে ‘আমাদের’ (ইংরেজদের) পরিকল্পনা রূপায়ণ করা যাবে কিনা এবং তা কী করে সুসম্পন্ন করা যাবে, সে সম্বন্ধে তিনিই সবচেয়ে ভাল বোঝেন।[১১] পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ও কাউন্সিল তাঁকে সরকারিভাবে ধন্যবাদ জানান।[১২] ক্লাইভও লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে লেখেন যে ওয়াটসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা না বললে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না।[১৩]

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. পূর্বতন ঐতিহাসিকদের মতো (পিটার মার্শাল, রজত রায় ইত্যাদি) সম্প্রতি কুমকুম চ্যাটার্জীও (Merchants, Politics and Society, 1996, p. 103) বলেছেন যে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীরাই সিরাজদৌল্লাকে হঠাবার জন্য চক্রান্তে যোগ দিতে ইংরেজদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এ বক্তব্য মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তিনি আরও বলেছেন যে ইংরেজরা নবাব-বিরোধী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল কারণ তারা ভয় পেয়েছিল সিরাজদৌল্লা হয়তো ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সঙ্গে আঁতাত করবেন। আমরা অবশ্য তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছি তাঁর এই মতও গ্রহণ যোগ্য নয়।
  2. ওয়ালসকে লেখা স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি, ৯ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, III, p. 343.
  3. Scrafton, Reflections, p. 81.
  4. ঐ, পৃ. ৯৮।
  5. Watts’ to Governor and Fort William Council, 15 Aug. 1755, BPC, Range 1, vol. 28; FWIHC, vol. 1, pp. 884-85.
  6. Watts’ Memoirs, p. 37.
  7. ঐ, পৃ. ৪২।
  8. Orme, Military Transactions, vol. II, Sec, I, p. 148; তাঁর পিতাকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ১৩ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 468.
  9. Law’s Memoirs, Hill, III, p. 191.
  10. Watts’ Memoirs, p. 80.
  11. ক্লাইভকে ওয়াটস, ২৩ মে ১৭৫৭, Hill, II, pp. 392-93.
  12. ওয়াটস তাঁর পিতাকে, ১৩ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 469.
  13. লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে ক্লাইভ, ৬ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 465.