» » পলাশি বিপ্লবের অনিবার্যতা

পলাশি বিপ্লবের অনিবার্যতা

পলাশি বিপ্লব কেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সে-সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল—মুসলমান শাসনের নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দুরা মুসলমান নবাবের শাসনের অবসান কামনা করছিল।[১]

 আবার অনেকের বক্তব্য, পলাশি আসলে হিন্দু-জৈন সওদাগর ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং মহাজন শ্রেণীর দ্বারা সংগঠিত বিপ্লব। কারণ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে এদের স্বার্থ এমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল যে, সিরাজদৌল্লা ইউরোপীয়দের, বিশেষ করে ইংরেজদের, বাংলা থেকে তাড়িয়ে দেবে, এটা এরা মোটেই মেনে নিতে পারেনি।[২] আরেক দল ঐতিহাসিক বলছেন, একদিকে ‘বাংলার অভ্যন্তরীণ’ সংকট অন্যদিকে নবাব যেভাবে শাসকগোষ্ঠীর গণ্যমান্য অমাত্যদের বিরূপ করে তুলেছিলেন যার জন্য নবাবকে গদিচ্যুত করতে তারা ইংরেজদের সাহায্য চেয়েছিল—দুটো ব্যাপারই ইংরেজদের পলাশির ষড়যন্ত্রে/বিপ্লবে টেনে এনেছিল।[৩] কিন্তু আমরা এখানে দেখাব যে উপরোক্ত বক্তব্যগুলির কোনওটাই গ্রহণযোগ্য নয়। ইংরেজদের বাংলাবিজয়ের পেছনে সবচেয়ে জোরালো যে-উদ্দেশ্য কাজ করেছে, তা হল কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের স্বার্থরক্ষা, যেটা ঠিক প্রাক্-পলাশি সময়ে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল।

দ্বিধাবিভক্ত সমাজ

প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, এ বক্তব্যের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা এস. সি. হিল।[৪] তিনি বলেছেন, মধ্য-অষ্টাদশ শতকে বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ দ্বিধাবিভক্ত ছিল। মুসলমান শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমান নবাবের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য কোনও ত্রাণকর্তার প্রত্যাশায় অধীর হয়ে পড়েছিল এবং ইংরেজদের জানিয়েছিল সাদর অভ্যর্থনা। হিল সাহেব তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে দু’জন সমসাময়িক ইউরোপীয়র—জাঁ ল’ এবং কর্নেল স্কটের (Scott)— লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। জাঁ ল’ বলেছেন: ‘হিন্দু রাজারা [জমিদাররা] মুসলমান শাসনকে ঘৃণার চোখে দেখত। প্রখ্যাত ব্যাঙ্কার জগৎশেঠরা, যাদের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, না থাকলে সিরাজদৌল্লা যে বিপ্লবে বিতাড়িত হন, তারপরে তারা হিন্দু রাজত্ব কায়েম করত।’[৫] অন্যজন, কর্নেল স্কট তাঁর বন্ধু মি. নোবলকে লিখেছেন: ‘হিন্দু রাজারা এবং রাজ্যের হিন্দুরা মুসলমান শাসনের নিপীড়নে ক্ষুব্ধ। তারা গোপনে এর পরিবর্তন চাইছিল এবং এই অত্যাচারী শাসনের অবসানের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।’[৬] এ-সব বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে হিলের সিদ্ধান্ত: ‘মুসলমান শাসকের বিরুদ্ধে হিন্দুদের অসন্তোষ ছিল। তা থেকে অব্যাহতির আশায় তারা গোপনে সম্ভাব্য মুক্তিদাতার অপেক্ষা করছিল।’[৭]

হিলকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে আরেকজন ঐতিহাসিক অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপ তুলে ধরায় যত্নবান। তিনি লিখছেন: ‘ইংরেজদের ধারণা ছিল, হিন্দুরা মুসলিম নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য শুধু প্রস্তুতই ছিল না, তারা মুসলমান শাসনের অবসান ঘটাতে ইংরেজদের সাহায্য নিতেও আগ্রহী ছিল।’[৮] সুতরাং দেখা যাচ্ছে উক্ত দু’জন ঐতিহাসিকেরই বক্তব্য, প্রাক্-পলাশি বাংলায় সমাজ ছিল দ্বিধাবিভক্ত। হিন্দুরা মুসলিম শাসনকে ঘৃণার চোখে দেখত এবং তার হাত থেকে অব্যাহতি চাইছিল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে সমাজের কোনও দ্বিধাবিভক্ত চেহারা (যার ফলে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করা যায়) চোখে পড়ে কি না তা দেখার আগে সমাজের এই দ্বিধাবিভক্ত রূপচিত্রণের পেছনে ইউরোপীয়দের বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য কাজ করেছে কি না তা বিচার করে দেখা উচিত।

বস্তুতপক্ষে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে অনেক ইউরোপীয়ই বাংলা বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিল এবং এ জয় অনায়াসলভ্য বলে মনে করত। তাদের লেখা থেকেই তাদের এ মনোভাব পরিষ্কার বোঝা যায়। সুতরাং বাংলা বিজয় যেখানে মুখ্য উদ্দেশ্য, তখন সে অবাধ বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণে যদি তারা বাংলার দ্বিধাবিভক্ত সমাজের চেহারা খুঁজে বার করতে চায়, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাঁ ল’ বা স্কটের মন্তব্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতই মনে হয় এবং সে-কারণেই এগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া এ-প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, পলাশি শুধু হিন্দুত্বের দ্বারা সংগঠিত বিপ্লব নয়—এটি মূলত ইংরেজদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল, যাতে তারা শাসকশ্রেণীর একটি শক্তিশালী অংশকে সামিল করতে পেরেছিল। এর মধ্যে হিন্দু যেমন ছিল, তেমনি মুসলমানও। এখানে স্মর্তব্য, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় আরও দুটি বিপ্লব হয়েছিল—১৭২৭ এবং ১৭৩৯-৪০ সালে, যখন শাসকশ্রেণীর দুই সম্প্রদায়েরই অভিজাতবর্গ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থানুযায়ী ও অভিপ্রায় অনুসারে নবাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নয়। সুতরাং ওই দুটি বিপ্লবের সময়ে যদি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কোনও প্রশ্ন না উঠে থাকে, তা হলে ১৭৫৬-৫৭ সালেও সে-প্রশ্নের অবতারণা অবান্তর।

এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে, আলিবর্দি তথা সিরাজদ্দৌল্লার সময় অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদার হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিক মহলে প্রাক্-পলাশি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপ অবাধ স্বীকৃতি পেয়েছে। লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (ব্রিটিশ লাইব্রেরি) ওরম সংগ্রহ (Orme Collection) ও হল্যান্ডের রাজকীয় মহাফেজখানায় (Algemeen Rijksarchief) ঠিক প্রাক্-পলাশি বাংলার উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদারদের দুটি তালিকা আমরা পেয়েছি। প্রথমটিতে (রবার্ট ওরমের তালিকা) দেখা যাচ্ছে আলিবর্দির সময় (১৭৫৪-তে) দেওয়ান, ‘তান-দেওয়ান’, ‘সাব-দেওয়ান’, বক্সি প্রভৃতি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদের মধ্যে ছয়টিই হিন্দুরা অলংকৃত করছে—একমাত্র মুসলিম বক্সি ছিল মীরজাফর। আবার ১৯ জন জমিদার ও রাজার মধ্যে ১৮ জনই হিন্দু।[৯] বাংলায় ওলন্দাজ কোম্পানির প্রধান ইয়ান কারসেবুমের (Jan Kerseboom) তালিকাতেও (১৭৫৫ সালের) নায়েব দেওয়ান উমিদ রায়ের নেতৃত্বে হিন্দুদেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য।[১০] ১৭৫৪-৫৫ সালের এই যে চিত্র, নবাব সিরাজদ্দৌল্লার সময় তার কোনও পরিবর্তন হয়নি। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুসলমান রাজত্বে হিন্দুরা মুসলমানদের চাইতেও বেশি সুবিধেজনক অবস্থায় ছিল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি রাজ্যের প্রশাসনিক শাসনযন্ত্রে হিন্দু প্রাধান্য এত বেশি ছিল যে রবার্ট ওরম মন্তব্য করেছেন: [১১]

তাঁর [আলিবর্দির] রাজত্বকালে হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল অপরিসীম। শাসনযন্ত্রের প্রতিটি বিভাগেই এটা লক্ষ করা যায়। তারা এত যত্ন ও দক্ষতার সঙ্গে সব বিভাগের কাজকর্ম পরিচালনা করত যে তাদের অজান্তে বা তাদের হাত দিয়ে ছাড়া কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজই হত না।

সিরাজদ্দৌল্লার সময় সর্বক্ষেত্রে এই হিন্দু প্রাধান্য আরও বেড়ে যায়। তরুণ নবাবের সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন মোহনলাল। প্রকৃতপক্ষে সিরাজের ওপর মোহনলালের প্রভাবই ছিল সর্বাধিক। ইউসুফ আলির তারিখ-ই-বাংগালা-ই-মহবৎজঙ্গী-র ভাষায় মোহনলাল ছিলেন নবাবের সবচেয়ে বড় ভরসা (firm pillar)। মোহনলালের মতো ‘বিধর্মী’কে এত বেশি প্রাধান্য দেবার জন্য তিনি সিরাজের ওপর বিরক্ত ছিলেন।[১২] ওরমও লিখেছেন: ‘মোহনলাল সিরাজের মন্ত্রী না হলেও সব মন্ত্রী মিলে যে ক্ষমতার অধিকারী, তার চেয়েও মোহনলালের প্রভাব অনেক বেশি।[১৩] সুতরাং এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাক্-পলাশির বাঙালি সমাজ হিন্দু-মুসলমান এ-সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, এ-কথা বিশ্বাস করা কঠিন।

বাংলার সমাজ যদি সত্যিই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ত, তা হলে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য ও ফারসি ইতিহাসে তার প্রতিফলন অবশ্যই দেখা যেত। কিন্তু সেরকম কোনও নির্দিষ্ট ইঙ্গিত তৎকালীন সাহিত্য বা ইতিহাসে দেখা যায় না। সমাজের উঁচুতলায় কিছুটা টানাপোড়েন নিশ্চয়ই থাকতে পারে, জমিদার ও শাসকশ্রেণীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই চলতেই পারে। কিন্তু সেগুলি হিন্দু-মুসলমান এই বিভেদমূলক চেতনা থেকে উদ্ভূত নয়, তার মূল শ্রেণীগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সংঘাত। বাংলায় হিন্দু, মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের বিশেষ করে সাধারণ মানুষ বহুদিন ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের মধ্যে পাশাপাশি বাস করে এসেছে। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে লেখা কবি ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল কাব্যে আছে, হিন্দু সওদাগর লক্ষ্মীন্দরকে সর্পদেবতা মনসার হাত থেকে বাঁচাতে লোহার খাঁচায় বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, তাতে মা মনসাকে দূরে রাখার জন্য অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে একটি কোরাণও রাখা ছিল।[১৪] আবার প্রায় এই সময় রচিত বেহুলাসুন্দর কাব্যে দেখা যায়, এক হিন্দু সওদাগরের পুত্রলাভের কামনায় ব্রাহ্মণরা কোরাণের সাহায্য নিচ্ছে এবং সওদাগরকে আল্লার নাম করতে বলছে। উক্ত কাব্যেই আছে, ব্রাহ্মণরা কোরাণ দেখে সওদাগরের বাণিজ্যযাত্রার শুভদিন নির্ণয় করছে। সওদাগরও ব্রাহ্মণদের নির্দেশ অনুযায়ী আল্লার নাম নিতে নিতে বাণিজ্যযাত্রা করছে, যেন এ নির্দেশ বেদশাস্ত্রেই লেখা আছে।[১৫]

সাধারণ মানুষের মধ্যে এই দুই ধর্ম ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের যে প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরে চলছিল, অষ্টাদশ শতকেও তা বজায় ছিল। সমাজের উঁচুতলাতেও দুই ধর্মসংস্কৃতির সমন্বয় চোখে পড়ে। নবাব শহমৎ জঙ্গ (নওয়াজিস মহম্মদ খান) শওকত জঙ্গের (যিনি তখন পাটনা থেকে এসেছিলেন) সঙ্গে মুর্শিদাবাদের মতিঝিলে সাতদিন ধরে হোলি উৎসব পালন করেন। সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের চুক্তি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) সম্পাদন করেই তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদ ফিরে তাঁর প্রাসাদে হোলি উৎসবে মেতে ওঠেন।[১৬] শুধু তাই নয়, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এই দুই ধর্মসংস্কৃতির সমন্বয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এ সময় মুসলমানরা হিন্দু মন্দিরে পুজো দিচ্ছে আর হিন্দুরা মুসলমানদের দরগাতে ‘সিন্নি’ দিচ্ছে—এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এই দুই ধর্ম আর সংস্কৃতির সমন্বয় প্রচেষ্টা থেকেই সত্যপীরের মতো নতুন ‘দেবতা’র জন্ম—যে ‘দেবতা’ দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই পূজ্য। কবি ভারতচন্দ্রের সত্যপীর কবিতা এ মিলন প্রক্রিয়ার প্রকৃষ্ট প্রতিফলন।[১৭] অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে রচিত শ্যামসুন্দর গাজির পুঁথি-তে আছে যে এক হিন্দু দেবী স্বপ্নে গাজির সামনে আবির্ভূত হন এবং তাঁর ইচ্ছানুযায়ী পরের দিন সকালে গাজি ব্রাহ্মণদের সহায়তায় সব হিন্দু আচার মেনে দেবীর পূজা করেন। হিন্দুরা সামাজিক, এমনকী ধর্মীয় ব্যাপারেও, মুসলমানদের মতামত গ্রহণ করত এবং তাদের সহায়তা কামনা করত।[১৮] ১৭৩২ সালের একটি বাংলা দলিলে, যাতে গোঁড়া বৈষ্ণব ধর্মের ওপর সহজিয়া ধর্মের বিজয় প্রতিফলিত হয়, দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের সঙ্গে কয়েকজন মুসলমানও তাতে সই করেছে।[১৯] এডওয়ার্ড সি. ডিমক (Edward C. Dimmock, Jr) একটি সুচিন্তিত প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগের (পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত) বাংলা সাহিত্য পড়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি কোনওরকম ‘গভীর বিদ্বেষে’র পরিচয় পাওয়া দুষ্কর।[২০] দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা ও বোঝাপড়ার চমৎকার নিদর্শন অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কবি ফৈজুল্লার সত্যপীর কবিতা—যেখানে ‘যে রাম, সেই রহিম’ এমন অভিব্যক্তি সোচ্চার।[২১] সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য থেকে যে সব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কোনও পরিচয় মেলে না।

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. Hill, Bengal, I, p. xxiii, Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 41.
  2. C. A. Bayly, Indian Society, pp. 49-50: P. J. Marshall, Bengal, p. 67; Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 32; Hill, I, p. xxii.
  3. P. J. Marshall, Bengal, pp. 75-76, 80; Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, pp. 12. 14-15.
  4. Hill, Bengal, vol. I, Introduction.
  5. S. C. Hill, Three Frenchmen in Bengal, p. 120.
  6. Hill, Bengal, I, p. xxiii.
  7. ঐ, lii.
  8. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p.41.
  9. Orme Mss., India, VI, ff. 1500-2. ওরমের তালিকায় প্রত্যেকের নাম ও তাদের পদমর্যাদার উল্লেখ আছে।
  10. Jan Kerseboom’s ‘Memorie’, 14 Feb, 1755, VOC 2849, ff. 125-26. বাংলায় ওলন্দাজ কোম্পানির প্রধান বা ডাইরেক্টররা বাংলা ছাড়ার আগে তাঁদের উত্তরসূরিদের জন্য বিস্তৃত রিপোর্ট লিখে রেখে যেতেন। এতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থার বিশদ বিবরণ তো থাকতই, সঙ্গে থাকত শিল্প-বাণিজ্যের খবরাখবর, সওদাগর-মহাজন-বণিকদের যাবতীয় বৃত্তান্ত, বিভিন্ন শিল্পের সংগঠন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে তাদের বাণিজ্যিক পরিস্থিতি, দেশবিদেশের জাহাজের আনাগোনার মাধ্যমে সমুদ্র বাণিজ্যের নানা খবর, এমনকী বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর (যেমন আর্মানিদের) বাংলার বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা, ইত্যাদি বহুরকমের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। বলতে গেলে ঐতিহাসিকদের পক্ষে এই ‘মেমোরি’ (Memorie) গুলি এক বিশাল রত্নভাণ্ডার।
  11. Robert Orme, Military Transactions, vol. II, Sec. I, pp. 52-53.
  12. Yusuf Ali, Tarikh-i-Bangala-i-Mahabatjangi, pp. 130, 132. বস্তুত বেশির ভাগ প্রায়-সমসাময়িক ফারসি ইতিহাসের লেখকই ব্যাপারটা একেবারেই পছন্দ করেননি।
  13. Orme, Military Transanctions, vol. II, Sec. I, pp. 127-28
  14. D. C. Sen, History of Bengali Language and Literature, pp. 288, 793.
  15. ঐ, পৃ. ৩১৯, ৭৯৩.
  16. Karam Ali, Muzaffarnamah, text, ff. 86a-86b, 123b; J. N. Sarkar, Bengal Nawabs, pp. 49,72.
  17. D. C. Sen, Bengali Language, pp. 396-97,793; ভারতচন্দ্র, সত্যপীরের কথা।
  18. S. R. Mitra, Types of Early Bengali Prose, pp. 135-38; সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, ১৭, ১৩০৮ বাংলা সাল, পৃ. ৮-১০।
  19. ঐ।
  20. Edward C. Dimmock, Jr. “Hinduism and Islam in Medieval Bengal”, in Rachel van M. Baumer, (ed.), Aspects of Bengali History and Society, p. 2.
  21. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, পৃ. ৪২৩।