» » পলাশির পরিণাম : সুদূরপ্রসারী প্রভাব

পলাশির পরিণাম : সুদূরপ্রসারী প্রভাব

প্রায়-সমসাময়িক ঐতিহাসিক করম আলি পলাশির পরিণতি খুব সংক্ষেপে ব্যক্ত করেছেন: ‘পলাশির পরে ইংরেজরা বাংলায় তাদের নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।’[১] মঁসিয়ে জাঁ ল’-ও বলেছেন যে পলাশি সমগ্র বাংলাকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।[২] এমনকী ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্টন ঠিক পলাশি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেই, যখন মীরজাফর মসনদেও বসেননি, মন্তব্য করেছেন যে এখন ‘সারা বাংলা আমাদের হাতের মুঠোয়।’[৩] বস্তুতপক্ষে সম্প্রতি দেখানো হয়েছে যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে নবাবি আমলে বাংলায় যে আর্থিক ও শিল্পবাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি দেখা গেছে, পলাশির পর তা ধীরে ধীরে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। এই শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজ কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের দৌলতে বাংলার অর্থনৈতিক অবক্ষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়।[৪] এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় প্রায়-সমসাময়িক ঐতিহাসিক ও পর্যটক আলেকজ্যান্ডার ডো-র (Alexander Dow) লেখায়। তিনি লিখেছেন: ‘যে দিন থেকে বাংলা বিদেশিদের অধীনে চলে যায় সেদিন থেকেই বাংলার অর্থনৈতিক অধোগতির সূত্রপাত।’[৫] এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পলাশির পর বাংলায় এক ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’ শুরু হয়ে যায়, যার চরিত্র ছিল অত্যন্ত নির্মম। রাজনৈতিক দিক থেকে বলা যায় যে, পলাশির পর ইংরেজরা বাংলায় পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে এবং এখান থেকেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ সুগম হয়।[৬]

পলাশির পর ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে অবাধ লুঠপাটের সব দরজা খুলে যায় এবং তারাও দু’হাতে লুঠতরাজ শুরু করে দিল বলে একজন বিশিষ্ট ঐতিহাসিকের যে বক্তব্য তাতে কোনও অতিরঞ্জন নেই।[৭] পলাশির পরেই যে লুঠ শুরু হয় তার অনুরূপ কিছু পৃথিবীর ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জোর করে অগাধ টাকাপয়সা ও ধনরত্ন আদায় করে নেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা গেছে। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা বাংলা থেকে এভাবে সংগৃহীত অপরিমেয় ধনসম্পদ সব বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দেয় এবং এভাবে শুরু হয় বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের এক অবাধ প্রক্রিয়া। এই ধন নিষ্ক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ে এবং তার ফলে দেশের ও মানুষের অবস্থা অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়ে। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ পলাশি-উত্তর ৪২-৪৩ বছরে বাংলা থেকে কী বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ বাংলার বাইরে চলে যায় তার সঠিক হিসেব দেওয়া সম্ভব নয়, যদিও এ-সম্বন্ধে কিছুটা আন্দাজ মাত্র করা যেতে পারে। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা নানা উপায়ে বাংলা থেকে প্রচুর ধনসম্পদ আহরণ করেছিল। ধন নিষ্ক্রমণের সঠিক হিসেব করতে গেলে এ-সবগুলি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।[৮]

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কোনও কোনও বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মনে করেন যে কোম্পানির কর্মচারীদের (যারা ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল) অপরাধী ধরে নিয়ে তাদের সর্বজনীন একটা নিন্দার পাত্র বলে গণ্য করা সমুচিত হবে না। সেই যুগের মাপকাঠি দিয়ে তাদের বিচার করতে হবে; তাদের নৈতিকতাহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিসমষ্টি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও অনুচিত। মনে রাখতে হবে, তারা ভারতবর্ষে এসেছিল প্রধানত ধনসম্পদ আহরণ করে ধনবান হওয়ার জন্য আর তা ছাড়া ইংরেজ জাতির যদি কিছু হিতসাধন করা যায় তার জন্য। তারা যা করছে তা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কি না সে-প্রশ্ন নিয়ে আদৌ মাথা ঘামায়নি এবং তারা যা করছে তা নিয়েও তাদের কোনও অলীক ধারণা ছিল না।[৯] এ-বক্তব্য নিয়ে তর্ক না তুলেও এটা বলা অনুচিত হবে না যে, ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের নানা কাজকর্মের ফলে ভারতের ইতিহাসে বিশেষ করে তার অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়েছিল তার সম্যক বিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন।

কোম্পানি ১৭৫৭ থেকে ১৭৬০-এর মধ্যে মীরজাফরের কাছ থেকে ২ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা পেয়েছিল।[১০] তা ছাড়া মীরজাফর কোম্পানির কর্মচারীদের নগদ পুরস্কার ও দান হিসেবে ৫৯ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে পলাশি কোম্পানির কর্মচারীদের দ্রুত ব্যক্তিগত লাভের অনেক পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ সালের মধ্যে কোম্পানির কর্মচারীরা বাংলায় রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে মীরজাফর ও অন্যান্যদের কাছ থেকে আনুমানিক ১ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা পেয়েছিল। এই টাকার মধ্যে কিন্তু বিপ্লব সংগঠিত করে কোম্পানির নিজস্ব লাভের পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত নয়। ওই সময়ের মধ্যে এর পরিমাণ নগদ ৮ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা এবং ভূমিরাজস্ব বাবদ ৫৬ লক্ষ টাকা।[১১]

পলাশি বিপ্লবের ফলে ব্যক্তিগতভাবে ক্লাইভই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিলেন। তবে বিপ্লবের ফলে ব্রিটিশ ফৌজের সাধারণ স্তরের একজন সৈনিকও কম করে ২৪,০০০ টাকা করে পেয়েছিল।[১২] পলাশি যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ক্লাইভ তাঁর পিতাকে লেখেন যে মীরজাফর তাঁকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মোট ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা দিতে সম্মত হয়েছেন এবং তাঁর বদান্যতায় ওই টাকা পেলে ‘আমি দেশে গিয়ে এমন আরামে থাকতে পারব যা কোনওদিন কল্পনাই করতে পারিনি।’[১৩] কোম্পানির আরেক কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্টন লিখেছেন যে, পলাশির ফলে ‘ইংরেজ জাতির ৩০ লক্ষ পাউন্ড লাভ হয়েছিল।’ তা ছাড়া বাংলার নবাবের কাছ থেকে যা টাকা পাওয়া গেছে ‘তার সবটাই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে চলে এসেছে, কারণ বাংলায় যে টাকাটা পাওয়া গেছে তা দিয়ে চিন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ছাড়াও সারা ভারতবর্ষের বাণিজ্যই আমরা তিন বছর চালিয়েছি, ইংল্যান্ড থেকে এক আউন্স রুপোও নিয়ে আসার প্রয়োজন হয়নি।’[১৪] এ-সব নগদ টাকা ছাড়াও কোম্পানিকে যে ভূখণ্ড দেওয়া হয়েছিল তা থেকে, ক্লাইভের অনুমান অনুযায়ী, বছরে আয়ের পরিমাণ হবে ১২ লক্ষ টাকা।[১৫]

পলাশির পরে কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের হাতে এভাবে অঢেল টাকাপয়সা আসার ফলে কোম্পানিকে আর ইংল্যান্ড থেকে রুপো বা নগদ টাকাপয়সা নিয়ে এসে বাংলা থেকে রফতানি পণ্য কিনতে হয়নি। বাংলায় সংগৃহীত অর্থ দিয়ে শুধু বাংলার বাণিজ্য নয়, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের, এমনকী চিনদেশের সঙ্গে বাণিজ্য এবং কোম্পানির অন্যান্য খরচপত্র মেটানোও সম্ভব হয়েছিল। প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলায় পণ্য সংগ্রহের জন্য যে পরিমাণ টাকার দরকার হত, তার প্রায় শতকরা আশি থেকে নব্বই ভাগই ইংল্যান্ড থেকে সোনা-রুপো হিসেবে আসত। কিন্তু পলাশির পর ইংল্যান্ড থেকে সোনা-রুপো আসা একদম বন্ধ হয়ে গেল। কোম্পানির যাবতীয় বাণিজ্য ও খরচপত্র বাংলার রাজস্ব ও কোম্পানি এবং তার কর্মচারীদের বাংলায় সংগৃহীত অর্থেই চলত। এভাবেই বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের সূত্রপাত হল।[১৬] বস্তুতপক্ষে, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ এই দশ বছরে বাংলা থেকে রফতানি পণ্যের মোট যে মূল্য তা থেকে বাংলায় আমদানি পণ্যের মোট মূল্য বাদ দিয়ে পণ্যসামগ্রী ও সোনা-রুপো মিলিয়ে যে ধন নিষ্ক্রমণ হয়েছিল তার পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৪ কোটি টাকা।[১৭]

জেমস গ্যান্টের (James Grant) হিসেব অনুযায়ী ১৭৮৬ সালে বাংলা থেকে যে পরিমাণ ধন নিষ্ক্রমণ হয় তার পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। এই হিসেবে অবশ্য বাংলা থেকে ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে যে পরিমাণে অর্থ চলে যাচ্ছিল তা ধরা হয়নি। কোম্পানির পরিচালক সমিতির হিসেব অনুযায়ী এর পরিমাণ বছরে ২০ লক্ষ টাকা।[১৮] হোল্ডেন ফারবারও (Holden Furber) অন্যভাবে হিসেব করে গ্যান্টের মতোই সিদ্ধান্ত করেছেন যে, সমগ্র ভারতবর্ষকে ধরে ১৭৮৩-৮৪ থেকে ১৭৯২-৯৩ পর্যন্ত এই ধন নিষ্ক্রমণের পরিমাণ বছরে ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকার মতো।[১৯] ইরফান হাবিব কিন্তু মনে করেন, পণ্যসামগ্রীর ক্রয়মূল্য ধরে হিসেব করলেও ওই হিসেব নিতান্তই কম। তাঁর অনুমান, ১৭৮০ ও ১৭৯০-এর দশকে বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে বাৎসরিক যে ‘ট্রিবিউট’ বা অর্থ যেত তার পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকার মতো।[২০] যদি তাই হয়, তবে এ-বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকতে পারে না যে এর আগের দু’ দশকে অর্থাৎ ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে ধন নিষ্ক্রমণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি ছিল কারণ তখনই বাংলায় কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসা, উপঢৌকন ও দপ্তরের (নানা উপরি পাওনা) মাধ্যমে প্রচর অর্থ সংগ্রহ করেছিল এবং তার প্রায় সবটাই বিভিন্ন পথে বাইরে চলে যেত। বাংলার নবাব ও অন্যান্যদের কাছ থেকে কর্মচারীরা নানাভাবে যে অর্থ আদায় করত তার কোনও হিসেবপত্র নেই। ফলে এ ভাবে যে অর্থ সংগৃহীত হয় তার পরিমাণ সম্বন্ধে কোনও সঠিক ধারণা করা সম্ভব নয়। তবে যে-সব অর্থপ্রাপ্তির রসিদপত্র পাওয়া যায় তা থেকে এটা বলা যায় যে, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সালের মধ্যে (যখন উপহার, পারিবারিক দস্তুর, ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিল) ইংরেজরা শুধু ব্যক্তিগত ভাবেই যে অর্থ পেয়েছিল তার মোট পরিমাণ আনুমানিক ৫ কোটি টাকার মতো হবে।[২১]

কোম্পানির কর্মচারীদের আয়ের সবচেয়ে লোভনীয় উৎস ছিল ব্যক্তিগত ব্যবসা। তারা বেপরোয়াভাবে যে বিশাল পরিমাণ অন্তর্বাণিজ্য করতে শুরু করল তা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। এটা তাদের প্রাপ্ত উপহার, দান, দস্তুর প্রভৃতির চেয়েও দেশের পক্ষে অনেক বেশি ক্ষতিকারক ছিল। তাদের এভাবে দেশের অন্তর্বাণিজ্যকে কুক্ষিগত করাটা দেশের ‘অর্থনীতি লুঠে’র সামিল বলে গণ্য করা চলে। তা ছাড়া এর ফলে যে-সব ভারতীয় ও এশীয় বণিক প্রাক্-পলাশি যুগে বাংলার বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তারা আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল এবং এভাবে বাংলার সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যগত স্থলপথে বহির্বাণিজ্য নষ্ট হয়ে যায়।[২২] ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে কোম্পানির কর্মচারীরা কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিল তার কোনও সঠিক হিসেব দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা শুধু কোম্পানির কয়েকজন কর্মচারী তাদের নিজস্ব ব্যবসার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ রোজগার করেছিল তার একটা আন্দাজ দিতে পারি যা থেকে সাধারণভাবে কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করত তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।

মুর্শিদাবাদ দরবারের ইংরেজ প্রতিনিধি সাইকস (Sykes) মুর্শিদাবাদ ও অন্যান্য জেলায় সোরা, কাঠ ও রেশমের একচেটিয়া ব্যবসা করে দু’বছরে ১২ থেকে ১৩ লক্ষ টাকা রোজগার করেছিলেন প্রতি বছরে।[২৩] আরেকজন কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস (William Bolts) ব্যক্তিগত ব্যবসা করে ৬ বছরে ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন। কোম্পানির কর্মচারীরা এভাবে যে পরিমাণ টাকাপয়সা উপার্জন করত তার প্রায় সবটাই বিলস অব এক্সচেঞ্জ (Bills of Exchange) বা হুণ্ডির মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও ইউরোপে পাঠিয়ে দিত। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টারি কমিটির একটি অনুমান অনুযায়ী কোম্পানির কর্মচারীরা পলাশি বিপ্লবের পর এক দশকে ইংরেজ ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির ওপর হুণ্ডির মাধ্যমে প্রতি বছর ৮০ লক্ষ টাকা ইংল্যান্ড ও ইউরোপে পাঠিয়েছিল। এই হিসেবের মধ্যে অবশ্য কোম্পানির কর্মচারী নয় এমন ইংরেজ ও ইউরোপীয়দের চিন দেশে রফতানির মূল্য ধরা হয়নি। সেখানে রফতানি পণ্য বিক্রি করে টাকাটা সোজা ইংল্যান্ড বা ইউরোপে পাঠিয়ে দেওয়া হত। ১৭৮৩ সালের একটি পার্লামেন্টারি কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী একজন ইংরেজ ব্যবসায়ী এভাবে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা ইংল্যান্ডে পাঠায়। কোম্পানির অনেক কর্মচারী আবার হিরে রফতানির মাধ্যমে বাংলা থেকে টাকা পাচার করত—হিরেগুলি চোরাইচালান করা হত ইউরোপে।[২৪]

শুধু ইংরেজ কোম্পানি নয়, বাংলায় অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিরও পলাশির পরে ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো এনে বাংলায় রফতানি পণ্য কেনার প্রয়োজন হত না। প্রাক্-পলাশি যুগে ইংরেজদের মতো তাদেরও ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো/নগদ টাকাপয়সা এনে বাংলায় পণ্যসংগ্রহ করতে হত। কিন্তু পলাশির পরে ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের সংগৃহীত অর্থ এ-সব কোম্পানিকে দিত যা দিয়ে কোম্পানিগুলি বাংলায় পণ্য কিনত আর ওই অর্থের সমপরিমাণ টাকা হুণ্ডির মাধ্যমে এ-সব কর্মচারীদের নামে ইউরোপে চলে যেত। ফলে কোম্পানিগুলিকে আর ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো আনতে হত না। এটা বাংলা থেকে একরকম ধন নিষ্ক্রমণেরই সামিল। ১৭৬৮ সালেও কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল জানিয়েছিল যে, ডাচ ও ফরাসিদের তহবিলে টাকা উপচে পড়ছে যা দিয়ে আগামী তিন বছর তাদের রফতানি পণ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য খরচ সহজেই মেটানো যাবে।[২৫] বারওয়েলের (Barwell) অনুমান অনুযায়ী ১৭৫৬ ও ১৭৬৭ সালের মধ্যে ডাচ ও ফরাসিদের মাধ্যমে যে অর্থ ইউরোপে চালান যায় তার পরিমাণ কম করে ৯৬ লক্ষ টাকা।[২৬]

প্রাক্-পলাশি বাংলা থেকে ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছর ইংরেজ ও ডাচ কোম্পানির রফতানির মোট মূল্য প্রতি বছর গড়ে ৬২ লক্ষ টাকার মতো ছিল।[২৭] এর সঙ্গে ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয়দের বাণিজ্য যোগ করলে গড়মূল্য বছরে ৭০ লক্ষ টাকার মতো দাঁড়ায়। এই রফতানি বাণিজ্যের পণ্যসংগ্রহের জন্য প্রায় পুরো টাকাটাই ইউরোপ থেকে সোনা-রুপোর মাধ্যমে আনতে হত।কিন্তু পলাশির পরে বাংলায় এই সোনা-রুপোর আমদানি একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এবং এটা বাংলা থেকে যে ধন নিষ্ক্রমণ হয় তার একটা বড় অংশ। ইংরেজ কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী (যিনি পরে বাংলার গভর্নরও হয়েছিলেন) ভেরেলস্ট (Verelst) মন্তব্য করেছেন যে ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সালের মধ্যে বাংলায় সোনা-রুপো আসা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এখান থেকে ধনসম্পদ বাইরে চলে যাওয়া—এই দুটো মিলে বাংলার ৬ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার লোকসান হয়।[২৮] একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী পলাশির পর এক দশকে বাংলা থেকে কোম্পানিগুলির সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ইউরোপীয় ও ইংরেজদের হিরের চোরাচালান ও চিনদেশে রফতানি বাদ দিয়ে যে ধনসম্পদ বাইরে চলে যায় তার মূল্য হবে ১৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। বাংলার রাজস্ব বছরে ২ কোটি ২৪ লক্ষ ধরে পলাশির পর এক দশকে বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের পরিমাণ দাঁড়ায় বার্ষিক রাজস্বের ৬১ শতাংশ। এটা রক্ষণশীল অনুমান। প্রকৃতপক্ষে ৬৬ শতাংশের মতো হবে।[২৯] সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পলাশির পর বাংলা থেকে এক বিশাল আকারের ধন নিষ্ক্রমণ শুরু হয় এবং তাতে বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।

কোনও কোনও ঐতিহাসিক কিন্তু বাংলা থেকে এই যে ধন নিষ্ক্রমণ এবং তার ফলে অর্থনীতিতে যে অবক্ষয় দেখা যায় তা স্বীকার করতে নারাজ। এঁদের বক্তব্য, এর জন্য প্রথমে চাই ‘ধন-নিষ্ক্রমণের একটি যথার্থ সংজ্ঞা এবং এই নিষ্ক্রমণের যে পরিমাণ তার সঙ্গে বাংলার মোট আয়ের (income) একটা তুলনামূলক হিসেব।’[৩০] বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণ ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন রকমের অনুমান ও মতামত আছে। একটি মত হচ্ছে, এই নিষ্ক্রমণের ফলে বাংলার সম্পদের ৫ থেকে ৬ শতাংশ লোকসান হয়। আবার অন্য একটি মতে সম্পদ শুধু একতরফা স্থানান্তরিত হওয়ায় ভারতীয় অর্থনীতিতে অবক্ষয় দেখা গেছে, এ-কথা বলা যায় না।[৩১] এই মতের সপক্ষে যুক্তি, কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের ইউরোপে অর্থ পাঠাবার তাগিদের ফলে একদিকে রফতানি অনেক বেড়ে যায় এবং এ-রফতানির প্যাটার্নেও অনেক পরিবর্তন হয়। আরও যুক্তি, বাংলায় ইংরেজ শাসনের প্রবর্তন না হলে ইংল্যান্ড থেকে আমদানি বস্ত্রের প্রতিযোগিতার সামনে বাংলা থেকে মিহিবস্ত্রের রফতানি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকলেও, রেশম ও আফিং-এর রফতানির পরিমাণ খুব কমই থেকে যেত এবং তা বাড়ার কোনও সম্ভাবনাই থাকত না। তা ছাড়া নীল রফতানির প্রশ্নই আসত না।[৩২] এ-সব যুক্তি দেখিয়ে বলা হচ্ছে যে কোম্পানির সরকার কর বাবদ কৃষক ও কারিগরদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ আদায় করছিল, তার একটা অংশ কোম্পানি এভাবে (রফতানি বৃদ্ধি করে) তাদের ফেরত দেয়। আর প্রাক্-পলাশি বাংলার শ্রীবৃদ্ধিতে যে-সব দেশীয় বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কার-মহাজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, উত্তর-পলাশি যুগে তাদের পতনের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, কোম্পানির আমলে যে-সব নতুন সুযোগসুবিধের সৃষ্টি হয় তাতে এক নতুন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী শ্রেণীর উদ্ভব হয় এবং এরাই পূর্বতন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ীর অভাব পূরণ করে, ফলে তেমন কিছু ক্ষতি আসলে হয়নি।[৩৩]

কিন্তু ওপরের যুক্তিগুলি গ্রহণ করা কঠিন। এ-ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্য মনে রাখা দরকার তা হচ্ছে, উত্তর-পলাশি পর্বে ইংল্যান্ড থেকে কোনও সোনা-রুপো না এনেই বাংলা থেকে সব পণ্য সংগ্রহ করে রফতানি করা হয়েছে, যা আগে কখনও হয়নি৷ ইরফান হাবিব[৩৪] একটি প্রবন্ধে এ-বিষয়ে বলেছেন যে, পলাশির পরে ভারতবর্ষ থেকে যে পরিমাণ অর্থ বাইরে চালান করা হয়েছিল, তার সব যদি একদিকে জেমস গ্র্যান্ট ও জন শোরের (John Shore) প্রদত্ত[৩৫] বাংলার মোট জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে এবং অন্যদিকে ব্রিটেনে ব্রিটিশ জাতীয় আয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তা হলে এদেশ থেকে ধন নিষ্ক্রমণের প্রভাব সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকবে না। এই থেকেই স্পষ্ট হবে ধন নিষ্ক্রমণ ভারতীয় অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্রিটেনকে কতটা সমৃদ্ধ করেছিল। ইংরেজ কোম্পানি বাংলার রফতানি পণ্য প্রায় কুক্ষিগত করার ফলে, ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য বাদ দিলে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য যে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না।[৩৬] উত্তর-পলাশি পর্বে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলার চিরাচরিত স্থলবাণিজ্য প্রচণ্ড মার খায় অথচ মধ্য-অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত স্থলপথে বাংলার এই বহিবাণিজ্যের পরিমাণ ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রফতানি বাণিজ্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশিই ছিল।[৩৭]

আবার উত্তর-পলাশি পর্বে বাংলার রফতানি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যায় বলে যে-বক্তব্য তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতদিন প্রাক্‌-পলাশি যুগে বাংলার রফতানি বাণিজ্য বলতে আমাদের দৃষ্টি সাধারণত ইউরোপীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতীয় ও অন্যান্য এশীয় বণিকরা বাংলা থেকে যে রফতানি বাণিজ্য করত তা আমরা ধর্তব্যের মধ্যে নিইনি, মুখ্যত এই কারণে যে এ-বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ও তথ্য ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং তেমন কোনও পরিসংখ্যানও আমাদের হাতে ছিল না। কিন্তু এখন আমরা তথ্যপ্রমাণ ও পরিসংখ্যান দিয়ে এটা দেখাতে পেরেছি যে, মধ্য-অষ্টাদশ শতকেও বাংলা থেকে বস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে এশীয়রা ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল। শুধু তাই নয়, বাংলা থেকে এশীয় বণিকদের কাঁচা রেশম রফতানির পরিমাণ ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রফতানির চার-পাঁচগুণ বেশি ছিল। এই তথ্যগুলি মনে রাখলে উত্তর-পলাশি পর্বে রফতানি বৃদ্ধির ফলে পূর্বতন এশীয় রফতানি বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে ক্ষতি হয়েছিল তা পুষিয়ে দিয়েছিল বলে যে-বক্তব্য তা অসার হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, পলাশির পরে অনেক সুযোগসুবিধে সৃষ্টি হওয়ায় নতুন এক ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উদ্ভব হয় বলে যে বক্তব্য, সে-সম্বন্ধে এটা বলা যায় যে, এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কোনও তুলনাই হয় না। প্রাক্-পলাশি এবং উত্তর-পলাশি এই দুই পর্বের মধ্যে আসমান-জমিনের ফারাক। আগে শিল্পবাণিজ্যের যে সুস্থ ও অনুকূল পরিবেশ ছিল তা দেশীয় ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কারদের উদ্ভব ও শ্রীবৃদ্ধির যথেষ্ট সহায়ক ছিল। কিন্তু উত্তর-পলাশি পর্বে কোম্পানির শাসনকালে তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, তার ফলে এ সময় জগৎশেঠ, খোজা ওয়াজিদ বা উমিচাঁদের মতো কোনও বণিকরাজার আবির্ভাব হয়নি বা ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে আসা কোনও প্রভাবশালী সওদাগরও আর চোখে পড়ে না। এমনকী নবাবি আমলের বড় বড় দাদনি বণিকদের মতো (যেমন কলকাতার শেঠ ও বসাক, কাশিমবাজারের কাটমা পরিবার, ইত্যাদি) কারও সাক্ষাৎও মেলে না।[৩৮] এদের মধ্যে অনেকেই কোম্পানিগুলির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করতে পারত, কোম্পানির সঙ্গে এদের সম্পর্ক ছিল সমানে-সমানের। কিন্তু পলাশির পরে যে বণিক ব্যাঙ্কার-গোষ্ঠীর উদ্ভব হয় তাদের বেশির ভাগই ছিল কোম্পানির বশংবদ এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কোম্পানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল—যা প্রাক্-পলাশি যুগের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

অন্যদিকে উত্তর-পলাশি পর্বে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা কৃষক, তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের কাছ থেকে কর বাবদ যা আদায় করেছিল তার একটা অংশ তাদের অন্যভাবে (রফতানি বাণিজ্যের উন্নতি ঘটিয়ে) ফিরিয়ে দিয়েছিল বলে যে যুক্তি, তা এ সময় তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা যে অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছিল, তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি। পলাশির পরবর্তী সময় এরা তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার ও শোষণ চালায় এবং তার ফলে বাংলার সুপ্রাচীন সব শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।এতে তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে, তাদের দুঃখদুর্দশার সীমা থাকে না। অথচ নবাবি আমলে তাঁতিদের এতটা স্বাধীনতা ছিল যে, তারা ইচ্ছেমতো কাপড় তৈরি করতে পারত এবং তারা এই কাপড় তাদের ইচ্ছেমতো যে-কোনও ক্রেতাকে বিক্রি করতে পারত। কিন্তু পলাশির পর তাদের এই স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা তাঁতি-কারিগরদের ওপর নিজেদের ‘প্রভুত্ব’ স্থাপন করে।তারা তাঁতিদের বাধ্য করল তাদের নির্দেশ মতো শুধু যে ধরনের ও যে পরিমাণ কাপড় তারা বুনতে বলবে তাই তাঁতিদের বানাতে হবে, তার অন্যথা করা চলবে না। এজন্য তাদের খুশিমতো দাম তারা তাঁতিদের নিতে বাধ্য করত, যদিও ওই দাম খোলা বাজারের দামের চেয়ে অনেক কমই হত। কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের গোমস্তারা তাদের ‘প্রভু’দের সাহায্যে, বলতে গেলে, এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর একদিকে শারীরিক নির্যাতন ও নানা নিপীড়ন এবং অন্যদিকে মাত্রাহীন শোষণ চলতে থাকে। এদের এখন একেকজন নির্দিষ্ট গোমস্তার কাছে নাম লেখাতে বাধ্য করা হল। একজন তাঁতি যে গোমস্তার কাছে নাম লেখাতে বাধ্য হল, সে সেই গোমস্তা ছাড়া অন্য কারও জন্য কাপড় বুনতে পারবে না, এ নিয়ম চালু হল। আবার এক গোমস্তার খাতায় নাম লেখানো তাঁতিকে অন্য গোমস্তার কাছে ‘ক্রীতদাসের’ মতো ‘হাতবদল’ও করা হত।

প্রাক্-সমসাময়িক একটি পাণ্ডুলিপির অজ্ঞাতনামা এক ইংরেজ লেখক মন্তব্য করেছেন যে তাঁতি-কারিগরদের (উত্তর-পলাশি যুগে) দুর্দশা বর্ণনাতীত।[৩৯] ১৭৬৯ সালে কোম্পানির এক কর্মচারী, রিচার্ড বেচার, যিনি প্রাক্-পলাশি বাংলায় ছিলেন, অন্য এক কর্মচারী, ভেরেলস্টকে লেখেন: ‘কোম্পানি দেওয়ানি পাওয়ার (১৭৬৫) পর থেকে এ দেশের লোকজনের অবস্থা আগের চেয়ে (প্রাক্-পলাশি) অনেক খারাপ হয়েছে…. আমার বিশ্বাস এ-বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যে ভাবে এখন কোম্পানির রফতানি পণ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে’ এবং ‘প্রতিবছর কোনও সোনা-রুপো আমদানি না করেই যে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ বাইরে চালান করা হচ্ছে, তাতেই এদেশের এমন দুরবস্থা।[৪০] ভেরেলস্ট[৪১] এবং বোল্টস[৪২] স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, বাংলার আর্থিক দুর্দশার সূত্রপাত উত্তর-পলাশি যুগে। শুধু তাই নয়, প্রায় সমসাময়িক ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার ডো’-ও মন্তব্য করেছেন যে বাংলার দুর্ভাগ্য ও দুর্দশার শুরু, সিরাজদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর বাংলায় যে-সব রাজনৈতিক বিপ্লব ও পরিবর্তন হয় তা থেকেই।[৪৩]

অবশ্য কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলছেন যে যদিও বাংলা থেকে বেশ বড় রকমের ধন নিষ্ক্রমণ হয়েছিল তাকে শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষের শোষণ হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না—সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে ইউরোপীয় এবং ইংরেজদের বিভিন্ন কর্মপ্রচেষ্টা ও উদ্যোগ ভারতীয় অর্থনীতির উন্নতির সহায়ক হয়েছিল। এটাও বলা হয় যে ইংরেজদের ও ইউরোপীয়দের এ-সব প্রচেষ্টার ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে অর্থনৈতিক যোগসূত্র অনেক ঘনীভূত হয়। এটাও হয়তো সম্ভব যে এদের বিভিন্ন প্রচেষ্টার ফলে ১৭৮৩ থেকে ১৭৯৩-এর মধ্যে ভারতবর্ষের ধনসম্পদ হ্রাস হওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধিই পেয়েছিল। এই যুক্তিও দেখানো হয় যে ইংরেজ ও ইউরোপীয়রা বাংলা থেকে বস্ত্র রফতানি বন্ধ করলে বাংলার তাঁতি ও কাটুনিদের (spinners) এক ষষ্ঠাংশ বেকার হয়ে যেত।[৪৪] কিন্তু এ-সবই শুধু জল্পনা-কল্পনা ও অনুমানমাত্র, কোনওটাই তথ্যপ্রমাণ দিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য করে পরিবেশিত হয়নি। অন্যদিকে এখন আমরা দেখাতে পেরেছি যে নবাবি আমলে বাংলার বস্ত্র ও রেশমের রফতানি বাণিজ্যের যে শ্রীবৃদ্ধি এবং যার সিংহভাগই এশীয় বণিকদের হাতে ছিল (ইউরোপীয়দের নয়), অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যায়। তার ফলে বাংলার অসংখ্য তাঁতি, কাটনি ও অন্যান্য কারিগররা শোচনীয় দুর্দশার মধ্যে পড়ে। সুতরাং বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি ও মানুষের যে ক্ষতি হয় তা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের আগমনের ফলে যে স্বল্প লাভ হয় তা দিয়ে পূরণ হয়েছিল এ-কথা কিছুতেই বলা যায় না।

পলাশির রাজনৈতিক প্রভাব তার অর্থনৈতিক পরিণতির চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে মীরজাফর ও ইংরেজদের মধ্যে যে চুক্তি হয় তা অনেকটা রক্ষণশীল (conservative)। এতে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের আলিনগরের যে চুক্তি হয়েছিল (৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) তার বাইরে নতুন বা গুরুত্বপূর্ণ কোনও শর্ত ছিল না।[৪৫] কিন্তু এ-বক্তব্য মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। আসলে এই চুক্তিতে এমন কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সংযোজিত হয় যাতে নবাবের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। নবাবকে ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত করা হয়েছিল, তাঁর সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়ে তাঁকে পুরোপুরি ইংরেজদের ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়।[৪৬]

মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তির যে শর্ত, ‘ইংরেজদের শত্রু আমার শত্রু, তা সে ভারতীয় বা ইউরোপীয় যেই হোক না কেন,’ তা শুধু সম্পূর্ণ নতুন নয়, খুব গুরুত্বপূর্ণও বটে। এটা নবাবের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপও বটে। এর ফলে নবাব ইংরেজদের ওপর নির্ভরশীল একটি পতলে পর্যবসিত হন এবং তাতে প্রয়োজনে, ইংরেজদের সঙ্গে বনিবনা না হলে, ফরাসি বা অন্য কোনও ইউরোপীয় বা এমনকী কোনও ভারতীয় শক্তির সঙ্গেও আঁতাত করার কোনও স্বাধীনতা তাঁর আর থাকল না। পলাশির কিছুদিন পরেই মীরজাফর এটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছিলেন। তা ছাড়া, চুক্তির অন্য আরেকটি শর্ত—নবাবকে ফরাসিদের ও তাদের সব সম্পত্তি ইংরেজদের হাতে সমর্পণ করতে হবে এবং তাদের বাংলা থেকে বরাবরের মতো বহিষ্কার করতে হবে—ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব ও ফরাসিদের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও আঁতাতের সম্ভাবনাকে একেবারে নির্মূল করে দেয়। তার ফলে ইংরেজদের শক্তিবৃদ্ধিতে বা বাংলার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপের যে প্রচেষ্টা তাতে বাধা দেওয়ার কোনও ক্ষমতাই নবাবের থাকল না। তিনি অসহায় দর্শকে পর্যবসিত হলেন।

তা ছাড়াও, চুক্তির আরেকটি শর্ত অনুযায়ী যখনই নবাবের ইংরেজ ফৌজের সাহায্য প্রয়োজন হবে, তখন তাঁকে এই ফৌজের সব খরচপত্র বহন করতে হবে। এতে বাংলায় পাকাপাকিভাবে ইংরেজ ফৌজ বহাল রাখার একটা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল এবং ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব কিছু করার মতো সাহস ও শক্তি হারালেন। শুধু তাই নয়, এই ফৌজ পরে বাংলার আশেপাশে ইংরেজদের প্রতিপত্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। তাই পলাশির ঠিক পরেই ক্লাইভ লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে লেখেন: ‘আমার দৃঢ় ধারণা বাংলায় আপনাদের যে উপনিবেশ গড়ে উঠছে তার গুরুত্ব চিন্তা করে আপনারা যে শুধু তাড়াতাড়ি বেশি সংখ্যক সৈন্যসামন্ত এবং উপযুক্ত কর্মচারী পাঠাবেন তা নয়, এখানকার শাসন চালানোর জন্য যোগ্য তরুণদের পাঠাতে ভুলবেন না।’[৪৭] তিনি যে বাংলার শাসন পরিচালনার জন্য উপযুক্ত তরুণদের চেয়ে পাঠালেন, তা থেকে মনে হয়, অদূর ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে তিনি সেটা ভালভাবেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। সবশেষে, চুক্তিতে অন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল। তাতে মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি হুগলির নীচে কোনও দূর্গ তৈরি করবেন না। এটা নবাবের সার্বভৌমত্বের ওপর ইংরেজদের হস্তক্ষেপের সামিল এবং এতে সামরিকভাবে নবাবকে একেবারে পঙ্গু করে দেওয়া হল। ওই শর্তের ফলে নবাবের পক্ষে কোনও কারণেই আর ইংরেজদের চ্যালেঞ্জ জানাবার অবকাশ থাকল না এবং এর পরেই ইংরেজরা কলকাতায় বিশাল দুর্গ তৈরির ব্যবস্থা করল।[৪৮]

পলাশি বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় ১৭৭২ সালে একটি পার্লামেন্টারি কমিটির সামনে ক্লাইভের সাক্ষ্য থেকে:[৪৯]

পলাশির যুদ্ধজয় আমাকে কী অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছিল তা একবার চিন্তা করে দেখুন।একজন নবাব আমার অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল; একটি সমৃদ্ধ নগরী আমার দাক্ষিণ্যপ্রার্থী; এই নগরীর ধনীশ্রেষ্ঠ মহাজন ও সওদাগরেরা আমাকে খুশি করতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। [নবাবের] কোষাগার শুধু আমার জন্যই খুলে দেওয়া হয়েছে—আমি দু’পাশের স্তূপীকৃত সোনা ও হিরে-জহরত দেখে যাচ্ছি। সভাপতি মহাশয়, এই মুহূর্তে আমি আমার বিনয় দেখে বিস্মিত হচ্ছি।

সুতরাং ওপরের তথ্যপ্রমাণ ও বিশ্লেষণ থেকে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পলাশির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফলাফল বাংলার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক হয়েছিল। পলাশির পরেই ইংরেজরা বাংলার আর্থিক সম্পদ করতলগত করে ও বাংলায় তাদের রাজনৈতিক প্রভত্বের বিস্তার করে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলেই একদা সমৃদ্ধ বাংলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত।

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ৭৮।
  2. Law’s Memoir, Hill, III, p. 212.
  3. Scrafton, Reflections, p. 98.
  4. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, Chapters, 7,8,9 & 10; See also, N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1; D.B. Mitra, Cotton Weavers of Bengal; Hameeda Hussain, Company Weavers of Bengal; Tapan Raychaudhuri and S. Bhattacharya in Cambridge Economic History of India, vol. II.
  5. Alexander Dow, Hindostan, vol. III, p. lxxvii.
  6. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 126.
  7. N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1. p. 221.
  8. বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের পুরো বৃত্তান্তের জন্য, ঐ, পৃ. ২২১-২৪০; Holden Furber, John Company at Work, pp. 304-07; Irfan Habib, ‘The Eighteenth Century in Indian Economic History’, pp. 110-113.
  9. Holden Furber, John Company, Appendix A, p. 327.
  10. তখন পাউন্ড আর টাকার বিনিময় হার ছিল মোটামুটি এক পাউন্ডে আট টাকা।
  11. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 127.
  12. Hill,I, p. ccx; III, p. 362.
  13. ক্লাইভ তাঁর পিতাকে, ১৯ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, III, p. 360.
  14. Scrafton, Reflections, p. 130.
  15. বেলচিয়ারকে ক্লাইভের চিঠি, Hill, III, p. 361; স্ক্র্যাফ্টন কিন্তু ওই ভূখণ্ডের রাজস্বের পরিমাণ বছরে ৮ লক্ষ টাকা বলে অনুমান করেছিলেন, Scrafton, Reflections, p. 130.
  16. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 127.
  17. ঐ,পৃ. ১২৭-২৮।
  18. N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, p. 236-এ উদ্ধৃত।
  19. Holden Furber, John Company, p. 310, OF 471C Fiep (drain in goods) বলেছেন।
  20. Irfan Habib, ‘The Eighteenth Century in Indian Economic History’, p. 111.
  21. N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, p. 221-22.
  22. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, Chaps. 5,7,8
  23. বারওয়েল, তাঁর পিতাকে, N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, P, 223-26 0961.
  24. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, pp. 129-30.
  25. লন্ডনে কোম্পানির পরিচালকদের লেখা ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের চিঠি, Fort William-India House Correspondence, vol. 5, quoted in N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, p. 230.
  26. ঐ।
  27. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 42-43.
  28. H. Vereist, English Government in Bengal, pp. 85-86.
  29. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, pp. 130-31.
  30. P. J. Marshall, Bengal, p. 165.
  31. A. K. Bagchi, Political Economy, p. 81; K. N. Chaudhuri, ‘India’s International Economy in the Nineteenth Century’, MAS, II (1968), p. 47, both quoted in Marshall, Bengal, p. 165.
  32. P. J. Marshall, Bengal, pp. 165-66.
  33. ঐ, পৃ. ১৬৬-৬৭।
  34. Irfan Habib, ‘Studying a Colonial Economy’, MAS, 19, 3 (1985), pp. 357-58.
  35. James Grant in Fifth Report, ed., Firminger, vol. II., p. 276 and John Shore in Ibid, pp. 27-28.
  36. Steuart cited is S. Bhattacharyya in Cambridge Economic History of India, vol. II, p. 289.
  37. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 202-11, 249-58.
  38. ঐ, অধ্যায় ৫,৭ ও ৮।
  39. Mss. Eur. D. 283, ff. 37-38.
  40. W. K. Firminger, Historical Introduction to the Fifth Report, p. 183.
  41. উদাহরণস্বরুপ, H. Verelst to Court of Directors, 2 April 1769, BPC., vol. 44, f. 434. para 6.
  42. William Bolts, Considerations, p. 200.
  43. Alexander Dow, Hindostan, vol. III, lxxxii.
  44. Holden Furber, John Company, pp. 310-12.
  45. P. J. Marshall, Bengal, p. 79; Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, p. 15. মার্শাল অবশ্য তাঁর বক্তব্যে একটা নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টির কথা বলেছেন। সেটা হচ্ছে পরিবর্তিত অবস্থায় নতুন সংযোজন শুধু বাংলায় ক্লাইভের ফৌজের উপস্থিতি। এ-কথা অবশ্য পরে কুমকুম চট্টোপাধ্যায়ও বলেছেন, যদিও সবাই জোর দিয়েছেন যে-বক্তব্যে তা হল পলাশির পর চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনও নতুন শর্ত যোগ করা হয়নি।
  46. মীরজাফরের সঙ্গে ইংরেজদের চুক্তির শর্তাবলীর জন্য, Hill, II, pp. 56-57, 373-74, 442.
  47. লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে ক্লাইভের চিঠি, ২৬ জুলাই ১৭৫৭, Hill, II. p. 461.
  48. P. J. Marshall, Bengal, p. 81.
  49. P. J. Marshall, Bengal, p. 81.