» » পঞ্চম অধ্যায় : পলাশি

পঞ্চম অধ্যায় : পলাশি

নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের সম্যক বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। তা না করলে এই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মুর্শিদাবাদেই এ ষড়যন্ত্রের উদ্ভব, বিকাশ ও রূপায়ণ। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে পলাশি বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে শুধু নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পলাশিতে ইংরেজদের বাংলা বিজয় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্থাপন করে। বাংলা থেকেই এবং বাংলার অর্থভাণ্ডার দিয়েই ইংরেজরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের প্রভুত্ব বিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা। সেজন্য তারা কেন এবং কী ভাবে পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলা জয় করে, তার আলোচনা করা প্রয়োজন।

স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে শুধু নয়, এস. সি. হিল (১৯০৫) থেকে শুরু করে অধুনা পিটার মার্শাল (১৯৮৭), ক্রিস বেইলি (১৯৮৭), রজতকান্ত রায় (১৯৯৪) প্রমুখের গ্রন্থেও[১] সিরাজদ্দৌল্লা এবং পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব সম্বন্ধে কতগুলি বক্তব্য স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে দেখা যায়। সাধারণভাবে এ বক্তব্যগুলি হল—পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের বিশেষ কোনও ভূমিকা ছিল না; সিরাজদ্দৌল্লা এতই দুশ্চরিত্র, দুর্বিনীত ও নিষ্ঠুর ছিলেন যে তাতে রাজ্যের অমাত্যবর্গ শুধু নয়, সাধারণ মানুষও নবাবের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই তাঁকে অপসারণ করতে মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বদ্ধপরিকর হয় এবং এ কাজ সম্পন্ন করতে তারা ইংরেজদের সামরিক শক্তির সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশায় তাদের ডেকে আনে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় একটি ‘আকস্মিক’ ঘটনামাত্র, এর পেছনে তাদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ (মার্শালের ভাষায় ‘no calculated plottings’) ছিল না। মুর্শিদাবাদ দরবারে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে তারা মাঠে নেমে পড়ে এবং নবাবের অমাত্যদের সঙ্গে সিরাজকে হঠিয়ে মীরজাফরকে নবাব করার পরিকল্পনায় সামিল হয়।

সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয় হয় যে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের যে বিবাদ ও সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে তিনি শেষ পর্যন্ত বাংলার মসনদও হারালেন, তার জন্য মূলত দায়ী তিনিই। আবার পলাশির ব্যাখ্যা হিসেবে যুক্তি দেখান হয়ে থাকে যে সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হয়ে তাঁর আচরণ ও ব্যবহারে প্রভাবশালী অমাত্যবর্গকে তাঁর প্রতি বিরূপ করে তোলার ফলে বাংলায় যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ‘সংকট’ দেখা দেয়, তার পরিণতিই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব। ইদানীং এটাও প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে প্রাক্‌-পলাশি বাংলায় রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ‘সংকটও’ [বিশেষ করে কে. এন. চৌধুরী (১৯৭৮), পিটার মার্শাল (১৯৮০, ’৮৭)] দেখা দিয়েছিল এবং এই ‘উভয় সংকট’ থেকে বাংলাকে উদ্ধার করার জন্যই যেন ইংরেজরা ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও’ বাংলা জয় করে। কোনও কোনও ঐতিহাসিক আবার ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করতে গিয়ে প্রাক-পলাশি বাঙালি সমাজের একটি দ্বিধাবিভক্ত চিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় যত্নবান। এঁদের বক্তব্য, পলাশির প্রাক্কালে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলিম শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় মুসলিম নবাবের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য ইংরেজদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।

উপরোক্ত বক্তব্যগুলি কতটা সঠিক এবং তথ্য ও যুক্তিনির্ভর, তার সূক্ষ্ম এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। গত দু’দশকেরও বেশি ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে, বিশেষ করে ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (India Office Records, British Library, London) রক্ষিত ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র ও ‘প্রাইভেট পেপারস’ এবং হল্যান্ডের রাজকীয় আর্কাইভসে (Algemeen Rijksarchief, The Hague) সংরক্ষিত ডাচ কোম্পানির দলিল দস্তাবেজ ও কাগজপত্রে (যেগুলি এর আগে পলাশির প্রেক্ষিতে কেউ দেখেননি বা ব্যবহার করেননি) যেসব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি এবং তার পাশাপাশি আগের নানা তথ্য ও সমসাময়িক ফারসি ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে আমরা ওপরের বক্তব্যগুলি খণ্ডন করেছি।

আমাদের মূল বক্তব্য, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল ইংরেজরাই, ভারতীয়রা নয়। ইংরেজরা বেশ পরিকল্পিতভাবেই একাজ সম্পন্ন করে এবং নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে তারা মুর্শিদাবাদ দরবারের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে তাদের পরিকল্পনায় সামিল করে। শুধু তাই নয়, পলাশির যুদ্ধের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে যাতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকে। তবে এটাকে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের দোষ স্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল হবে। নবাবের দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটা অংশ সিরাজদ্দৌল্লার ওপর বিরূপ হয়ে একটা চক্রান্ত করার চেষ্টা করছিল, একথা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমরা যে বক্তব্যের ওপর জোর দিচ্ছি তা হল, ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং খুব সম্ভবত তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই চক্রান্ত পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে নবাবের পতন ঘটাতে পারত না।

বিচার্য বিষয়

আলোচনার সুবিধের জন্য বিষয়গুলি আর একটু বিশদভাবে বলা প্রয়োজন। প্রথম, ঐতিহাসিকরা (এবং বেশিরভাগ সমসাময়িক লেখকরাও বটে) সহমত যে নবাব হওয়ার আগে সিরাজদ্দৌল্লা এতই নির্মম, নিষ্ঠুর এবং দুশ্চরিত্র ছিলেন যে সবাই আলিবর্দির পরে সিরাজের নবাব হওয়ার সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। সিরাজের এই ‘কদর্য’ চরিত্র অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকে শুধু নয়, সাধারণ মানুষকেও তাঁর প্রতি বিরূপ করে তুলেছিল। কাশিমবাজারের তদানীন্তন ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ লিখেছেন: ‘Before the death of Alivardi Khan, the character of Siraj- uddaula was reputed to be worst ever known. In fact he had distinguished himself not only by all sorts of debaucheries but by a revolting cruelty.’[২] দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বক্তব্য, ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে সিরাজের যে বিবাদ ও সংঘর্ষ হয়েছিল তার জন্য সিরাজদ্দৌল্লাই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। এ সংঘর্ষের কারণ আলোচনা করতে গিয়ে এস. সি. হিল নবাবের উদ্দেশ্য বা কারণ এবং নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ এই দু’ভাগে ভাগ করেছেন। হিলের মতে এ সংঘর্ষের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ হল সিরাজদ্দৌল্লার ‘দম্ভ’ এবং ‘অর্থলিপ্সা’। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজের যেসব অভিযোগ— ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও দুর্ভেদ্যকরণের প্রচেষ্টা, দস্তক বা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিপত্রের যথেচ্ছ ও বেআইনি অপব্যবহার এবং নবাবের অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয়দান— সেগুলিকে হিল সাহেব ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।[৩]

তৃতীয়ত, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বক্তব্য, পলাশি ভারতীয়দেরই ষড়যন্ত্র (ক্রিস বেইলির ভাষায় ‘Indian-born conspiracy’)। এর পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ ছিল না। প্রথমদিকে ইংরেজদের লক্ষ্য ছিল ‘খুবই সীমিত’ কিন্তু তারা যখন উপলব্ধি করল যে মুর্শিদাবাদ দরবারে একটি বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাতে উৎসুক, তখন তাদের লক্ষ্য আস্তে আস্তে প্রসারিত হল।[৪] সাধারণভাবে পলাশির ষড়যন্ত্রের জন্য প্রধানত মীরজাফরকেই দায়ী করা হয়। মীরজাফরই বিশ্বাসঘাতক—নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে বাংলার মসনদ অধিকার করার মতলবে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে পলাশি চক্রান্তে যোগ দেন— এ মত বহুল প্রচারিত। বাংলায় মীরজাফর নামটাই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। এখনও ওই নাম বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক শব্দ।

চতুর্থত, প্রাক্‌-পলাশি বাংলায় অভ্যন্তরীণ ‘সংকটের’ কথাও বলা হয়ে থাকে। আগে এই ‘সংকটকে’ শুধু রাজনৈতিক ‘সংকট’ হিসেবে দেখা হত। কিন্তু ইদানীং এর সঙ্গে অন্য একটি মাত্রাও যোগ করার চেষ্টা হয়েছে—বলা হচ্ছে এটা অর্থনৈতিক ‘সংকট’ও বটে। রাজনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয় যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার বাণিজ্যিক-ব্যাঙ্কিং শ্রেণি, জমিদার ও অভিজাতবর্গের সঙ্গে নবাবের যে শ্রেণিগত জোটবদ্ধতা গড়ে উঠেছিল এবং যা মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার নিজামতকে স্থায়িত্ব দিয়েছিল, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর তা ভেঙে পড়ে। আর অর্থনৈতিক সংকটের লক্ষণ হিসেবে নির্দেশ করা হচ্ছে— অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি, শিল্পবাণিজ্যের অধোগতি, ব্যবসায়ী/মহাজন শ্রেণির আর্থিক দুরবস্থা, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম এবং ইংরেজ কোম্পানির রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণে ঘাটতি, ইত্যাদি। এ সবগুলিকে ১৭৪০-র দশকে যে ক্রমাগত মারাঠা আক্রমণ হয়েছিল তাঁর ফলশ্রুতি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।[৫]

আবার অধুনা বলা হচ্ছে, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত যে হিন্দু-জৈন মহাজন-ব্যাঙ্কিং ও ব্যবসায়ী শ্রেণির শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, তার প্রেক্ষিতেই পলাশি বিপ্লবের ব্যাখ্যা করা সমুচিত। হিল সাহেব অবশ্য অনেকদিন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে তাদের সঙ্গে উপরোক্ত শ্রেণির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।[৬] কিছুদিন আগে ব্রিজেন গুপ্ত দেখাবার চেষ্টা করেছেন, বাংলার সঙ্গে ইউরোপীয় সমদ্র বাণিজ্যের ফলে হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। এই বিশেষ শ্রেণিই বাংলায় ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রধান সহায়কের (‘catalytic agent’) কাজ করেছিল।’[৭] আর এখন পিটার মার্শাল, ক্রিস বেইলি প্রমুখ ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে ইউরোপীয়দের সঙ্গে বাংলার হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ওপর জোর দিচ্ছেন— বলছেন, তাঁর ফলে উভয়ের স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এবং সে কারণেই হিন্দু-জৈন মহাজন-ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়।[৮] অর্থাৎ সেই ‘কোলাবোরেশন থিসিসের’ ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই থিসিসের মূল প্রতিপাদ্য, ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে বাংলায় হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের, বিশেষ করে ইংরেজদের, স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় এবং সেজন্যই এরা ইংরেজদের সঙ্গে পলাশির ষড়যন্ত্রে সামিল হয়। বিশদভাবে বলতে গেলে এ বক্তব্য মোটামুটি এরকম: অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় বাণিজ্যেরই বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা, ইউরোপীয়রাই বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি রফতানি বাণিজ্য করছিল এবং ফলে তারাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি ধনসম্পদ (রুপো, টাকাকড়ি) আমদানি করত। আর এই বাণিজ্যের ফলে হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বেশ লাভবান হতে থাকে এবং সে কারণেই তাদের সঙ্গে ইংরেজদের একটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্রিস বেইলি এমন কথাও বলছেন যে বাংলায় ‘ব্যবসায়ী-ভূস্বামীদের স্বার্থ ইউরোপীয়দের ভাগ্যের সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছিল যে কলকাতা থেকে ইংরেজদের তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা তারা সহ্য করতে পারছিল না এবং সেজন্যই পলাশির ঘটনা ঘটল’।[৯]

সবশেষে এবং একদিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রাক-পলাশি বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত চিত্র। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের বক্তব্য, পলাশি যুদ্ধের প্রাক্‌কলে বাংলার সমাজ হিন্দু এবং মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত ছিল। মুসলমান নবাবের অত্যাচারে জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা মুসলমান শাসন থেকে মুক্তি চাইছিল, তাই তারা ইংরেজদের স্বাগত জানাতে উৎসুক ছিল। এ মতবাদের প্রধান প্রবক্তাও এস. সি. হিল। ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার যে সংঘর্ষ বাধে, হিলের মতে তাঁর অন্যতম ‘সাধারণ’ কারণ মুসলমান শাসকদের প্রতি হিন্দুদের অসন্তোষ। স্যার যদুনাথ সরকার সোজাসুজি এ ধরনের কথা না বললেও উদ্ধৃতি দিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, মূলত হিন্দুরাই মুসলমান শাসনের অবসান চাইছিল। ব্রিজেন গুপ্ত বাংলার দ্বিধাবিভক্ত এই সমাজের কথা বলতে গিয়ে প্রায় হুবহু হিলের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন।[১০]

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. S. C. Hill, Bengal in 1756-57, 3 vols; P. J. Marshall, Bengal — the British Bridgehead; C. A. Bayly, Indian Society and the Making of the British Empire; Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, IHR: পলাশীর ষড়যন্ত্র।
  2. Law’s Memoir, Hill, III, p. 162.
  3. Hill, Vol. I, Introduction, p. liii.
  4. P.J. Marshall, Bengal, p. 91; C. A. Bayly, Indian Society, p. 50: Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, pp. 7, 11, 12; পলাশী, পৃ. ১২, ১৬।
  5. আমার প্রবন্ধ, ‘Was there a crisis in mid-Eighteenth Century Bengal?’, presented in the “Workshop on the Eighteenth Century”. University of Virginia, Charlottesville. Now published in Richard B. Barnett, ed., Rethinking Early Modern India, pp. 129-52.
  6. Hill, Vol. 1, p. XXIII.
  7. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 32.
  8. C. A. Bayly, Indian Society, p. 50
  9. ঐ, pp. 49-50.
  10. S. C. Hill, Three Frenchmen in Bengal, p. 120; Bengal in 1756-57, vol. I, Introduction, pp. xxiii, lii; Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p.41.