» » পঞ্চম অধ্যায় : পলাশি

সিরাজদ্দৌল্লার চরিত্র

ইতিহাসের গল্পকথায় শুধু নয়, মননশীল লেখকদের ভাষ্যেও সিরাজদ্দৌল্লা দুশ্চরিত্র, নির্মম, নিষ্ঠুর ও লম্পট। সন্দেহ নেই, সমসাময়িক বিদেশি পর্যবেক্ষক ও ফারসি ইতিহাসেও এমন বর্ণনাই আছে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য, ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের সংঘর্ষের কারণ খুঁজতে গিয়ে বা পলাশি চক্রান্তের স্বরূপ উদঘাটনে নবাব হওয়ার আগে সিরাজ চরিত্রের এই ‘অন্ধকার’ দিকটা খুঁটিয়ে দেখার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবু তর্কের খাতিরে ওটা প্রয়োজনীয় বলে যদি ধরেও নেওয়া যায়, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখতে বাংলার প্রায় সব নবাবই একই চরিত্রদোষে দোষী—দুশ্চরিত্র আর নিষ্ঠুর কেউ কম ছিলেন না। তা হলে শুধু সিরাজদ্দৌল্লাকেই ‘দুশ্চরিত্রের’ জন্য দোষী করার প্রচেষ্টা কেন? মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার সব নবাবই নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। সুজাউদ্দিন ও সরফরাজ দু’জনেই দুশ্চরিত্র ছিলেন। সেক্ষেত্রে সিরাজদ্দৌল্লার প্রতিই কেন শুধু এ অপবাদ? এটাকে পলাশির ষড়যন্ত্র ও ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যথার্থতা প্রমাণ করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক প্রচার বলে সন্দেহ করা কি খুবই অমূলক?

আমাদের এ বক্তব্যকে কিন্তু সিরাজ চরিত্রের দোষস্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ভুল বোঝার অবকাশ নেই। নবাব হওয়ার আগে দুশ্চরিত্রের অপবাদ সিরাজকে দেওয়া যায় না বা নবাব হিসেবে সিরাজ খুব মহান ছিলেন এটা মোটেই আমাদের বক্তব্য নয়। আমাদের যুক্তি অন্যত্র। আমাদের প্রশ্ন— নবাব হওয়ার পরেও কি সিরাজ আগের সেই চরিত্রের লোক ছিলেন? তার মধ্যে কি কোনও পরিবর্তন এসেছিল বা তার কি চৈতন্যোদয় হয়েছিল? নবাব হওয়ার পরেও কি তিনি আগের মতো উদ্ধত, দুশ্চরিত্র, নিষ্ঠুর আর নির্মম ছিলেন? ইতিহাসে এর সোজাসুজি সাক্ষ্যপ্রমাণ তেমন কিছু নেই। তবু এখানে ওখানে ছোটখাট কিছু তথ্য, কিছু ইঙ্গিত থেকে একটা ধারণা আমরা করতে পারি। তা ছাড়া নবাব হিসেবে (যদিও স্বল্প সময়ের জন্য—পনেরো মাসেরও কম) সিরাজদ্দৌল্লার আচরণ ও কাজকর্ম বিশ্লেষণ করেও আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারি। এখানে একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আমাদের মনে রাখতে হবে। সিরাজ চরিত্রের যে কদর্য দিকটার দিকে সবাই অঙ্গুলি সংকেত করছেন, তা কিন্তু মুখ্যত সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার আগের চরিত্র (জাঁ ল’ স্পষ্ট বলেছেন ‘Before the death of Alivardi Khan’)। নবাব হওয়ার পরে সিরাজ চরিত্রের এ ‘অন্ধকার’ দিকটার সোজাসুজি কোনও তথ্য বা প্রমাণ কিন্তু অপ্রতুল। এর কারণ সম্ভবত নবাব হওয়ার পরে সিরাজদ্দৌল্লার স্বভাব এবং আচরণের পরিবর্তন।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সাম্প্রতিক লেখাতেও সিরাজদ্দৌল্লাকে ‘জেদী’, ‘একরোখা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাঁর ‘মেজাজি রাগিস্বভাবের’ ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।[১] লব্ধপ্রতিষ্ঠ এক ঐতিহাসিক আবার সিরাজদ্দৌল্লার ‘নিষ্ঠুরতা, উচ্ছৃঙ্খলতা ও উন্মাদ স্বভাবের’ গল্পকে ‘পরাজিতের মরণোত্তর পুরস্কার’ বলে উল্লেখ করেও সত্য ঘটনা কী তা এড়িয়ে বলছেন ‘সত্য যাই হোক না কেন, সিরাজদ্দৌল্লা মোটেই আলিবর্দির যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন না।’[২] নবাব হওয়ার পরে সিরাজের চরিত্রে যে একটা বিরাট পরিবর্তন হয়েছিল তা আমরা ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের (Luke Scrafton) লেখা থেকে জানতে পারি। তিনি লিখেছেন, ‘আলিবর্দির মৃত্যুশয্যায় সিরাজ কোরান ছুঁয়ে শপথ করেন যে তিনি জীবনে আর কোনওদিন মদ্যস্পর্শ করবেন না, সে শপথ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।’[৩] অথচ এই স্ক্র্যাফ্‌টনই আগে সিরাজকে ‘অতিরিক্ত পানাসক্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। সিরাজ-চরিত্রে এ পরিবর্তন খুবই অর্থবহ কারণ যে যুবক অত্যধিক মদ্যপানে অভ্যস্ত তিনি যে এত সহজে দীর্ঘদিনের বদভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারলেন এবং মৃত্যুপথযাত্রী মাতামহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আজীবন রক্ষা করেছেন, তাঁর পক্ষে ইচ্ছে করলে নিজের স্বভাবচরিত্র সংশোধন ও পরিবর্তন করতে পারা অত্যাশ্চর্য কিছু নয়। ওই কারণে মনে হয় নবাব হওয়ার আগে সিরাজের চরিত্র যেমনই থাকুক না কেন, রাজ্যভার গ্রহণ করার পর তাঁর চরিত্রে পরিবর্তন একেবারে অসম্ভব কিছু নয়।

এমন পরিবর্তন যে অসম্ভব নয় (যদিও নাটকীয় হতে পারে) এবং তার যে সম্ভাবনাও ছিল সেটা আমাদের জানাচ্ছেন জাঁ ল’, যিনি-ই প্রধানত সিরাজচরিত্রের কদর্য রূপটি তুলে ধরেছেন। তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ: ‘People have flattered themselves that when he (Siraj] became Nawab he would be more humane.’ তিনি নিজেও অবশ্য আশা করেছিলেন যে হয়তো “সিরাজ একদিন [নবাব হওয়ার পরে?] সজ্জনে পরিণত হতে পারেন।’ তাঁর ওরকম বিশ্বাসের কারণও ছিল যার জন্য তিনি লিখেছেন, ‘[ঢাকার] তরুণ নবাব নওয়াজিস মহম্মদ খান[৪] সিরাজের চেয়ে কম দুশ্চরিত্র ও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না কিন্তু পরে তিনি সর্বজনপ্রিয় হয়ে ওঠেন’।[৫]

এবার নবাব হওয়ার পর সিরাজদ্দৌল্লার আচরণ বিশ্লেষণ করা যাক। জাঁ ল’র লেখা থেকেই স্পষ্ট যে তিনি ফরাসিদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন। ফরাসিদের প্রতি কোনও নিষ্ঠুরতা বা উদগ্র রাগ তিনি দেখাননি। তাঁর দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মসনদের দাবিদার, ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের প্রতি তিনি কেমন আচরণ করেছিলেন? নবাব হওয়ার আগে তাঁর যে চরিত্র আমরা দেখেছি, তার সঙ্গে মিলে যায় এমন হঠকারিতা বা অবিবেচনাপ্রসূত কিছু কি তিনি করেছিলেন? এর উত্তর কিন্তু একদম ‘না’। তিনি তাঁর প্রথম শত্রু ঘসেটি বেগমকে (যিনি সিরাজকে নবাব হিসেবে একেবারে চাননি এবং সিরাজ যাতে নবাব হতে না পারেন তাঁর জন্য যথাসাধ্য চক্রান্ত করছিলেন) যেভাবে ‘বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্তির সঙ্গে বাগ মানিয়েছিলেন’ তা তারিখ-ই-বংগালা-ই-মবহতজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলি খানও তারিফ না করে পারেননি। তিনি লিখছেন যে বহুলোক, যারা আগে ঘসেটি বেগমকে সমর্থন করছিল, তারা সিরাজের ‘আপোষমূলক নীতি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটাবার প্রচেষ্টায়’ সন্তুষ্ট হয়ে বেগমের দল ছেড়ে সিরাজের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। শওকত জঙ্গ অবশ্য আরও অনেক শক্তিশালী ও বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই নিজের তখ্‌ত বজায় রাখতে সিরাজ তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হন ও তাঁকে পর্যুদস্ত করেন।[৬]

ইংরেজদের সঙ্গেও কিন্তু সিরাজদ্দৌল্লা প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। পরে একদিকে দৌত্যের মাধ্যমে ও অন্যদিকে অস্ত্রধারণ করে একটা মিটমাট করতে চেয়েছিলেন। একুশ বাইশ বছরের তরুণ এক নবাবের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি জ্ঞানবুদ্ধি আর কী আশা করা যেতে পারে? কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ উইলিয়াম ওয়াটস, যিনি মুর্শিদাবাদ দরবারের হাঁড়ির খবর পর্যন্ত রাখতেন, সিরাজদ্দৌল্লাকে ‘ক্ষমতা এবং ধনসম্পত্তির প্রাচুর্যে কিঞ্চিৎ বেসামাল’, বলে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা হয়তো সত্যের অনেকটা কাছাকাছি। কিন্তু পনেরো মাসের স্বল্প রাজত্বকালে সিরাজ কোনও পাগলামি, অর্বাচীনতা বা নিষ্ঠুরতার পরিচয় যে দেননি, ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ থেকে তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা যায়। পাশাপাশি এটাও সত্য যে সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হিসেবে, দেশের শাসক হিসেবে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। এদেশে ব্যবসা করতে এসে নবাবের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার মতো কোনও ঔদ্ধত্যকে তিনি সহ্য করতে রাজি ছিলেন না। ওয়াটসের মতে সিরাজদ্দৌল্লা বিদেশি বণিকগোষ্ঠীর কাছে প্রত্যাশা করেছিলেন যে তারা নবাবের আদেশ বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে। কিন্তু তা বলে সিরাজ সর্বক্ষণ ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব দেখিয়েছেন, এমন কথা ঠিক নয়। যে তরুণ যুবা ‘উগ্র মেজাজ’ এবং ‘নির্মম নিষ্ঠুরতার’ জন্য কুখ্যাত, তিনি কিন্তু নবাব হওয়ার পরে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অবরোধ ও আত্মসমর্পণের পরে পরাজিত ইংরেজদের প্রতি ‘উদার মানবিকতার’ সঙ্গে ব্যবহার করেছেন[৭]— এ তথ্য কাশিমবাজার কুঠির এক ইংরেজ কর্মচারীরই। কাশিমবাজারের ইংরেজ বিষয়-সম্পত্তির ওপর সিরাজ হাত পর্যন্ত দেননি, শুধু সেখানকার অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। ইংরেজদের সম্পূর্ণ অসহায় পেয়েও কোন লুঠতরাজ, হত্যা বা নিষ্ঠুরতার আশ্রয় কিন্তু সিরাজ নেননি। সিরাজ চরিত্র সম্বন্ধে ওয়াটসের মন্তব্য: ‘….in his own nature [Siraj was] timid to the last degree.’ স্ত্রী লুৎফুন্নেসার প্রতি সিরাজের গভীর ভালবাসা ও মদ্যপান না করার প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্যে কিন্তু বদ্‌ চরিত্রের লক্ষণ কিছু পাওয়া পাওয়া যায় না।

সিরাজ-ইংরেজ বিরোধ

নবাব সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজদের মধ্যে যেসব বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং যার ফলে শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, সেগুলি ভাল করে বিশ্লেষণ করা দরকার, যাতে এ সংঘর্ষের প্রকৃত কারণগুলি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। সিরাজ নবাব হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর ও ইংরেজদের পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাতের ফলে দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আসলে আলিবর্দির মৃত্যুর ঠিক আগে সিরাজ ইংরেজ কোম্পানির বেশ কিছু কাজকর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন কারণ এগুলির মাধ্যমে নবাবের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছিল। ইউরোপে যুদ্ধ বাধার আশঙ্কায় এবং আলিবর্দির মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদের মসনদ নিয়ে বিরোধ অবধারিত ভেবে ইংরেজ ও ফরাসিরা উভয়েই প্রায় প্রকাশ্যে তাদের দুর্গগুলির সংস্কার ও সংহত করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলিবর্দির গুরুতর অসুস্থতা এবং অন্যদিকে দিল্লি থেকে মুঘল সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী বাংলার বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য অভিযান করতে পারেন এমন আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সিরাজ আপাতত ইংরেজ ও ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা মুলতুবি রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন।[৮]

ইংরেজদের প্রতি বিরূপ হওয়ার সিরাজদ্দৌল্লার আরও গভীর কারণ ছিল। তিনি নবাব হওয়ার পর ইংরেজরা তাকে কোন উপঢৌকন বা নজরানা পাঠাননি বলে তাঁর ক্ষোভ হয়েছিল বলে যে বক্তব্য, তা মোটেই ঠিক নয়।[৯] প্রথম থেকেই তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে ইংরেজরা তাঁর সিংহাসন প্রাপ্তির বিরোধিতা করতে পারে এবং তারা মসনদের দাবিদার, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মদত দিচ্ছে। এ সন্দেহ কিন্তু একেবারে অমূলক নয়। বস্তুত ইংরেজরা প্রথম থেকে প্রায় ধরেই নিয়েছিল সিরাজের পক্ষে নবাব হওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির অধ্যক্ষ রেনল্ট বা কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’র লেখা এবং অন্যান্য বেশ কিছু ইউরোপীয় তথ্য থেকেও জানা যায় যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে একটা মতলব ভাঁজছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। রেনল্ট স্পষ্ট জানাচ্ছেন: ‘ঘসেটি বেগমের দলকে মসনদ দখলের দৌড়ে কেউ আটকাতে পারবে না এবং সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য, এই স্থির বিশ্বাসে ইংরেজরা ঘসেটি বেগমের সঙ্গে [সিরাজের বিরুদ্ধে] চক্রান্ত শুরু করে।’[১০] জাঁ ল’ও লিখেছেন যে অন্য অনেকের মতো ইংরেজরাও ভেবেছিল, ‘সিরাজদ্দৌল্লা কখনও নবাব হতে পারবেন না এবং তাই তারা কোনও কাজে তাঁর দ্বারস্থ হত না’।[১১] তা ছাড়া মসনদের জন্য সিরাজের অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গের সঙ্গেও ইংরেজদের যোগাযোগ ছিল।[১২] এসব দেখেই মনে হয় কোম্পানির কর্মচারী রিচার্ড বেচার বলেছেন যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের ওপর রেগে যাওয়ার যথেষ্ট ইন্ধন যুগিয়েছিল।[১৩]

সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের সংঘর্ষের জন্য তাঁর আত্মম্ভরিতা ও অর্থলিপ্সাই দায়ী বলে যে বক্তব্য তা কিন্তু মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তিনি যদি সত্যিই দাম্ভিক হতেন এবং তাঁর দাম্ভিকতাই যদি বিরোধের অন্যতম কারণ হত তা হলে তাঁর দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গকে পরাভূত করার পরই তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাঁর বিরুদ্ধে অর্থলিপ্সার অভিযোগও ভিত্তিহীন।[১৪] আসলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজের তিনটি নির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। আমাদের কাছে যেসব তথ্যপ্রমাণ আছে তা থেকে সহজেই প্রমাণ করা যাবে যে এগুলি খুবই ন্যায়সঙ্গত এবং মোটেই ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য সিরাজের ‘মিথ্যা ওজর’ নয়। সিরাজের অভিযোগগুলি হল—(১) নবাবের বিনা অনুমতিতে ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও এটাকে দুর্ভেদ্য ও সুসংহত করার প্রচেষ্টা। (২) দস্তকের বেআইনি ও যথেচ্ছ অপব্যবহার। (৩) নবাবের অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয়দান। খোজা ওয়াজিদকে ইংরেজদের সঙ্গে আপস মীমাংসার দৌত্যে নিযুক্ত করার পর একটি চিঠিতে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে এ তিনটি অভিযোগের কথা স্পষ্ট করে জানান।[১৫]

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. রজতকান্ত রায়, পলাশী।
  2. P.J. Marshall, Bengal.
  3. Luke Scrafton, Reflections, p. 55.
  4. নওয়াজিস মহম্মদ খান ছিলেন নবাব আলিবর্দির ভাই সৈয়দ আহমেদের পুত্র, আলিবর্দির কন্যা ঘসেটি বেগমের স্বামী ও ঢাকার শাসনকর্তা বা ছোট নবাব।
  5. Law’s Memoir, Hill, III, pp. 162-64.
  6. ইউসুফ আলি, তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গী, পৃ. ১১৮.
  7. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 57.
  8. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, p. 41.
  9. সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, পৃ. ৩৮-৪১।
  10. ডুপ্লেকে লেখা রেনল্টের চিঠি, চন্দননগর, ২৬ আগস্ট ১৭৫৬, Hill, I, p. 204.
  11. Law’s Memoir, Hill, III, pp. 162-64.
  12. সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, পৃ. ৪১।
  13. ড্রেককে লেখা বেচারের চিঠি, ২২ মার্চ ১৭৫৭, Beng. Letters Recd, vol. 23,f. 460.
  14. বিস্তারিত বিবরণের জন্য, S. Chaudhury, Prelude to Empire, pp. 47-48.
  15. ওয়াজিদকে সিরাজদ্দৌল্লা, ১ জুন ১৭৫৬, Hill, III, p. 152.