» » পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

বয়সের সাথে সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তন হয়। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে করিম বকশের মেজাজ ঠাণ্ডা না হলেও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে বৈকি। তা না হলে তার শড়কির হাতল ঘুণে ধরতে পায়? চার বছর বোধ হয় লাঠিটায়ও তেল মাজা হয়নি। তেলের দামও বেড়েছে, আর লাঠির দরকারটাও কমেছে অনেক। মাটির ওপর পুরানো লাঠিটা ঠুকতে ঠুকতে তার নিজের ও লাঠির বিগত শৌর্যের কথা মনে পড়ে। পেতলে মুঠি-বাধা এই লাঠিটা যৌবন-কাল থেকেই তার পথচলার সাথী। কারণ, মেজাজের জন্যে শত্রু কম ছিল না তার। তাই বুড়োর মত লাঠি হাতে সে চলত। এমন কি ঘুমোবার সময় পাশেই থাকত লাঠিটা। লাঠিটা হাতে নিলেই তার একদিনের কথা মনে পড়ে।

দুপুর রাত্রে যাত্রাগান শুনে এসেছিল সে। মেহেরনের দরজা খুলে দিতে দেরী হয়েছিল। তাকে হাতের এই লাঠিটা দিয়েই সে মেরেছিল। গর্ভবতী মেহেরন সে আঘাত সহ্য করতে পারেনি। তারপর গলায় রশি বেঁধে গাবগাছে লটকিয়ে সে রেহাই পেয়েছিল। হাজারখানেক টাকা অবশ্য খরচ করতে হয়েছিল এ-ব্যাপারে।

তার আরো মনে হয় আজকাল, লাঠিটা হয়তো হাশরের দিন তার বিরুদ্ধেই সাক্ষী দেবে খোদার কাছে।

মেহেরন করিম বকশের প্রথম স্ত্রী।

তারপর সে জয়গুনকে বিয়ে করে। তার ওপরও তার বাহুবলের কসরত চলে ছয় বছর। তার শরীরের কোনো অঙ্গ বোধ হয় তার প্রহারের কাছে রেহাই পায়নি।

জয়গুনের শাশুড়ী সান্ত্বনা দিত—ওয়াতে কি অইছে বউ! মরদগুনে যেই পিডে মারব, হেই পিড বিস্তে যাইব। যেই আতে, যেই পায় মারব, বেবাক বিস্তে যাইব। তুই বুঝিন কাডুরিয়ার বউর কিচ্ছা হোনস নাই? তয় হোন : রসুল-করিম একদিন বিবি ফাতেমারে কইল-”অমুক জাগায় এক কাডুরিয়া থাকে। তার বউ আট বিস্তের বড় বিস্তে যাইব।” বিবি ফাতেমা জিগাইল—”ক্যান যাইব?” রসুল করিম কইল—”যাও, গিয়া দেইখ্যা আহ একদিন।” বিবি ফাতেমা কাডুরিয়ার বাড়ী গিয়া দ্যাহে কি, ওমা! ঘরের দুয়ারে হাজাইয়া থুইছে দাও, লাডি, ঠ্যাঙ্গা, দড়ি। বিবি ফাতেমা কাডুরিয়ার বউরে জিগাইল—”অত লাঠি ঠ্যাঙ্গা এমুন কইর‍্যা রাখছে কে?” সে জ’ব দিল—”আমি।” জিগাইল, “ক্যাঁ?” সে জব দিল—”যদি সোয়ামীর খেডমতে তিরুডি অয়, তয় এই লাঠি দিয়া আমারে পিডাইব। কামের সময় কোতায় লাডি বিচরাইব? এই এর লাইগ্যা আতের কাছে আইন্যা রাখছি। জিগাইল, “দাও রাখছ ক্যাঁ?” জব দিল—”যদি মনে লয় কাটব।”

—দ্যাখ, কেমুন জননা আছিল। জয়গুনের শাশড়ী মাথা নাড়ত।

জয়গুন এ কেচ্ছা বহু আগেই শুনেছে। মুসলমান ঘরের বউ এ কেচ্ছা শোনেনি, তা অস্বাভাবিক।

জয়গুন হয়তো সহ্য করত। কিন্তু করিম বক্‌শ তাকে সে সুযোগ দেয়নি।

বছর দুই আগে করিম বক্‌শ আবার বিয়ে করেছে। তবে আঞ্জুমনের কপাল ভালো। আগের সে মেজাজ আর নেই। বিশেষ করে পয়লা ঘরের ছেলে রহিম বক্‌শ বাপের অত্যাচারে শ্বশুর বাড়ী উঠে যাওয়ার পর, তার মেজাজ অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে।

কিন্তু বাহুবল যত কমেছে, বাক্যবল তত নয়। ঝগড়া আর প্যানপ্যানিটাই আজকাল আছে। প্রতিপক্ষ ঝগড়ায় পিছপাও নয় বলে, খেতে বসতে ঝগড়া হয়। দিন বড় বাদ যায় না। যে দিন বাদ যায়, সেদিন পাড়ার সবাই সচকিত হয়। একজন আরেক জনকে জিজ্ঞেস করে—করিম বক্‌শ বুঝি বাড়ীতে নাই আইজ?

সেদিন আঞ্জুমন এক বেদেনীর কাছ থেকে মেয়ের অসুখের জন্য কিসের তাবিজ রাখছিল! করিম বক্‌শ হাট থেকে এসে দেখেই আগুন। জিজ্ঞেস করে—কিয়ের তাবিজ, আঁ? আমারে টোনা করবি নি?

তার এই এক অকারণ সন্দেহ।

আঞ্জুমন রেগে যায়, বলে–হ, টোনা করমু। ভেড়া বানাইয়া রাখমু তোমারে।

—হারামী! বৈতাল মাগি! বলে সে উঁচু করে পুরানো লাঠিটা।

—আত উডাইও না কইতে আছি। খইয়া পড়ব আত। কুড়-কুষ্ঠ অইব।

করিম বক্‌শ লাঠিটা নামায়। তারপর বলে—জয়গুন তো তোর মতন আছিল না। মাইর্যা চাবড়া কইরা ফেলাইলেও উই করত না। আর তোর গায়ে ফুলের টোহা না দিতেই–

জয়গুনকে ছেড়ে দেয়ার পর কাসুকে নিয়ে করিম বক্‌শ বিব্রত হয়েছিল। একদিন করিম বকশের এক নিঃসন্তান বোন এসে কাসুকে নিয়ে যাওয়ায় সে নিশ্চিন্ত হয়।

কাসু ফুপুর বাড়ীতে এক রকম ভালোই ছিল।

কিছুদিন আগে ফুপু মারা যাওয়ার পর করিম বক্‌শ তাকে নিজের বাড়ী নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ বাড়ীর ঝগড়াটে আবহাওয়ায় এসে কয়েক দিনেই সে মনমরা হয়ে গেছে। এখানে আদর করে কেউ কোলে নেয় না তাকে। ডাকেও না কেউ। এখানে কারো মুখেই হাসি নেই। তাই ওর নিজের হাসিও কোথায় মিলিয়ে গেছে। কারো মুখের দিকে চেয়েই সে ভরসা পায় না। শুধু একজনকেই তার পছন্দ হয়েছে। সে হাসু। তার এখানে আসবার পর সে তিনদিন এসেছে। কিছুদিন ধরে তারও দেখা নেই।

হাসুর দেওয়া কদমা করিম বক্‌শ পানিতে ফেলে দিয়েছিল। চরকিটা ভেঙে দিয়েছিল পায়ের তলায় ফেলে। কাসুকেও থাপ্পড় মেরেছিল পিঠের ওপর। ঐ দিন থেকেই কাসু আরো মুষড়ে পড়ে। করিম বক্‌শ সেদিন তাকে একটা মাটির ঘোড়া কিনে দিয়েছিল! কাসু তা ছোঁয়নি।

হাসু আর আসবে না, তার ছোট মনেই সে অনুমান করেছিল সেদিন। হাসুর আসার পথের দিকে চেয়ে তার দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

করিম বক্‌শ ঐ দিন থেকেই হুঁশিয়ার হয়েছে। হাসুকে তার সন্দেহ হয়। ছোঁড়াটা ভারী ফেরেববাজ। ফুসলি দিয়ে কাসুকে নিয়ে যেতে পারে এই তার ভয়। তাই সে যেখানে যায়, প্রায় সাথে সাথেই রাখে কাসুকে। বড় ছেলেটা শ্বশুর বাড়ী পালিয়েছে। কাসুই এখন একমাত্র ভরসা।

খেত-পাথারে জোয়ারের পানি আসার সাথে সাথে করিম বক্‌শের মনে আসে এক জোয়ার। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সে কোঁচ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মাঠে মাঠে! তার ঐ এক ঝোঁক। তার যৌবনের হিংস্র স্বভাবের অবশিষ্ট এই মাছ শিকার। কয়েকদিনের চেষ্টাও অনেক সময় বিফলে যায়। তবু তার ধৈর্যের অভাব নেই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে সে ধান খেতের ভেতর মাছের সন্ধান করে বেড়ায়।

এ বছর তার সুবিধা হয়েছে আরো। আউশ ধান পেয়েছে মণ সাতেক। এ ধানে প্রায় আমন ধর ধর হবে। কারণ ছেলে ও ছেলেবৌ চলে যাওয়ায় খাবার লোক কমেছে। গাই দুই সের দুধ দেয়। আট আনা করে রোজ একটাকা পাওয়া যায়। সুতরাং তার আর ভাবনা নেই। সারাদিনে সে শুধু বাজারে গিয়ে দুধ বেচে! কাজ আরো আছে বটে। কিন্তু মাছ ধরার নেশায় সে সব কাজের খেয়ালই হয় না। ছেলে থাকতে সব কাজ সে-ই করত।

তিনদিন অবিরাম বৃষ্টিপাতের পর আজ দুপুরের দিকে রোদ উঠেছে। ভাত খাওয়ার পর করিম বক্‌শ ডাকে—ফুলির মা, এক ছিলিম তামাক দাও দেহি জলদি। বাতাসের রাগ নাই আইজ। মাছ দ্যাখতে সুবিধা অইব।

আঞ্জুমন কয়ে আগুন দিয়ে ফু দিতে দিতে আসে। করিম বকশের হাতের কোটায় কঙ্কেটা বসিয়ে দিয়ে বলে—আর তো কাম নাই তোমার। পাডের জাগডা দ্যাখছ?

—হুঁ, দেখমু হনে আইজ। নিরাগ বাতাসে আইজ চকে যা মাছ দ্যাহা যাইব! —

বাটনা বাইট্টা রাহুম হে-অইলে, কি কও?

করিম বক্‌শ খোঁচাটা নীরবে সহ্য করে। মাছ সে চার-পাঁচ দিনেও একটা পায় না। তাই এ টিটকারী।

কোঁচ-যুতি হাতে সে নৌকায় ওঠে। পাশের বাড়ীর হারুনকে ডেকে নেয় নৌকা বাইতে। কাসুকেও রেখে যায় না বাড়ীতে।

এদিকের পানি কালো, তাই স্বচ্ছ। মাছ মারতে অসুবিধা। শিকারী মাছ দেখবার আগেই, মাছ শিকারীকে দেখতে পেয়ে পালায়।

দাড়া-পথ বেয়ে তারা খালের ধারের একটা ধান খেতে ওঠে। নদীর পানি খাল দিয়ে। এসে এখানকার পানি ঘোলা করে রাখে।

করিম বক্‌শ নিশ্চুপ ওঁত পেতে থাকে। চারিদিকে চোখ বুলায় একটা ধান গাছ নড়ে কিনা। কখনও কোঁচ নিয়ে, কখনও যুতি হাতে নিয়ে সে তাক করে।

মাছের কোন লক্ষণ না পেয়ে হাতের ইশারায় সে আর এক খেতের দিকে নৌকা চলাবার নির্দেশ দেয়।

এক জায়গায় কয়েকটা ধান গাছ নড়ে ওঠে। আর যায় কোথা! ঝররর ঝপ! কোঁচ দিয়ে কোপ দেয় করিম বক্‌শ।

আরো অনেক লোক জমা হয়েছিল মাছ মারতে। একজন বলে আইজ আর মিয়াবাই খালি আতে যাইব না, বোঝতে পারছি।

করিম বক্‌শ কোঁচটা তুলে নিরাশ হয়। বলে—দুশশালা! আইজ যাত্রাডাই খারাপ। আর কেওর কোঁচের নিচে পড়তে পারলি না? আমারডার নিচেই–

—কি মিয়া, কাছিম নাহি? একজন জিজ্ঞেস করে।

—আর কইও না মিয়া। আইজ যাত্রাড়াই খারাপ।

—যাত্রা খারাপ! ক্যাঁ? বউর মোখ দেইক্যা যাত্রা কর নাই মিয়া?

হারুন ও কাসু দু’জনেই উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল। হারুন নিজের মাথা থেকে মাথলাটা। কাসুকে দিয়ে বলে—ঘাম দিছেরে, ইস! মাথলাডা মাথায় দে, রউদ লাগব না।

আরো কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে যখন আর মাছের সাড়া পাওয়া যায় না, তখন করিম বক্‌শ বলে—কি জানি এইরম আইতাছে ক্যান। তোরা কাপড় উড়া কইর‍্যা পিন্দা নে, দেহি কি অয়।

করিম বক্‌শ নিজেও গামছা পরে লুঙ্গি ছাড়ে। লুঙ্গির দিক পালটিয়ে নিয়ে আবার পরে।

এবার করিম বক্‌শ এক চাক গজার মাছের পোনার পেছনে লাগে। কিন্তু গজারটা খুবই চালাক। পোনার কাছাকাছিও ঘেঁষে না। মাছটা বড়ই হবে খুব, করিম বক্‌শ অনুমান করতে। পারে। পোনাগুলিও বড় হয়েছে। অনেকক্ষণ পরে পরে এক সঙ্গে ভেসে ওঠে। এক জায়গায় থাকলেও কথা ছিল। এই এখানে দেখা যায়, তারপর আর নেই। কোথায় গেল? কোথায় গেল? করিম বক্‌শ এদিক-ওদিক তাকায়। কিছুক্ষণ পরে ভুস করে ভেসে ওঠে। করিম বক্‌শ মুখে কিছু না বলে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। হারুন আস্তে আস্তে অনুসরণ করে।

পোনাগুলি খেতের পর খেত পার হয়ে চলেছে। ঘোলাপানি ছেড়ে আসে কালো পানিতে। করিম বক্‌শ তবুও হাল ছাড়ে না।

এবার একটা জলা খেত পার হয়ে পোনাগুলি ধানখেতে ঢোকে। করিম বক্‌শ কেঁচটা রেখে যুতি হাতে নিয়ে আবার মনোযোগ দেয়। পেছনে হাত দেখিয়ে নৌকার গতি মন্থর করার নির্দেশ দেয়। নিজেও সে নুয়ে এক হাতে ধানগাছের গোছা ধরে নৌকার গতিরোধ করে।

কাসু!

হাসুর ডাক। করিম বক্‌শ চমকে ওঠে। চেয়ে দেখে সে জয়গুনের বাড়ীর কাছাকাছি এসে পড়েছে।

জয়গুন, মায়মুন ও হাসু দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে, এদিকে জয়গুন এখন গাছের আড়ালে চলে গেছে।

কাসু ডাক শুনে দাঁড়িয়েছিল। করিম বক্‌শ বলে—ব’ হারামজাদা। বইয়া পড়! পইড়া যাবি।

তারপর হারুনের কাছ থেকে লগি নিয়ে জোর ঠেলায় সে নৌকা ছুটায় বাড়ীর দিকে।

জয়গুন চেয়ে থাকে যতক্ষণ নৌকাটা দেখা যায়। কাসুকে তিন বছরের রেখে সে এসেছিল। এখন সে বড় হয়েছে। কথা বলতে শিখেছে। কিন্তু দূর থেকে মুখখানা আদৌ দেখা গেল না। এখন বড় হয়ে সে মুখখানা কেমন হয়েছে, অনেক চেষ্টা করেও মনে মনে তা গড়তে পারে না জয়গুন।