» » তৃতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ : নবাবি আমল

তৃতীয় অধ্যায় : মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ : নবাবি আমল

নবাবি আমলেই মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ, এ কথা সর্বতোভাবে স্বীকার্য। নবাবি আমল বলতে অবশ্য আমরা স্বাধীন নবাবি আমলের কথাই বলছি অর্থাৎ মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজদ্দৌল্লা পর্যন্ত, তার মানে পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত। তারপর মুর্শিদাবাদে কিছুদিন নবাব অধিষ্ঠিত ছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু সে নবাবরা ইংরেজদের হাতের পুতুল ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। ফলে মুর্শিদাবাদের গৌরবময় দিনের অবসান সিরাজদ্দৌলার পর থেকেই। পলাশির পর ইংরেজরা পর্যায়ক্রমে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয় এবং মুর্শিদাবাদের পরিবর্তে কলকাতা হয়ে ওঠে বাংলার প্রাণকেন্দ্র। ফলে ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে মুর্শিদাবাদ।

মুর্শিদকুলি খান

মুর্শিদকুলি শুধু মুর্শিদাবাদ শহরের পত্তনই করেননি, এর উন্নতিকল্পে তাঁর অবদান অনেকখানি। অবশ্য এখানে বলা প্রয়োজন, তখনকার বাংলা তথা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মুর্শিদকুলির সহায়ক হয়েছিল যার ফলে তিনি মুর্শিদাবাদকে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। আমরা আগেই দেখেছি যে মুর্শিদকুলি একই সঙ্গে মুঘল সম্রাট ঔরংজেবের বিশেষ বিশ্বাসভাজন ও প্রীতিভাজন হয়ে উঠেছিলেন যার ফলে স্বয়ং সম্রাটের পৌত্র ও বাংলার সুবাদার শাহজাদা আজিম-উস-শানকে উপেক্ষা করেই তাঁর দেওয়ানি কার্যালয় ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, ঔরংজেব যখন আজিম-উস-শানের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে (মুর্শিদকুলির প্রতি বিরূপতা ও তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য) তাঁকে বাংলা ছেড়ে পাটনা চলে যাবার নির্দেশ দিলেন, তখন শাহজাদা আজিম তাঁর পুত্র ফারুখশিয়রকে বাংলায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে রেখে পাটনা চলে গেলেন। কিন্তু সম্রাট ঔরংজেব ফারুখশিয়রকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন মুর্শিদকুলির পরামর্শমতো রাজকার্য চালান।[১] ফলে কার্যত মুর্শিদকুলিই বাংলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদও বাংলায় প্রাদেশিক সরকারের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হল। তাই স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদেরও গুরুত্বও অনেক বেড়ে গেল এবং মুর্শিদাবাদ শহরের বিস্তৃতি ও প্রতিপত্তি সমান তালে বৃদ্ধি পেতে লাগল।

বস্তুতপক্ষে ১৭০৭ সালে সম্রাট ঔরংজেবের মৃত্যু পর্যন্ত মুর্শিদকুলিই ছিলেন বাংলার সর্বেসর্বা। ঔরংজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সম্রাট হলেন প্রথম বাহাদুর শাহ। তিনি পুত্র আজিম-উস-শানকে আবার বাংলার সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত করলেন। কিন্ত আজিম দিল্লিতে তাঁর পিতার কাছেই থাকতে লাগলেন এবং তাঁর পুত্র ফারুখশিয়রকে নায়েব সুবাদার করে বাংলার শাসনভার তাঁর ওপরই ন্যস্ত করলেন। প্রথম বাহাদুর শাহের রাজত্বের প্রথমদিকে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে মুর্শিদকুলিকে বাংলার ‘ডেপুটি গভর্নর’(সুবাদার) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আজিম-উস- শান তাঁর বহুদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু মুর্শিদকুলির ওপর বদলা নেবার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তাঁর বৃদ্ধ ও দুর্বল পিতা সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহের ওপর তাঁর প্রভাব খাটিয়ে মুর্শিদকুলিকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করলেন। মুর্শিদকুলিকে দাক্ষিণাত্যের দেওয়ান করে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ফলে পুরো দু’বছর, ১৭০৮ থেকে ১৭০৯, তাঁকে বাংলার বাইরে কাটাতে হল।[২]

কিন্তু ১৭১০ সালে আবার মুর্শিদকুলিকে বাংলার দেওয়ান করে ফিরিয়ে আনা হল। এর প্রধান কারণ শাহজাদা আজিম-উস-শান বুঝতে পেরেছিলেন যে দিল্লির মসনদের জন্য যে লড়াই আসন্ন, এবং যাতে তিনি নিজে একজন প্রধান অংশগ্রহণকারী হবেন, তাতে যত বেশি সংখ্যক মুঘল মনসবদার ও অমাত্যদের সমর্থন লাভ করতে পারবেন, ততই তাঁর শক্তিবৃদ্ধি হবে। সেজন্য তিনি মুর্শিদকুলির সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে ফেলে তাঁকে নিজের দলে আনার চেষ্টা করলেন। এর ফলেই মুর্শিদকুলি বাংলার দেওয়ান পদে পুনরায় নিযুক্ত হতে পারলেন। আর কাগজে কলমে তখনও বাংলার সুবাদার রইলেন আজিম-উস-শান।[৩]

তারপর দিল্লিতে চলল রাজনৈতিক পালাবদলের খেলা। সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর (১৭১২) যে গৃহযুদ্ধ শুরু হল, তাতে আজিম-উস-শান নিহত হলেন এবং সম্রাট হলেন জাহান্দার শাহ।৪ তাঁর পরে সম্রাট হলেন ফারুখশিয়র (১৭১৩)। তিনি তাঁর শিশুপুত্র ফরখুন্দা শিয়রকে কাগজে কলমে বাংলার সুবাদার পদে নিযুক্ত করেন এবং মুর্শিদকুলি হলেন বাংলার ডেপুটি সুবাদার। শেষ পর্যন্ত সম্রাট ফারুখশিয়র ১৭১৬/১৭ সালে মুর্শিদকুলিকে জাফরখান নাসিরি উপাধি দিয়ে বাংলার সুবাদার পদে অভিষিক্ত করেন। ১৭২৭ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত মুর্শিদকুলি একাদিক্রমে বাংলার সুবাদার ও দেওয়ান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এভাবে তিনি ১০ বছরের বেশি বাংলার সর্বোচ্চ পদাধিকারী হিসেরে শাসন করে গেছেন। এটা সাধারণ মুঘল শাসনব্যবস্থার যে রীতিনীতি ছিল তার সম্পূর্ণ এবং একমাত্র ব্যতিক্রম। একমাত্র মুর্শিদকুলিই সুবাদার ও দেওয়ান এ দুটি পদের অধিকারী হতে পেরেছিলেন।[৪] স্যার যদুনাথ সরকার লিখেছেন যে মুর্শিদকুলি ১৭১৭ সালে বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত হন কিন্তু আব্দুল করিম তাঁর গবেষণায় দেখাবার চেষ্টা করেছেন যে সালটা আসলে ১৭১৬, ১৭১৭ নয়। মনে হয় আব্দুল করিমের বক্তব্যই সঠিক।[৫]

সে যাই হোক, একাধারে বাংলার দেওয়ান ও সুবাদার পদে মুর্শিদকুলির নিযুক্তি মুর্শিদাবাদের ইতিহাসেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ঢাকার বদলে মুর্শিদাবাদই এখন বাংলার রাজধানীতে পরিণত হল। তাই স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদ হয়ে উঠল বাংলার প্রাণকেন্দ্র, রাজতন্ত্র ও শাসনযন্ত্রের সব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এ অবস্থা চলল সিরাজদ্দৌলা পর্যন্ত, অর্থাৎ পলাশির যুদ্ধ অবধি। তারপরই বাংলায় স্বাধীন নবাবি আমলের পরিসমাপ্তি। তারপরের নবাবরা মূলত ইংরেজদের ক্রীড়নক ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। ইংরেজরাও ধীরে ধীরে কলকাতাকে সব ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রস্থল করে তুলল। ফলে মুর্শিদাবাদ স্বাধীন নবাবি আমলের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

মুর্শিদকুলিই বাংলায় নিজামত বা নবাবির প্রতিষ্ঠাতা। দিল্লির মুঘল বাদশাহদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, তিনি শুধু নিয়মিত বাংলার রাজস্ব দিল্লিতে পাঠিয়ে দিতেন। দিল্লিতে তখন ডামাডোল, একের পর একজন দিল্লির মসনদ দখল করছেন, মুর্শিদকুলি কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। দিল্লিতে যিনিই বাদশাহ হচ্ছেন, মুর্শিদকুলি তাঁকেই রাজস্ব পাঠাচ্ছেন, কোনওরকমের ভেদাভেদ না করে। তিনি জানেন, বাংলার রাজস্ব ছাড়া দিল্লির কোনও বাদশাহেরই চলবে না। তাই তাঁরা কেউই মুর্শিদকুলিকে ঘাঁটাতে যাবেন না, বাংলায় তিনি যা করতে চাইবেন, তাই করতে পারবেন। এভাবেই তিনি বাংলায় নিজামত এবং স্বাধীন নবাবি প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর পর বাংলার অন্য নবাবরাও তাঁর নীতি অনুসরণ করে বাংলা থেকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠিয়েছেন, দিল্লিও বাংলা নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি। নবাব আলিবর্দি খানের রাজত্বের প্রথম কয়েক বছর অবধি নিয়মিত এ রাজস্ব পাঠানো হয়েছিল। মনে হয় ১৭৪০-এর দশকের প্রথম কয়েক বছরের পর, সম্ভবত মারাঠা আক্রমণের জন্য, এ রাজস্ব পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।[৬]

১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি কার্যালয় স্থানান্তরিত করার পর থেকেই একদিকে যেমন সেখানে লোক সমাগম বেড়ে যায় তেমনই অন্যদিকে শাসনকার্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন দফতরের জন্য নির্মাণকার্যও শুরু হয়ে যায়। মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমিদারদের আমলারা, দেওয়ানি কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সব কানুনগো ও অন্যান্য কর্মচারীরা সবাই ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে আসে। তা ছাড়া বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কার-মহাজনও, যাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান জগৎশেঠ পরিবার, নতুন সুযোগের সন্ধানে ঢাকা থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন।[৭] এ ছাড়াও, মুর্শিদকুলির রাজস্ব বিভাগের সংস্কারের ফলে যে নতুন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী শ্রেণির আবির্ভাব হয় মুর্শিদাবাদ তাদেরও প্রধান আস্তানা হয়ে ওঠে।[৮] শুধু তাই নয়, মুর্শিদাবাদ প্রথমে দেওয়ানি কার্যালয় ও পরে রাজধানী হওয়ার ফলে তার গুরুত্ব এতই বেড়ে যায় যে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিও মুর্শিদাবাদের সন্নিকটে, কাশিমবাজারে, তাদের কুঠিগুলিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করে, যদিও অবশ্য তাদের কাছে কাশিমবাজার কুঠিগুলির প্রয়োজনীয়তা কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্র সংগ্রহের জন্য।

দেওয়ানির পরে যখন মুর্শিদকুলিকে বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত করা হল, তখন মুর্শিদাবাদই বাংলার রাজধানীতে পরিণত হল। ফলে সেখানে শুধু রাজকর্মচারী নয়, ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার থেকে শুরু করে নানারকম অসংখ্য লোকের আনাগোনাও শুরু হয়ে গেল এবং এদের মধ্যে অনেকেই নতুন রাজধানীতে তাদের আস্তানা পাতল। এভাবে মুর্শিদাবাদ বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত্তম শহর হয়ে উঠল। শুধু ভারতীয় বা এশীয় বণিকরা নয়, অনেক বিদেশি বণিকরাও মুর্শিদাবাদে ঠাঁই করে নিল। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আর্মানিরা। মুর্শিদাবাদের পার্শ্ববর্তী সৈয়দাবাদে তারা নিজেদের একটি বসতি স্থাপন করে সেখানে একটি গির্জাও প্রতিষ্ঠা করল।[৯] ফরাসিরাও এখানে একটি কুঠি তৈরি করে।[১০] তা ছাড়া মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি কাশিমবাজার বাংলার বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে এশিয়া ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী, সওদাগর, ব্যাঙ্কার-মহাজনদের শুধু নয়, প্রায় সব প্রধান ইউরোপীয় কোম্পানিরও বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে।[১১] এসব কারণে মুর্শিদাবাদের গুরুত্বও অনেক বেড়ে যায়।

মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি কার্যালয় নিয়ে আসার পরে স্বাভাবিক কারণেই মুর্শিদকুলি বিভিন্ন দফতরের জন্য নির্মাণকার্য শুরু করে দেন। রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন সলিম জানাচ্ছেন, দুঘরিয়ার ঊষর ও নির্জন প্রান্তরে মুর্শিদকুলি একটা প্রাসাদ, দেওয়ানখানা (Board of Revenue), খালসা খাজাঞ্চিখানা (Court of Exchequer) প্রভৃতি তৈরি করেন।[১২] তা ছাড়া ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের সুবিধের জন্য তিনি একটি সরাইখানা তৈরি করেন, তার মধ্যে একটি মসজিদও। তিনি যখন বাংলার সুবাদার পদেও নিযুক্ত হন এবং মুর্শিদাবাদ বাংলার রাজধানীতে পরিণত হয়, তখন সেখানকার নির্মাণকার্য স্বভাবতই অনেক বেড়ে যায়। তিনি মুর্শিদাবাদে একটি টাঁকশালও স্থাপন করেন এবং সেখানে যে মুদ্রা তৈরি হত তাতে লেখা থাকত ‘মুর্শিদাবাদ টাঁকশালে তৈরি’।[১৩] তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে মুর্শিদাবাদের পূর্ব প্রান্তে তাঁর খাস তালুকে তিনি একটি খাজাঞ্চিখানা, একটি কাটরা ও মসজিদ এবং বিরাট একটি জলাশয় নির্মাণ করেন। ওই মসজিদের সিঁড়ির তলায় তিনি নিজের সমাধিক্ষেত্রও বানিয়ে নেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ঐখানে সমাধিস্থ করা হয়।[১৪] এটি ‘জাফর খানের কাটরা’ নামে পরিচিত।

মুর্শিদকুলির সময় মুর্শিদাবাদের নানারকমের উৎসব ও জাকজমক ছিল দেখবার মতো। তার মধ্যে একটি ছিল পুণ্যাহ, চৈত্র মাসের শেষে জমির রাজস্ব আদায় শেষ হওয়ার পর বৈশাখের প্রথমদিকে হত পূণ্যাহ। ওইদিন মুর্শিদাবাদে সব জমিদাররা বা তাদের প্রতিনিধিরা হাজির হত। মহাসমারোহে চলত পুণ্যাহের উৎসব।[১৫] বাংলা থেকে দিল্লিতে রাজস্ব পাঠানোর ব্যাপারটাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রত্যেক বছরই মুর্শিদকুলি রাজস্ব বাবদ নগদ ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা করে পাঠাতেন। তা ছাড়াও খালসা জমি থেকে প্রাপ্ত আয় এবং বাংলা থেকে বহুবিধ চিত্তাকর্ষক জিনিসপত্র রাজস্বের সঙ্গে যেত। এ সবই দু’শোটি শকটে বোঝাই করে ছ’শো অশ্বারোহী ও পাঁচশো পদাতিক সৈন্যের পাহারায় মুর্শিদকুলি নিজে মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। তবে সবচেয়ে বড় জাঁকজমক দেখা যেত হজরত মহম্মদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে। এটা হত রবি-উল-আওয়াল মাসের পয়লা তারিখ থেকে বারো তারিখ পর্যন্ত। এ ক’দিন নবাব মুর্শিদাবাদ ও নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে জ্ঞানীগুণী, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধুসন্ত, ফকির, শেখ, সৈয়দ, ইত্যাদি বিভিন্ন স্তরের লোকজনকে মজলিসে নেমন্তন্ন করে সবাইকে পানাহারে আপ্যায়িত করতেন। শুধু তাই নয়, ওই ক’দিন ভাগীরথীর দক্ষিণে লালবাগ থেকে পশ্চিম তীরের উত্তরে শাহিনগর পর্যন্ত নদীর দু’ধারেই হাজার হাজার চিরাগবাতি দিয়ে সাজানো হত। ওই সব চিরাগের আলোতে মসজিদ, মিনার, গাছপালায় কোরানের শ্লোক ও নানাবিধ কবিতা ফুটে উঠে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হত। মুর্শিদকুলির নির্দেশে নাজির আহমেদ চিরাগের আলো জ্বালাবার জন্য প্রায় এক লক্ষ লোক নিয়োগ করতেন। সন্ধের সময় একবার তোপধ্বনি করে আলো জ্বালাবার সংকেত দেওয়া হত এবং সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার চিরাগবাতি জ্বলে উঠে এক অপূর্ব সুন্দর বাতাবরণের সৃষ্টি করত। রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন সলিমের ভাষায় ‘producing an illusion as if a sheet of light had been unrolled, or as if the earth had become a sky studded with stars’.

মুঘলধারা অনুসরণ করে মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদে নবাবি দরবারও শুরু করেন। বলা বাহুল্য এ দরবারে রাজ্যের অমাত্যরা শুরু করে ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী, বিদেশি পর্যটক, ইউরোপীয় কোম্পানিরগুলির প্রতিনিধিরা নিয়মিত উপস্থিত হতেন। মুর্শিদকুলির রাজস্ব ও শাসনবিভাগের সংস্কারের ফলে বাংলায় শুধু নতুন এক ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার-মহাজন শ্রেণির আবির্ভাব হয়নি, নতুন এক বড় বড় জমিদার শ্রেণি ও একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও উদ্ভব হয়। এদের মধ্যে অনেকেরই নবাবি দরবারে যাতায়াত ছিল। এ দরবারের জাঁকজমক পরবর্তী নবাবদের সময় অনেক বেড়ে যায়। যেহেতু মুর্শিদকুলি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, সেজন্য ধর্মের প্রতিপালনেও তিনি যথেষ্ট নজর দিতেন, যেটা তাঁর পরে বাংলার নবাবদের মধ্যে বিশেষ দেখা যায়নি। রোজ কোরানপাঠ ও মালাজপ করার জন্য তিনি আড়াই হাজার কোরানে পারদর্শী ব্যক্তি ও তসবি (মালাজপক) নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর নিজের রসুইখানা থেকে রোজ দু’বেলা এদের খাবার পরিবেশন করা হত।[১৬]

যতদূর জানা যায়, তাতে মনে হয় মুর্শিদকুলির সময় মুর্শিদাবাদের সাধারণ লোকদের অবস্থা বেশ ভালই ছিল। এখানে প্রথমে দেওয়ানি ও পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে নানারকমের নির্মাণকার্য এবং ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী, জমিদার, অমাত্য এ সবের আনাগোনার ফলে কাজকর্মের এবং আয়ের পথও বেশ সুগম হয়। তা ছাড়া মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদ থেকে (সারা বাংলা থেকেও বটে) বাইরে চাল রফতানি একদম বন্ধ করে দেন। অথচ বহুদিন থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে, এমন কী লোহিত সাগর ও পারস্য সাগর অঞ্চলেও, বাংলা থেকে চাল রফতানি হত।[১৭] যাই হোক, মুর্শিদকুলি চাল রফতানি বন্ধ করার ফলেই সম্ভবত তাঁর সময় মুর্শিদাবাদে চালের দাম ছিল, গোলাম হোসেন সলিমের তথ্য অনুযায়ী, টাকায় ৫ থেকে ৬ মণ, যদিও সলিমুল্লা বলছেন, টাকায় ৪ মণ। সে অনুপাতে অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও ছিল সস্তা। ফলে রিয়াজের লেখক বলছেন, মুর্শিদাবাদের লোকেরা তখন মাসে এক টাকা খরচ করলেই পোলাও, কালিয়া খেতে পারত। এটা হয়তো অত্যুক্তি, যদিও এ থেকে অনুমান করা যায় সাধারণ লোকদের অবস্থা বেশ স্বচ্ছলই ছিল।[১৮]

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মুর্শিদকুলির আমলে বাঙালি হিন্দুদের অবস্থার বেশ উন্নতি হয়। মুসলমান রাজত্ব হলেও তিনি বিশেষ করে রাজস্ব বিভাগে বাঙালি হিন্দুদেরই শুধু নিযুক্ত করেছিলেন। তার অন্যতম কারণ অবশ্য বাঙালি হিন্দুরা যেমন ফারসি ভাষা আয়ত্ত করেছিল, তেমনি রাজস্বের ব্যাপারেও তাদের বেশ দক্ষতা ছিল। তা ছাড়া মুর্শিদকুলির ধারণা ছিল হিন্দুরা রাজস্বের হিসেবে গরমিল করলে বা তা আত্মসাৎ করলে তিনি তাদের কড়া শাস্তি দিতে পারবেন, যেটা মুসলমান কর্মচারী হলে তাঁর পক্ষে করা অসুবিধেজনক ছিল। শাস্তির ভয়ে হিন্দুরা তহবিল তছরূপ বা রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে কোনওরকমের অবহেলা করবে না। তারিখ-ই-বংগালার লেখক সলিমুল্লা লিখছেন:[১৯]

Murshed Kuli Khan employed none but Bengally Hindoos in the collection of revenues, because they are most easily compelled by punishment to discover their malpractices, and nothing is to be apprehended from their pusillanimity.

বলা বাহুল্য, মুর্শিদাবাদে সদর দেওয়ানি কার্যালয় অবস্থিত হওয়ার ফলে উক্ত কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে যারা উচ্চপদস্থ, তাদের মধ্যে অনেকেই মুর্শিদাবাদেই বসবাস করতে শুরু করে। তাতে মনে হয় মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যায় সাম্প্রদায়িক অনুপাতে অনেকটা ভারসাম্য দেখা যায়। রিয়াজের লেখক বলছেন এ সময় মুর্শিদাবাদের জনসাধারণ নবাবদের কল্যাণে দিল্লি তথা উত্তর ভারতের লোকদের সঙ্গে মেলামেশা ও কথাবার্তা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেদের চালচলন, কথাবার্তা ও ব্যবহারে দিল্লি ও উত্তর ভারতের লোকদের মতো অনেকটা পরিশীলিত হয়ে ওঠে, যেটা বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে দেখা যায় না।[২০]

সুজাউদ্দিন

মুর্শিদকুলির মৃত্যুর (১৭২৭) পর তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর দৌহিত্র সরফরাজ খান বাংলার মসনদে বসেন। কিন্তু তাঁর বৃদ্ধ পিতা সুজাউদ্দিন খান, যিনি তখন উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর বা ছোট নবাব ছিলেন, মুর্শিদকুলির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মসনদের লোভে মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে আসেন এবং মুর্শিদকুলির প্রাসাদ চেহেল সুতুনে (‘palace of forty pillars’—চল্লিশ স্তম্ভের প্রাসাদ— মুর্শিদকুলির তৈরি) নিজেকে বাংলার সুবাদার বা নবাব হিসেবে ঘোষণা করেন। সরফরাজ কিন্তু এটা মোটেই মেনে নিতে চাননি এবং সুজাউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। তাঁর চরিত্রের যতই দোষ থাক, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মাতৃভক্ত। তাঁর মা, সুজাউদ্দিনের পত্নী, জিন্নতউন্নেসা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা ও গুণবতী মহিলা। তাই স্বামী সুজাউদ্দিনের উচ্ছৃঙ্খল চরিত্র ও নারী সম্ভোগে চরম আসক্তি দেখে তাঁর ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে স্বামীকে ছেড়ে তাঁর পিতার কাছে চলে আসেন। কিন্তু সরফরাজ যখন তাঁর পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে চাইলেন, তখন তাঁর দিদিমা, মুর্শিদপত্নী নাসিরা বানু বেগম, ও মা জিন্নতউন্নেসা তাঁকে তা থেকে এই বলে নিবৃত্ত করলেন যে সুজাউদ্দিন বৃদ্ধ হয়েছেন, বেশিদিন রাজত্ব করতে পারবেন না। তাই কিছুদিনের মধ্যে সরফরাজ নবাব হতে পারবেন— সুতরাং শুধু শুধু রক্তক্ষয়ের প্রয়োজন নেই। সরফরাজ দিদিমা ও মায়ের কথা মেনে নিয়ে, পিতা সুজাউদ্দিনকে নবাব/সুবাদার হিসেবে স্বীকার করে নিলেন।[২১]

মসনদে বসার কিছুদিনের মধ্যেই সুজাউদ্দিন শুধু ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দিলেন না, সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদ দরবারকে নতুন করে সাজিয়ে জাঁকজমক পূর্ণ করে তুলতে লেগে গেলেন। বয়স হয়ে গেলেও তিনি জীবনের আনন্দসম্ভোগ ছেড়ে দিতে একেবারেই রাজি ছিলেন না। বরং নবাব হওয়ার পর ক্ষমতা ও অর্থের অধিকারী হয়ে তাতে আরও ডুবে গেলেন। তাঁর আনুষঙ্গিক হিসেবে তিনি মুর্শিদাবাদকে ঢেলে সাজাতে চাইলেন। মুর্শিদকুলির তৈরি প্রাসাদ ও অন্যান্য ইমারত ছোট ছোট বলে তাঁর একেবারে পছন্দ ছিল না। তাই তিনি মুর্শিদকুলির প্রাসাদ ভেঙে একটি প্রশস্ত প্রান্তরে বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তা ছাড়াও তিনি একটি অস্ত্রাগার, একটি অত্যুচ্চ তোরণ, একটি দেওয়ানখানা (revenue court), চল্লিশটি স্তম্ভের ওপর চেহেল-সুতুন নামে একটি প্রাসাদ (palace of forty pillars), একটি ব্যক্তিগত দফতর (private office– খিলওয়াত খানা), একটি জুলুসখানা (reception hall) ও একটি খালিসা কাছারি (court of exchequer— ফরমানবাড়ি) নির্মাণ করেন। শুধু তাই নয়, মুর্শিদকুলির সময়কার রাজস্ব বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী নাজির আহমেদকে ফাঁসিতে ঝোলাবার পর মুর্শিদাবাদের অদূরে ভাগীরথী তীরে তিনি যে মসজিদ ও উদ্যান নির্মাণ শুরু করেছিলেন, সুজাউদ্দিন সেটা সম্পূর্ণ করেন। সেখানেও তিনি প্রাসাদ, জলাশয় ইত্যাদি নির্মাণ করেন এবং তাঁর নাম দেন ফরাহবাগ বা ফর্হাবাগ। সেখানে তিনি সারা বছর পিকনিক ও নানারকমের আনন্দ উৎসব করতেন। আর বছরে একবার তাঁর দরবারের উচ্চপদস্থ ও শিক্ষিত কর্মচারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করতেন।[২২]

সরফরাজ

নবাব সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর (১৭৩৯) সরফরাজ নবাব হলেন। যদিও সমসাময়িক কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেছেন যে তিনি তাঁর পিতার মতোই নারীসম্ভোগ ও বিলাসব্যসনে লিপ্ত ছিলেন,[২৩] তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলি খান কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য কথা লিখছেন। ইউসুফ আলির ভাষ্য অনুযায়ী সরফরাজের ভোগবিলাসের প্রতি কোনও আসক্তি ছিল না, তিনি নিয়মিত দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন।[২৪] সে যাই হোক, তাঁর সময় মুর্শিদাবাদ দরবারে বিশেষ জাঁকজমকের ব্যবস্থা তেমন দেখা যায় না। তাঁর পিতার মতো প্রাসাদ, ইমারত ইত্যাদি নির্মাণও তাঁর রাজত্বে চোখে পড়ে না। এর প্রধান কারণ অবশ্য তিনি মাত্র বছরখানেকই রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। তিনি মসনদে বসার পরই সুজাউদ্দিনের দরবারের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী তিন অমাত্য/পারিষদ, যাঁদের ‘ত্রয়ী’ বলা হয়— দেওয়ান আলমচাঁদ, ব্যাঙ্কার জগৎশেঠ ফতেচাঁদ ও সৈয়দ আহমেদ— এবং যাঁদের হাতে নবাব সুজাউদ্দিনের সময় বাংলার শাসনক্ষমতাই চলে গেছল, তাঁরা সরফরাজকে সরিয়ে আলিবর্দিকে বাংলার নবাব করার ষড়যন্ত্র করেন। আলিবর্দি, যাঁকে সুজাউদ্দিন বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন, গিরিয়ার যুদ্ধে (১৭৪০ সালে) সরফরাজকে পরাজিত ও নিহত করে বাংলার মসনদ দখল করে নেন।

আলিবর্দি খান

আলিবর্দির শাসনকালে মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার ওপর দিয়ে বিরাট ঝড় বয়ে যায়। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত মারাঠারা প্রায় প্রত্যেক বছরই বাংলায় লুঠতরাজ চালায়। তাই আলিবর্দি মারাঠা আক্রমণ প্রতিহত করতে তাঁর রাজত্বের অনেকটা সময়ই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। তা ছাড়া, এ সময় তাঁকে বিহারে আফগান বিদ্রোহেরও সম্মুখীন হতে হয়। ফলে তাঁর সময় মুর্শিদাবাদ দরবারের জাঁকজমক তেমন চোখে পড়ে না। মারাঠা আক্রমণের ঢেউ মুর্শিদাবাদেও আছড়ে পড়ে। যেহেতু মারাঠাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল টাকাকড়ি ও ধনসম্পত্তি সংগ্রহ করা এবং যেহেতু রাজধানী মুর্শিদাবাদে নবাব ও তাঁর ধনী অমাত্যরা ছাড়াও বহু বড় বড় ধনী ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ীদের আবাস, তাই মারাঠাদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মুর্শিদাবাদ। ফলে এ সময় মুর্শিদাবাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ব্যাহত হয়, কারণ মারাঠাদের লুঠতরাজের ভয়ে বড় ব্যাঙ্কার-মহাজন-ব্যবসায়ী মুর্শিদাবাদ ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যেত এবং এ কারণে মুর্শিদাবাদে নগদ টাকা ও ধার জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। দু’-একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে।

১৭৪২ সালের ৭ জুন কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠিয়ালরা কলকাতায় জানাচ্ছে যে মারাঠা আক্রমণের ভয়ে জগৎশেঠরা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে গেছেন, তাই কোনও শরাফ বা মহাজনই মুর্শিদাবাদে থাকা নিরাপদ মনে করছে না। একমাত্র জগৎশেঠরা ফিরে এলে তারা নিশ্চিন্ত বোধ করবে। ফলে মুর্শিদাবাদের বাজারে নগদ টাকার যথেষ্ট অভাব দেখা দিয়েছে, ধার পাওয়াও দুষ্কর হয়ে উঠেছে। তাই নবাব আলিবর্দি জগৎশেঠকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।[২৫] ১৪ জুন কাশিমবাজার থেকে কুঠিয়ালরা জানাচ্ছে, জগৎশেঠ ফিরে এসেছেন, তা দেখে অন্য ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কারও, তাই বাজারে টাকার আর কোনও অভাব নেই।[২৬] আবার ১৭৪৩ সালে মারাঠা আক্রমণের আশঙ্কায় জগৎশেঠরা যখন মুর্শিদাবাদ থেকে পালালেন, তখন ওই বছর জুন মাসে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি থেকে জানাচ্ছে যে ‘এখানে কোনও ধার পাওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে কারণ জগৎশেঠরা শহর ত্যাগ করার ফলে বাজারে নগদ টাকার নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছে।’[২৭] আবার ২ জুলাই তারা লিখছে, ‘জগৎশেঠ ফতেচাঁদ মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন এবং কাশিমবাজারে এখন টাকার প্রাচুর্য, ধার পাওয়াও অনেক সহজ।’[২৮] ১৭৪২ সালে মীর হাবিবের প্ররোচনায় মারাঠারা মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করে লুঠতরাজ চালায়, জগৎশেঠের বাড়ি থেকে তারা মূল্যবান জিনিসপত্র ছাড়াও নগদ ২ কোটি টাকা লুঠ করে নিয়ে যায় (মুজাফফরনামার লেখক করম আলির ভাষ্য অনুযায়ী ৩ লক্ষ)।[২৯]

তবে মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের অর্থনীতি ও শিল্পবাণিজ্যে এক বিরাট বিপর্যয় দেখা দেয় বলে অনেক ঐতিহাসিকের যে অভিমত, তা কিন্তু অনেকাংশেই অতিরঞ্জিত।[৩০] মারাঠা আক্রমণ ও লুঠতরাজ কিছুটা বিপর্যয় ঘটিয়েছিল সন্দেহ নেই, তবে সেটা সাময়িক এবং কোনও কোনও অঞ্চলেই শুধু সীমাবদ্ধ ছিল। মারাঠারা বাংলা ও মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করত বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়— বর্ষা শুরু হবার আগেই তারা বাংলা থেকে ফিরে যেত এবং বর্ষা শেষ হবার পর আবার ফিরে আসত। ফলে বাংলার কৃষক কারিগররা মারাঠারা চলে যাবার পর তাড়াতাড়ি তাদের কাজকর্ম শুরু করে দিত আবার মারাঠারা ফিরে আসার আগে ফসল তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেত। তা ছাড়া মারাঠারা মোটামুটি একটি নির্দিষ্ট পথ ধরেই আক্রমণ করতে আসত এবং সে পথের দু’ধারেই শুধু লুঠতরাজ চালাত।[৩১] ফলে মারাঠা আক্রমণ মুর্শিদাবাদ তথা বাংলায় দীর্ঘস্থায়ী কোনও বিপর্যয় ঘটাতে পারেনি।[৩২]

১৭৫১ সালে মারাঠাদের সঙ্গে আলিবর্দির চুক্তি হয়ে যাবার পর বাংলা তথা মুর্শিদাবাদে মারাঠা আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আলিবর্দি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারলেন এবং দরবারের জাঁকজমকের দিকে নজর দিলেন। এ সময়কার একটি পুণ্যাহের বিবরণ দিয়েছেন তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলি। সেদিন চারশোর বেশি ব্যক্তিকে, যাদের মধ্যে জমিদার, অমাত্য, রাজকর্মচারী সবাই ছিল, আলিবর্দি তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী খেলাত বা সম্মান পোশাক প্রদান করেন। তারপর সবাইকে ভুরিভোজে অ্যাপ্যায়িত করা হয়। ওইদিন নবাব তাঁর প্রাসাদে সোনা দিয়ে মোড়া খুঁটির ওপর লাগানো, সোনার সুতো দিয়ে এমব্রয়ডারি করা সামিয়ানার তলায় স্বর্ণখচিত সিংহাসনে বসে জমিদারদের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব গ্রহণ করেন।[৩৩]

মারাঠা আক্রমণ সত্ত্বেও আলিবর্দির সময় যে মুর্শিদাবাদের যথেষ্ট উন্নতি ও বিস্তার হয়েছিল, তার প্রমাণ মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলির বিবরণ থেকে পাওয়া যায়। করম আলি লিখেছেন:[৩৪]

The city of Bengal [i.e. Murshidabad] in his reign extended over 12 kos [24 miles] in length and 7 kos [14 miles] in breadth; in addition to this, many rich men had built pleasure-houses outside the city. Twelve persons were entitled to play the naubat morning and evening. Many kinds of people, high and low, and all classes of artisans and men of all skill and letters were assembled in this city.

বস্তুতপক্ষে প্রায়-সমসাময়িক ফারসি ইতিহাস থেকে জানা যায় যে মারাঠাদের বছরে ১২ লক্ষ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শান্তি কিনে নেবার পর আলিবর্দি বাংলা থেকে মারাঠা আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন মুছে দেবার প্রতি খুবই যত্নবান হয়ে পড়েন। জনৈক ফারসি ঐতিহাসিকের মন্তব্য, আলিবর্দি এ কাজ করেছেন ‘with judgement and alacrity and to the repose and security of his subjects, and never after-wards deviated in the smallest degree from those principles’.[৩৫]

সিরাজদ্দৌল্লার পনেরো মাসের স্বল্প রাজত্বেও মুর্শিদাবাদে জাঁকজমক ও বৈভবের কোনও ঘাটতি ছিল না। নবাবদের প্রাসাদ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের জন্য মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এ প্রাসাদ হীরাঝিলের প্রাসাদ নামে পরিচিত হয়। আলিবর্দির সময়কার মতো তাঁর সময়েও মুর্শিদাবাদ দরবারে এবং রাজপ্রাসাদে মহাসমারোহে হোলি ও অন্যান্য উৎসব পালিত হত। তাঁর কাছে হোলি উৎসবের এমনই আকর্ষণ ছিল যে ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের সন্ধি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) করেই তিনি তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদ এসে মনসুরগঞ্জের প্রাসাদে হোলিতে মেতে ওঠেন।[৩৬]

মুর্শিদাবাদের নবাব ও বণিকরাজাদের (merchant princes) সঞ্চিত ধনসম্পদ প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। মুর্শিদকুলির সময় থেকে আলিবর্দির রাজত্বের প্রথম দিক অর্থাৎ ১৭৪০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত দিল্লিতে মুঘল বাদশাহের কাছে রাজস্ব বাবদ বছরে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা পাঠিয়েও নবাবের কোষাগারে প্রচুর অর্থ সঞ্চিত হত। শুধু নবাব নন, তাঁর আত্মীয় পরিজন ও অমাত্যরাও বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছিল। মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলির ভাষ্য অনুযায়ী আলিবর্দি-কন্যা ও ঢাকার নবাব নওয়াজিস মহম্মদের পত্নী ঘসেটি বেগমের মোতিঝিল প্রাসাদ থেকে সিরাজদ্দৌল্লা তাঁকে বিতাড়িত করার পর সেখান থেকে হিরে জহরত বাদ দিয়েই নগদ ৪ কোটি টাকা ও ৪০ লক্ষ মোহর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এক কোটি টাকা মূল্যের সোনা-রুপোর নানা বাসনও মোতিঝিল থেকে সিরাজ কবজা করেছিলেন।[৩৭] এতে অত্যুক্তি থাকলেও অনেকটাই সত্য আছে বলে মনে হয়।

পলাশিতে সিরাজদ্দৌল্লার পরাজয়ের পর ইংরেজরা মুর্শিদাবাদে নবাবের কোষাগারে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিল যে ওখানে শুধুমাত্র সোনা-রুপো মিলে ২ কোটি টাকা সঞ্চিত ছিল। তা ছাড়াও, তারিখ-ই-মনসুরীর লেখকের মতে, নবাবের হারেমে লুকোনো যে ধনসম্পদ ছিল, সোনা, রুপো, হিরে, জহরত মিলে তার মূল্য কম করে ৮ কোটি টাকা।[৩৮] মুর্শিদাবাদের বণিকরাজা জগৎশেঠদের ব্যবসার মূলধনই ছিল আনুমানিক ৭ কোটি (William Bolts)[৩৯] থেকে ১৪ কোটি টাকার (N. K. Sinha)[৪০] মতো আর তাদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল ৫০ লক্ষ টাকা।[৪১] পলাশিতে ইংরেজ বিজয়ের পর রবার্ট ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ দেখে প্রায় হতবাক। তিনি লিখেছেন:[৪২]

The city of Murshidabad is as extensive, populous and rich, as the city of London, with this difference that there are individuals in the first possessing infinitely greater property than any of the last city.

একটি অনুমান অনুযায়ী ১৭৬০-এর দশকে লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল ৭৫০,০০০-এর মতো।[৪৩] ক্লাইভের বক্তব্য যদি ঠিক হয়, তা হলে তখন মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যাও ওরকমই ছিল।

এখানে উল্লেখযোগ্য, ১৭৭২ সালে লন্ডনে একটি পার্লামেন্টারি কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ক্লাইভ বলেছিলেন:[৪৪]

Consider the situation in which the victory at Plassey had placed me! A great prince was dependent on my pleasure; an opulent city lay at my mercy; its richest bankers bid against each other for my smiles; I walked through vaults which were thrown open to me alone, piled on either hand with gold and jewels! Mr. Chairman, at this moment I stand astonished at my moderation.

এ থেকে স্পষ্ট যে ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ নবাবদের কোষাগারে সঞ্চিত ধনসম্পদ দেখে একেবারে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন।

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. আহকম-ই-আলমগিরি, পৃ, ১০৬ক, Abdul Karim, Murshid Quali and His Times-এ উদ্ধৃত, পৃ. ২৫।
  2. J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, Vol. II, p. 405; Abdul Karim, Murshid Quli, pp. 28-29.
  3. Abdul Karim, Murshid Quli, pp. 30-31; J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, Vol. II, pp. 405-406.
  4. মাসির-উল-উমারা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৭৫২; তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৩৯ক, Abdul Karim, Murshid Quli-তে উদ্ধৃত, পৃ. ৫৪; J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, p. 406.
  5. J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, vol. II, p.407; Abdul Karim, Murshid Quli, pp. 54-55.
  6. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 11, 18.
  7. রিয়াজ, পৃ. ২৮; তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ২৯ক, Abdul Karim, Murshid Quli, p. 21-এ উদ্ধৃত।
  8. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 17-18; K. M. Mohsin, Murshidabad, p. 6.
  9. S. Chaudhury and M. Morineau, ed., Merchants, Companies and Trade, p. 75. P. C. Majumdar, Musnud, p. 233
  10. K. M. Mohsin, Murshidabad, p. 6.
  11. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 208-209.
  12. রিয়াজ, পৃ. ২৮; Abdul Karim, Murshid Quli, p. 4.
  13. রিয়াজ, পৃ. ২৮; Abdul Karim, Murshid Quli, p. 23, যদিও আব্দুল করিম মনে করেন যে ১৭০৪ সালে দেওয়ানি স্থানান্তরিত করার পরই মুর্শিদাবাদে টাকশালটি স্থাপিত হয়, অন্য মতে মুর্শিদকুলি সুবাদার হওয়ার পরে ১৭১৬/১৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  14. রিয়াজ, পৃ. ২৮৪; তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭০; A. H. Dani, Muslim Architecture, pp. 275-76.
  15. রিয়াজ, পৃ. ২৭৯-৮০; তারিখ-ই-বংগলা, পৃ. ৬৭; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, পৃ. ৪৭১।
  16. রিয়াজ, পৃ. ২৮০, তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৬৪; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, পৃ. ৪৭১। রিয়াজের লেখক বলছেন আড়াই হাজার আর সলিমুল্লা ও নিখিলনাথ রায়ের লেখায় দু’হাজার।
  17. S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization in Bengal, pp. 4-5, 242- 43; S. Chaudhury and M. Morineau, ed., Merchants, Companies and Trade, p. 5.
  18. রিয়াজ, পৃ. ২৮০-৮১; তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৬৫; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, পৃ. ৪৭২।
  19. সলিমুল্লা, তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৩৬-৩৭।
  20. রিয়াজ, পৃ. ২৭।
  21. J. N. Sarkar, ed., Histrory of Bengal, vol. 2, pp. 422-23; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 2-3; স্যার যদুনাথ সরকার অবশ্য বলছেন যে অন্যান্যদের মধ্যে সরফরাজ তাঁর মাতামহী, মুর্শিদপত্নীর, কথাতেই প্রধানত নিজের পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে নিবৃত্ত হন। রিয়াজের লেখকও অবশ্য বলছেন যে মুর্শিদকুলির পত্নী, নাসিরা বানু বেগম, যিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও বিচক্ষণ এবং যিনি সরফরাজকে প্রাণাধিক ভালবাসতেন, তিনিই বুঝিয়ে সুঝিয়ে সরফরাজকে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে নিবৃত্ত করলেন (রিয়াজ, পৃ. ২৮৮)। অন্যদিকে সলিমুল্লার ভাষ্য অনুযায়ী সরফরাজের দিদিমা ও মা দু’জনেই এটা করেছিলেন (সলিমুল্লা, তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭২)।
  22. রিয়াজ, পৃ. ২৯০-৯১; তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭৫।
  23. K.K.Datta, Alivardi, pp. 16-18; রিয়াজ, পৃ. ২৮৮;সলিমুল্লা, তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭৩।
  24. ইউসুফ আলি, তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গী, পৃ. ৯-১০।
  25. Factroy Records, Kasimbazar, Vol. 6, 7 June 1742; BPC, vol. 6, 14 June 1742.
  26. ঐ, vol. 15, f, 194vo, 21 June 1742; Factory Records, Kasimbazar, vol. 6, 14 June 1742.
  27. BPC, vol. 16, f. 181vo, 10 June 1743; Factory Records, Kasimbazar, vol. 6,6 June 1743.
  28. BPC, vol. 6, 2 July 1743.
  29. J. H. Little, Jagatseth, p. 120; করম আলি, মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ২৯।
  30. K. K. Datta, Alivardi; P. J. Marshall, East Indian Fortunes; Bengal—the British Bridgehead; K. N. Chaudhuri, Trading World of Asia.
  31. Richard Becher’s letter to Governor Verelst, 24 May 1769, quoted in W. K. Firminger, Fifth Report, pp. 183-84.
  32. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 300-302, “Was there an eco- nomic crisis in mid-eighteenth century Bengal?” in Richard B. Barnett, ed, Rethinking Early Modern India, pp. 219-52.
  33. ইউসুফ আলি, তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গী পৃ. ১১৬; J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, pp. 154-55.
  34. মুজাফ্‌ফরনামা, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, p. 58.
  35. Calendar of Persian Correspondence, vol. II, pp. 191, 197, quoted in K. K. Datta, Alivardi, p. 140.
  36. মুজাফ্‌ফরনামা, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, p. 72.
  37. ঐ, পৃ .৬২।
  38. তারিখ-ই-মনসুরী, trans, H. Blochmann, JAS, no. 2, 1867, pp. 95-96.
  39. William Bolts, Considerations, p. 158.
  40. N. K. Sinha, Economic History of Bengal, Vol. II, p. 134.
  41. Luke Scrafton to Colonel Clive, 17 Dec. 1757, Orme Mss. India, XVIII, f. 5043; Eur. G 23, Box 37.এ প্রসঙ্গে আমার বই From Prosperity to Decline, পৃ.১১৪-১৫ দ্রষ্টব্য।
  42. J. H. Little, The House of Jagatseth, p. 2-তে উদ্ধৃত।
  43. K. M. Mohsin, Murshidabad, p. 227 and p. 227, fn. 1 দ্রষ্টব্য।
  44. Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 126 উদ্ধৃত।