তের পরিচ্ছেদ

মেয়ে লোকটি কে?

কাসুর মনে বারবার এই প্রশ্নটাই আনাগোনা করতে থাকে। তাকে কোলে নিয়ে কত আদর করলো! আখ খেতে দিলো। দরদর করে পানি পড়ছিল তার চোখ বেয়ে! কে সে?

একবার তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু করিম বকশের মুখ-চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায়।

করিম বকশের রাগ তখনও থামেনি। জয়গুন সে রাগ থেকে কোন রকমে বেঁচে গিয়েছিল। একত্র ঘর-সংসার করার পুরাতন স্মৃতি করিম বকশের মেজাজকে চরমে উঠতে দেয়নি। কিন্তু তারপর লগির উপর দিয়ে তার রাগের জের চলে সমানভাবে। লগির জোর গুঁতোয় ধানখেতের মাঝ দিয়ে যেন তীরের মত ছুটছিল তার ডিঙি। ডিগির গলুইয়ে পানি উঠছিল ছলাৎ ছলাৎ! কিন্তু বাড়ীর কাছাকাছি এসে লগিটা মটাৎ করে ভেঙে দু’ভাগ হয়ে যায়। করিম বকশের রাগ কিন্তু এতক্ষণে থামে। লগি ভাঙার আফসোসে নয়, তার রাগের জয়লাভ। তার রাগ জয়ী হয়েছে লগিটা ভেঙে দিয়ে। এমনি কোনো মাশুল না পেলে তার রাগের কোনো মতেই শান্তি আসে না। লগিটা না ভাঙলে বাড়ী পর্যন্ত পৌছে আঞ্জুমনের সাথে খুব এক চোট ঝগড়া হওয়ার সম্ভাবনা হয়ত ছিল।

বাপের থমথমে মুখের দিকে চেয়ে কাসুর কথা বলার সাহস হয় না। চুপ করে সে বসেই থাকে আর ভাবে—মেয়েলোকটি কে হতে পারে?

প্রশ্নটার মীমাংসায় সেদিন থেকে সে অনেকটা সময় নিয়োজিত করেছে। কিন্তু তার কাঁচা মাথা কোন সন্তোষজনক হদিস খুঁজে বার করতে পারেনি।

হদিস শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

আঞ্জুমন একদিন হাশরের ময়দানের কিচ্ছা বলছিল। শুনে কাসু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে—হাশরের ময়দানে এত মাইনষের মধ্যে মারে চিনতে পারা যাইব? আমি ত মা-রে দেহি নাই। তুমি মা-রে চিনাইয়া দিবা?

আঞ্জুমন কাসুর অভিলাষ বুঝতে পেরে ব্যথিত হয়। কাসুর প্রশ্নটা তাকে খুব পীড়া দিতে আরম্ভ করে আজ। সে ভাবে কাসুকে এমন করে মিথ্যার জালে জড়িয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না। অন্তত তার তো কোনই লাভ নেই লোকসান ছাড়া। কাসু ওর মা-র কাছে চলে গেলেই ভালো হয় যেন। করিম বকশা ফুলিকে মোটেই আদর করে না। এমন কি বাজান বাজান বলে কেঁদে খুন হয়ে গেলেও কোলে তুলে নেয় না। আরো গলাগাল দেয়—মেকুরের বাচ্চাড়া কান্দে ক্যাঁ? এইডারে ছালা ভইরা জঙ্গলে ফ্যালাইয়া দিয়া আয়। কাসুই করিম বকশের কাছে সব। ফুলি যেন তার কেউ নয়।

ভাবতে ভাবতে তার মন বিরক্তিতে ভরে ওঠে। সে স্থির করে—আজ কাসুক ওর মা-র কথা বলে দেবে। জয়গুনের বাড়ী দেখিয়ে দেবে কাসুকে। করিম বকশের ইঙ্গিতে সে এতদিন কাসুকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখেছিল। মা-র কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে সাজিয়ে বলতে হত অনেক কথা। কাসু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, তার মা-র কবরের কথা। আঞ্জুমন কোন দ্বিধা না করে মেহেরনের কবরটাই দেখিয়ে বলেছিল—এই যে এইডা তোর মা-র কবর।

কাসু বিশ্বাস করেছিল, নিশ্বাস ফেলেছিল আর চেয়েছিল একদৃষ্টে কবরটার দিকে।

মা-র কথা শুনতে শুনতে সে তন্ময় হয়ে যেত। আর ভাবত আহা—মা থাকা কত সুখের! সঙ্গে সঙ্গে তার মনে জাগত সমবয়সীদের কথা। হামিদের মা হামিদকে কত স্নেহ করে। সেলিমের মা কত আদর করে সেলিমকে। কিন্তু তাকে আদর করবার কেউ নেই।

তারপর থেকে সে প্রায়ই কবরটাকে দেখতে আসতো। মাঝে মাঝে করিম বকশের কাছ থেকে পয়সা চেয়ে মোমবাতি কিনে কবরে দিত।

আঞ্জুমন এবার বলে—আমি একটা কথা কইতে পারি। কেওর কাছে না কইতে পারস? কাসু মাথা নাড়ে।

—খবরদার, তোর বাজান হোনলে আমারে কাইট্যা দুই খণ্ড কইর‍্যা ফ্যালাইব। তয় হোন। অই কবরডা তোর সতাই মা-র! আমি যেমুন সতাই মা, তেমন।

—কে আমার মা? কাসু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তুমিই ত কইছিলা ঐডা আমার মা-র কবর।

—ওহোঁ, মিছা কথা। তোর মা অহনো বাঁইচ্যা আছে।

কাসু বিশ্বাস করতে পারে না। সে বলে ফাঁটকি দ্যাও তুমি।

—ফাঁটকি দিমু ক্যাঁ? বিশ্বাস না করলে আর কইমু না। থাউক। আঞ্জুমন চুপ করে।

কিন্তু কাসুর শোনার আগ্রহ এবার বেড়ে যায়। সে বলে, আইচ্ছা, এইবার বিশ্বাস করমু,

–কইলে কি দিবি আমারে?

—তুমি যা চাও হেইয়া দিমু।

–আমি চাই :

আসমানী বিরিক্ষর ফল,
তল নাই দীঘির জল,
যা খাইলে হয় অসুরের বল। পারবি দিতে?

কাসু বিপদে পড়ে। কোথায় পাবে সে এসব? আসমানে গাছ হয়, সেই গাছে ফল হয়। কি তার নাম? সে বুঝতেই পারে না কিছু। আর তল নাই দীঘি—সেটাই বা কেমন? হতাশায় কাসুর মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। তার ধারণা, এগুলো দিতে না পারলে তার সৎসা তাকে তার মা-র কথা বলবেই না।

আঞ্জুমন খলখলিয়ে হেসে ওঠে। কাসুর পিঠ চাপড়ায়। কাসু এবার ভরসা পায়।

অঞ্জুমন আরম্ভ করে—তোর বয়স তহন তিন বচ্ছর। তোর বাপ তোর মারে ছাইড়া দেয়। তোরে তোর ফুফুর কাছে, পাড়াইয়া দায়। তোর একটা বইন আছে, মায়মুন তার নাম।

কাসুর সন্দেহ দূর হয় না। কিন্তু সে মনোযোগ দিয়ে শোনে সব কথা।

আঞ্জুমন আবার বলে—ঈদে টুপিখান দিছিল কে? তোর মা দিছিল না? অই যে কানা বুড়ি দিয়া গেল, ঐ কানা বুড়ি তোর মামানি।

কাসুর সমস্ত সন্দেহের অবসান হয় এবার। সৎমায়ের আচরণে কাসু কোন দিনই সদিচ্ছার পরিচয় পায়নি। তার হাব-ভাব দেখলে তার ভয়ই হত। আজ সৎমায়ের মমতায় সে বিস্মিত হয়। তাকে খুব ভালো লাগে। আঁচল ধরে আবদার করতেও এখন বাধে না কাসুর।

সে বলে—যাইমু মা-র কাছে। আমারে লইয়া যাও না মা-র কাছে।

—আমি লইয়া যাইমু কোতায়? সর্বনাশ! তোর বাজান জানতে পারলে আমারে মাইরা কাহটা গাঙে ফ্যালাইয়া দিব। খবরদার। জানতে যেন না পারে।

কাসু মাথা নাড়ে।

আঞ্জুমন বলে—চল, তোরে দেহাইয়া দেই। বাড়ীর উত্তর ধারে গেলে দ্যাহা যায় বাড়ীখান।

কাসুকে নিয়ে আঞ্জুমন বাড়ীর উত্তর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

সূর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বলে—ঐ যে দুইখান বাড়ীর ফাঁক দিয়া দ্যাহা যায় একটা বড় তালগাছ। ঐ বাড়ী, অই হানেই থাকে তোর মা।

কাস পলকহীন দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার মন এই মুহূর্তে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু নিচে মাঠের দিকে চেয়ে নিরুপায় বলে মনে হয় নিজেকে। আশ্বিনের শেষাশেষি, পানি শুকিয়ে আসছে। জমির উঁচু আল দেখা যায়। সমস্ত মাঠ কাদায় দৈ-দৈ হয়ে আছে। পায়ের পথও নয়, নায়ের পথও নয়।

করিম বখ্‌শ যখন বাড়ী থাকে না, তখন কাসু প্রায়ই বাড়ীর উত্তর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। নৌকার মাঝে দেখা মা-র মুখখানা চিন্তা করে।

এখান থেকে তালগাছটা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু মাঠের কাদা আর পানি কাসুর সাথে আড়ি ধরেছে যেন। রোজ এখানে এসে এসে তার রাগ ধরে পানির ওপর। কেন পানি শুকাতে দেরী করছে এত?

দু’একটা লোককে কাদা ভেজা পথ চলতে দেখে তার মনে হয়, সে যদি একটু বড় হত, তবে সে-ও যেতে পারত অনায়াসে। মাঝে মাঝে কারো কাঁধে চড়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু কে এমন দরদী যে তাকে কাঁধে করে নেবে?

তালগাছটার দিকে দু’একটা পাখীকে উড়ে যেতে দেখে তারও উড়বার স্পৃহা জাগে। ঐ শাখীগুলোর মত দুটো পাখা যদি তার থাকত!

মাঠের কাদা যতই শুকিয়ে আসতে থাকে, কাসুর মনও ততই উড়-উড় করতে থাকে। কার্তিক মাসের শেষে মাঠের মাঝে পথ পড়ে। এমনি সময়ে একদিন শফির মা আসে এ বাড়ীতে। কাসুর আনন্দ আর ধরে না। এ রকমই একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিল সে।

এক প্রহর বেলা। করিম বক্‌শ গোয়াল থেকে গাইটা বের করে উঠানে কাঠাল গাছের সাথে বাধে। আঞ্জুমন ঝিনুকে করে সর্ষের তেল এগিয়ে দেয়।

করিম বক্‌শ হুকুম করে—হাম্বাডা লইয়া আয়। বাজারের বেইল অইয়া গেছে।

—আমার ঘিন করে। তুমিই যাও।

করিম বক্‌শ গোয়ালের এক পাশে ঝুলানো হাম্বাটা নিয়ে আসে।

গাইটার বাছুর মরেছে অনেক দিন। দুধ-চোর গাই বাছুর না দেখলে দুধ ছাড়ে না। কোথায় লুকিয়ে রাখে। বাছুর না দেখলে বাটে হাত দেওয়াও মুস্কিল। ঠ্যাং দিয়ে লাথি মারে। এসব অসুবিধার জন্যে এই অদ্ভুত ব্যবস্থা। মরা বাছুরটার চামড়ার খোলসে খড়-বিচালি ভরে নকল বাছুর তৈরী করা হয়েছে।

করিম বক্‌শ হাতে সর্ষের তেল নিয়ে বাঁটে মাখিয়ে দেয়। তারপর নকল বাছুরটার মুখ বাটের কাছে নিয়ে বাছুরের অনুকরণে গুঁতো মারে। এ রকম করলে যখন বাটে দুধ নেমে আসে, তখন দুই হাঁটুর মাঝে হাঁড়ি রেখে করিম বক্‌শ দুইতে আরম্ভ করে।

-বাছুর কবে মরল ভাই?

করিম বক্‌শ চেয়ে দেখে—শফির মা। নিতান্ত অনিচ্ছার সাথেই সে উত্তর দেয়—মাস তিনেক অইল।

—অনেক দিন ত অইল। কেমুন কইর‍্যা মরল? দুধে পানি মিশাও বুঝিন? দুধে পানি মিশাইলে বাছুর মইরা যায়। এইডা হাচা কতা। শফির মা ঠাট্টার সুরে বলে।

জয়গুন করিম বকশের সংসারে থাকতে এ রকম ঠাট্টা-মশকরা প্রায়ই মূলত তাদের মধ্যে। বহুদিন বহু ঘটনার তিক্ততার পরেও আজ কেমন করে যে এ ঠাট্টাটুক জিভ থেকে পিছলে বেরুল, শফির মা নিজেই বুঝতে পারে না। কথাটা বলেই সে লজ্জিত হয়। করিম বক্‌শ আপন মনে এ-বাঁট থেকে ও-বাঁটে হাত চালিয়ে দুধ নামাতে থাকে। তার মুখেও ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায়।

গাইটা নিষ্প্রাণ নিষ্পন্দ নকল বাছুরটার গা চাটতে থাকে শুধু শুধু।

আঞ্জুমন পিঁড়ে এনে বসতে দেয় শফির মাকে। শফির মা-র কথার উত্তর সে-ই দেয় এবার—পানি মিশাইব কোন দুখে? পানি মিশান বোধ করি ভাল আছিল। বাছুররে দুধ খাইতে না দিলে বাঁচব কেমন কইর‍্যা, কও? ঘাস না চিনতেই দুধের বাছুরের সামনে দিয়া রাখত ঘাস। আর সমস্ত দিন ভ্যা-ভ্যা করত বাছুর। বাছুরেরে দুধ খাইতে দিলে যে আঁড়ি উনা থাকে, বোঝলা নি বইন?

করিম বক্‌শ খেকিয়ে ওঠে-থাম মাগি বেজাত। কুড়ুমের কাছে বিত্তান্ত শুরু করছে। বেশী বকরবকর করলে দুধের আঁড়িডা তোর মাথার ‘পর ভাওমু, কইয়া রাখলাম।

শফির মা বলে—থাউক, বিহান বেলা কাইজ্যা কইর‍্য না গো তোমরা। হাশ্বাড়া কিন্তু খুব কসই অইছে। আমি তো ভাবছিলাম জিত বাছুরই। কে বানাইছে? মায়মুনের বাপ, তুমি?

অনেকদিন পরে ‘মায়মুনের বাপ’ ডাকটা শুনে চমকে ওঠে করিম বক্‌শ। শফির মা এই বলেই তাকে ডাকত। এ পাড়ার সবাই ডাকে ‘রহির বাপ’ বলে। আঞ্জুমনের বাপের বাড়ীতে ডাকে ‘ফুলির বাপ’। শেষের দুটোই চলছে আজকাল। আগের নামটা ঘুমিয়ে গেছে তার মনে। করিম বক্‌শ মাথা নাড়ে।

—হ। কারিগরিতে, তোমার মত ওস্তাদ আর নাই এই আশে-পাশে।

করিম বকশের দুধ দোহন শেষ হয়েছে। শফির মা-কে কথা বলবার অবসর না দিয়ে সে দুধের হাঁড়ি হাতে উঠে পড়ে।

শফির মা বলে—আদত কথাডা হোন এইবার। তোমার কাছে আইছি একটা কথা লইয়া।

করিম বক্‌শ দাঁড়ায়। বলে—কি কতা?

—মায়মুনের সম্বন্ধ ঠিক অইছে। আমি কত চেষ্টা-তদবির কইর‍্যা তয় ঠিক করলাম। অইলে এমুন সম্বন্ধ কপাল কুটলেও জুটত না।

—কোথায় সম্বন্ধ!

—সোলেমানের পোলা, সদাগর খার নাতি ওসমানের লগে।

–কবে বিয়া?

—এই মাসের এই কয়দিন পর। অগ্রাণ মাসের নয় তারিখ। তোমার কিন্তু যাইতে অইব।

—আমি যাইতে পারতাম না।

—এ তুমি কেমুন কথা কও! তোমার মাইয়া, তুমি না গেলে চলব কেমনে?

তোমার মাইয়া!

করিম বকশের মনের দুয়ারে ধাক্কা খেয়ে বারবার প্রতিধ্বনি করে কথা দুটি। কিন্তু উমর মনে বারিপাতের চেষ্টা বৃথা। কাসুকে ফুসলি দেয়ার ষড়যন্ত্রের কথা মনের ভেতর টেনে এনে সে নিজেকে কঠিনতর করে তোলে। এবার স্বরটা কঠিন করেই সে বলে—যেদিন থেইকা ও বিদায় দিছি, হেদিন থেইকা ওরা আমার কেউ না।

-তুমি কি কও ভাই! তোমার মাইয়া, তুমি না গেলে কেমুন দ্যাহা যায়? কাসুও যাইব তোমার লগে।

–কাসু যাইব!

—ক্যাঁ, দোষ কি? আবার তোমার লগেই লইয়া আইবা।

–বাহার কথা কইছ! কেও যাইব না। কাসু যাইব না, বাড়ীর একটা পোনাও যাইব না। কাসু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। আঞ্জুমনের ইশারায় এবার সে চুপি চুপি সরে যায়।

—কেউ না? কফির মা আবার বলে।

–হ, হ, কেউ না। বিয়া দিয়া দ্যাও, চাই কাইট্যা গাঙ্গে ভাসাইয়া দ্যাও, হেতে আমার কি? আমি হুঁ-হাঁ কিচ্ছু কইমু না।

শফির মা আর কথা বাড়াবাড়ি করতে সাহস করে না। সে আগেই জানত, মায়মুনের বিয়েতে করিম বক্‌শকে পাওয়া যাবে না। তবু সে এসেছিল যাতে পরে দূষতে না পারে।

পাশ থেকে কঞ্চির লাঠিটা হাতে নিয়ে শফির মা ওঠে।

আঞ্জুমন বলে—পান খাইলা না বইন?

—নালো বইন। আমি আবার বিনে ছেঁচা মোখে দিতে পারি না। ছেঁচতে দেরী অইয়া যাইব।

শফির মা পথ নেয়। খেতের আলের ওপর কাসু দাঁড়িয়ে আছে। শফির মা যেতেই তার একখানা হাত ধরে সে বলে—আমি যাইমু, মামানি।

—আমি তোর মামানি, কে কইছে?

—আমি হুনছি।

কাসু আবার বলে—আমি যাইমু, তোমার লগে।

—কই যাবি?

কাসু কোন উত্তর দেয় না।

শফির মা বলে—নারে বাজান। তোরে নিলে আমি দোষের ভাগী অইমু। শিগগির বাড়ীতে যা। তোর বাপ মাইরা খুন কইর‍্যা ফ্যালাইব।

—উহুঁ, জানতে পারব না। বাজান দুধ বেচতে যাইব।

—ফুলির মা কইয়া দিব তোর বাজানের কাছে।

—ওহোঁ, কইব না। হে-ই ত আমারে চিনাইয়া দিছে ঐ তালগাইছ্যা বাড়ীডা।

শফির মা একটু চিন্তা করে বলে—আইচ্ছা চল। আবার তাড়াতাড়ি ফিরা আইতে অইব। তোর বাপ জানতে পারলে কিল এট্টাও জমিনে পড়ব না।

কাসু বলে—বাজার তন ফিরতে দেরী অইব। তার আগেই ফিরা আইমু আমি।

শফির মা-কে পেছনে ফেলে কাস এগিয়ে যায়। শফির মাও জোরে পা ফেলে। কিন্তু। কাসুর সাথে সে হেটে পারে না। সে কতদূর এগোয়, আবার পেছনে ফিরে তাকায়।

করিম বকশের বাড়ী ছাড়িয়ে অনেক দূর এসে পড়েছে তারা। এবার পেছন দিকে তাকাতেই শফির মা দেখতে পায়-করিম বক্‌শ উর্বশ্বাসে ছুটে আসছে এদিকে। কোণাকুণি ধানখেত মই দিয়ে যেন আসছে সে। কাসু শফির মা-কে ছাড়িয়ে নল খানেক এগিয়ে গিয়েছিল।

শফির মা ডাকে কাসু। ভয়ে তার গলা দিয়ে আর কথা বেরোয় না।

কাসু পেছন দিকে তাকিয়ে ‘থ’ হয়ে যায়।

শফির মা বলে—ভালা চাসত বাড়ীমুখি পথ দে। নইলে আড্ডি গুড়া কইর‍্যা ফ্যালাইব।

কাসু এসে শফির মা-কে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। তারা দু’জনেই ভয়ে কাঁপতে থাকে। শফির মা-র কাঁপুনি অনুভব করতে পেরে তার ভয় আরো বেড়ে যায়।

করিম বক্‌শ এসে পড়েছে। দুই হাতে কাসুকে ধরতেই সে আত-চীৎকার করে ওঠে। সে। শফির মা-র আঁচল জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু করিম বক্‌শ তার রাক্ষুসে থাবায় ছাড়িয়ে নেয় কাসুকে। শফির মা-কে ধাক্কা মেরে বলে—তুই মাইয়ালোক। নইলে আইজ–

রাগের অতিশয্যে করিম বকশের মুখ দিয়ে কথার শেষটা বের হয় না। এবার সে কাসকে বাম কাঁধে ফেলে ডান হাত দিয়ে এক একটা থাপ্পড় মারে আর বলে—আর এই মুখি পাও ফেলবি? দ্যাখ, কেমুন মজা।

কাসু কাঁধের ওপর থেকেই হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে থাকে।

করিম বকশের ধাক্কা খেয়ে শফির মা বসে পড়েছিল মাটির ওপর। সে অবস্থায়ই সে জিরিয়ে নেয় আর চেয়ে দেখে করিম বকশের কাণ্ড।

কিছু দূর যাওয়ার পর আর করিম বকশকে দেখা যায় না। পানি খেতের আড়ালে পড়ে গেছে সে এখন। সোজা হয়ে দাঁড়ালে করিম বক্‌শের কীর্তি দেখা যেত। কিন্তু শফির মা তখনও বসে হাঁপাচ্ছে।