ষোল পরিচ্ছেদ

মায়মুন শ্বশুর বাড়ী থেকে চলে এসেছে। জয়গুন রাগে ফেটে পড়ে। কঠিন স্বরে জেরা করতে আরম্ভ করে—না কইয়া পলাইয়া আলি ক্যাঁ? এহন মাইনষে হুনলে ঝাটা মারব মোখে।

—পলাইয়া আহি নাই মা। খেদাইয়া দিছে।

—খেদাইয়া দিছে!

—হ, দ্যাহ না আমার নাক-কান খালি। গয়নাগুলা খুইল্যা নিছে। পিন্দনের কাপড় রাইখ্যা এই ছিঁড়া কাপড় দিছে।

কৈফিয়তে জয়গুনের রাগ নামে। ব্যাপারটার কিছু কিছু সে হাসুর কাছে শুনেছিল সেদিন। কিন্তু তার শাশুড়ীর এরূপ আচরণের কোন কারণ হাসু বলতে পারেনি। সেও ভেবে পায় না। জয়গুন আবার জেরা করে–কি দোষ করছিলি? ক’ শীগগীর।

—কিচ্ছু দোষ করি নাই, মা। মায়মুনকে শ্বশুর বাড়ীর কেউ পছন্দ করেনি। সোলেমান খাঁও না। কিন্তু অপছন্দের কথা সে কখনও মুখ ফুটে বলতে পারেনি। কারণ সে নিজেই দেখেশুনে ছেলের জন্যে বউ পছন্দ করেছিল।

মায়মুন যেদিন প্রথম শ্বশুর বাড়ী আসে, সেদিনই তার শ্বশুর-শাশুড়ীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

শাশুড়ী বলে—তুমি কি চউখের মাথা খাইয়া বউ দেখছিলা? এই রহম জালি বউ দেইখ্যা-হুইন্যা আনে কেও? এহন ভাত কাপড় দিয়া পালতে অইব।

—জালি কোহানে দ্যাখছ তুমি? এক্কেরে ঝুনা নাইকল।

—হ, ঝুনা না আরও কিছু। ও না পারব ওসমানের ঘর করতে, না পারব এক কলসী পানি আনতে। দুই ঠ্যাং লইয়া টেকির উপরে ওঠলেও কথা হোন না ঢেঁকি! দুই সের চাউলের ভাতের আঁড়ি উডাইতে গেলে ফেলাইয়া দিব। তহন ভাতও যাইব, আঁড়িও যাইব।

সোলেমান খাঁ কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারে। কিন্তু নিজের কৃতকর্মের জন্যে স্ত্রীর কাছে সে হার মানতে রাজী নয়। সে স্ত্রীকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলে—তুমি কিছু চিন্তা কইর না। হবায় বিয়ার পানি পাইছে। দুই মাসের মইদ্যেই দ্যাখবা বউ আমাগ লায়েক অইছে।

কিন্তু দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। মায়মুন তার শ্বশুর-শাশুড়ীর চোখের সামনে তাদের ইচ্ছেমত বড়সড় হয়ে উঠল না। যেমন ছিল, তেমনটি রয়ে গেল। শাশুড়ীর রাগ ধরে—কেন সে ভোমরায় আল দেওয়া কদুর মত ঝিম ধরে থাকল, কেন হাতে-পায়ে বড় হয়ে উঠল না।

সোলেমান খাঁর এজলাসে প্রায়ই এ ব্যাপারে শুনানি হতে থাকে। একদিন সোলেমান খাঁর স্ত্রী বলে—ভাত খাইতে ত কম খায় না। আমাগ দুনা ভাত খায়। যদি জিগাই আর নিবি বউ? তয় কোন দিন ‘না’ করব না। আঁসের মতন গলা–সমান খাইয়া টাববুস অইয়া তারপর উঠব। এত খাওয়া ত’ বড় অয়নের নাম নাই। আর অইবই বা কেমনে। সুর্য-দীগল বাড়ীর মাইয়া। পরাণ লইয়া বাঁইচ্যা আছে, এই কালের ভাইগ্য। তোমারে হেইসুম কত কইর‍্যা যে কইলাম, সূর্য-দীগল বাড়ীর মাইয়া আননের কাম নাই। হেইয়া হোনলা না। মাইয়ার উপরে পেত্নীর দিষ্টি না আছে ত কি কইলাম।

সোলেমান খাঁ মনোযোগ দিয়ে শোনে। তারপর বলে মানুষ ত তিন আঙুল। এত ভাত রাখে কই?

কে জানে কই রাখে? আমার মনে অয় গলার তন পাও পর্যন্ত বেবাকখানি ওর প্যাট। এমুন হাবাইত্যা ঘরের মাইয়া বেশী দিন ভাত-কাপোড় দিয়া রাখলে তোমারে আর বিচরাইয়া পাওয়া যাইব না—তালুক-মুলুক বেচতে অইব।

সোলেমান খাঁ নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে। গালে হাত দিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে—আমার মনে লয়, তোমার কথাই খাডি। পেত্নীর দিষ্টি আছে। পেত্নী ওর লগে খায় বুইল্যাই না এত ভাত লাগে।

সোলেমান খাঁ-র স্ত্রী আবার বলে—হোন কই, এই রাকস রাহনের কাম নাই। হেদিন ওসমানের ঘরে দিছিলাম। শরমেরও কত। রাইতে হেই কি চিক্কইর! আর এট্ট অইলে চৌদ্দ বাড়ীর মানু একখানে কইরা লইত? ছিঃ ছিঃ! অ-ঘিন, অ-ঘিন। বোঝলাম, এইডা জুয়ান অইতে অইতে আমার ওসমান ঠণ্ডা অইয়া যাইব। আর এদ্দিন তক্ত বহাইয়া। খাওয়াইলে ফউত অইয়া যাইবা, কইয়া রাখলাম। কমসে কম তিন খান বচ্ছর ত লাগব লায়েক অইতে।

-কি করতে চাও ত?

–আমি কই, ওরে ওর মা-র কাছে পাইয়া দ্যাও। মা-রড খাইয়া বড় অউক। জেরে দাহা যাইব।

সোলেমান খাঁ সব শুনে এবার রায় দেয়——ওরে ওর মার কাছেই পাড়াইয়া দ্যাও। আমি আবার ওসমানের শাদী দিমু।

—গয়নাগুলা?

—খুইল্যা রাখবা। ওসমানের বিয়া দিতে লাগব তো। আবার জোড়ায় জোড়ায় গয়না বানাইমু, ট্যাকা কই? টাকা কি গাছের গোড়া যে, ঝুল দিলেই পড়ে? খালি গয়না কী, কাপোড় দুইডাও রাইখ্যা দিবা। কয়মাস আগে কিনছি। অহনও দুই ধোপ পড়ে নাই। এই কাপোড় আর গয়না দিয়া হাজাইয়া নতুন বউ ঘরে আনমু।

তারপর একদিন হাসু ও শফি আসে মায়মুনকে দেখতে। মায়মুনের শাশুড়ী, দুটি ননদ ও ছোট্ট একটি দেবর একটা চাঙারির চারপাশে চক্রাকারে বসে কাঁচা মটরশুটি ছাড়াচ্ছিল। মানুষ আসার শব্দ পেয়ে মায়মুনের শাশুড়ী একবার তাকায়। তারপর মাথায় আঁচল টেনে আবার মটরের দানা বাছতে শুরু করে।

হাসু ও শফি পরস্পর মুখের দিকে তাকায়। এ রকম অবজ্ঞা ও অবহেলার কি কারণ থাকতে পারে, তারা ভেবে পায় না। হাসু জিজ্ঞেস করে–কেমুন আছেন মাঐ সা’ব? মায়মন কই?

উত্তর দেয় মায়মুনের ছোট ননদ, গাঙ্গের ঘাডে পানি আনতে গেছে। তার মুখের কথা। শেষ না হতেই মায়মুন আসে। কাঁখের কলসীটা ছোট। তবুও তার ভারে মায়মুন সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না। কোমর বেঁকিয়ে খোড়ার মত পা ফেলতে ফেলতে সে আসে। হাঁসু ও শফিকে দেখতে পেয়ে খুশীতে ভরে ওঠে। সে পানির কলসীটা রান্না ঘরে রেখে ছুটে আসে। হাসুর একটা হাত ধরে বলে—মিয়াভাই গো, কোনসুম আইলা?

–এইত আইলাম।

–আমি যাইতাম তোমার লগে।

জরিনা বিবি অথাৎ মায়মুনের শাশুড়ী এবার ফোঁস করে ওঠে—হ, যাও ভাইর লগে অহনই চইলা যাও। হ হাশেম মিয়া, তোমায় আললাদি বইনগারে আইজই লইয়া যাও। আমরা আর রাখতে চাই না।

–কি অইছে মাত্র? কোন দোষ করছে মায়মুন?

—না বাপু, অমুন ঝিরকুইট্যা বউ দিয়া আমাগ চলব না। কই গেলি ওসমান? কি কইছিলাম?

জরিনা বিবি ঘরে যায় ওসমানের কাছে। আস্তে আস্তে বলে—গয়না গুলা খুইল্যা রাখ। পিন্দনের কপোড়ডা রাইখ্যা এট্টা ছিঁড়া কাপোড় দিয়া দে! ওড়া পিন্দা কোন রহমে শরম বাঁচাইয়া আতে পায়ে যাউকগা ভাইর লগে।

ওসমানের চোখে-মুখে অক্ষমতা ফুটে ওঠে। হাসু ও শফির উপস্থিতিতে এ কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে বলে—তুমি দ্যাও গিয়া। আমার শরম করে।

—আহা, আমার নতুন বউ রে! অত যদি শরম, তয় ঘোমডা দিয়া ঘরে বইয়া থাক। তোরা মরদ অইছিলি কোন দুকখে? আমি মাইয়া মানুষ। পারি কিনা-পারি দ্যাখ চউখ মেইল্যা!

জরিনা বিবি দুই গোত্তা দিয়ে দু’পা এগুতেই ওসমান বাধা দেয়—মা, মা, হোন। ওরা আইজ যাউকগা। পরশু তরশু আইয়া যেন লইয়া যায়।

জরিনা বিবি দরজার ওপর দাঁড়িয়ে যায়। ওসমানের দিকে ফিরে বলে—আইচ্ছা, কইয়া দেই।

তারপর ঘর থেকে নিচে নেমে হাসু ও শফির দিকে চেয়ে বলে—হোন বাপু। কাইল পরশু আইয়া তোমাগ বইনেরে লইয়া যাইও।

হাসু বলে—বিষয় কি? কি অইছে মাঐ?

—কিচ্ছুই অয় নাই মিয়া। যা কই মনে থাকে যেন।

শফি হাসুর দিকে চেয়ে বলে—আইজই মায়মুনেরে লইয়া যাই।

—না, আইজ থাউক। মা-র কাছে জিগাইয়া দেহি, যদি নিতে কয়, তয় লইয়া যাইমু। হাসুর কথা শুনতে পেয়ে জরিনা বিবি বলে—মা-র কাছে আর হোনতে অইব না বাপু। তোমার মা মানা করত না। কাইল আইয়া লইয়া যাইও।

-আইচ্ছা।

এই ‘আইচ্ছা’ বলে যে হাসু চলে গেল আর হাসুর দেখা নেই। জরিনা বিবি নিজেই মায়মুনের গায়ের গয়না খুলে একটা ছেঁড়া কাপড় পরিয়ে তাকে তৈরী করে রেখেছে। তিন দিনের দিনও যখন কেউ এসে নিয়ে গেল না, তখন তার পরের দিন ভোরবেলা জরিনা বিবি নিজেই মায়মুনের হাত ধরে বাড়ীর নিচের মটর খেতের পাশে এনে ছেড়ে দেয়।

তাদের পেছনে মায়মুনের দুটি ননদও এসে দাঁড়ায়।

দূরে সুর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটা দেখিয়ে জরিনা বিবি বলে—ঐ তালগাছটা বরাবর চইল্যা যাও। খোদায় যদি তোমার কপালে এই বাড়ীর ভাত লেইখ্যা থাকে তো আবার আইও, অহন মা-র বুকের দুধ খাইয়া মোটা তাজা অও গিয়া।

—আমি একলা যাইমু? মায়মুন জরিনা বিবির মুখের দিকে তাকায়।

—একলা যাইবা না তো দোকলা পাইবা কই? যাও। তোমার রূপ বাইয়া বাইয়া পড়ে না সোনা। পথের মাইনষে ধইর‍্যা লইয়া যাইব না।

মায়মুন যেন কারাগার থেকে খালাস পেয়ে এল। তার আনন্দই হয়। আর সে আনন্দ বেড়ে যায় প্রত্যেক পদক্ষেপে। পেছনে তাকাতেও তার ভয় হয়।

কিন্তু বাড়ীতে পা দিয়ে মা-র কর্কশ জেরার মধ্যে পড়ে তার বুক দুরু দুরু করতে থাকে।

জয়গুন আবার জিজ্ঞেস করে–কি দোষ করছিলি?

—কিচ্ছু দোষ করি নাই মা।

—দোষ-ঘাইট না করলে অম্বায়ই খোদাইয়া দিল? হাসুকে দিয়া অহনই আবার পাড়াইয়া দিমু।

শফির মা আসে। কথার আগা-গোড়া না শুনেই শুরু করে—পুরুষের ঘরতন পলাইয়া আহে কেও? পুরুষের ঘরই মাইয়ালোকের হাপন ঘর। হেইখানে জিন্দিগী কাড়াইতে অইব। হউর-হাউরীর খেদমত করতে অইব। মরলেও হেই মাড়ি বুকের উপুর লইয়া থাকতে অইব। হেই মাড়ি ছাড়তে আছে? হেই মাড়ি কামড় দিয়া পইড়্যা থাকতে অয়।

মায়মুনের মুখের দিকে চেয়ে দেখে জয়গুন। আসহায় চোখ দুটো টলটল করছে, করুণা ভিক্ষা করছে তার কাছে।

এবার মায়মনের ওপরের সমস্ত রাগ জয়গুন শফির মা-র ওপর ঢালে। সে বলে—থাউক, থাউক। আর বকরবকর কইর‍্য না। তুমি বুড়া অইছ বাতাসে। তোমার কথায় মাডি খাইছি আমি। অমন বুইড়া জামাইর কাছে মাইয়া না দিয়া কুচি কুচি কইর‍্যা কাইট্যা গাঙ্গে ভাসাইয়া দেওয়ন ভাল আছিল। আমার বাড়ী থাকতে ও এমুন আছিল? প্যাট ভইরা ভাত খাইতে না পারলেও, এই রকম হকনা কাষ্ট আছিল না।

শফির মা মায়মুনকে জিজ্ঞেস করে—তোর হাউরী প্যাট ভইর‍্যা তোরে খাইতে দেয় নাই, মায়মুন?

—এই দুই মুঠ ভাত দিয়া কইত—নে, খাইয়া ওঠ বউ। দিনকাল ভালা না। প্যাট উনা থাকলে কোন ব্যারাম-আজার আইতে পারে না।

—অ্যাঁহ-হ্যাঁ-হ্যাঁ। কাসুর মা বাড়ীতে আছ?

গলা খাঁকারি দিয়ে সাদেক মিয়া সকলের সামনে এসে দাঁড়ায়।

জয়গুন মাথায় কাপড়ের আঁচল টেনে দেয়। শফির মা জিজ্ঞেস করে—কি খবর সাদেক মিয়া?

—খবর বেশী ভালা না। কাসুর খুব অসুখ। যহন-তহন অবস্থা।

জয়গুন চমকে ওঠে। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। দুনিয়াটা অন্ধকার ঠেকছে চোখে। ঘোমটার নিচে অস্ফুট প্রতিধ্বনি হয়-কাসুর অসুখ! যহন-তহন অবস্থা।

—বেহাল অবস্থা। করিম ভাই আমারে পাড়াইয়া দিছে, তোমারে নিতে। দেরী অইলে–

সাদেক মিয়ার মুখ দিয়ে কথার শেষটা বের হয় না।

কাসুর শয্যা-পার্শ্বে দু’জন মৌলবী অনর্গল দোয়া-কালাম পড়ে চলেছেন। মাঝে মাঝে করিম বকশের কথার নিচে তাদের স্বর চাপা পড়ে যায়। তার আকুল আবেদন কান্নার মত বেরিয়ে আসে—আল্লা, তুমি আমার কাসুরে বাঁচাও। তুমি জান-মালের মালিক। ওর জানের বদলে দুইডা জান সদকা দিমু। তুমি ওরে বাঁচাও ওর জানের বদলে দুইডা খাসি সদকা দিমু। আল্লা, আল্লা, তুমি রহমান, তুমি রহিম। তুমি বাঁচানেওলা। তুমি–

লম্বা ঘোমটা টেনে জয়গুন দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। তার পিছনে হাসু ও শফির মা-কে দেখে করিম বক্‌শ বুঝতে পারে, জয়গুন এসেছে। করিম বক্‌শ মৌলবী দু’জনকে ইশারায় সরে যেতে বলে নিজেও বেরিয়ে যায়।

জয়গুন কাসুর বিছানার পাশে বসে ডাকে—কাসু, কাসু আমার সোনামণি।

শফির মা, শফি, হাসু ও মায়মুন বিছানার দুই পাশে বসে। আঞ্জুমনও আসে। তাদের সকলের মাথা ঝুঁকে থাকে কাসুর মুখের ওপর।

শফির মা বলে—চাইয়া দ্যাখ কাসু। তোর মা আইছে।

কাসু কোন সাড়া দেয় না। চোখ দুটো আধবোজা। মাথাটা কখনও সোজা হয়, কখনও এ-পাশে ও-পাশে হেলে পড়ে। তার নিশ্চল হাত পা ছড়িয়ে আছে লম্বা হয়ে। অনিয়মিত নিশ্বাস-প্রশ্বাসে বুকের ওপরের কথাটা দুলে ওঠে। বুকের ওপর কান পেতে কফের ঘ্যাড় ঘ্যাড় শব্দ শোনা যায়।

জয়গুন আবার ডাকে—কাসু, বাজান একবার চউখ মেইল্যা দ্যাখ।

করিম বক্‌শ ডেকে বলে–কাসু, চাইয়া দ্যাখ তোর মা আইছে।

কাসুর মাথাটা বাম কাত থেকে ডান কাত হয় শুধু। কোন সাড়া পাওয়া যায় না।

আঞ্জুমন বলে—দুই দিন আগেও টাস টাস কতা কইছে। দুই দিন ধইরা জব বন্ধ। কত ফকির-কবিরাজ, কত কত পানি পড়া, তাবিজ-তুমার! কিছুতেই কিছু অইল না। যে যা কইছে কোন তিরুডি অয় নাই। অহন আল্লার আতে সপর্দ। অউয়ত-মউয়ত আল্লার আত। আল্লায় যদি মোখের দিকে চায়। – করিম বক্‌শ দোর গোড়া থেকে বলে—আল্লা যদি কাসুরে দুইন্যায় রাইখ্যা যায়, তয় আমি জমিনের উপরে খাড়াইয়া মানতি করলাম, কাসুর একটা জানের বদলে দুইডা খাসি জবাই কইর‍্যা তার গোশত গরীব মিসকিনরে বিলাইয়া দিমু। কাসুরে আজমীরশরীফ খাজা বাবার দরগায় লইয়া যাইমু।

জয়গুনের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে অবিরল ধারায়। হৃদয়ভেদী কান্নার বেগ চেপে রাখতে গিয়ে তার স্বর ভেঙে যায়। ভাঙা গলায় সে আমিনকে বলে—দুইডা দিন আগেও যদি আমারে খবর দিত। ওর মোখের কথা হুইন্যা মনেরে বুঝ দিতে পারতাম। ওর ‘মা-মা’ ডাক হুইন্যা পরাণ শীতল করতাম।

একটু থেমে আবার বলে—তোমরা ডাকতর দেহাইছিলা?

—ডাকতর কি করব? কত ফকির হট খাইয়া গেল!

অন্ধকারের মধ্যে জয়গান আলো খুঁজে বেড়ায়। নিরাশার মধ্যেও আশা চেপে ধরে বুকে। ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও সে হাল ছেড়ে দেয় না।

হাসুকে সে নির্দেশ দেয়—হাসু, যা। জগদীশ ডাকতর না অয় আর কোনো ডাকতর জলদি কইর‍্যা লইয়া আয়। পথে দেরী করিস না। বলেই সে মনে মনে চিন্তা করে, ডাক্তার এলে টাকা দিতে হবে। কিন্তু কোথায় টাকা?

জয়গুন এবার শফিকে বলে—তুই বাড়ীত যা। বড় আঁস দুইডা বাজারে লইয়া যা। বেইচ্যা টাকা লইয়া চালাক কইরা আবি। কিন্তু দুইডা আসে কত পাওয়া যাইব! বড় জোর দুই টাকা।

মায়মুন বলে—আমার আঁস দুইডাও লইয়া যাইও, শফি ভাই। আমাগ কাসু বাঁচলে কত আঁস পাওয়া যাইব আবার।

জয়গুন বলে—হ, চাইড্যা আঁসই লইয়া যায়।

শফির মা শফিকে সাবধান করে দেয়—জলদি কইর‍্যা যা। তোর কিন্তুক আবার শামুকের চলতি। দেরী করলে উফায় রাখতাম না।

নিয়মের দুনিয়ায় অনেক অনিয়ম আছে। ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ তাই সব সময়ে পাওয়া যায় না।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলা সারাদিনের কর্মফল বড় সামান্য। পরোপকার প্রায়ই বিফলে যায়। সে কর্মে যদিও ফল ফলে, তা তিতো, বিষাক্ত।

এটা অনিয়ম বৈকি।

গ্রামের বুড়ো ডাক্তার রমেশ চক্রবর্তীর বেলায়ও এ অনিয়মটা নিয়মিত ভাবে বিদ্যমান। বিশ বছর রোগী দেখে, ওষুধ ঢেলে-গলে তিনি হাত পাকিয়েছেন। কিন্তু এই পর্যন্তই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেও অর্থ সঞ্চয় করেননি কিছুই। অসহায় রোগীর চিকিৎসার বোঝাই ঘাড়ে নিয়েছেন শুধু। টাকার সিন্দুক বোঝাই হল না কোনদিন।

সাধারণভাবে গ্রামের লোকের আস্থা নেই অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ওপর। তাদের ধারণা—অ্যালোপ্যাথিকের তেজালো ওষুধ পেটে গেলে রোগী যা–ও দুঘণ্টা বাঁচত, তাও শেষ হয়ে যায় দুঘণ্টা আগেই। গ্রামে তাই ফকির-কবরেজদের পসার বেশী। ওষুধ মেশানো পানির চেয়ে বেশী কদর মন্ত্রপূত পানির। সোয়া সের চাল আর সোয়া পাঁচ আনা পয়সা দিয়ে যেখানে ফকির বিদায় করা যায়, সেখানে টাকা খরচ করে ডাক্তার বড় কেউ ডাকে না।

ধরাবাধা কয়েক ঘর লোক আছে রমেশ ডাক্তারের। ঘুরে ফিরে তারাই আসে। দু’টাকা দেয়, মাসখানেক ধরে চিকিৎসা করিয়ে নেয়। ওষুধ খেয়ে খেয়ে টাকার দাম তোলে। চিকিৎসায় টাকা খরচ করবার মত বড়লোক যারা, তারা এখানে আসে না। তারা যায় বড় ডাক্তার জগদীশবাবুর কাছে। দিনমজুরের কাছ থেকে দিন-মজুরী নিয়ে রমেশ ডাক্তারের দিন চলে টেনেটুনে।

রমেশ ডাক্তারের বাইরের ঘরটা একাধারে ডাক্তারখানা ও বৈঠকখানা দুই-ই। ঘরের এক পাশে দুটো আলমারী। তার মধ্যে নানা আকারের শিশি-বোতল সাজানো। ওগুলোর অধিকাংশই খালি। সুদিনে যখন ওষুধ পাওয়া যেত অপর্যাপ্ত, তখনও ওগুলো পুরোপুরি ভরা ছিল না।

আলমারীর একটা তাকে ভারী ভারী কয়েকখানা ডাক্তারী বই। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল। তার এক পাশে ডাক্তারের বসবার জন্যে একখানা কাঠের চেয়ার, অন্য তিন পাশে টিনের চেয়ার তিনখানা। এক পাশে একটা লম্বা টুল। দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে আরাম করে বসবার জন্যে টুলটাকে দেয়ালের কাছ ঘেঁষে রাখা হয়েছে। অপর পাশে দেয়ালের সাথে ঠেকানো একটা কাঠের চেয়ার। তার পেছনের একটা পায়া ভাঙা। আসন গ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের হুশিয়ার করার জন্যে পায়া-ভাঙা চেয়ারটায় কে একজন একটা কাগজ এঁটে দিয়েছে। তাতে লেখা—খোঁড়া।

এত হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও নিরক্ষর গদু প্রধান একদিন চেয়ারটা নিয়ে পড়ে গিয়েছিল।

ডাক্তারের চোখের সামনে একটা দেয়াল ঘড়ি। বহু দিন ধরে অমেরামত পড়ে আছে। কোন রসিক লোক ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে ঘড়িটার কাচের উপর একটা কাগজ এঁটে দিয়েছে। কাগজটিতে লেখা ‘কলেরা রোগী।‘

লেখাটা দেখে রমেশ ডাক্তার হেসে ফেলে বলেছিলেন-কলেরা নয়, কলেরা নয়। হৃদ-বন্ধ। কলেরা হলে এমন ওষুধ খাইয়ে দিতাম–

—কলেরার আবার চিকিৎসা আছে নি? ডাক্তারের কথা শেষ না হতেই জাফর মিয়া বলে।

—নেই কেন? নিশ্চয় আছে। জীবনে কত কলেরা রোগী ভাল করলাম এই হাতে।

—তয় হেইডা আসল কলেরা না। পেডের অসুখ। আসল কলেরা বসন্তু অইলে আবার মানুষ বাঁচে?

—বাঁচে না মানে? একশোবার বাচে। এবারও কত রোগী বেঁচে গেল আমার হাতে।

নিত্যানন্দ বলে—তুমি আবার মানুষ বাঁচাতে পার নাকি, ডাক্তার?

–নিশ্চয়ই পারি।

ডাক্তারের কথায় সবাই হেসে ওঠে। অনেকে মনে করে ডাক্তারের ক্ষ্যাপামিটা আজ আবার বেড়ে গেল।

—এ কি! তোরা হাসছিস? মানুষ যদি বাঁচাতে না পারি, তবে তোরা আসিস কেন? আমার ওষুধ খাস কেন? ডাক্তার টেবিলের ওপর চাপড় মারেন।

কালিপদ বলে তোমার কাছে আসি মনের শান্তির জন্যে, মনেরে বুঝ দিতে। তা ছাড়া কি! তুমি বাঁচাতেও পার না, মারতেও পার না। মরা-বাঁচা ঈশ্বরের হাত।

কালিপদ ওপর দিকে আঙুল দেখিয়ে ঈশ্বরের অবস্থান নির্দেশ করে।

মুখ বিকৃত করে রমেশ ডাক্তার বলেন—মরা বাঁচা ঈশ্বরের হাত! তবে দেব এক ফোটা পটাশিয়াম সায়নাইড? দেখি কে বাঁচায়?

নিত্যানন্দ বলে—তোমার ঐ বাজে কথা রাখ ডাক্তার। মাথাটা তোমার আজ আবার গরম হয়েছে, বুঝলাম। জগদীশ সেন এত বড় ডাক্তার, সেও এত বড় কথা বলতে সাহস করে না। ঈশ্বরের ওপর ভরসা করে সে। সেদিন অজিত চৌধুরীর ছেলে মারা গেল। জগদীশ ডাক্তার চৌধুরীকে বল—আমরা ওষুধ দিতে পারি, জীবন তো আর দিতে পারি না।

—ও সব ফাঁকা কথা বুঝলে? অজ্ঞতা ঢাকবার পথ ওটা। লোককে সান্ত্বনা দেওয়ার বুলি। আসলে ও কথার কোন অর্থ হয় না। এমন অনেক রোগী আছে, যার বাবার ভরসা ছিল না, আমাদের ওষুধ খেয়ে সে হয়তো বেঁচে যায়। যখন বেঁচে ওঠে তখন নাম হয় উপরওয়ালার। তার গুণকীর্তন হয়। মসজিদে শিরনি দেওয়া হয়। হরিলুট দেওয়া হয় মন্দিরে। আমাদের নামও নেয় না মুখে। জালাল শেখের টাইফয়েড হয়েছিল, জানো তোমরা। দুই মাইল পথ হেঁটে রোজ সকালে বিকালে হাজিরা দিয়েছি, ওষুধ দিয়েছি। আমার কাছে ক্লোরোমাইসিটিন ছিল না। জগদীশের কাছ থেকে নিজের টাকায় কিনে দিয়েছি। যখন বেঁচে গেল, তখন একদিন দেখাও করলে না এসে। আমাকে দিয়েছিল কত জানো? তিন টাকা। শুনেছি, আজমীরের দরগায় জালাল পাঁচ টাকা মানত পাঠিয়েছে।

একটু দম নিয়ে আবার তিনি আরম্ভ করেন—আমাদের হাতে সব লোকই যে বাঁচবে তা তো বলছি না। এর কারণ অনেক। একটা কারণ হচ্ছে–চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমাদের অজ্ঞতা। আমার হাতে যে রোগী মারা গেল, আর একজন ভালো ডাক্তারের কাছে সে হয়তো মরত না। তা ছাড়া রোগ নির্ণয়ে, ওষুধ-নির্বাচনে ভুল-ভ্রান্তি, ওষুধের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব—নানা কারণ আছে। এ ছাড়াও আছে রোগীর গাফিলতি। সময় থাকতে আসবে না। আসবে তখন যখন টলমল অবস্থা। ঐ অবস্থায় ডাক্তার ডেকে কোন কাজ হয় না। ডুবন্ত নৌকা উদ্ধার করা সোজা ব্যাপার নয়। কথায় বলে—মরণকালে লক্ষ্মীবিলাসের বড়ি কোন কাজ দেয় না। মানুষ মরবে, এতে সত্য কথা। তবে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে হবে তো। বাতির তেল ফুরালে তেল দিতে হবে। ঝড়ে নিবে না যায়। তার জন্য ঢাকনা লাগাতে হবে। বাতিটা যে-দিন ফুটো ঝাঁজরা হয়ে ভেঙে যাবে, সে দিনের কথা আলাদা। অবশ্য সমস্ত লোককে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার মত চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার হয়নি। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি হচ্ছে দিন দিন।

সবাই বিরক্ত হয় ডাক্তারের ওপর। তারা মনে করে—আজ মাথাটা একটু বেশীই খারাপ হয়েছে ডাক্তারের।

কালীপদ বলে রাখ তোমার বক্তিমা। এইবারে বিদায় কর। ডাক্তার বলেন—একটু সবুর কর। ওদের আগে বিদায় করি। ওরা দূরের লোক। এসো দেখি দিল মহম্মদ। ক’দিন থেকে জ্বর?

—আইজ চাইর দিন।

ডাক্তার নাড়ী দেখেন। বুক পরীক্ষা করেন। তারপর বলেন—দেখি জিভ। হা করো, আ—এমন করে।

দিল মহম্মদ হা করে। তার নিশ্বাসের সাথে এক ঝলক দুর্গন্ধ এসে ধাক্কা মারে ডাক্তারের নাকে। তিনি মুখটা একপাশে সরিয়ে বলেন—কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়নি।

একটা কাগজে ‘ব্যবস্থা’ লিখে ডাক্তার বলেন—কোন ভয় নাই। এ কাগজটা কম্পাউডারকে দাও। ওষুধটা দিনে তিনবার খাবে। ঠাণ্ডা লাগিও না। শিশি এনেছো?

–হ্যাঁ।

–আচ্ছা যাও। পরশু এসো আবার। আলাউদ্দিন, তুমি এসো। কি তোমার?

—প্যাটটা ফুইল্যা রইছে দুই দিন ধইর‍্যা। একবার খাইলে আর খাইতে ইচ্ছা করে না।

ভাত দেখলে বমি আহে। খোয়াবে খাইলে হুনছি এই রহম অয়।

—অ্যাঁ, কি বল্লি?

–মা কইছে, খোয়াবে যারা খায়, তাগ প্যাট ভার অইয়া থাকে এই রহম। অজম অয় না।

বুড়ো ন’কড়ি বলে—ডাক্তারের কাছে এগুলা কইস না। এই সব ভূতের ব্যামোর কিছু ডাক্তার বুঝবও না, বিশ্বাসও করব না। আমিও কত দিন স্বপ্নে খাইছি—রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাফি, কচুরী, পানতুয়া—ন’কড়ি মিষ্টির নামের শিকলি ছাড়তে শুরু করে।

মুচকি হেসে ডাক্তার বলেন—খেতে কেমন লাগে?

—কেমন লাগবে আবার! ভালা। ঠিক হালুইকরের মিষ্টির মতন। কিন্তুক অজম অইতে চায় না। অজম অইলে কি আর কথা আছিল?

ডাক্তার রহস্য করে বলেন—সত্যি, হজম হলে আর কোন কথা ছিল না। বাজারে যখন রসগোল্লা সন্দেশ পাওয়া যায় না আজকাল, তখন স্বপ্নে বিনে পয়সায়—

—বেশ মজা কাইরা খাওয়ন যাইত। ডাক্তারের মুখের কথা লুফে নিয়ে ন’কড়ি বলে।

ডাক্তার এবার গর্জন করে ওঠেন—হুঁহ্‌, যত সব আহম্মক নিয়ে কারবার। যা এখন থেকে। স্বপ্নে রসগোল্লা খা গে। ওষুধ খেতে হবে না।

আলাউদ্দিন দাঁড়িয়ে থাকে। ডাক্তার হাত বাড়িয়ে তাকে একটু কাছে টেনে নেন। জামাটা তুলে রাগের সাথে জোরে জোরে তার পেট টিপতে শুরু করেন।

বাধা-ধরা একঘেয়ে জীবন ডাক্তারের এমনি করেই চলে। চলে ঘড়ির কাঁটার মত একই পথে। কিন্তু তার কাছে বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে বলে মনে হয়নি কোনদিন। মুর্খ লোকের কার্য-কারণহীন আজগুবি কথাবার্তা শুনে তিনি যত বিরক্ত হন, তাদের অজ্ঞতার জন্যে তার চেয়েও বেশী সহানুভূতি জাগে তার মনে। এ সমস্ত লোকের নাড়ী দেখে দেখে তাদের ওপর কেমন একটা নাড়ীর টান জন্মে গেছে ডাক্তারের। ভোর বেলা এদের মুখ দেখলে তবেই তার ভালো লাগে। তাজা হয়ে ওঠে দেহ-মন।

কিন্তু কিছুদিন ধরে ডাক্তারের দিনগুলো আর চলতে চায় না। যেন হুঁচোট খেয়ে চলছে দিনগুলো। স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাস্তুত্যাগের হিড়িক পড়েছে দেশে। ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের চোখে লেগেছে আলোর ধাঁধা। ডাক্তারের স্ত্রীর চোখেও তাই লেগেছে। পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়ার জন্যে তিনি অধীর হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ডাক্তারের পাকা চোখে দূরের সে আলো নেশা জাগাতে পারে না। পারে না মায়ার সৃষ্টি করতে। স্বামী-স্ত্রীর এই বিরুদ্ধ মনোভাব সংসারের সমস্ত শান্তি নষ্ট করেছে। এই একই প্রসঙ্গ নিয়ে কথার প্যাচাল শুরু হয় দু’জনের মধ্যে। সহজে তা থামতে চায় না। স্ত্রী নানারকম যুক্তিতর্কের অবতারণা করেন, বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে স্বামীকে প্ররোচিত করেন। কিন্তু আদম তার সংকল্পে হল। সে জানে, নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার অর্থ স্ব-ভ্রষ্ট হওয়া। ঈভ তাই নিষিদ্ধ ফলের সাজি নিয়ে ব্যর্থ হয় বারবার।

আজও ডাক্তার রোগী দেখা শেষ করে সবে আঙিনায় উঠেছেন অমনি গিন্নী আরম্ভ করেন—ওগো শুনছো? আর তোমাকে বলেই বা কি হবে?

অন্যমনস্কভাবে ডাক্তার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গলা চড়িয়ে গিন্নি বলেন—জগদীশ ডাক্তার আজ যাচ্ছে, শুনেছো?

—তাতে হয়েছে কি?

—হবে আবার কি? সবাই একে একে চলে যাচ্ছে। আর আমরা এখানে জপমালা নিয়ে বসে থাকি আর কি!

–হ্যাঁ, মালা জপতেই শুরু কর। তাই ভালো। দেখো ঈশ্বর যদি কিছু ব্যবস্থা করেন। চাও তো পুষ্পক রথও পাঠিয়ে দিতে পারেন তোমার জন্যে।

বিরক্তির মধ্যেও নিজের রসিকতায় হেসে ওঠেন ডাক্তার। তার হাসি গিন্নীর অন্তরে ঘা দেয়। তিনি বলেন—তা তুমি যেয়ে।

—আমি যাব! উহুঁ! এখান থেকে আমি একচুলও নড়ছিনে। এমন সাজানো বাগিচা ছেড়ে নরকে যেতে পারবো না।

কথায় সুবিধা করতে না পেরে গিন্নী বলেন—তা বেশ। এখানে থেকে মুসলমানের হাতে যদি কচুকাটা না হও তো কি বল্লাম।

—ওসব বাজে কথা রাখ। এখানে কে তোমাকে মারছে শুনি? কতগুলো পশুর প্ররোচনায় যা হয়েছিল, তা আর হবে না দেখে নিও। ভাইয়ের বুকে ছুরি বসিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়

—সবাই বুঝতে পেরেছে। ভাইয়ের বুকের রক্তে যে করুণ অভিজ্ঞতা হল, হিন্দুমুসলমানের মন থেকে তা সহজে মুছে যাবে না। আর যদি একান্ত মুছেই যায়, তবে বুঝব তার পেছনে কাজ করেছে স্বাথান্ধ হিংস্রতা। শুধু এখানেই নয়। সব জায়গায় এ হিংসতা দেখা দিতে পারে। যেমন আসামে ‘বঙ্গাল খেদা’ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ধুতিবালাদের বিরুদ্ধে মুখারা কুকরি শান দিচ্ছে। বিহারে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে বাঙালীকে। এখন এক গণ্ডগোলের ভয়ে পালিয়ে আর এক গণ্ডগোলের মুখে গিয়ে পড়তে হবে। এখানে আমাদের কিসের অভাব? কোন দুঃখে যাব আমরা ঘর-বাড়ী ছেড়ে? জানো না, এখানে আমরা মার কোলে আছি।

হাসু এসে ডাক্তারের উঠানে দাঁড়ায়।

ডাক্তারের খোঁজে সে এ-গাও ও-গাও ঘুরেছে। জগদীশ ডাক্তারকে পাওয়া গেল না। তিনি পাততাড়ি গুটিয়েছেন। আজই চলে যাচ্ছেন দেশ ছেড়ে। হরেন ডাক্তারও নেই। তিনি অনেক দিন আগেই চলে গেছেন। তার শূন্য ভিটা তচনচ হয়ে আছে ঘাস-লতা-পাতায়।

রমেশ ডাক্তার তখনও বকে চলেছেন—এখন হুজুগে মেতে অনেকেই বাড়ী-দরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যাদের টাকা নেই তারাও যাচ্ছে। অনেকে বাড়ী-ঘর বিক্রি করে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি না কিসের নেশায় যাচ্ছে এরা। কিন্তু দেখবে, আবার এরা ফিরে আসবে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ক্ষুধা ও রোগে আধমরা হয়ে আবার এরা ফিরবে। কিন্তু তখন আর মাথা খুঁজবার ঠাঁই মিলবে না। আমাদের পূর্বপুরুষ হিন্দু-মুসলমান আপনজনের মত কত যুগ ধরে কাটিয়েছে এ মাটিতে। একের ওপর নির্ভর করে বেঁচে উঠেছে আর একজন। একজন যুগিয়েছে ক্ষুধার অন্ন, আর একজন দেখিয়েছে আলো।

ডাক্তার পাশের দিকে দেখেন–গিন্নী নেই। কখন তিনি বেরিয়ে গেছেন। উঠানে হাসু দাঁড়িয়ে। দেখতে পেয়ে ডাক্তার বলেন—কিরে বাপু, কি চাই।

—আমার ভাইয়ের খুব অসুখ।

স্ত্রীর ওপর এতক্ষণ বক্তৃতা ঝেড়ে রমেশ ডাক্তারের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। তিনি বলেন—আমি যেতে পারব না।

কথাটা বলে তখনি ভাবেন—আর তো কেউ নেই। হরেন অনেক দিন আগেই চলে গেছে। জগদীশও আজ যাচ্ছে। এ তল্লাটে এ তিন হন ছাড়া আর কে আছে? ডাক্তার যাবার মনস্থ করেন। বাড়ীতে থাকলে আবার স্ত্রীর কথায় কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং রোগী দেখতে যাওয়া ভালো।

জামা গায়ে চড়িয়ে স্টেথসকোপ ও ‘এমারজেন্সী ব্যাগ’ নিয়ে ডাক্তার বের হন। পেছন থেকে স্ত্রী বাধা দেন—এই দুপুরে রোদ মাথায় করে কোথায় চল্লে আবার?

উত্তর না দিয়ে ডাক্তার এগিয়ে যান।

—চান করে খাও-দাও। বিকেলে যেও। স্ত্রী তাগাদা দেন।

স্ত্রীর কথাগুলোকে শ্লেষের আঘাত করে ডাক্তার বলেন—চান করব আবার খাব। এদিকে মানুষ মরে যাচ্ছে।

পেছন ফিরে ডাক্তার আবার বলেন—এখন দেখো, আমরা চলে গেলে এদের কি উপায় হবে। এতগুলো গ্রামের মধ্যে আমরা তিনটে ডাক্তার ছিলাম। দু’জন তো চলেই গেল।

আমিও যদি চলে যাই, তবে এরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

ডাক্তারের ব্যাগটা হাসু হাতে করে নেয়।

ডাক্তার রোগী দেখে চিন্তিত মুখে বলেন—ডবল নিমোনিয়া। এত দিন ছিলে কোথায়?

করিম বক্‌শ বলে—ফকির দেখছিল এতদিন।

—নাকের ওর ঘা হয়েছে কেমন করে?

–দড়ি-পড়া দিছিল ফকির।

ডাক্তার দাতে দাঁত চেপে বলেন—ফকির! দড়ি পড়া! দেশের শাসন ক্ষমতা আমার হাতে থাকলে ব্যাটাদের কুরবাজি দেখিয়ে ছাড়তাম। ফাঁসি দিতাম ব্যাটাদের। এ নরহত্যা ছাড়া কিছু নয়।

ডাক্তার আসায় জয়গুন বড় করে মাথায় কাপড় টেনে পেছন ফিরে বসেছিল। তার বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পিটছে অবিশ্রান্ত। সে এবার ঘুরে ডাক্তারের পা ধরে করুণ মিনতি জানায়—ডাক্তার বাবু, আমার কাসুকে বাঁচাইয়া দ্যান। আপনে আমার ধর্মের ব্যাপ।