» » কালোচিতার ফটোগ্রাফ

এ যেন স্বর্গের সিঁড়ি, উঠছে তো উঠছেই, শেষ আর হয় না। এই পাহাড়ি শহরটার নিচ থেকে ওপরে শর্টকাট পথ তৈরি করতে এমন বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে বড় প্যাকেটে পুরে সেটা বুকের ওপর চেপে ধরে তার একটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল মতিলাল। আজকাল টানা উঠতে বুকে হাঁপ ধরে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল একেবারে ওপর থেকে একটি মানুষ তরতরিয়ে নিচে নেমে আসছে। এ নিশ্চয়ই কোনও ডানপিটে তরুণ, নইলে ওই গতিতে নামার কথা চিন্তা করত না। ওভাবে নামতে হলে রীতিমত অভ্যস্ত হওয়া দরকার। মতিলাল সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। সিঁড়িটা চওড়া নয়, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে খাদ। কিন্তু সে ভাল করে সরে যাওয়ার আগে ছেলেটি তাকে মৃদু ধাক্কা মেরে নিচে চলে গেল একটুও গতি না কমিয়ে। আর ওই সামান্য ধাক্কাতেই মতিলালের হাতের প্যাকেট ছিটকে পড়ল মাটিতে। বেরিয়ে এল চিনি-চায়ের ছোট্ট প্যাকেটগুলো, দুটো ম্যাগাজিন।

চাপা গলায় গালাগালি করতে করতে উবু হয়ে বসে সে প্যাকেট দুটো এবং ম্যাগাজিন তুলছিল। যৌবনের শুরুতে মানুষ নিজেকে কী না কী মনে করে। ভাগ্যিস এই প্যাকেটগুলো ছিঁড়ে যায়নি। উঠে দাঁড়াবার আগে সে যে জিনিসটাকে দেখতে পেল সেটা তার নয়। একটা সেলোফেন কাগজে মোড়া বস্তু পড়ে আছে পায়ের কাছে। হাত বাড়িয়ে তুলেই বুঝতে পারল জিনিসটা বেশ ভারী। মতিলাল নিশ্চিত যে ওই অতি স্মার্ট ছেলেটি ধাক্কার সময় টের পায়নি জিনিসটা পড়ে গেছে। সে নিচের দিকে তাকাল। ছেলেটি এবার সিঁড়ি থেকে নেমে বাজারের দিকে যাচ্ছে। পরনে নীল জিনস্ এবং ওপরে চামড়ার জ্যাকেট, মাথায় একটা সাদা টুপি। সে চিৎকার করে ডাকার চেষ্টা করল কিন্তু ছেলেটা মুখ তুলল না। মতিলাল জিনিসগুলো নিয়ে যতটা সম্ভব জোরে নিচে নামতে লাগল। আজকাল ধীরেসুস্থে হাঁটাচলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। কিন্তু ছেলেটাকে ধরতে হবে বলে সে জোরে নামছিল। বেচারা হয়ত এখন টের পাবে না জিনিস পড়ে গেছে। যখন পাবে তখন আফসোস করবে। তাই এখন ওটা ওকে ফেরত দিয়ে কিছু কথা শোনানো যেতে পারে।

নিচে নামার পর সে ছেলেটাকে দেখতে পেল না। ওপর থেকে সে দেখেছে ছেলেটি গিয়েছে বাজারের দিকে। অতএব সেদিকেই চলল সে। সাদা টুপি চামড়ার জ্যাকেট পরা মানুষের চেহারা খুঁজে খুঁজে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেল মতিলাল।

এখন কী করা যায়? অন্যের জিনিস বাড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া কোনও মানে হয় না। আবার যেখানে পেয়েছিল সেখানে ফেলে রেখে যেতেও ভদ্রতায় লাগছে। এই দোকানদারদের কাছে দেওয়ার চেয়ে সবাইকে জানিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। সে সেলোফেনের মোড়কটা ধীরে-ধীরে খুলছিল। কী জমা দিচ্ছে তা দেখেই জমা দেবে। হঠাৎ মোড়কের ফাঁক দিয়ে একটা সরু কালো নল বেরিয়ে আসামাত্র সে চমকে উঠল। হায় ভগবান! এটা একটা পিস্তল! সে তাড়াতাড়ি মোড়কটা জড়িয়ে এপাশ-ওপাশ তাকাতেই দেখল এক মাঝবয়সি গোঁফওয়ালা লোক চট করে চোখ সরিয়ে নিল। লোকটা কি পিস্তল দেখতে পেয়েছে? বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটছিল কেউ। মতিলাল বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। এই পিস্তল আইনি না বেআইনি তাই বা কে জানে। যদি ছেলেটা এটা আইনসঙ্গত মনে করত তা হলে কি ওভাবে ফেলে যেত! এত ভারী জিনিস যখন পড়েছিল তখন কোনও আওয়াজ কানে যায়নি তো? আচ্ছা, এমন হতে পারে ছেলেটা এই পিস্তলের কথা জানেই না, তার হাত থেকে কিছু পড়েনি ওখানে। পিস্তল অনেক আগে কেউ রেখে গিয়েছিল ওখানে। না হলে পড়ার সময় নিশ্চয়ই আওয়াজ পেত সে। অন্য কারও পিস্তল সে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। পুলিশকে গিয়ে এই কথা বলে পিস্তল জমা দিলে ওরা বিশ্বাস করবে? গত কয়েক মাস ধরে উগ্রপন্থীদের ধরার জন্য পুলিশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই পাহাড়ি শহরে এখন সামান্য গোলমাল হলে ব্যাপক ধরপাকড় হয়। কিছুদিন আগে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কারও-বা কারও মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। এখন অবস্থা কিছুটা শান্ত হলেও পুলিশ সহজে তার কথা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই বাজারের রাস্তায় পিস্তল হাতে কেউ যদি তাকে ধরে তা হলেও তো কৈফিয়ত দেওয়ার কিছু থাকবে না। মতিলাল আর ভাবতে পারছিল না। মোড়কটাকে বড় ব্যাগের ভেতরে চালান করে দিয়ে সে মুখ তুলতেই দেখল গোঁফওয়ালা লোকটা আবার তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তার মানে ওই লোকটা তাকে লক্ষ করছে। কেন? পা-দুটো হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেল ওর। লোকটা কী করে জানল তার কাছে পিস্তল আছে? সে এই প্রশ্নের জবাব না পেয়ে নিজেকে বোঝাল হয়ত অন্য কারণে লোকটা তাকে লক্ষ করছে। এখন সর্বত্র পুলিশের লোক ছড়ানো। বাজারে ফিরে এসেও কেনাকাটা না করে ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ওর সন্দেহ হতে পারে।

মতিলাল পা চালাল। কিছুটা যাওয়ার পর মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে সে আর গোঁফওয়ালা লোকটাকে দেখতে পেল না। ওর মন একটু হালকা হল। খাড়াই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল সে। লোকজন অবশ্য ওঠানামা করছে কিন্তু সন্দেহ করার মত কাউকে তার চোখ পড়ল না।

একপাশে ঢালু পাহাড়, অন্যপাশে সুন্দর বাড়িগুলো। দুপুর গড়ালেই রোদ এসে পড়ে এখানে আবহাওয়া ভাল থাকলে। মতিলাল একটু দ্রুত হাঁটছিল। রাস্তা থেকে কয়েক ধাপ উঠে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সে নিজের বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছে গেল। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আগে বড় প্যাকেটটাকে টেবিলের ওপর রাখল। দরজাটা ভাল করে বন্ধ করে সে প্যাকেট থেকে সেলোফেনের মোড়কটাকে বের করে সন্তর্পণে খুলতে লাগল। হ্যাঁ, সত্যি-সত্যি এটা একটা পিস্তল। পিস্তলটা রাখা হয়েছে একটা রবারের খাপের মধ্যে। মতিলালের মনে হল এই কারণে সিঁড়ির ওপর পড়া সত্ত্বেও কোনও আওয়াজ কানে আসেনি। পিস্তলকে রবারের খাপে রাখার নিয়ম কি না তার জানা নেই। সে দেখল অস্ত্রটির বুকের ভেতর গুলি ভরা আছে। অর্থাৎ এখনই ব্যবহার করতে চাইলে কোনও অসুবিধে নেই।

পিস্তলটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে সে বাইরের দিকে তাকাল। কাচের জানলার বাইরে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝকঝক করছে। দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়। মতিলাল পৃথিবীর সবাইকে এখন ক্ষমা করে দিল। যারা তার শত্রুতা করেছে, যাদের সে সহ্য করতে পারে না তার লিস্ট তৈরি করতে হলে প্রথমে সুভদ্রার নাম লিখতে হয়। সে একা থাকে। এই ছোট্ট বাড়িটায় একা থাকতে তার খারাপ লাগে না আজকাল। তবু সুভদ্রা তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। পিস্তলটা যদি কারও ওপর ব্যবহার করতে সে বাধ্য হয় তা হলে প্রথমে সুভদ্রা। মতিলাল চোখ বন্ধ করল। তার বন্ধ চোখের পাতায় এখন সুভদ্রার মুখ! ফোলা-ফোলা চোখ, সবসময় কিছু একটা ভেবে চলেছে। বিশ্বাস শব্দটি ওর অভিধানে নেই। গুলিটা ছুড়লে ঠিক কোথায় গিয়ে লাগলে সুভদ্রাকে কেমন দেখাবে তা ভেবে পাচ্ছিল না মতিলাল। ধীরে-ধীরে মুখটা তার কাছে অন্যরকম হয়ে গেল। যতই ঝগড়া করুক, গালমন্দ দিক, আলাদা থাকুক, যে মুখে এককালে সে আদর করেছে, যদিও খুবই গোনাগুনতি ব্যাপার, তবু সেই মুখ গুলিতে ক্ষতবিক্ষত করতে পারবে না। সুভদ্রার জন্যে তার ক্রমশ মায়া হতে লাগল। আর তখনই বেল বাজল।

কে এল! উঠে দরজা খুলতে গিয়ে খেয়াল হল। পিস্তলটা তার হাতে দেখতে পেলে যে আসবে তারই চোখ বড় হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে গুজব তৈরি হবে। কোথায় রাখা যায় এটা? দ্বিতীয়বার বেল বাজাতেই মতিলাল তড়িঘড়ি করে দেওয়ালে ঝোলানো একটা তিব্বতি ব্যাগের ভেতর মোড়কসমেত পিস্তলটা ঢুকিয়ে দিল। সুভদ্রা চলে যাওয়ার পর থেকে ওই ব্যাগে হাত দেওয়া হয়নি। যতটা পারে শান্ত মুখে দরজা খুলেই হকচকিয়ে গেল সে। গম্ভীর মুখে সুভদ্রা দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলামাত্র তাকে ঠেলে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সুভদ্রা।

কে আছে, অ্যাঁ? এতক্ষণ কার সঙ্গে ফুর্তি করা হচ্ছিল। বেল টিপতে টিপতে হাতে কড়া পড়ে গেল আর বাবুর খোলার নাম নেই? দুমদুম শব্দ করে ভেতরে ঢুকে চারপাশ দেখে নিল সুভদ্রা।

দরজাটা বন্ধ করে প্রায় চোরের মত খানিকটা দূরত্বে এসে দাঁড়াল মতিলাল।

এতক্ষণ কী করছিলে?

কিছু না।

তা হলে দরজা খুলছিলে না কেন?

এমনি।

এমনি? উত্তর শুনে শরীর গুলিয়ে ওঠে। শুধু এই কারণে তোমার সঙ্গে আমি ঘর করতে পারিনি, বুঝলে? শোনো, তোমাকে এবার টাকা বাড়াতে হবে।

টাকা?

 আকাশ থেকে পড়লে কেন? যা টাকা দিচ্ছ তাতে কোনও ভদ্রমহিলার মাস চলে না।

আমি কী করতে পারি? মিনমিন করে বলল মতিলাল।

কী করতে পারি মানে? ইয়ার্কি? তোমার বউ-এর খাওয়া-পরা চলছে না আর তুমি বলছ কী করতে পারি? অন্য কেউ হলে মুখ ভেঙে দিতাম আমি। গজগজ করে উঠল সুভদ্রা, একেই দুর্নাম রটাচ্ছ আমি নাকি মুখরা, খারাপ ব্যবহার করি, তার ওপর মুখ ভেঙে দিলে আর দেখতে হবে না। এখন থেকে প্রত্যেক মাসে দুশো টাকা করে বেশি দেবে।

আমি কোত্থেকে পাব? আমি যা রোজগার করি তা তো জানো!

আমি কিছুই জানি না। কেন, যেসব মেয়েছেলের সঙ্গে দিনরাত ফুসুর-ফুসুর করতে তাদের গিয়ে বলো না। অকম্মের বাদশা।

ঠিক আছে, কিন্তু আমারও তো একটা কথা ছিল।

তোমার কোনও কথা থাকতে পারে না।

কিন্তু ছিল, বিশ্বাস করো।

ল্যাঙটের আবার বুক পকেট। বলো, বলে ফেলো।

ইয়ে, তুমি তো আমাকে ছেড়ে গেছ–।

হ্যাঁ। গেছি। ওরকম মাদিমুখো পুরুষের সঙ্গে কেউ থাকতে পারে না।

ঠিক আছে। এখন তুমি যার কাছে আছ–।

তার মানে? তুমি আমাকে চরিত্রহীনা বলছ?

 না, না, এখন তো তোমার সঙ্গে বলরাম থাকে; থাকে না?

তাতে কী এল-গেল। সে কি আমার মন্ত্রপড়া স্বামী? বিয়ে করেছি তাকে? আমি কি নিতান্তই উল্লুক? বিয়ে করলে তোমার কাছ থেকে টাকা-পয়সা পাওয়া যাবে নাকি?

ও। তা হলে বিয়ে না করে এমনি-এমনি আছ?

হ্যাঁ। সাহেব-মেমরা যেমন থাকে। তা তোমার এখানেও বুড়ি-বুড়ি মেয়েছেলেরা যাতায়াত করে বলে শুনেছি। যদি কাউকে দেখতে পাই! সুভদ্রা ঘুরে দাঁড়িয়ে সদ্য কিনে আনা প্যাকেটগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওগুলো কী?

চা, চিনি।

আমি নিয়ে যাচ্ছি। কীসে নিই! চোখ ঘুরল সুভদ্রার। তারপর এগিয়ে গিয়ে দেওয়াল থেকে তিব্বতি ব্যাগটা টেনে নামিয়ে প্যাকেটগুলো তাতে ফেলে দিল। হাঁ-হাঁ করে উঠল মতিলাল, আরে, আরে করছ কী? ওই ব্যাগটা নিও না!

কেন? এটা তোমার বাবার সম্পত্তি? আমি কিনেছিলাম না? আমার জিনিস নিতে আমাকেই নিষেধ করা হচ্ছে। যদি বিয়ে করতাম তবে এবাড়ির সব জিনিসই নিয়ে যেতে হত আমাকে। আজ যাচ্ছি। সামনের মাস থেকে দুশো টাকা বেশি দেবে। যেমন এসেছিল তেমনি ঝড়ের মত চলে গেল সুভদ্রা।

দরজা বন্ধ করে ধীরে-ধীরে কিচেনে গেল মতিলাল। গ্যাস জ্বেলে এক কাপ কফি বানিয়ে বসার ঘরে এল। সামনের জানলা দিয়ে পাহাড়ের অনেকটা দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিল সে। বেতের চেয়ারে বসে পাহাড় দেখতে-দেখতে সময় কাটানো ওর প্রিয় অভ্যেস। সুভদ্রা চলে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু মনে হচ্ছে ওর কথাগুলো এই ঘরে ভাসছে। জীবনের একটা ভুল অনেক দাম দিয়ে গেল। বলরাম তারই বন্ধু। কন্ট্রাক্টরি করে। কঁচা পয়সা হাতে। সুভদ্রার শরীরের দিকে নজর ছিল অনেকদিন। এখন সে সুভদ্রার কাছেই থাকে। অথচ সুভদ্রা নাকি ওর কাছ থেকে একটা পয়সাও নেয় না। অভাবে থাকবে, তবু সাহায্য নেবে না। প্রয়োজন হলে এ বাড়িতে এসে সে ঝামেলা করবে। মানুষের চরিত্র বোঝা মুশকিল।

মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স তার। চাকরি করে ব্যাঙ্কে। সুভদ্রা চলে যাওয়ার পর কোনও মেয়েমানুষের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়নি। এই বয়সে বন্ধুরা রুমাল পালটানোর মত মেয়েমানুষ পালটায়। তার উৎসাহ হয় না। আজ রবিবার। ব্যাঙ্ক বন্ধ। কোনও কাজ নেই। দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে চা খাবে। সন্ধে থেকে হুইস্কি। রাত বাড়লে একটা চমৎকার ঘুম। এইভাবেই বাকি জীবন যদি কাটিয়ে দিতে পারত। সে কফি শেষ করে নিজের ঘরে এল। বিছানার ওপরে একটা সিনেমার পত্রিকা। মাধুরী দীক্ষিতের মুখ। এখনকার নায়িকারা বেশি সুন্দরী না মধুবালা, মালা সিনহারা? বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বসলে বেশ ভালভাবে সময় কেটে যায়। অড্রে হেপবার্ন, সোফিয়া লোরেন না প্রিটি ওম্যানের সেই মেয়েটা। কী যেন নামটা?

এইসময় দরজার বেল বেজে উঠল গাক-গ্যাক করে। লোকটা রসকষহীন। বেল বাজানোর ধরনের ওপর মানুষের চরিত্র অনেকটা বোঝা যায়। মতিলাল এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। নিশ্চয়ই সুভদ্রা ফিরে আসেনি। এমনভাবে বেল ও বাজায় না।

দরজা খুলতেই হকচকিয়ে গেল মতিলাল। এক জিপ পুলিশ সামনে দাঁড়িয়ে। থানার ওসি থাপাকে সে চেনে। দয়া মায়া স্নেহ বলে বোধগুলো ঈশ্বর ওর জন্মের সময় দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। থাপার হাতে রিভলভার। সেটা মতিলালের নাকের ডগায় নাচিয়ে থাপা বলল, হ্যান্ডস আপ। চালাকির চেষ্টা করলে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেব।

কোনওরকমে দুটো হাত মাথার ওপর তুলতেই ধমক খেল সে, ‘ঘরে চলো’।

অতএব ঘরে ঢুকতেই হল। পুলিশ বাহিনীকে সদর দরজায় রেখে থাপা দুজনকে নিয়ে ভেতরে এল, ‘বাড়িতে আর কে-কে আছে?’

‘কেউ নেই।’ মাথার ওপর হাত তুলেই রেখেছিল সে।

‘কী কী বেআইনি অস্ত্র আছে বাড়িতে?’

‘অস্ত্র? অস্ত্র থাকবে কেন?’ করুণ গলায় পালটা প্রশ্ন করল সে।

‘মারব মুখে এক থাবড়া, আমাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। বের করো পিস্তলটা।’

‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না, বিশ্বাস করুন!’ ককিয়ে উঠল সে।

‘তোমার কাছে কোনও পিস্তল নেই?’ ছোট-ছোট চোখে তাকাল থাপা।

‘না নেই।’

‘আজকে একজন তোমাকে পিস্তল পাচার করেনি?’

‘না। বিশ্বাস করুন!’

‘অ্যাই সার্চ করো। সব খুঁজে দ্যাখো। নো মার্সি।’ থাপা আদেশ দেওয়ামাত্র বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তল্লাশি করতে। মতিলাল দেখল ওরা ঘর লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। দুটো কাচের প্লেট ভাঙল। সব গেল।

ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে করেন। চিনি, দুধ, চা যা ইচ্ছে সুভদ্রা নিয়ে যাক, আর কোনওদিন সে বাধা দেবে না। ভাগ্যিস ও আজ এসেছিল এবং তিব্বতি ব্যাগে পিস্তলটাকে রাখায় ব্যাগের সঙ্গে আপদটাকেও নিয়ে গিয়েছে সুভদ্রা।

‘হাত নামাও।’ থাপার গলা।

আদেশ শুনে চোখ খুলে ধীরে-ধীরে হাত নামাল মতিলাল।

‘কোথায় রেখেছ?’

মতিলাল চোখ ঘুরিয়ে দেখল বাহিনী হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

‘আমি কিছুই জানি না।’

সঙ্গে-সঙ্গে থাপার হাত এগিয়ে এল। তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দেখল লোকটা। শেষে তাকে বলল, ‘যদি প্রমাণ পাই মালটা তোমার কাছে ছিল তা হলে তোমার চামড়া ছাড়িয়ে নেব। এই, ডাক তো লোকটাকে। আজ ওর একদিন না আমার, দেখি?’

সেপাইরা বাইরে থেকে যাকে ধরে নিয়ে এল তাকে দেখে মতিলাল অবাক। সেই মাঝবয়সি গোঁফওয়ালা লোকটা। থাপা এগিয়ে গিয়ে ওর জামার কলার এমনভাবে মুঠোয় ধরল যেন দম আটকে গেল, ‘অ্যাই শালা। এই খবর এনেছিস? কোথায় পিস্তল?’

লোকটা হাউমাউ করে উঠল, ‘মাইরি বলছি ওর প্যাকেটে ছিল। আমি দেখেছি।’

‘থাকলে কোথায় যাবে?’

‘ও ওই প্যাকেট নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছে।’

‘ঢুকে আর বের হয়নি?’

‘তা বলতে পারব না। মাঝখানে আমি কিছুক্ষণের জন্যে আপনাকে ফোন করতে গিয়েছিলাম। প্যাকেটটা পেয়েছেন?’ লোকটা সেই অবস্থায় বলল।

‘এখানে কোনও প্যাকেটই নেই। শোন, এবার থেকে ইনফরমেশন কারেক্ট না হলে,—’ প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ঠেলে ফেলে দিল লোকটাকে। তারপর সদলবলে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। জিপের চলে যাওয়া শব্দ কানে যাওয়ার পর মতিলাল দেখল লোকটা চেষ্টা করছে উঠে বসতে। পড়ে যাওয়ার সময় নিশ্চয়ই প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে লোকটা।

মতিলাল একটা চেয়ার টেনে বসল। ওঠার চেষ্টা করে লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে বলল, ‘আমাকে দেখে খুব মজা লাগছে, না?’

মতিলাল বলল, ‘পিস্তলটা পাওয়া গেলে আমার অবস্থা তোমার চেয়ে খারাপ হত।’

দৃশ্যটা কল্পনা করে লোকটা যেন নিজের কষ্ট একটু কম করে দেখল, ‘আচ্ছা, মালটা কোথায় হাওয়া করে দিলে ভাই? তাজ্জব ব্যাপার?’

‘কী মাল?’

‘ইয়ার্কি? আমি স্পষ্ট দেখেছি তুমি প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিলে। ওটা যে তোমার নয় সেটা বুঝতে পেরেই পেছনে লাগলাম। বাজারের মধ্যে কাউকে খুঁজে না পেয়ে তুমি যখন মোড়ক খুলছিলে তখন স্পষ্ট পিস্তলের নলটা দেখতে পেয়েছি।’

‘তুমি তা হলে পুলিশের লোক?’

‘তোমার ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই। পুলিশের লোক হলে থাপা আমার গায়ে হাত তুলতে সাহস পেত? আমার কাজ হল গোপন খবর ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়ে কিছু কামাই করে নেওয়া। তুমি আমাকে আজ বোকা বানালে। আমি জানি পিস্তলটা এই বাড়িতেই আছে।’ লোকটা উঠে দাঁড়াল।

মতিলাল দার্শনিকের মত বলল, ‘খুঁজে দ্যাখো, ওরাও তো খুঁজল।’

লোকটা যেন আদেশের অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে জিনিসপত্র সরিয়ে দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে বলল, ‘তুমি কি বিবাহিত? বউ কোথায়?’

‘পিস্তলটা আগে খোঁজ তারপর খেজুরে আলাপ করো।’ মতিলাল খেঁকিয়ে উঠল।

খুঁজতে খুঁজতে লোকটা কিচেনে পৌঁছে গেল। একটু বাদে তার গলা ভেসে এল, ‘খুব খিদে পেয়েছে। তোমার রুটি আর সবজি খেতে পারি?’

‘দুটোর বেশি নেবে না। প্লেটে করে নিয়ে এখানে চলে এসো।’

মতিলাল হুকুম করল। লোকটা প্লেট নিয়ে রুটি চিবোতে চিবোতে এগিয়ে এসে বলল, ‘ওঃ বাঁচলাম।’

‘লোকটা কে?’ মতিলাল এখন যেন কর্তৃত্বে।

‘কোন লোক?’

‘যে সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নামছিল। যার প্যাকেট পড়ে যেতে তুমি দেখেছিলে?’

‘আমি কি পৃথিবীর সব মানুষকে চিনি?’ মুখ ঘুরিয়ে নিল লোকটা।

‘তুমি মিথ্যে কথা বলছ।’

‘বিনা পয়সায় আমি খবর দিই না।’

‘পুলিশকে তো নাম বলেছ। একই খবর বিক্রি করে কবার পয়সা নেবে।’

‘মাইরি আর কী? পুলিশকে ওর কথা বলতে যাব কেন? বলেছি তুমি বাজারের মধ্যে পিস্তল নিয়ে ঘুরছিলে। ছেলেটার কথা ভুলেও পুলিশকে বলিনি।’

‘তুমি তো আচ্ছা শয়তান!’ মতিলাল অবাক।

‘শয়তান বলো আর যাই বলো আমার তাতে কিছু যায় আসে না। বিজনেস ইজ বিজনেস, আমার বউ তো পৃথিবীর সব গালাগাল শিখে ফেলেছে আমাকে দেবে বলে। তাতে কোন কাজটা হয়েছে শুনি? এখন তুমি জিগ্যেস করতে পারো কেন আমি পুলিশকে ছেলেটার কথা বলিনি। প্রথম কথা, যদি তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ তা হলে তোমার অপরাধ কমে যাবে, পুলিশের কাছেও তেমন গুরুত্ব থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যদি তুমি পুলিশের চোখ এড়িয়ে পিস্তলটা রেখে দিতে পারো তা হলে আমি ওই ছেলেটার কাছে গিয়ে বলতে পারি তার পিস্তল কোথায় আছে এবং টাকা খিচতে পারি।’ লোকটা খাওয়া শেষ করে হাসল।

‘যে পিস্তল মাটিতে ফেলে দিয়ে যায় সে কেন তোমার কাছে খবর পেয়ে সেটা নিতে আসবে?’

‘অনেক সময় বাধ্য হয়ে ফেলে। বিপদ এড়াবার জন্যে ফেলতে হয়। তা হলে পিস্তলটাকে তুমি এ বাড়ি থেকে পাচার করে দিয়েছ। দারুণ ঘোড়েল মাল তুমি।’

‘অনেকক্ষণ থেকে গালাগাল দিচ্ছ তুমি!’

‘দেব না? আজ তোমার জন্যে কামাই বন্ধ, উলটে মার খেতে হল!’

‘কী নাম তোমার?’

‘শানবাহাদুর।’

‘থাকো কোথায়?’

‘বোটানিক্যাল গার্ডেনের রাস্তায়।’

‘মাঝে-মাঝে এসো। মন ভাল থাকলে গল্প করা যাবে।’

‘মন খারাপ হয় নাকি খুব?’

‘তা তো হয়ই। একা মানুষ।’

‘ও। তা হলে চলো। আমার বউ-এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি, তোমার মন একদম ভাল হয়ে যাবে।’ শানবাহাদুর হাসল।

‘এই বললে তোমার বউ গালাগালির এক্সপার্ট।’

‘তাই তো নিয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ গালাগালি শুনলে দেখবে মনটা আর মনে থাকে না। কেমন উদাস হয়ে যায়।’

‘মাপ করো ভাই। তুমি গিয়ে তোমার চেনা সেই ছেলেটাকে খবর দাও। তাতে যদি কিছু রোজগার হয় তোমার।’ মতিলাল প্রায় জোর করে শানবাহাদুরকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

চেয়ারে বসতেই তার সুভদ্রার কথা মনে এল। পিস্তলটা দেখতে পেয়েও নিশ্চয়ই চেঁচিয়ে উঠবে। এখনও যে দ্যাখেনি তার প্রমাণ দেখলে এতক্ষণে ছুটে আসত। কিন্তু পুলিশ যদি জানতে পারে ওর কাছে পিস্তল আছে তা হলে আর দেখতে হবে না। মেরে কিমা বানিয়ে দেবে সুভদ্রাকে। বিনা দোষে কষ্ট পাবে বেচারা।

মতিলালের মনে হল এখনই সুভদ্রার বাড়িতে গিয়ে ওকে সাবধান করে দেওয়া উচিত। সে উঠল। কিন্তু তারপরই মনে পড়ল শানবাহাদুরের কথা। লোকটা যদি বাইরে গিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। তা হলে নিশ্চয়ই ওর পিছু নেবে। সুভদ্রার কাছে গেলে দুই-এ দুই চার করে নিতে অসুবিধে হবে না ওর। এমনিতে হয়ত কিছু হত না, সে আগ বাড়িয়ে বিপদ ডেকে আনবে।

মতিলাল নিজের বিছানায় চলে এল। জুতো খুলে মোজা-পায়েই শুয়ে পড়ল সে। আঃ কী আরাম! একটু ঘুমিয়ে নিয়ে বিকেল নাগাদ সুভদ্রার খোঁজে গেলেই হবে, ততক্ষণ শানবাহাদুরের ধৈর্য থাকবে না দাঁড়িয়ে থাকার। চোখ বন্ধ করল সে। চোখের পাতায় হেমা মালিনী, রেখা অথবা জিনাতের শরীর ঘুরে-ঘুরে আসত লাগল। এইভাবে কল্পনা করা ওর দীর্ঘদিনের অভ্যেস।