Blog

  • অপশক্তিধরদের আলোকিত চিন্তা চেতনা

    অপশক্তিধরদের আলোকিত চিন্তা চেতনা

    বর্তমান পৃথিবীর বড় অপশক্তি আমেরিকা কখনো ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’, ‘গ্লোব্লাইজেশন’ নামে নিজেদের বস্তুবাদী নাস্তিকতাবাদী সংস্কৃতিকে আলোকিত চিন্তা চেতনা বলে আখ্যায়িত করে জোরপূর্বক সমগ্র বিশ্বের উপর তা চাপিয়ে দিতে চায়, দুঃখের বিষয় হল এই যে, স্বয়ং মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোক অপশক্তিধরের ভয়ে অথবা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ার কারণে অপশক্তিধরের সংস্কৃতিকে উন্নত, নিরপেক্ষ এবং আলোকিত চিন্তার ধারক বলে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা করছে। প্রিয় জন্মভূমি (লেখকের) ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানেও এ ভাল কাজটিকে বড় জিহাদের চেতনা মনে করে কাজ করা হচ্ছে, এর কিছু দৃষ্টান্ত দ্রষ্টব্য।

    1. পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তার এক বক্তব্য বলেছেন— চরমপন্থী মৌলভীদের ইসলামের আমাদের দরকার নেই, যদি কারো কাছে বোরকা এবং দাড়ি পছন্দ হয় তাহলে সে যেন তা তার ঘরে সীমাবদ্ধ রাখে, আমরা তাদের এ বোরকা এবং দাড়ি রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দিতে দিব না।1
    2. লণ্ডনে প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী তার চিন্তা চেতনার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন— “কিছু মৌলবাদী সংগঠন আমাদেরকে কয়েক শতাব্দী পিছনে নিয়ে যেতে চায়, আমাদেরকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, ধর্মীয় অন্ধত্ব চায় যে আমি চোরের হাত কেটে দেই, আমি কি সমস্ত গরীবদের হাত কেটে তাদেরকে টুণ্ডা করে দেব? না তা কখনো হতে পারে না। চরমপন্থী গ্রুপ আমাদের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায়, কিন্তু এ সল্প লোকদের জানা থাকা উচিত যে, আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বেঁচে আছি, আমরা চরমপন্থীদেরকে তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করতে অনুমতি দেব না।2
    3. বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী বলেন—নারীদেরকে ঘরে বন্দী রাখা একটি পশ্চাদমুখী চিন্তা, পর্দায় লুকিয়ে থাকা নারীরা ইসলামের পশ্চাদমুখীতার চিত্র প্রকাশ করছে, কিছু লোক নারীদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী রাখতে এবং তাদেরকে পর্দা করাতে চায়, যা একেবারেই ভুল।3
    4. কোহাটে এক বৈঠকে আলোচনা করতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধান বলেছেন— ইসলামের পশ্চাদ পদতা রাষ্ট্রের উন্নতির পথে বাধা, কেউ দাড়ি রেখেছে তো ভাল, কিন্তু আমাকে বলবে না যে, আমি দাড়ি রাখব বা না রাখব। ফিল্মি পোষ্টার, গান বাজনা, দাড়ি না-রাখা, মহিলাদেরকে বোরকা পরিধান না করানো, সেলওয়ার, কামিজ, পেন্ট এবং এল এফ, এগুলো ছোট খাট বিষয়। অতএব এগুলোকে ইস্যু বানাবে না, এগুলো ছোট চিন্তার লোকদের কাজ, পাকিস্তান বিরাট চেলেঞ্জের মুখে আছে, ইস্যু হল এই যে, দেশে কার আইন চলবে? আমরা উন্নত ইসলাম চাই, যা কায়েদে আযম এবং আল্লামা ইকবালের চিন্তায় ছিল, উন্নয়নশীল পাকিস্তান, কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য মানুষের চিন্তা চেতনার মধ্যে পরিবর্তন দরকার, সমগ্র জাতি গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি চায়, ইসলামে সকলের অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার মর্যাদা বুঝুন।4

    পাকিস্তানের প্রধানের আরো কিছু বক্তব্য

    1. সেকেলে চিন্তা-চেতনা এবং প্রাচীন বর্ণনাসমূহের উন্নতির এ যুগে মোটেও কোন দরকার নেই, বর্তমান যুগ উন্নতির এমন স্তরে এসে পৌঁছেছে যে অতীতের সাথে তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। সাইন্স, টেকনোলজী এবং উন্নত জীবনযাপনের দ্রুততায় ধর্ম কালের সাথী হতে পারবে না, চাদর, চার দেয়াল, পর্দা, স্কার্ফ, দাড়ি মোল্লাদের ধর্ম এবং পশ্চাদপদতার নিদর্শন। তলওয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন এর পরিবর্তে ডিবলোমাসীর মাধ্যমে কাজ করা হয়, অপরাধ, ডাকাতি ইত্যাদির শাস্তি ইসলামী বিধান পরিহার করে যুগোপযুগী বিধান আবিষ্কার করতে হবে, চোরের হাত কেটে জাতিকে টুণ্ডা করা যাবে না।5

    রাষ্ট্র প্রধানের বক্তব্যের সারমর্ম হল এই—

    ক) দাড়ি, পর্দা চরমপন্থী মৌলভীদের ইসলাম।

    খ) চোরের হাতকাটা ধর্মীয় পাগলামীর বহিঃপ্রকাশ।

    গ) ধর্ম কালের সাথে তাল মেলাতে পারবে না।

    ঘ) জিহাদের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন জিহাদ পরিহার করতে হবে।

    ঙ) গবেষণার মাধ্যমে ইসলামী দণ্ডবিধিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

    পর্দা, দাড়ি, স্কার্ফ, জিহাদ, ইসলামী দণ্ডবিধির কথা আলোচনা করার আগে রাষ্ট্রপ্রধান এও বলেছেন— সেকেলে চিন্তা চেতনা এবং প্রাচীন বর্ণনাসমূহের উন্নতির এ যুগে মোটেও কোন দরকার নেই।

    যেন উল্লেখিত অনৈসলামী কানুনসমূহ আলোকিত চিন্তা-চেতনা এবং উন্নতির সাথে সম্পর্ক রাখে, সম্ভবত এটাই কারণ যে, রাষ্ট্র প্রধান ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের সমস্ত ইসলামী গৌরবকে খতম করার এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে দেশের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, দাড়ি, পর্দার বিরোধিতা, ইসলামী দণ্ডবিধিতে অসন্তুষ্টি, আল্লাহর পথে জিহাদের বিরোধিতা, খেলাফত (ইসলামী আইন)-এর প্রতি অসন্তুষ্টি6, সিনেমা, গান-বাজনার সমর্থন, নিজের গৌরবময় অতীত ইতিহাস থেকে পিছপা। হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি এবং নারী পুরুষের সম্মিলিত মেরাথন, ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর নযরদারী, বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তানী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ, গোত্রীয় অঞ্চলসমূহে সঠিক আক্বীদা বিশ্বাসী লোকদের রক্তপাত করা, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কোরআ’নের সূরা এবং আয়াতসমূহ ছাটাই করা, মুসলিম বিজয়ীদের কর্মকাণ্ড সম্বলিত বিষয়সমূহ খতম করা, সাহাবাগণের ব্যাপারে ‘শহীদ’ শব্দটি উঠিয়ে দিয়ে ‘নিহত’ শব্দ ব্যবহার করা, গৌরবজনক নিদর্শনসমূহের কথা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূর করা, হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু শাসকদের ইতিহাস শিক্ষাব্যবস্থায় চালু করা, ক্লাস ওয়ান থেকে ইংরেজী শিখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া, মুসলমানদের চিরস্থায়ী শত্রু ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাঈলের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার ব্যাপারে সৌখিনতা প্রকাশ করা। এমনিভাবে অন্যান্য ইসলামী ঘটনাবলী, ইসলামী বিধিবিধান এবং ইসলামী সংস্কৃতি আলোহীন এবং অনুন্নত মনে করার ফল।7

    ইতিহাস সাক্ষী যে মুসলিম শাসকদের দ্বীন থেকে দূরে থাকা এবং দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতাই মুসলমানদেরকে সর্বদা অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে, তুর্কীতে মোস্তফা কামাল পাশা সাধারণ জনসাধারণকে ‘নুতন উন্নত তুর্কী’ সুন্দর শ্লোগান দিয়ে সর্ব প্রথম ইসলামী খেলাফতের প্রতি হস্তক্ষেপ করেছে এবং তা শেষ করেছে ইসলামী খেলাফত শেষ করার পর, আরবী ভাষা এবং আরবী লিখনীর প্রতি কঠোরতা আরোপ করেছে, ইসলামী ইবাদত, নামায, আযানের জন্য আরবী ভাষার পরিবর্তে তুর্কীভাষায় চালু করেছে। জোরপূর্বক মুসলমানদের দাড়ি মুণ্ডন করিয়েছে, বোরকা পরহিতা নারীদেরকে জোরপূর্বক বোরকা খুলে দিয়েছে, টুপির স্থলে হেট বা ইংলিশ পোষাক পরতে বাধ্য করেছে, শিক্ষা বোর্ড থেকে আরবী, ফার্সি ভাষা তুলে দিয়েছে। আরবী গ্রন্থ এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপিসমূহ বিক্রি করে দিয়েছে, ওক্‌ফ সম্পত্তি বিলীন করে দিয়েছে, মসজিদসমূহে তালা ঝুলিয়েছে, আয়া সুফিয়ার প্রসিদ্ধ মসজিদকে জাদুঘরে পরিণত করেছে, সুলতান মোহাম্মদ ফাতেহ মসজিদকে গুদামে পরিণত করেছে, দেশ থেকে ইসলামী বিধানসমূহ অকার্যকর করে দিয়েছে, ইউরোপের স্কলারদেরকে সারাদেশে নিয়োগ করেছে, মোস্তফা কামালের উল্লেখিত ভূমিকার ফলে তুর্কির ইসলামী কর্মকাণ্ড পরিপূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে গেছে, বর্তমানে তুর্কি একটি সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে আছে, কিছু দিন আগে সংবাদপত্রের আলোচিত একটি সংবাদ দ্রষ্টব্য।

    তুর্কির শহর আনাতুলের আদালত দু’জন কোরআ’নের শিক্ষকের ব্যাপারে সাড়ে আট বছর বন্দী থাকার ফায়সালা করেছে, কেননা তারা ১৯৯৪ সালে যখন তাদের বয়স ১১ বছর ছিল তখন দু’জন বাচ্চাকে নিয়ম বহির্ভুতভাবে এক মসজিদে কোরআ’ন শিখানোর অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। যেহেতু এ মামালাটির অনেকদিন পর্যন্ত শুনানী চলছিল তাই দীর্ঘদিন পর এর রায় ঘোষণা করা হল।8

    আমাদের সামনে আরও একটি উদাহরণ, উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের বড় মোগল, যে ইতিহাসে জালালুদ্দীন আকবর নামে পরিচত, জালালুদ্দীন আকবর আল্লাহ্‌র দ়ীনের ভিত্তি এ দর্শনের উপর রেখেছে যে, ইসলাম ১৪শত বছরের পুরাতন ধর্ম, এখন আমাদের একটি নূতন উন্নত ধর্ম দরকার, তাই বাদশাহ্ সালামত একটি নূতন দিন আবিষ্কার করল, যার কালেমা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ আকবর খলিফাতুল্লাহ্‌’। ভারতে যেহেতু বিভিন্ন ধর্মের লোকদের বসবাস ছিল তাই এধর্মে মুসলমান ব্যতীত সমস্ত দলসমূহের সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হল, অগ্নিপূজকদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য শাহী মহলে পৃথকভাবে আগুন জ্বালিয়ে আলোকিত রাখা হত এবং তার পূজা করা হত, তাদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ সরকারীভাবে পালন করা হত, খৃষ্টানদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য ঈসা (আ.) এবং মারইয়ামের মূর্তি তৈরি করে তার সামনে আকবর সম্মান জানাতে দাঁড়াত, আবার চার্চেও উপস্থিত হত। হিন্দুদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য হিন্দুদের মূর্তি এবং তাদের বিভিন্ন উৎসব সরকারীভাবে পালন করা হত, আকবর নিজে মাথায় তিলক ব্যবহার করত, গাভী কোরবানী করা নিষেধ করেছিল, তার মহলে বানর ও কুকুর পালিত হত,  বানরকে পবিত্র প্রাণীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, মহলে নিয়মিত জুয়ার আসর বসত, জীনভূতের অনুসারীদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য আকবর শুধু শিকার করাই ত্যাগ করে নি, বরং মাংস খাওয়াও পরিহার করেছিল। ইসলামী বিধি-বিধানসমূহকে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করা হয়েছে, সূদ, জুয়া, মদ পান হালাল করে দেওয়া হয়েছিল, দাড়ি মুণ্ডাতে উৎসাহিত করার জন্য আকবর নিজের দাড়ি মুণ্ডন করেছিল। মোহাম্মদ, আহমদ, মোস্তফা ইত্যাদি নাম রাখা নিষেধ করা হয়েছিল, নূতন মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছিল, পুরাতন মসজিদসমূহ ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল, আযান, নামায, রোযা, হজ্ব ইত্যাদি ইবাদতের ক্ষেত্রে বাধ্য বাধকতা ছিল, বার বছরের আগনে খতনা করা নিষেধ ছিল। এরপর মেয়েদর স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল যে, তারা চাইলে খতনা করতে পারবে আর না চাইলে করবে না। একাধিক বিয়ে নিষেধ করা হয়েছিল, ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থাকে পঙ্গু করা হয়েছিল। অথচ, বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, ইতিহাস ইত্যাদি শিক্ষা ব্যবস্থা সরকারী ছত্রছায়ায় চলত। বায়তুল্লাহ্‌কে অবমাননা করার ইচ্ছা নিয়ে আকবর রাতে কেবলার দিকে পা দিয়ে রাত্রি যাপন করত, আকবের এ নূতন উন্নত ধর্ম যদি পরিপূর্ণভাবে বিস্তারের সুযোগ পেত তাহলে আজ সমগ্র হিন্দুস্থান কুফরস্থানে পরিণত হত। কিন্তু আল্লাহ্‌র ইচ্ছা সবকিছুর উপর বিজয়ী। ঐ সময়ে আল্লাহ্‌ শাইখ আহমদ সেরহিন্দি রাহিমাহুল্লাহের মাধ্যমে এ কুসংস্কারকে সমূলে উৎপাটনের জন্য ভূমিকা রাখলেন, যার সুন্দর পক্ষেপের ফলে আবুল আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহের ভাষায়, ‘শুধু হিন্দুস্তানকেই কুফরীর অতলতলে যাওয়া থেকে বাঁচান নি, বরং এ বিশাল ফিতনা মুখথুবড়ে পড়ে গিয়েছিল। যদি তা কামিয়াব হতে পারত, তাহলে আজ থেকে ৩/৪শ’ বছর আগেই এখান থেকে ইসলামের নাম নিশানা মিটে যেত।9

    মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের রেখে যাওয়া সংস্কার ‘নূতন উন্নত ধর্ম’ আকবরের রেখে যাওয়া সংস্কার ‘নূতন উন্নত ধর্ম’, আর মোশাররফের রেখে যাওয়া সংস্কার ‘আলোকিত চিন্তা’, এ তিনটি পন্থাই সাধারণ মানুষের জন্য দৃষ্টি আকর্ষক হলেও ইসলামের জন্য তা বিষাক্ত।

    বর্তমান যুগের আলোকিত চেতনার মূল আলোকিত চেতনা নয় বরং তা হল ঐ অন্ধকার এবং যুলম যে পথে শয়তান তার বন্ধুদের আনতে চায়। যেমন স্বয়ং আল্লাহ্ বলেছেন—

    اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ ۗ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ٢٥٧

    অর্থ: “আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাক হচ্ছে তাগুত (শয়তান) তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, এরাই হল জাহান্নামী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে। (সূরা বাকারাহ-২৫৭)

    অতএব আলেমদের উচিত হল সর্ব সাধারণকে এ আলোকিত চেতনা সম্পর্কে অবগত করানো এবং তাদেরকে বুঝানো যে আমাদের অতীত মোটেও অনুজ্জ্বল নয় বরং অন্যান্য সমস্ত উম্মতদের তুলনায় আমাদের অতীত সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং আলোকিত যাতে আমাদের গৌরব রয়েছে, আমরা ১৪শত বছরের পুরানো শরীয়তে মোহাম্মদীকে আমাদের জীবনের চেয়েও অধিক ভালবাসি। এরই উপর মৃত্যুবরণ করা এবং এরই উপর পুনরুত্থিত হওয়া আমাদের জীবনের লক্ষ্য। এর বিপরীতে শয়তানের সংস্কৃতি, আলোকিত চেতনা, নিরপেক্ষতা, আমার ঘৃণাকরি এবং এ থেকে আমরা মুক্ত। আমাদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে—

    أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا ٦٠

    অর্থ: “আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমার সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে যাতে তারা ওকে মান্য না করে, পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। (সূরা নিসা-৬০)

  • লেখকের আরয

    লেখকের আরয

    بسم الله الرحمن الرحيم

    الحمد الله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، والعاقبة للمتقين، اما بعد!

    কোরআ’ন অবতীর্ণের পূর্বে আরবের সামাজিক অবস্থা, সামাজিকতা, চারিত্রিক, রাজনৈতিক, সর্বদিক থেকে অন্ধকার এবং বর্বরতার অতলতলে নিমজ্জিত ছিল। সর্বত্র শিরক, মূর্তিপুজার সয়লাভ ছিল, মানুষ একে অপরের রক্ত পিপাসু এবং একে অপরের সম্পদ ও সম্মান লুণ্ঠনে ব্যস্ত ছিল, প্রতিশোধের বদলে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ চলত, কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত প্রথিতকরণ সাধারণ বিষয় ছিল। অসংখ্য নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করাকে গৌরবের বিষয় মনে করা হত। মদপান, জুয়া, ব্যভিচার তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। উলঙ্গপনার অবস্থা ছিল এই যে, নারী ও পুরুষরা উলঙ্গ হয়ে বাইতুল্লাহ (কাবা ঘরের) ত্বাওয়াফ করাকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করত। গরীব, মিসকীন, বিধবা, ইয়াতীমদের দেখার মত কেউ ছিল না। এমতাবস্থায় যখন কোরআ’ন অবতীর্ণ হল তখন মাত্র কয়েক বছরের অল্প সময়ে কোরআ’নের শিক্ষা আশ্চর্যজনক ভাবে আরবদের এদৃশ্য পট পরিবর্তন করে দিল, মাওলানা আলতাফ হোসাইন হালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

    ঐটা কি বিজলীর গর্জন না মহান পথ প্রদর্শকের আওয়াজ ছিল

    যা আরব ভূমিকে পরিপূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

    যে সমস্ত লোকেরা নিজের কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রথিতকরণকে সাধারণ কিছু বলে মনে করত, স্বয়ং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাদের অপরাধ স্বীকার করে তাদের কৃতকর্মের জন্য নয়নাশ্রু ঝরাচ্ছিল, এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে আবেদন করল হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমার এক মেয়ে ছিল যে আমার নিকট অত্যন্ত আদরের ছিল, আমি তাকে ডাকলে সে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আমার নিকট আসত, একদিন আমি তাকে ডাকলাম এবং সাথে নিয়ে চললাম, পথিমধ্যে একটি কুয়া পেয়ে আমি তাকে সেখানে নিক্ষেপ করলাম, তার সর্বশেষ আওয়াজ আমার কানে আসছিল আর সে বলতে ছিল ‘ও আব্বা ও আব্বা’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) নয়নাশ্রু ঝরাতে লাগলেন, লোকেরা ঐ ব্যক্তিকে কথা বলতে নিষেধ করতে চাইল, তিনি বললেন: তাকে বাধা দিওনা, যে বিষয় সম্পর্কে তার জানার যথেষ্ট অনুভুতি আছে, তাকে সে বিষয়ে প্রশ্ন করতে দাও। ঘটনা শোনার পর তিনি বললেন: জাহেলিয়াতের যুগে যা কিছু হয়েছে ইসলাম গ্রহণ করার ফলে আল্লাহ্ তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, এখন নুতন করে জীবন যাপন শুরু কর। (দারেমী)।

    ঐ ব্যক্তি যে ধন-সম্পদের জন্য ডাকাতি করত, লুটপাট করত, কোরআ’নের শিক্ষা তাকে পৃথিবীর ধন-সম্পদের লোভ থেকে এত অনাগ্রহী করেছে যে, ধন-সম্পদের চেয়ে তুচ্ছ আর কোনকিছু তার কাছে ছিল না! একদা ত্বালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার ঘরে আসল, চেহারায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ছিল, স্ত্রী এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে উত্তরে বলল: আমার নিকট কিছু সম্পদ জমা হয়ে গেছে এজন্য আমি চিন্তা করছি, স্ত্রী বলল: তাতে চিন্তিত হওয়ার কি আছে? স্বামী-স্ত্রী পরামর্শ করে লোকদেরকে ডেকে আনল এবং ত্বালহা তার জমাকৃত সম্পদ চার লক্ষ দিরহাম লোকদের মাঝে বণ্টন করে দিল। (ত্বাবারানী)।

    ঐ সমস্ত লোক যারা দিন-রাত মদ, পানির মত ব্যবহার করত তারা মদ হারাম হওয়ার বিধান অবতীর্ণ হলে (সূরা মায়েদা-৯০) এমনভাবে মদ পরিহার করল যেন মদের ব্যাপারে তাদের কোন ধারণাই ছিল না।

    বুরাইদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর পিতা বলেন: “আমরা একটি টিলার উপর বসে মদ পান করছিলাম, ওখান থেকে আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হলাম, তখন মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হল, আমি দ্রুত ফিরে এসে আমার সাথীদেরকে আয়াতটি শোনালাম, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মদ পান করা শেষ করেছিল আবার কেউ পেয়ালা মুখে লাগিয়ে মদ পান করছিল, কেউ হাতে পেয়ালা ধরে ছিল, আমার আওয়াজ শোনামাত্র সবাই মদের পেয়ালা মাটিতে ঢেলে দিল, আর যখন আমি আয়াতের শেষ অংশ অর্থাৎ—

    অর্থ: “তোমরা কি মদ পান করা থেকে বিরত থাকবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠল:

    অর্থ: হে আমাদের রব আমরা বিরত থাকলাম। (ইবনু কাসীর)

    ঐ সমাজ যেখানে উলঙ্গপনা এবং বেহায়াপনার সয়লাভ চলছিল, একজন নারীকে দশ দশজন পুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখা বৈধ বিয়ের মর্যাদা ছিল, সেখানে কোরআ’নের শিক্ষা নারীদের মধ্যে এত লজ্জাবোধের অনুভুতি সৃষ্টি করতে পেরেছিল যে, যখন কোরআ’নে পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হল তখন যে সমস্ত নারীদের কাছে পর্দা করার মত কাপড় ছিল না তারা তাদের পরিধানের কাপড় ছিড়ে উড়না বানিয়েছিল।

    আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেন ঐ সমস্ত নারীদের প্রতি যারা—

    وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ

    অর্থ: “এবং তারা যেন তাদের মাথার উড়না তাদের বক্ষদেশে ফেলে রাখে।” (সূরা নূর-৩১)—

    এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই তারা তাদের পরিধানের বস্ত্র ছিড়ে তা দিয়ে উড়না বানিয়েছিল। (বোখারী)

    কোরআ’ন মাজীদ বান্দাদেরকে তাদের রবের সাথে এত গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে তুলেছে যে, তার সামনে পৃথিবীর বড় বড় নে’মতসমূহও সাধারণ এবং মূল্যহীন মনে হয়েছে।

    আবু ত্বলহা নিজের আঙ্গুর এবং খেজুরের সুন্দর সাজানো ঘন সবুজ বাগানে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিল, নামাযরত অবস্থায় মন আল্লাহর দিক থেকে ফিরে বাগানের দিকে চলে আসল এবং সে ভুলে গেল যে কত রাকাত নামায আদায় করেছে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতটুকু বাধা হওয়ার রাগে নামায শেষ করেই রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) নিকট আসল এবং আবেদন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ এ বাগান আমাকে নামাযের সময় আল্লাহর দিক থেকে অন্যমনস্ক করে দিয়েছে, তাই আমি তা দান করে দিলাম তা আপনি যেখানে খুশী সেখানে ব্যবহার করুন।

    ঐ সমাজ যেখানে মানুষের মধ্যে পরকালের জওয়াবদিহিতা এবং আল্লাহর ভয় থেকে পরিপূর্ণরূপে গাফেল করে দিয়েছিল, তাদেরকে সর্বপ্রকার পাপকাজে নিমজ্জিত করে দিয়েছিল, কোরআ’নের শিক্ষা তাদের অন্তরে পরকালের এতটা ভয় সৃষ্টি করেছিল যে, তারা প্রতি মুহূর্তে পরকালকেই অগ্রাধিকার দিত। মায়েয বিন মালেক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে নিজে স্বীকার করল যে, সে পাপে লিপ্ত হয়েছে এবং তাকে ঐ পাপ থেকে মুক্ত করা হোক। তিনি মায়েয রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার পাপের কথা স্বীকার করা সত্বেও কিছু প্রশ্ন করে তাকে তার অবস্থান থেকে হটাতে চাইলেন, কিন্তু মায়েয (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নাছোড়বান্দার ন্যায় বলতে লাগল যে, আমাকে এ পাপ থেকে মুক্ত করুন। তাই তিনি রায় দিলেন এবং মায়েয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে পাথর মেরে হত্যার মাধ্যমে শাস্তি কার্যকর করা হল। (মুসলিম)।

    যে সমাজে নিকট আত্মীয়দের মৃত্যুতে মৃতদের জন্য মাতাম করা, চেহারা ক্ষত করা, উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করা, বছর কি বছর ধরে শোক পালন করা, গৌরবের বিষয় মনে করা হত, ঐ সমাজের এক একজন ব্যক্তি এমন ধৈর্য এবং নিয়মানুবর্তীতায় অভ্যস্ত হল যে, পুরুষ তো বটেই এমনকি নারীরাও ধৈর্যের দৃষ্টান্ত হয়ে গেল।

    উম্মে আতীয়া বাসরায় স্বীয় ছেলের অসুস্থতার কথা মদীনায় বসে জানতে পারলেন, তাই তিনি বাসরা সফর করার দৃঢ় সংকল্প করলেন, বাসরা পৌঁছে তিনি জানতে পারলেন যে, দুদিন পূর্বে তার ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, উম্মে আতীয়া দুঃখ ভরাক্রান্ত হৃদয় হলেন বটে, কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু বলছিলেন ‘ইন্না লিল্লাহ্ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, এটা ব্যতীত তার মুখ দিয়ে অন্য আর কোন শব্দ বের হয় নাই।

    এরপর চতুর্থ দিন আতর তলব করে তা ব্যবহার করলেন এবং বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করতে নিষেধ করেছেন।

    যে সমাজে নারীর মর্যাদা বা সম্রমের কোন লেশমাত্রও ছিল না, কোরআনের শিক্ষা পুরুষদের অন্তরে এমন পরিবর্তন এনে দিয়েছিল যে, তারা নিজেরাই নারীর সম্মান এবং সম্ভ্রমের রক্ষক হয়ে গেল, এক মহিলা মসজিদ থেকে বের হচ্ছিল, আবু হুরাইরা অনুভব করল যে, সে সুগন্ধি ব্যবহার করেছে, আবু হুরাইরা মহিলাকে ওখানে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল— হে আল্লাহর বান্দী তুমি কি মসজিদে যাচ্ছ? সে বলল: হাঁ। আবু হুরাইরা বলল: আমি আমার প্রিয় নবী আবুল কাসেম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন: যে নারী মসজিদে সুগন্ধি ব্যবহার করে আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না যতক্ষণ না সে তার ঘরে ফিরে গিয়ে গোসল করে আসে। (আহমদ)

    ঐ লোকেরা যারা সর্বদা একে অপরের রক্ত পিপাসু ছিল, যাদের নিকট মানবাত্মার কোন মূল্য ছিল না, কিতাব ও সুন্নাতের শিক্ষা তাদেরকে শুধু নিজেদেরই নয় বরং অন্যদের জীবন রক্ষক বানিয়ে দিয়েছে।

    খোবাইব আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে তার বংশের লোকেরা ধোঁকায় ফেলে গ্রেপ্তার করে মক্কার মোশরেকদের নিকট বিক্রি করে দিয়েছিল, মোশরেকরা তার কাছ থেকে বদরের যুদ্ধে নিহতদের বদলা নিতে চাচ্ছিল, সেটা ছিল যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাস, তাই তারা তাকে হত্যা করার সময় পিছিয়ে দিল, আর খোবাইব আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বেড়ি পরিধান করে এক ঘরে বন্দী করে রাখল, নিষিদ্ধ মাস শেষ হয়ে গেলে মক্কার কোরাইশরা খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে হত্যার তারিখ নির্ধারণ করল। খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিহত হওয়ার আগে পবিত্র হওয়ার জন্য বন্দীশলার কর্তার নিকট ক্ষুর চাইল, কর্তা তার কম বয়সী বাচ্চার মাধ্যমে ক্ষুর দিয়ে পাঠাল। কিন্তু পরে সে চিন্তায় পড়ে গেল যে, আমি কি বোকামী করলাম, হত্যার আসামীর নিকট নিজের সন্তানের হাতে ক্ষুর দিয়ে পাঠালাম। কর্তা পেরেশান অবস্থায় দৌঁড়ে আসল এবং দেখল খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ক্ষুর হাতে নিয়ে বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করছে, হে ছেলে তোমার মা তোমার হাতে ক্ষুর পাঠানোর সময় আমাকে ভয় করে নাই? কর্তা সাথে সাথে ঐ পেরেশান অবস্থায় বলে উঠল, হে খোবাইব আমি এ বাচ্চা তোমার নিকটে আল্লাহ্‌র নিরাপত্তায় পাঠিয়েছি, খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বাচ্চার মায়ের চিন্তা দূর করার জন্য বলল: চিন্তা করবে না, আমি এ নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করব না, আমাদের ধর্মে অত্যাচার, ওয়াদা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। যে ব্যক্তিকে আগামী দিন অন্যায়ভাবে নিহত হতে হবে, সে নিজেই কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা ঠিক মনে করে নাই। ঐ সমস্ত লোক যারা জাহেলিয়াতের যুগে হালাল ও হারামের মধ্যে কোন পার্থক্য করত না, কোরআ’নের শিক্ষা তাদেরকে আমানতদারী এবং ধার্মিকতার এমন স্তরে নিয়ে এসেছে যে, কারো কাছ থেকে একটি পয়সা হারাম ভাবে নেওয়া তারা মোটেও পছন্দ করত না। সা’দ বিন ওবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন বংশের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব দিলেন এবং সাথে সাথে এ উপদেশ দিলেন যে, দেখ! কিয়ামতের দিন যেন এমন না হয় যে, তোমার কাঁধে বা পিঠে যাকাতের উঠ চিল্লাতে থাকে। সা’দ বিন উবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ আমি এধরণের দায়িত্ব থেকে অবসর চাচ্ছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার স্থলে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিলেন। (ত্বাবরানী)।

    যে সমাজে ব্যক্তি স্বার্থ, নির্দয় আচরণ, লুটপাট সাধারণ বিষয় ছিল, কিতাব ও সুন্নাতের শিক্ষা তাদেরকে অল্প কয়েক বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে সমবেদনা পরায়ণ, একে অপরের কল্যাণকামী, আত্মত্যাগী করে তুলেছিল।

    ইয়ারমুকের যুদ্ধে কতিপয় সাহাবা প্রচণ্ড গরমের তাপে আহত অবস্থায় পিপাসায় কাতরছিল, ইতিমধ্যে একজন মুসলমান পানি নিয়ে আসল এবং আহতদেরকে তা পান করাতে চাইল, তাদের প্রথম ব্যক্তি বলল, দ্বিতীয় ব্যক্তিকে পানি পান করাও। যখন দ্বিতীয় ব্যক্তিকে পানি পান করাতে গেল তখন সে বলল, তৃতীয় জনকে পানি পান করাও। পানি পরিবেশনকারী তখনও তৃতীয় জনের নিকট পৌঁছে নাই, এতিমধ্যেই প্রথম ব্যক্তি শহিদ হয়ে গেছেন, তখন সে দ্বিতীয় জনের নিকট আসল, ততক্ষণে সেও তার মালিকের ডাকে সাড়া যুগিয়েছে, আর যখন তৃতীয় জনের নিকট পৌঁছল, তখন সেও পানি পান না করে শাহাদাতবরণ করেছে। (ইবনু কাসীর)

    মূল বিষয় হল এই যে, কোরআ’ন মাজীদ অত্যন্ত অল্প সময়ে একত্ববাদের বিশ্বাসের সাথে সাথে মানুষের চরিত্র এবং কর্মের দিক থেকে এমন এক উন্নতমানের মানুষ তৈরী করেছে, ইতিহাসে যার কোন তুলনা নেই, শুধু এতটুকু বুঝে নিন যে কোরআন মাজীদ ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে কয়লাকে স্বর্ণে পরিণত করেছে।

    আল্লাহ্ তা’য়ালা কোরআ’ন অবতীর্ণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন—

    الر ۚ كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ ١

    অর্থ— “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি আপনার প্রতি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে নিয়ে আসেন, পরাক্রান্ত প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তারই পথের দিকে। (সূরা ইবরাহীম-১) ।

    সুরা ইবরাহীমের উল্লেখিত আয়াত থেকে নিন্মোক্ত দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়—

    1. কোরআনের শিক্ষাই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার ক্ষমতা রাখে, বা অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, মানুষকে অন্ধকারচ্ছন্ন চিন্তা চেতনা থেকে আলোকিত চিন্তা চেতনার পথে আনতে পারে।
    2. কোরআ’ন অবতীর্ণের আগে সমস্ত জাহেলী কর্মকাণ্ড যেমন— শির্‌ক, কুফর, মদ, জুয়া, ব্যভিচার, খারাপকাজ, উলঙ্গপনা, পর্দাহীনতা, বেহায়াপনা, গানবাজনা, রক্তপাত, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, চক্রান্ত, চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, মারামারি ইত্যাদিকে আল্লাহ্ অন্ধকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অথচ কোরআন অবতীর্ণের পরে উল্লেখিত পাপকাজসমূহ থেকে পাক পবিত্র হয়ে তাওহীদে (একত্ববাদে) বিশ্বাসী হয়ে নামায, রোযা, যাকাত, হজ্ব, আমানতদারী, ধর্মভীরুতা, সত্যবাদীতা, সহনশীলতা, কল্যাণকামিতা, আত্মত্যাগ, নেকী, আল্লাহভীতি, সততা, লজ্জাশীলতা, পর্দা ইত্যাদির ন্যায় উন্নত গুণাবলীকে আল্লাহ্ তা’য়ালা আলো বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    অতএব আলো এবং আলোকিত চিন্তা চেতনা শুধু তাই যা আল্লাহ তা’য়ালা আলো বলে আখ্যায়িত করেছেন, যদি সমস্ত পৃথিবীও ঐ আলোকে অন্ধকার বলে আখ্যায়িত করতে থাকে, তবুও তা আলো হিসেবেই থাকবে, অন্ধকার বলে বিবেচিত হবে না; আর যাকে আল্লাহ্ অন্ধকার বলেছেন তা অন্ধকার হিসেবেই থাকবে, যদিও সমস্ত পৃথিবী তাকে আলো বলতে শুরু করে, অবশ্য আলোকে অন্ধকার বলে বিবেচনাকারী এবং অন্ধকারকে আলো বলে বিবেচনাকারীরা নিজেরাই নিষ্ফল হবে।

    অতএব আমাদের এ দৃঢ় ঈমান আছে যে নারীকে পর্দা করে সমাজকে ফেতনা ফাসাদ থেকে রক্ষা করা, পুরুষকে নারীদের উপর কর্তৃত্বকারী হিসেবে মানা, পারিবারিক নিয়মকে আইনে পরিণত করা, ইসলামী দণ্ডবিধি আইন বাস্তবায়ন করা, সমাজকে মদ, ব্যভিচার, অন্যায়ের মত নিকৃষ্ট অপরাধ থেকে পাক পবিত্র করা, চোর এবং ডাকাত থেকে সমাজকে সংরক্ষণ করা, হত্যার বিনিময়ে হত্যার আইন বাস্তবায়ন করে, হত্যা এবং রক্তপাত দূর করা, একাধিক বিয়ে প্রথাকে মেনে নিয়ে সমাজকে গোপন প্রেম, বাড়ী থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া, আদালতের বিয়ের ন্যায় বেহায়া এবং অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করে, মিথ্যা অপবাদের আইন বাস্তবায়ন করে নারীকে সম্মান এবং তার সম্ভ্রম রক্ষা করা, ইসলামের দুশমন কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা স্বয়ং আলোকিত চিন্তা চেতনা।

  • আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষারত

    আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষারত

    إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ ٧١

     “তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমানদের অন্তর্ভুক্ত।” — (সূরা আ’রাফ-৭১)

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করছি তাঁর নিকট সাহায্য চাচ্ছি, তাঁর নিকট আমাদের পাপসমূহের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি, নিজের মনের কুপ্রবঞ্চনা এবং নিজের অপকর্মসমূহ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যাকে আল্লাহ্ হেদায়েত দেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারবে না, আর যাকে আল্লাহ্ পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ হেদায়েত দিতে পারে না। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত সত্য কোন মা’বুদ নেই, তিনি এক তাঁর কোন শরীক নেই, আর আমি আরও সাক্ষী দিচ্ছি মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।

    অতঃপর আল্লাহ্‌র বাণী:

    الر ۚ كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ

    অর্থ: “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে আনেন, পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।” (সূরা ইবরাহীম-১)

    অতএব আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত কুরআ’ন মাজীদের সমস্ত বিধি-বিধান অন্ধকার থেকে বের কারী এবং আলো দানকারী, বা আলোকিত চিন্তা দানকারী।

    অতএব, হে আমাদের রব আমরা একথার প্রতি ঈমান রাখি যে,

    • পর্দার বিধান একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা আহযাব-৫৩)
    • পুরুষদেরকে নারীদের উপর কর্তৃত্ব দেয়া একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা নিসা-৩৪)
    • ইসলামী দণ্ডবিধি আইনের প্রতি আমল করা একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা মায়েদা-৩৩, সূরা নূর-২,৪)
    • একাধিক বিয়ে করার বিধান আলোকিত চিন্তা (সূরা নিসা-৩৩)
    • হত্যার বদলে হত্যা একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা বাকারা-১৭৮)
    • ইহুদী নাসারাদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখার বিধান একটি আলোকিত বিধান (সূরা নিসা-১৪৪)
    • ইসলামের শত্রু কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বিধান একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা আনফাল-৬০)
    • গান-বাজনা হারাম হওয়ার বিধান আলোকিত চিন্তা (সূরা লোকমান-৬,৭)
    • দাড়ি রাখার বিধান একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা ত়-হ়া-৯৪)

    ধর্ম নিরপেক্ষতার পতাকাবাহীরা! বাক স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বীগণ! তোমাদের নিকট —

    • পর্দার বিধান পশ্চাদপদতার আলামত।
    • পুরুষদের নারীর উপর কর্তৃত্ববান করার বিধান নারী স্বাধীনতা বিরোধী।
    • ইসলামী দণ্ড বিধি আইন অমানবিক এবং অত্যাচারমূলক শাস্তি।
    • একাধিক বিয়ে করার বিধান নারীদের প্রতি যুলুম করা।
    • হত্যার বদলা হত্যা মানবতা বিরোধী।
    • ইহুদী নাসারাদের সাথে বন্ধুত্ব সম্মান ও আত্মতৃপ্তি।
    • কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সন্ত্রাসবাদ।
    • গান বাজনা মনের প্রশান্তি।
    • দাড়ি রাখা পশ্চাদপদতা।

    নিঃসন্দেহে আমাদের এবং তোমাদের মাঝে এ দ্বন্ধের সমাধান খুব শীঘ্রই হবে, যখন সূর্য এক মাইল দূরত্বে অবস্থান করবে, পৃথিবী আগুনের ন্যায় উত্তপ্ত হবে, আর প্রত্যেক মানুষ ঘামের মাঝে হাবুডুবু খাবে।

    • তোমরাও খালি পা এবং উলঙ্গ শরীরে থাকবে এবং আমরাও খালি পা ও উলঙ্গ শরীরে থাকব।
    • তোমরাও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াবে এবং আমরাও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াব।
    • তোমাদের কাছেও কোন অনুবাদক থাকবে না, আর আমাদের কাছেও কোন অনুবাদক থাকবে না।
    • তোমাদের কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না এবং আমাদেরও কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না।
    • তোমরাও কোন বেচাকেনা করতে পারবে না আর আমরাও না।
    • রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তোমাদের কাছেও থাকবে না এবং আমাদের কাছেও থাকবে না।
    • আদালত স্থাপিত হবে।
    • আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁর আসনে আসীন হবেন।
    • ফেরেশ্‌তাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবে।
    • নবীগণের সর্দার, নবীগণের ইমাম, সত্যবাদী, সম্মানিত, অনুগ্রহ পরায়ন, বিশ্বস্ত রাসূল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাক্ষ্য হবেন।
    • মামলা পেশ হবে … … এবং এরপরে!
    • আলোকিত চিন্তাধারার ধারক ও বাহক এবং পশ্চাদমুখী চিন্তাধারার ধারক ও বাহকদের মাঝে যথাযথ ফায়সালা করা হবে।
    • ফায়সালার পর তোমরা তোমাদের রাস্তা অবলম্বন করবে, আর আমরা আমাদের রাস্তা অবলম্বন করব।
    • অতএব ফাসসালার সময় আসা পর্যন্ত তোমরাও অপেক্ষা করতে থাক, আর আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করতে থাকি।

    إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ ٧١

     “তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমানদের অন্তর্ভুক্ত।” — (সূরা আ’রাফ-৭১)

    وصلى الله على نبينا محمد صلى الله عليه وسلم وآله واصحابه اجمعين

  • অনুবাদকের আরয

    অনুবাদকের আরয

    সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার জন্য যিনি মহাগ্রন্ত আল-ক়োরআ’নকে মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন, আর অসংখ্য দরূদ ও সালাম বর্ষিত বর্ষিত হোক ঐ মহামানবের প্রতি যার চরিত্র ছিল ক়োরআ’নের বাস্তব নমুনা। মূলতঃ আল-ক়োরআ’ন মানব জাতির জন্য একটি সংবিধান এবং তাদের মুক্তির দিশারী, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, এই আল-ক়োরআ’ন আজ বহু মুসলমানের নিকট শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ মাত্র, তাই তারা সময়ে সুযোগে আচার অনুষ্ঠানে বরকত স্বরূপ তা তেলাওয়াত করে থাকে। অথচ বাস্তবতা হল এই যে, এই মহাগ্রন্থকে আমলে এনে ইতিহাস স্বীকৃত জাহেলিয়াতের যুগের লোকেরা মহামানব মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ও সাল্লামের) স্বীকৃত সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিল, এমন কি এই ক়োরআ’ন অবতীর্ণের পনেরশ বছর পরেও বহু অমুসলিম এই আল-ক়োরআ’ন গবেষণা করে তাঁর সত্যতায় অভিভূত হয়ে শান্তির দ্বীন ইসলাম গ্রহণে নিজেকে ধন্য করছে, অথচ আমাদের অনেক মুসলমান আজ এই আল-ক়োরআ’নকে যথাযথভাবে আমলে না আনার কারণে তারা তাঁর যথাযথ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

    উর্দুভাষী সুলেখক জনাব ইকবাল কীলানী সাহেব তাঁর লিখিত ‘তালিমাত ক়োরআ’ন মাজীদ’ নামক গ্রন্থে আল-ক়োরআ’নের বিভিন্ন বিষয়সমূহকে দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে সুন্দর ভাবে আলোচনা করেছেন যা পাঠে একজন মানুষ আল-ক়োরআ’নের শিক্ষণীয় বিষয় সমূহকে সহজে বুঝতে পারবে এবং আল-ক়োরআ’ন অনুযায়ী জীবন গঠনে আগ্রহী হবে।

    আর এই মূল্যবান গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদের দায়িত্ব আমি নগন্যের উপর অর্পিত হলে, একাজে আমার কাঁচা হাত হওয়া সত্বেও আমি তার অনুবাদের কাজ শুরু করি এই আশায় যে, এই গ্রন্থ পাঠে বাংলাভাষী মুসলমান মহাগ্রন্থ আল-ক়োরআ’ন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান আহরণ করে যথাযথ আমলের মাধ্যমে তারা তাদের ইহকাল এবং পরকালে উপকৃত হবে, আর এই উসীলায় মহান আল্লাহ্ এই গোনাহগারের প্রতি সদয় হয়ে তাকে ক্ষমা করবেন।

    পরিশেষে সুহৃদ পাঠকবর্গের প্রতি এই আবেদন থাকল যে, এই গ্রন্থ পাঠান্তে কোন প্রকার ভুলভ্রান্তি তাদের দৃষ্টিগোচর হলে, আর তারা তা আমাকে অবগত করালে আমি পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করার জন্য চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্।

    ১৪/০৭/২০১০

    পি. ও. বক্স -৭৮৯৭ (৮২০)

    রিয়াদ – ১১১৫৯, কে. এস. এ.

    ফকীর ইলা আফভী রাব্বিহি

    আবদুল্লাহিল হাদী মু. ইউসুফ

    মোবাইল : ০৫০৪১৭৮৬৪৪

  • আল-কুরআনের শিক্ষা

    আল-কুরআনের শিক্ষা

    আল-কুরআ’নের শিক্ষা, উর্দু ভাষায় লিখিত তাফহীমুস্‌ সুন্নাহ সিরিজের ২২তম সংখ্যা। মূল লেখক মুহাম্মদ ইকবাল কীলানী, বাংলায় অনুবাদ করেছেন আবুদুল্লাহিল হাদী মুহাম্মদ ইউসুফ। গ্রন্থটির প্রকাশ করেছে ‘মাকতাবা বাইতুস্‌সালাম’, রিয়াদ সাউদী আরব।

    আল-কুরআনের শিক্ষা : বিষয় সূচী।

  • একুশের গল্প

    একুশের গল্প

    তপুকে আবার ফিরে পাবো, একথা ভুলেও ভাবিনি কোনদিন। তবু সে আবার ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে। ভাবতে অবাক লাগে চার বছর আগে যাকে হাইকোর্টের মোড়ে শেষবারের মতো দেখেছিলাম, যাকে জীবনে আর দেখবো বলে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি— সেই তপু ফিরে এসেছে। ও ফিরে আসার পর থেকে আমরা সবাই যেন কেমন একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। রাতে ভালো ঘুম হয় না। যদিও একটু আধটু তন্দ্রা আসে, তবু অন্ধকারে হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়লে গা হাত পা শিউরে ওঠে। ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়, লেপের নিচে দেহটা ঠক্‌ঠক্ করে কাঁপে।

    দিনের বেলা ওকে ঘিরে আমরা ছোটখাটো জটলা পাকাই।

    খবর পেয়ে অনেকেই দেখতে আসে ওকে। অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে ওরা। আমরা যে অবাক হই না তা নয়। আমাদের চোখেও বিস্ময় জাগে। দু’বছর ও আমাদের সাথে ছিলো। ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের খবরও আমরা রাখতাম। সত্যি কি অবাক কাণ্ড দেখতো, কে বলবে যে এ তপু। ওকে চেনাই যায় না। ওর মাকে ডাকো, আমি হলফ করে বলতে পারি, ওর মা-ও চিনতে পারবে না ওকে।

    চিনবে কি করে? জটলার একপাশ থেকে রাহাত বিজ্ঞের মতো বলে, চেনার কোন উপায় থাকলে তো চিনবে। এ অবস্থায় কেউ কাউকে চিনতে পারে না। বলে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আমরাও কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়ি ক্ষণিকের জন্য।

    অনেক কষ্টে ঠিকানা জোগাড় করে কাল সকালে রাহাতকে পাঠিয়েছিলাম, তপুর মা আর বউকে খবর দেবার জন্য।

    সারাদিন এখানে সেখানে পই পই করে ঘুরে বিকেলে যখন রাহাত ফিরে এসে খবর দিলো, ওদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তখন রীতিমত ভাবনায় পড়লাম আমরা। এখন কি করা যায় বল তো, ওদের একজনকেও পাওয়া গেল না? আমি চোখ তুলে তাকালাম রাহাতের দিকে।

    বিছানার উপর ধপাস করে বসে পড়ে রাহাত বললো, ওর মা মারা গেছে।

    মারা গেছে? আহা সেবার এখানে গড়াগড়ি দিয়ে কি কান্নাটাই না তপুর জন্যে কেঁদেছিলেন তিনি। ওঁর কান্না দেখে আমার নিজের চোখেই পানি এসে গিয়েছিলো।

    বউটার খবর?

    ওর কথা বলো না আর। রাহাত মুখ বাঁকালো। অন্য আর এক জায়গায় বিয়ে করেছে।

    সেকি! এর মধ্যেই বিয়ে করে ফেললো মেয়েটা? তপু ওকে কত ভালবাসতো। নাজিম বিড়বিড় করে উঠলো চাপা স্বরে।

    সানু বললো, বিয়ে করবে না তো কি সারা জীবন বিধবা হয়ে থাকবে নাকি মেয়েটা। বলে তপুর দিকে তাকালো সানু।

    আমরাও দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলাম ওর ওপর।

    সত্যি, কে বলবে এ চার বছর আগেকার সেই তপু, যার মুখে এক ঝলক হাসি আঠার মতো লেগে থাকতো সব সময়।

    কি হাসতেই না পারতো তপুটা। হাসি দিয়ে ঘরটাকে ভরিয়ে রাখতো সে। সে হাসি কোথায় গেল তপুর? আজ তার দিকে তাকাতে ভয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে আসে কেন?

    দু’বছর সে আমাদের সাথে ছিলো।

    আমরা ছিলাম তিনজন।

    আমি, তপু আর রাহাত।

    তপু ছিলো আমাদের মাঝে সবার চাইতে বয়সে ছোট। কিন্তু বয়সে ছোট হলে কি হবে, ও-ই ছিলো একমাত্র বিবাহিত।

    কলেজে ভর্তি হবার বছরখানেক পরে রেণুকে বিয়ে করে তপু। সম্পর্কে মেয়েটা আত্মীয়া হতো ওর। দোহারা গড়ন, ছিপছিপে কটি, আপেল রঙের মেয়েটা প্রায়ই ওর সাথে দেখা করতে আসতো এখানে। ও এলে আমরা চাঁদা তুলে চা আর মিষ্টি এনে খেতাম। আর গল্প গুজবে মেতে উঠতাম রীতিমত। তপু ছিল গল্পের রাজা। যেমন হাসতে পারতো ছেলেটা, তেমনি গল্প করার ব্যাপারেও ছিল ওস্তাদ।

    যখন ও গল্প করতে শুরু করতো, তখন আর কাউকে কথা বলার সুযোগ দিতো না। সেই যে লোকটার কথা তোমাদের বলছিলাম সেদিন। সেই হোঁৎকা মোটা লোকটা, ক্যাপিটালে যার সাথে আলাপ হয়েছিল, ওই যে, লোকটা বলছিলো সে বার্নাডশ’ হবে, পরশু রাতে মারা গেছে একটা ছ্যাকরা গাড়ির তলায় পড়ে। … আর সেই মেয়েটা, যে ওকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছিলো … … ও মারা যাবার পরের দিন বিলেতি সাহেবের সাথে পালিয়ে গেছে … রুণী মেয়েটার খবর জানতো! সে কি রুণীকে চিনতে পারছো না? শহরের সেরা নাচিয়ে ছিলো, আজকাল অবশ্য রাজনীতি করছে। সেদিন দেখা হল রাস্তায়। আগে তো পাটকাঠি ছিলো। এখন বেশ মোটাসোটা হয়েছে। দেখা হতেই রেস্তোরায় নিয়ে খাওয়ালো। বিয়ে করেছি শুনে জিজ্ঞেস করলো, বউ দেখতে কেমন?

    হয়েছে, এবার তুমি এসো। উঃ, কথা বলতে শুরু করলে যেন আর ফুরোতে চায় না; রাহাত থামিয়ে দিতে চেষ্টা করতো ওকে!

    রেণু বলতো, আর বলবেন না, এত বকতে পারে—।

    বলে বিরক্তিতে না লজ্জায় লাল হয়ে উঠতো সে।

    তবু থামতো না তপু। এক গাল হাসি ছড়িয়ে আবার পরম্পরাহীন কথার তুবড়ি ছোটাত সে, থাকগে অন্যের কথা যখন তোমরা শুনতে চাও না নিজের কথাই বলি। ভাবছি, ডাক্তারিটা পাশ করতে পারলে এ শহরে আর থাকবো না, গাঁয়ে চলে যাবো। ছোট্ট একটা ঘর বাঁধবো সেখানে।

    আর, তোমরা দেখো, আমার ঘরে কোন জাঁকজমক থাকবে না। একেবারে সাধারণ, হাঁ, একটা ছোট্ট ডিসপেনসারি, আর কিছু না। মাঝে মাঝে এমনি স্বপ্ন দেখায় অভ্যস্ত ছিল তপু।

    এককালে মিলিটারিতে যাবার সখ ছিল ওর।

    কিন্তু বরাত মন্দ। ছিলো জন্মখোঁড়া। ডান পা থেকে বাঁ পাটা ইঞ্চি দু’য়েক ছোট ছিলো ওর। তবে বাঁ জুতোর হিলটা একটু উঁচু করে তৈরি করায় দূর থেকে ওর খুঁড়িয়ে চলাটা চোখে পড়তো না সবার।

    আমাদের জীবনটা ছিলো যান্ত্রিক।

    কাক ডাকা ভোরে বিছানা ছেড়ে উঠতাম আমরা। তপু উঠতো সবার আগে। ও জাগাতো আমাদের দু’জনকে, ওঠো, ভোর হয়ে গেছে দেখছো না? অমন মোষের মতো ঘুমোচ্ছ কেন, ওঠো। গায়ের উপর থেকে লেপটা টেনে ফেলে দিয়ে জোর করে আমাদের ঘুম ভাঙাতো তপু। মাথার কাছের জানালাটা খুলে দিয়ে বলতো, দেখ, বাইরে কেমন মিষ্টি রোদ উঠেছে। আর ঘুমিয়ো না ওঠো।

    আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে, নিজ হাতে চা তৈরি করতো তপু।

    চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে আমরা বই খুলে বসতাম। তারপর দশটা নাগাদ স্নানাহার সেরে ক্লাশে যেতাম আমরা।

    বিকেলটা কাটতো বেশ আমোদ ফুর্তিতে। কোনদিন ইস্কাটনে বেড়াতে যেতাম আমরা। কোনদিন বুড়িগঙ্গার ওপারে। আর যেদিন রেণু আমাদের সাথে থাকতো, সেদিন আজিমপুরার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দূর গাঁয়ের ভেতরে হারিয়ে যেতাম আমরা।

    রেণু মাঝে মাঝে আমদের জন্য ডালমুট ভেজে আনতো বাসা থেকে। গেঁয়ো পথে হাঁটতে হাঁটতে মুড়মুড় করে ডালমুট চিবোতাম আমরা। তপু বলতো, দেখো রাহাত আমার মাঝে মাঝে কি মনে হয় জান?

    কি?

    এই যে আঁকাবাঁকা লালমাটির পথ, এ পথের যদি শেষ না হতো কোনদিন। অনন্তকাল ধরে যদি এমনি চলতে পারতাম আমরা।

    একি, তুমি আবার কবি হলে কবে থেকে? ভ্রূ জোড়া কুঁচকে হঠাৎ প্রশ্ন করতো রাহাত।

    না না কবি হতে যাব কেন। ইতস্তত করে বলতো তপু। কেন যেন মনে হয়….।

    স্বপ্নালু চোখে স্বপ্ন নামতো তার।

    আমরা ছিলাম তিনজন।

    আমি, তপু আর রাহাত।

    দিনগুলো বেশ কাটছিলো আমাদের। কিন্তু অকস্মাৎ ছেদ পড়লো। হোস্টেলের বাইরে, সবুজ ছড়ানো মাঠটাতে অগুনতি লোকের ভিড় জমেছিলো সেদিন। ভোর হতে ক্রুদ্ধ ছেলেবুড়োরা এসে জমায়েত হয়েছিলো সেখানে। কারো হাতে প্ল্যাকার্ড, কারো হাতে শ্লোগান দেবার চুঙ্গো, আবার কারো হাতে লম্বা লাঠিটায় ঝোলান কয়েকটা রক্তাক্ত জামা। তর্জনি দিয়ে ওরা জামাগুলো দেখাচ্ছিলো, আর শুকনো ঠোঁট নেড়ে নেড়ে এলোমেলো কি যেন বলছিলো নিজেদের মধ্যে।

    তপু হাত ধরে টান দিলো আমার, এসো।

    কোথায়?

    কেন, ওদের সাথে।

    চেয়ে দেখি, সমুদ্রগভীর জনতা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে।

    এসো।

    চলো।

    আমরা মিছিলে পা বাড়ালাম।

    একটু পরে পেছন ফিরে দেখি, রেণু হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের দিকে ছুটে আসছে।

    যা ভেবেছিলাম, দৌড়ে এসে তপুর হাত চেপে ধরলো রেণু। কোথায় যাচ্ছ তুমি। বাড়ি চলো। পাগল নাকি, তপু হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। তারপর বললো, তুমিও চলো না আমাদের সাথে। না, আমি যাবো না, বাড়ি চলো। রেণু আবার হাত ধরলো ওর।

    কি বাজে বকছেন। রাহাত রেগে উঠলো এবার। বাড়ি যেতে হয় আপনি যান। ও যাবে না।

    মুখটা ঘুরিয়ে রাহাতের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে এক পলক তাকালো রেণু। তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, দোহাই তোমার বাড়ি চলো। মা কাঁদছেন।

    বললাম তো যেতে পারবো না, যাও। হাতটা আবার ছাড়িয়ে নিলো তপু।

    রেণুর করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হলো। বললাম, কি ব্যাপার আপনি এমন করছেন কেন, ভয়ের কিছু নেই, আপনি বাড়ি যান।

    কিছুক্ষণ ইতস্তত করে টলটলে চোখ নিয়ে ফিরে গেলো রেণু।

    মিছিলটা তখন মেডিক্যালের গেট পেরিয়ে কার্জন হলের কাছাকাছি এসে গেছে।

    তিন জন আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম।

    রাহাত শ্লোগান দিচ্ছিলো।

    আর তপুর হাতে ছিলো একটি মস্ত প্ল্যাকার্ড। তার ওপর লাল কালিতে লেখা ছিলো, রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই।

    মিছিলটা হাইকোর্টের মোড়ে পৌঁছুতে অকস্মাৎ আমাদের সামনের লোকগুলো চিৎকার করে পালাতে লাগলো চারপাশে। ব্যাপার কি বুঝবার আগেই চেয়ে দেখি, প্ল্যাকার্ডসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তপু। কপালের ঠিক মাঝখানটায় গোল একটা গর্ত। আর সে গর্ত দিয়ে নির্ঝরের মতো রক্ত ঝরছে তার।

    তপু! রাহাত আর্তনাদ করে উঠলো।

    আমি তখন বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম।

    দু’জন মিলিটারি ছুটে এসে তপুর মৃতদেহটা তুলে নিয়ে গেলো আমাদের সামনে থেকে। আমরা এতটুকুও নড়লাম না, বাধা দিতে পারলাম না। দেহটা যেন বরফের মতো জমে গিয়েছিলো, তারপর আমিও ফিরে আসতে আসতে চিৎকার করে উঠলাম, রাহাত পালাও।

    কোথায়? হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো রাহাত।

    তারপর উভয়েই উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিলাম আমরা ইউনিভার্সিটির দিকে। সে রাতে, তপুর মা এসে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিলেন এখানে। রেণুও এসেছিলো, পলকহীন চোখজোড়া দিয়ে অশ্রুর ফোয়ারা নেমেছিলো তার। কিন্তু আমাদের দিকে একবারও তাকায়নি সে। একটা কথাও আমাদের সাথে বলেনি রেণু। রাহাত শুধু আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিলো, তপু না মরে আমি মরলেই ভাল হতো। কি অবাক কাণ্ড দেখতো, পাশাপাশি ছিলাম আমরা। অথচ আমাদের কিছু হলো না, গুলি লাগলো কিনা তপুর কপালে। কি অবাক কাণ্ড দেখতো।

    তারপর চারটে বছর কেটে গেছে। চার বছর পর তপুকে ফিরে পাবো, একথা ভুলেও ভাবিনি কোনদিন।

    তপু মারা যাবার পর রেণু এসে একদিন মালপত্রগুলো সব নিয়ে গেলো ওর। দুটো স্যুটকেস একটা বইয়ের ট্রাঙ্ক, আর একটা বেডিং। সেদিনও মুখ ভার করে ছিলো রেণু।

    কথা বলেনি আমাদের সাথে। শুধু রাহাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, ওর একটা গরম কোট ছিলো না, কোটটা কোথায়?

    ও, ওটা আমার স্যুটকেসে। ধীরে কোটটা বের করে দিয়েছিলো রাহাত। এরপর দিন কয়েক তপুর সিটটা খালি পড়ে ছিলো। মাঝে মাঝে রাত শেষ হয়ে এলে আমাদের মনে হতো, কে যেন গায়ে হাত দিয়ে ডাকছে আমাদের।

    ওঠো, আর ঘুমিও না, ওঠো।

    চোখ মেলে কাউকে দেখতে পেতাম না, শুধু ওর শূন্য বিছানার দিকে তাকিয়ে মনটা ব্যথায় ভরে উঠতো। তারপর একদিন তপুর সিটে নতুন ছেলে এলো একটা। সে ছেলেটা বছর তিনেক ছিলো।

    তাররপর এলো আর একজন। আমাদের নতুন রুমমেট বেশ হাসিখুশি ভরা মুখ।

    সেদিন সকালে বিছানায় বসে? এনাটমি’র পাতা উল্টাচ্ছিলো সে। তার চৌকির নিচে একটা ঝুড়িতে রাখা ‘স্কেলিটনের ‘স্কাল’টা বের করে দেখছিলো আর বইয়ের সাথে মিলিয়ে পড়ছিলো সে। তারপর এক সময় হঠাৎ রাহাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, রাহাত সাহেব, একটু দেখুন তো, আমার ‘স্কালে’র কপালের মাঝখানটায় একটা গর্ত কেন?

    কি বললে? চমকে উঠে উভয়েই তাকালাম ওর দিকে।

    রাহাত উঠে গিয়ে ‘স্কাল’টা তুলে নিলো হাতে। ঝুঁকে পড়ে সে দেখতে লাগলো অবাক হয়ে। হাঁ, কপালের মাঝখানটায় গোল একটা ফুটো, রাহাত তাকালো আমার দিকে, চোখের ভাষা বুঝতে ভুল হলো না আমার। বিড়বিড় করে বললাম, বাঁ পায়ের হাড়টা দু’ইঞ্চি ছোট ছিলো ওর।

    কথাটা শেষ না হতেই ঝুড়ি থেকে হাড়গুলো তুলে নিলো রাহাত। হাতজোড়া ঠক্‌ঠক্‌ করে কাঁপছিলো ওর। একটু পরে উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে বললো বাঁ পায়ের টিবিয়া ফেবুলাটা দু’ইঞ্চি ছোট। দেখো, দেখো।

    উত্তেজনায় আমিও কাঁপছিলাম।

    ক্ষণকাল পরে ‘স্কাল’টা দু’হাতে তুলে ধরে রাহাত বললো, তপু।

    বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো ওর।

  • ম্যাসাকার

    ম্যাসাকার

    ওরা আমার কি ছিল? বন্ধু-বান্ধব? কিছুই নয়, তবু ওদের স্মৃতি আমার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে প্রাণহীন করে তুলেছে কেন? মানুষের মৃত্যু! সেতো এক চিরন্তন সত্য। মৃত্যু আছে বলেই সৃষ্টির প্রয়োজন আছে। আবার নব নব সৃষ্টিই মানুষকে যুগে যুগে উৎসাহ, উদ্দীপনা আর প্রেরণা দিয়ে এসেছে।

    কিন্তু তবুও ওদের মৃত্যুতে আমি এত ব্যথাতুর কেন? কত শত দুর্ভিক্ষ, মহামারী আমি ডিঙ্গিয়ে এসেছি, কত লাখো হাজার মাংসহীন দেহকে রাস্তার আনাচে-কানাচে পড়ে থাকতে দেখেছি, দু’মুঠো ভাতের অভাবে, দিনের পর দিন তিলে তিলে শুকিয়ে শুকিয়ে মানুষ কেমন করে মরে, তাও আমি দেখেছি। দীর্ঘশ্বাসের অগ্নিকুণ্ডে দাঁড়িয়ে আমি কতবার প্রত্যক্ষ করেছি— আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া পড়শী অনেকেই চলে যাচ্ছে মৃত্যুপথের মিছিল ধরে, চোখের জল চোখে শুকিয়ে; নতুনকে আলিঙ্গন করে নিয়েছি, পুরাতনের সমাধির পাশে বসে, জীবনকে প্রাণহীন হতে দিইনি কিছুতেই। কিন্তু আজ আমি এত দুর্বল হয়ে পড়েছি কেন? যুদ্ধক্ষেত্রের এই বীভৎস রঙ্গমঞ্চে প্রতিটি সৈনিকের রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠেছে শত্রু সৈন্যের রক্ত পানেচ্ছায়। আমি এত নিস্তেজ কেন?

    অনেক কষ্ট করে কতগুলো ফুলের চারাগাছ সংগ্রহ করেছি, ওদের কবরের শিয়রে। যেখানে ক্রুশগুলো গাড়ানো আছে, আর এক পাশে পুঁতে দেব বলে। এ গাছগুলো একদিন বড় হবে। ওতে ফুল ফুটবে, তার সে ফুলগুলো এক একটা করে ঝরে পড়বে ওদের কবরের ওপর; ফুলের সুমিষ্ট গন্ধে কবরের মানুষগুলো সব জেগে উঠবে, ফুল ওদের শোনাবে শান্তির আগমন বাণী; ওদের বিক্ষুব্ধ আত্মা শান্তি পাবে, ওরা শান্তি পাবে। স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাত্রেও আজকের মতো ভীষণ শীত পড়েছিলো। গরমের দেশের লোক আমরা, এত শীত আমাদের সইবে কেন? দুটোর ওপর চারটে কম্বল চাপিয়েও বিছানায় শুয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছিলাম।

    ফ্রন্ট থেকে মাত্র অল্প কয়েক মাইল দূরে মিলিটারি হাসপাতালের ডাক্তার আমি। রাত্রে মাত্র চার ঘণ্টার বিশ্রাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে আসে। কিন্তু সেদিন এর ব্যতিক্রম হলো, ঘুম এলো না। নানা রকম এলোমেলো চিন্তা এসে মাথায় গিজ গিজ করতে লাগলো। রেডিয়াম ঘড়িতে স্পষ্ট দেখতে পেলাম একটা ঘণ্টা এর মধ্যেই কেটে গেছে। আর মাত্র তিনটে ঘণ্টা বাকি আছে, কিন্তু ঘুম এখনো এলো না। চমকে উঠলাম, ঘুম! আমি জানি, নিশ্চিত করে জানি, একজন ষোল বছরের কচি ছেলে আজ রাত ভোর হবার আগেই চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়বে। পৃথিবীর সমস্ত গোলা-বারুদ যদি একসাথে শব্দ করে ওঠে, তবুও তার সে ঘুম ভাঙবে না।

    যেদিন তাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন থেকেই জানতাম, ওর বাঁচবার কোন আশা নেই। সকরুণ দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকিয়ে ব্যথিত স্বরে বলেছিল— ডাক্তার, আমার বাঁচবার কি কোন আশা নেই, ডাক্তার! জানতাম, বুকের পাঁজরে গুলি লাগলে সে রোগীকে বাঁচানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না, তবুও তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম— ভয় করবার কিছু নেই, নিশ্চয়ই তুমি ভাল হয়ে যাবে।

    বেদনায় ভরা মুখখানা ওর আশার ক্ষীণ আলোকরশ্মিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল; কিন্তু পরক্ষণেই তা ম্লান হয়ে গেলো। যখন সে একটা অসহনীয় বেদনা অনুভব করলো বুকের নিচে, এক গ্লাস জল। ওর ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো, জল নিয়ে এলো নার্স, কিন্তু এক ফোঁটা জলও তার ভাগ্যে জুটলো না, গ্লাস ভরে গেলো উষ্ণ রক্তে, রক্ত বমন আরম্ভ হলো ওর, ভীত বিহ্বল চোখ দুটো বেয়ে এবার নামলো অশ্রুর বন্যা, কিছুতেই তাকে সান্ত্বনা দেওয়া গেলো না, বললাম— কেঁদো না জর্জ, কাঁদলে শরীর আরও খারাপ হয়ে যাবে।

    আমায় সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করো না ডাক্তার! আমি জানি, আমার বাঁচবার কোন আশা নেই, ক্ষুব্ধ অভিমানে ও চাপা আর্তনাদ করে উঠলো।

    ষোল বছরের এক কচি বালক। ফুল সবেমাত্র পাপড়ি মেলছিলো, ওর সম্মুখে ছিল আশা-আকাঙ্ক্ষা ভরা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কিন্তু— না ফুটতেই পাপড়ি ঝরে গেলো। পুওর জর্জ।

    উঃ। ওর কথাগুলো আজও বার বার আমার কানের ওপর মর্মর বেদনা সৃষ্টি করছে,— জানো ডাক্তার। এরা আমায় জোর করে আমার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে।

    কথা বলো না জর্জ। কথা বলা নিষেধ। কিন্তু আমার মানা সত্ত্বেও সে থামলো না স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, কথা বলতে ওর কষ্ট হচ্ছে, তবুও সে আপন মনে বলে চললো—হ্যাঁ, আমি নিশ্চয়ই মরে যাবো। আমার মা, ছোট ভাই-বোন, কাউকে আমি আর দেখবো না, কাউকে আমি আর দেখবো না। কান্নায় ওর গলার স্বর বন্ধ হয়ে এলো।

    ঘুম আর আসবে না জানি, যা একটু তন্দ্রা এসেছিল, তাও ছুটে গেলো, চিন্তা স্রোতের গতি পরিবর্তনের ধাক্কায়, গুলির শব্দে হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু যে দৃশ্যটা দেখলাম, সে দৃশ্য দেখে পাষাণেরও চোখে জল আসে।

    এডোয়ার্ড বলেছিলো নিজ হাতে সে তার জীবনের যবনিকা টেনে দেবে!

    যে বাঁচার ভেতর সার্থকতা নেই, যে জীবনের ভেতর এতটুকু মধুরতা নেই, সে জীবনের ঘানি টেনে কি লাভ ডাক্তার? বার বার আক্ষেপ করেছিলো এডোয়ার্ড। বেচারা তার দুটো চোখই হারিয়েছিলো, শুধু তাই নয়, মুখটা এমন কদাকার হয়ে গিয়েছিলো যে, দেখলে ভয় হতো। এক সময় সে যে খুব সুশ্ৰী ছিলো তা তার মুখের এক পাশেকার সুস্থ স্থানটুকু দেখলেই বোঝা যেতো। এডোয়ার্ড বলেছিলো, গত জুলাই মাসে ওর বিয়ে হবার কথা ছিলো ম্যারিয়ানার সাথে। ম্যারিয়ানা! রুদ্ধ হয়ে এলো এডোয়ার্ডের কন্ঠস্বর। লাজুক মেয়ে ম্যারিয়ানা, ছোটকাল থেকে এক সাথেই আমরা বড় হয়েছিলাম। জানালার বাইরে অন্ধ দৃষ্টি মেলে এডোয়ার্ড বললো, … … আমরা পরস্পরকে ভালবাসতাম। আমাদের গার্জেনরা তার যথোচিত মর্যাদা দিয়েছিলেন। আমাদের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে। বার কয়েক ঢোক গিললো এডোয়ার্ড, ডাক্তার, তুমি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছো, তখন আমাদের অন্তরে কেমন খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু— কিন্তু! দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সে। কিন্তু একি হলো ডাক্তার! আমার সে জীবন কোথায় গেলো? আমি জানি, আমার সে জীবন আর ফিরে আসবার নয়, সে আর ফিরে আসবে না। জর্জের মতো এডোয়ার্ড অল্পবয়স্ক ছিল না, তাই চোখের জলকে সে সামলে নিয়েছিলো।

    —যুদ্ধে এলে কেন? হঠাৎ প্রশ্ন করে বসেছিলাম।

    —হ্যাঁ যুদ্ধে কেন এলাম। মাথা নাড়তে নাড়তে আপন মনেই বললো সে। কিন্তু, তুমি ম্যারিয়ানার কথাটারই পুনরাবৃত্তি করলে ডাক্তার। ম্যারিয়ানাও বলেছিলো, কেন যুদ্ধে যাবে? যুদ্ধ করে তোমার কি লাভ? সে দিন প্রথম ম্যারিয়ানার চোখে জল দেখেছিলাম, ও ভীষণ কেঁদেছিল আর বলেছিল, যুদ্ধে যেয়ো না এডোয়ার্ড। যুদ্ধে আমাদের কোন দরকার নেই। কিন্তু ম্যারিয়ানা জানতো না যে, আমাদের সরকার সৈন্যবৃত্তি গ্রহণ করাটাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, যুদ্ধ করবার ইচ্ছা থাকুক কিংবা না থাকুক সবার গলায় একটা করে ব্রেনগান ঝুলিয়ে, যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়া চাই-ই। আজ বার বার মনে হচ্ছে, ম্যারিয়ানা ঠিকই বলেছিলো, যুদ্ধে আমাদের কি লাভ? বুলেটের সামনে, কুকুর বেড়ালের মতো মরা, তীব্র সেলের আঘাতে হাত পা আর চোখ হারিয়ে চিরতরে অকর্মণ্য হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি পুরস্কারই আমরা পেয়ে থাকি?

    একটুখানি চুপ করে এডোয়ার্ড আবার বললো— আমি জানি ম্যারিয়ানা আর আমায় গ্রহণ করবে না।

    —নিশ্চয়ই সে গ্রহণ করবে। আমি তাকে আশ্বাস দিলাম।

    —না-না-না, কি বলতে গিয়ে এডোয়ার্ড থেমে গেলো। তারপর অনেকক্ষণ কি চিন্তা করে ধীরে ধীরে বললো, হ্যাঁ, ম্যারিয়ানা হয়ত আমায় গ্রহণ করবে। কিন্তু নিশ্চয়ই সে আমায় নিয়ে সুখী হতে পারবে না, উঃ! আমি সব কিছু হারিয়েছি।

    তখন বিশ্বাস হয়নি এডোয়ার্ডের কথা; কিন্তু যখন রক্তাপ্লুত মেঝের ওপর তাকে রিভলবার হাতে পড়ে থাকতে দেখলাম, তখুনি বিশ্বাস করতে পারছিলাম যে, এডোয়ার্ড আত্মহত্যা করেছে। রিভলবারের গুলিতে মাথার হাড়গুলো চারদিকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

    এডোয়ার্ডের উত্তপ্ত মস্তিষ্কগুলোকে যখন মেঝের উপর থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হচ্ছিল, তখনি জর্জ প্রলাপ বকতে আরম্ভ করলো। এরা আমার বাবাকে মেরেছে, আমার চার ভাইকে ধরে এরা কামানের মুখে জুড়ে দিয়েছে, আমায়ও মারলো এবং এরা আমায় বাঁচতে দিলো না। এরা কাউকে বাঁচতে দেবে না। সবাইকে মেরে ছাড়বে এরা। সবাইকে।

    দুয়ারে মৃদু শব্দ হতে চমক ভাঙলো আমার। ঘড়িতে তিনটা বেজে গেছে। আমার পাওনা চারটে ঘণ্টার মধ্যে তিনটেই শেষ, এবার কে যেন দুয়ারে আরো জোরে শব্দ করলো, ওয়ার্ড ইনচার্জ-এর গলা শুনতে পেলাম, মিঃ চৌধুরী শীঘ্রি আসুন। চল্লিশ নম্বর সিটের রোগীটার অবস্থা ভীষণ খারাপ, ও আপনাকে খুঁজছে।

    চল্লিশ নম্বর সিট। হ্যাঁ, জর্জের সিট নম্বর চল্লিশ। কিন্তু, সে আমায় খুঁজছে কেন? দেরি নয়, আলেস্টারটা গায়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মৃত্যুর ক্রিয়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছে ওর উপর, নিস্তেজ হয়ে এসেছে ওর দেহ। ওর মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, অতি জোর করেই বুঝি ও চোখ দু’টিকে মেলে, একবার চারদিকে চাইলো। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই এক টুকরো ম্লান হাসি হেসে, ঈশারা করে কাছে ডাকলো। আমার মুখটাকে জোর করে টেনে নিয়ে ও-ওর মুখের উপর রাখলো। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মৃদু স্বরে কানে কানে বললো, আশীর্বাদ করো ডাক্তার। এরপর যেন এমন একটা দেশে জন্মাই, যেখানে ছোট ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে এমন করে বলি দেয়া হয় না। আশীর্বাদ করো ডাক্তার। আ…..। কথা বন্ধ হয়ে গেলো চিরতরে। আরও কি বলতে চেয়েছিলো ও, কিন্তু পারলো না। আশ্চর্য হলাম আমি, এ কয়টা কথা বলতেই কি সে এতক্ষণ মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বেঁচে ছিল? কিন্তু এ তো শুধু কথা নয়, ওর অন্তিম মুহূর্তের একটা বাসনা।

    এডোয়ার্ড আর জর্জের আত্মা চলে গেছে দূরে সমুদ্র পারে; তাদের ছোট্ট গ্রামগুলোতে, বিরাটকায় সমুদ্র পোতের গহ্বরে ভরে যেখান থেকে তাদের চালান দেয়া হয়েছিল, দেয়া হয়েছিল যুদ্ধের শিকার হিসেবে বধ্যভূমির দিকে। উঃ! হে বিধাতা, যদি সত্যিই তুমি থেকে থাক, তা’হলে ওদের ক্ষমা করো না। উগ্র সাম্রাজ্যলোলুপতায় যারা লাখো সহায়-সম্বলহীন নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করে। কোটি কোটি নারীকে বৈধব্যের বেশ পরিয়ে দুঃখের হোমানলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে। তাদের তুমি ক্ষমা করো না। বিস্ময়ে রোষান্বিত হয়ে উঠেছিল প্রশস্ত কপাল। অবাক হয়ে গিয়েছি বৃদ্ধ লুইয়ের কথায়।

    আর, রক্ত পিপাসুক, সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে নিজের দেশকে মুক্ত করার জন্য যাঁরা লড়াই করে, তাদের তুমি আরও শক্তি দাও প্রভু! তাদের তুমি আরও সাহস দাও।

    কিন্তু আর দেরি নয়। রাত্রি প্রভাত হয়ে এলো প্রায়। ঘণ্টা কয়েক মাত্র বাকি, যুদ্ধশ্রান্ত সৈনিকরা সব এখন বিশ্রাম নিচ্ছে, সকালের আক্রমণ আরো শক্তিশালী করবার জন্য।

    ফুলের চারা গাছগুলো হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম, বাইরের উন্মুক্ত প্রান্তরে। বাঁ দিকে একটু এগিয়ে গেলেই সৈন্যদের গোরস্থান, সেখানেই আছে জর্জ, এডোয়ার্ডের কবর ও লুইয়ের সমাধি।

    কে………ও? সরে গেলো জর্জ, এডোয়ার্ড আর লুইয়ের কবরের পাশ থেকে?

    আশেপাশে কোন জনবসতি নেই জানি, কিন্তু এ কিশোরী মেয়ে কোত্থেকে এলো এখানে?

    আমাকে কিছু ভাবতে না দিয়েই ও হাত দিয়ে আমায় কাছে ডাকলো। তারপর চোখ দিয়ে ইশারায় বললো, পিছে পিছে এসো। ও চলতে আরম্ভ করলো। কিন্তু, এক অপরিচিত মেয়ের পেছনে পেছনে আমি যাবো কেন?

    চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। ও ফিরে দাঁড়ালো, ধীরে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। উঃ কি তীব্র চাহনি। চোখ দুটো ঝলসে উঠলো আমার, চাপা আর্তনাদ করে উঠলাম, আসছি। তারপর পিছে পিছে এগিয়ে চললাম। একটা কথাও বললো না কিশোরী মেয়েটি। রীতিমত ভয় পেয়ে গেলাম। কোথায়? এবং কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাকে?

    কিসের পচা ভেপসা গন্ধ ভেসে এলো নাকে, হাত দিয়ে রুমালটা বের করে আনলাম পকেট থেকে, ক্রমশ আরও তীব্রতর হয়ে আসছে গন্ধটা। বমি করবার উপক্রম হলো আমার। তবুও এগিয়ে চললাম ধীরে ধীরে।

    এক সময়ে মেয়েটা পিছন ফিরে দাঁড়ালো। অবাক হলাম, একটু আগে যে চোখ দিয়ে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরিয়ে আসছিলো এখন সে চোখ দুটোকে কত শান্ত, স্নিগ্ধ আর আবেগপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, তুমি এখানে কি কাজ করো? মেয়েটির গলার স্বর আমার কানে সেতারের ঝঙ্কার দিয়ে গেলো, বিস্ময়ে কপালের রেখাগুলো কুঁচকে এলো আমার। কে……এ নারী। সাধারণ মহিলা না দেবী? মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম।

    —আমি এখানে ডাক্তারী করি।

    —ডাক্তারী করো? আমাকে ডাক্তার বলে মেয়েটির যেন বিশ্বাস হলো না, এমনি ভাব করলো সে, তারপর বললো—

    —ডাক্তার হয়ে তুমি এ গন্ধটা কিসের বলতে পারছো না?

    —হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। নাকের উপর থেকে রুমালটা সরিয়ে নিয়ে ভালো করে গন্ধটা পরীক্ষা করে দেখলাম আমি, তারপর বললাম, নিশ্চয়ই কোন জন্তু জানোয়ার মরে পচে আছে।

    হাঃ! হাঃ! হাঃ! মেয়েটির বিকট হাসিতে শিউরে উঠলাম আমি, মনে হলো যেন রূপকথার কোন এক রাক্ষুসে মূলোর মতো দাঁত বের করে আমাকে ব্যঙ্গ করলো। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো, কতগুলো জন্তু জানোয়ার ওখানে মরে পচে আছে। ভ্রূ কুঁচকে কথা কয়টি বলে, এক অদ্ভূত বিজাতীয় হাসি টানলো মেয়েটি। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা আক্রোশে বার বার উচ্চারণ করলো সে, জানোয়ার! জানোয়ার! তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। হাঃ! হাঃ! হাঃ! পূর্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটি আবার তাকালো আমার দিকে। ভয়ে কাঠ হয়ে এলো সমস্ত শরীর। একি সেই শান্ত স্নিগ্ধ নারীমূর্তি। না এক জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড!

    হ্যাঁ, ওরা জানোয়ারই তো! নইলে এমন করে মরবে কেন? মেয়েটি আবার বললো। এতক্ষণে খেয়াল ভাঙলো আমার। কোথায় চলেছি আমি? কোন্ মরীচিকার পথে? ফিরে দাড়ালাম আমি, কিন্তু এগোতে পারলাম না এক পা-ও। পেছন থেকে ডাক এলো, ডাক্তার কি অদ্ভুত করুণায় ভেজা সেই আহ্বান। তুমি বড্ড অস্বস্তি বোধ করছো, নয় কি ডাক্তার? কিন্তু তোমায় আমার বড্ড প্রয়োজন আছে ডাক্তার।

    মেয়েটির চোখে অসংখ্য অনুরোধ।

    সামনে এগিয়ে চলতে চলতে মেয়েটি আবার বললো, ওই যে, ওই দেখ ডাক্তার! জানোয়ারগুলো কেমন করে পড়ে আছে।

    শিউরে উঠলাম আমি। সামনে যতদূর দেখা যায়, শুধু মৃতের স্তূপ। কোন এক সময় হয়তো এরা মানুষ ছিলো, কিন্তু, সঙ্গীনের খোঁচায় আর বুলেটের আঘাতে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমন বিকৃতি লাভ করেছে যে ওদের মানুষ বলে ভাবা দুঃসাধ্য।

    হঠাৎ মনে পড়ে গেলো, হাঃ! হাঃ হাঃ! সেই বিকট হাসি, মেজর কলিনসের দাঁত বের করা সেই প্রবল অট্টহাসি —হাঃ! হাঃ! হাঃ! আর টেবিলে চপেটাঘাত করে বলা সেই কথাগুলো—Struggle for existence। বাঁচবার জন্য আমরা সংগ্রাম করে যাবো! আর যত পারবো শত্রুদের হত্যা করবো। মানুষের কোন প্রয়োজন নেই আমাদের। মানুষ চাই না আমরা। আমরা, চাই মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোলিয়াম খনিগুলো। সোনা ফলানো শস্যভূমি আর বড় বড় কারখানাগুলো, আর চীন ভারতের মতো কলোনিগুলো, যেখানে আমরা আমাদের সমস্ত রদ্দি মালগুলো চালাতে পারবো। তার জন্য প্রয়োজন হলে আমরা রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেবো ওদের ঘরে ঘরে। এটম বোম মেরে নিশ্চিহ্ন করে দেব ওদের। আর মেশিন গান দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবো, ওদের শান্তির কপোতকে।

    কোন্‌ পাপিষ্ঠরা এ নিষ্পাপ মানুষগুলোকে এমন করে হত্যা করেছে? নিজের অজ্ঞাতসারেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো কথা কয়টি।

    —কি বললে ডাক্তার! মেয়েটি চকিতে আমার দিকে ফিরে চাইলো। তুমি ওদের পাপিষ্ঠ বললে? কিন্তু ওরা এ কথা শুনলে তোমাকেও এমনি করে মারবে। এরা তোমার চেয়েও অতি সামান্য কথা বলেছিলো, এরা শুধু বলেছিল আমরা যুদ্ধ চাই না। এ না চাওয়াটাই এদের কাল হয়েছে, ওরা এদের এক একটা করে ধরে এনে এখানে জড়ো করলো; আর নির্বিবাদে টিপে দিল মেশিন গানের ট্রিগার।

    কিছুক্ষণ চুপ রইলো মেয়েটি। দূর সমুদ্রের বাতাসে ওর চুলগুলো উড়তে আরম্ভ করেছে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট দুটোকে কামড়িয়ে ধরে, পায়ের নিচেকার রক্তে ভেজা মাটির দিকে চোখ দুটো নামিয়ে কি যেন ভাবলো, তারপর এক সময়ে আবার বলতে আরম্ভ করলো, কিন্তু কেন? কেন আমরা যুদ্ধ করবো? ওরাওতো আমাদের মা, ভাই, বোনের মত, ওদেরো ছেলেমেয়ে আছে, বাড়িতে সুন্দর ফুটফুটে বউ আছে, আরো আছে আত্মীয় পরিজন। ওদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে, সাধ, স্বপ্ন আছে, যেমনটি আমাদের আছে, মানুষের কল্পিত একটা সীমারেখার এপারে, ওপারে বলেই কি আমরা পরস্পর শত্রু। তুমিই বলো ডাক্তার! সভ্যতার একি নিষ্ঠুর পরিহাস। মানুষকে সে মানুষের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য প্ররোচণা দেয়।

    আবার কিছুক্ষণ থামলো মেয়েটি, দূরে পূর্বাকাশে শুকতারাটা জ্বল জ্বল করছে, মেয়েটি একবার সে দিকে ফিরে চাইলো, তারপর ক্ষুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যর্থতার তীব্র হুতাশনে ভেজা কণ্ঠে বললো, জীবনটা এ রকম হলো কেন ডাক্তার? কত স্বপ্ন ছিল আমার। যা নারীর চিরন্তন স্বপ্ন, একটা সুন্দর সুঠাম স্বামী, ফুটফুটে স্বাস্থ্যবান ছেলে, আর ফুর্তির জোয়ারে ঘেরা ছোট্ট একটা ঘর। কিন্তু একি হলো ডাক্তার? একি হল? যুদ্ধ আমাদের একি সর্বনাশ করলো। টপ টপ করে জল পড়ছিলো ওর চোখ দিয়ে। সান্ত্বনা দেবার কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না— দেখ, দেখ ডাক্তার! ওই দু’বছরের ছেলেটি, সে ওদের কাছে কি অপরাধ করেছিলো, যার জন্য এ ক্ষুদ্র দেহটাকে ওরা বুলেটের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে। দু’হাত দিয়ে চোখ ঢাকলাম, এ দৃশ্য দেখবার নয়, কিছুতেই নয়।

    এই মুহূর্তে আট বছর আগেকার আর একটা ছবি, পাশাপাশি ভেসে উঠলো আমার চোখের সামনে।

    পথে পথে মোড়ে মোড়ে আর রাস্তার আনাচে-কানাচে বসে বসে ঠুকছে, রক্ত মাংসহীন শবের দল, এক নয় দুই নয় হাজার হাজার। পথের কুকুর আর আকাশের শকুনদের ভোজসভা বসেছে নর্দমার পাশে। আধমরা মানুষগুলোকে টানা-হেচড়া করে মহা-উল্লাসে ভক্ষণ করছে ওরা। দ্বিতীয় মহাসমর। আর দুর্ভিক্ষ জর্জরিত সোনার বাংলা, চারদিকে শুধু হাহাকার, অন্ন নেই। বস্ত্র নেই! নেই! নেই! কিছু নেই! শুধু আছে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, আর অভাব অনটন।

    বলতে না বলতেই বাজার থেকে চালডাল সবকিছু গেলো অদৃশ্য হয়ে, আর হু হু করে বেড়ে গেলো জিনিসপত্রের দর। কালকের দু’ পয়সার পাউরুটি রাত না পোহাতেই হয়ে গেলো দু’আনা। তারপর চার আনা। পাঁচ টাকা মণের চাল তা কিনা চোখের পলক না ফেলতেই গিয়ে ঠেকলো পঞ্চাশের কোঠায়।

    চিতার পর চিতা জ্বলে উঠলো সোনা ফলানো দেশের পল্লীতে পল্লীতে, মাটি খুঁড়ে কবর দেবার অবসর কই? খরস্রোতা নদীগুলোও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, মরা টানতে টানতে।

    শান্তিপ্রিয় মানুষ সব ভীত, ত্রস্ত এই বুঝি সাইরেন বাজবে, আর সাথে সাথে আরম্ভ হবে নরহত্যা যজ্ঞ। এক মুহূর্তে বুঝি ধ্বংস হয়ে যাবে মানুষের বহু কষ্টে গড়া ওই সুন্দর শহর, বহু মূল্যবান মিউজিয়াম আর বহু সাধনার পর সৃষ্ট ওই বিশাল পাঠাগার।

    এই বুঝি পুড়ে ছাই হয়ে গেলো কৃষকের রক্ত দিয়ে বোনা পাটের গাছগুলো, আর শ্রমিকের একমাত্র মাথা গুঁজবার সম্বল খোলার ঘরটি। বহু কথা, বহু ছবি, এক নিমেষে, চলচ্চিত্রের মত রেখাপাত করে গেলো আমার মানসপটে |

    গরিব চাষী রহিম শেখের চোখে ঘুম নেই। ঘুম নেই ওর লিকলিকে বৌটির চোখে, আর অবলা মেয়েটির চোখে, পেটের অশান্ত পোকাগুলোর তীব্র দংশনে ছটফট করছে ওরা, ঘুম কি করে আসবে।

    ইজ্জত গেল! ইজ্জত গেল ওদের। মান-সম্মান নিয়ে বাঁচা বুঝি দায় হয়ে পড়লো এবার। শিকারি কুকুরের মত ওঁত পেতে আছে গোরা সৈন্যগুলো সব। বদ্ধ দোরের আড়াল থেকে দুরু দুরু বুকে কাঁপছে গ্রাম্য তরুণীরা। মাতৃময়ী বাঙ্গালি নারীর দেহ নিয়ে চারদিকে চলছে ছিনিমিনি খেলা, অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানরা সব ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। আঁস্তাকুড়ের ছাইয়ের গাদায়, শহরের নর্দমায়, আর জলপচা খানা ডোবায়।

    এক হাত কাপড়। শুধু এক হাত কাপড় আর এক মুঠো ভাতের জন্য ওরা বিক্রি করে দিচ্ছে ওদের আপন পেটের ছেলেমেয়েকে আর কলমা পড়ে বিয়ে করা বৌকে।

    কি একটা অদ্ভুত পরিবর্তন। শুধু একটা মহাসমর। আর মানুষগুলোকে পৌঁছিয়ে দিয়ে এলো আদিম যুগের নরখাদকের দেশে।

    জানো ডাক্তার? মেয়েটির গলার স্বরে হঠাৎ চিন্তার স্রোতটা মাঝপথেই বাধাপ্রাপ্ত হলো, চেয়ে দেখলাম মেয়েটি আবার বলতে আরম্ভ করেছে— এ পৃথিবীতে বিচার বলে কিছু নেই। বিচার যদি থাকতো, তাহলে এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অপরাধীদের কেউ বিচার করলো না কেন? ওদের রচিত আইনে আছে, প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ, যার আশ্রয় নিয়ে ওরা দৈনন্দিন কত নিরাপরাধীকে ফাঁসে ঝুলিয়ে মারে। কিন্তু ওদের বেলায় এ আইন কোথায় গেল? তুমিই বল ডাক্তার! পৃথিবীর ইতিহাসে এতবড় হত্যাকাণ্ড আর কোনদিন ঘটেছিল কি? দেখো, সেই খুনী আসামীদের মানুষগুলো সব মাথায় তুলে নাচছে, গলায় মালা পরিয়ে বলছে— পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বীর! অদ্বিতীয় মহামানব।

    আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো ও, বাতাসের মৃদু প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোন শব্দ নেই, দূরে ফ্রন্টের সৈন্যদের ঘুম আরো ঘনীভূত হয়ে এসেছে, ভোরের হিমেল হাওয়ার মৃদু পরশে।

    ডাক্তার। আবার ওর কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, তোমার কাজের খুব ক্ষতি করে ফেললাম ডাক্তার। কিছু মনে করো না, ভোর হয়ে এলো প্রায়। দেখছ না। আকাশের তারাগুলো সব একে একে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে?

    আমি চুপ, ও আবার বললো— আচ্ছা ডাক্তার, বর্তমানে পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাধি কোন্‌টা বলতে পারো?

    হঠাৎ এ প্রশ্নের হেতু? নিজের মনকেই নিজে প্রশ্ন করলাম প্রথমে, তারপর উত্তর দিলাম— হ্যাঁ, প্লেগ, যার দ্বারা আক্রান্ত হলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মানুষ মারা যায়!

    —অদ্ভুত কথা শুনালে ডাক্তার। ভ্রূজোড়া কপালে উঠে এলো মেয়েটির। প্লেগ! প্লেগ একটা রোগ তা জানি, সে রোগের ঔষধ আবিষ্কার করবার জন্যও তোমরা অনেক চেষ্টা করছো। কিন্তু আশ্চর্য ডাক্তার, যুদ্ধ নামক যে ব্যাধিটা ঘণ্টায় হাজার হাজার মানুষের জীবন নাশ করে চলেছে, তার প্রতিরোধের জন্য তোমরা কি করছো? তোমরা রোগের চিকিৎসা করো, একটা মানুষকে বাঁচাবার জন্য তোমাদের কত সাধ্য সাধনা, কত সংগ্রাম। কিন্তু লাখো মানুষের মৃত্যুকে তোমরা নির্লিপ্তের মতো উপেক্ষা করে যাচ্ছো কেন?

    শুধু বিস্মিত হলাম না, অবাকও হলাম, এ নারী বলে কি?

    ও আবার বললো— একটা কাজ করতে পারবে ডাক্তার। একটা মহৎ কাজ।

    মুখ ফুটে কিছু বলতে হলো না আমার চোখ দুটোই জানিয়ে দিল— কি কাজ, আগে সেটাই বলো, পারিতো নিশ্চয়ই করবো।

    —ভয় পেয়ো না ডাক্তার। তোমায় আমি এমন কোন কাজের ভার দেবো না, যা তুমি বইতে পারবে না। ও এবার আমার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। আমি অবাক হলাম, ওর চোখের পলক পড়ে না কেন? ও বলতে আরম্ভ করলো— তোমায় আমি বলবো না যে, তুমি যুদ্ধটা থামিয়ে দাও, শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাও। কারণ তা তোমার একার কাজ নয়। তুমি একা তা পারবে না।

    ওর দৃষ্টি তখন দূর দিগন্তের সীমারেখার দিকে প্রসারিত। চোখের তারায় তারায় স্ফুলিঙ্গ দেদীপ্যমান। ও আবার বলে চললো— কিন্তু একটা কথা জানো ডাক্তার? মাটির মানুষগুলো নিশ্চয়ই একদিন জাগবে। আর শয়তানদের মুখোশ খুলে ফেলবে তারা। তাদের জাগরণের দুর্বার স্রোতে কোথায় ভেসে যাবে যুদ্ধের দালালরা আর অত্যাচারী ধনকুবেররা তখন একটা নূতন পৃথিবীর সৃষ্টি হবে, যেখানে দুঃখ, দুর্দশা অভাব অনটন বলে কিছু থাকবে না, মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ, এত হিংসা-বিদ্বেষ, সব কিছুর অবসান হবে।

    আর পৃথিবীতে স্বর্গের প্রতিষ্ঠা হবে, নয় কি ডাক্তার।

    —কি কাজ তা তো এখনো বললে না তুমি। ওর কথার মাঝখানেই বাধ দিলাম। যদিও ওর কথাগুলো বাঁচবার উদ্দীপনা আর নূতন সৃষ্টির প্রেরণা দিচ্ছিল আমাকে। কিন্তু সময় বড্ড কম।

    —হ্যাঁ ডাক্তার। কাজের কথাটাই বলবো এবার তোমায়। মেয়েটি এবার ডান দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, তারপর সামনে একটা ঝোপের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে বললো— ওই যে ডাক্তার, চেয়ে দেখ, গাছের আড়ালে একটা দালানের ভাঙ্গা কার্নিশ দেখা যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছ না? ও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে, হ্যাঁ, আবছা দেখতে পাচ্ছি। আমি সায় দিলাম।

    তোমাকে সেখানে যেতে হবে ডাক্তার।

    কিন্তু কেন?

    আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এক অদ্ভুত হাসি খেলে গেলো মেয়েটির দু’ঠোঁটের মাঝপথ দিয়ে, আমি শপথ করে বলতে পারি, অমন ব্যথাতুর হাসি আমার জীবনে আমি কাউকে হাসতে দেখিনি।

    বললো, যাও ডাক্তার! নিজ চোখে দেখবে।

    —কি ভাবছো ডাক্তার? আমার অন্যমনস্ক মুখের দিকে তাকিয়ে ও আবার প্রশ্ন করলো।

    —হুঁ!—কই কিছু না তো!

    হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তুমি কিছু ভাবছিলে।

    —ভাবছিলাম? ও … …. … হ্যাঁ, ভাবছিলাম তোমার কথা।

    … … … আমার কথা?

    হ্যাঁ, ভাবছিলাম পৃথিবীর প্রত্যেকটা লোক যদি তোমার মতো হতো, তাহলে কি সুন্দরই না হতো এ পৃথিবীটা।

    —ও … … …! মেয়েটি এবার আমার দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে তাকালো, অন্ধকার দূর হয়ে ফর্সা হয়ে আসছে আকাশ। আর দাঁড়ালাম না সেখানে, এগিয়ে চললাম সেই ভাঙা কার্নিশটা লক্ষ্য করে। কিছুদূর এসে একবার পিছন দিকে ফিরে চাইলাম, ও দাঁড়িয়ে আছে, নিথর নিষ্কম্প, পলকহীন চাহনি, তারপর গুনে গুনে আরও গোটা পঞ্চাশেক পদক্ষেপ সামনে এসে আর একবার ফিরে চাই, নেই ও নেই, ওর চিহ্নও নেই।

    কাদের পদশব্দ। মাটির ওপর ভারি বুট জুতার আওয়াজ না? এক নয়, অনেক। গাছের আড়ালে আত্মগোপন করে দাঁড়ালাম, থাকি ইউনিফর্ম পরা সৈন্যগুলো হুড়োহুড়ি আর ধাক্কাধাক্কি করে ঘরের ভেতর গিয়ে ঢুকলো, তারপর … … … অনেকক্ষণ … … … অনেক উদ্বেগপূর্ণ মুহূর্ত কেটে গেলো, অপেক্ষায় আছি, ওরা কখন বেরুবে। হ্যাঁ, এক সময় ওরা বেরিয়ে এলো, এলোমেলো উস্কখুস্ক চুল, খেলাহীন পদবিক্ষেপে ওরা একের গায়ের উপর অন্যে হেলে পড়লো আর মাঝে মাঝে এমন বিশ্রী কতগুলো শব্দের উচ্চারণ করতে লাগলো, যা সভ্য মানুষকে বলতে আমি কোনদিনও শুনিনি।

    রুদ্ধ নিঃশ্বাসে আরো কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। ওরা ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর অদৃশ্য হলে গেলো।

    অনেক দিনের পুরোনো বাড়ি। দেয়ালে চুনকাম পড়েনি, তাও কয়েক বছর হবে। মরচে পড়া জানালা দরজাগুলো কোন রকম ঝুলে আছে। ঘরের দেয়ালে অসংখ্য মাকড়সার জাল। দেয়ালে টাঙানো একখানা ফটো। কে? … … … চমকে পিছিয়ে এলাম দু’হাত। আধভাঙা ডেসিং টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে ফটোটা নামিয়ে নিলাম, অতি সন্তর্পণে। রুমাল দিয়ে ধুলোবালিগুলো ঝেড়ে নিলাম, তারপর দু’চোখে ভরে তার দিকে তাকালাম। সেই অপরূপা তরুণী, মুখের কোণে স্নিগ্ধ হাসির রেখা, নিচে ছোট করে লেখা নাম-লু-ই-সা।

    ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারটা টানতেই খুলে গেলো, অনেকগুলো খাতা-পত্র সাজানো রয়েছে, থাকে থাকে, শুধু ধুলোবালি জমে আছে চারপাশে। একখানা খাতা হাতে তুলে নিলাম, কবিতার খাতা, প্রথম পৃষ্ঠাতেই লাল কালিতে লেখা বড় বড় করে কটা লাইন।

    যুদ্ধ আমি চাই না, কারণ, যুদ্ধ এমন একটা ব্যাধি যে শুধু দুর্বল এবং রোগা লোকের জীবন হরণ করে না, সুস্থ সবল এবং সতেজ মানুষকেও হত্যা করে।

    আমি শান্তি চাই, কারণ—শান্তি মানুষকে—তারপর পাতার পর পাতা উল্টে গেলাম। আর দেখে গেলাম, কবিতার পর কবিতা; শেষের কবিতা একটু শব্দ করেই পড়লাম—

    হে আমার ভীরু মন

    চলার পথে কভু যদি—

    উন্মত্ত সাগর কিবা—

    ক্ষুধিত ব্যাঘ্রেরও

    সম্মুখীন হই।

    তুমি আমারে পিছিয়ে এনো না।

    শক্তি দিয়ো সাহস দিয়ো!

    যেন— সে সাগর আমি ডিঙ্গাতে পারি।

    সে বাঘ যেন হত্যা করতে পারি।

    আর— আমার

    রুটি, রুজি আর অধিকারের

    দাবি নিয়ে যখন

    আমি এগিয়ে যাবো।

    সামনে উদ্ধৃত রাইফেল দেখে,

    তুমি আমার মাথা নত করে দিও না।

    আমার রুগ্ন মায়ের কথা চিন্তা করে

    আমার নগ্ন বৌ-এর

    সকরুণ চাহনির কথা মনে করে

    আর— আমার হতভাগা

    শিশুর শোচনীয় মৃত্যুর

    কথা স্মরণ করে

    তুমি আমাকে রুখে

    দাঁড়াবার সামর্থ্য দিয়ো!

    শক্তি দিয়ো!

    যদি ওরা গুলি চালায় চালাতে দাও।

    ভীত হয়ো না তুমি— কত

    মারবে ওরা?

    শত?…….হাজার? লক্ষ? কোটি?

    এরচেয়েও বেশি?

    না-গো-না, ওদের গুলি

    ততক্ষণে ফুরিয়ে যাবে।

    আর— এক কোটি প্রাণের

    পরিবর্তে শতকোটি

    প্রাণ মুক্তি পাবে—

    শোষণের জিঞ্জির হতে।

    পড়া শেষ করে খাতাগুলো ড্রয়ারের ভেতর রেখে দিলাম। হাতঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম, বেলা এগারোটা। খক্ ….. খক্ করে কে যেন কাশলো, আশেপাশে কোথায়। তারপর অস্পষ্ট কাতরানির শব্দ— মাগো।….আর যে পারি না মা।

    পাশের রুমে ঢুকতেই মেঝের উপর অনেকগুলো বোতলের ভগ্নাবশেষ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম। মেঝেটা একেবারে ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে চাপলাম, পচা মদের গন্ধ বাতাসে বিষ ছড়াচ্ছে।

    তারপর যে রুমটিতে পা দিলাম, সেটা একটা লম্বা হল রুম। সামনে একটা জ্যান্ত বাঘ দেখলেও বুঝি এত চমকাতাম না আমি যেমন করে চমকে উঠলাম। শুধু অবাক হলাম না, শরীর যেন হিম হয়ে এলো আমার। শরীরের তন্ত্রীগুলো এক মুহূর্তের জন্য অচল থেকে আবার সচল হয়ে এলো, পা দুটো দু’বার ঠক্‌ঠক্‌ করে কেঁপে তারপর স্থির হলো। ঝাপসা দৃষ্টিশক্তিকে আরো প্রসারিত করে আমি ওদের দিকে তাকালাম।

    উলঙ্গ। একেবারে উলঙ্গ, বিবস্ত্রা নারী দেহ সব ছড়িয়ে আছে মেঝের উপর, এখানে ওখানে, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মাটির ঢেলার মতো। শেকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে ওদের শীর্ণ হাতগুলো, দেয়ালের আটার সাথে। কাতরাচ্ছে ওরা— মাগো! আর যে সইতে পারি না মা।

    কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। উঃ! বার কয়েক ঘুরপাক দিয়ে উঠলো মাথাটা। মানুষগুলো সব কি পশু হয়ে গেল নাকি? মনুষ্যত্বের এতটুকু নিদর্শনও কি তাদের ভেতর অবশিষ্ট নেই। অসংযত পা দুটো খুট করে শব্দ করে উঠলো, ক্ষুধিত সিংহের সামনে পড়লে, নিরস্ত্র মানুষ যেমন ভয়ার্ত চিৎকার করে ওঠে, ওরাও ঠিক তেমনি আর্তনাদ করে উঠলো, মাগো। এবার আর বাঁচবো না। আর, তারপর— কোটরে ঢোকা চোখগুলো উলঙ্গ করে, আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ওরা। অজস্র অভিশাপ ঝরে পড়ছে ওদের ও চোখগুলো থেকে। ওরা অভিশাপ দিচ্ছে, ওদের জন্মদাতাকে; মানুষের আদিম বন্যতাকে, আর— ওদের জীবন-যৌবন হরণকারীদিগকে।

    —হাঃ —হাঃ! হাঃ! আবার মেজর কলিনসের সেই অট্টহাসি। আবার রক্তাক্ত সূরা হাতে বলে যাওয়া, মেজর কলিনসের সেই কথাগুলো, — হাঃ! হাঃ!! হাঃ! ইরান, তোরান আর মিসরের নেকাব পরা মেয়ের মোমের মতো দেহগুলো আমাদের স্থায়ী সম্পত্তি হয়ে রইবে। রাশ্যার উজবেকি আর কাজাকি তরুণীর শালীনতাকে বুকে ছুরি হেনে, ওদের ন্যাংটা নাচাবো আমরা, ভারতের লজ্জাবতী মাংস-পিণ্ডগুলোর ঘোমটা উল্টিয়ে আমরা চুমো খাব। আর আমাদের কামনা চরিতার্থের জন্য ওদের আমরা ব্যবহার করবো। ঠিক জুতো আর মুজোকে আমরা যে রকম ব্যবহার করে থাকি।

    যন্ত্রচালিতের মতো এসে দাঁড়ালাম ওদের পাশে। অবাক হলো ওরা, যখন আমি ওদের বাঁধনগুলো একে একে খুলে দিতে লাগলাম। ওদের ভয় দূর হলো, লজ্জা এসে পূরণ করলো ভয়ের স্থান, ওরা শীর্ণ হাত দুটো দিয়ে বুকটাকে ঢেকে, পাশের ঘরটাতে পালিয়ে গেলো। সব শেষ, শুধু আর একটি মাত্র বাকি, ওর বাঁধনটা খুলতে গিয়ে ইলেকট্রিকের সক্ পাওয়ার মতো আমি লাফিয়ে উঠলাম। এত ঠাণ্ডা, এত শীতল।

    —হতভাগী মেয়েটা মারা গেছে। গলার স্বরটা কেঁপে উঠলো আমার। আর সাথে সাথে একটা মেয়ের করুণ চিৎকার শোনা গেলো পাশের ঘর থেকে— দিদিগো! দি—দি। ঝড়ের বেগে সে ছুটে এলো আমার সামনে মৃতা মেয়েটির পাশে, আর তার উপুড় হয়ে পড়ে থাকা দেহটাকে ধরে চিৎকার দিলো প্রথমে, তারপর ওর বুকের ভেতর মুখ গুঁজে কান্নার জোয়ারে ভেসে পড়লো মেয়েটি। কে?—লু-ই-সা? অবাক বিস্ময়ে বোবা হয়ে রইলাম আমি। হ্যাঁ, লু-ই-সাই বটে। মৃতা তরুণীটি লুইসারই প্রতিকৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে আমায়।

    ওঘর থেকে একজন চিৎকার করে বললো ওর নাম, লু-ই-সা, আজ দু’দিন ধরে ভীষণ ছটফট করছিলো ও।

    —কাল বিকেলে ওকে আমি ‘একফোঁটা জল, এক ফোঁটা জল’ বলে চিৎকার করতে শুনেছি। বললো, আর একজন।

    গায়ের আলেস্টারটা খুলে লুইসার নগ্ন দেহটা ঢেকে দিলাম আমি। প্রচণ্ড শীতের ভেতরেও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা দেখা দিল। হতবিহ্বল নেত্রে আমি চেয়ে রইলাম, লুইসার শুকনো মুখটার দিকে। ওর জিভটা এখনও বেরিয়ে আছে, দাঁতের ফাঁক দিয়ে। মনে হলো সে চিৎকার করে বলছে— এক ফোঁটা জল। এক ফোঁটা জল। ওর ছোট বোনটা তখনও কাঁদছে, আরও চেঁচিয়ে আরও করুণ গলায়। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিতে চাইলাম, ফোঁস করে ও সাপের মতো ফণা তুলে দূরে সরে গেলো। উঃ! এ খাকি পোশাকের প্রতি কি অদ্ভুত ঘৃণা জমে আছে ওদের বুকের পাঁজরে পাঁজরে।

    আবার পদশব্দ! বেশি নয় অল্প কয়েকটা। পাশের ঘরের মেয়েগুলো নিঃশ্বাস নেওয়াও বন্ধ করে ফেললো নাকি? নইলে এত গভীর নীরবতা কেন? কিন্তু ডাকবার অবসর কোথায়। লুইসার ছোট বোনটা, বার কয়েক হুমড়ি খেয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে তার মৃতা বোনটিকে ফেলে। নরখাদকের গন্ধ পেয়েছে তাই তারা পালাচ্ছে।

    চোখ ফিরাতেই চেয়ে দেখলাম সামনে দাঁড়িয়ে মেজর কলিনস্। মেজর কলিনস্ হাসছে আর বলছে—হাঃ! হাঃ! তুমিও ফুর্তি করতে এসেছো ডাক্তার? হ্যাঁ ফুর্তি করো, ফুর্তি করো ডাক্তার! আমাদের সৈন্যরা ওদের ত্রিশটা গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। ফুর্তি করো ডাক্তার। ফুর্তি করো।

    হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। অনুভব করলাম জর্জ, এডোয়ার্ড আর লুইয়ের আত্মা এসে ঘিরে দাঁড়িয়েছে আমায়, লুইসা আমার কানে কানে বলছে, ডাক্তার। —লাখো হাজারো মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহের কথা কি এত শিঘ্রই তুমি ভুলে গেলে?

    শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড বেগে মেজর কলিনসের মুখে আমি বসিয়ে দিলাম চড়।

    শান্তি সংগ্রামে আমার প্রথম পদক্ষেপ।

     

    রচনাকাল : নভেম্বর, ১৯৫২

  • দেমাক

    দেমাক

    লোকটাকে দেখলেই গা জ্বালা করে রহমতের।

    গর্বে মাটিতে যেন পা পড়তে চায় না লোকটার। লম্বা সুঠাম দেহ। দেড় হাত চওড়া বুক। মাংসল হাত দুটো ইস্পাত-কঠিন। বড় বড় চোখ দুটোতে সব সময় রক্ত যেন টগবগ, টগবগ করে। গায়ের রঙটা কালো কুচকুচে। চামড়াটা ঠিক কাকের পাখনার মতো মসৃণ আর তেলতেলে। গর্বে মাটিতে যেন পা পড়তে চায় না লোকটার। সকালে ভোরে ভোরে উঠে কাজে বেরিয়ে যায়। রাত দশটায় ঘরে ফেরে। হাতমুখ ধুয়ে ভাত খায়। তারপর নিজ হাতে তৈরি আমকাঠের ইজিচেয়ারটাকে দাওয়ায় টেনে এনে হাত-পা ছড়িয়ে বসে। বসে বসে ‘কিংস্টর্ক’ সিগারেট ফোঁকে।

    লোকটাকে দেখলেই গা-জ্বালা করে উঠে রহমতের। মনে মনে ঈর্ষা হয়, শুধু তার প্রতি নয়; তার গোটা পরিবারটাই ওর কাছে ঈর্ষার বস্তু।

    সেদিন রাতের ভাত খেয়ে বারান্দায় বসে বসে লোকটা যখন সিগারেট ফুঁকছিলো, তখন জানালার ফাঁক দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রাগে গজগজ করছিলো রহমত। স্ত্রী মেহেরুনকে ডেকে এনে দেখাচ্ছিল। দেখ দেখ শা’র বাবুয়ানা দেখ। পায়ের উপর পা তুলে কেমন চুরুট টানছে। যেন নবাব সলিমুল্লার নাতি আর কি।

    ইস্। দেমাক কত। মেহেরুন তার ঠোঁট মুখ বিকৃত করেছিল। দেমাকের আর জায়গা পায় না। এত দেমাক থাকবে না, থাকবে না। তারপর একটু থেমে আবার বলেছিল, বাসের ড্রাইভার, তার আবার এত দেমাক কেন? রহমত এর উত্তরে কিছু বলেনি। শুধু নীরবে দাঁতে দাঁত ঘষেছিল একটানা অনেকক্ষণ। আর মনে মনে লোকটার বংশ নিপাত করেছিল।

    লোকটাকে সবাই চেনে এ পাড়ার। বাস ড্রাইব্রার রহিম শেখ। রহিম শেখ বাস চালায়। টাউন সার্ভিসের বাস। ওর কোন ধরাবাঁধা বেতন নেই। দৈনিক যা টিকেট বিক্রি হয় তা থেকে পেট্রোল খরচ আর মালিকে কমিশন বাদ দিয়ে বাকি টাকাটা কন্ডাক্টর, সে আর যে ছোকরাটাকে নবাবপুর-ষ্টেশন-হাইকোর্ট বলে চিৎকার করবার জন্যে রাখে, সে ভাগ করে নেয়। টাকা যে খুব পায় তা নয়। তবু সেই অল্প ক’টা টাকা কাপড়ের ব্যাগে পুরে যখন সে বাসায় ফেরে, তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে মন-প্রাণ ভরে থাকে রহিম শেখের। কাজ তার গর্ব। কাজ করেই খায় সে। পরের কাছে হাত পাতে না। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে না। কিংবা তাদের ওই বাসের মালিকটার মতো পুঁজি খাটিয়ে বসে বসে মুনাফা লুটে না। কাজ করেই খায় সে। কাজ তার গর্ব।

    বাসায় বউ আছে তার। আমেনা। বাড়িতে অবসর সময় বেতের ডালা, বাস্কেট আর মাদুর তৈরি করে সে। পরে স্বামীর হাতে বাজারে বিক্রি করতে পাঠায়। ছেলেমেয়েও কম নয়। তিন মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ে মুন্নির বয়স এবার চৌদ্দতে পড়লো। ওর পায়রা পোষার সখ। সেই বছর তিনেক আগে মেয়ের আবদার রাখতে গিয়ে বাজার থেকে একজোড়া খয়েরি রঙ-এর পায়রা এনে দিয়েছিল রহিম শেখ। সেই একজোড়া বংশানুক্রমিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন বার জোড়ায় পৌঁছেছে। সারাদিন ওদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে মুন্নি। ওদের ঘরগুলো ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়া। খাওয়ানো। নতুন বাচ্চাগুলোর দেখাশোনা করা। সকাল আর বিকেলে পায়রাগুলোকে একবার করে আকাশে উড়িয়ে দেয়া। সন্ধ্যাবেলা বাসায় ঢুকলে সযত্নে খোপের দরজাগুলো একে একে বন্ধ করে দেয়া। ওদের নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকে মুন্নি। কিন্তু পায়রাগুলো ওর বড় বজ্জাত। মাঝে মাঝে দল বেঁধে মেহেরুনের ঘরে ঢুকে ওর চালডাল খেয়ে ফেলে। দেখলে রেগে আগুন হয়ে যায় মেহেরুন। প্রথমে পায়রাগুলোকে গালিগালাজ করে। যমের হাতে দেয়া, তারপর উঁচু গলায় পায়রার মালিকের উপর আক্রমণ চালায়। সব শেষে গোটা পরিবারটার উপরই রাগে ফেটে পড়ে মেহেরুন। এ তার রোজকার অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। এইতো সেদিন ভরদুপুরে কি গালাগালিটাই না পাড়ছিলো সে। মুন্নি তখন সবে গোসল সেরে ভেজা চুলগুলো রোদে শুকুচ্ছিলো বসে বসে। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এই মেয়ে, সামলে কথা বল বলছি, নইলে ভালো হবে না, কবুতরে চাল খেয়েছে তো আমরা কি করবো অ্যাঁ?

    কি করবো মানে, বেঁধে রাখতে পার না?

    ওগুলো কি গরু-ছাগল যে বেঁধে রাখবো?

    বেঁধে না রাখতে পারলে, পুষবার এত সখ কেন শুনি? অন্যের ঘরে ঢুকে যখন তখন চালডাল খেয়ে ফেলে নষ্ট করে, বলি চালডালগুলো কিনতে কি পয়সা লাগে না, না মাগনায় পাই?

    এরপর আরো কিছুক্ষণ উভয়ের তরফ থেকে তর্কবিতর্ক চলেছিলো। সবশেষে খোদাকে সাক্ষী রেখে মেহেরুন প্রতিজ্ঞা করেছিলো। দেখ মুন্নি, এবার যদি তোর কবুতর আমার চালডাল খায়, তাহলে সেই কবুতরের জান আমি রাখবো না হুঁ।

    মুন্নি ঠোঁট উলটিয়ে বলেছিল, ইস এত সস্তা না।

    কিন্তু মেহেরুনের কাছে ব্যাপারটা খুব যে সস্তা তা বিকেলেই টের পেয়েছিল মুন্নি। সাদা-কালো রঙ মেশানো পায়রা জোড়া বাসায় ফেরেনি। এদিক ওদিক তালাশ করলো মুন্নি। আমেনাও নিজের কাজ ফেলে রেখে মেয়ের সাথে তালাশে নামলো। অন্ধকার ঘন হয়ে এলো তবু পায়রা জোড়ার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল মুন্নির। মেহেরুনের ঘরের চারপাশে সতর্কভাবে বারকয়েক ঘুরাফেরা করলো সে। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো। কিন্তু ঘরের ভেতর জমাট অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না সে।

    রাতে রহিম শেখ বাসায় ফিরলে আমেনা সবকিছু খুলে বললো তাকে। মুন্নি তখন পায়রার শোকে বসে বসে কাঁদছিলো দাওয়ায়। সবকিছু শুনে মেয়ের দিকে এক পলক তাকালো রহিম শেখ। রাগে ছ’ ফুট লম্বা দেহটা তার থরথর কেঁপে উঠলো। অন্ধকার দাওয়ায় দাঁড়িয়ে গালিগালাজ যা কিছু জীবনের সঞ্চয় সব উজাড় করে দিলো সে রহমত আর মেহেরুনের উদ্দেশ্যে। পরে রাগটা একটু কমে এলে শ্বাস টেনে টেনে বললো, হারাম খেতে খেতে এদের হারাম খাওয়ার একটা অভ্যেস হয়ে গেছে। শক্ত সমর্থ জোয়ান মানুষ, কাজকর্ম একটা কিছু করে খাবে না—তো চুরিচামারি করে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে খায়। শা— যাবি সব জাহান্নামে।

    হয়েছে যাক তুমি এসো, মেয়েকে নিয়ে এখন ভাত খাও। আমেনা স্বামীকে একপাশে টেনে নিয়ে গেলো।

    অনেক রাতে, জানালা আর কপাট বন্ধ করা পাকের ঘরটায় বসে কবুতরের ঝোল দিয়ে মজা করে ভাত খেয়েছিল সেদিন রহমত আর মেহেরুন। একমুখ ভাত চিবুতে চিবুতে মেহেরুন বলেছিল, যা করেছি, ঠিক করেছি, কি বলো?

    হ্যাঁ, ঠিক। রহমত সায় দিয়েছিল। ব্যাটা বাসের ড্রাইভার বলে কিনা আমরা হারাম খাই। শা—তুমি যেমন ড্রাইভারি করে রোজগার কর; আমিও তেমন মানুষের হাত দেখে পয়সা কামাই। তোমারটা যদি হালাল হয়, আমারটা হারাম হতে যাবে কেন?

    ঠিকই তো। মেহেরুন সমর্থন জনিয়েছিল তাকে। আর লোকটার দেমাক দেখো না। কালকে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে মেয়েকে বলছিলো, ভিক্ষে করা পয়সা নয় আমার। গায়ে খেটে রোজগার করি। একটা ফুটো পয়সারও আমার দাম আছে। শা—দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। রহমত মুখ বিকৃত করেছিলো। কথায় কথা বেড়েছিলো, আলাপ চলেছিলো অনেকক্ষণ।

     

    মাঝখানে অনেকগুলো দিন।

    দুটি পরিবারের জীবন এমনি করেই এগুচ্ছিলো। হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটলো। দুর্ঘটনা ঘটলো রহিম শেখের জীবনে। প্রথম দূর্ঘটনা। এর আগে পর পর ক’টা দিন একটানা ধর্মঘট করেছিলো ওরা। কমিশন কমানোর দাবিতে ধর্মঘট। আর ধর্মঘট শেষ হবার দিন চারেক পর সকালে, আর আর দিনের মত বাস নিয়ে বেরিয়েছিল রহিম শেখ। লম্বা, সুঠাম দেহ মাংসল হাত দুটো ইস্পাত কঠিন। বড় বড় চোখ দুটো রক্তজবার মত লাল। বাসটা ঠিকই চালাচ্ছিলো রহিম শেখ। কিন্তু হঠাৎ সামুনের ট্রাককে পাশ কাটাতে যেতেই, তীব্রবেগে বাসটা গিয়ে ধাক্কা খেলো রাস্তার পাশের একটা ল্যাম্পপোস্টের সাথে। পরক্ষণেই সামনের কাঁচভাঙ্গার ঝনঝন শব্দ। দু’হাতে চোখ দুটো চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠলো রহিম শেখ। লাল চোখ বেয়ে লাল রক্তের স্রোত নেবে এলো তার।

    বাসায় সবাই যখন এ খবর পেলো তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।

    মুন্নিকে সাথে নিয়ে হাসপাতালে তাকে দেখতে গেলো আমেনা।

    অনেক খোঁজ খবরের পর সন্ধান মিললো তার। চোখেমুখে ব্যান্ডেজ আঁটা, নিসাড় হয়ে শুয়ে আছে সে। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কে?

    আমি। গলা দিয়ে কথা সরছিলো না আমেনার।

    একটু নড়েচড়ে রহিম শেখ আবার বললো, সাথে আর কেউ আসেনি?

    এসেছে।

    আমি বাবা। মুন্নি এগিয়ে বাবার একখানা হাত মুঠোর মধ্যে তুলে নিলো। চোখ দুটো তার পানিতে টলমল করছে। এরপর বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ ব্যান্ডেজ বাঁধা চোখ দুটো দু’হাতে চেপে ধরে আর্তকণ্ঠে রহিম শেখ বলে উঠলো উঃ! আমি সব হারিয়েছি। সব হারিয়েছি। এবার আমি কি করে বেঁচে থাকবো?

    কাপড়ের খুঁটে চোখের পানি মুছে নিয়ে আমেনা বললো, ওগো, খোদা না করুন, সত্যিই যদি তেমন কিছু হয়; তুমি ঘাবড়িয়ো না। আমি আছি, দু’বেলা চারটে ভাত জোটে সে বন্দোবস্ত হয়ে যাবে।

    আমেনার কথায় মনকে সান্ত্বনা দিতে পারলো না রহিম শেখ। প্রশান্তভাবে বার কয়েক মাথা নাড়লো সে।

    খবর পেয়ে রহমতও দেখতে এসেছিল তাকে। মেহেরুন বলেছিল লোকটার সাথে যত শত্রুতাই থাক না কেন, হাজার হোক, সে আমাদের প্রতিবেশী, তাকে একবার দেখে আসা উচিত।

    হ্যাঁ, কথাটা মিথ্যে বলনি। রহমত সায় দিয়েছিলো তার কথায়। আজকাল কিন্তু রহিম শেখকে দেখলে তার প্রতি আর ঘৃণা বোধ হয় না রহমতের। আর ভয় লাগে না তাকে। বরঞ্চ তার প্রতি আজকাল অনুকম্পা জাগে ওর। করুণা হয়। হবেই বা না কেন? লোকটা তো আগের মতো আর দেমাক দেখিয়ে বেড়ায় না। দুটো চোখই হারিয়েছে সে। চোখ গেলে আর দুনিয়াতে কী-ই বা থাকে মানুষের। চাকরিটাও গেছে তার। এখন তো ভিক্ষে করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই রহিম শেখের। এখন তো আর দশজনের বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয় সে। এই ভেবে তার প্রতি করুণা জাগে রহমতের। দয়া হয়। সেই লম্বা সুঠাম দেহটা যেন কেঁচোর মতো কুচকে একটুখানি হয়ে গেছে। মাথা উঁচিয়ে আজকাল আর চলতে পারে না সে। দাওয়ায় বসে ঝিমোয়। ক’দিন থেকে রহমত লক্ষ করছিলো, ভোর সকালে উঠে ছোট ছেলেটার কাঁধে হাত দিয়ে কোথায়, যেন বেরিয়ে যায় রহিম শেখ। অনেক রাত বাসায় ফিরে। তারপর দাওয়ায় পিদিমের আলোতে বসে বসে, মুন্নির হাতে থলে থেকে বের করা ফুটো পয়সা, আধ আনি, এক আনি সব হিসেব করায়।

    ব্যাপার কি, অ্যাঁ? মেহেরুনকে একদিন জিজ্ঞেস করলো রহমত। মেহেরুন গালে হাত দিয়ে বললো, খোদা মালুম। আমি কি জানি। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো, কি আর করবে, ভিখ মাগতে যায় আর কি। বলতে গিয়ে এক টুকরো হাসি দোল খেয়ে উঠলো ঠোঁটের কোণে। রহমতও হাসলো। সুক্ষ্ম সূতোর মতো মিহি হাসি।

    সে দিনটা ছিলো রোববার। রোববারে অফিস-আদালত সব বন্ধ থাকে। আর তাই ও দিনটা রহমতের রোজগার বেশ বেড়ে যায়। কেরানি বাবুরা সব হাত দেখাবার জন্য ভিড় জমিয়ে ফেলে। কারো বা প্রমোশন। কারো বিয়ে। আবার কেউ কেউ ছেলেপুলের সংখ্যাও জানতে চায়। সবদিন এক জায়গায় বসে না রহমত। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বসে।

    সেদিন সদরঘাটের মোড়ে বসবে বলেই ঠিক করলো সে। জায়গাটা খুব ব্যস্তসমস্ত। লোকজনের চলাফেরা খুব বেশি। ছুটির দিনে তো এমন ভিড় লাগে, মনে হয় যেন একটা হাট বসেছে।

    রাস্তার পাশে একটা ভালো জায়গা ঠিক করে নিয়ে বসে পড়লো রহমত। পাশেই একটা খোঁড়া আর একটা শীর্ণকায় মেয়ে ছোট্ট একটা টিন হাতে ভিখ মাগতে বসেছে। এ বাবু, চারটে পয়সা দাও বাবু, দু’দিন কিছু খাইনি বাবু, চারটে পয়সা দাও।

    অদূরে খবরের কাগজের হকাররা সব চিৎকার জুড়ে দিয়েছে, ইত্তেফাক-আজাদ-মর্নিং নিউজ। হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলো রহমত; তাকিয়ে দেখলো, চৌরাস্তার মোড়ে ল্যাম্পপোস্টটার নিচে দাঁড়িয়ে রহিম শেখ। হাতে তার এক গাদা কাগজ। ঊর্ধ্বে একখানা কাগজ তুলে ধরে সে জোর গলায় হাঁকছে, গরম খবর সার—গরম খবর।

    ইস, দেমাকে যেন পা মাটিতে পড়তে চায় না লোকটার!

  • কয়েকটি সংলাপ

    কয়েকটি সংলাপ

    [আজ থেকে উনিশ বছর আগে যে সংলাপ পথে-প্রান্তরে শুনেছিলাম।]

    ভাইসব! আমরা কি চেয়েছিলাম। কি পেয়েছি।

    আমরা চেয়েছিলাম একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। যেখানে সুখ থাকবে, শান্তি থাকবে। কিন্তু আমরা কি পেয়েছি।

    কিছু না।

    কিছু না।

    কিছু না।

    ওরা আমাদের সুখ কেড়ে নিয়েছে।

    আমাদের ভাইদের ধরে ধরে জেলখানায় পুরেছে।

    জেলখানার ভেতর গুলি করে দেশপ্রেমিকদের হত্যা করেছে ওরা।

    আমার মাকে কাঁদিয়েছে।

    আমার বাবাকে বরখাস্ত করেছে।

    আমার ভাইবোনদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে।

    এখন ওরা আমাদের ভাষাও কেড়ে নিতে চায়!

    না।

    না।

    না।

    আমরা তা হতে দেব না।

    আমাদের মুখের ভাষাকে আমরা কেড়ে নিতে দেব না।

    হরতাল।

    সারা দেশব্যাপী আমরা হরতাল করবো।

    না না, সেটা ঠিক হবে না। তারচেয়ে এসো আমরা সারা দেশব্যাপী স্বাক্ষর সংগ্রহ করি।

    কি হবে হরতাল করে।

    ওরা একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে।

    হরতাল হবে না।

    মিছিল বের করতে পারবে না।

    না।

    না।

    বেআইনী আইনকে আমরা মানি না।

    আমরা একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবো।

    ভাঙবো।

    ওরা গুলি করেছে।

    শুনেছো ওরা গুলি করেছে।

    ওরা গুলি করে কয়েকটি ছাত্র মেরে ফেলেছে।

    কোথায়?

    মেডিক্যাল কলেজের মোড়ে।

    আশ্চর্য।

    এজন্যে আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম।

    এজন্যে আমরা পাকিস্তান এনেছিলাম।

    এই সরকারকে আমরা মানি না।

    খুনী ডাকাতদের আমরা মানি না।

    পদত্যাগ চাই।

    ওদের পদত্যাগ চাই।

    বরকতের খুন আমরা ভুলবো না।

    রফিক আর জব্বারের খুন আমরা ভুলবো না।

    বিচার চাই।

    ফাঁসি চাই ওই খুনীদের।

    ভাইসব। সামনে এগিয়ে চলুন।

    ওদের গোলাগুলি আর বেয়নেটকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলুন।

     

    [আজকের সংলাপ। পথে-প্রান্তরে যে সংলাপ শুনছি।]

    কি চাই?

    একুশে ফেব্রুয়ারির চাঁদা।

    কি করবেন?

    একটা ম্যাগাজিন বের করবো।

    ম্যাগাজিন বের করে কি হবে?

    বাঙলা একাডেমি থেকে ওরা পুরস্কার দেবে বলেছে। ওখানে জমা দেব।

     

    নাহ্। তোমাদের দিয়ে কিছু হবে না। ওরা নামজাদা সব গায়ক গায়িকাদের বুক করে বসে আছে। আর তোমরা সব আলসের হদ্দ, চুপ করে ঘরে বসে গরুর গোস্ত খাচ্ছো?

    চিন্তা করবেন না স্যার। আয়োজন আমরাও কম করিনি। ওদের চেয়ে আমাদের ফাংশন, আপনি দেখবেন অনেক ভালো হবে।

    ভালো হবে কি। ভালো হতেই হবে। এর সঙ্গে আমার মান-সম্মান জড়িয়ে রয়েছে। বুঝলে না, আমি হলাম তোমাদের প্রেসিডেন্ট। আর হ্যাঁ। আমার বক্তৃতাটা ভালো করে লিখে দিও কিন্তু। একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাসটা যেন থাকে ওর মধ্যে। আর শহীদদের নামগুলো।

    দেখো, গতবারের মতো আবার উল্টাপাল্টা লিখে রেখো না। না, না, তুমি চিন্তা করো না। আমি দিন কয়েকের মধ্যে বাড়ি আসছি। তারপর ওদের মাথা ভাঙবো।

    কিন্তু তুমি আসবে কি করে ?

    কেন?

    তুমি না বললে ছুটিছাটা নেই।

    আছে, আছে, ওইতো দিন কয়েক পরে একুশে ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন। তুমি একটুও বোঝ না আমি আগের দিন রাতেই এখান থেকে রওনা হয়ে যাবো। তারপর দেখো না শালাদের মাথা যদি না ভেঙ্গেছি। কি সাহস ওদের, আমার ক্ষেতের কুমড়ো চুরি করে নিয়ে যায়।

     

    ওরা কোথায় মিটিং করবে?

    পল্টনে।

    আর তারা?

    তারা করবে বায়তুল মোকাররমে।

    ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট খালি নেই?

    নেই ৷

    বাঙলা একাডেমি?

    ওখানেও কারা যেন সেমিনার করছে।

    তাহলে?

    কি যে করবো বুঝতে পাচ্ছি না।

    শোন এক কাজ করো। আমাদের মিটিংটা আমরা রেসকোর্সেই করবো।

    আল্লা যা করে ভালোর জন্যেই করে। রেসকোর্সে মিটিং করলে এমন জমা জমবে না, বাকি সবার চোখে ধাঁধা লেগে যাবে।

    এই শোন। আজ বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না।

    কেন?

    দেরি হলে প্রভোষ্ট ভীষণ রেগে যাবে। শেষে আর কোন দিনও বাইরে আসতে দেবে না।

    কিন্তু আমার যে তোমার সঙ্গে অনেক অনেক কথা ছিলো।

    ছিলো তো বুঝলাম। কিন্তু। আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না?

    কি?

    কাল রাতে শহীদ মিনারের ওখানে এসো না।

    ওখানে কেন?

    আমরা সবাই ওখানে আলপনা আঁকতে যাবো। অনেক রাত পর্যন্ত থাকবো। ইচ্ছে মতো কথা বলা যাবে।

    তোমাদের প্রভোষ্ট কি অত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে দেবে?

    দেবে না মানে। বিশ আর একুশে বাধা দিলে ওর হাল খারাপ করে দেবো না আমরা।

     

    স্যার।

    কি?

    ছাত্ররা সব ঘন ঘন আসছে যাচ্ছে।

    কেন? কেন? ছাত্ররা কেন আসছে?

    বিজ্ঞাপন চাইছে?

    কিসের বিজ্ঞাপন?

    একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবাই সংকলন বের করছে কিনা।

    হুঁ। এক কাজ করুন। এ বছরটা জয় বাংলার বছর। কাউকে ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। আমি একটা ফান্ড স্যাংশন করে দিচ্ছি। ওখান থেকে সবাইকে কিছু কিছু ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে দেন। এতে আমাদের কোম্পানির গুডউইল আরো বেড়ে যাবে। আর শুনুন।

    ইয়েস স্যার।

    আপনার পরিচিত কোন কবিটবি আছে?

    কেন স্যার?

    না, ভাবছিলাম, শহীদদের ওপরে চার লাইন কবিতা লিখে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করলে—

    সেটা নিয়ে ভাববেন না স্যার। সেটা আমি নিজেই লিখে দিতে পারবো স্যার। আপনি জানেন না স্যার, আমারও একটু আধটু লেখার অভ্যাস আছে স্যার।

    তাহলে তাই করুন।

    আরেকটা কথা ছিলো স্যার।

    কি?

    আমাদের ওই পিয়নটা স্যার। এবারের ঘূর্ণিঝড়ে ওর ঘর বাড়ি সব শেষ হয়ে গেছে স্যার। ও এক মাসের বেতন এডভান্স চাইছে স্যার।

    কিসের মধ্যে কি নিয়ে এলেন। যা বললাম তাই করুন গিয়ে এখন। ওসব-আজেবাজে ব্যাপার নিয়ে আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না। বলে দিন হবে না।

     

    কটা ভেঙ্গেছিস?

    চারটা।

    তুই?

    আমি পাঁচটা গাড়ির নম্বর প্লেট। আর সতেরোটা সাইনবোর্ড।

    জানিস, আমাদের পাড়ার সেই মোটা সাহেবটা, ওইযে সেই লোকটা যার মেয়ের কাছে একটা চিঠি লিখেছিলাম বলে আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল মনে নেই তোর? সেই তখন থেকে ঘাপটি মেরে বসে আছি। দাঁড়াও একুশে ফেব্রুয়ারি আসুক। গাড়িতে ইংরেজি নম্বর প্লেট। নাক খসে দেবো না? দিলাম, শালার গাড়ি সুদ্ধু ভেঙ্গে দিয়েছি।

    ঠিক করেছিস। শালার আমরা সংস্কৃতি সংস্কৃতি করে জান দিয়ে ফেললাম। আর ব্যাটারা ইংরেজি নম্বর লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবে।

    ঠিক করেছিস।

     

    [আগামী দিনে যে সংলাপ শুনবো। পথে-প্রান্তরে যে সংলাপ মুখে মুখে উচ্চারিত হবে।]

    বছরে কতদিন?

    তিনশ’ পয়ষট্টি দিন।

    তিনশ’ পয়ষট্টি দিনে ক’টা শহীদ দিবস?

    দু’শো বিরানব্বইটা।

    বাকি থাকে ক’টা?

    তিয়াত্তরটা।

    তিয়াত্তরটা আর বাকি রেখে কি হবে?

    ওগুলোও ভরে ফেলো।

    আগুন জ্বালো।

    আবার আগুন জ্বালো।

    পুরো দেশটায় আগুন জ্বালিয়ে দাও।

    সাত কোটি লোক আছে।

    তার মধ্যে না হয় তিন কোটি মারা যাবে।

    বাকি চার কোটি সুখে থাকুক। শান্তিতে থাকুক। পুরো বছরটাকে শহীদ দিবস পালন করুক ওরা।

     

    রচনাকাল : ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১

  • কতগুলো কুকুরের আর্তনাদ

    কতগুলো কুকুরের আর্তনাদ

    কুকুরগুলো একসঙ্গে চিৎকার জুড়ে দিলো।

    সাদা কুকুর।

    কালো কুকুর।

    মেয়ে কুকুর।

    পুরুষ কুকুর।

    তাদের চিৎকারে শহরে যেখানে যত ভদ্রলোক ছিলো সবার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তারা ভীষণ বিরক্ত হলো।

    রাগ করলো।

    এবং কুকুরগুলোকে গুলি করে মারার জন্যে বন্দুক হাতে রাস্তায় বেরিয়ে এলো।

    বাইরে বেরিয়ে এসে ভদ্রলোকরা দেখলো।

    পথ ঘাট মাঠ সব কুকুরে কুকুরারণ্য।

    দাওয়ায় কুকুর।

    কার্নিশে কুকুর।

    হোটেলে কুকুর।

    রেস্তোরায় কুকুর।

    স্কুল। পাঠশালা। অফিস। আদালত। সর্বত্র কুকুরে কুকুরময়। সবাই গলা ছেড়ে চিৎকার করছে। সমস্ত কণ্ঠ হতে বিকট শব্দ হচ্ছে চারদিকে।

    সহসা ভদ্রলোকরা গুলি করতে লাগলো।

    গুলির শব্দে শহরে যত বেশ্যা ছিলো, সবাই ছুটে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। ছোট বেশ্যা। বড় বেশ্যা।

    যুবতী বেশ্যা।

    বুড়ি বেশ্যা।

    কুৎসিত বেশ্যা।

    সুন্দরী বেশ্যা।

    ওরা মৃত কুকুরগুলোর জন্যে করুণ কান্না জুড়ে দিলো।

    বেশ্যাদের কান্নায় সমস্ত শহরে বিষাদের ছায়া নেমে এলো।

    আর।

    ওদের কান্না দেখে ভদ্রলোকেরা হাতে ধরে রাখা বন্দুকগুলো ঘৃণার সঙ্গে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো।

    এবং

    কুকুরের মতো চিৎকার জুড়ে দিলো।

  • ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি

    ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি

    মাঝে মাঝে ভাবি কতগুলো কুষ্ঠ রোগীকে নিয়ে একটা ছবি বানাবো। যাদের সারা দেহে পচন ধরেছে— তবু তারা চিৎকার করে বলছে না না। আমাদের কিছু হয়নি তো!

    তাদের হাত পা’গুলো সব গলে গলে খসে পড়ছে। তবু তারা উগ্রকণ্ঠে বলছে— ও কিছু না, ও কিছু না। আমাদের কিছু হয়নি তো। ওদের পুঁজভরা দেহ থেকে অসহ্য দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। তবু তারা আতর আর গোলাপ জলে আকণ্ঠ ডুবিয়ে চিৎকার করছে— কিছু হয়নি তো! তারা মরে ভূত হয়ে গেছে। তবু তাদের প্রেতাত্মা দুর্বার আক্রোশে আর্তনাদ করে বলছে— আমরা মরিনি তো!

    ইচ্ছে করে আমার পাশের বাড়ির ছোট বউটিকে নিয়ে একটা ছবি বানাই। ছোট বউটি, যার স্বামী আজ দশ বছর ধরে জেলখানায় পচে মরছে।

    কি অপরাধ তার, কেউ জানে না।

    কি দোষে তাকে বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়েছে তা তার পাষাণ বউটিকে জিজ্ঞেস করলেও সে মুখ ফুটে কিছু বলে না।

    অথচ বউটি কি গভীর যন্ত্রণায় ডাঙ্গায় তোলা গাছের মতো তড়পায়। দিনে, রাতে নীরবে।

    তবু চিৎকার করে সে কাঁদবে না।

    তবু মুখ ফুটে সে কিছু বলবে না।

    ইচ্ছে করে আমার এক বন্ধুকে নিয়ে ছবি তৈরি করতে।

    বহুদিন আগে যাকে প্রথমে আরমানিটোলায় পরে পল্টনে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিতে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম সহস্র জনতার মিছিলের মাঝখানে। সেই একুশের ভোরে যে আমার কানে কানে বলেছিল— বন্ধু, যদি আজ মরে যাই তাহলে আমার মাকে কাঁদতে নিষেধ করে দিও। তাকে বলো সময়ের ডাকে আমি মরলাম।

    সময় পাল্টে গেছে হয়তো তাই আজ সেই বন্ধু আমার আমলাদের ঘরে ঘরে যুবতী মেয়েদের ভেট পাঠায় দু’টো পারমিটের লোভে।

    আহা, তাকে নিয়ে যদি একটা ছবি বানাতে পারতাম।

    আমার ছোট বোনটি!

    সে একটা ছায়াছবির বিষয়বস্তু হতে পারতো।

    তার বড় আশা ছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। দু’ দু’বার কঠিন রোগ ভোগের পর ডাক্তার তার লেখাপড়া বন্ধ করে দিলো।

    বললো ব্রেন এফেক্ট করতে পারে।

    কিন্তু সে শুনলো না। রাত জেগে জেগে পড়লো সে।

    পাস করলো। ভালোই পাস করলো সে— প্রথম বিভাগে।

    তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে আনাগোনা শুরু হলো তার।

    রোজ যায়, রোজ আসে।

    একদিন দেখলাম সিঁড়ির গোড়ায় বসে বসে কাঁদছে।

    বললাম। কিরে, কি হয়েছে তোর?

    বললো। আমায় ভর্তি করলো না ওরা।

    কেন?

    আমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে অনেকক্ষণ দেরি করলো সে। তারপর ধীরে ধীরে বললো, কলেজে পড়ার সময় স্টাইক করেছিলাম তাই। এর কিছুদিন পরে ব্রেনটা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেলো তার।

    বোনটা আমার পাগল হয়ে গেলো।

    আহা, বড় সখ ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে।

    মাঝে মাঝে ভাবি, কতগুলো অসংস্কৃত লোককে নিয়ে একটা ছবি বানাবো যারা দিনরাত শুধু সংস্কৃতির কথা বলে।

    কালচারের কথা বলে।

    ভাষার কথা বলে। ঐতিহ্যের কথা বলে।

    বলে আর বলে।

    কারণে বলে।

    অকারণে বলে।

    বলে বলে এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তাল তমালের স্নিগ্ধ ছায়ায়। তারপর স্বপ্ন দেখে। ধূসর মরুভূমির স্বপ্ন।

    তৈমুর লং আর চেঙ্গিস খাঁর স্বপ্ন।

    হিটলার আর মুসোলিনীর স্বপ্ন।

    আহা, কি সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখে ওরা।

    ইচ্ছে করে সেলুলয়েডে কয়েকটি মানুষের ছবি আঁকি। যাদের মুখগুলো শূকর শূকরীর মতো। যাদের জিহ্বা সাপের ফণার মতো।

    যাদের চোখ জোড়া ইঁদুর ছানার মতো।

    যাদের হাতগুলো বাঘের থাবার মতো।

    আর যাদের মন মানুষের মনের মত সহস্র জটিলতার গিঁটে বাঁধা। যারা শুধু পরস্পরের সঙ্গে কলহ করে আর অহরহ মিথ্যে কথা বলে।

    যারা শুধু দিনরাত ভাতের কথা বলে।

    অভাবের কথা বলে।

    মাংসের ঝোলের কথা বলে।

    আর মরে। গিরগিটির মতো। সাপ-ব্যাঙ-কেঁচোর মতো।

    মরেও মরে না।

    গণ্ডায় গণ্ডায় বাচ্চা বিইয়ে বংশ বৃদ্ধি করে রেখে যায়। আহা, আমি যদি সেই তরুণকে নিয়ে একটা ছবি বানাতে পারতাম। যার জীবন সহস্র দেয়ালের চাপে রুদ্ধশ্বাস।

    আইনের দেয়াল।

    সমাজের দেয়াল।

    ধর্মের দেয়াল।

    রাজনীতির দেয়াল।

    দারিদ্র্যের দেয়াল।

    সারাদিন সে ওই দেয়ালগুলোতে মাথা ঠুকছে আর বলছে— আমাকে মুক্তি দাও। আমাকে মুক্তি দাও। আমার ইচ্ছাগুলোকে পায়রার পাখনায় উড়ে যেতে দাও আকাশে। কিম্বা সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দাও। সেখানে তারা প্রাণভরে সাঁতার কাটুক।

    সারাদিন সে শুধু ছুটছে, ভাবছে— আবার ছুটছে।

    এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে।

    ঈর্ষার দেয়াল।

    ঘৃণার দেয়াল।

    মিথ্যার দেয়াল।

    সংকীর্ণতার দেয়াল

    কত দেয়াল ভাঙবে সে?

    তবু সে আশাহত হয় না। ইচ্ছার আগুন বুকে জ্বেলে রেখে তবু সে ছুটছে আর ভাঙছে।

    সহস্র দেয়ালের নিচে মাথা কুটে কুটে বলছে— মুক্তি দাও।

    আমাকে মুক্তি দাও।

    যদিও সে জানে মানুষের আয়ু, অত্যন্ত সীমিত।

  • পোস্টার

    পোস্টার

    দূর থেকেই দেখলেন আমজাদ সাহেব। লাল কালো হরফে লেখা অক্ষরগুলো সকালের সোনালি রোদে কেমন চিকচিক করছে। সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক।

    বাজারে এক মেছুনীর সাথে ঝগড়া করে মেজাজটা এমনিতেই বিগড়ে ছিলো আমজাদ সাহেবের। তার ওপর সদ্য চুনকাম করা বাড়ির দেয়ালে এহেন পোস্টার দেখে রাগে থরথর করে কেঁপে উঠলেন তিনি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলেকে ডাকলেন। আনু উ-উ।

    আনুর দেখা নেই। বাবার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে লাটিম আর মার্বেল হাতে বেরিয়ে পড়েছে সে সেই ভোরে। কানু এসে বললো, কি বাবা?

    তোকে কে ডেকেছে। আনু কোথায়? চোখ রাঙ্গিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন আমজাদ সাহেব। এত কষ্ট করে, বাড়িওয়ালার হাত পা ধরে হোয়াইট ওয়াশ করালাম। দেয়ালে লিখে দিলাম বিজ্ঞাপন লাগিও না। তবুও— তবুও দেখ না পাজীগুলোর যদি একটু কাণ্ডজ্ঞান থাকতো। যত সব নচ্ছার কোথাকার।

    আমায় গাল দিচ্ছ কেন। ওগুলো কি আমি লাগিয়েছি নাকি? মুখ ভার করলো কানু।

    ছেলের কথায় আরো ক্রুদ্ধ হলেন আমজাদ সাহেব। শূয়ার কোথাকার, তোর কথা কে বলছে? বলছিলাম, যে বাঁদরগুলো এসব পোস্টার লাগায় তাদের ধরতে পারিস না? ধরে জুতোপেটা করে দিতে পারিস না তাদের। থাকিস কোথায়? রীতিমত হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন আমজাদ সাহেব।

    পাশের বাড়ির আফজাল সাহেব বাইরে চিৎকার শুনেই বোধ হয় বেরিয়েছিলেন। বললেন, কি ব্যাপার আমজাদ সাহেব? এই সকাল বেলা—?

    আর বলবেন না সাহেব, সাধে কি আর চেঁচাচ্ছি। এসেই দেখুন না একবার। বলে আঙ্গুল দিয়ে দেয়ালের পোস্টারটাকে দেখালেন আমজাদ সাহেব।

    ও। এ আর কি। ও তো সব জায়গায় লাগিয়েছে ওরা। শহরটাকে একেবারে ছেয়ে ফেলেছে সাহেব। তারিফ করতে হয় এই ছেলেগুলোর।

    আঁ! আপনি বলছেন কি? রীতিমত অবাক হলেন আমজাদ সাহেব। আপনি ওই ছেলেগুলোর তারিফ করছেন?

    তারিফ করবো না। আফজাল সাহেব বললেন। দেশের মধ্যে সাচ্চা কেউ যদি থেকে থাকে তো ওরাই আছে। ওরাই লড়ছে দেশের স্বার্থের জন্য।

    আর মন্ত্রীরা বুঝি কিছু করছে না আপনি বলতে চান?

    করছে না কে বলছে। আলবত করছে। আফজাল সাহেব উত্তর করলেন। খবরের কাগজে দেখেন না। আজ এখানে টি পার্টি, কাল ওখানে ডিনারের আয়োজন। পরশু নিউয়র্ক যাত্রা। করছে না কে বলছে। অনেক করছে ওরা।

    তা তো আপনারা বলবেনই। একচোখা লোক কিনা, তাই একদিকটাই দেখেন শুধু। বলে আর সেখানে দাঁড়ালেন না আমজাদ সাহেব। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন তিনি।

    হালিমা বিবি তৈরি হয়েই ছিলেন বোধ হয়? ভেতরে ঢুকতেই মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হল্লা করবার আর সময় পেলে না? এদিকে অফিসের সময় হয়ে এলো, একটু পরেই তো ভাত ভাত করে বাড়ি ফাটাবে।

    স্ত্রীর সাথে এ সময়ে ঝগড়া করার মোটেই ইচ্ছে ছিলো না আমজাদ সাহেবের। তবুও কাপড় ছাড়তে ছাড়তে বললেন, ঘরে বসে বসে হুকুম সবাই দিতে পারে। কাজের বেলায় কেউ নয়। থলে থেকে তরকারি বের করতে গিয়ে হঠাৎ বাধা পেলেন হালিমা বিবি। কি বললে, কাজ করি না আমি, না? বলি এই ভোর সকালে উঠে বিছানাপত্তর গুটানো থেকে শুরু করে, ঘর ঝাড়ু দেয়া, বাসনপত্তর মাজা, চুলোয় আঁচ দেয়া এগুলো কি তুমি করেছো, না আমি। কে করেছ শুনি?

    খুব একটা খারাপ কথা মুখে এসেছিলো আমজাদ সাহেবের। সামলে নিলেন অতি কষ্টে। বয়স্ক ছেলেমেয়েদের সামনে রোজ রোজ এ ধরনের ঝগড়াঝাটি সত্যি কি বিশ্রী ব্যাপার। স্ত্রীর দিকে কঠিন দৃষ্টিপাত করে গামছা আর লুঙ্গি হাতে কলগোড়ায় চলে গেলেন তিনি।

    স্ত্রীর আক্ষেপভরা খেদোক্তি সেখানেও ধাওয়া করলো তাকে। কাজ করেও কোন নাম নেই। কোন স্বীকৃতি নেই। বার বছর বয়সে মাথায় ঘোমটা চড়িয়ে মিনসের ঘর করতে এসেছি। সেই থেকে কাজ আর কাজ। খেটে খেটে শরীর আমার হাড্ডিসার হয়েছে। তবুও নাম নেই, তবুও—। বলতে বলতে শুরু করলেন হালিমা বিবি। খোদা, আমার মরণ হয় না কেন? আজরাইলের কি চোখ কানা হয়েছে, আমায় দেখে না?

    চটপট গোছলটা সেরে একটু পরেই ফিরে এলেন আমজাদ সাহেব। তখনও নিজের অদৃষ্টকে একটানা ধিক্কার দিচ্ছেন হালিমা বিবি। একটা চাকর রাখেনি লোকটা। আমায় বাঁদীর মতো খাটিয়ে নিয়েছে। একটা ভালো কাপড় কিনে দেয়নি কোনদিন। ছেঁড়া নেংটি পরে পরে আমি থাকি। তবুও নাম নেই। তবুও—।

    আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ রাগে ফেটে পড়লেন আমজাদ সাহেব। চুপ করো বলছি। নইলে এখনি গলা টিপে দেবো।

    দাও না, দাও। সামনে এগিয়ে এলেন হালিমা বিবি।

    সরোষদৃষ্টিতে তার দিকে এক পলক তাকালেন আমজাদ সাহেব। তারপর, আলনা থেকে জামাটা নামিয়ে নিয়ে সোজা রাস্তায় নেবে এলেন তিনি। রাস্তায় নেবে কেন যেন আবার পেছনে দেয়ালটার দিকে ফিরে তাকালেন আমজাদ সাহেব।

    আর একখানা পোস্টার।

    ঠিক আগের পোস্টারটার পাশেই সেঁটে দেওয়া হয়েছে। গোট গোট অক্ষরে লেখা। বাঁচার মতো মজুরি চাই।

    এ মুহূর্তে কে যেন এক টিন জ্বলন্ত পেট্রোল ঢেলে দিয়েছে আমজাদ সাহেবের গায়ের ওপর। দপ্ করে জ্বলে উঠলেন আমজাদ সাহেব। আনু উ-উ।

    আনু তখনো ফেরেনি! কানু এসে ভয়ে ভয়ে বললো! কি বাবা? কি বাবা—

    আ-আ। তীব্র দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করলেন তিনি। তুই কেন, আনু কোথায়?

    কানু বানিয়ে বললো ও স্কুলে গেছে।

    ও স্কুলে গেছে, আর তুমি ঘরে বসে বসে করছো কি। আঁ? ছেলেকে ধমকে উঠলেন আমজাদ সাহেব। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবার দেখছিস কি, যা-না একটা বাঁশ জোগাড় করে এনে নিচু থেকে গুতিয়ে পোস্টার দুটো ফেলে দে মাটিতে। আর শোন, সারাদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি তুই, খবরদার কেউ যেন পোস্টার-ফোস্টার না লাগাতে পারে, হ্যাঁ। বুঝলি তো।

    জ্বী-হ্যাঁ।

    হ্যাঁ। যা বললুম মনে থাকে যেন। বলে অফিসমুখো হলেন আমজাদ সাহেব।

    পেছন থেকে মেজো মেয়ে টুনি ডেকে বললো, বাবা, ভাত খেয়ে যাও। মা ভাত খেয়ে যেতে বলছে।

    মেয়ের ডাকে পেছনে একবার ফিরে তাকালেও, থামলেন না আমজাদ সাহেব। আগের মতই চলতে থাকলেন।

    না খেয়েই আজ অফিসে যাবেন তিনি।

    শুধু আজ বলে নয়। বছরে বার মাসে তিন মাস না খেয়েই অফিস করেন আমজাদ সাহেব। কোন কোনদিন পেটের অবস্থা বেশি কাহিল হয়ে পড়লে, মোড়ে বিহারীদের সস্তা হোটেলটায় ঢুকে গোটা দুয়েক ডালপুরী আর কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে অফিসে যান তিনি। মাসের প্রথম হলে, অফিসের পাশে দিল্লি রেস্টুরেন্টটায় ঢুকে শিক কবাব আর চাপাতি উদরস্থ করেন।

    আজ কিন্তু এ মুখো ও মুখো কোন মুখোই হলেন না আমজাদ হোসেন। অনেকটা দৌড়াতে দৌড়াতে অফিসমুখো ছুটলেন তিনি। নতুন সাহেব ভীষণ কড়া। পাঁচ মিনিট লেট হলে ডাহা পাঁচ টাকা জরিমানা করে বসে থাকে।

    শা’র সাহেবের গুষ্ঠীর শ্রাদ্ধ হতো।

    কাঠের সিঁড়িটা বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন আমজাদ সাহেব। সরু বারান্দাটা পার হতেই সাহেবের সাথে একেবারে মুখোমুখি।

    এই যে আমজাদ সাহেব। আজও আপনি লেট। পনেরো মিনিট।

    পনেরো মিনিট নয় সার। পাঁচ মিনিট। কথাটা ঠোঁটের কাছে এসেও কেমন যেন থেমে গেলো। মুখ কাঁচুমাচু করে বার কয়েক হাত কচলালেন তিনি। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাঁর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নতুন জুতোর মচমচ শব্দ তুলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলন তাঁর চেম্বারের দিকে। ভেতরে ঢুকে সবার দিকে এক পলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে নিজের আদি অকৃত্রিম চেয়ারটিতে এসে বসলেন আমজাদ সাহেব।

    এল, ডি, ক্লার্ক হাশমত মিয়া, বার কয়েক তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, কি আমজাদ সাহেব, চোখ দুটো এত লাল কেন? ভাবীর সাথে ঝগড়া করে এসেছেন বুঝি?

    কথা শুনে দাঁতে জিভ কাটলেন আমজাদ সাহেব। কি যে বলেন, খানদানী পরিবারে বৌয়ের সাথে ঝগড়া? ছ্যা-ছ্যা। জানেন আমার নানা ছিলেন খাঁটি শেখ। আর দাদা—।

    আরে না না, তা কি আর জানিনে। জানি। তবে এমনি একটু ঠাট্টা করলুম আপনার সাথে। বললেন হাশমত মিয়া।

    মনে মনে বড় গর্ববোধ করলেন আমজাদ সাহেব। বললেন, ঠাট্টা করে, যে বলছেন, তা আমি বুঝেছি। তবে কিনা; চোখ দুটো লাল হবার পেছনেও কারণ আছে একটা।

    কারণটা বলতে গিয়ে, দেয়ালে পোস্টার লাগানো আর তা দেখে তাঁর ভীষণ চটে যাওয়ার ইতিবৃত্তটাই শোনালেন আমজাদ সাহেব।

    হাশমত মিয়া বললেন, এতে রাগ করবার কি আছে?

    আলবত আছে। আমজাদ সাহেব মাথা ঝাঁকালেন। কতগুলো বখাটে ছোকড়া, বুঝলেন হাশমত সাহেব, কাজকর্ম কিছুই নেই। সারাদিন শুধু এই করেই বেড়ায়। আসলে কি জানেন— এরা হচ্ছে দেশের শত্রু। মানে এরা বিদেশের দালাল। কেন, আপনি পরশু প্রধানমন্ত্রীর বেতার বক্তৃতা শোনেন নি? আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন আমজাদ সাহেব। হাশমত মিয়া বললেন, চুপ, সাহেব আসছে।

    সাহেব ঠিক এলেন না। দরজা দিয়ে উঁকি মেরে আবার চলে গেলেন বাইরে।

    কেন যেন আজ অফিসের কাজে মোটেই মন বসছিলো না আমজাদ সাহেবের। এটা ওটা অনেক কিছু ভাবছিলেন তিনি।

    কালু মুদির পাওনা, দুধওয়ালার বাকি, মেয়ের বিয়ে— অনেক চিন্তাই মাথার ভেতর গিজগিজ করছিলো তাঁর।

    পাশের সিটে বসা হাশমত মিয়া খসখস শব্দে কলম চালাচ্ছিলেন আপন মনে।

    সামনের সারিতে বসা রমেশবাবু তার নস্যির ডিবে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন পকেটময়, আর বিরক্তিতে ভ্রূ বাঁকাচ্ছিলেন বার বার।

    সদ্য বিয়ে করা ডেসপাচার মূলকুত মিয়া কাজের ফাঁকে ফিস্‌ফিসিয়ে নতুন বৌ-এর গল্প করছিলেন পাশের সিটে বসা আকবর আলির সাথে। সবার দিকে এক পলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফাইলের ভেতর ডুব দিলেন আমজাদ সাহেব।

    মাথার উপরে বৈদ্যুতিক পাখাটা একটানা ঘুরছিলো ভনভন শব্দে।

    দেয়ালঘড়িতে তখন বোধ হয় বেলা একটা।

    হঠাৎ ওপাশের টেবিল থেকে ক্যাশিয়ার হুরমত আলি চাপা স্বরে বললেন, শুনছেন আমজাদ সাহেব?

    কি।

    অফিসে নাকি ছাঁটাই হবে।

    ছাঁটাই? তড়িত আহত হওয়ার মতো আচমকা চমকে উঠলেন আমজাদ সাহেব।

    হ্যাঁ, ছাঁটাই। আস্তে বললেন হুরমত আলি।

    খবরটা এক মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লো অফিসের আনাচে কানাচে। চলন্ত কলমগুলো শ্লথ হলো; থেমে পড়লো; খসে পড়লো অনেকের হাত থেকে। ফেকাশে দৃষ্টি তুলে পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো সবাই।

    ছাঁটাই? সেকি? কাঁপা ঠোঁটে বিড়বিড় করে উঠলেন হাশমত মিয়া। ও গড সেইভ মি। সেইভ গড। চাপা আর্তনাদ করে উঠলো এংলো ইন্ডিয়ান টাইপিস্টটা।

    আমজাদ সাহেব নিষ্কম্প। নিশ্চুপ। একটা কথাও মুখ দিয়ে বেরুচ্ছিলো না তাঁর। মাথার ভিতর শুধু গিজগিজ করছিলো কালু মুদির পাওনা, দুধওয়ালার বাকি, মেয়ের বিয়ে—। কপালের শিরাগুলো টনটন করছিলো তাঁর।

    সব অফিসেই ছাঁটাই হচ্ছে সাহেব। নিচ্ছে না, শুধু বের করছে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললেন হুরমত আলি।

    কপালটা দু’হাতে চেপে ধরে এল-ডি ক্লার্ক রমেশবাবু বললেন, কাল সেক্রেটারিয়েট থেকেও নাকি সাতজনকে ছাঁটাই করেছে শুনলাম।

    ও গড, সেইভ মি। সেইভ মি গড। আর একবার আর্তনাদ করে উঠলো এংলো ইন্ডিয়ান টাইপিস্টটা।

    ডাফটসম্যান আকবর আলি এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। হঠাৎ টেবিলের উপর একটা প্রচণ্ড ঘুসি মেরে লাফিয়ে উঠলেন তিনি। ছাঁটাই করবে মানে— ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি?

    হ্যাঁ, ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি? এটা মগের মুলুক নয়। তাঁকে সমর্থন করে বললেন মূলকূত মিয়া। আমাদের বৌ পরিবার নেই? ভাই বোন নেই? তারা চলবে কেমন করে? ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি যে ছাঁটাই করে দেবে?

    আঃ মূলকুত সাহেব। আস্তে আস্তে; এত চিৎকার করছেন কেন? চাপা স্বরে তাকে তিরস্কার করলেন বুড়ো ক্যাশিয়ার হুরমত আলি।

    আমজাদ সাহেব তখনও নিশ্চুপ, নিষ্কম্প।

    বিকেলে, অফিস ছুটির মিনিট কয়েক আগেই টাইপ করা নামগুলো টাঙ্গানো দেখা গেলো বারান্দায় নোটিশ বোর্ডের ওপর।

    অনেকগুলো নাম ৷

    একটা। দু’টো, তিনটে। তিনটে নামের নিচের নামটার দিকে চোখ পড়তেই মাথায় হাত দিয়ে ধপ্ করে বারান্দায় বসে পড়লেন আমজাদ সাহেব। খোদা, খোদা একি করলে!

    গড! ও গড! গড!

    ভগবান। ছেলেপিলেগুলো যে না খেয়ে মরবে ভগবান।

    অনেকটা টলতে টলতে অফিস ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলেন আমজাদ সাহেব। একটা নিরালা পার্কে ঢুকে একখানা আধভাঙ্গা বেঞ্চের ওপর ঝুপ করে বসে পড়লেন তিনি। নিরালায় একটু চিন্তা করবেন। কিন্তু চিন্তা করতে বসে বহুমুখী চিন্তার ধাক্কায় অল্পক্ষণের মধ্যেই হাঁফিয়ে উঠলেন আমজাদ সাহেব।

    দূরে একটা হলদে বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে পাশের বাড়ির একটা ছেলের সাথে ঈশারায় কথা বলছে। সেদিকে কিছুক্ষণ অর্থহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। চিঠির আদান-প্রদান হলো এ জানালা থেকে ও জানালায় দৃষ্টি সেদিকে থাকলেও, ভাবছেন তিনি অন্য কিছু। চাকরিটা তাহলে সত্যিই গেলো।

    আরে আমজাদ যে। কি ব্যাপার, এখানে কি করছো? পেছনে পরিচিত কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকালেন আমজাদ সাহেব।

    আবিদ সাহেব দাঁড়িয়ে। এককালের সহপাঠী; বর্তমান ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে কাজ করেন।

    ম্লান হেসে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন আমজাদ সাহেব। কি হে, কেমন আছ? ভালতো?

    ভালো আর কোথায়? ঘরে বৌয়ের অসুখ—

    অসুখ?

    হ্যাঁ। সেই পুরোনো রোগটাই আবার চাড়া দিয়ে উঠেছে।

    ডাক্তার দেখাওনি?

    ডাক্তারতো বলেছে রক্ত বলতে কিছু নেই শরীরে। বলে একটু থামলেন আবিদ সাহেব। তা ভাই, একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে পারো। বড় কষ্টে আছি।

    কেন তুমি চাকরি করতে না। সেটা কি হলো? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমজাদ সাহেব। সে তো গত পরশুই খতম। বলে ম্লান হাসলেন আবিদ সাহেব।

    সাতজনকে ছাঁটাই করেছে আমাদের ওখান থেকে শুননি?

    ছাঁটাই! ছাঁটাই! ছাঁটাই!

    উঃ কি হবে এই পোড়া পৃথিবীটার?

    কপালের ফুলে ওঠা শিরা দু’টো টিপে ধরে উঠে দাঁড়ালেন আমজাদ সাহেব।

    বাসার কাছে এসে পৌঁছতেই চোখ দু’টো দপ্ করে জ্বলে উঠলো তাঁর। হাত পা সমেত গোটা শরীরটা আর একবার কেঁপে উঠলো, রাগে-ক্ষোভে। সদ্য চুনকাম করা তাঁর একতালা দালানটার দিকে আগুনঝরা দৃষ্টিতে আর একবার তাকালেন আমজাদ সাহেব। ময়লা পায়জামা আর ছেঁড়া শার্ট পরা একটি কুড়ি বাইশ বছরের রোগা ছেলে দেয়ালে পোষ্টার লাগাচ্ছে। ধড়ে প্রাণ রাখবো না শালার। চাপা রোষে গর্জেই উঠলেন তিনি। শালার গোষ্ঠীর শ্রাদ্ধ করবো আজ। হাত দু’টো নিসপিস করছিলো আমজাদ সাহেবের। এতদিন পর হাতের মুঠোয় পেয়েছেন ছেলেটাকে, যতসব বখাটে ছোকড়া-শা’র আজ আর আস্ত রাখবো না, পিষে ফেলবো পায়ের তলায়।

    পোস্টার দেয়ালে সেঁটে দিয়ে ছেলেটা ধীরে ধীরে ততক্ষণে এগিয়ে আসছে তাঁরই দিকে। হিংস্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন আমজাদ সাহেব। হঠাৎ পোস্টারটার দিকে নজর পড়তেই থমকে দাঁড়ালেন তিনি। পুরোনো খবরের কাগজের ওপর লাল কালিতে লেখা গোট গোট অক্ষর। ছাঁটাই করা চলবে না।

  • জন্মান্তর

    জন্মান্তর

    লোকটাকে এর আগেও ক’দিন দেখেছে মন্তু। হ্যাংলা রোগাটে দেহ। তেলবিহীন উস্কোখুস্কো চুল। লম্বা নাক, খাদে ঢোকা ক্ষুদে ক্ষুদে দু’টি চোখ; সেক্রেটারিয়েট থেকে বেরিয়ে ক্লান্ত দেহটা টেনে টেনে নবাবপুরের দিকে এগোয়। কদাচিৎ বাসে চড়ে।

    বাস স্টান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে আপন মনে একটা আধপোড়া বিড়ি টানছিলো আর লোকটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলো মন্তু।

    পঞ্জিকার হিসেবে মন্তু এবার পনের-এর ব্যূহ ভেদ করবে। অর্থাৎ নাবালকের ডিঙ্গি থেকে সাবালকের ডাঙ্গায় পা দেবে। বয়স সবে পনের হলেও নিদেনপক্ষে বার পাঁচেক জেলের হাওয়া খেয়ে এসেছে মন্তু-মন্তু শেখ।

    ভাবতে গেলে জীবনটাই অদ্ভুত মন্তুর।

    আরও অদ্ভুত লাগে, যখন সে নিজে বসে বসে তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবে।

    সুখীয়াল স্বপ্নে ভরা দিন।

    তখন নেহায়েৎ বাচ্চা ছিলো মন্তু। সূর্য উঠতেই ক্ষেতের আইলে বাবার জন্য হুঁকো আর পান্তা নিয়ে হাজির হতো সে। বাবা জমিতে হালচাষ করতেন; মই দিতেন; আর ধান বুনতেন!

    বছর শেষে যা ফসল ঘরে আসতো, তা দিয়ে কোন রকমে দিন চলে যেতো ওদের। বাবা বলতেন, মন্তুরে আমার লেখাপড়া শিখামু। ইসকুলে পাঠামু ওরে।

    কি যে কও মিয়া! লেখাপড়ার আবার কদর আছে নাকি আজকাইল। নূরু চাচা বোঝাতেন বাবাকে। উয়ার চাইতে ক্ষেতের কাজ ভালা। ভালা কইরা চাষ কইরলে সোনা ফলে। মন্তুরে ক্ষেতের কাজ শিখাও।

    না বাপু, তা অইবার নয়। মৃদু মৃদু ঘাড় নাড়তেন বাবা।

    বাবার চোখে স্বপ্ন ছিলো।

    সে স্বপ্ন ভাঙতে দেরি হলো না।

    তখন যুদ্ধের মওসুম। সৈন্যরা এসে জমিগুলো সব দখল করে নিলো ওদের। সেখানে ঘাঁটি করবে ওরা। প্লেন ওঠানামার ঘাঁটি।

    সৈন্যরা এলো।

    সাথে নিয়ে এলো অসংখ্য ট্রাক, লরি আর বুলডোজার।

    আরো যে দুটো জিনিস সাথে করে এনেছিল ওরা, তা হলো দুর্ভিক্ষ আর মহামারী।

    দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে বাবা, মা, ভাই, বোন সবাইকে হারালো মন্তু। গাঁও ছেড়ে দলে দলে লোক ছুটছে শহরের পথে। সারি সারি লোক চলছে তো চলছেই। তেমনি একটা দলের সাথে শহরে চলে এলো মন্তু।

    শহর নয়তো প্রেতপুরী। পথে ঘাটে, ডাস্টবিনে মৃতের ছড়াছড়ি। অলিতে গলিতে অসংখ্য ক্ষুধিতের মিছিল। সে মিছিলে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল মন্তু। এমনি সময় দেখা ওর জুলমত সিকদারের সাথে। শহরে তখন পকেটমারের এক বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসেছে জুলমত। মন্তুকে দেখে বললো, এখানে কেন পড়ে পড়ে মরছিস বাপু। আয় আমার সাথে আয়। রোজগারের বন্দোবস্ত করে দেবো!

    জুলমতের কাছেই প্রথম হাতেখড়ি পড়লো মন্তুর। কালু, মতি, হীরা ওরাও ছিলো ওর সাথে। মতি নাকি সম্প্রতি ব্যবসা ছেড়ে কোন এক মন্ত্রীর কনফিডেন্সিয়াল এ্যাসিস্ট্যান্ট হয়েছে। চালাক ছেলে বটে, লোকে বলে মানিকে মানিক চেনে। একবারে খাঁটি কথা।

    বিড়িটা শেষ হতে কায়দা করে সেটা নর্দমায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে চকের দিকে এগুতে লাগলো মন্তু।

    হোটেলে ঢুকে পেট ভরে ভাত খেয়ে নিল সে। তারপর ওহিদ আলীর পানের দোকান থেকে কিমাম দেয়া একটা পান মুখে পুরে আর একটা বিড়ি ধরালো।

    কিরে মন্তু, আইজকা কিছু রোজগার অইল? ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো ওহিদ আলী। আরে, মরদ কি কোন দিন খালি হাতে ফেরে। মুখের কোণে গর্বের হাসি টেনে পকেট থেকে একটা জ্বলজ্বলে আংটি বের করে ওহিদ আলীকে দেখালো মন্তু।

    বিস্ময়ে চকচক করে উঠলো ওহিদ আলীর চোখ দুটো। মন্তু তখন আবার চলতে আরম্ভ করেছে।

    আংটিটার জন্য আজ সারাটি সকালটা হয়রান হতে হয়েছে ওকে। বাব্বাঃ যেমন ছেলে তেমনি মেয়ে। আংটি একটা কিনবে তো তিন ঘণ্টা ধরে তিনশ তিরিশটা আংটি পরখ করে তারপর কিনলো এটা। ছেলেটা বললো, নাও, হাতে পরে নাও তোমার।

    না, এখন না, পরে পরবো। মেয়েটা বললো, কোটের পকেটে রেখে দাও তোমার।

    মন্তুর বরাত! বরাত জোরই বলতে হবে। নইলে এই পকেটমারের যুগে কোটের পকেটে ভুলেও কেউ অলঙ্কার রাখে।

    জেল রোডের মোড়ে এসে আংটিটাকে আর একবার পরখ করে দেখলো মন্তু। উঁচু দেয়ালে ঘেরা জেলটার দিকে চোখ পড়তে বিনয়ের সাথে জেলকে একটা সালাম ঠুকলো সে। জেল তার গুরু। এ কথা স্বীকার করতেই হবে।

    একবার জেলে গেছে পাঁচ দশটা নতুন রকমের প্যাঁচ, নতুন রকমের কলা-কৌশল আয়ত্ত করে রেখেছে সে। গুরু মানবে না কেন? গুরুই তো। গুরুকে আর একটা সালাম ঠুকলো মন্তু। আংটিটা তখনও মুঠোর মধ্যে ওর।

    পরীবানুর ছবিটা চোখের পাতায় ভেসে উঠছে এখন।

    নবী সিকদারের লাল টুকটুকে নাতনী পরীবানু। একদিন এ আংটিটা আঙুলে পরেই মন্তুর পাশে এসে দাঁড়াবে সে। পরীবানু। পরীবানু নয় ফুলপরী। ও নামেই ওকে ডাকে মন্তু। ও নামেই আদর করে ওকে। সিকদার ব্যাটা বড় মিটমিটে লোক। সেদিন বললে, এত ফুচুর-কাছুর ভালো লাগে না মিয়া। বিয়ে করতে চাও তো বলো। মোল্লা ডেকে কলমা পড়িয়ে দিই।

    হক কথা। এই তো চায় মন্তু।

    চাইলেই হলো। অলঙ্কার পত্তর নেই, কিছু নেই, মেয়ে কি মাগনা নাকি? ব্যাটা সিকদার এক মুখে চার কথা বলে। তিনপদ অলঙ্কার ফেলে দাও দিখিনি। এখনই নাতনীকে হাতে তুলে দিচ্ছি তোমার। শালা— চামার, চামার।

    মন্তুকে বুঝেছে কি সে? তিনপদ অলঙ্কার বুঝি জোটাতে পারবে না মন্তু। এইতো আজকেই জুটিয়ে ফেলেছে সে একপদ। আর দু’পদে কয়দিন লাগবে। এক হপ্তা কি পনেরো দিন। বড় জোর এক মাস তারপর— তারপর ভাবতে ভাবতে রোমাঞ্চিত হলো মন্তু।

    বংশালের মাথায় এসে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালো সে।

    মুকুলে একটা ছবি এসেছে। কালু বলেছে বড়ো মজাদার ছবি। শেষ শো’তে একটি চান্স নিলে মন্দ হয় না। আপন মনে কয়েকটা শিস্ দিলো মন্তু।

    শো শেষ হলো রাত বারোটায়। কালো মেঘে ঢাকা গাঢ় অন্ধকার আকাশ বেয়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে তখন। হল থেকে বেরিয়ে, সোজা রাস্তায় এসে নামলো মন্তু। বগলে ওর সদ্য হাত সাফাই করা একটা বাঘ মার্কা ছাতা।

    ছাতাটা মেলে ধরে জনশূন্য নবাবপুর রোড বেয়ে এগিয়ে চলতে বেশ লাগছিলো মন্তুর। গুনগুন করে সদ্য দেখা সিনেমার দু’কলি গান ভাজতে লাগলো সে।

    হঠাৎ পেছনে কার পায়ের শব্দে ফিরে তাকানো মন্তু। একটু ভালো করে তাকাতে চিনলো সে। সেই লোকটা— সেক্রেটারিয়েট থেকে বেরিয়ে ক্লান্ত দেহটা টেনে টেনে রোজ যে নবাবপুরের দিকে এগোয়। হ্যাংলা—রোগাটে দেহ। তেলবিহীন রুক্ষ্ম চুল। লম্বা নাক। খাদে ঢোকা ক্ষুদে ক্ষুদে দু’টি চোখ। মন্তুর মনে হলো লোকটা যেন পিটপিট করে তাকাচ্ছে ওর দিকে। না, ঠিক ওর দিকে নয়, ওই ছাতাটার দিকে।

    ছাতার বাটটা শক্ত করে চেপে ধরলো মন্ত্ৰ।

    বৃষ্টিটা আরও একটু জোরে আসতেই লোকটা পা চালিয়ে ছাতার নিচে এসে দাঁড়ালো মন্তুর। উঃ এ বৃষ্টিতে ভেজা মানে নির্ঘাত নিউমোনিয়া। একটা ম্লান হাসি ছড়িয়ে মন্তুর দিকে তাকালো সে। গা-টা জ্বলে উঠলো মন্তুর। ইচ্ছে হলো এখনি ধাক্কিয়ে লোকটাকে রাস্তার একপাশে ফেলে দিতে। কিন্তু লোকটার হ্যাংলা দেহটার কথা ভেবে তা করলো না মন্তু। শুধু বার কয়েক চোখ পাকিয়ে পাকিয়ে দেখলো তাকে।

    আপনি কোনটায় গেছলেন। কথা না বলাটা অভদ্রতার পরিচয়, তা ভাল করেই জানে মন্তু।

    কোনটায় মানে?— আপনি কি বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছিনে।

    লোকটার বোকা বোকা মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি পেলো মন্তুর। এরাত বারোটার সময় মানুষ কোত্থেকে ফিরতে পারে, লোকটা মন্তুকে এত অবুঝ মনে করলো নাকি?

    আসছেন কোত্থেকে। সোজা পথেই এবার জিজ্ঞেস করলো সে।

    দৈনিক দেশের কথা অফিস থেকে।

    সেখানে কাজ করেন বুঝি?

    হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে সেক্রেটারিয়েটের ওখানে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

    হ্যাঁ, ওখানেও কাজ করি আমি। এল, ডি, ক্লার্ক। সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা। ওখান থেকে আর বাড়ি যাইনে, সোজা চলে আসি পত্রিকা অফিসে। কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বেজে যায়।

    দিন পনেরো ঘণ্টা কাজ করেন! বলেন কি সাহেব? তাহলে তো বেশ সুখেই আছেন। অনেক টাকা রোজগার হয়। এত টাকা করেন কি? মুরুব্বিয়ানা চালে কথাগুলো বললো মন্তু।

    ম্লান হাসলো লোকটা। পরিবারটা তো আর নেহায়েত ছোট নয়, ভাইবোন সবাই মিলে মোট বারো জন। তা— দেড়শো টাকায় কিই বা হয়।

    মাত্র দেড়শো টাকা। চোখ দুটো কপালে উঠলো মন্তুর। একটা লোক দিন পনেরো ঘণ্টা কাজ করে মাসের শেষে পায় মাত্র দেড়শো টাকা!

    বোকা, বোকা, লোকগুলো সব কি বোকা। হো-হো করে হাসতে ইচ্ছে হলো মন্তুর।

    আপনি কি করেন? এবার মন্তুর উত্তর দেবার পালা।

    আমি? আমি বিজিনেস— মানে ব্যবসা করি। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে জবাব দিলো মন্তু।

    কিসের?

    এই ছোটখাট— মানে সামান্য কারবার।

    কথার ফাঁকে একটা জীর্ণ দালানের সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা। চুনকাম পড়েনি সে দালানে, কতদিন, কত বছর হবে তা কে জানে!

    নড়বড়ে দরজার কড়াটা বারকয়েক নাড়তেই একটা বিদ্ঘুটে শব্দ করে খুলে গেলো দরজাটা। দরজার ওপাশে একটা নারী ছায়ামূর্তির অস্তিত্ব অনুভব করলো মন্তু।

    আরে দাঁড়িয়ে রইলেন যে, আসুন। বৃষ্টিটা থামুক, তারপর যাবেন। আসুন।

    দ্বিরুক্তি না করে বারান্দায় উঠে দাঁড়ালো মন্তু।

    তখন শুধু বৃষ্টি নয়। বৃষ্টির সাথে সাথে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়তে শুরু করেছে। রাস্তায় পানি জমেছে অল্প অল্প।

    কিন্তু ঘরে যা অন্ধকার, সামনে এগোনোই বিপজ্জনক। তাই দোরগোড়াতেই দাঁড়িয়ে রইলো মন্তু। লোকটা ভেতরে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর তার চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেলো ভেতরে। একটা বাতি না হলে চলবে কি করে, ভদ্রলোক এসেছেন।

    কিন্তু কি করবো বলো। ঘরে যে এক ফোঁটা তেলও নেই।

    কারো কাছ থেকে অল্প একটু ধার আনা যাবে না?

    ধার করে করেই তো এ তিন দিন চলেছি। মেয়েলী কণ্ঠে মিনমিনে আওয়াজ। একটা অজানা পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে মন্তুর চোখের পর্দায়। স্থির পাথরের মতো তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সে।

    আরে দাঁড়িয়ে রইলেন যে, আসুন— আসুন। অন্ধকারের ভেতরে ওর দিকে একটা হাতলভাঙ্গা চেয়ার এগিয়ে দিলো লোকটা। ভাগ্যিস আপনি ছিলেন। নইলে পথের মধ্যে বৃষ্টিতে কি যে অবস্থা হতো। হাত দুটো বারকয়েক কচলালো লোকটা।

    মন্তু বসলো।

    বাতি এলে, ঘরের চারপাশে আলতো চোখ বুলিয়ে নিলো মন্তু।

    ছোট্ট অপরিসর ঘর। মাঝখানে একটা চটের বেড়া দিয়ে দু’ভাগ করা হয়েছে ঘরটাকে। আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু নেই। একটা দড়ির খাটিয়া। একটা পুরোনো টেবিল, একটা চেয়ার আর দেয়ালে একটা ছোট্ট আলনা।

    বার কয়েক ভ্রূ কোঁচকালো মন্তু।

    এ্যা! মা, আমার টাকা! টাকা গেলো কোথায় মা? বুকফাটা চাপা আর্তনাদে চমকে উঠে ফিরে তাকালো মন্তু। লোকটা কি হার্টফেল করবে নাকি? নইলে অমন করছে কেন?

    টাকা! টাকা! টাকা! কি সর্বনাশ হলগো আমাদের। কি সর্বনাশ হলো! সরু মোটা অনেকগুলো কণ্ঠের চাপা গোঙানির শব্দ যেন চাবুক মেরে গেলো মন্তুর বুকে, পিঠে, পেটে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে।

    কি হয়েছে। আপনারা অমন করছেন কেন? ঠিক নিজেও বুঝতে পারলো না মন্তু। কখন সে সবার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

    লোকটা কঁকিয়ে যা বললো, তা শুনে রীতিমত ঘামিয়ে উঠলো সে। সেক্রেটারিয়েট থেকে পাওয়া একশ’টি টাকা বেমালুম উধাও হয়ে গেছে পকেট থেকে। বাসে করে যখন সংবাদপত্রের অফিসে গিয়েছিলো, তখন বোধ হয় কেউ পকেট থেকে তুলে নিয়েছে বলে তার ধারণা।

    ওইতো, আপনার বুক পকেটেই তো রয়েছে টাকাগুলো। আনন্দে আটখানা হয়ে পড়লো মন্তু, যেন এভারেস্টের চূড়োয় উঠেছে।

    না না, ওগুলো ‘দেশের কথা’ থেকে পেয়েছি। ওখানে পঞ্চাশ টাকা। সরবে প্রতিবাদ জানালো লোকটা। তারপর নির্বিকারভাবে মুখের লাগাম খুলে দিলো সে পকেটমারের চৌদ্দ পুরুষের পিণ্ডি চটকাবার উদ্দেশ্যে।

    মন্তু তখনো নির্বাক।

    বাইরে তখন ঝড় বইছে। বাজ পড়ছে প্রচণ্ড শব্দে।

    রাস্তায় হাঁটুর উপর পানি।

    বৃষ্টি থামলো না। বরং আরো বেড়ে গেলো।

    আর, তাই মন্তুর যাওয়া হলো না।

    টাকার শোকে একেবারে মুষড়ে পড়লেও, অতিথি সৎকার করতে ভুললো না লোকটা। ছেঁড়া কাঁথার ওপর বৌ-এর একখানা পুরোন শাড়ি বিছিয়ে দিয়ে মন্তুর শোবার বন্দোবস্ত করে দিলো।

    হ্যাঁ না কিছুই বললো না মন্তু। সোজা শুয়ে পড়লো সে।

    শুলো কিন্তু ঘুমালো না। জেগেই রইলো মন্তু। আর অপেক্ষা করতে লাগলো সবাই কতক্ষণে ঘুমায়।

    দেয়ালের সাথে ঝুলান সাটের বুক পকেটে পঞ্চাশটা টাকা। পাঁচখানা দশ টাকার কড়কড়ে নোট! কিছুতেই ভুলতে পারছিলো না সে।

    দূরে কাদের দেয়ালঘড়িতে ঢং করে একটা শব্দ হলো। নিরালা পৃথিবী, নিঃশব্দ তন্দ্ৰায় নিমগ্ন।

    অতি সাবধানে উঠে দাঁড়ালো সে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনে। আর একটু এগুতেই, কান্না মেশানো স্বরে কে যেন বললো, মাগো, হাঁড়িতে কি একটা ভাতও নেই। পেটটা যে পুড়ে গেলো।

    অজানা পৃথিবীর আর এক পাঠ!

    রীতিমত শিউরে উঠলো মন্তু।

    বাচ্চা মেয়েটা এখনও ঘুমোয়নি। পেটে ক্ষুধা নিয়ে কেমন করেই বা ঘুমোবে সে। মায়ের সান্ত্বনাবাক্য শোনা গেলো একটু পরে। কি আর করবে মা! রাতটা যে কোনমতে কাটাতেই হবে।

    একটা কচি মেয়ে কিছু না খেয়েই রাত কাটাবে? পকেটে হাত দিয়েও টাকাগুলো নিতে পারলো না মন্তু। মোট দেড়শ’টি টাকা। এ দিয়েই এদের কোনমতে মাস কাটাতে হয়। এবার মাত্র পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে কেমন করে চলবে এরা? মরে যাবে নির্ঘাত, মরে যাবে! মরে যাবে ওই কচি মেয়েটা! এর হাড় বের করা বউটা। আর ওই বাকি যে ক’জনা আছে সবাই। সবাই ওরা মরে যাবে। উঃ! ভাবতে গিয়ে মন্তুর কাঠিন্যে ভরা প্রাণটাও যেন কেমন করে উঠলো আজ। নিজের অভাব ভরা অতীত মনে পড়লো।

    দূরে কার দেয়ালঘড়িতে আরো দুটো শব্দ হলো।

    আর দেরি করলো না মন্তু। নিঃশব্দে পকেটের ভেতর হাতটা ঢুকিয়ে দিলো সে। সোনার আংটিটা এ আঁধারের ভেতরও কেমন চিক্‌চিক্ করছে। দু’হাতে আংটিটা অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করলো সে। পরীবানুর মুখটা ভেসে উঠলো চোখের পর্দায়।

    মত চোখ বুজলো।

    চোখ খুললো।

    তারপর আস্তে আংটিটা ছেড়ে দিলো দেয়ালে ঝোলান শার্টের বুক পকেটে। খস করে একটা শব্দ হলো সেখানে। তাও কান পেতে শুনলো। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলো সে।

    বৃষ্টিটা তখন থেমে গেছে। আর রাহুমুক্ত চাঁদ খল-খলিয়ে হাসছে আকাশে।

  • ইচ্ছা-অনিচ্ছা

    ইচ্ছা-অনিচ্ছা

    কালবৈশাখী দূরন্ত ঝড়ে নড়বড়ে চালাঘরটা ধসে পড়লো মাটিতে। বিন্তি জানতো না সে খবর।

    মিয়া বাড়িতে ধান ভানতে গিয়েছিল সে। ফিরে আসতেই রাস্তায় মনার মা বললো, তখনই কইছিলাম বৌ ঘরডারে একটু মেরামত কর। তা তো কইরলা না এহন—

    এহন কি অইছে বুয়া? শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো বিন্তি। মনার মা বললো, কি আর অইবো বাপু। ঘরডা পইড়া গেছে তুফানে।

    পইড়া গেছে? ইয়া আল্লা! হাত পাগুলো সব ভেঙ্গে এলো বিন্তির। করুণ কণ্ঠে তীব্র আর্তনাদ করে উঠলো সে। তিনডা কাচ্চাবাচ্চা নিয়া কোনহানে যামু আমি। কেমন কইরা ঠিক করমু ওই ঘর। আল্লারে-আল্লাহ্।

    বিন্তির কান্নাটা বুকে বড় বিঁধলো মনার মার। কি আর কইরবা বৌ। খোদার কাছ থাইকা দুঃখই আনছো; দুঃখই টানতে অইব জীবনভর। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সে। সোয়ামীটাও অকালে মারা যাওনে, আহ; তোমার এত দুর্দশা।

    তার কথা আর কও ক্যান বুয়া। হে যেইদিন মরছে হেইদিন থাইকাই তো ভাঙছে এ পোড়া কপাল। কথা শেষে কান্নার বেগটা আরো একটু বাড়লো বিন্তির। আদর করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মনার মা। কথায় কয় সোয়ামী নাই যার দুনিয়াই আন্দার তার!

    স্বামী অবশ্য এককালে ছিল বিন্তির। হাসিখুশি ভরা মানুষ। শক্ত-সামর্থ্য দেহ। বিন্তিকে কতই না ভালবাসতো সে। হাটে গেলে রোজ ঠোঙ্গায় করে চার পয়সার বাতাসা কিংবা দু’পয়সার ডালমুট নিয়ে আসতো বিন্তির জন্য। আদর করে হাতের মুঠোয় পুরে দিয়ে কানে কানে বলতো, সোনাদানা কিছু নাই, আর কি দিমু তোরে। আল্লা মিয়ায় গরিব কইরা বানাইয়াছে মোরে। তারপর— একদিন অকস্মাৎ জ্বরে পড়লো সে। টিপরা রাজার দেশে পাহাড়ে বাঁশ কাটতে গিয়েছিল শীতের মৌসুমে। ফিরে যখন এলো তখন ম্যালেরিয়ায় হাড্ডিসার হয়ে গেছে আবুল। দেখে প্রথমে আঁতকে উঠেছিল বিন্তি। ইয়া আল্লা, এই কাল ব্যামোয় কেমন কইরা ধরলো তোমারে। কেমন কইরা এই অবস্থা অইলো তোমার।

    কথা কইও না বৌ। কথা কইবার পারি না। জলদি গায়ে কাঁথা চাপা দে। জ্বরে তখন ঠকঠক করে কাঁপছিলো আবুল। চাটাইয়ের উপর শুইয়ে দিয়ে, গায়ে ওর কাঁথা চাপা দিল বিন্তি।

    বিপদ আসেতো সব দিক দিয়েই আসে।

    মিয়াবাড়িতে তখন ধান ভানার কাজ করতো বিস্তি। তিন মণ ওজনের ঢেঁকি; ঘণ্টাখানেক ভানতেই পায়ে ব্যথা করে ওঠে। শরীর অবশ হয়ে আসে। হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হতেই পা পিছলে পড়ে গিয়ে কপাল আর পায়ে ভীষণ আঘাত পেলো বিন্তি। হাটুর নিচটা অসম্ভব রকম ফুলে গেলো দেখতে না দেখতে।

    পুরো সাতটি দিন আতুরের মতো ঘরে বসে ছিল সে। আবুলের তখন শেষ অবস্থা। তো জ্বরের ঘোরে যা তা বকতে শুরু করেছে সে। এক ফোঁটা পথ্য কি ঔষুধ কিছুই ছিল না ঘরে। আবুল মারা গেল। ওর মৃত্যুতে উঠানে গড়াগড়ি দিয়ে অসম্ভব কেঁদেছিল বিন্তি। পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদেছিল সে।

    পাড়াপড়শীরা সান্ত্বনা দিয়েছিলো। কাইন্দা কি অইবে আবুর বৌ। কাঁদলে কি আর আবুরে ফিরা পাইবি।

    এত কান্দিস না বৌ। কান্দলে পর খোদা রাগ করবে। বিন্তির দুঃখে সহানুভূতি দেখিয়ে বলেছিলেন বুড়ো কাশেম মোল্লা। খোদার মাল খোদা নিয়া গেছে। তাতে কাইন্দবার কি আছে। কাইন্দা কি লাভ? হের থাইকা সোয়ামীডার যাতে পরকালে সদগতি অয় তার চেষ্টা কর। দুই চারডা মোল্লা ডাইকা খতম পড়া। কিছু দান খয়রাত কর।

    দান খয়রাত করতে অবশ্য কার্পণ্য করেনি বিন্তি। ইহকালের মাটিতে শুধু মাত্র দু- পয়সার কুইনাইনের অভাবে স্বামীকে বাঁচিয়ে না রাখতে পারলেও স্বামীর পরকালীন সুখ অভাবে শান্তির জন্য যথাসাধ্য ব্যয় করেছে সে। সে সব দীর্ঘ পাঁচ বছর আগের কথা।

    মাটিতে থুবড়ে পড়া কুঁড়েটার সামনে দাঁড়িয়ে সেদিনের ঘটনাগুলোই চোখের উপর বুলিয়ে নিচ্ছিল বিন্তি।

    মনার মা বললো, ভাবনা চিন্তা কইরা আর কি কইরবা বৌ। ঘরটা কেমনে মেরামত কইরবা এহন সেই চেষ্টা কর। কাচ্চাবাচ্ছাগুলোরে নিয়াতো আর উঠানে রাইত কাটান যাইবো না।

    মনার মার কথায় ওর দিকে মুখ তুলে তাকালো বিন্তি।

    না-না, আইজ রাইতের লাইগা চিন্তা নাই। আইজ রাইতটা না অয় আমার ঘরেই কাটাইলা। সহানুভূতির সাথে বললো মনার মা।

    বাড়ির মুরুব্বি মনু পাটারী বললো, দুঃখ করিস না বিন্তি। খোদায় যা করে ভালার লাইগাই করে। জানেন উপর দিয়া আইছিলো, মালের উপর দিয়া গেছে। কিছু দান খয়রাত কর তুই, দুই চাইরডা মোল্লা ডাইকা খতম পড়া।

    হ-হ— তা-তো কইরবই। খোদার কামে গাফেলতি করন ঠিক না। মনুকে সমর্থন জানালো মনার মা।

    সে রাতটা, মনার মার ছোট্ট কুঁড়েতেই ছেলেপিলে নিয়ে কাটালো বিন্তি।

    পরদিন ভোর সকালে বড় মিয়ার দোরগোড়ায় ধরনা দিল সে।

    বড় মিয়া পাকা পরহেজগার লোক। দু’ দু’বার হজ্জ করে এসেছেন তিনি। বিন্তির দুঃখের কথা শুনে বললেন, আবু বড় ভালা মানুষ আছলো বিন্তি। তুই তার বৌ। তোরে সাহায্য করমু না কারে করমু। বিন্তির হাতের বালা জোড়া, লোহার সিন্দুকে তুলে রেখে, তাকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিলেন বড় মিয়া। সময় মতো টাহাগুলো ফেরত দিয়া তোর জিনিস তুই নিয়া যাইস। কেমন?

    মহাজনী কারবার করেন বড় মিয়া। তবে, সুদ খান না। সুদের নাম কেউ নিলে, গালে চাটি মেরে সাতবার তওবা পড়ান তাকে। লোকে অলঙ্কারপত্র বন্ধক রাখে। বড় মিয়া দু’চার টাকা দিয়ে সাহায্য করেন তাদের। তবে, শর্ত আছে একটা। মাস তিনেকের মধ্যে টাকা শোধ না দিতে পারলে, অলঙ্কারগুলো বড় মিয়ার হয়ে যায়। মালিকের তাতে কোন অধিকার থাকে না। আর তাই বড় মিয়ার লোহার সিন্দুক দিন দিন ভর্তি হয়ে আসে।

    বালা বন্ধক রেখে আনা টাকা দিয়ে ভাঙ্গা ঘর মেরামত করলো বিন্তি। পুরোনো খুঁটি, পুরোনো খড় আর পুরোনো বেড়াগুলোকেই জোড়াতালি দিয়ে নতুন করে দাঁড় করালো কোন রকমে।

    ঘরটা মেরামত করতে করতে সঈদ কামলা বললো, আরো কিছু টাহা খরচ কইরলে ভালা অইতো আবুর বৌ। এই জোড়াতালি দেয়া ঘর তুফান আইলেই তো আবার পইড়া যাইবো।

    কি করমু চাচা। অসহায় ব্যাকুলতায় হু হু করে কেঁদে উঠলো বিন্তি। খোদা, খোদাই ভরসা আমার।

    তাতো ঠিকই কইছ বৌ। খোদাইতো সব। খোদায় ইচ্ছা কইরলে সুখ দিবার পারে মানুষেরে, ইচ্ছা কইরলে দুখ। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সঈদ কামলা।

    মনার মা বললো, আহা— কথায় কয় মাটি দিয়া বানাইছ খোদা, মাটির নিচে নিবা। বেহেস্ত কি দোজখ তুমি; তোমার ইচ্ছা মতো দিবা।

    করিম মোল্লা বোধ হয় বিকেলে হাট করতেই বেরিয়েছিলেন।

    বিন্তির নতুন ঘরটার দিকে চোখ পড়তে, দরদ ভেজা কণ্ঠে বিন্তিকে ডেকে বললেন, আবুর বৌ, খোদারে ফাঁকি দিও না। দু’চার জন মোল্লা ডাইকা নতুন ঘরে মিলাদ পড়াও। নইলে ঘরের ভিটা পাকা অইবো না।

    মিলাদ পড়ানোর কথাটা বিত্তিও ভাবছিলো মনে মনে।

    নতুন ঘর উঠালে মিলাদ পড়ানো রেওয়াজ। মিলাদ না পড়ালে ঘরে ফেরেস্তা আসে না। আর যে ঘরে ফেরেস্তা আসে না সে ঘরের উন্নতি নেই; স্থায়িত্ব নেই— তা ভালো করেই জানে বিন্তি। তাই, আবার বড় মিয়ার দোরগোড়ায় হাজির হলো সে।

    মিয়া গিন্নি ছমিরন বিবি তখন উঠানে ধান শুকাচ্ছিলেন বসে বসে। আর বার বার তাকাচ্ছিলেন আকাশের দিকে। বৈশাখের আকাশ এই রোদে ভরা, আর এই মেঘে ঢাকা। কোথায় থেকে হঠাৎ এত মেঘ এসে হাজির হয় তা ভাবতে অবাক লাগে ছমিরন বিবির। তাই, একসাথে ধান আর আকাশ দুটোকেই পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি বসে বসে। মেঘ দেখলেই ধানগুলো ঝটপট ঘরে উঠিয়ে নিয়ে যাবেন এই ইচ্ছে তাঁর।

    বিন্তির দুঃখের কথা শুনে বড় আফসোস করলেন ছমিরন বিবি। আহা তোর কপালডা তুই খাইবার আছস বিন্তি। কইলাম, ছেইলা মাইয়াগুলোরে কারো হাওলা কইরা দিয়া কারো সঙ্গে ‘সাঙ্গা’ বইয়া যা তুই। যৌবন এহনো ঢলঢল কইরবার আছে তোর গায়ে। সাঙ্গা বইতি চাইলে তুই হাজার জনে এহন সাঙ্গা করতে চাইবো তোরে। ক্যান বেহুদা নিজেরে শুকাইয়া মইরবার আছস তুই।

    ছমিরন বিবির কথায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো বিন্তি। তারপর বললো। না আম্মাজান, মইরা গেলেও সাঙ্গা বইমু না কারো কাছে। তাইলে ছেইলা মাইয়াগুলা আমার উপাস মরবো।

    এর উত্তরে কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন ছমিরন বিবি। হঠাৎ চোখ পড়লো তাঁর আকাশের দিকে। দক্ষিণ থেকে একটা বিরাটকায় কালো মেঘ উঠে আসছে আকাশে। ওরে ও বিন্তি আমার ধানগুলোরে একটু ঘরে তুইলা দে। জলদি কর জলদি কর বৃষ্টি যে আইয়া পড়লো।

    মিয়া গিন্নির ধানগুলো ঘরে তুলে দিয়ে— কাপড়ের আঁচলে ঘাম মুছে নিয়ে সসঙ্কোচে বড় মিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল বিন্তি। কয়ডা টাহা ধার দেন হুজুর।

    ধার দিতে আমার কোন আপত্তি আছেরে আবুর বৌ। আমার কি কোন আপত্তি আছে। সাদা দাড়িগুলোতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন বড় মিয়া। কিন্তুক, কিছু একডা তো বন্ধক রাইখতে অইবো তোরে। এমনে কেমন কইরা টাহা দেই।

    আমার কাছে একডা তামার বাটিও নাই হুজুর। জোড়হাতে অনুনয় করলো বিন্তি। কয়ডা টাহা দেন।

    কইলাম তো কিছু বন্ধক না রাইখলে টাহা দিবার পারমু না।

    তাইলে আমার কি অইবো হুজুর। আমার কি অবস্থা অইবো। বিন্তি কেঁদে উঠলো এবার।

    কিছুক্ষণ চুপচাপ কি যেন ভাবলেন বড় মিয়া। তারপর বললেন। তোর ঘর ভিটিটাই না অয় বন্দক রাখ না আমার কাছে।

    তা কেমন কইরা অয় হুজুর। বড় মিয়ার আকস্মিক প্রস্তাবে রীতিমত ঘাবড়ে গেলো বিন্তি। ভিটেবাড়ি বন্ধক রাখবে এ কেমনতর কথা? বিন্তিকে এ নিয়ে চিন্তা করতে দেখে অভিমানহত হলেন বড় মিয়া।

    এতে এত চিন্তা কইরবার কি আছে বিন্তি। আমি কি কোনদিন তোগো কোন খারাবি করছি। না করবার চাই?

    না-না, তা ক্যান কইরবেন হুজুর। তা ক্যান কইরবেন। বাধা দিয়ে বললো বিন্তি। আপনে আমাগো মা-বাপ।

    বিত্তির কথায়, দরদ যেন উছলে বড় মিয়ার কণ্ঠে। তোরে বিনা বন্ধকেই কিছু টাকা ধার দিবার ইচ্ছা আছিল বিন্তি। কিন্তু হায়াত মউততো কায়েম না হাওলাত বরাত রাইখা মইরা গেলে কেয়ামতের দিন দায় দিবার লাগবো তাই কইবার আছিলাম— বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বড় মিয়া। আল্লার কুদরতের শান কে বুঝবার পারে। তোর মতো গরিব দুঃখীদের বাঁচাইবার লাইগাইতো আল্লায় আমাগো মতো দুই চাইরজন বড় মানুষের পাঠাইছে দুনিয়ার পরে। কথা শেষে তছবি পড়ায় মন দিলেন বড় মিয়া।

    দ্বিমত করিছ না বিন্তি রাজি অইয়া যা। বড় মিয়ার হয়ে ওকালতি করলেন সুলতান মৌলভী। আল্লার ওলি মানুষ একডা কথা কইছে কথাডা ফালাইস না, বদদোয়া লাগবো।

    বদদোয়াকে ভীষণ ভয় করে বিন্তি। খোদাভক্ত, পরহেজগার মানুষের বদদোয়া বড় সাংঘাতিক জিনিস। বিন্তির মনে আছে— এ গাঁয়ের কেতু শেখকে একবার বদদোয়া দিয়েছিলেন এক পীর সাহেব। সেই বদদোয়াতেই তো গোষ্ঠী শুদ্ধ লোপ পেলো কেতুর। এক এক করে সবাই মরলো। এখন একেবারে ফাঁকা বাড়ি খাঁ খাঁ করে।

    বদদোয়ার ভয়ে অগত্যা রাজি হয়ে গেলো বিন্তি। একটা সাদা কাগজে কি সব লিখে, তার ওপর বিত্তির টিপসই নিলেন বড় মিয়া। তারপর, এক টাকার বারটা ময়লা নোট গুঁজে দিলেন ওর হাতে।

    মোল্লা খাওয়ানোর সময়, মুরগির হাড্ডি চিবোতে চিবোতে বিন্তির রান্নার অজস্র প্রশংসা করলেন কাশেম মোল্লা। বললেন, আহা বড় স্বাদের রাঁধা আবুর বৌ। বড় স্বাদের রাঁধা রাঁধছ।

    সুলতান মৌলভী বললেন, আরো দু’এক টুকরো গোস্ত দাও না আব্বুর বৌ। কেপ্পনি কর ক্যান। খোদার কামে কেপ্পনি ভালা না। ঠিক-ঠিক। কাসেম মোল্লা সমর্থন জানালেন তাকে। খোদার কামে কেপ্পনি ভালা না বৌ। আমারে আর চাইডা ভাত আর একটুহানি সুরুয়া দাও।

    খাওয়া শেষে মিলাদ পড়লেন সবাই। বিন্তির জন্যে দোয়া করলেন অকৃপণ কণ্ঠে। তারপর, নতুন ঘরের চার কোণে চারটে তাবিজ পুতে ঘরময় পড়ানো পানি ছিটোলেন কাসেম মোল্লা। ঘাবড়াইস না বিন্তি। খোদার উপরে আস্থা রাহিস। খয়রাতি পয়সাগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন সুলতান মৌলভী।

    আকাশ বেয়ে তখন অসংখ্য মেঘ অস্বাভাবিক গতিতে ছুটে চলেছে দূর দিগন্তের দিকে। বৈশাখ এখনও শেষ হয়নি।

    ঝাঁপিটা লাগিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো বিন্তি। কাল বৈশাখীকে আর কোন ভয় নেই তার। ভয় নেই কোন দূরন্ত ঝড়ের কঠোর ভ্রূকুটিকে। ঘরে ফেরেস্তা এনেছে সে। খোদার ফেরেস্তা। যে খোদা এই দুনিয়াকে সৃষ্টি করেছে। যার ইঙ্গিতে চলছে এই বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড।

    প্রশান্ত হাসিতে ভরে উঠলো বিন্তির মুখখানা।

    মাঝরাতে হঠাৎ কিসের প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো ওর। প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস হলো না। কাসেম মোল্লার তাবিজ; সুলতান মৌলভীর পড়ানো পানি; খোদার ফেরেস্তা। সব কিছুর প্রতি এমন চরম উপেক্ষা; এ কোন শক্তি। ভাঙ্গা হাতের কব্জিটাকে চেপে ধরে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ আকাশের দিকে তাকালো বিন্তি।

    সকাল বেলা বড় মিয়ার মেজ ছেলেকে উর্দু পড়াতে যাচ্ছিলেন কাসেম মোল্লা। বিন্তির ভাঙ্গা কুঁড়েটার দিকে চোখ পড়তে অনেক আফসোস করলেন তিনি। খোদা তোরে পরীক্ষা কইরতাছে বিন্তি। আহা— খোদার কুদরতের শান কে বইলবার পারে।

    ছাগ্‌লে দাড়িগুলোর ভেতর হাত বুলোতে বুলোতে বললেন তিনি, হয়ত কোন বড় মুছিবত আছিলো তোর উপর। খোদার ছোট্ট মুছিবত দিয়া পার কইরলেন সেইডা। ঘাবড়াইস না। এহন কান্নাকাটি কইরা খোদার কাছে মাপ চা। খোদার রাস্তায় কিছু খরচ কর। আহা— খোদায় যা করে ভালার লাইগাই করে।

    খোদায় যা করে ভালোর লাইগাই করে। কাসেম মোল্লার দিকে তাকিয়ে কাঁপা ঠোঁটে অদ্ভুতভাবে হাসলো বিত্তি।

  • অতি পরিচিতি

    অতি পরিচিতি

    অসংখ্য বই পুস্তকে সাজানো ট্রলির বাবার লাইব্রেরি। দেখে অবাক হল আসলাম। সত্যি, বাসায় এতবড় একখানা লাইব্রেরি আছে, ট্রলি তো এ কথা ভুলেও কোনদিন বলেনি তাকে।

    একটু হাসলেন ট্রলির বাবা। বলেন, দৈনিক কমপক্ষে ঘণ্টা আটেক এখানেই কাটে আমার। রীতিমত একটা নেশা হয়ে গেছে। কেবল পড়া পড়া আর পড়া। জীবনটা বই পড়ে পড়ে কাটালাম।

    লিনেনের শার্ট আর ট্রপিকেলের প্যান্ট পরা সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক যুগল ভ্রূ-জোড়ার নিচে তীক্ষ্ণ একজোড়া চোখ। কপালে বার্ধক্যের জ্যামিতিক রেখা। কেন জানি প্রথম সাক্ষাতেই ভদ্রলোকের প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধা জন্মে গেলো আসলামের। মেহগিনি কাঠের রঙিন সেল্ফ থেকে মরক্কো লেদারে বাঁধাই মাসিক ‘মাহে নও’য়ের বাৎসরিক সঙ্কলনখানা নামিয়ে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভদ্রলোক আবার বলেন, কিন্তু, একটা কথা কি জানো আসলাম এদেশে শিক্ষার কোন কদর নেই।

    শিক্ষা আছে যে তার কদর থাকবে? বাবার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ওপাশ থেকে উত্তর করলো ট্রলি।

    ট্রলির সাথে আসলামের পরিচয় আজকের নয়। বছরখানেক আগের। ভার্সিটির লনে, প্রথম পরিচয় মুহূর্তে কোন এক মন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে ট্রলি বলেছিলো, আমি তার ভাগনী।

    মন্ত্রীর ভাগনী? মানে আপনার মামা মিনিস্টার? প্রথমটায় অল্প একটু অবাক হয়েছিলো বইকি আসলাম।

    সরু ঠোঁটের ওপর লিপিস্টিকের ডগাটা নিখুঁতভাবে বুলিয়ে নিয়ে ট্রলি বলেছিলো, জ্বী হ্যাঁ। আমার এক মামা মিনিস্টার। আর, এক মামা এ্যামবাসেডার।

    মামা যার মিনিস্টার, দুনিয়া তার তামার মতো উজ্জ্বল বলে জানতো আসলাম। তাই বলেছিলো, আপনার বাবাও কি তাহলে—।

    না না, ওসব মন্ত্রীগিরির মধ্যে বাবা নেই। তিনি আমদানি রপ্তানির ব্যবসা করেন। ট্রলি বলেছিলো।

    বাবা ব্যবসা করেন। মামা মিনিস্টার। সত্যি কেন যেন সেদিন বড্ড ভালো লেগেছিলো ট্রলিকে। ফিনফিনে বাতাসের ভেতর বাগানে বেড়াতে বেড়াতে ট্রলির বাবা বললেন, জানো আসলাম, এই যে গাড়ী বাড়ি আর ধন-দৌলত দেখছো, এ সব কিছু স্রেফ ব্রেইন দিয়ে আয় করা।

    ভাষাটা দ্রষ্টব্য না হলেও ঠিক বোঝা গেলো না। কপালে বিস্ময়ের ঢেউ তুলে আসলাম তাকালো ট্রলি আর তার বাবার দিকে।

    মুখ টিপে হাসলো ট্রলি।

    হাসলেন ট্রলিরা বাবা।

     

    দিনটা ছিলো রোববার। আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসে বসে কি একটা মার্কিনী পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিলো ট্রলি। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই কৈফিয়তের সুরে প্রশ্ন করলো, এতদিন আসনি যে?

    আসবো কেমন করে বলো। তোমার মামা যে ঘর থেকেই বেরুতে দিলেন না এ কয়দিন।

    তার মানে?

    মানে একশ’ চুয়াল্লিশ ঘার কারফিউ।

    ওঃ ভ্রূ-জোড়া নেচে উঠলো ট্রলির।

    হঠাৎ বলে উঠলো আসলাম, আচ্ছা ট্রলি, তুমিই বলো। এতগুলো নিরীহ ছেলেকে গুলি করে মারা কি উচিত হয়েছে?

    হুঁ, কি বললে? বই থেকে মুখ তুললো ট্রলি।

    ওই গুলি ছোড়ার কথা বলছিলাম। তুমি কি কোন খোঁজ রাখ না ট্রলি?

    রাখি। মাথা দুলিয়ে বললো ট্রলি, যদি বলি গুলি ছেড়াটা ন্যায়-সঙ্গত হয়েছে তাহলে?

    হ্যাঁ তাহলে? দোরগোড়া থেকে গম্ভীর গলায় বললেন ট্রলিরা বাবা। আসলে কি জানো আসলাম। এদেশের ছেলেমেয়েগুলো সব গোল্লায় গেছে। উচ্ছন্নে গেছে সব। নইলে ইসলামী ভাষা ছেড়ে দিয়ে ওই কুফুরি ভাষার জন্য এতমাতামাতি কেন? কথা তখনও শেষ হয়নি ট্রলির বাবার। ইসলামী দেশে ইসলামী ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হবে এতে কোন সন্দেহ নাই। টেবিলে একটা প্রচণ্ড ঘুষি পড়লো তার। আসলাম, আমি যা কিছু বলি থরো স্টাডি করেই বলি। আমি বলছি তোমায়। অনেক স্টাডি করে আমি দেখেছি।

    বাংলা ভাষার নিজস্ব ঐতিহ্য বলতে কিছুই নেই। একেবারে নাথিং। নট এ সিংগল ফাদিং। বাবার সাথে তাল মিলিয়ে বললো ট্রলি।

    প্রতিবাদে কি বলতে যাচ্ছিলো আসলাম। থামিয়ে দিল সে, হয়েছে থাক। তোমার মাথায় শয়তান বাসা করেছে। ওগুলো তাড়াতে হবে। ওঠো, উপরে চলো।

    টেনে তাকে উপরে নিয়ে এলো ট্রলি। বসো। জোর করে চেপে বসিয়ে দিল চেয়ারের উপর। তারপর বৈদ্যুতিক পাখাটাকে ঘুরিয়ে দিয়ে কাছে এসে দাঁড়ালো সে। মাথার এলোমেলো চুলের ভেতর পরম আদরে ওর নরম আঙুলগুলোকে বুলিয়ে দিয়ে ট্রলি বললো, তুমি এরকমটি হবে তা কোনদিনও ভাবতে পারিনি আসলাম। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো করুণ হাসি ট্রলির।

     

    ট্রলির বাবার পুরোনো চাকরের সাথে আলাপ হলো বৈঠকখানায়। বুড়োকে দেখে যেন জর্জ বার্নাড শ’র কথা মনে পড়ে গেলো আসলামের। সুদূর বিলেতের মৃত বার্নাড শ’র সাথে অদূর রমনার এই বুড়ো ভৃত্যের আকৃতিক সামঞ্জস্য সত্যি বড় অদ্ভূত ব্যাপার।

    কৌতূহল বশেই হয়ত জিজ্ঞেস করে আসলাম, কতদিন আছ এখানে?

    তা সাহেব অনেক দিন। বুড়ো হেসে বললো, সেই যুদ্ধের আমল থেকে।

    বল কিহে। সেতো বছর দশেকেরও বেশি।

    হ্যাঁ সাহেব। বছর দশেকের মতই প্রায়। বুড়ো বললো, তখন কিন্তু এদের অবস্থা অতো ভালো ছিল না। কলকাতায় সার্কুলার রোডের উপর রেশনের দোকান ছিল একটা। গলাটাকে একটু খাড়ে নিল বুড়ো। এখন যা কিছু দেখছেন— এসব তো পাকিস্তান হবার পরেই—। কথাটা শেষ করতে পারলো না সে। ভেতর থেকে ট্রলির ডাক পড়তেই ভেতরে চলে গেলো।

     

    দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর, ভার্সিটির লনে আবার দেখা হল ট্রলির সাথে।

    কেমন আছ ট্রলি? জিজ্ঞেস করলো আসলাম।

    এই এক রকম। ট্রলি বললো, আগামী মাসে বিলেত যাচ্ছি।

    কেন, হঠাৎ?

    ট্রলি বললো, তুমিতো জান, মেজ আপা ওখানেই আছেন। তাঁর বাসায় কিছুদিন বেড়াবো। তারপর সেখান থেকে যাবো কালিফোর্নিয়াতে বড় আপার কাছে।

    ফিরছো কখন?

    বলতে পারছি না ঠিক। টানা চোখের ভ্রূ-জোড়া নেচে উঠলো ট্রলির। বললো, বড় আপা গিয়ে আর ফেরেননি। ওখানেই বাসা বাড়ি করে রয়ে গেছেন। মেজ আপার অবস্থাও প্রায় সে রকম হতে চলেছে। আমারও হয়ত—

    কথাটা শেষ করলো না ট্রলি। কেন যেন হঠাৎ থেমে গেলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো, সময় করে একবার বাসায় এসো তোমার সাথে একটা জরুরি কথা আছে।

    আরেক দিন কি একটা কাজে রাস্তায় বেরিয়েছিল আসলাম। পেছন থেকে ট্রলির কন্ঠস্বর শুনে ফিরে দাঁড়ালো। কেডিলাকের হুইল ধরে বসে আছে ট্রলি। কাছে আসতেই বললো, খবরটা নিশ্চয়ই শুনেছো।

    কোন খবর? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো সে।

    কেন, আজকের কাগজ পড়নি? ট্রলি অবাক হলো।

    না, এখনও পড়িনি।

    পড়নি? তাহলে মোটরে উঠ। একটু অবাক করিয়ে দিই তোমায়। জোরে হেসে উঠলো ট্রলি।

    বাসার সামনে অসংখ্য মোটরের সার দেখে সত্যি অবাক হল আসলাম। বললো কি ব্যাপার ট্রলি?

    বুঝতে পারছো না কিছু? ট্রলির চোখে রহস্যঘন হাসি। ট্রলি হেসে বললো, বাবা শিঘ্রী সেন্টালের এডুকেশন বিভাগের বড় কর্তা হয়ে যাচ্ছেন, বুঝলে?

    ও, তাই নাকি?

    হ্যাঁ তাই, ট্রলি বললো। তোমাদের পছন্দ হবে তো?

    নিশ্চয়ই হবে। তাঁর মত একজন ইন্টালেকচুয়াল লোক—

    কথাটা কেন যেন গলায় আটকে গেলো। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি তুলে ট্রলি বললো, একটা দরখাস্ত লিখে রেখোতো আসলাম। বাবার একজন প্রাইভেট সেক্রেটারীর দরকার হতে পারে। আমি তোমায় রিকমেন্ড করে দিয়ে যাব। বুঝলে?

    মোটর থেকে নামতেই ট্রলির বাবাকে দেখা গেল। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত তিনি। তাই হয়ত আসলামের উপস্থিতি তাঁর চশমায় ঘেরা চোখে ধরা পড়লো না সহজে।

    ট্রলি বললো, লাইব্রেরিতে গিয়ে বস তুমি। আমি একটা কাজ সেরে আসি। কেমন? বলে উপরে চলে গেলো সে।

    সেল্‌ফ থেকে একটা বই নামিয়ে পড়তে বসলো আসলাম। রবি ঠাকুরের গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ।

    কে আসলাম? ট্রলির বাবার চমকে ওঠা কণ্ঠস্বরে বই থেকে মুখ তুলে তাকলো সে।

    কখন এলে তুমি? উচ্ছ্বসিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন ট্রলির বাবা।

    এইতো মিনিট পনেরো আগে। ধরা গলায় উত্তর দিল আসলাম।

    কি পড়ছো ওটা? আরো কাছে এগিয়ে এলেন তিনি। তারপর বইটার উপর ঝুঁকে পড়ে বললেন, ও গীটাজ্ঞলী? এ নাইস, নাইস বুক। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন দেশের ভাবী শিক্ষাকর্তা, ট্রলির বাবা। বললেন, গীটাজ্ঞলী, ওঃ! চমৎকার বই! মিলটনের একখানা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

  • স্বীকৃতি

    স্বীকৃতি

    জীবনকে অস্বীকার করিস না মনো! অস্বীকার করিসনে তোর আপন সত্তাকে, অনেক কিছু তোর করবার আছে এ জীবনে।

    অনেক চেষ্টা করেছে মনোয়ারা, কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারেনি জামানের এ কথা কয়টি। সংসারের নিত্য নৈমিত্তিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে, বার বার মনে পড়ে যায়। আর ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে পড়ে সে।

    সেদিনের সেই ফ্রক পড়া ছোট মেয়েটি শাড়ির পোঁচ লাগতে না লাগতেই যে কখন যৌবনের রোজনামচায় নাম লিখিয়ে ফেললো তা নিজেও ভাবতে পারে না মনোয়ারা। বুড়ি দাদীর চোখেই প্রথম ধরা পড়ছিল সে। পান খাওয়া লাল দাঁতগুলোকে ফাঁক করে ভর্ৎসনার সুরে ছেলেকে বলেছিলেন তিনি, আমি মরে গেলে তোদের যে কি হবে তাই ভাবছি।

    সদ্য অফিস ফেরত ছেলে অবাক হয়েছিল মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে— কেন, কি হয়েছে মা? মেয়েটার যে বিয়ে দেবার বয়স হয়ে গেছে তার কি কোন খোঁজ রেখেছিস? রাখবিই বা কেন, তুই কি কোন দিন সংসারের ভেবেছিস, না ভাবিস? যাই বল বাবা, মেয়ের জন্য এবার একটা ভাল দেখে জামাই দেখ।

    জামানতো ওকে প্রথমে দেখে চিনতেই পারলো না, চিনবেই বা কি করে? চার বছর পর সে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছে; এ চার বছরের ভেতর অনেক পরিবর্তন এসে গেছে মনোয়ারার শরীরে, চেহারায়।

    অবাক হচ্ছো যে, চিনতে পারছো না? আমাদের মনো, মনোয়ারা গো। মা ওর সংশয় দূর করলেন।

    ও! ঠোঁটের কোণে একটু হাসি টেনে, নিজ অজ্ঞতাকে ঢাকতে চাইলো জামান।

    ক্লাশ সেভেনে পড়ে। গত বছর বৃত্তি পেয়েছিল। মায়ের কথায় আবার মুখ তুলে মনোয়ারার দিকে তাকাল জামান ৷ সে ততক্ষণে সরে গেছে পর্দার আড়ালে। তার এই আড়ালের ঘটনাকে আর একদিন জামান বলেছিলো, পর্দাই তোমাদের পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে মনো। এ রহস্যঘেরা পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ থেকে তোমাদের বঞ্চিত করেছে। জামানের কথায় অবাক হয়েছিলো মনোয়ারা, কিন্তু কোন উত্তর দেয়নি। শুধু চেয়েছিলো ওর দিকে, কাজল কালো চোখ দুটো মেলে।

    জানো ও খুব ভালো রান্না করতে জানে। মা বললেন।

    হুঁ। মৃদু হাসলো জামান।

    ওই যে টেবিল ক্লথটা দেখছ না। ওটা মনোয়ারা সেলাই করেছে। বেশ সুন্দর হাতের

    কাজও জানে ও।

    মায়ের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে খুশি হতে পারে না মনোয়ারা। বরং পর্দার এ পাশ থেকে রেগেছে মনে মনে— মা যেন কেমন! মনোয়ারা জানে জামানের কাছে এ সবের কোন মূল্য নেই। মনোয়ারার আন্দাজ অহেতুক নয়। কেননা, একটু পরে চায়ের পেয়ালাটা যখন সে জামানের দিকে এগিয়ে দিল তখন চায়ে একটা চুমুক দিয়েই জামান হেসে উঠলো— চা তো তৈরি করেছিস খাসা করে। লেখাপড়ায়ও নাকি বৃত্তি পেয়েছিস। হাতের কাজেও বেশ ভালো। কোন পলিটিক্যাল ফাংসনে টাংসনে যাস?

    ফিক করে হেসে উঠে একটু দূরে সরে দাঁড়াল মনোয়ারা।

    পটেন কাল ফা-সা-নটা কি বাবা, তাতো বুঝলাম না। মায়ের অজ্ঞতা পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছিল মনোয়ারার কাছে। তাই সে সরে যেতে চেয়েছিল।

    যাচ্ছিস কোথায়? বস, তোর সাথে কথা আছে। আদেশের সুরে বললো জামান।

    আঁচলটা গুটিয়ে নিয়ে মনোয়ারা বসলো। সামনের একখানা চেয়ারে উপর।

    পলিটিক্যাল ফাংসনটা বুঝলে না মামী, ওটা হচ্ছে রাজনীতি করা। মানে সভাসমিতি করা; বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বক্তৃতা দেওয়া—।

    অ-বক্তিতা দেওয়া? ওতো ব্যাটা ছেলেরা করে। মা অবাক হন।

    না, মেয়েরাও করে। মায়ের অজ্ঞতা দূর করতে চেষ্টা করে জামান। এতক্ষণ চুপটি করে মনোয়ারা চেয়েছিল জামানের মুখের দিকে। এবার দৃষ্টি বিনিময় হলো ওদের; জামান আর মনোয়ারার। মনোয়ারা চোখ সরিয়ে নিল) কিন্তু জামান পারলো না, চোখ দুটো ওর মুখের উপর রেখেই বললো— বেশ সুন্দর হয়েছিল তো দেখতে। লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠলো মনোয়ারার মুখখানা।

    অথচ এই সেদিনের কথা। যখন ওরা ছোট ছিল, একসাথে হুড়ো-হুড়ি আর খেলাধূলা করতো, ওরা ঘর বাঁধতো, বর বধূ সাজাতো। কই সেদিন তো মনোয়ারা রাঙা হয়ে উঠেনি। অদ্ভুত মানুষের জীবন।

    হ্যাঁ, অদ্ভুতই তো নইলে ভাবতেও তো পারছে না মনোয়ারা, কেমন করে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলো? কেমন করে যে কৈশোর আর যৌবন ছাড়িয়ে প্রবেশ করলো প্রৌঢ়ত্বের কোঠায়। বিছানার চাদরটা গুটিয়ে ফেললো। ময়লা হয়ে গেছে ভীষণ। না কাঁচলে আর নয়। আবুলকে পাঠিয়ে দোকান থেকে সাবান আনিয়ে নিতে হবে একটা। কিন্তু— কি যেন ভাবছিল সে একটু আগে।

    ও-হ্যাঁ, তার ছোটবেলাকার কথা, আর জামানের কথা— এরপর আরও দু’ একটা দিন গেছে অসহ্য পরিবেশের ভেতর দিয়ে। তারপর তৃতীয় দিনে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে দু’জনাই।

    চল সিনেমায় যাবো? জামান বললো, সাথে কিন্তু আর কাউকে নিতে পারবি না, শুধু তুই একা?

    মা যেতে দিলে তো।

    কেন যেতে দেবে না? মাকে শুনিয়ে শুনিয়েই জোর গলায় বললো জামান, চোরের সাথে যাচ্ছিস তো না, আমার সাথে যাচ্ছিস, নে-কাপড় পরে নে, সময় হয়ে এলো।

    বাঁধা দেবার কোন পথ রাখেনি জামান, মা এসে শুধু বোরখাটা এগিয়ে দিলেন— নে, সময় হয়ে এলো।

    রিক্সা আনতে গিয়েছিল জামান, ফিরে এসে মনোয়ারার হাতে বোরখা দেখে অবাক হলো— ওটা আবার কেন?

    মা বলেছেন। মুখ নিচু করে উত্তর দিল মনোয়ারা।

    ওর হাত থেকে বোরখাটা টেনে নিয়ে বারান্দায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, এক হাতে ওর একখানা হাত ধরে, হেঁচকা টান দিল জামান।

    চল—

    রিক্সায় চড়তে এসে অবাক হলো মনোয়ারা— রিক্সার পর্দা লাগানো হয়নি যে? প্রয়োজন নেই বলে। নিস্পৃহের মতো উত্তর দিল জামান।

    বাবা আর চাচা জানতে পারলে কিন্তু ভীষণ গাল দেবেন। মনোয়ারার কণ্ঠে ভয়ের আভাস।

    বিরক্তি বোধ করে জামান। নে নে, উঠবি তো ওঠ। বাবা বকবে, চাচা বকবে, কেন বকবে বলতো? তোদের কি বাইরে বেরুতে নেই নাকি?

    আর কথা কাটাকাটি করেনি মনোয়ারা। আসলে কোন কথাই যেন সে অবিশ্বাস করতে পারেনি যুক্তিহীন বলে। চুপটি করে রিক্সায় এসে বসেছে, রিক্সা ছেড়ে দিয়েছে।

    জামান নামলো প্রথমে— নেমে আয়! দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে মনোয়ারাকে ইশারা করলো জামান।

    ভীষণ ভয় পেয়েছিল মনোয়ারা। অজানা অচেনা এ কোন জায়গায় জামান তাকে নিয়ে এলো, পরক্ষণে যার সামনে গিয়ে তাকে দাঁড়াতে হলো তাকে দেখে আরো ঘাবড়ে গেল সে। আধ পাকা চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, তীক্ষ্ণ চোখ, উন্নত নাসিকা গৌরবর্ণ দেহ এক বলিষ্ঠ পুরুষ। এর কথাই কি তুমি বলেছিল জামান? উঃ কি কর্কশ গলা। মনোয়ারা আর একবার ফিরে তাকালো ভদ্রলোকের দিকে।

    হ্যাঁ, এর কথাই বলেছিলাম।

    নামকি তোমার! আবার সে কর্কশ গলায় প্রশ্ন। নামটা বলবার সঙ্কোচও কাটিয়ে উঠতে পারছিলো না মনোয়ারা, জামানই ওর হয়ে বললে— নাম মনোয়ারা।

    কিন্তু ও এতো লজ্জা করছে কেন? ওকে বুঝিয়ে দাও, যে পথে এসেছে, সে পথে লজ্জা সঙ্কোচ সব কিছু ঝেড়ে ফেলে মাথা উঁচিয়ে চলতে হবে ওকে।

    যে পথে এসেছে? কোন পথ? রীতিমত ঘেমে উঠলো মনোয়ারা। লোকটা কি হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর বুকের দিকে। না-না, ঠিক বুকের দিকে নয়, গলার সাথে ঝুলানো নেকলেসটার দিকে।

    অলঙ্কার পরাটাকে তুমি খুব পছন্দ কর বলে মনে হচ্ছে।

    হঠাৎ এ প্রশ্নের হেতু? মাথাটা যেন ঘুলিয়ে যাচ্ছে মনোয়ারার। কিন্তু ও অলঙ্কারের ইতিহাসটা যদি তুমি জানতে তাহলে নিশ্চয়ই, ওগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। না ইতিহাস জানবার কোন দরকার নেই ওর। জামানের প্রতি ভীষণ রাগ হয় মনোয়ারার। ভদ্রলোক আবার ততক্ষণে বলে চলেছেন— প্রাচীনকালে, প্রাচীনকালে কেন? মধ্যযুগেও পুরুষেরা নারীর উপর অমানুষিক উৎপীড়ন চালাতো। যখন তখন যথেচ্ছাভাবে তাদের মারপিট করতো। শুধু তাই নয়। কোমরে, গলায়, হাত পায়ে শিকল বেঁধে ঘরের ভেতর ফেলে রাখতো ওদের। পাছে ওরা পালিয়ে যায়। নারী সে ট্র্যাডিশন ক্ষুণ্ণ করলো না। আজও তাই তারা হাতে, পায়ে, গলায় শেকল— অবশ্য আগে লোহার ছিল, এখন সোনার পরে গর্ব অনুভব করে। সেদিনই ঘরে ফিরে মনোয়ারা তার সমস্ত অলঙ্কার আলমারীতে তুলে রেখে দিয়েছে। আর পরেনি।

    মা আর দাদী অবাক হলেন।

    কিরে? এত কান্নাকাটি করে বাপের কাছ থেকে ওগুলো আদায় করে নিলি কি আলমারীতে তুলে রাখার জন্য?

    সেদিন কোন উত্তর দেয়নি মনোয়ারা। উত্তর আর কবে, কখন, কোন কথারই বা দিয়েছে সে? অফিস থেকে ফেরার পর স্বামী যখন আবোল তাবোল আরম্ভ করে, তখন কি মনোয়ারা ইচ্ছা করলে তার উত্তর দিতে পারে না? কিন্তু কৈ, দেয়নি তো কোনদিন? স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বলতে পারে না। লোকটা কেমন ভেঙ্গে পড়ছে দিন দিন। সারাদিন হিসাবের খাতায় সারি সারি অঙ্ক কষলে কারই বা মেজাজ ঠিক থাকে?

    ওই যা, চাদরটা এবার কি করে কাঁচবে মনোয়ারা? পানিটা যে চলে গেলো, তিনটার আগে কি আর আসবে?

    আকাশে তখন বিবর্ণ মেঘের ছুটোছুটি। এলোমেলো হাওয়ায় চুলের গোছা বার বার কপালে লেপ্টে আসছে সাবানের পানিতে।

    আবার আনমনা হয়ে পড়ে মনোয়ারা।

    মাঝে কিছুদিনের জন্য কোথায় চলে গিয়েছিল, ফিরে এসে মনোয়ারাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে সব বুঝিয়ে দিল। তাকে কি করতে হবে। মাথা নাড়লো মনোয়ারা, না সে পারবে না। রাগে ফেটে পড়লো জামান— এটা পারবিনে, ওটা পারবিনে, পারবি কি বলতো?

    রান্না করতে। আঁচলের আড়ালে মুখ টিপে হেসেছিলো মনোয়ারা।

    হ্যাঁ, ওটা ছাড়া আর পারবিই বা কি? কিন্তু এমন একদিন আসবে সেদিন আমাদের বলার আগেই নারী এগিয়ে আসবে পাশে। রাগের মাত্রা বাড়লো বই কমলো না জামানের, পাকঘরের ভেতরেই তো তোরা তোদের বন্দি করে রেখেছিস। আচ্ছা বলতো মনো, এই সারাটা দিন পাকঘরের ভেতর রান্না করতে তোদের একটুও বিরক্তি আসে না নাকি?

    দূর ছাই চুলোর উপরে তেলটা কখন থেকে ফুটছে তো ফুটছেই। বড্ড অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে মনোয়ারা। কি দরকার পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটি করে, জীবনটা তো তার রান্না করেই গেলো। তবুও কি সে খাইয়ে কোনদিন সন্তুষ্ট করতে পেরেছে? তেল হয়েছে তো মসলা হয়নি। মসলা হয়েছে তো নুন বেশি পড়ে গেছে। নিত্য নতুন অভিযোগ।

    হ্যাঁ, নতুন নতুন জিনিস পাক করতে আমাদের খুব ভাল লাগে। জামানকে রাগাবার জন্যই কথাটা বলেছিল মনোয়ারা।

    দম বন্ধ করে ফুলতে লাগলো জামান। তারপর এক সময় চিৎকার করে বেরিয়ে গেলো— বছরে বছরে ছেলের মা হতেই আসলে তোদের ভালো লাগে।

    অন্যায় কিইবা বলেছিস জামান। একটা কেন? এইতো সে বছর দুটোই হয়ে বসলো তার। এ নিয়ে সবাই কত হাসাহাসি করলো। হাসুক ওরা। কি আছে তাতে মনোয়ারার? খোদা যদি দেয়, মনোয়ারা কি করতে পারে তাতে। হ্যাঁ, খোদা কম দেয়নি তাকে এই ক’টি বছরে; মোট ছ’টি দিয়েছে। সন্তান বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। যে একশ’ পঁচিশ সেই একশ’ পঁচিশই রয়ে গেছে। মনোয়ারা যদি চাকরি করতে পারতো তাহলে হয়তো সংসারটা কিছু স্বচ্ছল হয়ে আসতো। কিন্তু, ঘর সামলাবে, না বাইরে চাকরি করতে যাবে মনোয়ারা? কোনটা করবে।

    জামান বলেছিল কি একটা দেশের কথা, সেখানে নাকি ছেলে-মেয়েদের কিন্ডারগার্টেন না কিসে রাখা হয়। আর মা-বোন বেরিয়ে যায় কাজে। সে রকম হলে মন্দ হতো না হয়ত।

    আবার ভাবনার অতলে ডুবে পড়লো মনোয়ারা।

    সেই যে সকালে বেরিয়ে গেলো লোকটা, রাত দশটার আগে ফিরলো না। দোরগোড়ায় মনোয়ারার সাথে একেবারে মুখোমুখি।

    রাগ পড়লো তো? মুচকি হাসলো মনোয়ারা।

    ফাজলামো করিসনে, বুঝলি? হাতের বান্ডিলটা টেবিলের উপর রাখলো জামান।

    ওগুলো আবার কি? বান্ডিলটা হাতে নিয়ে— কাগজের মোড়কটা খুলে ফেললো মনোয়ারা, অনেকগুলো ফটো, দেশে-বিদেশের মেয়েদের।

    ওগুলো তোর জন্য এনেছি, দেখ—একবার দু’টো চোখ দিয়ে ভাল করে দেখ। মনোয়ারা ঘাড়ের উপর একখানা হাত রেখে, ওর দৃষ্টিকে ফটোগুলোর উপর আরো নত করে বলেছিলো জামান— তোদের মতো ওদেরও ঘর সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে; কিন্তু সাহিত্য, বিজ্ঞানে ওরা কত উন্নত একবার দেখে নে।

    সত্যি অবাক হয়েছিল মনোয়ারা। শুধু অবাক নয়। প্রেরণা এসেছিল ওর অবচেতন মনের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ওদের মতো হবার জন্য। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই কি আর এ দেশে সব কিছু করা যায়? মাথার ওপর বাপ-মা রয়েছে, আর রয়েছে সমাজ।

    তরকারিটা নামিয়ে নিয়ে, ডালের কড়াইটা তুলে দিল মনোয়ারা। না, একটু ভাল করে ভাবতে পারবে তারও উপায় নেই। জামানেরও বা চলে যাওয়া ছাড়া আর কি উপায় ছিল?

    ওতো কম করেনি মনোয়ারার জন্য। ওরই উৎসাহে মনোয়ারা লিখতে আরম্ভ করেছিলো— গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা। প্রথম প্রথম লেখায় একটু জড়তা ছিল বইকি। তাও কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল সে জামানের প্রচেষ্টায়। উঃ। সেদিনটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না মনোয়ারা। তার প্রথম লেখা, প্রথম গল্প যেদিন ছাপার অক্ষরে পত্রিকায় প্রকাশিত হলো। চারদিক থেকে প্রশংসা পত্র এলো, চমৎকার গল্প। বলিষ্ঠ লেখনী। উজ্জ্বল ভবিষ্যত।

    জামান বললো— দেখ, তোর ভেতর এমন একটা প্রতিভা ঘুমিয়ে আছে, তা কি তুই জানতি? আসলে, সব কিছুর মূলে ওই চেষ্টা থাকা চাই, সাধনা করতে হয়, তাহলেই প্রতিভা বিকাশ পায়, বুঝলি।

    কিন্তু, বুঝেও কি করতে পারলো মনোয়ারা? আর লিখতে পারেনি সে, লিখতে পারবেও না। প্লট আসে, ভালো ভালো প্লট, কিন্তু— মা, ভাত দেবে না? স্কুলের যে সময় হয়ে এলো।

    শুধু খাই, খাই খাই।

    নে, খা। ভাতের গামলাটা ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে কাপড়ের আঁচলে মুখের ঘাম মুছলো মনোয়ারা। ভোর না হতেই স্কুলের—অফিসের তাগিদ। দু’হাতে কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারে না সে। হাঁফিয়ে উঠে, মাথা ঘুরায়; শরীরে ক্লান্তি নেমে আসে। তবুও রেহাই নেই, নিস্তার নেই, করতেই হবে।

    দেখো জামান, তুমি আমার ভাগনে, অতি আপনার জন, তোমাকে আর কি বলবো, অবুঝ নও তুমি।

    সেদিন মামার মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো জামান। তারপর বলেছিলো— কেন কি ব্যাপার মামা?

    মানে, লোকে কি সব আজেবাজে কথা বলাবলি করছে।

    আজেবাজে কথা!

    হ্যাঁ, বোঝত, ঘরে বয়স্কা মেয়ে থাকলে, অনেকেই অনেক কথা বল, তাই বলছিলাম— কথাটা আর শেষ করেননি তিনি। হয়তো শেষ কথাটা উচ্চারণ করতে ভদ্রতায় বাঁধছিলো তার। কিন্তু মনোয়ারার দাদী ওসব ভদ্রতার ধার ধারেন না। তাই সহজ এবং সরল ভাষায় তিনি বলেছিলেন— ন্যাকামো! আরে বুঝতে তো পাচ্ছ সবই।

    এবার সব সত্যিই বুঝলো জামান। ছোট্ট চামড়ার সুটকেসটাকে হাতে নিয়ে নির্বিকারভাবে বেরিয়ে গেলো সে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল তখন, সে বৃষ্টির ভেতর ভিজেই চলে গেলো। কেউ বাধা দিলো না, এমন কি মনোয়ারাও না। নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল সে। চোখের পলকগুলো কি ভিজে উঠছিল মনোয়ারার? নইলে আঠা আঠা লাগছিলো কেন চোখের চারপাশটা।

    তারপর— একটা বছর না ঘুরতেই বিয়ে। নূতনজীবন। নূতন করে ঘর বাঁধবার দিন। স্বামীর বলিষ্ঠ দেহের সবল পেশীর ভেতর নিজেকে হারিয়ে ফেলার পালা। তারপর এক ঝড়ো রাতে আকস্মিক ভাবেই খবরটা শুনলো মনোয়ারা— জামানকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। আর কিছুদিন পরেই শুনলো ওকে আন্দামান না কোথায় চালান দেওয়া হয়েছে। খবরটা শুনে খুবই দুঃখ হয়েছিল তার কিন্তু ভাববার অবসর পায়নি সে। কারণ আবুল তখন সাত মাসের। তাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল সে।

    কিন্তু আজকাল প্রায়ই ভাবনায় পড়ে মানোয়ারা। সেই যে লোকটাকে নিয়ে গেলো ওরা। আজও সে ফিরে আসেনি। দেশ স্বাধীন হবার পরেও না। তবে কি ওকে ওরা মেরে—

    মা, মাগো, দেখো না আবুল ভাই ওরা বিকেলে আরমানিটোলা মিটিং-এ যাচ্ছে, আমায় নেবে না বলছে। মা আমি যাবো। মেয়ে সেলিনা এসে গলা জড়িয়ে ধরেছে তখন।

    ধিঙ্গী মেয়ে, আজ বিয়ে দিলে কাল ছেলের মা হবে, পুরুষদের মিটিং-এ রূপ দেখাতে যাবেন উনি। মেয়ের মুখের উপর খুন্তি নাড়ে মনোয়ারা।

    কেন, মেয়েদের বুঝি সভা-সমিতিতে যেতে নেই? আমি যাবো। সেলিনা গোঁ ধরে।

    অবাক মনোয়ারা। বড্ড বেশি অবাক। জামানের কথা, ঠিক জামানের কথাটাই ধ্বনিত হয়েছে সেলিনার কণ্ঠে। কিন্তু কোত্থেকে এসব শিখছে ও। কেমন একটা অজানা আক্রোশে সারা শরীর ফুলতে থাকে মনোয়ারার। দু’হাতে মেয়ের দু’কাধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, আজকাল দজ্জাল মেয়েদের সঙ্গে মেশা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পটাপট থাপ্পড় পড়ে মেয়েটার গালে।

    কিন্তু আবার অবাক হতে হয় মনোয়ারাকে। সেলিনা সরে দাঁড়ায় না এক পাও। বোবা চোখে সে তাকিয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে— কি এমন অন্যায় দাবি তার বুঝতে পারে না। মনোয়ারার উদ্যত হাত মাঝপথেই থেমে যায়। সেলিনার আয়ত পানিভরা চোখে ঝড়ো মেঘের বিপ্লবী প্রতিজ্ঞার ছায়া কি ঘন হয়ে উঠছে না।

    না, না, একি করছে সে। কেন, কেন, কি অধিকার তার রয়েছে এ পরিবর্তনকে অস্বীকার করার? দূরে বহু দূরে, কোনও নির্জন দ্বীপের নিরালা তটে যেন একটা স্বপ্নমাখা আবছা শৃঙ্খলিত মূর্তি তার চোখে ভেসে উঠে!

    না, না, সে স্বীকার করবে একে— এই পরিবর্তনকে, এই বিপ্লবী ঝড়ো হাওয়াকে। ছুটে গিয়ে বিছানায় লুটিয়ে সে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে। দেহটা থেকে থেকে দমকে দমকে কাঁপতে থাকে তার।

  • অপরাধ

    অপরাধ

    না, আর সইতে পারে না সালেহা। জীবনটা একেবারে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে তার কাছে। বিয়ে হয়েছে আজ চার বছর। চারটে বছর মানুষের জীবনে নেহায়েৎ কম নয়। এ চারটে বছর কেমন করে তাকে কাটাতে হয়েছে তা সেই একমাত্র জানে। দু’বেলা চারটে ভাত খেতে পারলেই যদি মানুষ সুখী হতো, তাহলে সালেহার অসুখী হবার কোন কারণই ছিল না। মানুষের জীবনে অনেক আমোদ-আহ্লাদ থাকে, কিন্তু তার কোনটাই ভোগ করতে পারেনি সালেহা। কারাগার। এ চারটে বছর ঠিক যেন কারাগারের ভিতরই দিন কাটিয়েছে সে। এতটুকু স্বাধীনতা নেই, নেই নিজের ইচ্ছামত চলাফেরা করার এতটুকু অধিকার।

    পীর সাহেবের বাড়ির কঠোর শাসন। ঘরের ঝি-বৌদের বাইরের লোক যাতে দেখতে না পায়, তার জন্যে জানালায় মোটা পর্দা টাঙ্গানো। তা একটু ফাঁক করে বাইরে এক পলক তাকাতে যাবে তাও স্বামীর নিষেধ। শোবার ঘরের ছোট্ট কামরাটা আর রান্নাঘরের ধোঁয়ায় ভরা পরিসরটার ভেতরে তার গতিবিধি সীমাবদ্ধ। বাইরের মুক্ত আলো বাতাসে প্রাণ জুড়ানো ছোঁয়া সে আজ চারটে বছর ধরে পায়নি। অসহ্য! একেবারে অসহ্য বোধ হচ্ছে সালেহার। এ চারটে বছর একটু প্রাণ খুলে শ্বাসও নিতে পারেনি সে। গলা ছেড়ে একটা কথা বলতে কিংবা হাসতেও সাহস পায়নি। পীর সাহেবের কঠোর আপত্তি এতে। মেয়েদের জোরে কথা বলতে নেই। শব্দ করে হাসতে নেই। পদে পদে বাঁধা। পেট ভরে চারটে ভাত খাবে, তারও জো নেই। মেপে মেপে ভাত ওঠে সবার পাতে। পীর সাহেব বলেন, অতিরিক্ত খেলে কেয়ামতের দিন তার হিসাব দিতে হবে।

    অনেক সয়েছে সালেহা। অনেক। কিন্তু তার প্রতিদানে কি পেয়েছে সে? দু’টি চোখ পানিতে ভিজে ওঠে সালেহার। ভাল করেই সে জানে যা সে চায় তা তার আশি বছরের স্বামীর কাছ থেকে কোনদিনও পেতে পারে না। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে অশান্ত বুকটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে।

    আঠারো বছরের তরুণী সে। বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সে। বাবার এ কীর্তির কথা মনে পড়তে আরো জোরে কান্না আসে— বাবা! তার বাবা কি করে এ দোজখখানায় তাকে ছুঁড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত আরামে দিন কাটাচ্ছে।

    সমস্ত কাহিনীটা ভাবতেও তার আজ মন কেমন করে। ঝিমঝিম করে মাথার ভেতরটা। মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখে উঠলো এইমাত্র। কিন্তু দুঃস্বপ্ন কি মানুষের জাগরণে এমনি বার বার করে ফিরে আসে। হয়ত আসে, নইলে বিগত এই ক’টি বছরের ভেতর কেন সে ভুলতে পারলো না সেই বছরটিকে—

    সে বছর বর্ষা এসেছিল বড় অসময়ে। ভীষণভাবে। পথঘাট ডুবে গিয়েছিল সব। দিগন্ত ছোঁয়া অথৈ পানিতে টলমল করছিল চারদিক। শোনা গেল পলাশপুরের পীর সাহেব এ পথে আসবেন। জাঁদরেল পীর। পূর্ব পুরুষ থেকে বর্তমান পুরুষের নাম পর্যন্ত নানাবিধ অলৌকিক কীর্তিতে জড়ানো। দাদা আর বাবা এর ভয়ানক ভক্ত শিষ্য। খবরটা এ তল্লাটে শোনা যেতেই বাবা সাদর আহ্বান জানালেন, গোলামি ঘরে হুজুরকে মেহেরবানী করতে। হুজুর মেহেরবানী করলেন। একা নয়। একপাল সাঙ্গপাঙ্গ সঙ্গে করে।

    বৈঠকখানায় ধবধবে বিছানা পেতে তাদের থাকবার আস্তানা করা হলো। বারবাড়ির প্রাঙ্গণে খোঁড়া হলো ইয়া বড় বড় দু’টি চারমুখো উনুন।

    পীর সাহেবের লম্বা দাড়ি আর নুরানী চেহারার সুখ্যাতি শুনে পাড়ার কৌতূহলী মেয়েদের জোড়া জোড়া চোখের মেলা বসেছিলো ওদের বাংলা ঘরের বেড়া ঘিরে। সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সালেহাও একবার চুপি চুপি গিয়েছিল। কিন্তু লম্বা দাড়ি বা নুরানী চেহারার বিশেষত্ব বুঝতে না পেরে বিরক্ত হয়েই সরে এসেছিল মিনিট দুই পরে।

    রাত্রে দাদা তাকে ডেকে বললেন, যা নাতনী ভাল দেইখা একখানা শাড়ি পইরা আয়।

    অবাক হয়ে সালেহা দাদার মুখের দিকে হা করে তাকিয়েছিল, শাড়ি ক্যান পরমু দাদা?

    হুজুরের হাত পাওগুলো একটু টাইনা টুইনা দিয়া আয় সালু, বহুত দোয়া করবো।

    চৌদ্দ বছর বয়স তখন সালেহার। ছোট একটা ঘোমটা দিয়ে বাবার সাথে পীর সাহেবের পাশে এসে দাঁড়ালো সে।

    বাবা বললেন, আমার লেড়কি, হুজুর।

    হাত বাড়িয়ে পীর সাহেবকে ছালাম করলো সালেহা। হাত তুলে দোয়া করলেন পীর সাহেব। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার লেড়কি নাকি? বহুত আচ্ছা লেড়কি আছে।

    হুজুরের হাত পাগুলো টিইপা দেওত— মা-বাবা ঈশারা করলেন সালেহাকে। ভীষণ লজ্জা করছিল সালেহার।

    তোমহার নাম কি আছে? পীর সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন। কেমন মিষ্টিই না লেগেছিল কথা ক’টি সেদিন।

    কিন্তু সালেহা কি তখন জানতো যে সে বুড়োটা একটা পুরোপুরি জন্তু, পাক্কা একটা খুনী?

    চারটে বছর। চারটে বছর, নয়তো ঠিক চারটে যুগ যেন। সালেহাই জানে এ ক’টা বছর কেমন করে সে জ্বলে পুড়ে মরছে। প্রথম থেকেই জানতো সে এ বুড়োর সাথে বিয়ে তার মৃত্যুরই সামিল। কিন্তু, জেনেও কি সে প্রতিবাদ করতে পেরেছিল? সে কি মুখ ফুটে বলতে পেরেছিল তোমরা কেন এ বুড়োর সাথে বিয়ে দিচ্ছ আমায়? আমার দেহমনের স্বাভাবিক স্বপ্ন কি পূরণ করতে পারবে এ বুড়ো? কিন্তু কিছুই বলতে পারেনি সালেহা। বলবার সাহসের অভাব ছিল তার ভেতর। বললেও হয়ত কেউ আমল দিত না।

    পাশের বাড়ির মেয়েদের কাছেই প্রথমে সে কথাটা শুনেছিলো কিন্তু বিশ্বাস হয়নি। আশি বছরের এক বুড়োর সাথে তার বিয়ে এ-ও কি সম্ভব। কিন্তু দিন দুয়েকের ভেতর সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো। দাদা মাকে ডেকে বললেন, আমাগো সালেহারে পীর সাইবের ভারী পছন্দ অইছে।

    মা কোন উত্তর দেয়নি। সালেহা ভাল করেই জানে এ বিয়েতে মায়ের মত ছিল না। প্রতিবাদও তিনি করেছিলেন কিন্তু ফল হয়নি। বাবা বলেছিল মাইয়া লোকে ভালো মন্দের কি বোঝে। তাদের জিজ্ঞাইবার বা কোন দরকারডা। আরে পীর জামাই কি সকল মাইয়ার ভাইগ্যে জোটে। মাইয়ার কপাল ভালা কইতে অইবে।

    কপাল। এ ক’বছর হাঁড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সালেহা তার কপালকে। পাঁচ সতীনের ঘর। পাঁচ সতীন নয়তো ঠিক পাঁচ পাঁচটা দজ্জাল বাঘ যেন। ওরা সালেহার আগে এসেছে, তাই ওদের দাবিও তার আগে। উঠতে বসতে তাদের তীব্র কটাক্ষ সালেহার মনকে বিষিয়ে তুলেছে। মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া বুঝি আরম্ভ হয়ে গেছে তার ভেতর। আর বাঁচবে না সালেহা; আর কিছুদিন এখানে থাকলে সে নিশ্চয়ই মরে যাবে।

    বাইরের ঘরে লোক আসে, তাদের চোখে না দেখলেও গলার স্বরে আন্দাজ করতে পারে সে। এক এক সময় মনে হয় ছুটে গিয়ে তাদের কাছে দাঁড়ায় সালেহা। সব কিছু জানিয়ে দেয় ওদের। সবার সামনে দাঁড়িয়ে বুড়ো ছদ্ম মুখোশ খুলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে এখানে কেন ওরা আসে? কেন ওরা একটা খুনীর পাঁয়ে এত শ্রদ্ধা নিবদেন করে? খুনী! খুনী! বুড়োটা একটা খুনী ছাড়া আর কিছু নয়। সালেহাকে সে খুন করেছে।

    একটা পূর্ণযৌবনা তরুণীর আশা আকাঙ্ক্ষায় ভরা কোমল হৃদয়কে ছুরি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে ফেলছে। ওই বুড়োটা। সে সব বলে দেবে। সব কিছু। কিন্তু বড় দুর্বল সে, তাই কিছু বলা হয় না।

    সালেহা বুঝতে পারে, দুর্বলতাই এতদূর নিয়ে এসেছে তাকে। নইলে প্রথমেই সে প্রতিবাদ করতে পারতো। স্পষ্ট মনে আছে— তাদের গ্রামের চৌধুরী বাড়ির মেয়ে হাসিনার কথা, বাবার পছন্দ করা জায়গায় বিয়ে করতে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছিল সে।

    শেষে একগুঁয়ে মেয়েটি বাবার মুখে ছাই দিয়ে এক রাতে পালিয়ে গেলো, কলেজ পাশ করা এক ছেলের সাথে। সালেহার স্পষ্ট মনে আছে, গ্রামের ছেলে বুড়োরা কেমন ছি ছি করছিলো। পুকুর ঘাটে, ঘরের দাওয়ায়, ঢেঁকির চারপাশে জটলা পাকিয়ে গ্রামের মেয়েরা কেমন হাসাহাসি করতো চৌধুরী বাড়ির কলঙ্কের বিষয় আলোচনা করে। সালেহাও যোগ দিত তাদের সাথে।

    কিন্তু আজ সে বুঝতে পেরেছে। হাসিনা ঠিকই করেছিলো। হাসিনার মতো সালেহাও যদি পালিয়ে যেতে পারতো তাহলে জীবনটা দুঃখের হতো না।

    বিয়ের রাতে পাড়াপড়শীরা যখন মুখের কোণে হাসি টেনে সালেহাকে সাজাতে এলো, মা তখন বার বার আঁচলে চোখ মুছছিলো। আজও সে সব কথা সালেহা ভুলে যায়নি। মামারা অনেক সান্ত্বনা দিচ্ছিল। তুই কান্দছ ক্যান সালুর মা। মাইয়ার তর বরাত ভালো, বেহেস্তের হুর অইয়া থাকবো।

    পরাণ দিয়া পীর সাহেবের খেদমত করিছ সালু, আখেরাতে বেহেস্ত পাইবি। পালকিতে চড়িয়ে দিয়ে নানা নানী তার কানে কানে সিসফিসিয়ে বলে দিয়েছিল বিদায় দেবার সময়।

    হ্যাঁ। এ ক’বছরে বেহেস্তের আস্বাদ ভাল করেই পেয়েছে সালেহা। বেহেস্তের অমন যৌবন হুরত্ব লাভের আশায় আজ তার বয়সের বসন্ত সম্ভারে অসময়ে উল্টো হাওয়া বইছে। অকাল বার্ধক্য আজ ইশারা দিয়ে যেন তাকে ডাকছে। অসহায় আর্তনাদে পাশবালিশটাকে বুকে চেপে ধরে সালেহা। কিন্তু প্রাণহীন এ তাকীয়াটাকে বুকে জড়িয়ে আর কতদিন সে একটা মানব শিশুর উপস্থিতিকে ভুলে থাকবে? কতদিন রিক্ত বুকের হাহাকার নিয়ে লোক সমাজে অভিনয় করবে সব পাওয়ার পরিতৃপ্তির? বার কয়েক এপাশ-ওপাশ করে অসহ্য উত্তেজনায় বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সালেহা। আজ মনের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়ার পালা তার। জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় সালেহা। আর কাউকে ভয় করবার প্রয়োজন নেই। হাত বাড়িয়ে পর্দাটা ফাঁক করে সে। ফিনফিনে বাতাসের সাথে এক ঝলক চাঁদের আলো এসে পড়ে ওর মুখের উপর! পূর্ণিমার ভরা চাঁদ। সেদিকে একবার মুখ তুলে চেয়ে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে সে। ওহ্ খোদা, প্রকৃতির কত মুক্ত সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত সে। রাত্রি বেড়ে চলে। জানালার পাশে দোলান চাঁদটা একটু এলিয়ে গেছে পশ্চিমে। আর তার তেরছা আলোয় দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ একটি তরুণীর ছায়া জানালার পাশ থেকে এসে দাঁড়িয়েছে কম্পিত পা দু’খানা— পাশের কামরা থেকে বড় বিবির নাক ডাকার শব্দ আসছে। কোণের ঘরের জানালার ফাঁক গলিয়ে মিটমিটে আলো আসছে বাইরের দিকে, পীর সাহেব আজ ঝি-বৌ-এর কাছে আছে।

    সেদিকে একবার ফিরে ছায়া আবার সরতে শুরু করে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে। পূর্ব পুরুষদের কবরখানার কাছে এসে আর একবার সে থমকে দাঁড়ায়। সম্মুখে উন্মুক্ত আকাশের নিচে পায়ে চলা অপরিসর গ্রাম্য পথ। খানিক বাদে পদধ্বনি বেজে ওঠে সে পথের ধূলিকায়। তারপর—সালেহার হুঁশ নাই। হুঁশ হলো চুলের মুঠিতে টান পেয়ে। এ্যঁ সে পালিয়েছে। স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি। এই দীর্ঘ ক’ক্রোশ পথ সে হেঁটে এসেছে। একে কি পালানো বলে? এই কি পালানোর সংজ্ঞা; তা না হ’লে চুলের মুঠি ধরা রুদ্র মূর্তি বাবার গলায় ও আওয়াজ কিসের— হারামজাদী আমার মুখে চুন কালি লাগাইলি তুই। মানসম্মান ভেস্তে দিলি আমার। আত্মসম্মান জ্ঞানী সমাজী জীব বাবা। কলঙ্কিনী মেয়েকে মারবার অধিকার তার আছে। তাই খোদাই হাতপা দুটো সমান ভাবে মেয়ের উপর চালাতে থাকে ৷

    না, এবারে সে প্রতিবাদ করবে। নিশ্চয়ই করবে। কিন্তু ভাষা কোথায়? একি সে কাঁপছে? বাবার পা দু’খানি জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলছে, আর মাইরো না বাপজান, তোমার পায়ে পড়ি আর মাইরো না। ক্লান্ত পিতা ক্ষান্ত হয় এবারে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দাদী কাঁদছিলেন। মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতেই তিনি ধরে ফেললেন। দাদীকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে সালেহা। বুকটা জ্বলছে, না ব্যথা করছে ঠিক বুঝতে পারে না সে। শুধু মনে হচ্ছে হাঁটুর উপর ওঠা কাপড়টাকে নামিয়ে নেবার ক্ষমতা বুঝি তার লোপ পেয়েছে।

    আজ মা বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে বাবা তাকে এরকমভাবে মারতে পারতেন না। তার বিয়ের পরেই মারা গেছে। মায়ের কথা মনে পড়তে দ্বিগুণ হয়ে এলো কান্নার বেগ। পাষাণ বাবা। মাকেও এরকমভাবে মারতো। মার খেয়ে মায়ের হাড়গুলো সব জখম হয়ে গিয়েছিল। মা কাঁদতো না, কোঁকাতো। আর সুদূর আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কি যেন ভাবতো।

    উঃ হাত দুটো আর পিঠটা কি রকম ফুলে যাচ্ছে সালেহার। মায়েরও মাঝে মাঝে এ রকম হতো। কেরোসিন তেল গরম করে যা মালিশ লাগাতো। বাবা না জানলেও জানে বাবার মার খেয়েই মা মারা গেছে। ডাকু! এরা সবাই ডাকু। খুনী। উঃ আর কিছু ভাবতে পারছে না সালেহা। অসাড় হয়ে আসছে তার সমস্ত শরীর।

    বিকেলে লোক এলো পীর সাহেবের বাসা থেকে। দাদা হাতজোড় করে বললেন— অবুঝ মাইয়া, একটা খারাপ কাম কইরা ফেলছে, পীর সাইবেরে বইলা দিয়েন মাফ কইরা দিতে।

    মাফ! মাফ করবেন পীর সাহেব একজন দুশ্চরিত্রা মেয়েকে।

    খবর শুনে সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে পীর সাহেরের। বারান্দায় কতক্ষণ দ্রুত পদচারণা করলেন তিনি, পীর বংশের কলঙ্ক। তিনি সইবেন কি করে?

    দুশ্চরিত্রা মেয়ের শাস্তি-এক-শ-এক কোড়া, এক-শ-এক। গর্জে উঠলেন পীর সাহেব, চমকে উঠে বাবা। সকালে রাগের উপর মা মরা মেয়েকে তিনি যথেষ্ট মার মেরেছেন। তার ওপর এক-শ-এক কোড়া বেত্রাঘাত! সে কি সালেহার কোমল দেহে সইবে।

    অথচ পীর সাহেবের আদেশ।

    আমার পিঠের উপর একশ এক কোড়া মারেন হুজুর। ওই মাইয়াটারে মাফ কইরা দেন। বাবা পীর সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে।

    পীর সাহেবকে কোন উত্তর দিতে হলো না এর। উত্তর নিয়ে এলো সামছুল। সালেহার ছোট ভাই।

    সকাল থেকে রক্ত বমি করতে করতে ঘণ্টাখানেক হয় সালেহা মারা গেছে।

    সপাং করে কে যেন একটা চাবুকের ঘা মারলো উপস্থিত জনতার পিঠের উপর।

    অস্পষ্ট গুঞ্জরণ শোনা গেল সঙ্গে সঙ্গে— মাগীটা মরবে না? পীর সাইবের মুখে ছাই মারি যাবে কোথায়। পীর সাহেবের বদদোয়া লেগেছে।

    সায় দিয়ে পীর সাহেবও মাথা নাড়লেন— গুনাহগারোকো, আল্লাহ্ তায়ালানে কভি মাফ নাহি করতা হ্যায়।

  • ভাঙ্গাচোরা

    ভাঙ্গাচোরা

    টুনুর স্বামীকে দেখে এমনভাবে চমকাতে হবে তা কে জানতো।

    তবু চমকেছিলাম, ভীষণভাবেই চমকে উঠেছিলাম হয়তো।

     

    কাল রাতে যখন ট্রেন থেকে নেমেছিলাম তখন বাইরে শীত পড়ছিলো ভীষণ। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। বাতাসের বরফ ঝরছিল যেন। কোটের কলারটা তুলে দিয়েও কানটা ঢাকা যাচ্ছিলো না। উদলা হাত জোড়া জমে আসতে চাইছিলো শীতের প্রকোপে। স্টেশনে লোকজনের বিশেষ ভিড় ছিলো না। মাঝে মাঝে দু’একজন চা ভেণ্ডারের চিৎকার ছাড়া সাড়াশব্দও তেমন ছিলো না বললেই চলে। ব্যস্তভাবে হয়ত একটা কুলির জন্যই তাকাচ্ছিলাম এদিক-ওদিক, ঘন কুয়াশা ভেদ করে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এসে দাঁড়ালো একটা লোক। পরনে একটা খাটো করে পরা লুঙ্গি। মাথা আর কান ঢেকে গায়ে একটা ময়লা চাদর জড়ান। পায়ে একজোড়া মোটর টায়ারের স্যান্ডাল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সুটকেসটা হাতে আর হোল্ডারটা বগলে তুলে নিল ও। উঃ কি ভীষণ কুয়াশা পড়েছে। আসুন সাহেব; দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন। আরো মাল আছে নাকি? না, চলো। লোকটার আগাগোড়া আর এক পলক তাকিয়ে নিয়ে পিছু পিছু এগুতে লাগলাম ওর।

    গেটের কাছাকাছি এসে লোকটা ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবেন সাহেব?

    আপাতত ডাকবাংলোয়। —এই শোন— রিক্সা টিক্সা পাওয়া যাবেতো এখন?

    হ্যাঁ, আমার নিজেরই রিক্সা আছে। ও বললো। আর বলতে গিয়ে বারকয়েক কাশলো ও।

    মফস্বল শহর।

    স্টেশনের সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে কিছুদূর গেলে বিজলী বাতির আর কোন বন্দোবস্ত নেই। সামনের ছোট্ট কেরোসিন বাতিটার উপর নির্ভর করেই চলে রিক্সা। দোকানপাটগুলো খোলা থাকলে তবু কিছু আলো আসে রাস্তায়। কিন্তু এ পৌণে বারোটায় দোকানপাট বন্ধ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তার মালিকরা। লোকজন কারো সাড়াশব্দ নেই। শুধু দু’একটা হ্যাংলা কুকুর মাঝে মাঝে চিৎকার করছে এখানে ওখানে। রাস্তাগুলো সব গর্তে ভরা। প্রতি গজ অন্তর একটা করে খাদ। এসব রাস্তায় রিক্সা চালাতে শুধু রিক্সা চালকেরই কষ্ট হয় না। আরোহীরও গা-হাত পা ব্যথা করে উঠে। বিরক্তি লাগে।

    ইস রাস্তাগুলোর এই দুরবস্থা কেন? কেন যেন হঠাৎ বিড়বিড় করে উঠেছিলাম।

    লোকটা একবার পেছনে তাকিয়ে নিয়ে বললো। বন্যায় সব ডুবে গিয়েছিল কিনা, তাই খাদ পড়ে গেছে।

    তা— বন্যাতো কবে নেমে গেছে, এখন মেরামত করে নিলেই পারে।

    কে করবে মেরামত—।  হঠাৎ যেন বলতে গিয়ে চুপ করে গেল লোকটা। রিক্সা থামিয়ে নিভে যাওয়া বাতিটা জ্বালিয়ে নিয়ে আবার চড়লো রিক্সায়।

    ডাকবাংলোটা স্টেশন থেকে বেশি দূর নয়।

    পৌঁছতে মিনিট বিশেক সময় নিয়েছিল মাত্র।

    লোকটা নিজ হাতেই সুটকেস আর হোল্ডারটা তুলে রাখলো বারান্দায়।

    তারপর বললো, আপনি দাঁড়ান। দারোয়ান বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ওকে ডেকে আনি।

    শীতের রাতে একবার ঘুমের কোলে ঢলে পড়লে সহজে উঠতে চায় না কেউ, তুলতে বেশ সময় নিয়েছিলো। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ বোঝা যাচ্ছিলো এমন আয়েশের ঘুমটা ভেঙ্গে যাওয়ায় মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হয়েছে সে। তবু সে ভাবটা গোপন রেখে লম্বা একটা সালাম জানিয়ে মালপত্রগুলো ভেতরে নিয়ে গেলো দারোয়ান।

    রিক্সাওয়ালাটা তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে।

    কত দিতে হবে তোমায়? পকেট থেকে ব্যাগটা বের করে এগিয়ে যাই তার দিকে। ও বললো, আপনার সাথে আর কি দরাদরি করবো। আপনার যা খুশি তাই দিন।

    সে কি হয়। কত রেট তা না জানালে আন্দাজে কি দেবো আমি। আপনার যা খুশি দিন। আগের কথাটাই পুনরাবৃত্তি করলো সে। ব্যাগ থেকে একটা আধুলি বের করে হাতে তুলে দিলাম তার। এই নাও। হলতো?

    জ্বী হ্যাঁ। ঘাড় নেড়ে সায় দিলো সে কথার। তারপর সালাম জানিয়ে গুটিগুটি পায়ে রিক্সাটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো ধীরে।

    অদূরে দাঁড়ান দারোয়ানটা এতক্ষণ দেখছিলো সব। ও চলে যেতে এগিয়ে এসে বললো, এ-বাবু। ইস্টেশনছে এঁহা চার আনা লেতা। আওর আপ একঠু আঠান্নি দে দিয়া উসোকো। এ-হে বহুত জাস্তি দে দিয়া আপ। বহুত জাস্তি। চার- চার আনা পয়সা। আপন মনে অনেকক্ষণ পর্যন্ত চার আনা পয়সার জন্য আপসোস করছিলো সে। ওর কথায় কান না দিয়ে, যেখানে শোবার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল সেখানে এসে ঢুকলাম। পথেই জংশনে খেয়ে এসেছিলাম। তাই রাতে আর খাওয়ার কোন প্রয়োজন ছিলো না। শোবার আগে আগামী দিনের করণীয় বিষয়গুলো ঠিক করে নিয়েছিলাম মনে মনে। ভোরে উঠেই হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে সরাসরি কাজগুলো সেরে নিতে হবে। এস, ডি-ওর সাথে দেখা করতে হবে। সার্কেল অফিসারের সাথে আলোচনা করতে হবে টাকা-পয়সার ব্যাপার নিয়ে। তারপর দুপুরে টুনুর বাসায়।

    দীর্ঘ আট বছর পর কাল হঠাৎ দেখতে পেয়ে হয়ত প্রথমে চিনতেই পারবে না টুনু। অবাক হয়ে মুখের পানে তাকিয়ে বলবে, কাকে চান? পরে চিনতে পেরে হয়ত আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলবে। উঃ এতদিনে বুঝি টুনুর কথা মনে পড়ল তোমার। এই দীর্ঘ আট বছর পরে?

    দীর্ঘ আট বছর।

    জীবনের মানচিত্রে আটটি বছর নেহায়েৎ কম নয়।

    তবুও ভাবতে গেলে মনে হয় এই সেদিনের কথা।

    কোলকাতায় একই পাড়াতে থাকতাম। পাশাপাশি বাসা।

    টুনু তখন শাখাওয়াতে পড়তো ক্লাস সিক্সে কি সেভেনে।

    আমি পড়তাম মিত্ৰয়। ওই একই ক্লাসে।

    স্কুল ছুটির পর বিকেলে প্রায় ওদের বাসায় যেতাম।

    ওরাও আসতো মাঝে মাঝে।

    আনাগোনা মিলমিশ আর ঘনিষ্ঠ হৃদ্যতা ছিলো উভয় পরিবারের মধ্যে। আমাদের দু’জনকে একসাথে দেখলেই বুড়ি দাদী ফোড়ন কাটতো।

    কি গো, কি কথা হচ্ছে দু’জনের মধ্যে। পিরীত টিরিত নয়তো। তাইলে বলো। এখন থেকেই ওকালতি শুরু করে দিই।

    তারপর ক্লাস এইটের বছর সে পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় উঠে গেলো টুনুরা। আর তার মাস আটেক পরেই তো শোনা গেলো; একটা ননম্যাট্রিক ছেলের সাথে কোথায় পালিয়ে গেছে টুনু। পালিয়ে গেছে— খবরটা প্রথমে মোটেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরে অবশ্য বিশ্বাস না করে পারিনি। এরপর মাঝখানে দু’টি বছর।

    দু’বছর পর হঠাৎ টুনুর সাথে দেখা ট্রেনে। দেশ বিভাগের পর কোলকাতা থেকে ঢাকা আসবার পথে।

    দেখা হতে মৃদু হাসলো টুনু। বললো। কেমন আছ ভালোতো?

    ভালো। তুমি কেমন?

    আমি বে-শ ভালো। ঠোঁট টিপে হেসেছিল টুনু। আরো অনেক কথার পর হাতে একটা ঠিকানা গুঁজে দিয়ে বলেছিলো, মফস্বল শহরেই আছি। সময় পেলে একবার এসো। কেমন?

    সময়ও হয়নি, আসতেও পারিনি কোনদিন।

    এবার হঠাৎ সরকারী কাজে এখানে আসতে হওয়ায়; আসবার পথেই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম টুনুর সাথে একবার দেখা করবো। কে জানে এ ক’বছরে কত পরিবর্তন এসেছে ওর দেহে-মনে চেহারায়।

     

    পরদিন খুব ভোরে ভোরেই বিছানা ছেড়ে উঠলাম।

    হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করলাম।

    সরকারী কাজগুলো সেরে নিলাম একে একে।

    তারপর ঠিকানাটা পকেটে গুঁজে টুনুর খোঁজে।

    সার্কেল অফিসের পিওনটাকে বলতে ও বললো, পাড়াটা আমি চিনি। চলুন না স্যার আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।

    কতদূর হবে পাড়াটা?

    বেশি দূর নয় স্যার। আসুন না আমি পৌঁছে দিচ্ছি।

    বেশি দূর নয় বললেও বেশি দূরই মনে হলো। ঠিকানাটা মিলিয়ে বাসার সামনে পৌঁছে দিয়ে পিয়নটা চলে গেলো। বলে গেলো। এইতো এই বাসা স্যার। আমি এখন যাই তাহলে।

    যাও। ওকে যেতে বলে সামনে এগিয়ে গেলাম।

    বাঁশে ঘেরা দেয়া মাঝারি গোছের একটা ঘর। ওপরে টিনের চালা। সামনে স্বল্প পরিসর। দু’তিনটে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মাটি নিয়ে খেলা করছে সেখানে। আমায় দেখে, মুখে আঙ্গুল পুরে হা করে আমার দিকে তাকালো ওরা। বয়সে যে সবার চাইতে বড় সে এগিয়ে এসে বললো, কাকে চাই? মুখের আদলটা তার টুনুকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

    বললাম, এটা কি তোমাদের বাসা খোকা?

    হ্যাঁ।

    তোমার মা বাসায় আছেন?

    হ্যাঁ আছেন। কেন কি চাই আপনার? অনেকটা মাতব্বরি চালেই জিজ্ঞেস করলো ছেলেটা। মৃদু হেসে বললাম, দরকার আছে, তুমি যাওতো খোকা ভেতরে গিয়ে তোমার মাকে বলো তোমার সালাম মামা এসেছে।

    এ কথায় একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো ছেলেটা। তারপর বললো। আচ্ছা আপনি দাঁড়ান। আমি খবর দিচ্ছি মাকে। বলে ভেতরে চলে গেলো সে।

    একটু পরেই চট ঝোলান দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে উঁকি মারলো টুনুর মুখ।

    কয়েকটি নীরব মুহূৰ্ত্ত।

    তারপর খলখলিয়ে উঠলো টুনু। আরে সালাম তুমি, কি ভাগ্যি আমার। এসো এসো, ভেতরে এসো, ওখানে দাঁড়িয়ে কেন। ভিতরে এসো। অনেকটা হাত বাড়িয়ে ভেতরে এগিয়ে নিলো টুনু। কইরে বিনু। মামা এসেছে তোর, একটা মোড়া এনে বসতে দে। কইরে বিনু শুনছিস। মেয়েটা গেলো কই? মেয়ের কোন সন্ধান না পেয়ে নিজ হাতেই পাশের ঘর থেকে একটা মোড়া এনে আমায় বসতে দিলো টুনু। চোখ বুলিয়ে প্রথমে ঘরটাকেই দেখলাম। তারপর খুঁটে খুঁটে দেখলাম টুনুকে।

    সত্যি, এ ক’বছরে অনেক বদলে গেছে টুনু। সেদিনের সেই তন্নী মেয়েটি আর নেই। ফর্সা রংটা তামাটে হয়ে গেছে। গোলগাল চেহারাটা গেছে ভেঙ্গে। কানের কাছের দু’একটা চুলে পাকও ধরেছে টুনুর।

    তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হঠাৎ টুনু বললো, কি দেখছো অমন করে?

    তোমায় দেখছি টুনু। পরক্ষণেই জবাব দিলাম। সত্যিই তুমি অনেক বদলে গেছো।

    তাই নাকি? টুনু মুখ টিপে হাসলো। তা বদলাবো না তো কি সারা জনম এক রকম থাকবো নাকি। বয়স হচ্ছে না? স্বল্পকাল থেমে আবার বললো, ভাগনে ভাগনীও তোমার কম হয়নি। মোট চারজন।

    কই ওরা কোথায়, ওদের কাউকে তো দেখছি না।

    ওরা কি আর এক মিনিটের জন্য ঘরে থাকে। সারাটা দিন পঁই পঁই করে ঘুরে বেড়ায় পাড়ার বখাটে ছেলেগুলোর সাথে। বলে ছেলেমেয়েদের খোঁজেই হয়তো বাইরে বেরিয়ে গেলো টুনু।

    বসে বসে অতীতের কথাই ভাবছিলাম।

    টুনু ফিরে এলো একটু পরে। সাথে একটা সাত আট বছরের ময়লা ফ্রক পরা মেয়ে আর দুটো ছেলে। মেয়েটাকে সামনে ঠেলে দিয়ে টুনু হেসে বললো, এই দেখো এটা হচ্ছে এক নম্বর। ডাক নাম বিনু। আসল নাম রেখেছি মনোয়ারা আর এটা হচ্ছে মেজ ছেলে। এটা সেজ। বড়টা কোথায় গেছে। দাঁড়াও না আসুক ফিরে। পিঠের চামড়া তুলে ফেলবো আজ। বোঝা গেল টুনু রেগেছে। আগে রাগলে খুব সুন্দর দেখাতো ওকে। আজ কিন্তু তেমন কিছু মনে হলো না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, কর্তা কোথায়?

    কর্তা। তার কথা বল কেন ভাই, লোকটার কি শান্তি আছে। এইতো সেই সকালে বেরিয়ে গেছে কাজে। পোস্টাফিসে পিয়নের কাজ। জান তো ও কাজে কত খাটুনি। দুপুরে একবার শুধু আসে খেতে। তারপর খেয়েদেয়ে আবার বেরুবে। ফিরতে ফিরতে সেই রাত নিশুতি। টুনু থামলো। কিছুক্ষণ বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। তারপর আবার বললো, কি ব্যাপার, তুমি এক কাপড়ে এসেছো, নাকি, মালপত্র সাথে কিছু নেই?

    এর উত্তর দিতে গিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতে হলো বই-কি। মাটিতে চোখ নামিয়ে সত্য কথাটাই শেষে বললাম।

    আর তা শুনে বড় অবাক হলো টুনু। সে কি। আমি থাকতে এখানে, তুমি উঠেছো ডাকবাংলায়। সে কি।

    লজ্জায় লাল হয়ে এলাম। কিছু বললাম না।

    টুনুও যেন এ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করতে চাইল না। স্বল্পকাল নীরব থেকে বললো। যে ক’দিন আছো, খাওয়া দাওয়াটা কিন্তু এখানেই করো। বলে উঠে দাঁড়াল টুনু। মোড়াটা নিয়ে পাকঘরে এসো, চুলোর উপর ভাত চড়িয়ে এসেছি। এসো, ওখানে বসে গল্প করা যাবে তোমার সাথে।

    পাক ঘরে এসে রাজধানীর কথা জিজ্ঞেস করলো টুনু। কে কোথায় আছে। কেমন আছে। এমনি আরও অনেক কথা।

    তারপর পাড়লো নিজের কথা। শরীরটা দেখছো না কেমন দিন দিন ভেঙ্গে যাচ্ছে। রোগে ধরেছে আজ তিন বছর। এখানে ভালো ডাক্তার নেই। একবার ভাবছিলাম তোমার ওখানে গিয়ে চিকিৎসা করাবো। কিন্তু, যাবার কি কোন জো আছে। তিন চারটে ছেলে-মেয়ে ঘরে। ওদের কার কাছে রেখে যাই। ওর অবস্থাতো আরো খারাপ। লোকটা বোধ হয় বেশি দিন বাঁচবে না, সারাদিন যা খাটে, বেতনতো পায় মাত্র পঞ্চাশ টাকা। ওতে কিইবা হয় বলতে বলতে কেমন ম্লান হয়ে এলো টুনুর মুখখানা। আর কি যেন বলতে যাচ্ছিল সে। মেজ ছেলেটা কোত্থেকে ছুটে এসে বললো মা, মেস থেকে ওরা লোক পাঠিয়েছে। বলছে আজ নাকি তরকারিতে তুমি বড্ড বেশি লবণ দিয়ে দিয়েছ। আর ওরা তোমায় রাখবে না।

    ছেলের এ আকস্মিক কথায় অপ্রস্তুত হয়ে গেলো টুনু। চোখাচোখি হতে লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে উঠলো ওর মুখখানা। মাটিতে চোখ নামিয়ে নিয়ে বললো, তোমার কাছে আর লুকিয়ে কি লাভ বলো। বোঝতো, একমাত্র ওর আয়ে কিইবা হয়। পাশে পি, ডিব্লউ, ডির মেস আছে। সকাল বিকেল ওদের ভাতটা পাক করে দিই। বলতে গিয়ে লজ্জায় মুখখানা আরো নুয়ে এলো টুনুর। আরো বেশি অপ্রস্তুত হলো। সে আর সে ভাবটা কাটিয়ে উঠবার জন্যই হয়ত বললো, রান্না বান্নাই তো আমাদের কাজ। ঘরে যেমন রাঁধি। তেমনি ওদেরও রেঁধেদি। মাস মাস কুড়িটা টাকা। কমতো নয়। চুলোর উপর থেকে ভাতের হাঁড়িটা নামিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো টুনু। কাপড়ের আঁচলে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললো। উনি বোধ হয় এলেন। দেখি, বলে পাকঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সে। একটু পরেই শোবার ঘর থেকে তার গলার আওয়াজ শোনা গেলো উনি এসেছেন সালাম। এসো, দেখা করে যাও। টুনুর স্বামীকে দেখে এমনভাবে চমকাতে হবে তা কে জানতো।

    তবু চমকালাম, ভীষণভাবেই চমকে উঠলাম হয়তো। পরনে একটা খাটো করে পরা লুঙ্গি, গায়ে একটা ময়লা চাদর জড়ানো। পায়ে একজোড়া মোটর টায়ারের স্যান্ডেল। লোকটাকে চিনতে একটুও ভুল হলো না। সেও চিনলো আমায়। আর, চিনলো বলেই তো মুখখানা কেমন ফেকাশে হয়ে গেলো তার। হাত মুখ ধুবার অছিলায় ছুটে কলতলায় চলে গেলো সে।

    ও চলে গেলে কানের কাছে মুখ এনে চাপা গলায় টুনু বললো, পিয়নের কাজ করলে কি হবে। লোকটার প্রেসটিজ জ্ঞান বড় টনটনে। খবরদার। আমি যে মেসের ভাত পাক করে দিই; ঘুণাক্ষরেও একথাটা বলো না ওকে। তাহলে রেগে আগুন হয়ে যাবে। টুনুর কণ্ঠে অনুরোধের সুর। তুমি বসো। উনি হাত মুখ ধুয়ে আসুন। তারপর গল্প করবে। চুলোটা খালি যাচ্ছে। আমি তরকারিটা তুলে দিয়ে আসি।

    হাত মুখ ধুয়ে টুনুর স্বামীও ততক্ষণে ফিরে এসেছে আবার। লজ্জা আর সঙ্কোচের ভাবটা তখনো কাটেনি। একখানা ছেঁড়া গামছায় হাত মুছতে মুছতে কাছে এগিয়ে এসে হঠাৎ সে বললো, মাসে পঞ্চাশ টাকা বেতনে সংসার চলে না। তাতো বোঝেনই। অফিস ছুটির পর অগত্যা তাই রাতে রিক্সা চালাই। বলতে বলতে হঠাৎ আমার হাতজোড়া আপন মুঠোর মধ্যে তুলে নিলো ও, তারপর চারদিকে সতর্কভাবে তাকিয়ে নিয়ে ধরা গলায় বললো, দোহাই আপনার সালাম সাহেব। ও কথাটা বলবেন না টুনুকে। প্রেসটিজ জ্ঞান বড় টনটনে ওর। জানতে পারলে কেলেঙ্কারি কিছু একটা ঘটিয়ে বসবে। দোহাই আপনার—।

  • মহামৃত্যু

    মহামৃত্যু

    লাশটাকে ধরাধরি করে উঠোন থেকে ঘরে নিয়ে এলো ওরা।

    তারপর আস্তে শুইয়ে দিলো মেঝের উপর।

     

    বাইরে তখন সন্ধ্যার আস্তরণে কালো রাত নেমে এসেছে ঘন হয়ে। শিয়রে দুটো মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে চক্রাকারে বসলো ওরা, লাশটাকে ঘিরে। কারো মুখে কথা নেই, সবাই চুপচাপ। কাঁপা হাতে ওর রক্তভেজা বুক পকেট থেকে একটা খাম বের করে আনলো শমসের আলী, একখানা চিঠি, আর একখানা ফটো।

    কার ফটো ওটা? কাঁধের উপর দিয়ে মুখ গলিয়ে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো রহমান, কার ফটো?

    ওর ভাবী বধূর, আস্তে করে বললো শমসের আলী, এ মেয়েটার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল ওর, আসছে বৈশাখে—।

    ওটা রেখে দাও, বুক পকেটেই রেখে দাও ওটা। কে যেন বললো আশ্চর্য মৃদু গলায়। খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা পাড়ায়। আর দলে বেঁধে ওকে দেখতে আসছিলো সবাই। দোরগোড়ায় জুতোগুলো নিঃশব্দে খুলে রেখে ভেতরে ঢুকছিলো ওরা, যেন দেব দর্শনে এসেছে। দুটো মেয়ে এসে নীরবে বসলো ওঁর পায়ের কাছে।

    আর একজন বসলো শিয়রের পাশে।

    বুড়ো সুরেন উকিলের ছোট মেয়েটা হঠাৎ তার কানে আঙ্গুলটা কেটে রক্ত তিলক বসিয়ে দিলো ওপর পাণ্ডুর কপালে।

    বাকি দু’জন পরম স্নেহভরে চুলের প্রান্তভাগ দিয়ে মুছে দিলো ওর পায়ের ধুলোগুলো। আর সবাই নির্বাক নিস্পন্দন।

    ধূপদানিতে ধূপ জ্বলছে মৃদু। ক্ষয়ে আসা মোমবাতি দুটোর জায়গায় আরো দুটো মোমবাতি জ্বেলে দিলো শমসের আলী।

    বুড়ো সগির মিয়া ঈশারায় বাইরে ডেকে নিয়ে গেল রহমানকে।

    কবর দেবার কোন বন্দোবস্ত কিছু হয়েছে?

    হচ্ছে।

    গোরস্তানে কখন নিয়ে যাবে ওকে?

    ভোরে।

    কাপড় চোপড় কেনা হয়েছে?

    না।

    তবে, এই নাও, টাকা নাও, কাপড় কেনার জন্য পকেট থেকে পাঁচটে টাকা বের করে দিলো সগির মিয়া।

    সুরেন উকিল দিলো আরও পাঁচটে টাকা।

    ঝগড়াটে পল্টুর মা, হাড়কেঞ্জন বলে যার পাড়াময় খ্যাতি, সেও দুটো টাকা গুঁজে দিলো রহমানের হাতে।

    ট্যাক্সি ড্রাইভার ফজল শেখ উজার করে দিলো ওর সারা দিনের পুরো রোজগারটা।

    রহমান বললো, এত টাকা দিয়ে কি হবে?

    ফজল শেখ বললো, ওর জন্য ভালো দেখে একটা কাপড় কিনো। দেখো, মিহি হয় যেন, বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো এর।

    আর দেখো, আতর আর কর্পূর একটু বেশি পরিমাণে কেনা হয় যেন। চোখ দুটো পানিতে ছলছল করে উঠলো সগির মিয়ার।

    কিইবা সামর্থ্য আছে আমাদের। আমরা কিইবা করতে পারি ওর জন্য। ঘর আর বাহির।

    বাহির আর ঘর।

    সারা রাত এক লহমার জন্যও ঘুমালো না ওরা।

    ঘুম এলো না ওদের, রাত জেগে বসে বসে হয়ত গত বিকেলটার কথাই ভাবছিলো ওরা।

     

    অস্তগামী সূর্যের তির্যক আভায় আকাশের সাদা টুকরো টুকরো মেঘগুলো রক্তবর্ণ ধারণ করেছিলো তখন। কাঠের লম্বা বারান্দাটার এপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বুড়ি দাদী তার বার বছরের নাতনীকে সে মেঘগুলো দেখাচ্ছিল আর বলছিলো, ও মেঘগুলো লাল কেন জান? ও- মা জান না বুঝি? তা জানবে কেন। আজকালকার মেয়ে কিনা; ধর্মকথাতো পড়ওনি; শোনও না । হোসেন কে চেন? হজরত আলীর ছেলে হোসেন। এজিদ তাঁকে অন্যায়ভাবে খুন করেছিলো কারবালায়, বড় কষ্ট দিয়ে খুন করেছিলো তাঁকে। সেই হোসেনের পাক রক্ত, রোজ বিকেলে জমাট বেঁধে দেখা দেয় পশ্চিমাকাশে বুঝলে?

    নিচে, কলতলায় তখন পানি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিলো গুটি আটেক মেয়েমানুষ। পল্টুর মা তার মোটাসোটা দেহটা দেখিয়ে বারবার শাসাচ্ছিলো বাকি সবাইকে। আর আপন মনে বকবক করছিলো একটানা।

    দোতলার কোণের ঘরে অফিস ফেরত বাবুরা তাস নিয়ে বসেছিলো সবে। পাশের ঘরে টেকো মাথা রহমানটা রোগা লিকলিকে বৌটাকে মারছিলো তখন। রোজ যেমনটি মারে।

    সামনের বাড়ির বুড়ো উকিলের তম্বী মেয়েটা সেতারে ইমন কল্যাণের সুর ছড়াচ্ছিলো মৃদু।

    বেশ কাটছিলো বিকেলটা।

    রোজ যেমনটি কাটে।

    ছেদ পড়লো অকস্মাৎ।

    পশ্চিমমুখো লম্বা দোতালা বাড়ির বাসিন্দাদের চমকে দিয়ে সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো একটা লোক। পেছনে আরো তিনজন। কাকে যেন ধরাধরি করে এনে নিঃশব্দে উঠোনে নামিয়ে রাখলো ওরা।

    পাংশু মুখ; বাকহীন।

    কলগোড়ায় যারা দাঁড়িয়েছিল, তারাই আর্তনাদ করে উঠলো সবার আগে। আ-হা-হা কার ছেলেগো! কার ছেলে এমন করে খুন হলো। আ-হা-হা কার ছেলেগো!

    কোন মায়ের বুক খালি হলো গো। কার ছেলে খুন হলো!

    ঝগড়াটে পল্টুর মা এক পা দু পা করে এগিয়ে এলো সামনে। কেমন করে মরলো গো ছেলেটা; আঁ? কেমন করে মরলো? লোকগুলো তখনো চুপচাপ।

    দোতলায় যারা ছিলো তারাও ততক্ষণে নেমে এসেছে নিচে।

    মৃত লোকটাকে ঘিরে তখন একটা ছোটখাট জটলা বেঁধে গেছে উঠোনে। রক্তাক্ত মৃতদেহটার ওপর ঝুঁকে পড়ে হঠাৎ চাপা আর্তনাদ করে উঠলো এল, ডি, ক্লার্ক শমসের আলী। হায় খোদা, একি করলে, এ যে আমাদের নূরুর ছেলে শহীদ।— কেমন করে মরলো?

    কি যেন বলতে গিয়েও বলতে পারলো না লোকগুলো।

    টিকো মাথা রহমান বললো, আরে— তাইতো এ যে দেখছি শহীদ, আপনার রুমেইতো থাকতো ও শমসের সাহেব। তাই না?

    হাঁ, ও আমার রুমেই থাকতো। আস্তে বললো শমসের আলী। তার আবার ওকে বয়ে নিয়ে আসা লোকগুলোর দিকে মুখ তুলে তাকালো সে। এ যে রক্তে চপচপ করছে। কেমন করে মরলো?

    চারজন লোকের একজন গিয়ে সদর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এলো আস্তে। ফিরে এসে চাপা গলায় ফিসফিস করে কি যেন বললো সে সবাইকে।

    সে কি? চাপা আর্তনাদ কান্নার মত শোনা গেলো একসাথে আঁতকে উঠলো দোতলা বাড়ির বাসিন্দারা। সে কি?

    ট্যাক্সি ড্রাইভার ফজল শেখ বললো সে কি, কে গুলি করতে গেল ওকে। কেন গুলি করলো?

    আবার এজিদ নাজেল হলো নাতো দুনিয়ার ওপর? বুড়ি দাদী বিড়বিড় করে উঠলো।

    তারপর এক সীমাহীন নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো সবাই। ফেকাশে বিবর্ণ চোখগুলো তুলে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো ওরা। তারপর আবার তাকালো মাটিতে। শোয়ান রক্তলাল মৃতদেহটার দিকে।

    কালো, মুখচোরা ছেলেটা বছর খানেকের উপর থেকেই ছিলো এ বাড়িতে। থাকতো। খেতোঁ। কলেজে যেতো।

    কই, কোনদিনও তো চোখে পড়েনি কারো।

    পড়বেই বা কেমন করে। বাহাত্তর গেরস্তের বাড়িতে কত লোক আসে, কত লোক যায়। কে কার খোঁজ রাখে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে সব সময়। কিন্তু, অকস্মাৎ আজ সবাই এক অদ্ভূত একাত্মতা অনুভব করলো ওই ছেলেটার সাথে। বেদনার্ত চোখ তুলে সবাই তাকালো ওর দিকে।

    সারারাত তাকালো ওরা।

    ভোরে গরম পানিতে ওর লাশটাকে ধুইয়ে যখন খাটের ওপর শোয়ান হলো, তখন সারা উঠোনটা গিজগিজ করছে লোকে।

    পাড়ার ছেলেরা একটা লম্বা বাঁশের ডগায় পতাকার মতো ঝুলিয়ে নিয়েছে ওর রক্তে ভেজা জামাটা ৷ ওটা ওরা বয়ে নেবে শবযাত্রার পুরোভাগে। বুড়ো সগির মিয়া বলছিলো, ওকে আমরা গোরস্তান পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো কিনা আমার সন্দেহ হচ্ছে। বড় রাস্তায় ট্রাকভর্তি মিলিটারি আর পুলিশ দেখে এলাম। মাঝ পথে হয়তো ছিনিয়ে নেবে ওরা।

    আমরা দেবো কেন? দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠলো ছেলেরা।

    মা নেই, বাবা নেই, ভাই-বোন কেউ এখানে নেই ওর।

    মা বাবা হয়ত ভাবছেন ছেলে তাদের নিরাপদেই পড়ালেখা করছে এখন। গ্রীষ্মের বন্ধে বাড়ি আসবে। কোলের মানিক ফিরে আসবে কোলে। শেষ দর্শনের জন্য মুখের বাঁধনটা খুলে দেয়া হলো ওর।

    পল্টুর মা, ঝুঁকে পড়ে চুমো খেলো ওর কপালে। তারপর চোখে আঁচল চেপে সরে দাঁড়ালো এক পাশে।

    বুড়ি বিড়বিড় করে বললো। হায় খোদা, এজিদের গোষ্ঠি বুঝি এখনও দুনিয়ার ওপর রেখে দিয়েছ তুমি। হায় খোদা!

    আহা মা যখন মউতের কথা শুনবে— তখন কি অবস্থা হবে মা’র। বললো আর একজন।

    মৃতের খাটটা কাঁধে তোলা নিয়ে কাড়াকাড়ি হলো কিছুক্ষণ।

    ছেলেরা বললো, আমরা নেবো।

    বুড়োরা বললো, আমরা।

    শেষে রফা হলো। ঠিক হলো মিনিট দশেকের বেশি কেউ রাখতে পারবে না। শ’খানেক লোক পাড়ার। সবাইকে সুযোগ দিতে হবে তো!

    খাটে শোয়ান শহীদকে নিয়ে যখন রাস্তায় নামলো ওরা। সূর্য তখন বেশ খানিকটা উঠে গেছে উপরে।

    সবার সামনে বাঁশের ডগায় ঝোলান রক্তাক্ত জামা হাতে সুরেন উকিলের ছোট মেয়ে শিবানী। তার দু’পাশে হোসেন ডাক্তারের দুই নাতনী। রানু আর সুফিয়া। ওদের যেতে নিষেধ করছিলো অনেকেই। তবু জিদ ধরেছে ওরা— ওরা যাবেই।

    যাক। যেতে চাইছে যখন যাক না, কি আছে। বলেছিলেন বুড়ো সগির মিয়া।

    মিছিলটা তখন ধীরে ধীরে এগুচ্ছিল সরু গলি বেয়ে।

    আর গলির দু’পাশের জানালা, ছাদ আর বারান্দা থেকে মেয়েরা-মায়েরা দু’হাতে কোঁচড় ভরা ফুল ছুঁড়ে মারছিলো ওর খাটিয়া লক্ষ্য করে। চামেলি। গোলাপ। রজনীগন্ধা।

    ফুল আর গোলাপজল।

    গোলাপজল আর ফুল।

    ফুলে ফুলে আগাগোড়া ঢেকে গেলো শহীদ। ফুলের নিচে ডুবে গেলো ওর লাশটা। দোতলা বাড়ির সংকীর্ণ বারান্দা থেকে ফুল ছুঁড়ে মারতে মারতে আশ্চর্য মৃদু গলায় কে যেন বললো, আমাদের ভাষাকে বাঁচাবার জন্য প্রাণ দিয়েছে ও।

    আমাদের জন্য প্রাণ দিয়েছে। বললো আর একজন।

    কথাটা কানে আসতেই বোধ হয়; অকস্মাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো এল, ডি, ক্লার্ক শমসের আলী। দু’চোখে অশ্রুর বান ডাকলো ওর।

    ছি, শমসের ভাই কাঁদছো কেন। এ সময় কাঁদতে নেই। মৃদু তিরস্কার করলো ওকে ফজল শেখ।

    ওর কানের কাছে মুখ এনে চাপা স্বরে শমসের আলী বললো, বড় হিংসে হচ্ছে— বড় হিংসে হচ্ছে, ফজলুরে আমি কেন ওর মত মরতে পারলাম না।

  • নয়া পত্তন

    নয়া পত্তন

    ভোরের ট্রেনে গাঁয়ে ফিরে এলেন শনু পণ্ডিত।

    ন্যুব্জ দেহ, রুক্ষ চুল, মুখময় বার্ধক্যের জ্যামিতিক রেখা।

    অনেক আশা ভরসা নিয়েই গিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, কিছু টাকা পয়সা সাহায্য পেলে আবার নতুন করে দাঁড় করাবেন স্কুলটাকে। আবার শুরু করবেন গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের পড়ানোর কাজ। কত আশা। আশার মুখে ছাই।

    কেউ সাহায্য দিলো না স্কুলটার জন্য। না চৌধুরীরা। না সরকার। সরকারের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে তো রীতিমত ধমকই খেলেন শনু পণ্ডিত। শিক্ষা বিভাগের বড় সাহেব শমসের খান বললেন, রাজধানীতে দুটো নতুন হোটেল তুলে, আর সাহেবদের ছেলেমেয়েদের জন্য একটা ইংলিশ স্কুল দিতে গিয়ে প্রায় কুড়ি লাখ টাকার মতো খরচ। ফান্ডে এখন আধলা পয়সা নেই সাহেব। অযথা বার বার এসে জ্বালাতন করবেন না আমাদের। পকেটে যদি টাকা না থাকে, স্কুল বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকুন। এমনভাবে ধমকে উঠেছিলেন তিনি যেন স্কুলের জন্য সাহায্য চাইতে এসে ভারী অন্যায় করে ফেলেছেন শনু পণ্ডিত।

    হেঁট মাথায় সেখান থেকে বেরিয়ে চলে এলেও; একেবারে আশা হারাননি তিনি। ভেবেছিলেন সরকার সাহায্য দিলে না, চৌধুরী সাহেব নিশ্চয়ই দেবেন। এককালে তো চৌধুরী সাহেবের সহযোগিতা পেয়েই না স্কুলটা দিয়েছিলেন শনু পণ্ডিত।

    সে আজ বছর পঁচিশেক আগের কথা—

    আশেপাশে দু’চার গাঁয়ে স্কুল বলতে তখন কিছুই ছিলো না।

    লেখাপড়া কাকে বলে তা জানতোই না গাঁয়ের লোক।

    তখন সবেমাত্র এন্ট্রান্স পাশ করে বেরিয়েছেন শনু পণ্ডিত। বাইশ বছরের জোয়ান ছেলে।

    চৌধুরীরও তখন যৌবনকাল। নতুন বিয়ে করা বৌ নিয়ে গাঁয়েই থাকতেন তিনি। গাঁয়ে থেকে জমিদারীর তদারক করতেন। বর্ষার মওসুমে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে দক্ষিণের ঝিলে যেতেন বুনো হাঁস আর কালো বক মারতে। অবসর সময় তাস, পাশা আর দাবা খেলতেন বসে বসে। কথায় কথায় গায়ে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠার ইচ্ছেটা তাঁর কাছে ব্যক্ত করেছিলেন শনু পণ্ডিত। জুলু চৌধুরীও বেশ আগ্রহ দেখালেন। বললেন, সেতো বড় ভালো কথা, গাঁয়ের লোকগুলো সব গণ্ডমূর্খ রয়ে যাচ্ছে। একটা স্কুল দিয়ে যদি ওদের লেখাপড়া শেখাতে পারো সেতো বড় ভালো কথা। কাজ শুরু করে দাও। টাকা পয়সা যতদূর পারি সাহায্য করবো।

    টাকা পয়সা খুব বেশি কিছু না দিলেও, স্কুলের জন্য একটা অনাবাদী জমি ছেড়ে দিয়েছিলেন জুলু চৌধুরী। শহর থেকে ছুতোর মিস্ত্রী এনে গুটি কয়েক ছোট ছোট টুল আর টেবিলও তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। একমাত্র সম্বল দু’ টুকরো ধেনো জমি ছিল শনু পণ্ডিতের। সে দুটো বিক্রি করে স্কুলের জন্য টিন, কাঠ আর বেড়া তৈরির বাঁশ কিনেছিলেন তিনি।

    ব্যয়ের পরিমাণটা তাঁরই বেশি ছিলো, তবু চৌধুরীর নামেই স্কুলটার নামকরণ করেছিলেন তিনি জুলু চৌধুরীর স্কুল। আটহাত কাঠের মাথায় পেরেক আঁটা চারকোণী ফলকের ওপর জুলু চৌধুরীর নামটা জ্বলজ্বল করতো সকাল বিকেল।

    আজও করে।

    যদিও আকস্মিক ঝড়ে মাটিতে মুখ থুবরে ভেঙ্গে পড়েছে স্কুলটা। আর তার টিনগুলো জং ধরে অকেজো হয়ে গেছে বয়সের বার্দ্ধক্য হেতু।

    স্কুলটা ভেঙ্গে পড়েছে। সেটা আবার নতুন করে তুলতে হলে অনেক টাকার দরকার। শনু পণ্ডিত, ভেবেছিলেন, সরকার সাহায্য দিলো না, জুলু চৌধুরী নিশ্চয়ই দেবেন। কিন্তু ভুল ভাঙলো। সাহায্যের নামে রীতিমত আঁতকে উঠলেন জুলু চৌধুরী। বললেন, পাগল, টাকা পয়সার কথা মুখেও এনো না কখনো। দেখছো না কত বড় স্টাব্লিশমেন্ট। চালাতে গিয়ে রেগুলার হাঁসফাঁস হয়ে যাচ্ছি। আধলা পয়সা নেই হাতে। এদিক দিয়ে আসছে। ওদিক দিয়ে যাচ্ছে। শনু পণ্ডিত বুঝলেন, গাঁয়ের ছেলেগুলো লেখাপড়া শিখুক, তা আর চান না চৌধুরী সাহেব।

    না চৌধুরী, না সরকার, কেউ না।

    অগত্যা গাঁয়ে ফিরে এলেন শনু পণ্ডিত।

    ভেঙ্গে পড়া স্কুলটার পাশ দিয়ে আসবার সময় দু’চোখে পানি উপচে পড়ছিলো শনু পণ্ডিতের। লুঙ্গির খুঁটে চোখের পানিটা মুছে নিলেন। গাঁয়ের লোকগুলো উন্মুখ হয়ে প্রতীক্ষা করছিলো তাঁর। ফিরে আসতেই জিজ্ঞেস করলো, কি পণ্ডিত, টাকা পয়সা কিছু দিলো চৌধুরী সাহেব।

    না, গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন শনু পণ্ডিত। চৌধুরীর আশা ছাইড়া দাও মিয়ারা। এক পয়সাও আর পাইবা না তার কাছে থাইকা। সেই আশা ছাইড়া দাও।

    পণ্ডিতের কথা শুনে কেমন ম্লান হয়ে গেলো উপস্থিত লোকজন। বুড়ো হাশমত বললো, আমাগো ছেইলা পেইলাগুলো বুঝি মূর্খ থাইকবো। তা, আমার কি কইরবার আছে কও। আমিতো আমার সাধ্যমত করছি। আস্তে আস্তে বললো শনু পণ্ডিত।

    বুড়ো হাশমত বললো, তুমি আর কি কইরবা পণ্ডিত। তুতি তো এমনেও বহুত কইরছ। বিয়া কর নাই শাদি কর নাই। সারা জীবনটাই তো কাটাইছ ওই স্কুলের পিছনে। তুমি আর কি কইরবা।

    দুপুরের তপ্ত রোদে তখন খাঁ খাঁ করছিলো মাঠ ঘাট, প্রান্তর, দূরে খাসাড়ের মাঠে গরু চরাতে গিয়ে বসে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলো কোন রাখাল ছেলে। বাতাসে বেগ ছিল না। আকাশটা মেঘশূন্য। সবাইকে চুপচাপ দেখে আমিন বেপারি বললো, আর রাইখা দাও লেখাপড়া। আমাগো বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষে কোনদিন লেখাপড়া করে নাই। ক্ষেতের কাজ কইরা খাইছে। আমাগো ছেইলা পেইলারাও তা কইরবো। লেখাপড়ার দরকার নাই।

    তা–মন্দ কও নাই বেপারি। তাকে সমর্থন জানালো মুন্সি আক্রম হাজী। লেখাপড়ার কোন দরকার নাই। আমাগো বাপ দাদায় লেখাপড়া কারে কয় জাইনতোও না।

    বাপ দাদায় জানতোও না দেইখা বুঝি আমাগো ছেইলা পেইলাগুলোও কিছু জাইনবো না। ইতা কিতা কও মিয়া। তকু শেখ রুখে উঠলো ওদের ওপর।

    শনু পণ্ডিত বললো, আগের জামানা চইলা গেছে মিয়া। এই জমানা অইছে লেখাপড়ার জমানা। লেখাপড়া না জাইনলে এই জামানায় মানুষের কদর অয় না।

    তা তোমরা কি কেবল কথা কইবা না কিছু কইরবা। জোয়ান ছেলে তোরাব আলী অধৈর্য হয়ে পড়লো। বললো, চৌধুরীরা তো কিছু দিবো না তা বুঝাই গেলো। আর গরমেন্টো— গরমেন্টোর কথা রাইখা দাও। গরমেন্টোও মইরা গেছে। এহন কি কইরবা, একডা কিছু কর।

    হুঁ। কি কইরবা কর। চিন্তা কর মিয়ারা বিড়বিড় করে বললো শনু পণ্ডিত। বুড়ো হাশমত চুপচাপ কি যেন ভাবছিলো এতক্ষণ। ছেলে দুটো আর বাচ্চা নাতিটাকে অনেক আশা ভরসা নিয়ে স্কুলে দিয়েছিল সে। আশা ছিলো আর কিছু না হোক লেখাপড়া শিখে অন্তত কাচারির পিয়ন হতে পারবে ওরা। গভীরভাবে হয়ত তাদের কথাই ভাবছিলো সে। হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে বললো, যতসব ইয়ে আইছে— যাও ইস্কুল আমরাই দিমু। কারো পারোয়া করি না। না গরমেন্টো—না চৌধুরী, বলে কোমরে গামছা আঁটলো হাশমত।

    বুড়ো হাশমতকে কোমরে গামছা আঁটতে দেখে জোয়ান ছেলে তোরাব আলীও লফিয়ে উঠলো। বললো, টিনের ছাদ যদি না দিবার পারি। অন্তত ছনের ছাদতো দিবার পারমু একটা। কি মিয়ারা?

    হ-হ ঠিক। ঠিক কথাই কইছ আলির পো। গুঞ্জরণ উঠলো চারদিকে। হাশমত বললো, মোক্ষম প্রস্তাব। ছনের ছাদই দিমু আমরা। ছনের ছাদ দিতে কয় আঁটি ছন লাইগবো? কি পণ্ডিত, চুপ কইরা রইলা ক্যান। কওনা?

    কমপক্ষে তিরিশটা লাইগবো। মুখে মুখে হিসেব করে দিলো শনু পণ্ডিত। তকু বললো, ঘাবড়াইবার কি আছে, আমি তিনডা দিমু তোমগোরে। আমি দুইডা দিমু পণ্ডিত। আমরডাও লিস্টি কর। এগিয়ে এসে বললো কদম আলী।

    তোরাব বললো, আমার কাছে ছন নাই ছন দিবার পারমু না আমি। আমি বাঁশ দিমু গোটা সাত কুড়ি। বাঁশও তো সাত আট কুড়ির কম লাইগবো না।

    হ-হ ঠিক ঠিক । সবাই সায় দিলো ওর কথায়।

    দু’দিনের মধ্যে জোগাড়যন্ত্র সব শেষ।

    বাঁশ এলো, ছন এলো। তার সাথে বেতও এলো বাঁশ আর ছন বাঁধবার জন্য।

    আয়োজন দেখে আনন্দে বুকটা নেচে উঠলো শনু পণ্ডিতের।

    এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে কি যেন ভাবছিলো আমিন বেপারি। সবার যাতে নজরে পড়ে এমন একটা জায়গায় বসে গলা খাঁকরিয়ে বললো সে, জিনিস পত্তরতো জোগাড় করইছ মিয়ারা। কিন্তুক যারা গতর কাইটাবো তাগোরে পয়সা দিবো কে?

    হাঁ, তাইতো। কথাটা যেন এক মুহূর্তে নাড়া দিলো সবাইকে।

    হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন শনু পণ্ডিত। এইডা বুঝি একটা কথা অইলো। নিজের কাম নিজে করমু, পইসা আবার কে দিবো? বলে বাঁশ কেটে চালা বাঁধতে শুরু করলেন তিনি। বললেন, নাও নাও যিয়ারা শুরু কর।

    হুঁ। শুরু কর মিয়ারা। বললো তকু শেখ।

    স্কুলের খুঁটি তৈরির জন্য লম্বা একটা গাছকে খাল পার থেকে টেনে নিয়ে এলো তোরাব। হুঁ, টান মারনা মিয়ারা। টান মার।

    হুঁ। মারো জোয়ান হেঁইয়ো—সাবাস জোয়ান হেঁইয়ো। টান মার। টান মার।

    আস্তে আস্তে। এত তড়বড় কোরলে অয়। বললো বুলির বাপ।

    হুঁ। কামের মানুষ হেঁইয়ো। আপনা কাম, হেঁইয়ো। টান টান। মরা চৌধুরী হেঁইয়ো। চৌধুরীর লাশ হেঁইয়ো। হঠাৎ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো তোরাব আর তকু।

    হাসলো সবাই।

    পকপক করে কেশে নিয়ে বুড়ো হাশমত বললো, মরা গরমেন্টো কইলা না মিয়ারা। মরা গরমেন্টো কইলা না।

    হুঁ। মরা গরমেন্টো হেঁইয়ো। — গরমেন্টোর লাশ হেঁইয়ো। টান টান। করম মাঝি চুপ করেছিলো এতক্ষণ। বললো, ফুর্তিছে কাম কর মিয়ারা। আমি সিন্নি পাকাইবার বন্দোবস্ত করিগা।

    বাহ্‌বা মাঝির পো, বাহ্‌বা। চালাও ফুর্তি। কলকণ্ঠে চিৎকার উঠলো চারদিক থেকে!

    পাটারী বাড়ির রোগা লিকলিকে বুড়ো কাদের বক্সটাও এসে জুটেছে সেখানে। তাকে দেখে আমিন বেপারি ভ্রু কোঁচকাল। কি বাক্স আলী। সিন্নির গন্ধে ধাইয়া আইছ বুঝি? কয় দিনের উপাস?

    যত দিনের অই, তোমার তাতে কি। বেপারির কথায় ক্ষেপে উঠলো কাদের বক্স। এত দেমাক দেহাও ক্যান মিয়া। উপাস ক্যাডা না থাকে। তুমিও থাক। সকলে থাকে।

    ঠিক ঠিক। তকু সমর্থন করলো তাকে। চৌধুরীরা ছাড়া আর সকলেই এক আধ বেলা উপাস থাকে। এমন কোন বাপের ব্যাটা নাই যে বুক তাবড়াইয়া কইবার পারবো—জীবনে একদিনও উপাস থাকে নাই-ই। তকু আর কাদেরের কথায় চুপসে গেলো আমিন বেপারি।

    তোরাব বললো, কি মিয়ারা, কিতা নিয়া তর্ক কর তোমরা। বেড়াটা ধর। টান মার। হুঁ। মার জোয়ান হেঁইয়ো—চৌধুরীর লাশ হেঁইয়ো—মরা চৌধুরী হেঁইয়ো। আহ্‌হারে চৌধুরী রে। খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সবাই এক সাথে।

    আক্রম হাজী রুষ্ট হলো ওদের ওপর। এত বাড়াবাড়ি ভালা না মিয়ারা। এত বাড়াবাড়ি ভাল না। এহনও চৌধুরীর জমি চাষ কইরা ভাত খাও। তারে নিয়া এত বাড়াবাড়ি ভালা না।

    চাষ করিতো মাগনা চাষ করি নাকি মিয়া। তোরাব রেগে উঠলো ওর কথায়। পাল্লায় মাইপা অর্ধেক ধান দিয়া দিই তারে।

    পাকা অর্ধেক। বললো কাদের।

    সন্ধ্যা নাগাদ তৈরি হয়ে গেলো স্কুলটা।

    শেষ বানটা দিয়ে চালার উপর থেকে নেবে এলেন শনু পণ্ডিত।

    লম্বা স্কুলটার দিকে তাকাতে আনন্দে চিক্‌চিক্ করে উঠলো কর্ম ক্লান্ত চোখগুলো।

    সৃষ্টির আনন্দ।

    বিড়িতে টান মেরে কদম আলী বললো, গরমেন্টোর আর চৌধুরীরে আইনা একবার দেখাইলে ভালা অইবো পণ্ডিত। তাগোরে ছাড়াও চইলবার পারি আমরা।

    হ-হ! তাগোরে ছাড়াও চইলবার পারি। ঘাড় বাঁকালো শনু পণ্ডিত। একটু দূরে সরে গিয়ে বটগাছটার নিচে বসতেই কাঠের ফলকটার দিকে চোখ পড়লো তকু শেখের। আট হাত লম্বা কাঠের ওপর পেরেক আঁটা ফলক। তার ওপর জুলু চৌধুরীর নামটা জ্বলজ্বল করে সকাল বিকেল।

    ওইটা আর এইহানে ক্যান? বললো তকু শেখ। ওইটারে ফালাইয়া দে। ফালাইয়া দে ওইটা। ভাসাইয়া দে ওইটারে খালের ভিতর। তোরাব আলী বললো, ভাসাইয়া দে খালে; চৌধুরী খালে ভাসুক। হঠাৎ কি মনে করে আবার নিষেধ করলো তোরাব। থাম-থাম ফালাইস না। ইদিকে আন।

    কালো চারকোণী ফলকটার ওপর ঝুঁকে পড়ে একখানা দা দিয়ে ঘষে ঘষে চৌধুরীর নামটা তুলে ফেললো তোরাব আলী। তারপর বুড়ো হাশমতের কল্কে থেকে একটা কাঠ কয়লা তুলে নিয়ে অপটু হাতে কি যেন লিখলো সে ফলকটার ওপর।

    শনু পণ্ডিত জিরোচ্ছিলো বসে বসে। বললো, ওইহানে কি লেইখবার আছে আলীর পো। কিতা লেইখবার আছে ওইহানে?

    পইড়য়া দেহ না পণ্ডিত, আহ পড়ইয়া দেহ। আট হাত লম্বা কাঠের ওপর পেরক আঁটা ফলকটাকে যথাস্থানে গেঁড়ে দিলো তোরাব।

    অদূরে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত দৃষ্টি মেলে মৃদুস্বরে পড়লেন শনু পণ্ডিত। শনু পণ্ডিতের ইসকুল। পড়েই বার্ধক্য জর্জরিত মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো তাঁর। বিড়বিড় করে বললেন, ইতা কিতা কইরছ আলীর পো। ইতা কইরছ?

    ঠিক কইরছে। একদম ঠিক। ফোকলা দাঁত বের করে মৃদু হাসলো বুড়ো হাশমত।

    লজ্জায় তখন মাথাটা নুয়ে এসেছে শনু পণ্ডিতের।