Blog

  • প্রথম সংস্করণের ভূমিকা।

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা।

    আজ এক বৎসর হইল, এসিয়ার পূর্ব্ব প্রান্তে যে ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিয়াছে, তাহার বিস্তৃত বৃত্তান্ত পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন। এই লোকভয়ঙ্কর মহাযুদ্ধ কতদিনে সমাপ্ত হইবে, সৌভাগ্যলক্ষ্মী কাহার প্রতি কিরূপে প্রসন্ন হইবেন, তাহা এক্ষণে নিশ্চয়রূপে প্রকাশ করিতে পারা যায় না। আমেরিকা ও ইয়ুরােপীয় শক্তিপুঞ্জ প্রাচ্য রণরঙ্গভূমে তাণ্ডবনৃত্যে প্রবৃত্ত হইবেন কিনা, তাহাও অধুনা ভবিষ্যৎ গর্ভে নিহিত।

    ইহা সত্য যে, কি জলে, কি স্থলে, এ পর্যন্ত যতগুলি ক্ষুদ্র বা বৃহৎ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকটিতে জয়লক্ষ্মী জাপানের প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ করিয়াছেন। জাপান সৈনিকের অদ্ভুত কর্ম্মকুশলতা, অসাধারণ কষ্টসহিষ্ণুতা, অপূর্ব্ব স্বদেশহিতৈষীতা দর্শন করিয়া ইউরােপ স্তম্ভিত ও আমেরিকা বিস্মিত হইয়াছে। জাপানী সেনাপতিগণের সৈন্যসঞ্চালন, বৃহৎ কামান পরিচালন ও টর্পেডো ক্ষেপণ প্রভৃতি অবলােকন করিয়া পৃথিবীর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতিরাও বিস্মিত ও মােহিত হইয়াছেন।

    লেখক শ্রীউমাকান্ত হাজারী

    সকলই সত্য; কিন্তু তথাপিও আশঙ্কা হয়। যে রুষ পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ শক্তি বলিয়া পরিগণিত, ব্রিটিশকেশরী যাহার জন্য ভারতসীমান্তে ব্যতিব্যস্ত, ফরাসিশার্দ্দূল যাহার সহিত মিত্রতা করিয়া গৌরবান্বিত, জর্ম্মণঅহি বর্ত্তমান মুহূর্ত্তে যাহাকে বন্ধু বলিয়া আলিঙ্গন করিতে উদ্যত, মার্কিণনক্র দূরে অবস্থান করিয়াও যাহার নামে কম্পিত, মুসলমান জগতের একছত্রী সম্রাট তুরষ্ক সােলতান যাহার পদানত, সেই মহাকায় ভীম-পরাক্রমশালী রুষঋক্ষের সহিত ক্ষুদ্র দ্বীপবাসী জাপান তরক্ষুর যুদ্ধ! আশঙ্কার কারণ নাই কি?

    আমরা জাপানকে প্রাণের অধিক ভালবাসি। জাপানবাসী নরনারিগণকে অতি নিকট আত্মীয় বলিয়া মনে করি। যাঁহারা বলেন, জাপান একদিন নিজ বাহুবলে ইংলণ্ডকে পর্য্যুদস্ত করিয়া সমগ্র ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা প্রদান করিবে, জাপানের কৃপায় বােম্বাই নগরী একদিন বােষ্টন বন্দরে পরিণত হইবে, তাঁহারা হয় ভ্রান্ত, না হয় উন্মাদগ্রস্ত। বাতুলালয়ই তাঁহাদের উপযুক্ত বাসস্থান। জাপানের প্রতি আমাদের ভালবাসা ও সহানুভূতির কারণ অন্যবিধ। জাপান এসিয়াবাসী বলিয়া আমাদের ধর্ম্মভ্রাতা, জাপানবাসীরা ভগবান বুদ্ধদেবের উপাসক বিধায় আমাদের ধর্ম্ম শিষ্য। আমাদের সর্ব্বপ্রধান তীর্থ গয়াধাম, জাপানিগণের অতি প্রিয় ও পরম তীর্থ। জাপানে বিধিমতে সংস্কৃত চর্চ্চা হইয়া থাকে, এক্ষণে বহুতর জাপানী যুবক ভারতে আসিয়া সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করিতেছেন। ইউরােপ বা আমেরিকায় আমাদের স্থান নাই, তথায় আমরা বিতাড়িত, ঘৃণিত ও অপমানিত। অষ্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় ভারতবাসী মাত্রেই কুলি বলিয়া অভিহিত। পক্ষান্তরে জাপানের প্রতি গৃহদ্বার আমাদের জন্য উন্মুক্ত, তথায় আমরা ভারতবাসী বলিয়া পূর্ব্বগৌরবে সম্মানিত। মিঃ ওয়াগেল ইংলণ্ডে কাচনির্ম্মাণ কৌশল শিক্ষা করিতে গিয়া যে বিপদে পড়িয়াছিলেন, তাহা আমরা ভুলি নাই; আর আজি ভারতবাসী দলে দলে জাপানে গমন করিয়া নিরুপদ্রপে নানাবিধ শিল্পকলা শিক্ষা করিয়া আসিতেছেন, তাহাও স্বচক্ষে দেখিতেছি। ইহাতেও যদি আমরা জাপানকে ভাল না বাসি, জাপানিগণের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ পােষণ না করি, জাপানবাসীর মঙ্গলের জন্য সর্ব্বমঙ্গলার চরণে প্রার্থনা না করি, তাহা হইলে আমাদের মত কৃতঘ্ন ও নরাধম ধরাতলে আর কোথায় পাওয়া যাইবে?

    জাপানবাসিগণের নিকটে আমরা প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে যে সমস্ত উপকার পাইতেছি, একবার তাহারও আলােচনা ও চিন্তা করা কর্ত্তব্য। ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, একটী আমাদের মত ক্ষুদ্রকায় অন্নমৎস্যভুক আসিয়িক জাতি গত ৩০ বৎসরের চেষ্টায় যে অনন্যসাধারণ উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা দিনান্তে চিন্তা করিয়াও আমাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা একটু ঊর্দ্ধে উঠিয়াছে। আমার নিত্যউপবাস-রুগ্ন প্রতিবাসীর পর্ণকুটীর সহসা প্রাসাদে পরিণত ও অতিথি অভ্যাগতের আনন্দ কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিলে, আমরা যেরূপ যত্ন ও পরিশ্রম সহকারে তাহার কারণ নির্দ্দেশে চেষ্টা করিয়া থাকি, আজ শিক্ষিত ভারতবাসী মাত্রেই সেইরূপ আগ্রহ সহকারে জাপানের অসাধারণ অভ্যুদয়ের কারণ নির্দ্দেশে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তাহারই ফলে “স্বদেশী সমাজ” প্রভৃতি বিবিধ সাময়িক প্রবন্ধের উদ্ভব হইয়াছে, বিভিন্নমতাবলম্বিগণের মধ্যে সৌভ্রাত্রভাব ও একতার পথ উন্মুক্ত হইয়াছে। আজ ভারতবর্ষের নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে, পল্লীতে পল্লীতে সাধারণ শিক্ষার উপযােগিতা ও বিজ্ঞান শিক্ষার আবশ্যকতা বজ্রনির্ঘোষে ঘােষিত হইতেছে। রাজানুগ্রহের উপর নির্ভর না করিয়া, রাজনৈতিক আন্দোলনে সমস্ত শক্তি অপব্যয় না করিয়া, যাহাতে সমাজের চেষ্টায় দেশের অন্নকষ্ট বিদূরিত হয়, শ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল সহজে হস্তগত হয়, স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, নৈতিক ও দৈহিক বল পরিবর্দ্ধিত হয়, আজ সর্ব্বত্রই তাহার জন্য চেষ্টা হইতেছে। ইহা উন্নতির চিহ্ন, মঙ্গলের লক্ষণ।1

    কিন্তু হায়! আমাদের অদৃষ্ট ও এসিয়ার বর্তমানাবস্থা স্মরণ করিলে মনে বড় আশঙ্কা হয়। মনে হয়, বুঝি প্রাচ্য গগনের প্রভাত-মার্ত্তণ্ড মধ্যাহ্নের পূর্ব্বেই অস্তমিত হইবে, অষ্টমীর অর্দ্ধ-শশধর অকালেই করাল রাহুর কবলগ্রস্ত হইবে। এসিয়ার, ভারতের, বৌদ্ধধর্ম্মের, আশাভরসা প্রশান্ত মহাসাগরের অতল জলে নিমর্জ্জিত হইবে।

    জননী! ইহাই কি সত্য? যে জাপান আত্ম অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, ন্যায্য স্বত্ব রক্ষার জন্য ধর্ম্মযুদ্ধে অগ্রসর হইয়াছে, তাহাকে কি রক্ষা করিবে না?

    যেন কোন দেবতা আবির্ভূত হইয়া এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদিগকে বলিতেছেন;—“ভয় নাই। পঞ্চকোটী নরনারী যখন একতা-বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া আত্মত্যাগ-ব্রত অবলম্বন করিয়াছে, তখন আর কিসের ভয়? যখন প্রত্যেক জাপানীর হৃদয় স্বদেশানুরাগে পরিপূর্ণ রহিয়াছে, তখন আর কাহাকে ভয়? যাহাদের ধর্ম্মকর্ম্ম, যাগযজ্ঞ, কামমােক্ষ, সমস্তই সম্রাট ও স্বদেশানুরাগের অন্তর্ভূত, পৃথিবীতে তাহাদের পরাজয় নাই। যে জাতির বালক হইতে বৃদ্ধ পর্য্যন্ত, পর্ণকুটীরবাসী কৃষক হইতে প্রাসাদবাসী সম্রাট পর্য্যন্ত, বালিকা হইতে বৃদ্ধা পর্য্যন্ত সকলেই একস্বরে “স্বদেশ” “স্বদেশ” বলিয়া চীৎকার করিতেছে, সে জাতির জন্য আশঙ্কা নাই।”

    আমরা বঙ্গদেশবাসী ভীরুঅপবাদগ্রস্থ বাঙ্গালী; একতা, আত্মত্যাগ, স্বদেশানুরাগ প্রভৃতি শব্দের প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারি না। আমাদের প্রধান ভরসা ইংলণ্ড ও আমেরিকা। পঞ্চবার্ষিক সন্ধি অনুসারে ইংলণ্ড কিছুতেই রুষকে ম্যানচুরিয়া গ্রাস করিতে দিবেন না। আমেরিকা কোন ক্রমেই প্রশান্ত মহাসাগরে রুষাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হইতে দিবেন না। পৃথিবীর এই দুই মহাশক্তির স্বার্থের সহিত জাপানের স্বার্থ অভিন্ন, ইহাই আমাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু যদি রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা জাপানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন পূর্ব্বক গম্ভীর হইয়া বসেন, মার্কিণ বন্ধুরা বেদান্তের উপদেশ প্রদান করিতে করিতে প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি মারিবার সংকল্প করেন, তাহা হইলে জাপান কি করিবে?

    পূর্ব্বে বলিয়াছি, আমরা জাপানকে ভালবাসি, জাপানের নরনারিগণকে অতি নিকট আত্মীয় বলিয়া মনে করি। বলা বাহুল্য, এই জন্য বহু অর্থ ব্যয় ও শ্রমস্বীকার পূর্ব্বক এই ক্ষুদ্র ইতিবৃত্ত সঙ্কলন করিয়াছি। ইহাতে জাপানের ভৌগােলিক ও ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত, জাপানিগণের রীতিনীতি, আচার ব্যবহার, ধর্মবিশ্বাস, শিক্ষাপ্রণালী, শাসনপদ্ধতি প্রভৃতি বিবিধ বিষয় সংক্ষেপে বিবৃত হইয়াছে। বঙ্গের অমর কবি তাঁহার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ গীতিকবিতায় যাহাকে “অসভ্য জাপান” বলিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, সেই জাপান কি কৌশলে পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, পরাক্রমশালী ও সুসভ্য রাজ্য বলিয়া পরিগণিত হইল, তাহাও এই পুস্তকে লিখিত হইয়াছে।

    এই পুস্তকের পরিশেষে রুষ-জাপান যুদ্ধের কারণ ও বর্তমান সময় পর্যন্ত যতগুলি উল্লেখযােগ্য যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহারও বিবরণ সংক্ষেপে বিবৃত হইয়াছে।

    সামটা,

    শ্রীউমাকান্ত হাজারী।

    ৮ই ফ্রেব্রুয়ারী, ১৯০৫।

  • নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস

    নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস

    নব্য জাপান

    রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস।

    শ্রীউমাকান্ত হাজারী

    প্রণীত

    দ্বিতীয় সংস্করণ।

    “Japan is indeed the object-lesson of national

    efficiency, and happy is the nation

    that learns it.”

    LORD ROSEBERY

    সামটা স্বদেশী সমিতি হইতে (সামটা পােষ্ট বি, সি, আর)

    প্রকাশিত।

    Printed by Sarat Chandra Mallick,

    The DIVINE PRESS

    5, Lal Ostagur’s Lane, Calcutta.

    মাঘ, ১৩১৩

  • ষষ্ঠ প্রবন্ধ

    ষষ্ঠ প্রবন্ধ

    বহু কালের পর পালামৌ সম্বন্ধে দুইটা কথা লিখিতে বসিয়াছি। লিখিবার একটা ওজর আছে। এক সময়ে একজন বধির ব্রাহ্মণ আমাদের প্রতিবাসী ছিলেন, অনবরত গল্প করা তাঁহার রোগ ছিল। যেখানে কেহ একা আছে দেখিতেন, সেইখানে গিয়া গল্প আরম্ভ করিতেন; কেহ তাঁহার গল্প শুনিত না, শুনিবারও কিছু তাহাতে থাকিত না। অথচ তাঁহার স্থির বিশ্বাস ছিল যে, সকলেই তাঁহার গল্প শুনিতে আগ্রহ করে। একবার একজন শ্রোতা রাগ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আর তোমার গল্প ভাল লাগে না, তুমি চুপ কর।” কালা ঠাকুর উত্তর করিয়াছিলেন, “তা কেমন করিয়া হবে, এখনও যে এ গল্পের অনেক বাকি।” আমারও সেই ওজর। যদি কেহ পালামৌ পড়িতে অনিচ্ছুক হন, আমি বলিব যে, “তা কেমন করে হবে, এখনও যে পালামৌর অনেক কথা বাকি।”

    পালামৌর প্রধান আওলাত মৌয়া গাছ। সাধু ভাষায় বুঝি ইহাকে মধুদ্রুম বলিতে হয়। সাধুদের তৃপ্তির নিমিত্ত সকল কথাই সাধু ভাষায় লেখা উচিত। আমারও তাহা একান্ত যত্ন। কিন্তু মধ্যে মধ্যে বড় গোলে পড়িতে হয়, অন্যকেও গোলে ফেলিতে হয়, এই জন্য এক এক বার ইতস্তত করি। সাধুসঙ্গ আমার অল্প, এই জন্য তাঁহাদের ভাষায় আমার সম্পূর্ণ অধিকার জন্মে নাই। যাঁহাদের সাধুসঙ্গ যথেষ্ট অথবা যাঁহারা অভিধান পড়িয়া নিজে সাধু হইয়াছেন, তাঁহারাও একটু একটু গোলে পড়েন। এই যে এইমাত্র মধুদ্রুম লিখিত হইল, অনেক সাধু ইহার অর্থে আশোকবৃক্ষ বুঝিবেন। অনেক সাধু জীবন্তীবৃক্ষ বুঝিবেন। আবার যে সকল সাধুর গৃহে অভিধান নাই, তাঁহারা হয়ত কিছুই বুঝিবেন না; সাধুদের গৃহিণীরা নাকি সাধুভাষা ব্যবহার করেন না। তাঁহারা বলেন, সাধুভাষা অতি অসম্পন্ন; এই ভাষায় গালি চলে না, ঝগড়া চলে না, মনের অনেক কথা বলা হয় না। যদি এ কথা সত্য হয়, তবে তাঁহারা স্বচ্ছন্দে বলুন, সাধুভাষা গোল্লায় যাক।

    মৌয়ার ফুল পালামৌ অঞ্চলে উপাদেয় খাদ্য বলিয়া ব্যবহৃত হইয়া থাকে। হিন্দুস্থানীয়েরা কেহ কেহ সক করিয়া চালভাজার সঙ্গে এই ফুল খাইয়া থাকেন। শুকাইয়া রাখিলে এই ফুল অনেক দিন পর্য্যন্ত থাকে। বর্ষাকালে কোলেরা কেবল এই ফুল খাইয়া দুই তিন মাস কাটায়। পয়সার পরিবর্ত্তে এই ফুল পাইলেই তাহাদের মজুরি শোধ হয়। মৌয়ার এত আদর, অথচ তথায় ইহার বাগান নাই।

    মৌয়ার ফুল শেফালিকার মত ঝরিয়া পড়ে, প্রাতে, বৃক্ষতল একেবারে বিছাইয়া থাকে। সেখানে সহস্র সহস্র মাছি, মৌমাছি, ঘুরিয়া ফিরিয়া উড়িয়া বেড়ায়, তাহাদের কোলাহলে বন পূরিয়া যায়। বোধ হয় দূরে কোথায় একটা হাট বসিয়াছে। একদিন ভোরে নিদ্রাভঙ্গে সেই শব্দে যেন স্বপ্নবৎ কি একটা অষ্পষ্ট সুখ আমার স্মরণ হইতে হইতে আর হইল না। কোন্ বয়সের কোন্ সুখের স্মৃতি, তাহা প্রথমে কিছুই অনুভব হয় নাই, সে দিকে মনও যায় নাই। পরে তাহা স্পষ্ট স্মরণ হইয়াছিল। অনেকের এইরূপ স্মৃতিবৈকল্য ঘটিয়া থাকে। কোন একটি দ্রব্য দেখিয়া বা কোন একটি সুর শুনিয়া অনেকের মনে হঠাৎ একটা সুখের আলোক আসিয়া উপস্থিত হয়; তখন মন যেন আহ্লাদে কাঁপিয়া উঠে—অথচ কি জন্য এই আহ্লাদ, তাহা বুঝা যায় না। বৃদ্ধেরা বলেন, ইহা জন্মান্তরীণ সুখস্মৃতি। তাহা হইলে হইতে পারে, যাঁহাদের পূর্ব্বজন্ম ছিল, তাঁহাদের সকলই সম্ভব। কিন্তু আমার নিজ সম্বন্ধে যাহা বলিতেছিলাম, তাহা ইহজন্মের স্মৃতি। বাল্যকাল আমি যে পল্লীগ্রামে অতিবাহিত করিয়াছি, তথায় নিত্য প্রাতে বিস্তর ফুল ফুটিত, সুতরাং নিত্য প্রাতে বিস্তর মৌমাছি আসিয়া গোল বাধাইত। সেই সঙ্গে ঘরে বাহিরে, ঘাটে পথে হরিনাম—অস্ফূট স্বরে, নানা বয়সের নানা কণ্ঠে, গুন্‌ গুন্‌ শব্দে হরিনাম মিশিয়া কেমন একটা গম্ভীর সুর নিত্য প্রাতে জমিত, তাহা তখন ভাল লাগিত কি না স্মরণ নাই, এখনও ভালো লাগে কিনা বলিতে পারি না, কিন্তু সেই সুর আমার অন্তরের অন্তরে কোথায় লুকান ছিল, তাহা যেন হঠাৎ বাজিয়া উঠিল। কেবল সুর নহে, লতা-পল্লব-শোভিত সেই পল্লীগ্রাম, নিজের সেই অল্প বয়স, সেই সময়ের সঙ্গিগণ, সেই প্রাতঃকাল, কুসুমবাসিত সেই প্রাতর্বায়ু, তাহার সেই ধীর সঞ্চরণ সকলগুলি একত্রে উপস্থিত হইল। সকলগুলি একত্র বলিয়া এই সুখ, নতুবা কেবল মৌমাছির শব্দে সুখ নহে।

    অদ্য যাহা ভাল লাগিতেছে না, দশ বৎসর পরে তাহার স্মৃতি ভাল লাগিবে। অদ্য যাহা সুখ বলিয়া স্বীকার করিলাম না, কল্য আর তাহা জুটিবে না। যুবার যাহা অগ্রাহ্য, বৃদ্ধের তাহা দুষ্প্রাপ্য। দশ বৎসর পূর্ব্বে যাহা আপনিই আসিয়া জুটিয়াছিল, তখন হয়তো আদর পায় নাই, এখন আর তাহা জুটে না, সেই জন্য তাহার স্মৃতিই সুখদ।

    নিত্য মুহূর্ত্তে এক একখানি নূতন পট আমাদের অন্তরে ফোটোগ্রাফ হইতেছে এবং তথায় তাহা থাকিয়া যাইতেছে। আমাদের চতুষ্পার্শ্বে যাহা কিছু আছে, যাহা কিছু আমরা ভালোবাসি, তাহা সমুদয় অবিকল সেই পটে থাকিতেছে। সচরাচর পটে কেবল রূপ অঙ্কিত হয়; কিন্তু যে পটের কথা বলিতেছি, তাহাতে গন্ধ স্পর্শ সকলই থাকে, ইহা বুঝাইবার নহে, সুতরাং সে কথা থাক।

    প্রত্যেক পটের এক একটা করিয়া বন্ধনী থাকে, সেই বন্ধনী স্পর্শ মাত্রেই পটখানি এলাইয়া পড়ে, বহু কালের বিস্মৃত বিলুপ্ত সুখ যেন নূতন হইয়া দেখা দেয়। যে পটখানি আমার স্মৃতিপথে আসিয়াছিল বলিতেছিলাম, বোধহয় মৌমাছির সুর তাহার পটবন্ধনী।

    কোন পটের বন্ধনী কী, তাহা নির্ণয় করা অতি কঠিন; যিনি তাহা করিতে পারেন, তিনিই কবি। তিনিই কেবল একটি কথা বলিয়া পটের সকল অংশ দেখাইতে পারেন, রূপ গন্ধ স্পর্শ সকল অনুভব করাইতে পারেন। অন্য সকলে অক্ষম, তাহারা শত কথা বলিয়াও পটের শতাংশ দেখাইতে পারে না।

    মৌয়া ফুলে মদ্য প্রস্তুত হয়, সেই মদ্যই এই অঞ্চলে সচরাচর ব্যবহার। ইহার মাদকতাশক্তি কত দূর জানি না, কিন্তু বোধ হয়, সে বিষয়ে ইহার বড় নিন্দা নাই, কেন না আমার একজন পরিচারক এক দিন এই মদ্য পান করিয়া বিস্তর কান্না কাঁদিয়াছিল, বিস্তর বমি করিয়াছিল। তাহার প্রাণও যথেষ্ট খুলিয়াছিল, যেরূপে আমার যত টাকা সে চুরি করিয়াছিল, সেই দিন তাহা সমুদয় বলিয়াছিল। বিলাতী মদের সহিত তুলনায় এ মদের দোষ কি, তাহা স্থির করা কঠিন। বিলাতী মদে নেশা আর লিবর দুই থাকে। মৌয়ার মদে কেবল একটী থাকে, নেশা-লিবর থাকে না; তাহাই এ মদের এত নিন্দা, এ মদ এত সস্তা। আমাদের ধেনোরও সেই দোষ।

    দেশী মদের আর একটা দোষ, ইহার নেশায় হাত পা দুইয়ের একটিও ভাল চলে না। কিন্তু বিলাতী মদে পা চলুক বা না চলুক, হাত বিলক্ষণ চলে, বিবিরা তাহার প্রমাণ দিতে পারেন। বুঝি আজ কাল আমাদের দেশেরও দুই চারি ঘরের গৃহিণীরা ইহার স্বপক্ষ কথা বলিলেও বলিতে পারেন।

    বিলাতী পদ্ধতি অনুসারে প্রস্তুত করিতে পারিলে মৌয়ার ব্রাণ্ডি হইতে পারে, কিন্তু অর্থসাপেক্ষ। একজন পাদরি আমাদের দেশী জাম হইতে শ্যামপেন প্রস্তুত করিয়াছিলেন, অর্থাভাবে তিনি তাহা প্রচলিত করিতে পারেন নাই। আমাদের দেশী মদ একবার বিলাতে পাঠাইতে পারিলে জন্ম সার্থক হয়, অনেক অন্তরজ্বালা নিবারণ হয়।

  • পঞ্চম প্রবন্ধ

    পঞ্চম প্রবন্ধ

    কোলের নৃত্য সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ বলা হইয়াছে, এবার তাহাদের বিবাহের পরিচয় দিতে ইচ্ছা হইতেছে। কোলের অনেক শাখা আছে। আমার স্মরণ নাই, বোধ হয় যেন উরাঙ, মুণ্ডা, খেরওয়ার এবং দোসাদ এই চারি জাতি তাহার মধ্যে প্রধান। ইহার এক জাতির বিবাহে আমি বরযাত্রী হইয়া কতক দূর গিয়াছিলাম। বরকর্ত্তা আমার পাল্‌কী লইয়া গেল, কিন্তু আমায় নিমন্ত্রণ করিল না; ভাবিলাম—না করুক, আমি রবাহূত যাইব। সেই অভিপ্রায়ে অপরাহ্ণে পথে দাঁড়াইয়া থাকিলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি, পাল্‌কীতে বর আসিতেছে। সঙ্গে দশ বার জন পুরুষ আর পাঁচ ছয় জন যুবতী, যুবতীরাও বরযাত্রী। পুরুষেরা আমায় কেহই ডাকিল না, স্ত্রীলোকের চক্ষুলজ্জা আছে, তাহারা হাসিয়া আমায় ডাকিল, আমিও হাসিয়া তাহাদের সঙ্গে চলিলাম; কিন্তু অধিক দূর যাইতে পারিলাম না; তাহারা যেরূপ বুক ফুলাইয়া, মুখ তুলিয়া, বায়ু ঠেলিয়া মহাদম্ভে চলিতেছিল, আমি দুর্ব্বল বাঙ্গালী, আমার সে দম্ভ, সে শক্তি কোথায়? সুতরাং কতক দূর গিয়া পিছাইলাম; তাহারা তাহা লক্ষ করিল না; হয়ত দেখিয়াও দেখিল না; আমি বাঁচিলাম। তখন পথপ্রান্তে এক প্রস্তরস্তূপে বসিয়া ঘর্ম্ম মুছিতে লাগিলাম, আর রাগভরে পাথুরে মেয়েগুলাকে গালি দিতে লাগিলাম। তাহাদিগকে সেপাই বলিলাম, সিদ্ধেশ্বরীর পাল বলিলাম, আর কত কি বলিলাম। আর একবার বহু পূর্ব্বে এইরূপ গালি দিয়াছিলাম। একদিন বেলা দুই প্রহরের সময় টিটাগড়ের বাগানে “লসিংটন লজ” হইতে গজেন্দ্রগমনে আমি আসিতেছিলাম—তখন রেলওয়ে ছিল না, সুতরাং এখনকার মত বেগে পথ চলা বাঙ্গালীর মধ্যে বড় ফেসন হয় নাই—আসিতে আসিতে পশ্চাতে একটা অল্প টক টক শব্দ শুনিতে পাইলাম। ফিরিয়া দেখি, গবর্ণর জেনেরল কাউন্‌সলের অমুক মেম্বারের কুলকন্যা একা আসিতেছেন। আমি তখন বালক, ষোড়শ বৎসরের অধিক আমার বয়স নহে, সুতরাং বয়সের মত স্থির করিলাম, স্ত্রীলোকের নিকট পিছাইয়া পড়া হইবে না, অতএব যথাসাধ্য চলিতে লাগিলাম। হয়ত যুবতীও তাহা বুঝিলেন। আর একটু অধিক বয়স হইলে এদিকে তাঁহার মন যাইত না। তিনি নিজে অল্পবয়স্কা; আমার অপেক্ষা কিঞ্চিৎমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠা, সুতরাং এই উপলক্ষে বাইচ খেলার আমোদ তাঁহার মনে আসা সম্ভব। সেই জন্য একটু যেন তিনি জোরে বাহিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে পশ্চিমে মেঘের মতো আমাকে ছাড়াইয়া গেলেন, যেন সেইসঙ্গে একটু “দুয়ো” দিয়া গেলেন,—অবশ্য তাহা মনে মনে, তাঁহার ওষ্ঠপ্রান্তে একটু হাসি ছিল, তাহাই বলিতেছি। আমি লজ্জিত হইয়া নিকটস্থ বটমূলে বসিয়া সুন্দরীদের উপর রাগ করিয়া নানা কথা বলিতে লাগিলাম। যাহারা এত জোরে পথ চলে, তাহারা আবার কোমলাঙ্গী? খোশামুদেরা বলে, তাহাদের অলকদাম সরাইবার নিমিত্ত বায়ু ধীরে ধীরে বহে। কলাগাছে ঝড়, আর শিমূল গাছে সমীরণ?

    সে সকল রাগের কথা এখন যাক; যে হারে, সেই রাগে। কোলের কথা হইতেছিল। তাহাদের সকল জাতির মধ্যে একরূপ বিবাহ নহে। এক জাতি কোল আছে, তাহারা উরাঙ কি, কি তাহা স্মরণ নাই, তাহাদের বিবাহপ্রথা অতি পুরাতন। তাহাদের প্রত্যেক গ্রামের প্রান্তে একখানি করিয়া বড় ঘর থাকে। সেই ঘরে সন্ধ্যার পর একে একে গ্রামের সমুদয় কুমারীরা আসিয়া উপস্থিত হয়, সেই ঘর তাহাদের ডিপো। বিবাহযোগ্য হইলে আর তাহারা পিতৃগৃহে রাত্রি যাপন করিতে পায় না। সকলে উপস্থিত হইয়া শয়ন করিলে গ্রামের অবিবাহিত যুবারা ক্রমে ক্রমে সকলে সেই ঘরের নিকটে আসিয়া রসিকতা আরম্ভ করে, কেহ গীত গায়, কেহ নৃত্য করে, কেহ বা রহস্য করে। যে কুমারীর বিবাহের সময় হয় নাই, সে অবাধে নিদ্রা যায়। কিন্তু যাহাদের সময় উপস্থিত, তাহারা বসন্তকালের পক্ষিণীর ন্যায় অনিমেষলোচনে সেই নৃত্য দেখিতে থাকে, একাগ্রচিত্তে সেই গীত শুনিতে থাকে। হয়ত থাকিতে না পারিয়া শেষে ঠাট্টার উত্তর দেয়, কেহ বা গালি পর্য্যন্তও দেয়। গালি আর ঠাট্টা উভয়ে প্রভেদ অল্প, বিশেষ যুবতীর মুখবিনির্গত হইলে যুবার কর্ণে উভয়ই সুধাবর্ষণ। কুমারীরা গালি আরম্ভ করিলে কুমারেরা আনন্দে মাতিয়া উঠে।

    এইরূপে প্রতি রাত্রে কুমার কুমারীর বাক্‌চাতুরী হইতে থাকে, শেষ তাহাদের মধ্যে প্রণয় উপস্থিত হয়। প্রণয় কথাটি ঠিক নহে। কোলেরা প্রেম প্রীতের বড় সম্বন্ধ রাখে না। মনোনীত কথাটি ঠিক। নৃত্য হাস্য উপহাস্যের পর পরস্পর মনোনীত হইলে সঙ্গী, সঙ্গিনীরা তাহা কাণাকাণি করিতে থাকে। ক্রমে গ্রামে রাষ্ট্র হইয়া পড়ে। রাষ্ট্র কথা শুনিয়া উভয় পক্ষের পিতৃকুল সাবধান হইতে থাকে। সাবধানতা অন্য বিষয়ে নহে। কুমারীর আত্মীয় বন্ধুরা বড় বড় বাঁশ কাটে, তীর ধনুক সংগ্রহ করে, অস্ত্রশস্ত্রে শান দেয়। আর অনবরত কুমারের আত্মীয় বন্ধুকে গালি দিতে থাকে। চীৎকার আর আস্ফালনের সীমা থাকে না। আবার এদিকে উভয় পক্ষে গোপনে গোপনে বিবাহের আয়োজনও আরম্ভ করে।

    শেষ একদিন অপরাহ্ণে কুমারী হাসি হাসি মুখে বেশ বিন্যাস করিতে বসে। সকলে বুঝিয়া চারি পার্শ্বে দাঁড়ায়, হয়তো ছোট ভগিনী বন হইতে নূতন ফুল আনিয়া মাথায় পরাইয়া দেয়, বেশ বিন্যাস হইলে কুমারী উঠিয়া গাগরি লইয়া একা জল আনিতে যায়। অন্য দিনের মত নহে, এ দিনে ধীরে ধীরে যায়, তবু মাথায় গাগরি টলে। বনের ধারে জল, যেন কতই দূর! কুমারী যাইতেছে আর অনিমেষলোচনে বনের দিকে চাহিতেছে। চাহিতে চাহিতে বনের দুই একটি ডাল দুলিয়া উঠিল। তাহার পর এক নবযুবা, সখা সুবলের মত লাফাইতে লাফাইতে সেই বন হইতে বহির্গত হইল, সঙ্গে সঙ্গে হয়তো দুটা চারিটা ভ্রমরও ছুটিয়া আসিল। কোল-কুমারীর মাথা হইতে গাগরি পড়িয়া গেল। কুমারীকে বুকে করিয়া যুবা অমনি ছুটিল। কুমারী সুতরাং এ অবস্থায় চীৎকার করিতে বাধ্য, চীৎকারও সে করিতে লাগিল। হাত পাও আছড়াইল। এবং চড়টা চাপড়টা যুবাকেও মারিল; নতুবা ভাল দেখায় না! কুমারীর চীৎকারে তাহার আত্মীয়েরা “মার মার” রবে আসিয়া পড়িল। যুবার আত্মীয়েরাও নিকটে এখানে সেখানে লুকাইয়া ছিল, তাহারাও বাহির হইয়া পথরোধ করিল। শেষে যুদ্ধ আরম্ভ হইল। যুদ্ধ রুক্মিণীহরণের যাত্রার মতো, সকলের তীর আকাশমুখী। কিন্তু শুনিয়াছি, দুই একবার নাকি সত্য সত্যই মাথা ফাটাফাটিও হইয়া গিয়াছে। যাহাই হউক, শেষ যুদ্ধের পর আপোষ হইয়া যায় এবং তৎক্ষণাৎ উভয় পক্ষ একত্র আহার করিতে বসে।

    এইরূপ কন্যা হরণ করাই তাহাদের বিবাহ। আর স্বতন্ত্র কোনো মন্ত্র তন্ত্র নাই। আমাদের শাস্ত্রে এই বিবাহকে আসুরিক বিবাহ বলে। এক সময় পৃথিবীর সর্ব্বত্র এই বিবাহ প্রচলিত ছিল। আমাদের দেশে স্ত্রী-আচারের সময় বরের পৃষ্ঠে বাউটি-বেষ্টিত নানা ওজনের করকমল যে সংস্পর্শ হয়, তাহাও এই মারপিট প্রথার অবশেষ। হিন্দুস্থান অঞ্চলের বরকন্যার মাসী পিসী একত্র জুটিয়া নানা ভঙ্গীতে, নানা ছন্দে, মেছুয়াবাজারের ভাষায় পরস্পরকে যে গালি দিবার রীতি আছে, তাহাও এই মারপিট প্রথার নূতন সংস্কার। ইংরেজদের বরকন্যা গির্জ্জা হইতে গাড়ীতে উঠিবার সময় পুষ্পবৃষ্টির ন্যায় তাহাদের অঙ্গে যে জুতাবৃষ্টি হয়, তাহাও এই পূর্ব্বপ্রথার অন্তর্গত।2

    কোলদের উৎসব সর্ব্বাপেক্ষা বিবাহে। তদুপলক্ষে ব্যয়ও বিস্তর। আট টাকা, দশ টাকা, কখন কখন পনর টাকা পর্য্যন্ত ব্যয় হয়। বাঙ্গালীর পক্ষে ইহা অতি সামান্য, কিন্তু বন্যের পক্ষে অতিরিক্ত। এত টাকা তাহারা কোথা পাইবে? তাহাদের এক পয়সা সঞ্চয় নাই, কোন উপার্জ্জনও নাই, সুতরাং ব্যয় নির্ব্বাহ করিবার নিমিত্ত কর্জ্জ করিতে হয়। দুই চারি গ্রাম অন্তর এক জন করিয়া হিন্দুস্থানী মহাজন বাস করে, তাহারাই কর্জ্জ দেয়। এই হিন্দুস্থানীরা মহাজন কি মহাপিশাচ, সে বিষয়ে আমার বিশেষ সন্দেহ আছে। তাহাদের নিকট একবার কর্জ্জ করিলে আর উদ্ধার নাই। যে একবার পাঁচ টাকা মাত্র কর্জ্জ করিল সে সেই দিন হইতে আপন গৃহে আর কিছুই লইয়া যাইতে পাইবে না, যাহা উপার্জ্জন করিবে, তাহা মহাজনকে আনিয়া দিতে হইবে। খাতকের ভূমিতে দুই মণ কার্পাস, কি চারি মণ যব জন্মিয়াছে, মহাজনের গৃহে তাহা আনিতে হইবে; তিনি তাহা ওজন করিবেন, পরীক্ষা করিবেন, কত কি করিবেন, শেষ হিসাব করিয়া বলিবেন যে, আসল পাঁচ টাকার মধ্যে এই কার্পাসে কেবল এক টাকা শোধ গেল, আর চারি টাকা বাকি থাকিল। খাতক যে আজ্ঞা বলিয়া চলিয়া যায়। কিন্তু তাহার পরিবার খায় কি? চাষে যাহা জন্মিয়াছিল, মহাজন তাহা সমুদয় লইল। খাতক হিসাব জানে না, এক হইতে দশ গণনা করিতে পারে না, সকলের উপর তাহার সম্পূর্ণ বিশ্বাস। মহাজন যে অন্যায় করিবে, ইহা তাহার বুদ্ধিতে আইসে না। সুতরাং মহাজনের জালে বদ্ধ হইল। তাহার পর পরিবার আহার পায় না, আবার মহাজনের নিকট খোরাকী কর্জ্জ করা আবশ্যক, সুতরাং খাতক জন্মের মত মহাজনের নিকট বিক্রীত হইল। যাহা সে উপার্জ্জন করিবে, তাহা মহাজনের। মহাজন তাহাকে কেবল যৎসামান্য খোরাকি দিবে। এই তাহার এ জন্মের বন্দোবস্ত।

    কেহ কেহ এই উপলক্ষে “সামকনামা” লিখিয়া দেয়। সামকনামা অর্থাৎ দাসখত। যে ইহা লিখিয়া দিল, সে রীতিমত গোলাম হইল। মহাজন গোলামকে কেবল আহার দেন, গোলাম বিনা বেতনে তাঁহার সমুদয় কর্ম্ম করে; চাষ করে, মোট বহে, সর্ব্বত্র সঙ্গে যায়। আপনার সংসারের সঙ্গে আর তাহার কোন সম্বন্ধ থাকে না। সংসারও তাহাদের অন্নাভাবে শীঘ্রই লোপ পায়।

    কোলদের এই দুর্দ্দশা অতি সাধারণ। তাহাদের কেবল এক উপায় আছে—পলায়ন। অনেকেই পলাইয়া রক্ষা পায়। যে না পলাইল, সে জন্মের মত মহাজনের নিকট বিক্রীত থাকিল।

    পুত্রের বিবাহ দিতে গিয়া যে কেবল কোলের জীবনযাত্রা বৃথা হয় এমত নহে, আমাদের বাঙ্গালীর মধ্যে অনেকের দুর্দ্দশা পুত্রের বিবাহ উপলক্ষে অথবা পিতৃমাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে। সকলেই মনে মনে জানেন, আমি বড় লোক, আমি “ধুমধাম” না করিলে লোকে আমার নিন্দা করিবে। সুতরাং কর্জ্জ করিয়া সেই বড়লোকত্ব রক্ষা করেন, তাহার পর যথাসর্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়া সে কর্জ্জ হইতে উদ্ধার হওয়া ভার হয়। প্রায় দেখা যায়, “আমি ধনবান্” বলিয়া প্রথমে অভিমান জন্মিলে শেষ দারিদ্র্যদশায় জীবন শেষ করিতে হয়।

    কোলেরা সকলেই বিবাহ করে। বাঙ্গালা শস্যশালিনী, এখানে অল্পেই গুজরান চলে, তাই বাঙ্গালায় বিবাহ এত সাধারণ। কিন্তু পালামৌ অঞ্চলে সম্পূর্ণ অন্নাভাব, সেখানে বিবাহ এরূপ সাধারণ কেন, তদ্বিষয়ে সমাজতত্ত্ববিদেরা কি বলেন জানি না। কিন্তু বোধ হয় হিন্দুস্থানী মজাজনেরা তথায় বাস করিবার পূর্ব্বে কোলদের এত অন্নাভাব ছিল না। তাহাই বিবাহ সাধারণ হইয়াছিল। এক্ষণে মহাজনেরা তাহাদের সর্ব্বস্ব লয়। তাহাদের অন্নাভাব হইয়াছে, সুতরাং বিবাহ আর পূর্ব্বমত সাধারণ থাকিবে না বলিয়া বোধ হয়।

    কোলের সমাজ এক্ষণে যে অবস্থায় আছে দেখা যায়, তাহাতে সেখানে মহাজনের আবশ্যক নাই, যদি হিন্দুস্থানী সভ্যতা তথায় প্রবিষ্ট না হইত, তাহা হইলে অদ্যাপি কোলের মধ্যে ঋণের প্রথা উৎপত্তি হইত না। ঋণের সময় হয় নাই। ঋণ উন্নত সমাজের সৃষ্টি। কোলদিগের মধ্যে সে উন্নতির বিলম্ব আছে। সমাজের স্বভাবতঃ যে অবস্থা হয় নাই, কৃত্রিম উপায়ে সে অবস্থা ঘটাইতে গেলে, অথবা সভ্য দেশের নিমাদি অসময়ে অসভ্য দেশে প্রবিষ্ট করাইতে গেলে, ফল ভাল হয় না। আমাদের বাঙ্গালায় এ কথার অনেক পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। এক সময় ইহুদি মহাজনেরা ঋণ দানের সভ্য নিয়ম অসভ্য বিলাতে প্রবেশ করাইয়া অনেক অনিষ্ট ঘটাইয়াছিল। এক্ষণে হিন্দুস্থানী মহাজনেরা কোলদের সেইরূপ অনিষ্ট ঘটাইতেছে।

    কোলের নববধূ আমি কখন দেখি নাই। কুমারী এক রাত্রের মধ্যে নববধূ! দেখিতে আশ্চর্য্য! বাঙ্গালায় দুরন্ত ছুঁড়ীরা ধূলাখেলা করিয়া বেড়াইতেছে, ভাইকে পিটাইতেছে, পরের গোরুকে গাল দিতেছে, পাড়ার ভালখাকীদের সঙ্গে কোঁদল করিতেছে, বিবাহের কথা উঠিলে ছুঁড়ী গালি দিয়া পলাইতেছে। তাহার পর এক রাত্রে ভাবান্তর। বিবাহের পরদিন প্রাতে আর সে পূর্ব্বমতো দুরন্ত ছুঁড়ী নাই। এক রাত্রে তার আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন হইয়া গিয়াছে। আমি একটি এইরূপ নববধূ দেখিয়াছি। তাহার পরিচয় দিতে ইচ্ছা হয়।

    বিবাহের রাত্রি আমোদে গেল। পরদিন প্রাতে উঠিয়া নববধূ ছোট ভাইকে আদর করিল, নিকটে মা ছিলেন, নববধূ মার মুখ প্রতি এক বার চাহিল, মার চক্ষে জল আসিল, নববধূ মুখাবনত করিল, কাঁদিল না। তাহার পর ধীরে ঘীরে এক নির্জ্জন স্থানে গিয়া দ্বারে মাথা রাখিয়া অন্যমনস্কে দাঁড়াইয়া শিশিরসিক্ত সামিয়ানার প্রতি চাহিয়া রহিল। সামিয়ানা হইতে টোপে টোপে উঠানে শিশির পড়িতেছে। সামিয়ানা হইতে উঠানের দিকে তাহার দৃষ্টি গেল, উঠানের এখানে সেখানে পূর্ব্বরাত্রের উচ্ছিষ্টপত্র পড়িয়া রহিয়াছে, রাত্রের কথা নববধূর মনে হইল, কত আলো! কত বাদ্য! কত লোক! কত কলবর! যেন স্বপ্ন! এখন সেখানে ভাঙা ভাঁড়, ছেঁড়া পাতা! নববধুর সেই দিকে দৃষ্টি গেল। একটি দুর্ব্বলা কুক্কুরী—নবপ্রসূতি—পেটের জ্বালায় শুষ্ক পত্রে ভগ্ন ভাণ্ডে আহার খুঁজিতেছে, নববধূর চোখে জল আসিল। জল মুছিয়া নববধূ ধীরে ধীরে মাতৃকক্ষে গিয়া লুচি আনিয়া কুক্কুরীকে দিল। এই সময় নববধূর পিতা অন্দরে আসিতেছিলেন, কুক্কুরীভোজন দেখিয়া একটু হাসিলেন, নববধূ আর পূর্ব্ববমত দৌড়িয়া পিতার কাছে গেল না, অধোমুখে দাঁড়াইয়া রহিল। পিতা বলিলেন, ব্রাহ্মণভোজনের পর কুক্কুর ভোজনই হইয়া থাকে, রাত্রে তাহা হইয়া গিয়াছে, অদ্য আবার এ কেন মা? নববধূ কথা কহিল না! কহিলে হয়ত বলিত, এই কুক্কুরী সংসারী।

    পূর্ব্বে বলিয়াছি, নববধূ লুচি আনিতে যাইবার সময় ধীরে ধীরে গিয়াছিল, আর দুই দিন পূর্ব্বে হইলে দৌড়িয়া যাইত। যখন সেই ঘরে গেল, তখন দেখিল, মাতার সম্মুখে কতকগুলি লুচি সন্দেশ রহিয়াছে। নববধূ জিজ্ঞাসা করিল, “মা! লুচি নেব?” মাতা লুচিগুলি হাতে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, “কেন মা আজ চাহিয়া নিলে? যাহা তোমার ইচ্ছা তুমি আপনি লও, ছড়াও, ফেলিয়া দাও, নষ্ট কর; কখন কাহাকেও ত জিজ্ঞাসা করে লও না? আজ কেন মা চাহিয়া নিলে? তবে সত্যই আজ থেকে কি তুমি পর হ’লে, আমায় পর ভাবিলে?” এই বলিয়া মা কাঁদিতে লাগিলেন। নববধূ বলিল, “না মা! আমি বলি বুঝি কার জন্য রেখেছ?” নববধূ হয়ত মনে করিল, পূর্ব্বে আমায় “ওই” বলিতে আজ কেন তবে আমায় “তুমি” বলিয়া কথা কহিতেছ?

    নববধূর পরিবর্ত্তন সকলের নিকট স্পষ্ট নহে সত্য, কিন্তু যিনি অনুধাবন করিয়াছেন, তিনিই বুঝিতে পারিয়াছেন যে, পরিবর্ত্তন অতি আশ্চর্য্য! এক রাত্রের পরিবর্ত্তন বলিয়া আশ্চর্য্য! নববধূর মুখশ্রী এক রাত্রে একটু গম্ভীর হয়, অথচ তাহাতে একটু আহ্লাদের আভাসও থাকে। তদ্ব্যতীত যেন একটু সাবধান, একটু নম্র, একটু সঙ্কুচিত বলিয়া বোধ হয়। ঠিক যেন শেষ রাত্রের পদ্ম। বালিকা কী বুঝিল যে, মনের এই পরিবর্ত্তন হঠাৎ এক রাত্রের মধ্যে হইল!

  • চতুর্থ প্রবন্ধ

    চতুর্থ প্রবন্ধ

    আবার পালামৌর কথা লিখিতে বসিয়াছি; কিন্তু ভাবিতেছি এবার কী লিখি? লিখিবার বিষয় এখন ত কিছুই মনে হয় না, অথচ কিছু না কিছু লিখিতে হইতেছে। বাঘের পরিচয় ত আর ভাল লাগে না; পাহাড় জঙ্গলের কথাও হইয়া গিয়াছে, তবে আর লিখিবার আছে কী? পাহাড়, জঙ্গল, বাঘ, এই লইয়াই পালামৌ। যে সকল ব্যক্তিরা তথায় বাস করে, তাহারা জঙ্গলী, কুৎসিত, কদাকার জানওয়ার, তাহাদের পরিচয় লেখা বৃথা।

    কিন্তু আবার মনে হয়, পালামৌ জঙ্গলে কিছুই সুন্দর নাই, এ কথা বলিলে লোকে আমায় কী বিবেচনা করিবে? সুতরাং পালামৌ সম্বন্ধে দুটা কথা বলা আবশ্যক।

    এক দিন সন্ধ্যার পর চিকপর্দ্দা ফেলিয়া তাঁবুতে একা বসিয়া সাহেবী ঢঙ্গে কুক্কুরী লইয়া ক্রীড়া করিতেছি, এমত সময় এক জন কে আসিয়া বাহির হইতে আমাকে ডাকিল, “খাঁ সাহেব!” আমার সর্ব্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল। এখন হাসি পায়, কিন্তু তখন বড়ই রাগ হইয়াছিল। রাগ হইবার অনেক কারণও ছিল; কারণ নং এক এই যে, আমি মান্য ব্যক্তি; আমাকে ডাকিবার সাধ্য কাহার? আমি যাঁহার অধীন, অথবা যিনি আমা অপেক্ষা অতি প্রধান, কিম্বা যিনি আমার বিশেষ আত্মীয়, কেবল তিনিই আমাকে ডাকিতে পারেন। অন্য লোকে “শুনুন” বলিলে সহ্য হয় না।

    কারণ নং দুই যে, আমাকে “খাঁ সাহেব” বলিয়াছে, বরং “খাঁ বাহাদুর” বলিলে কতক সহ্য করিতে পারিতাম, ভাবিতাম, হয়তো লোকটা আমাকে মুছলমান বিবেচনা করিয়াছে, কিন্তু পদের অগৌরব করে নাই। “খাঁ সাহেব” অর্থে যাহাই হউক, ব্যবহারে তাহা আমাদের “বোস মশায়” বা “দাস মশায়” অপেক্ষা অধিক মান্যের উপাধি নহে। হারম্যান কোম্পানি যাহার কাপড় সেলাই করে, ফরাসী দেশে যাহার জুতা সেলাই হয়, তাহাকে “বোস মহাশয়” বা “দাস মহাশয়” বলিলে সহ্য হইবে কেন? বাবু মহাশয় বলিলেও মন উঠে না। অতএব স্থির করিলাম, এ ব্যক্তি যেই হউক, আমাকে তুচ্ছ করিয়াছে, আমাকে অপমান করিয়াছে।

    সেই মুহূর্ত্তে তাহাকে ইহার বিশেষ প্রতিফল পাইতে হইত, কিন্তু “হারামজাদ্‌” “বদ্‌জাত” প্রভৃতি সাহেবস্বভাবসুলভ গালি ব্যতীত আর তাহাকে কিছুই দিই নাই, এই আমার বাহাদুরি। বোধ হয়, সে রাত্রে বড় শীত পড়িয়াছিল, তাহাই তাঁবুর বাহিরে যাইতে সাহস করি নাই। আগন্তুক গালি খাইয়া আর কোন উত্তর করিল না; বোধ হয় চলিয়া গেল। আমি চিরকাল জানি, যে গালি খায়, সে হয় ভয়ে মিনতি করে, নতুবা গালি অকারণ দেওয়া হইয়াছে প্রতিপন্ন করিবার নিমিত্ত তর্ক করে; তাহা কিছুই না করায়, আমি ভাবিলাম, এ ব্যক্তি চমৎকার লোক। সেও হয়তো আমাকে ভাবিল, “চমৎকার লোক”। নাম জানে না, পদ জানে না, কী বলিয়া ডাকিবে তাহা জানে না; সুতরাং দেশীয় প্রথা অনুসারে সম্ভ্রম করিয়া ‘খাঁ সাহেব’ ডাকিয়াছে, তাহার উত্তরে যে ‘হারামজাদ’ বলিয়া গালি দেয়, তাহাকে “চমৎকার লোক” ব্যতীত আর কী মনে করিবে?

    দণ্ডেক পরে আমার “খানশামা বাবু” তাঁবুর দ্বারে আসিয়া ঈষৎ কণ্ঠকণ্ডুয়নশব্দ দ্বারা আপনার আগমনবার্ত্তা জানাইল। আমার তখনও রাগ আছে, “খানশামা বাবু”ও তাহা জানিত, এইজন্য কলিকা-হস্তে তাঁবুতে প্রবেশ করিল, কিন্তু অগ্রসর হইল না, দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া অতি গম্ভীরভাবে কলিকায় ফুঁ দিতে লাগিল। আমি তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া ভাবিতেছি, কতক্ষণে কলিকা আলবোলায় বসাইয়া দিবে, এমন সময়ে দ্বারের পার্শ্বে কী নড়িল, চাহিয়া দেখিলাম সে দিকে কিছুই নাই, কেবল নীল আকাশে নক্ষত্র জ্বলিতেছে; তাহার পরেই দেখি দুইটি অস্পষ্ট মনুষ্যমূর্তি দাঁড়াইয়া আছে। টেবিলের বাতি সরাইলাম, আলোক তাহাদের অঙ্গে পড়িল। দেখিলাম, একটি বৃদ্ধ আবক্ষ শ্বেত শ্মশ্রুতে পরিপ্লুত, মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, তাহার পার্শ্বে একটি স্ত্রীলোক বোধ হয় যেন যুবতী। আমি তাহাদের প্রতি চাহিবামাত্র উভয়ে দ্বারের নিকট অগ্রসর হইয়া যোড়হস্তে নতশিরে আমায় সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। যুবতীর মুখ দেখিয়া বোধ হইল যেন বড় ভয় পাইয়াছে, অথচ ওষ্ঠে ঈষৎ হাসি আছে। তাহার যুগ্ম ভ্রূ দেখিয়া আমার মনে হইল যেন অতি ঊর্দ্ধে নীল আকাশে কোনো বৃহৎ পক্ষী পক্ষ বিস্তার করিয়া ভাসিতেছে। আমি অনিমিষ লোচনে সুন্দরী দেখিতে লাগিলাম; কেন আসিয়াছে, কোথায় বাড়ী, এ কথা তখন মনে আসিল না। আমি কেবল তাহার রূপ দেখিতে লাগিলাম, তাহাকে দেখিয়াই প্রথমে একটি রূপবতী পক্ষিণী মনে পড়িল; গেঙ্গোখালি “মোহনায়” যেখানে ইংরেজেরা প্রথম উপনিবাস স্থাপন করেন, সেইখানে একদিন অপরাহ্ণে বন্দুক স্কন্ধে পক্ষী শিকার করিতে গিয়াছিলাম, তথায় কোন বৃক্ষের শুষ্ক ডালে একটি ক্ষুদ্র পক্ষী অতি বিষণ্নভাবে বসিয়াছিল, আমি তাহার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলাম, আমায় দেখিয়া পক্ষী উড়িল না, মাথা হেলাইয়া আমায় দেখিতে লাগিল। ভাবিলাম “জঙ্গলী পাখি হয়ত কখন মানুষ দেখে নাই, দেখিলে বিশ্বাসঘাতককে চিনিত।” চিনাইবার নিমিত্ত আমি হাসিয়া বন্দুক তুলিলাম; তবু পক্ষী উড়িল না, বুক পাতিয়া আমার মুখপ্রতি চাহিয়া রহিল। আমি অপ্রতিভ হইলাম, তখন ধীরে ধীরে বন্দুক নামাইয়া অনিমিষলোচনে পক্ষীকে দেখিতে লাগিলাম; তাহার কি আশ্চর্য্য রূপ! সেই পক্ষিণীতে যে রূপরাশি দেখিয়াছিলাম, এই যুবতীতে ঠিক্‌ তাহাই দেখিলাম। আমি কখন কবির চক্ষে রূপ দেখি নাই, চিরকাল বালকের মত রূপ দেখিয়া থাকি, এই জন্য আমি যাহা দেখি, তাহা অন্যকে বুঝাইতে পারি না। রূপ যে কি জিনিস, রূপের আকার কি, শরীরের কোন্ কোন্ স্থানে তাহার বাসা, এ সকল বার্ত্তা আমাদের বঙ্গকবিরা বিশেষ জানেন, এইজন্য তাঁহারা অঙ্গ বাছিয়া বাছিয়া বর্ণনা করিতে পারেন, দুর্ভাগ্যবশতঃ আমি তাহা পারি না। তাহার কারণ, আমি কখন অঙ্গ বাছিয়া রূপ তল্লাস করি নাই। আমি যে প্রকারে রূপ দেখি, নির্লজ্জ হইয়া তাহা বলিতে পারি। একবার আমি দুই বৎসরের একটি শিশু গৃহে রাখিয়া বিদেশে গিয়াছিলাম। শিশুকে সর্ব্বদাই মনে হইত, তাহার ন্যায় রূপ আর কাহারও দেখিতে পাইতাম না। অনেক দিনের পর একটি ছাগশিশুতে সেই রূপরাশি দেখিয়া আহ্লাদে তাহাকে বুকে করিয়াছিলাম। আমার সেই চক্ষু! আমি রূপরাশি কী বুঝিব? তথাপি যুবতীকে দেখিতে লাগিলাম।

    বাল্যকালে আমার মনে হইত যে, ভূত প্রেত যে প্রকার নিজে দেহহীন, অন্যের দেহে আবির্ভাবে বিকাশ পায়, রূপও সেইপ্রকার অন্যদেহ অবলম্বন করিয়া প্রকাশ পায়, কিন্তু প্রভেদ এই যে, ভূতের আশ্রয় কেবল মনুষ্য, বিশেষতঃ মানবী। কিন্তু বৃক্ষ, পল্লব, নদ ও নদী প্রভৃতি সকলেই রূপ আশ্রয় করে। যুবতীতে যে রূপ, লতায় সেই রূপ, নদীতেও সেই রূপ, পক্ষীতেও সেই রূপ, ছাগেও সেই রূপ; সুতরাং রূপ এক, তবে পাত্র-ভেদ। আমি পাত্র দেখিয়া ভুলি না; দেহ দেখিয়া ভুলি না; ভুলি কেবল রূপে। সে রূপ, লতায় থাক অথবা যুবতীতে থাক, আমার মনের চক্ষে তাহার কোন প্রভেদ দেখি না। অনেকের এই প্রকার রুচিবিকার আছে। যাঁহারা বলেন যুবতীর দেহ দেখিয়া ভুলিয়াছেন, তাঁহাদের মিথ্যা কথা।

    আমি যুবতীকে দেখিতেছি, এমত সময় আমার খানসামা বাবু বলিল, “এরা বাই, এরাই তখন খাঁ সাহেব বলিয়া ডাকিয়াছিল।” শুনিবামাত্র আবার রাগ পূর্ব্বমত গর্জ্জিয়া উঠিল, চীৎকার করিয়া আমি তাহাদের তাড়াইয়া দিলাম। সেই অবধি আর তাহাদের কথা কেহ আমায় বলে নাই। পর-দিবস অপরাহ্ণে দেখি, এক বটতলায় ছোট বড় কতকগুলা স্ত্রীলোক বসিয়া আছে, নিকটে দুই একটা “বেতো” ঘোড়া চরিতেছে জিজ্ঞাসা করায় জানিলাম, তাহারাও “বাই”; ব্যয় লাঘব করিবার নিমিত্ত তাহারা পালামৌ দিয়া যাইতেছে, এই সময় পূর্ব্বরাত্রের বাইকে আমার স্মরণ হইল, তাহার গীত শুনিব মনে করিয়া তাহাকে ডাকিতে পাঠাইলাম। কিন্তু লোক ফিরিয়া আসিয়া বলিল, অতি প্রত্যুষে সে চলিয়া গিয়াছে, আমি আর কোন কথা কহিলাম না দেখিয়া এক জন রাজপুত প্রতিবাসী বলিল, “সে কাঁদিয়া গিয়াছে।”

    আ। কেন?

    প্র। এই জঙ্গল দিয়া আসিতে তাহার সঙ্গীরা সকলে মরিয়াছে, মাত্র এক জন বৃদ্ধ সঙ্গে ছিল, “খরচা”ও ফুরাইয়াছে। দুই দিন উপবাস করিয়াছে, আরও কতদিন উপবাস করিতে হয় বলা যায় না। এ জঙ্গল পাহাড় মধ্যে কোথা ভিক্ষা পাইবে? আপনার নিকট ভিক্ষার নিমিত্ত আসিয়াছিল, আপনিও ভিক্ষা দেন নাই।

    এ কথা শুনিয়া আমার কষ্ট হইল, তাহার বিপদ্‌ কতক অনুভব করিতে পারিলাম, নিজে সেই অবস্থায় পড়িলে কী যন্ত্রণা পাইতাম, তাহা কল্পনা করিতে লাগিলাম। জঙ্গলে অন্নাভাব, আর অপার নদীতে নৌকাডুবি একই প্রকার। আমি তাহাকে অনায়াসে দুই পাঁচ টাকা দিতে পারিতাম, তাহাতে নিজের কোন ক্ষতি হইত না; অথচ সে রক্ষা পাইত। আমি তাহাকে উদ্ধার করিলাম না, তাড়াইয়া দিলাম; এ নিষ্ঠুরতার ফল এক দিন আমায় অবশ্য পাইতে হইবে, এরূপ কথা আমার সর্ব্বদা মনে হইত। দুই চারি দিনের পর একটি সাহেবের সহিত আমার দেখা হইল, তিনি দশ ক্রোশ দূরে একা থাকিতেন, গল্প করিবার নিমিত্ত মধ্যে মধ্যে আমার তাঁবুতে আসিতেন। গল্প করিতে করিতে আমি তাঁহাকে যুবতীর কথা বলিলাম। তিনি কিয়ৎক্ষণ রহস্য করিলেন, তাহার পর বলিলেন, আমি স্ত্রীলোকটির কথা শুনিয়াছি; সে এ জঙ্গল অতিক্রম করিতে পারে নাই, পথে মরিয়াছে। এ কথা সত্যই হউক বা মিথ্যাই হউক, আমার বড়ই কষ্ট হইল; আমি কেবল অহঙ্কারের চাতুরীতে পড়িয়া “খাঁ সাহেব” কথায় চটিয়াছিলাম। তখন জানিতাম না যে, এক দিন আপনার অহঙ্কারে আপনি হাসিব।

    সাহেবকে বিদায় দিয়া অপরাহ্ণে যুবতীর কথা ভাবিতে ভাবিতে পাহাড়ের দিকে যাইতেছিলাম, পথিমধ্যে কতকগুলি কোলকন্যার সহিত সাক্ষাৎ হইল, তাহারা “দাড়ি” হইতে জল তুলিতেছিল। এই অঞ্চলে জলাশয় একেবারে নাই, নদী শীতকালে একেবারে শুষ্কপ্রায় হইয়া যায়, সুতরাং গ্রাম্য লোকেরা এক এক স্থানে পাতকুয়ার আকারে ক্ষুদ্র খাদ খনন করে—তাহা দুই হাতের অধিক গভীর করিতে হয় না—সেই খাদে জল ক্রমে ক্রমে চুঁইয়া জমে। আট দশ কলস তুলিলে আর কিছু থাকে না, আবার জল ক্রমে আসিয়া জমে। এই ক্ষুদ্র খাদগুলিকে দাড়ি বলে।

    কোলকন্যারা আমাকে দেখিয়া দাঁড়াইল। তাহাদের মধ্যে একটি লম্বোদরী—সর্ব্বাপেক্ষ বয়োজ্যেষ্ঠা—মাথায় পূর্ণ কলস দুই হস্তে ধরিয়া হাস্যমুখে আমায় বলিল, রাত্রে নাচ দেখিতে আসিবেন? আমি মাথা হেলাইয়া স্বীকার করিলাম, অমনি সকলে হাসিয়া উঠিল। কোলের যুবতীরা যত হাসে, যত নাচে, বোধহয় পৃথিবীর আর কোন জাতির কন্যারা তত হাসিতে নাচিতে পারে না; আমাদের দুরন্ত ছেলেরা তাহার শতাংশ পারে না।

    সন্ধ্যার পর আমি নৃত্য দেখিতে গেলাম; গ্রামের প্রান্তভাগে এক বটবৃক্ষতলে গ্রামস্থ যুবারা সমুদয়ই আসিয়া একত্র হইয়াছে। তাহারা “খোপা” বাঁধিয়াছে, তাহাতে দুই তিনখানি কাঠের “চিরুণী” সাজাইয়াছে। কেহ মাদল আনিয়াছে, কেহ বা লম্বা লাঠি আনিয়াছে, রিক্তহস্তে কেহই আসে নাই, বয়সের দোষে সকলেরই দেহ চঞ্চল, সকলেই নানা ভঙ্গীতে আপন আপন বলবীর্য্য দেখাইতেছে। বৃদ্ধেরা বৃক্ষমূলে উচ্চ মৃন্ময় মঞ্চের উপর জড়বৎ বসিয়া আছে, তাহাদের জানু প্রায় স্কন্ধ ছাড়াইয়াছে, তাহারা বসিয়া নানাভঙ্গিতে কেবল ওষ্ঠক্রীড়া করিতেছে, আমি গিয়া তাহাদের পার্শ্বে বসিলাম।

    এই সময় দলে দলে গ্রামস্থ যুবতীরা আসিয়া জমিতে লাগিল; তাহারা আসিয়াই যুবাদিগের প্রতি উপহাস আরম্ভ করিল, সঙ্গে সঙ্গে বড় হাসির ঘটা পড়িয়া গেল। উপহাস আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না; কেবল অনুভবে স্থির করিলাম যে, যুবারা ঠকিয়া গেল। ঠকিবার কথা, যুবা দশ বারটি, কিন্তু যুবতীরা প্রায় চল্লিশ জন, সেই চল্লিশ জনে হাসিলে হাইলণ্ডের পল্টন ঠকে।

    হাস্য উপহাস্য শেষ হইলে, নৃত্যের উদ্যোগ আরম্ভ হইল। যুবতী সকলে হাত ধরাধরি করিয়া অর্দ্ধচন্দ্রাকৃতি রেখা বিন্যাস করিয়া দাঁড়াইল। দেখিতে বড় চমৎকার হইল। সকলগুলিই সম উচ্চ, সকলগুলিই পাথুরে কাল; সকলেরই অনাবৃত দেহ, সকলের সেই অনাবৃত বক্ষে আরশির ধুকধুকি চন্দ্রকিরণে এক একবার জ্বলিয়া উঠিতেছে। আবার সকলের মাথায় বনপুষ্প, কর্ণে বনপুষ্প, ওষ্ঠে হাসি। সকলেই আহ্লাদে পরিপূর্ণ, আহ্লাদে চঞ্চল, যেন তেজঃপুঞ্জ অশ্বের ন্যায় সকলেই দেহবেগ সংযম করিতেছে।

    সম্মুখে যুবারা দাঁড়াইয়া, যুবাদের পশ্চাতে মৃন্ময়মঞ্চোপরি বৃদ্ধেরা এবং তৎসঙ্গে এই নরাধম। বৃদ্ধেরা ইঙ্গিত করিলে যুবাদের দলে মাদল বাজিল, অমনি যুবতীদের দেহ যেন শিহরিয়া উঠিল; যদি দেহের কোলাহল থাকে, তবে যুবতীদের দেহে সেই কোলাহল পড়িয়া গেল, পরেই তাহারা নৃত্য আরম্ভ করিল। তাহাদের নৃত্য আমাদের চক্ষে নূতন; তাহারা তালে তালে পা ফেলিতেছে, অথচ কেহ চলে না; দোলে না, টলে না। যে যেখানে দাঁড়াইয়াছিল, সে সেইখানেই দাঁড়াইয়া তালে তালে পা ফেলিতে লাগিল, তাহাদের মাথার ফুলগুলি নাচিতে লাগিল, বুকের ধুক্‌ধুকি দুলিতে লাগিল।

    নৃত্য আরম্ভ হইলে পর একজন বৃদ্ধ মঞ্চ হইতে কম্পিতকণ্ঠে একটি গীতের “মহড়া” আরম্ভ করিল, অমনি যুবারা সেই গীত উচ্চেঃস্বরে গাইয়া উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে যুবতীরা তীব্র তানে “ধুয়া” ধরিল। যুবতীদের সুরের ঢেউ নিকটের পাহাড়ে গিয়া লাগিতে লাগিল। আমার তখন স্পষ্ট বোধ হইতে লাগিল, যেন সুর কখন পাহাড়ের মূল পর্য্যন্ত, কখন বা পাহাড়ের বক্ষ পর্য্যন্ত গিয়া ঠেকিতেছে; তাল পাহাড়ে ঠেকা অনেকের নিকট রহস্যের কথা, কিন্তু আমার নিকট তাহা নহে, আমার লেখা পড়িতে গেলে এরূপ প্রলাপবাক্য মধ্যে মধ্যে সহ্য করিতে হইবে।

    যুবতীরা তালে তালে নাচিতেছে, তাহাদের মাথার বনফুল সেই সঙ্গে উঠিতেছে নামিতেছে, আবার সেই ফুলের দুটি একটি ঝরিয়া তাহাদের স্কন্ধে পড়িতেছে। শীতকাল, নিকটে, দুই তিন স্থানে হু হু করিয়া অগ্নি জ্বলিতেছে, অগ্নির আলোকে নর্ত্তকীদের বর্ণ আরও কাল দেখাইতেছে; তাহারা তালে তালে নাচিতেছে, নাচিতে নাচিতে ফুলের পাপড়ির ন্যায় সকলে একবার “চিতিয়া” পড়িতেছে; আকাশ হইতে চন্দ্র তাহা দেখিয়া হাসিতেছে, আর বটমূলের অন্ধকারে বসিয়া আমি হাসিতেছি।

    নৃত্যের শেষ পর্য্যন্ত থাকিতে পারিলাম না; বড় শীত; অধিক ক্ষণ থাকা গেল না।

  • তৃতীয় প্রবন্ধ

    তৃতীয় প্রবন্ধ

    পূর্ব্বে একবার “লাতেহার” নামক পাহাড়ের উল্লেখ করিয়াছিলাম। সেই পাহাড়ের কথা আবার লিখিতে বসিয়াছি বলিয়া আমার আহ্লাদ হইতেছে। পুরাতন কথা বলিতে বড় সুখ, আবার বিশেষ সুখ এই যে, আমি শ্রোতা পাইয়াছি। তিন চারিটি নিরীহ ভদ্রলোক, বোধ হয় তাঁহাদের বয়স হইয়া আসিতেছে, পুরাতন কথা বলিতে শীঘ্র আরম্ভ করিবেন এমন উমেদ রাখেন, বঙ্গদর্শনে আমার লিখিত পালামৌ-পর্য্যটন পড়িয়াছেন; আবার ভাল বলিয়াছেন। প্রশংসা অতিরিক্ত; তুমি প্রশংসা কর আর না কর, বৃদ্ধ বসিয়া তোমায় পুরাতন কথা শুনাবে; তুমি শুন বা না শুন সে তোমায় শুনাবে, পুরাতন কথা এইরূপে থেকে যায়, সমাজের পুঁজি বাড়ে। আমার গল্পে কাহার পুঁজি বাড়িবে না, কেন না আমার নিজের পুঁজি নাই। তথাপি গল্প করি, তোমরা শুনিয়া আমায় চিরবাধিত কর।

    নিত্য অপরাহ্ণে আমি লাতেহার পাহাড়ের ক্রোড়ে গিয়া বসিতাম, তাঁবুতে শত কার্য্য থাকিলেও আমি তাহা ফেলিয়া যাইতাম; চারিটা বাজিলে আমি অস্থির হইতাম; কেন তাহা কখনও ভাবিতাম না; পাহাড়ে কিছুই নূতন নাই, কাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবে না, কোন গল্প হইবে না, তথাপি কেন আমায় সেখানে যাইতে হইত জানি না। এখন দেখি এ বেগ আমার একার নহে। যে সময়ে উঠানে ছায়া পড়ে, নিত্য সে সময় কুলবধূর মন মাতিয়া উঠে, জল আনিতে যাইবে; জল আছে বলিলেও তাহারা জল ফেলিয়া জল আনিতে যাইবে; জলে যে যাইতে পাইল না, সে অভাগিনী। সে গৃহে বসিয়া দেখে উঠানে ছায়া পড়িতেছে, আকাশে ছায়া পড়িতেছে, পৃথিবীর রং ফিরিতেছে, বাহির হইয়া সে তাহা দেখিতে পাইল না, তাহার কত দুঃখ। বোধ হয়, আমিও পৃথিবীর রং ফেরা দেখিতে যাইতাম। কিন্তু আর একটু আছে, সেই নির্জ্জন স্থানে মনকে একা পাইতাম, বালকের ন্যায় মনের সহিত ক্রীড়া করিতাম।

    এই পাহাড়ের ক্রোড় অতি নির্জ্জন, কোথাও ছোট জঙ্গল নাই, সর্ব্বত্র ঘাস। অতি পরিষ্কার, তাহাও বাতাস আসিয়া নিত্য ঝাড়িয়া দেয়। মৌয়া গাছ তথায় বিস্তর। কতকগুলি একত্রে গলাগলি করে বাস করে, আর কতকগুলি বিধবার ন্যায় এখানে সেখানে একাকী থাকে। তাহারই মধ্যে একটিকে আমি বড় ভাল বাসিতাম, তাহার নাম “কুমারী” রাখিয়াছিলাম। কখন তাহার ফল কি ফুল হয় নাই; কিন্তু তাহার ছায়া বড় শীতল ছিল। আমি সেই ছায়ায় বসিয়া “দুনিয়া” দেখিতাম। এই উচ্চ স্থানে বসিলে পাঁচ সাত ক্রোশ পর্য্যন্ত দেখা যাইত। দূরে চারি দিকে পাহাড়ের পরিখা, যেন সেইখানে পৃথিবীর শেষ হইয়া গিয়াছে। সেই পরিখার নিম্নে গাঢ় ছায়া, অল্প অন্ধকার বলিলেও বলা যায়। তাহার পর জঙ্গল। জঙ্গল নামিয়া ক্রমে স্পষ্ট হইয়াছে। জঙ্গলের মধ্যে দুই একটি গ্রাম হইতে ধীরে ধীরে ধূম উঠিতেছে, কোন গ্রাম হইতে হয়ত বিষণ্ণ ভাবে মাদল বাজিতেছে, তাহার পরে আমার তাঁবু, যেন একটি শ্বেত কপোতী জঙ্গলের মধ্যে একাকী বসিয়া কী ভাবিতেছে। আমি অন্যমনস্কে এই সকল দেখিতাম; আর ভাবিতাম এই আমার “দুনিয়া।”

    একদিন এই স্থানে সুখে বসিয়া চারি দিক্‌ দেখিতেছি, হঠাৎ একটি লতার প্রতি দৃষ্টি পড়িল; তাহার একটি ডালে অনেক দিনের পর চারি পাঁচটি ফুল ফুটিয়াছিল। লতা আহ্লাদে তাহা গোপন করিতে পারে নাই, যেন কাহারে দেখাইবার জন্য ডালটি বাড়াইয়া দিয়াছিল; একটি কালোকালো বড় গোচের ভ্রমর তাহার চারি দিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল; আর এক একবার সেই লতায় বসিতেছিল। লতা তাহাকে নারাজ, ভ্রমর বসিলেই অস্থির হইয়া মাথা নাড়িয়া উঠে। লতাকে এইরূপ সচেতনের ন্যায় রঙ্গ করিতে দেখিয়া আমি হাসিতেছিলাম, এমত সময়ে আমার পশ্চাতে উচ্চারিত হইল:

    “রাধে মন্যুং পরিহর হরিঃ পাদমূলে তবায়ং।”

    আমি পশ্চাৎ ফিরিলাম, দেখিলাম কেহই নাই, চারি দিক্‌ চাহিলাম, কোথায়ও কেহ নাই। আমি আশ্চর্য্য হইয়া ভাবিতেছি, এমত সময়ে আবার আর এক দিকে শব্দিত হইল,

    “রাধে মন্যুং” ইত্যাদি।

    আমার শরীর রোমাঞ্চ হইল, আমি সেই দিকে কতক সভয়ে, কতক কৌতূহলপরবশে গেলাম। সে দিকে গিয়া আর কিছুই শুনিতে পাইলাম না। কিয়ৎ পরেই “কুমারীর” ডাল হইতে সেই শ্লোক আবার উচ্চারিত হইল, কিন্তু তখন শ্লোকের স্পষ্টতা আর পূর্ব্বমত বোধ হইল না, কেবল সুর আর ছন্দ শুনা গেল। “কুমারীর” মূলে আসিয়া দেখি, হরিয়াল ঘুঘুর ন্যায় একটি পক্ষী আর একটির নিকট মাথা নাড়িয়া এই ছন্দে আস্ফালন করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছে, পক্ষিণী তাহাকে ডানা মারিয়া সরিয়া যাইতেছে, কখন কখন অন্য ডালে গিয়া বসিতেছে। এবার আমার ভ্রান্তি দূর হইল, আমি মন্দাক্রান্তাচ্ছন্দের একটিমাত্র শ্লোক জানিতাম; ছন্দটি উচ্চারণ মাত্রেই শ্লোকটি আমার মনে আসিয়াছিল, সঙ্গে সঙ্গে কর্ণেও তাহার কার্য্য হইয়াছিল; আমি তাহাই শুনিয়াছিলাম “রাধে মন্যুং।” কিন্তু পক্ষী বর্ণ উচ্চারণ করে নাই, কেবল ছন্দ উচ্চারণ করিয়াছিল। তাহা যাহাই হউক, আমি অবাক্‌ হইয়া পক্ষীর মুখে সংস্কৃত ছন্দ শুনিতে লাগিলাম। প্রথমে মনে হইল, যিনি ‘উদ্ধবদূত’ লিখিয়াছেন, তিনি হয়ত এই জাতি পক্ষীর নিকট ছন্দদ পাইয়াছিলেন। শ্লোকটির সঙ্গে এই “কুঞ্জকীরানুবাদের” বড় সুসঙ্গতি হইয়াছে। শ্লোকটি এই—

    রাধে মন্যুং পরিহর হরিঃ পাদমূলে তবায়ং।
    জাতং দৈবাদসমৃশমিদং বারমেকং ক্ষমস্ব॥
    এতানাকর্ণয়সি নয়বন্ কুঞ্জকীরানুবাদান।
    এভিঃ ক্রুরৈর্বয়মবিরতং বঞ্চিতাঃ বঞ্চিতাঃ স্মঃ॥

    উদ্ধব মথুরা হইতে বৃন্দাবনে আসিয়া রাধার কুঞ্জে উপস্থিত হইলে গোপীগণ আপনাদের দুঃখের কথা তাঁহার নিকট বলিতেছেন, এমত সময়ে কুঞ্জের একটা পক্ষী বৃক্ষশাখা হইতে বলিয়া উঠিল, “রাধে আর রাগ করিও না। চেয়ে দেখ, স্বয়ং হরি তোমার পদতলে। দৈবাৎ যাহা হইয়া গিয়াছে, একবার তাহা ক্ষমা কর।” গোপীরা এত বার এই কথা রাধিকাকে বলিয়াছে যে, কুঞ্জ-পক্ষীরা তাহা শিখিয়াছিল। যাহা শিখিয়াছিল, অর্থ না বুঝিয়া পক্ষীরা তাহা সর্ব্বদাই বলিত। গোপীরা উদ্ধবকে বলিলেন, “শুন্‌লে—কুঞ্জের ঐ পাখী কী বলিল—শুন্‌লে? একে বিধাতা আমাদের বঞ্চনা করেছেন, আবার দেখ, পোড়া পক্ষীও কত দগ্ধাচ্ছে।”

    পক্ষী আবার বলিল, “রাধে মন্যুং পরিহর হরিঃ পাদমূলে তবায়ং”। তাহাই বলিতেছিলাম বিহঙ্গচ্ছন্দে বিহঙ্গের উক্তি বড় সুন্দর হইয়াছিল।

    ছন্দ কি গীত শিখাইলে অনেক পক্ষী তাহা শিখিতে পারে; কিন্তু ছন্দ যে কোন পক্ষীর স্বরে স্বাভাবিক আছে, তাহা আমি জানিতাম না। সুতরাং বন্য পক্ষীর মুখে ছন্দ শুনিয়া বড় চমৎকৃত হইয়াছিলাম। পক্ষীটির সঙ্গে কতই বেড়াইলাম, কত বার এই ছন্দ শনিলাম, শেষ সন্ধ্যা হইলে তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম। পথে আসিতে আসিতে মনে হইল, যদি এখানে কেহ ডারউইন সাহেবের ছাত্র থাকিতেন, তিনি ভাবিতেন নিশ্চয়ই এ পক্ষীটি রাধাকুঞ্জের শিক্ষিত পক্ষীর বংশ, বৈজিক কারণে পূর্ব্বপুরুষের অভ্যস্ত শ্লোক ইহার কণ্ঠে আপনি আসিয়াছে। বৈষ্ণবদের উচিত, এ বংশকে আপন আপন কুঞ্জে স্থান দেন। রাধাকুঞ্জের সকল গিয়াছে, সকল ফুরাইয়াছে, কেবল এই বংশ আছে। আমার ইচ্ছা আছে, একটি হরিয়াল পালন করি, দেখি সে “রাধে মন্যুং পরিহর” বলে কি না বলে।

    আর এক দিনের কথা বলি; তাহা হইলেই লাতেহার পাহাড়ের কথা আমার শেষ হয়। যেরূপ নিত্য অপরাহ্ণে এই পাহাড়ে যাইতাম, সেইরূপ আর এক দিন যাইতেছিলাম, পথে দেখি একটি যুবা বীরদর্পে পাহাড়ের দিকে যাইতেছে, পশ্চাতে কতকগুলি স্ত্রীলোক তাহাকে সাধিতে সাধিতে সঙ্গে যাইতেছে। আমি ভাবিলাম, যখন স্ত্রীলোক সাধিতেছে, তখন যুবার রাগ নিশ্চয় ভাতের উপর হইয়াছে; আমি বাঙ্গালী, সুতরাং এ ভিন্ন আর কি অনুভব করিব? এক কালে এরূপ রাগ নিজেও কত বার করিয়াছি, তাহাই অন্যের বীরদর্প বুঝিতে পারি।

    যখন আমি নিকটবর্ত্তী হইলাম, তখন স্ত্রীলোকেরা নিরস্ত হইয়া এক পার্শ্বে দাঁড়াইল। বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করায় যুবা সদর্পে বলিল, “আমি বাঘ মারিতে যাইতেছি, এইমাত্র আমার গোরুকে বাঘে মারিয়াছে। আমি ব্রাহ্মণ-সন্তান; সে বাঘ না মারিয়া কোন্ মুখে আর জল গ্রহণ করিব?” আমি কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হইয়া বলিলাম “চল, আমি তোমার সঙ্গে যাইতেছি।” আমার অদৃষ্টদোষে বগলে বন্দুক, পায়ে বুট, পরিধানে কোট পেণ্টুলন, বাস তাঁবুতে; সুতরাং এ কথা না বলিলে ভাল দেখায় না, বিশেষতঃ অনেকে আমায় সাহেব বলিয়া জানে, অতএব সাহেবি ধরণে চলিলাম, কিন্তু নিঃসঙ্কোচচিত্তে। আমি স্বভাবতঃ বড় ভীত, তাহা বলিয়া ব্যাঘ্র ভুল্লুক সম্বন্ধে আমার কখন ভয় হয় নাই। বৃদ্ধ শিকারীরা কত দিন পাহাড়ে একাকী যাইতে আমায় নিষেধ করিয়াছে, কিন্তু আমি তাহা কখনও গ্রাহ্য করি নাই, নিত্য একাকী যাইতাম; বাঘ আসিবে, আমায় ধরিবে, আমায় খাইবে, এ সকল কথা কখনও আমার মনে আসিত না। কেন আসিত না, তাহা আমি এখনও বুঝিতে পারি না। সৈনিক পুরুষদের মধ্যে অনেকে আপনার ছায়া দেখিয়া ভয় পায়, অথচ অম্লান বদনে রণ-ক্ষেত্রে গিয়া রণ করে। গুলি কি তরবার তাহার অঙ্গে প্রবিষ্ট হইবে, এ-কথা তাহাদের মনে আইসে না। যত দিন তাহাদের মনে এ কথা না আইসে, তত দিন লোকের নিকট তাহারা সাহসী; যে বিপদ্‌ না বুঝে, সেই সাহসিক। আদিম অবস্থায় সকল পুরুষই সাহসী ছিল, তাহাদের তখন ফলাফলজ্ঞান হয় নাই। জঙ্গলীদের মধ্যে অদ্যাপি দেখা যায়, সকলেই সাহসী, ইউরোপীয় সভ্যদের অপেক্ষাও অনেক অংশে সাহসী; হেতু ফলাফলবোধ নাই। আমি তাহাই আমার সাহসের বিশেষ গৌরব করি না। সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে সাহসের ভাগ কমিয়া আইসে; পেনাল কোড যত ভালো হয় সাহস তত অন্তর্হিত হয়। এখন এ সকল কচকচি যাক।

    যুবার সঙ্গে কতক দূর গেলে সে আমায় বলিল, “বাঘটি আমি স্বহস্তে মারিব।” আমি হাসিয়া সম্মত হইলাম। যুবা আর কোন কথা না বলিয়া চলিল। তখন হইতে নিজের প্রতি আমার কিঞ্চিৎ ভাল বাসার সঞ্চার হইল। “হস্তে মারিব” এই কথায় বুঝাইয়াছিল, যে পরহস্তে বাঘ মারা সম্ভব; আমি সাহেববেশধারী, অবশ্য বাঘ মারিলে মারিতে পারি, যুবা এ কথা নিশ্চয় ভাবিয়াছিল, তাহাতেই কৃতার্থ হইয়াছিলাম। তাহার পর কতক দূর গিয়া উভয়ে পাহাড়ে উঠিতে লাগিলাম। যুবা অগ্রে, আমি পশ্চাতে। যুবার স্কন্ধে টাঙ্গী, সে একবার তাহা স্কন্ধ হইতে নামাইয়া তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করিয়া দেখিল, তাহার পর কতক দূর গিয়া মৃদুস্বরে আমাকে বলিল, আপনি জুতা খুলুন, শব্দ হইতেছে। আমি জুতা খুলিয়া খালি পায় চলিতে লাগিলাম, আবার কতক দূর গিয়া বলিল, “আপনি এইখানে দাঁড়ান, আমি একবার অনুসন্ধান করিয়া আসি।” আমি দাঁড়াইয়া থাকিলাম, যুবা চলিয়া গেল। প্রায় দণ্ডেক পরে যুবা আসিয়া অতি প্রফুল্লবদনে বলিল, “হইয়াছে, সন্ধান পাইয়াছি, শীঘ্র আসুন, বাঘ নিদ্রা যাইতেছে।” আমি সঙ্গে গিয়া দেখি, পাহাড়ের একস্থানে প্রকাণ্ড দীর্ঘিকার ন্যায় একটি গর্ত্ত বা গুহা আছে, তাহার মধ্যস্থানে প্রস্তরনির্ম্মিত একটি কুটীর, চতুঃপার্শ্বস্থ স্থান তাহার প্রাঙ্গণস্বরূপ। যুবা সেই গর্ত্তের নিকটে এক স্থানে দাঁড়াইয়া অতি সাবধানে ব্যাঘ্র দেখাইল। প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে ব্যাঘ্র নিরীহ ভাল মানুষের ন্যায় চোখ বুজিয়া আছে, মুখের নিকট সুন্দর নখরসংযুক্ত একটি থাবা দর্পণের ন্যায় ধরিয়া নিদ্রা যাইতেছে। বোধ হয় নিদ্রার পূর্ব্বে থাবাটি একবার চাটিয়াছিল। যে দিকে ব্যাঘ্র নিদ্রিত ছিল, যুবা সেই দিকে চলিল। আমায় বলিল, “মাথা নত করিয়া আসুন, নতুবা প্রাঙ্গণে ছায়া পড়িবে।” তদনুসারে আমি নতশিরে চলিলাম; শেষ প্রাঙ্গণে একখানি বৃহৎ প্রস্তরে হাত দিয়া বলিল, “আসুন, এইখানি ঠেলিয়া তুলি।” উভয়ে প্রস্তরখানিকে স্থানচ্যুত করিলাম। তাহার পর যুবা একা তাহা ঠেলিয়া গর্ত্তের প্রান্তে নিঃশব্দে লইয়া গেল, একবার ব্যাঘ্রের প্রতি চাহিল, তাহার পর প্রস্তর ঘোর রবে প্রাঙ্গণে পড়িল। শব্দে কি আঘাতে তাহা ঠিক জানি না, ব্যাঘ্র উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল; তাহার পর পড়িয়া গেল। এ নিদ্রা আর ভাঙিল না। পর-দিবস বাহকস্কন্ধে ব্যাঘ্রটি আমার তাঁবু পর্য্যন্ত আসিয়াছিলেন; কিন্তু তখন তিনি মহানিদ্রাচ্ছন্ন বলিয়া বিশেষ কোন প্রকার আলাপ হইল না।

  • দ্বিতীয় প্রবন্ধ

    দ্বিতীয় প্রবন্ধ

    সেকালের হরকরা নামক ইংরেজী পত্রিকায় দেখিতাম, কোন একজন মিলিটারি সাহেব “পেরেড” বৃত্তান্ত, “ব্যাণ্ডের” বাদ্যচর্চ্চা প্রভৃতি নানা কথা পালামৌ হইতে লিখিতেন। আমি তখন ভাবিতাম, পালামৌ প্রবল সহর, সাহেবসমাকীর্ণ সুখের স্থান। তখন জানিতাম না যে, পালামৌ শহর নহে, একটি প্রকাণ্ড পরগণামাত্র। শহর সে অঞ্চলেই নাই, নগর দূরে থাকুক, তথায় একখানি গণ্ডগ্রামও নাই, কেবল পাহাড় ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ।

    পাহাড় আর জঙ্গল বলিলে কে কী অনুভব করেন বলিতে পারি না। যাঁহারা “কৃষ্ণচন্দ্র কর্ম্মকার কৃত” পাহাড় দেখিয়াছেন, আর যাঁহাদের গৃহপার্শ্বে শৃগালশ্রান্তিসংবাহক ভাটভেরাণ্ডার জঙ্গল আছে, তাঁহারা যে এ কথা সমগ্র অনুভব করিয়া লইবেন, ইহার আর সন্দেহ নাই। কিন্তু অন্য পাঠকের জন্য সেই পাহাড় জঙ্গলের কথা কিঞ্চিৎ উত্থাপন করা আবশ্যক হইয়াছে। সকলের অনুভবশক্তি তো সমান নহে।

    রাঁচি হইতে পালামৌ যাইতে যাইতে যখন যখন বাহকগণের নির্দ্দেশমত দূর হইতে পালামৌ দেখিতে পাইলাম, তখন আমার বোধ হইল যেন মর্ত্ত্যে মেঘ করিয়াছে। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া সেই মনোহর দৃশ্য দেখিতে লাগিলাম। ঐ অন্ধকার মেঘমধ্যে এখনই যাইব, এই মনে করিয়া আমার কতই আহ্লাদ হইতে লাগিল। কতক্ষণে পৌঁছিব মনে করিয়া আবার কতই ব্যস্ত হইলাম।

    পরে চারি পাঁচ ক্রোশ অগ্রসর হইয়া আবার পালামৌ দেখিবার নিমিত্ত পাল্কী হইতে অবতরণ করিলাম। তখন আর মেঘভ্রম হইল না, পাহাড়গুলি স্পষ্ট চেনা যাইতে লাগিল; কিন্তু জঙ্গল ভাল চেনা গেল না। তাহার পরে আরও দুই এক ক্রোশ অগ্রসর হইলে, তাম্রাভ অরণ্য চারি দিকে দেখা যাইতে লাগিল; কি পাহাড়, কি তলস্থ স্থান সমুদয় যেন মেঘদেহের ন্যায় কুঞ্চিত লোমরাজিদ্বারা সর্ব্বত্র সমাচ্ছাদিত বোধ হইতে লাগিল। শেষ আরও কতদূর গেলে বন স্পষ্ট দেখা গেল। পাহাড়ের গায়ে, নিম্নে সর্ব্বত্র জঙ্গল, কোথাও আর ছেদ নাই। কোথাও কর্ষিত ক্ষেত্র নাই, গ্রাম নাই, নদী নাই, পথ নাই, কেবল বন—ঘন নিবিড় বন।

    পরে পালামৌ প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, নদী, গ্রাম, সকলই আছে, দূর হইতে তাহা কিছুই দেখা যায় নাই। পালামৌ পরগণায় পাহাড় অসংখ্য, পাহাড়ের পর পাহাড়, তাহার পর পাহাড়, আবার পাহাড়; যেন বিচলিত নদীর সংখ্যাতীত তরঙ্গ। আবার বোধহয় যেন অবনীর অন্তরাগ্নি একদিনেই সেই তরঙ্গ তুলিয়াছিল। এখন আমার ঠিক স্মরণ হয় না, কিন্তু বোধ হয় যেন দেখিয়াছিলাম, সকল তরঙ্গগুলি পূর্ব্ব দিক হইতে উঠিয়াছিল, কোন কোনটি পূর্ব্ব দিক্‌ হইতে উঠিয়া পশ্চিম দিকে নামে নাই। এইরূপ অর্দ্ধপাহাড় লাতেহারগ্রামপার্শ্বে একটি আছে, আমি প্রায় নিত্য তথায় গিয়া বসিয়া থাকিতাম। এই পাহাড়ের পশ্চিমভাগে মৃত্তিকা নাই, সুতরাং তাহার অন্তরস্থ সকল স্তর দেখা যায়; এক স্তরে নুড়ি, আর এক স্তরে কাল পাথর, ইত্যাদি। কিন্তু কোন স্তরই সমসূত্র নহে, প্রত্যেকটি কোথাও উঠিয়াছে, কোথাও নামিয়াছে। আমি তাহা পূর্ব্বে লক্ষ্য করি নাই, লক্ষ্য করিবার কারণ পরে ঘটিয়াছিল। এক দিন অপরাহ্ণে এই পাহাড়ের মূলে দাঁড়াইয়া আছি, এমত সময় আমার একটা নেমকহারাম ফরাসিস কুক্কুর (poodle) আপন ইচ্ছামতো তাঁবুতে চলিয়া গেল, আমি রাগত হইয়া চীৎকার করিয়া তাহাকে ডাকিলাম। আমার পশ্চাতে সেই চীৎকার অত্যাশ্চর্য্যরূপে প্রতিধ্বনিত হইল। পশ্চাৎ ফিরিয়া পাহাড়ের প্রতি চাহিয়া আবার চীৎকার করিলাম, প্রতিধ্বনি আবার পূর্ব্বমত হ্রস্ব দীর্ঘ হইতে হইতে পাহাড়ের অপর প্রান্তে চলিয়া গেল। আবার চীৎকার করিলাম, শব্দ পূর্ব্ববৎ পাহাড়ের গায়ে লাগিয়া উচ্চ নীচ হইতে লাগিল। এইবার বুঝিলাম, শব্দ কোন একটি বিশেষ স্তর অবলম্বন করিয়া যায়; সেই স্তর যেখানে উঠিয়াছে বা নামিয়াছে, শব্দও সেইখানে উঠিতে নামিতে থাকে। কিন্তু শব্দ দীর্ঘকাল কেন স্থায়ী হয়, যত দূর পর্য্যন্ত সেই স্তরটি আছে, ততদূর পর্য্যন্ত কেন যায়, তাহা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না; ঠিক যেন সেই স্তরটি শব্দ কন্‌ডক্‌টার (conductor); যে পর্য্যন্ত ননকন্‌ডক্টরের সঙ্গে সংস্পর্শ না হয়, সে পর্য্যন্ত শব্দ ছুটিতে থাকে।

    আর একটি পাহাড় দেখিয়া চমৎকৃত হইয়াছিলাম। সেটি একশিলা, সমুদয়ে একখানি প্রস্তর। তাহাতে একেবারে কোথাও কণামাত্র মৃত্তিকা নাই, সমুদয় পরিষ্কার ঝর্‌ঝর্‌ করিতেছে। তাহার এক স্থান অনেক দূর পর্য্যন্ত ফাটিয়া গিয়াছে, সেই ফাটার উপর বৃহৎ এক অশ্বত্থগাছ জন্মিয়াছে। তখন মনে হইয়াছিল, অশ্বত্থবৃক্ষ বড় রসিক, এই নীরস পাষাণ হইতেও রস গ্রহণ করিতেছে। কিছু কাল পরে আর একদিন এই অশ্বত্থগাছ আমার মনে পড়িয়াছিল, তখন ভাবিয়াছিলাম বৃক্ষটি বড় শোষক, ইহার নিকট নীরস পাষাণেরও নিস্তার নাই। এখন বোধহয় অশ্বত্থগাছটি আপন অবস্থানুরূপ কার্য্য করিতেছে; সকল বৃক্ষই যে বাঙ্গালার রসপূর্ণ কোমল ভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়া বিনা কষ্টে কাল যাপন করিবে, এমত সম্ভব নহে। যাহার ভাগ্যে কঠিন পাষাণ, পাষাণই তাহার অবলম্বন। এখন আমি অশ্বত্থটির প্রশংসা করি।

    এক্ষণে সে সকল কথা যাউক, প্রথম দিনের কথা দুই একটি বলি। অপরাহ্ণে পালামৌয়ে প্রবেশ করিয়া উভয়পার্শ্বস্থ পর্ব্বতশ্রেণী দেখিতে দেখিতে বনমধ্য দিয়া যাইতে লাগিলাম। বাঁধা পথ নাই, কেবল এক সংকীর্ণ গো-পথ দিয়া আমার পাল্কী চলিতে লাগিল, অনেক স্থলে উভয়প্বার্শস্থ লতা পল্লব পাল্কী স্পর্শ করিতে লাগিল। বনবর্ণনায় যেরূপ “শাল তাল তমাল, হিন্তাল” শুনিয়াছিলাম, সেরূপ কিছুই দেখিতে পাইলাম না। তাল, হিন্তাল একেবারেই নাই; কেবল শালবন, অন্য বন্য গাছও আছে। শালের মধ্যে প্রকাণ্ড গাছ একটিও নাই, সকলগুলিই আমাদের দেশীয় কদম্ববৃক্ষের মতো, না হয় কিছু বড়; কিন্তু তাহা হইলেও জঙ্গল অতি দুর্গম, কোথাও তাহার ছেদ নাই, এই জন্য ভয়ানক। মধ্যে মধ্যে যে ছেদ আছে, তাহা অতি সামান্য। এইরূপ বন দিয়া যাইতে যাইতে এক স্থানে হঠাৎ কাষ্ঠঘণ্টার বিষণ্ণকর শব্দ কর্ণগোচর হইল, কাষ্ঠঘণ্টা পূর্ব্বে মেদিনীপুর অঞ্চলে দেখিয়াছিলাম। গৃহপালিত পশু বনে পথ হারাইলে, শব্দানুসরণ করিয়া তাহাদের অনুসন্ধান করিতে হয়; এইজন্য গলঘণ্টার উৎপত্তি। কাষ্ঠঘণ্টার শব্দ শুনিলে প্রাণের ভিতর কেমন করে। পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে সে শব্দে আরও যেন অবসন্ন করে; কিন্তু সকলকে করে কি না তাহা বলিতে পারি না।

    পরে দেখিলাম, একটি মহিষ সভয়ে মুখ তুলিয়া আমার পাল্কীর প্রতি একদৃষ্টিতে চাহিয়া আছে, তাহার গলায় কাষ্ঠঘণ্টা ঝুলিতেছে। আমি ভাবিলাম, পালিত মহিষ যখন নিকটে, তখন গ্রাম আর দূরে নহে। অল্প বিলম্বেই অর্ধশুষ্ক তৃণাবৃত একটি ক্ষুদ্র প্রান্তর দেখা গেল, এখানে সেখানে দুই একটি মধু বা মৌয়াবৃক্ষ ভিন্ন সে প্রান্তরে গুল্ম কি লতা কিছুই নাই, সর্ব্বত্র অতি পরিষ্কার। পর্ব্বতছায়ায় সে প্রান্তর আরও রম্য হইয়াছে; তথায় কতকগুলি কোলবালক একত্র মহিষ চরাইতেছিল, সেরূপ কৃষ্ণবর্ণ কান্তি আর কখন দেখি নাই; সকলের গলায় পুতির সাতনরী, ধুক্‌ধুকীর পরিবর্ত্তে এক একখানি গোল আরসী; পরিধানে ধড়া, কর্ণে বনফুল; কেহ মহিষপৃষ্ঠে শয়ন করিয়া আছে, কেহ বা মহিষপৃষ্ঠে বসিয়া আছে, কেহ কেহ নৃত্য করিতেছে। সকলগুলিই যেন কৃষ্ণঠাকুর বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। যেরূপ স্থান, তাহাতে এই পাথুরে ছেলেগুলি উপযোগী বলিয়া বিশেষ সুন্দর দেখাইতেছিল; চারিদিকে কাল পাথর, পশুও পাথুরে; তাহাদের রাখালও সেইরূপ। এই স্থলে বলা আবশ্যক এ অঞ্চলে মহিষ ভিন্ন গোরু নাই। আর বালকগুলি কোলের সন্তান।

    এই অঞ্চলে প্রধানতঃ কোলের বাস। কোলেরা বন্য জাতি, খর্ব্বাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ; দেখিতে কুৎসিত কি রূপবান্‌, তাহা আমি মীমাংসা করিতে পারি না! যে সকল কোল কলিকাতা আইসে বা চা-বাগানে যায়, তাহাদের মধ্যে আমি কাহাকেও রূপবান্‌ দেখি নাই; বরং অতি কুৎসিত বলিয়া বোধ করিয়াছি। কিন্তু স্বদেশে কোল মাত্রেই রূপবান্‌, অন্তত আমার চক্ষে। বন্যেরা বনে সুন্দর; শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

    প্রান্তরের পর এক ক্ষুদ্র গ্রাম, তাহার নাম স্মরণ নাই; তথায় ত্রিশ বত্রিশটি গৃহস্থ বাস করে। সকলেরই পর্ণকুটির। আমার পাল্কী দেখিতে যাবতীয় স্ত্রীলোক ছুটিয়া আসিল। সকলেই আবলুসের মতো কাল, সকলেই যুবতী, সকলেরই কটিদেশে একখানি করিয়া ক্ষুদ্র কাপড় জড়ান; সকলেরই কক্ষ, বক্ষ আবরণশূন্য। সেই নিরাবৃত বক্ষে পুতির সাতনরী, তাহাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরসী ঝুলিতেছে, কর্ণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বনফুল, মাথায় বড় বড় বনফুল। যুবতীরা পরস্পর কাঁধ ধরাধরি করিয়া দেখিতে লাগিল, কিন্তু দেখিল কেবল পাল্কী আর বেহারা। পাল্কীর ভিতরে কে বা কি, তাহা কেহই দেখিল না। আমাদের বাঙ্গালায়ও দেখিয়াছি, পল্লিগ্রামে বালক বালিকারা প্রায় পাল্কী আর বেহারা দেখিয়া ক্ষান্ত হয়। তবে যদি সঙ্গে বাদ্য থাকে, তাহা হইলে “বর-কনে” দেখিবার নিমিত্ত পাল্কীর ভিতর দৃষ্টিপাত করে। যিনি পাল্কী চড়েন, সুতরাং তিনি দুর্ভাগ্য, কিন্তু গ্রাম্য বালক বালিকারাও অতি নিষ্ঠুর, অতি নির্দ্দয়।

    তাহার পর আবার কতকদূর গিয়া দেখিলাম, পথশ্রান্তা যুবতীরা মদের ভাঁটিতে বসিয়া মদ্য পান করিতেছে। গ্রামমধ্যে যে যুবতীদের দেখিয়া আসিয়াছি, ইহারাও আকারে অলঙ্কারে অবিকল সেইরূপ, যেন তাহারাই আসিয়া বসিয়াছে। যুবতীরা উভয় জানুদ্বারা ভূমি স্পর্শ করিয়া দুই হস্তে শালপত্রের পাত্র ধরিয়া মদ্য পান করিতেছে, আর ঈষৎ হাস্যবদনে সঙ্গীদের দেখিতেছে। জানু স্পর্শ করিয়া উপবেশন করা কোলজাতির স্ত্রীলোকদিগের রীতি; বোধ হয় যেন সাঁওতালদিগেরও এই রীতি দেখিয়াছি। বনের মধ্যে যেখানে সেখানে মদের ভাঁটি দেখিলাম, কিন্তু বাঙ্গালায় ভাঁটিখানায় যেরূপ মাতাল দেখা যায়, পালামৌ পরগণায় কোন ভাঁটিখানায় তাহা দেখিলাম না। আমি পরে তাহাদের আহার ব্যবহার সকলই দেখিতাম, কিছুই তাহারা আমার নিকট গোপন করিত না, কিন্তু কখন স্ত্রীলোকদের মাতাল হইতে দেখি নাই, অথচ তাহারা পানকুণ্ঠ নহে। তাহাদের মদের মাদকতা নাই, এ কথাও বলিতে পারি না। সেই মদ পুরুষেরা খাইয়া সর্ব্বদা মাতাল হইয়া থাকে।

    পূর্ব্বে কয়েক বার কেবল যুবতীর কথাই বলিয়াছি, ইচ্ছাপূর্ব্বক বলিয়াছি এমন নহে। বাঙ্গালার পথে, ঘাটে, বৃদ্ধাই অধিক দেখা যায়, কিন্তু পালামৌ অঞ্চলে যুবতীই অধিক দেখা যায়। কোলের মধ্যে বৃদ্ধা অতি অল্প, তাহারা অধিকবয়ঃ হইলেও যুবতীই থাকে, অশীতিপরায়ণা না হইলে তাহারা লোলচর্ম্মা হয় না। অতিশয় পরিশ্রমী বলিয়া গৃহকার্য্য কৃষিকার্য্য সকল কার্য্যই তাহারা করে, পুরুষেরা স্ত্রীলোকের ন্যায় কেবল বসিয়া সন্তান রক্ষা করে, কখন কখন চাটাই বুনে। আলস্য জন্য পুরুষেরা বঙ্গমহিলাদের ন্যায় শীঘ্র বৃদ্ধ হইয়া যায়; স্ত্রীলোকেরা শ্রমহেতু চিরযৌবনা থাকে।

    লোকে বলে পশুপক্ষীর মধ্যে পুরুষজাতিই বলিষ্ঠ ও সুন্দর; মনুষ্যমধ্যেও সেই নিয়ম। কিন্তু কোলদের দেখিলে তাহা বোধ হয় না, তাহাদের স্ত্রীজাতিরাই বলিষ্ঠা ও আশ্চর্য্য কান্তিবিশিষ্টা। কিন্তু তাহাদের বয়ঃপ্রাপ্ত পুরুষদের গায়ে খড়ি উঠিতেছে, চক্ষে মাছি উড়িতেছে, মুখে হাসি নাই, যেন সকলেরই জীবনীশক্তি কমিয়া আসিয়াছে। আমার বোধ হয় কোলজাতির ক্ষয় ধরিয়াছে। ব্যক্তিবিশেষের জীবনীশক্তি যেরূপ কমিয়া যায়, জাতিবিশেষেরও জীবনীশক্তি সেইরূপ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ক্রমে ক্রমে লোপ পায়। মনুষ্যের মৃত্যু আছে, জাতিরও লোপ আছে।

    এই পরগণায় পর্ব্বতে স্থানে স্থানে অসুরেরা বাস করে, আমি তাহাদের দেখি নাই, তাহারা কোলদের সহিত বা অন্য কোন বন্য জাতির সহিত বাস করে না। শুনিয়াছি, অন্যজাতীয় মনুষ্য দেখিলে তাহারা পলায়; পর্ব্বতের অতি নিভৃত স্থানে থাকে বলিয়া তাহাদের অনুসন্ধান করা কঠিন। তাহাদের সংখ্যা নিতান্ত অল্প হইয়া পড়িয়াছে। পূর্ব্বকালে যখন আর্য্যেরা প্রথমে ভারতবর্ষে আসেন, তখন অসুরগণ অতি প্রবল ও তাহাদের সংখ্যা অসীম ছিল। অসুরেরা আসিয়া আর্য্যগণের গোরু কাড়িয়া লইয়া যাইত, ঘৃত খাইয়া পলাইত, আর্য্যেরা নিরুপায় হইয়া কেবল ইন্দ্রকে ডাকিতেন, কখন কখন দলবল জুটাইয়া লাঠালাঠিও করিতেন। শেষে বহু কাল পরে যখন আর্য্যগণ উন্নত ও শক্তিসম্পন্ন হইলেন, তখন অসুরগণকে তাড়াইয়াছিলেন। পরাজিত অসুরগণ ভাল ভাল স্থান আর্য্যদের ছাড়িয়া দিয়া আপনারা দুর্গম পাহাড় পর্ব্বতে গিয়া বাস স্থাপন করে। অদ্যাবধি সেই পাহাড়পর্ব্বতে তাহারা আছে, কিন্তু আর তাহাদের বল বীর্য্য নাই; আর সে অসীম সংখ্যাও তাহাদের নাই। এক্ষণে যেরূপ অবস্থা, তাহাতে অসুরকুল ধ্বংস হইয়াছে বলিলেও অন্যায় হয় না; যে দশ পাঁচ জন এখানে সেখানে বাস করে, আর কিছু দিনের পর তাহারাও থাকিবে না।

    জাতিলোপ মধ্যে মধ্যে হইয়া থাকে; অনেক আদিম জাতির লোপ হইয়া গিয়াছে, অদ্যাপি হইতেছে। জাতিলোপের হেতু দর্শনবিদ্‌গণের মধ্যে কেহ কেহ বলেন যে, পরাজিত জাতিরা বিজয়ী কর্ত্তৃক বিতাড়িত হইয়া অতি অযোগ্য স্থানে গিয়া বাস করিলে, পূর্ব্বস্থানে যে সকল সুবিধা ছিল, তাহার অভাবে ক্রমে তাহারা অবনত ও অবসন্ন হইয়া পড়ে। এ কথা অনেক স্থলে সত্য সন্দেহ নাই; অসুরগণের পক্ষে তাহাই খাটিয়াছিল বোধহয়। কিন্তু সাঁওতালেরাও এক সময় আর্য্যগণ কর্ত্তৃক বিতাড়িত হইয়া দামিনীকোতে পলায়ন করিয়াছিল। সেই অবধি অনেক কাল তথায় বাস করে, অদ্যপিও তথায় খাস সাঁওতালেরা বাস করিতেছে, পূর্ব্বাপেক্ষা তাহাদের যে কুলক্ষয় হইয়াছে, এমত শুনা যায় না।

    মারকিন ও অন্যান্য দেশে যেখানে সাহেবেরা গিয়া রাজ্য স্থাপন করিয়াছেন, সেখানকার আদিমবাসীরা ক্রমে ক্রমে লোপ পাইতেছে, তাহার কারণ কিছুই অনুভব হয় না। রেড ইণ্ডিয়ান, নাটিক ইণ্ডিয়ান, নিউ জিলাণ্ডার, তাস্মানীয় প্রভৃতি কত জাতি লোপ পাইতেছে। মৌরিনামক আদিম জাতি বলিষ্ঠ, বুদ্ধিমান্‌, কর্ম্মঠ বলিয়া পরিচিত, তাহারাও সাহেবদের অধিকারে ক্রমে লোপ পাইতেছে। ১৮৪৮ সালে তাহাদের সংখ্যা এক লক্ষ ছিল, বিশ বৎসর পরে ৩৮ হাজার হইয়া গিয়াছিল, এক্ষণে সে জাতির অবস্থা কি, তাহা জানি না। বোধ হয় এতদিনে লোপ পাইয়া থাকিবে, অথবা যদি এত দিন থাকে, তবে অতি সামান্য অবস্থায় আছে। মৌরি দুর্ব্বল নহে, তৎসম্বন্ধে একজন সাহেব লিখিয়াছেন: “He is the noblest of savages, not equalled by the best of Red Indians.” তথাপি এ জাতি লোপ পায় কেন? তুমি বলিবে সাহেবদের অত্যাচারে? তাহা কদাচ নহে, ক্যানেডার অধিবাসী সম্বন্ধে সাহেবরা কতই যত্ন করিয়াছিলেন, কিছুতেই তাহাদের কুলক্ষয় রক্ষা করিতে পারেন নাই। ডাক্তার গিকি লিখিয়াছেন যে, “In Canada for the last fifty years the Indians have been treated with paternal kindness but the wasting never stops * * * * The Government has built them houses, furnished them with ploughs, supplied them constantly with rifles, ammunition, and clothes, paid their medical attendants * * * but the result is merely this that their extinction goes on more slowly than it otherwise would.” সমাজোপযোগী ভাল স্থান ত্যাগ করিয়া বিপরীত স্থানে ত এই জাতিদের যাইতে হয় নাই, তবে তাহাদের কুললোপ হইল কেন?

    কেহ কেহ বলেন যে, সাহেবদের সংস্পর্শে দোষ আছে। প্রধান জাতির সংস্পর্শে আসিলে সামান্য জাতিরা কতকটা উদ্যমভঙ্গ ও অবসন্ন হইয়া পড়ে। এ কথার প্রত্যুত্তরে এক জন সাহেব লিখিয়াছেন যে, ভারতবর্ষে কতই সামান্য জাতি বাস করে, কিন্তু শ্বেতকায় জাতির সংস্পর্শে তাহাদের ত কুলবৃদ্ধির ব্যাঘাত হয় না।

    আমরা এ কথা সম্বন্ধে এইমাত্র বলিতে পারি যে, ভারতবর্ষে আদিম জাতিদের কুলক্ষয় অনেক দিন আরম্ভ হইয়াছে, কিন্তু ইংরেজদের সমাগমের পর কোন জাতির ক্ষয় ধরিয়াছে, এমত নিশ্চয় বলিতে পারি না। তবে কোলদের সম্বন্ধে কিছু সন্দেহ করা যাইতে পারে, তাহার কারণ, আর এক সময় সমালোচনা করা যাইবে। এক্ষণে এ সকল কথা যাউক, অনেকের নিকট ইহা শিবের গীত বোধ হইবে। কিন্তু এ বয়সে যখন যাহা মনে হয়, তখনই তাহা বলিতে ইচ্ছা যায়; লোকের ভাল লাগিবে না, এ কথা মনে তখন থাকে না। যাহাই হউক, আগামী বারে সতর্ক হইব। কিন্তু যে কথার আলোচনা আরম্ভ করা গিয়াছিল, তাহা শেষ হয় নাই। ইচ্ছা ছিল, এই উপলক্ষে বাঙ্গালীর কথা কিছু বলি। কিন্তু চারি দিকে বাঙ্গালীর উন্নতি লইয়া বাহবা পড়িয়া গিয়াছে; বাঙ্গালী ইংরেজী শিখিতেছে, উপাধি পাইতেছে, বিলাত যাইতেছে, বাঙ্গালী সভ্যতার সোপানে উঠিতেছে, বাঙ্গালীর আর ভাবনা কী? এ সকল তো বাহ্যিক ব্যাপার। বঙ্গসমাজের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার কি একবার অনুসন্ধান করিলে ভাল হয় না? শুনিতেছি, গণনায় বঙ্গবাসীদের সংখ্যা বাড়িতেছে। বড়ই ভাল!

  • প্রথম প্রবন্ধ

    প্রথম প্রবন্ধ

    বহুকাল হইল আমি একবার পালামৌ প্রদেশে গিয়াছিলাম, প্রত্যাগমন করিলে পর সেই অঞ্চলের বৃত্তান্ত লিখিবার নিমিত্ত দুই এক জন বন্ধুবান্ধব আমাকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিতেন, আমি তখন তাঁহাদের উপহাস করিতাম। এক্ষণে আমায় কেহ অনুরোধ করে না, অথচ আমি সেই বৃত্তান্ত লিখিতে বসিয়াছি। তাৎপর্য্য বয়স। গল্প করা এ বয়সের রোগ, কেহ শুনুন বা না শুনুন, বৃদ্ধ গল্প করে।

    অনেক দিনের কথা লিখিতে বসিয়াছি, সকল স্মরণ হয় না। পূর্ব্বে লিখিলে যাহা লিখিতাম, এক্ষণে যে তাহাই লিখিতেছি এমত নহে। পূর্ব্বে সেই সকল নির্জ্জন পর্ব্বত, কুসুমিত কানন প্রভৃতি যে চক্ষে দেখিয়াছিলাম, সে চক্ষু আর নাই। এখন পর্ব্বত কেবল প্রস্তরময়, বন কেবল কণ্টকাকীর্ণ, অধিবাসীরা কেবল কদাচারী বলিয়া স্মরণ হয়। অতএব যাঁহারা বয়োগুণে কেবল শোভা সৌন্দর্য্য প্রভৃতি ভাল বাসেন, বৃদ্ধের লেখায় তাঁহাদের কোনো প্রবৃত্তি পরিতৃপ্ত হইবে না।

    যখন পালামৌ যাওয়া আমার একান্ত স্থির হইল, তখন জানি না যে সে স্থান কোন্‌ দিকে, কত দূরে। অতএব ম্যাপ দেখিয়া পথ স্থির করিলাম। হাজারিবাগ হইয়া যাইতে হবে এই বিবেচনায় ইন্‌ল্যাণ্ড ট্রাঞ্জিট কোম্পানীর (Inland Transit Company) ডাকগাড়ী ভাড়া করিয়া রাত্রি দেড় প্রহরের সময় রাণীগঞ্জ হইতে যাত্রা করিলাম। প্রাতে বরাকর নদীর পূর্ব্বপারে গাড়ি থামিল। নদী অতি ক্ষুদ্র, তৎকালে অল্পমাত্র জল ছিল, সকলেই হাঁটিয়া পার হইতেছে, গাড়ী ঠেলিয়া পার করিতে হইবে, অতএব গাড়ওয়ান কুলি ডাকিতে গেল।

    পূর্ব্বপার হইতে দেখিলাম যে, অপর পারে ঘাটের উপরেই একজন সাহেব বাঙ্গালায় বসিয়া পাইপ টানিতেছেন, সম্মুখে একজন চাপরাসী একরূপ গৈরিক মৃত্তিকা হস্তে দাঁড়াইয়া আছে। যে ব্যক্তি পারার্থ সেই ঘাটে আসিতেছে, চাপরাশি তাহার বাহুতে সেই মৃত্তিকাদ্বারা কী অঙ্কপাত করিতেছে। পারার্থীর মধ্যে বন্য লোকই অধিক, তাহাদের যুবতীরা মৃত্তিকারঞ্জিত আপন আপন বাহুর প্রতি আড়নয়নে চাহিতেছে আর হাসিতেছে, আবার অন্যের অঙ্গে সেই অঙ্কপাত কিরূপ দেখাইতেছে তাহাও এক একবার দেখিতেছে। শেষে যুবতীরা হাসিতে হাসিতে দৌড়িয়া নদীতে নামিতেছে। তাহাদের ছুটাছুটিতে নদীর জল উচ্ছ্বসিত হইয়া কূলের উপর উঠিতেছে।

    আমি অন্যমনস্কে এই রঙ্গ দেখিতেছি এমত সময়ে কুলিদের কতকগুলি বালক বালিকা আসিয়া আমার গাড়ী ঘেরিল। “সাহেব একটি পয়সা” “সাহেব একটি পয়সা” এই বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। ধুতি চাদর পরিয়া আমি নিরীহ বাঙালী বসিয়া আছি, আমায় কেন সাহেব বলিতেছে তাহা জানিবার নিমিত্ত বলিলাম, “আমি সাহেব নহি।” একটি বালিকা আপন ক্ষুদ্র নাসিকাস্থ অঙ্গুরীবৎ অলঙ্কারের মধ্যে নখ নিমজ্জন করিয়া বলিল, “হাঁ, তুমি সাহেব।” আর একজন জিজ্ঞাসা করিল, “তবে তুমি কি?” আমি বলিলাম, “আমি বাঙ্গালী।” সে বিশ্বাস করিল না, বলিল, “না, তুমি সাহেব।” তাহারা মনে করিয়া থাকিবে যে, যে গাড়ি চড়ে, সে অবশ্য সাহেব।

    এই সময় একটি দুইবৎসরবয়স্ক শিশু আসিয়া আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া হাত পাতিয়া দাঁড়াইল। কেন হাত পাতিল তাহা সে জানে না, সকলে হাত পাতিয়াছে দেখিয়া সেও হাত পাতিল। আমি তাহার হস্তে একটি পয়সা দিলাম, শিশু তাহা ফেলিয়া দিয়া আবার হাত পাতিল, অন্য বালক সে পয়সা কুড়াইয়া লইলে শিশুর ভগিনীর সাথে তাহার তুমুল কলহ বাধিল। এই সময় আমার গাড়ী অপর পাড়ে গিয়া উঠিল।

    বরাকর হইতে দুই একটি ক্ষুদ্র পাহাড় দেখা যায়। বঙ্গবাসীদের কেবল মাঠ দেখা অভ্যাস, মৃত্তিকার সামান্য স্তূপ দেখিলেই তাহাদের আনন্দ হয়। অতএব সেই ক্ষুদ্র পাহাড়গুলি দেখিয়া যে তৎকালে আমার যথেষ্ট আনন্দ হইবে ইহা আর আশ্চর্য্য কি? বাল্যকালে পাহাড় পর্ব্বতের পরিচয় অনেক শুনা ছিল, বিশেষতঃ একবার এক বৈরাগী আখড়ায় চুণকাম-করা এক গিরিগোবর্দ্ধন দেখিয়া পাহাড়ের আকার অনুভব করিয়া লইয়াছিলাম। কৃষক-কন্যারা শুষ্ক গোময় সংগ্রহ করিয়া যে স্তূপ করে, বৈরাগীর গোবর্দ্ধন তাহা অপেক্ষা কিছু বড়। তাহার স্থানে স্থানে চারি পাঁচখানি ইষ্টক গাঁথিয়া এক একটি চূড়া করা হইয়াছে। আবার সর্বোচ্চ চূড়ার পার্শ্বে এক সর্পফণা নির্ম্মাণ করিয়া তাহা হরিত, পীত, নানা বর্ণে চিত্রিত করা হইয়াছে, পাছে সর্পের প্রতি লোকের দৃষ্টি না পড়ে এইজন্য ফণাটি কিছু বড় করিতে হইয়াছে। কাজেই পর্ব্বতের চূড়া অপেক্ষা ফণাটি বড় হইয়া পড়িয়াছে, তাহা মিস্ত্রির গুণ নহে, বৈরাগীরও দোষ নহে। সর্পটি কালীয়দমনের কালীয়, কাজেই যে পর্ব্বতের উপর কালীয় উঠিয়াছে, সে পর্ব্বতের চূড়া অপেক্ষা তাহার ফণা যে কিছু বৃহৎ হইবে ইহার আর আশ্চর্য্য কী? বৈরাগীর এই গিরিগোবর্দ্ধন দেখিয়া বাল্যকালেই পর্ব্বতের অনুভব হইয়াছিল। বরাকরের নিকট পাহাড়গুলি দেখিয়া আমার সেই বাল্যসংস্কারের কিঞ্চিৎ পরিবর্ত্তন হইতে আরম্ভ হইল।

    অপরাহ্ণে দেখিলাম একটি সুন্দর পর্ব্বতের নিকট দিয়া গাড়ী যাইতেছে। এত নিকট দিয়া যাইতেছে যে, পর্ব্বতস্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরের ছায়া পর্য্যন্ত দেখা যাইতেছে। গাড়ওয়ানকে গাড়ী থামাইতে বলিয়া আমি নামিলাম। গাড়ওয়ান জিজ্ঞাসা করিল, “কোথা যাইবেন?” আমি বলিলাম, “একবার এই পর্ব্বতে যাইব।” সে হাসিয়া বলিল, “পাহাড় এখান হইতে অধিক দূর, আপনি সন্ধ্যার মধ্যে তথায় পৌঁছিতে পারিবেন না।” আমি এ কথা কোনরূপে বিশ্বাস করিলাম না। আমি স্পষ্ট দেখিতেছিলাম, পাহাড় অতি নিকট, তথা যাইতে আমার পাঁচ মিনিটও লাগিবে না, অতএব গাড়ওয়ানের নিষেধ না শুনিয়া আমি পর্ব্বতাভিমুখে চলিলাম। পাঁচ মিনিটের স্থলে ১৫ মিনিট কাল দ্রুতপাদবিক্ষেপে গেলাম, তথাপি পর্ব্বত পূর্বমতো সেই পাঁচ মিনিটের পথ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। তখন আমার ভ্রম বুঝিতে পারিয়া গাড়ীতে ফিরিয়া আসিলাম। পর্ব্বতসম্বন্ধে দূরতা স্থির করা বাঙ্গালীর পক্ষে বড় কঠিন, ইহার প্রমাণ পালামৌ গিয়া আমি পুনঃ পুনঃ পাইয়াছিলাম।

    পরদিবস প্রায় দুই প্রহরের সময় হাজারিবাগ পৌঁছিলাম। তথায় গিয়া শুনিলাম, কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাটীতে আমার আহারের আয়োজন হইতেছে। প্রায় দুই দিবস আহার হয় নাই, অতএব আহার সম্বন্ধীয় কথা শুনিবামাত্র ক্ষুধা অধিকতর প্রদীপ্ত হইল। যিনি আমার নিমিত্ত উদ্যোগ করিতেছেন, তিনি আমার আগমনবার্ত্তা কিরূপে জানিলেন, তাহা অনুসন্ধান করিবার আর সাবকাশ হইল না, আমি তৎক্ষনাৎ তাঁহার বাটীতে গাড়ী লইয়া যাইতে অনুমতি করিলাম। যাঁহার বাটীতে যাইতেছি, তাঁহার সহিত আমার কখনও চাক্ষুষ হয় নাই। তাঁহার নাম শুনিয়াছি, সুখ্যাতিও যথেষ্ট শুনিয়াছি; সজ্জন বলিয়া তাঁহার প্রশংসা সকলেই করে। কিন্তু সে প্রশংসায় কর্ণপাত বড় করি নাই, কেন না বঙ্গবাসীমাত্রই সজ্জন; বঙ্গে কেবল প্রতিবাসীরাই দুরাত্মা, যাহা নিন্দা শুনা যায় তাহা কেবল প্রতিবাসীর। প্রতিবাসীরা পরশ্রীকাতর, দাম্ভিক, কলহপ্রিয়, লোভী, কৃপণ, বঞ্চক। তাহারা আপনাদের সন্তানকে ভাল কাপড়, ভাল জুতা পড়ায়; কেবল আমাদের সন্তানকে কাঁদাইবার জন্য। তাহারা আপনার পুত্রবধূকে উত্তম বস্ত্রালঙ্কার দেয়, কেবল আমাদের পুত্রবধূর মুখ ভার করাইবার নিমিত্ত। পাপিষ্ঠ, প্রতিবাসীরা! যাহাদের প্রতিবাসী নাই, তাহাদের ক্রোধ নাই। তাহাদেরই নাম ঋষি। ঋষি কেবল প্রতিবাসী-পরিত্যাগী গৃহী। ঋষির আশ্রমপ্বার্শে প্রতিবাসী বসাও, তিন দিনের মধ্যে ঋষির ঋষিত্ব যাইবে। প্রথম দিন প্রতিবাসীর ছাগলে পুষ্পবৃক্ষ নিষ্পত্র করিবে। দ্বিতীয় দিনে প্রতিবাসীর গোরু আসিয়া কমণ্ডলু ভাঙ্গিবে, তৃতীয় দিনে প্রতিবাসীর গৃহিণী আসিয়া ঋষি-পত্নীকে অলঙ্কার দেখাইবে। তাহার পরই ঋষিকে ওকালতির পরীক্ষা দিতে হইবে, নতুবা ডেপুটি মেজিষ্ট্রেটীর দরখাস্ত করিতে হইবে।

    এক্ষণে সে সকল কথা যাক্‌। যে বঙ্গবাসীর গৃহে আতিথ্য স্বীকার করিতে যাইতেছিলাম, তাঁহার উদ্যানে গাড়ী প্রবেশ করিলে তাহা কোনো ধনবান ইংরেজের হইবে বলিয়া আমার প্রথমে ভ্রম হইল। পরক্ষণেই সে ভ্রম গেল। বারাণ্ডায় গুটিকত বাঙ্গালী বসিয়া আমার গাড়ী নিরীক্ষণ করিতেছিলেন, তাঁহাদের নিকটে গিয়া গাড়ি থামিলে আমি গাড়ী হইতে অবতরণ করিলাম। আমাকে দেখিয়া তাঁহারা সকলেই সাদরে অগ্রসর হইলেন। না চিনিয়া যাঁহার অভিবাদন সর্ব্বাগ্রে গ্রহণ করিয়াছিলাম, তিনিই বাটীর কর্ত্তা। তিনি শত লোক সমভিব্যাহারে থাকিলেও আমার দৃষ্টি বোধ হয় প্রথমেই তাঁহার মুখের প্রতি পড়িত। সেরূপ প্রসন্নতাব্যঞ্জক ওষ্ঠ আমি অতি অল্প দেখিয়াছি। তখন তাঁহার বয়ঃক্রম বোধহয় পঞ্চাশ অতীত হইয়াছিল, বৃদ্ধের তালিকায় তাঁহার নাম উঠিয়াছিল, তথাপি তাঁহাকে বড় সুন্দর দেখিয়াছিলাম। বোধহয় সেই প্রথম আমি বৃদ্ধকে সুন্দর দেখি।

    যে সময়ের কথা বলিতেছি, আমি তখন নিজে যুবা; অতএব সে বয়সে বৃদ্ধকে সুন্দর দেখা ধর্ম্মসঙ্গত নহে। কিন্তু সে দিবস এরূপ ধর্ম্মবিরুদ্ধ কার্য্য ঘটিয়াছিল। এক্ষণে আমি নিজে বৃদ্ধ, কাজেই প্রায় বৃদ্ধকে সুন্দর দেখি। একজন মহানুভব বলিয়াছিলেন যে, মনুষ্য বৃদ্ধ না হইলে সুন্দর হয় না, এক্ষণে আমি তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করি।

    প্রথম সম্ভাষণ সমাপন হইলে পর স্নানাদি করিতে যাওয়া গেল। স্নান গোছলখানায় ইংরেজী মতেই হইল, কিন্তু আহার ঠিক হিন্দুমতে হয় নাই, কেন না, তাহাতে পলাণ্ডুর আধিক্য ছিল। পলাণ্ডু হিন্দুধর্ম্মের বড় বিরোধী। তদ্ভিন্ন আহারের আর কোনো দোষ ছিল না, সঘৃত আতপান্ন, আর দেবীদুর্লভ ছাগমাংস, এই দুই-ই নির্দোষী।

    পাক সম্বন্ধে পলাণ্ডুর উল্লেখ করিয়াছি, কিন্তু পিঁয়াজ উল্লেখ করাই আমার ইচ্ছা ছিল। পিঁয়াজ যাবনিক শব্দ, এই ভয়ে পলাণ্ডুর উল্লেখ করিয়া সাধুগণের মুখ পবিত্র রাখিয়াছি, কিন্তু পিঁয়াজ পলাণ্ডু এক দ্রব্য কি না, এ বিষয়ে আমার বহুকালাবধি সংশয় আছে। একবার পাঞ্জাব অঞ্চলের এক জন বৃদ্ধ রাজা জগন্নাথ দর্শন করিতে যাইবার সময় মেদিনীপুরে দুই এক দিন অবস্থিতি করেন। নগরের ভদ্রলোকেরা তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রার্থনা করিলে, তিনি কি প্রধান, কি সামান্য, সকলের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া নানাপ্রকার আলাপ করিতেছিলেন, এমত সময় তাঁহাদের মধ্যে একজন যোড়হস্তে বলিলেন, “আমরা শুনিয়াছিলাম যে, মহারাজ হিন্দুচূড়ামণি, কিন্তু আসিবার সময় আপনার পাকশালার সম্মুখে পলাণ্ডু দেখিয়া আসিয়াছি।” বিস্ময়াপন্ন রাজা “পলাণ্ডু!” এই শব্দ বার বার উচ্চারণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তদারকের নিমিত্ত স্বয়ং উঠিলেন, নগরস্থ ভদ্রলোকেরাও তাঁহার পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলেন। রাজা পাকশালার সম্মুখে দাঁড়াইলে, একজন বাঙ্গালী পিঁয়াজের স্তূপ দেখাইয়া দিল। রাজা তখন হাসিয়া বলিলেন, “ইহা পলাণ্ডু নহে; ইহাকে পিঁয়াজ বলে। পলাণ্ডু অতি বিষাক্ত সামগ্রী, তাহা কেবল ঔষধে ব্যবহার হয়। সকল দেশে তাহা জন্মে না; যে মাঠে জন্মে, মাঠের বায়ু দূষিত হইয়া যায়, এই ভয়ে সে মাঠ দিয়া কেহ যাতায়াত করে না। সে মাঠে আর কোনো ফসল হয় না।”

    রাজার এই কথা যদি সত্যি হয়, তাহা হইলে অনেকে নিশ্চিন্ত হইতে পারেন। পলাণ্ডু আর পিঁয়াজ এক সামগ্রী কি না, তাহা পশ্চিম প্রদেশে অনুসন্ধান হইতে পারে, বিশেষতঃ যে সকল বঙ্গবাসীরা সিন্ধুদেশ অঞ্চলে আছেন, বোধ হয় তাঁহারা অনায়াসেই এই কথার মীমাংসা করিয়া লইতে পারেন।

    আহারান্তে বিশ্রামগৃহে বসিয়া বালকদিগের সহিত গল্প করিতে করিতে বালকদের শয়নঘর দেখিতে উঠিয়া গেলাম। ঘরটি বিলক্ষণ পরিসর, তাহার চারি কোণে চারিখানি খাট পাতা, মধ্যস্থলে আর একখানি খাট রহিয়াছে। জিজ্ঞাসা করায় বালকেরা বলিল, “চারি কোণে আমরা চারিজন শয়ন করি, আর মধ্যস্থলে মাষ্টার মহাশয় থাকেন।” এই বন্দোবস্ত দেখিয়া বড় পরিতৃপ্ত হইলাম। দিবারাত্র বালকদের কাছে শিক্ষক থাকার আবশ্যকতা অনেকে বুঝেন না।

    বালকদের শয়নঘর হইতে বহির্গত হইয়া আর এক ঘরে দেখি, এক কাঁদি সুপক্ক মর্ত্তমান রম্ভা দোদুল্যমান রহিয়াছে, তাহাতে একখানি কাগজ ঝুলিতেছে, পড়িয়া দেখিলাম, নিত্য যত কদলী কাঁদি হইতে ব্যয় হয়, তাহাই তাহাতে লিখিত হইয়া থাকে। লোকে সচরাচর ইহাকে ক্ষুদ্র দৃষ্টি, ছোট নজর ইত্যাদি বলে; কিন্তু আমি তাহা কোনরূপে ভাবিতে পারিলাম না। যেরূপ অন্যান্য বিষয়ের বন্দোবস্ত দেখিলাম, তাহাতে “কলাকাঁদির হিসাব” দেখিয়া বরং আরও চমৎকৃত হইলাম। যাহাদের দৃষ্টি ক্ষুদ্র, তাহারা কেবল সামান্য বিষয়ের প্রতিই দৃষ্টি রাখে, অন্য বিষয় দেখিতে পায় না। তাহারা যথার্থই নীচ। কিন্তু আমি যাঁহার কথা বলিতেছি, দেখিলাম তাঁহার নিকট বৃহৎ সূক্ষ্ম সকলই সমভাবে পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। অনেকে আছেন, বড় বড় বিষয় মোটামুটি দেখিতে পারেন, কিন্তু সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি তাহাদের দৃষ্টি একেবারে পড়ে না। তাঁহাদের প্রশংসা করি না। যাঁহারা বৃহৎ সূক্ষ্ম একত্র দেখিয়া কার্য্য করেন, তাঁহাদেরই প্রশংসা করি। কিন্তু এরূপ লোক অতি অল্প।

    “কলাকাঁদির ফর্দ’” সম্বন্ধে বালকদিগের সহিত কথা কহিতে কহিতে জানিলাম যে, একদিন এক চাকর লোভ সম্বরণ করিতে না পারিয়া দুইটি সুপক্ক রম্ভা উদরস্থ করিয়াছিল, গৃহস্থের সকল বিষয়েই দৃষ্টি আছে, সকল বিষয়েরই হিসাব থাকে, কাজেই চুরি ধরা পড়িল। তখন তিনি চাকরকে ডাকিয়া চুরির জন্য জরিমানা করিলেন। পরে তাহার লোভ পরিতৃপ্ত করিবার নিমিত্ত যত ইচ্ছা কাঁদি হইতে রম্ভা খাইতে অনুমতি করিলেন। চাকর উদর ভরিয়া রম্ভা খাইল।

    অপরাহ্ণে আমি উদ্যানে পদচারণ করিতেছি, এমত সময় গৃহস্থ “কাছারি” হইতে প্রত্যাগত হইলেন। পরে আমাকে সমভিব্যাহারে লইয়া বাগান, পুষ্করিণী, সমুদয় দেখাইতে লাগিলেন। যে স্থান হইতে যে বৃক্ষটি আনাইয়াছেন, তাহারও পরিচয় দিতে লাগিলেন। মধ্যাহ্নকালে “কলাকাঁদি” সম্বন্ধে যাহা দেখিয়াছি এবং শুনিয়াছি, তাহা তখনও আমার মনে পুনঃ পুনঃ আলোচিত হইতেছিল; কাজেই আমি কদলীবৃক্ষের প্রসঙ্গ না করিয়া থাকিতে পারিলাম না। বলিলাম, “আমার ধারণা ছিল এ অঞ্চলে রম্ভা জন্মে না; কিন্তু আপনার বাগানে যথেষ্ট দেখিতেছি।” তিনি উত্তর করিলেন, “এখানে বাজারে কলা পাওয়া যায় না। পূর্ব্বে কাহার বাটীতেও পাওয়া যাইত না। লোকের সংস্কার ছিল যে, এই প্রস্তরময় মৃত্তিকায় কলার গাছ রস পায় না, শুকাইয়া যায়। আমি তাহা বিশ্বাস না করিয়া, দেশ হইতে ‘তেড়’ আনিয়া পরীক্ষা করিলাম। এক্ষণে আমার নিকট হইতে ‘তেড়’ লইয়া সকল সাহেবই বাগানে লাগাইয়াছেন। এখন আর এখানে কদলীর অভাব নাই।”

    এইরূপ কথাবার্ত্তা কহিতে কহিতে আমরা উদ্যানের এক প্রান্তভাগে আসিয়া উপস্থিত হইলাম, তথায় দুইটি স্বতন্ত্র ঘর দেখিয়া আমি জিজ্ঞাসা করায় গৃহস্থ বলিলেন, “উহার একটিতে আমার নাপিত থাকে, অপরটিতে আমার ধোপা থাকে। উহারা সম্পূর্ণ আমার বেতনভোগী চাকর নহে, তবে উভয়কে আমার বাটীতে স্থান দিয়া এক প্রকারে আবদ্ধ করিয়াছি। এখন যখনই আবশ্যক হয়, তখনই তাহাদের পাই। ধোপা, নাপিতের কষ্ট পূর্ব্বে আর কোন উপায়ে নিবারণ করিতে পারি নাই।”

    সন্ধ্যার পর দেখিলাম, শিক্ষক-সম্মুখে বালকেরা যে টেবিলে বসিয়া অধ্যয়ন করিতেছে, তথায় একত্র একস্থানে তিনটি সেজ জ্বলিতেছে। অন্য লোক যাঁহারা কদলীর হিসাব রাখেন না, তাঁহারা বালকদের নিমিত্ত একটি সেজ দিয়া নিশ্চিন্ত হন, আর যিনি কদলীর হিসাব রাখেন, তিনি এই অতিরিক্ত ব্যয় কেন স্বীকার করিতেছেন জানিবার নিমিত্ত আমার কৌতূহল জন্মিল। শেষে আমি জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, “ইহা অপব্যয় নহে, অল্প আলোকে অধ্যয়ন করিলে বালকের চক্ষু দুর্ব্বল হইবার সম্ভাবনা; যথেষ্ট আলোকে অধ্যয়ন করিলে চল্লিশের বহু পরে ‘চালশা’ ধরে।”

    উচ্চপদস্থ সাহেবরা সর্ব্বদাই তাঁহার বাটীতে আসিতেন, এবং তাঁহার সহিত কথাবার্ত্তায় পরমাপ্যায়িত হইতেন। বাঙ্গালীরা ছোট বড় সকলেই তাঁহার সৌজন্যে বাধ্য ছিলেন, যে কুঠীতে তিনি বাস করিতেন, সেরূপ কুঠী সাহেবদেরও সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় না; কুঠীটি যেরূপ পরিষ্কৃত ও সুসজ্জীভূত ছিল, তাহা দেখিলে যথার্থই সুখ হয়, মনও পবিত্র হয়। মনের উপর বাসস্থানের আধিপত্য বিলক্ষণ আছে। যাহারা অপরিষ্কৃত ক্ষুদ্র ঘরে বাস করে, প্রায় দেখা যায়, তাহাদের মন সেইরূপ অপরিষ্কৃত ও ক্ষুদ্র। যিনি বিশ্বাস না করেন, তিনি বলিতে পারেন যে, যদি এ কথা সত্য হয়, তাহা হইলে প্রায় অধিকাংশ বাঙ্গালীর মন ক্ষুদ্র ও অপরিষ্কৃত হইত। আমরা এ কথা লইয়া কোন তর্ক করিব না, আমরা যেমন দেখিতে পাই, সেই মত শিখিয়াছি। যাঁহাকে উপলক্ষ করিয়া এই কথা বলিয়াছি, তাঁহার মন, “কুঠী”র উপযোগী ছিল। সেরূপ কুঠীর ভাড়ায় যে ব্যক্তি বহু অর্থ ব্যয় করে, সে ব্যক্তি যদি কদলীর হিসাব রাখে, তাহা হইলে কী বুঝা কর্ত্তব্য?

    রাত্রি দেড় প্রহরের সময় বাহকস্কন্ধে আমি ছোটনাগপুর যাত্রা করিলাম। তথা হইতে পালামৌ দুই চারিদিনের মধ্যে পৌঁছিলাম। পথের পরিচয় আর দিব না, এই কয়েক ছত্র লিখিয়া অনেককে জ্বালাতন করিয়াছি, আর বিরক্ত করিব না, এবার ইচ্ছা রহিল, মূল বিবরণ ভিন্ন অন্য কথা বলিব না, তবে যদি দুই একটি অতিরিক্ত কথা বলিয়া ফেলি, তাহা হইলে বয়সের দোষ বুঝিতে হইবে।

  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে বঙ্গভারতীর একজন কৃতী অথচ অলস ও অসাবধান সাধক বঙ্কিমাগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্রের অন্যতম সার্থক এবং সুসমঞ্জস রচনা “পালামৌ”—বস্তুতঃ আধুনিক কাল পর্য্যন্ত তাঁহার সাহিত্যকীর্ত্তি এই “পালামৌ”কে কেন্দ্র করিয়াই প্রতিষ্ঠিত আছে। এই কারণে সঞ্জীবচন্দ্রের এই রচনাটিই আমরা পুনঃপ্রকাশিত করিলাম।

    “পালামৌ” সঞ্জীবচন্দ্র-সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শনে’ সর্ব্বপ্রথম ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। লেখকের আসল নাম ছিল না; “প্র. না. ব.” এই ছদ্ম নাম ব্যবহৃত হইয়াছিল। ১২৮৭ বঙ্গাব্দের পৌষ-সংখ্যায় আরম্ভ, ১২৮৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে ‘বঙ্গদর্শনে’ ইহা সমাপ্ত হয়। প্রকাশের ক্রম এইরূপঃ ১২৮৭, পৌষ, পৃ. ৪১২-১৯; ফাল্গুন, পৃ. ৫১৩-১৯; ১২৮৮ আষাঢ়, পৃ. ১৩৫-৩৯; শ্রাবণ, পৃ. ১৬৫-৭১; আশ্বিন, পৃ. ২৮১-৮৬; ১২৮৯, ফাল্গুন, পৃ. ৫১৪-১৭। “পালামৌ” সঞ্জীবচন্দ্রের জীবৎ-কালে স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই। তাঁহার মৃত্যুর পর বঙ্কিমচন্দ্র ‘সঞ্জীবনী সুধা’ নাম দিয়ে সঞ্জীবচন্দ্রের রচনার যে সঙ্কলন প্রকাশ করেন, তাহাতেই “পালামৌ” সর্ব্বপ্রথম পুস্তকাকারে মুদ্রণগৌরব লাভ করে। দুঃখের বিষয়, অনবধানবশতঃ ‘সঞ্জীবনী সুধা’তে অনেক মুদ্রাকর-প্রমাদ ঘটিয়া স্থানে স্থানে অর্থ বোইকল্য ঘটিয়াছে এবং যে-কোন কারণেই হোক ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত সর্ব্বশেষ অংশ স্থান পায় নাই। বসুমতি-সংস্করণ সঞ্জীব-গ্রন্থাবলিতে ‘সঞ্জীবনী সুধা’র পাঠই অনুসৃত হইয়াছে। সুতরাং আমরাই সর্ব্বপ্রথম সম্পূর্ণ “পালামৌ” পুস্তকাকারে প্রকাশ করিলাম, ইহা বলা চলে। আমরা ‘বঙ্গদর্শনে’র পাঠ গ্রহণ করিয়াছি।

    সঞ্জীবচন্দ্রের জীবনী বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছেন, বঙ্কিম-রচনাবলীর “বিবিধ” খণ্ডে তাহা প্রকাশিত হইয়াছে। সঞ্জীবচন্দ্রের প্রচলিত গ্রন্থাবলীর সঙ্গেও তাহা সচরাচর যুক্ত দেখা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের পরও আরও উপকরণ সঞ্জীবচন্দ্রের জীবনী সম্পর্কে যাহা পাওয়া গিয়াছে, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত “সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা”র ‘সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ পুস্তকে তাহা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। সঞ্জীবচন্দ্রের গ্রন্থপঞ্জীও উহাতে দেওয়া হইয়াছে।

    বঙ্কিমচন্দ্রের মত আমরাও মনে করি, “তিনি যে এ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা সাহিত্যে আপনার উপযুক্ত আসন প্রাপ্ত হয়েন নাই, তাহা যিনি তাঁহার গ্রন্থগুলি যত্নপূর্ব্বক পাঠ করিবেন, তিনিই স্বীকার করিবেন। কালে সে আসন প্রাপ্ত হইবেন”। এই ভরসা লইয়াই আমরা তাঁহার একটি শ্রেষ্ঠ রচনা পুনঃপ্রকাশ করিলাম। এ যুগের পাঠকেরা এই রচনা হইতেই সঞ্জীবচন্দ্রের সাহিত্যকীর্ত্তি সম্বন্ধে সচেতন হইবেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।

    চন্দ্রনাথ বসু “পালামৌ” সম্বন্ধে লিখিয়াছেন:

    …উপন্যাস না হইয়াও পালামৌ উৎকৃষ্ট উপন্যাসের ন্যায় মিষ্ট বোধ হয়। পালামৌর ন্যায় ভ্রমণকাহিনী বাঙ্গালা সাহিত্যে আর নাই। আমি জানি উহার সকল কথাই প্রকৃত, কোন কথাই কল্পিত নয়। কিন্তু মিষ্টতা মনোহারিত্বে উহা সুরচিত উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত ও সমতুল্য।

    রবীন্দ্রনাথ তাঁহার ‘আধুনিক সাহিত্যে’ সঞ্জীবচন্দ্রের “পালামৌ” সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। এই আলোচনা সকলের পাঠ্য। আমরা নিম্নে সেই আলোচনা হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিয়া এই ভূমিকা সমাপ্ত করিতেছি। রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন:

    পালামৌ ভ্রমণবৃত্তান্তের মধ্যে সৌন্দর্য্যের প্রতি সঞ্জীবচন্দ্রের যে একটি অকৃত্রিম সজাগ অনুরাগ প্রকাশ পাইয়াছে এমন সচরাচর বাংলা লেখকদের মধ্যে দেখা যায় না। সাধারণত আমাদের জাতির মধ্যে একটি বিজ্ঞবার্দ্ধক্যের লক্ষণ আছে—আমাদের চক্ষে সমস্ত জগৎ যেন জরাজীর্ণ হইয়া গিয়াছে। সৌন্দর্য্যের মায়া-আবরণ যেন বিস্রস্ত হইয়াছে—এবং বিশ্বসংসারের অনাদি প্রাচীনতা পৃথিবীর মধ্যে কেবল আমাদের নিকটই ধরা পড়িয়াছে। সেই জন্য অশন বসন ছন্দ ভাষা আচার ব্যবহার বাসস্থান সর্ব্বত্রই সৌন্দর্য্যের প্রতি আমাদের এমন সুগভীর অবহেলা। কিন্তু সঞ্জীবের অন্তরে সেই জরার রাজত্ব ছিল না। তিনি যেন একটি নূতনসৃষ্ট জগতের মধ্যে একজোড়া নূতন চক্ষু লইয়া ভ্রমণ করিতেছেন। “পালামৌ”তে সঞ্জীবচন্দ্র যে, বিশেষ কোনো কৌতূহলজনক নূতন কিছু দেখিয়াছেন, অথবা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে কিছু বর্ণনা করিয়াছেন তাহা নহে, কিন্তু সর্ব্বত্রই ভালবাসিবার ও ভালো লাগিবার একটা ক্ষমতা দেখাইয়াছেন। “পালামৌ” দেশটা সুসংলগ্ন সুস্পষ্ট জাজ্বল্যমান চিত্রের মতো প্রকাশ পায় নাই, কিন্তু যে সহৃদয়তা ও রসবোধ থাকিলে জগতের সর্ব্বত্রই অক্ষয় সৌন্দর্য্যের সুধাভাণ্ডার উদ্ঘাটিত হইয়া যায় সেই দুর্লভ জিনিসটি তিনি রাখিয়া গিয়াছেন, এবং তাঁহার হৃদয়ের সেই অনুরাগপূর্ণ মমত্ববৃত্তির কল্যাণকিরণ যাহাকেই স্পর্শ করিয়াছে—কৃষ্ণবর্ণ কোলরমণীই হৌক্‌, বনসমাকীর্ণ পর্ব্বতভূমিই হৌক্‌, জড় হৌক্‌, চেতন হৌক্‌, ছোট হৌক্‌, বড় হৌক্‌ সকলকেই একটি সুকোমল সৌন্দর্য্য এবং গৌরব অর্পণ করিয়াছে।
    লেখক যখন যাত্রা আরম্ভকালে গাড়ি করিয়া বরাকর নদী পার হইতেছেন এমন সময় কুলীদের বালকবালিকারা তাঁহার গাড়ি ঘিরিয়া “সাহেব একটি পয়সা” “সাহেব একটি পয়সা” করিয়া চীৎকার করিতে লাগিল—লেখক বলিতেছেন “এই সময় একটি দুই বৎসর বয়স্ক শিশু আসিয়া আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া হাত পাতিয়া দাঁড়াইল। কেন হাত পাতিল তাহা সে জানে না, —সকলে হাত পাতিয়াছে দেখিয়া সেও হাত পাতিল। আমি তাহার হস্তে একটি পয়সা দিলাম, শিশু তাহা ফেলিয়া দিয়া আবার হাত পাতিল; অন্য বালক সে পয়সা কুড়াইয়া লইলে শিশুর ভগিনীর সহিত তাহার তুমুল কলহ বাধিল।”

    সামান্য শিশুর এই শিশুত্বটুকু, তাহার উদ্দেশ্যবোধহীন অনুকরণবৃত্তির এই ক্ষুদ্র উদাহরণটুকুর উপর সঞ্জীবের যে-একটি সকৌতুক স্নেহহাস্য নিপতিত রহিয়াছে সেইটি পাঠকের নিকট রমণীয়;—সেই একটি উল্টা-হাতপাতা ঊর্দ্ধমুখ অজ্ঞান লোভহীন শিশু ভিক্ষুকের চিত্রটি সমস্ত শিশুজাতির প্রতি আমাদের মনের একটি মধুররস আকর্ষণ করিয়া আনে।

    দৃশ্যটি নূতন এবং অসামান্য বলিয়া নহে পরন্তু পুরাতন এবং সামান্য বলিয়াই আমাদের হৃদয়কে এরূপ বিচলিত করে। শিশুদের মধ্যে আমরা মাঝে মাঝে ইহারই অনুরূপ অনেক ঘটনা দেখিয়া আসিয়াছি, সেইগুলি বিস্মৃতভাবে আমাদের মনের মধ্যে সঞ্চিত ছিল;—সঞ্জীবের রচিত চিত্রটি আমাদের সম্মুখে খাড়া হইবামাত্র সেই সকল অপরিস্ফুট স্মৃতি পরিস্ফুট হইয়া উঠিল এবং তৎসহকারে শিশুদের প্রতি আমাদের স্নেহরাশি ঘনীভূত হইয়া আনন্দরসে পরিণত হইল।…

    সঞ্জীব বালকের ন্যায় সকল জিনিস সজীব কৌতুহলের সহিত দেখিতেন এবং প্রবীণ চিত্রকরের ন্যায় তাহার প্রধান অংশগুলি নির্ব্বাচন করিয়া লইয়া তাঁহার চিত্রকে পরিস্ফুট করিয়া তুলিতেন এবং ভাবুকের ন্যায় সকলের মধ্যেই তাঁহার নিজের একটি হৃদয়াংশ যোগ করিয়া দিতেন।

  • পালামৌ

    পালামৌ

    ভ্রমণ-নেশার মায়ার খেলা যুগ যুগ ধরেই মানুষের ভেতরে বাস করে এসেছে। পালামৌ গল্পে লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমনই এক মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়ার অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন। যদিও এই ভ্রমণকাহিনী যতটা না কাহিনী, তার চেয়ে মানবিক উপাখ্যানের গল্প হিসেবেই ধরা দিবে পাঠকের হৃদয়ে।

    পালামৌ সর্বপ্রথম ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রমথনাথ বসু ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। মোট ছয় কিস্তিতে প্রকাশিত এই লেখা পরবর্তীতে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।

    বইটি খানিকটা ভ্রমণকাহিনী, খানিকটা স্মৃতিচারণমূলক লেখা। সদ্য ঘটা ভ্রমণের না, অর্ধবিস্মৃত যৌবনের স্মৃতি বৃদ্ধবয়সের পরিণত চোখে আবার দেখে লেখা। এই বইয়ের সমালোচনা লেখার বড় সমস্যা হচ্ছে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন একবার। মোটামুটি বইটার মান সম্পর্কে ভালো ধারণা তার সমালোচনাতেই পাওয়া যাবে।

    ছোট একটি বই পাঠকের জানাশোনার কয়েকটা জানলা একসাথে খুলে দিলো। লেখার ধরণে তিনি বঙ্কিমের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল, রসবোধ এবং কবিত্বেও কমতি নেই। বইটা থেকে বেশকিছু জায়গা হয়ত উদ্ধৃতি দেওয়া যেত তবে তার মেধা ও প্রজ্ঞা এবং তার সাথে লেখার স্বচ্ছলতা বোঝাতে নীচে একটু উদ্ধৃতি দিলাম। এখানে ‘পট’-কে আমরা দৃশ্যকল্প বলতে পারি—

    “কোন পটের বন্ধনী কী, তাহা নির্ণয় করা অতি কঠিন; যিনি তাহা করিতে পারেন, তিনিই কবি। তিনিই কেবল একটি কথা বলিয়া পটের সকল অংশ দেখাইতে পারেন, রূপ গন্ধ স্পর্শ সকল অনুভব করাইতে পারেন। অন্য সকলে অক্ষম, তাহারা শত কথা বলিয়াও পটের শতাংশ দেখাইতে পারে না।”

    বন-জঙ্গল, পাহাড়, পশু-পাখি অপরূপ প্রকৃতির এমন বর্ণনা সত্যি মনোমুগ্ধকর, একদম প্রকৃতির কাছে নিয়ে যায়। কোন কিছুই বিস্তারিত বলেন নি কিন্তু ভালোলাগাটুকু দিয়েই পাঠকমনকে আকর্ষণ করতে পেরেছেন লেখক সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

    কিছু কিছু জায়গার লেখকের প্রকৃতির বর্ণনা এবং সেটাকে জীবনের নানান কোণ থেকে মিলিয়ে দেখাতে পারা— রীতিমতো দুর্দান্ত! যেমন, এক জায়গায় রুক্ষ মৃত্তিকাশূন্য পাথরের ফাঁকে বেড়ে উঠা অশ্বত্থগাছ দেখে উনি লিখেছেন,—

    “তখন মনে হইয়াছিল, অশ্বত্থবৃক্ষ বড় রসিক, এই নীরস পাষাণ হইতেও রস গ্রহণ করিতেছে। কিছু কাল পরে আর একদিন এই অশ্বত্থগাছ আমার মনে পড়িয়াছিল, তখন ভাবিয়াছিলাম বৃক্ষটি বড় শোষক, ইহার নিকট নীরস পাষাণেরও নিস্তার নাই। এখন বোধহয় অশ্বত্থগাছটি আপন অবস্থানুরূপ কার্য্য করিতেছে; সকল বৃক্ষই যে বাঙ্গালার রসপূর্ণ কোমল ভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়া বিনা কষ্টে কাল যাপন করিবে, এমত সম্ভব নহে। যাহার ভাগ্যে কঠিন পাষাণ, পাষাণই তাহার অবলম্বন।”

    সাহিত্যরসিকদের মাঝে এই বইকে নিয়ে একধরনের মুগ্ধতার আঁচ টের পাওয়া যায়, বলা হয়ে থাকে, এটা বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ভ্রমণ কাহিনী।

  • ফোরকানুল হকের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা

    ফোরকানুল হকের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা

    মিশরীয় সংবাদপত্র ‘আল উসবু’ ইহুদী নাসারাদের গোপন দলিল সমূহের উদ্ধৃতিতে ফোরকানুল হক লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করেছে, আমি সংক্ষিপ্তাকারে সেই বিষয়ে আলোকপাত করছি—

    1. মুসলমানদেরকে এ বিশ্বাস করানো যে কোরআন মাজীদ আসমানী কিতাব নয় বরং মানব রচিত গ্রন্থ।
    2. পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিসমূহকে একথা বিশ্বাস করানো যে, কোরআন মাজীদ নীতিবাচক দৃষ্টিসম্পন্ন একটি গ্রন্থ যা মানব সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তার বিরোধী। আর ফোরকানুল হক ইতিবাচক দৃষ্টি সম্পন্ন একটি গ্রন্থ যেখানে মানবাধিকার, নারীর অধিকার গণতন্ত্রকে সুস্পষ্ট করা হয়েছে।
    3. পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিসমূহকে একথা বিশ্বাস করানো যে ফোরকানুল হক ভালবাসা, ভাতৃত্ব এবং নিরাপত্বার ধারক বাহক।
    4. পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াকে প্রতিরোধ করা।
    5. ইহুদী নাসারাদের সম্মিলিত সংস্কৃতিকে সমগ্র বিশ্বে বিজয়ী করা।

    এ হল ঐ সমস্ত নিকৃষ্ট উদ্দেশ্য যে উদ্দেশ্য ‘ফোরকানুল হক’ লিখা হয়েছে, এ সমস্ত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গোপন দলীলসমূহে দেয়া বিষয়গুলো নিম্নরূপ—

    1. প্রথমে ফোরকানুল হক ইউরোপ এবং ইসরাঈলে বণ্টন করা হবে এরপর আস্তে আস্তে অন্যান্য দেশসমূহে বণ্টন করা হবে।3
    2. জন্মসূত্রে মুসলমানদেরেকে বাধ্য করা হবে তারা যেন কোরআন মাজীদ পরিত্যাগ করে ফোরকানুল হককে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে, আর যারা তা গ্রহণ করতে না চাইবে তাদের উপর যুলম ও নির্যাতনের সমস্ত পন্থা অবলম্বন করা হবে।
    3. তিন চার বছর পর ইউরোপ, অ্যামেরিকা এবং ইসরাঈলের সেনারা মুসলিম দেশসমূহকে আবরোধ করবে যাতে করে মুসলিম দেশসমূহ ফোরকানুল হকের উপর আমল করতে বাধ্য হয়।
    4. আগামী বিশ বছরে পৃথিবীকে ইসলাম মুক্ত করা হবে, যাতে করে একজন মুসলমান ও এমন না থাকে যার চিন্তা চেতনায় ইসলাম থাকবে।4

    لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَيِّۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٥٦

    অর্থ— ‘আল্লাহ্ই হচ্ছেন মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান, আর যারা অবিশ্বাস করেছে শয়তান তাদের পৃষ্ঠপোষক, সে তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।’ (সূরা আল-বাক্বারা-২৫৬)

  • ফোরকানুল হকের শয়তানি

    ফোরকানুল হকের শয়তানি

    ১. শিরকী দিক—

     ফোরকানুল হকের প্রতিটি সূরার শুরু নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা শুরু হয়েছে। (অর্থ) আমি শুরু করছি বাপের নামে, কালিমার নামে এবং রুহুল কুদুসের নামে যে শুধু একমাত্র ইলাহ। এটাই তত্ত্ববাদের আক্বীদা (বিশ্বাস) যা এত অস্পষ্ট এবং বুঝার অনুপযুক্ত যে, আজও কোন বড় খৃষ্টান আলেমও এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে নাই।

    ২. আল্লাহ্‌র অবমাননা—

     ফোরকানুল হকের বিভিন্ন স্থানে কোর‘আন মাজীদ এবং বিধি-বিধানের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আল্লাহ্ তা’লাকে মারাক্তকভাবে অবমাননা করা হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ এক স্থানে লেখা আছে — (অর্থ) ‘এবং যখন শয়তান বলল, (নাউযুবিল্লাহ্) হে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি তোমাকে আমার রিসালাত এবং ওহীর জন্য সমস্ত লোকদের মধ্য থেকে বাছাই করেছি, অতএব, আমি তোমাকে যা দিচ্ছি সে অনুযায়ী আমল কর, আর আমার নে’মতসমূহকে স্মরণ কর এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ কর। (সূরা আল গারানিক-৯)। উল্লেখ্য সূরা আ’রাফের ১৪৪ নং আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা মূসা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছেন— قَالَ يَٰمُوسَىٰٓ إِنِّي ٱصۡطَفَيۡتُكَ عَلَى ٱلنَّاسِ بِرِسَٰلَٰتِي وَبِكَلَٰمِي فَخُذۡ مَآ ءَاتَيۡتُكَ وَكُن مِّنَ ٱلشَّٰكِرِينَ ١٤٤ — অর্থ, ‘আমি তোমাকেই আমার রিসালাত ও আমার সাথে বাক্যালাপের জন্য লোকদের মধ্যে হতে মনোনীত করেছি, অতএব, এখন আমি তোমাকে যা কিছু দেই তা তুমি গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’

    ৩. নবীগণের অপমান—

     নবীগণের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ, তাদেরকে অবমাননা, তাদেরকে হত্যা করা ইহুদীদের এমন এক অপরাধ যার কথা কোরআন মাজীদে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে, আর এর একটি জীবন্ত উদাহরণ ফোরকানুল হক। যার একটি আয়াত এই— ‘আর যখন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শয়তানের সাথে একাকী হল, তখন বলল, আমি তোমার সাথে আছি, অতএব মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পরিত্যাগ করে শয়তানকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করল।’ (সূরা আল গারানিক-৮)। অন্য এক স্থানে লেখা হয়েছে—‘এক নিরক্ষর কাফের ব্যক্তি (নাউজুবিল্লাহ্) নিরক্ষরদেরকে শিক্ষা দিয়েছে ফলে তাদের অজ্ঞতা এবং মূর্খতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।’ (সূরা আশশাহাদাত-৪)।

    ৪. জিবরীল (আ.) এর অবমাননা—

    কোরআন অবতীর্ণের সময়কাল থেকেই আহলে কিতাব (ইহুদী-নাসারারা) জিবরীল (আ.)-এর দুশমন ছিল। তাদের দাবী হল জিবরীল (আ.) ইসহাকের বংশ ছেড়ে ইসমাঈলের বংশে কেন গেল? তাই তারা ফোরকানুল হকে নিজেদের হিংসা ও বিদ্বেষের কথা এভাবে প্রকাশ করেছে। — ‘মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট মিথ্যা ও চক্রান্তমূলক ওহী করা হয়েছে যা শয়তান তার নিকট নিয়ে এসেছে।’ (সূরাতুল গারানিক-১৫)। এ শয়তানী আয়াতে জিবরীল (আ.)-কে শয়তান (নাউযু বিল্লাহ্) এবং কোরআনুল কারীমকে মিথ্যা এবং চক্রান্ত বলে আক্ষ্যায়িত করা হয়েছে (নাউযু বিল্লাহ্)।

    ৫. জিহাদ হারাম—

     নিঃসন্দেহে জিহাদ শব্দটি আজ সমগ্র বিশ্বে কাফেরদের জন্য জীবন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, জিহাদ কাফেরদের ঘুমকে হারাম করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন ফোরকানুল হক লেখার মূল উদ্দেশ্যই হল মুসলমানদেরকে জিহাদ থেকে নিরুৎসাহিত করা।

    এ সম্পর্কে কিছু ইবলীসী অনর্থক কথাবার্তা দেখুন—‘তারা আমাদের দিকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে যে আমি মুমেনদের কাছ থেকে জান্নাতের বিনিময়ে তাদের জীবন ক্রয় করে নিয়েছি, আর আমার পথে যুদ্ধ করবে, ইঞ্জিলের আলোকে এ অঙ্গিকার পূর্ণ করা আমার দায়িত্ব, সাবধান হও, এ ধরনের অপবাদ দাতারা মিথ্যুক।’ পরে আরো বলা হয়েছে— ‘আমি পাপিষ্ঠদের জীবন ক্রয় করি না, পাপিষ্ঠদের জীবন মারদুদ শয়তান ক্রয় করে।’

    আরো একটি উদাহরণ— ‘তোমরা কি ধারণা করছ যে, আমি বলেছি, আল্লাহ্‌র পথে যুদ্ধ কর আর মুমেনদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত কর5, অথচ আমার পথে কোন যুদ্ধ নেই, আর না আমি মুমেনদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছি। বরং পাপিষ্ঠদেরকে মারদুদ শয়তান যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছে। (নাউযুবিল্লাহ্) (সূরা আল-মাওয়েজা-২)।

    অন্য এক স্থানে লিখেছে— ‘আর বিজয়ী হয়ে গেছে (আহলে কিতাবদের জান্নাত) মুসলমানদের ঐ জান্নাতের উপর যার অঙ্গীকার তাদের সাথে করা হয়েছে এবং যার জন্য তারা আনন্দ এবং সুস্বাদ অনুভব করে, ঐ পথে জীবন দেয়, মূলত সেটা ব্যভিচারী এবং পাপিষ্ঠদের জান্নাত। (সূরা রূহ-৩)।

    ৬. গণীমতের মালের নিন্দা—

    জেহাদের মাধ্যমে অর্জিত গণিমতের মালের বিষয়টিও কাফেরদের জন্য বেদনাদায়ক, এটাকে তারা কোথাও ডাকাতি, কোথাও চুরি, কোথাও লুট, কোথাও জুলম বলে আখ্যায়িত করেছে। শুধু একটি উদাহরণ দেখুন— ‘আর তোমাদেরকে বলা হয়েছে যারা আল্লাহ্ প্রতি ঈমান রাখে না তাদের সাথে যুদ্ধ কর, আর গণিমতের মাল হিসেবে যা পাও তা ভক্ষণ কর, তা হালাল এবং পবিত্র, এটা জালেমদের কথা।’ (নাউজুবিল্লাহ্) (সূরা আল- আতা-৭)।

    ৭. কোরআন মাজীদের অবমাননা—

    ইহুদী নাসারারা মৌখিক এবং লিখিত কোন পন্থা অবলম্বন করতে কোন প্রকার ত্রুটি করে নি, ফোরকানুল হকের ইবলিসী কথা বার্তা তার মুখ দিয়ে বের হয়েছে বলে এক স্থানে প্রমাণিত হয়েছে, তাই সে একস্থানে লিখেছে— ‘হে লোকেরা! তোমাদের নিকট শয়তানের পথভ্রষ্টমূলক আয়াত পড়ে শোনানো হচ্ছে, যাতে করে সে তোমাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে, অতএব, তোমরা শয়তানের নিদের্শ অনুসরণ করবে না এবং তাকে তোমাদের নিকৃষ্ট দুশমন হিসেবে জান।’ (সূরা আল-আতা-১৫)

    ৮. কোরআন মাজীদে পরিবর্তন—

    আহলে কিতাবদের মধ্যে আসমানী কিতাবসমূহে পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক অপরাধ পরায়ণতা আছে। তাওরাত এবং ইঞ্জিলের পর কোরআন মাজীদে তারা নিকৃষ্টতম পরিবর্তনের অপরাধে লিপ্ত হয়েছে, শাব্দিক পরিবর্তনে উদাহরণ তো পাঠ করা ইতিপূর্বে দেখেছেন, আর বিধি-বিধানে পরিবর্তনের একটি উদাহরণ আমরা এখানে পেশ করলাম— ‘তোমরা আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছ যে, আমি নিষিদ্ধ মাসসমূহে যুদ্ধ হারাম করেছি, আমি যা হারাম করেছিলাম তা আমি রহিত করে দিয়েছি, অতএব, এখন আমি হারাম মাসসমূহে বড় যুদ্ধ করা হালাল করে দিয়েছি।’ (সূরা আস্‌সালাম-১১)

    ৯. মুসলমানদের সাথে শত্রুতা—

    ফোরকানুল হকে মুসলমানদেরকে কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে পথভ্রষ্ট লোকেরা’ (সূরা আস্সালাম-১); আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে কাফেররা’ (সূরা তাওহীদ)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে মুনাফেকরা’ (সূরা মাসীহ্-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে মোশরেকরা’ (সূরা সালুস-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে অপরাধীরা’ (সূরা আল মাওয়েজা-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে মিথ্যা আরোপকারীরা’ (সূরা আল ইফক-১৭)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে অজ্ঞ লোকেরা’ (সূরা আল খাতাম-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে পরিবর্তনকারীরা’ (সূরা আল আসাতীর-১)।

    আর আহলে কিতাবদেরকে সর্বত্র — ‘হে ঈমানদাররা।’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে, কোরআ’ন মাজীদে যেভাবে বানী ইসরাঈলদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এমনিভাবে ফোরকানুল হকে মুসলমানদের উপর অসংখ্য অপবাদ দেয়া হয়েছে, আর যে, বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা হল এই যে, মুসলমানরা হত্যাকারী, ডাকাত, চোর, সন্ত্রাসী এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী। কিছু উদাহরণ নিচে পেশ করা হল—

    ক) ‘তোমরা গীর্জা এবং উপসানালয়সমূহ বিনষ্ট করেছ, যেখানে আমার নাম স্মরণ করা হত, আর তোমরা আমাদের ঐ মোমেন বান্দাদের উপসানালয়সমূহ বিনষ্ট করেছ যারা তোমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করেছে, তোমাদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছে, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করেছ, অতএব, তোমরা যুলুমকারী।’ (সূরা আল আসাত্বীর-৪)।

    খ) ‘তোমরা বলেছ, দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই, কিন্তু আমার মুমেন বান্দাদের উপর কুফরী চাপিয়ে দেয়ার জন্য জবরদস্তি করছ, যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে সে নিরাপত্তা লাভ করেছে, আর যে ব্যক্তি সত্য দ্বীনের উপর অটল ছিল তাকে পাপিষ্ঠদের ন্যায় হত্যা করা হয়েছে।’ (সূরাতুল মূলুক-১)

    গ) ‘তোমাদের কর্ম পদ্ধতি, কুফরী করা, শিরক করা, ব্যভিচার করা, যুদ্ধ করা, হত্যা করা, লুটপাট করা, নারীদেরকে বন্দী করা, অজ্ঞতা এবং নাফরমানী করা।’ (সূরা আল কাবায়ের- ৩, পৃ. ২৪৯)।

    উল্লেখিত ইবলিসী কথাবার্তাসমূহে যেভাবে মুসলমানদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করা হয়েছে ফোরকানুল হকের অধিকাংশ অংশে এ ধরনের ইবলিসী কথাবার্তায় ভরপুর।

    ১০. সত্য গোপন করা—

    আহলে কিতাবদের অপরাধসমূহের মধ্যে একটি অপরাধ হল সত্য গোপন করা, ফোরকানুল হকেও এ উদাহরণ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। একটি উদাহরণ —

    সূরা নিসার মধ্যে আল্লাহ্ তা’লা এরশাদ করেছেন—

     وَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تُقۡسِطُواْ فِي ٱلۡيَتَٰمَىٰ فَٱنكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ مَثۡنَىٰ وَثُلَٰثَ وَرُبَٰعَۖ فَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تَعۡدِلُواْ فَوَٰحِدَةً أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡۚ ذَٰلِكَ أَدۡنَىٰٓ أَلَّا تَعُولُواْ ٣

     অর্থ— ‘তবে নারীদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দু’টি, তিনটি ও চারটি বিয়ে করো। কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে ন্যায় বিচার করতে পারবে না তবে মাত্র একটি অথবা তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যার অধিকারী (ক্রীতদাসীকে বিয়ে করো) এটা অবিচার না করার নিকটবর্তী।’ (সূরা নিসা-৩)।

    ফোরকানুল হকের লেখক কোরআন মাজীদের এ আয়াতটিকে এভাবে লিখেছে— ‘তোমরা বিয়ে কর দু’টি, তিনটি, চারটি, অথবা ক্রীতদাসীদেরকে।’

    ‘যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে ন্যায় বিচার করতে পারবে না’— এই অংশটুকু বাদ দিয়েছে।

    যেখানে একাধিক বিয়ের জন্য অপরিহার্য শর্ত ‘ন্যায় বিচার’ এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ন্যায় বিচার ব্যতীত দুই বা তিন বা চার বিয়ের কথা উল্লেখ করে তারা বুঝাল যে, মুসলমানদের শরীয়ত একটি অবিচার মূলক শরীয়ত।

    ১১. ভালবাসা এবং নিরাপত্তার চক্রান্ত—

    ফোরকানুল হকে ইহুদী নাসারাদেরকে ‘হে ঈমানদাররা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।6 আর ফোরকানুল হকের দিকনির্দেশনাকে ‘সত্য দীন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।7 এবং বিভিন্ন স্থানে এ দাবী করা হয়েছে যে, ইহুদী নাসারারা ভালবাসা, ন্যায় বিচার, শান্তি ও নিরাপত্তার ধারক ও বাহাক। যেমন— ‘হে মানবমণ্ডলী! আমি ভালবাসা, দয়া, অনুগ্রহ, ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তার নির্দেশ দিয়ে থাকি।’ (সূরা আল কতল-৩)। অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয় দ্বীনে হকই ভালবাসা, ভাতৃত্ব, দয়া ও শান্তির দ্বীন।’ (সূরা আল আজহা-৫)।

    ভালবাসা, ভাতৃত্ব, দয়া ও শান্তিরধারকেরা আফগানিস্তান ও ইরাকে সাধারণ জনতার উপর যে ভালবাসা, ভাতৃত্ব, দয়া ও নিরাপত্তার সাথে যেমন আক্রমণ করেছে বা আফগানিস্তান ও ইরাকের জেলসমূহ এবং কিউবার বন্দীশলায় মুসলমান বন্দীদের সাথে যে ভালবাসা, ভাতৃত্ব ও নিরাপত্তামূলক আচরণ করা হচ্ছে তা সমগ্র বিশ্ব অবলোকন করছে।

    ১২. ফোরকানুল হকের সাম্প্রদায়িকতা

    সমগ্র পৃথিবীর সামনে আজ আলোকিত চিন্তা, নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতার বড়াইকারী ‘উন্নত বিশ্ব’ ভিতরে ভিতরে কতটা দলীয় গোঁড়ামীর অন্ধত্ব এবং উন্মাদনায় মত্ত। তার অনুমান ফোরকানুল হকের এ দু’টি লাইন থেকে অনুমান করুন— এক. ‘সত্য ইঞ্জিল এবং সত্য ফোরকানুল হকই সত্য দ্বীন, আর যে ব্যক্তি এ দ্বীন ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন অন্বেষণ করবে তা তার কাছ থেকে কখনো গ্রহণ করা হবে না।’ (সূরা আল জুযিয়াহ-১৩)। দুই. ‘আমি সত্য দ্বীনের কথা স্মরণ করানোর জন্য ফোরকানুল হক অবতীর্ণ করেছি, যা সত্য ইঞ্জিলের সত্যায়নকারী, যাতে করে তাকে অন্যান্য সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করতে পারি, যদিও কাফেররা (মুসলমানরা) তা অপছন্দ করে।’ (সূরা আর আযহা-৬)।

    দ্বিতীয় আয়াত থেকে শুধু এ কথাই প্রমাণিত হয় না যে, ইহুদী নাসারারা তাদের দলীয় ব্যাপারে কত গোঁড়ামী এবং উন্মাদনায় মত্ত আছে, বরং এ কথাও বুঝা যায় যে, তারা সর্বশক্তি প্রয়োগে ইসলামকে পরাজিত এবং ইহুদী ও নাসারাদেরক বিজয়ী করার দৃঢ় প্রত্যয়ী।

    এখন ফোরকানুল হকের আলোকিত চিন্তাসম্পন্ন কিছু দিক নিদের্শনার উল্লেখ এখানে করতে চাই যাতে পাঠকরা বুঝতে পারে যে বর্তমান যুগের আলোকিত চিন্তার মূল উৎস কোথায়?

    ক) পর্দা নারীজাতির জন্য একটি লাঞ্ছনা এবং অবমাননা— ‘আল মাহদী’ ফোরকানুল হকে লিখেছে— ‘তোমরা তোমাদের নারীদের মাঝে এ বলে প্রচ্ছন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছ যে, যখন কেউ কোন প্রশ্ন করবে তখন পর্দার আড়াল থেকে প্রশ্ন করবে, আর এটা আমার সৃষ্টিকে লাঞ্ছনা এবং অবমাননা করা।’ (সূরা নিসা-১০)।

    খ) নারীদেরকে ঘরে বসিয়ে রাখা অবিচার— ঐ সূরায় পরবর্তীতে লিখা হয়েছে— ‘তোমরা নারীদেরকে তোমাদের একথা দিয়ে বন্দী করে রেখেছ যে,“তোমরা তোমাদের ঘরে থাক” সতর্ক হও ঘরে বসে থাকার নিদের্শ নিকৃষ্ট নিদের্শ, যা জালেমরা দিয়েছে।’ (সূরা নিসা-১১)।

    গ) পুরুষদেরকে শাসক নির্ধারণ করা জান্তব এবং হিংস্রতা— ‘তোমরা বল যে পুরুষ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, আর যে সমস্ত নারীদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদেরকে উপদেশ দাও, তাদেরকে বিছানা থেকে পৃথক করে দাও, তাদেরকে প্রহার কর, তাহলে মানুষ, বন্য পশু, হিংস্র প্রাণী এবং চতুষ্পদ জন্তুর মাঝে পার্থক্য কি থাকল?’ (সূরা নিসা-৪)।

    ঘ) উত্তরাধিকারে নারীকে অর্ধেক সম্পদ দেয়া, দুইজন নারীর সাক্ষীকে একজন পুরুষের সাক্ষীর সমান নির্ধারণ করা সম্পর্কে— ‘তোমাদের শরীয়তে নারী পূরুষের অর্ধেক সম্পদ পায়, কেননা (কোরআনে বলা হয়েছে) পুরুষ নারীর দ্বিগুণ সম্পদ পাবে, তোমাদের শরীয়তে নারীর সাক্ষীও পুরুষের অর্ধেক, কেননা (কোরআনে বলা হয়েছে) যদি দু’জন পুরুষ সাক্ষী না পাওয়া যায় তাহলে দু’জন নারী এবং একজন পুরুষ সাক্ষ্য দিবে, তাহলে নারীর উপর পুরুষের একগুণ মর্যাদা বেশি, আর এটা জালেমদের ন্যায় বিচার।’

    ঙ) ত্বালাক হারাম— ‘আর আমি বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি ত্বালাক এবং ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হবে না।’ (সূরা আতুহুর-৯)।

    চ) ত্বালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ে করা ব্যভিচার এবং কুফর— ‘যে ব্যক্তি কোন তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে বিয়ে করল সে ব্যভিচার করল, আর তার এ কাজটি কুফরী এবং পাপ কাজ।’ (সূরা আত্বালাক-৩)।

    ছ) একাধিক বিয়ে ব্যভিচার— ‘তোমরা বলেছ যে বিয়ে করো ঐ সমস্ত নারীদেরকে যাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয়, দুই, তিন, চারটি পর্যন্ত, অথবা ঐ সমস্ত কৃতদাসীদেরকে যারা তোমাদের অধীনস্ত। একথা বলে তোমরা বর্বরতার অভ্যাস ব্যভিচারের অবর্জনা এবং পাপের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছ, তাই তোমরা পবিত্র হতে পারবে না।’ (সূরা আল মিযান-৯)

    জ) নারী পুরুষের পার্থক্য পূর্ণ অধিকারের দুর্নাম— ফোরকানুল হকের ইবলিসী কথাবার্তাসমূহে শুধু বিয়েকে গোলামী হিসেবেই দেখায়নি বরং নারী পুরুষের পার্থক্য পূর্ণ অধিকারকে সরাসরি যুলুম হিসেবেও পেশ করা হয়েছে, যেহেতু পুরুষরা চার জন স্ত্রী রাখতে পারবে তাহলে নারী কেন চার জন স্বামী রাখতে পারবে না।

    ‘তোমরা নারীদেরকে তোমাদের যৌনকামনা পূরণের মাধ্যম করে রেখেছ। তোমরা যেভাবে খুশি সেভাবে তাকে চাও, কিন্তু নারী তোমাদেরকে যেভাবে খুশী সেভাবে চাইতে পারে না। তোমরা নারীকে যখন খুশী তখন ত্বালাক দিতে পার, অথচ তারা তোমাদেরকে ত্বালাক দিতে পারে না। তোমরা তাদেরকে ভিন্ন করে রাখতে পার, কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভিন্ন করে রাখতে পারবে না। তোমরা তাদেরকে প্রহার করতে পার, কিন্তু তারা তোমাদেরকে মারতে পারবে না। তোমরা একজন নারীর সাথে দু’জন, তিন জন, চার জন বা একজন কৃতদাসী রাখতে পার, কিন্তু তারা দ্বিতীয় স্বামী রাখতে পারে না। তোমরা তাদের উপর কর্তৃত্বশীল, কিন্তু তারা তোমাদের উপর কর্তৃত্বশীল নয়, এমন কি তারা তাদের নিজেদের কোন বিষয়েও ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।’ (সূরা নিসা ৮, ৯)।

    ঝ) খুনের বদলা খুন একটি ধ্বংসাত্বক কাজ— কোরআন মাজীদে আল্লাহ্ তা’লা বলেছে—

    وَلَكُمۡ فِي ٱلۡقِصَاصِ حَيَوٰةٞ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٧٩

    অর্থ— ‘হে জ্ঞানবান লোকেরা! (কেসাসের মধ্যে) প্রতিশোধ গ্রহণে তোমাদের জন্য জীবন আছে।’ (সূরা আল বাকারা-১৭৯)।

    এর অর্থ হল এই যে, হত্যাকারীকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করতে হবে, অথচ পাশ্চাত্যে কেসাসের (হত্যার বিনিময়ে হত্যাকারীকে হত্যা করা) বিধান না থাকায় আলোকিত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে ফোরকানুল হকের লেখক লিখেছে— ‘আমি তোমাদেরকে কেসাসের (হত্যার বিনিময়ে হত্যা করার নিদের্শ) দেই নি, হে জ্ঞানী ব্যক্তিরা তোমাদের জন্য কেসাসে (হত্যার বিনিময়ে হত্যার মধ্যে) রয়েছে ধ্বংস ও বরবাদ।’ (সূরা আল মোহতাদীন -৭)।

    ফোরকানুল হকের ইবলিসী কথাবর্তা পড়ার পর এ অনুমান করা দুষ্কর নয় যে, মূলত ইহুদী নাসারারাদের অন্তরে কোরআন মাজীদের বিরুদ্ধে সুপ্ত হিংসা বিদ্বেষ গ্রন্থাকারে বের হয়েছে।

    সমস্ত ইবলিসী কথাবার্তা সম্পর্কে আমরা পাঠকদেরকে যেদিকে দৃষ্টি ফেরাতে চাই তা হলো এই যে, আল্লাহ্ তা’লাকে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিবরীল (আ.)-কে (নাউজুবিল্লাহ্ আবারও নাউজুবিল্লাহ্) বার বার শয়তান বলে আখ্যাকারী ইহুদী নাসারা কি মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে? (নাউজু বিল্লাহ্) কোরআন মাজীদেকে শয়তানের আয়াত হিসেবে উল্লেখকারী অভিশপ্ত ইহুদী নাসারারা কি মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে? ফোরকানুল হকের শয়তানী আয়াতসমূহ বিশ্বাসকারী ইহুদী নাসারা এবং কোরআন মাজীদে আল্লাহ্‌র অবতীর্ণ আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাসকারী মুসলমানদের উদ্দেশ্য কি এক হতে পারে? সূর্য আলোহীন হতে পারে, চাঁদ টুকরা টুকরা হতে পারে, আকাশ বিদীর্ণ হতে পারে, পৃথিবী ফাটতে পারে কিন্তু মুসলমান এবং কাফেরদের মাঝে বন্ধুত্ব হতে পারে না।

    উল্লেখ্য, ইহুদী নাসারাদের মুসলমানদের সাথে দুশমনির বিষয়টি প্রাকশিত এ কয়েকটি আয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আরো বিস্তৃত।

  • ফোরকানুল হকের ফেতনা

    ফোরকানুল হকের ফেতনা

    কাফের মোশরেকদের কোরআনের সাথে দুশমনী এখন কোন গোপন বিষয় নয়, আর সময় অতিক্রমের সাথে সাথে এ দুশমনী আরো বৃদ্ধি পেতে থাকবে। নিকট অতীত এবং বর্তমানের মোশরেক ও ইহুদী-নাসারাদের কোরআনের সাথে দুশমনীর কিছু উদাহরণ নিচে পেশ করা হল:

    1. বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম ই গালডিসটোন সংসদে এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন মুসলমানদের হাতে, বা তাদের অন্তরে বা মাথায় থাকবে, ততক্ষণ ইউরোপ মুসলিম দেশসমূহে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, আর যদি প্রতিষ্ঠিত করেও তাহলে তা স্থায়ী করতে সফল হবে না। এমনকি ইউরোপ নিজে টিকে থাকাও নিরাপদ হবে না।7
    2. ১৯০৮ খৃষ্টাব্দে বৃটেনের মন্ত্রী নোআবাদিয়াত এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানদের নিকট কোরআন মাজীদ থাকবে, ততক্ষণ তারা আমাদের পথ আগলে থাকবে, আমাদের উচিত কোরআনকে তাদের জীবন থেকে দূর করে দেয়া।8
    3. অবিভক্ত ভারতের ইউপির গভর্ণর স্যার উইলিয়াম মিউর কোরআন মাজীদ সম্পর্কে তার কুমনোভাবকে এভাবে প্রকাশ করেছে যে, দু’টি জিনিস মানবতার দুশমন, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তলোয়ার এবং মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোরআন।9
    4. আলজিরিয়ার উপর ফ্রান্সের উপনিবেশিক শাসনের শত বছর পূর্তিতে ফ্রান্সের রাষ্ট্রনায়ক তার এক বক্তব্য বলেছে, মুসলমানদের রাত দিন থেকে কোরআন বের করা এবং আরবী ভাষার সাথে তাদের সম্পর্ক নষ্ট করা জরুরী। যাতে করে আমরা সহজে তাদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারি।10
    5. ১৯৮৪ খৃষ্টাব্দে ভারতে হিন্দুরা নিয়মিত একটি আন্দোলন শুরু করেছে যে, হয় কোরআন ছাড় না হয় ভারত ছাড়। ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে কলকাতার একটি আদালতে হিন্দুরা মামলা করেছে যে, কোরআন মাজীদের উপর নিয়মানুবির্তিতা আরোপ করতে হবে।11
    6. নেদারল্যান্ডের এক ফ্লিম নিৰ্মাতা ‘এত্বায়াত’ নামে একটি ফ্লিম তৈরী করে, সেখানে একজন পতিতার পেটে সূরা নূরের এ আয়াতটি লিখে দিয়েছে— ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي فَٱجۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ وَلَا تَأۡخُذۡكُم بِهِمَا رَأۡفَةٞ فِي دِينِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۖ وَلۡيَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَةٞ مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٢ — অর্থ: ‘ব্যভিচারী ব্যভিচারিণী তাদের প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাত করবে, আল্লাহ্‌র বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং পরকালে বিশ্বাসী হও, মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা নূর – ২)। এর সাথে একজনের পিঠে বেত্রাঘাতের জখম অবস্থায় দেখানো হয়েছে, এ ফ্লিমের মূল উদ্দেশ্য হল এই যে, ইসলামের এ শাস্তি একটি অবিচার, জুল্‌ম।
    7. বর্তমান সময়েও অ্যামেরিকান এক বুদ্ধিজীবী ওয়াশিংটন টাইমে কোরআন মাজীদ সম্পর্কে তার কুমনোভাব এভাবে প্রকাশ করেছে যে, মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদীতার মূল হল স্বয়ং কোরআন মাজীদের শিক্ষা। একথা বলা ঠিক নয় যে, মুসলমানদের মধ্যে একজন সন্ত্রাসী এবং অল্প সংখ্যক উচ্চাভিলাষী সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদেরকে বন্দী করে রেখেছে। বরং মূল বিষয়টি কোরআনী শিক্ষার ফল। এ সমস্যার সমাধান এটাই যে, মধ্যমপন্থী মুসলমানদেরকে কোরআন মাজীদের শিক্ষা পরিবর্তন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা।12
    8. ৭ জুলাই ২০০৫ খৃষ্টাব্দে লণ্ডনে ঘটে যাওয়া বোমাবাজীর উপর কথা বলতে গিয়ে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, ইসলামী সন্ত্রসীরা ইরাকে ক্ষমতা দখলের জন্য পাশ্চাত্য পরিকল্পনার পরিবর্তে শয়তানী দর্শন এ হামলায় উদ্বুদ্ধ করেছে। (হে আল্লাহ্ তুমি তাদের উপর অভিসম্পাত কর)।13
    9. ইটালীর প্রসিদ্ধ সাংবাদিক খাতুন এবং ইয়ানা ফালাসী এ বক্তব্য রেখেছে যে, মুসলমানদের পবিত্র কিতাব কোরআন, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না; একথা বলা ভুল হবে যে সন্ত্রাসী অল্প কিছু মুসলমান বরং সমস্ত মুসলমানই এ চেতনা রাখে।14

    কোরআনের সাথে দুশমনির এ কথাগুলোতো কাফের নেতাদের মুখ দিয়ে বের হয়েছে কিন্তু যে দুশমনী তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে তা আরো মারাত্বক।

    يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ بِطَانَةٗ مِّن دُونِكُمۡ لَا يَأۡلُونَكُمۡ خَبَالٗا وَدُّواْ مَا عَنِتُّمۡ قَدۡ بَدَتِ ٱلۡبَغۡضَآءُ مِنۡ أَفۡوَٰهِهِمۡ وَمَا تُخۡفِي صُدُورُهُمۡ أَكۡبَرُۚ قَدۡ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ ١١٨

    অর্থ, ‘তাদের মুখ থেকেই শত্রুতা প্রকাশিত হয় আর তাদের মনে যা গোপন রাখে তা গুরুতর। (সূরা আল ইমরান-১১৮)।

    নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে কোরআন মাজীদের বিরুদ্ধে প্রচার প্রোপাগাণ্ডার ক্ষেত্রে কাফেরদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, এ কোরআন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নাযিলকৃত নয় বরং মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই তা রচনা করেছে। আজও কাফেরদের মূল লক্ষ্য এ বিষয়েই যে, এ কোরআন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজস্ব রচনা বলে প্রমাণ করা, যাতে করে ইসলামের সবকিছু নিজে নিজেই নষ্ট হয়ে যায়।

    এ উদ্দেশে কোরআন মাজীদে বার বার পরিবর্তন করার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে, প্রথমে আরবী ভাষায় পরিবর্তনকৃত কোরআন প্রকাশ করা হয়েছে, এর পর হিব্রু ভাষায় পরিবর্তন কৃত কোরআন প্রকাশ করা হয়েছে, ইহুদী নাসারাদের এই কামনাকে নস্যাত করার জন্য সাউদী আরব সরকার আজ থেকে ২১ বছর আগে ১৪০৫ হিজরী বাদশাহ ফাহাদ কোরআন একাডেমী নামে একটি বিরাট প্রকল্প স্থাপন করেছে, যা প্রতি বছর তিন কোটি কোরআন মাজীদ ছেপে সমগ্র বিশ্বে ফ্রি বণ্টন করার সুভাগ্য লাভ করেছে।15 এই বাদশাহ্ ফাহাদ কোরআন একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইহুদী নাসারাদের উদ্দেশ্য ধূলোলুণ্ঠিত হল।

    ইহুদী নাসারারা তাদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জন্য এখন একটি নুতন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, আজ থেকে মোটামুটি দশ বছর পূর্বে (৯/১১ ঘটনার পাঁচ ছয় বছর পূর্বে দু’জন ফিলিস্তিনী ইহুদী আল-মাহদী এবং সাফী আরবী ভাষায় কোরআন মাজীদের আদলে একটি কিতাব রচনা করে, তার নামসমূহ কোরআন মাজীদের সূরাসমূহের নামের অনুরূপ করে রাখা হয়েছে, যেমন— সূরা ফাতেহা, সূরা সালাম, সূরা নূর, সূরাতুল ঈমান, সূরাতুত তাওহীদ, সূরাতুল মাসীহ, সূরাতুন নিসা, সূরাতুন নিকাহ, সূরাতু তালাক, সূরাতুস সিয়াম, সূরাতুস্ সালা ইতাদি। এ সূরাসমূহে কোরআন মাজীদের সূরাসমূহের আদলে ছোট ছোট আয়াত লিখা হয়েছে, ৯০% শব্দ এবং বাক্য কোরআন মাজীদ থেকে নেয়া হয়েছে। কিতাবটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ফোরকানুল হক’। প্রথম প্রকাশনায় আরবী এবং ইংরেজী ভাষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, প্রতি পৃষ্ঠার অর্ধেক আরবী আর অর্ধেক ইংরেজী অনুবাদ। ১৫×20 সে. মি. আকারে ৩৬৬ পৃ.। কিতাবটি অ্যামেরিকান ইহুদী কোম্পানী “project omega 2001”, এবং “Wise press” প্রকাশ করেছে, যার বিক্রয় মূল্য ১৯.৯৯ ডলার। প্রকাশকের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, এটা ফোরকানুল হকের প্রথম পারা এরপর আরো ১১ পারা প্রকাশিত হবে, ফোরকানুল হকের এ সংক্ষিপ্ত পরিচিতির পর আমরা তার বিভিন্ন দিক নিয়ে কিছু আলোকপাত করতে চাই।

    ফোরকানুল হকের বিভিন্ন দিক

     ফোরকানুল হকের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করার আগে এ বিষয়টি বর্ণনা করা জরুরী যে, ফোরকানুল হককে আল্লাহ্ পক্ষ থেকে ওহীকৃত কিতাবের আদলে পেশ করা হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ, এক স্থানে লিখা হয়েছে— ‘আমি এই ফোরকানুল হকেকে ওহী হিসেবে অবতীর্ণ করেছি। (সূরাতুত তানযিল-৪)।

    অপর এক স্থানে লিখা হয়েছে— ‘ফোরকানুল হককে আমি অবতীর্ণ করেছে যাতে করে পথভ্রষ্টদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথে নিয়ে আসি।’ (সূরা মাসীহ্-৬)।

    উল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে ফোরকানুল হকের লেখকদের নিম্নোক্ত দাবীসমূহ প্রমাণিত হচ্ছে, চাই তারা তা বাস্তবে করে থাকুক আর নাই করুক—

    1. বক্তা আল্লাহ্ নবী।
    2. জীবরীল ওহী নিয়ে তার নিকট আসে।
    3. ফোরকানুল হকে যা কিছু লিখা হয়েছে তা সবই আল্লাহ্ পক্ষ থেকে।

    কোরআন মাজীদের আলোকে এ তিনটি দাবীর বিধান এ রকম—

    وَمَنۡ أَظۡلَمُ مِمَّنِ ٱفۡتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوۡ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمۡ يُوحَ إِلَيۡهِ شَيۡءٞ وَمَن قَالَ سَأُنزِلُ مِثۡلَ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُۗ وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذِ ٱلظَّٰلِمُونَ فِي غَمَرَٰتِ ٱلۡمَوۡتِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ بَاسِطُوٓاْ أَيۡدِيهِمۡ أَخۡرِجُوٓاْ أَنفُسَكُمُۖ ٱلۡيَوۡمَ تُجۡزَوۡنَ عَذَابَ ٱلۡهُونِ بِمَا كُنتُمۡ تَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ غَيۡرَ ٱلۡحَقِّ وَكُنتُمۡ عَنۡ ءَايَٰتِهِۦ تَسۡتَكۡبِرُونَ ٩٣

    অর্থ, ‘আর ঐ ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম কে হতে পারে যে আল্লাহ্‌র প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে? অথবা এরূপ বলে, আমার উপর ওহী নাযিল করা হয়েছে অথচ প্রকৃত পক্ষে তার উপর কোন ওহী নাযিল করা হয় নি। (সূরা আন‘আম-৯৩)।

    অতএব,ফোরকানুল হকে যা কিছু লিখা হয়েছে তা পরিষ্কার মিথ্যা, অপবাদ এবং বাতেল। এ সমস্ত ইবলিসী কথাবার্তা এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল এই যে, হয়তবা এর মাধ্যমে ইহুদী নাসারাদেরকে নিজেদের বন্ধু এবং সমমনের বলে বিশ্বাসকারীদের চোখ খুলে যাবে এবং তাদের অনুভূতি হবে যে, যারা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের দুশমন তারা কখনো মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না?

  • কোরআন মাজীদের চেলেঞ্জ কি?

    কোরআন মাজীদের চেলেঞ্জ কি?

    কোর’আন মাজীদ সম্পর্কে কাফেরদের দাবী ছিল এই যে, এটা আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত কিতাব নয়, বরং মোহাম্মদের নিজস্ব আবিষ্কার। আল্লাহ্ তা’লা কোরআন মাজীদে এর উত্তর দিয়েছেন যে, যদি কোর’আন মাজীদ মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজস্ব আবিষ্কার হয় তাহলে তার অনুরূপ একটি সূরা বা একটি কথা তোমরাও আবিষ্কার করে দেখাও। আল্লাহ্‌র বাণী—

    أَمۡ يَقُولُونَ ٱفۡتَرَىٰهُۖ قُلۡ فَأۡتُواْ بِعَشۡرِ سُوَرٖ مِّثۡلِهِۦ مُفۡتَرَيَٰتٖ وَٱدۡعُواْ مَنِ ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ١٣

    অর্থ: ‘তবে কি তারা বলে যে, ওটা সে নিজেই রচনা করেছে? তুমি বলে দাও, তাহলে তোমরাও ওর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা আনয়ন কর, আর যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে (তোমাদের সাহায্যার্থে) আল্লাহ্ ব্যতীত যাদেরকে ডাকতে পার তাদেরকে ডেকে আন।’ (সূরা হুদ-১৩)।

    দশটি সূরার পর আল্লাহ্ একটি সূরারও চেলেঞ্জ দিয়েছেন, আল্লাহ্ বাণী—

    وَإِن كُنتُمۡ فِي رَيۡبٖ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا فَأۡتُواْ بِسُورَةٖ مِّن مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُواْ شُهَدَآءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٢٣

    অর্থ: ‘এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, যদি তোমরা তাতে সন্দিহান হও তবে তার অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের সাহায্যকারীদেরকে ডেকে নাও যদি তোমরা সত্য বাদী হও।’ (সূরা বাকারা-২৩)।

    একটি সূরার পর আল্লাহ্ একটি আয়াতের চেলেঞ্জও দিয়েছেন, যে একটি সূরা তো অনেক দূরের কথা তোমরা এর অনুরূপ একটি আয়াতও তৈরী করতে পারবে না। আল্লাহ্‌র বাণী—

    أَمۡ يَقُولُونَ تَقَوَّلَهُۥۚ بَل لَّا يُؤۡمِنُونَ ٣٣ فَلۡيَأۡتُواْ بِحَدِيثٖ مِّثۡلِهِۦٓ إِن كَانُواْ صَٰدِقِينَ ٣٤

     অর্থ: ‘তারা কি বলে, এ কোর’আন তাঁর নিজের রচনা? বরং তারা অবিশ্বাসী। তারা যদি সত্যবাদী হয় তাহলে এর অনুরূপ কোন রচনা উপস্থিত করুক না।’ (সূরা তূর-৩৩, ৩৪)

    সূরা বানী ইসরাইলে আল্লাহ্ এত কঠোর চেলেঞ্জ করেছেন যা অন্য আর কোথাও করেন নি। আল্লাহ্‌র বাণী—

    قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨

    অর্থ: ‘হে মোহাম্মদ! তুমি বলে দাও যদি এই কোর’আনের অনুরূপ কোর’আন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কোর’আন আনয়ন করতে পারবে না।’ (সূরা বনী ইসরাইল-৮৮)

    প্রশ্ন হল এই যে, গত ১৪ শত বছর থেকে আরব এবং অনারবে বিদ্ধমান কোর’আন মাজীদের ঘোর-দুশমনদের কেউ এ চেলেঞ্জ গ্রহণ করেনি।

    বাস্তবতা হল এই যে, কিছু উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় লিখিত হয়েছে। ইসলামের শত্রুদের কেউ কেউ কোর’আনের সাথে মিল রেখে সূরা তৈরীর চেষ্টা করেছে। যেমন—

    1. মুসাইলাম কাজ্জাব রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগেই নবুয়তের দাবী করেছিল এবং বলেছিল যে আমার উপর ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, প্রমাণ হিসেবে নিম্নের সূরাটি পেশ করেছিল। যার অর্থ, হে ঘেনর ঘেনরকারী ব্যাঙ তুমি যতই ঘেনর ঘেনর কর তুমি কাউকে পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারবে না, আর না পানিকে নোংরা করতে পারবে।
    2. মুসাইলামা কাজ্জাবের দাবী কৃত আরেকটি সূরার অর্থ— হাতী, হাতী কি? তুমি কি জান হাতী কি? তার লেজটি ছোট আর শুঁড়টি বড়।
    3. শিয়াদের একটি দলের দাবী সূরা ‘বেলায়েত’ কোর’আন মাজীদের অন্তর্ভুক্ত— অর্থ, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম, হে লোকেরা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ, তোমরা ঈমান আন নবী এবং তাঁর ওলী প্রতি, যাকে আমি প্রেরণ করেছি, তারা উভয়ে তোমাদেরকে সঠিক পথের প্রতি আহ্বান করে। নবী এবং ওলী (নবীর বন্ধু) একে অপরের পরিপূরক, আর আমি সবকিছু জানি এবং সবকিছু সম্পর্কে অবগত। নিশ্চয় যারা আল্লাহ্‌র অঙ্গিকার পূর্ণ করে, তাদের জন্য রয়েছে নে’মত ভরপূর জান্নাত, আর যারা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে আমার আয়াতসমূহকে যখন তা তাদের নিকট তেলওয়াত করা হয়, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামে বেদনাদায়ক স্থান। যখন কিয়ামতের দিন তাদেরকে ডাকা হবে যে কোথায় জালেম এবং রাসূলগণকে মিথ্যায় প্রতিপন্নকারীরা, তিনি রাসূলদেরকে সত্য সহকারে সৃষ্টি করেছেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদেরকে বিজয়ী করবেন। আর স্বীয় রবের তাসবীহ পাঠ কর তাঁর প্রশংসা সহ, আর আলী সাক্ষী দাতাদের অন্তর্ভুক্ত।9
    4. ১৯৯৯ খৃষ্টাব্দে ফিলিস্তিনের একজন ইহুদী ড. আনীস সুরস নিন্মোক্ত চারটি সূরা তৈরী করে ছিল। (১) সূরা আল মুসলিমুন, (১১ আয়াত বিশিষ্ট) (২) সূরা আত্ তাজাস্‌সুদ (১৫ আয়াত বিশিষ্ট) (৩) সূরা আল ঈমান (১০ আয়াত বিশিষ্ট) (৪) সূরাতুল ওসায়া (১৬ আয়াত বিশিষ্ট) এবং সে এ দাবী করেছিল যে আমি কোর’আন মাজীদের চেলেঞ্জ গ্রহণ করে এ সূরাগুলো তৈরী করেছি।10 এর মধ্যে সূরা মুসলিমুনের কিছু আয়াত নিচে উল্লেখ করা হল— অর্থাৎ, ‘আলিফ, লাম, সোয়াদ, মীম। বল, হে মুসলমান নিশ্চয় তোমরা পথভ্রষ্টতার মাঝে পতিত আছ, নিশ্চয় যারা আল্লাহ্ এবং তাঁর মাসীহ (ঈসা আ.)কে অস্বীকার করে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে জাহান্নামের আগুন এবং বেদনাদায়ক শাস্তি, ঐ দিন কিছু কিছু চেহারা লাঞ্ছিত এবং কালো হবে, আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা চাও, কিন্তু আল্লাহ্ যা চান তিনি তাই করেন।
    5. ২০০৫ সালের শুরুতে ইহুদী এবং খৃষ্টানরা মিলে অ্যামেরিকায় “ফোরকানুল হক” নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল, যেখানে কোর’আন মাজীদের অনুকরণে ৭৭টি সূরা লিখেছিল। ঐ সূরাসমূহের কিছু কিছু আয়াত এ গ্রন্থের উপযুক্ত আলোচনায় পাঠকরা পেয়ে যাবেন।

    কোরআন মাজীদের অনুকরণে আয়াত এবং সূরা তৈরী করার এ সমস্ত উদাহরণ থেকে পরিষ্কারভাবে একথা প্রমাণিত হয় যে, কোরআন মাজীদ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে হওয়ার দাবী (নাউজু বিল্লাহ্) একটি বাতেল দাবী।

    বাস্তবতা হল এই যে, কোরআন মাজীদে যে বিষয়টিকে চেলেঞ্জ করা হয়েছে তা এরকম নয় যে, কোন ব্যক্তি আরবী ভাষার শব্দ বা অক্ষর ব্যবহার করে এ ধরণের কিছু লাইন কখনো তৈরী করতে পারবে না, যেমন কোরআন মাজীদে আছে। চিন্তা করুন! যে সমাজে বিশুদ্ধ সাহিত্যিকতা পূর্ণ আরবী ভাষার স্বনামধন্য সাহিত্যিকরা ছিল, এমনকি ইমরুল কায়েসের মত বাকপটু কবি বিদ্ধমান ছিল, তাদের জন্য আরবী ভাষায় কয়েকটি  লাইন তৈরী করা কি এমন কঠিন কাজ ছিল? মূলত কোরআন মাজীদ যে বিষয়ের চেলেঞ্জ করেছিল তা ছিল এই যে, কিয়ামত পর্যন্ত কোন মানুষ একটি সূরা তো দূরের কথা এমনকি একটি আয়াতও তৈরী করতে পারবে না, যা বিশুদ্ধতা, সাহিত্যিকতা, শ্রুতিমধুরতা, আকৃষ্টিতা, মানুষের নিকট গ্রহণ যোগ্যতা ইত্যাদি দিক থেকে কোরআন মাজীদের আয়াতের ন্যায় সমমানের হবে। এ চেলেঞ্জের সামনে সমগ্র আরব বিশ্ব অপারগ হয়ে লাজওয়াব হয়ে গিয়েছিল এবং অকপটে স্বীকার করে নিয়ে ছিল যে, এ কোর’আন কোন মানুষের কথা নয়। নিচে এর কিছু উদাহরণ পেশ করা হল—

    1. জিমাদ আজদী (রযিয়াল্লাহু আনহু) যখন সর্ব প্রথম কোর’আন মাজীদের তেলওয়াত শুনল তখন সাথে সাথে বলে উঠল, আমি এধরণের কথা কখনো শুনিনি, আমি গণকদের কথা শুনেছি, কবিদের কথা শুনেছি, যাদুকরদের কথা শুনেছি, কিন্তু এ বাণী সমুদ্রের অতল তলে পৌঁছে যাবে।
    2. ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) সূরা ত্বা-হার আয়াতসমূহ শ্রবণে তার সমস্ত রাগ নিমিষে নিঃশেষ হয়ে গেল আর বলতে লাগল ‘কত উন্নত এবং উত্তম একথা’।
    3. বানী আবদুল আসহাল বংশের সর্দার উসাইদ বিন হুজাইর (রযিয়ল্লাহু আনহু) যখন মোসআব বিন ওমাইর (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুখে কোর’আন মাজীদ শুনতে পেল তখন বলতে লাগল, ‘আহ! কত উত্তম এবং উন্নত বাণী’।
    4. হজ্বের সময়ে কোরাইশ সর্দারদের একটি পরামর্শ বৈঠক দারুন নাদওয়ায় অনুষ্ঠিত হল, যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে তাঁকে যাদুকর বা পাগল বা কবি বা গণক বলে আখ্যায়িত করে হাজীদেরকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। লোকদের বিভিন্ন পরামর্শের আলোকে সভায় ইসলামের নিকৃষ্ট দুশমন ওলীদ বিন মুগীরা এ সিদ্ধান্ত দিল যে, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গণক, পাগল, কবি, জাদুকর নয়, আল্লাহ্‌র কসম! তাঁর কথা অত্যন্ত সুন্দর, তাঁর মূল অত্যন্ত সুদৃঢ়, আর ডাল পালা ফলবান, তার ব্যাপারে খুব বেশি বললে যে কথা বলা যায় তাহল, এই যে, সে জাদুকর, তাঁর কথা শুনে বাপ-ছেলে, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় এবং একথার উপর সবাইকে একমত করতে হবে।
    5. কোরাইশ সর্দার ওতবা বিন রাবীয়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মুখে সূরা হা-মীম সাজদার আয়াত শুনে এসে কোরাইশ নেতাদেরকে বলল, আল্লাহ্‌র কসম! আমি এমন এক বাণী শুনেছি যা ইতিপূর্বে আর কখনো শুনিনি। এ বাণী না কোন কবির বাণী না কোন জাদুকরের বাণী। আমার পরামর্শ এই যে, তাঁকে তার অবস্থা মত থাকতে দাও, আল্লাহ্‌র কসম! এ বাণীর মাধ্যমে বিরাট যুদ্ধ সংঘটিত হবে, যদি সে আরবদের উপর বিজয়ী হয় তাহলে সরকার তোমাদের সরকার হবে, তাঁর সম্মান তোমাদের সম্মান হবে, আর আরবরা যদি তাঁকে হত্যা করে তাহলে বিনা বদনামীতে তোমাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাবে।
    6. আল্লাহ্‌র দুশমন আবুজাহাল এবং তারা অপর দুই সাথী আবু সুফিয়ান এবং আখনাস বিন শারীক, এ তিন জন রাতের আঁধারে পৃথক পৃথক ভাবে মক্কার হারামে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখে কোর’আন মাজীদ শুনতে গেল। দ্বিতীয় দিনও শুনল এরপর তৃতীয় দিনও শুনল। তৃতীয় দিন আখনাস বিন শারীক আবু সুফিয়ানের ঘরে গেল এবং জিজ্ঞেস করল যে, বল মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তেলওয়াতকৃত বাণী সম্পর্কে তোমার কি অভিমত? আবু সুফিয়ান নির্দ্বিধায় বলে ফেলল এটা কোন মানুষের মুখের বাণী হতে পারে না। আখনাস বলল, আমারও একই অভিমত, এরপর আখনাস আবু জাহালের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করল মোহাম্মদের তেলওয়াতকৃত বাণী কেমন? আবুজাহাল বলল, আমাদের বংশ এবং বনী আবদে মানাফের সাথে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিযোগীতা চলছে, নেতৃত্ব এবং উদারতায় আমরা উভয়ে সমান, এখন তারা দাবী করছে যে, আমাদের বংশে নবী জন্মগ্রহণ করেছে। এর প্রতিরোধ আমরা কিভাবে করব? তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা কখনো তার প্রতি ঈমান আনব না।
    7. হাবশায় হিযরত করার সময় আবু বকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)ও হিজরত করার ইচ্ছা পোষণ করে বের হয়েছিলেন, কিন্তু ইবনে দাগীনা তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনল এবং মক্কার হারামে এসে আবু বকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে নিরাপত্তা দেওয়ার ঘোষণা দিল। কোরাইশ সর্দাররা বলল, ‘ইবনে দাগিনা! আমরা তোমার নিরাপত্তা দেওয়াকে ভঙ্গ করছি না, কিন্তু তুমি আবু বকরকে বলে দাও যে, সে যেন ঘরের ভিতরে থেকে নামায আদায় করে এবং কোর’আন তেলওয়াত করে। সে যদি উঁচু কণ্ঠে নামায আদায় করে এবং কোর’আন তেলওয়াত করে তাহলে আমাদের বাচ্চারা এবং মহিলারা ফেতনায় পড়ে যাবে। আবু বকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু) কিছু দিন নিচু আওয়াজে কোর’আন মাজীদ তেলওয়াত করলেন, এরপর আবার উঁচু আওয়াজে কোর’আন তেলওয়াত করতে শুরু করলেন। যখন তিনি উঁচু আওয়াজে কোরআন তেলওয়াত করতেন তখন মোশরেকদের বাচ্চা, বৃদ্ধবনিতা কোর’আন শোনার জন্য একত্রিত হয়ে যেত, এতে মক্কার মোশরেকরা পেরেশান হয়ে গেল। ইবনে দাগিনাকে ডেকে তার নিকট অভিযোগ করল। ইবনে দাগিনা আবুবকর (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে উঁচু আওয়াজে কোর’আন তেলওয়াত করতে নিষেধ করল। তখন আবুবকর (রযিয়াল্লাহু আনহু) ইবনে দাগিনাকে তার দেওয়া নিরাপত্তা ফেরত দিল এবং বলল, আমি তোমার দেওয়া নিরাপত্তা তোমাকে ফেরত দিলাম এবং আল্লাহ্ দেওয়া নিরাপত্তায় আমি সন্তুষ্ট। (বোখারী)
    8. নবুয়তের পঞ্চম বছরের ঘটনা। একদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হারামে বসে উচ্চ স্বরে সূরা নজম তেলওয়াত করছিলেন, শ্রবণকারীদের মধ্যে মুসলমান কাফের উভয়েই উপস্থিত ছিল। কোরআন মাজীদের প্রতিক্রিয়ার এ অবস্থা ছিল যে, সমস্ত শ্রোতারা পিনপতন নিরব হয়ে কোরআন মাজীদ শুনছিল; সূরা তেলওয়াত শেষ করে যখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেজদা করছিলেন তখন সমস্ত শ্রোতারা নিজেদের অজান্তেই সিজদা করে ফেলেছিল, কাফেরদের একথা স্মরণই ছিল না যে, তারা কি করছে। সেজদা করার পর কাফেররা তাদের এ কর্মের জন্য লজ্জিত হল। কোরআন মাজীদ তেলওয়াতের এ অলৌকিক প্রতিক্রিয়া তো ছিল আরবীভাষীদের উপর, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ার আরো আশ্চর্যজনক দিক হল যে এ কোর’আন আরবদের উপর যেমন প্রভাব ফেলে এমনিভাবে অনারবদের মন মস্তিষ্কের উপরও যথেষ্ট প্রভাব ফেলার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে।

    কোর’আন মাজীদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার রাষ্ট্র প্রধান খরোশিফের এ ঘটনাটি পাঠকদেরকে অভিভূত করবে যে, মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান জামাল আবদুন নাসের রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান খরোশীফের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য গেল। আর সাথে করে মিশরের প্রখ্যাত ক্বারী আবদুল বাসেতকেও নিয়ে গেল। সাক্ষাতে জামাল আবদুন নাসের কারী আবদুল বাসেতকে পরিচয় করিয়ে দিল এবং তার মুখ থেকে কালামুল্লাহ্ (আল্লাহ্‌র বাণী) শোনার জন্য নিবেদন করল। খরোশীফ বলল, আমি তো আল্লাহকেই মানি না, তাহলে তাঁর বাণী কি করে শোনব? নাসেরের বারংবারের নিবেদনে খোরশীফ কোর’আন শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করল। কারী আবদুল বাসেত সূরা ত্বা-হার ঐ আয়াতসমূহ তেলওয়াত করতে লাগল যা শ্রবণে ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণ করে ছিলেন। সূরা ত্বা-হার তেলওয়াত শুনে খোরশীফের চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল। তেলওয়াত শেষ হলে নাসের খোরশীফকে জিজ্ঞেস করল, আপনি তো আল্লাহকে মানেন না তাহলে আপনার চোখ কেন অশ্রুসজল হল? খোরশীফ বলল, আমি সত্যিই আল্লাহকে মানি না কিন্তু এ বাণী শোনে অশ্রু নিয়ন্ত্রন করতে পারি নি, তার কারণ আমি বুঝতে পারছি না।12

    খোরশীফ সত্যিই দুর্ভাগ্যবান মানুষ ছিল, তার মন মস্তিষ্কে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাই সে তা বিবেচনা করার চিন্তাও করে নি, যে তার চোখে পানি আসার কারণ কি? কিন্তু এ ধরণের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যে, লোকেরা কুফরী অবস্থায়ও কোর’আন মাজীদের অর্থ না জেনেই শুধু তেলওয়াত শুনেই চোখে পানি এসে গেছে, তার অন্তরে ঢেউ সৃষ্টি হয়ে গেছে, মনমস্তিষ্ক জয় হয়ে গেছে, এরপর তখনই মস্তিষ্ক তৃপ্তি লাভ করেছে যখন ইসলাম গ্রহণ করেছে।

    ঈমানদারদের বিষয়টি তো ভিন্ন যে, মক্কা এবং মদীনার হারামে রামযান মাসে কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদের নামাযে) কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, হাজার নয় বরং লক্ষ লক্ষ মুসলমান উপস্থিত থাকে যাদের মধ্যে কোরআন মাজীদের আয়াতের অর্থ বুঝার মত লোক কমই থাকে। কিন্তু ইমামগণের সুললিত কণ্ঠে যখন কোর’আন শুনে তখন চোখে অশ্রু ঝরতে থাকে, মনে দুনিয়ার সুখ সমৃদ্ধির কথা থাকে না, কান্না থামানো যায় না। আর যারা কোরআন মাজীদ বুঝে তেলওয়াত করে তাদের বিষয়টি তো আরো ভিন্ন, তেলওয়াত করার সময় তাদের মন এত নরম হয় যে শব্দের উচ্চারণ করতে অনেক সময় তাদের কষ্ট হয়। শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়, অন্তর নরম হয়ে যায়, তেলওয়াত শোনার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পায়, মন-মানসিকতা এমন হয় যে, মানুষ দুনিয়ার চাওয়া পাওয়া থেকে একেবারেই বিমুখ হয়ে যায়। মক্কার হারামের ইমাম শেখ সউদ আশ-শুরাইমের (হাফিযাহুল্লাহ্) পেছনে নামায আদায়কারীরা জানে যে, নামাযে সূরা তেলওয়াত করার সময় তাঁর অবস্থা এই হয় যে, কোন কোন সময়ে তিনি সূরা ফাতেহার তেলওয়াত পূর্ণ করতে পারেন না, কণ্ঠ নিচু হয়ে যায়, নিজের অজান্তেই কান্নায় ভেংঙ্গে পড়েন। এটাই ঐ চেলেঞ্জ যা কোরআন মাজীদে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত জ্বিন ও ইনসানকে দেয়া হয়েছে, যদি তোমরা এটা বুঝ যে, কোরআন মাজীদ মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্বরচিত তাহলে তোমরাও এ ধরণের একটি সূরা বা কমপক্ষে একটি আয়াত রচনা করে দেখাও যা পাঠ করে মৃত অন্তর জাগ্রত হবে, যা শ্রবণে চোখ অশ্রুসজল হবে, শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যাবে, অন্তর নরম হয়ে যাবে, যা মানুষের মন থেকে দুনিয়ার চাওয়া পাওয়ার চিন্তাকে দূর করে দিবে, যা বারবার তেলওয়াত করলে তেলওয়াত করার বা শ্রবণ করার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পাবে, মানুষের অন্তর তার অজান্তে বলে উঠবে যে এ বাণীতো শুধু আমার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে, এর অপেক্ষায়ই আমি ছিলাম, এটা ব্যতীত আমার জীবন বৃথা ছিল, এর প্রতি ঈমান এনে আমি আমার জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য খোঁজে পেয়েছি।

    কোরআন মাজীদের সাহিত্যিকতা ছাড়াও তার বিস্ময়কর আরো অনেক দিক রয়েছে13, আর এর প্রতিটিই চেলেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত। এসমস্ত বিশ্বয়কর বিষয়সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বয়কর বিষয় হল এই যে, অল্পবয়সী বাচ্চাদের পরিপূর্ণ কোরআ’ন এমনভাবে মুখস্ত করে নেয়া যে, কোথাও একটি যের, যবর, পেশের ত্রুটি থাকে না, এথচ এবাচ্চা স্পষ্ট আরবীতো দূরের কথা সাধারণ আরবী শব্দসমূহের অর্থ সম্পর্কেও অবগত নয়, ঐ বাচ্চাকে যদি তার মাতৃ ভাষার কোন বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা মুখস্ত করতে দেয়া হয়, তাহলে সেতা মুখস্ত করতে পারবে না, আর যদি মুখস্ত করেও তাহলে বেশি দিন পর্যন্ত তা মুখস্ত রাখতে পারবে না। অথচ কোরআন মাজীদ মুখস্তকারী হাফেজরা আজীবন তা পড়ে এবং পড়ায়, তা শুনে এবং শোনায়।14

    অল্প বয়সে, দশ বার বছর বয়সে কোরআন মাজীদ মুখস্ত করে নেওয়া তো সাধারণ বিষয়, কিন্তু এর চেয়েও কম বয়সে কোর’আন মাজীদ মুখস্ত করার উদাহরণও রয়েছে।16

    অল্প বয়স ছাড়াও বয়স্ক হয়ে কোরআন মাজীদ মুখস্ত করার উদাহরণও আছে, অথচ এ বয়সে মুখস্ত শক্তি লোপ পেতে থাকে।17 পরিশেষে কি কারণ আছে যে, আজ পৃথিবীতে তাওরাত, ইঞ্জিলের অনুসারীও যথেষ্ট রয়েছে কিন্তু এদের মধ্যে তাওরাত বা ইঞ্জিলের হাফেজ একজনও নেই, অথচ কোরআন মাজীদের হাফেজ কোন অতিরঞ্জন ছাড়া বলা যেতে পারে যে, কোটি কোটি। মন ও মস্তিষ্কে এত সহজে রেখাপাতকারী এবং মুখস্ত হওয়ার উপযুক্ত আয়াত যদি কেউ তৈরী করতে পারে তাহলে তৈরী করে দেখাক। ইহুদী স্কলার ডক্টর আনীস যে, ‘ফোরকানুল হক’ লিখেছে তার প্রথম শব্দটিই এত অসমাঞ্জস্য এবং অস্পষ্ট যে, তা সহজে মুখে উচ্চারণ করা যায় না এবং মানবিক স্বভাবও তা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়।18 মূলত কাফেরদের কোর’আনের সাথে দুশমনীর মূল কারণ, এ চেলেঞ্জটি যা ১৪ শত বছর থেকে তাদেরকে অপারগ এবং লা-জওয়াব করে রেখেছে। হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে তারা সবসময় অস্থিরতায় ভোগছে কিন্তু কিছুই করতে পারছে না, যার বহিঃপ্রকাশ তাদের মৌখিক ঠাট্টা বিদ্রূপের মাধ্যমে হয়ে থাকে; আবার কখনো কখনো কোরআন মাজীদকে বাস্তবে অবমাননা এবং বেয়াদবীর মাধ্যমেও করে থাকে।

    অতএব, কোন মুসলমানের ‘ফোরকানুল হক’ বা অনুরূপ কোন লিখনী দেখে এ ভুলে পতিত হওয়া ঠিক হবে না যে, কোরআন মাজীদে দেয়া চেলেঞ্জ গ্রহণ করা হয়েছে, বা তার গুরুত্ব কমে গেছে, ঐ চেলেঞ্জ আজও আলহামদুলিল্লাহ্ ঐ ভাবেই বিদ্ধমান আছে যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে বিদ্ধমান ছিল এবং কিয়ামাত পর্যন্ত এভাবেই বিদ্ধমান থাকবে।

    لَّا يَأۡتِيهِ ٱلۡبَٰطِلُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَلَا مِنۡ خَلۡفِهِۦۖ تَنزِيلٞ مِّنۡ حَكِيمٍ حَمِيدٖ ٤٢

    অর্থ, ‘কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না—অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়, এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহ্‌র নিকট হতে অবতীর্ণ। (সূরা হা-মীম সাজদাহ/ফুসসিলাত-৪২)।

  • নে’মতের বহিঃপ্রকাশ

    নে’মতের বহিঃপ্রকাশ

    কোরআন লিখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগ থেকেই কোর’আন সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ছিল। গত ১৪শত বছরের মধ্যে কোরআন মাজীদ লিখনের উন্নতির স্তরসমূহের প্রতি একবার দৃষ্টি দিলে তা দেখে মানব বিবেক আশ্চর্য হয় যে, প্রতিটি যুগের মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ তা’লা কোরআন মাজীদকে অত্যন্ত সুন্দর করে লিখার ব্যাপারে কত ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। শতাব্দীর উন্নত স্তরসমূহ অতিক্রম করার পর আজ আমাদের সামনে পূর্ণাজ্ঞ যের, যবর, পেশ এবং ওয়াকফ (বিরাম) চিহ্নসহ অত্যন্ত সুন্দর এবং সহজতর লিখনীর মাধ্যমে এমন একটি মোসহাফ (কোরআন) বিদ্ধমান যা বিশ্ব ব্যাপী অত্যন্ত সহজভাবে শিখা এবং শিখানো হয়। মূলত এ সমস্ত কর্মকাণ্ড আল্লাহ্ তা’লার পরিপূর্ণ হিকমত এবং সর্বময় ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ, যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লা কোর’আন মাজীদ সংরক্ষণের ওয়াদা করে রেখেছেন। নে’মতের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ বাস্তবতা প্রকাশ করা আমার (লিখকের) জন্য আনন্দের বিষয় যে, কীলানী বংশকেও আল্লাহ্ তা’লা কোর’আন লিখার সুভাগ্য দান করেছেন, যার শুরু সম্মানিত পিতা হাফেজ মোহাম্মদ ইদরীস কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) পূর্ব পুরুষ মৌলবী মোহাম্মদ বখস (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত ১৮৬১ইং)19 মৌলবী মোহাম্মদ বখশ (রাহিমাহুল্লাহ্‌র) ছেলে মৌলবী ইমামুদ্দীন কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত ১৯১৯ইং) তার নাতী মৌলবী নূর এলাহী কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত১৯৪৩ইং) এরপর তার পৌত্র হাফেজ মোহাম্মদ ইদরীস কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত১৯৯২ইং) ব্যতীত কীলানী বংশের আরো কিছু সুভাগ্যবান ব্যক্তিকেও আল্লাহ্ তা’লা এ সুভাগ্য দান করেছেন যাদের নাম এবং তাদের লিখিত কোরআন মাজীদের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:

    1. মৌলবী মোহাম্মদ বখশ কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তিনি বেশ কিছু কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    2. মৌলবী ইমামুদ্দীন কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তাফসীর ওহীদী (নওয়াব ওয়াহিদুজ্জামান হায়দারাবাদী রাহিমাহুল্লাহ্‌) ও আরো কিছু কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    3. মৌলবী মোহাম্মদ দীন কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্‌) তাফসীর ওহীদী (নওয়াব ওয়াহিদুজ্জামান হায়দারাবাদী রাহিমাহুল্লাহ) ছাড়াও আরো কিছু কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।20
    4. মৌলবী নূও এলাহী কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ) তিনি সাধারণ কোরআন লিপিবদ্ধ করেছেন যার সংখ্যা ১৫টি।21
    5. মোহাম্মদ সুলাইমান কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তাফসীর আবুল হাসানাতের ২৬তম পারা পর্যন্ত লিখেছেন, বাকী চার পারা অসুস্থতার কারণে লিখতে পারেন নি।
    6. হাফেজ ইদরীস কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তাফসীর সানায়ী (মাওলানা সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাফসীর আহসানুত্তাফাসীর (ডেপুটি সায়্যেদ আহমদ হাসান দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ্ লিখিত) লিপিবদ্ধ করেছেন।22
    7. আবদুররহমান কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) আশরাফুল হাওয়াসী (মাওলানা মোহাম্মদ আবদুহ লিখিত) লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়া ফিরোজ সানায এবং তাজ কোম্পানীর বেশ কিছু সাধারণ কোর’আন তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।23
    8. আবদুল গাফুর কীলানী মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী লিখিত তাদাব্বুর কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়াও পারা পারা অনুবাদ কৃত কোর’আনও লিপিবদ্ধ করেছেন।
    9. আবদুল গাফ্‌ফার কীলানী (রাহিমহুল্লাহ্) তাফহিমুল কোর’আনের ১ম খণ্ড এবং বিভিন্ন সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    10. মোহাম্মদ ইউসুফ কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) মাওলানা সায়্যেদ আবুল আলা মাওদুদী লিখিত তাফহিমুল কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন, এছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ কোরআন মাজীদও লিপিবদ্ধ করেছেন।
    11. খুরসীদ আহমদ কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ) পারা পারা অনুবাদ কৃত কোর’আনও লিপিবদ্ধ করেছেন।
    12. রিয়ায আহমদ কীলানী ময়ীনউদ্দীন সাফেয়ী লিখিত আরবী তাফসীর জামেউল বায়ান লিপিবদ্ধ করেছেন।
    13. মোহাম্মদ ইয়াকুব কীলানী তাফসীর মাযহারী ছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ কোরআন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    14. এনায়েতুল্লাহ্ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    15. আবদুর রউফ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    16. খালীলুর রহমান কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    17. মোহাম্মদ সাঈদ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    18. আবদুল ওয়াহীদ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    19. আবদুল ওয়াকীল কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    20. আবদুল মুয়েদ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    21. আবদুল মুগীস কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।

    কোর’আন লিখন কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, একটি বড় সুভাগ্যের ব্যাপার; কীলানী বংশে এর কল্যাণকর ধারা আলহামদুলিল্লাহ্ আজও আছে, কিন্তু আফসোসের বিষয় হল কম্পিউটারের যুগে কীলানী বংশসহ সমস্ত কোর’আন লিখকদেরকে এ সুভাগ্য থেকে বঞ্চিত করেছে, যদিও কিছু কিছু পুরাতন প্রকাশক টেকনিকেল সৌন্দর্যের জন্য আজও হাতের লিখনীকে কম্পিউটারের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। মূল কথা কোর’আন মাজীদের প্রকাশনা এবং প্রচারণা আলহামদুলিল্লাহ্ দিন দিন বেড়ে চলছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চালু থাকবে। অতএব, আল্লাহ্‌র জন্য অসংখ্য প্রশংসা।

  • কুরআন মাজীদের সাত ক়েরাত

    কুরআন মাজীদের সাত ক়েরাত

    মূলত কোর’আন মাজীদ কোরাইশদের তেলওয়াত পদ্ধতি (তাদের ভাষায়) অবতীর্ণ হয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন বংশের বিভিন্ন রকমের স্থানীয় ভাষা এবং উচ্চারণ পদ্ধতির কারণে উম্মুতে মোহাম্মাদীকে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ৭টি স্থানীয় ভাষায় কোর’আন তেলওয়াতের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। জিবরীল (আ.) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ নির্দেশ পৌঁছাল যে, আপনি আপনার উম্মতকে একটি স্থানীয় ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, আমি এ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আমার উম্মত এ ক্ষমতা রাখে না। জিবরীল (আ.) দ্বিতীয় বার আসল এবং বলল, আল্লাহ্ তা’লা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদেরকে স্থানীয় দু’টি ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, আমি এ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আমার উম্মত এ ক্ষমতা রাখে না। জিবরীল (আ.) তৃতীয় বার আসল এবং বলল, আল্লাহ্ তা’লা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদেরকে স্থানীয় ৩টি ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, আমি এ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আমার উম্মত এ ক্ষমতা রাখে না। জিবরীল (আ.) চতুর্থ বার আসল এবং বলল, আল্লাহ্ তা’লা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদেরকে স্থানীয় ৭টি ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন, এ সাতটি স্থানীয় ভাষার মধ্যে মানুষ যে ভাষায় কোর’আন তেলওয়াত করবে তা সঠিক হবে।24

    উল্লেখ্য, ৭টি ভাষার উদ্দেশ্য হল কোথাও উচ্চারণের পার্থক্য, যে এক কেরাতে (পদ্ধতিতে) পড়া হয় মূসা অন্য ক্বেরাতে মূসায়ু, আবার কোথাও যের যবর পেশের পার্থক্য যেমন— এক কেরাতে যুল আরসিল মাজীদু (দালের উপর পেশ দিয়ে) আবার অন্য কেরাতে যুল আরসিল মাজীদি (দালের নিচে যের দিয়ে)। আবার কোথাও এ পার্থক্য হয় এক বচন, দ্বিবচন এবং বহুবচনে, বা পুং লিঙ্গ এবং স্ত্রী লিঙ্গের পার্থক্য। যেমন এক ক্বেরাতে তাম্মাতু কালিমাতু রাব্বিক আবার অন্য ক্বেরাতে তাম্মাত কালিমাত রাব্বুক। আবার কোথাও এ পার্থক্য হয়ে থাকে ক্রিয়ার মধ্যে, যেমন এক ক্বেরাতে ওমান তাত্বাওয়া খাইরান, আবার অন্য কেরাতে মান ইয়ত্বাওয়া খাইরান। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে, এ সাত কেরাতের তেলওয়াতের মাধ্যমে অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য হয় না। এটা এধরণের পার্থক্য যেমন মিশরের অধিবাসীরা আরবী ‘জ্বিম’ অক্ষরটিকে বাংলা ‘গ’ এর ন্যায় উচ্চারণ করে, যেমন ‘জানাযা’ শব্দটিকে তারা ‘গানাযা’ উচ্চারণ করে থাকে, ইরানের অধিবাসীরা আরবী ‘কাফ’ অক্ষরটিকে বাংলা ‘চ’-এর ন্যায় উচ্চারণ করে থাকে, যেমন ‘আল্লাহু আকবার’কে তারা ‘আল্লাহু আচ্চার’ উচ্চারণ করে। ভারতের হায়দারাবাদ এলাকার লোকেরা আরবী ‘কাফ’ অক্ষরটিকে বাংলা ‘খ’-এর ন্যায় উচ্চারণ করে, যেমন ‘সন্দুক’কে তারা ‘সন্দুখ’ উচ্চারণ করে থাকে। কিন্তু এ ভিন্নতার কারণে কোথাও অর্থের মধ্যে কোন পরিবর্তন করে না। ঠিক এমনিভাবে কোর’আন মাজীদের ভিন্ন ভিন্ন সাত ক্বেরাতের বিষয়টিও অনুরূপই।

    ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-র কোর’আন মাজীদকে এক ক়েরাতে (তেলওয়াত পদ্ধতিতে) একত্রিতকরণ এবং সূরা সমূহের বিন্যাস:

    ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলে (২৫-০৩৫) হি. জিহাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে গমনকারী সাহাবাগণ বিজিত অঞ্চলসমূহে নিজ নিজ শিক্ষা অনুযায়ী কোর’আন মাজীদ তেলওয়াত করত, যতদিন পর্যন্ত মানুষ ৭ ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) সম্পর্কে অবগত ছিল ততদিন কোন প্রকার প্রশ্ন দেখা দেয়নি, কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে ইসলাম দূর দূরান্তের অঞ্চলসমূহে পৌঁছার পর ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) সম্পর্কে মানুষের ধারণা কমতে লাগল, ফলে ভিন্ন জন ভিন্ন পদ্ধতিতে তেলওয়াত করার কারণে মানুষের মাঝে একজন আরেক জনের তেলওয়াতকে ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করতে লাগল, হুযাইফা বিন ইয়ামেন (রযিয়াল্লাহু আনহু) আরমেনিয়া এবং আজারবাইজানের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আমীরুল মুমেনীন এ উম্মত আল্লাহ্‌র কিতাব নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হওয়ার আগে তার একটা সুরাহা করুন। ওমসান (রযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন যে, কি হয়েছে? হুযাইফা (রযিয়াল্লাহু আনহু) বলল, যুদ্ধ চলাকালে দেখলাম যে সিরিয়ার লোকেরা উবাই বিন কা’ব (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তেলওয়াত পদ্ধতিতে কোর’আন তেলওয়াত করছে, যা ইরাক বাসীরা শোনেনি, আর ইরাকবাসীরা আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তেলওয়াত পদ্ধতিতে কোর’আন তেলওয়াত করছে যা সিরিয়াবাসীরা শোনেনি, ফলে একে অপরকে কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। ইতিপূর্বে ওসমান (রযিয়ল্লাহু আনহু)-এর নিকট এ ধরনের অভিযোগ এসেছিল, তাই তিনি সম্মানিত সাহাবাগণকে একত্রিত করে বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করলেন যে, এ বিষয়ে আপনাদের কি পরামর্শ? সাহাবাগণ ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করল, আপনি এ ব্যাপারে কি চিন্তা করেন? ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) বলল, আমার পরামর্শ হল এই, যে সমস্ত মুসলমানদেরকে এক ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতির) উপর একমত করে দেই, যাতে কোন মতভেদ না থাকে। সাহাবাগণ ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-র এ পরামর্শকে পছন্দ করল এবং এটাকে তারা সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করল। এ সম্মিলিত সিদ্ধান্তের উপর কাজ করার জন্য ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) চারজন সাহাবার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করলেন, এ কমিটির মধ্যে ছিল যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন যোবাইর (রযিয়াল্লাহু আনহু), সা’ঈদ বিন আস (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুর রহমান বিন হারেস (রযিয়াল্লাহু আনহু)। এ কমিটিকে সহযোগীতা করার জন্য পরে আরো অন্যান্য সাহাবীগণ তাদের সাথে শামীল হয়ে ছিলেন। এ কমিটিকে এ দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল যে, তারা আবুবকর এবং ওমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমার) একত্রিতকৃত কপি থেকে এমন একটি কপি প্রস্তুত করবে যা শুধু একটি ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতিতে) হবে, আর যদি কোন শব্দ বা আয়াতের ব্যাপারে মত ভেদ হয় যে, এটা কিভাবে লিখা হবে তখন তা কোরাইশদের তেলওয়াত অনুযায়ী লিখতে হবে, কেননা কোর’আন কারীম তাদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবাগণের একমিটি ‘উম্ম’কে সামনে রেখে যে গুরুত্বপূর্ণ কজে আঞ্জাম দিয়ে ছিল তা ছিল নিম্নরূপ:

    1. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে সাহাবাগণের নিকট যতগুলো সহীফা ছিল তা আবার তলব করা হল এবং এগুলোকে নুতন করে ‘উম্ম’-এর সাথে মেলানো হল, ততক্ষণ পর্যন্ত একটি আয়াত নুতন মোসহাফে (কোর’আনে) অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই যতক্ষণ না সাহাবাগণের ভিন্ন ভিন্ন সহিফার সাথে মেলানো হয়েছে।
    2. আয়াতসমূহকে যের যবর পেশহীনভাবে এমনভাবে লিখা হল যেন সমস্ত ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) এক হয়ে যায়, যেমন: কিয়ামতের দিনের মালিক ও কিয়ামতের দিনের বাদশাহ। এ দু’টি পদ্ধতিকে নুতন মোসহাফে (কোর’আনে) এমন ভাবে লিখা হল, এতে উভয় ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) লিখার মধ্যে এসে গেছে, কিন্তু এর অর্থের মধ্যে কোন রূপ পরিবর্তন হয় নাই।
    3. ‘উম্ম’-এর মধ্যে সমস্ত সূরাসমূহ পৃথক পৃথক সহিফায় (পুস্তকে) অগোছালোভাবে বিদ্ধমান ছিল, এ কমিটি চিন্তাভাবনা করে সমস্ত সূরাগুলোকে ধারাবহিকভাবে সাজিয়ে একত্রিক করে দিল।
    4. ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) সকলের ঐক্যমতে প্রস্তুতকৃত কোর’আনের এ কপি বিভিন্ন স্থানে পাঠলেন, তার মধ্যে একটি কপি মক্কায়, একটি সিরিয়ায়, একটি ইয়ামেন, একটি বাসরায়, একটি কুফায় পাঠালেন আর একটি কপি মদীনায় সংরক্ষণ করলেন।
    5. কোর’আন মাজীদের এ কপি বিভিন্ন ইসলামী কেন্দ্রগুলোতে পাঠানোর সাথে সাথে ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) একজন বিশেষজ্ঞ এবং কারীও ঐ সমস্ত ইসলামী কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়েছেন, যারা লোকদেরকে সকলের ঐক্যমতে প্রস্তুতকৃত কোর’আনের তেলওয়াত পদ্ধতি মোতাবেক যথাযথভাবে লোকদেরকে কোর’আন শিক্ষা দিত। তাদের মধ্যে যায়েদ (রযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন মদীনায়, আর আবদুল্লাহ্ বিন সায়েব (রযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন মক্কায়।

    এসমস্ত কর্মগুলো শেষ করার পর ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) সাহাবাগণের নিকট বিদ্ধমান ভিন্ন ভিন্ন তেলওয়াত পদ্ধতি সম্বলিত কপিগুলো আগুন দিয়ে পুরিয়ে দিলেন। আর ‘উম্ম’ হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহার) নিকট ফেরত দিলেন, যা হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহার) মৃত্যুর পর মারওয়ান আগুন দিয়ে পুরিয়ে দিয়েছিল।

    এ সাত কোরাতকে (তেলওয়াত পদ্ধতিকে) একটি পদ্ধতি একটি মোসহাফে (কোর’আনে) সমবেত করার মধ্যে ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) কোর’আন মাজীদের ঐ বিরাট খেদমতে আঞ্জাম দিলেন যার ফলে আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা ঐ পদ্ধতিতেই কোর’আন মাজীদ তেলওয়াত করছে, যে তেলওয়াত পদ্ধতিতে কোর’আন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। সাহাবা কেরামগণের এ কষ্টের পর আল্লাহ্‌র দয়া ও অনুগ্রহে কোর’আন মাজীদের এক একটি অক্ষর, এক একটি শব্দ, এক একটি আয়াত কিভাবে কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত করে রেখেছেন তার কিছু উদাহরণ নিচে পেশ করা হল:

    1. কোর’আন মাজীদে ইবরাহীম শব্দটি ৬৯ বার এসেছে এর মাধ্যে সূরা বাক্বারার সর্বত্র এ শব্দটি ‘ইয়া’ ব্যতীত লিখা হয়েছে। যেমন, إِبْرَٰهِـۧمَ; আবার অন্যান্য সূরাসমূহে ইবরাহীম শব্দটি ‘ইয়া’ অক্ষরসহ লিখা হয়েছে। যেমন, إِبْرَاهِيمُ। কোর’আন মাজীদ লিখার ক্ষেত্রে এ পার্থক্য কোর’আন মাজীদের প্রতিটি কপিতে ১৪শত বছর থেকে চলে আসছে যা আজ পর্যন্ত কোন মুসলমান বা অমুসলিম প্রকাশক তা পরিবর্তন করতে পারে নাই, না কিয়ামত পর্যন্ত তা করতে পারবে।
    2. সামূদ শব্দটি কোর’আন মাজীদে দুইভাবে লিখা হয়েছে, যেমন, প্রথম আরবী ‘দাল’ অক্ষরটিতে যবর দিয়ে ثَمُودَ — সূরা হুদ ৬১ নং আয়াত, আবার কোর’আন মাজীদের চারস্থানে এই শব্দটি আলিফ যোগে এভাবে লিখা হয়েছে, ثَمُودَاْ সূরা হুদ ৬৮ নং আয়াত। ১৪শত বছর থেকে কোর’আন মাজীদের চারটি স্থানে সামূদ শব্দটি আলিফ যোগে লিখিত আছে, যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে লিখা হয়েছিল, আজও পৃথিবীর সমস্ত মোসহাফে (কোরআনে) এভাবেই লিখিত আছে, কোন প্রকাশকই সামূদ শব্দ অতিরিক্ত আলিফ অক্ষরটি উঠিয়ে দিতে পারে নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত পারবেও না।
    3. ‘কাওয়ারীর’ শব্দটিও কোরআনে দু’ভাবে লিখিত হয়েছে— একস্থানে আরবী ‘রা’ অক্ষরটির উপর যবর দিয়ে— যেমন, সূরা নামলের ৪৪ নং আয়াতে قَوَارِيرَ; আবার অন্য এক স্থানে সূরা ইনসানের ১৫ নং আয়াতে “রা” অক্ষরের পরে আলিফ যোগে লিখা হয়েছে, قَوَارِيرَا۠ — কিন্তু নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে যেখানে ‘কাওয়ারিরা’ শব্দটি ‘আলিফ’ অক্ষর ব্যতীত লিখা হয়েছিল আজও প্রতিটি মোসহাফে (কোরআনে) আলিফ ব্যতীতই লিখা হচ্ছে, আর যেখানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে ‘আলিফ’ যোগে লিখা হয়েছিল ওখানে আজও ‘আলিফ’ অক্ষর যোগেই লিখা হচ্ছে। অবশ্য তেলওয়াত কারীদের সুবিধার্থে ‘আলিফ’ অক্ষরের উপর একটি গোল ( ۟ ) চিহ্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। আর শিক্ষকগণ তাদের ছাত্রদেরকে শিখিয়ে দেন যে এ ‘আলিফ’টি অতিরিক্ত যা পড়ার সময় উচ্চারণ হবে না।
    4. কোর’আন মাজীদে لِشَىْءٍ শব্দটি উপরে উল্লেখিত পদ্ধতিতে দুই শ’য়ের অধিক স্থানে লিখিত হয়েছে শুধু একস্থানে এ শব্দটির সাথে ‘আলিফ’ অক্ষর যোগে সূরা কাহাফের ২৩ নং আয়াতে لِشَاْيۡءٍ এভাবে লিখিত হয়েছে, যা আরবী লিখন পদ্ধতি অনুযায়ী সঠিক নয়, কিন্তু সমস্ত মোসহাফে (কোরআনে) আজও এভাবেই বিদ্ধমান আছে, যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে লিখা হয়েছিল। আজ পর্যন্ত কোন প্রকাশক তা সংশোধন করার মত সাহস দেখাতে পারে নাই।
    5. সূরা নামলের ২১ নং আয়াতে أَوۡ لَيَأۡتِيَنِّي শব্দটি এভাবে লিখা হয়েছে যার অর্থ হয়, কিংবা আমি তাকে হত্যা করব। এ শব্দটিতে ‘জালে’র পূর্বে ‘আলিফ’ অক্ষরটি অতিরিক্ত যা শুধু লিখার নিয়ম অনুযায়ীই অশুদ্ধ নয়, বরং অনুবাদ করার ক্ষেত্রেও মারাক্তক ভুলের কারণ হতে পারে যদি ঐ ‘আলিফ’ অক্ষরটি তেলওয়াতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে তার অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবে আর তাহবে এই যে, কিংবা আমি তাকে হত্যা করব না। আশ্চর্য বিষয় হল যখন কোর’আন মাজীদে যের, যবর, পেশ ছিল না, নক্তা (ফোটা) ছিল না তখন আয়াতের এ অংশটি অতিরিক্ত (আলিফ) সহ অপরিবর্তিত অর্থ নিয়ে ইসলামের শত্রুদের হাতে কিভাবে নিরাপদ ছিল? অথচ সর্বকালেই কাফেরার কোর’আন মাজীদে পরিবর্তনের অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল।
    6. এ বাক্যটি কোর’আন মাজীদে দু’বার এসেছে, প্রথম সূরা আনকাবুতে দ্বিতীয় সূরা যুমারে। সূরা আনকাবুতে শব্দটি ‘ইয়া’ অক্ষরসহ লিখিত হয়েছে, যেমন— يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ أَرۡضِي وَٰسِعَةٞ فَإِيَّٰيَ فَٱعۡبُدُونِ ٥٦ — আয়াত নং-৫৬। আবার সূরা যুমারে এ বাক্যটি ‘ইয়া’ অক্ষর ব্যতীত এভাবে লিখিত হয়েছে, قُلۡ يَٰعِبَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمۡۚ لِلَّذِينَ أَحۡسَنُواْ فِي هَٰذِهِ ٱلدُّنۡيَا حَسَنَةٞۗ  وَأَرۡضُ ٱللَّهِ وَٰسِعَةٌۗ إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ ١٠  — আয়াত নং-১০। উভয় পদ্ধতির অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, লিখার এ পার্থক্য ১৪শত বছর থেকে কোর’আন মাজীদের প্রতিটি কপিতে এভাবেই বিদ্ধমান আছে। ‘ইয়া’ অক্ষরের এ সাধারণ পার্থক্যটি আজ পর্যন্ত কোন মুসলমান বা অমুসলিম কোন প্রকাশক পরিবর্তন করতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্ত বদলাতেও পারবে না।
    7. কোর’আন মাজীদে ‘লাইল’ শব্দটি ৭৪টি স্থানে উল্ল্যেখ হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী ‘লাইল’ শব্দটিকে তার পূর্ববর্তী শব্দের সাথে মিলাতে হলে আরেকটি ‘লাম’ অক্ষর যোগ করতে হয়, যেমন— … যেমন কোর’আন মাজীদের অন্যান্য শব্দগুলো ‘লাম’ অক্ষর যোগ করা হয়েছে, যেমন— قَالُوٓاْ أَجِئۡتَنَا بِٱلۡحَقِّ أَمۡ أَنتَ مِنَ ٱللَّٰعِبِينَ٥٥ — সূরা আম্বীয়া-৫৫ বা لَّا ظَلِيلٖ وَلَا يُغۡنِي مِنَ ٱللَّهَبِ ٣١ — সূরা মুরসালাত-৩১। কিন্তু ‘লাইল’ শব্দটি সমস্ত কোর’আনে একটি ‘লাম’ যোগে ব্যবহার হয়েছে। যা লিখার পদ্ধতি অনুযায়ী সঠিক নয়, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কোর’আন মাজীদে ‘লাইল’ শব্দটিতে আরেকটি ‘লাম’ যোগ করতে পারেনি।
    8. কোর’আন মাজীদের সূরাসমূহের শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ দ্বারা শুরু করা হয়েছে, কিন্তু সূরা তাওবার শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ উল্লেখ নেই, তার কারণ হল, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ সূরা লিখানোর সময় তার শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ লিখাননি। তাই ১৪শত বছর থেকে পৃথিবীর সমস্ত মোসহাফ (কোর’আন)-এ সূরাটি بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ব্যতীতই লিখিত হয়ে আসছে, কোন বন্ধু বা শত্রুর সাহস হয়নি যে, তারা সূরা তাওবার শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ লিখবে।
    9. সূরা ক়াহাফে সূসা (আ.) এবং খিজির (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, যে তাঁরা উভয়ে একটি এলাকাতে পৌঁছার পর সেখানকার লোকদের নিকট খাবার চাইল, কিন্তু তারা খাবার দিতে অস্বীকার করল। কুরআন মাজীদের ভাষায় … অর্থাৎ, ‘তারা অস্বীকার করল’।খলীফা ওলীদ বিন আবদুল মালেকের সময়ে যখন কোরআন মাজীদে নোক্তা (ফোটা) যোগ করা হল, তখন কেউ কেউ … এর পরিবর্তে … শব্দ লিখার পরামর্শ দিল, যার অর্থ হয়, তারা খাবার দিল। যাতে করে আপ্যায়ন করাতে অস্বীকার করার স্থলে আপ্যায়ন করাল, আর এলাকাবাসীরা তাদের বদনাম থেকে বেঁচে যাবে। তখন ওলীদ বিন আবদুল মালেক বললেন, ‘কোরআন মাজীদ তো অন্তর থেকে অন্তরে স্থানান্তিত হয়।’ (অর্থাৎ, যা হাফেজদের অন্তরে সংরক্ষিত থাকে এবং তারা তাদের ছাত্রদের অন্তরে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে স্থানান্তরিত করে। অতএব, কাগজের পরিবর্তনে কোন কাজ হবেনা।25 তাই তা যেমন ছিল তেমনই থাকতে দাও। গত ১৪শত বছর থেকে কাফেরদের সর্বপ্রকার শত্রুতা এবং কুচক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও কোন কট্টরপন্থী কাফেরও কোরআন মাজীদের কোন একটি শব্দ বা অক্ষর বা কোন যের বা যবর এমনকি ফোটার কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি, আর কিয়ামত পর্যন্ত কোনদিন পারবেও না। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ অর্থাৎ, ‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ আর এই বাণীর কার্যকারিতা বিগত ১৪শত বছর থেকে চলে আসছে।

    আব্বাসী খলীফা মামুনুর রশীদের শাসনামলে কোরআন সংরক্ষণ সংক্রান্ত ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে পাঠকদের মনঃপুত হবে।

    মামুনুর রশীদ তার শাসনামলে জ্ঞান চর্চার মূল্যায়ন করতেন, যেখানে সকলেরই প্রবেশাধিকার ছিল। একটি বৈঠকে একজন ইহুদী উপস্থিত ছিল, তার জ্ঞানগর্ব এংব সাহিত্যকতাপূর্ণ আলোচনায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে খলীফা মামুন ইসলাম গ্রহণ করার জন্য দাওয়াত দিলেন। কিন্তু ইহুদী তা প্রত্যাখ্যান করল। এক বছর পর ঐ ইহুদী আবার ঐ বৈঠকে উপস্থিত হল কিন্তু এই সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে মামুনুর রশীদ তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমার হাতের লেখা সুন্দর, আমি বই লিখে বিক্রি করি, আমি পরীক্ষামূলকভাবে তাওরাতের তিনটি কপি লিপিবদ্ধ করেছি, সেখানে বহুস্থানে আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে কম বেশি করেছি এবং এ কপি নিয়ে ইহুদীদের গীর্জায় গিয়েছি। ইহুদীরা যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে তা ক্রয় করেছে। এরপর ইঞ্জিলের তিনটি কপি পরিবর্তন করে লিখে তা চার্চে নিয়ে গেলাম এবং খৃষ্টানদের নিকট তা বিক্রি করলাম। এরপর কোরআন মাজীদের তিনটি কপি নিলাম এবং এখানেও ঐভাবে কম বেশি করে লিখলাম এবং মসজিদে নিয়ে গিয়ে তা মুসলমানদের নিকট বিক্রি করে দিলাম। কিন্তু এই তিনটি কপিই খুব তাড়াতাড়ি আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হল এই বলে যে, এটাতে পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ, তাওরাত ও ইঞ্জিলের সমস্ত কপি গৃহিত হয়েছে এবং কোন কপিই ফেরত আসেনি। এ ঘটনার পর আমার বিশ্বাস জন্মাল যে, সত্যিই কোরআন মাজীদ সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ্ নিয়েছেন, তাই আমি মুসলমান হয়ে গেলাম।26

    ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলের পর:

    ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কোরআন মাজীদের যে কপিটি প্রস্তুত করিয়েছিলেন তা ছিল যের, যবর, পেশ ও নোক্তা বা ফোটা বিহীন। আরবী ভাষীদের জন্য এ ধরনের কোনআন তেলওয়াত করা ততটা কঠিন ছিল না, কিন্তু অনারবদের জন্য তা যথেষ্ট কষ্টকর ছিল। বলা হয়ে থাকে যে, সর্বপ্রথম বসরার গভর্ণর যিয়াদ বিন আবু সুফিয়ান একজন আলেম আবুল আসওয়াদ আদদুয়ালীকে এ বিষয়ে একটি সমাধান খোঁজার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি অক্ষরগুলোতে নোক্তা বা ফোটা দেওয়ার পরামর্শ দিলেন এবং তাই করা হল। আবদুল মালেক বিন মারওয়ান (৬৫-৮৬ হি.) তার শাসনামলে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরআন তেলওয়াতকে আরও সহজতর করার জন্য ইয়াহইয়া বিন ইয়ামার, নাসার বিন আসেম লাইসী ও হাসান বাসরী (রাহিমাহুমুল্লাহ্)-এর পরামর্শ ক্রমে যের, যবর, পেশ সংযোগ করেছেন। আবার বলা হয়ে থাকে যে হাযমা এবং তাশদীদের আলামতসমূহ খালীল বিন আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ্) স্থাপন করেছেন। এই বিষয়ে আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

    সাহাবা এবং তাবেয়ীনগণের অভ্যাস ছিল যে, তারা সপ্তাহে একবার কোরআন মাজীদ খতম করতেন, এ উদ্দেশ্যে তারা পূর্ণ কোরআন মাজীদকে সাত ভাগে ভাগ করেছিলেন, যাকে হিযব বা মাঞ্জিল বলা হয়। মূলত এই হিযব বা মাঞ্জিলের ভাগ সাহাবা কেরামগণের যুগে হয়েছিল। অবশ্য কোরআন মাজীদকে ত্রিশ পারায় ভাগ করা, প্রত্যেক পারাকে চার ভাগে ভাগ করা, অর্থাৎ, চতুর্থাংশ, অর্ধেক, তৃতীয়াংশ, এমন কি রুকুর আলামত, আয়াত নাম্বার, ওয়াক্‌ফ (যতি চিহ্ন) যোগ করা ইত্যাদি মোসহাফ উসমানী (উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগে একত্রিকৃত কোরআন)-এর পরে করা হয়েছে। যার সংযোজন একমাত্র কোরআন মাজীদের তেলওয়াত এবং মুখস্ত করাকে সহজ করার জন্য করা হয়েছে। কোরআন মাজীদ অবতীর্ণের সময়কালের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই এবং শরীয়তের দৃষ্টিতেও এর কোন বিশেষ বিধান নেই। এই বিষয়ে মহান আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

  • কোরআন সংরক্ষণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

    কোরআন সংরক্ষণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

    কোরআ’ন মাজীদ অবর্তীর্ণের সূত্রপাত হয়েছিল লাইলাতুল কদর, ২১ রমযান, ১০ আগষ্ট ৬১০ খৃষ্টাব্দ, সোমবার।25

    ঐ সময়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বয়স ছিল চন্দ্র বছর হিসেবে ৪০ বছর, ৬ মাস, ১২ দিন। আর সৌর বছর হিসেবে ৩৯ বছর তিন মাস ২২ দিন।26

    অহী অবতীর্ণের প্রারাম্ভে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভয়ে থাকতেন যে নাজানি তিনি অহীর কথাগুলো ভুলে যান, জিবরীল (আ.)-এর সাথে সাথে অহীর কথগুলো বার বার দোহরাতেন, ফলে আল্লাহ্ এ নির্দেশ দিলেন যে,

    لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ ١٦

    অর্থ: “তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্য আপনি দ্রুত অহী আবৃত্তি করবেন না।” (সূরা ক্বিয়ামা-১৬)

    সাথে সাথে এ নিশ্চয়তাও দিলেন যে, এ অহী স্মরণ রাখা এবং পড়ানো আমার দায়িত্ব। আল্লাহ্‌র বাণী:

    إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ ١٧ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ١٨

    অর্থ: “এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব, অতঃপর আমি যখন তা পাঠ করি তখন আপনি ঐ পাঠের অনুসরণ করুন। (সূরা কিয়ামা-১৭,১৮)

    আল্লাহ্‌র এবাণী থেকে একথা পরিষ্কার ভাবে স্পষ্ট হয় যে, কোরআন মাজীদের এক একটি আয়াত, এক একটি শব্দ স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্তরে সংরক্ষিত করে দিয়ে ছিলেন। আরো সতর্কতার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি বছর রমযান মাসে কোরআন মাজীদের ততটুকু শোনাতেন যতটুকু অবতীর্ণ হয়েছিল। যে বছর তিনি মৃত্যুবরণ করেন ঐ বছর জিবরীল (আঃ) কে দু’বার কোরআ’ন শুনিয়েছেন। যেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্তরে কোরআন মাজীদ এমনভাবে সংরক্ষিত ছিল যে সামান্য ভূল ত্রুটি বা সামান্য হেরফেরের কোন প্রকার কোন সম্ভবনা ছিল না।

    সাহাবা কেরামগণের মাঝে শিক্ষিত অশিক্ষিত সর্বপ্রকার লোকই ছিল, শিক্ষিত লোকদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল, তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোরআ’ন সংরক্ষণের জন্য কোরআ’ন মুখস্ত করা এবং লিখিত ভাবে রাখা উভয় পদ্ধতিই তিনি অবলম্বন করেছেন।

    উভয় পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নীচে উল্লেখ করা হল:

    কোরআ’ন মুখস্ত করা:

    কোরআ’ন মাজীদের অবতীর্ণ যেহেতু শাব্দিক ভাবে হয়েছিল অতএব জিবরীল (আ.) শব্দ এবং আয়াতের ধারাবাহিকতার সাথে সাথে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তার বিশুদ্ধ উচ্চারণও শিখাত, আর ঐ শাব্দিক ভাবেই উম্মত পর্যন্ত পৌঁছানো জরুরী ছিল, তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সার্বিক প্রচেষ্টা কোরআ’ন মুখস্ত করার ক্ষেত্রে ব্যয় করেছেন।

    মদীনায় হিযরত করার পর তিনি সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছেন, এরপর মসজিদের এক পাশে সামান্য উঁচু করে “সুফ্‌ফা” তৈরী করে তাকে মাদ্রাসায় রূপ দিয়েছেন, যেখনে উস্তাদগণ তাদের ছাত্রদেরকে কোরআ’ন শিক্ষা দিত। ওবাদা বিন সামেত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: যখন কোন ব্যক্তি হিজরত করে মদীনায় আসত তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে আমাদের আনসারদের মধ্য থেকে কারো নিকট পাঠিয়ে দিতেন, যেন তাকে কোরআ’ন শিখানো হয়। মসজিদ নববীতে কোরআ’ন মাজীদ তেলাওয়াত করা এবং শিক্ষা দেয়ার আওয়াজ এত বেশি হত যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন যে, হে লোকেরা তোমরা তোমাদের আওয়াজ সংযত রাখ।

    কোরআন মুখস্ত করার প্রতি তাড়াহুড়া এবং বেশি গুরুত্ব দেয়ার দ্বিতীয় কারণ এই যে, আরবদের ছিল যথেষ্ট মুখস্ত শক্তি, যারা তাদের বংশধারাতো বটেই এমনকি তারা তাদের ঘোড়ার বংশধারাও পরিষ্কার করে জানত।

    কোরআ’ন মুখস্তের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার তৃতীয় কারণ ছিল এই যে, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নামাযে কিছু না কিছু তেলওয়াত করা অপরিহার্য, ফরয নামায ব্যতীত নফল নামায, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাযের ফযিলত সাহাবা কেরামগণের মাঝে কোরআ’ন মুখস্তের আগ্রহকে আরো বৃদ্ধি করেছে।

    রমযান মোবারকের পূর্ণ মাস কোরআ’ন মাজীদ তেলওয়াত, শ্রবণ, মুখস্ত, শিখা, শিখানোর বিশেষ সময়, এতদ্ব্যতীত কোরআন মাজীদের অসংখ্য ফযিলত এবং কল্যাণের প্রতি দৃষ্টি রেখে কোরআন মুখস্ত করার ব্যাপারে সাহাবা কেরামগণ একে অপরের চেয়ে অগ্রগামী থাকার জন্য চেষ্টা করত।

    ৪র্থ হিযরীতে বিরে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনায় ৭০ জন সাহাবীর ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে তারা সবাই ভাল কোরআ’ন তেলওয়াতকারী ছিল, তারা দিনের বেলায় কাঠ কেটে আহলে সুফ্‌ফার লোকদের জন্য খাবার সংগ্রহ করত এবং কোরআন শিখত ও শিখাত, আর রাতে আল্লাহ্‌র নিকট দোয়া করা ও নামায আদায়ে ব্যস্ত থাকত।27

    সাহাবা কেরামগণের এ আগ্রহের ফলাফল এই ছিল যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায়ই হাফেযগণের একটি বড় দল গড়ে উঠেছিল, ঐদলের মধ্যে আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু), ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু), ওসমান গনী (রযিয়াল্লাহু আনহু), আলী (রযিয়াল্লাহু আনহু), তালহা (রযিয়াল্লাহু আনহু), সা’দ (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রযিয়াল্লাহু আনহু), হুযাইফা বিন ইয়ামান (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবু হুযাইফা (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর গোলাম সালেম (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবু হুরাইরা (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রযিয়াল্লাহু আনহু), আমর বিন আস (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন আমর (রযিয়াল্লাহু আনহু), মোয়াবীয়া (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন যুবাইর (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন সায়েব (রযিয়াল্লাহু আনহু), আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা), হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহা), উম্মু সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-গণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য।28

    রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মৃত্যুর সাথে সাথেই ১১ হিযরীতে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে ৭০০ হাফেযে কোরআ’নের শাহাদাত বরণ একথা স্পষ্ট করে প্রমাণ করে যে ঐ সময় পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণ হাফেয গড়ে উঠেছিল, মুখস্ত করার মাধ্যমে কোরআন মাজীদ সংরক্ষণের এ ধারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিদ্ধমান আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চালু থাকবে, ইনশাআল্লাহ্।

    কোরআন লিখন:

    কোরআন মুখস্ত করার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া সত্বেও কোরআন লিখে রাখার গুরুত্বের কথা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মোটেও ভুলে যান নি। এ উদ্দেশ্যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষিত সাহাবাগণকে এ দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন যে, ওহী নাযিল হওয়া মাত্রই তারা তা লিখে রাখবে। যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর নিদৃষ্ট ওহীর লিখক ছিল, এছাড়াও সরকারী অন্যান্য বিষয়াবলী লিখে রাখার দায়িত্বও তার ছিল। স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বিদেশী ভাষা শিখার এবং লিখার জন্য দিক নিদের্শনা দিয়ে ছিলেন। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখ যোগ্য ওহী লিখকগণের নাম নিম্ন রূপ:

    1. আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    2. ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    3. ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    4. আলী (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    5. ওবাই বিন কা’ব (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    6. যুবাইর বিন আওয়াম (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    7. মোয়াবিয়া বিন সুফিয়ান (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    8. মুগীরা বিন শো’বা (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    9. খালেদ বিন ওলীদ (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    10. সাবেত বিন কায়েস (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    11. আবান বিন সাঈদ (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    12. আবদুল্লাহ্ বিন সাঈদ বিন আস (রযিয়াল্লাহু আনহু)।29

    জাহেলিয়াতের যুগেও লিখক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে নির্দেশ দিয়ে রেখে ছিলেন যে, সে যেন সাহাবা কেরামগণকে লিখা শিখায়, বলা হয়ে থাকে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে ওহী লিখকগণের সংখ্যা ৪০ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ছিল।30

    রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখনই কোরআ’ন কারীমের কোন আয়াত অবতীর্ণ হত তখন তিনি ওহী লিখকদেরকে পরিপূর্ণভাবে নির্দেশ দিতেন যে, এ আয়াতটি ওমুক ওমুক সূরায় ওমুক ওমুক আয়াতের পরে লিখ, তখন ওহী লিখকগণ পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, গাছের পাতা, হাড্ডি বা কোন কিছুর উপর লিখে রাখত, এভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে কোরআন কারীমের এমন একটি কপি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল যা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের তত্ত্বাবধানে লিখিয়েছেন। এছাড়াও অনেক সাহাবী এমন ছিলেন যে, তারা নিজের ইচ্ছা ও আগ্রহে কোন কোন সূরা বা আয়াত নিজের নিকট লিখে রাখত, যেমন ওমার (রযিয়ল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর বোন এবং ভগ্নিপতি একটি পুস্তিকায় সূরা ত্বা-হা এর কিছু আয়াত লিখে রেখেছিল, তাই বলা হয়ে থাকে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত অগোছানো ভাবে ১৭টির অধিক মোসহাফের (কোরআ’নের কপি) সন্ধান পাওয়া যায়।31

    লিখনীর মাধ্যমে কোরআন সংরক্ষণের ধারা আজও মুখস্তের মাধ্যমে কোরআ’ন সংরক্ষণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণে শুধু জারিই নেই বরং তা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে, মোটামুটি শতাধিক ভাষায় কোরআন মাজীদের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে, শুধু মদীনায় প্রতিষ্ঠিত “বাদশাহ ফাহাদ আল কোরআ’ন একাডেমী” থেকে প্রতি বছর ২কোটি ৮০ লক্ষ কোরআন মাজীদের কপি ছেপে বিশ্ব ব্যাপী বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়। (তাঁকে আল্লাহ্ ইসলাম এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন)।

    উল্লেখ্যঃ প্রেস আবিষ্কারের পরে সর্বপ্রথম ১১১৩ হি. জার্মানীর হামবুর্গ প্রেসে কোরআন মাজীদ ছাপানো হয় যার একটি কপি আজও দারুল কুতুব মিশরিয়াতে বিদ্ধমান আছে।32

    আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়ল্লাহু আনহু)-এর যুগে কোরআন মাজীদ একত্রিত করণ:

    ইয়ামামার যুদ্ধে যখন হাফেজগণের একটি বড় দল শহিদ হয়ে গেল তখন সর্বপ্রথম ওমার ফারুক (রযিয়ল্লাহু আনহু) কোরআ’ন মাজীদ লিখিত ভাবে একত্রিত করার প্রয়োজন অনুভূত করেন, তাই তিনি আমীরুল মুমেনীন আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট এসে বলল, ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেজদের একটি বড়দল শহিদ হয়ে গেছে, যদি যুদ্ধসমূহে এভাবে হাফেযগণ শহিদ হতে থাকে তাহলে আশঙ্কা রয়েছে যে কোরআ’ন মাজীদের একটি বড় অংশ বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাই তুমি কোরআ’ন মাজীদ একত্রিত করার প্রতি গুরুত্ব দাও।

    আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়ল্লাহু আনহু) বললেন, যেকাজ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জিবদ্দশায় করে নি সেকাজ আমি কি করে করতে পারি?

    ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) উত্তরে বললেন, আল্লাহ্‌র কসম এটা খুবই ভাল কাজ! এরপর আল্লাহ্ তা’লা একাজের জন্য আবুবকর (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অন্তর খুলে দিলেন, তখন তিনি যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডেকে বললেন, তুমি যুবক এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তোমার ব্যাপারে কারো কোন খারাপ ধারণা নেই, তুমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অহীর লিখক ছিলে তাই তুমি কোরআন মাজীদের আয়াতসমূহ খুঁজে তা একত্রিত কর। যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) বলল, যদি তারা (আবুবকর এবং ওমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) আমাকে কোন পাহাড় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করতে বলত তাহলে তা আমার জন্য এতটা দুষ্কর হত না যতটা দুষ্কর কোরআ’ন মাজীদ একত্রিতকরণ। আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু) যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে একাজের জন্য বার বার বলতে থাকলেন, এমন কি এক সময়ে আল্লাহ্ যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অন্তরকে একাজের জন্য খুলে দিলেন ফলে তিনি একাজ করতে শুরু করলেন।33

    যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) কত কষ্ট স্বীকার করে একাজে আঞ্জাম দিয়েছেন তা একথা থেকে অনুমান করা যাবে যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন আয়াত নিয়ে যায়েদ (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট আসত তখন তিনি নিম্ন উল্লেখিত চারটি পদ্ধতিতে তা যাচাই বাছাই করতেন,

    1. যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) নিজে হাফেজ ছিলেন তাই প্রথমে নিজের মুখস্তের আলোকে তা যাচাই করতেন।
    2. ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু) ও যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে কোরআ’ন একত্রিত করার কাজে জড়িত ছিলেন, তিনিও কোরআ’নের হাফেজ ছিলেন তাই তিনিও নিজের মুখস্তের আলোকে তা যাচাই করতেন।
    3. যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) ততক্ষণ একটি আয়াতকে গ্রহণ করতেন না যতক্ষণ না দু’জন গ্রহণ যোগ্য ব্যক্তি এ সাক্ষ্য না দিত যে, হাঁ এ আয়াতটি সত্যিই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে লিখা হয়েছে।
    4. পরিশেষে পেশকৃত আয়াতটিকে অন্যান্য সাহাবাগণের লিখিত আয়াতের সাথে মেলানো হত, যে আয়াতটি এ চারটি শর্ত অনুযায়ী সঠিক হত তা গ্রহণ করা হত। এত গুরুত্বের সাথে যায়েদ (রযিয়াল্লাহু আনহু) কোরআন একত্রিকরণের এগুরুত্বপূর্ণ কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।

    যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) একত্র কৃত এ কপিটিকে “উম্ম” বলা হত, এ উম্মের ৩টি বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল —

    ক) সমস্ত সূরাসমূহের আয়াতগুলোকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিদের্শিত বিন্যাস অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়েছে।

    খ) ঐ কপিতে কেরআতের (তেলওয়াত পদ্ধতির) ৭টি পদ্ধতিই বিদ্ধমান ছিল, যাতে করে যে ব্যক্তি যে পদ্ধতিতে সুবিধামত কোরআন তেলওয়াত করতে পারবে সে ঐভাবে তা করবে।

    গ) সূরাসমূহ ধারাবাহিক ভাবে সাজানো হয়নি বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক ভাবে সহিফার (পুস্তিকার) আকৃতিতে বিন্যস্ত করা হয়েছিল।

    আবুবকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলে ঐ কপিটি আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট সংরক্ষিত ছিল, আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর পর ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে এ কপিটি ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট ছিল, ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাত বরণের পর এক কপিটি উম্মুল মুমেনীন হাফসা বিনতু ওমার (রাযিয়াল্লাহু আনহার) নিকট সংরক্ষিত ছিল।

  • ইসলাম ও কুফুরীর দ্বন্ধ

    ইসলাম ও কুফুরীর দ্বন্ধ

    ইসলাম এবং কুফরীর দন্দ্ব ঐ দিন থেকে শুরু হয়েছে যেদিন ইবলীস আল্লাহ্‌র নির্দেশ অমান্য করে আদম (আ.)-কে সেজদা করতে অস্বীকার করেছিল এবং বিতাড়িত হয়েছিল, বিতাড়িত হওয়ার পর সে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিল যে,

    قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ١٦ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ  ١٧

    অর্থ— সে বলল, আপনি আমাকে যেমন উদ্‌ভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। এরপর তাদের নিকট আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। (সূরা আ’রাফ-১৬,১৭)

    ইবলীসের এ প্রতীজ্ঞার পর থেকে মানব ইতিহসের রাত ও দিন কখনো ইসলাম ও কুফুরের দন্দ্ব থেকে মুক্ত ছিল না, কখোনো এ দন্দ্ব নূহ (আ.) এবং তাঁর কাউমের সরদারদের মাঝে ছিল, কখনো ইবরাহীম (আ.) এবং নমরূদের মাঝে ছিল, আবার কখনো হুদ (আ.) এবং তাঁর কাউমের সরদারদের মাঝে ছিল, আবার কখনো সালেহ (আঃ) এবং তাঁর কাউমের সরদারদের মাঝে ছিল, সর্বশেষে এ দন্দ্ব মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং কোরাইশদের সরদারদের মাঝে সংঘটিত হয়েছিল।

    আল্লাহ্ তা’য়ালা কোরআ’ন মাজীদে সম্মানীত নবীগণের সাথে কাফের নেতাদের দন্দ্বের কথা বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা অধ্যায়নে কাফেরদের ইসলামের সাথে শত্রুতা, সত্যের প্রতি উগ্রমনভাব, ঈমানদারদের বিরুদ্ধে যোগসাজেস এবং চক্রান্ত, ঈমানদারদের প্রতি যুলম, তাদেরকে কষ্ট দেয়া, তাদেরকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা, এর বিপরীতে ঈমানদারগণের দৃঢ়মনোভাব এবং ধৈর্য, ঈমানদারদের জন্য আল্লাহ্‌র সাহায্য এবং সংরক্ষণ, সর্বশেষে কাফেরদের দৃষ্টান্তমূলক পরিণতি ইত্যাদি থেকে বস্তবতাকে বুঝা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। এবাস্তব সত্য থেকে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়—

    ১ম, ইসলাম এবং কুফরের মাঝে দন্দ্ব আবহমানকাল থেকেই শুরু হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে, আল্লামা ইকবাল বলেছেন—

    ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দন্দ্ব আবহমানকাল থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে, মোস্তফার (ইসলামের) আলোর সাথে আবু লাহাবের দন্দ্ব।

    ২য়, ইসলাম এবং কুফরের মাঝের দন্দ্বের মূল কারণ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনা।

    “তা’লিমাত কোরআ’ন” বিষয়টি এত ব্যাপক যে, কয়েকশ পৃষ্ঠার গ্রন্থে তা আলোচনা করা সম্ভব ছিল না, আমি বর্তমান আবস্থার আলোকে শুধু ঐ সমস্থ শিক্ষাগুলোর উপরে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি যে, যে বিষয়গুলো ইসলামের শত্রুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঠাট্টা বিদ্রুপের নিদর্শনে পরিণত করেছে। উল্লেখিত শিক্ষাগুলো ছাড়াও আক্বীদা, গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এবং নিষেধাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে, আশা করছি এতে এ গ্রন্থ থেকে উপকার হাসিলে আরো অধিক সুবিধা হবে, ইন্‌শাআল্লাহ্।

    এগ্রন্থের ভাল দিকগুলো আল্লাহ্ তা’য়ালার দয়া এবং আনুগ্রহের ফল, আর ভুলভ্রান্তিসমূহ আমার নিজের গোনাহের কারণে। আমি আল্লাহ্ তা’য়ালার নিকট দোয়া করছি যে, তিনি যেন আমার জীবনের গোনাহ এবং অকল্যাণসমূহ স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে আবৃত করে দেন, নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত অনুগ্রহকারী এবং ক্ষমাশীল ও দয়াকারী।

    এ গ্রন্থ প্রস্তুতির ব্যাপারে সহযোগিতাকারী উলামাগণের জন্য উদার মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, আল্লাহ্ তাদের ইলম ও আমলে বরকত দিন, দুনিয়া এবং আখেরাতে তাদেরকে তাঁর অসীম রহমতে রহম করুন আমীন!

    বিজ্ঞজনের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা যে, তাদের চোখে এ গ্রন্থের যেখানেই কোন ভুল দৃষ্টি গোচর হবে উদার চিত্তে তারা তা আমাকে অবগত করাবেন, আমি তাদের জন্য দোয়া করব এবং পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করে আমি আনন্দ উপভোগ করব। (আল্লাহ্ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন।)

    আমার মোহতারাম বন্ধু জনাব সেকান্দার আব্বাসী সাহেব, (হায়দারাবাদ সিন্দ)-এর জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞাতার হকদার এজন্য যে, সে তাফহিমুসসুন্নাহ্ সিরিজের সমস্ত বই অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে এবং যথেষ্ট যত্নসহকারে শুধু সিন্ধী ভাষায় অনুবাদই করে নি বরং তার প্রকাশনা এবং বণ্টেনের দায়িত্বও পালন করছে, আল্লাহ্ তার সুস্থতা এবং জীবনে বরকত দিন, তিনি তাকে আরো একনিষ্ঠ এবং দৃঢ়তার সাথে হাদীস প্রচার এবং প্রসারের তাওফিক দিন, আমীন!

    ভাই আযীয খালেদ মাহমুদ কিলানী, হাদীস পাবলিকেশন্সের ম্যানেজার এবং ভাই আযীয হারুনুর রশীদ কিলানী ডিজাইনার, তারা তাদের নিজ দায়িত্বের চেয়ে আরো অধিক গুরুত্ব দিয়ে নিষ্ঠার সাথে কাজ করায় আমার অগ্রহ আরো জোরদার হয়েছে। এ দু’ভাইয়ের রাতদিনের পরিশ্রমে গ্রন্থসমূহ যথাযথ নিয়মে প্রকাশিত হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’য়ালা এ ভাতৃদ্বয়কে দুনিয়া এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন। তাদের ধন-সম্পদ এবং পরিবার পরিজনে বরকত দান করুন। আমীন!

    সাউদী আরবে তাফহিমুসসুন্নাহ্ প্রকাশ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হাফেজ আবেদ এলাহী সাহেব (মুদীর, মাক্তাবা বাইতুস্‌সালাম) অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে এ দায়িত্বে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন, দোয়া করছি যে, আল্লাহ্ তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন!

    আমি আমার ঐ সমস্ত বন্ধুদেরর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা তাফহিমুস্‌সুন্নার প্রকাশনার জন্য গত বিশ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং দৃঢ়তার সাথে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, বিশেষ করে প্রিয় পাঠকগণেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা এহাদীস গ্রন্থসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার পর আমার জন্য কল্যাণের দোয়া করছে, আল্লাহ্ তাদের সকলকে দুনিয়া ও আখেরাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন!

    হে বিশ্ব প্রতিপালক! হাদীস প্রচারণার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে তুমি অনুগ্রহ করে কবুল কর, এটাকে তুমি আমার জন্য, আমার পিতা-মাতার জন্য, অনুবাদকদের জন্য, প্রকাশকদের জন্য, সহযোগিতাকারীদের জন্য, পাঠকদের জন্য, সাদকা জারিয়া কর এবং ঐ দিন তোমার রহমত হাসিলের যারিয়া কর যেদিন তোমার রহমত ব্যতীত মাগফিরাতের আর কোন রাস্তা থাকবে না।

    وصلى الله على نبينا محمد صلى الله عليه وسلم وآله واصحابه اجمعين، برحمتك يا ارحم الراحمين.

    ১৬ রবিউস্‌সানী ১৪২৭হিঃ,

    মোতাবেক ১৪ মে ২০০৬ইং।

    মোহাম্মদ ইকবাল কিলানী (আফাল্লাহু আনহু)

    রিয়াদ, সাউদী আরব

  • মানবাধিকার ও আমেরিকা

    মানবাধিকার ও আমেরিকা

    আমেরিকা এবং পাশ্চাত্যদেশ সমূহ নিজেদেরকে মানবাধিকারের ঝাণ্ডাবাহী এবং রক্ষক হিসেবে এতটা প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে যে, এর ফলে আমাদের এখানকার মুক্তচিন্তাশীল এবং আধুনিক চিন্তাশীলরা বাস্তবেই মনে করে যে, আমেরিকা এবং পাশ্চাত্য মানবাধিকারের বড় রক্ষক। আসুন ইতিহাসের আয়নায় তা যাচাই করুন যে বাস্তবেই কি তা ঠিক আছে? সর্বপ্রথম আমেরিকার অতীত ইতিহাসে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।

    1. খৃষ্টীয় ১৮ শতাব্দীতে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা নুতন শক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের “নুতন পৃথিবী” আবাদ করার জন্য ৭০ লক্ষ রেড ইণ্ডিয়ানকে হত্যা করেছিল, আফ্রিকা মহাদেশের কৃষ্ণাঙ্গদেরকে জন্তুর ন্যায় ধরে ধরে নিজেদের ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল, জাহাজসমূহে জন্তুর ন্যায় ভরপুর করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল এবং তাদেরকে বেচা-কিনা করেছিল। এই কৃষ্ণাঙ্গরা আজও আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের ন্যায় মর্যদা পায় না। যখনই কৃষ্ণাঙ্গরা আমেরিকার সংবিধানে লিখিত মানবাধিকারের দাবী করেছে তখন তাদেরকে অত্যন্ত নির্মম ভাবে শেষ করে দেয়া হয়েছে।27
    2. ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে দক্ষিণ ডকুটা এবং আর্জেনটাইনের উপর অ্যামেরিকা আক্রমণ করে;
    3. ১৮৯১ খৃষ্টাব্দে চিলির উপর আক্রমণ করে;
    4. ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে আওয়হুর উপর আক্রমণ করে;
    5. ১৮৯৩ খৃষ্টাব্দে হুয়াইয়ের উপর আক্রমণ করে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহকে শেষ করে দেয়;
    6. ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে কোরিয়ার উপর;
    7. ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে পানামার উপর;
    8. ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে নাকানা গোয়ার উপর আক্রমণ;
    9. ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে ফিলিপাইনের উপর আক্রমণ— এ যুদ্ধ ১৯১০ পর্যন্ত (অর্থাৎ ১২ বছর পর্যন্ত) চলছিল, এর ফলে ৬ লক্ষ ফিলিপাইনী মারা যায়;
    10. ১৯১২ খৃষ্টাব্দে কিউবার উপর হামলা;
    11. ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে মেক্সিকোর উপর আক্রমণ;
    12. ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে হাইতির উপর আক্রমণ;
    13. ১৯১৭-১৯১৮ খৃষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে;
    14. ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে হোল্ডরিজের উপর আক্রমণ করে;
    15. ১৯২০ খৃষ্টাব্দে গোয়েটির উপর আক্রমণ করে;
    16. ১৯২১ খৃষ্টাব্দে পশ্চিম অর্জিনিয়ার উপর আক্রমণ করে।
    17. ১৯৪১-৪৫ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, এতে চার কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে অ্যামেরিকা অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে এবং তাদের এক কোটি ৬০ লক্ষ সৈন্য তাতে অংশ গ্রহণ করে। হিরুশিমা এবং নাগাসাকীর উপর এটমবোমা নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে মানবাধিকারের পতাকাবাহী অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট টারোমীন এবং সভ্য বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার উন্সটন চার্চেলও ছিল।
    18. ১৯৪৩ খৃষ্টাব্দে ডিউটোরিটে কৃষ্ণাঙ্গদের বিদ্রোহকে দমন করার জন্য অ্যামেরিকা সেনা আক্রমণ করে;
    19. গ্রীসের যুদ্ধস্থান (১৯৪৭-৪৯ খৃষ্টাব্দে ) কমান্ডো আক্রমণ করে;
    20. ১৯৫০ খৃষ্টাব্দে পোরটোএকোরে আক্রমণ করে;
    21. ১৯৫৩ খৃষ্টাব্দে সেনা আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের সরকার পরিবর্তন করে।
    22. ১৯৫৪ খৃষ্টাব্দে গোয়েটেমালার উপর বোমা নিক্ষেপ করে।
    23. ১৯৬০ খৃষ্টাব্দে থেকে ১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে অ্যামেরিকা ১৫ বছর পর্যন্ত ভিয়েতনামের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, যার ফলে ১০লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
    24. ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দে অ্যামেরিকা ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান সোহর্তোর বিরোধী পক্ষের ১০লক্ষ লোককে মারার জন্য সহযোগিতা করেছিল।
    25. ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দে থেকে১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত (৬ বছর) কম্বোডিয়ার সাথে যুদ্ধ করেছিল। এতে ২০ লক্ষ লোককে হত্যা করেছে।
    26. ১৯৭১-৭৩ খৃষ্টাব্দে লাউসে বোমা নিক্ষেপ করেছে।
    27. ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দে দক্ষিণ ঢেকোটার উপর সেনা আক্রমণ করে।
    28. ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দে চিলির উপর সেনা আক্রমণ করে সরকার পরিবর্তন করে।
    29. ১৯৭৬-১৯৯২ খৃষ্টাব্দে এন্‌গোলায় দক্ষিণ আফ্রিকার সহযোগিতায় সংঘঠিত বিদ্রোহীদেরকে সহযোগিতা করে।
    30. ১৯৮১- ৯০ খৃষ্টাব্দে নাকারাগোয়ার উপর সেনা আক্রমণ করে।
    31. ১৯৮২- ৮৪ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত লেবাননের মুসলিম অঞ্চলসমূহে বোমাবাজী করেছে।
    32. ১৯৮৪ খৃষ্টাব্দে পারস্য সাগরে দু’টি ইরানী বিমান ধ্বংস করেছে।
    33. ১৯৮৬ খৃষ্টাব্দে সরকার পরিবর্তনের জন্য লিবিয়ার উপর আক্রমণ করে।
    34. ১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে ইরাক অ্যামেরিকার সৈন্যদের সহযোগিতায় ইরানের উপর আক্রমন করে। এ যুদ্ধ ৮ বছর পর্যন্ত চলেছে যার ফলে উভয় পক্ষের লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে।
    35. ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে ফিলিপাইনে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ হয়, অ্যামেরিকা এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য ফিলিপাইনকে আকাশ সীমা দিয়ে সহযোগীতা করেছে।
    36. ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে সেনা আক্রমনের মাধ্যমে পানামার সরকার পরিবর্তন করেছে, যার ফলে ২ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেছে।
    37. ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে আলজেরিয়ার ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে, যারা দেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেল, ইসলামী বিপ্লবকে প্রতিরোধ করার জন্য অ্যামেরিকার সাহায্যে সেনা আক্রমণ চালানো হয়, যার ফলে ৮০ হাজার লোক নিহত হয়েছে।
    38. ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে ইরাককে কুয়েতের উপর আক্রমণ করার জন্য উৎসাহিত করে এবং ১৯৯১ খৃষ্টাব্দে ডিজারেট স্টার্ম অপারেশনের আদলে নিজেই ইরাকের উপর আক্রমণ করে, যার ফলে হাজার হাজার ইরাকী মৃত্যুবরণ করে।
    39. ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে হাইতির সরকার পরিবর্তন করানোর জন্য সেনা আক্রমন করে।
    40. ১৯৯৬ খৃষ্টাব্দে ইরাকের উপর আক্রমণ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সেনা আস্তানাসমূহে মিসাইল নিক্ষেপ করে। ১৯৯৮ খৃষ্টাব্দে সুদানের দু’টি অস্ত্র কারখানার উপর আক্রমণ করে।
    41. ১৯৯৮- খৃষ্টাব্দে আফগাস্তিানে সি, আই, এর প্রতিষ্ঠিত জিহাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্ৰসমূহে মিজাইল হামলা চালায়;
    42. ১৯৯৮ খৃষ্টাব্দে ইরাকের উপর আবার একাধারে চার দিন মিসাইল আক্রমণ করতে থাকে।
    43. ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার উপর বিদ্রোহ করায়, খৃষ্টানদেরকে সহযোগিতা করে, লাখ লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছে, পরিশেষে পূর্ব তৈমুরকে একটি খৃষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে কায়েম করে।2829
    44. সোভিয়েত ইউনিয়নের জোর পূর্বক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তির জন্য দশ লক্ষ শহীদের কোরবানীর রক্ত না শুকাতেই আফগানিস্তানের উপর ২০০১ খৃষ্টাব্দে বিমান এবং মিসাইল থেকে বোমাবাজী শুরু করে, যার ফলে ২৫ হাজার নিরপরাধ মানুষ শাহাদাত বরণ করে। ৭হাজার মানুষকে বন্দী করা হয়, আর তালেবানের স্থানে উত্তারঞ্চলীয় জোটের পুতুল সরকার কায়েম করা হয়।
    45. ইরাকে পরমানবিক অস্ত্র থাকার বাহানা দিয়ে ২০ মার্চ ২০০৩ খৃষ্টাব্দে অ্যামেরিকা ইরাকের উপর আক্রমণ করে, যার ফলে হাজার হাজার নিরপরাধ লোক নিহত হয়েছে, ইরাকে অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণ লাভের পর ফালুজা শহরের ঘণবসতিপূর্ণ এলাকায় অ্যামেরিকান সৈন্যরা বিষাক্ত গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করেছে, যা ব্যবহারে জাতিসঙ্গের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
    46. ২০০৬ খৃষ্টাব্দে জানুয়ারিতে ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচনে হামাস বিজয় লাভ করে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পতাকাবাহী অ্যামেরিকা হামাসের সরকারকেই মেনে নিতে অস্বীকার করে নি বরং তাদেরকে খতম করার জন্য একের পর এক পরিকল্পনাও নিতে থাকে।
    47. ইরানে আহমদ নাযাদের সরকার যেহেতু অ্যামেরিকাকে নিজের মনিব হিসেবে দেখছে না, তাই অ্যামেরিকা এখন রাত দিন সেখানে হামলা করার বাহানা খোঁজছে।
    48. নামে মাত্র সন্ত্রাসবাদ খতম করার অজুহাতে পাকিস্তান অ্যামেরিকার বন্ধু হওয়া সত্বেও ডজন বারের বেশি পাকিস্তানের আকাশ সীমা পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যবহার করে পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে চেলেঞ্জ করেছে।

    আসুন একবার ১৪ শত বছর আগের মানবাধিকার সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনার কিছু দৃষ্টান্ত নেয়া যাক, এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন যে, মানবাধিকারের দাবীতে কে সত্যবাদী আর কে মিত্যাবাদী?

    1. বিদায় হজ্বের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাষণ দিতে গিয়ে, মানুষকে মানবাধিকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক অর্থবোধক এক বক্তব্য পেশ করেছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত এর বিকল্প কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। অ্যামেরিকা এবং প্রাচ্যবাসীরা যখন একান্তচিত্তে কোন সময় তা অধ্যায়ন করবে এবং এ অনুযায়ী আমল করার সিদ্ধান্ত নিবে, তাহলে নিঃসন্দেহে ঐ দিন থেকেই বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার সয়লাভ হয়ে যাবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন— হে মানব মণ্ডলী! নিশ্চয় তোমাদের রব একক, তোমাদের পিতাও একজন।

      শুনে রাখ কোন আরাবীর অনারবীর উপর এবং কোন অনারবীর কোন আরাবীর উপর কোন বিশেষ মর্যাদা নেই, না কোন লাল বর্ণের অধিকারী কোন কৃষ্ণাঙ্গের উপর, না কোন কৃষ্ণাঙ্গের কোন লাল বর্ণের অধিকারীর উপর কোন বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তবে (তাদের মাঝে) মর্যাদার (মাপকাঠি) হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। (মুসনাদ আহমদ)

      তিনি অন্যত্র আরেকটি বক্তব্যে বলেছেন— হে মানব মণ্ডলী! তোমাদের রক্ত, সম্পদ, সম্মান একে অপরের উপর সর্বদাই হারাম, এ বিষয়গুলো তোমাদের জন্য এমনি মর্যাদাবান যেমন আজকের দিন (১০ যিলহাজ্জ্ব) এবং যেমন এই শহর (মক্কা) তোমাদের নিকট মর্যাদাবান। (বোখারী, আবুদাউদ, নাসায়ী)।

    2. মানুষের জানের নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করার জন্য এতটুকু সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দিয়ে তার ভাইয়ের প্রতি ইঙ্গিত করবে তার উপর ফেরেশ্তা ততক্ষণ পর্যন্ত অভিসম্পাত করতে থাকবে যতক্ষণ না সে তা থেকে বিরত হবে। চাই সে তার আপন ভাই হোক বা যে ধরণের ভাই হোক না কেন। (মুসলিম)
    3. অমুসলিমদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানকে নিশ্চিত করতে গিয়ে বলা হয়েছে— যে ব্যক্তি কোন যিম্মীকে (ইসলামী রাষ্ট্রে বিধর্মী প্রজা) বিনা কারণে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না। (বোখারী)
    4. যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে এ নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যেন নিহতদেরকে মোসলা (নাক, কান) কর্তন না করা হয়। শত্রুকে ধোঁকা দিয়ে হত্যা করা যাবে না; শত্রুকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে হত্যা করা যাবে না; শত্রুকে নিরাপত্তা দেয়ার পর তাকে হত্যা করা যাবে না; নারী, শিশু, শ্রমিক, ইবাদতকারীদেরকে হত্যা করা যাবে না; ফলবান বৃক্ষ কাটা যাবে না; চতুপদ জন্তু হত্যা করা যাবে না; অঙ্গীকার ভঙ্গ করা যাবে না; যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের জান মালের নিরাপত্তা ঐভাবে দিতে হবে যেভাবে মুসলমানদের জানমালের নিরপত্তা বিধান করা হয়ে থাকে। ( বোখারী, মোয়ত্বা, আবুদাউদ, ইবনু মাযা)

    ইসলামের এ দিক নির্দেশনা শুধু মৌখিকই ছিল না বরং মুসলমানরা সর্বকালে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে এ দিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছে।

    আমরা এখানে উদাহরণ সরূপ কিছু ঘটনা উল্লেখ করতে চাই—

    1. ৮ম হিযরীর শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খালেদ বিন ওলীদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে এক কাবিলা (বংশের) লোকদেরকে দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠালেন, ভুল বুঝাবুঝির ভিত্তিতে কিছু সংখ্যক লোককে কাফের মনে করে হত্যা করা হল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বিষয়টি জানতে পারলেন তখন উভয় হাত তুলে দোয়া করলেন “হে আল্লাহ্ খালেদ যা করেছে তা থেকে আমি দায়িত্ব মুক্ত। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিহতদের রক্ত পণ এবং অন্যান্য ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।
    2. ৪র্থ হিযরীর সফর মাসে বি’রে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনার পর, যেখানে আমর বিন উমাইয়া জমেরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন, মদীনায় ফিরে আসার সময় রাস্তায় কিলাব বংশের দু’ব্যক্তিকে শত্রু পক্ষের লোক মনে করে হত্যা করেছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ঘটনা জানতে পেরে তিনি তাদের উভয়ের রক্তপণ আদায় করেন।
    3. ২য় হিযরীর রজব মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি গোয়েন্দা দল সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন, যাদের কোরাইশদের একটি গ্রুপের সাথে সংঘর্ষ হল, সাহাবাগণ নিজেদের মাঝে পরামর্শক্রমে কোরাইশদের গ্রুপটির উপর আক্রমণ করল, ফলে কোরাইশদের এক ব্যক্তি নিহত হল, দু’জন গ্রেফতার হল, একজন পালিয়ে গিয়েছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ঘটনা জানতে পেরে বললেন— আমি তোমাদেরকে হারাম (নিষিদ্ধ মাসে) যুদ্ধ করার অনুমতি দেই নি, ফলে তিনি দু’জন বন্দীকেই মুক্তি দিয়ে দিলেন এবং নিহত ব্যক্তির রক্তপণ আদায় করলেন।
    4. বদরের যুদ্ধে মক্কার মোশরেকদের ৭০জন লোক বন্দী হয়েছিল, এরা মুসলমানদের জানের শত্রু ছিল, মুসলমানদেরকে পৃথিবী থেকে চির বিদায় করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু যখন বন্দী হয়ে আসল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে নির্দেশ দিলেন যে বন্দীদের সাথে ভাল আচরণ করবে, তাই সাহাবাগণ নিজেরা খেজুর খেত, আর বন্দীদেরকে ভাল খাবার পরিবেশন করত, যে সমস্ত বন্দীদের কাপড় ছিল না তাদের জন্য কাপড়ের ব্যবস্থা করা হল, বন্দীদের মধ্যে এক ব্যক্তির নাম ছিল সুহাইল বিন আমর, যে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে রক্ত গরম করা বক্তব্য দিত, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) পরামর্শ দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ তার সামনের দু’টি দাঁত ভেঙ্গে দিন, যাতে আর কোন দিন আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলতে না পারে। শাস্তি দেয়ার উপযুক্ত পরামর্শ ছিল, সামনে কোন বাধাও ছিল না, বিশ্ববাসীর প্রতি রহমতের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-র পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে বন্দীদের সাথে সদাচারণের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যা পৃথিবীতে আজও অতুলনীয়।
    5. বদরের যুদ্ধের বন্দীদের মাঝে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জামাতা আবুল আসও ছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মেয়ে যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) আবুল আসের মুক্তির জন্য কিছু সম্পদ পাঠাল, যার মধ্যে একটি হারও ছিল যা খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তার মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় দিয়েছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ হার দেখা মাত্র মন নরম হয়ে গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে বললেন— যদি তোমরা অনুমতি দাও তাহলে আবুল আসকে বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দিতে চাই, সাহাবাগণ সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমতি দিলে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবুল আসকে মুক্তি দিয়ে দিলেন।
    6. হুনাইনের যুদ্ধে ৬ হাজার লোক মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সবাইকে শুধু বিনা মুক্তিপণেই মুক্তি দেন নি বরং তাদের প্রত্যেককে একটি করে মিশরীয় চাদরও উপহার হিসেবে দিলেন। আজ সমগ্র বিশ্বে যারা নিজেদের বড়ত্ব, সভ্যতা ও মানবতাবাদের দাবী করে বেড়াচ্ছে, তারা তাদের শতবছরের ইতিহাসে এধরণের কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পেলে তা পেশ করুক!
    7. গামেদী বংশের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল— ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পবিত্র করুন, সাথে সাথে একথাও স্বীকার করল যে আমি অবৈধভাবে গর্ভধারণ করেছি, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন— তুমি ফিরে চলে যাও, সন্তান প্রসবের পর আসবে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার শাস্তি এজন্য দেরী করলেন, যেন নির্দোষ শিশু সন্তানটির ক্ষতি না হয়, সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর ঐ মহিলা আবার আসলে তিনি বললেন— যাও এখন গিয়ে তাকে দুধ পান করাও, দুধ পানের বয়স শেষ হলে আসবে, মহিলাটি আবার ফিরে চলে গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বিতীয় বার তার শাস্তি এজন্য দেরী করলেন যেন একটি মা’সুম বাচ্চা তার মায়ের দুধ পান এবং স্নেহ বঞ্চিত না হয়। দুধপানের বয়স শেষ হওয়ার পর মহিলা আবার আসল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার উপর শাস্তি কার্যকর করলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু মায়ের পেটেই সন্তানের নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দেন নি বরং সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পরও তাকে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করা পছন্দ করেন নি।
    8. ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে ইসলামী সেনাদল এক যিম্মীর (ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম প্রজার) জমির ফসল বিনষ্ট করে দিল, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তখন বাইতুল মাল থেকে জমির মালিককে দশ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ দিলেন।30

    বাস্তবতা হল এই যে, ইসলাম আজ থেকে ১৪ শত বছর আগে যেভাবে মানবাধিকারকে সংরক্ষণ করেছে, পাশ্চাত্য তার সমস্ত উন্নতি, অগ্রগতি ও মুক্তচিন্তার অধিকার থাকা সত্বেও এধরণের মানবাধিকারের কল্পনাও করতে পারবে না।

    জাতি সঙ্ঘের জেনারেল এসেম্বলীতে ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৮ খৃষ্টাব্দে মানবাধিকার সম্পর্কে ৩০ দফা সম্বলিত যে ঘোষণা পেশ করা হয়, তা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে দেখা যাবে যে এখানে মানবাধিকারের শুধু রেফারেন্সই রয়েছে, কিন্তু ইসলাম যেভাবে মানব জীবনের সকল স্তরে পৃথক পৃথক অধিকার নির্ধারণ করেছে, যেমন— পিতা-মাতার অধিকার, সন্তানদের অধিকার, স্বামীর অধিকার, স্ত্রীর অধিকার, প্রতিবেশীর অধিকার, এতীমের অধিকার, মিসকীন ও অভাবীদের অধিকার, ভিক্ষুকের অধিকার, মুসাফিরের অধিকার, বন্দীর অধিকার, ক্রীতদাসের অধিকার, অমুসলিমের অধিকার, এমনকি কিছুক্ষণের জন্য কারো নিকট অবস্থানকারীর অধিকার, পাশ্চাত্যের এধরণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চিন্তা কিয়ামত পর্যন্ত আসবে না।

    পাশ্চাত্যবাসীদের নিকট নারী অধিকারের যথেষ্ট বলিষ্ট কণ্ঠ শোনা যায়, কিন্তু সত্য কথা হল এই যে, পাশ্চাত্যবাসীরা নারী অধিকারের নামে নারীকে শুধু উলঙ্গই করেছে, এছাড়া আর কোন অধিকার যদি তারা নারীকে দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের তা পরিষ্কার করা উচিত, অথচ ইসলাম নারীকে শুধু সম্ভ্রম এবং সম্মানই রক্ষা করে নি বরং তাকে সমাজে একজন সম্মানীতা এবং মানানসই স্থানও দিয়েছে, মা হিসেবে তাকে পিতার চেয়েও অধিক ভাল আচরণ পাওয়ার অধিকার দিয়েছে, স্ত্রী হিসেবে তার জন্য আলাদা অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে, মেয়ে এবং বোন হিসেবেও তাকে তার অধিকার দেওয়া হয়েছে, যদি বিধবা হয় তাহলে সে ক্ষেত্রেও তার অধিকার দেয়া হয়েছে, যদি ত্বালাক প্রাপ্তা হয়, তাহলে ঐ ক্ষেত্রেও তার অধিকার তাকে দেয়া হয়েছে। উন্নতী ও অগ্রগতি সম্পন্ন এবং মুক্তচিন্তার পাতাকাবাহী পাশ্চাত্য সমাজ আদৌ কি নারীকে এ অধিকার দিতে প্রস্তুত আছে? কিন্তু পাশ্চাত্যবাসীদের চক্রান্তের কি ধারণা যে, মায়ের পেটে শিশুর জীবনের নিরাপত্তা বিধানকারী ইসলামের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্ত্রাসী, রক্তপাতকারী, হত্যাকারী নবী ছিলেন? (নাউজুবিল্লাহ্)।

    আর শুধু একটি রাষ্ট্র ইরাকের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ৫ লক্ষ মা’সুম বাচ্চাকে মৃত্যু মুখে পতিত কারী অ্যামেরিকা এবং পাশ্চাত্যবাসীরা সবচেয়ে বড় মানবাধিকার রক্ষা কারী?

  • আল্লাহ্ কি হিংস্রতা এবং জুলম করেন?

    আল্লাহ্ কি হিংস্রতা এবং জুলম করেন?

    ইসলাম সাধারণ মানুষের জন্য যেমন শান্তি ও নিরাপত্তার দ্বীন, এমনিভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও একটি শান্তি ও নিরাপত্তার দ্বীন। আল্লাহ্ যেমন সাধারণ মানুষের হেদায়েতের জন্য কোরআন মাজীদে কিছু কিছু বিধান অবতীর্ণ করেছেন এমনিভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য কিছু কিছু অপরাধের শাস্তির বিধানও রেখেছেন, যে বিধানগুলো ঐ রকম অপরিবর্তনীয়— যেমন নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্বের বিধানগুলো অপরিবর্তনীয়। আল্লাহ্‌র নির্ধারণকৃত শাস্তি যাকে ইসলামের পরিভাষায় “হুদূদ”(দণ্ডবিধি) বলা হয় তা নিন্মরূপ—

    1. চুরীর শাস্তি— চোরের শাস্তি হল তার হাত কেটে দেয়া। (৫ : ৩৮)।
    2. ডাকাতির শাস্তি— সশস্ত্র ডাকাতদল যদি ডাকাতি করার সময় কাউকে হত্যা করে কিন্তু সম্পদ লুট না-করে তাহলে তার শাস্তি হল হত্যার বিনিময়ে হত্যা।
      আর ডাকাতি করার সময় যদি হত্যা করে এবং সম্পদও লুট করে, তাহলে তার শাস্তি শূলিতে চড়ানো, আর ডাকাতি করার সময় যদি শুধু সম্পদ লুট করে হত্যা না করে তাহলে তার শাস্তি হল তাদের হস্ত ও পদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কাটা। (৫ : ৩৩)।
    3. সত্বী-সাধ্বী নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি— সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি ৮০টি বেত্রাঘাত।(২৪ : ৪)।
    4. অবিবাহিত নর-নারীর যিনার (ব্যভিচারের) শাস্তি— একশত বেত্রাঘাত ।(২৪ : ২)। যদি নর ও নারী উভয়ের সম্মতিতে যিনা (ব্যভিচার) হয়ে থাকে, তাহলে উভয়েরই উক্ত শাস্তি হবে, আর যদি কোন একজনের ইচ্ছায় জোরপূর্বক যিনা (ব্যভিচার) হয়ে থাকে, তাহলে যে জোর করে যিনা (ব্যভিচার) করেছে তার এ শাস্তি হবে।
    5. বিবাহিত নর-নারীর যিনার (ব্যভিচার) শাস্তি— তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করা। (বোখারী ও মুসলিম)। উল্লেখ্য, বিবাহিত নর-নারীর যিনার (ব্যভিচারের) শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করা, এসংক্রান্ত আয়াতটি কোরআ’ন মাজীদের সূরা আহযাবে অবতীর্ণ হয়েছিল, কিন্ত পরবর্তীতে আল্লাহ্ তা’য়ালা ঐ আয়াতের বিধান কার্যকর রেখে তার তেলওয়াত রহিত করে দেন, এ বিধানের উপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমল করেছেন, তাঁর মৃতুর পর খোলাফায়ে রাশেদীনগণ আমল করেছেন। (আশরাফুল হাওয়াসী, ফুটনোট নং—৯ পৃঃ ৪১৮)।
    6. মদ পানের শাস্তি— নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে এবং আবুবকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহুর) যুগে মদ পানের শাস্তি ছিল ৪০টি বেত্রাঘাত, ওমর ফারুক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর শাসনামলে সাহাবাগণের পরামর্শ ক্রমে মদপানের শাস্তি নির্ধারণ করেন ৮০টি বেত্রাঘাত, এব্যাপারে আবদুর রহমান বিন আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহুর) পরমার্শ ছিল দণ্ডবিধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম শাস্তি হল মিথ্যা অপবাদের শাস্তি, তাই মদ পানের শাস্তিও কম পক্ষে তার সমপর্যায়ের হওয়া উচিত। তাই মদ পানের শাস্তি তখন ৮০টি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হল, এব্যাপারে সমস্ত সাহাবাগণের ঐক্যমত ছিল এবং এর উপর আমলও শুরু হল।

    আমাদের এটা দৃঢ় বিশ্বাস যে আল্লাহ্‌র নির্ধারণ কৃত শাস্তির বিধানে আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে মানুষের প্রতি দয়ারই বহিঃপ্রকাশ, আর এ শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন করার মধ্যে আদম সন্তানের জন্য কল্যাণ রয়েছে, আর তা বাস্তবায়ন ব্যতীত কোন সমাজ ব্যবস্থাতেই মানুষের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়।

    নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং সাহাবাগণের যুগে ইসলামের বিজয়ের মাধ্যমে যে সমস্ত এলাকাগুলো ইসলামী সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সেখানে যখন ইসলামী আইন কার্যকর করা হল, তখন ঐসমস্ত এলাকাসমূহে শান্তি ও নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত স্থাপন হল।

    নজদের শাসক আদী বিন হাতেম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে দ্বিধা সংকোচ করছিল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন— আদী হয়ত তুমি মুসলমানদের স্বল্পতা এবং কাফেরদের আধিক্য দেখে ইসলাম গ্রহণ করা থেকে বিরত আছ, আল্লাহ্‌র কসম! অতিশীঘ্রই সমগ্র আরবে ইসলামের পতাকা বিজয়ী দেখতে পাবে, আর শান্তি ও নিরাপত্তার এমন এক দৃষ্টান্ত কায়েম হবে যে, একজন মহিলা একা একা যানবাহনে আরোহণ করে কাদেসিয়া (ইরানের একটি শহর) থেকে রওয়ানা হয়ে নির্ভয়ে সফর করে মদীনায় পৌঁছে যাবে, সফরকালে তার মধ্যে শুধু আল্লাহ্‌র ভয় থাকবে। একথা শুনে আদী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণ করল এবং নিজের মৃত্যুর পূর্বে একথার সাক্ষ্য দিলেন যে, আল্লাহ্‌র কসম! রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে, আমি স্বচোখে দেখেছি যে একজন মহিলা একা একা নিজের যানবাহনে আরোহণ করে কাদেসিয়া থেকে নির্ভয়ে সফর করে মদীনায় পৌঁছেছে। বিশাল আয়তন বিশিষ্ট ইসলামী সম্রাজ্যে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা একমাত্র ইসলামী দণ্ডবিধি কার্যকর থাকার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

    আজকের এই অশান্তির যুগে পৃথিবীর সভ্য এবং উন্নত দেশসমূহে দৃষ্টি দিয়ে দেখুন যে যদি পৃথিবীর কোথাও এমন কোন দেশ থাকে যেখানে দিন ও রাতের যেকোন সময় মানুষ নির্ভয়ে সফর করতে পারবে তাহলে সেটা সৌদী আরব, যেখানে না শোয়ার কোন ভয় আছে না জীবনের না ইজ্জতের। নিরাপত্তা ও শান্তির এ পরিবেশ ইসলামী দণ্ডবিধি কার্যকর করার কারণে যদি না হয় তাহলে আর কি কারণে?

    মরোক্কোতে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ওলফ্রেড হুফ মীন ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামী দণ্ডবিধি সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করে, যেখানে সে চোরের হাত কাটা, হত্যার বিনিময়ে হত্যাকারীকে হত্যা করা, যিনা (ব্যভিচারকারীকে) পাথর মেরে হত্যা করা সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করেছে, সেখানে সে একথা প্রমাণ করেছে যে মানবতাকে শান্তি ও নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এদণ্ডবিধি কায়েম করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই।1

    প্রিয় জন্মভূমিতে (লেখকের) যখন থেকে আধুনিক ইসলামের ধারক এবং আলোকিত চিন্তার সরকার এলো তখন থেকেই ইসলামী বিধানাবলী এবং ইসলামী নিদর্শনসমূহের প্রতি ঠাট্টার ধারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালু হল, আর তখন নুতন করে ইসলামী দণ্ডবিধি আইনে কিছু বিশেষ নযরধারী শুরু হয়, ফলে খোলাখুলিভাবে পরিষ্কার ভাষায় ইসলামী দণ্ডবিধিকে হিংস্র এবং জুলুম বলে আখ্যায়িত করা হল, যার পরিষ্কার অর্থ দাঁড়ায় এ শাস্তির বিধান প্রবর্তনকারী সত্বা (আল্লাহ্ মাফ করুন, আবারো আল্লাহ্ মাফ করুন) হিংস্র এবং জালেম।

    চিন্তা করুন

    • যে মহান সত্বা তাঁর নিজের জন্য দয়ালু, করুনাময়, ক্ষমাশীল এধরণের গুণাবলী বেছে নিয়েছেন তিনি কি হিংস্র এবং জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি সর্বধা স্বীয় বান্দাদের গোনাহ্ মাফ করে তাদেরকে স্বীয় নে’মত দান করে থাকেন, তিনি কি হিংস্র ও জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি তাঁর আরশে একথা লিখে রেখেছেন যে, আমার রহমত আমার রাগের উপর বিজয়ী (বোখারী ও মুসলিম) তিনি কি হিংস্র এবং জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি তার রহমতের ৯৯ ভাগ কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করার জন্য রেখে দিয়েছেন (বোখারী ও মুসলিম) তিনি কি জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যার সমস্ত ফায়সালা বিজ্ঞানময়, যার সমস্ত ফায়সালা সর্বপ্রকার ত্রুটিমুক্ত, যার সমস্ত ফায়সালা প্রশংসার দাবী রাখে, তিনি কি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে হিংস্র এবং অবিচার করতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি জুলুম না-করার ওয়াদা করেছেন (৫০:২৯) তিনি কি তাঁর বান্দাদের প্রতি হিংস্র এবং জুলম মূলক ফায়সালা করতে পারেন?
    • অতএব হে আমার জাতির নেতা, সরকারের সর্বোচ্চ মসনদে বসে আল্লাহ্ তা’য়ালাকে গালি দিবে না। দয়াময়, অনুগ্রহশীল, অত্যন্ত ধৈর্যশীল, মহাজ্ঞানী সত্বার শ্রেষ্টত্ব এবং তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে বেয়াদবী করা থেকে বিরত থাক। তাঁর শাস্তি ও পাকড়াওকে ভয় কর, স্বীয় গোনাহের জন্য তাঁর নিকট তাওবা কর।
    • যাতে এমন না হয় যে এ সর্বোচ্চ মসনদ থেকে ছিটকে পড়।
    • যেন এমন না হয় যে, আকাশ থেকে পাথর বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু করে।
    • যেন এমন না হয় যে, আকাশ থেকে ফেরেশ্তাগণকে অবতরণ করার হুকুম দেওয়া হয়।
    • এমন যেন না হয় যে পৃথিবীর নীচের অংশ উপর এবং উপরের অংশ নীচে করে দেওয়া হয়।
    • এমন যেন না হয় যে আকাশ ও যমিনের মুখগহ্বর উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে আর এ উভয়ের পানি মিলিত হয়ে সবকিছুকে একাকার করে দিবে।
    • এমন যেন না হয় যে, চরম ক্ষুধা এবং করুণ অভাব ও লাঞ্ছনা আর অপমান আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
    • এমন যেন না হয় যে ভূমি ধ্বস, ভূমিকম্প, চেহারার বিকৃতি, পাথর বৃষ্টি আমাদের উপর বর্ষণ না হয়।

    এর পর আমরা আশ্রয় খুঁজব অথচ কোথাও আশ্রয় পাব না, তাওবা করতে চাইব হয়ত তাওবা করার সুযোগ পাব না, অতএব হে জাতির প্রধান! কোরআনের এ হুশিয়ারী বাণী কান খুলে শোন—

    أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ ١٦ أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ۖ فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ ١٧ وَلَقَدْ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَكَيْفَ كَانَ نَكِيرِ ١٨

    অর্থ— “তোমরা কি ভাবনা মুক্ত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে, না তোমরা নিশ্চিত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্ক বাণী। তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছিল, অতঃপর কত কঠোর হয়েছিল আমার অস্বীকৃতি। (সূরা মুলক-১৬-১৮)