Blog

  • জনতা

    জনতা

    জনতার দেহে আজ প্রাণের সঞ্চার দেখি গ্রামে শহরে
    অফিসে কাছারিতে কলে কারখানায় স্কুলে কলেজে রাজপথে;
    গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সাম্যবাদ আজ দেয়ালের পরিচিত লিপি,
    তাই সমাজ ব্যবস্থার চাই আশু পরিবর্তন।

    এই উপমহাদেশে আজ এত দিনে রীতিমত কায়েম হল জনতার রাজ।
    ছোট বড় উচু নীচু রোড রোলারের তলে পিষ্ট দলিত একাকার।
    ফানুষের মতো ফাঁকা ঠুনকো বুলির ধাপ্পাবাজি ধরা পড়ে,
    সখের নেতাদের স্বার্থপর পুরনো কারসাজির দিন খতম হয়েছে।

    এবার বন্ধু, শ্রমের কড়ি দিয়ে কেনো তোমাদের অন্ন বস্ত্র,
    যথারীতি বংশানুক্রমিক শোষণের মহার্য রক্তের দামে নয়।
    ব্যাঙ্কের লেজারে কাগজে কালিতে তোমাদের কোটি টাকার হিসেব
    কোন আগন্তুক সকালে বাজেয়াপ্ত হলে বিস্মিত হয়ো না, বন্ধু!
    অনেক দিনের জমানো দুধ ক্ষীর মাখন এত কাল খেয়েছ,
    এবার জনতার মাঝে সকলের পাশে বসে ডাল রুটি খাও।
    মনে রেখ বন্ধু, বাড়তি বিত্ত আনে বাড়তি রক্তচাপের রোগ;
    বিত্তহীনের অকালমৃত্যু বিরল, যেমন মাথাহীনের থাকে না মাথাব্যথা।

    দিন আনা দিন খাওয়ার বাঁধাধরা সরল কাঠামোয়
    ভেদাভেদের বিরাট ফাঁক ক্রমে ক্রমে ভরাট হয়ে আসে।
    আজকের জনতার মুক্ত আদালতে সাম্যের আইনে বাঁধা
    এই উপমহাদেশে এক জাতি। একতা।

    আজকের জাতীয় জীবনে ভাঙাগড়ার নিত্য খেলায়
    পরম শত্রু সংক্রামক ব্যাধির মতো ঘৃণ্য মারাত্মক আক্রমণে
    দূষিত বন্যার মতো সমাজের স্তরে স্তরে ক্ষয়িষ্ণু আস্তানা পাতে
    নিদারুণ দারিদ্র্যের পচনশীল ক্ষতগ্রস্ত নিঠুর অভিশাপ।

    তাই বৈশাখের খরতর রুদ্র রৌদ্র দহনে ভস্মীভূত হয়ে যায়
    গণজীবনের মূল মর্মকথা; প্রতিভার যোগ্যতার সাফল্যের উজ্জ্বল মানদণ্ড
    বেসামাল দারিদ্র্যের দমকা ঝড়ে কালে কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।
    কত মূল্যবান প্রাণ নিঃশেষিত, কত মহান আত্মা লাঞ্ছিত লুণ্ঠিত হয়,
    সাধু আর শয়তানের ঐতিহাসিক উপাধিতে স্বচ্ছ তুলনা আনে
    নিশি শেষের চরম ব্যর্থতা হতাশা অথবা বিকৃত মনোবৃত্তির বিকাশ।

    দুর্বাসার কঠিন অভিশাপ যেন দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ বিদ্রোহের ভাষা,
    ভিক্ষা প্রতারণা আত্মদহন অথবা আত্মহত্যা কখনও পথের সম্বল;
    কারণ দিনরাত মাটি কেটে পাথর ভেঙ্গে বোঝা বয়ে, তবু মেলে না
    পেট ভরার মতো দু মুঠো ভাত, দুখানা রুটি কিংবা তৃষ্ণার জল।
    স্নেহপুত্তলিকা রুগ্ন উলঙ্গ শিশুর ভাগ্যে বার্লি জোটে না,
    পরম আদরের সোমত্ত বৌয়ের নেই পরনের এক টুকরো শাড়ী,
    বেড়া ভাঙ্গা মাটির ঘরের জীর্ণ চালে নেই ছাউনির পাতা,
    দারুণ খরায় মাঠের ফাটল বাড়ে, গোয়ালের বলদ মরে অনাহারে,
    বাকি খাজনার দায়ে ঘরবাড়ী ঘটি বাটি মান ইজ্জত প্রাণটুকু পর্যন্ত
    প্রতি বছরই মহাজনের হাতের মুঠোর মধ্যে অনায়াসে বাঁধা পড়ে।

    জনজীবনের এই সব মামুলি কথা কে কবে শুনতে চায়?
    কোন হৃদয়বান বোঝে সর্বহারাদের এই চিরাচরিত দুঃখ?
    তথাকথিত ভদ্র সভ্য সমাজের চোখে অনীপ্সিত নোংরা জঞ্জাল
    এই উপমহাদেশের উপেক্ষিত জনগণের যে বিরাট অংশ,
    তারাই কোটি কোটি দরিদ্র নিম্ন মধ্যবিত্ত অবহেলিত নগণ্য মানুষ;
    তবু দেশ সংগঠনে তাদের সস্তা জলবৎ রক্তের বিশেষ প্রয়োজন।

    জনতার কণ্ঠে সংস্কারের সংগ্রামের উদার ডাক শোনা যায়,
    সিভিল সাইরেণে দীর্ঘ দিনের ভয়াবহ কঠিন যুদ্ধের ঘোষণা,
    জনগণের আশু পরম বৈরী দারিদ্র্যকে নিঃশেষিত করে মুছে দাও!

    এবার তাই ধনী বন্ধুদের সন্ধির হাত উদারতায় প্রসারিত হোক!
    যা কিছু সঞ্চিত রয়েছে তাদের গোপন ভারী ভাণ্ডে সমানভাগে

    পুরনো দিনের পাওনার খতিয়ানে নির্ভুল গাণিতিক হিসেবে
    আসরের সকলের মাঝে এনে সমানভাবে দিতে হবে বেঁটে,
    সেই হবে দারিদ্র্যের সংগ্রামের স্বয়ংক্রিয় চরম সংহার হাতিয়ার।

    এ কথা তো মানো, এই উপমহাদেশ তোমার আমার এবং তাহাদের;
    এখানের গণ আদালতে এক জাতি সমতায় চাই একতা।

    আজ সেই পরম লগ্ন এসেছে, বন্ধু। আর বৃথা দেরী নয়,
    তোমাদের বৃহৎ প্রাসাদের অব্যবহৃত অখ্যাত কোন অন্ধকার কোণে
    শত শত পথবাসী গৃহহীনের জন্যে সামান্যতম ঠাঁই চাই,
    তোমাদের ভাঁড়ারের বাড়তি বাসি খাবারের অকৃপণ দানের দ্বারা
    তাদের জ্বলন্ত জঠরের ক্ষুধার দাবানলের নিবৃত্তি অবশ্যই হবে!
    শুধু মনে রেখ, বন্ধু, এক জাতি। একতা।

  • মশাল

    মশাল

    মশাল জ্বলছে পৃথিবীর মুখে। রক্তমশাল।
    আগ্নেয়গিরি ফুটন্ত লাভা ঢালে লাল লাল।
    পাহাড় ফেটেছে চৌচির উত্তপ্ত রোদে,
    জঠর জ্বলছে কঠোর ক্ষুধায়, দারুণ ক্রোধে।

    সংজ্ঞা খুঁজছো কঙ্কালটার অভিধান জুড়ে?
    দেখাব বুকের ঝাঁজরা পাঁজরা নখাগ্রে খুঁড়ে?

    ভয় কি মানুষ, মানুষের এই হাড় মাস দেখে,
    লোনা রক্ত ও স্বাদহীন মেদ দেখ না চেখে!
    লকলকে লোভী জিভ খাঁক হবে মশালে জ্বলে,
    লক্ষ মশাল জ্বলছে, জানো কি, বক্ষতলে!

  • ইস্তাহার

    ইস্তাহার

    পৃথিবীর নানা প্রান্তে শোষণের ভয়ঙ্কর ছবি
    দেখে, আজ আমি এক বিদ্রোহী বিপ্লবী কবি,
    আমার বুকের রক্তে লিখি লাল লাল ইস্তাহার।
    দুর্ভিক্ষে যুদ্ধে রোগে অনশনে মানি নি তো হার,
    মিছিলের পুরোভাগে করি আজ জেহাদ ঘোষণা,
    আমি তো জানি না, বন্ধু, নত শির কাতর প্রার্থনা৷

    যে সকল বজ্র মুঠি কেড়ে নিয়ে অন্ন বারবার
    দুর্বলের ভগ্ন প্রাণে জাগায় ক্ষুধার হাহাকার,
    আমার এ মেরুদণ্ডে উষ্ণ রক্তে অশান্ত প্রবাহ
    সেই লোভী জিহ্বাকে জিঘাংসায় করবেই দাহ।

    দেয়ালে দেয়ালে লেখা আমার জ্বলন্ত ইস্তাহার।
    সাক্ষ্য দেবে অন্যায়ের ইতিহাসে। ঘৃণ্য অত্যাচার,
    অবিচার অনশনে নিঃস্ব পঙ্গু দুঃস্থ দিশহারা
    নিত্য বঞ্চিতের প্রতি সাত্বনার ধূর্ত ইসারা
    তাহাদের প্রলুব্ধ করে, যারা ক্লীব মুর্খ পদানত।
    যুগে যুগে অপদস্থ, অপমানে অতি মর্মাহত;
    আমি কভু সেই দলে লিখি না তো পাগলের নাম,
    তাদের বেদনা দুঃখ বঞ্চনা, আমি জানতাম!

    আমি লিখি ইস্তাহারে শুধু তাহাদেরই সব কথা,
    যাদের চায় না কেউ, যাদের জীবনে ব্যর্থতা;
    সেই সব প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্ষুব্ধ কঙ্কাল
    আপন অস্থি দিয়ে ভাবীকালে জ্বালবে মশাল।

  • মুখবন্ধ

    মুখবন্ধ

    আমার কবিতাগুচ্ছ মুঠো মুঠো জ্বলস্ত অঙ্গার,
    সৈনিকের অস্ত্রাগারে ইম্পাতের উজ্জ্বল তলোয়ার
    ছত্রে ছত্রে স্বীকৃত জীবনের সত্য অঙ্গীকার,
    দুর্বলের দরিদ্রের নিজস্ব কঠিন হাতিয়ার।

     

    আমার কবিতা বিংশ শতাব্দীর প্রত্যক্ষ দর্পণ,
    আধ্যাত্মিক জীবনের বেদান্তের সহজ দর্শন।
    কোমল কুসুম সুষমায় মাখা চন্দ্রমহিমা,
    পাশাপাশি কামানের রকেটের শৌর্য গরিমা।

     

    তোমাদের দ্বারে দ্বারে আমি কবি নিত্য অতিথি,
    তোমাদের সুখ দুঃখ পরিণয় জন্ম মৃত্যু তিথি
    আমার কবিতা রাখে সযতনে মালিকায় গেঁথে;
    আমি থাকি তোমাদের আঁতুড়ে বাসরে শ্মশানেতে।

     

    আমি কবি তোমাদের একান্ত আপনার জন,
    আমার কবিতা চার বিশ্বজনে করিতে আপন।

  • ইস্তাহার

    ইস্তাহার

    ইস্তাহার বইটির লেখকের নাম জানা যায়নি, তাই অজ্ঞাতনামা লেখকের তালিকায় বইটি প্রকাশিত হলো। ইস্তাহার প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (১৯৫১ খৃষ্টাব্দে)। প্রকাশক দেবকুমার বসু, ৯/৩ টেমার লেন। কলিকাতা ৯-এর বিশ্বজ্ঞান থেকে। বইটির মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীপ্রভাতচন্দ্র রায়
    শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস প্রাঃ লিঃ। ৫ চিন্তামশি দাস লেন। কলিকাতা ৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন গণেশ বসু।

  • কৃত্তিবাস স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন

    কৃত্তিবাস স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন

    কৃত্তিবাস

    স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন।

     

    ২৭শে চৈত্র ১৩২২

     

    সভাপতির অভিভাষণ

     

    PRINTED BY N. CHATTERJEE
    AT THE ART PRINTERS,
    14, College Square, Calcutta.

    শ্রী আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।


    কৃত্তিবাস।

    “ওরে বাছা মাতৃকোষে রতনের রাজি।
    এ ভিখারী দশা। তবে তোর কেন আজি?”

    মাইকেল মধুসুদন।

    ব্যাস, বাল্মীকি ও কৃত্তিবাস। সামান্য প্রণিধান সহকারে দৃষ্টি করিলেই যেমন উপলব্ধি হয় যে, সংস্কৃত অনার্য্য কাব্যাবলীর অধিকাংশের উপরেই ব্যাস বা বাল্মীকির প্রভাব সুপরিস্ফুট, কেহ মহর্ষি ব্যাস-বিরচিত কবিতা-কুঞ্জের পথিক, কেহ বা রত্নাকরের নানরত্নসমুদ্ভাসিত কবিতা-মন্দিরের যাত্রী; এক-ভাবে না একভাবে যেমন ব্যাস-বাল্মীকি এই উভয়ের একতরের কাব্যের আদর্শ, পরবর্তী অনার্য্যকবিকুলের কাব্যাবলীর উপজীব্য, তদ্রূপ, বাঙ্গালার মহাকবি কৃত্তিবাসের প্রভাব,—তাঁহার ভাষার প্রভাব, ভাবের প্রভাব, রচনাভঙ্গির প্রভাব তৎপরবর্ত্তী বঙ্গীয় কবিকুলের উপর সম্যক্‌রূপে সুপরিস্ফুট। কৃত্তিবাসের পরবর্ত্তী কবিবৃন্দ, যে সমুদয় সুরভিকুসুমে বীণাপাণির পাদপূজা করিয়াছেন, তাহার অধিকাংশই তদীয় কবিতারূপী কল্পনাকানন হইতে সংগৃহীত। এই হিসাবে, সংস্কৃত কাব্যাবলীর সহিত ব্যাস-বাল্মীকির যে সম্বন্ধ, বঙ্গভাষার কাব্যাবলীর সহিত কৃত্তিবাসেরও সেই-ই সম্বন্ধ।

    কালিদাস ও কৃত্তিবাস।—আদিকবি বাল্মীকির রামায়ণের পর কালিদাস আবার সেই রামচরিতেরই পুনর্বর্ণন করিলেন। রামায়ণ শ্লোকবদ্ধ মহাকাব্য, কালিদাসের রঘুবংশও শ্লোকবদ্ধ মহাকাব্য। কালিদাসের আবির্ভাবের বহুপূর্ব্ব হইতে রামায়ণ ভারতের সকল সমাজে কীর্ত্তিত, গীত, অধীত ও ভক্তিপূর্ব্বক শ্রুত হইত। তথাপি কালিদাসের রঘুবংশ ভারতের বিদ্বদ্বৃন্দ সাদরে গ্রহণ করিলেন। ইহার হেতু কি? একান্ত সুপরিচিত ও সর্ব্বদা শ্রুত বৃত্তান্তের পুনঃ পঠন-পাঠনে এই যে আগ্রহ, এত যে আদর, তাহার একমাত্র কারণ কালিদাসের প্রাঞ্জল ভাষা ও ভাবের সুস্পষ্টতা। যদি ভাষা এত সুন্দরী এবং সম্পত্তি-শালিনী না হইত, তাহা হইলে, কেবল ভাবের তরঙ্গলীলায় বা কল্পনার ক্রীড়ায় কালিদাসের কাব্য সুধী-সমাজের চিত্তাকর্ষণ করিতে পারিত না। কল্পনা বিষয়ে বাল্মীকির সহিত কালিদাসের তুলনা করিতে প্রয়াস পাওয়া বৃথা। তবুও যে, কালিদাস এত প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন, তাহার প্রধান কারণ তাঁহার সুমধুর ভাষা। কালিদাস ব্যতীত আরও অনেকে রামায়ণ উপজীব্য করিয়া কাব্যাদি বিরচন করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের গ্রন্থ জন-সমাজে রঘুবংশাদির ন্যায় আদৃত হয় নাই। এই আদর-অনাদরের একমাত্র নিদান, ভাষাগত প্রাঞ্জলতার উৎকর্ষাপকর্ষ এবং ভাবের সুস্পষ্টতা। কালিদাস এমন মনোহারিণী ভাষায় তদীয় কাব্যাবলী নির্ম্মাণ করিয়াছেন, যে, যে কোন সময়ে, যে কোন সমাজের লোকেই তাহা পাঠ করুক না কেন, বিমুগ্ধ হইবে। সংস্কৃত সাহিত্যে এই ভাষাগত উৎকর্ষের জন্য যেমন কালিদাসের শ্রেষ্ঠতা, বঙ্গীয় সাহিত্যেও তেমনই ভাষাগত উৎকর্ষের নিমিত্ত কৃত্তিবাসের শ্রেষ্ঠতা। যে ভাষা সম্প্রদায়বিশেষের জন্য উপনিবদ্ধ, অর্থাৎ কেবল শিক্ষিত বা কেবল অশিক্ষিতদিগের জন্য যে ভাষা ব্যবহৃত, ধনী নির্ধন, পণ্ডিত মূর্খ, ইহার একতরের উদ্দেশ্যে যে ভাষা গ্রথিত, তাহা কদাচ স্থায়ী বা সকলজনসম্মত উৎকৃষ্ট ভাষা হইতে পারে না। তাদৃশী ভাষায় নিবদ্ধ গ্রন্থাদি কখনও কালজয়ী হইতে পারে না। তাহাকে প্রকৃত ভাষা বলা যায় না। তাদৃশী ভাষায় বিরচিত গ্রন্থাদি কালের তরঙ্গে দেখিতে দেখিতে ভাসিয়া যায়। অল্পকাল মধ্যেই তাহার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।

    যে ভাষা কোনও সম্প্রদায় বিশেষে সীমাবদ্ধ নহে, সকল সম্প্রদায়নির্ব্বিশেষে, সমাজ-দেহের প্রত্যেক শিরা ধমনী কৈশিকায় যে ভাষা প্রবেশ করিতে পারে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকে যে ভাষাকে “আমার” বলিয়া গ্রহণ করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করেন, শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী নির্ধন, পণ্ডিত অপণ্ডিত, সকলে সমানভাবে যে ভাষাকে আদর করিয়া লয়েন, তাহাই যথার্থ ভাষা। কালিদাস যেমন তাদৃশী সর্ব্বতোগামিনী ও সর্ব্বতোব্যাপিনী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন বলিয়াই তদীয় কাব্য সকল সম্প্রদায়ে সকল সময়ে সকলের প্রিয় পদার্থ, মহাকবি কৃত্তিবাসও তদীয় অনবদ্য রামায়ণ কাব্য সেইরূপ সর্ব্বকালানুযায়িনী সর্ব্বতোগামিনী ও সর্ব্বতোব্যাপিনী ভাষায় রচনা করিয়াছেন বলিয়া, তদীয় রামায়ণ, এত প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। যে সমুদয় কাব্যের ভাষা প্রাঞ্জল নহে, বা ভাবও সুস্পষ্ট নহে, সেই কাব্যাদির প্রভাব সমাজে স্থায়িত্ব লাভ করিতে পারে না। ভাষা ও ভাব উভয় সম্পদে সম্পন্ন বলিয়াই কৃত্তিবাসের রামায়ণ কালজয়ী হইয়া রহিয়াছে। সংস্কৃতে কালিদাস এবং বঙ্গভাষায় কৃত্তিবাস,—এই দুই জন একই কারণে অমরত্ব লাভ করিয়াছেন।

    কৃত্তিবাস ও অন্যান্য রামায়ণকারগণ।—কৃত্তিবাসের পর আরও অনেক কবিযশঃপ্রার্থী ব্যক্তি রামায়ণ রচনাপূর্ব্বক বঙ্গসাহিত্যের অঙ্গ পরিপুষ্ট করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের সকলের দ্বারাই যে ভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হইয়াছে একথা নিঃসঙ্কোচে বলা কঠিন।

    এপর্য্যন্ত যত দূর জানা গিয়াছে, তাহাতে কৃত্তিবাসই সর্ব্বপ্রথম বঙ্গভাষায় রাম-চরিত নিবদ্ধ করেন। তাহার পরে আরও চতুর্দ্দশ ব্যক্তি রামায়ণী কথায় পুস্তক রচনা করিয়াছেন বলিয়া নির্দ্দেশ পাওয়া যায়। কালে হয়ত, আরও অনেক নাম পাওয়া যাইবে। এই প্রসঙ্গে বঙ্গীয় সাহিত্যপরিষদ্‌ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আর সেই সঙ্গে বঙ্গভাষার ইতিহাস-লেখক অক্লান্তকর্ম্মা শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ও সর্ব্বথা প্রশংসনীয়। এতদুভয়ের সমবেত চেষ্টার ফলেই আমরা আজ কৃত্তিবাসকে প্রকৃত ভাবে চিনিবার অবসর পাইয়াছি। কৃত্তিবাসের রামায়ণে যে প্রকার পাঠ-বৈষম্য ঘটিয়াছে, তাহাতে প্রকৃত কৃত্তিবাসের সম্পূর্ণ পরিচয় এখনও দুর্লভ। তবুও যতটা পাওয়া যাইতেছে, তজ্জন্য, সাহিত্যপরিষদ্‌ এবং দীনেশ বাবু বঙ্গবাসীর কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন।

    কৃত্তিবাস এবং তৎপরবর্ত্তী অনেকে একই রামায়ণ অবলম্বনে কাব্য নির্ম্মাণ করিলেন, কিন্তু কৃত্তিবাসের কাব্য আবাল বৃদ্ধ বনিতার প্রিয়, সকল সমাজের আদরণীয় হইল, ইহার প্রকৃত কারণ কি?

    কৃত্তিবাস মহর্ষি বাল্মীকির রামায়ণ মাত্র অবলম্বন করিয়াই কাব্য লিখেন নাই। আমাদের দেশে কথকতায়, যাত্রায়, গোষ্ঠীবন্ধনে, সর্ব্বত্রই নানা ভাবে ও, নানা আকারে রামবিষয়ক বৃত্তান্ত বহুকাল হইতে, কৃত্তিবাসের বহু পূর্ব্ব হইতে চলিয়া আসিতেছিল। ফলতঃ লোকমুখে স্ত্রী-পুরুষ-সমাজে রাম-সীতার কথা কীর্ত্তিত হইত, এখনও হইতেছে। কৃত্তিবাস তদীয় গ্রন্থরচনায় এই লোকপরম্পরাগত গাথার অনেকটা অনুসরণ করিয়াছিলেন। কেবল অনুবাদে বা মহর্ষি-চিত্রিত আলেখ্যাবলীর পুনশ্চিত্রণেই যদি কৃত্তিবাস রত থাকিতেন, তাহা হইলে, তদীয় কাব্য এত প্রসিদ্ধি লাভ করিতে পারিত না। তাঁহার পরবর্ত্তী রামায়ণ-লেখকগণের অনেকের গ্রন্থে কৃত্তিবাসোচিত মৌলিকতা নাই। অধিকাংশ স্থানই অনুবাদ মাত্রে পর্য্যবসিত। কোনও রামায়ণকার স্বকীয় কল্পনার চঞ্চল বৈদ্যুতী প্রভায় গ্রন্থের ক্বচিৎ ভাস্বর করিয়াছেন, সত্য, কিন্তু পরক্ষণেই আবার কল্পনামান্দ্য-দোষে গ্রন্থের শ্রীহানি ঘটিয়াছে। এই স্থলে কবিচন্দ্রের নাম উল্লেখ্য। কবিচন্দ্র স্বীয় রামায়ণে অঙ্গ-রায়বার নামে যে অধ্যায় লিখিয়াছিলেন, যাহা আজ কৃত্তিবাসের বলিয়া বঙ্গের অধিকাংশ গৃহে আদৃত, সেই অধ্যায়টি বাস্তবিকই অনেকটা কবিত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই অনুপাতে কবিচন্দ্রের গ্রন্থের অপরাংশসমূহ গ্রহণ করা যায় না। সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত অনেকে যেমন দু’একটি মনোহারিণী কবিতা রচনা করিয়া থাকেন, প্রাচীন কালেও করিতেন; যে কবিতাগুলি “উদ্ভট” আখ্যায় জন-সমাজে প্রচারিত, কিন্তু ঐ উদ্ভট-কর্ত্তাদের কোনও বিশিষ্ট এবং উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ পাওয়া যায় না, চঞ্চল কল্পনার ক্ষণিক অনুগ্রহে মাত্র দু’চারিটি হৃদয়াকর্ষিণী কবিতাতেই তাঁঁহাদের কবিত্ব পরিসমাপ্ত, তদ্রূপ অন্যান্য রামায়ণকারগণের অনেকেরই দুই একটি, বা কাহারও দু’চারিটি রসভাবপূর্ণ অধ্যায় রচনার পরই কবিত্বের পর্য্যবসান ঘটিয়াছে। সমগ্র গ্রন্থে কবিতার উচ্ছলিত তরঙ্গলীলা একমাত্র কৃত্তিবাসেই পরিদৃষ্ট হয়।

    কৃত্তিবাস জানিতেন যে, যাঁহাদের জন্য তিনি কাব্য লিখিয়াছেন, তাঁহারা কি চান্‌, কতটুকু বা কতটা তাঁহাদের অভিলষিত? কিরূপ আলেখ্যে তাঁহাদের নয়ন রঞ্জন হইবে? কবিত্বের সার্থকতার এই মূলমন্ত্রে তিনি দীক্ষিত হইয়া তবে কাব্য লিখিতে বসিয়াছিলেন, সর্ব্বদা এই মন্ত্রের স্মরণপূর্ব্বক কাব্য লিখিয়াছেন, তাই তাঁঁহার কাব্য এত জমিয়াছে। এই জন্যই কেবল বাল্মীকির আদর্শ তাঁঁহার উপজীব্য ছিল না, তিনি প্রয়োজনমত, অন্যান্য পুরাণ, উপপুরাণ প্রভৃতিরও সাহায্য গ্রহণ করিয়াছেন। কালিকাপুরাণ, অধ্যাত্মরামায়ণ, অদ্ভুতরামায়ণ প্রভৃতি হইতেও তিনি আদর্শ সঙ্কলন করিয়াছেন।

    অনেক কাব্য কবির সমসাময়িক সমাজের রুচি এবং ছায়ার অনুসরণে নির্ম্মিত হওয়ায়, সেই নিয়মিত সমাজে এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে সেই কাব্য আদৃত হইয়া থাকে, কিন্তু পরবর্ত্তী ও পরিবর্ত্তিত সমাজে তাহার আদর ক্রমেই কমিয়া যায়। যে কবির কাব্য, যত অধিক পরিমাণে এইরূপ সাময়িক ভাবে পরিপূর্ণ, সে কবির কাব্য, ততই অল্পকালস্থায়ী। অন্যান্য অনুবাদকগণের রামায়ণগ্রন্থের অপ্রসিদ্ধির ইহাও অন্যতম কারণ। তাঁহাদের রামায়ণের যে যে অধ্যায়গুলি এই প্রকার কোন বিশেষভাবে লিখিত নহে, অর্থাৎ সাধারণ ভাবে, সকল সময়ের অনুগত করিয়া লিখিত, সেই সেই অধ্যায়গুলির মর্য্যাদা এখনও একেবারে লুপ্ত হয় নাই। দৃষ্টান্তরূপে কবিচন্দ্রের “অঙ্গদরায়বার” ও রঘুনন্দন গোস্বামীর “রামরসায়নের” অশোকবনবর্ণন প্রভৃতির উল্লেখ করা যাইতে পারে। বস্তুতঃ সরল ভাষা এবং সুস্পষ্ট ভাব,—এই দুই দুর্লভ সম্পদে কৃত্তিবাসের কাব্য বঙ্গসাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অতি সরল কথায়, সকলের বোধগম্য ভাষায়, তিনি তাঁঁহার হৃদয়ের ভাব অতি স্পষ্টরূপে সাধারণের সম্মুখে প্রকাশ করিতে পারিতেন। ভাষার দীনতায় বা ভাবের জড়তায় তাঁঁহার কাব্য কুত্রাপি দুষ্ট হয় নাই। তিনি যখন যে চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন, তাহার কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোনরূপ অসম্পূর্ণতা রাখেন নাই। যে কবি, যত অধিক পরিমাণে প্রাঞ্জলভাষায় মনের ভাবরাশি, তদীয় সমাজের সমক্ষে অতি সুস্পষ্টরূপে তুলিয়া ধরিতে পারিবেন, সেই কবি তত অধিক আদৃত হইবেন। কৃত্তিবাস সেইটি অতি উত্তমরূপে পারিতেন বলিয়াই, তাঁঁহার “রামায়ণ” অপরাপর “রামায়ণ” অপেক্ষা ভাবুকসমাজে, অথবা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল সমাজেই এত প্রিয় হইয়াছে।

    দয়া, দাাক্ষিণ্য, সমবেদনা, স্নেহ, প্রেম, ভক্তি প্রভৃতি স্বর্গীয় সম্পদে মানব দেবতা হয়, আবার এইগুলির অভাবে মানব দানব হইয়া থাকে। কৃত্তিবাস এই মহনীয় গুণাবলীর এমন সুস্পষ্টভাবে বর্ণন করিয়াছেন, যে, পাঠকালে, হৃদয় অনির্ব্বচনীয় আনন্দরসে আপ্লুত হয়। মহাকবি ভবভূতি যেমন তাঁঁহার উত্তরচরিতের নিরবদ্য ও নয়নরঞ্জন চিত্রগুলির আদর্শ কালিদাসের কাব্যাবলী হইতে গ্রহণ করিয়া, পরে, সেই আদর্শের উপর নৈপুণ্য সহকারে বর্ণসংযোগ করিয়া আনন্দময়ী মূর্ত্তি নির্ম্মাণ করিয়াছেন, যে মূর্ত্তির গরিমায় সংস্কৃত সাহিত্য গৌরবিত হইয়াছে, কৃত্তিবাসও সেইরূপ মহর্ষিকৃত আদর্শের উপর সতর্ক হস্তে বর্ণসংযোগপূর্ব্বক, তৎ তৎ চিত্রাবলী বঙ্গীয় সমাজের অনুগত ভাবে উপস্থাপিত করিয়াছেন, অলঙ্কারের গুরু ভারে, বা ভাষার আড়ম্বরে তদীয় কবিতাসুন্দরী ক্লিষ্ট হন নাই। তাঁঁহার কবিতা সর্ব্বত্র একভাবে, ভাগীরথীর প্রবাহের ন্যায় তর তর করিয়া চলিয়া গিয়াছে, আবিলতায় সে কবিতার প্রবাহ দুষ্ট হয় নাই, বা ভাবের জড়তায় সে কবিতার অমর্য্যাদা ঘটে নাই। অন্যান্য কবি অপেক্ষা তদীয় প্রাধান্যের এইটিই মুখ্য কারণ। ভাষার প্রাঞ্জলতা এবং ভাবের সুস্পষ্টতার সহিত তাঁহার আশ্চর্য্যচিত্রনৈপুণ্যের সম্মিলনে তদীয় কাব্য ত্রিবেণীসঙ্গমের ন্যায় পবিত্র ও সর্ব্বজনসেব্য হইয়াছে।

    কৃত্তিবাসের রামায়ণে প্রক্ষেপ—কৃত্তিবাসের রামায়ণ রচনার প্রায় এক শত বৎসর পরে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেব আবিভূর্ত হন। চৈতন্যের আবির্ভাবের এবং তদীয় প্রেম-বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত হইবার পূর্ব্ববর্ত্তী কালের হস্তলিখিত কোন কৃত্তিবাসী রামায়ণের পুস্তক এপর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। যদি কখনও পাওয়া যায়, তবে তখন কৃত্তিবাসের প্রক্ষিপ্ত অংশগুলির সমাধানের উপায় অনেকটা সহজ হইবে। চৈতন্যের আবির্ভাবের পর বঙ্গদেশে যে ভক্তির স্রোত, প্রেমের “বাণ” বহিয়াছিল, পরবর্ত্তী কালের রামায়ণ-সমূহে তাহার প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিদ্যমান। যে সময়ে যে ভাব দেশের মধ্যে মাথা তুলিয়া দেশটাকে বিভোর করিয়া ফেলে, সেই সময়ের জাতীয় সাহিত্যাদিতেও সেই ভাবের প্রভাব প্রবিষ্ট হইয়া, তাবৎ সাহিত্যকে ‘তদ্ভাবভাবিত’ করিয়া তোলে। তাই পরবর্ত্তী কালের কৃত্তিবাসে আমরা কি বীর কি করুণ, সকল রসেই নদিয়ার ভক্তির তরঙ্গের উচ্ছ্বাস দেখিতে পাই। লিপিকারগণ, সুবিধা পাইলেই রামের স্থলে শ্যাম করিয়াছেন। পরিবর্ত্তিত কৃত্তিবাসের অনেক অনাবশ্যক স্থলে অতর্কিত বৈষ্ণবী দীনতার পরাকাষ্ঠা দেখিতে পাই। কৃত্তিবাসের স্বকপোলকল্পিত বীরবাহু, পরবর্ত্তী কালের বৈষ্ণব লিপিকারগণের কৃপায়, দীনাতিদীন বৈষ্ণবসেবক-গণের ন্যায়, করযুগল জুড়িয়া ধরণীতে লুটায়। তুলসীতলার মৃত্তিকায় অঙ্গরাগ করিয়া বৈষ্ণব যেমন “শ্রীবাসের আঙ্গিনায়” মহাপ্রভুর ভক্তগণকে প্রণাম করেন, সেইরূপ রাক্ষসগণও কপিগণকে গল-লগ্নবাসে প্রণাম করে। এইরূপ অনেক স্থলেই বৈষ্ণবীয় কোমলতার ও দীনতার চরম দেখিতে পাই। এ সমস্তই চৈতন্যের পূর্ণ প্রকটের পর কৃত্তিবাসে প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে। এইরূপ সংক্রামক রোগের পরিচয় আমরা অন্যত্রও দেখিতে পাই। অনেক বৌদ্ধ গ্রন্থের দুই একটি স্থলের ঈষৎ পরিবর্ত্তনপূর্ব্বক, কোথাও বা প্রমাণসূত্রটিকে বদলাইয়া, সমগ্র গ্রন্থখানিকে “হিন্দু” করিয়া তোলা হইয়াছে। কৃত্তিবাসে পাঠবৈষম্যের ইহাই একমাত্র কারণ নহে। বহুকাল পূর্ব্বের হস্তলিখিত যে সকল পুঁথি পাওয়া গিয়াছে, তাহার সহিত বর্ত্তমান কৃত্তিবাসের ত মিল নাই-ই, এমনকি ১৮০৩ খৃঃ অব্দে শ্রীরামপুরের মিশনারিগণের দ্বারা প্রথম যে “কৃত্তিবাস” মুদ্রিত হয়, তাহার সহিতও বর্ত্তমান কৃত্তিবাসের অনেক স্থলে আদৌ মিল নাই। মিশনারিদের পুস্তকে যেখানে আছে,—

    “পাকল চক্ষে রামের পানে চাহিলেক বালি।
    দন্ত কড়মড়ায় বীর রামেরে পাড়ে গালি॥”

    সেই স্থানে—পরবর্ত্তী কালের সংশোধিত বটতলার সংস্করণে আছে,—

    “রক্তনেত্রে শ্রীরামের পানে চাহে বালি।
    দন্ত কড়মড় করে, দেয় গালাগালি॥”

    পরবর্ত্তী কালে ভাষার পরিমার্জ্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালার আদিকবি কৃত্তিবাসও “পরিমার্জ্জিত” হইয়াছেন!! কবির কাব্য পরিষ্কৃত করিতে যাইয়া, সংশোধকগণ আবর্জ্জনারাশির দ্বারা কৃত্তিবাসকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। এই ব্যাপারের মূলে আর একটি সত্য নিহিত আছে। আমাদের দেশে, যখন যে কোনও নূতন জিনিষের আবির্ভাব হইয়াছে, আমরা তাহাকে, ধীরে ধীরে পুরাতনের সহিত মিশাইয়া নিজেদের ছাঁঁচে ঢালাই করিয়া “আপন” করিয়া লইয়াছি। আমাদের এই adaptability আছে বলিয়াই আমাদের ধর্ম্ম, আমাদের সাহিত্য এখনও টিকিয়া আছে। নবীন নানাবিধ ভঙ্গিরাগবিভূষিতা, শ্রুতিমোহিনী বঙ্গভাষার যেমন আবির্ভাব হইল, অমনি আমরা আমাদের প্রাচীন, দুর্ব্বোধ শব্দসঙ্কুল ভাষাকে তাহার অনুগত করিয়া লইলাম, তাই আমার প্রাচীন—“অমিয় সায়ারে নিশান করিতে সকলি গরল ভেল” ইহার স্থলে “অমিয় সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল হলো” করিয়া ফেলিলাম। প্রতিমার মূল পঞ্জরের কোন বিশেষ পরিবর্ত্তন করিলাম না বটে, কিন্তু একটু নূতন ভঙ্গিতে বর্ণযোজনা করিয়া, প্রাচীনাকে নবীন করিয়া তুলিলাম। ইহাতে প্রাচীনার অঙ্গহানি ঘটিল। এইরূপে মূল কৃত্তিবাসের অর্দ্ধসংস্কৃত, অর্দ্ধ-হিন্দি অনেক শব্দ পরিবর্ত্তিত হইতে হইতে ক্রমে বর্ত্তমান বাঙ্গালায় আসিয়া দাঁঁড়াইল। তাই প্রাচীন কৃত্তিবাসের

    “মুঞি” “ভিলন্ত” “কর‍্যা” “থুয়্যা” “পাকল” প্রভৃতি অধুনা অপ্রচলিত শত শত শব্দের পরিত্যাগ সাধিত হইল। ইহা কালের নিরঙ্কুশ বিধান। ইহার উপর মানুষের কর্ত্তৃত্ব তত অধিক নাই। যাহা গ্রাহ্য, কাল তাহার গ্রহণ করিবে। যাহা বর্জ্জনীয়, কাল তাহার বর্জ্জন করিবে।

    শাক্ত এবং বৈষ্ণব—এই দুই সম্প্রদায়ের লিপিকারগণের কল্যাণে কৃত্তিবাসের অনেক স্থলে যেমন শাক্তপ্রভাব পরিদৃষ্ট হয়, তেমনই বৈষ্ণবপ্রভাবও পরিদৃষ্ট হয়। ইহা ছাড়া, অন্যান্য পুরাণ উপপুরাণ প্রভৃতি হইতে অনেক মনোরম অংশও লিপিকারগণ বাছিয়া আনিয়া কৃত্তিবাসে জুড়িয়া দিয়াছেন। অনেকে অনেক নূতন কবিতার প্রণয়ন করিয়া কৃত্তিবাসের গ্রন্থে পূরিয়া দিয়া, স্ব স্ব আত্মাভিমানের পূজা করিয়াছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ কৃত্তিবাস হইতে শত শত স্থল উদ্ধৃত করা যাইতে পারে, ঐতিহাসিকের সে কার্য্য হইতে আমি বিরত হওয়াই সঙ্গত মনে করি।

    কৃত্তিবাসের কল্পনা তাহার গন্তব্য পথ—রামায়ণী কথার আশ্রয়ে কালিদাস ভবভূতি রঘুবংশ উত্তরচরিত প্রভৃতির রচনা করিয়াছেন বটে, কিন্তু যেস্থানে যেরূপ প্রয়োজন, তাঁহারা নূতন মূর্ত্তিও গঠন করিয়াছেন। কবির কল্পনার বৈদ্যুতিক শক্তিতে শক্তিমান্‌। সেই সতত চঞ্চলা শক্তি কদাচ কোন নির্দ্দিষ্ট পথে, কোন পূর্ব্ব-নির্দ্দিষ্ট রেখা বাহিয়া চলিতে পারে না, জানেও না। তাই কবিকৃত সৃষ্টিতে, অনেক স্থলে মূল আদর্শেরও পরিবর্ত্তন দেখিতে পাই। কালিদাস ভবভূতি প্রভৃতি মহাকবিগণ তাই মহর্ষিক্ষুন্নপথ কল্পনার দৌত্যে অল্পবিস্তর ছাড়িয়া, অন্য পথেও গিয়াছেন। কৃত্তিবাসও সেইরূপ অনেক স্বকল্পিত আলেখ্যের অঙ্কনপূর্ব্বক, তদীয় গ্রন্থ সুচারুতর করিয়াছেন। সর্ব্বত্রই বাল্মীকির অনুসরণ করেন নাই। বীরবাহু তরণীসেন প্রভৃতির সৃষ্টি তাঁহার আত্মকল্পনার চরম উৎকর্ষ খ্যাপন করিতেছে। কবিগণ কাহারও অঙ্গুলিসঙ্কেতে চলেন না। কল্পনা কাহারও দাসীত্ব করিতে জানে না। কল্পনা কখনও কবিকে মেঘের উপর লইয়া গিয়া সৌদামিনীর বিলাসচঞ্চলা মূর্ত্তি প্রদর্শন করে, কখনও আবার তুষারমণ্ডিত কমলের কেশরের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া কবিকে কত নিভৃত সৌন্দর্য্য দেখায়। উন্মাদিনী চঞ্চলার ন্যায় কবির উন্মাদিনী কল্পনা কাহারও অঙ্গুলিসঙ্কেতে পরিচালিত বা ভ্রূকম্পনে বিকম্পিত হয় না। সে আপনার ভাবেই আপনি বিভোর হইয়া ছুটে, পরের ভাবে ভুলে না। কৃত্তিবাসের স্বৈরচারিণী কল্পনা কোনও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া রহে নাই। কোথাও প্রাচীন পথে, কোথাও বা নূতন পথে যেখানে যেমন ইচ্ছা, সে কল্পনা চলিয়া গিয়াছে। তরণীসেন বীরবাহু প্রভৃতির সৃষ্টি এই নূতন পথে যাত্রারই ফল।

    কবির পরিচয়।—আনুমানিক ১৩০৬শক ১৩৮৫ খৃঃ অব্দের মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে কৃত্তিবাস জন্ম গ্রহণ করেন। বঙ্গের প্রতিগৃহে যে দিন বীণাপাণির চরণকমল অর্চ্চিত হইতেছিল, “সকলবিভবসিদ্ধ্যৈ পাতু বাগ্‌দেবতা নঃ” বলিয়া যেদিন ভক্তি-গদগদকণ্ঠে স্তব করিতে করিতে হিন্দু তাহার চিরপ্রার্থিত দেবতার চরণে মস্তক স্থাপন করিতেছিল, সেই শুভ ক্ষণেই যাঁঁহার জন্ম, তাঁঁহার জীবন যে সেই বাগ্‌দেবতার অনুগ্রহে ধন্য ও কৃতকৃতার্থ হইবে তাহাতে আর কথা কি?

    ৭৩২ খৃঃ অব্দে আদিশূর কনোজ হইতে যে পাঁচ জন ব্রাহ্মণকে এ দেশে আনয়ন করেন, তাঁহাদের অন্যতম ভরদ্বাজ-গোত্রীয় শ্রীহর্ষ হইতে সপ্তদশ পুরুষ অধস্তন নরসিংহ ওঝা বেদানুজ রাজার প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। এই বেদানুজ সম্ভবতঃ পূর্ববঙ্গের স্বর্ণগ্রামের রাজা ছিলেন। আন্দাজ ১২৪৮ অব্দে এই নরসিংহ অরাজক স্বর্ণগ্রাম পরিত্যাগপূর্ব্বক গঙ্গাতীরে বাস করিবার সঙ্কল্পে ফুলিয়ায় আসিয়া বসতি স্থাপন করেন। ফুলিয়ার তখন বড় স্পর্দ্ধার দিন। কৃত্তিবাস নিজেই স্বীয় বংশ-পরিচয়ের সময়ে বলিয়াছেন যে, পূর্ব্বে এখানে “মালঞ্চ” ছিল, নানাবিধ ফুলের বাগান ছিল, তাই ইহার নাম হয়—“ফুলিয়া”। এই ফুলিয়ার দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বীচিমালিনী ভাগীরথী রজতধারায় প্রবাহিত ছিলেন। প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য্যের ইহা লীলানিকেতন ছিল। মন্ত্রিশ্রেষ্ঠ নরসিংহ তাঁঁহার তদানীন্তন পদোচিত বিভবাদির সহিত এই মনোহর স্থানে আসিয়া একেবারে জুড়িয়া বসিলেন। কৃত্তিবাসের ভাষায়

    “ফুলিয়া চাপিয়া হইল তাঁঁহার বসতি।
    ধন ধান্যে পুত্র পৌত্রে বাড়য়ে সন্ততি॥”

    ফুলিয়া “চাপিয়া” তাঁঁহার বসতি হইল। এই নরসিংহের পরমদয়ালু পুত্র গর্ভেশ্বর কৃত্তিবাসের প্রপিতামহ। গর্ভেশ্বরের পুত্র মুরারি ওঝা, কৃত্তিবাসের পিতামহ এক অতি প্রধান কবি ছিলেন। তাঁহার কোন গ্রন্থাদির পরিচয় পাই না সত্য, কিন্তু কবি কৃত্তিবাস স্বয়ং তাহাকে ব্যাস মার্কণ্ডেয়াদির সহিত তুলনা করিয়াছেন।

    এই মুরারি ওঝার পৌত্র কৃত্তিবাসের নিজের উক্তিতেই দেখিতে পাই, বাল্যে তিনি প্রথমতঃ চতুষ্পাঠীতে বিদ্যাভ্যাস করেন। এই চতুষ্পাঠীর শিক্ষাই তদীয় সংস্কৃত রামায়ণ পাঠের সোপান। পাঠ সমাপ্তির পর, তদানীন্তন প্রথা অনুসারে তিনি গৌড়েশ্বরের সভায় আত্ম-পরিচয়ার্থ উপস্থিত হন। রাজা তাঁহার গুণগ্রামের পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে রামায়ণ রচনা করিতে আদেশ করেন। “তথাস্তু” বলিয়া কৃত্তিবাস যখন সগর্ব্বে বাহির হইলেন, তখন সকলে “ধন্য ধন্য” বলিয়া কবির অভ্যর্থনা করিলেন।

    “সবে বলে ধন্য ধন্য ফুলিয়া পণ্ডিত।
    মুনিমধ্যে বাখানি’ বাল্মীকি মহামুনি।
    পণ্ডিতের মধ্যে তথা কৃত্তিবাস গুণী॥”

    বলিয়া সহস্র মুখে কৃত্তিবাসের প্রশস্তি সঙ্গীত উচ্চারিত হইল। কৃত্তিবাস স্বয়ং এই প্রসঙ্গে অনেক কথা বলিয়াছেন, আত্মবংশের বিশিষ্ট পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। তিনি যে কত বড় বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার পরিচয় আমি আর বিশেষ কি বলিব! এখনও “ফুলিয়ার মুখটী” বলিয়া আমরা তাঁহারই বংশের স্পৰ্দ্ধা করি। রাঢ়ীয় শ্রেণীর প্রধান এবং মুখ্য বংশ “ফুলিয়ার মুখটি”—কৃত্তিবাসেরই অনুস্মৃতি মাত্র।

    মাহেন্দ্রক্ষণে রাজা কৃত্তিবাসকে রামায়ণ রচনার আদেশ করিয়াছিলেন। বঙ্গভাষার অরুণ-রাগরঞ্জিতা উষার প্রথম আলোকচ্ছটা কৃত্তিবাসের মস্তকে প্রথম স্বর্ণকিরীট পরাইয়া দিয়াছিল,—বঙ্গভূমি, বঙ্গভাষা ও সেই সঙ্গে বাঙ্গালী জাতি ধন্য হইয়াছে। পল্লী-প্রান্তরের স্নিগ্ধ বটচ্ছায়ায়, জন-পদবধূর গোষ্ঠীবন্ধনে, বর্ষীয়সী ললনাদিগের বিশ্রামকক্ষে, কৃত্তিবাসের বিরচিত গাথা গীত ও ভক্তিপূর্ব্বক শ্রুত হইতেছে। ভাষায় যাহার সম্যক্‌ অধিকার নাই, সেই প্রাকৃত ব্যক্তিও প্রেম ভরে রামায়ণ গান করিয়া আত্মহারা হইতেছে, আর সেই সঙ্গে, নিরক্ষর সরল কৃষক সাশ্রুনয়নে ও তন্ময়হৃদয়ে সে গান শুনিয়া আপনাকে ভুলিয়া যাইতেছে। এখনও একাদশীর অপরাহ্ণে ধূসরবসনা বিধবারা সমবেত হইয়া, কোন ললিতকণ্ঠ বালকের দ্বারা রামায়ণ পড়াইয়া শুনিতেছেন, তাঁহাদের উপবাস-ক্লিষ্ট হৃদয়ের ভক্তির রস উচ্ছলিত হইয়া উঠিতেছে। মনোহর কল্পনা, মধুরভাব, অমুপম সৃষ্টিকৌশলে, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, বঙ্গ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ্‌রূপে পরিগণিত। কৃত্তিবাসের পর, আজ পর্য্যন্ত যত ব্যক্তি বঙ্গবাণীর পাদ পূজা করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রত্যেকেরই পূজার উপকরণ—ফুল, ফল, পল্লব,—কৃত্তিবাসের ঐ রামায়ণরূপী কল্পকানন হইতে চয়িত ও সংগৃহীত। কৃত্তিবাস ধরাধামে অবতীর্ণ হইবার পর পাঁচশত বৎসরেরও অধিক কাল অতীত হইয়াছে বটে, কিন্তু আজও প্রতিক্ষণে তাঁহার নাম বঙ্গের গৃহে গৃহে, বিপণির পণ্যকুটীরে, চাষার আশার কৃষিক্ষেত্রে—সর্ব্বত্র কীর্ত্তিত হইতেছে। আজ আর

    “দক্ষিণে পশ্চিমে যা’র গঙ্গা তরঙ্গিণী”

    সে “ফুলিয়া” নাই, সে “ফুলিয়ায়” কৃত্তিবাসের সেই “চাপিয়া বসতি”র চিহ্নও নাই, কিন্তু সেই “ফুলিয়া পণ্ডিতের” মোহন বাঁশরীর ঝঙ্কার এখনও বাঙ্গালীর “কাণের ভিতর দিয়া মরমে” প্রবেশ করিতেছে, বাঙ্গালীকে উন্মত্ত করিয়া, বিভোর করিয়া রাখিয়াছে।

    কৃত্তিবাসের এই সার্ব্বভৌম প্রসিদ্ধির অপর কতিপয় কারণও পরিদৃষ্ট হয়। ভারতবর্ষের মৃত্তিকা বড়ই কোমল, বড়ই উর্ব্বর। রামচন্দ্র, যুধিষ্ঠির, কর্ণ, ভীষ্ম, দধীচি, শিবি, সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী, অরুন্ধতী, লোপামুদ্রা, ঔশীনরী প্রভৃতি এই ভারতবর্ষেরই চিত্র। যাহার প্রাণে প্রেম, নয়নে ভক্তির অশ্রু, ভারতবাসীরা তাহাকে হৃদয় পাতিয়া গ্রহণ করে, প্রাণ দিয়া পূজা করে। কৃত্তিবাস এ রহস্য বুঝিতেন। তিনি আরও বুঝিতেন যে, নিশীথে নিস্তব্ধ রজনীর সৌম্যমূর্ত্তি যাহার চিত্তকে অভিভূত, বা অনুভূতির বিমল কর-ধৌত করিতে না পারে, সে কদাচ ঐ নৈশ নীরবতার মাধুর্য্য অপরকে বুঝাইতে পারে না; সায়ংকালের শ্যামায়মানা বনভূমির প্রাঞ্জল মূর্ত্তি যাহার প্রাণে আকুলতা জন্মাইতে অসমর্থ, সে কখনও সান্ধ্য-সুষমার পবিত্র আলেখ্য অঙ্কন করিতে পারে না। সকল পদার্থেরই অনুভূতি চাই। সমস্ত বিষয়েই মগ্ন হওয়া চাই, প্রাণ অকৃপণভাবে ঢালিয়া দেওয়া চাই, অন্যথা সিদ্ধিলাভ সুদূরপরাহত। কৃত্তিবাস অকৃপণভাবে, আত্মপ্রাণ কবিতাদেবীর পাদপদ্মে ঢালিয়া দিয়াছিলেন, তাঁহার হাতে আর কিছুই ছিল না, সমস্তই ঐ চরণে অঞ্জলি দিয়াছিলেন, তাই তদীয় কবিতার কুত্রাপি কোনরূপ বাধা দোখতে পাই না। সর্ব্বত্রই সমান এবং অপ্রতিহত গতি। অসম্ভব হইলেও মনে হয়, যেন, এক সময়ে, এক স্থানে বসিয়া, অন্য-চিন্তা-বিযুক্ত হইয়া, মহাকবি, তাঁহার সাধের রামায়ণ গান গাহিয়াছেন। তিনি নিজে সে গানে মজিতে পারিয়াছিলেন, তাই তাঁহার শ্রোতৃবর্গও মজিয়াছে, আত্মবিস্মৃত হইয়া, তাঁহার সেবা করিয়াছে, আচন্দ্র-দিবাকর করিবেও।

    তুমি যখন অভ্রভেদী, শুভ্রতুষারশীর্ষ, হিমাচলের পাদদেশে বসিবে, বিধাতার কৃপায়, তখন যদি তোমার হৃদয়ে, কোন প্রশান্ত ছবির ছায়াপাত হয়, কোন বিরাট্‌ শক্তির স্পন্দন অনুভূত হয়, তবেই তুমি ঐ বিরাট্‌ হিমাচলের প্রশান্ত ভাবের, প্রশান্ত মূর্ত্তির কিয়দংশ হয়ত, তোমার কল্পনা-দর্পণের সাহায্যে অন্যকে প্রদর্শন করিতে পার। অন্যথা, তোমার সাধ্য কি যে তুমি হিমাচলের ঐ গম্ভীর-মাধুর্য্যের বর্ণন করিবে। তুমি যে স্থানে, যে সময়ে, যে অবস্থায় বর্ত্তমান, যদি সেই স্থানের, সেই সময়ের, সেই অবস্থার সহিত, নিজেকে মিশাইতে না পার, “তদ্ভাব ভাবিত” করিতে না পার, তবে কদাচ, তদ্দেশীয় ও তৎকালীন ভাবের স্ফুরণ তোমার দ্বারা সম্ভব হইবে না। তোমার দ্বারা তদ্দেশবাসিগণের হৃদয় কদাচ বিমোহিত হইতে পারে না। দীপকরাগের সময়ে, তুমি বেহাগ পূরবীতে আলাপ করিলে, তাহা কখনও জমিতে পারে না। সে আলাপে শ্রুতির সুখ হয় না, বরং পীড়াই জন্মে। ভারতবর্ষের বিশেষতঃ বঙ্গদেশের ধর্ম্মপ্রাণ অধিবাসীরা কি চায়, কি ভালবাসে, এ তত্ত্ব মহাকবি কৃত্তিবাস বুঝিতেন। এদেশের লোকের হৃদয় কি উপাদানে গঠিত, কোন্‌ উপকরণ তাহাতে অধিক, তাহা কৃত্তিবাস জানিতেন, তাই তাঁঁহার দেশবাসিগণের হৃদয়ের ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া, তিনি তদীয় কল্পনার মোহন বীণায় ঝঙ্কার করিয়াছিলেন। তাই সে ঝঙ্কার বসন্তের পিকঝঙ্কারের ন্যায়, বঙ্গবাসীদিগকে বিমুগ্ধ, একেবারে আকুল করিয়া তুলিয়াছিল। এই হিসাবেও সংস্কৃতে কালিদাস ও বাঙ্গালায় কৃত্তিবাস একই মন্ত্রে দীক্ষিত, একই পথের যাত্রী। তোমার পাঠকগণ কি চান্, কতটুকু চান্, তোমার বীণার কোন্ তার স্পর্শ করিলে, তাহার ধ্বনি তোমার পাঠকের হৃদয়ে অনুরণিত হইবে, তাহার “কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিবে,”—এজ্ঞান যদি তোমার না থাকে, তবে তুমি যত বড় শক্তিশালী লেখকই হও না কেন, যত বড় কলাবিদ্যাবিশারদই হও না কেন, তোমার লেখায় বা তোমার অঙ্কিত আলেখ্যে, তোমার সামাজিক বর্ণের বা তোমার দর্শকবৃন্দের পরিতৃপ্তি হইবে না। তোমার সে লেখায় বা সে চিত্রে, তদীয় দেশবাসী সহৃদয়বর্গের হৃদয় আকৃষ্ট ও বিমোহিত হইবে না। যে সমুদয় লেখকের এই জ্ঞান আছে, তাঁহাদের লেখাই কালজয়ী হয়, থাকিয়া যায়; আর যাঁহাদের এই জ্ঞান নাই, তাঁহাদের লেখা ছিন্ন তুষারের ন্যায় অতি অল্পকাল মধ্যেই কোথায় মিলাইয়া যায়। আর্য্য রামায়ণ অবলম্বনপূর্ব্বক অন্য অনেক কবি বঙ্গভাষায় রামায়ণ রচনা করিয়াছেন, কিন্তু কৃত্তিবাসের রামায়ণ তন্মধ্যে যে এত প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে, প্রায় পাঁচ শত বৎসরেরও অধিক কাল সমানভাবে বা উত্তরোত্তর ক্রমেই অধিকতরভাবে, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্ত্রীপুরুষ, ইতর ভদ্র সকল সমাজেই পূজিত হইতেছে, ইহার কারণ হইল, পূর্ব্বোক্ত জ্ঞান। কৃত্তিবাসের ঐ জ্ঞান প্রচুর পরিমাণে ছিল। যে দেশে তিনি অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, সেই দেশের অধিবাসীরা কি ভালবাসে, কি চায়, তাহা তিনি জানিতেন এবং তিনিও তাহাই চাহিতেন ও ভালবাসিতেন। তাই, তিনি যদি কখনও সামান্য একটু গুণ্‌গুণ্‌, করিয়া স্বরবিলাস করিয়াছেন, অমনি সেই গুণ্‌গুণ্‌, ধ্বনি শতগুণে বর্দ্ধিত হইয়াই যেন, তদীয় দেশবাসীদিগের হৃদয় বিমোহিত করিয়া তুলিয়াছে। দিবাবসানে সাগরগামিনী তটিনীর প্রাণের আকুল গীতিকা, কুলকুল ধ্বনিতে যেমন শ্রান্ত পথিকের চিত্তে একটা জড়তা, একটা তন্দ্রা আনিয়া দেয়, পথিক একপদে তাঁহার কর্ম্মময় দীর্ঘ দিবসের সমস্ত ক্লেশ ভুলিয়া যান, কেমন একটা ঘুমের ঘোরে তাঁহার নয়ন নিমীলিত হইয়া আসে, সেইরূপ, প্রেমিক কবি কৃত্তিবাসের মোহিনী বীণার ঝঙ্কারেও বঙ্গবাসীর হৃদয় বিমোহিত, আনন্দালস হইয়া রহিয়াছে। কবে কোন্‌ দিন্‌, কত শত সহস্র বৎসর পূর্ব্বে, তমসার তীরে “মা নিষাদ” বলিয়া বাল্মীকি গান ধরিয়াছিলেন, আর আজও যেন সেই গানের ধ্বনির বিরাম হয় নাই। সে স্বরলহরী যেন বাতাসে এখনও ভাসিয়া বেড়াইয়া, ভারতবাসীদের প্রাণে কেমন একটা তন্দ্রা জন্মাইয়া দিতেছে, সেইরূপ কবে কোন্‌ দিন্‌, কোন্‌ শুভমুহূর্ত্তে পতিতোদ্ধারিণীর তীরে বসিয়া, তাঁঁহারই কুলকুল গীতির সুরে সুর মিশাইয়া ফুলিয়ার পণ্ডিত তান ধরিয়াছিলেন, আজ সে ফুলিয়া নাই, সে ভাগীরথীও দূরে সরিয়া গিয়াছেন,—কিন্তু সেই স্বপ্নময়, আবেশময় তানের এখনও যেন শেষ লয় হয় নাই। সে রাম, সে অযোধ্যা, কিছুই নাই, তবুও সেই রামের কথা, রামের স্মৃতি যেমন ভারতের নরনারীর প্রাণে প্রাণে গাঁঁথা রহিয়াছে, আজীবন থাকিবেও, তদ্রূপ আজ সে ফুলিয়া নাই, সে জাহ্নবী নাই, সে কৃত্তিবাস নাই, কিন্তু কৃত্তিবাসের কথা, কৃত্তিবাসের স্মৃতি বঙ্গবাসী কদাচ বিস্মৃত হইবে না। রাম-সীতার পাদস্পর্শে অযোধ্যা চিরকালের মত তীর্থ হইয়া রহিয়াছে, কৃত্তিবাসের পাদস্পর্শে ফুলিয়া বঙ্গের সাহিত্যসাম্রাজ্যের প্রধান তীর্থ হইয়াছে। ফুলিয়ার মুখটী, শুধু ফুলিয়ার নহে, বাঙ্গালার গৌরব স্থান, পরমস্পর্দ্ধার ভাজন হইয়াছেন। জন্ম জন্মান্তরে কৃত্তিবাস কত তপস্যা করিয়াছিলেন, তাঁঁহার সে তপস্যার ফলে তিনি ত অমর হইয়াছেনই, তাঁঁহার মাতৃভাষাকেও অমরী করিয়া গিয়াছেন। বাঙ্গালীর জাতীয় সাহিত্যের স্বর্ণমন্দিরের তিনিই ভিত্তিস্থাপন করিয়াছেন। যে দেশে এবং যে জাতিতে কৃত্তিবাসের ন্যায় কবি আবির্ভূত হন, সে দেশ ধন্য, সে জাতি বরেণ্য। কৃত্তিবাস বাঙ্গালী জাতিকে বড় করিয়া দিয়াছেন; তিনি যে সঙ্গীত ধরিয়াছিলেন, আজ এই পাঁচ শত বৎসর ধরিয়া যিনি যতটুকু পারেন, সেই সঙ্গীতেরই “তান প্রদান” করিতেছেন। তাঁঁহার সাধনার ফলে, তাঁঁহার স্বজাতির জাতীয় সাহিত্য ধীরে ধীরে পরিপুষ্টি লাভ করিতেছে। বাঙ্গালীর যতই চক্ষু ফুটিতেছে, ততই তাহারা তাঁঁহার আদর করিতে শিখিতেছে।

    সমবেত ভদ্রমণ্ডলী এবং বন্ধুবর সতীশচন্দ্র, আপনারা মহাকবি কৃত্তিবাসের জন্মস্থানে অদ্য এই যে মহোৎসবের আয়োজন করিয়াছেন,—পূজ্য মহাপুরুষের পূজার অনুষ্ঠান করিয়াছেন, এজন্য সমগ্র বাঙ্গালী জাতির কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন। যে সমুন্নতবংশের কৃত্তিবাস অলঙ্কার ছিলেন, সেই ফুলিয়ার মুখটীর একজন কবিতারসবঞ্চিত অভাজনকে আপনাদের অদ্যকার উৎসবে আহ্বান করিয়াছেন বলিয়া আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। যে কুলে আমার জন্ম, সেই কুলের একজন প্রধান পুরুষের এবং বঙ্গের সর্ব্বপ্রধান মহাকবির স্মৃতিবাসরে আমি উপস্থিত হইবার সুযোগ পাইয়াছি বলিয়া নিজেকেও ধন্য ও কৃতকৃতার্থ মনে করিতেছি।

    এস কৃত্তিবাস, তোমার বড় সাধের ফুলিয়ায় একবার ফিরিয়া এস, এই দেখ, তোমার উদ্দেশে, কত শত ভক্ত আজ সজলনেত্রে ফুলিয়ায় উপস্থিত, তুমি তাহাদিগের সারস্বতভাণ্ডারে যে অমূল্য রত্ন দিয়া গিয়াছ, সেই রত্নের গৌরবে তাহারা আজ গৌরবিত, কৃত্তিবাসের স্বজাতি বলিয়া আদৃত। এস কবি, আবার আসিয়া—

    “পবন নন্দন হনূ, লঙ্ঘি ভীমবলে
    সাগর, ঢালিলা যথা রাঘবের কাণে
    সীতার বারতা-রূপ সঙ্গীত লহরী;
    তেমতি, যশস্বি, তুমি সুবঙ্গ মণ্ডলে
    গাও গো রামের নাম সুমধুর তানে,
    কবি-পিতা বাল্মিকীকে তপে তুষ্ট করি।”

    শ্রীআশুতোষ মুখোপাধ্যায়।

  • রুষ ও জাপান যুদ্ধের ইতিহাস।

    রুষ ও জাপান যুদ্ধের ইতিহাস।

    চীনের বক্সার বিদ্রোহ প্রশমিত হইলে, মার্কিন, জাপান ও ইয়ুরােপীয় শক্তিগণ সকলে সমবেত হইয়া অঙ্গীকার করেন যে; — আমরা বিবিধ ক্ষতিপূরণের জন্য চীন গভর্ণমেণ্টের নিকট হইতে এক শতকোটী টাকা গ্রহণ করিব; কিন্তু চীন-সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখিব। সম্মিলিত সৈন্যগণ চীনের যে সমস্ত দুর্গ ও নগরাদি অধিকার করিয়াছে, তথা হইতে ক্রমে ক্রমে সৈন্য সামন্ত উঠাইয়া লইব।

    অন্যান্য শক্তিপুঞ্জ স্ব স্ব প্রতিজ্ঞানুসারে চীনরাজ্য পরিত্যাগপূর্ব্বক স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন, কিন্তু রুষ মাঞ্চুরিয়া পরিত্যাগ করিলেন না। শক্তিনিচয়ের পুনঃ পুনঃ অনুরােধ ও ভয় প্রদর্শন স্বত্তেও তিনি আজি নয় কালি, এমাসে নয় পরমাসে ইত্যাদি বিবিধ রাজনৈতিক ছল আরম্ভ করিয়া কালবিলম্ব করিতে আরম্ভ করিলেন। কিছুদিন পরে মাঞ্চুরিয়া পরিত্যাগ করা দূরে থাকুক, রুষ গভর্ণমেণ্ট কোরিয়া রাজ্যের উপরে স্বীয় লােলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। দেখিতে দেখিতে আলু নদীর তীরবর্ত্তী অরণ্যে কাষ্ঠছেদনের অধিকারপত্র সংগৃহীত হইল, কোরিয়ার উইজু বন্দর রুষ বন্দরে পরিণত হইল।

    রুষের এই সকল দুরভিসন্ধি দর্শনে জাপান গভর্ণমেণ্ট স্বভাবতঃই উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। জাপান মনে করিলেন, রুষ ত মাঞ্চুরিয়া পরিত্যাগ করিবেই না; তাহার উপরে যদি কোরিয়া রাজ্য গ্রাস করিয়া বসে, তাহা হইলে কয়েক বৎসরের মধ্যে আমারও স্বাধীনতা-গৌরব বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। অদ্য ১৮০০ শত বৎসর ধরিয়া যে কোরিয়ার উপরে আমার অখণ্ড আধিপত্য বিদ্যমান রহিয়াছে, যাহার উপরে জাপানবাসীর জীবন মরণ নির্ভর করিতেছে, সেই কোরিয়া রাজ্য কখনও রুষিয়ার করালগ্রাসে পতিত হইতে দিব না। তাঁহারা স্থির করিলেন, যদি দুরাকাঙ্খ রুষ, ন্যায়, ধর্ম্ম ও যুক্তির মস্তকে পদাঘাত পূর্ব্বক পররাজ্য গ্রাস করিতে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে আমরা “নিপনের” আজন্মস্বাধীনতাগৌরব রক্ষার জন্য ঈশ্বরের মহামহিমামণ্ডিত নাম স্মরণ করিয়া ধর্ম্মযুদ্ধে অগ্রসর হইব।

    গত ১৯০৩ অব্দের ২৩শে জুন তারিখে টোকিওর মন্ত্রণামন্দিরে রুষদুত ব্যারণ রােসেনের সহিত জাপানের পররাষ্ট্র সচিব ব্যারণ কমুরা মহাশয়ের প্রবল বাক্‌যুদ্ধ উপস্থিত হয়। সপ্তমাস ব্যাপী তর্ক বিতর্কের পর খ্রীষ্টধর্ম্মপরায়ণ জার মহােদয় প্রকাশ করিলেন যে;—মানচুরিয়া সম্বন্ধে আমি জাপানের কোন কথা শুনিব না। কোরিয়ার ১/৩ অংশ নিরপেক্ষ থাকিবে, অবশিষ্টাংশে রুষাধিকার বিস্তৃত হইবে। ২২শে ডিসেম্বর তারিখে জাপান উত্তর দিলেন:— না, তাহা হইবে না। রুষকে কোন নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানচুরিয়া পরিত্যাগ করিতে হইবে। কোরিয়ায় জাপানের ক্ষমতা অক্ষুন্ন থাকিবে। ৬ই জানুয়ারি তারিখে রুষ রাজনৈতিক ভাষায় মানচুরিয়ায় জাপানের স্বত্ব স্বীকার করিলেন, কিন্তু কোরিয়া সম্বন্ধে নিজাভিপ্রায় পূর্ব্বমত বলবৎ রাখিলেন। ১৩ই জানুয়ারি তারিখে জাপান আপনার শেষ অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া কহিলেন, মানচুরিয়ায় যাহাতে সমস্ত জাতিই স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করিতে পারে তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে; কোরিয়ায় জাপানের প্রভুত্ব ও বাণিজ্যাধিকার অব্যাহত থাকিবে। ইহার পরে দ্বাবিংশতি দিবস অতিবাহিত হইল, তথাপিও রুষ গভর্ণমেণ্ট কোন উত্তর প্রদান করিলেন না। এই ঘটনায় জাপানের মনে রুষের দুরভিসন্ধি সম্বন্ধে গভীর সন্দেহের উদয় হইল। অতঃপর তাঁহারা আর কালবিলম্ব অনুচিত মনে করিয়া, ৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখে রুষিয়ার সহিত সমস্ত রাজনৈতিক সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন।

    এইরূপে রুষের চাতুর্য্য, স্বার্থপরতা, দুরাকাঙ্ক্ষা ও পররাজ্যগ্রাসস্পৃহার বিষময়ফলে সুদূর প্রাচ্য ভূখণ্ডে লোক-ভয়ঙ্কর ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল।

    জলযুদ্ধ।

    গত ১৯০৪ অব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে রাত্রি দ্বিপ্রহরের সময়ে রুষ জাপানে প্রকৃত যুদ্ধারম্ভ হয়। তদবধি সন্ধিপত্র স্বাক্ষর পর্য্যন্ত সমুদ্রবক্ষে যতগুলি ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকটীতেই জয়লক্ষ্মী জাপানের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করিয়াছেন। এই কালসমরে রুষিয়ার জলবল সম্পূর্ণ নির্ম্মূল হইয়া গিয়াছে। রুষের কি সর্ব্বনাশ হইয়াছে, তাহা নিম্ন প্রদর্শিত তালিকা পাঠ করিলে সহজেই হৃদয়গম্য হইবে।

    যুদ্ধের পূর্ব্ব দিবস পর্যন্ত সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে রুষিয়ার এই কয়েকখানি রণতরি বিদ্যমান ছিল,—

    আর্থার বন্দরে (যুদ্ধজাহাজ) জারউইচ্ B, রেট্ভিসান C, সিবাষ্টপোল G, পোলটাবা G, পারচ্ভিট G, পোবিডা, G, পেট্র পেবলস্কি A।

    (লৌহমণ্ডিত রণতরি) বেয়ান E।

    (রক্ষিত রণতরি) আস্কল্ড C, নভিক E, ডিয়ানা D, পালাডা G, বেরিন E।

    কোরিয়ার উপকূলে;—(রক্ষিত রণতরি) ভেরিয়াগ E, কোরিজ E।

    ভ্যালাডিভােষ্টক বন্দরে (লৌহমণ্ডিত রণতরি) গ্রোমোবিয়া রসিয়া F, রুরিক E, বগাটির F।

    উপরােক্ত প্রথমশ্রেণীর রণতরিসমষ্টির মধ্যে A চিহুিত জাহাজ খানি জাপানের আগ্নেয়যন্ত্রে পড়িয়া ৭০০ সৈন্য ও প্রচুর যুদ্ধোপকরণসহ সাগরগর্ভে প্রবিষ্ট হইয়াছে। এই জাহাজে সুপ্রসিদ্ধ নৌ-সেনাপতি ম্যাকারফ্ ও জগদ্বিখ্যাত চিত্রকর ভেরেটসাগীন অবস্থিত ছিলেন।

    B চিহ্নিত জাহাজখানি চীনের কিয়াচিউ বন্দরের সন্নিকটে জলমগ্ন হয়। ইহাতে সেনাপতি উইটগার্ট, দুইশতাধিক সৈন্যসহ মৃত্যু মুখে পতিত হইয়াছিলেন।

    C চিহ্নিত অস্কল্ড চীনের উসাং বন্দরে ভগ্নাবস্থায় বন্দী হয়।

    D চিহ্নিতখানি ফরাসী অধিকৃত সৈগন বন্দরে বন্দী হয়।

    E চিহ্নিত রণতরি ছয়খানি জাপানের গােলা ও টর্পেডোর আঘাতে প্রচুর সৈন্য ও যুদ্ধোপকরণ সহ সাগরসলিলে নিমগ্ন হয়।

    F চিহ্নিত তরণীদ্বয় দ্রুত পলায়নকালে সমুদ্রমধ্যস্থ পর্ব্বত চুড়ায় আহত হইয়া জলমগ্ন হয়।

    G চিহ্নিত প্রথম শ্রেণীর রণতরি ছয়খানি আর্থার বন্দরে জলমগ্ন হইয়া জাপানিদিগের হস্তে পতিত হয়।

    এতদ্ভিন্ন এনিসি, ষ্টিরিগাছি, বুনি, রেষ্ট্রফনি প্রভৃতি অনেকগুলি কামানবাহী ও টর্পেডো ধবংসিণীতরণী বিনষ্ট ও নিরপেক্ষ বন্দরে বন্দী হয়। রেসিটেলনী, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি কয়েকখানি জাপানীরা কাড়িয়া লয়।

    উপরােক্ত রণতরি সকলের মূল্য ত্রিংশতি কোটী টাকার ন্যূন হইবে না।

    এই যুদ্ধে জাপানের হ্যাট্‌সুজ নাম্নী যুদ্ধজাহাজ, যশিনো নাম্নী রক্ষিত রণতরি ও কয়েকখানি টর্পেডো বােট জলমগ্ন হইয়াছিল।

    স্থলযুদ্ধ।

    রুষজাপান সমরে যতগুলি উল্লেখযােগ্য যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার সকলগুলিতেই জয়লক্ষ্মী রুযিয়ার প্রতি কার্পণ্য প্রকাশ করিয়াছেন। কি আলুতীরে, কি দুরারােহ ন্যান্সান পর্ব্বতে, কি ওয়েফ্যানকু প্রান্তরে, কি সুরক্ষিত কেইপিং নগরে, কি দুর্গম মটিয়েন গিরিপ্রদেশে, কি ট্যাসিচিও ক্ষেত্রে, সর্ব্বস্থানেই রুষ সৈন্য পরাজিত ও বিতাড়িত হইয়াছে। দ্রুত পলায়ন ব্যপদেশে রুষ সেনাপতিরা প্রতিযুদ্ধেই বহু সংখ্যক কামান, বহু সহস্র বন্দুক, প্রচুর যুদ্ধোপকরণ ও বহু পরিমাণ খাদ্যাদি পরিত্যাগ পূর্ব্বক ও সগৌরবে পলায়ন করিতে বাধ্য হইয়াছেন। রুষ সেনানী ও সৈনিকগণ প্রকৃত বীরের ন্যায় প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়াও এই ছয়টী যুদ্ধ ক্ষেত্রের কোন স্থলেই সফলকাম হইতে পারেন নাই। তাঁহারা প্রতি যুদ্ধেই জীবনে উপেক্ষা, অপূর্ব্ব বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্বের পরকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াও নিষ্ঠুর অদৃষ্ট দেবীর চিত্ত বিনােদনে সমর্থ হয়েন নাই।

    সপ্তম যুদ্ধ পৃথিবীর সমরেতিহাসে লেয়ং যুদ্ধ নামে অভিহিত হইয়াছে। ইহাই বিংশ শতাব্দীর সর্ব্বপ্রথম প্রধান যুদ্ধ। রুষ সেনাপতি কুরােপাট্‌কিন, সার্দ্ধ দ্বিলক্ষ প্রথম শ্রেণীর সৈন্য ও ষষ্ঠ শতাধিক কামান লইয়া লেয়ং নগরে অবস্থিতি করিতে ছিলেন। নদী, পর্ব্বত, প্রাচীর ও পরিখা প্রভৃতিতে এই নগরী স্বভাবতঃই দুর্ভেদ্য ও দুরাক্রম্য ছিল, তাহার উপরে রুষদিগের ষষ্ঠ মাসব্যাপী বিপুল অধ্যবসায় ও অসামান্য চেষ্টায় লেয়ং নগরী একটী অজেয় দুর্গে পরিণত হইয়াছিল। ফলতঃ মহাযুদ্ধ হইবার আশঙ্কায় কুরোপাট্‌কিন তাঁহার অবস্থান সুরক্ষিত করা সম্বন্ধে কোন অংশই অসম্পূর্ণ রাখেন নাই।

    হায়! তথাপিও তাঁহাকে ভীষণ পরাজয় সহ্য করিতে হইয়াছিল; তথাপিও তাঁহাকে লজ্জারক্ত বদনে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া আত্মরক্ষা করিতে হইয়াছিল। আমেরিকা, জাপান ও বিলাতী পত্র সম্পাদকেরা কুরােপাটকিনের এই অদ্ভুত পলায়ন বর্ণনায় সহস্রমুখ হইলেও, ফরাসী, জার্ম্মাণ ও রুষ পত্র-সম্পাদকেরা অণুমাত্র আনন্দ প্রকাশ করেন নাই। এই পৃষ্ঠপ্রদর্শন ব্যাপারে রুষ জনসাধারণ কোনরূপ আনন্দ করিবার অবসর পায় নাই; জার মহোদয় ও মন্ত্রিগণের পরাজয়মলিনবদনমণ্ডলে কোনরূপ আনন্দ চিহ্ন প্রকটিত হয় নাই। যে দাম্ভিক সেনাপতি তিনলক্ষ মাত্র সৈন্য লইয়া যুদ্ধারম্ভের ছয় মাস মধ্যেই টোকিওর নন্দন কাননে প্রবেশ করিতে বাসনা করিয়াছিলেন, তাঁহার অপূর্ব্ব বীরত্ব পুনঃ পুনঃ পলায়ন কৌশলে পর্য্যবসিত হইতে দেখিয়া আমরাও আনন্দ লাভ করিতে পারি নাই। এই যুদ্ধের ভয়াবহ ফলে বিচলিত হইয়া, কুরোপাট্‌কিনকে পরােক্ষে তিরস্কার করিবার ব্যপদেশে জার মহােদয় সেনাপতি গ্রিপেনবার্গকে স্বাধীন ক্ষমতা প্রদান করিয়া মাঞ্চুরিয়ার দ্বিতীয় সেনাপতি পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন।

    রুষ পক্ষের হিসাবে লেয়ং যুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার রুষ সৈন্য হতাহত হয়। জাপানের হতাহতের সংখ্যা চল্লিশ সহস্রের ন্যূন হইবে না। এই যুদ্ধে ১৩ জন রুষ সৈন্য ও ৩০ টী যুদ্ধাশ্ব জাপানের বন্দী হয়। এতদ্ব্যতীত ৪০০০ বন্দুক, ১৬ লক্ষ টোটা, ১০ হাজার শেলগােলা, ১২ শত শকট, ১৬ হাজার খনন যন্ত্র, ৫৬০ লাঙ্গল, ২৫০০ কুঠার, ৬৪০০ জামা, ১৯ হাজার টিন মাংস ও প্রচুর রেলসরঞ্জাম জাপানের হস্তগত হয়।

    অষ্টম যুদ্ধ “সা” নদীর তীরদেশে সংঘটিত হওয়ায় সা-হো-যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছে। এই যুদ্ধে সেনাপতি কুরোপাট্‌কিন তিন লক্ষ সৈন্য লইয়া বিপুল বিক্রমে জাপানবাহিনীকে আক্রমণ করিয়া ভীষণ পরাজয় সহ্য করেন। ইতিপূর্ব্বে কোন যুদ্ধেও রুষের এরূপ পরাজয় হয় নাই। ইয়ুরােপের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি সাহো যুদ্ধের ভীষণ পরিণাম দৃষ্টি করিয়া পূর্ব্ব্যভ্যস্থ কৌশল অবলম্বন পূর্ব্বক নিজ গৌরব রক্ষা করেন। এই যুদ্ধে ৭০৯ জন রুষ সৈন্য জাপানের বন্দী হয়। সমরক্ষেত্রে জাপানী শববাহকেরা পঞ্চদশ সহস্র মৃত রুষসৈন্যের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করে। এতদ্ব্যতীত ৪৫টী কামান, ৫৪০০ বন্দুক, ৭৮ হাজার টোটা ও ৭ হাজার বড় গােলা বিজয়ী জাপানিগণের হস্তগত হয়। অনেকের অনুমান এই যুদ্ধে এক লক্ষ রুষ সৈন্য হতাহত হইয়াছিল।

    সাহো যুদ্ধে জাপানী সৈন্যেরও সামান্য ক্ষতি হয় নাই। এই যুদ্ধে ৩০ হাজার জাপানী সৈন্য হতাহত ও ১২টী কামান রুষের অধিকৃত হইয়াছিল।

    নবম যুদ্ধ ২য় সাহােযুদ্ধ বা হিকণ্টাইয়ের যুদ্ধ নামে অভিহিত হইয়াছে। গত পূর্ব্ব ২৫শে জানুয়ারি দ্বিতীয় রুষ সেনাপতি গ্রিপেনবার্গ বিপুল সৈন্য লইয়া অতর্কিতভাবে জাপানবাহিনীর বামভাগ আক্রমণ করেন। প্রথম চারি দিবসের যুদ্ধ দর্শনে অনেকেরই ধারণা হইয়াছিল যে, বুঝি এতদিনে জয়লক্ষ্মী রুষের প্রতি অনুকূলা হইলেন। কিন্তু তাহা হইল না, রুযিয়ার দগ্ধ অদৃষ্টে সে শুভ মুহূর্ত্ত আসিয়াও আসিল না। সেনাপতি ওয়ামার অপূর্ব্ব নেতৃত্ব কৌশলে চতুর্থ রজনীতে যুদ্ধের গতি সম্পূর্ণ নূতনাকার ধারণ করিল, তাহার ফলে প্রভাতের পূর্ব্বেই রুষের পূর্ণ পরাজয় হইল।

    এইরূপ প্রকাশ, এই যুদ্ধে ৩৬ সহস্র রুষসৈন্য ও সাত সহস্র জাপানী সৈন্য হতাহত হইয়াছিল।

    পরাজয়ের হেতু নির্দ্দেশ করিতে যাইয়া গ্রিপেনবার্গ বলিয়াছেন;—কুরোপাট্‌কিন যথা সময়ে সৈন্য সাহায্য করিলে, তাঁহাকে এরূপ পরাজয় সহ্য করিতে হইত না। কুরােপাট্‌কিন বলেন, গ্রিপেনবার্গ তাঁহার সহিত কোনরূপ পরামর্শ না করিয়া মহাযুদ্ধ সংঘটনপূর্ব্বক ভীষণ পরাজয় সহ্য করিয়াছিলেন।

    আর্থার বন্দর অধিকার পৃথিবীর সমর ইতিহাসে এক অপূর্ব্ব কীর্ত্তি। জাপানীরা ২৩৩ দিনব্যাপী অবরোধ করিয়া, বহু সৈন্য উৎসর্গ করিয়া ১৯০৫ খৃঃ ১লা জানুয়ারি তারিখে অজেয় আর্থার দুর্গে মিকাভাের সূর্য্যাঙ্কিত বিজয় বৈজয়ন্তী উড্ডীন করিতে সমর্থ হয়। এই বন্দর অধিকার করিতে জাপানীরা যে অসাধারণ সহিষ্ণুতা, বিপুল অধ্যবসায় ও অদ্ভুত শৌর্য্য প্রদর্শন করিয়াছে, জগতের ইতিহাসে তাহার তুলনা নাই।

    রুষ সেনাপতি মহাবীর ষ্টোসেল প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক বলিয়াছিলেন, একজন মাত্র রুষসৈন্য জীবিত থাকিতে, রুষের ধমনীতে বিন্দুমাত্র শােণিত থাকিতে আমি আত্মসমর্পণ করিব না।” অবশেষে সেই কঠোর কর্ম্মা সেনাপতি নিরুপায় হইয়া, দুঃখে, ক্ষোভে, অভিমানে জাপান সেনাপতিকে বলিয়াছিলেন,—”নগী! আর নয়, আমরা আত্মসমর্পণ করিতেছি।”

    ১৯০৫ খৃঃ ১লা জানুয়ারি তারিখে আর্থার বন্দরস্থিত কি সেনা, কি সামরিক কর্ম্মচারী সকলেই জাপানের নিকটে আত্মসমর্পণ করেন। ইহাতে বন্দরের সমস্ত দুর্গ, গােলাগুলি, বারুদ, বন্দুক, কামান, রণতরি ও বিবিধ বাণিজ্যজাহাজনিচয় জাপান গভর্ণমেণ্টের হস্তগত হয়। দশ বৎসর পূর্ব্বে রুষ যে সম্পত্তি অম্লানবদনে জাপানের নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়াছিল, জাপান সেনাপতি নগী কেবলমাত্র জাপানী সেনার সাহায্যে সেই সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করিয়াছেন। কেন জাপানের যশােনিনাদে দিঙ্মণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইবে না?

    রুষ কর্ম্মচারিগণ দুর্গরক্ষায় বিশেষ বীরত্ব প্রকাশ করায়, জাপান সেনাপতি প্রস্তাব করেন, যে সমস্ত রুষ কর্ম্মচারী শপথ করিয়া বলিবেন, “আর কখনও জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না” তাঁহারা রুষিয়ায় প্রত্যাবর্ত্তন করিতে অধিকার পাইবেন। এই রূপ শপথ করিয়া মহাবীর ষ্টোশেল, ৪৪১ জন কর্ম্মচারী ও ২২৯ আরদালীসহ মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন। অবশিষ্ট ৪৩ জন কর্ম্মচারী ও ২৩৪৯১ জন সৈনিক বন্দী হইয়া জাপানে প্রেরিত হয়।

    সৈন্য ও কর্ম্মচারী ব্যতীত, বিজয়ী জাপান সেনাপতি আর্থার বন্দরে ৫৯টী স্থায়ী দুর্গ, ৫৪৬টী কামান, ৩৫ হাজার বন্দুক, ৮২ হাজার শেলগােলা, ১৯ লক্ষ মণ কয়লা, ৪ খানি যুদ্ধ জাহাজ, ২খানি লৌহমণ্ডিত রণতরি, ১৪ খানি টর্পেডো তরণী, ১০ খানি বাণিজ্য জাহাজ, ৩৫ খানি কলের জাহাজ ও প্রচুর রেল সরঞ্জাম প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

    দশম যুদ্ধ মুকদেন যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছে। এই মহাযুদ্ধে জাপানের সুসন্তান মার্শাল ওয়ামা যে অপূর্ব্ব কৃতিত্ব ও অসাধারণ রণচাতুর্য্যের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন, পৃথিবীর সমরেতিহাসে তাহার তুলনা নাই। আজি জাপান সৈনিকের অনন্যসাধারণ শৌর্য-বীর্য্য দর্শন করিয়া, আমেরিকা স্তম্ভিত, ইউরােপ ভীত, এসিয়া পরমানন্দে বিমােহিত। প্রশান্ত মহাসাগরে রুষের জলবল পূর্ব্বেই নির্ম্মূল হইয়া যায়, তাহার পরে মানচুরিয়ার বিস্তৃত সমরপ্রাঙ্গনে স্থলবলও এক রূপ ধ্বংশ হইয়া গেল। বহুবর্ষ ধরিয়া, বহু কোটী মুদ্রা ব্যয় করিয়া, রুষ সমগ্র এসিয়ায় একাধিপত্য বিস্তারের যে কল্পনা করিতেছিলেন, আজি জাপানের প্রচণ্ড বিক্রমে সে কল্পনাজাল সহসা ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। হায়! অদৃষ্টের কি কঠোর উপহাস!

    আর ইউরােপের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি মহাবীর কুরােপাট্‌কিন! যিনি একদা টোকিওর নন্দন কাননে দৈত্যপতির ন্যায় বিচরণ করিতে বাসনা করিয়াছিলেন, মুকদেন যুদ্ধে তাঁহার সমস্ত আশাভরসা, তেজ, গর্ব্ব বিনষ্ট হইয়া গেল। এই মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ফলে বিচলিত হইয়া, জার মহােদয়, সেনাপতি লিনিভিচকে মানচুরিয়ার প্রধান সেনাপতিপদে নিযুক্ত করেন। হায়! নিষ্ঠুর অদৃষ্ট।

    রুষপক্ষ হইতে প্রকাশ, সাহাে মুকদেন যুদ্ধে প্রায় দুই লক্ষ রুষ সৈন্য হত, আহত ও বন্দী হইয়াছে এবং প্রায় ৫০০ শত কামান জাপানের হস্তগত হইয়াছে।

    এইরূপ প্রকাশ, এই যুদ্ধে যে সমস্ত সমরোপকরণ ও রসদাদি জাপানের হস্তগত হইয়াছে, তাহার কিয়দ্দংশ শকটপূর্ণ হইয়া স্থানান্তরে প্রেরণ কালে ১২ মাইল পথ আচ্ছন্ন হইয়াছিল।

    মার্শাল ওয়ামার রিপোর্টে প্রকাশ, এই মহাসমরে জাপানের হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার হইয়াছিল।

    মুকদেন যুদ্ধের পরে, টিলিং, সিংহিং প্রভৃতি স্থানে যে সকল যুদ্ধ হইয়াছিল তাহার সকল গুলিতেই রুষিয়ার শােচনীয় পরাজয় হয়। পৃথিবীর সমরেতিহাসে এরূপ ধারাবাহিক পরাজয়ের কথা শ্রুত হওয়া যায় নাই।

    বাল্টিক নৌ-বাহিনীর পরিণাম।

    জাপানিদিগকে উপর্য্যুপরি জয়লাভ করিতে দেখিয়া রুষ সম্রাট এডমিরাল রোজ্ডেজ্ভেনস্কির অধীনে বাল্টিক সাগরস্থিত নৌ-বাহিনীকে সুসজ্জিত করিয়া জাপানযুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই বিপুল-বাহিনী যখন ইংরেজের কয়েকখানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্ণবপােত বিনষ্ট করিয়া আটলাণ্টিকবক্ষঃ আলােড়িত করিতে করিতে প্রাচ্য সমুদ্রাভিমুখে ধাবিত হইল,তখন অনেকেই জাপানের পরিণাম ভাবিয়া আকুল হইয়াছিলেন। এই সময়ে জার্ম্মানি, ফরাসী প্রভৃতি নিরপেক্ষ শক্তিপুঞ্জেরা বিবিধ উপায়ে রুষিয়ার সাহায্য করিয়াছিলেন। অধিক কি, ইংরেজ বণিকেরা পর্য্যন্ত প্রকারান্তরে এই বিরাটবাহিনীর আবশ্যকীয় ইন্ধনাদি সংগ্রহে সহায়তা করিয়াছিলেন। এই সমস্ত ঘটনায়, বিশেষতঃ যখন রুষবাহিনী চীনসাগর অতিক্রম করিয়া জাপানের নিকট দিয়া উত্তরাভিমুখে অগ্রসর হইল, অথচ জাপানী নৌ-সেনাপতি টেগো শত্রুর গতিরোধ জন্য কোনপ্রকার চেষ্টা করিলেন না, তখন জাপানের জয় সম্বন্ধে সকলেরই অন্তঃকরণে দারুণ সন্দেহ উপস্থিত হইল। কিন্তু হায়! এত চেষ্টা ও আড়ম্বর স্বত্ত্বেও রুষিয়ার দগ্ধাদৃষ্টে পুনরায় দারুণ পরাজয় ঘটিল, জগতে পুনরায় অধর্ম্মের পরাজয় ও ধর্ম্মের জয় বিঘােষিত হইল।

    জাপান ও কোরিয়া প্রায়দ্বীপের মধ্যে কোরিয়া প্রণালী অবস্থিত। গত ১৯০৫ অব্দের ২৭ মে শনিবার তারিখে রুষ নৌ-বাহিনী চারিভাগে বিভক্ত হইয়া এই প্রণালীতে প্রবিষ্ট হইবামাত্র জাপানী নৌ-বাহিনী কর্ত্তৃক আক্রান্ত হয়। শনিবার প্রাতঃকাল হইতে আরম্ভ হইয়া সােমবার প্রাতঃকাল পর্যন্ত যুদ্ধ হইয়াছিল। প্রথম দ্বাদশ ঘণ্টার মধ্যেই রুষবাহিনী বিধ্বস্ত হইয়া ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে আরম্ভ করে। পরে নৈশযুদ্ধে জাপানের টর্পেডাের আঘাতে তাহাদের শােচনীয় সর্ব্বনাশ সাধিত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ সম্পূর্ণ পরাস্থ না হইয়াছিল, ততক্ষণ জাপানী সৈন্যেরা বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রকাশ করে নাই।

    এই কালসমরে রূষপক্ষের রিয়াজসুভায়ফ, আলেকজেণ্ডার, বেরিডিনো, ডিমিট্রি, নাচিমহফ্, ভ্যালাডিমির, মনােমাক, জামযুগ, উষাহফ্,অসলিয়া, নাভারিণ, আলমাজ প্রভৃতি রণপােতগুলি কোরিয়া প্রণালীস্থিত সুসীমা দ্বীপের নিকটে জলমগ্ন হয়। নিকোলাস, ওরেল, আপ্রাকসিন, সেনিয়াভিন ও চিভােডি এই পাঁচখানি রণতরি বিজয়ী জাপানিদিগের হস্তগত হয়।

    এই সমস্ত রণতরিগুলির মূল্য বিংশতি কোটী টাকার ন্যূন হইবে না।

    এই মহাযুদ্ধে জাপানীপক্ষের তিনখানি টর্পেডো তরণী বিনষ্ট ও ৪০০ লােক হতাহত হয়। এইরূপ প্রকাশ যে যুদ্ধ পরিচালন কালে সেনাপতি টেগো ও এডমিরাল যিশু সামান্য আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

    এই যুদ্ধে ৫৫০০ শত রুষসেনার সহিত প্রধান সেনাপতি রােজডেজভেনস্কি, নেবােগেটফ্, ফোকর্সাম ও বোট্রোভােস্কি জাপানের বন্দী হন।

    অতিদর্পে লঙ্কেশ্বর রাবণ বিনষ্ট হইয়াছিলেন, অতিশয় অভিমানে কুরুপতি দুর্য্যোধনের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল, আর অতিলােভে রুষ সম্রাট নিকোলাস হতমান, নষ্টগৌরব ও ভগ্নমনোরথ হইলেন। অর্দ্ধ ইউরােপ ও অর্দ্ধ এসিয়া যাঁহার পদানত এই যুদ্ধ ফলে সেই রুষসম্রাটকে জাপানের ইচ্ছানুসারে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিতে হইল। ধনবল, বাহুবল, লােকবলের অপেক্ষা যে ধর্ম্মবল কত শ্রেষ্ঠ তাহা তিনি জানিতেন না। অর্দ্ধ পৃথিবীর অপ্রিয় অধীশ্বরের অপেক্ষা ক্ষুদ্রদ্বীপের প্রিয় সম্রাট যে কত শক্তিশালী, জার মহােদয় এই যুদ্ধে তাহা সম্যক্‌ হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইয়াছেন।

    জাপানের এই অশ্রুতপূর্ব্ব জয়লাভে আজ আমরা আনন্দিত; কোন্ প্রাচ্যজাতি প্রাচ্যজাতির জয়লাভে আনন্দ ও গর্ব্ব অনুভব না করিবে? জাপান গত মহাযুদ্ধে পাশ্চাত্য মােহ-জাল ছিন্ন করিয়া প্রাচ্যজগতের মুখােজ্জ্বল করিয়াছে। সেই জন্যই আমাদের আনন্দ। কিন্তু প্রবল প্রতাপ রুষ সম্রাটের অবস্থা স্মৃতিপথে উদিত হইলে আমরা দুঃখে ম্রিয়মাণ হই। ভারতবর্ষের ভীষণ দুর্ভিক্ষের সময়ে রুষিয়া নানাপ্রকারে আমাদিগকে সাহায্য করিয়াছিল, সুতরাং আমরা রুষিয়ার নিকটও কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ। রুষ সম্রাট নিকোলাস আমাদের ভারত সম্রাট সপ্তম এডোয়ার্ডের নিকট আত্মীয়, সেজন্যও আমরা তাঁহার বিপদে দুঃখিত। কিন্তু তিনি যদি আমাদিগকে বিপদকালে সাহায্য না করিতেন, অথবা তিনি আমাদের রাজরাজেশ্বরের আত্মীয় না হইতেন, তথাপি আমরা তাঁহার এই দুর্দ্দশায় দুঃখিত হইতাম। প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাটকে, ধুল্যবলুণ্ঠিত দেখিলে কাহার হৃদয়ে বিষাদের ছায়া পতিত না হয়? প্রবল ভূমিকম্পে গগণস্পর্শী অট্টালিকা ভূমিশায়ী হইলে কে তাহা অবিচলিত চিত্তে দর্শন করিতে পারে?

    ****

    গত রুষজাপান যুদ্ধে যে সমস্ত খ্যাতনামা রুষ সেনাপতিগণের দারুণ ভাগ্যবিপর্যয় ঘটিয়াছিল, নিম্নে তাঁহাদের একটী তালিকা প্রদান করা হইল।

    স্থল সেনাপতি।

    (জেনারল উপাধিধারী যে ২৮ জন যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন)

    1. ষ্টোশেল … বন্দী
    2. গ্রিপেনবার্গ অপমানিত হইয়া প্রত্যাবর্ত্তন।
    3. আরলফ্‌ ঐ
    4. ট্রুসক্‌ ঐ
    5. কেলার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত।
    6. কোণ্ড্রোচেনকো ঐ
    7. জারপিটসি ঐ
    8. রিয়ালিনকিন ঐ
    9. স্নোলেনস্কি ঐ
    10. রটকোভোস্কি নিহত
    11. স্মারনফ্ বন্দী
    12. রেচ টালিনিষ্কি ঐ
    13. প্লাগ ঐ
    14. বিলি ঐ
    15. গোরবাটকোভোস্কি ঐ
    16. নিকিটিন ঐ
    17. ফক বন্দী
    18. ক্রোণ্ডাভিচ সাংঘাতিক আহত।
    19. কাসাটালিনিস্কী আহত।
    20. সাসুলিচ পদানত।
    21. স্কাকেলবার্গ আহত।
    22. রেনেন ক্যাম্প ঐ
    23. মিচচেন্‌কো ঐ
    24. কুরোপাটকিন্‌ পদাবনত।
    25. বিলডারিং ঐ
    26. লিনিভিচ্ উন্নতিলাভ করিয়া যুদ্ধ শেষ পর্য্যন্ত ছিলেন।
    27. কাবলারস্ যুদ্ধ শেষ পর্য্যন্ত স্বপদে ছিলেন।
    28. সাকারফ্ ঐ

    জল সেনাপতি

    (এডমিরাল উপাধিধারী যে ১৬ জন যুদ্ধে নিযুক্ত হন)

    1. এলেকসিফ অপমানিত হইয়া প্রত্যাবর্ত্তন।
    2. ষ্টার্ক ঐ
    3. স্ক্রাইডলফ্ ঐ
    4. বেজোব্রাজফ ঐ
    5. উখ্‌টোমস্কি বন্দী
    6. উইরেণ ঐ
    7. লচচিনিস্কি ঐ
    8. গ্রিগোরিভিচ ঐ
    9. রোজডেজভেস্কি বন্দী
    10. ফোকেরশাম ঐ
    11. বোট্রোভোস্কি ঐ
    12. ম্যাকারফ্‌ নিহত।
    13. নেবোগেটফ্ ঐ
    14. মোলাস্ ঐ
    15. উইটগেট্ ঐ
    16. জেসুরু যুদ্ধ শেষ পর্য্যন্ত ভ্যালিডিভোষ্টকে ছিলেন।

    রুষ জাপান সন্ধি।

    বাল্টিক নৌ-বাহিনীর শােচনীয় পরিণাম সন্দর্শন করিয়া আমেরিকার যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেণ্ট রুজভেল্ট মহােদয় ১৯০৫ অব্দের ৯ই জুন তারিখে যুযুৎসু জাতিদ্বয়ের নিকটে সন্ধির প্রস্তাব করেন। তদনুসারে রুষপক্ষে কাউণ্ট ডি-উইটী ও জাপান পক্ষে ব্যারণ কমুরা সন্ধিদূত নিযুক্ত হইয়া, আমেরিকার পাের্টসমাউথ নগরে গমন করেন। ১০ই আগষ্ট তারিখে সন্ধির প্রথম অধিবেশন হয়। প্রায় এক মাসকালব্যাপী প্রবল তর্ক বিতর্কের পরে ৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে উভয় পক্ষ সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিয়া, বিংশশতাব্দীর প্রথম যুদ্ধের অবসান করেন।

    নিম্নে সন্ধির যাবতীয় স্বত্ত্বগুলি ধারাবাহিকরূপে সঙ্কলিত হইল।

    1. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণজন্য জাপান গভর্ণমেণ্ট রুষিয়ার নিকটে অর্থরূপে কিছু গ্রহণ করিবেন না। যে সমস্ত রুষ সৈন্য বন্দী হইয়া জাপানে অবস্থিতি করিতেছে, তাহাদের জন্য যে টাকা ব্যয় হইয়াছে, জাপান তাহা প্রাপ্ত হইবেন।
    2. রুষাধিকৃত সাগেলিয়ন দ্বীপ সমান দুই অংশে বিভক্ত করিয়া, তাহার দক্ষিণার্দ্ধ জাপান গ্রহণ করিবেন। এই অর্দ্ধাংশে জাপান গভর্ণমেণ্ট স্থায়ীভাবে কোন দুর্গাদি নির্ম্মাণ করিবেন না। যেশাে ও সাগেলিয়ান দ্বীপের মধ্যবর্তী লাপিরুজ প্রণালী জাপানের অধিকার ভুক্ত হইবে।
    3. লিয়াওটাং উপদ্বীপ, দুর্গাদিসহ আর্থার বন্দর ও ইলিয়ট দ্বীপপুঞ্জ জাপান গভর্ণমেণ্ট প্রাপ্ত হইবেন।
    4. যুযুৎসু জাতিদ্বয় নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানচুরিয়া পরিত্যাগ করিবেন।
    5. স্বরাজ্যে চীন গভর্ণমেণ্টের একাধিপত্য স্থাপিত হইবে।
    6. চীনরাজ্যে সমস্ত বৈদেশিক শক্তির সমান বাণিজ্যাধিকার থাকিবে।
    7. হার্ব্বিন হইতে আর্থার বন্দর পর্যন্ত রুষিয়ার রেলপথ জাপান গভর্ণমেণ্ট প্রাপ্ত হইবেন। ভ্যালাডিভােষ্টক রেলপথ রুষিয়ার অধিকারে থাকিবে।
    8. কোরিয়া রাজ্যের সমস্ত বিভাগে জাপানের অক্ষুণ্ণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবে।
    9. রুষাধিকৃত ভ্যালাডিভােষ্টক হইতে বেরিং প্রণালী পর্য্যন্ত সাইবেরিয়া প্রদেশের উপকূলে জাপানীরা মৎস্য ধরিবার অধিকার প্রাপ্ত হইবে।
    10. রুষিয়ার যে সমস্ত যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাহাজ জাপান গভর্ণমেণ্ট ধৃত করিয়াছেন এবং যাহা সমুদ্রে নিমগ্ন রহিয়াছে, সে সমস্ত জাপান প্রাপ্ত হইবেন।
    11. রুষিয়ার যে সমস্ত যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাহাজ নিরপেক্ষ বন্দরে আত্মসমর্পণ করিয়াছে, সে সমস্ত রুষ গভর্ণমেণ্ট প্রাপ্ত হইবেন।

    উপরােক্ত সন্ধিপত্রের স্থূলমর্ম্ম প্রকাশ হইবার অব্যবহিত পরেই সমগ্র সভ্যজগৎব্যাপিয়া মহা হুলস্থূল পড়িয়া গিয়াছিল। “টাইমস” বলিয়াছিলেন, “জাপানীরা এই সন্ধিতে স্বীকৃত হইয়া যে ঔদার্য্য, মহানুভবতা ও আত্মসংযমতার পরিচয় প্রদান করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখন পরিদৃষ্ট হয় নাই।” “মণিং পােষ্টের” মতে “এই মহা ত্যাগস্বীকারে জাপানের বিজয়গৌরব শতগুণে বর্দ্ধিত হইয়াছে।” “গ্রাফিক” বলিয়াছিলেন, “খৃষ্টীয় রাজন্যবর্গের কেহই এরূপ মহত্ব ও উদারতা দেখাইতে পারেন না।” “ডেলীমেল” লিখিয়াছিলেন, “যুদ্ধকৌশলে জাপানীরা শ্রেষ্ঠ হইলেও কুটরাজনীতিতে রুষিয়ার সমকক্ষ নহে।” “ষ্টাণ্ডার্ডে” প্রকাশ, রুষ গভর্ণমেণ্ট গােপনে জাপানের ক্ষতিপুরণ করিয়াছেন, কেবল জারের বিশেষ অনুরােধে সন্ধিপত্রে ইহা পরিত্যক্ত হইয়াছে।

    জাপানী পত্র সম্পাদকেরা বলিয়াছিলেন, জাপানের জয়ের তুলনায় বর্ত্তমান সন্ধি কিছুই নহে।

    আমেরিকা, জারমানি ও প্যারিসের পত্র সম্পাদকেরা একবাক্যে জাপানের মহানুভবতা ও রুষ মন্ত্রিগণের কূটরাজনীতিজ্ঞতার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন।

    রুষপত্র “নভােভ্রিমিয়া” বলিয়াছিলেন, “বর্ত্তমান সন্ধি রুষিয়ার অদৃষ্টে দারুণ বিপদ আনয়ন করিবে।” রুষিয়ার “সুয়েট” লিখিয়াছিলেন, “সাগেলিয়ান দ্বীপের অর্দ্ধাংশ পরিত্যাগের তুলনায় জাপানের ত্যাগস্বীকার কোনক্রমেই গণনীয় হইতে পারে না।” “রাস্” পত্রে প্রকাশ “বর্ত্তমান সন্ধিতে শত্রুপক্ষেরই স্বার্থ অধিক পরিমাণে সংরক্ষিত হইয়াছে।” “নভােস্তীতে” প্রকাশ “এই সন্ধিতে রুষিয়ার পূর্ব্বগৌরব সম্পূর্ণ বিনষ্ট হইয়াছে।”

    রুষ জাপান যুদ্ধের সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইবার অল্পদিবস পূর্ব্বে (১৯০৫, ১২ই আগষ্ট) ইংরেজ ও জাপানের সহিত একটী চুক্তি হইয়া গিয়াছে। তাহাতে উভয়শক্তি উভয়েরই বিপদে সাহায্য করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছেন। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হইবার তারিখ হইতে দশ বৎসরের জন্য এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

    সম্পূর্ণ।

  • জাপানের নানাকথা।

    জাপানের নানাকথা।

    মুদ্রা বিভাগ।

    ১০ রিন—১ ছেন, ১০০ ছেন—১ ইয়েন। “ইয়েন” রৌপ্য মুদ্রা, ইহা ইংরেজী ২ শিলিং ·৫৮২০৭৫ পেন্সের সমান, আমাদের প্রায় ১॥৹ টাকা হইবে। “ছেন” তাম্রমুদ্রা, আমাদের এক পয়সার সমান। “রিন” দুই কড়ার তুল্য হইবে।

    ওজন প্রণালী।

    ৬ কিন—১ কোয়ান, ১৭ কোয়ান—১ পাইকল। ৪ পাইকল—১ কোকু (তরল), ১ কোকু—৪০ গ্যালন। ১ কিন ইংরেজী ·১০৩২ পাইণ্ট, আমাদের প্রায় অর্ধসের হইবে।

    জমি মাপিবার প্রণালী।

    ৬ সাকু—১ কেন, ৬০ কেন—১ চো, ৩৬ চো—১ রাই।

    ইংরেজী ·৯৯৪ ফিটে ১ মাকু হইয়া থাকে। ১ চো প্রায় ২৩৫ হস্তের সমান। এক রাই ইংরেজী দুই মাইলের উপর। অর্থাৎ আমাদের এক ক্রোশের কিছু কম হইবে।

    ডাক বিভাগ।

    ১৮৭১ খৃঃ মার্চ্চমাসে জাপানে ইয়ুরােপীয় প্রথায় ডাকঘর স্থাপিত হয়। এই বৎসরেই ডাক-আইন ও টিকিট প্রকাশিত হয়। ১৮৭৫ খৃঃ সেভিং ব্যাঙ্কের প্রথা প্রবর্ত্তিত হয়। ১৮৮৫ অব্দে রিপ্লাই কার্ডের প্রচলন হয়। এক্ষণে জাপানে একটী জেনারেল পােষ্টাফিস ৫০০০টী ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর পােষ্টাফিস ও ১৮০০টী টেলিগ্রাফ আফিস আছে। গত পূর্ব্ববর্ষে ডাক বিভাগীয় উচ্চ কর্ম্মচারির সংখ্যা ৩০০ শত, মধ্য কর্ম্মচারির সংখ্যা ১৮০০০ হাজার ও অধস্তন কর্ম্মচারির সংখ্যা ৬৬০০০ হাজার ছিল। এই বৎসরে সমগ্র রাজ্যে ৩৫ কোটী পোষ্টকার্ড ও ১৫ কোটী পত্র ব্যবহৃত হইয়াছিল। ডাক বিভাগে যত টাকা আয় হইয়া থাকে, তাহার শতকরা ৬৮ ভাগ এই বিভাগে ব্যয় নির্দ্দিষ্ট আছে। জাপানে॥৹ আউন্স ওজনের পত্রে ও ২॥ আউন্স ওজনের সংবাদ পত্রে, যথাক্রমে ৩ ছেন ও॥৹ ছেন মাশুল লাগিয়া থাকে। পােষ্টকার্ড ও রিপ্লাই কার্ডের মূল্য যথাক্রমে ১॥ ছেন ও ৩ ছেন মাত্র। বুক প্যাকেট ও নমুনা ডাকের প্রতি ৩৸ আউন্সে ২ ছেন মাশুল দিতে হয়। রেজিষ্ট্রীর জন্য ৭ ছেন ব্যয় হইয়া থাকে। পত্রাদি ব্যারিং হইলে ডবল মাশুল দিতে হয়। জাপানে ১০ ইয়েন মণিঅর্ডার করিতে হইলে ৬ ছেন কমিশন দিতে হয়। টেলিগ্রাফে প্রতি ১৫ কথায় ২০ ছেন ব্যয় হয়।

    জাপানের রেলপথ।

    জাপানের সর্ব্বপ্রথম রেলপথ ১৮৭২ খৃঃ ১২ই এপ্রেল তারিখে উদ্ঘাটিত হয়। ১৮৭৭ খৃঃ ৬৫ মাইল পথ প্রস্তুত হয়। জাপানের উন্নতিসহকারে রেলপথ ক্রমেই বৃদ্ধি হইয়া বর্ত্তমান সময়ে ৫০০০ মাইলে পরিণত হইয়াছে। পূর্ব্বে গভর্ণমেণ্টের খাসে দুইটী ও ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর হস্তে ৪১টি রেলপথ ছিল। সম্প্রতি সমস্তই গভর্ণমেণ্টের অধীনে আসিয়াছে। জাপানে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর গাড়ী আছে। ভাড়ার অনুপাত যথাক্রমে ৩ঃ ১′৭৫ঃ ও ১ঃ। দ্বাদশ বর্ষের ন্যূনবয়স্কদিগকে অর্দ্ধ ভাড়া দিতে হয়। চারি বৎসরের কম হইলে কিছুই দিতে হয় না। রিটর্ণ টিকিটে পূর্ণ ভাড়ার শতকরা ২% বাদ পাওয়া যায়। প্রথম শ্রেণীর টিকিটে ১০০ কিন, দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিটে ৬০ কিন ও তৃতীয় শ্রেণীর টিকিটে ৩০ কিন ওজনের ভাড়া লাগে না। যাত্রীদিগকে নিজের সাইকেলের জন্য ভাড়া দিতে হয় না। জাপানি ট্রেণের ১ম ও ২য় শ্রেণীতে একজন করিয়া ভৃত্য অবস্থিতি করে।

    জাপান পৃথিবীর নন্দনকানন বলিয়া প্রসিদ্ধ। এইজন্য প্রাচীন ভারতীয়েরা এই দ্বীপের নাম সুদর্শন রাখিয়াছিলেন। জীবন সার্থক ও নয়ন পরিতৃপ্ত করিবার অনেক দৃশ্য এখানে দেখিতে পাওয়া যায়। ইয়াকোহামা বন্দর, হাকোন পর্ব্বতের আশাহৃদ, ফুজিসামা শৃঙ্গ, সীতা পর্ব্বতের রেলপথ, তেনারুনদীর লৌহসেতু, হামানা হৃদ, নাগােয়ার স্বর্ণভবন, ইয়ােরো জলপ্রপাত ইরামানাকা উষ্ণপ্রস্রবণ, কেনরোকু পার্ক, কিয়াটোর বংশকুঞ্জ, মিনাটোগোয়ার তীর্থ প্রভৃতি ভ্রমণকারীমাত্রেরই দ্রষ্টব্য।

    ****

    কলিকাতা হইতে প্রতি সপ্তাহেই আপকার কোম্পানীর অথবা ইন্দোচায়না কোম্পানির ডাক জাহাজ হংকং দ্বীপে গমন করিয়া থাকে। হংকং হইতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ডাক জাহাজে জাপানে গমন করা যায়। কলিকাতা হইতে হংকং, প্রথম শ্রেণীর ভাড়া ২৫০৲, দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়া ২০০৲, ডেকের ভাড়া ৪৫৲ টাকা। হংকং হইতে ইয়াকোহামা, ১ম শ্রেণী ২২৭ ৷৹, জাহাজের সম্মুখবর্ত্তী কামরা ৯৮৲ এবং ডেকের ভাড়া ৩৫৲ টাকা মাত্র। ইহা ভিন্ন প্রায় এক মাসের আহারাদি আছে। কলিকাতা, ৯ নং ওলড কোর্ট হাউস স্ট্রীটে টমাস কুক এণ্ড সনের কার্য্যালয়ে টিকিট প্রভৃতি পাওয়া যায়। বােম্বাই বন্দর হইতে ও হংকং হইয়া “প্যাসিফিক মেলে” জাপানে গমন করিতে পারা যায়।1

    জাপানীরা যে প্রণালী অবলম্বন করিয়া দৈহিক বলবীর্য্য বৃদ্ধি করে, তাহার নাম “জিউ জুৎসু”। জাপানিভাষায় ইহার অর্থ পেশী বিনষ্টকরা, কিন্তু ইহার দ্বারা পেশী সমূহের পুষ্টিসাধন হয়। অতি দুর্ব্বল ও ক্ষীণকায় ব্যক্তিও ইহার অনুশীলন করিয়া বিপুল বলশালী হইতে পারে। জাপানের সৈনিক ও নাবিকদিগকে এই বিদ্যা শিক্ষা করিতে হয়। ইহাতে সর্ব্বপ্রথমে আহারের প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হয়, পরে ফুস্‌ফুস্ ও হৃৎপিণ্ডের উন্নতিসাধন করিতে হয়। শিক্ষার্থীদিগকে অস্থিবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যা আলােচনা করিতে হয় এবং যােগীর ন্যায় সংযত ও শুদ্ধাচারী হইয়া বাস করিতে হয়। চারি বৎসর বিশেষ ধৈর্য্য সহকারে শিক্ষা না করিলে, এই বিদ্যায় সিদ্ধ হওয়া যায় না।2

    ****

    জাপানে “হারা-কিরি” অর্থাৎ আত্মহত্যা অত্যন্ত প্রবল। জাপানীরা অতি সামান্য কারণেই নিজের জীবন বিনষ্ট করিয়া ফেলে। তাহাদের বিশ্বাস আত্মহত্যায় ইহকালে যশঃ ও পরকালে স্বর্গলাভ হইয়া থাকে। জাপানের প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রে লিখিত আছে যে, মানবমাত্রেরই আত্মজীবন রক্ষা ও বিনষ্ট করিবার অধিকার আছে। বর্ত্তমান রাজবিধানে “হারা-কিরি” গুরুতর অপরাধ বলিয়া উক্ত হইয়াছে।

    জাপানের শিমোজ বারুদ পৃথিবীমধ্যে বিখ্যাত। জাপানী অধ্যাপক শিমোজ দীর্ঘকালব্যাপী পরিশ্রম ও পরীক্ষার পরে ইহা প্রস্তুত করেন। তাঁহারই নামানুসারে ইহার নাম শিমােজ বারুদ হইয়াছে। এরূপ অসাধারণ বিস্ফোটন-শক্তিসম্পন্ন বারুদ পৃথিবীর কোন বৈজ্ঞানিক এ পর্য্যন্ত আবিষ্কার করিতে পারেন নাই।

    জাপানী অধ্যাপক ওমােরি ভূমিকম্পের গতি ও স্থিতি পরিমাপক যে যন্ত্র প্রস্তুত করিয়াছেন, তাহা পাশ্চাত্য পণ্ডিত মিল্নির যন্ত্রাপেক্ষা বহুপরিমাণে কার্য্যকরী হইয়াছে। সম্প্রতি এই যন্ত্রের সাহায্যে সিমলাশৈল হইতে ২০০০ মাইল দূরবর্ত্তী স্থানের ভূমিকম্প অবগত হওয়া গিয়াছে।

    ১৮৯৪ অব্দের ২৯শে জুন তারিখে জাপানী অধ্যাপক কিটা সাটো হংকং দ্বীপে উপস্থিত থাকিয়া প্লেগের বীজাণু আবিষ্কার করেন। এক্ষণে পৃথিবীর সর্ব্বস্থানে কিটাসাটোর মতানুসারেই এই ভয়াবহ ব্যাধির নিদানতত্ব স্থিরীকৃত হইতেছে।

    চিকিৎসাশাস্ত্রে জাপান অনেক উন্নতি সাধন করিয়াছে। সংপ্রতি জাপানের সুবিখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার শিগা আমাশয় রােগের জীবাণু আবিষ্কার করিয়া পাশ্চাত্য জগতের চিকিৎসকগণকে চমৎকৃত করিয়াছেন। ডাক্তার শিগা আমাশয়গ্রস্ত রােগীর শােণিতে ঐ জীবাণু দেখিতে পাইয়াছেন। আর একজন জাপানী চিকিৎসক পশু পক্ষী প্রভৃতি জীবের অন্ত্র হইতে এক প্রকার রস প্রস্তুত করিয়াছেন, ঐ রস মুমূর্ষু রােগীর শরীরে প্রবেশ করাইয়া দিলে সেই মুমূর্ষুর জীবনীশক্তি কিয়ৎকালের জন্য সতেজ হইয়া উঠে।

    “গেইসা” জাপানের নৃত্যকারিণী রমণী। এই অপ্সরানিন্দিত সুন্দরী সঙ্গীতবালিকাগণের নৃত্য দর্শন ও গীত শ্রবণ জন্য জাপানীরা বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়া থাকে। ইহাদিগের কমনীয় মুখশ্রী, বিচিত্র বেশবিন্যাস ও অঙ্গভঙ্গিমা প্রভৃতি দর্শন করিলে বোধ হয়, যেন জগতের চক্ষু পরিতৃপ্ত করিবার জন্য গেইসা সুন্দরীর সৃষ্টি হইয়াছে। গেইসাদিগের চরিত্র দূষিত নহে। ইহারা পিতা, মাতা, ভ্রাতা প্রভৃতি অভিভাবকগণের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে থাকিয়া নৃত্যগীতাদি করিয়া থাকে। উপযুক্ত সময়ে বিবাহ হইলে আর কখনও সাধারণ সমক্ষে বহির্গত হইতে বা গীতাভিনয় করিতে পারে না।

    জাপানিদিগের ভদ্রতা ও নম্রতা শিক্ষা করিবার বিষয়। তাহারা কথায় কথায় ধন্যবাদ ও নমস্কার করিয়া থাকে। গুরুজনকে আমাদের মত জানু অবনত করিয়া প্রণাম করিয়া থাকে। জাপানে মারামারি অথবা ঝগড়া বিবােধ প্রায় দেখা যায় না। জাপানী ভাষায় কুৎসিত গালাগালির প্রতিশব্দ নাই। বিশেষ রাগের কারণ হইলে লােকে “বাকা” অর্থাৎ বােকা বলিয়া গালি দিয়া থাকে। এখানে গৃহাভ্যন্তরে চর্ম্মপাদুকা লইয়া যাওয়া বিশেষ নিষিদ্ধ, এইজন্য অনেকেই বস্ত্রপাদুকা ব্যবহার করে।

    জাপানে “সাতজুমা” অর্থাৎ মল্ল উপাধিধারী একটী প্রসিদ্ধ বংশ আছে। ইহারা কুস্তিগীর পালােয়ান ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তিকে কন্যাদান করা ঘৃণার বিষয় মনে করে। ইহারা পুত্র কন্যার জন্মদিনে একটী বৃক্ষ রােপণ করিয়া থাকে, পরে সন্তানের বিবাহের সময়ে সেই বৃক্ষের কিয়দংশ ছেদন করিয়া কোন একটী গৃহসরঞ্জাম প্রস্তুত করে।

    জাপানের ন্যায় বৈদ্যবহুল দেশ সমগ্র পৃথিবীমধ্যে কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। জাপানি-ভাযায় হাতুড়িয়া বৈদ্যের নাম “কুইসা”; ইহাদের প্রস্তুত গণ্ডার বটিকা, মহিষমিশ্রণ, ছাগারিষ্ট, হংসরস প্রভৃতি ঔষধ, সর্দ্দিজ্বর ও বিবিধ জটিল রোগে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। জাপানী ভৈষজ্যশাস্ত্রে মৃগনাভিকেই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ঔষধ বলা হইয়াছে।

    জাপানে যে সমস্ত গল্প ও উপকথা প্রচলিত আছে, সেই সকলের মধ্যে দুই চারিটী গল্পের সহিত এ দেশীয় কোন কোন উপকথার অপূর্ব্ব ঐক্যতা পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বিহগবিহগীর (ব্যাগমাবেগমী) উপাখ্যান ও সাতভাই চম্পার কথা বলা যাইতে পারে। জাপানী উপকথায় দেব দানবের সহিত মানুষের বিবাহ, ব্যাঘ্র শৃগালাদির মানুষের রূপ ধারণ, শিয়ালভূত, মন্ত্রবলে মৃতদেহে জীবনসঞ্চারণ প্রভৃতি বহু অনৈসর্গিক কথা শ্রুত হওয়া যায়।

    ১৮৯৬ খৃঃ ১লা জুন তারিখে জাপান গভর্ণমেণ্ট যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ চীনের নিকট হইতে ফরমােসা (তৈবান) ও তৎসন্নিহিত ৭৬টী ক্ষুদ্র দ্বীপ গ্রহণ করেন। সেই সময়ে এই দ্বীপের অবস্থা যারপরনাই শােচনীয় ছিল। জাপানের সুশাসনে ফরমোসা এক্ষণে দ্বিতীয় জাপানে পরিণত হইয়াছে। বর্ত্তমান সময়ে এই দ্বীপের লােক সংখ্যা ৩০ লক্ষ ৪০ হাজার হইবে। টেহােকু, ফেলাং, কাগী, হামা প্রভৃতি প্রধান নগরে বহুসংখ্যক বিদ্যালয়, ডাক্তারখানা ও ব্যাঙ্ক প্রভৃতি স্থাপিত আছে। এই দ্বীপে ৫টি রেলপথ আছে, তাহার পরিমাণ ১৫৮ মাইল হইবে। সম্প্রতি ৮২ মাইল প্রস্তুত হইতেছে। এতদ্ভিন্ন ২০০ মাইল পথে ট্রামগাড়ী চলিতেছে। টেলিগ্রাফের দৈর্ঘ্য ২০০০ মাইল হইবে। সমগ্র দ্বীপে ১০৯টী ডাকঘর আছে। এখান হইতে প্রচুর পরিমাণে আফিং, লবণ, কর্পূর, চিনি, চাউল, কাচ, কাগজ ও কয়লা পৃথিবীর নানাস্থানে রপ্তানি হইয়া থাকে। ইহার মধ্যে প্রথম দ্রব্য তিনটীতে গভর্ণমেণ্টের একচেটিয়া আছে। এখানেও জাপানের ন্যায় ডাক্তারের বিনানুমতিতে অহিফেন সেবন করিলে দণ্ডনীয় হইতে হয়।

    বর্ত্তমান বর্ষে জাপান গভর্ণমেণ্ট ফরাষীর নিকট হইতে আলাস্কার নিকটবর্তী সেণ্ট পিরি ও অপর একটি ক্ষুদ্রদ্বীপ ক্রয় করিয়া লইয়াছেন। ইহাতে আমেরিকায় জাপানের প্রথম অধিকার স্থাপিত হইল। এইরূপ জনরব যে, ফিলিপাইন ক্রয় সম্বন্ধে মার্কিন রাজ্যের সহিত জাপানীদিগের কথাবার্ত্তা হইতেছিল, কিন্তু উভয় রাজ্যের সহিত গুরুতর মনোমালিন্য ঘটায় সে প্রস্তাব স্থগিত রহিয়াছে।

  • জাপানের সমর বল।

    জাপানের সমর বল।

    স্থলবল।

    ১৮৮৩ অব্দে জাপানের সৈন্যসংখ্যা সর্ব্বপ্রকারে এক লক্ষের ন্যূন ছিল। গত চীন-জাপান যুদ্ধের পর হইতে সৈন্যসংখ্যা অধিক পরিমাণে বর্দ্ধিত হইয়াছে। এক্ষণে জাপানে যুদ্ধের জন্য সর্ব্বদাই ৬ লক্ষ সৈন্য প্রস্তুত থাকে। তন্মধ্যে কর্ম্মচারীর সংখ্যা ২০০০০ হাজার, পদাতিক ৫ লক্ষ এবং অশ্বারোহী ও গােলন্দাজ সৈন্যের সংখ্যা এক লক্ষ হইবে। ইঞ্জিনিয়ারিং, টেলিগ্রাফ, বেলুন, রসদ ও গুপ্তচর বিভাগের লােক সংখ্যাও এক লক্ষের অধিক হইবে। এতদ্ভিন্ন ক্ষুদ্র বৃহৎ ২৫০০ কামান আছে।

    সম্রাটই জাপানের সর্ব্বপ্রধান সেনাপতি। তাঁহার আদেশ ব্যতীত কোন সৈন্যদল পরিচালিত হইতে পারে না।

    সম্রাটের নিম্নেই যুদ্ধমন্ত্রীর পদ নির্দ্দিষ্ট আছে। তিনি তাঁহার অধীন কর্ম্মচারিগণের সহিত পরামর্শ করিয়া যুদ্ধবিভাগের যাবতীয় কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া থাকেন।

    এক্ষণে সমগ্র জাপান সাম্রাজ্য তিন প্রেসিডেন্সিতে বিভক্ত। প্রতি প্রেসিডেন্সিতে চারিটী করিয়া ডিভিসন আছে। ৮টী রেজিমেণ্ট লইয়া প্রতি ডিভিসন গঠিত হইয়াছে।

    সৈনিকগণের শিক্ষারজন্য জাপানে ১৪টী কলেজ ও স্কুল আছে। অশ্ববিভাগের কার্য্য পরিচালনার্থ টোকিও নগরে একটী কার্য্যালয় আছে। দেশের নানাস্থানে তাহার সাতটী শাখা আছে। অশ্বসমূহের জন্য রাজ্যমধ্যে সাড়ে চারি লক্ষ বিঘা জমি পতিত আছে। টোকিও ও ওসাকা নগরে কামান, গােলাগুলি ও অস্ত্রাদির কারখানা আছে। মেজারু, ইটাবাস ও আইওনা নগরে বারুদের গুদাম আছে।

    জাপানের পদাতিক সৈন্য জর্ম্মন আদর্শে গঠিত। এই বিভাগে কোন বিদেশীয় জাতির প্রবেশাধিকার নাই।

    জাতীয় বিপত্তি উপস্থিত হইলে, জাপানের সৈন্য-সংখ্যা আরও বর্দ্ধিত হইতে পারে। রাজাজ্ঞানুসারে জাপানবাসী সমর্থ পুরুষ মাত্রেই অস্ত্রধারণ করিতে বাধ্য। সমগ্র জাপান-সাম্রাজ্যে এক্ষণে উক্তরূপ যুবকের সংখ্যা ৮০ লক্ষের অধিক হইবে। তন্মধ্যে ২০ লক্ষ যুবক যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করিয়া অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন। প্রয়ােজন হইলে স্বদেশের গৌরব রক্ষার জন্য তাঁহারা এই মুহুর্ত্তেই সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হইতে পারেন।

    জাপান গবর্ণমেণ্ট এক্ষণে সেনা-বিভাগ সম্বন্ধে যে ব্যবস্থা করিয়াছেন, তাহার ফলে তাঁহারা ভবিষ্যতে সমরক্ষেত্রে সাড়ে সাত লক্ষ সৈন্য প্রেরণ করিতে সমর্থ হইবেন। জাপানী গবর্ণমেণ্ট মাঞ্চুরিয়া ও কোরিয়ার সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করিতেছেন। যেরূপ ব্যবস্থা হইয়াছে, তাহাতে জাপানস্থিত সৈন্যের সংখ্যা শতকরা ৫০ জন হিসাবে বৃদ্ধি হইবে। জাপানের মন্ত্রিসভায় সে দিন জাপানী সমরসচিব স্পষ্টই বলিয়াছেন, জাপানী বাহিনীকে তাঁহারা এমন দুর্দ্ধর্ষ করিয়া তুলিবেন যে, কোন শক্তিই তাঁহাদিগের সহিত সহসা শক্তি পরীক্ষায় সাহসী হইবেন না। জাপানীরা অচিরেই পৃথিবীতে অজেয় শক্তিরূপে পরিণত হইবে প্রাচ্য দেশসমূহের পক্ষে ইহা সুসংবাদ, সন্দেহ নাই।

    জাপান গভর্ণমেণ্টকে প্রচুর সৈন্য পরিপােষণ করিতে হইলেও বৎসরে ছয় কোটী টাকার অধিক ব্যয় করিতে হয় না। জাপানে প্রতি পদাতিক সৈন্য ও অশ্বারােহী সৈন্যের বার্ষিক বেতন যথাক্রমে ৪৫৲ ও ৬০৲ টাকা মাত্র। কর্ণেল, কাপ্তেন প্রভৃতি সেনানায়কেরা বৎসরে দেড় শত হইতে দুই শত টাকা বেতন পাইয়া থাকেন। প্রধান সেনাপতিগণের বার্ষিক বেতন ৫০০৲ হইতে ৭৫০৲ টাকার অধিক নহে। সৈন্যবিভাগীয় কুলিগণের প্রত্যেক ব্যক্তি খাদ্য ও দৈনিক ৴১০ হিসাবে মাহিনা পাইয়া থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদিগকে প্রত্যহ তিনবার করিয়া খাদ্য প্রদান করা হইয়া থাকে। প্রত্যুষে চা, বিষ্কুট, মাছভাজা ও শুষ্কান্ন; মধ্যাহ্নে ভাত, শুস্কমৎস্য ও মাংস, এবং সায়াহ্ণে চা, বার্লি, পাঁওরুটী ও পায়ষ ব্যবস্থা। চিকিৎসকের আদেশানুসারে এই ব্যবস্থা পরিবর্ত্তিত হইয়া থাকে।

    নৌবল।

    জাপানবাসীরা গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে জলযুদ্ধ বিষয়েও অসামান্য উন্নতি লাভ করিয়াছে। জাপানীরা বুঝিয়াছে, দ্বীপবাসীর পক্ষে প্রবল নৌ-বল ভিন্ন আত্মরক্ষার সুবিধা হইতে পারে না। ইংরেজ নৌ-সেনাপতি ফিট্জিরাল্ড স্পষ্টাক্ষরে বলিয়াছেন;—In some matters they appears to have improved upon the methods of their instructor.

    অর্থাৎ জাপানীরা স্বীয় প্রতিভাবলে, কোন কোন বিষয়ে ইংরেজাপেক্ষাও নৌ-যুদ্ধের অধিকতর উন্নতি সাধন করিরাছে। পরপৃষ্ঠায় জাপানের বর্ত্তমান নৌ-বলের তালিকা প্রকাশ করা যাইতেছে।

    যুদ্ধজাহাজ (Battle Ship)।

    নাম। যতটন। অশ্ব-শক্তি। বেগ। কামান। মন্তব্য।
    ১। মিকাণা ১৫৩৫০ ১৬২০৩ ১৮ মাইল ৫০ অগ্নি লাগিয়া নষ্ট হওয়ায় মেরামত হইয়াছে।
    ২। সিকিসামা ১৫০৮৮ ১৪৭০০ ১৮ ,, ৫০
    ৩। য়্যাসাহী ১৫৪৪৫ ১৫৪৪৫ ১৮ ,, ৫০
    ৪। ফুজি ১২৩২০ ১৪০০০ ১৮১/২ ,, ৩৮
    ৫। হিজেন ১২০০০ ১৬০০০ ১৭ ,, রুষিয়ার “রেটভিসান”
    ৬। ইকি ৯৬৭২ ৮০০০ ১৬ ,,    ,,      “নিকোলাস”
    ৭। একাই নির্ম্মিত হইতেছে।
    ৮। সাতজুমা ১৯০২০ পৃথিবীমধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সম্প্রতি নির্ম্মিত হইয়াছে।
    ৯। ইয়াসিমা ৯৮৫৫ ১৮২৮৪ ১৮১/২ ,, ৩৮ রুষিয়ার “ওরেল”
    ১০। আইয়োয়ামি ১৩৬০০ ১৬০০০ চীন হইতে প্রাপ্ত
    ১১। চীনইয়েন ৭৭৩৫ ৬২০০ ১৪১/২ ,, ১৮
    ১২। টোগো ১০৩৪০ ১১২৫৫ রুষিয়ার “পোলটাভা”
    ১৩। কাটোরি ১৫৯৪০ ১৬০০০ ১৮ ,, ৫০
    ১৪। সুও ১২৬৭৪ ১৪৫০০ রুষিয়ার “পোভিডা”

    রুষিয়ার “পােভিডা” লৌহমণ্ডিত প্রথম শ্রেণীর রণতরি।
    ( Cruiser ) ।

    নাম। টন। শক্তি। মন্তব্য।
    ১। টোকিওয়া ৯৮৫৫ ১৮২৪৮
    ২। আডজুমা ৩৪৬৫ ১৬০০০
    ৩। আসো ৭৭৩৬ ২৭৪০০ “রুষিয়ার বেয়ান”
    ৪। ক্যাসুগা ৭৬২৮ ১৩৫০০ } দুইখানি ইংলণ্ডে প্রস্তুত, এবং চিলি হইতে ক্রীত।
    ৫। নিশিন ৭৬২৮ ৯৪০০
    ৬। ইকোমা ১৩৫৭০ সম্প্রতি নির্ম্মিত হইয়াছে।
    ৭। ইয়াকুমা ৯০০০ ১৫৫০০
    ৮। আইওয়েট ৯৯০৬ ১৪৭০০

    এতদ্ভিন্ন “কুরুমা” “সুকুকু” নাম্নী দুইখানি তরণী প্রস্তুত হইতেছে।

    লৌহমণ্ডিত রক্ষিত রণতরি।

    ১। একাগী ২। একাসি ৩। একি সুসীমা
    ৪। চিতোজ ৫। হাসিডেট ৬। আজুমা
    ৭। একিনো সীমা (রুষিয়া হইতে প্রাপ্ত) ৮। নানিওয়া ৯। টেকাসেগো
    ১০। কাসাগী ১১। মাৎসুসিমা ১২। সুগারু (রুষিয়ার “পালাভা”)
    ১৩। সুম। ১৪। ইন সুসীমা ১৫। টেকিচিও
    ১৬। নিটাকা ১৭। ইডজুমা ১৮। অকোশী
    ১৯। টেকিওয়া ২০। ইয়েয়ামা ২১। সয় (রূষিয়ার ভেরাগ
    ২২। ওটেয়া

    এতদ্ব্যতীত কামানবাহক তরি ও উপকূল রক্ষক পােতের সংখ্যা ৩০ খানি হইবে।

    জাপানের টর্পেডো তরি ৭৮ খানি ও টর্পেডো নাশক তরণীর সংখ্যা ৫১ খানি হইবে।

    উপরােক্ত প্রভূত শক্তিশালী রণতরি ভিন্ন জাপান সাম্রাজ্যে ৫৫০০ খানি বাণিজ্যপােত আছে। তাহার মধ্যে ১৪০০ খানি কলে ও ৪০০ খানি পাইলে চলিয়া থাকে।

    অধিকাংশ পােতের তলদেশ ও মর্মস্থান লৌহ বা তাম্রমণ্ডিত থাকায় যুদ্ধকার্য্যে ব্যবহৃত হইতে পারে।

    ১৮৬৭ অব্দে জাপানের ৯ খানি মাত্র রণতরি ছিল। ১৮৭২ খৃঃ ২০ খানি হয়। ১৮৯৩ খৃঃ এই সংখ্যা বর্দ্ধিত হইয়া ৩২ খানিতে পরিণত হয়। গত পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে সমগ্র রণতরির সমষ্টি ৫৯ খানি ও কামান সংখ্যা ১১৫৬টী গণিত হইয়াছিল। এই পুস্তকে বর্ত্তমান বৎসরের (১৯০৬ খৃঃ) সংখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে।

    জাপানী নৌ-বিভাগে এডমিরাল, ভাইস এডমিরাল, রিয়ার এডমিরাল, কাপ্তেন, কমাণ্ডার, লেপ্টনেণ্ট, চিফগনার ও বােটস্ওয়েন উপাধিধারী কর্ম্মচারী আছেন। প্রথম তিন শ্রেণীর নৌ-সেনাপতিরা বৎসরে যথাক্রমে নয় হাজার, ছয় হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা বেতন পাইয়া থাকেন। পরবর্ত্তী তিন শ্রেণীর বার্ষিক বেতন যথাক্রমে ২৫৯০৲ ১৮০০৲ ও ১৫০০৲ টাকা নির্দ্দিষ্ট আছে।

  • জাপানের বাণিজ্য।

    জাপানের বাণিজ্য।

    আর্জেণ্টাইন, অস্ত্রিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, ডেন্মার্ক, ফ্রান্স, জারমানি, গ্রেটব্রিটেন, ইটালী, মেক্সিকো, নেদারল্যাণ্ড, পেরু, রুসিয়া, শ্যাম, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যাণ্ড, ইউনাইটেডষ্টেটস প্রভৃতি বৈদেশিক গভর্ণমেণ্টের সহিত জাপানের বাণিজ্য সন্ধি আছে। জাপান হইতে যে সমস্ত দ্রব্যসম্ভার বিদেশ প্রেরিত হইয়া থাকে, তন্মধ্যে চা, চাউল, কর্পূর, কর্পূরতৈল, তামাক, মৎস্য, দিয়াশলাই বিছানা, মােম, রেশম, রেশমীবস্ত্র, পশম, তুলা, বার্নিস, তাম্র, টীন, কয়লা সর্ব্বপ্রধান। চাউল প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য হইলেও সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত বিদেশে প্রেরিত হইতে পারে না; এইজন্য জাপানে দুর্ভিক্ষ নাই। গত ১৯০৩ অব্দে সাড়ে চল্লিশ কোটী টাকার দ্রব্য বিদেশ প্রেরিত হইয়া ছিল। ইহার পূর্ব্ববর্ষে রপ্তানির পরিমাণ ৪০ কোটী টাকা ছিল।

    সূত্র ও রেশমীবস্ত্রাদিবয়নে জাপানীরা পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করিয়াছে। ‘ওসাকা’ বন্দর প্রশান্ত মহাসাগরের ম্যানচেষ্টার রূপে পরিগণিত হইয়াছে। হােয়াইট দ্বীপে কয়লা, কেরাসিন, স্বর্ণ ও রৌপ্যের আকর আছে। জাপানের তাম্রখনি পৃথিবীমধ্যে বিখ্যাত। এক্ষণে সমগ্র জাপান সাম্রাজ্যে ৫৭টী রৌপ্য ১৩৬টী তাম্র-রৌপ্য এবং ৭২টী মিশ্রধাতুর খনি আছে। এই সমস্ত খনি হইতে গত পূর্ব্ব বর্ষে ৯ লক্ষ মণ তাম্র ৬২ হাজার মণ স্বর্ণ, দেড় লক্ষ মণ রৌপ্য, ২৫ কোটী মণ কয়লা উত্তোলিত হইয়াছিল। গতবর্ষে জাপানে যে সুবর্ণখনি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার মূল্য আনুমানিক হিসাবে ৪০০ কোটী স্থির হইয়াছে।

    জাপান সভ্যতার উচ্চতর সােপানে আরােহণ করিয়াও দেশীয় বাণিজ্যের উন্নতি সম্বন্ধে অণুমাত্র উদাসীন হয় নাই। বাষ্পীয় যন্ত্রের প্রবল প্রতিযােগিতা সত্বেও জাপানের প্রতি পল্লীতেই চরকা হইতে সূত্র নির্ম্মাণ ও তাঁতসাহায্যে বস্ত্র বয়ন হইয়া থাকে। জাপানের গৃহে গৃহে হস্তজাত ছুরি, কাঁচি, মৃত্তিকানির্ম্মিত বাসন ও বংশনির্ম্মিত নানাবিধ গৃহসামগ্রী দেখিতে পাওয়া যায়। জাপানী শিল্পীরা কাগজের দ্বার, জানালা, বাঁশের বিছানা, বাক্স, ব্যাগ প্রভৃতি প্রস্তুত বিষয়ে অসামান্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়া থাকে।

    জাপানবাসিরা যে কেবলমাত্র সমরশাস্ত্রে পারদর্শী হইয়াই ইউরােপীয় জাতিগণের সমকক্ষ হইয়াছে, এরূপ নহে। তাহারা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যাদি বিষয়েও অসাধারণ উন্নতিলাভ করিয়াছে। মহাযুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিয়াও, জাপানী কৃষকেরা গত পূর্ব্ববর্ষে ভূমি হইতে ১৪ কোটী মণ চাউল, ৬ কোটী মণ যব, ৪ কোটী মণ বিবিধ তরকারী উৎপন্ন করিয়াছে। সরকারী গণনানুসারে উক্ত বর্ষে ১৩ লক্ষ মণ নীলপত্র, ৮ লক্ষ মণ তামাক ও পৌণে সাতলক্ষ মণ চা উৎপন্ন হইয়াছে।

    টোকিও নগরে কাগজের প্রকাণ্ড কারখানা আছে। তথায় মিৎসুমাতো, কোজো ও গাম্পি নামক বৃক্ষ হইতে কাগজ প্রস্তুত হইয়া থাকে। কাঠে কাগজ হয়, কাগজে গৃহ নির্ম্মিত হয়, কড়ি, বরগা প্রস্তুত হয়, রেল প্রস্তুত হয়, জলের নৌকা হয় এবং চা তৈয়ারির কেটলি প্রস্তুত হয়।

    জাপানের মৎস্যের ব্যবসা অতি বিস্তৃত। এখানে ৯ লক্ষ ঘর জালিক আছে, তাহাদের জনসংখ্যা ৩০ লক্ষ হইবে। ইহারা ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাল, বড়সি এবং বংশনির্ম্মিত যন্ত্রাদির সাহায্যে জাপান, কোরিয়া ও সাইবেরিয়ার উপকূলে বিবিধ প্রকার মৎস্য ধরিয়া থাকে। গত পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে সমগ্র জাপানে সাড়ে চারি লক্ষ নৌকা ও এগার লক্ষ নানাশ্রেণীর জাল ছিল। সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ নৌকার নাম “সাউনসি”, ইহা দৈর্ঘ্যে ৫০ ফিট ও প্রস্থে ১৮ ফিট হইবে।

    গম, চিনি, গজদন্ত, স্বর্ণ, লৌহ, কাচ, চামড়া, ঔষধ, পুস্তক, মানচিত্র, রং, বিবিধ প্রকার তৈল বিদেশ হইতে আমদানি হইয়া থাকে। এই সকল ঐব্যের মধ্যে চীনের গম ও কোরিয়ার সুবর্ণ সমধিক প্রসিদ্ধ। গত পূর্ব্ববর্ষে আমদানীর মূল্য ৩১ কোটী টাকা স্থির হইয়াছিল। জাপানের ডাক, রেল, টেলিগ্রাফ, কাপড়ের কল, সূতার কল, মুদ্রাযন্ত্র প্রভৃতি সমস্ত কল কারখানা দেশের মুলধনে দেশীয় লােক কর্ত্তৃক পরিচালিত হইতেছে। সামান্য সূচ হইতে আরম্ভ করিয়া বিশাল যুদ্ধ-জাহাজ পর্য্যন্ত সমস্তই জাপানে প্রস্তুত হইতেছে। এক্ষণে জাপানে বিবিধ শ্রেণীর ৭৮২৯টী কল কারখানা বিদ্যমান আছে, এই সকলের মধ্যে প্রায় ৩০০০টী বিদ্যুৎ ও বাষ্প বলে ও অবশিষ্টগুলি হস্তকৌশলে পরিচালিত হইতেছে। ইহাদের মূলধন ৬৮, ৮২, ৮৭,০০০ টাকার উপর হইবে। এক্ষণে জাপানে ৬০টী সূতার কলে ২০ লক্ষ টাকু চলিতেছে, কলের তাঁত ৯০০০ হাজার চলিতেছে। সমগ্র কল কারখানায় ৪ লক্ষ মজুরের কার্য্য হইতেছে।

    বাণিজ্যের ক্রমােন্নতি সহকারে একদিকে যেমন দেশের ধনবৃদ্ধি হইতেছে, অন্যদিকে সেইরূপ জীবন-সংগ্রামের কঠোরতা বৃদ্ধি হইয়াছে। আজ কাল দৈনিক মজুরির হার অত্যধিক পরিমাণে বাড়িয়া উঠিয়াছে।

    যে সমস্ত জাপানী সদাগরেরা পৃথিবীর নানাস্থানে ব্যবসা বাণিজ্য করিতেছেন, তন্মধ্যে ফুকিসামা, আমাজেসাকি, লিটসু, নিফন, গােডো, কানাকিম ও ওসাকা কোম্পানি সর্ব্বপ্রধান। ইহাঁদের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় এক কোটী টাকার ন্যূন হইবে না।

    বাণিজ্যাদির সুবিধার জন্য জাপান সাম্রাজ্যে ২৩১৭টী “জিনকো” অর্থাৎ ব্যাঙ্ক আছে। এই সকলের মধ্যে জাপান ব্যাঙ্ক সমধিক প্রসিদ্ধ। ইহার বর্ত্তমান মূলধন মুদ্রা ও নােটসহ ২৫ কোটী টাকা হইবে। এতদ্ব্যতীত ১৮০ টী সাধারণ, ৫০টী কৃষি ও ৪৬৭টী সেভিং ব্যাঙ্ক আছে।

  • জাপান সাম্রাজ্যের গঠনপ্রণালী ও রাজনীতি।

    জাপান সাম্রাজ্যের গঠনপ্রণালী ও রাজনীতি।

    সমগ্র জাপান সাম্রাজ্য ৪৫টী “কেন” অর্থাৎ প্রদেশে বিভক্ত। প্রতি প্রদেশে একজন করিয়া “চো” অর্থাৎ শাসনকর্ত্তা অবস্থিতি করেন। প্রতি গ্রামেই গ্রামবাসিগণ কর্ত্তৃক নির্ব্বাচিত ১২ জন প্রধান ব্যক্তি লইয়া এক একটী গ্রাম্যসমিতি আছে। প্রতি গ্রামেই এক জন করিয়া পােলিস অবস্থান করে।

    সম্রাটই রাজ্যের সর্ব্বপ্রধান কর্ত্তা; তিনি “নেকয়্যাকু” অর্থাৎ মন্ত্রিসভার সাহায্যে রাজ্যের প্রকৃত শাসন সংরক্ষণ করিয়া থাকেন। কার্যের শৃঙ্খলাসাধন জন্য মন্ত্রিসভা রাজস্ব, শিক্ষা, সামরিক, বৈদেশিক, অভ্যন্তরীণ, ঔপনিবেশিক প্রভৃতি নানা বিভাগে বিভক্ত আছে। প্রত্যেক বিভাগে একজন করিয়া মন্ত্রী (দৈজিন) আছেন।

    ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের অনুকরণে জাপানে পালামেণ্ট অর্থাৎ প্রতিনিধি সভা স্থাপিত হয়। এই সভা আভিজাত ও সাধারণসভা নামে দুই ভাগে বিভক্ত। সাধারণ সভার সভ্যদিগের ক্ষমতা অধিক; কারণ সাম্রাজ্যের যাবতীয় আয় ও ব্যয়ের উপরে ইহাঁদের সম্পূর্ণ কর্ত্তৃত্ব আছে। যাহাঁদের বয়ঃক্রম ২৫ বৎসর এবং বৎসরে ১৫৲ টাকা বা তদূর্দ্ধ কর দিয়া থাকেন, সাধারণ সভার সভ্য মনােনীত করিবার জন্য তাঁহাদের একটী “ভােট” দিবার অধিকার আছে। বর্ত্তমান বৎসরে ৪৫টী “কেন” (জেলা) হইতে ২৯৬টী, ৫৩টী “সাই” (সহর) হইতে ৭৩টী, ৪টী “চো” (দ্বীপ) হইতে ৪টী, যেশোদ্বীপ হইতে ৬টী ও ওকিনাওয়া (লিচুপুঞ্জ) হইতে ২টী সভ্য সাধারণ সভায় প্রবিষ্ট হইয়াছেন। আভিজাত সভার সভ্যের সংখ্যা ৩৫৭ জন, ইহাঁরা সাত বৎসরের জন্য ও সাধারণ সভার সভ্যেরা চারি বৎসরের জন্য মনােনীত হইয়া থাকেন। জাপানবাসির পােষ্যপুত্র অথবা জাপান রমণীর স্বামী ভিন্ন কোন বৈদেশিক মতদাতা বা সভ্য হইতে পারেন না। সম্রাট কর্ত্তৃক উভয় সভার সভাপতি ও সহকারী সভাপতি মনোনীত হইয়া থাকে। তাঁহারা প্রত্যেকে বৎসরে ৬০০০৲ টাকা ভাতা পাইয়া থাকেন। অন্যান্য সভ্যরা প্রত্যেকে ১২০০৲ টাকা পাইয়া থাকেন। যে সমস্ত সভ্যেরা রাজকর্ম্মচারী, তাঁহারা কেবলমাত্র পাথেয় পাইয়া থাকেন। প্রতি বৎসরে তিনমাস কাল পার্লামেণ্ট বসিয়া থাকে। এক তৃতীয়াংশ সভ্য উপস্থিত না হইলে কোন বিষয় আলােচিত হইতে পারে না। এক সভার প্রস্তাবিত বিষয় অন্য সভা ও সম্রাট কর্ত্তৃক অনুমােদিত হইলে তাহা আইনরূপে গৃহীত হইয়া থাকে। কোন বিশেষ রাজনৈতিক আন্দোলন ব্যতীত অন্য কোন সময়ে যে কোন ব্যক্তি সভামধ্যে প্রবেশ লাভ করিতে পারেন।3

    বর্ত্তমান সময়ে জাপানে একটী সুপ্রিমকোর্ট, সাতটী “কোশােইন” (আপিলকোর্ট) ৪৮টী “চিহো-সেবানসাে” (জেলাকোর্ট) ও ৩১০টী নিম্ন আদালত আছে। এই চারি শ্রেণীর আদালতের বিচারক সংখ্যা যথাক্রমে ২৫, ১২১, ৩৯৯ ও ৫৫৭ জন হইবে। এই সমস্ত বিচারালয়ে গত পূর্ব্ববর্ষে ১,৬১, ৮৫৪টী দেওয়ানী মােকর্দ্দমা ও ১, ৮৩, ৫৬২টী ফৌজদারী মােকর্দ্দমা হইয়াছিল।

    জাপানের পােলিশ প্রথা সর্ব্বোৎকৃষ্ট। এখানে গ্রামে গ্রামে একজন করিয়া পােলিশ আছে। তাহাদের নিকটে এলাকাধীন স্থানের মানচিত্র ও অধিবাসিগণের তালিকা আছে।

    প্রতি অফিসেই টেলিফোঁ সংযােগ রহিয়াছে। যে কোন ব্যক্তি তথায় পাঁচটী মাত্র পয়সা দিলে অন্যত্র সংবাদে পাঠাইতে পারে। এখানে উৎকোচের ব্যবস্থা আদৌ নাই। দেশবাসীর অর্থ ও শােণিত শোষণ করিবার জন্য জাপানী পােলিশের সৃষ্টি হয় নাই।

    এক্ষণে জাপানে ১৩৯টী কারাগার আছে। প্রতি কারাগারেই একজন করিয়া জেল গভর্ণর আছেন। তাঁহার বার্ষিক বেতন নয় শত হইতে পঁচিশ শত টাকা। গত পূর্ব্ব বৎসরে জেলসমূহের কর্ম্মচারী সংখ্যা ১১,৯৯৫ জন ছিল। এক্ষণে সমগ্র কারাগারের কয়েদীগণের দৈনিক উপস্থিত সংখ্যার গড় ৬০ হাজার হইবে। কয়েদীগণের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়, তাহাদিগকে গ্রীষ্মকালে প্রতি পাঁচ দিবসে ও শীতকালে প্রতি দশ দিবসে স্নান করিতে দেওয়া হয়। প্রত্যহ তিনবার করিয়া খাদ্য প্রদান করা হয়। কয়েদীরা মুক্ত হইয়া যাহাতে সদুপায়ে জীবিকার্জ্জন করিতে পারে, তাহার জন্য কারাগারের ভিতরে ও বাহিরে তাহাদিগকে বস্ত্রবয়ণ, সূচীকর্ম্ম, ইষ্টকনির্ম্মাণ প্রভৃতি, বিবিধ বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়। কয়েদীরা বাহিরে কর্ম্ম করিয়া যাহা উপার্জ্জন করে, মুক্তিদানকালে তাহা তাহাদিগকে প্রদান করা হয়।

    জাপান গভর্ণমেণ্টের মােট আয় ৫০ কোটী টাকা হইবে। জমির মূল্যের শতকরা ২॥৹ হিসাবে প্রায় ১৮ কোটী টাকা ভূমির রাজত্ব সংগৃহীত হইয়া থাকে। বার্ষিক ৪৫০৲ টাকা আয় হইলে ইনকম্ ট্যাক্স দিতে হয়। গত বৎসরে ইহা হইতে প্রায় ৬ কোটী টাকা সংগৃহীত হইয়াছিল। অবশিষ্ট টাকা দেশীয় ও বিদেশীয় মদিরা,4 তামাক,5 বাণিজ্য শুল্ক, রেলওয়ে, পােষ্টাফিস, মিণ্ট, বনবিভাগ, খনিকর, কষ্টম, ষ্ট্যাম্প প্রভৃতি হইতে গৃহীত হয়। পূর্ব্বে প্রতি জাপানীকে ৮৩ পেন্স বা ৫৷৹ করিয়া কর প্রদান করিতে হইত। গত মহাযুদ্ধের পর হইতে আর ৩৭ পেন্স করিয়া অধিক দিতে হইতেছে।

    জাপান গভর্ণমেণ্ট সৈন্যপালনার্থ প্রতি বর্ষে প্রায় ছয় কোটী টাকা ব্যয় করিয়া থাকেন। সাধারণ শিক্ষার জন্য সমগ্র আয়ের শতকরা ২॥৹ টাকা অর্থাৎ প্রায় এক কোটী টাকা ব্যয় হইয়া থাকে। বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতির জন্য প্রায় ৮৭ লক্ষ টাকা ব্যায়িত হয়। জাপান গভর্ণমেণ্ট যেস্থলে শিক্ষাব্যয় নির্ব্বাহার্থ ব্যক্তি প্রতি।৴৫ পয়সা করিয়া ব্যয় করেন, ভারত গভর্ণমেণ্ট সেই স্থলে আড়াই পয়সার অধিক ব্যয় করিতে অসমর্থ হইয়া থাকেন।

    জাপানবাসিদিগের আর্থিক অবস্থা, ভারতসন্তানগণের ন্যায় শোচনীয় নহে। জাপানে প্রত্যেক ব্যক্তির গড় আয় বৎসরে ৮০৲ টাকা হইবে, তাহাদিগকে সর্ব্বপ্রকারে ৮৲ টাকার অধিক কর প্রদান করিতে হয় না।

  • জাপানের সাহিত্য ও সংবাদপত্র।

    জাপানের সাহিত্য ও সংবাদপত্র।

    জাপানের সাহিত্যভাণ্ডার পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যজাতির সাহিত্যের ন্যায় ঐশ্বর্য্য সম্পদে পরিপুষ্ট নহে। জাপানী সাহিত্যে কালিদাস বা সেক্সপিয়ার দূরের কথা, মিল্টন বা মধুসূদনের ন্যায় কবির পরিচয় পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, প্রাচীন জাপান যুদ্ধবিগ্রহ ও ব্যবসাবাণিজ্যে ব্যাপৃত থাকায় সাহিত্য সম্বন্ধে কোনরূপ চিন্তা করিবার অবসর পায় নাই।

    “কোজিকী” জাপানের সর্ব্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ। ইহা ভারতীয় পৌরাণিক গ্রন্থাবলীর ন্যায় বিবিধ অতিপ্রকৃত উপাখ্যানে পরিপূর্ণ। কোজিকীর কোন কোন আখ্যায়িকার সহিত অস্মদ দেশীয় পুরাণ বিশেষের ঐক্যতা পরিলক্ষিত হয়। ইহা গদ্যে রচিত।

    জাপানীদিগের প্রধান নীতিশাস্ত্রের নাম ‘বুসিডাে’। হিন্দুর নিকটে বেদ, মুসলমান সমীপে কোরান ও খ্রীষ্টানের কাছে বাইবেল যদ্রুপ, প্রাচীন ‘বুসিডাে’ জাপানিগণের নিকটে তদ্রুপ। জাপানীরা এই গ্রন্থকে ভগবান ভাস্করের মুখ-নিঃসৃত বলিয়া বিশ্বাস করিয়া থাকে। ইহাতে পরমাত্মা, জীবাত্মা, পুনজন্ম, পরজন্ম, পাপপুণ্য, স্বাস্থ্য, পীড়া, রাজভক্তি, পিতৃমাতৃভক্তি, স্বদেশপ্রীতি প্রভৃতি বহু বিষয় ধারাবাহিকরূপে লিখিত আছে।

    অতি পূর্ব্বকালে “বুসি” অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত ক্ষত্রিয় জাতি ভিন্ন অন্য কেহ এই গ্রন্থ পাঠ করিতে অধিকারী ছিল না। এক্ষণে—জাপানের উন্নতির যুগে—ইহা সাধারণসম্পত্তিরূপে পরিগণিত হইয়াছে। “বুসিডাের” কয়েকটী উপদেশ এইরূপ;—“আড়ম্বর পরিত্যাগ পূর্ব্বক দীনভাবে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ কর।” “আত্ম অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিয়া স্বধর্ম্ম প্রতিপালন কর।” “হিংসা, দ্বেষ, মিথ্যা, চাতুর্য্য পরিহার করিয়া সত্য ও সরলতার আশ্রয় গ্রহণ কর।” “পরলােকে বিশ্বাস স্থাপন করিয়া ধর্ম্মাচরণ কর।” “বিবেকের সাহায্যে পাপপুণ্য নির্ণয় কর।” ইত্যাদি

    “কোজিকী”, “বুসিডাে” প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করিলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, প্রাচীনযুগে জাপানী সাহিত্যে প্রভূত পরিমাণে সংস্কৃত ভাষার রীতি প্রবেশলাভ করিয়াছিল। সংস্কৃতের ন্যায় জাপানী কবিতায় এখনও দ্ব্যর্থ দেখা যায়। অনেকগুলি জাপানী শব্দের সহিত সংস্কৃত শব্দের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। যথা,—“শামন” (শ্রমণ) “সর” (স্বর্গ) “সামুরে” (সমর) “যিযুৎসু” (যুযুৎসু) “সেন্‌দন্” (চন্দন) ইত্যাদি।

    খৃষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দে জাপানী সাহিত্য বৌদ্ধধর্ম্মের নবীন উপাদানে নবীকৃত হইয়া উঠে। এই সময়ে চীন ভাষা হইতে কয়েকখানি গ্রন্থ জাপানী ভাষায় অনুদিত হয়। এই সমস্ত গ্রন্থাবলীর মধ্যে প্রজ্ঞা পারমিতা, মহাপ্রজ্ঞা পারমিতা অমিতাভ সূত্র, রত্নজাল সূত্র, মহা পরিনির্ব্বান সূত্র, (এইখানি এক্ষণে সংস্কৃত ভাষায় পাওয়া যায় না) ললিত বিস্তর, ধর্ম্মপদ, সাংখ্য দর্শন, চন্দ্রগর্ভ ও সূর্য্যগর্ভ মহায়ণ সূত্র প্রভৃতি ধর্ম্মগ্রন্থ সমধিক প্রসিদ্ধ। সপ্তম শতাব্দে সাহিত্য প্রাচীন ভারতের ন্যায় কবিতাবহুল হইয়া উঠে। এই সময়ে চীন দার্শনিক কনফিউসিয়াসের নীতিশিক্ষায় লােকের হৃদয় কর্ম্মপ্রবণ ও ধর্ম্মানুরক্ত করিবার জন্য জাপানী কবিরা বিবিধ বিষয়ের কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে পুস্তক সকল ইতিহাসের ন্যায় লিখিত হইতে আরম্ভ হয়। এই সময়ে মুরাসাকিসিকিবু নাম্নী জনৈক জাপানী মহিলা “গেঞ্জিমােণো-গাতারি” নামে একথানি ধর্ম্মগ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সুপ্রসিদ্ধ “মন-যো-শিও” অর্থাৎ লক্ষপত্র নামক কবিতা পুস্তক এই সময়ে সঙ্কলিত হয়। ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে জাপানে “নো” নামে এক শ্রেণীর সাহিত্যের উৎপত্তি হইয়াছিল। ইহা অনেকাংশে আধুনিক গীতি কবিতার ন্যায় ছিল। এই সময়ে জাপানে “কাইও-জেন” অর্থাৎ প্রহসনের সৃষ্টি হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে জাপানী সাহিত্যে বিবিধ উপন্যাস (নিনজিও বন) ও নাটকের (জোরুরি-বন) উৎপত্তি হয়।

    এক্ষণে জাপানে যে কয়টী ছন্দ প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে তৌকা সর্ব্বপ্রধান। প্রায় শতকরা ৮০টী কবিতা এই ছন্দে রচিত হইয়া থাকে। ইহা ৩১টী অক্ষর সম্বলিত পঞ্চপদে বিভক্ত। পদপঞ্চে যথাক্রমে ৫, ৭, ৫, ৭ ও ৭টি অক্ষর থাকে। নিমে সম্রাট রচিত কয়েকটী কবিতা ও তাহার অনুবাদ প্রদত্ত হইল।

    কোরে ওয়া মিনা
    ইকুছা নো নিওয়ানি
    ইদোহাতেতে
    ও কিনা ইয়া হিতােরি
    ইয়ামাদা মরুবাণ

    মায়ের সন্তান, সকলে গিয়াছে,
    কর্ত্তব্য পালিতে,—
    উন্মুক্ত কৃপাণ লইয়া করে;
    তাহাদের বৃদ্ধ জনক জননী,
    শূন্য গেহে ভাবে,
    গিয়াছে তনয় ঘাের সমরে।

    চিবাইয়া কুরু
    কামি নো কোকোরোনি
    কানো ওরাণ
    ওয়াগা কুনি-তামি নাে
    ছুকুছু মাকোতে ওয়া

    শ্রীবিন্দুমাধব দেব পরাৎপর
    স্নেহ বরিষণ,—
    করুন তা’দের পুণ্যমস্তকে,
    মধুরিমাময় সারল্য তা’দের
    হৃদে একাগ্রতা,
    অতি তুচ্ছ করে মনুজান্তকে।

    কুণি ও ওমােও
    মিচি নি ফুতাৎছুওয়া
    নিকারি কিরি
    ইকুছা লো নিওয়া নি
    তাৎছু মো তাতামো মাে

    সমর প্রাঙ্গনে, সুখ জন্মস্থানে,
    যে থাকে যেখানে,
    সকলেরই হৃদে জনমভূমি;
    তাহারা সকলে মায়ের সন্তান
    স্বজাতির তরে,
    এক মনঃপ্রাণ দৃঢ়সংযমী।

    হৃদে আশা বাঁধি, অতি সন্তর্পণে,
    যবে জাতিধ্বজা
    সঁপিয়া দিলাম তা’দের কাছে;
    মহতী আশাতে, হৃদয় স্পন্দিল
    বিবেক বলিল,
    নবোদিত ভানু কীর্ত্তি আনিছে।

    পুরাতন গ্রন্থে যবে দৃষ্টি করি
    একটী ভাবনা,
    জাগে সদা মম হৃদিকন্দরে;
    প্রজারঞ্জন, প্রজার পালন
    প্রজা সুশাসন
    কিরূপ হ’তেছে রাজ্য ভিতরে।

    আজ কাল জাপানী সাহিত্যে বহুসংখ্যক লেখক-লেখিকার আবির্ভাব হইয়াছে।

    গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে যে সমস্ত বিদেশী গ্রন্থ জাপানী ভাষায় অনুদিত হইয়াছে, তন্মধ্যে স্মাইল, মিল, স্পেনসার ও কাণ্টের গ্রন্থাবলী প্রসিদ্ধ। উপন্যাসের মধ্যে “আর্ণেষ্ট মলট্রাভার” সর্ব্বপ্রথমে অনুবাদিত হয়। “টেলিমেক্‌স” ও “রবিন্‌সনক্রসোর” পাঠক সংখ্যা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক। এতদ্ব্যতীত ডুমা’ ভার্ণ, কারভেণ্ট, হ্যাগার্ড প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিকগণের গ্রন্থরাজি জাপানী সাহিত্যের অধিকাংশ স্থান অধিকার করিয়াছে।

    অনুবাদিত কবিতা পুস্তকের মধ্যে গ্রের “এলিজি”, গােল্ডস্মিথ কৃত “ডেজার্টেড ভিলেজ” ও টেনিসনের “এনক-আর্ডেন” উল্লেখ যােগ্য।

    ঔপন্যাসিকগণের মধ্যে বেকিন, টেনিহিকো সানসুই, ইক্কু ও ন্যানুসী প্রভৃতি গ্রন্থকার বিখ্যাত। জাপানী সমালােচকেরা ইহাঁদের সহিত যথাক্রমে লিটন, স্কট, হিউগো, ডিকেন্স ও কলিন্সের তুলনা করিয়া থাকেন। মানবচরিত্রাঙ্কণে বেকিনের সহিত সেকস্‌পিয়ারের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়।

    জাপানের সর্ব্বপ্রথম সংবাদপত্রের নাম “যােমি-উরি” ইহা ১৬০৩ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ইহার পরের উল্লেখ যােগ্য পত্রের নাম “কেইগােয়া-সিম্বু”। ১৮৭১ খৃঃ “জিম্বু-জিজি” নামে আর একখানি পত্র জন্মগ্রহণ করে। ১৮৭২ অব্দে জন ব্লাকি নামক জনৈক ইংরেজ কর্ত্তৃক “জাপান হেরাল্ড” নামে একখানি প্রথম শ্রেণীর দৈনিক পত্র বাহির হয়। এই সময় হইতে জাপানে সংবাদপত্রের সংখ্যা অতি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। ১৮৭৮ খৃঃ সংবাদপত্রের সংখ্যা ২০০, ও পাঠক সংখ্যা ৩ কোটী ছিল। ১৮৯৪ অব্দে পত্রের সংখ্যা ৮১৪ খানিতে পরিণত হয়, ইহার ৫ বৎসর পরে ৯৭৮ খানি হয়। এক্ষণে ১৩৫০ খানি হইয়াছে। দশ সহস্র লােকের বাসস্থান এমন নগর নাই, যেখান হইতে দুই বা তিনখানি সংবাদপত্র বাহির হয় না। টোকিও হইতে প্রত্যহ ৪০ খানি সংবাদপত্র বাহির হইয়া থাকে, তন্মধ্যে “জিজি” “নিচিনিচি” “ককুমিন” “নিপন” “জিজিসিম্পো” “য়্যাসাই” “হােচি” “মাইয়াকি” প্রভৃতি দৈনিকগুলি সমধিক প্রসিদ্ধ। ওসাকা,কোব, ইয়াকোহামা ও নাগােয়া হইতে অনেকগুলি দৈনিক পত্র বাহির হইয়া থাকে। ইংরেজী পত্রের মধ্যে জাপান গেজেট, জাপান টাইমস, জাপান মেল, হেরাল্ড, কোব হেরাল্ড প্রভৃতি পত্রগুলি উল্লেখযােগ্য। এই সকল পত্রের প্রত্যেকটীর গ্রাহকসংখ্যা এক লক্ষের অধিক হইবে।

    জাপানের মুদ্রাযন্ত্রবিধি অতীব কঠোর। রাজ্য সম্পর্কীয় কোন গুপ্তকথা প্রকাশ করিলেই সম্পাদক মহাশয়কে কারাদণ্ড ভােগ করিতে হয়। এইজন্য সংবাদপত্র মাত্রেরই একজন করিয়া “কারা-সম্পাদক” থাকে। তিনি প্রকৃত সম্পাদকের ভৃত্যরূপে অবস্থিতি করেন এবং প্রয়ােজন হইলে অম্লানবদনে কারাগৃহে গমন করিয়া থাকেন।

  • জাপানের শিক্ষা-প্রণালী।

    জাপানের শিক্ষা-প্রণালী।

    সুশিক্ষাই সর্ব্ববিধ উন্নতির মূল। কি সাম্রাজ্যের পরিপুষ্টি, কি বাণিজ্যের বিপুলবিস্তার, কি স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধিসাধন, কি জ্ঞানের পরিধি প্রসারণ, ইহার কোন একটিও শিক্ষা নিরপেক্ষ নহে। জাপানবাসীরা গত ত্রিংশতি বৎসর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ে যে উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে অতি অপূর্ব্ব ও সর্ব্বাপেক্ষা বিস্ময় জনক।

    জাপানের শিক্ষার ইতিহাস ১৮৬৮ খৃঃ হইতে আরম্ভ হইয়াছে। ইহার তিন বৎসর পরে গবর্ণমেণ্টের তত্ত্বাবধানে জাপানে “মম্বাসাে” অর্থাৎ শিক্ষাবিভাগ স্থাপিত হয়। ১৮৭২ খৃঃ শিক্ষাসংক্রান্ত কতকগুলি ব্যবস্থা প্রণীত হইয়া শিক্ষাবিভাগে নবযুগের আবির্ভাব হয়।

    এক্ষণে জাপানে চারিশ্রেণীর বিদ্যালয় দৃষ্ট হয়। যথা,— প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য-বিদ্যালয়, উচ্চ-বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়।

    প্রাথমিক বিদ্যালয় জাপানের প্রতি “সান” অর্থাৎ পল্লীগ্রামে দৃষ্ট হয়। ইহাতে ষষ্ঠ বৎসর হইতে চতুর্দ্দশ বর্ষীয় বালক বালিকাগণকে জাপানী ভাষায় শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, গণিত ও স্বাস্থ্যরক্ষা বিষয়ক সাধারণ সূত্রগুলি শিক্ষা দেওয়া হয়। পীড়িত ও অতি দরিদ্র ব্যতীত গ্রামের সকল বালক বালিকাই এই বিদ্যালয়ে আসিতে বাধ্য হইয়া থাকে। এই সমস্ত বিদ্যালয়গুলি গবর্ণমেণ্ট ও গ্রামবাসীর অর্থ সাহায্যে রক্ষিত হইয়া থাকে। ১৯০২ খৃঃ এই শ্রেণীর বিদ্যালয়-সংখ্যা ২৮,৩৮১, ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা ৪৯,৮০,৬০৪ ও শিক্ষক এবং শিক্ষয়ত্রী সংখ্যা ১,০৩৭৮০ জন ছিল।

    জাপানের প্রতি জেলাতেই এক বা ততােধিক মধ্য-বিদ্যালয় অবস্থিত আছে। এই সমস্ত বিদ্যালয়ে চৌদ্দ হইতে অষ্টাদশ বর্ষ বয়স্ক বালক বালিকাদিগকে জাপানী, চীনা ও ইংরাজী ভাষায় সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগােল, গণিত, জ্যামিতি, বিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যোতিষ প্রভৃতি বিবিধ বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়। যাহাতে ছাত্র ও ছাত্রীগণের ধর্ম্মজ্ঞান, নীতি ও শারীরিক শক্তি সম্যক পরিপুষ্ট হয়, তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়। ১৯০২ সালে এই শ্রেণীর বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৯২, ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা ১,০২,৩০৪ এবং শিক্ষক ও শিক্ষায়ত্রী সংখ্যা ৪২৩৩ জন ছিল।

    উচ্চ বিদ্যালয় গুলি রাজধানী ও প্রধান নগরে অবস্থিত। ইহাতে জাপানী, ইংরাজী ও জর্ম্মান ভাষায় গণিত, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আইন, চিকিৎসা-শাস্ত্র, কৃষি, বাণিজ্য, ভূতত্ব প্রভৃতি বিবিধ বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে। এই বিদ্যালয়ে সপ্তদশ বৎসরের ন্যূন বয়স্ক কোন ছাত্র প্রবিষ্ট হইতে পারে না। ১৯০৩ খৃঃ জাপানের উচ্চ-বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮টী ও ছাত্র সংখ্যা ৪৬৮১ জন ছিল।

    জাপানে ৭০টী উচ্চ বালিকাবিদ্যালয় ও ৫৪টি নর্ম্মাল বিদ্যালয় আছে। নর্ম্মাল বিদ্যালয়ে ছাত্রগণকে চারি বৎসর ও ছাত্রীগণকে তিন বৎসর অধ্যয়ন করিতে হয়। নর্ম্মাল বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রী প্রস্তুত করিবার জন্য আবার দুইটী উচ্চ নর্ম্মাল বিদ্যালয় আছে। ইহার একটী টোকিয়ে রাজধানীতে ও অন্যটী হিরােসিমা নগরে অবস্থিত। গত পূর্ব্ব বর্ষে ইহার ছাত্র সংখ্যা ৮০৩ জন ও ছাত্রী সংখ্যা ৩৬১ জন ছিল।

    জাপানে দুইটী “দৈগাকু” অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ইহার একটী রাজধানীতে ও অন্যটী মিয়াকো নগরে অবস্থিত। উচ্চবিদ্যালয়ের উত্তীর্ণ ছাত্র ভিন্ন কেহই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইতে পারে না।

    টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়,—এখানে আইন, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কৃষিবিদ্যা বিষয়ক ৬টী কলেজ আছে। আইন বিভাগের মধ্যে চিকিৎসা সম্বন্ধে একটী নির্দ্দিষ্ট পাঠ্য আছে। ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মধ্যে গৃহনির্ম্মাণ, রসায়ন, বারুদ, খনি ও ধাতু সম্বন্ধে নয়প্রকার পাঠ্য আছে। সাহিত্য কলেজে দর্শন, জাপানী-সাহিত্য, চীন-সাহিত্য, ইতিহাস ও বিবিধ বৈদেশিক সাহিত্য প্রভৃতি নয়প্রকার পাঠ্য আছে। বিজ্ঞান কলেজে গণিত, জ্যোতিষ, পদার্থবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা প্রভৃতি সাতপ্রকার পাঠ্য আছে। কৃষি কলেজে কৃষিবিদ্যা, বনবিদ্যা প্রভৃতি চারি প্রকার পাঠ্য আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত একটা বৃহৎ পুস্তকাগার ও হাঁসপাতাল আছে। আইন কলেজে কতদিন পাঠ করিতে হইবে তাহার নিশ্চয়তা নাই। অন্যান্য কলেজে তিন বৎসর অধ্যয়ন করিতে হয়। কোন ছাত্রকেই সাত বৎসরের অধিক কাল পড়িতে দেওয়া হয় না।

    টোকিয়ো বিশ্ব-বিদ্যালয়ে বর্ত্তমান বৎসরে আইনবিভাগে ২৫, চিকিৎসাবিভাগে ২৩, ইঞ্জিনিয়ারিংবিভাগে ২৫, সাহিত্যবিভাগে ২০, বিজ্ঞানবিভাগে ২১, ও কৃষিবিভাগে ১৭ জন অধ্যাপক আছেন।

    এই বিশ্ব-বিদ্যালয় হইতে চিকিৎসাশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হইলে ইগাকুশী, ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় উত্তীর্ণ হইলে কোগাকুশী, সাহিত্যে উত্তীর্ণ হইলে বানগাকুশী, বিজ্ঞানশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হইলে রিগাকুশী ও কৃষিবিদ্যায় উত্তীর্ণ হইলে নােগাকুশী উপাধি পাওয়া যায়।

    জাপান গবর্ণমেণ্ট টোকিও বিশ্ব-বিদ্যালয়ের জন্য প্রতিবর্ষে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া থাকেন।

    এই বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা বর্ষে বর্ষে কি পরিমাণে বর্দ্ধিত হইতেছে, তাহা নিম্নলিখিত তালিকা হইতে বুঝিতে পারা যায়।

    ১৮৯০ ১৮৯৫ ১৯০০ ১৯০৩
    আইন ৩০১ ৪৭২ ৮২০ ১২০৮
    চিকিৎসা ১৮৮ ১৭৮ ৪০২ ৭১৭
    ইঞ্জিনিয়ারিং ১০৬ ২৯৫ ৪০৭ ৯০১
    সাহিত্য ৮৮ ২১৯ ৩১২ ৮৩৩
    বিজ্ঞান ৭৭ ১০২ ১০৫ ২১৩
    কৃষি ৪৮৫ ২৪৯ ২৬২ ৪৯৪
    বিবিধ ৪৮ ১০৫ ১৯২ ২৫০
    ১,২৯৩ ১,৬২০ ২,৫০০ ৪,৬১৬

    কিয়াটো বিশ্ব-বিদ্যালয়ে আইন, চিকিৎসা, বিজ্ঞান এবং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতির চারিটী কলেজ আছে। এখানে কোন ছাত্রকে তিন বৎসরের অধিক কাল এক প্রকার পাঠ্য পাঠ করিতে দেওয়া হয় না। চিকিৎসা কলেজে চারি বৎসর অধ্যয়ন করিতে হয়। অন্যান্য নিয়মাদি টোকিও বিশ্ব-বিদ্যালয়ের অনুরূপ।
    বিশ্ব-বিদ্যালয়ের বাৎসরিক ফিজ ৩৭॥৹ টাকা। ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রগণকে আরও ১৫৲ টাকা অতিরিক্ত প্রদান করিতে হয়।

    এই দুইটী বিশ্ববিদ্যালয় হইতে গত ২৫ বৎসরে প্রায় ৫০০০ ছাত্র উত্তীর্ণ হইয়াছে।

    টোকিও ও কিয়াটো বিশ্ব-বিদ্যালয় ভিন্ন জাপানে শিল্প, কৃষি ও স্ত্রীশিক্ষাসংক্রান্ত আরও কয়েকটী বিশ্ব-বিদ্যালয় আছে।

    উপরােক্ত বিদ্যালয়সমূহ ভিন্ন জাপানে উচ্চ ও নিম্নশ্রেণীর ১৪৭৪টী বিদ্যালয় বর্ত্তমান আছে। তন্মধ্যে ৪৭টী কৃষি, ২০০টী শিল্প, ৩৬টী বাণিজ্যবিষয়ক বিদ্যালয় উল্লেখ যােগ্য। শিল্প বিদ্যালয়ের মধ্যে টোকিও উচ্চ শিল্প বিদ্যালয়, ওসাকা শিল্প বিদ্যালয় ও কিয়াটো উচ্চ শিল্প বিদ্যালয় সমধিক প্রসিদ্ধ। এই সমস্ত বিদ্যালয়ে রসায়ণ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাদি গঠন, রং করণ, বস্ত্র বয়ন, চীনাবাসন গঠন, মদ্য প্রস্তুত করণ, ধাতুবিদ্যা, মানচিত্র অঙ্কিত করণ, চিত্রবিদ্যা প্রভৃতি বিবিধ বিষয় হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।

    এক্ষণে জাপানে ১৬টী মূকবধির বিদ্যালয় ও ২৫৪টী কিণ্ডারগার্টেন বিদ্যালয় বিদ্যমান আছে।

    জাপান গবর্ণমেণ্ট ১৮৭০ খৃষ্টাব্দ হইতে শিল্প ও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিদেশে ছাত্র প্রেরণ আরম্ভ করেন। ১৮৭২ অব্দে প্রায় ২৫০ ছাত্র প্রেরিত হইয়াছিল। ১৮৯৫ অব্দে কেবল মাত্র ১১ জন প্রেরিত হয়। পূর্ব্বে জাপানী বিদ্যালয়ের জন্য ইউরােপ ও আমেরিকা হইতে অধ্যাপক আনিতে হইত, এক্ষণে তাহার প্রয়ােজন হয় না।

    সমগ্র জাপান রাজ্যে বর্ত্তমান সময়ে প্রায় ৫৪ লক্ষ ছাত্র বিবিধ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতেছে। এখানে বিদ্যালয় গমনযােগ্য বালক ও যুবকবর্গের মধ্যে শতকরা ৮৫ জন বিদ্যালয়ে গমন করিয়া থাকে। আমেরিকার যুক্তরাজ্য (ইউনাইটেডষ্টেটস্) পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা সুসভ্য রাজ্য বলিয়া পরিগণিত। প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে সেই শক্তিশালী রাজ্যের সহিতও জাপানের তুলনা হয় না। হতভাগ্য ভারতের সহিত আর কি তুলনা করিব?

    জাপানীরা ইংলণ্ডের নিকট হইতে নৌবিদ্যা, ফ্রান্সের নিকটে যুদ্ধবিদ্যা, জার্ম্মানির নিকট হইতে চিকিৎসাশাস্ত্র এবং আমেরিকার নিকট হইতে শিক্ষাপ্রণালী গ্রহণ করিয়া সকলগুলিই স্বদেশের উপযোগী করিয়া লইয়াছে। কোন বিষয়েই আমাদের ন্যায় অবিকল অনুকরণ করে নাই।

    জাপান সম্রাট বলিয়াছিলেন,—“It is designed, henceforth, education shall be so diffused that there may not be a village with an ignorant family, nor a family with an ignorant member.” সম্রাটের এই উক্তি সার্থক হইয়াছে।

  • সামাজিক রীতিনীতি।

    সামাজিক রীতিনীতি।

    আচারব্যবহার, বেশভূষা, খাদ্য, কুসংস্কার ও ক্রীড়াকৌতুক প্রভৃতি।

    সাধারণতঃ জাপানের অধিবাসিগণকে নিম্নলিখিত সাত ভাগে বিভাগ করা যাইতে পারে। ১ম সম্ভ্রান্তবংশ, ২য় যাজক, ৩য় রাজকর্ম্মচারী, ৪র্থ বণিক, ৫ম সৈনিক, ৬ষ্ঠ শিল্পী ও ৭ম শ্রমজীবিগণ।6

    সন্ত্রান্তবংশীয় ব্যক্তিগণ, যাজক-সমাজ, রাজকর্ম্মচারিগণ ও বাণিজ্যজীবি সম্প্রদায় লইয়া উচ্চশ্রেণী গঠিত হইয়াছে। এই শ্রেণীর পুরুষদিগের বর্ণ গৌর, শরীর দীর্ঘ ও মুখমণ্ডল শ্মশ্রুল। তাঁহাদের আকৃতি ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গাদির গঠন প্রণালী অনেকাংশে ভারতীয় শ্রেষ্ঠজাতিগণের অনুরূপ। তাঁহাদিগকে সহসা দর্শন করিলে, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চশ্রেণীর বাঙ্গালী বলিয়া ভ্রম উপস্থিত হয়।

    সৈনিক, শিল্পিগণ ও শ্রমজীবি সম্প্রদায় লইয়া নিম্নশ্রেণী গঠিত হইয়াছে। এই শ্রেণীর লোকদিগের বর্ণ পীত, আকৃতি খর্ব্ব, শ্মশ্রু বিরল, অধরোষ্ঠ স্থূল ও নাসিকা চেপ্টা। ইহারা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও কষ্টসহিষ্ণু।

    জাপানী কুল-লক্ষ্মিগণের গঠন অতি সুন্দর। বর্ণ উজ্জ্বল গৌর, নয়নদ্বয় ভাসমান ও স্থির-কটাক্ষবিশিষ্ট। ভ্রমরকৃষ্ণ কেশরাশি অপূর্ব্ব কৌশলে পৃষ্ঠোপরি বিন্যস্ত। পাশ্চাত্য যুবতীসুলভ বিলাস বিভ্রম নাই, কিন্তু তথাপিও প্রথম দর্শনে দর্শক মাত্রেরই চিত্ত আকৃষ্ট হয়। বস্তুতঃই জাপানী স্ত্রী সুশীলা, একান্ত পতিপরায়ণা, সর্ব্বথা সংসার শুভকারিণী।

    জাপানে রমণীগণের নাম রাখায় একটু বিশেষত্ব আছে। প্রায়ই নামের পূর্ব্বে ‘ও’ এবং পরে ‘সান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। যাঁহার নাম তারা, তাঁহাকে সম্বোধন করিবার সময়ে “ও তারা সান” অর্থাৎ হে তারাসুন্দরী বলিয়া সম্বােধন করাই জাপানী সভ্যতা। “সান” শব্দ পুরুষের নামের পরে ব্যবহৃত হইলে মহাশয় অর্থ বুঝায়।

    “কাইমনো” জাপানবাসী পুরুষ ও রমণীগণের জাতীয় পরিচ্ছদ। ইহা দেখিতে অনেকাংশে বিলাতী অলষ্টার বা এদেশীয় আলখেল্লার অনুরূপ। কাইমনো স্কন্ধদেশ হইতে পাদমূল পর্যন্ত লম্বিত, ইহার ভিতরভাগ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পকেটে পরিপূর্ণ। “ওবি” নামক নাতিপ্রসস্ত ৭।৮ হস্ত দীর্ঘ বস্ত্রখণ্ড দ্বারা কটিবন্ধের কার্য্য হইয়া থাকে। কাইমনো ও ওবি সাধারণতঃ কার্পাস সূত্রে নির্ম্মিত হয়। অবস্থাবানেরা রেশম নির্ম্মিত পরিচ্ছদাদি ব্যবহার করিয়া থাকেন। জাপানে অলঙ্কার পরিধানের প্রথা দেখিতে পাওয়া যায় না।

    জাপানের বালক বালিকারা বাল্যকাল হইতে পিতা, মাতা, জ্যেষ্ঠভ্রাতা প্রভৃতি গুরুজনের আদেশ প্রতিপালনে অভ্যস্থ হয়। ইহার ফলে জাপানিগণের পারিবারিক জীবনে কোন অশান্তি পরিলক্ষিত হয় না। জাপানী বালিকারা শৈশব হইতেই রন্ধন, গৃহমার্জ্জন, শয্যারচন, নিমন্ত্রিতগণের ভােজ্যাহরণ প্রভৃতি আবশ্যকীয় গৃহকার্য্য সমূহ অতি যত্নপূর্ব্বক সম্পন্ন করিয়া থাকে। জাপান কুমারী অতি অল্প বয়স হইতেই পতিব্রত্যধর্ম্মের শিক্ষা পাইয়া থাকে। ঘুড়িউড়ান, নদীরজলে কাগজের নৌকাচালান, কৃত্রিম যুদ্ধ, বিবাহাভিনয়, পুতুলের তীর্থযাত্রা, ধুলাখেলা প্রভৃতি এদেশীয় বালক বালিকাগণের প্রধান ক্রীড়া।

    জাপানে প্রত্যেক বালিকার যােগ্য বয়সেই বিবাহ হইয়া থাকে। উচ্চশ্রেণীরমধ্যে বিবাহের গড় বয়স পাত্রপক্ষে বাইশ ও পাত্রিপক্ষে ষোল বৎসর দৃষ্ট হয়। পিতা মাতা প্রভৃতি প্রকৃত অভিভাবকেরাই বিবাহসম্বন্ধ স্থির করিয়া থাকেন। ইহাতে কোন পক্ষ বিরাগ প্রদর্শন করে না।7 নিজ পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের-মধ্যে কন্যার বিবাহসম্বন্ধ স্থির হইতে পারে না। কোনও জাপানী কুমারী স্বেচ্ছায় স্বয়ংবরা হইতে পারে না। সম্প্রদায় বিশেষে কন্যাপণ ও বরপণ প্রচলিত আছে। বিবাহ রজনীতে পানভােজন ব্যতীত অন্য কোন বিশেষ ধর্ম্মানুষ্ঠানের সংস্রব নাই। স্ত্রী-আচার প্রচলিত আছে। বিবাহ সমাপ্ত হইলে বর-বধূ তুষার-শুভ্র-পরিচ্ছদ পরিধান পূর্ব্বক গুরুজনের নিকট সৌন্দর্য্যবর্দ্ধন ও দীর্ঘজীবন কামনা করিয়া আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া থাকে। বিবাহের একটী নিষ্ঠুর প্রথা এই যে, দম্পতি যুগলের একের বা উভয়ের মৃত্যু হইলে শবদেহ আবৃত করা হইবে বলিয়া, পরিণয়ের নবীন পরিচ্ছদ অতি যত্নপূর্ব্বক রক্ষা করা হইয়া থাকে।

    বালিকাবধূ বিবাহের অল্পদিবস পরেই পতিগৃহে গমন করিয়া থাকে। তথায় তাহাকে শ্বশ্রূঠাকুরাণীর সম্পূর্ণ শাসনাধীনে বাস করিতে হয়। তাহাকে প্রত্যুষে সকলের অগ্রে শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া সংসারের যাবতীয় কর্ম্ম সম্পন্ন করিতে হয়। জাপানী যুবতীরা আপনাদিগকে পতির সমকক্ষ বলিয়া ধারণা করে না। তাহারা স্বামীকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করিয়া থাকে। স্বামী অসচ্চরিত্র হইলেও তাহারা অসূয়া-পরবশ হয় না। তাহাদের বিশ্বাস, প্রবৃত্তি শান্ত হইলেই, স্বামীর চরিত্র আপনিই শােধিত হইয়া যাইবে। জাপানীবধূর ভালবাসা অপরিসীম হইলেও তাহা ইয়ুরােপীয় ললনাগণের ভালবাসার ন্যায় উদ্দাম ও চাঞ্চল্যপরিপূর্ণ নহে। ফলতঃ জাপানী স্ত্রীই পতি হৃদয়ের চির প্রহ্লাদিনী; সংসার সরােবরের প্রফুল্ল কমলিনী; সংসার তরুর বিনােদ বল্লরী; শান্তিকুঞ্জের সুরভি মল্লিকা।8

    প্রাচীন ও মধ্যযুগে জাপানে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল। তৈহো সংহিতা নামক জাপানের প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রের ব্যবস্থানুসারে ভার্য্যা ব্যাভিচারিণী, মিথ্যাভাষিনী, শ্বশ্রূজনবিদ্বেষিনী, কন্যাপ্রসবিনী, চৌর্যাদি দোষাক্রান্তা ও পীড়িতা হইলে স্বামী অধিবেদন করিতে পারিত।9 এক্ষণে স্ত্রী ব্যাভিচারিণী, অভিভাবকের অসম্মতিতে গৃহত্যাগিনী ও চৌর্য্যাদি দোষাক্রান্তা হইলে, রাজবিধানের সাহায্য লইয়া পত্নীত্যাগ করিতে হয়। যাহারা লেখ্য-সাহায্যে চুক্তিবদ্ধ হইয়া বিবাহ করে, তাহারা রাজসাক্ষিক লেখ্যের চুক্তি অনুসারে বিবাহসম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিতে পারে।

    জাপানে নিম্নশ্রেণীর অশিক্ষিত সম্প্রদায়েরমধ্যে বিধবা বিবাহ প্রচলিত আছে। উচ্চ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারমধ্যে এই প্রথা নিন্দনীয় বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। অতি পূর্ব্বে সন্ত্রান্তবংশে সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল, এক্ষণে রাজব্যবস্থা দ্বারা তিরােহিত হইয়াছে।

    জাপানে ভিন্ন ভিন্ন আখ্যাধারী বহুসংখ্যক বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রত্যেক বংশেই একজন করিয়া “ইউজি-নো- কামি” অর্থাৎ প্রধান আছে। পূর্ব্বে জাপানে প্রত্যেক বংশ রেজেষ্ট্রী হইত এবং রেজেষ্ট্রী পুস্তকে বংশের প্রধান ব্যক্তির নাম ও বাসস্থান লিখিত থাকিত। শেষ পুস্তকে ১১৮২টী বংশের উল্লেখ আছে।

    জাপানের প্রাচীন ধর্ম্মপুস্তকে ত্যজ্যপুত্রের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। পুত্র বংশের প্রধান ব্যক্তিকে অপমান করিলে, বংশগৌরবের হানিকর কোন কার্য্য করিলে, পুত্র উন্মত্ত বা ক্লীব হইলে ও চৌর্য্যাদি দোষাক্রান্ত হইলে পিতা কর্ত্তৃক পরিত্যজ্য হইত। এক্ষণে রাজবিধানের সাহায্য ব্যতীত ত্যজ্যপুত্র সিদ্ধ হয় না। জাপানে “কিউযোশী” অর্থাৎ পােষ্যপুত্র গ্রহণ প্রথা প্রচলিত আছে। চারি পুরুষের মধ্যস্থিত জ্ঞাতি হইতে ১০ বৎসরের ন্যূনবয়স্ক বালক দেখিয়া পােষ্যপুত্র লইতে হয়। জামাতাকে পােষ্যপুত্ররূপে গ্রহণ করা যায় না। তবে কোন বালককে গৃহে আনিয়া পােষ্যপুত্র করিয়া কন্যার সহিত বিবাহ দেওয়া যাইতে পারে। ইহাকে “মুকোযোশী কহে।” সম্প্রতি এই প্রথা জাপানে অত্যধিক বৃদ্ধি প্রাপ্ত হওয়ায় নুতন দেওয়ানী আইনের ৮৩৯ ধারায় ও রেজেষ্ট্রী আইনের ১০২ ধারায় মুকো-যােশী সম্বন্ধে কয়েকটী অভিনব নিয়ম সন্নিবেশিত হইয়াছে।

    জাপানে জ্যেষ্ঠপুত্রই পিতার সন্মান (বােটোকো-সােজোকু) ও সম্পত্তি (আইসান-সােজোকু) লাভ করিয়া থাকে। পুত্রাভাবে মৃত ব্যক্তির পিতা, পিতার অভাবে মাতা, তদাভাবে প্রথমা পত্নী, তদাভাবে মৃতের সহােদর, সহােদরাভাবে সহােদরা, তদাভাবে অন্য পত্নীগণ, তদাভাবে মৃতের জ্ঞাতি ভ্রাতাগণ সম্পত্তির উত্তরাধিকার করিয়া থাকে।

    অন্ন, মৎস্য ও শাকসব্জি জাপানিদিগের প্রধান খাদ্য। অতি সন্ত্রান্ত ব্যক্তি হইতে দীন পর্য্যন্ত সকলেই ভাত, মাছ, শাক আহার করিয়া থাকে। নিম্নে কয়টী উৎকৃষ্ট জাপানি ব্যঞ্জনের নাম লিখিত হইল।

    জাপানী নাম বঙ্গীয় নাম জাপানী নাম বঙ্গীয় নাম
    মিয়া সিম সুক্ত মাছিটোরি শাকের ঘণ্ট
    লুইমনো মাছের ঝোল উমেনী শাক, মাছ ও লেবুর রস সহযোগে অম্ল
    নিজাকানা আলু ও মাছের কালিয়া সুকিমনো আচার
    টেরায়াকি মাছের চড়চড়ি গােসেন পায়ষ
    সাসিমা চিংড়িমাছ ভাজা সিওয়াকি মাছের কাবাব

    মধ্যশ্রেণীর পরিবারে ভাত, চিংড়িসিদ্ধ, কাঁকড়ার কাবাব, কেবাকী (বাইন) ও জেটাচাকা (চাঁদা) মৎস্যের অম্ল নিত্যই রন্ধন হইয়া থাকে। নিম্নশ্রেণীর জাপানীরা অন্ন অপেক্ষা মৎস্য অধিক পরিমাণে ভোজন করিয়া থাকে।

    জাপানীরা পৃথিবীর অন্যান্য জাতির ন্যায় উচ্চাসনে উপবেশন করিয়া ভােজন করে না। তাহারা বঙ্গবাসীর ন্যায় পিঁড়ি ও পত্রের উপর উপবিষ্ট হইয়া হস্তসাহায্যে ভোজন করিয়া থাকে।

    জাপানে শূকর ও গো-মাংস ভক্ষণ চলিত নাই। এখানে কেহই গাে হত্যা করিতে পারে না। খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী ও ইয়ুরােপ প্রত্যাগতদিগের মধ্যে কেহ কেহ বিদেশাগত শুষ্ক গো-মাংস ও টেবিনেব (মুরগী) ভক্ষণ করিয়া থাকেন। জাপানিরা পরমান্ন ও পিষ্ঠকাদি ব্যতীত কেবলমাত্র দুগ্ধপান করে না। তরকারী বিশেষে দুগ্ধ, ঘৃত, নবনীত, তৈল ও চর্ব্বি ব্যবহৃত হইয়া থাকে।

    জাপানের অধিকাংশ নরনারী প্রত্যহ চা-পান করিয়া থাকে। সাকি ও সয় জাপানের জাতীয় সুরা, প্রায় সকলেই পান করিয়া থাকে। সাকি চাউল হইতে প্রস্তুত হয়। ইহা প্রথমে ওসাকা নগরে প্রস্তুত হইয়াছিল বলিয়া ইহার নাম “সাকি” হইয়াছে। চিকিৎসকের অনুমতি ভিন্ন জাপানে কেহই অহিফেন সেবন করিতে পারে না। এখানে সিগারেট ও বিবিধ প্রকারে তাম্রকূট সেবনের প্রথা আছে।

    জাপানবাসিদিগের মধ্যে অনেকগুলি কুসংস্কার বর্ত্তমান আছে। এখানে রাত্রে লবণ ধার করিতে নাই। মাসের শেষ শনিবারে বস্ত্র ধৌত করিতে নাই। বিবাহের দিনে বরকন্যার পরিচ্ছদ লাল বা বেগুনি বর্ণের হইলে উভয়ের মধ্যে দাম্পত্যবন্ধন স্থায়ী হইবে না। কোন বালক দর্পণে মুখ দেখিলে, তাহাকে যৌবনে যমজ সন্তানের জনক হইতে হয়। গ্রহণের সময়ে জলপান করিলে শরীরমধ্যে বিষ প্রবিষ্ট হয়। কুকুর কাঁদিলে গৃহস্থের অকল্যাণ হয়; মোরগ চালে উঠিলে গৃহদাহের আশঙ্কা আছে। মৎস্য ধরিবার মানসে যাত্রা করিয়া পুরোহিতের সহিত সাক্ষাৎ হইলে, বাটীতে ফিরিয়া আসাই মঙ্গল। গ্রামে বসন্ত ও কলেরা প্রভৃতি সংক্রামক পীড়ার প্রাদুর্ভাব হইলে, গৃহস্থেরা দ্বারদেশে লিখিয়া দেয় যে, এবাটীতে বালক বালিকা একটীও নাই। জাপানীরা যাত্রা কালে বক ও সুকি নামে কচ্ছপ দেখিলে বড়ই আনন্দানুভব করিয়া থাকে।

    জাপানবাসিরা সর্ব্বদাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিতে ভালবাসে। অনেকে প্রত্যহ তিনবার স্নান করিয়া থাকে। এখানে প্রতি গৃহস্থের বাটীতে কয়েকটী ফুলের গাছ, একখণ্ড ক্রীড়াভূমি ও একটী কূপ দেখিতে পাওয়া যায়। জাপানীরা প্রাণ ভরিয়া মুক্তবায়ু সেবন করিতে পারিলে বড়ই প্রফুল্ল হয়।

  • ধর্ম্মপ্রণালী।

    ধর্ম্মপ্রণালী।

    আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, শিণ্টোধর্ম্ম জাপানের প্রাচীন ধর্ম্ম। এক্ষণে এই ধর্ম্মাবলম্বী লােকদিগকে সিন্‌জু বলে। সূর্য্যসহধর্ম্মিনী অমতেরাশু বা উষাদেবী সিনজুগণের আরাধ্যা দেবী। দেশের নানাস্থানে মিয়াসিয়া নামে সিনজুদিগের ধর্ম্মমন্দির আছে। মন্দিরের পুরােহিতগণ নেগি ও কানিগি নামে অভিহিত হইয়া থাকে। সিন্‌জুগণ মস্তক মুণ্ডন করে না। ইহারা বিবাহ গৌরবের বিষয় বলিয়া মনে করে। সিন্‌জুদিগের একটী বিশেষত্ব এই যে, ইহারা গাত্রবস্ত্রে ও শিরস্ত্রাণে স্বীয় নাম ও বাসস্থান প্রভৃতি আবশ্যকীয় পরিচয় লিখিয়া রাখে। ইহারা মাসের প্রথম, পঞ্চদশ ও অষ্টাবিংশতি দিবসে উপাসনা ভিন্ন অন্য কোন গৃহকার্য্য করে না। সিনজুগণ রাজাজ্ঞাপালন, তীর্থ ভ্রমণ, ভিখারীভোজন, পুণ্যদিনে দান করণ ইত্যাদি কার্য্য ইহলোক ও পরলোকের কল্যাণপ্রদ বলিয়া বিশ্বাস করে।

    খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে চীনদেশীয় প্রচারকগণ জাপানে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। এই সময়ে জাপানে শিণ্টোধর্ম্ম, ভারতীয় তান্ত্রিকধর্ম্ম ও চীনদার্শনিক কনফিউসিয়াস্ প্রবর্ত্তিত একটী প্রাচীন ধর্ম্ম বিদ্যমান ছিল।

    এক্ষণে জাপানের অধিকাংশ ব্যক্তিই বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী। প্রায় প্রতি পল্লীতেই বৌদ্ধধর্ম্মমন্দির ও যাজক দেখিতে পাওয়া যায়।

    জাপানে প্রত্যেক গৃহস্থের বাটীতে তিনটী পবিত্র স্থান আছে। প্রথম, কামিদানা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্ত্তা ভগবানের পূজাস্থান; দ্বিতীয়, বুদসুদান অর্থাৎ বুদ্ধবেদী; তৃতীয়, ইউজি-গেমি অর্থাৎ কুলদেবতা-গৃহ। এই সকল স্থানে প্রত্যহ যথারীতি পূজা হইয়া থাকে। সিনজুগণ দেবতার সম্মুখে দর্পন, শুভ্রবস্ত্র ও পানপাত্র স্থাপন করিয়া চাউল, সাকি ও বিবিধ মৎস্যসহযোগে উপাসনায় প্রবৃত্ত হইয়া থাকে। বৌদ্ধগণ দেবপূজায় মৎস্য ব্যবহার করে না। টৌরীশাখা, কদলীপত্র ও বিচালিনির্ম্মিত রজ্জু দেবকার্য্যে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। পূজাগৃহে প্রত্যহ দীপদান করা হয়।

    রাজ প্রাসাদে তিনটী পবিত্র মন্দির আছে। ১ম,—কাশিকোদোকোরো; এইখানে প্রত্যহ অমতেরাশু অর্থাৎ উষাদেবীর অর্চ্চনা হইয়া থাকে। ২য়,—কোরাইদেন; এই মন্দিরে সম্রাটের পূর্ব্বপুরুষগণের উদ্দেশে প্রত্যহ পূজা হইয়া থাকে। ৩য়,—শিনদেন; এইখানে বহুসংখ্যক দেবদেবীসহ ভগবান অমিতাভ অর্থাৎ বুদ্ধদেবের পূজা হইয়া থাকে।

    জাপানবাসী সিনজু ও বৌদ্ধদিগের মধ্যে কাহারও মৃত্যু হইলে আত্মীয় স্বজনেরা মৃতের ঔর্দ্ধদৈহিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন করিয়া থাকে। বৌদ্ধেরা ৭ দিনে প্রথম শ্রাদ্ধ, ১৪ দিনে দ্বিতীয় শ্রাদ্ধ এইরূপে ৪৯ দিনে ৭টী শ্রাদ্ধ করিয়া শুদ্ধ হইয়া থাকে। সিনজুগণের মধ্যে কি-নিচি (দিন-শ্রাদ্ধ) সাে-সুকি (মাসিক-শ্রাদ্ধ) ও লেন-কি অর্থাৎ বার্ষিক শ্রাদ্ধের প্রথা প্রচলিত আছে। বার্ষিক শ্রাদ্ধ সিনজুগণের মধ্যে ১, ৫, ১০, ২০, ৩০, ৪০ ও ৫০ বৎসরে এবং বৌদ্ধগণের মধ্যে ১, ৩, ৭, ১৩, ১৭, ২৩, ২৭, ৩৩, ৩৭, ৪৩, ৪৭, ৫০ ও ১০০ বৎসরে হইয়া থাকে। শ্রাদ্ধকার্য্য নিজগৃহে, কোন তীর্থস্থানে বা দেবমন্দিরে পুরােহিত কর্ত্তৃক সম্পাদিত হইয়া থাকে।

    বর্ত্তমানে জাপানে একাদশটী মহােৎসব হইয়া থাকে। যথা, সেনসাই, (নববর্ষ) এইদিনে সম্রাট স্বয়ং জীমুতমনু ও নিজপিতা কেমিয়ামনুর পূজা করিয়া থাকেন। ২য় জেনসাই, (শীতোৎসব) ৩য় সিনেন-ক্বোয়াই, (বর্ষপূজা) ৪র্থ কেমিয়াসাই, এই দিনে সম্রাটের পিতার মৃত্যুতিথি পূজা হইয়া থাকে। ৫ম কিজেন সেটসু, জাপানের সর্ব্বপ্রথম সম্রাটের সিংহাসনারােহণ উপলক্ষে প্রতিবর্ষের ১১ই ফেব্রুয়ারি তারিখে এই উৎসব হইয়া থাকে। ৬ষ্ঠ সিউনকি-কোরি, (বসন্তোৎসব) প্রতিবর্ষের ২০ মার্চ্চ তারিখে হইয়া থাকে। ৭ম জীমুতমনু সাই, প্রতিবর্ষের ৩ এপ্রিল তারিখে হইয়া থাকে। ৮ম জিউকি-কোরি-সাই (শরতােৎসব) প্রতিবর্ষের ২৩শে সেপ্টেম্বর তারিখে এই পর্ব্ব উপলক্ষে সকলেই পূর্ব্বপুরুষগণের পূজা করিয়া থাকে। ৯ম কালেম-মাৎসুরি বা সিনশো সাই (নবান্ন) ১০ম তেনচো-সেটসু (বর্ত্তমান সম্রাটের জন্মদিন) ১১শ নমনো মাৎসুরি, ২৩শে নবেম্বর তারিখে নূতনধান্য ছেদন উপলক্ষে এই উৎসব হইয়া থাকে।

    এতদ্ভিন্ন জাপানে আরও কয়েকটী জাতীয়-উৎসব প্রচলিত আছে।

    ভগবান গৌতম বুদ্ধ স্বীয় শিষ্যবর্গের মধ্যে যে কয়টী নিষেধাজ্ঞা প্রচার করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে সেসিত (অহিংসা) ফুলতা (চুরি না করা) সিজেন (সৎশীলতা) সেগো (সত্যবাদিতা) প্রভৃতি কয়েকটী অনুশাসন জাপানবাসী বৌদ্ধগণের মধ্যে প্রবল দেখা যায়।

    ১৫৪৯ খৃষ্টাব্দের ১৫ই আগষ্ট তারিখে ফ্রান্সিস জেভিয়ার জাপানে আগমন পূর্ব্বক খৃষ্টধর্ম্ম প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। এইরূপ শুনা যায়, তিনি নিংসিট নামক জনৈক অশীতিবর্ষীয় বৌদ্ধ যাজককে তর্কযুদ্ধে পরাস্থ এবং একটী মৃতাবালিকাকে মন্ত্রবলে পুনর্জীবিত করিয়া জাপানে অপূর্ব্ব প্রতিপত্তি লাভ করেন। ফলতঃ জেভিয়ারের যত্নেই জাপানে খৃষ্ট মাহাত্ম্য প্রথম প্রচারিত হয়, তাঁহারই চেষ্টায় আমকুশা দ্বীপস্থ সমগ্র নরনারী খৃষ্টধর্ম্মে দীক্ষিত হয়।

    ১৫৮৭ খৃঃ সেনাপতি টয়োটমার আদেশানুসারে খৃষ্টধর্ম্ম প্রচারকেরা জাপান পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন। তদবধি বহু বৎসরমধ্যে খৃষ্টধর্ম্ম জাপানে মস্তকোত্তোলন করিতে সাহসী হয় নাই। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে জেসুইট প্রচারকদিগের যত্নে জাপানে পুনরায় খৃষ্টধর্ম্মের প্রচার আরম্ভ হয়। ইহাতে কুপিত হইয়া জাপানের ১১৪শ সম্রাট মিকাডো সাকুরামাচি ১৭৩৮খৃঃ ১২ই এপ্রেল তারিখে রাজ্যের নানাস্থানে ৩৭ হাজার খৃষ্টান প্রজাকে নিহত করিয়া ফেলেন।

    অধুনা জাপানে খৃষ্টশিষ্যগণের সঙ্খ্যা সামান্য নহে।

    আজিকালি জেনারল বুথের মুক্তিফৌজ, কর্ণেল অলকটের থিয়সফি, আনি বেসন্তের বৈজ্ঞানিক ধর্ম্ম প্রভৃতি বিবিধ ধর্ম্মমত জাপানের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান আছে।

  • ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: নবযুগ।

    ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: নবযুগ।

    বলিতে গেলে, সােগানাধিপত্য অবসানের পর বৎসরে—১৮৬৮ খৃঃ অব্দে—প্রাচীন জাপান নবজীবন প্রাপ্ত হয়। এই বৎসরে “মেইজি” অব্দের প্রবর্ত্তন হয়। এই বৎসরে রাজধানী কিয়াটো নগর হইতে জেডো নগরে স্থানান্তরিত হয়। এই বৎসরেই জেডো নাম পরিবর্ত্তিত হইয়া উহা টোকিয়ো অর্থাৎ প্রাচ্য রাজধানী নামে অভিহিত হয়।

    প্রথম মেইজি অব্দে মিকাডো মেঘমুক্ত প্রভাকরের ন্যায় সিংহাসনে প্রতিভাত হইয়া, একখানি ঘোষণা পত্র প্রচার করেন। এই পত্রে নিম্নলিখিত পাঁচটী বিষয় লিখিত হইয়াছিল। যথা,— (১) রাজ্যের যাবতীয় কার্য্য দেশের বিদ্বান সম্প্রদায় কর্ত্তৃক পরিচালিত হইবে। (২) প্রাসাদবাসী সম্রাট হইতে পর্ণকুটীরবাসী কৃষক পর্য্যন্ত সকল ব্যক্তিকেই জাতীয় উন্নতির জন্য আত্মােৎসর্গ করিতে হইবে। (৩) দেশের অধিবাসী মাত্রেই দেশীয় শিল্পের সহায়তা করিবেন। (৪) প্রাচীন রাজনীতির সংস্কার হইবে। (৫) জাতীয় সঞ্জীবন শক্তির অনুকূল শিক্ষাপ্রণালী প্রবর্ত্তিত হইবে।

    এই ঘােষণা প্রচারের কতিপয় বৎসর পরে, ১৮৮৯ খৃঃ ১১ই ফেব্রুয়ারী তারিখে সম্রাট আর একটী ঘােষণা প্রচার দ্বারা জাতীয় মহা সমিতি গঠন করেন। সভ্যতাভিমানী ইয়ুরােপীয় রাজন্যবর্গ নররুধিরে বসুন্ধরা সিক্ত হইতে দেখিয়াও প্রজা সাধারণকে যে অধিকার প্রদান করিতে সঙ্কোচ বােধ করেন, জাপান সম্রাট স্বয়ং উদ্যোগী হইয়া প্রজাগণকে সেই অধিকার প্রদান করিলেন।

    এসিয়া খণ্ডে জাপানেই সর্ব্বপ্রথমে রাজার শাসনদণ্ড প্রজার হস্তগত হয়। এই প্রাচ্য মহাসাগরের ক্ষুদ্রদ্বীপের অধীশ্বরকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া তাঁহার প্রজারা শাসনদণ্ড গ্রহণ করে নাই। রাজা স্বেচ্ছায়, উপযাচক হইয়া প্রজাদিগের হস্তে শাসন ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিলেন। এরূপ মহানুভবতা জগতের ইতিহাসে অতি বিরল। যে শাসনক্ষমতা লাভ করিবার জন্য রুষিয়ার কোটী কোটী প্রজা বহু বৎসর হইতে প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে, নরশােণিত ধারায় পৃথিবী কর্দ্দমাক্ত করিতেছে, সেই শাসনদণ্ড জাপানীরা অযাচিত ভাবে প্রাপ্ত হইয়াছে। জাপান সম্রাট মৎসুহিতো দেখাইয়াছেন যে, এক কালে যে বৌদ্ধ নরপতিগণ পরের সেবার জন্য আপনার যথাসর্ব্বস্ব দান করিয়া ভিক্ষুক হইতেও কুণ্ঠিত হইতেন না, তিনি সেই শ্রেণীর বৌদ্ধ নৃপতিগণেরই অন্যতম। তিনি পরের কল্যাণ কামনায় সুদুর্লভ রাজশক্তি পরিত্যাগ করিতে মুহূর্ত্ত মাত্র ইতস্ততঃ করিলেন না। জাপান সম্রাট এখন প্রজাবৃন্দের হস্তে রাজদণ্ড সমর্পণ পূর্ব্বক তদ্বিনিময়ে প্রজার নিকট হইতে অনন্যসুলভ শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রাপ্ত হইয়াছেন। প্রজার শ্রদ্ধাভাজন হইয়া তিনি কেবল রাজমুকুট ও রাজ সিংহাসন লইয়াই সন্তুষ্ট আছেন।

    অদ্য উনচত্বারিংশৎবর্ষ মাত্র হইল, মেইজি অব্দ প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। এই অনতিদীর্ঘসময়মধ্যে নব্য জাপান যে অনন্যসাধারণ উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে অপূর্ব্ব। এই স্বল্পসময় মধ্যে পৃথিবীর কোনও জাতি এতাদৃশ উন্নতিলাভে সমর্থ হয় নাই। এই উন্নতির গুঢ়তত্ত্ব সম্বন্ধীয় সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা যথাক্রমে লিপিবদ্ধ করিতেছি।

    জাপানের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণ।

    রাজ পরিবার ।

    জাপানের বর্ত্তমান সম্রাট মৎসুহিতো ১৮৫২ খৃষ্টাব্দের ৩রা নবেম্বর তারিখে কিয়াটো নগরে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি নিপণের সর্ব্বপ্রথম সম্রাট জীমূতমনু হইতে ১২০ পুরুষ অধস্তন। ইঁহার পিতার নাম কেমিয়ামনু ও মাতার নাম অশােকা। ইনি ১৮৬৬ খৃঃ অব্দের ১৩ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মিকাডো অর্থাৎ দেবতার প্রতিনিধি উপাধি ধারণ করিয়া জাপানের রাজসিংহাসনে আরােহণ করেন। এই অব্দের ১২ই অক্টোবর তারিখে মহাআড়ম্বর সহকারে সম্রাটের মুকুটোৎসব সম্পন্ন হয়।

    মৎসুহিতো মিকাডোর ন্যায় বুদ্ধিমান, কার্য্যতৎপর, শান্তিপ্রিয়, অশেষগুণসম্পন্ন, প্রজারঞ্জক নরপতি পৃথিবীতে অধিক দৃষ্ট হয় না। মিকাডো রাজকোষ হইতে প্রতিবর্ষে ৪৫ লক্ষ মুদ্রা পাইয়া থাকেন। ইহা ভিন্ন পূর্ব্বপুরুষ-সঞ্চিত প্রচুর স্বর্ণমুদ্রায় ও মণি মাণিক্যে তাঁহার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ। জনৈক ইয়ুরােপীয় পরিব্রাজক বলেন, এই সঞ্চিত ধনের মুল্য দুই শত কোটী টাকার ন্যূন হইবে না। সম্রাট অশ্বারােহণে ভ্রমণ করিতে বড় ভাল বাসেন। তাঁহার মন্দুরায় নানাদেশীয় অতি উৎকৃষ্ট অশ্ব আছে। সদগ্রন্থ ও সংবাদপত্র পাঠে সম্রাটের সমধিক অনুরাগ দৃষ্ট হয়। তিনি মধ্যে মধ্যে কবিতা রচনা করিয়া সময়ের সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন। সম্রাট প্রজামাত্রকেই সন্তানের ন্যায় দর্শন করিয়া থাকেন।1

    সম্রাটমহিষী হারুকো ১৮৫০ খৃঃ ২৪শে মে তারিখে ভূমিষ্ঠ হয়েন। ১৮৬৯ অব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মিকাডোর সহিত ইহাঁর উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মিকাডো মহিষী পতিব্রতা, বিদুষী ও কার্য্যপ্রিয়া বলিয়া বিখ্যাত। অসংখ্য দাসদাসীতে রাজপ্রাসাদ পরিপূর্ণ থাকিলেও, ইনি স্বহস্তে সংসারের বিবিধকার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকেন। সাম্রাজ্যের হিতকর যে কোন কার্য্যেই সম্রাটমহিষীর সহানুভূতি দৃষ্ট হয়। রাজ্যের কত দীন, পীড়িত ও নিরন্ন পরিবার যে সাম্রাজ্ঞীর অর্থসাহায্যে রক্ষা পাইতেছে, কেহ তাহার সংখ্যা করিতে পারে না। সম্রাটের ন্যায় ইনিও সুকবি বলিয়া প্রসিদ্ধ।

    বহু সন্ততির জনক জননী হইলেও সম্রাটদম্পতির সন্তান ভাগ্য প্রসন্ন নহে। তাঁহাদের প্রথম পুত্র ও প্রথমা কন্যা ভূমিষ্ঠ দিবসেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ২য়, ৪র্থ ও ৫ম পুত্র এবং ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ১০ম কন্যা ভূমিষ্ঠের অল্পদিবস মধ্যেই ইহলােক হইতে অপসারিত হয়। এক্ষণে তৃতীয় পুত্র এবং ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী কন্যা জীবিত আছেন। মাসাকো, ফুসাকো, নবুকো ও একিকো নাম্নী রাজকন্যা চতুষ্টয় জননীর ন্যায় বিদ্যাবতী ও গুণবতী বলিয়া পরিচিতা।

    সম্রাটের তৃতীয় পুত্র যশােহিত হারুনোমিয়া বহু পরিমাণে পিতৃগুণসম্পন্ন। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দের ৩১শে আগষ্ট তারিখে ইহাঁর জন্ম হয়। ১৮৮৮ খৃঃ ৩রা নবেম্বর তারিখে ইহাঁকে “কৌতেসী” অর্থাৎ জাপানের যুবরাজ বলিয়া ঘােষিত করা হয়। ১৯০০ অব্দের ১০ই মে তারিখে সাদাকো নাম্নী জনৈকা গুণবতী আভিজাতকুমারীর সহিত যুবরাজের বিবাহ হয়। পর বৎসর ২৯শে এপ্রেল তারিখে যুবরাজদম্পতির প্রথম পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। তাহার নাম হিরােহিত। যুবরাজের দ্বিতীয় পুত্র বাশুহিত ১৯০২ খৃঃ ২৫শে জুন তারিখে ভূমিষ্ঠ হয়েন। তৃতীয় পুত্র নবুহিত, গত ১৯০৫ অব্দের ৩রা জানুয়ারি তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।


    মার্কুইস হিরােবুমি আইটো।——ইনি জাপানের চাণক্য বলিয়া পরিচিত। ইহাঁর ন্যায় মন্ত্রণানিপুণ ও রাজনীতিবিশারদ ব্যক্তি সমগ্র জাপান-মধ্যে দৃষ্টিগােচর হয় না। ইনি ১৮৬৩ খৃঃ গোপনে জন্মভূমি পরিত্যাগ পূর্ব্বক সর্ব্বপ্রথমে ইংলণ্ডে গমন করেন। আইটো এই সময় “ন্যাভিগেশন” “ষ্টীমার” প্রভৃতি দুই চারিটী শব্দ ব্যতীত ইংরেজী ভাষার কিছুই জানিতেন না। ইনি স্বদেশে প্রত্যাগত হইয়া সর্ব্বপ্রথমে ইয়ুরােপের অনুকরণে জাপানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয় এক্ষণে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত সংযুক্ত হইয়াছে। ইহাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাচীন জাপান জীর্ণবাস পরিত্যাগ করতঃ নূতন বস্ত্র পরিধান করিয়াছে।

    আইটো রাজনীতি ও শিক্ষাপ্রণালীর সংস্কার সাধনে উদ্যোগী হইলে জাপানের রক্ষণশীলদল তাঁহার ভীষণ শত্রু হইয়া উঠে। পরিশেষে এই শত্রুতা এত প্রবল হইয়াছিল যে একদিন অপরাহ্নে চা-গৃহে গমনকালে ইনি পথিমধ্যে শত্রুগণের হস্তে আক্রান্ত হন। একটী জাপানীবালিকা নিজ কুটীরে আশ্রয় দিয়া সে যাত্রা তাঁহার জীবন রক্ষা করে। আশ্চর্য্যের বিষয় আইটো কিছুদিন পরে এই দয়াবতী রমণীকে পত্নীরূপে প্রাপ্ত হয়েন।

    মার্কুইস মহােদয় এক্ষণে প্রাচীন হইয়াছেন। জাপানবাসিরা ইহাঁকে দেবতার ন্যায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিয়া থাকে। ইনি এক্ষণে সম্রাটের বিশেষ অনুরােধে কোরিয়া রাজ্যে জাপান রাজপ্রতিনিধির কার্য্য করিতেছেন।

    মার্কুইস আরিযোশী ইয়ামাগাটা।——জাপানের সর্ব্বপ্রথম সেনাপতি। ইহাঁর বিদ্যা, বুদ্ধি ও বিক্রম অসাধারণ। বয়ষ ৭২ বৎসর হইলেও মার্কুইসের দেহের ও মনের তেজ অদ্যাপিও হ্রাস হয় নাই। ইনি এক্ষণে ফিল্ডমার্শাল উপাধি ধারণ করিয়া স্বদেশের সৈন্যগঠন কার্য্যে নিযুক্ত আছেন।

    কাউণ্ট কাটসুরা।——গত রুষ জাপান যুদ্ধের সময়ে ইনি জাপানের “দৈজো-দেজিন”, অর্থাৎ প্রধান মন্ত্রিপদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় ইনি ইয়ামাগাটার প্রিয়শিষ্য এবং কুটমন্ত্রণায় আইটোর সমকক্ষ। ইহাঁর কৌশল ও সুমন্ত্রণায় জাপান সাম্রাজ্য অল্প দিবসেই সভ্যজগতের মধ্যে পরিগণিত হইয়াছে।

    মার্কুইস সৈয়নজি কিনমৎসু,—— বর্ত্তমান বৎসরে (১৯০৬ খৃ) ইনি জাপানের প্রধান মন্ত্রীপদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে ইনি জাপানের অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য সম্বন্ধে যেরূপ অসাধারণ উন্নতি সাধন করিয়াছেন, তাহাতে ইহাঁর বুদ্ধিমত্বা ও কার্য্যতৎপরতার সম্যক পরিচয় পাওয়া গিয়াছে।

    ব্যারণ কমুরা,——গত মহাযুদ্ধের সময়ে ইনি জাপানের পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন। জাপান সাম্রাজ্যের মধ্যে ইনি একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক বলিয়া পরিচিত। ইনি আমেরিকার পাের্টস্‌মাউথ নগরে উপস্থিত থাকিয়া রুষ-জাপান যুদ্ধের সন্ধিপত্রে জাপান সম্রাটের পক্ষে নাম স্বাক্ষর করেন। ব্যারণ মহােদয় এক্ষণে জাপানের রাজদূত স্বরূপে ইংলণ্ডে অবস্থান করিতেছেন।

    কাউণ্ট কাটোটাকাকী,——বর্ত্তমান বৎসরে ইনি জাপানের বৈদেশিক মন্ত্রীপদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।

    কাউণ্ট অকুমা,——ইতিপূর্ব্বে জাপানের রাজস্ব সচিব ছিলেন। ইনি সর্ব্বদাই অকপট চিত্তে দেশের উপকার করিয়া থাকেন। সমগ্র রাজ্যমধ্যে ইহাঁর শত্রু নাই। ইহাঁর ন্যায় সরলভাষী, সুবক্তা ও লেখক জাপান রাজ্যে অধিক দৃষ্ট হয় না।

    ব্যারণ সাকাটানি যশিরো,——জাপানের বর্ত্তমান রাজস্ব-মন্ত্রী। ইনি অল্পদিবস মধ্যে জাপানের রাজস্ববিষয়ক বিবিধ উন্নতি সাধন করিয়াছেন। সাম্রাজ্যের আয়ব্যয় সম্বন্ধীয় প্রত্যেক বিভাগেই ইহাঁর প্রখর দৃষ্টি দেখিতে পাওয়া যায়।

    লেপ্টনাণ্ট জেনারল টেরাউচি,——ইনি এক্ষণে জাপানের যুদ্ধমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত রহিয়াছেন। ইহাঁর ন্যায় সুকৌশলী কূটমন্ত্রণানিপুণ সেনাপতি পৃথিবীতে বিরল। ইহাঁর কার্য্য সকল বিদ্যুতের ন্যায় মহাদ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়।

    মার্কুইস ওয়ামা,——বয়ষ ৬২ বৎসর। গত মহাযুদ্ধে ইহাঁর অদ্ভুত রণপাণ্ডিত্য ও অসাধারণ সৈন্য পরিচালনাশক্তি দর্শন করিয়া সভ্যজগৎ স্তম্ভিত হইয়াছিল। গৃহে পরিজনগণের নিকটে ইনি ভদ্র, শান্ত ও হাস্যবদন; কিন্তু রণক্ষেত্রে, শক্রসমক্ষে কালান্তক শমন। ইনি ১৮৯৪ খৃঃ চীনজাপান যুদ্ধে অশীতি সহস্র সৈন্য লইয়া যুদ্ধে জয়লাভ করেন। গত রুষজাপান যুদ্ধে ইনি প্রধান সেনাপতি রূপে অসংখ্য জাপানবাহিনী পরিচালিত করিয়াছিলেন। ইহাঁর দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ ফুট হইবে। মার্কইসের পত্নী জাপান সাম্রাজ্যমধ্যে বিদুষী বলিয়া পরিচিতা। ইহাঁর দুইটী পুত্র ও একটী কন্যা আছে।

    কাউণ্ট নডজু,——বয়স ৬১ বৎসর। সকলের বিশ্বাস ইহাঁর ন্যায় রণনিপুণ সেনাপতি জাপানে আর নাই। কাউণ্ট মহাশয় মহাযুদ্ধ ভিন্ন আনন্দানুভব করেন না। সৈন্যগণ মধ্যে ইহাঁর বিশেষ প্রতিপত্তি আছে। ইনি জাপানিগণ মধ্যে মহাবলশালী ও কুস্তিকুশল ব্যক্তি বলিয়া বিখ্যাত। গত মহাযুদ্ধে ইনি জাপান অনীকিনীর মধ্যভাগ পরিচালন করিয়া অদ্ভুত সমরনৈপুণ্যের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন।

    ব্যারণ কুরোকী,——বয়ষ ৬১ বৎসর। এইরূপ শুনা যায়, ইহাঁর পিতা রুষাধিকৃত পােলণ্ডদেশ হইতে জাপানে আগমন করিয়াছিলেন। কামানের গভীর গর্জ্জন, আহতের হৃদয়বিদারী আর্তনাদ, মুমূর্ষুর কাতরতা, কিছুতেই ইহাঁর ভ্রুক্ষেপ নাই। ব্যারণ মহােদয় মৃত্যুকে অতি তুচ্ছ বলিয়া মনে করেন। রণক্ষেত্র তাঁহার নিকট ক্রীড়াক্ষেত্র স্বরূপ প্রতীয়মান হয়। গত মহাযুদ্ধে ইনি জাপান চমূর দক্ষিণপার্শ্ব পরিচালনা করিয়াছিলেন।

    কাউণ্ট ওকু,——বয়ষ ৬৫ বৎসর। ইহার মুখশ্রী সুন্দর ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সুগঠিত। কাউণ্টের বেগ প্রতি প্রচণ্ড। ইনি যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও বিঘ্ন অনতিক্রম্য বলিয়া বিশ্বাস করেন না। কাউণ্ট মহােদয় জীবনের কোন সময়েই শত্রুগণকে হাস্য করিবার অবসর প্রদান করেন নাই। মহামহিম ভারত সম্রাটের মকুটোৎসব সময়ে ইনি দিল্লী নগরীতে শুভাগমন করিয়াছিলেন। গত মহাযুদ্ধে ইনি জাপান সৈন্যের বামপার্শ্ব রক্ষা করিয়াছিলেন।

    কাউণ্ট নগী,——ইহার ন্যায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও কঠোর অন্তঃকরণবিশিষ্ট সেনাপতি জাপান সাম্রাজ্যে দেখিতে পাওয়া যায় না। এ পর্যন্ত কেহই ইহাঁর নয়নে শােকাশ্রু বহির্গত হইতে দেখে নাই। কাউণ্ট লক্ষপতি হইয়াও অতি দীনপ্রজার ন্যায় জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিয়া থাকেন। সম্রাট ও স্বদেশ ভিন্ন কাহারও উপরে তাঁহার মায়া মমতা নাই। গত মহাযুদ্ধে ইনি আর্থার বন্দর অধিকার করিয়া সমগ্র পৃথিবীবাসীর বিস্ময় উৎপন্ন করিয়াছিলেন। এই কালসমরে তাঁহার দুইটী পুত্রেরই মৃত্যু হয়।

    ভাইস এডমিরাল সেটো মিনরু,——বর্ত্তমান বৎসরে ইনি জাপানের জলযুদ্ধ বিভাগের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। ইনি পৃথিবীর নানারাজ্য পরিভ্রমণ করিয়া প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জ্জন করিয়াছেন।

    এডমিরাল টোগো,——ইংরাজেরা ইহাঁকে জাপানের নেলসন বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকে। গত মহাযুদ্ধে ইহাঁর জলযুদ্ধকৌশল দর্শন করিয়া সমগ্র সভ্যজগৎ বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়াছে। ইহাঁর সংকল্প স্থির ও অধ্যবসায় অসাধারণ। মন্ত্রগুপ্তিতে পৃথিবীর কোন সেনাপতিই ইহাঁর সমকক্ষ নহেন। এডমিরাল মহোদয় কোন সময়েই অধিক কথা কহিতে ভাল বাসেন না। ইহাঁর গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলে, তাহা নিতান্ত দীনব্যক্তির কুটীর বলিয়া অনুভব হয়। সম্প্রতি রাজ-চিত্রকর মরূকী জাপানের নানাস্থানে ইহাঁর ছায়াচিত্র বিক্রয় করিতে আরম্ভ করায়, ইনি নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন। ইহাঁর পুত্র ও কন্যাগণও সর্ব্বাংশে পিতৃগুণবিশিষ্ট। এডমিরাল মহোদয় অল্পকাল মধ্যেই ইংলণ্ডে গমন করিবেন বলিয়া সমগ্র ইয়ুরােপ ব্যাপিয়া হুলস্থুল পড়িয়া গিয়াছে। ইনি এক্ষণে জাপানের প্রধান নৌসেনাপতিপদে অবস্থিত রহিয়াছেন।

    এডমিরাল ক্যামিমুরা,——জাপানের দ্বিতীয় নৌসেনাপতি। গত মহাযুদ্ধে ইনি ভ্যালাডিবােষ্টক বন্দর অবরূদ্ধ করিয়া ছিলেন।

    ভাইস এডমিরাল কটাক্ষ,——জাপানের নৌসেনাপতি। ইহাঁরই বুদ্ধিকৌশলে অতি অল্প সময় মধ্যে রুষাধিকৃত সাগালিয়ন জাপান সৈন্যের হস্তগত হয়।

    ব্যারণ শিবসহা,——ইনি জাপান সাম্রাজ্যের কুবের বলিয়া পরিচিত। ইহাঁর মূলধন শতকোটী মুদ্রার অধিক হইবে। ইনি বুদ্ধিমান, সুলেখক ও প্রাচীন বলিয়া সর্ব্বত্র সম্মানিত। অর্থনীতি ও বার্ত্তাশাস্ত্রে ইহাঁর প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে। গত মহাযুদ্ধে ব্যারণ মহােদয় সমস্ত সম্পত্তিই সম্রাটচরণে উৎসর্গ করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে যাইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলে, সম্রাট তাঁহাকে ধন্যবাদ দিয়া নিবৃত্ত করেন।

    ইহা ব্যতীত জাপানে আরও বহুসংখ্যক কৃতবিদ্য ও কার্য্যকুশল ব্যক্তি অবস্থিতি করিতেছেন। যাঁহারা পৃথিবীর নানাস্থানে দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত রহিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই সুপণ্ডিত ও রাজনীতি বিশারদ। এক্ষণে জাপানে প্রিন্স ১২ জন, মার্কুইস ৩৪ জন, কাউণ্ট ৯০ জন, ভাইকাউণ্ট ৩৬২ জন ও ব্যারণ উপাধিধারী ২৮৭ জন সুশিক্ষিত ও বহুশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বিদ্যমান আছেন।

  • ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: মধ্যযুগ।

    ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: মধ্যযুগ।

    বৌদ্ধধর্ম্ম কোন সময়ে জাপানে প্রবেশ লাভ করিয়াছিল, কোন সময়ে জাপানিগণের রীতিনীতি, আচারব্যবহার বৌদ্ধ ভাবাপন্ন হইয়াছিল তাহা নিশ্চয়রূপে বলিতে পারা যায় না। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দের পূর্ব্বে যে জাপানে বৌদ্ধসভ্যতা প্রচলিত ছিল, তাহার কোন নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায় না।10

    ইয়ুরােপীয় পণ্ডিতগণের অনুমান, চীনের বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই সর্ব্বপ্রথমে জাপানে গমন করিয়া, তথায় বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচারের পথ উন্মুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু এক্ষণে নানাস্থান হইতে যেরূপ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে, তাহাতে স্পষ্টই প্রতীত হয় যে, জাপানে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রবেশের বহুপূর্ব্বে তথায় প্রাচীন আর্য্যসভ্যতা ও ভারতীয় তান্ত্রিক ধর্ম্মের বিস্তার হইয়াছিল।

    জাপানের প্রাচীন ইতিহাস পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দে যে সমস্ত ব্যক্তি জাপানে ভারতবাসী বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ তন্ত্রশাস্ত্রে সুনিপুণ ও কেহ কেহ ঐন্দ্রজালিক বিদ্যায় সুপণ্ডিত ছিলেন। কাই (Kii) প্রদেশীয় একটী উষ্ণ প্রস্রবণের নিকটে কয়েকজন হিন্দু সন্ন্যাসী বাস করিতেন। এইরূপ শুনা যায়, ইঁহাদিগের মধ্যে একজন নগ্ন ছিলেন এবং ইঁহার দৃষ্টি সর্ব্বদাই দক্ষিণদিকে থাকিত।

    জাপানের ইতিহাসে বােধিসেন ভারদ্বাজ নামক একজন ভরদ্বাজ বংশীয় ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে। ইনি ভারতবর্ষ হইতে সমুদ্রপথে কোচীন-চীনে আগমন করেন, তথায় কিছুকাল অতিবাহিত করিয়া “ফোচে” নামক চীন দেশীয় পণ্ডিতের সহিত জাপানের “ওসাকা” নগরে উপস্থিত হন। বােধিসেন প্রায় চতুর্বিংশতি বর্ষকাল জাপানে অতিবাহিত করেন। ইঁহার মৃত্যুর পর, স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ, তাঁহার সমাধিস্থানে একখণ্ড প্রস্তর প্রােথিত হয়। অদ্যাপিও জাপানের সুবিখ্যাত নারা প্রদেশে বােধিসেন ভারদ্বাজের প্রতিষ্ঠিত মঠ ও স্মৃতি প্রস্তরফলক বর্ত্তমান আছে। “মান্‌জো-শিউ” নামক জাপানের প্রচীন পদ্য সংগ্রহ পুস্তকে “ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মণ ও বায়সের উপাখ্যান” নামক একটী ক্ষুদ্র কবিতা লিখিত আছে।11

    চীন ত্রিপিটকান্তর্গত12 গ্রন্থাবলী পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, চীন দেশীয় ধর্ম্মপ্রচারকগণ সপ্তম শতাব্দ হইতে দশম শতাব্দ পর্য্যন্ত জাপানবাসিগণের নিকট বৌদ্ধধর্ম্ম ও বৌদ্ধনীতির মহিমা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন।

    সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে সাম্রাজ্ঞী সু-ইকো জাপানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিতা ছিলেন। তিনিই এ দেশের প্রথম স্ত্রী-শাসনকর্ত্রী। বৌদ্ধধর্ম্মে তাঁহার অচলাভক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস থাকায় এই সময় হইতে জাপানে বৌদ্ধধর্ম্ম বদ্ধমূল হয়। এই শতাব্দীতে সপ্তজন সম্রাট ও পঞ্চজন সাম্রাজ্ঞী জাপানে রাজত্ব করেন। ভারতের বৌদ্ধধর্ম্ম ইতিহাসে প্রিয়দর্শী অশোকের ন্যায়, সাম্রাজ্ঞী কৈমিও ও সাম্রাজ্ঞী কো-কেন জাপানে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কৈমিও রাজ্যের নানাস্থানে বৌদ্ধ মন্দির নির্ম্মাণ করিয়া, প্রত্যেক মন্দিরে ভগবান শাক্যমুণির মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহার সময়ে রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে পান্থ-নিবাস, অনাথ-আশ্রম ও চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়। এই সকল কার্য্যের জন্য তিনি ব্যয় স্বীকারে অণুমাত্র কুণ্ঠানুভব করিতেন না।

    নবম শতাব্দীর মধ্য হইতে একাদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত জাপানের সর্বত্র ফুজিয়ারা বংশের বিশেষ প্রতিপত্তি হয়। জাপানী ঐতিহাসিকেরা এই সময়কে “ফুজিয়ারা সময়” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এই সময়ে ফুজিয়ারা বংশীয় কতিপয় সম্রাট ও সাম্রাজ্ঞীর যত্নে জাপানে বৌদ্ধধর্ম্মের অসাধারণ উন্নতি সাধিত হইয়াছিল।

    খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর পর হইতে মিকাডোর ক্ষমতা হ্রাস হইয়া জাপানে তৈরা ও মাইনামটো নামক দুইটি সম্ভ্রান্ত বংশের ক্ষমতা অত্যধিক বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ইঁহাদের ভয়ে ভীত হইয়া, সম্রাট ভেদনীতি অবলম্বন পূর্ব্বক উভয় বংশকে বলহীন করিয়া ফেলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তৈরা বংশে কায়ামর নামে জনৈক প্রতাপশালী ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বুদ্ধিবলে সম্রাটকে হস্তগত করিয়া, স্ব-বংশীয় প্রধান ব্যক্তিগণের সাহায্যে মাইনামটো বংশীয় নেতৃগণকে সংগ্রামক্ষেত্রে নিহত করেন।

    কালক্রমে হতাবশিষ্ট মাইনামটো বংশে যােরিটোমো নামক জনৈক বীরযুবকের উৎপত্তি হয়। কথিত আছে, তাঁহার ন্যায় অসামান্য ধীশক্তিসম্পন্ন রাজনীতিজ্ঞ ব্যক্তি জাপানে জন্মগ্রহণ করেন নাই। তিনি ১১৮০ খৃষ্টাব্দে সম্রাট টাকাকুরার সহিত নিজ সুন্দরী ও সুলক্ষণা কন্যার উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন করেন। যােরিটোমো ১১৮৪ খৃঃ অব্দে কৌশলে রাজশক্তি গ্রাস পূর্ব্বক জাপানের “দৈজো-দেজিন” অর্থাৎ প্রধান মন্ত্রীপদে সমারূঢ় হইয়া নিজেই সম্রাটের যাবতীয় কার্য্য পরিচালনা করিতে আরম্ভ করেন। কোন কোন জাপানী ঐতিহাসিকের নিকটে যোরিটোমো জাপান সাম্রাজ্যের “টাইকুন” অর্থাৎ সেনাপতি বলিয়া আখ্যাত হইয়াছেন।

    এই সময় জাপানে জায়গীর-প্রথার প্রবর্ত্তন হয়। জায়গীরদারগণ আপনাপন অধিকৃত স্থান রক্ষার ব্যয় ভিন্ন নিজেদের বেতন জন্য বৎসরে ১০ হাজার “কোকু” অর্থাৎ ত্রিশ হাজার মণ ধান্য পাইতেন। জায়গীরদারদিগকে জাপানীরা “দাইমিও” বলিত।

    ১১৮৬ অব্দে জাপানে “সোগান” অর্থাৎ রাজ্যরক্ষক নামক একটী প্রধান পদের সৃষ্টি হয়। মাইনামটো নামক প্রথম সােগানবংশ ১১৮৬ খৃঃ হইতে ১৩৩৬ খৃঃ পর্য্যন্ত রাজ্যশাসন করেন। কাকামুরা নগরে তাঁহাদের বাসভবনের ভগ্নাবশেষ অদ্যাপি দেখিতে পাওয়া যায়। আসিকাগা নামক দ্বিতীয় সোগানবংশ ২৩৭ বর্ষ পর্য্যন্ত কিয়াটো নগরে বাস করিয়া রাজ্যশাসন করেন। এই বংশে হিদো-ইযোসী নামক জনৈক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সােগান উপাধি ধারণ ধরিয়া দুইবারে কোরিয়া রাজ্যের দ্বি-তৃতীয়াংশ অধিকার করেন।

    খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে দিগ্বিজয়ী জঙ্গিস খাঁর পুত্র সুপ্রসিদ্ধ কুবলাই খাঁ অসংখ্য মােগল সৈন্য লইয়া পঙ্গপালের ন্যায় জাপান রাজ্য আচ্ছন্ন করেন। প্রায় চত্বারিংশ বর্ষব্যাপী ভীষণ যুদ্ধে তিন লক্ষ মােগল সৈন্যের মধ্যে কয়েকজন মাত্রকে লইয়া কুবলাই স্বদেশে উপস্থিত হন। এই মহাসমরে জাপানবাসিগণ যে অদ্ভুত বীরত্ব ও অপূর্ব্ব স্বদেশানুরাগ প্রদর্শন করিয়াছিল, তাহা বর্ণনা করিতেও হৃদয় কম্পিত ও শরীর লােমাঞ্চিত হইয়া উঠে।

    মহাবীর কুব্‌লাই জাতিনির্ব্বিশেষে প্রতিভার পূজা করিতেন। তিনি জাপানবাসী বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বিগণের হস্তে পরাজিত হইয়া, তাঁহার বিশাল রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম্ম বিস্তারের জন্য চীন ও জাপানবাসী লামাগণকে আহ্বান করেন। বহু তর্কবিতর্ক ও আলােচনার পরে অবশেষে বৌদ্ধধর্ম্ম তাঁহার মনঃপুত হয়।

    ১৬০৩ খৃষ্টাব্দে টোকাগুয়া বংশের জনৈক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সােগান উপাধি ধারণ করিয়া জাপানের রাজসিংহাসন অধিকার করিতে মনস্থ করেন। দীর্ঘকালব্যাপী ভীষণ গৃহযুদ্ধের পরে মিকাডােবংশ কিয়াটো নগরে (মিয়াকো) ও সোগানবংশ জেডো সহরে (টোকিও) আপনাপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই দারুণ অন্তর্বিপ্লবের বিষময়ফলে জাপানের কি রাজনৈতিক, কি সামাজিক সমস্ত উন্নতিই বহুদিনের জন্য স্থগিত হইয়া যায়।

    এই সময়ের অবস্থা বর্ণনাবসরে ইয়ুরােপীয় ও আমেরিকার ইতিহাস লেখকেরা লিখিয়াছেন;—জাপানে দুইটি নরপতি রাজত্ব করিয়া থাকেন। জেডাের রাজা রাজ্য শাসন করেন এবং কিয়াটোর রাজা বৌদ্ধধর্ম্ম রক্ষা করেন। সুপ্রসিদ্ধ জাপানী ঐতিহাসিক মিঃ ওকাকুরা “Awakening of Japan” নামক গ্রন্থে এই সময়ের জাপানের অবস্থার সহিত বর্ত্তমান ভারতবর্ষ ও চীন সাম্রাজ্যের তুলনা করিয়াছেন।

    জাপানবাসিরা বৈদেশিক জাতিগণকে বিশেষতঃ ইয়ুরোপীয় খৃষ্টান সম্প্রদায়দিগকে, বহু কাল হইতে বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসের চক্ষে দর্শন করিয়া আসিতেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইংরাজ, ফরাসী, ওলন্দাজ, পাের্টুগিস্, দিনেমার প্রভৃতি ইয়ুরােপীয় জাতিগণ বাণিজ্য ব্যপদেশে এসিয়ায় আগমন করিয়া, যেরূপ সামান্য সূত্র অবলম্বন পূর্ব্বক এই বিশাল মহাদেশ গ্রাস করিতে আরম্ভ করেন, তাহাতে জাপানীরা যে ইয়ুরােপীয়দিগকে আপনাদের ঘাের শত্রু বলিয়া মনে করিবে, তাহাতে আর আশ্চর্য্য হইবার কারণ কি? জনৈক প্রথিতনামা জাপানী ঐতিহাসিক লিখিয়াছেন,——যে দিন ইংরাজেরা বাণিজ্য উপলক্ষ করিয়া অন্যায়ভাবে রত্নগর্ভা বিশাল ভারতবর্ষ আত্মসাৎ করিল, সেইদিন হইতেই জাপানীরা ইয়ুরোপবাসিগণের চরিত্র অবগত হইয়াছে। ক্রমেই যখন খৃষ্টানেরা প্রাচ্যদেশবাসীদিগকে ভ্রষ্ট ও ধর্ম্মত্যাগী বলিয়া ঘোষণা করিতে আরম্ভ করিল, তখন হইতেই জাপানীরা ইয়ুরােপবাসীর প্রতি দারুণ বিদ্বেষভাব পােষণ করিয়া আসিতেছে।

    আমরা ইতিপূর্ব্বে যে গৃহযুদ্ধের কথা উল্লেখ করিয়াছি, তাহার বিষময়ফলে ক্রমেই জাপানের অবস্থা শােচনীয় হইতে আরম্ভ হইল। এই সময়ে—১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে—কমােডাের পেরি নামক জনৈক মার্কিণ নৌ সেনাধ্যক্ষ ৪ খানি রণতরি লইয়া জাপানে আগমন করেন। জাপান রাজ্য ও মার্কিণ সাধারণতন্ত্রের মধ্যে একটী বাণিজ্য-সন্ধি স্থাপন করাই তাঁহার অভিলাষ ছিল। এই সময়ে টোকাগুয়াবংশীয় দ্বাদশ সােগান জাপানে রাজত্ব করিতেছিলেন। তিনি পেরির প্রস্তাবে কর্ণপাত না করায়, পেরি কূপিত হইয়া পােতস্থিত কামানের সাহায্যে টোকিও উপসাগরের উপকূলবর্ত্তী নগর সমূহের উপর গােলাবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করেন। বিপদ দেখিয়া জাপানবাসী বৌদ্ধগণ যুদ্ধদেবতা কার্ত্তিকেয়ের ও সিণ্টোগণ অনশন ব্রতাবলম্বন করিয়া সমুদ্র ও ঝটিকার উপাসনা করিতে লাগিল। গত পূর্ব্ববর্ষে যে জাতির জলযুদ্ধ কৌশল দেখিয়া পৃথিবীর বীরমণ্ডলী ধন্য ধন্য করিয়াছিল, কিঞ্চিদধিক অর্দ্ধ শতবর্ষ পূর্ব্বে সেই জাতির পূর্ব্বপুরুষগণ নৌকা ও কাষ্ঠ উড়ুপে আরােহণ করিয়া পেরির সম্মুখীন হইল। এই অসম সমরের পরিণামফল বুঝিতে পারিয়া, সম্রাট ও সােগান উভয়েই পেরির প্রস্তাবিত সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিতে বাধ্য হন।

    ইহার কতিপয় বর্ষ পরে, ইংরাজ, ফরাসী প্রভৃতি ইয়ুরােপীয় জাতিগণ আমেরিকাবাসীর ন্যায় জাপানের সহিত বাণিজ্য-সন্ধি সংস্থাপন করেন। কিন্তু খৃষ্টশিষ্যগণের অদম্য জঠরানল সহজে পরিতৃপ্ত না হওয়ায়, ১৮৬৩ খৃঃ ১১ই আগষ্ট তারিখে কোগিশামা নামক স্থানে তাহাদের সহিত জাপানিগণের একটী ক্ষুদ্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বলা বাহুল্য এই যুদ্ধেও জাপানীরা সম্পূর্ণ পরাস্থ হয়।

    উপরিউক্ত ঘটনানিচয় হইতেই নিপনের নবযুগ আরম্ভ হইল। বৈদেশিক জাতির হস্তে বার বার পরাজিত হইয়া জাপানবাসীর হৃদয়ে যে গভীর ক্ষত উৎপন্ন হইল, অদ্যাপিও তাহার রক্ত নির্গম রুদ্ধ হয় নাই। পেরির উৎপীড়নে অনেকেই ব্যথিত হইয়াছিলেন। এক্ষণে ইয়ুরােপীয় খৃষ্টান জাতির আচরণ দেখিয়া সকলেরই মােহনিদ্রা ভঙ্গ হইল। জাপানের সুসন্তান মাত্রেই বুঝিলেন, আর রক্ষা নাই; এখন হইতে সাবধান না হইলে, অনতিকাল মধ্যেই সমগ্র রাজ্য শত্রুর করাল-কবলে নিপতিত হইবে; নিপনের আজন্ম-স্বাধীনতা-সূর্য্য চিরদিনের জন্য অস্তমিত হইবে।

    বাগ্মিগণ হৃদয়বিলােড়নকারিণী বহ্নিতাপােচ্ছাসিনী বক্তৃতা দ্বারা, সুলেখকগণ অন্তর প্রজ্জ্বালনকারিণী রণােন্মাদিনী রচনা দ্বারা, স্বদেশীয় শ্রোতৃবর্গের ও পাঠকবৃন্দের চিত্ত উন্মত্ত করিয়া তুলিলেন। পরিশেষে,—অতি অল্প দিবস মধ্যে—সমগ্র জাপানবাসী একবাক্যে স্থির করিলেন যে, স্বদেশহিত-যজ্ঞে স্বার্থপশু উৎসর্গ না করিলে কোন উপায়েই জননী জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা হইবে না।

    ইহা স্থির করিয়াই সর্ব্বপ্রথমে জাপানের অদ্বিতীয় শক্তিধর প্রধান সেনাপতি কিকি স্বদেশহিতব্রতে আত্মস্বার্থ বিসর্জ্জন দিলেন। তিনি বিশাল রাজ্য, সােগানের স্বর্ণসিংহাসন, অতুল্য সম্মান, সমস্তই সম্রাটচরণে উৎসর্গ করিয়া কেবলমাত্র একখানি সুশাণিত তরবারি গ্রহণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে দাইমিও আখ্যাধারী জায়গীরদারগণ, কুগেবংশীয় ভূম্যাধিকারিগণ, আইচু ও টোকাগুয়া বংশীয় সামুরাইগণ ও অন্যান্য সম্মানিত বংশের রাজকর্ম্মচারিগণ একে একে কিকি সােগানের মহৎ দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিলেন। লক্ষপতি স্বেচ্ছায় পথের ভিখারী হইলেন। এই দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হইয়া নিরক্ষর সৈনিকেরা পর্য্যন্ত আপনাপন নিস্করভূমি পরিত্যাগ পূর্ব্বক সম্রাট সমক্ষে দণ্ডায়মান হইল।

    সমগ্র দেশ ব্যাপিয়া স্বদেশানুরাগের প্রবল ঝটিকা বহিতে লাগিল। দেশে দেশে, নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে, স্বদেশ ও সম্রাটের মঙ্গল কামনায় ভগবান শাক্যমুণির আরাধনা হইতে লাগিল। বালক হইতে বৃদ্ধ পর্য্যন্ত, কৃষক হইতে জমিদার পর্য্যন্ত, মূর্খ হইতে পণ্ডিত পর্য্যন্ত, অধিক কি বালিকা হইতে বৃদ্ধা পর্য্যন্ত, সকলেই সম্রাট ও স্বদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করিতে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হইল। ঝটিকা বহিতে লাগিল। স্বদেশানুরাগ ও স্বজাতিপ্রেমের প্রবলবহ্নিতে জাপান-ভূমি পূত ও পুণ্যময় হইল। সোগান পদ বিলুপ্ত হইয়া, জাপান সাম্রাজ্য একমাত্র সম্রাটের অধীন হইল।

    এইরূপে ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে প্রশান্ত মহাসাগরের সুনীলবক্ষে বালার্কদ্যূতিমণ্ডিত জাপান রাজ্যে নবযুগ আরম্ভ হইল।

  • ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: প্রাচীনযুগ।

    ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: প্রাচীনযুগ।

    ভারতীয় আর্য্যজাতিগণ যে অতি প্রাচীন কাল হইতে ভারতবর্ষ ব্যতীত পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ও দ্বীপপুঞ্জাদির কথা সম্যক্‌রূপে অবগত ছিলেন, আর্যজাতি, আর্য্যধর্ম্ম ও আর্য্যাচার যে এক সময়ে পৃথিবী ব্যাপিয়া বিদ্যমান ছিল, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ অদ্যাপি দেদীপ্যমান রহিয়াছে। “ফেলিক ওয়ারসিপ” নামক ইংরাজী গ্রন্থে লিখিত আছে, এক সময়ে তান্ত্রিক আচার, শিবলিঙ্গপূজা এবং ভারতীয় ব্রতাচরণ, প্রাচীন আসিরিয়া, (অসুর দেশ) চালিডিয়া, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা প্রভৃতি নানা দেশে অনুষ্ঠিত হইত। আমাদের পুরাণ গ্রন্থে বলিরাজা ও সূর্য্যবংশীয় জনৈক নৃপতির পাতালে গমন করার কথা লিখিত আছে। আমেরিকায় বলিভিয়া ও পুরুভিয়া নামে দুইটী দেশ আছে। পুরুভিয়ার প্রধান নগর কুজনাে নগরীতে অদ্যাপি কয়েকটি দেবালয়, দেব বিগ্রহ ও একটী সূর্য্য মন্দিরের ভগ্নাবশেষ বিদ্যমান আছে। কেহ কেহ বলেন, প্রাচীন বলিভূমিও পুরুভূমি হইতে আধুনিক বলিভিয়া ও পুরুভিয়া নামের উৎপত্তি হইয়াছে। জনৈক সংস্কৃতজ্ঞ সুপণ্ডিত বহু প্রাচীন গ্রন্থ আলোচনা করিয়া লিখিয়াছেন;—ইংরেজেরা যাহাকে আমেরিকা বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন, শ্রীমদ্ভাগবতে তাহাকে আবর্ত্তন উপদ্বীপ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। এই আবর্ত্তন উপদ্বীপের পশ্চিমখণ্ডে (আমেরিকার উত্তর প্রদেশে) সূর্য্যবংশীয় পুরুকুৎস রাজার রাজ্য পুরুভূমি অর্থাৎ পেরু প্রদেশ ও দক্ষিণ প্রদেশে বলি রাজার রাজ্য বলিভূমি অর্থাৎ বলিভিয়া দেশ বিদ্যমান আছে। এখানে অদ্যাপি “রামু-সীতোয়ো” অর্থাৎ রামসীতার উৎসব হইয়া থাকে।

    H. M. Westrap প্রণীত Ancient Archœology নামক গ্রন্থে প্রাচীন মিশরীয়, গ্রীক, রােমান প্রভৃতি জাতির শিল্পকলা ও ভাস্কর বিদ্যার বহু বিবরণ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। এই পুস্তক যত্নসহকারে পাঠ করিয়া জনৈক বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিক লিখিয়াছেন;—

    এই গ্রন্থের ১৬৪ পৃষ্ঠায় গ্রীক দেবতা জুপিটারের প্রতিমূর্ত্তি অঙ্কিত আছে। এই মূর্ত্তি নিবিষ্টচিত্তে দেখিলেই মনে হয়, ইহা যেন ভারতীয় পৌরাণিক দেব মহাদেবেরই প্রতিমূর্ত্তি। বাম হস্তে পারাবত-শীর্ষ ত্রিশূল; দুই পার্শ্বে যেন জয়া-বিজয়া; পদতল সমীপে দুই দিকে ছিন্নমস্তার প্রতিরূপ; আর আমাদের দেশে দশভূজা প্রতিমার চালচিত্রে যেমন বহুবিধ দেব-দেবীর মূর্ত্তি অদ্যাপি অঙ্কিত হইয়া থাকে, এই জুপিটার-প্রতিমা-ফলকের ললাটদেশে যেন তেমনই চাল-চিত্র অঙ্কিত। এই পুস্তকের ১৭৪ পৃষ্ঠায় প্রাচীন এথেন্সে প্রচলিত মুদ্রা বিশেষের প্রতিমূর্ত্তি আছে; এই মুদ্রার একদিকে যেন লক্ষ্মী দেবীর মূর্ত্তি অঙ্কিত; অপর দিকে লক্ষ্মী-পেচক ও ধান্য পাত্র খুঁচির প্রতিরূপ বিন্যস্ত। এই পুস্তকের ১৮৮ পৃষ্ঠার চিত্র দেখিলেই মনে হয়, ইহা যেন আমাদের দেশের মহিষমর্দ্দিনীরূপের প্রতিরূপ; মহিষ কায়, হইতে অসুর বিনির্গত হইয়াছে; এই অসুর,—পার্শ্বোপবিষ্ট অপর অসুরের কেশাকর্ষণ করিতেছে। ১০১ পৃষ্ঠায় অঙ্কিত মূর্ত্তি সমূহ দেখিলেই মনে হয়, ঠিক যেন ভারতের বৃন্দাবনবিলাসিনী শ্রীরাধার প্রতিমা; পার্শ্বে বংশীবাদন তৎপর শ্রীকৃষ্ণ, কোন মূর্ত্তি বা বীণাধারিণী বীণাপাণির বিকৃতি। এই সকল মূর্ত্তির হাব-ভাব ও বেশ-ভূষা দেখিলে, নিশ্চয়ই ভারতীয় বলিয়া প্রতীত হইবে,—রাধা-কৃষ্ণপ্রতিমার পার্শ্বে হ্লাদিনী রসান্যাদিনী সখী-মণ্ডলী। পুস্তকের ১৭০ পৃষ্ঠায় রােমবিগ্রহ অঙ্কিত আছে, ইহা দেখিলেই মনে হইবে,—অবিকল যেন চতুর্ম্মুখ ব্রহ্মারই অনুকরণ! ২৩১ পৃষ্ঠায় যে রোমান-চিত্র বিশেষের প্রতিচিত্র অঙ্কিত আছে, তাহা দেখিলেই মনে হইবে, আমাদেরই শাস্ত্রবর্ণিত সমুদ্র-মন্থনের প্রতিমূর্ত্তি;—সমুদ্র-গর্ভ হইতে চন্দ্র ও উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব উঠিতেছে,—আবার চৈত্রেক-পার্শ্বে সমুদ্র সম্ভব সুধা লইয়া, দেবাসুরে মহাযুদ্ধ বাধিয়া গিয়াছে।

    কেবলমাত্র গ্রীক বা রােম দেশে নহে, প্রাচীন মিশর দেশের মূর্ত্তি-প্রসঙ্গেও ভারতীয় দেবদেবীর প্রতিমার লক্ষণ দিব্যরূপ প্রকটিত। উপরি-উক্ত পুস্তকের ১৫৫ পৃষ্ঠায় যে চিত্র অঙ্কিত রহিয়াছে, তাহা দেখিলেই মনে হইবে,—ইহা যেন অবিকল জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রারই প্রতিমূর্ত্তি; জগন্নাথ কৃষ্ণবর্ণ, বলরাম শুভবর্ণ এবং ইঁহাদের উভয়ের মধ্যস্থলে সুভদ্রাদেবী উপবিষ্ট। প্রতিমা-চিত্রে যেরূপ,—সৌধ-মন্দির চিত্রেও সেইরূপ ভারতীয় ভাবানুকরণই পুরা মাত্রায় প্রকটিত। মিশরীয় প্রাচীন মন্দির বিশেষের দৃশ্য যেন ভুবনেশ্বর মন্দির সদৃশ।

    এক সময়ে আর্য্যধর্ম্মই যে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে প্রচলিত ছিল, এই সকল রূপ-প্রতিমা কি তাহার অন্যরূপ পরিচায়ক নহে? সুদুর উত্তর কুরুবর্ষে,13 তির্ব্বতে, মানসসরােবরে, চীন-সাম্রাজ্যে, কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্ত্তী কলচিস প্রদেশে, তুরস্কের বসােৱা নগরে, পারস্যের অন্তর্গত নানা প্রদেশে, অদ্যাপিও হিন্দুদিগের প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্ত্তি বিরাজমান আছে। এখনও অনেক হিন্দু সন্ন্যাসীরা এই সকল স্থানে গমন করিয়া থাকেন।

    কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চশতবর্ষ পূর্ব্বেও আর্য্যজাতির ইয়ুরােপ14 গমনের কথা অবগত হওয়া যায়। ভূগর্ভোত্থিত যে শিলালিপি হইতে ইহা স্থির হইয়াছে, তাহা অদ্যাপিও ইংলণ্ডের রাজকীয় কৌতুকাগারে রক্ষিত আছে15

    এই সকল দৃষ্টান্ত হইতে নিসংশয়ে প্রতীত হইতেছে,ভারতীয়েরা এক সময়ে পৃথিবীর সর্ব্বস্থানেই আপনাদের অক্ষুন্ন প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন।

    প্রাচীনযুগে হিন্দু বণিকেরা পোতারোহণপূর্ব্বক বালি, যাবা, সুমাত্রা, বোর্ণিও প্রভৃতি প্রাচ্য দ্বীপপুঞ্জে গমনাগমন করিতেন। এই সমস্ত স্থানে অদ্যাপিও হিন্দু উপনিবেশের সুস্পষ্ট চিহ্ণ বর্ত্তমান রহিয়াছে। হিন্দুরা যে, জাপানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন না, তাহারও কয়েকটী প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। ইয়োকোহামার অনতিদূরে কামিকুরা নামক স্থানে ৩৩১/৩ হস্ত উচ্চ একটী বুদ্ধদেবের প্রতিমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। আর একস্থানে ৪২ হস্ত উচ্চ একটি দেবমূর্ত্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে। শেষোক্ত মূর্ত্তির গাত্রে সংস্কৃত ভাষায় কতকগুলি কথা খোদিত আছে। তাহাতে জানা যায়, খ্রীষ্ট জন্মিবার বহুশতবর্ষ পূর্ব্বে এই দেবমূর্ত্তি ভারতবর্ষ হইতে জাপানে আনীত হইয়াছিল।

    জাপানের প্রাচীন নাম সুদর্শন দ্বীপ। রামায়ণের অন্তর্গত কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডের চত্বারিংশ সর্গে চারুদর্শন সুদর্শন দ্বীপ ও সূর্ম্যরাগ-রঞ্জিত মনোহর স্বর্ণ পর্ব্বতের উল্লেখ আছে। কালক্রমে সুদর্শন নামের অপভ্রংশে ‘নিপন’ নাম হইয়াছে। প্রাচীন সুবর্ণ পর্ব্বত হইতে আধুনিক ‘ফুজিসান’ পর্ব্বতের নাম উৎপন্ন হইয়া থাকিবে। মহর্ষি বাল্মীকি সুদর্শন দ্বীপকে সূর্যোদয়ের স্থান বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, জাপানী ভাষায় নিপন শব্দের অর্থ সূর্য্যোদয়ের স্থান। আমাদের বৈবস্বত মনুর ন্যায়, জাপান রাজবংশের আদি পুরুষ সিণ্টো, সূর্য্য হইতে উৎপন্ন। জাপান রাজবংশধরেরা আপনাদিগকে অদ্যাপিও সূর্য্যবংশীয় বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন।

    অনেকে অনুমান করেন; যে সভ্যতারাগে জাজ্জ্বল্যমান হইয়া জাপান আজি উষার সুকুমার অরুণ প্রভার ন্যায় উত্তরােত্তর উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছে, সে সভ্যতা জাপানবাসিরা পাশ্চাত্য জাতির নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছে। এ অনুমান প্রকৃত নহে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অভ্যঙ্গনে জাপানের বর-বপু কিঞ্চিন্মাত্রায় মসৃণ হইয়াছে সত্য, কিন্তু উহার জাতিকলেবর গঠনে যে ভারতবর্ষই মন্ত্রগুরু অদ্যাপিও তাহার দৃঢ় নিদর্শন বিদ্যমান আছে। এই বিবরণ আমরা ক্রমান্বয়ে লিপিবদ্ধ করিতে যত্ন করিব।

    জাপান দ্বীপের উৎপত্তি ও তথায় লােকের বসতি সম্বন্ধে অনেক অপূর্ব্ব উপাখ্যান প্রচলিত আছে। তাহার অধিকাংশই ভারতীয় পৌরাণিক আখ্যায়িকার ন্যায় অপূর্ব্ব রহস্যে বিজড়িত। জাপানীদিগের বিশ্বাস, অতি প্রাচীনকালে এই দ্বীপে দেবতারা রাজত্ব করিতেন। বহুযুগ পরে সেই দেববংশে মানব ও দেবধর্ম্মবিশিষ্ট এক সম্প্রদায় মনুষ্যের জন্ম হয়। ইহার বহুবর্ষ পরে তাঁহাদের সন্তানসন্ততি হইতে বর্ত্তমান জাপানিগণের উৎপত্তি হইয়াছে।

    ইয়ুরােপীয় পণ্ডিতগণের অনুমান যে, চীন হইতে জাপানীদিগের উৎপত্তি হইয়াছে। কিন্তু উভয় জাতির ধর্ম্ম ও ভাষার অসাদৃশ্য, রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারের পার্থক্য, মানসিক গতি ও চরিত্রের ভিন্নতা দর্শনে, কিছুতেই উক্ত অনুমানের সারবত্ত্বা উপলব্ধি হয় না।

    পাশ্চাত্য মানবতত্ত্ববিদেরা মনুষ্যবর্গের বর্ণ, মুখশ্রী ও গঠনাদির বিভিন্নতা অনুসারে সমগ্র মানবজাতিকে, ককেশীয়, মােঙ্গলীয়, ইথিওপীয়, মালয় ও আমেরিক এই পঞ্চ শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে চীন, বর্মা, শ্যাম, জাপান, এসিয়াস্থ রুষিয়া, তিব্বত প্রভৃতি দেশের অধিবাসিগণ মােঙ্গলীয় শ্রেণীভুক্ত। ইহাদিগের বর্ণ পীত, কেশ স্থূল ও ঋজু, শ্মশ্রু বিরল, মুখ প্রশস্ত ও চেপ্টা, গণ্ডাস্থি উন্নত এবং চক্ষু বাদামাকৃতি।

    নিম্নশ্রেণীর জাপানিগণের গঠনাদি মােঙ্গলীয় ভাবাপন্ন হইলেও জাপানের শিক্ষিত ও উন্নতিবংশীয়দিগের বর্ণ ও শারীরিক গঠনাদি অনেকাংশে ভারতীয় শ্রেষ্ঠজাতিগণের অনুরূপ। তাঁহাদিগকে সহসা দর্শন করিলে, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চশ্রেণীর বাঙ্গালী বলিয়া ভ্রম উপস্থিত হয়। তাঁহাদিগের বর্ণ গৌর, কেশ দীর্ঘ, নাসিকা উন্নত ও সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুগঠিত। যাঁহারা সংবাদপত্রে জাপান-সম্রাট, মার্কুইস আইটো, মন্ত্রী টেরাউচি, এডমিরাল টোগো, সেনাপতি অকু প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ জাপানিগণের আলােকচিত্র দর্শন করিয়াছেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই আমাদের একমতাবলম্বী হইবেন। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ অধিবেশনে একটী আশ্চর্য্য পরীক্ষা হইয়াছিল। তাহাতে দুই জন জাপানী ভদ্রলোক এদেশীয় পরিচ্ছদ পরিধান পূর্ব্বক সভায় উপস্থিত স্বত্বেও কেহই তাঁহাদিগকে বাঙ্গালী হইতে ভিন্ন বিবেচনা করিতে পারেন নাই।

    পৃথিবীর সর্ব্বত্রই দৃষ্ট হয় যে, অনেক প্রদেশ আদিম অধিবাসী শূন্য হইয়া নূতন জাতি কর্ত্তৃক উপনিবেশিত হইয়াছে। ইয়ুরােপ মহাদেশের ইতিবৃত্ত পাঠ করিলে, ইহার প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যাইবে। আরও দেখা যায়, আদিম জাতি ও নবাগত জাতির সংমিশ্রণে নানাস্থানে নূতন নূতন জাতিনিচয়ের উৎপত্তি হইয়াছে। উদাহরণ স্বরূপ মূলাটো ও জম্বো প্রভৃতি জাতির কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। এইরূপ উদাহরণ ভারতবর্ষেও বিরল নহে।

    আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, দুর অতীতের কোন এক সময়ে ভারতীয় আর্য্যজাতিগণের কোন এক শাখা সুদর্শন দ্বীপে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিলেন। এই মহাঘটনা, আর্য্যজাতির অতীত গৌরবের সুবর্ণযুগে, কি ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বৌদ্ধযুগে ঘটিয়াছিল, তাহা নিঃসন্দেহে নির্ণয় করিবার অবসর উপস্থিত হয় নাই।

    কোজিকি নামক জাপানের পুরাণগ্রন্থে লিখিত আছে যে, অতি প্রাচীন কালে সিণ্টো নামক জনৈক মহাপুরুষ ভগবান সূর্য্য হইতে উৎপন্ন হইয়া মর্ত্তধামে অবতরণ করেন। তাঁহার সন্তানসন্ততিরা বহুযুগ ধরিয়া পৃথিবী সুশাসন পূর্ব্বক অন্তর্হিত হইলে, নিপন রাজ্যে অতি ভয়াবহ দেবাসুর সংগ্রাম আরম্ভ হয়।

    ভগবতী বসুমতী উকুনিনুনী নামক অজেয় অসুর কর্ত্তৃক পীড়িতা হইয়া, প্রভাকরপত্নী দেবী অমৃতরাশির আশ্রয় গ্রহণ করেন। মহাদেবী বসুন্ধরার কাতর-ক্রন্দনে বিগলিতা হইয়া মিকাডো নামক মহাবলশালী দেব সেনাপতিকে দৈত্য দলনার্থ ভূতলে প্রেরণ করেন। বহুযুগ ধরিয়া দেবদানবে ভীষণ যুদ্ধ হয়। অবশেষে মিকাডো ও তাঁহার মানসপুত্রগণের বাহুবলে দানবেরা পরাজিত হইয়া দেশত্যাগ পূর্ব্বক পাতাল প্রদেশে পলায়ন করে। যুদ্ধাবসানে মিকাডো নিপনের সম্রাট হন। ইহাই জাপানের পৌরাণিক ইতিহাস।

    মিকাডাে বংশে জীমূতমনু নামক জনৈক মহাপ্রতাপশালী নরপতি জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম নিনো অব্দে অর্থাৎ খৃষ্ট জন্মিবার ৬৬০ বৎসর পূর্ব্বে ইহাঁর আবির্ভাব হয়। এই সময় হইতে জাপানে কাল গণনার সূত্রপাত হয়। দেববংশসম্ভূত বলিয়া জীমূতমনু রাজ্যের সর্ব্বত্রই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন। সহস্র সহস্র ধর্ম্মমন্দিরে মহােৎসব সহকারে তাঁহার নিত্য পূজা হইত। প্রজাগণ সাক্ষাৎ ঈশ্বর বােধে তাঁহাকে ভয় ও ভক্তি করিত। এই সময়ে জাপানীরা সিণ্টো ধর্মাবলম্বী ছিল। সূর্য্যপূজা, রাজভক্তি ও স্বদেশপ্রীতি এই ধর্ম্মের মূলমন্ত্র ছিল। প্রজা মাত্রেই সম্রাট ও স্বদেশের জন্য সাগর সলিলের ন্যায় অকাতরে অর্থ ও শােণিত ব্যয় করিত।

    জীমূতমনু মিকাডাের পর হইতে জাপানে রাজ-সম্মান অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। এই সময়ে জনসাধারণ সম্রাটকে দেবতা বােধে তাঁহার শরীর পরম পবিত্র বলিয়া বিশ্বাস করিত। রাজা কোন সময়ে মৃত্তিকা স্পর্শ করিতেন না। কোনস্থানে যাইতে হইলে বাহকের স্কন্ধে উঠিয়া গমন করিতেন। সম্রাটের নখর ও কেশ প্রভৃতি কেহই পাপভয়ে ছেদন করিতে সাহসী হইত না। সম্রাটের জন্য প্রত্যহ নূতনপাত্রে রন্ধন হইত, রন্ধনান্তে সেগুলি সমুদ্রগর্ভে পরিত্যাগ করা হইত। সম্রাট প্রত্যহ নূতন স্বর্ণপাত্রে ভােজন করিতেন। সে পাত্র পরিত্যাগ না করিয়া, তাহা অবসর মত দ্রব করিয়া নূতন পাত্র প্রস্তুত করা হইত। সম্রাটের পীড়া হইলে, সিণ্টো ধর্ম্মমন্দিরের পুরোহিতগণকে অনশনে থাকিয়া ত্রিসন্ধ্যা সূর্য্যোস্তোত্র পাঠ করিতে হইত। সম্রাট শাস্ত্রানুসারে দ্বাদশটি পত্নী গ্রহণ করিতে পারিতেন। পত্নীগর্ভজাত সন্তান মাত্রেই রাজ সম্মান প্রাপ্ত হইতেন। সর্ব্বাপেক্ষা জ্যেষ্ঠ পুত্রের গৌরব অধিক ছিল, তাঁহারই অদৃষ্টে সিংহাসনের উত্তরাধিকার ঘটিত। সম্রাটের মৃত্যু হইলে কনিষ্ঠ পত্নী মৃতপতির অনুগামিনী হইতেন। অন্যান্য পত্নীরা ইচ্ছা করিলে এই সতীধর্ম্ম পালন করিতে পারিতেন। বিধবা সম্রাট-মহিষীরা অন্য পতি গ্রহণ করিতে পারিতেন না।

    এই সময়ে জাপানিগণের মধ্যে বিবিধ সংস্কার বিদ্যমান ছিল। তাহারা শুনিয়াছিল, পৃথিবীর নিম্নে একটি বৃহদাকার তিমিঙ্গিল আছে, সেই মৎস্য মস্তক নাড়িলে ভূমিকম্প হয়। তাহারা বলিত দেবমন্দির গুলি সিণ্টোর পতাকার উপরে স্থাপিত বলিয়া তথায় ভূমিকম্পের উপদ্রব হয় না। তাহাদের বিশ্বাস ছিল, কুদিনে মরিলে মনুষ্য প্রেতযােনি প্রাপ্ত হয়, অধার্ম্মিকগণ মরণান্তে শৃগাল ও উল্কামুখী হয়।

    আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে ভারতবর্ষ চীন, গ্রীক ও মিশর প্রভৃতি কয়েকটি দেশ ভিন্ন সমগ্র পৃথিবী অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এই সময় হইতে (২৫৫০ খৃঃ পূঃ) জাপানের পুরাবৃত্ত অতি সুন্দরভাবে লিখিত হইতে আরম্ভ হইয়াছে।

    আমরা দেখিতে পাই, প্রাচীনযুগেও জাপানবাসীরা শিল্প ও বাণিজ্য কুশল জাতি বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল। খৃষ্ট জন্মিবার ৬৫০ বৎসর পূর্ব্বে জাপানীরা স্বদেশজাত দ্রব্যাদি লইয়া চীন ও কোরিয়ার সহিত সমুদ্রপথে বাণিজ্য করিত। বর্ত্তমান সময়ের দুই সহস্র বর্ষ পূর্ব্বে জাপানে জনসংখ্যা গ্রহণ করা হইয়াছিল। ১৭০০ বৎসর অতীত হইল, জাপানে ডাকঘর স্থাপিত হইয়াছে। সহস্রাধিক বর্ষ বিগত হইল, জাপানবাসীরা রেশম বয়ন ও চীনাবাসন প্রস্তুত প্রণালী অবগত হইয়াছে।

    খৃষ্ট জন্মিবার বহুবর্ষ পূর্ব্ব হইতেই জাপানীরা ভারতবর্ষের কথা অবগত হইয়াছে। এই সময়ে তাহারা ভারতবর্ষকে “তেনজিকু” ও ভারতবাসীকে “তেনজিকুজিন” নামে অভিহিত করিত। এই দুইটি শব্দের অর্থ যথাক্রমে স্বর্গ ও স্বর্গবাসী। এইরূপ প্রবাদ আছে, প্রাচীনযুগে জাপানীরা, ভারতবাসী কোন ব্যক্তিকে দর্শন করিলে বলিত;—“আজ আমাদের মানব জন্ম ধন্য হইল, আমাদের স্বর্গযাত্রার পথ উন্মুক্ত হইল। আমরা স্বচক্ষে স্বর্গবাসীকে দর্শন করিলাম।”

  • ভৌগলিক বৃত্তান্ত।

    ভৌগলিক বৃত্তান্ত।

    অবস্থান ও বিভাগ।

    এসিয়ার পূর্ব্বপ্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরবক্ষে কতকগুলি বৃহৎ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ লইয়া জাপান সাম্রাজ্য সংগঠিত হইয়াছে। তন্মধ্যে নীপন, কিউসিউ, সিকক্, যেশাে, ফরমােসা এই পাঁচটী দ্বীপ সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান। এতদ্ভিন্ন কিউরাইল, লুচু, বােনিন প্রভৃতি বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ ইহার অন্তর্গত।

    জাপান সাগর ও কোরিয়া প্রণালী পশ্চিমে থাকিয়া জাপান সাম্রাজ্যকে এসিয়াটিক রুষিয়া ও কোরিয়া উপদ্বীপ হইতে বিচ্ছিন্ন করিতেছে।

    ১২৯° হইতে ১৫০° অক্ষাংশের মধ্যে এই রাজ্য অবস্থিত।

    জাপান সাম্রাজ্যের পরিমাণফল প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গ মাইল। তুলনায় ইংলণ্ড, ওয়েলস্‌, স্কটলণ্ড ও আয়র্লণ্ডের দ্বিগুণ, এবং জর্ম্মণ সাম্রাজ্যের ও ফ্রান্সের সমতুল্য হইবে। লােকসংখ্যা ৪ কোটী ৭০ লক্ষর উপর।

    জাপান সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত। জাপান ও অধীন দ্বীপপুঞ্জ।

    জাপান বলিতে নীপন, কিউসিউ, সিকক্ ও কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ বুঝায়। ইহার মধ্যে নীপনের দৈর্ঘ্য ৯০০ মাইল ও প্রস্থ ১০০ মাইল। কিউসিউ দৈর্ঘ্যে ২০০ মাইল ও প্রস্থে ৮০ মাইল। সিককের দৈর্ঘ্য ১৫০ মাইল ও প্রস্থ ৮০ মাইল হইবে।

    অধীন দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে যেশাে ও ফরমোসা সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ। যেশো দৈর্ঘ্যে ৩০০ মাইল ও প্রস্থ ১০০ মাইল। ফরমােসা দৈর্ঘ্যে ২০০ ও বিস্তারে ৭০ হইবে।16

    রাজধানী ও প্রধান নগর।

    জাপানী ভাষায় নীপন শব্দের অর্থ সূর্যোদয়ের স্থান। এই দ্বীপ চীনবাসিগণের নিকট য়ংহু বা জিয়নউ নামে পরিচিত। প্রাচীন ভারতবর্ষের সুবর্ণযুগে এই দ্বীপের নাম সুদর্শন ছিল।17

    জাপান সাম্রাজ্যের রাজধানী টোকিও নীপন দ্বীপে অবস্থিত। “টো” শব্দে প্রাচ্য ও “কিও” শব্দে রাজধানী বুঝায়। সুতরাং জাপানী ভাষায় টোকিও অর্থে প্রাচ্য রাজধানী বুঝিতে হইবে। এই নগরী কলিকাতা হইতে ৩২০০ মাইল উত্তর-পূর্ব্বে অবস্থিত। লােকসংখ্যা ১৪ লক্ষ হইবে।

    এই নগর এসিয়া মহাদেশের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা উন্নত ও বাণিজ্য-প্রধান স্থান। যে সমস্ত সাগরশাখা সহরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তাহার উভয়পার্শ্বে নানাবিধ সুন্দর সুন্দর বৃক্ষশ্রেণী রােপিত আছে। এখানে অনেকগুলি সেতু আছে। প্রধান সেতুর নাম নিপবস্‌। রাজপ্রাসাদ নগরের মধ্যভাগে অবস্থিত। সম্রাটের ব্যবহারের জন্য নানাস্থানে অনেকগুলি অট্টালিকা আছে। জাপানের অনেক প্রধান লােক এইখানে অতি মনােহর গৃহসকল নির্ম্মাণ করিয়াছেন। সাধারণ গৃহগুলি কাষ্ঠ নির্ম্মিত। এইখানে জাপানের পার্লামেণ্ট সভা, ইউনিভার্সিটী, ব্যাঙ্ক, নেভাল কলেজ, টর্পেডো স্কুল প্রভৃতি অবস্থিত। এখানকার বাজার, চক, উপবন ও ডক প্রভৃতি অতি সুন্দর। ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে এই সহরের লোক সংখ্যা ১৩৭৮১৩২ জন ছিল।

    ওসাকা জাপানের দ্বিতীয় সহর। এই নগর সমুদ্রতীরে অবস্থিত অতি সুরক্ষিত বন্দর। ইহার লােকসংখ্যা ৫ লক্ষ হইবে। এইখানে যুদ্ধোপযােগী বিবিধ অস্ত্র, গােলা, বারুদ প্রভৃতি প্রস্তুত হয়। অনেকে ইহাকে জাপানের উলউইচ্ বলিয়া থাকেন। এই নগরের অধিবাসিগণ ধনাঢ্য ও বিলাস পরায়ণ। জাপানীরা এই সহরকে প্রমােদ ভবন বলিয়া থাকে।

    মিয়াকো বা কিয়াটো । বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রসিদ্ধ। জাপানের প্রধান ধর্ম্মযাজক এইখানে বাস করিয়া থাকেন। সকলে তাঁহাকে দৈরি বলিয়া থাকে। এই নগরে জাপানের প্রাচীন যুগের অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। কিয়াটো পূর্ব্বে সমগ্র রাজ্যের রাজধানী ছিল।

    ইয়াকোহামা । জাপানের সর্ব্ব প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। এই স্থানে ইংরাজ, ফরাসী প্রভৃতি বৈদেশিকগণের বাণিজ্যপােতসকল নঙ্গর করিয়া থাকে।

    হিওগো। অন্তর্বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থান।

    সিমনসেকি। সাগরতীরবর্ত্তী সুরক্ষিত বন্দর। এই নগরে চীন জাপান যুদ্ধের সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়।

    মেজারু। এখানে একটী গবর্ণমেণ্টের ডক আছে। এই নগরে জলযুদ্ধের উপযোগী অস্ত্রাদি নির্ম্মিত হইয়া থাকে।

    নাগাসাকি। অতি সুরক্ষিত বন্দর, কিউসিউ দ্বীপে অবস্থিত। এখানকার ডকগুলি অতি উৎকৃষ্ট। নাগাসাকিতে প্রচুর পরিমাণে কয়লা রক্ষিত হইয়া থাকে। ইংরাজ, মার্কিণ, প্রভৃতি জাতিরা এইখানে বাণিজ্য করিয়া থাকে। এই স্থানের গৃহসকল অতি সুন্দররূপে নির্ম্মিত, প্রতি গৃহেই বারাণ্ডা আছে। এই নগরের মধ্যে ও বাহিরে অনেক বৌদ্ধমঠ দৃষ্টিগােচর হয়।

    সেসাবাে। জাপান সাগরীয় রণতরী শ্রেণীর প্রধান আশ্রয় স্থান। এইখানে গবর্ণমেণ্টের ডক আছে। এই বন্দরে বড় বড় জাহাজ, লাইনার, টর্পেডো বােট প্রভৃতি গঠিত হয়।

    এতদ্ভিন্ন সঙ্গ, কোকুরা, কতসীমা, হামাতা প্রভৃতি উন্নতিশীল নগর আছে।

    হাকোডোট। সুগারু প্রণালীর উত্তরতীরস্থিত অতি সুরক্ষিত বন্দর। এখানে জাহাজ গঠনোপযােগী কতকগুলি উৎকৃষ্ট ডক আছে।

    মাটসমৈ। জেসো দ্বীপের শাসনকর্ত্তা এইখানে অবস্থিতি করেন। জাপান সম্রাট সময়ে সময়ে এই নগরে বাস করিয়া থাকেন। সহরটী ক্রমনিম্ন ও চারিদিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত। দেখিতে অতি সুন্দর।

    মারোয়ান। অতি সুরক্ষিত সামুদ্রিক বন্দর।

    এতদ্ভিন্ন জেসােদ্বীপে ফুকুসমা, ওসিমা, অকেশী প্রভৃতি প্রধান প্রধান নগর আছে।

    তৈবান। চীনের দক্ষিণ পূর্ব্ব উপকূলে অবস্থিত ফরমোসা দ্বীপের প্রধান নগর। এইখানে জাপানের রাজপ্রতিনিধি অবস্থান করেন। পূর্ব্বে চীনের উৎকট অপরাধীরা এইখানে নির্ব্বাসিত হইত। ফরমোসার অন্য আর একটী সমৃদ্ধিশালী নগর তাকাও।

    উপরােক্ত নগরগুলি ভিন্ন জাপান সাম্রাজ্যে কোব, হিরোসিমা, কুরি, নিগাটা প্রভৃতি কয়েকটী উল্লেখযােগ্য নগর আছে।

    জলবায়ু।

    জাপানের প্রায় সমগ্র ভাগই শীতমণ্ডলের অন্তর্গত। উত্তরাংশে ইয়ুরােপের ন্যায় অতি তীব্র শীত অনুভূত হয়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে তাপমান যন্ত্রের পারদ ২৮° ডিক্রির নিম্নে পতিত হয়। দক্ষিণাংশে বায়ুর তাপ অতি গ্রীষ্মের সময় ৯৮° হইয়া থাকে। কিন্তু দিবাভাগে দক্ষিণদিক হইতে এবং রজনীতে পূর্ব্বদিক হইতে সমুদ্র বায়ু প্রবাহিত হওয়ায় গ্রীষ্মের তাপ অনুভূত হয় না। এ দেশের ঋতু অত্যন্ত পরিবর্তনশীল হইলেও জলবায়ু সাধারণতঃ স্বাস্থ্যকর। পূর্ব্ববায়ু অপেক্ষা, দক্ষিণবায়ু সমধিক সুখস্পর্শ। বর্ষাকালে জাপানে প্রচুর বারিবর্ষণ হইয়া থাকে। এখানে ঝড়ের বেগ অতি প্রচণ্ড।

    জাপানে ঝটিকা, বজ্রপাত, সমুদ্রপ্লাবন ও ভূমিকম্প সর্ব্বদাই হইয়া থাকে।

    ভূমি ও উৎপন্ন ।

    জাপানের ভূমি সাধারণতঃ উর্ব্বরা। সর্ব্বত্রই কৃষিকার্য্য অতি সুন্দররূপে সম্পন্ন হয়। জাপানীদিগের ন্যায় কৃষিকুশল জাতি পৃথিবীতে দৃষ্ট হয় না। ইহারা একখণ্ড ভূমিও বৃথা ফেলিয়া রাখে না। সুবিধা হইলে পাহাড়ের অতি উচ্চস্থান পর্য্যন্তও কর্ষণ করিয়া থাকে। জাপানে পূর্ব্বে ব্যবস্থা ছিল, যে ব্যক্তি পতিত জমি আবাদ করিবে, তাহাকে দুই বৎসরের মধ্যে কোনরূপ কর প্রদান করিতে হইবে না; আর যে অলস ব্যক্তি এক বৎসর নিজ জমি চাষ করিবে না, সে তাহার জমির যাবতীয় অধিকার হইতে বঞ্চিত হইবে।

    জাপানে ধান্য, যব, গম, চা, তুলা, রেশম, পাট, তামাক প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া থাকে। ধান্যের চাষই অধিক পরিমাণ ভূমিতে হইয়া থাকে। এখানে এক প্রকার অতি উৎকৃষ্ট তণ্ডুল আছে, তাহা কিয়ৎক্ষণ শীতল জলে রক্ষা করিলে অন্ন প্রস্তুত হয়। যে যে স্থানে তামাক উৎপন্ন হয়, তন্মধ্যে নাগাসাকি ও সাস্‌মার তামাকই উৎকৃষ্ট ও সুগন্ধযুক্ত। জাপানীরা অতি উত্তমরূপে, তামাকের চাষ করিয়া থাকে। যাহারা কোন তামাক ব্যবহার করিতে পারে না, তাহারাও এদেশের তামাক ব্যবহার করিতে পারে। জাপানে মূলা, শশা, ফুটী, তরমুজ, আলু, কাফি, চা প্রভৃতি যথেষ্ট জন্মিয়া থাকে। নানাপ্রকার বাঁশ, কর্পূর ও বার্ণিষ উৎপাদক বৃক্ষ প্রভৃতি নানাবিধ আশ্চর্য্য উদ্ভিদ এখানে পাওয়া যায়। এক প্রকার বৃক্ষ হইতে দুগ্ধের ন্যায় শ্বেতবর্ণ রস নিঃসৃত হয়। সুখাদ্য ফলের মধ্যে কমলা, লিচু, আঙ্গুর, কুল, চেরি, আখরােট, পেয়ারা, পিচ প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। বৃহৎ বৃক্ষের মধ্যে ওক, পাইন, দেবদারু, মেহগ্নি প্রভৃতি দৃষ্ট হয়। জাপানে নানাশ্রেণীর অতি মনোহর পুষ্প উৎপন্ন হইয়া থাকে। এখানে পশমের অভাব নাই। এখানকার তুতজাত রেশম সর্ব্বত্র প্রসিদ্ধ।

    আকরিক।

    আকরিকের মধ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, টিন, পাথুরিয়া কয়লা প্রচুর পাওয়া যায়। লৌহ অধিক পাওয়া যায় না। লৌহের অনেক কার্য্য তাম্র দ্বারা সম্পন্ন হইয়া থাকে। এখানকার তাম্রের ন্যায় উৎকৃষ্ট তাম্র পৃথিবীর কুত্রাপি পাওয়া যায় না। জাপানীরা ইহা এক ইঞ্চ মােটা ও এক ফুট লম্বা পাত করিয়া বিক্রয় করে। অপকৃষ্ট তাম্র ইষ্টকাকারে বিক্রীত হয়। জাপানে তামার খনিতে সময়ে সময়ে স্বর্ণ পাওয়া যায়। সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত কেহই স্বর্ণখনির কার্য্য করিতে পারে না। এখানকার টিন রৌপ্যের ন্যায় শুভ্র ও উজ্জ্বল। জাপানের নানাস্থানে একরূপ মৃত্তিকা পাওয়া যায়, তাহা হইতে মনােহর বাসন প্রস্তুত হয়। চীনাবাসন বলিয়া ইহা পৃথিবীর নানাদেশে বিক্রয় হইয়া থাকে।

    জীবজন্তু।

    জাপানে অশ্ব, মহিষ, গবাদি গ্রাম্য জন্তু দৃষ্ট হয়। এখানকার অশ্ব সকল বলিষ্ঠ, কিন্তু বৃহৎ নহে। মৃত্তিকাকর্ষণ ও শকটচালন জন্য গরু ও মহিষ ব্যবহৃত হয়। ছাগ, মেষ, হরিণ, শূকর, ভল্লুক প্রভৃতি নানাস্থানে দেখা যায়। জাপানে পক্ষী অতি বিরল, এই পার্থিব অমরাবতীতে হংস, কুক্কুট ও ভরত পক্ষী ভিন্ন উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট বিহঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায় না। এখানে সর্প অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। ফিনাকারী ও তিতাকাজি নামে দুই শ্রেণীর সর্প আছে, উহারা এদেশীয় গােখুরা ও কেউটে সাপ অপেক্ষাও ভীষণ। ইহারা কাহাকেও দংশন করিলে দষ্ট ব্যক্তির নিশ্চয়ই মৃত্যু হয়। এই দুই শ্রেণী ভিন্ন জাপানে আর দুই তিন প্রকার সর্প আছে, তাহারা বিষাক্ত নহে। এই দ্বীপে উঁই বড়ই প্রবল। ইহার অত্যাচারে জাপানীরা ব্যতিব্যস্ত হইয়া থাকে। ইহারা বলে, গৃহের চারি পাশে লবণ ছড়াইয়া দিলে কিয়দ্দিবসের জন্য উঁইয়ের দৌরাত্ম নিবারিত হয়।

    জাপানের সমুদ্র, নদী ও বিল প্রভৃতিতে প্রচুর মৎস্য পাওয়া যায়। জাপান সমুদ্রে ঠিক মানুষের ন্যায় এক রূপ মৎস্য আছে। ইহার মস্তক বৃহৎ, বক্ষদেশে ও মুখমণ্ডলে আঁইস নাই। ইহার পায়ে বালকের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গুলি আছে। টোকিও উপসাগরে ইহা অধিক পাওয়া যায়। এখানকার জলাশয়ে কুম্ভীর ও কচ্ছপাদির অভাব নাই। জাপান সমুদ্রে শুক্তি, নানাবর্ণের প্রস্তর ও প্রবালাদি পাওয়া যায়।

  • দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

    দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

    প্রথম সংস্করণ দুই হাজার খণ্ড নিঃশেষিত হওয়ায় “নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের” দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইল। প্রথম সংস্করণের যে যে স্থানে ত্রুটী ছিল, এই সংস্করণে তাহা সংস্করণে তাহা সংশােধন করিয়াছি। পণ্ডিতপ্রবর বীরেশ্বর পাঁড়ে, কবিবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজ্ঞানাচার্য্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, স্বদেশানুরাগী অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রভৃতি সুধিগণের নির্দেশানুসারে কয়েকটি প্রস্তাব নূতন করিয়া সন্নিবিষ্ট করিয়াছি। এতদ্ভিন্ন গত মহাযুদ্ধের শেষফল, ইংরেজ-জাপান সন্ধি, রুষ জাপান সন্ধি প্রভৃতির সারমর্ম্ম বিবৃত করিয়াছি। তজ্জন্য পুস্তকের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ বর্দ্ধিত হইয়াছে। গ্রাহকগণের অনুরােধ নিবন্ধন মূল্য প্রথম সংস্করণের ন্যায় চারি আনাই রাখিয়াছি।

    শ্রীউমাকান্ত হাজারী।

    সামটা পােষ্ট,

    বি, সি, আর।