Blog

  • ছয়

    ছয়

    ঘুটফুটে সন্ধ্যা। আকাশে অসংখ্য মেঘের ভিড়। এই বুঝি বৃষ্টি এলো। কাঠের সিঁড়িগুলো বেয়ে উপরে উঠে এসে কাসেদ দেখলো, বাসায় কেউ নেই। শুধু সালমা ড্রয়িং রুমে একখানা চৌকির ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে কি একটা পত্রিকা পড়ছে।

    কে কাসেদ ভাই, এই সন্ধ্যাবেলা কোত্থেকে?

    মহাবিদ্যালয় মানে কলেজ থেকে, বাসায় কি কেউ নেই?

    না, ওরা সবাই সিনেমায় গেছে।

    তুমি যাওনি? যাইনি সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। পত্রিকাটা বন্ধ করে উঠে বসে সালমা বললো, শরীরটা সেই সকাল থেকে ভালো নেই।

    কেন, কী হয়েছে? ওর সামনে চৌকিতে এসে বসলো কাসেদ।

    সালমা বললো, অসুখ করেছে।

    কী অসুখ?

    সালমা ফিক্‌ করে হেসে দিলো এবার যান, অতো কথার জবাব দিতে পারবো না। একটা কিছু পেলেই হলো, অমনি সেটা নিয়ে প্রশ্ন আর প্রশ্ন। কী বিশ্ৰী স্বভাব আপনার। কাসেদ গম্ভীর হয়ে গেলো। একটু পরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, বিশ্ৰী স্বভাব দিয়ে তোমায় আর ব্যতিব্যস্ত করবো না, চলি এবার।

    মুহুর্তে ওর পথ আগ্‌লে দাঁড়ালো সালমা। যাবেন কী করে, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।

    হোক, তাতে তোমার কী?

    সালমা মুখ টিপে হাসলো একটুখানি। তারপর বললো, ইস, এত রাগ নিয়ে আপনি চলেন কী করে।

    সহসা ওর খোলা চুলের গোছা ধরে একটা জোরে টান মারলো কাসেদ। রাগে ফেটে পড়ে বললো, ফাজিল মেয়ে কোথাকার। ইয়ার্কির আর জায়গা পাওনা, তাই না?

    সালমার মুখখানা মান হয়ে গেলো। দেখতে না দেখতে চোখজোড়া পানিতে টলমল করে উঠলো ওর। সামনে থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে আবার কোঁচের উপরে বসলো সে। পরক্ষণে ডুকরে কেঁদে উঠলো সালমা, আমি এমন কা করেছি যে, আপনি সব সময় আমার সঙ্গে অমন দুর্ব্যবহার করেন?

    চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়ালো কাসেদ।

    সালমা কাঁদছে।

    কৌচের ওপর উপুড় হয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে সে।

    খোলা জানোলা দিয়ে আসা বাতাসে নয়, কান্নার আবেগে দেহটা কাঁপছে তার।

    খোলা চুলগুলো পিঠময় ছড়ানো।

    ধীরে ধীরে ওর পাশে এসে বসলো কাসেদ।

    সালমা, সে ডাকলো ভয়ে ভয়ে।

    সালমা কোনো উত্তর দিলো না।

    ওর মাথার উপর আস্তে করে একখানা হাত রাখলে সে। সালমা সহসা উঠে বসলো। সালমা তীব্র দৃষ্টিতে তাকালো এক পলক ওর দিকে। তারপর তীব্ৰ বেগে ছুটে পাশের ঘরে চলে গেল সে।

    কাসেদ ডাকলো, সালমা।

    সালমা সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।

    তারপর আর কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না তার।

    সেদিন অনেকক্ষণ এক ঘরে বসেছিলো কাসেদ। ভেবেছিলো হয়তো এক সময় রাগ পড়ে গেলে বাইরে আসবে সালমা।

    সালমা আসেনি।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    কাসেদের আপন বোন নয় নাহার।

    মায়ের দূর সম্পৰ্কীয় এক খালাতো বোনের মেয়ে। ছোটবেলায় ওর মা মারা যান। ওর বাবা তখন কী একটা কোম্পানীতে চাকরি করতেন।

    স্ত্রীকে হয়তো বড় ভালবাসতেন তিনি, তবুও কিছুদিন পরে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে মিলিটারীতে চলে যান। নাহারকে রেখে যান মায়ের কাছে। মাঝে মাঝে চিঠি আসতো।

    কখনো মাদ্রাজ থেকে। কখনো পেশোয়ার থেকে। কখনো কানপুর।

    শেষ চিঠি এসেছিলো আরাকান থেকে।

    তারপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।

    কেউ বলেছে যুদ্ধে মারা গেছে।

    কেউ বলেছে, জাপানীরা ধরে নিয়ে গেছে টোকিওতে।

    লড়াই শেষ হলো।

    সন্ধি হলো শত্ৰু-মিত্ৰে।

    তারপর আরো কত বছর গেলো নাহারের বাবা আর ফিরে এলেন না।

    মা বলতেন, আমার কোন মেয়ে নেই, তুই আমার মেয়ে। তোকে মানুষ করে বড় ঘরে বিয়ে দেবো আমি। তোর ঘরের নাতি-পুতি দেখবো, তবে মরবো।

    বাবা বলতেন, বেশ হলো, এতদিনে মেয়ের সখ মিটলো তোমার।

    মা বলতেন, মিটবে না। খোদার কাছে কত কেঁদেছি, কত বলেছি আমায় একটা মেয়ে দাও। দেখলে তো, খোদার কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। তবু তুমি এক বেলা নামাজ পড় না। কেন পড় না বলতো? তোমার কি পরকালের একটুও ভয় হয় না?

    আবার ইহকাল পরকাল নিয়ে এলে কেন বলতো? বাবা ক্ষেপে উঠতেন, বেশ তো কথা হচ্ছিলো।

    মা স্নান হেসে বলতেন, নামাজের নাম নিলেই তোমার গায়ে জ্বর আসে কেন বলতে পারো?

    বাবা কিছু বলতেন না, শুধু সরোষ দৃষ্টিতে এক পলক তাকাতেন মায়ের দিকে। মা আফসোস করে বলতেন, তুমি আমাকে দোজখে না নিয়ে ছাড়বে না। বাবা নির্বিকার গলায় জবাব দিতেন, বেহেস্তের প্রতি আমার লোভ নেই। তোমার যদি থেকে থাকে তুমি যেও, আমি তোমার পথ আগলে দাঁড়াবো না। এরপর মা থেমে যেতেন, অবুঝ স্বামীর সঙ্গে তর্ক করা নিরর্থক তা তিনি ভালো করেই জানতেন।

    সামনে খোলা খাতাটার দিকে চোখ পড়তেই কাসেদ বিব্রত বোধ করলো। কবিতা লিখতে বসে খাতার মধ্যে এতক্ষণ সব কী লিখছে সে? ইকবাল, জাহানারা, বিয়ে, নাহার, মিলিটারী, কানপুর, নামাজ, শিউলী। একটার পর একটা হিজিবিজি লেখা। সাদা কাগজটা আরো অনেক শব্দের ভরে ভরে উঠছে। খাতা থেকে পাতাটা ছিড়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দিলো কাসেদ।

    দরজার দিকে চোখ পড়তে দেখলো, নাহার দাঁড়িয়ে।

    কী ব্যাপার কিছু বলবে?

    নাহার বললো, মা ডাকছেন। বলে চলে গেল সে।

    মা তখনো গল্প করছিলেন খালুর সঙ্গে। খালু একটা মোড়ার ওপর বসে। মা চৌকির ওপর পা ছড়িয়ে খালুর পান বানাচ্ছেন, আর কী যেন আলাপ করছেন।

    নাহার একপাশে দাঁড়িয়ে।

    কাসেদ আসতে মা বললেন, বস।

    খালু বললেন, তুমি কি সেই কেরানীগিরির চাকরিটা এখনো আঁকড়ে রেখেছো নাকি?

    কাসেদ সায় দিয়ে বললো, হ্যাঁ।

    খালু বললেন, অন্য কোথায় ভালো দেখে একটা কিছু পাওয়া যায় কিনা চেষ্টা-চরিত্র করো। এ দিয়ে কতদিন চলবে।

    খালু নিজে এককালে কেরানী ছিলেন; তাই কেরানীগিরির বেদনা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।

    কাসেদকে চুপ থাকতে দেখে তিনি আবার বললেন, ধোপার গাধা আর কোম্পানীর অফিসের কেরানীর মধ্যে পার্থক্য নেই বুঝলে? এতে না আছে কোন রোজগার, না আছে সম্মান।

    কাসেদ বললো, তিনজন মানুষ আমরা, এ রোজগারেই চলে যাবে। টাকা টাকা করে, টাকা দিয়ে করবো কী?

    মা বললেন, শোন, ছেলের কথা শোন। যেন সংসার এই থাকবে। ঘরে আর বউ ছেলে আসবে না। বলি তুই এমন হলি কী করে বলতো, তোর বাবা তো এমনটি ছিলেন না। কাসেদ কোন উত্তর দেবার আগেই খালু বললেন, ‘এ নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবে না। বড়বু’। মাথায় বোঝা চাপলে আপনা থেকেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বলে পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে একগাল হাসলেন তিনি। নাহার হঠাৎ বললো, মা ভাত দেবো?

    মা ব্যস্ততার সঙ্গে বললেন, তাইতো, কথায় কথায় দেখছি অনেক রাত হয়ে গেছে। যাও ভাত বেড়ে নাও, তোমার খালুও এখানে খাবেন।
    খালু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না বড়বু, আমি বাসায় গিয়ে খাবো। ওরা সবাই বসে থাকবে।

    মা হেসে বললেন, মেয়ে আসছে বেড়াতে, বাসায় নিশ্চয়ই খুব ভালো পাক-শাক হচ্ছে। আমাদের এখানে ডাল-ভাত কি আর মুখে রুচবে?
    কী যে বলেন বড়বু, খালু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, বাসায় কি আর আমরাও কোর্মা পোলাও খাই, ডাল ভাত সব জায়গায়। এখন চলি, আরেক দিন এসে খেয়ে যাবো। যাবার উদ্যোগ করতে করতে আবার থেমে গেলেন খালু। কাসেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সালমা এসেছে ঢাকায়। বড়বু’কে বলে গেলাম রোববার দিন ওকে নিয়ে বাসায় এসো। কাসেদ অবাক হয়ে বললো, রোববার দিন কেন?

    মা বললেন, তোমাদের দাওয়াত করে গেলেন উনি। নাতিনের আকিকা হবে। প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না কাসেদ। যখন বুঝতে পারলো তখন আরো চিন্তিত হলো সে, সালমার মেয়ে হয়েছে নাকি?

    মা পরক্ষণে বললেন, ওমা তুই জানিসনে? বলতে গিয়ে কথাটা গলার মধ্যে আটকে গেলো তার। ঢোক গিলে আবার বললেন, আজ তিন মাস হতে চললো, তা তুই জানবি কোত্থেকে, আত্মীয়-স্বজন কারো খোঁজ কী তুই রাখিস। কী যে হলি বাবা।

    খালু হেসে বললেন, ও কিছু না বড়বু। এ হলো কেরানী রোগ।

    আর কারো কথা মনে থাকে না, সব ভুলে যেতে হয়।

    আরেকটা পান মুখে পুরে দিয়ে একটু পরে বিদায় নিলেন খালু।

    পাকঘরে বসে খাওয়ার আয়োজন করছে নাহার।

    মা কলতলায় বসে বসে অজু করছেন। এশার নামাজ না পড়ে ভাত মুখে দেন না তিনি।

    কাসেদ তখনো মায়ের বিছানায় বসে।

    নীরব।

    নীরবে ভাবছে সে।

    কী আশ্চৰ্য, সালমা মা হয়েছে।

    সেই সালমা–

    পরনে কালো ডোরাকাটা ফ্রক। মাথায় সাপের মত সরু একজোড়া বিনুনী। পায়ে স্লিপার।

    অপরিসর বারান্দায় রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটি দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

    পেছন থেকে পা টিপে টিপে এসে ওর চোখজোড়া দু’হাতে চেপে ধরলো কাসেদ।

    এই কী হচ্ছে, হাতজোড়া ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো সালমা। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে সে সহসা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, সেই কখন থেকে বসে আছি। আর উনি এতক্ষণে এলেন।

    ওর একটা বিনুনীতে টান মেরে কাসেদ বললো, এই তোকে একশো বার নিষেধ করে দিয়েছি না মিথ্যে কথা বলিসনে।

    সালমা অবাক হয়ে বললো, বা-রে মিথ্যে কথা কই বললাম।

    এই তো বললি।

    কই, কখন?

    এইতো একটু আগে।

    ইস, উনি বললেই হলো, ঠোঁট উল্টে মুখ ভেংচালো সালমা।

    ওর বেণী জোড়া ধরে আবার টান দিলো কাসেদ, বসে আছি বললি কেন, তুই তো আসলে দাঁড়িয়েছিলি।

    চুলে টান পড়ায় যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো সালমা। তারপর চিৎকার করে উঠে বললো, বলবো, একশোবার মিথ্যে কথা বলবো আমি। তাতে তোর কী শুনি।

    কাসেদ ক্ষেপে গিয়ে ওর মাথাটা রেলিঙের সঙ্গে ঠুকে দিয়ে বললো, তুই করে বললি কেন রে, আমি কি তোর ছোট না বড়?

    সালমা ততক্ষণে কাঁদতে শুরু করেছে।

    ওকে কাঁদতে দেখে কাসেদ বিব্ৰতবোধ করলো। বার কয়েক হাফপ্যাণ্টে হাত মুছলো সে। তারপর কাছে এসে দাঁড়িয়ে কোমল গলায় বললো, লেগেছে না-রে?

    সালমা কোনো জবাব দিলো না।

    একটু পরে ওর পিঠের উপর ভয়ে ভয়ে একখানা হাত রেখে কাসেদ শুধালো, পার্কে যাবি না?

    এক ঝটিকায় ওর হাতখানা দূরে সরিয়ে দিলো সালমা।

    কাসেদ আবার রেগে গিয়ে বললো, এই এক দুই করে আমি দশ পর্যন্ত গুনবো; এর মধ্যে যদি তুই না যাস তাহলে আমি চললাম। বলে জোরে জোরে এক দুই গুনতে শুরু করলো সে। ন’য়ে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো কাসেদ। সালমা তখনো কাঁদছে। কাসেদকে চুপ করে থাকতে দেখে একবার শুধু আড়চোখে তাকালো সালমা।

    কাসেদ অতি কষ্টে দশ উচ্চারণ করলো; কিন্তু সঙ্গে বললো; দেখ তোকে পনেরো পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দিলাম। এবার কিন্তু একটুও নড়াচড় হবে না। বলে আবার গুনতে শুরু করলো সে।

    পনেরো বলার পূর্ব মুহূর্তে সালমা চিৎকার করে উঠলো, তুই আমাকে মেরেছিস কেন?

    কাসেদ হেসে দিয়ে বললো, আর মারবো না, চল।

    ডান হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালো সালমা। তারপর ফিক্‌ করে হেসে দিয়ে বললো, আজ কিন্তু আমাকে দোলনায় চড়াতে হবে।

    আর একদিন।

    তখন ফ্রক ছেড়ে সালওয়ার পায়জামা ধরেছে সালমা।

    বয়স বেড়েছে। হয়তো পনেরো কিম্বা ষোল।

  • চার

    চার

    বড় সরল মেয়ে শিউলী।

    কিছুক্ষণের পরিচয়ে বড় সহজ হয়ে এসেছে সে। যে কথাগুলো সকলকে বলা যায় না, তাও সে বলেছে ওকে।

    জাহানারা যদি শিউলীর মত হতো? কাসেদ ভাবলো নীরবে।

    শিউলী বললো, আমার আর সব বন্ধুরা যদি আপনার মতো হতো তাহলে বড় ভালো হতো, তাই না কাসেদ সাহেব?

    কাসেদ বললো, আমি আপনার বন্ধুদের কোনদিন দেখিনি সুতরাং তাদের সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে পারছিনে। তবে, আমাকে কেন যে আপনি আদর্শ বন্ধু বলে ভাবছেন তাও ঠিক বুঝতে পারলাম না। একি আপনার উচিত হচ্ছে?

    নিশ্চয়ই হচ্ছে। অত্যন্ত জোরের সঙ্গে জবাব দিলো শিউলী। আজকাল আর মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না। আপনাদের মত পুরুষের চোখের দিকে তাকালেই মনের ভাষা পড়ে নিতে পারি আমি। বুঝতে পারি, লোকটা কেমন।

    শিউলী থামালো।

    কাসেদ মৃদু হেসে বললো, অল্প বয়সে দেখছি অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে আপনার।

    অভিজ্ঞতা কম বেশি সবারই হয়। শিউলী গম্ভীর গলায় জবাব দিলো। তবে কেউ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, কেউ নেয় না।

    আপনি কোন দলে?

    শিউলী বলল, প্রথমোক্ত।

    কাসেদ বলল, তাহলে নতুন কোন পুরুষের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব না করাই উচিত।

    তারপর বন্ধু বানানো উচিত।

    আমাকে যাচাই করেছেন কি?

    অবশ্যই।

    কখন করলেন?

    আপনার অজান্তে। মুখ টিপে হাসল শিউলী। আমার বাসা এসে গেছে। এখানে নামতে হবে আমায়।

    রিক্সাটা থামিয়ে ছাই রঙের একটা দোতলা বাড়ির সামনে নেমে পড়লো শিউলী। বাড়ির বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালো সে। বললো, আবার দেখা হবে। সময় করে একবার আসুন আমাদের বাসায়। কাল কিম্বা পরশু।

    কাসেদ সংক্ষেপে বলল, আসবো।

    রিক্সা থেকে মুখ বের করে ওদের বাসাটা ভালো করে দেখে নিলো সে। দেখলো একটা বুড়ো দোতলার বারান্দায় নীরবে দেখছে ওদের।

    বাসায় এসে একবার জাহানারা ও শিউলীর কথা ভাবলো কাসেদ। দুটি মেয়েতে কী আশ্চৰ্য ব্যতিক্রম।

    জাহানারাকে সে আজ অনেক দিন ধরে চেনে।

    কতদিন সে গেছে ওদের বাসায়।

    সেও এসেছে এখানে।

    সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছে ওরা, তর্ক করেছে ইকবালের দর্শন নিয়ে। রবি ঠাকুরের কবিতা নিয়ে।

    মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত আলোচনার আশেপাশে এলেও গভীরে যায়নি কোনদিন। ইচ্ছে করেই যেন এড়িয়ে গেছে জাহানারা।

    হ্যারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে টেবিলের উপর থেকে একটা খাতা টেনে নিয়ে বসলো কাসেদ। কবিতা লিখবো। বহুদিন কিছু লেখা হয় নি।

    পাশের ঘরে ছোট খালুর সঙ্গে কথা বলছেন মা।

    তাদের কথাগুলো এখান থেকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কাসেদ।

    মা বললেন, ওদের দু’জনকে নিয়েই তো আমার যত দুশ্চিন্তা। নিজের জন্যে ভাবিনে। বুড়ো হয়ে গেছি। কাল বাদে পরশু একদিন কবরে যেতে হবে।

    খালু বললেন, ‘সব বুড়ো-বুড়িদেরই ওই এক চিন্তা বড়বু’, ছেলেমেয়েদের একটা কিছু হিল্লে হোক। দু’পয়সা রুজি-রোজগার করে নিজের পায়ে দাঁড়াক ওরা। আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন তিনি।

    মা কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে হঠাৎ বললেন, নাহারের জন্যে একটা ছেলে দেখে দাও না। বয়স তো ওর কম হলো না।

    খালু বললেন, ‘আজকাল ছেলে পাওয়া বড় ঝকমারি বড়বু’। ম্যাট্রিক পাশ করা ছেলে, সেও আবার ম্যাট্রিক পাশ মেয়ে চায়, বুঝলেন না?

    মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর অস্পষ্ট গলায় বললেন, মেয়ে আমার ম্যাট্রিক পাশ নয় সত্যি, কিন্তু ঘরকন্নায় ওকে কেউই হার মানাতে পারবে না। ক্ষণকাল নীরব থেকে মা আবার বললেন, কী যে হয়েছে আজকাল কিছু বুঝিনে, আমাদের জামানায় লোকে দেখতো মেয়ে কেমন রান্নাবান্না করতে পারে।

    ‘সে জামানা পুরোনো হয়ে গেছে বড়বু’। এখন লোকে লেখাপড়া না জানা বউ-এর কথা চিন্তাও করতে পারে না।

    খালু থামলেন।

    অনেকক্ষণ ওদের কোন কথাবার্তা শোনা গেল না।

    হয়তো এখনো মনে মনে নাহারের কথা চিন্তা করছেন মা।

  • তিন

    তিন

    জাহানারা এখনো এলো না। একদল ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা বলছে সে। ওদের কথা যেন ফুরোবে না কোনদিন।

    মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো কাসেদ।

    এ কী বলছেন আপনি? জাহানারা অবাক চোখে তাকালো ওর দিকে।

    মৃদু গলায় বললো, আপনাকে ভালবাসার কথা কোনদিন ভুলেও ভাবিনি আমি।

    কোনদিনও না জাহানারা? কাতর কণ্ঠে শুধালো সে।

    কিন্তু কেন, কেন বলতে পারে? সহসা তার কণ্ঠস্বর দৃঢ় শোনালো। সামনে ঝুঁকে পড়ে কাসেদ বললো, যাকে এত কাছে ঠাঁই দিয়েছ, তাকে আরো কাছে টেনে নিতে এত ভয় কিসের?

    ভয়? আমি তো ভয়ের কথা বলি নি।

    তবে কেন তুমি ভালবাসবে না আমায়?

    ভালো লাগে না বলে।

    সহসা সুরেলা কণ্ঠে হেসে উঠল জাহানারা।

    না জাহানারা নয়, শিউলী। শিউলী হাসছে এখনো, আপনি মনে মনে এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা বলছিলেন কাসেদ সাহেব? শিউলী শুধালো।

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত গলায় বললো, কই, নাতো। আপনি কী করে বুঝলেন কথা বলছি।

    আমি সব বুঝি। আস্তে করে বললো সে। বলে অন্য একটা টেবিলে সরে গেল সে।

    মিলি তার ব্যাগ থেকে কাঁটা আর উল বের করে আপন মনে মোজা বুনছে। কাসেদের চোখে চোখ পড়তে মৃদু গলায় বললো, মেয়ের জন্য।

    আপনার মেয়ে আছে বুঝি? বোকার মত প্রশ্ন করে বসলো কাসেদ।

    মিলির মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো, হ্যাঁ বড্ড দুষ্ট। খালি পায়ে হেঁটে কেবল ঠাণ্ডা লাগায়।

    আবার মোজা বোনায় মন দিলো মিলি।

    কাসেদ নীরব।

    এই একা বসে থাকতে বড় বিরক্তি লাগছে ওর।

    চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কাসেদ।

    ওর দিকে চোখ পড়তে জাহানারা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো সামনে।

    একি, আপনি চলে যাচ্ছেন নাকি?

    বসে বসে আর কী করবো বলুন। জাহানারাকে চুপ থাকতে দেখে কাসেদ আবার বললো, কেন ডেকেছিলেন বললেন না তো?

    ও হ্যাঁ, জাহানারা মুদু হেসে বললো, আমি সেতার শিখবো ঠিক করেছি। একজন মাষ্টার দেখে দিতে পারেন?

    কাসেদ বোকার মত ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।

    এই বুঝি জাহানারার একান্ত প্রয়োজনীয় কথা? এরই জন্যে বাসায় যাওয়া আর অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকা।

    কাসেদ হতাশ হলো।

    জাহানারা বললো, চুপ করে রইলেন যে।

    কাসেদ বললো, না ভাবছিলাম আপনার হঠাৎ সেতার শেখার সখ হলো কেন?

    জাহানারা বললো, এমনি।

    কাসেদ বললো, বেশ মাষ্টার না হয় আপনাকে ঠিক করে দেবো, কিন্তু–কিন্তু কি?

    কিছুদিন পরে আবার ছেড়ে দেবেন না তো?

    দেখুন, সারা দেহে দৃঢ়তা এনে জাহানারা বললো, আমি এক কথার মেয়ে।

    কাসেদ মৃদু হেসে বললো, বেশ শুনে সুখী হলাম। এখন চলি তা হলে। আবার দেখা হবে।

    জাহানারা বললো, যাবেন? আচ্ছা বলে আবার সেই ছেলেমেয়েদের জটলার দিকে এগিয়ে গেল সে।

    কাসেদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো, জন্মদিনের আসরে আগত ছেলেদের, মেয়েদের, বুড়ো বুড়ীদের। তারপর যখন সে বাইরে বেরুতে যাবে এমনি শিউলী পেছন থেকে ডাকলো। চলে যাচ্ছেন বুঝি?

    কাসেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো, হ্যাঁ।

    শিউলী ঠোঁট কেটে বললো, যাবার আগে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়া উচিত ছিলো। তাই নয় কি?

    কাসেদ লজ্জা পেলো। ইতস্ততঃ করে বললো, বড় ভুল হয়ে গেছে, আর আপনারাও সবাই কথা বলছিলেন কিনা, তাই। আচ্ছা এখন চলি।

    দাঁড়ান। কাসেদকে অবাক করে দিয়ে শিউলী পরক্ষণে বললো, আমিও বাসায় ফিরবো ভাবছি। চলুন। এক সঙ্গে যাওয়া যাবে। দুহাতে পরনের শাড়িটা আলতো করে গুটিয়ে নিলো শিউলী। খোপাটা দেখলো ঠিক আছে কিনা, তারপর কাসেদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো সে। কিছুদূর পথ ওরা নীরবে হেঁটে এলো পাশাপাশি। শিউলী কোথায় যাবে কাসেদ জানে না। কোথায় বাসা ওদের সে প্রশ্নও করে নি সে। শুধু জানে, জাহানারার কাজিন শিউলী।

    শিউলী আজ বিকেলে ওর সঙ্গে পথ হাঁটছে।

    আরো অনেক পথ পেরিয়ে এসে সহসা কাসেদ শুধালো, আপনি কোন দিকে যাবেন?

    কেন, যেদিকে আপনি যাচ্ছেন। শিউলী নির্লিপ্ত।

    কাসেদ ঢোক গিলে বললো, আমি এখন বাসায় যাবো।

    বেশ তো চলুন না। দু’চোখে হাসি ছড়িয়ে শিউলী বললো, আমাকেও বাসায় ফিরতে হবে। একটুকাল থেমে সে আবার যোগ করলো, আপনাদের খুব কাছাকাছি থাকি।

    কাসেদ অবাক হলো, তাই নাকি? কই, বলেন নি তো?

    এইতো পরিচয় হলো, বলবার সুযোগ দিলেন কোথায়? শিউলে মুখ তুলে তাকালো ওর দিকে।

    কাসেদ কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেলো।

    ওরা তখন ষ্টোডিয়ামের কাছাকাছি এসে গেছে।

    রাত নামছে ধীরে ধীরে।

    বিজলী বাতিগুলো জ্বলছে মিটিমিটি।

    চারপাশের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে।

    খেলার মাঠের সামনেকার গোল চত্বরটিতে লোকজন বসে বসে গল্প করছে। খেলার গল্প। সিনেমার গল্প। আর মাঝে মাঝে চিনেবাদাম কিনে খাচ্ছে ওরা।

    সহসা হেসে বললো শিউলী, আচ্ছা আমরা এভাবে হাঁটছি কেন বলুন তো? একটা রিক্সা নিয়ে চলে গেলেই তো পারি।

    একটু পরে একখানা রিক্সায় চড়ে বসলো ওরা।

    একটি অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে রিক্সায় চড়ার অভিজ্ঞতা ওর এই প্ৰথম। তাই বারবার অস্বস্তি বোধ করছিলো কাসেদ। কপালে মৃদু ঘাম জন্মছিলো এসে; বারবার ওর কাছ থেকে সরে বসার চেষ্টা করছিলো সে। ওর অবস্থা লক্ষ্য করে শিউলী ঠোঁট টিপে হাসলো, আপনি ভয় পাচ্ছেন বুঝি?

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত গলায় বললো, কই, নাতো?

    তাহলে অমন করছেন কেন?

    না, এমনি। লজ্জা কাটিয়ে ওর সঙ্গে সহজ হবার চেষ্টা করলো কাসেদ।

    আপনার বাবা বেঁচে আছেন?

    আছেন।

    মা?

    আছেন।

    বাবা কী করেন?

    সহসা শব্দ করে হেসে উঠলো শিউলী। অতসব জানতে চাইছেন কেন বলুন তো? বিয়ের সম্বন্ধ পাঠাবার চিন্তা করছেন বুঝি? শিউলী ঝুঁকে তাকালো ওর মুখের দিকে।

    ওর কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হলো কাসেদ।

    হঠাৎ সে ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলো।

    শিউলী আস্তে করে বললো, রাগ করলেন তো? করুন। এমনি সবাই আমার ওপর রাগ করে। আপনি অবশ্য ওদের সবার মত কিনা জানি না। ক্ষণকাল থেমে শিউলী আবার বললো, জানেন, আমি অনেক লোকের সঙ্গে মিশেছি। ওরা অনেকেই আপনার বয়েসি। কেউবা ছোট। কেউ আরো বড়ো। ওদের সঙ্গে বন্ধু হিসেবেই মিশতাম আমি। আপনি হয়তো বলবেন, এ দেশে পুরুষে মেয়েতে বন্ধুত্ব চলতে পারে না। আমি বলবো, ওটা ভুল। ওটা আপনাদের মনের সংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। এই যে আমরা দু’জন এক রিক্সায় চড়ে বাসায় ফিরছি। লোকে দেখে কত কিছুই না ভাবতে পারে। কিন্তু আমি জানি, আমাদের মনে কোন দুর্বলতা নেই।

    কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।

    শান্ত শিশুর মত নীরবে শিউলীর কথাগুলো শুনছে সে। গাল বেয়ে মুদু ঘাম ঝরছে তার।

    বড় রাস্তা পেরিয়ে রিক্সাটা গলির মধ্যে ঢুকলো।

    শিউলী বললো, জানেন? ওরা কেউ আমার বন্ধুত্বের মূল্য দিতে পারে নি। কিছুদিন মেলামেশার পরেই ওদের ব্যবহার যেন কেমন পাল্টে যেতো। আমার চোখেমুখে চেহারায় কী যেন খুঁজে বেড়াতো ওরা। আমি দেখে ঠিক বুঝতে পারতাম না। তারপর–। বলতে গিয়ে আবার হেসে উঠলো শিউলী। তারপর যা আশঙ্কা করতাম তাই হতো। ওরা প্ৰেম নিবেদন করে বসতো আমায়। কী বিশ্ৰী ব্যাপার দেখুন তো। কাসেদের মুখের দিকে তাকালো শিউলী। ওর চেহারায় কী প্রতিক্রিয়া হলো তাই হয়তো লক্ষ্য করছিলো সে।

    কাসেদ নীরব।

    হঠাৎ সে প্রশ্ন করলো, আপনার বয়স কত?

    মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। ওরা বিব্রত বোধ করে। কিন্তু শিউলীর চোখেমুখে কোন ভাবান্তর দেখা গেলো না। যেন এমনি প্রশ্নের সঙ্গে সে বহুদিন থেকে পরিচিত। বহুবার তাকে এর জবাব দিতে হয়েছে। তাই পরক্ষণে শিউলী বললো, অত্যন্ত সহজভাবেই বললো, বয়স জানতে চাইছেন কেন, ভাবছেন বুঝি আমি অল্প বয়সে পেকে গেছি?

    কাসেদ বললো না, ঠিক তার উল্টো। বয়স হলে কী হবে। আপনি আসলে এখনও বাচ্চা রয়ে গেছেন।

    শিউলী মুহুর্ত কয়েক স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। যেন এর আগে এমনি উত্তর সে শোনে নি কোনদিন।

    ওকে চুপ থাকতে দেখে কাসেদ জিজ্ঞেস করলো, চুপ করে গেলেন যে? কী ব্যাপার, রাগ করেন নি তো?

    রাগ? অপূর্ব ভঙ্গি করে শিউলী জবাব দিলো, আপনি আমার কে যে আপনার উপর রাগ করবো?

    কাসেদ বেশ বুঝতে পারলো, এ মেয়ের সঙ্গে কথা বলায় সে পেরে উঠবে না। তবু শিউলীকে ভাল লাগলো ওর।

    বেশ মেয়ে।

  • দুই

    দুই

    পাশের ঘর থেকে মায়ের কোরান শরীফ পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। টেনে টেনে সুর করে পড়ছেন তিনি। রোজ পড়েন। সকালে, দুপুরে আর রাতে। মাসে একবার করে কোরান শরীফ খতম করা চাই, নাইলে উনি শান্তি পান না। রাতে ভাল করে ঘুমও হয় না তাঁর।

    মাঝে মাঝে কাসেদ বলে, মা, এত পুণ্য দিয়ে তুমি করবে কী শুনি?

    মা হেসে জবাব দেন, একি শুধু আমার নিজের জন্যেরে—, তোদের জন্যে নয়? বলতে গিয়ে সহসা মায়ের মুখখানা স্নান হয়ে আসে। হয়তো মৃত স্বামীর কথা সে মুহুর্তে মনে পড়ে তাঁর। বাবা ছিলেন একেবারে উল্টো মেরুর মানুষ। ভুলেও কোনদিন ধর্ম-কর্মের ধার ধারতেন না তিনি। একবেলা নামাজ কিম্বা একটা রোজাও কখনো রাখেন নি।

    মা কিছু বলতে গেলে উল্টো ধমকে উঠতেন, বলতেন ওসব বাজে কাজে সময় ব্যয় করার ধৈৰ্য আমার নেই।

    মা আহত হতেন। কিন্তু সাহস করে আর কিছু বলতেন না।

    বাবা মারা গেছেন, আজ কতদিন। আজও রাত জেগে মা বাবার জন্যে প্রার্থনা করেন। কান্নাকাটি করেন। খোদার কাছে বলেন, ওকে তুমি মাফ করে দিও খোদা, ওর সব অপরাধ তুমি ক্ষমা করে দিও।

    চারপাশে তাকিয়ে দেখলো, বিছানাটা সুন্দর করে বিছিয়ে দিয়ে নাহার ইতিমধ্যে সরে পড়েছে। রান্নাঘরে বোধ হয় খাওয়ার আয়োজন করছে সে এখন।

    বইটা খুলে জাহানারার চিঠিখানা আবার বের করলো কাসেদ।

    হাতের লেখাটা বেশ পরিষ্কার আর ঝকঝকে।

    জাহানারা, আমি তোমাকে ভালবাসি জাহানারা!

    জাহানারা নীরব।

    চোখজোড়া মাটিতে নামিয়ে নিয়ে কী যেন গভীরভাবে ভাবছে সে।

    সারা মুখে ঈষৎ বিস্ময়।

    সারা দেহ উৎকণ্ঠায় কাঁপছে তার। সন্দেহ আর সম্ভাবনার দোলায় দুলছে তার মন!

    কাসেদ ভয়ে ভয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি আমায় ভালবাস না জাহানারা?

    জাহানারার ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে এক টুকরো হাসি জেগে উঠলো।

    ধীরে ধীরে সে হাসি চোখে আর চিবুকে ছড়িয়ে পড়লো তার। লজ্জায় মাথাটা নত হয়ে এলো। মুখখানা অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে সে বললো, তুমি কি কিছুই বোঝ না?

    কাসেদ নীরব।

    মুহুর্তের আনন্দে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। দীর্ঘ সময় ধরে সে দিনে রাতে যাকে নিয়ে অশেষ কল্পনার আলপনা বুনতো, সে আজ তার কাছে ধরা দিয়েছে।

    জাহানারা! মিষ্টি করে সে ডাকলো।

    বলো। চোখ তুলে তাকাতে সঙ্কোচ বোধ করছে মেয়েটি।

    কাসেদ বললো, তুমি আমাকে আজ বড় অবাক করলে।

    কেন?

    আমি ভাবতেও পারি নি তুমি আমাকে ভালবাসতে পারো।

    অমন করে ভাবতে গেলে কেন?

    জানি না। শুধু জানি এ প্রশ্ন বার বার আমাকে যন্ত্রণা দিতো। আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিলো সে। জাহানারা কাছে সরে এসে একখানা হাত রাখলো ওর নরম তুলতুলে চুলের অরণ্যে। তারপর ধীরে ধীরে সিঁথি কাটতে কাটতে মৃদু গলায় সে বললো, থাক। ওসব কথা এখন থাক, অন্য কিছু বলো।

    কাসেদ ওর চোখে চোখ রেখে আস্তে করে শুধালো, কী বলবো?

    কিরে বিড়বিড় করে কী-সব বকছিস তুই? মায়ের কণ্ঠস্বর তীরের ফলার মত কানে এসে বিঁধলো তার। কাসেদ চমকে উঠে বসলো।

    মা ওর মাথার ওপর একখানা হাত রেখে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, আজকাল আমন করে তুই কী ভাবিস বলতো?

    কাসেদ ইতস্ততঃ করে বললো, ও কিছু না মা, চলো ভাত দেবে এখন, বড় ক্ষিধে পেয়েছে।

    মা ভর্ৎসনা করে বললেন, ক্ষিধে পেয়েছে এতক্ষণ বলিস নি কেন, চল, খাবি চল। ওঠ, মুখহাত ধুয়ে নে। বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

    রান্না ঘরে নাহার এখন খাবার সাজাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি এখনো থামে নি।

    বাতাস বেড়েছে আরো।

    পরদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে জাহানারাদের বাসায় গেলো কাসেদ।

    বাসাটা ওদের পুরানা পল্টনে। একতলা বাড়ি সদ্য চুনকাম দেয়া।

    সামনে বাগান। বসে বিকেলে ওরা চা খায়, গল্প করে।

    পথে যেতে যেতে কাসেদ ভাবলো, জাহানারা হয়তো তার অপেক্ষায় এতক্ষণে অধীর হয়ে আছে। ঘর ছেড়ে বারবার বারান্দায় বেরিয়ে আসছে সে। চেয়ে চেয়ে দেখছে লোকটা আসছে কিনা। সে কি আসবে না আজ? পাতলা কপালে সরু সরু রেখা এঁকে শোবার ঘরে সরে গেলো জাহানারা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাখানা দেখলে সে। বড় স্নান মনে হচ্ছে আজ। কিছুই ভাল লাগছে না। মন বসতে চাইছে না কোন কাজে। বিকেল হয়ে গেলো, কাসেদ এখনো আসছে না কেন? ভাবতে বড় ভালো লাগলো ওর। মনটা খুশীতে ভরে গেলো। জাহানারা কি সত্যি ওকে ভালবাসে?

    বাসার কাছে এসে কাসেদ দেখলো সামনের বাগানে অনেক লোকের ভিড়। ছেলেবুড়ো-মেয়ে। দেখে অবাক হলো সে। সবার পরনে সদ্য ধোয়ান কাপড়। হাসছে। কথা বলছে। মাঝে মাঝে চানাচুর আর ডালমুটি খাচ্ছে। একখানা পিরিচ হাতে অনেকগুলো মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জাহানারা। আজ সুন্দর করে সেজেছে সে। পরনে হালকা নীল রঙের শাড়ি। চুলগুলো খোপায় বাধা। চারপাশে তার সাদা ফুলের মালা জড়ানো। কপালে কুমকুমের টিপ। কাসেদকে দেখতে পেয়ে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলো জাহানারা।

    আপনি এলেন তাহলে?

    একমুখ হেসে বললো সে।

    হাসলে ওকে আরো সুন্দর দেখায়।

    সরু সরু দাঁতগুলো মুক্তোর মত চিকচিক করে ওঠে।

    কাসেদ শুধালো, না আসার কোন হেতু ছিলো কি? যাক্‌গে, বাড়িতে এত অতিথির ভিড় কেন?

    জাহানারা জিভ কেটে বললো, ওমা আপনি জানেন না বুঝি, আজ আমার জন্মদিন।

    জানবো কী করে বলুন। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো কাসেদ।

    জাহানারা পরক্ষণে বললো, তাইতো আপনাকে বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি। কিছু মনে করেন নি তো?

    না, এতে মনে করার কী আছে? নিজেই যেন লজা পেলো কাসেদ। জাহানারা বললো, আসুন কিছু মুখে দিন, চা খাবেন, না কোন্ড ড্রিঙ্ক? কথাগুলো কাসেদের কানে পৌঁছালো কি-না, বোঝা গেলো না। মুহুর্তে সে বিব্রত বোধ করলো।

    চারপাশে তাকিয়ে দেখলো, অনেকগুলো চোখের দৃষ্টির মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে।

    জাহানারা আবার বললো, দাঁড়িয়ে কেন, আসুন।

    কাসেদ ইতস্ততঃ করে শুধালো, আমায় ডেকেছেন কেন বললেন না তো? ভ্রূজোড়া তুলে জাহানারা বললো, ও হ্যাঁ, সে পরে আলাপ করা যাবে। আগে কিছু খেয়ে নিন। অফিস থেকে এসেছেন, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পথে কিছু খান নি, তাই না?

    কাসেদের মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো, কিছু বলতে চেষ্টা করলে সে, পারলো না। দু’টি মেয়ে দলছাড়া হয়ে জাহানারার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলো আর অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখছিলো তাকে।

    জাহানারা মৃদু হেসে বললো, আসুন। এদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই আপনার। মিলি চৌধুরী। আমার অনেক কালের বান্ধবী, ইডেনে পড়ে। আর এর নাম শিউলী, আমার কাজিন।

    আর ইনি হলেন কাসেদ আহমেদ। নাম হয়তো শুনে থাকবে তোমরা, কবিতা লেখেন।

    মিলি আর শিউলী হাত তুলে আদাব জানালো। পরিমিত হাসলো দু’জনে। মিলি জানতে চাইলো, আপনি কী ধরনের কবিতা লেখেন?

    কাসেদ বললো, লিখি না, লিখতাম এককালে।

    ইতিমধ্যে জাহানারা সরে গেছে সেখান থেকে। অদূরে কয়েকটি ছেলে-মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে সে।

    শিউলী শুধালো, আপনার কোন বই বেরিয়েছে?

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, না।

    মিলি বললো, আসুন বসা যাক।

    বাগানের এক কোণে তিনখানা বেতের চেয়ার টেনে গোল হয়ে বসলো ওরা।

    কাসেদ নীরব।

    মিলি আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখছে।

    শিউলী মিটমিটি হাসছে।

    দোহারা গড়ন। ময়লা রঙ। লম্বা মুখের উপর নাকটা বড় ছোট হলেও বেমানান মনে হয় না। চোখের নিচে সরু একটা কাটা দাগ। ভ্রুতে সুরমা টানা। কাসেদের মুখের ওপরে চঞ্চল চোখজোড়া মেলে ধরে হাসছে সে। অস্বস্তিতে মুখখানা অন্যদিকে সরিয়ে নিলো কাসেদ।

    আড়চোখে মেয়েটিকে আরেকবার দেখলো সে।

    এখনো তাকিয়ে মেয়েটি।

    এখনো।

    সহসা মিলি শুধালো, আপনি কোথায় থাকেন, কাসেদ সাহেব?

    কাসেদ মৃদু গলায় বললো, কলতাবাজারে।

    বাসায় কে আছেন আপনার?

    মা আছেন আর এক দূরসম্পৰ্কীয়া বোন।

    শিউলী হাসছে, হাসুক।

  • এক

    এক

    আকাশের রঙ বুঝি বারবার বদলায়। কখনো নীল। কখনো হলুদ। কখনো আবার টকটকে লাল। মাঝে মাঝে যখন সাদা-কালো মেঘগুলো ইতি-উতি ছড়িয়ে থাকে আর সোনালী সূর্যের আভা ঈষৎ বাঁকা হয়ে সহস্ৰ মেঘের গায়ে লুটিয়ে পড়ে তখন মনে হয়, এর রঙ একটি নয়, অনেক।

    এখন আকাশের কোন রঙ নেই।

    আছে বৃষ্টি।

    একটানা বর্ষণ।

    সেই সকাল থেকে শুরু হয়েছে। তবু থামবার কোন লক্ষণ নেই। রাস্তায় এক হাঁটু পানি জমে গেছে। অতি সাবধানে হাঁটতে গিয়েও ডুবন্ত পাথরনুড়ির সঙ্গে বার-কয়েক ধাক্কা খেয়েছে কাসেদ। আরেকটু হলে একটা সরুনর্দমায় পিছলে পড়তো সে। গায়ের কাপড়টা ভিজে চুপসে গেছে। মাথার চুলগুলো বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে যখন বাসায় এসে পৌঁছলো কাসেদ, তখন জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে।

    বোধ হয় ঝড় উঠবে আজ।

    প্ৰচণ্ড ঝড়।

    ভেজান দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে কাসেদ দেখলো, ছোট্ট একখানা পিঁড়ির ওপরে বসে চুলোয় আঁচ দিচ্ছে নাহার, মা তসবিহ হাতে পাশে দাঁড়িয়ে কী নিয়ে যেন আলাপ করছেন ওর সঙ্গে।

    ভেতরে আসতে অনুযোগ ভরা কণ্ঠে মা বললেন, দেখো, ভিজে কী অবস্থা হয়েছে দেখো। কী দরকার ছিলো। এই বৃষ্টিতে বেরুবার?

    কাসেদ কোন উত্তর দেবার আগেই মা আবার বললেন, ঠাণ্ডা লেগে তুমি একদিন মারা যাবে। এই বলে দিলাম দেখো, তুমি একদিন বৃষ্টিতে ভিজেই মারা যাবে।

    কেন মিছেমিছি চিন্তা করছে মা। ভেজাটা আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। দেখো কিছু হবে না।

    না হবে না। যেদিন অসুখ করবে। সেদিন টের পাবে। সহসা কী মনে পড়তে খানিকক্ষণ চুপ থেকে মা শুধোলেন, ছাতাটা করেছ কী শুনি? তাইতো মা, ছাতাটা! ইতস্ততঃ গলায় জবাব দিল, ওটা সেদিন অফিস থেকে এক ভদ্রলোক নিয়ে গেছেন, তার কাছ থেকে আর আনা হয় নি।

    যা ভেবেছিলাম, নাহারের দিকে এক নজর তাকিয়ে নিয়ে মা বিরক্তির সঙ্গে বললেন, তোর দিন যাবে কী করে আমায় বলতো? আজ এটা, কাল সেটা তুই শুধু মানুষকে বিলোতে থাকবি। রাজত্বি থাকতো না হয় বুঝতাম। টানাটানির সংসার।

    নিজের ঘরে এসে ভেজা কাপড়গুলো দড়ির ওপর ঝুলিয়ে রাখলো কাসেদ। আলনা থেকে একটা গেঞ্জি টেনে নিয়ে পরলো। তারপর উনুনের পাশে এসে বললো, বিলোচ্ছি কে বললো মা, ছাতাটা ভদ্রলোক কিছুক্ষণের জন্য চাইলেন। তাই দিলাম। ওটা তো চিরকালের জন্য দেই নি, কাল আবার চেয়ে নিয়ে আসব।

    মা এই অবসরে তসবিহ গুণছিলেন আর মনে মনে কী যেন পড়ছিলেন তিনি। থেমে বললেন, আনবি যে তা আমি জানি। ক’দিন ক’টা জিনিসি দিয়ে তুই ফেরত এনেছিস শুনি? এইতো, গেলো শীতে তোর বাবার কম্বলটা যে নিয়ে কোন এক বন্ধুকে দিলি, আর কী হলো?

    কী আর হবে মা। একদিন সে নিজেই এসে ফেরত দিয়ে যাবে।

    হ্যাঁ, দিয়ে যেতে ওর বয়ে গেছে। অমন জিনিস কেউ পেলে আর হাতছাড়া করে? লোকটাকে তুমি শুধু শুধু সন্দেহ করছে মা। ও বড় ভালো লোক। হাতজোড়া উনুনের উপর ছড়িয়ে দিলো কাসেদ। একটু গরম হয়ে নিতে চায় সে। মা বললেন, তুই তো দুনিয়া শুদ্ধ লোককে ভালো বলিস। আজ পর্যন্ত একটা লোককে খারাপ বলতে শুনলাম না। সেদিন মুদী এসে যাচ্ছেতা গালাগাল দিয়ে গেলো, তাকে একটা কথা বলেছিলি তুই?

    মা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন ছেলের দিকে।

    কাসেদ নীরবে আগুন পোহাতে লাগলো।

    নাহার এতক্ষণে একটা কথাও বলে নি। চুপচাপ মা ছেলের ঝগড়া দেখছিলো। সহসা উনুন থেকে মুখখানা তুলে আস্তে করে বললো, তোমার নামাজের সময় হয়ে গেলো মা। মা বললেন, তাইতো! বলে তাড়াতাড়ি চলেন গেলেন তিনি। চুলোর ওপরে চালগুলো ততক্ষণে ফুটতে শুরু করেছে। ঢাকনিটা তুলে পানির পরিমাণটা দেখে নিলো নাহার।

    কাসেদ তখনও চুপ করে আছে।

    নীরবে কী যেন ভাবছে সে।

    নাহার এক সময় বললো, জাহানারা এসে আজ অনেকক্ষণ বসেছিলেন।

    কখন এসেছিল সে? গলাটা যেন সহসা কেঁপে উঠলো তার। নাহার মৃদু গলায় বললো, সকাল বেলা।

    কিছু কি বলে গেছে তোমায়? কাসেদের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।

    নাহার বললো, না, একখানা চিঠি রেখে গেছে।

    চিঠিটা কোথায়?

    আপনার টেবিলের ওপর রাখা আছে। ঘাড় নিচু করে আবার আপন কাজে মন দিল নাহার। চোখ জোড়া তুলে এক নজর কাসেদের দিকে তাকালে সে হয়তো দেখতে পেতো সারা মুখ তার লাল হয়ে গেছে।

    উনুনের উপর থেকে হাতখানা সরিয়ে এনে পরক্ষণে উঠে দাঁড়ালো কাসেদ। দ্রুতপায়ে নিজের কামরায় এসে টেবিলের দিকে তাকালো সে। চিঠিখানা একটা বইয়ের নিচে চাপা দিয়ে রাখা। মুহুর্তে অনেকগুলো প্রশ্ন এসে ভিড় জমালো। চিঠিতে কী লিখেছে জাহানারা? আর কেনই বা এসে এতক্ষণ বসেছিলো সে? কাল বিকেলে নবাবপুরে দেখা হয়েছিলো ওর সঙ্গে। অনেকক্ষণ কথাও বলেছিলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ভোর না হতে আবার সে বাসায় আসলো কেন? বাসায় অবশ্য প্ৰায় আসে জাহানারা। কাসেদ না থাকলে মায়ের সাথে বসে বসে গল্প করে। কথা বলে। খামের ভিতর থেকে কাগজের টুকরোটা বের করে নিয়ে আগ্রহের সঙ্গে পড়লো কাসেদ।

    জাহানারা লিখেছে–

    অনেকক্ষণ বসেও আপনাকে না পেয়ে অবশেষে চলে যাচ্ছি। বিশেষ প্রয়োজন ছিলো।

    সময় করে একবার বাসায় আসবেন কিন্তু। আপনাকে আমার বড় দরকার।

    চিঠিটা বার-কয়েক পড়লো কাসেদ। বিশেষ করে শেষের লাইনটা। সেখানে যেন একটু অন্তরঙ্গতার ছোয়া রয়েছে। আন্তরিকতার স্পর্শ। কাগজটা আবার ভাঁজ করে বইয়ের মধ্যে রেখে দিল সে। তারপর নীরবে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো।

    বাইরে এখনো টুপটুপ বৃষ্টি পড়ছে।

    সরু গলিটায় একটা মানুষও নেই।

    সবাই ঘরে খিল এঁটে ঘুমোবার আয়োজন করছে এখন। কিম্বা, বিছানায় বসে বসে গল্প করছে, রূপকথার গল্প।

    কাসেদ ভাবলো আকাশটা পরিষ্কার হয়ে গেলে এখনই সে জাহানারাদের ওখানে যেতে পারতো। প্রয়োজনটা জেনে নেয়া যেতো ওর কাছ থেকে। নইলে রাতটা বড় উৎকণ্ঠায় কাটবে।

    কেন যেতে লিখেছে জাহানারা?

    জানালার পাশ থেকে সরে এসে বিছানায় বসলো কাসেদ।

    ওর মনে এখন রঙের ছোয়া লেগেছে। দু’চোখে স্বপ্নের আবীর ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে।

    একদিন জাহানারাকে বিয়ে করবে কাসেদ।

    অর্থের প্রতি তার লোভ নেই। একগাদা টাকা আর অনেকগুলো দাসীবাদীর স্বপ্নও সে দেখে না।

    ছোট্ট একটা বাড়ি থাকবে তার, শহর নয়, শহরতলীতে, যেখানে লাল কাঁকরের রাস্তা আছে আর আছে নীল সবুজের সমারোহ। মাঝে মাঝে দু’পায়ে কাঁকর মাড়িয়ে বেড়াতে বেরুবে ওরা।

    সকাল কিম্বা সন্ধ্যায়। রাস্তায় লোকজনের ভিড় থাকবে না। নিরালা পথে মন খুলে গল্প করবে ওরা, কথা বলবে।

    আজকের বিকালটা বড় সুন্দর, তাই না?

    কালও এমনটি ছিলো।

    চিরকাল যদি এমনটি থাকে?

    তাহলে বড় একঘেয়ে লাগবে। সহসা শব্দ করে হেসে উঠবে জাহানারা। হয়তো বলবে, একটানা সুখ আমি চাই না, মাঝে মাঝে দুঃখেরও প্রয়োজন আছে; নইলে সুখের মূল্য বুঝবো কেমন করে?

    ওরা কথা বলবে।

    আরো অনেক কথা।

    কখনো কানে কানে, কখনো মনে মনে, কখনো নীরবে।

    তারপর রাত নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরে আসবে ওরা।

    সামনের বাঁকানো বারান্দায় বেতের টেবিলের ওপর দু’কাপ চা রাখা। গরম চায়ের উত্তাপ যেন বার বার দেহকে স্পর্শ করছে এসে।

    বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেবে ওরা। কী ভাবছো?

    কিছু না।

    আমার কি মনে হচ্ছে জানো?

    কী?

    তোমার কপালে যদি একটা তারার টিপ পরিয়ে দিতে পারতাম।

    কাসেদ লক্ষ্যও করে নি কখন নাহার এসে বিছানার পাশে দাঁড়িয়েছে।

    ওর হাতের চুড়ির শব্দে সহসা যেন সন্বিত ফিরে পেলো সে।

    নাহার বললো, উঠুন চাদরটা ভালো করে বিছিয়ে দিই।

    ও। সরে এসে টেবিলের সামনে বসলো কাসেদ।

    এলোমেলো চাদরটা তুলে নিয়ে ভালো করে বিছিয়ে দিচ্ছে নাহার। ছিপছিপে দেহ ময়লা রঙ আর মিষ্টি চেহারার নাতিদীর্ঘ মেয়েটি বড় কম কথা বলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও কোন সময় মুখ দিয়ে বেরুবে না তার। আচ্ছা নাহার, ও এখানে কতক্ষণ বসেছিল?

    কে? নাহার অবাক চোখে তাকালো।

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত স্বরে বললো, জাহানারার কথা বলছি।

    নাহার অস্পষ্ট গলায় বললো, অনেকক্ষণ!

    অনেকক্ষণ? কাসেদ চুপ করে গেলো!

  • শেষ বিকেলের মেয়ে

    শেষ বিকেলের মেয়ে

    শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০) জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস। রোমান্টিক প্রেমের উপাখ্যানটির প্রকাশক সন্ধানী প্রকাশনী।

  • অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    [book]

    অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    [REPLIES TO THE MOST COMMON QUESTIONS ASKED BY NON-MUSLIMS]

    ডঃ জাকির নায়েক কর্তৃক আন্তর্জাতিক দা’ওয়াহ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ধারণা, বিকাশ ও পরিচালনা

    ভূমিকা

    দাওয়াহ একটি কর্তব্য

    আরবী ‘দাওয়াহ’ শব্দের অর্থ ‘আহ্বান’ বা ‘আমন্ত্রণ’। ইসলামী প্রেক্ষাপটে এর অর্থ  অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া বা ইসলাম প্রচার করা।

    ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) হলেন সমগ্র মহাবিশ্বের প্রভু, এবং মুসলমানদেরকে সমস্ত মানবজাতির কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

    মহিমান্বিত কুরআন বলে:

    ٱدْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلْحِكْمَةِ وَٱلْمَوْعِظَةِ ٱلْحَسَنَةِ ۖ وَجَـٰدِلْهُم بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ ۚ … ١٢٥

    আপনি মানুষকে আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা (হিকমাহ) ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা করুন উত্তমপন্থায়।

    — আলকুরআন, সূরা নাহল, আয়াত ১২৫।

    দাওয়াতের কৌশল

    অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার বিভিন্ন কৌশল রয়েছে। এমনকি যদি একজন মুসলিম ইসলাম সম্পর্কে হাজারটা ভাল কথা বলে, তবুও অধিকাংশ অমুসলিম ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে না কারণ তাদের মনের পেছনে ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলোর উত্তর পাওয়া যায় না।

    তারা ইসলামের ইতিবাচক প্রকৃতির সাথে একমত হতে পারে। কিন্তু, তাৎক্ষণিক তারা বলবে— “আহ! অথচ আপনারা সেই মুসলিম যারা মৌলবাদী, যারা সন্ত্রাসী। আপনি সেই মুসলিম যারা একাধিক নারীকে বিয়ে করেন। আপনারা সেই একই মানুষ যারা নারীদেরকে পর্দার আড়ালে রেখে অবরোধবাসিনী করে রাখেন, ইত্যাদি।”

    আমি ব্যক্তিগতভাবে অমুসলিমকে জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করি, তিনি ইসলামের ভুল কী বলে মনে করেন। তাদের সীমিত জ্ঞান দ্বারা, সঠিক বা ভুল, যেকোন উৎস থেকেই হোক না কেন, আমি সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করি, তারা ইসলামে কী ভুল বলে মনে করেন। আমি তাদের খুব অকপট এবং খোলামেলা হতে উত্সাহিত করি এবং তাদের বোঝাই যে আমি ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনা সহ্য করতে পারি।

    কুড়িটি অতি সাধারণ প্রশ্ন

    আমার বিগত কয়েক বছরের দাওয়াতের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছি যে, ইসলাম সম্পর্কে একজন সাধারণ অমুসলিমের বিশটি সাধারণ প্রশ্নও নেই। যখনই আপনি একজন অমুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন, “ইসলামে আপনার কি ভুল মনে হয়?” তিনি পাঁচ বা ছয়টি প্রশ্ন করেন এবং এই প্রশ্নগুলি সর্বদাই বিশটি সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে পড়ে।

    যৌক্তিক জবাব সংখ্যাগরিষ্ঠকে বোঝাতে সক্ষম

    ইসলাম সম্পর্কে বিশটি অতি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর প্রজ্ঞা ও যুক্তি দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অধিকাংশ অমুসলিম এইসকল উত্তর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। একজন মুসলমান যদি এই উত্তরগুলো মুখস্থ করেন বা সহজভাবে মনে রাখেন, ইনশাআল্লাহ তিনি সফল হবেন; যদি অমুসলিমদের ইসলামের সম্পূর্ণ সত্য সম্পর্কে বোঝাতে না পারেন, তবে অন্তত ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের ভুল ধারণা দূর করতে এবং ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা বিরত রাখতে পারবেন। খুব অল্প সংখ্যক অমুসলিম এই উত্তরগুলির পাল্টা জবাব দিতে পারেন, যার জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে।

    সময়ের ব্যবধানে ভুল ধারণা পরিবর্তন হয়

    ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলো বিভিন্ন সময় ও যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। সঙ্কলিত এই বিশটি সর্বাধিক সাধারণ প্রশ্ন বর্তমান সময়ের উপর ভিত্তি করে। কয়েক দশক আগে, প্রশ্নগুলি ভিন্ন ছিল এবং কয়েক দশক পরেও এই প্রশ্নগুলি পরিবর্তন হতে পারে মিডিয়া ইসলামকে কিভাবে প্রক্ষেপণ করে তার উপর ভিত্তি করে।

    বিশ্বেজুড়ে অভিন্ন ভুল ধারণা

    আমি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সাথে আলোচনা করেছি। সারা বিশ্বের সাধারণ অমুসলিমদের দ্বারা জিজ্ঞাসা করা ইসলাম সম্পর্কে এই বিশটি সর্বাধিক সাধারণ প্রশ্ন একই।

    অঞ্চলভেদে সম্পূরক প্রশ্ন হতে পারে

    স্থানভেদে কয়েকটি সম্পূরক প্রশ্ন থাকতে পারে, উদাহরণ স্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অতিরিক্ত প্রশ্ন ছিল; ইসলাম কেন সুদের লেনদেন হারাম করেছে?

    কিছু সাধারণ প্রশ্ন ভারতীয় অমুসলিমদের মধ্যে নির্দিষ্ট

    আমি সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত বিশটি সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে ভারতীয় অমুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত কিছু প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করেছি। যেমন, মুসলমানেরা আমিষ খায় কেন? কারণ এই যে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেদের পরিমাণ প্রায় বিশ শতাংশ অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে, এইভাবে সারা বিশ্বে অমুসলিমদের মধ্যেও এই প্রশ্নগুলি সাধারণ হয়ে উঠেছে।

    মিডিয়ার কারণে ভুল ধারণা

    অধিকাংশ অমুসলিমের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা উদিত হয় মিডিয়ার কারণে, কেননা, মিডিয়া তাদের উপর ক্রমাগত ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্যের বোমাবর্ষণ করতে থাকে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তা আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট চ্যানেল, রেডিও স্টেশন, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা বইই হোক না কেন। সম্প্রতি ইন্টারনেট তথ্যের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠেছে। যদিও এটি ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, তবুও ইন্টারনেটে ইসলাম সম্পর্কে একটি বিশাল পরিমাণ ভয়ানক প্রচারণা পাওয়া যায়। অবশ্য মুসলমানেরাও ইসলাম ও মুসলমানদের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এই হাতিয়ার ব্যবহার করছেন, কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তুলনায় তারা অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। আমি আশা করি মুসলমানদের প্রচেষ্টা আরও বাড়বে এবং অব্যাহত থাকবে।

  • জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    [book]

    মূল: ডা. জাকির নায়িক

    অনুবাদ: তাহের আলমাহদী

    ভূমিকা

    ‘জাকির আবদুল করিম নায়িক’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামী চিন্তাবিদ, ধর্মপ্রচারক, বক্তা ও লেখক; তিনি ‘ডাক্তার জাকির নায়িক’ নামেই সমধিক বিখ্যাত। তিনি ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করেন, তিনি তাঁর কাজের সুবিধার্থে ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিভিন্ন ভাষায় ‘পিস টিভি নেটওয়ার্ক’ পরিচালিত হয়ে থাকে।

    জাকির আবদুল করিম নায়েক ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটার্স হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি কিশিনচাঁদ চেল্লারাম কলেজে ভর্তি হন। তিনি মেডিসিনের ওপর টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড নাইর হসপিটালে ভর্তি হন। অতঃপর, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ মুম্বাই থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন সার্জারি বা এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

    ১৯৮৭ সালে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক ‘আহমদ দিদাতে’র সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন, তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯১ সালে তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং আইআরএফ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্ত্রী ফারহাত নায়েক, ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের (IRF) নারী শাখায় কাজ করেন। এই কারণে তাঁকে ‘আহমদ প্লাস’ বলা হয়ে থাকে।

    এছাড়াও তিনি মুম্বাইয়ের ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং ইউনাইটেড ইসলামিক এইডের প্রতিষ্ঠাতা, যা দরিদ্র ও অসহায় মুসলিম তরুণ-তরুণীদের বৃত্তি প্রদান করে থাকে।

    ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনে’র ওয়েবসাইটে তাকে “পিস টিভি নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষক ও আদর্শিক চালিকাশক্তি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই চ্যানেলটি ‘সমগ্র মানবতার জন্য সত্য, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, সৌহার্দ্য ও জ্ঞানের’ প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে বলে এর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ২০১৬ সালে, একটি প্রেস কনফারেন্সে, জাকির নিজেকে নন-রেজিস্ট্যান্ট ইন্ডিয়ান (এনআরআই) বা বছরের অর্ধেকের বেশি সময় প্রবাসে বসবাসকারী ভারতীয় হিসেবে দাবি করেন।

    নায়েক বর্তমানে মালেশিয়ায় স্থায়ী নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।

    ‘পিস টিভি’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁর বক্তৃতা প্রায় দশ কোটি দর্শকের নিকট পৌঁছে যায়। তাকে ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ’, ‘অনুমেয়ভাবে ভারতের সালাফি মতাদর্শের অনুসারী সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি’, ‘টেলিভিশনভিত্তিক-ধর্মপ্রচারণার রকস্টার এবং আধুনিক ইসলামের একজন পৃষ্ঠপোষক’ এবং ‘পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ইসলাম ধর্মপ্রচারক’ বলা হয়ে থাকে। বহু ইসলামি ধর্মপ্রচারকদের সাথে তার ভিন্নতা হল, তার বক্তৃতাগুলো পারস্পারিক আলাপচারিতা ও প্রশ্নোত্তরভিত্তিক, যা তিনি আরবি কিংবা উর্দুতে নয় বরং ইংরেজি ভাষায় প্রদান করেন, এবং অধিকাংশ সময়েই তিনি ঐতিহ্যগত আলখাল্লার পরিবর্তে স্যুট-টাই পরিধান করে থাকেন।

    পেশাগত জীবনে তিনি একজন চিকিৎসক হলেও ১৯৯১ সাল থেকে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। ইসলাম এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর তার বক্তৃতাসমূহ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

    তিনি প্রকাশ্যে ইসলামে শ্রেণীবিভাজনকে অস্বীকার করে থাকেন, তবুও অনেকে তাকে সালাফি মতাদর্শের সমর্থক বলে মনে করেন এবং অনেকে তাঁকে ‘ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারকারী’ একজন ‘আমূল-সংস্কারবাদী’ ইসলামিক ‘টেলিভেগানিস্ট’ বা ‘তহবিল সংগ্রহকারী টেলিভিশন ধর্মপ্রচারক’ বলে সমালোচনা করে থাকেন। বর্তমানে ভারত, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তাঁর ধর্মপ্রচার নিষিদ্ধ। বলা হয়ে থাকে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরের তুলনায় এর ভেতরেই তাঁর সমালোচকের সংখ্যা বেশি।

    ‘ডা. জাকির নায়িক’ শাইখ মোহাম্মাদ রাশিদ আল মাখতুম এ্যাওয়ার্ড ফর ওয়ার্ল্ড পিস কর্তৃক  ‘ইসলামিক পারসোনালিটি অব ২০১৩’, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান টুয়ানকু আব্দুল হালিম মুয়াদজাম শাহ ‘ডিস্টিংগুইশড ইন্টারন্যাশনাল পারসোনালিটি এওয়ার্ড’, শারজাহ শাসক সুলতান বিন মোহাম্মেদ আল কাশিমি কর্তৃক ‘শারজাহ এওয়ার্ড ফর ভলান্টারি ওয়ার্ক, ২০১৪’, গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া জাম্মেহ কর্তৃক ‘ইন্সাইনিয়া অব দ্য কমান্ডার অব দ্য ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক অব দ্য গাম্বিয়া’, গাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘অনারারি ডক্টরেট (ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস)’, রাজকীয় সাউদী আরব কর্তৃক ‘বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ লাভ করেন।

    মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও জাকির নায়েক তার বক্তব্য ও মতের জন্য বিভিন্ন স্থানে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

    ২০১৬ সালে ‘হুসনি টাইগার’ নামক স্বঘোষিত শিয়া দল কর্তৃক জাকির নায়েকের মাথার বিনিময়ে ১৫ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। একই সালের ১৩ জুলাই, ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেত্রী’ ‘সাধ্বী প্রাচী’ জাকির নায়েকের শিরশ্ছেদকারীকে ৫০ লক্ষ রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেন।

    জাকির নায়েকের বিভিন্ন সময়ের প্রদত্ত বক্তৃতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আমন্ত্রিত ও অনামন্ত্রিত শ্রোতৃগণ অংশগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা পরবর্তীতে মূল ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। জাকির নায়িকের প্রকাশিত বক্তৃতামালা বাংলায় অনূদিত হয়েছে, এর মধ্যে বাছাই করা গ্রন্থগুলোর সমন্বয়ে ‘জাকির নায়িক বক্তৃতামালা’ বা ‘জাকির নায়িক লেকচার সমগ্র’ বা ‘জাকির নায়িক উপদেশ সমগ্র’ নামে গ্রন্থ সঙ্কলিত হয়েছে।

  • নবীন সন্ন্যাসীর গুপ্তকথা

    নবীন সন্ন্যাসীর গুপ্তকথা

    যেমন ঘটে থাকে, আমার এক বন্ধু রয়েছে, যিনি মাঝে মাঝেই ইঙ্গিত দেন সীমাহীন নিদ্রা থেকে তুলে, তিনি আত্মা সকল আহ্বান করতে পারেন। অন্ততপক্ষে একটি আত্মা। এক ক্ষুদ্র আত্মা যার শক্তি সীমিত। তিনি মাঝেমধ্যে বলে থাকেন, অবশ্য তখনই, যখন স্কচ ও সোডার চতুর্থগ্লাসে পৌঁছান। এটি একটি স্পর্শকাতর সমতা রক্ষার বিষয়। তিনগ্লাস ও তিনি, আত্মা (অতি প্রাকৃত প্রকারে) সম্পর্কে কিছুই জানেন না। পাঁচ গ্লাস ও তিনি নিদ্রায় ঢলে পড়েন।

    আমার মনে হয়েছিল, সে সন্ধ্যায় তিনি সঠিকমাত্রায় পৌঁছেছিলেন, সে জন্য বললাম, ‘আপনার সেই আত্মাকে মনে পড়ে?’

    পানীয়ের দিকে তাকিয়ে জর্জ বলেন, ‘হ্যাঁ,’ যেন, কেন মনে করা দরকার, সে সম্পর্কে তিনি বিস্মিত।

    ‘না, আপনার পানীয়ের কথা বলছি না,’ আমি বললাম, ‘সেই যে দুই সে.মি. লম্বা ছোট্ট আত্মা, যার সম্বন্ধে বলেছিলেন, অন্য কোনো অস্তিত্ব থেকে তাকে আহ্বান করে এনেছেন। এমন একজন, যার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে।

    ‘আ:’ জর্জ বললেন, ‘আজাজেল্।’ অবশ্য এটা তার নাম নয়। তার প্রকৃত নাম উচ্চারণ করতে পারলাম না। আমার ধারণা, তাকে আমি এই নামেই ডাকি, এই নামেই মনে রাখি।’

    ‘তাকে কি আপনি খুব বেশি ব্যবহার করেন?’

    ‘না, বিপজ্জনক। অত্যন্ত বিপজ্জনক। সব সময়ে শক্তির মোকাবিলা করতে সাধ যায় ঠিক। কিন্তু আমি নিজে সতর্ক, ভুলেও অসতর্ক হই না। আপনি জানেন, আমার নীতিবোধের মাত্রা উচ্চস্তরের। সে জন্য একবার এক বন্ধুকে সাহায্য করতে, তাকে আহ্বান করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম।

    ‘কি ঘটেছিল?’

    ‘বোধকরি আমার বুক হাল্কা করার প্রয়োজন পড়েছে।’ চিন্তিতভাবে জর্জ বললেন, ‘না বলতে পেরে চিত্ত কলুষিত হতে শুরু করেছে- আমার বয়স তখন অনেকটাই কম, আর সেই সময়ে, নারী মানেই পুরুষের জীবনে এক বিশেষ ভূমিকা। এখন ভাবলে মুর্খামি মনে হয়, কিন্তু পিছু ফিরে তাকালে, আমি পরিষ্কার মনে করতে পারি, সে সময়ে বিশেষ একটি নারী পৃথক অর্থ নিয়ে প্রতিভাত হতো।

    আসলে সব মেয়েই হয়তো মোটামুটি এক ধাতুতে গড়া, তবু সেই সব দিনগুলোতে, আমার এক বন্ধু ছিল মর্টেনসন, অ্যান্ড্রু মর্টেনসন। আমার মনে হয় না আপনি তাকে চিনবেন। গত কয়েক বছরে আমিও তাকে দেখিনি বিশেষ।

    কথা হচ্ছে, সে বিশেষ একটি নারী সম্পর্কে আপ্লুত ছিল। তার চোখে মেয়েটি ছিল দেবদূতী। সে তাকে ছাড়া বাঁচবে না। এই ধরায় একমাত্র, অদ্বিতীয়া এবং সুস্বাদু খাদ্য চরকার তেলে ডোবালে যে অবস্থা হয়, মেয়েটি বিহনে তার জীবনেরও তদনুরূপ পরিণতি ঘটবে। আপনি জানেন, এভাবেই প্রেমিকেরা মনের ভাব ব্যক্ত করে থাকে।

    মুশকিল হল, মেয়েটি তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল এবং আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে, ত র আত্মাভিমানকে এতটুকু মর্যাদা না দিয়ে। মেয়েটি তাকে ঘোরতর অপমান করল তার নাকের ডগা দিয়ে, চোখের সামনে দিয়ে অন্য একজনের হাত ধরে চলে গেল। মর্টেনসনের চোখের জলের পরোয়া করল না সে।

    আক্ষরিক অর্থে এভাবেই ঠিক বলতে চাইছি না, মর্টেনসন আমাকে যেমন ধারণা দিয়েছিল,’ আমি সেটাই উপস্থাপন করতে চাইছি। এই ঘরেই সে আমার সঙ্গে পান শুরু করেছিল। বন্ধুর জন্য আমার তখন বুকে রক্তক্ষরণ, বললাম, ‘দুঃখিত মর্টেনসন। তুমি এভাবে ভেঙো না। যখন তুমি মেয়েটি সম্পর্কে ভাবনা বন্ধ করে দেবে, দেখবে সে সাধারণ একটি মেয়ে মাত্র। পথের দিকে তাকাও সারে সারে মেয়ে চলেছে।’

    সে তিক্ত স্বরে বলল, ‘এখন তো আমি চাই রমণীবিহীন অস্তিত্ব। অবশ্যই আমার স্ত্রী ব্যতীত, যাকে আমি যখনতখন, কখনোই এড়িয়ে যেতে পারি না। শুধুমাত্র প্রতিদানে যদি মেয়েটির জন্য কিছু করতে পারতাম।’

    বললাম, ‘তোমার স্ত্রীর প্রতি?’

    ‘না-না, আমি কেন স্ত্রীর প্রতি কিছু করতে চাইব? আমি সেই নারীর কথা বল’ ই, যে আমাকে নির্দয়ভাবে ছুঁড়ে ফেলেছে।’

    ‘কার মতন?’

    ‘চুলোয় যাক… যদি নিজেই জানতাম!’ সে বলল।

    ‘হয়তো, আমি তোমার সাহায্যে আসতেও পারি,’ আমি বললাম, কারণ তখনে। আমার অন্তরে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে। ‘আমি এক আত্মাকে ব্যবহার করতে পারি, যার অলৌকিক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে, যদিও ক্ষুদ্র আত্মা।’ আমি একটা আঙুল আর বুড়ো আঙুল দিয়ে ইঞ্চিখানেক মাপ দেখালাম যাতে তার নিশ্চিত ধারণা জন্মায়। বললাম, ‘সেই কিন্তু কিছু করতে পারবে’

    আমি তাকে আজাজেলের কথা বললাম, ও বিশ্বাস করল। আমি প্রায়ই লক্ষ্য করেছি, আমি যখন কোনো গল্প বলি, শ্রোতার দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায়। কিন্তু মশাই, আপনি যখন গল্প বলেন, ঘরে যে অবিশ্বাসের বাতাস নামে, তা এতই পুরু, যে কঠিন করাত দিয়ে কাটতে হবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা নয়। নৈতিক দৃঢ়তার এবং এক ঝলক সততা ও স্বচ্ছতার কাছে কিছুই লাগে না।

    যখন আমি বললাম, মর্টেনসনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে বলল, ‘সে যদি মেয়েটিকে কিছু দিতে চায়, তার বন্দোবস্ত করতে আমার সাহায্য পাওয়া কি সম্ভব?’

    ‘যদি সত্যিই উপহারযোগ্য কিছু হয় মশাই। আশা করি, মেয়েটির শ্বাসে দুর্গন্ধ আনা অথবা কথা বলার সময় ব্যাঙ বেরিয়ে আসার মতন কোনো কিছু করার কথা আপনি মনে আছেন না।

    ‘নিশ্চয় নয়,’ সে ফুঁসে উঠল।

    ‘আপনি আমাকে কী মনে করেন! যতই হোক ও আমাকে দুটি সুখী বছর উপহার দিয়েছিল। আমি তার উপযুক্ত প্রতিদান দিতে ইচ্ছা করি। আপনি বলেন, আপনার আত্মার শক্তি সীমিত।’

    ‘সে এই একরত্তি।’ আমি বলি, আমার তর্জনী আর মধ্যমা ফাঁক করে দেখাই। ‘ওই আত্মা মেয়েটিকে সর্বোৎকৃষ্ট কণ্ঠস্বর দিতে পারে? কোনো একটু সময়ের জন্য! অন্ততপক্ষে একটি অনুষ্ঠানে গাইতে।’

    ‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করে দেখব।’

    মর্টেনসনের প্রস্তাব সজ্জনসুলভ বলেই মনে হল (তার পূর্ব প্রণয়িনী স্থানীয় গীর্জায় গান গাইতো), এটিই যদি যথার্থ চুক্তি হয়। সে সব দিনে, সত্যিই আমার সুরের কান ছিল, আর প্রায়ই ঐ সব জায়গায় যেতাম (অবশ্যই কালেকশন বক্স থেকে দূরে থেকে)। আমি বরং তার গান উপভোগ করতাম এবং মনে হতো শ্রোতাগণ বিনয় সহকারে গ্রহণ করছে। সে সময়ে মনে হতো, মেয়েটির নীতিবোধ পরিপার্শ্বের সঙ্গে মানাচ্ছে না। কিন্তু মর্টেনসন বলত, সঙ্গীত পরিবেশনে মেয়েটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

    অতএব আমি আজাজেলের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। সাহায্য করতে সে সর্বতোভাবে উৎসুক ছিল। আপনি জানেন, কেউই বিনিময়ে আমার আত্মা দাবি করল না। আমার মনে পড়ে, একবার আজাজেল্‌কে বলেও ছিলাম, যদি সে আমার আত্মা চায়। সে জিজ্ঞেস করেছিল, সেটা আমার কি? সেটা যে কী তাতো আমি নিজেও জানতাম না। শুধু বলা যায়, এই আত্মা তার নিজের জগৎ থেকে আমাদের জগতে তার প্রভাব ছড়িয়ে বিরাট সাফল্য অর্জন করতে চাইছিল। তার ইচ্ছা, সে সহায় হবে।

    ওই আত্মার বক্তব্য, সাফল্যের সঙ্গে সে তিন ঘণ্টা পার করে দেবে, আর মর্টেনসনকে সে সংবাদটা দিতে, সে বলল, ‘চমৎকার।’

    আমরা একটা রাত বেছে নিলাম, যে রাতে মেয়েটি বাক্ বা হ্যান্ডেলের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অথবা পিয়ানোর কোনো প্রাচীন ধূন গাইতে চলেছে এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপী একক সঙ্গীত পরিবেশনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।

    সে রাতে, মর্টেনসন গীর্জায় গেল এবং অবশ্যই আমিও। যা ঘটতে চলেছে, তার জন্য নিজেকেই দায়ী ভাবছিলাম এবং মনে করলাম, পরিস্থিতির তত্ত্বাবধান আমার করাই মঙ্গল।

    বিষাদগ্রস্ত মর্টেনসন বলল, ‘আমি মহড়ায় গিয়েছিলাম, ও তো যেমন গায় তেমনই গাইছিল। জানেন মনে হচ্ছিল সে এক লেজবিশিষ্ট এবং কেউ তার লেজ মাড়িয়ে দিয়েছে। ঠিক এইভাবে অবশ্য মর্টেনসন মেয়েটির কন্ঠস্বর বাখ্যা করেনি। অবশ্য যদিও তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে পুরুষ বুদ্ধিভ্রষ্ট হতে পারে।

    আমি তার দিকে নিন্দার দৃষ্টি হানলাম। ‘একজন মহিলা সম্পর্কে এমন উক্তি করো না। বিশেষ করে তাকে যখন মহান দান দিতে চলেছ।’

    ‘ঠিক তাই! আমি চাই তার কণ্ঠস্বর হোক নিখাদ। সম্পূর্ণ শুদ্ধ। এখন আমার চোখ থেকে ভালবাসার কুয়াশা উঠে গেছে, আমি দেখছি, ওকে অনেক দূরে যেতে হবে এখনো। তোমার কি মনে হয়, ওই আত্মা এটা করে উঠতে পারবে?’

    ‘কিন্তু রাত ৮-১৫ মিনিটের আগে পরিবর্তন আসবে না।, একটা সন্দেহের ছুরি আমাকে আঘাত করল, ‘তুমি তো এমন চাইছ না, যে শুধু মহড়ার সময় তার কণ্ঠস্বর পরম শুদ্ধ হোক আর মূল অনুষ্ঠানের সময় শ্রোতারা হতাশ হোক! ‘

    ‘তুমি আমাকে ভুল ভাবছ,’ সে প্রতিবাদ করল।

    যাই হোক, অনুষ্ঠান শুরু হল এক মিনিট আগে। শুক্লবসনা মেয়েটি গান গাইতে উঠল, ঠিক রাত ৮-১৫ মিনিটে। আমার পকেট ঘড়ি দুমিনিটের বেশি এদিক ওদিক করে না।

    মেয়েটি ছোটখাটো গায়িকা ছিল না। সুরের মাত্রায় মাধুর্য ছিল, অনুরণনের বিস্তার ছিল, উচ্চগ্রামে পৌঁছলে অর্কেস্ট্রার সুরকে ছাপিয়ে যেতে পারত। যখন সে গানের সঙ্গে তাল রাখতে, প্রশ্বাস নিতে কয়েক গ্যালন বাতাস গ্রহণ করত, তখন আমি বুঝতে পারতাম মর্টেনসন তার মধ্যে দেখেছিল এক পোশাকসর্বস্ব নারীকে।

    ও তার চিরাচরিত স্বরগ্রামে গান শুরু করল এবং ঠিক ৮-১৫ মিনিটে মনে হলো আরেকটি কণ্ঠ যোগ দিয়েছে আমি যেন দেখলাম, মেয়েটি ছোট্ট একটি লাফ দিল। যেন কী শুনছে, নিজেই বুঝতে পারল না। যে হাতে মাইক ধরা ছিল, হাতটি কেঁপে উঠল। ওর কণ্ঠস্বর এত উচ্চগ্রামে পৌঁছেছে, যেন সে নিজেই একটা অর্গান, যা পরম শুদ্ধ সুর লয় তালে বেজে চলেছে। প্রতিটি অনুনাদ যথাযথ। সেই মুহূর্তে যেন অনন্য কোনো নবীন সুরের মূর্ছনা জন্ম নিল আর একই তালে লয়ে। একই গুণ মানের বাকি সুর মূর্ছনা সকল যেন মূল সুর মুর্ছনার অশুদ্ধ প্রতিফলন। প্রতিটি নাদ যথাযথ স্পন্দনে সুর সুধার অনুরণন। কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা স্পন্দিত হচ্ছে বলিষ্ঠ কুশলী নিয়ন্ত্রণে।

    প্রতিটি নাদে ওর সুরেলা কণ্ঠ উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর হয়ে চলেছে। অর্গান বাজিয়ের আর বাজনার দিকে মন নেই। সে শুধু ওরই দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শপথ করে বলতে পারব না, তবে মনে হয় সে বাজনা থামিয়ে দিল। যদি সে বাজিয়ে চলতও, তবু তার বাজনা আমি শুনতে পেতাম না। যখন ও গাইছিল, আপনার অন্য কিছু শোনার উপায়ই ছিল না। কিচ্ছু না, শুধু ওর গান ছাড়া। ততক্ষণে ওর নিজের মুখ থেকেও বিস্ময়ের ছাপ অন্তর্হিত, নয়নে ঘনিয়েছে মহিমময় দৃষ্টি। তার গানের সঙ্গে আর বাজনার প্রয়োজন পড়ছে না। কণ্ঠে সুর খেলছে আপনিই, কোনো নির্দেশ বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। সঞ্চালক স্থাণুবৎ আর সমবেত সঙ্গীত গাইয়ের দল একদম মূক।

    একক সঙ্গীত সমাপ্ত হল। সমবেত সঙ্গীত তখন সকলের কানে যেন ফিসফিসানি। গানের দল, তাদের কণ্ঠস্বরের জন্য লজ্জিত হয়ে পড়েছে। একই রাতে একই গীর্জায়, গীত পরিবেশনে তারা বিব্রত।

    পরবর্তী সমগ্র অনুষ্ঠানই ছিল ওর। সে যখন গাইছিল, তখন শুধু তার কন্ঠস্বরই শ্রবণগ্রাহ্য ছিল। অন্য সব কণ্ঠস্বর পুরোপুরি নিস্তব্ধ। সে যখন গাইছিল না, শ্রোতাদের মনে হচ্ছিল তারা সবাই অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, আলোর অভাব তখন অসহ্য লাগছিল।

    আর যখন অনুষ্ঠান একেবারে শেষ হল, আপনি কি জানেন, গীর্জায় করতালি দেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ। কিন্তু করতালি পড়তে লাগল। গীর্জায় উপস্থিত প্রত্যেকে এক সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, যেন তাদের পা পুতুলনাচের দড়ি দিয়ে এক সঙ্গে বাঁধা। তারপর করতালির পর করতালি। স্পষ্ট বোঝা গেল শ্রোতারা সারারাত করতালি দেবে, যতক্ষণ না মেয়েটি আবার গাইছে।

    ও আবার শুরু করল, একক কণ্ঠস্বরে, আবহসঙ্গীত তখন দ্বিধাগ্রস্ত মেজাজের মৃদু সুরে বাজছে। ওর ওপর জোর স্পট লাইটের আলো পড়ছে। সমবেত গাইয়ের দলকে দেখাই গেল না। কোনো প্রয়াসের প্রয়োজন হচ্ছিল না ওর।

    আপনি ধারণা করতে পারবেন না, কোনো চেষ্টা ছাড়াই কি সাবলীল ছিল সেই সঙ্গীত। আমি নিজের কানে মোচড় দিলাম, ওই স্বর ছাপিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের ওঠানামা। আশ্চর্য হলাম, এক নাদে উচ্চগ্রামে সুর ধরে রাখতে, তার দুজোড়া ফুসফুস কী কসরতে বাতাসের যোগান দিতে পারছে। কিন্তু তাকে থামতেই হল। এমন কি করতালিও থামল। আর তখনই খেয়াল করলাম, মর্টেনসন চকচকে চোখে বসে রয়েছে তার সমস্ত স্বত্তা দিয়ে সঙ্গীতে মগ্ন হয়ে। তখনই উপলব্ধি করলাম, কী ঘটে গেছে!

    আমি তো সত্যি বলতে গেলে, ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সরলরেখা মাত্র। কোনো রকম বক্র তঞ্চকতা আমার মধ্যে ছিল না। তাই আমি বুঝতেই পারিনি মর্টেনসনের মতলব কী ছিল!

    মেয়েটি পরম শুদ্ধ স্বরে গেয়েছে, কিন্তু আর কখনো সে এমনটি পারবে না। যেন মেয়েটি জন্মান্ধ ছিল, তিন ঘণ্টার জন্য তার চোখে আলো এল। চারপাশের বস্তু, বর্ণ, আকার, আশ্চর্য সব কিছু ঘিরে আছে আমাদের। এসব দেখতে আমরা অভ্যস্ত, দেখতে যে পাচ্ছি সে সম্পর্কে সচেতন নই। কিন্তু আপনি মনে করুন, আপনি পূর্ণ গৌরবে সব কিছু দর্শন করলেন মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য, তারপর আবার অন্ধ হয়ে গেলেন।

    আপনি অন্ধত্ব সহ্য করতে পারতেন, যদি কখনো দেখতে না পেতেন। কিন্তু সংক্ষিপ্ত সময়ে জ্ঞান লাভ করে, আবার অজ্ঞানে ফেরা? কেউ পারে নাকি?

    ঐ নারী অবশ্যই আর কখনোই গায়নি। কিন্তু এটি গল্পের একটি অংশ মাত্র প্রকৃত বিয়োগান্ত নাটক ছিল আমাদের জন্য, সব শ্রোতাদের জন্য। আমরা তিন ঘণ্টা ব্যাপী প্রকৃত সঙ্গীতের মাধুর্য উপভোগ করেছি। আপনি কি মনে করেন, ঐ অনন্য সঙ্গীত ছাড়া অন্য কোনো গান শোনা আমাদের সহ্য হবে!

    আমি তখন থেকে সুরবধির। হালে একটা রক সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ইদানীং তা এত জনপ্রিয়, শুধুমাত্র নিজেকে পরীক্ষা করতে। বিশ্বাস করবেন না, একটি সুরও কানে লাগল না। সব কিছুই হট্টগোল।

    আমার একমাত্র সান্ত্বনা ছিল মর্টেনসন। সে অতি উৎসাহভরে, শ্রেষ্ঠ মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, কিন্তু শ্রোতা সকলের মধ্যে নিকৃষ্টতম। কারণ সে সবসময় কানে ইয়ারপ্লাগ পরে থাকে। চুপি চুপির ঊর্ধ্বে, উচ্চগ্রামের শব্দ সে সহ্য করতে পারে না।

    উচিত শিক্ষা হয়েছে তার।