Blog

  • দুই

    দুই

    ধপাস ধপাস ঢেঁকির শব্দে গমগম শিকদার বাড়ি।

    ঘুমে ঢুলুঢুলু বউ দুটোর গা বেয়ে দরদর ঘাম নামে। এতক্ষনে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে ওরা। আঁচলটা কাঁধের ওপর থেকে নামিয়ে নিয়ে, সামনে হাত রাখার বাঁশের ওপরে গুটিয়ে রেখেছে দুইজনে। মাঝে মাঝে তুলে নিয়ে বুক আর গলার ঘাম মুছে নিচ্ছে। ঘামে কাপড়টা চপ চপ করছে ওদের।

    সেদিকে খেয়াল নেই মকবুলের। ও ভাবছে অন্য কথা।

    বাড়ির ওপরের জমিটাতে লাঙল না দিলে নয়। অথচ হাল যে একটা ধার পাবে সে সম্ভাবনা নেই। লাঙল অবশ্য যা হোক একটা আছে ওর। অভাব হল গরুর। গরু না হলে লাঙল টানবে কিসে। আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়। মকবুল ভাবল, বউ দুটোকে লাঙলে জুড়ে দিয়ে, দূর এটা ঠিক হবে না। লোকে গালাগাল দেবে ওকে। বলবে, দেহ বউ দুইডা দিয়া লাঙল টানায়। তাঁর চেয়ে এক কাজ করলে কি ভালো হয় না? না। বউদের দিয়েই লাঙল টানাবে সে। দিনে নয়, রাতে। বাইরের কোনো লোকে দেখবার কোনো ভয় থাকবে না তখন। বউরা অবশ্য আপত্তি করতে পারে। কিন্তু ওসব পরোয়া করে না মকবুল। মুফত বিয়ে করেনি সে। পুরো চার চারটে টাকা মোহরানা দিয়ে একটা বিয়ে করেছে। হু।

    ভাবছিলো আর সোনারঙ ধানগুলো ঢেঁকির নিচে ঠেলে দিচ্ছিল মকবুল। হঠাৎ একটা তীব্র আর্তনাদ করে হাতটা চেপে ধরলো সে। অসতর্ক মুহূর্তে ঢেকিটা হাতের ওপর এসে পড়েছে ওর। আল্লারে বলে মুখ বিকৃত করলো মকবুল।

    টুনি আর আমেনা এতক্ষন স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়েছিলো ঢেঁকির ওপর। ঘোর কাটতে ছুটে নেমে এল ওরা। ওদের কাছে এগিয়ে আসতে দেখে ওদের গায়ের ওপরে থুতু ছিটিয়ে দিলো মকবুল, দূর-হ দূর-হ আমার কাছ থাইকা। বলতে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চাপালো মকবুল।

    আমেনা বলল, দেহ কারবার, নিজের দোষে নিজে দুঃখ পাইল আর এহন আমাগোরে গালি দেয়। আমরা কি করছি।

    তোরা আমার সঙ্গে শত্রুতামি করছস। বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো মকবুল। তোরা দুই সতীনে ইচ্ছা কইরা আমার হাতে ঢেঁকি ফালাইছস। তোরা আমার দুশমন।

    হ্যাঁ দুশমনই তো। দুশমন ছাড়া আর কি। কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছলো আমেনা। টুনি এগিয়ে গেলো ওর ফুলা হাতে একটা ভিজে ন্যাকড়া বেঁধে দেয়ার জন্যে। লাফিয়ে তিন হাত পিছিয়ে গেলো মকবুল। দরকার নাই, দরকার নাই। অত সোহাগের দরকার নাই। বলে একখানা সরু কাঠের টুকরো নিয়ে ওর দিক ছুড়ে মারলো মকবুল।

    বিষ উঠছে নাহি বুড়ার? এমন করতাছে ক্যান। চাপা রোষে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো টুনি। খোলা আকাশের নিচে এসে দাড়াতে ঠান্ডা বাতাসে দেহটা জুড়িয়ে গেলো ওর। হঠাৎ মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। উঠোন থেকে মন্তুর ঘরের দিকে তাকালো ও। একটা পিদিম জ্বলছে সেখানে। একবার চারপাশে দেখে নিয়ে মন্তুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো টুনি।

    মাচাঙের ওপর থেকে কাঁথা বালিশটা নামিয়ে শোবার আয়োজন করছিলো মন্তু।

    টুনি দোরগোড়া থেকে বলে, বাহ, বারে!

    মন্তু মুখ তুলে তাকায় ওর দিকে। বলে ক্যান কী অইছে?

    টুনি ফিসফিসিয়ে বলে, আজ যাইবা না?

    মন্তু অবাক হয়, কই যামু?

    টুনি মুখ কালো করে চুপ থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে, ক্যান ভুইলা গেছ বুঝি?

    মন্তুর হঠাৎ মনে পড়ে যায়। বেড়ার সঙ্গে ঝুলানো মাছ ধরার জাল্টার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলে, অ-মাছ ধরতে?

    যাইবা না? সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে টুনি।

    মন্তু হেসে বলে, যামু। কিন্তু পরক্ষণে চিন্তিত হয়ে পড়ে সে, বুড়ো যদি টের পায় তাইলে কিন্তুক জানে মাইরা ফালাইবো।

    হঠাৎ ফিক করে হেসে দেয় টুনি। মাইররে ডরাও নাকি?

    মন্তু সে কথার জবাব না দিলে টুনি বলে, ভাত খাইছ?

    না! তুমি খাইছ?

    হু। তুমি গিয়া খাইয়া আস যাও। জলদি কইরা আইসো। বিছানাটা আবার গুটিয়ে রেখে বেড়ার সঙ্গে ঝুলানো জালটা মাটিতে নামিয়ে নেয় মন্তু।

    ও ঘর থেকে আমেনার ডাক শোনা যায়, টুনি বিবি কই গেলা, খাইতে আহ!

    আহি বলে সেখান থেকে চলে যায় টুনি।

    আজকাল রাতের বেলা আমেনার ঘরে শোয় মকবুল। টুনি থাকে পাশের ঘরে। আগে, ফাতেমা আর ওরা দুজনে একসঙ্গে থাকতো। মাসখানেক হল ফাতেমা বাপের বাড়ি গেছে। এখন টুনি একা। রাতের বেলায় ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি ঘুরে বেড়ালেও ধরবার উপায় নেই। রাত জেগে মাছ ধরাটা ইদানিং একটা নেশা হয়ে গেছে ওদের। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে গ্রামের এ পুকুর থেকে অন্য পুকুরে জাল মেরে বেড়ায় ওরা। হাতে একটা টুকরি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে থাকে টুনি। জালে ওঠা মাছগুলো ওর মধ্যে ভরে রাখে।

    পর পুকুরের মাছ ধরতে গিয়ে সমস্ত সময় সজাগ থাকতে হয় ওদের। চারপাশে দৃষ্টি রাখতে হয়। একদিন প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলো দুজনে। জমির মুন্সির বড় পুকুরে মাছ ধরতে গিয়েছিলো সেদিন। আকাশে চাঁদ ছিলো কিন্তু চাঁদনী ছিলো না। কালো মেঘে ছেয়ে ছিলো পুরো আকাশটা।

    এক হাটু পানিতে নেমে জালটাকে সন্তর্পণে ছুঁড়ে দিয়েছিলো সে। পুকুরের মাঝখানটাতে। শব্দ হয়নি মোটেও। কিন্তু পুকুর পাড় থেকে জোর গলায় আওয়াজ শোনা গেলো, কে কে জাল মারে পুকুরে?

    এক হাটু পানি থেকে নীরবে এক গলা পানিতে নেমে গেল মন্তু। টুনি ততক্ষণে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। জমির মুন্সির হাতের টর্চটা বিদ্যুৎবেগে ছুটে গেল পুকুরের এপার থেকে ওপারে। মনে মনে বার বার খোদাকে ডাকছিলো মন্তু, খোদা তুমি সব।

    একটু পরে পাড়ের ওপা থেকে টুনির চাপা গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো, এই উইঠা আহ। মুন্সি চইলা গেছে। বলে খিলখিল শব্দে হেসে ওঠে সে। ওর হাসির শব্দে রাগে সমস্ত দেহটা জ্বালা করে উঠেছে মন্তুর। এমন সময়ে মানুষ হাঁসতে পারে?

    তারপর থেকে, আরো সাবধান হয়ে গেছে মন্তু। গনু মোল্লার কাছ থেকে তিন আনা পয়সা খরচ করে একটা জোরদার তাবিজ নিয়েছে সে। রাতে বিরাতে গাঁয়ের পুকুরে মাছ ধরে বেড়ানো, বিপদ আপদ কখন কী ঘটে কিছুতো ব্লা যায় না। আগে থেকে সাবধান হয়ে যাওয়া ভালো। সগন শেখের পুকুর পাড়ে এসে, বাজুর ওপরে বাঁধা তাবিজটাকে আজ একবার ভালো করে দেখে নিলো মন্তু। তারপর বুনো লতার ঝোপটাতে দুহাতে সরিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল সে। টুনি পেছন থেকে বললো, বারে অত জোরে হাঁটলে আমি চলি কি কইরা? মন্তু জালটাকে গুছিয়ে নিতে নিতে বললো, আস্তে আহ তাড়া কিসের? টুনি বলে, বারে, আমার বুঝি ডর ভয় কিছুই নাই। যদি সাপে কামড়ায়? সাপের কথা বলতে না বলতেই হঠাৎ একটা আঁধি সাপ ফোঁস করে ওঠে সরে যায় সামনে থেকে। আঁতকে ওঠে দুহাত পিছিয়ে আসে মন্তু। ভয় কেটে গেলে থুতু করে বুকের মধ্যে একরাশ থুতু ছিটিয়ে দেয় সে। পেছনে টুনির দিকে তাকিয়ে বলে, বুকে থুতু দাও তাইলে কিচ্ছু অইবো না। কোনো রকম বিতর্কে না এসে নীরবে ওর কথা মেনে টুনি। কপালটা আজ মন্দ ওদের। অনেক পুকুর ঘুরেও কিছু চিংড়িগুড়ো ছাড়া আর কিছু জুটলো না। মাছ গুলো কেমন যেন সেয়ানা হয়ে গেছে। পুকুরের ধারে কাছে থাকে না। থাকে গিয়ে একে বারে মাঝখানটিতে, এত দূর জাল উড়িয়ে নেয়া যায় না। টুনি বলে থাক, আইজ থাউক, চলো বাড়ি ফিইরা যাই। জালটাকে ধুয়ে নিয়ে মন্তু আস্তে আস্তে বলে, চলো।

    সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুলো হাতটা কোলে নিয়ে বসে বসে আবুল আর হালিমার ঝগড়া দেখছিলো মকবুল।

    অনেকক্ষণ কী একটা বিষয় নিয়ে তর্ক চলছে ওদের মধ্যে। দাওয়ায় বসে বসে যা মুখে আসছে ওকে বলে যাচ্ছে আবুল। হালিমাও একেবারে চুপ করে নেই। উঠোনে একটা লাউয়ের মাচা বাঁধতে বাঁধতে দুএকটা জবাবও দিচ্ছে সে মাঝে মাঝে। মকবুল হাতের ব্যথায় মৃদু কাতরাচ্ছিল আর পিটপিট চোখে তাকাচ্ছিল ওদের দিকে।

    হঠাৎ দাওয়া থেকে ছুটে এসে মুহূর্তে হালিমার চুলের গোছাটা চেপে ধরল আবুল। তারপর কোন চিন্তা না করে সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দিলো ওর তলপেটে। উঃমাগো, বলে পেটটা দুহাতে চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল হালিমা। রাগে তখন ফোঁপাচ্ছে আবুল, আমার ঘরের ভাত ধ্বংস কইরা রাস্তার মানষের লগে পিরিত। জানে খতম কইরা দিমু না তোরে। কাইটা রাস্তায় ভাসায় দিমু না। বলে আবার ওর চুলের গোছাতে হাত দিতে যাচ্ছিল আবুল, বুড়ো মকবুল চিৎকার করে উঠল, খবরদার আবুইল্যা, তুই যদি বউয়ের গায়ে আরেকবার হাত তুলছস তাইলে ভালো অইবো না কিন্তুক।

    আমার ঘরণীর গায়ে আমি হাত তুলি কি যা ইচ্ছা করি, তুমই কইবার কে অ্যাঁ? পরক্ষণে আবুল জবাব দিল, তুমি যহন তোমার ঘরণীরে তুলাপেডা কর তহন কি আমরা বাঁধা দিই।

    অমন কোণঠাসা উত্তরের পর আর কিছু বলার থাকেনা মকবুলের। শুধু জ্বলন্ত দৃষ্টিতে এক নজর ওর দিকে তাকালো মকবুল। আবুল তখন ঘরের ভিতর টেনে নিয়ে চলেছে হালিমাকে। ভিতরে নিয়ে গিয়ে মনের সুখে মারবে। ওর ইচ্ছেটা হয়ত বুঝতে পেরেছিলো হালিমা তাই মাটি আকড়ে ধরে গোঙাতে লাগলো সে, ওগো তোমার পায়ে পড়ি, আর মাইরো না, মইরা যামু।

    চুপ, চুপ তীব্র গলায় ওকে শাসিয়ে ঝাঁপিটা বন্ধ করে দেয় আবুল। হেকচা টানে ওর পরনের ছেঁড়া ময়লা শাড়িটা খুলে নিয়ে ঘরের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সে। তালি দেওয়া পুরান ব্লাউজটা আঁটসাঁট করে বাঁধা ছিলো, টেনে সেটাও খুলে ফেলে আবুল। তারপর দুপায়ে ওর নগ্ন দেহটাকে প্রচন্ডভাবে মাড়াতে থাকে সে। বেড়ার সঙ্গে পুরান একটা ছড়ি ঝোলানো ছিলো, সেটা এনে হালিমার নরম তুলতুলে কপালে কয়েকটা আঁচড় টেনে দেয় আবুল।এইবার পিরিত কর। আরো পিরিত কর রাস্তার মানষের লগে। আহারে। এরে মাইয়াডারে মাইরা ফালাইস না। ওরে অ পাষাইন্যা, দরজা খোল, মারিস না আর মারিস না, জাহান্নামে যাইবি, মারিস না। বাইরে থেকে দুহাতে ঝাঁপিটাকে ঠেলছে ফকিরের মা। আবুল এক বার তাকালো সেদিকে, ঝাঁপি খুললো না।

    বউ মারায় একটা পৈশাচিক আনন্দ পায় আবুল। মেরে মেরে এর আগে দুটো বউকে প্রানে শেষ করে দিয়েছে সে।

    প্রথম বউটা ছিলো এ গাঁয়েরই মেয়ে। আয়েশা। একটু বেঁটে, একটু মোটা আর রঙের দিক থেকে শ্যামলা। অপূর্ব সংযম ছিল মেয়েটির। আশ্চর্য শান্ত স্বভাব। কত মেরেছে ওকে আবুল। কোনো দিন একটু শব্দও করেনি। পিঠটা বিছিয়ে দিয়ে উপুড় হয়ে চুপচাপ বসে থাকতো। কিল, চাপড়, ঘুসি ইচ্ছেমতো মারতো আবুল।

    একটা সামান্য প্রতিবাদ নেই। প্রতিরোধ নেই।

    শুধু আড়ালে নীরবে চোখের পানি ফেলত মেয়েটা।

    তারপর একদিন ভীষণভাবে রক্তবমি শুরু হল ওর। জমাট বাঁধা কালো রক্ত। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে মারা গেলো আয়েশা।

    আয়েশা টিকেছিলো বছর তিনেক। তাঁর পরেরটা কিন্তু ওর চাইতেও কম। মাত্র দুবছর।

    অবশ্য জমিলার মাত্র দুবছর টিকে থাকার পেছনে একটা কারণও আছে। ও মেয়েটা ছিলো একটু বাচাল গোছের আর একটু রুক্ষ মেজাজের। সহজে আবুলের কিল চাপড়গুলো গ্রহণ করতে রাজি হত না সে। মারতে এলে কোমরে আঁচল বেঁধে রুখে দাঁড়াতো।

    হাজার হোক মেয়েতো। পুরুষের সঙ্গে পারবে কেন? বাঁধা দিতে গিয়ে পরিণামে আরও বেশি মার খেত জমিলা। ও যখন মারা গেলো আর ওর মৃতদেহটা যখন গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করছিলো সবাই তখন ওর সাদা ধবধবে পিঠের ওপর সাপের মতো আঁকাবাঁকা ফুলে ওঠা রেখাগুলো দেখে শিউরে উঠেছিলো অনেকেই। ওরে পাষাইন্যারে এমন দুধের মতো মাইয়াডারে শেষ করলি তুই। আয়েশা মারা যাবার পর অবশ্য ভীষন কেঁদেছিল আবুল। গড়িয়ে গড়িয়ে কেঁদেছিল সারা উঠোনে। পাড়াপড়শিদের বলেছিলো, আহা বড় ভালো বউ আছিলো আয়েশা। আমি পাষাইন্যা তাঁর কদর বুঝলাম না। আহারে এমন বউ আর পামু না জীবনে।

    আয়েশার শোকে তিনদিন এক ফোঁটা দানাপানিও মুখে পোরেনি আবুল। তিন রাত কাটিয়েছে ওর কবরের পাশে বসে আর শুয়ে। পাড়াপড়শিরা ভেবেছিলো ওর চরিত্রে বুঝি পরিবর্তন এলো এবার। এবার ভালো দেখে একটা বিয়ে শাদি করিয়ে দিলে সুখে শান্তিতে ঘর-সংসার ক্রবে আবুল।

    কিন্তু জমিলার সঙ্গেও সেই একই ব্যবহার করেছে আবুল। একই পরিনাম ঘটেছে জমিলার জীবনেও।

    দ্বিতীয় বউয়ের মৃত্যুতে আবুলের গড়াগড়ি দিয়ে কান্নার কোনো মূল্য দেয়নি পড়শিরা। মুখে বিরক্তি এনে বলেছে, আর অত ঢঙ করিস না আবুইল্যা। তোর ঢঙ দেইখলে গা জ্বালা করে।

    আমার বউয়ের দুঃখে আমি কাঁদি, তোমাগো গা জ্বালা করে ক্যান? ওদের কথা শুনে ক্ষেপে ওঠে আবুল।

    কপালে এক মুঠো ধুলো ছুঁয়ে সহসা একটা প্রতিজ্ঞা করে বসে সে, এই তওবা করলাম বিয়া শাদি আর করমু না। খোদা, আমারে আর বিয়ার মুখ দেখাইও না। বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে আবুল।

    পড়শিরা গালে হাত দিয়ে বলেছে, ইয়া আল্লা, এই কেমনতর কথা। বউ মারলি তুই, সেই কথা বইলা কি শত্রুতামি করলাম নাকি আমরা? সাচা কথা কইলেই তো মানুষ শত্রু হয়। ঠিক কইছ বইচির মা, সাচা কথা কইলেই এমন হয়। তা, আমাগো সে দিন থেকে আবুলের সাতে পাঁচে আর কেউ নেই ওরা।

    আজকাল হালিমাকে যখন প্রহর অন্তর একবার করে মারে আবুল তখন কেউ কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। মাঝে মাঝে বুড়ো মকবুল এক-আধটু বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে। আবুইল্যা, তোর কি মানুষের পরান না, এমন কইরা যে মার্চ বউডারে তোর মনে একটুও চোট লাগে না আবুইল্যা? বউদের অবশ্য মকবুলও মারে। তাই বলে আবুলের মতো অত নির্দয় হওয়াটা মোটেই পছন্দ করে না সে। মারবি তো মার। একটুখানি সইয়া মার। অপরাধের গুরুত্ব দেইখা সেই পরিমাণ মার। এ হল মকবুলের নিজস্ব অভিমত।

    অপরাধ, এমন কোনো সাংঘাতিক করেনি হালিমা। পাশের বাড়ি নুরুর সঙ্গে কী একটা কথা বলতে গিয়ে হেসেছিলো জোরে। দূর থেকে সেটা দেখে গা জ্বালা করে উঠেছে আবুলের। একটা গভীর সন্দেহে ভরে উঠেছে মন।

    এমন মন খোলা হাসি তো আবুলের সঙ্গে কোনোদিন হাসেনি হালিমা।

    বেহুঁশ হালিমাকে ভেতরে ফেলে রেখে আবুল যখন বাইরে বেরিয়ে এলো তখন সর্বাঙ্গে ঘামের স্রোত নেমেছে ওর। পরনের লুঙ্গি দিয়ে গাঁয়ের ঘামটা মুছে দাওয়ার ওপর দম ধরে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিলো আবুল। মাটির হুঁকোটাকে নেড়েচেড়ে কি যেন দেখলো, তারপর কলকেটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে।

    রশীদের বউ সালেহা উঠোনে বসে চাটাই বুনছিল। আবুলকে এদিকে আসতে দেখে মুখ টিপে হেসে বলল, বউ-এর পিরিত বুঝি আর সইলো না মিয়ার। আর সইবো, বহুত সইছি। মুখ বিকৃত করে পুরনো কথাটাই আবার বলে গেলো আবুল, আমার ঘরের ভাত খাইয়া রাস্তার মানষের সঙ্গে পিরিত। তুমি কও ভাবী, এইডা কি সহ্য করণ যায়?

    হ্যাঁ তাতো খাঁটি কথাই কইছ। সালেহা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ঘরনী যদি মনের মতো না হয় তাইলে কি তারে নিয়ে আর সুখে ঘর করণ যায়?

    আর ভাবী, দুনিয়াদারী আর ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে দুই চোখ যেই দিকে যায় চইলা যাই। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে আবুল। তারপর কলকেটা সালেহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, চুলায় আগুন আছে? একটুহানি আগুন দাও।

    এই দিই, বলে কলকেটা হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল সালেহা। একটু পরেই আবার বেরিয়ে এলো সে। ও কাছে আসতে গলার স্বরটা একেবারে খাদে নামিয়ে এনে আবুল বলল, আইজ আর ছাড়ি নাই ভাবী। যতক্ষণ পারছি মারছি। তুমি একটু তেল গরম কইরা মালিশ কইরা দিও ওর গায়ে। হাডডি না দুই একখানা ভাইঙ্গা গেছে কে জানে। তাইলে তো বড় বিপদ অইব। কাম কাজ কত পইর‍্যা রইছে। সব কিছু বন্ধ অইয়া যাইব।

    সেই কথা আগে খেয়াল আছিলো না মিয়ার? সালেহা মুখ বাঁকাল। কাম কাজের যখন ক্ষতি অইবো জান, তহন না মারলেই পাইরতা। মারলা ক্যান।

    উঁহু, আবুল সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, মারছি ঠিক করছি, না মারলে আস্কারা পাইয়া যাইত।

    আর আস্কারা কি এমনে কম পাইছে? চারিদিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে চাপা স্বরে সালেহা বলল, নুরুর সঙ্গে আজকা কথা কইছে? ওতো রোজরোজ কথা কয়।

    কী? চোখ জোড়া আবার ধপ করে জ্বলে উঠলো আবুলের, আমারে এতদিন কও নাই ক্যান?

    সালেহা বলল, কী দরকার বাবু আমাগো মিছামিছি শত্রু বইনা। কইতাম গেলে তো অনেক কথাই কইতে অয়। তাকি আর একদিনে শেষ করা যায়।

    কি কথা কও ভাবী। খোদার কসম ঠিক কইরা কও। তামাক খাওয়াটা একেবারে ভুলে গেলো আবুল।

    সালেহা আস্তে করে বললো, যাই কও বাবু কারো বদনাম করার অভ্যাসই আমার নাই। কিন্তুক কই কী বউডা তোমার বড় ভালো অয় নাই। আমরা তো আয়শাকেও দেখছি, জমিলারেও দেখছি। ওরা তো আমাগো হাতের ওপর দিয়েই গেছে।

    ওগো তুলনা আছিলো না। কিন্তু হালিমার স্বভাব চরিত্র বাবু আমার বড় ভালো লাগে না। বলতে গিয়ে বার কয়েক কাশলো সালেহা। কাশটা গিলে নিয়ে আবার সে বলল, ইয়ে মানে, বাইরের মানুষের সঙ্গে হাসাহাসি আর ঢলাঢলি। একটুখানি লজ্জা শরমও তো থাকা চাই। কথা শেষে আবুলের রক্তলাল চোখ জোড়ার দিকে দৃষ্টি পড়তে রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলো সালেহা। একটু ধমকের সুরে বলল, দেইখো বাপু, তুমি আবার মাইয়াডারে মারতে শুরু কইরো না। এমনিতেই বহুত মারছ। এতে যদি শিক্ষা না হয় তাইলে আর এ জন্মেও হইবে না। সালেহার কথাটা শেষ হবার আগে সেখান থেকে চলে গেছে আবুল। কলকেটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছে সে। একটু পরে আবার হালিমার কান্নার শব্দ শোনা গেলো ঘর থেকে। আবুল আবার মারছে তাকে।

  • এক

    এক

    মস্ত বড় অজগরের মতো সড়কটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে বিস্তীর্ণ ধান খেতের মাঝখান দিয়ে।

    মোঘলাই সড়ক।

    লোকে বলে, মোঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের হাতে ধরা পড়বার ভয়ে শাহ সুজা যখন আরাকান পালিয়ে যাচ্ছিলো তখন যাবার পথে কয়েক হাজার মজুর খাটিয়ে তৈরি করে গিয়েছিলো এই সড়ক।

    দুপাশে তাঁর অসংখ্য বটগাছ। অসংখ্য শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সগর্বে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই দীর্ঘকাল ধরে। ওরা এই সড়কের চিরন্তন প্রহরী।

    কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম।

    চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা।

    মাঝে মাঝে ধান খেত সরে গেছে দূরে। দুধারে শুধু অফুরন্ত জলাভূমি। অথই পানি। শেওলা আর বাদাবনের ফাঁকে ফাঁকে মাথে দুলিয়ে নাচে অগণিত শাপলার ফুল।

    ভোর হতে আশেপাশের গাঁয়ের ছেলে-বুড়োরা ছুটে আসে এখানে। এক বুক বানিতে নেমে শাপলা তোলে ওরা। হৈ-হুল্লোড় আর মারামারি করে, গালাগাল দেয় একে অন্যকে। বাজারে দর আছে শাপলার। এক আঁটি চার পয়সা করে।

    কিন্তু এমনো অনেকে এখানে শাপলা তুলতে আসে, বাজারে বিক্রি করে পয়সা রোজগার করা যাদের ইচ্ছে নয়।

    মন্তু আর টুনি ওদেরই দলে।

    ওরা আসে ধল-পহরের আগে, যখন পূর্ব আকাশের শুকতারা ওঠে। তাঁর ঈষৎ আলোয় পথ চিনে নিয়ে চুপি চুপি আসে ওরা। রাতে শিশিরে ভেজা ঘাসের বিছানা মাড়িয়ে ওরা আসে ধীরে ধীরে। টুনি ডাঙায় দাঁড়িয়ে থাকে।

    মন্তু নেমে যায় পানিতে।

    তারপর, অনেকগুলো শাপলা তুলে নিয়ে, অন্য সবাই এসে পড়ার অনেক আগে সেখান থেকে সরে পড়ে ওরা।

    পরির দীঘির পাড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। শাপলার গায়ে লেগে থাকা আঁশগুলো বেছে পরিষ্কার করে।

    মন্তু বলে, বুড়ো যদি জানে তোমারে আমারে মাইরা ফালাইবো।

    টুনি বলে, ইস, বুড়ার নাক কাইটা দিমু না।

    নাক কাইটলে বুড়ো যদি মইরা যায়?

    মইরলে তো বাঁচি। বলে ফিক করে হেসে দেয় টুনি, পাখির মতো উইড়া আমি বাপের বাড়ি চইলা যামু।

    বলে আবার হাসে, সে হাসি আশ্চর্য এক সুর তুলে পরির দীঘির চার পাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

    এ দীঘি এককালে এখানে ছিলো না।

    আশেপাশের গাঁয়ের ছেলে-বুড়োদের প্রশ্ন করলে তারা মুখে মুখে বলে দেয় এ দীঘির ইতিহাস। কেউ চোখে দেখেনি, সবাই শুনেছে। কেউ শুনেছে তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা জেনেছে তার দাদার কাছ থেকে। আর তার দাদা শুনেছে তারও দাদার কাছ থেকে।

    সে অনেক বছর আগে।

    তখন সড়ক ছিলো না। কিছুই ছিলো না এখানে। শুধু মাঠ, মাঠ আর মাঠ। সীমাহীন প্রান্তর। বৈশাখী পূর্ণিমা রাতে পরিরা নেমে আসতো এই পৃথিবীতে। ওরা নাচতো, গাইতো, খেলতো।

    লাল পরি, নীল পরি আর সবুজ পরি। পরিদের অনেক নামও জানা আছে এ গাঁয়ের লোকের। পুঁথিতে লেখা আছে সব। একদিন হঠাৎ পরিদের খেয়াল হল, একটা দীঘি কাটবে। যার পানিতে মনের আনন্দে সাঁতার কাটতে পারবে ওরা। ডুব দিয়ে পানি ছিটিয়ে, ইচ্ছেমতো হৈ-হুল্লোড় করতে পারবে।

    যেই চিন্তা সেই কাজ।

    আকাশ থেকে খন্তা কোদাল আর মাটি ফেলবার ঝুড়ি নিয়ে এলো ওরা।

    বৈশাখী পূর্ণিমার রাত।

    রূপোলি জোছনার স্নিগ্ধ আলোয় ভরেছিলো এই সীমাহীন প্রান্তর। দক্ষিণের মৃদু বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিলো পরিদের হাসির শব্দ।

    কথায় গানে আর কাজে।

    রাত ভোর হবার আগে দীঘি কাটা হয়ে গেলো।

    পাতাল থেকে কলকল শব্দে পানি উঠে ভরে গেলো দীঘি।

    সেই দীঘি।

    তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গ্রাম। এক নয়, অনেক।

    গভীর রাতে ধপাস ধপাস ঢেঁকির শব্দে গমগম করে গ্রামগুলো।

    জোড়া বউকে ঢেঁকির ওপরে তুলে দিয়ে রাত জেগে ধান ভানে বুড়ো মকবুল। পিদিমের শিখাটা ঢেঁকির তালে তালে মৃদু কাঁপে।

    মকবুল ধমকে ওঠে বউদের, কি, গায়ে শক্তি নাই? এত আস্তে ক্যান। আরো জোরে চাপ দাও না, হুঁ। এমনভাবে গর্জে ওঠে মকবুল, যেন খেতে লাঙল ঠেলতে গিয়ে রোগা লিকলিকে গরু জোড়াকে ধমকাচ্ছে সে। হুঁ, হট হট। হুঁ, আরো জোরে। আরো জোরে। ধমক খেয়ে ঢেঁকিতে আরো জোরে চাপ দেয় ওরা। টুনি আর আমেনা। পাশের বাড়ি থেকে আম্বিয়ার গান সোনা যায়। ‘স্বপ্নে আইলো রাজার কুমার, স্বপ্নে গেলো চইলারে। দুধের মতো সুন্দর কুমার কিছু না গেলো বইলারে’।

    ঢেঁকিতে চড়লেই গান গাওয়ার সখ চাপে আম্বিয়ার। সতেরো আঠারো বছর বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনো বিয়ে হয়নি ওর। আঁটসাঁট দেহের খাঁচে খাঁচে দুরন্ত যৌবন, আট-হাতি শাড়ির বাঁধন ভেঙ্গে ফেটে পড়তে চায়। চেহারায় মাধুর্য আছে। চোখ জোড়া বড় বেশি তীক্ষ্ণ। ঢেঁকিতে চড়লে, ঢেঁকিকে আর সুখ দেয় না ও। এত দ্রুত তালে ধান ভানতে থাকে, মনে হয় ঢেঁকিটাই বুঝি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।

    ধান ভানা শেষ হলে গায়ে দর দর ঘাম ঝরে ওর।একটা চাটাইয়ের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে জোরে শ্বাস নেয় আম্বিয়া।

    ঢেঁকির পাশে বসে এই মুহূর্তে বারবার আম্বিয়ার কথা মনে পড়ছিল বুড়ো মকবুলের।দাঁত মুখ খিচে বউদের আবার ধমক মারল ও শুনছনি, আম্বিয়া কেমন ধপাস ধপাস কইরা ধান ভাইনতাছে।আর তোরা, কিছু না, বলে বার কয়েক মাটিতে থুতু ফেললো মকবুল। বা হাতে কপালের ঘামগুলো মুছে নিল সে।

    দাওয়ার ওপাশে পিদিম হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল ফকিরের মা। সেখান থেকে বলল, আহা মকবুল! বউগুলোর বুঝি এই রাতেরবেলাও আর শান্তি দিবি না তুই। সারাদিন তো খাটাইছস, এহন এই দুপুর রাইতেও-, বলে টুনি আর আমেনার জন্য আফসোস করতে করতে নিজের ঘরে চলে গেলো ও।

    এ বাড়িতে মোট আট ঘর লোকের বাস।

    সামনে নুয়ে পড়া ছোট ছোট ঘরগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লাগানো। বাঁশের তৈরি বেড়ার ভাঙ্গা অংশগুলো তালপাতা দিয়ে মোড়ান। চালার স্থানে স্থানে খড়কুটো উঠে ফুটো হয়ে গেছে। দিনের সূর্য আর রাতের চাঁদ এসে একবার করে সে ফুট দিয়ে উঁকি মেরে যায় ঘরের ভেতরে। আম কাঁঠাল পাটি পাতা আর বেতাক বনে ঘেরা বাড়ির চারপাশ। মাঝে মাঝে ছোট বড় অনেকগুলো সুপুরি আর নারকেল গাছ লাগানো হয়েছে অনেক আগে। দুএকটা খেজুর গাছও ছড়িয়ে রয়েছে এখানে সেখানে। ছোট পুকুর। পুকুরে সিং,কই আর মাগুর মাছের কমতি নেই। দিন রাত শব্দ করে ঘাই দেয় ওরা। পানিটা সারাক্ষন ঘোলাটে করে রাখে। সামনে মাঝারি উঠোন। শীত কিংবা গ্রীষ্মে শুকিয়ে একরাশ ধুলো জমে। বর্ষায় এক হাটু কাদা। কাদার ওপর ছোট ছোট ব্যাঙ এসে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। হাস কি মোরগে দেখলেই তাড়া করে ওদের। ধরে ধরে মারে। পুবের সারে উত্তরের ঘরটা মকবুলের। বাড়ির অন্য সবার চেয়ে ওর অবস্থাটা কিছু ভালো।

    মকবুল তিন বিয়ে করেছে। তিন বউ বেঁচে আছে ওর।

    বড় বউ আমেনা। কালো মোটা আর বেঁটে। বয়স প্রায় ত্রিশের কোঠায় পৌঁছেছে এবার। খুব ঘন ঘন কথা বলে। কথা বলার সময় পোকায় খাওয়া দাঁতের ফাঁক দিয়ে থুতু ছিটিয়ে সামনের লোকদের ভিজিয়ে দেয়। পারিবারিক কলহ বাঁধলে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবার হুমকি দেখায়।

    মেজ ফাতেমা। দেখতে রোগা, হ্যাংলা আর লম্বা। বছরের তিন মাস পেটের অসুখে ভোগে। ছমাস বাপের বাড়িতে কাঁটায়। বয়সের হিসেবটা সে নিজেও জানেনা। কেউ পনেরো বললেও সায় দেয়। পচিশ বললেও মেনে নেয়।

    সবার ছোট টুনি। গায়ের রং কালো। ছিপছিপে দেহ। আয়ত চোখ। বয়স তার তের-চৌদ্দর মাঝামাঝি। সংসার কাকে বলে সে বোঝে না। সমবয়সী কারো সঙ্গে দেখা হলে সব কিছু ভুলে মনের সুখে গল্প জুড়ে দেয়। আর হাসে। হাঁসতে হাঁসতে মেঝেতে গড়াগড়ি দেয় টুনি।

    বুড়ো মকবুলের পরিবারে আরো একজন আছে।

    নাম তার হীরন। ও তার বড় মেয়ে। বড় বউ-এর সন্তান। এবার দশ ছেড়ে এগারোয় পড়লো সে।এখন থেকে মকবুল ওর বিয়ের জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে। দুএক জায়গায় এর মধ্যে সম্বন্ধও পাঠিয়েছে সে। বড়, মেজ আর ছোট এই তিন বউ নিয়ে মকবুলের সংসার। তিন বউকে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো জমিজমা নেই ওর।আসলে বউদের আয় দিয়ে চলে ও। বড় দুই বউ দিব্যি আয় করে। বাজার থেকে পাতা কিনে এনে দিয়েই খালাস মকবুল। দুই বউ মিলে একদিনে তিন চারটে চাটাই বুনে শেষ করে।মাঝে মাঝে টুনিও বসে পড়ে ওদের সঙ্গে, কাজ করে। চাটাইগুলো বাজারে বিক্রি করে লাভের অংশ দিয়ে পেঁয়াজ, লঙ্কা আর পান-সুপুরি কেনে মকবুল।

    ফসলের দিনে সবাই যখন গরু দিয়ে ধান মাড়ায় তখন তিন বউকে লাগিয়ে ধান মাড়ানোর কাজটা সেরে ফেলে ও। বর্ষা পেরিয়ে গেলে বাড়ির ওপরে যে ছোট জমিটা তাতে বউকে কোদাল হাতে নামিয়ে দেয় মকবুল। নিজেও সঙ্গে থাকে। মাটি কুপিয়ে কুমড়ো আর শিমের গাছ লাগায়। দুবেলা জল ঢেলে গাছগুলোকে তাজা রাখে। সুখ আছে আবার সুখ নেইও মকবুলের জীবনে। তিন বউ যখন ঝগড়া বাধিয়ে চুল ছেঁড়ার লড়াই শুরু করে তখন বড় বিষাদ লাগে ওর। হাতের কাছে জা পায় তাই দিয়ে তিন জনকে সমানে মারে সে। কাউকে ছাড়াছাড়ি নেই।

    মকবুলের পাশের ঘরটা ফকিরের মার।

    তার পাশেরটা আবুলের।

    তার পাশে রশিদ।

    পাশাপাশি তিনটে ঘর।

    সবার দক্ষিণে যে ঘরটা সবার চেয়ে ছোট, ওটায় থাকে মন্তু। একা মানুষ। বাবা মা ভাইবোন কেউ নেই। বাবাকে হারিয়েছে ও জন্মের মাসখানেক আগে। মাকে, দশ বছর বয়সে। লোকে বলে, মন্তু নাকি বড় একগুয়ে আর বদমেজাজি। স্বভাবটা ঠিক জানোয়ারের মতো।

    টুনি বলে, অমন মাটির মানুষ নাকি জন্মে আর দেখেনি সে।

    আহা অমনটি আর হয় না।

    ওপাশে আর কোনো ঘর নেই।

    পশ্চিমের সারে, দক্ষিনের ঘরটা মনুর।

    তার পাশে থাকে সুরত আলী।

    তার পাশে গনু মোল্লা।

    গনু মোল্লা নির্ভেজাল মানুষ। কারো সাতেও থাকে না। পাঁচেও না। জমিজমা নেই। চাষবাসের প্রশ্ন ওঠে না। সারাদিন খোদার এবাদত করে। যেখানে যায় তসবির ছড়াটা হাতে থাকে তার। আপন মনে তসবিহ পড়ে।

    দীঘিকে কেন্দ্র করে এই গ্রাম।

    কখন কোন যুগে পত্তন ঘটেছিলো এ গ্রামের কেউ বলতে পারে না। কিন্তু, এ বাড়ির পত্তন বেশি দিন আগে নয়। আশি কি খুব জোর নব্বই বছর হবে।

    সেই তেরশ’ সনের বন্যা।

    অমন বন্যা দুচার জন্মে কেউ দেখেনি।

    মাঠ ভাসলো, ঘাট ভাসলো, ভাসলো বাড়ির উঠান। ঘর ভাসলো, বাড়ি ভাসলো, ভাসলো কাজির কুশান।

    কিছু বাদ নেই। ঘর বাড়ি গোয়াল গরু সব। এমন কি মানুষও ভাসলো। জ্যান্ত মানুষ। মরা মানুষ।

    তাল গাছের ডগায় ঝোলান বাবুই পাখির বাসায়ও কিছুকালের জন্য পরম নিশ্চিন্তে ঘর বেঁধেছিলো পুঁটি মাছের ঝাঁক।

    রহমতগঞ্জ কুলাউড়া নিজামপুর ভেসে সব একাকার হল।

    বুড়ো কাসেম শিকদার ছিলো কুলাউড়ার বাসিন্দা।

    বুড়ো আর বুড়ি। ছেলেপিলে ছিলো না ওদের। মাটির নিচে পুঁতে রাখা টাকা ভরা কলসিটা বুকে জড়িয়ে ধরে বানের জলে ভাসান দিলো বুড়ো আর বুড়ি।

    কলা গাছের ভেলায় চারদিন চার রাত। খাওয়া নেই, দাওয়া নেই। একেবারে উপোস। তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম। ভেলা ভাসছে আর ভাসছে।

    অবশেষে এসে ঠেকল এই দীঘির পাড়ে।

    লাল পরি নীল পরি আর সবুজ পরির দীঘি। ছোটখাট একটা পাহাড়ের মতো উঁচু যার পাড়।

    গ্রামটা পছন্দ হয়ে গেলো কাসেম শিকদারের।

    কলসি থেকে টাকা বের করে দুচার বিঘে জমি কিনে ফেলল সে। গোড়াপত্তন হল এ বাড়ির।

    বাড়ির চারপাশে আম কাঁঠাল সুপুরি আর নারকেলের গাছ লাগালো কাসেম শিকদার। পুকুর কাটলো। ভিটে বাধলো। পছন্দ এত ঘর তুললো বড় করে। কিন্তু মনে কোন শান্তি পেল না সে। ছেলেপুলে নেই। মারা গেলে কে দেখবে এত বড় বাড়ি।

    মাঝে মাঝে চিন্তায় এত বিভোর হয়ে যেতো যে খাওয়া-দাওয়ার কথা মনে থাকতো না তার। বুড়ি ছমিরন বিবি লক্ষ করতেন সব। বুঝতেন কেন স্বামীর মনে সুখ নেই, চোখে ঘুম নেই, আহারে রুচি নেই। মনে মনে তিনিও দুঃখ পেতেন।

    তারপর, একদিন জল ভরা চোখে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ালেন ছমিরন বিবি। আস্তে করে বললেন, তুমি আর একডা নিকা কর। বলতে গিয়ে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল তাঁর। দুগণ্ড বেয়ে অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ছিলো।

    তবু স্বামীকে নিজ হাতে সাজিয়ে দিলেন ছমিরন বিবি। হাতে মেহেদি দিলেন। মাথায় পাগড়ি পরালেন। ঘরটা লেপে মুছে নিয়ে নিজ হাতে বিছানা পাতলেন স্বামী আর তাঁর নতুন বিয়ে করা বউ-এর জন্য। আদর করে হাত ধরে এনে শোয়ালেন তাদের। নতুন বউ-এর দিকে তাকাতে সাহস পেলেন না ছমিরন বিবি। ছুটে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ছুরির তীক্ষ্ণ ফলা দিয়ে যেন তখন কলজেটা কুটিকুটি করে কাটছিলো তাঁর। নিজেকে আর বেঁধে রাখতে পারলেন না তিনি। পুকুর পাড়ে ধুতুরা ফুলের সমারোহ। গুনে গুনে চারটে ফুল হাতে নিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সেগুলো মুখে পুরে দিয়ে নীরবে ঘুমিয়ে পড়লেন। দীঘির পাড়ে উঁচু ঢিপির মতো তাঁর কবরটা আজও চোখে পড়ে সবার আগে।

  • হাজার বছর ধরে

    হাজার বছর ধরে

    হাজার বছর ধরে প্রখ্যাত বাংলাদেশী ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান রচিত একটি কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস। ১৯৬৪ সালে এ উপন্যাসটির জন্য তিনি আদমজী পুরষ্কারে সম্মানিত হন।

    কাহিনী সংক্ষেপ

    প্রচ্ছদ: হাজার বছর ধরে
    প্রচ্ছদ: হাজার বছর ধরে

    নদী বয়ে চলেছে আপন গতিতে। গাছে গাছে ফুল ফোটে। আকাশে পাখি উড়ে- আপন মনে গান গায়। হাজার বছর ধরে যেই জীবনধারা বয়ে চলেছে, তাতে আশা-নিরাশা, প্রেম-ভালবাসা, চাওয়া-পাওয়ার খেলা চললেও তা সহজে চোখে পড়ে না, অন্ধকারে ঢাকা থাকে। কঠিন অচলায়তন সমাজে আর যাই থাকুক, নারীর কোন অধিকার নাই। নারী হাতের পুতুল মাত্র। পুরুষ তাকে যেমন নাচায় তেমন নাচে। নিজের ইচ্ছেতে কাউকে বিয়ে করাটা এমন সমাজে অপরাধ, গুরুতর অপরাধ। অন্ধকার এই সমাজে আনাচে কানাচে বাস করে কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, নারী নির্যাতন। পরীর দীঘির পাড়ের একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কাহিনী। কখন এই গ্রামের গোড়াপত্তন হয়েছিল কেউ বলতে পারে না। এক বন্যায় “কাশেম শিকদার” আর তার বউ “ছমিরন বিবি” বানের পানিতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে এসে ঠাঁই নিয়েছিল এই জায়গায়। সেই থেকে এখানে পত্তন হয়েছে শিকদার বাড়ির।

    শিকদার বাড়িতে বাস করে বৃদ্ধ “মকবুল” ও তার তিন স্ত্রী সহ “আবুল”, “রশিদ”, “ফকিরের মা” ও “মন্তু” এবং আরো অনেকে। বৃদ্ধ মকবুলের চতুর্দশবর্ষী বউ টুনির মনটা মকবুলের শাসন মানতে চায় না। সে চায় খোলা আকাশের নিচে বেড়াতে, হাসতে, খেলতে। তাই সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় অল্প বয়সী সুঠামদেহী মন্তুকে। মন্তু বাবা-মা হারা, অনাথ। বিভিন্ন কাজ করে বেড়ায়। টুনি আর মন্তু সকলের অগোচরে রাতের বেলায় বেরিয়ে পড়ে মাছ ধরতে। বর্ষায় যায় শাপলা তুলতে। এমনি করে দুজন দুজনার কাছে এসে যায়। অব্যক্ত ভালবাসার জোয়ারে ভাসে ওরা দু’জন। কিন্ত কেউ মুখ ফুঁটে বলতে পারেনা মনের কথা, লোক লজ্জার ভয়ে। সমাজের রক্ত চক্ষু ওদের দূরে রাখে।

    গ্রাম-বাংলায় যা হয়, কলেরা বসন্তের বাতাস লাগলে উজাড় হয়ে যায় কয়েক ঘর মানুষ। ডাক্তার না দেখিয়ে তারা টুকটাক তাবিজ করে, এভাবেই দিন চলে। মকবুলের আকস্মিক মৃত্যুর পর মন্তু যখন মনের কথা টুনিকে খুলে বলে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। গনু মোল্লা, আম্বিয়া, রশিদ, ফকিরের মা, সালেহা কেউই নেই। টুনির সঙ্গে মন্তুর অনেক দিন দেখা হয়নি। টুনি হারিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে। তবুও টুনিকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে মন্তুর। এমনি করে অনেকটা সময় পার হয়েছে। রাতের বেলা সুরত আলীর ছেলে ওর বাপের মতোই পুঁথি করে- “শোন শোন বন্ধুগনে শোন দিয়া মন, ভেলুয়ার কথা কিছু শান সর্বজন।” ভেলুয়া সুন্দরীর কথা সবাই শানে। একই তালে, একই সুরে হাজার বছরের অন্ধকার এক ইতিহাস নিয়ে এগিয়ে চলে সবাই। হাজার বছরের পুরনো জোৎস্না ভরা রাতে একই পুঁথির সুর ভেসে বেড়ায় বাতাসে।

    কালের আবর্তে সময় গড়ায়। প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে। শুধু পরিবর্তন আসেনা অন্ধকার, কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রাম বাংলার আচলায়াতন সমাজে।

    চরিত্রসমূহ

    • বুড়ো মকবুল – শিকদার বাড়ির প্রধান ও মুরব্বি
    • আমেনা – বুড়ো মকবুলের প্রথম স্ত্রী
    • ফাতেমা – বুড়ো মকবুলের দ্বিতীয় স্ত্রী
    • টুনি – বুড়ো মকবুলের তৃতীয়া স্ত্রী ও উপন্যাসের নায়িকা
    • মন্তু – উপন্যাসের মূলচরিত্র
    • আম্বিয়া – করিমের বোন, উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে মন্তুর স্ত্রী
    • ফকিরের মা – প্রতিবেশী
    • আবুল – প্রতিবেশী
    • হালিমা – আবুলের স্ত্রী
    • গনু মোল্লা – ধর্মীয় ব্যক্তি (প্রতিবেশী)

    পুরস্কার ও সম্মাননা

    • জহির রায়হান হাজার বছর ধরে উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

    চলচ্চিত্র

    ২০০৫ সালে জহির রায়হানের প্রথমা স্ত্রী কোহিনুর আক্তার সুচন্দা হাজার বছর ধরে উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।1 এ চলচ্চিত্রে প্রধান দুটি চরিত্র মন্তু ও টুনির ভুমিকায় রিয়াজ ও শশী অভিনয় করেন। এছাড়াও শাহনুর, সুচন্দা, এটিএম শামসুজ্জামান বিভিন্ন চরিত্র চিত্রায়িত করেছেন। চলচ্চিত্রটি সমালোচক ও দর্শকদের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়। সেবছর এটি ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয়।2 এছাড়াও তিনটি বিভাগে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অর্জন করে।

  • তেইশ

    তেইশ

    মা শান্তভাবে শুয়ে আছেন বিছানায়। দেহটা সাদা লেপে ঢাকা। একটুও নড়ছেন না তিনি।

    কাছে আসতে মা বললেন, বোস, তোকে কতগুলো কথা বলার জন্যে ডেকেছি। কাসেদ বললো, একি কথা বলার সময় মা, তোমার এখন ঘুমোনো উচিত। নইলে শরীর খারাপ করবে যে।

    মা ম্লান হাসলেন, বললেন, শরীর আমার ঠিক আছে বাবা। বলে কিছুক্ষণ থামলেন তিনি। কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছিলো। আঁচল দিয়ে সেগুলো মুছে নিয়ে বললেন একটা কথা মনে রাখিস, খোদা আমাদের এ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। মারা যাবার পরে আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো। খোদা তাদেরই ভালো চোখে দেখেন যারা ধর্মকর্ম করে। কোরান-হাদিস মেনে চলে। তোর বাবা–বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো তাঁর। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তোর বাবা এসব কোনদিনও মানেন নি। তুই তাঁর মত হবি আমি চাই নে। আবার থামলেন মা। কড়িকাঠের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কী যেন ভাবলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, দুনিয়াটা কিছু না বাবা, এখানে লোভ করতে নেই, তাহলে আখেরে ঠকতে হয়।

    মায়ের গলার স্বরটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।

    কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে।

    নাহার পায়ের কাছে বসে।

    কাসেদ তাঁর মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে বললো, তুমি এখন চুপ করো মা, ঘুমাও।

    মা শুনলেন কিনা বোঝা গেলো না। অন্যমনস্ক চোখজোড়া কড়িকাঠ থেকে নামিয়ে এনে তিনি বললেন, আরেকটা কথা বাবা, আমি যখন মারা যাবো তখন লক্ষ্য রাখিস আমি যেন কলেমা পড়তে পড়তে মরি। আর আমি মরে গেলে, কবর দেবার সময় বাইরের কোন লোককে আমায় দেখাসনে বাবা। মা থামলেন।

    অনেকক্ষণ ধরে ঘামানোর পর এখন ঘাম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর। গায়ের লেপটা টেনে নিতে নিতে ক্লান্ত স্বরে মা বললেন, যাও বাবা, এবার তুমি ঘুমোও গিয়ে।

    কিন্তু ঘুমোনো হলো না তার। ভোররাতের দিকে ঈষৎ তন্দ্ৰায় চোখজোড়া জড়িয়ে এসেছিলো। নাহারের ডাকে চমকে জেগে গেলো সে।

    দেখে যান। মা কেমন করছেন। নাহারের কণ্ঠস্বর উৎকণ্ঠায় ভরা। কাসেদের বুকের ভেতরটা আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠলো।
    সহসা উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে মায়ের ঘরে গেলো সে। সেই মাঝরাতে যেমনি ছিলেন তেমনি শুয়ে মা। চোখজোড়া খোলা, কড়িকাঠের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। কাসেদ সামনে এসে দেখলো দু’চোখের কোণ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে।
    জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন মা।

    শুকনো ঠোঁটজোড়া নেড়ে কী যেন বলতে চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু কোন কথা বেরুচ্ছে না, শুধু একটা কর্কশ আওয়াজ বেরুচ্ছে ভেতর থেকে। কাসেদ ডাকলো, মা!

    মা আবার চেষ্টা করলেন কিছু বলতে। বলতে পারলেন না।

    অসহায়ের মত চারপাশে এক পলক তাকালো কাসেদ। সহসা দেহটা কেঁপে উঠলো তার। ভয় করতে লাগলো।

    একটা বাটি থেকে মায়ের মুখে এক চামচ পানি তুলে দিতে দিতে নাহার কাঁপা গলায় বললো, মা কলেমা পড়, মা কলেমা পড়।

    হঠাৎ মায়ের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লো কাসেদ, ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় সেও বললো, মা শুনছো? মা কলেমা পড়ো, মা গো।

    কিছু বলবার জন্যে মা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

    নাহার বললো, মা কলেমা পড়ো। কাসেদ বললো, মা, মাগো, কলেমা। সহসা মায়ের কণ্ঠ শোনা গেলো। মা বললেন, বাবা। আমি চললাম, তোরা সাবধানে থাকিস।

    মা চুপ করে গেলেন।

    চামচে করে দেয়া পানি মুখ থেকে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়লো বিছানার ওপর।

    মা, মাগো, বলে নাহার চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।

    কাসেদ হতভম্বর মত দাঁড়িয়ে রইলো বিছানার পাশে। বাইরে রাত ভোর হচ্ছে এখন। একটু আগে এখানে তিনটি প্রাণী ছিলো।

    এখন দুটি। একটি হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে।

    কাসেদ কাঁদলো না। কান্না এলো না তার। হঠাৎ যেন পাথর হয়ে গেছে সে।

    আজ সকালে খালু এসে নাহারকে নিয়ে গেছেন ওদের বাড়িতে। কাল ওর বিয়ে।

    মা মারা যাবার পর ক’দিন মেয়েটা একটানা কেঁদেছে। শেষের দিকে শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরতে কোন আওয়াজ বেরুতো না।

    মায়ের শূন্য বিছানার পাশে বসে বসে কী যেন ভাবতো সে।

    আজ সেও চলে গেছে।

    যাবার আগে পা ছুঁয়ে সালাম করে গেছে তাকে।

    বলেছে, ছোট্ট করে বলেছে, যাই।

    এখন এ বাড়িতে কাসেদ একা।

    চারপাশটা কেমন ফাঁকা লাগছে ওর।

    মনটা শূন্য।

    সারাদিন বাইরে বেরুলো না কাসেদ।

    বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাটালো। একবার এপাশ আর একবার ওপাশ। আর সারাক্ষণ অনেক কিছু কথা ভাবলো সে। অনেকের কথা মনে পড়লো।

    মায়ের বড় ইচ্ছে ছিলো জাহানারাকে বউ করে আনবে ঘরে। মুখ ফুটে কোনদিন না বললেও বেশ বুঝতে পারতো কাসেদ। মায়ের ইচ্ছাটা গোপন ছিলো না।

    কিন্তু জাহানারা?

    থাক, যার নাম জীবন থেকে মুছে গেছে তাকে স্মৃতির পাতায় ঠাঁই দিয়ে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। ওকে নিয়ে অনেক ভেবেছে কাসেদ। শিউলীকে নিয়েও কম ভাবেনি সে। দুই দেহ, এক মন। মেয়ে জাতটাই বোধ হয় অমনই।

    না, তা নয়? সালমা তো ওদের মত নয়। আর মকবুল সাহেবের মেয়ে? কত শান্ত, কত সরল। বড় সাহেবের জীবনটাকে কী সুন্দর করে তুলেছে সে। ওরা কত সুখী।

    না, কাসেদ বিয়ে করবে না।

    একা থাকবে।

    মাঝে একটু তন্দ্ৰা এসেছিলো। একটা বড় ইঁদুরের কিচ কিচ শব্দে তন্দ্ৰা ছুটে গেলো ওর। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো সে।

    খোলা জানোলা দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে। ঘরের মাঝখানে। কাসেদ বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে সরে গেলো। বাইরের আকাশটা মেঘে ছেয়ে আছে।

    কোথাও মেঘের রঙ কালো, কোথাও সাদা, কোথাও ঈষৎ লাল। এখন শেষ বিকেল।

    লাল সূৰ্যটা হারিয়ে গেছে উঁচু উঁচু দালানের ওপাশে। ওটাকে এই জানোলা থেকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু তার শেষ আভাটুকু বাড়িগুলোর মাথার ওপর দিয়ে আকাশে ছড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে দূরের দিগন্তে কোথাও যেন আগুন লেগেছে। তার উত্তাপ থেকে বাঁচবার জন্যে টুকরো টুকরো মেঘগুলো উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে আরেক দিগন্তের দিকে।

    বাতাস বইছে জোরে।

    পাশের বাড়ির ছাদে মেলে দেয়া কুমারী মেয়ের হাল্কা নীল শাড়িখানা বাতাসে পতাকার মতো উড়ছে পতপত করে।

    আরো দূরের আকাশে একটা চিল একা একা ঘুরছে। শেষ বিকেলের সোনালি আভায় মসৃণ পাখাটি চিকচিক করছে তার।

    পুরো শহরটা একটা থমথমে ভাব নিয়ে রাত্রির অপেক্ষা করছে। সহসা বাইরের দরজায় কড়াটা নড়ে উঠলো।

    একবার।

    দু’বার।

    তিনবার।

    কাসেদ ঠিক ভেবে উঠতে পারলো না। এ সময়ে তার কাছে কে আসতে পারে। মা মারা যাবার প্রথম দুদিন আত্মীয়-স্বজন অনেকে দেখা করতে এসেছিলো। আজকাল তারা আসে না।

    তবে কে আসতে পারে এমনই বিকেলে?

    দরজাটা খুলে দিতে কাসেদ অবাক হয়ে দেখলো নাহার দাঁড়িয়ে। এক হাতে খোলা কপাটটা ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে।

    পরনের সাদা শাড়িটায় হলুদ মাখানো। হলুদ ছড়ানো সারা দেহে তার। হাতে মেহেদী, গাঢ় লাল।

    কাসেদ বিস্মিত গলায় বললো, একী নাহার তুমি!

    কোন কথা না বলে নিঃশব্দে ভেতরে এলো নাহার। তারপর আলতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললো, এতকাল যার সাথে ছিলাম, তাকে ছেড়ে থাকতে পারলাম না বলে চলে এসেছি। যেতে বলেন তো আবার ফিরে যাই।

    কাসেদ বিস্ময় বিমূঢ় স্বরে বললো, কাল তোমার বিয়ে আর আজ হঠাৎ এখানে চলে আসার মানে?

    নাহার নির্বিকার গলায় বললো, বিয়ে আমার হয়ে গেছে।

    কার সাথে? কাসেদ চমকে উঠল যেন।

    ক্ষণকাল ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নাহার। তারপর অত্যন্ত সহজ কণ্ঠে বললো, যার সাথে হয়েছে তার কাছেই তো এসেছি আমি। তাড়িয়ে দেন তো চলে যাই। কাসেদ বোবার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ওর হলুদ মাখানো মুখের দিকে। কিছুতেই সে ভেবে পেলো না, সেই চাপা মেয়েটা আজ হঠাৎ এমন মুখরা হয়ে উঠলো। কেমন করে?

    পেছনের দরজাটা বন্ধ করতে করতে সে শুধু মৃদু গলায় বললো, চলো, ও ঘরে চলো।

    সমাপ্ত

  • বাইশ

    বাইশ

    সন্ধ্যার স্বল্প আলোয় শিউলীকে ছায়ার মত মনে হলো।

    রাস্তার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে সে।

    উচ্ছাস নেই। উচ্ছলতা নেই।

    মৃদু হেসে শুধু শুধালো, এলেন তাহলে? ভেবেছিলাম হয়তো আর আসবেন না।

    কাসেদ বললো, আমি তো না করিনি।

    ওর এলোমেলো চুল, ছন্নছাড়া দৃষ্টি আর ক্লান্ত মুখের দিকে সন্ধানী চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো শিউলী।

    কাসেদ ম্লান গলায় জিজ্ঞেস করলো, অমন করে কী দেখছেন? হাতের ব্যাগটা এ হাত থেকে অন্য হাতে সরিয়ে নিতে নিতে শিউলী বললো, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এইমাত্র লড়াইয়ের ময়দান থেকে পালিয়ে এসেছেন।

    কাসেদ বললো, অনেকটা তাই।

    শিউলী বললো, তার মানে?

    কাসেদ বললো, লড়াই শুধু রাজার সঙ্গে রাজার, এক জাতের সঙ্গে অন্য জাতের আর এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশেরই হয় না। একটি মনের সঙ্গে অন্য একটি মনেরও লড়াই হয়।

    শিউলী মুখ টিপে হাসলো, তার মানে আপনি এতক্ষণ অন্য একটি মনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তাই না? শিউলী থামলো। থেমে আবার বললো, সে মনটি কার জানতে পারি কি?

    কাসেদ নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললো, সে মনও আমার। আমার নিজের। একজন চায় স্বার্থপরের মত শুধু পেতে। অন্যজন পেতে জানে না, জানে শুধু দিতে। বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই তার আনন্দ।

    শেষেরটাকেই আমার ভালো লাগে। কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে শিউলী বললো, আমার আপনার মধ্যে কোথায় যেন একটা মস্ত বড় মিল আছে।

    কোথায়? আস্তে করে শুধালো কাসেদ।

    শিউলী মিষ্টি করে বললো, তা তো জানি না।

    ওর শান্ত মুখখানার দিকে তাকিয়ে বড় ভালো লাগলো কাসেদের। মৃদু গলায় সে বললো, একটা কথা বলবো মনের সঙ্গে অনেক লড়াই করেছি।

    কী কথা? শিউলী চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে।

    কাসেদ কী ভেবে শুধালো, আপনি কেন ডেকেছিলেন তাতো বললেন না। কেন ডেকেছি তাতো আমি নিজেও জানি না। শুধু জানি ডাকতে ইচ্ছে করছিলো। হয়তো কিছু বলবো ভেবেছিলাম, কিন্তু- সহসা চুপ করে গেলো শিউলী।

    কাসেদ বললো, আমি কিন্তু বলবো বলেই এসেছি।

    বলুন।

    চলুন আমরা দু’জনে বিয়ে করি। এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে ফেললো কাসেদ। সে কথাটা জাহানারাকে বলার জন্যে দীর্ঘ দিন ধরে মনের সঙ্গে লড়াই করছিলো, সে কথাটা শিউলীকে মুহুর্তেই বলে দিলো সে।

    শিউলী চমকে উঠলো।

    দু’জনে নীরব।

    কারো মুখে কথা নেই।

    কাছে, দূরে অনেক লোক। হাঁটছে। হাসছে। কথা বলছে। চিৎকার করে ডাকছে একে অন্যকে। তবু মনে হলো গোরস্তানের নির্জনতা যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে চারপাশের মুখরতাকে।

    শিউলীর ঠোঁটের একটি কোণে এক সুতো হাসি জেগে উঠলো সহসা। সে হাসি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো। তার পুরো ঠোঁটে, চিবুকে, চোয়ালে, চোখে, সারা মুখে।

    মুহুর্তে শব্দ করে হেসে উঠলো শিউলী। আপনি কি আজ অসুস্থ?

    না, মোটেই না।

    তাহলে এসব কী বলছেন?

    যা তুমি চাও, আজ সকালেও চেয়েছিলে, আমি তাই বলছি শিউলী।

    শিউলী আবার হাসলো, মনে হচ্ছে আমার চাওয়া না চাওয়া সবটুকুই আপনি জানেন।

    আজকের সকালটা যদি মিথ্যে না হয়ে থাকে, তাহলে বলবো জানি এবং সবটুকুই জানি।

    আর আমি বলি আপনি কিছুই জানেন না। শিউলী গম্ভীর হয়ে এলো। মুখে এখন হাসির চিহ্নটুকুও নেই। ম্লান গলায় সে বললো, আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ চিনতে পারলো না।

    কেন জানি না, সবাই ভুল বোঝে আমায়। হয়তো এই আমার ভাগ্যে লেখা ছিলো।

    এসব কী বলছে শিউলী?

    কাসেদ অবাক হলো, কথা বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠলো ওর।

    শিউলী বললো, আপনাকে অন্য আর পাঁচজনের চেয়ে ভিন্ন মনে করতাম বলেই হয়তো এতো সহজভাবে মিশতাম। কিন্তু–বলতে গিয়ে থামলো সে। কপালে ভাজ ফেলে কী যেন ভাবলো, ভেবে বললো, আপনিও শেষে ওদের মতো হয়ে যাবেন এ আমি ভাবি নি কোন দিন।

    কাসেদের বুঝতে আর বিলম্ব হলো না সন্ধেবেলার এই শিউলীর সঙ্গে সকালের সেই শিউলীর কোন মিল নেই। এরা যেন দুটি ভিন্ন মেয়ে। সম্পূর্ণ আলাদা।

    কিন্তু কেন?

    কেন এমন হলো?

    শিউলী!

    বলুন।

    একটি দিনের মধ্যেই কি মানুষ এত বদলে যেতে পারে?

    আমিও তাই ভাবছি। সকালের সঙ্গে বিকেলের আপনার যেন কোন মিল নেই।

    আর তুমি? তুমি কি সেই সকালের মেয়েটি আছো?

    আমি? আমার কথা বাদ দিন। আমি যে কখন কী অবস্থায় থাকি, সে আমি নিজেও জানি না।

    বাহ্‌ চমৎকার।

    কাসেদের দিকে চমকে তাকালো শিউলী। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর ধীরে ধীরে বললো, আমার দিক থেকে যদি

    কোন অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে তার জন্যে আমি মাফ চাইছি কাসেদ সাহেব।

    সত্যি আমি অপারগ, নইলে–।

    কথাটা শেষ করলো না সে।

    কাসেদের মনে হলো শিউলী হাসছে।

    তীক্ষ্ণ বিদ্রুপে ঠোঁটের কোণজোড়া জ্বলছে ওর।

    কাসেদ হেরে গেলো।

    প্রথম পরাজয়ের গ্লানি মুছে যাবার আগেই দ্বিতীয় বার পরাজিত হলো সে। নিজের বোকামীর জন্যে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো ওর। আগুনে হাত বাড়ালে পুড়বে জানতো।

    তবু কেন সে এমন করলো?

    রাত বাড়ছে।

    রাস্তাঘাট নির্জন হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

    আরো অনেক ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেছে শিউলী।

    শিউলী আর জাহানারা, ওরা দুই নয়, এক।

    একের এপিঠ আর ওপিঠ।

    বাসায় ফিরতে অনেক রাত হলো ওর।

    খালু এসে দরজা খুলে দিলেন।

    এত রাতে তাকে দেখে অবাক হলো কাসেদ। মুখখানি ক্লান্ত আর বিমর্ষ।

    কোন প্রশ্ন করার আগে খালু চাপাস্বরে বললেন, তুমি এসেছে? এসো, শব্দ করো না।

    খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরের সবটুকু দেখতে পেলো কাসেদ। মা বিছানায় শুয়ে। মাথার একপাশে নাহার বসে। অন্য পাশে খালাম্মা। চাপাস্বরে মাকে কী যেন বলছেন খালা।

    খালু বললেন, বড়বু’র শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমরা এসেছিলাম, নইলে কী যে হতো, কথা বলতে বলতে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো ওরা।

    মা এতক্ষণে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তাকালেন এবার। বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। নাহার উঠে দাঁড়িয়ে কাসেদকে বসবার জায়গা করে দিলো। মায়ের পাশে এসে বসলো কাসেদ।
    রুগ্ণ হাতখানা ওর দিকে বাড়িয়ে আস্তে করে বললেন, এসেছিস বাবা। শীর্ণ ঠোঁটে ম্লান হাসলেন তিনি। ফিসফিস করে আবার বললেন, এত রাত হলো কেন তোর? অনিয়ম করে শরীরটাকে তো শেষ করলি বাবা। মায়ের কপালে হাত বুলাতে বুলাতে কাসেদ বললো, তুমি এখন ঘুমোও মা।

    মা চুপ করে গেলেন।

    খালা একটা শিশি থেকে ওষুধ ঢেলে খাওয়ালেন তাঁকে।

    কাসেদ উঠতে যাচ্ছিলো, শার্টে টান পড়ায় আবার বসে পড়লো।

    মা বললেন, যাচ্ছিস কোথায়? আমার পাশে বোস।

    আর কোন কথা বললেন না মা। নীরবে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলেন ওকে।

    রাত বেড়ে চললো।

    আরো, রাত হলে পরে, মাকে দেখাশোনার ব্যাপারে প্রচুর উপদেশ দিয়ে খালা খালু বিদায় নিলেন।

    নিজের ঘরে এসে নীরবে অনেকক্ষণ বসে রইলো কাসেদ।

    বইপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করলো কিছুক্ষণ।

    আকাশ-পাতল অনেক ভাবলো। কী যে ভাবলো সে নিজেও বলতে পারে না।

    মাঝে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো সে।

    নাহার এসে দাড়ালো দরজায়।

    মা ডাকছেন আপনাকে।

    হুঁ। কাসেদ উঠে দাঁড়ালো।

  • একুশ

    একুশ

    শিউলী আড়চোখে এক পলক দেখে নিয়ে মৃদু হাসলো। হেসে বললো, আপনারা পুরুষ মানুষগুলো এত সহজে বদলে যেতে পারেন যে কী বলবো!

    কাসেদ চুপ করে থাকবে ভেবেছিলো, কিন্তু জবাব না দিয়ে পারলো না। অন্য পুরুষের কথা আমি বলতে পারবো না। নিজে আমি সহসা বদলাই নে। আমি যা ছিলাম। তাই আছি, তাই থাকবো।

    তাই নাকি? চোখজোড়া বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো শিউলী। শুনে বড় খুশি হলাম। কিন্তু জনাব, একটা কথা যদি জিজ্ঞেস করি তাহলে রাগ করবেন না তো? মুখ টিপে হাসছে শিউলী।

    কাসেদ বললো, বলুন।

    ক্ষণকাল চুপ করে থেকে শিউলী ধীরে ধীরে বললো, সেদিন বিকেলে সেই একসঙ্গে রিক্সায় চড়ে হাতে হাত রেখে বেড়ানো আর মাঝে মাঝে একটা কী দুটো কথা বলা এর সবটুকুই কি মিথ্যা। মুখখানা নুইয়ে ওর চোখে চোখে তাকাতে চেষ্টা করলো শিউলী।

    সহসা কোন উত্তর দিতে পারলো না সে।

    একটু পরে কী ভেবে বললো, আপনি যা ভাবছেন সে অর্থে মিথ্যে।

    আমি কী ভেবেছি তা আপনি বুঝলেন কী করে?

    কারণ আমি শুনেছি সব। কাসেদ বিরক্তির সঙ্গে বললো: জাহানারা এসেছিলো বাসায়, কাল বিকেলে।

    শিউলী হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো।

    অনেকক্ষণ চুপচাপ কী যেন ভাবলো সে।

    রিক্সাটা কাসেদের অফিসের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে।

    শিউলী আস্তে করে বললো, সেদিন আপনি একটা অনুরোধ করেছিলেন, আমি রেখেছিলাম। আজ আমার একটা কথা। আপনি রাখবেন? ওর কণ্ঠস্বরে আশ্চৰ্য আবেগ।

    নড়েচড়ে বসে কাসেদ শুধালো, কী কথা বলুন?

    শিউলী ধীর গলায় বললো, আজ বিকেলে আমি নিউ মার্কেটের মোড়ে আপনার জন্যে অপেক্ষা করবো, আপনি আসবেন, কিছু কথা আছে আপনার সঙ্গে। আসবেন তো?

    রিক্সা থেকে নেমে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো কাসেদ।

    তারপর মৃদুস্বরে বললো, চেষ্টা করবো।

    চেষ্টা করবো নয়, অবশ্যই আসবেন।

    ততক্ষণে অফিসের দৌড়গোড়ায় পা দিয়েছে কাসেদ।

    শিউলী রিক্সা নিয়ে তখনো দাঁড়িয়ে রইলো, না চলে গেলো, একবার ফিরেও দেখলো না সে।

    অফিসে এখন আর সে উত্তেজনা নেই।

    সব শান্ত।

    মকবুল সাহেব পক্ষাঘাত রোগে এখনও বিছানায় পড়ে আছেন। ভালো হবার কোন সম্ভাবনা নেই।

    পরস্পরের কাছ থেকে শোনা যায়। আজকাল আর আগের সে আর্থিক অনটন নেই তাঁর। বড় সাহেবের শ্বশুর এখন, বেশ সুখেই আছেন। বড় সাহেবও বেশ সুখী।

    রোজ দুপুরে মকবুল সাহেবের মেয়ে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে তাঁর জন্যে। পরনে সুন্দর একখানা শাড়ি, মাথায় ছোট একটা ঘোমটা, হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার, পায়ে পাতলা স্যাণ্ডেল। নিঃশব্দে মেয়েটি উঠে আসে ওপরে। হাল্কা পায়ে সে এগিয়ে যায় বড় সাহেবের কামরার দিকে। তারপর দু’জনে একসঙ্গে খায়। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে নীরবে। আবার বাড়ি ফিরে যায় মেয়েটি।

    প্রথম প্রথম অফিসের সবাই মুখ টিপে হাসতো। চাপা ঘরে আলোচনা চলতো ওদের।

    আজকাল তাও বন্ধ।

    শুধু মেয়েটি যখন আসে আর সামনে দিয়ে হেঁটে বড় সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। তখন কী একটা অস্বস্তিতে ভোগে কাসেদ।

    ইচ্ছে করে মেয়েটিকে দেখতে।

    কিন্তু ও যখন আসে তখন ওর মুখের দিকে তাকাতে গিয়েও পারে না সে। কোথা থেকে একটা জড়তা এসে সারা দেহ গ্ৰাস করে নেয় ওর। মেয়েটি ওর বউ হতে পারতো।

    ইচ্ছে করলে ওকে বিয়ে করতে পারতো কাসেদ।

    হয়তো ওকে নিয়ে বেশ সুখী হতে পারতো সে। আজ বড় সাহেবের জন্যে খাবার নিয়ে আসে, সেদিন কাসেদের জন্যে আসতো মেয়েটি।

    দু’জনে এক সঙ্গে খেত ওরা।

    কথা বলতো।

    গল্প করতো।

    কত না আলাপ করতো খেতে বসে।

    কিন্তু জাহানারা।

    জাহানারা, একি করলে তুমি?

    অফিসের কাজ করতে বসে একটুও মন বসল না ওর। গতদিন বিকেলের ছবিটা বার বার ভেসে উঠছে চোখে। জাহানারার প্রতিটি কথা আবার নতুন করে কানে বাজছে এখন। টাইপরাইটারটা একবার কাছে টেনে নিয়ে আবার দূরে ঠেলে দিলো সে। হঠাৎ সামনে টেবিলের উপর বিছানো কাগজের দিকে চোখ পড়তে চমকে উঠল কাসেদ।

    জাহানারার নাম লিখে সম্পূর্ণ কাগজটা ভরিয়ে তুলেছে সে।

    চারপাশে দ্রুত তাকিয়ে নিয়ে একটা কলম দিয়ে ধীরে ধীরে নামগুলো কেটে ফেললো সে।

    কাটতে গিয়ে একটুখানি ম্লান হাসলো সে।

    ওর জীবনে থেকেও জাহানারার নামটাকে হয়তো এমনি করে কেটে ফেলতে হবে একদিন।

    অফিস থেকে বেরুবার আগে মন স্থির করে নিয়েছিলো কাসেদ। বিকেলে যাবে জাহানারার ওখানে। কাল যে ভুল বুঝাবুঝির মধ্য দিয়ে সে চলে এসেছে তা দূর করে আসবে আজ।

    যে কথাটা এতদিন বলে নি, বলতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছে। আজ সে কথাটা ওকে খুলে বলবে সে। হয়তো শুনে হাসবে জাহানারা। শব্দ করে হেসে উঠবে, তবু বলবে কাসেদ।

    যা হবার হোক।

    জীবনে একটা চরম সিদ্ধান্ত নিতে চায় সে।

    জাহানারাদের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর মনে হলো কে জানে হয়তো আজ এখানে এই শেষ আসা।

    বুড়িটা বাচ্চা কোলে নিয়ে বারান্দায় বসেছিলো। ডেকে এনে ওকে বসালো ভেতরে। বললো, বয়েন, উনি উপরে আছেন, খবর দিই গিয়া। বলে সে চলে গেলো ভেতরে। সেই যে গেলো অনেকক্ষণ আর তার দেখা নেই, একা ঘরে বসে বসে ক্লান্তিবোধ করলো সে। উঠে দাঁড়িয়ে বার-কয়েক পায়চারী করলো। বসলো, আবার উঠে দাঁড়ালো।

    জাহানারা এলো না, এলো সেই বুড়ি। ওর মুখের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুধালো, আপনার নাম কী?

    কাসেদ নাম বলতে আবার ভেতরে চলে গেলো বুড়ি।

    আবার সব চুপ।

    অনেকক্ষণ হলো কারো আসার লক্ষণ দেখা গেলো না।

    চোখ মেলে প্রতিনিয়ত দেখা দেয়াল আর কড়িকাঠগুলো দেখতে লাগলো কাসেদ।

    কিভাবে জাহানারার সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে, মনে মনে একবার তার মহড়া করে নিলো।

    তবু কেউ আসে না।

    অবশেষে এল।

    জাহানারা নয়। বুড়িটিও নয়। ওদের বাচ্চা চাকরটা।

    চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কাসেদ।

    চাকরটা মৃদু হেসে বলল, আপাজানের শরীর খারাপ, আজ দেখা হবে না। অন্যদিন আসতে বলেছে।

    শরীর খারাপ বলে নিচে নেমে এসে একবার কাসেদের সঙ্গে দেখাও করতে পারলো না জাহানারা? এর আগে জ্বর নিয়েও ওর সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছে সে, কাসেদ নিষেধ করলেও আমল দেয় নি।

    আর আজ!

    কথাটা সহসা বিশ্বাস হতে চাইলো না ওর।

    চাকরটা মৃদু হেসে চলে গেলো ভিতরে।

    হাসলো না, যেন বিদ্রুপ করে গেলো ওকে।

    আবার একা।

    ঘরের মধ্যে বার-কয়েক পায়চারি করলো কাসেদ। ভালো লাগছে না, বারবার করে মনে হলো, জাহানারা আজ ইচ্ছে করে অপমান করলো তাকে। সে কোন অপরাধ করে নি। তবু তাকে শাস্তি দিলো জাহানারা। কাসেদের মনে হলো পুরো দেহটা জ্বলছে ওর।

    অপমান আর অনুশোচনার তীব্ৰ জ্বালা যেন পাগল করে তুলেছে তাকে। কেন ওকে ভালবাসতে গেল সে!

    সামান্য ভদ্রতা আর সহজ মানবিক বৃত্তিগুলোও হারিয়ে ফেলেছে জাহানারা। অতি নিচে নেমে গেছে সে।

    ওর তুলনায় সালমা অনেক বড়ো। অনেক উদার মনের মেয়ে সে। দেখতে শুনতেও সে খারাপ নয়। প্রাণভরে কাসেদকে ভালবাসতো সালমা। মুহুর্তের জন্যে কাসেদের মনে হলো সালমার ডাকে সেদিন সাড়া না দিয়ে মস্ত বড় ভুল করেছে সে।

    আর শিউলী?

    শিউলীর কথা মনে হতে কাসেদের মনে পড়লো, সন্ধ্যার আগে আগে শিউলী ওর জন্যে অপেক্ষা করবে বলেছে নিউমার্কেটের মোড়ে।

    শিউলীর পাশে জাহানারাকে আজ অনেক ছোট মনে হলো কাসেদের। শিউলীর হাসি। কথা। আলাপের ভঙ্গী আর বাচ্চা মেয়ের মতো ব্যবহার সব সুন্দর। অন্তত জাহানারার চেয়ে।

  • বিশ

    বিশ

    জাহানারা স্থিরদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তারপর টেনে টেনে বললো, আপনি জানেন না বলেই আপনাকে জানানো প্রয়োজন। নইলে–সে থেমে গেলো হঠাৎ৷

    কাসেদ ইতস্তত করে বললো, কিন্তু এসব আপনি কেন বলছেন। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

    আপনি অবুঝ নন। জাহানারা পরক্ষণে বললো, কাউকে ভালবাসতে যাওয়ার আগে তার সব কিছু জেনে নেয়া উচিত, নইলে পরের দিকে অশেষ অনুতাপে ভুগতে হয়। বলতে গিয়ে চোখেমুখে রক্ত এসে জমেছে তার। কথাগুলো জড়িয়ে আসতে চাইছে বারবার।

    কাসেদ চমকে উঠলো।

    কিছু বলতে যাবে এমন সময় চা হাতে নাহার এসে ঢুকলো ঘরে।

    দু’জনের দিকে দু’কাপ চা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে উভয়ের দিকে তাকালো নাহার। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো সে।

    টেবিলের ওপর চায়ের পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে জাহানারা আবার বললো, অবশ্য শিউলী মেয়ে হিসেবে খারাপ নয়। আমার কাজিন। আমি ওকে ভালো করে জানি।

    তাছাড়া আপনার সঙ্গেও মানাবে বেশ। কিন্তু কথাটা শেষ করলো না সে।

    বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, কী ভেবে আবার বসে পড়লো কাসেদ। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে শুধালো, আপনার কথা কি শেষ হয়েছে?

    জাহানারা কথার জবাবে বললো, আমার অনধিকার চর্চার জন্যে হয়তো আপনি রাগ করেছেন। তাই ক্ষমা চাইছি।

    কাসেদ বললো, ক্ষমা চাওয়ার কোন প্রশ্ন আসে না। কিন্তু কথা কি জানেন, আপনি যে এই এতক্ষণ এত কিছু বললেন আমি তার কোন হদিস খুঁজে পাচ্ছি না। শিউলীকে আমি ভালবাসি এ কথা আপনাকে কে বললো শুনি?

    ভয় নেই। জাহানারা মৃদু হেসে বললো, আমি নিশ্চয় এ নিয়ে দশ জায়গায় আলোচনা করবো না।

    কাসেদ বিরক্তির সঙ্গে বললো, আপনি ভুল করছেন। শিউলীর সঙ্গে আমার তেমন কোন সম্পর্ক নেই। বিশ্বাস করুন।

    সহসা গম্ভীর হয়ে গেল জাহানারা। স্থিরচক্ষে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে। কী যেন খুঁজতে চেষ্টা করলে ওর দু’চোখের মণিতে। তারপর টেনে টেনে বললো, সেদিন বাসা থেকে ফিরে আসার পথে আপনি কি কিছু বলেন নি ওকে?

    কাসেদ ভাবতে চেষ্টা করলো। সেদিন অনেক কথা হয়েছে শিউলীর সঙ্গে। অনেক আলাপ। সঠিক সব কিছু ভাবতে গিয়েও মনে হলো না তার।

    ওকে চুপ থাকতে দেখে জাহানারা মৃদু হাসল। উঠে দাঁড়িয়ে বললো, অনেক রাত হয়ে গেলো, এখন উঠি তাহলে।

    কাসেদ সঙ্গে সঙ্গে বললো, একটা ভুল ধারণা নিয়ে আপনি চলে যাবেন? বসুন। আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে।

    জাহানারা বসলো। বসে বললো, বলুন কী কথা।

    পাশের ঘরে মা নামাজ শেষে টেনে টেনে সুর করে কোরান শরীফ পড়ছেন। শরীরটা আজ একটু ভালো যাচ্ছে তাঁর। তাই উঠে বসেছেন বিছানায়।

    কাসেদ নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মেঝের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললো, সেদিন ওর সঙ্গে আমার তেমন কোন কথা হয়নি। যা হয়েছিল তার সবটুকু আমার মনে নেই। তবে যে কথাই হোক না কেন, তা থেকে আপনি যে সিদ্ধান্ত টেনেছেন তা–সত্যি বলতে কী হাসি পাওয়ার মতো।

    জাহানারা মৃদু হাসলো। আপনার কাছে কৈফিয়ত চাই নি কাসেদ সাহেব।

    আমি কৈফিয়ত দিচ্ছিও না। সহসা রেগে গেলো কাসেদ। আপনি শুনতে চেয়েছিলেন তাই বলছিলাম। না করলে বলবো না। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে সরে গেলো সে।

    দু’জনে নীরব।

    পাশের ঘর থেকে শুধু মায়ের সুর করে কোরান পড়ার শব্দ আসছে ভেসে। ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে বাইরে।

    আকাশে অনেক তারা।

    এবার চলি। পেছন থেকে জাহানারার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল কাসেদ। ফিরে তাকালো না।

    বললো, আসুন।

    ঘরের মাঝখান থেকে জুতোর শব্দ ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে চলে গেলো। পাশের ঘরে মায়ের সঙ্গে কথা বলছে জাহানারা।

    কাসেদ তখনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।

    মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মেলামেশার পরিণাম অবশেষে এই দাঁড়ায়। জাহানারার মাধ্যমে আলাপ হয়েছিলো। তারপর দেখা হলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতো। আলোচনা করতো। এর উর্ধ্বে অন্য কোন সম্পর্ক ছিলো না।

    কে জানে হয়তো এটা জাহানারার একটা মনগড়া ব্যাপার। নিজে থেকে হয়তো একটা সিদ্ধান্ত টেনেছে সে। আর তাই নিয়ে ছুটে এসেছে কাসেদকে বলতে। বলতে নয় ঠিক, বকতে। কিন্তু কেন?

    কাসেদ যদি শিউলীকে সত্যি ভালবেসে থাকে তাতে জাহানারার এত মাথাব্যথ্যা কেন। ভাবতে গিয়ে হঠাৎ যেন একটু আলোর সন্ধান পেলো কাসেদ।

    জাহানারা ভালবাসে ওকে।

    শিউলী যা বলেছে সব মিথ্যে।

    এতো অস্থিরতার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য মনটা ভালো হয়ে গেলো ওর। বেশ হাল্কা বোধ করলে সে।

    কাল বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে জাহানারাদের বাসায় যেতে হবে তাকে। ওকে বুঝিয়ে বলতে হবে সব। তুমি যা ভেবেছো তার সবটুকু মিথ্যে জাহানারা। শিউলীর সঙ্গে আমার তেমন কোন সম্পর্ক নেই। যদি কিছু থেকে থাকে সেতো তোমার সঙ্গে।

    আমি তোমাকে ভালবাসি জাহানারা।

    না। তা হয় না। মাষ্টার সাহেবের সঙ্গে আমাদের বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেছে।

    জাহানারা অটল।

    না জাহানারা। একবার চেয়ে দেখো তোমাকে ভালবেসে আমি যে নিঃশেষ হয়ে গেলাম।

    আমি একটি মেয়ে, ক’জনকে ভালবাসবো বলুন তো? জাহানারার চোখে মুখে কৌতুক।

    শুধু আমাকে। শুধু আমাকে জাহানারা। কাসেদের গলার স্বর কাঁপছে। বুকের নিচে যন্ত্রণা।

    বাইরে কাক ডাকছে। বোধ হয় ভোর হয়ে এলো।

    বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো কাসেদ।

    চোখজোড়া জ্বালা করছে।

    মাথা ঘুরছে।

    সারা দেহে ঘাম করছে ওর।

    মা আর নাহার চাপাস্বরে কথা বলছে পাশের ঘরে।

    ভোর হবার অনেক আগে ঘুম থেকে উঠে ওরা। সাংসারিক আলাপ আলোচনাগুলো বিছানায় শুয়ে শুয়ে এ সময়ে সেরে নেয়।

    কলতলায় গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে মাথায় জল ঢাললো কাসেদ।

    মাথা তুলতে দেখে, নাহার তোয়ালে হাতে পেছনে দাঁড়িয়ে।

    হাত বাড়িয়ে তোয়ালেখানা ওকে দিলো নাহার। আস্তে করে বললো, সাবান এনে দেবো?

    তোয়ালেখানা হাতে নিয়ে কাসেদ বললো, না।

    নাহার আর দাঁড়ালো না, যেমন নিঃশব্দে এসেছিলো তেমনি চলে গেলো সে।

    ঘরে এলে মা শুধালেন, কিরে আজ এত সকাল-সকাল উঠলি যে?

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, এমনি।

    বেলা ন’টার সময় অফিসে যাবার জন্যে বেরুচ্ছে, মা কাছে ডাকলেন, পাশে বসিয়ে গায়ে-মাথায় হাত বুলালেন ওর। বললেন, আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসবি বাবা, আমার কেমন যেন লাগছে।

    কাসেদ বললো, ভেবো না মা, তুমি খুব শিঘ্রী ভালো হয়ে যাবে।

    মা ম্লান হাসলেন।

    বাসা থেকে বেরিয়ে খানিকটা পথ এসেছে, একখানা রিক্সা এসে থামলো সামনে।

    শিউলী বসে, মিটমিটি হাসছে সে।

    মুহুর্তে বিগত বিকেলের কথা মনে পড়ে গেলো কাসেদের।

    বাহ্‌, বেশ তো! রিক্সা থেকে দ্রুত নেমে এসে শিউলী বললো, আমি এলাম বাসায় আর আপনি চলে যাচ্ছেন?

    আপনার কোন বাঁধন নেই, আমাকে অফিসে চাকুরি করে খেতে হয়। – যথাসম্ভব গভীর হবার চেষ্টা করলো কাসেদ।

    শিউলী বললো, সে আমি জানি। আর এও জানি আপনি একজন অনুগত কেরানী। কাজ ফেলে বসে থাকেন না। মিষ্টি করে কথাটা বললো সে, বলে হেসে উঠলো তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গীতে।

    কাসেদ তেমনি গম্ভীর স্বরে বললো, বাসায় মা আছেন, নাহার আছে, যান না, ওদের সঙ্গে গল্প করে বেশ কিছুটা সময় কাটবে আপনার।

    আমি ওদের কাছে আসি নি তা আপনি জানেন, শিউলীর কণ্ঠস্বর সহসা পাল্টে গেলো।

    কাসেদ ইতস্তত করে বললো, তাহলে কার কাছে এসেছেন?

    তাও আমাকে বলতে হবে? ভ্রূজোড়া বিস্তারিত করে অপূর্ব ভঙ্গীতে হাসলো শিউলী, তাহলে শুনুন, আমি আপনার কাছে এসেছি এবং আপনার কাছেই আসি।

    কিন্তু কেন? উত্তেজিত গলায় কাসেদ শুধালো, আপনার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই যার জন্যে আপনি আমার কাছে আসতে পারেন। সারা মুখ কালো হয়ে গেলো শিউলীর।

    ঠোঁটের কোণে একসূতো হাসি জেগে উঠলো ধীরে ধীরে, তারপর সে হাসি অতি সুক্ষ্ম ঢেউ তুলে ছড়িয়ে পড়লো তার সম্পূর্ণ ঠোঁটে, চিবুকে, চোখে, সারা মুখে।

    শিউলী মৃদু গলায় বললো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া না করে, আসুন রিক্সায় উঠুন। ভয় নেই আপনাকে নিয়ে আমি কোথাও পালিয়ে যাবো না, অফিসে নামিয়ে দিয়ে আমার হোষ্টেলে ফিরে যাবো।

    কাসেদ বললো, আমি রোজ হেঁটে যাই, আজও যেতে পারবো।

    শিউলী বললো, দেখুন মেয়েমানুষের মত রাগ করবেন না, উঠুন, রিক্সায় উঠুন। শিউলীর চোখের দিকে তাকিয়ে এবার আর না করতে পারলো না কাসেদ, নীরবে উঠে বসলো সে।

    রিক্সাওয়ালাকে যাবার জন্যে নির্দেশ দিয়ে শিউলীও উঠে বসলো পাশে। আজ একটু ছোট হয়ে বসতে চেষ্টা করলো কাসেদ।

    শিউলীর গায়ে গা লাগতে পারে সেই ভয়ে।

  • ঊনিশ

    ঊনিশ

    আগামী রোববার বাসায় আসবে বলেছে জাহানারা। কেন আসবে? কিছু কথা আছে তার। কী কথা?

    একবার ডেকেছিল সেতারের মাষ্টার ঠিক করে দেবার জন্য।

    এবার হয়তো বলবে, মাষ্টারের সঙ্গে আমার বিয়ের আয়োজন করে দাও।

    কাসেদ যেন এ জন্যেই এসেছিলো জাহানারার জীবনে।

    দরখাস্তখানা লিখে পকেটে রাখলো কাসেদ।

    সাত দিনের ছুটি চাই তার। যদি না দেয় তাহলে, ও চাকরিই ছেড়ে দেবে সে। কী হবে দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত গাধার খাটুনি খেটো?

    তারচে’ লিখবে সে। দিন রাত শুধু লিখবে আর লিখবে।

    সেই ভালো।

    দরখাস্ত নিয়ে অফিসে এসে, খবর শুনে বোবা হয়ে গেলো কাসেদ। বড় সাহেব আবার বিয়ে করছেন। বিয়ে করছেন মকবুল সাহেবের মেজো মেয়েকে।

    আগেই জানতাম, এ না হয়ে পারে না। এক নম্বর কেরানী বিশেষ জোরের সঙ্গে বললেন, বলি নি আমি, এতো যে ছুটোছুটি এর পিছনে কিন্তু আছে, দেখলেন তো?

    একাউণ্টেণ্ট বললেন, আমারও তাই সন্দেহ হয়েছিল। বলে একটা লম্বা হাই তুললেন তিনি, কিন্তু কি বলেন, ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না? দুনিয়াতে কতো মেয়ে থাকতে কিনা ওই কালো কুৎসিত মেয়েটাকে– কথাটা শেষ করলেন না তিনি। অঙ্গভঙ্গী দিয়েই বাকিটুকু বুঝিয়ে দিলেন।

    এক নম্বর কেরানী হাসলেন কাসেদের দিকে তাকিয়ে।

    কাসেদ নিজের খবরটা বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সেই সেদিন মকবুল সাহেবের বাড়িতে, সন্ধ্যার আবছা আলোয় আবিষ্কার করা মেয়েটি এখন গিন্নি সেজে বড় সাহেবের বাড়িতে এসে উঠেছেন ঘর-সংসার করার জন্য। ইচ্ছে করলে কাসেদও বিয়ে করতে পারতো।

    তাহলে এখন বড় সাহেবের ঘরে না থেকে মেয়েটি থাকতো কাসেদের ঘরে। অফিস শেষে বাড়ি ফিরে গেলে ছুটে এসে দরজা খুলে দিত সে। হেসে বলতো, ফিরতে এতো দেরী হলো যে?

    কাসেদ গম্ভীর গলায় বলতো, একগাধা কাগজ ফেলে আসি কী করে বল তো?

    বলতে বলতে এক হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিতো সে আর অন্য হাতে কাছে টেনে নিতো তাকে।

    কিন্তু এসব কী চিন্তা করে কাসেদ?

    গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, বেয়ারার হাতে দরখাস্তখানা বড় সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দিলো কায়েদ।

    একটু পরে বড় সাহেব ডেকে পাঠালেন।

    কাসেদ ভাবছিলো, কী বলে ছুটি নেবে।

    কিন্তু সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভাবনা মুহুর্তে দূর হয়ে গেলো।

    অবাক হয়ে তাঁর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো সে।

    কোট-প্যাণ্ট নয় আজ পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে অফিসে এসেছেন তিনি। সারা মুখে পরিতৃপ্তির উজ্জ্বল আভা। দু’চোখে আনন্দের অপূর্ব ঝিলিক। যেন জীবনে এ প্রথম প্রেমে পড়েছেন বড় সাহেব। তার এ রূপ আর কখনো দেখে নি কেউ।

    সাহেব মৃদু গলায় শুধোলেন, হঠাৎ ছুটি চাইছেন, কী ব্যাপার?

    কাসেদ বললো, মায়ের ভীষণ অসুখ। সারাক্ষণ তার কাছে থাকতে হচ্ছে, তাই। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য না হলেও একেবারে মিথ্যে নয়। সাহেব উৎকণ্ঠা জানিয়ে বললেন ভীষণ অসুখ, সেকি? ভালো দেখে ডাক্তার দেখিয়েছেন তো?

    মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো কাসেদ, বললো, ডাক্তার বলেছে সব সময় রোগীর কাছে কাছে থাকতে, তাইতো–কথাটা শেষ করলো না সে।

    টেবিলের ওপর থেকে কলামটা তুলে নিয়ে দরখাস্তের একপাশে কী যেন লিখলেন বড় সাহেব। বললেন ছুটি আমি দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু এর মধ্যে মায়ের শরীর যদি ভালো হয়ে আসে, তাহলে অফিস করবেন এসে। নইলে অনেক কাজ জমা হয়ে পড়ে থাকবে।

    দরখাস্তখানা টেবিলের এক পাশে রেখে দিয়ে বেয়ারাকে ডাকবার জন্য বেল টিপলেন বড় সাহেব। তাকে সালাম জানিয়ে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো কাসেদ।

     

    রোববার দিন আসবে বলেছিলো জাহানারা।

    এলো না। সকাল থেকে বাসায় অপেক্ষা করেছে কাসেদ। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, দুপুর পেরিয়ে বিকেল, তখনো না আসায় বিচলিত বোধ করলো সে। একবার মনে হলো, হয়তো সে আর আসবে না, কাপড় পরে বাইরে বেরুবার তোড়জোড় করলো। কিন্তু কাপড় পরা হয়ে গেলে মনে হলো যদি সন্ধ্যার পরে আসে সে, তাহলে? কাসেদকে ঘরে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাবে জাহানারা। কে জানে, কী কথা বলার আছে তার– এমনো হতে পারে শিউলী যা বলেছে তার সবটুকু মিথ্যা। হায় খোদা, যদি তাই হতো।

    ভাবতে গিয়ে আর বাইরে বেরুনো হয় না তার।

    কিন্তু সন্ধ্যার পরেও এলো না জাহানারা। রাতেও না।

    বিরক্ত হয়ে রাত দশটার পরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে কাসেদ।

    ফিরেছে রাত দুটো বাজিয়ে।

    সে রোববার না এলেও পরের রোববারে এলো জাহানারা।

    তখন বিকেল।

    ঘরে এসে মায়ের মাথার কাছে বসলো সে।

    অসুস্থ মা অনুযোগভরা কণ্ঠে বললেন, এতদিন পরে এলে মা।

    জাহানারা মৃদু গলায় বললো, কাজ ছিলো।

    কাজ ছিলো না হাতি ছিলো। অদূরে দাঁড়ানো কাসেদ আনমনে বিড়বিড় করে উঠলো।

    মা অত্যন্ত স্নেহের দৃষ্টিতে দেখছিলেন তাকে। আর ফিরে তাকাচ্ছিলেন কাসেদের দিকে।

    মা কী চান আর এ মুহুর্তে তিনি মনে মনে কী ভাবছেন তা ভালো করে জানে কাসেদ।

    যাঁরা ধর্মপ্রাণ, খোদা নাকি তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে থাকেন, তবে কি মায়ের বাসনা বাস্তবে রূপ পাবে?

    কাসেদ কি বিয়ে করতে পারবে জাহানারাকে?

    ওহ! এসব কি ভাবছে সে।

    মা আর জাহানারার সামনে থেকে সরে নিজের ঘরে চলে এলো কাসেদ। একটা বিষয় সে এখনো বুঝতে পারছে না। আজ আসার পরে থেকে কাসেদের সঙ্গে এখনো একটা কথাও বলে নি জাহানারা। বললে নিশ্চয় ওর সম্মান হানি হতো না।

    সেতারের মাষ্টারকে যদি ও বিয়ে করতে চায় করুক না, তাতে কাসেদের কোন বক্তব্য থাকবে না। ব্যথা যদি সহ্য করতে হয় নীরবে সহ্য করবে সে। পাশের ঘরে মা আর জাহানারা কী আলাপ করছে, সব এ ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছে কাসেদ।

    মা এখন নাহারের বিয়ের কথা শোনাচ্ছে তাকে।

    ওর বিয়ের পাকা কথা দিয়ে দিলাম মা! দিন তারিখ আসছে হপ্তায় ঠিক হবে। ছেলেটি বড় ভালো।

    জাহানারা শুধালো, ছেলে কি ঢাকাতেই আছে?

    মা বললেন, হ্যাঁ। ঢাকায় বাসা আছে ওর।

    জাহানারা বললো, তাহলে ভালোই হলো, সব সময় আমাদের কাছে কাছে থাকবে।

    তা মা আমি যত দিন বেঁচে আছি। ওকে চোখের আড়াল করছি নে। বিয়ের পরেও ও আমার কাছে থাকবে। মা ভাঙ্গা গলায় বলছেন, ও আমার ডান হাত। ও কাছে না থাকলে আমি চোখে দেখিনে মা। বড় ভালো মেয়ে। লক্ষ্মী মেয়ে। অমনটি আর হয় না। বলতে গিয়ে একটা

    দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন তিনি। কিন্তু থামলেন না। আবার বললেন, মেয়েদের পাঁচ দশটা স্বাদ আহ্লাদ থাকে। ওর তাও নেই। কোনদিন মুখ ফুটে কিছুই চায় নি সে আমার কাছে। বলতে গিয়ে একবার কেঁদে ফেললেন তিনি। কান্নায় বন্ধ হয়ে এলো তাঁর কণ্ঠস্বর।

    নাহার ডাকলো, মা।

    জাহানারা নীরব। কী বলবে হয়তো সে বুঝে উঠতে পাচ্ছিলো না। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে মা বললেন, যাও, তুমি এবার ও ঘরে গিয়ে বসো। নাহার, মা আমার ওদের জন্যে দু’কাপ চা বানিয়ে দে। কাসেদ বিছানায় বসে বসে এতক্ষণ ওদের আলাপ শুনছিলো।

    উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে সরে গেলো সে।

    দরজার দিকে পেছন ফিরে থাকায় সেদিককার কিছুই এখন সে দেখতে পাচ্ছে না। দেখছে বাইরের আকাশ। যদিও সজাগ মন তার পেছনেই পড়ে আছে। জাহানারার পায়ের শব্দ শোনা গেলো। এ ঘরে।

    জানালার ওপর আরো ঝুঁকে এলো সে।

    শব্দ থেমে গেছে।

    কাসেদ আড়চোখে একবার তাকালো পেছনে।

    ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে জাহানারা। দেখছে ওকে।

    ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো কাসেদ। ও, আপনি!

    ও কখন এসেছে যেন জানে না সে।

    জাহানারা মৃদু গলায় শুধালো, অমন তন্ময় হয়ে কী দেখছিলেন বাইরে?

    কিছু না। এমনি দাঁড়িয়েছিলাম। সরে এসে বিছানায় বসলো কাসেদ, বসুন। চেয়ারটা টেনে জাহানারা বসলো। গত রোববার দিন আসবো বলেছিলাম। হঠাৎ একটা কাজ পড়ে যাওয়ায় আসতে পারি নি।

    যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে সে।

    কাসেদ বললো, অবশ্য আমিও বাসায় ছিলাম না। একটা কাজে সারাদিন বাইরে থাকতে হয়েছিলো। মিথ্যে কথাই বললো সে, কেন যে বললো হঠাৎ তার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নিজেও খুঁজে পেলো না।

    জাহানারা হেসে বললো, তাহলে না এসে ভালোই করেছি। কি বলেন?

    কাসেদ হাসতে চেষ্টা করলো, পারলো না। টেবিলের ওপর থেকে একখানা বই তুলে নিয়ে তার পাতা ওল্টাতে লাগলো জাহানারা। কিছু বলবে সে। কিন্তু, কোত্থেকে যে শুরু করবে। তাই ভেবে উঠতে পারছে না। বার দুয়েক ব্যর্থ হয়ে অবশেষ জাহানারা বললো, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিলো আমার।

    কাসেদ ঢোক গিলে বললো, বলুন।

    বুকটা আবার অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে তার। হাত-পাগুলো ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। বইটা বন্ধ করে জাহানারা বললো, আপনি হয়তো জানেন না যে শিউলী একটি ছেলেকে ভালবাসতো।

    না, নাতো। কাসেদ অবাক হয়ে তাকালো জাহানারার দিকে। সে বুঝতে পারলো না জাহানারা হঠাৎ শিউলীর প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছে কেন। স্বল্প বিরতি নিয়ে জাহানারা আবার বললো, ছেলেটি এখন ইটালিতে আছে। ফাইন আর্টসের ছাত্র সে।

    কিন্তু— কিছু বলতে গেলো কাসেদ।

    ওকে থামিয়ে দিয়ে জাহানারা আবার বললো, দু’বছরের ট্রেনিং-এ গেছে সে। ফিরে এসে ওদের বিয়ে হবে।

    কিন্তু সেতো কোনদিন বলে নি আমায়। ঈষৎ বিস্মিত স্বরে কাসেদ বললো। আজ আপনার কাছ থেকেই প্ৰথম শুনছি।

  • আঠারো

    আঠারো

    হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ওর। দেহটা কাঁপছে। বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যথা। যন্ত্রণা। কাসেদের মনে হলো এ মুহূর্তে এখান থেকে ছুটে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে পারলে যেন কিছুটা শান্তি পেত সে। স্বস্তি পেতো। মাথাটা ভার হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়িয়ে পড়তে চায় মাটিতে।

    কেন এমন হলো?

    পা থেকে মাথা পর্যন্ত জাহানারাকে দেখে নিলো কাসেদ। আজ ওকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। অনেক আকর্ষণীয়। ওর চোখের আর মুখের লাবণ্য অনেক বেড়ে গেছে। কথার মধ্যেও আশ্চর্য পরিবর্তন।

    কাসেদের মনে হলো সে যেন এ মুহুর্তে আরো বেশি করে ভালবেসে ফেলেছে ওকে। তাকে পাবার আকাঙ্ক্ষা আরো তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে ওর মনে।

    না। জাহানারাকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের কোন কিছুই কল্পনা করতে পারে না কাসেদ। কিছুই না।

    জাহানারা শুধালো, চা খাবেন, না কফি?

    কাসেদ কোন উত্তর দিলো না। শুধু একদৃষ্টি তাকিয়ে রইলো ওর দিকে।

    জাহানারা বললো, আপনার কী হয়েছে বলুন তো? আজ কেমন যেন অন্য রকম মনে হচ্ছে আপনাকে।

    কাসেদ মনে মনে ভাবলো, পরিবর্তন আমার মধ্যে নয়, তোমার মধ্যে এসেছে। তুমি আগের সেই মেয়েটি নেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন।

    কিন্তু মুখে বললো, আমার শরীরটা ভালো নেই।

    সে কী, অসুখ করে নি তো? জাহানারার চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়াপাত হলো। হাত বাড়িয়ে ওর কপাল স্পর্শ করে দেখলে সে, বললো, কই টেম্পারেচার নেই তো?

    শিউলী বললো, ওর তো জ্বর হয়নি যে টেম্পরেচার পাবে। ওর শরীর খারাপ করছে।

    জাহানারা বললো, এক কাপ কফি খান, শরীর ভালো হয়ে যাবে।

    কাসেদ বললো, থাক। এখন আমার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া এখনই আমাকে উঠতে হবে।

    জাহানারা চোখ বড় বড় করে বললো, সেকি, এই এলেন আর চলে যাবেন?

    কথাটা কানে গেলো না ওর। ও তখন ভাবছে জাহানারার জন্যে একটা সেতারের মাষ্টার ঠিক না করে দিয়ে কত বড় ভুল করেছে। জাহানারা বারবার করে বলেছিলো, একটা মাষ্টার ঠিক করে দিন। তখন যদি ওর অনুরোধ রক্ষা করতো সে তাহলে হয়তো এত বড় বিপর্যয় ঘটতো না।

    শিউলী শুধালো, আপনি কি বাসায় ফিরবেন?

    কাসেদ বললো, হ্যাঁ।

    খুলে যাওয়া খোঁপাটা ভালো করে বাঁধতে বাঁধতে জাহানারা জানালার পাশে সরে দাঁড়ালো। তারপর সেখান থেকে জিজ্ঞেস করলো, রোববার দিন বিকেলে কি আপনি বাসায় থাকবেন?

    কেনো?

    যদি থাকেন তাহলে বাসায় আসবো। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার। বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠলো ওর। আড়চোখে একবার ওকে দেখে নিয়ে বললো, রোববার ছাড়া অন্য কোন দিন আসতে পারেন না?

    জাহানারা বললো, রোববার দিন আমার ছুটি কিনা তাই। অন্যদিন গেলে আমার সেতার শেখা হবে না। মাষ্টার ভীষণ রাগ করবেন।

    আবার সেতার শেখা!

    আবার সেতারের মাষ্টার!

    রাগে দেহটা জ্বালা করে উঠলো ওর। পরক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ঠিক আছে, আমি বাসায় থাকবো, আসবেন। এখন চলি।

    ওর সঙ্গে শিউলীও উঠে দাঁড়ালো। আমার একটা কথা রাখবেন কাসেদ সাহেব?

    কী?

    বাড়ি যাবার পথে আমাকে হোষ্টেলে পৌঁছে দিয়ে যাবেন?

    কিন্তু…কাসেদ ইতস্তত করে বললো, পথটা তো এক হলো না। উল্টো।

    শিউলী বললো, আমার জন্যে না হয় একটু উল্টো পথ ঘুরেই গেলেন। যাবেন কি?

    কাসেদ জাহানারার দিকে এক পলক তাকালো; ও জানালা গলিয়ে বাইরে আকাশ দেখছে, দেখুক।

    কাসেদ বললো, যাবো বইকি, চলুন। গলার স্বরে উৎসাহের আধিক্য দেখে নিজেই চমকে উঠলো। বুঝতে পারলো না কথাটা হঠাৎ এত জোরের সঙ্গে কেন বলতে গেলো সে।

    জানালা থেকে সরে এলো জাহানারা।

    শিউলী শুধালো, তুমি এখন ঘরে বসে বসে করবে কী জাহানারা?

    জাহানারা ধীর গলায় বললো, কী আর করবো, মাষ্টার একটা নতুন গদ দিয়ে গেছেন, বসে বসে সেতার বাজাবো।

    আবার মাষ্টার!

    আবার সেতার!

    শিউলীকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো কাসেদ।

    কিছুই ভালো লাগছে না।

    মনটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে ওর।

    আকাশে অনেক তারা জ্বলছে। রাস্তায় অনেক লোক। বাতাসে কার বাগানের মিষ্টি গন্ধ আসছে ভেসে। কিন্তু এর কোন কিছু দিয়ে এ শূন্যতা ভরানো যাবে না।

    শুনেছেন? সহসা কাসেদ বললো, আপনার প্রস্তাব মেনে নিয়েছি। আপনি আমার একটা কথা রাখুন। আজ।

    কী কথা? শিউলীর দুচোখে ঔৎসুক্য ভীড় করেছে এসে।

    কাসেদ মৃদু গলায় বললো, আমার সঙ্গে একটু বেড়াবেন। ঘুরবেন যেখানে যেখানে আমি নিয়ে যাই। আজ বড় একা লাগছে আমার।

    শিউলী ভ্রূজোড়া প্রসারিত করে তাকালো ওর দিকে, তারপর হেসে বললো, কিন্তু আমাকে যে ন’টার মধ্যে হোষ্টেলে ফিরতে হবে, নইলে সুপার ভেতরে ঢুকতে দেবে না। শেষে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে।

    কাসেদ ম্লান হেসে বললো, আমি যদি আপনার জন্যে উল্টো পথে পাড়ি দিতে পারি, আপনি আমার জন্য এ ঝামেলার ঝুঁকিটা নিতে পারেন না?

    কিন্তু কেন বলুন তো? কণ্ঠে ঈষৎ বিস্ময় নিয়ে শিউলী শুধালো, আজ হঠাৎ বেড়াতে ইচ্ছে হলো কেন আপনার? বিশেষ করে আমাকে সঙ্গে নিয়ে।

    কাসেদ সহসা জবাব দিলো না।

    নীরবে কী যেন ভাবলো।

    জাহানারা, কেন এমন করলে তুমি! তোমাকে ভালবেসে পরিপূর্ণ ছিলাম আমি। যেদিকে তাকাতাম ভালো লাগতো আমার। আজ আকাশের নীল আর নিওনের আলো সব কিছু বিবৰ্ণ মনে হচ্ছে আমার চোখে।

    কেন এমন হলো জাহানারা?

    আমি জাহানারা নই, শিউলী। শিউলী মিটমিটি হাসছে। কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে ওর।

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত হয়ে গিয়ে বললো, না–মানে। কথাটা শেষ করলো না সে। সহসা শিউলীর একখানা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে আবেগভরা গলায় কাসেদ বললো, আচ্ছা! বলতে পারেন, আমি যা চাই তা পাইনে কেন?

    হাতখানা সরিয়ে নিলো না শিউলী। মৃদু চাপ দিয়ে শুধু বললো, চাওয়া পাওয়ার সঙ্গে সাপে-নেউলের সম্পর্ক রয়েছে যে। এই দেখুন না, আমি চাই ছেলেদের সঙ্গে বন্ধু হিসেবে মিশতে আর ওরা চায় আমাকে ঘরের গিনী হিসেবে পেতে। ভাবুন তো কেমন বিচ্ছিরি ব্যাপার। শিউলী হাসল শব্দ করে। কিন্তু আপনাকে যদি কেউ গিনী হিসেবে পেতে চায়, সেটা কি অন্যায়?

    ওর হাতে একটা নাড়া দিলো শিউলী।

    শিউলী পরক্ষণে বললো, একতরফা চাওয়াটা অন্যায় বইকি।

    কথাটা তীরের ফলার মত এসে বিঁধল ওর বুকে।

    শিউলী কি বলতে চায় জাহানারার সঙ্গে একতরফা প্ৰেম করে অন্যায় করেছে কাসেদ? না। আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। আমি। কাসেদ জোরের সঙ্গে বললো, ভালবাসা অন্যায় নয়। সে একতরফা হোক কিম্বা দুতরফা। হাতখানা ওর হাত থেকে টেনে নিয়ে শিউলী অপূর্ব কণ্ঠে বললো, ধরুন আমি যদি আপনাকে ভালবাসি। আপনি কি তা সহজ করে নিতে পারেন? অবশ্য, আপনাকে ভালবাসতে যাওয়ার কোন প্রশ্নই আসছে না।

    কেন, কেন বলুন তো; শিউলীর কথার জবাব দিতে গিয়ে বিচলিত বোধ করলো কাসেদ। সে বুঝে উঠতে পারলো না। আর পাঁচটি ছেলেকে যদি ভালবাসা যেতে পারে, ওকে কেন নয়।

    শিউলী কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, তারপর বললো, এসব কেনর উত্তর দেয়া কঠিন কাসেদ সাহেব। আমার তরফ থেকে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, আপনি বন্ধু হিসেবে অত্যন্ত ভালো, কিন্তু প্রেমিক হিসেবে নন। বলে মুখ টিপে হাসলো সে।
    নিজেকে বড় অসহায় মনে হলো কাসেদের।

    হাত-পাগুলো ভেঙ্গে আসছে।

    না, আমি তো বন্ধু হিসেবে জাহানারাকে পেতে চাইনে।

    আমি চাই আরো আপন করে।

    একান্তভাবে নিজের করে।

    কেন, কেন আমাকে ভালবাসা যেতে পারে না? আবেগের চাপে গলাটা ভেঙ্গে আসছে তার। আপনি কী মনে করেন- কথাটা শেষ করতে পারলো না কাসেদ। শিউলীর হাসির শব্দে থেমে গেলো। শিউলী বললো, আপনার কী যেন হয়েছে আজ। এসব বাদ দিয়ে এখন বাসায় ফিরে যান; আমারও হোষ্টেলে যেতে হবে।

    কাসেদ কোন জবাব দেবার আগেই রিক্সাওয়ালাকে হোষ্টেলের পথে যাবার নির্দেশ দিলো শিউলী।

    পথে আর কোন কথা হলো না।

    শিউলী চুপ। ঠোঁটের কোণে শুধু একটুখানি হাসি। মাঝে মাঝে জেগে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

    কাসেদ নীরব। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে ওর।

    সারা রাত ঘুমালো না সে।

    সকালে স্নান সেরে বড় সাহেবের কাছে একখানা দরখাস্ত লিখলো কাসেদ। দিন সাতেকের ছুটি চাই।

    এ সাত দিন কোথাও বেরুবে না সে।

    একা ঘরে বসে থাকবে। শুধু ভাববে। আর ভাববে।

    কেন এমন হলো?

  • সতেরো

    সতেরো

    বিকেলে কাসেদের মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে গেলো।

    বাড়িতে মায়ের অসুখ। তবু বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করলো না তার।

    ইচ্ছে হলো জাহানারাদের ওখানে যেতে।

    কী করছে জাহানারা?

    হয়তো বাগানে বসে বসে গল্প করছে পাড়ার বান্ধবীদের সঙ্গে।

    কিম্বা তার শোবার ঘরে জানালার পাশে বই পড়ছে, উপন্যাস, গল্প অথবা কবিতা।

    জাহানারা, এভাবে আর কতদিন চলবে বলতে পারে? কতদিন আমি ভেবেছি আমার মনের একান্ত গোপন কথাটা ব্যক্ত করবো তোমার কাছে। বলবো সব। বলবো এসো আমরা ঘর বাঁধি। তুমি আর আমি। আমরা দু’জনা, আর কেউ থাকবে না সেখানে।

    কেউ না।

    রাস্তায় কত লোক। আসছে। যাচ্ছে। কথা বলছে। ওরাও হয়ত ভাবছে কারো কথা। কারো স্বপ্ন আঁকছে মনে মনে, কল্পনার চোখে দেখবার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতের দিনগুলোকে, রোমাঞ্চকর অনাগত দিন।

    আজকাল জাহানারাকে নিয়ে একটু বেশি করে ভাবছে কাসেদ।

    মূলে রয়েছে মা। রোজ একবার করে তাড়া দিচ্ছেন তিনি। বিয়ে করো। আমি বেঁচে থাকতে একটা বউ নিয়ে আয় ঘরে।

    আর বিয়ের কথা যখনি ভাবে কাসেদ জাহানারা ছাড়া অন্য কারো চিন্তা মনে আসে না তার।

    একমাত্র জাহানারা স্ত্রী হিসেবে ঘরে আসতে পারে তার।

    আর কেউ নয়।

    বাইরে, বাসার সামনে কমলা রঙের শাড়ি পরে মেয়েটি দাঁড়িয়ে, সে জাহানারা নয়, শিউলী।

    শিউলীর সঙ্গে সেই অনেকদিন আগে জাহানারার জন্মদিনে এই বাড়িতেই প্ৰথম আলাপ হয়েছিলো তার।

    শিউলী হাসলো। জাহানারার কাছে এসেছেন বুঝি?

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, হ্যাঁ।

    শিউলী বললো, ও এখন সেতার শিখছে, ডিষ্টার্ব করা ঠিক হবে না। আসুন না, আমরা এখানে মাঠের ওপর বসি।

    কাসেদ ইতস্তত করে বললো, হ্যাঁ বসা যেতে পারে, আমার কোন আপত্তি নেই।

    শিউলী ঠোঁট টিপে হাসলো। মনে হলো কিছু বলবে। বললো না।

    মাঠের ওপরে যেখানে কয়েকটা ফুলের টবে লাল, সাদা ফুল ফুটে আছে সেখানে এসে বসলো ওরা।

    কাসেদ বললো, কই আপনি এলেন না তো একদিনও?

    শিউলী বললো, যেতাম। কিন্তু, পরে ভাবলাম আসা-যাওয়ার উৎসাহ দেখে আপনি যদি শেষে ভুল বুঝে বসেন আমায়?

    ভুল! ভুল কিসের? কাসেদ অবাক হলো।

    শিউলী হেসে হেসে বললো, যদি ভাবেন আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেছি তাহলে? বলে শব্দ করে হেসে উঠলো। সে হাসির দমকে সরু দেহটা যেন নেতিয়ে পড়তে চাইলো ঘাসের ওপরে।

    কাঁধের ওপর থেকে কোলে নেমে আসা আঁচলখানা আবার যথাস্থানে তুলে দিয়ে শিউলী বললো, আচ্ছা একটা কথার জবাব দিতে পারেন?

    কী কথা?

    মাঝে মাঝে আপনাকে বড় দেখতে ইচ্ছে করে, কেন বলুন তো?

    শিউলী তার চোখের দিকে তাকালো।

    পর পর কয়েকটা ঢোক গিললো কাসেদ।

    জবাব দেবার মত কোন কথা খুঁজে পেলো না সে। আলোচনাটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়ার জন্যেই হয়তো সে পরক্ষণে বললো, চলুন না, জাহানারার ঘরে গিয়ে বসা যাক। এতক্ষণে তার সেতার শেখা নিশ্চয় শেষ হয়েছে। এত শিঘ্রী? শিউলী যেন চীৎকার করে উঠলো। তারপর ঠোঁটের কোণে অর্থপূর্ণ হাসির ঈষৎ তরঙ্গ তুলে ধীর গলায় বললো, আপনি কি ভাবেন সেতার শেখানটাই মুখ্য?

    কাসেদ শুধালো, কেন বলুন তো?

    শিউলী হাসলো, আপনি কিছুই জানেন না তাহলে?

    কাসেদের বুকটা কেঁপে উঠলো সহসা। কিছু বলতে গিয়ে আবার বার কয়েক ঢোক গিললো, কই জানি না তো?

    শিউলীর চোখেমুখে কৌতুক। সামনে ঝুঁকে এসে আস্তে বললো, তারের সঙ্গে তারের জোর প্ৰেম চলছে।

    তার মানে? হৃৎপিণ্ডতা গলার কাছে এসে আঘাত করছে যেন। সপ্ৰসন্ন দৃষ্টি মেলে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো কাসেদ।

    শিউলী বললো, এখনো বুঝলেন না? ঠোঁট টিপে আবার হাসলো সে। এই সহজ কথা বুঝতে এত দেরি হচ্ছে আপনার? চারপাশে এক পলক দেখে নিয়ে আরো কাছে সরে এলো শিউলী। মাষ্টার আর ছাত্রীতে মন দেয়া নেয়ার পালা চলছে, বুঝলেন?

    কাসেদের মনে হলো, ওর দেহটা যেন ক্লান্তি আর অবসাদে ভেঙে আসতে চাইছে। উঠে দাঁড়াবার শক্তি পাচ্ছে না সে।

    কেন এমন হলো জাহানারা?

    এ সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করলে কী ক্ষতি হয়ে যেতো তোমার? আমি নিশ্চয় বাধা দিতাম না, কেন দেবো?

    পৃথিবীতে আমরা সবাই প্রথমে নিজের কথা ভাবি, পরে অন্যেরা। তুমি তোমার পথে চলবে, আমি আমার পথে। তোমারটা আমি কোনদিনও কেড়ে নিতাম না। তবে কেন তুমি সব কিছু লুকিয়ে গেলে আমার কাছ থেকে?

    ওকি আপনি একেবারে চুপ করে গেলেন যে? শিউলীর কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞাসার সুর, কী ভাবছেন?

    না, কিছু না তো? কাসেদ নিজেকে আড়াল করতে চাইলো শিউলীর দৃষ্টি থেকে।

    শিউলী আবার বললো, আপনি যেন কেমন একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন মনে হচ্ছে?

    তাই নাকি? না, এমনি। কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।

    শিউলী শুধালো, উঠবেন নাকি?

    কাসেদ বললো, হ্যাঁ, না ভাবছি–।

    কী ভাবছেন?

    এখানে আর একটু বসা যাক, কি বলেন? অনেকটা সহজ হবার চেষ্টা করলো কাসেদ।

    শিউলী বললো, জাহানারার সঙ্গে দেখা করবেন না?

    করবো না কেন? দেখা করতেই তো এসেছি। বলতে গিয়ে গলার স্বরটা কাঁপলো ওর।

    কী আশ্চর্য! আজি বিকেলে জাহানারাদের বাসার পথে আসতে আসতে অনেক কিছু ভেবেছে কাসেদ, অনেক কল্পনার জাল বুনেছে। কিন্তু ভুলেও ভাবে নি, মাষ্টারের সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক পাতিয়ে বসতে পারে জাহানারা। কেন এমন হলো?

    শিউলী শুধালো, আপনার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে?

    কাসেদ উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, শিউলী তাকে বাধা দিয়ে আবার বললো, ওই যে জাহানারা।

    মাঠ থেকে বারান্দার দিকে দেখলো কাসেদ।

    এইমাত্র মাষ্টারকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে জাহানারা।

    মাষ্টার বললো, এবার যাই তাহলে?

    জাহানারা বললো যাই নয়, আসি। কাল ঠিক সময় আসবেন তো? আসবেন কিন্তু। নইলে আরো বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখবো। একটু শাসন, একটু রাগ, একটু অভিমান।

    এমন করে তো কাসেদের সঙ্গে কথা বলে নি জাহানারা।

    শিউলী বিড়বিড় করে কী বললো কিছু বোঝা গেল না।

    জাহানারা তার মাষ্টারের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসছে।

    দাঁতগুলো চিকচিক করছে বিকেলের রোদে।

    ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো ওরা।

    শিউলী ডাকলো, জাহানারা।

    ওদের দেখে চোখ জোড়া বড়ো বড়ো করে তাকালো জাহানারা, তোমরা ওখানে করছো কী?

    শিউলী হেসে দিয়ে বললো, প্ৰেমালাপ করছি, তাই না কাসেদ সাহেব?

    ঘাড় বাকিয়ে বাঁকা চোখে কাসেদের দিকে তাকালো সে।

    জাহানারা ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে সামনে।

    কাসেদ কোন উত্তর না দিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলো।

    জাহানারা শুধালো, আপনি কখন এসেছেন?

    কাসেদ কোন জবাব দেবার আগেই শিউলী বললো, অনেকক্ষণ হয়। উনি এসেছেন, আমি আটকে রেখেছি এখানে।

    জাহানারা বললো, ভিতরে গেলেই তো পারতেন।

    না, ভাবলাম আপনার অসুবিধা হতে পারে। যতই লুকোতে ইচ্ছে করুক না কেন, গলার স্বর অস্বাভাবিক শুনালো জাহানারার কানে।

    জাহানারা মিষ্টি হাসলো, কী যে বলেন, অসুবিধে কেন হবে! আসুন ভেতরে বসবেন।

    কাসেদের মনে হলো জাহানারার কথাবার্তায় আগের সেই আন্তরিকতা নেই। বাড়িতে এসেছে। যখন বসাতে হবে তাই বসতে বলছে সে।

    সামনে জাহানারা আর পেছনে শিউলী আর কাসেদ। পাশাপাশি। শিউলী চাপা স্বরে শুধালো, আপনার কী হয়েছে বলুন তো, সেই তখন থেকে কেমন যেন গুম হয়ে আছেন।

    কাসেদ বললো, ও কিছু না।

    জাহানারা পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলো, আমাকে কিছু বললেন কি?

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, না।

  • ষোলো

    ষোলো

    দিন কয়েক থেকে মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।

    মাঝে মাঝে জ্বর আসে। ছেড়ে যায়। আবার আসে।

    এই জ্বরের মধ্যেও মা নামাজ পড়া বাদ দেন নি। পড়েন, বসে বসে।

    আর সারাক্ষণ শব্দ করে দোয়া দরুদ পাঠ করেন।

    মাঝে মাঝে দুঃখ প্রকাশ করেন নাহারের জন্যে আর কাসেদের জন্যে।

    বলেন, আমি মরে গেলে তোদের যে কী হবে ভেবে পাই না।

    আজ বিকেলে কাসেদ বাসায় ফিরে এলে মা কাছে ডাকলেন ওকে।

    বললেন, এখানে এসে বসো, আমার মাথার কাছে।

    কপালে হাত রেখে কাসেদ দেখলো জ্বর আছে কিনা। নেই।

    নাহার বললো, এই একটু আগে জ্বর নেমে গেছে।

    মা বললেন, আমাকে নিয়ে তোরা ভাবিস নে। বুড়ো হয়ে গেছি, আর ক’দিন বাঁচবো।

    কাসেদ বললো, ওসব অলক্ষুণে কথা কেন বলছো মা, তুমি এখন ঘুমোও। এইতো কাল সকালেই ভাল হয়ে যাবে।

    মা চুপ করলেন না। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো তাঁর। তবু বললেন, তোর খালু এসেছিলো, নাহারের বিয়ের সেই পুরানো প্রস্তাবটা নিয়ে।

    শ্বাস নেবার জন্যে থামলেন মা।

    নাহার বিছানার ওপাশে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো। বিয়ের কথা শুনে বার-কয়েক ইতস্তত করে পাশের ঘরে সরে গেলো সে।

    মা আবার বললেন, আমি এ বিয়েতে মত দিয়েছি। অসুখে যেমন ধরেছে কে জানে কখন মরে যাই। যাবার আগে ওকে স্বামীর ঘরে তুলে দিয়ে যেতে চাই। নইলে মরেও শান্তি পাবো না আমি। গলাটা ধরে এলো মায়ের। বার দু’য়েক ঢোক গিলে নিয়ে বললেন, তাছাড়া ছেলেটাও তো খারাপ না, ভালোই, এখন তুই মত দিলেই হয়ে যায়।

    মায়ের কথায় মৃদু হাত বুলোতে বুলোতে কাসেদ আস্তে করে বললো, আমার মতামতের কী আছে, তোমরা যা ভালো মনে করো, করবে। অবশ্য নাহারকে একবার জিজ্ঞেস করে নিয়ো।

    ওকে আবার জিজ্ঞেস করবো কী? মা চোখ তুলে তাকালেন ওর দিকে।

    আমরা কি ওর খারাপ চাই? ছেলেটা শুনেছি, দেখতে শুনতে ভালো।

    মা পাশ ফিরে শুলেন।

    কাসেদ নীরবে ওঁর মাথায় হাত বুলোতে লাগলো।

    রাতে ওর ঘরে খাবার নিয়ে এলে নাহারকে বসতে বললো কাসেদ।

    বললো তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।

    নাহার ঈষৎ বিস্ময় নিয়ে তাকালো ওর দিকে। বসলো না। দরজার কপাট ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো সে।

    কাসেদ ভাবলো কথাটা কিভাবে বলা যেতে পারে।

    বিছানার ওপর থেকে উঠে টেবিলের পাশে গিয়ে বসলো সে।

    নাহার অপেক্ষা করছে দাঁড়িয়ে।

    থালার মধ্যে ভাত ঢেলে নিতে নিতে কাসেদ বললো, তোমার বিয়ের জন্যে খালু একটা প্ৰস্তাব এনেছেন শুনেছো–

    নাহার কোন জবাব দিলো না।

    কাসেদ ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে দেখলো তাকে।

    তবু সে চুপ।

    কাসেদ বললো, মা অবশ্য তাঁর মত দিয়েছেন। তুমি যদি মত দাও, তাহলে আমারও আপত্তির কিছু নেই।

    নাহার নড়েচড়ে দাঁড়ালো।

    ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হলো দরজায়।

    কাসেদ এবার আর তাকালো না।

    নিঃশব্দে ভাত খেতে লাগলো সে। খেতে খেতেই বললো, তোমার ইচ্ছা হলে ছেলেটিকে দেখতেও পারো। আর যদি মত না থাকে তাও বলতে পারো। সঙ্কোচের কিছু নেই।

    তবু চুপ করে রইলো নাহার। মুখখানা নুইয়ে পায়ের পাতার দিকে চেয়ে রইলো সে।

    কী ব্যাপার, কিছু বলছে না যে?

    নাহার নীরব।

    তোমার কি কোন মতামত নেই?

    তবু চুপ সে।

    তুমি কি কিছুই বলবে না? কাসেদ স্থির দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।

    আমি কী বলবো? এতক্ষণে কথা বললো নাহার। ওর গলার স্বরে বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা, আপনারা যা ভালো মনে করেন তাই করবেন, আমার কোন মতামত নেই। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো সে।

    শেষের দিকে গলাটা জড়িয়ে এলো তার।

    তখনো দাঁড়িয়ে সে।

    হ্যারিকেনের আলোয় মুখখানা ভালো করে দেখা গেলো না।

    পাশের ঘরে মা দরুদ পড়ছেন শুয়ে শুয়ে। এখান থেকে সব কিছু শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট।

    ভাত খেয়ে উঠে দাঁড়াতে থালাবাসনগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেলো নাহার।

    ও চলে যেতে খাতা-কলম নিয়ে বসলো কাসেদ।

    লিখবে।

    ভীষণ লিখতে ইচ্ছে করছে ওর।

     

    অফিসের কানাঘুষো ইদানীং অন্য রূপ নিয়েছে।

    মকবুল সাহেবের প্রতি বড় সাহেবের পক্ষপাতিত্ব সবার মনে ঈর্ষার জন্ম দিয়েছে। আর তাই রোজ অফিসে এসে কাজের ফাঁকে তারা চাপা সুরে এই অর্থপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলছে। রোজ বিকেলে সাহেব হাসপাতালে যান অসুস্থ মকবুল সাহেবকে দেখতে, তাঁর খবরাখবর নিতে।

    কিন্তু কেন, কিসের জন্য?

    শহরে এমন আরেকটি অফিস কী কেউ দেখাতে পারবে যার একজন কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়লে বড় সাহেব রোজ তাকে দেখতে যান? শুধু কী দেখতে যাওয়া?

    রোজ যাবার সময় বিস্কিট, হরলিক্স, ফলমূল কত কিছু নিয়ে যান তিনি। তাছাড়া ওঁর পেছনে টাকা খরচ করার ব্যাপারেও এতটুকু কাৰ্পণ্য করছেন না তিনি। শোনা যাচ্ছে কোলকাতা থেকে একজন নামকরা ডাক্তার আনার কথাও ভাবছেন বড় সাহেব।

    কিন্তু কেন?

    কাসেদ বলে, যদি টাকা খরচ করেই থাকেন, আপনাদের এত মাথাব্যথা কেন? শুনে বিশ্ৰীভাবে হাসে এক নম্বর কেরানী। বলে, মাথাব্যথা হতো না, যদি না এই টাকা খরচের পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য লুকানো থাকতো।

    বলে আবার হাসে লোকটা।

    কাসেদ বুঝতে পারে না, ও কী বলতে চায়। ইতস্তত করে আবার প্রশ্ন করে, তার মানে?

    মানে? মানে অত্যন্ত সহজ। চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে এক নম্বর বলে, মকবুল সাহেবের একটি বয়স্ক মেয়ে আছে সে খবর রাখেন?
    কাসেদ বলে, হ্যাঁ রাখি। একটি নয় দু-তিনটি মেয়ে আছে তাঁর।

    ব্যাস। মাথা দুলিয়ে এক নম্বর কেরানী আবার বলে, বাকিটুকু আপনি নিজেই বুঝে নিন।

    কাসেদের বুঝতে বাকি থাকে না।

    একাউণ্টেণ্ট তার টেবিল থেকে গলা বাড়িয়ে বলেন, পরশু দিন বিকেলে দেখলাম বড় সাহেব তাঁর গাড়ি করে ওদের হাসপাতাল থেকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছেন।

    কাসেদ পরক্ষণে বলে, ওটা অন্যায় কিছু করেন নি তিনি।

    আরে সাহেব আপনার এত গা জুলছে কেন শুনি? এক নম্বর কেরানী টেনে টেনে বলেন, আমরা তো আর আপনাকে বলছি না।

    জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিলো কাসেদ, বড় সাহেবকে এদিকে আসতে দেখে চুপ করে গেলো সে।

    বড় সাহেব কেন যে এ ঘরে এলেন কিছু বুঝা গেল না।

    লম্বা অফিস ঘরটায় বার কয়েক পায়চারী করলেন তিনি। মনে হলো কী যেন গভীরভাবে ভাবছেন, চিন্তা করছেন।

    স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হবার আগে এবং পরে সব সময় তাঁকে কিছুটা চিন্তাক্লিষ্ট দেখাতো।

    কিন্তু আজকের ভাবনার মধ্যে রয়েছে একটা অনিবাৰ্য অস্থিরতা। কেরানীরা এখন আর কথা বলছে না।

    কাজ করছে।

  • পনেরো

    পনেরো

    মকবুল সাহেব। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত মকবুল সাহেব কি ভালো হবেন?

    এ রোগ তো ভালো হবার নয়। আর তিনি যদি ভালো না হন তাহলে তার জায়গায় নিশ্চয় এই অফিসের একজনকেই নেয়া হবে। কাকে নেবে কিছু জানেন? এক নম্বর কেরানী চাপাস্বরে শুধোলেন দু’নম্বর কেরানীকে।

    দু’নম্বর কী বললেন কিছু শোনা গেলো না।

    দুপুরে বড় সাহেব ডেকে পাঠালেন তাকে।

    কিছু টাকা দিলেন।

    খোঁজখবর নিলেন।

    বললেন, আমি অবশ্য বিকেলের দিকে একবার যাবো।

    কাসেদও ভাবছিলো বিকেলে একবার হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসবে লোকটাকে।

    লোকটাকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহের আড়ালে আরেকটি বাসনা লুকিয়ে ছিলো। সেই মেয়েটিকে দেখবে। বিকেলের রঙে যার দেহ রাঙানো। কিন্তু অফিস ছুটি হবার একটু আগে সালমা এসে হাজির।

    মুখখানা গভীর। কালো। চুলগুলো এলোমেলো। চোখে চরম বিতৃষ্ণা। কাসেদ চমকে উঠলো। কী ব্যাপার, হঠাৎ অফিসে?

    সালমা বললো, বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি।

    কাসেদ বললো, দাঁড়িয়ে কেন, বসো।

    সালমা বললো, এখানে একগাদা লোকের সামনে কিছু বলতে পারবো না আমি। তোমার কি বাইরে আসতে অসুবিধা হবে?

    না, অসুবিধা কিসের। এইতো একটু পরেই অফিস ছুটি হবে, তারপর বাইরে বেরুনো যাবে খ’ন। কিন্তু অমন কী ঘটলো কিছু বুঝতে পাচ্ছিনে। তোমাকে যেন একটু ক্লান্ত মনে হচ্ছে?

    ক্লান্ত বইকি, সালমা চাপাস্বরে বললো, বড় ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমি। শেষের কথাগুলো স্পষ্ট শোনা গেলো না।

    কাসেদ বুঝলো, কিছু একটা ঘটেছে। হয়তো স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করেছে সে। কিম্বা মা-বাবার সঙ্গে।

    অফিসে আর কোন আলাপ হলো না।

    রাস্তায় নেমে কাসেদ বললো, কী দরকার বলো।

    সালমা বললো, এই রাস্তায়? চলো না কোথাও গিয়ে বসা যাক।

    কোথায় যাবে?

    কেন, কোন রেষ্টুরেণ্টে?

    খোলা রেস্তোরায় বসা ঠিক হবে না।

    তাহলে কেবিনে বসবে।

    কাসেদ ইতস্তত করলো কিন্তু সালমার অনুরোধ এড়াতে পারলো না সে।

    চায়ের পেয়ালা সামনে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো সালমা।

    টেবিলের ওপর হিজিবিজি কাটলো।

    কাসেদ বললো, কী চুপ করে রইলে যে, কিছু বলবে না?

    সালমা একবার আড়চোখে দেখে নিলো তাকে। তারপর বললো, আচ্ছা আমাকে দেখে তোমার কী মনে হয় বলতো?

    কাসেদ শুধালো, হঠাৎ এ প্রশ্ন?

    সালমা বললো, না মানে বলছিলাম কী, আমাকে দেখে কি তোমার মনে হয় আমি খুব সুখী?

    চায়ের পেয়ালাটা মুখের কাছ থেকে নামিয়ে এনে কাসেদ বললো, এ প্রশ্নের জবাব দেয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ সুখ জিনিসটা হচ্ছে মনের ব্যাপার, ওটা যদি বাইরের হতো, তাহলে সাদা চোখে দেখা যেতো। তোমার মনকে তো আর আমি দেখতে পাচ্ছি নে।

    দেখবার চেষ্টাই-বা করলে কবে। সালমার কণ্ঠস্বরে অভিমান ঝরছে, নিজেকে নিয়েই তো ব্যস্ত থাকলে চিরকাল, অন্যের কথা ভাববার অবকাশ কোথায়। কথা বলতে গিয়ে বারবার মুখখানা লাল হয়ে উঠছিলো ওর। কিন্তু কাসেদের দিকে একবারও দেখলো না সে।

    চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলো কাসেদ। বিব্রত গলায় বললো, আমার কথা বাদ দাও। তোমার নিজের কথা কী বলছিলে তাই বলো।

    অল্পক্ষণের জন্যে চুপ করে গেলো সালমা।

    কাসেদের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারে নি সে।

    এক চুমুক চা খেয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে সালমা আবার বললো, সব মানুষই জীবনে সুখী হতে চায়। আমিও চেয়েছি। যাকে ভালবাসলাম তাকে পেলাম না। যাকে বিয়ে করতে হলো তাকে ঠিক মনের মতোটি করে পেতে চাইলাম। কিন্তু–

    বলতে গিয়ে সহসা থেমে পড়লো সালমা।

    মাথার ওপরে ফ্যানটা ঘুরছে জোরে।

    এলোমেলো চুলগুলো উড়ছে বাতাসে।

    মুখ খুলে কাসেদের দিকে তাকালো সালমা। আস্তে করে বললো, সে চাইলো আমি তার মতো হই। পাতলা সিফনের শাড়ি পরে ঠোঁটে আর মুখে রঙ মেখে ওর সঙ্গে ক্লাবে যাই। ওর বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিই, গল্প-গুজব করি। দুই মন, দুই মেরুতে বসে। মিল যেখানে নেই সেখানে সুখের তালাশ করা পাগলামো, তাই না?

    কাসেদ কী বলবে ভেবে পেলো না।

    সালমা নীরব।

    কাসেদের কাছ থেকে উত্তরের অপেক্ষায় আছে সে।

    কাসেদ বললো, এ নিয়ে চিন্তা করে কী হবে সালমা? এ চিন্তার কি কোন শেষ আছে?

    সালমা উত্তরে বললো, বিপাশাকে যদি তোমার কাছে দিয়ে যাই তুমি রাখবে? কাসেদ অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে, কেন বলতো?

     

    সালমা কী যেন ভাবলো। ভেবে বললো, ওকে তোমার কাছে রেখে আমি কোথাও চলে যাবো।

    এ পাগলামোর কোন মানে হয় না, কাসেদ হাসতে চেষ্টা করলো। বললো, জীবনের পথ যত কঠিন আর যত দুৰ্যোগময় হোক না কেন, তার কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোন অর্থ হয় না। ওটা কাপুরুষতার লক্ষণ।

    তাই নাকি? অপূর্ব হাসলো সালমা। টেনে টেনে বললো, কাপুরুষ আমি না তুমি?

    কাসেদ ইতস্তত করে বললো, তার মানে?

    মানে, তুমি কি বলতে চাও, তুমি একজন বীর-পুরুষ?

    কাসেদ হেসে দিয়ে বললো, বীর-পুরুষ হয়তো নই, তবে কাপুরুষও নই।

    কাপুরুষ নও? সালমা শব্দ করে হাসলো, তাহলে একটা কথা বলি?

    বলো।

    সালমা নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। ওর ঠোঁটের কোণে মৃদু মৃদু হাসি। তারপর টেনে টেনে বললো, আজ এখান থেকে বেরিয়ে, তুমি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে দূরে বহু দূরে কোথাও?

    কাসেদ চমকে উঠলো। সহসা সে বুঝতে পারলো না কী বলবে। কী বলা যেতে পারে। সালমা আবার লাল হলো। মুখখানা সরিয়ে নিলো অন্যদিকে।

    কিছুক্ষণ দু’জনে একেবারে চুপ।

    একটু পরে সালমা আবার বললো, কী, চুপ করে রইলে যে, বীর-পুরুষের সাহসে কুলোচ্ছে না বুঝি?

    কাসেদ গম্ভীর গলায় বললো, একটা অসম্ভব প্রস্তাব করে বসলে তো আর চলে না।

    অসম্ভব? টেবিলের উপর ঝুঁকে এলো সালমা, তীক্ষ্ণ গলায় বললো, সাহসে কুলোচ্ছে না তাই বলো। কেন মিছামিছি বাজে অজুহাত দেখাচ্ছে! সালমা নড়েচড়ে বসলো। বেয়ারাকে ডাকো। বিলটা চুকিয়ে দিই।

    কাসেদ বললো, কিন্তু কী দরকারী কথা আছে বলেছিলে, তাতো বললে না।

    সালমা বললো, থাক তার প্রয়োজন আর নেই। যে গাছে প্ৰাণ নেই তার গোড়ায় পানি ঢেলে কী হবে? খুব তো বড়াই করছিলে কাপুরুষ নই, কাপুরুষ নই। সহসা কান্নায় গলাটা ধরে এলো তার।

    কাসেদ বললো, অকারণে কেন একটা সহজ সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছ বলো তো? তুমি কী চাও আমার কাছ থেকে?

    কিছু না। কিছু না। কিছু না। এতক্ষণে সত্যিকার কান্না নেমে এলো তার দু’চোখ বেয়ে। কাপড়ের আঁচলে অশ্রুবিন্দু মুছে নিতে নিতে সে আবার বললো, কিছুই চাই না, আমি। চাই শুধু ঝগড়া করতে। সারাটা জীবন তাইতো করে এসেছি।

    এতক্ষণে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো কাসেদ। বললো, ওটা বোধ হয় আমাদের কপালে লেখা ছিলো সালমা। নইলে যখনই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, আমরা ঝগড়া করেছি। করি। কেন করি?

    তুমি আমাকে আঘাত দিয়ে আনন্দ পাও, তাই।

    কাউকে আঘাত দিয়ে কেউ আনন্দ পায় না সালমা।

    সালমা কোন জবাব দিলো না।

    পরনের শাড়িটা গুছিয়ে নিতে নিতে উঠে দাঁড়ালো সে।

    ওকি, চললে নাকি?

    চিরকাল বসে থাকবো বলে এখানে আসি নি নিশ্চয়। সালমার গলার স্বরটা অদ্ভুত শোনালো।

    কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেলো কাসেদ। সালমা ততক্ষণে কেবিনের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবিন ছেড়ে কাসেদও বেরিয়ে এলো সঙ্গে সঙ্গে।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    দুটো ঘটনাই পরপর ঘটলো।

    আগের দিন পুরো অফিসটা একটা চাপা উত্তেজনায় ভুগেছে। কারণটা তেমন অভাবিত কিছু নয়। বড় সাহেবের সঙ্গে তার বউয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। বউ ডিভোর্স করেছে তাকে। হাজার হোক অফিসের বড় সাহেব, তাকে নিয়ে হাসির হুল্লোর ছড়ান যায় না। গলা কাটা যাওয়ার ভয় আছে। তবু কর্মচারীরা এ নিয়ে আলোচনা করতে ছাড়ে নি।

    অবশেষে এমনি কিছু যে ঘটতে পারে তা সবাই আঁচ করছিলো। যেখানে স্বামী-স্ত্রীতে আদায়-কাচকলায় সম্পর্ক, সেখানে সকল সম্পর্ক বর্জন করাই বাঞ্ছনীয়।

    তবু অনেকে সাহেবের জন্যে আফসোস করলো। বললো, বেচারা।

    আবার কেউ কেউ বললো, ভালই হয়েছে, সাহেব বেঁচেছে। নইলে সারাটা জীবন ছারপোকা হয়ে থাকতে হতো।

    কেউ বললো, বিয়ে করে বড় ঠেকেছে সাহেব! কী লোক ছিলো কেমন হয়ে গেছে।

    সাহেবকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ না হতেই পরবর্তী ঘটনাটা ঘটলো।

    মকবুল সাহেব, যিনি সারাদিন পান খেতেন আর অফিসটাকে জমিয়ে রাখতেন, তিনি হঠাৎ পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

    সেদিন অফিসে এসেই দারোয়ানের কাছ থেকে খবরটা শুনলো কাসেদ। প্ৰথমে চমকে গিয়েছিলো, পরে সামলে নিয়ে শুধালো, কার কাছ থেকে শুনলে?

    দারোয়ান জানালো, তার ছেলের কাছ থেকে।

    অফিসের সবাই জেনেছে একে একে।

    দুঃখ করেছে, আহা লোকটা বড় ভালো ছিলো। তাদের শোক প্রকাশের ধরন দেখে মনে হলো, যেন বুড়ো মকবুলের মৃত্যু-সংবাদ শুনেছে তারা। তা পক্ষাঘাতে ভোগা আর মারা যাওয়া এক কথা। আফসোস জানাতে গিয়ে একাউণ্টেণ্ট বলেন, যতদিন বেঁচে থাকবে একটানা কষ্ট করতে হবে। কাসেদ শুধালো, এখন তিনি আছেন কোথায়?

    কনিষ্ঠ কেরানী বললো, হাসপাতালে। সকালবেলা নাকি মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    একাউণ্টেণ্ট বললেন, মেডিক্যাল গেলে কি হবে, ও রোগ ভালো হবার নয়। কথাটা বেশ জোরের সঙ্গে বললেন তিনি। গলাটা অস্বাভাবিক শোনালো। মনে হলো রোগটা না সারুক তাই যেন চান তিনি।

    টাইপরাইটারের উপর হাত জোড়া ছড়িয়ে দিয়ে চুপচাপ একাউণ্টেণ্টের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কাসেদ।

    মকবুল সাহেবের অনুপস্থিতে তাঁর কাজের দায়িত্ব পড়বে একাউণ্টেণ্ট সাহেবের হাতে। প্রমোশন হবে তাঁর। আয় বাড়বে। পদমর্যাদা বাড়বে।

    খোদা করুন। তিনি ভালো হয়ে যান তাড়াতাড়ি। কাজের ফাঁকে এক সময় একাউণ্টেণ্ট বললেন, আল্লা তাকে আবার আমাদের মাঝখানে ফিরিয়ে আনুক। এটা কী তার মনের কথা? সত্যি কি তিনি মনেপ্ৰাণে তাই চাইছেন? কাসেদের কেন যেন বিশ্বাস হলো না। মানুষ মাত্র স্বার্থপর। স্বার্থের প্রশ্নের সঙ্গে বিরোধ বাঁধে। বাবাতে ছেলেতে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি বসায়।

    একাউণ্টেণ্ট সাহেব ভালো করে জানেন, বুড়ো মকবুল যদি সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরে আসে তাহলে তাঁর পক্ষে সেটা শুভ হবে না। এসব জানা সত্ত্বেও কি তিনি পক্ষাঘাত আক্রান্ত ব্যক্তিটির রোগমুক্তি কামনা করছেন? নাকি, এ তাঁর বাইরের কথা। মনে মনে হয়তো ভাবছেন অন্য কিছু। ভাবছেন বুড়ো আর সুস্থ না হোক। হয় মারা যাক কিম্বা অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকুক বিছানায়।

    মানুষ তাই চায়। নিজের মঙ্গলের জন্যে অন্যের ক্ষতি চিন্তা করতে সে একটুও বিলম্ব করে না।

    কাসেদ কাজে মন বসাতে চেষ্টা করলো।

    কিন্তু বুড়ো মকবুলের কথা বারবার করে মনে হতে লাগলো তার।

    বিকেলে অফিস শেষ হবার কিছু আগে বড় সাহেব ডেকে পাঠালো তাকে। স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর এ ক’দিন কারো সামনে আসেন নি তিনি। কথা বলেন নি কারো সঙ্গে। অফিসে এসেছেন। থেকেছেন। কাজ করেছেন। কাসেদ যখন বড় সাহেবের রুমে এসে ঢুকলো, সাহেব তখন একগাদা ফাইলের মধ্যে মুখ গুজে আছেন। তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে কয়েকবার কাশলো কাসেদ। তবু তিনি তাকাচ্ছেন না দেখে নীরবে সে দাঁড়িয়ে রইলো।

    দেয়ালঘড়ির পেণ্ডুলাম দুলছে, দোলনার মত শব্দ হচ্ছে।

    বড় সাহেব ফাইলটা বন্ধ করে রাখলেন। তারপর কাসেদের দিকে চোখে পড়তে একটু অবাক হয়ে শুধালেন, আপনি এখানে কেন?

    কাসেদ বললো, আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।

    সাহেব কী যেন ভাবলেন। কপালের আঁকাবাঁকা রেখাগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে আসছে তাঁর। দু’চোখে কী এক শূন্যতা।

    হঠাৎ নড়েচড়ে বসলেন সাহেব। বললেন, হ্যাঁ, আপনাকে ডেকেছিলাম। ডেকেছিলাম মকবুল সাহেবের খবর জানতে। ও’র কী খবর?

    কাসেদ বললো, আমি ঠিক জানি নে। শুনেছি হাসপাতালে আছেন। মেডিক্যাল কলেজে।

    হুঁ। টেবিলের উপর ছড়ানো কয়েকখানা কাগজ ফাইলের মধ্যে রেখে দিতে দিতে সাহেব শুধালেন, আপনার কি এখন কোন কাজ আছে?

    না।

    তাহলে চলুন। একবার হাসপাতালে যাওয়া যাক। টেবিলের ড্রয়ারগুলো বন্ধ করে রেখে উঠে দাঁড়ালেন বড় সাহেব।

    হাসপাতালে মকবুল সাহেবের বেডটা খুঁজে বের করতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না। পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের সতেরো নম্বর বেড।

    দূর থেকে কাসেদ দেখতে পেলো বিছানার চারপাশে মকবুল সাহেবের বউ এবং ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

    বড় সাহেব চাপা গলায় শুধোলেন, এখন কি ওখানে যাওয়া ঠিক হবে?

    কাসেদ কী বলবে ভাবছিলো, এমন সময় মকবুল সাহেবের স্ত্রীর চোখ পড়লো এদিকে।

    এদের সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে এক পাশে সরে দাঁড়ালেন।

    বড় ছেলে সামনে এগিয়ে বিনীত স্বরে বললো, আসেন স্যার।

    সাহেব যেতে যেতে শুধোলেন, এখন উনি কেমন আছেন?

    আগের চেয়ে কিছুটা ভাল আছেন স্যার।

    ওরা বেডের যে পাশে গিয়ে দাঁড়ালো তার অন্য পাশে পাশাপাশি তিনটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। তিনজনের মাথায় ঘোমটা টানা।

    প্রথম জনের কোলে একটি বাচ্চা মেয়ে। হয়তো সে সবার বড়। বিবাহিতা। দ্বিতীয় জনের বয়স কুড়ি একুশের মতো হবে। মুখখানা ভালো করে দেখতে না পেলেও কাসেদের চিনতে ভুল হয় না।

    এই সেই মেয়ে যাকে বিকেলে বাড়ির আঙ্গিনায় বসে থাকতে দেখেছিলো সে। তৃতীয় মেয়েটির গায়ের রঙ ওদের চেয়েও ফর্সা। বয়স অল্প।

    সাহেব অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে মকবুল সাহেবের কপালে একখানা হাত রাখলেন। চোখ মেলে তাকালেন মকবুল সাহেব।

    একদৃষ্টি তাকিয়ে রইলেন সাহেবের দিকে। চোখের পলক পড়ছে না। ঠোঁট জোড়া কাঁপছে শুধু। যেন কিছু বলতে চান তিনি।

    সাহেব মৃদু গলায় বললেন, চিন্তার কিছু নেই। ভালো হয়ে যাবেন।

    মকবুল সাহেবের খোলা চোখ দিয়ে দরদর করে অশ্রু ঝরতে লাগলো।

    ওপাশে দাঁড়ান তিনটি মেয়ে আর তাদের মা আঁচলে চোখ মুছলো।

    ওরাও কাঁদছে।

    কাঁদছে না শুধু ছেলেরা।

    ওদের সারা মুখ স্নান। চেহারায় যন্ত্রণার ছাপ। কিন্তু চোখে অশ্রু নেই। সাহেব বললেন, চাকরীর জন্য চিন্তা করবেন না। ওটা আপনারই থাকবে, কিছুদিন পর ভালো হয়ে গেলে আবার জয়েণ্ট করবেন।

    মকবুল সাহেব আবার কিছু বলতে চেষ্টা করলেন। বলতে পারলেন না, ওপাশে দাঁড়ান স্ত্রী-কন্যার ওপর চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে আবার বড় সাহেবের দিকে তাকালেন তিনি। পলক পড়ছে না চোখের।

    শুধু পানি ঝরছে আর ঠোঁট জোড়া কাঁপছে।

    সাহেব বললেন, টাকা-পয়সার কথা ভাবতে হবে না। আমি বন্দোবস্ত করে দেবো।

    এবার, এতক্ষণে কান্না কমে এল তার। যেন অনেকটা আশ্বস্ত বোধ করলেন তিনি।

    কাসেদকে দেখলেন। দেখলেন চারপাশে।

    কাসেদের দিকে মুখখানা এনে বড় সাহেব চাপা স্বরে বললেন, এদের দেখাশোনার দায়িত্বটা আপাততঃ আপনাকেই নিতে হবে।

    কাসেদ সন্মতি জানিয়ে মাথা নত করলো।

    বড় সাহেব আবার বললেন, আমি অফিস থেকে কিছু টাকা স্যাঙ্কশন করিয়ে দেবো। প্রয়োজন মত খরচ করবেন।

    কাসেদ আবার মাথা নোয়ালো।

    একটা নার্স টেম্পারেচার নিয়ে গেলো। তাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে কী যেন আলাপ করলেন বড় সাহেব।

    মকবুল সাহেবের মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এসে সেই মেয়েটিকে দেখতে চেষ্টা করলো কাসেদ।

    দেখা গেলো না।

    সন্ধ্যার মত আবছা-ই রয়ে গেলো সে।

    রাস্তায় বেরিয়ে একটা ফলের দোকান থেকে কিছু ফল কিনে দিলেন সাহেব। বললেন, এগুলো হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে আপনি বাসায় চলে যান।

    ফলের ঠোঙ্গাটা হাতে নিয়ে চলে আসছিলো কাসেদ।

    সাহেব পিছন থেকে আবার ডাকলেন, বললেন, আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি। কিছু মনে করবেন না। সাহেবের গলার স্বরটা কেমন যেন ক্লান্ত আর জড়ানো। কাসেদ অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে।

    গাড়ি আছে। বাড়ি আছে। চাকরী আছে ভালো, টাকা-পয়সার অভাব নেই। তবু সুখী হতে পারলো না লোকটা।

    কাসেদ নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওঁর দিকে। কিছু বললো না। পুরো অফিসটা চাপা কথার গুমোট হাওয়ায় ভরে আছে সেই সকাল থেকে।

  • তেরো

    তেরো

    বাইরে রাত।

    ভেতরে দু’জন নীরবে বসে।

    আশেপাশে কারো কোন সাড়া শব্দ নেই।

    সমস্ত পৃথিবী যেন চুপ করে আড়ি পেতে আছে ওরা কি বলে শুনবার জন্য। কাসেদ বললো, আপনার আঙ্গুলে একটা কালো দাগ পড়ে গেছে।

    জাহানারা বললো, সেতার শিখতে গেলে প্ৰথম প্রথম অমন হয় শুনেছি।

    কাসেদ বললো, হুঁ।

    আবার দু’জনে চুপ করে গেলো ওরা।

    বাইরে তারা জ্বলছে, ভেতরে বাতি।

    কাসেদ ভাবলো, জাহানারাকে মন খুলে আজ সব কিছু বললে কেমন হয়।

    এখানে কেউ নেই।

    এইতো সময়।

    কাপটা মুখের কাছে এনে নামিয়ে রাখলো কাসেদ।

    জাহানারা নীরবে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।

    সেও কিছু বলতে চায় ওকে।

    সে বলুক। প্রথম সেই বলুক। কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।

    জাহানারা বললো, আপনি যেন আগের চেয়েও শুকিয়ে গেছেন।

    কাসেদ বললো, মা-ও তাই বলেন।

    হ্যাঁ, মা কেমন আছেন?

    ভালো।

    নাহার?

    সেও ভালো।

    আপনার শরীর কেমন?

    মোটামুটি যাচ্ছে।

    আবার নীরবতা। শূন্য চায়ের কাপ দুটো সামনে নামিয়ে রেখেছে ওরা। ওরা এখন মুখোমুখি বসে। জাহানারা জানালার দিকে তাকিয়ে। হয়তো আকাশ দেখছে কিম্বা আঁধারের আলো। কাসেদ দেখছে জাহানারাকে। ওর চোখ, ওর মুখ, ওর চিবুক।

    কী সুন্দর।

    আমাকে কিছু বললেন, জানালা থেকে চোখ সরিয়ে এনে ওর দিকে তাকালো জাহানারা।

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত গলায় বললো কই না, নাতো।

    জাহানারা মৃদু হাসলো। কিছু বললো না।

    জাহানারা। আস্তে করে ওকে ডাকলো কাসেদ।

    বলুন। চাপা স্বরে জবাব দিলো জাহানারা।

    আমি এখন চলি।

    সেকি, এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন? অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো জাহানারা। যেন এমন কিছু একটু আগেও সে ভাবতে পারে নি। যেন এ সময় চলে যাওয়াটা কোনমতে বিশ্বাস করতে পারছে না সে।

    কাসেদ বললো, অনেকক্ষণ বসা হলো। আর কত?

    জাহানারা আরো কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর অস্পষ্ট গলায় বললো, আচ্ছা।

    বলতে বলতে উঠে দাড়ালো সে। এ মুহুর্তে ওকে বড় দুর্বল দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে শরীরটা যেন ক্লান্তির ভারে ভেঙ্গে পড়তে চাইছে। বাইরে বারান্দা পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিলো জাহানারা।

    আবার আসছেন তো?

    আসবো।

    বাইরে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে একটা জোর শ্বাস নিলো কাসেদ।

    দিন কয়েক পরে নিউ মার্কেটের মোড়ে শিউলীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো ওর। শিউলীর পরনে বাদামী রঙের একখানা শাড়ি। চুলগুলো খোঁপায় বাঁধা। হাতে একটা কাপড়ের থলে।

    আপনি বেশ মানুষ তো, অনুযোগ ভরা কণ্ঠে শিউলী বললো, এত করে বললাম। শুক্রবার দিন গেটের সামনে আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন, কই আপনি এলেন না তো? সারাটা বিকেল শুধু ঘর-বার করেছি। শিশুসুলভ হাসিতে সারা মুখ ভরে এলো তার।

    কাসেদ আস্তে করে বললো, ভুলে গিয়েছিলাম।

    ভুলে তো যাবেনই। আমি আপনার কে যে আমার সঙ্গে দেখা করার কথা আপনার মনে থাকবে। গলাটা যেন ঈষৎ কেঁপে উঠল তার।

    শিউলীর সঙ্গে পরিচয়ের পর এই প্রথম চমকে উঠলো কাসেদ। ওর চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকালো সে। কী বলতে চায় শিউলী।

    কী বলতে চায় সে?

    সেই পুরোনো সুরে সহসা হেসে উঠলো শিউলী। আমার দিকে অমন করে চেয়ে থাকবেন না কিন্তু। সুন্দর চোখের চাউনি আমি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারি না। কে বললো আমার চোখ দু’টি সুন্দর। কাসেদ তখনো ওর দিকে তাকিয়ে। হাতের ব্যাগটা সজোরে দুলিয়ে শিউলী বললো, শুধু কী সুন্দর, অদ্ভুত মায়াময় চোখ দুটো আপনার, দেখলে ভালবাসতে ইচ্ছে করে।

    তাই নাকি? বলতে গিয়ে ঢোক গিললো কাসেদ।

    শিউলী হাসছে।

    সেই পুরনো হাসি।

    রাস্তার মোড়ে একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ করতে দেখে আশপাশের লোকজন আড়চোখে লক্ষ্য করছিলো ওদের। ওদের দৃষ্টির অর্থ বুঝতে বিলম্ব হয় না কাসেদের।

    শিউলীকে সজাগ করে দিয়ে কাসেদ বললো, আপনি সত্যি একেবারে ছেলে মানুষ।

    শিউলী হাসি থামিয়ে বললো, আপনি বুঝি চাপা হাসি পছন্দ করেন?

    এ প্রসঙ্গ নিয়ে আর বেশিদূর এগুতে ইচ্ছে করলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বললো, মার্কেটিং করতে এসেছিলেন বুঝি?

    শিউলী হাতের থলেটি দেখিয়ে বললো, হ্যাঁ।

    এখন কি হোষ্টেলে ফিরবেন?

    ইচ্ছে তাই ছিলো কিন্তু এখন আর ফিরছি নে।

    তাহলে কী করবেন? একটু অবাক হয়ে শিউলীর দিকে তাকালো কাসেদ। শিউলী নির্বিকার গলায় বললো, আপনার সঙ্গে ঘুরবো, বেড়াবো, গল্প করবো। কাসেদ বিব্রত বোধ করলো। ইতস্তত করে বললো, কিন্তু আমি এক বন্ধুর বাসায় যাব ভাবছিলাম।

    ঠিক আছে, সঙ্গে আমিও যাবো। শিউলী পরক্ষণে বললো, আপনার বন্ধুটি নিশ্চয়ই আমাকে বের করে দেবেন না।

    না, তা কেন করবে, কিন্তু–

    আপনার আপত্তি আছে। এই তো। শিউলী মুখ টিপে হেসে বললো, বন্ধুর ওখান থেকে কোথায় যাবেন শুনি?

    বাসায় ফিরবো।

    বাহ্‌ কি মজা। হঠাৎ যেন হাততালি দিতে ইচ্ছে করলো শিউলীর, আনন্দে আটখানা হয়ে বললো, আপনাদের বাসায়ও যাওয়া যাবে আজ। একবার চিনে আসি তো, তারপর আপনার সঙ্গে দেখা হোক না হোক বাসায় গিয়ে হামলা করবো।

    কাসেদ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললো, তারচে এক কাজ করুন, হোষ্টেলে ফিরে যান আজ। অন্যদিন নিয়ে যাব বাসায়।

    মুখখানা কালো করে ওর দিকে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো শিউলী। অদ্ভুত করে একটুখানি হাসলো সে। ধীরে ধীরে বললো, কোন কিছুতে অতিমাত্রায় আগ্রহ দেখানোটা বোকামো। যাকগে, আপনার বাসায় যাবার স্পৃহা আমার আর নেই। চলি। হোষ্টেলের দিকে পা বাড়ালো শিউলী। প্রথমে রীতিমত অপ্ৰস্তুত হয়ে গেলো কাসেদ। পর মুহুর্তে কয়েক পা এগিয়ে ডাকলো, এই যে শুনুন। শিউলী ফিরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বললো, কিছু বলার থাকলে বলুন। আমার আবার দেরি হয়ে যাচ্ছে। হাতজোড়া কোথায় রাখবে ভেবে না পেয়ে, একটা হাত নিজের চুলের মধ্যে বুলোতে বুলোতে আর অন্যটা দিয়ে শিউলীর ব্যাগটা টেনে ধরে কাসেদ আস্তে করে বললো, বলছিলাম কী চলুন।

    কোথায়? একটু অবাক হলো শিউলী।

    কাসেদ বললো, কেন আমাদের বাসায়।

    ওর মুখের দিকে আবারো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো শিউলী। একটা সুন্দর হাসির তরঙ্গ সারা মুখে ছড়িয়ে পড়লো, হেসে দিয়ে শিউলী বললো, এতক্ষণ এত ঢং করছিলেন কেন শুনি?

    কাসেদ নিরুত্তর রইলো।

    বাসায় এসে ওর বইপত্র খাতাগুলো ছড়িয়ে একাকার করলো শিউলী।

    এক একটা করে খুললো, পড়লো, বন্ধ করে আবার খুললো সে।

    হঠাৎ তালাবদ্ধ সুটকেসটার দিকে চোখ পড়লে বললো, দেখি, চাবিটা দেখি আপনার?

    কাসেদ বললো, কোন চাবি দিয়ে কী করবেন আপনি?

    সুটকেসটা খুলবো।

    কেন?

    খুলে দেখবো। ওর মধ্যে কী আছে। শিউলীর কণ্ঠস্বর আশ্চর্য নির্লিপ্ত।

    কাসেদ বললো, না, ওটার চাবি আমি কাউকে দিই না।

    ও, ভ্রূজোড়া বিস্তারিত করে ঈষৎ হাসলো। সামনে এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বললো, ওর মধ্যে প্রেমপত্রগুলো সব লুকিয়ে রেখেছেন বুঝি? তাহলে থাক।

    ওসব কাউকে না দেখানোই ভালো। হাসতে হাসতে আবার টেবিলটার দিকে সরে গেলো শিউলী।

    ও চলে গেলে মা শুধোলেন, মেয়েটি কে রে?

    কাসেদ বললো, জাহানারার চাচাত বোন।

    মা বললেন, ও তাই, গলার স্বরটা অনেকটা জাহানারার মত।

    মেয়েটি কী করে?

    কলেজে পড়ে।

    এখানে বুঝি বাসা আছে ওদের।

    না। ও হোষ্টেলে থাকে।

    মা। তবু এত কথা জিজ্ঞেস করলেন, নাহার একটি কথাও জিজ্ঞেস করলো না। ওরা যখন ভেতরের ঘরে বসে কথা বলছিলো তখন নিজ হাতে চা বানিয়ে ওদের দিয়ে গেছে নাহার। আর কিছু লাগবে কিনা, কথা না বলে ইশারায় কাসেদকে প্রশ্ন করেছে। তারপর কাসেদ যখন শিউলীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ওর, তখনো উত্তরে একটা ছোট্ট আদাব জানিয়ে নিজের কাজে ফিরে গেছে নাহার। ওর ব্যবহারটা বড় অসামাজিক বলে মনে হলো কাসেদের।

    শিউলী চলে গেলে নাহারকে ডাকলে সে, আচ্ছা, তোমার একী স্বভাব বলতো? একজন ভদ্রমহিলা বাসায় এসেছে, তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম, পরিচয় করিয়ে দিলাম, দু’চারটে কথা বলবে, একটু আলাপ করবে, তা নয়, একেবারে চুপ। তোমার কি কথা বলতে কষ্ট হয় নাকি।

    বুড়ো-আঙ্গুল দিয়ে মেঝেতে দাগ কাটতে কাটতে নাহার জবাব দিলো, আলাপ করার কিছু থাকলে তো। বলে এলোমেলো করে রাখা বইগুলো গুছাবার কাজে লেগে গেলো নাহার। একটার পর একটা, বইগুলো আবার সুন্দর করে সাজিয়ে রাখছে সে। কাসেদ চুপ করে রইলো। আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।

  • বারো

    বারো

    দরজার ঝুলানো ময়লা পর্দাটা ঈষৎ নড়ে উঠলো।

    কে যেন পাশে দাঁড়িয়ে।

    অন্ধকারে তাকে ঠিক দেখা গেলো না।

    চুড়ির আওয়াজ শুনে মনে হলো একটি মেয়ে।

    হয়তো সেই মেয়েটি, যে একটু আগে আঙ্গিনার পাশে বসে বসে মাথায় উকুন খুঁজছিলো।

    কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।

    মকবুল সাহেব হাতের ছাতাখানা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

    পর্দার ওপাশ থেকে একখানা শীর্ণ হাত বেরিয়ে এলো সামনে। এক পেয়ালা চা আর একটা পিরিচে কিছু মিষ্টি।

    হাতজোড়া সরে গেলো।

    পর্দাটি ঈষৎ নড়ে উঠলো আবার।

    কাপ আর পিরিচখানা সামনে নামিয়ে রাখলেন মকবুল সাহেব। বললেন, গরিবের বাসায় এসেছেন– কথাটা শেষ করলেন না তিনি। এ ধরনের কথা সাধারণত শেষ করা হয় না।

    চায়ের কাপটা নীরবে সামনে টেনে নিলো কাসেদ।

    চা খেয়ে যখন রাস্তায় বেরিয়ে এলো তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে।

    জাহানারাদের ওখানে অনেকদিন যাওয়া হয় নি।

    আজ রাতে, এমনি রাতে একবার গেলে মন্দ হয় না। কিন্তু জাহানারা সেতার শেখবার জন্যে একটা মাষ্টার রাখার কথা বলেছিলো। গেলেই হয়তো প্রশ্ন করবে, কই আমার মাষ্টার ঠিক করেন নি?

    জবাবে কোন রকমের অজুহাত দেখানো যাবে না। বলা যাবে না, কাজের চাপ ছিলো কিম্বা সময় করে উঠতে পারি নি। তাহলে হয়তো অভিমান করে বসবে সে। বলবে, আমার জন্যে না হয় কাজের একটু ক্ষতিই হতো।

    মেয়েরা এমনি হয়। তারা যাকে ভালবাসে তাকে বড় স্বাৰ্থপরের মত ভালবাসে।

    লালবাগের চৌরাস্তায় এসে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো কাসেদ। যাবে কী যাবে না।

    রাস্তার মোড়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে একখানা চলন্ত বাসে উঠে পড়লো সে। বসবার জায়গা নেই। রড ধরে এখানেও দাঁড়িয়ে থাকতে হলো তাকে।

    জাহানারাদের বুড়ি চাকরানীটা বারান্দায় বসে বসে কি যেন সেলাই করছিলো।

    কাসেদকে দেখে একগাল হেসে বললো, আপা মাষ্টারের কাছে সেতার শিখছে।

    বাড়িতে ঢুকে থমকে দাঁড়ালো কাসেদ। তাহলে জাহানারা কাসেদের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই একজনকে খুঁজে নিয়েছে। নিজেকে এ মুহুর্তেও বড় অপরাধী মনে হলো তার। কাসেদের জন্যে অপেক্ষা করে হয়তো হতাশ হয়ে পড়েছিলো জাহানারা। অবশেষে নিজেই একজনকে খুঁজে নিয়েছে।

    ওকে চুপ থাকতে দেখে বুড়ি চাকরানীটা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো, তারপর মৃদু হেসে সেলাইয়ে মনোযোগ দিলো আবার।

    বুড়ির সামনে সহসা অস্বস্তি বোধ করলো কাসেদ।

    জাহানারার ঘর থেকে সেতারের টুং-টাং আওয়াজ শোনা যাচ্ছে আর মুদু হাসির শব্দ।

    সেতার শিখতে বসে হাসছে জাহানারা। কেন?

    সেতারের সঙ্গে হাসির কোন সম্পর্ক নেই।

    দৌড়গোড়ায় একটু ইতস্তত করে ভেতরে ঢুকে পড়লো কাসেদ।

    মেঝের উপর একখানা ফরাস পেতেছে জাহানারা; একপাশে একটা সেতার হাতে সে বসে; অন্য পাশে ফর্সা রঙের রোগা পাতলা একটি ছেলে। পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

    কাসেদ ভেতরে ঢুকতেই সেতারের ওপর ধরা হাতখানা সহসা থেমে গেলো। কাসেদের চোখের দিকে এক পলকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো জাহানারা। তারপর হেসে দিয়ে বললো, আপনি? এতদিন আসেন নি যে?

    কাসেদ সহসা কোন জবাব দিতে পারলো না। কিছু বলতে গিয়েও পাশে বসা ছেলেটির দিকে চোখ পড়তে থেমে গেল সে।

    জাহানারা বললো, উনি আমাকে সেতার শেখাচ্ছেন।

    দু’জনে হাত তুলে আদাব বিনিময় করলো ওরা।

    কাসেদ বললো, ওনার কথা আগেই শুনেছি।

    জাহানারা কৌতুহলভরা চোখে তাকালো ওর দিকে, কার কাছ থেকে শুনেছেন?

    কাসেদ বললো, বুড়ির কাছ থেকে।

    জাহানারার সেতারের মাষ্টার বললেন, দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।

    কাসেদ ইতস্তত করে বললো, তাহলে আমি এখন যাই। আপনাদের গুরুছাত্রীর সাধনায় অকারণ ব্যাঘাত সৃষ্টি করা উচিত নয়। ওর গলার স্বরে অসতর্ক অভিমান ঝরে পড়লো।

    পরক্ষণে নিজেই সেটা বুঝতে পারলো কাসেদ। লজ্জায় দু’জনের কারো দিকে তাকাতে পারলো না সে।

    জাহানারা স্থিরচোখে ওর দিকে তাকিয়ে। একটু আগে মৃদু হাসছিল সে, এখন তার লেশমাত্র নেই। মাষ্টার বললেন, একটু বসে গেলেই পারেন। আপনার উপস্থিতি আমাদের কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না। বলে হেসে উঠলেন তিনি।

    হাসি নয়। এ যেন কাসেদকে বিদ্রুপ করা হলো।

    জাহানারা অত্যন্ত শান্ত গলায় বললো, জানেন তো সাধনার সময় আশ-পাশের কারো অস্তিত্বের কথা সাধকের মনে থাকে না। আমরাও আপনার উপস্থিতির কথা ভুলে যাবো।

    কী বলেন? বলে নতুন মাষ্টারের দিকে তাকালো জাহানারা। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসলো। যেন অনেকদিনের চেনাজানা। অনেক কালের আপনজন।

    কাসেদ বসলো নীরবে।

    আজকের এই রাতে না এলেই ভালো হতো। কেন আসতে গেলো সে?

    স্নেহ-প্ৰেম ভালবাসা এর মূল্য নেই।

    এর কোন অর্থ নেই কেরানী জীবনে।

    জাহানারা। একী করলে তুমি জাহানারা। যে তার হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে তোমাকে ভালবাসলো তার কথা তুমি একটুও ভাবলে না। একটিবার স্মরণ করলে না তাকে যে গোপনে তোমাকে নিয়ে অশেষ স্বপ্ন এঁকেছে মনে মনে। দুদিনের পরিচয়ে যাকে পেলে, তাকেই ভালবেসে ফেললে তুমি?

    ভালো বলেই ওকে আমি ভালবেসেছি। জাহানারার গলার স্বর তীব্র এবং তীক্ষ্ণ শোনালো কানে।

    কিন্তু ওযে ভালো এ কথা কেমন করে বুঝলে? ক’দিন ওর সঙ্গে মিশেছো তুমি? ওর কতটুকু তুমি জানো? ও একটা ঠগ হতে পারে, জোচ্চোর হতে পারে। তোমার ফুলের মতো পবিত্র জীবন নিয়ে হয়তো ছিনিমিনি খেলতে পারে সে।

    যদি খেলেই তাতে আপনার কিবা এলো গেলো।

    হয়তো কিছুই এসে যাবে না। কিন্তু জাহানারা, তুমি বাচ্চা খুকী নও, বোঝার মত বয়স হয়েছে তোমার। যে চরম সিদ্ধান্ত তুমি নিতে চলেছে, তার আগে কি একটুও ভাববে না, চিন্তা করবে না?

    চিন্তা আমি করি নি সেকথা কেমন করে বুঝলেন? জাহানারা হাসলো।

    হাসলে ওকে আরো সুন্দর দেখায়।

    ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আর কোন কথা বলতে পারলো না কাসেদ।

    হঠাৎ সুর কেটে গেলো।

    জাহানারা বললো, একী, সাধনা না হয় আমরা করছি। কিন্তু আপনি তন্ময় হয়ে আছেন কেন?

    কাসেদ ইতস্তত করে বললো, একটা কবিতার বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম।

    ও, তাহলে আপনি কবিতার ভাবে মগ্ন ছিলেন। আমি ভাবছিলাম বুঝি সেতারের সুর শুনে।

    মাষ্টার সবিনয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাহলে এখন চলি?

    জাহানারা ঘাড় দুলিয়ে বললো, কাল আসছেন তো?

    হ্যাঁ, আসবো।

    দেখবেন, আবার ভুলে যাবেন না যেন।

    না, ভুলবো না।

    আপনি সব ভুলে যান কিনা, তাই বললাম। মাষ্টারকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলো জাহানারা।

    ও ফিরে এলে কাসেদ বললো, আমি চলি।

    যাবার জন্যে অমন উতলা হয়ে গেলেন কেন? আপনি এসেছেন বলেই তো মাষ্টারকে তাড়াতাড়ি বিদায় দিলাম। জাহানারা মৃদু গলায় বললো, এখানে চুপটি করে বসুন। আমি দু’কাপ চা করে নিয়ে আসি। আমি না আসা পর্যন্ত যাবেন না যেন। শাসনের ভঙ্গিতে ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে ভেতরে চলে গেল জাহানারা।

    ওর শেষ কথাগুলো মুহুর্তে শান্ত করে দিয়ে গেলো তাকে। তাহলে এতক্ষণ যা নিয়ে এত চিন্তা করছিলো সে, তার কোনটাই সত্য নয়।

    কাসেদের সঙ্গে কথা বলবে বলে মাষ্টারকে তাড়াতাড়ি বিদায় করে দিয়েছে জাহানারা।

    জাহানারা তুমি বড় ভালো মেয়ে। বড় লক্ষ্মী মেয়ে তুমি। তাইতো তোমাকে এত ভাল লাগে। ভালবাসি।

    দু’কাপ চা হাতে ওর সামনে এসে বসলো জাহানারা।

    চা আনতে গিয়ে মুখহাত ধুয়ে এসেছে সে।

    শাড়িটা পালটেছে।

    চুলে চিরুনি বুলিয়েছে কয়েক পোঁচ।

    কাসেদ বললো, তাহলে সেতারের মাষ্টার ঠিক করেই ফেললেন আপনি?

    আপনার অপেক্ষায় আর কতকাল বসে থাকবো।

    চায়ের কাপটা টেনে নিতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠলো কাসেদের।

  • এগারো

    এগারো

    দিন কয়েক পরে অফিসে এসে শিউলীর কাছ থেকে আরেকখানা টেলিফোন পেলো কাসেদ।

    শিউলী বললো, আহ গলাটা চিনতে পারছেন তো?

    কাসেদ জবাব দিলো, অবশ্যই পারছি।

    শিউলী বললো, তাহলে শুনুন, আপনাকে কয়েকটা খবর দেবার আছে। বাবা কুমিল্লায় বদলী হয়ে গেলেন।

    তাই নাকি?

    আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি এখন বাসা ছাড়া পাখি।

    তার মানে?

    মানে এখন হোষ্টেলে আছি।

    হোষ্টেলে?

    জী।

    ওটা কি মুক্ত বিচরণ ভূমি নাকি?

    কেন বলুন তো?

    নিজেকে এইমাত্র বাসা ছাড়া পাখির সঙ্গে তুলনা করলেন কিনা, তাই।

    ওই যা, আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, আপনি কবি মানুষ। টেলিফোনে মিহি হাসির শব্দ শোনা গেলো ওর। শিউলী হাসছে।

    কাসেদ শুধালো, আপনার খবর বলা শেষ হলো?

    শিউলী বললো, না আছে। হ্যালো, শুনুন, প্রত্যেক শুক্রবার আর রোববার আমাদের বাইরে বেরুতে দেয়া হয়।

    ভালো কথা, তারপর?

    সামনের শুক্রবার আপনার কোন কাজ আছে কি?

    আছে কি-না এখনো বলতে পারি নে।

    না থাকলে আসুন না বিকেলের দিকে একটু বেড়ানো যাক।

    কাসেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো, হঠাৎ বেড়াবার সাথী হিসেবে…

    শিউলী পরক্ষণে জবাব দিলো, আপনাকে ভাল লাগে বলে। সেই পরিচিত শব্দে হেসে উঠলো সে।

    কাসেদ বিব্ৰত বোধ করলো। রিসিভারটা ডান হাত থেকে বা হাতে সরিয়ে নিয়ে আস্তে করে বললো, এবার রেখে দিই?

    কেন, কথা বলতে বিরক্তিবোধ করছেন বুঝি?

    না, তা নয়। কাসেদ ইতস্ততঃ করে বললো, অনেকক্ষণ ধরে ফোনটা আটকে রেখেছি কিনা।

    বুঝলাম। শিউলী মৃদু গলায় বললো, ফোনটা কষ্ট পাচ্ছে, রেখে দিন। বলে আর দেরি করলো না সে। রিসিভারটা রাখার শব্দ শুনতে পেল সে।

    দু’টার পর থেকে অফিসে আর কারো মন বসতে চায় না।

    কখন চারটা বাজবে আর কখন তারা এই চেয়ার-টেবিল আর ফাইলের অরণ্য থেকে বেরিয়ে বাইরে মুক্ত আকাশের নিচে গিয়ে দাঁড়াবে সে চিন্তায় সবার মন উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে।

    দুটো থেকে চারটের মাঝখানকার সময়টা তাই কাজের চেয়ে আলাপ-আলোচনা আর গল্প করেই কাটে বেশির ভাগ সময়।

    এ সময় হেড ক্লার্কের পানের ডিবে দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকে। হয়তো তাই কথা বলার মাত্রা বেড়ে যায়। মেজাজ রুক্ষ থাকলে সকলকে গাল দেয়। প্ৰসন্ন থাকলে সবার সঙ্গে হেসে কথা বলে। সকলের কুশল জিজ্ঞেস করে। আজ বিকেলে অফিস থেকে বেরুবার আগে হেড ক্লার্ক বললেন, আজ আপনি আমার বাসায় যাবেন কাসেদ সাহেব, আপনার ছাতাটা নিয়ে আসবেন। শুনছেন?

    কাসেদ বললো, আমি তো আপনার বাসা চিনি না। চেনেন না, চিনে নেবেন। পান চিবুতে চিবুতে হেড ক্লার্ক আবার বললেন, চলুন না আমার সঙ্গে আজ যাবেন বাসায়। বিকেলে বিশেষ কারো সঙ্গে কোন এনগেজমেণ্ট নেই তো? শেষের কথাটার ওপর যেন তিনি বিশেষ জোর দিলেন।

    কাসেদ মুখ তুলে তাকালেন ওর দিকে। হেড ক্লার্কের কথা বলার ভঙ্গিটা ভালো লাগলো না ওর। ভেবেছিলো চুপ করে যাবে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তবু বাড়াতে হলো, আমার বিশেষ কেউ আছে সেটা আপনি জানলেন কোত্থেকে?

    আহা, রেগে গেলেন নাকি? হেড ক্লার্ক পরক্ষণে বললেন, কথাটা যদি বলেই থাকি এমন কী অন্যায় করেছি বলুন? এ বয়সে সবার বিশেষ কেউ একজন থেকে থাকে, আমাদেরও ছিলো। ক্ষণকাল থেমে আবার শুধোলেন তিনি, আপনার বুঝি কেউ নেই?

    থাকলেই বা আপনাকে বলতে যাবে কে? কাসিদের হয়ে জবাবটা দিলেন এক নম্বর কেরানী।

    হেড ক্লার্ক সরোষ দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে। তারপর বললেন, আপনাকে যে কাজটা করতে দিয়েছি ওটা হয়েছে?

    এক নম্বর কেরানীর মুখখানা মুহুর্তে ম্লান হয়ে গেলো। হেড ক্লার্ক মুখে একটা পান তুলে দিয়ে বললেন, আগে কাজ শেষ করুন, তারপর কথা বলবেন।

    ঘাড় নিচু করে কাজে মন দিলো এক নম্বর কেরানী।

    কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারলো না।

    হেড ক্লার্ক চুপ।

    কাসেদ নীরব।

    দেয়ালে কুলান বড় ঘড়িটা শুধু আওয়াজ তুলে এগিয়ে চলেছে তার নির্দিষ্ট গতিতে।

    আর কোন শব্দ নেই।

    অফিস থেকে দু’জনে এক সঙ্গে বেরিয়ে এলো ওরা।

    দু’জন গম্ভীর।

    রাস্তায় নেমে এসে কাসেদ প্রথমে কথা বললো, আপনি কি এখন সোজা বাসায় যাবেন?

    গুমোট অবস্থাটা কেটে যাওয়ায় যেন খুশি হলেন ভদ্রলোক, অফিস থেকে বেরিয়ে আমি অন্য কোথাও যাইনে।

    কাসেদ বললো, বেশ তাহলে চলুন আপনার বাসায় যাওয়া যাক।

    বলে হেড ক্লার্কের মুখের দিকে তাকালো কাসেদ। তাঁর কোন ভাবান্তর হয়েছে কিনা লক্ষ্য করলো, কিন্তু কিছু বুঝা গেল না।

    হেড ক্লার্ক মৃদু গলায় বললেন, বেশ তো চলুন। আপনার ছাতাটা–বলতে গিয়ে থেমে গেলেন তিনি, কথাটা শেষ করলেন না।

    অফিস থেকে মকবুল সাহেবের বাসাটা বেশ দূরে নয়, তবু অনেক দূর। পল্টন থেকে লালবাগ।

    মাসের শুরুতে বাসে চড়ে অফিসে আসেন তিনি। বাসে চড়ে বাসায় ফেরেন। মাসের শেষে বাস ছেড়ে পদাতিক হন। হেঁটে আসেন, হেঁটে যান। কিছুদূর এসে মকবুল সাহেব বললেন, আমি পারতপক্ষে বাসে চড়িনে বুঝলেন। ওতে বড় ভিড়, আমার মাথা ঘু্রোয়। আগে রিক্সায় করে আসতাম যেতাম। কিন্তু ব্যাটারা এমন হুড়মুড় করে চালায়, দু’বার ট্রাকের নিচে পড়তে পড়তে অল্পের জন্যে বেঁচে গেছি। সেই থেকে আর রিক্সায় চড়িনে। আজকাল শ্ৰীচরণ ভরসা করেছি। এতে কোরে বিকেল বেলায় বেড়ানোটাও হয়ে যায়।

    কী বলেন?

    তাকে সমর্থন জানাতে গিয়ে শুধু একটুখানি হাসলো কাসেদ, কিছু বললো না। কারণ কিছু বলতে গেলে বিকেল বেলায় বেড়ানোর চেয়ে টাকাকড়ির সমস্যাটা এসে পড়ে সবার আগে।

    লালবাগে একটা সরু গলির ভেতরে একখানা আস্তর উঠা একতলা দালান, আর একটা দোচালা টিনের ঘর নিয়ে থাকেন মকবুল সাহেব। বড় পরিবার। ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি।

    বাইরের একখানা ঘর বৈঠকখানা এবং স্কুল পড়ুয়া দুই ছেলের শোবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।

    ঘরের মধ্যে আসবাবপত্রের চেয়ে ধুলোবালি আর আবর্জনার আধিপত্য সবার আগে চোখে পড়ে। জানালা দু’খানায় পর্দা সেই কবে লাগানো হয়েছে কে জানে। নিচের দিক থেকে কিসে যেন খেয়ে অর্ধেকটা করে ফেলেছে। বাতাসে মৃদু মৃদু দুলছে সেগুলো। আর কিছু নয়, শুধু ওই পর্দাগুলোর দিকে তাকালেই গৃহকর্তার দীনতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভেতরে ঢুকে একখানা চেয়ারে ওকে বসতে বললেন মকবুল সাহেব। দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে পঞ্চাশোত্তর বৃদ্ধ এখন ক্লান্ত। কাসেদকে বসতে বলে নিজে একখানা চৌকির উপর বসে পড়লেন। চারপাশে তাকিয়ে বললেন, বাড়িটা বিশেষ ভাল না। তবু, সেই পার্টিশানের পর থেকে আছি, একটা মায়া বসে গেছে। ছাড়ি ছাড়ি করেও ছাড়া যায় না।

    বাইরের ঘরে তাঁর গলার আওয়াজ পেয়ে ভেতরে থেকে কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে এসে জুটলো এ-ঘরে। কারো পরনে ময়লা ফ্রক, কারো পরনে ছেঁড়া হাফপ্যাণ্ট, কেউ-বা ন্যাংটা।

    বুড়ো মকবুল উঠে গিয়ে তাদের দু’জনকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর চোখমুখে চিবুকে চুমু দিয়ে একগাল হেসে বললেন, এরা সব আমার নাতি নাতনি। বিকেলটা এদের নিয়ে কাটে আমার। বুড়োর চোখে-মুখে কী এক প্রশান্তি। এ মুহুর্তে যেন নিজের সকল দীনতা ভুলে গেছেন তিনি। চেয়ে দেখতে বেশ ভালো লাগছিলো কাসেদের। কিছুক্ষণের জন্যে হয়তো সে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলো। হঠাৎ নজরে এলো, জানালায় ঝোলানো আধখানা পর্দার ওপাশে একটি মেয়ে এদিকে পিছন করে আছে। কালো ঘন চুলগুলো তার পিঠময় ছড়ানো। গায়ের রংটাও কালো। চিকন হাত জোড়া দিয়ে চুলের অরণ্যে উকুন খুঁজছে সে। চেহারাটা ভাল করে দেখবার উপায় নেই। পাশ থেকে যেটুকু দেখা গেল তাতে মনে হল নাকটা বেশ তীক্ষ্ণ আর চোখজোড়া বড় বড়।

    মকবুল সাহেব তার নাতি নাতনিদের নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। বলে গেলেন, আপনি বসুন, আমি এক্ষুণি আসছি।

    কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।

    জানালার পাশ থেকে চোখজোড়া সরে এসেছিলো, আবার সেদিকে তাকালো কাসেদ। মেয়েটি এখনো বসে আছে। মকবুল সাহেবের মেয়ে। হয়তো সবার বড়। কিম্বা মেজো, কিম্বা সেজো। বিকেল বেলার ম্লান আলোয় ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছে সে। একটু পরে তাকে আর দেখা যাবে না। কালো মেয়ে সন্ধ্যার আলোতে হারিয়ে যাবে।

    কাসেদ নিজেও জানে না, কখন সে জানালার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে পড়েছিলো, ঔৎসুক্যে আনত দেহ সহসা সচকিত হলো। মনে মনে লজ্জা পেলো কাসেদ। একটা অপরিচিত মেয়েকে দেখার জন্যে অমন করছে কেন সে? এ প্রশ্নের জবাব সে দিতে পারবে না। সে জানে মেয়েটাকে দেখতে তার ইচ্ছা করছে, ভালো লাগছে, সুন্দর লাগছে। অন্তত বিকেলের এই বিশেষ মুহুর্তটিতে। এযে কাসেদ সাহেব, আপনাকে অনেকক্ষণ একা বসিয়ে রেখেছি, কিছু মনে করেন নি তো? মকবুল সাহেব এসে ঢুকলেন ভেতরে। পানে মুখখানা ভরে এসেছেন তিনি। হাতে একখানা ছাতা। ছাতাটার দিকে চোখ পড়তে কাসেদ চিনলো তার ছাতা। কিন্তু যেমনটি ছিলো তেমনটি নেই। উপরে, নিচে, মাঝখানে অনেকগুলো ক্ষত। মকবুল সাহেব একবার ছাতা আর একবার কাসেদের মুখের দিকে তাকিয়ে সলজ্জ কণ্ঠে বললেন, ছাতাটা আপনাকে দেয়া গেলো না কাসেদ সাহেব, ওটা মেরামত করতে হবে।

    কাসেদ পরক্ষণে বললো, ঠিক আছে, আমি নিজেই মেরামত করে নেবো।

    মকবুল সাহেব বললেন, না, না, তা কেমন করে হয়। বলতে গিয়ে মুখখানা বিরক্তিতে ভরে এলো তার। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এই ছেলে পিলেদের নিয়ে আর পারা গেলো না। একটা জিনিস এদের জন্যে ঠিক থাকে না, এত মারধোর করি– সহসা দরজার দিকে চোখ পড়তে থেমে গেলেন তিনি।

  • দশ

    দশ

    চলুন, এবার ওঠা যাক। বড় সাহেব আস্তে করে বললেন।

    কোন কথা না বলে উঠে দাঁড়ালো কাসেদ।

    হয়তো সে অনেক বদলে গেছে।

    এখন দেখলে আর সেই পুরনো মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ঘরে উঠে যাবার পথে ভাবলো কাসেদ।

    বারান্দার এককোণে একটা মোড়ার উপর বসেছিলো সালমা। চুলগুলো পিঠের ওপরে ফেলে দিয়েছে সে। পরনে একখানা কালো পাড়ের মিহি শাড়ি সাদা জমিনের ওপর হলুদ সুতোর ফুল আঁকা। কানে, গলায়, হাতে অলঙ্কারের বোঝা। সালমা চোখ তুলে কিছুক্ষণ এক পলকে তাকিয়ে রইলো। সহসা কিছু বলতে পারলো না সে, ওর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক টুকরো মিষ্টি হাসি জেগে উঠলো। পরক্ষণে সারা মুখে সে হাসি ছড়িয়ে পড়লো, কাসেদ ভাই।

    কাসেদ বললো, তোমাকে দেখতে এলাম সালমা।

    সালমার মুখখানা অকারণে রাঙা হলো। উঠে দাঁড়িয়ে মোড়াটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল সে, বস।

    কাসেদ বসলো।

    বাড়িতে আজ অনেক অতিথি এসেছে। ঘরে, বারান্দায় ছাদে ছড়িয়ে আছে ওরা। কথা বলছে, হাসছে, আলাপ করছে এটা-সেটা নিয়ে।

    ব্যাপার কী, অনেক শুকিয়ে গেছ যে।

    সালমার কথার জবাবে কাসেদ কী বললো স্পষ্ট বোঝা গেলো না।

    সালমা আবার শুধালো, প্রেমে পড় নি তো?

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত গলায় বললো, তার মানে?

    মাথার চুলগুলো দু’হাতে খোপাবদ্ধ করতে করতে সালমা বললো, শুনেছি প্রেমে পড়লে নাকি লোক শুকিয়ে যায়।

    ওসব বাজে কথা। প্রসঙ্গটা পাল্টাবার জন্য হয়তো, কাসেদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, তোমার মেয়ে হয়েছে জানাও নি তো, একটা চিঠি লিখলেও তো পারতে।

    সালমা বললো, জানাতাম, কয়েকবার ইচ্ছেও হয়েছিল লিখি, কিন্তু কী জানো, আজকাল বড় আলসে হয়ে গেছি। একখানি চিঠি লিখবো তাও লিখি লিখি করে হয়ে ওঠে না।

    কাসেদ বললো, কুড়িতেই বুড়ি হয়ে গেলে মনে হচ্ছে।

    সালমা বললো, বুড়ি হই নি তো কি, ক’বছর পরে মেয়ে বিয়ে দেবো।

    বলতে গিয়ে নিজেই হেসে দিলো সালমা, তুমি বস, আমি পলিকে নিয়ে আসি।

    আলসে মেয়েটি চপল ভঙ্গি করে ঘরে চলে গেলো, একটু পরে আবার যখন সে সামনে এসে দাঁড়ালো তখন তার কোলে একটা ফুটফুটে মেয়ে।

    সালমা বললো, দেখতে ঠিক ওর বাবার মত হয়েছে।

    কাসেদ বললো, গায়ের রঙটাও।

    সালমা বললো, চোখজোড়া কিন্তু আমার।

    হবেও-বা। কাসেদ মৃদু গলায় বললো, নাম কী রেখেছো?

    সালমা জবাব দিলো, পলি। ওর বাবার দেয়া নাম। তোমার নিশ্চয় পছন্দ হয় নি?

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, না।

    ঘাড়টা ঈষৎ বাঁকা করে সালমা অপুর্ব কণ্ঠে শুধালো, তুমি হলে কী নাম রাখতে?

    এসব বাতুল প্রশ্নের কোন মানে হয় না। কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।

    সালমা বললো, তবু বল না শুনি।

    কাসেদ ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো, তারপর বললো, কী নাম রাখতাম জানি না, তবে এ মুহুর্তে একটা নাম মনে পড়ছে আমার, বিপাশা, হয়তো তাই রাখতাম।

    বিপাশা। বার-কয়েক নামটা উচ্চারণ করলো সালমা। কী যে ভাবলো, ভেবে পরক্ষণে বললো, আমি ওকে বিপাশা নামেই ডাকবো।

    এতে আমার আপত্তি আছে, ওর কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে কাসেদ বললো, ওর বাবা যে নাম দিয়েছে সেই নামে তোমাকেও ডাকতে হবে। কাসেদের কণ্ঠে যেন ধমকের সুর। আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো কাসেদ। পরিচিত একজন মহিলাকে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখে থেমে গেলো।

    কাসেদের মনে হল যেন এর আগে কোথাও দেখেছে তাকে। মহিলার চাউনি দেখে মনে হলো, তিনিও যেন তাকে চিনতে পেরেছেন। সালমা বললো, ইনি মিসেস চৌধুরী। ওর স্বামী বিপাশার বাবার সঙ্গে এক সাথে কাজ করতো কুড়িগ্রামে। আর ইনি হলেন–

    ওকে আমি চিনি। সালমাকে থামিয়ে দিয়ে মিসেস চৌধুরী অর্থপূর্ণ হাসি ছড়ালেন।

    কাসেদ তখন স্মৃতির খাতায় মহিলার ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। সহসা শুধালো, আপনাকে এর আগে কোথায় যেন দেখেছি?

    জী হ্যাঁ। মহিলা মৃদু হেসে বললেন, জাহানারাদের ওখানে।

    বেশি ভাবতে হলো না মিসেস চৌধুরীর জন্যে। জাহানারাদের বাসায় আলাপ হওয়া মিলি চৌধুরীকে একটু পরেই খুঁজে পাওয়া গেলো।

    মিলি চৌধুরী একটু শুধোলেন, ভালো আছেন তো?

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, ভালো।

    হঠাৎ কেন যেন সালমাকে গভীর দেখালো। কাসেদের মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে কী যেন আবিষ্কার করার চেষ্টায় মেতে উঠেছে সে।

    মিলি বললেন, নতুন কিছু লিখলেন?

    কাসেদ বললো, না।

    আলাপ জমলো না। একটু পরে বারান্দা ছেড়ে ঘরে চলে গেলেন মিলি চৌধুরী। এখানে দু’জন নীরব।

    নীরবতা গুঁড়িয়ে কাসেদ শুধালো, হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে গেলে যে?

    না, এমনি। সালমা সহজ হতে চেষ্টা করলো, পলির চোখেমুখে আদর করলো সে। দুহাতে দোলনার মত করে বার কয়েক দোলাল তাকে।

    তারপর যতদূর সম্ভব সহজ গলায় শুধালো, জাহানারাটা কে?

    জাহানারা? সহসা কিছু বলতে পারলো না কাসেদ। অপ্ৰস্তুত ভাবটা কাটিয়ে নিতে কিছুক্ষণ সময় লাগলো তার। একটু পরে বললো, জাহানারা আমার একজন বান্ধবীর নাম।

    বান্ধবী না আর কিছু? কাসেদের চোখেমুখে কী যেন খুঁজছে সালমা।

    ওর চোখের মণিজোড়া সহসা বড় তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি। সে হাসির কোন অর্থ আছে হয়তো, কিম্বা নেই।

    কাসেদ শুধালো, বান্ধবীর অন্য কোন মানে আছে নাকি?

    সালমা বললো, আগে ছিলো না। এখন আছে। আগের দিনে ছেলের সঙ্গে ছেলের বন্ধুত্ব হতো। মেয়েদের সঙ্গে মেয়ের। আজকাল ছেলেতে মেয়েতে বন্ধুত্বের পালাটা বড় জোরেশোরে শুরু হয়েছে।

    তাতে কি এর অর্থগত রূপটা পাল্টেছে?

    পাল্টেছে বই কী? সালমা দৃঢ় গলায় বললো, এখন তার অর্থ এক নয়, অনেক। বন্ধুর স্ত্রীকেও বলি বান্ধবী, নিজের স্ত্রীকেও বলি বান্ধবী। বন্ধুর প্রেমিকা, তাকেও ডাকি বান্ধবী বলে, আবার নিজের প্ৰেয়সী তার পরিচয় দিতে গিয়ে বলি, বান্ধবী। সব বান্ধবী এক হলো নাকি?

    সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো সালমা।

    কাসেদ নীরব।

    ওকে চুপ থাকতে দেখে সালমা আবার শুধালো, তোমার বান্ধবীটি কোন শ্রেণীর জানতে পারি কি? বলতে গিয়ে সামনে ঝুঁকে এলো সালমা। কয়েকগুচ্ছ চুল মাথার উপর থেকে গড়িয়ে এসে কপালে ঢলে পড়লো, চুলগুলো এখন বাতাসে দুলছে।

    কাসেদ তখনো নীরব।

    খানিকক্ষণ পরে নীরবতা ভেঙে সে বললো, তুমি যে কয়েকটি শ্রেণীর কথা বললে তার কোনটিতেই সে পড়ে না।

    সামান্য জবাবটা দিতে এত দেরি হলো কেন? ভ্রূজোড়া বিস্তৃত করে আবার শুধালো সালমা।

    সহসা রেগে উঠলো কাসেদ। তোমার সঙ্গে বাজে তর্ক করতে আমি আসি নি সালমা।

    এসব আমার ভাল লাগে না। বলে উঠে দাঁড়ালো সে। সে আমি জানি। ম্লান গলায় আস্তে করে বললো সালমা! বলে মুখখানা কেন যেন অন্যদিকে সরিয়ে নিলো, সে হয়তো আড়াল করে নিলো কাসেদের কাছ থেকে। কাসেদ শুধু একবার ফিরে তাকাল, কিছু বললো না।

    ঘরের ভেতর যেখানে ফরাস পেতে বুড়ো-বুড়িরা গল্পে মেতে উঠেছে সেখানে যাবার জন্যে পা বাড়ালো কাসেদ।

    বুড়ো-বুড়িদের আলোচনার ধারা ভিন্ন রকমের।

    এখানকার আলাপের প্রসঙ্গ অতি জাগতিক।

    সোনা রূপোর দর কমলো কী বাড়লো।

    কোন্‌ বাজারে ভালো তারি-তরকারি পাওয়া যায়।

    কোন্‌ দোকানে সস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি হয়।

    কোথায় গেলে মেয়ের জন্য একটা ভালো পাত্র জোটার সম্ভাবনা আছে–এমনি সব আলোচনা।

    কাসেদকে আসতে দেখে খালু বললেন, এসো বাবা, বোসো।

    মা সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে।

    খালা পান চিবেচ্ছিলেন বসে বসে। আঙ্গুলের ডগা থেকে একটুখানি চুন চুষে নিয়ে বললেন, তুমি এলে ভালই হলো, শোনো বাবা, তোমার খালুজী নাহারের জন্য একটা ভালো প্ৰস্তাব এনেছেন।

    মা বললেন, ওকে খুলে বলো না সব। ওই তো এখন বিয়ে দেবার মালিক। খালু বললেন, শোনো বাবা, ছেলে তেমন কেউকেটা একটা কিছু নয়। আই-কম পর্যন্ত পড়ে, পরীক্ষা দিয়েছিলো, পাশ করেনি। এখন ইডেন বিল্ডিং-এ চাকরি করে। সোয়া শ’ টাকা বেতন।

    কাসেদ আবার জিজ্ঞেস করলো, পরীক্ষাটা আবার দেয় নি ক্যান?

    দেয় নি নয়, দেবে, আবার দেবে। খালু জবাব দিলেন, ছেলে ভালো এতে কোন সন্দেহ নেই।

    ঘরের কোণে পানের পিক ফেলে এসে বললেন, এক মায়ের এক ছেলে, বাবা মারা গেছে ছেলেবেলায়। এক ঘর।

    মা বললেন, কোন ঝামেলা নেই, নাহার সুখেই থাকবে।

    কাসেদ কোন মন্তব্য করলো না।

    কথার ফাঁকে সালমা এসে বসেছে একপাশে। একটু গভীর। একটু যেন অন্যমনস্ক।

    খালু বললেন, আজকাল মেয়ে বিয়ে দেবার মত ঝকমারী আর নেই বড়বু। যাদের টাকা আছে তারা টাকা-পয়সা নিয়ে ভালো ভালো ছেলে বেছে নেয়।

    খালা বললেন, শুধু মেয়ে কেন, ছেলে বিয়ে দিতেও কী কম ঝামেলা!! একটা ভালো মেয়ে পাওয়া যায় না, আমাদের নজরুলের জন্য মেয়ে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেলাম, যা-ও পাওয়া গেলো, ও খোদা মেয়ের বাবা সি. এস. পি. সি. এস. পি. করে পাগল। সি. এস. পি. ছাড়া মেয়ে বিয়ে দিবেন না।

    মা বললেন, আগের দিনে লোকে বংশ দেখতো। এখন সি. এস. পি. ছাড়া দেখে না।

    খালু বললেন, ও কিছু না বড়বু, যুগের হাওয়া। যেমন আদি যুগ, মধ্যযুগ, আর কলিযুগ আছে, তেমনি বিয়ের ব্যাপারেও কতগুলো যুগ রয়েছে। ডাক্তার যুগ, ইঞ্জিনিয়ার যুগ, সি. এস. পি, যুগ। এখন সি. এস. পি, যুগ চলছে। বলে শব্দ করে হেসে উঠলেন তিনি। অন্যমনস্ক সালমাও না হেসে পারলো না।

    হাসলো সবাই।

    খাওয়ার ডাক পড়ায় বৈবাহিক আলোচনা আর এগুলো না। আসর ছেড়ে সকলে উঠে পড়ল।

    সালমা সামনে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো, খাওয়ার টেবিলে তোমার পাশের চেয়ারটিতে আমি ছাড়া আর কাউকে বসতে দিয়ো না যেন, তুমি যাও, আমি বিপাশাকে বিছানায় রেখে আসি।

    কাসেদ কিছু বলার আগেই সামনে থেকে সরে গেলো সালমা। সে শুধু বোকার মত তাকিয়ে রইলো। ওর চলে যাওয়া পথের দিকে।

  • নয়

    নয়

    ফোনের ওপর হাত রেখে তখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে কাসেদ। শিউলীর সঙ্গে আমন অভদ্র ব্যবহার না করলেও পারতো সে। কে জানে কী ভাবছে। জাহানারার সঙ্গে দেখা হলে হয়তো সব কিছু খুলে বলবে সে। বলবে, তোমার কেরানী বন্ধুটিকে ভদ্রতা শিখতে বলে।

    জাহানারা কী মনে করবে কে জানে। হয়তো খুশি হবে। বলবে কাসেদকে তুমি চেনো না শিউলী, তাই অতবড় অপবাদ দিতে পারলে।

    ওর মত মানুষ হয় না।

    কিম্বা জাহানারা রেগে যাবে। ভ্রূজোড়া বাঁকিয়ে বলবে, কেরানী তো, ভদ্রতা শিখবে কোত্থেকে।

    না, জাহানারা অমন কথা বলতে পারে না। সে তার মনের মানুষ। তার মুখ দিয়ে অমন একটা রূঢ় মন্তব্য কল্পনা করতেও পারে না কাসেদ। কিন্তু ওর জন্যে একটা সেতারের মাষ্টার এখনো ঠিক করা গেলো না। আজ বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে প্রথম কাজ হবে যে কোন একজন ভালো সেতারীর সঙ্গে আলাপ করা। লোকটার কার্তিকের মত চেহারা হলে চলবে না, তাকে বুড়ো হতে হবে কিম্বা কুৎসিত। জাহানারা হাসবে, হেসে লুটিয়ে পড়বে বিছানায়। মুখখানা বিকৃত করে বলবে, লোকটা দেখতে কেমন বিচ্ছিরি, তাই না? তোমার মত সুপুরুষ আর একটিও দেখলাম না জীবনে। এত রূপ তুমি কোথায় পেলে বল না গো।

    দুলিচাঁদের কাছে লেখা চিঠিটা কি টাইপ করা হয়ে গেছে? জাহানারা নয়–বড় সাহেব।

    হ্যাঁ, স্যার। ওটা তৈরি আছে, নিয়ে আসবো কি?

    আমার প্রয়োজন নেই, পাঠিয়ে দেবার বন্দোবস্তু করুন, আর শুনুন, আজ অফিস শেষে চট করে চলে যাবেন না। অনেক কাজ পড়ে আছে, সেগুলো শেষ করতে হবে, আমিও থাকবো এখানে। বলে, ক্ষয়ে যাওয়া সিগারেটটা ছাইদানীতে রেখে দিলেন বড় সাহেব। সামনে খুলে রাখা বইটির প্রতি আবার মনোযোগ দিলেন তিনি।

    কাজ বিশেষ কিছু নেই তা জানতো কাসেদ।

    এমনি হয়। অতীতেও হয়েছে।

    অফিস ছুটি হয়ে যাবার পরেও নিজের চেম্বারে চুপচাপ বসে থাকে বড় সাহেব। কখনো বই পড়েন। কখনো চিঠিপত্র লেখেন বসে বসে। সব সময় একা একা ভালো লাগে না বলে মাঝে মাঝে অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে কোন একজনকে রেখে দেন সঙ্গে। কথা বলেন, এটা, সেটা কাজ করান। গল্প করেন, নিজের জীবনের গল্প। বাবা বড় গরিব ছিলেন। প্রাইমারি স্কুলের সেকেণ্ড মাষ্টার। বেতন পেতেন মাসে পনেরো টাকা। তাও নিয়মিত নয়। ছোটবেলা কত কষ্ট করে লেখাপড়া শিখতে হয়েছে তাঁকে।

    দূর গাঁয়ে জায়গীর থাকতেন বড় সাহেব। তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন। ফিরে আসতে অনেক রাত হয়ে যেতো। তখন দু’পায়ে ব্যথা করতো ভীষণ।

    পরের বাড়িতে ঠিকমত খাওয়া জুটতো না। বই কেনার পয়সাও ছিলো না তাঁর। সহপাঠীদের কাছ থেকে চেয়ে এনে পড়তেন। রাত জেগে পড়বার উপায় ছিলো না। ওতে তেল খরচ হয়। তেল কেনার টাকা কোথায়?

    তবু কোনদিন দমে যান নি বড় সাহেব। হতাশা আসতো মাঝে মাঝে, তখন চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকতেন তিনি। কান্না পেতো, কাঁদতেন, চোখের পানি ধীরে ধীরে চোখেই শুকিয়ে যেতো।

    কিন্তু কান্নারও শেষ আছে বুঝলেন? সামনে ঝুঁকে পড়ে বড় সাহেব বললেন, জীবনে এত কষ্ট করেছি বলেই তো সুখের মুখ দেখতে পেয়েছি। এখন আমার মতো সুখে ক’টি লোক আছে বলুন?

    বড় সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে সহসা কাসেদের মনে হলো, সত্যি কি লোকটা সুখে আছে?

    অফিসের লোকজন বলে, সুখে যদি থাকবে তাহলে এই কাঁচা বয়সে চুলে পাক ধরেছে কেন বলতে পারো।

    এক নম্বর কেরানী বলে, চিন্তায় পেকেছে। মানুষ যত বড় হয়, ওদের চিন্তা তত বড়।

    একাউণ্টেণ্ট বলেন, চিন্তা নয় দুঃশ্চিন্তা। তা হবে না কেন, ঘরের বউ যদি পরপুরুষের সঙ্গে হল্লা করে বেড়ায় তাহলে কার মন-মেজাজ ঠিক থাকে বলো।

    বড় সাহেবের গিন্নীকে অনেকদিন আগে একবার দেখেছিলো কাসেদ। সারা মুখে কৃত্রিমতা মেখে অফিসে এসেছিলেন তিনি, স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে। দৈহিক লাবণ্যের প্রদর্শনী দেখিয়ে মহিলা সেই যে গেলেন আর আসেন নি কোনদিন।

    দারওয়ানকে দিয়ে চা-নাশতা আনলেন বড় সাহেব।

    ইতিমধ্যে দু’-একখানা ফাইলও নাড়াচাড়া হলো।

    চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সহসা বড় সাহেব শুধোলেন, ঢাকায় ফুচকা পাওয়া যায়?

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত হয়ে গিয়ে বললো, যায় বই কি।

    আপনি ফুচকা খান?

    না।

    খেয়েছেন কোনদিন?

    না।

    আমি খেয়েছি। অনেক খেতাম ছোটবেলায়। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে বড় ভালো লাগতো।

    বড় সাহেব চুপ করে গেলেন। আজকের বিত্তবান দিনগুলোর চেয়ে হয়তো ছেলেবেলাকার অনটনে ভরা, ফুচকা-খাওয়া দিনগুলোকে আজও অনেক প্রিয় বলে মনে হচ্ছে তাঁর।

    আশ্চর্য মানুষের মন। সে যে কখন কী চায় তা নিজেও বলতে পারে না। কিসে তার সুখ আর কিসে তার অসুখ এর সত্যিকার জবাব সে নিজেও দিতে পারে না কোনদিন।

    জাহানারা, যদি কোনদিন সময় মেলে, তোমার মনের অর্গল তুমি খুলে দিয়ো আমার কাছে। তোমার অনেক চাওয়ার পাশে আমার অনেক পাওয়ার স্বপ্নগুলোকে থরেথরে সাজিয়ে নেবো। গরমিল চাইনে জীবনে, দেখছে না, মিলের অভাবে মানুষগুলো কেমন মরোমরো হয়ে আছে। এ তোমার ভুল ধারণা কাসেদ। জাহানারা আস্তে করে বললো, অভাবটা মিলের নয়, রঙের। আমাদের জীবনে রঙ নেই।

    রঙ। রঙ সে আবার কী?

    ওর প্রশ্ন শুনে মৃদু হাসলো জাহানারা। মুখখানা ঈষৎ হেলিয়ে বললো, এর কোনো আকার নেই। থাকলে, আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতাম। আসলে ওটা একটা অনুভূতি যা মানুষের চেহারায় আনে উজ্জ্বলতা, মনে যোগায় আনন্দ, দেহকে দেয় উষ্ণতা আর প্রাণকে করে সজীব।

    জাহানারার দু’চোখে তখন স্বপ্ন।

    কী এক তন্ময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে সে।

  • আট

    আট

    মা, নামাজ পড়া শেষ করে এসে ছেলের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

    হাতের তালুতে মুখ রেখে ওপাশের দেয়ালের কী যেন দেখছে সে।

    চোখের মণিজোড়া স্থির নিম্পলক।

    কী রে ভাত খাবি না?

    মায়ের ডাকে চোখের পলক নড়ে উঠলো তার। উঠে দাঁড়িয়ে বললো, তোমরা বসে পড় আমি হাতমুখ ধুয়ে আসি।

    একখানা মাদুরের ওপর পাশাপাশি দুটো থালা সাজানো। সামনে একটা বড় পেয়ালার মধ্যে তরকারি। আর অন্য একটি থালায় বাড়তি ভাত ঢালা। নাহার এখন খাবে না।

    ওদের দু’জনের খাওয়া হয়ে গেলে তারপর সে বসবে খেতে।

    আজকে নয়। বহুদিন থেকে এই রীতি চলে আসছে তার।

    যেদিন রাতে কাসেদের ফিরতে দেরি হয় সেদিন মা ঘুমিয়ে পড়লেও সে ঘুমোয় না। উঠে দরজাটা খুলে দেয়। সাবান, তোয়ালে আর পানির বদনাটা নিয়ে রেখে আসে কলতলায়। খাবারগুলো সাজিয়ে দেয় টেবিলের ওপর। তারপর যতক্ষণ কাসেদ খায় নাহার নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার পাশে। মাঝে শুধু একবার জিজ্ঞেস করে, আর কিছু দেবো?

    না।

    সে চুপ।

    খাওয়া শেষ হয়ে গেলে থালাবাসনগুলো নিয়ে কালতলায় চলে যায় সে।

    কলতলায় পানি পড়ার শব্দ শোনা যায় অনেকক্ষণ ধরে।

    আজ খেতে বসে মা শুধোলেন, কাল জাহানারা কেন এসেছিলো রে?

    আবার জাহানারা!

    কাসেদ সংক্ষেপে বললো, এমনি।

    মা বললেন, মেয়েটা বড় ভালো, লেখাপড়া শিখেছে তাই বলে নাক উঁচু নয়। আস্তে আস্তে কথা বলে। চেহারাটাও বেশ মিষ্টি। ওর বাবা করে কিরে?

    কাসেদ মুখ না তুলেই বললো, উকিল।

    মা আর কোন প্রশ্ন করলেন না। নীরবে খাচ্ছেন তিনি। হয়তো কিছু ভাবছেন। এ মুহূর্তে তাঁর মনে কিসের ভাবনা রয়েছে তা ঠিক বলে দিতে পারে কাসেদ। ভাবছেন জাহানারার মত একটি মেয়েকে যদি বউ সাজিয়ে ঘরে আনা যেতো।

    অফিসে থাকাকালীন সময়টা মন্দ কাটে না কাসেদের।

    কাজের চাপে তখন বাইরের দুনিয়ার কথা মনে থাকে না। এটা হলো ফাইল, টাইপ রাইটার, চিঠিপত্র আর কাগজ কলমের পৃথিবী। এখানে জাহানারা, শিউলী, সালমা, সেতার কিম্বা কবিতার প্রবেশ নিষেধ।

    এখানকার প্রথম কথা হলো কাজ।

    দ্বিতীয় কথা হলো তোয়াজ।

    তৃতীয় কথা হলো ফাঁকি।

    এ তিনের অপূর্ব মিশ্রণে অফিসের সময়টুকু বেশ কাটে ওর।

    কর্মচারীর সংখ্যা নেহায়েৎ নগণ্য নয়।

    বড় সাহেব আছেন একজন। সবার বড়। বয়স তাঁর ত্ৰিশের কোঠায়। সুন্দরী বউ আছে বাড়িতে আর একটি ফুটফুটে ছেলে। বড় সাহেব ভীষণ পরিশ্রমী। কাজ করে কখনো ক্লান্ত হন না তিনি। কাউকে অলসভাবে বসে থাকেত দেখলে ধমকে উঠেন, বলেন, এই জন্যে আমাদের জীবনে কিছু হলো না, হবেও না। এই যে দেখছেন অফিসের বড়কর্তা হয়ে বসেছি, গাড়ি, বাড়ি করেছি, এগুলি নিশ্চয় খোদা আকাশ থেকে ফেলে দেন নি, এর জন্যে অসুরের মত খাটতে হয়েছে আমায়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবে না বলে থেমে যান সাহেব। পরিমিত হাসেন। সে হাসির অর্থ ধরে বাকি কথাটা বুঝে নিতে হয়।

    বড় সাহেবের পরে যার স্থান তিনি পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ। সামনের কয়েকটা দাঁত ঝরে গেছে বহু আগে। যত কাজ করেন। তার দ্বিগুণ পান খান, আর তার চেয়েও অনেক বেশি কথা বলেন। কথা না বললে নাকি তার কাজের মুড আসে না। গৃহী মানুষ। এই বৃদ্ধ বয়সেও বিরাট পরিবারের ভার বহন করে চলেছেন। ছেলেমেয়েদের সংখ্যা নেহায়েৎ নগণ্য নয়, তার ওপর নাতিনাতনী আছে অনেক।

    বুড়ো মকবুল সাহেবের পাশে যার আসন তিনি টাকা-আনা-পাইয়ের হিসেব নিয়ে সারা দিন ব্যস্ত। একাউনটেণ্ট নওশের আলী এখনো বিয়ে করেন নি। করবেন বলে ভাবছেন। রোজ ভাবেন। কিন্তু টাকা-আনা-পাইয়ের হিসেবও মিলছে না। আর তাঁর বিয়ে করাও হয়ে উঠছে না। এরপর, কাসেদকে বাদ দিলে আরো চারটে প্রাণী আছে অফিসে। প্রথম দু’জন কেরানী, কাসেদের সমগোত্রীয়। এক গোয়ালের গরু নাকি এক সঙ্গে ঘাস খায় না। এক গোত্রীয় মানুষগুলোর পক্ষেও একতালে চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই, তিন কেরানীর মধ্যে কথাবার্তা খুব কম হয়। মেলামেশা তার চেয়েও কম।

    একটি দারোয়ান। খোদাবক্স তার নাম। পশ্চিমে বাড়ি ছিল তার, বিহার কিম্বা উড়িষ্যায়। দেশ বিভাগের পর পূর্বদেশে হিজরত করেছে। সঙ্গে এসেছে দু’টি বউ আর একটা রামপুরী ছাগল। অফিসের পাশেই ওরা থাকে। সারাদিন কলহ করে ডাল-রুটি আর স্বামী সোহাগ নিয়ে। খোদা বক্স নির্লিপ্ত পুরুষ। নীরবে বসে বসে গোঁফের ডগা জোড়া মসৃণ করে আর খইনি খায়।

    আজ অফিসে ঢুকবার পথে খোদাবক্স টুল ছেড়ে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা সালাম ঠুকলো তাকে। কাসেদ বুঝতে পারলো ও কিছু বলতে চায়। কেমন আছো খোদাবক্স, কিছু বলবে?

    খোদাবক্স বিনয়ের সঙ্গে শুধালো, মেরা দরখাস্ত কী কুচ হুয়া সাহেব?

    কিছুদিন আগে বেতন বাড়াবার জন্যে বড় সাহেবের কাছে একটা দরখাস্ত পাঠিয়েছিলো। সে দুটি বউ আর এক ছাগলের সংসার পঞ্চাশ টাকায় চলে না তাই লিখে জানিয়েছিলো।

    কাসেদ মৃদু হেসে বললো, হবে হবে, আর কিছুদিন অপেক্ষা করো খোদা বক্স। বড় সাহেব নিশ্চয় এবার তোমার বেতন বাড়িয়ে দেবেন। খোদা বক্স খুশি হয়ে আর একটা সালাম ঠুকলো। বললো, আপকা মেহেরবানী হুজুর।

    কাসেদ ওকে শুধরে দিলে বললো, আমায় নয়, বড় সাহেবেরে বলো। বলে ভেতরে চলে এলো সে।

    বড় সাহেব ইতিমধ্যে এসে পড়েছেন। রুমে বসে দু’নম্বর কেরানীর সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।

    নওশের আলী ফাইলে মুখ ঢুকিয়ে হিসেব নিয়ে ব্যস্ত।

    মকবুল সাহেব মুখের মধ্যে একজোড়া পান গুঁজে দিয়ে বললেন, এই যে, তিন নম্বর কেরানী আপনি তিন মিনিট লেট করে এসেছেন, ঘড়ি দেখুন।

    কারো ওপর রাগ করলে তার নাম নিতে ভুলে যান তিনি, মনগড়া কতগুলো নম্বর ধরে সম্বোধন করেন। এতে রাগ করার যথেষ্ট কারণ থাকলেও কেউ কিছু মনে করে না, বলে–লোকটার মাথায় ছিট আছে। কাসেদ ঘড়ি দেখলো সত্যি সে তিন মিনিট লেট।

    কিছু না বলে চুপচাপ তার চেয়ারটায় গিয়ে বসলো কাসেদ। ফাইলগুলো টেনে নিলো সামনে। ওপরের ফাইলটার এককোণে টানা হাতে লেখা একটা নাম–’জাহানারা’।

    কোন অসতর্ক মুহুর্তে হয়তো লিখে রেখেছিলো সে।

    কলামটা তুলে নিয়ে সাবধানে নামটা কালি দিয়ে ঢেকে দিলো সে।

    চারপাশে তাকালো এক পলক।

    মকবুল সাহেব এখনো তার তিন মিনিট লেট হওয়া নিয়ে চাপা স্বরে রাগ প্রকাশ করছেন। হঠাৎ ছাতার কথা মনে পড়ে গেল কাসেদের। নিজের টেবিল থেকে গলা বাড়িয়ে বললো, মকবুল সাহেব, আমার ছাতাটা?

    প্রথমে ওর দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালেন মকবুল সাহেব, সহসা লজ্জা পেয়ে বললেন, এই দেখুন। আপনার ছাতাটা আনতে গিয়ে রোজ ভুলে যাই। আপনি এক অদ্ভুত লোক তো সাহেব, অফিস থেকে যাবার সময় আমায় একটু মনে করিয়ে দিলে পারেন।

    কাসেদ আস্তে করে বললো, কী করব বলুন, আমিও ভুলে যাই।

    মকবুল সাহেব তাঁর পান-খাওয়া দাঁতগুলো বের করে হাসলেন। বললেন, বেশ লোক তো আপনি, বলে একটুখানি থামলেন। তিনি থেমে বললেন, আজ বিকেলে মনে করিয়ে দেবেন; কাল নিশ্চয় নিয়ে আসবো।

    ফাইলগুলো খুলে কাজে মন দিলো কাসেদ। অনেকগুলো চিঠি টাইপ করতে হবে আজ।

    তারপর বড় সাহেবের স্বাক্ষর নিয়ে সেগুলো পাঠিয়ে দিতে হবে বিভিন্ন কোম্পানীর অফিসে। পিয়ন-বইতে নাম, ঠিকানা সব তুলে রাখতে হবে।

    কাসেদ সাহেব।

    জী।

    এক কাজ করুন না, আজ অফিস ছুটি হলে আমার সঙ্গে চলে আসুন বাসায়। ছাতাটা নিয়ে যাবেন। গোল কৌটোটা খুলে আর একটা পান বের করলেন মকবুল সাহেব।

    কাসেদ আস্তে করে বললো, আচ্ছা সে তখন দেখা যাবে।

    আজ নতুন নয়। এর আগেও অনেকবার তাকে বাসায় যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মকবুল সাহেব। আজ যাবো কাল যাবো করে যাওয়া হয়ে ওঠে নি। লোকে বলে, বাসায় নেমন্তন্ন করার পেছনে নাকি কন্যাদায় মুক্ত হওয়ার একটা গোপন আকুতি রয়েছে।

    কথাটা সত্য কী মিথ্যে কাসেদ জানে না।

    শুধু এই জানে, বিবাহযোগ্য তিনটি মেয়ে রয়েছে তার। তাদের বিয়ে দিতে হবে। বিত্তশালী পাত্রের কল্পনা নেই, চলনসই হলেই হলো। ওদের কথা মাঝে মাঝে আলোচনা করেন মকবুল সাহেব। তখন তাকিয়ে দেখলে হঠাৎ করে মনে হয়। ভদ্রলোকের বয়স আরো বেড়ে গেছে।

    চোয়ালের হাড়জোড়া আরো উঁচু। দু’চোখ আরো কোটরাগত। বৃদ্ধ কেরানী সহসা মুমূর্ষ। রোগীর মত হয়ে যায়।

    একবার এই অফিসের একটি ছেলেকে নাকি জামাতা বানাবার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ করে এনেছিলেন তিনি।

    বড় মেয়েটির সঙ্গে বিশেষ ভাবও জন্মে গিয়েছিলো ছেলেটির।

    কিন্তু বিয়ে হলো না।

    ছেলেটি রাজী হলো না বিয়ে করতে।

    কেন?

    কেউ জানে না।

    শুধু জানে, ছেলেটি নাকি মকবুল সাহেবের কাছ থেকে কিছু নগদ কড়ি দাবি করেছিলো।

    মকবুল সাহেব রাজী হন নি। বরং ক্ষেপে গিয়ে বড় সাহেবকে ধরে কনিষ্ঠ কেরানীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দিয়েছেন।

    তারই জায়গায় পরে কাসেদকে নেয়া হয়েছে।

    মেশিনটা টেনে নিয়ে দ্রুত টাইপ করে চলল কাসেদ। অফিসে এখন সবাই চুপ।।

    টাইট-রাইটারের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।

    বড় সাহেব বার কয়েক টহল দিয়ে গেছেন। প্রত্যেকের টেবিলে এসে নীরবে দেখে গেছেন, কে কী করছে।

    এখন তিনি ফিরে গেছেন তাঁর চেম্বারে।

    কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে। পকেট থেকে রুমালটা বের করে ঘামগুলো মুছলো কাসেদ।

    স্যার।

    কিরে?

    সাহেব ডেকেছেন আপনাকে?

    মুখ তুলে বেয়ারাটার দিকে তাকালো কাসেদ।

    সজাগ সাহেব বুঝি কিছু লক্ষ্য করে গেছেন কে জানে। সবার সামনে তিনি কাউকে কিছু বলেন না। নিজের চেম্বারে ডেকে বলেন। হয়তো মানুষের আত্মসম্মান বোধের প্রতি তাঁর দৃষ্টি রয়েছে, তাই।

    মানুষ মাঝে মাঝে অনেক কিছু ভাবে। কখনো তার অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। কখনো যায় না। তবু তার ভাবনার শেষ হয় না।

    দু’নম্বর কেরানীর টেবিল থেকে বড় সাহেবের চেম্বারে আসতে হলে মাত্র উনিশটি পদক্ষেপের প্রয়োজন। কিন্তু, এর মধ্যে আকাশ-পাতাল কত কিছুই না চিন্তা করেছে কাসেদ। চাকরীর প্রমোশন থেকে বরখাস্ত কোন কিছুই বাদ যায় নি।

    বড় সাহেব এইমাত্র একটা সিগারেট ধরিয়েছেন।

    সামনে রাখা একটা গোটা বইয়ের উপর নীরবে চোখ বুলোচ্ছেন তিনি।

    মুখ না তুলেই আস্তে করে বললেন, আপনার ফোন।

    টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা রিসিভারটার দিকে তাকালো কাসেদ।

    সহসা বুঝতে পারল না এ সময় কে ফোন করতে পারে তাকে।

    হ্যালো।

    হ্যালো–অন্য প্ৰান্ত থেকে মিহি কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো।

    বিব্রত কাসেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। আড়চোখে একবার এক পলক তাকালো বড় সাহেবের দিকে। তিনি নির্লিপ্ত।

    হ্যালো, আপনি কে বলছেন? সাহস সঞ্চয় করে মহিলার নাম জানতে চাইলো সে।

    অন্য পক্ষের হাসির শব্দ শোনা গেলো। আমাকে চিনতে পারছেন না বুঝি?

    না, না-তো।

    একটু চিন্তা করুন, ঠিক চিনতে পারবেন।

    রিসিভারটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো কাসেদ।

    চিন্তা করলো, কিন্তু চিন্তা করে সময় সময় সকল সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় না।

    পেলেও সকল ক্ষেত্রে তা সত্য হয় না।

    হ্যালো, অন্য পক্ষ আবার ডাকলো।

    কাসেদ এবার জিজ্ঞেস করলো, আপনি কাকে চান?

    আপনাকে। মহিলা আবার হেসে উঠলেন।

    আপনাকে? বলতে গিয়ে বার কয়েক ঢোক গিললো কাসেদ। কিন্তু কেন বলুন তো?

    একটা কবিতা শোনাবার জন্য। শোনাবেন কি?

    রিসিভারটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে কাসেদ। এ কার পাল্লায় পড়লো সে। কিন্তু পরক্ষণে ওর মনে হলো, জাহানারা নয়তো?

    হ্যালো, হ্যালো।

    না, জাহানারার গলার স্বরটা কোন মতেই এত মিহি নয়। দু’একবার ফোনে ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিলো কাসেদের। কখনো এমন তো মনে হয় নি।

    হ্যালো, চুপ রইলেন যে?

    চুপ না থেকে কী করবো বলুন।

    বললাম তো একটা কবিতা আবৃত্তি করুন।

    কাসেদ আরেক বার তাকালো বড় সাহেবের দিকে। মনে হলো তাঁর মুখে বিরক্তির ছাপ, কাজের সময় কোন মেয়ের সঙ্গে খুনসুঁটি করাটা তাঁর কাছে ভাল ঠেকছে না।

    হ্যালো।

    হ্যালো।

    বলুন।

    আমি শিউলী বলছি।

    শিউলী। যার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিলো জাহানারাদের বাসায়, জন্মদিনের আসর থেকে এক সঙ্গে বাসায় ফিরেছিলো ওরা।

    আপনি কোথেকে বলছেন?

    কলেজ থেকে।

    ক্লাস নেই বুঝি।

    না।

    তাহলে বসে বসে একটা কবিতার বই পড়লেই পারেন। রিসিভারটা নামিয়ে রাখলো কাসেদ।

    বড় সাহেব এতক্ষণে মুখ তুলে এক পলক তাকালেন ওর দিকে। তাঁর চোখে বিরক্তি নেই। আছে কৌতুহল। যেন আলাপটা নীরবে উপভোগ করছিলেন তিনি। কান পেতে শুনছিলেন সব।

  • সাত

    সাত

    অন্যদিন।

    খালুজী তখন বরিশালে বদলী হয়ে গেছেন।

    সালমা কলেজে পড়ে।

    অফিসের কী একটা কাজে বরিশাল যেতে হলো তাকে।

    তিন দিন ছিলো।

    যেদিন রাতে সে চলে আসবে সেদিন সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়া হলো, কিন্তু সালমাকে আশেপাশে কোথাও খুঁজে পেল না।

    খালাম্মাকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, কী জানি কোথায় গেলো। বোধ হয় ছাদে, বলে বার কয়েক ওর নাম ধরে ডাকলেন তিনি।

    কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না।

    কিছুক্ষণ পরে ছাদে এসে কাসেদ দেখলো, সালমা দাঁড়িয়ে। ছাদের এক কোণে, চুপচাপ।

    পরনের কালো শাড়িটা গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গেছে তার। চুলগুলো এলো খোঁপা করা।

    দূরে, ষ্টিমার ঘাটের দিকে তাকিয়ে কি যেন গুনগুন করছে সে।

    হয়তো কোনো গানের কলি কিম্বা কোনো অপরিচিত সুর।

    কাসেদ ডাকলো, সালমা।

    সালমা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালো ওর দিকে। কিছু বললো না।

    কাসেদ বললো, আমি যাচ্ছি সালমা।

    সালমা পরক্ষণে বললো, যাবেন বৈ-কি, আপনাকে তো কেউ ধরে রাখে নি।

    কাসেদ অপ্ৰস্তুত গলায় বললো, না, তা নয়, তোমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এলাম।

    সালমা মৃদু গলায় বললো, বেশ বিদায় দিলাম।

    কাসেদ চলে যাচ্ছিলো, সালমা পেছন থেকে ডাকলো তাকে, শুনুন, এখুনি কি যাচ্ছেন?

    হ্যাঁ।

    এত সকাল সকাল গিয়ে কি হবে।

    সকাল কোথায়, ষ্টিমারের সময় হয়ে গেছে।

    কে বললো, এখনো দুঘণ্টা বাকি।

    বাজে কথা।

    চলুন, ঘড়ি দেখবেন।

    কাসেদের সঙ্গে নিচে নেমে এলো সালমা।

    ড্রয়ার থেকে খালুজীর ঘড়িটা বের করে এনে দেখালো তাকে। বললো, আমার কথা বিশ্বাস করেন নি তো, এই দেখুন, এখন মাত্ৰ নটা বাজে। ষ্টিমার ছাড়বে এগারোটার সময়।

    ঘড়ি দেখে অবাক হলো কাসেদ। সেই কখন সন্ধ্যা হয়েছে; এতক্ষণে ন’টা। সালমা কোনো জবাব দিল না। ঘড়িটা আবার ড্রয়ারে রেখে দিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোপাটা খুলে চুলে চিরুনি বুলোতে লাগলো সে। সহসা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে শুধালো, যাবার জন্যে অমন হন্যে হয়ে উঠছেন কেন শুনি।

    কাসেদ বললো, চিরকাল থাকবো বলে আসি নি নিশ্চয়। কাজে এসেছিলাম, সারা হলো, চলে যাচ্ছি।

    চোখজোড়া বড় বড় করে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সালমা।

    তারপর মুখখানা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে মৃদু গলায় বললো, আপনাকে চিরকাল এখানে থাকতে বলছেই বা কে।

    বললেও হয়তো আমি থাকতাম না।

    নিজেকে আপনি কী ভাবেন বলুন তো? হঠাৎ ফোঁস ফোঁস করে উঠলো সালমা।

    কাসেদ শান্ত স্বরে বললো, একজন অধম কেরানী।

    কেরানীর অত দেমাক কেন?

    কবি বলে।

    সালমা চুপ করে গেলো। চিরুনিটা টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিলো সে। চুলগুলো আবার খোঁপায় বাঁধলো। বন্ধ জানালাটা খুলে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইলো সে। বাইরে আজ বৃষ্টি নেই। মেঘ নেই। আছে শুধু অন্ধকার। সীমাহীন অন্ধকারে ঢাকা দূরের দিগন্ত।

    জানালা থেকে মুখখানা সরিয়ে নিয়ে এলো সালমা। চুপ করে বসে আছেন কেন, আপনার ষ্টিমারের সময় হয়ে গেছে। একটু পরে গিয়ে দেখবেন, ওটা আর ঘাটে নেই।

    তা নিয়ে তোমার আর মাথা ঘামাতে হবে না। কাসেদ আস্তে করে বললো, ষ্টিমার ছাড়ার এখনো অনেক দেরি।

    সালমা স্নান হাসলো। তারপর ড্রয়ার থেকে ঘড়িটা বের করে এনে মৃদু গলায় বললো, ওটা আমি এক ঘণ্টা স্লো করে দিয়েছিলাম।

    কেন?

    আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাই। বলে সামনে থেকে সরে গেল সালমা।

    ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

    আর এলো না।