Blog

  • হারলেও হাসে

    হারলেও হাসে

    টিফিনের সময় মিটিং বসল।

    এ ধরনের গোপন এবং জরুরি মিটিং আমরা সাধারণত করি স্কুলের পেছন দিকটায়। ঝাঁকড়া জামরুল গাছটার নীচে। সকলে গাছের তলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসি। পল্টু শুধু বসে গাছের ওপরে, ডালে পা ঝুলিয়ে। এই কারণে ওকে আমরা মাঝে মধ্যেই ‘হনুমান পল্টু’ বলে ডাকি। তাতে তার কিছু আসে যায় না। জরুরী সময়ে সে গাছের ডালে বসতেই পছন্দ করে।

    আজ বসেছে। বলল, ‘বন্ধুগণ, সব জিনিস মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু এই জিনিস মেনে নেওয়া যায় না। অনেক হয়েছে আর নয়।’

    তপন গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসেছে। দাঁত দিয়ে ঘাস কাটছে। সবসময়ই সে এরকম করে। মনে হয়, সুযোগ পেলে লুকিয়ে ঘাস খায়ও। বলল, ‘আমি পল্টুর কথা সমর্থন করি। শুধু সমর্থন করি না। একশো ভাগ সমর্থন করি। হার-জিতের থেকে অনেক বড়ো হল সম্মান। আমাদের সম্মান। ক্লাস সেভেনের সম্মান। সেই সম্মান রক্ষা করতে না পারলে ট্রফি, মেডেল জিতে লাভ কী?’

    ফুচাইয়ের নামের মধ্যে একটা ফাজিল ফাজিল ব্যাপার আছে। কিন্তু সে যথেষ্ট গম্ভীর প্রকৃতির ছেলে। আজ আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। বলল, ‘প্রসূন, তোমাকে যে রিপোর্ট তৈরি করতে বলা হয়েছিল সেটার কী হল?’

    প্রসূন মন দিয়ে কেক খাচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই বলল, ‘আমার রিপোর্ট রেডি।’

    তমাল ওর হাত থেকে কেকের বাকি অংশটা কেড়ে টুক করে নিজের মুখে পুরে ফেলল। তারপর বলল, ‘আগে রিপোর্ট বল। তারপর খাবি।’

    প্রসূন বেজার মুখে বলল, রিপোর্ট খুবই ভয়ঙ্কর এবং দুঃখজনক। শেষ এগারোটা ম্যাচে একই কাণ্ড হয়েছে। হেরে যাওয়ার পর বিশু হেসেছে। দুটো ম্যাচের ঘটনা তো মারাত্মক। সে যতবার গোল খেয়েছে, ততবার মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিক ফিক করে হেসেছে। আশ্চর্যের কথা হল, ওই দুটো ম্যাচে আমাদের ফল, বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ হয়েছিল। এত খারাপ যে, খেলা শেষে আমাদের টিমের দুএকজনের চোখে জল পর্যন্ত এসে গিয়েছিল। নাম বলে আমি আর তাদের লজ্জায় ফেলতে চাইছি না। তাছাড়া এই রিপোর্ট কান্না নিয়ে নয়, হাসি নিয়ে। যাই হোক, হারবার পর বিশুর হাসবার রহস্য আমি বুঝতে পারছি না।”

    মল্লিব্রত লাফিয়ে উঠে বলল, “আমি তোদের বলেছিলাম না? এবার বিশ্বাস হল তো?”

    অজয় চোখ সরু করে বলল, “আচ্ছা প্রসূন, তোর কী মনে হয়? এসব সময় বিশু কি চাইছিল, আমরা হেরে যাই?”

    প্রসূন জিভ কেটে বলল, “ছি, ছি এ কী কথা বলছিস! একথা আমাদের মনে আনাও অন্যায়। বিশু না খেললে আমাদের হাঁড়ির হাল হত। তাছাড়া ও তো শুধু দল হারলে হাসে না, নিজে গোল খেলে, আউট হয়ে গেলেও হাসে। স্পোর্টসের সময় যখন দু-একটা ইভেন্টে জিততে পারেনি তখনও খুব হাসাহাসি করেছে বলে খবর পেয়েছি। সুশান্ত বলছিল, হান্ড্রেড মিটারস্ আর হার্ডল রেসে পিছিয়ে পড়ে ও নাকি সব থেকে মজা পেয়েছিল।’

    সুশান্ত চিন্তিত গলায় বলল, “এটাই তো মুশকিল হয়েছে। হাসির মানে বোঝা যাচ্ছে না।”

    সুকল্যাণ চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছিল। শেষ দুটো ম্যাচে ক্লাস সেভেনের ভয়ঙ্কর পরাজয়ের পেছনে সুকল্যাণের অবদান খুবই বড়ো। সে দুটো সেমসাইড করেছে। একটা আবার হাতে লেগে। সুকল্যাণ উদাসীন গলায় বলল “তোরা কিন্তু একটু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিস। দুম করে কিছু করে বসিস না।”

    অরূপ দুঃখী মুখ করে বলল, “কোন ভাবনা চিন্তার আর সুযোগ নেই। আমরা যা ঠিক করেছি সেটাই আমাদের করতে হবে। কাজটা খুবই দুঃখের। আমাদের অসুবিধেও হবে খুব। কিন্তু উপায় নেই।”

    তাপস ক্লাসের ফার্স্ট বয়। যে কোনও বিষয়ে মত দেওয়াটা তার স্বভাব। তার বেশিরভাগ মতই অবশ্য শোনা হয় না। সে বলল, ‘বিশুকে ডেকে একবার জিগ্যেস করলে হত না? ওরাও তো একটা বক্তব্য থাকতে পারে।”

    অরূপ বলল, “থাকতে পারে। কিন্তু যে এরকম উদ্ভট আচরণ করছে তার মতামত জেনে কী হবে? তাছাড়া বিশুর জ্বর হয়েছে। আজ আসেনি। এটাই সুযোগ। বেচারি এখানে থাকলে আমরা এই কষ্টদায়ক সিদ্ধান্তটা কিছুতেই ওর সামনে নিতে পারতাম না। সুতরাং আর দেরি করাটা ঠিক হবে না।”

    গাছের ওপর থেকে পল্টু বলল, অরূপ ঠিকই বলেছে। খুবই দুঃখের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হচ্ছে। কারোর আপত্তি থাকলে হাত তোল।”

    সকলে মাথা নামিয়ে বসে রইল। কেউ হাত তুলল না। এর মানে হচ্ছে, সিদ্ধান্তে সকলেই একমত।

    খেলায় হারবার পরও হাসবার অপরাধে ক্লাস সেভেনের বিশ্বনাথ পাল ওরফে বিশুকে যাবতীয় টিম থেকে বাদ দেওয়া হল।

    বিশুর মধ্যে একটা পাগল পাগল ব্যাপার আছে। চেহারায় কোন ছিরিছাঁদ নেই। চুলগুলো খোঁচা খোঁচা। হাঁটাচলাটা ল্যাগব্যাগে ধরনের। প্যান্টে ঠিকমত গুঁজতে জানে না। জুতোর ফিতে সবসময়ই খোলা। পাগলাটে ধরনের মানুষের মজা হল, সাধারণ ক্ষমতা না থাকলেও তাদের কিছু না কিছু অ-সাধারণ ক্ষমতা থাকে। বিশুরও সেরকম রয়েছে। তার অসাধারণ ক্ষমতা খেলাধুলোতে। সবধরনের খেলাতেই এই ছেলে দারুণ ওস্তাদ। ক্রিকেটে ওর ফিল্ডিং দেখলে চমকে উঠতে হয়। ঝপাং ঝপাং করে শুয়ে পড়ে এমন সব ক্যাচ ধরে যে নিজের দলের বোলার পর্যন্ত ঘাবড়ে যায়। এত ঘাবড়ে যায় যে আউট করার আনন্দে লাফাতে পর্যন্ত ভুলে যায়।

    ফুটবলের সময় বিশু গোলকিপার। গোলপোস্টের দিকে আসা বল যখন সে ধরে তখন মনে হয় সে বুঝি কোনও মানুষ নয়। একটা পাখি। তার হাত দুটো আসলে দুটো ডানা। গোলপোস্টের দিকে আসা বল পাখির মতো উড়ে উড়ে সে ধরতে পারে।

    একবার আমাদের গেম টিচার বিজয়বাবুর মাথায় ভূত চাপল।

    তিনি বললেন, ফুটবল, ক্রিকেট একঘেয়ে হয়ে গেছে। এবার অন্যকিছু করতে হবে। তিনি হকি খেলার ব্যবস্থা করলেন। আমরা সবাই ভেবেছিলাম এ খেলায় বিশু তেমন কেরামতি দেখাতে পারবে না। পারবেই বা কী করে? হকি তো আর সে কখনও খেলেনি। ওরে বাবা! দশমিনিট পরে দেখা গেল সেখানেও বিশু মারাত্মক। হকি স্টিকে যেন আঠা লাগিয়ে মাঠে নেমেছে। বল তাকে ছেড়ে অন্যদিকে যেতেই চায় না যে়!

    এখানেই বিশুর খেলা-প্রতিভার শেষ নয়। ক্রিকেট, ফুটবল, হকির মতো বড়ো বড়ো খেলার পাশাপাশি কবাডি, পিট্টু, বল চোরের মতো, ছোটখাটো খেলাতেও বিশুর পারদর্শিতা দেখবার মতো। স্পোর্টসের সময় দৌড়, লং জাম্প, হাই-জাম্পে তার ধারে কাছে কারোর আসা শক্ত। অত প্ৰাইজ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য বেচারিকে রিকশা ডাকতে হয়।

    বিশু অবশ্য লেখাপড়াতেও ভয়ঙ্কর। যে কোনও পরীক্ষায় দুটো তিনটে বিষয়ে ফেল করা তার কাছে কোন ঘটনা নয়। তবে তাকে কখনও ক্লাসে রেখে দেওয়া হয় না। কারণ, তাহলে আমাদের ক্লাস টিমের কেলেঙ্কারি হত। বিশুর মতো তুখোড় খেলোয়াড় আমাদের ক্লাসে থাকলে কী হবে, দল হিসেবে ক্লাস সেভেন খুবই দুর্বল। এতই দুর্বল যে প্রায় সব খেলাতেই আমরা হেরে যাই। বিশু চেষ্টা করে খুব। যেখানে বারো গোলের হার অবশ্যম্ভাবী সেখানে বিশুর জন্য আমরা সাত গোলে হেরে ফিরি। যেখানে পঞ্চাশ রান আমাদের হার কেউ আটকাতে পারবে না, সেখানে কুড়ি রানে বিপক্ষ দল জিতে যায়। বিশু এর থেকে বেশি আর কী করতে পারে? ম্যাচ শেষ হলে অন্য ক্লাসের ছেলেরা ঠাট্টা করে বলে, ‘এবার থেকে অতজনে মাঠে না নেমে তোরা বরং বিশুকে একা মাঠে নামা। দেখবি রেজাল্ট ভালো হবে।”

    এই তো গত বছর আন্তক্লাস ফুটবল টুর্নামেন্টে সব মিলিয়ে বাহান্নটা গোল খেয়ে ক্লাস সেভেন রেকর্ড করল। তবে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিটা কিন্তু পেয়েছিল বিশুই। সে ট্রফি পেল আটচল্লিশটা গোল বাঁচানোর জন্য। বিশু না থাকলে আমরা বাহান্নর বদলে ঠিক একশোটা গোল খেতাম।

    অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় মাস্টারমশাইরা এই জিনিসটা মাথায় রাখেন। বিশুকে ক্লাসে উঠতে না দিলে আমাদের অবস্থা যে ভয়াবহ হবে সেটা ওঁরা বুঝতে পারেন। হেডস্যারের সঙ্গে অনেক আলোচনা-টালোচনা করে শেষপর্যন্ত স্পোর্টস গ্রাউন্ডে বিশুকে ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়।

    তবে গত ফুটবল টুর্নামেন্টের পর থেকে গেম টিচার বিজয়বাবু খুব রেগে আছেন। বলছেন, ‘এতদিন জানতাম, চাঁদের মধ্যে কলঙ্ক থাকে। কিন্তু তোদের ক্লাসে দেখছি, একগাদা কলঙ্কের মধ্যে একটা চাঁদ পড়ে রয়েছে। এ আর মেনে নেওয়া হবে না। বিশুকে হয় ফেল করিয়ে আটকে দেব, নয়তো ডবল প্রমোশন দিয়ে উঁচু ক্লাসে তুলে নেব। না তোদের সঙ্গে আর ওকে রাখা যাবে না।”

    বিজয়বাবুর এই হুমকি শুনে আমাদের মুখ শুকিয়ে গেল। হারবারও একটা প্রেস্টিজ থাকবে না। এখনই তো আমাদের ক্লাসের নাম হয়ে গেছে, “হেরো ক্লাস সেভেন’, এরপরে হয়তো হবে সুপার হেরো ক্লাস সেভেন।’ সে বড়ো লজ্জার হবে।

    এতকিছুর পরও আমাদের কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে হল। ক্লাস টিম থেকে বিশুকে বাদ দিতে হল।

    খবরের নিয়ম হল যে খবর যত বেশি গোপন রাখার চেষ্টা হবে সে খবর তত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়বে। এটার ক্ষেত্রেও তাই হল। টিফিনে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছুটির আগে সবাই সেটা জেনে গেল। অন্য ক্লাসের ছেলেরা এসে আমাদের ধরে ধরে জানতে চাইল, এরকম ভয়ঙ্কর ঘটনা আমরা কোন সাহসে ঘটালাম? আমরা চুপ করে থাকলাম। বেশি চাপাচাপি করলে বললাম, “এটা ক্লাস সেভেনের নিজস্ব ব্যাপার। বলা যাবে না।”

    আমাদের মন খুব খারাপ। খেলায় ক্লাস সেভেনের ভবিষ্যতের কথা ভেবেও খুব দুশ্চিন্তা হতে লাগল।

    পরদিন স্কুলে যেতেই পল্টু, প্রসূন, সুকল্যাণকে বিজয় স্যার ডেকে পাঠালেন। চোখে মুখে টেনশন। টিচারস রুমের এক কোণে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, যা শুনছি সেটা সত্যি নাকি?”

    সুকল্যাণ মাথা নামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার সত্যি।’

    স্যার আঁতকে উঠে বললেন, ‘বলিস কী! সত্যি! ক্লাস শুদ্ধ তোদের সকলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”

    প্রসূন বলল, “কিছু করার নেই স্যার। আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন।”

    স্যার চাপা ধমকের গলায় বললেন, “ক্ষমা করব মানে? বিশু না খেললে কী অবস্থাটা হবে একবার বুঝতে পেরেছিস? হেডমাস্টারমশাইকে আমি কী কৈফিয়ত দেব? না কিছুতেই তোমাদের একথা শোনা যাবে না। বিশুকে তোমরা আজই দলে ফিরিয়ে নাও। পরশু ক্লাস এইটের সঙ্গে তোমাদের ম্যাচ। আমি দেখতে চাই তখন বিশুও খেলছে।”

    পল্টু মাথা নামিয়ে বলল, “সেটা হয় না স্যার। বিশু খেললে আমরা কেউ খেলব না।”

    স্যার রেগে গিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘খেলবে না মানে। তোমাদের তো খুব সাহস বেড়েছে দেখছি।” কিছুক্ষণের মধ্যে গলা নামিয়ে বললেন, কী হয়েছে রে তোদের? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। বিশুর সঙ্গে সকলের ঝগড়া হয়েছে নাকি? খুলে বল তো।”

    স্যারকে সব বলা হল। কীভাবে বিশু খেলায় হেরে যাওয়ার পরও হাসে, কীভাবে ক্লাস হারলে হাসে, হাসতে হাসতে বাড়ি যায়, কীভাবে নিজে গোল খেয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, কীভাবে আউট হয়ে যাওয়ার পর দাঁত বের করে মাঠের বাইরে ফিরে আসে, কীভাবে দৌড়ে পিছিয়ে পড়লে মজা পায়-সবই।

    সব শুনে বিজয়স্যার অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। মনে মনে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করলেন। ছাদের দিকে পিটপিট করে তাকালেন। তারপর ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “না, বিষয়টা সত্যি খুব জটিল। জিতলে হাসে আমি জানি, কিন্তু হারলে কেন হাসবে? হারার মধ্যে হাসির কোন এলিমেন্ট আছে? হারলে তো কাঁদার কথা? এতদিন ধরে গেম টিচারের কাজ করছি। কত খেলা করলাম, কত খেলা দেখলাম। এরকম তো শুনিনি কখনও! বিশু ছেলেটার মাথায় একটু গোলমাল আছে সেটা আমরা সব মাস্টারমশাই জানি। কিন্তু এখন দেখছি গোলমাল একটু নয়, গোলমাল খুব বেশি।”

    সুকল্যাণ বলল, “তাহলেই বলুন স্যার, এরপর ওকে দল থেকে বাদ দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল? কাজটা করে আমাদের খুবই দুঃখ হয়েছে। আমরা ওকে প্রত্যেকে খুব ভালবাসি। খেলাধুলোয় ও আমাদের ক্লাসের গর্ব, স্কুলের গর্ব। কিন্তু এই ঘটনার পর ওকে বাদ না দিয়ে আমাদের কী উপায় ছিল?”

    প্রসূন বলল, ‘ক্লাস সেভেন সব খেলায় হারতে পারে স্যার, কিন্তু প্রেস্টিজ বলে তো একটা জিনিস থাকবে। সেটায় তো হার মেনে নেওয়া যায় না।’

    বিজয়স্যার বললেন, “কখনই নয়। তোদের মুখে যা শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে বিশু হার জিতের ব্যাপারটাতেই একটা গোলমাল পাকিয়ে দিচ্ছে। এই পাগলামি যদি সংক্রামিত হয় তাহলে কেলেঙ্কারি। এবার থেকে হেরে গিয়েও সবাই ধেই ধেই করে নাচবে। নিজে গেম টিচার হয়ে আমি এই বেনিয়ম কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। না, নো নেভার।” এতদূর বলে বিজয়স্যার হাঁপ নিলেন। নস্যি নিলেন। তারপর বললেন, “কিন্তু পরশুদিনের খেলাটার কী হবে? এরকম সময় যদি তোরা দু-তিন ডজন গোলে হারিস আমি তো মুখ দেখাতে পারব না। আচ্ছা, এবারটা কী বিশুকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না? বিশুকে নিলেও তোরা যে হারবি তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বিচ্ছিরি ভাবে হারাটা তো ঠেকানো যেত আর এবারকার মত আমার মুখ কিছুটা রক্ষা পেত।’

    সুকল্যাণ, প্রসূন, পল্টু মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এর জন্য ওরা তৈরি ছিল না। স্যারের বকাঝকা ঠিক আছে, কিন্তু তা’বলে এভাবে অনুরোধ? তিনজনই খুব লজ্জা পেয়ে গেল। পল্টু আমতা আমতা করে বলল, ‘পরশুর খেলাতেও আমরা যে হারব…। আর তারপর যদি বিশু আবার হাসে?”

    বিজয়স্যার এবার রেগে গেলেন। গলা তুলে বললেন, “গাধাটার হাসি আমি বের করছি। ফের যদি হেরে গিয়ে হাসে তাহলে ওকে স্কুল থেকে দূর করে দেব। তাছাড়া এটাই তো ওর শেষ ম্যাচ।”

    টিফিনের সময় গাছতলায় আবার জরুরি মিটিং। বিশু স্কুলে এসেছে, কিন্তু মিটিঙে ডাকা হয়নি। গাছের ডালে বসে পল্টু বিজয় স্যারের কথা সবাইকে বিস্তারিত জানাল। তারপর ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল, “বন্ধুগণ, কোন উপায় নেই। স্যারের মুখরক্ষার জন্যই আমরা এবারের মতো বিশুকে ফিরিয়ে নিচ্ছি। আবার আমরা হারব এবং বিশু আবার হাসবে। কিন্তু সেটাই ওর শেষ হাসি হবে।”

    কার শেষ হাসি, কে হাসে?

    সেদিন খেলায় যা ঘটল তা আমরা কল্পনা করতেও পারিনি। গোটা স্কুলের কেউ-ই পারেনি। বাবা, মায়েদের পাশে চেয়ার নিয়ে বসে থাকা মাস্টার মশাইরা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইলেন। বিজয় স্যার ঘন ঘন নস্যি নিয়ে হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘাড়ের কাছে গিয়ে হাঁচতে লাগলেন। এতে হেডমাস্টার মশাইয়ের খুব রেগে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি রেগে না গিয়ে হাত বাড়িয়ে বললেন, “বিজয় তোমার নস্যির কৌটোটা একটু দাও তো। এক টিপ নিয়ে ফেলি। এই সময় মাথা পরিষ্কার রাখাটা জরুরি।”

    আজকের খেলায় আমরা তিন-এক গোলে ক্লাস এইটকে হারিয়ে দিলাম!

    সবাই চলে গেছে। আমরা ক্লাস সেভেনের ছেলেরা মাঠের এককোনায় গোল হয়ে বসে আছি চুপ করে। জিতে এত ঘাবড়ে গেছি যে কথা বলতে পর্যন্ত ভুলে গেছি। সন্ধে হতে আর দেরি নেই। অল্প অল্প ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে।

    জেতার বিকেল বুঝি এত সুন্দর হয়! হঠাৎ শুনি ফোঁপানির আওয়াজ। মুখ ফিরিয়ে দেখি, একটু দূরে বিশু হাঁটুর ওপর মাথা রেখে বসে আছে। কাঁদছে নাকি! হ্যাঁ, কাঁদছেই তো! আরে, কাঁদছে কেন? জেতার পর কেউ কাঁদে নাকি! ছেলেটা সত্যি পাগল। হাফটাইমের পরে ও চার চারটি গোল না বাঁচালে আমরা আজ আবার হারতাম।

    পল্টু উঠে গিয়ে বিশুর পিঠে হাত রাখল। বলল, “অ্যাই বিশু, কাঁদছিস কেন? অ্যাই মুখ তোল। মুখ তোল বলছি। কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?”

    বিশু মুখ তুলল। চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, “কাঁদছি তো তোদের কী? আনন্দ হচ্ছে তাই কাঁদছি। প্লিজ, তোরা আমাকে কাঁদতে দে।”

    আমরা ওকে কাঁদতে দিলাম।

    এরপর বহু খেলায় আমরা জিতেছি, তেমনি অনেক খেলায় হেরেছিও। বিশু কিন্তু তার স্বভাব বদলায়নি। হেরে গেলে সে একইরকম ভাবে হাসে। তবে আমরা আর রাগ করি না। কারণ, আমরা বুঝতে পেরেছি, হারবার পর হাসা খুব কঠিন কাজ। এই কাজ সবাই পারে না। বিশুর মতো পাগলাটে ধরনের ছেলেরাই কেবল পারে। হারবার পর তারা মোটেও ভেঙে পড়ে না। বরং হাসতে হাসতে তারা নিজের জেদটাকে বাড়িয়ে নেয়। যাতে কোনও না কোনদিন জিতে খুব আনন্দ হয়। এত আনন্দ যে কান্না পেয়ে যায়।

  • আশ্চর্য পুকুর

    আশ্চর্য পুকুর

    আমাদের স্কুলে যিনি বাংলা ব্যাকরণ পড়াতেন তিনি ছিলেন চিমটি স্পেশালিস্ট। বিভিন্ন ধরনের চিমটি আবিষ্কার করে তিনি ছাত্র মহলে খুবই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। খ্যাতির কারণ চিমটি নয়, চিমটির নাম। চিমটির তিনি চমৎকার চমৎকার সব নাম দিতেন। সমাস-চিমটি, সন্ধি-চিমটি, এককথায় চিমটি, বিপরীত শব্দে চিমটি…। চিমটি অ্যাপ্লাই করার আগে স্যার ক্লাসে উচ্চ-গলায় চিমটির নাম ঘোষণা করতেন। তারপর মিটমিটি হেসে বলতেন, ‘এই নাম কি তোমাদের পছন্দ হয়েছে?’ আমরা সমস্বরে বলতাম, ‘খুবই হয়েছে স্যার। তবে খেয়াল রাখবেন যেন বেশি না লাগে।’ স্যার মাথা নাড়তেন কিন্তু খেয়াল রাখতেন না। চিমটিতে যথেষ্টই লাগত। গোটা পিরিয়ডটা জ্বালা জ্বালা করত। তবে চোখ দিয়ে জল বের হওয়ার মতো লাগত না।

    ব্যাকরণ স্যার যেদিন অবসর নিলেন সেদিন একটা কাণ্ড হল। হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে স্যার ধরা গলায় বললেন, ‘ছেলেরা, তোমাদের অনেক ব্যথা দিয়েছি। আজ যদি ইচ্ছে হয় তোমরা এসে আমাকে একটা করে চিমটি কেটে যেতে পারো। আমি কিছু মনে করব না। তবে দেখবে, জীবনে ব্যাকরণ যেন ভুল না হয়।’

    চিমটিতে যা হয়নি, স্যারের কথা শুনে আমাদের তাই হল। সবার চোখে জল এসে গেল।

    স্কুল জীবন এরকমই হয়। এই জীবনে হাসিতেও আনন্দ, চোখের জলেও আনন্দ থাকে। অন্য কোন জীবনে এই জিনিস পাওয়া যায়?

    নানা ধরনের গল্পের সঙ্গে স্কুল জীবন অনেকগুলো গল্প লিখলাম এই বইতে। শুধু আমার স্কুল জীবন নয়, তোমাদের সকলের স্কুল জীবন। লেখার পর দেখলাম, সব গল্প সত্যি হল না, অথচ কোনও গল্পই যেন মিথ্যে নয়!

    তোমাদের দিনগুলো এমনই আনন্দময় হোক।

  • নয়

    নয়

    লালবাগে যখন প্রথম পুলিশ ভ্যানটা এসে পৌঁছলো বেলা তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। শুকনো ধুলো উড়ছে বাতাসে। হলদে রোদ চিকচিক করছে লালবাগের মাঠের ওপর। যেখানে এককালে সেই একশো বছর আগে দেশী সিপাহী বিদ্রোহ করেছিলো। বিদেশী বেনিয়াদের বিরুদ্ধে সেই মাঠে।

    পুলিশ ভ্যানটা গেটের সামনে এসে থামতে, কবি রসুলকে দেখতে পেলো আসাদ। পরনে তার একটি লুঙ্গি। গায়ে একটা কম্বল জড়ানন। ওদের দেখতে পেয়ে ছুটে এলো কবি রসুল। কোত্থেকে ধরেছে তোমাদের?

    ইউনিভার্সিটি থেকে।

    এখানে কজন?

    এখানে আমরা আঠারো জন। আরো অনেককে ধরেছে। ওদেরও এখনি নিয়ে আসবে। সকালে যারা ধরা পড়েছিলো, তারা সকলে ঘিরে দাঁড়ালো নতুন অভ্যাগতদের। হাতে হাত মেলালো ওরা। তারপর রাহাতের দিকে চোখ পড়তে অক্ষুট আর্তনাদ করে উঠলো, একি, ওর মাথা ফাটলো কেমন করে?

    আসাদ বললো, ইউনিভার্সিটিতে লাঠি চার্জ করছে ওরা।

    তাই নাকি?

    হ্যাঁ।

    পাশে একজন দারোগা দাঁড়িয়েছিলো। কবি রসুল তার দিকে তাকিয়ে রেগে উঠলো। কি সাহেব তামাশা দেখছেন বুঝি? ছেলেটা তো মারা যাবে। একটা ডাক্তার ডাকুন না।

    এখানে ডাক্তার ডাকার কোন নিয়ম নেই। দারোগা জবাব দিলো। বলেন তো তাকে হাসপাতালে পাঠাই।

    হয়েছে, আপনাকে অত দরদ দেখাতে হবে না। সবুর মাটিতে থু থু ছিটিয়ে বললো। লোকগুলোকে দেখলে ঘেন্নায় বমি আসে আমারু আন খান সাহেব, এখান থেকে দূরে সরে যান।

    এমন অপ্রত্যাশিত অপমানের কথা ও রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো লোকটার। কিন্তু কিছু বলতে সে সাহস করলো। চুপচাপ সরে গেলো একপাশে। মেডিকেলের ছেলেরা বললো, আপনারা ঘাবড়াবেন না, জখমটা তেমন মারাত্মক নয়, আমরা ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি। বলে ওরা এগিয়ে এসে রাহাতকে ধরাধরি করে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বসালো। ওসমান খান বললো, একটু গরম পানি আর কিছু আয়োডিন দরকার।

    দাঁড়ান দেখি জোগাড় করতে পারি কিনা। ওকে আশ্বাস দিয়ে থানা ইনচার্জের কাছ থেকে আয়োডিন আর গরম পানি আনার বন্দোবস্ত করতে গেলো কবি রসুল।

    পুলিশ ভ্যান থেকে নামবার আগ পর্যন্ত আসাদ ভেবেছিলো সালমার সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায় তাহলে সে কি আগের মত সহজভাবে কথা বলতে পারবে।

    গত রাতের কথা বারবার করে মনে পড়ছিলো তার।

    থানা অফিসের পাশে লম্বা ব্যারাকটার সামনে আরো সাত-আটটা মেয়ের মাঝখানে বসে ওদের কি যেন বোঝাচ্ছিল সালমা। দেখে আসাদ বুঝলো ওরা মেডিকেলের মেয়ে। সকালের হোস্টেল থেকে ধরা পড়েছে ওরা। কারো পরনে সেলওয়ার, কারো পরনে শাড়ি।

    আসাদকে দেখে ফিক করে হেসে দিলো সালমা। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো, বেশ আপনিও ধরা পড়েছেন তাহলে?

    কি করবো বলুন, আপনাদের ছেড়ে থাকতে পারলাম না।

    আসাদের কথায় মুখখানা ঈষৎ রাঙা হয়ে উঠলো সালমার। চোখজোড়া মাটির দিকে নাবিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলো সে। কে জানে হয়তো গত রাতের কথা মনে পড়েছে তার, আসাদ ভাবলো।

    একটু পরে সালমা ইতস্তত করে বললো, আমরা ভোর রাতেই এ্যারেস্ট হয়েছি।

    হ্যাঁ, আমি তা শুনেছি।

    কার কাছ থেকে শুনলেন? ভ্রূজোড়া স্বল্প বাঁকিয়ে প্রশ্ন করলে সালমা। আসাদ বললো, আপনার সহপাঠীদের কাছ থেকে।

    ও, সালমা মৃদু হেসে মুখখানা অন্য দিকে ঘুরিয়ে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে লাগলো। না। গতরাতের কথা এখন আর মনে নেই তার। সব ভুলে গেছে মেয়েটি, আসাদ ভাবলো। ভেবে কেন যেন মনটা ব্যথায় টন টন করে উঠলো তার।

    ভার্সিটির মেয়েদের নিয়ে তখন দ্বিতীয় প্রিজন-ড্যানটা এসে পৌঁছেছে লালবাগে। ওদের দেখতে পেয়ে শিশুদের মত আনন্দে হাততালি দিতে দিতে সেদিকে এগিয়ে গেলো মেডিকেলের মেয়েরা। এই যে নীলা যে, এসে এসো। ছুটে এসে ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলে সালমা।

    রানু বললো, বাহ সালমা আপা তুমি? বেশ ভালোই হলো একসঙ্গে থাকা যাবে।

    সালমা জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কজন?

    নীলা জবাব দিলো, পাঁচ।

    তাহলে পাচ আর আট মিলে আমরা তেরোজন হলাম।

    হ্যাঁ, তেরোজন মেয়ে আমরা। সালমা বললো।

    আসাদ কাছে দাঁড়িয়েছিলো। ফোঁড়ন কেটে বললো, আমাদের তুলনায় কিন্তু সমুদ্রে বারিবিন্দু।

    হয়েছে, হয়েছে অত বড় বড় কথা বলবেন না। নীলা ঠোঁট বাঁকালো।

    দেখেছি আপনাদের সাহস। পুলিশ দেখে সব বেড়ালের মত পালিয়েছেন আবার কথা বলেন। আমরা পালাই নি, হুঁ।

    উত্তরে কি যেন বলতে যাচ্ছিলো সালাদ। এমন সময় আরো একটা পুলিশ ভ্যান এসে থামলো সেখানে।

    আরো এক দল ছেলে।

    আরো একদল মেয়ে।

    তারপর বেলা যত পড়তে লাগলো, গ্রেপ্তার করে অনা ছেলেমেয়েদের সংখ্যাও তেমনি বাড়তে লাগলো ধীরে ধীরে।

    কাঁটা তার আর পুলিশ ঘেরা মাঠটার মধ্যে গোল হয়ে বসলো ছেলেরা মেয়েরা। আর তারা প্রতীক্ষ্ণ করতে লাগলো কথন জেলখানায় নিয়ে যাবে। তাদের সকলের মুখে হাসি, চোখে শপথের কাঠিন্য।

    হঠাৎ একসময় সবার মাঝখান থেকে অপূর্ব দরদ নিয়ে নীলা গান গেয়ে উঠলো যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে।

    তারপর সে গাইলো, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।

    ওর গান শুনে কিছুক্ষণের জন্যে সবাই যেন বোরা হয়ে গেলো। কি এক গভীর মৌনতা চারপাশ থেকে এসে গ্রাস করলো ওদের।

    খানিকক্ষণ পরে আবার কলকল করে কথা বলে উঠলো ওরা। কবি রসুল একজন দারোগাকে ডেকে বললো, কি ব্যাপার, আমাদের কি এখানে ফেলে রাখবেন নাকি?

    আর একজন জিজ্ঞেস করলো, জেলখানায় কখন নেবেন?

    এখানে আর ভালো লাগছে না। জেলে নিতে হয় নিয়ে চলুন। উহ্ এই ফাঁকা মাঠের মধ্যে কতক্ষণ বসে থাকা যায়। দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি করুন না আপনারা। ওদের হৈ হট্টগোলের একপাশে চুপচাপ বসেছিলো মুনিম। লাঠির আঘাত লেগে বা চোখটা ফুলে গেছে তার। নীলার গান শুনে বারবার ডলির কথা মনে পড়ছে, ডলিও তো নীলার মত আসতে পারতো এখানে। কেন সে এলো না? ভাবতে গিয়ে বুকটা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠলো মুনিমের।

    ওকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বেনু বললো, কি ভাবছেন মুনিম ভাই?

    না, কিছু না। চোখ তুলে বেনুর দিকে তাকালো মুনিম। দেহের গড়নটা একটু ভারি গোছের। চেহারাখানা সুন্দর আর কমনীয়। সবার সঙ্গে হেসে কথা বলে বে। কোন আবিলতা নেই, কলুষতা নেই আর কাজ পেলে কি খুশিই না হয় মেয়েটা। দুহাতে কাজ করে, ওর দিকে তাকিয়ে মুনিমের আবার মনে হলো, ডলি কেন বেনুর মত হলো না। বেনু ওর পাশে বসলো।

    ফোলা চোখটার দিকে দৃষ্টি পরতে বললে লাঠির আঘাত লেগেছিলো, তাই না মুনিম ভাই

    মুনিম সংক্ষেপে বললো, হ্যাঁ।

    বেনু বললো, মেডিকেলের ছেলেদের বললে ওরা সুন্দরভাবে ব্যান্ডেজ করে দেবে।

    বলবো ওদের? বেনুর উৎকণ্ঠা দেখে অবাক হলো মুনিম। বেনু আবার বললো, বলবো? মুনিম সংক্ষেপে ঘাড় নাড়লো। না।

    বেনু আর কিছু বললো না। চুপচাপ রোদে চিকচিক করা অসমতল মাঠটার দিকে চেয়ে রইলো।

    অদূরে বসা সালমা আসাদকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এর আগে কোনদিন জেলে যান নি?

    গেছি।

    কবার?

    তিনবার।

    তাই নাকি?

    হ্যাঁ। আসাদ মুদু হাসলো। চেয়ে দেখলো মাটির দিকে চোখ নাবিয়ে কি যন ভাবলে সালমা। কে জানে, হয়তো গত রাতের কথা ভাবছে সে। কিম্বা ভাবছে তার কারারুদ্ধ স্বামীর কথা। কি ভাবছে জিজ্ঞেস করতে সাহস হলো না আসাদের।

     

    মাঠের ও পাশটায় এরা বসেছিলো।

    ওপাশটায় তখন কবি রসুল একজন পুলিশ অফিসারের ওপর রেগে গিয়ে বলছে, এই রোদের ভিতের কতক্ষণ বসিয়ে রাখবেন এখানে। জেলে কি নেবেন না নাকি?

    নেবো, নোবো, এত ধৈর্য হারাচ্ছেন কেন। এখনি নেব। জবাবটা তাড়াতাড়ি সেরে সেখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে গেলো পুলিশ অফিসারটা। সবুর মাটিতে থুথু ছিটিয়ে বললো, লোকগুলোকে দেখলে ঘেন্নায় বমি আসে আমার, তোমরা কেমন করে যে ওদের সঙ্গে কথা বলে। বলে আবার মাটিতে থুথু ছিটালো সে।

    কেউ কিছু বললো না।

     

    পরপর তিন চারখানা পুলিশ বোঝাই গাড়ি উত্তর থেকে দ্রুত দক্ষিণ দিকে চলে গেলো। এক নজর সেদিকে তাকিয়ে দেখলো বজলে তারপর মৃদুপায়ে আবার হাঁটতে লাগলো।

    মিরেন্ডারে বসে এক কাপ চা খাবে।

    কাচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে সাহানাকে একা বসে থাকতে দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলো বজলে।

    ওকে দেখতে পেয়ে সাহানা ম্লান হাসলো, চা খেতে এলেন বুঝি?

    বজলে ওর সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে বললো, হ্যাঁ। আপনি খেয়েছেন?

    হ্যাঁ।

    আরেক কাপ খান আমার সঙ্গে।

    সাহানা হা না কিছু বললো না। বয় এসে দাঁড়িয়েছিলো। বজলে দুকাপ চা আনতে বললো তাকে।

    বয় চলে গেলে বজলে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো, এখন কোথায় আছেন আপনি?

    সাহানা সে কথার কোন জবাব না দিয়ে স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো বজলের দিকে। তারপর বললো, মাহমুদের সঙ্গে কি আপনার দেয়া হয়েছিলো, এর মধ্যে।

    বজলে বললো, যা সকালে ওর ওখানে গিয়েছিলাম আমি।

    সাহানা মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বললো, আমি এখন সেগুন বাগানে আমার এক বান্ধবীর বাসায় আছি।

    ও! বজলে মুদু স্বরে বললো। বয় এসে চা রেখে গেলো টেবিলের উপর।

    পটের ভেতর এক চামচ চিনি ঢেলে দিয়ে সাহানা বললো, ও নিশ্চয় আমার সম্পর্কে অনেক কথা বলেছে আপনাকে।

    বজলে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে বন্ধুর পক্ষ নিয়ে বললো, না ও কিছু বলে নি আপনার সম্পর্কে।

    নিশ্চয় বলেছে, আপনি কোনে আমার কাছ থেকে। অদ্ভুতভাবে হাসলো সাহানা। পেয়ালার চা ঢালতে ঢালতে আবার বললো, জানেন, লোকটা বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছিলো আমায়। আর এখন বলে, না আমি ও রকম কোন কথাই দিই নি। ক্ষণকাল থেমে আবার সে, তখন কত অনুনয়, তোমার ভালবাসা পেলে স্বর্গ মর্ত এক করে দেবো, আর এখন জোচ্চোর কোথাকার।

    বজলে মাথা নিচু করে ছিলো। চোখ তুলে এবার তাকালো ওর দিকে।

    পরনে একখানা কলাপাতা রঙের পাতলা শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক লাগলো। চুলগুলো গোলাকার খোঁপা করা। ডলির চেয়ে কম সুন্দরী নয় সাহানা। চায়ের কাপটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে সাহানা আবার বললো, ও ভেবেছে চিরকাল আমি করুণার ভিখিরি হয়ে থাকি। উর্বর চিন্তা বটে। বলে অদ্ভুতভাবে হাসলো সাহানা।

    তারপর চায়ের পেয়ালায় মৃদু চুমুক দিয়ে বললো, থাক ওসব কথা, আপনার কি খবর বলুন। চা খেয়ে বেরিয়ে কোথায় যাবেন।

    বজলে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, কিছু ঠিক নেই, এমনি একটু ঘুরে বেড়াবো।

    সাহানা বললো, আমার ওখানে চলুন না।

    বজলে শুধালো কোথায়?

    সেগুন বাগানে। ওকে অবাক করে দিয়ে অপূর্ব গলায় সাহানা বললো। ওরা সবাই দেশের বাড়িতে গেছে। বাসাটা খালি। রাতের বেলা একা থাকতে বড় ভয় করবে আমার। চলুন না, আপনিও থাকবেন। সাহানার দুচোখে আশ্চর্য আমন্ত্রণ।

    চুল থেকে পা পর্যন্ত ওর পুরো দেহটার দিকে এক পলক তাকালো বজলে। ডলিকে মনে পড়লো। ও যদি জানতে পারে? না ও মোটেই জানতে পারবে না। সিগারেটে একটা জোর টান দিলো বজলে। তারপর কঁপা গলায় বললো। আচ্ছা যাবে।

    ওর চোখে চোখ রেখে ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি ছড়ালো সাহানা।

    মিরেন্ডার থেকে বেরিয়ে একখানা রিক্সা নিলো ওরা। ওর কানের কাছে মুখ এনে বজলে কি যেন বলতে যাচ্ছিলো। সাহানা বললো, ডলি গেলো।

    ডলি? বজলে আঁতকে উঠলো। কোথায় দেখলেন তাকে?

    সাহানা বললো। এইতো রিক্সা করে গেলো ওদিকে।

    মুহূর্তে মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেলো বজলের।

    ওকি দেখেছে আমাদের?

    সাহানা হেসে দিয়ে বললো, তা কেমন করে বলবো। বলে ওর হাতে একটা মৃদু চাপ দিলো সাহানা। ওর হাতখানা মুঠোর মধ্যে নিয়ে নীরবে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলো বজলে। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে ফ্যাকাশে দৃষ্টি মেলে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো সে।

    হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে ধুকধুক করছে।

    আকাশের পশ্চিম দিগন্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছিলো ধীরে ধীরে।

    দিনের ক্লান্তি শেষে, রাত আর স্নিগ্ধতা নিয়ে আসছিলো পৃথিবীর বুকে। কর্মচঞ্চল শহর রাত্রির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই বিষণ্ণ বিকেলে হঠাৎ মৌনতার গভীর সমুদ্রে ডুব মেরেছিলো যেন।

     

    জেল গেটের সামনে বন্দি ছাত্র-স্বত্রীদের জড়ো করা হলো এনে। একজন নয় দুজন নয়। আড়াইশর ওপর সংখ্যা ওদের।

    খবর পেয়ে আত্মীয়-স্বজন খোঁজ নিতে এসেছেন। কার কি প্রয়োজন কাগজে টুকে নিচ্ছেন চটপট।

    সালমার বিছানাপত্তর আর কাপড়-চোপড় নিয়ে শাহেদ এসেছিলো।

    হোন্ডল আর সুটকেসটা সামনে নাবিয়ে রেখে সে বললো, নে আপা তোর জিনিসপত্রগুলো সব দেখে নে, আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে, জলদি কর।

    কেন, তুই কোথায় যাবি? সালমা উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করলো।

    শাহেদ বললো। বারে, তাদের যে ধরে এনেছে তার প্রতিবাদ ধর্মঘট করবো না বুঝি?

    সালমা মনে মনে খুশি হলো। বললো, দেখো তুমি যেন দুষ্টুমি করো না। তাহলে কিন্তু খুব রাগ করবো।

    তুই আমায় কি মনে করি আপি? আমি দুষ্টুমি করি? শাহেদ আহত হলো। এইতো এখন গিয়ে পোস্টার লিখতে বসবো। পাড়ার ছেলেদের সব বলে রেখেছি। আজ রাতের মধ্যে দুশ পোস্টার লাগানো চাই, কি মনে করেছিস তুই? বলে চলে যাচ্ছিলো শাহেদ।

    কি মনে পড়তে ফিরে এসে পকেট থেকে একখানা চিঠি বের করে এগিয়ে দিলো সালমার দিকে।

    দিতে ভুলেই যাচ্ছিলাম, নে দুলাভাইয়ের চিঠি।

    হাত বাড়িয়ে চিঠিখানা নিলো সালমা।

    আসাদ বললো, কার চিঠি

    সালমা ওর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলে, ও লিখেছে, রাজশাহী জেল থেকে। আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলো। নীলা ডাকলো।

    সালমা এসে আমাদের নাম ডাকছে।

    অস্ফুট কণ্ঠে আসি বলে, চলে গেলো সালমা।

    গত রাতের কথা সে একেবারে ভুলে গেছে। স্বামীর চিঠিখানা কত যত্ন করে রেখেছে। হাতের মধ্যে, আসাদ ভাবলো।

    আর ভাবতে গিয়ে মনটা কেন যেন ব্যথা করে উঠলো তার।

    সাহানাকে দেখে তেমন অবাক হয় নি মুনিম, জানতো সে আসতে পারে।

    অবাক হলো ওর সঙ্গে ডলিকে দেখে।

    সাহানা বললো, ডলি এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে।

    প্রথমে কিছুক্ষণ একটা কথাও মুখ দিয়ে সরলো না মুনিমের। অপ্রত্যাশিত আনন্দে বোবা হয়ে গেছে সে।

    ডলি এগিয়ে এসে এক মুঠো ফুল গুঁজে দিলো ওর হাতের মধ্যে। কিছু বললো না।

    মাটিতে চোখ নাবিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।

    মুনিম মৃদু গলায় বললো, হয়তো দীর্ঘদিন তোমার সঙ্গে দেখা হবে না ডলি।

    ডলি চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে।

    স্বল্প অন্ধকারেও মুনিম দেখলো ঢলিক চোখজোড়া পানিতে ছলছল করছে। আনন্দে মনটা নেচে উঠছিলো বারবার। আর শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছিলো ডলিকে। ডলির এমন রূপ আর কোনদিন চোখে পড়ে নি মুনিমের।

    আসাদ এসে ওর কাঁধের উপর একখানা হাত রাখলো। তোমার বাসা থেকে কেউ আসেনি মুনিম?

    আমেনা এসেছিলো। মুনিম জবাব দিলো। কাপড়-চোপড়গুলো ওই দিয়ে গেছে। মা নাকি খবর শুনে কাঁদতে শুরু করেছেন। মাকে নিয়ে আমার এক জ্বালা। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলো মুনিম।

    আসাদ সরে গেলো অন্য দিকে। ওর কেউ আসেনি। মা যার নেই দুনিয়াতে কেউ বুঝি নেই তার। হঠাৎ মরা মায়ের কথা মনে পড়ায় মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো আসাদের।

    নাম ডেকে ডেকে তখন একজন করে ছেলেমেয়েদের ঢোকান হচ্ছিলো জেলখানার ভেতরে।

    নাম ডাকতে ডাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন ডেপুটি জেলার সাহেব। এক সময়ে বিরক্তির সাথে বললেন, উহ্‌ এত ছেলেকে জায়গা দেবো কোথায়। জেলখানাতে এমনিতে ভর্তি হয়ে আছে।

    ওর কথা শুনে কবি রসুল চিৎকার করে উঠলো, জেলখানা আরো বাড়ান সাহেব। এত ছোট জেলখানায় হবে না।

    আর একজন বললো, এতেই ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।

  • আট

    আট

    ভোরে আসার কথা ছিলো। আসতে বেলা হয়ে গেলো ওর। ছাইদানের ওপর রাখা সিগারেট থেকে শীর্ণ ধোঁয়ার রেখা সাপের মত এঁকেবেঁকে উঠে বাতাসে মিইয়ে যাচ্ছে। বিছানা শূন্য। কৌচেও কেউ বসে নেই।

    বাথরুমে ঝাঁপঝপ শব্দ হচ্ছে পানি পড়ার। বজলে চারপাশে তাকিয়ে টেবিলের ওপর থেকে একটি ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে ছবি দেখতে লাগলো।

    কিছুক্ষণ পর পানি পড়ার শব্দ বন্ধ হলে, তোয়ালে দিয়ে মাথার পানি মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো মাহমুদ। এই যে তুমি এসে গেছ, তাহলে। ও হেসে বললো, ওই পত্রিকার নিচে সিগারেটের প্যাকেট আছে নিয়ে একটা ধরাও।

    বজলে শুধালো,সাহানাকে দেখছি না, ও কোথায় গেলো?

    চুলে তেল মাখছিলো মাহমুদ, মুখ না ঘুরিয়েই বললো, আর বলো না, ওর সঙ্গে কাল রাতে একটা বিশ্রী রকমের ঝগড়া হয়ে গেছে আমার!

    হঠাৎ?

    না, ঠিক হঠাৎ নয়। কদিন থেকে সম্পর্কটা বড় ভালো যাচ্ছিলো না।

    ক্ষণিক বিরতি নিয়ে মাহমুদ আবার বললো,তুমিতো জান, ওর ব্যাপারে কোনদিন কোন কার্পণ্য করি নি আমি। যখন যা চেয়েছেদিয়েছি, কিন্তু কি জানো, মেয়েটা এক নম্বরের নিমকহারাম, বড় নির্লজ্জ, আর ওর কথা শুনে তোমার কাজ নেই। থেমে আবার নতুন কিছু বলতে যাচ্ছিলো মাহমুদ। বজলে বাধা দিয়ে বললো, কিন্তু সে গেলো কোথায়?

    মাহমুদ ক্ষণকাল চুপ করে থেকে বললো, চলে গেছে, ভোরে উঠে ওর মালপত্র নিয়ে বুঝলে বজলে, একটা কথা না বলে চলে গেছে।

    যাক, মরুকগে, আমার কি? চুলের ওপর চিরুনি বুলোতে বুলোতে মুখটা বিশ্রীভাবে বাঁকালো মাহমুদ।

    সিগারেটটা ধরিয়ে নিয়ে ম্যাগাজিনের ওপর আবার চোখ নাবালো সে।

    হ্যাঁ, যে কথা বলার জন্য ডেকেছিলাম বজলে–।

    হুঁ, বলো। পত্রিকাটা টেবিলের ওপর নাবিয়ে রাখলে সে।

    দেয়ালে টাঙানো ওর নিজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে মাহমুদ মৃদু গলায় বললো, মুনিম তোমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাই না?

    এ ধরনের প্রশ্ন আশা করে নি বজলে। তাই প্রথমে সে কিছুক্ষণের জন্যে বোবা হয়ে গেলো। তারপর আস্তে করে বললো, না, ঠিক ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয় তবে তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের আলাপ। কিন্তু, কেন বল তো?

    না, এমনি। থেমে আবার বললো মাহমুদ, ওর সম্পর্কে তোমার ধারণাটি কি বলতো, মানে ছেলেটা কেমন?

    সিগারেটে একটা জোর টান দিলো বজলে, তারপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললো, দেখো ব্যক্তি হিসেবে ওকে বেশ ভাল লাগে আমার। তবে ওর রাজনৈতিক আদর্শকে আমি ঘৃণা করি। কিন্তু আজ হঠাৎ এসব প্রশ্ন কেন করছো আমায়?

    মাহমুদ সহসা কোন জবাব দিলো না। তারপর যখন সব কিছু খুলে বললো তখন আর কিছু অস্পষ্ট রইলো না বজলের কাছে। বজলের উচিত মুনিমের সঙ্গে খুব সদ্ভাব রাখা। ওর আস্থাভাজন হওয়া। তারপর ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে ভেতরের খবরগুলো সব অতি সাবধানে বের করে নেয়া। কোথায় থাকে সে, কি করে, কাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, এসব জেনে মাহমুদকে বলা। এর বিনিময়ে তার কর্তাদের কাছ থেকে ওকে একটা মোটা টাকার বন্দোবস্ত করে দিতে পারে মাহমুদ। কোন খাটুনী নেই অথচ ফিয়াসেকে নিয়ে আমোদফুর্তিতে থাকার মত অনেক টাকা পাবে সে।

    অর্থাৎ তুমি আমাকে গোয়েন্দাগিরি করতে বলছ, তাই না? অল্প একটু হেসে গম্ভীর হয়ে গেলো বজলে ।

    না, ঠিক তা নয়, বুঝলে বজলে, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। মাহমুদ ইতস্তত করছিলো।

    প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে নিয়ে বজলে ধীরে ধীরে কেটে কেটে বললো, দেখো মাহমুদ, তুমিতো আমাকে জান, জীবন সম্পর্কে আমার নিজস্ব একটা দর্শন। আছে, সেটা হলো, কারো ক্ষতি না করা, কাউকে দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়া। ঝামেলা আমার ভাল লাগে না। আমি চাই নিরুজ্ৰৰ অথচ সুন্দর জীবন। আমাকে ওসব জটিলতার ভেতর না টানলে ভালো হয় না?

    একটু আগের হালকা আবহাওয়াটা হঠাৎ যেন একটু গুমোট বলে মনে হলে মাহমুদের। উভয়ে খানিকক্ষণের জন্যে মৌন হয়ে রইলো। অবশেষে মৌনতা ভেঙ্গে বজলে বললো, তুমি কি এখন বেরুবে কোথাও?

    দেয়ালে একটা টিকটিকি খাবারের তালাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো, সেদিকে চেয়ে থেকে মাহমুদ বললো, না, এ বেলা কোথাও যাবার ইচ্ছা নেই, ঘরেই থাকবো।

    একটু পরে বজলে উঠে দাড়ালো,দুপুরের দিকে ডলি হয়তো আসতে পারে এখানে, এলে বসতে বলো, আমি আবার আসবো–বলে আর অপেক্ষা করলো না।

    ও চলে গেলে কিছুক্ষণ চোখ মুদে চুপচাপ বসে রইলো মাহমুদ। হাত ঘড়িটা দেখলো। বার কয়েক । নটা বাজতে মিনিট কয়েক বাকি।

    এতক্ষণে তার এসে যাবার কথা। মাহমুদ বিড়বিড় করে বললো, এখনো এলো না যে? উঠে কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে পায়চারি করলো সে। জানালায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ সিড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যেতে শিকারি কুকুরের মত কানজোড়া খাড়া হয়ে গেলো তার।

    হ্যাঁ, তারই পায়ের শব্দ। মুখখানা প্রসন্ন হাসিতে ভরে গেলো। একটু পরে পর্দার ফাঁক দিয়ে তার চেহারা দেখা গেলো। মাহমুদ মৃদু হেসে ডাকলো, এসো।

    চারপাশে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে ভেতরে এসে কৌচের উপর বসলো সবুর । মাহমুদ উৎকণ্ঠা নিয়ে বললো, এত দেরি হলো যে?

    সবুর একটা ক্লান্তির হাই তুলে বললো, হলে কয়েকটি ছেলে এ্যারেষ্ট হয়েছে, ওদেরে নিয়ে ছেলেদের মধ্যে ভীষণ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে কিনা তাই আসতে দেরি হয়ে গেলো। বলে আরেকবার চারপাশে তাকালো সে।

    মাহমুদ সিগারেটের প্যাকেটটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, তারপর কি খবর বলো।

    সবুর মৃদু হেসে বললো, গতকাল যে রিপোর্টটা পাঠিয়েছিলাম, পেয়েছেন তো?

    মাহমুদ মাথা সামনে একটু ঝুঁকিয়ে বললো,হ্যাঁ পেয়েছি।

    সবুর বললো, আমাকে এখুনি আবার ফিরে যেতে হবে হলে। আজকের রিপোর্টটা বিকেলে পাঠিয়ে দেবো। আমাকে ডেকেছিলেন কেন বলুন তো?

    হ্যাঁ, তোমাকে ডেকেছিলাম, বলতে গিয়ে কি যেন ভাবলো মাহমুদ।

    তোমাকে ডেকেছিলাম, হ্যাঁ, শোন, একটু সাবধানে থেকে আর তোমার রিপোর্টগুলো খুব ভাসা ভাসা হয়ে যাচ্ছে, আরো একটু বেশি করে ইনফরমেশন দেবার চেষ্টা করো।

    সবুর আহত হলো। কেন, ইনফরমেশন কি আমি কম দিই।

    না না, সে কথা আমি বলছি নে। শব্দ করে হেসে পরিবেশটা হাল্কা করে দিতে চাইলে মাহমুদ। বললো, আরো ইনফরমেশন থাকা দরকার। আমি সে কথা বলছিলাম।

    আচ্ছা ভবিষ্যতে তাই চেষ্টা করবো। সবুর উঠে দাঁড়ালো। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলো সে।

    মাহমুদ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বললো, কি?

    সবুর বললে, আমার এ মাসের বিলটা এখনো পাইনি।

    ও হ্যাঁ, তোমার বিল তৈরি হয়ে আছে, দু-একদিনের মধ্যেই পেয়ে যাবে।

    একটা সিগারেট ধরিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ম্যাগাজিনটার পাতা উল্টাকে লাগলো মাহমুদ। সবুরের পায়ের শব্দটা একটু পরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো সিড়ির ওপর।

     

    বেলা নটা দশটা থেকে ছেলেরা বিভিন্ন হল, কলেজ আর স্কুল থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে লাগলো। রাস্তা দিয়ে দলবদ্ধভাবে না এসে একজন দু’জন করে আসছিলো ওরা। কারণ শহরে তখনো একশ চুয়াল্লিশ ধারা পুরোপুরিভাবে বহাল রয়েছে। জীপে চড়ে পুলিশ অফিসাররা ইতস্তত ছুটোছুটি করছে রাস্তায়। কয়েকটি রাস্তার মোড়ে স্টেনগান আর ব্রেনগান নিয়ে রীতিমত ঘাঁটি পেতে বসেছে ওরা।

    শহরের চারপাশ থেকে ছেলেরা যেমন আসছিলো তেমনি সাথে করে নতুন নতুন খবর নিয়ে আসছিলো ওরা। একদল ছেলে নিজেদের মধ্যে কি যেন আলোচনা করতে করতে মধুর স্টলে এসে ঢুকলো। আসা কাছেই বসেছিলো ওদের। ঘাড় বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কোত্থেকে আসছেন?

    আমরা নবকুমার স্কুল থেকে।

    আর আপনারা?

    আমরা জগন্নাথ কলেজ।

    ও দিককার খবর কি?

    সাতজনকে এ্যারেস্ট করেছে।

    আরে, ডাঃ জামান যে, তোমাদের হোস্টেলে নাকি পুলিশের হামলা হয়েছিলো। ব্যাপার কি?

    তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মোট সতেরোজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তার মধ্যে সাতজন মেয়ে। ওর কথায় চমকে উঠলো আসাদ।

    সালমার কথা মনে পড়লো। ক্ষণিক নীরব থেকে আগ্রহের সাথে সে প্রশ্ন করলো, মেয়েদের হোস্টেলেও হামলা হয়েছিলো বুঝি?

    হয়েছিলো মানে, রীতিমত কুরুক্ষেত্র। জামান হেসে জবাব দিলো।

    মেয়েরা অবশ্য একহাত দেখিয়েছে এবার। সেই পঞ্চাশ সালের কথা মনে নেই? তখন স্টাইকের সময় আমরা দোরগোড়ায় শুয়ে পড়েছিলাম আর মেয়েরা সব আমাদের গায়ের ওপর দিয়ে টপকে ক্লাশে গিয়েছিলো। সেই পাজী মেয়েগুলো এখন আর নেই। ওগুলো প্রায় সব বেরিয়ে গেছে। এখন নতুন যারা এসেছে তারা বেশ ভালো।

    জামান থামলো।

    আসাদ ভাবছিলো সালমা গ্রেপ্তার হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু কি ভেবে প্রশ্ন করলো না সে।

    পাশের টেবিলে তখন খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো আরেক দল ছেলে।

    একজন ডাকলো, বলাই এদিকে এসো। মধু, কোথায় মধু?

    এদিকে দুকাপ চা দাও মধুদা।

    খাবার আছে কিছু যা আছে নিয়ে এসো, ভাল করে খেয়ে নিই। যদি এ্যারেস্ট হয়ে যাই তো ক্ষিধেয় মরবো।

    কি ব্যাপার, একটা সন্দেশ চেয়ে চেয়ে হয়রান হয়ে গেলাম, এখনি কালো পতাকা তুলতে যেতে হবে, কইরে বলাই, একটা সন্দেশ কি দিবি জলদি করে?

    ব্যাটা অপদার্থ, তাড়াতাড়ি কর।

    মুনিমকে এদিকে আসতে দেখে আসাদ উঠে দাঁড়ালো। মুনিমের হাতে দুটো কালো পতাকা আর এক বাডিল কালো ব্যাজ। বাডিলটা টেবিলের ওপর নাবিয়ে রেখে মুনিম বললো, আর দেরি করে কি লাভ। ছেলেরা প্রায় সব এসে গেছে। এখন কালো পতাকাটা তুলে দিই, কি বল আসাদ

    আসাদ কোন জবাব দেবার আগেই বাইরে থেকে কে যেন একজন চিল্কার করে ডাকলো, মুনিম ভাই, আসুন, আর কত দেরি।

    পাশ থেকে রাহাত বললো, দাঁড়ান মুনিম ভাই, একটু দাঁড়ান। এক কাপ চা খেয়ে নিই।

    সবুর দাঁড়িয়েছিলো একটু দূরের কথা শুনে সে জ্বলে উঠলো ভীষণভাবে, তোমাদের শুধু খাওয়া আর খাওয়া, কেন, একদিন না খেলে কি চলে না।

    তোমার চলতে পারে আমার চলে না। রাহাত রেগে উঠলো। মুনিম বললো, হয়েছে তোমরা এখন ঝগড়া বাধিয়ো না, কালো পতাকা তুলতে কারা কারা যাবে এসো আমার সঙ্গে।

    কয়েকজন ছেলে সাথে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সিড়ি বেয়ে একটু পরে উপরে উঠে গেলো মুনিম।

    নিচে, মধুর স্টলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সংঘবদ্ধ হলো বাকি ছেলেরা, সংখ্যায় হয়তো শচার-পাঁচেক হবে ওরা। বয়সের তারতম্যটা সহজে চোখে পড়ে। কারো বয়স ষােল সতেয়োর বেশি হবে না। কারো চব্বিশ পেরিয়ে গেছে। কারো গায়ের রঙ কালো। কারো গৌরবর্ণ। করে পরনে পায়জামা, কারো প্যান্ট। কিন্তু সংকল্পে সকলে এক। প্রতিজ্ঞায় অভিন্ন।

    একটু পরে মুনিম আর তার সাথীদের ছাদের উপর দেখা গেলো। ওরা কালো পতাকা তুলছে। পূবালি সুর্যের সোনালি আভায় চিকচিক করছে ওদের মুখখানা। কালো পতাকা উড়ছে আর শ্লোগানের শব্দে ফেটে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

    সার বেঁধে কয়েকটা পুলিশের গাড়ি এসে থামলো অদূরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে। গাছের ছায়ায়।

    রাহাত মুখে গুনলো এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত সাত গাড়ি পুলিশ এসেছে। রে, ওই দেখ, সাত গাড়ি পুলিশ এসেছে। সবুর ঠোঁট বাঁকালো। এতেই ঘাবড়ে গেলে বুঝি? সব পিঁপড়ে, পিঁপড়ে; একেবারে কাপুরুষের দল। এর চাইতে মায়ের কোলে বসে চুকচুক। করে দুধু খাওয়া উচিত ছিলো তোমাদের।

    খবরদার, মুখ সামলে কথা বলে বলছি, নইলে। রাহাত ঘুষি বাগিয়ে উঠেছিলো, দৌড়ে এসে ওর হাতটা চেপে ধরলো আসাদ। একি হচ্ছে, একি করছো তোমরা। ছিছি। ঘৃণায় দেহটা রি-রি করে উঠলো। তারা ওদের দিকে কিছু কালো ব্যাজ আর আলপিন এগিয়ে দিয়ে বললো, নাও, কালো ব্যাজ পরাও সকলকে, তোমরাও পরো।

    ছেলেরা তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ইতস্তত দল বেঁধে বেঁধে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত। কেউ আলোচনা করছে পুলিশ নিয়ে। কেউ ভাবছে যদি জেলে যেতে হয়। কেউ ভাবছে, যারা জেলে গেছে তাদের কথা।

    কয়েকটি ছেলেকে ঘুরে ঘুরে কালো ব্যাজ পাচ্ছিলো। কারো শার্টের পকেটে, কারো কাঁধের ওপর। আসাদ এগিয়ে গেলো তাদের দিকে। আপনারা অমন ঘুরঘুর করছেন কেন? সবাই এক জায়গায় জমায়েত হোন, ওদের ডাকুন। তারপর সে নিজেই ডাক দিলো, ভাইসব। তার ডাকে ছেলেরা এসে ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ হতে লাগলো আম গাছতলায়। মেয়েরাও এসে পৌঁছেছে এতক্ষণে। বারোজন মেয়ে। পরনে সবার কালো পাড় দেয়া শাড়ি। চোখেমুখে সবার আনন্দের উজ্জ্বল দীপ্তি। রাহাত বললো, আপনাদের আর সবাই কোথায়?

    নীলা বললো, ওরা আসবে না।

    কেন?

    ওদের ভয় করে। আম গাছতলায় ছেলেদের পাশে ওর সাথীদের বসিয়ে রেখে নীলা সোজা মুনিমের কাছে এলো। কই ব্যাজ দি আমরা এখনো ব্যাজ পাইনি।

    আমার কাছে তো নেই, আসাদের কাছে। হাত দিয়ে অদূরে দাঁড়ানো আসাদকে দেখিয়ে দিলো সে। পুলিশ অফিসাররা তখন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে প্রক্টারের সঙ্গে কি যেন আলাপ করছিলো অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে।

    ছেলেরা ওদের দিকে তাকিয়ে আলাপ করছিলো।

    তুমি কি মনে করো, পুলিশের ভেতরে আসবে।

    আসবে মানে, দেখছে না ওরা ভেতরে আসার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে।

    হলেই হলো নাকি, আমরা ওদের ভেতরে ঢুকতে দেবো না।

    আমরা এখানে শুয়ে পড়বো তবু ঢুকতে দেবোনা ওদের।

    আমরা এখানে জান দিয়ে দেবো, তবু–।

    আহ, আপনারা থামুন, এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন, একটু চুপ করুন।

    মুনিমের গলা শোনা গেল একটু পরে। কিন্তু সোরগোল থামানো গেলো না। কে একজন চিৎকার করে উঠলো। ওই যে আরো দু রী পুলিশ আসছে, দেখো দেখে।

    দু লরী নয়, তিন লরী, তাকে শুধরে দিলো আরেকজন। দেখেছো মাথায় লোহার টুপি লাগিয়েছে ওরা, যেন যুদ্ধ করতে এসেছে।

    প্রক্টার সাহেবকে সাথে নিয়ে তিনজন পুলিশ অফিসার লনটা পেরিয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এলো ছেলেদের দিকে। ইন্সপেক্টর রশীদের বুকটা কাঁপছিলো ভয়ে। কে জানে ছাত্রদের ব্যাপার, কিছু বলা যায় না। কাছে গেলে কেউ যদি একটা ইট ছুঁড়ে মারে মাথার ওপর, তাহলে?

    উহ্‌ কেন যে এই পুলিশ লাইনে এসেছিলাম। অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করে ওঠে ইন্সপেক্টর রশীদ।

    পাশ থেকে কিউ, খান জিজ্ঞেস করেন, কি বললেন?

    বড় সাহেবের প্রশ্নে রীতিমত অপ্রস্তুত হয়ে যায় ইন্সপেক্টর রশীদ।

    সামলে নিয়ে বললেন, না না, ও কিছু না স্যার। বলছিলাম কি, এই ছেলেগুলো বড় বেশি বেড়ে গেছে, এদের আচ্ছা করে ঠেঙ্গানো উচিত।

    হুম, ঠোটের ওপর মৃদু হাসি খেলে গেলে কিউ. খানের।

    ওদের এদিকে এগুতে দেখে ছেলেরা এমন বিকটভাবে চিৎকার জুড়ে দিলো যে, কে কি বলছিলো ঠিক বোঝা গেল না। আসাদ এগিয়ে এসে থামাতে চেষ্টা করলোল ওদের । কিন্তু কেউ থামলো না।

    ইন্সপেক্টর রশীদ বার কয়েক ইতস্তত করে বললো, আমাদের কথাটা আপনারা একটু শুনবেন কি?

    আপনাদের কথা আমরা গুনতে চাই না।

    আপনারা এখান থেকে চলে যান।

    এটা কি পুলিশ ব্যারাক নাকি?

    এটা বিশ্ববিদ্যালয়।

    এখানে কে ঢুকতে দিয়েছে আপনাদের?

    বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান এখান থেকে।

    রাগে চোখমুখ লাল হয়ে গেলে কিউ. খানের কয়েক দাঁতে দাঁত ঘষলেন তিনি।

    তারপর ইশারায় সাথীদের ফিরে আসতে বলে, নিজেও ফিরে যাবার জন্যে পা বাড়ালেন। কপালে তার ভাবনার ঘন রেখা। কি করা যেতে পারে এখন?

    এদিকে ছেলেরা তখন উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে।

    ওদের কিছুতে এদিকে আসতে দেবো না আমরা।

    না মুনিম ভাই, আপনি না বললে কি হবে। আমরা ওদের বাধা দেবোই। ইট মেরে ওদের মাথা ফাটিয়ে দেব আমরা। সবার গলা ছাপিয়ে সবুরের গলা শোনা গেলো, ভাইসব, তোমরা ইট জোগাড় কর। আমরা জান দেবো তবু মাথা নোয়াবো না। আমরা বীরের মতো লাগবে-ইট জোগাড় করো।

    ওর কথাটা শেষ না হতে কে একজন চিৎকার করে উঠলো, পুলিশ।

    আরেকজন বললো, পালাও, পালাও।

    অদূরে, শখানেক পুলিশ অর্ধ বৃত্তাকারে ছুটে আসছে ছাত্রদের দিকে।

    মাথায় ওদের হেলমেট, হাতে একটা করে লাঠি। লোহার নাল লাগানো বুট জুতো দিয়ে শ্যামল
    দুৰ্বাঘাসগুলো মাড়িয়ে ছুটে আসছিলো ওরা।

    ছুটে আসছিলো দুচোখে বন্য হিংস্রতা নিয়ে। পালাও, পালাও–।

    পুলিশ।

    এর মাঝে আরেকটি কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, ভাইসব, পালিও না, রুখে দাড়াও সে কণ্ঠস্বর আসাদের। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর চাপা পরে গেলো চারদিকের উন্মত্ত কোলাহল।

    ভাইসব পালিও না। সমস্ত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো আসাদ।

    সামনে তাকিয়ে দেখলো পুলিশগুলো প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়েছে তার। পেছনে একটা ছেলেও দাঁড়িয়ে নেই, সকলে পালাচ্ছে। শুধু পাঁচটি মেয়ে ভয়ার্ত চোখ মেলে বসে আছে ওর পেছনে
    আম গাছতলায় । ভাইসব……। শেষ বারের মত ডাকতে চেষ্টা করলো আসাদ। পরক্ষণে একটা
    লাঠি এসে পড়লো ওর কোমরের ওপর।

    আর একটা।

    আরো একটা আঘাত ।

    টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলো আসাদ। পাশ থেকে কে যেন গম্ভীর গলায়। বললো, এ্যারেস্ট হিম। আর সঙ্গে সঙ্গে দু’জন কনস্টেবল তাদের ইস্পাত দৃঢ় বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলো তাকে।

    আসাদের মনে পড়লো বায়ান্ন সালের এমনি দিনে প্রথম যে দশজন ছেলে চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ করেছিলো তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলো সে।

    সেদিনও সবার আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো তাকে।

    আর আজ তিন বছর পর সেই দিনটিতে সে আবার সবার আগে বন্দি হলো। বাণিজ্য
    ভবনের দিকে যারা পালাচ্ছিলো, তাদের মধ্যে মেয়েও ছিলো একজন। শাড়িতে পা জড়িয়ে কংক্রিটের রাস্তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো মেয়েটা। জীবনে কোনদিন পুলিশের মুখোমুখি
    হয়নি তাই ভয়ে মুখখানা সাদা হয়ে গেলো তার। কলজেটা ধুকধুক করতে লাগলো গলার কাছে
    এসে। মনে মনে সে খোদাকে ডাকলো। খোদা বাঁচাও। পরক্ষণে চেয়ে দেখলো একটা
    কনস্টেবল লাঠি উচিয়ে ছুটে আসছে ওর দিকে। অস্ফুট আর্তনাদ করে মেয়েটা চোখজোড়া
    বন্ধ করলো।

    পুলিশ ভ্যানে উঠে দাঁড়াতে আসাদ পেছনে তাকিয়ে দেখলো, আম গাছতলায় বসে থাকা সে পাঁচটি মেয়েকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা হচ্ছে এদিকে। নীলা আছে, রানু আর রোকেয়াও আছে ওদের দলে।

    ওরা হাত তুলে অভিবাদন জানালে ওকে। তারপর এগিয়ে গেলো আরেকটি পুলিশ ভ্যানের দিকে। ওদের দিক থেকে চোখজোড়া সরিয়ে আনতে আসাদ চমকে উঠলো। রাহাতও গ্রেপ্তার হয়েছে। কপাল চুইয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছে ওর। সাদা জামাটা ভিজে লাল হয়ে গেছে রক্তে। কাছে আসতে দু’হাতে ওকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলো আসাদ। তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর ক্ষতস্থানটা চেপে ধরলো সে। মেয়েরা তখন পাশের ভ্যান থেকে স্লোগান দিচ্ছিলো, বরকতের খুন ভুলবো না। শহীদের খুন ভুলবো না।

    আরো জন কয়েক ছেলেকে এনে ভোলা হলো প্রিজন-ভ্যানের ভেতরে। তাদের মধ্যে একজনের কাঁধের ওপর লাঠির ঘা পড়ায় হাড়টা ভেঙ্গে গিয়েছে। তাই ব্যথায় সে। কাতরাচ্ছিলো আর ফিসফিস করে বলছিলো, হাতটা আমার ভেঙ্গে গিয়েছে একেবারে, মাগো ব্যথায় যে মরে গেলাম।

    কি, তোমরা চুপ করে কেন স্লোগান দাও।

    আসাদ স্লোগান দিলো, শহীদের স্মৃতি।

    আর সকলে বললো, অমর হোক।

    ছাত্রদের কাছ থেকে প্রথম প্রতিরোধ এলো লাইব্রেরির ভেতরের দরজায়, দুটো টেবিল টেনে এনে দরজার ওপর ব্যারিকেড সৃষ্টি করলো ওরা। একটি ছেলে চিৎকার করে ডাকলো, আরো টেবিল আন এদিকে, আরো, আরো। দরজা আটকে ফেলো, যেন ওরা ঢুকতে না পারে।

    ওদের এখানে ঢুকতে দেবো না আমরা।

    না কিছুতে না।

    ওরা যখন প্রতিরোধ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছিলো তখন কিছু সংখ্যক ছেলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে সেলফ থেকে কয়েকটা বই নাবিয়ে সুবোধ বালকের মত পড়তে বসে গেলো। বাইরে যে এত কিছু ঘটে গেলো যেন ওসবের সাথে কোন যোগ ছিলো না ওদের। যেন অনেক আগে থেকে এমনি পড়ছিলো ওরা। এখনন পড়ছে।

    ওদের দিকে চোখ পড়তে ঘৃণায় দেহটা বার কয়েক কেঁপে উঠলো বেনুর। চোখজোড়া জ্বালাপোড়া করে উঠলো। একটা ছেলের হাত থেকে ছোঁ মেরে বইটা কেড়ে নিয়ে তীব্র গলায় বেনু তিরস্কার করে উঠলো, আপনার লজ্জা করে না এখন বই পড়ছেন, ওদিকে আপনার বন্ধুদের কুকুরের মত মারছে। আপনার লজ্জা করে না।

    কয়েকটি ছেলে লজ্জা পেয়ে উঠে দাঁড়ালো।

    কিন্তু কয়েকজন উঠলো না। আগের মতো বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করলো তারা।

    একজন ছেলে গলা চড়িয়ে বললো, থাক, ওদের পড়তে দাও। কাপুরুষদের শান্তিতে থাকতে দাও। তোমরা সকলে এদিকে এসো। পুলিশগুলোকে এখানে কিছুতে ঢুকতে দেবো না আমরা। কিন্তু পেছনের দরজা দিয়ে পুলিশগুলো ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে সেখানে। শুধু সেখানে নয়, মেয়েদের কমনরুমে, অধ্যাপকদের ক্লাবে, বাণিজ্য ভবনে, দোতলার করিডোরে, সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু হয়েছে পুলিশের।

     

    ঘুমঘুম চোখে পায়ের শব্দটা কানে আসছিলো তার। ভেজানো দরজাটা ঠেলে কে যেন ঢুকলো ভেতরে। পায়ের শব্দ ঘরের মাঝখানে এসে শ্লথ হয়ে গেলো, তারপর থেমে গেলে এক সময়।

    মাহমুদ চোখ মেলে তাকালো এতক্ষণে।

    চোখেমুখে অপ্রস্তুত ভাব নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে ডলি।

    ও আপনি বসুন। শুয়েছিলো, উঠে বসলী মাহমুদ।

    ওর দিকে ভালো করে তাকাতে সাহস হলো না ডলির। গত রাতের কথা মনে হতে অকারণে আরক্ত হলো সে। টিয়ে রঙের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে সামনের কৌটিতে বসে পড়লে ডলি। পরনে তার হলদে ডোরা কাটা শাড়ি। গায়ে সিফনের ব্লাউজ। চুলগুলো সুন্দর বেণি করা। কপালে চন্দনের একটা ছোট্ট ফোটা আর কানে একজোড়া সাদা পাথরের ট। ডলিকে বেশ লাগছিলো দেখতে।

    বার কয়েক ইতস্তত করে ওর দিকে না তাকিয়েই ডলি জিজ্ঞেস করলো, বজলের আসার কথা ছিলো, ও কি এসেছিলো এখানে?

    বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওপাশের বড় জানালাটা খুলে দিলো মাহমুদ, তারপর বললো, এসেছিলো, আপনাকে বসতে বলে গেছে।

    ডলি হতাশ হলো। আসবে তো বলে গেছে, কিন্তু কখন আসবে তার কি কোন ঠিক আছে। এতক্ষণ কি করে এখানে অপেক্ষা করবে ডলি?

    দুজনে চুপ করে ছিলো।

    মাহমুদ নীরবতা ভেঙ্গে একটু পরে বললো, শহরের কোন খবর জানেন?

    ডলি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলো না। পরে বুঝতে পেরে বললো, না। কিছু জানে না সে।

    মাহমুদ বললো, ইউনিভার্সিটি থেকে কয়েকশ ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে। ডলি চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। কার কাছ থেকে শুনলেন?

    কণ্ঠস্বরে ওর ব্যগ্রতা দেখে একটু অবাক না হয়ে পারলো না মাহমুদ।

    বললো, সারা শহর জানে আর আপনি জানেন না?

    এ কথার পর চুপ করে গেলোডলি। আর কোন প্রশ্ন তাকে করলো না। মাহমুদ লক্ষ্য করলো ডলি যেন বড় বেশি গম্ভীর হয়ে গেছে। কিছু ভাবছে সে, কিন্তু অত গভীরভাবে কি ভাবতে পারে ডলি?

    একটু পরে ডলি জিজ্ঞেস করলো, কেন গ্রেপ্তার করা হলে ওদের?

    মাহমুদ না হেসে পারলো না। হেসে বললো, বড় বোকার মত প্রশ্ন করলেন আপনি, বিনে কারণে কি ওদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওরা আইন অমান্য করেছিলো। ক্ষণকাল থেকে মাহমুদ আবার বললো, ওদের নেতা কি যেন নাম ছেলেটার, হ্যাঁ, মুনিম, একে নিশ্চয় চিনেন আপনি? ডলি চমকে উঠে বললো, কই নাতো, আপনি কার কাছে শুনলেন? মাহমুদ মৃদু হেসে বললো, বজলের বন্ধু কিনা, তাই ভাবলাম সে ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে।

    ডলি মাটিতে চোখজোড়া নাবিয়ে রেখে ঈষৎ ঘাড় নাড়লো, না বজলে ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয় নি ডলির।

    আলোচনার ধারাটা হয়তো অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেবার জন্যেই একটু পরে ডলি জিজ্ঞেম করলো, উনি কোথায়, ওনাকে দেখছি না যে

    মাহমুদ বুঝতে না পেরে বললো, কার কথা বলছেন?

    ডলি অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে বললো, কেন আপনার ওয়াইফ।

    ওয়াইফ মাহমুদ যেন চিৎকার করে উঠলো, আমার ওয়াইফ?

    তারপর হো হো করে হেসে উঠে বললো। ও সাহানার কথা বলছেন?

    কে বলেছে ও আমার ওয়াইফ, ও নিজে বুঝি?

    ডলি ঘাড় নেড়ে বললো, না, অন্যের কৃছিথেকে শুনেছি।

    কে সে?

    বজলে।

    বজলে? মাহমুদ আবার শব্দ করে হেসে উঠলো। তাহলে আপনি ভুল শুনেছেন। সাহানা আমার বোন। বলে হঠাৎ কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলো সে।

    ডলির ভালো লাগলো না। সব কিছু যেন কেমন অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিলো তার কাছে।

    খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে এক সময় উঠে দাঁড়ালো সে।

    মাহমুদ সচকিত হয়ে বললো, একি আপনি চললেন নাকি?

    ডলি ওর দিকে না তাকিয়েই বললো, বজলে এলে বলবেন, শরীরটা আমার খুব ভালো লাগছিলো না তাই চলে গেলাম।

    আচ্ছা তাই বলবো। ও চলে যেতে চাওয়ায় যেন স্বস্তি পেলো। কে জানে, সাহানা সম্পর্কে যদি আরো কিছু জিজ্ঞেস করে বসতো? ডলি চলে গেলে একটা সিগারেট ধরিয়ে মনে মনে বজলেকে গালাগালি দিলো মাহমুদ। আস্ত একটা ইডিয়ট। তারপর গুনগুন করে একটা ইংরেজি গানের কলি ভাজতে লাগলো সে। একটু পরে তাকেও বেরুতে হবে বাইরে।

  • সাত

    সাত

    সারারাত এক লহমার জন্যে ঘুমোল না ওরা।

    মেডিকেল হোস্টেল, মুসলিম হল, চামেলী হাউস, ইডেন হোস্টেল, ফজলুল হক হল, সতর্ক প্রহরীর মত সারারাত জেগে রইল ওরা।

    কেউবা জটলা বেঁধে কোরাসে গান গাইলো, ভুলবো না, ভুলবো না, একুশে ফেব্রুয়ারি।

    কেউ গাইলো, দেশ হামারা।

    ফজলুল হক হলটাকে বাইরে থেকে দেখতে মোঘল আমলের দুর্গতদের মত মনে হয়। আস্তরবিহীন ইটের দেয়ালগুলো রক্তের মত লাল।

    তিনতলা দালানটা চৌকোণণা, মাঝখানে দুর্বাঘাস পাতা প্রশস্ত মাঠ।

    দুপাশে বাগান।

    মাঠের ওপর ছেলেরা কাগজের স্মৃতিস্তম্ভ গড়তে বসলো। বাঁশের কঞ্চি এলো। কাগজ এালো। রঙ তুলি সব কিছু নিয়ে কাজে লেগে গেলো ওরা। অদূরে কালো পতাকা আর কালো ব্যাজ বানাতে বসলো আরেক দল ছেলে। ঘন অন্ধকারে ছায়ার মত মনে হলো ওদের।

    তিনতলা থেকে কে একজন ডেকে বললো, একটু অপেক্ষা করো, আমরা আসছি।

    অপেক্ষা করার সময় নেই, নিচে থেকে কবি রসুল জবাব দিলো।

    রাতারাতি শেষ করতে হবে সব। তোমরা তাড়াতাড়ি এসো।

    আরেকজন বললো, আসতে আঠার টিনটা নিয়ে এসো মাহের।

    এমনি, আরো একটা রাত এসেছিলো বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে।

    পরিকল্পনাটা প্রথমে আলীম ভাই-এর মাথায় এসেছিলো।

    রাতারাতি একটা স্মৃতিস্তম্ভ গড়বে আমরা।

    চমৎকার। শুনে সায় দিয়েছিলো সবাই।

    মেডিকেল হোস্টেলের চারপাশে তখন জমাট নিস্তব্ধতা। রাস্তায় গাড়ি ঘোড়ার চলাচল নেই। আকাশমুখী গাছগুলো কুয়াশার ভারে আনত।

    একে একে ছেলেরা সবাই বেরিয়ে এলে ব্যারাক ছেড়ে।

    প্রথমে একটা জায়গা ঠিক করে নিলো ওরা।

    শহীদ রফিকের গুলিবিদ্ধ খুলিটা চরকীর মত ঘুরতে ঘুরতে যেখানে এসে ছিটকে পড়েছিলো, যেখানে দাঁড়িয়ে বরকত তার জীবনের শেষ কথাটা উচ্চারণ করেছিলো, ঠিক হলো সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ গড়বে ওরা।

    সেখান থেকে প্রায় তিনশ’ গজ দূরে, মেডিকেল কলেজের একটা বাড়তি ঘর তোলার জন্যে ইট রাখা হয়েছিলো স্তুপ করে। এই তিনশ’ গজ পথ সার বেঁধে দাঁড়াল ছেলেরা। তারপর হাতে হাতে, এক ঘণ্টার মধ্যে চার হাজার ইট সেখান থেকে বয়ে নিয়ে এলো ওরা। স্টোর রুমের তালা খুলে তিন বস্তা সিমেন্ট বের করা হলো। দু’জন গিয়েছিলো রাজমিস্ত্ৰী আনতে। চকবাজারে। সেই শীতের রাতে অনেক তালাশ করে মিস্ত্রী নিয়ে ফিরে এলো ওরা।

    সারারাত কাজ চললো।

    পরদিন সমস্ত দেশ অবাক হয়ে শুনলো সে খবর।

    তারপর।

    তারও দিন চারেক পরে আরো একটা খুব শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় হলো সবাই। সরকারের মিলিটারি এসে স্মৃতিস্তম্ভটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে গেছে।

    কিন্তু, ছেলেরা দমেনি। ধুলোয় মেশানো ইটের পাঁজরগুলোকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলো ওরা। কয়েকটা গন্ধরাজ আর গাঁদা ফুলের চারা লাগিয়ে দিয়েছিলো ভেতরে।

    এসব তিন বছর আগের কথা।

    সে রাতে মেডিকেলের ছেলেরা কাপড় দিয়ে কঞ্চির ঘেরটা ঢেকে নিলো সযত্নে। বাগান থেকে ফুল তুলে এনে অজস্ৰ ফুলে ভরিয়ে দিলো বেদী।

    তারপর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গান গাইলো ওরা, শহীদের খুন ভুলবো না।

    বরকতের খুন ভুলবো না।

    কাগজ দিয়ে গড়া স্মৃতিস্তম্ভের কাজ শেষ হলে পরে ছেলেরা অনেকে কবি রসুলের রুমে বিশ্রাম নিতে এলো। রাহাত আর মাহের হাত-পা ধুয়ে ধপ করে শুয়ে পড়লো বিছানার ওপর। উঃ এই শীতের ভেতরেও গায়ে ঘাম বেরিয়ে গেছে। রাহাত ই তুললো।

    মাহের বললো, একটা সিগারেট খাওয়ানা রসুল ভাই। আছে?

    না, নেই। কম্বলের ভেতর থেকে মুখ বের করে জবাব দিলো রসুল।

    বিকেল থেকে শরীরটা জ্বর জ্বর করছিলো ওর। এখন আরো বেড়েছে। কিন্তু সেটা ও জানতে দেয় নি কাউকে। ওর ভয়, যদি জ্বরের খবরটা সবাই জেনে যায় তাহলে ঘর ছেড়ে এক পাও বাইরে বেরুতে দেবে না ওকে। উহ! এমন দিনেও কেউ ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে পারে।

    নড়েচড়ে শুতে গিয়ে ওর গায়ে হাত লাগতে রাহাত চমকে উঠলো।

    একি রসুল ভাই, তোমার জ্বর এসেছে।

    এই সামান্য জ্বর।

    ইস! গা দেখছি পুড়ে যাচ্ছে, আর তুমি বলছে সামান্য। রাহাত উঠে বসে কম্বলটা ভাল করে গায়ে জড়িয়ে দিল ওর।

    মাহের বললো, আমি ঘুম দিলাম রাহাত। ভোর রাতে ব্লাক ফ্ল্যাগ তোলার সময় আমায় জাগিয়ে দিয়ে।

    এখন আবার ঘুমোবো কি? রাহাত কোন উত্তর দেবার আগে আরেকজন বললো। একটু পরেই পতাকা তোলার সময় হয়ে যাবে। তারচে’ এসে গল্প করি।

    সেই ভালো। মাহের উঠে বসলো, কিন্তু একটু ধুয়ো না পেলে জমছে না। আছে নাকি কারো কাছে, থাকলে এক-আধটা দাও।

    আহ, তুমি জ্বালিয়ে মারলে। কে একজন বলে উঠলো, নাও টানো।

    সিগারেটটা ধরিয়ে একটা তৃপ্তির টান দিলো মাহের। তারপর একটা গল্প বলতে শুরু করলো সে।

     

    ঘড়িতে এলাৰ্ম দিয়ে রেখেছিলো সালমা। এলাৰ্মের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল ওর। গায়ের ওপর থেকে লেপটা সরিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসলো।

    বাতিটা জ্বালিয়ে কলগগাড়া থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এলো। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘন চুলগুলোর মধ্যে মৃদু চিরুনি বুলিয়ে নিলো সালমা। খাটের তলা থেকে স্টোভটা টেনে নিয়ে আগুন ধরালো। ঠাণ্ডায় হাত-পা কাঁপছিলো। আগুনের পাশে বসে গা-টা একটু গরম করে নিলে সে। তারপর চায়ের কেতলিটা আগুনে তুলে দিয়ে আসাদকে ডাকতে গেলো।

    দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতে বড় সঙ্কোচ হচ্ছিলো সালমার। দরজা খুলে দেখলো, কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে আসাদ। বালিশের ওপর থেকে মাথাটা গড়িয়ে পড়েছে বিছানার ওপর। চোখে তার গাঢ় ঘুম কি নাম ধরে ডাকবে, সালমা ভাবলো । আসাদ সাহেব, না আসাদ ভাই।

    অবশেষে ডাকলো, এই শুনছেন। চারটা বেজে গেছে, শুনছেন?

    শোনার কোন লক্ষণ দেখা গেল না।

    সালমা ভাবলো শাহেদকে দিয়ে জাগাবে ওকে। কিন্তু এতো রাতে শাহেদকে জাগানো বিপদ। যেমন রগচটা ছেলে, রেগে গিয়ে আবার একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে।

    সালমা আবার ডাকলো, এই যে, শুনছেন। চারটে বেজে গেছে।

    শুনছেন?

    আহ্ কি হচ্ছে এই রাতের বেলা। সহসা রেগে গেলো আসাদ। তার চোখেমুখে বিরক্তি।

    ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শুলো সে।

    সালমা মুখ টিপে হাসলো ।

    আচ্ছা বিপদ তো লোকটাকে নিয়ে। এই যে শুনছেন? কাঁধের পাশে জোরে একটা ধাক্কা দিলো সালমা।

    ধড়ফড় করে এবার বসলো আসাদ। কি ব্যাপার ক’টা বাজে।

    চারটা। সালমা ঈষৎ ঘাড় নেড়ে বললো, আপনি তো বেশ ঘুমোতে পারেন? উঠুন, চটপট হাত-মুখ ধুয়ে নিন। আমি যাই চায়ের পানিটা নামই গিয়ে।

    কেমন? মিষ্টি করে হাসলো সালমা ।

    যান, আমি আসছি। আসাদের চোখেমুখে তখনও ঘুমের অবসাদ। জড়ানো গলায়। বললো, উত্ কি শীত। হাত-পা সব ঠকঠক করে কাঁপছে।

    চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিন। নইলে ঠাণ্ডা লাগবে। যাবার সময় বলে গেলো সালমা।

    ঘুমে তখনো চোখজোড়া বার বার জড়িয়ে আসতে চাইলো তার। তবু চাদরটা গায়ে টেনে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো আসাদ। চটিজোড়া খাটের তলা থেকে বের করে নিয়ে পরলো।

    বারান্দায় বালতি ভরা পানি ছিলো।

    পানিতে হাত দিতে গিয়ে ঠাণ্ডায় শিউরে উঠলো সে।

    উত্তর থেকে আসা ঈষৎ ভেজা বাতাস দেয়ালের গায়ে প্রতিহত হয়ে অদ্ভুত একটা শব্দের সৃষ্টি করছে। সে শব্দ অনেকটা যেন হাহাকারের মতো শোনাচ্ছে কানে।

    ও ঘর থেকে সালমা শুধালো, আপনার হাত-মুখ ধোঁয়া হলো আসাদ সাহেব? এইতো হলো।

    ঘরের মধ্যে আর কোন আলো নাই। অন্ধকারে শুধু স্টোভটা জ্বলছে, মাঝখানে। তার পাশে বসে স্থির চোখে কেতলিটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সালমা। দেয়ালে বড় হয়ে একটা ছায়া পড়েছে তার। দোরগোড়ায় মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ালো আসাদ। হঠাৎ দেয়ালের ছায়াটাকে অদ্ভুত সুন্দর বলে মনে হলো ওর।

    নিঃশব্দে স্টোটার কাছে এসে বসলো আসাদ।

    আপনার কি খুব শীত লাগছে? এক সময় আস্তে করে সালমা শুধালো।

    স্টোভের আরো একটু কাছে সরে এসে আসাদ বললো, সত্যি ভীষণ শীত পড়েছে। হাতজোড়া বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে দেখুনা বলে হাত দুটো ওর দিকে এগিয়ে দিলো আসাদ।

    অন্ধকারে মৃদু হাসলো সালমা হাত বাড়িয়ে ওর হাতের তাপ অনুভব করতে গেলে হাতজোড়া মুঠোর মধ্যে আলতো ধরে রাখলো আসাদ।

    সালমা শিউরে উঠলো।

    প্রথমে রীতিমত ঘাবড়ে গেলো সে। ঈষৎ বিস্মিত হলো।

    তারপর চুপচাপ মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইলো জ্বলন্ত স্টোভের দিকে। বুকটা দুরু দুরু কাঁপছে তার। এই শীতের ভেতরেও মনে হলো সে যেন ঘামতে শুরু করেছে। কয়েকটি মুহূর্ত, বেশ ভালো লাগলো সালমার।

    সে ওর মুখের দিকে তাকাবার সাহস পেলো না। হাতজোড়া টেনে নেবার কোন চেষ্টা করলো না। শুধু আধফোটা স্বরে বললো, পানি গরম হয়ে গেছে। বলতে গিয়ে গলাটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো।

    তারপর এক সময় আস্তে হাতজোড়া টেনে নিলো সালমা।

    নিঃশব্দে চা তৈরি করতে লাগলো সে।

    চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ।

    আসাদ বললো, আমার কাপের চিনি একটু কম করে দেবেন।

    সালমার মনে হলো আসাদের গলাটাও যেন কাঁপছে। যেন একটু আড়ষ্ট আর জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর।

    অন্ধকারে বার কয়েক ওর শক্ত সবল হাতজোড়ার দিকে তাকালো সালমা। না। রওশন তার হারানো হাত দুটো কোনদিনও ফিরে পাবে না। একটা অশান্ত দীর্ঘশ্বাস বাতাসে শিহরণ জাগিয়ে গেলো।

    অনেকক্ষণ নীরবে চায়ের পেয়ালায় চুকুম দিলো ওরা। মিছিল, শোভাযাত্রা, ধর্মঘট, মুহূর্তের জন্য সবকিছু অনেক দূরে সরে গেলো।

    তারপর।

    তারও অনেক পরে।

    আগে থেকে রিক্সা ঠিক করা ছিলো, দোরগোড়ায় তার ডাক শোনা গেলো। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আসাদ বললো, কাপড় পরে নিন, সময় হয়ে গেছে।

    সালমা অস্ফুট স্বরে কি যে বললো, বোঝা গেলো না।

    বাইরে কনকনে শীত।

    রিক্সায় এসে চুপচাপ বসলো ওরা।

    সালমাকে মেয়েদের হোস্টেলে পৌছে দিয়ে আসাদ তখন ছেলেদের ব্যারাকে এসে। ঢুকলো। ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ টাইফুনের শব্দে স্লোগানের তরঙ্গ জেগে উঠলো চারদিকে। অন্ধকারের বুক চিরে ধ্বনির বজ্ৰ ইথারে কাপন সৃষ্টি করলো।

    মুসলিম হল, নূরপুর ভিলা, চামেলী হাউস, ফজলুল হক হল, বান্ধব কুটির, মেডিকেল হোস্টেল, ঢাকা হল যেন হুঙ্কার দিয়ে উঠলো এক সাথে। সে শব্দ তরঙ্গে অভিভূত হয়ে কে একজন ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো, বিদ্ৰোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে।

    ছেলেরা তখন কালো পতাকা উত্তোলন করছিলো।

    সরু সিঁড়িটা বেয়ে ছাদের উপর উঠে এলো একদল ছেলে। মুনিম জিজ্ঞেস করলো, মই এনেছ তো?

    দেখো মইটা খুব মজবুত নয়। সাবধানে উঠো; কালো পতাকাটা উড়িয়ে দাও।

    পতাকাটা উড়িয়ে দেয়া হলে পর বেশ কিছুক্ষণ ধরে স্লোগান দিলো ওরা। তারপর কেউ কেউ নিচে নেবে গেলো। আর কয়েকজন ছাদের ওপর পায়চারী করতে লাগলো নিঃশব্দে।

    একপাশে, যেখানে কার্নিশটা বেশ চওড়া, সেখানে এসে বসলো মুনিম। কুয়াশা ছাওয়া আকাশে তখন তারারা নিভতে শুরু করেছে একটা একটা করে। রমনার আকাশে ধলপহর দিচ্ছে। মৃদু উত্তরা বাতাসে শীতের শেষ সুর। দু’একটা পাখি শাল, দেবদারু গাছের ফাঁকে কিচিরমিচির করে ডাকছে।

    কার্নিশের উপর থেকে দেখলো মুনিম। তিন লরী পুলিশ এসে নাবলো মুসলিম হলের গেটে। সাথে একটা জীপ। জীপ থেকে নাবলেন পুলিশ অফিসাররা। গাব্ৰাগোট্টা চেহারা। চোখগুলো লাল শাল।

    গেটটা বন্ধ ছিলো বলে বাইরে দাঁড়াতে হলে ওদের । দারওয়ানকে ডাকলো, কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেলো না। ফ্লাগ ষ্ট্যাণ্ড কালো পতাকাটা পত পত করে উড়ছিলো। সে দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষলো ওরা। ছেলেরা তখন শ্লোগান দিতে শুরু করেছে। দমন নীতি চলবে না। ছাদের উপর থেকে দ্রুত নিচে নেবে এলো মুনিম।

    একটা ছেলে ওকে দেখতে পেয়ে বললো, আপনি ওদিকে যাবেন না মুনিম ভাই । আপনি পেছনে থাকুন।

    আরেকটি ছেলে হাত ধরে পেছনের দিক টেনে নিয়ে গেলো তাকে।

    খবরটা পেয়ে ইতিমধ্যে প্রভোষ্ট সাহেব এসে হাজির। মোটাসোটা দেহটা নিয়ে রীতিমতো হাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি, বুকটা দুরু দুরু করছিলো। শুকনো ঠোঁটজোড়া নেড়ে বারবার বিড়বিড় করছিলেন তিনি, কি আপদ, কি আপদ।

    তাঁকে দেখে দারওয়ান সালাম ঠুকে গেট খুলে দিলো। গেট খুলতে পুলিশ অফিসাররা হুড়মুড় করে ঢুকতে যাচ্ছিলো, ছেলেরা চিৎকার করে উঠলো, আপনারা ভেতরে ঢুকবেন না বলছি।

    আহাহা কি হয়েছে, কি হয়েছে। হাত-পা নেড়ে একবার পুলিশ অফিসারদের দিকে আরেকবার ছাত্রদের দিকে তাকালেন তিনি।

    গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, তাঁর দেহটা কাঁপছে।

    ছেলেরা বললো, ওদের বাইরে দাঁড়াতে বলুন স্যার, ভেতরে এলে ভালো হবে না।

    আহাহা, আপনারা ভিতরে আসছেন কেন, বাইরে দাঁড়ান একটু।

    প্রভোষ্ট সাহেবের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে গেটের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো পুলিশ অফিসাররা।

    ছেলেদের সঙ্গে এরপর কিছুক্ষণ বচসা হলো প্রভোষ্ট সাহেবের। প্রভোষ্ট সাহেব বললেন, কি আপদ, কালো পতাকাটা এবার নাবিয়ে ফেললেই তো পারো তোমরা। নাবিয়ে ফেলো না।

    বাজে অনুরোধ আমাদের করবেন না স্যার। নাবাবার জন্যে ওটা তুলি নি। ছেলেরা একস্বরে বলে উঠলো। নিরাশ হয়ে বার কয়েক মাথা চুলকালেন প্রভোষ্ট সাহেব। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, কি আপদ, কি আপদ।

    পুলিশ অফিসারগুলোর ধৈর্যচ্যুতি ঘটছিলো। তাই হুড়মুড় করে আরেক প্রস্থ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে তারা। ছেলেরা এগিয়ে এসে বাধা দিলো। আমরা ঢুকতে দিবো না বলছি, দেবো না।

    তবু খাকি পোষাক পরা অফিসারদের সামনে এগুতে দেখে পরক্ষণে অপরিসর বারান্দাটার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লা ওরা। তারপর চিৎকার করে বললো, যেতে হলে বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যাও, এমনিতে যেতে দেবো না আমরা।

    পুলিশ অফিসারগুলো পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো। একজন অফিসার আরেকজনের কানে ফিসফিসিয়ে বললো, আমাদের অত কোমল হলে চলবে কেন স্যার, শুনলে কিউ. খান সাহেব বরখাস্ত করে দেবেন আমাদের। কিন্তু কেউ সাহস করলো না এগুতে।

     

    মেডিকেলে মেয়েদের হোস্টেলের বাঁ দিককার রুমটায় তিন-চারজন মেয়েকে নিয়ে বসে আলাপ করছিলো সালমা। বাইরে বারান্দায় বসে তখন কয়েকটি মেয়ে গান গাইছিলো, ওদের ভুলিতে পারি না, ভুলি নাই রে- একটু আগে কালো পতাকা তুলেছে ওরা। এখনো সেই পতাকা তোলার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলো। এমন সময়, হঠাৎ একটা বিরাট শব্দে চমকে উঠলো সালমা। বারান্দা থেকে একটি মেয়ে চিৎকার করে বললো, পুলিশ।

    কোথায়? সালমা ছিটকে বেরিয়ে এলো বারান্দায়।

    মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেখালো ওই দেখো।

    সালমা চেয়ে দেখলো পুলিশ বটে। ছাত্রদের ব্যারাক ঘেরাও করেছে ওরা। সামনে দাড়িয়ে কিউ, খান নিজে। রাতে বড় কর্তার পাল্লায় পড়ে মাত্রাতিরিক্ত টেনেছে। তার আমেজ এখনো যায় নি। মাথাটা এখনো ভার ভার লাগছে। চোখজোড়া জবা ফুলের মত লাল টকটকে।

    মেডিকেল ব্যারাকের গেটটা পেরুতে কালো কাপড় দিয়ে ঘেরা শহীদ বেদীটা চোখে পড়লে কিউ, খানের। লাল চোখে আগুন ঠিকরে বেরুলো তার। আধধ আলো-অন্ধকারে শহীদ বেদীটার দিকে তাকালে গাটা ছমছম করে ওঠে। আলকাতরার মত কালো কাপড়টা অন্ধকারকে যেন বিভীষিকাময় করে তুলেছে। আর তার ওপর যত্নে সাজিয়ে রাখা অসংখ্য ফুলের মালা হিংস্র পশুর চোখের মত জ্বলছে ধিকিধিকি করে।

    কিউ. খানের ঈশারা পেয়ে একদল পুলিশ অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লে শহীদ বেদীটার ওপর। কঞ্চির ঘেরাটা দুহাতে উপরে অদূরে নর্দমার দিকে ছুঁড়ে মারতে লাগলো তারা। কালো কাপড়টা টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলো একপাশে। ফুলগুলো পিষে ফেললো বুটের তলায়। হঠাৎ একটা রক্ত গোলাপ মারাতে গিয়ে কিউ, খানের মনে পড়লো, যৌবনে একটি মেয়েকে এমনি একটি ফুল দিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিলো সে।

    এক মুহূর্ত নীরব থেকে পিশাচের মত হেসে উঠলো কিউ, খান। হৃদয়ের কোমলতা তার মরে গেছে বহুদিন আগে।

    ছেলেরা ইতিমধ্যে ব্যারাক ছেড়ে বেড়িয়ে জমায়েত হয়েছে বাইরে।

    আর মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগান দিচ্ছে উত্তেজিত গলায়। কারো গায়ে গেঞ্জি, কারো লুঙ্গি ছাড়া আর কিছুই নেই পরনে। কেউ কেউ গায়ে কম্বল চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েছে বাইরে। সকলে উত্তেজিত। ক্রোধে আর ঘৃণায় হাত-পাগুলো ছিলো। যেন পুলিশগুলোকে হাতের মুঠোয় পেলে এক্ষুণি পিষে ফেলবে ওরা।

    হঠাৎ কিউ. খানের বন্য গলায় আওয়াজ শোনা গেলো চার্জ।

    মুহূর্তে পুলিশগুলো ঝাঁপিয়ে পড়লো ছাত্রদের উপর।

    ওসমান খান সীমান্তের ছেলে। ভয় কাকে বলে জানে না সে। ছাত্রদের বেপরোয়া মারতে দেখে সে আর স্থির থাকতে পারলো না। বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে পুলিশের মাঝখানে। ইয়ে সব কায় হোতা হ্যায়, হামলোগ ইনসান নাহি হ্যায়? দুজন পুলিশকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে গড়িয়ে পড়লো ওসমান খান। ছেলেরা সব পালাচ্ছিলো, ওসমান খান চিৎকার করে ডাকলো ওদের, আরে ভাগতা হায় কিউ। ক্যায়া হামলোগ ইনসান নাহি হ্যায়? কিন্তু পরক্ষণে একজন লালমুখে ইন্সপেক্টর ছুটে এসে গলাটা টিপে ধরলো তার। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিলো ওসমান খানের মুখের ওপরে। প্রথম কয়েকটা ঘুষি কোন রকমে সয়ে নিয়েছিলো সে।

    তারপর হুঁশ হারিয়ে টলে পড়লো মাটিতে।

    রশীদ চৌধুরী এতক্ষণ লেপের তলায় ঘুমোচ্ছিলো। এসব হট্টগোল আর স্লোগান দেয়া ওর ভাল লাগে না। যারা এসব করে তাদের দুচোখে দেখতে পারে না সে ও জানে শুধু দুটো কাজ। এক হলো সিনেমা দেখা আর দুই হলো সারারাত জেগে ফ্লাশ খেলা। এ দুটো নিয়ে মশগুল থাকে সে।

    বাইরে হট্টগোল শুনে ব্যাপার কি দেখার জন্যে দরজা দিয়ে উঁকি মারছিলো সে। অমনি একটা পুলিশ হাতের ব্যাট দিয়ে তো মারলো ওর মুখের ওপর। অস্ফুট আর্তনাদ করে দরজাটা বন্ধ করে দিতে চাইছিলো রশীদ চৌধুরী। ধাক্কা মেরে দরজাটা খুলেই পুলিশটা ওর গেঞ্জি চেপে ধরলো। ভাগতে হে কাঁহা, চালিয়ে।

    রশীদ চৌধুরী বলির পাঠার মত কাঁপতে লাগলো, আমি কিছু করি নি।

    আরে-আরে এ কি হচ্ছে? খামোস–ভয়ঙ্কর স্বরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো পুলিশটা।

    রশীদ চৌধুরী আবার তাকে বোঝাতে চাইলে যে, সে নির্দোষ। আমি কিছু করি নি, কসম খোদার বলছি। কিন্তু এতে কোন ফল লাভ হলো না দেখে এবার রীতিমত গরম হয়ে উঠলো রশীদ চৌধুরী। চিৎকার করে সে তার বন্ধুদের ডাকলো। ভাইসব- তারপর স্লোগান দিতে লাগলো উত্তেজিত গলায়।

  • ছয়

    ছয়

    সদরঘাটের মোড়ে কবি রসুলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো লেখক বজলে হোসেনের। পরনে একটা ট্রপিক্যাল প্যান্ট, গায়ে লিলেনের সার্ট পায়ে একজোড়া সদ্য পালিশ করা চকচকে জুতো। লেখক বজলে হোসেন যান্ত্রিক প্রর্সি ছড়িয়ে বললো, আরে রসুল যে, কি খবর, কোথায় যাচ্ছো?

    রসুল বললো, এখানে এক দর্জির দোকানে কিছু কালো কাপড় সেলাই করতে দিয়েছিলাম। নিতে এসেছি। তুমি কোথায় চলছে?

    আমি? আমার ঠিকানা আছে নাকি। বেরিয়েছি, কোথাও একটু আড্ডা মারা যায় কিনা সেই খোজে। এসোনা রিভারভিউতে বসে এক কাপ চা খেতে খেতে গল্প করা যাবে।

    চা আমি পাব না, রোজা রেখেছি। গভীর গলায় জবাব দিলো রসুল।

    তারপর ওর জুতো জোড়ার দিকে টমট করে তাকালে সে।

    বজলে ভ্রূ কুঁচকে বললো, রোজা আবার কেন? যতদূর জানি এটা তো রোজার মাস নয়। পরক্ষণে বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। ও হ্যা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে, তাই না? বলে শব্দ করে হেসে উঠলো সে। কিন্তু পর মুহূর্তে কবি রসুলের রক্তলাল চোখ জোড়ার দিকে দৃষ্টি পড়তে মুখটা পাশুটে হয়ে গেলো তার। ভয়ে ভয়ে বললো, কি ব্যাপার, অমন করে তাকিয়ে রয়েছে কেন, কি ভাবছে?

    তোমার ধৃষ্টতারও একটা সীমা থাকা উচিত।

    ওর কথা শুনে মুখটা কালো হয়ে গেলো বজলে হোসেনের।

    কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো, দেখ রসুল, আমরা হলাম সাহিত্যিক। সমাজের আর দশটা লোক, মিছিল কি শোভাযাত্রা বের করে, পুলিশের লাঠি গুলি খেয়ে প্রাণ দিলে কিছু এসে যায় না। কিন্তু আমাদের মৃত্যু মানে দেশের এক একটা প্রতিভার মৃত্যু। নিজের জ্ঞানগর্ভ ভাষণে অশেষ তৃপ্তি বোধ করলো বজলে হোসেন।

    ওর কথাটা শুনে সমস্ত দেহটা জ্বালা করে উঠলো কবি রসুলের। আশ্চর্যভাবে রাগটা সামলে নিয়ে বললো, রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে এ নিয়ে তোমার সঙ্গে আমি তর্ক করতে চাই নে বজলে। আমার এখন কাজ আছে।

    আমারও অনেক কাজ, বলে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না বজলে, চায়ের নেশা পেয়েছে ওর। রিভারভিউতে যাবে।

    রিভারভিউতে বসে এক কাপ চা আর একটা চপ খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লে সে। ডলির সঙ্গে এনগেজমেন্ট আছে। ভাবতে এখনো অবাক লাগে বজলের, কাল হঠাৎ এমন অপ্রত্যাশিতভাবে ডলি ওর কাছে ধরা দিলো কেন? একি ওর ক্ষণিক দুর্বলতা না বজলেকে সে অনেক আগে থেকে ভালবাসতো? হয়তো কোনটা সত্য নয়। হয়তো প্রথমটা সত্য। কাল রাতে সিনেমা দেখে ফেরার পথে ডলি যেন বড় বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। ঈষৎ কাত হয়ে মাথাটা রেখেছিলো ওর কাঁধের ওপর।

    বজলে ওকে আলিঙ্গন করতে চাইলে ডলি বাধা দিয়ে বলেছিলো, না।

    এখন আমায় এমনি থাকতে দাও বজলে।

    খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলো, কাল যদি তোমাকে ডাকি। বেড়াতে বেরুবে তো আমার সঙ্গে?

    একটু ভেবে নিয়ে ডলি জবাব দিয়েছিলো, হ্যাঁ, বেরুবো, বিকেলে যদি পারো বাসায় এসো।

    বাসায় এসে বজলে দেখলো ডলি আগে থেকে সেজেওজে বসে আছে।

    পরনে একটা মেরুন রঙের শাড়ি। গায়ে একটি সাদা ব্লাউজ। চুলে আজ খোঁপা বাঁধে নি ডলি, বিনুনী করে ছেড়ে দিয়েছে পিঠের উপর।

    বজলেকে দেখে মৃদু হাসলো ডলি।

    বজলে বললো, তুমি দেখছি তৈরি হয়ে বসে আছ। চলো।

    ডলি বললো, চা খাবে না?

    ও বজলে বললো, খাবো, তবে ঘরে নয় বাইরে।

    রাস্তায় নেমে ডলি জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবে?

    হাতের ইশারায় একখানা রিক্সা থামিয়ে জবাব দিলো, একবার রিক্সায় ওঠা যাক তো। তারপর দেখা যাবে।

    রিক্সায় উঠে কিছুক্ষণ লক্ষ্যবিহীন ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালো লাগলো ওদের। রেস্তোরাঁয় বসে দুকাপ কফি আর কিছু প্যাস্ট্রি খেলো।

    বজলে সিনেমা দেখার পক্ষে ছিলো। ডলি নিষেধ করলো, রোজ সিনেমা দেখতে ভাল লাগেনা ওর। তার চেয়ে শহরতলীতে কোথাও বেড়াতে গেলে মন্দ হয় না।

    বজলে বললো, দি আইডিয়া। চলে যাওয়া যাক।

    ডলি বললো, চলো।

    খানিকক্ষণ পর বজলে আবার বললো, সন্ধের পর মাহমুদের ওখানে যাবার কথা আছে।

    তুমি যাবে তো?

    ডলি বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিলো, আমি কেন ওর ওখানে যাবো?

    বজলে ওর একখানা হাত ধরে নরম গলায় বললো, ওখানে কেউ থাকবে না ডলি।

    আমরা নিরিবিলিতে গল্প করবো।

    ডলি ঈষৎ লাল হয়ে বললো, না।

     

    বিকেলে চা খেতে বসে শাহেদ প্রশ্ন করলো, কাল রাতে আমার বিছানায় যে শুয়েছিলো, লোকটা কে-রে আপা?

    আসাদ সাহেব। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।

    তোমাদের দলের লোক বুঝি?

    না।

    ইস, না বললেই হলো। আমি দেখলে চিনি নে যেন।

    চিনেছে, ভাল করেছে। এখন চুপ করো।

    কেন চুপ করবো? শাহেদ রেগে উঠলো। লোকটার জ্বালায় কাল রাতে একটুও ঘুমোতে পেরেছি নাকি? ঘুমের ভেতর অমন হাত-পা নাড়তে আমি জন্মেও দেখি নি কাউকে। মাঝ রাতে ইচ্ছে করছিলো জানালা গলিয়ে, বাইরে ফেলে দিই লোকটাকে।

    ওর কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠলো সালমা।

    শাহেদ বললো, তুই হাসছিস? আমার যা অবস্থা হয়েছিলো তখন, শুধু কি হাত-পা ঘূছিলো লোকটা? ঘুমের ঘোরে কি যেন সব বলছিলো বিড় বিড় করে। আর মাঝে মাঝে চিঙ্কার উঠছিলো, উত্ কেমন করে যে রাতটা কেটেছে আমার।

    হাসতে গিয়ে মুখে আঁচল দিলো সালমা। বললো, দাঁড়াও না, আজ রাতেও তোমার ওখানে থাকবে সে।

    আজকেও থাকবে বুঝি? চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শাহেদ। তুই কি আমায় ঘর থেকে তাড়াতে চাস আপা।

    কেন, তোমার যদি ওখানে ঘুম না আসে তাহলে আলাদা বিছানা করে দেবো সেখানে থেকো।

    তাহলে তাই করে দিস। শাহেদ শান্ত হলো।

    ওর মাথার চুলগুলোর মধ্যে হাত বুলিয়ে দিয়ে সালমা একটু পরে জিজ্ঞেস করলো, হ্যাঁরে, আমার কোন চিঠিপত্র এসেছে?

    সাহেদ সংক্ষেপে ঘার নাড়লো না।

    শুনে বিমর্ষ হয়ে গেলো সালমা। রওশনের শেষ চিঠি পেয়েছে সে অনেক দিন। এতো দেরি তো কোনবার হয় না। সালমার মনে হলে হয়তো তার অনেক অসুখ করেছে। না হলে চিঠি লিখছে না কেন?

    ভাবতে গিয়ে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো ওর।

     

    তখন না বলেও মাহমুদের ওখানে যেতে হলো ডলিকে।

    সাহানাকে নিয়ে মাহমুদ তখন বাইরে বেরুবার তোড়জোড় করছিলো।

    ওদের দেখে খুব খুশি হলো সে। বললো, তোমরা এসেছে বেশ ভাল হলো। চলো এক সঙ্গে বেরোন যাবে।

    বজলে শুধালো, কোথায় যাচ্ছ তোমরা

    মাহমুদ বললো, সাহানা যাবে ওর এক বান্ধবীর বাসায় আর আমি একটা অফিসিয়াল কাজে।

    মাহমুদকে ঈশারায় এক পাশে ডেকে নিয়ে এালো বজলে। তারপর ধমকের সুরে বললো, তুমি একটা আস্ত গবেট। ডলিকে নিয়ে এখানে এসেছি কেন এ সামান্য ব্যাপারটা বোঝ না? বলে মুচকি হাসলো সে।

    ক্ষণকাল ওর দিকে তাকিয়ে মাহমুদ কাঁধ ঝাঁকালো। মৃদু হেসে হেসে বললো, বুঝেছি। তারপর ডলির দিকে এগিয়ে গেলো সে। আপনারা এখানে বসে গল্প করুন। আমি সাহানাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসছি। বলে আড়চোখে বজলের দিকে তাকালে সে।

    ডলি ব্যস্ততার সঙ্গে বললো, আপনারা কতক্ষণে ফিরবেন?

    মাহমুদ কাঁধ আঁকিয়ে জবাব দিলো, এইতো যাব আর আসবে।

    সাহানা অকারণে হাসলো একটু।

    ডলি সে হাসির কোন অর্থ খোঁজে পেলো না।

    ওরা চলে গেলে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এলো বজলে।

    ঘরে এখন ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। এখন ইচ্ছে করলে নির্বিঘ্নে পরস্পরকে আলিঙ্গন করতে পারবে ওরা।

    ডলির পাশে এসে বসলো বজলে। তারপর দুহাতে ওকে কাছে টেনে নিলো। ডলি বিরক্তির সঙ্গে বললো, একি হচ্ছে?

    বজলে ওর কানের কাছে মুখ এনে বললো, এখন আর আমায় বাধা দিয়ো না ডলি।

    ডলি কপট হেসে বললো, এই জন্যে বুঝি আসা হয়েছে এখানে।

    বজলে বললো, হ্যাঁ, এই জন্যে। ডলিকে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করলো সে। ডলি এবার আর বাধা দিলো না।

     

    রাত আটটা বাজবার তখনো কিছু বাকি ছিলো। আকাশের ক্যানভাসে সোনালি তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। কুয়াশা ঝরছে। উত্তরের হিমেল বাতাস বইছে ধীরে ধীরে।

    শাহেদের হাত ধরে ছাদে উঠে এলো সালমা।

    ছোট্ট ছাদ।

    আরো অনেকে তখন আশেপাশের ছাদে উঠে গল্প করছিলো বসে বসে। সালমা শুনলো, রাজ্জাক সাহেব তার গিন্নীকে বলছেন, দেখো আগে থেকে সাবধান করে দিচ্ছি কাল ছেলেমেয়েদের কাউকে বাইরে বেরুতে দিয়ো না। না, না, যেমন করে থোক ওদের আটকে রেখে ঘরের মধ্যে। কে জানে কাল কি হয়। হয়তো সেবারের মত গুলি চালাবে ওরা।

    শুধু রাজ্জাক সাহেব নন। সবার মুখে একটা দুশ্চিন্তার ছাপ। কাল নিশ্চয় কিছু একটা ঘটবে। কি ঘটবে কে জানে। হয়তো রক্তপাত হবে। প্রচুর রক্তপাত। সালমা শুনলো, রাজ্জাক সাহেবের গিন্নী প্রশ্ন করলেন, আর কত এসব চলবে বলতো? রাজ্জাক সাহেব জবাব দিলেন, জানি না।

    কেউ জানে না কতকাল এমনি উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে ওদের থাকতে হবে। এমনো সময় এসেছে মাঝে মাঝে, যখন মনে হয়েছে, এবার বুঝি তারা শান্তির নাগাল পেলো। কিন্তু পরক্ষণে তাদের সে ভুল ভেঙ্গে গেছে। হিংসার নখরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ওরা। হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে বলেছে, আর পারি না।

    সালমা শুনলো, রাজ্জাক সাহেব বলছেন, কতকাল চলবে সে কথা ভেবে কি হবে। তুমি ছেলেমেয়েগুলোকে কাল একটু সামলে রেখো।

    গিন্নী বললেন, রাখবো।

    আর এমনি সময় অকস্মাৎ সমস্ত শহর কাঁপিয়ে অজুতকণ্ঠের শ্লোগানের শব্দে চমকে উঠলো সবাই। যারা ঘুমিয়ে পড়েছিলো, তারা ঘুম থেকে জেগে উঠে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করলো, কি হলো, ওরা কি গুলি চালালো আবার?

    আকাশে মেঘ নেই। তবু ঝড়ের সংকেত।

    বাতাসে বেগ নেই। তবু তরঙ্গ সংঘাত।

    কণ্ঠে কণ্ঠে এক আওয়াজ, শহীদের খুন ভুলবো না। বরকতের খুন ভুলবো না।

    যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে। পৃথিবী কাঁপছে। ভূমিকম্পে চৌচির হয়ে ফেটে পড়ছে। দিগ্বিদিক।

    শুধু উত্তর নয়। দক্ষিণ নয়। পূর্ব নয়। পশ্চিম নয়। যেন সমস্ত পৃথিবী জুড়ে ছাতে ছাতে, প্রতি ছাতে বিক্ষুব্ধ ছাত্র যুবক ফেটে পড়ছে চিৎকারে, শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

    সবাই বুঝলো। বুঝতে কারো বেগ পেতে হলো না। রাস্তায় শ্লোগান দেয়া নিষেধ। মিছিল শোভাযাত্রা বেআইনী করেছে সরকার। আর তাই ঘরে ঘরে ছাতের উপরে সমবেত হয়ে শ্লোগান দিচ্ছে ওরা, ছাত্ররা। মুসলিম হল, মেডিকেল হোস্টেল, ঢাকা হল, চামেলী হাউস, ফজলুল হক হল, বান্ধব কুটির, ইডন হোস্টেল, নূরপুর ভিলা। সবাই যেন এককণ্ঠে আশ্বাস দিচ্ছে, দেশ আমার, ভয় নাই।

    সালমার হাতে একটা টান দিয়ে শাহেদ বললো, গত ইলেকশনের সময় তোরা শ্লোগান দিয়েছিলি ছাদের ওপরে দাঁড়িয়ে তাই না আপি?

    যা। সালমা সংক্ষেপে জবাব দিলো। শাহেদ বললো, কি লাভ হয়েছে তোদর। যাদের ভোট দিয়ে পাঠিয়েছিস তারা তো এখন কিছুই বলছে না।

    উত্তরে সালমা কিছু বলবে ভাবছিলো। শুনলো রাজ্জাক সাহেব তাঁর স্ত্রীকে বোঝাচ্ছেন, সবাই তো আর মীরজাফর নয়। ভাল লোকও আছে।

    আসল কথা হল, কে ভালো আর কেমন্দ সেটা যাচাই করে নেয়া, বুঝলে?

     

    অনেকক্ষণ একঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে ব্যথা করছিলো মাহমুদের। একটা চেয়ার খালি হতে তাড়াহুড়া করে বসে পড়লো সে। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলো নটা বেজে গেছে প্রায়।

    এতক্ষণ কিউ. খানের একটানা প্রলাপ শুনতে হয়েছে। বড় কর্তার ধমক খেয়ে লোকটা রেগেছে ভীষণ। এইতো একটু আগে ইন্সপেক্টারদের সবাইকে ডেকে অবস্থা জানালেন। তিনি। আমি জানতাম আপনাদের দিয়ে কিছু হবে না। আপনারা শুধু গায়ে বাতাস দিয়ে বেড়াতে পারেন।

    বড় কর্তা বললেন, কি আশ্চর্য। আপনাদের কাজের নমুনা দেখলে আমার গা জ্বালা করে ওঠে। এত কিছু ঘটে যাচ্ছে, অথচ আপনারা কিছুই করতে পারছেন না।

    একজন পুলিশ অফিসার হত কচলে বললো, আমরা কি করবো স্যার?

    ওরা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। আমরা হুকুমের দাস। আমরা কি করবো স্যার?

    আপনারা কি করবেন মানে? বড় কর্তা জঁ কুঁচকে বললেন, আপনারাই তো সব কিছু করবেন। আপনারা হচ্ছেন সাচ্চা দেশপ্রেমিক। দেশ তো আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

    বড় কর্তার কথা শুনে মাহমুদ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো তাঁর দিকে। আর ভাবছিলো, সত্যি লোকটা একটা জিনিয়াস। মানুষকে কি শ্রদ্ধার চোখেই দেখে। আমাদের প্রতি তাঁর কি গভীর মমতাবোধ। বড় কর্তা আবার বললেন, আপনারা নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছেন, গুটিকয় বিদেশের দালাল আমাদের সোনার দেশটাকে একেবারে উচ্ছনে নিয়ে যাচ্ছে। সর্বনাশ করছে আমাদের।

    তাঁর কথায় একজন অফিসার উৎসাহিত হয়ে বললো, ইয়ে হয়েছে স্যার। কি যে বলবো। যেখানে যাই, সেখানে দেখি ছেলে-ছোকরারা সব জটলা বেঁধে কি সব ফুসুফাসুর করছে। জানেন স্যার, লোফার এই খবরের কাগজের হকার বলুন, রিক্সাওয়ালা বলুন, এমন কি সরকারী কর্মচারীদের মধ্যেও কেমন একটা সন্দেহের ভাব দেখলাম। আমাদের বিরুদ্ধে কেমন যেন একটা ষড়যন্ত্র করছে ওরা।

    ওহে। দেশটা একেবারে রাষ্ট্রদ্রোহীতে ভরে গেছে। কিউ. খানের চোখে মুখে হতাশার ছাপ।

    গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো মাহমুদ।

    সাহানা এর জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে গুলিস্তানের সামনে। তাকে নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে। বজলে আর ডলি এখনো অপেক্ষা করছে।

    স্লোগান দিবার চোঙাগুলো একপাশে এনে জড়ো করে রাখলো ওরা। এতক্ষণ ছাদের ওপরে উঠে একটানা অনেকক্ষণ স্লোগান দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সবাই। এই শীতের মরশুমেও গা বেয়ে ঘাম ঝরছে। গলা ফেটে গেছে। স্বরটা ভেঙ্গে ভেঙ্গে বেরুচ্ছে গলা দিয়ে।

    মুনিম বললো, গরম পানিতে নুন দিয়ে গার্গেল কারো, ভালো হয়ে যাবে। নইলে ব্যথা করবে গলায়। কাল আর কথা বেরুবে না।

    কয়েকজন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো ওর বিছানায় এলিয়ে পড়লো।

    কেউ কেউ কাল দিনে কি ঘটতে পারে তাই নিয়ে জোর আলোচনা শুরু করলো করিডোরে। কেউ ডাইনিং হলে খেতে গেলো। খাবার টেবিলেও তর্ক-বিতর্ক আর আলোচনার শেষ নেই।

    মাঝখানের মাঠটায়, যেখানে সুন্দর ফুলগাছের সার থরে থরে সাজানো, ঘাসের উপর হাত-পা ছড়িয়ে বসলো মুনিম। অনেক চিন্তার অবসরে ডলির কথা মনে পড়লো ওর। ডলির সঙ্গে একবার দেখা হলে ভালো হতো। মুনিম ভাবলো। কিন্তু পরক্ষণে আরেক চিন্তায় ডলি হারিয়ে গেলো মন থেকে। রাত শেষে তোর হবে। আর পুলিশ এসে হয়তো ঘিরে ফেলবে পুরো হলটাকে। এমনি ঘিরেছিলো আরেকবার। বায়ান্ন সালের পঁচিশে ফেব্রুয়ারিতে। তখন এই হলটাই ছিলো আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। সেদিনের কথা ভাবতে অবাক লাগে মুনিমের। রীতিমত একটা সরকার চালাতে হয়েছিল ওদের । বজলুর পঁচিশ নম্বর রুমটা ছিলো অর্থ দপ্তরের অফিস। দোরগোড়ায় লাল কালিতে বড় বড় করে লেখা ছিলো অর্থ দপ্তর। ছেলেরা টাকা সংগ্রহের জন্যে কৌটা হাতে বেরিয়ে যেতো ভোরে ভোরে। রাস্তায় আর বাসায় বাসায় চাঁদা সংগ্রহ করে বেড়াতে ওরা। দুপুরে কৌটো ভরা আনি দুয়ানি আর টাকা এনে জমা দিতো অফিসে। আন্দোলনের যাবতীয় খরচপত্র সেখান থেকে চালানো হতো। বজলু ছিলো এই দপ্তরের কর্তা। অর্থনীতিতে খুব ঝানু ছিলো বলে ওই পদটা দেয়া হয়েছিলো ওকে। নত ছিলো ওর হেড কেরানী। কেরানীর মতই মনে হতো ওকে।

    অর্থ দপ্তরের পাশে ছিলো ইনফরমেশন ব্যুরো। ওদের কাজ ছিলো কোথায় কি ঘটছে। তার খবর সংগ্রহ করা। ভোর হতে সাইকেলে চড়ে এই ক্ষুদে গোয়েন্দার দল বেরিয়ে পড়তে শহরের পথে। কোথায় ক’জন গ্রেপ্তার হলো, কোথায় অধিক সংখ্যক পুলিশ জমায়েত হয়েছে, কোন জায়গায় এখন হামলা চলার সম্ভাবনা আছে এসব খোঁজ নিতে ওরা।

    আর কোন খোঁজ পেলে তক্ষুণি হেড অফিসে এসে খবরটা পৌঁছে দিতো। এছাড়া আরো কয়েকটা কাজ ছিলো ওদের। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় খবর আদান-প্রদান করা, সরকারী গোয়েন্দাদের ওপর নজর রাখা, আর নিজেদের মধ্যে কোন স্পাই আছে কিনা, সেখানে দৃষ্টি রাখা। ইনফরমেশন ব্যুরোর কর্মকর্তা ছিলো আরজান ভাই। বড় ধুরন্ধর ছিলো লোকটা। দুজন সরকারী গোয়েন্দাকে হলের মধ্যে ধরে কি মারটাই না দিয়েছিলো সে। ইনফরমেশন ব্যুরোর পাশে ছিলো প্রচার বিভাগের অফিস। তার পাশে খাদ্য দপ্তর। ওদের কাজ ছিলো জেলখানায় আটক বান্দিদের খাবার সরবরাহ করা। কেন্দ্রীয় দপ্তরটা ছিলো মনসুর ভাইয়ের রুমে। যেখানে বসে আন্দোলন সম্পর্কে মূলনীতি নির্ধারণ করা হতো। সেই মতে চলতো সবাই।

    বিকেলে অফিস-আদালত থেকে কারখানা আর বস্তি থেকে হাজার হাজার লোক এসে জমায়েত হতো হলের সামনে। প্রচার দপ্তর থেকে মাইকের মাধ্যমে আগামী দিনের কর্মসূচি জানিয়ে দেয়া হতো ওদের।

    তারপর তারা চলে যেতো। বসে বসে সে দিনগুলোর কথা ভাবছিলো মুনিম। ভাবতে বেশ ভাল লাগছিলো ওর। একটা ছেলে এগিয়ে এসে বললো, এখানে কুয়াশার মধ্যে বসে আছেন কেন, উঠুন মুনিম ভাই। আপনার জন্যে ভাত নিয়ে এসেছি রুমে। মুনিম উঠে দাঁড়ালো। চলো।

     

    সাহানাকে নিয়ে বেশ রাত করে বাসায় ফিরে এলেী মাহমুদ। প্রায় রাতে এমনি দেরি হয় ওর। কোনদিন কাজ থাকে। কোনদিন ক্লাবে যায় আর রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা মারে। জীবনটা হলো একটা সুন্দর করে সাজানো বাগানের মত। যেদিকে খুশি ইচ্ছেমত উড়ে যেতে পারে তুমি। কিম্বা কখনো ভ্রমর হয়ে উড়ে বেড়াতে পারো এক ফুল থেকে অন্য ফুলে।

    সাহানার বাহুতে স্পর্শ করে মাহমুদ বললো, সাহানা তুমি আমাকে খুব ভালবাস, তাই না?

    সাহানা চোখ তুলে শুধু একবার তাকালো ওর দিকে। তারপর সংক্ষেপে বললো, হ্যাঁ। মাহমুদ জানতো, কি উত্তর দেবে সাহানা। অতীতে এমনি আরো অনেককে প্রশ্ন করে ওই একই জবাব পেয়েছে সে। আগে রোমাঞ্চিত হতো। আজকাল আর তেমন কোন সাড়া জাগে না মনে। তবু, আবার জিজ্ঞেস করলো মাহমুদ, সত্যি ভালবাস।

    সাহানা হেসে জবাব দিলো, জানি না।

    আমি জানি, মাহমুদ কেটে কেটে বললো। আমি জানি, একদিন তুমি বাবুই পাখির মত পলকে উড়ে চলে যাবে।

    সাহানা রক্তাভ হলো। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললো, তাই যাবো। একজনের কাছে বেশি দিন থাকতে ভালো লাগে না আমার।

    গলার স্বরে তার শ্লেষ আর ঘূণা।

    মাহমুদের মনে হলো মেয়েটি বড় নির্লজ্জ। ঠোঁটের কোণে কথাটা একটুও বাধলো না ওর। কি নির্বিকার ভাবেই না বলে গেলো।

    মাহমুদ নিজেও ওকথা বলেছে অনেককে।

    সালেহাকে মনে পড়ে। টালি ক্লার্কের মেয়ে সালেহ্যাঁ। মেয়েটা রীতিমত ভালবেসে ফেলেছিলো ওকে।

    বোকা মেয়ে।

    ওর কথা ভাবলে দুঃখ হয় মাহমুদের। অমন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা না করলেও পারতো সে।

    কিন্তু সাহানা ওর মত বিষ খাবে না। খুব স্বাভাবিকভাবে সব কিছু নিতে পারবে সে। তবু মাহমুদের কেন যেন আজ মনে হলো মেয়েটা বড় নির্লজ্জ।

    ভেতরে বাতি নেভানো ছিলো। কড়া নাড়তে গিয়ে দুজনের চোখে চোখ পড়লো। মুখ টিপে এক টুকরো অর্থপূর্ণ হাসি ছড়ালো সাহানা। মাহমুদও না হেসে পারলো না। খানিকক্ষণ কোন সাড়া পাওয়া গেলো না। তারপর বাতি জ্বলে উঠলো। শব্দ হলো কপাট খোলার। খোলা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে বজলে। পরিপাটি চুলগুলো এলোমেলো। মুখে ঈষৎ বিরক্তির আমেজ। ওদের দেখে বললো, কি ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে?

    মাহমুদ হাত ঘড়িটা ওর মুখের কাছে বাড়িয়ে দিয়ে আস্তে করে বললো, খুব তাড়াতাড়ি ফিরি নি কিন্তু।

    বজলে লজ্জা পেয়ে বললো, একি, দুঘণ্টা। আমার মনে হচ্ছিলো–।

    আমারো তেমনি মনে হলো। ডলির দিকে আড়চোখে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে শব্দ করে হাসলো মাহমুদ।

    নীল আলো ছড়ানো ঘরের দেয়ালে একটা টিকটিকি টিক টিক শব্দে ডেকে উঠলো।

    কৌচের উপর বসে দেহটা এলিয়ে দিল মাহমুদ।

    আলনা থেকে তোয়ালেটা নাবিয়ে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলো সাহানা।

    ডলি দাঁড়িয়েছিলো উত্তরমুখখা আলমারিটার পাশে, জানালার ধার ঘেঁষে ওদেরকে পেছন করে।

    মাহমুদ বললো, কাল সকালে কি তোমার সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে বজলে?

    বজলে প্রশ্ন করলো, কেন বলতো?

    মাহমুদ বললো, কিছু আলাপ ছিলো।

    বজলে শুধালো, গোপনীয় কিছু?

    মাহমুদ ঘাড় নাড়লো না, ঠিক গোপনীয় কিছু নয়।

    বজলে এগিয়ে এসে বসলো তার সামনে। কাল কেন, এখন বল না।

    মাহমুদ বললো, না, এখন না। কাল সকালে বরং একবার এখানে এসো তুমি, কেমন?

    জানালার পাশে দাঁড়ানো ডলি ঝুঁকে পড়ে কি যেন দেখছিলো বাইরে।

    সার সার বাতি। গাড়ি আর লোকজন। সবকিছু বড় অস্বস্তিকর মনে হলো তার। যেন এমন একটা নিরিবিলি অন্ধকার কোণে গিয়ে লুকোতে পারলে সে বেঁচে যায়। পেছন ফিরে তাকাতে ভয় হচ্ছে ওর। যদি মাহমুদের চোখে চোখ পড়ে তাহলে? সত্যি ওরা কি ভাবছে, কে জানে। ডলি রীতিমত ঘামতে শুরু করলো।

    বাইরে বেরিয়ে যখন রিক্সায় উঠলো ওরা, তখন ইলশেগুঁড়ির মত বৃষ্টি ঝরছে। ডলি অনুযোগের সুরে বললো, আজ আমাকে এতবড় একটা লজ্জা না দিলে চলতো না?

    বজলে অপ্রস্তুত হয়ে বললো, কোথায় লজ্জা দিলাম তোমায়?

    ডলি ঈষৎ রক্তাভ হয়ে বললো, জানি না।

    ডলির হাতটা মুঠোর মধ্যে তুলে নিয়ে মৃদু চাপ দিলো বজলে। চোখজোড়া ওর মুখের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে বাইরে গাড়ি ঘোড়া আর লোকজন দেখতে লাগলো ডলি।

    রাস্তায় তেমন ভিড় নেই, যানবাহন চলাচল অনেক কম। পথের দুপাশে দোকানগুলোতে খদ্দিরের আনাগোনা খুব বেশি নয়। সহসা ডলি চমকে উঠলো। মনে হলো ওদের রিক্সার পাশ ঘেঁষে মুনিম সাইকেল নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো। কোথায় গেলো সে?

    কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে ডলি। এমনো হতে পারে যে, আজ বাসায় ফিরে দেখবে মুনিম তার অপেক্ষায় বসে আছে। ডলিকে কাছে পেয়ে হয়তো বলবে, অনেক ভেবে দেখলাম ডলি, তোমাকে বাদ দিলে জীবনে আর কিছুই থাকে না। তাই সব ছেড়ে দিয়ে তোমার কাছে ফিরে এলাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও। বলে কাতর চোখজোড়া তুলে ওর দিকে তাকাবে সে। ডলি তখন কি উত্তর দেবে?

    ভাবতে গিয়ে ঘেমে উঠলো ডলি। কিন্তু পরক্ষণে মনে হলো এ তার উদ্ভট কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। মুনিমকে সে দেখেনি, ওটা চোখের ভুল। এ তিনদিন ওরা খালি পায়ে হাঁটাচলা করছে। সাইকেলে নিশ্চয় চড়বে না মুনিম। ভাবতে গিয়ে কেন যেন বড় হতাশ হলো উলি।

    বজলে ওর হাতে একটা নাড়া দিয়ে বললো, কি ব্যাপার চুপচাপ কি ভাবছো?

    ডলি আরো একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো, না, কিছু না। তারপর অনেকটা পথ চুপ থেকে সহসা প্রশ্ন করলো, ওরা স্বামী-স্ত্রী তাই না?

    ওরা কারা? কাদের কথা বলছেঃ বজলে অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে। ডলি বললো, সাহানা আর মাহমুদ।

    বজলে কি ভেবে বললো, হ্যাঁ, ওরা স্বামী-স্ত্রী-এই তো মাস কয়েক হলো বিয়ে হয়েছে তাদের। কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?

    না, এমনি। বজলের একখানা হাত নির্জের হাতের মধ্যে তুলে নিলো ডলি।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    পরদিন বিদ্যালয়ের গেটে যেখানে নোটিশ বোর্ডগুলো টাঙ্গানো ছিলো, তার পাশে সাঁটানো, লাল কালিতে লেখা একটি দেয়াল পত্রিকার উপর দল বেঁধে ঝুঁকে পড়লো ছেলেমেয়েরা। কারো পরনে শাড়ি, কারো সেলওয়ার। দেয়াল পত্রিকাটা পড়ছিলো আর গম গম স্বরে কথা বলছিলো ওরা।

    নীলা আর বেনু অদূরে দাঁড়িয়ে।

    সারা রাত জেগে ওই দেয়াল পত্রিকা লিখেছে ওরা।

    কাল রাতে কেউ ঘুমোয় নি।

    কালো বার্নিশ দেয়া কাঠের সিঁড়িটা বেয়ে পা টিপে টিপে যখন নিচে নেমে আসছিলো নীলা তখন হাত ঘড়িটায় বারটা বাজে। চারপাশে ঘুঘুটে অন্ধকার আর চাপা গলার ফিসফিসানি। করিডোর পেরিয়ে ডাম কোণে বেনুর ঘরে এসে জমায়েত হয়েছিল ওরা।

    বাতি কি জ্বালবো?

    না।

    মোম আছে?

    আছে।

    জানালাগুলো বন্ধ করে দাও। সুপার কি ঘুমিয়েছে।

    হ্যাঁ।

    দরজায় খিল দিয়ে দাও। ম্যাচেশটা কোথায়। আহ্ শব্দ করো না, সুপার জেগে যাবে।

    টেবিল চেয়ারগুলো একপাশে সরিয়ে নিয়ে, মসৃণ মেঝের ওপরে গোল হয়ে বসলো ওরা।

    বাইরে রাত বাড়ছে।

    মোমবাতির মৃদু আলোয় বসে দেয়াল পত্রিকাগুলো লিখছে ওরা। তাই আজ বিদ্যালয়ের সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে ওরা কান পেতে শোনার চেষ্টা করছিলো কে কি মন্তব্য করে।

    আমতলায় জটলা করে দাঁড়িয়েছিলো তিনটি ছেলে আর দুটি মেয়ে।

    একটি ছেলে সহানুভূতি জানিয়ে একটি মেয়েকে বললো, খালি পায়ে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে নাতো আপনাদের

    কষ্ট? কি যে বলেন। মেয়েটি ঈষৎ ঘাড় নেড়ে বললো, খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস আছে আমাদের।

    অদূরে বেলতলায় বসে একদল নতুন ছেলেকে একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শোনাচ্ছিলো কবি রসুল।

    সত্যি বরকতের কথা ভাবতে গেলে আজো কেমন লাগে আমার। মাঝে মাঝে মনে হয় সে মরে নি। মধুর রেস্তোরাঁয় গেলে এখনো তার দেখা পাবো। বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো তার। সে আমার অতন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। কালো রঙের লম্বা লিকলিকে ছেলে।

    সেদিন এক সঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে এসেছিলাম আমরা। রাইফেলধারী পুলিশগুলো তখন সার বেঁধে দাঁড়িয়েছিল গেটের সামনে। ইউনিফর্ম পরা অফিসাররা ঘোরাফেরা করছিলো এদিক সেদিক আর মাঝে মাঝে উত্তেজিতভাবে টেলিফোনে কি যেন আলাপ করছিলো কর্তাদের সঙ্গে। বলতে গিয়ে সেদিনের সম্পূর্ণ ছবিটা ভেসে উঠলো কবি রসুলের চোখে। সকাল থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্কুল কলেজ থেকে ছাত্ররা এসে জমায়েত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে। শহরে একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি হয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ। দল বেঁধে কেউ আসতে পারছে না তাই। তবু এলো।

    বেলা এগারোটায় আম গাছতলায় সভা বসলে ওদের।

    দশ হাজার ছাত্রছাত্রীর সভা।

    একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ করার চিন্তা করছিলো ওরা।

    একজন বললো, ওসব হুজ্জত হাঙ্গামা না করে আসুন আমরা প্রদেশব্যাপী স্বাক্ষর সগ্রহ অভিযান চালাই।

    ওসব স্বাক্ষর অভিযান বহুবার করেছি। ওতে কিছু হয় না। কে একজন চিৎকার করে উঠলো সভার এক প্রান্ত থেকে।

    আর একজন বললো। ওসব মিষ্টি মিষ্টি কথা ছেড়ে দিন কর্তারা।

    মিষ্টি কথায় চিড়া ভেজে না। কিছু হবে না ওসব করে।

    ওরা তবু বললো। হবে, হবেনা কেন। আমরা স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তারপর মন্ত্রীদের কাছে ডেপুটেশন পাঠাবো।

    ওই মন্ত্রীদের কথা রেখে দিন। হঠাৎ ডায়াসের পাশ থেকে কে একজন লাফিয়ে উঠলো।

    মন্ত্রীদের আমরা চিনে নিয়েছি।

    আরেকজন বললো। দালালের কথা আমরা শুনতে চাই না।

    আপনারা বসে পড়ুন।

    তারপর বসে পড়ন চিারে ফেটে পড়লো সমস্ত সভা।

    তবু ওদের মধ্য থেকে একজন বললো, দেখুন,আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আপনারা দয়া করে আমার কথা শুনুন। আমায় বিশ্বাস করুন। দেখুন। শুনুন।

    না, না। আপনার কথা শুনবে না। আপনি বসে পড়ুন।

    আরে, এ লোকটা আচ্ছা পাইট তো, আমরা শুনতে চাইছি না তবু জোর করে শোনাবে।

    আরে তোমরা করছে কি লোকটাকে ঘাড় ধরে বসিয়ে দিতে পারছে না? সভার মধ্যে ইতস্তত চিল্কার শোনা গেলো। অবশেষে বসে যেতে বাধ্য হলো লোটা।

    তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে বক্তাদের বাকযুদ্ধ চললো।

    কেউ বললো, অমান্য করো।

    কেউ বললো, অমান্য করো না।

    অবশেষে ঠিক হলো, দশজন করে একসঙ্গে একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ করবে ওরা। দল বেঁধে সবাই জেলে যাবে তবু তাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে দেবে না।

    তখন বেলা বারটা।

    শীতের মরশুম হলেও সে বছর শীত একটু কম পড়েছিলো। রোদ উঠেছিলো প্রখর দীপ্তি নিয়ে। সে রোদ মাথায় নিয়ে প্রথম দলটা তৈরি হলো আইন অমান্য করার জন্য। একটা লম্বা মত ছেলে ওদের নাম ঠিকানাগুলো টুকে নিচ্ছিলো খায়।

    আপনার কোন কলেজ?

    জগন্নাথ।

    আপনার? আমার কলেজ নয় স্কুল। আরমানিটোলা।

    আপনি কোন কলেজের?

    মেডিকেল।

    আপনি?

    ইউনিভার্সিটি।

    আর আপনি?

    ঢাকা কলেজ।

    সবার নাম আর ঠিকানাগুলো একটা খাতায় লিখে নিলো সে।

    গেটের বাইরে দাঁড়ানো পুলিশের দল ইতিমধ্যে খবর পেয়ে গিয়েছিলো। তাই তারাও তৈরি হয়ে নিলো।

    একটু পরে ছাত্রদের প্রথম দলটা বেরুলো বাইরে। দশটা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ওরা শ্লোগান দিলো, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।

    পুলিশের দল এগিয়ে এসে ওদের ঘিরে দাঁড়ালো। তারপর গ্রেপ্তার করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিলো সবাইকে।

    একটু পরে বেরুলো দ্বিতীয় দল।

    তারপর তৃতীয় দল।

    পুলিশ অফিসাররা হয়ত বুঝতে পেরেছিলো, গ্রেপ্তার করে শেষ করা যাবে না। তাই ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেবার জন্যে একজন বেঁটে মোটা অফিসার দৌড়ে এসে অকস্মাৎ একটা কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ে মারলো ইউনিভারসিটির ভেতরে।

    তারপর আরেকটা।

    তারপর কাঁদুনে গ্যাসের ধেয়ায় ইউনিভার্সিটি এলাকা নীল হয়ে গেলো। ছেলেমেয়েরা ছিটকে পড়লো চারদিকে ছত্রভঙ্গ হলো। চোখগুলো সব জ্বালা করছে। ঝাঁপসা হয়ে আসছে। চারদিক। পানি ঝরছে। দুহাতে চোখ ঢাকলো। কেউ দুচোখে রুমাল চাপা দিলো। কদুনে গ্যাসের অকৃপণ ধারা তখনো বর্ষিত হয়ে চলেছে। একটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো বেলতলায়। দুটো মেয়ে ছুটে এসে পাঁজাকোলা করে ভেতরে নিয়ে এলো তাকে।

    আমি আর বরকত দেয়াল টপকে মেডিকেল কলেজে গিয়ে ঢুকলাম।

    তারপর সেখান থেকে দৌড়ে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে।

    ওখানকার ছেলেরা তখন মাইক লাগিয়ে জোর গলায় বক্তৃতা দিচ্ছে। হোস্টেলের ভেতর লাল সুরকি ছড়ান রাস্তার উপর ইতস্তত ছড়িয়ে সবাই। পুলিশ অফিসারও ততক্ষণে ভার্সিটি এলাকা ছেড়ে দলবল নিয়ে মেডিকেলের চারপাশে জড়ো হয়েছে এসে। একটু পরে হোস্টেলের ভেতরে কয়েকটি কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ে মারলো ওরা। মেডিকেলের ছেলেরা বোকা নয়। তারা সব জানে। কাঁদুনে গ্যাসগুলো ফাটবার আগে সেগুলো তুলে নিয়ে পরক্ষণে পুলিশের দিকে ছুঁড়ে মারলো তারা। রাস্তার পাশে কতগুলো ছোট ছোট রেস্তোরাঁ আর হোটেল ছিলো। পুলিশের কর্তারা তার পেছনে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিলো। মেডিকেলের পশ্চিম পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা এ্যাসেম্বেলি হাউস ছুঁয়ে রেসকোর্সের দিকে চলে গেছে সে রাস্তার মোড়ে, জীপগাড়িসহ জনৈক এম. এল. এ-কে তখন ঘিরে দাঁড়িয়েছে একদল ছেলে। বেচারা এম. এল. এ তাদের হাতে পড়ে জলে ভেজা কাকের মতো ঠকঠক করে কাঁপছিলো আর অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলো এদিক সেদিক। আশেপাশে যদি একটা পুলিশও থাকতো। ছেলেরা জীপ থেকে নামালো তাকে। একটা ছেলে তার আচকানের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে হেঁচকা টানে ছিড়ে ফেললো পকেটটা। আরেকটা ছেলে চিলের মত ছোঁ মেরে তার মাথা থেকে টুপিটা তুলে রাস্তায় ফেলে দিলো। লোকটা মনের ক্ষোভ মনে রেখে বিড়বিড় করে বললো, আহা করছেন কি করছেন কি?

    আমি আর বরকত মাইকের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ বরকত বললো, দাঁড়াও আমি একটু আসি। বলে গেটের দিকে যেখানে ছেলেরা জটলা বেঁধে তখনো শ্লোগান দিচ্ছিলো, সেদিকে এগিয়ে গেলো সে। সূর্য তখন হেলে পড়েছিলো পশ্চিমে। মেঘহীন আকাশে দাবানল জ্বলছিলো। গাছে গাছে সবুজের সমারোহ। ডালে ডালে ফাল্গুনের প্রাণবন্যা। অকস্মাৎ সকলকে চমকে দিয়ে গুলির শব্দ হলো।

    ফিরে তাকিয়ে দেখলাম। একটা ছেলের মাথার খুলি চরকির মত ঘুরতে ঘুরতে প্রায় ত্রিশ হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়লো। আরেকটি ছেলে যেখানে দাঁড়িয়েছিলো মুহূর্তে সেখানে লুটিয়ে পড়লো। আরেক প্রস্থ গুলি ছোঁড়ার হলো একটু পরে।

    আরেক প্রস্থ।

    একটা ছেলে তার পেটটাকে দুহাতে চেপে ধরে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়লো বার নম্বর ব্যারাকের বারান্দায়। চোখজোড়া তার ফ্যাকাসে হতবিহবল । আরো তিনটি ছেলে বুকে হেঁটে হেঁটে সে বারান্দার দিকে এগিয়ে এলো। তাদের কারো হাতে লেগেছে গুলি। কারো হাটুতে।

    বরকতের গুলি লেগেছিলো উরুর গোড়ায়। রক্তে সাদা পাজামাটা ওর লাল হয়ে গিয়েছিলো। আমরা চারজনে ধরাধরি করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। পথে সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছিলো। বলেছিলো, তোমরা ঘাবড়িয়ো না, উরুর গোড়ায় গুলি লেগেছে, ও কিছু না। আমি সেরে যাবো। সে রাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গিয়েছিলো সে।

    অনেকক্ষণ পর কবি রসুল থামলো। কি গভীর বিষাদে ছেয়ে গেছে তার মুখ। একটু পরে বিষাদ দূর হয়ে সে মুখ কঠিন হয়ে এলো।

    এনাটমির ক্লাশটা শেষ হতে নার্সেস কোয়ার্টারে মালতীর সঙ্গে দেখা করতে গেলো সালমা। মালতী তখন স্নান সেরে মাথায় চিরুনি বুলোচ্ছিলো বসে বসে। আসতে দেখে মৃদু হেসে একখানা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললো, বোসো।

    সালমা বসলো।

    মালতী বললো, ক্লাস থেকে এলে বুঝি?

    সালমা সায় দিলো, হ্যাঁ। তারপর বললো, এ মাসের টাকাটা নিতে এলাম। মালতী বললো, বোসস দিচ্ছি। চিরুনিটা নামিয়ে রেখে সুটকেসটা খুলে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করলে মালতী। তারপর নোটটা সালমার হাতে তুলে দিয়ে মালতী চাপা গলায় আবার বললো, আজকে তোমরা রোজা রাখ নি?

    রেখেছি।

    সবাই?

    হ্যাঁ সবাই।

    তুমি রেখেছে?

    হ্যাঁ। চিরুনিটা আবার তুলে নিয়ে বিছানায় এসে বসলো মালতী। আস্তে করে বললে, তোমরা তো তবু ভোর রাতে খেয়েছে। এখানে আমরা যে ক’জনে রেখেছি, ভোর রাতে খেতে পারিনি। জানতো ভাই, চাকরি করি। রোজা রেখেছি শুনলে অমনি চাকরি নট হয়ে যাবে।

    বলতে গিয়ে স্নান হাসলো সে। রওশনের কোন চিঠি পেয়েছো?

    পেয়েছি।

    কেমন আছে সে?

    ভালো।

    তোমার দাদা?

    গ্যাস্ট্রিক আলসারে ভুগছে।

    এখন কোন্ জেলে আছেন তিনি।

    রংপুর।

    একটু পরে মালতীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নার্সেস কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে এলো সালমা।

    মেডিকেলের গেটে ওর জন্য অপেক্ষা করছে আসাদ। দূর থেকে ওকে দেখলে সে । ওর সঙ্গে একদিনের মেলামেশায় অনেক কিছু জানতে পেরেছে সালমা। ঘরে মা নেই, বাবা আছেন। তিনি খুব ভালো চোখে দেখেন না তাকে। রাজনীতি করা নিয়ে সব সময় গালাগালি দেন। একবার তাকে সাজা দেবার জন্য ইউনিভার্সিটির খরচপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন। একদিনে তার কাছে অনেক কিছু জানতে পেরেছে সালমা। ছেলেটি জানেশোনে বেশ। কাল ভোর রাতে ভাত খেতে বসে অনেকক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলো ওর সঙ্গে। ওর কথা বলার ভঙ্গিটা অনেকটা রওশনের মত। তবে বড় লাজুক। চোখজোড়া সব সময় মাটির দিকে নামিয়ে রেখে কথা বলে।

    কাছাকাছি এসে সালমা বললো, আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো, কিছু মনে করবেন না।

    না, মনে করার কি আছে। পরক্ষণে জবাব দিলো আসাদ।

    সালমা বললো, সেই ইস্তেহারগুলো মুনিম ভাইকে পৌঁছে দিয়েছেন তো?

    আসাদ বললো, দিয়েছি।

    কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সালমা আবার বললো, কাল রাতে পেট ভরে খান নি। এখন খুব কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয় ।

    খাই নি কে বললো? পেট ভরেই তো খেয়েছি। শুধু শুধু আপনি চোখজোড়া তখনো মাটিতে নামানো। কথা বলতে গেলে হঠাৎ রওশনের মত মনে হয়, বিশেষ করে ঠোঁট আর চিবুকের অংশটুকু। সালমা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো।

    পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে হাতে তুলে দিলো আসাদ। নিন। যে জন্যে এসেছিলাম। প্রায় গোটা পঞ্চাশেক কালো ব্যাজ আছে এর ভেতরে। এতে হবে তো?

    হ্যাঁ, হবে। সালমা ঘাড় নাড়লো।

    তাহলে আপনার সঙ্গে কাজ আমার আপাতত শেষ। এখন চলি।

    রাতে আবার দেখা হবে।

    কালো পতাকার কি হলো? পেছন থেকে প্রশ্ন করলে সালমা।

    এখনো দর্জির দোকানে। রাতে আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তখন পাবেন। বলে দ্রুতপায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে গেল আসাদ।

    নীলা, বেনু আর ওদের সঙ্গে একটি অপরিচিত মেয়েকে এগিয়ে আসতে দেখে, ওদের জন্যে দাঁড়ালো সালমা।

    নীলা বললো, কি সালমা, কাল আমাদের হোস্টেলে যাবি বলেছিলে। কই গেলে নাতো? চলো এখন যাবে।

    সালমা বললো, যাবার ইচ্ছে ছিলো, সময় করতে পারিনি। ওদের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে ওর নজরে পড়লো নীলা আর বেনুর পরনে দুটো কুচকুচে কালো শাড়ি। বাতাসে শাড়ির আঁচলগুলো পতাকার মত পতপত করে উড়ছে। বাহ্ চমৎকার।

    নীলা অবাক হয়ে তাকালো, কি?

    ইশারায় দেখিয়ে সালমা জবাব দিলো, তোমাদের শাড়ি।

    হ্যাঁ, নীলা মৃদু হাসলো। কালো ব্যাজ ব্যাণ্ড করেছে। আর তাই আমরা কালো শাড়ি পরেছি। দেখি ওরা আমাদের শাড়ি পরা ব্যান্ড করতে পারে কিনা।

    বেনু এতক্ষণ চুপ করে কি যে ভাবছিলো। আসাদ সাহেবকে আপনি কত দিন ধরে চেনেন?

    সালমা ঠিক এ ধরনের কোন প্রশ্নের জন্যে তৈরি ছিল না। ইতস্তত করে বললে, মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা তাও পুরো হয় নি। কিন্তু কেন বলুন তো?

    না এমনি। বেনু দৃষ্টিটা অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে বললো, আপনার সঙ্গে দেখলাম কিনা, তাই।

    কথা বলতে বলতে চামেলী হাউসের কাছে এসে পৌঁছলো ওরা। দূর থেকে দেখলে গেটের সামনে একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে।

    সালমা বললো, কেউ এল বোধ হয়।

    বে বললে, আসে নি, যাচ্ছে।

    নীলা বললো, গতকাল অনেকে চলে গেছে হোস্টেল ছেড়ে। কারা রটিয়ে দিয়েছে একুশের রাতে পুলিশ হোস্টেলে হামলা করবে, সে খবর শুনে।

    সালমা অবাক হলো, তাই নাকি?

    দুটো সুটকেস আর একটা বেডিং ভোলা হলো ছাদের ওপর।

    যে মেয়েটা চলে যাচ্ছিলো তার দিকে এগিয়ে নীলা বললো, তুইও চললি বিলকিস?

    মেয়েটার মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো, চোখ তুলে ওদের দিকে তাকাতে পারলো না। সে। শুধু ইশারায়, অদূরে দাঁড়ান ভদ্রলোককে দেখিয়ে আস্তে করে বললো, চাচা এসেছে নিয়ে যেতে। বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠলো তার অসহায়ভাবে।

    ইউনিভার্সিটিতে এসে প্রথমে মুনিমের খোঁজ করল আসাদ। ভার্সিটির ভেতরটা কালকের চেয়ে আজকে আরো সরগরম। চারপাশে ছেলেরা জটলা বেঁধে ধর্মঘটের কথা আলোচনা করছে।

    এমনি একটা জটলার পাশে এসে দাঁড়ালো আসাদ।

    একটা ছেলে বললো, তুমি যা ভাবছে, কিছু হবে না, দেখবে কাল রাস্তায় একটা ছেলেকেও বেরুতে দেবে না ওরা।

    আরেকজন বললো, অবাক হবার কিছু নেই। কাল হয়তো কারফিউ দেবে।

    তৃতীয়জন বললো, আজকেও কি কম পুলিশ বেরিয়েছে নাকি রাস্তায়।

    পল্টনের ওখানে চার-পাঁচ লরী পুলিশ দেখে এলাম।

    প্রথম জন ওকে শুধরে দিলো । তুমি যে একটা আস্ত গবেট তাতো জানতাম না মাহেরা আরে, ওগুলো পুলিশ নয়, মিলিটারি। ওখানে তাঁবু ফেলেছে। কাল এতক্ষণে দেখবে পুলিশ আর মিলিটারি দিয়ে পুরো শহরটা ছেয়ে ফেলেছে। দ্বিতীয় জন গভীরভাবে রায় দিলো এবার।

    মুনিমের দেখা পেয়ে আসাদ আর দাঁড়ালো না সেখানে।

    মধুর রেস্তোরাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আরেক দল ছেলেকে কি কি যেন বোঝাচ্ছে মুনিম ।

    তেলবিহীন চুলগুলো দস্যি ছেলের মত নেচে বেড়াচ্ছে কপালে ওপর। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ।

    আসাদ বললো, তোমায় খুঁজছিলাম মুনিম।

    কেন? কি ব্যাপার? পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলো সে।

    আসাদ বললো, শুনলাম কাল রাতে তোমাদের বাসায় পুলিশের হামলা হয়েছিলো।

    হ্যাঁ, ঠিক শুনেছ। মুনিম মৃদু হাসলো। অবশ্য ব্যর্থ অভিসার, রাতে বাসায় ছিলাম না আমি।

    অদূরে দাঁড়িয়ে ওদের আলাপ শুনছিলো সবুর। বললো, তোমার কপাল ভালো, ধরা পড়লে কি আর এ জন্মে ছাড়া পেতে? জেলখানায় পচে মরতে হতো। রাতে কোথায় ছিলে?

    বাইরে অন্য এক বাসায় ছিলাম।

    বাসায়, না হলে–সবুর মৃদু হাসলো।

    না, বাসাতেই ছিলাম। মুনিম ঘাড় নাড়লো।

    সবুর বললো, আমাকেও দেখছি আজ রাতে বাইরে কোথাও থাকতে হবে। বাসার আশেপাশে গত ক’দিন ধরে টিকটিকির উদ্রব বড় বেড়ে গেছে। মুনিম কি যেন বলতে । যাচ্ছিলো। সহসা সামনের লন দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি মেয়ের দিকে চোখ পড়তে ডলির কথা মনে পড়লো ওর। ডলির সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের জন্যে হলেও দেখা করা প্রয়োজন।

    সবুরের হাত ঘড়িটার দিকে এক পলক তাকালো মুনিম। এর মধ্যে দুটো বেজে গেলো, আমাকে একটু ভিক্টোরিয়া পার্ক যেতে হবে।

    পাগল নাকি? আসাদ রীতিমত চমকে উঠলো। এখন তুমি ইউনিভার্সিটি এলাকা ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। বাইরে পা দিলেই ধরবে।

    ঠিক বলছে আসাদ। রাহাত সমর্থন জানালে তাকে। এখন এ এলাকার বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না আপনার। তাছাড়া নবকুমার আর নবাবপুর হাইস্কুলের ছেলেরা একটু পরে দেখা করতে আসবে। আপনি না থাকলে চলবে কি করে?

    অগত্যা ডলির সঙ্গে দেখা করার চিন্তাটা মূলতবি রাখলো মুনিম। কিন্তু জাহানারাকে একখানা চিঠি না লিখলে নয়। রাতের হাত থেকে খাতাটা আর আমাদের পকেট থেকে কলমটা টেনে নিয়ে মধুর রেস্তোরাঁর এককোণে এসে চিঠি লিখতে বসলো মুনিম। গতকাল রাতে আমাদের বাসা সার্চ হয়েছে। খবরটা হয়তো ইতিমধ্যে পেয়েছে। এখন থেকে কিছুদিনের জন্যে বাসায় যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। শুনলাম মা খুব কান্নাকাটি করছেন। মাকে সব কিছু বুঝিয়ে সান্ত্বনা দেবার ভার তোমার উপরে রইলো। আশা করি এ চিঠি পেয়ে তুমি একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করবে। আজ রাতে আর তোমাদের ওখানে যাবো না। হোস্টলে থাকবো।

    এখানে এসে চিঠিটা শেষ করেছিলো মুনিম।

    পুনশ্চ দিয়ে আবার লিখলো। কাল রাতে ডলির খবর জানতে চেয়েছিলে, ডলি ভালো আছে।

    চিঠিখানা একটা ছেলের মারফত জাহানারার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে দুহাতে মুখ খুঁজে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলো মুনিম। মধুর রেস্তোরাঁয় এখন ভিড় অনেকটা কমে গেছে। কিছু ছেলে এদিকে সেদিকে বসে।

  • চার

    চার

    শাহেদ চলে যাবার পর, টেবিলে বসে অনেকক্ষণ ধরে একটা বই নাড়াচাড়া করলো সালমা। বইতে আজ মন বসছে না তার। বড় চাচার শেষের কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। আর রওশনের মুখখানা ভেসে উঠছে বইয়ের পাতায়। বসে বসে অনেক অবাস্তব চিন্তার জাল বুনে চললো সে। এখন যদি হঠাৎ রওশন এখানে এসে পড়ে? কে জানে হয়তো এর মধ্যে কিছু একটা ঘটে গেছে দেশে। রওশন ছাড়া পেয়েছে জেল থেকে। তার চোখে মুখে আনন্দের চমক। সে দোরগোড়া থেকে ডাক দিলো, সালমা আমি এসেছি দরজা খোল। না, এই নিঃসঙ্গ জীবন আর ভাল লাগে না। এই ক্ষুদ্র দেহে একবড় ক্লান্তির বোঝ আর বয়ে বেড়াতে পারে না সালমা। পাশের বাড়ির রেডিওটায় কি একটা গান হচ্ছিলো। মাঝে মাঝে কান পেতে সেটা শুনতে চেষ্টা করছিলো সে। সদরে কড়া নড়ার শব্দ হতে বইটা বন্ধ করে রেখে পরনের কাপড়াটা দুহাতে একটু পরিপাটি করে নিলে সালমা। দরজাটা খুলে দিয়ে ঠিক তাকে চিনতে পারলো সে। আপনি আসাদ ভাই না?

    হ্যাঁ। আস্তে জবাব দিলো আসাদ।

    আসুন।

    দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তাকে ভিতরে নিয়ে এলো সালমা। একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললো, বসুন।

    আসাদ বসলো। বসে চারপাশে চোখ বুলিয়ে এটা সেটা দেখতে লাগলো সে। সালমা ভাবলো, এমনি বোবার মত চুপ করে বসে থাকা যায় না। কিছু একটা বলতে হয়। কিন্তু বলার মত কোন কথা খুঁজে পেলে না সে। অবশেষে ইতস্তত করে শুধালো চা খাবেন।

    না থাক। আসাদ নড়েচড়ে বসলো।

    না কেন। খান না এককাপ। বলে আর উত্তরের অপেক্ষা না করে তাঁটের তলা থেকে স্টোভটা টেনে নিলো সালমা।

    আসাদ এবার না করলো না। সেও খুঁজছিলো মনে মনে। কিছু বলতে হবে। এমনি জড়ের মত কতক্ষণ আর চুপ করে থাকা যায়। আর একটু পরে একটা প্রশ্ন করলে সে। আপনি বুঝি মেডিকেলে পড়েন?

    ইউনিভার্সিটিতে।

    ও। সালমা স্টোভে আগুন ধরিয়ে দিলো।

    খানিকক্ষণ পর আসাদ আবার জিজ্ঞেস করলো, আপনার ছোট ভাইকে দেখছি না যে, উনি কোথায়?

    শাহেদের প্রসঙ্গ উঠতে মুখখানা কালো হয়ে গেলো সালমার। গলা নামিয়ে সঙ্কোচের সঙ্গে বললো, ও সিনেমায় গেছে।

    সিনেমায়? আসাদ রীতিমত অবাক হলো। কিন্তু এর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করলো না সে। চায়ের পেয়ালাটা ওর হাতে তুলে দিয়ে আলোচনাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেবার চেষ্টা করলো সালমা। আজ ধরপাকর হয়েছে। শুনেছেন কিছু

    না।

    কাল তো রোজা রাখতে হবে।

    হ্যাঁ।

    ভোররাতের কিছু বন্দোবস্ত করেছেন।

    ভাত বেঁধে রেখেছি। তরকারি নেই, সাদা ভাত। শুধু ডিম দিয়ে যেতে হবে কিন্তু। ঈষৎ হাসলো সালমা।

    আসাদ আস্তে করে বললো, আমার অভ্যাস আছে।

    রাতে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি হলো মুনিমের। সারাদিন ছুটাছুটি করে ভীষণ ক্লান্ত সে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠার শক্তি পাচ্ছিলো না। কিন্তু এই অপরিসীম ক্লান্তির মাঝেও কোথায় যেন একটা অফুরন্ত শক্তির উৎস লুকিয়ে ছিলো। যা তাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো সামনের দিকে। মনে পড়লো। বাবার কেরানী বন্ধু রসুল সাহেবের সঙ্গে আজ বিকেলে যখন মেডিকেলের সামনে দেখা হয়েছিলো তখন তিনি কাছে এগিয়ে এসে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এবার কি একেবারে চুপ করে থাকবে তোমরা? কিছু করবে না?

    আমরা আপনাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। দেখছেন তো আমাদের হাত পা একেবারে বাঁধা। বলেছিলো আরেকজন। সে লোকটা কাজ করে কোন এক ব্যাঙ্কে।

    ওদের কথা ভাবতে গেলে নিজেকে অনেক বড় মনে হয় মুনিমের। আর তখন সমস্ত ক্লান্তি তার কপূরের মতো উড়ে যায়।

    বাসায় ফিরে মুনিম দেখলো, টেবিলে ভাত সাজিয়ে মা বসে আছেন। আমেনার সঙ্গে কি নিয়ে আলাপ করছেন তিনি। ওকে আসতে দেখে মা তিরস্কার করে বললেন, এই একটু আসি বলে সকালে বেরিয়ে গিয়ে এই রাত দশটায় ফিরছিস তুই। এদিকে আমি চিন্তা করে মরি। ঘর বাড়ি কি কিছু নেই নাকি তোর

    মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো মুনিম। তারপর গম্ভীর গলায় বললো, জানোমা, সেবার যে গুলি করে কতগুলো ছেলেকে মেরেছিলো, তাদের জন্যে আমরা একটু শোক করবো তাও দিচ্ছে না ওরা।

    মিনসেদের হয়েছে কি? কাঁদতেও দেবে না নাকি? মা অবাক হলেন। মুনিম সাগ্রহে বললো, তাইতো মা, কাদবার জন্যে আন্দোলন করছি।

    কিন্তু বাবা তোমার আন্দোলন করে কাজ নেই। পরক্ষণে জবাব দিলো মা। যে মায়ের পাঁচ-সাতটা ছেলে আছে তারা আন্দোলন করুক। তুমি আমার এক ছেলে, তোমার ওসবে দরকার নেই।

    আরো কিছুক্ষণ সেখানে বসে থেকে মা চলে গেলেন তাঁর শোবার ঘরে। হতাশ হয়ে টেবিলের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো মুনিম। মাকে নিয়ে বড় জ্বালা ওর।

    মা চলে যেতে আমেনা বললো, মিন্টু এসেছিলো। কি একটা বই দিয়ে গেছে তোমার জন্যে। বলে মায়ের ঘর থেকে বইটা এনে ওর হাতে দিতে গিয়ে ফিক করে হেসে দিলো আমেনা। তারপর চলে গেলে সে।

    প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলো মুনিম। পরে, বইটা দেখে বুঝতে পারলে কেন হেসেছে আমেনা। বহুদিন আগে কোন এক জন্মদিনে যে বইটা ডলিকে উপহার দিয়েছিলো সে, সেটা মিন্টুর হাতে ফেরত পাঠিয়েছে ডলি। কি অর্থ হতে পারে এর?

    চিরতরে সম্পর্কচ্ছেদ, না ক্ষণিকের অভিমান?

    বইটা ওলটাতে গিয়ে মুনিম দেখলে ভেতরে একখানা চিঠি। আগ্রহের সঙ্গে চিঠিটা খুলে পড়লো মুনিম। ডলি লিখেছে–

    মুনিম,

    তুমি উত্তর মেরুর মানুষ, আমি দক্ষিণ মেরুর।

    ভেবে দেখলাম তোমাতে আমাতে মিলন সম্ভব নয়। তাই বজলেকে গ্রহণ করলাম। ওকে আমি ভালবাসি নি কোনদিন। তবু, একই মেরুর মানুষ তো, খাপ খাইয়ে নিতে পারবো। তুমিও পারবে বলে আশা করি।

    ইতি। -ডলি

    চিঠি পড়ে কিছুক্ষণের জন্যে বিমূঢ় হয়ে গেলো মুনিম ।

    একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে তার ওপরে বসলো সে।

    হয়তো এমনো হতে পারে যে ডলি যা লিখেছে সেটা ওর মনের কথা নয়।

    হয়তো বা মনের কথা। কিন্তু হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কি হেতু থাকতে পারে?

    মুনিম তো কোন দুর্ব্যবহার করে নি ওর সঙ্গে।

    ডলি নিজে রাগ করে যেতে নিষেধ করেছ।

    একটু পরে চিঠিটা জামার পকেটে রেখে দিয়ে মুনিম ভাবলো কাল একবার সময় করে। ডলির সঙ্গে দেখা করবে।

    রাতে জাহানারাদের বাসায় থাকবে বলে পূর্বাহ্নে জানিয়ে দিয়েছিলো মুনিম। ঘরে থাকা নিরাপদ নয়। যে কোন সময় হামলা হতে পারে।

    তাই রাতের খাওয়াটা তাড়াতাড়ি সেরে মা-বাবা ঘুমিয়ে পড়লে আমেনাকে বাইরের দরজাটা বন্ধ করতে বলে রাস্তায় নেমে এলো মুনিম।

    পেছন থেকে আমেনা চাপা স্বরে বললো, সাবধানে থেকে ভাইয়া।

    মুনিম অন্ধকারে মৃদু হাসলো।

    বাইরের জীবনে যখন গভীর নৈরাশ্য পাথরের মত চেপে বসছে মানুষের মনে, যখন প্রতিটি পদক্ষেপ শঙ্কা ভয় আর ত্ৰাসে জড়িয়ে আসতে চায় আর একটি মুহূর্তের জন্যে মানুষ তাকে বিপন্মুক্ত বলে ভাবতে পারে না, সব সময় মনে হয় ওই বুঝি মৃত্যু নেমে এলো তার ভয়াবহ নীরবতা নিয়ে, তখনো সংসারে স্নেহ প্ৰেম আর ভালবাসা পাশাপাশি বিরাজ করে। বলেই হয়তো মানুষগুলো এখনো বেঁচে আছে। একবার চারপাশে সন্তৰ্পণে তাকিয়ে নিয়ে দ্রুত সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে ওপাশের সরু গলিতে গিয়ে ঢুকলো মুনিম।

    জাহানারা আর তার অধ্যাপক স্বামী টেবিলে ভাত সাজিয়ে ওর অপেক্ষায় বসেছিল। ওরা ভেবেছিলো হয়তো মুনিম এখানে খাবে। তাই দোকান থেকে কিছু ভাল কবাব এনে রেখেছিলো।

    জাহানারা ভাত খাবে না। রুটি খাবে। দু’দিন থেকে ঠাণ্ডা লেগে গায়ে মৃদু জ্বর এসেছে। ওর। তাছাড়া এক বেলা রুটি খাবার চিন্তাটা কিছুদিন থেকে মাথায় ঢুকেছে। ওতে নাকি বাড়তি মেদ কমে যায়। জাহানারার মতে শুধু ওর কেন সবার মতে দিনে দিনে বড় বেশি মোটা হয়ে যাচ্ছে সে। পরিচিত দু’একজন ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করেছে জাহানারা। সব রোগের ওষুধ আছে, আর এই যে বিশ্রী রকমের মোটা হয়ে যাচ্ছি এর কোন ওষুধ নেই আপনাদের কাছে?

    ডাক্তার বন্ধুরা কেউ শব্দ করে হেসে দিয়েছে, আছে বইকি। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিন। দেখবেন, যে হারে মোটা হয়েছেন সে হারে শুকিয়ে যাবেন।

    কেউ বলেছে, সকালে উঠে কিছু ডন বৈঠক দিন। দেখবেন দু’দিনেই সব বাড়তি মাংস ঝরে যাবে।

    আবার কেউ বলেছে, এক কাজ করুন না, দু’বেলা ভাত খাওয়াটা বন্ধ করে একবেলা রুটি খেতে শুরু করুন আর দৈহিক শ্ৰমটা বাড়িয়ে দিন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

    শেষের প্রস্তাবটা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হলো জাহানারার। তাই ক’দিন ধরে একবেলা রুটি খাবার চিন্তা করছিলো সে।

    মুনিম এসে জানালো সে খেয়ে এসেছে। শুনে আহত হলো জাহানারা।

    বললো, তোমাকে তখন বলে দিয়েছিলাম, এখানে খাবে।

    মুনিম কি জবাব দেবে প্রথমে কিছু ভেবে পেলো না। পাঠ না পারা ছাত্রের মত বার কয়েক ঘাড় চুলকালো সে। একবার অধ্যাপকের দিকে আর একবার জাহানারার দিকে তাকিয়ে বললো, উপায় ছিলো না, বুঝলে বাসায় না খেলে মা ভীষণ রাগ করতেন। আর তুমি তো জান উনি আমাকে নিয়ে সব সময় কেমন বাড়াবাড়ি করেন।

    জাহানারা কিছু বলতে যাচ্ছিলো। অধ্যাপক তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, খেয়ে এসেছে। ভালো কথা। আমরা অনেকক্ষণ ধরে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি, বেশি না পারো আমাদের সঙ্গে অল্প চারটে খাও। অন্তত কবাটা। ওটা তোমার জন্যেই আনা।

    না বললে যে ওদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না তা জানতো মুনিম।

    অগত্যা চেয়ার টেনে বসলো সে।

    খাওয়ার অবসরে বাইরের অবস্থা জানতে চাইলে অধ্যাপক।

    কাল সত্যি সাংঘাতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আবার সেই বায়ান্ন সালের পুনরাবৃত্তি হবে না তো, আবার সেই রক্তপাত।

    অধ্যাপক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। তার প্রশস্ত কপালের ভাজগুলো স্পষ্ট হয়ে দেখা দিলো। মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকে এলো সামনে। মুনিমের কাছ থেকে কোন জবাব না পেয়ে নিজে থেকে আবার বলতে লাগলো সে, তোমাদের ওই নেতাদের ওপর আমার এতটুকু আস্থা নেই। আমি জানি এবং বেশ ভালো করে জানি, ওদের মধ্যে কোন পৌরুষ নেই। কতগুলো ভীরু কাপুরুষ ওরা! তোমার কি মনে হয় ওরা এ সময়ে তোমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে?

    মুনিম এবারও নিরুত্তর রইলো। নেতাদের সে নিজেও যে খুব বিশ্বাসের চোখে দেখে তা নয়। আর বিশ্বাস করবেই বা কেমন করে। নেতাদের কাছে দল বেঁধে দেখা করতে গিয়েছিলো। ওরা ওদের সক্রিয় সাহায্য চেয়েছিলো, ওরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেছে।

    বিব্রত গলায় বলছে, দেখো সাংঘাতিক কিছু করে বসো না তোমরা। দেখে যেন শান্তি ভঙ্গ না হয়।

    শান্তি বলতে কি মনে করে ওরা।

    অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার আক্রমণের মুখে আত্মসমর্পণ?

    আমি জানি। তোমাদের ওই নেতারা কি চায়। টেবিলের ওপাশ থেকে অধ্যাপক আবার বললো, ওদের আশু লক্ষ্য হলো গদি দখল করা। আর পরবর্তী অভিপ্রায় হলো বাকি জীবনটা যাতে স্বচ্ছন্দে কাটে সে জন্যে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা। তুমি কি মনে করেছে ওরা এ দেশকে ভালবাসে? দেশবাসীর জন্যে দরদে বুক ওদের ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তাই না? তুমি কি। আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলো অধ্যাপক। মুনিম মাঝপথে বাধা দিয়ে বললো, তা আমি জানি। তারপর আবার চুপ করে গেলো, সে। খানিকক্ষণ তিনজনে নীরব রইলো।

    ছোট মেয়েটা ঘুম থেকে ওঠে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো। উঠে গিয়ে তাকে শান্ত করে এসে আবার টেবিলে বসলো জাহানারা। অধ্যাপক স্ত্রীর দিকে এক পলক তাকালো, তারপর মুনিমের দিকে চোখজোড়া ফিরিয়ে এনে আবার বললো, কিন্তু ওরা যদি এ সময়ে তোমাদের পাশে এসে না দাঁড়ায় তাহলে একা একা কতক্ষণ লড়বে তোমরা

    তা জানি না।

    মুনিমকে হঠাৎ যেন বড় চিন্তিত মনে হলো। একটু থেমে আস্তে সে বললো, শুধু জানি, ওদের জন্যে আমাদের কাজ থেমে থাকবে না।

    এক টুকরো রুটি মুখে তুলতে গিয়ে থেমে মুনিমের দিকে তাকালো জাহানারা।

    অধ্যাপকের মুখখানা শিশুর সরল হাসিতে ভরে উঠলো।

    বার কয়েক মাথা নেড়ে সে বিড়বিড় করে বললো, হ্যাঁ, এমন কথা শুধু তোমরাই বলতে পারো। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশকে ভালবাসতে শিখেছে শুধু তারাই বলতে পারে। হ্যাঁ, কেবলমাত্র তারাই পারে। আনন্দে দেহটা বার কয়েক কেঁপে উঠলো তার।

    কিন্তু মনিম জানে এ কথা ওর নয়।

    আরেকজনের।

    বাইশে ফেব্রুয়ারি গুলি খেয়ে মরেছে সেই হাইকোর্টের মোড়ে, তিন বছর আগে।

    তিন বছর?

    হ্যাঁ তিনটে বছর। কিন্তু এখনো তার মুখখানা স্পষ্ট মনে আছে মুনিমের। শুধু তার মুখ কেন, তাদের সকলের মুখ আজো ভেসে ওঠে তার চোখে।

    কাক ডাকা ভোর না হতে সেদিন দলে দলে তারা এসে জমায়েত হয়েছিলো মেডিকেল কলেজের পুরোনো হোস্টেলে।

    ছেলে। বুড়ো। মেয়ে।

    ছাত্র। শ্রমিক। কেরানী।

    কত লোক হবে?

    কেউ গুনে দেখে নি। আকাশের তারা গুনে বিশেষ করা যায়। যেদিকে তাকাও সমুদ্রের মত ছড়িয়ে আছে জনতা। আর সবার কণ্ঠে বিদ্রোহের সুর।

    এর জন্যে বুঝি পাকিস্তান চেয়েছিলাম আমরা?

    আমাদের ছেলে-মেয়েদের ধরে ধরে মারবার জন্যে?

    হায় খোদা তুমি ইনছাফ করা এর!

    গায়েবি জানাযা পড়ার জন্যে সমবেত হয়েছিলো ওরা। আর বুড়ো ইমাম সাহেব মোনাজাত করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, যারা আমাদের কচি ছেলেদের গুলি করে মারলো, খোদা তুমি তাদের ক্ষমা করো না।

    সূর্য তখন ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছিলো পুবের আকাশে।

    গায়েবি জানাযা শেষ হলে পর জোয়ারের বেগে মিছিলে বেরিয়ে পড়লে সবাই। নেতারা কেউ ছিলেন না।

    তারা কখনই বা ছিলেন?

    ফরহাদ বললো, বাদ দাও ওদের কথা। আমাদের কাজ আমরা করে যাবো। মেডিকেল থেকে বেরিয়ে মিছিলটা এগিয়ে চলেছিলো হাইকোর্টের দিকে। ফরহাদ হাত ধরে টানলো ওর। এসো মুনিম।

    তারপর জনতার মাঝখানে হারিয়ে গেলো ওরা।

    ভাইসব মিছিলে আসুন। কে যেন ডাকলো।

    তুমি কি যাবে না, চলে এসো।

    খোদার কছম বলছি ওরা জাহান্নামে যাবে। খোদা কি ওদের বিচার করবে না মনে করছো? আলবত করবেন।

    ওকি কাঁদছেন কেন। কেঁদে কি হবে।

    আওয়াজ তুলুন ভাইসব।

    তারপর সাগর কল্লোলের মত চিকারে ফেটে পড়লো বিক্ষুব্ধ জনতা।

    ফরহাদের হাতে একটা নাড়া দিয়ে মুনিম বললো, তোমার কি মনে হয় আজকেও ওরা গুলি করবে?

    জানি না। মৃদু গলায় জবাব দিয়েছিলো ফরহাদ। করলে করতে দাও। ক’জন মারবে ওরা।

    প্রশস্ত রাস্তা জুড়ে মিছিলটা এগিয়ে চলেছিল হাইকোর্টের পাশ দিয়ে। অকস্মাৎ কয়েকখানা মিলিটারি লরী দ্রুতবেগে এসে রাস্তার তেমাথায় যেখানে লম্বা পলাশ গাছটায় অসংখ্য লালফুল ধরেছিলো, সেখানে এসে থামলো। আর পরক্ষণে ইউনিফর্ম পরা সৈন্যরা সার বেঁধে রাস্তার ওপর শুয়ে পড়ে রাইফেলের নলগুলো তাক করে ধরলে মিছিলের দিকে। কয়েকটি উত্তেজিত মুহূর্ত।

    ভাবতে গায়ের লোমগুলো এখননা বর্শার ফলার মত খাড়া হয়ে যায় মুনিমের। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের আর্ত চিঙ্কার ভেসে আসে কানে।

    খোদা ইনছাফ করবে।

    খোদা আমি যে মরে গেলাম।

    মাগো। আমাকে বাঁচাও, মরে গেলাম। মুমূর্ষের চিৎকার আর পোড়া বারুদের গন্ধ।

    পোনা মাছের মতো মানুষগুলো ছুটে চারপাশে হাইকোর্টের রেলিঙ ডিঙ্গিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করতে যাচ্ছিলো যে লোকটা, রেলিঙের উপরেই স্কুলে পড়লো সে। কে জানে হয়তো শেষ মুহূর্তে স্ত্রীর মুখখানা ভেসে উঠেছিলো তার চোখে। বাচ্চা মেয়েটার কথা মনে পড়েছিলো। হঠাৎ তাইতো জীবনের প্রতি গভীর মমতা জন্মে গিয়েছিলো। ভেবেছিলো পালিয়ে বাঁচবে। কিন্তু সে জানতো না ইতিমধ্যে তার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়ে গেছে। আরেকটা সতেরো আঠারো বছরের ছেলে। পায়ে গুলি লেগেছিলো তার, তবু বুকে হেঁটে পালাতে চেষ্টা করছিলো সে আর ভয়ার্ত স্বরে বারবার বিড়বিড় করে বলছিলো, আমাকে মেরো না।

    কিছুদূর এগুতে জন্মের মত বাক রোধ হয়ে গেলো তার।

    একটা অফুট আর্তনাদ করে ছেলেটির দিকে ছুটে গিয়েছিলো ফরহাদ।

    তার গায়ে যে গুলি লাগতে পারে সে কথা মনে ছিলো না। শুধু মনে ছিলো, আমাদের কাজ আমরা করে যাবে।

    কি ভাবছেছা অমন করে? অধ্যাপকের গলার স্বরে চমকে তার দিকে তাকালো মুনিম। খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। জগ থেকে এক গ্রাস পানি ঢেলে নিয়ে সে বললো, আমি বুঝতে পারছি তুমি কি ভাবছ।

    কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, দিন এক রকম যায় না। বলে পানির গ্লাস এক নিঃশ্বাসে শেষ করে হাত ধােয়ার জন্যে উঠে দাড়ালো সে। ওদের আলোচনার বিষয়গুলো খুব উপাদেয় লাগছিলো না জাহানারার। তাই বিষয়ান্তরে যাবার জন্যে মুনিমের দিকে একটু ঝুঁকে এসে সে জিজ্ঞেস করলো, ডলির কি খবর?

    নিজেকে সহসা বড় অসহায় মনে হলো মুনিমের। কে জানে, জাহানারা হয়তো ইতিমধ্যে শুনেছে সব, কিম্বা শোনে নি। তবু কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে গেলো সে।

    জাহানারা আবার প্রশ্ন করলো, ডলি কেমন আছে?

    মুনিম বললো, জানি না।

    জাহানারার ঠোঁটে মৃদু হাসি জেগে উঠলো। না জানবার তো কথা নয়।

    জাহানারার দিকে স্থির চোখে তাকালে সে। মুখখানা বিরক্তি আর অসহিষ্ণুতায় ভরা।

    চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে বললো, তার কথা আমাকে জিজ্ঞেস করো না। জাহানারা, প্লিজ-1 দৃঢ় গলায় কথাটা বলবে ভেবেছিলো, কিন্ত ফাটা বাঁশের বাঁশির মত শোনাল সবকিছু। এ সময় ডলির কথাটা না তুললে কি ভাল করতো না জাহানারা?

    কাণ্ডজ্ঞানহীন আর কাকে বলে। তার ওপর রাগ করার কোন অর্থ হতে পারে না জেনেও চেয়ারটাতে সশব্দে পেছনের দিকে ঠেলে, পাশের ঘরের যেখানে অধ্যাপক হাত ধুয়ে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো, সেখানে তার পাশে গিয়ে বসলো মুনিম।

    জাহানারা বিস্ময়ভরা দৃষ্টি মেলে তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ।

    রাত দুপুরে কিউ খানের বাসা থেকে লোক আসবে তাকে ডাকতে, এ কথা ঘুমোবার এক মুহূর্ত আগেও ভাবেনি মাহমুদ। লেপের ভেতরে কি আরামে ওয়েছিল সে। একটা সুন্দর স্বপ্নও ইতিমধ্যে দেখেছিলো। এখন আবার কাপড় পড়ে যেতে হবে সেই দু মাইল দূরে, কিউ খানের বাসায়। ভাবতে গিয়ে মেজাজটা বিগড়ে গেলে মাহমুদের। দুত্তরি তোর চাকুরির নিকুচি করি। রাত নেই দিন নেই ডেকে পাঠাবে, যেন কেনা গোলাম আর কি। মনে মনে বিড়বিড় করলো সে। তারপর গরম কোটটা গায়ে চড়িয়ে নিয়ে একটু পরে বাইরে বেরিয়ে এলো।

    সাহানা ঘুমুচ্ছে।

    ঘুমোক।

    কিউ খানের বাসায় এসে দেখলো সে একা নয়। আরো অনেকে এসেছে সেখানে। বাইরে বারান্দায় রীতিমত ভিড় জম গেছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় বাতাসটা নীল হয়ে আসছে। ইন্সপেক্টর রশীদকে সামনে পেয়ে একপাশে ডেকে নিয়ে এলো মাহমুদ। ব্যাপারটা কি বলতো, এই রাত দুপুরে?

    ইন্সপেক্টর রশীদ বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, রাতে কয়েকটি বাসা সার্চ করতে হবে বোধ হয়, আমি ঠিক জানি না। তারপর গলার স্বরটা আরো একটু নামিয়ে এনে বললো, বড় কর্তারা সবাই ভীষণ ক্ষেপে গেছে। ভেতরে এখন ক্লোজ ডোরে আলাপ-আলোচনা চলছে ওদের।

    মাহমুদ বললো, তাহলে এখনো কিছু ঠিক হয় নি।

    রশীদ মাথা নাড়লো, না।

    মাহমুদ হতাশ গলায় বললো, রাতের ঘুমটা একেবারে মাটি হলো। রশীদ মৃদু হেসে বললো, করাতের হয় দেখো! আবহাওয়া ভীষণ গরম। বড় কর্তা রেগে গিয়ে বলেছে, এত কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে শহরে অথচ কাউকে গ্রেফতার করা হলো না, কেমন কথা?

    মাহমুদ বললো, আমারো তাই মত। ধরে সবগুলোকে জেলে পোরা উচিত। রশীদ আবার হাসলো। তেমনি চাপা স্বরে বললো, ধরা উচিত তো বুঝলাম। কিন্তু কজনকে ধরবে।

    মাহমুদ পরক্ষণে বললো, কেন যারা এসব করছে তাদের সকলকে। বাইরে আকাশটা কুয়াশায় ছাওয়া ছিলো। সেদিকে তাকিয়ে ইন্সপেক্টর রশীদ জবাব দিলো, ধরে শেষ করতে পারবে বলে তো মনে হয় না বলে চারপাশে তাকিয়ে দেখলো রশীদ। কেউ শুনলো নাতো?

    কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাহমুদ কাঁধ ঝাঁকালো। যাকগে, আমাদের ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। কর্তারা যা করার করবে যদি বলে ধরো, ধরবো। যদি বলে ছাড়ো, ছাড়বো। যদি বলে মারো, মারবো। আমাদের কি ভাই, টাকা পাই চাকরি করি। বলে একটা চেয়ারের ওপর ধপ করে বসে পড়লো মাহমুদ। হা তোমার কাছে সিগারেট আছে? তাড়াহুড়ো করে আসতে গিয়ে আমার প্যাকেটটা ফেলে এসেছি বাসায়। রশীদ কিছু বললো না, পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে নিঃশব্দে এগিয়ে দিলে তার দিকে। বাইরে ঘন কুয়াশা ঝরছে।

    ভেতরে কর্তারা বৈঠক করছেন এখনো।

    মাঝে মাঝে তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে বাইরে। মাঝে মাঝে উগ্র গলার স্বর। এখান থেকে স্পষ্ট কিছু বোঝা যাচ্ছে না কি বলছে তার। মাহমুদ সিগারেটে একটা জোর টান দিলো।

  • তিন

    তিন

    কলতাবাজারে ওদের ছোট বাসা বাড়িটায় যখন ফিরে এল সালমা তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে চারপাশে। স্বচ্ছ নীলাকাশে একটি দুটি করে তারা জ্বলতে শুরু করেছে।

    কাপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধুলো সালমা। আলনা থেকে ভোয়ালেটা নামিয়ে মুখ-হাত মুছলো। তারপর জানালার কবাট দুটো খুলে কিছুক্ষণের জন্যে সেখানে দাঁড়ালো সে।

    এমনি সময় যখন পুরো শহরটা আবছা অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।

    এখানে সেখানে ঝি ঝি পোকার মত টিমটিমে আলো, কোথাও-বা হালকা নীল ধোঁয়া সরীসৃপের মত একে বেঁকে উঠে গেছে আকাশের দিকে।

    কোথাও কোন শাশুড়ি তার বউকে গালাগালি দিচ্ছে, বাচ্চা ছেলেরা সুর করে পড়ছে কোন ছড়ার বই কিম্বা কোন ছন্দোবদ্ধ কবিতা, তখন এমনি জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ লাগে সালমার।

    উত্তর থেকে ভেসে আসা হিমেল বাতাসে বসন্তের ঘ্রাণ।

    এ মুহূর্তে রওশন যদি থাকতে পাশে।

    ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠলো সালমা।

    আজ কত দিন হয়ে গেছে, দিন নয়, বছর। কত বছর।

    বিয়ের মাস খানেক পরে ধরা পড়েছিল রওশন।

    দাদাসহ কোথায় যেন বেরিয়েছিলো ওরা, সন্ধ্যার পরে। দুজনের কেউ আর ফিরে আসে নি। ভাত সাজিয়ে সারা রাত জেগেছিলো সালমা। পরদিন সকালে খোঁজ নিয়ে শুনলো লালবাগে পুলিশের হেফাজতে আছে ওরা।

    জানালার পাশ থেকে সরে এসে বিছানার নিচে রাখা একটা টিনের সুটকেস টেনে বের করলো সালমা। রওশনের পুরনো চিঠিগুলো একে একে বের করে দেখলো সে।

    জানো সালমা, কাল মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো আমার। বাইরে তখন অবিরাম বৃষ্টি ঝরছিলো। আর সেই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে জানি না কখন মনটা হঠাৎ উন্মনা হয়ে পড়েছিলো। আর সেই মুহূর্তে আকাশ ছোঁয়া চার দেয়ালের বাঁধন ছাড়িয়ে বহুদূরে চলে গিয়েছিলাম আমি।

    মনে হলো, আমার সেই গ্রামের বাড়িতে বুড়ো দাদীর কোলে মাথা রেখে রূপকথার গল্প শুনছি।

    বাইরে এমনি বৃষ্টি ঝরছে। আর আমি দুচোখে অফুরন্ত কৌতূহল নিয়ে শুনছি, কেমন করে সেই কদাকার রাক্ষসটা ছলনা চাতুরী আর মুক্তির তাণ্ডব মেলিয়ে কুঁচবরণ কন্যার স্নেহমাখা আলিঙ্গন থেকে তার অতি আদরের রাজকুমারকে নিয়ে গিয়ে আটক রাখলো পাথরের নিচে।

    তারপর আর চিঠিখানা পড়তে পারলো না সালমা। সেন্সরের নিখুঁত কালো কালির আড়ালে পরের অংশটুকু চাপা পড়ে গেছে।

    ওটা রেখে দিয়ে আরেকখানা চিঠি খুললে সালমা।

    আরেকখানা।

    আরো একখানা।

    তারপর দুয়ারে কে যেন বড়া নাড়লো।

    টিনের সুটকেসটা বন্ধ করে রেখে এসে দরজাটা খুললো সালমা।

    বড় চাচা এসেছেন।

    সারা মুখে কাচা পাকা দাড়ি। পরনে পায়জামা আর শার্ট। হাতে একটা ছাতা। সালমা জানতে চাচা আজ আসবেন।

    ছাতাটা একপাশে রেখে দিয়ে কোন রকম ভূমিকা না করেই চাচা বললেন, শোনো, আগামী দুতিন দিন রাস্তাঘাটে বেরিয়ো না। আমার শরীর খারাপ, গায়ে জ্বর নিয়ে এসেছি। জানি আমার কথার কোন দাম দিবে না তোমরা। আজকালকার ছেলেপিলে তোমরা বুড়োদের বোকা ভাবো। তবু না এসে থাকতে পারলাম না। শোনো, একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটবে এবার, এই আমি বলে রাখলাম।

    আপনাকে এক কাপ চা করে দিই? ওর কথার মাঝখানে হঠাৎ একটা যতি টানার চেষ্টা করলে সালমা।

    চাচা থেমে গিয়ে বললেন, ঘরে আদা আছে?

    আছে।

    তাহলে একটু আদা মিশিয়ে দিও।

    আচ্ছা। খাটের নিচের স্টোভটা টেনে নিয়ে চা তৈরি করতে বসলো সালমা। মাঝে মাঝে রওশনকেও এমনি চা বানিয়ে খাওয়াতে সে।

    একদিন নিজের হাতে স্টোভ ধরাতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলেছিলো রওশন। সালমা পোড়া জায়গায় মলম লাগিয়ে দিতে শাসনের ভঙ্গীতে বলেছিলো, খবরদার, আর স্টোভের ধারে পাশেও আসতে পারবে না তুমি।

    কি করবো বলো, কিছু করার জন্যে হাতজোড়া সব সময় নিসপিস করে।

    মুহূর্তের জন্যে সালমার মনে হলো যেন হাতজোড়া আগের মত আছে রওশনের, বলিষ্ঠ একজোড়া হাত।

    না, আর কোনদিনও সে আলিঙ্গন করতে পারবে না।

    স্টোভের ওপর চায়ের কেতলিটা ধীরে ধীরে তুলে দিলো সালমা।

    চাচা জিজ্ঞেস করলেন, রওশনের কোন চিঠি পেয়েছে?

    সালমা আস্তে করে বললো, হ্যাঁ।

    চাচা সে কথা শুনলেন কিনা বোঝা গেলো না। তিনি নিজের মনেই বলতে লাগলেন, কি হবে এসব করে। এতে করে বলি ছেড়ে দে বাবা, ওসব আমাদের ঘরের ছেলেদের পোষায় না। ও হচ্ছে বড়লোকদের কাজ যাদের কাড়ি কাড়ি টাকা আছে। সারা দুনিয়ার লোকে লুটেপুটে খাচ্ছে। ঘর করছে। বাড়ি করছে। জমিজম করছে। আর ওনারা শুধু জেল খেটেই চলেছেন। দেশ উদ্ধার করবে। বলি, দেশ কি তোমাদের জন্যে বসে রয়েছে। সবাই নিজের নিজেরটা সামলে নিচ্ছে। তোরা কেন বাবা মাঝখানে নিজের জীবনটা শেষ করছিস? না, এসব পাগলামো ছাড়া আর কিছু নয়। তুমি রওশনকে কড়া করে একখানা চিঠি লিখে দাও সে যেন বন্ড দিয়ে চলে আসে নিজের ঘর সংসার উচ্ছনে গেলো, দেশ নিয়ে মরছে। হ্যাঁ, তুমি ওকে চিঠি লিখে দাও ও যদি বন্ড সই করে না আসে তাহলে আমরা কোর্টে গিয়ে তালাকের দরখাস্ত করবো। হ্যাঁ, তোমার বাবা বেঁচে থাকলেও তাই করতেন। বড়চাচা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। গলাটা একেবারে নিচের পর্দায় নামিয়ে এনে বললেন, আমি তোমাদের ভালো চাই বলেই বলছি নইলে বলতাম না।

    সালমার দেহটা বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। জ্বলন্ত স্টোভটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে। পাথরে মত নিশ্চল।

    আজ নতুন নয় বহুদিন এ কথা বলেছেন চাচা।

    রওশনও চিঠি লিখেছে।

    আমার জন্যে তুমি নিজেকে শেষ করবে কেন সালমা। আমি কবে বেরুবো জানি না। কখন ছাড়া পাবো জানি না। তুমি আর কতদিন অপেক্ষা করে থাকবে।

    পরিষ্কার করে কিছু লেখে নি সে। লিখতে সাহস হয় নি হয়তো। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে সালমা উঠে দাঁড়ালো। চায়ের পেয়ালাটা এগিয়ে দিলো বড় চাচার হাতে।

    একটু পরে চা খাওয়া শেষ হলে আরো বার কয়েক সালমাকে সাবধান করে দিয়ে আর রওশনকে একখানা ঝাড়া চিঠি লেখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন বড় চাচা। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তার সঙ্গে হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো সালমা। বড় ক্লান্তি লাগছে। তেইশ বছরের এই দেহটা তার যেন আজ মনে হলো অনেক বুড়িয়ে গেছে। হয়তো কিছু দিনের মধ্যে একেবারে ভেঙ্গে পড়বে। তখন অনেক অঞ ঝরিয়েও এ জীবনটাকে আর ফিরে পাবে না সে। ভাবতে গিয়ে সহসা কান্না পেলো সালমার। শাহেদের ডাকে চমক ভাঙলো। ভাত দে আপা, ক্ষিধে পেয়েছে। কি ভাবছিস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! দুলাভাইয়ের কথা?

    সালমা শিউরে উঠলো। না, কিছু না। চলো ভাত খেতে যাবে। দরজার সামনে থেকে সরে গেলো সালমা।

    ভাত খেয়ে উঠে শাহেদ বললো, ইয়ে হয়েছে আপা। আমি একটু বাইরে যাবো। ফিরতে দেরি হবে। তুই কিন্তু ঘুমোস নে।

    আমার জেগে থাকতে বয়ে গেছে। সালমা রেগে গেলো। এখন বাইরে যেতে পারবে না তুমি।

    কেন?

    কেন মানে? এ রাত আটটায় বাইরে কি দরকার তোমার?

    দরকার আছে।

    কি দরকার?

    বলতে পারবো না।

    না বলতে পারলে যেতেও পারবে না।

    বললাম তো দরকার আছে।

    কি দরকার বলতে হবে।

    সিনেমায় যাবো।

    সিনেমায় যাবে তো রাত নটার শো কেন? দিনে যেতে পারে না? এখন পড়ো গিয়ে। দেখতে হলে কাল দিনে দেখো।

    আজ শেষ শো, কাল চলে যাবে।

    কি সিনেমা শুনি।

    ন্যাকেড কুইন।

    ন্যাকে্ড কুইন? সালমা অবাক হলো, ওটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে। তোমার মত বাচ্চা ছেলেদের জন্য নয়।

    আমি বুঝি বাচ্চা? শাহেদ ক্ষেপে উঠলো। তোর চোখে তো আমি জীবনভর বাচ্চাই থেকে যাবো।

    ছোট ভাইটিকে নিয়ে বড় বিপদ সালমার। একটুতে রাগ করে বসে। অন্যায় কিছু করতে গেলে বাধা দেবে সে উপায় নেই। মাঝে মাঝে বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে সালমা।

    ওকে চুপ থাকতে দেখে শাহেদ আবার বললো, আমি চললাম, দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যা। বলেই যাবার উদ্যোগ করলে সে।

    পেছন থেকে সালমা ডাকলো, যেয়ো না শাহেদ। শোন, বাচ্চা ছেলেদের ঢুকতে দিবে না ওখানে।

    ইস দেবে না বললেই হলো। কত ঢুকলাম।

    সালমার মুখে যেন একরাশ কালি ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো শাহেদ।

    এমনি স্বভাব ওর।

    ডলি তার ঘরে বসেছিল।

    বজলে হোসেন বায়রনের একটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলো তাকে।

    Let us have wine and the women
    Mirth and laughter
    Sermens and soda water the day
    After……

    সম্পর্কে বজলে হোসেন মামাতো ভাই হয় ওর। যেমন লেখে তেমনি ভালো আবৃত্তি করতে পারে বলে। তাই ওকে ভালো লাগে ডলির।

    ও এলে বায়রন অথবা শেলীর একখানা কবিতার বই সামনে এগিয়ে দিয়ে ডলি বলে একটা কবিতা পড়ে শোনাবে হাসু ভাই? তোমার আবৃত্তি আমার খুব ভালো লাগে।

    তাই নাকি? বজলে হোসেন হাসে আর মিটমিট করে তাকায় ওর দিকে। তারপর বইটা তুলে নিয়ে আবৃত্তি করে শোনায়–

    Man being reronable, muts get
    Drunk
    The bast of life is but intoxiction.

    শুনতে শুনতে এক সময় আবেশে চোখজোড়া জড়িয়ে এলো ডলির।

    নিওনের আলোয় গদি আঁটা বিছানার উপর এলিয়ে পড়লো সে।

    কবিতা পাঠ থামিয়ে মৃদু গলায় বজলে হোসেন ডাকলো, ডলি।

    ডলি চোখজোড়া মেলে কি যেনো বলতে যাচ্ছিলো। মুনিমকে করিডোর দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে থেমে গেলে সে।

    পরনে দুপুরের সেই পোষাক।

    পা জোড়া তেমনি জুতোবিহীন।

    মুনিমকে এখন এ পোষাকে আশা করেনি ডলি। তাই ঈষৎ অবাক হলো। কিন্তু বজলের সামনে ওকে কিছু বললে না সে। শুধু গম্ভীরকণ্ঠে অভ্যর্থনা জানালো, এসো।

    বইটা বন্ধ করে রেখে বজলে বললো, মুনিম যে, কি ব্যাপার আন্দোলন ছেড়ে হঠাৎ জন্মদিনের আসরে?

    কেন, যারা আন্দোলন করে তাদের কি জন্মদিনের আসরে আসতে নেই নাকি? পরক্ষণে জবাব দিলো মুনিম।

    বজলে একগাল হেসে বললো, না, আসতে নেই তা ঠিক নয়। তবে একটু বেমানান ঠেকে আর কি।

    উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলো মুনিম।

    ডলি বিরক্তির সঙ্গে বললো, তোমরা কি শুরু করলে? বাজে কথা নিয়ে তর্ক করার আর সময় পেলে না। তারপর হাত ঘড়িটার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিলো সে। চলো, ওঘরে সবাই অপেক্ষা করছে।

    সোফা ছেড়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো বজলে। কাপড়ের ওপরে কোত্থেকে একটা পোকা এসে বসেছিলো। হাতের টোকায় সেটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বললো, চলো। বলে আর ওদের জন্যে অপেক্ষা না করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে।

    বজলে চলে যাবার পরেও কেউ কিছুক্ষণ কথা বললে না ওরা। মুনিমের নগ্ন পা জোড়ার দিকে বারবার ফিরে তাকাচ্ছে ডলি।

    অপ্রতিভ হয়ে মুনিম বললো, অমন করে কি দেখছে?

    ডলি ঘর নাড়লো। কিছু না। তারপর মুখখানা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে বললো, আমায় এমন করে অপমান করতে চাও কেন শুনি?

    মুনিম কথাটা বুঝতে না পেরে অবাক হলো। তার মানে?

    তিক্ত হেসে ডলি বললো, জন্মদিনের উৎসবে খালি পায়ে না এলেও পারতে।

    ও। মুহূর্তে নিজের নগ্ন পা জোড়ার দিকে তাকালো মুনিম। আস্তে করে বললো, জানো তো আমরা তিনদিন খালি পায়ে হাঁটাচলা করছি।

    এখানে জুতো পায়ে দিয়ে আসলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না।

    পাগল। মুনিম এবার না হেসে পারলো না।

    ডলি দাঁতে ঠোঁট চেপে কি যেন চিন্তা করলো। দাঁড়াও, বাবার স্যাণ্ডেল এনে দিই। তোমায়। সহসা যেন একটা সমাধান খুঁজে পেলে ডলি। ভয় নেই, এখানে তোমার বন্ধুরা কেউ দেখতে আসবে না।

    হাত ধরে ডলিকে থামালো মুনিম। কি পাগলাম করছে, শোন।

    কি! ডলির মুখখানা কঠিন হয়ে এলো।

    মুনিম বললো, আমায় তুমি ইমমোরাল হতে বলছে?

    ঈষৎ হেসে চমকে ওর দিকে তাকালো ডলি। তারপর হতাশ আর বিরক্তির চাপে ফেটে পড়ে বললো, তোমার যা ইচ্ছা তাই করো গে তুমি। বার কয়েক লম্বা লম্বা শ্বাস নিলো সে। ঠিক আছে তুমি এ ঘরেই বসে। ও ঘরে যেও না। আমি আসছি। বলে চলে যাচ্ছিলো ডলি।

    পেছন থেকে মুনিম সহসা বললো, আমাকে ওঘরে নিয়ে যেতে তোমার লজ্জা হচ্ছে বুঝি?

    ডলি থমকে দাঁড়ালো খুব ধীরে ধীরে ফিরে তাকালো ডলি। ওর চোখের মণিজোড়া জ্বলছে। ঠোঁটের প্রান্তটুকু ঈষৎ কাঁপছে। মৃদু গলায় সে বললো, হ্যাঁ। গলায় একটু জড়তা নেই। কথাটা বলে পলকের জন্যেও সেখানে অপেক্ষা করলো না ডলি, চলে গেলো।

    আবার যখন ফিরে এলো তখন মুখখানা গম্ভীর। হাতে এক প্লেট মিষ্টি।

    টেবিলের ওপরে ছড়ানো বইগুলো সরিয়ে নিয়ে প্লেটটা সেখানে রাখলে সে। মুদু গলায় বললো, নাও খাও।

    তুমি খাবে না?

    না।

    কেন?

    আমি পরে খাবো। গলার বরে কোন উত্তাপ নেই।

    প্লেট থেকে একটি মিষ্টি তুলে নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল মুনিম।

    নাও, তুমি আগে খাও নইলে কিন্তু আমি একটাও খাবো না বলে দিলাম। ডলি এবার আর না করলো না।

    মুনিম আস্তে করে বললো, আমার ওপরে মিছামিছি রাগ করো না ডলি।

    একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখো, আমার কোন দোষ নেই।

    ডলি মৃদু হাসলো, আমি কি তোমার কাছে কোন কৈফিয়ত চেয়েছি।

    উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলো মুনিম, টেবিল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তে সে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লো, ইতস্তত করে বললো, সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। এক্ষুণি যেতে হবে আমার ডলি। ছটার সময় আমার একটা মিটিং আছে।

    মিটিং? ডলির মুখখানা ম্লান হয়ে এলো। আমার জন্মদিনেও তোমাকে মিটিং-এ যেতে হবে। আমি তোমাকে নিয়ে সিনেমায় যাবো বলে এ্যাডভান্স টিকিট কেটেছিলাম।

    না ডলি, তা হয় না। মুনিমের কণ্ঠে অনুনয়ের সুর। আমাকে মিটিং-এ যেতে হবে, না গেলে চলবে না। ডলি ভু বাঁকিয়ে সরে গেলো জানালার পাশে, তারপর চুপচাপ কি যেন ভাবলো অনেকক্ষণ ধরে।

    মুনিম পেছন থেকে ডাকলো, ডলি।

    ডলি ফিরে তাকিয়ে বললো, তুমি মিনিট কয়েকের জন্যেও কি বসতে পারবে না।

    তোমার সঙ্গে আমার একটা জরুরি আলাপ ছিলো।

    বলো। মুনিম বসলো।

    ডলি কোন রকম ভূমিকা করলো না। ওর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, তুমি কি সত্যি আমাকে ভালবাস?

    মুনিম অবাক হলো। সে ভেবে পেল না কেন আজ হঠাৎ এ প্রশ্ন করছে ডলি। কেন, সন্দেহ আছে নাকি?

    আছে।

    কারণ?

    আমার প্রতি তোমার উদাসীনতা। কি মনে করছো তুমি আমায়। আমি কি তোমার ভালবাসার কাঙাল? না তোমার ভালবাসা না পেলে আমি মরে যাবো? সব সময় তুমি সভাসমিতি আর আন্দোলন নিয়ে থাকবে আর আমার্কে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে, কি মনে করেছো তুমি? আমি বাচ্চা খুঁকি নই। সব বুঝি, এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে রীতিমত হাঁপাতে লাগলো ডলি।

    কি বলবে, কি করবে বুঝে উঠতে জারলো না মুনিম। হতবিহ্বলভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো সে। ইতস্তত করে বললো,তোমার এসব প্রশ্নের জবাব দেবার মতো সময় এখন আমার হাতে নেই।

    ডলি তীব্র গলায় বললো, যাতো, আর এসো না।

    যেতে যেতে হোঁচট খেয়ে ফিরে তাকালো মুনিম। তারপর বললো, আচ্ছা! বলে বেরিয়ে গেলো সে।

    মুনিম চলে গেলে খানিকক্ষণ পাথরে গড়া পুতুলের মুর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো ডলি।

    দেহটা উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করলে পর একখানা সোফার উপর বসে পড়লো সে।

    পাশের ঘরে ডলিকে খোঁজ করে না পেয়ে এ ঘরে এলো বজলে হোসন।

    দেখা পেয়ে ঈষৎ ক্লান্তির ভাব করে বললো, কি ব্যাপার, তোমাকে খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান। এখানে একা বসে করছে কি তুমি?

    কিছু না। এমনি বসে আছি। ডলি সোফার ওপরে মাথাটা এলিয়ে দিলো। তোমার শরীর খারাপ করছে নাকি?

    না।

    মুনিম কি চলে গেছে।

    হ্যাঁ।

    ওকি, তোমার মাথা ধরেছে নাকি। অমন করছে কেন?

    কি করছি। ওর উদ্বেগ দেখে ফিক করে হেসে দিলো ডলি।

    তারপর কি মনে হতে আজ এক নতুন দৃষ্টি নিয়ে বজলেকে অনেকক্ষণ চেয়ে দেখলো ডলি। তারপর অকস্মাৎ প্রশ্ন করলো, আহা হামু বাই, রোজ তুমি কেন এখানে আস বলতো?

    বজলে ইতস্তত করে বললো, যদি বলি তোমাকে দেখতে।

    ওর কথায় হঠাৎ যেন শিউরে উঠলো ডলি। মনে মনে খুশি হলো সে। প্রসন্ন হলো।

    কিন্তু সে ভাবটা গোপন রেখে আবার জিজ্ঞেস করলো, কেন দেখতে আসো? দেখবার মতো কি আছে আমার?

    তোমার রূপ! তোমার সৌন্দর্য। নরোম গলায় জবাব দিলো বজলে।

    ডলি চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। এক ঝলক সূক্ষ্ম হাসি ঢেউ খেলে গেলো ঠোঁটের এক কোণ ঘেঁষে। সাদা গাল রক্তাভ হলো। ক্ষণকাল চুপ করে থেকে সহসা সে বললো, আমার কাছে একখানা বাড়তি টিকিট আছে, সিনেমায় যাবে?

    অফকোর্স। বজলের মনটা খুশিতে ভরে উঠলো।

    ডলি ওর দিকে একখানা হাত বাড়িয়ে বললো, চলো।

    পথে ডলি রিকসা নিতে চাইলো।

    বজলে বললো, না জন্মদিনে রিকসা নয় ট্যাকসিতে যাব।

    ডলি না করতে পারলো না। মৃদুস্বরে বললো, তাই ডাকো।

    সিনেমা হলে এসে মাহমুদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো ওদের। শাহানাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে মাহমুদ। কাঁধের উপরে ঈষৎ চাপ দিয়ে বজলে চাপা গলায় শুধালো, শাহানা বুঝি আজকাল তোমার কাছে আছে?

    হ্যাঁ। মাহমুদ মৃদু হাসলো। জান তো, ওর স্বামী ওকে ডিভোর্স করেছে। এখন আমার কাছে থাকে।

    শাহানার পরনে একটা কমলা রঙের শাড়ি। গায়ে কারু আঁকা ব্লাউজ। পায়ে একজোড়া হাইহিল জুতো। ডলির সঙ্গে ওদের পরিচয় করিয়ে দিল বজলে। কাঁধটা একদিকে ঈষৎ কাৎ করে পিটপিট চোখে ডলির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ধূর্তের মতো হাসলো মাহমুদ। তারপর বজলেকে একপাশে ডেকে এনে বললো, মেয়েটা দেখতে বেশ তো।

    জোটালে কোত্থেকে।

    বজলে বিস্মিত হলো। তোমাকে ওর কথা আগে একদিন বলেছিলাম, বলিনি?

    কই মনে পড়ছে নাতো?

    হ্যাঁ বলেছিলাম। তুমি ভুলে গেছে। ও আমার মামাতো বোন।

    ওর কাঁধজোড়া ঝাঁকালো মাহমুদ। তারপর অদূরে দাঁড়ানো ডলির দিকে বারকয়েক ফিরে ফিরে তাকালো সে।

    বজলে ওর দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলো।

    মাহমুদ বললো, চলো এককাপ করে কফি খাওয়া যাক। শো শুরু হবার এখনো বেশ দেরি আছে।

    বজলে বললো, চলো।

  • দুই

    দুই

    ক্লাশে মন বসছিলো না সালমার।

    প্রফেসর নার্ভাস সিসটেমের উপর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন আর সে ভাবছিলো তার কারারুদ্ধ স্বামীর কথা।

    মাঝে মাঝে এমনি হয় তার। মনটা খারাপ থাকলে অথবা কোনো আন্দোলনের সামনে এসে দাঁড়ালে, কোন মিছিল দেখলে, কেন সভা-সমিতিতে গেলে, স্বামীর কথা মনে পড়ে। বড় বেশি মনে পড়ে তখন। কে জানে এখন কেমন আছে রওশন।

    মাসখানেক আগে শেষ চিঠি পেয়েছিলো তার। তারপর আর কোন চিঠি আসেনি।

    আগে নিজ হাতে লিখতে। কি সুন্দর হাতের লেখা ছিলো তার। আজকাল অন্যের হাতে লেখায়।

    হাতের কথা মনে হতে মুখখানা ব্যথায় লাল হয়ে এলো তার। দুখানা হাতই হারিয়েছে রওশন।

    একখানাও যদি থাকতো।

    প্রথমে কিছুই জানতো না সালমা। শুনেছিলো রাজশাহী জেলে গুলি চলেছে। শুনে আর্তচিৎকারে কিংবা গভীর কান্নায় ফেটে পড়ে নি সে। বোব দৃষ্টি মেলে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়েছিলো। মুহূর্তের জন্য চারপাশের এই সচল পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ভুলে গিয়ে, জানালার দুটো শিক দুহাতে ধরে নির্বাক দাঁড়িয়েছিলো সে। বুকের ঠিক মাঝখানটায় আশ্চর্য এক শূন্যতা।

    হয়তো মারা গেছে রওশন।

    পরে শুনলো মরে নি। ভালো আছে সে। সুস্থ আছে।

    এই ঘটনার মাস দুয়েক পরে রাজশাহী জেলে রওশনের সঙ্গে দেখা করতে যায় সালমা। জেল অফিসের সেই ঘরে সেদিন সহসা যেন মাথায় রাজ পড়েছিলো সালমার। যে বলিষ্ঠ হাত দুটো দিয়ে তাকে আলিঙ্গন করতো সে দুটো হাত হারিয়েছে রওশন। শার্টের হাতজোড়া শুধু ঝুলে আছে কাঁধের দুপাশে।

    সালমার মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো মনের ভাবটা আঁচ করতে পেরেছিলো রওশন। তাই ক্ষণিকের জন্যে সেও কেমন উন্মনা হয়ে পড়েছিলো। সেই প্রথম অতি কষ্টে, বাঁধ ভেঙ্গে আসা কান্নাকে সংযত করলে সালমা। আস্তে করে শুধালো, কেমন আছো?

    শূন্য হাতজোড়া সামান্য নড়ে উঠলো। ঠোঁট কাঁপলো। রওশন মৃদু গলায় জবাব দিলে, ভালো।

    নিজেকে বড় বিপন্ন মনে হলো সালমার, মনে হলো শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। বুকের নিচে একটা চিনচিনে ব্যথা। সালমা সহসা প্রশ্ন করে বসলো, খাও দাও কেমন করে? বলে কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলে সে। মুখের রঙ হলদে থেকে নীলে বদল হলো।

    চোখজোড়, অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে রওশন ইতস্তত করে জবাব দিলো, বন্ধুরা খাইয়ে দেয়। বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এসেছিলো তাঁর। আর সালমার চোখে টলটল করে উঠেছিলো দু’ফোটা পানি।

    ভাত না হয় বন্ধুরা খাইয়ে দেয়। কিন্তু কেমন করে বিড়ির ছাই ফেলে সে? কেমন করে বইয়ের পাতা উল্টোয়? কেমন করে জামাকাপড় পরে? ভাবতে গিয়ে হৃৎপিণ্ডটা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠেছিলো তার। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর মুখ তুলে শুধালো, দুহাতেই কি গুলি লেগেছিলো? হ্যাঁ। রওশন জবাব দিলো, আর কয়েক ইঞ্চি এদিক ওদিক হলেই এ জন্যে আর দেখা পেতে না। সহসা শব্দ করে হেসে উঠলো রওশন। অপরিসর সেই ঘরের চার দেয়ালে প্রতিহত হয়ে সে হাসি তীরের ফলার মত এসে বিঁধলো সালমার কানে।

    সালমা শিউরে উঠলো। লোকটা কি পাগল হয়ে গেলো নাকি?

    শূন্য হাতজোড়া তখনন কাঁপছে হাসির ধমকে।

    রওশনের সঙ্গে সালমার প্রথম আলাপ হয়েছিলো এক শাওন ঘন রাতে, ঢাকাতে ওদের টিকাটুলীর বাসায়।

    তখন সালমা স্কুলে পড়তো। বয়সে আরো অনেক ছোট ছিলো। তখন আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের অনেকটা থিতিয়ে এসেছে। গ্রেফতার করে কয়েকশো লোককে আটক করা হয়েছে জেলখানায়। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে।

    রওশনের নামেও পরোয়ানা বেরিয়েছিলো। আর তাই, আজ এখানে, কাল সেখানে গা ঢাকা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো সে।

    একদিন শাওন রাতে রিমঝিম বৃষ্টি ঝরছিলো। দাদার সঙ্গে রওশন এলে ওদের বাসায়।

    বৃষ্টিতে গায়ের কাপড় ভিজে গিয়েছিলো।

    গামছায় গা মুছে নিয়ে দাদা ডাকলেন, সালমা শুনে যা।

    এই আসি, বলে দাদার ঘরে এসে রওশনকে দেখে লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলো সালমা।

    লম্বা গড়ন। উজ্জ্বল রঙ। তীক্ষ্ণ চেহারা। দাদা পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমার বন্ধু রওশন। আর এ আমার বোন সালমা। ক্লাশ নাইনে পড়ে। সালমা হাত তুলে আদাব জানালো তাকে।

    রওশন মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলো, কোন স্কুলে পড়ছে? কামরুন্নেছায়।

    দাদা বললেন, মাসখানেক ও এখানে থাকবে সালমা। ওর দেখাশোনার ভার কিন্তু তোমার ওপর।

    মাসখানেকের জন্যে ওর ভার নিয়েছিলো সালমা।

    জীবনের জন্যে নিতে হবে কে জানতো?

    ক্লাশ শেষে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পুরনো দিনের স্মৃতিটা যেন স্বপ্নের মত মনে হলো ওর।

    শহরের এ অংশটা পুরানো আর ভাঙ্গাচোরা। বাড়িগুলো সব একটার সঙ্গে আরেকটা একেবারে ঠাসা। দরজাগুলো সব এত ছোট যে, ভেতরে যেতে হলে উপুর হয়ে ঢুকতে হয়। রাস্তাগুলো খুব সরু সরু। অনেক জায়গায় এত সরু যে পাশাপাশি একটার বেশি দুটো রিকশা যেতে পারে না। এমনি একটা সরু রাস্তার ওপরে মতি ভাইয়ের ছোট রেস্তোরাঁ।

    সকাল থেকে মনটা আজ কেমন উন্মুখ হয়ে পড়ে আছে তার। কাউন্টারে বসে এতক্ষণ ফজলুর সঙ্গে তর্ক করছিলো সে।

    ফজলু বলছিলো, আমি নিজ কানে শুনে এলাম, করাচীতে কোন এক মন্ত্রী মারা গেছে, তার জন্য খালি পায়ে হেঁটে শোক করছে ওরা।

    আর তুমি বলছে মিথ্যে কথা?

    তুমি একটা আন্ত উলুক। মতি ভাই গাল দিয়ে উঠলো। মন্ত্রীর জন্যে শোক করতে ওদের বয়ে গেছে। আসলে অন্য কোন কারণ আছে।

    আমার তো মনে কেমন ধাঁ ধাঁ লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে। আর জানো? কাল রাতে আমি একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছি। মনে আছে, সেবারে আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই সেবার। মনে পড়ছে না তোমার। উহ্ সে এক জামানা গেছে ভাই। আমার তো মনে হয়েছিলো দুনিয়াটা বুঝি ফানাহ্‌ হয়ে যাবে। চারদিকে শুধু হরতাল আর হরতাল। ইউনিভারসিটির ছাত্ররা। মেডিকেল কলেজ। সেক্রেটারিয়েট। হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি। ব্রিক ওয়ার্ক। রেলওয়ে। সব হিসেব দিয়ে কি আর শেষ করা যায়? তাই মিছিলের তো অন্ত ছিলো না। এ গলি দিয়ে একটা বেরুচ্ছে, ও গলি দিয়ে আরেকটা। সবার হাতে বড় বড় সব প্রাকার্ড। তাতে লাল কালিতে লেখা খুনীরা সব গদি ছাড়। সে এক জমানা গেছে ভাই। একটানা কথা বলতে গিয়ে ঘামিয়ে উঠলো মতি ভাই। কোলের উপর থেকে গামছাখানা তুলে নিয়ে গায়ের ঘাম মুছলো সে। তারপর সামনে ঝুঁকে পড়ে বললো, জানো? এই যে বসে আমি, এখান থেকে বিশ হাত দূরে, ওই-ওইযে ল্যাম্পশোস্টটা দেখতে পাচ্ছে, ওটার নিচে গুলি খেয়ে মারা গেলো আমাদের আমেনার বার বছরের বাচ্চা ছেলেটা।

    ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলো সে। হঠাৎ কোত্থেকে একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামলো ওখানটায়। পুলিশ দেখে, কি যে বলবো, ভাই, এতটুকুন বাচ্চার যে কি সাহস। চিৎকার করে বললো, জুলুমবাজ ধ্বংস হোক।

    মতি ভাই যখন কথা বলছিলো ঠিক তখন চা খাবে বলে রেস্তোরাঁয় এসে ঢুকলো মুনিম আর রাহাত। মতি ভাই তাকিয়ে দেখলে ওদের পা জোড়া নগ্ন। দেখে খুশীতে নড়েচড়ে। বসলো সে। এবার ওদের জিজ্ঞেস করে আসল খবর জেনে নিতে পারবে। সকালে অবশ্য একটা ছেলেকে মতি ভাই পাঠিয়েছিলো মোড়ে যে মেয়েদের স্কুল আছে সেখান থেকে খবর আনতে। কিন্তু, মেয়েরা নাকি গালাগালি করে তাড়িয়ে দিয়েছে ওকে। বলেছে, অমন হেঁড়া কাপড় পরে থাকলে কি হবে টিকটিকিদের আমরা ভালো করে চিনি। খবরদার এখানে যদি আবার আসো, তাহলে ইট মেরে মাথা ফাটিয়ে দেবো।

    এটা ওদের বাড়াবাড়ি।

    একজনকে না জেনেশুনে টিকটিকি বলা উচিত হয় নি ওদের। নিজের মনে ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখতে চেষ্টা করলো মতি ভাই। কিন্তু দেশের যা অবস্থা হয়েছে ওদেরও বা কি দোষ। কে গোয়েন্দা আর কে ভদ্রলোক সেটা বুঝাই বড় মুশকিল হয়ে পড়েছে। অদূরে বসা রাহাত আর মুনিমের দিকে বার কয়েক ফিরে তাকালো মতি ভাই। চা খাচ্ছে আর চাপা গলায় কি যেন আলাপ করছে। মতি ভাইয়ের ভীষণ ইচ্ছে হলো ওরা কি বলছে শুনতে। কিন্তু, সাহস হলো না তার। কে জানে, যদি ছেলে দুটো আবার তাকে গোয়েন্দা বলে সন্দেহ করে বসে। কিম্বা এমন তো হতে পারে যে ছেলে দুটোই গোয়েন্দার লোক। আজকাল তো এসব হরদম হচ্ছে।

    একটু পরে চা কাউন্টারে পয়সা দিতে এলো মুনিম।

    মতি ভাই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলো, আপনারা সবাই আজ খালি পায়ে হাঁটছেন কেন?

    এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মুনিম আর রাহাত পরস্পরের দিকে তাকালো। তারপর সামনে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিসিয়ে মতি ভাইকে কি যেন বললো মুনিম। শুনে মুখটা আনন্দে চিকচিক করে উঠলো তার। তাহলে সে যা আঁচ করেছিলো তাই।

    পয়সা দিয়ে ওরা চলে যাচ্ছিলো। মতি ভাই পেছন থেকে ডাকলো ওদের। ডেকে পয়সাগুলো ফিরিয়ে দিলো হাতে।

    মুনিম অবাক হলো। কি ব্যাপার, এগুলো অচল নাকি?

    না। অচল হতে যাবে কেন? মতি ভাই লজ্জিত হলো, চায়ের পয়সা দিতে হবে না, যান।

    সেকি কথা, জোর করে পয়সাগুলো হাতে গুঁজে দিতে চাইলো মুনিম। মতি ভাই তবু নিলো না।

    রাস্তায় নেবে রাহাতকে বিদায় দিলো মুনিম। বললো, তোমার আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। তুমি যাও। লিফলেটগুলো প্রস থেকে নিয়ে আমি একটু পরেই আসছি। তুমি আসাদকে গিয়ে বলো, নীরার সঙ্গে দেখা করে ও যেন দেয়াল পত্রিকাগুলো নিয়ে আলাপ করে।

    রাহাত ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো, তারপর ধীরে ধীরে বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলো সে।

    পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছলো মুনিম। এটা একটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে ওর। এ নিয়ে অনেকে ঠাট্টা করে। ও হাসে। কিছু বলে না। রুমালটা আবার যথাস্থানে রেখে দিল মুনিম। এখান থেকে সোজা প্রেসে যাবে কিনা ভাবলো। ভাবতে গেলে কপালে ভাঁজ পড়ে ওর। মুখখানা সূচালো হয়ে আসে। চোখজোড়া নেমে আসে মাটিতে।

    মুনিম ভাবছিলো। এমনি সময়ে একটা বাচ্চা ছেলে রাস্তার ওপাশ থেকে ছুটে এসে হাত চেপে ধরলে ওর। মুনিম ভাই, আপনাকে আপা ডাকছে।

    আরে, মিন্টু যে! তুমি এখানে?

    আপনাকে আপা ডাকছে।

    ও। হঠাৎ মুনিমের খেয়াল হলো, তাইতো, ডলিদের বাসার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। এতক্ষণ কোন খেয়াল ছিলো না। নিজের এই অন্যমনস্কতার জন্যে রীতিমত অবাক হলো মুনিম। একটু ইতস্তত করে বললো, এখন আমি খুব ব্যস্ত, বুঝলে মিন্টু, তোমার আপাকে গিয়ে বলো, পরে আসবো। না।

    তাহলে আপা আমায় বকবে। ওইতো উনি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে চলুন না। মিন্টু একেবারে নাছোড়বান্দা।

    ওকে অনেক করে বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হলো মুনিম।

    চোখজোড়া বিড়ালের চোখের মত জ্বলজ্বল করছিলো ডলির।

    মুখটা লাল হয়ে উঠেছিলো রাগে। দোরগোড়ায় পৌঁছতে বললো, না এলেই তো পারতে।

    আসতে তো চাইনি। জোর করে নিয়ে এলো।

    তাইতো বলছি, এলে কেন, চলে যাও না।

    আহ্ বাঁচালে তুমি। বলে চলে যেতে উদ্যত হলো মুনিম।

    পেছন থেকে চাপা গলায় ডলি চিৎকার করে উঠলো। যাচ্ছ কোথায়?

    কেন, তুমি যে যেতে বললে।

    না। ভেতরে এসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার।

    ডলির পিছু পিছু ভেতরে ঢুকলো মুনিম।

    বাসাটা বেশ বড় ডলিদের। সামনে যত্ন করে লাগানো, বাগান। পেছনে একটা ছোট টেনিস কোর্ট, সামনের গোল বারান্দাটা পেটেলে সাজানো বৈঠকখানা। পাশের ঘরটা খালি। তারপর চাকরদের থাকবার কামরা। নিচে ওরা কেউ থাকে না। থাকে দোতালায়।

    মুনিমকে ওর ঘরে বসিয়ে, আলনা থেকে তোয়ালেটা তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো ডলি। বললো, তুমি বসো, আমি এক্ষুণি আসছি।

    আমি কিন্তু বেশিক্ষণ বসতে পারবো না। পরক্ষণে জবাব দিলো মুনিম।

    ডলি তখন চলে গেছে।

    এ ঘর মুনিমের অনেক পরিচিত। বহুবার এখানে এসেছে সে। বসেছে। ঘন্টার পর ঘণ্টা গল্প করেছে ডলির সঙ্গে।

    একটা খাট। খাটের পাশে ডলির পড়বার ডেস্ক। একখানা চেয়ার! ডান কোণে একটা তাকের ওপর যত্ন করে সাজানো কয়েকটা বই। গল্প। উপন্যাস। এর মধ্যে একখানা বইয়ের ওপর চোখ পড়তে এক টুকরো মিগ্ধ হাসির আভা ঢেউ খেলে গেলো ওর ঠোঁটের কোণে। ও বইটা ডলিকে উপহার দিয়েছিলো মুনিম।

    ডলিকে প্রথম দেখেছিলো মুনিম দীর্ঘ ছবছর আগে। দেশ বিভাগের পরে তখন সবে নতুন ঢাকায় এসেছে সে। বাবা-মা তখনো কোলকাতায়। ঢাকায় এসে জাহানারাদের বাসায় উঠেছিলো মুনিম। সম্পর্কে জাহানারা ফুফাত বোন। স্বামী-স্ত্রীতে ওরা মিটফোর্ডের ওখানে থাকত। পাশাপাশি দুটো কামরা। একটা পাকঘর আর সরু একফালি বারান্দা। সপ্তাহ খানেক থাকবে বলে এসেছিলো মুনিম। কিন্তু জাহানারা ছাড়লো না, বললো, কোনোদিন আসবে তা ভাবি নি। এসেছে যখন দিন পনেরো না থেকে যেতে পারবে না। পাগল হয়েছে। সাতদিনের বেশি থাকলে মা-বাবা ভীষণ রাগ করবেন। মুনিম জবাব দিয়েছিলো। সামনের বার এলে পনেরো দিন কেন, মাস খানেক থাকবো।

    কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিন পনেরো থাকতে হয়েছিলো তাকে। কোলকাতায় ফিরে যাবার আগের দিন ডলিকে প্রথম দেখলো সে। হাল্কা দেহ, ক্ষীণ কটি, কাঁচা সোনার মত গায়ের রঙ। প্রথম দৃষ্টিতেই ভালো লেগে গিয়েছিলো মুনিমের। ডলিরা তখন ও পাড়াতেই থাকতো।

    জাহানারার সঙ্গে আলাপ ছিলো বলে বাসায় মাঝে মাঝে আসতো ডলি। তীক্ষ্ণ নাক। পাতলা চিবুক। সরু ঠোটের নিচে একসার ইদুরের দাঁত। ভেতরের ঘরে বসে জাহানারার সঙ্গে গল্প করছিলো সে। পর্দার এপাশ থেকে ওকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো মুনিম। আর, পরদিন ওকে কোলকাতায় চলে যেতে হবে ভেবে মনটা কেন যেন সেদিন বড় খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।

    বছর খানেক পরে ওরা যখন কোলকাতা ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঢাকাতে চলে এলো, ডলিরা তখন চাটগাঁ-এ। খোঁজটা জাহানারার কাছ থেকে পেয়েছিলো মুনিম। জাহানারা প্রশ্ন করলো, হঠাৎ ডলির খোঁজ করছে, ব্যাপার কি? যতদূর জানি, ওর সাথে তো তোমার কোন পরিচয় ছিলো না। মুনিম ঢোক গিলে বললো, না এমনি। সেবার তোমাদের এখানে দেখেছিলাম কিনা, তাই।

    জাহানারা মুখ টিপে হাসলো। তাই বলে।

    তারপর থেকে ডলির কথা প্রায় ভুলে গিয়েছিলো মুনিম। মাঝে মাঝে যে মনে হতো না। তা নয়। তবে সে মনে হওয়ার মধ্যে প্রাণের তেমন সাড়া ছিলো না।

    তখন প্রথম বর্ষের পাঠ চুকিয়ে দ্বিতীয় বৰ্ষ অনার্সে পড়ছে মুনিম। এমনি সময়, একদিন বিকেলে জাহানারাদের ওখানে বেড়াতে গিয়ে ডলিকে আবিষ্কার করলো সে।

    টেবিলে বসে চা খাচ্ছিলো ওরা।

    ওকে দেখে জাহানারা মৃদু হাসলো, মুনিম যে এসো। তারপর ডলির দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, এর কথাই তোমাকে বলেছিলাম ডলি। ডলি আরক্ত হয়ে তাকালো ওর দিকে।

    তারপর আদাব জানিয়ে বললো, জাহানারার কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি।

    তাই নাকি? খুব সহজভাবে ওর সঙ্গে প্রথম আলাপ শুরু হলো মুনিমের। একগাল হেসে বললো, আমিও আপনার কথা অনেকগুনেছি ওর কাছ থেকে। কি শুনেছেন? চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলে এনে আবার নামিয়ে রাখলে ডলি।

    মুনিম বললো, আপনি যা শুনেছেন তাই।

    উত্তরটা শুনে নিরাশ হয়েছিলো ডলি । কিন্তু নির্বাক হয় নি। মাঝে মাঝে দেখা হলে এটা সেটা নিয়ে আলাপ করতে ওর সঙ্গে। কখনো শহরের সেরা ছায়াছবি নিয়ে আলোচনা চলতো। কখনো শেকস্পীয়রের নাটক কিংবা শেলীর কবিতা। প্রথম প্রথম এ আলোচনা ক্ষণায়ু হতো, পরে দীর্ঘায়ু হতে শুরু করলো।

    একদিন দুপুরে ওকে একা পেয়ে জাহানারা অকস্মাৎ প্রশ্ন করে বসলো, আচ্ছা মুনিম, ডলিকে তোমার কেমন লাগে?

    সহসা কোন উত্তর দিতে পারলো না মুনিম। ইতস্তত করে বললো, মন্দ না, বেশ ভালই তো। শেষের কথাটার ওপর বিশেষ জোর দিল সে । জাহানারা মুখ টিপে হাসলো, হুঁ, এই ব্যাপার।

    কেন, কি হয়েছে? পরক্ষণে প্রশ্ন করলো মুনিম।

    না এমনি। তা তুমি অমন লাল হচ্ছে কেন। এতে আবার লজ্জার কি হলো। এবার শব্দ করে হেসে দিলো জাহানারা। আমি সব জানি তো, ডলি আমাকে সব বলেছে।

    হাতমুখ ধুয়ে এ ঘরে ফিরে এসে ডলি দেখলো তাকের উপরে রাখা বইগুলো ঘাটছে মুনিম।

    কি খুঁজছে? ডলি শুধালো ।

    কিছু না। একটা বই হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো মুনিম। বাড়ির চাকরটা দরজা দিয়ে একবার উঁকি দিয়ে চলে গেলো। তোয়ালে দিয়ে মুখখানা মুছে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে সঁড়ালো ডলি। অপূর্ব গ্রীবাভঙ্গি করে বললো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বসো।

    বইটা তাকের ওপর রেখে দিয়ে মুনিম আস্তে করে বললো, না, এবার চলি। না। মুহূর্তে খোলা দরজাটার সামনে পথ আগলে দাঁড়ালো ডলি।

    পাগলামো করো না। আমার এখন অনেক কাজ?

    কি কাজ?

    জান তো সব। তবু আবার জিজ্ঞেস করো কেন?

    না এমনি। কাপড়ের আঁচলটা আঙ্গুলে পেঁচাতে পেঁচাতে মৃদু গলায় জবাব দিলো ডলি।

    তার মুখখানা ম্লান আর বিবর্ণ। খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবার বললে সে, আজ আমার জন্মদিন।

    জন্মদিন! তাইতো, একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম।

    কোনদিন হয়তো আমাকেই ভুলে যাবে। অদ্ভুত গলায় জবাব দিল ডলি।

    মুনিম ইতস্তত করে বললো, কি যা-তা বলছে ডলি।

    ডলি মুখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মুনিমের দিকে তাকিয়ে রইলো ক্ষণকাল।

    ওর মুখে কি যেন খুঁজলো তারপর বললো, তুমি দিনে দিনে কেমন যেন বদলে যাচ্ছো।

    বদলে যাচ্ছি! পরিবর্তনটা কোথায় দেখলে তুমি?

    তোমার ব্যবহারে।

    যেমন–।

    নিজে বুঝতে পারে না? ওটা কি উদাহরণ দিয়ে বলে বুঝিয়ে দিতে হবে? অত্যন্ত পরিষ্কার গলায় টেনে টেনে কথাগুলো বললে ডলি।

    মুনিম নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।মনে মনে একটা উত্তর খুঁজছিলো সে।

    কি বলবে ভেবে না পেয়ে বললো, চলি।

    এবার আর বাধা দিলো না ডলি। বিষণ্ণ মুখখানা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে দরজার সামনে থেকে সরে গেলো সে। আজ বিকেলে আসছে তো?

    হ্যাঁ। আসবে।

    ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একটু পরে রাস্তায় বেরিয়ে এলো মুনিম। দুপুরের দিকে রোদ খুব কড়া হয়ে উঠলো। বাতাস না থাকায় রোদের মাত্রা আরো তীব্রভাবে অনুভূত হলো। মনে হলো পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বটা যেন অর্ধেক কমে গেছে।

    ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে তার শোবার ঘর বানায় বজলে হোসেন গরমে অস্থির হয়ে পড়েছিলো। একটা কবিতা কি একটা গল্প যে লিখবে তাও মন বসছে না। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস ছিলো তিনটে। দুটো অনার্স, এটা সাবসিডিয়ারি। ওর বড়ো দুঃখ হলো যে আজ তিনটে পার্সেন্টেজ নষ্ট হলো। শুধু আজ নয়, আসছে দুটো দিনেও ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারবে না সে। কি করে যাবে? জুতো পায়ে দিয়ে গেলে যে ছেলেরা তাড়া করবে ওকে। অথচ জুতো ছাড়া খালি পায়ে হাঁটার কথা ভাবতেও পারে না বজলে হোসেন। সত্যি খালি পায়ে ইউনিভারসিটিতে যাওয়া কি সম্ভব?

    পাগল। যতসব পাগলামো! হঠাৎ উদ্যোক্তাদের গালাগাল দিতে ইচ্ছে করলো ওর। খেয়ে-দেয়ে কোন কাজ নেই। কি যে করে সরকার। এসব ছেলেদের ধরে ধরে আচ্ছা করে ঠেঙ্গায় না কেন? গরমে গা জ্বালা করছিলো বজলে হোসেনের। বন্ধু মাহমুদকে আসতে দেখে মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠলো। বিছানা ছেড়ে উঠে বললো, মাহমুদ যে, এসো। কি খবর?

    উত্তরে কাঁধটা বেশ কায়দা করে ঝাঁকলো মাহমুদ। তারপর সিগারেটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললো, এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। ভাবলাম, তোমাকে এক নজর দেখে যাই। কি ব্যাপার, আজ বেরোও নি?

    বজলে মাথা নাড়লে, না।

    সিগারেটে একটা টান দিয়ে মাহমুদ কি যেন ভাবতে লাগলো। গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করে সে। এককালে কবিতা লেখার বাতিক ছিলো খুব।

    সেই সূত্রে বজলের সঙ্গে আলাপ। এখন আর লেখে না। একা থাকে শহরে। মা আর ছোট এক বোন আছে, তারা দেশের বাড়িতে।

    একটুকাল পরে বজলে প্রশ্ন করলো, এদিকে কোথায় আসছিলে? মাহমুদ জবাব দিলো, একটা প্রেসে। প্রেসে?

    হ্যাঁ।

    প্রেসে কি কাজ তোমার? বজলে অবাক হলো। তারপর সোৎসাহে বললো, কবিতার বই ছাপাতে দিয়েছ বুঝি? চমৎকার! কনগ্রেচুলেশন মাহমুদ। আমি বলি নি, তুমি ওই চাকরিটার মাথা খেয়ে আবার কবিতা লিখতে শুরু করে দাও। অন গড বলছি তুমি খুব সাইন করবে।

    ওর কথা শুনে হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠলো মাহমুদ। বললো, তোমাদের ছাত্ররা নাকি এখানে একটা প্রেসে লিফলেট ছাপতে দিয়েছে।

    খবর পেয়ে খোঁজ নিতে এসেছিলাম।

    নুইসেন্স। ধপ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো বজলে। তোমাদের সবাইকে ওই একই ভূতে পেয়েছে। খানিকক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে অন্য মনস্কভাবে বললো, কিছু পেলে?

    না, মাহমুদ একটা লম্বা হাই তুললো। ভার্সিটির খবর কি?

    বজলে সংক্ষেপে বললো। জানি না। আমি যাই নি। তারপর কি মনে হতে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলে সে। টেবিলের ওপর থেকে একটা খাতা টেনে নিয়ে আবার বললো, কাল রাতে হঠাৎ একটা দীর্ঘ কবিতার জন্ম দিয়েছি। দেখ তো কেমন হয়েছে। বলে কবিতাটা টেনে টেনে আবৃত্তি করে তাকে শোনাতে লাগলো বজলে হোসেন।

  • এক

    এক

    রাত দুপুরে সবাই যখন ঘুমে অচেতন তখন বৃটিশ মেরিনের সেপাহীরা এসে ছাউনি ফেলেছিলো এখানে। শহরের এ অংশটার তখন বসতি ছিলো না। ছিলো, সার সার উর্ধ্বমুখী গাছের ঘন অরণ্য। দিনের বেলা কাঠুরের দল এসে কাঠ কাটতো আর রাতে হিংস্র পশুরা চড়ে বেড়াতো। শহরে তখন গভীর উত্তেজনা। লালবাগে সেপাহীরা যে কোন মুহুর্তে বিদ্রোহ করবে। যে কটি ইংরেজ পরিবার ছিলো, তারা সভয়ে আশ্রয় নিলো বুড়িগঙ্গার ওপর গ্রিনবোট।

    খবর পেয়ে যথাসময়ে বৃটিশ মেরিনের সৈন্যরা এসে পৌঁছেছিলো আর শহরের এ অংশটা দখল করে তাঁবু ফেলেছিলো এখানে। সে থেকে এর নাম হয়েছিলো, আণ্ডার গোরা ময়দান।
    লোকে বলতো, আণ্ডা গোরার ময়দান। শেষতে লালবাগের নিরস্ত্র সেপাহীদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করেছিলো তারা। মানুষের রক্তে লালবাগের মাটি লাল হয়ে ওঠে। কিছু সেপাহী মার্চ করে পালিয়ে যায় ময়মনসিংহের দিকে। যারা ধরা পড়ে তাদের ফাঁসি দেয়া হয় আণ্ডা গোরার ময়দানে। মৃতদেহগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা হয় গাছের ডালে ডালে।

    লোকে দেখুক। দেশদ্রোহীতার শাস্তি কত নির্মম হতে পারে, স্বচক্ষে দেখুক নেটিভরা।

    এসব ঘটেছিলো একশো বছর আগে। আঠারশো সাতান্ন সালে।

    আণ্ডা গোরার ময়দান এখনো আছে। শুধু নয় পালটেছে তার। লোকে বলে, ভিকটোরিয়া পার্ক।

    সে অরণ্য আজ নেই। মাঝে একটা প্রচণ্ড ঝড় হয়েছিলো। সে ঝড়ে কি আশ্চর্য, গাছের-ডালগুলো ফেটে চৌচির হয়ে গেলো, আর গুঁড়িশুদ্ধ গাছগুলো লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। লোকে বলতো, গাছেরো প্রাণ আছে। পাপ সইবে কেন?

    তারপর থেকে আবাদ শুরু হয়ে এখানে।

    ঘর উঠলো। বাড়ি উঠলো। রাস্তা ঘাট তৈরি হলো। আর মহারানীর নামে গড়া হলো একটা পার্ক।

    আগে জনসভা হতো এখানে এখন হয় না। শুধু বিকেলে ছেলে বুড়োরা এসে ভিড় জমায়। ছেলেরা দৌড়ঝাঁপ দেয়। বুড়োরা শুয়ে-বসে বিশ্রাম নেয়, চিনে বাদামের খোসা ছড়ায়।

    এ হলো গ্রীষ্মে অথবা বসন্তে। শীতের মরশুমে লোক খুব কম আসে, সন্ধ্যার পরে কেউ থাকে
    না।

    এবারে শীত পড়েছিলো একটু বিদঘুটে ধরনের। দি

    নে ভয়ানক গরম। রাতে কনকনে শীত।

    সকালে কুয়াশায় ঢাকা পড়েছিলো পুরো আকাশটা। আকাশের অনেক নিচু দিয়ে মন্থর গতিতে ভেসে চলেছিলো এক টুকরা মেঘ। উত্তর থেকে দক্ষিণে। রঙ তার অনেকটা জমাট কুয়াশার মত দেখতে।

    ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে ঠিক সেই মেঘের মত একটি ছেলেকে হেঁটে যেতে দেখা গেলো নবাবপুরের দিকে। দক্ষিণ থেকে উত্তরে। পরনে তার একটা সদ্য ধোঁয়ান সাদা শার্ট। সাদা প্যান্ট।
    পা জোড়া খালি। জুতো নেই। রাস্তার দুপাশে দোকানীরা পসরা নিয়ে বসেছে। টাউন সার্ভিসের বাসগুলো চলতে শুরু করেছে সবে। ভিড় বাড়ছে। কর্মচঞ্চল লোকেরা গন্তব্যের দিকে ছুটছে রাস্তার দুধার ঘেঁষে। কিন্তু ওদের সঙ্গে এ ছেলেটির একটা আশ্চর্য অসামঞ্জস্য প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে। সব আছে তার। ধবধবে জামা। প্যান্ট। পকেটে কলম। কব্জিতে বাঁধা ঘড়ি। হাতে একটা খাতা। মুখের দিকে তাকালে, ভদ্রলোকের সন্তান বলে মনে হয়। কিন্তু, পায়ে জুতো নেই কেন ওরা জুতো অবশ্য এ দেশের অনেকেই পরে না। পরে না, পরবার সমর্থ নেই বলে আর সামর্থ যে নেই ওদের জীর্ণ মলিন পোষাকের দিকে তাকালে বোঝা যায়। এ ছেলেটির পোষাকে কোন দৈন্য নেই। বরং আভিজাত্যের চমক আছে। তবে, এ পোষাক পরে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে কেন সে?

    এ দৃশ্য যাদের চোখে পড়লো, তারা একটু অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে। তাদের চোখে হঠাৎ জাগা বিস্ময়। মনে ক্ষণিক প্রশ্ন। ছেলেটির মাথায় কোন ছিট নেই তো? পাগল নয় তো ছেলেটা?

    কেউ কেউ তাকে নিয়ে ইতস্তত মন্তব্য করলো। আরে না না, পাগল না। ছেলেটার বোধ হয় কেউ মারা গেছে। তাই শোক করছে খালি পায়ে হেঁটে।

    কেউ বললো, কে জানে এটা একটা ফ্যাশনও হতে পারে। আজকাল কত রকমের ফ্যাশন যে দেখি।

    কেউ বললো, মহররমের তো এখনো অনেক দেরি, তাই না?

    ছেলেটা তখনো হেঁটে চলেছে আপন মনে। মাঝে মাঝে সন্ধানী দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাচ্ছে সে। কি যেন তালাশ করছে। কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে তার চঞ্চল দুটো চোখ। আর যখন কোন লোকের দিকে তাকাচ্ছে সে, তখন তার মুখের দিকে না তাকিয়ে তার পায়ের দিকে দেখছে আগে।

    এমনি করে যখন বংশালের মোড় পেরিয়ে গেলো সে, তখন একজনের দিকে চোখ পড়তে সারামুখে আনন্দের আবীর ছড়িয়ে গেলো তার। পেছন থেকে সে তাকালে, মুনিম ভাই, এই যে, ওদিকে নয়, এদিকে।

    মুনিম পেছন ফিরে তাকালো।

    গায়ের রঙ তার রাতের আঁধারের মতো কালো। মসৃণ মুখ। খাড়া নাকের গোড়ায় পুরু ফ্রেমের চশমা। পরনে একটা ধবধবে পায়জামা পা জোড়া কিন্তু তারও নগ্ন। জুতো নেই।

    মুখোমুখি হতে পরস্পরের দিকে স্নেহার্ড চোখে তাকালো ওরা। মৃদু হাসলো। হেসেই গম্ভীর হয়ে গেলো দুজনে। তারপর পথ চলতে চলতে মুনিম বললো, বাসা থেকে মা বেরুতেই দিচ্ছিলেন না। বুঝলে আসাদ। মায়ের আমার সব সময় ভয়, যদি কিছু ঘটে? আমার অবশ্য এসব বালাই নেই। আসাদ আস্তে করে বললো, মা মরে গিয়ে বোধহয় ভালই হয়েছে। থাকলে নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করতো।

    বলতে গিয়ে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সে।

    ঠাটারী বাজার পর্যন্ত সংখ্যায় ওরা দুজন ছিলো। রেলওয়ে লেবেল ক্রসিং পেরিয়ে গুলিস্তানের কাছে এসে পৌঁছতে সে সংখ্যা দুজন ছাড়িয়ে দশজনে পৌঁছলো।

    ওরা এখন দশজন।

    দশজন মার্জিত পোষাক পরা নগ্ন পায়ের যাত্রী।

    পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ একজন বললো, একি একসঙ্গে হাঁটছো কেন?

    আইনে পড়বে যে, ভাগ হয়ে যাও।

    আসাদ চুপ করে ছিলো। সে বললো, জানো আমি যখন একা ছিলাম তখন সত্যি ভীষণ ভয় হচ্ছিলো আমার। এখন অবশ্য আর তা করছে না।

    ঠিক বলছো। আমারও তাই। তাকে সমর্থন জানালো আরেকজন।

    রমনা পোস্টাফিসটা পেছনে ফেলে ওরা যখন রেলওয়ে হাসপাতালের কাছে এসে পৌঁছেছে তখন একটা পুলিশ বোঝই লরী এসে আচমকা থামলো ওদের সামনে, একটু দূরে। তিন চারজন পুলিশ লরী থেকে নেমে রাস্তায় টহল দিতে লাগলো। পায়ে কালো রঙ দেয়া চকচকে বুট জুতো। পরনে খাকি পোষাক। মাথায় লোহার টুপি হাতে একটা করে রাইফেল। পুলিশ দেখে প্রথমে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো ওরা। পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো।

    একটি নীরব মুহূর্ত। তারপর আবার চলতে শুরু করলো।

    আসাদ বললো, মনে হচ্ছিলো আমাদের ধরবার জন্যে লরীটা থামিয়েছে ওরা। আমিও তাই ভাবছিলাম। বললো, আরেকজন।

    মুনিম কিছু বললো না। পকেট থেকে রুমালটা বের করে নীরবে মুখখানা মুছলো।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে সোজা উত্তরে, তার দুপাশে আকাশমুখী যে গাছগুলো দাঁড়িয়ে তার নাম দেবদারু। ফারুন আসতে সে গাছের পাতা ঝরতে থাকে। ঝরে অনেকটা ইলশেগুঁড়ির মত। ছোট ছোট সবুজ পাতাগুলো ঝরে পড়ে, রাস্তার ওপর সবুজের আস্তরণ বিছিয়ে দেয়। ভোরের দিকে সেখানে শিশিরের অসংখ্য সোনালি বিন্দু আলতো ছড়িয়ে থাকে।

    সেদিনের সেই কুয়াশা ছড়ান ভোরে রাস্তা যখন অনেকটা ফাঁকা আর জনশূন্য তখন তিনটি মেয়েকে এক সারিতে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।

    তাদের সবার পরনে চওড়া পাড়ের ধবধবে শাড়ি।

    প্রথমার চুলগুলো সুন্দর করে বিনুনী করা। মুখে তার চিকেন পক্সের গুড়ি গুড়ি দাগ।

    দ্বিতীয়ার দৈহিক গড়ন একটু ভারী গোছের। চেহারাটা সুন্দর আর কমনীয়। গায়ের রঙ দুধে আলতা মেশানো।

    তৃতীয়ার মেঘ কালো চুল পিঠময় ছড়ান। চোখজোড়া কাটাকাটি আর চিবুকের ওপর একটা মস্ত বড় তিল।

    জুতোবিহীন তিনজোড়া পা সমতালে মাটিতে ফেলছিলো তারা আর এগিয়ে আসছিলো নগ্ন পায়ে শিশির মেখে মেখে।

    ওরা ছিলো তিনজন।

    রানু, বেনু আর নীলা।

    রানু বললো, আপা, কেমন লাগছে রে?

    নীলা মুখ তুলে তাকালো, কি?

    এই খালি পায়ে হাঁটতে।

    কেন, জীবনে কি প্রথম খালি পায়ে হাঁটছে নাকি?

    না। তবে রাস্তায় এই প্রথম।

    বেনু সহসা হেসে উঠলো ওদের কথায়। বললো, আমার কিন্তু বেশ লাগছে। ওপাশ থেকে তখন আরো একটি মেয়ে এগিয়ে আসছিলো মেডিকেল কলেজের দিকে। তার গায়ের এ্যাপ্রন আর হাতের স্টেথোস্কোপ খানা দেখে সহজে অনুমান করা যাচ্ছিলো যে, সে ডাক্তারী পড়ে। অন্যদিন তার পায়ে এক জোড়া সুন্দর স্যাভেল পরানো থাকতো। আজ সেও নগ্ন পায়ে। চলনে তার জড়তা নেই। ক্লান্তি নেই। দৃঢ় পদক্ষেপ।

    কাছে আসতে নীলা মিষ্টি হেসে বললো, কি সালমা যে, ক্লাশে যাচ্ছ বুঝি? তারপর তার নগ্ন পা জোড়ার দিকে চোখ পড়তে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো সে, তুমিও তাহলে, বেশ বেশ।

    হ্যাঁ, আমি। আমিও তোমাদের দলে। সালমা শান্ত গলায় জবাব দিলো। বেনু বললো, তোমাদের আর সবাই, ওরাও খালি পায়ে হাঁটছে তো?

    হ্যাঁ।

    ইডেন কলেজের ওরা?

    ওরাও খালি পায়ে।

    কামরুন্নেছা?

    হ্যাঁ, ওরাও।

    সহসা কি এক আনন্দে চার জোড়া চোখ চিকচিক করে উঠলো।

    রানু বললো, সত্যি কি মজা না?

    তার কথায় আবার মৃদু হেসে উঠলো নীলা। হাসতে গেলে বড় সুন্দর দেখায় ওকে। ছিটেফোটার মত ব্রণের দাগ ছড়ানো মুখখানা হঠাৎ লাল হয়ে পরক্ষণে আবার শুভ্রতায় ফিরে আসে।

    পেছনে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে নীলা বললো, আচ্ছা আমরা এবার চলি সালমা। চলতে গিয়ে কি ভেবে আবার থেমে পড়লো। একা একা যাচ্ছে যে, পুলিশের ভয় নেই।

    ভয়? ভ্রূজোড়া অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা হয়ে এলো তাঁর। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ কাঁপন জাগলো। নীলার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে চাপা অথচ তীব্র গলায় বললো, ভয়, বলতে গিয়ে দুচোখে যেন আগুন ঠিকরে বেরুলো তার, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলো সালমা।

    আশ্চর্য শান্ত গলায় বললো, আমার স্বামী জেলে। ভাই জেলে। ছোট বোনটিও আমার জেলখানায়, আমার ভয় করার মত কিছু আছে।

    তিনটি মেয়ে। তিনটি নারী হৃদয়। মুহূর্তে মোচড় দিয়ে উঠলো।

    সালমার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারলো না ওরা। গুমোট ভাবটা কেটে গেলে নীলা আস্তে করে বললো, চলো। গলা থেকে ফাটা বাঁশের মত আওয়াজ বেরুলো তার।

    বে বললো, কি আশ্চর্য।

    রানুর চোখে তখনো বিস্ময়। সে মুখখানা ফিরিয়ে নিয়ে এলো নীলার দিকে। বেনুর দিকে।

    তারপর।

    রানু, বেনু আর নীলা। ওরা আবার হাঁটতে শুরু করলো।

    কিছুদূরে এসে রানু প্রথম কথা বললো। আপা, যা বলে গেলে সব সত্যি? কেন, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি! ওর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো নীলা। বেনু কিছু বললো না। সে বোবা হয়ে গেছে।

    বিশ্ববিদ্যালয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সবুরের সঙ্গে কথা বলছিলো মুনিম। ছেলেটা একটা বদ্ধ পাগল। কি যে সব বকে বোঝা ভার। বলে, এসব কিছু হবে না মুনিম ভাই, প্রয়োজন একটা আঘাত। সে আঘাত না দিতে পারলে কিছু হবে না। বলে হাসে সবুর। বদ্ধ পাগলের মত হাসে। মুনিম সরে গিয়ে পকেট থেকে এক আনা পয়সা বের করে সিগারেট কিনলো। তারপর পাশে ঝুলানো দড়ি থেকে সিগারেটটা ধরিয়ে নিলে সে। সবুরে চোখ পড়লো মেয়ে তিনটির দিকে। চোখ পড়তেই মুখখানা বিকৃত করে অন্য দিকে সরিয়ে নিলো সে।

    মেয়েরা ওর ভাবভঙ্গী দেখে হেসে উঠলো।

    মুনিম বললো, কি ব্যাপার মুখটা অমন করলে কেন?

    ওই মেয়েগুলোকে আমি দুচোখে দেখতে পারি না বলে।

    কেন, ওরা আবার কি করলো তোমার?

    আমার আবার কি করবে। সবুর মুখখানা প্যাঁচার মতো করে বললো, ওদের দিয়ে কোন কাজ হয় কোনদিন? আজ পর্যন্ত এক আন্দোলনে ওদের আসতে দেখেছো? এখন তো খালি পায়ে হেঁটে খুব বাহাদুরি দেখাচ্ছে। একটা পুলিশ আসুক, দেখবে তিনজন একসঙ্গে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে রাস্তার ওপর।

    কি যা তা বকছো? মুনিম ধমকে উঠলো। তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে। সবুর তবু থামলো না। যাই বল তুমি, ও মেয়েগুলোকে দিয়ে কিছু হবে না। এ আমি হলপ করে বলতে পারি।

    তুমি একটা বদ্ধ পাগল। বলে ফিক করে হেসে দিলো মুনিম। আধপোড়া সিগারেটটা সবুরের দিকে এগিয়ে দিলে। নাও টানো বলে দ্রুত পায়ে মধুর রেস্তোরাঁর দিকে এগিয়ে গেলো সে।

    আমগাছ তলায় একদল ছাত্র জটলা করে এতক্ষণ কি যেন আলাপ করছিলো। মুনিমকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে ঘিরে দাঁড়ালো ওকে।

    একজন বলল, পোস্টারগুলো কোথায় লাগাবা মুনিম ভাই? প্রক্টার সাহেব বড় বেশি গোলমাল শুরু করেছেন। বলছেন, এখানেও লাগাতে দেবেন না। আরেকজন বললো, দেয়াল পত্রিকার কি খবর মুনিম ভাই, ওটা লিখতে দিয়েছেন?

    তৃতীয় জন বললো, ব্যাপার কি? লিফলেটগুলো এখনো এসে পৌঁছলো না প্রেস থেকে?

    একসঙ্গে তিনটে প্রশ্ন।

    পকেট থেকে রুমালটা বের করে মুখ মুছলো মুনিম। সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বললো, সব হবে, এত ব্যস্ত হচ্ছে কেন তোমরা?

    কিন্তু পোস্টারগুলো?

    হ্যাঁ, ওগুলো আমাদের ইউনিয়ন অফিসের দেয়ালে সেঁটে দাও। তারপর একটা ছেলের দিকে তাকালো মুনিম। এই যে রাহাত, তুমি আমার সঙ্গে এসো। একটু প্রেস থেকে ঘুরে

    আসি। দেখি লিফলেটগুলোর কি হলো।

  • আরেক ফাল্গুন

    আরেক ফাল্গুন

    আরেক ফাল্গুন উপন্যাস বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত কথামালা। প্রকাশিত হয় ১৯৬৯।

  • দশ

    দশ

    অবশেষে বুড়ো মকবুল মারা গেলো।

    ধলপহর দেখা দেবার অনেক আগে যখন সারাগ্রাম ঘুমে অচেতন তখন এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো সে।

    সারারাতে কেউ ঘুমোল না।

    গনু মোল্লা, আবুল, রশীদ, সালেহা, মন্তু, টুনি, সবাই জেগে রইল মাথার পাশে। সন্ধেবেলা ফকিরের মা বলছিলো, লক্ষণ বড় ভোলা না। তোমরা কেউ ঘুমায়ো না মিয়ারা, জাইগা থাইকো।

    বহুলোককে হাতের ওপর দিয়ে মরতে দেখেছে ফকিরের মা। তাই, রোগীর চেহারা আর তার ভাবভঙ্গি দেখে সে অনেকটা আন্দাজ করতে পারে।

    সারারাত প্ৰলাপ বকেছে বুড়ো মকবুল।

    কখনো আমেনার নাম ধরে ডেকেছে সে। কখনো ফাতেমার জন্যে উতলা হয়ে উঠেছে। আবার কখনো প্ৰলাপের ঘোরে গরু তাড়িয়েছে। হুঁ হট হট। আরো মরার গরু চলে না। ক্যান; হুঁ হট হট।

    মাথার কাছে বসে সারাক্ষণ কোরান শরিফ পড়ল গনু মোল্লা।

    তারপর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয় এলো বুড়ো মকবুল। প্ৰলাপ বন্ধ হলো। একটু পরে মারা গেল সে।

    ওর বুকের উপর পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো টুনি।

    ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো সে।

    তাৱ বিলাপের শব্দ অন্ধকারে কেঁপে কেঁপে দূর পরীর দীঘির পড়ে মিলিয়ে গেলো।

    বিস্ময়ভরা চোখে টুনির দিকে তাকিয়ে রইলো মন্তু।

    পরদিন দুপুরে বুড়ো মকবুলের মৃতদেহটা যখন কাফনে আবৃত করে খাটিয়ার ওপর তোলা হলো তখন বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠোনের মাঝখানে ডাঙায় তোলা মাছে মতো তড়পাতে লাগলো টুনি। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা নানা সান্তনা দিতে চেষ্টা করলো ওকে। সালেহা, ফকিরের মা, সুরতের বউ ওরাও অনেক কান্নাকাটি করলো অনেকক্ষণ ধরে।

    যেন কেমন শূন্য হয়ে গেছে। একটা থমথমে ভাব নেমে এসেছে গাছের পাতায়। ঘরের চালে। উঠোনে। বাড়ির পেছনে। ছোট্ট পুকুরে আর সবার মনে। একটি লোক দীর্ঘদিন ধরে যে একবারও ঘরের দাওয়ায় বেরুতে পারেনি, বিছানায় পড়েছিলো! যার অস্তিত্ব ছিলো কি ছিলো না সহসা অনুভব করা যেতো না। সে লোকটা আজ নেই। কিন্তু তার এই না-থাকাই যেন সমস্ত থাকার অস্তিত্ত্বকে অস্বীকার করছে।

    সারা দুপুর টুনি কাঁদল।

    সারা বিকেল।

    সারা সন্ধ্যা।

    সালেহা অনেক চেষ্টা করলো। ওকে কিছু খাওয়াতে। সে খেলো না।

    ফকিরের মা বললো, কিছু খাও বউ। না খাইলে শরীর খারাপ অইয়া যাইবো। কিছু খাও।

    তবু খেলো না টুনি।

    মন্তু. সুরত আলী, আবুল, রশীদ কারো মুখে কোনো কথা নেই। কেউ দাওয়ায়, কেউ উঠোনে, কেউ দোরগোড়ায় বসে।

    আজ সহসা যেনো সমস্ত কথা হারিয়ে ফেলেছে ওরা।

    মিয়া-বাড়ির মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। মাথায় টুপিটা পরে নিয়ে গামছাটা কাঁধে চড়িয়ে নামাজ পড়তে চলে গেলো গনু মোল্লা, সুরত আলী, রশীদ। আর আবুলও উঠে দাঁড়ালো।

    রোজ যে তারা নামাজ পড়ে তা নয়। কিন্তু আজ পড়বে। বুড়ো মকবুলের মৃত্যু হঠাৎ পরকাল সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছে ওদের। পুকুর থেকে ওজু করে এসে সুরত আলী বললো, কই, যাইবা না মন্তু মিয়া?

    মন্তু ওর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, চলো। বলতে গিয়ে গলাটা অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠলো ওর।

    দিন তিনেক পর নৌকা নিয়ে বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল মন্তু।

    টুনি ডাকলো, শোনো।

    মন্তু তাকিয়ে দেখলো এ কয়দিনে ভীষণ শুকিয়ে গেছে টুনি।

    চোয়ালের হাড়দুটো বেরিয়ে পড়েছে; চোখের নিচে কালি পড়েছে তার।

    মুখখানা বিষন্ন। মাথায় ছোট একটা ঘোমটা।

    মন্তু বললো, কী।

    টুনি চারপাশে তাকিয়ে আস্তে করে বললো, আমার একডা কথা রাইখবা?

    মন্তু বললো, কও।

    মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলো টুনি। তারপর আস্তে করে বললো, আমারে একদিন সময় কইরা আমাগো বাড়ি পৌছায়া দিয়া আইবা? টুনির চোখজোড়া পানিতে ছলছল করছে। বুড়ো মকবুলের মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গে এ বাড়ির সাথে সকল সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে টুনির। আর কতদিন এখানে এমনি করে পড়ে থাকবে সে।

    মন্তু আস্তে করে বললো, ঠিক আছে যামুনি। কোনদিন যাইবা?

    টুনি মৃদু গলায় বললো, যেইদিন তোমার সুবিধা হয়। বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো সে।

    মন্তু বিব্ৰতবোধ করলো। কী বলে যে ওকে সান্ত্বনা দেবে, ভেবে পেলে না সে। টুনি একটু পরে কান্না থামিয়ে বললো, বড় ইচ্ছা আছিল তোমার বিয়া দেইখা যামু, তোমার হাতে মেন্দি পরাইয়া যামু। থাকন আর গেলো না।

    এ কথার আর উত্তর দিলো না মন্তু। গাঁয়ে সবাই জানে, সামনের শীতে আম্বিয়াকে বিয়ে করছে ও। টুনিও জানে।

    কাপড়ের আঁচলে চোখের পানি মুছে টুনি আবার বললো, বিয়ার সময় আমারে নাইয়র আনবা না?

    নিস্তেজ গলায় মন্তু পরীক্ষণে বললো, আনমু।

    সহসা ওর চোখের দিকে মুখ তুলে তাকালো টুনি। একটুকরো ম্লান হাসিতে ঠোঁটজোড়া কেঁপে উঠলো ওর। আস্তে করে বললো, কথা দিলা মনে থাহে যেন।

    মন্তু বললো, থাকবো।

    একে-একে বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিল টুনি।

    সবার গলা জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষপ করে কান্দলো সে।

    পরীর দীঘির পাড়ের উপর দিয়ে আসার সময় দূর থেকে বুড়ো মকবুলের কবরটি চোখে পড়লো। শুকনো মাটির সাদা ঢেলাগুলো ঢিপির মতো উঁচু হয়ে আছে। সেদিকে তাকাতে সারা দেহ কাঁটা দিয়ে ওঠে। কী এক অজানা ভয়ে বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে যেন।

    ভাটার স্রোতে নৌকো ভাসিয়ে দিলো মন্তু।

    সেই নৌকো।

    যার মধ্যে চড়িয়ে টুনিকে তার বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলো সে; দু-ধারে গ্রাম। মাঝখানে নদী। যতদূর চোখ পড়ে শুধু অথৈ জলের ঢেউ। বর্ষার পানিতে নদী নালা ক্ষেত সব এক হয়ে গেছে। এ সময়ে ভরা নদী দিয়ে নৌকো চালানোর প্রয়োজন হয় না। ক্ষেতের ধারে গোরস্থ-বাড়ির পেছনের ডোবার পাশে দিয়ে নৌকো চালিয়ে নেয়া যায়। এতে করে পথ অনেক সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে।

    টুনি ছইয়ের মধ্যে চুপচাপ বসে রইলো; মাথায় ছোট একখানা ঘোমটা।

    মন্তু সহসা বললো, বাইরে আইসা বসো না। গায়ে বাতাস লাইগবো।

    টুনি পরক্ষণে বললো, আইতাছি।

    কিন্তু সহসা এলো না সে। বাইরে কাঠের পাটাতনের উপরে ছোট হয়ে বসলো সে।

    সেই নদী।

    আগে যেমনটি ছিলো তেমনি আছে।

    আজ নদীর জলে হাতের পাতা ডুবিয়ে দিয়ে খেলা করলো না টুনি। উচ্ছল দৃষ্টি মেলে দু তাকালো না কোনো দিকে।

    শুধু বললো, আম্বিয়ারে বিয়া কইরলে এই নাওড়া তোমার আইয়া যাইবো না?

    মন্তু সংক্ষেপে বললো, হুঁ।

    টুনি বললো, বিয়ার পরে এই বাড়িতে থাকবা, না আম্বিয়াগো বাড়ি চইলা যাইবা?

    এ কথার কোনো জবাব দিলো না মন্তু। সে শুধু দেখলো ঘোমটার ফাঁকে একজোড়া চোখ গভীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।

    উত্তর না-পেয়ে টুনি আবার বললো, চুপ কইরা রইলা যে?

    মন্তু হঠাৎ দূরে আঙুল দেখিয়ে বললো, শান্তির হাট।

    টুনি চমকে তাকালো সেদিকে।

    ভাটার স্রোতে ঠেলে নৌকোটা ধীরেধীরে এগিয়ে চলেছে শান্তির হাটের দিকে। সার বাঁধা দোকানগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে।

    সহসা জোরে দাঁড় টানতে লাগলো মন্তু। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলো নৌকো। পড়তে গিয়ে সঙ্গেসঙ্গে নিজেকে সামলে নিলো টুনি। মাথার উপর থেকে ঘোমটাটা পড়ে যেতে পরীক্ষণেই সেটা তুলে নিলো আবার।

    মন্তু একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। গভীরভাবে কী যেন দেখছে সে।

    নৌকোটাকে ঘাটের দিকে এগুতে দেখে টুনি বললো, ঘাটে ভিড়াইতাছ কান, নামবা নাকি?

    মন্তু চুপ করে রইলো।

    টুনি আবার বললো, হাটে কি কোনো কাম আছে?

    মন্তু মুখখানা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে হঠাৎ মরিয়া গলায় বললো, মনোয়ার হাজীরে কথা দিছিলাম ওর ওইখানে এক রাইতের লাইগা নাইয়ার থাকুম। চলো যাই।

    টুনির দেহটা ধরে কে যেন একটা সজোরে নাড়া দিল। মুহূর্তে চোখজোড়া পাথরের : মতো স্থির হয়ে গেল ওর। মন্তুর মুখের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে।

    মন্তু আবার বললো, মনোয়ার হাজীরে কইলে ও মোল্লা ডাইকা সব ঠিক কইরা দিব। আবেগে গলাটা কাঁপছে ওর।

    টুনির চোখের কোণে তখন দু-ফোটা জল চিকচিক করছে। অত্যন্ত ধীরেধীরে মাথাটা নাড়ালো সে; আর অতি চাঁপা-স্বরে ফিসফিস করে বললো, না তা আর অয় না মিয়া। তা অয় না। বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।

    হাতের বৈঠাটা ছেড়ে দিয়ে বোবা চাউনি মেলে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো মন্তু। একটা – কথাও আর মুখ দিয়ে বেরুলো না ওর।

    তারপর

    তারপর নদীর স্রোত বয়ে চললো। কখনো ধীরে কখনো জোরে; কখনো মিষ্টি মধুর ছন্দে।

    সেদিন হাটবার। সওদা করে বাড়ি ফিরছে মস্তৃ। দু-পয়সার পান। একআনার তামাক আর দশপয়সার বাতাসা কাৰ্তিকের শেষে অগ্রহায়ণের শুরু। ঘরে ঘরে ধান উঠছে। অনেক রাত পর্যন্ত কারো চোখে ঘুম থাকে না। কাজ আর কাজ। সারাদিন ধান কেটে এনে পালা দিয়ে রাখে। রাতে গরু দিয়ে মাড়ায়। তারপর ঝেড়েমুছে সব পরিষ্কার করে রাখতে রাখতে রাত অনেক গড়িয়ে পড়ে।

    হাট থেকে বাড়ি ফিরে এসে মন্তু দেখে, উঠোনে আসর জমিয়ে বসে পুঁথি পড়ছে সুরত আলীর বড় ছেলেটা। মৃত বাবার এ গুণটি অতি সুন্দরভাবে আয়ত্ত্ব করেছে সে। দূর থেকে শুনলে অনেক সময় বোঝাই যায় না। মনে হয় সুরত আলী বুঝি বসে বসে পুঁথি পড়ছে।

    শুন শুন বন্ধুগণৱে শুন দিয়া মন।

    ভেলুয়ার কথা কিছু শুন সর্বজন।

    আজ উঠোনে এসে দাঁড়াতে ওদের সবার কথা মনে পড়লো মন্তুর।

    বুড়ো মকবুল, রশীদ, আবুল, সুরত আলী।

    কেউ নেই।

    জীবনের হাটে সকল বেচাকেনা শেষ করে দিয়ে একদিন আকষ্মাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে ওরা।

    টুনির সঙ্গে দেখা হয়নি অনেক বছর। প্রথম-প্ৰথম খোঁজখবর নিতো। আজকাল সে সময় হয়ে ওঠে না মন্তুর। সারাদিন কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে।

    হীরন আজকাল বুড়ো মকবুলের ঘরে থাকে। বহু আগে প্রথম স্বামী তালাক দিয়েছে ওকে। আবার বিয়ে হয়েছিলো। বছর তিন-চারেক ঘর-সংসার করার পর সেখান থেকেও তালাক পেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। তারপর আর বিয়ে হয়নি।

    এবার ওর একটা ভালো দেখে বিয়ে দেবার চেষ্টা করছে মন্তু। এখন সে বাড়ির কর্তা। সবার বুড়ো। যে-কোনো কাজে সবাই এসে পরামর্শ নেয় ওর।

    উঠোনে এসে দাঁড়াতে ওর হাত থেকে পান, তামাক আর বাতাসাগুলি এগিয়ে নিলো আম্বিয়া। তারপর কোলের বাচ্চাটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, দুপুর থাইকা কানছে, একটু কোলে নাও।

    কোলে নিয়ে ছেলেকে আদর করলে সে। মন্তুকে এগিয়ে আসতে দেখে সবাই পথ ছেড়ে আসরের মাঝখানে বসালো ওকে। এক ছিলিম তামাক সাজিয়ে এনে হাতে দিয়ে গেলো আম্বিয়া।

    ধীরেধীরে রাত বাড়তে লাগলো। চাঁদ হেলে পড়লো পশ্চিমে। উঠোনের ছায়াটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো। পরীর দীঘির পাড়ে একটা রাতজাগা পাখির পাখা ঝাপটানোর আওয়াজ শোনা গেলো। সুরত আলীর ছেলেটা তখনো একটানা পুঁথি পড়ে গেলো।

    কি কহিব ভেলুয়ার রূপের ব্যাখান।

    দেখিতে সুন্দর অতিরে রসিকের পরাণ।

    আকাশের চন্দ্ৰ যেনরে ভেলুয়া সুন্দরী

    দূরে থাকি লাগে যেন ইন্দ্ৰকূপের পরী।

    সুর করে চলে একমনে পুঁথি পড়ছে সে। রাত বাড়ছে। হাজার বছরের পুরনো সেই রাত।

  • নয়

    নয়

    চৈত্র মাসের রোদে পুরো মাঠটা খা খা করছে।

    যেদিকে তাকানো যায় শুধু শুকনো মাটি। পাথরের চেয়েও শক্ত। আর অসংখ্য ফাটল। মাটি উত্তাপ সহ্য করতে না-পেরে ফেটে যায়। দাঁড়কাকগুলো তৃষ্ণায় সারাক্ষণ কা-কা করে উঠে বেড়ায় এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে। বাড়ির আনাচে কানাচে।

    নদী-নালাগুলোতে পানি থাকে না। মানুষ গরু ইচ্ছেমতো পায়ে হেঁটে এপার-ওপার চলে যায়। পুকুরগুলোর পানিও অনেক কমে আসে।

    গরমে ঘরে থাকে না কেউ। গাছের নিচে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে-বসে দিন কটায়। বাতাসে একটি পাতাও নড়ে না। সারাক্ষণ সবাই শুধু হা-হুতাশ করে।

    এমনি সময়ে হীরনকে দেখবার জন্যে ওর শ্বশুরবাড়িতে গেছে বুড়ে মকবুল। যাবার সময় একটা ন্যাকড়ার মধ্যে এককুড়ি মুরগির ডিম সঙ্গে নিয়ে গেছে সে। শূন্য হাতে বেয়াই বাড়ি গেলে হয়তো ওরা লজ্জা দিতে পারে, তাই।

    পথে বামনবাড়ির হাট থেকে চারআনার বাতাসাও কিনেছে সে। বাড়ির বাচ্চাদের হাতে দেবে।

    ভর সন্ধ্যায় মেয়ের বাড়ি থেকে ফিরে এলো মকবুল। বারবাড়ি থেকে ওর ক্লান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, সুরত। সুরত। ও মন্তু, কেউ কি নাই নাকি রে।

    মন্তু গেছে মিয়া-বাড়ি। গাছ কাটার চুক্তি নিয়েছে সে।

    সুরতও সেখানে।

    আবুল বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী ভাইসাব কী আইছে।

    টুনি আর আমেনাও বেরিয়ে এলো বাইরে।

    মকবুল বললো, সুরুত, রশীদ ওরা কই।

    আমেনা বললো, সুরত কাজে গেছে, রশীদ গেছে হাটে, সালেহার লাইগা সাবু আনতে। ওর জ্বর হইছে ভীষণ।

    জ্বর নাহি, আহা কখন আইলো? গায়ের ফতুয়াটা খুলতে খুলতে মকবুল বললো, বাপু, তোমরা সক্কলে একটু সাবধানে থাইকো। ও বিন্তির মা, বঁইচির মা শোনো, তোমরা একটু সাবধানে থাইকো। গোরামে ওলাবিবি আইছে।

    ইয়া আল্লাহ মাপ কইরা দাও। আতঙ্কে সবাই শিউরে উঠলো।

    গনু মোল্লা ওজু করছিলো, সেখান থেকে মুখ তুলে প্রশ্ন করলো, কোনহানে আইছে ওলা, বিবি? কোন বাড়িতে আইছে?

    মকবুল বললো, মাঝি-বাড়ি।

    মাঝি-বাড়ি? একসঙ্গে বলে উঠলো সবাই। কয়জন পড়ছে?

    তিনজন।

    তিনজন কে কে, সে কথা বলতে পারবে না মকবুল। পথে আসার সময় ও-বাড়ির আম্বিয়ার কাছ থেকে শুনে এসেছে সে। বাড়ির সবাইকে আরেক প্রস্থ সাবধান করে দিলো বুড়ো মকবুল, তোমরা সক্কালে একডু হুইসারে থাইকো বাপু। একডু দোয়া-দরুদ পাইড়ো। বলে খড়মটা তুলে ঘাটের দিয়ে চলে গেলো সে।

    ফকিরের মা বুড়ি এতক্ষণ নীরবে শুনেছিলো সব, এবার বিড়বিড় করে বললো, বড় খারাপ দিনকাল আইছে বাপু। যেই বাড়িডার দিকে একবার নজর পড়ে সেই বাড়িডারে এক্কেবারে শেষ কইরা ছাড়ে ওলাবিবি। বড় খারাপ দিনকাল আইছে। বলে নিজের মৃত ছেলেটার জন্য কাঁদতে শুরু-করলো সে।

    টুনি দাঁতমুখ শক্ত করে তেড়ে এলো ওর দিকে, বুড়ি, যাহন তহন কান্দিছ না কইলাম। শিগগির থাম।

    ধমক খেয়ে ফকিরের মা চুপ করে গেলো। সেই বিয়ের সময় সালেহাকে মারার পর থেকে টুনিকে ভীষণ ভয় করে বুড়ি।

    ইতিমধ্যে মন্তু আর সুরত ফিরে এসেছে। কাঁধের উপর থেকে কুড়োলটা মাটিতে নামিয়ে রাখতে না-রাখতে টুনি একপাশে টেনে নিয়ে গেলো মন্তুকে।

    মাঝি-বাড়ি যাও নাই তো? মন্তু ঘাড় নাড়লো, না, ক্যান কী অইছে?

    টুনি বললো, ওলাবিবি আইছে ওইহানে। বলতে গিয়ে মুখখানা শুকিয়ে গেল ওর।

    মন্তুর দু-চোখে বিস্ময়। বললো, কার কাছ থাইকা শুনছ?

    ও-কথার কোনো জবাব না দিয়ে টুনি আবার বললো, শোনো ওই বাড়ির দিকে গেলে কিন্তুক আমার মাথা খাও। যাইও না ক্যান?

    মন্তু সায় দিয়ে মাথা নাড়ালো কিন্তু বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারলো না সে। আজ সকালে মিয়া-বাড়ি যাওয়ার পথে একবার করিম শেখের সঙ্গে দেখা করে গেছে মন্তু। নৌকোটাকে ভালোভাবে মেরামত করার বিষয় অনেকক্ষণ আলাপ করে গেছে ওর সঙ্গে। কিন্তু তখন তো এমন কিছু শুনেনি সে।

    আম্বিয়ার সঙ্গেও দেখা হয়েছিল, সেও কিছু বলেনি। উঠোনের এককোণে দাঁড়িয়ে সাত-পাঁচ ভাবলো মন্তু। বুড়ো মকবুলকে তামাক সাজিয়ে দেবার জন্যে রসুইঘরে গেছে টুনি। এই সুযোগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো সে।

    দীঘির পাদে নন্তু শেখের ভাইঝি জামাই তোরাবের সঙ্গে দেখা হলো। পরনে লুঙি আর হাতে লাঠি, বগলে একজোড়া পুরনো জুতো। মন্তুকে দেখে প্ৰসন্ন হাসির সঙ্গে তোরাব প্রশ্ন করলো, কি মিয়া খবর সব ভালো তো?

    মন্তু নীরবে ঘাড় নাড়লো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, কই যাও, শ্বশুরবাড়ি বুঝি?

    হুঁ। তোরাব শ্বশুরবাড়িতেই যাচ্ছে। কাজকর্মের ফাঁকে অনেকদিন আসতে পারেনি, খোঁজখবর নিতে পারেনি। তাই সুযোগ পেয়ে একবার সকলকে দেখে যেতে এসেছে সে।

    পকেট থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা মন্তুকে দিয়ে আরেকটা নিজে ধরালো। বিড়ি খেতে ইচ্ছে করছিলো না মন্তুর। তবু নিতে হলো।

    সগন শেখের পুকুরপাড়ে এসে থামলো তোরাব। জুতো-জোড়া বগল থেকে নামিয়ে নিয়ে হাত-পা ধোয়ার জন্যে ঘাটে নেমে গেল সে। বললো, একটুখানি দাঁড়ান মিয়া। অজু কইরা নি।

    হাত-পা ধুয়ে জুতো-জোড়া পরে আবার উপরে উঠে এলো তোরাব। পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলগুলো পরিপাটি করে নিয়ে বলল, মাঝি-বাড়ির খবর জানেন নাহি, সক্কলে ভালো আছে তো?

    মন্তু বললো, ভালো তো আছিলো, কিন্তুক একটু আগে শুনছি ওলা লাগছে।

    ওলা। তোরাব যেন আঁতকে উঠলো। পায়ের গতিটা কমিয়ে এসে সে শুধালো, কার কার লাগছে?

    মন্তু বললো, কি জানি ঠিক কইবার পারলাম না।

    হুঁ। হঠাৎ থেমে গেল তোরাব। কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল, তারপর পায়ের জুতো-জোড়া খুলে আবার বগলে নিতে নিতে বললো, এই দুঃখের দিনে গিয়ে ওনাগোরে কষ্ট দেয়নের কোনো মানি আয় না মিয়া। যাই, ফিইরা যাই! যেতে যেতে আবার ঘুরে দাঁড়ালো সে। আস্তে করে বললো, আমি যে আইছিলাম। এই কথাডা কাউরে কইয়েন না মিয়া। বলে মন্তুর উত্তরের অপেক্ষা না-করে যে পথে এসেছিলো সে পথে দ্রুত পায়ে আবার ফিরে বললো তোরাব।

    হাতের বিড়িটা অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ওর চলে—যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মন্তু।

    মাঝি-বাড়ি থেকে একটা করুণ বিলাপের সুর ভেসে এলো সেই মুহুর্তে। একজন বুঝি মারা গেলো। কলজেটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো মন্তুর। মাঝি-বাড়ির দেউড়িটা পেরিয়ে ভেতরে আসতে সারা দেহ কাঁটা দিয়ে উঠলো ওর।

    নন্তু শেখ মারা গেল। হাঁপানি-জর্জর করিম শেখ মৃত বাবার দেহের পাশে বসে কাঁদছে। আম্বিয়া কাঁদছে তার বিছানায় শুয়ে। ওলাবিবি তাকেও ভয় করেছে। তাই বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তি পাচ্ছে না মেয়েটা। সেখান থেকে কাঁদছে সে।

    দাওয়ার উপরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো মন্তু। মাঝি-বাড়ির ছমির শেখ ওকে দেখে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠলো। এই কী মুছিবত আইলো মিয়া, আমরা বুঝি এইবার শেষ অইয়া যামু।

    ওকে শান্ত করার চেষ্টা করলো মন্তু। তারপর ওর কাছ থেকে বাকি খোঁজখবর নিলো সে। ছোটভাই জমির শেখ কবিরাজ আনতে গেছে দু-ক্রোশ দূরে রতনপুরের হাটে। এখনো ফিরে আসেনি, ভোরের আগে যে আসবে তারও কোনো সম্ভাবনা নেই। এই একটু আগে জমির শেখ, পরিবারের ছেলেমেয়ে সবাইকে তায় মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। বুড়োরা মরে গেলেও ছেলেমেয়েগুলো যাতে বাঁচে। নইলে বাপ-দাদার ভিটার ওপরে বাতি দেবার কেউ থাকবে না। ছমির শেখের দু-গণ্ড বেয়ে পানি ঝরছে। তাকে সান্তনা দিতে গিয়ে নিজের চোখজোড়াও ভিজে এলো ওর। আম্বিয়ার ঘরের দিকে তাকাতে দেখলো, বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিলাপ করছে মেয়েটা।

    পরদিন ভোরে একটা খন্তা আর কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো মন্তু। পরীর দীঘির পাড়ে জায়গাটা আগেই দেখিয়ে গেছে ছমির শেখ। কথা ছিলো একটা কবর খোঁড়ার। এখন দুটো খুঁড়তে হবে। একটা নন্তু শেখের জন্যে, আরেকটা জমির শেখের জন্যে। রাতে কবিরাজ আনতে যাওয়ার সময় ভেদবমি শুরু হয় ওর। বাড়িতে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরে মারা গেছে ও।

    আগে মরার জন্য কবর খোঁড়ার কাজটা নন্তু শেখ করতো! গত ত্ৰিশবছর ধরে এ গাঁয়ে যত লোক মরেছে, সবার জন্যে কবর খুঁড়েছে সে। কোদাল হাতে কবর খোঁড়ার সময় প্রায় একটা গান গাইতো নন্তু শেখ। আজ ওর কবরের ছক কাটতে গিয়ে সে গানটার কথা মনে পড়ে গেলো মন্তুর।

    এই দুনিয়া দুই দিনের মুসাফিরখানা ও ভাইরে।

    মইরলে পরে সব মিয়ায়ে যাইতে হইবো কবরে।

    মাটি খুঁড়তো আর টেনে টেনে গান গাইতো নন্তু শেখ। বলতো, কত মানুষের কবর দিলাম, কত কবর খুঁইড়লাম এই জীবনে। তার হিসাব কি আর আছে মিয়া। এমনও দিন গ্যাছে যহন, একদিন সাত আটটা মাটি দিছি।

    গোরস্থানে কোনটা কার কবর। কাকে কোনদিন এবং কোথায় কবর দিয়েছে সবকিছু মুখে মুখে বলে দিতে পারতো নন্তু। আর যখন কবর খুঁড়তে গিয়ে মানুষের অস্থি কিম্বা মাথার খুলি পেতো সে, তখন সবাইকে দেখিয়ে বিজ্ঞের মতো বলতো— চিনবার পার এর? না না তোমরা চিনবা কেমন কইরা। আমি চিনি। এইডা কলিমুল্লা মাঝির মাইয়ার খুলি। এইহানেই তো কবর দিছিলাম ওরে। আহা মাইয়া আছিল বটে একডা। যেনো টিয়াপাখির ছাও। যে একবার দেইখছে সেই আর ভুলবার পারে নাই। বলে খুলিটার দিকে খুব ভালো করে তাকাতো নন্তু শেখ। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার করে দেখতো ওটা, আহা কী মাইয়া কী অইয়া গেছে। সোনার চাঁদ সুরত এহন চিনবারই পারা যায় না। অতি দুঃখের সঙ্গে নন্তু আবার বলতো, গলায় ফাঁস দিয়া মইরছিলো অভাগী। জামাইর সঙ্গে বনিবন অইতো না, তাই। খুলিটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নন্তু বলে যেতো, সেই বহুত দিনের কথা মিয়া, তহন তোমরা সব মায়ের পেটে আছিলা।

    সেই নন্তু শেখের মৃতদেহটা কবরে নামাতে গিয়ে চোখজোড়া পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো মন্তুর। মইরলে পরে সব মিয়ারে যাইতে অইবো কবরে। সারাদিন আর বাড়ি ফিরলো না মন্তু। দীঘির পাড়ে কাটিয়ে দিলো সে। ওর মায়ের কবরটা দেখলো। এককালে বেশ উঁচু ছিলো ওটা। অনেক দূর থেকে চোখে পড়তো। এখন মাটির নিচে খাদ হয়ে গেছে একহাঁটু। অনেকগুলো ছোট ছোট গর্ত নেমে গেছে ভেতরের দিকে, সেখানে মায়ের দু-একখানা হাড় হয়তো আজও খুঁজে পাওয়া যাবে। মায়ের জন্যে আজ হঠাৎ ভীষণ কান্না পেলো। মনে হলো ও বড় একা। এ দুনিয়াতে ওর কেউ নেই।

    শুকনো পাতার শব্দে পেছনে ফিরে তাকিলো মন্তু! টুনি দাঁড়িয়ে পেছনে। সারাদিন ওর দেখা না-পেয়ে অনেক খোঁজের পর এখানে এসেছে সে। মন্তুকে ওর মায়ের কবরের পাশে বসে থাকতে দেখে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো টুনি।

    তারপর ওর কাঁধের ওপর একখানা হাত রেখে আস্তে করে বললো, ঘরে যাইবা চালো।

    কোনো কথা না বলে নীরবে উঠে দাঁড়ালো মন্তু। কিন্তু তক্ষুনি বাড়ি ফিরলো না সে। বললো, তুমি যাও আমি আহি।

    টুনি উৎকণ্ঠিত গলায় বললো, কই যাইবা?

    মন্তু বললো, যাও না। আইতাছি। বলে টুনিকে সঙ্গে নিয়ে পরীর দীঘির পাড় থেকে নেমে এলো সে।

    ও যখন বাড়ি ফিরে এলো তখন বেশ রাত হয়েছে। বারবাড়ি থেকে মন্তু শুনতে পেল গনু মোল্লা ওরা বসে বসে কী যেন আলাপ করছে।

    গনু মোল্লা বলছে, সব অইছে খোদার কুদরত বাপু। নইলে এই দিনে তো কোনোদিনও ওলা বিবিরে আইতে দেহি নাই।

    মকবুল বললো, ওলা বিবির আইজকাল দিনকাল কিছু নাই। যহন তহন আহে।

    আমেনা বললো, এক পা খোড়া বিবির। তবু যে কেমন কইরা এত বাড়ি-বাড়ি যায়, আল্লা মালুম।

    ওর কথা শেষ না-হতেই টুনি জিজ্ঞেস করলো, কেমন কইরা ওর এক পা খোঁড়া অইল বুয়া?

    তখন টুনিকে বোঝাতে লেগে গেলো আমেনা। ওলা বিবি, বসন্ত বিবি। আর যক্ষ্মা বিবি- ওরা ছিলো তিন বোন। তিন বোন একপ্ৰাণ। যেখানে যেতো একসঙ্গে যেতো ওরা। কাউকে ফেলে কেউ বেরুতো না বাইরে।

    একদিন যখন খুব সুন্দর করে সেজেগুজে ওরা রাস্তায় হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলো তখন হঠাৎ হজরত আলীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। ওদের; রঙিন শাড়ি পরে বেরুলে কী হবে, ওদের চিনতে একমুহূর্তেও বিলম্ব হলো না হজরত আলীর। তিনি বুঝতে পারলেন—এর একজন কলেরা, একজন বসন্ত আর একজন যক্ষ্মা বিবি। মানুষের সর্বনাশ করে বেড়ায় এরা। আর তহনি এক কাইণ্ড কইরা বসলেন তিনি। খপ কইরা না ওলা বিবির একখান হাত ধইরা দিলেন জোরে এক আছাড়। আছাড় খাইয়া একখানা পা ভাইঙ্গা গেলো ওলা বিবির। আহা সব খোদার কুদরত।

    মকবুল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, একখান পা দিয়া দুনিয়াডারে জ্বালাইয়া খাইতাছে বেটি। দুই পা থাকলে তো দুনিয়াডারে একদিন শেষ কইরা ফালাইতো! হঠাৎ মন্তুর দিকে চোখ পড়তে বুড়ো মকবুল মুহূর্তে রেগে গেলো। কিরে নবাবের ব্যাটা, তোরে একশোবার কই নাই মাঝি-বাড়ি যাইস না, গেলি ক্যান অ্যাঁ?

    গনু মোল্লা বললো, আক্কেল পছন্দ নাই তো।

    সুরত আলী বললো, বাড়ির কারো যদি এহন কিছু অয় তাইলে কুড়াইল মাইরা কল্লা ফালায়া দিমু তোর।

    ফকিরের মা বুড়ি এতক্ষণ চুপ করে ছিল ৷ এবার সে বললো, বাপু গেলেই কি অইবো, আর না গেলেই কি অইবো। যার মউত আল্লায় যেইদিন লেইখা রাখছে সেই দিন অইবো। কেউ আটকাইবার পারবো না।

    ঠিক কইছেন চাচী আপনি ঠিক কইছেন। সঙ্গেসঙ্গে ওকে সমর্থন জানালো টুনি। ওর কথা শেষ হতেই হঠাৎ ফাতেমা জানালো, গত রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছে সে। দেখেছে একটা খোড়া কুকুর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে।

    বড় ভোলা দেখছ বউ। বড় ভোলা দেখছি। ফকিরের মা পরক্ষণে বললো, ওই খোড়া কুত্তা খোড়া মোরগ আর গরুর সুরত ধইরাই তো আহে ওলা বিবি। এক গেরাম থাইকা অন্য গোরামে যায়। বলে সমর্থনের জন্যে সবার দিকে একনজর তাকালো সে।

    মকবুল জানালো, শুধু তাই নয়। মাঝে মাঝে খোঁড়া কাক, শিয়াল, কিম্বা খোঁড়া মানুষের রূপ নিয়েও গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যাতায়াত করেন ওলা বিবি।

    হ্যাঁ মিয়ারা। বুড়ো মকবুল সবাইকে সাবধান করে দিলো! খোঁড়া কিছুরে বাড়ির ধারে—কাছে আইতে দিয়ো না তোমরা; অচেনা কোনো খোড়া মানুষও না। দেখলেই ওইগুলারে তাড়ায়ে খাল পার কইরা দিও।

    সকলে ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। হ্যাঁ তাই করবে। রাতে ঘুম হলো না মন্তুর। সারাক্ষণ বিছানায় ছটফট করলে সে। না, একটা বিয়ে ওকে এবার করতেই হবে। এমনি একা জীবন আর কত দিন কাটাবে-মন্তু। কিন্তু বিয়ের কথা ভাবতে গেল। ইদানীং টুনি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের কথা ভাবতে পারে না সে। শান্তির হাটের সেই রাত্রির পর থেকে টুনি তার সমস্ত অন্তর জুড়ে বসে আছে।

    গ্রামের কত লোক তাদের বউকে তালাক দেয়। বুড়ো মকবুল কেন তালাক দেয় না টুনিকে?

    হঠাৎ পরীবানুর পুঁথির কথা মনে পড়লো মন্তুর। সুরত আলী মাঝেমাঝে সুর করে পড়ে ওটা।

    ঘর নাই বাড়ি নাই দেখিতে জবর

    পরীবানুর আসিক লইল তাহারি উপর।

    কুলাটিয়া গ্রামের এক গৃহস্থের বউ পরীবানু। স্বামীর সঙ্গে মিলমিশ হতো না। অষ্টপ্রহর ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকতো। ঘর ছেড়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে নীরবে বসে থাকতো সে। আর সেখান থেকে দেখতো একটি রাখাল ছেলেকে। দুরে একটা বটগাছের নিচে বসে একমনে বাঁশি বাজাতো সে। এমনি চোখের দেখায় প্রেম হয়ে গেলো।

    তারপর।

    তারপর একদিন সময় বুঝিয়া দুইজনে পালায়া গেলো চোখে ধূলা দিয়া।

    মন্তুরও তাই মনে হলো। টুনিকে নিয়ে যদি একদিন পালিয়ে যায় সে। দূরে, বহুদূরে, দূরের কোনো গ্রামে কিম্বা শহরে। শান্তির হাটে যদি ওকে নিয়ে যায় সে, তা হলে মনোয়ার হাজী নিশ্চয় একটা বন্দোবস্ত করে দেবে। সেখানে টুনিকে নিয়ে সংসার পাতবে মন্তু। যে-কোনো দোকানে হাজীকে দিয়ে একটা চাকরি জুটিয়ে নেবে সে।

    এমনি আরো অনেক চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো মন্তু।

    সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরুতেই আমেনা জিজ্ঞেস করলো, নন্তু শেখের বাড়ির কোনো খবর জানো?

    না।

    ওমা জানো না? নতু শেখের ছেলে করিম শেখ পড়ছে আজ।

    মন্তু কোনো কথা বললো না। আমেনা বলে চললো, কবিরাজে কিছু কাইবার পরলো না। তাই ও গনু মোল্লারে ডাইক নিছে। একটু ঝাড়ফুক দিয়া যদি কিছু অয়।

    মন্তুকে চুপ করে থাকতে দেখে আমেনাও চুপ করে গেলো। অবশেষে আরও আট-দশটি প্রাণ হরণ করে তবে গ্রাম থেকে বিদায় নিলেন ওলাবিবি। গ্রামের সবাই মসজিদে সিন্নি পাঠালো। মিলাদ পড়ালো বাড়ি বাড়ি।

    ওলা বিবি গেলেন। আর দিনকয়েক পরে বৃষ্টি এলো জোরে। আকাশ কালো করে নেমে এলো অবিরাম বর্ষণ। সারারাত মেঘ গৰ্জন করলো। বাতাস বইলো। আর প্রচণ্ড বেগে ঝড় হলো।

    আগের দিন বিকেলে আকাশে মেঘ দেখে বুড়ো মকবুল তার পুরনো লাঙলটা ঠিক করে নিয়েছে। গরু নেই ওর। রওশন ব্যাপারীর কাছ থেকে একজোড়া গরু ঠিক করে নেবো; যে কদিন হাল চলবে সে কটা দিনের জন্যে ওকে নগদ টাকা দিতে হবে। তা ছাড়া গরুর ঘাস-বিচালির পয়সাটাও জুটাতে হবে তাকে।

    ভোর না-হতেই বেরিয়ে পড়লো মাঠে! আবুল, মন্তু, সুরত আলী, রশীদ, বুড়ো মকবুল আর গ্রামের সবাই। পুরুষরা কেউ বাড়ি নেই।

    পুরো মাঠ জুড়ে হাল পড়েছে। পাথরের মতো শক্ত মাটি বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে নরম হয়ে গেছে।

    হট হট হট হুঁ উঁ উঁ।

    বড় মিয়ার জমিতে লাঙল নামিয়েছে মন্তু আর সুরত।

    এককালে এ জমিটা সুরত আলীর ছিল। সরেস জমি। প্রায় মণ-সাতেক ধান ফলতো তখন। ধানের ভারে গাছগুলো সব নুয়ে পড়ে থাকতো মাটিতে।

    নিজ হাতে ক্ষেতে লাঙল দিতো সুরত। মই দিতো। ধান ফেলতো খুব সাবধানে। গাছ উঠলে, বসে বসে আগাছগুলো পরিষ্কার করতো। ছাই আর গোবর ছড়িয়ে দিয়ে যেতো প্রতিটি অঙ্কুরের গোড়ায় গোড়ায়। তারপর খাজনার টাকা জোটাতে না-পেরে ওটা বড় মিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে সে।

    আহা জমিড়ার কী অবস্থা কইরছে দেখছ? লাঙল ঠেলতে ঠেলতে সুরত আলী বললো, জমির লাইগা; ওগো আধ-পয়সার দরদ নাই। দরদ নাই দেইখাই তো জমিনও ফাঁকি দিবার লাগছে।

    মন্তু সঙ্গে সঙ্গে বললো, গেল বৎসর মোটে দেড়মণ ধান পাইছে। কোথায় সাতমণ আর কোথায়দেড় মণ।

    বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠলো সুরত আলীর। রুগণ গরু দুইটাকে হট হট করে জোরে তাড়া দিয়ে বললো, জমির খেদমত করন লাগে। বুঝলা মন্তু মিয়া, জমির খেদমত করন লাগে ৷ য’ত খেদমত কইরবা তত ধান দিব তোমারে।

    শেষের কথাগুলো স্পষ্ট করে শোনা যায় না। আপন মনে বিড়বিড় করে সুরত! হঠাৎ কোনোখানে যদি কতগুলো টাকা পেয়ে যেতো তাহলে জমিটাকে আবার কিনে নিতো সে। তখন সাতমাণের জায়গায় আটমাণ ধান বের করতো সে এ জমি থেকে।

    আকাশে এখনও অনেক মেঘ, দক্ষিণের বাতাসে উত্তরে ভেসে যাচ্ছে ওরা। যে-কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসতে পারে নিচে। সুরত তখনো চলছে আপন মনে। খোদার ইচ্ছা অইলো, জমিগুলান আমার থাইকা কাইড়া নিলো। খোদার ইচ্ছা! অইলো জমিনগুলান বড় মিয়ারে দিয়া দিলো। জমির লাইগা যার একটুও মায়াদয়া নাই তারই দিলো খোদা দুনিয়ার সকল জমি। এইডা কেমনতরো ইনছাফ অইলো মন্তু মিয়া? ইনছাফ ইনছাফ করো মিয়া, এইডা কেমনতরো ইনছাফ অইলো অ্যাঁ?

    হিরর। হট হট। হুঁ উঁ উঁ। গরুগুলোর লেজ ধরে জোরে তাড়া দিলো সুরত আলী। অদূরে রশীদ তার জমিতে ধান ফেলছে। মিশকালো দেহ বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে ঘাম ঝরছে ওর। হাঁটার সময় মনে হচ্ছে মুখ থুবড়ে ক্ষেতের মধ্যে পড়ে যাবে সে। ওটাও বড় মিয়ার ক্ষেত। বর্গা নিয়ে চাষ করছে রশীদ। ওর পাশের ক্ষেতে মই জুড়েছে বুড়ো মকবুল। কাজ করার সময় আশেপাশের দুনিয়াকে একেবারে ভুলে যায় সে। কোথায় কী ঘটছে লক্ষ করে না। ধান ফেলা শেষ হলে, রশীদ ডাকলো। অ ভাইজান।

    মকবুল মুখ না-তুলেই জবাব দিলো, কী, কও না।

    ধান তো ফালায়া দিলাম আল্লার নাম নিয়া।

    দাও, দাও ফালায়া দাও। এহন যত তাড়াতাড়ি ফালাইবা তত লাভ।

    আর লাভের কথা কইও না। গরুজোড়ার সঙ্গে মই জুড়তে জুডুতে রশীদ জবাব দিলো; ধান বেশি অইলেই বা কী, না আইলেই বা কী। বড় মিয়াকে তো অর্ধেক দিয়া দেওন লাগবো।

    ওই দিয়া-থুইয়া যা থাহে, তাই লাভ। মকবুল সাত্ত্বিনা দিলো ওকে।

    সুরত আলী তখনও আপন মনে বলে চলেছে, পরের জমিতে খাইট্যা কোনো আরাম নাই মন্তু মিয়া, পরের জমি… আরে গরুগুলার আবার কী অইলো। হালার নবাবের ব্যাটা। হট, হট হুঁ উঁ উঁ।

    মন্তু ততক্ষণে গান ধরেছে।

    আশা ছিলো মনে মনে, প্ৰেম করিমু তোমার সনে

    তোমায় নিয়া ঘর বাঁধিমু গহিন বালুর চরে ৷

    হঠাৎ গান থামিয়ে গরুজোড়ার লেজ ধরে সজোরে টান দিলো মন্তু। ইতি, ইতি, ইতি, চল।

    সুরত বললো, গান থামাইলি ক্যান মন্তু। গাইয়া যা, গাইয়া যা।

    মন্তু বললো, না ভাইজান গলাড়া হুকাইয়া গেছে, গান বাইরয় না।

    হ, হ, দুনিয়াড়াই হুকাইয়া গেছে মন্তু মিয়া। তোর গলা হুকায় নাই। জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সুরত আলী। আমাগো জমানায় আহা, কত গান গাইছি, কত ফুর্তি কইরছি। কত রংবাজি দেইখছি। আর অহন দুনিয়াড়াই আরেক রকম অইয়া গেছে মন্তু মিয়া। গাজি কালুর দুনিয়া আর নাই। সোনাভানের দুনিয়া পুইড়া ছাই অইয়া গেছে। বলে কর্কশ গলায় সে নিজে একখানা গান ধরলো।

    যা ছিলো সব হারাইলাম হয় পোড়া কপাল দোষে।

    ও খোদা,

    আমার কপাল এমন তুমি কইরলা কোন রোষে।

    গান গাইতে গাইতে খুকধুক করে অনেকক্ষণ কাশলো সুরত; বাঁ হাত দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে নিলো। থাম থাম আরে থামরে নবাবের বেটা। থা। গরুগুলোকে থামিয়ে তামাক খাওয়ার জন্যে আলোর ধারে এসে বসলো সে। বললো, মন্তু মিয়া আহো, তামুক খাইয়া লও।

    তামাকের গন্ধ পেয়ে মকবুল আর রশীদ ওরাও ক্ষেত ছেড়ে উঠে এলো। জোরে জোরে কয়েকটা টান দিয়ে বুড়ো মকবুলের দিকে হুঁকোটা বাড়িয়ে দিলো সুরত।

    প্ৰথমে একনিশ্বাসে কিছুক্ষণ হুঁকো টানলো মকবুল। তারপর একরাশ ধোয়া ছেড়ে বললে, মন্তু মিয়া তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আইজ সইন্ধ্যা বেলা বাড়ি থাইকো।

    রশীদ। আর সুরত একবার হুঁকোর দিকে তাকালো। কিছু বললো না। ওদের নজর এখন হুঁকোর দিকে।

    সন্ধেবেলা বুড়ো মকবুলের কাছ থেকে কথাটা শুনলো মন্তু। ওর বিয়ের কথা।

    মকবুল ঠিক করেছে এবার সত্যি সত্যি একটা বিয়ে করিয়ে দেবে মন্তুকে। চাচা চাচী এতদিন বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বিয়ে দিয়ে দিতেন। চাচা নেই। মকবুল বেঁচে আছে। বাড়ির মুরব্বি সে। এ ব্যাপারে তার একটা দায়িত্ব রয়েছে। পাত্রী ঠিক করে নিয়েছে মকবুল। মাঝি-বাড়ির আম্বিয়া। নন্তু শেখ আর তার ছেলে করিম শেখ কলেরায় মারা যাবার পর থেকে আম্বিয়া একা। বসতবাড়িটা, বাড়ির ওপরের ছোট্ট ক্ষেতটা আর সেই নৌকোটার এখন মালিক সে। ওকে বিয়ে করলে মন্তু অনেকগুলো সম্পত্তি পেয়ে যাবে একসঙ্গে।

    রশীদ তার ঘরের চালায় খড় দিয়ে ফুটোগুলো মেরামত করছিলো। তাকে ডাকলো মকবুল। তোমরা এইটার একটা ফয়সালা কইরা ফালাও মিয়া। ওই মাইয়া বেশিদিন থাকবো না। বহু লোকের চোখ পইড়ছে।

    চালার উপর থেকে রশীদ বললে, মাইয়ার হাঁপানি, শেষে বাড়ির সক্কলের হাঁপানি অইবো

    মকবুল সঙ্গে সঙ্গে বললো, আরে একবার বিয়া কইরা সম্পত্তিগুলান হাত কইরা নিক পরে দেহা যাইবো, যদি হাঁপানি হয়তো তালাক দিয়া দিবো।

    মন্তু সহসা কিছু বললে না। সে জানে বিয়ে তাকে করতে হবে। আম্বিয়াকে অনেক ভালো লাগছিলো তার। সেদিন যদি বুড়ো মকবুল বলতো তাহলে তক্ষুনি রাজি হয়ে যেতো সে। আজ ভাবতে গিয়ে অদূরে দাঁড়ানো টুনির দিকে তাকালো মন্তু।

    বুড়ো মকবুল বললো, অমন সম্বন্ধ আর পাইবি না মন্তু। চিন্তা করার কিছু নাই। মত দিয়া দে। কাইল রাইতে গিয়া ওর চাচা ছমির শেখের সঙ্গে আলাপ কইরা আহি।

    ফকিরের মা বললো, আপনেরা মুরুব্বি, আপনেরা ঠিক কইরা ফালান।

    আমেনা বললো, ঠিক কথা কইছ চাচী।

    মন্তু তখনও ভাবছে।

    একটা বসতবাড়ি। একটা নৌকো। আর বাড়ির ওপরে একটুকরো ক্ষেত। দেখতেও সুন্দরী সে। আঁটসাঁট দেহের খাঁজে খাজে দুরন্ত যৌবন আটহাত শাড়ির বাঁধন ছিড়ে ফেটে পড়তে চায়।

    বুড়ো মকবুল বললো, তাইলে ওই কথাই রইলো। কাইল রাইতের বেলা ওর চাচার সঙ্গে আলাপ করি গিয়া।

    মন্তু চুপ করে রইলো। তারপর খুব আস্তে করে বললো ও, আপনেরা যেইডা ভালো মনে করেন। করেন।

    মুখ-তুলে তাকাতে পারলো না সে; রসুইঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে টুনি। দাঁত দিয়ে হাতের নখ কাটছে সে। মন্তুর কথা শুনে সহসা শব্দ করে হেসে উঠলে সে। বললো, আমাগো মন্তু মিয়ার বিয়ায় কিন্তুক বড় দেইখ্যা একখান পাল্কি আনন লাগবো।

    ফকিরের মা বললো, মাইয়া এমন কইরা হাসতাছে যান ওরা বিয়ার কথা অইতাছে, দেহ না কারবার।

    ওর দিকে একটা তীব্ৰ কটাক্ষ হেনে পরমুহূর্তে সেখান থেকে সরে গেলো টুনি। বিয়ের কথা শুনে সুরত আলী আর আবুলও সমর্থন জানালো। গনু মোল্লা বললো, ভালা অইছে। মন্তু এইবার সংসারী অইবো।

    রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর টুনি মকবুলকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললো, আপনের সঙ্গে আমার একড়া কথা আছে।

    মকবুল রেগে উঠলো। এই রাতের বেলা এখন ঘুমোতে যাবে। এই সময়ে আবার এমন কী কথা বলতে চায় টুনি। রেগে বললো, কাইল দিনের বেলা কইয়ো।

    টুনি বললো, না অহনি কওনি লাগবো।

    বুড়ো মকবুল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললো, আচ্ছা কও কী কথা।

    চারপাশে দেখে নিয়ে ধীরেধীরে কথাটা বললো টুনি। মকবুল বড় বোকা। নইলে এমন সুযোগটা কেন হেলায় হারাচ্ছে সে। একটা বসতবাড়ি। একটা ক্ষেত। আর একটা নৌকো। ইচ্ছে করলে ওগুলোর মালিক সেও হতে পারে। সে কেন বিয়ে করে না আম্বিয়াকে।

    বুড়ে মকবুল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ও সম্ভাবনার-কথা সে নিজেও ভাবেনি এর আগে। টুনি যা বললো, শুধু তাই নয়। আরো লাভ আছে আম্বিয়াকে বিয়ে করায়। সারাদিন একটানা ধান ভানতে পারে সে। খাটতে পাৱে অসম্ভব।

    ওকে চুপ করে থাকতে দেখে টুনি আবার বললো, চিন্তা কইরতাছ কী, চিন্তা করার কিছুই নাই।

    এ মুহূর্তে টুনিকে ওর নিজের চেয়েও অনেক বড় বলে মনে হলো মকবুলের। মনে হলো টুনির কাছে নেহায়েত একটা শিশু সে।

    একটু পরে চাপা গলায় মকবুল বললো, বড় বউ আর মাইঝা বউ যদি রাজি না অয়?

    টুনি বললো, রাজি অইবো না ক্যান। নিশ্চয় অইবো।

    মকবুল বললো, ওগো না অয় রাজি করুন গেল। কিন্তুক আম্বিয়া?

    মকবুলের কণ্ঠস্বরে গভীর অন্তরঙ্গতা।

    টুনি বললো, চেষ্টা কইরলে সব অয়, অইবো না ক্যান?

    এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো ওরা। মকবুল বললো, বহ বউ। বহ।

    টুনি বসলো ওর পাশে। দুজনে পাশাপাশি। মকবুলের কাঁধের ওপর একখানা হাত রাখলো টুনি। তারপর নীরবে অনেকক্ষণ বসে রইলো ওরা।

    বাড়ির বাচ্চাকাচ্চাদের উঠোনে বসিয়ে কিচ্ছা বলছে ফকিরের মা; চাঁদ সওদাগরের কিচ্ছা। একমনে হা করে শুনছে সবাই।

    সালেহা কাঁদছে ওর ঘরে। কাল দুপুরে ওর মুরগিটাকে শিয়ালে নিয়ে গেছে ধরে। সেই শোকে কাঁদছে সে।

    আমেনা আর ফাতেমা দুজনকে ডেকে এনে সামনে বসিয়ে কথাটা বললো বুড়ো মকবুল।

    শুনে আমেনা সঙ্গেসঙ্গে প্রতিবাদ করলো, এমন কী অভাব আছে আপনের যে ওকে বিয়ে করতে চান?

    ফাতেমা বললো, এই বুড়া বয়সে মাইনষে কইবো কী?

    টুনি বললো, মাইনষের কথা হুইনা কী অইবো। মাইনষে তো অনেক কথা কয়।

    তবু ফাতেমা আর আমেনা ঘোর আপত্তি জানালো। মকবুল অনেক বোঝাতে চেষ্টা করলো ওদের। কিন্তু ওরা রাজি হলো না।

    অবশেষে মকবুল রেগে গেলো, শাসিয়ে বললো, অত কথা বুঝি না। আম্বিয়ারে বিয়া আমি করমুই। তোমরা পছন্দ করো কি না করো।

    কথাটা চাপা থাকলো না। পরদিন বাড়ির সবাই জেনে গেলো ব্যাপারটা। মন্তুর বিয়ে সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে নিজের বিয়ের কথা বলে এসেছে মকবুল। কথাটা আমেনা আর ফাতেমার কাছ থেকে শুনেছে সবাই। মন্তু রীতিমতো অবাক হলো।

    সালেহা উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললো, ইতা কেমন কথা অ্যাঁ। মাইনষে হুনলে কইবো কি?

    ফকিরের মা বললো, মকবুল মিয়ার এইডা উচিত। অয় নাই। যাই কও মিয়া, এইডা উচিত। অয় নাই।

    আমেনা আর ফাতেমা দুজনে মিলে গনু মোল্লার কাছে কাঁদাকাটি করেছে। বলেছে, মানষে হাসিহসি কইরবো। আপনে ওনারে বাধা দ্যান। আপনের কথা ওনি হুনবেন।

    সুরত আর আবুলকে ডেকে ওদের সঙ্গে আলাপ করলো গনু মোল্লা! বললো, বাড়ির বদনাম অইয়া যাইবো।

    শুনে সুরত আলী আর আবুল দুজন খেপে উঠলো। এইসব কি অ্যাঁ, বুড়ার কি ভীমরতি আইছে নাহি?

    আবুল বললো, বুড়া বয়সে এইসব কী পাগলামি শুরু অইছে।

    কিছু বললো না। শুধু মান্তু।

    রাতে গনু মোল্লার ঘরে জমায়েত হলো সবাই।

    রশীদ এলো। আবুল এলো। সুরত আলী, সালেহা, আমেনা, ফাতেমা, ফকিরের মা সবাই এলো।

    এলো না শুধু মন্তু, টুনি, আর যাকে নিয়ে বসা— সেই বুড়ো মকবুল। মকবুল তার ঘরের মধ্যে নীরবে বসে রইল।

    সবকিছু সেও শুনেছে। গনু মোল্লার ঘরে ওরা কেন জমায়েত হয়েছে সব বুঝতে পেরেছে সে। এর মূলে আমেনা আর ফাতেমা; ওর দুই স্ত্রী। যাদের এতদিন খাইয়েছে পরিয়েছে সে। নিমকহারাম, এক নম্বরের নিমকহারাম। চাপা আক্ৰোশে গর্জাতে লাগলো বুড়ো মকবুল।

    টুনি বললো, ওগো হিংসা আইতাছে। ওরা চায় না। আপনে সম্পত্তির মালিক অন। টুনি ঠিক বলেছে, বাড়ির কেউ চায় না ও আম্বিয়াকে বিয়ে করুক। বিয়ে করলে একদিনে অনেকগুলো সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে বুড়ো মকবুল। বাড়ির কেউ সেটা সহ্য করতে পারছে না।

    এক ছিলিম তামুক সাজিয়ে ওর হাতে তুলে দিলো টুনি। বললো, মাথা গরম কইরেন না। এই সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখন লাগে।

    গনু মোল্লার ঘরে সবাই জমায়েত হলেও মকবুলকে সেখানে ডেকে আনার জন্যে যেতে কেউ সাহস করলো না। আবুল বললো সুরতকে যেতে। সুরত বললো ফকিরের মার কথা। ফকিরের মা ভয়ে আঁতকে উঠে বললো, ওরে বাবা আমি যাইবার পারমু না।

    অবশেষে গনু মোল্লাকে আসতে হলো। উঠোন থেকে মকবুলের নাম ধরে ডাকলো সে। মকবুল বেরুলো না। বেরিয়ে এলো টুনি। একটু পরে ভেতরে এসে টুনি বললো, আপনারে যাইতে কয়।

    গনু মোল্লাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বুড়ো মকবুল বললো, ক্যান, ক্যান যাইতে কয়।

    টুনি বললো, কী কথা আছে।

    মকবুল বললো, কথা এইহানে আইসা কইতে পারে না। আমি যামু ক্যান?

    টুনি একে শান্ত করলে। বললো, মাথা গরম কইরেন না, যান না। ওরা কী কয় শুনেন। স্ত্রীর মুখের দিকে পরম নিৰ্ভয়তার সঙ্গে তাকালো বুড়ো মকবুল। তারপর ধীরেধীরে দাঁড়ালো সে।

    বুড়ো মকবুলকে গনু মোল্লার ঘরে ঢুকতে দেখে নড়েচড়ে বসলো সবাই। কারো মুখে কথা নাই।

    টুনি এসে দাঁড়িয়েছে বুড়ো মকবুলের পাশে।

    গনু মোল্লা তার নামাজের চৌকিটার উপর বসলো।

    সবাই চুপ।

    কেউ কিছু বলছে না। কথাটা কী দিয়ে যে শুরু করবে ভেবে উঠতে পারছে না কেউ। টুনিই প্রথম কথা বললো, কই আপনেরা কিছু কইতেছেন না ক্যান। ক্যান ডাকছেন।

    সুরত আলী নড়েচড়ে বসলো।

    আমেনা নীরব।

    ফাতেমা মাটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। গনু মোল্লা বললো, মন্তুর বিয়ার ব্যাপারে কী অইছে। কথাটা বলে মকবুলের দিকে তাকালো সে।

    বুড়ো মকবুল কোনো জবাব দেবার আগেই টুনি বললো, মন্তু কইছে ও আম্বিয়ারে বিয়ে করবো না।

    ওর কথা শুনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল সবাই।

    আমেনা ফিসফিসিয়ে বললো, মিছা কথা।

    ফকিরের মা বললো, কই মন্তু মিয়া কই, তারে ডাহ না।

    কিন্তু মন্তুকে বাড়িতে খুঁজে পাওয়া গেল না। কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে সে।

    টুনি বললো, লাগব না। ওরে, ও আমারে কইছে বিয়া কইরবো না।

    আবুল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, তাইলে আমি বিয়া করুম আম্বিয়ারে। আমার ঘরে বউ নাই, খানাপিনার অসুবিধা অয়।

    ওর কথা সম্পূর্ণ না-হতেই আমেনা আর ফাতেমা একসঙ্গে বলে উঠলো, হুঁ তোমার একটা বউ দরকার।

    বুড়ো মকবুল টুনির দিকে তাকালো।

    টুনি বললো, ক্যান, ধইরা ধইরা মাইরা কবরে পাঠাইবার লাইগা নাহি।

    আবুল রেগে উঠলো, আমার বউ যদি আমি মারি তোমার তাতে কী?

    চুপ কর বেয়াদব, হঠাৎ গর্জে উঠলো মকবুল। এই জিন্দেগিতে আর তোরে বিয়া করামু না আমরা। তিন-তিনটা মাইয়ারে তুই কবরে পাঠাইছস। আবার বিয়ার নাম করছ, শরমও লাগে না। একটুখানি দম নিয়ে বুড়ো পরক্ষণে বললো, আম্বিয়ারে আমি বিয়া করমু ঠিক করছি। বলে টুনির দিকে তাকালে সে।

    আমেনা আর ফাতেমা পরমুহুর্তে প্রতিবাদ জানিয়ে বললো, আপনেরা শুনছেন, শুনছেন আপনেরা ৷ ইতা কিতা কাইবার লাগছে উনি।

    যা কইছি ঠিক কইছি। আঙুল তুলে ওদের দুইজনকে শাসলো মকবুল। তোমাগো যদি ভালো না লাগে তোমরা বাড়ি ছাইড়া চইলা যাও।

    শুনছেন, শুনছেন আপনেরা। কী কয় শুনছেন। আমেনা কেঁদে ফেললো।

    গনু মোল্লা বললো, এইডা ঠিক আইলো না মকবুল মিয়া। এইডা কোনো কামের কথা আইলো না। এই বুড়া বয়সে আরেকডা বিয়া কইরলে মানুষে কী কইবো।

    সুরত আলী আর ফকিরের মা বললো, মাইনষে বাড়ির বদনাম করবো।

    আমেনা বললো, মাইয়া বিয়া দিছে, তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ছিছি কইরবো না।

    কটমট চোখে আমেনার দিকে তাকালো মকবুল।

    ফাতেমা বললো, বুড়া বয়সে ভুতে পাইছে।

    নিমকহারাম, বলে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো বুড়ো মকবুল। তারপর অকস্মাৎ এক অবাক কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো সে। ঘরের মাঝখানে, এতগুলো লোকের সামনে হঠাৎ আমেনা আর ফাতেমা দুজনকে একসঙ্গে তালাক দিয়ে দিলো সে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো, তোরা বাইরইয়া যা আমার বাড়ি থাইকা। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে চমকে উঠলো। পরক্ষণে একটা আর্তনাদ করে মাটিতে পড়লো আমেনা। ফাতেমা মূর্ছা গেলো। ফকিরের মা চিৎকার করে উঠলো, আহারে পোড়াকপাইল্যা, এই কী কইরলি তুই, ওরে পোড়াকপাইল্যা এই কী কইরলি।

    আবুল হঠাৎ বসার পিঁড়িটা হাতে তুলে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারলো মকবুলের কপাল লক্ষ করে। ঘাস খাইয়া বুড়া আইছ অ্যাঁ। ঘাস খাইয়া বুড়া অইছ বেআক্কেইলা কোনহানের।

    দু-হাতে কপাল চেপে মাটিতে বসে পড়লো মকবুল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ফিনকির মতো রক্ত ঝরছে ওর।

    কান্না, চিৎকার, গলাগলি আর হা-হুতাশে সমস্ত ঘরটা মুহূর্তে নরকের রূপ নিলো।

    মকবুলকে দু-হাতে কাছে টেনে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো টুনি।

    ফাতেমার মাথায় পানি ঢালতে লাগলে সালেহা।

    ফকিরের মা আমেনাকে সান্তনা দিতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেললো। উঠোনের এককোণে দাঁড়িয়ে সব শুনলো মন্তু। সব দেখলে সে। কিন্তু কাউকে কিছু বললো না। নীরবে: পরীযর দীঘির দিকে চলে গেলো সে।

    পরদিন বিকেলে খবর পেয়ে আমেনা আর ফাতেমার বাড়ি থেকে লোক এসে নিয়ে গেলো ওদের। যাবার সময় করুণ বিলাপে পুরো গ্রামটিকে সচকিত করে গেলো। এতদিনের গড়ে তোলা সংসার একমুহুর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। ঘরের পেছনে লাগানো লাউ-কুমড়োর মাচাগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমেনা। যাবার সময় ফকিরের মাকে কেঁদে কেঁদে বলে গেলো, হীরনরে খবরড় দিয়ো না। শুইনলে মাইয়া আমার বুক ভাসায়া মইরা যাইব। খোদার কসম রইলো বুয়া, মাইয়ারে আমার খবরাডা দিয়ো না।

    ফাতেমাকে নেয়ার জন্য ভাই এসেছিলো ওর। যাবার সময় বাড়ির সবাইকে শাসিয়ে গেছে ও। বলে গেছে শিকদারবাড়ির লোকগুলোকে একহাত দেখে নেবে সে। বোনের জন্যে চিন্তা করে না ও। আগামী তিনমাসের মধ্যে এর চেয়ে দশগুণ ভালো ঘর দেখে ফাতেমার বিয়ে দিয়ে দেবে।

    মকবুল বিছানায়। মাথায় ওর একটা পট্টি বেঁধে দিয়েছে টুনি। হাড় কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে বুড়োর। মাঝে দু-একবার চোখ মেলে তাকিয়েছিলো, এখন নীরবে ঘুমুচ্ছে। টুনি ওর পাশে বসে বাতাস করছে ওকে।

    রাতে গনু মোল্লা এলো ওর ঘরে। বুড়ো মকবুলের গায়ে-মাথায় হাত দিয়ে ওর জ্বর আছে কিনা দেখলো। তারপর আস্তে করে বললো, রাগের মাথায় ইতা কিতা কইরালা মিয়া। শরীর ভালা হইয়া গেলে ভাবীসাবগোরে বাড়ি নিয়া আহো। রাগের মাথায় তালাক দিলে তো আর তালাক অয় না। ওই তালাক অয় নাই তোমার।

    একবাটি বার্লি হাতে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালে টুনি। আসতে দেখে গনু মোল্লা চুপ করে গেলো।

    টুনির উপরে আক্রোশ পড়েছে সবার। সবাই বুঝতে পেরেছে, এই যে-সব কাণ্ড ঘটে গেছে। এর জন্যে টুনিই দায়ী।

    উঠোনে দাঁড়িয়ে অনেকে কথা বললো। ওর নাম ধরে অনেক গালাগাল আর অভিশাপ দিলো বাড়ির ছেলেমেয়েরা।

    টুনি নির্বিকার। একটি কথার জবাব দিলো না।

    দিনকয়েক পরে আন্বিয়ার চাচা ছমির শেখ জানিয়ে দিয়ে গেলো বুড়ো মকবুলকে বিয়ে করবে না আম্বিয়া। তাছাড়া খুব শিষ্ট্ৰী আম্বিয়ার বিয়ের সম্ভাবনাও নেই।

    কথাটা শুনলো বুড়ো মকবুল; শুনে কোনো ভাবান্তর হলো না। ঘরের কড়িকাঠের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। ইদানীং দিনরাত মকবুলের সেবা-শুশ্রুষা করছে টুনি। সারাক্ষণ ও ওর আশেপাশে থাকে। একটু অবকাশ পেয়ে রসুইঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার পাটটা সেরে আসে সে। মরিচক্ষেত আর লাউ-কুমড়োর গাছগুলোর তদারক করে আসে। মাঝেমাঝে ফকিরের মা আর সালেহার আলাপ শুনে টুনি। মন্তু আর আম্বিয়াকে নিয়ে আলাপ করে ওরা। আজকাল নাকি অনেক রাত পর্যন্ত আম্বিয়াদের বাড়ি থাকে মন্তু। টুনি শুনে। কিছুই বলে না। একদিন বিকেলে মন্তু যখন বাইরে বেরুবে তখন তার সামনে এসে দাঁড়ালো টুনি। বললো, জ্বড়ডা ওর ভীষণ বাইরা গেছে। কবিরাজের কাছ থাইকা একটু ওষুধ আইনা দিবা?

    ওর মুখের দিকে নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মন্তু। ভীষণ শুকিয়ে গেছে টুনি। হঠাৎ বয়সটা যেন অনেক বেড়ে গেছে। ওর। চোখের নিচে কালি পড়েছে। চুলগুলো শুকনো।

    মন্তু ইতস্তত করছিলো; টুনি আবার বললো, আজকা নাহয় মাঝি-বাড়ি নাই গেলা। একটু ওষুধটা আইনা দাও। ওর ঠোঁটের কোণে একটুকরো ম্লান হাসি।

    মন্তু বললো, মাঝি-বাড়ি না গেলে তুমি খুশি অও?

    টুনি পরক্ষণে শুধালো, আমার খুশি দিয়া তুমি কইরবা কী?

    মন্তু কী জবাব দেবে ভেবে পেলো না।

    ওকে চুপ করে থাকতে দেখে টুনি আবার বললো, যাইবা না ক্যা, একশোবার যাইবা। পুরুষমানুষ তুমি কতদিন আর এক-একা থাইকবা।

    ঘর থেকে বুড়ো মকবুলের ডাক শুনে আর সেখানে দাঁড়ালো না টুনি। পরক্ষণে চলে গেলো সে।

    ও চলে যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো মন্তু। তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে।

    রাতে কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ এনে দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লো মন্তু। বর্ষা এগিয়ে আসছে। আম্বিয়া বলেছে নৌকোটা ঠিক করে নেবার জন্য। চাচা ছমির শেখ চেয়েছিলো নৌকোটা নিজে বাইবে। কিন্তু আম্বিয়া রাজি হয়নি। মন্তু ছাড়া অন্য কাউকে ওতে হাত দেবার অধিকার দিতে রাজি নয় সে।

    ছমির শেখ রেগে গালাগাল দিয়েছে ওকে। মন্তু সম্পর্কে কতগুলো অশ্লীল মন্তব্য করে বলেছে, ওর সঙ্গে তোমার মিলামিশা কিন্তুক ভালো আইতাছে না আম্বিয়া। গোরামের লোকজনে পাঁচরকম কথাবার্তা কইতাছে।

    কউক। তাগো কথায় আমার কিছু আইবো যাইবো না। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিয়েছে ওর স্পষ্ট উত্তরে প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়েছে ছমির শেখ। বলেছে, তোমার কিছু আহে না আহে, আমাগো আহে। মন্তুরে কিন্তুক এই বাড়িতে আইতে নিষেধ কইরা দিও বইলা দিলাম।

    তবু বারবার মস্তুকে বাড়িতে ডেকেছে আম্বিয়া। ও গেলে সংসারের নানা কথা নিয়ে আলাপ করেছে। ওর সঙ্গে আজও মন্তুর জন্যে অপেক্ষা করছিলো আম্বিয়া। চুলে তেল দিয়ে সুন্দর করে চুলটা আঁচড়েছে সে। সিঁথি কেটেছে। পান খেয়ে ঠোঁটজোড়া লাল টুকটুকে করে তুলছে।

    ও আসতে একখানা পিঁড়ি এগিয়ে দিলো আম্বিয়া।

    অর্ধেকটা মুখ ঘোমটার আড়ালে ঢাকা। সলজ্জে হাসির ঈষৎ আভাটা চোখে পড়েও যেন পড়তে চায় না।

    আম্বিয়া বললে, এত দেরি আইলো?

    মন্তু বললো, কবিরাজের কাছে গিছলাম।

    কেন গিয়েছিলো তা নিয়ে আর প্রশ্ন করে না আম্বিয়া।

    বিড়বিড় করে কী যেন সব বলে।

    রাতে ওখানে খেলো মন্তু।

    পানটা মুখে পুরে বাইরে বেরিয়ে এলো সে।

    বাইরে তখন ইলশেগুড়ি ঝরছে।

    ক’দিন পরপর বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার উপর দিয়ে পানি গড়াচ্ছে এপাশ থেকে ওপাশে। পানির সঙ্গেসঙ্গে ছোট ছোট বেলে আর পুঁটি ছুটোছুটি করছিলো এদিকে—সেদিকে।

    অন্ধকারের ভেতর ছকু আর মকু দু-ভাই মাছ ধরছিলো বসে বসে। মন্তুকে দেখে বললো, কি মিয়া এত রাইতে কোনদিক থাইকা?

    মাঝি-বাড়ি।

    হুঁ! একটা পুঁটিমাছ ধরে নিয়ে ছকু বললো, চইল্যা যাও ক্যান মন্তু মিয়া! তমাক খাইয়া যাও।

    না মিয়া শরীরডা ভালা নাই।

    মন্তু যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতে মকু বললে, আরো মিয়া যাইবা আর কী, বও। কথা আছে।

    কী কথা কও। জলদি কও। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে মাটিতে বসলো মন্তু।

    নিঝুম রাত। শুধু একটানা জল পড়ানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছে না। মাঝেমাঝে দু-একটা ব্যাঙ ডাকছে। এখানে-ওখানে। আরো তিন-চারটে পুঁটিমাছ ধরে নিয়ে ছকু আস্তে বললো, কি মন্তু মিয়া, তুমি নাহি করিমের বইন আম্বিয়ারে বিয়া কইরতাছ হুনলাম! বলে অন্ধকারে ঘোঁৎঘোঁৎ করে হাসলো সে।

    তামাক খেতে খেতে ওর দিকে তাকালো মন্তু। কিছু বললো না।

    মকু বললো, ভালো মাইয়্যার উপর তোমার চোখ পইড়ছে মন্তু মিয়া। তোমার পছন্দের তারিফ করন লাগে। অমন মাইয়া এই দুই চাইর গোরামে নাই। আহা সারা গায়ে যেন যৈবান ঢলঢল করতাছে।

    কি মন্তু মিয়া চুপ কইরা রইলা যে? ওকে কনুইয়ের একটা গুতো মারলো ছকু। বিয়া শাদি করবার আগে আমাগোরে একটু জানাইয়ো, একটু দাওয়াত তাওয়াত কইরো।

    করমু! করমু। আগে বিয়া ঠিক হোক তারপর করমু। একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো সে।

    দাওয়ার পাশে টুনি দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে হঠাৎ চেনা যায় না।

    মন্তুর পায়ের গতিটা শ্লথ হয়ে এলো।

    উঠোনে সালেহা আর ফকিরের মা বসে। মন্তুর সঙ্গে আম্বিয়ার বিয়ে নিয়ে রসালো আলোচনা করছে ওরা।

    আম্বিয়ার চাচা আজ বলেছে, সামনের শুক্রবার জুমার নামাজের পর গাঁয়ের মাতবরদের কাছে কথাটা তুলবে সে। বিচার চাইবে। এই-যে রাতে বিরাতে আম্বিয়ার সঙ্গে মন্তুর এত অন্তরঙ্গ মেলামেশা— এ! শুধু সামাজিক অন্যায় নয়, অধৰ্মও বটে।

    তাই নিয়ে মসজিদে বিচার বসাবে আম্বিয়ার চাচা।

    ফকিরের মা বললো, আমি কিন্তুক একটা কথা কইয়া দিলাম বউ। এই মাইয়া একেবারে অলুক্ষুইনা। যেই ঘরে যাইবো সব পুড়াইয়া ছাই কইরা দিবো।

    সালেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ঠিক কইছ চাচী।

    কথাটা বলতে গিয়ে আমেনা আর ফাতেমার কথা মনে পড়ে গেছে ওদের। আম্বিয়ার জন্যেই তো ওদের তালাক দিয়েছে বুড়ো মকবুল। নিজেও মরছে মরণ-রোগে।

    উঠোনে এসে একমুহুর্তের জন্যে দাঁড়ালো মন্তু।

    সালেহা আর ফকিরের মা কথা থামিয়ে তাকালো মন্তুর দিকে।

    টুনি কিছু বললো না। একটু নড়লো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।

    মন্তু ওর ঘরে গিয়ে দরজা এঁটে দিলো।

    কাল ভোরে আবার বেরুতে হবে ওকে।

  • আট

    আট

    দেখতে-না-দেখতে হীরনের বিয়ের দিনটা ঘনিয়ে এলো।

    একমাত্র মেয়ের বিয়ে, তাই আয়োজনের কোনো কার্পণ্য করেনি বুড়ো মকবুল।

    সাড়ে আট টাকা দাম দিয়ে একটা ছাগল কিনেছে সে। হাট থেকে চিকন চাল কিনে এনেছে আর অধসের ঘি।

    মিয়া-বাড়ি থেকে কয়েকটা চিনেমাটির পেয়ালা আর বরতন ধার নিয়ে এলো আমেনা। বরপক্ষের লোকদের মাটির বাসনে খেতে দিলে ফিরে গিয়ে হয়তো বদনাম করবে ওরা, তাই।

    বুড়ো মকবুলের শরীরটা ভালো নেই। চারিদিকে ছুটোছুটি করবে সে শক্তি পাচ্ছে না। সে। তাই বাড়ির অন্য সবার ওপরে বিভিন্ন কাজের ভার দিয়েছে। সুরত আলী, রশীদ, আবুল, মন্তু সবাই ব্যস্ত। বুড়ো শুধু দাওয়ায় একখানা পিড়ির উপর বসে তদারক করছে সব। খোঁজখবর নিচ্ছে। ভূঁইয়া-বাড়ির ঘরের পাশের বড় মেহেদি গাছ থেকে মেহেদি তুলতে গেছে সালেহা আর ফকিরের মা।

    আমেনা আর ফাতেমা, ঘরদোরগুলো লেপে মুছে ঠিক করে নিচ্ছে। পুরো উঠোনটাকে ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে করে তুলছে ওরা। টুনি পুকুরঘাটে, বাসনপত্রগুলো মাজছে।

    যায় বিয়ে, সেই হীরন। রসুইঘরের দাওয়ার চুপটি করে বসে রয়েছে আর অবাক হয়ে বারবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে সবার।

    দুপুর রাতে পাড়াপড়শির অনেকে এলো। এলো বাচ্চাকাচ্চা মেয়েছেলের দল। দুখানা বড় বড় চাটাই বিছিয়ে নিয়ে উঠোনে বসলো ওয়া। তারপর সবাই একসঙ্গে সুর করে গান ধরলোঃ

    মেহেদি তোমরা লাগো কোন কাজে

    আমরা লাগি দুলহা কইন্যার সাজে।।

    ঢেঁকির উপরে তখন আম্বিয়াও গান ধরেছে। বিয়ের ধান ভানতে এসেছে সে। সন্ধে থেকে ঢেঁকির উপর উঠেছে ও আর টুনি! তখন থেকে একমুহূর্তের বিরাম নেই। উঠোনে মেয়েরা গান গাইছলো। তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য টুনি আর আম্বিয়া দুজনে গলা ছেড়ে গান ধরলোঃ

    ভার্টুইয়ে না দিয়ো কলা

    ভাটুইর হইবে লম্বা গলা।

    সব লইক্ষণ কাম চিক্কণ পঞ্চ রঙের ভাটুইরে।

    সহসা শব্দ করে হেসে উঠল। বুড়ো মকবুল। ওর মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে আজ। জোরে জোর হুঁকো টানছে, আর চারপাশে চেয়ে চেয়ে দেখছে সে।

    হীরনকে মাঝখানে বসিয়ে ওর হাতে মেহেদি দিচ্ছে সবাই। মুখখানা নামিয়ে নিয়ে চুপ করে বসে আছে মেয়োটা।

    সুরতের ছেলেমেয়ে— কুদ্দুছ, পুটি, বিস্তি—ওরা হাতে মেহেদি দেবার জন্যে কাঁদাকাটি শুরু করে দিয়েছে। ওদের ধমকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলো সালেহা। মকবুল বললো, আহা তাড়াও ক্যান বউ; একটুখানি মেহেদি ওগোও দাও না। হঠাৎ ফকিরের মা নাচতে শুরু করলো। আঁচল দুলিয়ে, কোমর ঘুরিয়ে ঘুরেঘুরে নাচতে লাগলো সে।

    কই গেলা সুরক্তের বিবি আমার কথা শোন।

    আবের পাঙ্খা হাতে করি আউলাইয়া বাতাস কর।

    ফুলের পাখা হাতে নিয়া জোরে বাতাস কর।

    ওর নাচ দেখে ছেলে বুড়ো সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো একসঙ্গে। ধান ভানা বন্ধ করে টুনি আর আম্বিয়াও বাইরে বেরিয়ে এলো। আম্বিয়াকে আসতে দেখে নাচ থামিয়ে তার দিকে দৌড়ে এলো ফকিরের মা, হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেলো দলের মাঝখানে। তারপর ওকে লক্ষ করে ফকিরের মা গাইলোঃ

    কেমন তোমার মাও ব্যাপারে, কেমন ওরে হিয়া।

    এত বড় মাইয়া অইছ না করাইছে বিয়া।

    ওর গানটা শেষ না-হতেই আম্বিয়া নেচে উঠে। গানের সুরে জবাব দিলোঃ

    কেমন ওরে মাও ব্যাপারে, কেমন ওরে হিয়া

    তোমার মতো কাঞ্চন পাইলে এখন করি বিয়া।

    দূর পোড়া কপাইল্যা, দূর দূর বলে ওকে তাড়া করলো ফকিরের মা। দৌড়ে গিয়ে মন্তুর ঘরের মধ্যে ঢুকে দুয়ারে খিল দিলো আম্বিয়া! বাইরে ছেলে-বুড়োদের রোল পড়েছে তখন।

    সালেহা হেসে বললো, কিরে আম্বিয়া, এত ঘর থাইকতে শেষে আমাগো মন্তু মিয়ার ঘরে ঢুইকা খিল দিলি?

    আরেক প্রস্থ হেসে উঠলো সবাই।

    মন্তু তখন উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

    ওকে দেখে গ্রামের রসুন নানি তার ফোকলা দাঁত বের করে একহাল হেসে বললো, কি মিয়া, ডুইবা ডুইবা পানি খাও। ঘরে গিয়া দেহো কইন্যা তোমার ঘরে গিয়া খিল দিছে।

    মন্তু কী বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। হঠাৎ টুনির কণ্ঠস্বরে চমকে উঠলো সবাই। তীব্র গলায় সে বললো, কী অইতাছে অ্যাঁ? কী অইতাছে। কামকাজ ফালায়া কী শুরু করছ তোমরা। অ্যাঁ?

    সহসা সবাই চুপ করে গেলো। একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো ওরা। টুনি ততক্ষণে রসুইঘরের দিকে চলে গেছে। মন্তু নিৰ্বাক। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে আম্বিয়া। তার চোখমুখ পাকা লঙ্কার মতো লাল। চিবুক আর গলা বেয়ে ঘাম ঝরছে ওর। কিছুক্ষণের জন্য সবাই যেন কেমন একটু স্তব্ধ হয়ে গেলো। একটু আগেকার সেই আনন্দ-উচ্ছল পরিবেশটা আর এখন নেই। ফকিরের মা বিড়বিড় করে বললো, এমন কী কইরছি যে রাগ দেহান লাগছে। বিয়াবাড়ির মইধ্যে হৈচৈ না কইরা কি কান্দাকাটি করমু?

    সালেহা বললো, আমরা নাহয় মন্তু মিয়া আর আম্বিয়ারে নিয়া একটুখানি ঠাট্টামস্করা কইরতাছিলাম, তাতে টুনি বিবির এত জ্বলন লাগে ক্যান।

    ওর কথা শেষ না-হতে ঝড়ের বেগে রসুইঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো টুনি। কী কইল্যা অ্যাঁ? চুলগুলো বাতাসে উড়ছে ওর। চোখজোড়া জ্বলছে।

    সালেহা সঙ্গে সঙ্গে বললো, যা কইবার তা কইছি, তোমার এত পোড়া লাগে ক্যান। বলে মুখ ভ্যাংচালো সে।

    পরক্ষণে একটা অবাক কাণ্ড করে বসলো টুনি। সালেহার চুলের গোছাটা ধরে হ্যাঁচকা টানে ওকে মাটিতে ফেলে দিলো। তারপর চোখেমুখে কয়েকটা এলোপাতাড়ি কিলঘুসি মেরে দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো টুনি ৷ ঘটনার আকস্মিকতা কেটে যেতে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো সালেহা। মনে হলো এ মুহূর্তে ওর মা মারা গেছে। কান্না শুনে এঘর-ওঘর থেকে বেরিয়ে এলো অনেকে।

    মকবুল দাওয়া থেকে চিৎকার করে উঠলো, কিরে কী আইলো অ্যাঁ। কী অইলো।

    রশীদ, সুরুত সবাই ছুটে এলো সেখানে।

    রশীদ বললো, কি, কান্দবি না কইবি কিছু, কী অইছে?

    সালেহা কোনো জবাব দিলো না।

    ফকিরের মা বুঝিয়ে বললো সব। সালেহার কোনো দোষ নাই। আম্বিয়া আর মান্তুকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছিলো ওরা। টুনি বেরিয়ে এসে হঠাৎ সালেহাকে মেরেছে।

    মাইরছে। মাইরছে ক্যান? রশীদ খেপে উঠলো।

    ওকে, রাগতে দেখে আরো জোরে কন্ন জুড়ে দিলো সালেহা।

    বুড়ো মকবুল বিব্ৰতবোধ করলো। ইতস্তত করে বললো, মন্তু আর আম্বিয়া কই গেছে?

    মন্তুকে ঘরে দাওয়াতে বসে থাকতে দেখা গেলো। কিন্তু আম্বিয়াকে পাওয়া গেলো না সেখানে। এই গণ্ডগোলের মধ্যে নীরবে এখান থেকে সরে পড়েছে সে।

    ফকিরের মা বললো, ওগো কোনো দোষ নাই।

    কী ভেবে বুড়ো মকবুল একেবারে শান্ত হয়ে গেলো। আস্তে করে বললো, তোমরা আর হৈচৈ কইরো না। বিয়ের সময় এইসব ভালা না। যা আইছে তার বিচার আমি করমু। খাঁটি বিচার করমু আমি। বলে দাওয়ার দিকে চলে গেলে সে। তারপর হুকোটা হাতে তুলে নিয়ে আবার বললো, কই তোমরা চুপ কইরা রইলা ক্যান, গীত গাও, হ্যাঁ, গীত গাও।

    ছেলে বুড়োরা আবার হৈচৈ করে উঠলো।

    ফকিরের মা আবার গান ধরলো।

    এক বাটা পান এনে ওদের সামনে নামিয়ে রেখে গেলো আমেনা। বললো, খাও।

    কিছুক্ষণের মধ্যে পুরনো আবেশটি ফিরে এলে আবার। ফকিরের মা নাচতে শুরু করলে।

    কেমন তোমার মাও ব্যাপারে কেমন তোমার হিয়া।

    এত বড় ডাঙ্গর অইছো না করাইছে বিয়া।।

    বিয়ের জন্যে কিনে আনা ছাগলটা ঘরের পেছনে বেঁ-বেঁ করে ডাকছে। চোখের কোণজোড়া পানিতে ভিজে উঠেছে ওর।

    ভোর রাত পর্যন্ত কেউ ঘুমালো না।

    তারপর একজন-দুজন করে যায়-যার ঘরে চলে যেতে লাগলো। মন্তু সবে তার ঝাঁপটা বন্ধ করে দেবে এমন সময় বাইরে ধাক্কা দিলো টুনি। ও কিছু বলার আগে ভেতরে এসে ঢুকলো সে। পান খেয়ে ঠোঁটজোড়া লাল করে এসেছে। মুখে একটা প্ৰসন্ন হাসি, হাতে মেহেদি। সঙ্গে একটা মাটির বাটিতে করে আরো কিছু মেহেদি এনেছে সে।

    বাটিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে টুনি আস্তে করে বললো, দেহি তোমার হাত দেহি।

    মন্তু বললো, ক্যান?

    টুনি বললো, তোমারে মেহেদি দিমু।

    মন্তু বললো, না।

    টুনি বললো, না ক্যান— বলে ওর হাতটা টেনে নিলো সে। মাটিতে বসে ধীরেধীরে ওর হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতে লাগলো টুনি। মন্তু কোনো বাধা দিলো না। নীরবে বসে শুধু তাকে লক্ষ করে মৃদু হাসলো।

    কিছুক্ষণ পরে টুনি আবার বললো, আমার একডা কথা রাইখবা?

    কি?

    একডা বিয়া কর।

    হুঁ।

    দুজনে আবার চুপ করে গেলো ওরা।

    ওরা দুহাতের তালুতে সুন্দর করে মেহেদি পরিয়ে দিতে দিতে টুনি আবার বললো, আরেকডা কথা রাইখবা?

    কি?

    আমার পছন্দ ছাড়া বিয়া কইরবা না।

    হুঁ। একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো মন্তু। টুনি পরক্ষণে ওর হাতটা কোলের ওপরে টেনে নিয়ে ছোট একটা দীৰ্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, কথা দিলা? বলে অদ্ভুতভাবে ওর দিকে তাকালো টুনি।

    মন্তু কী বলবে ভেবে পেলো না। বর-কয়েক ঢোক গিললো সে। তারপর হঠাৎ করে বললো, শাপলা তুলতে যাইবা?

    মৃদু হেসে মাথা নাড়ালো টুনি। না!

    তাইলে চলো, মাছ ধরি গিয়া।

    টুনি আরো জোরে মাথা নাড়ালো, না।

    না ক্যান? মন্তুর কণ্ঠে ধমকের সুর।

    টুনি হেসে বললো, লোকে দেইখা ফেলাইলে কেলেঙ্কারি বাধাইবো। বলে উঠে দাঁড়ালো সে। মন্তুকে কথা বলার কোনো সুযোগ না-দিয়ে পরক্ষণে সেখান থেকে চলে গেলো টুনি।

    বিয়ের পরে ক’টা দিন বাড়িটা একেবারে জনশূন্য মনে হলো। ছেলে বুড়ো প্রায় সবাই চলে গেছে হীরনের সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ি। শুধু যায়নি মকবুল আর মন্তু।

    মকবুল যায়নি তাঁর অসুখ বলে। প্রায় বিকেলে জ্বর আসছে ওর। সকালে একেবারে ভালো;

    মন্তুরও শরীরটা ভালো নেই। বিয়ের দিন, রাতে বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লাগিয়েছে সে। বুড়ো মকবুল বলেছে, থাক, তোর গিয়া কাজ নাই। তুই পরে যাইছ।

    তাই থেকে গেছে সে।

    বাড়ির মেয়েছেলেরা ক’দিন ধরে ঘুমুচ্ছে খুব। বিয়ের সময়ে দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি কেউ, তাই।

    বুড়ো মকবুল সাবধান করে দিয়েছে ওদের, অমন করে ঘুমায়ো না তোমরা, চোর আইস সর্বনাশ কইরা দিবো।

    আর আইলেই বা কী নিবো। আছেই বা কী। আমেনা শান্তস্বরে জবাব দিয়েছে। ওর মনটা ভালো নেই। একমাত্র মেয়েকে শ্বশুর-বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে শান্তি পাচ্ছে না সে। বড় একা-এক লাগছে। কে জানে স্বামীর বাড়ি গিয়ে কত কষ্টই না সহ্য করছে হীরন।

    আজ সকাল থেকে মরাকান্না জুড়েছে ফকিরের মা! মৃত ছেলেটার কথা মনে পড়েছে ওর। বেঁচে থাকলে হয়তো সে এখন বিয়ের বয়সী হতো।

    জ্বর নিয়েও বুড়ো মকবুল পুকুরপাড়ে বসে বসে মরিচের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। ফাতেমা দু-বার এসে ডেকে গেছে। ওকে, আপনের কী অইছে। এইরকম কাজ কইরলে তো দুইদিনে মরবেন আপনে।

    কথাটা কানে নেয়নি মকবুল। একমনে পানি ঢালছে সে। মন্তুকে পাঠিয়েছে গাঁয়ের কোবরেজ মশায়ের কাছে। লক্ষণ বলে ঔষধ নিয়ে আসার জন্যে।

    উঠোনে টুনিকে ডেকে তার হাতে ঔষুধগুলো দিয়ে দিলো মন্তু। বললো, কবিরাজ মশায় কইছে, এইগুলান ঠিকমতো খাইতে।

    টুনি ঔষুধগুলো হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বললো, কী অইবো ওষুধ খাইয়া, বুড়া মরুক। বলেই চারপাশে তাকালো টুনি, কেউ শুনলো কিনা দেখলো। মন্তু কোনো জবাব দিলো না ও-কথার। বেড়ার সঙ্গে ঝুলানো হুঁকো আর কল্কেটা নিয়ে রসুইঘরের দিকে চলে গেল সে।

    একটু পরে একবাটি তেঁতুল-মরিচ মেখে এনে মন্তুর সামনে বসলো টুনি। অল্প একটু তেঁতুল মুখে পুরে দিয়ে গভীর তৃপ্তির সঙ্গে তার স্বাদ গ্রহণ করতে করতে টুনি শুধালো, খাইবা?

    বাটিটার দিকে একপলক তাকিয়ে নিয়ে মন্তু বললো, না। তারপর একমনে হুঁকো টানতে লাগলো সে।

    টুনি বললো, কোবিরাজ কী কইছে?

    একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে মন্তু জবাব দিলো, কইছে, কিছু না, ভালা অইয়া যাইবো।

    ভালো অইয়া যাইবো? চোখজোড়া কপালে তুললো টুনি।

    নেড়ি কুকুরটা টুনিকে কিছু খেতে দেখে আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিলো। হঠাৎ দাওয়া থেকে পিড়ি তুলে ওর গায়ে ছুড়ে মারলো টুনি। সারাদিন কেবল পিছে পিছে ঘুরে, কোনোহানে গিয়া একটু শান্তি নাই।

    পিঁড়ির আঘাতে কেঁউ কেঁউ করে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো কুকুরটা।

  • সাত

    সাত

    নবীনগরের ছোট খালে এসে নাওয়ের নোঙর ফেললো মন্তু।

    খালপাড়ে উঠে দাঁড়ালে টুনিদের বাড়ির লম্বা নারকেল আর তালগাছগুলো দেখা যায়। আর সেই তাল-নারকেলের বনের ফাঁকে ওদের দেউড়ি-ঘরটাও চোখে পড়ে এখান থেকে।

    নৌকা থেকে নামবার আগে মুখ-হাতটা ভালো করে ধুয়ে নিলো মন্তু। পুরনো লুঙিটা পালটে নিয়ে নতুন লুঙিটা পরলো, ফতুয়াটা খুলে জামাটা গায়ে দিলো সে। তারপর খদ্দরের চাদরটা কাঁধে ফেলে, পুরনো ছাতাটা বগলে নিয়ে ধীরেধীরে নৌকো থেকে নেমে এলো মন্তু।

    কিছুদূর এসে পকেট থেকে টুপিটা বের করলো।

    আসার সময় বুড়ো মকবুল বারবার করে বলে দিয়েছে, কুটুমবাড়িতে গিয়ে যেন মন্তু এমন কিছু না করে যার ফলে বাড়ির বদনাম হতে পারে। টুপিটা মাথায় পরে নিয়ে চারপাশে দেখতে দেখতে এগিয়ে চললো মন্তু। পথঘাট জানা আছে ওর। এর আগে মকবুলের বিয়ের সময় একবার এসেছিলো সে। দিন তিনেক থেকে গিয়েছে এখানে। রাস্তায় দু-চারজন অপরিচিত লোক ঈষৎ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো ওকে।

    তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুর উড়ে যাচ্ছে এ—গ্রাম থেকে ও—গ্রামে! একটু-একটু করে ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। এদিকের লোকেরা এরমধ্যে খেজুরগাছ কেটে রস নামাতে শুরু করে দিয়েছে। পথে আসতে তিন-চারজন গাছুনির সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো মন্তুর। ধারালো বাটাল দিয়ে গাছ কাটছে ওরা। তারপর মাটির কলসি ঝুলিয়ে দিয়ে নেমে আসছে গাছ থেকে।

    টুনিদের বাড়ির সামনে এসে যার সঙ্গে মন্তুর প্রথম দেখা হলো সে টুনির চাচা মোতালেৰ শিকদার। সন্ধেবেলা গরু-বাছুরগুলোকে ঠেঙিয়ে গোয়ালঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো সে। মন্তুকে আসতে দেখে হা করে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো, মন্তু মিয়া না? কী মনে কইরা।

    মন্তু এগিয়ে এসে পা ধরে সালাম করলো ওর। তারপর বললো, ভাইজান পাডাইছে, টুনি ভাবীরে নিবার লাইগা।

    অ। মুখখানা ঈষৎ ফাঁক করে গরুগুলোকে ঠেঙাতে ঠেঙাতে আবার গোয়ালঘরের দিকে চলে গেলে মোতালেব শিকদায়।

    একটু পরে আবার ফিরে এল সে। বললো, আয়েন ভিতরে আয়েন।

    টুপিটা ঠিক আছে কিনা একবার দেখে নিলো মন্তু, তারপর শিকদারের পিছুপিছু ভেতরে-বাড়িতে এগিয়ে চললো সে।

    ভেতর-বাড়ির পর্দা রক্ষা করা হয়েছে। তারই পাশে কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখের মধ্যে আঙুল পুরে দিয়ে অবাক চোখে দেখছে ওরা।

    ভেতর-বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াতে মন্তু দেখলো, ঘরের দাওয়ায় একটা বাঁশের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে টুনি। সারামুখে ওর হাসি যেন উপচে পড়ছে। নীরবে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে।

    মন্তুকে টুনিদের ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল শিকদার।

    রসুইঘর থেকে টুনির মা বেরিয়ে এলো বাইরে। মন্তু সালাম করলো তাকে।

    মা বললো, কইরে টুনি। মিয়ারে একখানা জলচকি আইনা দে, বউক।

    চৌকি এনে দিলে দাওয়ায় বসলো মন্তু।

    টুনির মা সবার কুশল জানতে চাইলো। টুনি কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করলো না, শুধু মুখ টিপে বারবার হাসতে লাগলো সে।

    টুনির মা বললো, টুনি তো কদিন ধইরা যাওনের লাগি উথালপাথাল লাগাইছে।

    উ। যাইবো। যমুনা আমি। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানালো টুনি।

    মা বললো, দাঁড়ায়া থাইকো না। মিয়ার অজুর পানি দাও।

    মন্তুর জন্যে হাতমুখ ধোয়ার পানি আনতে চলে গেল টুনি। মাও গেলো একটু পরে, বললো, তরকারিটা নামাইয়া আই।

    চারপাশটা তাকিয়ে দেখছিল মন্তু। এ ক-বছরে বেশ পরিবর্তন হয়েছে বাড়িটার। উঠানের কোণে পাশাপাশি দুটো জামগাছ ছিলো। কেটে ফেলা হয়েছে। রান্নাঘরের একপাশটা নুয়ে পড়েছে এখন। আগে অমনটি ছিলো না। আগে গোয়ালঘরটা পুকুরের পুবপাশে ছিলো, এখন সেটা উত্তরপাশে সরিয়ে আনা হয়েছে।

    টুনি একটি পানি রাখলো ওর সামনে, আর একজোড়া খড়ম। বললো, হাতমুখ ধুইয়া নাও।

    মন্তু মুখ-হাত ধুয়ে নিলে ওর দিকে একটা গামছা বাড়িয়ে দিয়ে টুনি বললো, চলো ভেতরে চলো, বাইরে শীত পড়তাছে।

    মন্তু কোনো কথা বললো না। শান্ত শিশুর মতো ওকে অনুসরণ করে ভেতরে চলে গেলো সে।

    পাশাপাশি দুটো ঘর। মাঝখানে একটা দরজা! ও পাশেরটাতে মা-বাবা থাকে আর টুনির ছোট-ছোট দুই ভাইবোন। এ পাশের ঘরটা দেখিয়ে টুনি মৃদু হেসে বললো, এইডা আমার ঘর।

    ওর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটা তাকিয়ে দেখলো মন্তু। ছোটঘর মালপত্রে ভরা। কয়েকটা বড়বড় মাটির ঘটি এককোণে রাখা, তার পাশে তিন-চারটে বেতের ঝুঁড়ি। ঝুড়ি-ভর্তি লাল আলু রাখা আছে! দক্ষিণকোণে একটা কাঠের চৌকি। চৌকির ওপরে একটা কাঁথা বিছানো। একটা তেল চিটচিটে বালিশ। চৌকির নিচে দুটাে ছোট ছোট টিনের প্যাটরা। পশ্চিমের বেড়ার সঙ্গে একটা কাঠের তাক বসানো হয়েছে। তাকের ওপরে রাখা আছে কয়েকটা ছোট ছোট মাটির ভাঁড় আর একটা মুড়ির টিন। তারপাশে বেড়ার সঙ্গে একটা ভাঙা আয়না ঝোলানো। উত্তরকোণে একটা দড়ির সঙ্গে ঝুলছে টুনির দু-খানা শাড়ি, ব্লাউজ আর একটা ময়লা কাঁথা। তাছাড়া ঘরের ঠিক মাঝখানে চিলেকাঠের সঙ্গে কতগুলো ছিকে। ছিকের মধ্যে কয়েকটা হাঁড়িপাতিল রাখা।

    মন্তু মুহুর্তে চোখ বুলিয়ে নিলো পুরো ঘরটার ওপর।

    টুনি চৌকিটা দেখিয়ে বললো, এইখানে বও।

    মন্তু বসলো।

    কিছুক্ষণ ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে টুনি বললো, অমন শুকায়া গেছ ক্যান?

    মন্তু পরক্ষণে বললো, কই না, শুকাই নাই তো।

    টুনি মৃদু হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

    মন্তুর মনে হলো, এ ক-মাসে টুনি অনেক পালটে গেছে। ওর দেহ পা আগের থেকে অনেক বড় হয়ে গেছে আর পায়ের রঙে একটা চিকচিকে আভা জেগে উঠেছে। আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়েছে টুনি।

    রাতে টুনির ঘরে ওর শোবার বন্দোবস্ত হলো। ময়লা কাঁথাটার ওপর ওর একখানা শাড়ি বিছিয়ে দিলো। বালিশটাকে ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করে দিলো। তারপর বললো, আর বইসা থাইকো না, শুইয়া পরো।

    মন্তু বললো, বেহান রাইতে কিন্তুক রওয়ানা দিতে অইবো।

    ওর কথা শেষ না হতে শব্দ করে হেসে দিলো টুনি। বললো, ইস, কইলেই আইলো। তারপর একটুকাল থেমে আবার বললো, সে কম কইরা আইলেও তিনদিন আমাগো বাড়ি বেড়ান লাগবো। তারপরে যাওনের নাম।

    মন্তু বললো, পাগল অইছ? তাইলে ভাইজানে মাইরা ফালাইবো আমারে। করিম শেখের নাও নিয়া আইছি…আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিলো সে।

    টুনি বললো, যাই শুই গিয়া, কথা যা অইবার কাইল সকালে অইবো। বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গেল সে।

    কুপিটা নিবিয়ে দিয়ে একটু পরে শুয়ে পড়লো মস্তু। করিম শেখের কথা মনে হতে অম্বিয়ার কথাও মনে পড়ছে তার।

    এখান থেকে ফিরে যাওয়ার পথে টুনিকে সব বলবে মন্তু। টুনি নিশ্চয় এ ব্যাপারে সাহায্য করবে ওকে।

    কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো মন্তু।

    ঘুম ভাঙলো কখন সে ঠিক বলতে পারবে না। রাতের গভীর অন্ধকারে সে শুধু অনুভব করলো একটা হাত তার চুলগুলো নিয়ে খেলছে। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলো মন্তু।

    গনু মোল্লার কাছ থেকে নেয়া তাবিজটা বাহুতে বাঁধা আছে কিনা দেখলো। তারপর কে যেন চাপাস্বরে ওকে ডাকলো, এই ৷

    সহসা কোনো সাড়া দিলো না মন্তু। হঠাৎ ওর হাতখানা শক্ত মুঠোর মধ্যে চেপে ধরলো সে। নরম তুলতুলে একখানা হাত।

    একটা অস্পষ্ট কাতরোক্তি শোনা গেলো, উহ্‌ এই।

    পরমুহূর্তে হাতখানা ছেড়ে দিলো মন্তু। টুনি?

    ইস, কথা কয়ো না। মায় হুনব। ওর মুখের ওপরে একখানা হাত রাখলো টুনি। তারপর মুখখানা আরো নামিয়ে এসে আস্তে করে বললো, চুপ, শব্দ কইরো না। শোনো, চুপচাপ উইঠা আইও আমার সঙ্গে।

    কিছু বুঝে উঠতে পারলো না মন্তু। টুনির মুখের দিকে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দুর্গ রইলো ও। তারপর ধীরেধীরে উঠে বসলো।

    বাইরে এসে দেখলো টুনির হাতে একটা মাটির কলস। শীতে দুজনে রীতিমতো কাঁপছিলো।

    মন্তু প্রশ্ন করলো, কী, কী অইছে।

    টুনি ফিক করে হেসে দিয়ে বললো, কিছু অয় নাই, এদিকে আইও।

    ওর একখানা হাত ধরে অন্ধকারে টেনে নিয়ে চললো। বার-বাড়িতে এসে মন্তু আবার প্রশ্ন করলো, কই চললা?

    টুনি শব্দ করে হাসলো আবার। বললো, কলসি গলায় দিয়ে দুইজনে পুকুরে ডুইবা মরুম চলো। তারপরেই মন্তুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সহসা প্রশ্ন করল সে, আমার সঙ্গে মরতে পারবা না?

    কী উত্তর দেবে ভেবে পেলো না মন্তু। কিন্তু তার উত্তরের অপেক্ষা না-করে আবার হেসে উঠলো টুনি। হাসির দমকে দেহটা বারবার দুলে উঠলো তার। বললো, ঘাবড়ায়ো না মিয়া, তোমারে মারুম না।

    বলে আবার চলতে লাগলো।

    এতক্ষণ এত অবাক হয়ে গিয়েছিলো মন্তু যে শীতের প্রকোপটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। বিস্ময়ের ঘোর কেটে যেতে-না-যেতে প্ৰচণ্ড শীতে দাঁতে দাঁত লেগে এলো ওর।

    একটা লম্বা খেজুরুগাছের নিচে এসে দাঁড়ালো টুনি। কলসিটা মস্তুর হাতে দিয়ে বললো, এইটা রাখো হাতে।

    তারপর পরনের শাড়িটাকে লুঙির মতো গুটিয়ে নিল সে। মন্তু কাঁপা গলায় শুধালো, কী করো?

    ওর প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না টুনি। নির্বিকারভাবে খেজুরগাছটা বেয়ে উপরে উঠে গেলো সে।

    মন্তুর মনে হলো ও স্বপ্ন দেখছে। একটু পরে একহাতে রসের হাঁড়িটা নিয়ে অন্যহাতে গাছ বেয়ে ধীরেধীরে নিচে নেমে এলো টুনি। কলসির মধ্যে রসটা ঢেলে হাঁড়িটা রেখে আসার জন্য আবার উপরে যাচ্ছিলো টুনি। মন্তু বললো, আরো কী করো। গাছ এখন পিছল। পইড়া যাইবা।

    পেছন ফিরে তাকিয়ে হাসলো টুনি। বললো, ইস্ কত উঠছি।

    পাশের ঝোপ থেকে দুটাে শিয়াল ছুটে এসে কিছুদূরে দাঁড়িয়ে মন্তুর দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোখজোড়া অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে ওদের। মন্তু একটা ধমক দিতে ছুটে পালিয়ে গেলো ওরা।

    টুনি নেমে এসে বললো, কারে ধমকাও?

    মন্তু আস্তে করে বললো, শিয়াল।

    আরো অনেকগুলো খেজুরগাছ থেকে রস নামিয়ে কলসি ভর্তি করলো ওরা।

    শীতের কুয়াশার বৃষ্টি ঝরিছে চারদিকে। মাটি ভিজে গেছে। গাছের পাতাগুলোও ভেজা। আশেপাশে তাকাতে গেলে বেশিদূরে দেখা যায় না। কুয়াশার আবরণে ঢেকে আছে চারদিক। হঠাৎ মন্তুর গায়ে হাত দিয়ে টুনি বললো, শীত লাগিতাছে বুঝি?

    মন্তু কোনো জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলো, তোমার লাগে না?

    টুনি বললো, উঁহু। বলে মাথাটা দোলালো সে।

    মন্তু বললো, রস দিয়া করবা কী?

    টুনি বললো, সিন্নি রান্দুম।

    মন্তু কোনো কথা বলার আগেই টুনি আবার বললো, তোমার নায়ে চলো।

    মন্তু অবাক হলো, নায়ে গিয়া কী করবা?

    টুনি নির্লিপ্ত গলায় বললো, সিন্নি রান্দুম।

    মন্তু বললো, পাগল হইছ?

    টুনি ফিক করে হেসে দিয়ে বললো, হুঁ। মন্তুর মুখের দিকে তাকালো সে, কই নাওয়ে যাইবা না।

    মন্তু কঠিন স্বরে বললো, না।

    ওর কণ্ঠস্বরে চমকে উঠলো টুনি। ওর চোখের দিকে কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মুহুর্তে একটা অবাক কাণ্ড করে বসলো সে। হাতের কলসিটা উপরে তুলে মাটিতে ছুড়ে মারলো। মাটিতে পড়ে মাটির কলসি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রস গড়িয়ে পড়লো চারপাশে।

    কিছুক্ষণের জন্য দুজনে বোবা হয়ে গেল।

    কারো মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরুলো না।

    মন্তু নীরবে তাকিয়ে রইলো ভাঙা কলসির টুকরোগুলোর দিকে।

    টুনি মুখখানা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে অন্ধকারে পাথরের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে রয়েছে।

    পুকুরপাড়ে লম্বা তালগাছগুলোর মাথায় দুটো বাদুর হঠাৎ পাখা ঝাপটিয়ে উঠলো।

    টুনি আস্তে করে বললো, চলো ঘরে যাই, চলো।

    মন্তু কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে ওকে অনুসরণ করলো শুধু।

    পরদিন যাওয়া হলো না মন্তুর।

    টুনির মা বললো, কুটুমবাড়ি আইয়ে নিজের ইচ্ছায়, আর যায় পরের ইচ্ছায়। ইচ্ছা! করলেই তো আর যাইতে পারব না মিয়া। যহন যাইতে দিমু তহন যাইবা।

    অগত্য থেকে যাওয়া হলো।

    সারাদিন একবারও কাছে এলো না টুনি। অথচ সারাক্ষণ বাড়িতে ছিলো সে। ঘরদের ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেছে। ঘাটে নিয়ে বাসনপত্র ধুয়ে এনেছে। রান্নাবান্না করেছে।

    তারপর খাওয়ার সময় মা ডেকে বলেছে, কইরে টুনি এইদিকে আয়। মন্তু মিয়াকে ভাত বাইড়া দে।

    তখন শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে থেকেছে সে। রাতের বেলা হঠাৎ বেঁকে বসলো টুনি। বললো, কাল সক্কালবেলাই চইলা যমু আমি। জিনিসপত্র সব গুছাইয়া দাও।

    মা বললো, আরো দুইটা দিন থাইকা যা। আবার কবে আইবার পারবি কে জানে।

    টুনি বললো, না, মন্তু মিয়ার কামকাজের ক্ষতি অইয়া যাইতেছে।

    মা বললো, মন্তু মিয়াকে বুঝাইয়া কইছি। হে রাজি আছে।

    টুনি তবু বললো, না কাল সক্কালেই চইলা যামু।

    পাশের ঘরের বিছানায় শুয়ে—শুয়ে সব শুনলো মন্তু।

    পরদিন ভোরে রওনা হয়ে গেলো ওরা।

    মন্তু আর টুনি।

    ওর বাবা আর চাচা দুই শিকদার খালপাড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলো ওদের। সঙ্গে ছোট দুই ভাইবোনও এলো। আর এলো ওদের কালো কুকুরটা।

    ছই-এর মধ্যে টুনির জন্যে কাঁথাটা বিছিয়ে দিয়েছিল মন্তু। তার ওপর গুটিসুটি হয়ে বসালে সে।

    খালের পাড়ে যতক্ষণ তার বাবা, চাচা আর ভাইবোনদের দেখা গেলো ততক্ষণ সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো টুনি।

    তারপর মুখখানা ঘুরিয়ে এনে নীরবে বসে রইলো।

    খাল পেরিয়ে যখন নৌকো নদীতে এসে পড়লো তখন দুপুর হয়ে আসছে। টুনি এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। মন্তু সারাক্ষণ কথা বলার জন্য আকুপাকু করছিলো। কিন্তু একবারও সুযোগ দিলো না টুনি। উজান নদীতে দাঁড় বেয়ে চলতে চলতে একসময়ে মন্তু বললো, বাইরে আইয়া কহো, গায়ে বাতাস লাগবো।

    ও নড়েচড়ে বসলো কিন্তু বাইরে বেরিয়ে এলো না।

    একটু পরে একটা কাপড়ের পুঁটুলি থেকে কিছু চিড়া আর একটুকরো খেজুরের গুড় বের করে ওর দিকে, এগিয়ে দিলো টুনি। বললো, বেলা অইয়া গেছে খাইয়া নাও। বলে আবার চুপ করে গেলো সে।

    মন্তু বললো, তুমি খাইবা না?

    না।

    না ক্যান?

    ক্ষিধা নাই।

    ঠিক আছে আমারও ক্ষিধা নাই। বলে আবার দাঁড় বাইতে লাগলো মন্তু। নদীর পানিতে দাঁড়ের ছপছপ শব্দ ছাড়া কিছুক্ষণ আর কিছুই শোনা গেলো না।

    ক্ষণকাল পরে টুনি আবার বললো, খাইবা না?

    না।

    শেষে শরীর খারাপ করবো।

    করুক গা। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল মন্তু।

    আর বেশিক্ষণ ছাঁইয়ের ভেতর বুসে থাকতে পারলো না টুনি। অবশেষে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। চিড়ার বাসনটা তুলে নিয়ে ওর সামনে এসে বসলো।

    নাও, খাও।

    কইলাম তো খামু না।

    তাইলে কিন্তুক পানির মধ্যে সব ফালাইয়া দিমু আমি। টুনি ভয় দেখালো ওকে।

    মন্তু নির্বিকার গলায় বললো, দাও ফালিইয়া।

    কিন্তু ফেললো না টুনি। কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে সহসা শব্দ করে হেসে উঠলো সে। হাসির দমকে মাথার ঘোমটাটা খসে পড়লো কাঁধের ওপর।

    টুনি বললো, আমি খাওয়াইয়া দিই?

    মন্তু বললো, না।

    টুনি বললো, তাইলে নিজে খাও। আমিও খাই। বলে একমুঠো চিড়ে মুখের মধ্যে পুরে দিলো সে।

    মন্তুর মুখেও একঝালক হাসি জেগে উঠলো। এতক্ষণে টুনির কোলের ওপরে রাখা বাসন থেকে একমুঠো চিড়ে নিয়ে সেও মুখে পুরলো।

    টুনি বললো, গুড় নাও। খাজুরি গুড়।

    চিড়ে খেতে খেতে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার সহজ হয়ে এলো টুনি। একফাঁকে ওকে জিজ্ঞেস করলো, বাড়ি পৌছাইতে কতক্ষণ লাগবো?

    মন্তু একটু চিন্তা করে নিয়ে বললো, মাইজ রাতে।

    বেশ জোরে দাঁড় বাইছিলো মন্তু। হঠাৎ টুনি বললো, এত তাড়াতাড়ি করতাছ ক্যান? আস্তে বাও না।

    মন্তু বললো, তাইলে বাড়ি যাইতে তিনদিন লাগবো।

    লাগে তো লাগুক না। টুনির কণ্ঠস্বরে চরম নির্লিপ্ততা।

    মন্তু কোনো জবাব দিলো না।

    আঁজলা ভরে নদীর পানি পান করলো ওরা। তারপর ছইয়ের বাইরে বসে টুনি দু-হাতে নদীর পানি নিয়ে খেলা করতে লাগলো। দু-পাশের অসংখ্য গ্রাম। একটার পর একটা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ওরা। মাঝেমাঝে রবিশস্যের ক্ষেত, নারকেল আর ঘন সুপুরির বন। জেলেদের পাড়া। ছোট ছোট ডিঙিনৌকায় চড়ে মাঝনদীতে এসে জাল ফেলেছে ওরা।

    একখানা হাত পানির মধ্যে ছেড়ে দিয়ে টুনি বললো, তুমি এইবার জিরাও। আমি দাঁড় টানি।

    মন্তু হেসে বললো, পাগল নাকি?

    টুনি বললো, ক্যান?

    মন্তু বললো, অত সহজ নয়, দাঁড় বাইতে ক্ষেমতার দরকার আছে।

    টুনি আবার চুপ করে গেলো।

    বিকেলের দিকে শান্তির হাটের কাছাকাছি এসে পৌছলো।ওরা। নদী এখন দম ধরেছে। পানিতে আর সেই স্রোত নেই। একটা থমথমে ভাব। একটু পরে জোয়ার আসবে। তখন আর নৌকো নিয়ে এগানো যাবে না। কুলে এসে বেঁধে রাখতে হবে। তারপর জোয়ার নেমে গিয়ে ভাটা পড়লে তখন আবার নৌকো ছাড়বে মন্তু।

    দূর থেকে শান্তির হাটটা দেখা যাচ্ছে।

    অসংখ্য লোক গিজগিজ করছে সেখানে।

    ওদিকে তাকিয়ে টুনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, ওইহানে কী?

    মন্তু বললো, ওইটা শাস্তির হাট।

    টুনি পানি থেকে হাতটা তুলে নিয়ে অপূর্ব ভঙ্গি করে বললো, ওইহানে চুড়ি পাওন যায়? আমারে কিনা দিবা?

    মন্তুর ইচ্ছে, জোয়ার আসার আগে শন্তির হাটে গিয়ে নৌকা ভিড়াবে। তাই সংক্ষেপে বললো, হু, দিমু।

    শান্তির হাটে পৌঁছে, একটা নিরাপদ স্থান দেখে নৌকা বাঁধলো মন্তু। নদীর পাড়ে খালি জায়গাটায় তাঁবু পড়েছে একটা। বিচিত্র তার রঙ। বাইরে ব্যান্ডপার্টি বাজছে খুব জোরে জোরে। চারপাশে লোকজনের ভিড়।

    হাটের কাছে আসার পর থেকে ছইয়ের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে টুনি। সেখান থেকে মুখ বের করে হঠাৎ সে প্রশ্ন করলো, ওইহানে কী?

    মন্তু বললো, সার্কাস পার্টি। সার্কাস পার্টি আইছে।

    সেদিকে তাকিয়ে থেকে টুনি আবার বললো, সেইটা আবার কী?

    মন্তু বললো, নানা রকম খেলা দেহায় ওয়া। মানুষের খেলা, বাঘের খেলা। আরো কত কী?

    বাঘের নাম শুনে ভয় পেয়ে গেলো টুনি। কিন্তু পরক্ষণে বললো, আমারে দেহাইবা?

    মস্তুর কোনো আপত্তি ছিলো না। কিন্তু হাটের মধ্যে মেয়েমানুষ নিয়ে যাওয়াটা সমীচীন বলে মনে হলো না ওর। তাই বললো, না, তোমার যাইয়া কাজ নাই। তুমি বহ, আমি আইতাছি।

    ওর চলে যাওয়ার কথা শুনে সঙ্গেসঙ্গে ছইয়ের বাইরে বেরিয়ে এলো টুনি। বললো, ওমা, আমি একলা থাকবার পারুম না এহানে। তুমি যাইও না।

    মুহূর্তে নিরাশ হয়ে গেলো মন্তু। ও নিজে এর আগে কোনোদিন সার্কাস দেখেনি। ভেবেছিলো এই সুযোগে একবার দেখে নেবে। কিন্তু টুনির কথায় ভেঙে পড়লো। সার্কাসের তাবুর দিকে চোখ পড়তে দেখলো শুধু পুরুষ নয়, অসংখ্য মেয়েছেলেও দলে দলে এসে ঢুকছে তাবুর মধ্যে।

    মন্তু কী যেন ভাবলো। ভেবে বললো, আহো, দেরি কইরো না, আহে।

    ওর পিছুপিছু নিচে নেমে এলো টুনি। মাথার ঘোমটাটা সে একহাত লম্বা করে দিয়েছে। আর সেই ঘোমটার ভেতর দিয়ে বিস্ময়-বিমুগ্ধ চোখে চারপাশে তাকায়ে দেখছে সে।

    তাঁবুর সামনে বড় বড় দুটো হ্যাজাক জ্বলিয়ে দিয়েছে ওরা। একপাশে একদল লোক ব্যান্ড বাজাচ্ছে।

    তাঁবুর দরজার ওপরে একটা মাচায় চড়ে দুটি মেয়ে ঘুরেঘুরে নাচছে। সারা গায়ে, মুখে নানা রকমের রঙ মেখেছে ওরা। টুনি অবাক হয়ে বললো, ওমা শরম করে না।

    মন্তু বললো, শরম করবে ক্যান, ওরা মাইয়্যা লোক না, পুরুষমানুষ মাইয়্যা সাজছে।

    অ! হা করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো টুনি।

    দরজায় দাঁড়ানো লোকটার কাছ থেকে তিন আনা দামের দু-খানা টিকেট কাটলো মন্তু। ভেতরে ঢুকে দেখে ছেলে বুড়ো মেয়েতে তিলধারণের জায়গা নেই। তাবুর কোণে অল্প একটু জায়গা নিয়ে গুটিসুটি হয়ে বসে পড়লো ওরা।

    কিছুক্ষণের মধ্যে সার্কাস শুরু হয়ে পেল। প্রথমে একটা মেয়ে দুটো লম্বা বাঁশের মাথায় বাঁধা একখানা দড়ির উপর দিয়ে নির্কিকারভাবে একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে হেঁটে চলে গেলো।

    দর্শকেরা হাতে তালি দিয়ে উঠলো জোরে। তারপর এলো বিকটাকার লোক। হাতের মুঠোর উপরে তিনটে মানুষকে তুলে নিয়ে চৱকির মতো ঘোরাতে লাগলো সে।

    সবাই একসঙ্গে বাহবা দিয়ে উঠলো। এরপর খুব জোরে ব্যান্ড বাজলো কিছুক্ষণ। তারপরেই এলো বাঘ। এসেই একটি হুঙ্কার ছাড়লো সে!

    মন্তুর একখানা হাত ওর মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে রাখলো টুনি। দু-চোখে ওর অপরিসীম বিস্ময়। ঘোমটার ফাঁকে একবার চারপাশে দর্শকদের দিকে তাকালো সে। তাকালো মন্তুর দিকে। তারপর আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো বাঘের ওপর।

    ইতিমধ্যে ভয়ে গুটিসুটি হয়ে মন্তুর বুকের মধ্যে সিঁধিয়ে গেছে টুনি।

    মন্তু নিজেও জানে না। কখন টুনিকে একেবারে কাছে টেনে নিয়েছে সে।

    সার্কাস শেষ হতে, দুজনের চমকে ভাঙলো। শক্ত করে ধরে রাখা মন্তুর হাতখানা মুহূর্তে ছেড়ে দিলো টুনি। তারপর মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো সে। মন্তু নিজেও কিছুক্ষণের জন্যে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। ইতস্তত করে বললো, চলো। ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো ওরা। ঘাটে আসার পথে মনোয়ার হাজীর চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে আসতে হয়। মন্তুকে দেখে হাজী দোকান থেকে চিৎকার করে উঠলো, আরে মন্তু মিয়া কই যাও, শুন শুন।

    মন্তু এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলো, পারলো না।

    আরে মিয়া কাজের কথা আছে গুইনা যাও। দু-হাতে ওকে কাছে ডাকলো মনোয়ার হাজী।

    টুনি পেছনে দাঁড়িয়েছিলো। ওর দিকে একপলক তাকিয়ে নিয়ে দোকালের দিকে এগিয়ে গেলো মন্তু। কাউন্টারের আরো অনেকগুলো লোক কথা বলছিলো।

    হঠাৎ মনোয়ার হাজী শব্দ করে হেসে উঠে বললো, বাহরে বাহ বিবিজানেরে সঙ্গে নিয়ে সার্কাস দেখবার আইছ বুঝি?

    সঙ্গে সঙ্গে আটজোড়া চোখ অদূরে দাঁড়ানো টুনি আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলো।

    মন্তু কিছু বলবার আগেই মনোয়ার হাজী সামনে ঝুঁকে পড়ে বললো, কহন করলা, অ্যাঁ? একবার খবর দিলা না। দাওয়াত করলা না। এইডা কেমন কথা?

    হতবুদ্ধি মন্তু কী বলবে কিছু ভেবে পেলো না, সে শুধু ইতস্তত করে একবার মনোয়ার হাজীর দিকে, আরেকবার টুনির দিকে তাকালো স্বারকয়েক। এক বিচিত্র অনুভূতির আবেশে মনটা ভরে উঠেছে ওর।

    মনোয়ার হাজী শুধালো, কোনো কাজ কাম নাইতো?

    একটা ঢোক গিলে মন্তু বললো, কিছু চুড়ি কিনন লাগব।

    হ্যাঁ, তা কিনবা না, নিশ্চয়ই কিনবা; একগাল হাসলো মনোয়ার হাজী। তারপর বললো, এহন চলো মিয়া ভাবীরে নিয়া আজকার রাতে আমাগো বাড়ি মেহমান অইবা।

    মন্তু পরক্ষণে বাঁধা দিলো, না না, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরন লাগবো।

    ওর কথাটা কানো নিলো না মনোয়ার হাজী; সে জানালো, থাকার কোনো অসুবিধে হবে। না ওদের। বাড়িতে ঘর আছে অনেকগুলি, তারই একটিতে সুন্দর করে বিছানা পেতে দেবে। তাতে যদি মন্তুর আপত্তি থাকে, তাহলে আরও একটা ভালো বন্দোবস্ত করে দিতে পারে মনোয়ার হাজী। সার্কাস-পার্টির ওখানে হোটেল উঠেছে কয়েকটা। এক-একটা ঘর একটাকায় একরাতের জন্যে ভাড়া দেয় ওরা। সেখানেও ইচ্ছে করলে থাকতে পারে মন্তু , পান-খাওয়া দাঁতগুলো বের করে মনোয়ার হাজী বললো, আরে মিয়া, নতুন বউ নিয়া যদি একটু ফুর্তি না কইরবা তাইলে চলে কেমন কইরা। এইতো বয়স তোমাগো।

    এই শীতেও ঘামিয়ে উঠেছে মন্তু। টুনির দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারলো, ও ভীষণ বিব্রত বোধ করছে।

    ক্ষণকাল পর মন্তু বললো, আরেকদিন আইসা আপনাগো বাড়ি মেহমান হিমু। আজকা যাই।

    ওরা আমন্ত্রণ রক্ষা না-করার জন্যে কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করলে মনোয়ার হাজী। অবশেষে বললো, আরেকদিন কিন্তুক আইবা মিয়া। আর হ্যাঁ, ভাবী সাহেবেরে সঙ্গে নিয়া আইবা কিন্তুক। বলতে বলতে টুনির দিকে তাকালো হাজী।

    জোয়ার পড়ে যাওয়ায় ভাটার পানি অনেক নিচে নেমে গেছে। যেখানে লোকোটা বেঁধে রেখে গিয়েছিলো সেখান থেকে অনেক দূরে সরে গেছে ওটা। মাঝখানের জায়গাটা পানি আর কাদায় ভীষণ পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। ওর ওপর দিয়ে হাঁটতে গেলে অতি সাবধানে আঙুলের নখগুলো দিয়ে মাটি চেপে রাখতে হয়! নইলে যে-কোনো মুহূর্তে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

    নিচে নামতে গিয়ে অন্ধকারে মস্তুর ফতুয়াটার একটি কোণ শক্ত করে ধরে রেখেছে টুনি। একটু অসতর্ক হতে পা পিছলে যাচ্ছিলো সে। মন্তু ধরে ফেললো; মাথার অচলটা কাঁধের উপরে গড়িয়ে পড়লো, একটা অস্ফুট কাতরোক্তি করলে টুনি। কাঁধের ওপর থেকে ওর মুখখানা সরিয়ে দিতে গিয়ে মন্তু সহসা অনুভব করলো, টুনির দু-চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। নিঃশব্দে কাঁদছে টুনি।

    ভাটিগাঙে নাও ভাসিয়ে দিয়ে নীরবে বসে রইলো মন্তু! মনটা আজ ভীষণ ভেঙে পড়েছে ওর। সারা দেহে আশ্চর্য এক অবসাদ। সেদিন রাতে রসের কলসটা ভেঙে ফেললো টুনি, তখনও এত খারাপ লাগেনি ওর। আজ কেমন একটা ব্যথা অনুভব করছে সে। বুকের নিচটায়। কলজের মধ্যে।

    নৌকোর ছইয়ের ভেতরে চুপচাপ বসে রয়েছে টুনি। একটা কথা বলছে না সে, একটু হাসছে না।

    হঠাৎ গলা ছেড়ে গান ধরলো মন্তু।

    বন্ধু রে—

    আশা ছিলো মনে মনে প্ৰেম করিমু তোমার সনে।

    তোমারে নিয়া ঘর বাঁধমু গহিন বালুর চরে।

    ও পরান বন্ধুয়ারে।।

    নদীর স্রোত নৌকোর গায়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছে। যেন বহুদিনের এই স্নেহের টানকে চিরন্তন করে ধরে রাখার জন্যে প্রাণহীন কাঠের টুকরোগুলোকে গভীর আবেগে বারবার জড়িয়ে ধরতে চাইছে ওরা। টুনি এখনো নীরব।

    খালের মুখের কাছে নৌকো থামাতে হলো।

    ভাটার পানি অনেক নিচে নেমে গেছে। পাতা পানিতে নৌকো নিয়ে ভেতরে যাওয়া যাবে না। এখানে অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ-না আবার জোয়ার আসে। জোয়ারের স্রোতে নৌকো নিয়ে ভেতরে চলে যাবে মন্তু। কিন্তু সে এখনো অনেক দেরি। ভোর রাতের আগে জোয়ার আসবে না।

    নৌকো থামাতে দেখে টুনি এতক্ষণে কথা বললো, কি, নাও থামাইলা ক্যান?

    হঠাৎ নিজের অজান্তে একটা কথা বলে বসলো মন্তু। বললো, বাড়ি যামু না। এইহানে থাকুম আমরা।

    ক্যান! ক্যান? টুনির কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা।

    শুনে শব্দ করে হেসে উঠলো মন্তু। ওর হাসিটা কাঁটা বাঁশের বাঁশির মতো শোনাল। নৌকো থেকে নোঙরটা তুলে নিয়ে নিচে নেমে গেলো মন্তু! ভালো করে মাটিতে পাতলে ওটা। নইলে জোয়ারের প্রথম ধাক্কায় মাঝনদীতে চলে যাওয়ার ভয় আছে। তারপর পা-জোড়া ধুয়ে নিয়ে নৌকোয় উঠতে উঠতে টুনির প্রশ্নের উত্তর দিলো মন্তু।

    জোয়ার না-আসা পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করতে হবে ওদের।

    এইহানে? বলতে গিয়ে চারপাশে তাকালো টুনি।

    আশেপাশে কোনো জনবসতি নেই। দক্ষিণে যতদূর তাকানো যায় অথৈ পানির ঢেউ। নদী এখানে বাঁব নিয়ে ঘুরে গেছে দূর সাগরের দিকে। কয়েকটা জেলে-নৌকো মাঝ— নদীতে টিমটিম বাতি জ্বলিয়ে জলে পাহারা দিচ্ছে। মাঝেমাঝে একে অন্যকে জোর গলায় ডাকছে ওরা। নিশির বাপ জাইগা আছনি, ও নিশির বাপরে কুই-কুই।

    পশ্চিমে চর পড়েছে। বিস্তীর্ণ ভূমি জুড়ে কোনো লোকালয় নেই। শুধু বালু আর বালু। তার উপরে আরো এগিয়ে গেলে সীমাহীন বুনো ঘাসের বন। দিনের বেলায় অসংখ্য গরু— বাছুর নিয়ে রাখাল ছেলেরা আসে এখানে, রাতে নিস্তব্ধ নিঝুম হয়ে থাকে সমস্ত প্ৰান্তর। পুবে, ফেলে আসা নদী। এঁকেবেঁকে চলে গেছে শান্তির হাটের দিকে।

    উত্তরে খাল। খালের পাড়ে অসংখ্য বুনো ফুলের বন। একটু ভালো করে তাকালে ওপারে তৈরি লম্বা সাঁকোটা নজরে আসে এখান থেকে। চারপাশে একপলক তাকিয়ে চুপ করে গেলো টুনি।

    ও মাঝি। মাঝি-ও-কু-ই। জেলে-নৌকো থেকে কে যেন ডাকলো, কোনহানের নাও, অ্যাঁঃ

    গলা চড়িয়ে মন্তু জবাব দিলো, পরীর দীঘি।

    জবাব শুনে চুপ করে গেলো জেলেটা।

    এতক্ষণ নৌকা বেয়ে আসছিলো বলে শীতের মাত্ৰাটা বুঝে উঠতে পারেনি মন্তু। তাড়াতাড়ি ছাঁইয়ের মধ্যে এসে ঢুকলো সে।

    টুনি নড়েচড়ে একপাশে সরে গেলো। ছাঁইয়ের সঙ্গে ঝোলানো হুঁকো আর কল্কেটা নামিয়ে নিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে এক ছিলিম তামাক ধরিয়ে নিল মন্তু। তারপর আবার বাইরে বেরিয়ে এসে গলুয়ের উপর আরাম করে বসে তামাক টানতে লাগলো। দক্ষিণ থেকে কনকনে বাতাস বইছে জোরে।

    আকাশে মেঘ।

    মেঘের ফাঁকে আধখানা চাঁদ মাঝেমাঝে উঁকি দিয়ে আবার মুখ লুকুচ্ছে তাড়াতাড়ি।

    টুনি ডাকলো। ওইহানে বইসা ক্যান, ভেতরে আহে।

    মন্তু কোনো জবাব দিলো না। আপন মনে হুঁকো টানতে লাগলো সে। টুনি আবার ডাকলে, আহো না, বাইরে ঠাণ্ডা লাগবো। মন্তু নীরব।

    আইবা না? টুনির কণ্ঠে অভিমান।

    বাইরে বেরিয়ে এসে ওর হাত থেকে হুঁকোটা নিয়ে নিলো টুনি।

    চলো, ভেতরে গিয়া শুইবা।

    এবার আর কোনো বাধা দিলো না। নিঃশব্দে ছইয়ের ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়লো সে। ওর গায়ের উপর কাঁথাটা টেনে দিয়ে মাথার কাছে চুপচাপ বসে রইলো টুনি।

    বাইরে কনকনে বাতাস। শূন্য-প্ৰান্তরের উপর দিয়ে হু হু করে ছুটে চলেছে দূর থেকে দূরে। সেদিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নীরবে বসে রইলো।

    ভোরে গ্রামে এসে পৌছলো ওরা

    মন্তু আর টুনি।

    পরীর দীঘির পাড়ে তিনটে নতুন কবর।

    দূর থেকে দেখে বুক কেঁপে উঠলো তার। নিজের অজান্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, কে মরলো?

    ঘোমটার নিচে থেকে টুনিও চোখ বড় বড় করে দেখছিলো কবরগুলো। পথে আসতে মাঝি-বাড়ির কুদ্দুছের সঙ্গে দেখা হতে সব শুনলো মন্তু। প্রথম কবরটা এ গায়ের তোরাব আলীর। আশির উপরে বয়স হয়েছিলো ওর। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে চলাফেরা করতে পারতো না।

    মরে বেঁচেছে বেচারা। নইলে আরো কষ্ট সহ্য করতে হতো।

    দ্বিতীয় কবরটা আসকর ফকিরের। পেটে পিলে হয়েছিলো। প্রায় রক্তবমি করতো। বুড়োরা বলতো, শত্রুপক্ষ কেউ নিশ্চয় তাবিজ করেছে, নইলে অমন হবে কেন।

    তার পাশের কবরটা হালিমার; আবুলের বউ হালিমা। গতকাল দুপুরে ঘরের মধ্যে হঠাৎ চিতল মাছের মতো তড়পাতে তড়পাতে মারা গেছে হালিমা।

    মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল মন্তুর। হালিমার মৃত্যুর সংবাদে কাঁদতে শুরু করেছে টুনি। ঘোমটার নিচে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে।

    ইতস্তত করে মন্তু বললো, কান্দ ক্যান, কাইন্দা কী আইব।

    বাড়ি ফিরে এলে বুড়ো মকবুল গভীর অসন্তোষ প্ৰকাশ করলো। একদিন নয়, দুদিন নয়, চার চারটি দিন। দুশ্চিন্তায় বারবার ঘর-বার করেছে সে। আইতে এত দেরি অইলো ক্যান? অ্যাঁ।

    মন্তু খুলে বললো সব। কুটুমবাড়িতে গিয়ে কুটুম যদি আসতে না দেয় তাহলে কী করতে পারে সে? তাছাড়া নদীতে যে জোয়ার-ভাটা আসে সেটাও কারো ইচ্ছেমতো চলে না। তাই আসতে দেরি হয়ে গেছে ওদের।

    মকবুল শুনলো সব, শুনে শান্ত হলো। তারপর, কোদালটা হাতে তুলে নিয়ে বাড়ির উপরের ক্ষেতটার দিকে চলে গেলো সে! যাবার পথে আমেনা আর ফাতেমাকে ডেকে গেলো মকবুল। মাটি কুপিয়ে সমান করে মরিচের চারা লাগাতে হবে।

  • ছয়

    ছয়

    কিছুদিন ধরে বেশ শীত পড়তে শুরু করেছে।

    দিনের বেলা ঈষৎ গরম। শেষরাতে প্ৰচণ্ড শীতে হাড়কাঁপুনি শুরু হয়। কাঁথার নিচেও দেহটা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে।

    এ সময়ে বাড়ির সবাই মাটির ভাঁড়ে তুসির আগুন জ্বেলে মাথার কাছে রাখে। মাঝে মাঝে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে অপ্তনটা উস্কে দেয়।

    আজকাল ভোর হবার অনেক আগে ঘুম থেকে উঠে যায় মন্তু। সোয়া দু-টাকা দিয়ে কেনা খদ্দরের চাদরটা গায়ে-মাথায় মুড়িয়ে নিয়ে হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে মাঝিবাড়ির দিকে ছুটে সে। কদিন হলো করিম শেখ হাঁপানিতে পড়েছে। সারাদিন খুকখুক করে কাশে আর লম্বা লম্বা শ্বাস নেয়।

    মন্তু বলে, একডা কবিরাজ দেহাও মিয়া।

    করিম বলে, কিছু হয় না মিয়া, অনেক দেহাইছি।

    আম্বিয়া বলে, হাটে-গঞ্জে যাও, ভালো দেইখা ডাকতর দেখাইত পারো না?

    করিম শেখ চুপ করে থাকে, কিচ্ছু বলে না।

    আজ সকালে মাঝি-বাড়ির দিকে সবে রওনা দিয়েছে মন্তু। দাওয়া থেকে মকবুল ডেকে বললো, রাইতের বেলা একটু সকাল কইরা ফিরো মন্তু মিয়া। হীরনের বিয়ার ফর্দ হইব আইজ।

    বাড়ির সকলকে আজ একটু সকাল—সকাল ঘরে ফিরে আসতে বলে দিয়েছে বুড়ো মকবুল। বিদেশ থেকে মেহমানরা আসবে, ওদের খাতির-যত্ন করতে হবে। আদর আপ্যায়ন করে খাওয়াতে হবে ওদের। নইলে বাড়ির বদনাম করবে ওরা।

    মন্তুর উপরে আরো একটা ভার দিয়েছে মকবুল। নাও নিয়ে গিয়ে টুনিকে বাপের বাড়ি হতে নিয়ে আসতে হবে।

    দু-একদিনের মধ্যে নবীনগরে যাবে মন্তু। করিম শেখের শরীরটা একটু ভালো হয়ে উঠলেই নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়বে সে।

    পথের দু-পাশের ক্ষেতগুলোতে কলাই, মুগ, মটর আর সরষে লাগানো হয়েছে। সারারাতের কুয়াশায় এই সকালে সতেজ হয়ে উঠেছে ওরা। রোদ পড়ে শিশির ফোঁটাগুলো চিকচিক করছে ওদের গায়ে।

    মাঝি-বাড়ির দেউড়ির সামনে অম্বিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মন্তুর। পুকুর থেকে এইমাত্ৰ গোছল করে ফিরছে সে। ঘন কালো চুলগুলো থেকে গড়িয়ে এখনো পানি ঝরছে। হাতের ভেজা শাড়িটার পানি নিংড়াতে নিংড়াতে আম্বিয়া বললো, মন্তু ভাই হুট কইরা চইলা যাইও না। পিঠা বানাইছি খাইয়া যাইও।

    মন্তু বললো, এই সকালবেলা গোছল করছে, তোমার শীত লাগে না?

    আম্বিয়া একটু হাসলো শুধু। কিছু বললো না।

    সারারাত মিয়া-বাড়িতে ধান ভেনেছে সে। এই শীতের রাতেও ধান ভানতে গিয়ে সারা দেহে ঘাম নেমেছে ওর। পুরো গায়ের কাপড়ে ঘামের বিশ্ৰী গন্ধ। তাই সকাল-সকাল গোছল করে নিয়েছে আম্বিয়া। খেয়েদেয়ে একটু পরে ঘুম দেবে। উঠবে সেই অপরাহ্ণে। তারপর আবার মিয়া-বাড়ি চলে যাবে আম্বিয়া। ধান ভানবে সারারাত।

    মন্তুকে একটা পিঁড়িতে বসতে দিয়ে ওর সামনে একবাসন পিঠা এগিয়ে দিলো আম্বিয়া্।

    কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে করিম শেখ বললো, খাও মিয়া খাও। বলে আবার কাশতে শুরু করলো সে। আম্বিয়া তখন পাশের ঘরে গিয়ে একটা ছেঁড়া কাপড় দিয়ে মাথার চুল ঝাড়ছে। মাঝেমাঝে বুড়ো নন্তু শেখের সঙ্গে কী যেন কথা বলছে সে।

    বেড়ার খুপরি দিয়ে চোরা চাউনি মেলে ওকে দেখতে লাগলো মন্তু। আঁটসাঁট দেহের খাঁজে-খাঁজে দুরন্ত যৌবন। আটহাতি শাড়ির বাঁধন ভেঙে ফেটে পড়তে চায়। আজ আম্বিয়াকে বড় ভালো লাগছে মন্তুর। চোখের পলকজোড়া ঈষৎ কেঁপে উঠলো।

    হ্যাঁ, আম্বিয়াকে বিয়ে করবে। সে। হোক হাঁপানি। সে পরে দেখা যাবে। বুড়ো মকবুলকে আজকেই ওর মনের কথাটা জানিয়ে দেবে মন্তু। সহসা একটা সিদ্ধান্ত করে বসলো সে।

    করিম শেখ লম্বা শ্বাস নিয়ে বললো, কি মিয়া হাত তুইলা বইসা রইলা যে?

    মন্তু তাড়াতাড়ি একটা পিঠা মুখে পুরে দিয়ে বললো, হুঁ হুঁ এই তো খাইতাছি। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো বাসনটা শূন্য করে দিলো মন্তু।

    কাঁথাটা ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে করিম শেখ কাঁপা গলায় বললো, আমার বুঝি দিনকাল শেষ হইয়া আইলো মিয়া, আর বাঁচুম না

    আহা অমন কথা কয় না মিয়া। অমন কথা কয় না। পরীক্ষণে ওকে বাধা দিয়ে মন্তু বললো, মরণের কথা চিন্তা কইরতেই নাই, আয়ু কইমা যায়।

    করিম শেখ তবু বিড়বিড় করে আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায় শোক প্রকাশ করতে লাগলো।

    রাতে এলো ওরা।

    বরের মামা, চাচা, আরো দু-তিনজন লোক।

    হীরনের বিয়ের ফর্দ হবে। আজ।

    মকবুলের বাইরের ঘরটাতে ফরাশ পেতে বসানো হলো ওদের। গনু মোল্লা বসলেন সবার মাঝখানে।

    আবুল, রশীদ আর সুরত আলী ওরাও বসলো সেখানে। বুড়ো মকবুল প্রথম আসতে রাজি হয়নি। বলছিলো, তোমরা সবাই আছো, ভালো মন্দ যা বুঝ আলাপ কর গিয়া। আমারে ওর মধ্যে টাইনো না।

    রশীদ বললো, কী কথা, আপনের মাইয়া, আপনে না থাকলে চলবো কেমন কইরা?

    ঘরের ভেতর থেকে বরের চাচা হাঁক ছাড়লো, কই, বেয়াই কই, তেনারে দেহি না ক্যান?

    অবশেষে ঘরে এসে এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়লো মকবুল।

    প্ৰথমে মেহমানের ভাত খাওয়ানো হবে। তারপরে ফর্দ হবে বিয়ের।

    এতক্ষণ খুঁজছিলো কখন বুড়ো মকবুলকে কিছুক্ষণের জন্যে একা পাওয়া যায়। তাহলে নিজের বিয়ের কথা ওকে বলবে সে। এই শীতে, হ্যাঁ এই শীতেই বিয়ে করে ঘরে বউ আনতে চায় মন্তু; কিন্তু মকবুলকে একা পাওয়া গেল না।

    সারা বাড়িতে আজ ভিড়।

    রান্নাঘরে ভিড়টা সবচেয়ে বেশি। বাড়ির মেয়ে পুরুষ কাচ্চাবাচ্চা সবাই গিয়ে জুটেছে সেখানে। সারাক্ষণ বকবক করছে। কার কথা কে শুনছে। কিছু বোঝা যায় না।

    হাঁড়িপাতিলগুলো একপাশে টেনে নিয়ে বাসন-বাসন ভাত বাড়ছে আমেনা। হঠাৎ মন্তুকে সামনে পেয়ে আমেনা জিজ্ঞেস করলো, মানুষ কয়জন?

    মন্তু বললো, আটজন।

    আটজন! আমেনার মাথায় রীতিমতো বাজ পড়লো। আটজনের কি ভাত রানছি নাকি আমি? আমি তো রানছি চাইরজনের। তোমার ভাইয়েয় আমারে চাইর জনের কথা কইছিল।

    বড় ঘর থেকে রান্নাঘরের দিকে আসছিলো মকবুল, কথাটা কানে গেল ওর। পরক্ষণে ভিতরে এসে রাগে ফেটে পড়লো সে। আমি কি জাইনতাম, আটজন আইবো ওরা? বারবার কইরা কইয়া দিছি। চারজনের বেশি আইসেন না আপনারা। ওরা তহন মইনা নিছে। আর এহন-বলে ঠোঁটজোড়া বিকৃত করে একটা বিশ্ৰী মুখভঙ্গি করলো মকবুল, হালার ভাত যেন এই জন্মে দেহে নাই হালারা।

    হইছে হইছে। আপনে আর চিল্লায়েন না, থামেন। মেজো বউ ফাতেমা চাপা গলায় বললো, যান যা আছে তা দিয়া একবার খাওয়ান। আমরা নাহয় পরে খামু।

    ফাতেমার কথায় শান্ত হয়ে চলে যাচ্ছিলো মকবুল; মন্তুর দিকে চোখ পড়তে বললো, তাইলে মন্তু মিয়া তুমি কাইল পরশু একদিন নবীনগর যাও। কেমন?

    মন্তু সংক্ষেপে ঘাড় নাড়লো। নিজের কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলো না সে। সহসা তার মনে একটা নতুন চিন্তা এলো। টুনি ফিরে এলে ওকে দিয়ে কথাটা মকবুলকে বলবে মন্তু।

    খাওয়া-দাওয়া শেষে ফর্দ করতে বসলো সবাই।

    প্রথমে উঠলো দেনা-পাওনার প্রশ্নটা।

    বরের চাচা ইদন শেখ বললো, অলঙ্কারপত্র বেশি দিবার পারমু না মিয়া। হাতের দুইজোড়া চুড়ি আর কানের দুইডা ঝুমকা।

    গলার আর কমরেরডা দিবো কে? সুরত আলী সঙ্গে সঙ্গে বললো, ওইগুলাও দিতে অইবো আপনাগোরে।

    পায়েরটরে বাদ দিয়া দিলা ক্যান অ্যাঁ? আবুল জোরের সঙ্গে বললো, পায়ের একজোড়া মলও দেওন লাগব।

    বুড়ো মকবুল নড়েচড়ে বসলো। সুরত আর আবুলের দিকে পরম নির্ভরতার সঙ্গে তাকালো সে।

    বরের মামা আরব পাটারী মৃদু হেসে বললো, এই বাজারে এতগুলান জিনিস দিতে গেলে কি কম টাকার দরকার মিয়া। আরো একটু কমসম কইরা ধরেন।

    আচ্ছা, পায়েরটা নাহয় নাই দিলেন। মাঝখানে পড়ে মধ্যস্থতা করে দিলো রশীদ। বাকিগুলান তো নিবেন?

    হ্যাঁ তাই সই। সুরত আলী বললো, সোনার জিনিস তো আর দিবার লাগছেন না, রূপার জিনিস দিবেন। তা মন কষাকষির কী দরকার?

    মকবুল কিছুই বললে না। একপাশে বসে রইলো চুপ করে। গনু মোল্লা ও নীরব। শুধু তসবি পড়ছেন ঢুলে ঢুলে।

    গহনার কথা শেষ হলে পরে মোহরানার কথা উঠলো;

    ইদন শেখ বললো, সব ব্যাপারে আপনাগোডা মইনা নিছি। এই ব্যাপারে। কিন্তুক আমাগোডা মাইনতে অইবো।

    আহা কয়েন না শুনি। রশীদ ঘাড় ঝাঁকালো।

    ইদন বললো, মোহরানাড়া পাঁচ টাহাই ধরেন।

    পাঁচ টাহা? অ্যাঁ, পাঁচ টাহা? কন কি? রীতিমতো খেপে উঠলো সুরত। মাইয়া কি মাগনা পাইছেন নাহি? অ্যাঁ? মাইয়ার কি কোনো দাম নাই?

    আহ, দাম আছে। বইলাইতো পাঁচ টাহা কইবার লাগছি। নইলে কি আর তিন টাকার উপরে উঠতাম? আরব পটারীর কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝরে পড়লো। কণ্ঠস্বরে বিকৃতি এনে সে বললো, সক্কল দিক দিয়াই বাড়াবাড়ি করবার লাগছেন আপনারা। আচ্ছা যান, আরো আট আনা বাড়াইয়া দিলাম। মোট সাড়ে পাঁচ টাহা।

    না বিয়াই। তা অয় না, অইবো না। এতক্ষণে কথা বললো বুড়ো মকবুল, এত কম মোহরানায় মাইয়ারে বিয়া দিবার পারমুনা, বলে হঠাৎ কেঁদে উঠলো সে, মাইয়া আমার কইলজার টুকরা বেয়াই। কত কষ্ট কইরা মানুষ করছি। দু-হাতে চোখের পানি মুছলো বুড়ো মকবুল। বিশটাহা যদি মোহরানা দেন। তাইলে মাইয়া বিয়া দিমু।

    মকবুলের চোখের পানি দেখে অপ্রতিভ হয় গেল সবাই। মাঝরাত পর্যন্ত অনেক তর্কবিতর্কের পর সোয়া এগারো টাকায় মিটমাট হলো সব। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে মেহমানরা বিদায় নিয়ে গেলো।

    মনে-মনে খুশি হলো মকবুল। সোয়া এগারো টাকা মোহরানায় এর আগে এ বাড়ির কোনো মেয়ের বিয়ে হয়নি।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    নৌকাটা ঘাটে বেঁধে রেখে একগাদা কাদা ডিঙিয়ে পাড়ে উঠে আসে ওরা। মন্তু আর করিম শেখ। হাটের এক কোণে মনোয়ার হাজীর চায়ের দোকানে বসে গরম দু’কাপ চা খায়।

    হাটের নাম শান্তির হাট। কিন্তু সারাদিন অশান্তিই লেগে থাকে এখানে। দূর দূর বহুদূর গ্রাম থেকে লোক আসে সওদা করতে। খুচরো জিনিসপত্রের চেয়ে পাইকারী জিনিসপত্রের বিক্রি অনেক বেশি। এখান থেকে মালপত্র কিনে নিয়ে গ্রামে গ্রামে আর ছোট ছোট হাট বাজারের দোকানীরা দোকান চালায়।

    মাঝে মাঝে দু’একটা সার্কাস পার্টিও আসে এখানে। তখন সমস্ত পরগণায় সাড়া পড়ে যায়। দলে দলে ছেলে বুড়ো মেয়ে এসে জড়ো হয় এখানে। দোকানীদেরও তখন খুশির অন্ত থাকে না। জোর বিক্রি চলে। নদীর পাড়ের ভরাট জায়গাটায় কয়েকটা দোচালা ঘর তুলে নিয়ে সেখানে হোটেল খোলে কেউ। ভিড় লেগেই থাকে।

    মানোয়ার হাজীর সঙ্গে করিম শেখের অনেক দিনের খাতির। এ হাটে এলে একমাত্র হাজীর দোকানেই চা খায় করিম। হাজীও বাইরের কোথাও যেতে হলে করিম শেখের নাও ছাড়া অন্য কারো নৌকায় যায় না। চায়ের পয়সা দিতে এলে হাজী একমুখ হেসে শুধালো, কি মিয়া খবর সব ভাল তো?

    করিম শেখ বিরক্তির সঙ্গে বললো, আর খবর, হাঁপানি হয়া মারতাছি।

    আহা, ওইডা আবার কখন থাইকা হইলো? হাজীর কণ্ঠে আন্তরিকতার সুর। তা মিয়া হাঁপানি নিয়া না বাইরলেই পারতা।

    কি আর করমু ভাই। পেট তো চলে না। করিম শেখ আস্তে করে বললো, পেট তো ঠাণ্ডা গরম কিছু মানে না।

    মন্তুকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে করিম।

    কিছুক্ষণ হাটের মধ্যে ঘোরাফেরা করে ওরা।

    আকাশটা অন্ধকার। সেই অন্ধকারে লুকিয়ে রয়েছে দু’পাশের গ্রামগুলো। মাঝে মাঝে দু’একটা মিটমিটে বাতি দেখে বোঝা যায় গেরস্থদের বাড়ি গেলো একটা। কিম্বা হঠাৎ কোথাও একসার বাতি দুলতে দুলতে এগিয়ে যেতে দেখলে চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় হাট থেকে ফিরছে। ওরা হাটুরের দল।

    মাঝে মাঝে দু একটা শিয়াল আর অনেকগুলো কুকুরের দলবাঁধা ডাক শোনা যায়। আর উজান নদীর একটানা কলকল শব্দ।

    হঠাৎ গলা ছেড়ে গান ধরে মন্তু।

    আশা ছিলো মনে মনে প্ৰেম করিমু তোমার সনে।

    তোমায় নিয়া ঘর বাঁধিমু গহিন বালুর চরে।

    গানের সুর বহুদূর পর্যন্ত প্ৰতিধ্বনিত হয়। করিম শেখ হুঁকোটা এগিয়ে দেয় ওর দিকে, নাও মিয়া তামুক খাও।

    হাত বাড়িয়ে হুঁকোটা নেয় মন্তু। গুডুম গুডুম টান মারে হুঁকোতে।

    তারপর আবার গান ধরে, আশা ছিল মনে মনে।

    গান শুনে করিম শেখের মনটা উদাস হয়ে যায়। ও বলে, এইবার একডা বিয়া শাদি করমু ঠিক করছি। একা একা আর ভালো লাগে না। মন্তু গান থামিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। অন্ধকারে ওর মুখখানা ভালো করে দেখতে পায় না সে!

    করিম শেখ আবার বলে, কি মিয়া কিছু কও না যে?

    মন্তু বলে, বিয়া করবা সেতো ভালো কথা।

    করিম শেখ বলে, করবার তো ইচ্ছা হয়, করি করে? ভাল দেইখ্যা একটা মাইয়া দেহয় দাও না।

    মন্তু হাসে, বলে, ভাল মাইয়া পাইলে কি আর নিজে এতদিন অবিয়াত থাকি মিয়া। বলে আবার গান ধরে সেঃ

    আশা ছিল মনে মনে…

    বাড়ি ফিরে এসে মন্তু দেখলে বুড়ো মকবুলের ঘরের সামনে একটু ছোট-খাট জটলা বসেছে। বাড়ির সবার সঙ্গে কি যেন পরামর্শ করছে মকবুল। বাড়ির সবার চেয়ে বড় সে। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সকলকে জিজ্ঞেস না করে কিছু করে না বুড়ো। অন্য সবার বেলাও তাই। মকবুলকে জিজ্ঞেস না করে বাড়ির কেউ কোনদিন কোন কাজ কারবার করে না; সুরত আলীর সঙ্গে হয়তো রশীদের মনোমালিন্য আছে! আবুলকে হয়তো মকবুল দু’চোখে দেখতে পারে না। গনু মোল্লাকে হয়তো দিনের মধ্যে পঞ্চাশ বার অভিশাপ দেয় ফকিরের মা। কিন্তু বাড়ির মান-সন্মান জড়িয়ে আছে এমন কোন কাজের বেলা কারো সঙ্গে কারো বিরোধ নেই। তখন সবাই এক। একসঙ্গে বসে পরামর্শ করবে ওরা। মন্তুকে আসতে দেখে ওর দিকে একথানা পিঁড়ি বাড়িয়ে দিলো সালেহা, বহ, মন্তু মিয়া বহ।

    আলোচনার ধারাটা মুহুর্তে বুঝে নিলো মন্তু।

    বুড়ে মকবুলের মেয়ে হীরনের বিয়ের প্ৰস্তাব এসেছে টুনিদের বাবার বাড়ির গ্রাম থেকে। আজ সন্ধ্যায় টুনিকে নিয়ে যাবার জন্যে ওর বাবার বাড়ি থেকে লোক এসেছিলো। সেই দিয়ে গেছে প্রস্তাবটা। জুলু শেখের বেটা কদম শেখ হাল গরু জমি সব আছে ওদের। খাস গেরস্তু ঘরের ছেলে; বিয়ে একটা অবশ্য করেছিল একবার। মাস তিনেক হলো বউ মারা গেছে।

    আমেনা বলছে, অত চিন্তা কইরা কী আইবো। পাকা কথা দিয়া দ্যান।

    গনু মোল্লা বললো, সব খোদার ইচ্ছা। মাইয়ার কপালে যদি সুখ থাকে তাইলে যেইহানে বিয়া দিবা সেই হানেই সুখে থাকবো। বড় বেশি বাছবিচার কইরোনা।

    মকবুল সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলো, হ্যাঁ, তাতো ঠিক কথা।

    হীরনের বিয়ের কথা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল, মাঝখানে রশীদের বউ সালেহা বলে উঠলো, আমাগো মন্তু মিয়ারেও এইবারে একডা বিয়া করাইয়া দ্যান।

    এককোণে নীরবে বসেছিলো মন্তু। ওর দিকে তাকিয়ে সকলে সালেহার কথায় একসঙ্গে সাড়া দিয়ে উঠলো।

    বুড়ো মকবুল গভীর গলায় বললো, হুঁ, ঠিক কথা কইছ সালেহা। ওর লাইগা একটা মাইয়া দেহন লাগে।

    আমেনা বললো, ওর তো বাপ মা কেউ নাই, আপনারা আছেন দেইখা শুইনা করায়া দেন বিয়াডা।

    সঙ্গে সঙ্গে দু-চারজন মেয়ে নিয়েও আলাপ করলো ওরা।

    ফাতেমার এক খালাতো বোন আছে। রসুন তার নাম। রসুনের মতো সাদা-হলুদে মেশানো গায়ের রঙ। সুঠাম দেহ। টানা টানা চোখ। বয়স তেরো-চৌদ্দ হবে।

    আবুল বললো, ওর মামার এক মেয়ে আছে। দেখতে যেন হুরপরী! তাই মামা আদর করে পরী বলে ডাকে। শুধু স্বভাবটা যেন একটু কেমন কেমন। তাও তেমন কিছু নয়। খায় একটু বেশি। আর ঘুমােয়। মকবুল পরক্ষণে বললো, ও মাইয়া ঘরে আইনা কাজ নাই মিয়া।

    আমেনা বললো, অতি দূরে-দূরে যাইতাছ ক্যান, নিজ গেরামে দেহ না। আমাগো আম্বিয়া কি খারাপ মাইয়া নাহি! ও হইলেই খুব ভালো হয়। দিনরাত গতর খাটাবার পারে। মন্তু মিয়ারে সুখে রাখবো।

    আম্বিয়ার প্রশ্নে কারো কাছ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। ও মেয়ে গতর খাটাতে পারে একথা সত্যি। কিন্তু ঘরের বউ করে আনার মতো মেয়ে নয়।

    মকবুল বললো, ওগো বংশে হাঁপানি রোগ আছে। শেষে হাঁপানি হইয়া মন্তুও মরবো।

    মন্তু কিন্তু একটা কথাও বললো না। সে চুপ করে বসে রইল এককোণে। আলোচনা অসমাপ্ত রেখে সেদিনের মতো উঠে গেলো সবাই। একটু পরে যে-যার ঘরে চলে গেলো ওরা।

    পিদিম জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকে অবাক হলো মন্তু। মাচাঙের ওপর একরাশ শাপলার ফুল ঝুলছে। বকের মতো সাদা ধবধবে পাতার মাঝখানে হলুদ রঙের কুঁড়ি। ডাঁটাসহ ফুলগুলো মাচাঙ থেকে নামিয়ে নিলো মন্তু।

    আজ সন্ধ্যায় বাপের বাড়ি চলে গেছে টুনি। যাবার আগে এগুলো রেখে গেছে ওর ঘরে। একটুকরো ম্লান হাসি জেগে উঠলো মস্তুর ঠোঁটের কোণে। ফুলগুলো আবার মাচাঙের উপর তুলে রেখে বিছানাটা নামিয়ে নিলো মন্তু।

  • চার

    চার

    খড়ম জোড়া তুলে নিয়ে হাত পা ধোয়ার জন্যে পুকুর ঘাটে চলে যায় মন্তু। অজু করে এসে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে আজ।

    মাঝি-বাড়ি থেকে ধপাস ধপাস ঢেঁকির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

    রাত জেগে আজও ধান ভানছে আম্বিয়া। বড় মিহি কন্ঠস্বর ওর, বড় সুন্দর জ্ঞান গায় সে।

    ভাটুইরে না দিয়ো শাড়ি,

    ভাটুই যাবো বাপের বাড়ি।

    সর্ব লক্ষণ কাম চিক্কন,

    পঞ্চ রঙের ভাটুইরে।।

    পুকুর ঘাট থেকে ফেরার পথে থমকে দাঁড়ালো মন্তু। ছোট পুকুরের পূর্ব পাড় থেকে কে যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম পাড়ের দিকে। আবছা আলোতে সব কিছু স্পষ্ট না দেখলেও মেয়েটিকে চিনতে ভুল হয় না মন্তুর। আবুলের বউ হালিমা। এত রাতে একা একা কোথায় যাচ্ছে সে। পশ্চিম পাড়ের লম্বা পেয়ারা গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটা। চারপাশে বার কয়েক ফিরে তাকাল সে। ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মন্তু। হাত-পাগুলো কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে ওর।

    পরনের কাপড়টার একটা প্রান্ত পেয়ারা গাছের মোটা ডালটার সঙ্গে বাধলো হালিমা। আরেকটা প্রান্ত নিজের গলার সঙ্গে পেচিয়ে কি যেন পরখ করলো সে।

    মন্তুর আর বুঝতে বাকি রইলো না, গলায় ফাঁস দিয়ে মরতে চায় হালিমা-

    এ দুনিয়াটা বোধ হয় অসহ্য হয়ে উঠেছে ওর কাছে। তাই আর বাঁচতে চায় না ও।

    মন্তু এই মুহূর্তে কি করবে ভেবে উঠতে পারছিলো না।

    হঠাৎ ওকে অবাক করে দিয়ে গলার ফাঁসটা খুলে ফেলে আপন মনে কেঁদে উঠলো হালিমা। পেয়ারা গাছটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো সে।

    হয়তো, বাবা-মার কথা মনে পড়েছে ওর। কিংবা দুনিয়াটা অতি নির্মম হলেও ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না হয়ত।

    এর মধ্যে বার চারেক গলায় ফাঁস পরেছে আর খুলেছে হালিমা। ওর অবস্থা দেখে অতি দুঃখে হাসি পেল মন্তুর। ধীরে ধীরে ওর খুব কাছে এগিয়ে গেলো সে। তারপর অকস্মাৎ ওর একখানা হাত চেপে ধরলো মন্তু।

    একটা করুন উক্তির সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালো হালিমা। বড় বিষণ্ণ চাহনি ওর। অনেকক্ষণ কারো মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুলো না। বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইলো দুইজন। ঈষৎ চাঁদের আলোয় মন্তু দেখলো, হালিমার নাক আর চোখ দুটো অসম্ভব রকম ফুলে গেছে। এত মার মেরেছে আবুল। মন্তু শিউরে উঠলো। তারপর কি বলতে যাচ্ছিলো সে। হঠাৎ এক ঝটকায় ওর মুঠো থেকে হাত খানি ছাড়িয়ে নিলে একটা চাপা কান্নার সঙ্গে সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেলো হালিমা। বোবা দৃষ্টি মেলে সে দিকে তাকিয়ে রইলো মন্তু।

    পুকুর পাড় থেকে ফিরে এসে উঠোন পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলো সে। চেয়ে দেখে, ঘরের দাওয়ায় বসে পুঁথির কথাগুলো গুনগুন করছে টুনি।

    দাওয়া থেকে নেমে এসে টুনি শুধালো, কোথায় গিছলা মিয়া; তোমারে আমি খুঁইজা মারি।

    শোবার ঘর থেকে মকবুল আর আমেনার গলার স্বর শোনা যাচ্ছে। রশীদ আর সালেহাও বিছানায় শুয়ে শুয়ে কি নিয়ে যেন আলাপ করছে নিজেদের মধ্যে।

    সুরত আলীর ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

    আবুল আর হালিমার ঘরেও কোন বাতি নেই।

    মন্তু সহসা টুনির কথার কোন জবাব দিলো না।

    টুনি আরো কাছে এগিয়ে এসে বললো, এহানি ঘুমাইবা বুঝি?

    মন্তু বললো, হুঁ। শরীরটা আইজ ভালো নাই।

    ক্যান, কি অইছে? টুনির কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা। জ্বর হয় নাই তো? মন্তু বললো, না এমনি খারাপ লাগতাছে।

    টুনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর আস্তে করে বললো, আইজ শাপলা তুলতে যাইবা না?

    মন্তু বললো, আজ থাক, কালকা যামু।

    টুনি কি যেন ভাবলো। ভেবে বললো, পরশু দিনকা আমি বাপের বাড়ি চইলা যামু।

    তাই নাহি?

    হুঁ। বাপজানের অসুখ, তাই।

    অসুখের কথা কার কাছ থাইকা শুনলা? ওর মুখের দিকে তাকালো মন্তু।

    টুনি আস্তে করে বললো, বাপজান লোক পঠাইছিলো।

    অ। উঠোনের মাঝখানে দু’জন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো ওরা। একটু পরে মন্তু নীরবতা ভাঙলো, পরশু থাইকা আমিও নাও বাইতে যাইতাছি।

    কোনহানে যাইবা? টুনি সোৎসাহে তাকালো ওর দিকে।

    মন্তু বললো, কোনহানে যাই ঠিক নাই। করিম শেখের নাও। সে যেই হানে নিয়া যায় সেই হানেই যামু।

    টুনি বললো, তোমার নায়ে আমারে বাপের বাড়ি পৌছাইয়া দিবা? বলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো টুনি।

    সহসা কোন জবাব দিতে পারে না মন্তু। তারপর ইতস্তত করে বলে, অনেক রাত অইছে এইবার ঘুমাও গিয়া। বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় মন্তু।

    পরদিন অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙলো মন্তুর।

    বাইরে উঠোনে তখন কি একটা বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধিয়েছে আমেনা আর সালেহা। অকথ্য ভাষায় পরস্পরকে গালাগালি দিচ্ছে ওরা। হনু মোল্লার ঘরের সামনে একটা বড় রকমের ভীড়।

    গ্রামের অনেক ছেলে বুড়ো এসে জমায়েত হয়েছে সেখানে। ব্যাপারটা কি প্রথমে বুঝতে পারলো না মন্তু। পরে বুড়ো মকবুলের মেয়ে হিরনীর কাছ থেকে শুনলো সব।

    মজু ব্যাপারীর মেয়েটাকে ভূতে পেয়েছে। ভূত তাড়াবার জন্য ওকে গনু মোল্লার কাছে নিয়ে এসেছে সবাই। ব্যাপারীর ছোট ভাইকে সামনে পেয়ে মন্তু শুধালো, কি মিয়া ভূতে পাইল কহন অ্যাঁ?

    ব্যাপারীর ভাই আদ্যপ্ৰান্ত জানালো সব।

    কাল ভোর সকালে পরীর দীঘির পাড়ে শুকনো ডাল পাতা কুড়োতে গিয়েছিলো মেয়েটা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো মেয়ে আর ফিরে না। ওদিকে মেয়ের মা তো ভেবেই আকুল বয়স্কা মেয়ে, কে জানে আবার কোন বিপদে পড়লো। প্রথমে ওকে দেখলো কাজী বাড়ির থুরথুরে বুড়িটা। লম্বা তেঁতুল গাছের মগডালে উঠে দু’পা দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে টেনে টেনে দিব্যি গান গাইছে মেয়েটা। বুড়ি তো অবাক, বলি লজ্জা শরমের কি মাথা খাইছ? দিন দুপুরে গাছে উইঠা পিরীতের গীত গাইবার লাগছ। ও মাইয়্যা, বলি লজ্জা শরম কি সব উইঠা গেছে নাহি দুনিয়ার উপর থাইক্যা?

    বুড়ি যত চিৎকার করে মরে, মেয়ে তত শব্দ করে হাসে। সে এক অদ্ভুত হাসি। যেন ফুরোতেই চায় না।

    খবর শুনে মজু ব্যাপারী নিজে ছুটে এলো দীঘির পাড়ে। নিচে থেকে মেয়েকে নাম ধরে বারবার ডাকলো সে। সখিনা, মা আমার নাক-কান কাটিছ না। মা, নাইম্যা আয়।

    বাবাকে দেখে ওর গায়ের ওপরে থুথু ছিটিয়ে দিলো সখিনা। তারপর খিলখিল শব্দে হেসে উঠে বললো, আর যামু না আমি। এইহানে থাকুম।

    ওমা কয় কি। মাইয়্যা আমার এই কি কথা কয়? মেয়ের কথা শুনে চোখ উল্টে গেলো মজু ব্যাপারীর।

    থুরথুরে বুড়ি এতক্ষণ চুপ করে ছিলো। সহসা বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়লো সে, লক্ষণ বড় ভালো না ব্যাপারী। মাইয়ারে তােমার ভূতে পাইছে।

    খবরদার বুড়ি বাজে কথা কইস না। উপর থেকে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানালো সখিনা।

    বেশি বক বক করলে ঘাড় মটকাইয়া দিমু।

    এ কথার পরে কারো সন্দেহের আর অবকাশ রইলো না।

    বুড়ি বললো, এ বড় ভালো লক্ষণ নয়, জলদি কইরা লোকজন ডাহ।

    লোকজন ডাকার কোন প্রয়োজন ছিলো না। কারণ হাঁক-ডাক শুনে ততক্ষণে গ্রামের অনেক লোক এসে জড়ো হয়ে গেছে সেখানে। বুড়ো ছমির মিয়া বললো, দাঁড়ায়া তামাশা দেখতাছ ক্যান মিয়ারা, একজন উইঠ্যা যাও না উপরে। কে উঠবে, কে উঠবে না। তাই নিয়ে বাচসা হলো কিছুক্ষণ। কারণ যে কেউ তো আর উঠতে পারে না। এমন একজনকে উপরে উঠতে হবে, মেয়ের গায়ে হাত ছোঁয়াবার অধিকার আছে যার। অবশেষে ঠিক হলো তকু ব্যাপারাই উঠবে উপরে। মেয়ের আপন চাচা হয় সে সুতরাং অধিকারের প্রশ্ন আসে না।

    তকু ব্যাপারীকে উপরে উঠতে দেখে ক্ষেপে গেলো সখিনা। চিৎকার করে ওকে শাসাতে লাগল সে, খবরদার, খবরদার ব্যাপারী, জানে খতম কইরা দিমু। বলে ছোট ছোট ডালপালা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ওর ঘাড়ের ওপরে ছুঁড়ে মারতে লাগলো সে। তারপর অকস্মাৎ এক লাফে দীঘির জলে ঝাঁপিয়ে পড়লো মেয়েটা। অনেক কষ্টে দীঘির পানি থেকে পাড়ে তুলে আনা হলো তাকে।

    কলসি কলসি পানি ঢালা হলো মাথার ওপর। তারপর যখন জ্ঞান ফিরে এলো সখিনার তখন সে একেবারে চুপ হয়ে গেছে। তারপর থেকে একটা কথাও বলে নি সখিনা। একটা প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি সে। তাই আজ সকালে গনু মোল্লার কাছে নিয়ে এসেছে ওকে, যদি ভূতটাকে কোন মতে তাড়ানো যায়। নইলে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। ব্যাপারীর ভাইয়ের কাছ থেকে সব কিছু শুনলো মন্তু। গনু মোল্লার ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলো একটা সাদা কাপড়কে সরষের তেলের মধ্যে ডুবিয়ে নিয়ে তার মধ্যে আগুন ধরিয়ে সেই কাপড়টাকে সখিনার নাকের ওপর গনু মোল্লা ধরেছে আর চিৎকার করে বলছে, কোনহানে থাইকা আইছস শীগগীর কইরা ক, নইলে কিন্তুক ছাড়মুনা আমি। ক শীগগীর। সখিনা নীরব।

    তার ঘাড়ের ওপর চেপে থাকা ভূতটা কোন কথাই বলছে না।

    মন্তু আর দাঁড়ালো না সেখানে। ঘরের পিছন থেকে একটা নিমের ডাল ভেঙ্গে নিয়ে দাঁতন করতে করতে পুকুর ঘাটে চলে গেলো সে। পুকুর পাড়ের পেয়ারা গাছের নিচে লাউ গাছগুলোর জন্য একটা মাচা বাঁধছে হালিমা। এখন দেখলে কে বলবে যে ওই মেয়েটা এই গতকাল রাতে ওই পেয়ারা গাছটার ডালে গলায় কাপড় বেঁধে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলো। ওর দিকে চোখ পড়তেই, কিছুক্ষণ এক দৃষ্টি তাকিয়ে থেকে তারপর আবার মাচা বাঁধতে লাগল হালিমা।

  • তিন

    তিন

    এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠলো টুনি।

    এত শিঘ্রী উঠত না সে, বুড়ো মকবুলের ধমক খেয়ে শুয়ে থাকাটা নিরাপদ মনে করলো না। মনে মনে বুড়োকে এক হাজার একশো অভিশাপ দিলো। চোখজোড়া জ্বালা করছে তাঁর। মাথাটা ঘুরছে। ঘরের পাশে ছাইয়ের গাদা থেকে একটা পোড়া কাঠের কয়লা তুলে নিয়ে সেটা দিয়ে দাঁত মাজতে পুকুরের দিকে চলে গেলো। এক গলা পানিতে নেমে মন্তু গোসল করছে পুকুরে।

    ঘোলাটে পানি আরো ঘোলা হয়ে গেছে।

    কতগুলো হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করে সাতার কাটছে এপার থেকে ওপারে। আর মাঝে মাঝে মুখটা পানিতে ডুবিয়ে চ্যাপটা ঠোঁট দিয়ে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা।

    কাঁঠাল গাছের গুড়ি দিয়ে বানানো ঘাটের এক কোণে এসে নীরবে বসলো টুনি। পা জোড়া পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে এক মনে দাঁতন করতে করতে হঠাৎ তাঁর নজরে এলো মন্তুর পিঠের ওপর একটা লম্বা কাটা দাগ।মনে হল কিছুক্ষণ আগেই বুঝি কিছুর সঙ্গে লেগে চিরে গেছে পিঠটা। ওমা, বলে মুখ থেকে হাত নামিয়ে নিলো টুনি, এই এই শোন। মন্তু ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, এইখানটা চিরলো কেমন কইরা, অ্যাঁ?

    মন্তু হেসে দিয়ে বলল, গতকাল রাতে সগন শেখের পুকুর পাড়ে একটা বুনো লতার কাঁটা লাগছিলো পিঠে।

    টুনির চোখজোড়া মুহূর্তে করুন হয়ে এলো। দরদ ভরা কন্ঠে সে আস্তে করে বলল, চলো কচু পাতার ক্ষির লাগাইয়া বাইন্দা দি, নইলে পাইকা যাইব, শেষে কষ্ট পাইবা।

    মন্তু আবার একগলা পানিতে নেমে যেতে যেতে বলল, দূর কিছু অইবো না আমার।

    টুনি কিছু বলতে যাচ্ছিলো হঠাৎ মকবুলের উঁচু গলার ডাক ওর কথায় ছেদ পড়লো।

    কই টুনি বিবি, বলি বিবিজানের মুখ ধোয়ন কি এহনো অইলো না নাকি? রান্নাঘর থেকে চিৎকার করছে বুড়ো মকবুল। কাল রাতে ধানগুলো ভানা হয়নি সেগুলো ভানতে হবে এহন। হাত ভেঙ্গে ফুলে গেলেও সহজে বসে থাকার পাত্র নয় মকবুল।

    তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে বুড়োর মৃত্যু কামনা করতে করতে ঘাট থেকে উঠে গেলো টুনি।

    মন্তুর কোনো জমিজমা নেই।

    পরের জমিতে খেটে রোজগার করে। লাঙ্গল চষে। ধান বোনে। আবার সে ধান পাকলে কেটে এনে মালিকের গোলা ভর্তি করে। তারপর ধানের মরশুম শেষ হয়ে গেলে কলাই, মুগ, তিল, সরিষার খেতে কাজ করে মন্তু। মাঝে মাঝে এ বাড়ি ও বাড়ি লাকড়ি কাটার চুক্তি নেয়। পাঁচ মণ এক টাকা। কোনো কোনো দিন আট নয় মণ লাকড়িও কেটে ফেলে সে। মাঝে কিছুকাল মাঝি-বাড়ির মন্তু শেখের ছেলে করিম শেখের সঙ্গে নৌকা বেয়েছিলো মন্তু। নৌকায় পাল তুলে অনেক দুরের গঞ্জে চলে যেতো ওরা। ওখান থেকে যাত্রী কিংবা মাল নিয়ে ফিরতো। ক্ষেতের রোজগারের চেয়ে নৌকায় রোজগার অনেক বেশি।

    মাচাঙের উপর থেকে আধ ময়লা ফতুয়াটা নামিয়ে নিয়ে গায়ে দিতে দিতে মন্তু ভাবলো, আজ একবার করিম শেখের সঙ্গে দেখা করবে গিয়ে। তখন সন্ধ্যার কালো অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে গ্রামের বুকে। মিঞা-বাড়ির মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। মাথায় টুপিটা পরে নিয়ে তসবিহ হাতে নামাজ পরতে চলছেন গনু মোল্লা। মোরগ হাঁসগুলো সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবার পর এখন উঠোনের এককোণে এসে জটলা বেঁধেছে। একটু পরে যার যার খোয়াড়ে গিয়ে ঢুকবে ওরা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলো মন্তু। মাঝি-বাড়িটা বেশি দূরে নয়।

    সগন সেখের পুকুরটা বাঁদিকে রেখে ডান দিকে মিয়াঁদের খেজুর বাগানটা পেরিয়ে গেলে দুটো ক্ষেত পরে মাঝি-বাড়ি।বাড়ির সামনে দিয়ে দাঁড়াতে মন্তু শেখের গরু ঘরের পেছন থেকে একটা লোম উঠা হাড় বের করা কালো কুকুর দৌড়ে এসে বিকট চিৎকার জুড়ে দিলো। হেই হেই করে কুকুরটাকে তাড়াবার চেষ্টা করলো সে।

    দেউড়ির সামনে বাঁশের উপর ঝুলিয়ে রাখা সুপুরি পাতার ঝালরের আড়াল থেকে একটা গানের কলি গুনগুন করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এলো আম্বিয়া।

    আরে মন্তু ভাই দেখি। কী খবর?

    মন্তু বললো, করিম আছে নাহি?

    মাথার চুলগুলো খোপার মধ্যে গুড়িয়ে নিতে নিতে আম্বিয়া বললো, আছে।

    আইজ কয়দিন থাইকা জ্বর অইছে ভাইজানের।

    কী জ্বর? কহন অইছে? মন্তুর চোখে উৎকণ্ঠা।

    আম্বিয়া আস্তে করে বললো, পরশু রাইত থাইকা অইছে। কী জ্বর তা কইবার পারলাম না।

    মন্তু কি যেন চিন্তা করলো। তারপর ফিরে যাবার জন্যে পা বাড়াতে আম্বিয়া পিছন থেকে ডাকলো, চইলা যাও ক্যান? দেখা কইরা যাইবা না? আম্বিয়ার পিছু পিছু হোগলার বেড়া দেয়া ঘরটায় এসে ঢুকলো মন্তু। কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে ম্লান হেসে করিম বললো, মন্তু মিয়া যে, তোমারে তো আইজ-কাল দেখা যায় না। বাইচা আছি না মইরা গেছি তাও তো খোঁজ-খবর নাও না মিয়া।

    মন্তু প্রথমে বিব্রত বোধ করলো, তারপর বললো, দেখা না অইলে কি অইবো মিয়া খোজ-খবর ঠিকই নিই।

    কলকেতে তামাক সাজিয়ে এনে হুঁকোটা মন্তুর দিকে বাড়িয়ে দিলো আম্বিয়া। তারপর জিজ্ঞেস করলো পান খাইবা? মন্তু হাত বাড়িয়ে হুকোটা নিতে নিতে বললো, না থাউক। আপন মনে কিছুক্ষণ হুঁকো টানলো সে। তারপর আসল কথাটা আলোচনা করলো ওর সঙ্গে। করিম শেখের সঙ্গে আবার কিছুদিনের জন্য নৌকায় কাজ করতে চায় মন্তু।

    শুনে খুশি হল করিম। বললো, নাওটারে একটু মেরামত করন লাগবো।

    কাল পরশু একবার আইসো।

    আবার আসবে বলে উঠতে যাচ্ছিল মন্তু।

    করিম সঙ্গে সঙ্গে বললো, আহা যাও কই, বহ না।

    না। রাইত অইছে যাই এইবার।

    আম্বিয়া বললো, বহ মন্তু ভাই, চাইরডা ভাত খাইয়া যাও।

    এর মধ্যে পাশের ঘরে গিয়ে ছেঁড়া ময়লা শাড়িটা পাল্টে একটা নীল রঙের শাড়ি পরে এসেছে আম্বিয়া।

    মুখখানা গামছা দিয়ে মুছে এসেছে সে।

    কিছুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো মন্তু। আঁটসাঁট দেহের খাঁচে খাঁচে দুরন্ত যৌবন, আঁট হাত শাড়ির বাঁধন ভেঙ্গে ফেটে পরতে চায়। ওকে অমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিব্রত বোধ করলো আম্বিয়া, দাঁড়াইয়া রইলা ক্যান, বহ না।

    মন্তু বললো, না আইজ না। আর এক দিন খামু।বলে বাইরে বেরিয়ে এলো মন্তু।

    পিদিম হাতে দেউড়ি পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিয়ে গেল আম্বিয়া। মন্তু শুধালো তোমার আব্বা কই গেছে?

    আম্বিয়া বললো, যেই কাজ কইরা বেড়ায় সেই কাজ করতে গেছে। যাইবো আবার কই। ওর গলায় ক্ষোব।

    ওর মুখের দিকে তাকালো মন্তু। ওর ক্ষোবের কারণটা সহজে বুঝতে পারলো। সাত গ্রামের মরা মানুষকে কবর দিয়ে বেড়ায় নন্তু শেখ। এ তাঁর পেশা নয় নেশা।

    আম্বিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন রাস্তায় নেমে এলো মন্তু তখন সে অনুভব করলো বেশ রাত হয়েছে।

    চারপাশে ঝিঁ-ঝিঁ পোকার অবিশ্রান্ত ডাক। মাঝে মাঝে গাছের মাথায় দু-একটা পাখি হঠাৎ পাখা ঝাঁপটিয়ে আবার নীরব হয়ে যাচ্ছে। আকাশে ভরা চাঁদ হাসছে খলখলিয়ে।

    বাড়ির কাছে এসে পৌঁছতেই সুরত আলীর সুর করে পুঁথি পড়ার শব্দটা কানে এলো মন্তুর।

    কইন্যা দেইখা গাজী মিয়ার চমক ভাঙ্গিলো।

    কইন্যার রূপেতে গাজী বেহুঁশ হইল।

    উঠোনে বেশ বড় রকমের জটলা বেধেছে একটা। মাটিতে একটা চাটাই বিছিয়ে বসেছে সবাই। আর তার মাঝখানে একটা পিদিমের আলোতে বসে পুঁথি পড়ছে সুরত। পুরুষরা তার ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেও মেয়েরা বসেছে একটু দূরে। যাদের বয়স কম তারা বসেছে আরো দূরে। দাওয়ার ওপরে।

    বুড়ো মকবুল গুড়ুক গুড়ুক হুঁকো টানছে আর বার বার প্রশংসা করছে সুরত আলীর পুঁথি পড়ার। বড় সুন্দর পুঁথি পড়ে সুরত আলী। এ গাঁয়ের সেরা পুঁথি পড়ুয়া সে।

    আকাশে যখন জোছনার বান ডাকে। ভরা চাঁদ খলখলিয়ে হাসে। দক্ষিনের মৃদুমন্দ বাতাস অতি ধীরে তার চিরুনি বুলিয়ে যায় গাছের পাতায় পাতায়। কাক ডাকে না। চড়ুই আর শালিক কোনো সাড়া দেয় না। গ্রামের সবাই সারা দিনের কর্মব্যস্ততার কথা ভুলে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নেয়।নিঃশব্দ নিঝুম রাতে কুঁড়েঘরের ছায়াগুলো ধীরে ধীরে হেলে পড়ে উঠোনের মাঝখানে। তখন সুর করে পুঁথি পড়ে সুরত আলী। গাজী কালুর পুঁথি। ভেলিয়া সুন্দরীর পুঁথি।

    শুন শুন বন্ধুগণরে, শুন দিয়া মন।

    ভেলুয়ার কথা কিছু শুন সর্বজন॥

    কী কহিব ভেলুয়ার রুপের বাখান।

    দেখিতে সুন্দর অতিরে রসিকের পরাণ॥

    আকাশের চন্দ্র যেনরে ভেলুয়া সুন্দরী।

    দূরে থাকি লাগে যেন ইন্দ্রকুলের পরী॥

    উৎকর্ণ হয়ে শোনে সবাই। সুরত আলী পড়ে।ঢুলে ঢুলে সুর করে পড়ে সে।পুরুষেরা গুড়ুক গুড়ুক তামাক টানে। মেয়েরা পান চিবায়। মাঝে মাঝে কমলার পুঁথিটাও পড়ে শোনায় সুরত। কমলার কিচ্ছা বর্ণনা করে সবার কাছে। কিচ্ছা নয়, একেবারে সত্য ঘটনা। হিরণ্য নগরের মেয়ে ছিলো কমলা। যেমন রুপ তেমনি গুণ। ভোজ উৎসব করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে একদিন বিয়ে হয়ে গেলো তার। হিরণ্য নগরের রাজকুমারের সঙ্গে।

    বড় সুখে দিন কাটছিলো ওদের।

    এক বছর পরে একটা দুধের মত মেয়ে জন্ম নিলো ওদের।

    আট বেহারার পালকি চড়ে একদিন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে লাল পরি নীল পরী আর সবুজ পরির দীঘির পাড় দিয়ে বাপের বাড়ি যাচ্ছিল কমলা। দীঘি দেখে পালকি থেকে নামলো সে। চৈত্র-মাসের খর রোদে ভীষন তেষ্টা পেয়েছিলো ওর। দীঘির স্বচ্ছ পানি দেখে বড় লোভ হল কমলার। পানিতে পায়ের পাতা ডুবিয়ে আঁচল ভরে পানি খেলো সে। তারপর যখন উঠতে যাবে, দেখলো, চুলের মতো কি যেন একটা কড়ে আঙ্গুলের গোড়ায় আটকে রয়েছে। হাত দিয়ে ছাড়াতে গেলো। পারলো না কমলা। যত টানে তত লম্বা হয় সে চুল। তার এক প্রান্ত পানির ভেতরে, অন্য প্রান্ত কড়ে আঙ্গুলের সঙ্গে গিটে আঁটা। ছাড়াতেও পারেনা কমলা, এগুতেও পারেনা। এগুতে গেলে পানির ভেতর চুলে টান পড়ে। কে যেন টেনে ধরে রেখেছে ওটা। চারিদিকে হই চই পড়ে গেলো।

    কত লোক এলো। কত লোক গেলো।

    কত কামার কুমার ওঝা এসে জড়ো হল। কেউ কিছু করতে পারলো না। ইস্পাতে তৈরি কুড়োল দিয়েও কাটা গেলো না চুলটা? তিন মাস তিন দিন চলে গেলো।

    তারপরে—

    এক রাতে স্বপনে দেখিলো সুন্দরী।

    দীঘির পানিতে আছে এক রাজপুরী॥

    সেইখানে আছে এক রাজপুত্র সুন্দর।

    আসেক হইয়াছে তার কমলার উপর॥

    কমলারে পাইতে চায় আপন করিয়া।

    কমলার লাইগা তার কান্দিছে হিয়া॥

    কাঁদতে কাঁদতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো কমলার। কাঁদলো সবাই। বাবা, মা। স্বামী সবাই।

    দীঘির পানি থেকে চুলে টান পড়লো এতদিনে। পাতা পানি থেকে হাঁটু পানিতে নেমে গেলো কমলা। হাঁটু থেকে বুক। তারপর গলা। ধীরে ধীরে দীঘির পানিতে অদৃশ্য হয়ে গেলো কমলা সুন্দরী।

    চাঁদ হেলে পড়ে পুব থেকে পশ্চিমে।

    ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।

    ঢুলে ঢুলে পুঁথি পড়া শেষ করল সুরত আলী।

    হীন মোয়াজ্জেমে কহেরে শুন সর্বজন

    কমলা সুন্দরীর কিচ্ছা হইল সমাপন॥

    ভুল চুক হইলে মোরে লইবেন ক্ষেপিয়া।

    দোয়া করিবেন মোরে অধীন জানিয়া॥

    পুঁথি পড়া শেষ হয়। কমলা সুন্দরী আর ভেলুয়া সুন্দরীর জন্যে অনেক অনেক আফসোস করে মেয়ে বুড়োরা। আঁচল দিয়ে চোখের পানি মোছে আমেনা। টুনির চোখ জোড়াও পানিতে টলটল করে ওঠে। ফকিরের মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, সব খোদার ইচ্ছা, খোদা মাইরবার চাইলে কিনা করতে পারে। বুড়ো মকবুল কিছুক্ষণের জন্য হুঁকো টানতে ভুলে যায়। সে চুপ করে কি যেন ভাবে আর নীরব দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে।