চৈত্র মাসের রোদে পুরো মাঠটা খা খা করছে।

যেদিকে তাকানো যায় শুধু শুকনো মাটি। পাথরের চেয়েও শক্ত। আর অসংখ্য ফাটল। মাটি উত্তাপ সহ্য করতে না-পেরে ফেটে যায়। দাঁড়কাকগুলো তৃষ্ণায় সারাক্ষণ কা-কা করে উঠে বেড়ায় এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে। বাড়ির আনাচে কানাচে।

নদী-নালাগুলোতে পানি থাকে না। মানুষ গরু ইচ্ছেমতো পায়ে হেঁটে এপার-ওপার চলে যায়। পুকুরগুলোর পানিও অনেক কমে আসে।

গরমে ঘরে থাকে না কেউ। গাছের নিচে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে-বসে দিন কটায়। বাতাসে একটি পাতাও নড়ে না। সারাক্ষণ সবাই শুধু হা-হুতাশ করে।

এমনি সময়ে হীরনকে দেখবার জন্যে ওর শ্বশুরবাড়িতে গেছে বুড়ে মকবুল। যাবার সময় একটা ন্যাকড়ার মধ্যে এককুড়ি মুরগির ডিম সঙ্গে নিয়ে গেছে সে। শূন্য হাতে বেয়াই বাড়ি গেলে হয়তো ওরা লজ্জা দিতে পারে, তাই।

পথে বামনবাড়ির হাট থেকে চারআনার বাতাসাও কিনেছে সে। বাড়ির বাচ্চাদের হাতে দেবে।

ভর সন্ধ্যায় মেয়ের বাড়ি থেকে ফিরে এলো মকবুল। বারবাড়ি থেকে ওর ক্লান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, সুরত। সুরত। ও মন্তু, কেউ কি নাই নাকি রে।

মন্তু গেছে মিয়া-বাড়ি। গাছ কাটার চুক্তি নিয়েছে সে।

সুরতও সেখানে।

আবুল বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী ভাইসাব কী আইছে।

টুনি আর আমেনাও বেরিয়ে এলো বাইরে।

মকবুল বললো, সুরুত, রশীদ ওরা কই।

আমেনা বললো, সুরত কাজে গেছে, রশীদ গেছে হাটে, সালেহার লাইগা সাবু আনতে। ওর জ্বর হইছে ভীষণ।

জ্বর নাহি, আহা কখন আইলো? গায়ের ফতুয়াটা খুলতে খুলতে মকবুল বললো, বাপু, তোমরা সক্কলে একটু সাবধানে থাইকো। ও বিন্তির মা, বঁইচির মা শোনো, তোমরা একটু সাবধানে থাইকো। গোরামে ওলাবিবি আইছে।

ইয়া আল্লাহ মাপ কইরা দাও। আতঙ্কে সবাই শিউরে উঠলো।

গনু মোল্লা ওজু করছিলো, সেখান থেকে মুখ তুলে প্রশ্ন করলো, কোনহানে আইছে ওলা, বিবি? কোন বাড়িতে আইছে?

মকবুল বললো, মাঝি-বাড়ি।

মাঝি-বাড়ি? একসঙ্গে বলে উঠলো সবাই। কয়জন পড়ছে?

তিনজন।

তিনজন কে কে, সে কথা বলতে পারবে না মকবুল। পথে আসার সময় ও-বাড়ির আম্বিয়ার কাছ থেকে শুনে এসেছে সে। বাড়ির সবাইকে আরেক প্রস্থ সাবধান করে দিলো বুড়ো মকবুল, তোমরা সক্কালে একডু হুইসারে থাইকো বাপু। একডু দোয়া-দরুদ পাইড়ো। বলে খড়মটা তুলে ঘাটের দিয়ে চলে গেলো সে।

ফকিরের মা বুড়ি এতক্ষণ নীরবে শুনেছিলো সব, এবার বিড়বিড় করে বললো, বড় খারাপ দিনকাল আইছে বাপু। যেই বাড়িডার দিকে একবার নজর পড়ে সেই বাড়িডারে এক্কেবারে শেষ কইরা ছাড়ে ওলাবিবি। বড় খারাপ দিনকাল আইছে। বলে নিজের মৃত ছেলেটার জন্য কাঁদতে শুরু-করলো সে।

টুনি দাঁতমুখ শক্ত করে তেড়ে এলো ওর দিকে, বুড়ি, যাহন তহন কান্দিছ না কইলাম। শিগগির থাম।

ধমক খেয়ে ফকিরের মা চুপ করে গেলো। সেই বিয়ের সময় সালেহাকে মারার পর থেকে টুনিকে ভীষণ ভয় করে বুড়ি।

ইতিমধ্যে মন্তু আর সুরত ফিরে এসেছে। কাঁধের উপর থেকে কুড়োলটা মাটিতে নামিয়ে রাখতে না-রাখতে টুনি একপাশে টেনে নিয়ে গেলো মন্তুকে।

মাঝি-বাড়ি যাও নাই তো? মন্তু ঘাড় নাড়লো, না, ক্যান কী অইছে?

টুনি বললো, ওলাবিবি আইছে ওইহানে। বলতে গিয়ে মুখখানা শুকিয়ে গেল ওর।

মন্তুর দু-চোখে বিস্ময়। বললো, কার কাছ থাইকা শুনছ?

ও-কথার কোনো জবাব না দিয়ে টুনি আবার বললো, শোনো ওই বাড়ির দিকে গেলে কিন্তুক আমার মাথা খাও। যাইও না ক্যান?

মন্তু সায় দিয়ে মাথা নাড়ালো কিন্তু বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারলো না সে। আজ সকালে মিয়া-বাড়ি যাওয়ার পথে একবার করিম শেখের সঙ্গে দেখা করে গেছে মন্তু। নৌকোটাকে ভালোভাবে মেরামত করার বিষয় অনেকক্ষণ আলাপ করে গেছে ওর সঙ্গে। কিন্তু তখন তো এমন কিছু শুনেনি সে।

আম্বিয়ার সঙ্গেও দেখা হয়েছিল, সেও কিছু বলেনি। উঠোনের এককোণে দাঁড়িয়ে সাত-পাঁচ ভাবলো মন্তু। বুড়ো মকবুলকে তামাক সাজিয়ে দেবার জন্যে রসুইঘরে গেছে টুনি। এই সুযোগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো সে।

দীঘির পাদে নন্তু শেখের ভাইঝি জামাই তোরাবের সঙ্গে দেখা হলো। পরনে লুঙি আর হাতে লাঠি, বগলে একজোড়া পুরনো জুতো। মন্তুকে দেখে প্ৰসন্ন হাসির সঙ্গে তোরাব প্রশ্ন করলো, কি মিয়া খবর সব ভালো তো?

মন্তু নীরবে ঘাড় নাড়লো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, কই যাও, শ্বশুরবাড়ি বুঝি?

হুঁ। তোরাব শ্বশুরবাড়িতেই যাচ্ছে। কাজকর্মের ফাঁকে অনেকদিন আসতে পারেনি, খোঁজখবর নিতে পারেনি। তাই সুযোগ পেয়ে একবার সকলকে দেখে যেতে এসেছে সে।

পকেট থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা মন্তুকে দিয়ে আরেকটা নিজে ধরালো। বিড়ি খেতে ইচ্ছে করছিলো না মন্তুর। তবু নিতে হলো।

সগন শেখের পুকুরপাড়ে এসে থামলো তোরাব। জুতো-জোড়া বগল থেকে নামিয়ে নিয়ে হাত-পা ধোয়ার জন্যে ঘাটে নেমে গেল সে। বললো, একটুখানি দাঁড়ান মিয়া। অজু কইরা নি।

হাত-পা ধুয়ে জুতো-জোড়া পরে আবার উপরে উঠে এলো তোরাব। পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলগুলো পরিপাটি করে নিয়ে বলল, মাঝি-বাড়ির খবর জানেন নাহি, সক্কলে ভালো আছে তো?

মন্তু বললো, ভালো তো আছিলো, কিন্তুক একটু আগে শুনছি ওলা লাগছে।

ওলা। তোরাব যেন আঁতকে উঠলো। পায়ের গতিটা কমিয়ে এসে সে শুধালো, কার কার লাগছে?

মন্তু বললো, কি জানি ঠিক কইবার পারলাম না।

হুঁ। হঠাৎ থেমে গেল তোরাব। কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল, তারপর পায়ের জুতো-জোড়া খুলে আবার বগলে নিতে নিতে বললো, এই দুঃখের দিনে গিয়ে ওনাগোরে কষ্ট দেয়নের কোনো মানি আয় না মিয়া। যাই, ফিইরা যাই! যেতে যেতে আবার ঘুরে দাঁড়ালো সে। আস্তে করে বললো, আমি যে আইছিলাম। এই কথাডা কাউরে কইয়েন না মিয়া। বলে মন্তুর উত্তরের অপেক্ষা না-করে যে পথে এসেছিলো সে পথে দ্রুত পায়ে আবার ফিরে বললো তোরাব।

হাতের বিড়িটা অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ওর চলে—যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মন্তু।

মাঝি-বাড়ি থেকে একটা করুণ বিলাপের সুর ভেসে এলো সেই মুহুর্তে। একজন বুঝি মারা গেলো। কলজেটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো মন্তুর। মাঝি-বাড়ির দেউড়িটা পেরিয়ে ভেতরে আসতে সারা দেহ কাঁটা দিয়ে উঠলো ওর।

নন্তু শেখ মারা গেল। হাঁপানি-জর্জর করিম শেখ মৃত বাবার দেহের পাশে বসে কাঁদছে। আম্বিয়া কাঁদছে তার বিছানায় শুয়ে। ওলাবিবি তাকেও ভয় করেছে। তাই বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তি পাচ্ছে না মেয়েটা। সেখান থেকে কাঁদছে সে।

দাওয়ার উপরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো মন্তু। মাঝি-বাড়ির ছমির শেখ ওকে দেখে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠলো। এই কী মুছিবত আইলো মিয়া, আমরা বুঝি এইবার শেষ অইয়া যামু।

ওকে শান্ত করার চেষ্টা করলো মন্তু। তারপর ওর কাছ থেকে বাকি খোঁজখবর নিলো সে। ছোটভাই জমির শেখ কবিরাজ আনতে গেছে দু-ক্রোশ দূরে রতনপুরের হাটে। এখনো ফিরে আসেনি, ভোরের আগে যে আসবে তারও কোনো সম্ভাবনা নেই। এই একটু আগে জমির শেখ, পরিবারের ছেলেমেয়ে সবাইকে তায় মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। বুড়োরা মরে গেলেও ছেলেমেয়েগুলো যাতে বাঁচে। নইলে বাপ-দাদার ভিটার ওপরে বাতি দেবার কেউ থাকবে না। ছমির শেখের দু-গণ্ড বেয়ে পানি ঝরছে। তাকে সান্তনা দিতে গিয়ে নিজের চোখজোড়াও ভিজে এলো ওর। আম্বিয়ার ঘরের দিকে তাকাতে দেখলো, বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিলাপ করছে মেয়েটা।

পরদিন ভোরে একটা খন্তা আর কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো মন্তু। পরীর দীঘির পাড়ে জায়গাটা আগেই দেখিয়ে গেছে ছমির শেখ। কথা ছিলো একটা কবর খোঁড়ার। এখন দুটো খুঁড়তে হবে। একটা নন্তু শেখের জন্যে, আরেকটা জমির শেখের জন্যে। রাতে কবিরাজ আনতে যাওয়ার সময় ভেদবমি শুরু হয় ওর। বাড়িতে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরে মারা গেছে ও।

আগে মরার জন্য কবর খোঁড়ার কাজটা নন্তু শেখ করতো! গত ত্ৰিশবছর ধরে এ গাঁয়ে যত লোক মরেছে, সবার জন্যে কবর খুঁড়েছে সে। কোদাল হাতে কবর খোঁড়ার সময় প্রায় একটা গান গাইতো নন্তু শেখ। আজ ওর কবরের ছক কাটতে গিয়ে সে গানটার কথা মনে পড়ে গেলো মন্তুর।

এই দুনিয়া দুই দিনের মুসাফিরখানা ও ভাইরে।

মইরলে পরে সব মিয়ায়ে যাইতে হইবো কবরে।

মাটি খুঁড়তো আর টেনে টেনে গান গাইতো নন্তু শেখ। বলতো, কত মানুষের কবর দিলাম, কত কবর খুঁইড়লাম এই জীবনে। তার হিসাব কি আর আছে মিয়া। এমনও দিন গ্যাছে যহন, একদিন সাত আটটা মাটি দিছি।

গোরস্থানে কোনটা কার কবর। কাকে কোনদিন এবং কোথায় কবর দিয়েছে সবকিছু মুখে মুখে বলে দিতে পারতো নন্তু। আর যখন কবর খুঁড়তে গিয়ে মানুষের অস্থি কিম্বা মাথার খুলি পেতো সে, তখন সবাইকে দেখিয়ে বিজ্ঞের মতো বলতো— চিনবার পার এর? না না তোমরা চিনবা কেমন কইরা। আমি চিনি। এইডা কলিমুল্লা মাঝির মাইয়ার খুলি। এইহানেই তো কবর দিছিলাম ওরে। আহা মাইয়া আছিল বটে একডা। যেনো টিয়াপাখির ছাও। যে একবার দেইখছে সেই আর ভুলবার পারে নাই। বলে খুলিটার দিকে খুব ভালো করে তাকাতো নন্তু শেখ। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার করে দেখতো ওটা, আহা কী মাইয়া কী অইয়া গেছে। সোনার চাঁদ সুরত এহন চিনবারই পারা যায় না। অতি দুঃখের সঙ্গে নন্তু আবার বলতো, গলায় ফাঁস দিয়া মইরছিলো অভাগী। জামাইর সঙ্গে বনিবন অইতো না, তাই। খুলিটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নন্তু বলে যেতো, সেই বহুত দিনের কথা মিয়া, তহন তোমরা সব মায়ের পেটে আছিলা।

সেই নন্তু শেখের মৃতদেহটা কবরে নামাতে গিয়ে চোখজোড়া পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো মন্তুর। মইরলে পরে সব মিয়ারে যাইতে অইবো কবরে। সারাদিন আর বাড়ি ফিরলো না মন্তু। দীঘির পাড়ে কাটিয়ে দিলো সে। ওর মায়ের কবরটা দেখলো। এককালে বেশ উঁচু ছিলো ওটা। অনেক দূর থেকে চোখে পড়তো। এখন মাটির নিচে খাদ হয়ে গেছে একহাঁটু। অনেকগুলো ছোট ছোট গর্ত নেমে গেছে ভেতরের দিকে, সেখানে মায়ের দু-একখানা হাড় হয়তো আজও খুঁজে পাওয়া যাবে। মায়ের জন্যে আজ হঠাৎ ভীষণ কান্না পেলো। মনে হলো ও বড় একা। এ দুনিয়াতে ওর কেউ নেই।

শুকনো পাতার শব্দে পেছনে ফিরে তাকিলো মন্তু! টুনি দাঁড়িয়ে পেছনে। সারাদিন ওর দেখা না-পেয়ে অনেক খোঁজের পর এখানে এসেছে সে। মন্তুকে ওর মায়ের কবরের পাশে বসে থাকতে দেখে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো টুনি।

তারপর ওর কাঁধের ওপর একখানা হাত রেখে আস্তে করে বললো, ঘরে যাইবা চালো।

কোনো কথা না বলে নীরবে উঠে দাঁড়ালো মন্তু। কিন্তু তক্ষুনি বাড়ি ফিরলো না সে। বললো, তুমি যাও আমি আহি।

টুনি উৎকণ্ঠিত গলায় বললো, কই যাইবা?

মন্তু বললো, যাও না। আইতাছি। বলে টুনিকে সঙ্গে নিয়ে পরীর দীঘির পাড় থেকে নেমে এলো সে।

ও যখন বাড়ি ফিরে এলো তখন বেশ রাত হয়েছে। বারবাড়ি থেকে মন্তু শুনতে পেল গনু মোল্লা ওরা বসে বসে কী যেন আলাপ করছে।

গনু মোল্লা বলছে, সব অইছে খোদার কুদরত বাপু। নইলে এই দিনে তো কোনোদিনও ওলা বিবিরে আইতে দেহি নাই।

মকবুল বললো, ওলা বিবির আইজকাল দিনকাল কিছু নাই। যহন তহন আহে।

আমেনা বললো, এক পা খোড়া বিবির। তবু যে কেমন কইরা এত বাড়ি-বাড়ি যায়, আল্লা মালুম।

ওর কথা শেষ না-হতেই টুনি জিজ্ঞেস করলো, কেমন কইরা ওর এক পা খোঁড়া অইল বুয়া?

তখন টুনিকে বোঝাতে লেগে গেলো আমেনা। ওলা বিবি, বসন্ত বিবি। আর যক্ষ্মা বিবি- ওরা ছিলো তিন বোন। তিন বোন একপ্ৰাণ। যেখানে যেতো একসঙ্গে যেতো ওরা। কাউকে ফেলে কেউ বেরুতো না বাইরে।

একদিন যখন খুব সুন্দর করে সেজেগুজে ওরা রাস্তায় হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলো তখন হঠাৎ হজরত আলীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। ওদের; রঙিন শাড়ি পরে বেরুলে কী হবে, ওদের চিনতে একমুহূর্তেও বিলম্ব হলো না হজরত আলীর। তিনি বুঝতে পারলেন—এর একজন কলেরা, একজন বসন্ত আর একজন যক্ষ্মা বিবি। মানুষের সর্বনাশ করে বেড়ায় এরা। আর তহনি এক কাইণ্ড কইরা বসলেন তিনি। খপ কইরা না ওলা বিবির একখান হাত ধইরা দিলেন জোরে এক আছাড়। আছাড় খাইয়া একখানা পা ভাইঙ্গা গেলো ওলা বিবির। আহা সব খোদার কুদরত।

মকবুল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, একখান পা দিয়া দুনিয়াডারে জ্বালাইয়া খাইতাছে বেটি। দুই পা থাকলে তো দুনিয়াডারে একদিন শেষ কইরা ফালাইতো! হঠাৎ মন্তুর দিকে চোখ পড়তে বুড়ো মকবুল মুহূর্তে রেগে গেলো। কিরে নবাবের ব্যাটা, তোরে একশোবার কই নাই মাঝি-বাড়ি যাইস না, গেলি ক্যান অ্যাঁ?

গনু মোল্লা বললো, আক্কেল পছন্দ নাই তো।

সুরত আলী বললো, বাড়ির কারো যদি এহন কিছু অয় তাইলে কুড়াইল মাইরা কল্লা ফালায়া দিমু তোর।

ফকিরের মা বুড়ি এতক্ষণ চুপ করে ছিল ৷ এবার সে বললো, বাপু গেলেই কি অইবো, আর না গেলেই কি অইবো। যার মউত আল্লায় যেইদিন লেইখা রাখছে সেই দিন অইবো। কেউ আটকাইবার পারবো না।

ঠিক কইছেন চাচী আপনি ঠিক কইছেন। সঙ্গেসঙ্গে ওকে সমর্থন জানালো টুনি। ওর কথা শেষ হতেই হঠাৎ ফাতেমা জানালো, গত রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছে সে। দেখেছে একটা খোড়া কুকুর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে।

বড় ভোলা দেখছ বউ। বড় ভোলা দেখছি। ফকিরের মা পরক্ষণে বললো, ওই খোড়া কুত্তা খোড়া মোরগ আর গরুর সুরত ধইরাই তো আহে ওলা বিবি। এক গেরাম থাইকা অন্য গোরামে যায়। বলে সমর্থনের জন্যে সবার দিকে একনজর তাকালো সে।

মকবুল জানালো, শুধু তাই নয়। মাঝে মাঝে খোঁড়া কাক, শিয়াল, কিম্বা খোঁড়া মানুষের রূপ নিয়েও গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যাতায়াত করেন ওলা বিবি।

হ্যাঁ মিয়ারা। বুড়ো মকবুল সবাইকে সাবধান করে দিলো! খোঁড়া কিছুরে বাড়ির ধারে—কাছে আইতে দিয়ো না তোমরা; অচেনা কোনো খোড়া মানুষও না। দেখলেই ওইগুলারে তাড়ায়ে খাল পার কইরা দিও।

সকলে ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। হ্যাঁ তাই করবে। রাতে ঘুম হলো না মন্তুর। সারাক্ষণ বিছানায় ছটফট করলে সে। না, একটা বিয়ে ওকে এবার করতেই হবে। এমনি একা জীবন আর কত দিন কাটাবে-মন্তু। কিন্তু বিয়ের কথা ভাবতে গেল। ইদানীং টুনি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের কথা ভাবতে পারে না সে। শান্তির হাটের সেই রাত্রির পর থেকে টুনি তার সমস্ত অন্তর জুড়ে বসে আছে।

গ্রামের কত লোক তাদের বউকে তালাক দেয়। বুড়ো মকবুল কেন তালাক দেয় না টুনিকে?

হঠাৎ পরীবানুর পুঁথির কথা মনে পড়লো মন্তুর। সুরত আলী মাঝেমাঝে সুর করে পড়ে ওটা।

ঘর নাই বাড়ি নাই দেখিতে জবর

পরীবানুর আসিক লইল তাহারি উপর।

কুলাটিয়া গ্রামের এক গৃহস্থের বউ পরীবানু। স্বামীর সঙ্গে মিলমিশ হতো না। অষ্টপ্রহর ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকতো। ঘর ছেড়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে নীরবে বসে থাকতো সে। আর সেখান থেকে দেখতো একটি রাখাল ছেলেকে। দুরে একটা বটগাছের নিচে বসে একমনে বাঁশি বাজাতো সে। এমনি চোখের দেখায় প্রেম হয়ে গেলো।

তারপর।

তারপর একদিন সময় বুঝিয়া দুইজনে পালায়া গেলো চোখে ধূলা দিয়া।

মন্তুরও তাই মনে হলো। টুনিকে নিয়ে যদি একদিন পালিয়ে যায় সে। দূরে, বহুদূরে, দূরের কোনো গ্রামে কিম্বা শহরে। শান্তির হাটে যদি ওকে নিয়ে যায় সে, তা হলে মনোয়ার হাজী নিশ্চয় একটা বন্দোবস্ত করে দেবে। সেখানে টুনিকে নিয়ে সংসার পাতবে মন্তু। যে-কোনো দোকানে হাজীকে দিয়ে একটা চাকরি জুটিয়ে নেবে সে।

এমনি আরো অনেক চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো মন্তু।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরুতেই আমেনা জিজ্ঞেস করলো, নন্তু শেখের বাড়ির কোনো খবর জানো?

না।

ওমা জানো না? নতু শেখের ছেলে করিম শেখ পড়ছে আজ।

মন্তু কোনো কথা বললো না। আমেনা বলে চললো, কবিরাজে কিছু কাইবার পরলো না। তাই ও গনু মোল্লারে ডাইক নিছে। একটু ঝাড়ফুক দিয়া যদি কিছু অয়।

মন্তুকে চুপ করে থাকতে দেখে আমেনাও চুপ করে গেলো। অবশেষে আরও আট-দশটি প্রাণ হরণ করে তবে গ্রাম থেকে বিদায় নিলেন ওলাবিবি। গ্রামের সবাই মসজিদে সিন্নি পাঠালো। মিলাদ পড়ালো বাড়ি বাড়ি।

ওলা বিবি গেলেন। আর দিনকয়েক পরে বৃষ্টি এলো জোরে। আকাশ কালো করে নেমে এলো অবিরাম বর্ষণ। সারারাত মেঘ গৰ্জন করলো। বাতাস বইলো। আর প্রচণ্ড বেগে ঝড় হলো।

আগের দিন বিকেলে আকাশে মেঘ দেখে বুড়ো মকবুল তার পুরনো লাঙলটা ঠিক করে নিয়েছে। গরু নেই ওর। রওশন ব্যাপারীর কাছ থেকে একজোড়া গরু ঠিক করে নেবো; যে কদিন হাল চলবে সে কটা দিনের জন্যে ওকে নগদ টাকা দিতে হবে। তা ছাড়া গরুর ঘাস-বিচালির পয়সাটাও জুটাতে হবে তাকে।

ভোর না-হতেই বেরিয়ে পড়লো মাঠে! আবুল, মন্তু, সুরত আলী, রশীদ, বুড়ো মকবুল আর গ্রামের সবাই। পুরুষরা কেউ বাড়ি নেই।

পুরো মাঠ জুড়ে হাল পড়েছে। পাথরের মতো শক্ত মাটি বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে নরম হয়ে গেছে।

হট হট হট হুঁ উঁ উঁ।

বড় মিয়ার জমিতে লাঙল নামিয়েছে মন্তু আর সুরত।

এককালে এ জমিটা সুরত আলীর ছিল। সরেস জমি। প্রায় মণ-সাতেক ধান ফলতো তখন। ধানের ভারে গাছগুলো সব নুয়ে পড়ে থাকতো মাটিতে।

নিজ হাতে ক্ষেতে লাঙল দিতো সুরত। মই দিতো। ধান ফেলতো খুব সাবধানে। গাছ উঠলে, বসে বসে আগাছগুলো পরিষ্কার করতো। ছাই আর গোবর ছড়িয়ে দিয়ে যেতো প্রতিটি অঙ্কুরের গোড়ায় গোড়ায়। তারপর খাজনার টাকা জোটাতে না-পেরে ওটা বড় মিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে সে।

আহা জমিড়ার কী অবস্থা কইরছে দেখছ? লাঙল ঠেলতে ঠেলতে সুরত আলী বললো, জমির লাইগা; ওগো আধ-পয়সার দরদ নাই। দরদ নাই দেইখাই তো জমিনও ফাঁকি দিবার লাগছে।

মন্তু সঙ্গে সঙ্গে বললো, গেল বৎসর মোটে দেড়মণ ধান পাইছে। কোথায় সাতমণ আর কোথায়দেড় মণ।

বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠলো সুরত আলীর। রুগণ গরু দুইটাকে হট হট করে জোরে তাড়া দিয়ে বললো, জমির খেদমত করন লাগে। বুঝলা মন্তু মিয়া, জমির খেদমত করন লাগে ৷ য’ত খেদমত কইরবা তত ধান দিব তোমারে।

শেষের কথাগুলো স্পষ্ট করে শোনা যায় না। আপন মনে বিড়বিড় করে সুরত! হঠাৎ কোনোখানে যদি কতগুলো টাকা পেয়ে যেতো তাহলে জমিটাকে আবার কিনে নিতো সে। তখন সাতমাণের জায়গায় আটমাণ ধান বের করতো সে এ জমি থেকে।

আকাশে এখনও অনেক মেঘ, দক্ষিণের বাতাসে উত্তরে ভেসে যাচ্ছে ওরা। যে-কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসতে পারে নিচে। সুরত তখনো চলছে আপন মনে। খোদার ইচ্ছা অইলো, জমিগুলান আমার থাইকা কাইড়া নিলো। খোদার ইচ্ছা! অইলো জমিনগুলান বড় মিয়ারে দিয়া দিলো। জমির লাইগা যার একটুও মায়াদয়া নাই তারই দিলো খোদা দুনিয়ার সকল জমি। এইডা কেমনতরো ইনছাফ অইলো মন্তু মিয়া? ইনছাফ ইনছাফ করো মিয়া, এইডা কেমনতরো ইনছাফ অইলো অ্যাঁ?

হিরর। হট হট। হুঁ উঁ উঁ। গরুগুলোর লেজ ধরে জোরে তাড়া দিলো সুরত আলী। অদূরে রশীদ তার জমিতে ধান ফেলছে। মিশকালো দেহ বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে ঘাম ঝরছে ওর। হাঁটার সময় মনে হচ্ছে মুখ থুবড়ে ক্ষেতের মধ্যে পড়ে যাবে সে। ওটাও বড় মিয়ার ক্ষেত। বর্গা নিয়ে চাষ করছে রশীদ। ওর পাশের ক্ষেতে মই জুড়েছে বুড়ো মকবুল। কাজ করার সময় আশেপাশের দুনিয়াকে একেবারে ভুলে যায় সে। কোথায় কী ঘটছে লক্ষ করে না। ধান ফেলা শেষ হলে, রশীদ ডাকলো। অ ভাইজান।

মকবুল মুখ না-তুলেই জবাব দিলো, কী, কও না।

ধান তো ফালায়া দিলাম আল্লার নাম নিয়া।

দাও, দাও ফালায়া দাও। এহন যত তাড়াতাড়ি ফালাইবা তত লাভ।

আর লাভের কথা কইও না। গরুজোড়ার সঙ্গে মই জুড়তে জুডুতে রশীদ জবাব দিলো; ধান বেশি অইলেই বা কী, না আইলেই বা কী। বড় মিয়াকে তো অর্ধেক দিয়া দেওন লাগবো।

ওই দিয়া-থুইয়া যা থাহে, তাই লাভ। মকবুল সাত্ত্বিনা দিলো ওকে।

সুরত আলী তখনও আপন মনে বলে চলেছে, পরের জমিতে খাইট্যা কোনো আরাম নাই মন্তু মিয়া, পরের জমি… আরে গরুগুলার আবার কী অইলো। হালার নবাবের ব্যাটা। হট, হট হুঁ উঁ উঁ।

মন্তু ততক্ষণে গান ধরেছে।

আশা ছিলো মনে মনে, প্ৰেম করিমু তোমার সনে

তোমায় নিয়া ঘর বাঁধিমু গহিন বালুর চরে ৷

হঠাৎ গান থামিয়ে গরুজোড়ার লেজ ধরে সজোরে টান দিলো মন্তু। ইতি, ইতি, ইতি, চল।

সুরত বললো, গান থামাইলি ক্যান মন্তু। গাইয়া যা, গাইয়া যা।

মন্তু বললো, না ভাইজান গলাড়া হুকাইয়া গেছে, গান বাইরয় না।

হ, হ, দুনিয়াড়াই হুকাইয়া গেছে মন্তু মিয়া। তোর গলা হুকায় নাই। জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সুরত আলী। আমাগো জমানায় আহা, কত গান গাইছি, কত ফুর্তি কইরছি। কত রংবাজি দেইখছি। আর অহন দুনিয়াড়াই আরেক রকম অইয়া গেছে মন্তু মিয়া। গাজি কালুর দুনিয়া আর নাই। সোনাভানের দুনিয়া পুইড়া ছাই অইয়া গেছে। বলে কর্কশ গলায় সে নিজে একখানা গান ধরলো।

যা ছিলো সব হারাইলাম হয় পোড়া কপাল দোষে।

ও খোদা,

আমার কপাল এমন তুমি কইরলা কোন রোষে।

গান গাইতে গাইতে খুকধুক করে অনেকক্ষণ কাশলো সুরত; বাঁ হাত দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে নিলো। থাম থাম আরে থামরে নবাবের বেটা। থা। গরুগুলোকে থামিয়ে তামাক খাওয়ার জন্যে আলোর ধারে এসে বসলো সে। বললো, মন্তু মিয়া আহো, তামুক খাইয়া লও।

তামাকের গন্ধ পেয়ে মকবুল আর রশীদ ওরাও ক্ষেত ছেড়ে উঠে এলো। জোরে জোরে কয়েকটা টান দিয়ে বুড়ো মকবুলের দিকে হুঁকোটা বাড়িয়ে দিলো সুরত।

প্ৰথমে একনিশ্বাসে কিছুক্ষণ হুঁকো টানলো মকবুল। তারপর একরাশ ধোয়া ছেড়ে বললে, মন্তু মিয়া তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আইজ সইন্ধ্যা বেলা বাড়ি থাইকো।

রশীদ। আর সুরত একবার হুঁকোর দিকে তাকালো। কিছু বললো না। ওদের নজর এখন হুঁকোর দিকে।

সন্ধেবেলা বুড়ো মকবুলের কাছ থেকে কথাটা শুনলো মন্তু। ওর বিয়ের কথা।

মকবুল ঠিক করেছে এবার সত্যি সত্যি একটা বিয়ে করিয়ে দেবে মন্তুকে। চাচা চাচী এতদিন বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বিয়ে দিয়ে দিতেন। চাচা নেই। মকবুল বেঁচে আছে। বাড়ির মুরব্বি সে। এ ব্যাপারে তার একটা দায়িত্ব রয়েছে। পাত্রী ঠিক করে নিয়েছে মকবুল। মাঝি-বাড়ির আম্বিয়া। নন্তু শেখ আর তার ছেলে করিম শেখ কলেরায় মারা যাবার পর থেকে আম্বিয়া একা। বসতবাড়িটা, বাড়ির ওপরের ছোট্ট ক্ষেতটা আর সেই নৌকোটার এখন মালিক সে। ওকে বিয়ে করলে মন্তু অনেকগুলো সম্পত্তি পেয়ে যাবে একসঙ্গে।

রশীদ তার ঘরের চালায় খড় দিয়ে ফুটোগুলো মেরামত করছিলো। তাকে ডাকলো মকবুল। তোমরা এইটার একটা ফয়সালা কইরা ফালাও মিয়া। ওই মাইয়া বেশিদিন থাকবো না। বহু লোকের চোখ পইড়ছে।

চালার উপর থেকে রশীদ বললে, মাইয়ার হাঁপানি, শেষে বাড়ির সক্কলের হাঁপানি অইবো

মকবুল সঙ্গে সঙ্গে বললো, আরে একবার বিয়া কইরা সম্পত্তিগুলান হাত কইরা নিক পরে দেহা যাইবো, যদি হাঁপানি হয়তো তালাক দিয়া দিবো।

মন্তু সহসা কিছু বললে না। সে জানে বিয়ে তাকে করতে হবে। আম্বিয়াকে অনেক ভালো লাগছিলো তার। সেদিন যদি বুড়ো মকবুল বলতো তাহলে তক্ষুনি রাজি হয়ে যেতো সে। আজ ভাবতে গিয়ে অদূরে দাঁড়ানো টুনির দিকে তাকালো মন্তু।

বুড়ো মকবুল বললো, অমন সম্বন্ধ আর পাইবি না মন্তু। চিন্তা করার কিছু নাই। মত দিয়া দে। কাইল রাইতে গিয়া ওর চাচা ছমির শেখের সঙ্গে আলাপ কইরা আহি।

ফকিরের মা বললো, আপনেরা মুরুব্বি, আপনেরা ঠিক কইরা ফালান।

আমেনা বললো, ঠিক কথা কইছ চাচী।

মন্তু তখনও ভাবছে।

একটা বসতবাড়ি। একটা নৌকো। আর বাড়ির ওপরে একটুকরো ক্ষেত। দেখতেও সুন্দরী সে। আঁটসাঁট দেহের খাঁজে খাজে দুরন্ত যৌবন আটহাত শাড়ির বাঁধন ছিড়ে ফেটে পড়তে চায়।

বুড়ো মকবুল বললো, তাইলে ওই কথাই রইলো। কাইল রাইতের বেলা ওর চাচার সঙ্গে আলাপ করি গিয়া।

মন্তু চুপ করে রইলো। তারপর খুব আস্তে করে বললো ও, আপনেরা যেইডা ভালো মনে করেন। করেন।

মুখ-তুলে তাকাতে পারলো না সে; রসুইঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে টুনি। দাঁত দিয়ে হাতের নখ কাটছে সে। মন্তুর কথা শুনে সহসা শব্দ করে হেসে উঠলে সে। বললো, আমাগো মন্তু মিয়ার বিয়ায় কিন্তুক বড় দেইখ্যা একখান পাল্কি আনন লাগবো।

ফকিরের মা বললো, মাইয়া এমন কইরা হাসতাছে যান ওরা বিয়ার কথা অইতাছে, দেহ না কারবার।

ওর দিকে একটা তীব্ৰ কটাক্ষ হেনে পরমুহূর্তে সেখান থেকে সরে গেলো টুনি। বিয়ের কথা শুনে সুরত আলী আর আবুলও সমর্থন জানালো। গনু মোল্লা বললো, ভালা অইছে। মন্তু এইবার সংসারী অইবো।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর টুনি মকবুলকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললো, আপনের সঙ্গে আমার একড়া কথা আছে।

মকবুল রেগে উঠলো। এই রাতের বেলা এখন ঘুমোতে যাবে। এই সময়ে আবার এমন কী কথা বলতে চায় টুনি। রেগে বললো, কাইল দিনের বেলা কইয়ো।

টুনি বললো, না অহনি কওনি লাগবো।

বুড়ো মকবুল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললো, আচ্ছা কও কী কথা।

চারপাশে দেখে নিয়ে ধীরেধীরে কথাটা বললো টুনি। মকবুল বড় বোকা। নইলে এমন সুযোগটা কেন হেলায় হারাচ্ছে সে। একটা বসতবাড়ি। একটা ক্ষেত। আর একটা নৌকো। ইচ্ছে করলে ওগুলোর মালিক সেও হতে পারে। সে কেন বিয়ে করে না আম্বিয়াকে।

বুড়ে মকবুল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ও সম্ভাবনার-কথা সে নিজেও ভাবেনি এর আগে। টুনি যা বললো, শুধু তাই নয়। আরো লাভ আছে আম্বিয়াকে বিয়ে করায়। সারাদিন একটানা ধান ভানতে পারে সে। খাটতে পাৱে অসম্ভব।

ওকে চুপ করে থাকতে দেখে টুনি আবার বললো, চিন্তা কইরতাছ কী, চিন্তা করার কিছুই নাই।

এ মুহূর্তে টুনিকে ওর নিজের চেয়েও অনেক বড় বলে মনে হলো মকবুলের। মনে হলো টুনির কাছে নেহায়েত একটা শিশু সে।

একটু পরে চাপা গলায় মকবুল বললো, বড় বউ আর মাইঝা বউ যদি রাজি না অয়?

টুনি বললো, রাজি অইবো না ক্যান। নিশ্চয় অইবো।

মকবুল বললো, ওগো না অয় রাজি করুন গেল। কিন্তুক আম্বিয়া?

মকবুলের কণ্ঠস্বরে গভীর অন্তরঙ্গতা।

টুনি বললো, চেষ্টা কইরলে সব অয়, অইবো না ক্যান?

এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো ওরা। মকবুল বললো, বহ বউ। বহ।

টুনি বসলো ওর পাশে। দুজনে পাশাপাশি। মকবুলের কাঁধের ওপর একখানা হাত রাখলো টুনি। তারপর নীরবে অনেকক্ষণ বসে রইলো ওরা।

বাড়ির বাচ্চাকাচ্চাদের উঠোনে বসিয়ে কিচ্ছা বলছে ফকিরের মা; চাঁদ সওদাগরের কিচ্ছা। একমনে হা করে শুনছে সবাই।

সালেহা কাঁদছে ওর ঘরে। কাল দুপুরে ওর মুরগিটাকে শিয়ালে নিয়ে গেছে ধরে। সেই শোকে কাঁদছে সে।

আমেনা আর ফাতেমা দুজনকে ডেকে এনে সামনে বসিয়ে কথাটা বললো বুড়ো মকবুল।

শুনে আমেনা সঙ্গেসঙ্গে প্রতিবাদ করলো, এমন কী অভাব আছে আপনের যে ওকে বিয়ে করতে চান?

ফাতেমা বললো, এই বুড়া বয়সে মাইনষে কইবো কী?

টুনি বললো, মাইনষের কথা হুইনা কী অইবো। মাইনষে তো অনেক কথা কয়।

তবু ফাতেমা আর আমেনা ঘোর আপত্তি জানালো। মকবুল অনেক বোঝাতে চেষ্টা করলো ওদের। কিন্তু ওরা রাজি হলো না।

অবশেষে মকবুল রেগে গেলো, শাসিয়ে বললো, অত কথা বুঝি না। আম্বিয়ারে বিয়া আমি করমুই। তোমরা পছন্দ করো কি না করো।

কথাটা চাপা থাকলো না। পরদিন বাড়ির সবাই জেনে গেলো ব্যাপারটা। মন্তুর বিয়ে সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে নিজের বিয়ের কথা বলে এসেছে মকবুল। কথাটা আমেনা আর ফাতেমার কাছ থেকে শুনেছে সবাই। মন্তু রীতিমতো অবাক হলো।

সালেহা উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললো, ইতা কেমন কথা অ্যাঁ। মাইনষে হুনলে কইবো কি?

ফকিরের মা বললো, মকবুল মিয়ার এইডা উচিত। অয় নাই। যাই কও মিয়া, এইডা উচিত। অয় নাই।

আমেনা আর ফাতেমা দুজনে মিলে গনু মোল্লার কাছে কাঁদাকাটি করেছে। বলেছে, মানষে হাসিহসি কইরবো। আপনে ওনারে বাধা দ্যান। আপনের কথা ওনি হুনবেন।

সুরত আর আবুলকে ডেকে ওদের সঙ্গে আলাপ করলো গনু মোল্লা! বললো, বাড়ির বদনাম অইয়া যাইবো।

শুনে সুরত আলী আর আবুল দুজন খেপে উঠলো। এইসব কি অ্যাঁ, বুড়ার কি ভীমরতি আইছে নাহি?

আবুল বললো, বুড়া বয়সে এইসব কী পাগলামি শুরু অইছে।

কিছু বললো না। শুধু মান্তু।

রাতে গনু মোল্লার ঘরে জমায়েত হলো সবাই।

রশীদ এলো। আবুল এলো। সুরত আলী, সালেহা, আমেনা, ফাতেমা, ফকিরের মা সবাই এলো।

এলো না শুধু মন্তু, টুনি, আর যাকে নিয়ে বসা— সেই বুড়ো মকবুল। মকবুল তার ঘরের মধ্যে নীরবে বসে রইল।

সবকিছু সেও শুনেছে। গনু মোল্লার ঘরে ওরা কেন জমায়েত হয়েছে সব বুঝতে পেরেছে সে। এর মূলে আমেনা আর ফাতেমা; ওর দুই স্ত্রী। যাদের এতদিন খাইয়েছে পরিয়েছে সে। নিমকহারাম, এক নম্বরের নিমকহারাম। চাপা আক্ৰোশে গর্জাতে লাগলো বুড়ো মকবুল।

টুনি বললো, ওগো হিংসা আইতাছে। ওরা চায় না। আপনে সম্পত্তির মালিক অন। টুনি ঠিক বলেছে, বাড়ির কেউ চায় না ও আম্বিয়াকে বিয়ে করুক। বিয়ে করলে একদিনে অনেকগুলো সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে বুড়ো মকবুল। বাড়ির কেউ সেটা সহ্য করতে পারছে না।

এক ছিলিম তামুক সাজিয়ে ওর হাতে তুলে দিলো টুনি। বললো, মাথা গরম কইরেন না। এই সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখন লাগে।

গনু মোল্লার ঘরে সবাই জমায়েত হলেও মকবুলকে সেখানে ডেকে আনার জন্যে যেতে কেউ সাহস করলো না। আবুল বললো সুরতকে যেতে। সুরত বললো ফকিরের মার কথা। ফকিরের মা ভয়ে আঁতকে উঠে বললো, ওরে বাবা আমি যাইবার পারমু না।

অবশেষে গনু মোল্লাকে আসতে হলো। উঠোন থেকে মকবুলের নাম ধরে ডাকলো সে। মকবুল বেরুলো না। বেরিয়ে এলো টুনি। একটু পরে ভেতরে এসে টুনি বললো, আপনারে যাইতে কয়।

গনু মোল্লাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বুড়ো মকবুল বললো, ক্যান, ক্যান যাইতে কয়।

টুনি বললো, কী কথা আছে।

মকবুল বললো, কথা এইহানে আইসা কইতে পারে না। আমি যামু ক্যান?

টুনি একে শান্ত করলে। বললো, মাথা গরম কইরেন না, যান না। ওরা কী কয় শুনেন। স্ত্রীর মুখের দিকে পরম নিৰ্ভয়তার সঙ্গে তাকালো বুড়ো মকবুল। তারপর ধীরেধীরে দাঁড়ালো সে।

বুড়ো মকবুলকে গনু মোল্লার ঘরে ঢুকতে দেখে নড়েচড়ে বসলো সবাই। কারো মুখে কথা নাই।

টুনি এসে দাঁড়িয়েছে বুড়ো মকবুলের পাশে।

গনু মোল্লা তার নামাজের চৌকিটার উপর বসলো।

সবাই চুপ।

কেউ কিছু বলছে না। কথাটা কী দিয়ে যে শুরু করবে ভেবে উঠতে পারছে না কেউ। টুনিই প্রথম কথা বললো, কই আপনেরা কিছু কইতেছেন না ক্যান। ক্যান ডাকছেন।

সুরত আলী নড়েচড়ে বসলো।

আমেনা নীরব।

ফাতেমা মাটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। গনু মোল্লা বললো, মন্তুর বিয়ার ব্যাপারে কী অইছে। কথাটা বলে মকবুলের দিকে তাকালো সে।

বুড়ো মকবুল কোনো জবাব দেবার আগেই টুনি বললো, মন্তু কইছে ও আম্বিয়ারে বিয়ে করবো না।

ওর কথা শুনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল সবাই।

আমেনা ফিসফিসিয়ে বললো, মিছা কথা।

ফকিরের মা বললো, কই মন্তু মিয়া কই, তারে ডাহ না।

কিন্তু মন্তুকে বাড়িতে খুঁজে পাওয়া গেল না। কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে সে।

টুনি বললো, লাগব না। ওরে, ও আমারে কইছে বিয়া কইরবো না।

আবুল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, তাইলে আমি বিয়া করুম আম্বিয়ারে। আমার ঘরে বউ নাই, খানাপিনার অসুবিধা অয়।

ওর কথা সম্পূর্ণ না-হতেই আমেনা আর ফাতেমা একসঙ্গে বলে উঠলো, হুঁ তোমার একটা বউ দরকার।

বুড়ো মকবুল টুনির দিকে তাকালো।

টুনি বললো, ক্যান, ধইরা ধইরা মাইরা কবরে পাঠাইবার লাইগা নাহি।

আবুল রেগে উঠলো, আমার বউ যদি আমি মারি তোমার তাতে কী?

চুপ কর বেয়াদব, হঠাৎ গর্জে উঠলো মকবুল। এই জিন্দেগিতে আর তোরে বিয়া করামু না আমরা। তিন-তিনটা মাইয়ারে তুই কবরে পাঠাইছস। আবার বিয়ার নাম করছ, শরমও লাগে না। একটুখানি দম নিয়ে বুড়ো পরক্ষণে বললো, আম্বিয়ারে আমি বিয়া করমু ঠিক করছি। বলে টুনির দিকে তাকালে সে।

আমেনা আর ফাতেমা পরমুহুর্তে প্রতিবাদ জানিয়ে বললো, আপনেরা শুনছেন, শুনছেন আপনেরা ৷ ইতা কিতা কাইবার লাগছে উনি।

যা কইছি ঠিক কইছি। আঙুল তুলে ওদের দুইজনকে শাসলো মকবুল। তোমাগো যদি ভালো না লাগে তোমরা বাড়ি ছাইড়া চইলা যাও।

শুনছেন, শুনছেন আপনেরা। কী কয় শুনছেন। আমেনা কেঁদে ফেললো।

গনু মোল্লা বললো, এইডা ঠিক আইলো না মকবুল মিয়া। এইডা কোনো কামের কথা আইলো না। এই বুড়া বয়সে আরেকডা বিয়া কইরলে মানুষে কী কইবো।

সুরত আলী আর ফকিরের মা বললো, মাইনষে বাড়ির বদনাম করবো।

আমেনা বললো, মাইয়া বিয়া দিছে, তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ছিছি কইরবো না।

কটমট চোখে আমেনার দিকে তাকালো মকবুল।

ফাতেমা বললো, বুড়া বয়সে ভুতে পাইছে।

নিমকহারাম, বলে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো বুড়ো মকবুল। তারপর অকস্মাৎ এক অবাক কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো সে। ঘরের মাঝখানে, এতগুলো লোকের সামনে হঠাৎ আমেনা আর ফাতেমা দুজনকে একসঙ্গে তালাক দিয়ে দিলো সে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো, তোরা বাইরইয়া যা আমার বাড়ি থাইকা। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে চমকে উঠলো। পরক্ষণে একটা আর্তনাদ করে মাটিতে পড়লো আমেনা। ফাতেমা মূর্ছা গেলো। ফকিরের মা চিৎকার করে উঠলো, আহারে পোড়াকপাইল্যা, এই কী কইরলি তুই, ওরে পোড়াকপাইল্যা এই কী কইরলি।

আবুল হঠাৎ বসার পিঁড়িটা হাতে তুলে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারলো মকবুলের কপাল লক্ষ করে। ঘাস খাইয়া বুড়া আইছ অ্যাঁ। ঘাস খাইয়া বুড়া অইছ বেআক্কেইলা কোনহানের।

দু-হাতে কপাল চেপে মাটিতে বসে পড়লো মকবুল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ফিনকির মতো রক্ত ঝরছে ওর।

কান্না, চিৎকার, গলাগলি আর হা-হুতাশে সমস্ত ঘরটা মুহূর্তে নরকের রূপ নিলো।

মকবুলকে দু-হাতে কাছে টেনে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো টুনি।

ফাতেমার মাথায় পানি ঢালতে লাগলে সালেহা।

ফকিরের মা আমেনাকে সান্তনা দিতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেললো। উঠোনের এককোণে দাঁড়িয়ে সব শুনলো মন্তু। সব দেখলে সে। কিন্তু কাউকে কিছু বললো না। নীরবে: পরীযর দীঘির দিকে চলে গেলো সে।

পরদিন বিকেলে খবর পেয়ে আমেনা আর ফাতেমার বাড়ি থেকে লোক এসে নিয়ে গেলো ওদের। যাবার সময় করুণ বিলাপে পুরো গ্রামটিকে সচকিত করে গেলো। এতদিনের গড়ে তোলা সংসার একমুহুর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। ঘরের পেছনে লাগানো লাউ-কুমড়োর মাচাগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমেনা। যাবার সময় ফকিরের মাকে কেঁদে কেঁদে বলে গেলো, হীরনরে খবরড় দিয়ো না। শুইনলে মাইয়া আমার বুক ভাসায়া মইরা যাইব। খোদার কসম রইলো বুয়া, মাইয়ারে আমার খবরাডা দিয়ো না।

ফাতেমাকে নেয়ার জন্য ভাই এসেছিলো ওর। যাবার সময় বাড়ির সবাইকে শাসিয়ে গেছে ও। বলে গেছে শিকদারবাড়ির লোকগুলোকে একহাত দেখে নেবে সে। বোনের জন্যে চিন্তা করে না ও। আগামী তিনমাসের মধ্যে এর চেয়ে দশগুণ ভালো ঘর দেখে ফাতেমার বিয়ে দিয়ে দেবে।

মকবুল বিছানায়। মাথায় ওর একটা পট্টি বেঁধে দিয়েছে টুনি। হাড় কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে বুড়োর। মাঝে দু-একবার চোখ মেলে তাকিয়েছিলো, এখন নীরবে ঘুমুচ্ছে। টুনি ওর পাশে বসে বাতাস করছে ওকে।

রাতে গনু মোল্লা এলো ওর ঘরে। বুড়ো মকবুলের গায়ে-মাথায় হাত দিয়ে ওর জ্বর আছে কিনা দেখলো। তারপর আস্তে করে বললো, রাগের মাথায় ইতা কিতা কইরালা মিয়া। শরীর ভালা হইয়া গেলে ভাবীসাবগোরে বাড়ি নিয়া আহো। রাগের মাথায় তালাক দিলে তো আর তালাক অয় না। ওই তালাক অয় নাই তোমার।

একবাটি বার্লি হাতে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালে টুনি। আসতে দেখে গনু মোল্লা চুপ করে গেলো।

টুনির উপরে আক্রোশ পড়েছে সবার। সবাই বুঝতে পেরেছে, এই যে-সব কাণ্ড ঘটে গেছে। এর জন্যে টুনিই দায়ী।

উঠোনে দাঁড়িয়ে অনেকে কথা বললো। ওর নাম ধরে অনেক গালাগাল আর অভিশাপ দিলো বাড়ির ছেলেমেয়েরা।

টুনি নির্বিকার। একটি কথার জবাব দিলো না।

দিনকয়েক পরে আন্বিয়ার চাচা ছমির শেখ জানিয়ে দিয়ে গেলো বুড়ো মকবুলকে বিয়ে করবে না আম্বিয়া। তাছাড়া খুব শিষ্ট্ৰী আম্বিয়ার বিয়ের সম্ভাবনাও নেই।

কথাটা শুনলো বুড়ো মকবুল; শুনে কোনো ভাবান্তর হলো না। ঘরের কড়িকাঠের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। ইদানীং দিনরাত মকবুলের সেবা-শুশ্রুষা করছে টুনি। সারাক্ষণ ও ওর আশেপাশে থাকে। একটু অবকাশ পেয়ে রসুইঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার পাটটা সেরে আসে সে। মরিচক্ষেত আর লাউ-কুমড়োর গাছগুলোর তদারক করে আসে। মাঝেমাঝে ফকিরের মা আর সালেহার আলাপ শুনে টুনি। মন্তু আর আম্বিয়াকে নিয়ে আলাপ করে ওরা। আজকাল নাকি অনেক রাত পর্যন্ত আম্বিয়াদের বাড়ি থাকে মন্তু। টুনি শুনে। কিছুই বলে না। একদিন বিকেলে মন্তু যখন বাইরে বেরুবে তখন তার সামনে এসে দাঁড়ালো টুনি। বললো, জ্বড়ডা ওর ভীষণ বাইরা গেছে। কবিরাজের কাছ থাইকা একটু ওষুধ আইনা দিবা?

ওর মুখের দিকে নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মন্তু। ভীষণ শুকিয়ে গেছে টুনি। হঠাৎ বয়সটা যেন অনেক বেড়ে গেছে। ওর। চোখের নিচে কালি পড়েছে। চুলগুলো শুকনো।

মন্তু ইতস্তত করছিলো; টুনি আবার বললো, আজকা নাহয় মাঝি-বাড়ি নাই গেলা। একটু ওষুধটা আইনা দাও। ওর ঠোঁটের কোণে একটুকরো ম্লান হাসি।

মন্তু বললো, মাঝি-বাড়ি না গেলে তুমি খুশি অও?

টুনি পরক্ষণে শুধালো, আমার খুশি দিয়া তুমি কইরবা কী?

মন্তু কী জবাব দেবে ভেবে পেলো না।

ওকে চুপ করে থাকতে দেখে টুনি আবার বললো, যাইবা না ক্যা, একশোবার যাইবা। পুরুষমানুষ তুমি কতদিন আর এক-একা থাইকবা।

ঘর থেকে বুড়ো মকবুলের ডাক শুনে আর সেখানে দাঁড়ালো না টুনি। পরক্ষণে চলে গেলো সে।

ও চলে যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো মন্তু। তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে।

রাতে কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ এনে দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লো মন্তু। বর্ষা এগিয়ে আসছে। আম্বিয়া বলেছে নৌকোটা ঠিক করে নেবার জন্য। চাচা ছমির শেখ চেয়েছিলো নৌকোটা নিজে বাইবে। কিন্তু আম্বিয়া রাজি হয়নি। মন্তু ছাড়া অন্য কাউকে ওতে হাত দেবার অধিকার দিতে রাজি নয় সে।

ছমির শেখ রেগে গালাগাল দিয়েছে ওকে। মন্তু সম্পর্কে কতগুলো অশ্লীল মন্তব্য করে বলেছে, ওর সঙ্গে তোমার মিলামিশা কিন্তুক ভালো আইতাছে না আম্বিয়া। গোরামের লোকজনে পাঁচরকম কথাবার্তা কইতাছে।

কউক। তাগো কথায় আমার কিছু আইবো যাইবো না। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিয়েছে ওর স্পষ্ট উত্তরে প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়েছে ছমির শেখ। বলেছে, তোমার কিছু আহে না আহে, আমাগো আহে। মন্তুরে কিন্তুক এই বাড়িতে আইতে নিষেধ কইরা দিও বইলা দিলাম।

তবু বারবার মস্তুকে বাড়িতে ডেকেছে আম্বিয়া। ও গেলে সংসারের নানা কথা নিয়ে আলাপ করেছে। ওর সঙ্গে আজও মন্তুর জন্যে অপেক্ষা করছিলো আম্বিয়া। চুলে তেল দিয়ে সুন্দর করে চুলটা আঁচড়েছে সে। সিঁথি কেটেছে। পান খেয়ে ঠোঁটজোড়া লাল টুকটুকে করে তুলছে।

ও আসতে একখানা পিঁড়ি এগিয়ে দিলো আম্বিয়া।

অর্ধেকটা মুখ ঘোমটার আড়ালে ঢাকা। সলজ্জে হাসির ঈষৎ আভাটা চোখে পড়েও যেন পড়তে চায় না।

আম্বিয়া বললে, এত দেরি আইলো?

মন্তু বললো, কবিরাজের কাছে গিছলাম।

কেন গিয়েছিলো তা নিয়ে আর প্রশ্ন করে না আম্বিয়া।

বিড়বিড় করে কী যেন সব বলে।

রাতে ওখানে খেলো মন্তু।

পানটা মুখে পুরে বাইরে বেরিয়ে এলো সে।

বাইরে তখন ইলশেগুড়ি ঝরছে।

ক’দিন পরপর বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার উপর দিয়ে পানি গড়াচ্ছে এপাশ থেকে ওপাশে। পানির সঙ্গেসঙ্গে ছোট ছোট বেলে আর পুঁটি ছুটোছুটি করছিলো এদিকে—সেদিকে।

অন্ধকারের ভেতর ছকু আর মকু দু-ভাই মাছ ধরছিলো বসে বসে। মন্তুকে দেখে বললো, কি মিয়া এত রাইতে কোনদিক থাইকা?

মাঝি-বাড়ি।

হুঁ! একটা পুঁটিমাছ ধরে নিয়ে ছকু বললো, চইল্যা যাও ক্যান মন্তু মিয়া! তমাক খাইয়া যাও।

না মিয়া শরীরডা ভালা নাই।

মন্তু যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতে মকু বললে, আরো মিয়া যাইবা আর কী, বও। কথা আছে।

কী কথা কও। জলদি কও। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে মাটিতে বসলো মন্তু।

নিঝুম রাত। শুধু একটানা জল পড়ানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছে না। মাঝেমাঝে দু-একটা ব্যাঙ ডাকছে। এখানে-ওখানে। আরো তিন-চারটে পুঁটিমাছ ধরে নিয়ে ছকু আস্তে বললো, কি মন্তু মিয়া, তুমি নাহি করিমের বইন আম্বিয়ারে বিয়া কইরতাছ হুনলাম! বলে অন্ধকারে ঘোঁৎঘোঁৎ করে হাসলো সে।

তামাক খেতে খেতে ওর দিকে তাকালো মন্তু। কিছু বললো না।

মকু বললো, ভালো মাইয়্যার উপর তোমার চোখ পইড়ছে মন্তু মিয়া। তোমার পছন্দের তারিফ করন লাগে। অমন মাইয়া এই দুই চাইর গোরামে নাই। আহা সারা গায়ে যেন যৈবান ঢলঢল করতাছে।

কি মন্তু মিয়া চুপ কইরা রইলা যে? ওকে কনুইয়ের একটা গুতো মারলো ছকু। বিয়া শাদি করবার আগে আমাগোরে একটু জানাইয়ো, একটু দাওয়াত তাওয়াত কইরো।

করমু! করমু। আগে বিয়া ঠিক হোক তারপর করমু। একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো সে।

দাওয়ার পাশে টুনি দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে হঠাৎ চেনা যায় না।

মন্তুর পায়ের গতিটা শ্লথ হয়ে এলো।

উঠোনে সালেহা আর ফকিরের মা বসে। মন্তুর সঙ্গে আম্বিয়ার বিয়ে নিয়ে রসালো আলোচনা করছে ওরা।

আম্বিয়ার চাচা আজ বলেছে, সামনের শুক্রবার জুমার নামাজের পর গাঁয়ের মাতবরদের কাছে কথাটা তুলবে সে। বিচার চাইবে। এই-যে রাতে বিরাতে আম্বিয়ার সঙ্গে মন্তুর এত অন্তরঙ্গ মেলামেশা— এ! শুধু সামাজিক অন্যায় নয়, অধৰ্মও বটে।

তাই নিয়ে মসজিদে বিচার বসাবে আম্বিয়ার চাচা।

ফকিরের মা বললো, আমি কিন্তুক একটা কথা কইয়া দিলাম বউ। এই মাইয়া একেবারে অলুক্ষুইনা। যেই ঘরে যাইবো সব পুড়াইয়া ছাই কইরা দিবো।

সালেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ঠিক কইছ চাচী।

কথাটা বলতে গিয়ে আমেনা আর ফাতেমার কথা মনে পড়ে গেছে ওদের। আম্বিয়ার জন্যেই তো ওদের তালাক দিয়েছে বুড়ো মকবুল। নিজেও মরছে মরণ-রোগে।

উঠোনে এসে একমুহুর্তের জন্যে দাঁড়ালো মন্তু।

সালেহা আর ফকিরের মা কথা থামিয়ে তাকালো মন্তুর দিকে।

টুনি কিছু বললো না। একটু নড়লো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।

মন্তু ওর ঘরে গিয়ে দরজা এঁটে দিলো।

কাল ভোরে আবার বেরুতে হবে ওকে।

Leave a Reply