Tag: সম্পন্ন গ্রন্থ

  • ভণ্ডপীর

    ভণ্ডপীর

    ভণ্ডপীর

    মুশেলের এক বয়োবৃদ্ধ দরবেশ। তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। এই বয়সে মানুষের মঙ্গল ছাড়া জীবনে তার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। এ জন্যই সবাই তাকে যথেষ্ট কামেল ও মুত্তাকী মনে করতো। লোকজন বলাবলি করতো, তার নেক নজরে পড়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।

    নিজের এবাদত বন্দেগী নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তিনি। সবার মাঝে এই ধারনা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত এই পীর যদি কারো জন্য দোয়া করেন তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা মঞ্জুর করবেন। এ জন্য দলে দলে লোক আসতো তার কাছে। তিনি সবার সাথে কথা বলতেন না, সবাইকে তার সাথে কথা বলার সুযোগও দিতেন না। তবে তিনি যার সাথেই কথা বলতেন সে তোক নিজেকে বড় সৌভাগ্যবান মনে করতো। লোকের ধারনা, তিনি যার সাথে কথা বলেন তার সব আশা পূরণ হয়ে যায়।

    এক লোক তাকে শহরের বাইরে একটি পর্ণকুটির দান করেছিল। সেই কুটিরেই থাকতেন তিনি। অল্পদিনের মাঝেই তার কেরামতির কাহিনী শহরের সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো। এমনকি দূর দূরান্তের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়লো তার কেরামতির খবর। ফলে প্রতিদিনই তার ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।

    ক্রমে তার কুটিরের সামনে জনতার ভীড় লেগে গেলো। প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে আসতে লাগলো সমস্যাগ্রস্ত লোকজন।

    তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুটিরের বাইরে আসতেন। অবশিষ্ট সময় তিনি আপন হুজরায় বসে এবাদত ও ধ্যানে কাটিয়ে দিতেন। যখন তিনি বাইরে আসতেন তখন খাদেমরা ঘিরে রাখতো তাকে। তিনি বাইরে এসেই দু’হাত উপরে তুলে উপস্থিত জনতাকে শান্ত হতে ইশারা করতেন।

    জনতা নিরব হলে তিনি তাদের নসীহত করতেন। তারপর দু’চার জনের সমস্যার কথা শোনার জন্য তাদের নিয়ে যেতেন কুটিরের ভেতরে।

    তিনি তাদের দুঃখ কষ্টের কথা শুনে তাদের শান্ত্বনা দিতেন এবং তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। ভাগ্যবান এই লোক ক’জন প্রশান্ত মন নিয়ে কুটিরের বাইরে চলে যেতো।

    তার সাথে কয়েকজন সুশ্রী ও স্বাস্থ্যবান খাদেম থাকতো। তাদের গায়ের রং ছিল ফরসা। তারা আপাদমস্তক সবুজ কাপড়ে সজ্জিত থাকতো।

    একদিন তারা উপস্থিত জনতাকে বললো, ‘এই কামেল দরবেশ মুশেলবাসীর জন্য রহমত স্বরূপ। তিনি তোমাদের জন্য সুসংবাদ বহন করে এনেছেন।’

    এভাবে প্রতিদিন তারা দরবেশ সম্পর্কে নানা রকম কথা শোনাতো। এইসব কথা লোকদের অন্তরে গেঁথে যেতো।

    দরবেশ যাদের সাথে কথা বলতেন তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে লোকদের শোনাতো নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তারা বলতো, ‘আমি অমুক বিপদে পড়ে হুজুরের কাছে এসেছিলাম। হুজুরের দোয়ায় আমার আশা পূরণ হয়েছে।’

    এইসব প্রচারণার ফলে কিছুদিনের মধ্যেই লোকজন দরবেশকে ইমাম মেহেদী বলে মনে করতে লাগলো। কেউ কেউ বলতে লাগলো, হযরত ঈসা (আ.) আবার দুনিয়ায় নেমে এসেছেন।

    একদিন লোকেরা দেখলো দরবেশ পালকিতে চড়ে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের মহলের দিকে যাচ্ছেন। সাথে আছে তার খাদেমবৃন্দ।

    তারা অবাক হয়ে দেখলো, ইয়াজউদ্দিনের রক্ষী বাহিনী তাঁকে সম্বর্ধনা জানিয়ে অত্যন্ত তাজিমের সাথে মহলের ভেতরে নিয়ে গেলো। কয়েক ঘন্টা পর তিনি সেখান থেকে বের হয়ে এলেন এবং নিজের পালকি রেখে ইয়াজউদ্দিনের শাহী টাঙ্গায় চড়ে বসলেন।

    লোকজন ভাবলো তিনি নিজের আস্তানায় ফিরে যাচ্ছেন। তারা হুজুরের সাথে রওনা হলো আস্তানায় গিয়ে হুজুরের কাছ থেকে দোয়া নেবে বলে।

    খাদেমরা বললো, আপনারা হুজুরের সাথে থাকবেন না। হুজুরের আস্তানায় গিয়ে অপেক্ষা করুন। লোকজন হুজুরের আগেই তার আস্তানায় পৌঁছার জন্য যে যেভাবে পারে ছুটলো।

    হুজুরের কুঁড়েঘরের কাছে গিয়ে জড়ো হয়ে বসে রইলো লোকজন। কিন্তু কোথায় হুজুর? সন্ধ্যা নাগাদ না হুজুর ফিরল, না তার খাদেমরা। তারা সেখানে কাউকে না পেয়ে সন্ধ্যার সময় নিজ নিজ বাড়ীর দিকে রওনা হলো। অতি উৎসাহী ভক্তবৃন্দ ফিরে গেল শাহী মহলের গেটে।

    দরবেশকে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের শাহী গাড়ী দূরে কোথাও নিয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় সেই গাড়ী ফিরে এলো শাহী মহলে। কিন্তু গাড়ীতে হুজুর নেই, সেখানে বসে আছে গাড়ীর চালক ও দু’জন রুক্ষী।

    জনতা গাড়ী থামিয়ে রক্ষীদের জিজ্ঞেস করতে লাগলো, ‘দরবেশ কোথায়?’

    ‘আমরা বলতে পারবো না তিনি কোথায় গেছেন?’ এক রক্ষী বললো, ‘তিনি আমাদেরকে এক পাহাড়ের ধারে গাড়ী রাখতে বললেন। আমরা গাড়ী থামালে তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমাদের আর কষ্ট করার দরকার নেই। এবার তোমরা চলে যাও।’

    আমি খাদেমদের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দরবেশ আমাদের ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন?’

    তিনি বললেন, ‘হুজুর এ পাহাড়ের কোন এক উপত্যকায় গিয়ে ধ্যানে বসবেন। মুশেলের আমীরের মঙ্গলের জন্য সেখানে তিনি প্রার্থনা করবেন। যতক্ষণ দিগন্তে তিনি কোন মঙ্গল নিশানা দেখতে না পাবেন তততক্ষণ চলবে এ প্রার্থনা। তারপর তিনি পাহাড় থেকে নেমে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনকে বলবেন এখন তার কি করা উচিত।’

    রক্ষী আরো বললো, ‘সেই খাদেম আমাকে আরো বলেছেন, হুজুরের প্রার্থনা শেষ হলে হুজুরের দোয়া নিয়ে মুশেলের সৈন্যরা যে দিকে যাবে সেদিকের পাহাড় তাদের চলার পথকে সহজ করে দেবে। তাদের সামনে মরুভূমি পড়লে সেই মরুভূমি শস্য শ্যামল প্রান্তরে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। শক্রর সৈন্য বাহিনী তাদের মুখোমুখী হলে দুশমন ফৌজ অন্ধ হয়ে যাবে।

    মুশেলের আমীর এই বাহিনী নিয়ে যেখানে গিয়ে পৌঁছবেন সেখানেই তারা বিজয়ী হবে এবং সেখানে তার রাজত্ব কায়েম হবে। এমনকি যদি সুলতান সালাহউদ্দিনের বাহিনীও তাদের সামনে পড়ে তবে তারা আমীর ইয়াজউদ্দিনের সামনে অস্ত্র সমর্পন করতে বাধ্য হবে।’

    তিনি আরো বললেন, ‘হুজুর স্বপ্নে দেখেছেন, খৃষ্টানরা আমাদের আমীরের গোলামে পরিণত হয়েছে এবং মুশেলবাসী অর্ধ পৃথিবীর বাদশাহ হয়ে গেছে। তারা সোনাদানা ও প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছে।’

    লোকজন প্রশ্ন করলো, ‘তিনি কোন পাহাড়ের উপত্যকায় ধ্যানে বসবেন?’

    ‘সে কথা বলতে বারণ আছে। হুজুর চান না, তিনি যখন ধ্যান করবেন বা প্রার্থনা করবেন তখন কেউ তাতে বিঘ্ন ঘটাক। এ জন্যই তিনি জনপদ থেকে দূরে সরে গেছেন। তাই আমরা বলতে পারবো না, তিনি এখন কোন পাহাড়ের উপত্যকায় গিয়ে বসবেন।’

    মুশেল থেকে কিছু দূরের পাহাড়ী এলাকা। শহরের কাছে হলেও সেখানে কোন জনবসিত নেই। সেখানে পাহাড়ের পর পাহাড় আর টিলার সমাহার। সেইসব টিলার ফাঁকে ছোট বড় খোলা প্রান্তর। তেমনি প্রান্তরের মাঝে হঠাৎ কোথাও দু একটি কুটির চোখে পড়ে। ওতে বাস করে কোন পাহাড়ী পরিবার। তেমনি একটি প্রান্তর।

    প্রান্তরটি বেশ সবুজ শ্যামল। পাহাড়ী রাখালরা সেখানে মেষ ও উট চরাতো। একদিন রাখালদেরকে সেই প্রান্তরে আসতে নিষেধ করে দিল একদল সেনিক। এই প্রান্তরের পাশ দিয়ে যাতে কোন লোক চলাচল করতে না পারে সে জন্য মুশেলের সৈন্যরা সেখানে পাহারা বসালো। কোন পাহাড়ীও যাতে সে পথে পা না বাড়ায় সে জন্য তাদের বলা হলো দূর দিয়ে যাতায়াত করতে।

    মুশেলের সৈন্যরা সেখানে পাহারা দিচ্ছিল। পাহাড়ী রাখাল ও লোকজন দেখলো, সেই সৈন্যদের সাথে আরো কিছু লোক আছে যাদের পোশাক ভিন্ন। তাদের সাথে বাইরের অজানা এই লোকগুলো কারা চিনতে পারলো না তারা।

    পাহাড়ী এলাকার সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ওদের যাতায়াত নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের মধ্যে জাগলো কৌতুহল। সেখানে কি ঘটে জানার জন্য তাদের আগ্রহের কোন কমতি নেই। বরং নিষেধাজ্ঞার ফলে ওইসব পাহাড়ীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠলো সেই প্রান্তর।

    সে জায়গা সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শুনতে লাগলো তারা। শোনা গেল, সেখানে এক দরবেশ এসেছেন। তিনি মুশেলবাসীর ভাগ্য পরিবর্তন করে দেবেন।

    এ কথাও সকলের মুখে মুখে গুজবের মত ফিরতে লাগলো যে, দরবেশ আকাশ থেকে কোন এক নিদর্শন দেখতে পাবেন। তারপর তিনি মুশেবাসীদের জন্য দোয়া করবেন। তার দোয়া নিয়ে যখন মুশেলের সৈন্যরা পথে নামবে তখন তাদের চলার পথের সব বাধা দূর হয়ে যাবে। তাদের সামনে যারাই পড়বে। ধ্বংস হয়ে যাবে তারা। এভাবেই মুশেলবাসী একদিন অর্ধ পৃথিবীর বাদশাহী পেয়ে যাবে।

    মুশেল শহরেও এসব গুজব সমানে চলছিল। যেখানেই দু’চারজন লোক সমাগম হয় সেখানেই তাদের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দরবেশের কেরামতির কাহিনী।

    একদিন এক রাস্তার মোড়ে চারজন লোক বসেছিল। তাদের মাঝেও দরবেশের অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাসান ইদরিস।

    হাসান ইদরিস সুলতান আইয়ুবীর সেই গোয়েন্দা যে বৈরুত থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের দুত এহতেশামুদ্দিন ও তার নর্তকী কন্যা সায়েরাকে সুলতান আইয়ুবীর কাছে নিয়ে এসেছিল। তার এই তুলনাহীন সফলতায় সুলতান খুবই খুশী হয়েছিলেন এবং ইসলামের ইতিহাসে বড় ধরনের অবদান রাখার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

    এহতেশামুদ্দিন সুলতান আইয়ুবীকে জানিয়েছিলেন, খৃষ্টানরা মুশেলের কাছে কোন এক পাহাড়ের গহ্বরে অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্য সামগ্রীর বিরাট ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। মুশলের সেই পাহাড়কেই তারা তাদের কমাণ্ডো বাহিনীরও আখড়া বানিয়েছে। এতে সুলতান আইয়ুবীর কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তারা পাহাড়ী এলাকায় তাদের সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। তিনি এই সত্যও উপলব্ধি করতে পারলেন, যুদ্ধের আগেই যে সৈন্য বাহিনী প্রতিপক্ষের অস্ত্র ও রসদপত্র হস্তগত করতে পারে তারা অর্ধেক যুদ্ধ আগেই জয় করে নেয়।

    এ জন্যই সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী সব সময় খৃস্টানদের অজ্ঞাতে তাদের অস্ত্র ও রসদ ভাণ্ডারে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে তা ধ্বংস করে দিত। সুলতানের কমাণ্ডো বাহিনীর হাতে বার বার নাজেহাল হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল খৃস্টান সৈন্যদের। তাই খৃস্টান বাহিনী সব সময় এই কমাণ্ডো আতঙ্কে ভুগতো।

    সুলতান আইয়ুবীর যুদ্ধের কিছু বিশেষ কৌশল ছিল। তিনি সব সময় মরুভূমির পানির উৎসগুলো নিজ অধিকারে রাখতেন। ঘাস ও চারণভূমিগুলোও নিজ অধিকারে রাখতেন। তার কমাণ্ডো বাহিনী খৃস্টানদের অস্ত্র ও রসদের ভাণ্ডার ধ্বংস করে দিত। এমনকি পশুর খাবারও নষ্ট করে ফেলতো যাতে তাদের ঘোড়া ও উটগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া যুদ্ধের জন্য তিনি সব সময় উঁচু স্থান বেছে নিতেন যাতে তার তীরন্দাজ বাহিনী পাহাড়ের চুড়ায় বসে সহজেই দুশমনকে টার্গেট বানাতে পারে।

    সুলতান আইয়ুবী তার গোয়েন্দা প্রধান হাসান বিন আবদুল্লাহকে বললেন, ‘খৃষ্টান কমাণ্ডোরা কোথায় আস্তানা গেড়েছে তা খুঁজে বের করো।’ এরপর তিনি তার কমাণ্ডো বাহিনীর সেনাপতি সালেম মিশরীকে বললেন, ‘তাদের আস্তানা ও রসদ ভাণ্ডারের সন্ধান পেলে সাথে সাথে সেগুলো হস্তগত করবে অথবা ধ্বংস করে দেবে।’

    সুলতান আইয়ুবী বুঝতে পারছিলেন, খৃস্টানরা আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেছে। তারা চাচ্ছে তিনি যেন আগে আক্রমণ করেন। কিন্তু তিনি তাদের পাতা ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি এহতেশামুদ্দিনের কাছ থেকে খৃষ্টানদের পরিকল্পনার সংবাদ পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, খৃষ্টান বাহিনীকে তিনি কোথাও স্থিরভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবেন না। আবার নিয়মিত যুদ্ধের সূচনাও করবেন না তিনি।

    সুলতান আইয়ুবী তার কমাণ্ডো বাহিনীকে তৎপর হতে হুকুম দিয়ে বললেন, ‘মুশেলের আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ো এবং খোঁজ নাও কোথায় দুশমন আত্মগোপন করে আছে। খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথে তাদের ওপর কমাণ্ডো হামলা চালাবে এবং ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাদের তছনছ করে দিয়ে মুহূর্তে আবার তাদের দৃষ্টির সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।’

    এরপর তিনি তার নিয়মিত বাহিনীকে আদেশ করলেন, “তোমরা সাঞ্জারের দিকে অভিযান চালাও এবং সাঞ্জার দূর্গ অবরোধ করে নাও।’

    সাঞ্জার মুশেল থেকে কিছু দূরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ। মুশেলের প্রতিরক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান সাঞ্জার। এ কেল্লার অধিপতি ছিলেন শারফুদ্দিন বিন কুতুবুদ্দিন।

    একটু আগে সুলতান আইয়ুবী তাঁর সেনাপতিদের বলেছিলেন, ‘এখন আমি আর কারো সাহায্য সহযোগিতার জন্য আবেদন জানাবো না বরং তলোয়ারের খোঁচায় তাদের সাহায্য আদায় করে নেবো।’ সাঞ্জার দূর্গ অবরোধ এই সংকল্প বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ।

    তিনি জানতেন, এসব ছোট ছোট মুসলমান আমীররা স্বাধীন থাকার জন্য খুবই লালায়িত। এ জন্য তারা গোপনে খৃষ্টানদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আছে।

    সাঞ্জারের আমীর শারফুদ্দিন সম্পর্কে সুলতান আইয়ুবী খবর পেলেন, তিনি মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের বন্ধু। তাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে সে প্রাচীর গড়ে তুলবে।

    হাসান বিন আবদুল্লাহ তাঁর গোয়েন্দাদের দিকে তাকালেন। মুশেলে তার গোয়েন্দা অনেকেই আছে। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন, খৃষ্টানদের রসদ ভাণ্ডারের খোঁজ পেতে হলে তাকে একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও সাহসী গোয়েন্দাকে বৈরুত পাঠাতে হবে। এদিকে যখন খৃস্টান কমাণ্ডোদের অনুসন্ধান চলবে তখন সে চেষ্টা করবে তারা কোথায় আছে সে খবর বৈরুত থেকে সংগ্রহ করতে। তিনি হাসান ইদরিসকে এ জন্য বাছাই করলেন।

    তখনি তার মনে হলো, এটা ঠিক হবে না। সে দীর্ঘদিন বৈরুতে ছিল, আবার ফিরে গেলে খৃস্টান গোয়েন্দারা তাকে চিনে ফেলতে পারে।

    হাসান ইদরিস ছিল গুপ্ত বেশ ধারণে ওস্তাদ। বেশভূষার সাথে সাথে সে নিজের কণ্ঠও বদলে ফেলতে পারতো। হাসান বিন আবদুল্লাহর অভিপ্রায় এবং তা পাল্টে ফেলার কথা জানতে পেরে সে হাসান বিন আবদুল্লাহকে বললো, ‘আপনি আমাকে নির্দ্বিধায় বৈরুত পাঠাতে পারেন। আমি বৈরুত ফিরে গিয়ে এমন বহুরূপ ধারণ করবো যে, পরিচিত লোকও আমাকে চিনতে পারবে না।’

    কিন্তু হাসান বিন আবদুল্লাহ এই ঝুঁকি নিতে সাহস পেলেন না। তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি বরং মুশেল যাও। ওখানে কেউ তোমাকে চেনে না। তুমি মুশেল থেকেই গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা করো।’

    হাসান ইদরিস মুশেল রওনা হলে সুলতান আইয়ুবী তাকে ডাকলেন এবং নিজে তাকে আরো কিছু উপদেশ দিলেন যাতে সে দ্রুত সাফল্য বয়ে আনতে পারে। তিনি তাকে বললেন, ‘হে প্রিয় বন্ধু! মনে রাখবে, ইতিহাস সব সময় সুলতান আইয়ুবীর নাম মনে রাখবে। পরাজিত হলে ইতিহাস আমাকে লজ্জা দেবে এবং একজন ব্যর্থ সেনানায়ক বলে তিরষ্কার করবে। আর যদি বিজয় লাভ করি বা শহীদ হই, তবে লোকে আমার কবরে ফুল ছিটাবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম আমার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমাকে স্মরণ করবে গর্ব ভরে। কিন্তু এটা খুবই অন্যায়।’

    তিনি হাসান ইদরিসকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘বিজয় মাল্য তো তোমাদের প্রাপ্য। প্রাপ্য তোমার সেইসব সঙ্গী সাথীদের, যারা শত্রুর দূর্গের ভেতর থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে আনে। এ তথ্যই তো আমাদের বিজয়ের পথকে সুগম করে। ইদরিস, দুনিয়া কিভাবে কাকে মূল্যায়ন করবে এটা বড় কথা নয়। আল্লাহ সব দেখছেন। তিনি জানেন এই বিজয়ের পেছনে কার অবদান কতটুকু। আমি বিশ্বাস করি, কাল কেয়ামতের মাঠে তোমাদের মাথায় আল্লাহ নিজ হাতে বিজয় মুকুট পরিয়ে দেবেন।

    আমি যদি পরাজিত হই তবে তা ঘটবে আমার ভুলের কারণে। হয়তো দেখা যাবে তোমাদের সংবাদকে আমি যেভাবে গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল সেভাবে দিতে পারিনি। কিন্তু যদি জয়লাভ করি সে জয় হবে তোমাদের। কারণ আমার কান ও চোখ তোমরা।’

    তিনি খানিক থামলেন। একটু পর হাসান ইদরিসের দিকে তাকিয়ে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘যদি আমি শহীদ হয়ে যাই তবু আমার আত্মা তোমাদের কবরের উপর ফাতেহা পাঠ করতে থাকবে। আমার আত্মা তোমাদের জন্য প্রতিনিয়ত মাগফেরাত কামনা করতে থাকবে। কারণ তোমরাই জাতির মহান বীর। মনে রেখো, একটি সমৃদ্ধ গোয়েন্দা বিভাগ সেই জাতির গৌরব ও গর্বের ধন।’

    তিনি বললেন, “দেখো, এ যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে আমার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আমি বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সাঞ্জার অভিযানে যাচ্ছি। আর তুমি? তুমি একা সেখানে যাচ্ছো যেখানে চারপাশে কিলবিল করছে তোমার দুশমন। আমি যদি বিজয়ী হই তা হবো আমার বাহিনীর জন্য, আর তুমি বিজয়ী হবে একা। তাহলে বলো, কার মর্যাদা বেশী হওয়া উচিত? যাও প্রিয় বন্ধু, তুমি যাও, আল্লাহ হাফেজ।’

    সূর্য ডুবেছে একটু আগে। হাসান ইদরিস এক গরীব মুসাফিরের বেশে নসিবা ক্যাম্প ত্যাগ করলো। সঙ্গে শুধু নিজের বাহন উটটি, আর কোন সঙ্গী নেই।

    অন্ধকার রাত। একাকী পথ চলছে হাসান ইদরিস। ভাবছে দায়িত্বের কথা। সুলতান আইয়ুবীর শেষ কথাগুলো এখনো তার কানে বাজছে। উট চলছে ধীর গতিতে।

    নসিবা থেকে বহু দূরে চলে এসেছে সে। রাতও গড়িয়ে গেছে অনেক। ঘুম ঘুম একটা ভাব পেয়ে বসেছে তাকে। এ সময় অসংখ্য ঘোড়ার মৃদু পদধ্বনি শুনতে পেলো সে। অনেক দূর দিয়ে কোন কাফেলা যাচ্ছে।

    এত রাতে কারা যায়? কার এ ঘোড়ার আরোহী? সুলতান আইয়ুবী কি স্বসৈন্যে সাঞ্জার দূর্গ অবরোধ করতে যাচ্ছেন? কান পেতে সে শুনলো ঘোড়ার ছুটে চলার শব্দ। এক সময় মিলিয়ে গেল সে ধ্বনি।

    সুলতান আইয়ুবী নসিবা থেকে তার ক্যাম্প উঠিয়ে নেননি। নসিবায় অবস্থিত তার হেডকোয়ার্টারে কিছু সৈন্য ও অফিসার এবং সেই সাথে তাঁর রিজার্ভ বাহিনীকে সেখানে প্রস্তুত অবস্থায় রেখে তিনি নসিবা ত্যাগ করলেন।

    এক সময় মুশেল এসে পৌঁছলে হাসান ইদরিস। সোজা গিয়ে রিপোর্ট করল মুশেলের গোয়েন্দা কমাণ্ডাবের কাছে।

    ‘তুমি এখানে জানতে এসেছো, খৃষ্টানরা তাদের সৈন্য, খাদ্য ও অস্ত্রসম্ভার পাহাড়ের কোন গুহায় লুকিয়ে রেখেছে?’ মুশেলের গোয়েন্দা কমাণ্ডার বললো, ‘আমরাও তো এখানে এ তথ্য জানার জন্যই আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

    ‘কিন্তু চেষ্টা তো সফল হতে হবে। সুলতান এ তথ্য জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন? কোন সূত্রই কি আপনারা সংগ্রহ করতে পারেননি?’

    ‘জানি না এ সূত্র কোন কাজ দেবে কিনা? এখানে এক দরবেশের আবির্ভাব হয়েছে। এতদিন তিনি শহরের কাছে এক কুটিরে বাস করতেন। এর মধ্যে এক ঘটনা ঘটলো।

    একদিন দরবেশ মুশেলের শাসক ইয়াজুদ্দিন মাসুদের মহলে গিয়ে তার সাথে দেখা করলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি এক পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি ভবিষ্যতবাণী করে বলেছেন, ‘মুশেলবাসীরা একদিন অর্ধ পৃথিবীর শাসক হবে। অগাধ সম্পদের মালিক হবে।’

    তিনি আরো বলেছেন, ‘তিনি তাদের জন্য দোয়া করবেন। একদিন আকাশ থেকে তিনি ইশারা পাবেন। তখন তিনি মুশেলের ফৌজকে অভিযানের জন্য বলবেন। তার দোয়া নিয়ে মুশেলের ফৌজ যখন ময়দানে নামবে তখন পথের সমস্ত বাঁধা তাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে।’

    ‘বলেন কি!’ হাসান ইদরিস অবাক হয়ে বললো, ‘এ লোক তো দরবেশ নয়। এ লোক খৃস্টানদের গোয়েন্দা। তাকে পাকড়াও করতে পারলেই খৃস্টান কমাণ্ডোদের হদিস বের করা সম্ভব।’

    ‘কিন্তু এ লোক তো এখন হাতের নাগালের বাইরে। পাহাড়ের কোথায় গিয়ে তিনি আসন নিয়েছেন জানা নেই আমাদের। তিনি পাহাড়ে আসন নেয়ার পর থেকে সৈন্যরা সে এলাকাটা ঘিরে রেখেছে। পাহাড়ের আশপাশ দিয়ে কারো চলাচলের অনুমতি নেই। এমনকি পাহাড়ী উপজাতিদেরও সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানকার চারণভূমিতে পশু চরাবার অনুমতিও নেই রাখালদের।’

    ‘দরবেশের নিরাপত্তার জন্য কারা পাহারা বসিয়েছে, মুশেলের সেনাবাহিনী?’

    ‘হ্যাঁ, তবে তাদের সাথে কিছু অচেনা মানুষও আছে। তারা কাউকে পাহাড়ে চড়তে দিচ্ছে না। এমন কি পাহাড়ের আশপাশেও ভিড়তে দিচ্ছে না।’

    ‘এখানে তার ভক্তের সংখ্যা কেমন?’

    ‘অনেক। কেউ কেউ তাকে ইমাম মেহেদী মনে করে। কেউ কেউ তাকে হযরত ঈসা (আ.) ভাবে। তাদের ধারনা, হযরত ঈসা (আ.) মুশেলবাসীর দুঃখ দূর করার জন্য আবার পৃথিবীতে নেমে এসেছেন।’

    কমাণ্ডার হাসান ইদরিসকে আরো বললো, ‘এই দরবেশের সুখ্যাতি শহর ও তার আশপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি একজন পবিত্র ও কামেল লোক এ ব্যাপারে সাধারণ মুসলমানদের মনে কোন সন্দেহ নেই। রাতের বেলা শহরের লোকেরা বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। কোন তারকা ছিটকে পড়লে তারা চিৎকার দিয়ে উঠে এই সেই ইশারা। এভাবে লোকজন আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভুলতে বসেছে।’

    ওরা চারজনই আইয়ুবীর গোয়েন্দা। বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে তাদেরকে দরবেশের মুখোশ খোলার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদেরকে এ কথা ভাল করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ইসলামে আত্মপূজা হারাম। মুশেলবাসীর মন মগজ যখন দরবেশ আচ্ছন্ন করে নিয়েছে তখন এই চার গোয়েন্দা দরবেশের মুখোশ খোলার কাজে লিপ্ত হলো।

    ‘আমার প্রিয় বন্ধুগণ। আমার কথা যদি হেসে উড়িয়ে না দাও তবে বলি।’ হাসান ইদরিস বললো, ‘যেখানে দরবেশ আছে সেখানেই খৃষ্টানদের রণসম্ভার ও রসদ আছে। আর এটা কোন তুচ্ছ ভাণ্ডার হতে পারে না।

    এমনিতেই জনসাধারণকে সরিয়ে তাদের নাগালের বাইরে গিয়ে দরবেশ তার আখড়া তৈরী করেনি। আমার বিশ্বাস, এতবড় বিস্তৃত পাহাড়ী এলাকায় যতই সৈন্যই পাহারায় বসানো হোক না কেন, ভেতরে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই সৃষ্টি করা সম্ভব। মানুষ এই ভয়ে সেখানে যায় না, ওখানে আল্লাহর এক দরবেশ বসে আছেন! তিনি চান না, তার আশেপাশে কেউ যাক। তাই লোকজন সেদিকে তাকানোর সাহস পায় না।’

    কমাণ্ডার হাসান ইদরিসকে বললো, ‘তুমি কি শোননি চারদিকে কি গুজব রটিয়ে দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি সে এলাকায় যাবে এবং দরবেশকে দেখার দুঃসাহস করবে, সে লুলো হয়ে যাবে, তার সন্তানদের চোখ অন্ধ হয়ে যাবে।’

    হাসান ইদরিসের অন্য সাথী বললো, “খৃষ্টানরা সেখানে অস্ত্রের গোপন ঘাঁটি গড়ে তুলেছে এতে আমাদেরও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সত্য মিথ্যা যাচাই না করে এ তথ্য আইয়ুবীর কাছে পাঠানোর কোন মানে হয় না। আমাদের জানা দরকার সেখানে কি আছে এবং তার পরিমাণ কেমন? সেখানে কি কেবল অস্ত্রই আছে নাকি সৈন্যও মজুদ করেছে খৃস্টানরা? এখন বলো, এ তথ্য উদ্ধারের জন্য আমরা কি করতে পারি? দরবেশ যে খৃষ্টানদের একটা সাজানো কাভার তোমার মত আমরাও তা বুঝতে পারছি?’

    ‘শুধু তথ্য আদায় নয় দরবেশকে তার সম্পদসহ ধ্বংস করতে হবে।’ হাসান ইদরিস বললো।

    ‘শুধু দরবেশকে ধ্বংস করলেই চলবে না, জনগণকেও বিভ্রান্তির হাত থেকে বাঁচাতে হবে। দরবেশের মুখোশ খুলে দিয়ে প্রমাণ করতে হবে এ লোক কোন পীর নয়, পীরের বেশ ধরে আছে মাত্র।’ অন্য সঙ্গী বললো।

    গোয়েন্দা কমাণ্ডার বললো, ‘খৃষ্টানদের বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। তারা শুধুমাত্র একজন দরবেশকে সেখানে বসিয়েই তাদের অস্ত্র ও রসদসম্ভার জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর সেই দরবেশ মুশেলের জনগণকে আল্লাহর ইশারার কথা বলে তাদেরকে জিহাদ থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। মনে হয় মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনও ছলনার শিকার। আল্লাহর ইশারার অপেক্ষায় মুসলমানদের বসিয়ে রেখে তারা প্রস্তুতি পূর্ণ করছে।’

    ‘দরবেশ সম্পর্কে মুশেলের আমীরের ধারণা কি?’ হাসান ইদরিস প্রশ্ন করলো।

    ‘দরবেশ যখন তাঁর মহলে গিয়েছিল তখন তাকে স্বসম্মানে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল ইয়াজউদ্দিনের মহলের রক্ষীরা।’ কমাণ্ডার প্রশ্নের উত্তরে বললো, ‘আর দরবেশ যখন বেরিয়ে আসে, তখন ইয়াজউদ্দিন তার ছয় ঘোড়ার শাহী পালকি দিয়েছিল দরবেশকে পৌঁছে দিতে। সেই গাড়ীতে করেই তিনি পাহাড়ী এলাকায় যান এবং সেখানে আস্তানা গাড়েন। এতেই প্রমাণ হয়, ইয়াজউদ্দিনও এই ষড়যন্ত্রের সাথে লিপ্ত।’

    ‘কিন্তু ষড়যন্ত্রটা কোন পর্যায়ের তা কিন্তু এতে পরিষ্কার হলো না। দরবেশ ও ইয়াজউদ্দিনের মধ্যে কি নিয়ে আলাপ হয়েছে। তা জানা দরকার ছিল।’

    ‘তারও ব্যবস্থা করা যাবে।’ কমাণ্ডার বললো, ‘যা কিছুই ঘটুক আমরা তা জানতে পারবো। মহলে রাজিয়া খাতুন আছেন। তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন মহলের ভেতর। তার কাছ থেকেই জানা যাবে মহলে দরবেশ কেমন খাতির যত্ন পেয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কি নিয়ে আলাপ হয়েছিল।’

    এরা সে এলাকায় সতর্ক দৃষ্টি রাখা শুরু করলো। গোয়েন্দা তৎপরতা ছড়িয়ে দিল পাহাড়, শহর এবং শহরতলী সংলগ্ন দরবেশের সেই কুটিরের আশপাশ পর্যন্ত।

    সাঞ্জার দুর্গের প্রাচীরের উপর প্রহরীরা অলসভাবে পাহার দিচ্ছিল। যুগটা যুদ্ধের হলেও ওদের জন্য সময়টা ছিল শান্তির। কোন রকম বিপদ বা ঝুঁকির আশংকা না থাকায় পাহারায় কোন সতর্কতা ছিল না।

    তাদের এ নিশ্চিন্ততার কারণ, সাঞ্জারের আমীর শারফুদ্দিন খৃষ্টানদের উপর নির্ভরশীল ছিল। তাই খৃস্টানরা তার ওপর কোন আক্রমণ করবে না, এটা জানা কথা। এছাড়া তাদের জানা আছে, পার্শ্ববর্তী হলবের আমীর ইমামুদ্দিন ও মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনও খৃস্টানদের সাথে সমঝোতা করে নিয়েছে। তারা তাকে এ আশ্বাসও দিয়েছে, বিপদের সময় তারা একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। ফলে প্রতিবেশী দুই অঞ্চলের সাথে এখন তার বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যাচ্ছে। এ অবস্থায় তার ভয়ের কোন কারণ নেই। এ জন্যই শারফুদ্দিন ও তার সৈন্যর ছিল নির্বিকার ও নিশ্চিন্ত। তারা কল্পনাও করেনি, সুলতান আইয়ুবী কখনো তাদের ওপর আক্রমণ করতে পারেন।

    মধ্য রাত পেরিয়ে গেছে। মানুষ ঘুমিয়ে আছে শান্তির কোলে। কিন্তু যাদের হাতে সম্পদের পাহাড় জমে যায় তারা অত সহজে ঘুমাতে পারে না। ভোগের তৃষ্ণা তাদের ঘুম ঘুম চোখগুলোকে যেন কিছুতেই ঘুমোতে দেয় না। তাই ঘুম এলেও ঘুমোতে পারছিল না শারফুদ্দিন। শরাবের নেশায় মাতাল অবস্থায় ঢুলছিল সে। খৃষ্টানরা তাকে দুটি সুন্দরী মেয়ে উপহার পাঠিয়েছিল, তারা তখনো তার হাতে তুলে দিচ্ছিল শরাবের পাত্র।

    কেল্লার উপর দিয়ে একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তীর বেগে ছুটে গেল। একটু পরেই আরো একটা প্রহরীরা বিস্মিত হলো। তখনো তারা ধারনাই করতে পারেনি, কেউ তাদের আক্রমণ করেছে। রহস্যময় স্ফুলিঙ্গের উড়াউড়ি দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওরা একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো। তাদের চাহনি বলছিল, কি অবাক কাণ্ডরে বাবা! ভূতের পাল্লায় পড়লাম নাকি?

    কেল্লার প্রহরীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে এ নিয়েই কথা বলছিল। তাদের সবার মুখেই ভয় ও আতংকের স্পষ্ট ছাপ। তারা যেদিক থেকে ফুলিঙ্গ দুটো ছুটে এসেছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো কিছু দেখা যায় কিনা। কিন্তু নাহ, সবকিছুই সুনসান, নিরব, নিস্তব্ধ।

    হঠাৎ সবাইকে ভড়কে দিয়ে আরো একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটে এলো এবং সেটি তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে দূর্গের ভেতরে পড়লো! স্ফুলিঙ্গটি উড়ে গিয়ে এমন জায়গায় পড়লো যেখানে পর শুকনো খাবার গাদা করে রাখা হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো।

    গাদার পাশেই ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। দেখতে দেখতে সেই আগুন কাঠের তৈরী আস্তাবল স্পর্শ করলো এবং মুহর্তে সেই আস্তাবল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো।

  • ছোট বেগম

    ছোট বেগম

    ছোট বেগম

    একদিন বিকাল বেলা। সূর্য অস্ত যাওয়ার সামান্য আগে সুলতান আইয়ুবী ফোরাতের কূলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তার সাথে অশ্বারোহী দলের সেনাপতি ও কমাণ্ডো বাহিনীর সেনাপতি সালেম মিশরী। তারা তাদের সামনে কিছু দূরে সাদা জোব্বা পরা এক লোককে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।

    লোকটির দু’হাত প্রার্থনার ভঙ্গিতে উপরে তোলা। সুলতান আইয়ুবী সেদিকে গেলেন এবং লোকটির কাছে পৌঁছে দেখতে পেলেন, সেখানে চারটি কবর রয়েছে।

    এই কবরগুলোর মধ্যে দু’টি কবরের মাথার দিকে একটা করে লাঠি পোতা। তার সাথে কাঠের তক্তা লাগিয়ে কবর ফলক বানানো হয়েছে। সেই ফলকের একটিতে আরবী হরফে লাল রংয়ে লেখা, “উমরুল মামলুক, আল্লাহ তোমার শাহাদাত যেন কবুল করে নেন।” –নাছরুল মামলুক।

    তার পাশের কবরের উপরেও একই ধরনের ফলক লাগানো। তাতে লেখা, “নাছরুল মামলুক, আল্লাহ আমার শাহাদাত কবুল করুন।”

    সুলতান আইয়ুবী দু’টি লেখাই পাঠ করলেন এবং সেই লোকটির দিকে তাকালেন, যে লোক কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করছিলেন। চেহারা সুরতে বেশ অভিজাত ও লেবাস পোশাকে আলেম ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছিল। সুলতান আইয়ুবী তার দিকে তাকালে তিনি সালাম দিয়ে বললেন, ‘আমি এই গ্রামের ইমাম। যেখানেই আমি কোন শহীদের সন্ধান পাই সেখানে গিয়ে তাদের জন্য ফাতেহা পাঠ করি। আমি বিশ্বাস করি, যেখানে শহীদের রক্ত ঝরে সে জায়গা মসজিদের মতই পবিত্র।

    আমি লোকদের বলি, ‘মুজাহিদরা সেই মহান ব্যক্তিত্ব যাদের ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের আঘাতে যে ধুলো উড়ে সে ধুলোও আল্লাহ কাছে কদর পায়। মহান আল্লাহ তার পথে জেহাদকে উওম ইবাদত বলে গণ্য করে থাকেন।’

    ‘কিন্তু আল্লাহর নামে জীবন কোরবান করা মানুষ এমন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি যাদের পরিচয় কেউ রাখেনা। যেমন এখানে আপনি দেখছেন। ইতিহাসে তাদের নাম নয়, আমার নামই লেখা হবে। কিন্তু আমার সমস্ত গৌরবের পেছনে রয়েছে এদেরই ত্যাগ ও কোরবানী, রয়েছে অসামান্য অবদান।’ বললেন সুলতান আইয়ুবী।

    তিনি তার সেনাপতিদের দিকে তাকালেন। তারপর এগিয়ে কবরের ফলক দুটিতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “এই দু’টি ফলকের লেখাই লাল রংয়ের। মনে হচ্ছে একজন লেখকই নিজের আঙ্গুল দিয়ে লেখা দুটো ‍লিখেছে।”

    ‘লাল রং নয় সুলতানে মুহতারাম, এ যে রক্ত! উমরুল মামলুকের কবরের ফলক লিখেছেন নাছরুল মামলুক। তারপর নিজের রক্ত দিয়ে লিখেছেন তার কবরের ফলক এবং তিনিও শহীদ হয়ে গেছেন। আমিও প্রার্থনা করছি, আল্লাহ তাদের শাহাদাত কবুল করুন। এখানে যে চারটি কবর দেখছেন এদের চারজনই আমার কমাণ্ডো বাহিনীর সদস্য ছিল।’ বললেন কমাণ্ডো বাহিনীর সেনাপতি সালেম মিশরী।

    সুলতান বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘তাই! তুমি চিনতে তাদের?’

    ‘হ্যাঁ সুলতান। ষোল সতেরো দিন আগে এক রাতে আমরা একটি নৌকা ধরেছিলাম। এই নৌকায় শত্রুর কমাণ্ডো বাহিনী তাদের সৈন্যদের জন্য রসদপত্র ও সাহায্য সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছিল।’

    সালেম মিশরী বললেন, ‘এ খবর তখনই আপনাকে জানানো হয়েছিল। আমাদের আট জন কমাণ্ডো সেনা সেই নৌকাটিকে আটক করেছিল। কিন্তু আটক করার সময় শত্রুদের সাথে লড়াইয়ে তাদের চারজন শহীদ হয়ে যায়।’

    ‘ঘটনাটি আবার বলো তো কিভাবে কি ঘটেছিল?’ বললেন সুলতান।

    ‘আমরা আগেই গোপন সূত্র থেকে জানতে পেরেছিলাম, একটা বড় নৌকা রাতে এদিক দিয়ে যাবে। সে নৌকায় শত্রুদের রসদপত্র ও অস্ত্রশস্ত্র থাকবে। আমি আমার আটজন কমাণ্ডোকে পাঠিয়ে দিলাম নৌকাটি আটক করার জন্য। তারা একটি ছোট নৌকায় ছিল। মধ্য রাতে তারা টের পায় অপর পাড় দিয়ে একটি নৌকা যাচ্ছে। আমাদের কাছে যে তথ্য ছিল তাতে আমরা জানতাম, নৌকায় বড়জোর চার পাচঁজন দুশমন সেনা থাকতে পারে। কিন্তু অপারেশনের পর জানা গেল, তাতে বিশজন শত্রু সেনা ছিল।

    আমাদের কমাণ্ডো বাহিনী দ্রুত ওপাড়ে পৌঁছলো এবং শত্রুর নৌকাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শত্রুরা আগে টের পায়নি, পেলে তীর মেরে সহজেই তারা পালিয়ে যেতে পারতো।

    আক্রান্ত হওয়ার পর ওরা যখন রুখে দাঁড়ালো, তখন দেখা গেল সংখ্যায় তারা অনেক। আমাদের কমাণ্ডোরা শত্রুর নৌকা কিছু দুরে থাকতেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল এবং নির্ভয়ে সাঁতরে গিয়ে চড়াও হয়েছিল শত্রুর ওপর।

    সাঁতারে তারা যথেষ্ট পটু ‍ছিল। তারা যখন দেখলো তাদের তুলনায় দুশমন অনেক তখন একজন গিয়ে নৌকার পালের রশি কেটে দিল। এরপর নৌকার ভেতর শুরু হলো এক ভীষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আমাদের কমাণ্ডো বাহিনীর যুবকরা অসম সাহসিকতা প্রদর্শন করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। আমাদের দু’জন তখনই শহীদ হয়ে যায়, বাকীরাও কম বেশী সবাই আহত হয়।

    আমাদের কমাণ্ডোরা শেষ পর্যন্ত শত্রুর নৌকাটি দখল করতে সমর্থ হয়। লড়াই শেষে তারা দেখতে পায় নৌকাটি দখল করার জন্য দুশমনের আঠারোটি লাশ তাদের ফেলতে হয়েছে। তারা শেষ মুহূর্তে দু’জনকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছে। ওই দু’জন সাতঁরে নদীর ওপাড়ে গিয়ে উঠলেও তাদের ধাওয়া করার মত অবস্থা ছিল না আমাদের কমাণ্ডোদের। তাই তাদের আর ধাওয়া করা হয়নি।

    আমাদের কমাণ্ডোরা দুটো নৌকাই কিনারায় ভিড়িয়ে আমাকে এই বিজয়ের খবর দেয়। সংবাদ পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে ছুটে আসি। ততোক্ষনে সকাল হয়ে গেছে।

    আমি এসে দেখতে পেলাম এক নৌকায় উমরুল মামলুক ও তার দুই সঙ্গীর লাশ। জানতে পারলাম একটু আগে উমরুল মামলুক শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছে।

    কমবেশী সবাই আহত হলেও নাছরুল মামলুকের অবস্থা ছিল সবচেয়ে শোচনীয়। তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত তার সারা শরীর। আমি তার কাছে গেলাম, দেখলাম তখনো তার জ্ঞান আছে। তার ক্ষতস্থানে পট্টি বাধার জন্য দ্রুত তাকে ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলো। এরপর যখন তাকে আমি ক্যাম্পে দেখতে গেলাম, সে আমাকে বললো, ‘আমাকে দুই টুকরো কাঠ ‍দিন।’

    বললাম, ‘এই শরীরে কাঠ দিয়ে তুমি কি করবে’?

    ও বললো, ‘আমি আমার শহীদ বন্ধুর কবরে নাম ফলক লাগাতে চাই।’

    আমি তাকে কাঠ সরবরাহ করলাম। সে তার আহত আঙ্গুলের ব্যাণ্ডেজের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া রক্ত দিয়ে উমরুল মামলুকের নাম ও এই লেখাগুলো ‍লিখলো। আমি নামফলকটি একটি লাঠির সাথে বেঁধে উমরুল মামলুকের কবরের ‍শিয়রে লাগিয়ে দিলাম।

    নাছরুল মামলুকের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না। তৃতীয় দিনে তার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি তাকে দেখতে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হতাশা প্রকাশ করে বললো, ‘নাছরুল মামলুককে বোধহয় বাঁচানো গেল না।’

    নাছরুল মামলুক নিজেও অনুভব করলো, সে আর বাঁচবে না।

    সে পুনরায় আমাকে বললো, ‘আমাকে আরেক টুকরো কাঠ ‍দিন।’

    আমি তার ইচ্ছা পূর্ণ করে দিলাম। সে কাঠের টুকরোটি নিজের কাছে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাতে আমি সংবাদ পেলাম, ‘নাছরুল মামলুক শহীদ হয়ে গেছে।’

    আমি যখন সেখানে গেলাম এক আহত রুগী আমাকে কাঠের টুকরোটি ‍দিয়ে বললো, ‘নাছরুল মামলুক তার ক্ষত স্থানের রক্ত দিয়ে এই ফলকটি লিখেছে।’

    আমি তাকিয়ে দেখলাম তাতে লেখা আছে, ‘নাছরুল মামলুক, আল্লাহ আমার শাহাদাত কবুল করুন।

    আহত রোগীটি আমাকে বললো, ‘নাছরুল মামলুক বলেছে, তাকে যেন তার বন্ধু উমরুল মামলুকের পাশে দাফন করা হয়।’

    ‘এরা দু’জনেই মামলুক ‍ছিল সম্মানিত ইমাম। আপনি কি জানেন এই মামলুক বংশ সম্পর্কে? এরা সেই গোলামদের বংশধর, ইসলামের আগমন যাদের ‍দিয়েছিল মুক্তির স্বাদ। আমাদের প্রিয় নবী রাসূল (সাঃ) ক্রীতদাস প্রথা ‍নিষিদ্ধ ঘোষনা করলে আরবে ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়।’ সুলতান আইয়ুবী ইমামকে বললেন।

    মহানবী (সাঃ) বলেছেন, মানুষ মানুষের গোলাম হতে পারে না। আমরা গোলাম শুধু এক আল্লাহর। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে যারা আমাদের দায়িত্বশীল আমরা তাদের মান্য করি।

    একটু খেয়াল করে দেখুন, একদিন যারা ছিল সামান্য গোলাম, জাতির জন্য তারা আজ কেমন ত্যাগ ও কোরবানীর নজরানা পেশ করছে। এরা মাত্র আটজন ছিল, কিন্তু বিশজনের কাছ থেকে নৌকা কেড়ে নেয়ার সাহস তারা কোথা থেকে পেল? এই শক্তি তারা পেয়েছে ইসলাম থেকে। আমার সৈন্যদের মধ্যে মামলুক ও তুর্কী সেনারা সাহস, বীরত্ব ও বিশ্বস্ততায় অনন্য।’

    ‘কিন্তু এখন মানুষ আবার মানুষের গোলামে পরিণত হচ্ছে,’ ইমাম সাহেব বললেন। ‘ক্ষমতার রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে মানুষকে আবার গোলামে পরিণত করা। কিন্তু মানুষ জানে না, ক্ষমতার স্বাদ বেশীদিন উপভোগ করা যায় না। ফেরাউনও মাটিতে মিশে গেছে। তেমনি প্রত্যেক জালিম শাসক, যারা ক্ষমতা ও গদি আঁকড়ে ধরে জনগনকে শোষণ ও ‍নির্যাতন করতো তাদের পরিণতি কখনো শুভ হয়নি। সাধারন মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাদশাহী ধরে রাখতে ‍গিয়ে তারা নিজেরাই রক্তাক্ত হয়েছে।’

    সেই সন্ধায় তারা যখন ফোরাতের কূলে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তখন সুলতান আইয়ুবীর রক্ষী বাহিনীর কমাণ্ডার এক লোককে সঙ্গে নিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। লোকটির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল সে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত। কমাণ্ডার তাদের কাছে এসে সুলতানকে লক্ষ্য করে বললো, ‘কায়রো থেকে কাসেদ এসেছে।’

    ‘কোন খারাপ খবর?’ সুলতান আইয়ুবী তাকে বললেন, ‘কি খবর নিয়ে এসেছো তুমি?’

    ‘সংবাদ ভালো নয় সুলতান।’ কাসেদ এ কথা বলে কোমর থেকে একটি কাগজ বের করে সুলতানের হাতে তুলে দিল।

    সুলতান আইয়ুবী চিঠি হাতে নিয়ে তার তাঁবুর দিকে রওনা হলেন। সঙ্গীদের বললেন, ‘চলো।’

    তাঁবুতে বসে তিনি চিঠিটা খুললেন। চিঠিটি তার গোয়েন্দা বিভাগের সর্বাধিনায়ক আলী বিন সুফিয়ানের হাতের লেখা।

    আমাদের সবচেয়ে ধার্মিক ও বীর সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুস দশদিন যাবত ‍নিখোঁজ রয়েছেন। খৃস্টানদের সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা এখানে গোপন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাসঘাতক গাদ্দারদের সংখ্যা ‍দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবু বলবো, এ সমস্যা ‍নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। আমরা এখানে শত্রুদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেব না।

    কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুস। তার কোন সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। তার সন্ধান না পাওয়াটাই পেরেশানীর একমাত্র কারন নয়। দুশ্চিন্তার আরো কারন আছে।

    আপনিতো জানেন, হাবিবুল কুদ্দুস তার বাহিনীর সৈন্যদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তারা তাদের প্রিয় সেনাপতির ইশারায় জান দিতেও কুন্ঠাবোধ করবে না। যদি তিনি স্বেচ্ছায় শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে থাকেন তবে ভয় হচ্ছে, তার বাহিনী যার দ্বারাই পরিচালিত হোক না কেন, তার ইশারা পেলে তারা বিদ্রোহ করে বসতে পারে।

    আমি এখনো তার সন্ধান চালাচ্ছি। তার ব্যাপারে আমি পুরোপুরি ‍নিরাশ নই। তবে আমি আপনার কাছ থেকে একটি ব্যাপারে নির্দেশনা চাই। যদি তার খোঁজ পাওয়া যায় এবং তাকে হত্যা করা জরুরী হয়ে পড়ে, তবে হত্যা করবো কিনা? আপনার নিয়োজিত মিশরের আমীর এ সম্মতি দিতে নারাজ। তিনি আমাকে শুধু এই অনুমতি দিয়েছেন যে, আমি আপনার কাছে পত্র প্রেরণ করে অনুমতি নিতে পারি।

    আমি তার সন্ধান করতে ব্যর্থ হই এটা যেমন আপনি চাইবেন না, তেমনি তিনি মনে করেন, সে আমার হাতে মারা যাক এটাও আপনি চাইবেন না। কিন্তু আমাদের এক সেনাপতির শত্রুর হাতে থাকাটাও ‍বিরাট ভয়ের কারন।’

    চিঠি পড়া শেষ করে সুলতান আইয়ুবী সঙ্গে সঙ্গে কাতিবকে ডাকলেন। কাতিব এলে চিঠির উওর লিখতে বসে গেলেন তিনি। তিনি লিখলেনঃ

    প্রিয় আলী বিন সুফিয়ান, তোমার উপর আল্লাহর করুনা বর্ষিত হোক। হাবিবুল কুদ্দুসের উপর আমার আস্থা ও বিশ্বাস এমন ছিল, যেমন তোমার উপর আছে। যে ব্যক্তি বেইমানী করতে প্রস্তুত হয়ে যায় সে কখনো আল্লাহকে ভয় পায় না। আর যে আল্লাহকে ভয় পায় না সে আমার মতো একজন নগণ্য মানুষকে কেন ভয় পাবে?

    তুমি এতে বিস্মিত হয়ো না যে, হাবিবুল কুদ্দুসের মত লোকও ধোঁকা দিতে পারে। ঈমান একটি শক্তি, কিন্তু সেটা হীরা ও পান্নার মত চকচক করে না। এতে সুন্দরী নারীর মত সৌন্দর্য ও আকর্ষণও থাকে না। আর ঈমান গদি ও রাজমুকুটও নয়। যখন মানুষের মধ্যে দুনিয়ার লোভ লালসা বেড়ে যায় ও ধন সম্পদের আকাঙ্খা সৃষ্টি হয় তখন মানুষের বেঈমান হতে বেশী সময় লাগে না।

    হাবিবুল কুদ্দুসকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করো। যদি কখনো মনে করো যে তাকে হত্যা করা দরকার, তবে অবশ্যই তাকে হত্যা করবে। এতে আমার কোন আপত্তি থাকবে না। কিন্তু এটা জানার চেষ্টা করবে, তাকে তো ছিনতাই করা হয়নি?

    এ বিষয়টা তোমার লক্ষ্য ও দৃষ্টিপটে রাখবে। তারপর যেটা ভালো মনে করো তাই করবে। দ্বীন ও দেশের কল্যাণের বিষয়টিই সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। একজন মানুষের জীবন বা মৃত্যুকে এ পথে বাধা হিসেবে মেনে নেয়া যায় না।

    দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য যেখানে বিপুল সংখ্যক সৈন্য অকাতরে মারা যাচ্ছে, সেখানে একজন গাদ্দারকে হত্যা করতে তোমার দ্বিধা করা উচিত নয়। যেখানে আল্লাহকে খুশি করার জন্য সৈন্যরা হাসি মুখে তাদের জীবন দিয়ে দিচ্ছে, সেখানে কোনো গাদ্দারকে দয়ামায়া দেখানোর প্রশ্নই উঠে না। সে গাদ্দার এটা নিশ্চিত হতে পারলে কালবিলম্ব না করে ফায়সালা করে ফেলবে।

    আলী, আল্লাহর কাছে পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকো, কারণ আমরা সবাই গোনাহগার বান্দা। পাক ও পবিত্র একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূল (সা:)। যদি তোমরা সত্যের উপরে থাকো তবে আল্লাহ তোমাদের সাথেই আছেন। শেষ পর্যন্ত তোমরাই জয়ী হবে।’

    সুলতান আইয়ুবী ‍চিঠিতে সিলমোহর মেরে চিঠিটা কাসেদের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আজ রাতে এখানেই বিশ্রাম নাও। কাল ঘুম থেকে উঠে খুব ভোরে যাত্রা করবে।’

    সে যুগটা ছিল ইতিহাসের অশুভ যুগ। একদিকে আরবের মাটি মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, অন্যদিকে ইহুদী ও খৃস্টানরা মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি করছিল গাদ্দার ও ষড়যন্ত্রকারী। মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে তাদের ধ্বংস করাই ছিল এ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য।

    মিশরেও চলছিল দুশমনের এ তৎপরতা। ইহুদী ও খৃস্টানরা মুসলিম নেতাদের মধ্যে গাদ্দার সৃষ্টির চেষ্টা চালানোর সাথে সাথে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলারও চেষ্টা করছিল। তারা মিশরের সৈন্য বিভাগকেও অকেজো করে দিতে চাচ্ছিল। সৈন্য বিভাগের ব্যাপারে নানারকম বদনাম ছড়িয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ওরা এ কাজ করছিল অত্যান্ত গোপনে ও কৌশলে।

    আলী বিন সুফিয়ান ও কায়রোর পুলিশ সুপার গিয়াস বিলকিস শত্রুদের এসব অপতৎপরতা বন্ধ ও অপরাধীদের খুঁজে বের করার জন্য আরামকে হারাম করে চষে ফিরছিলেন মিশরের সর্বত্র। তাদের বাহিনী কেবল কায়রো নয়, মিশরের বিভিন্ন পরগনা ও শহরে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

    সেনাবাহিনীর একজন সেনাপতির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত যে গোয়েন্দা বাহিনীর সুনাম সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা নিজেরাই তাদের এক সেনাপতিকে খুঁজে বের করতে পারছে না, এরচেয়ে লজ্জার বিষয় আলীর জন্য আর কিছুই হতে পারে না।

    হাবিবুল কুদ্দুস সম্পর্কে এ কথা ভাবাও মুশকিল যে, তিনি গাদ্দারদের দলে চলে যাবেন। কিন্তু এটা এমনই এক যুগ, এখন কে গাদ্দার আর কে নয় তা নির্ণয় করাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। গাদ্দারী এখন একটা সাধারণ ও সুবিধাজনক উপার্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    হাবিবুল কুদ্দুস যখন নিখোঁজ হলো তখন সবাই বলতে বাধ্য হলো, ‘তিনিও তো মানুষ, কোন ফেরেশতা তো নন।’

    হাবিবুল কুদ্দুসের স্ত্রী ছিল তিনজন। অবশ্য সে যুগে এটা কোন গর্হিত কাজ বলে গণ্য করা হতো না। তার সমসাময়িক অন্যান্য অফিসাররা বরং এ ক্ষেত্রে একটু এগিয়েই ছিল। তাদের বরং বিবি ছিল চারজন করে। যারা আরেকটু সৌখিন ছিল তাদের দু’একজন দাসীও থাকতো।

    হাবিবুল কুদ্দুসের কোন দুর্ণাম ছিল না। তার জীবনে মদ ও নাচগানের সামান্যতম প্রভাবও কেউ লক্ষ্য করেনি। তিনি নামাজ রোজার পাবন্দ ছিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন সত্যিকারের বীর মুজাহিদ। তিনি কেবল শত্রুর উপর কঠোর ছিলেন না, বরং বীরত্ব প্রদর্শন ও রণকৌশলেও ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। তিনি যুদ্ধ পরিচালনায় এতই ‍নিপুণ ছিলেন যে, সামান্য সৈন্য ‍নিয়ে বিপুল সংখ্যক শত্রু সেনার বাহিনীকেও তিনি বার বার পরাজিত ও ধ্বংশ করেছেন।

    তার সবচেয়ে বড় গুন ছিল, তিনি সবাইকে সহজেই আপন করে নিতে পারতেন। লোকেরাও তাকে ভালোবাসতো। তার অধীনস্ত সৈন্য ও কমাণ্ডাররা যখন যুদ্ধ করতো তখন তাদের আবেগ এমন হতো যেন তারা কারো নির্দেশে যু্দ্ধ করছে না, বরং নিজের ঈমানের দাবী পূরণের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। বাহিনীর সদস্যরা তাকে বুঝতে পারতো এবং তার ইশারাকেই তারা হুকুম মনে করতো।

    সে তার বাহিনী এমনভাবে পরিচালনা করতো যে, কখনো কখনো মনে হতো যেন এটা তার একান্ত নিজস্ব বাহিনী। যেন এরা সুলতান আইয়ুবীর নয়, হাবিবুল কুদ্দুসের আদেশে যুদ্ধ করছে।

    এত যে প্রিয় লোকটি, প্রশিক্ষন বা যুদ্ধের মাঠে তার রূপ ছিল সত্যি ভয়াবহ। সৈন্যদের তিনি কঠোর প্রশিক্ষন দিতেন এবং তাদের শৃঙ্খলার প্রতিও রাখতেন কড়া নজর।

    তিনি তার সৈন্যদের এমনভাবে প্রশিক্ষন ‍দিতেন যাতে তারা অন্যদের তুলনায় ক্ষীপ্র ও কৌশলী হয়। তার সৈন্য সংখ্যা ছিল ‍তিন হাজার পদাতিক, দুই হাজার অশ্বারোহী ও দুই হাজার তীরন্দাজ। তীরন্দাজদের তিনি এমন নিপুণ তীর চালানো শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, রাতের অন্ধকারে শুধু সামান্য আওয়াজ শুনেই তার সৈন্যরা যে তীর ছুঁড়তো তা গিয়ে শব্দকারীর বুকে বিদ্ধ হতো।

    আলী বিন সুফিয়ানও ছিলেন গোয়েন্দাগিরীতে ওস্তাদ। গিয়াস বিলকিসও ছিলেন দক্ষ পুলিশ সুপার। এদের দু’জনেরই ধারনা, হাবিবুল কুদ্দুসকে শত্রুরা যেভাবেই হোক তাদের বশে নিতে সক্ষম হয়েছে, যাতে তার সাত হাজার সৈন্যকে বিদ্রোহী করে তুলতে পারে।

    সাত হাজার সৈন্য কোন তুচ্ছ ও নগন্য সৈন্য ছিল না। এ সৈন্যদের বিদ্রোহের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখার উপায় তালাশ করছিলেন দু’জনই। গিয়াস বিলকিস বললেন, ‘এদের নিরস্ত্র করে দিলে কেমন হয়?’

    আলী বিন সুফিয়ান অনেক চিন্তা ভাবনা করে এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কিন্তু তারা যে কোন সময় বিদ্রোহ করে বসতে পারে গিয়াস বিলকিসের এ আশঙ্কা তিনি উড়িয়ে দিতে পারলেন না। তারা দু’জনই একমত হলেন, আজ না হলেও ভবিষ্যতে তারা বিদ্রোহ করবে।

    আলী বিন সুফিয়ান বললেন, ‘আপাতত তাদের নিরস্ত্র না করে বাহিনীর মধ্যে কিছু গোয়েন্দা ছড়িয়ে দিই। তারা সৈন্য ব্যারাকে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াবে এবং তাদের আলাপ আলোচনা শুনবে। কমাণ্ডারদের উপরও তারা দৃষ্টি রাখবে।’

    তাই করা হলো। কড়া দৃষ্টি রাখা হলো হাবিবুল কুদ্দসের বাড়ীর উপর। তার তিন স্ত্রীর মধ্যে একজনের বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। অন্য দু’জনের মধ্যে একজনের বয়স বিশ, অন্যজনের পঁচিশ। তাদের জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘হাবিবুল কুদ্দুস কোথায়?’

    তারা বললো, ‘কয়েকদিন আগে এক সন্ধায় তার কাছে দু’জন লোক এসেছিল। হাবিবুল কুদ্দুস তাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন, কিন্তু তারপর আর ফিরে আসেন নি।’

    চাকর বাকরদেরও সন্দেহমূলকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু তাতে কোন কাজ হলো না, কোনভাবেই তার সন্ধান পাওয়া গেল না।

    তার বিবিদের সম্পর্কেও গোপনে অনুসন্ধান করা হলো। কিন্তু তাদের ব্যাপারেও সন্দেহ করার মতো কোন তথ্য পাওয়া গেল না। শুধু এটুকু জানা গেল যে, অল্পবয়সী দুই বিবির মধ্যে একজনের প্রতি হাবিবুল কুদ্দুসের টান একটু বেশী ছিল।

    এই বিবির নাম জোহরা। জোহরা তারই অধীনস্ত অশ্বারোহী বাহিনীর এক কমাণ্ডারের মেয়ে। মেয়েটি দেখতে খুবই সুন্দরী ছিল। এ রকম সুন্দরী বিবি থাকলে তার প্রতি টান একটু বেশী থাকাই স্বাভাবিক।

    একদিন জোহরার পিতা সেই কমাণ্ডারকে তলব করা হলো গোয়েন্দা অফিসে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কেন এত অল্পবয়সী মেয়েকে তোমার সমবয়সী লোকের সাথে বিয়ে দিয়েছো? হাবিবুল কুদ্দুস কি তোমাকে তার অধীনস্ত পেয়ে বাধ্য করেছিল?’

    ‘না। সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুস ইসলাম ও জিহাদের ব্যাপারে এতই আন্তরিক যে, তা দেখেই আমি তার প্রতি অনুরাগী হই।’ বললেন সেই কমাণ্ডার।

    তিনি বললেন, ‘আমি তার সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে ‍যুদ্ধ করেছি। তিনি বলতেন, মুমিনের তলোয়ার একবার উন্মুক্ত হলে সে তলোয়ার ততোক্ষণ পর্যন্ত কোষবদ্ধ হবে না, যতোক্ষন তার সামনে একজন দুশমনও বর্তমান থাকে। তিনি আরো বলতেন, ‘যতোক্ষন কাফেরদের ফেতনা শেষ না হবে ততোদিন জিহাদ চালু থাকবে।’

    তিনি দেশের গাদ্দারদের প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। যখন সীমান্ত যুদ্ধে সুদানীরা আকস্মাৎ আক্রমন চালালো, তখন আমাদের দুই অশ্বারোহী পালানোর চেষ্টা করেছিলো। তিনি টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাদের দু’জনকে পাকড়াও করার হুকুম দেন।

    দু’জনকে ধরে আনা হলে তাদেরকে ঘোড়ার পিছনে দু’হাত রশি দিয়ে বেঁধে দুই অশ্বারোহীকে ঘোড়া ছুটাতে বললেন। তিনি অশ্বারোহীদের বললেন, ‘ঘোড়া ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত ঘোড়া থামাবে না।’

    যখন ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে ফিরে এলো তখন ঘোড়াগুলো হাফাচ্ছিল। ঘোড়ার পেছনে বাঁধা দুই সৈন্যের অবস্থা তখন শেষ পর্যায়ে। তাদের সমস্ত শরীরের কোথাও কাপড় ছিল না। তাদের শরীরের চামড়া উঠে গিয়েছিল। শরীরের মাংসও উঠে গিয়েছিল।

    যুদ্ধে অধিকাংশ সুদানী মারা গিয়েছিল। কিছু ধরা পড়ে বন্দী হয়েছিল। অন্যরা পালিয়ে গিয়েছিল। হাবিবুল কুদ্দুস সমস্ত সৈন্যদের একত্রিত করে সেই পলাতক সৈন্যদ্বয়ের লাশ দেখালেন।

    তিনি তাদের বললেন, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধরত সৈন্যদের পালানোর শাস্তি দুনিয়ায় এমনই হয় আর পরকালে তাদের দেহ হবে আগুনের খোরাক।’

    হাবিবুল কুদ্দুসের শ্বশুর বললো, ‘আমরা সবাই জিহাদে শহীদ হওয়ার জন্য প্রেরনা পেয়েছি তার কাছ থেকে।’

    ‘তোমার মেয়ে সম্পর্কে বলো, কেন তুমি তাকে হাবিবুল কুদ্দুসের সাথে বিয়ে দিয়েছিলে?’

    ‘একদিন আমার মেয়ে আমার সাথে ছিল। আমি মেয়েকে সেই শিক্ষাই দিয়েছিলাম যে শিক্ষা আমার পিতা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমার ছেলেও সে সময় ‍সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদলে সিরিয়াতে ছিল।

    আমি আমার মেয়েকে বললাম, ‘আমাদের সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুসও সুলতান আইয়ুবীর মত বীর মুজাহিদ।’

    সেদিনই তিনি আমার মেয়েকে দেখলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ মেয়েটা কে?’ আমি বললাম, ‘এ আমার মেয়ে এবং একজন তরুণী মুজাহিদ।’

    বেশ কিছুদিন পর তিনি আমাকে জানালেন, যদি আমার আপত্তি না থাকে এবং আমার মেয়ে সম্মত হয় তবে তাকে তিনি বিয়ে করতে চান। আমি মেয়ের মাকে কথাটা বললাম। মেয়ের মা বলল, ‘মেয়ে আগে থেকেই বলে আসছে সে এমন ব্যক্তিকে বিয়ে করতে চায় যে ইসলামের খেদমতে নিজের জীবনকে বাজী রাখতে প্রস্তুত।

    আমি খুশী মনে সেনাপতির সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলাম এবং আমার মেয়েও তাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিল। এখন শুনছি তিনি নিখোঁজ।

    আমি আপনাকে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলছি, তার এই নিরুদ্দেশে যদি কেউ অন্তর থেকে ব্যাথিত হয়ে থাকে, তবে সে একমাত্র আমার মেয়ে। আমি শুনেছি, সে তাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে। তার নিরুদ্দেশ হওয়ার পরও তার ভালবাসা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।

    তার ধারনা, দুশমনরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে মেরে ফেলেছে বা কোথাও বন্দী করে রেখেছে। আমি এও শুনেছি, তার অন্য দুই স্ত্রী বলেছে, সে যদি মারা যায় তবে তারা অন্যখানে বিয়ে করে নেবে। কিন্তু আমার মেয়ে এ রকম চিন্তা করাও পাপ মনে করে।’

    ‘এখন আমার বিশ্বাস হচ্ছে, তাদের পরিকল্পনা আমাদের হাতে এসে গেছে।’

    এই আওয়াজ কায়রো থেকে দূরে, বহু দূরে এক ধ্বংসাবশেষে উচ্চারিত হলো। এখানে কোন ফেরাউন তার সময়ে রাজমহল তৈরী করেছিল। সে যুগে এ স্থানটি খুব সুন্দর শহর ও মনোরম বাগবাগিচায় সাজানো ছিল। অঞ্চলটি পাহাড়ী হওয়ার পরও নীল নদের তীরে অবস্থিত হওয়ার কারনে এখানে গড়ে উঠেছিল জমজমাট শহর। আর ফেরাউন সেই শহরকে এমন অপরূপ সাজে সাজিয়েছিল, মনে হতো এটি কোন রূপকথার রাজ্য।

    পাহাড়ের উপরে ও আশেপাশে ছিল সবুজ গাছপালা। নদীতে খাল কেটে শহরের ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছিল নদীর পানি। সেই পানিতে চলতো সেচ কাজ। এভাবেই সেই রুক্ষ্ম পাহাড়কে বানানো হয়েছিল নয়নাভিরাম সবুজ উদ্যান।

    কোন এক ফেরাউন এখানে শহর ও মহল বানালেও তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে তার জৌলুশ। তারপর কালক্রমে একদিন তা ধ্বংশস্তুপে পরিণত হয়।

    সুলতান আইয়ূবীর আমলে এই ধ্বংসাবশেষ এক ভয়ংকর স্থানে পরিণত হয়। শহরের প্রাসাদগুলো রূপ নিয়েছিল ভূতুরে আস্তানায়। মহলের স্তম্ভগুলো জরাজীর্ণ হয়ে বুনো লতাপাতায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছিল। আবর্জনায় ভরে গিয়েছিল তার কামরাগুলো।

    বাদুড়, চামচিকা ও চিলেরা বাসা বেঁধেছিল সেই ধ্বংশস্তুপে। পাহাড়গুলো এত উঁচু ছিল যে, কালো মেঘ যখন উড়ে যেত, দূর থেকে মনে হতো সেগুলো পাহাড়ের গা ছুঁয়ে যাচ্ছে।

    এই জনপদ কিভাবে ধ্বংশ হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। তবে ধ্বংসাবশেষ দেখলে মনে হয় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক বিস্ফোরনে শহরটি ধ্বংশপ্রাপ্ত হয়। কারন পুরাতন এই ধ্বংসাবশেষের বাইরে ও ভিতরে মানুষের মাথা ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের হাড় হাড্ডি ছড়িয়ে আছে। অতীত যুগের অনেক অস্ত্রসস্ত্রও এদিক ওদিক পড়ে আছে।

    এখন এই ভূতুরে জায়গায় কেউ যায় না। লোক মুখে গুজব রটে গেছে, এখানে জ্বীন, ভূত ও খারাপ মানুষের প্রেতাত্মারা বাস করে। তারা এর আশেপাশে কোন জীবিত মানুষ পেলে তাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে।

  • রক্তস্রোত

    রক্তস্রোত

    রক্তস্রোত

    সম্রাট আরনাতের রক্ষিতা প্রিন্সেস লিলি ওরফে কুলসুম কথা বলছিল বাকারের সাথে। কুলসুম বাকারকে বললো, ‘আরনাতের সাথে আমি সুখেই ছিলাম। কিন্তু আমার অন্তরে জ্বলছিল প্রতিশোধের আগুন। সে মাঝে মাঝে আমাকে বলতো, ‘সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা ছদ্মবেশে এখানে আসে। তারা আমাদের গোপন তথ্য নিয়ে আবার সুযোগ মত পালিয়ে যায়।’ আরনাত আরও বলেছে, ‘খৃষ্টান ও ইহুদী সুন্দরী মেয়েরা মুসলমানদের দেশে গিয়ে সেখানকার বড় বড় আমীর ও অফিসারকে তাদের রূপের জালে বন্দী করে ফেলে। তারা আমাদের স্বার্থ উদ্ধারে আমীরদের ব্যবহার করে।’’

    কুলসুম বললো, ‘আরনাত আমাকে সেসব মেয়েদের কাহিনী প্রায়ই বলতো। তার গল্প শুনে আমার মনে হতো, ধর্মের জন্য ওই মেয়েরা কতই না ত্যাগ স্বীকার করছে! তারা এ জন্য নিজের সম্ভ্রম পর্যন্ত বিসর্জন দিচ্ছে। বাকার! আমিও এক নারী। আমি জানি নারীরা সম্ভ্রমকে কত অমূল্য সম্পদ মনে করে। সতীত্ব রক্ষা করার জন্য মেয়েরা নিজের জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। অথচ ওই মেয়েরা অকাতরে তা বিলিয়ে দিচ্ছে। এ যে কত বড় ত্যাগ তুমি তা কল্পনা করতে পারো?’

    থামল কুলসুম। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললো, ‘বাকার, আমার সম্ভ্রম তো লুট হয়েই গেছে। আমার ইচ্ছা আমি আমার ধর্মের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কোরবানী স্বীকার করি। প্রয়োজনে এ জন্য আমি আমার জীবন দিয়ে দেবো। এতদিন এ ত্যাগ স্বীকারের কোন সুযোগ পাইনি আমি। আরনাত এ সম্মেলনে এসে আমার কাছে এমন গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে যে তথ্য সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছানো জরুরী মনে করছি আমি। হয়তো এই কল্যাণকর কাজের জন্যই আল্লাহ আমাকে এই জাহান্নামের মধ্যে পাঠিয়েছে। তুমি কি মনে করো, এই সংবাদ সুলতানের কাছে পৌঁছালে তাতে কোন উপকার হবে?’

    ‘হ্যাঁ, অনেক উপকার হবে।’ বাকার বললো, ‘কিন্তু এ সংবাদ আমরা নিয়ে যাব না। আমি ও তুমি দু’জনেই যদি এখান থেকে নিখোঁজ হয়ে যাই তবে সম্রাট আরনাত বুঝে ফেলবে, আমরা দু’জনই গোয়েন্দা ছিলাম। এতে তারা তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন এই খবর সুলতান আইয়ুবীর উপকারে না লেগে তা তাঁর পরাজয়ের কারণ হবে।’

    ‘তার মানে, এত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছাতে পারব না?’ কুলসুমের কণ্ঠে উদ্বেগ।

    ‘অবশ্যই এ খবর সুলতানের কাছে পৌঁছবে।’ বাকার বললো, ‘আগে ক্রাকে যাই, ওখানে গিয়েই আমি এ খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।’

    ‘তুমি নিজে যাবে?’ কুলসুম জিজ্ঞেস করলো, ‘কিন্তু তুমি চলে গেলে আমি যে এখান থেকে পালাতে চাচ্ছি তার কি হবে?’

    ‘আমি যাব না, তুমিও পালাবে না।’ বাকার বললো, ‘ক্রাকে আমার সঙ্গী রয়েছে। খবর পৌঁছানোর দায়িত্ব তারাই পালন করবে। আমার দায়িত্ব শুধু তথ্য জোগাড় করা। তোমার কাজ এখনও শেষ হয়নি, সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আমি তোমাকে জানাবো সুলতান আইয়ুবীর কেমন ধরনের সংবাদ প্রয়োজন। সে সংবাদ তুমি আমাকে জোগাড় করে দেবে আর আমি তা দামেশক পর্যন্ত পৌঁছে দেব।’

    ‘তবে আমাকে এই জাহান্নামেই থাকতে হবে?’ কুলসুম উদাস কণ্ঠে বললো।

    ‘হ্যাঁ।’ বাকার উত্তর দিল, ‘তোমাকে এই জাহান্নামে এবং মৃত্যুর মুখমুখিই থাকতে হবে কুলসুম! যদি তুমি জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে চাও তবে এরচেয়ে ভাল কোন সুযোগ পাবে না। দ্বীনের জন্য এমন কোরবানী দেয়ার সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না।’

    কুলসুম শুনছিল বাকারের কথা। নতুন এবং অদেখা এক জগত যেনো তার চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। সে অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল বাকারের দিকে। বাকার বললো, ‘গোয়েন্দাদের ব্যাপারে সুলতান কি বলেন জানো? তিনি বলেন, একটি মাত্র গোয়েন্দা আমাদের সমস্ত সৈন্যবাহিনীর জয় ও পরাজয়ের কারণ হতে পারে। তাদের মিশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিবহুল। গোয়েন্দারা প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু মৃত্যু নয়, মৃত্যুর অধিক বিপদ ওঁৎ পেতে থাকে তাদের জন্য। কোন গোয়েন্দা শত্রুদের হাতে ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করা হয় না। তথ্য আদায়ের জন্য তাদের দেয়া হয় কঠিন শাস্তি। তাদের চামড়া ছিলে তাতে লবণ মাখানো হয়। তাকে এমন কঠিন শাস্তি দেয়া হয় যে, তারচেয়ে মৃত্যু হলে সে বেঁচে যেত। কিন্তু তাদের মরতেও দেয়া হয় না, বাঁচতেও দেয়া হয় না।’

    ‘কুলসুম!’ বাকার বললো, ‘কিন্তু নিজের ধর্ম, নিজের দেশ ও আপন জাতির জন্য কাউকে না কাউকে তো এমন ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়। সুলতান বলেন, ‘যে জাতির সন্তানদের মধ্য থেকে জাতির জন্য ত্যাগ ও কোরবানীর আবেগ নিঃশেষ হয়ে যায় অল্পদিনের মধ্যেই পৃথিবীর বুক থেকে সে জাতির অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যায়।’ তুমি যেখানে নিরুপায় হয়ে চারটি বছর কাটিয়ে দিয়েছ সেখানে আরো চারটি মাস কাটিয়ে দাও মহান এক মিশন নিয়ে, নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে।’

    ‘তুমি বলছো, তাতে জাতির কল্যাণ হবে! আমার পাপ মোচন হবে?’

    ‘হ্যাঁ কুলসুম! আরনাত এখন আর তোমার প্রভু নয়, সে তোমার শিকার। এ শিকার যেনো হাতছাড়া না হয় সেদিকে তোমার কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। তার সাথে আগের চেয়ে অধিক ভালবাসার ভাব দেখাবে। কিন্তু মনে রাখবে, তুমি এক বিষধর সাপকে আগলে রেখেছো। এ সাপ যদি তোমার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যায় তবে সে মুসলিম বিশ্বের বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

    ‘তবে আমাকে বলো!’ কুলসুম অধীর কন্ঠে বললো, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলো, আল্লাহ আমার এ খেদমত গ্রহণ করবেন এবং তিনি আমাকে মাফ করে দেবেন!’

    ‘নিশ্চয়ই! আল্লাহ বান্দার কোন আমলই বিফলে যেতে দেন না।’

    ‘তাহলে বলো আমাকে কি করতে হবে?’

    বাকার তাকে বুঝিয়ে বলতে শুরু করল তার কি করণীয়। সে তাকে বলল, ‘সবার সামনে এমন ভাব প্রকাশ করো না, যাতে তোমার এবং আমার মাঝে কোন গোপন সম্পর্ক রয়েছে মানুষ এমন ধারণা করতে পারে। সব সময় মনে রাখবে, এখানে আমাদের মত গোয়েন্দাদের ধরার জন্য খৃষ্টান গোয়েন্দারাও ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এটাও মনে রাখবে, এখানে শুধু আমরা দু’জনই নই, আমাদের সাথী আরো গোয়েন্দারা কাজ করছে। শুধু এখানেই নয়, খৃস্টানদের প্রতিটি শহরে ও গ্রামে ঘুরে বেরাচ্ছে আমাদের সাথীরা।

    কুলসুম, এ খবর শুনে অহংকারী ও বেপরোয়া হয়ে যেও না। মনে রেখো, এখানে খৃস্টান জেনারেল ও শাসকরা আছেন। তারা সব আহাম্মক এমনটি মনে করার কোন কারণ নেই। এদের মধ্যেও অনেকেই আছেন যারা সাহসী ও বুদ্ধিমান। তাদের চোখ কান খোলা। তাই যা করবে বুঝেশুনে করবে। একদিকে নিজের বুদ্ধি বিবেক কাজে লাগাবে আর সারাক্ষণ নির্ভর করবে শুধু আল্লাহর উপর। আমরা স্বেচ্ছায় এক কঠিন দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছি। এ দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে পরিপূর্ণ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে। এ কাজ করতে গিয়ে যত বিপদই আসুক না কেন সবই আমাদের মাথা পেতে নিতে হবে, সহ্য করতে হবে।’

    কুলসুম তাঁবুর কাছে এসে গাড়ী থেকে নামলো। সে এখন আর কুলসুম নয়, প্রিন্সেস লিলি। আর গাড়ীর চালক বাকার বিন মুহাম্মদও এখন একজন নিষ্ঠাবান খৃস্টান, যার নাম সায়বল। কুলসুম যখন গাড়ী থেকে নামলো, সায়বল তখন বগির পাশে এক নিরীহ চাকরের মত মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো।

    প্রিন্সেস লিলি তাঁবুতে ঢুকে দেখল সম্রাট আরনাত একটি নকশার ওপর ঝুঁকে আছেন। লিলি বললো, ‘অমন করে কি দেখছ?’

    আরনাত নকশা থেকে মুখ না তুলেই বললো, ‘খুবই জরুরী জিনিস। তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?’

    ‘প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়েছিলাম।’ লিলি বললো, ‘সেই সাথে একটু শিকার করারও শখ চেপেছিল।’

    আরনাত নকশা থেকে মুখ তুলে হাসিমুখেই জিজ্ঞেস করলো, ‘তা কি শিকার করেছো?’

    ‘কিছুই না।’ লিলি উত্তর দিল, ‘সব তীরই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।’ তারপর মন খারাপ করে বললো, ‘তুমি তো আর আমাকে তীর চালাতে শেখাওনি যে আমি শিকার ধরতে পারবো।’

    আরনাত হেসে বললো, ‘তাই! তা আমাকে বলবে তো! ঠিক আছে রাণী, দেখবেন এক সপ্তাহের মধ্যে আপনি পাকা শিকারী হয়ে গেছেন।’

    ‘তুমি সত্যি বলছো!’ আনন্দিত গলায় বললো লিলি, ‘কখন শেখাবে, কবে শেখাবে?’ কথা বলতে বলতে সে আরনাতের পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো।

    আরনাত আবার নকশার দিকে দৃষ্টি দিয়েছিল, সে আরনাতের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কিসের নকশা? অভিযানের, নাকি প্রতিরক্ষার?’

    ‘অভিযান চালাবেন সুলতান আইয়ুবী।’ আরনাত অন্যমনস্ক ভাবে বললো, ‘আর প্রতিরক্ষাও তাকেই করতে হবে। আমরা তাকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করছি। তাঁর শক্তি যখন নিঃশেষ হবে তখন আমরা অভিযান চালাবো। তখন আমাদের বাঁধা দেয়ার আর কেউ থাকবে না।’

    ‘সাংঘাতিক পরিকল্পনা তো!’ লিলির চোখে মুখে বিস্ময়।

    ‘হ্যাঁ লিলি, তুমি এখন তোমার তাঁবুতে যাও। আমাকে আরো অনেক কিছু চিন্তা করতে হবে। আজ রাতে সম্রাটদের যে কনফারেন্স হবে তাতে এই পরিকল্পনা ও নকশা পেশ করতে হবে আমাকে। আমি এমন নিখুঁত পরিকল্পনা পেশ করতে চাই যাতে কোন ভুল ত্রুটি না থাকে।’

    ‘মেয়েটির নাম কুলসুম ও তার সাথীর নাম বাকের বিন মুহাম্মদ। কুলসুমকে কোন মুসলিম কাফেলা থেকে লুট করেছিল সম্রাট আরনাত, তারপর নিজের হেরেমে ঢুকিয়ে নিয়েছে। আমাদের এজেন্ট বাকার আরনাতের গাড়ী চালক। ওখানে সে খৃস্টান পরিচয়ে আছে। মেয়েটি পালাতে গিয়ে বাকারের হাতে ধরা পড়লে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। তথ্যের মূল উৎস সেই মেয়ে। বাকার তাকে ট্রেনিং দিয়ে কাজের উপযোগী করে গড়ে নিয়েছে।’ সুলতান আইয়ুবীর কাছে এ তথ্য তুলে ধরছিল গোয়েন্দা বিভাগের উপ-প্রধান হাসান বিন আবদুল্লাহ।

    সুলতান আইয়ুবী হাসান বিন আবদুল্লাহর রিপোর্ট শুনছিলেন। তার চেহারা ক্রমেই কঠোর হয়ে উঠছিল। তিনি রক্তিম চোখে তাকালেন হাসানের দিকে। বললেন, ‘হাসান, কে বলতে পারবে আমাদের কত মেয়ে কাফেরদের কাছে এমনিভাবে বন্দী হয়ে আছে? আফসোস! আমাদের পাপের কারণে আমাদের মেয়েরা আজ কাফেরদের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। আমি আরনাতকে ক্ষমা করবো না। মনে রেখ হাসান, এ মেয়েকে আমি সেখান থেকে উদ্ধার করবো। ইজ্জত বিকিয়ে দিয়ে মেয়েরা আমাকে সাহায্য করুক, এ আমি চাই না। আরে, আমি তো লড়াই করছি আমার বোন ও কন্যাদের সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য। একজন মুজাহিদের জীবন তো তখনই সফল হয় যখন সে তার এক বোনের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

    ‘সুলতান! ক্রাকে আমাদের যে লোক আছে তারাই সময় মতো তাকে বের করে আনবে।’ হাসান বিন আবদুল্লাহ বললেন, ‘আক্রার পাদ্রী ও সম্মিলিত খৃস্টান রাজন্যবর্গ নসিবায় তিন দিন ধরে বৈঠক করে যুদ্ধের প্লান ও নকশা তৈরী করেছে। কুলসুম আরনাতের কাছ থেকে সেই পরিকল্পনার পুরোটাই জেনে নিয়েছে ও বাকারকে বলে দিয়েছে। এতোক্ষণ আমি বাকারের পাঠানো খবরই আপনার সামনে পেশ করলাম।’

    খৃস্টানরাও সুলতান আইয়ুবীর গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট ছিল। তাদের গোয়েন্দা মুশেল, হলব, দামেশক, কায়রোসহ মুসলিম অধ্যুষিত প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছড়িয়ে ছিল। তাদের মাধ্যমেই খৃস্টানরা জানতে পেরেছিল, মিশর থেকে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা বেরিয়ে পড়েছে। তারা আরও জানতে পেরেছে, সুলতান আইয়ুবী খুব শিঘ্রই অভিযান চালাচ্ছেন। সে জন্যই তারা প্রতিরোধ ব্যবস্থা দৃঢ় করে সুলতান আইয়ুবীর চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে।

    পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন স্থানে সৈন্য সমাবেশ করেছে। তারা এখনও জানতে পারেনি, সুলতান আইয়ুবী কোন দিক থেকে অভিযান চালাবেন আর সমরক্ষেত্র কোনটি হবে? তারা অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই সৈন্য সাজাচ্ছিল। তবে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্য সংখ্যা, বিশেষ করে তাঁর কি পরিমাণ তীরন্দাজ, পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য এবার অভিযানে বের হয়েছে সে পরিসংখ্যান তারা পেয়ে গেছে বলে খুবই উল্লসিত ছিল তারা।

    কুলসুম ও বাকারের কাছ থেকে আসা গোয়েন্দার কাছ থেকে হাসান বিন আবদুল্লাহ বিস্তারিত সংবাদ নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর কাছে সব বিবরণ তুলে ধরলেন। সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিবরণের সাথে এ তথ্যের মিল আছে। এটা তো আমরা আগেই জানতে পেরেছি, খৃস্টানরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন ক্রাকের সংবাদ এর সত্যটা আরো দৃঢ় করলো। নতুন খবর যা পেলাম তা হলো, খৃস্টান রাজন্যবর্গ তাদের মতপার্থক্য ভুলে আবারো একত্রিত হয়েছে এবং তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সম্মিলিতভাবেই তারা আমাদের মোকাবেলা করবে। অর্থাৎ এবারও আমাদেরকে খৃস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীর সাথেই যুদ্ধ করতে হবে।’

    ‘এ ছাড়া নতুন যে তথ্য পেয়েছি তাহলো, এবার আমরা তাদের সামরিক শক্তির একটি সঠিক পরিসংখ্যান পেয়েছি।’ বললেন হাসান বিন আবদুল্লাহ, ‘এবার তাদের বাহিনীতে থাকবে দুই হাজার দুইশো নাইট সৈন্য। নিঃসন্দেহে এটা এক বিরাট শক্তি। নাইটদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত থাকে লোহার পোশাক। এই পোশাকের কারণে তারা থাকে অধিক সুরক্ষিত ও নিরাপদ। নাইটদের ঘোড়াগুলোও সাধারণ সৈন্যদের ঘোড়ার চেয়ে অধিক শক্তিশালী ও দ্রুত গতিসম্পন্ন।’

    ‘এ নিয়ে আমি মোটেই উদ্বিগ্ন নই। আমি তাদের এমন সময় যুদ্ধের মাঠে নামাবো যখন প্রকৃতিতে থাকবে প্রচণ্ড উত্তাপের দাবদাহ। মাথার উপর থাকবে প্রখর সূর্য, পায়ের নিচের বালি থাকবে আগুনের হলকার মতোই উত্তপ্ত। তখন তাদের পোশাকই তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।’

    ‘আমরা আরো জানতে পেরেছি, প্রতিটি নাইট বাহিনীর সাথে থাকবে আট হাজার অশ্বারোহী ও ত্রিশ হাজার পদাতিক।’ হাসান বিন আবদুল্লাহ বললেন, ‘সৈন্যের এ সংখ্যাটা কিন্তু বিশাল।’

    ‘এটা জানা থাকায় আমার পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে। তবে আমি অবাক হয়েছি যে খবরটা শুনে তা হলো, আর্মেনিয়ার শাহের সৈন্যও নাকি খৃস্টানদের সাথে যোগ দিচ্ছে।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এ সৈন্য ক্রুসেডদের সৈন্যের অতিরিক্ত। আর এদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আমার যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে জানে। সম্ভবত ওদের পরামর্শেই ক্রুসেড বাহিনী এবার আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

    ‘সে অনুযায়ী আপনি হাতিন এলাকা থেকে যুদ্ধ শুরু করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খুবই সঠিক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে। কারণ হাতিন অঞ্চল আমাদের জন্য খুবই উপযোগী ও পরিচিত এলাকা।’

    ‘হে, আমার বন্ধুগণ! এখন আমাদের সামনে সেই সময় উপস্থিত, যখন আমাদের জীবন আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দেয়ার ডাক এসেছে। এ পৃথিবীর আলো বাতাস ডেকে বলছে, ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ো মুজাহিদ। এ ফরজ আমাদের ওপর অর্পণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত। তিনিই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, দুশমন ময়দানে এলে খবরদার ঈমানদার, কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না। আমাদের হত্যা করার জন্য আজ জোট বেঁধেছে দুশমন। এ অবস্থায় কোরআন আমাদের ডেকে বলছে, হে আল্লাহর সৈনিকেরা, ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ো। মারো আর মরো। মানবতার দুশমনদের হাত থেকে বাঁচাও বিপন্ন মানুষকে।’

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী দামেশকে তাঁর বিরাট কামরায় সেনাপতি ও কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘ক্ষমতা লাভের জন্য নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা ও নিজেরাই শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেননি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের অনেক রক্ত ঝরিয়েছি, ক্ষয় করেছি নিজেদের অনেক শক্তি। এই দীর্ঘ সময়ে শত্রুরা তাদের শক্তি আরও বহু গুণে বৃদ্ধি করে নিয়েছে। ফিলিস্তিন তারা শুধু দখলই করেনি, সেখানে তারা তাদের স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

    জাতি আমাদের হাতে তাদের স্বার্থ ও সম্মান রক্ষার জন্য অস্ত্র তুলে দিয়েছে। আমরাও স্বেচ্ছায় এ কঠিন দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে সৈনিকের খাতায় নাম লিখিয়েছি। জনগণ এই আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে, যেন আমরা শত্রুদের নির্মূল করে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন নিশ্চিত করি। যেন আরবের পবিত্র ভূমি থেকে কাফেরদের বিতাড়িত করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হেফাজত করি।

    আমি জানি, আপনারা কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পরেছেন। কিন্তু আমি বলতে চাই, ওটা যুদ্ধ ছিল না, ওটা ছিল ভ্রাতিঘাতি সংঘাত। গৃহযুদ্ধ আমাদের অনেক সময় ও শক্তি নষ্ট করেছে কিন্তু তাতে জাতির কোন কল্যাণ হয়নি। আমরাই আমাদের মেরেছি আর পরস্পর নিঃশেষ হয়েছি। কতিপয় গাদ্দারের কারণে জাতির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেলো।’

    সালাউদ্দিন আইয়ুবী বললেন, ‘বন্ধুরা, আসল যুদ্ধ সবেমাত্র শুরু হতে যাচ্ছে। আপনারা কেন এই যুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছেন তা ভাল মতো বুঝে নিন। কোন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা অস্ত্র হাতে নেইনি। কোন দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করাও আমাদের টার্গেট নয়। পাশবিক শক্তি আজ মানবিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। মানুষের জীবন আজ বিপন্ন হতে চলেছে। এ জমিন আল্লাহর, এখানে হুকুম চলবে আল্লাহর। কারণ আল্লাহই ভাল জানেন কিসে মানুষের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ। মানুষের জীবনকে শান্তিময় করার জন্যই তিনি তাঁর রাসূলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন ইসলাম।

    একমাত্র ইসলামই মানবতার রক্ষাকবচ। এখানে কোন অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপ নেই। আছে শাশ্বত কল্যাণ ও মুক্তির দিকনির্দেশনা। রাসূলই আমাদের নেতা। কোরআন আমাদের সংবিধান। আমরা মানবতার স্বার্থে এই শাশ্বত জীবন বিধান গ্রহণ করার জন্যই সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই। আমরা তাই অবিনাশী সত্য ও চির সুন্দরের আপোষহীন সৈনিক। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সভ্যতার সংরক্ষণ ও মানবতার কল্যাণ। অতএব মনকে জীবন্ত ও সতেজ করে তুলুন। কঠোর শপথ নিন, অশুভ, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। মানুষ বসবাস করবে স্বাধীন পৃথিবীতে, একমাত্র আল্লাহর গোলামী ছাড়া আর কারও গোলামী করতে সে বাধ্য নয়। কেবল এ পথেই মানব জাতি আপন মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

    বন্ধুগণ, এই লক্ষ্য হাসিলের জন্যই আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছুটে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ইসলামের বিজয় নিশান উড়িয়ে দিয়েছেন দেশ হতে দেশান্তরে। তারেক বিন জিয়াদ স্পেনের মাটিতে জ্বেলেছেন সত্যের আলো। মুহাম্মদ বিন কাসিম এই আলো নিয়েই পৌঁছেছিলেন সুদূর ভারতে। তাদের পদচিহ্ন ধরে ভবিষ্যৎ বংশধরদের দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বাণী সেখান থেকে আরও দূরদূরান্তে পৌঁছে দেয়া। কিন্তু আল্লাহর সৈনিকরা যখন গাফলতির ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো তখন আল্লাহর রাজত্ব ক্রমশ সংকীর্ণ হতে শুরু করলো।

    আফসোস! শত্রুরা এখন আমাদের ঘরে এসে বসে আছে। এখন তারা আমাদের কাবাঘর ও নবীর (সা.) রওজা মুবারক ধ্বংস করার পায়তারা করছে। কেমন করে এমনটি সম্ভব হলো? ব্যক্তির মধ্যে যখন বাদশাহ হওয়ার খায়েশ জাগে আর মানুষের মধ্যে সংকীর্ণ জাতীয়তার উন্মাদনা সৃষ্টি হয় তখন মানবতা বিপর্যস্ত হয়। তখন ইসলামের বিকাশ না হয়ে বরং তা সংকীর্ণ হতে থাকে। শাসক তার গদী ও ক্ষমতার লোভে ইসলামই বিসর্জন দেয় না, নিজের লজ্জাবোধও বিসর্জন দিয়ে দেয়।

    আজ বিশ্বব্যাপী সভ্যতার সংকট ও সার্বিক অবনতির কারণ শাসকবৃন্দের ক্ষমতা ও গদীর নেশা এবং মানুষের সীমাহীন লোভ ও ধনরত্নের প্রতি প্রবল আগ্রহ। প্রকৃত ঈমানদার দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব করে আর এখন দুনিয়া আমাদের উপর চেপে বসে আছে। দুনিয়ার মোহে আমরা পরকালের পরিণতির কথাও ভুলে গেছি। কে মানবতার প্রকৃত বন্ধু আর কে শত্রু সে বিচারের বিবেকও হারিয়ে ফেলেছে মানুষ। ফলে আমাদের বন্ধু ও শত্রুর পরিচয়ও আজ কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।

    এবার সামরিক শক্তির প্রসঙ্গে আপনাদের কিছু বলতে চাই। জাতির ভাগ্য অস্ত্রের মুখেই নির্ধারিত হয়। যাদের হাতে অস্ত্র থাকে ইতিহাস লেখা হয় সেই সব মুজাহিদদের নামে। যতদিন মুজাহিদরা নিজেদেরকে জাতির সেবক মনে করে ততোদিন তারা থাকে অজেয়। কিন্তু যখন সেই বাহিনীর সেনাপতি নিজেকে বাদশাহ ভাবতে আরম্ভ করে আর তার মুজাহিদরা আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলতে শুরু করে তখন তাদের বাহুতে আর কোন শক্তি থাকে না।

    তাদের খাপ খোলা তরোয়ালগুলো ঢুকে যায় খাপের ভেতর। তাদের মন থেকে হারিয়ে যায় জাতির সম্মান ও গৌরব রক্ষার আবেগ। তাদের অধঃপতন হতে হতে এই পর্যায়ে পৌঁছে যে, অবশেষে তারা নিজের ঈমানের দাবী পূরণেও আর সক্রিয় থাকে না। ধর্মকে তখন তারা ব্যবহার করতে শুরু করে প্রজাদের ধোঁকা দেয়ার কাজে। গোপনে শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করে তারা। প্রজাদের উপর নিজেদের শাসন চালাতে ব্যবহার করে আল্লাহর নাম।

    আমরা আজ ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার জন্য আপন বাড়ী ঘরের মায়া ত্যাগ করে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য একত্রিত হয়েছি। আমরা ক্ষমতা ও সম্পদের মোহ থেকে নিজেদেরই কেবল মুক্ত করিনি, যারা ক্ষমতা ও সম্পদের পূজারী তাদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে জাতিকে মুক্ত করেছি তাদের কবল থেকে। এতদিন জাতির আস্তিনের ভেতর লুকিয়েছিল যে বিষধর সাপ আমরা তার মাথা গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। এখন যদি আমরা হেরে যাই তবে তার কারণ একটাই হবে, আর তা হলো আমাদের নিয়তের ত্রুটি ও গণ্ডগোল। এ জন্যই আমি আপনাদের ময়দানে পা বাড়াবার আগে এ ব্যাপারে সতর্ক করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমরা যদি আমাদের নিয়তকে পরিচ্ছন্ন করতে পারি, আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহর রহমাত আমাদের বিজয়ের জামিনদার হয়ে যাবে।’

    সুলতান আইয়ুবী এমন আবেগময় দীর্ঘ বক্তৃতায় অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু তিনি যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে অভিযানে বেরোতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে সকলকে মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করার জন্য এ ভাষণ জরুরী হয়ে পড়েছিল।

    উপস্থিত সবাই ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সেনাপতি ও কমান্ডার। এদের মধ্যে ছিলেন সেনাপতি মুজাফফরউদ্দিন। যিনি একজন যোগ্য ও বীর সেনাপতি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এক সময় তিনি সুলতানের সঙ্গ ছেড়ে তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন এবং সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াইতেও অংশ নিয়েছিলেন। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার ফিরে এসেছেন সুলতানের বাহিনীতে। এ ছাড়া ছিলেন সেনাপতি তকিউদ্দিন, আফজালউদ্দিন, ফররুখ শাহ এবং মালেক আদিলের মত বীর ও যোগ্য সেনাপতিবৃন্দ। এদের কেউ কেউ ছিলেন সুলতান আইয়ুবীর নিজ বংশের এবং রক্ত সম্বন্ধীয় আত্মীয়। আর ছিলেন সেনাপতি কাকবুরী, যিনি সুলতান আইয়ুবীর দক্ষিন হস্ত রূপে পরিচিত ছিলেন। এদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না, যার কৌশল, দক্ষতা ও তেজস্বীতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এমনি একদল সুদক্ষ সেনাপতি নিয়ে সুলতান আইয়ুবী ফিলিস্তিন অভিমুখে অভিযান চালাতে যাচ্ছিলেন। তার চোখের সামনে তখন ভাসছিল মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস, যেখান থেকে আমাদের প্রিয় নবী মেরাজে গমন করেছিলেন।

    এ অভিযান ছিল খুবই বিপদসঙ্কুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ক্রুসেডদের সামরিক শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বই কেবল বেশী ছিল এমন নয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিক দিয়েও ক্রুসেড বাহিনী ছিল সুবিধাজনক অবস্থানে। ক্রুসেডাররা উল্লসিত ছিল এ জন্য যে, তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট মজবুত ও সংহত করে নিতে পেরেছে। তারা নিজেদের মাটিতে থেকে যুদ্ধ করবে, ফলে তাদের রসদের ঘাটতি পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী তার এলাকা থেকে বহু দূরে যুদ্ধ করতে আসবে। অনেক বাঁধা মাড়িয়ে দীর্ঘ পথ তাদেরকে রসদপত্র বহন করে আনতে হবে।

    যুদ্ধের স্বাভাবিক বিবেচনায় সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও আক্রান্ত বাহিনীর চাইতে আক্রমণকারী বাহিনী থাকবে বেকায়দায়। এ জন্য আক্রমণকারী সৈন্য সংখ্যা আক্রান্ত বাহিনীর ছয়গুন না হলেও দ্বিগুণ তো অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু সুলতান আইয়ুবীর বাহিনী দ্বিগুন তো দূরের কথা, সমানও ছিল না। বরং খৃস্টান বাহিনীর চাইতে অনেক কম সৈন্য নিয়েই সুলতানকে যুদ্ধযাত্রা করতে হচ্ছিল।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, এ যুদ্ধ অনেক সময় নেবে। সুলতান পরাজয় মেনে না নিয়ে ঝটিকা আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত রাখবেন খৃস্টানদের। আর খৃস্টানরা উন্নত অস্ত্র, বিপুল রসদসম্ভার, অধিক সৈন্য আর আপন ভুবনে যুদ্ধ করার সুবিধার কারণে পরাজয় মেনে না নিয়ে একের পর এক প্রতিহত করে যাবে সুলতানের প্রতিটি আক্রমণ। এই মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আইয়ুবীর সৈন্যরা তৈরী হচ্ছিল। তারা ভাবছিল, হয়তো দীর্ঘ দিন আর বাড়ী ফেরা সম্ভব হবে না। হয়তো এ জীবনে আর কোন দিনই বাড়ী ফিরতে পারবে না তারা। কিন্তু তাতে কোন আফসোস ছিল না তাদের।

    সুলতান আইয়ুবীও তাদেরকে এ কথাটিই বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি সৈন্য ও সেনাপতিদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, তারেক বিন জিয়াদের ইতিহাস। বলছিলেন, ‘বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে আমাদেরও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সমস্ত নৌযানগুলো আগুন লাগিয়ে পুড়ে ফেলার মত সাহস ও হিম্মত রাখতে হবে। পিছু হটার সব পথ বন্ধ না করলে বিজয় আমাদের পদচুম্বন করবে না। এই অনুভূতি নিয়ে ময়দানে পা বাড়াতে হবে আমাদের, এটাই আমার জীবনের শেষ যাত্রা, আর কোন দিন আমরা কেউ স্বদেশ ও স্বজনদের কাছে ফিরে আসতে পারবো না।’

    কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সুলতান আইয়ুবী বিশ্বাস করতেন, কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও দুনিয়ায় আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করা এমন ফরজ, যে দায়িত্ব আল্লাহ তাকে অর্পন করেছেন। আল্লাহ মুসলমানদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার যে আদেশ দান করেছেন এটাই তার জীবনের সবচে বড় ফরজ। এ দায়িত্ব দুনিয়ার সকল কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অধিকাংশ দেশ আল্লাহর আইনের শাসনে আনয়ন করা ও মানব জাতিকে আল্লাহর আনুগত্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের প্রকৃত কাজ। তিনি সমস্ত সৈন্য বাহিনীকে একত্রিত করে তাদের মধ্যে এই চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন।

    সুলতান আইয়ুবীর অন্তর দৃষ্টি ভবিষ্যতের আলো-অন্ধকার যেন পুরোটাই দেখতে পাচ্ছিলো। সেই আলোকে তিনি হাতিন অঞ্চলকেই আগামী যুদ্ধের মোক্ষম ক্ষেত্র বিবেচনা করলেন।

    ফিলিস্তিনের এক অখ্যাত পল্লী ছিল হাতিন। কিন্তু সুলতান আইয়ুবীর সংকল্প ও পরিকল্পনার কারণে এই অঞ্চলটি পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন মহিমা ও ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। খৃস্টান ঐতিহাসিকরা সুলতান আইয়ুবীর চিন্তা ও দূরদর্শিতা দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। ক্রুসেড বাহিনীর সম্মিলিত শক্তিকে হাতিন অঞ্চলে টেনে আনা, অভাবিত চাল ও রণ কৌশলের মাধ্যমে বিশাল খৃস্টশক্তিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে সুলতান আইয়ুবী নিজেকে এক দিগ্বিজয়ী সেনানায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। খৃস্টান রাজন্যবর্গের সম্মিলিত বাহিনীর মাত্র একটি দল ছাড়া সব কয়টি দল এ যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে এবং পরাজিত বাহিনীর অসংখ্য সৈন্য বন্দীত্ব কবুল করে নিজেদের আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয়।

    সামরিক বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধে সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা বিভাগ এবং তার কমান্ডো বাহিনীর বিস্ময়কর তৎপরতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে বাকার বিন মুহাম্মদ ও কুলসুমের তৎপরতা ছিল অবিস্মরণীয়। বাকার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও প্রয়োজনীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ করে তা সুলতান আইয়ুবীকে পৌঁছে দিয়েছিল। কুলসুম রাজকীয় বিলাসিতা ও সুখের জীবন উপেক্ষা করে আইয়ুবীর সৈন্যদের জন্য গোপন তথ্য সরবরাহ করেছে। তারা এবং তাদের মতো অসংখ্য গোয়েন্দা, যাদের নাম মানুষের দৃষ্টির অন্তরালেই রয়ে গেছে, তাদের ত্যাগ, কোরবানী ও শাহাদাতের বিনিময়ে রচিত হয়েছে নতুন ইতিহাস। আল্লাহর রাহে জীবন বিলিয়ে দেয়ার তামান্না নিয়ে যেসব মুজাহিদ হাতিনের ময়দানে রক্ত দিয়েছে তাদের ত্যাগের বিনিময়ে হাতিনের মত নগণ্য গ্রাম ইসলামের ইতিহাসে স্মৃতির নিদর্শন হয়ে আছে।

    সুলতান আইয়ুবী সর্বদা জুম্মার দিনে তার অভিযানের সূচনা করতেন। কারণ এ দিনটিকে তিনি আল্লাহর অধিক পছন্দনীয় ও পবিত্র দিন মনে করতেন। এই পবিত্র দিনে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর কাছে নতজানু থাকে। যখন এই দিনে সৈন্যরা অভিযানে বের হয় তখন সমগ্র জাতি আল্লাহর কাছে তাদের সফলতা কামনা করে দোয়া করতে থাকে।

    হাতিনের ময়দানে যাওয়ার জন্যও তিনি জুমার দিন বেছে নিলেন। দিনটি ছিল ১১৮৭ সালের ১৫ মার্চ। সুলতান আইয়ুবী তার বিশাল বাহিনীর মাত্র একটি ব্যাটেলিয়ান সঙ্গে নিয়ে ক্রাকের কাছে ক্যাম্প করে বসলেন।

    খৃস্টান গোয়েন্দারা দ্রুত এই খবর সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিল। গোয়েন্দারা বললো, ‘সুলতান আইয়ুবী ক্রাকের কাছে অবস্থান নিয়েছেন। সম্ভবত তিনি ক্রাক শহর অবরোধ করবেন।’

    কিন্তু সুলতানের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। এটা ছিল হজ্জের কাফেলা যাতায়াতের সময়। মিশর ও সিরিয়ার হজ্জ কাফেলাগুলো এই পথে যাতায়াত করতো। খৃস্টান দুর্বৃত্তরা এই সব কাফেলায় আক্রমণ চালাতো। এ সব আক্রমণ চালানো হতো ক্রাকের খৃস্টান সরকারের সহায়তায়। ক্রাকের সম্রাট শাহ আরনাত কুখ্যাত লুটেরা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।

    সুলতান আইয়ুবী চাচ্ছিলেন হজ্জ কাফেলাগুলো যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। এ জন্যই তিনি ক্রাকের কাছে গিয়ে অবস্থান নিলেন। তিনি জানতেন, তার এ উদ্দেশ্যের কথা খৃস্টানরা ধারনা করবে না। তারা ভাববে, সুলতান তাদের ওপর আক্রমণ করার জন্যই ওখানে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে মুসলিম কাফেলায় আক্রমণ করার চিন্তা যেমন বাদ দেবে তেমনি আক্রান্ত না হওয়ায় তারা থাকবে অজানা আশঙ্কা ও পেরেশানীতে। এতে দুশমনের মনোবল ভেঙ্গে পড়বে।

    ক্রাকের সন্নিকটে অবস্থান নেয়ায় সুলতানের দুটো উদ্দেশ্যই পূরণ হলো। ক্রুসেড বাহিনী সুলতানের চালাকি বুঝতে পারলো না। তারা ক্রাকের প্রতিরক্ষা জোরদার করার জন্য তাদের বাহিনীকে সদা প্রস্তুত অবস্থায় বসিয়ে রাখলো কেল্লার ভেতর। এদিকে হজ্জ কাফেলাগুলো নির্বিঘ্নে এগিয়ে গেল কাবার দিকে। সুলতান আইয়ুবী তার সেনাপতি ও কমান্ডারদের বুঝিয়ে দিলেন, কাফেলাগুলো চলে গেলে তাদের কি করতে হবে।

    সুলতানের ক্রাক অবরোধের ব্যাপারটি ছিল বেশ মজার। একদিন গভীর রাতে ক্রাকের রাজমহলে হঠাৎ যেন ভুকম্পন শুরু হয়ে গেল। শাহ আরনাতকে মাঝরাতে জাগানো হলো। তাকে বলা হলো, সুলতান আইয়ুবী ক্রাক শহর অবরোধ করে বসেছেন। শহর প্রাচীরের বাইরে সুলতানের বিশাল বাহিনী ক্যাম্প করে বসেছে। শাহ আরনাত হতচকিত হয়ে উঠে বসলেন। ভীতচকিত কণ্ঠে বললেন, ‘কি বললে? সুলতান আইয়ুবী শহর অবরোধ করেছেন?’

    কুলসুম তখন তার পাশেই ছিল। সে শাহ আরনাতের সাথে দৌড়ে শহরের মেইন গেটে গেল। সেখানে দেয়ালের উপর উঠে দেখলো প্রাচীরের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে শত শত মশাল জ্বলছে। বেশীর ভাগ মশালই নড়াচড়া করছে, অর্থাৎ সেখানে তাঁবু টানানো হচ্ছে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ঘোড়ার চি হি হি শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

    শাহ আরনাত আইয়ুবীর অবরোধ ঠেকাতে শহরের প্রাচীরের উপর সৈন্য সমাবেশ করলেন। শহরের মেইন গেটের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দৃঢ় করলেন। শাহ আরনাত ছুটাছুটি করে সৈন্যদের নানা রকম নির্দেশ দিচ্ছিলেন, কুলসুমের দিকে তার কোন খেয়াল ছিল না।

    কুলসুম ফিরে গেল মহলে। শাহ আরনাতের রক্ষীরা তার নির্দেশে ছুটাছুটি করছিল। মহলের পাশে দাঁড়িয়েছিল শাহী গাড়ী। এ গাড়ীতে করেই কুলসুম প্রতিদিন ভ্রমণ করতে যায়। গাড়ীর পাশে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাকার বিন মুহাম্মদ। মোট কথা, ক্রাকের রাজমহলের প্রতিটি ব্যক্তিই তখন নিজ নিজ দায়িত্বে তৎপর ছিল।

    কুলসুম আদেশের ভঙ্গিতে বললো, ‘সায়বল। গাড়ী এদিকে আনো।’

    বাকার যখন গাড়ী আনলো, তখন কুলসুম তার ওপর উঠে বসলো ও গাড়ী একদিকে চালাতে হুকুম দিল। শাহ আরনাতের অন্দর মহলের মেয়েরা সবাই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। তারা মহলের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল রক্ষীদের ছুটাছুটি। হঠাৎ তারা দেখতে পেলো, প্রিন্সেস লিলি গাড়ীতে উঠে গাড়ী চালককে গাড়ী চালাতে হুকুম করছে। তাদের মধ্যে এক মেয়ে রাগে দাঁত পিষে বললো, ‘এ হতভাগী কোন মুসলমানের বেটি, অথচ সে নিজেকে রাজরাণী মনে করে। তাকে শায়েস্তা করতেই হবে।’

    ‘সময় এসেছে।’ অন্য এক মেয়ে বললো, ‘সুলতান আইয়ুবীর অবরোধ খুব শক্ত ও ভয়ংকর হয়। তিনি অগ্নিবান নিক্ষেপ করবেন। মেনজানিক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করবেন। তখন শহরের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। সে সময় আমরা ওই মুখপোড়া ডাইনীকে শায়েস্তা করতে পারবো। দেখবে দু’দিনেই তার দেমাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’

    ‘তুমি আর বাহাদুরী করো না। তুমি না বলেছিলে তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে যে জেনারেল তাকে দিয়ে ঐ মেয়ের দেমাগ ঠাণ্ডা করে দেবে? কই, কিছুই তো করতে পারলে না।’ বললো অন্য আরেক মেয়ে।

    ‘তিনি সুযোগ করে উঠতে পারেননি। এবার দেখো ঠিকই সুযোগ এসে যাবে।’ আগের মেয়েটি বললো, ‘আগামীকাল সন্ধ্যা নাগাদ শহরের কি অবস্থা হয় দেখে নিও। সম্রাট আর শাহজাদী লিলির দিকে তাকাবারও ফুসরত পাবে না।’

    কুলসুম গাড়ী নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এক স্থানে পৌঁছলো। গাড়ী দাঁড় করিয়ে সে বাকারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাদের কোন লোক ভেতর থেকে কি ফটক খোলার ব্যবস্থা করতে পারবে?’

    ‘সময় মতো চেষ্টা করে দেখা যাবে।’ বাকার বললো, ‘এই সৈন্য বাহিনী আমাদের কিনা তা আমি নিশ্চিত নই। আমি বিস্মিত হচ্ছি এই ভেবে যে, যদি এরা আমাদের বাহিনীই হবে তবে তারা আগে কেন সংবাদ দেয়নি। সুলতান আইয়ুবী তো এমন ভুল করেন না। সকাল হলেই স্পষ্ট জানা যাবে, এ বাহিনী আসলে কার?’

    ‘যদি এরা সুলতানের বাহিনী হয় তবে কি আমরা এখান থেকে পালাতে পারবো?’ কুলসুম জিজ্ঞেস করলো।

    ‘সেটা অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।’

    ‘এই বিশৃংখল অবস্থায় আমি আরনাতকে সহজেই হত্যা করতে পারি।’

    এমন কাজ খবরদার করবে না।’ বাকার বললো, ‘সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করার সময় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তিনি পালাতে না পারেন।’

    ‘তাহলে আমি এখন কি করবো? এ অবস্থায় আমাদের কি কিছুই করণীয় নেই?’

    ‘আছে। তবে তার আগে দেখতে হবে এটা সুলতানের বাহিনী কিনা? আর শাহ আরনাত কোন দিক থেকে কিভাবে অভিযান চালান তাও আমাদের দেখতে হবে।’

    কুলসুম আবেগ ও উত্তেজনায় টগবগ করছিল। ঠিক কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না সে। তার অস্থিরতা লক্ষ্য করে বাকার বললো, ‘এখন অবস্থা অন্য রকম হয়ে গেছে। আমি খবর পেয়েছিলাম তিনি সৈন্যদের নিয়ে গেলিলি সাগরের দিকে যাবেন। কিন্তু…’

    ‘কিন্তু তিনি ক্রাক অবরোধ করে ঠিক কাজই করেছেন। এখন আমাদের উচিত তাকে সহায়তা করা।’

    ‘থামো। এতো উতলা হয়ো না। নিজেকে সংযত করো। কি করতে হবে সময় মতো আমি তোমাকে বলবো। চলো। এখানে আর বেশীক্ষণ দেরী করা ঠিক হচ্ছে না।’ বাকার বললো, ‘চলো ফিরে যাই।’

    এই হট্টগোলের মধ্য দিয়েই কেটে গেল রাত। প্রভাতের আলো ফুটতে শুরু করলো পূর্ব দিগন্তে। ক্রাকের প্রাচীরের উপর দূরপাল্লার কামানগুলো অগ্নিবর্ষণ করার জন্য মুখ হা করে বসেছিল। মেনজানিকগুলো প্রস্তুত হয়েছিল পাথর ও অগ্নিবান নিক্ষেপের জন্য। সৈন্যরা প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল সম্রাট আরনাতের নির্দেশের অপেক্ষায়।

    সম্রাট শাহ আরনাত প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলেন সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর দিকে। যখন তিনি দেখতে পেলেন ওখানে মুসলিম বাহিনীর নিশান উড়ছে তখন তিনি নিশ্চিত হলেন এটা সুলতান আইয়ুবীরই বাহিনী। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না, সুলতান আইয়ুবী এই বাহিনীর সাথে আদৌ আছেন কি নেই।

    তিনি বাহিনীর সজ্জা দেখে বিস্মিত হলেন। বাহিনীর সজ্জা মোটেও অবরোধের মত নয়। তারা তাঁবু টানিয়ে ক্যাম্প করেছে ঠিক, কিন্তু সৈন্যরা প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে। হামলা করার কোন তৎপরতাই তাদের মধ্যে নেই।

    সেদিনটি কেটে গেল নির্বিঘ্নে। কোন দিক থেকেই কোন হামলা হলো না। এভাবেই কাটলো আরও পাঁচটি দিন। আরনাতের অপেক্ষা অস্থিরতায় পরিণত হলো। কিন্তু তিনি জানতে পারলেন না, রাতে সুলতান আইয়ুবী অশ্বপৃষ্ঠে আরোহন করে তার বিশ্বস্ত কমান্ডো সৈন্যদের রাস্তায় দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন, যে রাস্তায় হাজীরা যাতায়াত করবে।

  • রিচার্ডের নৌবহর

    রিচার্ডের নৌবহর

    রিচার্ডের নৌবহর

    সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী শৈশব কালে তাঁর পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুবীর কাছ থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসের অবমাননা ও সেখানকার মুসলমানদের ওপর জঘন্য বর্বরতার কাহিনী শুনেছিলেন। তাঁর পিতা এ কাহিনী শুনেছিলেন তাঁর দাদা শাদী আইয়ুবীর কাছ থেকে।

    শৈশবের শোনা সেই নির্মমতার কাহিনী তাঁর ছোট্ট হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বয়স বাড়লেও সেই কাহিনীর কথা তিনি কোন দিন ভুলতে পারেননি। বরং সুলতান আইয়ুবী অনুভব করছিলেন, যতই তাঁর বয়স বাড়ছে ততোই তাঁর রক্তে, তাঁর শিরায় শিরায় সেই বর্বরতার তিক্ত স্মৃতি প্রচণ্ড আলোড়ন ও ঝড় তুলছে।

    শৈশবে যখন তিনি এ কাহিনী শুনেছিলেন তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বায়তুল মোকাদ্দাস তিনি একদিন মুক্ত করবেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই শপথ তাঁর দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে। আজ বায়তুল মোকাদ্দাস মুক্ত করতে এসে তাঁর মনে পড়ে গেল, তিনিও তাঁর দুই সন্তানকে শৈশবেই এ কাহিনী শুনিয়েছেন। তাদের একজন এখনো কিশোর থাকলেও অন্যজন এরই মধ্যে যৌবনের সিংহ দরোজা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জেহাদের ময়দানে। কিশোর আল মালেক আল জাহেরের অন্তরেও নিশ্চয়ই এমনি প্রতিজ্ঞা দানা বেঁধে উঠতে শুরু করেছে। আর যুবক আল আফজাল তো এই সপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই যোগ দিয়েছে সেনাদলে।

    তিনি ভাবছিলেন, আজ যদি আমি সফল হতে না পারি তবে কি এ সপ্ন মুছে যাবে? না, নিশ্চয়ই আল আফজাল ও মালেক আল জাহের এই সপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আবারো কোন বাহিনী নিয়ে ছুটে আসবে জেরুজালেম। মসজিদুল আকসা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই জিহাদ চলবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। মুক্তির ময়দান কখনো নিরব হবে না, হতে পারে না।

    ‘উদ্দেশ্যহীন ভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল’। আল আফজাল যখন সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছিল তখন তিনি তাঁকে বললেন, ‘এ কথা তোমার দাদা মরহুমের। তিনি এ কথা আমাকে ঠিক সেই সময় বলেছিলেন, যখন আমি চাচা শেরকাহ-এর সঙ্গে ক্রুসেডের বিরুদ্ধে প্রথম জিহাদে যাত্রা করি।

    তিনি আরও বলেছিলেন, আমার মনে হচ্ছে, তুমি কোনদিন এ দেশের আমীর হবে। এমনও হতে পারে তুমি সুলতান হয়ে যাবে। তবে যাই হও না কেন, একটা কথা মনে রাখবে, আজ থেকে তুমি কেবল আমার বেটা নও, তুমি এক মহান জাতির সন্তান। কোরআনে বলা হয়েছে, সন্তান মা বাবার খেদমত করবে। এখন তোমার মা ও বাবা হচ্ছে তোমার দেশ ও জাতি। সন্তানের উচিত নয় মা বাবাকে দুঃখ দেয়া। আল্লাহ্‌ কঠোর ভাষায় এ ব্যাপারে সাবধান বাণী উচ্চারন করেছেন।

    তোমাকে আল্লাহ্‌ তাঁর অনন্ত সৃষ্টি ধারায় একটি বিশেষ সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছেন। সময়ের সেই প্রয়োজনটি কি তা তোমাকে বুঝতে হবে। তোমাকে খেয়াল রাখতে হবে জাতির কোন খেদমতটি তুমি সবচে উত্তম ভাবে সম্পাদন করতে পারবে। নিজের আরাম আয়েশ ও সুখ ভোগের জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহ্‌র অনন্ত সৃষ্টিরাজির মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। সভ্যতার অগ্রগতি সাধনের জন্য। মানবতার কল্যাণের জন্য। আপন জাতির দুঃখ মোচনের জন্য।

    প্রিয় বেটা আমার! আপন জাতিকে দুঃখ দিও না। তাকে নিরাশ ও হতাশ করো না। জাতির পক্ষ থেকে তোমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয় তা সুষ্ঠু ভাবে পালন করো’।

    সুলতান আইয়ুবী তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘হে আমার নয়নের মনি! তোমার দাদা বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হয়ে যায় তারচে সৌভাগ্য আর কার! এমন শহীদদের কখনও ভুলে যাবে না। যে জাতি তার শহীদ সন্তানদের ভুলে যায় আল্লাহ্‌ নিজেও সে জাতিকে ভুলে যান। আর যে জাতির উপর থেকে আল্লাহ্‌র দৃষ্টি উঠে যায়, সে জাতির জন্য দুনিয়াটা জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়।

    তখন তাদের মসজিদ ও পবিত্র স্থানগুলো দুশমনের আস্তাবলে পরিণত হয়। তাদের কন্যাগুলো শত্রুদের বিলাসিতার সামগ্রী হয়ে যায়। দুনিয়ার কোথাও তারা একটু শান্তি ও স্বস্তির জায়গা খুঁজে পায় না’।

    বাপ আমার! মনে রেখো, এমন জাতির কিসমত থেকে সৌভাগ্য বের হয়ে যায়। তারা তখন পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যখন তোমাকে শাসন ক্ষমতায় বসানো হবে, তখন জাতিকে প্রজা ভাববে না।

    মনে রেখো, মানুষের ওপর শাসন করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের। যদি জনগণকে শাসন করতে গিয়ে আল্লাহ্‌র ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নাও তাঁর পরিণতি তোমার জন্য কখনো মঙ্গলময় হবে না। নিজেকে রাজাধিরাজ ভাবলে সেই পাপের শাস্তি পাবে মিশরের ফেরাউনদের মতো।

    ভেবে দেখো, কত শতাব্দী পার হয়ে গেছে, আজো মানুষ তাদের কথা মনে করলে ধিক্কার দেয়। আল্লাহ্‌র এমন অভিশাপ ও লানত তাদের কপালে জুটেছে যে, আল্লাহ্‌ তাদের মমি বানিয়ে রেখেছেন, যাতে তাদের কথা মানুষ কোন দিন ভুলতে না পারে। যাতে তাদের কথা মানুষ কোন দিন ভুলতে না পারে। যাতে যুগ যুগ ধরে তারা মানুষের অভিশাপ বয়ে বেড়ায়।

    যদি কখনো ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাও, মনে করবে আল্লাহ্‌ তোমার কাঁধে কোন বিরাট বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দেয়া এই বোঝা কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলা যেমন অন্যায়, এই দায়িত্বকে বোঝা না ভেবে একে নিজের দম্ভ প্রকাশের হাতিয়ার মনে করাও অপরাধ। মনে রেখো, ক্ষমতা দৃশ্যতঃ জাতির পক্ষ থেকে এলেও আসলে তা আসে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে।

    সরকারের সম্পদকে কখনো নিজের সম্পদ ভেবো না। বরং এসবকে ভাববে জনগণের জন্য দেয়া আল্লাহ্‌র নেয়ামত। সরকারকে হতে হবে জাতির আশ্রয়স্থল। জাতিকে যদি অর্ধাহারে রাখতে হয় সরকারী লোকজনকে থাকতে হবে অনাহারে। তাহলেই জাতির ভালবাসায় সিক্ত হবে সরকার। মসজিদের মিনারের মত সরকার প্রধানের মাথা থাকবে সবার উপরে। যেন তিনি দেখতে পান কেউ কোথাও বঞ্চিত হচ্ছে কিনা তার প্রাপ্য অধিকার থেকে।

    হে আমার প্রিয় বেটা! তোমার দাদা আরও বলেছেন, ‘সেই দিন তুমি মাথা উঁচু করে চলবে যেদিন তুমি মসজিদুল আকসা শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করতে পারবে। শান্তির ঘুম তুমি সেদিন ঘুমাবে, যেদিন তুমি মসজিদুল আকসায় বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করে নফল নামাজ পড়তে পারবে।

    আমাদের প্রিয় নবী(সাঃ) মেরাজে যাওয়ার আগে এই মসজিদুল আকসায় নফল নামাজ পড়েছিলেন। সে মসজিদের বারান্দায় যেদিন তুমি তোমার অশ্রু ঝরাতে পারবে, সেদিন ভাববে তুমি আল্লাহ্‌র রহমত পাওয়ার যোগ্য হয়েছো’।

    বাপ আমার! জেরুজালেমের অলিতে গলিতে কত যে নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেছিল, পবিত্র মসজিদের আঙ্গিনায় জাতির কত যে আদরের কন্যা সমভ্রম হারিয়েছিল, সে কথা স্মরণ হলে আজো আমার রাতে ঘুম হয় না। যে মসজিদে আমার প্রিয় রাসুল(সাঃ)এঁর মুবারক পা পড়েছিল, যে মসজিদে আমার রাসুলের পেশানী মুবারক সিজদায় পড়েছিল, সে মসজিদের অপবিত্রতার কথা স্মরণ হলে ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। মনে হয় আমি যেন নির্যাতিতের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি। যেন মসজিদুল আকসার বারান্দায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে শিশু ও নারীরা। যেন কেউ কম্পিত কণ্ঠে সেখানে আযান দিচ্ছে। সেই আযানের মধ্য দিয়ে সে যেন আমাকেই ডাকছে।

    তোমার দাদা বৃদ্ধ বয়সে কম্পিত হাতে আমার হাত আঁকড়ে ধরে বলেছিলেন, ‘বেটা, আমার জীবন ও যৌবন শেষ হতে চললো। যে কাজ আমি সম্পন্ন করতে পারিনি সে কাজের ভার আমি তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি। তুমি বায়তুল মোকাদ্দাসকে শত্রু মুক্ত করো। এইটিই হোক তোমার জীবনের লক্ষ্য। তুমি ক্ষমতায় গেলে শত্রুদের উপেক্ষা ও তুচ্ছ মনে করবে। তাতে তোমার সাহস ও মনোবল বৃদ্ধি পাবে। তুমি যদি আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা করতে পারো তবে মনে রেখো, আল্লাহ্‌র চাইতে ক্ষমতাধর কেউ নেই দুনিয়ায়। তুমি আল্লাহ্‌র ওপর আস্থা রাখতে পারলে আল্লাহ্‌ তোমার নেগাহবান হয়ে যাবেন। তখন তুমি নিশ্চিন্তে জাতির উপর শান্তির শাসন চালাতে পারবে।

    হয়তো তোমার শাসন ক্ষমতার বয়স দীর্ঘ হবে না। কুচক্রীদের চক্রান্তে উল্টে যাবে তোমার সুখের মসনদ। কিন্তু কুচক্রীদের সাথে মিলে গদী রক্ষা করতে যেয়ো না। জীবনে বেঁচে থাকার একটাই উদ্দেশ্য থাকবে, আর তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন। জীবনভর সেই পথে চলবে, যে পথ আল্লাহ্‌র প্রিয়, যে পথে চলার নির্দেশ দিয়েছে পবিত্র কোরআন’।

    সুলতান আইয়ুবী তাঁর সন্তান কে লক্ষ্য করে সেদিন বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান! আমি আমার পৈতৃক উত্তরাধিকার তোমার উপর ন্যস্ত করছি। আমি আমার পিতার মতই বলছি, আজ থেকে তোমরা আমার নও, মুসলিম জাতি ও মিল্লাতের সন্তান।

    আমি তোমাদের মাকেও বলে দিয়েছি, তুমি ভুলে যাও তোমার গর্ভে কোন সন্তান জন্ম নিয়েছিল। যদি ভুলতে না পারো তবে সন্তানকে আল্লাহ্‌র পথে দান করে দাও। কারণ আমি জাতির জন্য তোমার দুটি সন্তানকেই কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তোমাদের মাকে আমি আরো বলেছি, মনে করে দেখো, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সন্তানকে আল্লাহ্‌র পথে কোরবানী দিতে গিয়ে নিজ হাতে ছুরি চালিয়েছিলেন আপন সন্তানের গলায়।

    যদি তুমি কোন দোয়া করতে চাও তবে আল্লাহ্‌র কাছে এই দোয়া করো, তুমি যে সন্তানদের বুকের দুধ পান করিয়েছো সে দুধ যেন রক্ত হয়ে মসজিদুল আকসার পবিত্র বারান্দা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়। প্রতিজ্ঞা করো বেটা, আমি যদি বেঁচে না থাকি তবে বায়তুল মোকাদ্দাস তোমরা দুই ভাই মুক্ত করবে’।

    সুলতান আইয়ুবীর মনে পড়ে গেল তিনি এবার বায়তুল মোকাদ্দাস উদ্ধার অভিযান শুরু করার আগে তাঁর দুই সন্তানকেই কাছে ডেকেছিলেন। তিনি ১০৯৯ সালের যুদ্ধের সেই রক্তাপ্লুত ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের বলেছিলেন, ‘যাও বেটা। আল্লাহ্‌র সিপাই হও গিয়ে। আমি দোয়া করি, ব্যর্থতা যেনো কখনো তোমাদের স্পর্শ না করে। ভয়-ভীতি, লোভ ও অজ্ঞতা থেকে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করবে’।

    দুই ভাই রনাঙ্গনে যাওয়ার আগে সুলতান আইয়ুবীর সাথে দেখা করে তাকে সালাম করলো। তিনি তাদের সাথে মুসাফেহা ও কোলাকুলি করলেন। বললেন, ‘হৃদয়ে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে লড়াই করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদের নেগাহবান হোন’। তারা বাপের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলো। বড় ছেলে আফজাল ঘোড়ায় উঠতে উঠতে বললো, ‘মহান সুলতান! শুধু শহীদ হওয়াতে কোন কৃতিত্ব নেই। আমি শহীদ হওয়ার আগে বায়তুল মুকাদ্দাসের গলিতে শত্রুদের এত রক্ত প্রবাহিত করবো যে, আপনার ঘোড়ার পা যেন পিছলে যায়। আমরা দেখতে চাই, আপনি মসজিদুল আকসার ক্রুশ ও মূর্তি নিজ হাতে তুলে রাস্তায় খৃষ্টানদের নাপাক রক্তের মাঝে ফেলে দিচ্ছেন’।

    ‘কিন্তু সে রক্ত যেন নিরস্ত্র শহরবাসীর না হয় বেটা’। সুলতান আইয়ুবী বললেন।

    ‘সে রক্ত ক্রুসেড বাহিনীর বর্ম পরা নাইটদের হবে’। আল আফজাল বললো, ‘সে রক্ত সেই সব লৌহ পোশাকের ফাঁক গলে বের হবে, যে পোশাক পরে ক্রুসেড বাহিনী আজো গর্বের হাসি হাসে। আপনি দেখে নেবেন, ঈমানদারের অস্ত্র বেঈমান কাফেরদের লোহার পোশাক ছিন্নভিন্ন করার শক্তি রাখে’।

    ‘আল্লাহ্‌ তোমাদের কথায় বরকত দান করুন’। সুলতান আইয়ুবী বললেন। সন্তানদ্বয় পিতাকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে ঘোড়া হাকিয়ে দিল। এক সময় সুলতান আইয়ুবীর দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেল তাঁর দুই সন্তান।

    সুলতান আইয়ুবী বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে চল্লিশ মাইল দূরে ভূমধ্যসাগরের তীরে আসকালান শহরে সেই চিতা বাঘের মত বসে আছেন, যেন তিনি শিকার ধরার জন্য ওঁৎ পেতে আছেন। আবেগে তাঁর অবস্থা তখন টলোমলো। বিলম্ব না করে পারলে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস উড়ে যেতে চান। শিকারকে তাড়া করা বাঘের মতই জেরুজালেম ছুটে যেতে চাচ্ছিলেন তিনি। খৃষ্টানদের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়া করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ছটফট করছিল তাঁর মন। কিন্তু যুদ্ধের নিয়ম ও কৌশলের কথা চিন্তা করে তিনি তখনো আসকালানেই অবস্থান করছিলেন।

    জেরুজালেম ওখান থেকে আর মাত্র চল্লিশ মাইল। কিন্তু এ দীর্ঘ চল্লিশ মাইল রাস্তা যেন খই ভাজা তপ্ত বালি ও পাথরে বোঝাই। এটা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রতিরক্ষার প্রকৃতি-প্রদত্ত সুবিধা। তাছাড়া এ শহরটি শুধু শহরের প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল না। শহরের আশেপাশে দূর দুরান্ত পর্যন্ত ছোট ছোট কেল্লা গড়ে তোলা হয়েছিল শহরটি রক্ষার জন্য। সেই কেল্লাগুলো খৃষ্টানদের সুরক্ষিত সেনা ফাঁড়ি হিসাবে কাজ করছিল। সুলতান জানেন, শহরের প্রতিরক্ষার কাজে নিয়োজিত আছে খৃষ্টানদের টহলদার বাহিনীও। এরা শহরের বাইরে অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে পাহারা দেয় দূর দুরান্ত পর্যন্ত। এমন কড়া ও সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেড়াজাল ভেদ করে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছা যে কারো জন্যই এক দুঃসাধ্য ব্যাপার।

    সুলতান আইয়ুবীর আগমনের খবরে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও কঠিন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের এমন সাহস ছিল না যে তারা অগ্রসর হয়ে সুলতান আইয়ুবীকে আসকালান শহরে বাঁধা দেয় অথবা আক্রমণ চালায়। কারণ ক্রুসেড বাহিনী হাতিন রণাঙ্গন থেকে আসকালান পর্যন্ত সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর হাতে যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির শিকার হয়েছে এবং যে পরিমান রক্ত ও জান মালের ক্ষতি কবুল করেছে তাতে তাদের এ রকম সাহস করার কোন সুযোগ ছিল না।

    সুলতান আইয়ুবী বায়তুল মোকাদ্দাসের সব তৎপরতা ও খৃষ্টান জেনারেলদের গতিবিধি প্রতি মুহূর্তে অবগত হচ্ছিলেন। তিনি জানেন, বায়তুল মোকাদ্দাসের তখনকার শাসক সম্রাট গে অব লুজিয়ান হাতিনের রণক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দী হয়ে এখন দামেশকের কারাগারে বন্দী। তারপরও খৃষ্টান নাইট ও বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও তার জেনারেলরা সহজে এ শহরটি সুলতানের হাতে তুলে দেবে না।

    হাতিনের রণাঙ্গনে গে অব লুজিয়ান যে সব সৈন্য নিয়ে গিয়েছিলেন তার কিছু মারা গিয়েছিল, কিছু যুদ্ধবন্দী হয়েছিল। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পালাতে পেরেছিল, যাদের অধিকাংশই ফিরে গিয়েছিল জেরুজালেম। পলাতকদের মধ্যে সৈন্যদের চাইতে বেশী ছিল অফিসার এবং লৌহ পোশাকধারী নাইট। সুলতান জানেন, তারা অধিকাংশই আহত হয়ে বায়তুল মোকাদ্দাস এসে আশ্রয় নিলেও নাইটদের মধ্যে যে নৈতিক মনোবল (Moral courage) থাকে তা তাদেরকে আবার লড়াইয়ের ময়দানে টেনে আনবে। কারণ পদমর্যাদার সম্মান বজায় রাখতে না পারলে খৃষ্ট সমাজে তাদের বেঁচে থাকা হবে অর্থহীন।

    কিন্তু সাধারন সৈন্যদের মধ্যে এ নৈতিক মনোবল অবশিষ্ট ছিল না। তারা পালিয়ে জেরুজালেম পৌঁছেই সেখানে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে দিল। সেই আতংক দূর করার জন্য খৃষ্টান জেনারেল ও নাইটরা অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে।

    সুলতানের গোয়েন্দা বাহিনী যে খবর দিল তাতে তিনি জানতে পারলেন, বায়তুল মোকাদ্দাস শহরের ভেতরে খৃষ্টানদের সৈন্য সংখ্যা তখনো ষাট হাজার। তিনি আরও জানতে পারলেন, সুলতান আইয়ুবী শহরের পর শহর জয় করে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এ খবর ছড়িয়ে পড়লে উৎসাহী খৃষ্টানরা সুলতানকে বাঁধা দেয়ার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলে হাজির হচ্ছে পবিত্র শহরে। এদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। তারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহন করে ক্রুশের জন্য জীবন দিতে চায়। ওরা যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী না হলেও ওদের আবেগই একটা বিরাট অস্ত্র। কোন জনপদের জনগণ এভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তাদের পরাজিত করা খুব কঠিন। এদের কারণে শহরের প্রতিরক্ষা শক্তি নিঃসন্দেহে আরও মজবুত হয়েছে।

    জেরুজালেম শহরের প্রতিটি ফটকে তখন বিরাজ করছিল কড়া নিরাপত্তা প্রহরা। কিন্তু তারপরও দু’একটি ফটক খোলা রাখতে হচ্ছিল বিশেষ কারণে। কারণ যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা খৃষ্টান সৈন্যরা তখনো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বা একজন দু’জন করে ফিরে আসছিল জেরুজালেম। সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা এসব খবরও সুলতানকে সরবরাহ করছিল। সুলতান আইয়ুবী এসব পলাতক সৈন্যদের সাথে মিশে আরো কিছু গোয়েন্দাকে শহরে ঢুকে পড়ার হুকুম দিলেন। কারণ তিনি আশংকা করলেন এমনও সময় আসতে পারে, যখন ভেতরের গোয়েন্দারা বেরোতে পারবে না। কিন্তু নির্যাতিত খৃষ্টান সৈন্য হিসাবে এই নতুন গোয়েন্দারা কিছুটা সুবিধা আদায় করতে পারবে।

    সুলতানের হুকুম পেয়ে আরো কিছু গোয়েন্দা ছদ্মবেশে শহরে প্রবেশ করলো। তারা শহরের প্রতিটি আনাচে কানাচে ঘুরে দেখলো শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরন। শহরের প্রতিটি ফটক, প্রাচীরের অবস্থা, সৈন্যদের ব্যারাক সবকিছু তারা খুঁটিয়ে দেখলো এবং তাঁর একটি ম্যাপ হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে বেরিয়ে এলো শহর থেকে।

    সেখানকার মুসলমানদের অবস্থা তখন গৃহবন্দী পর্যায়ের। ঘর থেকে বেরোনোই তাদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠলো, শহর থেকে বেরোনোর তো প্রশ্নই আসে না। ফলে সুলতানের আশংকা সত্যে পরিণত হলো, মুসলিম গোয়েন্দাদের একটা অংশ আটকা পরে গেল ভেতরে।

    সুলতান বুদ্ধি করে নতুন গোয়েন্দা না পাঠালে শহর থেকে তথ্য পাচার করা লোকের অভাব দেখা দিতে পারতো। কিন্তু সুলতানের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহনের ফলে একটি অবশ্যম্ভাবী সংকটের হাত থেকে বেঁচে গেল মুসলিম বাহিনী।

    বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে দশ বারো মাইল দূরে আসকালানের পথে খৃষ্টানদের এক ফাঁড়ি। এখানে একশোর মতো ক্রুসেড সৈন্য অবস্থান করছিল।

    ১১৮৭ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের এক রাত। খৃষ্টান সৈন্যরা সবাই ক্যাম্পে ঘুমাচ্ছিল। বেশ কিছু তাবু দিয়ে বানানো হয়েছে ক্যাম্প। হঠাৎ ফাঁড়ির কাছে একটি বিস্ফোরণ হলো। সচকিত হলো জাগ্রত সৈন্যরা। বিস্ফোরণের শব্দে কারো কারো ঘুম ভেঙ্গে গেল।সৈন্যরা কিছু বুঝএ উঠার আগেই পর পর আরও দু’তিনটি বিস্ফোরণ ঘটলো একই রকম। সৈন্যরা তাকিয়ে দেখলো তাদের কয়েকটি তাবুতে আগুন জ্বলে উঠছে। তিন চারটি তাবু তখন জ্বলছে। হতবিহবল সৈন্যরা ভয়ে তাবু ছেড়ে এদিক ওদিক পালাতে লাগলো। সৈন্যরা চিৎকার দিয়ে যখন ছুটাছুটি আরম্ভ করলো তখনই তাদের উপর চারদিক থেকে শুরু হলো তীর বর্ষণ। প্রজ্জলিত তাবুর আলোকে সৈন্যদের ছুটাছুটি দেখা যাচ্ছিল। পেট্রোল ভর্তি হাড়ি নিক্ষেপের ফলে জ্বলে উঠেছিল আরো তাবু।

    সুলতান আইয়ুবীর এক কমাণ্ডো বাহিনী এ আক্রমণ পরিচালনা করছে। তারা মেঞ্জানিক নিক্ষিপ্ত পেট্রোল হাড়ির আলোয় তীর মেরে ধরাশায়ী করছিল ভীতসন্ত্রস্ত খৃষ্টান সৈন্যদের। খৃষ্টান সৈন্যরা তীর খেয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। ভয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল। তারা বুঝতে পারলো, সুলতান আইয়ুবীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেছে তারা। এ যাত্রা বাঁচার আর কোন আশা নেই।

    হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল তীর। কমাণ্ডো বাহিনীর কেউ একজন উচ্চস্বরে ঘোষণা করলো, ‘যদি বাঁচতে চাও তবে অস্ত্র সমর্পণ করে এক দিকে সরে দাড়াও’।

    অগ্নিশিখার তাণ্ডবলীলা চলছিল তাবুগুলোর ওপর। খৃষ্টান সেনাদের বাঁচার কোন আশা ছিল না। কমাণ্ডো বাহিনীর ঘোষণা শুনে যারা তখনো বেঁচেছিল দু’হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণ করলো। কমাণ্ডার গুনে দেখলো, মাত্র জনাত্রিশেক সৈন্য লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে।

    কমাণ্ডোরা খৃষ্টান সৈন্যদের অস্ত্রসস্ত্র ও ঘোড়াগুলো এক জায়গায় জড়ো করলো। জড়ো করা জিনিশগুলো পাঠিয়ে দেয়া হলো পেছনে। যখন সকালের সূর্য উদয় হলো তখন সেই পুড়ে যাওয়া ক্যাম্পের পাশে এসে দাঁড়ালো সুলতান আইয়ুবী অগ্রবাহিনীর প্রথম দলটি। তারা এখানে পৌঁছেই জানতে পারলো তাদের অগ্রাভিযানের পথ আরও বহুদূর পর্যন্ত নিরাপদ হয়ে আছে। গেরিলা বাহিনী ওখান থেকে আরো সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। তারা পথের পাশে দু’জন বা চারজনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ হয়ে ঝোপের মধ্যে বা টিলার ওপর কোন উঁচু পাথরের পিছনে বসে ওঁত পেতে থাকতো।

    যখন কোন খৃষ্টান অশ্বারোহী বা পদাতিক বাহিনী কাছে আসতো তখন অতর্কিতে আক্রমণ করে বসতো তাদের ওপর। ওরা টের পাওয়ার আগেই বিষাক্ত তীরের আঘাতে পথের ওপর লুটিয়ে পড়তো আরোহী। কমাণ্ডোরা এগিয়ে গিয়ে সরিয়ে নিতো তার ঘোড়া।

    খৃষ্টানদের দশ বারো জনের দলকে এগিয়ে আসতে দেখলে মাত্র দু’জন কমাণ্ডোই এভাবে তীর মেরে তাদের ঘায়েল করে ফেলতো। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতো না হামলা করতে। কারণ তারা জানে কোত্থেকে ছুটে এলো তীর তা বুঝে উঠার আগেই তাদের লাশগুলো লুটিয়ে পড়বে পথের ওপর।

    কখনো কোন হুশিয়ার দলের ওপর আক্রমণ করতে গিয়ে দু’একজন কমাণ্ডো যে শহীদ বা আহত হতো না এমন নয়। কিন্তু এরকম ঘটনা খুব কমই ঘটতো।

    এভাবেই খণ্ড যুদ্ধ চালাচ্ছিল কমাণ্ডোরা। তাদের কমাণ্ডার তাদের সাথে থাকতো না। কমাণ্ডোদের পথে পথে বসিয়ে দিয়ে তারা আরো সামনে এগিয়ে যেতো। কমাণ্ডোরা এদিক ওদিক লুকিয়ে থেকে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিত কখন আক্রমণ করতে হবে। এ ব্যাপারে কারো পরামর্শ বা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ ছিল না তাদের, কিন্তু তাদের ট্রেনিংই ছিল তাদের পরিচালক। তাদের বুদ্ধি ও বিবেকের সবগুলো দরোজা তারা খুলে রেখেছিল। তাদের তৎপরতা বলছিল, প্রতিটি কমাণ্ডোই যেন একেকজন দক্ষ সেনাপতি।

    হাতিনের যুদ্ধের পর সুলতান আইয়ুবী যে বড় শহরটি জয় করেছিলেন, সেখানে মুসলমানদের অবস্থা তিনি সৈন্যদের দেখিয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ চিত্তে তারা দেখছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদ, কোরআনের অবমাননা। শুনছিল যুবতী মেয়েদের করুণ কান্না, শিশু ও বুড়োদের রোদনধ্বনি।

    এ সব জনপদের মুসলমানদের চোখের চাহনিই বলছিল, এ যুদ্ধ কোন রাজা বাদশার রাজ্য লাভের যুদ্ধ নয়, এটা হচ্ছে নির্যাতিত মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। এ অনুভূতি প্রতিটি সৈনিকের ঈমানকে আরো সতেজ ও তরতাজা করে দিত।

    আসকালান শহরে সুলতান আইয়ুবী রাতে তেমন ঘুমোনোর সময় পেতেন না। কারণ কমাণ্ডো বাহিনীর বিভিন্ন দলের সংবাদ নিয়ে একের পর এক কাসেদ আসতেই থাকতো। বায়তুল মোকাদ্দাস থেকেও মাঝে মাঝে আসতো সেখানকার হুশিয়ার গোয়েন্দাদের পাঠানো রিপোর্ট। এদের অধিকাংশই আসতো রাতে। সুলতান আইয়ুবীর আদেশ ছিল, যে কোন সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই তা পৌঁছে দিতে হবে। তা সে গভীর রাত হোক বা তিনি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় হোক।

    যেহেতু কমাণ্ডোরা রাতের বেলাতেই বিভিন্ন ফাঁড়িগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে দখল করে নিতো সে জন্য রাতের বেলাতেই কাসেদরা ছুটতো খবর নিয়ে। তারা সুলতানকে বলতো, অমুক স্থানে খৃষ্টানদের এক সেনা ফাঁড়িতে আক্রমণ চালানো হয়েছে। সেখানে এতগুলো শত্রু সেনা নিহত ও এত জন বন্দী হয়েছে। জানাতো, এই অভিযানে এতজন কমাণ্ডো হতাহত হয়েছে। রিপোর্টের আলোকে তিনি বুঝে নিতেন কতটুকু রাস্তা পরিষ্কার ও বাঁধা মুক্ত হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী সুলতান আইয়ুবী তাঁর নকশায় রেখা টেনে অভিযানের পথ চিহ্নিত করতেন এবং নিজের সৈন্যদের অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিতেন।

    আসকালানে বসেই সুলতান আইয়ুবী সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের এক সম্মেলন ডাকলেন। এই সম্মেলনে নৌবাহিনীর এডমিরাল আলফারেসকেও আহবান করা হলো। আল ফারেসের কাছে যখন কাসেদ গিয়ে পৌঁছলো তখন তাঁর জাহাজ আসকালান থেকে বিশ মাইল দূরে। ভূমধ্যসাগরের মাঝে অবস্থান নিয়ে তারা দৃষ্টি রাখছিল সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায়।

    নৌকায় করে সেখানে গিয়ে পৌঁছতে কাসেদের মধ্যরাত পার হয়ে গেল। খবর পেয়ে আল ফারেস কাসেদের নৌকাতে করে রাতেই আসকালান এসে পৌঁছলেন।

    কাসেদ তাকে বললো, ‘সুলতান আইয়ুবী সমস্ত সেনাপতি ও কমাণ্ডারকেই এ সম্মেলনে ডেকেছেন’। আল ফারেস বুঝে নিলেন, বায়তুল মোকাদ্দাস আক্রমনের আগে এটাই হবে তাঁর সর্বশেষ যৌথ সভা। জাহাজ থেকে কাসেদের সাথে রওনা হওয়ার সময় তিনি মেয়ে দু’জনকে বললেন, ‘আমি একটু আসকালান যাচ্ছি’।

    ‘এত রাতে আসকালান কেন?’

    ‘সুলতান ডেকেছেন’।

    ‘কেন ডেকেছেন?’ এক মেয়ে জিজ্ঞেস করলো। ২১

    ‘আমার সরকারী দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করার তোমরা কে?’ আল ফারেস তাদের বললেন, তোমাদের কত বার বলেছি, আমার ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া কখনো কোন প্রশ্ন করবে না’।

    মেয়ে দু’জন হেসে ফেললো। বললো, ‘আপনার ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া আর কিছুর প্রতিই আমাদের কোন আকর্ষণ নেই। আপনি জাহাজে থাকলে আমরা পরম নিরাপত্তা বোধ করি। কিন্তু জাহাজ ছেড়ে আপনি কোথাও গেলেই আমাদের অন্তরে ভয় ঢুকে যায়’।

    ‘আপনি বাইরে গেলে আমরা পেরেশান হয়ে পড়ি বলেই না আপনাকে এ প্রশ্ন করি’। অন্য মেয়েটি বললো, ‘কখনো জাহাজ আক্রান্ত হলে কে আমাদের রক্ষা করবে? তার কথার খেই ধরে ওপর মেয়েটি বললো, ‘আফসোস! আমরা আপনাকে কোন সাহায্যই করতে পারছি না। নইলে আমাদের তো উচিত ছিল, আপনার অনুপস্থিতিতে এ জাহাজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ব্যস্ত থাকা। কখনো আক্রান্ত হলে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা। কিন্তু আমরা আপনার কোন কাজেই লাগতে পারলাম না’।

    ‘তোমরা যে কাজের যোগ্য আমি সে কাজই তোমাদের কাছ থেকে আদায় করে নেবো’। আল ফারেস বললেন, ‘লড়াই নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই তোমাদের। আমার অনুপস্থিতিতে অধিকাংশ সময় নিজেদের কামরাতেই থাকবে। উপরে গিয়ে মাল্লা বা সৈন্যদের বিরক্ত করবে না’।

    ‘আপনি কখন ফিরবেন?’

    ‘সম্ভবত আজ রাতে ফিরতে পারবো না’। আল ফারেস বললেন, ‘কাল সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসবো আশা করি’।

    আল ফারেস মেয়ে দুটির সঙ্গে গভীর অন্তরঙ্গভাবে মিশে গিয়েছিলেন। তারা কৌশলে সুলতান আইয়ুবীর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রায়ই জানতে চাইতো। কথায় কথায় তারা জানতে চাইতো, ‘ভুমধ্যসাগরে মিশর ও সিরিয়ার নৌবহর কোথায় আছে? তারা কি বন্দরেই অবস্থান করছে নাকি সমুদ্রের গভীরে। ওদের জাহাজের সংখ্যা কত, নৌ সেনা কত?

    তারা এসব জানতে চাইতো গল্পচ্ছলে এবং আল ফারেসও অসতর্ক অবস্থায় এ সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক জবাব দিয়ে ফেলতেন। কখনো সতর্ক থাকলে বলতেন, ‘এমন প্রশ্ন কখনো করো না আমাকে’।

    কিন্তু এই নিষেধ মানলে তাদের চলবে কেন? তারা তাদের রুপের মাধুর্য দিয়ে, প্রেমের অভিনয় দিয়ে প্রায়ই এমন সব গোপন কথা তার কাছ থেকে বের করে নিতো।এভাবে কখন যে আল ফারেস সেনাবাহিনীর অতি গোপনীয় বিষয়ও তাদের কাছে ফাঁস করে দিত টেরই পেতো না। কখনো এ ধরনের প্রশ্ন করার জন্য ওদের সামান্য ধমকও দিত।

    নেশার ঘোরে মানুষ মনের সব গোপন কথা ফাঁস করে দেয়। নেশা, সেটা মদের হোক বা ঔষধের হোক। কিন্তু আল ফারেস মদ পান করেন না। জাহাজে কোন মদ বা মাদক দ্রব্য রাখা হয় না। আল ফারেস চরিত্রহীন ব্যক্তিও নন যে, তাকে কোনভাবে ফাসিয়ে দেয়া যাবে। তার জন্য একটাই বিপদের কারণ, তিনি নিজেই নিজেকে মেয়েদের মায়ার বন্ধনে বন্দী করে নিয়েছেন। এই বন্ধন তার অবসাদ কিছুটা দূর করলেও এরই ফাঁক দিয়ে তার কাছ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল গোপন সংবাদ।

    মেয়ে দুটি ছিল এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। তারা দেখলো, আল ফারেসের মাঝে মদের নেশা নেই, কোন পশুত্বের ভাবও নেই। যদিও যৌবন আছে, সেই যৌবন শুধুই হৃদয়ের প্রেম ভালবাসায় সীমাবদ্ধ। সেখানে দেহের ভুমিকা নেই।

    তার ওপর আল ফারেস তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে এতই সচেতন ও দৃঢ় যে, দায়িত্বের তার সাথে কোন কথাই বলা যায় না। ফলে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠলো। তারা বুঝতে পারলো, নারীর নেশা জাগিয়েও তাকে কাবু করা সহজ হবে না।

    যে রাতে আল ফারেস সুলতান আইয়ুবীর ডাকে আসকালান গিয়েছিলেন সে রাতের ঘটনা। মেয়ে দুটি তাদের কেবিন থেকে বেরিয়ে উপরে চলে গেল। উপরে জাহাজের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওরা সমুদ্রে চাঁদের আলোর প্রতিফলন দেখছিল। সমুদ্রে চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছিল, তাদের মনে হচ্ছিল যেন মতি চমকাচ্ছে। এমন মনকাড়া দৃশ্যের দিকে তারা আপন মনে তাকিয়ে রইলো।

    ‘রোজী’! এক সময় এক মেয়ে অন্য জনকে বললো, ‘এখনতো আমাদের ভবিষ্যৎ একদম অন্ধকার। আল ফারেসকে আসলে মোমের মত নরম মনে হলেও দায়িত্বে সে পাথরের মত শক্ত। আমার মনে হয় আমরা এখানে কোন কাজ করতে পারবো না। এণ্ডু আসলে বরং তার সঙ্গে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু ভাবছি, এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া কি আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে? এণ্ডু হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে ছোট নৌকায় খাদ্য-পানীয়, ফলমূল ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রয় করার নাম করে জাহাজের কাছে আসে এবং মেয়ে দুটির সাথে দেখা করে। এ লোক খৃষ্টান গোয়েন্দা কমাণ্ডার। ঘটনাক্রমে মেয়ে দুটির সাথে তার সাক্ষাৎ হয়ে যায়।

    সে দরিদ্র ফেরিওয়ালার বেশে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে জাহাজে ফলমূল বিক্রি করতে এসে মেয়েদের দেখে চিনে ফেলে। ছদ্মবেশের কারণে মেয়েরা প্রথমে তাকে চিনতে না পারলেও সে ইশারায় তাদের সাথে মত বিনিময় করে এবং ফলমূল বিক্রির ছলে মেয়েদের সাথে দেখা করে।

    সে মেয়েদের জানায়, এই জাহাজের পিছনে সে ছায়ার মত লেগে আছে। সুযোগ পেলেই জাহাজ ধ্বংস করে দেবে। মেয়ে দুটি তাকে জানায়, কিভাবে তারা আল ফারেসের হাতে পড়লো। খৃষ্টান গোয়েন্দা কমাণ্ডার গোয়েন্দাগিরির স্বার্থে তাদেরকে জাহাজে থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রথম বার বিদায় নিয়েছিল।

    প্রথম সাক্ষাতের পর সে আরো দু’বার ছদ্মবেশে জাহাজে এসেছে ও মেয়েদের সাথে কথা বলেছে। মেয়েরা তাকে জানিয়েছে, ‘আল ফারেস আমাদের জালে ধরা দিচ্ছে না আর কোন গোপন তথ্যও দিচ্ছে না’।

    ‘এই জাহাজগুলো আর কতদিন এখানে ডিউটিতে থাকবে? এ জাহাজ কি টায়ারের দিকে যাবে?’ জানতে চায় এণ্ডু।

    মেয়েরা এ ব্যাপারে তাকে কোন তথ্য দিতে অপারগ হলে সে মেয়েদের বলে, ‘মনে হচ্ছে তোমরা হরমুনের শেখানো সব কৌশলই ভুলে গেছো? আরে, এ জাহাজে কেবল আল ফারেসই থাকে না, তার সহকারীরাও থাকে। আল ফারেসকে ফাসাতে না পারলে তার নিচের যে কোন একজন অফিসারকে ফাঁসিয়ে নাও। তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করো। আল ফারেসের সহকারীদের যাদেরকে সম্ভব তার শত্রু বানিয়ে দাও। কাজের কি কোন অভাব আছে? বুদ্ধি খাটাও, কাজ করো’। সে ওদেরকে বললো, ‘তোমাদের রূপ আর যৌবনের যে অস্ত্র আছে তা ঠিক মত ব্যবহার করতে শেখো। নিশ্চয়ই যাদুর মোহে কাউকে না কাউকে অন্ধ করতে পারবেই। এত কৌশল শেখার পর এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কি কোন মানে হয়?

    সেই রাতেই এক মেয়ে ওপর মেয়েকে নিরাশ হয়ে বলছিল, ‘রোজী! এণ্ডু আসলে বরং তার সঙ্গে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু ভাবছি, এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া কি আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে?’

    ‘শোন ফ্লোরী!’ রোজী তাকে বললো, ‘এণ্ডু এখান থেকে আমাদের বের করতে পারবে না। এটা যুদ্ধ জাহাজ! তুমি দেখতে পাচ্ছো রাতেও ছাদে, জাহাজের মাস্তুলে সর্বত্র নৌ সেনারা পাহারায় থাকে। এণ্ডুর সহযোগিতায় পালানোর চেষ্টা করলে এণ্ডুই বরং ধরা পড়ে যাবে। আমাদের এখুনি নিরাশ হওয়ার দরকার নেই। বরং পালাতে হলে আমাদের অন্য পথ বের করতে হবে’।

    ‘তবে অন্য পথই বেছে নাও’। ফ্লোরী বললো, ‘বলো, তাহলে এখন কি করবো?’

    ‘কি করবে? শোন তাহলে’। রোজী বললো, ‘আল ফারেসের সহকারী ক্যাপ্টেনকে দেখেছি সে প্রায়ই ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকায় ও হাসে’।

    রোজী বললো, ‘এরা দীর্ঘদিন ধরে সাগরে পড়ে আছে। এদের মাথার উপর খেলা করছে মৃত্যু। খোদা পুরুষের মধ্যে নারী সঙ্গ লাভের যে দুর্বলতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন সে দুর্বলতা সব পুরুষের আছে। কেউ খোদার ভয়ে নিজেকে সামলে রাখে, কেউ পায় না বলে খায় না।

    সহকারী ক্যাপ্টেনের অবস্থা আমি যতটুকু বুঝতে পারছি, সে দ্বিতীয় দলের। আমার মনে হয়, শুধু ইঙ্গিতটুকু পেতে যা দেরী, সে নিজেকে আমাদের হাতে সঁপে দিতে মোটেও দ্বিধা করবে না। এখন বলো, কাজটা আমি করবো, না তুমি? তবে আমার চেয়ে এ কাজের ট্রেনিং ও দক্ষতা তোমার ভাল আছে’।

    ‘তুমি বললে কাজটা আমিই করতে পারবো’। ফ্লোরী বললো।

    ‘কিন্তু কাজের সময় এ কাজের নিয়মটা মনে রাখবে’। রোজী বললো, ‘তার কাছ থেকে গোপন তথ্য যা জানার সব জেনে নেবে কিন্তু মূল্যটা পরিশোধ করবে না। নাকের ওপর মুলা ঝুলিয়ে দিয়ে সরে আসবে, যাতে আগ্রহ ও উন্মাদনায় ভাটা না পড়ে। তুমি সে লোকের মধ্যে উষ্ণতা ও উন্মাদনা এমনভাবে জাগিয়ে তুলবে, যাতে সে তোমার ইশারায় আল ফারেসকে হত্যা করতেও পিছপা না হয়। তাকে বুঝাবে, আল ফারেস বেঁচে থাকলে এবং তোমাদের সম্পর্ক জানতে পারলে সে তোমাদের কাউকে রেহাই দেবে না।

    অতএব আল ফারেস বেঁচে থাকলে তুমি তার হওয়ার দুঃসাহস করতে পারো না। যদি সে তোমাকে সত্যি চায় তবে তা সে কেবল তখনি পেতে পারে, যখন এ দুনিয়ায় আল ফারেস থাকবে না’।

    আল ফারেসের এই সহকারীর নাম ছিল আবদূর রউফ কুর্দি। সে ছিল কুর্দিস্তানের সন্তান এবং বেশ চালাক চতুর যুবক। সে মেয়ে দুটিকে দেখলেই তাদের দিকে তাকিয়ে অন্তরঙ্গ হাসি দিত। সে জানতো, এরা আল ফারেসের স্ত্রী নয়, দাসীও নয়। এরা যাযাবর মেয়ে। আল ফারেস এদেরকে জাহাজে আশ্রয় দিয়েছেন।

    রউফ কুর্দির মনে মেয়ে দুটির জন্য এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উরধতন অফিসারের আশ্রিতা বলে সে ওদের দিকে হাত বাড়াতে সাহস পাচ্ছিল না।

    সেই রাতে, যখন মেয়েরা জাহাজের ছাদে উঠে কার্নিশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, রউফ তখন পাহারাদারদের ডিউটি তদারক করার জন্য টহলে বেরিয়েছে। সে জানতো না, মেয়েরা ছাদে দাঁড়িয়ে রাত্রিকালীন সমুদ্রের নৈসর্গিক শোভা দেখছে।

    রউফ কুর্দি ছাদে উঠলো। দেখলো চাঁদের আলোয় জাহাজের কার্নিশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুই অনিন্দ্য অপ্সরী।

    আল ফারেস সুলতান আইয়ুবীর আহবানে চলে গেছেন আসকালন। জাহাজের দায়িত্ব এখন রউফ কুর্দির ওপর। রোজী রউফ কুর্দিকে দেখেই কামরার দিকে হাঁটা ধরলো। ফ্লোরী জাহাজের ছাদে কার্নিশ ধরে তেমনি দাঁড়িয়ে রইলো। রোজী হাঁটতে হাঁটতে রউফ কুর্দির পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, রউফ কুর্দি তার দিকে তাকিয়ে সেই অন্তরঙ্গ হাসি দিয়ে বললো, ‘রাতের সমুদ্র দেখছিলেন?’

    রোজী না থেমেই বললো, ‘হ্যাঁ’।

    রউফ কুর্দি বললো, ‘একটু দাঁড়াবেন?’

    থমকে দাঁড়ালো রোজী। রউফ কুর্দির দিকে তাকিয়ে বললো, না। আমি যদি আপনার পাশে দাঁড়াই তবে আরেকজন অসন্তুষ্ট হবে। আমি কাউকে অসন্তুষ্ট করতে চাই না’।

    রউফ কুর্দি অবাক হয়ে বললো, ‘কে অসন্তুষ্ট হবে?’

    রোজী আঙুল দিয়ে ফ্লোরীর দিকে ইঙ্গিত করে বললো, ‘ওই যে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে’।

    রউফ কুর্দি আরো অবাক হয়ে বললো, ‘কেন, অসন্তুষ্ট হবে কেন?’

    ‘সে প্রত্যেকের নিজ নিজ মনের ব্যাপার’। রোজী বললো, ‘একদিন আল ফারেস নিচে ক্যাবিনে শুয়েছিল আর আমি আপনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে অবস্থায় ও আমাদের দেখেছিল। পরে যখন তার কাছে গেলাম তখন সে বললো, ‘তুমি তো আল ফারেসকে দখল করে নিয়েছো। তুমি থাকলে আল ফারেসের কাছে আমার কোন দাম নেই। আমি তোমার অধিকারে কোনদিন ভাগ বসাতে যাইনি। আমার নিঃসঙ্গ জীবন আমি একজনের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম, সেখানেও তুমি হাত বাড়াবে?’ আমি তো অবাক। বললাম, ‘কার দিকে?’ সে বললো, ‘রউফ কুর্দি’। রউফ আমার। খবরদার, আমার অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে না। তারপর থেকে আমি আর আপনার কাছে যাইনি’।

  • মহাসমর

    মহাসমর

    মহাসমর

    জেরুজালেম হাত ছাড়া হওয়ার পর পোপ দ্বিতীয় আরবানুসের আহ্বানে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল সমগ্র খৃষ্টান বিশ্ব। তাদের নেতৃত্ব নিলেন জার্মানীর সম্রাট রিচার্ড। শুরু হ’ল যুদ্ধের এক মহাযজ্ঞ।

    প্রথমেই ময়দানে এলেন জার্মানীর সম্রাট ফ্রেডারিক। তিনি দুই লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে। তিনি এত বেশী সৈন্য নিয়ে এলেন যে, এক আইয়ুবীকে শায়েস্তা করার জন্য এরচে বেশী সৈন্যের দরকার মনে করলেন না তিনি। তাই অন্যান্য খৃষ্টান সম্রাটকে সঙ্গী বানানোরও প্রয়োজন অনুভব করলেন না। তিনি তার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী একাই অগ্রসর হলেন এবং বীরদর্পে দামেশকের উপর আক্রমণ করে বসলেন। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যে, তিনি সুলতান আইযুবীর যুদ্ধের টেকনিক সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তিনি দুই লক্ষ সৈন্যের দম্ভ নিয়ে সুদূর জার্মানী থেকে ছুটে এলেন আরবের মরুময় ভুখণ্ড দখল করতে। ভাবলেন, আইয়ুবীকে পরাজিত করা, এ আর এমন কি কঠিন কাজ!

    দীর্ঘ ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে এ আক্রমণ নিঃসন্দেহে ব্যাপক ও তীব্র ছিল। ঐতিহাসিকরা দামেশকের উপর এই আক্রমণকে ক্রুসেড যুদ্ধের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সর্বাত্মক আক্রমণ বলে বর্ণনা করেছেন।

    সম্রাট ফ্রেডারিক তার বিপুল সৈন্যের দম্ভ নিয়ে ছুটে এলেন। প্রথমেই তিনি টার্গেট করলেন সিরিয়াকে। তিনি সিরিয়ায় এসে কালবিলম্ব না করে দামেশকের ওপর প্রবলবেগে আক্রমণ করে বসলেন। কিন্তু দামেশক কব্জা করা তো দূরের কথা, তিনি দামেশকের একটি ইটও খসাতে পারলেন না।

    সম্রাট ফ্রেডারিক তার বিপুল সৈন্য নিয়ে যখন দামেশকের কাছে এসে উপস্থিত হলেন তখন তার ধারনা ছিল, সুলতান আইয়ুবী এই বিশাল বাহিনী দেখে যুদ্ধ করার পরিবর্তে আত্মসমর্পনের জন্য ছুটে আসবেন। তাই তিনি তার আগমন জানান দেয়ার জন্য প্রথমে দামেশকের ওপর পরীক্ষামূলক আক্রমণ চালালেন। সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা বীর বিক্রমে সে আক্রমণ রুখে দিল।

    রাতে ফ্রেডারিকের বাহিনী বিশ্রাম নিচ্ছিল। পরদিন ভোরে নতুন উদ্যমে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে মুসলিম বাহিনীর ওপর। তাই রাতের বিশ্রামটা ছিল তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

    দামেশকের আকাশে রাতের অন্ধকারে ছেয়ে গেল। সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী চুপিসারে বেরিয়ে এলো ক্যাম্প থেকে। এরপর তারা খৃষ্টান সেনাবহিনীর বিশাল ক্যাম্প অতিক্রম করে পৌঁছে গেল যেখানে এই বাহিনীর অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্যসামগ্রী ও যুদ্ধের অন্যান্য রসদপত্র রেখেছিল সেখানে। পাশেই ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। ওখানে ছিল লক্ষ লক্ষ যুদ্ধের ঘোড়া। একদল কমাণ্ডো চলে গেল সেই আস্তাবলের পেছনে।

    খৃষ্টান সৈন্যরা ঘুমিয়েছিল তাদের তাঁবুগুলোতে। সামান্য কিছু সৈন্য পাহারা দিচ্ছিল সেই তাঁবু। রসদ এবং আস্তাবলের ওখানেও পাহারা ছিল, তবে সবকিছুই ছিল ঢিলাঢালা। এতবড় বিশাল বাহিনীর ওপর রাতের অন্ধকারে আইয়ুবীর বাহিনী হামলা করবে এমনটি তারা কল্পনাই করতে পারেনি।

    তখনও রাত তেমন গভীর হয়নি। হঠাৎ একযোগে সুলতানের কমাণ্ডোরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই অস্ত্রভাণ্ডার, রসদসম্ভার ও আস্তাবলের ওপর। তারা এমন তীব্র ও প্রাণপণ আক্রমণ চালোলো যে, সামান্য ক’জন পাহারাদার মুহূর্তেই ওরা গায়েব করে দিল। তারপর সেই অস্ত্রসম্ভার ও রসদপত্র তাদেরই ঘোড়ার গাড়ীতে তুলে দামেশকের সেনা ক্যাম্পে আনা শুরু করল।

    শহরের প্রধান ফটকসহ সব কয়টি ফটক খুলে দেয়া হ’ল। শত শত ঘোড়ার গাড়ী লাইন দিয়ে এসে ঢুকতে লাগলো শহরে। সুলতান আইয়ুবী তার পুরো বাহিনী শহর থেকে বের করে মোতায়েন করলেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, যেনো কমাণ্ডোদের সরবরাহ কাজে কোন বিঘ্ন না ঘটে।

    এ খবর সম্রাট ফ্রেডারিকের ক্যাম্পে পৌঁছাতে দেরি হ’ল না। তারা দ্রুত তৈরী হয়ে নিজ নিজ অস্ত্র নিয়ে ছুটলো গুদামের দিকে। কিন্তু সে খানে তারা পৌঁছতে পারলো না, তার আগেই সুলতান আইয়ুবীর নিয়মিত বাহিনী তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

    জার্মানীর খৃষ্টান সৈন্যদের জন্য মুরুভূমি ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। তার ওপর দামেশক ছিল তাদের জন্য অপরিচিত ও নতুন জায়গা। রাতভর তারা লড়াই করল অনিশ্চিতের মত। কোথায় শত্রু, শত্রুর পরিমাণ কত, কি তাদের অস্ত্র কিছুই জানা নেই তাদের। তারা এক দিকে এগিয়ে যেতে চায়, তখন ছুটে আসে ঝাঁক ঝাঁক তীর। সঙ্গীদের কেউ কেউ লুটিয়ে পড়ে চোখের সামনে, বাকীরা পিছু হটে আত্মরক্ষা করে।

    অন্য দল এগুতে গিয়ে দেখে তাদের সামনে তলোয়ার ও বল্লমের দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে আইয়ুবীর সৈন্যরা। তারা থমকে দাঁড়িয়ে থাকে এক জায়গায়। সহসা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আইয়ুবীর কোন অশ্বারোহী বাহিনী।

    অদৃশ্য শত্রুর এই আক্রমণ ফ্রেডারিকের বাহিনীকে তছনছ করে ফেলল। সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সেনাপতি ও কমাণ্ডদের কাছ থেকে। কমাণ্ডাররা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে দেখলো চারদিকে কেবল অন্ধকার। আকাশের মিটিমিটি অনুজ্জল তারাগুলো হরিয়ে যাচ্ছে ছুটন্ত মেঘের আড়ালে।

    তারপরও যুদ্ধ। কারণ দুই লক্ষ সৈন্যের সামনে লিলিপুট। খৃষ্টানদের অস্ত্র ও রসদসম্ভারেরও কোন কমতি ছিল না। রাতভর লুট করেও যেন কোন কূল পাচ্ছিল না কমাণ্ডোরা। তারা নিজেদের শৃঙ্খলা অটুট রেখে গাড়ী বোঝাই করে দ্রুত এবং ক্রমাগত মালসামান শহরের অভ্যন্তরে পাঠাতেই থাকল।

    কমাণ্ডোরা বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল বিভিন্ন গুদাম। যারা অস্ত্র লুট করছিলে তারা কেবল অস্ত্রই লুট করতে থাকে। যারা গোলাবারুদ তুলছিল তারা গাড়ীর পর গাড়ী বোঝাই করছিল কেবল গোলাবারুদ দিয়ে। আরেক দল খাদ্য সামগ্রী লুট করার কাজে ব্যস্ত রইলো।

    সম্রাাট ফ্রেডারিকের ঘোড়ার গাড়ীর পরিমাণ ছিল অজস্র। পরিমাণে তা এতই বেশী যে, সবকটা ঘোড়ার গাড়ীতে ঘোড়া জুড়ে চালানোর মত সৈন্যও পাওয়া গেল না আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনীতে।

    তারা গাড়ী শহরে ঢুকিয়ে দিয়ে গাড়ী রেখে খালি ঘোড়া নিয়ে ছুটে যেতো গুদামে। ওখানে নতুন গাড়ীতে আগেই মাল ভরে রাখতো অন্যরা। তারা ঘোড়া রেখে নতুন ঘোড়া ও নতুন গাড়ী নিয়ে ছুটতো শহরের দিকে।

    এই ব্যস্ততার মধ্যে কোন ফাঁকে রাত শেষ হয়ে গেল টের পেল না আইয়ুবীর বাহিনী। তারা তখনও গাড়ী বোঝাই করে অস্ত্র ও খাদ্যসম্ভার  শহরে আনছিল, দেখতে পেলো পূর্ব দিগন্তে আলোর আভাস।

    সম্রাট ফ্রেডারিকের সৈন্যরা গজবের একটি রাত পার করল। তাদের দিকে রক্তচক্ষু মেলে উঠে এলো ভোরের নতুন সূর্য। ফ্রেডারিকের বাহিনী তখন এলোমেলো, বিচ্ছিন্ন। অনিশ্চিত দুঃস্বপ্নের ঘোর তাদের চোখে মুখে। শোচনীয় পরাজয়ের কালিমা নিয়ে ফ্রেডারিক তার বাহিনীকে পিছিয়ে নিয়ে নতুন কারে সংগঠিত করলেন।

    তিনি দেখতে পেলেন, বহু সৈন্য হতাহত হওয়ার পরও বিশাল বাহিনী বলে ঘাটতিটা তেমন চোখে পড়ে না। ময়দানে এখনও তার বিপুল সংখ্যক সৈন্য রয়েছে। কিন্তু তাদের মুখে দেয়ার মত খাদ্য নেই তার হাতে।

    তিনি পিছু হটে এক স্থানে ক্যাম্প করে নতুন করে যুদ্ধের প্ল্যান করা শুরু করলেন। কিন্তু অচিরেই টের পেলেন, তার বাহিনীতে কেবল খাদ্য নয়, পানিরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ তখন মুসলিম বাহিনীর হাতে। ফলে তারা কোথাও থেকে পানি সংগ্রহ করতে পাছে না। নানা বিপদাপদ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনটি কেটে গেল। ঝুপ করে তাদের সামনে নেমে এলো আকেটি ভয়ংকর রাত। ক্যাম্প অরক্ষিত রেখে ঘুমাতে যাওয়ার কথা ভাবতে পারলো না কেউ।

    একদল ঘুমোবে আরেক দল জেগে পাহারা দেবে ক্যাম্প, এসব যখন ভাবছিল খৃষ্টান সেনাপতি ও কমাণ্ডাররা, তখনি সৈন্যদের মাঝে হৈ চৈ পড়ে গেল। তারা শুনতে পেলো দূর থেকে ভেসে আসছে ছুটন্ত ঘোড়ার সম্মিলিত খুরধ্বনি।

    ২২ জিলহজ্জ ৫৮৬ হিজরীর দিবাগত রাত। মুসলিম কমাণ্ডোরা প্রচণ্ড বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল সম্রাট ফ্রেডারিকের বাহিনীর ওপর। তাদের বিদ্যুৎগতির আক্রমণে তছনছ হতে লাগলো খৃষ্টান বাহিনীর ক্যাম্প। ওখানে শুরু হয়ে গেল আহতদের আর্তচিৎকার, ভীত সন্ত্রস্ত সৈন্যদের কান্নাকাটি ও শোকের মাতম।

    খৃষ্টান বাহিনী যতটা প্রতিরোধ করছিল তারচে বেশী করছিল বিলাপ। কমাণ্ডোরা কোথাও থমকে না দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে ছুটছিল নাঙ্গা তলোয়ার হাতে। এবার আর তাদের নজর সম্পদ বা অস্ত্রের দিকে ছিল না। এবার তারা কচুকাটা করছিল সম্রাট ফ্রেডারিকের বীর সৈন্যদের।

    জার্মানীর সৈন্যরা ক্যাম্পের চারপাশে এবং ক্যাম্পের মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় শুকনো কাঠের খড়ি একত্রিত করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। এতে সুবিধা হচ্ছিল দু’পক্ষেরই, আক্রান্ত হওয়ার আগেই ওরা দেখতে পাচ্ছিল মুসলিম কমাণ্ডোদের, আবার কমাণ্ডোরাও দেখেশুনে আঘাত হানতে পারছিল। খৃষ্টানদের জ্বালানো অগ্নিকুণ্ডগুলো দেখে বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, সমস্ত ক্যাম্পই জ্বলছে।

    থেকে থেকে হামলা করছিল মুসলিম কমাণ্ডোরা। দ্রুতগতির ঘোড়া নিয়ে ঢকে পড়ছিল ক্যাম্পের ভেতর। কেউ বাঁধা দিতে এলেই মৃত্যু জাপটে ধরত তাকে।

    আহত খৃষ্টান সৈন্যদের চিৎকারে নরক গুলজার হয়ে উঠল ক্যাম্পের পরিবেশ। মরুভূমির রাতের বাতাস ভারী হয়ে উঠল সে কান্না ও বিলাপের ধ্বনিতে। তাদের নিয়ে চলছিল ছুটাছুট, চিকিৎসা ও ব্যাণ্ডেজ বাঁধার কাজ।

    পরদিন ভোর। জার্মান সেনাকমাণ্ড তার সৈন্যদের আরো পিছিয়ে নিলেন। তিনি তার সৈন্যদের সামলে নিয়ে সরে গেলেন বেশ খানিকটা দূরে।

    ওখানে কাছেই পাওয়া গেল ছোট্ট একটা গ্রাম। তাতে খাবার তেমন না মিললেও পানির অভাব দূর হয়ে গেল। তিনি ওখানেই ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

    তিনি জানতেন, ফ্রান্সে সম্রাট ফিলিপ অগাষ্টাস ও ইংল্যাণ্ডের সম্রাট রিচার্ড শীঘ্রই বিপুল সৈন্য নিয়ে চলে আসবেন আইয়ুবীকে শায়েস্তা করতে। তারা সমুদ্র পথে নৌবহার নিয়ে আসছেন। তিনি তার সৈন্য দামেশক থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন দূরে। অপেক্ষা করতে লাগলেন সম্রাট ফিলিপ ও সম্রাট রিচার্ডের জন্য।

    কিছুদিন পর। সম্রাট ফিলিপ ও রিচার্ডের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে তিনি ক্রমেই নিজের বাহিনীকে দামেশক থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তার খেয়াল হ’ল, বসে না থেকে কাছের শহর আক্রা দখল করে নিলে কেমন হয়!

    দামেশক থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি নজর দিলেন ফিলিস্তিনের উপকূলীয় শহর আক্রার দিকে। ফ্রেডারিক তার বাহিনীকে আক্রার দিকে অভিযান চালানোর আদেশ দিয়ে ভাবলেন, আক্রা দখল করতে পারলে পা রাখার মত একটা নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যাবে।

    ফ্রেডারিক যখন দামেশক আক্রমণ করেন তখন সুলতান আইয়ুবী দামেশক ছিলেন না। তার অনুপস্থিতিতেই সেখানকার কমাণ্ডোরা তাকে পিছু হটিয়ে দিয়েছিল।

    সুলতান তখন অবস্থান করছিলেন আক্রাতে। তিনি তাঁর সেনাপতি ও সীমান্ত রক্ষীদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, ‘যদি কেউ আক্রা আক্রমণ করতে আসে তবে তাকে বাঁধা না দিয়ে সামনে এগুতে দেবে। আক্রা সীমান্ত পেরিয়ে তারা যেন নির্বিঘ্নে শহরের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।’

    সুলতানে নির্দেশ অনুসারে ফ্রেডারিকের বাহিনীকে প্রতিরোধ না করে বরং তাদের বিনা বাঁধায় সামনে এগিয়ে যেতে দিল সীমান্ত রক্ষীরা। ফ্রেডারিকের বাহিনী এগিয়ে আসছে খবর পেয়েই তারা সরে গেল পথ থেকে।

    বাঁধা না পেয়ে আক্রার সীমান্তের বেশ ভেতরে ঢুকে গেল ফ্রেডারিকের বাহিনী। সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা বিভাগ পিছু নিল তাদের। তারা ফ্রেডারিকের বাহিনীকে অলক্ষ্যে থেকে অনুসরণ করতে লাগলো এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় কাসেদ পাঠাতে লাগলো সুলতানের কাছে।

    এবার শুরু হ’ল সুলতান আইয়ুবীর বিশেষ পদ্ধতির যুদ্ধ। সীমান্ত থেকে আক্রা শহর পর্যন্ত সারা রাস্তায় তিনি তার কমাণ্ডো বাহিনী ছড়িয়ে রেখেছিলেন। একাধিক কমাণ্ডো বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছিল এ পথটুকু। তাদের প্রত্যেকের জন্য ছিল নির্দিষ্ট এলাকা। সুলতানে আদেশ পায়নি বলে তারা কেউ আক্রমণ করতে পারছিল না ফ্রেডারিকের বাহিনীর ওপর, তাবে ফ্রেডারিকের প্রতিটি কদমে তারা নজর রাখছিল।

    আক্রার শহর তখনও বেশ দূরে। এক রাতের বিশ্রামের জন্য ক্যাম্প করেছে সম্রাট ফ্রেডারিকের বাহিনী। প্রতিদিনের মত রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছে সৈন্যরা। মাঝ রাতের দিকে তাদের ওপর আক্রমণ করে বসলো সুলতানের একদল কমাণ্ডো। আক্রমণটা তারা করেছিল ফ্রেডারিকের বাহিনীর লেজের দিকে। এই আক্রমণ লেজের দিকের একটা অংশ বিছিন্ন করে দিল মূল বাহিনী থেকে। তারপর সেই অংশটি নিঃশেষ করে দিল।

    কমাণ্ডোদের লক্ষ ছিল শত্রু বাহিনীর শেষ অংশের উপর। প্রথম রাতের পর দ্বিতীয রাতেও একই ঘটনা ঘটলো। দিনে কোন সৈন্যের ছায়াও দেখতে পায় না খৃষ্টান বাহিনী কিন্তু রাতের বেলা আক্রান্ত হয় তাদের বাহিনীর পিছন দিকটি। অদৃশ্য গেরিলারা কমাণ্ডো আক্রমণ চালিয়ে গায়েব করে দেয় সম্রাট ফ্রেডারিকের বিশাল বাহিনীর একটা নির্দিষ্ট অংশ।

    এভাবেই ঘটতে থাকল ঘটনা। রাতে যখন জার্মান বাহিনী কোথাও ক্যাম্প করতো, তখন সুলতানের কমাণ্ডো বাহিনী আক্রমণ করতো তাদের। দু’দিনেই শিক্ষা হয়ে গেল ফ্রেডারিকের। তিনি বাহিনীর পেছনের অংশ শক্তিশালী করলেন।

    কিন্তু দেখা গেল এবার বিপর্যয় আসছে অন্য দিক থেকে। কমাণ্ডোরা এবার খৃষ্টানদের তাঁবু লক্ষ্য করে ছোট মেঞ্জানিক দিয়ে পেট্রোল হাড়ি ও সলতেওয়ালা তীর বর্ষণ করতে শুরু করল। এতে জার্মান বাহিনীর সেনা ক্যাম্পে আগুন ধরে গেল। নিহত ও আহত হ’ল ঘুমন্ত সৈন্যরা।

    পরদিন ফ্রেডারিক ভাবলেন, থাক আর সামনে এগিয়ে কাজ নেই। তিনি সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাদের পথ রোধ করে দাঁড়ালো আইয়ুবীর কমাণ্ডোরা।

    তিনি থেমে গেলেন, থেমে গেল আক্রমণও। আবার তিনি রওনা হতে চাইলেন পেছন দিকে, আবারও বাঁধার সম্মুখীন হলেন। এভাবে যতবার তিনি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন ততবারই তিনি বাধার সম্মুখীন হলেন।

    এরপর তিনি পেছনে ফেরার চিন্তা বাদ দিয়ে আবার সামনে অগ্রসর হওয়া শুরু করলেন। এভাবেই জার্মান বাহিনী একদিন আক্রা শহরের সন্নিকটে গিয়ে পৌঁছলো।

    জার্মান সেনাদল যখন আক্রা পৌঁছলো তখন ফ্রেডারিক দেখতে পেলেন, তার সৈন্য সংখ্যা কমে গিয়ে বিশ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তাদের সৈন্য বাহিনী যখন পবিত্র ভূমিতে পদার্পন করেছিল তখন তাদের সংখ্যা দুই লক্ষ। এখন তাদের মধ্য থেকে এক লক্ষ আশি হাজারই নেই।

    তবে তার একলক্ষ আশি হাজার সৈন্যের সবাই যে মারা গিয়েছিল তা নয়। প্রথমে দামেশক আক্রমণের সময় জার্মানীর বিশাল বাহিনীর বহু সৈন্য হতাহত হয়। এরপর সেখান থেকে পিছু হটার সময় ক্ষুধা পিপাসার শিকার হয়ে মারা যায় অনেকে। কিছু মারা যায় অসুখ বিসুখে। একই বিপর্যয় সৈন্যদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। দামেশক থেকে ফেরার পথে এইসব ভীত সৈন্যদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পালিয়ে যায় প্রাণের মায়ায়। এরপর যারা সম্রাট ফ্রেডারিকের সঙ্গে ছিল আক্রা আসার পথে সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনীর তীর ও মেঞ্জানিকের নিক্ষেপিত পেট্রোল হাঁড়ির প্রজ্জলিত আগুনে পুড়ে মারা যায় বাকীরা।

    যে বিশাল হাজার সৈন্য আক্রা গিয়ে পৌঁছেছিল তারাও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। তাদের চোখের সামনে ভাসছিল এক বিশাল বাহিনী, যে বাহিনীর গর্বিত অংশ মনে হতো নিজেকে। সেই বাহিনী ছোট হতে হতে এখন এমন এক ক্ষুদ্র দলে পরিণত হয়েছে, যা দেখে আশাভঙ্গের বেদনায় মুষড়ে পড়ল তাদের অন্তরগুলো। এত তাদের মন থেকে ক্রুশের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ নিঃশেষ হয়ে গেল। এমনকি ক্রুশের প্রতি তারা যে শপথ করেছিল সেই শপথের কথা স্বরণ করার কথাও ভুলে গেল তারা।

    ফ্রান্সের সম্রাট ফিলিপ অগাষ্টাস ও ইংল্যাণ্ডের সম্রাট রিচার্ড সমুদ্র পথে ধেয়ে আসছে, এ খবর আগেই সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা পৌঁছে দিয়েছিল সুলতানকে। তারা জানালো, ইংল্যাণ্ডের সৈন্য এরই মধ্যে সাইপ্রাসে এসে গেছে।

    এই বাহিনীর সংখ্যা কত সে কথাও গোয়েন্দাদের কাছ থেকে জেনে নিলেন সুলতান। তারা জানালো, ইংল্যাণ্ডের সৈন্য সংখ্যা ষাট হাজারের মত হবে। ফ্রান্সের সৈন্য সংখ্যাও প্রায় সমপরিমাণ। এদিকে আক্রায় অবস্থান করছিল জার্মানীর বিশ হাজার সৈন্য। জেরুজালেম ও আশপাশের খৃষ্টান সম্রাটদের সৈন্যরাও যুদ্ধ বাঁধলে তাদের সাথে শামিল হবে এতে সন্দেহ নেই। সুলতান আইয়ুবী ভেবে দেখলেন, খৃষ্টানরা চাইলে তার বিরুদ্ধে এযাবত কালের সবচাইতে বড় সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারবে সন্দেহ নেই।

    সুলতান আইয়ুবী আরো খবর পেলেন, গে অব লুজিয়ান, যিনি সুলতানের সঙ্গে আর কখনও যুদ্ধে শামিল হবেন না এই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তিনিও কাউণ্ট কোনর‌্যাডকে সঙ্গে নিয়ে পৃথক একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যেই এই বাহিনীতে শামিল হয়েছে সাতশো দুর্ধর্ষ নাইট যোদ্ধা, নয় হাজার ফিরিঙ্গী সৈন্য ও বারো হাজার ওলন্দাজ সৈন্য। কিছু ইউরোপীয় সেনা অফিসারও যোগ দিয়েছে এই বাহিনীতে। এভাবে তার সৈন্য সংখ্যাও বাইশ হাজারে দাঁড়িয়ে গেছে।

    ছোট ছোট খৃষ্টান সম্রাটরাও আইয়ুবীর বিরুদ্ধে এটাকে চূড়ান্ত যুদ্ধ গণ্য করে তাদের বাহিনী পাঠাতে শুরু করল সম্মিলিত বাহিনীতে। মোটামুটি হিসেবে সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ালো গিয়ে ছয় লক্ষ।

    শুধু সৈন্য সংখ্যা নয়, যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ সরঞ্জাম সব দিক থেকেও ইসলামী সৈন্যদের তুলনায় তারা আশাতীত রকমের শ্রেষ্টত্বের অধিকারী। ফলে এবার সুলতানকে পরাজিত ও নিঃশেষ করা সম্ভব হবে এ ব্যাপারে খৃস্টানদের মনে কোন সন্দেহ রইলো না।

    অন্যদিকে চিত্র ছিল খুবই করুণ। সুলতানের সৈন্যরা অধিকাংশই ছুটিতে বাড়ী চলে গেছে। সুলতান আইয়ুবীর সাথে আছে মাত্র দশ হাজার মামলুক সৈন্য। যদিও এ বাহিনী প্রতিটি সদস্যই দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, বিশেষ করে সুলতানে কাছে যুদ্ধের ট্রেনিং পেয়ে নিজেদের ওপর ছিল তারা পূর্ণ আস্থাশীল, কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে এটা এতই অপ্রতুল যে, এরা কোন হিসাবের মধ্যেই পড়ে না। তবু এদের উপর সুলতানের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তিনি মনে করতেন, নিবেদিতপ্রাণ দশ হাজার সৈন্য অনায়াসে এক লাখ সৈন্যের মোকাবেলা করে বিজয়ী হতে পারে।

    যুদ্ধের জন্য ভৌগলিক কারণে আক্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। এখান থেকে স্থলপথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যেমন সহজ তেমনি সমুদ্র পথ ব্যবহারেরও রয়েছে অবাধ সুযোগ।

    আক্রা শহরে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র দশ হাজার এ সৈন্যের পরিমাণ বাড়ানোর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। তখনকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না যে, ছুটি প্রাপ্ত প্রতিটি সৈনিককে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ডেকে নেবেন। তার সৈন্য বাহিনীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছড়িয়ে আছে বিজিত অঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে। সুলতানকে ওসব অঞ্চলে সৈন্য মোতায়েন করে রাখতে হচ্ছে এ জন্য যে, ওসব জায়গা থেকে সৈন্য সরালেই তা খৃষ্টানরা পুনরায় দখল করে নেবে।

    সুলতান আইয়ুবী বায়তুর মোকাদ্দাসে তাঁর যে বাহিনী আছে তাদের কথা স্বরণ করলেন। ওখান থেকেও কোন সৈন্য সাহায্য পাওয়ার উপায় নেই। ওখান থেকে সৈন্য সরালেই তা আবার দখল করে নেবে ক্রুসেডাররা। সুলতান খবর পেয়েছেন, ক্রুসেড বাহিনী শহরের চারিদিকে একত্রিত হচ্ছে।

    সুলতান আইয়ুবী মহা সমস্যায় পড়ে গেলেন। জেরুজালেমের পতনকে বিশ্বের খৃষ্টান সম্প্রদায় তাদের অস্তিত্বের জন্য এক মহা হুমকি বলে গণ্য করছিল। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সারা দুনিয়া থেকে খৃষ্টানরা এসে একত্রি হচ্ছিল এই মহাসমরে। সুলতানের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ হানার জন্য যেখানে সমবেত হচ্ছে লাখ লাখ খৃষ্টান সৈন্য, সেখানে সুলতান তার নিজের কোন শহর বা কেল্লা থেকেই কোন সৈন্য সংগ্রহ করতে পারছেন না।

    অপরদিকে ধেয়ে আসছে ইংল্যাণ্ডের বিশাল নৌবহর। এ বাহিনী কেবল শক্তিশালী নয়, ভয়ংকরও। সুলতান আইয়ুবী ভালভাবেই জানেন, মিশরীয় নৌবহর দিয়ে ইংল্যাণ্ডের এ বিশাল নৌবাহিনীর সাথে কোনভাবেই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

    সুলতান আইয়ুবীর জন্য এ মহা সমস্যা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিল। তিনি জানতেন, এ সমস্যার মোকাবেলা তাকে করতেই হবে। কিন্তু কিভাবে মোকাবেলা করবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। এ যে বড় অসম সংকেত!

    অনেকগুলো বিজয় অর্জন করার পরও সুলতানের জন্য সময়টা এখন খুবই খারাপ। বিগত চারটি বছর তাঁর  সৈন্যরা একটানা যুদ্ধ করেছে। তাঁর বিস্বস্ত ও সদা তৎপর কমাণ্ডো বাহিনীও দীর্ঘদিন ধরে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে, মরুভূমিতে জীবন বাজি রেখে ক্রমাগত লড়াই করে আসছে। এ সব লড়াইয়ে তারা তাদের জীবন অকাতরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

    যুদ্ধের গতি লক্ষ করলে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা বিচার করলে তারা আর যুদ্ধ করার উপযোগী নেই। এখন তাদের প্রয়োজন একটু বিশ্রাম, একটু প্রশান্তির জীবন।

    এ মহা সমস্যায় পড়ে সুলতান আইয়ুবীর অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ালো যে, তিনি আর রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তিনি সব সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। যুদ্ধের নতুন কৌশল উদ্ভাবন, ময়দানের নতুন নকশা আঁকা এসব কাজে তিনি এত বেশী নিমগ্ন হয়ে পড়লেন যে, তাঁর শরীর ক্রমেই ভেঙ্গে পড়তে শুরু করল। দেখতে দেখতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক তাঁকে নিয়মিত অষুধ পথ্য দিতে লাগলেন। এবাবে কেটে গেল তিন চার দিন। চার দিন অসুখে থাকার পর তিনি ডাক্তারের সেবাযত্নে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু শরীরে আগের মত বল বা শক্তি পাচ্ছিলেন না।

    তার বয়স এখন ৫৪ বছর। কিশোর কালে তিনি যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গিয়েছিলেন। সারাটা যৌবন তিনি কাটিয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে। দুর্গম পাহাড়, গভীর জঙ্গল, কঠিন মুরুভূমি সর্বত্র একের পর এক যুদ্ধ করে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন সারাটা জীবন। বিজয়ের পর বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে এমন কঠিন বিপদে পড়বেন, কল্পনাও করেননি তিনি। তার মনে পড়ে গেল, কৈশোরে তিনি বায়তুর মোকাদ্দাস উদ্ধারের কসম খেয়েছিলেন। সে কসম তিনি পূর্ণ করেছেন। তারপর তিনি মসজিদুল আকসার মিম্বর ধরে শপথ করেছেন, “বেঁচে থাকতে আমি বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে ইসলামী পতাকা সরতে দেবো না”। এ শপথের কথা স্বরণ করেই তিনি এখন ঘুমাতে পারেন না। বিশ্রাম সারা জীবন তার জন্য হারাম ছিল, এখনও হারাম হয়েই রইলো।

    আমেরিকান ঐতিহাসিক এ্যান্থনী জুলিয়েট, হেরাল্ড লিম, লেনপোল, গীবন, আর্নল্ড প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, “সুলতান আইয়ুবী সামান্য সুস্থ হয়েই বললেন, ‘আমাকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে চলো’।

    তিনি তাঁর বিশ্বস্ত ও জিন্দাদীল সেনাবাহিনীর দশ হাজার সৈন্য আক্রায় রেখেই বায়তুল মোকাদ্দাসে রওনা হলেন। সঙ্গে নিলেন কেবল নিজের রক্ষী বাহিনী।

    সৈন্যদের বললেন, “আক্রার জিম্মা আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমি শপথ নিয়েছিলাম, বেঁচে থাকতে বায়তুল মোকাদ্দাসের ইসলামী পতাকা আমি অবনমিত হতে দেবো না। খৃষ্টানরা তাদের সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের সাথে মোকাবেলা করতে আসছে, আমি বায়তুল মোকাদ্দাসে তাদের সাথে চূড়ান্ত মোকাবেলা করার জন্য চলে গেলাম। বিজিত প্রতিটি অঞ্চলের হেফাজতের জিম্মা পালন করবে নিজ নিজ এলাকার মুজাহিদ বাহিনী। আক্রা যুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ন স্থান তোমাদের জীবন থাকতে এখানে ক্রুশের পতাকা উড়বে এ কথা আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না।

    তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস রওনা হয়ে গেলেন। কমাণ্ডো বাহিনীকে আগেই জানানো হয়েছিল, তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস রওনা হয়েছেন। তারা তাঁর জন্য আক্রা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত রাস্তা পূর্ণ নিরাপদ করার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিল। সুলতান আইয়ুবী নির্বিঘ্নে বায়তুল মোকাদ্দাস গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি সোজা গিয়ে মসজিদুল আকসায় উঠলেন। সেখানে সিজদায় পড়ে ছেড়ে দিলেন চোখের পানি। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে কাতর মিনতি করে বলতে লাগলেন, “হে আমার খোদা! আমাকে এমন ভয়াবহ সংকট মুহূর্তে তোমার গায়েবী মদদ দিয়ে সাহায্য করো। তোমার সৈনিকরা আজ এক কঠিন বিপদের মুখোমুখী। আমাদের আর কোন সহায় নেই যার কাছে আমরা সাহায্য চাইতে পারি।

    তুমি আমাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করো। তুমি আমাদের এমন ক্ষমতা দাও যাতে আমরা তোমার দ্বীনের দুশমনদের রুখে দিয়ে তোমার বান্দাদের নিরাপত্তা দিতে পারি, তোমার দ্বীনকে হেফাজত করতে পারি।”

    এভাবে তিনি কেঁদে কেঁদে আল্লাহর সাহায্য চাইতে লাগলেন।  ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি সারা দিন মসজিদে পড়ে অঝোরে কান্নাকাটি করলেন। সন্ধ্যার পর তিনি যখন মসজিদ থেকে বের হলেন, তখন তার মুখে ছিল প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল যে দৃঢ়তা ও মনোবল নিয়ে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস জয় করেছিলেন, তার চেহারায় আবার ফিরে এসেছে সেই দৃঢ়তা।

    রাতে সুলতান আইয়ুবী আবার মসজিদুল আকাসায় চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি সিজদায় পড়ে গেলেন এবং অশ্রু ভেজা কণ্ঠে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন। তিনি সারা রাত নফল ইবাদত ও দোয়া দরূদ পাঠ করে ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসেন।

    সেই রাতেরই ঘটনা। রাতে তিনি যখন মসজিদে গিয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করছিলেন তখন মসজিদের এক কোণে এক ব্যক্তি সারা শরীর কম্বলে ঢেকে ইবাদত বন্দেগী করছিল। সুলতান সারা রাত মসজিদে অবস্থান করেন এবং এবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে কাটিয়ে দেন নির্জন প্রহর। সেই লোকও সারা রাত মসজিদে অবস্থান করল এবং এবাদত বন্দেগী করে সময় কাটিয়ে দিল।

    তার ইবাদতের নিজস্ব কোন নিয়ম কানুন ছিল না। মনে হচ্ছিল লোকটি সুলতানকে অনুসরণ করছে। সুলতান সিজদায় গেলে সেও সিজদায় যায় আবার সুলতান মোনাজাতে বসে গেলে দেখা যায় সে লোকও দু’হাত তুলে মোনাজাত করছে। সুলতান নামাজে দাঁড়ালে সেও নামাজে দাঁড়িয়ে পড়তো। সুলতানকে অজিফা আওড়াতে দেখলে সেও অজিফা আওড়াতে শুরু করতো।

    লোকটা মসজিদে এসেই মুসল্লীদের থেকে দূরে গিয়ে বসেছিল। এশার নামাজের সময়ও দেখা গেল লোকটি তার চেহারা কম্বল ঢেকে মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। এতে কৌতুহল জাগলো সুলতানের রক্ষীদের। তারা দূর থেকে লোকটির দিকে নজর রাখতে শুরু করল।

    সকালে মুয়াজ্জিন ফজরের আজান দিলেও লোকটি তার অবস্থান থেকে নড়লো না। ওখানে দাঁড়িয়েই সে ফজরের নামাজ পড়ল। তারপর সুলতান মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলে সেও নিজেকে কম্বলে জড়িয়ে রেখে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। লোকটি মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় নামলো। এ সময় এক গোয়েন্দা পিছু নিল তার। লোকটি টের পেয়ে পথের ওপর থেমে গেল। দেখাদেখি থেমে গেল গোয়েন্দাটিও।

    কম্বলওয়ালা যখন নিশ্চিত হ’ল, তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে তখন সে ঘুরে দাঁড়ালো এবং অনুসরণকারীকে দাঁড়াতে দেখে তার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গেল। কিন্তু কি মনে কবরে সে আবার থমকে গাঁড়ালো এবং উল্টো দিকে ফিরে দ্রুত হাঁটতে লাগলো।

    তার পিছু নেয়া লোকটিও দ্রুত হাঁটতে লাগলো। রাস্তার পাশে সামনে এক লোক দাঁড়িয়েছিল। কম্বলওয়ালা তার কাছে গিয়ে থামলো এবং তাকে কিছু বলে সামনে চলে গেল। ওই লোকটি ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।

    অনুসরণকারী গোয়েন্দা সে লোকটির কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ লোকটি কে, যার সাথে তুমি কথা বললে?’

    ‘ও তুমি!’ সে লোকটি বললো, ‘তুমি তাকে অনুসরণ করছিলে?’

    ‘আমি তার পা দেখেছি।’ অনুসরণকারী বললো, ‘এ লোক পুরুষ নয়, মহিলা। এই মহিলা কি তোমার আত্মীয়? তুমি তাকে কিভাবে চেনো?’

    দাঁড়ানো লোকটি অনুসরণকারী গোয়েন্দার পূর্ব পরিচিত ছিল। তারা পরস্পরের নামও জানতো।

    ‘বন্ধু এহতেশাম!’ সে লোক বললো, ‘আমি জানি তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করছো। প্রত্যেকের ওপর দৃষ্টি রাখা তোমার দায়িত্ব। আর বন্ধু হিসেবে আমারও কর্তব্য কোন কিছু গোপন না করে তোমাকে সব বলে দেয়া। আচ্ছা বন্ধু, বলতো, একটি মেয়ের মসজিদে যাওয়া কি পাপ?’

    ‘না, মোটেই নয়।’ এহতেমাম বললো, ‘এই মহিলা নিজেকে কম্বল ঢেকে রেখেছিল। তাই আমার সন্দেহ হয়েছিল ওর ওপর। ওর দিকে নজর রাখতে গিয়েই টের পেলাম সে পুরুষ নয়, মহিলা। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার ওপর আমার কৌতুহল আরো বেড়ে গেল।

    শোন আল আস! সারা রাত আমরা তিনজন বায়তুল মোকাদ্দাসের আশেপাশে পাহারা দিয়েছি। কারণ কাল রাতটি সুলতান মসজিদেই কাটিয়েছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, আমরা ছদ্মবেশে তার হেফজতের জন্য পাহারা দিয়ে যাচ্ছি।’

    এহতেশাম বললো, ‘সুলতান কাউকে কিছু না জানিয়েই মসজিদে চলে এসেছিলেন। তার ধারণাই নেই যে, তার নিজস্ব রক্ষী বাহিনী ছাড়াও, কোন লোক তাঁর হেফজতের নিযুক্ত আছে।’

    ‘এটা হাসান বিন আবদুল্লাহর ব্যবস্থা। তুমি নিজেও সেনা কমাণ্ডার এবং আমাকে ভাল করে জানো। সে জন্যই তোমাকে সব বললাম। এখন বলো তো, মেয়েটি কে?’

    ‘অবশ্যই বলবো এহতেশাম।’ আল আস উত্তরে বললো, ‘বায়তুল মোকাদ্দাসে, বিশেষ করে মসজিদুল আকসার এত কাছে দাঁড়িয়ে কোন মুসলমান মিথ্যা বলতে পারে না। হাঁ, আমি অবশ্যই তোমাকে বলবো, এ মেয়েটি কে? কিন্তু তুমি বলো তো, এ মেয়ের ওপর তোমার সন্দেহ হ’ল কেন?’

    ‘আমি রাতে তাকে বারান্দার এক কোণে বসে থাকতে দেখলাম।’ এহতেশাম উত্তর দিল, ‘সুলতানের নিরাপত্তার কথা ভেবে মনে করলাম, তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে দেই। কিন্তু তখন এশার সময় হয়ে যাওয়ায় তাকে আর কিছু বললাম না। নামাজ শেষে সেখান থেকে তার চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু সবাই বাসায় ফিরলেও সে বাইরে বের হ’ল না।

    সে সময় সুরতান আইয়ুবী ভেতরে মিম্বরের সামনে ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত ছিলেন। আমি দেখলাম তিনি অজিফা পাঠ করছেন। কম্বলে ঢাকা লোকটি সুলতান আইয়ুবীর উপর হত্যার আক্রমণ চালাতে পারে সন্দেহ থাকলেও মসজিদ থেকে কাউকে তো বের করে দেওয়া যায় না! তাই আমি তাকে কিছু বলতে পারলাম না।

    আমি খেয়াল করে দেখলাম, লোকটার ইবাদতের নিজস্ব কোন ধরণ নেই। সে সুলতানকে অনুসরণ করে যাচ্ছে মাত্র।

    আমি আমার সাথীদেরকে তার কথা বললাম। তারাও মসজিদের ভিতরে ঢকে তাকে দেখে নিল। সাথীরা বললো, ‘এর উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।’

    রাত বাড়তে লাগলো কিন্তু সে লোক সেখান থেকে উঠল না। শেষে আমি তার পিছনে বসে গেলাম। আমি তার ক্রন্দন ও ফোঁপানোর শব্দ শুনতে পেলাম।

  • নন্দিত নরকে

    নন্দিত নরকে

    নন্দিত নরকে

    হুমায়ূন আহমেদ

    নন্দিত নরকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস। এর রচনাকাল ১৯৭০ এবং প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নকালে হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসটি রচনা করেন। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

  • আমি বীরাঙ্গনা বলছি

    আমি বীরাঙ্গনা বলছি

    ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ লেখিকা নীলিমা ইব্রাহিম রচিত একটি বই। এই বইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হওয়া সাত জন নারীর করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

    লেখিকা বইটিতে সাত জন বীরাঙ্গনা নারীর কথা বলেছেন যারা ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক অবস্থা থেকে এসেছে। দর্জির মেয়ে আছে, গ্রামের বিত্তশালী কৃষকের মেয়ে আছে আবার শহরের উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিবিদের মেয়ে আছে। তবে এই বীরাঙ্গনাদের মধ্যে একটি মিল হচ্ছে তারা জীবন যুদ্ধে কেউই পরাজিত হয়নি।

    মেহেরজান বলছে, “জীবনটা তো সরল সমান্তরালরেখায় সাজানো নয়। এর অধিকারী আমি সন্দেহ নেই, কিন্তু গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেন – কি বললেন আল্লাহ, পাগল হয়েছেন! বাঙালি মেয়ের জীবন পরিচালিত হবে আল্লাহর নির্দেশে! তাহলে এদেশের মৌলবী মওলানারা তো বেকার হয়ে থাকবেন, আর রাজনীতিবিদরাই বা চেঁচাবেন কি উপলক্ষ করে? না এসব আমার নিজস্ব মতামত, অভিযোগের বাঁধা আটি নয়।”

    যে কথা তাহের (ফাতেমার স্বামী) জানে না সেই কথাই চাঁপা ডাক্তারকে বলল। সে নির্মম কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে সে নিজেও কেঁদে উঠল। ডাক্তার নিচু হয়ে চাঁপাকে প্রণাম করল। দিদি, আপনারা প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আশ্চর্য এত ত্যাগ স্বীকার করে দেশ স্বাধীন করল বাঙালিরা, আর মা বোনদের দেওয়া ত্যাগের মূল্য দিতে পারল না। দূর্ভাগ্য সে দেশের!

    আমি মাঝে মাঝে ওর ঘরে গিয়ে বসতাম। চোখ নিচু করে মিনা বেরিয়ে যেত অথবা ঘরে ঢুকত। কিছু জিজ্ঞেস করলে খুব কুণ্ঠিতভাবে জবাব দিত। বলতাম, জেরিনা এই মেয়েগুলোর বুকে আগুন জ্বেলে দিতে পারিস না, ওরা কেন মাথা নিচু করে চলে? নীলিমাদি তোমাদের এ সমাজ ওদের চারিদিকে যে আগুন জ্বেলে রেখেছে তার উত্তাপেই ওরা মুখ তুলতে পারে না। বেশি বেশি বক্তৃতা দিও না। ওদের সম্পর্কে জেরিনা খুব বেশি স্পর্শকাতর ছিল।

    ❀ ❀ ❀

    সংসারের নিয়ম এই যে, কোন কিছু পেতে হলে তার জন্য মূল্য দিতে হয়। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে পাওয়ার জন্য আমাদের জাতিকেও বিরাট মূল্য দিতে হয়েছে। অগণিত নারী, পুরুষ ও শিশুর প্রাণ এবং বিপুল সম্পদের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই রাষ্ট্র। যারা সাধারণ মানুষ, দেশ ত্যাগ করে ভারতে যায়নি, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেনি, তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের আহার ও আশ্রয় দিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছে। স্বাধীনতা-যুদ্ধে জনসমর্থন এবং জনগণের সাহায্য-সহযোগিতার মূল্যও অপরিসীম। বর্তমান গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যুদ্ধকালে নির্যাতিতা কিছু নারীর মর্মান্তিক কাহিনী। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেই, ১৯৭২ সালে, বঙ্গবন্ধু সরকার পরম মহানুভবতায় এই নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে ঘোষণা করেন এবং স্বাধীনতা অর্জনে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দেন। নানাভাবে সরকার তাঁদেরকে আর সবার মতো মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। আমাদের সমাজ কিন্তু যথেষ্ট উদার মানসিকতার অধিকারী নয়। নানা রকম সংস্কার ও কুসংস্কার এবং ঔচিত্য-অনৌচিত্যের প্রশ্নকে আড়াল করে সামাজিক নিষ্ঠুরতাকে কেবল প্রশ্রয় নয়, প্রাধান্য দেয়। এই বৈরী বাস্তবতায় অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম সমাজকল্যাণের মনোভাব নিয়ে সাহসের সঙ্গে রচনা করেছেন এই গ্রন্থ। তিনি সরজমিনে তদন্ত করে তথ্য নির্ণয় করেছেন এবং বীরাঙ্গনাদের অন্তর্জালা তাঁদেরই জবানিতে সুন্দর ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

  • বাবরনামা

    বাবরনামা

    বাবরনামা

    মোগল সম্রাট জহির উদ্-দিন মুহম্মদ জালাল উদ্-দিন বাবর বিরচিত

    অনুবাদ • সম্পাদনা • ভূমিকা মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

    প্রকাশকাল—মাঘ ১৪২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

    প্রচ্ছদ—ধ্রুব এষ

    .

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    আমার অকাল প্রয়াত বন্ধু প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান

    তাঁর সহধর্মিণী সাহারা বানুকে

    চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ—

    জীবন-চলার পথ কত না বন্ধুর আর দুর্গম জানি

    সে জীবনে বাধা আছে, ব্যথা আছে, দুঃখ আছে, বঞ্চনা আছে,

    তবু সে জীবনখানি বিজয়ের আশা নিয়ে সদা জেগে আছে

    আশাহত ব্যথাহত, জীবন-যন্ত্রণা কত সব নেয় মানি।

    পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পথে-পথে যে জীবন চলে

    সে জীবন বাধা জয় করবেই একদিন সফল সে হবে।

    সফল জীবন-রূপে যে জীবন একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে

    চরৈবেতি চরৈবেতি, সত্য-পথে যে জীবন সদা বয়ে চলে—

    সে জীবন মরে নাকো, অমৃতস্য পুত্র রূপে চিরামর থাকে

    মহাকালচক্ররথে সে জীবন বয়ে চলে সেটাই জীবন

    অমৃতের পুত্র যারা, পৃথক সে কিছু নয় জীবনমরণ—

    ক্ষণিকের মুসাফির অমৃতের যাত্রাপথ অব্যাহত রাখে—

    ক্ষুদ্র সে জীবন তাই তার কাছে ক্ষুদ্র নয়, অসীম অনন্ত

    মহাকাল স্রোতে তাই যতই সে ভেসে যাক—নাই তার অন্ত।

    ১৫.৯.২০১৫ ঈসায়ী
    মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস
  • আনোয়ারা

    আনোয়ারা

    আনোয়ারা

    আনোয়ারা বাঙ্গালী ঔপন্যাসিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত একটি কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস। এটি তার রচিত প্রথম ও সর্বাধিক সার্থক উপন্যাস। এটি ১৯১৪ সালের ১৫ জুলাই (১৩২১ বঙ্গাব্দে) কলকাতা থেকে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। বাঙালি মুসলমান সমাজে মীর মশাররফ হোসেন রচিত “বিষাদ সিন্ধু”র পর এটিই সর্বাধিক পঠিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস। ২০১৪ সালে এ উপন্যাসের শতবর্ষ পূর্তি পালন করা হয়। এই উপন্যাসে সপ্তাদশ শতাব্দীতে গ্রামীণ বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠে।

    চরিত্রসমূহ হচ্ছে— আনোয়ারা; হামীদা; নূর ইসলাম; উকিল সাহেব; দাদীমা; গোলাপজান (আনোয়ারার সৎমা); সালেহা; সালেহার মা প্রমুখ।

    ১৯৫৬ সালে ‘আনোয়ারা’ সম্পর্কে ড. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ) এ বলেছেন,

    “জনপ্রিয়তা দিয়ে যদি কোন বইয়ের বিচার করতে হয়, তাহলে মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত ‘আনোয়ারা’র দাবিই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। ১৯১১ থেকে ১৪ সালের মধ্যে এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪৯ সালে এ বইটির ত্রয়োবিংশতি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং এ যাবৎ ‘আনোয়ারা’র দেড়লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়েছে।”

    ১৯৬১ সালে (বাংলা ১৩৬৮ সনের চৈত্র মাসে) এর সাতাশতম সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং ঐ সময় পর্যন্ত এর সাড়ে পাঁচ লক্ষ কপি বিক্রয় হয় বলে জানা যায়। কলকাতা ও ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত এ উপন্যাসের ৬০টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ‘আনোয়ারা’ এক সময় পাঠ্য-তালিকাভুক্ত ছিল।

    নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন তাঁর উপন্যাসে তাঁর সমকালীন জীবন ও সমাজকে যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সে সময়কার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ও স্খলন-পতনকে তিনি বাস্তবসম্মতভাবে রূপায়িত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাছাড়া মানবজীবনের কতগুলো চিরায়ত মূল্যবোধ যেমন-প্রেম, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ইত্যাদি তাঁর লেখায় যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে। এসব কারণেই তাঁর রচনা সেসময়ে যেমন ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, তেমনি তা চিরকালীন মানুষের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে, বিশেষত তাঁর রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক মর্যাদা পেয়েছে।

    ১৯১৭-১৯১৮ সালের মধ্যে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের পরিশিষ্ট বা সিকুয়্যাল হিসাবে ‘প্রেমের সমাধি’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে (বাংলা ১৩৭০ বঙ্গাব্দে) এর উনিশতম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আনোয়ারার মত এটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

    ১৯৬৭ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান এ উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। প্রযোজনা করেছেন ইফতেখারুল আলম। চলচ্চিত্রটিতে প্রধান চরিত্রসমূহে অভিনয় করেন রাজ্জাক, সূচন্দা, বেবী জামান, রুবিনা, রানী সরকার, আমজাদ হোসেন প্রমুখ। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ১৯৮৭ সালে এ উপন্যাসের ধারাবাহিক নাট্যরূপ সম্প্রচার করে।

    পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করেছে এই দুই নারী। তাই নিজেরা নারী হয়ে অপর নারীর প্রতি সামান্যতম ভালোবাসা বা করুণা মনে জন্ম নেয়নি। বরং প্রতিনিয়ত কিভাবে আনোয়ারাকে মানসিক অত্যাচার করা যায় সে ব্যাপারে তৎপর থেকেছে।

    উপন্যাসে শেষপর্যন্ত গোলাপজান তার লোভ, আক্রোশের জালে বন্দি হয়েছে। অতি লোভে তার ঘড়া পূর্ণ হয়। যদিও গোলাপজান আগের পক্ষের ছেলে বদসার খুনের দায় দিয়েছে স্বামীর ওপর। গোলাপজান চরিত্রের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজে বহুবিবাহের কুফল। অন্যদিকে সংসারে সৎ মায়ের উপস্থিতি সন্তানের জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় তার চিরন্তন রূপ। জাফর বিশ্বাসের মেয়ে গোলাপজান। বাবা ছিল ডাকতের সর্দার। শেষ জীবনে পুলিশের চেষ্টায় ধরা পড়ে ৮ বছর জেল খাটে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। বাপের মতো ডাকসাইটে স্বভাব গোলাপজানেরও। যদিও ভাই আজিমুল্লা বাপের পথে পা বাড়ায়নি। কিন্তু গোলাপজান দেখতে সুন্দরী। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে আসে। কিন্তু অজিমুল্লা এবং মায়ের শাসনে খোরশেদের সংসারে টিকে যায়। কিন্তু আনোয়ারার বাপ খোরশেদ স্ত্রীর কাছে সর্বদাই অবহেলিত। মেয়ের প্রতি অত্যাচারেও সে নির্বিকার। নুরল এসলামের হত্যার ষড়যন্ত্র করলেও গোলাপজানের পাপেই সে নিজ সন্তানকে হত্যা করে বসে।

    অন্যদিকে আনোয়ারার সৎ শাশুড়ির অত্যাচার অভিশাপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে কিন্তু আনোয়ারা এখানেও নির্বিকার। দুই মায়ের অত্যাচার নীরবে সয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে ঔপন্যাসিক নারী জীবনে দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দিকেই ঝুঁকেছেন। তবে উপন্যাসে তিনি সর্বোপরি দেখাতে চেয়েছেন স্বামী-স্ত্রী পরস্পর বোঝাপড়া, ঘরের সুখ বজায় থাকে নারীর ওপর, নারীর কোমল স্বভাবই সর্বত্র জয়ী, সতীত্বের গৌরব, ধর্ম জীবনের মাহাত্ম্য। আনোয়ারার দুঃখী জীবনের মাঝে স্বস্তি যেন এটুকুই নুরল এসলামের মতো পতি তার ভাগ্যে জুটেছে। নারীর অন্তঃপুরে অবস্থান এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা ও আনুগত্য উপন্যাসটিতে বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    আনোয়ারার পতিপরায়ণ স্বভাবই সংসারের সুখ-শান্তি বয়ে আনে সে লক্ষেই এগিয়েছেন লেখক। নারীর গুনেই শুধু অন্তঃপুরের শোভা বৃদ্ধি পায়। আর সে নারী যদি হয় গোলাপজান বা সালেহার মায়ের মতো তবে সংসার চির অশান্তিতে ডুবে যায়। লেখক সর্বোপরি নারীর জীবনের সঠিক দিশা দেখাতে চেয়েছেন আনোয়ারার জীবন রূপায়নের মধ্যে দিয়ে।

  • ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    অমলেন্দু দাশগুপ্ত

    ‘অমলেন্দু দাশগুপ্ত’ রচিত ‘ঋষি রবীন্দ্রনাথ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৬১ বঙ্গাব্দের শ্রীঅক্ষয় তৃতীয়ায়। প্রকাশক শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ; জেনারেল প্রিণ্টার্স য়্যাণ্ড পাব্লিশার্স লি., ১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা। গ্রন্থটির মূল্য ছিল তিন টাকা। মুদ্রাকর শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ কর্তৃক জেনারেল প্রিণ্টার্স য়্যাণ্ড পাব্লিশার্স লিমিটেডের মুদ্রণ বিভাগ—অবিনাশ প্রেস, ১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়েছিল। রচনাটি ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৩৬০ সালের ২৩শে শ্রাবণ হতে ২৩শে আশ্বিন ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল।

    ❀ ❀ ❀

    ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস আজ জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয়ই প্রাধান্য লইয়া উত্তরোত্তর পুরোভাগে আগমন করিতেছে, সে-পরিচয়টি হইল— রবীন্দ্রনাথ এ-যুগে উপনিষদের ঋষি। ঋষি শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করিয়া থাকে। ঋষি অর্থে সত্যদ্রষ্টাকে বুঝাইয়া থাকে। যিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন, তিনিই ঋষি। রবীন্দ্রনাথকে এই অর্থেই ঋষি বলা হইয়া থাকে।

    ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস আজ জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয়ই প্রাধান্য লইয়া উত্তরোত্তর পুরোভাগে আগমন করিতেছে, সে-পরিচয়টি হইল— রবীন্দ্রনাথ এ-যুগে উপনিষদের ঋষি। ঋষি শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করিয়া থাকে। ঋষি অর্থে সত্যদ্রষ্টাকে বুঝাইয়া থাকে। যিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন, তিনিই ঋষি। রবীন্দ্রনাথকে এই অর্থেই ঋষি বলা হইয়া থাকে।

    অনেকেই প্রশ্ন করিয়া থাকেন, রবীন্দ্রনাথ কি ব্রহ্মজ্ঞ? প্রশ্নটি জিজ্ঞাসার মধ্যে কোন অবিশ্বাস, সন্দেহ, প্রতিবাদ ইত্যাদি সূচিত হয় না। রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়িয়া, গান শুনিয়া সকলের মনেই এই ধারণা হইয়া থাকে যে, তিনি সত্যদ্রষ্টা ঋষি এবং তাঁহাকে ব্রহ্মজ্ঞ বলিয়াই সকলে বিশ্বাস করিয়া থাকেন। কিন্তু বিশ্বাস তো প্রমাণ নহে, তাই তাঁহাদের এই বিশ্বাসের সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে কি না, ইহা জানিবার জন্যই উক্ত প্রশ্নটি জিজ্ঞাসিত হইয়া থাকে।

    রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি সম্পর্কে বহু পুস্তক রচিত হইয়াছে। রবীন্দ্রদর্শন সম্বন্ধে বিশ্ববিখ্যাত মনীষী ডাঃ রাধাকৃষ্ণণ এবং ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তও পুস্তক রচনা করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহাকে ঋষি বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাদের এই স্বীকৃতি রবীন্দ্রনাথের মতবাদ, রবীন্দ্রনাথের রচনা ইত্যাদির ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ, ইহা প্রমাণের চেষ্টা উভয়ের কেহই করেন নাই, ঋষিরূপে তাঁহাকে স্বীকার করিয়া লইয়া তাঁহারা রবীন্দ্রদর্শন ও বাণীরই ব্যাখ্যা বা ভাষ্য করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আরও অনেকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রহিয়াছে, কিন্তু কোন গ্রন্থেই বিশেষভাবে এই প্রশ্নটিকে গ্রহণ করিয়া ইহার মীমাংসার চেষ্টা করা হয় নাই। রবীন্দ্র-জীবনীও কয়েকখানা রহিয়াছে, তাহাতেও পূর্বোক্ত প্রশ্নের কোন আলোচনা পরিদৃষ্ট হয় না।

    বলা বাহুল্য, প্রশ্নটি বস্তুতই কঠিন প্রশ্ন। কেহ ব্রহ্মজ্ঞ কি না, এ-প্রমাণ কে দিবে? তাহা ছাড়া ব্রহ্মজ্ঞ প্রমাণ-নির্ভর, এমন কথাও বলা চলে না। ব্রহ্ম আছেন, ইহাই কেহ প্রমাণ করিতে পারেন না, কারণ ব্রহ্ম প্রমাণের অতীত। যাঁহাকে প্রমাণ করা যায় না, সেই ব্রহ্মকে কেহ জানিয়াছেন কি না, ইহাও প্রমাণ করা স্বভাবতই সমান সাধ্যাতীত। সাধকগণ বড়জোর এই কথাই বলিতে পারেন এবং বলিয়া থাকেন যে, ব্রহ্মকে জানা যায়, তাঁহাকে পাওয়া যায় এবং অনেকেই বলিয়া গিয়াছেন যে, তাঁহারা তাঁহাকে জানিয়াছেন। তাঁহাদের আত্মোপলব্ধিই এই বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ।

    কিন্তু সে-প্রমাণও একান্তভাবে তাঁহাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেই আবদ্ধ, তাঁহারাও সে-প্রমাণকে বাহিরে আনিতে পারেন নাই। কাজেই রবীন্দ্রনাথ ঋষি, রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, ইহা প্রমাণ করা কাহারও পক্ষে সম্ভবপর নহে। শুধু ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তিই জানিতে পারেন যে, রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ কি না। কিন্তু তাঁহাদের সে-জানাটাও প্রমাণ করা অসাধ্য ও অসম্ভব।

    রবীন্দ্রনাথ ঋষি, তিনি ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, আমাদের এই বিশ্বাসের তবে কি কোন প্রমাণই পাওয়া সম্ভবপর নহে? সে-প্রমাণ পাওয়া একেবারে অসম্ভব ব্যাপার বলিয়া আমি মনে করি না। কেন, তাহাই প্রথমে সংক্ষেপে একটু আলোচনা করা যাইতেছে।

    ব্রহ্মসূত্রে ব্রহ্মের পরিচয়ে বলা হইয়াছে—“জন্মাদ্যস্য যতঃ”, এই অচিন্ত্য বিচিত্র বিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় যাঁহা হইতে, তিনিই সেই জিজ্ঞাসিত ব্রহ্ম। কিন্তু ইহা ব্রহ্ম সম্বন্ধে প্রমাণ নহে, শুধু লক্ষণ বা চিহ্ন। তেমনি ব্রহ্মজ্ঞ সম্বন্ধেও লক্ষণ বা চিহ্ন থাকে, তাহাই ব্রহ্মজ্ঞ সম্বন্ধে প্রমাণ বলিয়া স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে। ব্রহ্মজ্ঞের সে লক্ষণ বা চিহ্ন কি? ব্রহ্মোপলব্ধি বা আত্মোপলব্ধিই সেই লক্ষণ। দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসদেব বলিয়াছেন যে, যখন নিজের উপলব্ধি এবং শাস্ত্রের বাক্য মিলিয়া যায়, তখনই সাধক সিদ্ধ হইয়াছে জানিবে। উপলব্ধি এবং শাস্ত্রবাক্য এই সঙ্কেতনির্দেশ গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইলেই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত সেই প্রমাণ পাওয়া যাইতে পারে।

    কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ অতি অল্প কথাই লিখিয়াছেন। তাঁহার আত্মজীবনীর পাঠকমাত্রেই লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন যে, নিজের জীবনস্মৃতি রচনাতে তিনি নিজেকেই যথাসাধ্য আড়ালে রাখিয়াছেন, শুধু জীবনকেই গ্রহণ করিয়াছেন। নিজের সম্বন্ধে বলিতে তাঁহার ভদ্রমন এতই সঙ্কোচ ও দ্বিধাবোধ করিয়াছে যে, নিজের জীবনের ঘটনারও খুব কম উল্লেখই তিনি আপন জীবনস্মৃতিতে করিয়াছেন। সংযত ভদ্রমনের এতবড় পরিচয় আজ পর্যন্ত কোন আত্মজীবনীতেই দেখা যায় না এবং মনের এইরূপ আভিজাত্য লইয়া কম মানুষই পৃথিবীতে আসিয়াছেন।

    ধর্মগুরু, বা ধর্মপ্রচারকের ভূমিকা লইয়া রবীন্দ্রনাথ আসেন নাই, আসিয়াছেন কবিরূপে, তাই আপন জীবনের এই গভীরতম দিকটি তিনি নিকটতম জনের নিকট হইতেও একান্তভাবে গোপন রাখিয়াছেন। তথাপি শ্রম ও অধ্যবসায় লইয়া অগ্রসর হইলে তাঁহার ব্যক্তিগত উপলব্ধির বিবরণ কিছু কিছু সংগ্রহ যে না করা যায়, এমন নহে। কোন অধিকারী পুরুষ যদি এই বিষয়ে অগ্রসর হন, তবে রবীন্দ্রনাথের ঋষি-জীবনী এক পরম সম্পদরূপেই তিনি দেশবাসীকে দিয়া যাইতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের ঋষি-জীবনের সামান্য একটু দিগদর্শনের চেষ্টা মাত্র এখানে করা যাইতেছে।

  • হযরত ওমর

    হযরত ওমর

    হযরত ওমর

    বিচারপতি আবদুল মওদূদ রচিত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর জীবনী ‘হযরত ওমর’। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল পৌষ ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ (জানুয়ারি ১৯৬৭)। গ্রন্থটির দ্বাদশ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে। প্রকাশক মেছবাহউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৬৬ প্যারীদাস রোড, ঢাকা ১১০০। প্রচ্ছদ এঁকেছেন গোপাল মণ্ডল।

    উৎসর্গ

    বহু-ভাষাবিদ্ জ্ঞান সাগর

    ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

    শ্রদ্ধাভাজনেষু—

    ওকবাহ-বিন-আমিরের উক্তি-মতে নবী করীম (স.) বলেছিলেন–আমার পরে যদি কেউ নবী হতো, তা হলে ওমর-বিন্-খাত্তাব হতো।

    —তিরমিযি

    ভূমিকা

    ‘হযরত ওমর’ রচনা আজ শেষ হলো। এজন্যে প্রথমেই জানাই করুণাময় আল্লাহতালার উদ্দেশ্যে অশেষ শুকরিয়া।

    ওমর চরিত্রের বিশালতা উপলব্ধি করে স্বভাবতঃই আমি কুণ্ঠিত হই এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে, যদিও অনুরোধ আসে ‘কেন্দ্রীয় বাঙলা-উন্নয়ন-বোর্ডের পরিচালকের নিকট থেকে, যা আমার পক্ষে গৌরবের বিষয়। আমি আরও কুণ্ঠিত হই প্রধানত দুটি কারণে : যে পরিমাণ জ্ঞান ও অধ্যয়ন থাকা দরকার এরূপ মহৎ চরিত্র-চিত্রণে, তার কোনটাই আমার নেই; দ্বিতীয়তঃ সরকারী গুরু কর্তব্যভার যথাযোগ্য সম্পন্ন করে এরূপ বিরাট কাজে হস্তক্ষেপ করার মতো উপযুক্ত অবসর এবং মন ও মেজাজ পাওয়াও আমার পক্ষে সুদুর্লভ। তবুও এ কাজের ভার গ্রহণ করতে সাহসী হই, শ্রদ্ধেয় বন্ধুবর ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক সাহেবের আগ্রহাতিশয্যে। আমার সীমিত সামর্থের মধ্যে এ কাজে কতোটুকু সফল হতে পেরেছি, তার বিচারভার রইলো সহৃদয় পাঠক-শ্রেণীর উপর।

    আমি আগেই বলেছি, ওমর চরিত্র বিশাল ও মহৎ। এরূপ মহান চরিত্র চিত্রণকালে যে সব বিষয়ে, বিশেষতঃ খালিদ-বিন-ওলিদের পদচ্যুতি সম্পর্কিত তর্কিত বিষয়ে, যেরূপ আলোকপাত করা উচিত, আমার অক্ষম লেখনী-মুখে তা সম্ভব হয়নি, বিশাদ বা পরিচ্ছন্ন হয়নি। এ অক্ষমতাটুকুর জন্যে ওজরখাহী করে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, কোথাও সত্য গোপন করিনি, ঐতিহাসিক তথ্যের বিপরীত কিছু আলোচনা করিনি, কিংবা আমার আজন্ম শ্রদ্ধান্বিত হিরোর’ চরিত্র-চিত্রণে অতিরঞ্জনের চেষ্টাও পাইনি। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তথ্য-সম্বলিত সঠিক আলেখ্য তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছি।

    আরও একটি বিষয়ে পাঠকশ্রেণীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী প্রভৃতি ইসলামের পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নামোল্লেখে আমি ইংরেজিতে ও সাধারণতঃ উর্দুতে অনুসৃত নীতি অবলম্বন করে কেবলমাত্র তাঁদের নামোল্লেখ করেছি, নামের পূর্বে ‘হযরত’ ও পরে ‘রাদিআল্লাহ্” লিখিনি। এ পন্থা অবলম্বন করেছি লেখার সুবিধার্থে ও সাহিত্যের রীতি অনুসারে। আমি ‘হযরত’ শব্দটির শুধুমাত্র নবী-করীমের উদ্দেশ্যই ব্যবহার করেছি এবং এভাবে তাঁর ও তাঁর সাহাবাদের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখিতে প্রয়াস পেয়েছি।

    রাওয়ালপিণ্ডি
    ১৫ নভেম্বর, ১৯৬৫।
    আবদুল মওদুদ

    ❀ ❀ ❀

    ওমর! ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ বাহু!

    আহ্বান নয়-রূপ ধরে এসো! -গ্রাসে অন্ধতা রাহু

    ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!

    সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকীর আলো ক্ষীণ!

    * * *

    ইসলাম-সেত পরশ-মাণিক, তারে কে পেয়েছে খুঁজি?

    পরশে তাহারা সোনা হলো যারা, তাদেরই মোরা বুঝি।

    আজ বুঝি—কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর

    “মোর পরে যদি নবী হতো কেউ-হত সে এক উমর।”

    * * *

    হে খলিফাতুল মুসলেমীন! হে চীরধারী সম্রাট!

    অপমান তব করিবনা আজ করিয়া নান্দী পাঠ

    মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই

    তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।

    — কাজী নজরুল ইসলাম

  • ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    আঁধার আঁধার! অসীম আঁধার!

    আঁখি হয়ে যায় অন্ধ!

    জাগো শিশু-রবি, আনো আলো-সোনা

    আনো প্রভাতের ছন্দ!

    হ্যাঁ, ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের কথা বলব। প্রাগৈতিহাসিক কালে আর্যাবর্তে বিচরণ করতেন রঘু, কুরু, পাণ্ডব, যদু ও ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি বংশের মহা মহা বীররা। তাঁদের কেউ কেউ অবতার রূপে আজও পূজিত হন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের জগতে ভারতে প্রথম প্রভাত এনেছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতবিজয়ী আলেকজান্ডার এবং গ্রিকবিজয়ী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত।

    রাম-রাবণ ও কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধকাহিনির মধ্যে অল্পবিস্তর ঐতিহাসিক সত্য থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সে সম্বন্ধে তর্ক না তুলে আপাতত এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, পুরাণ-বিখ্যাত সেই সব যুদ্ধের পরেও ভারতে এসেছিল দীর্ঘকালব্যাপী এক তমিস্রযুগ। তারই মধ্যে কেবল সত্যের সন্ধান দেয় নিষ্কম্প দীপশিখার মতো বুদ্ধদেবের বিস্ময়কর অপূর্ব মূর্তি। আজ ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি, তখনও তার অস্তিত্ব ছিল না বটে, কিন্তু কি এদেশি, কি বিদেশি কোনও ঐতিহাসিকেরই এমন সাহস হয়নি যে বুদ্ধদেবকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দেন। সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বলতে বুঝি, বুদ্ধদেবের জীবনচরিত।

    বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং শিলালিপি প্রভৃতির দৌলতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পরবর্তী যুগের ভারতের কতকগুলি প্রামাণিক ছবি আমরা পেয়েছি। যদিও সে যুগের বৌদ্ধ চিত্রশালা সম্পূর্ণ নয়, তবু আলো-আঁধারের ভিতর থেকে ভারতের যে মূর্তিখানি আমরা দেখতে পাই, বিচিত্র তা—মোহনীয়!

    তারপরই সেই ছায়ামায়াময় প্রাচীন আর্যাবর্তে সমুজ্জ্বল মশাল হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার। যে শ্রেণির কাহিনিকে আজ আমরা ইতিহাস বলে গ্রাহ্য করি, তার জন্ম হয়েছিল সর্বপ্রথমে সেকালকার গ্রিক দেশেই। কাজেই আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান স্থানলাভ করল গ্রিক ইতিহাসেও এবং আলেকজান্ডারের পরেও প্রাচীন ভারতের সঙ্গে গ্রিসের আদান-প্রদানের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। তাই সে যুগের ভারতবর্ষের অনেক কথাই আমরা জানতে পেরেছি গ্রিক লেখকদের প্রসাদে। সেলিউকস প্রেরিত গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস লিপিবদ্ধ করে না রাখলে আমরা মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের যুগে মগধ সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের রাজপ্রাসাদ, রাজসভা, রাজধানী, সমাজনীতি, শাসননীতি, আচার-ব্যবহার প্রভৃতির অনেক কথাই জানতে পারতুম না। এজন্যে গ্রিসের কাছে ভারতবর্ষ হয়ে থাকবে চিরকৃতজ্ঞ।

    প্রাকৃতিক জগতে যেমন কখনও মেঘ কখনও রোদের খেলা, কখনও আলো কখনও ছায়ার মেলা, প্রত্যেক দেশের সভ্যতার ইতিহাসেও তেমনই পরিবর্তনের লীলা দেখা যায়। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের বা ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ কি আরও দুই-এক বছর আগে। তার কিছু কম দেড় শতাব্দী পরে মৌর্য সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়। তারপর ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখি সুঙ্গ, কান্ব ও অন্ধ্র প্রভৃতি বংশের কমবেশি প্রভুত্ব। ইতিমধ্যে গ্রিকরাও বারকয়েক ভারতের মাটিতে আসন পাতবার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

    কেবল গ্রিকরা নয়, মধ্য এশিয়ার ভবঘুরে মোগলজাতি তখন থেকেই ভারতবর্ষে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোগল বলতে তখন মুসলমান বোঝাত না (নিজ মঙ্গোলিয়ায় আজও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মোগলরা আছে) এবং মোগল বলতে আসলে কী বোঝায় সে সম্বন্ধেও সকলের খুব পরিষ্কার ধারণা নেই। যুগে যুগে নানা জাতি মোগলদের নানা নামে ডেকেছে। এদের বাহন ছিল ঘোড়া, খাদ্য ছিল মাংস, পানীয় ছিল দুগ্ধ। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোদোতাস এদের ডেকেছেন ‘সিথিয়ান’ বলে, পরবর্তী যুগের রোমানরা এদের ‘হুন’ নামে ডাকতেন, প্রাচীন ভারতে এদের নাম ছিল ‘শক’, এবং চিনারা এদের নাম দিয়েছিল Hiungnu। আসলে মোগল, শক, হুন, তাতার ও তুর্কিরা একরকম এক জাতেরই লোক, কারণ তাদের সকলেরই উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায় বা মঙ্গোলিয়ায়। এই আশ্চর্য জাতি ধরতে গেলে এক সময়ে প্রাচীন পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশকেই দখল করেছিল এবং ভারতবর্ষ তাদের অধিকারে এসেছিল দুইবার। প্রথমবারে তাদের বংশ কুষাণ বংশ বলে পরিচিত হয়। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বিখ্যাত সম্রাট কনিষ্ক এই বংশেরই ছেলে। দ্বিতীয়বারে তারা মোগল রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করে।

    মোগল বা শকরা ভারতে এসে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাবে নিজেদের সমস্ত বিশেষত্ব—এমনকী ধর্ম পর্যন্ত হারিয়ে একেবারে এদেশের মানুষ হয়ে পড়েছিল। কনিষ্ক ছিলেন বৌদ্ধ, তবু তাঁর নামে বিদেশি গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু কুষাণ বংশের শেষ সম্রাট বাসুদেবের নামই কেবল ভারতীয় নয়, ধর্মেও তিনি ছিলেন শৈব মতাবলম্বী হিন্দু। কারণ তাঁর নামাঙ্কিত প্রায় প্রত্যেক মুদ্রায় দেখা যায় শিব এবং শিবের ষাঁড়ের প্রতিমূর্তি।

    আনুমানিক ২২০ খ্রিস্টাব্দে বাসুদেবের মৃত্যু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে হয় কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন। যদিও তারপরেও কিছুকাল পর্যন্ত ভারতের এখানে-ওখানে কুষাণদের খণ্ড খণ্ড রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু কুষাণদের কেউ আর সম্রাট নামে পরিচিত হতে পারেননি।

    মোগল বা শকদের রাজত্বের সময়েই ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গোধূলির ম্লান আলো। প্রাচীনতর হলেও মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ যেন স্পষ্ট রূপে ও রেখায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শক ভারতবর্ষে তেমনভাবে নজর চলে না—সেটা ছিল যেন আলো-মাখানো ছায়ার যুগ, তার খানিকটা স্পষ্ট আর খানিকটা অস্পষ্ট।

    কিন্তু কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে এল সত্যিকার তমিস্রযুগ। যেন এক অমাবস্যার মহানিশা এসে সমগ্র আর্যাবর্তকে তার বিপুল আঁধার আঁচলে ঢেকে দিলে। অবশ্য, এ সময়কার হিন্দুস্থানে কোনও সাম্রাজ্য ও সম্রাট না থাকলেও ছোট ছোট রাজ্যের খুদে খুদে রাজার যে অভাব ছিল না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। নানা পুরাণে এ সময়কার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তাও ভাসা ভাসা, রহস্যময়। ওই খুদে রাজাদের কারুর ভিতরে এমন শক্তি ও প্রতিভা ছিল না যে সমগ্র ভারতের উপরে বিপুল একচ্ছত্র তুলে ধরেন। এক-এক দেশের সিংহাসন পেয়ে এবং বড়জোর প্রতিবেশি ছোট ছোট রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ বা ঝগড়া করেই তাঁরা তুষ্ট ছিলেন। এই গভীর অন্ধকার জগতে মাঝে মাঝে যেন, বিদ্যুৎ-চমকের মধ্যে দেখা যায় আভিরাস, যবন, শক, বল্হীক ও গর্দব্বিলাস প্রভৃতি অদ্ভুত বা বিদেশি বংশকে!

    বৃহৎ ভারতের আত্মা যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনুমানে বোঝা যায়, তখন ক্রমেই বৌদ্ধধর্মের অধঃপতন হচ্ছিল এবং হিন্দুধর্মের হচ্ছিল ক্রমোন্নতি। কিন্তু তখনকার দেশাচার, কলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইতিহাস জানবার কোনও উপায়ই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র মৌর্য বংশ লোপ পাওয়ার পরেও এবং সেই অন্ধকার যুগেও যে একটি প্রসিদ্ধ নগর বলে গণ্য হত, এ কথা জানা যায়। কিন্তু পাটলিপুত্রের রাজার নাম পাওয়া যায় না। পাঞ্জাবে ও কাবুলে ছিলেন শকবংশীয় কোনও কোনও রাজা। এ কথাও জানা গিয়েছে যে, কাবুলের ভারতীয় শক রাজারা ছিলেন বিলক্ষণ ক্ষমতাবান (৩৬০ খ্রিস্টাব্দেও কাবুলের শক রাজার দ্বারা প্রেরিত ভারতীয় যুদ্ধহস্তী ও সৈন্যের সাহায্যে পারস্যের অধিপতি দ্বিতীয় সাপর প্রাচ্য রোম-সৈন্যদের পরাজিত করেন)।

    প্রায় এক শতাব্দী এই অন্ধকার রহস্যের মধ্য দিয়ে অতীত হয়ে যায়। এই হারানো ভারতকে আর অতীতের গর্ভ থেকে উদ্ধার করা যাবে না, বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসে কেবল অন্ধকারের আর্তনাদ!

    ইউরোপের অবস্থাও তখন ভালো নয়। গ্রিস তখন গৌরবহীন এবং পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য হয়েছে বর্বর, অন্ধকার যুগের মধ্যে প্রবেশ করতে উদ্যত। চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কনস্তানতাইন দি গ্রেটের মৃত্যুর পর ইউরোপীয় রোম-সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল নামে মাত্র।

    কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা যখন মৃত্যুন্মুখ,  মহাভারতে জাগল তখন নবজীবনের কলধ্বনি।

    প্রায় শতাব্দীকাল পরে ঐতিহাসিক ভারতে এল আবার দ্বিতীয় প্রভাত! আমরা আজ সেই নবপ্রভাতের জয়গান গাইবার জন্যেই আয়োজন করছি।

    দীর্ঘরাত্রি শেষে প্রাতঃসন্ধ্যা এসে অন্ধকারের যবনিকা যখন সরিয়ে দিলে, তখন দেখলুম পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বিরাজ করছেন যে রাজা, ইতিহাসে তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত নামে বিখ্যাত (আনুমানিক ৩১৮ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর বাপের নাম ঘটোৎকচ এবং ঠাকুরদাদা ছিলেন শুধু গুপ্ত নামেই পরিচিত।

    গুপ্তবংশের উৎপত্তি নিয়ে গোলমাল আছে। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন নীচ জাতের লোক। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন অহিন্দু।

    লিচ্ছবি জাতি বুদ্ধদেবের সময়েই বিখ্যাত হয়েছিল। বৌদ্ধগ্রন্থে প্রসিদ্ধ বৈশালী নগরে ছিল লিচ্ছবিদের রাজ্য। লিচ্ছবিরা আর্য না হলেও সম্ভ্রান্ত ছিল অত্যন্ত এবং তাদের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

    এই বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিয়ে করে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মানমর্যাদা এত বেড়ে গেল যে, তুচ্ছ ‘রাজা’ উপাধি আর তাঁর ভালো লাগল না। তিনি গ্রহণ করলেন ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি এবং স্বাধীন নরপতির মতো নিজের ও রানি কুমারদেবীর নামাঙ্কিত মুদ্রারও প্রচলন করলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে চলল রাজ্য বাড়াবার চেষ্টা। এ চেষ্টাও বিফল হল না। দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই তিরহুত ও অযোধ্যা প্রভৃতি দেশ হস্তগত করে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত প্রমাণ করলেন যে সত্যসত্যই তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভের যোগ্য। ওদিকে তাঁর রাজ্যসীমা গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল (আজ যেখানে এলাহাবাদের অবস্থান) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজ্যাভিষেকের পরে নিজের নামে তিনি এক নতুন অব্দও চালালেন—তা গুপ্তাব্দ বলে পরিচিত।

    প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বেশিদিন রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারেননি। কিন্তু ছোট্ট একটি খণ্ড রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি যখন মাত্র দশ-পনেরো বছরের ভিতরেই নিজের রাজ্যকে প্রায় সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তখন তাঁর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ বীরত্ব ও যথেষ্ট যুদ্ধকৌশলের অভাব ছিল না, এ সত্য বোঝা যায় সহজেই। ম্যাসিদনের অধিপতি ফিলিপ তাঁর সমধিক বিখ্যাত পুত্র আলেকজান্ডারের জন্যে এমন দৃঢ় ভিত্তির উপরে সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন যে বিশেষজ্ঞদের মতে ফিলিপের মতো রাজনীতিজ্ঞ ও যুদ্ধকৌশলী পিতা না পেলে আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ী হতে পারতেন কিনা সন্দেহ! গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তও আর এক অতি বিখ্যাত পুত্রের পিতা। অতি অল্পদিনে খণ্ড-বিখণ্ড ভারতবর্ষে তিনি এমন এক অখণ্ড ও বিপুল রাজ্য স্থাপন করে গেলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই আকারে ও বলবিক্রমে তা প্রায় সুপ্রসিদ্ধ মৌর্য সাম্রাজ্যের সমান হয়ে উঠেছিল এবং তার স্থায়িত্ব হয়েছিল কিছু কম দুইশত বৎসর! ব্যাপকভাবে ধরলে বলতে হয়, ভারতবর্ষের উপরে গুপ্তযুগের অস্তিত্ব ছিল তিনশত পঞ্চাশ বৎসর!

    বলেছি, গুপ্তবংশীয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব নিশান্তকালে প্রাতঃসন্ধ্যায়। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের গৌরবময় অপূর্ব সূর্যোদয় তখনও হয়নি। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত তরুণ সূর্যের জন্যে অরুণ আসর সাজিয়ে রাখলেন। তারপরই হল গৌরবময় সূর্যোদয়। আর্যাবর্ত তারপরে আর কখনও দেখেনি তেমন আশ্চর্য সূর্যকে। তারই বিচিত্র কিরণে সৃষ্ট হয়েছিল ভারতের যেসব নিজস্বতা বা বিশেষত্ব, আজও বিশ্বসভায় তাই নিয়ে আমরা গর্ব করে থাকি। ভারতের অমর কালিদাস গুপ্তযুগেরই মানুষ। কেবল কি কালিদাসের কাব্য? ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘মুদ্রারাক্ষস’ প্রভৃতি অতুলনীয় সাহিত্যরত্নের সৃষ্টি গুপ্তযুগেই। প্রাচীনতম পুরাণ ‘বায়ুপুরাণ’ এবং ‘মনুসংহিতা’ও তাই। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতিষজ্ঞ হিসাবে গুপ্তযুগের বরাহমিহির ও আর্যভট্টের নাম বিশ্ববিখ্যাত। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় গুপ্তযুগের প্রতিভাকে প্রমাণিত করবার জন্য আজও বিদ্যমান আছে অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, ভরহুত, অমরাবতী ও শিগিরি প্রভৃতি। দিল্লির বিস্ময়কর লৌহস্তম্ভের জন্ম গুপ্তযুগেই। সংগীতকলাও হয়ে উঠেছিল সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ। কত আর নাম করব?

    এতক্ষণ গেল ইতিহাসের কথা। পরের পরিচ্ছেদেই আমাদের গল্প শুরু হবে এবং দেখা দেবেন আমাদের কাহিনির নায়ক।

  • ফুটন্ত গোলাপ

    ফুটন্ত গোলাপ

    ফুটন্ত গোলাপ

    কাসেম বিন আবুবাকার

    ফুটন্ত গোলাপ বাংলাদেশের কাসেম বিন আবুবাকারের লিখিত একটি রোমান্টিক উপন্যাস। লেখকের প্রথম উপন্যাস ফুটন্ত গোলাপ বইটি ১৯৮৬ প্রকাশিত হবার পরে, বইটি বাংলাদেশের প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের মানুষের নিকট বইটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠে, এবং বইটি তৎকালীন সময়ে বেস্ট সেলার বই হয়ে উঠে। এরপর ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি লেখক ও এই বইটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরে লেখক ও বইটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কেন্দ্রে পরিণত হয়। এমনকি বইটি কাসেম বিন আবুবাকারের লেখা কিনা, সেটা নিয়েও সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরি হয়। তবে কিছু পাঠক বইটি নিয়ে ব্যক্তিগত ব্লগিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করেছেন। ২০১১ সালে বইটি ৩০ তম সংস্করণ বাজারে বের হয়েছে, এবং বইটি সর্বমোট ১.৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে।

    কাহিনী সংক্ষেপ

    এই উপন্যাসটি প্রেমের সাথে ইসলামি ভাবধারার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। উপন্যাসের শুরুতেই মূল দুই ব্যক্তিত্ব নায়ক সেলিম ও নায়িকা লাইলির দেখা হয়ে যায়। গল্পে লাইলিকে একজন ধর্মপ্রান যুবতী হিসাবে দেখানো হয়েছে, লাইলির বাবা একজন কেরানি। লাইলি নিজে ভালো ইসলামি গান জানে। লাইলিদের পরিবার গরিব, অসহায় ও দুস্থভাবে জীবনযাপন করে। অপরদিকে সেলিমের পিতা একজন ধনী পরিবারের একজন সন্তান, সেলিম নিজেও ধর্মকর্ম তেমন বেশি মানেনা। সেলিম খুব ভালো ফুটবল খেলোয়ার এবং জুডো ও কারাতে পারদর্শী। সে নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করতে পারে। তবে লাইলি ও সেলিমের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, সেটি হলো তারা দুইজনই মেধাবী শিক্ষার্থী, তারা উভয়ই নিজ নিজ ক্লাসে প্রথম স্থানের অধিকারী হয়।

    উপন্যাসে লেখক গল্পের মধ্যে নানা নীতিকথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত, সেটিও লেখক তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে কি ধরনের নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটিও বইতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।

    বাস্তব উপজিব্য

    লেখক মল্লিক ব্রাদার্সে চাকরি করার সময় এই উপন্যাসটি লিখেন। সেই সময়ে মল্লিক ব্রাদার্সে একটি শিক্ষিতা মেয়ে কাজের জন্য আসতো। মেয়েটি বাইরে কমদামী বোরকা পরলেও, ভিতরে দামি পোশাক পরিধান করে ছিলো। লেখক বিষয়টি বুঝতে পারলে, মেয়েটি জবাবে তাকে বলে, ইসলাম ধর্ম নারীদের নিরাপত্তা ও পর্দার বিধানের জন্য বাইরে বের হওয়ার সময় অনাকর্ষক পোশাক পরিধান করতে বলেছে। লেখক এই মেয়ের এই ধারণা শুনে অভিভূত হন, এবং এই উপন্যাসটি রচনা করেন। উপন্যাসটি লেখার পরে লেখক দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই বলেছিলেন, আমার এই উপন্যাস এক দিন না এক দিন সবাই গ্রহণ করবে।

    জনপ্রিয়তা

    লেখক এই বইটি ১৯৭৮ সালে লেখা শুরু করেন, এটিই লেখকের প্রথম বই হওয়ায় নানা প্রতিবন্ধকতায় বইটি ১৯৮৬ সালে ১ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশ করা হয়। বইটি প্রকাশের পর ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বইটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করে। এরপর বই ও লেখককে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, যুক্তরাজ্যের মিডিয়া ডেইলি মেইল, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও মালয়মেইল পত্রিকা, ফ্রান্সের দ্য ডন পত্রিকা, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকাসহ আরো নানা আন্তর্জাতিক পত্রিকা বইটি ও লেখককে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের মধ্যেও বইটি সম্পর্কে বহু প্রতিবেদন এবং বিশাল জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায়। বইটি গুডরিডস বুক রিভিউ ওয়েবসাইটে ২১০ রেটার ২.৬৭ রেটিংস দিয়েছে।

    সমালোচনা

    বইটির তুমুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনেক সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকগণ বইটিকে একটি নিম্নমানের সাহিত্য বলে উল্লেখ করেছে, তারা বলেছে এই বইয়ের বাচনভঙ্গি, তুলনামূলক উদাহরণ ও বাক্য রচনায় উচ্চ সাহিত্যের ছাপ পাওয়া যায়নি। তারা উল্লেখ করেছে বইটি নিম্নমানের অর্ধ-শিক্ষিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে রচনা করেছে। এছাড়াও কিছু ইসলামি ব্যক্তিত্বও বইটিতে ইসলামি রচনার মোড়কে অশ্লীলতা ও নগ্নতা ছড়ানোর অভিযোগ করেছে।

    গ্রন্থকথা

    ফুটন্ত গোলাপ ইসলামিক প্রেমের উপন্যাস; লেখকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। প্রকাশক নূর-কাসেম পাবলিশার্স। প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর-১৯৮৬ খৃঃ। প্রথম নূর কাসেম পাবলিশার্স সংস্করণ জানুয়ারি-১৯৯৭ খৃঃ। ত্রিশতম প্রকাশ : মার্চ-২০১১ খৃঃ। প্রচ্ছদ সমর মজুমদার। যুক্তরাজ্য পরিবেশক সঙ্গী লিমিটেড, ২২ ব্রিকলেন, লন্ডন, যুক্তরাজ্য। গ্রন্থস্বত্ব লেখক। নূর-কাসেম পাবলিশার্স, ৩৮/৪, বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা-১১০০, থেকে মোঃ সায়ফুল্লাহ্ খান কর্তৃক প্রকাশিত এবং সালমানী মুদ্রণ সংস্থা, ৩০/৫, নয়াবাজার, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।

    বর্ণ বিন্যাস বাধন কম্পিউটার্স ৪৭/১, বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা ১১০০।

    উৎসর্গ

    যাদের মারফত আল্লাহপাক আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, সেই পুণ্যবান ও পুণ্যবতী আব্বা-আম্মার মোবারক কদমে।

    • “হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর। এবং শয়তানের অনুসারী হয়ো না। বাস্তবিকই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” –আল-কোরআন, সূরা-বাকারা, আয়াত-২০৮, পারা-২।
    • “পাঁচ ব্যক্তির সংসর্গ হইতে সর্বদা দূরে থাকিও (ক) মিথুক (খ) আহাম্মক (গ) কৃপণ (ঘ) কাপুরুষ (ঙ) ফাসেক।” –ইমাম জাফর সাদেক (রঃ)

    ভূমিকা

    বর্তমান সমাজের চরম অবনতি উপলব্ধি করে এই কাহিনী লেখার প্রেরণা পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে এভাবে যদি দিন দিন আমরা প্রগতি ও নারী স্বাধীনতার নাম দিয়ে চলতে থাকি, তা হলে ইসলাম থেকে সমাজের মানুষ বহুদূরে চলে যাবে। শুধু মুখে, কেতাবে ও মুষ্টিমেয় লোকের কাছে ছাড়া অন্য কোথাও ইসলামের নাম গন্ধ থাকবে না।

    বিদেশী শিক্ষাকে আমি খারাপ বলছি না। পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি। কিন্তু বিদেশী শিক্ষার সংগে সংগে তাদের ভালো দিকটা বাদ দিয়ে খারাপ দিকটাই অনুকরণ করে আমরা যেন “কাকের ময়ুর হওয়ার মত মেতে উঠেছি।

    অথচ আল্লাহ তায়ালা কোরআন পাকে বলিয়াছেন-”তোমরা (মুসলমানরা) উত্তম সম্প্রদায়, যে সম্প্রদায়কে প্রকাশ করা হইয়াছে মানবমণ্ডলীর জন্য। তোমরা নেক কাজের আদেশ কর এবং মন্দ কাজ হইতে নিবৃত্ত রাখ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” (সূরা-আল ইমরান, ১১০ নং আয়াত, পারা-৪)।

    আর এখন আল্লাহপাকের কথিত সেই মুসলমানেরা কোরআন ও হাদিসের আদর্শ ত্যাগ করে দুনিয়ার মধ্যে সব থেকে নিকৃষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছে। তাই তারা পৃথিবীর সকল দেশেই উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত।

    আমরা যদি আল্লাহর ও রাসূলের (দঃ) বাণীকে অনুকরণ ও অনুস্বরণ করে চলি, তা হলে নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের রহমতে আবার আমরা আমাদের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করতে পারব।

    যদি এই বাস্তবধর্মী উপন্যাসটি পড়ে বর্তমান যুব সমাজ সামান্যতমও জ্ঞান লাভ করে সেইমতো চলার প্রেরণা পায়, তবে নিজেকে ধন্য মনে করব।

    আমার এই প্রাণ প্রিয় উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৮৬ইং সালে এবং প্রথম সংস্করণেই বাংলাদেশ ও ভারতের পাঠক সমাজে আশাতীতভাবে সমাদৃত হয়। এ জন্য আমি আল্লাহপাকের দরবারে শতকোটি শুকরিয়া আদায় করছি এবং সেই সংগে আমার প্রিয় পাঠকবর্গের কাছে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

    ওয়াস সালাম
    কাসেম বিন আবুবাকার
    ২০ই পৌঁষ- ১৪০৩ বাংলা
    ২৩শে শাবান- ১৪১৭ হিজরী
    ৩রা জানুয়ারী ১৯৯৭ ইং

  • সে কোন বনের হরিণ

    সে কোন বনের হরিণ

    সে কোন বনের হরিণ

    কাসেম বিন আবুবাকার

    সে কোন বনের হরিণ, ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকার; প্রকাশক বিশ্বসাহিত্য ভবন, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০।

    1. “সৎ দ্বারা অসৎ দূর কর”, এই আয়াত সম্বন্ধে (হযরত মুহাম্মদ (দঃ)) বলিয়াছেন, “ক্রোধে ধৈর্য এবং অসদ্ব্যবহারের সময় ক্ষমা কর। যখন তাহারা ইহা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাহাদিগকে রক্ষা করিবেন এবং তাহাদের শত্রুগণকে হেয় করিবেন, যেন তাহারা পরম সুহৃদ হয়।” –বর্ণনায় : হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বুখারী
    2. “হে নফস, কথা বলাটা রূপার মতো হলেও চুপ থাকাটা স্বর্ণের ন্যায়।”–হযরত আলি (রাঃ)
    3. নীরবতা মঙ্গল না করতে পারে, কিন্তু ক্ষতি করে না।——জর্জ রিচার্ড

    এক

    আপু তোর ফোন।

    রূপা রাত দশটায় খেয়ে এসে পড়ছিল। ছোট বোন সায়মার কথা শুনে ঘড়ির দিকে তাকাল, কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটা।

    তাই দেখে সায়মা বলল, ছেলেটা রোজ রোজ তোকে ডিস্টার্ব করে, তুই কিছু বলিস নি কেন?

    রূপা তার কথার জওয়াব না দিয়ে বলল, বলে দে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।

    সায়মা অবাককণ্ঠে বলল, আমাকে মিথ্যে বলতে বলছ? তুমিই তো বলেছ কোনো কারণেই মিথ্যে বলা হারাম।

    একটা পড়া তৈরি করছিলাম, তাই বেখেয়ালে বলে ফেলেছি। তারপর ড্রইংরুমে এসে রিসিভার তুলে বিরক্তকণ্ঠে বলল, কেন প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে। ফোন করেন? কতদিন আপনাকে বলেছি, এ সময়ে পড়াশোনা করি।

    অন্য সময়ে আপনাকে নিরিবিলি পাওয়া যায় না। তাই এই সময়ে করি। রূপা রাগের সঙ্গে বলল, কিন্তু এখন তো সবাই জেগে। তা ছাড়া ফোনটা তো আমার ঘরে নেই। ছোট বোন প্রতিদিন ফোন ধরে আমাকে ডেকে দেয়। আচ্ছা, কে আপনি?

    আমি একজন মানুষ।

    আমার তো মনে হয় অমানুষ।

    তা হতে পারি। তবে অমানুষ হলেও খুব খারাপ অমানুষ নই।

    আমার ধারণা, আপনি খুব খারাপ অমানুষই। নচেৎ প্রত্যেকদিন একজন ছাত্রীর পড়ার ডিস্টার্ব করতেন না।

    আপনার কথা কতটা সত্য জানি না। তবে কী জানেন, আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তে হয়। খেয়ে এসে এই সময়ে কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারি না। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করার পর পড়ায় মন বসে। তাই একটু ডিস্টার্ব করি।

    কিন্তু আপনার ফোন আসার পর আমি যে পড়ায় মন বসাতেপারি না। প্লীজ, আর কোনো দিন এ সময়ে ফোন করবেন না।

    তা হলে বলুন, কখন ফোন করলে আপনার ডিস্টার্ব হবে না?

    কোনো সময়েই ফোন না করলে খুশী হব।

    কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা না বললে যে আমার পড়াশোনা একটুও হবে না। সারারাত একটু ঘুমও হবে না। পরীক্ষায় নির্ঘাৎ ডাব্বা মারব।

    আপনি আমাকে চেনেন না, জানেন না। আমিও আপনাকে চিনি না, জানি না, তবু এরকম কথা বলছেন কেন?

    আপনি আমাকে না চিনলেও, না জানলেও আমি আপনার সব কিছু জানি। কী জানেন বলুন তো?

    আপনার ভালো নাম যাবিন তাসনিম। ডাক নাম রূপা। বাবা রোকন উদ্দিন সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী। বর্তমানে মন্ত্রী। দেশের বাড়ি নীলফামারী জেলার পলাশবাড়ি। ঢাকায় দু’টা বাড়ি, দু’টা গাড়ি। একটা আপনার বাবার। অন্যটা আপনাদের দু’বোনের। গাড়ি নিয়ে দু’বোন মাঝে মধ্যে ঝগড়া করেন। আপনি ইডেনে বাংলায় অনার্স করছেন। ছোট বোন সায়মা ঐ কলেজেই ইন্টারে পড়ছেন। আপনারা দু’বোনই সুন্দরী। তবে আপনি একটু বেশি।

    সবকিছু মিলে যাচ্ছে দেখে রূপা খুব অবাক হয়ে ভাবল, ছেলেটা আমাদের সবকিছু জানে। কে হতে পারে চিন্তা করে না পেয়ে অধৈর্য গলায় বলল, হয়েছে হয়েছে, আর বলতে হবে না। এবার আপনার পরিচয়টা বলুন।

    বলা যাবে না।

    কেন?

    সময় হলে বলব।

    আপনি শুধু অমানুষ নন, কাপুরুষও। এই কথা বলে রূপা রিসিভার ক্র্যাডেলে রেখে ফিরে এসে পড়তে বসল। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারল না। বই বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগল, ছেলেটা কে হতে পারে? আমার পেছনেই বা লেগেছে কেন? ব্যাপারটা আব্বাকে জানালে কেমন হয়? আবার চিন্তা করল, ছেলেটার গলার আওয়াজ বেশ মিষ্টি। দেখতে কেমন কে জানে? অনেকের গলার আওয়াজ মিষ্টি হলেও দেখতে রোগা পেঁচকা, বেঁটে, চোখ ছোট ছোট, গায়ের রং মিশমিশে কালো। আবার কোনো গরিবের দেখতে শুনতে ভালো ছেলে নিজেকে বড়লোকের ছেলের পরিচয় দিয়ে ধন-সম্পত্তির লোভে বড়লোকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করতে চায়। এই ছেলেটা সেরকম নয়তো? তা না হলে পরিচয় দিতে চায় না কেন? এদিকে তলে তলে আমাদের সব খবর জেনে নিয়েছে। আজ তিন মাস ধরে ছেলেটা পিছনে লেগেছে। যদি সত্যিই তার কোনো বদ মতলব থাকে, তা হলে আব্বাকে। বলে বাছাধনকে জেলের ভাত না খাইয়েছি তো আমার নাম রূপা নয়।

    রূপা ও সায়মা রিডিংরুমে দুটো আলাদা টেবিলে পড়ে। দু’বোন একই বেডরুমে আলাদা খাটে ঘুমায়। সেখানেও পড়ার জন্য দু’টো চেয়ার টেবিল আছে। রাত দশটায় খাওয়ার পর দু’জনে বেডরুমে পড়ে। পড়তে পড়তে ঘুম পেলে সায়মা প্রায় প্রতিদিন চোখে মুখে পানি দিয়ে বারান্দায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। তাই ড্রইংরুমে ফোন বাজলে সে-ই ধরে।

    সায়মা এতক্ষণ একটা নোট করছিল। নোটটা শেষ করে রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু, এই বন্ধ করে চুপচাপ কী ভাবছিস?

    রূপা জানে কথা বললেই সায়মা ঐ ছেলেটাকে নিয়ে নানান কমেন্ট করবে। উপদেশ দিতেও ছাড়বে না। তাই তার কথার উত্তর না দিয়ে হাই তুলে বলল, আজ আর পড়তে ভালো লাগছে না, ঘুমাব বলে খাটে শুয়ে পড়ল।

    সায়মা কিছু বলল না, শুধু তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। বাথরুমের কাজ সেরে এসে শোয়ার সময় বলল, আপু তুই কী ঘুমিয়ে পড়েছিস?

    ঘুমাই নি, তবে ঘুম পাচ্ছে। তুই আর কোনো কথা বলবি না, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।

    আচ্ছা আপু, ছেলেটা তোকে প্রতিদিন ফোন করে কেন বলবি?

    রূপা রেগে উঠে বলল, তোকে কথা বলতে নিষেধ করলাম, তবু কথা বলছিস? বললাম না, আমার ঘুম পাচ্ছে?

    প্লীজ আপু, আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দে, আর একটাও কথা বলব না।

    সায়মা, তুই কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছিস। আর যদি একটা কথা বলিস, রিডিংরুমে গিয়ে ঘুমাব।

    সায়মা খুব ভীতু। একা ঘুমাতে ভয় পায়। রূপা যেদিন কোনো কারণে খুব রেগে যায়, সেদিন রিডিংরুমে ঘুমাতে চলে যায়। সায়মা তখন অন্যায় স্বীকার করে অনেক কাকুতি মিনতি করে তাকে এই রুমে নিয়ে আসে। তাই এখন তার কথা শুনে আর কিছু না বলে ঘুমিয়ে পড়ল।

    রূপা কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারল না। চিন্তা করতে লাগল, কিভাবে ছেলেটার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে? হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসার পর ঘুমিয়ে পড়ল।

    পরের দিন সকালে রূপা আব্বুকে বলল, আমাদের বেডরুমে একটা প্যারালাল ফোনের ব্যবস্থা করে দাও। পড়ার সময় ফোন এলে ড্রইংরুমে গিয়ে ফোন ধরতে খুব বিরক্ত লাগে। অনেক সময় ওখানে বাইরের লোকজন থাকে। অসুবিধে হয়।

    রোকন উদ্দিন সাহেবের কোনো পুত্র সন্তান নেই। শুধু দু’টো মেয়ে। বড় মেয়ে রূপা মায়ের সবকিছু পেয়েছে। পুত্র সন্তান না থাকায় রোকন উদ্দিন সাহেব দুই মেয়েকেই ভীষণ ভালবাসেন। তবে রূপাকে একটু বেশি। তার কথা শুনে বললেন, প্যারালাল নয়, কয়েকদিনের মধ্যে আর একটা ফোন তোদের জন্য নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।

    রূপা বলল, কয়েকদিন পরে যা করার করো, আজ প্যারালাল ফোনের ব্যবস্থা করে দাও।

    রোকন উদ্দিন সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে, অফিসে গিয়ে একজন লোক পাঠিয়ে দেব। সে ব্যবস্থা করে দেবে।

    আজ সন্ধ্যের পর থেকে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। রাত নটার পর বৃষ্টি একটু কমলেও দমকা দমকা ঝড় বইছে। দশটার সময় খেয়ে এসে রূপা সায়মাকে বলল, ঝড়-বৃষ্টির কারণে আজ হয়তো ছেলেটা ফোন করবে না। তবু যদি করে, তুই ফোন ধরবি। তারপর কি বলবে বুঝিয়ে বলল।

    সায়মা বলল, আজ আবার মিথ্যে বলতে বলছ?

    হ্যাঁ বলছি। বাজে ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যে বললে দোষ হয় না।

    কিন্তু উনি তো আমার গলা চেনেন।

    চিনুক, তবু যা বলতে বললাম বলবি।

    ঠিক সাড়ে দশটায় ফোন বেজে উঠতে রূপা সায়মাকে রিসিভ করতে বলল।

    সায়মা রিসিভার তুলে সালাম দিয়ে বলল, রূপা বলছি।

    অপর প্রান্ত থেকে অজানা ছেলেটা সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আপনি রূপা নন, সায়মা।

    কী করে বুঝলেন? আমি তো রূপাই বলছি।

    শুধু শুধু মিথ্যে বলে নিজেকে ছোট করছেন কেন?

    আপনি যখন বিশ্বাসই করছেন না তখন ফোন রেখে দিচ্ছি।

    প্লীজ রাখবেন না, দয়া করে আপনার আপুকে দিন।

    আপনি তো বিশ্বাসই করছেন না, আমি রূপা। রেখে দেব না তো কী করব?

    তা হলে বলুন, “আল্লাহর কসম আমি রূপা বলছি।”

    সায়মা জানে আল্লাহর নামে মিথ্যে কসম খাওয়া কবীরা গুণাহ। তাই কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল।

    কী হল? আল্লাহর কসম খেয়ে বললেন না যে?

    সায়মা মাউথপীসে হাত চাপা দিয়ে রূপার দিকে তাকিয়ে কসম খাওয়ার কথা বলে বলল, এখন কী করব?

    রূপা তার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বলল, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?

    ছেলেটা আহতস্বরে বলল, ছোট বোনকে দিয়ে এভাবে ফোন রিসিভ করতে বলা আপনার উচিত হয় নি। এটা আমার আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার কাছে সায়মা কত ছোট হয়ে গেল বলুন তো?

    উচিত অনুচিতের কথা পরে, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন কী না বলুন?

    একটা কেন, হাজারটা অনুরোধ রাখব। তবে ফোন করার ব্যাপারটা ছাড়া। তারপর বলল, বেডরুমে ফোন নিয়ে খুব ভালো করেছেন। পড়ার সময় আর ডিস্টার্ব করব না। কাল থেকে সাড়ে বারটার সময় যখন ঘুমাতে যাবেন তখন করব।

    রূপা খুব অবাক হয়ে বলল, এ রুমে ফোন নিয়েছি আপনি জানলেন কিভাবে?

    আল্লাহর ইচ্ছায় আমি অনেক কিছু জানতে পারি। শু

    ধু আমাদের অনেক কিছু জানতে পারেন, না অন্যদেরও জানতে পারেন?

    অন্যদের কোনো কিছু জানার ইচ্ছা কখন হয় নি। তাই সেকথা বলতে পারলাম না। তারপর বলল, কী যেন অনুরোধ করবেন বললেন?

    তা আর করব না। তবে একটা প্রশ্ন করব, সঠিক উত্তর দেবেন তো?

    উত্তর জানা থাকলে সঠিকই দেব। কারণ কোনো মুমীন মুসলমান মিথ্যে বলতে পারে না।

    আপনি আমার পেছনে লেগেছেন কেন?

    উত্তরটা আপনি জানেন, তবু জিজ্ঞেস করছেন কেন?

    সিওর হওয়ার জন্য।

    যা জেনেছেন সেটাই সত্যি।

    আমি কি জেনেছি, তা আপনি বুঝলেন কী করে? কারো মনের কথা তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানতে পারে না। এটা কুরআন পাকের কথা।

    আপনি ঠিক কথা বলেছেন। তবে আল্লাহ যাদেরকে পছন্দ করেন তাদেরকে মানুষের মনের খবর জানার জ্ঞান দান করেন।

    তারা তো আল্লাহর খাস বান্দা। আপনিও কী নিজেকে তাই ভাবেন?

    কখনই না। তাদের পায়ের ধূলোর সমান যোগ্যতাও আমার নেই।

    তা হলে ঐ কথা বললেন কেন?

    আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমি হিকমতের দ্বারা শুধু আপনাদের সবকিছু জেনে নিই।

    বুঝলাম না।

    পরে এক সময় বুঝিয়ে দেব। অবশ্য আপনিও চেষ্টা করলে হিকমতের দ্বারা আমার সবকিছু জানতে পারেন।

    হিকমত টিকমত বুঝিও না, আর জানিও না। আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। কিনা বলুন?

    বললাম তো, উত্তর জানা থাকলে নিশ্চয় দেব।

    আপনার নাম বলুন।

    আব্দুস সাত্তার।

    বাবার নাম?

    বলা যাবে না।

    ঠিকানা?

    তাও বলা যাবে না।

    কেন?

    বললাম বলা যাবে না, তবু জিজ্ঞেস করছেন কেন?

    আপনি কী করেন?

    দু’তিন মাস পরে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স দেব।

    আপনার বাবা কী করেন?

    একটা বেসরকারী কলেজে অধ্যাপনা করেন।

    আপনি যখন ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স করছেন তখন ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক জ্ঞান রাখেন?

    তাতো কিছু রাখি।

    তা হলে প্রতি রাতে একজন গায়ের মহররম মেয়েকে ফোন করা যে ইসলামের পরিপন্থী, তা তো জানার কথা। তবু করেন কেন?

    আপনাকে প্রায় দু’বছর আগে থেকে ভালবাসি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিয়ে। করব। জীবন সাথী পছন্দ করা ইসলামের পরিপন্থী নয়।

    এই আইন শুধু ছেলেদের বেলায়, না মেয়েদের বেলায়ও।

    উভয়েরই।

    আমি তো আপনাকে দেখি নি, চিনি নি, আপনাকে যদি আমার পছন্দ না হয়?

    ছেলেরা যেসব কারণে মেয়েদের পছন্দ করে, সে সব আপনার মধ্যে আছে। তাই আমি যেমন আপনাকে পছন্দ করেছি, তেমনি মেয়েরা যেসব কারণে ছেলেদের পছন্দ করে, সেসব আমার মধ্যে আছে। তাই আমি হান্ড্রেডপার্সেন্ট সিওর, আমাকে দেখলে আপনি অপছন্দ করবেন না।

    আপনার কথা সত্য হলেও সবক্ষেত্রে নয়। যেমন অনেক সুন্দরী মেয়ে অসুন্দর ছেলেকে পছন্দ করে। আবার অনেক সুন্দর ছেলে অসুন্দর মেয়েকে পছন্দ করে।

    আপনার কথা অস্বীকার করব না। আমি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে বলেছি। আর আপনি যা বললেন, তা ব্যতিক্রম।

    আপনি আমাকে দেখে শুনে ও আমাদের সবকিছু জেনে পছন্দ করেছেন এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন বললেন। আমারও কী উচিত নয়, আপনাকে দেখে।

    ও আপনাদের সবকিছু জেনে পছন্দ করা?

    অফকোর্স।

    তা হলে বলুন, কবে-কখন ও কোথায় আপনার সঙ্গে আলাপ করব।

    কাল বলব, আজ অনেক রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ন, নচেৎ ফজরের নামায কাযা হয়ে যাবে। তারপর রূপা কিছু বলার আগেই সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিল।

    রূপা সালামের উত্তর দিয়ে রিসিভার রেখে দিল।

    সায়মা এতক্ষণ নিজের খাটে বসেছিল। ছেলেটার কথা শুনতে না পেলেও আপুর কথায় বুঝতে পারল, সে আপুকে ভালবাসে ও বিয়ে করতে চায়। তাই রিসিভার রেখে দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা পরিচয় বলেছে?

    শুধু নাম বলেছে আব্দুস সাত্তার। বাবার নাম ও বাসার ঠিকানা বলে নি।

    তুই দেখা করার কথা বলতে কী বলল?

    কাল বলবে বলেছে?

    আর কী করেন জিজ্ঞেস করতে?

    ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স দেবে।

    নাম ছাড়া অন্য কিছুই যখন বলে নি, মনে হয় ছেলেটা ফ্রড। একা একা তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া তোর ঠিক হবে না।

    তোকে অত পাকামী করতে হবে না। নে এবার শুয়ে পড় বলে রূপা বাথরুম থেকে এসে শুয়ে পড়ল।

  • হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    মহানায়ক উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন অভীক চট্টোপাধ্যায়। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৩; প্রকাশক স্বাতী রায়চৌধুরী; সপ্তর্ষি প্রকাশন; প্রচ্ছদ এঁকেছেন সৌরীশ মিত্র। একই বছর ফেব্রুয়ারিতে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

    উৎসর্গ

    প্রকাশকের তরফ থেকে

    উত্তমকুমার অনুরাগীদের

    ভূমিকা

    ছোটোবেলায় যখন থেকে বড়োদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ ঘটল, তখন সেই বয়সেই মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে খচখচ করত। অবশ্যই, কারোর কাছে তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। আসলে, চলচ্চিচত্রের পর্দায় দেখতে ইচ্ছে হত, উত্তমকুমারকে। যেসব ছবি আমাকে দেখতে নিয়ে যাওয়া হত, তার কোনোটাতেই উত্তমকুমার থাকতেন না। অথচ, বাড়ির পিসি—কাকা—দাদাদের মুখে, বাড়ির বিভিন্ন ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিনেমার পত্রিকার পাতায় পাতায়, দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা পোস্টারে— সর্বত্রই দেখতাম একজনের প্রাধান্য— উত্তমকুমার! এই মানুষটিকে নড়াচড়া অবস্থায় পর্দায় দেখার ইচ্ছেটা প্রবল হওয়াই স্বাভাবিক। অবশেষে, ইচ্ছেপূরণ হল। মায়ের সঙ্গে দেখলাম ‘জয়জয়ন্তী’। ছবিটিতে ছোটোদের ভূমিকার একটা প্রাধান্য থাকার কারণেই বোধহয়, আমাকে তা দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু, আজ একথা অকপটে জানাতে দ্বিধা নেই, ওই বয়সেই ছবিতে থাকা বাচ্চচাদের পরিবর্তে উত্তমকুমার, অপর্ণা সেন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলি আমার মন কেড়েছিল। এ আমি আজও স্পষ্ট মনে করতে পারি। উত্তমকুমারকে প্রথম অভিনয়রত অবস্থায় দেখে, ঐ ছোটো বয়সেই ওঁর মতো হাঁটতে, চলতে, কথা বলতে ইচ্ছে জেগেছিল। পরবর্তীকালে, দেখলাম এই অসম্ভব আকর্ষণের নামই ‘উত্তমকুমার’। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিক্ষাদীক্ষা, পড়াশুনা, রাজনৈতিক—সামাজিক পরিবেশজাত প্রভাব থেকে সরল স্বাভাবিক ভাবনাগুলোর ওপরে যখন একধরনের সচেতন ধ্যান ধারণার আস্তরণ পড়তে লাগল, তার ফলে, সেই যুবকাবস্থায় নানারকম বিভাজনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হল। এরই ফলস্বরূপ, ‘মূলধারা’র সিনেমার রোম্যান্টিক ‘হিরো’ উত্তমকুমারের সম্বন্ধে বেশি ভাবনা—চিন্তা করার মতো কিছু নেই—এইরকম একপ্রকার মতের সমর্থক হয়ে উঠেছিলাম সেইসময়। ক্রমে, এইসব আরোপিত ঘোর যখন কাটতে শুরু করল এবং যথাযথভাবে আপন সত্তার দিকে তাকানোর অবকাশ মিলল, তখন চেতনার অনেকটাই মুক্তি ঘটার ফলে, অনেক বিষয়ের সঙ্গেই নতুন করে হৃদয়ের যোগ স্থাপিত হল, যেগুলি, এতদিন সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখা ছিল। এহেন অবস্থায় নতুন করে বুঝলাম, শক্তিশালী অভিনয় ও ‘স্টার’ অভিনেতার এক সম্পৃক্ত মিশ্রণের আদর্শ রূপ হলেন ‘উত্তমকুমার’। অনেক অর্থেই তিনি ব্যতিক্রমী। কেন? আসব সে কথায়, তবে তার আগে এই বইটার হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনি এবং গঠনপ্রণালী নিয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার।

    উপরে এত ব্যক্তিগত কথা দিয়ে শুরু করার একটাই অর্থ, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার মতো চল্লিশোর্ধ্ব বাঙালির জীবনে উত্তমকুমারের আগমনের ধরন, একটু হেরফের করে আমার ধাঁচেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটেছে। এবার আসি বইটার প্রসঙ্গে। আমার এক বন্ধু দেবাশিস গুপ্ত, যিনি আমার এলাকা চন্দননগরের বাসিন্দা, তিনিই নিজ উদ্যোগে তাঁর সংগ্রহে থাকা ১৩৬৭ সালের বৈশাখের প্রথম সংখ্যা নবকল্লোল পত্রিকা থেকে, একবছর ধরে পরপর সংখ্যায় বেরোনো উত্তমকুমারের ধারাবাহিকভাবে লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক রচনাটি সম্পূর্ণ ফোটোকপি করে আমার হাতে তুলে দেন। এই রচনাটি সম্বন্ধে কোনো ধারণাই আমার ছিল না। দীর্ঘদিন এটি দৃষ্টির অগোচরে ছিল। পুরোনো বই ও পত্রপত্রিকার সংগ্রাহক বন্ধু দেবাশিস গুপ্ত—র প্রতি এজন্য আমার কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই। তিনি এইভাবে নিজে এগিয়ে এসে, এই রচনাটি সম্বন্ধে আমায় অবহিত না করলে, বইটিই প্রকাশিত হতে পারত না। এই ফোটোকপি হাতে আসার পর, এটিকে বইয়ের আকার দেওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়। ‘সপ্তর্ষি প্রকাশন’ —এর সৌরভকে একবার বলাতেই, সে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল। এজন্য, তারও কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। কিন্তু, যতটুকু রচনা পাওয়া গিয়েছিল, তার পরে আরও ছিল। পুরোটা না পেলে তো, বই হবে না। লাইব্রেরির সাহায্য নেওয়া দরকার। বিশিষ্ট সাংবাদিক—প্রাবন্ধিক ও অনেক উচ্চচমানের গ্রন্থের সম্পাদক ভবেশ দাসের স্ত্রী রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের লাইব্রেরিয়ান শ্রীমতী এলা দাস, যাঁরা দুজনেই আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন, সেই বৌদি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’—এ উচ্চচপদে কর্মরত জয়গোপাল সাহার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সঙ্গে। তিনি অসম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে সাহায্য করলেন। পেয়ে গেলাম রচনাটির বাকি অংশের (নবকল্লোল ১৩৬৮ ও ১৩৬৯’ বৈশাখ) ফোটোকপি। ব্যস, সম্পূর্ণ রচনা হাতে। এরপর, এল অনুমতির প্রশ্ন। উত্তমকুমারের পৈতৃক বাড়ি যে রাস্তার ওপরে, সেই গিরিশ মুখার্জি রোডেই ‘গিরিশ ভবন’—এ আমার এক ভাইঝির বিয়ে হয়েছে। ওদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ উত্তমকুমারের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা। ভাইঝির শ্বশুরমশাই শ্রীতপন মুখোপাধ্যায়ের মারফত যোগাযোগ হল, উত্তমকুমারের পুত্রবধূ শ্রীমতী মহুয়া চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ভীষণ আন্তরিক ব্যবহারসহযোগে, তিনি এককথায় লিখিত অনুমতি দিয়ে দিলেন। উপরিল্লিখিত, প্রত্যেককে আমার অন্তরের সবটুকু কৃতজ্ঞতা নিবেদন করলাম। এছাড়া, তথ্য, ছবি ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ, সমাজতাত্ত্বিক গবেষক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, রেকর্ড—সংগ্রাহক জয়দীপ চক্রবর্তী, উত্তমকুমারকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা স্বপন দাস, শ্রদ্ধেয় সংগীতব্যক্তিত্ব ডঃ দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা বেতারের শ্রদ্ধেয় মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, কলেজ জীবনের অন্তরঙ্গ বন্ধু চলচ্চিচত্রপ্রেমী মানসকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চলচ্চিচত্র—গবেষক দেবীপ্রসাদ ঘোষেদের মতো ব্যক্তিরা। এঁদের প্রত্যেককে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালাম। প্রখ্যাত রেকর্ড—সংগ্রাহক সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায় একটি পত্রিকায় বেরোনো তাঁর লেখা উত্তমকুমারের রেকর্ড ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া গান সংক্রান্ত অভিনব দুষ্প্রাপ্য তথ্যবহুল রচনাটি এই বইতে পুনর্মুদ্রণের অনুমতি দিয়ে কৃতার্থ করেছেন। এজন্য, তাঁর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাই, আশিস পাঠককে যিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় সেপ্টেম্বর মাসে বইটি সম্পর্কে এক সুন্দর প্রতিবেদন লিখে, আগাম সবাইকে বইটি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এদের প্রত্যেকের অবদান বইটিকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়তা করেছে।

    এবার, শেষে, উত্তমকুমার তাঁর এই বইতে কীভাবে উঠে এসেছেন, সে বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে ভূমিকায় ইতি টানব। বাংলা সিনেমা সবাক হবার পর থেকে, বলা যায় আজ অবধি ঠিকঠাকভাবে যে তিনজন ‘স্টার’—এর দেখা মিলেছে, তাঁরা হলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশ বড়ুয়া ও উত্তমকুমার। প্রথম দুজনের চেয়ে উত্তমকুমার জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘপ্রভাবের দিক থেকে যে অনেক এগিয়ে, তা অনেকেই সম্ভবত মানবেন। তাছাড়া, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় যে সময় বিরাজ করতেন, তা ছিল মূলত থিয়েটারের যুগ এবং তিনিও নিজে পছন্দ করতেন মঞ্চাভিনয়।

    তখন সেই তিন—এর দশকে নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটছে চলচ্চিচত্রের—নিতান্তই এক শৈশবাবস্থা বলা যায়। ফলে, অভিনয় জগৎ শাসিত হত মঞ্চাভিনয়ের দ্বারা। আর, প্রমথেশ বড়ুয়া অবশ্যই একশো ভাগ চলচ্চিচত্রের মানুষ হলেও খতিয়ে দেখলে, একটা বিষয় সম্ভবত পরিষ্কার হয় যে, বড়ুয়াসাহেব প্রথমে একজন চিত্র—পরিচালক তারপরে অভিনেতা। প্রযোজনা ও পরিচালনার গুণে চলচ্চিচত্রকে সাবালক তৈরির ক্ষেত্রে, উজ্জ্বল ভূমিকা নিয়েছিলেন। এর সঙ্গে অবশ্যই ছিল প্রমথেশচন্দ্রের নায়ক ভূমিকায় অভিনয়। কিন্তু, উত্তমকুমার ছিলেন একজন আদ্যোপান্ত চলচ্চিচত্রাভিনেতা। অল্প কিছু ক্ষেত্রে, মঞ্চাভিনয় বা চলচ্চিচত্র—পরিচালনা করলেও, উত্তমকুমার সকলের মনে বিরাজ করছেন একজন স্বপ্নের নায়ক ও ‘স্টার’ অভিনেতা হিসেবে, একথা আশাকরি সকলেই মানবেন। এর বীজ নিয়েই যে তিনি জন্মেছিলেন, তার পরিষ্কার আভাস তাঁর লেখা এই বইতে আছে। এই রচনা যেখানে শেষ হচ্ছে তখন ১৯৬২ সালের এপ্রিল—মে মাস। সকলেই জানেন, এ সময়ে তিনি মধ্যগগনে। ফলে, তাঁর নিজেকে গড়ে তোলার জায়গাটি অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে এই বইতে। মনে রাখতে হবে, দুর্গাদাস ও প্রমথেশচন্দ্র দুজনেই ছিলেন কিন্তু অভিজাত বংশোদ্ভুত। অন্যদিকে, উত্তমকুমার এক ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের কলমপেষা কেরানি ছিলেন। সেখান থেকে স্বপ্ন দেখতেন নায়ক হওয়ার। এ যেন, আমাদের মতো সাধারণের ভাবনায় ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আমির হওয়ার স্বপ্ন দেখার মতো ব্যাপার। কিন্তু, যিনি আমিরত্বের সত্তা নিয়েই জন্মেছেন, ছেঁড়া—কাঁথা—টাথা তাঁর কাছে কিছু নয়। তিনি আমির হবেনই এবং হলেনও তা।

    ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে শুরু করে, পরপর ৭ খানি ছবি ফ্লপ হওয়ার পরে, ১৯৫২ সালে ব্যতিক্রমী পরিচালক নির্মল দে— র ‘বসু পরিবার’ ছবিতে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখলেন। এ থেকে স্পষ্ট হয়, কী পরিমাণ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এই অন্ধকার সময়টি তিনি অতিক্রম করেছেন। কখনও লড়াই ছেড়ে তো যানই নি, উপরন্তু, প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন তাঁর লক্ষ্যে। এইসময় একদিন একা গঙ্গার ধারে বসে থাকার সময়, হঠাৎ, এক সন্ন্যাসী কোথা থেকে উদয় হয়ে, উত্তমকুমারকে তাঁর পারিবারিক ও ছবির জীবনের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে এক অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী করে চলে যান, যা পরে অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। একদিকে গৌরী দেবীকে জীবনে পাওয়ার ব্যাপারে চিন্তা, অন্যদিকে ছবির জগতে সাফল্য পাওয়া নিয়ে চরম উদ্বেগ। সব মিলিয়ে এক অন্য উত্তমকুমার উঠে আসেন, তাঁর নিজ রচনায়। নিজের ছবির জগতে সাফল্য পাওয়ার বিষয়ে কতখানি গভীর চিন্তা—ভাবনা তিনি করেছিলেন, একটু ভাবলেই আমাদের কাছে তা পরিষ্কার হয়। ‘বসু পরিবার’—এ সাফল্য আসার পর কয়েকটি ছবি পেরিয়ে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ (১৯৫৪) ছবিতে সম্পূর্ণ এক অন্য উত্তমকুমার জেগে ওঠেন যেন। ইনিই হন আমাদের চেনা ‘স্টার’। একইসঙ্গে, এই ছবি থেকে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর রোম্যান্টিক রসায়নটিও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই বইতেই এক জায়গায় উত্তম তাঁর প্রিয় অভিনেতা হিসেবে প্রখ্যাত হলিউড ‘স্টার’ রোনাল্ড কোলম্যান—এর নাম করেছেন। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতেই প্রথম দেখা যায়, উত্তমকুমারের হাঁটাচলা, পোষাক নির্বাচন, চুলের বিন্যাস, তাকানো, ক্যামেরাকে ব্যবহার—সমস্ত পালটে যায়। একধরনের হলিউডি ‘স্টার’ ঘরানার সঙ্গে যার প্রভূত মিল চোখে পড়ে। এই জায়গা থেকেই তিনি সবাইকার থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেন। শুধু তাই নয়, ক্যামেরাকে নতুন ভাবে ব্যবহার করাও দেখা গেল তাঁর মধ্যে থেকে। যেমন, উত্তমকুমারের ক্যামেরার দিকে পিছন করে, পাশে তাকিয়ে একধরনের বিশেষ স্টাইলকে অবলম্বন করে অভিনয়, আমাদের কাছে ভীষণ প্রিয়। এর আগে, এরকম বিদেশিয়ানার ছোঁয়া—লাগা ভঙ্গিমায়, অন্য কোনো নায়ককে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না দর্শককুল। নিজে খুবই ভালো গান গাইতে পারতেন এবং কতখানি সংগীতবোধ তাঁর ছিল, তা তো ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে উত্তমকুমারের সুরারোপিত গানগুলি শুনলেই বোঝা যায়। এর ফলে, গানের সঙ্গে ঠোঁট নাড়ার ক্ষেত্রে, তিনি উচ্চচতম মানে পৌঁছেছিলেন। কী অসম্ভব নিষ্ঠা অভিনয় সংক্রান্ত বিষয়ে সারাজীবন দেখাতে পারলে, তবেই এই উচ্চচতায় পৌঁছোনো সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়। একটি দূরদর্শন সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মান্না দে বলেছিলেন যে, একবার তাঁর সঙ্গে মুম্বইয়ের রাস্তায় উত্তমকুমারের দেখা হয়েছিল। উত্তমবাবু হাতে একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে ঘুরছিলেন। মান্না দে জিজ্ঞাসা করাতে, উত্তমকুমার বলেছিলেন, তখন ‘অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি’ ছবির জন্য সদ্য রেকর্ড করা মান্না দে—র গাওয়া গানগুলি যখনই সময় পাচ্ছেন, বারবার শুনে ‘লিপিং’ প্র্যাকটিশ করছেন, যাতে স্যুটিং—এর সময়ে অভিনয়ে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। ভাবা যায়! অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার চরমতম নিদর্শন ছাড়া, একে আর কীইবা বলা যায়। এককথায়, ব্যক্তিগতভাবে যা মনে হয়, বাংলা ছবিতে হলিউডের ‘স্টার’ ঘরানাকে এক আদর্শ বাঙালির মোড়কে সফলতার সঙ্গে প্রথম এনেছিলেন উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়শৈলীর মধ্য দিয়ে।

    বিশ্ববন্দিত সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘নায়ক’ ছবির মধ্য দিয়ে যেন এই হলিউড স্টার উত্তমকুমারকেই অসাধারণভাবে তুলে ধরেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের মতো চিত্র পরিচালকেরা সাধারণত চিত্রনাট্য রচনা করে তার চরিত্রোপযোগী অভিনেতা—অভিনেত্রীদেরই নির্বাচন করে থাকেন। ‘নায়ক’ ছবির ক্ষেত্রে, কিন্তু উত্তমকুমারের সব কিছু বজায় রেখে সত্যজিৎ চরিত্রটি নির্মাণ করেন। একথা, তিনি নিজেই বলেছেন। এর ফলে, দুই অসামান্য সৃষ্টিশীল প্রতিভাধরের প্রতিভার এক অপূর্ব বিনিময় ঘটে যেন ছবিতে। একইরকম বিনিময় আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়—ছবি বিশ্বাস (‘জলসাঘর’) বা সত্যজিৎ রায়—তুলসী চক্রবর্তী (‘পরশপাথর’)—র ক্ষেত্রে। বিশেষ করে, একজন অভিনেতার কাছে, এ যে কতখানি সম্মানের তা বলে বোঝানো যায় না। এখান থেকেই বোধহয় উত্তমকুমারদের মতো অভিনেতারা বহুর মধ্যে এক হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর ৩৩ বছর পরও, এই কারণেই বোধহয় উত্তমকুমার আমাদের মধ্যে এতখানি জীবন্ত হয়ে থাকতে পারেন। এ হেন ঈশ্বরপ্রতিম অভিনেতার আত্মজীবনীর সম্পাদনার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখতে পেরে, সত্যিই নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।

    সবশেষে বলি, এই বইয়ের শেষে কিছু প্রাসঙ্গিক টীকাকরণ ও উত্তমকুমারের জীবনীপঞ্জি ও কর্মপঞ্জির একটি সাধ্যমতো বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পাদক হিসেবে কখনওই দাবি করছি না, যা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ।

    একটা কথা মনে রাখতে হবে, এটি কিন্তু উত্তমকুমারের আংশিক আত্মজীবনী (১৯৬২ সাল অবধি)। সম্পাদনার ক্ষেত্রে, যেসব ত্রুটি রয়ে গেল, তার জন্য পাঠকবর্গের কাছে আগাম মার্জনা চেয়ে রাখলাম। উত্তমকুমারের পরিবারবর্গ, প্রকাশক সহ বইটি নির্মাণে সমস্ত সাহায্যকারী ও উৎসাহদাতাদের উদ্দেশ্যে পুনরায় আমার কৃতজ্ঞতা জানালাম। সবশেষে, প্রণাম জানালাম চিরভাস্বর চিরনায়ক উত্তমকুমারকে।

    ১৮.১.২০১৩
    অভীক চট্টোপাধ্যায়
  • গোচারণের মাঠ

    গোচারণের মাঠ

    অক্ষয়চন্দ্র সরকার

    গোচারণের মাঠ

    ‘গোচারণের মাঠ’ শ্রীঅক্ষয়চন্দ্র সরকার রচিত যুক্তাক্ষর বর্জিত শিশুপাঠ্য কাব্যগ্রন্থ, এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১২৮৭ বঙ্গাব্দে, ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে। কাব্যখানি চুঁচুড়া থেকে সাধারণী যন্ত্রালয়ে শ্রীনন্দলাল বসু কর্ত্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল; মূল্য রাখা হয়েছিল ৵৹ দুই আনা মাত্র। দুষ্প্রাপ্য এই কাব্যখানির প্রচ্ছদ ও অন্যান্য বিষয়ে তেমন কিছু জানা যায়নি।

    ভূমিকা

    শ্রীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, এই ‘গোচারণের মাঠ’ পড়িয়া আমাকে যে পত্র লেখেন তাহা ভূমিকা স্বরূপ প্রকাশ করিলাম, ইহাতে আর কিছু না হয়, আমার আশার এবং আক্ষেপের কথা ব্যক্ত করিবে।

    শ্রীঅক্ষয়চন্দ্র সরকার।

    আশীর্ব্বাদ বিজ্ঞাপনঞ্চ বিশেষঃ

    তোমার গোচারণের মাঠ পড়িয়াছি। ২৪ পৃষ্ঠা কাব্য খানির মধ্যে একটিও যুক্তাক্ষর নাই;—বাঙ্গালী ভাষা তোমার আজ্ঞাধীন, যদি ইহা প্রমাণ করিবার জন্য লিখিয়া থাক, তবে তোমার অভিপ্রায় সিদ্ধ হইয়াছে স্বীকার করিতে হইবে।

    তোমার উদ্দেশ্য যাহাই হউক, যুক্ত অক্ষর ছাড়িয়া দেওয়াতে একটা বড় সুফল ফলিয়াছে। অতি সরল বাঙ্গালী ভাষায় কাব্য খানি লিখিত হইয়াছে। বাঙ্গালা ভাষায় যে সকল শব্দে যুক্ত অক্ষর আছে, সে গুলি প্রায় সংস্কৃত মুলক। অতএব যুক্ত-অক্ষর পরিত্যাগ করিলে কাজে কাজেই কট মট, সংস্কৃতবহুল ভাষাও পরিত্যক্ত হয়; যে সরল বাঙ্গালায় লোকে কথা বার্ত্তা কয়, সেই ভাষা আসিয়া পড়ে। ভাষা সম্বন্ধে ইহা সামান্য লাভ নহে। যত দিন না প্রচলিত বাঙ্গালায় বহি লেখার পদ্ধতি চলিত হয়, তত দিন সাধারণ লোকে বহি পড়িবে না; সাধারণ লোকে বহি না পড়িলে, লেখার উদ্দেশ্য সফল হইবে না, আর ভাষারও প্রকৃত পুষ্টিলাভ হইবে না।

    এমন কথা বলি না, যে প্রচলিত বাঙ্গালায় যুক্ত-অক্ষর নাই; বা যুক্ত অক্ষর বিরল। যুক্ত-অক্ষর ছাড়িয়া দিলে, এমন কি অধিক ক্ষণ কথা বার্ত্তা চলে না। তবে চলিত বাঙ্গালায় যুক্ত-অক্ষর কম, কেতাবি বাঙ্গালায় বেশী। তুমি দেখাইয়াছ, যে যুক্ত-অক্ষর একেবারে ছাড়িয়া দিয়াও ভাল ভাষায় ভাল কাব্য লেখা যায়।

    যুক্ত-অক্ষর ছাড়িয়া দিয়া কবিতা লেখা, এই প্রথম নহে তাহা আমি জানি; “পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল”—প্রভৃতি সকলেরই মনে আছে, আর তার পরও কোন কোন লেখক অসংযুক্ত বর্ণে কবিতা লিখিয়াছেন, এমনও স্মরণ হইতেছে। কিন্তু সে সকলের সঙ্গে তুলনায় “গোচারণের মাঠের” একটি বিশেষ প্রভেদ আছে। সে গুলি ছন্দোবিশিষ্ট হইলেও, কবিতা নহে।—কবিত্ব সেগুলিতে প্রায় নাই। যে সকল শিশুরা যুক্ত অক্ষর ভাল পড়িতে পারে না, তাহাদিগের কাব্য পাঠের জন্যই সে গুলি লেখা হইয়াছে। কিন্তু ছেলেদের কবিত্ব-হীন কাব্য পড়াইয়া কোন লাভ আছে কি না—আমার সন্দেহ। লোকের বিশ্বাস আছে যে ছন্দ ও মিল বিশিষ্ট রচনায় ছেলেদের মন হরণ করে, সেই জন্য গদ্য অপেক্ষা পদ্য পড়িতে ছেলেরা ভাল বাসিতে পারে। কিন্তু ফলে কি তাই? আমিত কোন শিক্ষকের মুখে শুনি নাই যে ছেলেরা গদ্যপাঠ অপেক্ষায় পদ্যপাঠে অধিক মনযোগী হয়। বোধ হয়, যত দিন ছেলেরা পাঠ্য পদ্যে কর্কশ উপদেশ, আর নীরস বর্ণনা ভিন্ন আর কিছুই পাইবে না, তত দিন গদ্যে পদ্যে তাহাদের সমান আদর বা অনাদর থাকিবে। ফলে, কবিত্ব-শূন্য কাব্য ছেলেদের পড়ান বিড়ম্বনা মাত্র। বিদ্যালয়ে কাব্য গ্রন্থ পড়াইবার উদ্দেশ্য কি? সাধারণ লোকের বিশ্বাস যে কাব্যে ভাষা শিক্ষা ভাল হয়। পোপের প্রাচীন কথার দ্বারা অনেকে এ সংস্কার সমূলক বলিয়া প্রমাণ করিতে চান। বিদেশীয় ভাষার পক্ষে ইহা সত্য হইলে হইতে পারে, দেশীয় ভাষার পক্ষে তত সত্য কি না,—আমার সন্দেহ। বালককে কাব্য পড়াইবার এক মাত্র উদ্দেশ্য—আমি স্বীকার করি—কাব্যের উন্নত ভাবের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি। ইহা কেবল পদ্যের দ্বারা সিদ্ধ হয় না—কবিত্বের প্রয়োজন। তোমার এই “গোচারণের মাঠ” অতি সরল ভাষায় লিখিত হইলেও, কবিত্ব-পূর্ণ। অনেক স্থানে উঁচু দরের কবিত্ব ইহাতে দেখিয়াছি। ছেলেদের যদি কাব্য পড়াইতে হয়, তবে এই খানিই তাহার উপযোগী। কিন্তু তাই বলিয়া, ইহা যে এ দেশের পাঠশাল স্কুলে চলিবে এমন ভরসা আমি করি না। যদি চলে তবে আমি বিস্মিত হইব। যাহা চলিবার যোগ্য তাহা চলিবে, শিক্ষা বিভাগের এমন নিয়ম নহে। শিক্ষা বিভাগে কেন, যাহা চলিবার যোগ্য তাহা তুমি কোথায় চলিতে দেখিয়াছ?

    চুঁচুড়া,
    ২২এ বৈশাখ, ১২৮৭
    শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
  • এ ডলস হাউস

    এ ডলস হাউস

    এ ডলস হাউস

    মূল: অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ।
    অনুবাদ : মাহবুব সিদ্দিকী।

    এ ডলস হাউস (ইবসেনের পুতুল যেখানে ব্রাত্য হয়ে রয়)। মূল: অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ। অনুবাদ : মাহবুব সিদ্দিকী। প্রথম প্রকাশ : একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ ফায়ূন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। উৎসর্গ : ডাহুক নদীকে

    মুখবন্ধ

    মুখবন্ধ

    সময়টা নারী অধিকার আন্দোলনের মোটামুটি গোড়ার দিকের। হেনরিক ইবসেনের ‘এ ডলস হাউস’(১৮৭৯) চারদিকে ভীষণ সাড়া ফেলেছে তখন। নারীনেত্রীরা এবং অতি অবশ্যই নারীবাদীরা একে যেন রাতারাতি নিজেদের আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো বানিয়ে ফেললেন। নোরার গৃহত্যাগ যেন গোটা ইউরোপীয়-নারী-সমাজের আদর্শ হয়ে উঠল। সেই সাথে নারী অধিকার আন্দোলনেও যোগ হতে থাকল নতুন নতুন মাত্রা। সমাজ, সংসার, বিয়ে সবকিছুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন তাঁরা; নানা অসংগতি আর জটিলতা খুঁজে বের করতে থাকলেন। কিন্তু এ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের কখন যে তাঁরা ‘এক্সট্রিমিস্ট’ হয়ে উঠলেন, তা নিজেরাও বুঝতে পারলেন না। ফলে, জগৎ সংসারের সমস্ত দোষ গিয়ে পড়ল পুরুষের ঘাড়ে! আর, নারীর অবস্থান হল যাবতীয় সমালোচনার উর্ধ্বে। ফলে, এ আন্দোলনে বস্তুত নিরপেক্ষতা বলতে কিছু রইল না, এবং স্বাভাবিকভাবেই নারী-পুরুষকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো হল। বাড়তে থাকল বিবাহ-বিচ্ছেদ আর সাংসারিক অশান্তি…

    কিন্তু আসলেই কি সব দোষ পুরুষের? কিংবা, সব দোষ নারীর বললেও কি তা যথার্থ হবে? নাকি, দোষ-ত্রুটিগুলো সম্পূর্ণ মানবিক এবং প্রাকৃতিক? এ প্রশ্নগুলোই অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ তুললেন তাঁর ছোটগল্পের মাধ্যমে। ঐ সময় অবশ্য কোন বই আকারে তিনি গল্পগুলো লেখেননি, বরং, প্রতিটি গল্প আলাদাভাবে প্রকাশিত। পরবর্তীতে, ১৮৮৪ সালে এরকম বেশ কতগুলো গল্পকে ‘গেটিং ম্যারেড’ নামে দু’মলাটে আবদ্ধ করা হয়। যে-কারণে কতগুলো গল্পের কাহিনিতে কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অবশ্য, এর অন্য কারণও ছিল–ঐ সময়ে নারীবাদীরা উঠেপড়ে লেগেছিলেন ‘বিয়ে’ সম্পর্কটাকে ‘মালিক-দাসী’ সম্পর্ক হিসেবে দেখাতে। স্ট্রিনডবার্গের কাছে একে নিতান্ত অমূলক মনে হয়েছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক; কেউ কারো মালিক বা দাসী নয়, বরং, ক্ষেত্রভেদে একে-অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতা মানে অক্ষমতা নয়, ভালোবাসার পূর্ণতা। নারী-পুরুষকে নারীবাদীরা যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামিয়েছেন, স্ট্রিনডবার্গ সেখানে খুঁজে পেয়েছেন সহযোগিতা।

    এ ডলস্ হাউস গল্পটি স্ট্রিনবার্গ লিখেছিলেন হেনরিক ইবসেন লিখিত ঐ একই নামের বিখ্যাত নাটকটির প্রতিক্রিয়া হিসেবে। যদিও অতি সাম্প্রতিককালে নাটকটির বিষয়বস্তু নিয়ে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে; প্রশ্ন উঠেছে–ইবসেন নিজে নোরাকে অধিকারবঞ্চিত দেখাতে চেয়েছেন, নাকি নারীবাদীরা নিজেদের মত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নিয়েছেন? (কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের Female Power and Some Ibsen Plays ago দ্রষ্টব্য) কিন্তু ঐ সময়ের প্রচলিত ব্যাখ্যায় (নারীবাদী ব্যাখ্যা) স্ট্রিনবার্গ ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন। সে-কারণেই, ঐ নামের ছোটগল্প লিখে দেখাতে চাইলেন–নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা মানেই নারীদের প্রতি কোন অন্ধ পক্ষপাতিত্বে পৌঁছানো নয়। সংসারে ভুল-ত্রুটি সবারই থাকে, একে যেকোন একপক্ষের বিরুদ্ধে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করাটা আসলে এক ধরনের গোড়ামি।

    পরিবর্তনের প্রচেষ্টায়, দেনা-পাওনা, বিবাহিত এবং অবিবাহিত, এবং প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা গল্পগুলোতে স্ট্রিনবার্গ ঐ সময়ের তথাকথিত নারী আন্দোলনকে ব্যাঙ্গ করেছেন। নারীবাদীরা কীভাবে ভীষণ অযৌক্তিক আচরণ করেছেন সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। ফলে, এ গল্পগুলোর কাহিনি মোটামুটি একই রকম–প্রতিটি গল্পে তিনি নারীবাদীদের ‘আদর্শ সংসার’ কে প্লট হিসেবে নিয়েছেন; অতঃপর বাস্তবতার আলোকে সে ‘আদর্শ সংসার’ ধারণার ত্রুটিগুলো দেখিয়েছেন।

    স্ট্রিনডবার্গের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রচেষ্টা ফুটে ওঠে ক্ষতিপূরণ, বিবাহ অনিবার্য এবং ফিনিক্স গল্পগুলো পড়লে। এ গল্পগুলোতে, তিনি পুরুষের দোষগুলো সামনে এনে নারীর অবস্থানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। সেইসঙ্গে, সামনে এনেছেন এক নির্মম সত্যকে নারী-পুরুষের অবস্থানগত দ্বন্দ্ব যদি থেকেই থাকে, তবে তার দায় এককভাবে নারী বা পুরুষ কারোরই নয়, বরং, চিরায়ত এ অবস্থান তৈরিতে পরিবার এক বিরাট ভূমিকা রাখে, যেখানে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রকট হয় নারীরই আরেক রূপ (বউ-শাশুড়ি, ননদ-ভাবী ইত্যাদি)। তাই, সত্যিকার পরিবর্তন চাইলে, পরিবর্তনটা আনতে হবে পরিবার সম্পর্কিত সামগ্রিক চিন্তা-ভাবনায়, শুধুমাত্র পুরুষের দিকে আঙুল তুললে সেটা অন্যায় হবে।

    অপ্রাকৃতিক নির্বাচন এবং রোমিও অ্যান্ড জুলিয়া গল্প দুটোর প্লট সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমটিতে উঠে এসেছে শ্রেণি-বৈষম্য, এবং সেইসাথে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, স্ট্রিনডবার্গ সবসময়ই নির্যাতিতের পক্ষে ছিলেন। তাঁর কলম সব সময় ন্যায়ের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। দ্বিতীয় গল্পটি একটি মধুর দাম্পত্য সম্পর্কের গল্প। হয়ত, এটাই স্ট্রিনডবার্গের ‘আদর্শ দাম্পত্য সম্পর্ক, যেখানে ভালোবাসা আছে, আবার ভিন্নমতও আছে; রোমন্থন আছে, খুনসুটিও আছে, এবং দিনশেষে অবশ্যই দুজনের মুখে হাসি আছে।

    যাহোক, প্রতিটি গল্পে স্ট্রিনর্গের বিশ্লেষণী ক্ষমতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। গল্পগুলোতে হয়ত কিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়; কিংবা, কিছু গল্পে হয়ত হেনরিক ইবসেনকে একটু বেশিই খোঁচানো হয়েছে; তবু মানতেই হয়, নারী অধিকারের দোহাই দিয়ে যে ‘এক্সট্রিমিজম’ শুরু হয়েছিল তা থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেয় অগাস্ট স্ট্রিনবার্গের ‘গেটিং ম্যারেড’।

    “এক ভাষার সাহিত্যকর্ম অন্য ভাষায় পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়” কথাটা হয়ত আংশিক সত্য। পুরো সত্যটা হচ্ছে, সাহিত্যরস আস্বাদনের ক্ষমতা যার রয়েছে তার জন্য ভাষা কোন বাধা নয়। ব্যক্তিগত জীবনে অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ মানুষটা ছিলেন ক্ষ্যাপাটে প্রকৃতির। তাঁর লেখাতেও সে ছাপ বেশ গাঢ়ভাবেই পাওয়া যায়। তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে আমি তাই দেখার চেষ্টা করেছি সেই ক্ষ্যাপাটে মানুষটাকে, বুঝতে চেয়েছি তাঁর বোধকে। গল্পগুলো অনুবাদ করতে গিয়েও এ-স্বাধীনতাটুকু আমি অক্ষুণ্ণ রেখেছি–পাঠকের সামনে স্ট্রিন্ডবার্গকে মূর্তিমান করতে তাঁর গল্পের বক্তব্যকেই অনুবাদ করেছি, লাইনকে করিনি। আশা করি, পাঠক একে সুদৃষ্টিতে দেখবেন। তবুওততা একদিনে ‘মেঘনাদবধ হয় না–গল্পগুলোর অনুবাদে কোথাও কোন অসঙ্গতি চোখে পড়লে নির্দ্বিধায় জানাবেন। পরবর্তী অনুবাদকে আরও সমৃদ্ধ করতে আপনাদের পরামর্শগুলো পথনির্দেশনা হিসেবেই গৃহীত হবে।

    মূল বইয়ের সবগুলো গল্পের অনুবাদ এখানে নেই। বাছাইকৃত দশটি গল্প নেয়া হয়েছে। ফলে মূল নামটিও–গেটিং ম্যারেড–এখানে ব্যবহার করা হয়নি। বরং বইয়ের সবচেয়ে আলোচিত–এ ডলস্ হাউস–গল্পটিই বইয়ের শিরোনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পাঠকের গ্রহণ/অগ্রহণই বলে দেবে অবশিষ্ট গল্পগুলোর পরিণতি কী হবে…

    ঢাকা
    ২২ আগস্ট ২০১৬ ইং
    মাহবুব সিদ্দিকী

    ভূমিকা

    ভূমিকা

    অগাস্ট স্ট্রিনবার্গ বাংলাদেশী পাঠক মহলে খুব বেশি পরিচিত না হলেও বিশ্বসাহিত্যে অত্যন্ত সমাদৃত একজন সৃজনশীল মানুষ। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতি শাখায় বিচরণ থাকলেও মূলত নাট্যকার হিসেবেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এ বইতে অবশ্য পাঠক তাঁর গল্পকার সত্তার সঙ্গেই পরিচিত হবেন। তবে, আমার কাছে অগাস্ট স্ট্রিনড়বার্গ সবসময়ই একজন প্রতিবাদী মানুষের প্রতিভূ। সে অর্থে আমাদের নজরুলের সঙ্গে তাঁর ভীষণ সাযুজ্য খুঁজে পাই, যিনি সকল প্রতিকূলতার মাঝেও সাম্যের গান গেয়েছেন, বলেছেন–“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” কিন্তু সাম্যের নামে যখন নারী-পুরুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধাচারী দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, দায়িত্ব-কর্তব্য, সমঝোতাকে দাঁড়িপাল্লায় তোলা হতে লাগলো, হেনরিক ইবসেনের তথাকথিত ‘নারীবাদী নাটকগুলোর দোহাই দিয়ে সম্পর্কগুলো সংজ্ঞায়িত হতে লাগলো এককভাবে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে, তখনই অগাস্ট স্ট্রিনবার্গ তাঁর চিরচেনা প্রতিবাদী মূর্তিতে আবির্ভূত হলেন। পাঠকের সামনে উপস্থাপন করলেন এমন কিছু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ বিষয়কে যেগুলো এড়িয়ে গিয়ে কতিপয় গত্বাঁধা স্থূল-বিষয় নিয়ে সে সময় নারী আন্দোলন দানা বাঁধছিল। স্ট্রিনডবার্গ মনে করতেন, আন্দোলন ব্যাপারটি নিরপেক্ষ; এর শুরুতে ‘নারী বা ‘পুরুষ যেকোন শব্দ জুড়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে সেটিকে একপাক্ষিক করে ফেলা, আর এ ধরনের আন্দোলনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় পোষণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যদিও স্ট্রিনড়বার্গের ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ভীষণ নারী-বিদ্বেষী হয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, সেসময় তিনি পুরোপুরি মানসিক বিকারগ্রস্থ ছিলেন এবং তাঁর গল্পগুলো সে সময়ের অনেক আগে লেখা। যাহোক, আমার মনে হয় বাংলাদেশেও বর্তমানে স্ট্রিনর্গের সময়ের মত একটি একপেশে ধারা চলছে। অনেকটা বোধহয় জোর করেই নারী-পুরুষ সম্পর্কটাকে বারবার আতশি কাঁচের নিচে আনা হচ্ছে এবং পুরুষ কিংবা পুরুষতান্ত্রিক শব্দগুলোকে ঋণাত্বক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ চেষ্টার চালিকাশক্তি হিসেবে গতানুগতিকভাবেই হেনরিক ইবসেনের নাটকগুলোকে ব্যবহার করা হয়। অথচ ইবসেনের বক্তব্য যে ভিন্ন আঙ্গিক থেকেও উপস্থাপন সম্ভব, কিংবা নাটকগুলোর সূক্ষতর বিশ্লেষণ যে অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের বিপক্ষে যেতে পারে এই চিন্তাটি কিন্তু করা হয় না। আমি অবশ্য মনে করি, কোন বিষয়ে নারী বা পুরুষ যে কারো ভুল দেখতে পাওয়া মানেই তার অবস্থান নিচু বা ঋণাত্বক হয়ে যাওয়া নয়। এতে বরং এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা মনুষ্যত্বের সীমার মধ্যেই রয়েছেন, কারণ, “মানুষ মাত্রই ভুল হয়।” কিন্তু এই ভুলগুলোকে যারা খুব বেশি বড় করে তোলেন তারা বুঝতে চান না–বিপরীতপ্রান্তে দাঁড়ানো মানুষটিকে ক্রমাগত অসহনীয় হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা প্রকারান্তরে নিজের অবিবেচকতাকেই প্রকট করে তোলা। তাই, সময় এসেছে ‘জেন্ডার বিষয়টিকে নতুনতর আলোকে চিন্তা করার; এবং তার অংশ হিসেবে স্ট্রিনবার্গ-পাঠ যথেষ্ট ফলদায়ী হবে বলেই আমার ধারনা। সে হিসেবে স্ট্রিনবার্গের গল্প নিয়ে বই প্রকাশ করা একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছি।

    আমাদের দেশে অনুবাদ-সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিকাশমান মাধ্যম। বলা হয়ে থাকে, মৌলিক লেখার চেয়ে অনুবাদের ক্ষেত্রে মেধা, মনন আর শ্রমের খরচ বেশি হয়। অনুবাদ কেবলমাত্র ভাষান্তর নয়, এর সঙ্গে ভাবেরও প্রয়োজন। এজন্য অনুবাদকের সাহিত্যজ্ঞান প্রখর হওয়া আবশ্যক। অন্যথায়, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় লেখা রূপান্তরিত হবে ঠিকই, কিন্তু লেখার মাঝে প্রাণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠবে। একটি সার্থক অনুবাদ তার শিল্পগুণে হয়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম। তাই স্বপ্রণোদিত হয়ে অনুবাদের দীর্ঘযাত্রার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অভিলাষে যারা উদ্যোগী হন, তাদের সাধুবাদ জানানো প্রত্যেক সচেতন বইপ্রেমির নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। অনুবাদক শুধু বিদেশী সাহিত্যটিকে নয়, সেদেশের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, ব্যক্তিসম্পর্ক, প্রতিবেশের সাথে নিজ ভাষার পাঠককে পরিচিত করানোর ভূমিকাটিও পালন করেন। সে বিবেচনায় অনুবাদক আদতে একজন ভ্রমণ প্রদর্শক। পাঠকের প্রশান্তিই অনুবাদকের পরিতৃপ্তি।

    মাহবুব সিদ্দিকী বয়সে তরুণ, নিজে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন এবং পেশাগত জীবনেও তার ছাপ বজায় রাখতে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। পেশাদার অনুবাদক তিনি নন, আমি বলবো এটি একটি শুভবার্তা। কারণ, পেশাদার অনুবাদক মানে এই কাজটির মাধ্যমেই তার জীবিকার সংস্থান হয়। ফলে, যত বেশি সম্ভব অনুবাদ তাকে করতে হয় একটি সীমিত ব্যবধিতে। সেক্ষেত্রে কোয়ালিটি বনাম কোয়ান্টিটি এর চিরন্তন সংঘাতে তাকে মধ্যবর্তী একটি সমঝোতায় আসতে হয়। মাহবুব সিদ্দিকীর সেই বাস্তবতা নেই, তিনি অনুবাদ করেছেন গভীর আন্তরিকতা থেকে। ফলে, যত্ন এবং নিষ্ঠার সমন্বয়ে গুণগত উৎকর্ষের একটি মাত্রায় পৌঁছতে তাঁর প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। আমার সুযোগ ঘটেছিল তাঁর অনুবাদের প্রাথমিক পাণ্ডুলিপিটি পড়বার। পাঠ পরবর্তীতে অনুবাদের কিছু অংশের ব্যাপারে তাঁকে মতামত দিই যেখানে আরেকটু উন্নতির সুযোগ রয়েছে। সেই পরিক্রমায় জানতে পারি, শুধু আমি একা নই, তাঁর পাণ্ডুলিপি পাঠকের তালিকায় ছিলেন আরও বেশ ক’জন সাহিত্যানুরাগী, যাদের প্রত্যেকের মতামতের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল থেকে অনুবাদে প্রয়োজনীয় পরিমার্জনার কাজটি করা হয়েছে। একটি অনুবাদ প্রকল্পে এতজন মানুষের মতামত নিয়ে সেই অনুযায়ী সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়া কাজটির প্রতি অনুবাদকের শতভাগ নিবেদনকেই স্বতঃসিদ্ধ করে। তাই, মাহবুব সিদ্দিকী ভবিষ্যতেও অনুবাদের কাজটি অব্যাহত রাখলে আমাদের অনুবাদ-সাহিত্য যে আরও সমৃদ্ধ হবে এ ব্যাপারে নিঃসংশয়েই অভিমত ব্যক্ত করা যায়। প্রতিক্রিয়া একজন শিল্পীর কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। অনুবাদকও তো একজন শিল্পীই বটে।

    যেহেতু এটি তাঁর প্রথম কাজ, পাঠক যদি উৎসাহসূচক মতামত দেন সেটি হয়তো তাঁর অন্তর্নিহিত শিল্পচেতনাকে আরও তেজোদ্দীপ্ত করবে। আমাদের দেশে অভিযোগ করা মানুষের সংখ্যা অগণিত, তুলনায় উৎসাহ দেবার মানুষের সংখ্যা কম। এই সরলীকৃত প্রবণতার বাইরে থেকেই পাঠক তরুণ অনুবাদকের প্রয়াসকে মূল্যায়ন করুক, এটিই প্রত্যাশা। অগাস্ট স্ট্রিনর্গের প্রতি আরও একবার শ্রদ্ধা জানাই, এবং সেই সাথে মাহবুব সিদ্দিকীর জন্যও শুভকামনা রইলো।

    ড. কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

    অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

    ইংরেজি বিভাগ

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    কৃতজ্ঞতা

    কৃতজ্ঞতা

    শ্রদ্ধেয় ড.কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় স্যার, যার সুবাদে অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গকে চিনেছি। স্যার না-থাকলে হয়ত স্ট্রিনবার্গ আমার কাছে ‘স্ট্রেঞ্জার থেকে যেত। সেই সঙ্গে, আরও একজন মানুষের নাম না করলেই নয়–শ্রদ্ধেয় শেখ আলাউদ্দিন স্যার। গল্পগুলো ছাপার অক্ষরে পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগে স্যার পড়ে না-দিলে বুঝতেই পারতাম না, ‘আ-কার, ‘এ-কার’, ‘হ্রস্ব ই কার’, ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি রয়েছে।

    ভাইয়া (মাহফুজ সিদ্দিকী) কে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানালে সেটা ন্যাকামো হবে কি না জানি না, ভাইয়া হয়ত পাকামোও বলতে পারে; তবুও, গল্পগুলো পড়ে দিয়ে, দরকার মতো মন্তব্য করে এবং আরও নানাবিধ উপায়ে সহযোগিতা করে এগুলোর কাঠামো দাঁড় করাতে ভাইয়া যে ভূমিকা রেখেছে সেজন্য আমার পক্ষ থেকে যেকোনো রকম অনুভূতি প্রকাশ পেলে দিনশেষে তার নাম কৃতজ্ঞতা-ই হবে।

    ঢাকা
    ২৩ আগস্ট, ২০১৬
    মাহবুব সিদ্দিকী

    অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ

    অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ

    অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গকে বলা হয় আধুনিক সুইডিশ সাহিত্যের জনক। ১৮৪৯ সালের ২২ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করা এ মানুষটি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একাধারে তিনি নাট্যকার, গল্পকার, চিত্রকর, ঔপন্যাসিক এবং কবি। চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে সুইডিশ সাহিত্যাঙ্গন দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। আজও তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাঁর সময়ের মতই প্রাণবন্ত এবং যুগোপযোগী। দাপিয়ে বেড়ানো’ কথাটা আক্ষরিক অর্থেই স্ট্রিনডবার্গের সঙ্গে ভীষণভাবে মানানসই। কারণ, প্রচলিত বিশ্বাস আর ধ্যানধারণাকে তিনি অনবরত আঘাত করেছেন তাঁর কলম আর তুলির আঁচড়ে। ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন একগুঁয়েরকম স্বাধীনচেতা। নিজেকে প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধাচারী ঘোষণা করে তিনি বলতেন–“জীবনের জটিলতার জালে আমরা এত বিশ্রীভাবে জড়িয়ে পড়েছি যে, এ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে, সুন্দর করে শুরু করতে হবে।” এ অনুভূতি থেকেই হয়তো জীবনব্যাপী সাহিত্যকর্ম নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। গল্প, নাটক আর কবিতার বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্নতর আঙ্গিকে প্রকাশ করেছেন। তবে, তিনি সব সময়ই ‘প্রাকৃতিক নিয়ম’(Natural Law) কথাটায় বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন, আরোপিত কোন মতামত বা বক্তব্য কখনোই মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। একে উল্লেখ করেছেন ‘বৃহত্তর প্রাকৃতিকতাবাদ’ (Greater Naturalism) হিসেবে। নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সে সমতার অর্থ এই নয় যে, নারী-পুরুষকে একই কাজ করতে হবে। নারী-পুরুষের মিলন নিয়েও প্রশংসনীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর। “দৈহিক মিলন কখনোই ‘কাম-নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত নয়, বরং, মানব মনের সুকুমার প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত।” স্ট্রিনবার্গ আরোপিত নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না। ফলে, তথাকথিত নারী আন্দোলন’ বা ‘নারী অধিকার’ শব্দগুলোর প্রতি ভীষণ বিরক্ত ছিলেন। উপরন্তু, এগুলোকে মানবজাতির মধ্যে বিভেদ-সৃষ্টিকারী মতবাদ মনে করতেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে নারী এবং পুরুষ উভয়েরই যথাযোগ্য মর্যাদা পাওয়া উচিত বলে বিশ্বাস করতেন। এ বিশ্বাস থেকেই, ১৮৮৪ সালে সুইডিশ নারীদের ভোটাধিকার আদায়ে তিনি রীতিমত আন্দোলন করেছেন। অনেক সমালোচক স্ট্রিনবার্গকে ‘নারী-বিদ্বেষী’ বলে রায় দিলেও বাস্তবতার নিরিখে একে খারিজ করে দেওয়াই সমীচীন। কারণ, যে সময়ে তিনি নারীদের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্বেষ প্রদর্শন করেছেন সে সময়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তাঁর বিখ্যাত কাজগুলোর প্রায় সবই ঐ ভারসাম্যহীনতার আগে করা। সর্বোপরি, ‘নিরপেক্ষ অবস্থান বলে কিছু হয় না। লেখকের বক্তব্যকে কালের কষ্টিতে যাচাই করে নেওয়ার দায়িত্ব পাঠকের ওপর বর্তায়।

    স্ট্রিনডবার্গের বক্তব্যে ছিল ক্ষুরধার তীক্ষ্ণতা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছু বলাকে কখনোই বরদাস্ত করতে পারতেন না। ফলে, নরওয়ের বিখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের বর্ণনাবহুল নাটকগুলোকে ভীষণ অপছন্দ করতেন, সেগুলোর বিষয়বস্তু নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এ-নিয়ে দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়েও শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিল–একে-অন্যকে খোঁচা দিলে বেশকিছু লেখালেখি করেছেন। তবে, স্ট্রিনবার্গের অনুসারীর সংখ্যাও কিন্তু নেহাত কম নয়। টেনিস উইলিয়ামস, এডওয়ার্ড অ্যালবি, ম্যাক্সিম গোর্কি, জন অসবর্নসহ অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক নিজেদের লেখালেখিতে স্ট্রিনবার্গের প্রভাব স্বীকার করেছেন। আমেরিকান নাট্যকার ইউজিন ও’নিল ১৯৩৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর স্ট্রিনডবার্গকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে স্বীকার করে তাঁকে ‘সবচাইতে প্রতিভাধর আধুনিক নাট্যকার’ (The greatest genius of all modern dramatists) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যদিও তার বহু আগেই স্টিনডবার্গ চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। ১৯১১-তে নিউমোনিয়ায়। আক্রান্ত হন। সেরে ওঠার আগেই ‘কোলন ক্যান্সার’ ধরা পড়ে। বেশ কয়েক মাস শয্যাশায়ী থেকে ১৯১২ সালের ১৪ মে স্ট্রিনবার্গ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

    সুইডিশ সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্য আজও তাঁকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

  • হৃদয়ের শব্দ

    হৃদয়ের শব্দ

    ইন্দ্রনীল সান্যাল

    [book]

    প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০২০।

    প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল।

    নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের সমস্ত

    অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

    ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষককে।

    কৃতজ্ঞতা স্বীকার

    লেখক ও চিকিৎসক দেবাঞ্জন সেনগুপ্ত, যে আমার ছোটবেলার বন্ধু। মেডিক্যালের ছাত্রী ত্বিষা চট্টোপাধ্যায় ওরফে গুঞ্জা, যে আমার আর এক বন্ধুর কন্যা। এই দুজন আমার এই উপন্যাসের পান্ডুলিপি পড়ে নানা পরামর্শ দিয়েছে। সেগুলো আমি গ্রহণও করেছি। তারপরেও যদি তথ্যগত ত্রুটি থেকে যায়, তার দায় সম্পূর্ণ ভাবে আমার। পত্রভারতী গ্রুপের সকল সদস্যকেও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁদের

    সমবেত প্রচেষ্টায় এই উপন্যাস গ্রন্থায়িত হল।

    এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, শঙ্খ ঘোষ, অমিতাভ দাশগুপ্ত, বীরেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং জন লেননের কবিতার পংক্তি, কবিতার নাম অথবা গানের লাইন ব্যবহার করা হয়েছে।

    তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাই।

    অভিজ্ঞানের লেখা কবিতাগুলির রচয়িতা আমি।

    “Two souls with but a single thought—

    Two hearts that beat as one!’’

    — John Keats

    বিধিসম্মত সতর্কীকরণ

    এটা উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্রদের নাম, পেশা, বাসস্থান; কাহিনিতে বর্ণিত রাজনৈতিক দলের নাম; চিকিৎসা সংক্রান্ত, পুলিশি এবং আইনি কার্যকলাপ লেখকের কল্পনাপ্রসূত। জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, সংগঠন বা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কোনওরকমের সাদৃশ্য একান্তই কাকতালীয়।

    নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে ঢুকি ১৯৮৫ সালে। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে ছিল এমনটা নয়। আমি প্রেসিডেন্সিতে ইংরিজিতে অনার্সের ফর্ম তুলেছিলাম। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে কমপ্যারেটিভ লিটারেচার নিয়ে পড়ার ইচ্ছেও ছিল। কারণ আমি লেখালিখির জগতে আসতে চেয়েছিলাম।

    আমার থেকে দশ বছরের বড় দাদা এবং মা মিলে ঘাড় ধরে ঢুকিয়ে দিল ডাক্তারি পড়তে। সেই যে সাহিত্য জগত থেকে নির্বাসন ঘটল, সেটা চলল ২০০৪ সাল পর্যন্ত।

    কী ভাবে? ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ডাক্তারি পড়াশুনো। পরের দু’বছর ইনটার্নশিপ ও হাউসস্টাফশিপ। কলেজ জীবনের সাত বছর আমি ছিলাম, আক্ষরিক অর্থে আউটসাইডার। পড়াশুনো করতাম, রাজনীতি করতাম, টুকটাক প্রেমও করেছি। কিন্তু জীবন সম্পর্কে আশ্চর্য এক উদাসীনতা কাজ করত। কাজ করত অন্তর্লীন বিষাদ। কলেজকে, শিক্ষকদের, সহপাঠীদের, সিনিয়র দাদা আর জুনিয়র ভাইদের দেখতাম কৌতূহল ভরে।

    ১৯৯৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করলাম এবং পোস্টিং হল সন্দেশখালি ব্লকের জেলিয়াখালি নামের এক হেলথ সেন্টারে। সেটি একটি দ্বীপ। দাঁড় বওয়া নৌকো পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হত। ইলেকট্রিসিটি পৌঁছয়নি। সেখানে ছিলাম পাঁচ বছর।

    ওই পাঁচটা বছর কী করে যে কাটিয়েছি সে আমিই জানি! হেলথ সেন্টারে থাকতাম। চিকিৎসা করার পাশাপাশি দিনে দশ থেকে বারো ঘণ্টা পড়তাম। প্র্যাকটিস করতাম না। বাড়ি আসতাম মাসে একবার। কাদায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, তুমুল ঝড়ের সময় নদীতে নৌকা পারাপার, পালস পোলিও নিয়ে পঞ্চায়েত অফিসে মিটিং—এই সব মনে পড়ে। কলকাতা শহরের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।

    ২০০০ সালে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এনট্রান্স পরীক্ষায় সফল হয়ে চলে এলাম কলকাতায়। পরের তিন বছর আবার অমানুষিক পড়াশুনো করতে হল। ২০০৩ সাল থেকে জীবন ছন্দে ফিরতে শুরু করল। ২০০৪ সালে তমলুক জেলা হাসপাতালে পোস্টিং হল। এবং আমার মনে পড়ে গেল, প্রায় কুড়ি বছর আগে নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—লিখব।

    তো, সেই ছিল লেখালিখির শুরু। ছোটগল্প থেকে বড় গল্প থেকে নভেলা থেকে উপন্যাস—সবই টুকটাক লিখে ফেলেছি। ২০১০ সাল নাগাদ মনে পড়ে গেল কলেজ জীবনের কথা। এবং দেখলাম, সব মনে আছে। আউটসাইডার হয়ে যে জীবন কাটিয়েছিলাম—সেটি মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটছে, ফুলের মতো ফুটে উঠছে, পাখির ছানার মতো ডানা মেলতে চাইছে। মাথা ভর্তি অজস্র চেনা, অচেনা, আধোচেনা চরিত্র ঘুরপাক খাচ্ছে, স্লাইড শোয়ের মতো মনের পর্দায় আছড়ে পড়ছে একের পর এক ঘটনা।

    সত্যি কথা বলতে কি, এই উপন্যাস লেখার জন্যে আমাকে মাথা খেলাতে হয়নি। কম্পিউটারের কি বোর্ড টেপার কায়িক শ্রম ছাড়া কিছুই করতে হয়নি। লেখা নিজের আনন্দে আসত। এবং এই উপন্যাসটি লেখার সময় যে পরিমাণ আনন্দ পেয়েছি, তা আগে কখনও পাইনি। কখনও হাসতাম, কখনও ভয় পেতাম, কখনও বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতাম, দু’একবার কেঁদেও ফেলেছি। তাড়াতাড়ি কি বোর্ড থেকে মুছে ফেলেছি অশ্রু।

    তিন বছর ধরে উপন্যাসটি লেখার পরে পাঁচ বছর ফেলে রেখেছিলাম। মাঝেমধ্যে টুকটাক এডিট করতাম।

    পত্রভারতীর কর্ণধার শ্রী ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধায় জানতেন উপন্যাসটির কথা। তিনিই একদিন দাবি জানালেন, এটি বই করতে চান। আমি রাজিও হয়ে গেলাম। কিন্তু এই উপন্যাস শুরু হচ্ছে ২০১০ সালে। আর আমার ডাক্তারি ছাত্রজীবন ১৯৮৫ সালে শুরু। পঁচিশ বছরে ডাক্তারি পাঠক্রম আমূল বদলে গেছে।

    ইতিমধ্যে আমার বন্ধুর কন্যা ত্বিষা চ্যাটার্জি ওরফে গুঞ্জা ডাক্তারি পড়তে ঢুকেছে। এবং সে আমার বন্ধুও বটে। তাকেই নিয়মিত এই উপন্যাস পর্বে পর্বে মেল করতাম। সে সংশোধন করে দিত। মেল চালাচালি চলেছিল ছমাস ধরে। অবশেষে উপন্যাসটি রেডি হল। পান্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম পত্রভারতীর দপ্তরে। বুকের মধ্যে যে পাথর জমা হয়েছিল ১৯৮৫ সাল থেকে, তা সরে গেল ২০১৯ সালে।

    আজ নিজেকে ভারমুক্ত লাগছে। আমার কাজ শেষ। প্রিয় পাঠক, এবার আপনার দায়িত্ব!

    ১লা জানুয়ারি ২০২০
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
  • ভাটির দেশ

    ভাটির দেশ

    [book]

    জল-জঙ্গলের দেশ সুন্দরবন। সে দেশে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। আর আছে বাঘ-কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা সবহারানো কিছু মানুষ। গত শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে এই কাদামাটি আর বাদাবনের দেশেই এক সাহেব আদর্শ সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের সেই স্বপ্নের সূত্র ধরেই লেখা শুরু হল ভাটির দেশের নতুন ইতিহাস। অলিখিত বিধি-বাঁধনের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বাদাবনের সমাজ-সংস্কৃতি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক পিয়ালি রয় আর দিল্লির কেতাদুরস্ত ব্যবসায়ী কানাই দত্তের সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে টলমল করে ওঠে সে পটভূমির সূক্ষ্ম ভারসাম্য। কানাইয়ের মাসি নীলিমা স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার। নীলিমার স্বামী, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নির্মল ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী। ১৯৭৯ সালে মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু বিতাড়নের ঘটনার ঠিক পর পরই রহস্যময় পরিস্থিতে মৃত্যু হয় তার।

    পিয়া সুন্দরবনে এসেছে সেখানকার বিরল প্রজাতির ডলফিনের বিষয়ে গবেষণার জন্য। তার পথপ্রদর্শক স্থানীয় জেলে ফকির। নদীখাঁড়িতে ঘোরাঘুরির সময় পিয়ার দোভাষীর কাজ করে দেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গ ধরল কানাই। আর তার পরেই ঘুরতে শুরু করল কাহিনির স্রোত।

    মহাকাব্যপ্রতিম এই উপন্যাসে আঠারো ভাটির দেশের জীবন আর প্রকৃতি, ইতিহাস আর লোকপুরাণকে জীবন্ত চেহারায় উপস্থিত করেছেন অমিতাভ ঘোষ।

    অমিতাভ ঘোষের ‘The Hungry Tide’ উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন অচিন্ত্যরূপ রায়, বাংলায় নাম রেখেছেন ‘ভাটির দেশ’। প্রথম প্রকাশ ২০০৪ সালে।

    এই উপন্যাসে ব্যবহৃত সমস্ত নাম, চরিত্র, স্থান এবং ঘটনা কাল্পনিক। কোথাও কোনওভাবে যদি কোনও বাস্তবের সঙ্গে মিল ঘটে থাকে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

    প্রথম আনন্দ সংস্করণ নভেম্বর ২০০৯; পঞ্চম মুদ্রণ এপ্রিল ২০১৯। উৎসর্গ : লীলাকে।

  • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ

    করুণা প্রকাশনী, কলকাতা

    প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭

    প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ

    ॥ রোমাঞ্চন ॥

    বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, ডিটেকটিভ, মিস্ট্রি, স্পাই—নানান শব্দের ফাঁকে-ফোঁকরে রহস্য ছড়িয়ে আছে। আমরা এই শেষের দিকের সবধরনের রচনাকে একত্র করে ভেবে নিচ্ছি। এছাড়া উপায় নেই। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকে শর্বিলক-এর চুরি করতে যাওয়ার মধ্যে রোমাঞ্চের গন্ধ আছে—কিন্তু তাকে কোনোক্রমেই গোয়েন্দা-কাহিনি বলা যাবে না। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি ইংরেজি গোয়েন্দা রচনার অনুবাদের হাত ধরে এসেছে। অতএব ইংরেজি মতগুলোকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

    ইংরেজি মতের কথা মনে হলেই এডগার অ্যালেন পো-এর কথা আগে মনে পড়ে যাবে। তাঁর The Murders in the Rue Morgue- পৃথিবীর প্রথম ডিটেকটিভ গল্প (১৮৪১ খ্রি.)। এর পরে নাম করতে হয় উইলকি কলিন্স-এর। তাঁর মুন স্টোন অথবা দি উওম্যান ইন্‌ হোয়াইট-এর ইন্সপেক্টর বাকেট ছিলেন ডিটেকটিভদের প্রথম সেরা মানুষ। তারপরে এসেছেন শার্লক হোমস্ আর ওয়াটসন নিয়ে আর্থার কোনান ডয়েল। আগাথা ক্রিস্টির এরকুল পোয়রোর কথা রসিকমাত্রেই জানেন। জেমস্ বন্ড, হ্যাডলি চেজ তো হাল আমলের ব্যাপার। নইলে Mystries of the Court of London (বাংলায় ‘লণ্ডন রহস্য’ নামে কয়েকখণ্ডে অনূদিত) পুরনো আমলে কম সাড়া জাগায়নি। এসব নামের উল্লেখ এজন্যে যে বাংলা রহস্য কাহিনি এগুলির কাছে সবচেয়ে ঋণী। পাঁচকড়ি দে মশাই কি গোবিন্দরাম বা দেবেন্দ্রবিজয় নির্মাণ করতে পারতেন, যদি না পুলিস ইন্সপেক্টর বাকেট তাঁর চোখের সামনে ঘোরাফেরা না করতেন?

    ॥২॥

    কাজেই বাংলা সাহিত্যে ডিটেকটিভ রচনার আবির্ভাব হতে দেরি হয়েছিলো। ভালো ডিটেকটিভ গল্প লেখা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। হত্যা, খুন, রাহাজানি, জোচ্চুরি এসব কাজের মধ্যে একটা অপরাধজনক মৌজ আছে। এর গল্পকে হতে হয় ঘামছোটানো ঘুম-তাড়ানো চরিত্র। আমাদের মধ্যে গোপন অপরাধ-বোধকে জাগ্রত করে তাতে সুড়সড়ি দিতে হবে—গল্পটা হবে পো-এর ভাষায় ‘Somewhat Peculiar Narrative.’ লেখককে হতে হবে একইসঙ্গে নাট্যকার, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞানী এবং শিল্পীও। চাই কৌতূহল শেষ অবধি জিইয়ে রাখার দুঃসাধ্য সংযম এবং আর্ট। রহস্যময়তাকে বজায় রাখতে হবে আদ্যোপান্ত। ভারতের আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে এতোগুলো বিপ্লব একসঙ্গে ঘটেনি। ঘটলো ইংরেজ আগমনের পর অপরাধ প্রবণতার বিচিত্র পরিবেশ সৃষ্টির ফলে। ইংরেজি সাহিত্য এবং ব্রিটিশ সরকার দুই হাত ধরে অতএব রহস্যকাহিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এসে পড়ল। এর মধ্যে ছোট গল্পের যথার্থ একটা কাঠামোর সঙ্গে বাঙালি রসিক পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছেন। কারণ তখনি আবির্ভূত হচ্ছেন বাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা, পালয়িতা এবং অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অভিযোগ, তাঁর রহস্যময় গল্পের পিছনে ছিলো অ্যালেন পো-র রহস্যময়তার ছায়া। রবীন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করবো কি, স্বয়ং কোনান ডয়েল শার্লক হোমসের চরিত্র কি আঁকতে পারতেন যদি না সামনে পোর ডিটেকটিভ Dupin প্রত্যক্ষ না থাকতেন! তাঁর প্রভাবেই ডয়েল Professor Challenger-কে নিয়ে Science fiction লেখেননি?

    অতএব সত্যেন্দ্রনাথের লাইব্রেরি থেকে পো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মগ্ন হলেন এবং Golden Bag এবং গুপ্তধন, The Cask of Amontillado আর The Tell – Tale-Heart ও সম্পত্তি সমৰ্পণ, Premature Burial এবং জীবিত ও মৃত ইত্যাদি মিতালি পাতিয়ে বসলো। কঙ্কাল, নিশীথে, ক্ষুধিত পাষাণ, ডিটেকটিভ গল্পগুলি অচিরে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    ॥৩॥

    একটু আগে যে ব্রিটিশ রাজত্বের কথা বলছিলাম। তার একটা কারণ চোর-ডাকাতের প্রাধান্য যেমন বেড়েছিল, তেমনি ধনীদের অত্যাচারও বেড়েছিলো। বেন্টিকের আমলে শ্লিম্যানের চেষ্টায় ঠগিদমন হলেও অপরাধীর সংখ্যা কমেনি। “থানাদার” স্থলে ‘দারোগা’রা এলেন। এমনি এক দারোগা ছিলেন গিরিশচন্দ্র বসু (এ পদে যোগ দেন ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে)। ডাকাতি দমনে তাঁর পটুত্ব ছিল। তাঁর চোখে দেখা অপরাধীদের অপরাধ ও তার দমনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে ছিল। তাই দিয়ে তিনি লিখে বসলেন ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’–বিশ্বস্ত এবং রোমাঞ্চকর আত্মজীবনীর ভঙ্গিতে। প্রকাশিত হলো ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে। সত্যি কথা বলতে বাংলার মাটিতে অপরাধ ও তার দমনের একটা বিশ্বাসযোগ্য চিত্র প্রথম পেলাম এই বইটিতে। একে গোয়েন্দাকাহিনি কেউ বলবো না—কিন্তু তার সূত্রপাত তো বলতেই পারি।

    সঠিক গোয়েন্দা কাহিনি পাবার জন্যে আমাদের আরও সাত-আট বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।১৮৯৬। তার আগেই অবশ্য আমরা ক্রাইম-এর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের বিভিন্ন রচনায়—ইংরেজি রাজমোহনস্ ওয়াইফ, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতিতে। কিন্তু রীতিমতো রহস্য-রোমাঞ্চ নিয়ে প্রথম আবির্ভূত হলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এবং বাঁকাউল্লার দপ্তরের লেখক বরকতুল্লা (?)। দুজনকেই ব্রাকেটে প্রথম বলা যেতে পারে বই প্রকাশের দিক থেকে।

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯১৭) আদরিণী (১৮৮৭), ডিটেকটিভ পুলিস-১ম কাণ্ড (১৮৮৭) পাহাড়ে মেয়ে (১৮৮৯), বনমালীদাসের হত্যা (১৮৯১) প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা হলেও তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন ‘দারোগার দপ্তর’ লিখে। এটি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে (১ম সংখ্যা) ধারাবাহিকভাবে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। ৪০-৪৮ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাগুলি বিভিন্ন নামে অবশ্য প্রকাশিতহত। যেমন ১৭৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘প্রতিশোধ’। ১৫৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘দীর্ঘকেশী’। ১৫৭ সংখ্যার নাম (১৪ বর্ষ ১৩১৩ব.) “ভীষণ হত্যা অর্থাৎ একটি স্ত্রীলোক হত্যার ভীষণ রহস্য”। ‘দারোগার দপ্তর’ এর প্রচার সংখ্যা ছিল প্রচুর। খুব লক্ষ্য করার ব্যাপার ইংল্যান্ডে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে শার্লক হোমস্-এর আবির্ভাবের মাত্র এক বছর পরে প্রিয়নাথের ‘ডিটেকটিভ পুলিস’ বাজার মাত করে দেয়। Indian Mirror পত্রিকা (২৫ জানুয়ারি ১৮৮৮) এর প্রশংসা করে লিখেছিল :

    We have also read with attention another book composed by the same author, and styled. ‘Detective Police’. The book has also been written by following the story of a man who was actually tried by the High Court of Calcutta on the most serious charges and is up to date undergoing the term of punishment in the criminal jail of Alipore.

    ১৪নং হুজুরি মলস্ লেন বৈঠকখানা ‘দারোগার দপ্তর’ কার্যালয় থেকে (সুকুমার সেন জানিয়েছেন ১৬২ নং বহুবাজার স্ট্রিট এর কার্যালয় ছিল। তবে কি ঠিকানার পরিবর্তন হয়েছিল?) উপেন্দ্রভূষণ চৌধুরি কর্তৃক প্রকাশিত হয়ে ‘দারোগার দপ্তর’ খণ্ডে খণ্ডে আত্মপ্রকাশ করত।

    এই সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’। এর দারোগা মশায়ের নাম ছিল বরকাতুল্লা—‘শ্রীযুক্ত কোতোয়া, বরকতুল্লা নাম’। একদা সুকুমার সেন অনুমান করেছিলেন বইটির ‘সম্ভাব্য লেখক’ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। এই অনুমান অবশ্য তথ্যসমর্থিত নয়। তবে বরকতুল্লা নামটি লোকমুখে বকাউল্লা থেকে বাঁকাউল্লায় পরিণত হয়েছিল সম্ভবত। এর কাহিনির মূল ছিলো ইংরেজি পরে বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’, নাম পায়। বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এর প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ ছিল লোমহর্ষক। এইভাবে গিরিশচন্দ্র-বঙ্কিমচন্দ্র-প্রিয়নাথদের দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠক ফাঁড়ি-দারোগা-থানা-পুলিশের একটা রোমাঞ্চিত স্বাদ পেতে শুরু করেছিল। বাঁকাউল্লার দপ্তরের মধ্যেই নারীরা ডিটেকটিভ কাহিনীর অনিবার্য চরিত্রে পরিণত হতে শুরু করেছিল।

    এই নারী-হত্যা-নারীহরণ-ডাকিনীবিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে এসে গিয়েছিল ‘বিলাইতি’ রহস্যরস আর দেশি কাহিনির জারজসন্তান হিসেবে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৯) কলম মারফৎ। রেনল্ডসের Joseph Wilmot-এর ছায়া অবলম্বনে এই এক নূতন! আমার গুপ্তকথা (১৮৭০-৭৩) নামে ৮৭০ পৃষ্ঠার এই বিশাল খিচুড়িরসের বইটির অনুক্রম হিসেবে ১৮৭৩-৭৯ সালে ছয় বছর ধরে ‘আমার গুপ্তকথা।—আশ্চর্য!!!’ নামে ধারাবাহিক প্রকাশের পর তিনখণ্ডে মোট ৪৯৬ পৃষ্ঠার ‘তুমি কি আমার’ গ্রন্থনামে পরবর্তী বইটি প্রকাশিত হল। আর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ৬৪৪ পৃষ্ঠার আর একটি ঢাউস ‘নবন্যাস’ প্রকাশিত হল ‘আর এক নতুন! হরিদাসের গুপ্তকথা’। আসলে এই ‘গুপ্তকথা’ প্রকাশ্য করেই ভুবনচন্দ্র খ্যাতিমান হয়ে পড়লেন। অবশ্য রেনল্ডস-এর বইটির বঙ্গানুবাদ দুখণ্ডে মোট (৭৪৫+৭৮৪) ১৫২৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশকালে নাম ছিল ‘বিলাতি গুপ্তকথা’। কিন্তু প্রত্যক্ষ ডিটেকটিভ বইগুলির মধ্যে ছিল চার খণ্ড ‘মার্কিন পুলিস কমিশনার’ (১ম খণ্ড হারাধনের অনুসন্ধান : ১৮৯৬, পৃ. ৬৪, ২য় খণ্ড মেয়ে চুরি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০;৩-৫ খণ্ড—অপূর্ব নারী ডিটেকটিভ : ১৮৯৬, পৃ. ২৬৮ এবং ৬ষ্ঠ খণ্ড জলবিবি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০) গুপ্তচর (১৮৯৮), ইউজিন সু রচিত ওয়াণ্ডারিং জু অবলম্বনে রচিত চারখণ্ডে ঠাকুরবাড়ীর দপ্তর। অভিশপ্ত য়িহুদী (১৯০০), নন্দনকানন সিরিজের তৃতীয় বল্লরী চন্দ্রমুখী (১৯০২), ঐ সিরিজের মারী কোরেলির Sorrows of Satan এর বঙ্গানুবাদ ‘সন্তপ্ত সয়তান’ (১৯০৩-৪), সয়তানী (১৯০৬), ডিউক তারাচাঁদ (১৯২০), গোয়েন্দার গল্প (মাইকেল মোহনচাঁদ) প্রভৃতি। তাঁর খ্যাতির অন্য আর একটি কারণ ছিলো রেনল্ডস-এর বিখ্যাত Mysteries of Court of London-এর খণ্ডশ অনুবাদ ‘লণ্ডন রহস্য’ (১৯১২-১৪)।

    এই ফাঁকে একজন কৃতী লেখকের কথা বলে নিই। ভদ্রলোক যে কেন আর রহস্য কাহিনি লিখলেন না জানিনা, লিখলে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতো। কারণ তাঁর আগে ‘ভদ্রস্থ’ কোনো লেখক এপথে পা বাড়াননি। তিনি নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ‘তপস্বিনী’ উপন্যাস লিখে যিনি খ্যাতি-অখ্যাতি দুই-ই কুড়িয়েছিলেন। ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পটি ছিল ‘চুরি না বাহাদুরি’। রহস্যজনক গোয়েন্দা গল্পের যথার্থ স্রষ্টা তাকে বলা চলতো যদি তিনি এপথে থাকতেন। রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি, ভৌতিক আবেশ রচনা ও শেষাবধি কৌতূক নির্মাণে সিদ্ধহস্ত লেখক ট্রেনের মধ্যে দুই ভদ্রলোকের চুরি ও গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার একটা ঠাসবুনুনিতে পাঠকদের অভিভূত করে রাখেন। শেষ অবধি চোর টাকা পয়সা দিয়ে যায় এক অদ্ভুত কৌশলে। গল্পে হয়তো চমৎকারিত্ব নেই, কিন্তু আছে পরিবেশ রচনার কৃতিত্ব। প্রিয়নাথের ‘Detective Story গুলি বঙ্গভাষায় মৌলিক Sensational novel-রূপে পরিগণিত হইবার উপযোগী’ বলে সাহিত্য সমালোচক মন্তব্য করলেও এগুলিকে সাহিত্য পর্যায়ভুক্ত করা যাবে কিনা বলা মুস্কিল। সেদিক থেকে নগেন্দ্রনাথের রচনাটি সাহিত্যরসে টইটম্বুর।

    সাহিত্যরস থাকুক না থাকুক গোয়েন্দারহস্য একালের পাঠকদের রুচি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিল। আসলে নতুন স্বাদের এই রচনা পাঠককে অভিভূত করতে সমর্থ হচ্ছিল। শরচ্চন্দ্ৰ দেব (সরকার)-এর ক্রাইম কাহিনিগুলির বিক্রির হিসেব থেকে এটা সহজে বোঝা যায়। শরচ্চন্দ্র সরকার ‘সংকলিত গোয়েন্দা কাহিনি নামে ডিটেকটিভ গল্প মাঝে মাঝে প্রকাশিত হত। প্রত্যেক খণ্ড সপ্তাহে দুদিন করে সাময়িকপত্রের মতো ফর্মা ধরে বিক্রি হত। এ-সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞাপনের বয়ান থেকে জানতে পারি, “গোয়েন্দা কাহিনী” এপর্যন্ত প্রায় পাঁচ লক্ষ ফর্মা বিক্রীত হইয়াছে।’ শরচ্চন্দ্র তীর্থে বিভ্ৰাট অথবা গুমখুন নামে বইপত্রও লিখেছিলেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ‘ভাল ভাল লোকে ও যে গোয়েন্দা কাহিনি পড়তে শুরু করেছিলেন তার প্রমাণ লেখকেরা অনেক সময় এই সব ভালো ভালো লোককে বই উৎসর্গ করতেন। সুকুমার সেন এঁদের কয়েকজনের নাম জানিয়েছেন—মহেন্দ্ৰনাথ বিদ্যানিধি, নগেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালীপ্রসাদ ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু, দামোদর মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় কৃষ্ণ দেব, সারদাচরণ মিত্র প্রভৃতি। গল্পগুলির সঙ্গে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এ সময়ে আসতে শুরু করেছিল ভালো ভালো ছবির আকর্ষণও। গোয়েন্দা কাহিনি চরিত্র হয়ে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করেছিল প্রথমযুগের ঠিক অব্যাবহিত পরেই। ‘রঘু ডাকাত’ ছিল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

    এসময়ে অনেক অকিঞ্চিৎকর লেখকের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের কথা আমরা তেমন করে বলতে চাইছি না।

    ॥ 8 ॥

    বাংলা ডিটেকটিভ উপন্যাসের দ্বিতীয় ভূবন নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন তিন বিখ্যাত রহস্যরসিক পাঁচকড়ি দে, দীনেন্দ্রকুমার রায় এবং সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য। আর একজনেরও নাম করতে পারি হরিসাধন মুখোপাধ্যায়।

    পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩-১৯৪৫) এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহার- উড়িষ্যা-আসাম পর্যন্ত তিনি খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ছোটোগল্প লেখার তেমন চেষ্টা তিনি করেন নি—কিন্তু ছোটো আকারের রহস্য কাহিনী লিখেছিলেন। পাঁচকড়ির খ্যাতি শুধু গল্পের প্লটের জন্য নয়, তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম দুটি গোয়েন্দাকে আমদানি করলেন ইংরেজি অনুকরণে। এঁরা হলেন দেবেন্দ্রবিজয় ও তাঁর সহায়ক-কাম-গুরু অরিন্দম। আগেই বলেছি পুলিশ ইন্সপেক্টর বাকেট সাহেব ছিলেন তাঁর আদর্শ।

    শরচ্চন্দ্র দেবের জনপ্রিয়তার কথা আগেই বলে এসেছি। কিন্তু যার বই নিয়ে প্রথম কাড়াকাড়ি প’ড়ে গেল লাইব্রেরিতে লাইন পড়লো, সংস্করণের পর সংস্করণ ছাপা হতে শুরু করলো—তিনি পাঁচকড়ি দে। তাঁর হাতের কাছে আছে শার্লক হোমস আর আছে ‘যমুনা পত্রিকা’। যমুনা পত্রিকা মানে ফণীন্দ্রনাথ পাল আর তাঁর দাদা যতীন্দ্র পাল। দুই পাল-ভাই আর পাঁচকড়ি মিলে যেন বই লেখার প্রতিযোগিতায় নামলেন। যতীনবাবু লিখলেন কুলবধূ, গৃহিণী, ঘরের লক্ষ্মী, ধর্মপত্নী নাম দিয়ে অজস্র বই। তাঁর ভাই লিখলেন ইন্দুমতী, ছোট বৌ, বন্ধুর বৌ, মধুমিলন প্রভৃতি। আর বন্ধু পাঁচকড়ি বাজার সরগরম করে ফেললেন মায়াবী, মায়াবিনী, হত্যাকারী কে? নীলবসনা সুন্দরী দিয়ে। ‘যমুনা’ আর ‘জাহ্নবী’তে জোয়ার বইতে লাগল তাই নিয়ে। পাঁচকড়ি কলকাতার তিন জায়গায় তিনটে প্রাসাদ নির্মাণ করলেন। হবেই না বা কেন? ১০০,০০০ লক্ষাধিক বিক্রি হয় তাঁর বই—মায়াবী, মনোরমা, মায়াবিনী, পরিমল, জীবনস্মৃত রহস্য, হত্যাকারী কে? লক্ষ টাকা, হত্যারহস্য, ভীষণ প্রতিশোধ, ভীষণ প্রতিহিংসা, কালসর্পী, নীলবসনা সুন্দরী, গোবিন্দ রাম, রহস্য বিপ্লব, মৃত্যু বিভীষিকা, পরিতজ্ঞা পালন, বিষম বৈসূবন, জয় পরাজয়, নরবলি, মৃত্যুরঙ্গিনী, শক দুহিতা, হরতনের নওলা, সুহাসিনী, মরিয়ম প্রভৃতি। ‘বিশেষ সুবিধা—একত্রে ৫ কিংবা তদূর্ধ্ব মূল্যের এই উপন্যাস লইলে মাশুল লাগে না।’ উপরন্তু ‘সতী শোভনা’ সঙ্গে ফ্রি। সমস্ত বই অনুবাদিত হয়ে চলেছে হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলেগু, ‘কেনেদী’, মারাঠি, গুজরাটি, সিংহলি, ইংরেজি—দেশি-বিদেশি ভাষায়। ছাপা ভালো, ছবিও সব মনোরম। বই পড়ে কখনও হিতবাদী লেখে “রচনাচাতুর্য চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছেন, কখনও Statesman লেখে- This is a sensational Hypnotic Novel in Bengali’ তাঁর জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ধাওয়া করেছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজের বছরে (১৯১৩) পাঁচকড়ি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন ‘জীবমৃত-রহস্য’–’শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর/শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/মহাশয় করকমলেষু’। সুকুমার সেন অনুমান করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ পড়ে তিনি ‘শ্রীমতী শোভনা’ লিখেছিলেন।

    খুব মজার একটা কাকতলীয় ব্যাপার ঘটে গেলো পাঁচকড়ির শেষ জীবনে। হঠাৎ বন্ধু যতীন্দ্রনাথ পাল মারা গেলেন। যতীন্দ্রনাথ পাল সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র। মাত্র ৩৬/৩৭ বছর বয়সের মধ্যেই ছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা বইয়ের লেখক। তাঁর মৃত্যুতে পাঁচকড়ি ‘জীবনৃত’ হয়ে গেলেন। তাঁর রহস্যকাহিনির ‘উৎস’টি গেল শুকিয়ে। বন্ধুর মৃত্যুর পর আড়াই দশকের বেশি বেঁচে রইলেন তিনি—কিন্তু আর কোনো বই লিখতে পারলেন না। কু-লোকে নানা কথা বলে। বলেন—তাঁর রচনায় নাকি শরৎচন্দ্র সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ পাল এবং রাজানারায়ণ বসুর পুত্র মনীন্দ্রনাথ বসুর হাতের গন্ধ পান তাঁরা।

    ॥ ৫ ॥

    পাঁচকড়ি দে-র জন্ম ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। বাবার নাম কেদারনাথ দে। বাল্য শিক্ষার সূচনা ভবানীপুরের একটি স্কুলে। খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনো করেছিলেন বলে বলা যায় না। দেখতে বেশ সুরুপুষ। শুধু রহস্য উপন্যাস লিখেই যা উপার্জন করে গেছেন তা তিন পুরুষে ভোগ করার উপযুক্ত। জোড়া সাঁকোর ৭নং শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে তাঁর একটি বইয়ের দোকান ছিল—”পাল ব্রাদার্স”। তিনি দে দোকান কেন পাল ব্রাদার্স হল ভাবতে গেলে মনে হয়- তিনি সম্ভবত ধীরেন্দ্রনাথ পাল যতীন্দ্রনাথ পালেদের বকলমা নিয়েছিলেন। একটি, ছাপাখানারও তিনি মালিক হন বাণী প্রেস।

    পাঁচকড়ির জনপ্রিয়তার একটা দৃষ্টান্ত দিই। হিতবাদী পত্রিকা সে সময়ে মন্তব্য করেছিলেন—”রচনা চাতুর্যে চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। আমরা দেওয়ান গোবিন্দরাম পাঠে প্রকৃতই পরম প্রীতি লাভ করিয়াছি। এই জনপ্রিয়তার মূলে ছিল তাঁর বিদেশি রোমাঞ্চ সাহিত্যের আত্মকরণ। তার প্রমাণ তিনি অনেক বইতে রেখে গেছেন। একটি বইয়ের পাদটীকায় তিনি লিখে গেছেন—”সঞ্জীবচন্দ্রই এরূপ একটা ক্ষমতাপ্রাপ্ত দেখিয়া কেহ কেহ বিস্মিত হইবেন সন্দেহ নাই। এই বিদ্যা অতিশয় ধৈর্য্য এবং বিপুল অধ্যবসায় সাপেক্ষ। ইহা আমাদিগের দেশীয় বিদ্যা নহে, ইউরোপীয়। এখন আমাদের দেশে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি এই বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছেন। ইহার নাম (Ventroquilism) ভেন্ট্রোকুইলিজম। কেবল অপরের স্বর অনুকরণে সক্ষম হইলে ভেন্ট্রোকুইলিস্ট হইতে পারা যায় না—শব্দকে ইচ্ছামত স্থানে উত্তেজিত করা প্রয়োজন। আমরা বৃহৎ অট্টালিকা মধ্যে, প্রান্তরে, নদীতটে, অথবা কোন নির্জন স্থানে দাঁড়াইয়া কোন শব্দ করিবামাত্র চারিদিক হইতে প্রতিধ্বনি শুনতে পাই;যিনি নিজের স্বর অব্যক্ত রাখিয়া কেবলমাত্র সেই প্রতিধ্বনিতে ইচ্ছামত দূরে সুস্পষ্টরূপে উত্তেজিত করিতে পারেন, তিনি প্রকৃত ভেস্ট্রোকুইলিস্ট।’

    তাঁর সময়ে উপন্যাস রাজত্বে সম্রাটের স্থানে আসীন বঙ্কিমচন্দ্র। সেকারণে ভাষার ভঙ্গিমায় তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে অনুসরণ করেছেন—’প্রভাত হইলে কাহার? বিষাদ, আনন্দ কাহার উত্তমর্ণের, তাহার একদিনের সুদ বাড়িল। আর কাহার, কয়েদী তস্করের; তাহার একদিনের মেয়াদ কমিল।’

    আমরা এই খণ্ডে পাঁচকড়ি দে-রচিত পাঁচটি রহস্য উপন্যাসের সংকলন ঘটিয়েছি। পরবর্তী খণ্ডগুলিও একে একে প্রকাশিত হবে। সেখানে পাঁচকড়ির রচনা-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো—যেমন তাঁর রচিত গোয়েন্দা চরিত্র, সহকারী গোয়েন্দা-চরিত্র, পুলিশের ভূমিকা ইত্যাদি প্রকাশ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে। এখন সংকলিত উপন্যাস-পঞ্চকের মধ্যে তিনটি উপন্যাস সম্পর্কে সমসাময়িক কালের বক্তব্য তুলে দিয়ে তৎকালীন প্রতিক্রিয়ার কথা একালের পাঠকের সমীপে নিবেদন করি—

    মায়াবিনী উপন্যাসের আগে তিনি ‘মনোরমা’ উপন্যাস লেখেন। এই মায়াবী যখন ‘গোয়েন্দার গ্রেপ্তার’ সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল—তখন এর নাম ছিল ‘জুমেলিয়া’। তিনফর্মা ছাপা হয়েছিল, পরে বাকি অংশটি লিখে তিনি একেবারে বই আকারে যখন প্রকাশ করলেন—তখনই নাম বদলে হয় ‘মায়াবিনী’। তিনি চেষ্টা করতেন প্রতি পুনর্মুদ্রণে বইকে পরিমার্জিত করার। যেমন দ্বিতীয়বার ছাপার সময় মায়াবিনী উপন্যাসের ভূমিকায় লেখেন—’এখানে ইহার অনেকাংশ পরিবর্ধিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থান পুনর্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্যও পূর্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।’

    মায়াবিনীর আগে যে ‘মায়াবী’ রহস্যন্যাস লেখা হয়েছিল—সেটি সম্পর্কে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা ২ জ্যৈষ্ঠ ১৩১২ তারিখে মন্তব্য করেছিলেন—

    “আমরা অন্যান্য অনেক লেখকের ও অনেক ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িয়াছি কিন্তু তন্মধ্যে কোনখানি শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বাবু লিখিত উপন্যাসের ন্যায় হৃদয়গ্রাহী নয় নাই। হয়ত সেগুলিতে নানা রকমের বীভৎস ঘটনার দ্বারা কেবল একটা গল্প তৈয়ারী করা হইয়াছে মাত্র, কিন্তু বাঁধন নাই, গল্প সাজাইবার যে একটা কৌশল থাকা দরকার তাহাও নাই। নতুবা হয়ত কোন একখানি ইংরাজি বা ফরাসী উপন্যাসের ধারাবাহিক অক্ষম অনুবাদ। ‘মায়াবী’র ঘটনা সর্ব্বাঙ্গসুন্দর। ভাষাও গ্রন্থকারের নিজস্ব; যেমন প্রাঞ্জল তেমনি মধুর। গ্রন্থকারের গল্প সাজাইবার বেশ হাত আছে—রহস্য বিন্যাসের ক্ষমতাও অতুলনীয়। একবার পড়িতে আরম্ভ করিলে শেষ পৃষ্ঠার শেষ পংক্তি পর্যন্ত পাঠককে বিপুল আগ্রহে অগ্রসর হইতে হয়।”

    এবার ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘নীলবসনা সুন্দরী’ বইটি সম্পর্কে কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ‘জাহ্নবী’ পত্রিকায় প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় যে সমালোচনাটি করেছিলেন—তা উদ্ধার করে দিই—

    “নীল বসনা সুন্দরী, হত্যাকারী কে? শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজি ও ফরাসীস্ লেখকদিগের রচিত যেসব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    ‘বঙ্গভূমি’ পত্রিকা (১৯ মাঘ ১৩১১) পাঁচকড়ির সবচেয়ে সাড়াজাগানো রচনা ‘নীলবসনা সুন্দরী’ সম্পকে লিখেছিলেন :

    “নীলবসনা সুন্দরী বঙ্গ সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্বে বাংলায় ভালো ডিটেকটিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন, যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশ জনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীলবসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    “হত্যাকারী কে?” (দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯০৭) সম্পর্কে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (৩ বর্ষ ১ সংখ্যা) বিখ্যাত সমালোচক চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন :

    “হত্যাকারী কে? পাঁচকড়ি দে প্রণীত একখানি ডিটেকটিভ গল্প এবং সে হিসাবে ইহাতে বিবৃত ঘটনার সমাবেশ এবং অনুসন্ধানের প্রণালীতে কারিকুরীর পরিচয় পাওয়া যায়। অক্ষয়বাবু যে একজন সুদক্ষ ডিটেকটিভ ইহা গ্রন্থকার দেখাইতে সমর্থ হইয়াছেন। ভাষাও প্ৰশংসার্হ।”

    আর ১৯ ভাদ্র ১৯১০ তারিখের ‘বসুমতী’ মন্তব্য করেছিলেন—

    “গল্পটি বেশ হইয়াছে, গল্পটি আদ্যোপান্ত পাঠ করিবার পর সত্য সত্যই জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করে হত্যাকারী কে? ইহাতে লেখকের বাহাদুরী প্রকাশ পাইয়াছে। যে পাঠকগণ ডিটেকটিভ গল্প পাঠ করিতে বিশেষ উৎসুক, এই পুস্তকখানি তাঁহাদের নিশ্চয়ই ভালো লাগিবে।”

    পাঁচকড়ির বই ইংরেজির মতও বহু ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার পরিসরকে বহুধাবিস্তৃত করেছিল। সেই প্রবাহকে একালেও বহমান রাখার জন্যে আমাদের খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের এই আয়োজন।

    দোলযাত্রা ১৪১৬
    বারিদবরণ ঘোষ

    সূচি

    • নীলবসনা সুন্দরী
      ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল …
    • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী
      সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ করুণা প্রকাশনী, কলকাতা প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭ প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ ॥ রোমাঞ্চন ॥ বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, …
    • মায়াবিনী
      বিজ্ঞাপন প্রথম বার। গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল। দ্বিতীয় বার। এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা …

    নীলবসনা সুন্দরী
    মায়াবিনী
    মায়াবী
    হত্যা রহস্য
    হত্যাকারী কে