Tag: সম্পন্ন গ্রন্থ

  • ভারতনাট্যম

    ভারতনাট্যম

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    [book]

    ‘ভারতনাট্যম’ মাসুদরানা সিরিজের দ্বিতীয় বই, এবং এটি লেখকের এই সিরিজের একটি মৌলিক রচনাও। কাহিনী তেমন কিচ্ছু না, ভারতীয় সাংস্কৃতিক দল এসেছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠান করতে। মেজর জেনারেল রাহাত খান তাদের মাঝে ঘাপলা দেখতে পেলেন। নজর রাখতে গিয়ে (তৎকালীন) পিসিআইয়ের একজন এজেন্ট মারা পড়েছে। এবার পাঠানো পিসিআইয়ের মাসুদ রানাকে ফটোগ্রাফারের ছদ্মবেশে। রানা কি পারবে তাদের দুরভিসন্ধি জেনে আসতে? কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল মোলাসেস সেন্ট— অর্থাৎ চিটাগুড়ের গন্ধ। ব্যাপার কী? এ যে বিষাক্ত কেউটের চেয়েও ভয়ঙ্কর! রানার মৃত্যুসংবাদ প্রচার করেও কি ধোঁকা দেয়া গেল ওদের?

    প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়ে’র তুলনায় ‘ভারতনাট্যমে’র লেখনী আরেকটু আঁটসাট, স্মার্ট। সুলতার সাথে রানার সম্পর্ক যেমন মেলোড্রামাটিক, এটায় তা অনেকটাই অনুপস্থিত। মিত্রাকেও ভাল লেগেছে বেশ, নিজ দেশ আর প্রেমের প্রতি দোদুল্যমানতাটা আরোপিত লাগেনি। জয়দ্রথ মৈত্র মশাইও নেগেটিভ চরিত্র হিসেবে ঠিকঠাক।

    তবে জুয়ার আড্ডায় রানার টানা চার দান জিতে ফেলাটা নাটকীয়ই ছিল। যদিও তার জুয়া ভাগ্য বরাবরই অবিশ্বাস্য।

    ধ্বংস পাহাড়ের তুলনায় রানাও বেশ অনেকটা পরিণত এই বইয়ে। সাথে সোহেলের প্রথম প্রবেশ। সোহেলের হাত কাটা পড়ার মিশন নিয়ে ভিন্ন একটি বই হলেও মন্দ হতো না। ধ্বংস পাহাড়ে মাসুদ রানা ‘সিনিয়র সার্ভিস’ পান করত, এই বইয়ে ধরেছে ৫৫৫ সিগারেট।

    বর্তমান সংস্করণে আমরা ‘ভারতনাট্যমে’র অসংক্ষেপিত সংস্করণ অনুসরণ করেছি। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে।

  • স্বর্ণমৃগ

    স্বর্ণমৃগ

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    [book]

    ‘স্বর্ণমৃগ’ রচিত হয়েছে ‘ইয়ান ফ্লেমিং রচিত জেমস বণ্ড সিরিজের ‘অন হার ম্যাজেস্টিস সিক্রেট সার্ভিস’ ও ‘গোল্ডফিংগার’-এর ছায়া অবলম্বনে। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, সেবা প্রকাশনী থেকে। ‘স্বর্ণমৃগ’ মাসুদ রানা সিরিজের তৃতীয় বই এবং প্রথম খণ্ডের তৃতীয় উপন্যাস।

    হিংস্র এক স্বর্ণ চোরাচালানকারীর উদয় হয়েছে পাকিস্তানে; এক অভিনব পন্থায় স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। মাঠে নেমেই সকল প্রতিযোগীকে খেদিয়ে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে সে। এবার তার খোঁজেই পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হলো রানাকে। মাসুদ রানা চলেছে করাচি। সমুদ্রের ধারে পরিচয় হলো স্বর্ণমৃগের সাথে, খেলার চলে; উপরি পাওনা হিসেবে রানার জীবনে এলো জিনাত সুলতানা।

    লাস্যময়ী জিনাত সুলতানা ছাড়াও করাচিতে দেখা মিলল সাত ফুটি লম্বা দানব গুংগা আর রহস্যময় চরিত্রের অধিকারী ওয়ালী আহমদের যে জুয়াতে মেয়েদের হারিয়ে আনন্দ লাভ করে। প্রচণ্ড সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়ে মাসুদ রানা। জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করল রানা, শক্তির দ্বন্দ্বে ওয়ালী আহমেদের ক্ষমতার কাছে সে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুমাত্র। কিন্তু পিছিয়ে এলো না রানা, আহ্বান করল নিশ্চিত মৃত্যুকে।

    সুন্দরী জিনাতকে আত্নহত্যার হাত থেকে বাঁচিয়ে অপ্রত্যাশিত সাহায্য পাওয়া গেলো তার বাবার কাছ থেকে। বেরিয়ে পড়ল কালপ্রিটের আসল চেহারা। শেষ দৃশ্যে জিনাতের পরিনতি কী হলো তা ভালোভাবে বোঝা যায় নি। তাই তার বিষয়টা বেশ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অনুমান করতে হয়েছে।

  • দুঃসাহসিক

    দুঃসাহসিক

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    Tag: সম্পন্ন গ্রন্থ

    ‘দুঃসাহসিক’ কাজী আনোয়ার হোসেন রচিত ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের চতুর্থ উপন্যাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই রহস্যোপন্যাসটি রচিত হয়েছে ‘ইয়ান ফ্লেমিঙের ‘জেমস বণ্ড সিরিজে’র ‘ডায়মন্ডস আর ফরেভারে’র ছায়া অবলম্বনে। পিকিং শহর থেকে এল সাহায্যের আবেদন, একজন দুঃসাহসী বাঙালি লোক চাই। বন্ধু দেশ… যেতে হলো রানাকে। মুখোমুখি হতে হলো শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষের।

    পাকিস্তান কাউন্টার ইনটেলিজেন্স—পিসিআই-র ঢাকা শাখার কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছে চাইনিজ সিক্রেট্ সার্ভিস্ (সিএসএস)— ইউরেনিয়াম স্মাগলিং গ্যাঙের নাড়িনক্ষত্র খুঁজে বের করতে হবে। চীন, পাকিস্তানের অন্যতম বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ও সিএসএস অনেক দুঃসময়ে সাহায্য করেছে পিসিআইকে। তাই পিসিআই-র ঢাকা শাখাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সিএসএসের জন্য। পিসিআই-র অন্যতম দুঃসাহসিক অফিসার মাসুদ রানাকে পাঠানো হয় সাহায্যের জন্য। কিন্তু রানা যখন সেখানে যায়, তখন সে বুঝতে পারে যে, সে অনেক বড় বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে—যেখানে তার প্রাণসংশয়ও হতে পারে। তবুও ‘দুঃসাহসিক’ অভিযান চালিয়ে মাসুদ রানা শাংহাই থেকে হংকং, হংকং থেকে ম্যাকাও ঘুরে দুর্ধর্ষ গ্যাং রেড লাইটনিঙের ডেরা থেকে কার্য হাসিল করে বেরিয়ে আসে।

    ‘দুঃসাহসিক’ গল্পটি ভাল কিন্তু আর পাঁচটা সাধারণ স্পাই থ্রিলার গল্প থেকে আলাদা করার মত কোন বৈশিষ্ট্যই ফুটিয়ে তুলতে পারেননি লেখক। এছাড়া সংলাপগুলো অনেকটাই দুর্বল। আর লেখক মাসুদ রানা সিরিজের পূর্ববর্তী গল্পগুলোতে সেভাবে নারী চরিত্রগুলো এনেছেন, এই গল্পটিতেও প্রায় একইভাবে নারী চরিত্রটি এনেছেন; যা একেবারে গতানুগতিক—সহজ কথায়, বর্তমান থ্রিলার-রোমেন্টিক চলচ্চিত্র বা সিরিজে যেভাবে নারী চরিত্রগুলো (যদিও সেখানে নায়িকা বলে সম্বোধন করা হয়) আনা হয়, অনেকটা সেভাবেই লেখক এই গল্পেটিতে নারী চরিত্রটিকে স্থান দিয়েছেন। তবে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলায় কাহিনীটির নাম ‘দুঃসাহসিক’ যথার্থ হয়েছে।

  • হরিদাসের গুপ্তকথা

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    নবীন-সন্ন্যাসী

    পঞ্চানন রায় চৌধুরী

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    অপূর্ব্ব উপন্যাস


    প্রথম এডুলিচার সংস্করণ: বৈশাখ ১, ১৪৩২; এপ্রিল ১৪, ২০২৫

    ওসিআর, শুদ্ধিপাঠ ও সম্পাদনা : তাহের আলমাহদী

    প্রকাশক : এডুলিচার; বিশুদ্ধজ্ঞানের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান

    গ্রন্থস্বত্ব : পাবলিক ডোমেইন

    অনুসৃতি : তৃতীয় সংস্করণ, ১৩৩৭; 1930

    প্রকাশক : শ্রীতারাচাঁদ দাস; ৮২, আহিরীটোলা ষ্ট্রীট্, কলিকাতা; মুদ্রণ : চক্রবর্ত্তী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস; ২নং নিমুগোস্বামী লেন, কলিকাতা

    মূল্য : ১৷৷৹ টাকা
    The Copy-Rights of this book are the property of
    Tara Chand Dass
    Rights Strictly Reserved.
    1930


    ভূমিকা

    নিবিড় কানন মধ্যে একটি সুরভি কুসুম বিকশিত হইলে তাহার সুবাসে যেমন সমগ্র বনস্থলি আমোদিত করে, তেমনি বংশে একটি সুপুত্ত্র জন্মিলে তার বিমল যশে সেই বংশ উজ্জ্বল হ’য়ে থাকে। ইতিহাস প্রায় ধনীপক্ষে চাটুকার হইয়া থাকে, সুতরাং অন্ধকারময় খনিতে মণির ন্যায় অজ্ঞাত কুল শীল কোন দরিদ্রের গৃহে কোন মহাপুরুষ জন্মিলে প্রায় তার কোন খোঁজ খবর রাখে না।

    প্রায় এক শত বৎসর পূর্ব্বে আমাদের এই হরিদাস সুদূর পাঞ্জাবে এক প্রবাসী ব্রাহ্মণের গৃহে উদয় হইয়াছিলেন এবং বাইশ বৎসর বয়সে সন্ন্যাসের মহামন্ত্র লইয়া সংসারের সহিত সকল সম্বন্ধ ছেদন করিয়া ফেলেন। এই বাইশ বৎসরকাল সংসারে কিরূপ ভাবে, কিরূপ দরের লোকের সহিত অতিবাহিত করিয়াছিলেন এবং কোন তাপরাধ না করিয়া যেরূপ পুনঃ পুনঃ লাঞ্ছনা ভোগ করিয়াছিলেন, তাহাই এই পুস্তকে বিশদভাবে বর্ণিত হইয়াছে।

    যদি এই সংসারে বহুরূপী ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির লোক চিনিবার কাহারও সাধ হয়, মুসলমান রাজত্বের অন্তিমকালে ও ইংরাজ রাজত্বের সূত্রপাতে এই স্বর্ণ-প্রসূ বাঙ্গালা দেশের আভ্যন্তরিক অবস্থা জানিতে যদি বাসনা জন্মায়, ইতিহাস প্রসিদ্ধ অনেক বড় বড় লোকের বিচিত্র গুপ্ত রহস্য জানিবার ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে আমাদের এই ইতিহাসের সহিত আলাপ করুন, কখনই ফললাভে বঞ্চিত হইবেন না। ভয় বিস্ময় ক্রোধ প্রভৃতি রসে অন্তরার্ণব উদ্বেলিত হইয়া উঠিবে।

  • অবিশ্বাস্য

    অবিশ্বাস্য

    ‘অবিশ্বাস্য’ তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী রচিত একটি ভৌতিকগল্প সঙ্কলন। গ্রন্থটিতে এগারটি ভৌতিক গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্প পৃথক হলেও কোন গল্পেরই শিরোনাম নেই। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় শ্রাবণ, ১৩৬৯ বঙ্গাব্দে। প্রকাশক : প্রবীর মিত্র। সাহিত্য প্রকাশ, ৫/১, রমানাথ মজুমদার ষ্ট্রীট, কলিকাতা – ৭০০০০৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শতদল ভট্টাচার্য, যদিও সে প্রচ্ছদটি এখন আর পাওয়া যায় না। মুদ্রাকর: গোপাল পাল, স্টার প্রিন্টিং প্রেস, ২১/এ, রাধানাথ বোস লেন, কলিকাতা-৬। এই সংস্করণে গল্পগুলোকে এক থেকে এগারো পর্যন্ত ক্রমিক দিয়ে সাজানো হয়েছে। আমরাও এই দ্বিতীয় সংস্করণটি অনুসরণ করলেও প্রতিটি গল্পের কাহিনী অনুযায়ী আলাদা শিরোনাম প্রদান করেছি অনলাইন পাঠকদের সুবিধার্থে।

    উৎসর্গ

    ৺গিরীন্দ্র সিংহ

    সুদূরতমেষু

  • দস্যু বনহুর

    দস্যু বনহুর

    ‘দস্যু বনহুর’ বাংলাদেশী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘রোমেনা আফাজ’ সৃষ্ট একটি কথাচরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি লিখেছেন ১৩৮টি কাহিনী, যা সামগ্রিকভাবে ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাসের নামও ‘দস্যু বনহুর’। ছোটবেলা নৌদূর্ঘটনায় চৌধুরী বাড়ীর ছেলে মনির হারিয়ে যায়, দস্যু সর্দার কালু খাঁ তাঁকে কুঁড়িয়ে পান ও পরবর্তিতে তাঁকে ‘দস্যু বনহুর’ রুপে গড়ে তোলেন। গরীবের বন্ধু ও চোরাকারবারীদের চিরশত্রু দস্যু বনহুর যেমন গরীবের কাছে ছিলেন সম্মানিত, তেমনি চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীদের কাছে ছিলেন যমদূতের মত। এই সিরিজের স্লোগান হচ্ছে ‘সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর’।

    দস্যু বনহুরের সহায়ক চরিত্র হিসেবে রয়েছে রহমান ও কায়েস, তারা একাধারে বনহুরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিল— একজন জঙ্গলে অন্যজন শহরে; শহুরে স্ত্রীর নাম মনিরা ও অপরজনের নাম নূরী। মনিরার গর্ভে দস্যু বনহুরে বড় ছেলে ‘নুরুজ্জামান নূর’ এর জন্ম, যে পরবর্তীতে দেশের সৎ ও সাহসী ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। নূরীর গর্ভে ‘জাভেদ’ নামে তার একটি ছেলের জন্ম হয়, যে পিতার মতই দস্যুতা করতে ভালবাসে।

  • দস্যু বনহুরের নতুন রূপ

    দস্যু বনহুরের নতুন রূপ

    ‘দস্যু বনহুরের নতুন রূপ’— এটি ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের দ্বিতীয় গ্রন্থ। ‘দস্যু বনহুর’ বাংলাদেশী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘রোমেনা আফাজ’ সৃষ্ট একটি কথাচরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি লিখেছেন ১৩৮টি কাহিনী, যা সামগ্রিকভাবে ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাসের নামও ‘দস্যু বনহুর’। ছোটবেলা নৌদূর্ঘটনায় চৌধুরী বাড়ীর ছেলে মনির হারিয়ে যায়, দস্যু সর্দার কালু খাঁ তাঁকে কুঁড়িয়ে পান ও পরবর্তিতে তাঁকে ‘দস্যু বনহুর’ রুপে গড়ে তোলেন। গরীবের বন্ধু ও চোরাকারবারীদের চিরশত্রু দস্যু বনহুর যেমন গরীবের কাছে ছিলেন সম্মানিত, তেমনি চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীদের কাছে ছিলেন যমদূতের মত। এই সিরিজের স্লোগান হচ্ছে ‘সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর’।

    দস্যু বনহুরের সহায়ক চরিত্র হিসেবে রয়েছে রহমান ও কায়েস, তারা একাধারে বনহুরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিল— একজন জঙ্গলে অন্যজন শহরে; শহুরে স্ত্রীর নাম মনিরা ও অপরজনের নাম নূরী। মনিরার গর্ভে দস্যু বনহুরে বড় ছেলে ‘নুরুজ্জামান নূর’ এর জন্ম, যে পরবর্তীতে দেশের সৎ ও সাহসী ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। নূরীর গর্ভে ‘জাভেদ’ নামে তার একটি ছেলের জন্ম হয়, যে পিতার মতই দস্যুতা করতে ভালবাসে।

  • সৈনিক বেশে দস্যু বনহুর

    সৈনিক বেশে দস্যু বনহুর

    ‘সৈনিক বেশে দস্যু বনহুর’— এটি ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের তৃতীয় গ্রন্থ। ‘দস্যু বনহুর’ বাংলাদেশী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘রোমেনা আফাজ’ সৃষ্ট একটি কথাচরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি লিখেছেন ১৩৮টি কাহিনী, যা সামগ্রিকভাবে ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাসের নামও ‘দস্যু বনহুর’। ছোটবেলা নৌদূর্ঘটনায় চৌধুরী বাড়ীর ছেলে মনির হারিয়ে যায়, দস্যু সর্দার কালু খাঁ তাঁকে কুঁড়িয়ে পান ও পরবর্তিতে তাঁকে ‘দস্যু বনহুর’ রূপে গড়ে তোলেন। গরীবের বন্ধু ও চোরাকারবারীদের চিরশত্রু দস্যু বনহুর যেমন গরীবের কাছে ছিলেন সম্মানিত, তেমনি চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীদের কাছে ছিলেন যমদূতের মত। এই সিরিজের স্লোগান হচ্ছে ‘সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর’।

    দস্যু বনহুরের সহায়ক চরিত্র হিসেবে রয়েছে রহমান ও কায়েস, তারা একাধারে বনহুরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তার দু’জন স্ত্রী ছিল— একজন জঙ্গলে অন্যজন শহরে; শহুরে স্ত্রীর নাম মনিরা ও অপরজনের নাম নূরী। মনিরার গর্ভে দস্যু বনহুরে বড় ছেলে ‘নুরুজ্জামান নূর’ এর জন্ম, যে পরবর্তীতে দেশের সৎ ও সাহসী ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। নূরীর গর্ভে ‘জাভেদ’ নামে তার একটি ছেলের জন্ম হয়, যে পিতার মতই দস্যুতা করতে ভালবাসে।

  • নাথুরামের কবলে মনিরা

    নাথুরামের কবলে মনিরা

    রহস্য ধাঁচের গল্প নিয়ে রচিত “নাথুরামের কবলে মনিরা” বইটি, গল্প-চরিত্রের নানা দিক দস্যু বনহুর সিরিজ এই বইটির মাধ্যমে খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি পড়ার সময় অনেক অনেক ভাল লাগা অনুভব করছিলাম। অন্তত এই সিরিজের প্রথম বইগুলোর চেয়ে এই বইটির বর্ণনা, সংলাপ ইত্যাদি অনেক ভাল হয়েছে। বইটি আমার ভাল লেগেছে, আপনারা যারা দস্যু বনহুর সিরিজের “নাথুরামের কবলে মনিরা” বইটি পড়বেন বলে ভাবছে তাদের বলব, তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলুন, আমার বিশ্বাস আপনারও আমার মতই ভাল লাগবে!

  • গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    ‘গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র প্রথম উপন্যাস। এটি লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের মে মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় অক্টোবর ১৯৯৭ সালে এবং তৃতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের বইমেলায়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    উপন্যাসটি রচিত হয়েছে টানা, প্রায় এক হাজার অনুচ্ছেদে। অনলাইনে একসাথে এত দীর্ঘ লেখা পড়ে পাঠক ক্লান্তিবোধ করবেন, তাই আমরা বইটিকে কয়েকটি অনুচ্ছদে বিভক্ত করে প্রকাশ করেছি। অবশ্যই লক্ষ্য রাখা হয়েছে যাতে কোন পরিচ্ছেদে কাহিনী বর্ণনার ছেদ না পড়ে।

    গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    জাদুল আসাদির তাঁবুতে বিশ্রাম নিচ্ছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। শিরস্ত্রাণ খোলেননি। তাঁবুর বাইরে সশস্ত্র দেহরক্ষীরা পাহারা দিচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য রক্ষীবাহিনীর কমাণ্ডার একটু অন্যদিকে গেলেন। একজন গার্ড পর্দা ঈষৎ ফাঁক করে উঁকি দিল তাবুর ভেতর। দু’চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন সুলতান। গার্ড বাইরে দাঁড়ানো চারজন সঙ্গীর দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ করে খুলল একবার। সে চারজন দেহরক্ষী অন্যদের সাথে গল্প জুড়ে দিল।

    তাঁবুতে ঢুকল প্রথম রক্ষী। খঞ্জর হাতে নিল। বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে গেল ঘুমন্ত সুলতানের দিকে। খঞ্জর বাগিয়ে ধরে হাত উপরে তুলল। সালাহুদ্দীনের বুক লক্ষ্য করে যখন নেমে আসছিল হাত, ঠিক সে মুহূর্তে পাশ ফিরলেন তিনি। রক্ষীর আঘাত গিয়ে পড়ল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর শিরস্ত্রাণে।

    বিদ্যুৎ গতিতে দাঁড়িয়ে গেলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। নিমিষেই ঘটনা আঁচ করে নিলেন। নিজের বাছাই করা দেহরক্ষী আক্রমণ করছে দেখেও হতবাক হলেন না।

    রক্ষী শিরস্ত্রাণের পাশ কেটে মাটিতে গেঁথে যাওয়া খঞ্জর টেনে তুলছিল। পলকে পূর্ণ শক্তিতে রক্ষীর মুখে ঘুসি মারলেন সালাহুদ্দীন। মট করে হাড় ভাঙ্গার শব্দ হল। বিকট শব্দ করে চিৎ হয়ে পরে গেল রক্ষী।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবী রক্ষীর হাত থেকে ছিটকে পড়া খঞ্জর নিজের হাতে তুলে নিলেন। চিৎকার শুনে বাইরে থেকে ছুটে এল দু’জন রক্ষী।

    ‘ওকে বেঁধে ফেল।’ নির্দেশ দিলেন সুলতান।

    কিন্তু ওরা সুলতানের আদেশ অমান্য করে উল্টো তাঁকেই আক্রমণ করে বসল। একা খঞ্জর দিয়ে দুই রক্ষীর তলোয়ারের মোকাবেলা করতে লাগলেন সালাহুদ্দীন। তাঁবুর ভেতর শুরু হলো অসম এক লোমহর্ষক লড়াই।

    দু’এক মিনিটের মধ্যেই অন্য গার্ডরাও ভেতরে প্রবেশ করল। অবাক বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তারা তাকিয়ে রইল সালাহুদ্দীন ও রক্ষীদের অসম লড়াইয়ের দিকে। সম্বিত ফিরে এলে একজন এগিয়ে এসে আঘাত করল রক্ষীদের। দেখাদেখি অন্য রক্ষীরাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবার রক্ষীরা দুই দল হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করল। আপন পর পার্থক্য করতে না পেরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী।

    সংঘর্ষ থেমে গেল। দু’জন নিহত হল এই সংঘর্ষে। আহত হল কয়েকজন, পালিয়ে গেল একজন। তদন্ত শেষে দেখা গেল দেহরক্ষীদের সাতজন ছিল ঘাতক দলের সদস্য। গুমাস্তিগীন নামে খলিফা সালেহের এক কেল্লাধিপতি সালাহুদ্দীনকে হত্যার জন্য এদের নিয়োগ করেছিল।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে হত্যা করার এ ধরনের কয়েকটি প্রচেষ্টা পরপর ব্যর্থ হল। এ হত্যা পরিকল্পনার হোতা ছিল সাইফুদ্দীন। সাইফুদ্দীন ছিল সালাহুদ্দীনের চাচাতো ভাই খলিফা আস-সালেহের একজন আমীর। যে সময়ের কথা বলছি, তখন মুসলিম বিশ্বের প্রধান হলেও কার্যত ইসলামী দুনিয়া ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত। বিভিন্ন প্রদেশের গভর্ণরগণ সুলতান উপাধি ধারণ করে বলতে গেলে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। এ ঘটনার পর একদিন ভোরে সাইফুদ্দীনকে লক্ষ্য করে একটি চিঠি পাঠালেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। তাতে তিনি লিখলেন, “খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জানো না সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা।’

    চিঠিটি লিখেছিলেন তিনি ১১৭৫ সালের এপ্রিল মাসে। খলিফা সালেহ এবং সাইফুদ্দীন খৃষ্টানদের সহযোগিতায় সালাহুদ্দীনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। পরাজিত হয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেল সাইফুদ্দীন। তার তাঁবুতে পাওয়া গেল অগণিত সম্পদ। পাওয়া গেল খাঁচায় বন্ধী রঙবেরঙের পাখি, এক ঝাঁক সুন্দরী তরুণী, নর্তকী, গায়িকা। বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্র আর পিপা ভর্তি মদ।

    সালাহুদ্দীন খাঁচায় দুয়ার খুলে দিলেন, পাখীরা উড়ে গেল উন্মুক্ত আকাশে। নর্তকী, গাায়িকা আর তরুণীদের মুক্ত করে দিলেন। চিঠি লিখলেন আমীর সাইফুদ্দীনের কাছে, ‘তোমরা বেঈমানী করে খৃষ্টানদের সহযোগিতায় আমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছ। একবারও কি ভেবেছ, তোমাদের এ ষড়যন্ত্র ইসলামী বিশ্বের মানচিত্র মুছে দিতে পারে? যদি আমাকেই ঈর্ষা কর, যদি আমিই তোমাদের শত্রু হয়ে থাকি, মেরে ফেল আমায়। দু’বার সে চেষ্টাও করেছ। সফল হওনি, আবার না হয় চেষ্টা করে দেখ। এবার সফল হলে হতেও পার।

    ‘যদি নিশ্চয়তা দিতে পারো, আমাকে হত্যা করলে ইসলাম আরো গৌরবোজ্জ্বল হবে, তবে আমার মাথা কেটে তোমাদের পায়ের কাছে রেখে দিতে বলব। মনে রেখো, অমুসলিম কখনো মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না। ইতিহাস এর সাক্ষী। ফ্রান্স সম্রাট এবং রিমাণ্ডের মতো খৃষ্টানকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সহযোগিতা করছ বলে তোমরা ওদের বন্ধু। ওরা সফল হলে ওদের প্রথম শিকার হবে তোমরাই। এরপর পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের নামও মুছে যাবে।

    ‘তোমরা যোদ্ধা জাতির সন্তান। সৈন্য হওয়া তোমাদের জাতীয় পেশা। প্রতিটি মুসলমানই আল্লাহর সৈনিক। তার জন্য শর্ত কেবল ঈমান ও সৎকাজ। খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জানো না সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা। অনুরোধ করি, আমার সাথে সহযোগিতা কর। জিহাদে শরীক হও,  না হলে কমপক্ষে বিরোধীতা কোরো না। আমি তোমাদের কোন শাস্তি দেব না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।’

    —সালাহুদ্দীন আইয়ূবী।

    এ সব যুদ্ধের ফলে অজস্র যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে এসেছিল। বন্দীর সংখ্যা ছিল অগণিত। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে তিন ভাগে ভাগ করলেন। এক ভাগ যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে তাদের মুক্ত করে দিলেন। এক ভাগ দিলেন সৈন্য এবং গরীবদের। তৃতীয় ভাগ পাঠিয়ে দিলেন নিজামুল মুল্‌ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই তিনি শিক্ষা লাভ করেছিলেন। নিজের জন্য এবং জেনারেলদের জন্য কিছুই রাখেননি। বন্দীদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। কিছু অমুসলিমও ছিল, সালাহুদ্দীনের মহানুভবতায় ওরা তার আনুগত্য গ্রহণ করে সোবাহিনীতে ভর্তি হয়ে গেল।

    ইবনে সাবার ফেদাই গ্রুপ দু’বার সালাহুদ্দীনকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করেছিল। ফেদাইদেরকে ঐতিহাসিকগণ  ঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দু’-দু’বারই তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। তৃতীয় আক্রমণ হল খৃষ্টান এবং সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করার পর। সাইফুদ্দীন পালিয়ে গুপ্তঘাতক দলের সাহায্য কামনা করল।

    সালাহুদ্দীনের প্রায় একশো বছর আগে হাসান ইবনে সাবা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন উপদলের জন্ম দিয়েছিল। নিজেদের পরিচয় দিত মুসলমান হিসেবে। কিছু অলৌকিক কাজ দেখিয়ে মানুষকে অনুসারী বানাতো। সুন্দরী তরুণী, মদ, হিপটোনিজম এবং চাটুকারিতা ছিল ওদের পুঁজি। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ছিল বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ঘাতক দল। ওরা মানুষকে হত্যা করত গোপনে।

    এরা ছিল সতর্ক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং দুঃসাহসী। এরা পোশাক আশাক এবং ভাষা পরিবর্তন করে বড় বড় জেনারেলের দেহরক্ষীর চাকরী নিত। সময় সুযোগ বুঝে এমন ভাবে সারতো হত্যার কাজ, নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীকে কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যেত না। ধীরে ধীরে ইবনে সাবার দল ঘাতকদল হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে ওরা ছিল পারদর্শী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হত্যার কাজে ব্যবহার করত বিষ। সুন্দরী যুবতীরা মদের সাথে এ বিষ মিশিয়ে দিত।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে রূপসী নারী দিয়ে বা মদ খাইয়ে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। তিনি এ দুটো থেকেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেন সতর্কভাবে। ফলে আকস্মিক আক্রমণ ছাড়া তাঁকে হত্যা করার অন্য কোন পথ ছিল না। কিন্তু বিশ্বস্ত ও নিবেদিত প্রাণ দেহরক্ষীদের উপস্থিতিতে তাও ছিল অসম্ভব। সালাহুদ্দীন ভেবেছিলেন পরাজয়ের পর সালেহ এবং সাইফুদ্দীন আর মাথা তুলে দাঁড়াবে না। সম্মিলিত বাহিনীর অহমিকা চুর্ণ হবার পর সালাহুদ্দীনের সাথে টক্কর দেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সংশোধন হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল ওরা।

    বিজয়ের পর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তাঁর অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখলেন। দখল করলেন গাজাসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী— দুঃসাহসী এক যোদ্ধা, অসাধারণ এক সেনাপতি। ইসলামের শত্রুরা আজও তাকে সম্বোধন করে ‘গ্রেট সালাদীন’ বলে, মুসলমানরা স্মরণ করে জাতীয় বীর হিসাবে।

    মুসলিম মিল্লাতের ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লেখা রয়েছে তাঁর নাম। খৃষ্টান জগৎ তাঁর সাহস, বুদ্ধিমত্তা আর রণকৌশলের কথা কোনদিন ভুলতে পারবে না। ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে তাঁর জয় পরাজয়ের বিস্ময়কর কাহিনী। কিন্তু ক্রুশের ধ্বজাধারীরা মদ আর রূপের মায়াজালে যে ষড়যন্ত্রের বিস্তার ঘটিয়েছিল, নিজেদের সে সব অপকর্মের চমকপ্রদ কাহিনী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি।

    ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। মিসরের গভর্ণর এবং সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলেন সালাহুদ্দীন। তিনি ছিলেন রাজপরিবারের সন্তান। অল্প বয়সেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মনে করতেন শাসক রাজা নয়, শাসক হলো ইসলামের রক্ষক। বুদ্ধি হওয়ার পর তিনি দেখেছিলেন মুসলিম শাসকদের অনৈক্য। বিলাসপ্রিয় শাসকবর্গ সুন্দরী রমণী আর মদে আকণ্ঠ ডুবেছিল। গাদ্দারী, বিলাসিতা আর অবিশ্বাসের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যৎ।

    রাষ্ট্রের কর্ণধারদের হারেমের শোভা বর্ধন করছিল ইহুদী আর খৃষ্টান যুবতীরা। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব সুন্দরী রমনীদের রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল মানুষের ইসলামী জোশ আর স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বার আবেগ অনুভূতি।

    এ সুযোগে খৃষ্টান শাসকগণ একের পর এক ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো দখল করে নিচ্ছিল। মুসলিম শাসকবর্গ প্রজার রক্ত শুষে খৃষ্টানদেরকে বাৎসরিক কর প্রদান করত। ওদের সেনা শক্তির ভয়ে সর্বক্ষণ তটস্ত হয়ে থাকত। খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে ভোগবিলাসের হারেমে বন্দী রেখে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব দখলের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছিল।

    সালাহুদ্দীন শিক্ষা লাভ করেছিলেন নিজাম-উল-মুলক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে শিক্ষার্থীদেরকে খালেছ ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলার ব্যবস্থা ছিল। আর সে জন্যই ঘাতকদলের প্রথম শিকার ছিলেন নিজাম-উল-মুলক। রোমানদের রাজ্যবিস্তারে তিনি ছিলেন বড় বাঁধা। এ বাঁধা দূর করার জন্য তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

    সালাহুদ্দীন এখানেই সেনা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। প্রশাসনিক কাজে তাঁকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন নুরুদ্দীন জঙ্গী। মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার সকল গুণাবলী এখানেই অর্জন করেছিলেন তিনি। সালাহুদ্দীন আইয়ূবী গোয়েন্দা বৃত্তি, কমাণ্ডো অভিযান এবং গেরিলা অপারেশনকে সবচে’ বেশী গুরুত্ব দিতেন। তিনি দেখেছিলেন গুপ্তচর বৃত্তিতে খৃষ্টান জগৎ অনেক অগ্রসর। মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা আর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। সালাহুদ্দীন অত্যন্ত ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে এর মোকাবিলা করেছিলেন।

    তিনি মিসরের গভর্ণর ও সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলে শুরু হল ষড়যন্ত্র। বড় বড় জেনারেলরা এ পদের জন্য ছিল লালায়িত। তাঁরা যখন দেখল তাঁদের আশায় গুড়ে বালি, তখন ক্ষুব্ধ জেনারেলগণ ষড়যন্ত্র শুরু করল তাঁর বিরুদ্ধে।

    ওদের ধারণায় সালাহুদ্দীন একজন বালকমাত্র। এ পদের যোগ্যতা তাঁর মধ্যে নেই। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে জেনারেলদের সে ধারণা ভেঙে গেল। সালাহুদ্দীন কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। সৈন্যদের জন্য ভোগবিলাস এবং মদ নিষিদ্ধ করলেন। মনোনিবেশ করলেন ওদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে। ফলে অল্প দিনেই সেনাবাহিনী সুশৃংখল ও সুসংগঠিত হয়ে উঠল। অল্পবয়স্ক অর্বাচীন বালক বলে তাঁকে যারা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখছিল, টনক নড়ে উঠল তাদের।

    সালাহুদ্দীন খৃষ্টান শক্তির মোকাবিলার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। মুক্ত ফিলিস্তিনে শ্বাস নেয়ার দুর্মর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনীকে সে ভাবে গড়ে তুলতে লাগলেন তিনি। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘যে খোদা আমাকে মিসরের গভর্ণর করেছেন, অবশ্যই তিনি ফিলিস্তিনও মুক্ত করবেন।’ তাঁর এ ঘোষণার জন্য কেবল খৃষ্টানই নয়, খৃষ্টানপন্থী মুসলমান আমীর ওমরারাও তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়াল। বাইরের শত্রুর চাইতে ঘরের শত্রুরা হয়ে উঠল তাঁর জন্য অধিকতর বিপজ্জনক।

    নতুন গভর্ণরের অভ্যর্থনার আয়োজন করা হল। আয়োজন করলেন জেনারেল নাজি। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক তিনি। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী ছাড়াও বেসামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত। মুচকি হেসে একে একে সকলের সাথে করমর্দন করলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। কণ্ঠে স্নেহ-ভালবাসার উষ্ণ পরশ। কোন কোন অফিসারের ঠোঁটে কুটিল হাসি। দৃষ্টিতে ঘৃণা আর উপহাস। ওদের ধারণা, নুরুদ্দীন জঙ্গীর সাথে সুসম্পর্ক এবং রাজপরিবারের সন্তান বলেই সালাহুদ্দীন গভর্ণর হতে পেরেছেন। এক প্রবীণ অফিসার আরেকজনের কানে কানে বলল, ‘এখনো শিশু, আমরা পেলে পুষে নেব।’

    অনুষ্ঠানে তাঁকে শিশুই মনে হচ্ছিল। জেনারেল নাজির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন সালাহুদ্দীন। কপাল কুঞ্চিত হল ঈষৎ। করমর্দনের জন্য হাত প্রসারিত করলেন। নাজি তোষামুদে দরবারীদের মত সালাহুদ্দীনকে কুর্নিশ করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমো খেয়ে বললেন, ‘আপনার জীবন রক্ষার্থে আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও বিলিয়ে দেব। আপনি আমাদের কাছে মাননীয় জঙ্গীর আমানত।’

    ‘ইসলামের চাইতে আমার জীবনের দাম বেশী নয় সম্মানিত জেনারেল।’ সালাহুদ্দীন বললেন, ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্ত সংরক্ষণ করে রাখুন। খৃষ্টান ষড়যন্ত্রের ঘণঘটা মুসলিম বিশ্বের আকাশে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।’

    জবাবে মৃদু হাসলেন নাজি। যেন তাঁকে রূপ কথার গল্প শোননো হচ্ছে। নাজি ছিল ফাতেমী খেলাফতের সিপাহসালার। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক। সৈন্যদের সবাই ছিল সুদানের অধিবাসী। তাঁর বাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত। বলতে গেলে এরা ছিল নাজির ব্যক্তিগত সৈন্য। নাজি ছিল মুকুটহীন সম্রাট।

    তখন মুসলিম দেশগুলোর কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করছিল খৃষ্টান জগৎ। মিসর এবং আশপাশের শাসকদের জন্য নাজি ছিল এক ত্রাস। তাঁর মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রভূমি। ভেড়া দেখলে নেকড়ের যেমন দাঁত বেরিয়ে আসে, সালাহুদ্দীনকে দেখে নাজিরও তেমনি দাঁত বেরিয়ে এসেছিল। সালাহুদ্দীন তাঁর এ ক্রুর হাসির মর্ম না বুঝলেও এটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, এ শক্তিধর জেনারেলকে তাঁর প্রয়োজন।

    ‘হুজুর অনেক দূর থেকে এসেছেন। খানিক বিশ্রাম করে নিন।’ নাজি বলল।

    ‘যে কঠিন দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে, আমি তার যোগ্য নই। এ দায়িত্বভার আমার বিশ্রাম এবং নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে। প্রথমে অফিসে গেলেই কি ভাল হয় না?’

    ‘হুজুর কি আগে খেয়ে নেবেন?’ বলল একজন অফিসার।

    একটু ভেবে ওদের সাথে হাঁটা দিলেন সালাহুদ্দীন। দু’সারিতে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র গার্ডবাহিনী। ওদের হাতের অস্ত্র এবং পেশীবহুল বলিষ্ঠ দেহ দেখে তাঁর চেহারায় হেসে উঠল আনন্দের দ্যুতি। দরজার কাছে পৌঁছতেই চেহারায় এ আলো হঠাৎ নিভে গেল। তার বদলে হতাশার আঁধার এসে গ্রাস করল তাঁকে।

    দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন রূপসী তরুণী। তাদের পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে রেশম কোমল চুল। পরনে পাতলা পোশাক। হাতে ফুলের ঝুড়ি। সালাহুদ্দীনের পথে ওরা ফুল ছুঁড়তে লাগল। সাথে সাথে বেজে উঠল দফ ও রবাবের সুর ঝঙ্কার।

    থমকে দাঁড়ালেন সালাহুদ্দীন। ডানে বাঁয়ে নাজি এবং তাঁর সহকারীরা। ভারতীয় রাজরাজড়াদের মত ওরা নুয়ে তাঁকে সামনে চলার জন্য অনুরোধ করল।

    ‘সালাহুদ্দীন ফুল মাড়ানোর জন্য আসেনি।’ গমগম করে উঠল সালাহুদ্দীনের কণ্ঠ। ঠোঁটে শ্লেষের হাসি। যে হাসি দেখতে ওরা অভ্যস্ত নয়।

    ‘হুজুর চাইলে আমরা আকাশের তারা এনে দিতে পারি’ নাজি বলল।

    ‘আমাকে খুশী করতে হলে একটা জিনিসই আমার পথে ছড়ানো যেতে পারে।’

    ‘আদেশ করুন।’ মুখ খুলল নাজি’র সহকারী, ‘কোন জিনিস আপনাকে তুষ্ট করতে পারবে।’

    ‘খৃষ্টানদের লাশ।’ মৃদু হেসে বললেন সালাহুদ্দীন।

    ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল অফিসারের।

    মুহূর্তে বদলে গেল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর চেহারা। দু’ চোখ থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল আগুনের হল্‌কা। বললেন, ‘মুসলমানদের জীবন ফুলশয্যা নয়। আপনারা কি জানেন না খৃষ্টানরা মুসলিম বিশ্বকে ইঁদুরের মত কেটে টুকরো টুকরো করে চলছে?’

    তাঁর গম্ভীর কণ্ঠের ধ্বনি বদলে দিল ঘরের পরিবেশ। প্রতিটি শব্দ থেকে বিস্ফোরিত হচ্ছিল প্রচণ্ড ক্রোধ। ‘আমাদের মেয়েদের উলঙ্গ করে ওদের ইজ্জত পদদলিত করেছি বলেই আজ আমরা ফুল মাড়াতে পারছি। শুনুন, আমার দৃষ্টি আটকে আছে ফিলিস্তিনে। আপনারা কি আমার পথে ফুল বিছিয়ে মিশর থেকে ইসলামকে বিদায় করতে চাইছেন?’

    তিনি চারদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমার পথ থেকে ফুল সরিয়ে নাও। এ ফুলে পা পড়লে আমার হৃদয় কাঁটার ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। সরিয়ে দাও মেয়েদের। আমি চাই না ওদের সোনালী চুলে জড়িয়ে গিয়ে আমার তরবারী গতি হারিয়ে ফেলুক।’

    ‘হুজুরের ইজ্জত সম্মান……।’

    ‘আমাকে আর কখনো হুজুর বলবে না।’ ঝাঁঝের সাথে বললেন তিনি। মনে হল শব্দের তীব্র আঘাতে ওদের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেয়া হয়েছে। ‘তোমরা যার কালেমা পড়েছ হুজুর তো তিনি। আমি তাঁর দাসানুদাস মাত্র। সে হুজুরের জন্য আমার জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে চাই। তাঁর পয়গাম আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি। খৃষ্টান জগৎ ওই পয়গাম ছিনিয়ে নিয়ে রোম উপসাগরে ডুবিয়ে দিতে চাইছে। ডুবিয়ে দিতে চাইছে মদের দরিয়ায়। আমি বাদশা হয়ে এখানে আসিনি।’

    নাজির চোখের ইশারায় মেয়েরা ফুল কুড়িয়ে দরজা থেকে সরে গেল। দ্রুতপায়ে ভেতরে ঢুকলেন সালাহুদ্দীন। প্রশস্ত কক্ষ। ফুল দিয়ে সাজানো বিশাল টেবিল। টেবিলে নানা রকম সুস্বাদু খাবার।

    খাবারে দৃষ্টি বুলিয়ে তিনি তাকালেন সহকারী সালারের দিকে।

    ‘মিসরের সব মানুষ কি এমন খাবার খেতে পারে?’

    ‘না হুজুর’। সহকারীর জবাব, ‘গরীবরা তো এসব খাবার স্বপ্নেও দেখে না।’

    ‘তোমরা কোন্ সমাজের লোক? যারা এমন খাবার স্বপ্নেও দেখে না ওরা কি তোমাদের চেয়ে ভিন্ন জাতি?’

    সকলেই নির্বাক।

    ‘এখানে যত চাকর-বাকর এবং ডিউটিরত সেপাই রয়েছে সবাইকে ডেকে নিয়ে এসো। এ খাবার ওরা খাবে।’

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবী একটা রুটির সাথে ক’টুকরা তরকারী তুলে তড়িঘড়ি খাওয়া শেষ করলেন। এরপর নাজিকে সাথে নিয়ে হাঁটা দিলেন গভর্ণর হাউসের দিকে।

    দু’ঘন্টা পর। গভর্ণর হাউস থেকে বেরিয়ে এল নাজি। দ্রুত এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। এক লাফে ঘোড়ায় চড়ে দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল।

    রাত নেমেছে। নাজি খাস কামরায় কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুকে নিয়ে মদের আসর বসিয়েছে। নাজি বলল, ‘যৌবনের তেজ কয়েক দিনের মধ্যেই ঠাণ্ডা করে দেব। কমবখ্‌ৎ বলল কি জান? বলল, কাবার প্রভুর শপথ! মুসলিম বিশ্ব থেকে খৃষ্টানদের বিতাড়িত করে তবে আমি বিশ্রাম নেব।’

    ‘সালাহুদ্দীন আইয়ূবী? হুহ্!’ সহকারী সালারের কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর। ‘ইসলামী রাষ্ট্রের দম ফুরিয়ে গেছে সে এ খবরও জানে না। এখন তো সুদানীরা দেশ চালাবে।’

    অন্য এক কমাণ্ডার প্রশ্ন করল, ‘পঞ্চাশ হাজার ফৌজের সবাই সুদানী একথা তাঁকে বলেননি। বলেননি যে ওরা আপনার নির্দেশে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না?’

    ‘তোমার কি মাথা খারাপ এডরোস? আমি বরং তাঁকে নিশ্চয়তা দিয়েছি। বলেছি আপনারা ইশারা পেলে আমার সৈন্যরা খৃষ্টানদের ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু…’

    থেমে গেল নাজি।

    ‘কিন্তু কি?’

    ‘মিসরের লোকদেরকে ফৌজে ভর্তি করার জন্য সে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ ফৌজ এক এলাকার থাকা নাকি উচিৎ নয়। সে মিসরের লোকদেরকে আমার সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে।’

    ‘আপনি কি বললেন?’

    ‘বলেছি আপনার নির্দেশ পালন করা হবে। কিন্তু আমি তা করব না।’

    ‘তার মনমানসিকতা কেমন বুঝলেন?’

    ‘একরোখা জেদী।’

    ‘আপনার বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার সামনে সে এখনো শিশু। নতুন গভর্ণর হয়ে এলো তো! কদিন পরই পদের নেশায় পেয়ে বসবে।’

    ‘আমি তাঁর এ নেশা দূর করবো না। নেশায় নেশায় তাকে নিঃশেষ করব।’

    ওরা অনেকক্ষণ ধরে সালাহুদ্দীনকে নিয়ে কথা বলল। নতুন গভর্ণর এই মুকুটহীন সম্রাটের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে কি পদক্ষেপ নেয় হবে তাও আলোচিত হল।

    অন্যদিকে সালাহুদ্দীন তাঁর সহকারীদের বলছিলেন, ‘আমি এখানে রাজা হয়ে আসিনি। কাউকে রাজত্ব করতেও দেবো না।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমাদের সামরিক শক্তির প্রয়োজন। এখানকার সেনাবাহিনীর গঠন পদ্ধতি আমার পছন্দ নয়। পঞ্চাশ হাজর ফৌজের সবাই সুদানী। অথচ সব এলাকার লোকেরই সৈন্য হবার অধিকার আছে। এভাবে ওদের জীবনের মানও উন্নত হতে পারে। সব এলাকা থেকে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার জন্য আমি নাজিকে বলে দিয়েছি।’

    ‘নাজি কি আপনার নির্দেশ পালন করবে?’ একজন সহকারী প্রশ্ন করল।

    ‘কেন, সে কি আমার হুকুম অমান্য করবে নাকি?’

    ‘করতেও পারে। ফৌজের সর্বময় কর্তা তিনি। তিনি কারো নির্দেশ পালন করেন না, বরং অন্যকে তাঁর নির্দেশ পালনে বাধ্য করেন।’

    এ কথায় সালাহুদ্দীন একটু নীরব রইলেন। তবে তাঁর চেহারায় কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। তিনি কি ভাবছেন তা বুঝে উঠার আগেই আলী বিন সুফিয়ানকে রেখে অন্যদের বিদায় জানালেন তিনি।

    আলী মধ্য বয়সী এক চৌকস গোয়েন্দা লিডার। কুশলী, সাহসী এবং অসম্ভব বাকপটু। গুপ্তচর বৃত্তির জন্য সে বিশ্বস্ত ও নিবেদিতপ্রাণ কিছু লোককে ট্রেনিং দিয়ে পারদর্শী করে তুলেছে। তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব গোয়েন্দা দল। আকাশ থেকে তারকা ছিনিয়ে আনতে বললেও যারা পিছপা হবে না। চিন্তা চেতনার দিক থেকে সে ছিল আইয়ূবীর সমমনা। সালাউদ্দীন তাকে বাগদাদ থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন।

    ‘শুনলে আলী! এরা বলল, কারো হুকুম পালন করতে নয়, নাজি হুকুম দিতে অভ্যস্ত!’

    ‘শুনলাম তো। চিনতে ভুল না করলে বলব, লোকটি ধুরন্ধর ও বড় ধরনের ক্রিমিনাল। তার ব্যাপারে আগে থেকেও আমি কিছুটা জানি। জনগণের টাকায় লালিত সেনাবাহিনী এখন তার নিজস্ব ফৌজ। তার ষড়যন্ত্রের ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ‘সব এলাকার লোকই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার প্রয়োজন’ আপনার এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী এবং সঠিক হয়েছে। আমার তো আশংকা হচ্ছে সুদানী সৈন্যরা প্রয়োজনের সময় আপনার হুকুম অমান্য করে তারই অনুগত্য করবে। বলা যায় না, ফৌজের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি পরিবর্তন করে নাজিকে আপনার অপসারণও করতে হতে পারে।’

    ‘না, নাজির মত প্রভাবশালী ব্যক্তিকে এখনই বিরূপ করতে চাই না। এ মুহূর্তে তাঁকে অপসারণ করা ঠিক হবে না। নিজেদের রক্ত ঝরানোর জন্য আমি অস্ত্র হাতে নেইনি, আমাদের তরবারী শত্রুর জন্য। আমি আগে ভালবাসা দিয়ে তাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করব। তুমি বর্তমান সেনাবাহিনী আমাদের কদ্দুর কাজে আসবে তা-ই বোঝার চেষ্টা কর।’

    ‘আপনার ভালবাসা তাকে শুধরাতে পারবে বলে মনে হয় না’।

    সালাহুদ্দীন যা ভেবেছিলেন নাজি ততটা সহজ ছিল না। ভালবাসা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। তার সব প্রীতি এবং মমতা ছিল ক্ষমতার সাথে। ক্ষমতার প্রশ্নে সে ছিল অত্যন্ত কঠোর। মানুষ হিসাবে ছিল অসম্ভব ধূর্ত। ষড়যন্ত্র ছিল তার হাতিয়ার। কাউকে ফাঁসাতে চাইলে তার সাথে মোমের মত কোমল ব্যবহার করত। সালাহুদ্দীনের সাথে তার ব্যবহার ছিল অনুগত দাসানুদাসের মত। তার সামনে সে কখনো বসত না। সালাহুদ্দীনের প্রতিটি কথায় জি-হুজুরীর ভূমিকা পালন করত।

    নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে মিসরের সকল অঞ্চল থেকেই সেনা ভর্তি শুরু করে দিয়েছিল। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। সালাহুদ্দীনও তাকে একটু একটু পছন্দ করা শুরু করেছেন। নাজি তাকে আশ্বাস দিয়েছিল, সেনাবাহিনী আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়। ফৌজের পক্ষ থেকে নতুন গভর্ণরকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার প্রস্তাবও দিল সে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি তার এ আমন্ত্রণ মুলতবী রাখলেন।

    রাত নেমেছে। নিজের কক্ষে দু’জন কমাণ্ডার নিয়ে মদ পান করছিল নাজি। মৃদু লয়ে বাজছে সংগীতের সুর মুর্ছনা। তালে তালে নাচছে দু’জন নর্তকী। পায়ে নুপুর নেই। বে আব্রু দেহের ভাঁজে ভাঁজে মাদকতা। প্রহরী ভেতরে এসে নাজির কানে কানে কি যেন বলল।

    মদির আবেশে মত্ত নাজির আনন্দে বিঘ্ন ঘটাবার সাহস কারও ছিল না। কিন্তু এ আসর থেকে তাকে কোন্ সময় তুলে নেয়া যায় প্রহরী তা জানত।

    উঠে দাঁড়াল নাজি। প্রহরী তাকে একটি কক্ষে নিয়ে গেল। সুদানী পোশাক পরে একজন লোক বসে আছে। সাথে এক যুবতী।

    নাজিকে দেখে দু’জন উঠে দাঁড়াল। যুবতীর রূপ মাধুর্য দেখে নাজি খানিক হতভম্বের মত তাকিয়ে রইল। সে নারী শিকারী। শুধু ভোগের জন্যই নয়, বড় বড় অফিসারদের ব্লাকমেল অথবা তাদেরকে হাতে রাখবার জন্যও সুন্দরী যুবতীদের ব্যবহার করত নাজি। কসাই যেমন পশু দেখলে গোশত পরিমাণ করতে পারে, সেও প্রথম দেখাতেই বুঝত কাকে দিয়ে কোন কাজ করানো যাবে। নারী ব্যবসায়ীরা প্রায়শই তার কাছে মেয়ে নিয়ে আসত।

    বিক্রেতা যুবতীর ব্যাপারে বলল, ‘দারুণ স্মার্ট। নাচতে পারে, গাইতে পারে, মুখের মধুতে পাথরও গলিয়ে দিতে পারে।’

    নাজি ওর ইন্টারভিউ নিয়ে চমৎকৃত হল। ভাবল, একটু তৈরী করে নিলে যে কোন কাজেই ব্যবহার করা যাবে।

    দাম দস্তুর শেষে টাকা নিয়ে চলে গেল লোকটি। নাজি ওকে নিয়ে চলে এল জলসা ঘরে। নাচতে বলল তরুণীকে। দেহের বাড়তি কাপড় ফেলে দিয়ে দু’পাক ঘুরতেই হা হয়ে গেল তিন দর্শক। ফ্যাকাশে হয়ে গেল আগের দু’নর্তকীর চেহারা। নতুন মেয়েটার সামনে ওরা এখন মূল্যহীন বাসি ফুল।

    আসর ভেঙে দিল নাজি। নতুন মেয়েটাকে রেখে সকলকে বিদায় করে দিল।

    ‘নাম কি সুন্দরী?’

    ‘আমার নাম জুলি’।

    ‘তোমাকে যে দিয়ে গেল সে বলেছে, তুমি নাকি পাথর গলাতে পার। আমি তোমার সে যোগ্যতা যাচাই করতে চাই।’

    ‘কে সে পাথর?’

    ‘মিসরের নতুন গভর্ণর। যিনি একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কও।’

    ‘সালাহুদ্দীন আইয়ূবী?’

    ‘হ্যাঁ, যদি তাকে বশে আনতে পার তবে তার ওজন সমান সোনা তোমার পুরষ্কার।’

    ‘তিনি কি মদ পান করেন?’

    ‘না, মুসলমান শূকরকে যেমন ঘৃণা করে, সে মদ, নারী, নাচ, গান এবং ভোগবিলাসকে তেমনি ঘৃণা করে।’

    ‘শুনেছি আপনার কাছে এমন সব যুবতী রয়েছে যাদের দেহের যাদু নীল নদের স্রোতকেও রুদ্ধ করে দিতে পারে। ওরা কি ব্যর্থ?’

    ‘এখনও পরীক্ষা করে দেখিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এ কাজ করতে পারবে। সালাহুদ্দীনের বিশ্বাস এবং চরিত্র সম্পর্কে আমি তোমাকে বিস্তারিত বলব।’

    ‘তাকে কি বিষ খাওয়াতে হবে?’

    ‘এখন নয়। তার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। আমি চাই সে তোমার মত রূপসীর আঁচলে বাঁধা পড়ুক। এরপর তাকে আমার পাশে বসিয়ে মদ খাওয়াব। মারতে চাইলে তোমার প্রয়োজন নেই, ঘাতক দলকে দিয়ে সহজেই তা করানো যায়।’

    ‘তার মানে আপনি দুশমনি নয় বন্ধুত্ব চাইছেন?’

    জুকির বুদ্ধিমত্তায় নাজি কতক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

    ‘হ্যাঁ জুকি।’

    ওর রেশম কোমল চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল নাজি, ‘আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। এমন বন্ধুত্ব, যেন সে আমার কথায় উঠে এবং বসে। এর পর কি করতে হবে তা আমি জানি।’ থামল নাজি।

    একটু ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘একটা কথা তোমাকে বলা প্রয়োজন। সালাহুদ্দীনের হাতেও একটা চাল আছে। তোমার রূপ যৌবনের ওপর তার চাল বিজয়ী হলে তুমি বাঁচতে পারবে না। সালাহুদ্দীনও তোমায় বাঁচাতে পারবে না। তোমার জীবন আমার হাতে। এ জন্যই তোমার সাথে এত খোলামেলা কথা বলছি। নইলে আমার মত জেনারেল তোমার মত এক গনিকার সাথে এভাবে আলাপ করত না।’

    ‘অনাগত ভবিষ্যত বলে দেবে কে ধোঁকা দেয়। এবার বলুন তার কাছে আমি পৌঁছব কিভাবে?’

    ‘আমি তার সম্মানে এক সংবর্ধনার আয়োজন করতে যাচ্ছি। রাতে তার শয়ন কক্ষে তোমায় ঢুকিয়ে দেব।’

    ‘ঠিক আছে, এর পরের কাজ হবে আমার।’

  • সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান

    সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান

    ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র দ্বিতীয় উপন্যাস। ‘গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযানে’র মত এটিও লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের মে মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১২তে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    রূপের ফাঁদে

    কায়রো থেকে দু’মাইল দূরে এক বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের এক দিকে বালিয়াড়ি, ছোট ছোট পাহাড়। বাকি তিন দিকে দিগন্ত বিস্তৃত বালুর সমুদ্র।

    এ মাঠ আজ লাখ মানুষের পদভারে কম্পিত। উট, ঘোড়া আর গাধায় চড়ে এসেছে মানুষ। তবে বেশীর ভাগ এসেছে পায়ে হেঁটে। চার পাঁচ দিন থেকে জমা হচ্ছে দর্শক। ভিড়ের চাপে দলিত মথিত হচ্ছে কায়রোর বাজার। সরাইখানায় উপচে পড়া ভিড়।

    এরা এসেছে সরকারী ঘোষণা শুনে। এক হপ্তা পর অনুষ্ঠিত হবে সামরিক মহড়া। মিসরের সেনাবাহিনী ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজী, অসিখেলা সহ বিভিন্ন যুদ্ধের খেলা দেখাবে। অসামরিক লোকও এসব খেলায় অংশ নিতে পারবে।

    এতে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীনর দু’টো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, যারা মিসরের সেনাবাহিনীকে দুর্বল ভাবছে তাদের ভুল ধারণা দূর করা।

    পাঁচ-ছ’ দিন আগে থেকেই লোকজন আসছে। এতে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীন বেজায় খুশী। দর্শক এক লাখ হলে নতুন সেনা ভর্তি হবে পাঁচ হাজার।

    কিন্তু সরকারী এ ঘোষণায় আলী ছিলেন উদ্বিগ্ন।

    ‘মাননীয় সুলতান!’ বললেন তিনি ‘এক লাখ দর্শক হলে এর মধ্যে এক হাজার থাকবে শক্রর গুপ্তচর। মেয়েরা আসছে গ্রাম থেকে। এদের বেশীর ভাগ সুদানী। সুদানী মেয়েরা অত্যন্ত ফর্সা, খ্রিষ্টান মেয়েরা অনায়াসে এদের সাথে মিশে যেতে পারবে।’

    ‘তোমার সমস্যা আমি বুঝতে পারছি আলী। কিন্তু এ মহড়া কেন জরুরী তা তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ। তোমার সংস্থার তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দাও।’

    ‘আমি মেলার বিপক্ষে নই সুলতান। এটা যে খুবই প্রয়োজন তাও বুঝি। আপনাকে উৎকণ্ঠায় ফেলতে চাইনি, মেলা কি সমস্যা নিয়ে আসছে তাই শুধু বলতে চাইছি।’

    কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিনি পতিতালয়। এ সব পতিতালয় রাতভর খদ্দেরে পূর্ণ থাকে।

    শহরের বাইরেও কিছু তাঁবু টানানো হয়েছে। আমার ব্রাঞ্চের রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু তাঁবু রয়েছে ভাসমান পতিতাদের। সারারাত নাচগানের আসর জমজমাট থাকে ওসব তাঁবুতে। আগামীকাল মেলা, এর মধ্যে নর্তকীরা দর্শকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রচুর অর্থ।’

    ‘মেলা শেষ হয়ে গেলে এসব থাকবে না। এর ওপর আমি কোন বিধি নিষেধ আরোপ করতে চাই না। মিসরীদের নৈতিক চরিত্র উন্নত নয়। দীর্ঘ দিনের সাংস্কৃতিক আবহ দু’একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

    সেনাবাহিনীতে লোক বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য আমার প্রচুর দর্শক প্রয়োজন। তুমি জান আলী আমাদের অনেক সৈন্য প্রয়োজন। সামরিক এবং বেসামরিক অফিসারদের বৈঠকেও আমি এ দিকটা ব্যাখ্যা করেছি।’

    ‘মিটিংয়ে আপনি বড় বেশী খোলামেলা আলোচনা করেছেন। আপনাকে এ থেকে বিরত রাখতে পারিনি সুলতান। আমার গোয়েন্দা দৃষ্টি বলছে, এসব অফিসারদের অর্ধেক আপনার অনুগত নয়। আপনি জানেন, অনেকে আপনাকে সইতে পারছে না। কারো কারো আন্তরিকতা ও আনুগত্য রয়েছে সুদানীদের সাথে। আমি এদের পেছনে একজন করে টিকটিকি লাগিয়ে রেখেছি। ওরা নিয়মিত আমাকে খোঁজ খবর দিচ্ছে।’

    ‘কোন বিপজ্জনক তৎপরত কি ধরা পড়েছে?’

    ‘না, তবে পদমর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এরা রাতে সন্দেহজনক তাঁবু এবং মিনি পতিতালয় গুলোতে যাতায়াত করে। দু’জন তো দুটি নর্তকীকে বাঁদীতেই নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে আমার মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দু’টি পাল তোলা নৌকা, দশদিন আগে নৌকাগুলো রোম উপসাগরের পাড়ে দেখা গেছে।’

    ‘এ তে বিশেষ এমন কি রয়েছে?’

    ‘স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ওদের তৎপরতা রহস্যজনক। ওখানকার সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার পর দু’জন করে বিভিন্ন স্থানে পাহারা বসানো হয়েছে। খ্রিষ্টানরা যেন আকস্মিক আক্রমণ করতে না পারে এজন্য গোয়েন্দা বিভাগের কিছু লোক স্থানীয় বেদুঈন এবং জেলেদের পোশাকে ওখানে ঘোরাফিরা করছে। কিন্তু বিশাল সাগর সৈকতে নজর রাখার জন্য এদের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। বিশেষ করে যেখানে যেখানে সাগর থেকে চ্যানেল ভেতরে ঢুকেছে সে এলাকায় নজর রাখা ওদের পক্ষে সম্ভব নয়।

    দিন দশেক আগে একটা চ্যানেল থেকে দু’টো পাল তোলা নৌকাকে বেরোতে দেখা গেছে। হয়ত রাতে এসেছিল। দু’জন দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার ছুটে গিয়েও ওদের ধরতে পারেনি, নৌকা দু’টো তখন সাগরের বেশ ভেতরে চলে গেছে। ওগুলো জেলে নৌকা ছিল না। নিশ্চয়ই সাগরের ওপার থেকে এসেছিল।

    আমাদের সৈন্যরা পাহাড়ের ফাঁক ফোঁকড় এবং মরুভূমির বিশাল এলাকা খুঁজেও কিছুই পায়নি। নৌকায় কারা ছিল, কেন এসেছে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছি না। দিগন্ত বিস্তৃত বিশাল মরুভূমিতে ওদের খুঁজে বের করা কেবল কঠিন নয়, অসম্ভবও।’

    আলী আরও বলল, ‘দেড়মাস থেকে মেলার সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। এ খবর ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছা বিচিত্র নয়। সংবাদ পেলে ওদের গোয়েন্দারা আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কায়রোতে মেয়ে কেনা বেচা শুরু হয়েছে। ক্রেতারা সাধারণ নাগরিক নয়। ব্যবসায়ী, প্রশাসক এবং সেনাবাহিনীর পদস্থ ব্যক্তি ও পতিতাদের দালালরা এসব মেয়েদের কিনছে। এদের মধ্যে খ্রিষ্টান মেয়েও থাকতে পারে, শুধু পারে না, আমি মনে করি অবশ্যই আছে।’

    এসব সংবাদে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীন উৎকষ্ঠিত হলেন না।

    রোম উপসাগরের পাড়ে খ্রিষ্টানশক্তি পরাজিত হয়েছে বছর খানেক আগে। ওখানে এখন কোন ছাউনিও নেই। আলী বিন সুফিয়া কিছু গোয়েন্দা নিয়োগ করলেও ওরা তেমন শক্তিশালী নয়। সংবাদ এসেছে খ্রিষ্টান গুপ্তচরে ছেয়ে গেছে মিসর।

    মিসরের ব্যাপারে তাদের পরিকল্পনা এখনও জনা যায়নি। শোনা যায় বাগদাদ এবং দামেশকে ওদের তৎপরতা বেশী। বিশেষ করে সিরিয়ার মুসলিম আমীর-ওমরারা মদ আর বিলাসিতায় ডুবে যাচ্ছে।

    রোম উপসাগরের যুদ্ধের সময় নুরুদ্দীন জঙ্গী খ্রিষ্টান রাজ্য আক্রমণ করে ওদের সন্ধি করতে বাধ্য করেছিলেন। বন্দীদের মধ্যে রিনান্ট নামের একজন সেনাপতিও ছিল। ওরা মুসলমান বন্দীদের হত্যা করায় জঙ্গী ওদের ছাড়েননি।

    সুলতান জঙ্গী মুসলিম বিশ্বকে সফল নেতৃত্ব দিচ্ছেন সালাহুদ্দীনের এ বিশ্বাস ছিল। তবুও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী তৈরি করছিলেন। তিনি চাইছিলেন মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার সাথে সাথে আরবকে মুক্ত করতে। একই সময়ে আক্রমণ এবং মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট রাখার জন্য প্রচুর সৈন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেমত নতুন সেনা ভর্তি হচ্ছিল না।

    পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে তার বিরোধী শক্তি ছিল প্রবল, আনুগত্য ছিল যৎসামান্য। নূরুদ্দিন জঙ্গী কিছু সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। মিসরের একটি ফৌজ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো দেখেনি। সুলতান সালাহুদ্দীনকেও দেখেনি ওরা। এজন্যই মেলার আয়োজন।

    মেলার সময় অফিসার এবং কমান্ডারদের তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মেশার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন ওদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে। ‘ওদের বোঝাতে হবে আমরা সবাই এক। সবাই চাই আল্লাহ এবং রসূলের দ্বীনকে প্রসারিত করে এ ভূখন্ডকে খ্ৰীষ্টানদের আধিপত্য মুক্ত করতে।’

    মেলার আগের দিন আলী সালাহুদ্দীন আয়ুবীকে বললেন, ‘সুলতান, শক্রর গুপ্তচরদের আমি ভয় পাই। যেসব মুসলিম ভায়েরা বেঈমানদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে, তাদের নিয়ে আমি শঙ্কিত। এদের ঈমান দৃঢ় হলে চরদের সমগ্র বাহিনীও আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারত না। নবাগতা নর্তকীদের দিয়ে ওরা জাল ফেলছে। এরপরও আমার বাহিনী দিনরাত তৎপর রয়েছে।’

    ‘তোমার লোকদের বলো দুশমনের চরদের হত্যা না করে জীবিত গ্রেফতার করতে। ওরা শক্রর জন্য চোখ এবং কান কিন্তু আমাদের জন্য ভাষা। ওদের কাছ থেকে তুমি সব খবর সংগ্রহ করতে পারবে।’

    ○ ○ ○

    মেলার দিনের সূর্য হেসে উঠল পূর্বকাশে। বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠের তিন দিকে দর্শকদের উপচেপড়া ভীড়! পাহাড়ের দিক সংরক্ষিত ওদিকে কাউকে যেতে দেয়া হয়নি।

    বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। বন্যার উত্তাল সাগরের গর্জনের ন্যায় ভেসে এল অশ্বক্ষুরধ্বনি। ধুলোয় ভরে গেল আকাশ। দু’হাজারের ও বেশী ঘোড়া ছুটে আসছে তীব্র গতিতে।

    প্রথম ঘোড়া মাঠে প্রবেশ করল। আরোহী সালাহুদ্দীন আয়ুবী। তার দু’পাশে পতাকাবাহী। পেছনে অশ্বারোহী দল।

    ঘোড়ার পিঠ রঙীন চাদরে সুশোভিত। আরোহীদের হাতে বর্শা। কোমরে তরবারী। বর্শার মাথায় রঙীন কাপড়ের তৈরী ছোট ছোট ঝাণ্ডা। মাঠে প্রবেশ করেই গতি কমিয়ে দিলেন তিনি। দুলকি চালে এগুচ্ছে ঘোড়াগুলো। সওয়াররা বসে আছে মাথা উঁচিয়ে। টানটান বুক। চোখে মুখে দৃঢ়তা।

    নিস্তব্ধতা নেমে এল দর্শকদের মাঝে। অর্ধবৃত্তের মত দাঁড়িয়ে আছে দর্শক। পেছনের দর্শকরা ঘোড়ার পিঠে। তারও পেছনে উট। প্রতিটাতে দুতিন জন করে দর্শক।

    দাঁড়ানো দর্শকদের সামনে একখানে চাদোয়া টানানো, নীচে চেয়ার পাতা। ব্যবসায়ী, বড় বড় অফিসার এবং শহরের সন্মানিত ব্যক্তিরা বসেছেন ওখানে।

    প্রথম সারিতে বসে আছেন কায়রোর মসজিদ সমূহের ইমামগণ। এরা সকলেই সালাহুদ্দীনের শ্রদ্ধাভাজন। ধর্মীয় গুরু এবং আলেমদের তিনি বেশী ভালবাসেন। অনুমতি ছাড়া তাদের মজলিসে বসেন না।

    সালাহুদ্দীন আইয়ুবী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নির্দেশ দিয়েছিলেন সবার সাথে সুস্পর্ক গড়ে তুলতে।

    এ সচিবদেরই একজন খাদেমুদ্দীন আল বারক। আলী বিন সুফিয়ানের পর সুলতানের সবচে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনীর সকল গোপন পরিকল্পনা তিনি জানেন। যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং ম্যাপ থাকত তার কাছে।

    খাদেমুদ্দীন আল বারকের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দেহে আরবীয় সৌষ্ঠব। সপ্রতিভ, সুপুরুষ।

    মঞ্চে তার পাশে এসে বসল একটা মেয়ে। অপূর্ব সুন্দরী। যুবতীর সাথে এসেছে একজন পুরুষ। বয়স ষাটেরও বেশী। ধনাট্য ব্যবসায়ী মনে হচ্ছে তাকে।

    সামনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে যুবতী বার বার তাকাচ্ছে আল বারকের দিকে। কয়েকবারই মেয়েটার তাকানো লক্ষ্য করলেন আল বারক।

    যুবতী আবার তাকাল তার দিকে। চোখাচোখি হতেই সুন্দর করে হাসল মেয়েটা। এভাবে বেশ কবার চোখাচোখি হল তাদের, প্রতিবারই মিষ্টি মধুর হাসি উপহার পেল আল বারক। আবারও হাসতে যাবে, সাথে আসা বুড়োর দৃষ্টি পড়ল তার ওপর, সাথে সাথে ঠোঁট থেকে হাসি উবে গেল মেয়েটার।

    দর্শকদের সামনে দিয়ে পেরিয়ে গেল ঘোড়সওয়াররা। এগিয়ে আসছে উষ্ট্রারোহী বাহিনী।

    উটগুলোকে সাজানো হয়েছে রঙবেরঙের কাপড় দিয়ে। বাঁকানো ঘাড়ের শীর্ষে গর্বোদ্ধত মাথা। আরোহীদের হাতে দীর্ঘ বাটঅলা বল্লম। ফলার খানিক নীচে তিন ফিট চওড়া এবং দেড় ফিট লম্বা রঙিন কাপড় বাধা। উড়ছে বাতাসে। সওয়ারের কাঁধে ধনু। উটের পালানে বাধা রঙীন তুনীর। আরোহীদের দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। হাবভাবে রাজসিক ভাব।

    উটগুলো দেখতে দর্শকদের উটের মত হলেও ওগুলো যে সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত ওদের ছন্দোবদ্ধ গতি দেখলেই তা বোঝা যায়। চলনে এমন একটা রাজসিক ভাব, মনে হয় ভিনগ্রহ থেকে এসেছে।

    আল বারক আবার চাইল মেয়েটার দিকে। চোখে চোখ রাখল। মেয়েটার চোখ থেকে একই সাথে ঝরে পড়ছে আত্মনিবেদন, আকুতি আর নীরব আমন্ত্রণ।

    বিদ্যুৎ খেলে গেল আল বারকের শরীরে। যুবতীর ঠোঁটে ভেসে উঠল লাজনম্র হাসি। বুড়োর দিকে দৃষ্টি পড়তেই যুবতীর চোখে মুখে নেমে এল একরাশ ঘৃণা ও হতাশা।

    আল বারকের স্ত্রী চার সন্তানের জননী। এ মুহুর্তে স্ত্রীর কথা ভুলে গেলেন তিনি। তাকিয়ে রইলেন যুবতীর দিকে। বাতাসে উড়ছে সুন্দরীর রেশমী নেকাব। কখনও এসে পাশে বসা আল বারকের বুকে, মুখে লুটিয়ে পড়ছে।

    আল বারক আলতো হাতে সরিয়ে দিল সে কাপড়। লজ্জা জড়ানো কণ্ঠে ক্ষমা চাইল যুবতী।

    মৃদু হাসলেন তিনি। বললেন, ‘আরে না না, এতে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে?’

    উষ্ট্রারোহীদের পেছনে পদাতিক ফৌজ, তীরন্দাজ আর তলোয়ারবাজ। পরনে সামরিক পোশাক। অপলক চোখে তাকিয়ে রইল দর্শকরা। প্রতিটি সৈনিকই সুঠাম দেহী। চেহারায় আনন্দের দ্যুতি।

    গর্বোদ্ধত বুকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। দর্শকরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুলতান সালাহুদ্দীন তা-ই চাইছিলেন।

    সবশেষে এল সাজোয়া বাহিনী। প্রতিটি কামানের পেছনে একটা করে এক্কাগাড়ী। গাড়ীতে বড় বড় পাথর এবং বিভিন্ন সাইজের ভাঁড়। ভাঁড়ে দাহ্য পদার্থ।

    ধীরে ধীরে দর্শকদের সামনে দিয়ে এরাও পেরিয়ে গেল।

    দীর্ঘ চক্কর দিয়ে ফিরে এলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। সামনে পতাকাবাহী। ডানে, বায়ে এবং পেছনে গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা। তারও পেছনে সেনাপতিদের ঘোড়া।

    সুলতান ঘোড়া থামালেন। দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে সালাম দিয়ে লাফিয়ে নামলেন ঘোড়া থেকে। চলে গেলেন চাঁদোয়ার নীচে।

    দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাল সবাই। তিনি সালামের জবাব দিয়ে নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসলেন।

    আরোহী এবং পদাতিক সৈন্যরা পাহাড়ের আড়াল হয়ে গেল। ফাঁকা ময়দান। এক দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার মাঠে প্ররেশ করল। একহাতে ঘোড়ার বলগা, অন্যহাতে উটের রশি। মধ্য মাঠে এসে ঘোড়ার পিঠে দাড়িয়ে পড়ল সওয়ার। লাগাম ছেড়ে দিয়ে উটের পিঠে লাফিয়ে পড়ল। আবার ফিরে এল চলমান অশ্বের পিঠে। এরপর লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। ঘোড়া এবং উটের সাথে ছুটে গেল কিছুদূর। আবার একলাফে ছুটন্ত ঘোড়ায় উঠে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল।

    সামান্য ডানে ঝুঁকলেন আল বারক। তার মুখ এবং মেয়েটার মাথার-মাঝে দু’তিন ইঞ্চি ফাঁক। মেয়েটা তাকে দেখল। হাসল আল বারক। মেয়েটার ঠোঁটে এখনও সেই লাজুক হাসি। এদিকে চোখ পড়তেই কপাল কুঞ্চিত হল বৃদ্ধের। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে।

    সহসা পাহাড়ের দিক থেকে উড়ে এল কতগুলো মাটির পাতিল। মাঠে পড়ে ফেটে গেল পাতিলগুলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তরল পদার্থ। আশপাশে একশ গজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। ভিজে গেল মাঠ।

    পাহাড়ের টিলায় ভেসে উঠল দু’জন তীরন্দাজের মুখ। আগুনের ফিতা বাঁধা তীর ছুঁড়ল ওরা। ভেজা মাঠে তীর পড়তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন।

    একদিক থেকে ছুটে এল চারজন ঘোড়সওয়ার। আগুনের কাছে এসেও থামল না। তীব্র গতিতে ছুটিয়ে দিল ঘোড়া। অবাক দর্শকরা ভাবল ওরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু আগুনের ভেতর দিয়ে ছুটতে দেখা গেল ওদের। বেরিয়ে গেল অপর দিক দিয়ে।

    দর্শকদের শ্লোগানে প্রকম্পিত হল আকাশ বাতাস। দু’জন আরোহীর কাপড়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। ছুটন্ত ঘোড়া থেকে লাফ দিল ওরা। গড়গড়ি খেল বালিতে। নিবে গেল পোশাকের আগুন।

    আল বারকের দৃষ্টি মাঠে নেই। বার বার তাকাচ্ছে যুবতীর দিকে। প্রতিবারই মিষ্টি করে হাসছে তরুণী। আবার দৃষ্টি ফিরে যাচ্ছে বুড়োর দিকে। হঠাৎ বৃদ্ধ উঠে গেলেন। মেয়েটাকে তার সাথে আসতে দেখেছে আল বারক।

    ‘তোমার আব্বা উঠে গেলেন কেন?’ প্রশ্ন করলেন তিনি।

    ‘বৃদ্ধ আমার পিতা নন, স্বামী।’

    ‘স্বামী!’ আল বারকের কণ্ঠে অবাক বিস্ময়। ‘তোমার পিতা মাতাই, কি এ বিয়ে দিয়েছেন!’

    ‘সে আমায় কিনে নিয়েছে।’ যুবতীর নিঃস্পৃহ জবাব।

    ‘গেলেন কোথায়?

    ‘আপনার সাথে আমার চোখাচোখির ব্যাপারটা আঁচ করে রাগ করে চলে গেছেন। সন্দেহ করছেন আপনার জন্য আমার আকর্ষণ রয়েছে।’

    ‘সত্যিই কি আমার জন্য তোমার আকর্ষণ রয়েছে।’

    লজ্জায় নত হল যুবতীর চোখ। ঠোঁটে বিনম্র হাসি। অক্ষুট কণ্ঠে বলল, ‘ওকে আর সহ্য করতে পারছি না। হাঁফিয়ে উঠেছি। কেউ আমাকে এ বুড়োর হাত থেকে মুক্তি না দিলে আত্মহত্যাই করব।’

    মাঠে সৈন্যরা সেনা নৈপূণ্য দেখাচ্ছিল। মল্লযুদ্ধ, অসি চালনা, তীরন্দাজী। দর্শক এ ধরনের ক্রীড়ানৈপুন্য আগে কখনও দেখেনি।

    এতকাল এরা দেখে এসেছে সুদানীদের। ওদের হামবড়া ভাবের অন্ত ছিল না। অফিসাররা রাস্তায় বেরুত রাজ রাজড়ার মত। তাদের সঙ্গী সেনাদল গ্রামবাসীদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত।

    চারণভূমি থেকে ওরা লুট করত পশু। কারো কাছে ভাল জাতের উট বা ঘোড়া থাকলে জোর করে নিয়ে যেত। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, সেনাবাহিনী তৈরী করা হয় জনগণের উপর অত্যাচার করার জন্য।

    কিন্তু সালাহুদ্দীন আয়ূবীর ফৌজ ছিল তারচে ভিন্ন। যারা মহড়ায় অংশ নেয়নি, তাদের ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল দর্শকদের মাঝে। জনসাধারণকে বোঝাতে হবে ফৌজ তাদেরই ভাই এবং বন্ধু। শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী সৈনিকদের জন্য ছিল কঠোর শাস্তি।

    আল বারক মহড়া সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়লেন। ভুলে গেলেন সুলতানের নির্দেশ। যুবতী তার বিবেকের উপর চেপে বসল।

    আল বারক তাকে ভাললাগার কথা বললেন। আহ্বানে সাড়া দিল যুবতী। একান্তে দেখা করতে বললেন আল বারক।

    যুবতী বলল, ‘আমি তার কেনা বাঁদি ও আমাকে বন্দী করে রেখেছে। তার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে আসা সম্ভব নয়। ঘরে তার চারজন স্ত্রী। ওরাও আমার উপর দৃষ্টি রাখে।’

    স্বীয় পদমর্যাদার কথা ভুলে গেলেন আল বারক। টিনেজারদের মত সাক্ষাতের জন্য বিভিন্ন স্থানের নাম উল্লেখ করতে লাগলেন। একটি স্থান তরুণীর পসন্দ হল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের পোড়োবাড়ী। শহরের বাইরে। ভবঘুরেরাই কেবল ওখানে যায়।

    ‘ঠিক আছে, আমি ওখানে আসতে পারি, যদি আপনি আমাকে ওর হাত থেকে বাঁচানোর ওয়াদা দেন।’

    ‘অবশ্যই। ঐ বুড়োর হাত থেকে তোমাকে মুক্ত করার ওয়াদা করছি আমি।’

    ‘কখন আসব?’

    ‘আজ রাতে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন। কি, আসবে তো?’

    মেয়েটি আবারো সেই সলজ্জ হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা।’

    ○ ○ ○

    কায়রোতে রাত নেমেছে।

    মেলা শেষ হয়েছে দু’দিন আগে। দর্শকরা যে যার বাড়ী ফিরে গেছে। অস্থায়ী পতিতালয়গুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে সরকারী নির্দেশে। সন্দেহজনক পুরুষ ও নারীদের খুঁজছিল গোয়েন্দারা।

    মেলার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। দু’দিনে চার হাজার যুবক সেনা ফৌজে ভর্তি হয়েছে।

    আল বারক চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরনে সাধারণ পোশাক। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলেন কেউ দেখছে কিনা। না, কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই বুঝতে পেরে নিশ্চিন্তে রওনা দিলেন পুরনো সেই ভাঙা বাড়ীর দিকে।

    ঘুমিয়ে পড়েছে মরুভূমি। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে থেকে থেকে ডেকে উঠছে পাহাড়ী শেয়াল। মেয়েটা বলেছিল সে বন্দিনী। সবসময় চোখে চোখে রাখা হয়। তবুও আসবে এ আশায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। আত্মরক্ষার জন্য একটা খঞ্জর সাথে নিয়েছেন।

    নারীর পাগল করা রূপের মোহ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। হৃদয় হয় ভয় শূন্য। আল বারক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হলেও এখন অবিবেচক যুবক।

    ভাঙা বাড়ীটার কাছে একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে, আপাদমস্তক ঢাকা। ছায়াটা মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলেন। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে ঢুকে গেলেন ভেতরে।

    অন্ধকার কক্ষ। পাখা ঝাপটানোর শব্দ হল। হঠাৎ গালে চড় মারল কেউ। সাথে সাথে ভেসে এল চি, চি, শব্দ। বাদুড়। ওরা বড় বড় নখ দিয়ে মুখ আঁচড়ে দেবে ভেবে ভয় পেয়ে বসে পড়লেন তিনি।

    বাদুরগুলো উড়ে বেড়াতে থাকল। ভয় পেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। উড়ন্ত বাদুড়ে ভরে গেল কক্ষ। চি চি শব্দ করতে করতে বেরিয়ে এল বাদুড়গুলোও।

    সতর্ক প্রহরায় থাকা এক বন্দিনী যুবতী কি করে এ ভয়ংকর পোড়োবাড়িতে আসবে এ কথা তিনি একবারও ভাবলেন না। উঠোনে দাঁড়িয়ে ভীত চোখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন।

    কারো পায়ের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। খঞ্জর হাতে তুলে নিলেন তিনি। মাথার উপর বাদুড় উড়ছে, পাখা ঝাপটানোর শব্দ হচ্ছে। আল বারক চাপা কণ্ঠে ডাকলেন, ‘আছেফা।’

    এ নামই তাকে বলেছিল মেয়েটা।

    ‘আপনি এসেছেন!’ আছেফার কণ্ঠ।

    ছুটে এসে আল বারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘শুধু আপনার জন্যই এ ভয়ঙ্কর স্থানে এসেছি। তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। বুড়োকে মদের সাথে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। দেরী হলে জেগে উঠতে পারে।’

    ‘মদের সাথে বিষ মিশাতে পারলে না?’

    ‘আমি কখনও মানুষ হত্যা করিনি। একজন পর-পুরুষের সাথে এভাবে ভয়ঙ্কর স্থানে আসব, তাও কি ভেবেছি কখনও!’

    আল বারক যুবতীকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। হঠাৎ পেছনের পথ আলোময় হয়ে উঠল। তার আগমন পথে জ্বলে উঠল দু’টো মশাল। এক ঝটকায় আছেফাকে পেছনে নিয়ে এলেন তিনি। এরা কি প্রেতাত্মা না মেয়েটার পেছনে এসেছে, ভাবছেন আল বারক।

    গর্জে উঠল একটা কণ্ঠ, ‘দু’টোকেই জবাই করে ফেল।’

    মশাল নিয়ে এগিয়ে এল চারজন বলিষ্ঠ জোয়ান। একজনের হাতে বর্শা, তিনজনের হাতে তরবারী।

    মশাল মাটিতে পুঁতে দিল ওরা। আলোয় ভরে গেল আঙ্গিনা। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত ওরা আল বারকের চার পাশে ঘুরতে লাগল। আছেফা তার পেছনে।

    বারান্দা থেকে শব্দ এল, ‘পেয়েছ? জীবন্ত ছেড়ো না কাউকে।’ মেয়েটার বুড়ো স্বামীর আওয়াজ।

    আছেফা পেছন থেকে সামনে চলে এল। ঘৃণা এবং ক্ৰোধকম্পিত কষ্ঠে বলল, ‘এসো, এগিয়ে এসো। খুন কর আমাকে। এ জীবনে আমার আর বাঁচার সাধ নাই। বুড়ো পাঠা, টাকার জোরে আমার জীবনটা তুমি ধ্বংস করে দিয়েছ।’

    আমার এ যৌবনকে তুমি কি দিতে পেরেছ? আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আল্লার গজব পড়বে তোমার ওপর। তোমাকে আমি ঘৃণা করি। আমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি। ওকে আমিই এখানে আসতে বলেছি…’

    আছেফা ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে।

    ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন সশস্ত্র লোক। বর্শাধারী এগোল আছেফার দিকে। বর্শার ফলা তার পেটে ঠেকিয়ে বলল, ‘ছিনাল মাগী, আর একটা কথাও না। মরবি তো মর, তার আগে ফলাটা দেখে নে। জাহান্নামে তোর নাগরকে আগে পাঠাব, না তোকে?’

    এক ঝটকায় বর্শা ধরে ফেলল আছেফা। হ্যাচক টানে কেড়ে নিয়ে আল বারক থেকে সরে গেল খানিক। এরপর বর্শা উঁচিয়ে বলল, ‘আয়, এগিয়ে আয়। দেখি একে আমার আগে কে হত্যা করে।’

    ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তম্ভিত। আল বারক খঞ্জর হাতে এগিয়ে এলেন। মেয়েটা বর্শাধারীকে আক্রমণ করল। পিছিয়ে গেল সে।

    তার সঙ্গীরা আল বারককে আক্রমণ না করে আক্রমণের পাঁয়তারা করছিল। ইচ্ছে করলে ওরা অনেক আগেই তাকে হত্যা করতে পারত।

    আছেফা ধমকাচ্ছিল। আঘাত করছিল লক্ষ্যহীন ভাবে।

    আল বারক এক ব্যক্তিকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করল। তার পেছনে ছুটে এল দু’জন, একলাফে আছেফা ওদের পেছনে চলে গেল। ইচ্ছে করলে বর্শা মেরে ওদের ঘায়েল করতে পারত আছেফা। কিন্তু খঞ্জর দিয়ে তরবারীর মোকাবিলা করা যায় না।

    বুড়ো একদিকে দাঁড়িয়ে হস্বিতম্বি করছিল। আক্রমণ প্রতি আক্রমণে কেটে গেল কিছু সময়। কেউ আহত হয়নি। আঁচড়ও লাগেনি কারও গায়ে। এবার বৃদ্ধ বলল, ‘থামো!’

    যুদ্ধ থেমে গেল।

    ‘এমন বিশ্বাসঘাতিনীকে আমি আর বাড়ীতে নেবো না। জানতাম না ও এত দজ্জাল। জোর করে নিয়ে গেলে কখন আমাকে মেরেই ফেলবে!’

    ‘আমি তোমাকে এর মূল্য পরিশোধ করে দেব।’ আল বারক বলল, ‘তুমি একে কত দিয়ে কিনেছিলে?’

    ‘আমার সম্পদের অভাব নেই। ওকে আমি আপনাকে উপহার দিলাম। আমি অবাক হচ্ছি আপনার প্রতি ওর ভালবাসা দেখে। কি পরিমাণ ভালবাসা থাকলে নিজের জীবন বিপন্ন করে এতগুলো লোকের মোকাবিলা করতে পারে একবার ভেবে দেখেছেন? ও যুদ্ধবাজ বংশের মেয়ে তো, এক যোদ্ধার ঘরেই ওকে মানাবে ভাল।’

    তাছাড়া আপনি প্রশাসনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। সুলতানের এক অনুরাগী হিসাবে আপনাকে আমি অসন্তুষ্ট করতে পারি না। আমি ব্যবসায়ী মানুষ, সারাদিন ব্যস্ত থাকি বাইরে। আর এ বুড়ো বয়সে ওর মত যুবতী ঘরে রাখাও বিপজ্জনক। আমি ওকে তালাক দিলাম। এবার ও আপনার জন্য বৈধ।’

    করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল সে। অস্ত্রধারীদের দিকে ফিরে বলল, ‘এই চল, খবরদার, এই ঘটনা কাউকে বলবি না।’

    লোকগুলো মশাল তুলে ফিরে গেল। অবাক চোখে ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন আল বারক। তার পায়ের নীচে মাটি কাঁপতে লাগল। কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল বৃদ্ধ তার সাথে প্রতারণা করেছে। পথে লুকিয়ে থেকে দু’জনকেই হত্যা করবে।

    আছেফার হাত থেকে বর্শা হাতে নিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন ভাঙা বাড়ি থেকে।

    আছেফার হাত ধরে দ্রুত হাঁটছিলেন তিনি। বারবার তাকাচ্ছিলেন ডানে, বাঁয়ে, পেছনে। সামান্য শব্দেও চমকে উঠে থেমে যেতেন। অন্ধকারেই চাইতেন এদিক ওদিক। ধীরে ধীরে হাঁটা ধরতেন আবার। শহরে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

    আছেফা থামল। তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনি কি আমায় বিশ্বাস করেন!’

    আল বারক তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগের কারণে কিছুই বলতে পারলেন না।

    এ ঘটনার পর দেখা গেল আল বারক নয়, মেয়েটাই তাকে কিনে নিয়েছে। তার মনে হচ্ছিল আছেফা তার জন্য পাগল। শুধু তার জন্য এতগুলো লোকের সাথে একা লড়াই করেছে আছেফা।

    আছেফা তার রূপের জালে আটকে ফেলেছে তাকে। আল বারক স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলল। সে স্থান দখল করল আছেফা।

    সে যুগে মেয়েদের ক্রয় বিক্রয় চলত। স্ত্রীর কোন মর্যাদা ছিল না। চারজন স্ত্রী রাখাকে পুরুষের অধিকার মনে করা হত। বিত্তশালীরা পুষত রক্ষিতা। মুসলমান ওমরাদেরকে নারীরাই ধ্বংস করেছে। স্বামীদের সন্তুষ্ট করার জন্য স্ত্রীরাই সুন্দরী মেয়ে খুঁজে এনে স্বামীদের উপহার দিত।

    আল বারক আছেফাকে নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। সবাই তখন ঘুমিয়ে। সকালে স্ত্রী দেখল স্বামীর বিছানায় এক অনিন্দ্যসুন্দর যুবতী। এতে সে মোটেই অসন্তুষ্ট হলো না। ভাবল, এমন দু’একজন স্ত্রী বা রক্ষিতা পোষার ক্ষমতা তার স্বামীর রয়েছে। ও আসায় তার কিছুটা দায়িত্ব বরং কমবে। কিন্তু একবারও ভাবল না, আজ থেকে তার ভালবাসা হারিয়ে গেছে।

    একদিন যে মেয়েরা পুরুষের সাথে কাফেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এখন তারা শুধুমাত্র পুরুষের ভোগের সামগ্রী—এ কথা ভাবতে কষ্ট হতো সালাহুদ্দীনর। এতে সমাজের অর্ধেক শক্তিই নিঃশেষ হয়নি বরং এরা জাতির পৌরুষকেও নিঃশেষ করে দিয়েছে।

    ব্যবসায়ী পণ্যের মত মেয়েদের নিলাম হত। অপহরণ, খুন ধর্ষণের ঘটনা ঘটত অহরহ। তিনি নারীদের এ অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইলেন।

    নারীকে পুরুষের এবং পুরুষকে নারীর এই অনাহুত মোহ থেকে মুক্ত করতে তিনি ‘এক স্বামীর এক স্ত্রী’ শ্লোগান তোললেন। তিনি জানতেন দু’তিনজন স্ত্রী এবং রক্ষিতার মালিক আমীর ওমরারা সরাসরি এর বিরোধিতা করবে। কারণ, এরাই ছিল নারীদের প্রধান খরিদ্দার।

    নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সালাহুদ্দীন কুমারী মেয়েদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করতে চাইলেন। এতে হারেমগুলো শূন্য হবে। নারী ফিরে পাবে মর্যাদা। কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না আসা পর্যন্ত তা সম্ভব ছিল না।

    সমাজে তার শত্রুর পরিমাণ ছিল যথেষ্ট। তিনি জানতেন, বিশ্বাসঘাতকের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি জানতেন না তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী, রাষ্ট্রীয় এবং সামরিক গোপন পরিকল্পনার রক্ষক আল বারকও এক রূপসীর ফাঁদে পড়েছেন। প্রেমের অভিনয় দিয়ে যে রূপসী তাকে আপন কর্তব্য ভুলিয়ে দিচ্ছিল।

    ○ ○ ○

  • সুবাক দুর্গে আক্রমণ

    সুবাক দুর্গে আক্রমণ

    ‘সুবাক দুর্গে আক্রমণ’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র তৃতীয় উপন্যাস। সিরিজের প্রথম দু’টি উপন্যাসের মত এটিও লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১২তে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    এই সিরিজের পূর্বের দুটি গ্রন্থের মত এটিও ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    বিষের ছোঁয়া

    কায়রোর উপশহরের এক মসজিদ। একদিন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে শহরতলীর সে মসজিদের কাছে এসে থামল আটজন অশ্বারোহী। মসজিদ থেকে সামান্য দূরে এক সরাইখানার ফটকে এসে ঘোড়া থেকে নামল ওরা। ঘোড়াগুলো তুলে দিল সরাইখানার লোকজনের হাতে। তারপর দু’জন দু’জন করে চারটে দলে ভাগ হয়ে ওরা মসজিদের চারদিকটা ভাল করে ঘুরে দেখল।

    এশার নামাজের আযান হল। ওরা একে একে এসে প্রবেশ করল মসজিদে। প্রথম সারিতে নামাজ পড়ল চারজন, চারজন দাঁড়াল মসজিদের ভিতরের সর্বশেষ কাতারে।

    নামাজ শেষ হল, মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন ইমাম সাহেব। লোকজন প্রতিদিনের মত আজও ইমাম সাহেবের ওয়াজ শোনার জন্য যে যার জায়গায় বসে পড়ল।

    ওয়াজ শুরু করলেন ইমাম সাহেব। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ‘ইমাম সাহেব! আল্লাহ আপনার জ্ঞানের আলো আরও বাড়িয়ে দিক। আপনার খ্যাতি শুনে আমরা আটজন অনেক দূর থেকে এসেছি। সমস্যা মনে না করলে জিহাদের বিষয়ে কিছু বলুন। জিহাদের তাৎপর্য আমরা বুঝি না। লোকজন বলছে আমাদের নাকি জিহাদের ভুল অর্থ বুঝানো হয়েছে।’

    ‘আমরা জিহাদ সম্পর্কে আপনার বয়ান শুনতে চাই।’ সাতটি কণ্ঠ একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হল।

    একজন বলল, ‘এ হচ্ছে সময়ের দাবী। আমাদের জিহাদের ভুল ব্যাখ্যা শোনানো হয়েছে। আমরা সঠিক অর্থ জানতে চাই।’

    ‘কোরআনের নির্দেশ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘কোরানের বাণী মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া আমার দায়িত্ব। একবার নয়, হাজার বার আমি আপনাদের কাছে জিহাদের তাৎপর্য তুলে ধরতে প্রস্তুত। জিহাদের অর্থ অন্যের জমি দখল করা বা কারও গলা কাটা নয়। হত্যা, মারামারি বা খুনাখুনিও জিহাদ নয়।’ তিনি কোরানের আয়াত পড়ে বললেন, ‘এ আমার কথা নায়, খোদার কালাম। সর্বোত্তম জেহাদ হচ্ছে নিজের নফস বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করা। তাইতো আমি বলি, পাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই হচ্ছে আসল জিহাদ। তোমরা শোননি, ইসলাম তরবারীর জোরে নয়, প্রেম এবং ভালবাসা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জিহাদের অর্থ বলদে গেছে। এর অর্থ পরিবর্তন করেছে ক্ষমতালোভীরা। খ্রিষ্টানরা অন্যের দেশ দখল করাকে ধর্মযুদ্ধ বলে। মুসলমানও একই উদ্দেশ্যে লড়াই ও ঝগড়া করাকে জিহাদ বলে। আর এসব কথা বলে ক্ষমতাসীন শাসকরা। তারা এসব বলে তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। মানুষকে ধর্মের কথা বলে যুদ্ধে লিপ্ত করে রাজা বাদশারা। এতে রাজাদের শাসন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের।’

    ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবীও কি মানুষকে অন্যায়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছেন?’ প্রশ্ন করল একজন।

    ‘না! তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হোক। বড়রা তাকে যা বলেছে, আন্তরিকতার সাথে তাই তিনি পালন করছেন। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে তার মনে ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে। ভেবে দেখো—খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়! দু’জন নবীর কথাইতো এক। হযরত ঈসা (আ.) প্রেম ভালবাসার কথা বলেছেন। আমাদের নবীও মানুষকে ভালবাসতে বলেছেন। তাহলে এসব যুদ্ধ বিগ্রহ এল কোত্থেকে! আল্লাহর জমিনে যারা নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করে মানুষকে গোলামে পরিণত করতে চায় এসব তাদের আবিষ্কার।

    আমি মিসরের সম্মানিত আমীরের কাছে যাব। তাঁকে বোঝাব জিহাদের সত্যিকার তাৎপর্য। অশিক্ষা এবং অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে তিনি যা করছেন এ হচ্ছে সত্যিকারের জিহাদ। খোতবা থেকে খলিফার নাম মুছে তিনি বড় জিহাদ করেছেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। শিশুদেরকে খোদার নামে যুদ্ধবিগ্রহ শেখানো হচ্ছে। এদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তীর  ও তরবারী। এ তীর ও তরবারী ওরা কোথায় ব্যবহার করবে? অবশ্যই কিছু মানুষ দেখিয়ে বলতে হবে, এরা তোমাদের শত্রু। এদের নিশ্চিহ্ন কর।’

    ইমাম সাহেবের কণ্ঠে ছিল অবর্ণনীয় আকর্ষণ। যাদুগ্রস্তের মত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল শ্রোতারা। তিনি আবার শুরু করলেন, ‘তোমাদের শিশুদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। তাদের সাথে তোমরাও আগুনে পুড়বে। তোমরাই ওদেরকে পাপের পথে নিক্ষেপ করেছ। সেনাপিত এবং সম্রাটগণ তোমাদের স্বর্গে নিয়ে যেতে পারবে না। শুধু দ্বীন ইসলামের প্রদীপধারী ইমাম এবং আলেমরাই স্বর্গ দিতে পারবে। সমগ্র জীবন নামাজ পড়লে এবং ভাল কাজ করলেও মানুষের রক্তে রঙ্গীন হাত দোজখে নিক্ষিপ্ত হবে।

    তোমরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত প্রদান কর। কোষাগার হল সরকারের, সরকার গরীব নয়। যাকাত হল গরীবের অধিকার। তোমাদের যাকাতের টাকায় অস্ত্র এবং ঘোড়া কিনে মানুষকে হত্যা করা হয়। যাকাত দিয়ে তোমরা বেহেস্তে যাবে, অথচ এখন পাপের ভাগী হচ্ছ। এজন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত দেয়া যাবে না।’

    ইমাম সাহেব আলোচনার বিষয় ঘুরিয়ে বললেন, ‘অনেক কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। বলারও কেউ নেই। মানুষের মধ্যে রয়েছে একটা কামজ রিপু। এ এক জৈবিক সত্বা। তোমাদের কি নারীর প্রয়োজন হয় না! এ হচ্ছে স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা। আল্লাহই এ চাহিদা তৈরী করেছেন। তোমরা এ চাহিদা পূরণ করতে পার। এ জন্যই আল্লাহ একসঙ্গে চার স্ত্রী ঘরে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন স্ত্রীও যদি না রাখতে পার তবে টাকার বিনিময়ে কোন নারীর কাছে আকাঙ্ক্ষা পুরণ করতে যাওয়া অপরাধ হবে কেন? এ চাহিদা এ আকাঙ্ক্ষা তো খোদারই দান। তাই নিরূপায় হলে এ চাহিদা তোমাদেরকে অন্ধগলিতে নিয়ে যায়। এ অপরাধ নয়। এরপরও পাপ থেকে বেঁচে থেকো, কোন পুরুষের কাছে যেয়ো না। কারণ, কোরানে আছে, পুরুষের কাছে যাওয়ার অপরাধে আল্লাহ আ’দ ও সামুদ জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

    এক থেকে চার পর্যন্ত যত ইচ্ছে বিয়ে করতে পার। নিজের স্ত্রী এবং মেয়েদেরকে ঘরের ভেতর রাখবে। আমি দেখেছি যুবতী মেয়েদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শেখানো হচ্ছে ঘোড়সওয়ারী, অসি চালনা এবং আহতকে প্রাথমিক চিকিৎকা দানের পদ্ধতি। ওরা যুদ্ধে যাবে। আহতদের সেবা করবে। প্রয়োজনে যুদ্ধ করবে। ফলে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হবে। এ চরম পাপ। এ পাপ থেকে নিজে বেঁচে থাকো। যারা মসজিদে আসে না তাদেরকেও বলো। খোদার বিধানে কেউ হস্তক্ষেপ করো না। এ বড়ই গুণার কাজ।’

    ইমাম সাহেবের ওয়াজ শেষ হল। বসার স্থান না পেয়ে দাঁড়িয়েই অনেক শ্রোতা। একজন একজন করে হুজুরের সাথে হাত মিলিয়ে সবাই ফিরে যেতে লাগল। কেউবা ঝুঁকে তাঁর হাতে চুমো খেলো।

    ইমাম সাহেবের সামনে দু’জন লোক বসা। পরণে জুব্বা। মাথায় পাগড়ি। জরির কাজ করা রুমালে ঢাকা মুখের একাংশ। কাল দীর্ঘ দাড়ি। পোশাকে আশাকে মধ্যবিত্ত মনে হয়। একজনের এক চোখ হলুদ কাপড়ে বাঁধা। বললেন, হুজুর, ‘জিহাদ সম্পর্কে আরও কিছু বলুন।’

    ‘তোমার চোখে কি হয়েছে?’

    ‘হুজুর, আমার এক চোখ খারাপ।’

    ইমাম সাহেব তাকালেন সঙ্গীর দিকে। সঙ্গীটির মুখের একাংশ রুমালে ঢাকা, ঘন দাড়ি। এ দু’জন ছাড়া সবাই চলে গেছে।

    ‘তোমাদের সন্দেহ এখনও দূর হয়নি?’ মৃদু হেসে ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন।

    ‘সন্দেহ দূর হয়েছে।’ জবাব দিল একচোখা লোকটি। ‘আমরা সম্ভবত আপনাকেই খুঁজছি। মিসরের অর্ধেকটা চষে বেড়িয়েছি আপনার জন্য। আমাদেরকে ভুল ঠিকানা দেয়া হয়েছিল।

    ‘অর্ধেক মিসরেও আমার মত আলেম পাওনি?’

    ‘খুঁজেছি তো আপনাকে। আমরা কি সঠিক স্থানে আসিনি? ওয়াজ শুনে মনে হল আমরা আপনাকেই চাইছি।’

    বাইরের দিকে তাকালেন ইমাম সাহেব। বললেন, ‘আবহাওয়া কেমন হবে জানি না।’

    ‘বৃষ্টি আসবে।’ একচোখা লোকটির জবাব।

    ‘পরিষ্কার আকাশ।’

    ‘আমরা মেঘের সৃষ্টি করব।’ বলেই হেসে উঠল লোকটি। ইমাম সাহেব মুচকি হেসে ফিসফিসিয়ে বললনে, ‘কোত্থেকে এসেছ?’

    ‘এক মাস ছিলাম ইস্কান্দারিয়া, তার আগে সুবাক।’

    ‘মুসলমান?’

    ‘ঘাতক দলের সদস্য। মুসলমান মনে করতে পারেন।’

    এবার দু’জনই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

    ‘আপনাকে ওস্তাদ মানছি।’ লোকটির সঙ্গী বলল। ‘এ যে আপনিই আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না।’

    ‘আপনি ব্যর্থ হতে পারেন না।’

    ‘সাফল্য অত সহজ নয়।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘সালাহুদ্দীনকে তোমরা চেন না। আমি জিহাদ এবং জীবন সম্পর্কে এদের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছি। কিন্তু সালাহুদ্দীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সফল হতে দিচ্ছে না। জিহাদ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য তোমরা কেন আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলে?’

    ‘সুবাক থেকে আমাদের বলা হয়েছে এটিই আপনরার বড় পরিচয়।’ জবাব দিল একচোখা লোকটি। ‘আপনার বলা প্রতিটি কথাই ওখানে আমাদে শোনানো হয়েছে। আমাদের আরও বলা হয়েছে, আপনার ওয়াজে অবশ্যই যৌনতার প্রসঙ্গ থাকবে। এসব শিখতে আপনি নিশ্চয় অনেক পরিশ্রম করেছেন?’

    ‘আমার নাম কি?’

    ‘আপনি কি আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন? সন্দেহ করছেন আমাদের? পরস্পরের পরিচিতির জন্য নাম নয় আমরা বিভিন্ন সংকেত ব্যবহার করি।’

    ‘তোমরা কি জন্য এসেছ?’

    ‘ঘাতকদল কি কাজ করে?’

    ‘আমার কাছে পাঠানো হয়েছে কেন?’

    ‘একটা উষ্ট্রীর জন্য। আপনার কাছে দু’টি রয়েছে। আপনার কাছে আসার কথা ছিল না। আপনি হয়ত খবর পেয়েছেন সালাহুদ্দীনের এক কমাণ্ডার রজবের কাছে সুবাক থেকে তিনটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। একটা ছিল আমাদের জন্য। কিন্তু দু’টাই মারা গেছে। রজবের কাটা মাথা আর সবচে সুন্দরী উষ্ট্রীটা সালাহুদ্দীনের হাতে পৌঁছেছে। ওটাও শেষ।’

    ‘হ্যাঁ, শুনেছি।’ ইমাম সাহেবের বিষন্ন কণ্ঠ। ‘আমাদের অনেক ক্ষতি হল। সালাহুদ্দীনের এক শক্তিশালী সেনাপতি আমাদের হাতে ছিল। তাকেও জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভেতরে চল, এসব কথার জন্য এ স্থান উপযুক্ত নয়।’

    দু’জনই ইমাম সাহেবের সাথে বেরিয়ে গেল।

    ইমাম সাহেব দু’জনকে নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। বাড়িটি পরিচ্ছন্ন। দু’ তিনটা কামরা পেরিয়ে একটি কামরার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ওদের সামনে পুরনো এক দরজা। দরজায় তালা লাগানো। মনে হয় দীর্ঘ দিন থেকে খোলা হয়নি। এক পাশে জানালা। ইমাম সাহেব হাত লাগালেন। জানালার পাল্লা খুলে গেল। সবাই ভেতরে তাকাল। সাজানো গোছানো কক্ষ। দেয়ালে ঝুলছে সোনার তৈরী ক্রুশ। একপাশে যিশুর অন্যদিকে মা মেরীর হাতে আঁকা ছবি। ইমাম সাহেব বললেন, ‘আমার গীর্জা। আমার আশ্রয়।’

    ‘আকস্মিক বিপদ থেকে বাঁচার জন্য কি ব্যবস্থা রেখেছেন?’ একচোখা লোকটি প্রশ্ন করল। ‘ক্রুশ এবং ছবিগুলো এভাবে রাখা ঠিক হয়নি।’

    ‘এখানে আসার দুঃসাহস কেউ করবে না।’ ইমাম সাহেব হেসে বললেন। ‘মুসলমানরা সরল এবং আবেগপ্রবণ জাতি। হালকা যুক্তি আর আবেগময় কথায় ওরা জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। জৈবিক  চাহিদা মানুষের বড় দুর্বলতা। আমি এ দুর্বলতা উস্কে দিচ্ছি। এদের শিখাচ্ছি চারটে বিয়ে করা ফরজ। ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছি অশ্লীলতার দিকে। ধর্মের নামে মুসলমানকে দিয়ে ভাল-মন্দ দুটোই করানো যায়। হাতে কোরান দেখলে এরা মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নেয়। এ আমার সফল অভিজ্ঞতা। আমি এমন একদল লোক তৈরী করব যারা কোরান হাতে নিয়ে মসজিদে বসেই জিহাদ এবং সৎকর্ম নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আমি মেয়েদের ব্যাপারে ওদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করে দিচ্ছি। সালাহুদ্দীন মেয়েদের সামরিক ট্রনিং দিচ্ছে। আমি ওদের ঘরের কোণে বন্দী রেখে অর্ধেক জনশক্তি বেকার করে দেব।’

    ‘সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছাড়ানো উচিৎ।’ একচোখা লোকটির সঙ্গী বলল। ‘সালাহুদ্দীনের বড় সাফল্য, তিনি ফৌজ এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। এ মহূর্তে যদি ঘোষণা করেন, ফিলিস্তিন জয় করব, তবে মিসরের সব মানুষ তার সঙ্গী হবে।’

    ‘তিনি এমন ঘোষণা দেবেন না। কারণ তিনি বুদ্ধিমান। আবেগপ্রবণ লোক তিন পছন্দ করেন না। একশ’ উত্তেজিত জনতার চেয়ে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিককে তিনি বেশী প্রাধান্য দেন। তিনি সস্তা শ্লোগান দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করার লোক নন, তিনি বাস্তববাদী। মানুষকে বাস্তবতা আর প্রশিক্ষণ থেকে দূরে রেখে আবেগপ্রবণ করাই আমাদের কাজ। চিন্তা ছেড়ে দেবে মুলসমানরা। অবাস্তব আবেগে উত্তেজিত হবে। থমকে যাবে শত্রুর নিক্ষিপ্ত প্রথম তীর দেখে। আবেগ ছাড়া ওদের সব কিছুই আমরা নিঃশেষ করে দেব। দেখনি ওয়াজে আমি সালাহুদ্দীনের কেমন প্রশংসা করেছি।’

    ‘এসব কথা পরে হবে। আমরা উষ্ট্রী দুটো দেখতে চাই। তারপর বলুন, আমাদের কিভাবে আশ্রয় দেবেন। ও দু’জন ছাড় এখানে কি অন্য কোন লোক থাকে?’

    ‘না, এখানে আর কেউ থাকে না।’

    ইমাম সাহেব এখন সন্দেহমুক্ত। আলাপচারিতা থেকে তিনি নিঃসন্দেহ হয়েছেন যে এরা গোপন ঘাতক দলের সদস্য। তিনি তালা খুলে কামরায় প্রবেশ করে বসতে দিলেন ওদের।

    ‘আপনারা বসুন, আমি ওদের নিয়ে আসছি।’

    কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। একটু পর ফিরে এলেন সঙ্গে দুই অপরূপা যুবতীকে নিয়ে। দু’জনই আরব্য রজনীর পরীদের মত অপূর্ব সুন্দরী। পরনে মখমলের কালো ঘাগরায় সোনালী জরির কাজ, উপরে দুধে-আলতা রঙের হাতাকাটা মিনি ব্লাউজের ওপর পাতলা রেশমী ওড়না। চোখে মুখে স্নিগ্ধ কমনীয়তার কোমল পরশ। কচি লাউ ডগার মত সতেজ আর পেলব ত্বক।

    লোকজন জানে এরা ইমাম সাহেবের স্ত্রী। আপাদমস্তক বোরকায় ঢেকে ওদের এখানে আনা হয়েছিল। এখন বোরকা নেই। দেহের বেশীল ভাগ উন্মুক্ত। ওদের সাথে যুবতীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে আলমারী থেকে মদের বোতল বের করলেন ইমাম সাহেব। গ্লাস ভরলেন। লোক দু’জন ছু’ল না, এমনকি এক নজর দেখেই চোখ ধাঁধাঁনো যুবতীদের দিক থেকেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।

    ‘আগে কাজের কথা বলি, তারপর এসব হবে।’ বলল একচোখা লোকটি।

    ‘আমরা দু’জনকে হত্যা করতে চাই।’ সঙ্গীর কণ্ঠ, ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবী এবং আলী বিন সুফিয়ান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তাদের আমরা কখনও দেখিনি। ওদেরকে চিনিয়ে দেবেন। আপনি কি দেখেছেন কখনও?’

    ‘এতবেশী, এখন অন্ধকারেও ওদের চিনতে পারব। ওদের চেনাই ছিল আমার এ অভিযানের প্রথম কাজ। আলী ভীষণ ঘাগু। ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ। তবে ছদ্মবেশে এলেও আমি তাকে ঠিকই চিনতে পারব।’

    ‘সালাহুদ্দীনের ব্যাপারে কি অভিমত?’ একচোখা লোকটি বলল।

    ‘তাকেও চিনতে কষ্ট হবে না।’

    একচোখা লোকটি কানের কাছে তুলে আনলেন হাত। এক ঝটকায় খুলে আনলেন কৃত্রিম দাড়ি, গোঁফ। ছুঁড়ে ফেললেন দূরে। টেনে ছিঁড়ে ফেললেন চোখের হলুদ পর্দা। মুর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন ইমাম সাহেব। হাঁ হয়ে গেছে মুখ। বিষ্ফারিত চোখ। আতঙ্কিত মেয়ে দু’টো একবার তাকাচ্ছিল ছদ্মবেশী লোকটির দিকে আবার দেখছিল ভয়ে পাংশু হয়ে যাওয়া ইমাম সাহেবের মুখের দিকে। ভয়, আতঙ্ক আর উদ্বেগ মেশানো কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল ইমাম সাহেব, ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবী!’

    ‘হ্যাঁ বন্ধু! আমি সালাহুদ্দীন আয়ুবী, তোমার খ্যাতি শুনে ওয়াজ শুনতে এসেছিলাম।’

    সঙ্গীর দাড়ি মুঠোয় চেপে এক ঝটকায় খুলে ফেললেন সুলতান আয়ুবী।

    ‘হ্যাঁ চিনি।’ ইমামের কণ্ঠে পরাজয়। ‘আলী বিন সুফিয়ান।’

    আকস্মাৎ মেয়ে দু’টো ঘুরে পেছনের আলমিরার ওপর থেকে ছুরি টেনে নিল। সালাহুদ্দীন আয়ুবী ও আলী বিন সুফিয়ান ওদের ক্ষিপ্রতা দেখে মোটেও অবাক হলেন না। ওরা যে সব রকমের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তা ওদের ক্ষিপ্রতা দেখেই বুঝে নিলেন।

    ওরা যখন মেয়েদের তৎপরতা দেখছিলেন সেই ফাঁকে ইমাম সাহেব পেছনে হাত চালিয়ে বের করে আনলেন তরবারী। চোখের পলকে আঘাত করলেন সালাহুদ্দীনের মাথায়।

    সালাহুদ্দীন আয়ুবী এ আঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। চকিতে সরে দাঁড়ালেন তিনি।

    ততক্ষণে দু’জনই জুব্বার বেতর থেকে তরবারী বের করে নিয়েছেন।

    তরবারী চালনায় দক্ষ হলেও আরবের বিখ্যাত দুই বীরের সামনে দাঁড়াতে পারল না ওরা।

    আলী মেয়েদের ছুরি ধরা হাতের কনুই বরাবর ছেড়ে লাথি চালালেন। সাঁই করে ছুটে গিয়ে ছুরি দুটো দেয়ালে ঠক করে বাড়ি খেল।

    সালাহুদ্দীনের তলোয়ার স্পর্শ করল ইমামের তরবারী। তলোয়ারে তলোয়ার ঠেকিয়ে চাপ বাড়ালেন তিনি। পেছনে সরে যেতে চাইল ইমাম। সালাহুদ্দীন ওর দু’পায়ের ফাঁকে নিজের পা ঢুকিয়ে দিয়ে ওকে আরেকটু ঠেলে দিলেন পিছনে। ফলে তাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে পড়ে গেল ছদ্মবেশী ইমাম। হাত থেকে ছিটকে গেল তলোয়ার।

    আলী এগিয়ে এসে অস্ত্রগুলো তুলে নিল এক এক করে। সালাহুদ্দীন আলীকে বললেন, ‘বাইরে তোমার যে বন্ধুরা আছে ডাক তাদের।’

    বেরিয়ে গেলেন আলী। ফিরে এলেন অস্ত্রধারী ছ’জন সঙ্গীকে নিয়ে। এতক্ষণ এরা বাইরে পাহারা দিচ্ছিল।

    পরদিন মসজিদের সামনে জনতার প্রচণ্ড ভীড় জমে উঠল। ইমাম এবং মেয়ে দু’টোকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল জনতার সামনে। ছদ্মবেশী ইমাম সাহেব কিভাবে জিহাদ আর যৌনতার বিরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা তুলে ধরা হল জনতার সামনে।

    সালাহুদ্দীন আবেগময় ভাষায় বললেন, ‘মুসলিম ভাইয়েরা আমার! আমার কাছে ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর কালাম ও রাসূলের সুন্নাহ। প্রিয় নবী (সা.) যা বলেছেন ও করেছেন ইসলাম বলতে আমি তাকেই বুঝি, এর বেশীও না কমও না। পরহেজগারীর নামে দিনরাত মসজিদ ও খানকায় পড়ে থাকার নাম ইসলাম হতে পারে না। আল্লাহ যেমন জামাতে নামাজ পড়ার কথা বলেছেন তেমনি বলেছেন নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এটাই ইসলাম।

    আপনারা দেখতে পেয়েছেন কিভাবে সুফী ও দরবেশ সেজে আমাদেরকে কর্মবিমুখ করার সুগভীর চক্রান্তে মেতে উঠেছে শয়তানরা। যেখানে প্রিয় নবীর সহধর্মিনীরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, ছুটে গেছেন জেহাদের ময়দানে, পূর্ণ্যময়ী মহিলা সাহাবীগণ শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন, সেখানে পর্দার নামে আমাদের অর্ধেক জনশক্তিকে গৃহবন্দী করার পায়তারা করছে। যেন রাসূলের চাইতে তারা ইসলাম বেশী বুঝে, সাহাবীদের চাইতে তারা বেশী মুত্তাকী ও পরহেজগার। এ ধরণের আলেমদের ব্যাপারে আপনারা সতর্ক থাকবেন, এরা আলেম নয় খ্রিষ্টানদের চর। ইসলাম কোন ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। আমাদের মেয়েরা অবশ্যই পর্দা করবে, তবে ততটুকুই, যতটুকু করার জন্য ইসলাম তাদের নির্দেশ দিয়েছে। আবার আমাদের মেয়েরা সমাজিক ক্রিয়াকর্মেও অংশগ্রহণ করবে, তাবে ততটুকুই, যতটুকু করার অধিকার ইসলাম তাদের দিয়েছে।

    ঘরে আগুন লাগলে পর্দার জন্য মেয়েদের ঘরের ভেতর পুড়ে মরতে হবে ইসলাম যেমন এ কথা বলে না, তেমনি খোলামেলা শরীরে রাস্তায় ঘুরে বেহায়াপনা ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অবাধ লাইসেন্সও দেয় না ইসলাম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মধ্যমপন্থী জাতি। আমরা আমাদের মাতা-ভগ্নীদেরকে বাজারের পণ্য বানাতে পারি না, এ ধরনের যে কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে, সেই সাথে শরিয়ত নির্ধারিত পন্থায় ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণের সকল সুযোগ তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে তাদের মর্যাদা ও অধিকারকেও নিশ্চিত করতে হবে।

    বন্ধুরা আমার, ওরা আমাদের ভালবাসার মন্ত্র শোনায়, মানবতার কথা বলে। আমরা ওদের মত ঘৃণার বেলুনের ওপর ভালবাসার রঙিন মোড়ক লাগাই না। আমরা মানুষকে ভালবাসি হৃদয়ের গভীর মমতা দিয়ে। আমাদের আদর্শ সেই মহামানব, প্রতিদিন চলার পথে কাটা বিছিয়ে রাখার পরও নিঃসঙ্গ অসুস্থ বুড়িকে সেবা দিয়ে যিনি আপন করে নিতে পারেন।

    ভালবাসা ও সেবার ক্ষেত্রে জাত-পাতের কোন ভেদাভেদ করতে শিখিনি আমরা। আমাদের নবী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় সে আমার উম্মত নয়। এর চে’ অধিক মানব প্রেমের কথা কে কবে বলেছে? যার মাঝে এতটুকু মানব প্রেমের সৃষ্টি না হবে সে মুসলমান হবে কেমন করে। ভেবে দেখুন, যদি আমরা নবীর উম্মতই হতে না পারলাম তবে আমাদের এতসব এবাদত বন্দেগী কোন কাজে লাগবে?

    তাই তো আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে মানবতারই জয় ঘোষিত হয়। ইসলাম চায় মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। তাই মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা একজন মুজাহিদের পবিত্র দায়িত্ব। মানুষের আহার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য চেষ্টা করা আমাদের কাছে নিছক দুনিয়াবী কাজ নয়, বরং একজন সত্যিকার মুজাহিদের কাছে এটুকু ইসলামের ন্যুনতম দাবী। এ দাবীকে পাশ কাটিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি না আমরা। আবার আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার চেষ্টা বাদ দিয়ে কেবল দুনিয়াবী সমস্যার সমাধান করাকেও আমরা ইসলাম মনে করতে পারি না।

    প্রিয় ভাইয়েরা, আমাদের সংগ্রাম তাই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর সংগ্রাম। ওরা আমাদের অস্ত্রের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে আমরা রক্তপিপাসু। না, ক্ষমার মহত্তম দৃষ্টান্ত আমরাই দেখাতে পারি। এক ফোটা রক্ত না ঝরিয়েও আমরা মক্কা জয় করতে পারি। তারপরও আমাদের নবীকে অর্ধশতাধিক লড়াই পরিচালনা করতে হয়েছিল কি জন্য? মানবতার অপমান আমরা বরদাস্ত করতে পারি না। মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আমরা আপোষ করতে পারি না। আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছি নিপীড়িত মজলুম মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। চোর যদি ধর্মের কাহিনী শুনতো তবে আমাদের অস্ত্র হাতে নেয়ার প্রয়োজন হত না। কিন্তু আমরা জানি, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।

    সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আমাদের এ লড়াই অব্যহত থাকবে। খ্রিষ্টানদের যে কোন হামলা ও ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেয়ার জন্য সবসময় সজাগ ও প্রস্তুত থাকার জন্য আমি আপনাদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।’

    সালাহুদ্দীনের বক্তৃতার পর খ্রিষ্টান গোয়েন্দাদের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেয়া হল। অবাক বিস্ময়ে জনতা শুনল ছদ্মবেশী ইমাম এবং মেয়ে দু’টোর স্বীকারোক্তি।

    তারপর জনতাকে একজন একজন করে লাইনে দাঁড় করিয়ে ইমাম সাহেবের ঘরে নিয়ে দেখানো হল ক্রুশ, মেরী আর যিশুর মূর্তি। সাধারণ মানুষের সামনে খুলে গেল এক ছদ্মবেশী খ্রিষ্টান গোয়েন্দার অপকর্মের নমুনা।

    * * *

    সুলতানের নির্দেশে সমগ্র দেশে গুপ্তচরের নিশ্ছিদ্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন আলী বিন সুফিয়ান। খ্রিষ্টান গোয়েন্দায় ভরে গিয়েছিল দেশ। ইসলামী সংস্কৃতি বিনষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্র সুলতানকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

    একজন ইমাম ইসলামী চিন্তাধারা পাল্টে দিচ্ছে সংবাদ পেয়েও তিনি তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেননি। বলেছিলেন, ‘আলী! ধর্ম আজ বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হতে শুরু করেছে। ইমাম সাহেব হয়ত এমন কোন উপদলের লোক। অথবা তিনি মনগড়া তাফসীর করছেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমি প্রশাসক—আলেম নই, যদি তাকে গুপ্তচর মনে কর ভালভাবে যাঁচাই বাছাই করে নাও। আমার চাইতে একজন ইমামের মর্যাদা অনেক উর্ধে।’

    গোয়োন্দা হলে চিনে ফেলতে পারে এ জন্য আলী নিজে মসজিদে যাননি। ক’জন লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দশ থেকে বার দিন গিয়েছে ওরা। আলীকে শুনিয়েছে ইমামের বক্তৃতার হুবহু বর্ণনা।

    আলী সুলতানকে বললেন, ‘লোকটা গোয়োন্দা না হলেও ভ্রান্ত আকিদার। তাকে ধরা উচিৎ। সে এমনভাবে জিহাদের ব্যাখ্যা করছে যা শুধু একজন শত্রুর পক্ষেই করা সম্ভব।’

    সুলতান মনোযোগ দিয়ৈ আলীর কথা শুনে বললেন, ‘ব্যাপারটা মসজিদ এবং ইমাম সম্পর্কে। কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগে আরেকটু যাচাই করা দরকার।’

    অবশেষে সুলতান সিদ্ধান্ত নিলেন আলী সহ নিজেই যাবেন ইমামের ওয়াজ শুনতে।

    আহমদ কামালের গ্রেফতার করা মেয়েটার কাছ থেকে আলী জেনে নিয়েছিলেন খ্রিষ্টান গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত কোড বা সংকেত। মেয়েটা বলেছিল, ‘গোয়েন্দারা কেউ কারো নাম বলে না। ‘আমরা মেঘ নিয়ে আসব’ বলে পরস্পরকে পরিচিত হতে হয়। সুলতান তাই করেছিলেন। ধরা পড়ল ইমাম।

    ওদের তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়ে তদন্ত শুরু করলেন গোয়েন্দা প্রধান।

    তদন্তে জানা গেল, কায়রো উপশহরের এ মসজিদ জামে মসজিদ না হলেও মুসল্লীর অভাব নেই। এলাকাটায় মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত লোকের বাস। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় এখানকার লোকগুলো জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। ফলে বেশিরভাগ লোকই কুসংস্কারে বিশ্বাসী। ওরা সহজেই মন ভোলানো আবেগময় কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

    ছ’সাত মাস ধরে এলাকার মসজিদের কথা সবার মুখেমুখে। নতুন পেশ ইমাম এশার পর এমন ওয়াজ করেন যা কেবল মর্মস্পর্শীই নয়, অভিনব ও চিত্তাকর্ষকও।

    ঘটনার বিবরণে জানা গেল, ‘একদিন দু’জন স্ত্রীসহ একজন লোক এল গাঁয়ে। উঠল এক ব্যাক্তির ঘরে। দেখতে আলেমের মত। মসজিদে আসা যাওয়া করতে লাগলেন তিনি। ধীরে ধীরে ইমাম সাহেবের ভক্ত হয়ে গেলেন নতুন আলেম।

    পনর ষোল দিন পর একদিন ইমাম সাহেব মসজিদে এলেন না। খবর নিয়ে জানা গেল তিনি অসুস্থ।

    হাকীম সাহেব তার বাসায় গিয়ে দেখলেন ইমাম সাহেবের পেটে ব্যাথা। কোন ওষুধ কাজ হল না। তিন দিন পর মারা গেলেন ইমাম সাহেব। ইমাম সাহেব যেদিন অসুস্থ হন সেদিন আগন্তুক আলেম গ্রামে ছিলেন না, আগে যেখানে থাকতেন সেখান থেকে জিনিসপত্র আনতে গেছেন।

    ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর দিন ফিরে এলেন তিনি।

    পরনে লাল জুব্বা, ফর্সা চেহারা, ধূসর দাড়ি, মধুর তেলওয়াত। ইমাম সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘আহা! অমন ভাল লোক আর হয় না। উনি তো চলে গেলেন, এখন আমাদের কি হবে?’

    ‘কি হবে মানে?’

    ‘না, বলছিলাম, এখন তো আমাদে একজন ইমাম দরকার।’

    ‘তা দরকার বৈকি। তবে কিছু মনে না করলে বলব, আপনার যা এলেম-আমল এ দায়িত্বটা যদি আপনি নেন তবে আমাদের আর কোন দুশ্চিন্তা থাকে না।’

    তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বরলেন, ‘আপনারা সবাই চাইলে এ দায়িত্ব আমি নিতে পারি। এখানে থাকলে নিরিবিলিতে কিছু এবাদত বন্দেগীর সুযোগ পাবো। যদিও শহরে ইমামতি করেই দিন কাটাতাম কিন্তু হৈ-হাঙ্গামা এ বয়সে আর ভাল্লাগেনা বলেই এখানে চলে এসেছি।’

    তার কথায় লোকজন খুবই খুশি হল। ইমাম হিসাবে এমন একজন অভিজ্ঞ আলেম পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। এলাকার গণ্যমান্য লোকজন সামান্য পরামর্শের পর তাকেই ইমাম হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিল।

    বেতন নিয়ে তিনি কোন দরকষাকষি করলেন না। বললেন, ‘আপনারা যা বিবেচনা করে দেবেন তাতেই আমার হবে। তবে কারো দেওয়া নজরানা, হাদিয়া বা তোহফা আমি গ্রহণ করতে পারবো না। আমার দরকার শুধু খাওয়া-পরা ও স্ত্রীদের নিয়ে পর্দা পুশিদা মত থাকার মত একটা বাড়ি।’

    লোকজন মসজিদের পাশেই কায়েক কামরার একটি বাড়ী খালি করে দিল। সবার সামনে তিনি বাড়ীতে এসে উঠলেন। সাথে দুই স্ত্রী। স্ত্রী দু’জনই বোরকা পড়া, হাতে দস্তানা, পায়ে মোজা। লোকজন হুজুরের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সরবরাহ করল। তার ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হল সবাই। সকলকে মোহিত করল তার সুরেলা কণ্ঠের যাদু।

    মসজিতে আযান দিলেন মৌলভী সাহেব। আযানের শব্দে নিরবতা ছেয়ে গেল সমগ্র এলাকায়। যেন ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে পবিত্র এক সুর। সুরের মূর্চ্ছনায় মসজিদে ছুটে এল মানুষ। যারা বাড়ীতে নামাজ পড়তেন ছুটে এলেন তারাও। এশার পর সমবেত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে ওয়াজ করলেন তিনি। বললেন, প্রতিরাতে এভাবে ওয়াজ করবেন।

    সুরেলা কণ্ঠের প্রতিদিন রাতে এশার নামাজের পর নিয়মিত ওয়াজ করে যাচ্ছেন ইমাম সাহেব। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর খ্যাতি। ছ’সাত মাসের মধ্যে তিনি পুরো এলাকায় সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। তার ভক্তের সংখ্যা বেড়ে চলল প্রতিদিন। অনেকে মুরিদও হল। এ মসজিদে আগে জুম্মা পড়া হত না, তিনি প্রথম জুম্মা চালু করলেন।

    চারদিকে ইমাম সাহেবের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে ওয়াজ শুনতে ছুটে আসতে লাগল দূর-দূরান্তের লোকেরা। তার আলোচনায় স্থান পেত ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো। ইবাদাত এবং ভালবাসা ছিল প্রধান বিষয়। মানুষকে বুঝাতেন, মানুষ নিজে তার ভাগ্য গড়তে পারে না। মানুষ এক দুর্বল কিটাণুকীট। খোদার হাতেই মানুষের ভাগ্য। ওয়াজের সময় পবিত্র কোরান থাকত তার হাতে। মন্ত্রমুগ্ধের মত শ্রোতারা তার কথা শুনত। তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশংসা করে বলতেন, ‘মিসরের সৌভাগ্য যে, তার মত এমন এক ব্যক্তিত্বকে পেয়েছে শাসক হিসাবে।’

    তিনি জিহাদের নুতন ব্যাখ্যা দিলেন। মানুষ নির্দ্বিধায় তা মেনে নিল।

    সুলতান আইউবী খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে জেহাদে শরীক হওয়ার আহ্বান জানালে দু’টো কারণে এ এলাকার লোকারা ব্যাপকভাবে তাতে সাড়া দিয়েছিল। প্রথম কারণটি ছিল অর্থনৈতিক। সুলতান সৈন্যদের যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা দিতেন।

    দ্বিতীয় কারণ, সালাহুদ্দীন আইউবীর দেয়া জ্বালাময়ী ভাষণ। তিনি যখন বললেন, ‘খ্রিষ্টানরা পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের চিহ্ন মুছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হল জিহাদের ময়দানে ঝাড়িয়ে পড়া’ তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ঈমানের শিখা জ্বলে উঠল। জিহাদ যে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ সুলতান ওদেরকে তা ভালভাবেই বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে ইসলামের জন্য জীবন দেওয়ার উদগ্র বাসনা নিয়েই ওরা সুলতানের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিল। এদের বিশ্বাসে চিড় ধরাবার জন্যই ইমামরূপী গোয়োন্দা এখানে আশ্রয় গেড়েছিল।

  • গনগনির গুপ্তধন

    গনগনির গুপ্তধন

    গনগনির গুপ্তধন

    বিমলেন্দু চক্রবর্তী

    প্রকাশক

    শ্রী দ্বিজদাস কর

    অণিমা প্রকাশনী

    ১৪১ কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রীট, কলকাতা-৯

    ফোন : ৩৫-৭৯১৩

    প্রথম প্রকাশ

    জন্মাষ্টমী, ২রা ভাদ্র, ১৩৯১

    ১৯শে আগষ্ট, ১৯৮৪

    মুদ্রক

    শ্ৰী দুলাল চন্দ্র ঘোষ

    নিউ লোকনাথ প্রেস

    ৮এ, কাশী বোস লেন

    কলকাতা-৭০০০০৬

    প্রচ্ছদপট ও ছবি

    বিমলেন্দু চক্রবর্তী

    মূল্য

    আট টাকা

    স্থাপত্য-শিল্পী

    গোপালকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    পরম সুহৃদবরেষু

    লেখকের অন্যান্য রচনা :

    মধ্যদিনের গান

    রহস্যময় মহেনজোদড়ো

    মহাসংগম

    শুশুনিয়ার রহস্য

    রহস্যময় আগন্তুক

    প্রতিবিশ্ব

    সোপান

    বাঘবন্দী

    সাক্ষাৎকারে ভৈরবী সাধিকা

    অজন্তার কথা

    ভারতের গুহাচিত্র

    সরু চাপা গলি। দু’পাশে মাটির বাড়ি। একের পর এক মাটির ঘর। মাথায় বিচালীর চাল। মাটির দেওয়ালে লেপ্টে আছে খোলামকুচি। একখানা দু’খানা নয়—হাজার হাজার খোলামকুচি। কোনটা লাল কোনটা কালো। ফ্যাকাসে কালো রঙের খোলামকুচিও আছে।

    এক দেওয়ালে পোতা আধখানা কলসীর কানা। পটলমামার চোখে পড়তেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। চশমার ফাঁক দিয়ে বাঁকা চোখে দেখলেন। দাঁড়ালেন না। রাস্তা এখানে বাঁক খেয়েছে। একটা সরু রাস্তা নীচের দিকে নেমে গেছে। গলি-পথ আরো সরু। গলির মুখের সামনে একটা লাল বাক্স। পোষ্ট অফিস থেকে ঝুলিয়ে রেখেছে চিঠিপত্র ফেলার জন্যে।

    পটলমামার পাশ থেকে এঙলিঙ নীচের রাস্তায় নেমে গেলেন। ঝটপট কয়েক ধাপ এগিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। দেওয়ালের গায় নিকষ কালো বড় একখানা খোলামকুচি। মাটির ভিতর থেকে দাঁত বের করে যেন হাসছে।

    পটলমামা নামলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখ দু’টি শুধু এগিয়ে গেল। তাকিয়ে আছেন দূরের মজা পুকুরের দিকে। কি যেন ভাবছেন।

    এঙলিঙ বললেন, “ইউ থি….ইউ থি….”

    পটলমামা দেখলেন। তাঁর কপালের চামড়ায় কয়েকটা ভাঁজ খেলে গেল। নিজেকে সামলে নিলেন। বললেন, “কাম ব্যাক।”

    এঙলিঙ ঘুরে দাঁড়ালেন। আবার হাঁটতে শুরু করলেন। গলি বেয়ে রাস্তায় উঠে এসে পটলমামার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দু’জনে নীরব চোখে কি যেন বললেন। তারপর হাঁটা শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে এলেন শাস্ত্রী পল্লীর শেষ প্রান্তে। সেখানেই দুর্ঘটনা ঘটলো।

    গলির মধ্য থেকে হঠাৎ একটা সাইকেল এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো দু’ জনের উপর। আর একটু হলে এঙলিঙ চাপা পড়ে যেতেন। চাপা পড়লেন না। হঠাৎ সাইকেল হুড়মুড় করে কাঁধের উপর পড়তেই লাফ মারলেন। ছিটকে পড়লেন পটলমামার গায়ের উপর। দু’ জনেই পড়ে গেলেন। পটলমামার মুখ থেকে পাইপ ছিটকে পড়লো রাস্তায়।

    যুবকটি পা নামিয়ে নিজেকে সামলে নিল। চোখ বুলিয়ে দেখে নিল দু’ জনকে। তারপরই সাইকেল চালিয়ে দিল। পটলমামার পাইপের উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে তীর বেগে বেরিয়ে গেল।

    পটলমামা উঠে গায়ের ধুলো ঝেড়ে নিলেন। এঙলিঙ চোখের চশমা নাকে ঠিক মত লাগিয়ে ঝোলা কাঁধে তুলে নিলেন। ততক্ষণে পটলমামা পা বাড়িয়েছেন। এঙলিঙ বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁর পিছনে হাঁটতে শুরু করলেন। তাঁদের দেখে মনে হল না এই মুহূর্তে কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে।

    কয়েক পা এগোতেই শাস্ত্রী পল্লীর শেষ বাড়ি এসে গেল। মাটির দোতালা ঘর। সামনে উঠোন। উঠোনে বকুল গাছ। গাছের গোড়া সিমেণ্ট দিয়ে বাঁধানো। উল্টো দিকে বাউরী পাড়া। বাড়ির শেষ প্রান্তে কয়েকটি গাছ। বাঁয়ে উঁচু ঢিপি। ঢিপির উপর তালগাছ। তালগাছের পিছনে খাদ। খাদের পরেই চড়াই। চড়াইতে কয়েকখানা ছোট ঘর। বাউরীরা থাকে।

    দু’ পা এগোতেই রাস্তার পাশে আতা গাছের নীচে হাজার হাজার ঘোড়া। ঘোড়া নয় ঘোড়ার মৃত দেহ। একের উপর আর একটা ঘোড়া মুখ থুবরে পড়ে আছে। কোন ঘোড়ার মাথা স্কন্ধচ্যুত। কোন ঘোড়ার পা ভাঙ্গা। কোন ঘোড়া চিৎ হয়ে আছে। ঠ্যাং চারটে আকাশের দিকে তুলে ধরা। রাস্তার পাশে এমন হাজার হাজার ঘোড়া দেখলে চমকে উঠতে হয়।

    পটলমামা চমকালেন না। ঘোড়ার সমাধির সামনে থমকে দাঁড়ালেন। পিছনে এসে দাঁড়ালেন এঙলিঙ। এ যেন এক যুদ্ধ ক্ষেত্র। লড়াই শেষ হয়েছে। সৈন্যরা সব ফিরে গেছে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে পড়ে আছে হাজার হাজার নিহত ঘোড়া। কালো আর লাল ঘোড়া। বর্ষার জল পেয়ে স্যাঁতলা জমে গেছে।

    এঙলিঙ অস্পষ্ট গলায় বললেন, “ইউ থি।”

    পটলমামা বললেন, “গোরাই গাজীর কবর। এগুলো মানতের ঘোড়া।”

    এঙলিঙ চোখ তুললেন। দেখতে পেলেন আতা গাছের জটলার মধ্যে ইটে গাঁথা কবর। ইটগুলি দাঁত বের করে আছে। মানুষ প্রমাণ উঁচু কবরটি। ছাদ নেই। সামনের দিকে নীচু দরজা। দরজার দু’ পাশে সামান্য নক্‌শা। মাঝখানে সমাধি। সমাধির উপর গাছের শুকনো পাতা। কতদিন ঝাঁটা পড়ে নি যেন। ধূপকাঠী জ্বলে না আর। সন্ধ্যা হলে প্রদীপ জ্বালাতে আসে না কোন ভক্ত নারী। পরিত্যক্ত গোরাই গাজী মাটির নীচে তাঁর সব বিশ্বাস আর কর্মফল নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন।

    পটলমামা আবার অস্ফুট গলায় বললেন, “গোরাই গাজীর কবর।”

    এঙলিঙ পটলমামার মুখে চোখ ফেললেন। পটলমামা কি বলছেন তা বুঝতে পারছেন না। এঙলিঙ গোরাই গাজীর নাম শোনেন নি।

    পটলমামা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। গাঢ় স্বরে বললেন, “কিছুই থাকে না। মহাকাল সব গ্রাস করে। . যুগোত্তীর্ণ নায়ক বিস্মৃত হয়ে যায়। জঙ্গল এসে কবর দখল করে।”

    এঙলিঙ মাথা কাত করে পটলমামার কথাগুলি শুনলেন। তাঁর ছোট চোখ দুটি আরও ছোট হয়ে গেল। পিট্‌-পিট্ করে খানিক সময় দেখলেন কবর। পাশেই জঙ্গলা গাছে ফুটে আছে হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল। বুনো ফুল। তার কয়েকটি তুলে কবরের উপর সাজিয়ে দিলেন। পটলমামা পকেটে হাত ঢুকিয়ে পাইপটা খুঁজলেন। পাইপ পেলেন না। শূন্য হাত পকেট থেকে তুলে আনলেন। চোখ তুললেন আকাশে। আকাশ অনাবৃত নীলে নীল। নীল সমুদ্রের মত। সেই নীল সমুদ্রে সাদা মেঘ সমুদ্রের ঢেউয়ের মত। নীলের পিছনে নীল, তার পিছনে আছে মানুষের অজানা অচেনা অজ্ঞাত এক দেশ। মৃত্যুর পরের কুহেলিকাময় সেই দেশ।

    সামনেই দেখা গেল শীলাবতী নদী। এখান থেকে শুধু বালির এক দীর্ঘ রেখা। তার পরেই সবুজ মাঠ। সবুজ গাছের জটলা। তার ছায়ায় ছায়ায় গ্রাম আর মানুষের নিত্য দিন যাপনের সংসার।

    এপারে শুধু ঢেউয়ের পর ঢেউ। নদীর ঢেউ নয়। মাটির ঢিপি। একের পর এক মাটির ঢিপি। নদীর ঢেউ যেন কার মন্ত্রে মাটি পাথরে পরিণত হয়ে স্থির হয়ে আছে।

    ঢিপির মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা পথ। পটলমামার পিছনে এঙলিঙ। দু’পাশে মাটির ঢিপি। ঢিপির উপর অসংখ্য খোলামকুচি। কোন এক খেয়ালী মানুষ যেন কয়েক হাজার হাড়ি-কলসী এখানে ভেঙে গুড়ো-গুড়ো করেছে। কবে, কোন সময়ে? উত্তর নেই। আকাশে সূর্য। তার রোদ ঢিপির উপর। লাল-কালো খোলামকুচি আর কাঁকড়। কোন কোন কাঁকর কালো। পটলমামা ঝুঁকে একটি তুলে নিলেন। বেশ ভারী। হয়তো পাথরের মধ্যে লোহা। তিনি পাথরের টুকরোটি এঙলিঙের হাতে দিলেন।

    এঙলিঙ পাথরের টুকরো নাকের কাছে এনে দেখলেন। টপ্ করে পাথর আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। পাথর খণ্ড ফিরে আসতেই খপ করে লুফে নিলেন। আবার ভাল করে দেখলেন। পাথরটা পাশের জঙ্গলে ছুড়ে ফেলে দিলেন।

    ততক্ষণে পটলমামা অনেকটা নীচে নেমে গেছেন। এখান থেকে রাস্তা নীচু হয়ে খাদ কেটে শীলাবতীতে গিয়ে মিশেছে। যত নীচে নামা যায় তত বড় খাদ চোখে পড়ে। দু’পাশে পাথর আর কাঁকড়ের তাল দোতালা বাড়ীর মত উঁচু। উপরের দিক কালো। নীচের দিক টকটকে লাল। মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাদ। শাল গাছের চারা। তাদের আঁকাবাঁকা শিকড় সাপের মত পাক খেয়ে ঝুলে আছে।

    পটলমামা থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর ডান দিকে কাঁকড়রমাটির গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটি খোলামকুচি। তিনি চোখ উপর দিকে তুললেন। আঁকা-বাঁকা শালের শিকড় আর কাঁকড়ের শক্ত দেওয়াল। এমন শক্ত মনে হয় পাথরের খোয়া ফেলে কে যেন দুরমুজ করে রেখেছে।

    “ইউ থি….ইউ থি” শুনে পটলমামা ফিরে তাকালেন। তাঁর কয়েক হাত দূরে এঙলিঙ। পিছন দিকে পিঠ ঝুঁকিয়ে ঢিপির উপর চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। কুতকুতে ছোট চোখ দুটি বিস্ময়ে বিস্ফারিত। নাকটা ফুলে আছে। চশমা নীচে নেমে এসে নাকের ডগায় ঝুলছে।

    পটলমামা দ্রুত এগিয়ে এলেন। এসে যা দেখলেন তা বিস্মিত হবার মতই। পাহাড়ের ফুট দুয়েক নীচে লাল মাটির স্তর। সেই স্তরে পর পর সাজানো আছে একের পর এক ভাঙ্গা হাড়ি-কলসীর টুকরো। তাদের গায়ের রং ধুসর কালো।

    একি কোন শ্মশান? দেখে তাই মনে হয়। খোলামকুচির অনেক অংশ বাইরে বেরিয়ে আছে। তার উপরে রোদ পড়েছে। ঝক্-ঝক্ করছে হায়েনার দাঁতের মত। কারো পিঠ পেলেই ছুবলে রক্ত বের করে নেবে।

    শ্মশান আর একটু দূরে। তাই পটলমামা দাঁড়ালেন না।

    ঢালু পথ এগিয়ে শীলাবতীর বালিতে হুমরী খেয়ে পড়েছে। পথের ডান পাশে শ্মশান। শ্মশানের পাশ থেকে নদীর রেখার মত বৃহৎ খাদ। দু’পাশে খাড়াই পাহাড়। বালি ভেঙে চলতে হয়। দু’পাশের পাহাড়ের গায়ে নানা রকম নক্‌শা। ছোট ছোট খাদ। কোথাও পাথর এগিয়ে এসেছে। রোদ পড়েছে। পাশেই দীর্ঘ ছায়া। এ যেন ঘুমন্ত রাজপুরী। একের পর এক প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। জানালা দরজা সব আছে। হাঁ করে খোলা আছে। কিন্তু কোন প্রাণী নেই। নিস্তব্ধ। দুপুরের রোদে ঝিম মেরে আছে। হয়তো এককালে প্রাণ ছিল, প্রাণী ছিল, ছিল সবুজ মায়া। এখন কিছু নেই। ক্ষত বুক হাঁ করে খুলে রেখে রোদের মধ্যে হা-হা করছে।

    পটলমামা শ্মশান পার হয়ে নীচে নামলেন না। দাঁড়ালেন সবুজ বাগানের সামনে। শ্মশানের বাঁয়ে উঁচু ঢিপি। ঢিপির চারিদিকে কাঠি পুঁতে বেড়া দেওয়া! মাঝখানে অনেক গাছ, গাছের পর গাছ। সবুজ পাতা, পাতার ফাঁকে ফুল। রুক্ষ লাল ঢিপির মাঝখানে যেন জীবনের সবুজ উজ্জ্বলতা।

    দরজা খোলাই ছিল। পর পর ইট সাজিয়ে সিড়ি তৈরী। সিঁড়ির মাথায় বিচালীর চালের ছোট মাটির ঘর। পটলমামা উপরে ওঠা শুরু করলেন। উপরে উঠতেই খানিকটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উঠোন। আরো দু’খানা মাটির ঘর। মাঝখানের ঘরে কালীর মূর্তি। কালো কালী নয়, নীল কালী। শ্মশান কালী সাধারণত নীল হয়ে থাকে।

    পাশের ছোট ঘর থেকে ছ্যাক্ ছ্যাক্ আওয়াজ আসছে। একটু একটু ধোঁয়াও বাইরে এসে গাছের পাতা বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ওটি রান্না ঘর। মাছ ভাজার শব্দ আসছে তা এঙলিঙ বুঝতে পারলেন। তাঁর নোলায় জল এসে গেল। অন্যমনস্ক হতে গিয়ে কালীর মূর্তি দেখতে পেলেন। অমনি বলে উঠলেন, “ইউ থি, মাডাল খালি।” হাঁটু ভেঙে বসে ভক্তি সহকারে প্রণাম করলেন।

    পটলমামা প্রণাম করলেন না। একটা দড়ির খাটিয়া পাতা ছিল। গিয়ে তার উপর জাঁকিয়ে বসলেন। পিঠের থলে খুলে একটা পাইপ বের করলেন। তামাক পুরে আগুন লাগিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে তাকালেন। মাথার ওপর দেখতে পেলেন আকাশমণি গাছ। কুচি-কুচি হলুদ ফুল ফুটে আছে। হাওয়ায় ডালপালা দোল খাচ্ছে। অমনি ঝাঁকে-ঝাঁকে আকাশমণি ফুল ঝরে পড়ছে। হলুদ রংয়ের যেন বৃষ্টি নামছে।

    এঙলিঙ দু’-একবার রান্না ঘরের দিকে উঁকি-ঝুঁকি মেরে এসে বসলেন পটলমামার পাশে। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে বললেন, “টান্‌ট্রিক ভৈলব ইন খিচেন লুম।” কথাটা বলে পটলমামার মুখে চোখ ফেললেন। পটলমামার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন।

    খড়মের আওয়াজ শুনে চোখ খুললেন। দেখতে পেলেন দীর্ঘকায় এক পুরুষকে। গায়ের রং ফর্সা। চিবুকের নীচে কাঁচা-পাকা দাঁড়ি, মাথায় জটা নেই, আছে কাঁধ পর্যন্ত চুল। কপালে রক্ততিলক নেই দেখে এঙলিঙ হতাশ হলেন।

    খড়ম বাজিয়ে সামনে এসে সাধুজী জিগ্যেস করলেন, “আপনারা?”

    পটলমামা যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। বললেন, “আপনি একজন প্রাক্তন বিপ্লবী। দেশমাতৃকা ছেড়ে কালীমাতায় এলেন কেন?”

    সাধুজী একটু গম্ভীর হলেন। বললেন, “আপনি যা শুনেছেন তা সত্যই শুনেছেন। তবে মায়ের মূর্তি কেন তা বলতে পারবো না। কার্যকারণ সূত্রে অনেক ওলট-পালট ঘটনা জীবনে ঘটে। ঘটে না-কি?” পটলমামার চোখে চোখ ফেলে জিজ্ঞাসা করলেন।

    পটলমামা বললেল, “হ্যাঁ, এ রকম ঘটে। এই দেখুন না আমাকে, এক সময় ছিলাম আবগারী দারোগা। এখন চাকরি ছেড়ে বাউণ্ডুলের মত ঘুরে মরছি।”

    সাধুজী বললেন, “চাকরি ছেড়ে দিলেন!”

    পটলমামা বললেন, “হ্যাঁ। পাগলামী বলতে পারেন। তবে এ রকম পাগলামীও কোন কোন মানুষ করে।”

    পটলমামা আবগারী দারোগা ছিলেন শুনে এঙলিঙ খিক্ থিক্‌ করে হেসে উঠলেন। পটলমামা ফিরে তাকাতেই অপ্রস্তুত হয়ে হাসি থামালেন। পটলমামা ডাহা মিথ্যা পরিচয় দিচ্ছিলেন বলেই এঙলিঙের হাসি পেয়েছিল।

    সাধুজী এঙলিঙকে দেখে একটু বিস্মিত হলেন। বললেন, “ইনি?”

    পটলমামা বললেন, “মিঃ এঙলিঙ। তিব্বতী দার্শনিক।”

    এঙলিঙ মাথা নীচু করে অভিবাদন জানিয়ে ফিক্ করে একটু হেসে দিলেন। বললেন, “ইউ থিত দাউন।”

    সাধুজী ভাঙ্গা চেয়ারটায় চেপে বসলেন। বসে দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে কাঁচা-পাকা দাঁড়িকে পরিপাটি করে বললেন, “আপনার নামটি জানতে পারি? আমার নাম সুকুমার রায়। এই গড়বেতারই মানুষ।”

    পটলমামা ঘরের মধ্যে কালীমূর্তির দিকে একবার তাকালেন। চোখ ফিরিয়ে এনে বললেন, “হারাধন চক্রবর্তী।”

    পটলমামা নিজের নাম ‘হারাধন চক্রবর্তী’ বলতেই এঙলিঙ ফিক্ করে হাসতে গিয়ে পটলমামার চোখে চোখ পড়তেই হাসি আটকে ফেললেন।

    সাধুজী নাম শুনে সামান্য একটু হাসলেন। পটলমামা সে হাসি দেখতে পেলেন বলে লজ্জা পেলেন। হাসি সামলে লজ্জিতভাবে বললেন, “ডাক-সাইটে আবগারী দারোগার নাম হারাধন। যে ধন হারিয়ে গেছে তাইতো হারাধন।”

    তিনজনে একসঙ্গে হেসে উঠলেন।

    হাসি থামতেই পটলমামা ঝট্ করে উঠে পড়লেন। দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালেন। দেখতে পেলেন সাইকেলটিকে। সেই পথের যুবকটি সাইকেল নিয়ে নীচের উৎরাইতে দাঁড়িয়ে আছে। পটলমামাকে দেখতে পেয়েই ঝট্ করে সরে গেল। সাইকেল চালিয়ে ঢিপির আড়ালে চলে গেল।

  • নীলাঙ্গুরীয়

    নীলাঙ্গুরীয়

    ‘নীলাঙ্গুরীয়’ বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৫৭ সালের মাঘ মাসে। প্রকাশক শ্রীশচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রকাশ ভবন, ১৫, বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলকাতা ৭৩। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন শ্রীমনোজ বিশ্বাস। মুদ্রাকর শ্রীঅশোককুমার পাঁজা, শিবদুর্গা প্রিণ্টার্স, ১৫১ রামদুলাল সরকার ষ্ট্রীট, কলকাতা ৭০০ ০০৬। উপন্যাসটির উৎসর্গ লেখা হয়েছিল— “আমার স্নেহভাজন কনিষ্ট শ্রীহরিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে”। এই উপন্যাস সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ‘আনিসুজ্জামান’ লেখেন—

    “হাস্যরসের ছোটগল্পের পশরা নিয়ে ১৯৩০-এর দশকে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৬-১৯৮৭)। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গিয়েছিল যে, হাস্যরস তাঁর রচনার মূল উপাদান হলেও তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কারুণ্য। জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি। মানুষের স্বভাবজ খেয়ালিপনা ও আচরণগত অসংগতিতে যেমন তিনি হাসির খোরাক পেয়েছেন, তেমনি জীবনের নানা ক্ষেত্রে বিচিত্র দ্বন্ধ-সন্ধি থেকে উচ্ছ্বসিত বেদনারও সন্ধানলাভ করেছেন। তাঁর রচনায় তাই হাস্য ও করুণের এমন মেশামেশি। তাঁর অবিস্মরণীয় চরিত্র রাণু যেমন পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার নিত্যনতুন ফন্দি এঁটে আমাদের হাসির উদ্রেক করে, তেমনি তার বাল্যবিবাহের কালে শৈলেনকাকার কাছে আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার করে আমাদের চোখ অশ্রুসজল করে দেয়।

    নীলাঙ্গুরীয় (১৯৪২) বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস। এর রচনাপ্রণালি কিন্তু সম্পূর্ণতই ভিন্ন। উপন্যাসটির উপজীব্য প্রেম। কিন্তু উপন্যাসের প্রথমেই নায়কের জবানিতে লেখক প্রশ্ন উত্থাপন করেন : ‘ভালবাসা কি সব সময়েই তাহার সেই চিরন্তন রূপেই দেখা দিবে?—সেই আবেগ-বিহ্বল কিংবা অশ্রুসজল? ঘৃণা কি সব সময়েই ঘৃণা?’ তারপর কাহিনির কথক জানিয়ে দেন : ‘ভালবাসায় গরল থাকিতে পারে। অন্তত আমার বেলা তো ছিল।’ উপন্যাসটি এই গরলামৃতের কাহিনি। বস্তুত অন্যত্রও বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় প্রেমকে দেখেছেন একটি জটিল বৃত্তিরূপে। তার সঙ্গে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, পীড়নস্পৃহা—সবই জড়িয়ে থাকতে পারে।

    প্রায় সকল বিষয়ে উদাসীন ব্যারিস্টার রায়ের কনিষ্ঠ কন্যা তরুর গৃহশিক্ষকরূপে এই অভিজাত পরিবারে শৈলেনের আশ্রয়লাভ ঘটে। তরুর দিদি মীরার তত্ত্বাবধানের মধ্যে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক আভাসিত হলে শৈলেনের মন বিদ্রোহ করে। কিন্তু অচিরেই সে মীরার রহস্যপরায়ণ আচরণের মধ্যে প্রেমের দ্যোতনা উপলব্ধি করে এবং মীরার প্রতি নিজের আকর্ষণও সবিস্ময়ে আবিষ্কার করে। দুজনের সামাজিক অসমকক্ষতা সম্পর্কে দুজনেই সচেতন। তার উপরে মীরার প্রকৃতির মধ্যে আছে আভিজাত্যের অভিমান আর শৈলেনের চারপাশে রয়েছে নিজের অবস্থাবৈগুণ্যজনিত আত্মরক্ষা প্রবৃত্তির স্বরচিত দেওয়াল। ফলে আবেগ ও উচ্ছ্বাসের জায়গা প্রায়ই নিয়ে নেয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। নায়ক-নায়িকার অসাধারণ সংযম ও আত্মদমন উভয়ের মধ্যে চিরবিচ্ছেদ ঘটিয়ে উপন্যাসকে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ দান করে। মীরার সঙ্গে তার সম্পর্ককে শৈলেন বারংবার ‘ঘৃণায়-মেশানো ভালবাসা’ বলে উল্লেখ করেছে—তা নীলকান্তমণির মতোই নীল, তার মতোই খাঁটি। সে এই গরলামৃত পান করেছে, জন্মজন্মান্তর ধরে সেই গরলামৃত পান করার কামনাই ব্যক্ত করেছে—মীরার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেনি।

    মীরার চরিত্র-প্রসঙ্গে শৈলেন বলেছে :

    ওর এই খুবই কাছে আসাটাকে আমি যেমন প্রার্থনা করি, তেমনি আবার সন্দেহের চক্ষেও দেখি,—লক্ষ্য করিয়াছি মীরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে যখন খুব কাছে আসিয়া পড়ে তাহার পর হইতে অতি সামান্য একটা ঘটনাকে উপলক্ষ করিয়া—কখন বা উপলক্ষ না থাকিলেও—ঝপ করিয়া দূরে সরিয়া যায়। এই সময় জাগে তাহার সেই নাসিকার কুঞ্চন। আমাদের দু-জনের দূরত্বটা—যাহা মীরাই মিটাইয়া আনে—আবার স্পষ্ট হইয়া উঠে ৷

    মীরার আচরণের ব্যাখ্যায় তার মা বংশগতির প্রভাবের কথা বারবার বলেছেন। সেটাই হয়তো সব নয়। তার হৃদয়াবেগ ও ঔচিত্যবোধের স্পষ্ট দ্বন্দ্বের মধ্যে অনেকখানি দুর্জ্ঞেয়তা রয়ে গেছে। শৈলেনকে সে কেমনভাবে দেখেছে, তা আমরা জানতে পারি না। কেননা গোটা উপাখ্যানই শৈলেনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা।

    উপন্যাসটির তিনটি ভাগ : ‘মীরা’, ‘মীরা-সৌদামিনী’ ও ‘সৌদামিনী’। সৌদামিনী অনিল ও শৈলেনের বাল্যবন্ধু। দুজনের একজনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা গভীরতর হতে পারত। অনিল যে তাকে কামনা করেছিল, তা বোঝা যায়। শৈলেন বরঞ্চ ছিল কিছুটা উদাসীন। কিন্তু উদাসীনের প্রতিই সৌদামিনীর আকর্ষণ ছিল অধিক। একমাত্র অভিভাবক দিদিমার মৃত্যুর পরে ভাগবত হালদার উপযাচক হয়ে সৌদামিনীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে—তা কেবল পরোপকারবৃত্তির বশবর্তী হয়ে নয়। পরে সে সৌদামিনীর বিয়ে দিয়ে দেয় তার বৃদ্ধ কুটুমের সঙ্গে। অনিল তখন স্ত্রীপুত্র নিয়ে সংসারী, কিন্তু সৌদামিনীকে ভোলেনি। সে তার বৈধব্য কামনা করে এবং — মীরার প্রতি শৈলেনের ভালোবাসা নিষ্ফল হবে ধরে নিয়েই—সে শৈলেনকে বলে বিধবা সৌদামিনীকে বিয়ে করতে, নইলে তাকে আবার ভাগবতের নরকেই ঢুকতে হবে। সৌদামিনীর সঙ্গে আলাপে শৈলেন টের পায় যে, তার প্রতি সৌদামিনীর আকর্ষণ এখনো অটুট। সৌদামিনী যথার্থই বিধবা হয়, ভাগবতের আশ্রয় থেকে তার উদ্ধার হয় না, পরে সে চলে যায় সিনেমার জগতে—অনিলের কাছে তা মরণসমান। শৈলেন বলেছে, সৌদামিনী তাকে খাঁটি সোনা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সে তা নিতে পারেনি, কেননা নিখাদ সোনা নিতে হয় নিখাদ সোনা দিয়েই, শৈলেনের সুবর্ণ তো আগেই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল—মীরাকে। মীরার ভালোবাসা যে কী, সে-ব্যাখ্যা তো আগেই দেওয়া হয়েছে। মীরা শৈলেনের কাছে অনুযোগ করেছিল : ‘বলুন… আমার সর্বনাশের মধ্যে থেকে আমায় কেন জোর ক’রে টেনে নিলেন না?… কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শৈলেন আগেই দিয়েছিল : ‘আমি তোমায় সুখী করতে পারতাম না, কিন্তু আমি দুর্বল, মন স্থির করে উঠতে পারছিলাম না।’ সৌদামিনীও হয়তো একই প্রশ্ন করতে পারতো শৈলেনকে। শৈলেন হয়তো তাকে রক্ষা করার চেষ্টা না করার অপরাধ স্বীকার করে।

    নীলাঙ্গুরীয় তবু ত্রিভুজ প্রেমের উপন্যাস নয়, একান্তই মীরা-শৈলেনের প্রেমের কাহিনি। সৌদামিনীর মধ্য দিয়ে প্রেমের অন্য একটি রূপ প্রকাশিত হয়েছে মাত্র। নায়ক-নায়িকা ছাড়াও সৌদামিনী, অনিল, অম্বুরী, সরমা, তরুর চরিত্রাঙ্কনে সিদ্ধহস্তের ছাপ বিদ্যমান। মিস্টার রায় কতকটা ছাঁচে ঢালা, তবে সর্বত্র অসাধারণত্বের পরিচয় পাওয়া যায় অপর্ণা রায়ের চরিত্রে। উপন্যাসের বর্ণনা আগাগোড়াই সংযত। তবে আবেগের যথাযথ স্থানও আছে এতে। প্রায় নিরুদ্দিষ্ট পুত্রকে নিয়ে অপর্ণা দেবীর আবেগ, বৃদ্ধা ভুটানির মর্মন্তুদ হাহাকার, শৈলেনের অন্তর্জগতের কোলাহল অনিলের অসহায়ত্ববোধ—এসব তার উদাহরণ। শৈলেনের মর্মভেদী কৌতুক উপন্যাসের ট্রাজেডিকে গভীরতা দিতে সাহায্য করেছে।

    নীলাঙ্গুরীয় কেবল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নয়, বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

    উৎসর্গ

    আমার স্নেহভাজন কনিষ্ঠ

    শ্রীহরিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    ‘নীলাঙ্গুরীয়’ বইখানির একটু ইতিহাস আছে। শ্রাবণ, ১৩৪৬-এর শনিবারের চিঠিতে “কশ্চিৎ প্রৌঢ়” ‘ভালবাসা’ শীর্ষক একটি রচনা প্রকাশিত করেন। লেখক তাহাতে ভালবাসার নানা বৈচিত্র্য সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া শেষে তাঁহার পাঠকের নিজের নিজের অভিমত জানাইবার জন্য আহ্বান করেন।

    সকলেই স্বীকার করিবেন যে, মানুষের এই মনোবৃত্তিটি উপরে উপরে মোটামুটি সবল এবং নিরীহ মনে হইলেও আসলে অত্যন্ত জটিল। ‘কশ্চিৎ প্রৌঢ়ে’র আহ্বানে আমি ‘ভালবাসা’ নামক একখানি গল্প ‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশিত করি; যাহা পরে ‘বসন্ত’ নামক গল্প সংগ্রহে বাহির হইয়াছে। তাহাতে দেখিয়াছি ভালবাসার সঙ্গে মার খাওয়াইবার ইচ্ছা থাকাও বিচিত্র নয়।

    বৃত্তিটির জটিলতার আরও একটা দিক দেখাইবার ইচ্ছা থাকায় এই বইখানির অবতারণা। কতদূর সফল হইলাম বিদগ্ধ পাঠক বিচার করিবেন। আর একটা কথা,—‘নীলাঙ্গুরীয়’ কৌতুক রসের লেখা নয়। গোড়া থেকেই একটা অন্যবিধ প্রত্যাশায় থাকিয়া পাঠে বাধা জন্মাইতে পারে বলিয়া এটুকু বলিয়া দেওয়া প্রয়োজন মনে করিলাম।

    বইখানির প্রুফ দেখিয়া দিয়া সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমার চিরঋণী করিয়াছেন।

    জন্মাষ্টমী
    (১৩৪১)
    ব. ভ. ম
  • মুহাম্মদ বিন কাসিম

    মুহাম্মদ বিন কাসিম

    মেজর জেনারেল আকবর খান

    আমীর-ই-মুজাহিদীন

    মুহাম্মদ বিন কাসিম

    তরজমায়

    আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী

    ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ

    হিজরী পনের শতক উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত

    মুহাম্মদ বিন কাসিম : মেজর জেনারেল আকবর খান; আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী অনূদিত॥ ই. ফা. বা. প্রকাশনা : ১৩৪১॥ ই.ফা.বা. গ্রন্থাগার ৯২৩:১৯৭॥ বিষয় : জীবনী॥ প্ৰথম প্ৰকাশ : নভেম্বর ১৯৮৬, কার্তিক ১৩৯৩, সফর ১৪০৭॥ প্ৰকাশনায় : আবুল বাশার আখন্দ, অনুবাদ ও সংকলন বিভাগ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, বায়তুল মুকাররম, ঢাকা-২। প্রচ্ছদ : কামাল আহমেদ॥ ইলাস্ট্রেশন : কাজী শামসুল আহসান॥ মুদ্রণে : শেখ আবদুর রহিম, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন প্রেস॥ বাঁধাইয়ে : ওরিয়েন্টাল বাইণ্ডার্স ৫৯, পূর্ব বাসাবো বাজার, ঢাকা-১৭

    MUHAMMAD BIN QUASIM (The Biography of Muhammad bin Quasim) : Written in Urdu by General Akbar Khan, translated into Bengali by Abu Sayeed Muhammad Omar Ali and published by the Islamic Foundation Bangladesh. November 1986.


    যে কালো হাতের হিংস্র থাবায় জীবনের প্রথম প্রভাতেই ঝরে গেল মুহাম্মদ বিন কাসিম, কুতায়বা বিন মুসলিম, ‘আবদুল আযীয ইব্‌ন মূসা, ওমর ইব্‌ন ‘আব্দুল আযীয (র)-এর ন্যায় অনেক সম্ভাবনাময় যুবা ও তরুণের তরতাজা প্রাণ, থিতিয়ে গেল মুসা বিন নুসায়র ও তারিক বিন যিয়াদের ন্যায় বহু প্রৌঢ় ও যুবকের উৎসাহ-দীপ্ত আবেগ,—

    যে কালো হাতের বিষাক্ত ছোঁয়ায় হারিয়ে গেলেন হাসান আল-বান্না, সায়্যিদ কুত্‌ব, মুহাম্মদ ম্যালকম এক্স, ইসমা‘ঈল আল-ফারূকীর ন্যায় অনেক মনীষী—

    সেই কালো হাতের চির-ধ্বংস সাধনে প্রতিজ্ঞা-দীপ্ত তরুণদের হাতে।

    —অনুবাদক


    লেখক কর্তৃক লিখিত ও অনূদিত কয়েকটি বই

    • ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার (২য় সং)
    • ঈমান যখন জাগলো (২য় সং)
    • ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক (৩য় খণ্ড, ২য় সং)
    • ইসলামে প্রতিরক্ষা কৌশল (১ম সং) — (“মহানবী (সা)-র রণ-কৌশল” নামে ২য় সং প্রকাশের পথে
    • খালিদ বিন ওয়ালীদ (১ম সং)
    • ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক (১ম খণ্ড, প্রকাশের পথে)
    • গল্প পড়ি জীবন গড়ি (শিশু-কিশোর গ্রন্থ, ২য় সংস্করণ)
    • তাঁরা ছিলেন মানুষ (শিশু-কিশোর গ্রন্থ, ১ম সং)

    আমাদের কথা

    পৃথিবীর সমর নায়কদের ইতিহাসে মুহাম্মদ বিন কাসিম একটি অবিস্মরণীয় নাম। উমাইয়া খলীফা প্রথম ওয়ালীদের অন্যতম সিপাহসালার হাজ্জাজ ইবনে য়ূসুফের জামাতা সপ্তদশবর্ষী তরুণ যুবক মুহাম্মদ বিন কাসিম মুসলিম জাতির গৌরব। পৃথিবীর সমর ইতিহাসে এত অল্পবয়স্ক যুবকের নেতৃত্বে কোন সমরাভিযান পরিচালিত হয়েছে কি-না তা আমাদের জানা নেই। মূলত তাঁরই প্রজ্ঞা, তাকওয়া, সমর-কুশলতা ও কুরবানীর বদৌলতে এই উপমহাদেশ মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! এ বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণ সমর নেতাকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এক দিকে তাঁর অসম সাহসিকতা, বীরত্ব ও রণকূশলতা কিংবদন্তীর ন্যায় প্রচলিত, অপর দিকে তাঁর অকাল মৃত্যুর করুণ কাহিনী শোকাবহ ঘটনা হিসেবে অবিস্মরিত।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম সম্পর্কে তথ্য-নির্ভর কোন পুস্তক বাংলা ভাষায় নেই বললেই চলে। প্রখ্যাত সমর বিজ্ঞানী জেনারেল মুহাম্মদ আকবর খান প্রণীত “আমীরে মুজাহিদীন মুহাম্মদ বিন কাসিম” শীর্ষক গ্রন্থটি একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। লেখক অত্র পুস্তকে সমর-নায়ক ও রণকুশলী যোদ্ধা হিসেবে মুহাম্মদ বিন কাসিমের ঘটনা-বহুল ও তথ্যসমৃদ্ধ জীবনী তুলে ধরেছেন। লেখকের আলোচনা পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত। যুগের চাহিদা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অতি নিখুঁত-ভাবে তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবনী উপস্থাপনা করেছেন। বইটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন অধ্যাপক এ. এস. এম. ওমর আলী। তিনি একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত লেখক ও খ্যাতনামা অনুবাদক। অনুবাদের ভাষা প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য। আল্লাহ তা’আলা অনুবাদকের কলমকে আরও মযবুত করে দিন।

    ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ অতি অল্প সময়ের মধ্যে আলোচ্য পুস্তকটি প্রকাশ করত সুধী পাঠক মহলে উপহার দিতে পেরে রাহমানু’র-রাহীমের দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছে।

    ফরীদুদ্দীন মাসউদ

    পরিচালক

    অনুবাদ ও সংকলন বিভাগ

  • আভা ও তার প্রথম পুরুষ

    আভা ও তার প্রথম পুরুষ

    আভা ও তার প্রথম পুরুষ

    প্রথম প্রকাশ : নবেম্বর ১৯৮৮

    প্রকাশক: ওয়াজির হাসান, জাহাঙ্গীর ব্রাদার্স, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০

    সর্বস্বত্ব: লেখক

    প্রচ্ছদ: নাছির হাসান

    প্রকাশকের কথা

    লেখকের মৃত্যুর পর প্রথম বারের মতো আমরা পাঠকদের জন্য তাঁর অপ্রকাশিত নতুন উপন্যাস ‘আভা ও তার প্রথম পুরুষ’ দিতে পেরে আনন্দিত। সেই সাথে লেখকের অপ্রকাশিত অন্যান্য উপন্যাসগুলিও পাঠকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বই রূপে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

  • ভয়ংকর ষড়যন্ত্র

    ভয়ংকর ষড়যন্ত্র

    দীর্ঘদিন থেকে সুলতান মিসরে অনুপস্থিত। বেড়ে গেছে বিরোধীদের তৎপরতা। খ্রিস্টানরা উস্কে দিয়েছে পদচ্যুত ফাতেমী খেলাফতের অংশীদারদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন। খ্রিস্টান গোয়েন্দায় ভরে গেছে সমগ্র কায়রো। অর্থ আর নারী দেহের উষ্ণতায় নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে সুলতানের বিশ্বস্ত কয়েকজন। গোয়েন্দা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ইহুদি যুবতীদের কুটজালে ধরা ‍দিয়েছে প্রশাসনের উচ্চভিলাষী কতিপয় কর্মকর্তা। ওদের জাতীয় চেতনাবোধ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ক্ষমতার মোহে বিভোর এসব ব্যাক্তিদের হারেমের শোভাবর্ধন করছিল খ্রিস্টানদের রুপসী গোয়েন্দা যুবতীরা।

    ঘাতক দলের সদস্যরা ছিল আরও তৎপর। মিসর এখন ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের লীলাভূমি। অবস্থা এমন যে, কেবলমাত্র কোন অলৌকিক ঘটনাই মিসরকে রক্ষা করতে পারে।

    খ্রিস্টানদের সহযোগিতায় সুদানীরা মিসর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সেনাবাহিনীর এক অংশ বিদ্রোহের জন্য তৈরী। ভারপ্রাপ্ত গভর্নরের চোখে ঘুম নেই। সালাহুদ্দীন আইউবী সময়মত না এলে মিশর রক্ষা করা যাবে না। একসঙ্গে ভেতরের এবং বাইরের মোকাবিলা করা ভারপ্রাপ্ত গভর্ণরের পক্ষে সম্ভব নয়।

    খিজরুল হায়াত। দ্বীনদার এবং বিশ্বস্ত। মিসরের অর্থ সচিব। সাদামাটা জীবন পছন্দ করেন, অমায়িক। সুলতান নিজেই তাকে অর্থ সচিবের পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার সাথে মিসরের অর্থনীতি পুনঃ বিন্যাস করেছেন তিনি। এক রাতে বাইরে থেকে ফিরেছেন হায়াত। সবেমাত্র বাড়িতে পা রেখেছেন। আঁধার ফুঁড়ে ছুটে এল একটা তীর। বিধঁল খিজরুল হায়াতের পিঠে। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। উপর হয়ে পড়ে গেলেন তিনি। কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এল ব্যথাভরা চিৎকার। চিৎকার শুনে চাকর বাকররা ছুটে এল। ছুটে এল পরিবার পরিজন। ঘটনার আকস্মিকতায় থ’ হয়ে গেছে সবাই। কারও মুখে কথা নেই। মারা গেছেন খিজরুল হায়াত। একজন চাকর লক্ষ্য করল মৃত্যুর পূর্বে তিনি মাটিতে কিছু লেখার চেষ্টা করছিলেন। চাকরটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। মাটিতে লিখা মুসলেহ। ‘হ’ টা অর্ধেক লিখেছেন হত্যাকারীর পুরো নাম লিখার পূর্বেই মারা গেছেন তিনি। লিখাটা সংরখন করে লাশটা তুলে নেওয়া হল। একজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলকিসের কাছে। গিয়াস ছিলেন সুলতানের বিশ্বস্ত। আলী বিন সুফিয়ানের মত অপরাধ দমনে অভিজ্ঞ।

    সংবাদ পেয়েই ছুটে এলেন গিয়াস বিলকিস। গভীর মনযোগ দিয়ে নামটি দেখলেন। ততোক্ষণে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান মুসলেহ উদ্দিনও ছুটে এসেছেন। গিয়াস দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলেন তাকে। সন্তর্পণে মাটির লেখাটা পা দিয়ে মুছে ফেললেন।

    ‘যত তারাতাড়ি সম্ভব হত্যাকারীকে খুঁজে বের করুন।’ বললেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। ‘আগামীকাল ভোরেই আমি অপরাধীকে দেখতে চাই।’

    ‘আমি অপরাধীকে খুঁজে বের করব স্যার।‘ পুলিশ প্রধানের কন্ঠ।

    সবাই ফিরে গেলেন। রাতে গিয়াস খিজরুল হায়াতের সহকারী অফিস স্টাফসহ তার নিকটস্থ লোকদের ডেকে পাঠালেন। ওদের কাছে জানা গেল, আজ হায়াত সচিবদের এক মিটিংয়ে অংশগ্রহন করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সহকারি। মিটিংয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে সামরিক বাজেটের প্রসঙ্গ আসে। হায়াত বললেন, ‘সুলতান সুবাকে নতুন ফৌজ ভর্তি করেছেন। ওদের বেতনাদি দিতে হলে মিসরে অপ্রয়োজনীয় বাজেট কমাতে হবে।’

    এর বিরোধীতা করলেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি বললেন, ‘নতুন সৈন্য ভর্তি করার পূর্বে আমাদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। এমনিতেই সেনাবাহিনী সাদা হাতীতে পরিণত হয়েছে। মিসরের ফৌজ অশান্ত হয়ে আছে। তাদের অভিযোগ, সুবাকে প্রাপ্ত গনিমতের মাল থেকে তাদেরকে কিছুই দেওয়া হয়নি।’

    ‘আপনি কি জানেন না, গনিমতের সম্পদ ভাগ-বাটোযারা করে দেয়ার নিয়ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে?’

    হায়াত বললেন, ‘চমৎকার সিদ্ধান্ত। যারা গনিমতের জন্য যুদ্ধ করে তাদের ভেতর জাতীয় চেতনাবোধ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকে না।’

    এক পর্যায়ে এ আলোচনা বিতর্কে রূপ নিল। উত্তেজিত হয়ে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান বললেন, ‘সুলতান মিসরীয় সৈন্যদের সাথে ভাল ব্যবহার করেন না, যেমনটি করেন সিরীয় এবং তুর্কি সৈন্যদের সাথে।’

    ‘মনে হচ্ছে খ্রিস্টান এবং ফাতেমীরা আপনার মুখ দিয়ে কথা বলছে।’

    উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে মিটিং সমাপ্ত করে দেওয়া হল। অর্থ সচিবের সহকারী জানালেন, মিটিং শেষে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান স্যারের অফিসে এলেন। এখানেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হল। স্যার উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে বললেন, ‘আমি সুলতানের কাছে এ প্রসঙ্গ তুলব। বলব, আপনি ভর জলসায় সবাইকে বুঝাতে চেয়েছেন যে সেনাবাহিনী অশান্ত। আপনি বলেছেন, সুলতান সবার সাথে সমান ব্যবহার করেন না এবং গনিমতের মাল মিসরের সৈন্যদের না দিয়ে অন্য সৈন্যদের দিচ্ছেন। এছাড়া আপনি আমাকেও আপনার দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধান কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় বললেন, ‘তুমি বেঁচে থাকলে তো সুলতানকে এসব জানাবে।’

    উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে গিয়াস কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। কারণ পুলিশ বিভাগ তার অধীন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলার পূর্বে অবশ্যই প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকতে হবে। পুলিশ প্রধান বুঝলেন এ হত্যা ব্যাক্তিগত কারণে হয়নি। তিনি গোপনে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন।

                                                   

    পুলিশ প্রধান বিভিন্ন প্রমাণে যা জানলেন, তা হল, হত্যা ঘটনার দু’দিন পর মুসলেহ উদ্দীন রাতে বাসায় ফিরলেন। প্রথম স্ত্রী তাকে ডেকে নিলেন নিজের কক্ষে। তিনি ঢুকতেই স্ত্রী বিশটা আশরাফি তার সামনে রেখে বললেন, ‘খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী এ বিশ আশরাফি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।’ স্ত্রী এক টুকরা কাগজ স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। তাতে লেখা ছিল- ‘পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টুকরা স্বর্ণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু দিয়েছেন বিশ আশরাফি। আপনার স্ত্রীর কাছে দিয়ে গেলাম। আমাদের ধোকা দিয়েছেন। এখন একশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দিতে হবে। তা নয়তো একটা তীর খিজরুল হায়াতের মত আপনার হৃদপিন্ডেও গেঁথে যাবে।’

    মুসলেহ উদ্দীনের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কিছুটা সংযত হয়ে বললেন, ‘তুমি কি বলছ? ওরা কারা? কাউকে আমি কোন আশরাফি দেয়ার কথা বলিনি। বিশ্বাস কর, হায়াতের হত্যার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।’

    তুমিই হায়াতকে হত্যা করেছ। কি কারণে জানি না, তবে তুমি যে তার হত্যাকারি এতে কোন সন্দেহ নেই।’

    মুসলেহ উদ্দীনের প্রথম স্ত্রী সাবেরা। বয়স ত্রিশের কোঠায়, সুন্দরী। দেহের গাঁথুনি এখনও অটুট। পুরুষকে আকর্ষণ করার মত রূপ এখনও তার রয়েছে। মাস খানেক পূর্বে অপরূপা একজন তরুনীকে বাড়ি নিয়ে এসেছেন মুসলেহ উদ্দীন। এরপর থেকেই প্রথম স্ত্রীর কক্ষে যাওয়া বন্ধ। কয়েক দিনই তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সাবেরা, কিন্তু তিনি যাননি। তখন একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বেআইনী ছিল না। স্ত্রীরাও এতে কিছু মনে করতেন না। হত্যাকারীদের চিঠি পেয়ে ভড়কে গেলেন সাবেরা। স্বামীর অকল্যাণ কল্পনায় কেঁপে উঠল তার মন। এজন্যই তাকে ‍নিজের কক্ষে ডেকে এনেছিলেন।

    ‘মুখ বন্ধ রাখবে সাবেরা।’ গম্ভীর কন্ঠে বললেন মুসলেহ উদ্দীন। ‘এ হচ্ছে আমার দুশমনের একটা চাল। তারা তোমার এবং আমার মাঝে শত্রুতা সৃষ্ঠি করতে চাইছে।’

    ‘আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা ছাড়া তোমার মনে কি অন্য কিছু আছে?’

    ‘তোমায় আমি ভালবাসি সাবেরা। সেই প্রথম দিনের মত। তুমি কি ওদের কাউকে চিনতে পেরেছ?’

    ‘ওরা মুখোশ পরেছিল। তবে তোমার মুখোশ খুলে গেছে। তোমায় আমি চিনে গেছি।’

    স্বামী কিছু বলতে চাইছিলেন। তাকে কিছু বলতে না দিয়ে সাবেরা বলল, ‘সম্ভবতঃ তুমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করেছ। জেনে ফেলেছে সচিব। এ জন্যই গোপন আততায়ীর মাধ্যমে তাকে খুন করেছ।’

    ‘কেন আমায় মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ। কোষাগারের অর্থ আমি কেন আত্মসাৎ করতে যাব?’

    ‘তোমার না হলেও যে ফিরিংগী মেয়েটাকে বিয়ে ছাড়া সাথে রেখেছ তার প্রয়োজন আছে। তোমার মদ কেনার জন্য টাকার দরকার। যদি মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে চাও তবে বল ঘোড়াগাড়ী বোঝাই করে কি এনেছ? তোমার হারেমে প্রতিদিন নতুন নর্তকী আসছে বিনে পয়সায়? তোমার মদের আসরে যে টাকা খরচ হয় তা কোত্থেকে আসে?’

    ‘চুপ কর সাবেরা। ওরা কারা আমাকে একটু খোঁজ নিতে দাও। ইস! কি ভয়ংকর চাল চেলেছে। ক’দিন পরই সত্যি ঘটনা তুমি বুঝতে পারবে।’

    ‘না, আমি চুপ থাকব না। আমার বুকে তুমি প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ। মিসরের সব লোককে ডেকে ডেকে একথা বলব। অলি-গলিতে চিৎকার করে বলব তুমি খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী। হত্যা করেছ আমার ভালবাসা। এ হত্যার প্রতিশোধ আমি নিব।

    স্ত্রীকে অনেক অনুনয় বিনয় করে মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমাকে দু’দিন সময় দাও। দু’দিনের মধ্যেই আমি ওদের খুঁজে বের করে প্রমাণ করব হায়াতকে আমি হত্যা করিনি। পুলিশ প্রধান সন্দেহজনক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে আসল খুনীকেও পাকড়াও করতে পারবে।’

    পেরিয়ে গেল রাত। পর দিনও। মুসলেহ উদ্দিন বাড়ি ফেরেননি। ফিরিংগী মেয়েটাকেও কোথাও দেখা গেল না। সন্ধায় বাড়ি ফিরলেন মুসলেহ উদ্দিন। সোজা চলে গেলেন স্ত্রীর কক্ষে। আদুরে গলায় কথা বললেন। শোনালেন ভালবাসার কথা। সাবেরা তার ধোকার জালে পা দিতে চাইলেন না। কিন্তু জাত খেলুড়ে মুসলেহ উদ্দীনের কপট ভালবাসার ফাঁদে এক সময় ধরা দিলেন স্ত্রী।’

    ‘আমি দু’দিন পর্যন্ত ওই দু’জন কে খুঁজছি। এখনও পাইনি। আশা করি পেয়ে যাব। আমি যে হত্যাকারী নই তখন তোমায় আশ্বস্ত করতে পারব।’

    আরও অনেক কথা বললেন মুসলেহ উদ্দীন। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন সাবেরা। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। চাকর-বাকরদের ছুটি দিয়ে দিলেন। সমগ্র বাড়িতে নেমে এল কবরের নিরবতা। পাহারাদার কুকুরটাকে বাড়ির এক কোণে বেঁধে রেখে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন মুসলেহ উদ্দিন।

    মাঝ রাত। বাইরের পার্টিশন ঘেঁষে দাঁড়াল এক মুখোশধারী। তার কাঁধে পিঠে দাঁড়াল দ্বিতীয় জন। তৃতীয় ব্যাক্তি তার কাঁধে উঠে পার্টিশনের ভেতর লাফিয়ে পড়ল। খুলে দিল প্রহরীহীন ফটক। বাড়ির করিডোরে উঠে এল তিনজনে। এগিয়ে চলল বিড়ালের মত নিঃশব্দে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওরা সাবেরার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকল তিনজন। একজন হাত ছোঁয়াল সাবেরার মুখে। স্বামীর হাত ভেবে আকড়ে ধরে সে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

    কোন জবাব না দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল একজন। বেঁধে দিল হাত। পাজা কোলা করে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে কাঁধে তুলে নিল। চাকর বাকর কেউ নেই। বিনা বাধায় ওরা বেরিয়ে গেল। খানিক দূরে একটা গাছের সাথে তিনটে ঘোড়া বাঁধা ছিল। রশি খুলে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল তিনজন। বস্তা তুলে নিল একজন। মিসর পিছনে ফেলে ইস্কান্দারিয়ার দিকে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো।

    সকালে চাকর-বাকররা ফিরে এল। মুসলেহ উদ্দীন ওদেরকে সাবেরার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তন্ন তন্ন করে সারা বাড়ি খোঁজা হল। সাবেরা কোথাও নেই। এক চাকরাণীকে একান্তে ডেকে নিলেন মুসলেহ উদ্দীন। অনেকক্ষণ কথা বললেন দু’জন। এরপর তাকে নিয়ে গেলেন পুলিশের কাছে। মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমার স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার বিশ্বাস হায়াতকে ওই হত্যা করিয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি যে মুসলেহ উদ্দীনের স্ত্রী। কিন্তু পারেননি। এই চাকরাণীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।’

    পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের জবাবে চাকরাণী বলল, ‘পরশু রাতে দু’জন লোক এসেছিল। আমার মুনিব তখন ছিলেন না। দেখলাম মুখোশ পরা দু’ব্যাক্তি, ওরা বেগম সাহেবের সাথে দেখা করতে চাইল। বাড়িতে কোন পুরুষ না থাকায় আমি বললাম, এখন দেখা হবে না। ওরা বলল, ‘বেগম সাহেবের এই বিশটি আশরাফি ফেরত দিতে এসেছি।’ আমি বেগম সাহেবকে বলতেই তিনি দু’জনকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমাকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। বললেন, ‘কেউ এলে যেন তাকে সতর্ক করে দেই।’

    বাইরে থেকে আমি শুনলাম দু’জন কঠোর ভাষায় কথা বলছে আর বেগম সাহেবা অনুনয় বিনয় করছেন। তিনি আরও বললেন, আলি বিন সুফিয়ানের সহকারী হাসানকে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দেবেন। এই বিশ আশরাফি বেগম সাহেবা কিভাবে দিয়েছেন আমি জানি না। ওরা পঞ্চাশ আসরাফি দাবী করছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘তোমরা ভুল লোককে মেরেছ। হাসানকে মারতে পারনি।’

    ওরা বলল, ‘তুমি যে সময়ের কথা বলেছ ঠিক সে সময় এ লোকটি বাড়িতে ঢুকেছিল। লোকটি হাসান না অন্য কেউ আমরা দেখিনি। আমরা তীর ছুঁড়ে পালিয়ে গেছি।’

    পঞ্চাশ আশরাফি দেয়ার জন্য ওরা বেগম সাহেবাকে চাপ দিচ্ছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘আসল লোককে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দুটো সোনার টুকরা দেব।’ কিন্তু ওরা বলল, ‘যে কাজ করেছি আগে তার বিনিময় দাও, তারপর অন্য কাজ।’ বেগম সাহেবা অস্বীকার করায় ওরা বলল, ‘টাকা কিভাবে ওসুল করতে হয় আমরা জানি।’ এরপর ওরা দু’জন চলে গেল। বেগম সাহেবা আমায় ডেকে বললেন, ‘খবরদার, এসব কথা কাউকে বলবে না। আমাকে তিনি দুটো আশরাফিও দিয়েছেন। আজ সকালে তার কক্ষে গিয়ে দেখি তিনি নেই। আমার মন বলছে টাকা না দেয়ায় সে দু’জন লোকই তাকে অপহরণ করেছে।’

    পুলিশ প্রধান মুসলেহ উদ্দীনকে বসিয়ে রেখে চাকরাণীকে নিয়ে অন্য কক্ষে চলে এলেন।

    ‘এবার বল এ কথা তোমায় কে শিখিয়েছে, মুসলেহ উদ্দীন, না সাবেরা?’

    ‘এ জবানবন্দী আমার নিজস্ব।’

    ‘সত্যি করে বল সাবেরা কোথায়? কার সাথে গিয়েছে?’

    চাকরাণী ভয় পেয়ে গেল। পুলিশ প্রধানকে কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারল না। গিয়াস বললেন, ‘কিভাবে সত্যি কথা বের করতে হয় আমি জানি। তুমি এখন ফিরে যেতে পারবে না। পুলিশের শাস্তি সেলের কথা শুনেছ?’

    বিবর্ণ হয়ে গেল চাকরাণীর চাহারা। সে জানত, পুলিশের শাস্তি সেলে সত্য মিথ্যা আলাদা হওয়ার আগে দেহের হাড়গোড় আলাদা হয়ে যায়। সে কাঁদতে লাগল।

    ‘দেখুন, আমি এক গরীব মেয়ে। সত্যি কথা বললে মুনিব শাস্তি দেবেন। মিথ্যা বললে আপনারা।’

    ‘তোমার কোন ভয় নেই। তোমার নিরাপত্তার জিম্মা আমি নিচ্ছি।’

    চাকরাণী বলল, ‘হত্যার দ্বিতীয় দিন একজন মুখোশধারী এসেছিল। মুনীব বাড়ি ছিলেন না। লোকটা ছিল ফটকের বাইরে। বেগম সাহেবা ভিতরে। কি কথা হয়েছে আমরা কেউ শুনিনি। মুখোশধারী চলে গেলে বেগম সাবেরা ফিরে এলেন। হাতে ছিল একটা প্যাকেট। একরাত পর মুনীব আমাদের সবাইকে একরাতের জন্য ছুটি দিলেন।’

    ‘ইতিপূর্বেও কি সবাইকে সারা রাতের জন্য ছুটি দিয়েছিলেন?’

    ‘কখনও না। একজন ছুটিতে গেলে অন্য সবাই থাকত। আরো আশ্চর্য হল, কুকুরটাকে কখনও বেঁধে রাখা হয় না। ভয়ংকর কুকুর। অপরিচিত লোক দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ে। সে রাতে মুনিব নিজেই গেলেন কুকুরটাকে বেঁধে রাখতে।’

    ‘মুসলেহ উদ্দীনের সাথে সাবেরার সম্পর্ক কেমন ছিল?’

    ‘ইদানীং খুব খারাপ। মুনিব একটা সুন্দরী ফিরিংগী মেয়েকে বাড়ি আনার পর থেকে বেগম সাহেবার সাথে কথা বলেন না।’

    চাকরাণীকে বসিয়ে রেখে পুলিশ প্রধান উঠে গেলেন। ফিরে এলেন দু’জন সিপাই নিয়ে। সিপাইরা মুসলেহ উদ্দীনের দু’বাহু ধরে নিয়ে যেতে চাইল। প্রতিবাদ করলেন তিনি। পুলিশ প্রধান বললেন, ‘একে জেলে নিয়ে যাও। তার বাড়ি সীল করে পাহারার ব্যবস্থা কর। কাউকে বাইরে যেতে দেবে না।’

    কায়রোর উত্তরে এক সবুজ শ্যামল প্রান্তর। দুরত্ব অনেক। চারপাশে উঁচুনিচু পাহাড়। পাহাড় থেকে প্রান্তর ছুয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা ধারা। পূব আকাশ রাংগা হয়ে উঠেছে। অপহরণকারীরা ঘোড়া থামাল। নেমে এল তিনজন। বস্তার মুখ খুলে সাবেরাকে বের করে আনল। মুখের কাপড় সরিয়ে হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিল। সাবেরা অচেতন না হলেও অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করল। চিৎকার করারও শক্তি নেই। ওরা তাকে পানি পান করাল। খেতে দিল খেজুর আর রুটি। শীতল বাতাসে ওর শক্তি ফিরে এল। আচম্বিত সাবেরা উঠে দাঁড়াল। দৌড়ে টিলার আড়ালে চলে গেল। একজন মুখোশধারী ঘোড়ায় চেপে ছুটল ওর পেছনে। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল সাবেরা। মুখোশধারী তাকে ঘোড়ায় তুলে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এল।

    ‘পালিয়ে যেতে চাইলে যাও।’ বলল একজন। ‘কোথায় যাবে? এখান থেকে একজন শক্তিশালী পুরুষও এভাবে কায়রো পৌঁছাতে পারবে না।’

    সাবেরা কেঁদেকেটে ওদের গালাগালি করতে লাগল।

    ‘কায়রো ফিরে যেতে চাইলে যাও। কিন্তু ওখানে গেলেও মরবে। তোমার স্বামীই তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।’

    ‘মিথ্যে কথা।’

    ‘মিথ্যে নয়, সত্য। মজুরী হিসেবে তোমায় দিয়েছে। তোমার হাতে আমরাই আশরাফি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি তাকে বলেছ সে সচিবকে হত্যা করেছে। তুমি আরও বলেছ, এসব কথা পুলিশ প্রধানকে বলে দেবে। আগে থেকেই সে তোমার ওপর বিরক্ত। ফিরিংগী মেয়েটা তার মন দখল করে রেখেছে। মেয়েটা কে, কোথা থেকে এসেছে তোমাকে তা বলা যাবে না। পরদিন তোমার স্বামী আমাদের কাছে এল। আস্ত বেঈমান। বলেছিল কাজটা করলে পঞ্চাশ আশরাফি আর দু’টি সোনার টুকরা দেবে। কিন্তু কাজ শেষে পাঠাল বিশ আশরাফি। আমরা তোমাকে ব্যবহার করলাম। তোমার কাছে টাকা দেয়ার অর্থ যেন তুমিও ব্যাপারটা জানতে পার। বুদ্ধিটা কাজে লেগেছে। পরদিন পঞ্চাশ আশরাফি দিল। স্বর্ণের টুকরা দিল না। আমরা বললাম, ‘এখন পঞ্চাশে চলবে না। আরও বেশী দিতে হবে। না দিলে খবরটা পুলিশ প্রধানের কানে তুলে দেব।’

    তার জন্য সমস্যা ছিল ব্যাপারটা তুমি জেনে ফেলেছ। সে বলল, ‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাও। ওকে বিক্রি করে অনেক টাকা পাবে।’

    সাবেরার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সে হতভম্বের মত তিন অপহরণকারীকে দেখতে লাগল। মুখোশের মাঝখান দিয়ে দুটো করে চোখ দেখা যাচ্ছে। হিংস্র এবং ভয়ংকর। ওদের কণ্ঠে কোন হিংস্রতা ছিল না। ওরা বরং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে, এখান থেকে পালানো সম্ভব নয়।

    ‘আমি তোমাকে একবার দেখেছিলাম’, বলল একজন।

    ‘তোমার স্বামীর প্রস্তাব শুনে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে তোমাকে কত বিক্রি করা যাবে মনে মনে হিসাব করলাম। তুমি যুবতী, সুন্দরী। তোমাকে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। আমরা রাজি হলাম।’ তোমার স্বামী বলল, ‘রাতে আমার চাকর-বাকররা থাকবে না। কুকুরটাকেও বেঁধে রাখা হবে। রাতে এসে ওকে তুলে নিও।’ এ পারশ্রমিক না পেলে আমরা তাকে হত্যা করতাম। অপহরণ করতাম ফিরিংগী মেয়েটাকে। আমরা রাতে তোমাকে তুলে নিয়ে এলাম।’

    ‘তোমাকে এসব কথা বলার কারণ, তুমি স্বামীর ঘরের কথা ভুলে যাও।’ বলল দ্বিতীয় জন। ‘আমরা অসহায় কোন নারীর সম্ভ্রম নষ্ট করিনা। আমরা ব্যবসায়ী। অপহরণ এবং টাকার বিনিময়ে হত্যা করা আমাদের পেশা। তিনজন পুরুষ একজন নারীকে অপহরণ করে ভোগ করার মধ্যে কোন গর্ব নেই।’

    ‘তোমরা কি আমাকে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে বিক্রি করবে?’ কাঁপা কণ্ঠে সাবেরা জিজ্ঞেস করল। ‘শেষ পর্যন্ত এই কি হবে আমার কপালের লিখা?’

    ‘না, খারাপ কাজের জন্য জংলী এবং বেদুইন মেয়েদের ক্রয় করা হয়। তুমি সম্মানিতা গৃহ বধু। কোন আমীরের ঘরেই তুমি যাবে। আমরাও দামটা বেশী পাব। এখন কান্নাকাটি বন্ধ কর। কাঁদলে চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে বাজারে-মেয়ে হিসাবেই বিক্রি করতে হবে। এবার শুয়ে পড়। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও।’

    সাবেরা আশ্চর্য হয়েছে এতক্ষণ সময়ের মধ্যে এদের কেউ তার সাথে অশালীন আচরণ করেনি দেখে। মনে মনে স্বস্তিও পেয়েছে। রাতভর বস্তাবন্দী থেকে সমস্ত শরীর ব্যথা করছে। চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়ল ও। ঘুম ভেংগে গেল হঠাৎ। তার মাথায় চাপে আছে ভয় এবং আতংক। মনের দিক থেকে সে এ পরিণতিকে গ্রহণ করতে পারছে না। আড়চোখে তাকাল তিনজনের দিকে। ঘুমুচ্ছে ওরা। একবার ভাবল খঞ্জর বের করে ওদের হত্যা করে। বাতিল করে দিল চিন্তাটা। একা তিনজনের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চোখ পড়ল পাশে বাঁধা ঘোড়ার ওপর। পিঠে জিন বাঁধা। ও উঠে পড়ল। আলতো পায়ে এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। সূর্য নেমে গেছে টিলার ওপাশে। কায়রো কোন দিকে জানে না ও। তবুও বাঁচতে হলে পালাতে হবে ওকে। প্রয়োজনে বিশাল মরুর বিস্তারে ধুকে ধুকে মরবে, তবুও এদের হাতে সম্ভ্রম নষ্ট হতে দেবে না। আলগোছে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল সাবেরা। ছুটিয়ে দিল ঘোড়া।

    ঘোড়ার পদশব্দে তিনজনের ঘুম ভেংগে গেল। দু’জন দুটো ঘোড়ায় চেপে ছুটল তার পেছনে। টিলার বেষ্টনী থেকে বের হবার পথ জানা নেই সাবেরার। সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল এক পাহাড়। পেছনে তাকাল ও। ধাওয়াকারীরা কাছে চলে এসেছে। ঘোড়াসহ পাহাড়ে উঠতে লাগল সাবেরা। উপরে উঠে তাকাল বিপরীত দিকে, পথ পেয়ে গেল। নেমে এল নীচে। ধাওয়াকারীরাও তার পেছনে আসছে। কাছে চলে এসেছে ওরা। সামনে সমুদ্র। সমুদ্রের দিক থেকে আসছে চারজন উস্ট্রারোহী। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না ও। সাবেরা চিৎকার শুরু করলঃ ‘বাঁচাও, বাঁচাও, ডাকাতের হাত থেকে বাঁচাও।’

    ঘোড়া পৌঁছে গেল উস্ত্রারোহীদের কাছে। উস্ট্রারোহীদের দেখে মুখোশধারীরা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল। ওদের পিছু নিল উটের আরোহীরা। একজন ধনুকে তীর জুড়ে দু’জনকে লক্ষ্য করে ছুড়ল। বিঁধল এক ঘোড়ার ঘাড়ে। ঘোড়ার লাফালাফিতে পড়ে গেল সওয়ার। চার জন মিলে ওপর অশ্বারোহীকে ঘিরে ফেলল। একজনের পক্ষে চারজন তীরন্দাজের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, সে আত্মসমর্পণ করল। সাবেরা ওদের বলল, ‘এদের একজন ওপাশে রয়েছে।’ ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া আরোহীসহ তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা হল।

    এ চারজন উস্ট্রারোহী ছিল সুলতান সালাহুদ্দীনের সেনা বাহিনীর সদস্য। সাগর উপকূল এবং সমগ্র মরুভূমিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনা দল পেট্রোল ডিউটিতে রত ছিল। আচম্বিত শত্রুর আক্রমণ যেন না আসতে পারে এ জন্যই এই ব্যবস্থা। এরা কয়েক বারই বিপজ্জনক খ্রিস্টান গোয়েন্দাদের ধরে সুলতানের সামনে হাজির করেছে। সাবেরা সৈন্যদেরকে অপহরণের পুরো কাহিনী শোনাল। সে বলল, ‘উপ-রাস্ট্রপ্রধান আমার স্বামী। এ তিন ভাড়াটে খুনীদের দিয়েই তিনি অর্থ সচিবকে হত্যা করিয়েছেন। আমাকেও তুলে দিয়েছেন এদের হাতে।’

    তিন অপহরণকারীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হল। হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দুটো ঘোড়ায় করে ওদেরকে সৈন্যরা কমাণ্ডারের কাছে নিয়ে গেল। সাবেরা বসল উটের পিঠে। সূর্য ডোবার পূর্বেই এরা চার মাইল পথ অতিক্রম করল। সামনের মরুদ্যানে তাঁবু টানানো। ডিউটিরত সেনা দলের হেড কোয়ার্টার। ওরা সাবেরাকে নিয়ে গেল কমাণ্ডারের সামনে। কঠোর প্রহরায় তিন অপহরণকারীকে বসানো হল তাঁবুর বাইরে। আগামীকাল এদের কায়রো পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

                                                   

    খ্রিস্টানদের পদতলে পিষ্ট হচ্ছিল প্রিয় ফিলিস্তিন। মুসলমানদের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল পবিত্র ভূমির বালুকারাশি। দুর্দশার কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়ছিল অত্যাচারের অগ্নি বৃষ্টি। অসহনীয় নির্যাতনের দুঃসহ ব্যথায় কাৎরাচ্ছিল তৌহিদী জনতা। এমনি এক দুঃসময়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পা রাখলেন ফিলিস্তিনের মাটিতে।

    সুবাক এখন মুসলমানদের দখলে- দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ সংবাদ ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হৃদয়ে জ্বেলে দিল আশার প্রদীপ। অনাগত মুক্তির আনন্দে হিল্লোলিত হল প্রাণ। কিন্তু ওদের এ অব্যক্ত আনন্দ দুর্বিসহ বেদনা হয়ে দেখা দিল। খ্রিস্টানরা প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে দিল জেরুজালেম এবং আশপাশের জেলাগুলোর মুসলিম বসতি। এভাবেই মুসলমানদের ওপর সুবাক দুর্গ হারানোর শোধ তুলতে লাগল ওরা।

    মুসলমানদেরকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘৃণ্য তৎপরতায় মেতে ওঠা খ্রিস্টানরা সুবাকের পর ক্রাক নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ল। সালাহুদ্দীন যেন ক্রাক আক্রমণ করতে না পারে এ জন্য ক্রাকে চলল নির্বিচারে মুসলিম হত্যা। বুদ্ধির খেলায় হেরে গেছে ওরা। হাতছাড়া হয়েছে সুবাক দুর্গ। ক্রাক হাতছাড়া করা যাবে না। স্তব্ধ করে দিতে হবে সালাহুদ্দীনের অগ্রযাত্রা। ক্রাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করার পাশাপাশি তাই ওরা স্থানীয় মুসলমানদের শিরদাড়া ভেংগে দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। এখানেও খোলা হল বেগার ক্যাম্প। সামান্য সন্দেহ হলেই মুসলমানদেরকে নিক্ষেপ করতে লাগল সে ক্যাম্পে।

    ‘ফিলিস্তিন বিজয় আমাদের মহান উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্রাক থেকে নির্যাতিত মুসলমানদেরকে বের করে আনা তারচে বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।’ সুলতান সালাহুদ্দীনকে বলল গোয়েন্দা সংস্থার একজন গ্রুপ কমাণ্ডার, নাম তালাত চেঙ্গিস। তালাত একজন তুর্কী মুসলমান। সুবাক থেকে পালিয়ে যাওয়া খ্রিস্টানদের ছদ্মবেশে ক্রাকে পৌঁছে ছিল সে। ফিরে এসেছে তিন মাস পরে। গোয়েন্দা প্রধানের সামনেই তালাত সুলতানকে ক্রাকের রিপোর্ট দিচ্ছিল। ‘যে সব খ্রিস্টান সৈন্য’ লুকিয়ে ক্রাক পৌঁছেছে ওদের অবস্থা ভাল নয়। সহসা যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে পারবে না ওরা। তবে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে ওরা স্থানীয় মুসলমানদের ওপর। পুরুষদেরকে এলোপাথাড়ি গ্রেপ্তার করছে। মেয়েরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। আমরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য ওখানকার মুসলিম যুবকদেরকে গোপনে সঙ্গঠিত করতে শুরু করেছিলাম। কিছু যুবক পালিয়ে এসে ভর্তিও হয়েছে। কিন্তু চারদিকে খ্রিস্টান সৈন্য থাকায় অধিকাংশই ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আসতে পারছে না। তাছাড়া পরিবার-পরিজন ছেড়ে আসতে অনেকের অসুবিধা হচ্ছে।

    সবচে বিপদের কথা হল, কারো ওপর সন্দেহ হলেই তাকে বেগার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখনই ক্রাক আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে এ নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া আমাদের কর্তব্য।’

    এর আগে গোয়েন্দারা বলেছিল সুলতান ক্রাক আক্রমণ করলে রিমাণ্ড তার বাহিনী নিয়ে পেছন থেকে আক্রমণ করবে। সুলতানও সেনা অফিসারদের কাছে পূর্বেই এমন আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন। এ জন্য সেনা সদস্য বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল।

    সুলতান সালাহুদ্দীন তালাতকে বিদায় দিয়ে আলীকে বললেন, আবেগের দাবী হচ্ছে এ মুহূর্তে ক্রাক আক্রমণ করা। ওখানকার মুসলমানরা কি কষ্টের মধ্যে আছে আমি বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, শক্তি সঞ্চয় না করে আক্রমণ করো না। নিশ্চিত না হয়ে আক্রমণ করা যুদ্ধনীতির পরিপন্থী। আলী! আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে পুরুষদের। ইসলামের ইতিহাসে ওরা হচ্ছে নামহারা শহীদ। যে কোন জাতিকেই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এমন কোরবানী দিয়ে যেতে হয়। ওদের আব্রু, জীবন এবং ওদের দ্বীনের হেফাজতের জন্যই আমি ফিলিস্তিন শত্রুমুক্ত করতে চাই। সাধারণভাবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য আক্রমণ ও লুটপাট ছাড়া কিছুই নয়। যারা স্বীয় জাতির সন্তানদের ভুলে যায়, মুখ বুজে সহ্য করে শত্রুর নির্যাতন, তারা হয়ে যায় ডাকাত ও দস্যুদের সহযোগী। শত্রুর ওপর প্রতিশোধ না তুলে পরস্পরের সম্পদ লুণ্ঠন করে ওরা। প্রতারিত করে অন্যকে। ওদের শাসকরা গরীবের সম্পদ লুটে ভোগ বিলাসে মত্ত হয়। শত্রুরা আক্রমণ করলে অমূলক হম্বিতম্বি করে জনগণকে ধোকা দেয়। শত্রুর সঙ্গে গোপন আঁতাত করে। দেশের কোন অংশ ওদেরকে ছেড়ে দিয়ে রক্ষা করে গদী। ভোগ বিলাসের জন্যই ওরা শুষে নেয় জনগণের শেষ রক্তবিন্দু।

    অনেক জাতির শাসকগণ কেবল রাজ্য বিস্তারের মোহে যুদ্ধ করেছে। বিলাসিতার সময়টা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বইয়ে দিয়েছে রক্তের বন্যা। আজ পৃথিবী থেকে ওদের নামও মুছে গেছে। খ্রিস্টানদের মত আমরাও লড়াইকারী। কিন্তু দু’জনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে আমাদের ধর্মের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য। এসেছে আমাদের নারীদের অধিকার করে ওদের গর্ভ থেকে খ্রিস্টান জন্ম দেয়ার জন্য। আমরা আত্মরক্ষার জন্য এবং আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য লড়াই করছি। খ্রিস্টানদের এ ঝড়কে প্রতিরোধ করতে না পারলে আমরা বিবেকহীন, আত্মমর্যাদা শূন্য বলে পরিচিত হবো। আর যদি আমরা বাড়িতে বসে ওদের আক্রমণের অপেক্ষা করি তবে নিশ্চয়ই আমরা ভীত ও কাপুরুষ বলে চিহ্নিত হবো। প্রতিরোধর নিয়ম হলো, যখনি দুশমন তোমাকে হত্যা করার জন্য তরবারী কোষমুক্ত করবে, আঘাত করার পূর্বেই তোমার তলোয়ার তার শিরোচ্ছেদ করবে। সে আগামী কাল আক্রমণ করতে আসবে জানলে আজই তার মোকাবেলায় নেমে যাও যাতে সে আর আঘাত করার সুযোগ না পায়।’

    ‘নূরুদ্দীন জঙ্গীর কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায় না?’ আলী বললেন, ‘সাহায্য পেলে সাথে সাথেই আমরা ক্রাক আক্রমণ করতে পারতাম।’

    ‘না, তাঁর কাছে সবসময় এমন সৈন্য থাকা দরকার, আমরা পেছন থেকে আক্রান্ত হলে তিনি যেন ওদেরকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারেন।’ সালাহুদ্দীন বললেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার পক্ষপাতি নই, বরং গেরিলাদের পাঠিয়ে আমরা ওদের ঘুম হারাম করে দিতে পারি। আমার বিশ্বাস, আমাদের গুপ্তচর এবং গেরিলারা মিলে শত্রুর মূল উপড়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু ওখানকার নিরপরাধ মুসলমানদেরকে এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। কারণ, কমাণ্ডো বাহিনী কাজ শেষে এদিক ওদিক পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওখানকার নিষ্পাপ মুসলমান ভাই-বোনগুলো পালাতে পারবে না, তারা শত্রুর হাতে নিঃশেষ হয়ে যাবে। বিকল্প হিসেবে ওদেরকে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসা যায় কিনা দেখ। আক্রমণ করার জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে আমরা অনেক নতুন রিক্রুটও পেয়ে যাব।’

    ‘আমার মনে হয় এখানকার মুসলমানদের ব্যাপারে আমাদের পলিসি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।’ বলল খ্রিস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।

    ক্রাকের এক দুর্গে ক’জন খ্রিস্টান সম্রাট, উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মিটিং চলছিল। পরাজিত সেনাবাহিনীর দিকে তাকাতেই ওদের ক্রোধ বেড়ে যাচ্ছিল। এ পরাজয়কে ওরা বদলে দিতে চাইছিল বিজয় দিয়ে। এদের মধ্যে কেবল হরমুনই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করছিলেন। ক্রাকের মুসলমানদের ওপর চলছিল অবর্ণনীয় নির্যাতন। তিনি বললেন, ‘আপনারা এখানকার মুসলমানদের সাথে যেমন ব্যবহার করেছেন আমরাও সুবাকে তেমন করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে আমাদেরই এক গুপ্তচর মেয়ে বিপজ্জনক এক বন্দীকে পালাতে সাহায্য করেছিল। সে সুবাক দুর্গের সব কিছু দেখে গেছে। তাছাড়া সালাহুদ্দীন দুর্গপ্রাচীর যেভাবে ভেংগেছে এতে ভেতরের মুসলমানদেরও হাত ছিল। আমাদের ব্যবহারে ওরা এতটা বিরক্ত ছিল যে, জীবন বাজি রেখে ওরা সালাহউদ্দীনের সাহায্য করেছে। এরাই ছিল সালাহুদ্দীন সেনাবাহিনীর পথ প্রদর্শক।’

    ‘এ জন্যই আমরা এখানকার মুসলমানদের সাহস এবং আবেগ নিঃশেষ করার জন্য এরূপ নির্যাতন করছি।’ বলল এক সেনা কমাণ্ডার।

    ‘তার পরিবর্তে ওদেরকে আপনাদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করুন, ওরা আপনাদের সাহায্য করবে।’ বলল হরমুন। ‘আমায় অনুমতি দিলে ধর্মান্তরিত না করেই ওদেরকে খ্রিস্টানদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করব। তখন ওরা মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।’

    ‘ভুলে যাচ্ছ হরমুন!’ মুখ খুললেন সম্রাট রিমাণ্ড। ‘দু’একজন মুসলমানকে নারী দেহ আর টাকার লোভ দেখিয়ে গাদ্দারে পরিণত করা যায় কিন্তু গোটা সেনাবাহিনীকে গাদ্দার বানানো যায় না। হরমুন, ওদের ওপর নির্ভর করো না। ওদের আমরা বন্ধু বানাতে চাইনা, আমরা মুসলমানদেরকে নির্বংশ করতে চাই। কোন অমুসলিম কোন মুসলমানকে ভালবাসলে এর অর্থ হচ্ছে সে ইসলামকেই ভালবাসে। অথচ আমরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাই। ক্রাক, জেরুজালেম, ওফা এবং আদলিসা যেখানেই খ্রিস্টানদের শাসন রয়েছে সেখানেই মুসলমানদের ওপর এতটা নির্যাতন কর যেন ওরা মরে যায়। না মরলেও খ্রিস্টানদের সামনে মাথানত করে রাখে।’

    ‘মুসলমানদের সাথে এখানে যা করা হচ্ছে সালাহুদ্দীন আইউবী নিয়মিত তার খবর পাচ্ছেন।’ হরমুন বলল, ‘আপনারা তাকে ক্রাকে তাড়াতাড়ি আক্রমণ করতে বাধ্য করছেন। আপনারা ভুলে যাচ্ছেন আমাদের সেনাবাহিনী এ মুহূর্তে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত নেই।’

    ‘তবে কি এখানকার মুসলমানদেরকে মাথায় তুলে নাচব! বুঝতে পারছি না বন্দীদেরকে হত্যা না করে কেন আমরা লালন পালন করছি।’ জবাব দিলেন গে অব লুজিনাম।

    ‘কারণ মুসলমান বন্দীদের হত্যা করলে সালাহুদ্দীন আমাদের বন্দীদের হত্যা করবে। আমাদের কাছে রয়েছে ওদের তিনশ লোক, ওদের কাছে রয়েছে আমাদের তেরশ বন্দী।’

    ‘একজন মুসলমান সৈন্য হত্যার বিনিময়ে আমরা চারজন খ্রিস্টান সৈন্য হারাতে পারি না’, বললেন শাহ অগাস্টাস।

    ‘সালাহুদ্দীন আমাদের যে সব সৈন্যদের বন্দী করেছে ওরা ভীরু, কাপুরুষ। যুদ্ধ করার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব গ্রহণ করেছে। ওদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। আমাদের হাতে মরার চাইতে বরং মুসলমানদের হাতে মরাই ভাল। নিশ্চিন্তে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করার পক্ষপাতি আমি।’ একজন সেনা কমাণ্ডার দাঁড়িয়ে বলল।

    ‘স্থানীয় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে, বন্দীদের হত্যা করে আমরা কি সালাহুদ্দীনকে পরাজিত করতে পারব? এখন আমাদের সামনে সমস্যা হল সালাহুদ্দীন আক্রমণ করলে কিভাবে বাধা দেব, কিভাবে সুবাক দুর্গ পুনরুদ্ধার করব। আপনার কথামত ক্রাকের সব মুসলমানদের মেরে ফেললাম। তারপর কি হবে? শত্রু কি নিশ্চিহ্ন হবে? তারচে সালাহুদ্দীনের মত আমরাও আমাদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করছি না কেন?’ বলল একজন।

    ‘মিশরে আমাদের গোয়েন্দারা কি কাজ করছে অনুগ্রহ করে হরমুন কি বলবেন?’ বলল আরেক সেনা কমাণ্ডার।

    ‘হ্যাঁ, আমাদের গোয়েন্দারা আশানুরূপ কাজ করছে। সালাহুদ্দীন সুবাক কেল্লায়। তার অনুপস্থিতিতে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কায়রোর উপ-রাষ্ট্রপতি মুসলেহ উদ্দীন ফাতেমীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। মুসলেহ উদ্দিন সালাহুদ্দীনের বিশ্বস্ত। এখন আমাদের হাতে ফাতেমীরা গোপনে একজনকে খলিফা নির্বাচন করে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের সেনা অফিসাররা সুদানী বাহিনী তৈরী করছে। কায়রোতে সালাহুদ্দীনের ফৌজের দু’জন উপ-সেনাপ্রধান আমাদের লোক। সুদানীরা আক্রমণ করলেই ফাতেমীরা বিদ্রোহ করবে।’

    ‘ভুলে যাচ্ছ কেন, মিসরের সংবাদ পেলে সালাহুদ্দীন ক্রাক দুর্গ আক্রমণ মুলতবী রেখে ছুটে যাবে।’ বললেন রিমাণ্ড, ‘এখানেই রাখতে হবে তাকে। এমনভাবে বিরক্ত করতে হবে যেন তার সৈন্যরা মিসর যাবার পথ না পায়।’

    হরমুন বললেন, ‘আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, মিসরে তার যে ক’জন সৈন্য রয়েছে ওরা কিছু করতে পারবে না। ওদের বুঝানো হয়েছে যে, সুলতান তোমাদেরকে গনিমতের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছেন। হাজার হাজার সুন্দরী যুবতী ধরা পড়েছে, ওদেরকে সৈন্যদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করছে প্রশাসনের লোকেরা। আমি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি, গোটা সেনাবাহিনী সুদানীদের পক্ষ অবলম্বন করবে। এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য সালাহুদ্দীনকে এখানকার ফৌজ নিয়ে যেতে হবে। ততোক্ষণে কায়রো হবে ফাতেমী খেলাফতের পদানত। আমরা সালাহুদ্দীনকে আক্রমণ করব না। কায়রোতে স্থান না পেয়ে বিশাল মরুতে ঘুরে ঘুরে একদিন …

    ‘কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, খলিফার গদিও কিন্তু টিকে থাকেনি।’

    হরমুন বলল, ‘তার কারণ, ইসলামী সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থের দিকে নিবদ্ধ হল সকলের দৃষ্টি। ফলে, একে একে ছুটে যেতে থাকল বিজিত এলাকাগুলো। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা এখন আরবে অবস্থান করছি।

    প্রথম দিককার জেনারেলগণ ইসলামী রাজ্যের সীমানা যদ্দুর বিস্তৃত করেছিল, সালাহুদ্দীন আইউবী সে পর্যন্ত যেতে চাইছেন। তার সবচে বড় গুণ হচ্ছে, তিনি খেলাফত বা প্রশাসনের তোয়াক্কা করেন না। তার চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিসরের খেলাফত। তিনি তাকে পদচ্যুত করেছেন। সাহস, দূরদর্শিতা এবং সামরিক শক্তি নিজের হাতে থাকার কারণেই তিনি এমনটি করতে পেরেছেন।’

    মজলিশে পিন পতন নিরবতা নেমে এল। হরমুনই নিরবতা ভাঙল আবার, ‘বেসমারিক নেতৃত্বের লক্ষ্য ক্ষমতার মসনদ। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা অর্থ, নারী এবং মদে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুলতান তাদের এ দুর্বলতা বুঝতে পেরেছেন। আমরা কেবল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তাদেরকেই হাত করছি। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের দ্বিতীয় টার্গেট। সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে হলে তাদেরকে জনগণের কাছে হেয় করতে হবে। আমি এ কাজটিই করছি। এ ব্যাপারে আপনারা হয়ত আমার সাথে একমত হবেন না, তবুও আমি বলব, মুসলমানদের হাতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে সে।

    মুসলমানদের মানসিকতা আপনারা এখনও বুঝেননি, এ জন্যেই আমার কিছু কিছু পদক্ষেপ ও পরামর্শকে আপনারা ভাল চোখে দেখেন না। প্রশিক্ষণের সময় যদি মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে, তোমরা দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী, সিংহাসন উপহার দিলেও ওরা সৈন্য হয়ে থাকতেই পছন্দ করবে। কিন্তু যদি ওদের ভেতর আত্মপূজা, নারী লিপ্সা এবং মদে অভ্যস্ত করে দেওয়া যায় তবে আপন ধর্ম ছেড়ে দিতেও ওরা কণ্ঠিত হবে না। আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী প্রশাসনের লোকেরা দ্বিতীয় দায়িত্বটিই পালন করছে।’

    ‘তবে প্রশাসনের লোকদের মত সেনা ফৌজকে অত সহজে গাদ্দার বানানো যায় না। প্রশাসনের প্রতিটি লোকই রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সৈন্যরা সবাই তেমনটি দেখে না।’ হরমুনের কথার মাঝখানে বললেন অগাস্টাস।

    ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, তবে এটাও ঠিক, তাদের নবীর পরে খেলাফতের জন্য মুসলমানরাই পরস্পর যুদ্ধ করেছিল।’

    ‘কিন্তু জেনারেলগণ ঈমানদারীর সাথে দায়িত্ব পালন করে, এমনকি অন্য দেশ দখল করে খেলাফতের অন্তর্ভূক্ত করেছে।’

    ‘হ্যাঁ, মজাটা এখানেই। জেনারেলরা ঈমানদারীর প্রমাণ দিলেও খলিফারা তার কোন মূল্য দেয়নি, এমনকি খলিফারা তাদের সাথে ভাল ব্যবহার পর্যন্ত করেনি। ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়েছে।’

    সালাহুদ্দীন আইউবীকে যুদ্ধের ময়দানে হারানো সম্ভব নয়। কারণ, তাঁর প্রতিটি সৈন্য তাঁর মতই জানবাজ। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা এতটাই অবগত যে, মৃত্যু তাদের কোন ভীতির সৃষ্টি করে না।

    আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, তিনি শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করেন না, নিজেও লড়াই করেন। তাকে কোন খলিফা বা বেসামরিক নেতৃত্ব থেকে নির্দেশ নিতে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন পাকা মুসলমান। তাঁর কথা হচ্ছে, আমি সরাসরি খোদা এবং কোরআনের হুকুম পালন করি। আমাদের বাগদাদের গোয়েন্দারা বলেছে, নুরুদ্দীন জঙ্গী যেসব পরামর্শ পাঠিয়েছেন সালাহুদ্দীন তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রথমতঃ একজন বড় মুফতি ফতোয়া দিয়েছেন খেলাফতের কেন্দ্র থাকবে বাগদাদ। বিভিন্ন দেশের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে খলিফা সেনা প্রধানের সাথে পরামর্শ করবেন। দ্বিতীয়তঃ সামরিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খলিফা কোন হস্তক্ষেপ করবেন না। তৃতীয়তঃ খোৎবায় খলিফার নাম উচ্চারণ করা হবে না। সালাহুদ্দীন আরো নির্দেশ দিয়েছে যে, খলিফা বা তার মনোনীত কোন ব্যক্তি বা কোন কেল্লাদার বাইরে বের হলে জনগণ ফুলের তোড়া নিয়ে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না। খলিফার সম্মানে কোন শ্লোগান দেওয়া যাবে না।

    সালাহুদ্দীন আইউবীর বড় সাফল্য হল, তিনি শিয়া-সুন্নীর মতভেদ দূর করে দিয়েছেন। এখন শিয়াদের অনেকেই সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে আসীন। শিয়া আলেমদের তিনি বুঝিয়েছেন, ইসলামে নেই এমন কোন কাজ যেন তারা না করেন। এতে আমাদের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দল উপদল থাকলে আমাদের সুবিধা। এখন আমরা প্রশাসনের মধ্যে সালাহুদ্দীন এবং সেনাবাহিনীর বিরোধী মনোভাব তৈরী করছি।’

    ‘এ মনোভাব স্থায়ী করতে হবে।’ মুখ খুললেন ফিলিপ অগাস্টাস। ‘শুধু সালাহুদ্দীনই আমাদের শত্রু নয়, আমাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। আমাদের চেষ্টা হবে সালাহুদ্দীনের মৃত্যু হলে এ জাতি যেন অন্য কোন সালাহুদ্দীনের জন্ম দিতে না পারে। ওদের আকিদা বিশ্বাসে কুসংস্কার ঢুকিয়ে দাও। প্রতিটি লোকের চিন্তায় থাকবে রাজা হওয়ার স্বপ্ন। ওদেরকে বিলাসিতার গহীনে ডুবিয়ে দাও। দেখবে একজন অন্য জনের মাথা কাটছে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, একদিন এরা ক্রুশের গোলামে পরিণত হবে। ওদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ওদের ধর্ম খ্রিস্টবাদের রঙে রঙ্গীন হবে। ক্ষমতার লোভে একজন আরেকজনকে অন্যজনকে হত্যা করবে। সাহায্য চাইবে আমাদের কাছে। তখন হয়ত আমরা কেউ বেঁচে থাকব না। আমাদের আত্মা ওদের এ পরিণতি দেখে খুশি হবে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইহুদীরা নিজের যুবতী মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার কর। ইহুদীরা জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনকে নিজের মনে করে, এজন্য ওরা আমাদের দুশমন। কিন্তু সে কথা বলার সময় এটা নয়। ওদের বল, জেরুজালেম তোমাদের। শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন তোমাদেরকেই দেব। তোমরা এখন আমাদের সহযোগিতা কর। তবে ইহুদীরা অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের মানসিকতা বুঝতে পারলেই মুসলমানদের সাথে যোগ দেবে। সতর্কতার সাথে ফিলিস্তিনিদের লোভ দেখিয়ে ওদের সম্পদ এবং যুবতীদের ব্যবহার কর। বিজয় আমাদের হবেই।

                                                   

  • ভয়াল রজনী

    ভয়াল রজনী

    পাগলটাকে আর আঘাত করলো না ওসমান। জুতা খুলে মসজিদের ভেতরে ঢুকল দু’জন। ক্রুশটা এখনও তার হাতে। ভেতরে গিয়ে বললো ‘তোমার নাম কি যুবক?’

    ‘ওসমান’।

    ‘আমি মুসলমান, তুমি কখন থেকে আমার পিছু নিয়েছো?’

    ‘সারা দিন তোমার পিছনে হেঁটেছি, কিন্তু সুযোগ হয়নি’।

    ‘আমাকে কেন মারতে চাইছো?’

    ‘কারণ আমি ইসলাম এবং সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে কোন কথা সহ্য করি না’। তুমি পাগল হও আর যেই হও আমি তোমাকে হত্যা করবো’।

    ‘কিন্তু আমাকে হত্যা করলে ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের কি উপকার হবে?’

    ‘জানি না তবে ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের একজন দুশমন কমবে’।

    ‘তুমি কি যে-ই  ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের বিরোধীতা করবে তাকেই হত্যা করবে?’

    ‘অবশ্যই। সুযোগ পেলে আমি কাউকেই ছাড়বো না’।

    ‘তুমি কাকে ইসলামের বড় দুশমন মনে করো?’

    ‘অবশ্যই খৃষ্টানদের। তবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মত শক্তি এখনো আমার হয়নি। হলে তাদেরও আমি ছাড়বো না’।

    ‘ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের বিরোধীতা করলে তাদের হত্যা করতে হবে এই বুদ্ধি তোমায় কে দিয়েছে?’

    ‘কেউ এ কাজ করতে আমাকে বলেনি। আমি নিজে থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি’।

    ‘তুমি কি একাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো, নাকি তোমার সাথে আরো কেউ আছে?’

    ‘আমি একাই’

    আরো কয়েকটা প্রশ্ন করে পাগল লোকটা বললো, ‘তোমার মত একজন যুবকই আমার প্রয়োজন। তুমি নিজ থেকে এসেছো ভালই হয়েছে। ভেবেছিলাম এমন লোক পেতে আমার বেশ কষ্ট হবে’।

    ‘শোন, আমি সালাহুদ্দীনের একজন গোয়েন্দা। খৃষ্টানদের ধোকা দেয়ার জন্য পাগলের অভিনয় করছি। সফর করেছি এই পোষাকেই। তোমার সাথে কিছু কথা বলবো মন দিয়ে শোন- মনে রেখ মসজিদে হঠাৎ কেউ এসে পড়লে আমি আগের মত আজেবাজে কথা শুরু করবো পাগিলরা যেমন করে আরকি’!

    তুমি এমন ভাব করবে যেন আমার কথা মনযোগ দিয়ে শুনছো।

    যা বলার আমি দ্রুত বলছি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মুসল্লীদের মধ্যেও ওদের গুপ্তচর থাকতে পারে, এজন্য নামাযের আগেই কথা শেষ করতে হবে’।

    ওসমান কখনো গোয়েন্দা দেখেনি। ও জানতো না গোয়েন্দারা অসাধারন মেধবী হয়ে থাকে। ও অবাক হয়ে গোয়েন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সামান্য কয়েকটা প্রশ্ন করেই গোয়েন্দা লোকটি যুবককে চিনে নিয়েছে। বুঝেছে এ যুবক যথেষ্ট হুশিয়ার, বিশস্ত এবং আবেগপ্রবণ।

    ‘শোন ওসমান তোমার মত আরো কয়েকজন যুবক ও যুবতী যোগাড় করো। তাদের মন্মানসিকতাও তোমার মত হতে হবে। তাদেরকে তোমার মতই হতে হবে সাবধান ও বিশ্বস্ত। তাদের মানসিকতা তৈরী হয়ে গেলে শুরু হবে তোমাদের আসল কাজ। তোমাদেরকে প্রতিটি মুসলমাওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করতে হবে, সুলয়ান সালাহুদ্দীন বেচে আছেন এবং সুস্থ আছেন। তোমরা আরো প্রচার করবে, ক্রাক থেকে মাত্র কয়েক মাত্র কয়েক ঘণ্টার দুরত্বে অবস্থান করছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ক্রাক আক্রমনের জন্য মুসলিম বাহিনী শুধু প্রস্তুতই নয়, ওরা খৃষ্টান বাহিনীর আহার নিদ্রা হারাম করে রেখেছে। কায়রোর পরিস্থিতিও এখন পুরপুরি শান্ত। ওখান থেকে সকল ষড়যন্ত্রের মূল উপড়ে ফেলা হয়েছে’।

    ওসমানের বুকের ধুপধুপানি বেড়ে গেল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বললো, আপনি ঠিক বলছেন?

    ‘ওসমান, তোমার আর আমার স্বপ্ন এক। আমি যে স্বপ্নের বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছি আর তুমি আবেগে ভেষে বেড়াচ্ছ। এখন আর এভাবে ভেসে বেড়ালে চলবে না। আজ থেকে তুমি ভাববে, তুমিও আইয়ুবীর একজন সৈনিক। শোন আমি যা বলছি তা ঠিকই বলছি’।

    ‘আপনি সালাহুদ্দীন আইয়ুবীকে দেখেছেন?

    ‘হ্যা যুবক উনি আমাকে এখেনে পাঠিয়েছেন। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, উনি সছেন এই খবর এখানকার জনগনকে জানিয়ে দেয়া। তোমাকে দিয়েই এই কাজ শুরু হলো’।

    ‘সুলতান কখন আক্রমন করবেন? আমর তার পথ চেয়ে বসে আছি। আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তিনি বাইরে থেকে আক্রমন করলে আমরা ভেতর থেকে খৃষ্টানদের উপর ঝাপিয়ে পড়বো। আল্লাহর দোহাই লাগে, তাকে তাড়াতাড়ি আক্রমন করতে বলুন’।

    ‘বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে যুবক। প্রথমে শোন সুলতান আইয়ুবী কি বলেছেন। এরপত প্রতিটি যুবকের হৃদয়ে তা গেঁথে দাও। সুলতান বলেছেন, ক্র্যাকের মুসলিম যুবকদের বলে দাও তোমরাই ইসলামের রক্ষক। আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করতে হলে তোমাদের জিহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। তুমি তাদেরকে আমার জীবনের কাহিনী শুনাবে’।

    তিনি তার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে আরো বলেছেন, আমি প্রথম যুদ্ধ করেছি শৈশবে। একটি দুর্গে অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। নেতৃত্বে ছিলেম আমার চাচা। তিনি আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন ‘ভয় পেয়ো না। এখন ভয় পেলে ভয়ে ভয়ে কেটয়ে যাবে সারাটা জীবন। ইসলামের পতাকাবাহী হতে চাইলে এখনি পতাকা তুলে নাও। বেরিয়ে যাও দুশমনের ব্যুহ ভেদ করতে। আবার ফিরে এসো। ঝাপিয়ে পড় শত্রুর উপর’।

    সেদিন আমি ভয় পাইনি। তিনমাস অবরুদ্ধ ছিলাম। না খেয়ে থেকেছি। শেষ পর্যন্ত শত্রুর অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলাম। অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা প্রথমে খেয়েছি শত্রুর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া খাবার। দানা পানির অভাবে আমাদের যে সব ঘোড়া মরে গিয়েছিল তা পুরন করেছি শত্রুর ঘোড়া দিয়ে।

    সুলতান আরো বলেছেন, আমার জাতির সন্তানদের বলবে, শত্রু আমাদের ভালবাসার অস্ত্র দিয়ে আক্রমন করেছে। যদিও এটা মোটেও ভাল্বাসা নয়ব্রং ভালবাসার নামে প্রতারনার ফাদ মাত্র।

    ওরা জানে না প্রতারনা কি জিনিস, শুধু জানে ভালবাসার মিথ্যা অভিনয় করতে। মনে রেখ, কোন অমুসলিম মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না।

    খ্রীস্ট্রান শক্তি যুদ্ধের ময়দানে টিকতে পারে নি। ওদের সব পরিকল্পনা আমরা ধুলার সাথে মিশিয়ে দিয়েছি। ওরা এখন মুসলমান জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের হৃদয় থেকে বের করে দিতে চাইছে ইসলামী জাতীয়তাবোধ।

    সারা দুনিয়ার মুসলমান এক জাতি। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। শত্রুরা এ ভ্রাত্বের বন্ধন ছিন্ন করার উস্কানী দিচ্ছে।

    ওরা ধর্মের প্রতি প্রীতি ও ভালবাসার পরিবর্তে আমাদের কিশোর ও যুবকদের হৃদয়ে সৃষ্টি করতে চাচ্ছে পুঞ্জীভুত ঘৃনার পাহাড়। এ জন্য ওরা ব্যবহার করছে নানা রকম বিপজ্জনক অস্ত্র। ইসলামের কথা যারা বলে, ইসলামের পথে যারা চলে, তাদের ন্না অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে গালি দেওয়া হচ্ছে মোল্লা, গোড়া, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এসব বলে। এভাবে আগামী প্রজন্মের মন বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ওপর।

    মুসলিম যুবকদের বলবে, দুশমন আমাদের ওপর সর্বপ্লাবী হামলা শুরু করে দিয়েছে। সম্মুখ সমরের পাশাপাশি মানসিক চোরাগুপ্তা হামলা করছে। এর জন্য ব্যবহার করছে ভয়ংকর সব অস্ত্র। এ সব অস্ত্রের নাম হলো সম্পদের প্রতি মোহ, বিলাসিতা, আলস্য এবং দায়িত্বহীনতা।

    এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য খ্রীস্টান এবং ইহুদী শক্তি সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। ইহুদীরা নিজেদের যুবতী মেয়েদেরকে লেলিয়ে দিয়েছে তোমাদের পেছনে। তারা তোমাদের পাশবিক শক্তিকে উসকে দিচ্ছে।

    ওরা আমাদের যুবকদের হাতে তুলে দিচ্ছে নানা রকম নেশার দ্রব্য। সৃষ্টি করছে মাদকাশক্তি। কোন জাতি ধ্বংস হওয়ার জন্য এ দুটো অভ্যাসই যথেষ্ট।

    তুমি যুবকদের বলবে, পাপী মানুষের পরকালের জন্য নির্ধারিত রয়েছে নরকের কঠিন যন্ত্রণা। তুমি এ দুটো অভ্যাস পৃথিবীতেই তোমাদের জন্য নরক যন্ত্রণা নিয়ে আসবে। তোমরা যাকে আজ স্বর্গের আনন্দ ভাবছো, দু’দিন বাদে দেখবে তা আসলে জাহান্নামের শাস্তি।

    এখনি সচেতন না হলে একদিন তোমরা হবে খ্রীস্টানদের গোলাম। ওরা তোমাদের বোনদের আব্রু নষ্ট করবে। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকবে কোরানের ছেঁড়া পাতা, মসজিদ হবে ঘোড়ার আস্তাবল। চোখের সামনে তোমাদের বাড়িঘর জ্বলবে দাউ দাউ করে।

    সুলতান আরো বলেছেন, মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে চাইলে নিজের ঐতিহ্য কখনো ভুলে যেয়ো না। দুশমন একদিকে তোমাদেরকে উত্যক্ত করছে, অন্যদিকে সম্পদ আর নারীদের লোভ দেখাচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে,  মুসলমান কোন বিলাসপ্রিয় জাতি নয়। মুসলমান সম্পদের দাস হয় না, বরং সম্পদকেই তারা দাসে পরিনত করে। প্রয়োজন হলে খেজুর পাতার চাটাইতে বসে আমরা পৃথিবরী শাসন করতে পারি।

    রোম ও পারস্যের সম্রাটদের সুবিশাল প্রাসাদ আর অতুলনীয় শানশওকত ও তৈজসপত্রের চেয়ে আমাদের কাছে বেশী প্রিয় তেজী ঘোড়া আর জং হীন তলোয়ার। আমাদের মূলধন কোরআন আর হাদীস, আমাদের আসল সম্পদ ঈমান আর আমল। সহায় আমাদের আল্লাহ। বিশ্বাস ও কর্মের দৃঢ়তাই আমাদের রক্ষাকবচ।

    তুমি ওদেরকে বলবে, বিলাসদ্রব্য, সম্পদ আর নারী দেহের লোভ দেখিয়ে ওরা তোমাদেরকে গোলামীর শিকলে বাঁধতে চাইছে। তলোয়ারকে ভয় পেয়েই এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে ওরা।

    হে আমার জাতির সন্তানেরা, নিজের হাতে নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ো না।

    হে আমার জাতির সন্তানেরা, নিজের হাতে নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ো না। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাও।

    মনে রেখো, অত্যাচারী শাসক সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে। প্রতিপক্ষকে জুলুম অথবা অর্থ দিয়ে পরাভূত করতে চায়। অত্যাচারকে ভয় পেয়ো না। পা দিও না লোভের ফাঁদে।

    তোমরাই জাতির ভবিষ্যত। আমরা অতীত হয়ে গেছি। জাতির অস্তিত্ব এখন নির্ভর করছে তোমাদের হাতে। তোমরা সচেতন হলে জাতি বাঁচবে, তোমরা ঘুমিয়ে থাকলে জাতি মারা যাবে।

    শত্রু তোমাদের মন-মানসিকতার সোনালী ঐতিহ্য অপবিত্র চিন্তা ধারার কালো নেকাবে ঢেকে দিতে চায়। ওরা চায় পৃথিবরীর বুক থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। এর মোকাবেলায় চাই অফুরন্ত সাহস আর হিম্মত।

    তোমরা যদি সাহসের সাথে সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকতে পারো বুকের ভেতর, আর প্রতিটি মুহুর্ত সে স্বপ্নকে বুকে নিয়ে নির্ভয়ে পথ চলতে পারো, দেখবে, প্রতিটি সূর্যোদয় তোমাদের জন্য সফল ও বিজয়ের বার্তা বয়ে আনবে।

    তোমাদেরকে ভয় পায় বলেই এ কুটিল পথ বেছে নিয়েছে ওরা। শুরু করেছে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। মুমীন ঈমান বিকিয়ে দেয় না বলেই তো অস্ত্রের লড়াইতে নামতে হয় ওদের। কিন্তু যদি তোমাদের ঈমানী চেতনা নষ্ট করা যায় তবে আর অস্ত্রের লড়াইকে প্রয়োজন কি?

    মনে রেখো, যে হৃদয়ে ঈমানের আগুন নেই সে দেহে ওদের আঘাত করারও প্রয়োজন নেই। কারণ, কোন দেহ কাঠামোর সাথে ওদের কোন বিরোধ নাই, ওদের বিরোধ তো বিশ্বাসের সাথে, ঈমানের সাথে, তাওহীদের সাথে।

    তোমাদের হিরন্ময় বিশ্বাস ও চেতনার বিনাশ সাধনই ওদের একমাত্র টার্গেট। সে টার্গেটে পৌঁছার জন্যই ওদের এতসব সাংস্কৃতিক হামলা।

    দুঃখের বিষয়, প্রাণে না মেরেও যে আমাদের হত্যা করা যায় এ কথা ওরা বুঝলেও আমরা সহজে বুঝতে চাই না। তাই মুসলমানদের মত জীবন যাপন করা করেও আমরা মুসলমান বলে দাবী করতে পারি নিজেদেরকে।

    হে যুবক বন্ধুরা, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ, ভবিষ্যতে ওদের প্রতিটি কাজের ওপর নিবদ্ধ রেখো তোমাদের সজাগ দৃষ্টি। তাহলেই দেখতে পাবে ওদের প্রতিটি কাজের পেছনে এক অন্তর্গুঢ় লক্ষ্য রয়েছে। আর সে লক্ষ্যটি হচ্ছে তোমাদের ইসলামী চেতনার বিনাশ সাধন করা, ধর্মীয় ভাবধারার প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। তোমরা যে মিশনারী জাতি, তোমাদের ওপর যে খেলাফতের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে সে কথা তোমাদের ভুলিয়ে দেয়।

    বেঈমানরা তোমাদেরকে কি অবস্থায় নিয়ে এসেছে তা তো আজ নিজেরাই দেখতে পাচ্ছো। হে আমার যুবক বন্ধুরা, তোমরা মানসিকভাবে ওদের গোলামীর নিগড়ে একবার বন্দী হলে সমগ্র মুসলিম জাতিরও একই পরিণতি হবে। কারণ, মুসলিম উম্মাহ আর কিছুই নয়, সে তো তোমাদের সমষ্টি মাত্র।

    সময়ের এক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আজ তাই তোমাদের কাছেই আমি আকুল আহবান জানাচ্ছি, এসো, সংকীর্ণতা পরিহার করো। ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে বাঁচানোর কোন চিন্তা মনেও এনো না, সেটা হবে আত্মহত্যার শামিল। জোট বাঁধো, ঐক্যবদ্ধ হও, এক হয়ে রুখে দাঁড়াও শত্রুর বিরুদ্ধে’।

    সুলতানের বাণী শোনানোর পর মুসলিম গোয়েন্দাটি এবার ওসমান সালেমকে তার কাজ ও কর্মপদ্ধতি কি হবে সে বিষয়ে বলতে লাগল।

    ‘আমাদের প্রধান সেনাপতি বলেছেন, আবেগ তাড়িত হয়ে কোন কাজ করো না। কেবল আবেগ দিয়ে সময়ের গতিকে রোধ করা যায় না। সব সময় খেয়াল রাখবে, আবেগ যেন দূরদর্শীতার উপর বিজয়ী না হয়।

    কখনো এত্তজিত হবে না। সংযম এবং সতর্কতার সাথে কাজ করবে। এই সংযম ও সতর্কতাই বিজয়ের চাবিকাঠি।

    আমার আরও দু’জন সঙ্গী বিভিন্ন রূপ নিয়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে।

    এবার শোন তোমার কাজ কি হবে। এ মুহুর্ত থেকে বিশ্বস্ত মুসলমানদের বাড়িতে গোপনে তীর, ধনুক এবং বর্শা তৈরী করে লুকিয়ে রাখবে।

    যুবক, বৃদ্ধ, কিশোর সবাইকে অস্ত্রের ট্রেনিং নিতে হবে। তবে সাবধান, এ কাজ করতে হবে গোপনে। শত্রুরা যেন কোন মতেই তোমাদের প্রস্তুতির টের না পায়।

    ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে নারীদেরকেও অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেবে। জেহাদ কেবল পুরুষের জন্যই নয়, নারী পুরুষ সবার জন্য ফরজ।

    ইহুদী মেয়েদের কথা যেন কেউ কানে না তোলে। তাদের কোনো কথা বিশ্বাস করবে না। ওরা মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করার জন্য এবং জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য নানা কৌশলে নানা কথা প্রচার করবে।

    সন্দেহ করতে পারে এমন কোন কথা ওদের সাথে বলবে না। কারও সাথে ঝগড়াঝাটি করবে না। ফালতু ঝগড়ায় জড়িয়ে নিজেদের শক্তি ও সময় অপচয় করবে না।

    প্রথমে সঙ্গঠিত হয়ে একজনকে নেতা নির্বাচন করে নিও। প্রত্যেকের তৎপরতা নেতার নজরে থাকবে। তার অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো পদক্ষেপ নেবে না। নেতা বানাবে এমন একজনকে, যে পরহেজগার, যে তোমাদের মধ্যে সবচে ত্যাগী, নির্লোভ আর বিচক্ষণ।

    শত্রুর গতিবিধির ওপর ভালভাবে লক্ষ্য রাখবে। তুমি কি করছো সেটা বড় কথা নয়, শত্রু কি করছে সেটাই বড় কথা। কারণ শত্রুর ক্ষমতা ও শক্তি খর্ব করার ওপর নির্ভর করছে তোমার বিজয়।

    প্রতিপক্ষ আগামীকাল কি পদক্ষেপ নেবে তা যদি তুমি আজ জানতে না পারো তবে তার আগামীকালের অগ্রযাত্রাকে কিছুতেই তুমি প্রতিহত করতে পারবে না। ফলে নিজে কি করছো তা যেমন তোমানের নখদর্পনে থাকবে ঠিক একই ভাবে শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপও তোমাদের নখদর্পনে থাকতে হবে’।

    সূর্য ডুবো ডুবো। মসজিদের পেশ ইমামা এলেন। তাকে দেখে ক্রশ হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল পাগলা। মসজিদের ভেতর তার কণ্ঠ ভেসে এল, ‘মুসলমান! ক্রুশের আশ্রয়ে এসো। তোমাদের ইসলাম মরে গেছে’।

    ওসমানের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন বৃদ্ধ ইমাম।

    ‘এখানে কি করছিলে’ ঝাঝের সাথে ওসমানকে প্রশ্ন করলেন ইমাম।

    ‘ওকে ভেতরে বসিয়ে রেখেছিলে কেন? কেন তাকে শেষ করে দাওনি? তোমার দেহে কি মুসলিম পিতার রক্ত নেই? আমি বৃদ্ধ না হলে ওকে জীন নিয়ে পালিয়ে যেতে দিতাম না’।

    ‘ওকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই আমি ওর পিছু নিয়েছিলাম’।

    ইমামকে খঞ্জর দেখিয়ে বললো ওসমান। ‘আল্লাহর শোকর ও আমার আঘাত ক্রুশ দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছে। লোকটা পাগল নয়। ইহুদী বা খ্রিষ্টানও নয়। ও মুসলমান। সুলতান সালাহুদ্দীনের বাণী নিয়ে এসেছে’।

    ইমামকে সুলতানের পয়গাম শুনিয়ে ওসমান বললো, ‘আমি এর বাস্তবায়ন করবো। আজ সন্ধ্যা থেকৈই নেমে পড়বো কাজে’।

    একটু ভেবে নিয়ে ওসমান আবার বললো, ‘কিন্তু আমাদের একজন নেতা প্রয়োজন। আপনি কি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন? ভেবে দেখুন! সরকার জানতে পারলে প্রথমেই নেতার মস্তক উড়িয়ে দেবে’।

    ‘আমি এ জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকব মসজিদে দাঁড়িয়ে এমন কথা কি বলতে পারি? তবে আমি নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য কি না সে ফয়সালা করবে জাতি’।

    ‘আমি মসজিদের এ পবিত্র অংগনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, আমার জীবন, সন্তান-সন্ততি এবং ধন-সম্পদ ইসলামের জন্য উৎসর্গ করে দেবো’।

    সামান্য বিরতি নিয়ে তিনি আবেগের সাথে বললেন, ‘প্রিয় সন্তান, সালাহ উদ্দীন সালাহুদ্দীনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা গভীরভাবে মনে গেঁথে নাও। তিনি ঠিকই বলেছেন, যুবকরাই হচ্ছে দ্বীন এবং জাতির ভবিষ্যত রক্ষক। ইচ্ছে করলে এর আশার আলো জ্বালাতে পারে আবার ইচ্ছে করলে সমাজকে আঁধারেও ঢেকে দিতে পারে’।

    তিনি আরো বললেন, ‘কোন মুসলমান যুবক যখন কোনো ইহুদী বা খ্রিষ্টান যুবতীর দিকে তাকিয়ে থাকে তখন সে এ কথা ভাবে না যে, তার বোনও অন্যের কু দৃষ্টির শিকার হতে পারে।

    প্রিয় যুবক! খোদার এই ঘরে দাঁড়িয়ে আজ এই মুহুর্ত থেকে প্রতিজ্ঞা করো, সালাহ উদ্দীনের পয়গাম কার্যকরী করার জন্য জীবনপণ চেষ্টা করবে’।

                                                   

    নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে গেল ওসমান। বাড়ি গিয়েই ছোট বোন আল নূরকে নিরালায় ডেকে নিল। তাকে শোনাল সুলতান সালাহুদ্দীনের বাণী।

    বলল, ‘বোন! আমাদের দ্বীন এবং জাতি তোমার কাছে অনেক বড় ত্যাগের প্রত্যাশী। তুমি অন্তপুরবাসী নারী –আজ থেকে এ চিন্তা ছেড়ে দাও। মুসলিম নারীদের জেহাদের জন্য প্রস্তুত কর’।

    ওসমান তাকে আরো বলল, ‘আমি তোমাকে খঞ্জর এবং তীর, ধনুক ও তলোয়ারের ব্যবহার শিখাবো। তবে কাজ করতে হবে খুব সাবধানে, কেউ যেন সন্দেহ করতে না পারে আমরা কি করছি’।

    আজ নূর আবেগে ওসমানের হাত চেপে ধরল।

    ‘আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ভাইয়া।

    আমার বান্ধবীরাও দেশ এবং জাতির জন্য কি করা যায় সে ভাবনায় বেশ কিছুদিন যাবত অস্থির। আমরা তো এতকাল পুরুষের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম, এবার ভাবছিলাম আমরাও কিছু করতে পারি কি না’।

    ওসমান বললো, ‘সুলতান এবং মুসলিম বাহিনীর ব্যাপারে এতদিন আমরা যা শুনেছি সব মিথ্যা, সব গুজব। প্রতিটি মুসলমানের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের কানে সঠিক খবর পৌঁছে দিতে হবে। তবে মনে রেখো, মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট গাদ্দার এবং খ্রিষ্টানদের গোয়েন্দাও রয়েছে’।

    কয়েকটা বাড়ির উল্লেখ করে ওসমান বললো, ‘আগে এসব বাড়ির মেয়েদের হাত করে নাও। এরপর সতর্কতার সাথে তাদেরকে বলো, তোমাদের পুরুষগুলি জাতির সাথে গাদ্দারী করছে। ওদের বলো, খ্রিষ্টান এবং ইহুদী মেয়েদের ভালবাসার অভিনয় নিরেট প্রতারণা মাত্র। এ হচ্ছে আমাদের জাতির বিরুদ্ধে এক ধরনের ফাঁদ’।

    ‘রিনিকে এখানে আসতে বারন করবো? তোমার সাথেও তো ওর সম্পর্ক রয়েছে’। বলল আল নুর।

    ‘ওকে যা বলার আমিই বলবো। তুমি কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেল

    বে, শেষে আবার ঝামেলায় পড়ে যাই’।

    ‘ঠিকই বলেছেন, ও ভীষণ বুদ্ধিমতি এবং সতর্ক’।

    ‘ওকে কিছু বলার দরকার নাই, যা বলার আমি নিজেই বলবো’।

    ওস্মান নিজের ঘর থেকে কাজ শুরু করে দিল।

    রিনি একজন খৃস্ট্রান যুবতী।সুন্দরী। ওসমানদের বাড়ির অল্প দূরে ওদের বাড়ি। রিনির পিতা বর্তমানে এখানকার পুলিশ প্রধান। ওর পুরো নাম রিনি আলেকজেণ্ডার। রিনি আল নুরের বন্ধু। কিন্তু ওসমানকে দেখলে ওরচোখে মুখে আনন্দের দ্যুতি হেসে উঠতো। ওসমান এড়িয়ে চলতো তাকে।তার ধারনা খৃস্ট্রান মেয়েটা এখানে গোয়েন্দাগিরি করতে আসে। তবে ও যেন ওসমানকে সন্দেহ না করে করে এ জন্য কখনও কখনও তার সাথে হাসি ঠাট্টাও করতো।

    ওসমান ভাবলো, এখন রিনিকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করা উচিত। ছোট বোনকে সামরিক ট্রেনিং দিতে হবে, রিনিকে তা জানানো যাবে না।

    রিনিকে কিভাবে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করবে এ নিয়ে ওসমান সারাদিন ভাবল। গভীর ভাবনা চিন্রাত পর একটা বুদ্ধি এল তার মাথায়।

    পরদিন ওসমান আল নূরকে ডেকে বললো, ‘রিনি যখন আমাদের বাড়িতে আসে তখন তুমি তাকে কোন ছুতো দেখিয়ে বাইরে নিয়ে যেও। এভাবে কয়েকদিন এড়িয়ে চললে দেখবে একদিন ও নিজে থেকেই এখানে আসা বন্ধ করে দেবে’।

  • কেরী সাহেবের মুন্সী

    কেরী সাহেবের মুন্সী

    কেরী সাহেবের মুন্সী

    ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ একটি জীবনীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস, এটি রচনা করেছেন প্রমথনাথ বিশী। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে, আশ্বিন, ১৩৬৫ বঙ্গাব্দে। বইটির মূল উপজীব্য উইলিয়াম কেরী ও রামরাম বসুর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগের কলকাতা শহরের ইতিহাস ও ইংরেজ-বাঙালি সম্পর্কের জটিল সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এই উপন্যাসটির জন্য তিনি ১৯৬০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিলেন।

    বর্তমান সংস্করণে ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’র শ্রাবণ ১৪১৪ বঙ্গাব্দ প্রকাশিত চতুর্বিংশ মুদ্রণের অনুসরণ করা হয়েছে; এই সংস্করণটি মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট,  কলকাতা ৭০০ ০৭৩ হইতে এস. এন. রায় কর্তৃক প্রকাশিত ও অটোটাইপ, ১৫২ মানিকতলা মেন রোড, কলকাতা-৭০০ ০৫৪ হতে তপন সেন কর্তৃক মুদ্রিত। প্রচ্ছদপট এঁকেছিলেন আশু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং চয়নিকা প্রেস থেকে মুদ্রিত।

    উৎসর্গ

    শ্রীদেবেশচন্দ্র রায়

    প্রীতিভাজনেষু

    লেখকের বক্তব্য

    বছর পনেরো আগে রামরাম বসুর জীবন নিয়ে কিছু একটা লিখবার ইচ্ছা হয়, তখন ধারণা ছিল না যে তা ঠিক কি আকার ধারণ করবে। তার পরে বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করে বিস্মিত হয়ে গেলাম। রামরাম বসু প্রসঙ্গে উইলিয়াম কেরীকে পেলাম। বুঝলাম যে যে-সব মহাপ্রাণ ইংরেজ এদেশে এসেছেন, উইলিয়াম কেরী তাঁদের অগ্রগণ্য। কেরীর ধর্মজীবন, ধর্মপ্রচারে আগ্রহ, বাংলা গদ্য সৃষ্টিতে নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় অভিভূত করে দিল আমাকে। তখন ধীরে ধীরে কেরী ও রামরাম বসুকে অবলম্বন করে কাহিনীটি রূপ গ্রহণ করে উঠল।

    এই কাহিনীকে পাঠক ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে গ্রহণ করবেন কিনা জানি না, করলে আমার আপত্তির কারণ নেই। ১৭৯৩ থেকে ১৮১৩ সালের ইতিহাস এর কাঠামো। জ্ঞানত কোথাও ইতিহাসের সত্য থেকে বিচ্যুত হইনি। কেবল একটি বিষয়ে কিছু স্বাধীনতা নিয়েছি, দ্বারকানাথ ঠাকুরের বয়স কিছু বাড়িয়ে দিয়েছি! আর কিছুই নয়, রবীন্দ্রনাথের পিতামহকে কাহিনীর মধ্যে আনবার লোভ সম্বরণ করতে পারি নি।

    ইতিহাসের সত্য ও ইতিহাসের সম্ভাবনা ঐতিহাসিক উপন্যাসকারের উপাদান। ইতিহাসের সত্য অবিচল, তাকে বিকৃত করা চলে না। ইতিহাসের সম্ভাবনায় কিছু স্বাধীনতা আছে লেখকের। সত্যের অপব্যবহার করি নি, সম্ভাবনার যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছি।

    দুই শ্রেণীর নরনারীর চরিত্র আছে উপন্যাসখানায়, ঐতিহাসিক আর ইতিহাসের সম্ভাবনা-সঞ্জাত। কেরী, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, টমাস, রামমোহন, রাধাকান্ত দেব প্রভৃতি ঐতিহাসিক চরিত্র। রেশমী, টুশকি, ফুলকি, জন স্মিথ, লিজা, মোতি রায় প্রভৃতি ইতিহাসের সম্ভাবনা-সঞ্জাত অর্থাৎ এসব নরনারী তৎকালে এইরকমটি হত বলে বিশ্বাস। এখানে যেমন কিছু স্বাধীনতা আছে, তেমনি ভুলের সম্ভাবনাও বর্তমান। ভুল না করে স্বাধীনতার সুযোগ গ্রহণে লেখকের ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে ক্ষমতা কতটা প্রকাশ পেয়েছে জানি না।

    পাত্রপাত্রীর উক্তিকে লেখকের মন্তব্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সে-সব উক্তি পাত্রপাত্রীর চরিত্রের সীমানার মধ্যেই সত্য, তাদের সত্যের সাধারণ রূপ বলে গ্রহণ করলে লেখকের প্রতি অবিচার করা হয়। বলা বাহুল্য, কোন ধর্ম কোন সম্প্রদায় বা কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্য এ গ্রন্থের নয়। তার চেয়ে উচ্চতর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে লেখক। একটা সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বের কয়েকটি বিশেষ নরনারীর সুখদুঃখের লীলাকে অবলম্বন করে নির্বিশেষ মানবসমাজের সুখদুঃখের লীলাকে অঙ্কন লেখকের উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে এমন দাবি করি না—কিন্তু উদ্দেশ্য ও ছাড়া আর কিছু নয়।

    আরও একটা কথা বুঝলাম বিষয়ে প্রবেশ করে আর কাহিনীটা লিখতে গিয়ে— কলকাতা শহরের প্রাচীন অংশের প্রত্যেক পথঘাট, অট্টালিকা, উদ্যান, প্রত্যেক ইষ্টকখণ্ড বিচিত্র কাহিনীরসে অভিষিক্ত। এ শহরের একটি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আছে যা ভারতের প্রাচীন শহরগুলোর ব্যক্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র। ভারতের প্রাচীন ও নবীন যুগের সীমান্তে অবস্থিত এই শহর। এর অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও না ভালবেসে পারা যায় না একে, কারণ এ আমার সমকালীন। সমকালীনতার দাবি এ শহরের সকলের প্রতি। ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’রও ঐ দাবি—তদধিক কোন ঐশ্বর্য এর আছে মনে হয় না। অলমিতি—

    প্র.

    ৭ই মে, ১৯৫৮

    সেকালের পথঘাটের বর্তমান নামধাম

     

    সেকাল একাল
    বেরিয়াল গ্রাউণ্ড রোড পার্ক স্ট্রীট।
    এসপ্লানেড বর্তমান ইডেন গার্ডেন।
    নঈ তলাও পার্ক স্ট্রীট ও চৌরঙ্গীর মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের পুকুর।
    ঝাঁঝরি তলাও রোড কিড স্ট্রীট।
    বিজিতলাও লোয়ার সারকুলার রোড ও চৌরঙ্গীর মোড়ের উত্তর-পশ্চিম কোণের পুকুর।
    জানবাজার রোড সুরেন ব্যানার্জি রোড।
    কসাইটোলা স্ট্রীট বেন্টিঙ্ক স্ট্রীট।
    রোপওয়াক মিশন রো।
    দি অ্যাভিনিউ বহুবাজার স্ট্রীট।
    এসপ্লানেড রোড গঙ্গার ধার চাঁদপাল ঘাট থেকে শুরু হয়ে সোজা পূর্বদিকে চৌরঙ্গী রোড পর্যন্ত; বর্তমান রাজভবনের দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমমুখী দুটি প্রধান ফটক পার হয়ে এসপ্লানেড ঈস্ট ও চৌরঙ্গীর সংযোগস্থল পর্যন্ত।
    ট্যাঙ্ক স্কোয়ার লালদিঘি।
    ওল্ড মিশন চার্চ লালবাজার স্ট্রীট ও মিশন নোর মোড়ের দক্ষিণে অবস্থিত।
    সেন্ট জনস্ চার্চ কাউন্সিল হাউস স্ট্রীট ও হেস্টিংস স্টীটের মোড়ের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত।
    ওল্ড ফোর্ট বর্তমান পূর্ব রেলওয়ের প্রধান কার্যালয়,  কলকাতার কালেকটরেট ও জি পি ও-র উত্তর দিকের কিছু অংশ জুড়ে পুরাতন কেল্লা অবস্থিত ছিল।