Tag: সম্পন্ন গ্রন্থ

  • ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত বাংলা কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো রচিত হয় ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে। মাত্র একুশ বছর বয়সে সুকান্ত মারা যাবার কিছুদিন পূর্বে এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

    সুকান্ত যখন রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী, ঠিক সে মুহুর্তেও তার সাহিত্যচর্চার ব্যাঘাত ঘটে নি। অসুস্থ অবস্থায় নিজেদের ঘরের সিঁড়ি দেখে শোষক শ্রেণী আর শোষিতের প্রতিক বানিয়ে লিখলেন “সিঁড়ি”। এভাবে এ কাব্যগ্রন্থের “চিল”, “সিগারেট” ও “চারাগাছ” লিখলেন তিনি। যেগুলো দিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ “ছাড়পত্র”।

    কাব্যটি উৎসর্গ করা হয়—

    শ্রদ্ধেয় মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ-কে

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    সুকান্ত তার নিজের প্রথম কবিতার বই দেখে যেতে পারল না—চিরদিন আমাদের এই আক্ষেপ থেকে যাবে। সুকান্তর বই প্রকাশের ভার আমরাই গ্রহণ করেছিলাম; তাই আমাদের প্রত্যেকটা ভুলত্রুটি আজ পর্বতপ্রমাণ হয়ে স্মৃতিকে ভারাক্রান্ত করে তুলছে।

    সুকান্তর মৃত্যুর কয়েকটা দিন আগের কথা আজ বড় বেশী মনে পড়ছে। এই বইয়ের সমস্ত কবিতার ছাপানো ফাইল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে যখন সুকান্তর হাতে দিলাম, তখন আনন্দে উঠে বসেছিল সুকান্ত। বই তাহ’লে সত্যিই বেরোচ্ছে। আসার সময় সুকান্তকে কথা দিয়ে এসেছিলাম—বই বেরোতে আর এক সপ্তাহ। সে সপ্তাহ না যেতেই সুকান্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেল।

    নামকরণের জন্যেই বইটা বেরোতে এত দেরি হচ্ছিল। বই যখন প্রেসে দেওয়া হয়, সুকান্ত তখন শয্যাগত—বইয়ের নাম তখনও সে ঠিক ক’রে উঠতে পারেনি। পরে সে এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ল যে, নামকরণের ভার আমাদেরই নিতে হয়। কিন্তু কোন নামই আমাদের পছন্দ হচ্ছিল না। কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে যখন নাম ঠিক হ’ল, প্রচ্ছদপটও আঁকতে দেওয়া হ’ল—তখন অকস্মাৎ বজ্রাঘাতের মত এল সুকান্তর মৃত্যুর খবর। তারপর বইয়ের নাম বদ্‌লে প্রথম কবিতার নামে বইয়ের নাম রাখা হ’ল ‘ছাড়পত্র’।

    ‘ছাড়পত্রে’র সমস্ত কবিতাই ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যে লেখা। এ ছাড়াও, বইতে নেই এমন বহু কবিতা এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়িতে গোড়ার দিকে সেগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সুকান্তর মৃত্যুর পরে তার লেখার ঝুলিতে আরও বহু অপ্রকাশিত কবিতা পাওয়া যায়। এই সংকলনের সঙ্গে সেই সমস্ত কবিতাও জুড়ে দেবার কথা হয়। কিন্তু তা করতে গেলে আরও বেশী সময় লাগবে এবং বইটাও আকারে বেশী বড় হয়ে যাবে,—এই আশঙ্কা ক’রে ‘ছাড়পত্র’কে বর্তমান আকারেই বার করা এবং অন্যান্য কবিতা নিয়ে সুকান্তর দ্বিতীয় একটি কবিতা-সংগ্রহ বার করার সিদ্ধান্ত হয়। এই অনিশ্চয়তার জন্যে বই প্রকাশে আরও বেশী বিলম্ব হয়ে গেল; ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশের ব্যাপারে আমি গোড়া থেকে জড়িত ছিলাম বলেই এই বিলম্বের জন্য প্রকাশকদের পক্ষ থেকে পাঠকসমাজের কাছে ক্ষমা চাইছি।

    ‘ছাড়পত্রে’র কবিতাগুলি রচনার কালানুক্রমে সাজানো হয় নি। পর পর সাজানোর ব্যাপারে মোটামুটি ভারসাম্য ও ছন্দোবৈচিত্রের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তার ফলে প্রথম দিকে বহু নতুন ও শেষের দিকে বহু পুরানো কবিতাকে স্থান দিতে হয়েছে। ‘চারাগাছ’, ‘প্রার্থী’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘সিগারেট’ প্রভৃতি কবিতা সুকান্তর রোগশয্যায় লেখা; ‘ফসলের ডাক’, ‘কৃষকের গান’, ‘এই নবান্নে’, ‘আঠারো বছর বয়স’ প্রভৃতি কবিতা চার-পাঁচ বছর আগেকার লেখা—সুকান্তর বয়স তখন পনেরো ষোল। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘প্রস্তুত’, ‘দুরাশার মৃত্যু’, সম্ভবত তারও আগের লেখা।

    ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল—যুগসন্ধির এই পাঁচটা বছর ধরে ‘ছাড়পত্রে’র রচনাকাল। একদিকে মৃত্যুকীর্ণ যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ, বন্যা আর মহামারী, অন্যদিকে জীবনপ্রতিষ্ঠার মৃত্যুপণ সংগ্রাম—জয়পরাজয় আর উত্থানপতনে, সুখদুঃখ আর আশানিরাশায় ঘেরা এই পাঁচটা বছর ‘ছাড়পত্রে’ উৎকীর্ণ হয়ে আছে। কোটি কোটি মানুষের বলিষ্ঠ আশা কবির কণ্ঠে নির্ভীক ঘোষণায় ফুটে উঠেছে।

    —সুকান্ত নতুন যুগের সার্থক কবি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন একাত্মতা, সহজ কথা সোজাসুজি বলতে পারার এমন দুঃসাহসী ক্ষমতা লুকাস্তর সমসাময়িক আর কোন কবি দেখাতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হয়েও কবিত্বশক্তিতে সুকান্ত ছিল অগ্রগণ্যদের একজন। ইস্কুলের ছাত্র অবস্থায় দেশজোড়া এত বিরাট খ্যাতি বাংলার আর কোন কবির ভাগ্যেই বোধহয় জোটেনি। এই বয়সেই বিদেশে সুকান্তর একাধিক কবিতার অনুবাদ হয়েছে, তার কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

    সুকান্তর কবিতা যাঁরা পড়বেন, তাঁরা একথা স্বীকার করবেন যে, সুকান্তর কবিতা শুধুই বিরাট সম্ভাবনার ইঙ্গিত নয়, তাতে আছে মহৎ পরিণতির সুস্পষ্ট পদধ্বনি। ‘ছাড়পত্র’ তাই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পাবে।

    কবিতার বিচিত্র কলাকৌশলে, ছন্দের আশ্চর্য দক্ষতায়, শব্দনির্বাচনের অশেষ নৈপুণ্যে এই কবি কিশোর রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীদেরও অভিভূত করেছে। কিন্তু আঙ্গিকের মায়ায় সুকান্ত কখনও বাঁধা পড়েনি। ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম যুগের কবিতার সঙ্গে পরের যুগের কবিতা মিলিয়ে দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘ঠিকানা’ কিম্বা ‘বোধনে’র সঙ্গে ‘প্রার্থী’র তফাৎ অনেক। ‘প্রার্থী’তে এসে সুকান্ত সম্পূর্ণ একটা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছে। পদ্যছন্দ বর্জন ক’রে সহজ নিরাভরণ গদ্যে সে যে আকুতি প্রকাশ করেছে, তা অন্য কোন উপায়ে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। ‘আর উত্তাপ দিও রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে’—করুণা বা অনুকম্পার কথা নয়, জ্বলন্ত বিশ্বাসের অগ্নিগর্ভ বাণী।

    সুকান্তর প্রথম দিকের কবিতায় তার জীবনদর্শন একটু বেশী রকমের প্রকট মনে হতে পারে। হয়ত অতটা স্পষ্টবাদিতা অনেকের পছন্দ হবে না। যেখানে সমাজের শত্রুদের সে নাম ক’রে ক’রে চিনিয়ে দিয়েছে, যেখানে সে সংগ্রামের অগ্নিবর্ণ পথে পাঠকদের হাত ধ’রে ডেকেছে—সেখানে কবিতার সীমানা নিয়ে মতান্তর হতে পারে। কিন্তু সুকান্তর শেষের দিকে লেখা ‘খবর’, ‘চিল’, ‘প্রার্থী’ প্রভৃতি কাউকেই মুগ্ধ না ক’রে পারে না। শেষোক্ত কবিতাগুলি যে অনেক বেশী গভীর, অনেক বেশী মর্মস্পর্শী—এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।

    ‘ছাড়পত্রে’র কাব্যবিচার আমার উদ্দেশ্য নয়, সে ক্ষমতাও আমার নেই। সুকান্তর কবিতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে আমার যেটুকু পরিচয়, সেইটুকুই শুধু এখানে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি।

    সুকান্তর সেই সমস্ত অজ্ঞাতনামা বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, যাঁরা কষ্ট ক’রে কবিতাগুলি বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সংগ্রহ ক’রে দিয়েছিলেন। ‘ছাড়পত্রে’র প্রচ্ছদপট এঁকে দিয়েছেন খ্যাতনামা শিল্পী সত্যজিৎ রায়—তাঁকে অজস্র ধন্যবাদ। এ ছাড়াও অন্যান্য বহু বন্ধু নানাভাবে সাহায্য ক’রে বাধিত করেছেন। পরবর্তী সংস্করণ যাতে ত্রুটিহীন হ’য়ে উঠতে পারে তার জন্যে পাঠকপাঠিকাদের সহযোগিতা কামনা করি।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

    দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

    অনেকদিন আগেই ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হয়। কিন্তু নানা অসুবিধার দরুণ এতদিন প্রকাশকদের পক্ষে দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপানো সম্ভব হয়ে উঠেনি।

    এই সংস্করণ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলবার নেই। কয়েকটি নতুন কবিতা এই সংস্করণে দেওয়া হ’ল—‘দেশলাই কাঠি’, ‘সেপ্টেম্বর ’৪৬’ এবং পদ্য ছন্দে ‘কাশ্মীর’।

    যারা এতদিন অধীর আগ্রহ নিয়ে ‘ছাড়পত্রে’র দ্বিতীয় সংস্করণের জন্যে অপেক্ষা করেছেন, তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

    সু. মু.

    তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা

    ‘ছাড়পত্রে’র তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হ’ল—এই সানন্দ ঘোষণা ছাড়া নতুন ক’রে বলবার কিছু নেই। তৃতীয় সংস্করণে নতুন কোন কবিতা যোগ করা হয় নি; কিন্তু দুটি জায়গায় সামান্য সংশোধন করা হয়েছে। ‘কাশ্মীর’ শীর্ষক ২নং কবিতাটির শেষের দিকে ‘কাশ্মীর চঞ্চল—স্রোত লক্ষ’ বদলিয়ে ‘কাশ্মীর আজ চঞ্চল—স্রোত লক্ষ’ এবং ‘সেপ্টেম্বর ১৯৪৬’ কবিতার শেষের দিকে ‘আজকের কলকাতার প্রার্থনার’ জায়গায় ‘আজকের কলকাতার এ প্রার্থনা’ করা হয়েছে। তার কারণ, এই দুটি জায়গায় পড়তে গেলে আট্‌কায়। সুকান্তর হস্তলিখিত কপি যোগাড় ক’রে উঠতে না পারায় ছাপানো কবিতার সঙ্গে মূল লেখা মিলিয়ে দেখা সম্ভব হ’ল না। যাই হ’ক আশা করা যায় আগামী সংস্করণ বার হবার আগে কবিতাটি মিলিয়ে দেখে নিঃসংশয় হওয়া যাবে।

    কাগজ ও ছাপার দর বৃদ্ধির দরুণ বর্তমান সংস্করণটির মূল্য সামান্য বাড়াতে হ’ল। আশা করি পাঠকেরা মার্জনা করবেন।

    সু. মু.

  • ঘুম নেই

    ঘুম নেই

    ঘুম নেই

    কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অসামান্য জনপ্রিয় এবং শক্তিমান কবি ছিলেন। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে কড়া (১৯৫২) প্রভৃতি কবির প্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

  • পূর্বাভাস

    পূর্বাভাস

    পূর্বাভাস

    কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অসামান্য জনপ্রিয় এবং শক্তিমান কবি ছিলেন। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে কড়া (১৯৫২) প্রভৃতি কবির প্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

    পূর্বাভাস সুকান্ত ভট্টাচার্যের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এতে মোট ২৯টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলো হল—পূর্বাভাস, হে পৃথিবী, সহসা, স্মারক, নিবৃত্তির পূর্বে, স্বপ্নপথ, সুতরাং, বুদ্বুদ মাত্র, আলো–অন্ধকার, প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার মৃত্যুর পর, স্বতঃসিদ্ধ, মুহূর্ত (ক), মুহূর্ত (খ), তরঙ্গ ভঙ্গ, আসন্ন আঁধারে, পরিবেশন, অসহ্য দিন, উদ্যোগ, পরাভব, বিভীষণের প্রতি, জাগবার দিন আজ, ঘুমভাঙার গান, হদিশ, দেয়ালিকা, প্রথম বার্ষিকী, তারুণ্য, মৃত পৃথিবী ও দুর্মর।

  • মিঠেকড়া

    মিঠেকড়া

    মিঠেকড়া

    বড়োরা অবাক হয় সুকান্তর কবিতা পড়ে। এবার সুকান্তর ছড়া পড়ে অবাক হবে ছোটরা। আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ির ছড়া নয়, একেবারে একালের টাট্কা হাতে-গরম ছড়া। হাসতে হাসতে হঠাৎ হাত মুঠো হয়ে যাবে রাগে, চোখ দুটো জ্বলে উঠবে লাল-টক্‌টকে সূর্য-ওঠা দিনের কথা ভেবে। এমন ছড়া বাংলা দেশে আর কেউ লেখে নি।

    কলকাতার রাস্তায় বিষম এক খেলা। বন্দুকের সঙ্গে শুধু হাতের লড়াই। আশ্চর্য! এমন এক সাংঘাতিক কাণ্ড তার মধ্যেও মজা পেয়েছে সুকান্ত। গোটা বইতে এমনি সব মিঠে রসে ভেজানো কড়া পাকের ছড়া। সুকান্তই নিজে তাই তার বইয়ের নাম দিয়েছিল ‘মিঠেকড়া’।

    ‘পৃথিবীর দিকে তাকাও’—এই ছড়াটি একটি ইংরেজি কবিতার ভাবানুসরণে লেখা। বত্রিশ পৃষ্ঠার ছবিটি একটি বিদেশী ছবির ভাবাবলম্বনে আঁকা।

    ‘মিঠেকড়া’র ছবিগুলি এঁকেছেন শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। সুকান্ত এই ছড়াগুলো লেখার পর ছবি আঁকার জন্যে তারই হাতে প্রথম দেয় এবং এ বইয়ের পরিকল্পনা দুজনে মিলে করে। এতদিন পরেও দেবব্রতবাবু সুকান্তর মনের কথা যেভাবে ছবির রেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে তাকে অভিনন্দন না জানিয়ে পারছি না। সুকান্ত এ বই দেখলে কী খুশিই যে হ’ত।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

  • অভিযান

    অভিযান

    অভিযান

    খুব অল্প পরিসরে হলেও ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’ তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কবিতা, গীতি, গল্প ও নাটিকা তাঁর প্রতিভার প্রমাণ রয়েছে। তবে কবিতার সংখ্যা কম হলেও গুণে ও মানে প্রতিভার যে বিস্ময়কর স্ফুরণ ঘটেছে সে জন্য আর সব খ্যাতিকে ছাড়িয়ে সুকান্ত কবি হিসেবেই সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।

    ‘অভিযান’ বহুমুখী প্রতিভার সমাজ সচেতন কবি ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যে’র একটি গীতিনাট্য। এই গ্রন্থ তিনি কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের চিত্র এঁকেছেন। চরিত্রসমূহের সংলাপ, ঝগড়া-বিবাদ, চরিত্রের প্রকাশ এবং শেষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল— সব কিছুই কাব্যিক।

    ‘কালের যাত্রা’ নাটিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন— ‘যারা এতদিন মরেছিল, তারা উঠুক বেঁচে, যারা যুগে যুগে ছিল খাট হয়ে তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।’ সুকান্ত যেন প্রাণ ভরে রবীন্দ্রনাথের কথা শুনেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্ত করবী’তে রাজা-প্রজার কথা আছে, ধনদৌলতের কথা আছে, শোষণ-বঞ্চণার কথা আছে। সুকান্তের ‘অভিযানে’ও আছে মহারাজ, আছে কোতোয়াল, আছে শোষণ, ক্ষুধা আর বঞ্চনার জ্বালা। অভিযানের ‘সঙ্কলিতা’ আর রক্ত করবীর নন্দিনীর চরিত্র হুবহু এক নয়, কিন্তু আছে লক্ষ্যণীয় কিছু ব্যাপার। কালের যাত্রার সাথেও আছে অভিযানের খানিক মিল। কালের যাত্রায় আছে,— ‘আমরাই তো যোগাচ্ছি অন্ন তাই খেয়ে তোমরা বেঁচে আছ, আমরাই বুনেছি বস্ত্র, তাতেই তোমাদের লজ্জা রক্ষা!’ অথবা ‘দরিদ্রের রক্ত করে শোষণ বিরাট অহঙ্কারকে কর পোষণ’…।

    অভিযানের শেষ সংলাপ হল—

    ‘চলবে না অন্যায়, খাটবে না ফন্দি,

    আমাদের আদালতে আজ তুই বন্দী!’

    যুগ যুগ ধরে সমাজে যে শোষণ চলে এসেছে তার চির অবসানের আন্দোলন ও বিপ্লবের জন্য চাই সমাজ সচেতন কর্মী বাহিনী। তারা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে, ছিনিয়ে আনবে চূড়ান্ত বিজয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য এই কথাটাই ভাল করে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিযানে।

    অভিযান সাম্যবাদী প্রচারণার মোক্ষম হাতিয়ার নয়; ক্ষুধা ঘুচানোর অভিযান। এ অভিযান সমাপ্ত হলে অসহায় নারী-শিশু আর ক্ষুধায় কাতর হবে না, কাঁদবে না। অন্ধকারের চির অবসান হবে। এই জন্য চাই তাত্ত্বিক জ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ব্যাবহারিক দিকে পারঙ্গম জ্ঞানী ক্যাডার। যারা শাসকের রক্তচক্ষু, কোতোয়াল ও চরকে ভয় পাবে না, নির্ভয়ে এগিয়ে যাবে। প্রয়োজনে জীবন বাজী রাখবে। অভিযানে কোতোয়ালকে লক্ষ্য করে সঙ্কলিতার উক্তি—

    ‘তোমরা দেখাও শুধু শক্তি

    তাই তো করে না কেউ ভক্তি,

    কর না প্রজার কোন কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর জ্ঞান।’

    ‘চিরদিন তরুণেরা অন্যায়ের করে নিবারণ।’ তাই সত্যকাম কোতোয়ালকে বলতে পেরেছে—

    ‘তোমার মত দুর্জনকে করতে হলে ভয়।

    পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মোটেই উচিত নয়।’

    ইন্দ্রসেন বলছে, তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। এভাবে চিরকাল শাসন করা যাবে না। শোষকের দিন আজ গত। সঙ্কলিতা তাই আর্তনাদ করে বলছে—

    ‘দরিদ্রের রক্ত করে শোষণ

    বিরাট অহঙ্কারকে কর পোষণ,

    তুমি পশু, পাষণ্ড, বর্বর

    অত্যাচারী, তোমার ও হাত কাঁপে না থরথর?’

    এরপর যা হবার তাই হল; সঙ্কলিতার প্রাণ গেল দেশপ্রেমিক বলে। কিন্তু এতে কী মুক্তিযুদ্ধ থেমে থাকে? হাত দিয়ে যেমনি সূর্যের আলোকে রোখা যায় না, থামানো যায় না। গণজোয়ারের ঢেউ, সত্যের জন্য অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীতে একদিন সত্যের জয়পতাকা উড়বেই।

    ‘চলবে না অন্যায় খাটবে না ফন্দি,

    আমাদের আদালতে আজ তুই বন্দী।’

    সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন জনতার আদালতে সকল অপরাধীর বিচার হবে। বিচার হবে বিচারপতির, যিনি শাসকের স্বার্থে অন্যায় ও অবৈধ রায় প্রদান করেছেন। জনতার আদালত হবে বড় কঠিন ও নির্মম এক নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। ‘সূর্যপ্রণামে’র সমবেত গান ‘আহ্বানে’ কবি বলেছেন—

    ‘আমাদের ডাক এসেছে

    এবার পথে চলতে হবে,

    ডাক দিয়েছে গগণ-রবি

    ঘরের কোণে কেই বা রবে।

    ডাক এসেছে চলতে হবে আজ সকালে

    বিশ্বপথে সবার সাথে সমান তালে।’

    যে কথা কবি বারবার বলতে চান, সে কথা অস্তাচলের ‘প্রান্তকে’ আছে এভাবে— ‘সেথায় কাদের আর্তনাদ বারংবার বৈশাখীর ঝড়ে।/… ক্ষীণদীপ উধর আলোতে/ চিরন্তন পথের সঙ্কেত-রেখে যায় প্রভাতের কানে।’

    রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতার সুর সুকান্তের ‘শেষ মিনতি’তে খুঁজে পাওয়া যায়—

    ‘ওকে যায় চলে কথা না বলে, দিও না যেতে

    আমি কেঁদে কই যেও না কোথাও,

    সে যে হেসে কয় মোরে যেতে দাও।’

    আর সোনার তরীর — কোন পাড়ে নিয়ে যাবে হে সুন্দরী/ কোন পাড়ে ভিড়িবে তোমার সোনার তরী’র সাক্ষাত মিলে সুকান্তের ‘আয়োজন’ বর্ণনায়—

    ‘তুমি যাবে আমাদের মথিত করে! কোন মহাদেশের

    কোন আসনে হবে তোমার স্থান?

    কতদূর তা কে জানে।’

    শেষ করছি সঙ্কলিতা ও কোতোয়ালের কিছু সংলাপ উল্লেখ করে।

    সঙ্কলিতা (আঁচল তুলে)

    ওগো রাজপ্রতিনিধি,

    তুমি রাজ্যের বিধি।

    তুমি দাও আমাদের অন্ন,

    আমরা যে বড়ই বিপন্ন।

    কোতোয়াল

    য চ’লে ভিখারী মেয়ে যা চ’লে

    দেব না কিছুই তোর আঁচলে।

    সঙ্কলিতা

    তুমি যদি না দেবে তো কে দেবে এ রাজ্যে?

    সবারে রক্ষা করা তোমাদের কাজ যে।

    কোতোয়াল

    চুপ কর হতভাগী, বড় যে সাহস তোর?

    এখুনি বুঝিয়ে দেব আমার গায়ের জোর।

    সঙ্কলিতা

    তোমরা দেখাও শুধু শক্তি,

    তাইতো করে না কেউ ভক্তি;

    করো না প্রজার কোনো কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর অজ্ঞান।

    কোতোয়াল

    চল তবে মুখপুড়ী, বেড়েছিস বড় বাড়–

    কপালে আছে রে তোর নির্ঘাত কারাগার।

  • গীতিগুচ্ছ

    গীতিগুচ্ছ

    গীতিগুচ্ছ

    সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত গানের সংকলন গীতিগুচ্ছ প্রকাশিত হল। এতে উনিশটি গান রয়েছে। নিম্নে উনিশটি গানের প্রথম পঙ্‌ক্তি উল্লেখ করা হল—

    1. ওগো কবি তুমি আপন ভোলা।
    2. এই নিবিড় বাদল দিনে।
    3. গানের সাগর পাড়ি দিলাম।
    4. হে মোর মরণ, হে মোর মরণ।
    5. দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে।
    6. শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে।
    7. ও কে যায় চলে কথা না বলে দিও না যেতে।
    8. হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী।
    9. শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল ফুলের বনে।
    10. কিছু দিয়ে যাও এই ধূলিমাখা পান্থশালায়।
    11. ক্লান্ত আমি, ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা।
    12. সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন।
    13. কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি।
    14. মেঘ-বিনিন্দিত স্বরে।
    15. গুঞ্জরিয়া এল অলি।
    16. কোন অভিশাপ নিয়ে এল এই।
    17. ভুল হল বুঝি এই ধরণীতলে।
    18. মুখ তুলে চায় সুবিপুল হিমালয়।
    19. ফোটে ফুল আসে যৌবন।
  • হরতাল

    হরতাল

    হরতাল

    ‘হরতাল’ কবি সুকান্তের একটি গদ্যগ্রন্থ। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। কবি সুকান্ত ব্যক্তি জীবনে যেমন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন তেমন চিন্তার ছাপ রয়েছে তার রচনায়। তার প্রায় সব লেখাতেই সাধারণ মানুষের কথা, দুঃখ-কষ্টের চিত্র উঠে এসেছে। আলোচিত হয়েছে নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ, বিপ্লবের ভাষা ও বিপ্লবীর কণ্ঠস্বর। ‘হরতাল’ গ্রন্থটি তেমনই একটি চিন্তার ফসল। গ্রন্থটিতে তার লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত- অপ্রকাশিত গদ্য সংকলিত হয়েছে। যেখানে হরতাল, দেবতাদের ভয়, ষাঁড়-গাধা-ছাগলের কথা, লেজের কাহিনী শিরোনামের গদ্য স্থান পেয়েছে।
  • সুকান্তের পত্রগুচ্ছ

    সুকান্তের পত্রগুচ্ছ

    সুকান্তের পত্রগুচ্ছ

    সুকান্ত ভট্টাচার্য যে সকল পত্র লিখেছেন, তার মধ্যে বেশির ভাগই বন্ধু অরুণাচলকে লেখা। ‘পত্রগুচ্ছে’ অরুণাচল ও অন্যান্যদের লেখা তাঁর পত্রগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে। সারস্বত লাইব্রেরী, ২০৬ বিধান সরণী, কলিকাতা-৬ থেকে প্রকাশিত ‘সুকান্ত সমগ্র’র ২৭১ থেকে ৩৪৩ পাতায় ঊনপঞ্চাশটি চিঠি সন্নিবেশিত হয়েছে। এবং ৩৪৫ থেকে ৩৪৯ পাতায় ‘পত্রগুচ্ছ : পরিচিতি’ শিরোনামে ৬৪টি টিকা যুক্ত করা হয়েছে। এই সকল টীকায় পত্রে উল্লেখিত ব্যক্তি ও অন্যান্য কিছুর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আমরা প্রতিটি পত্রের শেষে সংশ্লিষ্ট পত্রের সাথে যুক্ত টীকাটি পরিবেশন করেছি। এবং ‘পত্রগুচ্ছ : পরিচিতি’গুলোকে নিম্নে একত্রে উপস্থাপন করেছি। স্মর্তব্য, একই পত্রে একাধিক টীকা রয়েছে, আবার কোন কোন পত্র আছে টীকাবিহীন, তাই পত্রের সংখ্যা ও টীকার সংখ্যায় গরমিল রয়েছে।

    1.  কবিবন্ধু অরুণাচল বসু।
    2.  এই সময় অরুণাচল বসুর সঙ্গে অর্থহীন অথচ বেশ ভারী ভারী শব্দ বানানোর খেলা চলছিল সুকান্তর। তখন কোনো কোনো লেখক অপ্রচলিত আভিধানিক শব্দকে বাংলায় চালু করার চেষ্টা করছিলেন—তার প্রতি এটা ছিল দু’জনের কটাক্ষ।
    3.  একটি মেয়ের ছদ্মনাম।
    4.  অরুণাচলের মা শ্রীয়ুক্তা সরলা বসুর লেখা একটি গল্প। পরে এটি “ছটি ফাগুন সন্ধ্যা” নামে প্রকাশিত হয়। এই চিঠিটার মাথায় সুকান্তর হাতে আঁকা কাস্তে-হাতুড়ি আছে।
    5.  শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। সুকান্তর মাসতুতো ভাই ও বন্ধু।
    6.  শ্রীরমেন ভট্টাচার্য। ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের জেঠতুতো ভাই ও সুকান্তর বন্ধু।
    7.  বেলেঘাটার বন্ধু শ্রীঅজিত বসু।
    8.  সহপাঠী বন্ধু শ্রীশৈলেন্দ্রকুমার সরকার।
    9.  সহপাঠী বন্ধু শ্রীশ্যামাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
    10.  অগ্রজ শ্রীসুশীল ভট্টাচার্যের বন্ধু শ্রীবারীন্দ্রনাথ ঘোষ। এঁর সাহচর্যে সুকান্ত সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
    11.  ‘শ্রীঅর্ণব’ অরুণাচলের তৎকালীন ছদ্মনাম। গৃহত্যাগ করায় কৌতুকচ্ছলে এই নামে সুকান্ত তাঁকে সম্বোধন করেছেন। এ-চিঠির প্রেরণ তারিখ ১৯৪২ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ।
    12.  সুকান্তর, অরুণাচল, ভূপেন এবং সুকান্তর সমবয়সী ছোটমামা বিমল ভট্টাচার্য—এই চারজনে ‘চতুর্ভুজ’ নামে একটি বারোয়ারী উপন্যাস লিখছিলেন। চাবুজনে লিখতেন বলে ঐ উপন্যাস-পাঠের সাপ্তাহিক বৈঠকের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘চতুর্ভুজ’। এখানে সেই উপন্যাসেরই উল্লেখ করা হয়েছে।
    13.  জেঠতুতো দাদা শ্রীমনোজ ভট্টাচার্য।
    14.  অরুণাচলের বাবার পোস্ট-কার্ডের পিছনের অংশে লেখা এই চিঠিতে অরুণাচলের অসুস্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুকান্ত।
    15. পূর্বোল্লিখিত ছোটমামা শ্রীবিমল ভট্টাচার্য।
    16. বৈমাত্রেয় বড়ভাই মনোমোহন ভট্টাচার্য ও তাঁর পত্নী সরস্থ দেবী।
    17. কবি শ্রীসুভাষ মুখোপাধ্যায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে, এই আলাপের আগে সুকান্তর জেঠতুতো দাদা ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কলেজের বন্ধু মনোজ ভট্টাচার্যের সহায়তায়, এর এক বছর পূর্বেই অবশ্ব সুকাত্তর একবার প্রাথমিক সাক্ষাৎ ও সংক্ষিপ্ত আলাপ হয়।
    18. সাহিত্যিক ও সাংবাদিক স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য।
    19. গ্রামে থাকার সময় সেখানকার উৎসাহীদে নিয়ে অরুণাচল “ত্রিদিব” নামে পত্রিকা বার করেন। এখানে ঐ পত্রিকার উল্লেখ করা হয়েছে।
    20. সে সময় রাজনীতিতে অনুৎসাহী অরুণাচল উক্ত পত্রিকার জন্য একটি দার্শনিক বা মনস্তাত্ত্বিক কবিতা চেয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরে সুকান্ত ‘মুহূর্ত’ কবিতাটি পাঠিয়েছিলেন।
    21. ঐ গ্রামীণ পাঠাগারের জন্য অরুণাচলের অনুরোধে সুকান্ত এই বইয়ের তালিকা পাঠান। ঐ তালিকার তলায় লেখা আছে “এই চিঠির প্রেরণ তারিখ ২৬শে ফাল্গুন, ৪৯”।
    22. এই চিঠিটিও সুকান্ত লিখেছিলেন অরুণাচলের বাবার লেখা পোস্ট কার্ডের পিছনে। অরুণাচলের বাবার ঐ-চিঠির তারিখ ইং ৪।৪।৪৩।
    23. কবি শ্রীঅরুণ মিত্র এবং কবি ও সাংবাদিক সরোজকুমার দত্ত।
    24. পূর্বোল্লিখিত ছোটমামা বিমল।
    25. সম্বোধনহীন এই চিঠিটিও অরুণাচলকে লেখা।
    26. এই চিঠিটি ১৯৪৩ সালের জুন মাসে লেখা।
    27. সুকান্তর অগ্রজ শ্রীসুশীল ভট্টাচার্যের বিয়ের দিন।
    28. সুকান্তর জেঠতুতো মেজদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্যের স্ত্রা রেণু দেবী।
    29. শ্রীরামকৃষ্ণ মৈত্র—তৎকালীন বিশিষ্ট রাজনৈতিক কমী ও বর্তমানে “ইণ্ডিয়ান স্টাডিস পাস্ট অ্যাণ্ড প্রেজেণ্ট’-এর ব্যবস্থাপক সম্পাদক।
    30. লক্ষ্মীবাবু চিত্রশিল্পী। ইনি কমিউনিস্ট পাটির সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন।
    31. চিঠিতে সুকান্ত স্বাক্ষর ও তারিখ দিতে ভুলে গেছেন। পোস্ট অফিসের শিলমোহরে তারিখ আছে ইং ১৩।৬।৪৪।
    32. সুকান্তর অনুজ শ্রীঅশোক ভট্টাচার্য।
    33. অরুণাচলের অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে লিখে যাওয়া এই চিঠিটির তারিখ ইং ২৯।৭।৪৪।
    34. তৎকালীন ছাত্রনেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য।
    35. পাটিকর্মী শ্রীহৃষীকেশ ঘোষ।
    36. পরীক্ষার ঠিক আগে অরুণাচলের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ায় বাড়ি ফিরে লাঞ্ছনার ভয় করেছিলেন সুকান্ত। সহপাঠিনী হলেন সেই মেয়েটি যাঁকে সুকান্ত ভালবাসতেন। পোস্ট-অফিসের শিলমোহরে এ-চিঠির তারিখ চিহ্নিত আছে ইং ২৮।২।৪৫।
    37. বর্তমান ত্রিপুরার সাম্যবাদী নেতা শ্রীনৃপেন চক্রবর্তী।
    38. অরুণাচল স্বাধীনতা-র কিশোর সভা-য় নামের আদ্যক্ষর (অ) স্বাক্ষর করে কাটুন আঁকতেন। তার অনুপস্থিতিতে তাকে বিব্রত করবার জন্যেই সেই সই-সহ কিশোর সভা-র পাতায় একটি ছবি ছাপান সুকান্ত। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে চিঠি লিখলে, অরুণাচলকে সুকান্ত এই উত্তর দেন। এই অহিনকুল মুখোপাধ্যায় বলতে শিল্পী শ্রীদেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে বুঝতে হবে। কেননা ছবিটি তিনিই এঁকে দিয়েছিলেন।
    39. ডায়ালেকটিকাল আদালত বলতে সুকান্ত যাকে ভালবাসতেন তার কাছে নালিশের ভয় দেখিয়েছিলেন অরুণাচল। কারণ সুকান্তর সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক ছিল ‘দ্বন্দ্ব-মধুর’।
    40. তখন অরুণাচল ও সুকান্তর ভাব আদান-প্রদানে ব্যবহৃত কয়েকটি বিশেষ শব্দের অন্যতম এই ‘মেটাফিসিকস’ শব্দটি। বেলেঘাটার শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই বিভূতি বসু অরুণাচল-সুকান্তর সঙ্গে দেখা হলেই তার তাত্ত্বিক আলোচনায় এই কথাটি খুব ব্যবহার করতেন। অতীত জীবনে বিপ্লবী, অকৃতদার ও বেশ কিছুটা আত্মভোলা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন এই মাস্টারমশাই।
    41. বর্তমান চিঠিটি ও ‘প্রিয় বয়স্য’ সম্বোধনমুক্ত চিঠিখানি একই পোস্ট কার্ডের উভয় পিঠে লেখা।
    42. সুকান্ত তখন সাময়িক অসুস্থ হয়ে পার্টির হাসপাতাল ‘রেড-এড কিওর হোমে’। একই শহরে থেকেও অরুণাচল দীর্ঘদিন তাঁকে দেখতে যেতে পারেন নি। তাই সম্বোধনটির মাধ্যমে তার বন্ধুবাৎসল্যকে খোঁচা দিয়ে এই ফাঁকা (ড্যাস চিহ্নিত) কার্ডের চিঠিটি লেখেন সুকান্ত।
    43. এই চিঠিটি অন্যের হাতে পাঠানো একটি হাত-চিঠি। তারিখ সম্ভবত ৩রা বা ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৪৬।
    44. বর্তমান চিঠিটিও ঐ একই সময়কার একটি হাত-চিঠি।
    45. অধ্যাপক শিশির চট্টোপাধ্যায়। এ-চিঠিটি সম্ভবত সুকান্ত অসুস্থ শরীরে অরুণাচলের অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়িতে লিখে রেখে যান।
    46. শিল্পী শ্রীদেবব্রত মুখোপাধ্যায়।
    47. জেঠতুতো দাদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য।
    48. পূর্বোল্লিখিত রেণু দেবী ও সুকাত্তর বড় মাসি।
    49. অরুণাচলকে লেখা সুকাত্তর সর্বশেষ চিঠি।
    50. অরুণাচলের মা লেখিকা শ্রীমতী সরলা বসুকে লেখা চিঠি। সম্ভবত ১৩৪৮ সালের ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ তারিখে অরুণাচলকে লিখিত চিঠিটির সঙ্গে এটি প্রেরিত হয়। ভাঁজ করা এই চিঠিটির পিছনে লেখা আছে “শ্রীমতী সরলা দেবী সমীপেষু”।
    51. ১৯৪২ সালের ৪ঠা মে তারিখে অরুণাচলের বাবা অশ্বিনীকুমার বসুর পোস্ট-কার্ডের চিঠির পিছনে এই চিঠি লেখেন সুকান্ত।
    52. ১৯৪২ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে অরুণাচলকে লেখা “সৎসঙ্গ শরণমূ, শ্রীশ্রীশ্রী ১০৮ অর্ণবস্বামী গুরুজী মহারাজ সমীপেষু” সম্বোধন-যুক্ত চিঠিটির সঙ্গেই এটি প্রেরিত হয়।
    53. এ চিঠিটি সম্ভবত ১৯৪৭ সালের ৭ই মার্চ লেখা।
    54. অরুণাচলের বাবা অশ্বিনীকুমার বসুকে লেখা চিঠি। সম্ভবত ইংরেজি তারিখ ২০শে মে ১৯৪২।
    55. শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। পরবর্তী চারটি চিঠিও একে লেখা।
    56. ছোটমামা শ্রীবিমল ভট্টাচার্য।
    57. পূর্বোল্লিখিত শ্রীরমেন ভট্টাচার্যের দিদি শ্রীমতী বিমল ভট্টাচার্যের দুই কন্যা। সুকান্ত কাশীতে এঁদের বাড়িতে ছিলেন।
    58. ভ্রাতুষ্পুত্রী শ্রীমতী মালবিকা ও পত্রলেখা এবং ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীউদয়ন ভট্টাচার্য।
    59. জেঠাইমা।
    60. কাশীতে মেজবৌদি রেণু দেবীকে লেখা চিঠিতে সুকান্ত যে লাল কার্ডের উল্লেখ করেছেন তা হল এই চিঠি। এটিও তাঁকেই লেখা।
    61. গল্প-লেখক শ্রীকৃষ্ণ চক্রবর্তীকে লেখা চিঠি। ১৯৭১ সালের আগস্টে প্রকাশিত ’বাংলা দেশ’ পত্রিকা থেকে চিঠিটি সংগৃহীত হয়েছে।
    62. কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব হিসাবে কিশোর বাহিনীর কোনো সদস্যকে লেখা চিঠি।
    63. পরিচিতি ৬২ দ্রষ্টব্য।
    64. হুগলীর কমিনিস্ট কর্মী শ্রীমদন সাহাকে লেখা চিঠি।
  • সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা

    সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা

    সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা : পরিচিতি

    সুকান্ত ভট্টাচার্যের অগ্রন্থিত ও প্রচলিত রচনাসমূহের সঙ্কলন।

    1. ‘ক্ষুধা’ গল্পটি ২রা এপ্রিল ১৯৪৩-এর অরণি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অরুণাচলকে লেখা ২৭শে চৈত্র ১৩৪৯ তারিখের চিঠিতে এই গল্পটির উল্লেখ করেছেন সুকান্ত।
    2. ‘দুর্বোধ্য’ গল্পটি ২৮শে মে ১৯৪৩-এর অরণি পত্রিকায় চিত্র-গল্প হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে।
    3. ‘ভদ্রলোক’ গল্পটিও অরণিতে ১৪ই ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
    4. ‘দরদী কিশোর’ গল্পটি সাপ্তাহিক জনযুদ্ধ পত্রিকায় কিশোর বিভাগে ২৮শে এপ্রিল ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়।
    5. ‘কিশোরের স্বপ্ন’ গল্পটি জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগে ৬ই অক্টোবর ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। জনযুদ্ধে প্রকাশিত গল্প দুটি শ্রীসুধী প্রধানের সহায়তায় সংগৃহীত।
    6. ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি ২৫শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪-এর অরণিতে প্রকাশিত হয়েছে।
    7. গানটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০। এটি ‘সূর্য-প্রণাম’-এর সমকালীন একটি অসম্পূর্ণ গীতিকাব্যের প্রথমাংশ বলে মনে হয়।
    8. এই গানটি শ্রীবিমল ভট্টাচার্য তাঁর স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন। গানটি গীতিগুচ্ছের গানগুলির সমকালীন বলে মনে হয়।
    9. সেপ্টেম্বর ১৯৪২-এ প্রকাশিত ‘জনযুদ্ধের গান’ সংকলন গ্রন্থটি থেকে এই গানটি সংগৃহীত।
    10. গানটি মাসিক বসুমতী, আশ্বিন ১৩৬৩-তে প্রকাশিত হয়েছে। পাণ্ডুলিপিও পাওয়া গেছে। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৩-৪৪ সাল।
    11. গানটির রচনাকাল ১৯শে জুলাই ১৯৪৪ সাল।
    12. ১২-১৩। ‘ভবিষ্যতে’ ও ‘সুচিকিৎসা’—এই ছড়া দুটি শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের লেখা সুকান্ত-প্রসঙ্গ’, ‘শারদীয়া বসুমতী’, ১৩৫৪-থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি! এগুলি ১৯৪০-এর আগের লেখা বলে অনুমিত।
    13. পরিচয় ছড়াটির রচনাকাল ১৩৩৯-৪০ সাল বলে মনে হয়।
    14. এই কবিতাটিও ভূপেন্দ্রনাথের ‘সুকান্ত-প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি, এটি ১৯৪০-এর আগের রচনা।
    15. ‘চৈত্রদিনের গান’ কবিতাটি শ্রীবিজনকুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ছোটদের ‘শিখা’ পত্রিকার জন্য রচিত। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০।
    16. এই কবিতাটি অরুণাচলকে সুকান্ত পত্রাকারে লিখেছিলেন। রচনার তারিখ ১৩ই কার্তিক ১৩৪৮।
    17. ‘পটভূমি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪২-৪৩।
    18. ‘ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে শোকোচ্ছ্বাস (শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-কে)’ — এই শিরোনামায় কবিতাটি লেখা হয়েছিল। দক্ষিণ কলকাতার লেক অঞ্চলের ‘ইণ্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি’র সদস্য ছিলেন শ্রীশচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। লেকে যুদ্ধকালীন মিলিটারী ক্যাম্প হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে সুকান্ত এই কবিতাটি লিখেছিলেন।
    19. “নব জ্যামিতি”র ছড়া সাপ্তাহিক জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগে প্রকাশের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৩।
    20. ‘জবাব’ কবিতাটি কার্তিক ১৩৫০-এর পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি শ্রীঅমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর সৌজন্যে প্রাপ্ত।
    21. ‘চরমপত্র’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৪।
    22. ১৯৪৪ সালে সুকান্তর মেজদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য গ্রেফতার হন। তাঁর মুক্তি উপলক্ষে সুকান্ত এই কবিতাটি লেখেন।
    23. ১৯৪৫ সালে সুকান্ত মেজবৌদি রেণু দেবীর সঙ্গে কাশী বেড়াতে যান। সুকান্ত ফিরে এসে শ্যামবাজারের বাড়ি থেকে এই চিঠিটি তাঁকে লিখেছিলেন। চিঠিটি শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন।
    24. ‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৬।
    25. ‘ব্যর্থতা’ কবিতাটি আষাঢ় ১৩৫৩-এর কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটি ‘মীমাংসা’ কবিতার প্রথম খসড়া বলে মনে হয়।
    26. ১৯৪৬ সালে রচিত এই কবিতাটি খুলনা ‘সপ্তর্ষি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শয্যাশায়ী সুকান্ত ‘রেড-এড কিওর হোম’ হাসপাতালের রাইটিং প্যাডে লিখে এটি পাঠান। কবিতাটি শ্রীমনীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত।
  • রাইফেল, রোটি, আওরাত

    রাইফেল, রোটি, আওরাত

    ভূমিকা

    মানুষ এবং পশুর মধ্যে বড় একটা পার্থক্য হচ্ছে, পশু একমাত্র বর্তমানকেই দেখে, মানুষ দেখে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে এক সঙ্গে বিচেনা করে। যখন কোন ব্যক্তি এবং সমাজ একমাত্র বর্তমানের মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকে তখন সর্বনাশের ইশারা প্রকট হতে থাকে।

    বাঙালির সুদীর্ঘ ইতিহাসের বোধ করি সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে তার সংগ্রামের কালগুলো। এবং এক্ষেত্রে উজ্জ্বলতম ঘটনা হচ্ছে, ১৯৭১-এ পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অসাধারণ লড়াই। এ ছিল সমগ্র জাতির একতাবদ্ধ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সংগ্রাম। আমাদের পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য, আমাদের বর্তমানের গৌরব এবং আমাদের ভবিষ্যতের প্রেরণা বাঙালির এ সংগ্রামের ইতিহাস।

    অত্যন্ত শঙ্কিত চিত্তে লক্ষ্য করার মত ব্যাপার হচ্ছে, আমরা এটাকে যেন ভুলে যেতে বসেছি। যেসব লক্ষ্য নিয়ে আমাদের লড়াই তাকে বাস্তবে রূপায়িত করার ব্যর্থতা থেকেই। এ বিস্মৃতির সূত্রপাত হচ্ছে। কিন্তু ব্যর্থ বর্তমান তো কোন জাতিরই চিরকালের সত্য ইতিহাস নয়, সত্য অনুভূতিও নয়। যে আবেগ এবং অনুভূতি চক্রান্তের ধূর্তচক্রে আচ্ছন্ন হচ্ছে, তাকে উজ্জীবিত করার জন্যই দরকার সংগ্রামের কালের মানুষের মহান ত্যাগ এবং নিষ্ঠাকে বারংবার স্মরণ করা। তার থেকেই আসবে কুশায়াকে দূর করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। আমাদের চিত্তের পবিত্রতা রক্ষা পাবে।

    সেকালের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে বসে লেখা আমাদের সমগ্র ইতিহাসে একটি মাত্র উপন্যাসই পাওয়া যায়—এ উপন্যাসই হচ্ছে “রাইফেল রোটি আওরাত”। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাস এর রচনাকাল। লেখক শহীদ আনোয়ার পাশা নিহত হলেন ১৯৭১ সালেরই ১৪ই ডিসেম্বর। স্বাধীনতা লাভের মাত্র দু’দিন আগে তিনি যে অমর কাহিনী উপন্যাসে বিধৃত করেছেন নিজেই হয়ে গেলেন তারই অঙ্গ চিরকালের জন্য।

    আনোয়ার পাশার উপন্যাসটি একদিক দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বসে একজনের প্রতিটি মুহূর্তের কাহিনী। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে সৃষ্ট এ শিল্পকর্ম কতটা সত্যনিষ্ঠা লেখকের জীবনের পরিণতিই তার মহান সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

    রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–জীবনে জীবন যোগ করা না হলে, কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।

    আনোয়ার পাশার উপন্যাস, তাঁর শেষ উচ্চারণ : নতুন মানুষ, নতুন পরিচয় এবং নতুন একটি প্রভা। সে আর কত দূরে। বেশি দূর হতে পারে না। মাত্র এই রাতটুকু তো। মা ভৈঃ। কেটে যাবে।” তার এবং আমাদের সকলের কামনা ও প্রত্যাশারই অভিব্যক্তি। শিল্পী তাঁর জীবনকে আমাদের জীবনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত করে দিয়েছেন। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ আনোয়ার পাশার শহীদ আত্মার আকাঙ্ক্ষাকেই যেন আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে চলেছে নিরন্তর এবং অম্লান।

    কাজী আবদুল মান্নান

    বৈশাখ, ১৩৯৪

    রাজশাহী।

  • পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা আকবর আলি খানের আত্মজীবনী—একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের জীবনের উন্মেষ ও বিকাশের কাহিনী। এ আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে লেখক তাঁর পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে লিখেছেন আবার নবীনগরের প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও লিখেছেন। ছোটবেলা থেকে লেখক ছিলেন বইপাগল। তবে নবীনগরে ভাল বই পাওয়া যেত না। ভাল বই পড়ার অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা মিটত ঢাকায় এলে। তিনি হন তুখোড় পাঠক। এই পাঠকই একদিন পড়তে পড়তে এবং গবেষণা করতে করতে লেখকে পরিণত হন। অবশ্য কোনো বই-ই দীর্ঘদিন গবেষণা ছাড়া তিনি লেখেন না। তাঁর প্রথম বই বের হয় ৫২ বছর বয়সে।

    নবীনগরের জলাভূমিতে লালিত সাদাসিধে বালকটি ছিলেন কল্পনাবিলাসী ও অন্তমু‌র্খী। ব্যক্তিগত জীবনে লাজুক এই লোকটি জীবিকার জন্য যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে— মুখচোরা বালকটি হলেন মাঠপর্যায়ের প্রশাসক। সিভিল সার্ভিসের বিচিত্র কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে মুখোমুখি করে নানা চ্যালেঞ্জের। দায়িত্ব নেন আইনশৃঙ্খলা, ভূমি প্রশাসন, উন্নয়ন প্রশাসন, নির্বাচন, এমনকি চা-বাগানের মত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার। এই অভিজ্ঞতার বিবরণ পাঠকদের কাছে পড়তে ভাল লাগবে।

    লেখক মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই বইয়ের তিনটি অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের ক্রিয়াকাণ্ড বর্ণনা করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অধ্যায়গুলোতে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের টালমাটাল দিনগুলোর পরিস্থিতিতে লেখকের অভিজ্ঞতা সাধারণ পাঠকদের ভাল লাগবে এবং বর্তমান প্রশাসকদের কাজে লাগবে।

    পুরানো সেই দিনের কথা প্রথম প্রকাশিত হয় ফাল্গুন ১৪২৮, ফেব্রুয়ারি ২০২২।

    উৎসর্গ

    মরহুম হামীম খান

    মরহুম নেহরীন খানের স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদিত

    কৃতজ্ঞতা স্বীকার

    যদিও বইটি আমার আত্মজীবনী, তবু এতে আমার পূর্বপুরুষদের প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন নীলুফার আহমদ (বীণা আপা), হাবিবুল্লাহ খান (রানু ভাই), ফরহাত উল্লাহ (পেরু), জি এম জিয়াউদ্দিন খান (জসিম), কবিরউদ্দিন খান, মাসরুর আলী খান (জামিল), ফারুক খান, কায়সার খান, ওয়ারেস আলী খান (অপু), জুবায়ের আহমদ খান (লুডু), ড. আহমদ হোসেন (ফুল মিয়া), মিনু আলম, সৈয়দ নুরউদ্দিন, মো. রিয়াজুর খান (সেন্টু), তাহমিনা খান, খন্দকার গিয়াসউদ্দিন (রসুল্লাবাদ স্কুলের শিক্ষক)। সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, তবু ভুল থাকতে পারে। যদি কোনো ভুল থাকে, তার জন্য আমি একা দায়ী, যাঁরা তথ্য দিয়েছেন, তাঁদের কেউ নন।

    ২০০৮ সালে মেরুদণ্ডের জটিলতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমার একটি অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারটি পুরোপুরি সফল না হওয়াতে আমার হাত-পা অচল হয়ে যায়। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে হাত ও পায়ের কার্যকারিতা কিছুটা ফিরে পাওয়ার পর আমি নিজে টাইপ করতে পারতাম। ২০১৫ সালের পরে হাত-পায়ের কার্যক্ষমতা আবার হ্রাস পায়। এখন আমার হাতের লেখা দুষ্পাঠ্য এবং টাইপ করার ক্ষমতা প্রায় শূন্যের ঘরে নেমে এসেছে। এই অবস্থায় বাইরের সহায়তা ছাড়া আমার পক্ষে বই লেখা সম্ভব নয়।

    বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠান আমাকে বই লেখার ব্যাপারে সহায়তা করছে। প্রথম প্রতিষ্ঠানটি হলো প্রথমা প্রকাশন। বইটি লেখার জন্য উৎসাহিত করেছেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রথমার কর্ণধার মতিউর রহমান, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ ও প্রথমার ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুন কবীর। তাঁদের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। প্রথমা প্রকাশন আমার অসুবিধা বিবেচনা করে তাদের কম্পিউটার অপারেটর মো. শহিদুল ইসলামকে আমাকে সহায়তার দায়িত্ব দেয়। মো. শহিদুল ইসলাম ও প্রথমার অন্যান্য কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ছাড়া এ বই প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। আমি তাঁদের সবাইকে জানাই ধন্যবাদ।

    দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান যেটি আমার লেখার ব্যাপারে সহায়তা করছে, সেটি হলো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার আমার বই লেখার জন্য ব্যবহার করতে পেরেছি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতা সহকারী এস এম রিফাত হাসান নানাভাবে এ বই লেখায় আমাকে সহায়তা করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও রিফাত হাসানকেও জানাই ধন্যবাদ।

    বইটির পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনা করার জন্য আমার বন্ধু ওয়ালিউল ইসলাম ও ছোট ভাই জিয়াউদ্দিন খানকে দিয়েছিলাম। উভয়েই অনেক মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। আমি তাদের অধিকাংশ পরামর্শই গ্রহণ করেছি। এরপর যা ত্রুটি রইল, তার জন্য আমিই দায়ী। সিভিল সার্ভিস একাডেমির ব্যাচমেটদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে সহায়তা করেছেন ওয়ালিউল ইসলাম, আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী এবং কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ। এঁরা গত ষাট বছর ধরে আমাকে নানাভাবে সহায়তা করে এসেছেন। এঁদের কাছে আমার ঋণের সীমা নেই।

    শারীরিকভাবে আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আমাকে সক্রিয় রাখার জন্য মানসিক সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। আমার বড় বোন নীলুফার আহমদ ও আমার কনিষ্ঠ দুই ভাই জিয়াউদ্দিন খান ও কবিরউদ্দিন খান এবং তাঁদের সহধর্মিণী মাকসুদা ও আনোয়ারার সার্বক্ষণিক সমর্থনের ফলেই আমি শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও এখনো কাজ করতে পারছি। আমার শাশুড়ি মিসেস জাহানারা রহমান (যার বয়স ইনশা আল্লাহ কয়েক মাসের মধ্যে ১০০ পূর্ণ হবে) এবং আমার স্ত্রীর বড় ভাই ড. এহসানুর রহমান আমার যে যত্ন নিচ্ছেন, তার জন্য আমি তাদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। এই বই লেখার সময় বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন আমার এককালের সহকর্মী জনাব আহমদ আলী, আমিন চৌধুরী, ফরহাত উল্লাহ (পেরু), স্বরূপ দে ও মোহাম্মদ ফারুক। তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    আকবর আলি খান১ জানুয়ারি ২০২২

    পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।

    ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

  • পলাশির অজানা কাহিনী

    পলাশির অজানা কাহিনী

    পলাশির অজানা কাহিনী
    [writer]

    পলাশির ঘটনাবলী ও যুদ্ধ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত আছে যে, সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করবার জন্য মীরজাফর, জগৎশেঠ প্রমুখ তখনকার কয়েকজন বণিক-ব্যাংকার-অভিজাত মানুষ চক্রান্ত সাজিয়েছিলেন। পেছন থেকে তাঁদের সাহায্য করেছিল ইংরেজরা। পলাশির পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্বপরিকল্পনা’ ছিল না, তাদের বাংলাবিজয় নেহাতই ‘আকস্মি ‘ ঘটনা। এমনকী, অনেক ঐতিহাসিক এও মনে করেন, বাংলার ‘আভ্যন্তরীণ সংকট’ ই ইংরেজদের বাংলায় ডেকে আনে। এই গ্রন্থ কিন্তু ঠিক এর উল্টো কথাই বলেছে। পলাশির ষড়যন্ত্র ও প্রাক্‌-পলাশি ঘটনাবলীর বিশদ ও সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করে এবং ডাচ ও ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র, কোম্পানির কর্মচারীদের লেখা থেকে অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করে লেখক সন্দেহাতীতভাবে দেখিয়েছেন যে, পলাশি চক্রান্তের মূল নায়ক ইংরেজরাই। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মদত ছাড়া ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ কোনওভাবেই সম্ভব হত না। তারাই একদিকে ভারতীয়দের নানা প্রভোলণ ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে, অন্যদিকে কাকুতি-মিনতি করে অন্যদের নিজস্ব চতুর ‘পরিকল্পনা’য় সামিল করিয়েছিল। সেই সময় ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য নিদারুণ সংকটে পড়ে যাওয়ায়, কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে ছলে-বলে কৌশলে বঙ্গবিজয় ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। পলাশির যুদ্ধ তারই পরিণতি। এই গ্রন্থের লেখক পলাশি নিয়ে বহু ধারণাকে আসার প্রমাণিত করেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন আবিষ্কৃত নতুন তথ্য ও সত্যের।


    উৎসর্গ

    আমার মা স্বৰ্গতা ইন্দুবালা চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশে


    ঋণ স্বীকার

    আমার স্ত্রী, মহাশ্বেতা, এ বই লেখার ব্যাপারে আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্য ছাড়া আমার পক্ষে এ-বই লেখা সম্ভব হত না, যেমন হত না আমার অন্য বইগুলি লেখাও। বহরমপুরের ‘ইতিহাস পরিক্রমা’ এ বইয়ের জন্য কয়েকটি ছবি দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। ন্যাশনাল লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ কয়েকটি দুষ্প্রাপ্য বই থেকে ছবি তোলার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। কলকাতার ছবি দুটি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর সৌজন্যে। আনন্দ পাবলিশার্স অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বইটি প্রকাশনার ব্যবস্থা করায় আমি আনন্দিত।

  • আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আকবর আলি খান রচিত আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি গ্রন্থটি লেখকের অর্থনৈতিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর নিবিড় গবেষণার নির্যাস। প্রবন্ধ গুলোর বিষয়বস্তু কৌতুহল উদ্দীপক যা পাঠকে আগ্রহী করবে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে পৌষ ১৪১৯ (জানুয়ারি ২০১৩); প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন, ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫, বাংলাদেশ; প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন প্রতিথযশা শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী, তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন অশোক কর্মকার। এই গ্রন্থে রয়েছে ১০টি প্রবন্ধ; প্রতিটিতে লেখক ভিন্ন বিষয় আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধগুলি অর্থনীতি, সুশাসন আর সমাজ সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করে যায় নিরন্তর। উন্মোচিত করে চিন্তার এক নতুন দিগন্ত। গভীর বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ প্রবন্ধগুলিতে যেমন লেখক নিজস্ব বিশ্লেষণ ছাড়াও বিভিন্ন পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ গুলোকে বিন্যস্ত করেছেন নিপূণভাবে।

    হতাশাগ্রস্থ বিজ্ঞান নামে অভিহিত অর্থনীতি ছিল একদিন সমাজবিজ্ঞানের দুয়োরানি। অথচ অর্থনীতিই আজকের সমাজবিজ্ঞানের সম্রাজ্ঞী। এর আওতা শুধু চাহিদা-জোগান বা রুটি-রোজগারেরর মতো আটপৌরে সমস্যায় সীমিত নয়। অর্থনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইনশাস্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইতিহাস, সংগঠন ও সিদ্ধান্ত তত্ত্বে এবং সমাজতত্ত্বের সব শাখায়। জন্ম, বিবাহ, ধর্ম, এমনকি ভাষা নিয়ে গবেষণায়ও প্রয়োগ করা হচ্ছে অর্থনীতির সূত্র। দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির বিকাশমান মাত্রা ও নতুন ধারাসমূহের বৈভন এখনো বাংলা ভাষায় প্রতিফলিত হয়নি। বাংলায় অর্থনীতি এখনো মান্ধাতা আমলের পাঠ্যবিষয় ও বাম-ডানির তরজায় সীমাবদ্ধ। গতানুগতিক গণ্ডির বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে এ বই।

    প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তু বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক। একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ‘ভেগোলজি ও অর্থনীতি।’ দুটি প্রবন্ধে অর্থনীতিতে অনভিপ্রেত পরিণাম ও মিত্রপক্ষের গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। দুটি প্রবন্ধের উপজীব্য বিশ্বায়ন। সুখ ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে পর্যালোচনা দেখা যাবে একটি নিবন্ধে। তথ্য অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ‘সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি’তে। একটি প্রবন্ধে জন্মদিনের অর্থনীতি ও আরেকটি প্রবন্ধে সরকারের অপচয় নিয়ে বিশ্লেষণ রয়েছে। নির্ভেজার গবেষণামূলক এই বই লেখা হয়েছে সহজ ভাষায়, বৈঠকি মেজাজে।

    বইটির অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখক নিজে কোন সিদ্ধান্ত দেন নি বরং নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে গেছেন যেটা সবচেয়ে মুগ্ধ করবে পাঠককে। পরস্পর বিরোধী তত্ত্বগুলিকে বিশ্লেষণ করে গেছেন এমনভাবে যে, যে কোন একটা পড়লে মনে হয় এটাই ঠিক। এইখানেই লেখকের স্বার্থকতা। তিনি পেরেছেন, নিরপেক্ষ থাকতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারটা পাঠককেই দিয়েছেন। একটা একটা প্রবন্ধ শেষে পাঠক উদ্দীপ্ত হয় সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আরও জ্ঞানার্জন করতে।

    আজব ও জবর আজব অর্থনীতি বইটি অর্থনীতির একাডেমিক কোনো বই নয়। বইটি গতানুগতিক গণ্ডীর বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে। অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা কম যেমন— সামষ্টিক অর্থনীতি, বিভিন্ন বিষয়ের উপর অর্থনীতির প্রভাব এগুলো সহজভাবে জানার জন্য বইটি মন্দ নয়।

    উৎসর্গ

    আমার পরম স্নেহের ছোট ভাই

    জি এম জিয়াউদ্দিন খান

    কবীর উদ্দিন খান

    এবং

    তাঁদের সহধর্মিণী

    মাকসুদা খান

    আনোয়ারা খান

  • নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    বাংলার ইতিহাস তথা উপমহাদেশের ইতিহাসকে জানতে চাইলে মুর্শিদাবাদকে বাদ তো দেয়া যাবেই না, বরং এ শহরটার গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। এ শহরের পরাজয় দিয়ে বাংলা তথা ভারতবর্ষে শুরু হয়েছিল ইংরেজদের শাসন।

    মুর্শিদাবাদ নগরী। এক করুণ-রঙিন ইতিহাস লগ্ন হয়ে আছে সে নগরীর পরতে পরতে। নবাব মুর্শিদকুলি খান ১৭০৪ সালে এই নগরীর পত্তন করেন। সে হিসেবে ২০০৪ সালে মুর্শিদাবাদের তিনশো বছর পূর্ণ হল। এ উপলক্ষেই বর্তমান গ্রন্থের অবতারণা। মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত বেশির ভাগ প্রামাণিক গ্ৰন্থই একশো বছর বা তার আগে লেখা। গত কয়েক দশকেও এই নগরী নিয়ে বেশ কিছু বই ও কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার সবগুলিতেই মুর্শিদাবাদের খণ্ড খণ্ড চিত্র, সামগ্রিক চিত্র ঠিক কোথাও পাওয়া যায় না।

    মুর্শিদাবাদের তিনশো বছর পূর্তি উপলক্ষে এর ইতিহাসের প্রতি, বিশেষ করে স্বাধীন নবাবি আমলে এই শহরের প্রসঙ্গে, নতুন ভাবে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন আছে। লেখক প্ৰায় চার দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে যে-সব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের এই সার্বিক ইতিহাস রচনা করেছেন। লেখক এই সত্যের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, নবাবি আমলই মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ। মুর্শিদাবাদে তিন বণিকরাজার কার্যকলাপ, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব কেন হল, তার সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যা, এ নগরীর বেগমদের সম্বন্ধে আকর্ষণীয় বিবরণ এবং মুর্শিদাবাদের শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের আকরভিত্তিক বিশ্লেষণ গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণ।

    এ শহর, সিরাজ-উদ-দৌলা, মীরজাফর, জগৎশেঠ ইত্যাদি অনেককে নিয়ে অনেক তথ্য অনেক গুজব আছে। এমনকি এমন কিছু বইও আছে যেখানে লেখা আছে, ইংরেজরা আসলে বাংলা দখল করতে চায়নি। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে না চাইতেও সেটা হয়ে গেছে। এ বইতে অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী সেসব গুজবকে অসংখ্য রেফারেন্স দিয়ে নাকচ তো করেছেনই সঙ্গে ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, মুর্শিদাবাদের উত্থান ইত্যাদি নানা দৃষ্টিকোণ দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

    অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী বাংলার স্বাধীন নবাবি আমলের রাজধানী মুর্শিদাবাদের রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন। যে রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ পুরো ভারতবর্ষের ইতিহাসের বাঁক বদলে দিয়েছিল।

    আওরঙ্গজেব তাঁর বিশ্বস্ত দেওয়ান করতলব খাঁকে হায়দরাবাদের দেওয়ানের পদ থেকে নিয়ে এসে বাংলা সুবার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন। তখন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর এবং সুবাদার সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-শান। রাজস্বসহ আরও নানা ইস্যুতে আজিমের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় করতলব খাঁর। বলা হয়, করতলব খাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আজিম-উস-শান। চৌকস করতলব খাঁ সম্রাটের প্রিয়ভাজন ছিলেন। কারণ দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে বিধ্বস্ত আওরঙ্গজেবের তখন পয়সার প্রধান উৎস বাংলা সুবা। সেই বাংলা থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাঠান করতলব খাঁ।

    বুদ্ধিমান করতলব খাঁ রাজস্ব বিভাগ ও কর্মচারীদের নিয়ে মকসুদাবাদে চলে এলেন। ইতোমধ্যে সম্রাট খুশি হয়ে করতলব খাঁকে মুর্শিদকুলি খান উপাধি দিয়েছেন। বাদশাহের অনুমতিক্রমে মখসুদাবাদের নামকরণ করলেন করলেন মুর্শিদাবাদ। ১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী হয়ে গেল মুর্শিদকুলির মুর্শিদাবাদ।

    মুর্শিদকুলি খানের উত্থানের কাহিনি বিস্ময়কর। তিনি জন্মেছিলেন হিন্দু বামুনের ঘরে। ছোটবেলায় ক্রীতদাস হিসেবে তাকে কিনে নেন একজন ইরানি ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ী রাজস্বব্যবস্থা ভালো বুঝতেন। আবারও, হাতবদল হয় মুর্শিদকুলির মালিকানা। এবার একজন ফারসি অভিজাতের অধীনস্থ হন তিনি। আরও ভাল ভাবে শেখার সুযোগ হয় খাজনা আদায়ের কাজকর্ম। এভাবেই রাজস্ব বিভাগে দক্ষতা অর্জন করেন মুর্শিদকুলি। যা পরবর্তীতে তার জীবনে চরম সৌভাগ্য বয়ে এনেছিল।

    মুর্শিদকুলি বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি জানতেন দিল্লির বাদশাকে নজরানা দিয়ে তুষ্ট করলেই চলবে। তিনি রাজস্বব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তার আমলে বাংলার বড় বড় পদ-পদবিধারী প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু। মুর্শিদকুলি মনে করতেন রাজস্ব আদায়ে মুসলমান কর্মীরা ফাঁকি দিতে পারে। তাই তিনি হিন্দুদের নিযুক্ত করেছিলেন। তার আমলে বাংলার উনিশটি বৃহৎ জমিদারির আঠারোটি ছিল হিন্দু জমিদারদের। অর্থাৎ, বাংলায় ধনাঢ্য মানুষ বেশির ভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল। তাহলে মুসলমানদের আর্থিক দুরবস্থার জন্য ব্রিটিশরা কতখানি দায়ি তা নিয়ে আরও আলাপ-আলোচনা হতে পারে। কারণ নবাবি আমলেই দেখা যাচ্ছে, ধন-সম্পদের মালিকানায় হিন্দু সম্প্রদায় এগিয়ে।

    মুর্শিদকুলি জাহাঙ্গীরনগর থেকে মুর্শিদাবাদে চলে আসার সময় সেখানকার কিছু সম্পদশালী বণিক পরিবারকে নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল জগৎশেঠ (এটি কোনো নাম নয়, উপাধি)। রাজস্থানের এই পরিবারটি সরকারের তথা নবাব মুর্শিদকুলির পৃষ্ঠপোষকতায় লাখ লাখ টাকা উপার্জনের সুযোগ পায়। একজন ইংরেজি ব্যবসায়ী উল্লেখ করেছেন, সেই আমলে জগৎশেঠের বার্ষিক আয় ছিল ৫৬ লাখ টাকা! পুরো উত্তর ভারতের আর্থ-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক এই পরিবারটি প্রয়োজনে বাংলার নবাবসহ দিল্লির বাদশাকে টাকা ধার দিত এবং বাংলা সরকারের টাকশালের দায়িত্বে ছিল।

    উঁমিচাদ আরও একজন ধনবান ব্যবসায়ী। ঐতিহাসিকরা এদের মার্চেন্ট কিং বা বণিক রাজা বলে অভিহিত করেছেন। এরা ব্যবসায়ী হলেও রাজার মতো জীবনযাপন করতেন। পরোক্ষভাবে সুবা এরাই পরিচালনা করতেন। যে-কোন সিদ্ধান্ত যা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতিকূলে যেতে পারে, এমন কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বাংলার কোন নবাবের ছিল না। মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত সকল নবাব এই বণিক রাজাদের তোয়াজ করে চলতেন। কিন্তু প্রথমবারের মত এসব বণিকরাজকে বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নিতে অস্বীকার করেন তরুণ নবাব সিরাজ।

    সিরাজউদ্দৌলা নবাব হওয়ার পর ইংরেজরা প্রথামাফিক নজরানা পাঠায়নি। যখন তিনি যুবরাজ, একবার কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠি পরিদর্শনে গেলে তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেখায়নি কোম্পানির কর্তারা। উপরন্তু, সম্রাট ফররুখশিয়ারের দেওয়া বিনা শুল্কে ব্যবসা করার ফরমানের অপব্যবহার করে ইংরেজরা কর ফাঁকি দিচ্ছিল এবং আলিবর্দির জীবদ্দশায় তারা দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করে। যা ছিল নিষিদ্ধ। মোটকথা, কিছু সমস্যা আলিবর্দির আমলেই তৈরি হয়েছিল। যা তিনি সমাধান করেননি বা করতে চাননি। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়েই সিরাজ কোম্পানিকে নিজের দুশমনে পরিণত করে।

    সিরাজকে একদল ঐতিহাসিক চূড়ান্ত মন্দ লোক হিসেবে দেখাতে চান। বুঝাতে চান তরুণ সিরাজ ছিল অপরিপক্ব ও অযোগ্য। কিন্তু সুশীল চৌধুরী দেখিয়েছেন সিরাজ যথেষ্ট বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি বুঝতেন কোম্পানিকে শায়েস্তা করতে ব্যর্থ হলে কোম্পানি তাকে শায়েস্তা করবে। মির জাফরকে বিশেষ ভরসা তিনি করতেন না। তাই দেখতে পাই পলাশির প্রান্তরে মীর মদনের মৃত্যু হলে বাধ্য হয়ে তিনি মীর জাফরের পায়ের সাথে নিজের মুকুট রেখে তার সাহায্য চান। অনভিজ্ঞতাই হয়তো সিরাজের কাল হয়েছে।

    বহিঃস্থ শত্রু চিহ্নিত করতে সফল সিরাজ ব্যর্থ হন ঘরের শত্রু যেমন– বড় খালা ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ ও জগৎশেঠের ষড়যন্ত্র বুঝতে। এমনকি ফরাসিদের সাথে মিত্রতার সর্বোচ্চ ফায়দা তুলতে সিরাজের ব্যর্থতা তার পরাজয় ত্বরান্বিত করেছে।

    মুর্শিদাবাদের বেগমদের নিয়ে লিখেছেন সুশীল চৌধুরী। তখনকার রাজনীতিতে নারীদের বুদ্ধি কীভাবে বাংলার ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল তার কিছু বর্ণনা পেয়েছি। বিশেষত, মীর জাফরের মুন্নি বেগম তো অতুলনীয়, যাকে ক্লাইভের মতো ব্যক্তি ‘মা’ উল্লেখ করে চিঠি লিখেছিল!

    উৎসর্গ

    আমার ছোটভাই

    অকালপ্রয়াত সলিলকান্তি চৌধুরীর

    স্মৃতির উদ্দেশে

    ঋণ স্বীকার

    এই বই লেখার ব্যাপারে আমার স্ত্রী, মহাশ্বেতা, আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্য ছাড়া এটা লেখা সম্ভব হত না। বহরমপুরের ‘ইতিহাস পরিক্রমা’ মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত অনেকগুলি ছবি দিয়ে কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। অধ্যাপক গৌতম ভদ্র কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। এ বইয়ের জন্য ন্যাশন্যাল লাইব্রেরি ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়্যালের কর্তৃপক্ষ কিছু ছবি ব্যবহার করবার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। শ্রীমতী সুস্মিতা দুধোরিয়া কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে আমাকে সাহায্য করায় উপকৃত হয়েছি। এই বইয়ের ব্যাপারে শ্রী শ্রীরাম সিং এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে আমার অনেক উপকার করেছেন। আনন্দ পাবলিশার্স অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বইটি প্রকাশনার ব্যবস্থা করায় আমি কৃতজ্ঞ।

    সংকেত সূচি

    BPC Bengal Public Consultations
    Beng. Letters Recd. Bengal Letters Received
    C & B Abstr. Coast and Bay Abstracts
    DB Despatch Books
    Fact. Record Factory Records
    FWIHC Fort William-India House Correspondence
    HB Hughli to Batavia
    Home Misc. Home Miscellaneous
    HR Hoge Regering van Batavia
    OC Original Correspondence
    Orme Mss. Orme Manuscripts
    Mss. Eur. European Manuscripts
    NAI National Archives of India
    VOC Verenigde Oost-Indische Compagnie
    Journals
    BPP Bengal Past and Present
    CHJ Calcutta Historical Journal
    IESHR Indian Economic and Social History Review
    IHR Indian Historical Review
    JAS Journal of Asian Studies
    J. As. S Journal of Asiatic Society
    JEH Journal of Economic History
    JESHO Journal of the Economic and Social History of the Orient
    MAS Modern Asian Studies
  • সূর্য দীঘল বাড়ী

    সূর্য দীঘল বাড়ী

    সূর্য দীঘল বাড়ী

    বাংলা সাহিত্যের সার্থক উপন্যাসগুলোর অন্যতম আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’; উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।

    কুসংস্কার, দারিদ্র্যতা, সামাজিক অবহেলা ও ধনী-শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ জনপদের মহিলা জয়গুণের জীবনযুদ্ধের কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ উপন্যাসে।

    বাংলা ১৩৫০ সনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অবিভক্ত ভারতের বাংলায় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ‘পঞ্চাশের আকাল’ নামে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ প্রাণ হারায়। যারা কোনমতে শহরের লঙ্গরখানায় পাত পেতে বাঁচতে পেরেছিল তাদেরই একজন একালের সময় স্বামী পরিত্যক্ত জয়গুন। সঙ্গে তার মৃত প্রথম স্বামীর ঘরের ছেলে ও দ্বিতীয় স্বামীর ঘরের মেয়ে। আরো আছে মৃত ভাইয়ের স্ত্রী-পুত্র। তারা গ্রামে ফিরে এসে এমন এক খন্ড জমিতে ঘর তৈরী করে যেটি অপয়া ভিটে বলে পরিচিতি ছিল। জীবনযুদ্ধে যখন সে প্রাণপণ লড়ছে তখন তার প্রতি গায়ের মোড়লের দৃষ্টি পড়ে। দ্বিতীয় স্বামীও তাকে আবার ঘরে তুলতে চায়। সে কারো প্রস্তাবেই সায় দেয় না। কিন্তু এ দুজনের সাক্ষাত ঘটে এবং মোড়ল তার প্রতিযোগীকে হত্যা করে। ঘটনার একমাত্র দর্শক হিসেবে জয়গুনকেও মূল্য দিতে হয় অন্যভাবে।

    …এই কাহিনীর বিচিত্রতার মধ্যে মূল বিষয় একটিই; তা হচ্ছে কুসংস্কার, সম্পদ, ধর্ম, প্রতিপত্তি, সামাজিক বাধা-নিষেধ, এমনকি জাতীয়তাবোধ- এ সব কিছুকেই কাজে লাগিয়ে শ্রমজীবী ক্ষুধার্ত মানুষকে ক্রমাগত শোষণ।

    ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন মসিহ উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। সরকারি অনুদান প্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, জহিরুল হক, কেরামত মাওলা, এটিএম শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রটি প্রধান চরিত্র ‘জয়গুন’– এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথমে ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে তিনি অভিনয়ে অস্বীকৃতি জানান। এবং তাঁরই প্রস্তাবে ‘জয়গুন’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডলি আনোয়ারকে নির্বাচন করা হয়।

    চলচ্চিত্রটির শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেন– ডলি আনোয়ার – জয়গুন; রওশন জামিল – শফির মা; জহিরুল হক – গদু প্রধান; আরিফুল হক – খলিল; কেরামত মাওলা – করিম বক্স; এটিএম শামসুজ্জামান – জোবেদ ফকির; সৈয়দ হাসান ইমাম – ইমাম; ফখরুল হাসান বৈরাগী – লেদু; নাজমুল হুদা বাচ্চু – ডাক্তার রমেশ; সেতারা বেগম – লালুর মা; সুফিয়া – আঞ্জুমান; ইলোরা গহর – মায়মুন; সজিব – কাসু এবং লেনিন – হাসু।

    এই চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন আলাউদ্দীন আলী।

    চলচ্চিত্রটি ১৯৮০ সালে পশ্চিম জার্মানীতে অনুষ্ঠিত ২৯তম ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফিল্ম ডুকার্ট’ স্বর্ণপদক লাভ করে। এছাড়া একই উৎসবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র ‘মানবিক আবেদনে’র জন্য আন্তর্জাতিক ইভানজ্যালিক্যাল (প্রোটেস্ট্যান্ট) সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যাথলিক সংস্থা কর্তৃক দুটি বেশেষ পুরস্কার লাভ করে।

    পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ১৯৮০ সালের ‘নবম ফিগুয়েরা দ্য ফজ’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের ‘প্রিক্‌স ডন কুইকজোট’ পুরস্কার লাভ করে। একই বছর ২২তম কার্লোভিভেরি (চেকোশ্লোভাকিয়া) চলচ্চিত্র উৎসবে ডিপ্লোমা লাভ করে।

    ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ মোট আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। পুরস্কারগুলো হল–

    • শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র – মসিহউদ্দিন শাকের (প্রযোজক)।
    • শ্রেষ্ঠ পরিচালক – শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের।
    • শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী – ডলি আনোয়ার।
    • শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য – শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের।
    • শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রহণ – আনোয়ার হোসেন।
    • শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা – সাইদুল আনাম টুটুল।
    • শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী – ইলোরা গহর ও সজিব।
    • শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী (বিশেষ শাখায়) – লেনিন।

    এছাড়া ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালে ছয়টি বিভাগে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সংস্থা (বাচসাস)’ পুরস্কার লাভ করে।

    উৎসর্গ

    বাবার স্মৃতির উদ্দেশে

  • পদ্মার পলিদ্বীপ

    পদ্মার পলিদ্বীপ

    পদ্মার পলিদ্বীপ1

    পদ্মার পলিদ্বীপ কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস এবং চতুর্থ প্রকাশিত গ্রন্থ। ‘মুক্তধারা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করে ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে। এই সংস্করণে প্রদত্ত ছোট্ট ভূমিকা থেকে জানা যায় লেখক এটি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালে, আর লেখা সমাপ্ত করেন ১৯৮৫ সালে। এর মাঝে উপন্যাসের ষোলটি অধ্যায় মুখর মাটি নামে বাংলা একাডেমীর ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর শেষ হয়েছে এই উপন্যাস এবং প্রকাশিত হয়েছে পদ্মার পলিদ্বীপ নামে।

    উপন্যাসে যে সময়ের কথা বিধৃত হয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়। জাপানী বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করে বার্মা দখল করেছে। ব্রিটিশরা আতঙ্কিত ভারতে দখল বজায় রাখা নিয়ে। ব্রিটিশ-বিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন চলছে দেশজুড়ে। উপন্যাসে সমকালীন বিশ্বের প্রসঙ্গ বলতে গেলে এটুকুই। বাকি পুরো উপন্যাস শুধুমাত্র পদ্মার পলিদ্বীপে বসবাসরত মানুষদের নিয়ে। বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই জনপদগুলি যুদ্ধের অভিঘাতে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যে ও কেরোসিন-নুনের দুস্প্রাপ্রাপ্যতায় হতচকিত হয় বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এর বেশি যোগাযোগ তারা বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। কেননা নিজেদের নিতান্ত জৈবিক অস্তিত্ত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য তারা শুধুমাত্র কৃষিকেই উপায় বলে জানে। কৃষি মানে জমি। জমি মানে তাদের কাছে পদ্মার পলিদ্বীপ। জেগে ওঠা ও তলিয়ে যাওয়ার অবিরাম অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পলিদ্বীপ নিয়েই তাদের চিন্তা। পলিদ্বীপে চাষ-বাস করা, দ্বীপ তলিয়ে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া, নতুন জেগে ওঠা চর দখলে জন্য যুথবদ্ধ পশুর মতো লড়াই করা—এই নিয়েই তাদের জীবন।

    এই সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় কিছু প্রকাশিত সংবাদের কারণে হয়তো দেশের অন্য অঞ্চলের শিক্ষিত পাঠক এদের কথা কিছুটা জানতে পান, কিন্তু তাদের বা আমাদের সার্বিক ধারণাটাই যে কতটা অস্বচ্ছ ও অসম্পূর্ণ তা পদ্মার পলিদ্বীপ পাঠের আগে অনেকেরই বোধগম্য হবে না। উপন্যাসের এরফান মাতব্বর, তার পরিবার , তার পুলকী-মাতব্বর, কোলশরীকদের নিয়ে নিজেদের হারানো চর খুঁজে বেড়ায়। তাদের সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার কারণও এই পদ্মা। কারণ- “পদ্মার অজগর স্রোত গিলে খেয়েছে, উদরে টেনে নিয়েছে সব জমি। গুণগাঁর নমকান্দি থেকে শুরু হয়েছিল ভাঙা। তারপর বিদগাঁর কোণা কেটে, দীলির আধাটা গিলে, কাউনিয়াকান্দা, ডিঙ্গাখোলা, লক্ষীচর আর মূলভাওরকে বুকে টেনে চররাজাবাড়ির পাশ কেটে উন্মাসিনী পদ্মা গা দোলাতে দোলাতে চলে গেছে পূব দিকে। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এঁকেবেঁকে চলেছে ডানে আর বাঁয়ে।”

    এরফান মাতব্বর কথায় কথায় বলে “চরের বাড়ি মাটির হাড়ি, আয়ু তার দিন চারি”। বলে বটে, কিন্তু চর ছাড়া অন্য কোনো ভূগোল বোঝে না সে। বুঝতেও চায় না। সে অপেক্ষা করে, কবে ফের জেগে উঠবে তাদের খুনের চর। আসল নাম লটাবনিয়ার চর। সেই চরের দখল নিতে নিজের প্রথম পুত্র রশীদসহ পাঁচ পাঁচজন মানুষ খুন হয়ে যাওয়ায় চরের নাম হয়েছে খুনের চর। এরফান মাতব্বরের প্রতীক্ষার চরের জেগে ওঠা প্রথম অবিষ্কার করে তার দ্বিতীয় পুত্র ফজল। তখনই শুরু হয় উপন্যাসের সকল পাত্র-পাত্রীর সচল হয়ে ওঠা।

    তারা চরে গিয়ে ওঠে, ভাওর ঘর তোলে, নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নেয়, সালামি আদান-প্রদান করে, জমিদারের কাছারিতে গিয়ে নায়েবকে সালামি দেয়, খাজনা দেয়, চরের মাটিতে রোপা ধান রুইতে শুরু করে। তাদের পুরনো শত্রু চেরাগ সরদার এবার চর দখল করতে আসবে না, এটা জানা ছিল। এই বিপদের আশংকাও কারো মনে ছিল না। কিন্তু বিপদ এলো। এলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত দিক থেকে। জঙ্গুরুল্লা দাঁড়াল তাদের পথের কাঁটা হয়ে। পঁয়তাল্লিশ বছরের জঙ্গুরুল্লার জীবনে চল্লিশ বছরই কেটেছে অবর্ণনীয় কষ্টে। সারা জীবন কাজ করতে হয়েছে। ফলে কখনো শুকায়নি শরীরের ঘাম। অথচ পেটে জ্বলছে খিধের আগুন। গরীব কৃষক গরীবুল্লার সন্তান জঙ্গুরুল্লা সাত বছর বয়সে মাতৃহারা। পদ্মা অববাহিকার প্রচলিত প্রবাদ—মা মরলে বাপ অয় তালই।’ বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, সৎমায়ের নির্যাতন। জঙ্গুরুল্লার বয়স দশ বছর হতে না হতেই কাজ নিতে হয় হোগলাচরের এক চাষীগেরস্তের বাড়িতে। সেখানে পেটে-ভাতে রাখালি পাঁচ ছয় বছর। তারপর দুইটাকা বেতনে ঐ চরেরই আরেক বড় গেরস্তের বাড়িতে চাষের কাজ। বছর চারেক পরে বাপের মৃত্যু। সৎ মা তার ছয় বছর বয়স্কা মেয়েকে নিয়ে ‘নিকে বসে’ অন্য জায়গায়। জঙ্গু ঘোপচরে বাপের ভিটেতে ফিরে আসে। গাঁয়ের দশজনের চেষ্টায় তার বিয়েটাও হয়ে যায়। বউ আসমানী গরীব ঘরের মেয়ে। গোবরের খুঁট দেওয়া থেকে শুরু করে ধানভানা, চাল ঝাড়া, মুড়ি ভাজা, ঘর লেপা, কাঁথা সেলাই, দুধ দোয়ানোসহ সব কাজেই তার হাত চলে। আবার অভাব-অনটনে দুই-এক বেলা উপোস দিতেও কাতর হয় না।

    এর মধ্যে একটি কাণ্ড ঘটে যায়। ঘোপচরের মাতব্বর সোহরাব মোড়লের ছেলের বিয়ের বরযাত্রী হয়ে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লা। কনে পক্ষের বাড়ি চরে নয়। তারা ভদ্র গেরস্ত। বরযাত্রীদের বসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল ধবধবে ফরাসের। সেই ফরাসের উপর জঙ্গুরুল্লা তার থ্যাবড়া পায়ের কয়েক জোড়া কাদার ছাপ ফেলেছিল। তা দেখে চোখটিপে হেসেছিল কনেপক্ষের লোকেরা। লজ্জার কান কাটা গিয়েছিল সোহরাব মোড়লের। বাড়ি ফিরে জুতো খুলে মারতে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লাকে। ডেকেছিল পা-না-ধোয়া শয়তান বলে। ব্যাস তখন থেকেই জঙ্গুরুল্লার নামের আগে যোগ হয়ে যায় অমোচনীয় বিশেষণ—পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা। নামের আগে এই বিশেষণ যোগ না করলে তাকে আর চিনতে পারে না পদ্মা অববাহিকার মানুষ। খড়িশার কাছারির নায়েব শশীভূষণ দাসকে ঘটনাক্রমে পাগলা শেয়ালের হাত থেকে বাঁচিয়ে তার কৃপা লাভ করে জঙ্গুরুল্লা। নায়েব তাকে পেয়াদার চাকরিতে বহাল করে নেন। মাসিক বেতন তিন টাকা। পেয়াদার চাকরিতে বেতন বেতনই। আসল উপার্জন হচ্ছে উপরি। তার সঙ্গে ক্ষমতার সংযোগ। নায়েবের হুকুমে সে বকেয়া খাজনা জন্য প্রজাদের ধরে নিয়ে যেত কাছারিতে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ব্যবহার করত সাড়ে তিন হাত লাঠি। কখনও তাদের হাত-পা বেঁধে চিৎ করে রেখে শুইয়ে রাখত, কখনও কানমলা , বাঁশডলা দিয়ে ছেড়ে দিত। পাঁচ বছর পরে তার চাকরী চলে যায়। ততদিনে জমি-জমা সংক্রান্ত ফন্দি-ফিকির, প্যাঁচ-ঘোচ শিখে গেছে জঙ্গুরুল্লা। বাংলা ১৩৪৬ সালে বর্ষা শেষে আশ্বিন মাসে মাঝ নদীতে একটার পর একটা চর ভাসতে শুরু করে। জঙ্গুরুল্লা সবগুলি চরই দখল করে নেয়। কুণ্ডু আর মিত্র জমিদারদের কাচারি থেকে বন্দোবস্ত এনে বসিয়ে দেয় কোলশরীক। তাদের কাছ থেকে মোটা হারে সেলামি নিয়ে সে নিজের অবস্থা ঘুরিয়ে ফেলে।

    চরপাঙ্গাশিয়ায় নতুন বাড়ি ওঠে তার। “উত্তর, পূব আর পশ্চিম ভিটিতে চৌচালা ঘর ওঠে। দক্ষিণ ভিটিতে ওঠে আটচালা কাচারি ঘর। নতুন ঢেউটিনের চালা আর পাতটিনের জোড়া দিয়ে ঘরগুলো দিনের রোদে চোখ ঝলসায়। রাতে চাঁদের আলোয় বা চলন্ত স্টিমারের সার্চলাইটের আলোয় ঝলমল করে।”

    টাকার জোর, মাটির জোর আর লাঠির জোরের সঙ্গে এখন তার চাই সম্মানের জোর। সেই সম্মানের জোর অর্থাৎ মান-সম্মান বাড়ানোর জন্য জঙ্গুরুল্লা টাকা খরচ করতেও কম করছে না। গত বছর সে মৌলানা তানবীর হাসান ফুলপুরীকে বাড়িতে এনে মস্তবড় এক জেয়াফতের আয়োজন করেছিল। যে জেয়াফতে গরুই জবাই হয়েছিল আঠারোটা। দাওয়াতী-বেদাওয়াতী মিলে অন্তত তিন হাজার লোক হয়েছিল। সে জনসমাবেশে মৌলানা সাহেব তাকে চৌধুরী পদবীতে অভিষিক্ত করে যান। সেদিন থেকেই সে চৌধুরী হয়েছে। নতুন দলিলপত্রে এই নামই চালু হচ্ছে আজকাল। চরপাঙ্গশিয়ার নামও বদলে হয়েছে চৌধুরীর চর। কিন্তু এত কিছু করেও তার নামের আগেরে পা-না-ধোয়া খেতাব ঘুচল না।

    সব কথাই জঙ্গুরুল্লার কানে যায়। রাগের চোটে সে দাঁতে দাঁত ঘষে। নিন্দিত পা দুটোকে মেঝের ওপর ঠুকতে থাকে বারবার। তার ইচ্ছা হয় এই পা দুটি দিয়ে সে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু, পদানত করে চারদিকের মাটি আর মানুষ। এমনি করে এক ধরনের দিগ্বিজয়ের আকাঙ্ক্ষার জন্ম নেয় তার মনে। আশেপাশে কোনো নতুন চর জাগলেই লাঠির জোরে সে তা দখল করে নেয়। এভাবে তার দৃষ্টি পড়ে যথারীতি খুনের চরের উপর। একসময় কটুবুদ্ধি ও লাঠির জোরে দখলও করে নেয় খুনের চর।

    উপন্যাসের বাকি অংশ এরফান মাতব্বরের জীবিত পুত্র ফজলের সেই চর পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের বর্ণনা। ফজল সত্যিকারের নায়ক। নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া জানা ছেলে, অনেকগুলি মানবীয় গুণের সমাবেশ ঘটেছে তার মধ্যে। নিজের ব্যক্তি জীবনও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। তার স্ত্রী ফুলজানকে আটকে রেখেছে তার শ্বশুর আরশেদ মোল্লা। ঘটনাচক্রে মেয়েকে তার সাথে দিয়ে দিলেও পদে পদে ফজলের জন্য বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলে সে। জঙ্গুরুল্লার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফজলের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে থাকে সে। জঙ্গুরুল্রার দৃষ্টি পড়েছে ফুলজানের উপর। নিজের জন্য নয়। ফুলজানকে তার চাই তার বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে শাদী দেওয়ার জন্য। তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। পীর সাহেব বিয়ে করলে এখানেই থাকবেন। তার মৃত্যু হবে এখানেই। চরের মাটিতেই দাফন হবে তাঁর। জঙ্গুরুল্লাদের বিশ্বাস—তাহলে আর কখনোই ডুবে যাবে না তাদের ঘর। তার পীরের উছিলায় আল্লাহ রক্ষা করবেন এই চরকে। সম্পূর্ণ জাগতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার ব্যবহার।

    অবশেষে অনেক দ্বন্দ্ব-বিরোধ, দুঃখ-কষ্ট, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ফজল ও তার লোকেরা নিজেদের খুনের চর পুনর্দখল করতে পারে। ফিরে পায় ফুলজানকেও। মধুরেণ সমাপয়েৎ…।

    অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে। কেউ চকিতে নিজের ভূমিকা পালন করে দৃশ্যপট থেকে সরে যায়, কারও স্থায়ীত্ব একটু বেশি। কিন্তু সব চরিত্রই যেন তৈরি হয়েছে ফজলকে পরিস্ফুটিত করা জন্যই। একরৈখিক উপন্যাসের এটিই সমস্যা। তবু পার্শ্ব চরিত্রগুলির মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি জানান দিতে পেরেছে জরিনা।

    ভাগ্য বিড়ম্বিতা নারীর সবচেয়ে করুণ এক উদাহরণ জরিনা। ভারতবর্ষে ‘সারদা আইন’ পাশের বছরে বাল্যবিবাহেরে হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। ‘সারদা আইন’ প্রচলিত হলে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। সেই কারণে ঐ আইন হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত যেখানে যেকটি সম্ভব, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করা হয়েছে। সেই সময়েই দশ বছরের জরিনার সঙ্গে বিয়ে হয় এগারো বছরের ফজলের। কিন্তু পুত্রের তুলনায় পুত্রবধূকে দ্রুত বেড়ে উঠতে দেখে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে এরফান মাতব্বর। তার অনেক উচ্চাশা ফজলকে নিয়ে। তার মনে হয় বউয়ের সঙ্গে থাকলে ফজলের লেখাপড়া হবে না। সে তাই অনেক দূরের স্কুলে পাঠিয়ে দেয় নবম শ্রেণীতে পড়া ফজলকে। আর জরিনার ভাইয়ের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে জরিনাকে তালাক গ্রহণে বাধ্য করে। পরে জরিনার বিয়ে হয় দাগী চোর হেকমতের সঙ্গে, হেকমত যে কিনা বছরের অধিকাংশ সময়ই জেল হাজতে কাটায়। ফলে জরিনাকে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে ধান ভেনে নিজের পেট চালাতে হয়। সেভাবেই সে কাজ নেয় ফুলজানের বাড়িতে। সেই বাড়িতেই ঘটনাক্রমে তার শারীরিক মিলন ঘটে ফজলের সঙ্গে। পরবর্তীতে ফজল যখন থানা-পুলিশ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তখনো তাকে আশ্রয় দিয়ে লুকিয়ে রাখে জরিনাই। সে বোঝে সে এখন পরস্ত্রী, ফজলের সঙ্গে মেলামেশা উচিত নয়। কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা তাকে বার বার বাধ্য করে ফজলের সংস্পর্শে আসতে। সত্যিকার অর্থে এই উপন্যাসের সবচেয়ে জীবন-রক্ত-মাংসের সার্থক চরিত্র জরিনা।

    উপন্যাস হিসাবে কোন শ্রেণীতে ফেলা যায় পদ্মার পলিদ্বীপকেকে? এ যেন একটি ডকুমেন্টরি ছবি। আবু ইসহাকের প্রথম উপন্যাস সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “যদি অনুভূতি আবেগের আন্তরিকতা সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হয়, তবে সূর্য দীঘল বাড়ী সার্থক উপন্যাসরূপে স্বীকৃতি লাভের যোগ্য।” একই মন্তব্য এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আবার সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে যে বিরূপ মন্তব্য করেছেন হাসান আজিজুল হক, সেটিও হয়ত এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাসান লিখেছেন,

    “কিন্তু উপন্যাস যে একটি শিল্প তা কি সূর্য দীঘল বাড়ীর বেলায় স্বীকার করে নেয়া যায়? উপন্যাসটি পড়বার সময় মনে হয় যেন একটি ক্যামেরা অতি ধীরে আমাদের গ্রাম সমাজের ভেতরে, গরিব মানুষের উঠানে, শোবার ঘরে, গোয়ালে, রান্নাঘরে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। উপন্যাসের সমস্ত উপাদান, জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও খবর শিল্পীর কল্পনা ও সৃষ্টিনৈপুণ্য কদাচ জারিত হয়ে অনন্য হয়ে উঠতে পারছে না—কোনো একটা দৃষ্টি গড়ে উঠতে পারছে না, উপন্যাস একটি জীবন্ত সত্তায় পরিণত হচ্ছে না।”

    হাসান আজিজুল হক যেসব সর্তকে সার্থক উপন্যাসের জন্য আবশ্যকীয় বলে মনে করেন, তা কোনো উপন্যাসেই পাওয়া যায় না। এমনকি হাসান-লিখিত উপন্যাসেও না। বৈয়াকরণিক সব শর্ত পূরণ না করেও অনেক উপন্যাস সত্যিকারের উপন্যাস হিসাবে চিহ্নিত হতে পেরেছে। পদ্মার পলিদ্বীপ ও এই ধরনের একটি উপন্যাস।

    হয়তো ডকুমেন্টেশনই আবু ইসহাকের আরাধ্য। তাই দেখা যায় উপন্যাসের শেষে ফুটনোট হিসেবে ১৩ পৃষ্ঠাব্যাপী উপন্যাসে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলির প্রমিত অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। বৈয়াকরণগণ ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ নামক একটি বর্গ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে বিশেষ ভৌগলিক অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানবচরিত যখন উপন্যাসিকের শিল্প-অভিপ্রায়ে স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে. তখনই একটি সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের জন্ম হয়। সেই অর্থে অনেকেই পদ্মার পলিদ্বীপ-কে আঞ্চলিক উপন্যাসের অভিধা দিতে চান। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে পৃথিবীর সকল উপন্যাসই একটি নির্দিষ্ট ভূগোল ও কালখণ্ডকে আত্মস্থ করে রচিত। উপন্যাসের পটভূমি বলতে যা বোঝানো হয়, তা সবসময়ই স্থানীক ও আঞ্চলিক। কখনোই সর্বব্যাপী নয়। তবে তার আবেদন হতে পারে সর্বব্যাপী। তখনই তা ক্লাসিক। সেগুলিই সবচেয়ে সার্থক রচনা হিসাবে বিবেচিত। পদ্মার পলিদ্বীপ বাংলাদেশের পথিকৃৎ উপন্যাসগুলির একটি হিসাবে আমাদের কাছে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।

  • ফেরারী

    ফেরারী

    লিফটের সামনে বিরাট লাইন। পাশাপাশি দুটো লিফট, কিন্তু একটার বুকে আউট অফ অর্ডার-এর লকেট ঝোলানো। ফলে লাইন লম্বা হয়েছে। স্বপ্নেন্দু রুমালে মুখ মুছতে মুছতে গেট পেরিয়ে থমকে দাঁড়াল। যাঃ শালা!

    এখন ঘড়িতে এগারোটা বাজতে দশ। পৌনে এগারোটায় মিসেস বক্সী দেখা করতে বলেছেন। অলরেডি পাঁচ মিনিট লেট! যেভাবে বাসে ঝুলে আসতে হয়েছে তাতে আটতলায় হেঁটে ওঠা অসম্ভব ব্যাপার। সে চোখ বুলিয়ে লাইনের লোক গুনতে লাগল। আটজনের বেশি যদি না হয় তাহলে তার সুযোগ আসবে চতুর্থ দলে। কী করা যায় বুঝে উঠছিল না স্বপ্নেন্দু। এই সময় ইন্দ্রিয় লাফিয়ে উঠল। হেনা সেন! মুহূর্তেই এই একতলাটা যেন বিয়েবাড়ি হয়ে গেল। হেনা সেন ধীরে সুস্থে লাইনের শেষে দাঁড়াতেই স্বপ্নেন্দু চট করে তার পেছনে দাঁড়াল!

    হেনা সেন এই আটতলা অফিসের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা। সুন্দরী বললে কম বলা হবে, মহিলার শরীরে যেন ঈশ্বর মেপে মেপে জাদু মাখিয়ে দিয়েছেন। অমন সুন্দর গড়নের বুক এবং নিতম্ব এবং তার সঙ্গে মেলানো অনেকটা উন্মুক্ত কোমর দেখলেই কলজেটা স্থির হয়ে যায়, মহিলা যখন কথা বলেন তখন আফসোস হয়, কেন শেষ হল। হেনা সেনের সঙ্গে স্বপ্নেন্দুর আলাপ নেই। এতদিন হেনা বসত তিনতলায়। সেখানকার বড় অফিসারের সঙ্গে কী একটা গোলমাল হয়ে যাওয়ায় ট্রান্সফার নিয়ে গত পরশু আটতলায় এসেছেন। পদমর্যাদায় স্বপ্নেন্দু অনেক ওপরে কিন্তু এই বাড়িতে হেনাকে চেনে না এমন কেউ নেই, কিন্তু তাকে?

    স্বপ্নেন্দু বাতাসে অসম্ভব মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিল। সেটা যে সামনের শরীরটা থেকে আসছে তা অন্ধও বলে দিতে পারবে। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জামার কলার ঠিক করল। মুখটা অকারণে রুমালে মুছল। যদিও হেনা সেনের চোখ এখন লিফটের দিকে তবু সে নিজেকে স্মার্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। মহিলার মাখনরঙা ভরাট পিঠ আর ঘাড় দেখে স্বপ্নেন্দুর মনে হল ওর শরীরে যেন অজস্র ফগ চাপ বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুর্ধর্ষ! লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন না ফুলের বাগানে— ভঙ্গি দেখলে ঠাওর করা মুশকিল। এখনও পর্যন্ত এই অফিসের কোনও রাঘব বোয়াল ওঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। মহিলার নাকি আত্মসম্মান বোধ খুব।

    স্বপ্নেন্দু মিসেস বক্সীর মুখটা মনে করল। আজ ঠিক চিবিয়ে খাবে তাকে। আটতলার সুপ্রিম বস মিসেস বক্সী। পাঁচ ফুটি ফুটবল। গায়ের রঙ অসম্ভব ফরসা কিন্তু শরীরে কোনও খাঁজ নেই, মুখটা বাতাবি লেবুর কাছাকাছি। সেই মুখে সিগারেট গুঁজে ইংরাজিতে ধমকান। জরুরি মিটিং ছিল। হেনা সেনের কোমরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নেন্দু বলল, থাক মিটিং। লিফটে লাইন পড়লে সে কী করবে। সঙ্গে সঙ্গে তার খেয়াল হল। মিসেস বক্সী ইচ্ছে করলে তাকে বদলি করে দিতে পারেন।

    স্বপ্নেন্দু ঠোঁট কামড়াল। ঠিক সেই সময় হেনা সেন পেছন ফিরে তাকালেন। স্বপ্নেন্দু হাসবার চেষ্টা করল। আহা, কি বুক। হেনা সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি কিছু বললেন?’

    ‘আমি? না তো।’ কলজেটা যেন লাফে গলায় উঠে এসেছে।

    ‘মনে হল!’ হেনা সেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন।

    ‘না! মানে এই লাইনটার কথা ভাবছিলাম।’ স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল মিসেস বক্সীর বিরুদ্ধে জেহাদটা বোধহয় কিছুটা ঠোঁট ফসকে বেরিয়েছে।

    ‘লাইন? লাইনের কথা কেউ আবার শব্দ করে ভাবে নাকি?’ হেনা সেন ততক্ষণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্বপ্নেন্দুর খুব ইচ্ছে করছিল কথা বলতে। তার পেছনে এখন আরও দশ-বারো জন দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

    সে বলল, ‘আপনি তো আটতলায় এসেছেন।’

    ‘হ্যাঁ। আমি ওখানকার ডি.ও। আমার নাম স্বপ্নেন্দু সোম।’

    ‘স্বপ্নেন্দু? বেশ সুন্দর নাম তো?’

    কথাগুলো তার মুখের দিকে না তাকিয়ে বলা। তবু স্বপ্নেন্দুর মনে হল তার নামটাকে এমন সুন্দর করে আজ পর্যন্ত কেউ উচ্চারণ করেনি। লাইনটা টুকটুক করে এগোচ্ছিল মাঝে মাঝে। এবারে ওদের সুযোগ এসে গেল। হেনা সেনের হাঁটা দেখে স্বপ্নেন্দুর মনে হল দুটো জমাট ঢেউ পাশাপাশি দুলে গেল। লিফটে জায়গা ভরাট। হেনা সেন ওঠার পর লিফটম্যান দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে দেখে স্বপ্নেন্দু একচিলতে জায়গায় পা রেখে শরীরকে সেঁধিয়ে দিল। ফলে তাকে এমনভাবে দাঁড়াতে হল যে হেনা সেনের শরীরের অনেকটাই তার শরীরে ঠেকেছে। এত নরম আর এত মধুর কিন্তু এত তার দাহিকাশক্তি যে স্বপ্নেন্দুর মনে হল সে মরে যাবে। আর এই লিফটটা যদি অনন্তকাল চলত। যদি আটতলা ছাড়িয়ে একশ আটতলায় উঠে যেত। কিংবা এই মুহূর্তে লোডশেডিং-ও তো হতে পারত। মাঝামাঝি একটা জায়গায় লিফটটাকে বেশ কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকতে হত তাহলে। কিন্তু এসোব কিছুই হল না। বিভিন্ন তলায় যত লোক নামছে তত হেনা সেনের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছে। সাততলায় যখন লিফট, তখন একহাত ব্যবধান।

    স্বপ্নেন্দুর মনে হল তার শরীরে যেন হেনা সেনের বিলিতি গন্ধ কিছুটা মাখামাখি হয়েছে। সে গাঢ় গলায় বলল, ‘যদি কোনও প্রয়োজন হয় তাহলে আমাকে বলবেন মিস সেন।’

    ‘ওমা আমাকে আপনি জানেন?’

    ‘চিনি কিন্তু জানি না।’ কথাটা খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বলতেই লিফটের দরজা খুলে গেল। হেনা সেন এমন অপাঙ্গে তাকালেন যে স্বপ্নেন্দু রুমাল মুখে তুলল।

    দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতেই হরিমাধব ছুটে এল, ‘আপনাকে ম্যাডাম আধঘণ্টা ধরে খুঁজছেন। খুব খেপে গেছেন।’

    ‘খেপে গেছেন?’

    ‘হ্যাঁ। ইংরেজিতে গালাগাল দিচ্ছিলেন একা বসে।’

    স্বপ্নেন্দু দেখল চলে যেতে যেতে হেনা সেন আবার অপাঙ্গে তাকালেন। কিন্তু এবার তার ঠোঁটে যে হাসি ঝোলানো তার মানেটা বড় স্পষ্ট। মনে মনে হরিমাধবের ওপর প্রচণ্ড চটে গেল স্বপ্নেন্দু। একদম প্রেসটিজ পাংচার করে দিল বুড়োটা। সে গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে এসে বসল।

    এই অফিসে সে দুই নম্বর। তার নিচে অন্তত আশিজন কর্মচারী। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তার। ওপর তলা কারণে অকারণে তাকে ধমকাচ্ছে আবার নিচের তলার লোকজন সুযোগ পেলেই চোখ রাঙিয়ে যায়। নিচের তলার কর্মচারীদের ইউনিয়ন আছে। সে না ঘাটকা না ঘরকা। হরিমাধবকে ডেকে এক গ্লাস জল দিতে বলে স্বপ্নেন্দু ট্রান্সফার অ্যাণ্ড পোস্টিং-এর ফাইলটা খুলে বসল। হেনা সেনকে দেওয়া হয়েছে স্ট্যটিসটিকে। কোনও কাজ নেই সেখানে। মাসে দুবার রিপোর্ট পাঠালেই চলে। তাছাড়া বুড়ো হালদার আছে চার্জে। লোকটা কাজ পাগল মানুষ। ওর সেকশনের সবাই ওর কাঁধে কাজ চাপিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই অফিসে একটা কথা চালু আছে। স্ট্যটিসটিক হল পানিশমেণ্ট সেল। কোনও পার্টি ওই টেবিলে কোনদিন যাবে না। সবাই পোস্টিং চায় সেকশনে। হেনা সেনকে ইচ্ছে করেই স্ট্যাটিসটিকে দেওয়া হয়েছে। মিসেস বক্সীর কাণ্ড এটা। এই সময় টেলিফোন বাজল।

    ‘সোম স্পিকিং।’

    ‘হোয়াট ডু য়ু ওয়াণ্ট?’ মিসেস বক্সীর গলা।

    ‘মানে?’

    ‘কাম শার্প। এক্ষুণি আসুন।’

    জলটা খেয়ে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল স্বপ্নেন্দু। পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলে বুলিয়ে নিল। তারপর দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

    মিসেস বক্সীর ঘরটা বিশাল। কার্পেটে মোড়া। ঘোরানো চেয়ার এবং টেবিল ছাড়াও এক কোণে কালো ডেকচেয়ার রয়েছে বিশ্রাম নেবার জন্যে। দরজা খুলে ভিতরে পা দিতেই মিসেস বক্সীর মুখের সিগারেট দুলতে লাগল, ‘এই রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন অফিসার পেলে আপনি কী করতেন?’

    ‘মানে?’

    ‘আপনার কটায় আসার কথা ছিল?’

    ‘ট্র্যাফিক জ্যাম ছিল ম্যাডাম! তার ওপর লিফট খারাপ।’

    ‘এইসব সিলি বাহানা কেরানিরা দেয়। আপনি কি ডিমোশন চান?’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নিচু করল, ‘সরি, কিন্তু এটা অনিচ্ছাকৃত।’

    ‘আই অ্যাম ফেড আপ। আপনারা কী ভেবেছেন? এটা অফিস না অন্য কিছু? দশটায় অ্যাটেণ্ডেন্স। আমি সাড়ে দশটা পর্যন্ত প্রত্যেককে গ্রেস দিয়েছি। কিন্তু এগারোটায় অ্যাটেণ্ডেন্স টোয়েণ্টি পার্সেণ্ট। আপনি ডি. ও. হয়েও ঠিক সময়ে আসছেন না। এক্সপ্লেইন।’

    ‘আমি দুঃখিত।’

    ‘দ্যাটস দি অনলি ওয়ার্ড য়ু নো। দিস ইজ লাস্ট ওয়ার্নিং।’ সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে মিসেস বক্সী বললেন, ‘বসুন।’

    চেয়ারটা টেনে সন্তর্পণে বসল স্বপ্নেন্দু। মহিলা চেয়ারে এমন ডুবে গেছেন যে শুধু মুখ আর বুকের অর্ধাংশ টেবিলের ওপর দৃশ্যমান। বুকের কোনও আদল নেই, যেন দুটো মাংসের তাল এক করে রাখা। স্বপ্নেন্দুর মনে চট করে হেনা সেনের শরীর ভেসে উঠল। মিসেস বক্সী এবার একটা ফাইল খুললেন, ‘আমার কাছে ক্রমাগত কমপ্লেন আসছে। এই অফিসে এখন ঘুষের ফেস্টিভ্যাল চলছে।’

    ‘ফেস্টিভ্যাল?’

    ‘ইয়েস। প্রকাশ্যে যখন ঘুষ নেওয়া হচ্ছে তখন ফেস্টিভ্যাল ছাড়া আর কি বলব? ডি. ও. হয়ে আপনি সেসব খবর জানেন?’

    ‘অনুমান করতে পারি।’

    ‘কোনও স্টেপ নিয়েছেন?’

    ‘স্পেসিফিক কমপ্লেন না থাকলে স্টেপ নেওয়া মুশকিল।’

    ‘বাট আই ওয়াণ্ট টু স্টপ ইট। তোমরা চাই চাই বলে ইউনিয়ন করবে আবার ঘুষ ছাড়া কোনও কাজ করবে না, এটা হতে পারে না। কী ভাবে স্টপ করা যায়?’

    ‘এটা খুব জটিল ব্যাপার। এই অফিস ব্যবসায়ীদের জরুরি ব্যাপার নিয়ে কাজ করে। বিভিন্ন সেকশনে তাদের আসতে হয়। দ্রুত কাজ কিংবা কিছু বিপদমুক্ত হবার জন্য তারা পয়সা খরচ করে। কেরানিদের যেটা হাতে নেই তার জন্যে অফিসাররা আছেন। দশজন অফিসার। তাঁরা যেসব কেস নিয়ে ডিল করেন সেখানে মোটা টাকার ব্যাপার। বেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আছে এ ব্যাপারে। অফিসাররা কখনও কমপ্লেন করে না তার অধস্তন কেরানি ঘুষ নিচ্ছে। এটা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সবার ধারণা যে কোনও কাজ করলেই পার্টিরা টাকা দিতে বাধ্য। এমন কি তার রুটিন ডিউটি করলেও।’

    স্বপ্নেন্দু ডি. ও। অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, মাইনেপত্র এবং রিপোর্টস সঠিক রাখার দায়িত্ব তার ওপর। পার্টিদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। সে লক্ষ্য করেছে হরিমাধব তার পিওন হওয়ায় খুব অখুশি। প্রায়ই সে অনুরোধ করে বদলির জন্য। তার সমান মাইনের অফিসাররা গাড়িতে অফিসে আসেন, প্লেন ছাড়া বেড়াতে যান না। মনে মনে বেশ ঈর্ষা বোধ করে স্বপ্নেন্দু। কিন্তু এসোব করা যায় কী করে?

    ‘বোবা হয়ে থাকবেন না। ব্যাচেলাররা যে এমন—!’ কাঁধ নাচালেন মিসেস বক্সী। ‘কিছু বলুন।’

    ‘দেখুন।’ একটু কাশল স্বপ্নেন্দু। ‘এটা খুব জটিল ব্যাপার। অভ্যেসটা নিচ থেকে ওপরে সর্বত্র। কাকে বাদ দিয়ে কাকে ধরবেন।’

    ‘ওপর মানে?’

    ‘আমি শুনেছি অফিসাররাও একই দোষী।’

    ‘দ্যাটস নট আওয়ার বিজনেস। ওদের জন্যে আরও ওপরতলায় লোক আছেন। কিন্তু দশপাঁচ একশ টাকার হরির লুট বন্ধ করা ডি. ও. হিসেবে আপনার কর্তব্য।’

    ‘আমার?’

    ‘হ্যাঁ। আপনি অফিস বস।’

    ‘বলুন, কী করতে হবে?’

    ‘আপনি ট্রান্সফার করুন। আজকেই একটা লিস্ট দিন আমাকে। একটা সেকশনে যে ছমাস আছে তাকে স্ট্যাটিস্টিক কিংবা এস্টাব্লিশমেণ্টে পাঠিয়ে দিন। আর নোটিস বোর্ড ঝুলিয়ে দিন কোনও পার্টি অফিসের ভেতর ঢুকতে পারবে না। তাদের যদি কোনও প্রয়োজন থাকে তাহলে রেসপেকটিভ অফিসারের সঙ্গে দেখা করবে। প্রথমে এটা করুন তারপর দেখা যাবে।’ মিসেস বক্সী আবার সিগারেট ধরালেন। স্বপ্নেন্দু তখনও ইতস্তত করছিল, ‘এ নিয়ে খুব ঝামেলা হবে।’

    ‘ঝামেলা? চাকরিতে ঢোকার সময় তাদের কি বলা হয়েছিল যে যত ইচ্ছে ঘুষ নিতে পারবে? তাছাড়া আপনি ব্যাচেলার মানুষ, আপনার ভয় কীসের? বোল্ড হন মশাই, চিরকাল মিনমিন করে গেলে কোনও লাভ হবে না।’

    নিজের ঘরে ফিরে এল স্বপ্নেন্দু। ব্যবস্থাটা তার ভাল লাগছিল না। সে নিজে কখনও ঘুষ নেয়নি। হয়ত ঘুষ নেবার বড় সুযোগ তার আসে নি বলে নেয়নি কিংবা এখনও মনে কিছু রুচি এবং নীতিবোধ কটকট করে বলে নেওয়ার প্রবৃত্তি হয় নি। কিন্তু এই হুকুমটা কার্যকর করতে গেলে ভিমরুলের চাকে ঘা পড়বে। তাছাড়া কেরানিদের চোখ রাঙাব আর অফিসারদের আদর করব, এ কেমন কথা।

    ঠিক তখনই টেলিফোনটা শব্দ করল। ওপাশে তিন নম্বর অ্যাসেসমেণ্ট অফিসার মুখার্জি, ‘সোম। বক্সীর বাক্সের চাবিকাঠি তোমার হাতে, আমাকে উদ্ধার করো ভাই।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘একটা মোর দ্যান লাখ কেসে ওঁর অ্যাপ্রুভাল দরকার ছিল। ফাইলটা চেপে রেখেছেন। একবার বলেছিলাম, কোনও কাজ হয়নি। পার্টি বলল উনি পঞ্চাশ চেয়েছেন, আমি অ্যাসেসমেণ্ট অফিসার, কষ্ট করে মাছ জালে ঢোকালাম উনি তার ঝোল খাবেন। বোঝো?’

    ‘দেখি।’ বলে রিসিভার নামিয়ে রাখল স্বপ্নেন্দু। মিসেস বক্সীর বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে এ ধরনের অভিযোগ হাওয়ায় ভাসে। পাঁচশো হাজার নয়, হঠাৎ বিশ পঁচিশের কারবারী উনি। পঞ্চাশ এই প্রথম শুনল স্বপ্নেন্দু। এখন সেই মহিলা তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন দশ টাকা বিশ টাকা যারা নেয় তাদের থামাতে হবে।

    হরিমাধবকে হুকুম করল সে, ‘বড়বাবুকে পাঠিয়ে দাও।’

    বড়বাবু চাকলাদার খুব ভাল মানুষ। সাতে-পাঁচে থাকেন না। আর মাত্র তিনমাস বাকি আছে অবসরের। স্বপ্নন্দুর ধারণা লোকটা সৎ। ঘরে ঢোকামাত্র সে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি ঘুষ নেন?’

    হাঁ হয়ে গেলেন চাকলাদার। তারপর কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘নিতাম কিন্তু এখন নিই না।’

    ‘কেন নিতেন, কেন নেন না?’

    চাকলাদার নুইয়ে পড়লেন, ‘তখন অভাবের তাড়নায় না নিয়ে পারিনি। কিন্তু ভিক্ষে নিচ্ছি বলে ঘেন্না হয়। তাছাড়া আজ বাদে কাল চলে যাব, এখন আর নোংরা হওয়ার প্রবৃত্তি হয় না।’

    স্বপ্নেন্দু লোকটিকে দেখল। মনে হল মিথ্যে বলছেন না। তারপর নিচু গলায় বলল, ‘এই অফিসের যে সমস্ত কেরানির ঘুষ নেয় তাদের ট্রন্সফার করতে হবে। ম্যাডামের অর্ডার। আপনি লিস্ট করুন।’

    ‘সে তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।’

    ‘হোক।’

    ‘আর তিন মাস আছি। কেন আমাকে বিপদে ফেলছেন স্যার।’

    ‘কেউ জানবে না। খুব গোপনে করুন। অর্ডারটা আমি এখানে টাইপ করাব না। যান।’

    চাকলাদার চলে যেতে স্বপ্নেন্দু চোখ বন্ধ করল আর সঙ্গে সঙ্গে হেনা সেনের শরীরটা ভেসে উঠল। সে বিয়ে-থা করেনি। মাত্র তিরিশ বছর বয়স। সরাসরি অফিসার হয়ে ঢুকেছে পরীক্ষা দিয়ে। সামনে ব্রাইট ক্যারিয়ার। কিন্তু হেনা সেন তাকে গুলিয়ে দিল। মহিলার মধ্যে অদ্ভুত মাদকতা আছে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে আবার হরিমাধবকে ডাকল, ‘শোন স্ট্যটিস্টিক থেকে মিস সেনকে ডেকে আনো।’

    ‘উনি এখন অফিসে নেই স্যার।’

    ‘নেই? তুমি জানলে কী করে?’

    ‘উনি যে এসেই ক্যাণ্টিনে যান বিশ্রাম করতে।’

    স্বপ্নেন্দু অবাক হয়ে গেল। আচ্ছা ফাঁকিবাজ মহিলা তো! সে বিরক্ত গলায় বলল, ‘ক্যাণ্টিন তো এই বাড়িতেই। সেখান থেকে ডেকে নিয়ে এসো।’

    হরিমাধব চলে যাওয়ার পর স্বপ্নেন্দুর মনে হল না ডাকলেই হত। হয়ত মহিলা অসুস্থ, বাইরে থেকে ঠাওর করা যায় না। তাছাড়া ওরকম সুন্দরী মহিলাদের একটু-আধটু সুবিধা দেওয়া দরকার। দশটা-পাঁচটা কলম পিষলে কি ওই শরীর থাকবে? কিন্তু সেই সঙ্গে স্বপ্নেন্দুর ভেতরটা খুব চঞ্চল হয়ে উঠল। সে চট করে চুলটা আঁচড়ে রুমালে মুখ ঘষে নিল। কাল থেকে দুটো রুমাল নিয়ে বেরোতে হবে। একটা খুব দ্রুত ময়লা হয়ে যায়।

    আবার টেলিফোন বাজল। ওপাশে সুজিত। ফিল্মে অভিনয় করে বেশ পরিচিত হয়েছে। একসঙ্গে কলেজে পড়ত এবং এখনও যোগাযোগ আছে। সুজিত জিজ্ঞাসা করল, ‘কাল বিকেলে কী করছ?’

    ‘কিছুই না।’

    ‘চলে এসো। আমার বাড়িতে সন্ধে সাতটায়। ফিল্মের কিছু মানুষ আসবে। একটা গোপন খবর ঘোষণা করব।’

    ‘কী খবর?’

    ‘উঁহু এখন বলব না। ওটা সারপ্রাইজ থাক। এসো কিন্তু। শুধু বলছি আমি বিয়ে করছি। দারুণ, দারুণ এক মহিলাকে।’ কট করে লাইনটা কেটে দিল সুজিত। রিসিভারটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ঈর্ষাবোধ করল সে। এমন কিছু ভাল দেখতে নয় কিন্তু সুজিত আজ বিখ্যাত। প্রচুর টাকা পাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে দারুণ মহিলাকে বিয়ে করছে। আর সে একটা ভাল স্টুডেণ্ট হয়েও কলা চুষছে। রাস্তাঘাটে কোনও মেয়ে তার দিকে তেমনভাবে তাকায় না। কলেজ লাইফে সুজিতের থেকে তার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল।

    এই সময় দরজায় শব্দ হতেই মুখ তুলে তাকাল স্বপ্নেন্দু। মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে তার। হেনা সেনের মুখ থমথমে, ‘ডেকেছেন?’

    উঠে দাঁড়াতে গিয়ে খেয়াল হল সে অফিসার। হাত বাড়িয়ে চেয়ারটা দেখিয়ে বলল, ‘বসুন। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।’

    হেনা সেন এগিয়ে এল রাজহাঁসের ভঙ্গিতে। ‘কী ব্যাপার?’

    ‘আগে বসুন, দাঁড়িয়ে কথা বলা শোভন নয়।’

    ব্যাপারটা যেন হেনা সেনের মনঃপূত হচ্ছিল না। তবু চেয়ারখানা সামান্য টেনে নিয়ে থমথমে মুখে বসলেন। স্বপ্নেন্দু সেটা লক্ষ্য করল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘এই অফিসের পরিবেশ আপনার কেমন লাগছে?’

    ‘ভালই।’

    ‘কিন্তু আমার ওপরওয়ালা মনে করেন পরিবেশ আদৌ ভাল নয়। তিনি চান অবস্থার উন্নতি করতে। আপনি সেকশনে আসতে চান?’

    ‘সেকশনে? না না। ওখানে ঝামেলা। আমি বেশ আছি।’

    ‘কিন্তু মিসেস বক্সী আপনাকে সেকশনে পাঠাতে বলেছেন।’

    এবার হাসলেন হেনা সেন, ‘উনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না। আপনি নিশ্চয়ই কারণটা বুঝতে পারছেন। সেকশনে যাওয়ার যাদের ইণ্টারেস্ট আছে তাদের পাঠান। আমি চলি।’

    ‘একটু বসুন।’ স্বপ্নেন্দু খুব অসহায় বোধ করছিল, ‘একটা কথা, এই সব আলোচনার কথা অফিসে গিয়ে বলবেন না।’

    ‘কেন?’

    ‘এটা টপ সিক্রেট।’

    ‘তাহলে আমাকে জানালেন কেন?’

    ঠোঁট কামড়াল স্বপ্নেন্দু, ‘আমার মনে হয়েছিল আপনাকে বিশ্বাস করা যায়।’

    ‘ধন্যবাদ।’ হেনা সেন সামান্য মাথা দুলিয়ে ঘর ছেড়ে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে এক্সপ্লেন করতে বলবেন কেন আমি অফিসে এসেই ক্যাণ্টিনে যাই।’

    ‘আপনি জানেন আমি সেটা পারি না।’

    ‘আমি জানি?’

    ‘জানা উচিত।’

    এবার হাসিটা মিষ্টি হল। তারপর বেরিয়ে গেলেন সেন। কয়েক মুহূর্ত বাদে স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল, একি করল সে। একজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে চরম অন্যায় হয়ে গেল। শুধু একজন সুন্দরী মহিলার শরীর দেখে সে মাথা খারাপ করে ফেলল? এখন উনি যদি অফিসে বলে বেড়ান তাহলে ম্যাডাম তাকে চিবিয়ে খাবে। অথচ এখন আর কিছু করার নেই।

    বিকেলে অফিসে হইচই পড়ে গেল। হেনা সেন নয়, কী করে যে খবর ফাঁস হয়ে গেছে তা কেউ জানে না। হয়ত হরিমাধব কিংবা বক্সীর বেয়ারা অথবা বড়বাবু, সোর্সটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু অফিসের সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেল। ঝেঁটিয়ে ট্রান্সফার হচ্ছে এই খবরটা আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল; বিকেল চারটেয় জানতে পারল স্বপ্নেন্দু। একজন ছাপ্পান্ন বছরের প্রৌঢ় এসে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন, ‘স্যার, আমাকে ধনেপ্রাণে মারবেন না।’

    ‘কী হয়েছে।’

    ‘আমার তিনটে মেয়ে। সেকশন থেকে সরিয়ে দিলে ওদের বিয়ে দিতে পারব না। একদম ভরাডুবি হয়ে যাবে স্যার।’ কেঁদে ফেললেন ভদ্রলোক।

    ‘আপনি জানলেন কী করে?’ স্বপ্নেন্দু সোজা হয়ে বসল।

    ‘সবাই জানে স্যার।’

    তারপর একটার পর একটা অনুরোধ। কারো মেয়ের বিয়ে হয় না, কারো সংসার চলবে না। অফিস থেকে চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে আসছিল। স্বপ্নেন্দু টেলিফোন করল মিসেস বক্সীকে। বেজে গেল টেলিফোন। হরিমাধব খোঁজ নিয়ে জানাল ম্যাডাম ঘণ্টাখানেক আগে অফিস থেকে বেরিয়ে গেছেন।

    স্বপ্নেন্দুর মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না কী করে খবরটা ফাঁস হয়ে গেল। সে চাকলাদারকে ডেকে পাঠাল, ‘আপনি স্টাফদের বলেছেন?’

    ‘না স্যার। তত শুনেছি ম্যাডাম নাকি ওঁর পিওনকে বলেছেন।’

    ‘ম্যাডাম?’ স্বপ্নেন্দু হাঁ হয়ে গেল। ঠিক সেই সময় দল বেঁধে স্টাফরা তার ঘরে প্রবেশ করল। একসঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি অভিযোগ এবং গালাগালের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। তাকে ঘিরে অনেকগুলো উত্তেজিত মুখ। স্বপ্নেন্দু বলার চেষ্টা করল, ‘আপনারা আমার কাছে এসেছে কেন? মিসেস বক্সীর কাছে যান। তিনিই অল ইন অল।’

    একজন বলল, ‘সে শালী পালিয়েছে।’

    ‘ঠিক আছে একজন বলুন। এনি অফ ইউ।’

    ‘শুনুন। অ্যাদ্দিন ধরে আমরা সেকশনে কাজ করছি, এখন এক কথায় সরাতে পারেন না। এতগুলো লোকের ভাতে হাত দেবার কোনও রাইট আপনার নেই।’

    ‘ভাতে হাত!’

    ‘নিশ্চয়ই।’

    ‘কিন্তু এটা তো বেআইনি।’

    সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার উঠল অজস্র অশ্লীল শব্দ। একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘অফিসাররা যখন মাল কামান তখন বুঝি আইন থাকে?’

    এই যুক্তির কাছে নরম হতেই হয়। স্বপ্নেন্দু মিসেস বক্সীকে একথাই সকালে বলেছিল। সে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি। বিশ্বাস করুন আমি এসোব কিছুই জানি না। মিসেস বক্সী এলে আমি নিশ্চয়ই আলোচনা করব।’

    ‘আপনি জানেন না?’

    ‘না।’ স্বপ্নেন্দু স্রেফ অস্বীকার করল।

    ‘মিথ্যে কথা। তাহলে স্ট্যাটিস্টিক থেকে মিস সেনকে ডেকে পাঠালেন কেন? মিস সেনকে সেকশনে দিতে চান?’

    ‘মিস সেন?’ ধক্ করে উঠল স্বপ্নেন্দুর বুক। মহিলা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন নাকি? ওফ, কি বোকামিই না করেছিল সে। একটা মেয়েছেলের সুন্দর চেহারা দেখে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল!

    ‘কি, চুপ করে আছেন কেন?’

    ‘ওর সঙ্গে আমার কী কথা হয়েছে আপনারা জানেন?’ শেষ চেষ্টা করল সে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার বাড়ল কেউ একজন হেনা সেনকে ডেকে আনতে। তারা সামনাসামনি ভজিয়ে নিতে চায়। স্বপ্নেন্দু ঘামতে লাগল এই লোকগুলোকে তার ক্ষিপ্ত নেকড়ের মত মনে হচ্ছিল। তার ঘরে হামলা হচ্ছে অথচ কোনও অফিসার এগিয়ে আসছেন না তাকে উদ্ধারের জন্যে।

    কিছুক্ষণের মধ্যে মিস সেনের আবির্ভাব হল। ঘরে ঢুকে বললেন, ‘কী ব্যাপার? আমায় কেন?’ যেন তিনি কিছু জানেন না।

    নেতা গোছের একজন প্রশ্ন করল, ‘মিস সেন, আজ সকালে উনি কি ট্রান্সফার পোস্টিং নিয়ে কিছু বলেছিলেন আপনাকে?’

    ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন হেনা সেন। ‘হ্যাঁ।’

    আর গলা শুকিয়ে গেল স্বপ্নেন্দুর। নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল তার। সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ল মিথ্যুক লায়ার।

    ‘কী বলেছিলেন?’

    ‘আমি অফিসে এসে রেস্ট নিতে ক্যাণ্টিনে যাই বলে উনি আমাকে বলেছিলেন এটা নাকি অন্যায়। প্রয়োজন হলে আমাকে ট্রান্সফার করে দেবেন। আমার আবার একটু রেস্ট না নিলে চলে না।’ হেনা সেন হাসলেন।

    আর স্বপ্নেন্দুর মনে হল সে গভীর কুয়োর তলা থেকে ভুস করে ওপরে উঠে এল। স্পষ্টতই আক্রমণকারীদের মুখে এখন হতাশা। কেউ কেউ হেনা সেনের দিকে অবিশ্বাসী চোখে তাকাচ্ছে। এবার হেনা সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি জানতে পারি কি কেন এঁদের ট্রান্সফার করা হচ্ছে?’

    ‘আমি জানি না, মিসেস বক্সী বলতে পারবেন।’

    ‘এঁদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে যে এরা পার্টির কাছে ঘুষ নেন? যদি না থাকে তাহলে এরকম অ্যাকশান নেওয়া মানে এঁদের অপমান করা। অনুমানের ভিত্তিতে আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’

    হেনা সেন হেসে হেসে কথাগুলো বলাতেই সোচ্চারে তাকে সমর্থন করল সবাই।

    যাওয়ার আগে স্টাফরা বলে গেল যদি এইরকম অর্ডার বের হয় তাহলে কাল থেকে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। ঘর ফাঁকা হয়ে গেল। রুমালে মুখ মুছল স্বপ্নেন্দু। খুব জোর বেঁচে গেল সে আজ। হেনা সেন তাকে বাঁচিয়ে দিল। মহিলা তাকে নাও বাঁচাতে পারতেন! সঙ্গে সঙ্গে আর একটা চিন্তা মাথায় আসা মাত্র উৎফুল্ল হল সে। মেয়েরা যাকে একটু নরম চোখে দ্যাখে, তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করে, কোথায় যেন পড়েছিল সে। এত ঝামেলার মধ্যেও এটুকু ভাবতে পেরে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল তার। খুব ইচ্ছে করছিল হেনা সেনকে ডেকে কৃতজ্ঞতা জানায় কিন্তু সাহস হল না তার। সঙ্গে সঙ্গে স্টাফদের মনে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে মহিলা খুবই বুদ্ধিমতী। তাকেও যেমন বাঁচাল তেমনি স্টাফদেরও চটাল না। চমৎকার।

    স্বপ্নেন্দু ঠিক করল মিসেস বক্সীর ওপর ব্যাপারটা ছেড়ে দেবে। তিনি যা করেন তাই হবে। সে আর এই ব্যাপারে থাকবে না। যদি মিসেস বক্সী চোখ রাঙান তাহলে হেড অফিসে বিস্তারিত জানাবে।

    ছুটির পর বেরিয়ে এসে বাসস্ট্যাণ্ডে কিছুক্ষণ দাঁড়াল স্বপ্নেন্দু। এই সময়টায় তার কিছুই করার থাকে না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়ির কোনও আকর্ষণ তার কাছে নেই। হাঁটতে হাঁটতে ধর্মতলায় চলে এল সে। আর তখনই আত্রেয়ীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। স্বপ্নেন্দু এড়াতে চাইছিল কিন্তু পারল না। আত্রেয়ী তাকে ডাকল, ‘কী ব্যাপার, কেমন আছ?’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নাড়লো, ‘ভাল। তুমি?’

    ‘আর থাকা। তুমি তো কোনও খোঁজখবর নাও না।’

    ‘কী হবে নিয়ে। তাছাড়া তোমার স্বামী তো সেটা পছন্দ করেন না।’

    ‘ওঃ স্বপ্নেন্দু! এই কথাটা শুনতে শুনতে আমি পাগল হয়ে গেলাম। আমার সব কাজেই যদি ওর মতামত নিতে হয় তাহলে—!’ বলতে বলতে কথা ঘোরালো সে, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

    ‘কোথাও না। বেকার মানুষ।’

    ‘তুমি আবার বেকার। এখনও বান্ধবী পাওনি?’

    ‘সে কপাল কোথায়?’

    ‘চলো আমাদের ওখানে চলো।’

    ‘মাথা খারাপ। স্ত্রীর বন্ধুকে দেখলে কোনও স্বামী সুখী হয় না।’

    ‘আমি আর পারছি না স্বপ্নেন্দু। এই লোকটার সঙ্গে একসঙ্গে বাস করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

    স্বপ্নেন্দু রাস্তাটার দিকে তাকাল। অজস্র মানুষ এই সন্ধেবেলায় যাওয়া আসা করছে। অথচ আত্রেয়ী এই পরিবেশকে ভুলে গিয়ে নিজের মনের কথা স্বচ্ছন্দে বলে যাচ্ছে। স্বপ্নেন্দু তবু বোঝাবার চেষ্টা করল, ‘এভাবে বলো না, তুমি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছ। অতীতটাকে ভুলে যেও না।’

    ‘ভুল করেছিলাম।’ তারপরেই যেন খেয়াল হল আত্রেয়ীর, ‘কোথাও বসবে?’

    ‘তোমার দেরি হয়ে যাবে না?’

    ‘আই ডোণ্ট কেয়ার। তোমাকে এতদিন বাদে দেখলাম। তোমার অফিসের টেলিফোন নাম্বারটা যে কাগজে ছিল সেটাও ছিঁড়ে ফেলেছে, কী রকম ব্রুট!’

    ‘আজ নয় আত্রেয়ী। আমার মন ভাল নেই।’

    ‘একদিন কিন্তু আমার কাছে এলে তোমার মন ভাল হয়ে যেত।’

    ‘সে অনেক দিন আগের কথা। তখন আমরা ছাত্র—।’

    ‘তোমার নাম্বাটা দাও তাহলে।’

    স্বপ্নেন্দু টেলিফোন নাম্বারটা বলতে আত্রেয়ী তিন চারবার নানান রকম করে মনে গেঁথে রাখল তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এখনও সেই পুরোনো বাড়িতেই আছ?’

    ‘আর কোথায় যাব? মা চলে যাওয়ার পর আমি আগলাচ্ছি।’

    হঠাৎ ব্যাগ খুলল আত্রেয়ী। তারপর কী ভেবে সেটা বন্ধ করে বলল, ‘তুমি হয়ত আমার কথা আজকাল আর ভাবো না কিন্তু আমার বড় মনে পড়ে তোমাকে। আমি ভুল করেছি স্বপ্নেন্দু, বিরাট ভুল।’

    আত্রেয়ী চলে গেলে আরও আনমনা হয়ে গেল সে। ছাত্রজীবনে কি তার সঙ্গে আত্রেয়ীর প্রেম হয়েছিল? না, ঠিক প্রেম বলে না ওটাকে। তবে আত্রেয়ীর কাছে যেতে ভাল লাগত তার। আর আত্রেয়ীর নজর ছিল আরও ওপরের দিকে। ভাল চাকুরে, প্রচুর পয়সা এবং ক্ষমতাবান মানুষের জন্যে তার লোভ ছিল। তাই সেই বয়সে ওরকম একটা মানুষকে পেয়ে সে স্বচ্ছন্দে স্বপ্নেন্দুদের ভুলে যেতে পেরেছিল। কষ্ট হয়েছিল অবশ্যই কিন্তু সেটা ভুলে যেতে সময় লাগেনি। প্রেম হলে কি তা সম্ভব হত। শরীরে যৌবন নেই। সেই চাপল্য নেই, আকর্ষণ করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। এই আত্রেয়ীর সঙ্গে নবীন প্রেম হয় না, পুরনো বন্ধুত্ব রাখা যায় মাত্র। কথাটা মনে হওয়ামাত্র হেনা সেনের শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে দম বন্ধ হয়ে গেল তার। হেনা সেনকে কৃতজ্ঞতা জানানো হল না। কাল এবং পরশু ছুটি। সোমবারে ঘরে ডেকে ওটা জানাতে গেলে হয়ত নানান কথা উঠবে। তাছাড়া সেদিন অফিসের আবহাওয়া কী রকম থাকবে তাও সে জানে না।

    আত্রেয়ীর সঙ্গে দেখা না হলে হয়ত বুকের ভেতর হেনা সেনের জন্যে এতটা আনচান শুরু হত না। আত্রেয়ীর যন্ত্রণাটা যেন তার মনে ছুঁইয়ে চলে গেল। স্বপ্নেন্দুর মনে হল হেনা সেনের বাড়িতে গিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এলে কেমন হয়? অফিস থেকে বের হবার আগে সে ওর ফাইল থেকে বাড়ির ঠিকানাটা জেনে এসেছে।

    পরমুহূর্তেই চিন্তাটাকে বাতিল করল সে। হেনা সেনের বাড়িতে যাওয়া একজন অফিসারের পক্ষে সম্মানজনক হবে না। হেনা যদি বিরক্ত হয় তাহলে অফিসে ঢি ঢি পড়ে যাবে। স্টাফরা তো বটে মিসেস বক্সী খড়্গহস্ত হবে। তাছাড়া হয়ত গিয়ে দেখবে ওর কোনও সহকর্মী সেখানে বসে আছে। তাহলে? বেইজ্জতের একশেষ। না, এটা অত্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাবে।

    এক কাপ চা খেয়ে হাঁটছিল স্বপ্নেন্দু। এই সময় একটা বাচ্চা ছেলে পেছনে লাগল। ধর্মতলায় এদের প্রায়ই চোখে পড়ে। একগাদা টাটকা ফুল নিয়ে এরা অনুনয় করে কিনতে। স্বপ্নেন্দু শুনেছে এই সব ফুলের অতীত নাকি ভাল নয়। কবরস্থান থেকে তুলে নিয়ে এসে নাকি বিক্রি করা হয়। তাছাড়া ফুল নিয়ে সে কী করবে? বাড়িতে যার ফুলদানি নেই তার ফুলের কী প্রয়োজন। ছেলেটাকে হটিয়ে দিলেও সে পিছু ছাড়ছিল না। ফুলগুলোর প্রশস্তি করতে করতে আকুতি জানাচ্ছিল কেনবার জন্যে। প্রায় বাধ্য হয়ে স্বপ্নেন্দু এবার ফুলগুলোর দিকে তাকাল। আর তখনই তার নজরে পড়ল একটা আধফোটা বড় রক্তগোলাপ কী রকম নরম সতেজ চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে। পুরো ফোটেনি ফুলটা কিন্তু এমন ডাঁটো এবং উদ্ধত ভঙ্গি, পাপড়ির গায়ে জলের ফোঁটা যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। সে ছেলেটাকে বলল, ‘ঐ ফুলটার দাম কত?’

    ‘আট আনা সাব।’ হাত বাড়িয়ে তুলে দিল সে গোলাপটিকে। লম্বা ডাঁটি এবং তাতে দুটো পাতা। দর করল না স্বপ্নেন্দু। দাম মিটিয়ে দিয়ে নাকের সামনে ধরতেই অদ্ভুত জোরালো অথচ মায়াবী গন্ধ পেল। এবং তখনই মনে হল এই গন্ধটা তার খুব চেনা। চোখ বন্ধ করতেই হেনার শরীর ভেসে উঠল। আজ সকালে লিফটে হেনা সেনের শরীর থেকে সে এই রকম গন্ধ পেয়েছিল। আদুরে চোখে ফুলটাকে দেখল স্বপ্নেন্দু আর তারপরেই মনে হল হেনা সেনের শরীরের সঙ্গেও এই ফুলের মিল আছে। এইরকম তাজা, উদ্ধত, অহঙ্কারী এবং মহিমাময়। শেষ শব্দটা ভাবতে পেরে খুব ভাল লাগল তার। মহিমাময়।

    ফুলটার দিকে তাকিয়ে স্বপ্নেন্দুর দ্বিতীয়বার মনে হল তার উচিত একবার হেনা সেনের বাড়িতে যাওয়া। সে তো কখনও ফুল কেনেনি। কোনও ফুলওয়ালা তার পেছনে জোটেনি কোনদিন। আজ কেন হল?

    আর ওই ছেলেটার কাছে এই ফুলটাই বা থাকবে কেন যা দেখলে হেনা সেনকে মনে পড়ায়! হেনা সেন থাকে ফুলবাগানের সরকারি ফ্ল্যাটে। তেমন বুঝলে একটা মিথ্যে ওজর দিতে অসুবিধে হবে না। তাছাড়া যে মেয়ে তাকে বাঁচাতে অতগুলো সহকর্মীর সামনে কথা সাজাল সে নিশ্চয় অফিসে গিয়ে নালিশ করবে না। এইসব ভেবে স্বপ্নেন্দু একটা ট্যাক্সি ধরল। পারতপক্ষে শেয়ারে ছাড়া সে ট্যাক্সিতে চড়ে না। কিন্তু আজ মনে হল এই ফুলটাকে নিয়ে বাসে ওঠা যায় না। ভেতরে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে। ঘাম জমছিল কপালে।

    সরকারি ফ্ল্যাটের কাছে এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে স্বপ্নেন্দুর মনে হল এই লাল গোলাপটাকে হাতে ধরে পথ হাঁটা উচিত হবে না। এটাকে দেখলে মানুষের কৌতূহল হবেই। অথচ পকেটে রাখলে ফুলটা নষ্ট হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সে রুমাল বের করে সযত্নে তাতে ফুলটাকে ঢেকে ঝুলিয়ে নিল এমন করে যে কেউ দেখলে চট করে বুঝতে পারবে না।

    নম্বর খুঁজে খুঁজে ফ্ল্যাটটা পেতে মিনিট পনেরো লাগল। তিন তলায় দরজার গায়ে লেখা আছে মিস্টার এসো কে সেন। এই লোকটা কে হতে পারে? হেনার বাবা? মেয়ের অফিসার বাড়িতে এসেছেন শুনলে ভদ্রলোক কী মনে করবেন? কিন্তু এখন ফিরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। একটু মরিয়া ভাব এসে গেলে স্বপ্নেন্দু কলিং বেলে আঙুল রাখল। আর আশ্চর্য, দরজা খুলল হেনা নিজে।

    ‘ওমা, আপনি?’ খুব অবাক গলায় প্রশ্ন করল হেনা।

    স্বপ্নেন্দু দেখল লালশাড়ি লাল ব্লাউজে হেনাকে ঠিক রক্তগোলাপটার মত দেখাচ্ছে। অফিস থেকে ফিরে স্নান করেছে নিশ্চয়ই কারণ লাবণ্য ঢলঢল করছে সারা অঙ্গে। স্বপ্নেন্দু কোনরকমে বলতে পারল, ‘এলাম।’

    ‘হ্যাঁ আসুন।’ হেনা সরে দাঁড়াতে স্বপ্নেন্দু ঘরে ঢুকল। সুন্দর সাজানো আধুনিক ঘর। দরজাটা ভেজিয়ে হেনা জিজ্ঞসা করলেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

    স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল রুমালটার কথা। ওটা এখনও হাতে ঝোলানো। যতটা সম্ভব ওটাকে আড়াল করে সে কথা বলল, ‘আমি না এসে পারলাম না। আজ আপনি আমাকে অফিসে বাঁচিয়েছেন। আমি যে কী বলে আপনাকে–’

    শব্দ করে হেসে উঠলেন হেনা সেন। তাঁর শরীরে পুরীর ঢেউগুলোকে চকিত দেখতে পেল স্বপ্নেন্দু। হেনা সেন হাসতে হাসতে বললেন, ‘বলিহারি আপনি! ওই জন্যে বাড়ি বয়ে ধন্যবাদ জানাতে এলেন! এখন যদি খবরটা অফিসে জানাজানি হয়ে যায়? আরে মুখটা অমন করেছেন কেন? বসুন বসুন।’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নাড়ল, ‘না বসব না। রাতও তো হল।’

    ‘রাত এমন কিছু হয়নি। দাঁড়ান, আমার মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।’ কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হেনা সেন ভেতরে চলে গেলেন। স্বপ্নেন্দু আড়ষ্ট হয়ে বসল। রুমালটাকে সে সন্তর্পণে সোফার ওপর রেখে দিল। তিনঘরের ফ্ল্যাট। অথচ অন্য মানুষের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না।

    একটু বাদেই এক প্রৌঢ়াকে নিয়ে হেনা সেন ফিরে এলেন, ‘আমার মা।’

    স্বপ্নেন্দুর ইচ্ছে করছিল প্রণাম করতে কিন্তু সেটা বাড়াবাড়ি হবে মনে হওয়ায় নমস্কার করল। সে। মহিলা বললেন, ‘বসুন।’

    ‘আমাদের অফিসার! খুব জাঁদরেল লোক।’ হেনা সেন জানালেন। মহিলা বললেন, ‘আপনি কি এদিকেই থাকেন?’

    ‘না। মানে আমার এক বন্ধুর কাছে এসেছিলাম, ভাবলাম দেখা করে যাই।’

    ‘ওর পুরনো অফিসে পরিবেশ ভাল ছিল না। একজন তো খুব বিরক্ত করতেন। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে নিষেধ করলাম বাড়িতে আসতে। আসলে বাবা, এখানে কোনও পুরুষ মানুষ যদি ঘন ঘন আসে তাহলে নানান কুকথা উঠবে। আমরা মায়ে মেয়েতে থাকি তো।’

    ‘সে তো নিশ্চয়ই!’ স্বপ্নেন্দু ঢোঁক গিলল।

    ‘ওর বাবা যা রেখে গিয়েছেন তাতে মেয়ের চাকরি করার দরকার হয় না। কিন্তু মেয়ে কথা শুনলে তো! এখন একটা ভাল ছেলে পেলে বেঁচে যাই।’

    হেনা চাপা গলায় বললেন, ‘আঃ মা! তুমি আবার আরম্ভ করলে!’

    প্রৌঢ়া স্বপ্নেন্দুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওই দ্যাখো, বলতেই আপত্তি। কিন্তু—!’

    ‘কোনও কিন্তু নয়। এখন ভেতরে গিয়ে রামের মাকে বল কফি করতে।’

    ‘কিন্তু স্বপ্নেন্দু উঠে দাঁড়াল, ‘মাফ করবেন! আমি কফি খাব না! মানে একটু আগে চা খেয়েছি তো!’

    ‘ও অন্য জায়গায় চা খেয়ে আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘না। মানে, ঠিক আছে আর একদিন খাব।’

    ‘আর একদিন খাবেন মানে? শুনলেন না মা একটু আগে কি বলল। ঘনঘন এ বাড়িতে এলে পাঁচজনে কুকথা বলবে।’ হেনা সেন আবার হাসিতে ভেঙে পড়লেন। স্বপ্নেন্দু ঠোঁট কামড়াল! তাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হচ্ছে আর কখনও এই বাড়িতে এসো না!

    প্রৌঢ়া অবশ্য বলে উঠলেন, ‘ছিঃ ওভাবে ঠাট্টা করতে হয়।’

    ‘আমি যে ঠাট্টা করলাম তা উনি বুঝতে পেরেছেন। সত্যি চা কফি খাবেন না?’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নাড়ল, ‘চলি আবার দেখা হবে।’

    ‘আপনার রুমাল পড়ে রইল ওখানে।’

    স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল। সে কয়েক পা ফিরে এসে রুমালটাকে তুলে নিল। এতসব সত্ত্বেও তার খুব ইচ্ছে করছিল হেনা সেনের হাতে টাটকা লাল গোলাপটা তুলে দিতে। কিন্তু এইসব কথাবার্তা আর প্রৌঢ়া মহিলার সামনে সেটা দেয়া অসম্ভব। ওঁরা দরজা পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিলেন। সিঁড়িতে পা দেবার আগে স্বপ্নেন্দু শুনল হেনা বলছেন, ‘ঝামেলাটা নিজের কাঁধে না রেখে মিসেস বক্সীর ওপর চাপিয়ে দিন। আপনার কি দরকার যেচে অপ্রিয় হওয়ার।’

    নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্নেন্দু টলমল হল। হেনা সেন তার সঙ্গে যতই রসিকতা করুক না কেন শেষ সময়ে যে কথাটা বলল তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় ওর প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি আছে। কোনও কোনও মানুষের একটা বাহ্যিক স্বভাব থাকে পরিহাস করার কিন্তু ভেতরের আন্তরিকতা যখন বেরিয়ে আসে তখন বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। হেনা সেই রকমের মেয়ে।

    বুঁদ হয়ে হাঁটছিল স্বপ্নেন্দু। লাল জামা লাল শাড়ি সাদা নিটোল ডানার মত কাঁধ থেকে হাত নেমে এসেছে যার সেই মেয়ে তার চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল। রুমালটাকে নাকের নিচে নিয়ে আসায় সে আবার হেনা সেনের শরীরের ঘ্রাণ আবুক নিতে পারল।

    বাড়ি ফিরে স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল আজ রান্না-বান্না বন্ধ। ওর রাতদিনের কাজ করে যে লোকটা সে দেশে গেছে কার অসুখের খবর পেয়ে। সামনে দুদিন ছুটি বলে স্বপ্নেন্দু আপত্তি করেনি। সন্ধ্যেটা এমন ঘোরে কেটে গেল যে এসোব কথা মনেও আসেনি। এখন রাত্রে হরিমটর।

    দরজা খুলে সে শোওয়ার ঘরে এল। একটা ফুলদানি নেই যেখানে গোলাপটাকে রাখা যায়। টেবিলে একটা সুন্দর কাচের বাটি ছিল, স্বপ্নেন্দু তার মধ্যে ফুলটাকে বসিয়ে দিল। একটুও টসকায়নি সেটা, তেমনি উদ্ধত এবং আদুরে। আর কি টকটকে লাল। কি খেয়াল হতে বাটিটাকে উল্টো করে বসিয়ে দিতে স্বপ্নেন্দু আবিষ্কার করল ফুলের রঙ কাচের আস্তরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসছে। আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে। সামান্য দূরে সরে কাঁচ চাপা ফুলটাকে দেখল সে। ঠিক মধ্যিখানে গর্বিত ভঙ্গিতে রয়েছে।

    এক কাপ কফি আর কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে শুয়ে পড়ল স্বপ্নেন্দু। আজ সারাদিন অনেক ঘটনা ঘটে গেল। চারদিকে শুধুই নোংরামো, একমাত্র ব্যতিক্রম হেনা সেন। কিন্তু তার কাছে আগের অফিসের কোনও অফিসার প্রায়ই যেত! লোকটাও কি হেনার প্রেমে পড়েছিল? মনে মনে খুব জেলাস হয়ে উঠল সে। হেনা লোকটাকে বাড়িতে এলাউ করত কেন? হেনারও কি দুর্বলতা ছিল? স্বপ্নেন্দুর অস্বস্তি শুরু হল। তার খেয়াল হল হেনা স্বইচ্ছায় ট্রান্সফার চেয়ে এই অফিসে এসেছে। দুর্বলতা থাকলে নিশ্চয়ই তা করত না।

    কিন্তু অফিসের পরিবেশটা জঘন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর চেয়েও কোনও কলেজে মাস্টারি নিয়ে অনেক বেশি আরামে থাকা যেত। আসলে এখন মানুষের লোভের কোনও সীমানা নেই। চাই আরও চাই। যেমন আত্রেয়ী। একসময় যেটাকে সুখ বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এখন সেটা থেকে মুক্ত হতে চাইছে। সে সুখের মালা যেন ফাঁস হয়ে বসেছে গলায়। আসলে সেখানেও একটা অতৃপ্তি, যা অন্য লোভ থেকে মনে জন্মেছে। স্বপ্নেন্দু শুয়ে শুয়ে হাসল। আজ পৃথিবীর সমস্ত মানুষ কোনও না কোনও লোভের শিকার। কাকে দোষ দেবে। এই নিয়ে মানিয়ে গুছিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। সে নিজেও তো লোভার্ত হয়ে হেনা সেনের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিল। অথচ যাওয়ার আগে কতকগুলো বাহানা তৈরি করতে হয়েছিল নিজের কাছে কৈফিয়ত দিতে। নিশ্বাস ফেলেছিল মৃদু তালে স্বপ্নেন্দু। তার তিনতলার ঘরে অল্প অল্প হাওয়া আসছে। মাথার ওপর ফ্যানটা ঘুরছে না। কলকাতা শহর কখন যে বিদ্যুৎহীন হয়ে গেছে তা টের পায়নি। স্বপ্নেন্দুর চোখের সামনে লাল শাড়ি লাল জামা। শিশুর মত ঘুমিয়ে পড়ল তাই নিয়ে।

  • কালোচিতার ফটোগ্রাফ

    কালোচিতার ফটোগ্রাফ

    এ যেন স্বর্গের সিঁড়ি, উঠছে তো উঠছেই, শেষ আর হয় না। এই পাহাড়ি শহরটার নিচ থেকে ওপরে শর্টকাট পথ তৈরি করতে এমন বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে বড় প্যাকেটে পুরে সেটা বুকের ওপর চেপে ধরে তার একটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল মতিলাল। আজকাল টানা উঠতে বুকে হাঁপ ধরে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল একেবারে ওপর থেকে একটি মানুষ তরতরিয়ে নিচে নেমে আসছে। এ নিশ্চয়ই কোনও ডানপিটে তরুণ, নইলে ওই গতিতে নামার কথা চিন্তা করত না। ওভাবে নামতে হলে রীতিমত অভ্যস্ত হওয়া দরকার। মতিলাল সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। সিঁড়িটা চওড়া নয়, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে খাদ। কিন্তু সে ভাল করে সরে যাওয়ার আগে ছেলেটি তাকে মৃদু ধাক্কা মেরে নিচে চলে গেল একটুও গতি না কমিয়ে। আর ওই সামান্য ধাক্কাতেই মতিলালের হাতের প্যাকেট ছিটকে পড়ল মাটিতে। বেরিয়ে এল চিনি-চায়ের ছোট্ট প্যাকেটগুলো, দুটো ম্যাগাজিন।

    চাপা গলায় গালাগালি করতে করতে উবু হয়ে বসে সে প্যাকেট দুটো এবং ম্যাগাজিন তুলছিল। যৌবনের শুরুতে মানুষ নিজেকে কী না কী মনে করে। ভাগ্যিস এই প্যাকেটগুলো ছিঁড়ে যায়নি। উঠে দাঁড়াবার আগে সে যে জিনিসটাকে দেখতে পেল সেটা তার নয়। একটা সেলোফেন কাগজে মোড়া বস্তু পড়ে আছে পায়ের কাছে। হাত বাড়িয়ে তুলেই বুঝতে পারল জিনিসটা বেশ ভারী। মতিলাল নিশ্চিত যে ওই অতি স্মার্ট ছেলেটি ধাক্কার সময় টের পায়নি জিনিসটা পড়ে গেছে। সে নিচের দিকে তাকাল। ছেলেটি এবার সিঁড়ি থেকে নেমে বাজারের দিকে যাচ্ছে। পরনে নীল জিনস্ এবং ওপরে চামড়ার জ্যাকেট, মাথায় একটা সাদা টুপি। সে চিৎকার করে ডাকার চেষ্টা করল কিন্তু ছেলেটা মুখ তুলল না। মতিলাল জিনিসগুলো নিয়ে যতটা সম্ভব জোরে নিচে নামতে লাগল। আজকাল ধীরেসুস্থে হাঁটাচলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। কিন্তু ছেলেটাকে ধরতে হবে বলে সে জোরে নামছিল। বেচারা হয়ত এখন টের পাবে না জিনিস পড়ে গেছে। যখন পাবে তখন আফসোস করবে। তাই এখন ওটা ওকে ফেরত দিয়ে কিছু কথা শোনানো যেতে পারে।

    নিচে নামার পর সে ছেলেটাকে দেখতে পেল না। ওপর থেকে সে দেখেছে ছেলেটি গিয়েছে বাজারের দিকে। অতএব সেদিকেই চলল সে। সাদা টুপি চামড়ার জ্যাকেট পরা মানুষের চেহারা খুঁজে খুঁজে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেল মতিলাল।

    এখন কী করা যায়? অন্যের জিনিস বাড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া কোনও মানে হয় না। আবার যেখানে পেয়েছিল সেখানে ফেলে রেখে যেতেও ভদ্রতায় লাগছে। এই দোকানদারদের কাছে দেওয়ার চেয়ে সবাইকে জানিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। সে সেলোফেনের মোড়কটা ধীরে-ধীরে খুলছিল। কী জমা দিচ্ছে তা দেখেই জমা দেবে। হঠাৎ মোড়কের ফাঁক দিয়ে একটা সরু কালো নল বেরিয়ে আসামাত্র সে চমকে উঠল। হায় ভগবান! এটা একটা পিস্তল! সে তাড়াতাড়ি মোড়কটা জড়িয়ে এপাশ-ওপাশ তাকাতেই দেখল এক মাঝবয়সি গোঁফওয়ালা লোক চট করে চোখ সরিয়ে নিল। লোকটা কি পিস্তল দেখতে পেয়েছে? বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটছিল কেউ। মতিলাল বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। এই পিস্তল আইনি না বেআইনি তাই বা কে জানে। যদি ছেলেটা এটা আইনসঙ্গত মনে করত তা হলে কি ওভাবে ফেলে যেত! এত ভারী জিনিস যখন পড়েছিল তখন কোনও আওয়াজ কানে যায়নি তো? আচ্ছা, এমন হতে পারে ছেলেটা এই পিস্তলের কথা জানেই না, তার হাত থেকে কিছু পড়েনি ওখানে। পিস্তল অনেক আগে কেউ রেখে গিয়েছিল ওখানে। না হলে পড়ার সময় নিশ্চয়ই আওয়াজ পেত সে। অন্য কারও পিস্তল সে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। পুলিশকে গিয়ে এই কথা বলে পিস্তল জমা দিলে ওরা বিশ্বাস করবে? গত কয়েক মাস ধরে উগ্রপন্থীদের ধরার জন্য পুলিশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই পাহাড়ি শহরে এখন সামান্য গোলমাল হলে ব্যাপক ধরপাকড় হয়। কিছুদিন আগে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কারও-বা কারও মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। এখন অবস্থা কিছুটা শান্ত হলেও পুলিশ সহজে তার কথা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই বাজারের রাস্তায় পিস্তল হাতে কেউ যদি তাকে ধরে তা হলেও তো কৈফিয়ত দেওয়ার কিছু থাকবে না। মতিলাল আর ভাবতে পারছিল না। মোড়কটাকে বড় ব্যাগের ভেতরে চালান করে দিয়ে সে মুখ তুলতেই দেখল গোঁফওয়ালা লোকটা আবার তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তার মানে ওই লোকটা তাকে লক্ষ করছে। কেন? পা-দুটো হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেল ওর। লোকটা কী করে জানল তার কাছে পিস্তল আছে? সে এই প্রশ্নের জবাব না পেয়ে নিজেকে বোঝাল হয়ত অন্য কারণে লোকটা তাকে লক্ষ করছে। এখন সর্বত্র পুলিশের লোক ছড়ানো। বাজারে ফিরে এসেও কেনাকাটা না করে ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ওর সন্দেহ হতে পারে।

    মতিলাল পা চালাল। কিছুটা যাওয়ার পর মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে সে আর গোঁফওয়ালা লোকটাকে দেখতে পেল না। ওর মন একটু হালকা হল। খাড়াই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল সে। লোকজন অবশ্য ওঠানামা করছে কিন্তু সন্দেহ করার মত কাউকে তার চোখ পড়ল না।

    একপাশে ঢালু পাহাড়, অন্যপাশে সুন্দর বাড়িগুলো। দুপুর গড়ালেই রোদ এসে পড়ে এখানে আবহাওয়া ভাল থাকলে। মতিলাল একটু দ্রুত হাঁটছিল। রাস্তা থেকে কয়েক ধাপ উঠে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সে নিজের বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছে গেল। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আগে বড় প্যাকেটটাকে টেবিলের ওপর রাখল। দরজাটা ভাল করে বন্ধ করে সে প্যাকেট থেকে সেলোফেনের মোড়কটাকে বের করে সন্তর্পণে খুলতে লাগল। হ্যাঁ, সত্যি-সত্যি এটা একটা পিস্তল। পিস্তলটা রাখা হয়েছে একটা রবারের খাপের মধ্যে। মতিলালের মনে হল এই কারণে সিঁড়ির ওপর পড়া সত্ত্বেও কোনও আওয়াজ কানে আসেনি। পিস্তলকে রবারের খাপে রাখার নিয়ম কি না তার জানা নেই। সে দেখল অস্ত্রটির বুকের ভেতর গুলি ভরা আছে। অর্থাৎ এখনই ব্যবহার করতে চাইলে কোনও অসুবিধে নেই।

    পিস্তলটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে সে বাইরের দিকে তাকাল। কাচের জানলার বাইরে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝকঝক করছে। দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়। মতিলাল পৃথিবীর সবাইকে এখন ক্ষমা করে দিল। যারা তার শত্রুতা করেছে, যাদের সে সহ্য করতে পারে না তার লিস্ট তৈরি করতে হলে প্রথমে সুভদ্রার নাম লিখতে হয়। সে একা থাকে। এই ছোট্ট বাড়িটায় একা থাকতে তার খারাপ লাগে না আজকাল। তবু সুভদ্রা তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। পিস্তলটা যদি কারও ওপর ব্যবহার করতে সে বাধ্য হয় তা হলে প্রথমে সুভদ্রা। মতিলাল চোখ বন্ধ করল। তার বন্ধ চোখের পাতায় এখন সুভদ্রার মুখ! ফোলা-ফোলা চোখ, সবসময় কিছু একটা ভেবে চলেছে। বিশ্বাস শব্দটি ওর অভিধানে নেই। গুলিটা ছুড়লে ঠিক কোথায় গিয়ে লাগলে সুভদ্রাকে কেমন দেখাবে তা ভেবে পাচ্ছিল না মতিলাল। ধীরে-ধীরে মুখটা তার কাছে অন্যরকম হয়ে গেল। যতই ঝগড়া করুক, গালমন্দ দিক, আলাদা থাকুক, যে মুখে এককালে সে আদর করেছে, যদিও খুবই গোনাগুনতি ব্যাপার, তবু সেই মুখ গুলিতে ক্ষতবিক্ষত করতে পারবে না। সুভদ্রার জন্যে তার ক্রমশ মায়া হতে লাগল। আর তখনই বেল বাজল।

    কে এল! উঠে দরজা খুলতে গিয়ে খেয়াল হল। পিস্তলটা তার হাতে দেখতে পেলে যে আসবে তারই চোখ বড় হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে গুজব তৈরি হবে। কোথায় রাখা যায় এটা? দ্বিতীয়বার বেল বাজাতেই মতিলাল তড়িঘড়ি করে দেওয়ালে ঝোলানো একটা তিব্বতি ব্যাগের ভেতর মোড়কসমেত পিস্তলটা ঢুকিয়ে দিল। সুভদ্রা চলে যাওয়ার পর থেকে ওই ব্যাগে হাত দেওয়া হয়নি। যতটা পারে শান্ত মুখে দরজা খুলেই হকচকিয়ে গেল সে। গম্ভীর মুখে সুভদ্রা দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলামাত্র তাকে ঠেলে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সুভদ্রা।

    কে আছে, অ্যাঁ? এতক্ষণ কার সঙ্গে ফুর্তি করা হচ্ছিল। বেল টিপতে টিপতে হাতে কড়া পড়ে গেল আর বাবুর খোলার নাম নেই? দুমদুম শব্দ করে ভেতরে ঢুকে চারপাশ দেখে নিল সুভদ্রা।

    দরজাটা বন্ধ করে প্রায় চোরের মত খানিকটা দূরত্বে এসে দাঁড়াল মতিলাল।

    এতক্ষণ কী করছিলে?

    কিছু না।

    তা হলে দরজা খুলছিলে না কেন?

    এমনি।

    এমনি? উত্তর শুনে শরীর গুলিয়ে ওঠে। শুধু এই কারণে তোমার সঙ্গে আমি ঘর করতে পারিনি, বুঝলে? শোনো, তোমাকে এবার টাকা বাড়াতে হবে।

    টাকা?

     আকাশ থেকে পড়লে কেন? যা টাকা দিচ্ছ তাতে কোনও ভদ্রমহিলার মাস চলে না।

    আমি কী করতে পারি? মিনমিন করে বলল মতিলাল।

    কী করতে পারি মানে? ইয়ার্কি? তোমার বউ-এর খাওয়া-পরা চলছে না আর তুমি বলছ কী করতে পারি? অন্য কেউ হলে মুখ ভেঙে দিতাম আমি। গজগজ করে উঠল সুভদ্রা, একেই দুর্নাম রটাচ্ছ আমি নাকি মুখরা, খারাপ ব্যবহার করি, তার ওপর মুখ ভেঙে দিলে আর দেখতে হবে না। এখন থেকে প্রত্যেক মাসে দুশো টাকা করে বেশি দেবে।

    আমি কোত্থেকে পাব? আমি যা রোজগার করি তা তো জানো!

    আমি কিছুই জানি না। কেন, যেসব মেয়েছেলের সঙ্গে দিনরাত ফুসুর-ফুসুর করতে তাদের গিয়ে বলো না। অকম্মের বাদশা।

    ঠিক আছে, কিন্তু আমারও তো একটা কথা ছিল।

    তোমার কোনও কথা থাকতে পারে না।

    কিন্তু ছিল, বিশ্বাস করো।

    ল্যাঙটের আবার বুক পকেট। বলো, বলে ফেলো।

    ইয়ে, তুমি তো আমাকে ছেড়ে গেছ–।

    হ্যাঁ। গেছি। ওরকম মাদিমুখো পুরুষের সঙ্গে কেউ থাকতে পারে না।

    ঠিক আছে। এখন তুমি যার কাছে আছ–।

    তার মানে? তুমি আমাকে চরিত্রহীনা বলছ?

     না, না, এখন তো তোমার সঙ্গে বলরাম থাকে; থাকে না?

    তাতে কী এল-গেল। সে কি আমার মন্ত্রপড়া স্বামী? বিয়ে করেছি তাকে? আমি কি নিতান্তই উল্লুক? বিয়ে করলে তোমার কাছ থেকে টাকা-পয়সা পাওয়া যাবে নাকি?

    ও। তা হলে বিয়ে না করে এমনি-এমনি আছ?

    হ্যাঁ। সাহেব-মেমরা যেমন থাকে। তা তোমার এখানেও বুড়ি-বুড়ি মেয়েছেলেরা যাতায়াত করে বলে শুনেছি। যদি কাউকে দেখতে পাই! সুভদ্রা ঘুরে দাঁড়িয়ে সদ্য কিনে আনা প্যাকেটগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওগুলো কী?

    চা, চিনি।

    আমি নিয়ে যাচ্ছি। কীসে নিই! চোখ ঘুরল সুভদ্রার। তারপর এগিয়ে গিয়ে দেওয়াল থেকে তিব্বতি ব্যাগটা টেনে নামিয়ে প্যাকেটগুলো তাতে ফেলে দিল। হাঁ-হাঁ করে উঠল মতিলাল, আরে, আরে করছ কী? ওই ব্যাগটা নিও না!

    কেন? এটা তোমার বাবার সম্পত্তি? আমি কিনেছিলাম না? আমার জিনিস নিতে আমাকেই নিষেধ করা হচ্ছে। যদি বিয়ে করতাম তবে এবাড়ির সব জিনিসই নিয়ে যেতে হত আমাকে। আজ যাচ্ছি। সামনের মাস থেকে দুশো টাকা বেশি দেবে। যেমন এসেছিল তেমনি ঝড়ের মত চলে গেল সুভদ্রা।

    দরজা বন্ধ করে ধীরে-ধীরে কিচেনে গেল মতিলাল। গ্যাস জ্বেলে এক কাপ কফি বানিয়ে বসার ঘরে এল। সামনের জানলা দিয়ে পাহাড়ের অনেকটা দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিল সে। বেতের চেয়ারে বসে পাহাড় দেখতে-দেখতে সময় কাটানো ওর প্রিয় অভ্যেস। সুভদ্রা চলে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু মনে হচ্ছে ওর কথাগুলো এই ঘরে ভাসছে। জীবনের একটা ভুল অনেক দাম দিয়ে গেল। বলরাম তারই বন্ধু। কণ্ট্রাক্টরি করে। কঁচা পয়সা হাতে। সুভদ্রার শরীরের দিকে নজর ছিল অনেকদিন। এখন সে সুভদ্রার কাছেই থাকে। অথচ সুভদ্রা নাকি ওর কাছ থেকে একটা পয়সাও নেয় না। অভাবে থাকবে, তবু সাহায্য নেবে না। প্রয়োজন হলে এ বাড়িতে এসে সে ঝামেলা করবে। মানুষের চরিত্র বোঝা মুশকিল।

    মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স তার। চাকরি করে ব্যাঙ্কে। সুভদ্রা চলে যাওয়ার পর কোনও মেয়েমানুষের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়নি। এই বয়সে বন্ধুরা রুমাল পালটানোর মত মেয়েমানুষ পালটায়। তার উৎসাহ হয় না। আজ রবিবার। ব্যাঙ্ক বন্ধ। কোনও কাজ নেই। দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে চা খাবে। সন্ধে থেকে হুইস্কি। রাত বাড়লে একটা চমৎকার ঘুম। এইভাবেই বাকি জীবন যদি কাটিয়ে দিতে পারত। সে কফি শেষ করে নিজের ঘরে এল। বিছানার ওপরে একটা সিনেমার পত্রিকা। মাধুরী দীক্ষিতের মুখ। এখনকার নায়িকারা বেশি সুন্দরী না মধুবালা, মালা সিনহারা? বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বসলে বেশ ভালভাবে সময় কেটে যায়। অড্রে হেপবার্ন, সোফিয়া লোরেন না প্রিটি ওম্যানের সেই মেয়েটা। কী যেন নামটা?

    এইসময় দরজার বেল বেজে উঠল গাক-গ্যাক করে। লোকটা রসকষহীন। বেল বাজানোর ধরনের ওপর মানুষের চরিত্র অনেকটা বোঝা যায়। মতিলাল এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। নিশ্চয়ই সুভদ্রা ফিরে আসেনি। এমনভাবে বেল ও বাজায় না।

    দরজা খুলতেই হকচকিয়ে গেল মতিলাল। এক জিপ পুলিশ সামনে দাঁড়িয়ে। থানার ওসি থাপাকে সে চেনে। দয়া মায়া স্নেহ বলে বোধগুলো ঈশ্বর ওর জন্মের সময় দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। থাপার হাতে রিভলভার। সেটা মতিলালের নাকের ডগায় নাচিয়ে থাপা বলল, হ্যাণ্ডস আপ। চালাকির চেষ্টা করলে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেব।

    কোনওরকমে দুটো হাত মাথার ওপর তুলতেই ধমক খেল সে, ‘ঘরে চলো’।

    অতএব ঘরে ঢুকতেই হল। পুলিশ বাহিনীকে সদর দরজায় রেখে থাপা দুজনকে নিয়ে ভেতরে এল, ‘বাড়িতে আর কে-কে আছে?’

    ‘কেউ নেই।’ মাথার ওপর হাত তুলেই রেখেছিল সে।

    ‘কী কী বেআইনি অস্ত্র আছে বাড়িতে?’

    ‘অস্ত্র? অস্ত্র থাকবে কেন?’ করুণ গলায় পালটা প্রশ্ন করল সে।

    ‘মারব মুখে এক থাবড়া, আমাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। বের করো পিস্তলটা।’

    ‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না, বিশ্বাস করুন!’ ককিয়ে উঠল সে।

    ‘তোমার কাছে কোনও পিস্তল নেই?’ ছোট-ছোট চোখে তাকাল থাপা।

    ‘না নেই।’

    ‘আজকে একজন তোমাকে পিস্তল পাচার করেনি?’

    ‘না। বিশ্বাস করুন!’

    ‘অ্যাই সার্চ করো। সব খুঁজে দ্যাখো। নো মার্সি।’ থাপা আদেশ দেওয়ামাত্র বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তল্লাশি করতে। মতিলাল দেখল ওরা ঘর লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। দুটো কাচের প্লেট ভাঙল। সব গেল।

    ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে করেন। চিনি, দুধ, চা যা ইচ্ছে সুভদ্রা নিয়ে যাক, আর কোনওদিন সে বাধা দেবে না। ভাগ্যিস ও আজ এসেছিল এবং তিব্বতি ব্যাগে পিস্তলটাকে রাখায় ব্যাগের সঙ্গে আপদটাকেও নিয়ে গিয়েছে সুভদ্রা।

    ‘হাত নামাও।’ থাপার গলা।

    আদেশ শুনে চোখ খুলে ধীরে-ধীরে হাত নামাল মতিলাল।

    ‘কোথায় রেখেছ?’

    মতিলাল চোখ ঘুরিয়ে দেখল বাহিনী হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

    ‘আমি কিছুই জানি না।’

    সঙ্গে-সঙ্গে থাপার হাত এগিয়ে এল। তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দেখল লোকটা। শেষে তাকে বলল, ‘যদি প্রমাণ পাই মালটা তোমার কাছে ছিল তা হলে তোমার চামড়া ছাড়িয়ে নেব। এই, ডাক তো লোকটাকে। আজ ওর একদিন না আমার, দেখি?’

    সেপাইরা বাইরে থেকে যাকে ধরে নিয়ে এল তাকে দেখে মতিলাল অবাক। সেই মাঝবয়সি গোঁফওয়ালা লোকটা। থাপা এগিয়ে গিয়ে ওর জামার কলার এমনভাবে মুঠোয় ধরল যেন দম আটকে গেল, ‘অ্যাই শালা। এই খবর এনেছিস? কোথায় পিস্তল?’

    লোকটা হাউমাউ করে উঠল, ‘মাইরি বলছি ওর প্যাকেটে ছিল। আমি দেখেছি।’

    ‘থাকলে কোথায় যাবে?’

    ‘ও ওই প্যাকেট নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছে।’

    ‘ঢুকে আর বের হয়নি?’

    ‘তা বলতে পারব না। মাঝখানে আমি কিছুক্ষণের জন্যে আপনাকে ফোন করতে গিয়েছিলাম। প্যাকেটটা পেয়েছেন?’ লোকটা সেই অবস্থায় বলল।

    ‘এখানে কোনও প্যাকেটই নেই। শোন, এবার থেকে ইনফরমেশন কারেক্ট না হলে,—’ প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ঠেলে ফেলে দিল লোকটাকে। তারপর সদলবলে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। জিপের চলে যাওয়া শব্দ কানে যাওয়ার পর মতিলাল দেখল লোকটা চেষ্টা করছে উঠে বসতে। পড়ে যাওয়ার সময় নিশ্চয়ই প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে লোকটা।

    মতিলাল একটা চেয়ার টেনে বসল। ওঠার চেষ্টা করে লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে বলল, ‘আমাকে দেখে খুব মজা লাগছে, না?’

    মতিলাল বলল, ‘পিস্তলটা পাওয়া গেলে আমার অবস্থা তোমার চেয়ে খারাপ হত।’

    দৃশ্যটা কল্পনা করে লোকটা যেন নিজের কষ্ট একটু কম করে দেখল, ‘আচ্ছা, মালটা কোথায় হাওয়া করে দিলে ভাই? তাজ্জব ব্যাপার?’

    ‘কী মাল?’

    ‘ইয়ার্কি? আমি স্পষ্ট দেখেছি তুমি প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিলে। ওটা যে তোমার নয় সেটা বুঝতে পেরেই পেছনে লাগলাম। বাজারের মধ্যে কাউকে খুঁজে না পেয়ে তুমি যখন মোড়ক খুলছিলে তখন স্পষ্ট পিস্তলের নলটা দেখতে পেয়েছি।’

    ‘তুমি তা হলে পুলিশের লোক?’

    ‘তোমার ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই। পুলিশের লোক হলে থাপা আমার গায়ে হাত তুলতে সাহস পেত? আমার কাজ হল গোপন খবর ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়ে কিছু কামাই করে নেওয়া। তুমি আমাকে আজ বোকা বানালে। আমি জানি পিস্তলটা এই বাড়িতেই আছে।’ লোকটা উঠে দাঁড়াল।

    মতিলাল দার্শনিকের মত বলল, ‘খুঁজে দ্যাখো, ওরাও তো খুঁজল।’

    লোকটা যেন আদেশের অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে জিনিসপত্র সরিয়ে দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে বলল, ‘তুমি কি বিবাহিত? বউ কোথায়?’

    ‘পিস্তলটা আগে খোঁজ তারপর খেজুরে আলাপ করো।’ মতিলাল খেঁকিয়ে উঠল।

    খুঁজতে খুঁজতে লোকটা কিচেনে পৌঁছে গেল। একটু বাদে তার গলা ভেসে এল, ‘খুব খিদে পেয়েছে। তোমার রুটি আর সবজি খেতে পারি?’

    ‘দুটোর বেশি নেবে না। প্লেটে করে নিয়ে এখানে চলে এসো।’

    মতিলাল হুকুম করল। লোকটা প্লেট নিয়ে রুটি চিবোতে চিবোতে এগিয়ে এসে বলল, ‘ওঃ বাঁচলাম।’

    ‘লোকটা কে?’ মতিলাল এখন যেন কর্তৃত্বে।

    ‘কোন লোক?’

    ‘যে সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নামছিল। যার প্যাকেট পড়ে যেতে তুমি দেখেছিলে?’

    ‘আমি কি পৃথিবীর সব মানুষকে চিনি?’ মুখ ঘুরিয়ে নিল লোকটা।

    ‘তুমি মিথ্যে কথা বলছ।’

    ‘বিনা পয়সায় আমি খবর দিই না।’

    ‘পুলিশকে তো নাম বলেছ। একই খবর বিক্রি করে কবার পয়সা নেবে।’

    ‘মাইরি আর কী? পুলিশকে ওর কথা বলতে যাব কেন? বলেছি তুমি বাজারের মধ্যে পিস্তল নিয়ে ঘুরছিলে। ছেলেটার কথা ভুলেও পুলিশকে বলিনি।’

    ‘তুমি তো আচ্ছা শয়তান!’ মতিলাল অবাক।

    ‘শয়তান বলো আর যাই বলো আমার তাতে কিছু যায় আসে না। বিজনেস ইজ বিজনেস, আমার বউ তো পৃথিবীর সব গালাগাল শিখে ফেলেছে আমাকে দেবে বলে। তাতে কোন কাজটা হয়েছে শুনি? এখন তুমি জিগ্যেস করতে পারো কেন আমি পুলিশকে ছেলেটার কথা বলিনি। প্রথম কথা, যদি তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ তা হলে তোমার অপরাধ কমে যাবে, পুলিশের কাছেও তেমন গুরুত্ব থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যদি তুমি পুলিশের চোখ এড়িয়ে পিস্তলটা রেখে দিতে পারো তা হলে আমি ওই ছেলেটার কাছে গিয়ে বলতে পারি তার পিস্তল কোথায় আছে এবং টাকা খিচতে পারি।’ লোকটা খাওয়া শেষ করে হাসল।

    ‘যে পিস্তল মাটিতে ফেলে দিয়ে যায় সে কেন তোমার কাছে খবর পেয়ে সেটা নিতে আসবে?’

    ‘অনেক সময় বাধ্য হয়ে ফেলে। বিপদ এড়াবার জন্যে ফেলতে হয়। তা হলে পিস্তলটাকে তুমি এ বাড়ি থেকে পাচার করে দিয়েছ। দারুণ ঘোড়েল মাল তুমি।’

    ‘অনেকক্ষণ থেকে গালাগাল দিচ্ছ তুমি!’

    ‘দেব না? আজ তোমার জন্যে কামাই বন্ধ, উলটে মার খেতে হল!’

    ‘কী নাম তোমার?’

    ‘শানবাহাদুর।’

    ‘থাকো কোথায়?’

    ‘বোটানিক্যাল গার্ডেনের রাস্তায়।’

    ‘মাঝে-মাঝে এসো। মন ভাল থাকলে গল্প করা যাবে।’

    ‘মন খারাপ হয় নাকি খুব?’

    ‘তা তো হয়ই। একা মানুষ।’

    ‘ও। তা হলে চলো। আমার বউ-এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি, তোমার মন একদম ভাল হয়ে যাবে।’ শানবাহাদুর হাসল।

    ‘এই বললে তোমার বউ গালাগালির এক্সপার্ট।’

    ‘তাই তো নিয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ গালাগালি শুনলে দেখবে মনটা আর মনে থাকে না। কেমন উদাস হয়ে যায়।’

    ‘মাপ করো ভাই। তুমি গিয়ে তোমার চেনা সেই ছেলেটাকে খবর দাও। তাতে যদি কিছু রোজগার হয় তোমার।’ মতিলাল প্রায় জোর করে শানবাহাদুরকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

    চেয়ারে বসতেই তার সুভদ্রার কথা মনে এল। পিস্তলটা দেখতে পেয়েও নিশ্চয়ই চেঁচিয়ে উঠবে। এখনও যে দ্যাখেনি তার প্রমাণ দেখলে এতক্ষণে ছুটে আসত। কিন্তু পুলিশ যদি জানতে পারে ওর কাছে পিস্তল আছে তা হলে আর দেখতে হবে না। মেরে কিমা বানিয়ে দেবে সুভদ্রাকে। বিনা দোষে কষ্ট পাবে বেচারা।

    মতিলালের মনে হল এখনই সুভদ্রার বাড়িতে গিয়ে ওকে সাবধান করে দেওয়া উচিত। সে উঠল। কিন্তু তারপরই মনে পড়ল শানবাহাদুরের কথা। লোকটা যদি বাইরে গিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। তা হলে নিশ্চয়ই ওর পিছু নেবে। সুভদ্রার কাছে গেলে দুই-এ দুই চার করে নিতে অসুবিধে হবে না ওর। এমনিতে হয়ত কিছু হত না, সে আগ বাড়িয়ে বিপদ ডেকে আনবে।

    মতিলাল নিজের বিছানায় চলে এল। জুতো খুলে মোজা-পায়েই শুয়ে পড়ল সে। আঃ কী আরাম! একটু ঘুমিয়ে নিয়ে বিকেল নাগাদ সুভদ্রার খোঁজে গেলেই হবে, ততক্ষণ শানবাহাদুরের ধৈর্য থাকবে না দাঁড়িয়ে থাকার। চোখ বন্ধ করল সে। চোখের পাতায় হেমা মালিনী, রেখা অথবা জিনাতের শরীর ঘুরে-ঘুরে আসত লাগল। এইভাবে কল্পনা করা ওর দীর্ঘদিনের অভ্যেস।

  • মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন সৃষ্ট একটি কাহিনী-চরিত্র। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ধ্বংস পাহাড় প্রচ্ছদনামের প্রথম গ্রন্থটি থেকে শুরু করে সেবা প্রকাশনী থেকে মাসুদ রানা সিরিজে এই চরিত্রকে নিয়ে চার শতাধিক গুপ্তচরবৃত্তীয় কাহিনীর বই প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজের প্রথম দুইটি বই মৌলিক হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার বইয়ের ভাবানুবাদ বা ছায়া অবলম্বনে রচিত হওয়া বইয়ের আধিক্য দেখা যায়। তবে আরও কিছু মৌলিক বই বের হয়েছিল। মাসুদ রানার চরিত্রটিকে মূলত ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সৃষ্ট জেমস বন্ড চরিত্রটির বাঙালি সংস্করণ হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন লেখক। কিন্তু বর্তমানে সিরিজটি বাংলা বই এর জগতে স্বকীয় একটি স্থান ধরে রেখে পথ চলছে।

    চরিত্র পরিচয়

    “বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। বিচিত্র তার জীবন। অদ্ভুত রহস্যময় তার গতিবিধি। কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর সুন্দর এক অন্তর। পদে পদে তার বিপদ-শিহরন-ভয় আর মৃত্যুর হাতছানি।”

    আকর্ষণীয় বিষয়াবলী

    1. মাসুদ রানার প্রকাশিত ৪০০টি বইয়ের কোনটিতেই তার মায়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
    2. রানাকে নিয়ে বিস্মরণ বইটির কাহিনী অবলম্বনে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাসুদ রানা তৈরি হয় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে। ছবির পরিচালক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)।
    3. বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটক প্রাচীর পেরিয়ে তৈরি হয় মাসুদ রানার কাহিনী পিশাচ দ্বীপ অবলম্বনে, যার চিত্রনাট্য লেখেন আতিকুল হক চৌধুরী। মাসুদ রানা এবং সোহানা চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে নোবেল এবং বিপাশা হায়াত।
    4. মাসুদ রানার ধ্বংস পাহাড় বইটির উর্দু সংস্করণ বের হয়, যার নাম ছিলো মউত কা টিলা।
    5. মাসুদ রানা সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর, এবং কাল্পনিক সংস্থা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর সদস্য, এবং তার সাংকেতিক নাম MR-9। এছাড়া রানা এজেন্সি নামক একটি গোয়েন্দা সংস্থাও রানা পরিচালনা করে থাকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে তথা ১৯৭১-এর আগের বইগুলোতে সংস্থাটির উল্লেখ থাকতো পি.সি.আই বা “পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স” হিসেবে।

    সহায়ক চরিত্রসমূহ

    মাসুদ রানার সহায়ক চরিত্রে প্রথমেই মেজর জেনারেল রাহাত খানের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (বিসিআই) এর প্রধান। তারই তত্বাবধানে রানা নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া তার কাজে সহায়তা করে থাকে সোহেল, সলিল, সোহানা, রূপা, গিলটি মিয়া প্রমুখ চরিত্রও। সাগর-সঙ্গম বইটি লিখতে গিয়ে কোনো এক বই থেকে কাছাকাছি একটা চরিত্র পেয়ে সেটাকেই কাহিনীর উপযোগী করে বসাতে গিয়ে লেখক নিজের অজান্তেই তৈরি করে ফেলেছেন গিলটি মিয়া চরিত্রটিকে। চরিত্রটির বাচনভঙ্গি তিনি তার মায়ের থেকে পেয়েছেন, যিনি হুগলির মানুষ হলেও কলকাতা শহরে বড় হয়েছিলেন। তারই মুখের ভাষা একটু অদলবদল করে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন গিলটি মিয়ার মুখে। সিরিজের ‘সোহেল’ চরিত্রটি খানিকটা জেমস বন্ডের বন্ধু ফিলিক্স লেইটারের আদলে গড়া। ‘সোহানা’ হলো লেখকের কল্পনার বাঙালি মেয়ে।

    এছাড়া মাসুদ রানার চিরশত্রুদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য হলো বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরী, উ সেন প্রমুখ। ‘কবীর চৌধুরী’ এসেছে সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা সিরিজের চরিত্র থেকে।

    চরিত্রের ছায়া

    1. মেজর জেনারেল রাহাত খান: প্রখ্যাত সাংবাদিক রাহাত খানকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
    2. মাসুদ রানা: নাম দেওয়া হলো লেখকের বন্ধু গীতিকার মাসুদ করিম ও মেবারের রাজা রানা প্রতাপ সিংহের নাম মিলিয়ে।

    আলোচিত শত্রু

    কবীর চৌধুরী: মাসুদ রানা সিরিজের ‘ধ্বংসপাহাড়’ বই প্রথম কবীর চৌধুরীর আবির্ভাব দেখা যায়। কবীর চৌধুরী খলচরিত্র হিসেবে বেশ প্রভাবশালী। বিজ্ঞান আর মানবতা নিয়ে তার ভাবনার কথা জানা যায়। গবেষনামুখী চরিত্র কবীর চৌধুরী। সুলতা রায়ের সঙ্গে রানার বিয়ে না হাওয়া, অনীতা গিলবার্ট আর সোহানা চৌধুরীকে রানা কাছ থেকে সরিয়ে দেন কবীর চৌধুরী। বইসমূহ: ধ্বংসপাহাড়, রানা! সাবধান!!, নীল আতংক : ১, ২, শয়তানের দূত, ব্ল্যাক স্পাইডার : ১, ২, পাগল বৈজ্ঞানিক, পালাবে কোথায় : ১, ২, প্রেতাত্মা : ১, ২, জিম্মি, নকল রানা : ১, ২, স্পর্ধা : ১, ২, মরণকামড় : ১, ২, আবার সেই দুঃস্বপ্ন : ১, ২, সেই পাগল বৈজ্ঞানিক, ভাইরাস x-99, মুক্তিপণ, চীনে সংকট, অশুভ প্রহর, কনকতরী, মহাবিপদ সংকেত, অন্ধকারের বন্ধু, শয়তানের দ্বীপ।

    কাহিনী সংগ্রহ

    মাসুদ রানার অধিকাংশ কাহিনীই বিভিন্ন বিদেশী লেখকের বই থেকে ধার করা। এলিস্ট্যার ম্যাকলীন (Alistair MacLean), রবার্ট লুডলাম (Robert Ludlum), জেমস হেডলি চেজ (James Headley Chase), উইলবার স্মিথ (Wilber Smith), ক্লাইভ কাসলার (clive cussler), ফ্রেডরিক ফরসাইথ(frederick forsyth)-সহ বহু বিদেশী, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যিকের লেখা কাহিনী থেকে ধার করে মাসুদ রানার কাহিনী লেখা হয়।

    কখনও কোনো বই বিদেশী কোনো একক বই থেকেই অনুবাদ করা হয়, আবার কখনও একাধিক বই মিলিয়ে লেখা হয়। যেমন: সিরিজের তৃতীয় বই স্বর্ণমৃগ লেখা হয়েছিলো ইয়ান ফ্লেমিঙের ৩টি কাহিনীর সহায়তা নিয়ে -লিভ অ্যান্ড লেট ডাই, গোল্ড ফিঙ্গার ও অন হার ম্যাজেস্টি’য সিক্রেট সার্ভিস। একাধিক বই থেকে লেখার ক্ষেত্রে প্রথমে যেখানে যেমনটা দরকার একটা কাঠামো তৈরি করে নিয়ে মাসুদ রানার উপযোগী অংশটুকু বইগুলো থেকে নেয়া হয়। তবে একক বই থেকে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে এমন অনেক কাহিনীও পাওয়া যায় যেগুলো সাধারণত তেমন একটা পরিবর্তনের দরকার হয় না।

    ইতিহাস

    ১৯৬০ – এর দশকে কাজী আনোয়ার হোসেনের কুয়াশা সিরিজ চলছিলো সেবা প্রকাশনী থেকে। তখন জনৈক মাহবুব আমিনের সমালোচনায় তিনি থ্রিলার সিরিজ সম্বন্ধে বৈশ্বিক একটা ধারণা লাভ করেন। মাহবুব আমিনই আনোয়ার হোসেনকে ডক্টর নো বইটি উপহার দিলে আনোয়ার হোসেন নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ পান এবং মাহবুব আমিনের প্রেরণায় ছাপতে শুরু করেন মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই ধ্বংস-পাহাড়। সেই বইটি লেখা হয়েছিলো লেখকের সেগুনবাগিচার বাসার দোতলায় বসে। বইটি লিখতে ৮-৯ মাসের মতো লেগেছিলো। লেখক, প্রথমে খসড়া একটা প্লট সাজিয়েছিলেন: ‘কুয়াশা’ সিরিজের আদলে, এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কাপ্তাই শহরের কাছে একটা পাহাড়ের ভেতর অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি নিয়ে গোপন গবেষণা করছিলো। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে বিশাল লেকের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়টা। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো পাকিস্তানের কোনো শত্রু দেশের সরবরাহ করা শক্তিশালী ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেবে বাঁধটা। আর সেটা ঠেকাবে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট মাসুদ রানা। এই প্লটকে বাস্তবসম্মত করতে লেখক স্বয়ং ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কাপ্তাই, কক্সবাজার প্রভৃতি স্থানে। একাজেই ব্যয় দীর্ঘ একটা সময়। সমস্যা দেখা দিলো তৎকালীন বাংলাদেশে এরকম ঢঙে লেখার চল ছিল না বাংলা ভাষায়, থ্রিলার ধারণ করার উপযোগী ভাষাও শিখতে লাগলেন ঠেকে ঠেকে, প্রয়োজনেই তৈরি করে নিতে হয়েছিলো লেখকের নিজস্ব একটা ধরন। শেখ আবদুল হাকিম তাই নিজের লেখায় ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না, বারবার কাটাকাটি করে পাণ্ডুলিপির চেহারাটাই বিগড়ে দিলেন। তৃতীয়বার পরিষ্কার করে আবার লিখলেন গোটা কাহিনীটাই। শেষ পর্যন্ত নিজের অসন্তুষ্টি নিয়েই ছাপার জন্য প্রেসে দিয়েছিলেন, এমনকি প্রুফ রিড করার সময়ও প্রচুর সম্পাদনা করেছিলেন লেখক। এমনকি প্রকাশিত অবস্থায় হাতে পাওয়া বইটিতেও লেখক নিজে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যদিও পাঠক ঠিকই সাদরে গ্রহণ করে নেয় মাসুদ রানাকে।

    রানা’র চেহারার ক্ষেত্রে লেখক চেয়েছিলেন পাঠকই নিজেকে রানা’র জায়গায় বসিয়ে ভাবুক, তাই তিনি রানা’র চেহারার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা দেননি। প্রথম দিককার বইগুলোতে ভারতীয় গোয়েন্দা কাহিনীর প্রভাব লেখক যে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা নয়। তবে কয়েকটি বই লেখার পাশাপাশি অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, ডেসমন্ড ব্যাগলি, হ্যামন্ড ইনস, ফ্রেডেরিক ফোরসাইথ, পিটার বেঞ্চলি, কেন ফোলেট, ক্লাইভ কাসলার, এডওয়ার্ড এস আরনস, কলিন ফর্বস, জেরার্ড ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক হিগিন্স, এ জে কুইনেল, জিওফ্রি জেনকিনস, উইলবার স্মিথ প্রমুখ বড় বড় থ্রিলার লেখকের বই পড়তে পড়তে রানার চরিত্র ক্রমেই আলাদা রূপ পেতে শুরু করে।

    নামকরণ

    মাসুদ রানা’র নামকরণ করা হয় দুজন বাস্তব মানুষের নামের অংশ মিলিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন তার স্ত্রী, আধুনিক সংগীতশিল্পী ফরিদা ইয়াসমিনের সাথে পরামর্শ করে নামটি নির্বাচন করেন। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন:

    “আমাদের দুজনেরই বন্ধু স্বনামধন্য গীতিকার মাসুদ করিমের ‘মাসুদ’ আর আমার ছেলেবেলার হিরো (নায়ক) ইতিহাসে পড়া মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংহ থেকে ‘রানা’ নিয়ে নাম হলো মাসুদ রানা।”

    ক্রান্তিকাল

    কখনও কখনও এমনও হয় যে, মাসুদ রানা সিরিজ বন্ধ হবার উপক্রম হয়। প্রথমবার এমনটা হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীন হবার আগে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রানার স্বর্ণমৃগ বইটি নিষিদ্ধ (ban) করেছিলো, লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন এতে চ্যালেঞ্জ করায় গোটা সিরিজই বন্ধ করে দেওয়ার জোগাড় করেছিলেন ক্ষুব্ধ এক সরকারি কর্মকর্তা। দ্বিতীয়বার, মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন জন টেলিফোনে হুমকি দিতে শুরু করেছিলো, কেননা স্বাধীনতার আগে ভারত কেবল একটা দেশ থাকলেও যুদ্ধের সময়কার অন্যতম মিত্র দেশ ভারত, স্বাধীনতার পরে নিকটবর্তী বন্ধু দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। এতে সিরিজের প্রথম দিককার বইগুলোতে ভারতকে শত্রুপক্ষ করে সাজানো কাহিনীগুলো সাধারণ্যের রোষানলে পড়ে। তখন সেবা’র কর্ণধার বাধ্য হয়ে প্রথম দিককার কয়েকটি বই থেকে ভারতবিরোধী অংশগুলো বর্জন করে নেন, এমনকি ২টি বই পুণর্লিখনও করা হয়েছিলো। তৃতীয়বার, প্লট সংকটের কারণে আটকে গিয়েছিলো সিরিজটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর (১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে) কোনো দেশ আর বাংলাদেশের শত্রু রইল না, অথচ শত্রুদেশ ছাড়া গুপ্তচর-কাহিনী হয় না। সেটা সামাল দেয়ার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরে রানা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি খুলে গুপ্তচরবৃত্তির পাশাপাশি সিরিজটিতে গোয়েন্দা, অ্যাডভেঞ্চার, ট্রেজার-হান্ট, এমনকি বিজ্ঞানকল্প ও পিশাচ কাহিনী টেনে আনা হয়েছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিমা লেখকরা যখন শত্রু হারিয়ে দিশেহারা, উপায়ান্তর না দেখে রানা সিরিজও খাঁটি গুপ্তচরবৃত্তি থেকে সরে এসে হয়ে পড়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতির আদলে চলতে শুরু করে।

    ভ্রান্তি

    মাসুদ রানা সিরিজের ক্রিমিনাল বইটি বের হওয়ার পর দেখা গেলো যে, ঐ একই কাহিনী নিয়ে আগেই বন্দী গগল নামে একটি বই বেরিয়েছিলো। এধরনের ভুল এই সিরিজে একবারই হয়েছিল।

    বিভিন্ন মাধ্যমে মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা চরিত্রটি নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় মাসুদ রানা সিরিজের ‘বিস্মরণ’ অবলম্বনে, ১৯৭৩ সালে। আর ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। পরিচালনায় ছিলেন মাসুদ পারভেজ তথা পরবর্তীকালের জনপ্রিয় অভিনেতা সোহেল রানা। তার পরিচালিত প্রথম ছবি এটি। বিশ বছরের বেশি সময় পর পরবর্তীকালে লেজার ভিশনের ব্যানারে এই চলচ্চিত্রটি ডিভিডি আকারে বাজারে আসে। বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে প্রথম প্যাকেজ নাটক প্রাচীর পেরিয়ে এর কাহিনী রচনা করা হয় শেখ আবদুল হাকিম রচিত মাসুদ রানা সিরিজের পিশাচ দ্বীপ নামক বই থেকে। কাহিনীর নাট্যরূপ প্রদান করেন আতিকুল হক চৌধুরী। ১৯৯৪ সালে প্রচারিত এই নাটকটিতে মাসুদ রানার ভূমিকায় অভিনয় করেন জনপ্রিয় মডেল তারকা নোবেল আর তার বিপরীতে সোহানার ভূমিকায় অভিনয় করেন বিপাশা হায়াত। খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন কে. এস. ফিরোজ।

    সমালোচনা

    মাসুদ রানা সিরিজটি সাধারণ বাঙালি পাঠকের ঘরে যে একেবারে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে, তা কিন্তু নয়। ষাট দশকের শুরুতে মাসুদ রানা সিরিজের বইয়ে উল্লেখিত নর-নারীর বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতাশ্রয়ী সম্পর্কের বিবরণ পাঠকসমাজকে কিছুটা হলেও থমকে দিয়েছিলো। প্রথম দিকে এমনটাই হয়েছিলো যে, ‘প্রজাপতি’ মার্কাওয়ালা বইগুলো পড়াই নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো বাঙালি সমাজে। যারা এসকল পেপারব্যাক বই পড়তো, তাদেরকেও খারাপ নজরে দেখা হতো। বর্তমানে ইন্টারনেটের দৌলতে মাসুদ রানা সিরিজ ভারতের বাঙালীদের ভেতরেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

    মাসুদ রানা’র প্রতি নানাভাবে সমালোচনা শুরু হলে সেবা প্রকাশনী প্রথমবারের মতো বইয়ের শেষে “আলোচনা” বিভাগ চালু করে। যাতে লেখকের বক্তব্য থেকে সমালোচনাগুলোর জবাব দেয়া সম্ভব হয়। সমালোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে যেমন ছিলো কাহিনী ধার করে লেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনি ছিলো কোনো চরিত্রের মৃত্যুজনিত অতি ঠুনকো বিষয়, কেননা বইয়ের কোনো প্রিয় চরিত্রের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করা হতো লেখককে। চরিত্রের মৃত্যুজনিত বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিলো খোদ রানা’র মৃত্যুতে। অগ্নিপুরুষ বইটিতে মাসুদ রানা, নেপল্‌সের কারাদারেলি হাসপাতালে মারা যায় এবং তাকে কবর দিয়ে দেশে ফেরেন অন্য চরিত্র, মেজর জেনারেল রাহাত খান। অবশ্য পরে লেখক তা কাটিয়ে ওঠেন সামান্য একটি সুযোগ পেয়ে গিয়ে; কারণ ঐ কাহিনীর শেষাংশে রাতের আঁধারে রানার মতো দেখতে এক লোককে পুলিশের লঞ্চ থেকে গোজো দ্বীপে নামতে দেখে পাঠক হয়তো রানা মারা যায়নি মনে করে আশান্বিত হোন।

    লেখকস্বত্ব নিয়ে বিতর্ক

    ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের লেখক হিসাবে কাজী আনোয়ার হোসেনের নাম প্রকাশিত হলেও, শেখ আবদুল হাকিম এবং ইফতেখার আমিন নামে দুইজন লেখক নিজেদের এর মূল লেখক হিসেবে দাবি করেছেন এবং স্বত্ব ও রয়্যালটি দাবি করে তারা কপিরাইট রেজিস্টার অফিসে অভিযোগ করেছেন। শেখ আবদুল হাকিম কপিরাইট অফিসে অভিযোগ করেছেন, এ পর্যন্ত কুয়াশা সিরিজ ও মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি বই তিনি লিখেছেন। অপরদিকে ইফতেখার আমিন দাবি করেছেন মাসুদ রানা সিরিজে তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ৫৮টি।

    লেখকস্বত্ব নিয়ে বিতর্কের অবসান

    ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শেখ আব্দুল হাকিম ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে স্বত্ব বা মালিকানা দাবি করে সেবা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কপিরাইট আইনের ৭১ ও ৮৯ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দাখিল করেন।

    এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইনি লড়াই শেষে ২০২০ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে দাবি করা মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি এবং কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে স্বত্ব পেতে যাচ্ছেন শেখ আবদুল হাকিম।

    বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রায়ে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু সমাধান ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে কপিরাইট বোর্ড বা বিজ্ঞ আদালত থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবেদনকারীর দাবি করা ও তালিকাভুক্ত বইগুলোর প্রকাশ বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য প্রতিপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হলো। এছাড়া প্রতিপক্ষকে আবেদনকারীর কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করা প্রকাশিত বইগুলোর সংস্করণ ও বিক্রিত কপির সংখ্যা এবং বিক্রয় মূল্যের হিসাব বিবরণী এ আদেশ জারির তারিখের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

    এ বিষয়ে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘শেখ আবদুল হাকিমের দাবি করা ২৬০টি মাসুদ রানার বইয়ের মধ্যে একটি এবং কুয়াশার ৫০টি বইয়ের মধ্যে ছয়টিতে লেখক হিসেবে তার নামে কপিরাইট করা আছে। বাকিগুলোর কপিরাইট করা নেই। তবে সেগুলো তার লেখা এটি তিনি প্রমাণ করেছেন। তবে কপিরাইট অন্তর্ভুক্তির কারণে তাকে প্রতিটি বইয়ের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে। এরপর প্রতিটি বইয়ের লেখক হিসেবে তার নাম যাওয়ার পাশাপাশি, কপিরাইটও তার হয়ে যাবে।’

    তিনি বলেন, ‘কাজী আনোয়ার হোসেন চাইলে অবশ্যই আমাদের এ রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারবেন। তা অবশ্যই ৯০ দিনের মধ্যে। এখানে তিনি হেরে গেলে, হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন।’

    কপিরাইট অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শেখ আবদুল হাকিম অভিযোগ করার পর অভিযোগকারী ও প্রতিপক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতিতে ওই বছরের ১১ ও ৩০ সেপ্টেম্বর এবং ৪ নভেম্বর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে উভয়পক্ষ সপক্ষে নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেন। দাখিল করা অভিযোগের বিষয়ে প্রতিপক্ষ লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন। প্রতিপক্ষের লিখিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাদী পুনরায় সপক্ষে লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করেন। পরবর্তীতে অভিযোগকারীর দাখিল করা যুক্তির বিষয়ে প্রতিপক্ষ পুনরায় লিখিত যুক্তিতর্ক পেশ করেন।

    বিষয়টি বেশ জটিল এবং দেশের প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে লেখক ও প্রকাশকের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে, এর সন্তোষজনক ও সুষ্ঠু সমাধানের উদ্দেশ্যে উক্ত অভিযোগের বিষয়ে এদেশের বিখ্যাত ও প্রথিতযশা কয়েকজন লেখক ও প্রকাশক এবং সেবা প্রকাশনীর সাবেক ব্যবস্থাপকের লিখিত মতামত চাওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন লেখক বুলবুল চৌধুরী ও শওকত হোসেন, প্রখ্যাত শিল্পী হাসেম খান এবং সেবা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক ইসরাইল হোসেন খান। তাদের লিখিত মতামতের ওপর ভিত্তি করেই রোববার রায় দেওয়া হয়েছে।

    কপিরাইট অফিসের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। শুনানি শেষে ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ১৪ জুনের ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে রুল জারি করেন। পরবর্তীতে কাজী আনোয়ার হোসেনের করা রিট ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আদালত খারিজ করে দেন। এর ফলে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বই এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের স্বত্ব পান প্রয়াত লেখক শেখ আবদুল হাকিম। কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষের আইনজীবী হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানান।

    সিরিজের বই

    সেবা প্রকাশনী কর্তৃক মাসুদ রানা সিরিজে এই পর্যন্ত মোট ৪৬৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে বইগুলিতে মোট ৩২০টি গল্প আছে (অনেক বইয়ের দুটি, এমনকি তিনটি ভলিউম থাকায় এমনটি হয়েছে)

    চলচ্চিত্র

    1. মাসুদ রানা (১৯৭৪) : ১৯৭৪ সালে মাসুদ রানার কাহিনী নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। যার পরিচালক ছিলেন মাসুদ পারভেজ।
    2. মাসুদ রানা : মাসুদ রানা সিরিজ নিয়ে জাজ মাল্টিমিডিয়া একটি চলচ্চিত্র নির্মান করছে। একটি আপাতবাস্তব টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মাসুদ রানার চরিত্র খুঁজে বের করা হবে। চলচ্চিত্রটির বাজেট ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি বাজেটের চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির ৫০ শতাংশ হবে হলিউডে, ৪০ শতাংশ হবে বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে। আর বাকি ১০ শতাংশ থাইল্যান্ড বা এমন এলাকাগুলোতে। চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফার এবং পরিচালক প্রায় সবাই হলিউডের। অমিতাভ রেজা চৌধুরীও চলচ্চিত্রটির সাথে যুক্ত থাকবেন।

    তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া।

  • ধ্বংস পাহাড়

    ধ্বংস পাহাড়

    কাজী আনোয়ার হোসেন

    [book]

    এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কবির চৌধুরী কাপ্তাই শহরের কাছে একটা পাহাড়ের ভেতর আলট্রা সোনিকস (অতিশব্দ) এবং অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি নিয়ে গোপন গবেষণা করছিলেন। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে বিশাল লেকের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়টা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের কোন শত্রু দেশের (ভারত) সরবরাহ করা শক্তিশালী ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেবেন বাঁধটা। আর সেটা ঠেকানোর দায়িত্ব পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট মাসুদ রানার উপর।

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    প্রথমেই বলে রাখি, এই বই বড়দের জন্যে লেখা।

    বাংলা সাহিত্যে রহস্যোপন্যাস বলতে বোঝায় কেবল ছোট ছেলে মেয়েদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কেনা এক ধরনের উদ্ভট গল্পের বই, যা হাতে দেখলে বাবা, কাকা, ভাইয়া এবং মাস্টার মশাই প্রবল তর্জন গর্জন করে কেড়ে নিয়ে নিজেরাই পড়তে লেগে যান, গোপনে।

    কেন পড়েন?

    কারণ এর মধ্যে এমন এক বিশেষ রস আছে যা প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা সুসাহিত্য বলি তার মধ্যে সাধারণত পাওয়া যায় না। তাই ছোটদের বই থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে, আংশিক হলেও, আনন্দ লাভ করেন বড়রা।

    কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশেষ করে ছোটদের জন্যে লেখা বলে এসব বইয়ে ছেলেমানুষির এতই ছড়াছড়ি থাকে যে আমরা বড়রা এই বই পড়ি, এবং এ থেকে আনন্দ পাই তা স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করি।

    তাই ছেলেমিটাকে যতদূর সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে বড়দের উপভোগ্য রোমাঞ্চকর রহস্যোপন্যাস রচনা করবার চেষ্টা করলাম।

    এ চিন্তা মাথায় ঢুকিয়েছেন বন্ধুবর মাহবুবুল আমীন (আবু)। তারই উৎসাহে এবং সর্বপ্রকার সহযোগিতায়, বলতে গেলে এক রকম বাধ্য হয়েই, লিখতে হলো ধ্বংস-পাহাড়। তাই এর নিন্দার সবটুকু গ্লানি অম্লান বদনে মাথা পেতে নিতে তিনি বাধ্য।

    প্রশংসার কথা কিছু বললাম না। যদি কিছু জোটেই, ভাবছি একা নিজেই চুপচাপ হজম করে ফেলব কিনা।

    কাজী আনোয়ার হোসেন
    মে, ১৯৬৬