Tag: সম্পন্ন গ্রন্থ

  • ভয়

    ভয়

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]
    [book]

    একটা মজার ঘটনার কথা বলি।

    ক্লাস নিচ্ছি, পড়াচ্ছি থার্মোডিনামিক্স। একটি ছেলেকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম সে উত্তর দিতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বললাম, নাম কি তোমার? সে উঠে দাঁড়াল কিন্তু নাম বলল না। ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা হাসতে শুরু করল। আমি বিস্মিত। তাদের হাসির কারণ ধরতে পারছি না। আবার বললাম, নাম কি তোমার? ছাত্র-ছাত্রীরা আবারও হেসে উঠল। ছেলেটির পাশে বসা একজন বলল, স্যার সে নাম বলবে না। কারণ তার নাম— মিসির আলি।

    ঘটনাটা ক্ষুদ্র। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঘটনা আমার মন আনন্দে পূর্ণ করল। মিসির আলি নামের চরিত্রটি আমি তাহলে অনেকের কাছেই পৌঁছে দিতে পেরেছি। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

    আমি বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে বললাম, তুমি অস্বস্তি বোধ করছ কেন? মিসির আলি চরিত্রটি কি তুমি পছন্দ কর না?

    সে মাথা নীচু করে রইল, অন্য একজন পেছন থেকে বলল, স্যার ওর নামটাই মিসির আলি, বুদ্ধি শুদ্ধি খুব কম।

    আবার সবাই হেসে উঠল।

    ঐ দিনের ক্লাসের ঘটনাটি আমার জীবনের আনন্দময় ঘটনার একটি।

    মিসির আলিকে নিয়ে আরো তিনটি গল্প লেখা হল। এই আনন্দময় ঘটনার উল্লেখ সেই কারণেই করলাম। হয়ত এতে খুব সূক্ষ্ম ভাবে হলেও সামান্য অহংকার প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠক-পাঠিকা আমার এই মানবিক ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন এই বিনীত কামনা।

    হুমায়ূন আহমেদ

    শহীদুল্লাহ হল

  • বিপদ

    বিপদ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ভূমিকা

    মিসির আলির আরো একটি গল্প। আমার ধারণা, অদ্ভুত এই গল্প পাঠক-পাঠিকারা এক কথায় উড়িয়ে দেবেন। তাতে ক্ষতি নেই, তবু আমি অনুরোধ করব উড়িয়ে না দিতে। এ জগৎ বড়ই রহস্যময়। প্রকৃতি মাঝে মাঝে কিছু রহস্য ভাঙ্গতে চেষ্টা করে, আবার পরমুহূর্তেই সচেতন হয়ে আরো কঠিন রহস্যে নিজেকে ঢেকে ফেলে। সেই রহস্যের জট ছড়ানো মিসির আলির ক্ষমতার বাইরে।

    হুমায়ূন আহমেদ

    শহীদুল্লাহ হল

    ১৬ই নভেম্বর ১৯৯১

  • অনীশ

    অনীশ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    হাসপাতালের কেবিন ধরাধরি ছাড়া পাওয়া যায় না, এই প্রচলিত ধারণা সম্ভবত পুরোপুরি সত্যি নয়। মিসির আলি পেয়েছেন, ধরাধরি ছাড়াই পেয়েছেন। অবশ্যি জেনারেল ওয়ার্ডে থাকার সময় একজন ডাক্তারকে বিনীতভাবে বলেছিলেন, ‘ভাই একটু দেখবেন—একটা কেবিন পেলে বড় ভালো হয়।’ এই সামান্য কথাতেই কাজ হবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আজকাল কথাতে কিছু হয় না। যে-ডাক্তারকে অনুরোধ করা হয়েছিল, তিনি বুড়ো। মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয় সমগ্র মানবজাতির ওপরই তিনি বিরক্ত। কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মানবজাতি নিঃশেষ হয়ে আবার যদি এককোষী এ্যামিবা থেকে জীবনের শুরু করে তাহলে তিনি খানিকটা আরাম পান। তাঁকে দেখে মনে হয় নি তিনি মিসির আলির অনুরোধ মনে রাখবেন। কিন্তু ভদ্রলোক মনে রেখেছেন। কেবিন জোগাড় হয়েছে পাঁচতলায়। রুম নাম্বার চার শ নয়।

    সব জায়গায় বাংলা প্রচলন হলেও হাসপাতালের সাইনবোর্ডগুলি এখনো বদলায় নি। ওয়ার্ড, কেবিন, পেডিয়াট্রিকস—এ-সব ইংরেজিতেই লেখা। শুধু রোমান হরফের জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা হরফ। হয়তো এগুলির সুন্দর বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় নি। কেবিনের বাংলা কী হবে? কুটির? জেনারেল ওয়ার্ডের বাংলা কি ‘সাধারণ কক্ষ’?

    যতটা উৎসাহ নিয়ে মিসির আলি চার শ’ ন’ নম্বর কেবিনে এলেন ততটা উৎসাহ থাকল না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন—বাথরুমের ট্যাপ বন্ধ হয় না। যত কষেই প্যাচ আটকানো যাক, ক্ষীণ জলধারা ঝরনার মতো পড়তেই থাকে। কমোডের ফ্ল্যাশও কাজ করে না। ফ্ল্যাশ টানলে ঘড়ঘড় শব্দ হয় এবং কমোডের পানিতে সামান্য আলোড়ন দেখা যায়। এই পর্যন্তই। তার চেয়েও ভয়াবহ আবিষ্কারটা করলেন রাতে ঘুমোতে যাবার সময়। দেখলেন বেডের পাশে সাদা দেয়ালে সবুজ রঙের মার্কার দিয়ে লেখা—

    “এই ঘরে যে থাকবে

    সে মারা যাবে।

    ইহা সত্য। মিথ্যা নয়॥’

    মিসির আলির চরিত্র এমন নয় যে এই লেখা দেখে তিনি আঁৎকে উঠবেন এবং জেনারেল ওয়ার্ডে ফেরত যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তবে বড় রকমের অসুখবিসুখের সময় মানুষের মন দুর্বল থাকে। মিসির আলির মনে হল তিনি মারাই যাবেন। সবুজ রঙের এই ছেলেমানুষি লেখার কারণে নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে। তাঁর লিভার কাজ করছে না বললেই হয়! মনে হচ্ছে লিভারটির আর কাজ করার ইচ্ছেও নেই। শরীরের একটি অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে অন্য অঙ্গগুলিও তাকে অনুসরণ করে। একে বলে সিমপ্যাথেটিক রিঅ্যাকশন। কারো একটা চোখ নষ্ট হলে অন্য চোখের দৃষ্টি কমতে থাকে। তাঁর নিজের বেলাতেও মনে হচ্ছে তাই হচ্ছে। লিভারের শোকে শরীরের অন্যসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিও কাতর। একসময় ফট করে কাজ বন্ধ করে দেবে। হৃৎপিণ্ড বলবে—কী দরকার গ্যালন গ্যালন রক্ত পাম্প করে? অনেক তো করলাম। শুরু হবে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা। সেই যাত্রা কেমন হবে তিনি জানেন না। কেউই জানে না। প্রাণের জন্ম-রহস্য যেমন অজানা, প্রাণের বিনাশ-রহস্যও তেমনি অজানা।

    তিনি শুয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। বেল টিপে নার্সকে ডাকলেই সে কড়া কোনো ঘুমের অষুধ খাইয়ে দেবে। মিসির আলির ধারণা, এরা ঘুমের ট্যাবলেট এ্যাপ্রনের পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রুগীর সামান্য কাতরানির শব্দ কানে যাওয়ামাত্র ঘুমের ট্যাবলেট গিলিয়ে দেয়। কাজেই ওদের না-ডেকে মাথার যন্ত্রণা নিয়ে শুয়ে থাকাই ভালো। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর পরের জগৎ নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।

    ধরা যাক মৃত্যুর পরে একটি জগৎ আছে। পার্টিকেলের যদি অ্যান্টি-পার্টিকেল থাকতে পারে, ইউনিভার্সের যদি অ্যান্টি-ইউনিভার্স হয়, তাহলে শরীরের এ্যান্টি-শরীর থাকতে সমস্যা কী? যদি মৃত্যুর পর কোনো জগৎ থাকে কী হবে সেই জগতের নিয়ম-কানুন? এ-জগতের প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন কি সেই জগতেও সত্যি? এখানে আলোর গতি সেকেণ্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, সেখানেও কি তাই? নিউটনের গতিসূত্র কি সেই জগতের জন্যেও সত্যি? হাইজেনবার্গের আনসার্টিনিটি প্রিন্সিপ্‌ল? একই সময়ে বস্তুর গতি এবং অবস্থান নির্ণয় করা অসম্ভব। পরকালেও কি তাই? নাকি সেখানে এটি খুবই সম্ভব?

    মিসির আলি কলিং বেলের সুইচ টিপলেন। প্রচণ্ড বমি ভাব হচ্ছে। বমি করে বিছানা ভাসিয়ে দিতে চাচ্ছেন না, আবার একা-একা বাথরুম পর্যন্ত যাবার সাহস ও পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে বাথরুমের দরজায় পড়ে যাবেন।

    অল্পবয়েসী একজন নার্স ঢুকল। তার গায়ের রঙ কালো, মুখে বসন্তের দাগ, তার পরেও চেহারায় কোথায় যেন একধরনের স্নিগ্ধতা লুকিয়ে আছে। মিসির আলি বললেন, এত রাতে আপনাকে ডাকার জন্যে আমি খুব লজ্জিত। আপনি কি আমাকে বাথরুম পর্যন্ত নিয়ে যাবেন? আমি বমি করব।

    ‘বাথরুমে যেতে হবে না। বিছানায় বসে-বসেই বমি করুন—আপনার খাটের নিচে গামলা আছে।’

    সিস্টার মিসির আলিকে ধরে-ধরে বসালেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, বমি ভাব সঙ্গে-সঙ্গে কমে গেল। মিসির আলি বললেন, ‘সিস্টার, আপনার নাম জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম সুস্মিতা। আপনি কি এখন একটু ভালো বোধ করছেন?’

    ‘বমি গলা পর্যন্ত এসে থেমে আছে। এটাকে যদি ভালো বলেন তাহলে ভালো।’

    ‘আপনার কি মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে?’

    ‘হচ্ছে।’

    ‘খুব বেশি?’

    ‘হ্যাঁ, খুব বেশি।’

    ‘আপনি শুয়ে থাকুন। আমি রেসিডেন্ট ফিজিসিয়ানকে ডেকে নিয়ে আসছি। তিনি হয়তো আপনাকে ঘুমের কোনো অষুধ দেবেন। তা ছাড়া আপনার গা বেশ গরম। মনে হচ্ছে টেম্পারেচার দুই-এর উপরে।’

    সুস্মিতা জ্বর দেখল। এক শ’ দুই পয়েন্ট পাঁচ। সে ঘরের বাতি নিভিয়ে ডাক্তারকে খবর দিতে গেল।

    মিসির আলি লক্ষ করছেন, তাঁর মাথার যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। ঘর অন্ধকার, তবু চোখ বন্ধ করলেই হলুদ আলো দেখা যায়। চোখের রেটিনা সম্ভবত কোনো কারণে উত্তেজিত। ব্যথার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি? আচ্ছা—জ্বর মাপার যন্ত্র আছে থার্মোমিটার! ব্যথা মাপার যন্ত্র এখনো বের হল না কেন? মানুষের ব্যথা-বোধের মূল কেন্দ্র—মস্তিষ্ক। স্নায়ু ব্যথার খবর মস্তিষ্কে পৌছে দেয়। যে-ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল ব্যথার পরিমাপক, সেই সিগন্যাল মাপা কি অসম্ভব?

    ব্যথা মাপার একটা যন্ত্র থাকলে ভালো হত। প্রসববেদনার তীব্রতা নাকি সবচেয়ে বেশি। তার পরেই থার্ড ডিগ্রী বার্ন। তবে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাও একেক মানুষের একেক রকম। কেউ-কেউ অতি তীব্র ব্যথাও শান্তমুখে সহ্য করতে পারে। মিসির আলি পারেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে। ব্যথা ভোলবার জন্যে কী করা যায়? মস্তিষ্ককে কি কোনো জটিল প্রক্রিয়ায় ফেলে দেওয়া যায় না? উল্টো করে নিজের সঙ্গে কথা বললে কেমন হয়? কিংবা একই বাক্য চক্রাকারে বলা যায় না?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    নার্স ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বাতি জ্বালাল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমার ডেলিরিয়াম হচ্ছে। একটি বাক্য বারবার উল্টো করে বলছি। “ব্যথা কি খুব বেশি’’—এই বাক্যটিকে আমি উল্টো করে বলছি, ‘শিবে বখু কি থাব্য?’

    ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কোনো রুগীর যখন ডেলিরিয়াম হয়, সে বুঝতে পারে না যে ডেলিরিয়াম হচ্ছে।’

    ‘আমি বুঝতে পারি। কারণ আমার কাজই হচ্ছে মানুষের মনোজগৎ নিয়ে। ডাক্তার সাহেব, আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। সম্ভব হলে খানিকটা অক্সিজেন দেবারও ব্যবস্থা করুন। আমার মস্তিষ্কে অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশন হচ্ছে। আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে।’

    ‘কি হেলুসিনেশন?’

    ‘আমি দেখছি আমার হাত দুটো অনেক লম্বা হয়ে গেছে। এখনো লম্বা হচ্ছে।’

    মিসির আলি গানের সুরে বলতে লাগলেন—

    “ম্বাল তক তহা রমাআ।

    ম্বাল তক তহা রমাআ।

    ম্বাল তক তহা রমাআ।”

    ডাক্তার সাহেব নার্সকে প্যাথিড্রিন ইনজেকশান দিতে বললেন।

    মিসির আলির ঘুম ভাঙল সকাল ন’টার দিকে।

    ট্রে-তে করে হাসপাতালের নাশতা নিয়ে এসেছে। দু’ স্লাইস রুটি, একটা ডিম সেদ্ধ, একটা কলা এবং আধ গ্লাস দুধ। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের একটির জন্যে বেশ ভালো খাবার—স্বীকার করতেই হবে। তবু বেশির ভাগ রুগী এই খাবার খায় না। তাদের জন্যে টিফিন ক্যারিয়ারে ঘরের খাবার আসে। ফ্লাস্কে আসে দুধ।

    জেনারেল ওয়ার্ডের অবস্থা অবশ্য ভিন্ন। সেখানকার রুগীরা হাসপাতালের খাবার খুব আগ্রহ করে খায়। যারা খেতে পারে না, তারা জমা করে রাখে। বিকেলে তাদের আত্মীয়স্বজনরা আসে। মাথা নিচু করে লজ্জিত মুখে এই খাবারগুলি তারা খেয়ে ফেলে। সামান্য খাবার, অথচ কী আগ্রহ করেই-না খায়! বড়ো মায়া লাগে মিসির আলির। কতবার নিজের খাবার ওদের দিয়ে দিয়েছেন। ওরা কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়েছে।

    আজকের নাশতা মিসির আলি মুখে দিতে পারলেন না। পাউরুটিতে কামড় দিতেই বমি ভাব হল। এক চুমুক দুধ খেলেন। কলার খোসা ছাড়ালেন, কিন্তু মুখে দিতে পারলেন না। শরীর সত্যি-সত্যি বিদ্রোহ করেছে।

    খাবার নিয়ে যে এসেছে, সে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ চোখে। রুগী খাবার খেতে পারছে না, এই দৃশ্য নিশ্চয়ই তার কাছে নতুন নয়। তবু তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দুঃখিত। লোকটি স্নেহময় গলায় বলল, ‘কষ্ট কইরা খান। না-খাইলে শরীরে বল পাইবেন না।’

    মিসির আলি শুধুমাত্র লোকটিকে খুশি করবার জন্যে পাউরুটি দুধে ভিজিয়ে মুখে দিলেন। খেতে কেমন যেন ঘাসের মতো লাগছে।

    আজ শুক্রবার।

    শুক্রবারে রুটিন ভিজিটে ডাক্তাররা আসেন না। সেটাই স্বাভাবিক। তাঁদের ঘর-সংসার আছে, পুত্র-কন্যা আছে। জন্মদিন, বিয়ে, বিবাহবার্ষিকী আছে। একটা দিন কি তাঁরা ছুটি নেবেন না? অবশ্যই নেবেন। মিসির আলি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর কাছে কেউ আসবে না। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে এ্যাপ্রন গায়ে মাঝবয়েসী এক ডাক্তার এসে উপস্থিত। ডাক্তার আসার এটা সময় নয়। প্রথমত শুক্রবার, দ্বিতীয়ত দেড়টা বাজে, লাঞ্চ ব্রেক। ডিউটির ডাক্তাররাও এই সময় ক্যান্টিনে খেতে যান।

    ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কেমন আছেন?’

    মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, ‘ভালো থাকলে কি হাসপাতালে পড়ে থাকি?’

    ‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে ভালো আছেন। কাল রাতে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। প্রবল ডেলিরিয়াম।’

    ‘আপনি রাতে এসেছিলেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘চিনতে পারছি না। মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। গত রাতে কী ঘটেছে কিচ্ছু মনে নেই।’

    ডাক্তার সাহেব চেয়ারে বসলেন। তাঁর শরীর বেশ ভারি। শরীরের সঙ্গে মিল রেখে গলার স্বর ভারি। চশমার কাঁচ ভারি। সবই ভারি ভারি, তবুও মানুষটির কথা বলার মধ্যে সহজ হালকা ভঙ্গি আছে। এ-জাতীয় মানুষ গল্প করতে এবং গল্প শুনতে ভালবাসে। মিসির আলি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমি আপনার জন্যে কী করতে পারি বলুন।’

    ‘একটা সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এই কেবিনটা ছেড়ে অন্য একটা কেবিনে চলে যেতে পারেন। একজন মহিলা এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন।’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘আমি এই মুহূর্তে কেবিন ছেড়ে দিচ্ছি।’

    ‘এই মুহূর্তে ছাড়তে হবে না। কাল ছাড়লেও হবে।’

    ডাক্তার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মিসির আলি বললেন, ‘ভদ্রমহিলা বিশেষ করে এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন কেন?’

    ‘তাঁর ধারণা, এই কেবিন খুব লাকি। কেবিনের নম্বর চার শ’ নয়। যোগ করলে হয় তের। তের নম্বরটি নাকি তাঁর জন্যে খুব লাকি। সৌভাগ্য-সংখ্যা। নিউমোরলজি’-র হিসাব।’

    ‘কী অদ্ভুত কথা!’

    ডাক্তার সাহেব হালকা স্বরে বললেন, ‘অসুস্থ অবস্থায় মন দুর্বল থাকে। দুর্বল মনে তের নম্বরটি ঢুকে গেলে সমস্যা।’

    ‘মনের মধ্যে যা ঢুকেছে তা বের করে দিন।’

    ডাক্তার সাহেব হেসে ফেলে বললেন, ‘এটা তো কোনো কাঁটা না রে ভাই, যে, চিমটা দিয়ে বের করে নিয়ে আসব। এর নাম কুসংস্কার। কুসংস্কার মনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। কুসংস্কারকে তুলে ফেলা আমার মতো সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। যাই ভাই। আপনি তাহলে কাল ভোরে কেবিন নম্বর চার শ’ পাঁচে চলে যাবেন। কেবিনটা সিঁড়ির কাছে না, কাজেই হৈ-চৈ হবে না। তা ছাড়া জানালার ভিউ ভালো। গাছপালা দেখতে পারবেন।’

    মিসির আলি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আমি এই রুম ছাড়ব না। এখানেই থাকব।’

    ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে তাকালেন। কি একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মিসির আলি বললেন, ‘রুম ছাড়ব না, কারণ ছাড়লে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আমি এই জীবনে কুসংস্কার প্রশ্রয় দেবার মতো কোনো কাজ করি নি। ভবিষ্যতেও করব না।’

    ‘ও, আচ্ছা।’

    ‘আপনি যদি অন্য কোনো কারণ বলতেন, রুম ছেড়ে দিতাম। আমার কাছে চার শ’ নয় নম্বর যা, চার শ’ পাঁচ-ও তা। তফাত মাত্র চারটা ডিজিটের।’

    ডাক্তার সাহেব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আপনি কি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলবেন? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভদ্রমহিলা এ-ঘরে না-আসা পর্যন্ত অপারেশন করাবেন না। অপেক্ষা করবেন। অথচ অপারেশনটা জরুরি।’

    ‘ওঁর অসুবিধা কী?’

    ‘কিডনির কাছাকাছি একটা সিস্টের মতো হয়েছে। আপনি যদি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন তাহলে ভালো হয়। ভদ্রমহিলাকে আপনি চেনেন।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘হ্যাঁ। ভালো করেই চেনেন। উনি অনুরোধ করলে না বলতে পারবেন না।’

    ‘নাম কি তাঁর?’

    ‘আমি ওঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি কথা বলুন।’

    মিসির আলি তাকিয়ে আছেন।

    দরজা ধরে যে-মহিলা দাঁড়িয়ে, তাঁর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হলেও তাঁকে দেখাচ্ছে বালিকার মতো। লম্বাটে মুখ, কাটা-কাটা চেহারা। অসম্ভব রূপবতী। সাধারণত রূপবতীরা মানুষকে আকর্ষণ করে না—একটু দূরে সরিয়ে রাখে। এই মেয়েটির মধ্যে আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। মিসির আলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। মেয়েটি বলল, ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?’

    ‘না।’

    ‘সে কী, চেনা উচিত ছিল তো! আপনি সিনেমা দেখেন না নিশ্চয়ই?’

    ‘না।’

    ‘টিভি? টিভিও দেখেন না? টিভি দেখলেও তো আমাকে চেনার কথা!’

    ‘আমার টিভি নেই। বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে অবশ্যি মাঝে-মাঝে দেখি। আপনি কি কোনো অভিনেত্রী?’

    ‘হ্যাঁ। এলেবেলে টাইপ অভিনেত্রী নই। খুব নামকরা। রাস্তায় বের হলে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ হয়ে যাবে।’

    মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গিতে মিসির আলি হেসে ফেললেন। মেয়েটিও হাসল। অভিনেত্রীর মাপা হাসি নয়, অন্তরঙ্গ হাসি। সহজ-সরল হাসি।

    ‘আপনি কিন্তু এখনো আমার নাম জিজ্ঞেস করেননি।’

    ‘কী নাম?’

    ‘আসমানী। এটা আমার আসল নাম। সিনেমার জন্যে আমার ভিন্ন নাম আছে। সেই নাম আপনার জানার দরকার নেই। ভেতরে আসব?’

    ‘আসুন।’

    মেয়েটি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসল। গলার স্বর খানিকটা গম্ভীর করে বলল, ‘শুনলাম আপনি নাকি কুসংস্কার সহ্য করতে পারেন না।’

    ‘ঠিকই শুনেছেন। সহ্য করি না এবং প্রশ্রয় দিই না।’

    ‘কুসংস্কার-টুসংস্কার কিছু না। আপনি আপনার ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিন। আমার এই কেবিনটা খুব পছন্দ। আমি আপনার কাছে হাতজোড় করছি। প্লীজ।’

    মেয়েটি সত্যি-সত্যি হাতজোড় করল। মিসির আলি লজ্জায় পড়ে গেলেন। এ কী কাণ্ড!

    ‘আমি এক্ষুণি ছেড়ে দিচ্ছি। হাতজোড় করতে হবে না।’

    ‘থ্যাংকস!’

    ‘থ্যাংকস বলারও প্রয়োজন নেই, তবে আমার ধারণা, এই কেবিনটিতেও শেষ পর্যন্ত আপনি থাকতে রাজি হবেন না।’

    ‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘আপনি রাতে যখন ঘুমুতে যাবেন তখন হঠাৎ করে দেয়ালের একটা লেখা আপনার চোখে পড়বে—সবুজ মার্কারে কাঁচা-কাঁচা হাতে লেখা—

    “এই ঘরে যে থাকবে

    সে মারা যাবে।

    ইহা সত্য, মিথ্যা নয়।”

    লেখা পড়েই আপনি আঁৎকে উঠবেন। যেহেতু আপনার মন খুব দুর্বল, সেহেতু আপনি আর এখানে থাকবেন না।’

    আসমানী বলল, ‘কোথায় লেখাটা—দেখি।’

    তিনি লেখাটা দেখালেন। আসমানী বলল, ‘কে লিখেছে?’

    মিসির আলি থেমে-থেমে বললেন, ‘যে লিখেছে তার সঙ্গে আমার দেখা হয় নি, তবে আমি অনুমান করতে পারি, একটি বাচ্চা মেয়ের লেখা। মেয়েটির উচ্চতা চার ফুট দু’ ইঞ্চি। এবং মেয়েটি এই ঘরেই মারা গেছে।’

    আসমানী ভুরু কুঁচকে বলল, ‘এ-সব আপনার অনুমান?’

    ‘জ্বি, অনুমান। তবে যুক্তিনির্ভর অনুমান।’

    ‘যুক্তিনির্ভর অনুমান মানে?’

    ‘এক-এক করে বলি। এটা একটা মেয়ের লেখা তা অনুমান করছি দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি দেখে। সবুজ মার্কারে আঁকা বেশ কিছু ছবি আছে, সবই বেণী-বাঁধা বালিকাদের ছবি। মেয়েরা একটা বয়স পর্যন্ত শুধু মেয়েদের ছবি আঁকে।’

    ‘তাই বুঝি?’

    ‘হ্যাঁ, তাই।’

    ‘আর মেয়েটির উচ্চতা কীভাবে আঁচ করলেন?’

    ‘মেয়েটির উচ্চতা আঁচ করেছি আরো সহজে। আমরা যখন দেয়ালে কিছু লিখি, তখন লিখি চোখ বরাবর। মেয়েটি বিছানায় বসে-বসে লিখেছে। সেখান থেকে তার উচ্চতা আঁচ করলাম।’

    ‘দাঁড়িয়েও তো লিখতে পারে। হয়তো মেঝেতে দাঁড়িয়ে লিখেছে।’

    ‘তা পারে। তবে মেয়েটি অসুস্থ। বিছানায় বসে-বসে লেখাই তার জন্যে যুক্তি-সঙ্গত।’

    আসমানী গম্ভীর গলায় বলল, ‘মেয়েটি যে বেঁচে নেই তা কী করে অনুমান করলেন? কাউকে জিজ্ঞেস করেছেন?’

    ‘না, কাউকে জিজ্ঞেস করি নি। এটাও অনুমান। বাচ্চারা দেয়ালে লেখার ব্যাপারে খুবই পার্টিকুলার। যা বিশ্বাস করে তা-ই সে দেয়ালে লেখে। যদি বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যেত তাহলে অবধারিতভাবে এই লেখার জন্যে সে লজ্জিত বোধ করত এবং হাসপাতাল ছেড়ে যাবার আগে লেখাটি নষ্ট করে যেত।’

    ‘আপনি কী করেন জানতে পারি?’

    ‘মাস্টারি করতাম, এখন করি না। পার্ট টাইম টীচার ছিলাম। অস্থায়ী পোস্ট। চাকরি চলে গেছে।’

    ‘আপনি আমাকে দেখে কি আমার সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন?’

    ‘একটা সামান্য কথা বলতে পারি—আপনার আসল নাম আসমানী নয়। অন্য কিছু।’

    ‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘আসমানী নামটি আপনি এমনভাবে বললেন যাতে আমার কাছে মনে হল অচেনা একটি শব্দ বলছেন। তার চেয়েও বড় কথা আপনার পরনে আসমানী রঙের একটি শাড়ি। শাড়িটি পরার পর থেকেই হয়তো আসমানী নামটা আপনার মাথায় ঘুরছে। প্রথম সুযোগে এই নামটি বললেন।’

    ‘আমার ডাক নাম “বুড়ি”।’

    মিসির আলি কিছু বললেন না। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বুড়ি বলল, ‘আপনি অনুমানগুলি কীভাবে করেন?’

    ‘লজিক ব্যবহার করে করি। সামান্য লজিক। লজিক ব্যবহার করার ক্ষমতা সবার মধ্যেই আছে। বেশির ভাগ মানুষই তা ব্যবহার করে না। যেমন আপনি ব্যবহার করছেন না। ভেবে বসে আছেন চার শ’ নয় নম্বর ঘরটি আপনার জন্যে লাকি। এ-রকম ভাবার পিছনে কোনো লজিক নেই।’

    ‘লজিকই কি এই পৃথিবীর শেষ কথা?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে লজিকই হচ্ছে পৃথিবীর শেষ কথা—। লজিকের বাইরে কিছু নেই? পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের সমাধান আছে লজিকে, পারবেন বলতে?’

    ‘পারব।’

    ‘ভালো কথা। শুনে খুশি হলাম। আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম মিসির আলি। আপনি কি কাল ভোরে এই কেবিনে আসতে চান? না মত বদলেছেন?’

    ‘আমি কাল ভোরে চলে আসব। যাই মিসির আলি সাহেব। স্লামালিকুম।’

    মেয়েটি নিজের কেবিনে ফিরে গেল। রাত দশটার ভেতর সে চার শ’ নয় নম্বর কেবিনে আগের রুগীর যাবতীয় তথ্য জোগাড় করল। এই কেবিনে ‘লাবণ্য’ নামের দশ বছর বয়সী একটি মেয়ে থাকত। হার্টের ভাল্বের কী একটি জটিল সমস্যায় সে দীর্ঘদিন এই ঘরটিতে ছিল। মারা গেছে মাত্র দশ দিন আগে। তার ওজন তেষট্টি পাউণ্ড। উচ্চতা চার ফুট এক ইঞ্চি।

    মিসির আলি সাহেব সামান্য ভুল করেছেন। তিনি বলেছেন চার ফুট দু’ ইঞ্চি। এইটুকু ভুল বোধহয় ক্ষমা করা যায়।

  • মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

    মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ‘আপনি কি ভূত দেখেছেন স্যার? ইংরেজিতে যাকে বলে spirit, ghost, astral body মানে প্রেতাত্মার কথা বলছি, অশরীরী……’

    মিসির আলি প্রশ্নটির জবাব দেবেন কি না বুঝতে পারছেন না। কিছু মানুষ আছে যারা প্রশ্ন করে, কিন্তু জবাব শুনতে চায় না। প্রশ্ন করেই হড়বড় করে কথা বলতে থাকে। কথার ফাঁকে-ফাঁকে আবার প্রশ্ন করে, আবার নিজেই জবাব দেয়। মিসির আলির কাছে মনে হচ্ছে তাঁর সামনের চেয়ারে বসে থাকা এই মানুষটি সেই প্রকৃতির। ভদ্রলোক মধ্যবয়স্ক। গোলাকার মুখে পুরুষ্ট গোঁফ। কুস্তিগির-কুস্তিগির চেহারা। কথার মাঝখানে হাসার অভ্যাস আছে। হাসার সময় কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু সারা শরীর দুলতে থাকে। ওসমান গনি নামের এই মানুষটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অবশ্য নিঃশব্দে হাসার ক্ষমতা নয়; প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাঁর নিচের পাটির একটি এবং ওপরের পাটির দু’টি দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। যে-যুগে রুট ক্যানালিং-এর মতো আধুনিক দন্ত চিকিৎসা শুরু হয়েছে, সে-যুগে কেউ সোনা দিয়ে দাঁত বাঁধায় না। এই ভদ্রলোক বাঁধিয়েছেন। ধবধবে সাদা দাঁতের মাঝে ঝকঝকে তিনটি সোনালি দাঁত।

    ‘কথা বলছেন না কেন স্যার, ভূত কি কখনো দেখেছেন?’

    ‘জ্বি না।’

    ‘না-দেখাই ভালো। আমি একবার দেখেছিলাম, এতেই অবস্থা কাহিল। ঘাম দিয়ে জ্বর এসে গিয়েছিল। এক সপ্তাহের উপর ছিল জ্বর। পায়ের পাতা চুলকাত। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলল—অ্যালার্জি। ডাক্তারদের কারবার দেখুন, আমি বললাম, ভূত দেখে জ্বর এসে গেছে। তার পরেও ডাক্তার বলে অ্যালার্জি। অ্যান্টি হিস্টামিন দিয়েছিল। অ্যান্টি হিস্টামিন কি ভূতের অষুধ, আপনি বলুন?’

    মিসির আলি বললেন, ‘আজ আমার একটু কাজ ছিল। বাইরে যাব। আপনি বরং অন্য একদিন আসুন, আপনার গল্প শুনব।’

    ‘দশ মিনিট লাগবে স্যার। ভূতের গল্পটা বলেই চলে যাব। আমার সঙ্গে একটা মাইক্রোবাস আছে, আপনি যেখানে যেতে চান আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাব। রিকন্ডিশান্ড মাইক্রোবাস। গত আগস্ট মাসে কিনেছি। দু’ লাখ পঁচিশ নিয়েছে।’

    মিসির আলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনি কি খুব অল্পকথায় আপনার ভূত দেখার গল্প বলতে পারবেন? যদি পারেন তাহলে বলুন, গল্প শুনব। খুব যে আগ্রহ নিয়ে শুনব তা না। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা ভূতের গল্প খুব আগ্রহ করে শোনে। আমার বয়স একান্ন। তার চেয়েও বড় কথা ভূত-প্রেতের ব্যাপারে আমার উৎসাহ কম।’

    ‘আমারো কম। খুবই কম। গল্পটা বলে চলে যাই স্যার।’

    ‘আচ্ছা বলুন। আপনি কি এই গল্প শোনাতেই এসেছেন?’

    ‘দ্যাটস কারেক্ট স্যার। আপনার ঠিকানা পেয়েছি আমার ভাগ্নির কাছ থেকে। সে বইটই পড়ে। বই পড়ে তার ধারণা হয়েছে আপনি দারুণ বুদ্ধিমান। অনেক বড় বড় সমস্যা নাকি সমাধান করেছেন। তখন ভাবলাম, যাই, ভদ্রলোককে দেখে আসি বুদ্ধিমান লোকের সঙ্গে কথা বলেও আনন্দ। গাধা টাইপের লোকের সঙ্গেও অবশ্যি কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায়। যাদের বুদ্ধি মাঝামাঝি, এদের সঙ্গে কথা বলে কোনো আনন্দ নেই। আমি আসায় বিরক্ত হন নি তো?’

    ‘না, বিরক্ত হই নি। আপনার কি কোনো সমস্যা আছে?’

    ‘না, কোনো সমস্যা নেই। প্রথম দিন ভূত দু’টাকে দেখে ভয় পেয়ে জ্বর হয়েছিল। এখন আর হয় না।’

    ‘প্রায়ই দেখেন?’

    ‘জ্বি-না। প্রায়ই দেখি না। ধরেন মাসে, দু’মাসে একবার।’

    ‘এরা আপনাকে ভয় দেখায়?’

    ‘না, ভয় দেখায় না। গল্পটা তাহলে বলি—’

    ‘সংক্ষেপ করে বলুন, আমার এক জায়গায় যেতে হবে।’

    ‘আপনি স্যার কোনো চিন্তা করবেন না। আমার মাইক্রোবাস আছে। গত আগস্ট মাসে কিনেছি। নাইনটিন এইটি মডেল……’

    ‘মাইক্রোবাসের কথা আগে একবার শুনেছি। ভূতের কথা কি বলতে চাচ্ছিলেন বলুন।’

    ‘ও হ্যাঁ—আমার হচ্ছে স্যার বিরাট ফ্যামিলি। পাঁচ মেয়ে। সব ক’টার চেহারা খারাপ। মা’র মতো মোটা, কালো, দাঁত উঁচু। একটারও বিয়ে হয় নি। এদিকে আবার আমার ছোট বোনটি মারা গেছে—তার তিন মেয়ে এক ছেলে উঠে এসেছে আমার বাড়িতে। গোদের উপর বিষফোঁড়া। আমার মা, এক খালাও সঙ্গে থাকেন। বাড়িভর্তি মেয়ে। একগাদা মেয়ে থাকলে যা হয়, দিন-রাত ক্যাঁচ-ক্যাঁচ—ক্যাঁচ-ক্যাঁচ। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় ভিসিআর। রোজ রাতে এরা দু’টা করে ছবি দেখে। আমার মা চোখে কিছুই দেখেন না, তিনিও ভিসিআর-এর সামনে বসে থাকেন। শব্দ শোনেন। শব্দ শুনেই হাসেন—কাঁদেন। গলার আওয়াজ শুনে বলতে পারেন কে শ্রীদেবী, কে রেখা। এই হল স্যার বাড়ির অবস্থা।’

    মিসির আলি হতাশ গলায় বলেন, ‘আপনি মূল গল্পটা বলুন। আপনি অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলছেন।’

    ‘মূল গল্পটা তাহলে বলি। বাড়ির মেয়েগুলির যন্ত্রণায় আমি রাতে ঘুমাই ছাদের চিলেকোঠায়। ছোট্ট ঘর। খাট আছে, ড্রেসিং টেবিল আছে, শুধু বাথরুম নেই—এই একটা অসুবিধা। আমার আবার ডায়াবেটিস আছে, কয়েকবার প্রস্রাব করতে হয়। ছাদে প্রস্রাব করি। কাজের ছেলেটা সকালে এক বালতি পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়। কাজের ছেলেটার নাম হল ইয়াসিন।’

    ‘প্লীজ, গল্পটা তাড়াতাড়ি শেষ করুন।’

    ‘জ্বি স্যার, শেষ করছি। গত বৎসর চৈত্র মাসের ছয় তারিখের কথা। রাতে ঘুমাচ্ছি, প্রস্রাবের বেগ হওয়ায় ঘুম ভেঙে গেল। মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্প ছিল। টেবিল ল্যাম্প জ্বালালাম। তখনি দেখি ঘরের কোণায় দু’টা ভূত। খুব ছোট সাইজ, লম্বায় এই ধরেন এক ফুটের মতো হবে। গজ-ফিতা দিয়ে মাপি নি। চোখের আন্দাজ। দু’-এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হতে পারে।’

    ‘তারা করছে কী?’

    ‘বই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। একজনের হাতে সবুজ মলাটের ময়লা একটা বই, অন্যজন সেই বই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। খিচ-খিচ, খিচ-খিচ করে কথা বলছে। আমি ওদের দিকে তাকাতেই কথা বন্ধ করে ফেলল। আমি তখনো ভয় পাই নি। কারণ হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে তো, এরা যে ভূত এইটাই বুঝি নি। কাজেই ধমকের মতো বললাম, ‘এ্যাই, এ্যাই।’

    ‘তখন কী হল?’

    ‘ধমক শুনে হাত থেকে বই ফেলে দিল। তারপর মিলিয়ে গেল। তখন বুঝলাম, এরা ভূত। ছোট সাইজের ভূত। তখন ভয় লাগল। জ্বর এসে গেল।’

    ‘এই আপনার গল্প?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আচ্ছা ঠিক আছে। চলুন এখন উঠি।’

    ‘ইন্টারেস্টিং লাগছে না স্যার?’

    ‘জ্বি, ইন্টারেস্টিং।’

    ‘ভূত এত ছোট সাইজের হয়, তা-ই জানতাম না। একটার আবার থুতনিতে অল্প দাড়ি, ছাগলা দাড়ি।’

    ‘আসুন, আমরা উঠি।’

    ওসমান গনি উঠলেন। মনে হল খুব অনিচ্ছায় উঠলেন। তাঁর আরো কিছুক্ষণ বসার ইচ্ছা ছিল। মিসির আলি ঘরে তালা দিতে-দিতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। ওসমান গনির কথাবার্তা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে—এই লোক তার ‘ছোট ভূতের’ গল্প বলার জন্য বারবার আসবে। নানানভাবে তাঁকে বিরক্ত করবে। একদল মানুষ আছে, যারা অন্যদের বিরক্ত করে আনন্দ পায়। ইনিও মনে হচ্ছে সেই দলের।

    ‘স্যার।’

    ‘বলুন।’

    ‘ভূতদের ঐ বইটা ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি।’

    ‘খুব ভালো করেছেন। এই বই তালাবন্ধ থাকাই ভালো।’

    ‘একদিন আপনাকে দেখাতে নিয়ে আসব।’

    ‘কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের বইয়ে আমার আগ্রহ আছে। ভূতের বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ নেই।’

    ‘আমারও নেই। এই জন্যে ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি। উল্টেও দেখি নি। তার উপর স্যার বইটা থেকে দুর্গন্ধ আসে। গো-মূত্রের গন্ধের মতো গন্ধ।’

    ভদ্রলোক আনন্দিত ভঙ্গিতে হাসলেন। মনে হচ্ছে বইটি থেকে গো-মূত্রের গন্ধ আসায় তিনি আনন্দিত। মিসির আলি মনে বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না। কঠিন গলায় বললেন, ‘চলুন রওনা হওয়া যাক। আমার জরুরি কাজ আছে।’

    ‘জ্বি আচ্ছা। কাজের সঙ্গে আপোস নাই। আগে কাজ, তারপর অন্য কথা। আমি তাহলে কাল আসি?’

    ‘কাল আসার কি দরকার আছে?’

    ‘দরকার আছে স্যার। ভূতের গল্পটা ভালোমতো বলা হয় নাই। ওরা আমার সঙ্গে কী-সব কথাবার্তা বলে—একটা আছে ফাজিল ধরনের, আমাকে ডাকে ছোট মামা।’

    ‘ভাই শুনুন, আমার কাছে আসার আর দরকার নেই। আমি নিজে অসুস্থ। বিশ্রাম করছি।’

    ‘আপনি তো স্যার বিশ্রামই করবেন। বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকবেন। আমি পাশে বসে গল্প বলব—’

    ‘আপনি দয়া করে আর আসবেন না। আমি একা-একা বিশ্রাম করতে পছন্দ করি।’

    ‘জ্বি আচ্ছা, আসব না। শুধু যদি স্যার আমাকে একটা উপদেশ দেন। কাগজে লিখে দেন, তাহলে খুব ভালো। উপদেশটা মানিব্যাগে রেখে দেব।’

    মিসির আলি হতভম্ব গলায় বললেন, ‘কী উপদেশ?

    ‘লিখবেন— “ওসমান গনি, আপনার মৃত্যু হবে পানিতে ডুবে। খুব সাবধান। খুব সাবধান।” এই লিখে আপনার নামটা সই করবেন।’

    ‘আমি আপনার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না। এ-সব কথা আমি কেন লিখব?’

    ‘অকারণে লিখতে বলছি না স্যার। কারণ আছে। যে-ভূতটা আমাকে ছোট মামা ডাকে, সে আমাকে বলেছে—আমার মৃত্যু হবে পানিতে ডুবে। আমাকে সাবধান করে দিয়েছে। ভূতের কথা কে বিশ্বাস করে বলেন? কেউ বিশ্বাস করে না। আমিও করি না। এখন যদি আপনি দয়াপরবশ হয়ে লিখে দেন—’

    ‘দেখুন ওসমান গনি সাহেব—এ-জাতীয় কথা আমি কখনো লিখব না। চলুন, আমরা ঘর থেকে বের হই। আকাশের অবস্থা ভালো না—ঝড়-বৃষ্টি হবে।’

    ‘লেখাটা না দিলে আমি স্যার যাব না। লিখে দিলে আর কোনোদিন এসে বিরক্ত করব না। আমি স্যার এককথার মানুষ। মানিব্যাগটা খুললেই আপনার লেখাটা চোখে পড়বে। তখন সাবধান হয়ে যাব। পানির ধারেকাছে যাব না।’

    ‘এটা লিখে দিলে আপনি চলে যাবেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আর কোনোদিন আসবেন না?’

    ‘বললাম তো স্যার, আমি এককথার মানুষ।’

    ‘বেশ, বসুন। লিখে দিচ্ছি।’

    ‘চা খেতে ইচ্ছা করছে। চিনি ছাড়া এক কাপ চা কি হবে?’

    ‘চা হবে না।’

    ‘আপনার কি প্যাড আছে স্যার? প্যাডে লিখে দিলে ভালো হয়।’

    ‘না, আমার প্যাড নেই।’

    ‘তাহলে নাম সই করে ঠিকানা লিখে দেবেন। আর টেলিফোন নাম্বার, যদি টেলিফোন থাকে।’

    ‘ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। টেলিফোন নেই।’

    ‘টেলিফোন না-থাকাই ভালো। বড়ই যন্ত্রণা। এমন সব আজেবাজে টেলিফোন আসে! এই পর্যন্ত আছাড় দিয়ে আমি ক’টা টেলিফোন ভেঙেছি বলুন তো স্যার?’

    মিসির আলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এই নিন আপনার কাগজ। এখন চলুন, যাওয়া যাক। দয়া করে আবার এসে আমাকে বিরক্ত করবেন না।’

    ‘স্যার থ্যাংকস। খুব উপকার করেছেন।’

    ওসমান গনি রাস্তায় নেমে বিস্মিত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। কোনো মাইক্রোবাস দেখা যাচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার মাইক্রোবাস কোথায়?’ ওসমান গনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘নতুন ড্রাইভার। বাস নিয়ে পালিয়ে গেছে বোধহয়। আপনি কী বলেন স্যার?’

    মিসির আলি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। যে-চায়ের দোকানের সামনে মাইক্রোবাসটি দাঁড়িয়ে ছিল, সেই চায়ের দোকানিকে জিজ্ঞেস করা হল। সে বলল, তার দোকানের সামনে কখনোই কোনো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে ছিল না।

    ওসমান গনি চিন্তিত গলায় বললেন, ‘বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। আমি এখন বাসায় যাব কী করে? আমার তো বাসার ঠিকানা মনে নেই।’

    ‘আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসার ঠিকানা মনে নেই মানে?’

    ‘আমার কিছু মনে থাকে না। ও, আচ্ছা আচ্ছা, নোটবুকে ঠিকানা লেখা আছে। স্যার, আপনি আমাকে একটা রিকশা ঠিক করে দিন। আর নোটবই দেখে ঠিকানাটা রিকশাওয়ালাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন। কী যন্ত্রণার মধ্যে পড়লাম দেখুন তো!’

    মিসির আলি নোটবই খুললেন। সেখানে প্রথমে বাংলা এবং পরে ইংরেজিতে লেখা—

    “ইনি মানসিকভাবে অসুস্থ।

    দয়া করে তাঁকে সাহায্য করুন। তাঁর বাসার ঠিকানা………….”

    ‘স্যার, ঠিকানাটা লেখা আছে না?’

    ‘আছে।’

    ‘পরের পৃষ্ঠায় ডায়াগ্রাম আছে। ডায়াগ্রাম দেখে রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিন, ও নিয়ে যাবে।’

    মিসির আলি নোটবই হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ-জাতীয় ঝামেলায় তিনি আগে পড়েন নি। ওসমাস গনি নিজেই রিকশা ডেকে আনলেন। তাঁকে বেশ উৎফুল্ল মনে হল। মিসির আলি রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে যেতে হবে। ওসমান গনি বললেন, ‘স্যার, তাহলে যাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। কারো সঙ্গে কথা বলে আজকাল আরাম পাই না। এই জন্যেই ছাদের ঘরে একা-একা থাকি। বড় ভালো লাগল স্যার। তবে সব ভালো দিকের যেমন মন্দ দিক আছে—এটারও আছে। মাইক্রোবাসটা চুরি হয়ে গেল। বাসায় ফিরেও শান্তি নেই। থানা-পুলিশ করতে হবে।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমি কি আসব আপনার সঙ্গে?’

    ওসমান গনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘না না না। কোনো প্রয়োজন নেই। এ-রকম আগেও হয়েছে, রিকশা করে চলে গেছি। আচ্ছা স্যার, যাই। আপনিও বাসায় চলে যান। রাত অনেক হয়ে গেছে। এত রাতে কোথাও যাওয়া ঠিক না। তা ছাড়া আমার মনে হয় আপনার আসলে কোথাও যাবারও কথা না। আমার হাত থেকে বাঁচার জন্য বলেছেন— ‘কাজ আছে।’ বুদ্ধিমান লোকেরা এ-রকম করে। আপনি স্যার আসলেই বুদ্ধিমান।’ ওসমান গনি নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হাসতে লাগলেন।

    মিসির আলি ঘরে ফিরলেন খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে। বিভ্রান্তির অনেকগুলি কারণ। প্ৰথম কারণ—ওসমান গনিকে মানসিক রুগী বলে মনে হচ্ছে না। যে-মানুষ খুঁজে খুঁজে তার ঠিকানা বের করতে পারে, সে নোট বইয়ে লেখা পড়ে বাসায় ফিরে যেতে পারে না, তা হয় না।

    লোকটি যে পাগল সাজার ভান করছে তাও না। যে ভান করবে, সে সারাক্ষণই করবে। আসল পাগলের চেয়ে নকল পাগল অনেক বেশি পাগলামি করে। মিসির আলি যে তাকে বিদেয় করবার জন্যে বলছেন—‘তাঁর কাজ আছে’, এই ব্যাপারটি ওসমান গনির কাছে ধরা পড়েছে। নকল পাগল হলে তা সে কখনো স্বীকার করত না। চেপে যেত। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? রাতে ঘুমুতে যাবার সময় মিসির আলি বালিশের কাছে রাখা খাতায় পেনসিলে অস্পষ্টভাবে লিখলেন—

    নাম : ওসমান গনি।

    বয়স : পঞ্চাশের কাছাকাছি।

    বিশেষত্ব : তিনটি সোনাবাঁধানো দাঁত। হাসেন কোনো রকম শব্দ না করে।

    (১) কেন এসেছিলেন? বুঝতে পারা যাচ্ছে না।

    (২) অন্যরা দাবি করছে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি নিজে দাবি করছেন না।

    (৩) তবে তিনি যে ভৌতিক গল্পের কথা বলছেন, তা মানসিক অসুস্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

    (৪) লোকটি বিত্তবান বলেই মনে হল। কারণ তিনি যে-তেতলা বাড়ির কথা বললেন, সেই বাড়িটি তাঁর হওয়ারই সম্ভাবনা। নোটবইয়ের ঠিকানায় গুলশানের কথা লেখা। গুলশান বিত্তবানদের এলাকা।

    (৫) ভদ্রলোকের হাতে পাথর-বসানো তিনটি আঙটি, ব্যবসায়ীরা সাধারণত পাথর-টাথরে বিশ্বাসী হয়। তিনি সম্ভবত একজন ব্যবসায়ী।

    রাত এগারটা পাঁচ মিনিটে মিসির আলি বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে গেলেন। কঠিন নিয়মে তিনি এখন নিজেকে বাঁধার চেষ্টা করছেন। ঘুম আসুক না-আসুক, রাত এগারটা বাজতেই বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়বেন। ঘুম আনানোর যে-সব প্রক্রিয়া আছে সেগুলি প্রয়োগ করবেন। তার পরেও যদি ঘুম না আসে কোনো ক্ষতি নেই। বিছানায় গড়াগড়ি করবেন। উঠবেন ভোর পাঁচটায়। ঘুম পাড়িয়ে দেবার কোনো যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় নি, কিন্তু ঘুম ভাঙানোর যন্ত্র আছে। তিনি দু’ শ’ ত্রিশ টাকা দিয়ে একটি অ্যালার্ম-ঘড়ি কিনেছেন। এই ঘড়ি ভোর পাঁচটায় এমন হৈচৈ শুরু করে যে, কার সাধ্য বিছানায় শুয়ে থাকে! বিজ্ঞানের এই সাফল্যের দিনে ঘুম আনার যন্ত্র বের হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। অ্যালার্ম-ঘড়ি যে-হারে বিক্রি হয়, ঘুম-ঘড়িও সেই হারে বিক্রি হবে।

    ঘুম আনানোর প্রক্রিয়াগুলি কাজ করছে না। মিসির আলি সাত শ’ ভেড়া গুনলেন। এই গুণন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ক্লান্ত হয়ে যাবার কথা। ক্লান্ত হবার পরিবর্তে মস্তিষ্ক আরো উত্তেজিত হল। মনে-মনে গল্প বললেও নাকি ঘুম আসে। গল্প বলার সময় ভাবতে হয়, এক দল ঘুম-ঘুম চোখের শিশুরা গল্প শুনছে। মিসির আলি গল্প শুরু করলেন। সব গল্প শুরু হয় এইভাবে—এক দেশে ছিল এক রাজা। তাঁর গল্পটা একটু অন্য রকম হল—এক দেশে ছিল এক রানী। রানীর দুই রাজা। সুয়োরাজা এবং দুয়োরাজা। সুয়োরাজাটা বড়ই ভালো………।

    কল্পনার শিশুদের একজন প্রশ্ন করল, ‘সুয়োরাজার নাম কি?’

    ‘সুয়োরাজার নাম হচ্ছে ওসমান গনি। মোটাসোটা একজন মানুষ, পঞ্চাশের মতো বয়স। হাতে তিনটা আঙটি। এর মধ্যে একটা আঙটি হচ্ছে নীলার। সুয়োরাজার তিনটা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো……’

    কল্পনার শিশুটি বলল, ‘এ আবার কেমন রাজা?’

    মিসির আলি বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। বাতি জ্বালালেন না, অন্ধকারেই বাথরুমে ঢুকে চোখে-মুখে পানি ঢাললেন। বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট ধরালেন, যদিও তাঁর বর্তমান নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতিতে রাত এগারটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কোনো সিগারেট খাবার ব্যবস্থা নেই। তিনি একধরনের অস্বস্তি বোধ করছেন, একধরনের বিভ্রান্তি—যা ওসমান গনি নামের মানুষটি তৈরি করে গেছেন। মাথা থেকে বিভ্রান্তি তাড়াতে পারছেন না। স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে আছে। বারান্দায় প্রচুর হাওয়া, আকাশ মেঘলা। শ্রাবণের ধারাবর্ষণ সম্ভবত শুরু হবে। তাঁর শীত-শীত লাগছে। জ্বলন্ত সিগারেট হাতে নিয়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সিগারেট পুড়তে পুড়তে একসময় তাঁর হাতেই নিভে গেল। তাঁর ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়। দু’ শ’ ত্ৰিশ টাকায় কেনা অ্যালার্ম-ঘড়ি তাঁকে যথাসময়ে ডেকে তুলল।

    তিনি হাতমুখ ধুলেন। কেরোসিন কুকারে চা বানিয়ে খেলেন। খানিকক্ষণ ফ্রী-হ্যান্ড একসারসাইজ করলেন। এও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতির অংশ। ডাক্তার বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন। পাথরের মতো মুখ করে বলেছেন, ‘মিসির আলি সাহেব, আপনার শরীরের কলকব্জা সবই নষ্ট হয়ে গেছে। এটা কি আপনি জানেন?’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘জানি।’

    ‘আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চান, না এখনি মরে যেতে চান?’

    ‘অল্প কিছুদিন বাঁচতে চাই।’

    ‘কতদিন?’

    ‘এই ধরুন এক বৎসর।’

    মিসির আলি ভেবেছিলেন ডাক্তার বলবেন, এক বৎসর কেন? ডাক্তার সে-প্রশ্ন করলেন না, খসখস করে প্রেসক্রিপশনে একগাদা কথা লিখতে লাগলেন।

    ভোরবেলা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে পনের মিনিট ফ্রী-হ্যান্ড একসারসাইজ হচ্ছে তার একটি। একসারসাইজের পর এক ঘণ্টা প্রাতঃভ্রমণের ব্যাপার আছে। ডাক্তার সাহেব লিখে দিয়েছেন—ঝড় হোক, টাইফুন হোক, ভূমিকম্প হোক—এক ঘণ্টা হাঁটতেই হবে।

    এখন ঝড়, টাইফুন বা ভূমিকম্প কোনোটাই হচ্ছে না। টিপটিপ করে বৃষ্টি অবশ্যি পড়ছে। সেই বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে বের হওয়া যায়। ছাতা মাথায় প্রাতঃভ্রমণ মন্দ নয়। সকালবেলা এই বেড়ানোটা তাঁর খারাপ লাগে না। বিচিত্র সব চরিত্র দেখা যায়। একদল মানুষ প্রাতঃভ্রমণকে প্রায় উপাসনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। উপাসনার যেমন কিছু নিয়ম আছে, এদেরও আছে। আরেক দল আছে ‘খাদক’ জাতীয়। ভ্রমণের এক পর্যায়ে বিশাল টিফিন-ক্যারিয়ার খুলে হাউহাউ করে পরোটা-গোস্ত যেভাবে গিলতে থাকেন, তাতে মনে হয় তাঁদের সৃষ্টি করা হয়েছে খোলা মাঠে বসে গোস্ত-পরোটা খাবার জন্যে।

    মিসির আলি বেরুবার মুখে বাধা পেলেন। গেটের কাছে আসতেই ত্ৰিশ পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসী এক ভদ্রলোক এসে শীতল গলায় বললেন, ‘আপনি কি বেরুচ্ছেন?’

    মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’

    ‘কাল রাতে ওসমান গনি নামের কেউ কি আপনার কাছে এসেছিলেন?’

    ‘এসেছিলেন।’

    ‘ঐ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলব। আমি পুলিশের লোক। ইন্সপেক্টর অব পুলিশ। আমার নাম রকিবউদ্দিন।’

    মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, ‘ওসমান গনি কি মারা গেছেন?’

    ‘হ্যাঁ, মারা গেছেন। আপনি কী করে জানলেন?’

    ‘অনুমান করেছি। আমার অনুমানশক্তি ভালো।’

    ‘অনুমানশক্তি ভালো থাকাই ভালো। আসুন, কথা বলি। বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোম মিনিস্টার নিজেই ইন্টারেস্ট দেখিয়েছেন। বেশিক্ষণ আমি আপনাকে বিরক্ত করব না। প্রাথমিকভাবে আধ ঘণ্টার মতো কথা বলব। পরে আবার আসব।’

    ‘রকিবউদ্দিন সাহেব, এখন তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। এখন মর্নিং-ওয়াকে যাচ্ছি। এক ঘণ্টা মর্নিং-ওয়াক করব। আপনাকে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।’

    ‘এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আপনাকে এক্ষুণি কথা বলতে হবে।’

    ‘এমন কোনো আইন কি আপনাদের আছে যে পুলিশ যখন কথা বলতে চাইবে তখনি কথা বলতে হবে?’

    ‘আইনের বিষয় নয়, হোম মিনিস্টার নিজে বলেছেন। তিনি বিষয়টায় খুব আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

    ‘আমি এই মুহূর্তে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছি না। কাজেই আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমি আমার ঘরের চাবি দিয়ে দিচ্ছি, আপনি আমার ঘরে অপেক্ষা করতে পারেন। তবে আপনার যদি ধারণা হয় আমি পালিয়ে যেতে পারি, তাহলে আপনি আমার সঙ্গেও আসতে পারেন।’

    ‘ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব। আপনি দেরি করবেন না। দিন, ঘরের চাবি দিন।’

    মিসির আলি চাবি দিয়ে গেট খুলে রওনা হলেন। রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়ে একবার পিছনে ফিরলেন। ইন্সপেক্টর সাহেব আগের জায়গায় চাবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মুখ শ্রাবণ মাসের আকাশের চেয়েও মেঘলা।

    বৃষ্টি জোরেসোরে পড়া শুরু করেছে। রাস্তায় নোংরা পানি। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ময়লা পানিতে ডুবিয়ে প্রাতঃভ্রমণে যাবার কোনো মানে হয় না—তবু মিসির আলি যাচ্ছেন। ঝড় হোক, টাইফুন হোক, ভূমিকম্প হোক—তাঁকে এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। সকালের খোলা হাওয়া গায়ে লাগাতে হবে। এক বৎসর তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে। দেখা যাক, ডাক্তারের উপদেশ মেনে কতদূর কি হয়।

    আজ শরীর অন্যদিনের চেয়েও বেশি খারাপ লাগছে। চোখ জ্বালা করছে, কোনো কিছুর দিকেই বেশি সময় তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হতে শুরু করেছে। শুধু শরীর নয়—মনও নষ্ট হতে শুরু করেছে। ওসমান গনির মৃত্যুসংবাদ তাঁকে বিচলিত করে নি। করা উচিত ছিল। খ্রিস্টানরা মৃত্যুসংবাদে গির্জায় ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজায়। নিয়মটা সুন্দর। সবাইকে জানিয়ে দেয়া—শোন, তোমরা শোন।! তোমাদের একজন চলে গিয়েছে—ঢং ঢং ঢং……

    ‘কেমন আছেন মিসির আলি সাহেব?’

    মিসির আলি তাকালেন—অপরিচিত একজন মানুষ। অপরিচিত মানুষদের প্রশ্নের জবাব খুব অল্প কথায় দিতে হয়, কিন্তু মিসির আলি একটি দীর্ঘ বাক্য বললেন, ‘আমি ভালো না। শরীর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—মনও নষ্ট হচ্ছে। অপেক্ষা করছি ঘণ্টার জন্যে, ঢং ঢং ঢং। ভাই যাই।’

    অপরিচিত ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি এতটা অবাক হচ্ছেন কেন তাও মিসির আলি ধরতে পারলেন না।

  • আমি এবং আমরা

    আমি এবং আমরা

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    মিসির আলি দু শ গ্রাম পাইজং চাল কিনে এনেছেন। চাল রাখা হয়েছে একটা হরলিক্সের কৌটায়। গত চারদিন ধরে তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছেন। চায়ের চামচে তিন চামচ চাল তিনি জানালার পাশে ছড়িয়ে দেন। তারপর একটু আড়াল থেকে লক্ষ করেন—কী ঘটে। যা ঘটে তা বিচিত্র। অন্তত তাঁর কাছে বিচিত্র বলেই মনে হয়। দুটা চড়ুই পাখি চাল খেতে আসে। একটি খায়, অন্যটি জানালার রেলিঙে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থাকে। ব্যাপারটা রোজই ঘটছে। পক্ষী সমাজে পুরুষ স্ত্রী পাখির চেয়ে সুন্দর হয়, কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে পাখিটি চাল খাচ্ছে সেটা পুরুষ পাখি। গম্ভীর ভঙ্গিতে যে বসে আছে, সে তার স্ত্রী কিংবা বান্ধবী। পক্ষী সমাজে বিবাহ প্রথা চালু আছে কিনা মিসির আলি জানেন না। একটি পুরুষ পাখি একজন সঙ্গিনী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, না সঙ্গিনী বদল করে—এই ব্যাপারটা মিসির আলির জানতে ইচ্ছা করছে। জানেন না। পক্ষী বিষয়ক প্রচুর বই তিনি যোগাড় করেছেন। বইগুলোতে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু এই জরুরি বিষয়টা নেই।

    পাবলিক লাইব্রেরিতে পুরোনো একটি বই পাওয়া গেল—ইরভিং ল্যাংস্টোনের ‘The Realm of Birds’. সেখানে পাখিদের বিচিত্র স্বভাবের অনেক কিছুই লেখা, কিন্তু কোথাও নেই একটি পাখি খাবে, অন্যটি দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। রহস্যটা কী? এই পাখিটির কি খিদে নেই? নাকি সে এক ধরনের উপবাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে? পক্ষী বিশারদরা কী বলেন? বিশারদদের ব্যাপারে মিসির আলির এক ধরনের এ্যালার্জি আছে। বিশেষজ্ঞদের কিছু জিজ্ঞেস করলেই তাঁরা এমন ভঙ্গিতে তাকান যেন প্রশ্নকর্তার অজ্ঞতায় খুব বিরক্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন পুরোপুরি না শুনেই জবাব দিতে শুরু করেন। সেই জবাব বেদবাক্যের মতো গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের জবাবের ওপর প্রশ্ন করা যাবে না। বিনয় নামক সদ্গুণটি বিশেষজ্ঞদের নেই। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে তাঁরা যা শেখেন তার চেয়ে অনেক বেশি শেখেন—অহংকার প্রকাশের কায়দাকানুন। পাখির ব্যাপারটাই ধরা যাক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকের কাছে গিয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোক সমস্যা পুরোপুরি না শুনেই বললেন, এটা কোনো ব্যাপার না। খিদে নেই তাই খাচ্ছে না, পশু ও প্রাণিজগতের নিয়ম হল খিদেয় খাদ্য গ্রহণ করা একমাত্র মানুষই খিদে না থাকলেও লোভে পড়ে খায়।

    মিসির আলি বললেন, প্রতিদিন একটা পাখির খিদে থাকবে না, অন্য একটার থাকবে—এটা কি যুক্তিযুক্ত?

    ‘একটা বিশেষ পাখিই যে খাচ্ছে না তাইবা আপনি ধরে নিচ্ছেন কেন? সব পাখি দেখতে এক রকম। একদিন একটা খাচ্ছে, অন্যদিন আরেকটা খাচ্ছে।’

    ‘আমি পাখি দুটাকে চিনি। খুব ভালো করে চিনি। অসংখ্য চড়ুই পাখির মধ্যেও আমি এদের আলাদা করতে পারব।’

    অধ্যাপক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ গা দুলিয়ে হাসলেন। তারপর ছোট শিশুকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন—একটা মশা আপনার গায়ে কামড় দিল, তারপর সেটা উড়ে গিয়ে অন্য মশাদের সঙ্গে মিশল। আপনি কি সেই মশাটা আলাদা করতে পারবেন?

    ‘না।’

    ‘যদি না পারেন তা হলে চড়ুই পাখিও আলাদা করতে পারবেন না। পুরুষ চড়ুই এবং মেয়ে চড়ুই দেখতে এক রকম। ভাই, এখন আপনি যান। এগারোটার সময় আমার ক্লাস, আমি কিছুক্ষণ পড়াশোনা করব।’

    ভদ্রলোক মিসির আলিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ডিকশনারি সাইজের এক বই খুলে পড়তে শুরু করলেন। ভাবটা এরকম যে আজেবাজে লোকের সঙ্গে কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় তাঁর নেই। দেখা যাচ্ছে, সবাই ব্যস্ত। সবারই সময়ের টানাটানি। একমাত্র তাঁরই অফুরন্ত সময়। সময় কাটানোই তার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুই করার নেই। মিসির আলির ডাক্তার তাঁকে বলেছেন—একজন মানুষের শরীরে যত ধরনের সমস্যা থাকা সম্ভব তার সবই আপনার আছে। লিভারের প্রায় পুরোটাই নষ্ট করে ফেলেছেন। অগ্ন্যাশয় থেকে সিক্রেশন হচ্ছে না। রক্তে ডাবলিউ বিসি-র পরিমাণ খুব বেশি। আপনার হার্টেরও সমস্যা আছে, ড্রপ বিট হচ্ছে। আপনাকে যা করতে হবে তা হল—দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে থাকা। বুঝতে পারছেন?

    ‘পারছি।’

    ‘সিগারেট ছেড়েছেন?’

    ‘এখনো ছাড়ি নি তবে শিগগিরই ছাড়ব।’

    ‘উপদেশ দিতে হয় বলে দিচ্ছি। মনে হয় না আপনি আমার উপদেশের প্রতি কোনো রকম গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারপরেও বলি—মন থেকে সমস্ত সমস্যা ঝেঁটিয়ে দূর করুন। যা করবেন তা হল বিশ্রাম। গান শুনবেন, পার্কে বেড়াবেন, হালকা বইপত্র পড়তে পারেন। রাত জাগা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মনে থাকবে?’

    ‘জি থাকবে।’

    ‘আমি জানি আপনি এর কোনোটাই করবেন না।’

    মিসির আলি হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, আমি আপনার উপদেশ মেনে চলব। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্যে যে উপদেশ মানব তা না। শরীরটা সত্যি সত্যি সারাতে চাচ্ছি। অসুস্থতা অসহ্য বোধ হচ্ছে।

    ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি মুখে বলছেন কিন্তু আসলে কিছুই করবেন না। কিছু কিছু মানুষ আছে অন্যের উপদেশ সহ্য করতে পারে না। আপনি সেই দলের।

    ডাক্তারের কথা ভুল প্রমাণিত করে মিসির আলি ডাক্তারের উপদেশ মতোই চলছেন। রাত নটার মধ্যেই ভাত খান, দশটা বাজতেই শুয়ে পড়েন। সমস্যা হল—ঘুম আসে না। মানুষ কম্পিউটার না। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে ঘুম পাড়ানো সম্ভব না। মিসির আলি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। এক এক রাতে এক এক ধরনের বিষয় নিয়ে ভাবেন। ইচ্ছে করে যে ভাবেন তা না। ভাবনাগুলোর যেন প্রাণ আছে, তারা নিজেরাই আসে। মিসির আলিকে বিরক্ত করে তারা যেন এক ধরনের আনন্দ পায়। ইদানীং তিনি চড়ুই পাখি নিয়ে ভাবেন। পাখি মানুষ চিনতে পারে কি পারে না এই তাঁর রাতের চিন্তার বিষয়। কোনো মানুষ যদি রোজ রোজ পাখিকে খাবার দেয় তা হলে সেই পাখিগুলো কি ঐ মানুষটিকে চিনে রাখবে?

    রাতে ঘুমের ঠিক না থাকলেও তাঁর ঘুম ভাঙে খুব ভোরে। ঘুম ভেঙে পার্কে বেড়াতে যান। দুপুরে খাওয়ার পর দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়েন। বিকেলে পার্কে গিয়ে বসেন। তার বসার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আছে। পা তুলে বেঞ্চিতে বসে তিনি গাছপালার সৌন্দর্য দেখতে চেষ্টা করেন, যদিও গাছপালা তাকে কখনোই আকৃষ্ট করে না। ডাক্তার হালকা বই পড়তে বলেছে। তিনি ‘হাসি হাসি হাসি’ এই নামে একটা তিন শ পৃষ্ঠার বই কিনে এনেছেন। বইটিতে দু হাজার একটি ‘জোক’ আছে। তিনি প্রথম পৃষ্ঠা থেকে পড়ে পড়ে এখন তেত্রিশ পৃষ্ঠায় এসেছেন—এখনো তাঁর হাসি আসে নি। এই বইটির দাম পড়েছে এক শ টাকা। মনে হচ্ছে এক শ টাকাই পানিতে গেছে।

    আরেকটি বই ফুটপাত থেকে কিনেছেন দু টাকা দিয়ে। বইটির নাম বেহুলার বাসরঘরের ইতিহাস। এই বইটি বরং ভালো। অনেক চিন্তাভাবনা করার ব্যাপার আছে। যেমন লখিন্দরের বাবার নাম চাঁদ সদাগর। চাঁদ সদাগর সম্পর্কে বলা হচ্ছে—

    কালীদহে পড়ে চাঁদ পান করে জল

    ক্ষণকাল যায় ভেসে ক্ষণে হয় তল।

    সপ্তদিন নবম রাত্রি ভাসিল সাগরে

    ইচামাছ বাসা বাঁধে দাড়ির ভিতরে…।

    অর্থাৎ চাঁদ সদাগরের দাড়িতে ইচামাছ বাসা বেঁধেছে। সাগরের ইচামাছ হচ্ছে গলদা চিংড়ি। এরা কী করে দাড়ির ভেতর বাসা বাঁধবে? রূপক অর্থে বলা হচ্ছে? রূপকের চিত্রকল্প তো বাস্তব হওয়া উচিত। অবাস্তব চিত্রকল্প দিয়ে রূপক তৈরি করার মানে কী? তা ছাড়া ‘সপ্তদিন নবম রাত্রি ভাসিল সাগরে’ বাক্যটির মানেই বা কী? সপ্তদিন সাগরে ভাসলে সপ্তরাতও ভাসতে হবে। অবিশ্যি শুরুতে এক রাত ভেসেছে এবং শেষে এক রাত ভেসেছে এই ভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তাতেও শেষ রক্ষা হয় না, কারণ চাঁদ সদাগরের নৌকাডুবি রাতে হয় নি। হয়েছে দিনে।

    মিসির আলি পার্কে তাঁর নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে আছেন। তাঁর পাশে দুটি বই। একটি হল বেহুলার বাসরঘরের ইতিহাস, অন্যটি— The Birds, Their habits. তিনি বই পড়ছেন না। বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখছেন। বাচ্চারা ফুটবল খেলছে। ফুটবল খেলার মতো ফাঁকা জায়গা এই পার্কে নেই। চারদিকে গাছগাছালি। এর মধ্যেই বাচ্চারা খেলছে। কে কোন দলে খেলছে এটা বের করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেরাও যার যেদিকে ইচ্ছা বলে কিক বসাচ্ছে। নির্ধারিত কোনো গোলপোস্ট আছে বলেও মনে হচ্ছে না। গোলকিপার যে দুটি গোলপোস্টের মাঝখানে দাঁড়াচ্ছে সেটাই গোলপোস্ট। বলের সঙ্গে সঙ্গে গোলপোস্টের স্থান বদল হচ্ছে।

    ‘স্লামালিকুম স্যার।’

    মিসির আলি না তাকিয়েই বললেন, ‘ওয়ালাইকুম সালাম।’

    ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি স্যার?’

    ‘এখন বলতে পারেন না। এখন আমি খেলা দেখছি।’

    ‘স্যার, আমি বসি না হয়।’

    ‘বসুন।’

    অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলল। কে জিতল কে হারল কিছু বোঝা গেল না। মনে হচ্ছে দু’ দলই জিতেছে। এও এক অসাধারণ ঘটনা। একসঙ্গে দুটি দলকে জিততে প্রায় কখনোই দেখা যায় না।

    ‘স্যার, আমি অনেকক্ষণ বসে আছি।’

    মিসির আলি তাকালেন। তাঁর ভুরু কুঞ্চিত হল। মানুষের সঙ্গ তাঁর কাছে কখনোই বিরক্তিকর ছিল না। অতি সাধারণ যে মানুষ তার চরিত্রেও অবাক হয়ে লক্ষ করার মতো কিছু ব্যাপার থাকে। কিন্তু ইদানীং মানুষ তাঁর কাছে অসহ্য বোধ হচ্ছে। বরং চড়ুই পাখির ব্যাপার তাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করছে। তাঁর পাশে বসে থাকা চশমা পরা মানুষটি মাঝে মাঝেই তাঁকে বিরক্ত করছে। তাকে এই পার্কেই দেখা যায়। সবদিন না, কয়েকদিন পরপর। এই লোক তাঁকে একটা গল্প বলতে চায়। তাও প্রেমের গল্প। পার্কে বসে প্রেমের গল্প শোনার মতো ধৈর্য এবং ইচ্ছা কোনোটাই তাঁর নেই। এ লোককে সে কথা অনেকবারই বলা হয়েছে। মিসির আলি ঠিক করলেন, আজ আরেক বার বলবেন। প্রথমে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন—তারপর কঠিন এবং রূঢ়ভাবে বলবেন।

    মিসির আলি বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন বলুন কেমন আছেন?’

    কঠিন কথা বলার আগে সহজভাবে শুরু করা। বুদ্ধিমান লোক হলে বুঝে ফেলা উচিত যে প্রস্তাবনা মূল বইয়ের মতো নয়।

    ‘জি স্যার, ভালো আছি।’

    ‘গল্প শোনাতে চাচ্ছেন তো? কিছু মনে করবেন না। গল্প শুনতে ইচ্ছে করছে না।’

    ‘আপনার চড়ুই পাখি দুটি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম।’

    ‘চড়ুই পাখি?’

    ‘জি স্যার, পরশুদিন আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি বলেছিলেন, আপনি আমার কোনো কথা শুনতে পারবেন না। চড়ুই পাখি নিয়ে ব্যস্ত। পাখি দুটি কি ভালো আছে?’

    ‘হ্যাঁ, ভালো আছে।’

    ‘এখনো কি পুরুষ পাখিটা খাচ্ছে এবং মেয়ে পাখি দূরে বসে দেখছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘স্যার, আমি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করেছি। আমার মনে হয় পাখি দুটাকে যদি আমরা খাঁচায় আটকে ফেলতে পারি তা হলে বোঝা যাবে ব্যাপারটা কী? খাঁচায় চাল দেওয়া থাকবে—ক্রমাগত চব্বিশ ঘণ্টা মনিটর করা হবে। যদি দেখা যায় খাঁচার ভেতর ও মেয়ে পাখিটা কিছুই খাচ্ছে না—তখন বুঝতে হবে…’

    মিসির আলি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খাঁচায় এদের ঢোকাব কী করে?’

    ‘খাঁচায় ঢোকানো সমস্যা হবে না, স্যার। চাল খাইয়ে খাইয়ে আপনি এদের অভ্যস্ত করে রেখেছেন— খাঁচার দরজা খুলে আপনি যদি এর ভেতর চাল দিয়ে দেন—পাখি দুটা খাঁচায় ঢুকবে।’

    মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘খাঁচা কোথায় পাওয়া যায়?’

    ‘নীলক্ষেতে ইউনিভার্সিটি মার্কেট নামে একটা নতুন মার্কেট হয়েছে। রঙিন মাছ, পাখি, পাখির খাঁচার অসংখ্য দোকান।’

    ‘খাঁচার কী রকম দাম?’

    ‘আপনি যদি বেয়াদবি না নেন—আমি আপনার জন্যে বড় একটা খাঁচা কিনেছি। আপনার বাসায় যে কাজের ছেলেটি আছে তাকে দিয়ে এসেছি।’

    ‘কেন করলেন?’

    ‘আপনার ভেতর কৌতূহল জাগানোর জন্যে করেছি। আমি বেশ কিছুদিন ধরে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনি কোনোরকম আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এমনকি আমার নাম পর্যন্ত জানতে চাচ্ছেন না। আমার ধারণা হয়েছে খাঁচাটা পেলে হয়তোবা আপনি কৌতূহলী হবেন। আমার নাম জানতে চাইবেন।’

    ‘আপনার নাম কী?’

    ‘আমার ডাকনাম তন্ময়। ভালো নাম মুশফেকুর রহমান।’

    ‘আপনি আমার কাছে কী চান?’

    ‘আমি আপনাকে একটা গল্প বলতে চাই।’

    ‘প্রেমের গল্প?’

    ‘প্রেমের গল্প বলা যেতে পারে।’

    মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমাকে দেখে কি আপনার মনে হয়— আমি প্রেমের গল্প শোনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী?’

    ‘হ্যাঁ, মনে হয়। আমার মনে হয় গল্প শুরু করলে আপনি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুরু করবেন। আমার দরকার অসম্ভব মনোযোগী একজন শ্রোতা। যে গল্প শুনে যাবে। একটি প্রশ্নও করবে না। গল্প শুনে হাসবে না, ব্যথিত হবে না।’

    ‘এমন শ্রোতা তো প্রচুর আছে। এই পার্কেই আছে।’

    ‘আপনি কী বলতে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারছি। আপনি বলতে চাচ্ছেন—এই পার্কে প্রচুর গাছ আছে। গাছগুলো আমার গল্পের মনোযোগী শ্রোতা হতে পারে। আপনি কি তাই বোঝাতে চাচ্ছেন না?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘গাছকে আমি আমার গল্প শুনিয়েছি। গাছরা আমার গল্প মন দিয়ে শুনেছে এবং গল্পের মাঝখানে প্রশ্ন করে আমাকে বিরক্ত করে নি। কিন্তু ওরা আমার গল্প বুঝতে পেরেছে কি না তা আমি জানতে পারছি না।’

    ‘আপনার গল্প বোঝা কি গাছদের জন্যে জরুরি?’

    ‘গাছের জন্যে জরুরি নয়। আমার জন্যে জরুরি। খুবই জরুরি।’

    ‘প্রেমের গল্পটি কি দীৰ্ঘ?’

    ‘গল্প বেশ দীর্ঘ। তবে গল্পের মূল লাইনটি যাকে বটম লাইন বলা হয় তা ছোট। স্যার, বটম লাইনটি বলব?’

    ‘বলুন।’

    ‘আমি আপনাদের মনোবিদ্যার ভাষায় একজন সাইকোপ্যাথ। আমি এ পর্যন্ত দুটি খুন করেছি। খুব ঠাণ্ডা মাথায় করেছি। খুব ভেবেচিন্তে করা। এই খুন দুটি করার জন্যে আমার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আমি তৃতীয় খুনটির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছি। প্রস্তুতিপর্ব আপনাকে বলতে চাচ্ছি। প্রস্তুতিপর্বে প্রেমের ব্যাপার আছে। এই জন্যেই বলছি প্রেমের গল্প।’

    ‘দুটি খুন করেছেন। তৃতীয়টি করবেন। করে ফেলুন। আমাকে বলার দরকার কী? আমার অনুমতি নেওয়ার ব্যাপার তো নেই।’

    ‘স্যার, আপনি কি আমার গল্প বিশ্বাস করেছেন?’

    ‘হ্যাঁ করেছি।

    ‘আমি তো আপনাকে একটা ভয়াবহ কথা বললাম। আপনি সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করলেন?’

    ‘হ্যাঁ করলাম।’

    ‘কেন করেছেন?’

    ‘আমি মানুষকে কখনোই অবিশ্বাস করি না। তা ছাড়া একজন মানুষ অকারণে কেন আমাকে এসে বলবে আমি দুটা খুন করেছি, তৃতীয়টি করব? এখন বলুন কেমন লাগে মানুষ খুন করতে?’

    ‘ভালো লাগে স্যার।’

    লোকটি হেসে ফেলল। সুন্দর হাসি। কিন্তু মিসির আলি শিউরে উঠলেন। লোকটির জিহ্বা কুচকুচে কালো। সে যখন হেসে উঠল মিসির আলি ব্যাপারটা তখনই লক্ষ্য করলেন।

    লোকটি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি আপনার ভেতর কৌতূহল জাগ্রত করতে পেরেছি। কাজেই আমি জানি আপনি এখন আমার কথা শুনবেন। আর স্যার, আপনি আমার জিহ্বা দেখে যেভাবে চমকে উঠেছেন সেভাবে চমকে ওঠার কিছু নেই। খুব ছোটবেলায় আমার অসুখ হয়েছিল। কালাজ্বর। ব্রহ্মচারী ইনজেকশন নিতে হয়েছে। সেইসঙ্গে আয়ুর্বেদি এক ওষুধ খেয়ে জিহ্বা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। স্যার যাই। খুব শিগগিরই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে। ও ভালো কথা, স্যার এই বইটিও আমি আপনার জন্যে এনেছি। অস্ট্রেলিয়ান পাখিদের ওপর একটা বই। পাখিদের সম্পর্কে কিছু তথ্য এই বইটিতে পেতে পারেন।

    ‘আপনার ভালো নাম কী যেন বললেন? মুশফেকুর রহমান?’

    ‘জি।’

    ‘আপনার সঙ্গে আমার কোথায় দেখা হবে? আপনার ঠিকানা কী?’

    ‘আমাকে আপনার খুঁজে বের করতে হবে না, স্যার। আমিই আপনাকে খুঁজে বের করব।’

  • তন্দ্রাবিলাস

    তন্দ্রাবিলাস

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ভোরবেলায় মানুষের মেজাজ মোটামুটি ভালো থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হতে থাকে, বিকালবেলায় মেজাজ সবচে বেশি খারাপ হয়, সন্ধ্যার পর আবার ভালো হতে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।

    এখন সকাল এগারটা, মেজাজের সাধারণ সূত্র মতে মিসির আলির মেজাজ ভালো থাকার কথা। কিন্তু মিসির আলির মন এই মুহূর্তে যথেষ্টই খারাপ। তিনি বসার ঘরে বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে আছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে। তাঁর মেজাজ খারাপের দুটি কারণের প্রথমটা হল—একটা মাছি। অনেকক্ষণ থেকেই মাছিটা তাঁর গায়ে বসার চেষ্টা করছে। সাধারণ মাছি না—নীল রঙের স্বাস্থ্যবান ডুমো মাছি। আম-কাঁঠালের সময় এই মাছিগুলিকে দেখা যায়। এখন শীতকাল—এই মাছি এল কোত্থেকে? মাছিটা তার গায়েই বারবার বসতে চাচ্ছে কেন? তাঁর সামনে বসে থাকা মেয়েটির গায়ে কেন বসছে না?

    মিসির আলির মেজাজ খারাপের দ্বিতীয় কারণ এই মেয়েটি। তাঁর ইচ্ছা করছে মেয়েটিকে একটা ধমক দেন। যদিও ধমক দেবার মতো কোনো কারণ ঘটে নি। মেয়েটি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। দেখা করতে আসার অপরাধে কাউকে ধমক দেয়া যায় না। ধমক দেয়ার বদলে মিসির আলি শব্দ করে কাশলেন। প্রচণ্ড শব্দে কাশলে, কিংবা কুৎসিত শব্দে নাক ঝাড়লে মনের রাগ অনেকখানি কমে। মিসির আলির কমল না বরং আরো যেন বাড়ল। মাছিটাও মনে হচ্ছে এই শব্দে উৎসাহ পেয়েছে। এতক্ষণ গায়ে বসতে চাচ্ছিল এখন উড়ে ঠোঁটে বসতে চাচ্ছে। কী যন্ত্রণা!

    স্যার, আমার নাম সায়রা বানু। সায়রা বানু নামটা কি আপনার মনে থাকবে?

    মিসির আলি বললেন, মনে থাকার প্রয়োজন কি আছে?

    অবশ্যই আছে। আমি এত আগ্রহ করে আমার নামটা আপনাকে কেন বলছি, যাতে মনে থাকে সেই জন্যেই তো বলছি।

    মিসির আলি রোবটের গলায় বললেন, মানুষের নাম আমার মনে থাকে না।

    মেয়েটি তাঁর রোবট গলা অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে বলল, আমারটা মনে থাকবে। কারণ একজন বিখ্যাত সিনেমা অভিনেত্রীর নাম সায়রা বানু।

    মিসির আলি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। অর্থহীন কথা শুনতে ভালো লাগছে না। তা ছাড়া শীতও লাগছে। চেয়ারটা টেনে রোদে নিয়ে গেলে হয়। তাতে কিছুক্ষণ আরাম লাগবে তারপর আবার রোদে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। শীতকালের এই এক যন্ত্রণা। ছায়া বা রোদ কোনোটাই ভালো লাগে না। মিসির আলি মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাছিটার কারণে নিজেকে এখন কাঁঠাল মনে হচ্ছে।

    মেয়েটি খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনি দিলীপ কুমার, সায়রা বানু এদের নাম শোনেন নি?

    দিলীপ কুমারের নাম শুনেছি।

    সায়রা বানু হচ্ছে দিলীপ কুমারের বউ। আমার বন্ধুরা অবিশ্যি আমাকে সায়রা বানু ডাকে না, তারা ডাকে এস বি। সায়রার এস, বানুর বি―এস বি। এস বি-তে আর কী হয় বলুন তো?

    বলতে পারছি না।

    এস বি হচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। আমার বন্ধুদের ধারণা আমার চেহারায় একটা স্পাই স্পাই ভাব আছে। এই জন্যেই তারা আমাকে এস বি ডাকে। আচ্ছা আপনারও কি ধারণা আমার চেহারায় স্পাই স্পাই ভাব? ভালো করে একটু আমার দিকে তাকান না। আপনি সারাক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন কেন?

    মিসির আলি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন না। মাছিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মাছিটা এদিক-ওদিক করছে বলেই এদিক-ওদিক তাকাতে হচ্ছে। আচ্ছা পৃথিবীতে মোট কত প্রজাতির মাছি আছে?

    এই যে শুনুন। তাকান আমার দিকে।

    মিসির আলি মেয়েটির দিকে তাকালেন। অতিরিক্ত ফর্সা একটি মেয়ে। বাঙালি মেয়েদের গায়ের রঙের একটা মাত্রা আছে। কোনো মেয়ে যদি সেই মাত্রা অতিক্রম করে যায় তখন আর ভালো লাগে না। তার মধ্যে বিদেশী বিদেশী ভাব চলে আসে। তাকে তখন আর আপন মনে হয় না। সায়রা বানুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাকে পর পর লাগছে। মেয়েটির মাথা ভরতি চুল। সেই চুলেও লালচে ভাব আছে। অতিরিক্ত ফর্সা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই হয়। তাদের গায়ের রঙের খানিকটা এসে চুলে লেগে যায়। চুল লালচে দেখায়—খানিকটা এসে লাগে চোখে। চোখ তখন আর কালো মনে হয় না। মেয়েটির মুখ লম্বাটে। একটু বোঁচা ধরনের নাক। বোঁচা নাক থাকায় রক্ষা—বোঁচা নাকের কারণেই মেয়েটিকে বাঙালি মনে হচ্ছে। খাড়া নাক হলে মেডিটেরিনিয়ান সমুদ্রের পাশের গ্রিককন্যা বলে মনে হত। বয়স কত হবে? উনিশ থেকে পঁচিশের ভেতর। মানুষের বয়স চট করে ধরতে পারার কোনো পদ্ধতি থাকলে ভালো হত। গাছের রিং গুনে বয়স বলা যায়। মানুষের তেমন কিছু নেই। মানুষের বয়স তার মনে বলেই বোধ হয়। আচ্ছা, একটা মাছি কতদিন বাঁচে?

    স্যার কথা বলছেন না কেন? আমাকে কি স্পাই মেয়ে বলে মনে হচ্ছে?

    স্পাই মেয়েদের চেহারা আলাদা হয় বলে আমি জানি না।

    একটু আলাদা হয়। স্পাই মেয়েদের মুখ দেখে এদের মনের ভাব বোঝা যায় না।

    এদের মুখে এক রকম ভাব মনের ভেতর আরেক রকম।

    তোমারও কি তাই?

    জি। ও আপনাকে বলতে ভুলে গেছি এস বি ছাড়াও আমার আরেকটা নাম আছে। নাম ঠিক না খেতাব। নববর্ষে পাওয়া খেতাব। আমাদের কলেজে পহেলা বৈশাখে খেতাব দেয়া হয়। আমার খেতাবটা হচ্ছে সাদা বাঘিনী। এস বি-তে সাদা বাঘিনীও হয়। সাদা বাঘিনী টাইটেল কেন পেয়েছিলাম শুনতে চান? খুবই মজার গল্প।

    মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। তাঁর কিছুই শুনতে ইচ্ছা করছে না। মাথার যন্ত্রণা এবং শীত ভাব দুইই বাড়ছে। গায়ে পাতলা একটা চাদর দিয়ে শীত ভাবটা কমানো যেত। চাদরটা ধুপিখানায় দিয়েছেন। ধোয়া নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, স্লিপের অভাবে আনতে পারছেন না। স্লিপটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। কড়া এক কাপ চা খেলেও শীতটা কমত। ঘরে চায়ের পাতা আছে, চিনি, দুধও আছে। গতকালই কিনে এনেছেন। কিন্তু গ্যাসের চুলায় কী একটা সমস্যা হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগুন জ্বলেই হুস করে নিভে যায়। মিস্ত্রি ডাকিয়ে চুলা ঠিক করা দরকার। গ্যাস মিস্ত্রিরা কোথায় থাকে কে জানে?

    সায়রা বানু মেয়েটি হড়বড় করে কথা বলে যাচ্ছে, তার কথা তিনি মন দিয়ে শুনছেন না। মাথায় দুশ্চিন্তা নিয়ে অন্য কিছুতে মন বসানো বেশ কঠিন। তবে মাছিটা এখন শান্ত হয়েছে। টেবিলের উপর চুপ করে বসে আছে। ডিম পাড়ছে না তো?

    ‘আমার সাদা বাঘিনী টাইটেল পাওয়ার ঘটনাটা খুব ইন্টারেস্টিং। শুনলে আপনি খুব মজা পাবেন। বলব?’

    মিসির আলি কিছুই বললেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন মেয়েটি তার গল্প বলবেই। তিনি বলতে বললেও বলবে, বলতে না বললেও বলবে।

    ‘হয়েছে কী শুনুন—সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে দিয়ে আমি যাচ্ছি। আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধু, রাকা। রাকা হচ্ছে বোরকাওয়ালী। বোরকা পরে। সউদি বোরকা। বেশ কয়েক টাইপ বোরকা পাওয়া যায় তা কি আপনি জানেন? সউদি বোরকা, পাকিস্তানি বোরকা। সউদি বোরকা ভয়াবহ, শুধু চোখ দুটো বের হয়ে থাকে। এমনিতে সে অবিশ্যি খুব স্টাইলিস্ট। বোরকার নিচে স্লিভলেস ব্লাউজ পরে। যাই হোক বোরকাওয়ালী রাকা হঠাৎ বলল, সে একটা পেনসিল কিনবে। আমি তাকে নিয়ে একটা দোকানে ঢুকলাম পেনসিল কিনতে। স্টেশনারির দোকান তবে তার সঙ্গে কনফেকশনারিও আছে। চা বিক্রি হচ্ছে। কেক বিক্রি হচ্ছে। দোকানটায় বেশ ভিড়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এক লোক করল কী বোরকাওয়ালীর গায়ে হাত দিল। গায়ে মানে কোথায় তা আপনাকে বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগবে। বোরকাওয়ালী এমন ভয় পেল যে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আমি বোরকাওয়ালীকে ধরে ফেললাম। তারপর বদমাশ লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি ওর গায়ে হাত দিলেন কেন? ষণ্ডাগণ্ডা টাইপের লোক। লাল চোখ। গরিলাদের মতো লোম ভরতি হাত। সে এমন ভাব করল যে আমার কথাই শুনতে পায় নি। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে বলল—দেখি একটা লেবু চা। তখন আমি খপ করে তার হাত ধরে ফেললাম। সে ঝটকা দিয়ে তার হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল কিন্তু তার আগেই আমি তার হাত কামড়ে ধরলাম। যাকে বলে কচ্ছপের কামড়। কচ্ছপের কামড় কী তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। কচ্ছপ একবার কামড়ে ধরলে আর ছাড়ে না, আমিও ছাড়লাম না। আমার মুখ রক্তে ভরে গেল। লোকটা বিকট চিৎকার শুরু করল। ব্যাপারস্যাপার দেখে বোরকাওয়ালী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এর পর থেকে আমার টাইটেল হয়েছে সাদা বাঘিনী।’

    গল্প শেষ করে সায়রা বানু খিলখিল করে হাসছে। মিসির আলি মেয়েটির হাসির মাঝখানেই বললেন, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?

    ‘গল্প করার জন্যে এসেছি। বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে গল্প করতে আমার খুব ভালো লাগে।’

    ‘আমি বিখ্যাত মানুষ?’

    ‘অবশ্যই বিখ্যাত। আপনাকে নিয়ে কত বই লেখা হয়েছে। আমি অবিশ্যি একটা মাত্র বই পড়েছি। ওই যে সুধাকান্ত বাবুর গল্প। একটা মেয়ে খুন হল আর আপনি কেমন শার্লক হোমসের মতো বের করে ফেললেন—সুধাকান্ত বাবুই খুনটা করেছেন। বই পড়ে মনে হচ্ছিল আপনার খুব বুদ্ধি কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না।’

    ‘আমাকে দেখে কেমন মনে হচ্ছে?’

    ‘খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। আপনার মধ্যে একটা গৃহশিক্ষক গৃহশিক্ষক ব্যাপার আছে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিয়মিত বেতন পান না এমন একজন অংকের স্যার। আপনি রোজ ভাবেন আজ বেতনের কথাটা বলবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলতে পারেন না। আচ্ছা আপনি এমন গম্ভীর মুখে বসে আছেন কেন? মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনে মজা তো পাচ্ছেনই না উল্টো বিরক্ত হচ্ছেন। সত্যি করে বলুন আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন?’

    ‘কিছুটা হচ্ছি।’

    ‘মাছিটা তো এখন আর বিরক্ত করছে না। কেমন শান্ত হয়ে টেবিলে বসে আছে। তারপরেও আপনি এত বিরক্ত কেন বলুন তো?’

    ‘তুমি অকারণে কথা বলছ এই জন্যে বিরক্ত হচ্ছি। অকারণ কথা আমি নিজেও বলতে পারি না অন্যের অকারণ কথা শুনতেও ভালো লাগে না।’

    ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে হলে সব সময় একটা কারণ লাগবে? তা হলে তো আপনি খুবই বোরিং একটা মানুষ। এত কারণ আমি পাব কোথায় যে আমি রোজ রোজ আপনার সঙ্গে কথা বলব?’

    মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘তুমি রোজ রোজ আমার সঙ্গে কথা বলবে?’

    ‘হুঁ।’

    ‘সে কী, কেন?’

    সায়রা বানু খুব সহজ ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘এক বাড়িতে থাকতে হলে কথা বলতে হবে না?’

    ‘এক বাড়িতে থাকবে মানে? আমি বুঝতে পারছি না।’

    ‘আমি আপনার সঙ্গে কয়েকটা দিন থাকব। কদিন এখনো বলতে পারছি না। দু দিনও হতে পারে আবার দু মাসও হতে পারে। আবার দু বছরও হতে পারে। সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার উপর।’

    মিসির আলি চেয়ার থেকে পা নামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালেন। হচ্ছেটা কী? এই যুগের টিনএজার মেয়েদের ভাবভঙ্গি, কাণ্ডকারখানা বোঝা মুশকিল। তারা যে কোনো উদ্ভট কিছু হাসিমুখে করে ফেলতে পারে। মেয়েটি হয়তো অতি তুচ্ছ কারণে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। কিংবা তাকে ভড়কে দেবার জন্যে গল্প ফেঁদেছে। পরে কলেজে বন্ধুদের কাছে এই গল্প করবে। বন্ধুরা মজা পেয়ে একে অন্যের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়বে। —ও মাগো বুড়োটাকে কী বোকা বানিয়েছি! সে বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে আমি থাকতে এসেছি।

    মিসির আলি নিজের বিস্ময় গোপন করে সহজভাবে বললেন, ‘তুমি এ বাড়িতে থাকবে?’

    ‘জি।’

    ‘বিছানা বালিশ নিয়ে এসেছ?’

    ‘বিছানা বালিশ আনি নি। আজকাল তো আর বিছানা বালিশ নিয়ে কেউ অন্যের বাড়িতে থাকতে যায় না। শুধু একটা স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ এনেছি। আর একটা পানির বোতল।’

    ‘স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ কোথায়?’

    ‘বারান্দায় রেখে এসেছি। শুরুতেই আপনি আমার স্যুটকেস দেখে ফেললে ঢুকতে দিতেন না। যাই হোক আমি এখন আমার স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে আসছি। আচ্ছা আপনি এমন ভাব করছেন যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। আকাশ থেকে পড়ার মতো কিছু হয় নি। বিপদগ্রস্ত একজন তরুণীকে কয়েকদিনের জন্যে আশ্রয় দেয়া এমন কোনো বড় অন্যায় না। আমি নিশ্চিত এরচে অনেক বড় বড় অন্যায় আপনি করেছেন।’

    ‘তুমি সত্যি সত্যি আমার এখানে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ?’

    ‘জি।’

    মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। এই মুহূর্তে তাঁর ঠিক কী করা উচিত তা মাথায় আসছে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মেয়েটির কাণ্ডকারখানা দেখাই মনে হয় সবচে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মেয়েটি বুদ্ধিমতী। এই পরিস্থিতিতে তিনি কী করবেন বা করতে পারেন সেই সম্পর্কে চিন্তাভাবনা সে নিশ্চয়ই করেছে। নিজেকে সম্ভাব্য সব রকম পরিস্থিতির জন্যে সে প্রস্তুত করে রেখেছে। মিসির আলির এমন কিছু করতে হবে যার সম্পর্কে মেয়েটির প্রস্তুতি নেই। সে কেন বাড়ি ছেড়ে এসেছে এই মুহূর্তে তা তাকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। কারণ এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক এবং সঙ্গত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটি তৈরি করে রেখেছে। তাঁর বিস্মিত হওয়াও ঠিক হবে না। তাঁকে খুব সহজ এবং স্বাভাবিক থাকতে হবে। যেন এমন ঘটনা প্রতি সপ্তাহেই দুটা-একটা করে ঘটছে।

    সায়রা বানু স্যুটকেস, হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। মিসির আলি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন সে গুনগুন করে কী একটা গানের সুরও যেন ভাজছে। কত সহজ স্বাভাবিক তার আচরণ।

    ‘কেক খাবেন?’

    ‘কেক?’

    ‘হুঁ। আমার নিজের বেক করা, ডিমের পরিমাণ বেশি হয়েছে বলে একটু ডিম ডিম গন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে ডিমের গন্ধ একেবারে সহ্য করতে পারে না। আমার কাছে অবিশ্যি খারাপ লাগে না। দেব আপনাকে এক পিস কেক?’

    ‘না।’

    ‘আপনাকে একটু বাজারে যেতে হবে, কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে। আমি অতি দ্রুত চলে এসেছি তো কাজেই অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আনা হয় নি। টুথপেস্ট এনেছি, টুথব্রাশ আনি নি। আমার অভ্যাস হচ্ছে রাতে শোবার সময় কুটকুট করে কয়েকটা লবঙ্গ খাওয়া। লবঙ্গ খেলে শরীরের রক্ত পরিষ্কার থাকে, কখনো হার্টের অসুখ হয় না। সেই লবঙ্গ আনা হয় নি। আপনাকে লবঙ্গ আনতে হবে। পারবেন? আমি আপনাকে টাকা দিয়ে দেব। আমি সঙ্গে করে অনেক টাকা নিয়ে এসেছি। বলুন তো কত এনেছি?’

    ‘বলতে পারছি না।’

    ‘অনুমান করুন। আপনি হচ্ছেন বিখ্যাত মিসির আলি। আপনার অনুমান হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুমান। বলুন আমার সঙ্গে কত টাকা আছে।’

    ‘পাঁচ হাজার টাকা।’

    ‘হয় নি। আমার সঙ্গে আছে মোট একান্ন হাজার টাকা। পাঁচ শ টাকার একটা বান্ডিল এনেছি আর এনেছি দশ টাকার একটা বান্ডিল। সেখান থেকে কিছু খরচ করেছি। বেবিট্যাক্সি ভাড়া দিয়েছি তিরিশ টাকা। ঠিক এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে পঞ্চাশ হাজার নয় শ সত্তর টাকা। আপনাকে টুকটাক বাজারের জন্যে পাঁচ শ টাকা দিচ্ছি, যা লাগে খরচ করবেন বাকিটা ফেরত দেবেন। এই নিন।’

    সায়রা বানু তার কাঁধে ঝুলানো কালো ব্যাগ খুলে টাকা বের করল। মিসির আলি টাকাটা নিলেন। মেয়েটি এক ধরনের খেলা শুরু করেছে। মিসির আলির মনে হল মেয়েটিকে সেই খেলা তার মতোই খেলতে দেয়া উচিত। এই মুহূর্তে এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে খেলা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি মেয়েটিকে আগ্রহ নিয়ে দেখতে শুরু করেছেন—তার তাকানোর ভঙ্গি, হাঁটার ভঙ্গি, বসার ভঙ্গি। আপাতদৃষ্টিতে এইসব খুবই ছোটখাটো ব্যাপার থেকে অনেক কিছু জানা যায়।

    সায়রা বানু চেয়ারে বসতে বসতে বলল, আমার খাওয়া নিয়ে আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। যা খাওয়াবেন আমি তাই খাব। শুধু মাছ ছাড়া। মাছ আমি খেতে পারি না—গন্ধ লাগে। অবিশ্যি চিংড়ি মাছ খাই। চিংড়ি মাছ কেন খাই বলুন তো?

    ‘বলতে পারছি না।’

    ‘চিংড়ি মাছ খাই কারণ চিংড়ি মাছ হচ্ছে আসলে এক ধরনের পোকা। পোকা বলেই চিংড়ি মাছে আঁশটে গন্ধ নেই। ও আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি। আরেকটা জিনিস খুব পছন্দ করে খাই। ইলিশ মাছের ডিম।’

    ‘মাছের ডিমেরও তো আঁশটে গন্ধ থাকে।’

    ‘ইলিশ মাছের ডিমে থাকে না। আপনি কেভিয়ার খেয়েছেন?’

    ‘না।’

    ‘কেভিয়ার হচ্ছে পৃথিবীর সবচে দামি খাবার। কালো রঙের মাছের ডিম। স্বাদ কী রকম জানেন?’

    ‘যেহেতু খাই নি স্বাদ কেমন তা তো জানার কথা না।’

    ‘স্বাদ কেমন আপনি জানেন। অনেকটা আমাদের শিং মাছের ডিমের মতো। তবে আঁশটে গন্ধ অনেক বেশি। নাক চেপে ধরে আমি একবার খানিকটা খেয়েছিলাম তারপর বমিটমি করে একাকার।’

    মিসির আলি পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। সঙ্গে দেয়াশলাই নেই। দেয়াশলাইয়ের খোঁজে রান্নাঘরে যেতে হবে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েটাকে কি বলবেন দেয়াশলাই এনে দিতে? মিসির আলিকে কিছু বলতে হল না। তার আগেই সায়রা বানু বলল, ‘আপনার লাইটার লাগবে?’

    ‘আছে তোমার কাছে?’

    ‘আছে। আপনি সিগারেট মুখে দিন আমি ধরিয়ে দিচ্ছি।’

    মেয়েটা যে ভঙ্গিতে লাইটার ধরাল তাতে মনে হল সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে তার অভ্যাস আছে। সে নিজে সিগারেট খায় না তো? না খায় না, সিগারেটের ধোঁয়ায় সে নাক কুঁচকাচ্ছে।

    ‘এই লাইটারটা আপনি রেখে দিন। লাইটারটা আমি আপনার জন্যে এনেছি।’

    ‘থ্যাংক য়্যু।’

    ‘আর এক প্যাকেট সিগারেটও এনেছি। আপনার একটা বইয়ে পড়েছিলাম একজন কে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসত। যেদিনই আসত আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসত।’

    মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, ‘একটু আগে বলেছিলে তুমি আমার একটা বইই পড়েছ।’

    ‘মিথ্যা কথা বলেছিলাম। অনেকগুলি বই পড়েছি। সুধাকান্ত বাবুর উপর লেখা বইটা সবচে ভালো লেগেছে। ওইটা আমি পড়েছি তিনবার। না তিনবার না। আড়াইবার পড়েছি। দুবার পড়েছি পুরোটা। শেষ বার পড়েছি শুধু শেষের কুড়ি পাতা।’

    ‘ভালো।’

    ‘মিথ্যা কথা বললে কি আপনি রেগে যান?’

    ‘না।’

    ‘আমাকে কেউ মিথ্যা কথা বললে আমি অবিশ্যি খুব রেগে যাই। আর আমার এমনই কপাল যে সবাই শুধু আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে। তবে আপনি বলবেন না সেটা আমি জানি। আপনার চেহারা দেখেই বোঝা যায় আপনি মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। আপনি কি জানেন যারা সব সময় মিথ্যা কথা বলে তাদের চেহারায় একটা মাইডিয়ার ভাব থাকে।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জি।’

    ‘যেসব মেয়েকে দেখবেন খুব মায়া মায়া চেহারা, আপনি ধরেই নিতে পারেন তারা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে।’

    ‘এই তথ্য জানতাম না।’

    ‘আপনি মিসির আলি আর আপনি এই সাধারণ তথ্য জানেন না? অথচ বইয়ে কত আশ্চর্য আশ্চর্য কথা যে আপনার সম্পর্কে লেখা হয়। যেমন কাউকে এক পলক দেখেই আপনি তার সম্পর্কে হড়বড় অনেক কথা বলে দিতে পারেন। আসলেই কি পারেন?’

    ‘না। পারি না।’

    ‘আচ্ছা চেষ্টা করে দেখুন না। আমার সম্পর্কে বলুন।’

    ‘কী বলব?’

    ‘আমাকে দেখে কী মনে হচ্ছে। এইসব। দেখি আপনার পাওয়ার অব অবজারভেশন।’

    ‘দেখ সায়রা বানু, আমি পরীক্ষা দেই না।’

    ‘পরীক্ষা ভাবছেন কেন? ভাবেন একটা খেলা। বলুন আমার সম্পর্কে বলুন।’

    মিসির আলি হাতের সিগারেট ফেলে দিলেন। আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করছে। তিনি নিজের ওপর একটু বিরক্ত হচ্ছেন কারণ তাঁর টেনশান হচ্ছে। টেনশান হলেই একটা সিগারেট শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করে। তাঁর শরীর ভালো না। এখন কিছুদিন টেনশান ফ্রি জীবন যাপন করতে চান। অজানা-অচেনা একটা মেয়ে হুট করে উপস্থিত হয়ে তাতে বাধা দিচ্ছে।

    মেয়েটি আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘কী হল কিছু বলছেন না কেন?’

    মিসির আলি খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘তোমার সম্পর্কে আমার প্রথম অবজারভেশন হচ্ছে তোমার নাম সায়রা বানু নয়।’

    ‘এরকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘মনে হবার কারণ হচ্ছে—সায়রা বানু যদি তোমার নাম হত তা হলে সায়রা বানু ডাকলে তুমি সহজ ভাবে রেসপন্স করতে। একটু আগে আমি বললাম, দেখ সায়রা বানু পরীক্ষা আমি দেই না। বাক্যটা আমি একবারে বলি নি। দেখ সায়রা বানু, বলে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করেছি। যখন দেখলাম তুমি হঠাৎ চমকে উঠলে তখনই আমি বাক্যটা শেষ করলাম। তোমার চমকে ওঠার কারণ হচ্ছে সায়রা বানু বলে যে তোমাকে সম্বোধন করা হচ্ছে তা তুমি শুরুতে বুঝতে পার নি। যখন বুঝতে পেরেছ তখনই চমকে উঠেছ। তোমার নাম কী?’

    ‘আমার নাম চিত্রা।’

    ‘তোমার সম্পর্কে আমার দ্বিতীয় অবজারভেশন হচ্ছে তোমাকে দীর্ঘদিন একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। আলোহীন একটা ঘরে দীর্ঘদিন থাকলে গায়ের চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তোমার তাই হয়েছে। তুমি আলোর দিকে ঠিকমতো তাকাতেও পারছ না। যতবার তাকাচ্ছ ততবার চোখের মণি ছোট হয়ে আসছে। ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে। আবার জানালা থেকে তুমি চোখ ফিরিয়েও নিতে পারছ না। বারবার বিস্মিত চোখে জানালা দিয়ে তাকাচ্ছ। কারণ অনেকদিন পরে তুমি জানালায় খোলা আকাশ দেখছ।’

    ‘আরো কিছু বলবেন?’

    ‘দীর্ঘদিন ধরে তুমি ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছ। যে কোনো কারণেই হোক তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। স্টোরি তৈরি করতে হচ্ছে। মিথ্যা বলাটা তোমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি কি ঠিক বলেছি?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘তোমার হাত বাঁধা ছিল। মণিবন্ধে কালো দাগ পড়ে গেছে।’

    ‘হুঁ।’

    ‘তোমার ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল। তুমি কিছুক্ষণ পরপরই নাক কুঁচকাচ্ছ। এবং তাকাচ্ছ ঘরের দক্ষিণ দিকে। দক্ষিণ দিক থেকে নর্দমার দুর্গন্ধ আসছে। সেটা এত প্রবল না যে এমনভাবে নাক কুঁচকাতে হবে। এর থেকে মনে হয়–হয় তোমার ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রবল আর নয়তো তোমাকে অনেক উঁচু কোনো ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, ছ তলা-সাত তলায় যেখানে রাস্তার নর্দমার গন্ধ পৌঁছে না।’

    চিত্রা চুপ করে রইল। সে খুব একটা বিস্মিত হল বলে মনে হল না। মিসির আলি বললেন, ‘এখন বল, তোমার ব্যাপারটা কী?’

    ‘আপনি তো কিছু না জেনেই অনেক কিছু বলতে পারেন। আপনি নিজেই বলুন।’

    ‘না আমি বলতে পারছি না।’

    ‘অনুমান করুন। দেখি আপনার অনুমানশক্তি আমার ঘ্রাণশক্তির মতো কি না।’

    ‘আমার ধারণা তুমি অসুস্থ। অসুস্থতাটা এমন যে রোগীকে ঘরে আটকে রাখতে হয়। তুমি কোনোক্রমে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছ।’

    ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে আমি পাগল তাই আমাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল? না আমি পাগল না। সুস্থ। ছিটেফোঁটা পাগলামি যা অন্যদের মধ্যে থাকে আমার তাও নেই। তবে আমাকে ঘরে আটকে রাখা হচ্ছিল তা ঠিক। ছাব্বিশ দিন হল ঘরে তালাবন্ধ। আমাকে সবাই মিলে ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছে। কারণটাও খুব সাধারণ এবং আপনার মতো বুড়োর কাছে হয়তো বা হাস্যকর। কারণটা বলব?’

    মিসির আলি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। মেয়েটির স্বভাব যা তাতে তিনি যদি বলেন হ্যাঁ বল—তা হলে সে নিশ্চিতভাবেই বলবে—না বলব না। তারচে চুপ করে থাকাই ভালো।

    ‘ব্যাপারটা প্রেমঘটিত। আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। দরিদ্র ফালতু টাইপ ছেলে। কিছুই করে না। তার প্রেমে পড়ার কারণ নেই। তারপরেও আমি পড়ে গেছি এবং এবং…’

    ‘এবং কী?’

    ‘গোপনে বিয়ে করার জন্যে তার সঙ্গে পালিয়েও গিয়েছিলাম। আমাকে ধরে আনা হয়। আমি তো খুব জেদি মেয়ে, কাজেই আমি সবাইকে বলি—আমি আবারো পালিয়ে যাব। তোমাদের কোনো সাধ্য নেই আমাকে ধরে রাখার।’

    ‘ছেলেটার নাম কী?’

    ‘ছেলেটার নাম দিয়ে আপনার দরকার কী?’

    ‘কোনো দরকার নেই। কৌতূহল বলতে পার।’

    ‘উনার নাম ফরহাদ।’

    ‘শুধুই ফরহাদ?’

    ‘ফরহাদ খান।’

    ‘তারপর?’

    ‘তারপর আবার কী?’

    ‘তোমার কাছ থেকে এই কথা শোনার পর তারা তোমাকে তালাবন্ধ করে রাখল?’

    ‘তাই তো রাখবে। যে মেয়ে এ জাতীয় কথা বলে তাকে নিশ্চয়ই কেউ কোলে করে ঘুরে বেড়াবে না। ঘুমপাড়ানি গান গাইয়ে ঘুম পাড়াবে না।’

    ‘আজ তুমি ছাড়া পেয়েছ, আমার কাছে না এসে ওই ছেলেটির কাছে চলে যাচ্ছ না কেন?’

    ‘যাব তো বটেই। আপনার কি ধারণা আমি চিরকালের জন্যে আপনার সঙ্গে থাকব?’

    ‘মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, চিত্রা তুমি আবারো মিথ্যা কথা বলছ।’

    ‘বুঝলেন কী করে?’

    ‘ছেলেটার নাম কী বল জিজ্ঞেস করার পর—থতমত খেয়ে গেলে। চট করে বলতে পারলে না। একটা কোনো নাম ভাবার জন্যে সময় নিলে। তারপর বললে উনার নাম ফরহাদ। উনি বললে—যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছ তার প্রসঙ্গে উনি বলবে কেন? বলবে ওর নাম ফরহাদ।’

    ‘তা হলে কি সত্যি কথা শুনতে চান?’

    ‘আমি এখন সত্যি-মিথ্যা কোনো কথাই শুনতে চাই না। তুমি আমার সাহায্য চাচ্ছ। যদি সত্যি চাও আমি তোমাকে সাহায্য করি, তা হলে তোমাকে সত্যি কথা বলতে হবে। তা তুমি পারবে না। মিথ্যা বলাটা তোমার রক্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। কিছুক্ষণ সত্যি বলার পর আবার মিথ্যা শুরু করবে।’

    ‘তাতে অসুবিধা কী? যেই মুহূর্তে আমি মিথ্যা বলব আপনি ধরে ফেলবেন। আপনার তো সেই ক্ষমতা আছে।’

    মিসির আলি আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন—‘চিত্রা শোন আমার পক্ষে তোমাকে এ বাড়িতে রাখা সম্ভব না। তোমাকে চলে যেতে হবে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যেতে হবে।’

    ‘আমার সমস্যা আপনি সমাধান করবেন না?’

    ‘মানুষের বেশিরভাগ সমস্যাই এরকম যে তা তারা নিজেরাই সমাধান করতে পারে। আমার ধারণা তোমার সমস্যার সমাধান তুমিই করতে পারবে।’

    ‘আমি আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি বলে কি আপনি রাগ করেছেন?’

    ‘রাগ করার প্রশ্ন আসছে না। মিথ্যা কথা বলাটাকে সবাই যতবড় অন্যায় মনে করে আমি তা করি না। আমার কাছে মনে হয় মানুষের অনেক অদ্ভুত ক্ষমতার একটি হচ্ছে মিথ্যা বলার ক্ষমতা। কল্পনাশক্তি আছে বলেই সে মিথ্যা বলতে পারে। যে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না সে সৃষ্টিশীল মানুষ না—রোবট টাইপ মানুষ।’

    ‘আপনি কি মিথ্যা বলেন?’

    ‘না বলি না। মানুষ হিসেবে আমি রোবট টাইপের। শোন চিত্রা, তুমি এখন চলে যাও।’ চিত্রা বিস্মিত গলায় বলল, ‘চলে যাব?’

    ‘হ্যাঁ চলে যাবে।’

    ‘আপনি আমাকে খুব অপছন্দ করেছেন তাই না?’

    ‘আমি তোমাকে অপছন্দও করি নি আবার পছন্দও করি নি।’

    ‘আমার বিষয়ে আপনার কোনো কৌতূহলও হচ্ছে না?’

    ‘লোকজনের ধারণা আমার কৌতূহল খুব বেশি, আসলে তা না। আমার কৌতূহল কম। অনেক কম।’

    ‘নীল রঙের মাছিটার দিকে আপনি যতটা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়েছেন আমার দিকে তাও তাকান নি। আমি কি মাছির চেয়েও তুচ্ছ?’

    মিসির আলি চুপ করে রইলেন।

    চিত্রা ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি দয়া করে গম্ভীর হয়ে থাকবেন না। যাবার আগে হাসিমুখে থাকুন। আপনার হাসিমুখ দেখে যাই।

    মিসির আলি হাসলেন। চিত্রা বলল, বাহ আপনার হাসি তো সুন্দর। যারা গম্ভীর ধরনের মানুষ তাদের হাসি খুব সুন্দর হয়। এরা হঠাৎ হঠাৎ হাসে তো এই জন্যে। আর যারা সব সময় হাসিমুখে থাকে তাদের হাসি হয় খুব বিরক্তিকর। তাদের কান্না হয় সুন্দর। আচ্ছা আমি তা হলে এখন উঠি।

    চিত্রা উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা এত সহজে চলে যেতে রাজি হবে তা মিসির আলি ভাবেন নি। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

    ‘আচ্ছা শুনুন, আমি আমার ব্যাগগুলি রেখে যাই। ব্যাগ হাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্রয় খোঁজার তো কোনো মানে হয় না, তাই না?’

    ‘বিছানা বালিশ নিয়ে যাওয়াই তো ভালো, সবাই ভাববে এই মেয়ের আসলেই আশ্রয় প্রয়োজন।’

    ‘আপনি কিন্তু সেরকম ভাবেন নি। আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। যাই হোক আমি জিনিসপত্র রেখে যাচ্ছি। একসময় এসে নিয়ে যাব।’

    ‘আচ্ছা।’

    ‘আপনি আসলেই রোবট টাইপ মানুষ। যাই কেমন?’

    ‘তুমি কি তোমার বাড়ির টেলিফোন নাম্বারটি দিয়ে যাবে?’

    ‘কেন? আচ্ছা দিচ্ছি। কাগজে লিখে দিচ্ছি। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না। আর যদি করেন আপনি ভয়াবহ বিপদে পড়ে যাবেন। এইবার কিন্তু আমি সত্যি কথা বলছি—কি বলছি না?’

    ‘মনে হচ্ছে বলছ।’

    চিত্রা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে কাগজ নিয়ে টেলিফোন নাম্বার লিখল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, এই নিন নাম্বার। আবারো বলছি নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না।

    ‘নিতান্ত প্রয়োজন বলতে তুমি কী বুঝাচ্ছ?’

    ‘ধরুন আমি আপনার ঘর থেকে বের হলাম। আর হঠাৎ একটা ট্রাক এসে আমার গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল তখন আপনি বাসায় টেলিফোন করে বলবেন—–চিত্রা মারা গেছে।’

    ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

    চিত্রা বেশ সহজ ভঙ্গিতেই বের হল। মিসির আলি উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তিনি আজ আর ঘর থেকে বের হবেন না। তিনি জানেন ঘণ্টা দু-একের ভেতর চিত্রা ফিরে আসবে, তার জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। মেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কোথাও রেখে স্বস্তি পায় না। কাজেই অপেক্ষা করাই ভালো।

    খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার মেয়েটি চলে যাবার পর মিসির আলির একটু মন খারাপ হয়ে গেল। পাখি উড়ে যাবার পর পাখির পালক পড়ে থাকে। মেয়েটা চলে গেছে তার পরেও কিছু যেন রেখে গেছে। স্যুটকেস এবং হ্যান্ডব্যাগ নয়, অন্য কিছু।

    মেয়েটির রেখে যাওয়া ৫০০ টাকার নোটটা পকেটে। টাকাটা ফেরত দিতে ভুলে গেছেন। আশ্চর্য কাণ্ড—মেয়েটি তার কালো ব্যাগও ফেলে গেছে। তার সব টাকা তো ওই ব্যাগে। বেবিট্যাক্সি নিয়ে যদি কোথাও যায় ভাড়া দিতে পারবে না।

    মিসির আলি অস্বস্তি বোধ করছেন। মেয়েটাকে মাথা থেকে তাড়াতে পারছেন না। মাছিটা এখনো টেবিলে বসে আছে। মারা গেছে নাকি? না মারা যায় নি। কীট এবং পতঙ্গ জগতের নিয়ম হল মৃত্যুর পর উল্টো হয়ে থাকা। পিঠ থাকবে মাটিতে পা থাকবে শূন্যে। মাছির বেলাতেও নিশ্চয়ই সেই নিয়ম। মিসির আলি তার লাইব্রেরির দিকে এগুলেন—মাছি সম্পর্কে জানার জন্যে কোনো বই কি আছে লাইব্রেরিতে? থাকার তো কথা।

    মাছি সম্পর্কে মিসির আলি তেমন কোনো তথ্য যোগাড় করতে পারলেন না। শুধু জানলেন পৃথিবীতে মোট ৮৫,০০০ প্রজাতির মাছি আছে। মৌমাছি যেমন মাছি, ড্রাগন ফ্লাইও মাছি। সবচে ছোট মাছি প্রায় অদৃশ্য আর সবচে বড় মাছি চড়ুই পাখি সাইজের। এদের সবারই দু জোড়া পাখা থাকে। এক জোড়া তারা ওড়ার কাজে ব্যবহার করে অন্য জোড়া ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যবহার করে। বেশিরভাগ প্রজাতির মাছিই মানুষের পরম বন্ধু—শুধু হাউস ফ্লাই নয়। এদের প্রধান কাজ অসুখ ছড়ানো।

  • ময়ূরাক্ষী

    ময়ূরাক্ষী

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ‘ময়ূরাক্ষী’ হুমায়ূন আহমেদের লেখা হিমু ধারাবাহিকের প্রথম উপন্যাস। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের চরিত্র সমূহ হচ্ছে— চৌধুরী খালেকুজ্জামান টুটুল/চৌধুরী ইমতিয়াজ টুটুল – হিমু; মীরা – জাস্টিস এম. সোবাহানের মেয়ে; বাদল – হিমুর ফুফাত ভাই; রিনকি – বাদলের বোন; রূপা – হিমুর বান্ধবী; মজিদ – হিমুর বন্ধু প্রমুখ।

    হিমুর বাবা ছিলেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ তিনি বিশ্বাস করতেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। এই মহাপুরুষ তৈরির জন্যই সে তার স্ত্রীকে হত্যা করে। একসময় হিমুর বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তিনি হিমুকে বলে যান সে যেন ১৬ বছর পর্যন্ত তার মাতৃকুল অর্থাৎ তার মামাদের কাছে থাকে। সাথে এও সতর্ক করে দিয়ে যান তার মামারা পিশাচ প্রকৃতির। পিশাচ শ্রেণির মানুষের সংস্পর্শে না এলে মানুষের সৎ গুণ সম্পর্কে ধারণা হবে না।

    একসময় হিমু বড় হয়। মেট্রিক পাসের পর তার ফুফুর বাড়িতে আসে। সেখানেও এক সমস্যা হয়। তার ফুফাতো ভাই তার সংস্পর্শে এসে তার ভক্ত হয় এবং ৩ বার ইণ্টারমিডিয়েটে ফেল করে। বাদল হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। হিমুর প্রতি রয়েছে তার অগাধ বিশ্বাস।

    ইউনিভার্সিটিতে পড়ার ২ বছর পর প্রথম কথা হয় রূপার সাথে। একসময় সে ভালোবেসে ফেলে হিমুকে কিন্তু হিমু তাকে ধরা দেয় না ঠিক তেমনিই চলেও যায় না সে। সে যে মহাপুরুষ হওয়ার সাধনা করছে সে কেমন করে স্বাভাবিক হয়ে রূপার কাছে যাবে।

  • মায়াবিনী

    মায়াবিনী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    বিজ্ঞাপন

    প্রথম বার।

    গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল।

    দ্বিতীয় বার।

    এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।

    গ্রন্থকার

  • দরজার ওপাশে

    দরজার ওপাশে

    হুমায়ূন আহমেদ

    দরজার ওপাশে

    ‘দরজার ওপাশে’ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত হিমু ধারাবাহিকের দ্বিতীয় উপন্যাস। নব্বই দশকে হিমুর প্রথম উপন্যাস ময়ূরাক্ষী প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। ‘দরজার ওপাশে’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালের মে মাসে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ৩৮/ক বাংলাবাজার, ঢাকা থেকে।

    হিমুর বন্ধু রফিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। চাকরি রক্ষা করতে রফিক হিমুর কাছে আসে। হিমুর এক বন্ধু জহির, তার পিতা একজন মন্ত্রী, হিমু ঠিক করে তার কাছেই যেতে হবে। এজন্য প্রথমে সে মন্ত্রীর নজর কাড়ার ব্যবস্থা করে যা থেকে বহু ঘটনা জন্ম নেয়।

    এভাবেই দরজার ওপাশের কাহিনী এগিয়ে চলে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী মোবারক হোসেন, কাহিনীচক্রে যিনি মন্ত্রিত্ব হারান; তার পালিয়ে যাওয়া পুত্র জহির; হিমুর চাকরি হারানো বন্ধু রফিক ও তার স্ত্রী যুথী; পুলিশের ওসি মোহাম্মদ সিরাজুল করিম ও তার অসুস্থ স্ত্রী; এবং হিমুর ছোট মামাকে নিয়ে। এছাড়া হিমু তো আছেই, সঙ্গে আছে হিমু ধারাবাহিকের নিময়িত চরিত্র বড় ফুপা, বড় ফুপু এবং বাদল।

    প্রস্তাবনা

    তার ডাক নাম হিমু। ভাল নাম হিমালয়। বাবা আগ্রহ করে হিমালয় নাম রেখেছিলেন, যেন বড় হয়ে সে হিমালয়ের মত হয়—বিশাল ও বিস্তৃত, কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নয়। হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। ইচ্ছে করলে তিনি ছেলের নাম সমুদ্র রাখতে পারতেন। সমুদ্রও বিশাল এবং বিস্তৃত। সমুদ্রকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। তার চেয়েও বড় কথা, সমুদ্রে আকাশের ছায়া পড়ে। কিন্তু তিনি সমুদ্র নাম না রেখে রাখলেন হিমালয়। কঠিন মৌন পর্বতমালা, যার গায়ে আকাশের ছায়া পড়ে না ঠিকই কিন্তু সে নিজেই আকাশ স্পর্শ করতে চায়। হিমুর বাবা চেয়েছিলেন হিমু একজন মহাপুরুষ হবে যে মহাপুরুষ পরম সত্য জানেন। কিন্তু হিমু কি চেয়েছিল? আমরা তার বাবার আকাঙ্ক্ষার কথা জানি, হিমুর আকাঙ্ক্ষা জানি না। সে কিসের সন্ধান করে বা আসলেই সে কোন কিছুর সন্ধান করে কি-না তা নিয়েই লেখা হল ‘দরজার ওপাশে’। যদিও আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গে লেখাটি লিখেছি তবু বিনীত অনুরোধ করছি কেউ যেন গুরুত্বের সঙ্গে লেখাটি গ্রহণ না করেন। মিসির আলী নামে আমার একটি চরিত্র আছে। সে কাজ করে লজিক নিয়ে। তার চিন্তাভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা যায় কিন্তু হিমু কাজ করে ‘এন্টি-লজিক’ নিয়ে। আমাদের এই জগতে ‘এন্টি-লজিকে’র স্থান নেই।

    ৫ই মে ১৯৯২
    হুমায়ূন আহমেদ
  • শিক্ষা ও সভ্যতা

    শিক্ষা ও সভ্যতা

    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

    [book]

    প্রথম সংস্করণ আশ্বিন, ১৩৩৪। ক্যালকাটা পাবলিশার্স, কলেজ ষ্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা। প্রকাশক শ্রীবারিদকান্তি বসু। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮ + ১৪৮। কলিকাতা, ৩১নং সেণ্ট্রাল এভিনিউ আর্ট প্রেসে শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখার্জ্জি, বি-এ কর্ত্তৃক মুদ্রিত। দাম দেড় টাকা। এই গ্রন্থে শিক্ষার লক্ষ্য, অন্নচিন্তা, রোম, আর্য্যামি, বৈশ্য, সবুজের হিন্দুয়ানী, ধর্ম্ম-শাস্ত্র, চাষী, ভারতবর্ষ, তুতান্-খামেন্, গণেশ — ইত্যাদি প্রবন্ধসমূহ সংকলিত হয়েছে।


    উৎসর্গ

    ৺পিতৃদেবের স্মরণে


    মুখবন্ধ

    এ বইএর প্রবন্ধগুলির বেশীর ভাগ ‘সবুজ পত্রে’, আর বাকী কয়েকটি কয়েকখানা সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘সবুজের হিন্দুয়ানী’ প্রবন্ধটি নবপর্যায় ‘সবুজ পত্রের’ প্রথম সংখ্যার জন্য লেখা। উপলক্ষ্যের উপযোগী আকারটি বদলালে বক্তব্য বহাল থাকলেও রসটা ঠিক থাকে না দেখে ওর সে আকারটি আর বদলাইনি। প্রবন্ধগুলিকে পুঁথিতে গেঁথে কিছুদিন বাচিয়ে রাখার চেষ্টা উচিত হ’ল, না পুরণো মাসিক- সাপ্তাহিকের স্তূপের মধ্যে বিস্মৃতির কবর দেওয়াই সমীচীন হ’ত তাতে অবশ্য সন্দেহ আছে। তবে, “বিষবৃক্ষোঽপি সংবদ্ধ স্বয়ং চ্ছেত্ত মসাম্প্রতম্”।

    শ্রীঅতুলচন্দ্র গুপ্ত

    আশ্বিন, ১৩৩৪

  • বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস

    বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস

    [book-name]

    ড. বি. আর. আম্বেদকর

    অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী

    প্রকাশক – ঐতিহ্য

    রুমী মার্কেট ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড

    বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০

    প্রকাশকাল – মাঘ ১৪২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

    প্রচ্ছদ – ধ্রুব এষ

    BUDDHU OTHOBA KARL MARX by Dr. B. R.Ambedkar

    Translated by Audity Falguni

    Published by Oitijjhya

    Date of Publication : February 2023

    উৎসর্গ

    শারমিন মুরশিদ

    এদেশের উন্নয়ন সংগ্রামে যিনি নিরন্তর ব্রতী

    তাপস রায়

    নিষ্ঠাবান সাংবাদিক ও প্রিয় অনুজ

  • তিতাস একটি নদীর নাম

    তিতাস একটি নদীর নাম

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book]

    তিতাস একটি নদীর নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত বিখ্যাত উপন্যাস। এই একটি উপন্যাস লিখে লেখক খ্যাতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে গ্রামের দরিদ্র মালো শ্রেণীর লোকজনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীকালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

    ইতিহাস

    প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩৬৩

    ২০৬, বিধান সরণি, কলিকাতা-৬, পুথিঘরের পক্ষে শ্রীঅনিলকুমার ভট্টাচার্য কর্তৃক প্রকাশিত ও ৬ শিবুবিশ্বাস লেন, কলিকাতা-৬, তাপসী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস হইতে অসিত সরকার কর্তৃক মুদ্রিত।

    দ্বিতীয় প্রকাশ আশ্বিন, ১৩৬৫

    প্রচ্ছদশিল্পী রণেন আয়ন দত্ত

    (ব্লকনির্মাতা রণজিৎ প্রসেস এ্যাণ্ড প্রিণ্টিং ইণ্ডাষ্ট্রিজ)

    ইণ্ডিয়ান ফোটো এনগ্রেভিং কোং প্রাইভেট লিঃ, ২৮ বেনিয়াটোলা লেন, কলিকাতা-৯ হইতে শ্রীদ্বিজেন্দ্রলাল বিশ্বাস কর্তৃক মুদ্রিত ও ২২ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা-৬ পুথিঘরের পক্ষ হইতে শ্রীসতীশ রায় কর্তৃক প্রকাশিত। দাম সাড়ে ছয় টাকা।

    প্রথম সংস্করণ হইতে পুনর্মুদ্রিত

    তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি প্রথমে মাসিক পত্রিকা মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়েছিল। কয়েকটি অধ্যায় মোহাম্মদীতে মুদ্রিত হবার পর উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি রাস্তায় হারিয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব ও অত্যাগ্রহী পাঠকদের আন্তরিক অনুরোধে তিনি পুনরায় কাহিনীটি লেখেন। কাঁচড়াপাড়া হাসপাতালে ভর্তির আগে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বন্ধু-বান্ধবকে দিয়ে যান।1 অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর কয়েক বছর পর তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামের এই উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রস্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে ঋত্বিক ঘটক বলেন:

    তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এ রকম লেখার দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো – সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। … অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এর পরের পুণর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুণর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার তারুণ্যে উজ্জীবিত। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা।2

    কাহিনী

    উপন্যাসটি ৪টি অংশে বিভক্ত এবং প্রত্যেকটি অংশে ২টি করে উপ-অংশ রয়েছে। অর্থাৎ মোট ৮টি অংশে উপন্যাসটি বিস্তৃত।

    তিতাস একটি নদীর নাম

    তিতাস নদীর উৎপত্তি মেঘনা নদী থেকে। মেঘনার জল নদীর এক পাড় ভেঙে জঙ্গল, মাঠ, ময়দানের ভেতর দিয়ে ঘুরে আবার মেঘনায় এসে পড়েছে। মেঘনা থেকে উদভূত এই ধারাই তিতাস নদী নামে পরিচিত। কাহিনীর সুচনাকালে তিতাসকে একটি জলভরা নদী হিসেবে লেখক বর্ণনা করেছেন। সারা বছরেই তিতাসের বুকে জল থাকে। তিতাস থেকে তেরো মাইল দূরে একটি নদী আছে বিজয় নামে। বিজয় নদীতে বর্ষাকাল ছাড়া জল প্রায় থাকে না এবং সেই কারণে বিজয় নদীর তীরে বসবাসকারী মালোদের আর্থিক ও শারীরিক অবস্থা খুবই দৈন্য। এইরকমই আর্থিক অনটনে ক্লিষ্ট দুই ভাই গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ বিজয়নদীর তীরে বাস করত। গৌরাঙ্গের বউ অনাহারে মারা গিয়েছিল। নিত্যানন্দের বউ ও দুই ছেলেমেয়ে ছিল। গৌরাঙ্গ তার দাদাকে পরামর্শ দেয় নয়ানপুরের ধনী বোধাই মালোর হয়ে খাটার জন্য। অন্যদিকে জমিলা বলে একজন নববধু তার স্বামী ছমির মিয়ার সঙ্গে বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে ফেরে নৌকা করে। আসবার পথে সে মালোপাড়ার ঘাটে একটি মেয়েকে দেখে এবং সই হিসেবে বন্ধুত্ত্ব পাতানোর আশা করে।

    প্রবাস খণ্ড

    বাসন্তী তার মাকে ডেকে বলে, “মা, ওমা, দেখ সুবলদাদা কিশোরদাদার কাণ্ড! আমি চৌয়ারি জলে ছাড়তে না ছাড়তে তারা দুইজনে ধরতে গিয়ে কি কাইজ্যা। এ কয় আমি নিমু, হে কয় আমি নিমু। ডরে আর কেউ কাছেও গেল না। শেষে কি মারামারি। আমি কইলাম, দুই জনে মিল্যা বানাইছ দুই জনে নিয়া রাইখ্যা দাও। মারামারি কর কেনে?”

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    তিতাসের পাড়ে বসবাসী মালোদের মধ্যে একজন ছিল দীননাথ মালোর কমবয়েসী মেয়ে বাসন্তী। বাসন্তীর গ্রামেই ছিল কিশোর আর সুবল নামে দুজন ডানপিটে কমবয়েসি ছেলে। তারা দুইজনে মিলে বাসন্তীর মাঘমণ্ডল ব্রতর জন্য চৌয়ারির বানিয়ে দেয়।3 সুবলের বাবা মারা যাওয়ায় সে কিশোরের সঙ্গে নদীতে জাল বাইতো। কিশোর সুবলের থেকে তিন বছরের বড় ছিল। কিন্ত তারা ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের বন্ধু। একদিন কিশোরের বাবা কিশোর ও সুবলকে প্রবীণ জেলে তিলকচাঁদের সঙ্গে উত্তরে শুকদেবপুর গ্রামে পাঠায়। তখন বাসন্তীর বয়স ১১ বছর। কিশোররা শুকদেবপুরের মোড়ল বাঁশিরামের বাড়ি পৌঁছায় মাছ ধরার অনুমতি আদায়ের জন্য। এর মধ্যে চৈত্র মাসের মাঝামাঝিতে দোল পূর্ণিমা এসে যায়। শুকদেব পুরের খলাতে দোল খেলার জন্য শুকদেবপুরের সকলের আমন্ত্রণ পড়ে এবং বাঁশিরাম মোড়লের গাঙের রায়ত হিসেবে কিশোর-সুবলরাও ডাক পায়। দোল খেলার সময় তরুণীরা কিশোরকে রঙ মাখায়। কিন্তু তাকে রঙ মাখাতে গিয়ে একটি অবিবাহিতা তরুণীর হাত কাঁপতে থাকে। দোলের অনুষ্ঠান চলার সময় মেয়েটির সঙ্গে কিশোরের চোখাচোখি হয়। হঠাৎই বাসুদেবপুরের লোকেরা ওখানে আক্রমণ চালায় পুরানো গন্ডগোলের রেশ ধরে। একজন আক্রমণকারী ওই তরুণীর দিকে অগ্রসর হয়, কিশোর তাকে বাঁচাবার জন্য এগিয়ে যায়। মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে গেলে কিশোর মেয়েটিকে পাঁজকোলা করে নিয়ে মেয়েটির মার কাছে নিয়ে যায়। এরপরে বাঁশিরাম মোড়লেরর বউয়ের পৌরোহিত্যে কিশোর ওই মেয়েটির সঙ্গে মালা বদল করে এবং মেয়েটির বাবা ও মা তাকে কিশোরের নৌকায় তুলে দেয়। কিশোরদের নৌকা যাত্রাপথে দুর্যোগের মধ্যে পড়ে, শেষে তারা নয়া গাঙের খাঁড়িতে নৌকা বাঁধে। সেখানে তারা রাতে ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখে যে তাদের নৌকায় ডাকাতি হয়ে গেছে এবং ডাকাতরা কিশোরের বউকে তুলে নিয়ে গেছে। তাদের নৌকা যখন তিতাসের মোহনায় পৌঁছায় তখন কিশোর জলে একজন মহিলাকে ভাসতে দেখে এবং বুঝতে পারে যে ওটা কিশোরেরই বউ এবং তারা মনে করে যে মেয়েটি মারা গেছে। কিশোরের চোখ লাল হয়ে ওঠে; তিলক সুবলকে বলে যে কিশোর পাগল হয়ে গেছে।

    নয়া বসত

    কিশোরের জালে অনেক মাছ উঠিয়াছে। বাঁশের গোড়ায় পা দিয়া, জলের হাতায় টান মারিয়া সে বুক চিতাইল, তার পিঠ ঠেকিল বেদিনীর বুকে। বেদিনী তরুণী, স্বাস্থ্যবতী। তার স্তন দুটি দুর্বিনীতভাবে উচাইয়া উঠিয়াছে। তার কোমল উন্নত স্পর্শ কিশোরের সর্ব শরীরে বিদ্যুতের স্পর্শ তুলিল। … … বেদিনী এক হাত ডান বগলের তলায় ও অন্য হাত বাম কাঁধের উপরে দিয়া বুক পর্যন্ত বাড়াইয়া কিশোরকে নিজের বুকে চাপিয়া ধরিল। অবলম্বন পাইয়া কিশোর পড়িয়া গেল না, কিন্তু দিশা হারাইল …

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    এরপর চার বছর কেটে যায়। গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ দুই বুড়ো একটি বাচ্চা ছেলে অনন্ত ও তার মাকে নিয়ে নৌকায় বের হয়। গৌরাঙ্গ স্বগতোক্তি করে যে অনন্তর মা সে পেটে থাকা অবস্থায় ডাকাতের নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে একটা বালুচরে ওঠে এবং ঘটনাক্রমে এই দুই বুড়োর আশ্রয়ে ভবানীপুরে আসে। তারা ভাবে যে অনন্তর মার বরকে ডাকাতে মেরে ফেলেছে তাই তারা অনন্তর মাকে বিধবার পোশাকেই রাখত। কিন্তু অনন্তর মা জানত যে সে কিশোরের বউ এবং কিশোরের গ্রামের নামও তার মনে ছিল, কিন্তু সে কিশোর অথবা সুবলের নাম জানত না। তাই শেষে তারা অনন্তর মাকে সেই গ্রামে পৌঁছাতে আসে। গ্রামের ঘাটে অনন্তর মা দেখে একজন বুড়ো একটা পাগলকে জোর করে চান করানোর চেষ্টা করছে। গ্রামে অনন্তর মার সঙ্গে সুবলার বউয়ের পরিচয় হয়। অনন্তর মা তার কাছে সূতা কাটা শেখে। অনন্তর মার সঙ্গে আরেকজনের আলাপ হয় সে হল গ্রামের ধনী কালোবরণের মা। কালোর মার কথা থেকে জানা যায় সুবলার বউয়ের আসল নাম বাসন্তী, তার বিয়ে সুবলার সঙ্গে হয় এবং সুবলা মারা যাওয়ার পরে সে সুবলার বউ নামেই পরিচিত হয়। একজন বড় মাতব্বর রামপ্রসাদের পৌরোহিত্যে মঙ্গলা তার সমাজে, যার মধ্যে সুবলার শ্বশুর আর কিশোরের বাবা ছিল, তাতে অনন্তর মাকে অন্তর্ভুক্ত করে। রামপ্রসাদ একদিন রাতে ঘুরতে ঘুরতে বুড়ো রামকেশবের বাড়ি যায়, সেখানে রামকেশবের পাগল ছেলে তাকে মাটিতে গর্ত কেটে বলে “এই তোমার মেঘনা গাঙ, অইখানে খাড়ি। … জাইগ্যা দেখি মাইয়া চুরি হইতাছে।”

    জন্ম মৃত্যু বিবাহ

    গ্রামে কালীপূজা হয়, পূজোতে সবাই চাঁদা দেয়, কিন্তু রামকেশবের চাঁদা মাফ হয়ে যায় তার ছেলে পাগল বলে। রামকেশব চাঁদা না দেওয়ার জন্য সে সঙ্কোচে প্রসাদ খায় না এবং তার ছেলে কিশোরকেও ঘরে বন্ধ করে রাখে পূজোর চারদিন। উত্তরায়ণ সংক্রান্তির দিন মালোরা প্রচুর খরচ করে খাওয়া দাওয়া করে। তাতে রামকেশব ঠিক করে সেও রামপ্রসাদ, মঙ্গলা ও তার ছেলে মোহন, সুবলার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর গ্রামের নতুন বাসিন্দা অনন্তর মাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবে। সুবলার বউ অনন্তর মাকে রামকেশবের বাড়িতে রান্নাঘরে পিঠা বানাতে নিয়ে যায়। সেখানে দুজনের কথোপকথনে জানা যায় যে কিশোর পাগল হয়ে বাড়ি আসার পর, বাসন্তীর বাবা কিশোরের বদলে সুবলের সাথে বাসন্তীর বিয়ে দেয়। সুবল একদিন কালোবরণের নৌকায় জিয়লের ক্ষেপ দিতে যায়। যখন নদীতে হঠাৎ তুফান আসে তখন সবাই নৌকা থেকে ঝাঁপ দিলেও সুবলের উপর নির্দেশ আসে লগি ঠেকিয়ে নৌকা বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তা করতে গিয়ে সে নৌকার তলায় চাপা পড়ে মারা যায়। এরপর থেকে অনন্তর মা প্রায় লুকিয়ে কিশোরকে দেখত। শীতে কিশোরের পাগলামি বেড়ে যায়। এরপর আরেক পাগলের সঙ্গে পড়ে নিজেকে জখম করতে থাকে। শেষে অনন্তর মা বাধ্য হয়ে কিশোরের সেবা করতে শুরু করে এবং কিশোর খানিকটা ভালো হয়ে ওঠে। এরপর দোলের দিন আসে; অনন্তর মা কিশোরকে রঙ মাখাতে যায়। কিন্তু রঙ মাখানোর পর কিশোর হঠাৎ অনন্তর মাকে পাঁজকোলা করে তুলে নেয় আর মূর্ছা যাওয়া অনন্তর মার আবরণ সরে যাওয়া বুকে মুখ ঘষতে থাকে। এসব দেখে গ্রামের মানুষ কিশোরকে প্রচন্ড মারধর করে। মারের চোটে কিশোর পরদিন ভোরে মারা যায়। আর তার চারদিন পরে অনন্তর মা মারা যায়।

    রামধনু

    সুবলের বউকে পাইয়া অনন্তের মা মনের আবেগ ঢালিয়া দেয়, তুমি না কইছিলা ভইন আমার একজন পুরুষ চাই! হ; চাই-ই ত। পুরুষ ছাড়া নারীর জীবনে কানাকড়ি দাম নাই।

    পুরুষ একটা ধর না।

    কই পাই?

    পাগলারে ধর।

    ধরতে গেছলাম। ধরা দিল না।

    ঠিসারা কইর না দিদি।

    আমি ভইন ঠিসারা করি না। সত্য কথাই কই। পাগলা যদি আমারে হাতে ধইরা টান দেয়, আমি গিয়া তার ঘরের ঘরনি হই। আর ভাল লাগে না।… … একলা জীবন চলে না। পাগলেরে পাইলে তারে লখ কইরা জীবন কাটাই।

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    কাদির মিয়া ও তার ছেলের সকরকন্দ আলু বোঝাই নৌকা ভারী বর্ষণে ও জোড়ালো বাতাসে ডুবে যাওয়া উপক্রম হলে বনমালী ও ধনঞ্জয় তাদের ও তাদের আলু উদ্ধার করে নিজেদের জেলে নৌকাতে তুলে নেয়। বনমালী ও কাদির মিয়ার সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে। বনমালী জানায় মালোপাড়ায় তার বোনের বিয়ে হয়েছে, তার পরামর্শে সে ও কাদির মালোপাড়ায় আলু বেচতে যায়। ওখানে অনন্ত কাদির মিয়ার আলুর পসরার সামনে ঘোড়াঘুড়ি করে। বনমালী ও কাদির মিয়া দুইজনেই দেখে অনন্ত বিস্ময় দৃষ্টিতে রামধনুর দিকে তাকিয়ে আছে। বনমালীর অনন্তকে খুব পছন্দ হয়, তাকে নিয়ে একটু ঘুড়ে বেড়ায় ও তাকে একদিন নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়। এদিকে সুবলার বউ অনন্তর পক্ষ থেকে অনন্তর মার শ্রাদ্ধের ব্যবস্থাদি করে। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বনমালীর বোন তদারকি করে, তার ছড়া কাটার ভালো ক্ষমতা ছিল। একদিন ঝড়ে সুবলার বউয়ের, মানে অনন্তর মাসীর, বাবার বাড়ি ভেঙে যায়। বাড়ি পুনরায় বানাতে প্রচুর খরচ হওয়ায় তার বাবা ও মা অনন্তকে, যে ওই বাড়িতেই থাকত, তাকে বিদায় দেওয়ার ইচ্ছা করতে থাকে। কালোবরণের মাও অনন্তকে রাখতে অস্বীকার করে কারণ তাদের বড় নৌকা ঝড়ে ভেঙে যাওয়ায় খুব ক্ষতি হয়েছে। একদিন বাসন্তীর, মানে সুবলার বউয়ের, মা অনন্তকে মারতে যায়, তাই নিয়ে মায়ে মেয়েতে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হয়। এইসব কিছুতে বাসন্তীর মাথা গরম হয়ে যায় ও অনন্তকে বাড়ি থেকে দূর করে দেয়। অনন্ত গামছায় মাছ ধরে, একা ঘুড়ে বেড়ায়, একদিন বনমালীর বোন অর্থাৎ লবচন্দ্রের বউয়ের বাড়ি যায়, কিন্ত পরে নিজেই বেড়িয়ে যায়। কেউ জানত না সে কোথায় থাকে। শেষে বনমালী তাকে খুঁজে বার করে নিজের সঙ্গে ও বোন উদয়তারা অর্থাৎ লবচন্দ্রের বউ কে নিয়ে দেশের বাড়ি চলে যায়। অনন্ত সেখানে বনমালীর পদ্মাপুরাণ পড়া এবং অন্যান্য লোকাচার ও অনুষ্ঠান অবলোকন করে। বনমালীর গ্রামে অনন্তর সঙ্গে একটি ছোট্ট মেয়ের পরিচয় হয়, সে জানায় তার নামও অনন্ত।

    রাঙা নাও

    বিরামপুর গ্রামে কাদির তার ছেলে ছাদির, ছাদিরের ছেলে রমু ও বউ খুশিকে নিয়ে বাস করে। কাদির তার ছেলেকে জানায় যে উজানচরের মাগন সরকার তার নামে ধারের মিথ্যে মামলা লাগিয়ে জমি দখল করে নিতে চায় যদিও কাদিররা পাট বেচে ধারের টাকাটা মিটিয়ে দিয়েছিল। এরমধ্যে খুশির বাবা তাদের বাড়িতে আসে মেয়েকে বাপের বাড়ি কয়েক দিনের জন্য নিয়ে যাবার জন্য। খুশির বাবা মুহুরী ছিল, সে বলে সে মামলা জিতিয়ে দেবে কাদিরকে, কিন্ত তাদের মধ্যে বচসা হয়ে যায়। এরপর কাদির মিয়া চোখ লাল করে মাগন সরকারের কাছে যায়, কিন্ত মাগন সরকার তাকে বলে যে এই শেষ বারের জন্য যেন তাকে এই সর্বনাশ করতে দেওয়া হয়, তারপর সে ভাল হয়ে যাবে। কাদিরও হতভম্ব হয়ে মেনে নেয়। কিন্ত পরদিনই মাগন সরকার নারকেল গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরে যায়। কাদির তা শুনে উদাস হয়ে যায়। ছাদির শ্রাবণে নৌকা দৌড়ে চালানোর জন্য বড় নৌকা বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে কাদিরের কাছে টাকা চাইলে কাদির দুহাত খুলে টাকা দিয়ে দেয়। দুজন মালো এসে ছাদিরের নৌকা বানিয়ে দিয়ে যায়। ভাদ্রের ১লা তারিখে সেই নৌকা জলে ভাসে। সেই দিন তিতাসে অনেক নৌকার সমাগম হয়। উদয়তারা, অনন্ত, অনন্তবালা, বনমালী একটা নৌকায় ছিল। আরেকটি নৌকা থেকে সুবলার বউ অনন্তকে দেখতে পেয়ে, তার নৌকায় গিয়ে ওঠে। কিন্ত সেখানে উদয়তারার সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয় এবং সবাই মিলে সুবলার বউকে মারধর করে।

    দুরঙা প্রজাপতি

    — কিরে গোলাম! বিয়া করবি?

    — করমু।

    — ক দেখি বিয়া কইরা কি করে?

    — ভাত রান্ধায়

    — হি হি হি, কইতে পারলি না গোলাম, কইতে পারলি না। বিয়া কইরা লোকে বউয়ের ঠ্যাং কান্ধে লয়, বুঝলি হি হি হি। … … আমারে বিয়া করবি?

    মোটাসোটা ঠ্যাং দুটির ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া অনন্ত বলিল, না।

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    উদয়তারাদের হাতে মার খাবার পর সুবলার বউ অপমানে ঘরের মধ্যেই বেশীরভাগ সময় থাকতে শুরু করে। কিন্তু বামুন কায়েতের যুবকরা তার বাড়ির দিকে উঁকি ঝুঁকি মারা শুরু করে আর তার নামে কুৎসা রটায়। সুবলার বউ এর প্রতিবাদে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে তামসীর বাবার বাড়ির সামনে, ওখানেই বামুন, কায়েতদের বেশি যাতায়াত ছিল। সুবলার বউয়ের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য মালো ছেলেরা একদিন তিনজন তবলা বাদককে মার দেয়। অন্যদিকে দৌড়ের সময় ছাদিরের নৌকাকে অন্য এক নৌকা ধাক্কা মেরে ভেঙে দেয়। বনমালী ছাদিরকে উদ্ধার করে। কাদির বনমালীকে আগেই চিনত, সে বনমালীকে আপ্যায়ণ করে। কাদিরের মেয়ে জমিলা উদয়তারাকে বলে সে তাকে শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় দেখেছিল এবং সই পাতানোর ইচ্ছা করেছিল। অনন্ত গ্রামে ফিরে পড়াশোনায় মন দেয় ও পড়াশোনাকে ভালোবাসে। এদিকে মালোপাড়ায় যাত্রাদলের রমরমাতে মালোরা দুদলে ভাগ হয়ে যেতে থাকে তাদের সংস্কৃতির সংরক্ষণের উপর চিন্তাধারা ভিত্তিতে। সুবলার বউ মোহনকে সঙ্গে নিয়ে হরিবংশ, ভাটিয়ালি প্রভৃতি মালো সংস্কৃতির গান গেয়ে অন্য মালোদের যাত্রাদল থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, কিন্তু সফল হয় না।

    ভাসমান

    যাত্রাদলের কাছে আত্মসমর্পণের পর মালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে এবং মেয়েদের বিলাসিতা বাড়তে থাকে। এরমধ্যে একদিন মালোরা বিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে তিতাসের বুকে ভাসমান চর গজিয়ে উঠেছে। দূরদূরান্তের চাষিরা ওই চরের দখলের জন্য মারামারি শুরু করে। মালোরা বর্ষাকালের জলের উপরই নির্ভর করে থাকে। রামপ্রসাদ জেলেদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। নিজে চর দখল করতে গিয়ে মারা যায়। এদিকে অনন্তবালার বিয়ের বয়স হয়ে যায়, কিন্ত সে অনন্তের আশায় বসে থাকে, যে কুমিল্লা শহরে চলে গিয়েছিল। অনন্তবালার বাবার পরামর্শে বনমালী অনন্তর শহরে যায় এবং অনন্তের সঙ্গে তার দেখা হয়। বনমালী এখন মাছের পোনার মজুরি খাটে। উদয়তারা বনমালীর বাড়ি থেকে অনেকদিন পরে শ্বশুরবাড়ীতে আসে এবং এসে বাসন্তীর, মানে সুবলার বউয়ের, সঙ্গে তার পুরনো ঝাগড়া মিটিয়ে ফেলে। মালোদের অবস্থা ধীরে ধীরে আরও খারাপ হতে থাকে এবং একে একে উদয়তারার বর, বাসন্তীর বাবা-মা, মোহনের বাবা মারা যায়। সুবলার বউ অত দু:খের মধ্যেও অনন্তর খোঁজ নিত। সে জানতে পারে অনন্তের সাক্ষাৎ বিরামপুরের কাদিরের সঙ্গে হয়। সেদিন বনমালী মারা যায়, তা দেখে কাদির তার ধানের গোলা খুলে দেয় বিতরণ করার জন্য। অনাহারে সুবলার বউ সবাইকে নিয়ে চিন্তায় দিবাস্বপ্ন দেখতে থাকে এবং একসময় তার শিথিল হাত থেকে জলভরা লোটা পড়ে যায়।

  • আদিম আতঙ্ক

    আদিম আতঙ্ক

    অদ্রীশ বর্ধন

    আদিম আতঙ্ক

    কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার

    ফ্যানট্যাস্টিক ও কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস যৌথ প্রয়াস

    প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০০১

    .

    উৎসর্গ

    গ্রন্থকীট কিশোর বন্ধু

    মেহবুব রহমানকে

    —অদ্রীশ জ্যেঠু

    ফ্যান্টাসটিকের দিনে পাশে থাকা

    সুরজিৎ দে-কে

    প্রকাশকের কথা

    বাংলায় ‘কল্পবিজ্ঞান’-এর জয়যাত্রা কিন্তু অনেকদিনের। ১৯৬৩ সালে অদ্রীশ বর্ধনের আশ্চর্যের হাত ধরে শুরু যে স্বর্ণযুগের, কালের নিয়মে তা আজ হারিয়েছে বিস্মৃতির অন্তরালে। উপযুক্ত প্রকাশক ও গবেষণার অভাবে তা দ্রুত মুছে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে। কল্পবিশ্ব প্রকাশনীর উদ্দেশ্য শুধু নতুন লেখক প্রতিভাকে সামনে আনাই নয়, কল্পবিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।

    ‘আদিম আতঙ্ক’ একটি শ্বাসরোধী কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার। এটি আমেরিকান লেখক ডিন কুন্‌জ এর লেখা ‘ফ্যান্টমস’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত। উপন্যাসটি প্রথমে ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল শুকতারার পাতায় ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০০০ সালের জানুয়ারি মাস অবধি। ২০০১ সালে উপন্যাসটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ‘আরুণি পাবলিকেশনস’ থেকে। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের আগ্রহী পাঠকদের জন্যে প্রায় ঊনিশ বছর পরে কল্পবিশ্ব ফ্যান্টাসটিক প্রকাশনের সঙ্গে যৌথভাবে উপন্যাসটি পুনঃপ্রকাশের দায়িত্ব নিল। বইটি প্রকাশের দায়িত্ব ও অনুমতি দেবার জন্যে অদ্রীশ বর্ধন ও তাঁর পুত্র অম্বর বর্ধনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

    আশা করি, কল্পবিশ্ব ও ফ্যান্টাসটিক এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘অপার্থিব সিরিজ’ এর অন্তর্গত এই কল্পবিজ্ঞান থ্রিলারটি কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতায় যোগ্য সমাদর পাবে।

    নভেম্বর ২০১৯

    প্রকাশক

    বিশেষ কৃতজ্ঞতা

    অম্বর বর্ধন, কেয়া বর্ধন, জয়া ঠাকুর, সঞ্জীব মিত্র

    সুমিত বর্ধন, সুদীপ দেব, সৌরভ দে, সুপ্রিয় দাস

  • লিঙ্গপুরাণ

    লিঙ্গপুরাণ

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : মাঘ, ১৪২৪

    উৎসর্গ

    প্রাণপ্রিয় কবি দেবযানী দত্তকে

    সূচিমুখ

    কথামুখ

    গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া নয়। গতানুগতিকতায় প্রথাবদ্ধ হয়ে বন্দি না-হয়ে উল্টো সুরে উল্টো পথে যা ভাবি তাই লিখি। পূর্বপুরুষের শিখিয়ে দেওয়া তোতাপাখির বুলি আওড়ানোতে আমি স্বভাবসিদ্ধ নই। ভিন্ন ভাবনায়, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথানির্মাণে আমার অক্ষরমালার চরৈবেতি। প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণাকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছি গভীর নিবিড়তায়। উচিত-অনৌচিতের জ্ঞানবর্ষণ নয়, নিজের জীবন এবং যাপনেও এই বদলের রূপরেখা অনুসরণের চেষ্টা করি।

    জ্যোতিষীগিরি একটা লাভজনক ব্যবসা। পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্যোতিষীদের রমরমা ব্যবসা আমরা সবাই দেখেছি। জেনেছি তাঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, মানুষের হাত-পা-কপাল দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। যদিও জ্যোতিষীদের কোনো বক্তব্য কোনোদিন কখনোই সত্য প্রমাণিত হয়নি, তা সত্ত্বেও জ্যোতিষীদের প্রতি মানুষের অগাধ ভক্তি। এইসব ভণ্ড জ্যোতিষীদের খপ্পরে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তবু জ্যোতিষীরা যেন দেবদূত, অন্তর্যামী। অথচ এই জ্যোতিষীরা অন্তরালে এক একটা পাক্কা শয়তান, যমদূত। যে যত বড়ো জ্যোতিষী, সে তত বড়ো মিথ্যা, তার চেয়ে বড়ো ভণ্ড, প্রতারক। এঁরা নাকি কেউ কেউ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। জ্যোতিষীকে কেউ বলেন শাস্ত্র, কেউ বলেন বিজ্ঞান। আসলে জ্যোতিষজ্ঞান না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান। পাথর ধারণ করলে ভাগ্য বদলে যায় না। জ্যোতিষবিদ্যা ও জ্যোতিষীদের পর্দাফাঁস করা হয়েছে ‘জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে।

    ছাগল, ভেড়া, মুরগি, শুয়োরের মাংসের মতো গোরুর মাংসও খেয়ে থাকে। আসলে মানুষ খায় না এমন একটি প্রাণী এ পৃথিবীতে নেই। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস হয়। তবুও মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র ঘৃণা, হত্যা ইত্যাদি। যত গণ্ডগোল গোরুকে ঘিরে। গোমাংস কি শুধু মুসলিমরাই খায়? ‘গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা হয়েছে গোমাংসের ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান। ‘সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে’ প্রবন্ধে হিন্দুদের পরমপূজ্য দেবী সরস্বতীর উৎস ও বিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিন্দুসমাজ ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় সমাজ কীভাবে ব্রাহ্মণদের কজায় চলে এলো? এই ব্রাহ্মণ্যবাদ হিন্দুসমাজে কতটা ক্ষতি করেছে? ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ’ প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।

    ‘মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুত্ববাদের ভারতবর্ষ’ প্রবন্ধের শিরোনামই বলে দিচ্ছে ভারতবর্ষের হিন্দুত্ববাদে মনুসংহিতার প্রভাব কতখানি। বাবা সাহেব মনুসংহিতা পুড়িয়ে দিয়েছিল। কী এমন আছে মনুসংহিতায়? মনু কে? মনুর বিধান কীভাবে হিন্দুসমাজে কীভাবে বর্ণবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে এই প্রবন্ধে সেটাই উপজীব্য।

    লিঙ্গপুরাণ প্রবন্ধে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি থাকলেও কোনো যৌনতা নেই। তবে সমগ্র আলোচনাই হয়েছে লিঙ্গ নিয়ে। এসেছে শিবলিঙ্গ বিষয়ও। আলোচনা হয়েছে জাপানের পেনিস ফেস্টিভাল থেকে অমরনাথের প্রাকৃতিক বরফের লিঙ্গ নিয়ে। রহস্য উদ্মাটনের চেষ্টা করা হয়েছে।

    প্রসঙ্গত কয়েকটি জরুরি কথা বলে রাখা প্রয়োজন– প্রথমত, লিঙ্গপুরাণ কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গ্রন্থ নয়। অনেকেই বইয়ের নাম দেখে ভাবেন, বইটিতে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট আছে। ১৮ অনুৰ্ধদের জন্য অপাঠ্য। ভুল ভেবে ভুল করবেন না। ইতোমধ্যে অনেকগুলি সাইট আমার চোখে পড়েছে, যেখানে আমার ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে বইটি অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরিতে রেখেছেন। তাঁদের অনুরোধ করছি ক্যাটাগরি বদলে ফেলুন। বইটি অবশ্যই প্রাপ্তমনস্কদের জন্য, কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের নয়। সকল বয়সের পাঠকরা বইটা পড়তে পারেন। দ্বিতীয়ত, যারা এই বইটি পিডিএফ করে বিভিন্ন সাইটে রেখেছেন, তাঁরা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করেছেন। আমি কারোকে পিডিএফ করার অনুমতি দিইনি। যত বেআইনি পিডিএফ আছে সব সাইট থেকে সরিয়ে ফেলুন। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সাইটে ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে যে পিডিএফ আপনারা ডাউনলোড করে পড়ছেন, তাঁদের বলি ওই বইটার সঙ্গে এই বইটার অনেক অমিল। প্রচ্ছদ একই থাকলেও বিষয় এক নেই। বেশ কিছু নতুন প্রবন্ধ যেমন সংযোজন করা হয়েছে, কিছু প্রবন্ধ বাতিলও করা হয়েছে। আগের যে প্রবন্ধগুলি বর্তমান বইতে আছে সেগুলিতেও প্রচুর সংযোজন, সংশোধন, বর্জন, পরিমার্জন করা হয়েছে। বলা যায় সম্পূর্ণ নতুন রূপে এই বইটি আপনাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এই বইয়ের আসল স্বাদ নিতে হলে পাইরেটেড পিডিএফ নয়, ই-বুক পড়ন।

    কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাবগম্ভীর বিষয় হলেও যতটা সম্ভব প্রাঞ্জল ভাষায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সংকলনে যেসব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বিদগ্ধ ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের দাবিতে পাঠকদের কাছে সেগুলি দুই মলাটে করে বন্দি পৌঁছে দিতে পারলাম। এই গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্য নিশ্চয় পাঠকদের মন জয় করতে পারবে।

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

  • সোনার ঘণ্টা

    সোনার ঘণ্টা

    অনিল ভৌমিক

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : শুভ দীপাবলী, ১৩৮৬; নভেম্বর, ১৯৭৯।

    অষ্টম মুদ্রণ : শুভ অক্ষয় তৃতীয়া, ১৩৯৪; মে, ১৯৮৭।

    প্রকাশনায়: সুপ্রিয়া পাল; উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির, সি-৩, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা, ৭০০০০৭ (প্রথম তলা)। প্রতিষ্ঠাতা: শরচ্চন্দ্র পাল; কিরীটিকুমার পাল।

    মুদ্রাকর: সন্তোষী প্রিণ্টার্স, তাপস সাঁতরা; ১৪৩, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলিকাতা-৯।

    প্রচ্ছদচিত্র : নারায়ণ দেবনাথ; পরিকল্পনায় : দিব্যদ্যুতি পাল।

    * * *

    সোনার ঘণ্টা প্রসঙ্গে

    ঘণ্টা সোনার কি রূপোর কি নেহাৎই তামার বা পিতলের, সেটা কোন বিচারের কথাই নয়। আসল যা হ’ল বিচার্য তা হচ্ছে ঘণ্টার ধ্বনি। সে ধ্বনি দিয়েই ঘণ্টার সত্যকার পরিচয়।

    ‘সোনার ঘণ্টা’ নামটির দরুণ যে কথাগুলি বলবার সুযোগ পেলাম শ্রীঅনিল ভৌমিকের সেই কিশোর উপন্যাসটি সম্বন্ধে সেগুলি বিশেষভাবে খাটে। বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্য লেখা বই-এর সংখ্যা ইদানীং যথেষ্ট বাড়লেও সত্যিকার সার্থক লেখার দেখা খুব কমই মেলে। ‘সোনার ঘণ্টা’ তার মধ্যে একটি বিশেষভাবে সমাদর পাবার বই, একথা অসঙ্কোচে বলতে পারি। গল্পের বিষয় ও বলবার মুন্সিয়ানা সব দিক দিয়েই বইটি মনে রাখবার মত।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র

    * * *

    ‘কসবা জগদীশ বিদ্যাপীঠ’-এর

    প্রাক্তন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

    ছাত্রদের উদ্দেশ্যে–


    নিবেদন

    একটি চিত্রকাহিনীই “সোনার ঘণ্টা” উপন্যাসটির মূল প্রেরণা। সেই কাহিনী ঢেলে সাজাতে গিয়ে ঘটনা, চরিত্র সবকিছু আমাকে নতুন ক’রে ভাবতে হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ– ইহুদী জ্যাকব, কাসেম, মকবুল, ফজল, হ্যারি প্রভৃতি চরিত্রগুলো আমারই চিন্তার ফসল। কুয়াশা, ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের প্রতিকুলতা পেরিয়ে সোনার ঘণ্টার দ্বীপে যাওয়া ও ফেরা, দু’টো মোহরে খোদিত নক্সার কাহিনী ইত্যাদি ঘটনাগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার মতো  ক’রে আমাকে সাজাতে হয়েছে। অনেকস্থলে চিত্রকাহিনীর ফাঁকও পূরণ করতে হয়েছে। এইভাবে বর্তমান উপন্যাসের পূর্ণরূপ গড়ে উঠেছে।

    সবিশেষ নিবেদন– উপন্যাসটি কিশোরদের জন্য রচিত। তাই কাহিনীর নায়ক ফ্রান্সিসকে নিচক এ্যাডভেঞ্চার বিলাসীরূপে অঙ্কন না ক’রে তাকে একটা জীবন-দর্শনের ভিত্তিভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেছি। কিশোরদের মনে এই দৃষ্টিভঙ্গীটুকু স্বীকৃতি পেলেই “সোনার ঘণ্টা” রচনা সার্থক ব’লে মনে করবো।

    প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য–  “সোনার ঘণ্টা” প্রথমে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাসরূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

    দীপাবলী, ১৩৮৬
    অনিল ভৌমিক

    * * *

    আজকের দিনে যেসব জাতি পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করেছে, সমস্ত পৃথিবীর সবকিছুর উপরেই তাদের অপ্রতিহত উৎসুক্য। এমন দেশ নেই, এমন কাল নেই, এমন বিষয় নেই যার প্রতি তাদের মন ধাবিত না হচ্ছে।

  • আজাজেল

    আজাজেল

    আইজাক আসিমভ কল্পবিজ্ঞানের সুবিখ্যাত কথাশিল্পী, অসীম কল্পনাশক্তিতে তার খেয়ালী কলম মেলে। ধরেছেন রূপক কাহিনী গ্রন্থনে। আঠারােটি গল্পকে সংকলনে বন্দী করে আমাদের উপহার দিয়েছেন। যারা রূপক কাহিনী ভালবাসেন এবং আসিমভের অনুরাগী ভক্তবাহিনী, সকলকেই অভিভূত করবে। আজাজেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন, দুই সে.মি. দীর্ঘ। আগুন-লাল-রঙা এক জিন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও চমৎকার জাদুশক্তির অধিকারী। শুধুমাত্র জর্জ। বিটারনাট, যিনি এক খামখেয়ালী ভাষাবিদ, জিন ও আত্মা আহ্বানের জাদুমন্ত্রে পারদর্শী এবং তারই ইচ্ছায় আজাজেল আবির্ভূত হয়। কিন্তু, আজাজেল তার বিস্ময়কর জাদুবিদ্যা, জর্জের ব্যক্তিগত লাভের খাতিরে ব্যবহৃত হতে অনুমতি দেবে না। জর্জের বন্ধুদের প্রয়ােজন পড়লে, তারা অনুগ্রহ পেতে পারে। কিন্তু একটাই সমস্যা। এই অন্য পার্থিব চমৎকার করিৎকর্মার, পার্থিবব্যঞ্জনা এবং মানবিক দুর্বলতা সম্পর্কে স্বল্পই জ্ঞান আর তার সদিচ্ছাপ্রসূত অবৈধ হস্তক্ষেপ যারপরনাই তামাসা ও অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়। এই কাহিনীগুলির শ্রমসাধ্য সংকলন আজাজেল ও বেচারি বিটারনাটের উদ্ভট ও ব্যর্থ অভিযানসমূহ অনুসরণ করেছে, যখন তারা ভালমনেই কিছু পরিচিত দুর্ভাগাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছিল। আসিমভের নিজস্ব ভঙ্গিতে এবং বিষমই মজা করে বর্ণিত আজাজেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্মল দুষ্টুমি-মাখা আনন্দ দেওয়ার দাবি রাখে। আজাজেল এর সতেরটি গল্প, প্রথম ‘দ্য ফ্যান্টাসি অ্যাণ্ড সায়েন্স ফিকশন’ ও ‘আইজাক আসিমভস সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংকলনিটর প্রথম গল্প ‘দুই সে.মি. জিন’ বিশেষ করে এই বইটির জন্যই লেখা।

    [book-name]

    অনিশা দত্তআইজাক আসিমভ

    Azazel by Isaac Asimov

    অনুবাদ : অনিশা দত্ত

    প্রথম প্রকাশ : বইমেলা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    সন্দেশ প্রকাশনার লুৎফর রহমান চৌধুরী প্রীতিভাজনেষু

    সূচনা

    ১৯৮০তে এরিক প্রর্টার নামে এক ভদ্রলোক আমাকে, তার সম্পাদনায় একটি পত্রিকার জন্য মাসিক রহস্য কাহিনী লিখতে অনুরোধ করেন। আমি সম্মত হই, কারণ আমি সজ্জনদের ‘না’ বলতে পারি না আর আমি এ যাবৎ যত সম্পাদকের সংস্পর্শে এসেছি, তারা যথাযথ সজ্জন।

    প্রথম কাহিনী আমি লিখি, এক ধরনের কল্পরহস্য যেখানে দুই সে.মি. লম্বা এক ক্ষুদ্র জিনের কথা বলেছি, নাম দিয়েছিলাম, ‘শঠে শাঠং।’ এরিক প্রর্টারের মনে ধরেছিল ও তিনি তা প্রকাশ করেন। এতে গ্রিসওল্ড নামে এক ভদ্রলোকের কথা বলেছিলাম যিনি ছিলেন মূল বক্তা আর সাথে ছিলেন তিন শ্রোতা। যার মধ্যে আমি নিজেও ছিলাম, যদিও নিজের পরিচয় দিইনি। চারজনে প্রতি সপ্তাহে ইউনিয়ন ক্লাবে মিলিত হতাম, আর আমি ইউনিয়ন ক্লাবেই গ্রিসওল্ডের গল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম। যাই হোক, যখন আমি ছোট্ট জিনকে নিয়ে ‘শঠে শাঠং’ নামে দ্বিতীয় কাহিনীর সূচনার চেষ্টা করছিলাম (নতুন কাহিনীর নাম দিলাম, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’)।

    এরিক বললেন, ‘না!’ হয়তো বা, এক বাক্যে, উদ্ভট কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু সে চায়নি, আমি সেটা অভ্যাসে রপ্ত করে ফেলি।

    অতএব, আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’কে এক পাশে সরিয়ে রেখে রহস্য কাহিনীর ধারাবাহিক শুরু করলাম, যাতে কোনো উদ্ভট কল্পনার মিশেলই দিলাম না। এদের মধ্যে তিনটি গল্প (যা এরিক চেয়েছিলেন দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুশো শব্দের মধ্যে) ঘটনাক্রমে আমার বই ‘দ্য ইউনিয়ন ক্লাব মিস্ট্রি’তে (ডাবল ডে, ১৯৮৩) সংগৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘শঠে শাঠং’কে অন্তর্ভুক্তি করিনি, কারণ ছোট্ট জিনের বিবৃতি, বাকি গল্পগুলোর সঙ্গে খাপ খেত না।

    ইতিমধ্যে আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ নিয়ে মেতেছিলাম। অপচয়কে আমি ঘৃণা করি। আমার কোনো লেখা অপ্রকাশিত থাকুক, আমার সহ্য হয় না। পরিস্থিতি সামলাতে, যাহোক করতে আমি প্রস্তুত। অতএব এরিকের দ্বারস্থ হয়ে বললাম, ‘সেই গল্পটা, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ যেটা তোমার পছন্দ হয়নি, আমি কি অন্য কোথাও প্রকাশ করতে পারি?’

    তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু শর্ত থাকবে, চরিত্রগুলোর নাম বদলে ফেলতে হবে। আমি চাই গ্রিসওল্ড ও তার সঙ্গীসাথীরা বিশেষভাবে আমার পত্রিকাতেই বিরাজ করুক।’

    তাই-ই করলাম। গ্রিসওল্ডের নাম বদলিয়ে, ‘জর্জ’ দিলাম আর শ্রোতা হিসেবে রাখলাম একজনকেই। প্রথম পুরুষ হিসেবে, আমি নিজে। সেটা তো হল। আমি ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশন-এর পত্রিকাতে সেটি বিক্রি করে দিলাম। এরপর ঐ ধরনের এক কাহিনী লিখলাম, ভাবধারা হল জর্জ ও আজাজেলের কাহিনী। জিনের নাম দিলাম আজাজে। এই বইটি (যে হাসি হেরে যায়, ঐ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার নিজেরও কল্পবিজ্ঞানের এক পত্রিকা ছিল, ‘আইজাক আসিমভের কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা’ আর শাওনা ম্যাককার্থি, তৎকালীন সম্পাদক ‘এফ্‌ অ্যান্ড এসএফ’ পত্রিকায় দেওয়ার বিরোধিতা করলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘ছোট্ট জিন আর তার যাদুকে, উন্নত প্রযুক্তির অপার্থি। প্রাণীতে বদলে দিন আর সকল কাহিনী আমার কাছে বিক্রি করে দিন।

    তাই-ই করলাম। আর তখন থেকেই আমার জর্জ ও আজাজেলের কাহিনীগুলো নিয়ে খ্যাপামি ছিল। আমি লিখতে শুরু করলাম আর বর্তমানে আমি এই গল্পগুলো থেকে আঠারোটি নিয়ে ‘আজাজেল্‌’-এ সংকলিত করেছি। মোট আঠারোটি গল্পের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হল। কারণ গল্পগুলো আয়তনে কমাবার তাগিদ ছিল না এরিকের পক্ষে। তাই আমি জর্জ ও আজাজেলের গল্পগুলো দ্বিগুণ দীর্ঘ করতে পেরেছি।

    কিন্তু এবারেও আমি শঠে শাঠংকে এর মধ্যে ঢোকাতে পারলাম না। কারণ পরবর্তী গল্পগুলোর সঙ্গে এর সুর তাল মিলত না। দুটি বিভিন্ন ধারাবাহিকের ধারণার মূল অনুপ্রেরণা থাকায়, শঠে শাঠং-এর বিরূপ ভাগ্যে, দুটি পৃথক ধারায়, কোনোটাতেই খাপ খাওয়ানো গেল না (যাক গে, সঞ্চয়ন তো হয়েই রইল, ভবিষ্যতে কোনো না কোনো রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। এর জন্য খুব দুঃখ করার প্রয়োজন নেই)।

    গল্পগুলো সম্পর্কে আমি কিছু যুক্তির অবতারণা করতে চাই, হয়তো আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন। কিন্তু আমি এক প্রকার বাচাল।

    1. যেমন আমি বলেছি, প্রথম গল্পটি বাদ দিই, ছোট্ট জিনের গল্পটি অন্যগুলোর সঙ্গে মিলছিল না। আমার সুন্দরী সম্পাদিকা জেনিফার ব্রেল জোর দিয়েছিলেন কিভাবে আমি ও জর্জ পরস্পরের সাথে পরিচিত হই, এবং জর্জের জীবনে কীভাে ছোট্ট জিনের অনুপ্রবেশ ঘটে। সেই প্রসঙ্গের অবতারণা আবশ্যিক।

      যদিও জেনিফার মধুর স্বভাব, তথাপি সে যখন দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হয়, তখন তার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন।

      আমি দুই সে.মি. জিনের গল্প লিখে ফেললাম এবং তার কথামতো বইটিতে প্রথম গল্প হিসাবে অন্তর্ভুক্তি ঘটল। এর পরেও কথা ছিল, জেনিফার চেয়েছিলেন, আজাজেল্‌ সংশয়াতীতভাবে জিনই হোক, অপার্থিব কোনো প্রাণী নয়। অতএব আমরা উদ্ভট রূপকথায় ফিরে এলাম। ‘আজাজেল্’ বাইবেলে উল্লিখিত এক নাম, পাঠকরা একে জিন হিসাবেই গ্রহণ করে থাকেন, যদিও বিষয়টি অপেক্ষাকৃত জটিলতর।

    2. জর্জকে খানিক বিষাদগ্রস্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও আমি নির্জীব ব্যক্তি পছন্দ করি না। তবু জর্জকে আমি ভালবাসি, আপনারাও বাসবেন। প্রথম পুরুষটি (আদতে আইজাক্ আসিমভ্) প্রায়শই জর্জ দ্বারা অপমানিত হয়েছেন এবং অবধারিত কয়েক ডলার খোয়াতে হয়েছে। কিন্তু আমি কিছু মনে করি নি। প্রথম গল্পের শেষে আমি বিশ্লেষণ করেই দিয়েছি, তার গল্পগুলো উৎকৃষ্ট ছিল এবং সেগুলো থেকে আমি যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করেছি। বিশেষত জর্জকে যা দিয়েছি (অবশ্যই কল্পনায় নয়), তার থেকে অনেক বেশি।
    3. অনুগ্রহ করে সতর্ক থাকুন, গল্পগুলো একাধারে হাস্যরস-স্নিগ্ধ ও শ্লেষাত্মক। যদি গল্পের ধরন অতিরঞ্জিত ও ‘আসিমভোচিত’ না হয়, তবে তা উদ্দেশ্যমূলক। একে সতর্কবাণী মনে করবেন। অতিরিক্ত কিছুর প্রত্যাশা করে বইটি কিনবেন না ও পরে পস্তাবেন না। যাক গে, যদি পিজি উডহাউসের সামান্যতম প্রভাবও লক্ষ্য করে থাকেন, তবে বিশ্বাস রাখবেন এটি দৈবক্রমে ঘটেনি।

      আজাজেল্‌ বল খেলা দেখতে যায়।

      সে রাতে আমি বাস্কেট বল খেলা দেখতে গিয়েছিলাম আর আজাজেল্‌ ছিল আমার পকেটে। খেলা দেখার জন্য সে পকেট থেকে মাথাটি উঁচিয়ে রাখছিল, আর কেউ তাকে দেখে ফেললে, মস্ত প্রশ্ন উঠত। তার ত্বক উজ্জ্বল লাল আর তার কপালে সিং- এর দুটি ছোট্ট দলা। ভাগ্যিস, সে সবসুদ্ধ বেরিয়ে আসেনি, কারণ তার সবচেয়ে প্রকট আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল এক সে.মি. লম্বা মাংসল লেজ। খেলার শেষে সে মন্তব্য করল, ‘বিশালবপু জবরজং যাচ্ছেতাই মানুষগুলোর, খেলার মাঠে উদ্যম দেখে আমার যতদূর মনে হল, যখনই গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটি গলিয়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে, তখনই ভরপুর উত্তেজনা।

      ‘ঠিক তাই!’ আমি বলি, ‘তুমি এক বাস্কেট জিতলে।

      ‘তাহলে, এই বোকা-বোকা খেলায় তোমার এই আশ্রিত এক বীরোচিত খেলোয়াড় হতে পারত, যদি প্রতিবারই সে গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিতে পারত।’

      ‘একদম ঠিক!’

      পরবর্তী নির্ধারিত খেলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে, আমি খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ছোট্ট জুনিপারকে আমি একটা কথাও বলিনি, কারণ তখনো পর্যন্ত আমি আজাজেলের দানবিক শক্তি ব্যবহার করিনি এবং তার কথাবার্তার সঙ্গে কার্যকলাপের সঙ্গতি থাকবে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম না।

      তাছাড়াও, আমি তাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। (এবং তার পর যা ঘটেছিল, আমরা দুজনেই যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম)