Tag: সম্পন্ন গ্রন্থ

  • ঔরস

    ঔরস

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    গ্রন্থকথা

    তিনটি নষ্ট উপন্যাসের সংকলনের প্রথমটি ‘রাহুকেতু’ যা একটি আত্মজীবনীমুলক কাহিনি। হাংরি আন্দোলনের সময়কালের সারস্বত সমাজের উথালপাতাল পাবেন পাঠকরা, তবে বুঝে নিতে হবে কারণ নামগুলি সবই ছদ্মনামে আছে। দ্বিতীয় উপন্যাসটি ‘ঔরস’ যা আপাদমস্তক রাজনৈকিত বক্তব্যে ঠাসা। ভাগলপুরের মাফিয়া অধ্যুষিত গাংগোতা সমাজ, গঙ্গায় জেগে ওঠা চরের দখল, অন্যদিকে চার হাজার কিলোমিটার জঙ্গল ঘিরে সালোয়া জুড়ুম, মাওবাদী, আধাসেনা, মিলিটারির মাঝে পড়ে অর্ধমৃত জনজীবনের বেঁচে থাকার গল্প। ‘লবিয়ার মাকড়ি’ উপন্যাসটি জাদু বাস্তবতার এক অনবদ্য পরিবেশন। এক ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা তীব্র রাজনৈতিক শ্লেষ, ব্যাঙ্গোক্তি, যা লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়েলিজম নয়, এই লেখা পাঠককে তৃপ্তি দেবে। মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের একজন দ্রোহী পুরুষ। ছয়-এর দশকে বাংলা সাহিত্যকে উচ্চকোটির লেখকদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছিলেন। চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, বসু, গুহ, মিত্রদের হাত ছেড়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস দাস, মণ্ডল, ধাড়াদের মতো যাদেরকে সাহিত্যের আঙিনায় ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল তাদের হাতে উঠে এসেছিল। আর, এই অসাধ্য সাধন ঘটিয়েছিলেন মলয় রায়চৌধুরী হাংরি সাহিত্য আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।

  • মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে

    মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    সে কীরে, ব্যাংকক! তপনের বন্ধুরা শুনে আঁতকে উঠল।

    কেন, তাতে কী? তপন দৃঢ়স্বরে জানায়, লোকে ইউরোপ—আমেরিকায় যাচ্ছে না? পড়তে যাচ্ছে, চাকরি করতে যাচ্ছে। এ—তো ঢের কাছে। ব্যাংকক চমৎকার শহর। আর। সুনীলদা বলেছে চাকরিটাও ভালো। এক পাঞ্জাবি ব্যবসাদার ও—দেশ থেকে মশলা নিয়ে। ভারতে চালান দেয়। ওর ব্যাংকক অফিসের জন্য একজন বিশ্বাসী লোক চাই। ভালো মাইনে দেবে। অনেক বাঙালি থাকে ওখানে। সাউথ—ইস্ট—এশিয়ার সঙ্গে ভারতের কদ্দিনের যোগাযোগ জানিস?

    সব শুনে বন্ধুরা ঘাড় নাড়ল, তা বটে, তা বটে। ঠিক আছে, যা দেখ কেমন লাগে। ছুটি—টুটি দেবে তো?

    অত দূরে? মা খবরটা শুনে তপনের মুখের দিকে চেয়ে বললেন। তপনের বাবা নেই। মা একটা স্কুলে পড়ান।

    তপন বলল, কিছু দূরে নয়। তুমি ভেবো না। সুনীলদা অ্যাদ্দিন রয়েছেন।

    বেশ, যা তবে। সাবধানে থাকবি। তোর বাবা থাকলেও বারণ করতেন না। খুশিই হতেন।

    বি. এ. পাস করে দু—বছর ধরে চাকরি খুঁজছিল তপন। হঠাৎ বন্ধু গুরুপদর পিসতুতো দাদা সুনীল ব্যানার্জির সঙ্গে আলাপ। সুনীলদা মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখানে স্কুলে পড়ান। ছুটিতে কলকাতায় এসেছেন। সুনীলদা কথায় কথায় বললেন, আমার বিশেষ পরিচিত ব্যাংককের ব্যবসায়ী গোবিন্দ সিং একজন লোক খুঁজছে। যাবে ব্যাংকক? তাহলে তোমার জন্য লিখি।

    তপন রাজি হয়ে গেছে।

    তপনের ভাই—বোন তিলু মিলু খবরটা শুনেই লাফাতে লাগল। তিলু তক্ষুনি ম্যাপ নিয়ে বসে গেল, থাইল্যান্ডের রাজধানী, তাই না? এই তো ব্যাংকক। কীসে যাবে দাদা? প্লেন, না জাহাজে?

    মিলু বলল, দাদা, ওঙ্কারভাট দেখতে যাবে না?

    তপন বলল, ইচ্ছে আছে। ব্যাংককের কাছেই তো।

    উঃ, কী লাক তোমার! গভীর বনের মধ্যে বিরাট ধ্বংসাবশেষ নগর। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মন্দির। আমি বইয়ে ছবি দেখেছি। প্রায় হাজার বছর আগে হিন্দু—রাজত্ব ছিল ওখানে। আর জানো দাদা, ওদেশের বাটিকের কাজ খুব সুন্দর। ছুটিতে আসার সময়—আমার জন্যে একটা…

    বাইরে বেপরোয়া ভাব দেখালেও প্রথমটা ভিতরে ভিতরে বেশ ঘাবড়াচ্ছিল তপন। কলকাতার বাইরে বড় একটা যায়নি সে। দিনে দিনে মনটা তার অস্থির হয়ে ওঠে। ভ্রমণ কাহিনি বা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়তে পড়তে মনে মনে বইয়ের চরিত্রদের পাশে নিজেকে কল্পনা করেছে। ওইসব অজানা দেশে বিচিত্র সব ঘটনার মধ্যে নিজেও যেন জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই কল্পনার জগৎ যে খানিকটা বাস্তবে ফলে যেতে পারে তা কোনো আশা করেনি। এই কলকাতা, এই ভবানীপুরের এত দিনের জীবন ছেড়ে কোথায় যেতে হবে?

    মনে সে সাহস আনে। কেন, এই তো সুনীলদা গিয়েছেন? বাবা নাকি পাস করেই বর্মায় গিয়েছিলেন চাকরি নিয়ে। চার বছর ছিলেন। ওঁরা শহরের লোক ছিলেন না। আর সে খাস কলকাতায় মানুষ। কত বেশি জানে—শোনে। তার অত ভয় কী?

    ভালো মাইনে। বাড়িতে বেশ কিছু টাকা পাঠানো যাবে। সে কী কম আনন্দের কথা? তাতেই সব কষ্ট সয়ে যাবে।

    মাসখানেকের ভিতর গোবিন্দ সিং—এর চিঠি এল। চাকরি মঞ্জুর। তপনের পাসপোর্ট ভিসা ইত্যাদি হয়ে গেল। সিং ব্রাদার্সের কলকাতায় বড়বাজারের অফিস থেকে তপনকে দেওয়া হল ব্যাংকক যাবার একখানি প্লেনের টিকিট। যাওয়ার দিনও এসে পড়ল।

    মায়ের চোখ ছলছল। বন্ধুরা ঘটা করে একটা বিদায় সংবর্ধনা দিয়ে ফেলল তপনকে। তারপর সত্যি একদিন তপন রওনা দিল দমদম থেকে ব্যাংককের পথে।

    ব্যাংকক। থাইল্যান্ড বা শ্যামদেশের রাজধানী।

    তপন এক মাস হল ব্যাংককে এসে কাজে যোগ দিয়েছে।

    সিং ব্রাদার্সের মালিক গোবিন্দ সিং—এর বয়স প্রায় ষাট। শক্ত সমর্থ সর্দারজি। বহু দেশে ঘুরেছেন, অনেকগুলো ভাষা জানেন, দিলদরিয়া লোক। তপনের সঙ্গে কথা বলেন ইংরেজি বা হিন্দিতে। মেনাম নদীর কাছে রাজাবংশী রোডে সিং ব্রাদার্সের মস্ত গুদাম। দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ায় অগুনতি ছোট—বড় দ্বীপ। অনেক দ্বীপেই নানারকম মশলার গাছ জন্মায়। তাই ইউরোপীয়ানরা এইসব দ্বীপকে বলত স্পাইস—আইল্যান্ডস। সিং ব্রাদার্স এই অঞ্চলের নানা জায়গা থেকে লবঙ্গ, গোলমরিচ, জায়ফল, এলাচ ইত্যাদি আমদানি করে। বড় বড় নৌকো আর লঞ্চে করে নদীপথে ব্যাংককে আনে। সেগুলো জমা হয় গুদামে, তারপর চালান যায় ভারতবর্ষে। আবার ভারত থেকে সিং ব্রাদার্স আনে রেশম ও চা। মালের হিসেব রাখা, নদীর ঘাট থেকে জিনিস ছাড়িয়ে আনা। সব কাজই করতে হয় তপনকে। এসব ব্যাপারে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে মন দিয়ে শেখে, মশলার রকমফের চেনে।

    গোবিন্দ সিং থাকেন নিউ রোডে। গুদাম থেকে বেশি দূরে নয়। তপনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে মহারাজ রোডে, গোবিন্দ সিং—এর বাড়ির কাছেই। খায় একটা পাঞ্জাবি হোটেলে—ভাত রুটি সবজি ডাল তরকারি। দইও মেলে।

    তপন সপ্তাহে একখানা চিঠি দেয় বাড়িতে। মাকে লেখে—কিছু ভেবো না। দিব্যি আছি। তিলু মিলুকে লেখে ওই দেশের খবর—

    ব্যাংকক বিরাট শহর, মেনাম নদীর দু—ধারে ছড়ানো। পুব পাশেই শহর বেশি জমজমাট। নদী থেকে অনেকগুলো খাল বেরিয়ে ঢুকে গেছে শহরের ভিতর। খালগুলোর ওপর দিয়ে অজস্র সাঁকো। থাইরা খালকে বলে কেলাং। বইয়ে পড়েছিস তো, ইটালির ভেনিস শহরে যেমন খাল আছে তেমনি। এই খালগুলোকে রাস্তাও বলা চলে, কারণ তাহই দিয়ে চলে অসংখ্য ছোট ছোট নৌকো, লোজন জিনিসপত্র নিয়ে। নৌকোর ওপর রীতিমতো বাজার বসে। নাম দিয়েছে—ফ্লোটিং মার্কেট। মাসখানেকে এত বড় শহরের কতটুকুই বা দেখেছি।

    কলকাতার মতোই এর কোনো অংশে আধুনিক বাড়িঘর হোটেল, চওড়া ঝকঝকে রাস্তা, আবার কোনো কোনো অংশে গলিঘঁজি বস্তি, পুরনো নোংরা ঘুপচি বাড়ি, দোকানপাট। মেনাম নদীতে নৌকো, বজরা, স্টিমার গিজগিজ করে। শ্যাম উপসাগরে পড়েছে মেনাম। বড় জাহাজ মোহনার বেশি ঢুকতে পারে না।

    এদেশে বেশিরভাগ লোকই বৌদ্ধ। সাত—আটশো বছর আগে এখানে ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার বিস্তার হয়েছিল। তাই শহরে ছড়িয়ে আছে এই দুই ধর্মের নিদর্শন। পথের ধারে কত যে বৌদ্ধ মন্দির বা ওয়াট। ঢালু ছাদ, ছুঁচালো মাথা, প্যাগোডা চেহারার মন্দিরগুলি। মন্দিরের গায়ে কেবল বুদ্ধমূর্তি—নানান আকার, নানান ছাঁদ দেখে দেখে একঘেয়ে লাগছে।

    পথের নাম দেখে ভারি মজা লাগে। মহারাজ রোড, রাম এক, রাম দুই, এমনি সব নাম। আগে এখানকার রাজাদের নাম ছিল নাকি রাম দিয়ে। প্রাচীন রাজধানীর নাম অযোধ্যা। ঘুরতে ফিরতে বিদেশ বলে মনে হয় না।

    কত দেশের লোকের বাস। বিদেশিদের মধ্যে চিনারাই সবচেয়ে বেশি। বেশিরভাগ লোক বাইরে প্যান্ট—শার্ট পরে। তাছাড়া পাজামা লুঙ্গি কুর্তা এমনকি ধুতি—পরা লোকও দেখেছি। পথেঘাটে ঘঘারে প্রচুর হলুদ আলখাল্লা—পরা পুরুষ। এরা নাকি শ্ৰমণ অর্থাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। শুনেছি প্রত্যেক বৌদ্ধ থাই অন্তত কিছু দিনের জন্য সন্ন্যাস নেয়, শ্রমণ হয়। থাইরা বেশ আমুদে। চিনা প্যাটার্নের চেহারা। জানিস, এ—দেশের টাকার নাম ভাট। প্রায় চল্লিশ পয়সার সমান এক ভাট।

    শান্ত ভদ্র তপনকে গোবিন্দ সিং—এর পছন্দ হয়েছে। গোবিন্দ সিং—এর সঙ্গে থাকেন তার। স্ত্রী এবং ছোট ছেলে। ছেলের বয়স বছর পঁচিশ। বাবার ব্যবসা দেখে। বড় ছেলে গেছে। কানাডা, কাগজ তৈরি শিখতে। ফিরে এসে এখানে কাগজের কল বানাবে।

    সময় পেলে গোবিন্দ সিং গল্প করেন। তিনি তপনকে কখনো ডাকেন তপনবাব, কখনো শুধু বাবু। বলেন, কত দেশ দেখলাম, কত কী শিখলাম, বড় ছেলে ফিরে এলে আমার ছুটি। আর দু—তিন বছর। তারপর দেশে চলে যাব, লুধিয়ানা। খেত—খামার করব। তখন ইচ্ছে হলে তুমি চলে যেও আমার কলকাতার অফিসে। ওখানে ভালো লোক দরকার।

    তিলু মিলুকে লিখল তপন—

    কয়েকটা নামকরা বৌদ্ধমন্দির দেখে ফেলেছি। যেমন ওয়াট পো, ওয়াট অরুণ ওয়াট ফ্রা—কিও। ফ্রা—কিওতে আছে বিখ্যাত এমারেল্ড বুদ্ধ। মন্দিরগুলোয় বিষ্ণু, গরুড়, কিন্নর, ড্রাগন ইত্যাদির মূর্তি। বড় বড় মন্দির সোনা আর মণি—মাণিক্যের ছড়াছডি। আর দেখেছি রাজপ্রাসাদ ও মিউজিয়াম। একটা ছুটির দিনে প্রাচীন রাজধানী অযোধ্যা দেখতে যাব। ঘোরার সময় তেমন পাই না। এত রাস্তা, ভয় হয় পথ না হারাই। পকেটে ব্যাংককের একটা ম্যাপ রাখি। হ্যাঁ, মিল ঠিক বলেছিলি, এখানে কাপড়ের ওপর বাটিকের কাজ চমৎকার। থাইরা ঘরে ঘরে বাটিক করে। নিয়ে যাব তোর জন্যে।

    এই অযোধ্যা দেখতে গিয়েই এক রবিবার তপনের সঙ্গে আলাপ হল ডক্টর ইন্দ দত্তর, ফলে তার জীবনে আর একটা চমকপ্রদ মোড় ফিরল।

    ব্যাংককের উত্তরে অযোধ্যা। সকালে ট্রেনে চড়ে রওনা দিল তপন। ঘণ্টা দুই লাগল পৌঁছতে। মেনাম নদীর ভিতর কয়েকটি দ্বীপ এবং নদীর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। প্রায় দুশো বছর আগে বর্মীদের আক্রমণে এই নগর ধ্বংস হয়।

    তপন ঘুরে ঘুরে দেখছিল। আরও অনেক টুরিস্ট এসেছিল। একটি লোককে তার বিশেষ ভাবে নজরে পড়ল।

    ভদ্রলোক অন্তত ছ—ফুট লম্বা। শক্ত গড়ন, ফর্সা রং, সুশ্রী ধারাল মুখ। জুলপি ও রগের চুলে সামান্য পাক ধরেছে। পরনে ট্রাউজার্স ও ফুলশার্ট, মাথায় সাদা পানামা টুপি।

    ভদ্রলোক মোটেই পুরনো মন্দির বা প্রাসাদ দেখছিলেন না। দূরবিন চোখে লাগিয়ে গাছে গাছে পাখি দেখে বেড়াচ্ছিলেন। চারপাশের লোকজন সম্বন্ধে ভ্রূক্ষেপ নেই।

    তপনের কৌতূহল হয়। সে ভদ্রলোকের পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। এইরকম দূরবিন দিয়ে পাখি দেখার ব্যাপারটায় তার আগ্রহ ছিল। তার এক মামার ছিল এই শখ। উনি আসামে। থাকেন। একবার কলকাতায় এসে তপনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকুরিয়ায় পাখি। দেখতে। ইনিও বোধহয় পক্ষিবিদ।

    জায়গাটা নিরালা। ভদ্রলোক চোখ থেকে দূরবিন নামিয়ে ফিরলেন। তপন হাত কুড়ি পিছনে। তপনকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত দেখে তিনি পরিষ্কার বাংলায় বললেন, বাঙালি?

    তপন চমকে থতমত খেয়ে ঘাড় নাড়ল।

    বেড়াতে এসেছেন?

    না। মানে আমি ব্যাংককে থাকি, জবাব দিল তপন।

    ও! কী করেন?

    চাকরি।

    হুঁ। ঠিক চিনেছি বাঙালি। ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

    কী করে বুঝলেন? খানিকটা চেহারায়, আর খানিকটা কথা শুনে। তখন নিজের মনে বিড়বিড় করছিলেন যে বাংলায়।

    আপনিও কি বাঙালি? তপন জিজ্ঞেস করল।

    না, তা ঠিক নয়। আমি থাই, বলেই ভদ্রলোক হো—হো করে হেসে উঠলেন।

    মানে! তপন ভ্যাবাচ্যাকা খায়।

    মানে জন্মসূত্রে বাঙালি বটে কিন্তু এই দেশের নাগরিক, এই দেশেই মানুষ হয়েছি। আমার নাম ইন্দ্র দত্ত।

    আমি তপন রায়। কলকাতায় থাকতাম।

    পাখির শখ আছে নাকি?

    নাঃ, তেমন কিছু নয়। আপনাকে দেখেই বেশি কৌতূহল হচ্ছিল।

    কফি চলবে?

    ভদ্রলোক কাঁধে ঝোলানো কফির ফ্লাস্ক নামিয়ে ঘাসে বসলেন। তপন বসল পাশে। একটু একটু করে আলাপ জমে উঠল।

    ডক্টর ইন্দ্র দত্ত ব্যাংকক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিতত্ত্বের অধ্যাপক। এই দেশেই জন্মেছেন। এদেশেই পড়াশোনা। অবশ্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সেও পড়েছেন কিছুকাল। বাবা বিষ্ণু দত্ত ছিলেন ডাক্তার। কলকাতায় থাকতেন। ভারতের স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে ইংরেজ সরকারের বিষনজরে পড়েন। জেল খাটা এড়াতে তিনি ভারত ছেড়ে পালান। বর্মা ঘরে আসেন শ্যামদেশে। ব্যাংককে বাস করতে থাকেন। ডক্টর ইন্দ্র দত্তর মা ছিলেন কা—প্রবাসী বাঙালি। ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণ একটু বাঁকা বাঁকা। এদেশে মানুষ হয়েও বাংলা চর্চা করেছেন এই আশ্চর্য।

    ইন্দ্র দত্ত দিলখোলা মানুষ। তপনের সব খবর নিলেন। চট করে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলেন—তোমাকে আবার আপনি বলব কী হে।

    কথায় কথায় ডক্টর দত্ত বললেন, আমার বাবা বিদেশে থেকে গেলেও মনেপ্রাণে ছিলেন ভারতীয়। পুরো বাঙালি। বাংলা বই আনতেন, বাংলায় কথা বলতেন ঘরে। বাবার মনে বড় দুঃখ ছিল ভারতবর্ষ পরাধীন। তাই যেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এদেশে এলেন, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন নিয়ে বাবা একেবারে মেতে উঠলেন। কোন্ সাল হবে সেটা? বোধহয় ১৯৪৩। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে। আমিও যোগ দিয়েছিলাম নেতাজির বাল—সেনায়। তখন আমার সাত—আট বছর বয়স।

    ভারত স্বাধীন হবার পর বাবা দুবার ওদেশে যান। আমি গেছি সঙ্গে। কলকাতায় আমার কিছু আত্মীয়—স্বজন থাকে। তবে যোগাযোগ তেমন নেই। বড় হয়ে আমি তিনবার ইন্ডিয়ায়। গেছি। সুন্দরবন আর জলদাপাড়া রিজার্ভ—ফরেস্ট দেখে এসেছি। বাংলাটা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। আমার স্ত্রীর কল্যাণে ফের চর্চা। ও কলকাতার মেয়ে। কেমব্রিজে পড়তে গেছিল। সেখানেই আমাদের আলাপ, তারপর বিয়ে। চলো আজই তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব। মণিকা ভীষণ খুশি হবে দেশের ছেলে দেখলে।

    দুপুরে ইন্দ্র দত্তর সঙ্গে ব্যাংককে ফিরল তপন।

    ডক্টর ইন্দ্র দত্তর সঙ্গে আলাপ হয়ে তপন বিদেশে একা থাকার দুঃখ অনেকখানি ভলে গেল। ব্যাংককে আরও কয়েকজন বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল বটে, তবে এমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি।

    ডক্টর দত্তর স্ত্রীও খুব ভালো। ভারি গোপ্লে। ওঁরা থাকেন সাদার্ন রোডে। নিজেদের বাড়ি। পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন এলাকা। একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, সামনে টকরো জমিতে ফুলের বাগান। তপন সপ্তাহে দু—তিনবার সাইকেলে চেপে হাজির হতে লাগল ডক্টর দত্তর বাড়ি। ওকে বাড়ির ছেলের মতনই আপন করে নিয়েছিলেন তারা। ডক্টর দত্তর ছেলেঙ্গলে নেহা একটি থাই ছেলেকে দত্তক নিয়েছেন। তার বয়স বছর পাঁচ—ছয়। ফুটফুটে দেন। নাম রেখেছেন রবি।

    ডক্টর দত্ত সন্ধের সময় সাধারণত বাড়িতেই থাকতেন। তপনের সঙ্গে নানা বিষয়ে গল্প করতেন—তার নানা দেশের অভিজ্ঞতা, নানান জীবজন্তুর কথা। কত জায়গায় ঘুরেছেন যে ঠিক নেই। জীবজন্তু সম্বন্ধে তপনের আগ্রহ ছিল। ডক্টর দত্তর সঙ্গে আলাপ হয়ে তার নতুন করে চোখ ফোটে। ডক্টর দত্তর কাছ থেকে সে জীবজন্তু ও ভ্রমণ কাহিনির বই নিত পড়তে।

    ইন্দ্র দত্তকে প্রথমে তপন ডক্টর দত্ত বলে ডাকত। ওঁর স্ত্রী আপত্তি জানালেন, তা হবে না। আমায় যখন বউদি বলেছ, ওকেও দাদা বলতে হবে।

    অতএব ডক্টর দত্তকে তপন দত্তদা বলে ডাকতে শুরু করল।

    চার মাস কেটেছে। গোবিন্দ সিং একদিন বললেন, তপনবাবু, আমার এক বন্ধুলোক ব্যাংককে বেড়াতে আসছে। ওর জন্য একটা কিউরিও কিনে এনে দিও। এই আট ডলারের মধ্যে। তোমার পছন্দ ভালো।

    রাজাবংশী রোডের গায়ে একটা রাস্তায় অনেকগুলো কিউরিও—শপ দেখেছিল তপন। বিকেলে সেখানে গেল।

    সরু গলিতে ছোট্ট দোকান। কাঁচের দরজা। ভিতরে কতরকম জিনিস সাজানো। নীলাভ আলোয় রহস্যময় লাগছে। দোকানদার কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এটা কিউরিও—শপ। অর্থাৎ দুর্লভ জিনিসের দোকান। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল তপন।

    কাউন্টারে একটি মুখ আবির্ভূত হল। শুকনো হর্তুকির মতো মুখখানা। অজস্র ভাজ। তর্পনের দিকে চেয়ে হাসল সে। চোখ সরু হয়ে গেল। খুদে খুদে দাঁতের মাঝে একটি সোনা—বাঁধানো দাঁত ঝিলিক দিল।

    বৃদ্ধাটিকে মনে হল চিনা রমণী। চুল টান করে ঘাড়ের কাছে গিট দেওয়া। গায়ে নীল রঙের ঢোলা জামা ও পাজামা। একগাল হেসে সে দোকানের শো—কেসের দিকে আঙল। দেখিয়ে বলল—সী।

    তপন এ ধরনের দোকানে কখনো ঢোকেনি আগে। কত অদ্ভুত অদ্ভুত যে জিনিস, কতরকম মূর্তি, ছুরি, পাত্র, ছবি।

    হঠাৎ একটা শো—কেসের ওপর তার চোখ আটকে গেল। সেখানে কয়েকটা পাখি সাজানো রয়েছে। জ্যান্ত নয়, স্টাফ করা। যেমন মিউজিয়ামে থাকে। তপন শুনেছে, গোটা পাখির পালকসুন্ধু চামড়ার মধ্যে কাঠের গুঁড়ো পুরে সেলাই করে দেওয়া হয়। দেখতে মনে হয় স্বাভাবিক পাখি। স্থির অবস্থায় বসা বা দাঁড়ানো।

    শো—কেসের ওপর রয়েছে একটা বাজপাখি, একটা মস্ত কালো কাকাতুয়া, আর একটা অদ্ভুত দেখতে পাখি। কোনো পাখির পালকের এমন বাহার তপন কখনো দেখেনি, কল্পনাও করেনি। একখণ্ড কাঠের ওপর স্ট্যান্ড দিয়ে আটকে দাঁড় করানো রয়েছে পাখিটা। উঃ কী রং! গাঢ় লাল, কমলা, নীল, সবুজ, সাদা, কালো—রেশমের মতো নরম চকচকে পালকে আলো ঠিকরোচ্ছে। লাল আর নীল রঙের পালকই বেশি।

    পাখিটা ছোট। সাত—আট ইঞ্চির বেশি লম্বা নয়। খাটো ল্যাজ। সবচাইতে সুন্দর হচ্ছে তার ল্যাজ থেকে বেরনো দুটি লম্বা পালক। ঠিক যেন দুটি সরু লোহার তার লম্বা হয়ে ডগায় গিয়ে পাকিয়ে গেছে। আর তারের ডগায় সবুজ পালকের গুচ্ছ। ছোট মাথাটি উঁচু করা, ডানা ছড়ানো, যেন এখুনি উড়বে। চোখের মণির জায়গায় দুটি টুকটুকে লাল পুঁতি বসানো। বাঃ! ওই পাখি যখন উড়ে বেড়াত! তপন কল্পনা করে। ঠিক একটুকরো রামধনু যদি উড়ে বেড়ায় তেমনি দেখতে লাগত নিশ্চয়ই।

    সেয়ানা দোকানি তপনের দৃষ্টি অনুসরণ করে অমনি পাখিটাকে নামিয়ে এনে সামনে রেখে বলল, বুরং রাজা।

    তপন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তখন দোকানি বদ্ধা আধো আধো ইংরেজিতে বলল, প্যারাদাইজ বার্ড।

    ও, এই হচ্ছে বার্ড অফ প্যারাডাইস! এ পাখির কথা পড়েছিল তপন। শুধু নিউগিনি অস্ট্রেলিয়ায় নাকি এই পাখি মেলে। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর পাখি। এ পাখিটায় কিন্তু বেশ খুত আছে। দূর থেকে বোঝা যায় না এমনভাবে রেখেছিল। পাখির একটা ডানার পালন প্রায় উঠে গেছে, আর একটি পায়ের আধখানা কাটা।

    হঠাৎ তপনের মাথায় এল এটা দত্তদাকে প্রেজেন্ট করলে কেমন হয়? ওর বাড়িতে এমনি স্টাফ করা একটা কাঠঠোকরা পাখি আছে। এটা পেলে উনি খুশি হবেন নিশ্চয়। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দরদস্তুর শুরু হল।

    কত দাম?

    বুড়ি মাথা নেড়ে, দাঁতের ঝিলিক দেখিয়ে দু—হাতের দশ দশ আঙুল ছড়িয়ে জানান— টুয়েন্টি ডলার।

    বাপরে থাক, অত পয়সা নেই। তাছাড়া অনেক খুঁত রয়েছে।

    অমনি দাম নেমে এল—ফিফটিন।

    নাঃ।

    কত দেবে?

    টেন।

    থার্টিন।

    নো নো টেন। তপন মাথা নাড়ল।

    বুড়ি মিটিমিটি করে দেখল খানিক। বুঝল তপন আর উঠবে না কিছুতেই। সে একটু হতাশভাবে বলল, অলরাইট, তে।

    তপন হিসেব করে দাম দিল ভাট—এ।

    দোকানি বুড়ি স্ট্যান্ড থেকে পাখিটা খুলে তার পাখা মুড়ে ছোট্ট করে ফেলল। তারপর প্লাস্টিকের থলিতে পুরে বেঁধে দিল। স্ট্যান্ডটা আলাদা দিল। আবার ইচ্ছেমতো এটাকে সাজিয়ে রাখা যাবে।

    গোবিন্দ সিং—এর বন্ধুর জন্য তপন নিল একটা কাগজ—কাটার ছুরি—পিতলের হাতলে রঙচঙে পাথর বসানো।

  • রক্তচোষা

    রক্তচোষা

    অজেয় রায়

    [book]

    রক্তচোষা

    গ্রীষ্মের ছুটির শেষ দিক। আমি আর সুনন্দ বেড়াতে গেলাম ঘাটশিলায়।

    সুনন্দর মামার একটা বাড়ি আছে ঘাটশিলায়। কেউ বড় যায়—টায় না। বন্ধই থাকে। বারোমাস। একজন মালি বাড়ি আগলায়। সুতরাং ইচ্ছে ছিল নির্বিঘ্নে আড্ডা মারব। এ বেড়াব। আমরা দুজনে কলেজে পড়ি। বেজায় বন্ধ। কলকাতার ভিড় আর হট্টগোল ছেড়ে এমন খোলামেলা প্রকৃতিরাজ্যে এসে মন আমাদের উড়তে লাগল।

    ঘাটশিলা শহরটি তকতকে পরিষ্কার। বাড়িঘর লোকজনের ঘেঁষাঘেষি নেই। শহরের বাইরে চারপাশে ধু—ধু পাথুরে মাঠ। কোথাও শাল বন। একধারে পরপর কতগুলো জঙ্গলে ঢাকা ছোট ছোট পাহাড়। শহরের পাশ দিয়ে গেছে সুবর্ণরেখা নদী। চওড়া নদীখাতের ভিতর প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের চাইয়ের ফাঁকে হু—হুঁ করে জল ছুটে চলেছে। সুবর্ণরেখা ছাড়াও কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড়ি নদী আছে ধারে কাছে।

    সুনন্দর মামার বাড়িটা শহরের প্রায় বাইরে একটু নির্জন অংশে। ধলভূমগড় যাবার পিচ বাঁধানো চওড়া রাস্তাটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে। এই পথ শহর ছাড়িয়ে, প্রান্তর ভেদ করে, শালবনের গা ছুঁয়ে দূর দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। তখন একটু একটু বর্ষা নেমেছে। গরম কমেছে। যদিও দিনের বেলা চড়া রোদ ওঠে, আমাদের কিন্তু পরোয়া নেই। দুটো সাইকেল জোগাড় করে দিনের বেলা টো—টো করে ঘুরে বেড়াই। রাতে বিছানায় শুয়ে শুনতে পাই হায়নার এ্যাক—খ্যাক হাসি। মালির বউ লছমি রান্না করে দেয়। ভাত—ডাল—তরকারি সে মোটামুটি রাঁধে। কিন্তু মাছ—মাংস নিজেরাই বানাই।

    ভোরবেলা প্রায়ই হাজির হয় বুধন মাঝি। কোনোদিন সে আনে তাজা ফলমূল, মাছ। মুরগি বা ডিম। কোনোদিন মধু। কখনও বা কলসি ভরা টাটকা খেজুর রস।

    বুধন মাঝি সাঁওতাল। মাঝবয়সী। আমাদের সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়ে গেছে। ও থাকে মাইল তিন—চার দূরে এক গ্রামে। গ্রামের নাম মহুয়াডাঙা। বুধন ঘাটশিলার বাজারে জিনিস বিক্রি করতে যায়। পথে আমাদের বাড়িতে বসে প্রায়ই খানিক গল্প করে নেয়। লোকটি চায়ের ভক্ত। চায়ের সময় এলে আমরা ওকে চা অফার করি। বুধন লাজুক লাজক মখে চক্ষ মুদে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।

    মোটামুটি একই ছাঁদে কাটছিল দিনগুলো। হঠাৎ ঘটনার মোড় গেল ঘরে।

    একদিন বর্ধন এল ভোরে। কয়েকটা ডিম এনেছে বিক্রি করতে। লক্ষ করলাম, তার ভারি বিষণ্ণ। সুনন্দ ঠাট্টা করল,—কি বুধন, মুখ ব্যাজার কেন, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। বুঝি?

    বুধন মাথা নাড়ল। তারপর কেমন ঝিম মেরে বসে রইল।

    বুঝলাম, ব্যাপার কিছু গুরুতর। হয়তো ওর বাড়িতে কারো অসুখ—বিসুখ করেছে। আমি সহানুভূতি দেখাই—বুধন, বলো শুনি হয়েছেটা কী!

    বুধন মুখ তুলে করুণ সুরে বলল, বাবু, আমার ভাইটারে মেরে ফেলবে। ঠিক মেরে ফেলবে।

    সে কি! বুধনের এক ছোটভাই আছে শুনেছিলাম। তার বেশি কিছু জানতাম না। কিন্তু তাকে মারবে কে? কেন?

    একটু একটু করে বুধনের কাছ থেকে উদ্ধার করলাম সমস্ত ঘটনা। এক আশ্চর্য অবিশ্বাস্য কাহিনি। মহুয়াডাঙায় নাকি রক্তচোষার আবির্ভাব ঘটেছে। মানুষের রক্তলোভী কোনো নিশাচর প্রাণী। আর গ্রামের লোকের সন্দেহ, বুধনের ভাই হচ্ছে এই রক্তচোষা।

    ঘটনার শুরু চারদিন আগে। মহুয়াডাঙায় এক উৎসব ছিল। রাত করে সবাই নাচ গান। করেছে। তারপর যে যেখানে পারে শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ নারী—কণ্ঠের আর্তনাদ। অনেকে ছুটে আসে। বোকামাঝির বউ জামফুল চেঁচাচ্ছে। কোলে তার চার বছরের ছেলে। সবাই .দেখল, বাচ্চাটির গলার পাশ দিয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। গলায় ক্ষতচিহ্ন। এক চিলতে চামড়া যেন গোল করে কেটে নেওয়া হয়েছে। আর তলায় মাংসের মধ্যে ছোট্ট গর্তের মত ফুটো। ক্রমাগত রক্ত বেরিয়ে আসছে ওই ক্ষত থেকে।

    জামফুল বলল যে, সে আর তার ছেলে ঘুমোচ্ছিল ঘরের দাওয়ায়। হঠাৎ ছেলের কান্না শুনে উঠে দেখে এই কাণ্ড।

    এ কীসের কামড়? সবাই পরামর্শ করল। ইঁদুর? ছুঁচো? সাপ—টাপ? উঁহু, ওসব নয়। অভিজ্ঞ লোকেরা কাটা জায়গা পরীক্ষা করে জানাল। তবে কি কোনো পোকা—মাকড়? কেউ সঠিক বুঝতে পারে না। যাহোক ন্যাকড়াপোড়া চাপা দিতে রক্ত বন্ধ হল।

    জামফুল আর একটা খবর দিয়েছিল। সে নাকি ছেলের কান্নায় ঘুম ভেঙেই দেখে বুনো। সামনে দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে।

    সেদিন কেউ বুনোকে নিয়ে মাথা ঘামায় নি। বুনো সম্বন্ধে গ্রামের লোকের সন্দেহ জাগল আরও দুদিন পরে। অর্থাৎ গত পরশু রাতে।

    ঢেঙ্গা মাঝি বুনোর প্রতিবেশী। ঢেঙ্গা ঘুমিয়েছিল তার খড়ের চালার নিচে খাঁটিয়া পেতে। একসময় ঘুম ভেঙে ঘাড়ে হাত দিয়ে বোঝে চটচটে কী যেন! দেশলাই জ্বেলে দেখে, রক্ত বেরোচ্ছে। গায়েও শুকনো রক্ত লেগে আছে। সেই একই রকম ক্ষতচিহ্ন। রক্ত যেন থামতে চায় না।

    গ্রামের লোক আর ব্যাপারটাকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিতে পারল না। কোনো চেনা জীব—জন্তুর দাঁত বা নখের দাগ নয়। তাদের ধারণা হয়েছে এ নিশ্চয়ই কোনো পিশাচ বা দানোর কীর্তি। সে ঘুমন্ত মানুষের দেহ ফুটো করে রক্ত চুষে নিচ্ছে। কে করতে পারে একাজ? একটা বিশেষ কারণে সবার বুনোর ওপর নজর পড়ল।

    বুধনের ভাই নামে বুনো, স্বভাবেও বুনো। সে ছোটবেলা থেকে বাউণ্ডুলে। একরোখা দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। কতবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। মাসের পর মাস পাহাড়ে—জঙ্গলে ঘুরেছে। কাজকর্ম চাষবাসে মন নেই। যত অদ্ভুত বিদ্যে শেখার ঝোঁক। ওঝাদের কাছে সাকরেদি করে মন্ত্র—তন্ত্র তুকতাক শিখেছে অনেক। অতি বদরাগী। কারোর সঙ্গে সদ্ভাব নেই। বুধনের সঙ্গেও নয়। ঢেঙ্গার সঙ্গে বুনোর কদিন আগে ঝগড়া হয়েছিল। দুজনের বাড়ির সীমানায় একটা কলগাছের দখল নিয়ে বুনো ঢেঙ্গাকে শাসিয়েছিল। ঢেঙ্গা বলেছে, যখন তার বউ ঢেঙ্গার ঘাড়ের রক্ত বন্ধ করতে ব্যস্ত, তখন সে দেখেছে, তার উঠোনে বুনো দাঁড়িয়ে। তার বাড়িতে এত রাতে বুনো এসেছিল কী করতে?

    গ্রামের লোক আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, রাতের বেলা বুনো নিশ্চয়ই দানো হয়ে মানুষের রক্ত চুষে খায়। গ্রামের মোড়ল বুনোকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে, সে দারুণ চটে যায়। বলে মিছিমিছি সবাই তার পিছনে লাগছে। এ ব্যাপারে তার কোনো হাত নেই। ঢেঙ্গার চিৎকার শুনে সে দেখতে গিয়েছিল ব্যাপারটা কী। কিন্তু গ্রামের লোকের বিশ্বাস হয়নি বুনোর কথা।

    ফুসফাস গুজগাজ আরম্ভ হয়েছে। বুনোই দায়ী। এ বুনোর কাজ। মহুয়াডাঙর মানুষগুলোকে সে এবার মেরে ফেলবে। ও আর মানুষ নেই। দানো হয়ে গেছে। কেউ বলছে, তাড়িয়ে দে গাঁ থেকে। কেউ বলছে মেরে ফেল, পিটিয়ে।

    গল্প শুনে আমরা থ। এমন কাণ্ড সম্ভব!

    আমি প্রশ্ন করলাম, সত্যি বুনো এরকম কাজ করতে পারে নাকি? তুই জানিস?

    বুধন বলল, আমি আড়ালে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে। বুনো বলেছে, আমি করি নি। মনে হল ও মিছে কথা বলছে না।

    সুনন্দ বলল, বুধন তোর ভাইকে কিছু দিনের জন্যে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বল। একবার যখন সন্দেহ ঢুকেছে মাথায়, বারবার এরকম হলে, হয়তো মরিয়া হয়ে গ্রামের লোক বুনোকে খুন করে বসবে।

    বুধন হতাশভাবে বলল, বলেছিলাম তাই। বুনো যাবে না।

    —কেন?

    —ওই মেয়েটার জন্যে।

    —কে মেয়ে?

    বুধন বলল, বুনো বিয়ে করেছিল। বউ মরে গেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের একটি মেয়ে আছে তার। মেয়েটি হতভাগ্য পঙ্গু। বছর দেড়েক আগে পড়ে গিয়ে তার ডান পায়ে চোট লাগে। তারপর পাটা ক্রমশ শুকিয়ে সরু হয়ে যাচ্ছে। জোর নেই পায়ে। প্রায় সব সময়। শুয়ে থাকে। বসে—বসে হাতে ভর দিয়ে হিচঁড়ে—হিঁচড়ে কোনোরকমে একটু—আধটু নড়াচড়া করে। ওকে নাইয়ে খাইয়ে দিতে হয়। এক বুড়ি তার দেখাশোনা করে।

    মেয়ের ওপর বুনোর প্রচণ্ড টান। মেয়ের জন্যই সে আজকাল বাড়ি ছেড়ে দুরে যায় না। দুনিয়ায় একমাত্র এই মানুষটিকেই সে ভালবাসে। বুনোর ভয়, সে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলে। তার মেয়েকে মেরে ফেলবে লোকে। বুধনকেও তার বিশ্বাস নেই। আবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে কোথাও গেলে, খোঁড়া মেয়েকে রাখবে কোথায়? সে সারাদিন মজরি খাটতে গেলে, মেয়ের যত্ন করবে কে? সুতরাং সে জেদ ধরেছে, গ্রামেই থাকবে। তাতে যা চা হোক।

    আমি ও সুনন্দ মাথা ঘামাতে শুরু করলাম।

    বুনো যতই একগুঁয়ে বা রাগী হোক, স্রেফ সন্দেহের শিকার হয়ে, তাকে মারা পড়তে দেওয়া যায় না। ওই অসহায় মেয়েটার ভাগ্যে তখন কী ঘটবে? এ কাজ কার? সত্যি কোনো মানুষ পিশাচের? না কোনো জন্তু জানোয়ারের? গ্রামের অন্য কোনো শয়তান কি এই কীর্তি করে বুনোর ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে? কেউ তো স্বচক্ষে দেখে নি বুনোকে রক্তপান করতে। এখন বুনোকে, তার মেয়েকে, বাঁচাই কী করে! দুই বন্ধু প্রাণপণে বুদ্ধি হাতড়াতে থাকি।

    আমি বললাম, পুলিশে খবর দিলে কেমন হয়?

    সুনন্দ বলল, কোনো লাভ নেই। গ্রামের ঘরোয়া ব্যাপারে পুলিশ নাক গলাবে না।

    বললাম, তবু চেষ্টা করি। যদি যায় পুলিশ, একটু ভয় দেখিয়ে আসে। তাহলে চট করে বুনোর ক্ষতি করতে অন্যেরা হয়তো সাহস পাবে না। ইতিমধ্যে রক্তচোষার ব্যাপারটা থেমে যেতে পারে।

    সুনন্দ ঘাড় নাড়ল—যাবে না পুলিশ। স্রেফ গুজব শুনে তিন—চার মাইল পথ ঠেঙিয়ে যেতে রাজী হবে না। উলটে আমাদের ঠাট্টা করবে। হ্যাঁ যাবে, যদি খুনখারাবি কিছু হয়, তারপর।

    তখন গিয়ে লাভটা কী হবে ঘোড়ার ডিম!—আমি রেগে বললাম।

    তিনজনে চুপচাপ বসে আছি। বুনোকে বাঁচাবার কোনো উপায় আমাদের মাথায় আসছে না। সুনন্দ বলে উঠল, ঠিক আছে, পুলিশ না যাক, আমরা যাব। মাঝেমাঝে ঘুরে আসব ওই গ্রামে। বুনোর খোঁজখবর করব। তাহলে গ্রামের লোক সাবধান হয়ে যাবে। কিন্তু একটা ছুতো চাই। হ্যাঁ, মুরগি। মুরগির খোঁজে যাওয়া যেতে পারে। বুধন, বুনোর মুরগি আছে?

    আছে—জানাল বুধন।

    —বেশ। আমরা দুজনে কাল মুরগি কিনতে যাব বুনোর কাছে। ওকে বলে রাখিস। আমাদের যেন আবার হাঁকিয়ে না দেয়। ওর ভালোর জন্যেই যাচ্ছি। বাইরের লোক বারবার বুনোর খোঁজে আসছে দেখলে, এখন কেউ ওকে মারবার সাহস পাবে না। কারণ জানে, বুনোর কিছু ঘটলে আমাদের তা নজরে পড়বে এবং ঘটনাটা অস্বাভাবিক মনে হলে পুলিশে খবর যাবে।

    আমাদের যুক্তি বুধনের পছন্দ হল। সে খুশিমনে বিদায় নিল।

    সুনন্দ মহা উত্তেজিত। এক রহস্যময় রোমাঞ্চের গন্ধ পেয়ে সে উৎসাহে টগবগ করতে লাগল। আমার মনেও লাগল তার ছোঁয়াচ। আর তার ফল—কী বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা!

    দুপুরবেলা। আমি ও সুনন্দ সাইকেলে চেপে মহুয়াডাঙা গ্রামের দিকে চললাম।

    আমাদের বাড়ি থেকে শহর ছাড়িয়ে মাইল খানেক গিয়ে ধলভূমগড় যাওয়ার বড় রাস্তা থেকে ডান পাশে এক সরু মেঠো রাস্তা বেরিয়ে গেছে। ওই পথ মাইল দুই দূরে মহুয়াডাঙায় শেষ হয়েছে। পথের দু—পাশে প্রান্তরে বড় বড় পাথর পড়ে আছে। মাঠে গাছপালা খুব কম। মাঝেমাঝে কয়েকটা শুধু খেজুর তাল বা বাবলা গাছ। আর এক নিঃসঙ্গ প্রাচীন বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। দূর থেকে মহুয়াডাঙা গ্রাম দেখা যায়। গ্রামে অবশ্য বেশ গাছপালা। একটা পুকুর রয়েছে। এমন অসময়ে দুই শহুরে যুবকের আবির্ভাবে গ্রামের লোক অবাক হয়ে গেল।

    বুনো মাঝির বাড়ি কোনটা?—জিজ্ঞেস করতেই একজন দেখিয়ে দিল আঙুল বাড়িয়ে। কিন্তু তার চোখের অদ্ভুত চাউনিটা আমাদের নজর এড়াল না।

    গ্রামে ঢোকার মুখেই বুনোর বাড়ি। একখানি মাত্র ছোট্ট মাটির ঘর। তাতে খড়ের চাল। তকতকে একফালি উঠোন। একটা প্রকাণ্ড শুয়োর বাড়ির সামনে মাটিতে গড়াচ্ছে। তার গায়ের ওপর চার—পাঁচটা ছানা। ঘরের বাইরে তেতুঁল গাছের ছায়ায় দড়ির খাঁটিয়াতে বুনো বসে ছিল। পাশে তার মেয়ে শুয়ে। সাইকেলটা একটা গাছে ঠেস দিয়ে রেখে আমরা কাছে যেতে বুনো উঠে দাঁড়াল। শুয়োরটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে পালাল। পিছনে পিছনে ছুটল তার বাচ্চারা।

    বুনোকে প্রথম দর্শনে ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। কী দুশমনের মতো চেহারা! রীতিমতো লম্বা। গিঁট পাকানো দেহ। মুখে অজস্র ভাঁজ। কাঁধ অবধি কালো কুচকুচে বাবরি চুল। ছোটছোট চোখ দুটো করমচার মতো লালচে। সে ঘাড় কাত করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে।

    আমি বললাম, তোমার নাম বুনো?

    —হ।

    সুনন্দ বলল, আমাদের বুধন পাঠিয়েছে। আমরা মুরগি কিনতে এসেছি।

    মুরগি মাঠে চরছে। এখন ধরা যাবে না।—বুনোর কণ্ঠস্বর ফাঁসফ্যাসে। ওর ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম, আমাদের আগমনে মোটেই খুশি হয়নি। নেহাৎ যেন ঠেকায় পড়ে আমাদের উপস্থিতি সহ্য করছে। ওর দাঁতগুলো বড় বড়। চওড়া হাঁ। দেখলেই মনে হয়, লোকটা রাগী বেপরোয়া।

    আমি বেশ চটলাম মনে মনে। এমন খুনি চেহারার বেয়াদপ লোকটার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত হতে ভারি দায় পড়েছে আমাদের। ফিরে যাই। ওর বরাতে যা হবার তোক। আমাদের বয়ে গেছে। কষ্ট করে এলাম এতদূর, এই ঢের। সত্যি কথা বলতে কি, লোকটাকে দেখে অবধি আমার মন বলছিল, এর দ্বারা যে কোনো ভয়ঙ্কর কাজ সম্ভব। হয়তো গ্রামের লোকের ধারণা ঠিকই। বুধন তার ভাই সম্পর্কে দুর্বল। তাই অন্যদের কথা মানতে চাইছে না।

    সুনন্দ কিন্তু বুনোর ব্যবহারে দমল না। দিব্যি খোশমেজাজে বলল, বেশ আমরা আবার পরশুদিন আসব। একটা মুরগি ধরে রাখিস। এখন একটু জল খাওয়া দিকি। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।

    বুনো নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। আমাদের দৃষ্টি পড়ল খাঁটিয়ায় শোওয়া ছোট্ট মেয়েটির দিকে। আহা, মুখখানি কী মিষ্টি! করুণ চোখে অবাক হয়ে দেখছে। একটি পা। তার সরু। অক্ষম। শরীরও খুব রোগা। বড় মায়া হল।

    সুনন্দ চাপা স্বরে বলল, অসিত, দেখ, অনেকে লক্ষ করছে আমাদের।

    কথাটা ঠিক। আড়াল—আবডাল থেকে অনেকে মেয়ে—পুরুষ উঁকিঝুঁকি মারছিল। তাদের চোখে কৌতূহল।

    বুনো জল আনল ঝকঝকে পিতলের ঘটিতে। খেলাম জল। যাবার সময় সুনন্দ চেঁচিয়ে বলে গেল বুনো, আমরা পরশুদিন আবার আসব।

    প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে ফিরে চলেছি। গ্রাম ছাড়িয়ে খানিক গিয়ে এক দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আসার সময় মহুয়াডাঙা থেকে প্রায় মাইল খানেক দূরে মাঠের মধ্যে প্রকাণ্ড একটা বটগাছ দেখেছিলাম। সেই গাছের নীচে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ আকৃতি। পরনে গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা। চোখে দূরবিন লাগিয়ে গাছের ডালে না জানি কী দেখছে।

    সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র। ঝাউবাংলোতে থাকেন।

    আমাদের পাড়ার একেবারে শেষ বাড়িটা হল ঝাউবাংলো। এই নাম স্থানীয় লোকদের দেওয়া। ঝাউবাংলো অন্য বাড়িগুলোর থেকে বেশ খানিক তফাতে। বিরাট কমপাউন্ডওলা বাড়ি। উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। ভিতরে প্রচুর গাছপালা। মস্ত লোহার ফটক থেকে বসত বাডি অবধি কাঁকর—ফেলা চওড়া রাস্তা। তার দুধারে আছে দুসারি ঝাউগাছ। বোধহয় এই জন্যেই ঝাউবাংলো নামের উৎপত্তি। ও বাড়ির বাসিন্দাদের চিনিনা। শুধু জেনেছি প্রতাপ রুদ্র ওই বাড়ির মালিক। ঘাটশিলার স্থানীয় কাউকে বা কোনো চেঞ্জারকে ঝাউবাংলোয় কখনো বেড়াতে যেতে দেখিনি।

    প্রতাপ বাবুকে কয়েকবার মাত্র দেখেছি। খুব ভোরে কালো রঙের থ্যাবড়ামুখো বিশাল এক কুকুর নিয়ে মাঠে বেড়াচ্ছেন। ভদ্রলোকের নিজের চেহারাও চোখে পড়ার মতো। ছ ফুটের ওপর খাড়া শরীর। দোহারা শক্ত গড়ন। রোদে পোড়া ফর্সা রঙ। মাংসহীন লম্বাটে মুখ। চাপা পাতলা ঠোঁট। টিয়া পাখির মতো বাঁকানো নাকের নীচে পাকানো গোঁফ আর চিবুকে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথায় কাঁচা—পাকা ঘন চুল। পরনে থাকে হাঁটু অবধি ঝুলের। পাঞ্জাবি ও পায়জামা। তার গম্ভীর ধরন দেখলে নিজে থেকে আলাপ করার উৎসাহ জাগে না। শুনেছি, ভদ্রলোক দু বছর হল বাড়িখানা কিনে এখানে বাস করছেন। তবে ঘাটশিলায় থাকেন না প্রায়ই। ওই বাড়িটা আগে ছিল এক জমিদারের সম্পত্তি।

    আরও শুনেছি, বাড়িটায় নাকি ছোটখাটো এক চিড়িয়াখানা আছে। কারণ প্রতাপ রুদ্রের পশু পাখির বেজায় শখ। অনেক বিচিত্র জীবজন্তুর ডাক ভেসে আসে বাড়ির ভেতর থেকে। কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়না ভিতরে। প্রতাপ রুদ্র সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল জেগেছিল। কিন্তু মেটাবার সুযোগ পাইনি।

    এখানে কী করছেন ভদ্রলোক?—আমি জানতে চাইলাম।

    সুনন্দ বলল, মনে হচ্ছে বার্ড—ওয়াচার। পাখি দেখছে। যাদের এই নেশা থাকে, যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় পাখির খোঁজে।

    —ভদ্রলোক শুনেছি নানারকম জীবজন্তু পোষেন।

    হ্যাঁ।—বলল সুনন্দ—ওর সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে আছে। ইন্টারেস্টিং লোক।

    প্রতাপ রুদ্র একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন আমাদের, তারপর আবার দূরবিন চোখে লাগালেন।

    সাইকেলে পাশাপাশি চলেছি। বললাম, হারে সুনন্দ, বুনো লোকটাকে কেমন লাগল? নিরীহ, মানে সত্যি নির্দোষ, মনে হয় কি?

    নিরীহ মোটেই না।—সুনন্দ জবাব দিল—তবে দোষী না নির্দোষ এখুনি বলা শক্ত।

    অর্থাৎ বুনোর হাবভাবে সুনন্দরও ধোঁকা লেগেছে।

    বিকেলে খরস্রোতা নদী ধরে অনেক দূর বেড়াতে গেলাম দুজনে। ধলভূমগড়ের রাস্তাকে আড়াআড়িভাবে কেটে খরস্রোতা বয়ে চলেছে। রাস্তা গেছে নদীর ওপর সাঁকো দিয়ে।

    ক্ষীণকায় নদীর টলটলে জলে বড়জোর হাঁটু ডোবে। স্ফটিক স্বচ্ছ জলের তলায় নুড়ি—পাথর, বালি, ঝিনুক পরিষ্কার দেখা যায়। কখনো নদীর পারে পারে, কখনো বা ঠাণ্ডা জলের স্রোতে পা ডুবিয়ে অনেকটা হাঁটলাম। ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল।

    সাঁকোর কাছাকাছি পৌঁছেছি, একটি লোক দ্রুত পায়ে সাঁকো পেরিয়ে চলে গেল। প্রতাপ রুদ্র। আমাদের তিনি দেখতে পেলেন না।

    আমরা লক্ষ করলাম, প্রতাপ বাবু কিছুটা এগিয়ে ধলভূমগড়ের রাস্তা ছেড়ে মাঠে নামলেন। ওই তো মহুয়াডাঙা গ্রামে যাবার পথ। শর ঝোঁপের আড়াল থেকে দেখলাম সেই দীর্ঘকায় ঋজু দেহ ক্রমে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কখনো বা উঁচু ঢিবির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আলো কমে আসায় তাকে বেশি দূর অবধি নজর করতে পারলাম না।

    সুনন্দ প্রথমে কথা বলল—কী ব্যাপার! এই সময় ওই দিকে ভদ্রলোক চললেন কোথায়?

    ঠাট্টা করলাম—হয়তো নিশাচর পাখির খোঁজে যাচ্ছে। কিংবা সাঁওতাল গ্রামে হাড়িয়া খাবার অভ্যাস আছে।

    সাঁকোর রেলিংয়ে আমরা আরও ঘণ্টাখানেক বসে রইলাম। একটার পর একটা গান গাইলাম হেঁড়ে গলায়। শেষে গলা ধরে যেতে চায়ের তাগিদে উঠলাম। প্রতাপ রুদ্র কিন্তু তখনও ফিরলেন না।

    পরদিন ভোরে বুধন এল। বুধন জানাল, গতরাতে নাকি আবার রক্তচোষার আবির্ভাব ঘটেছিল মহুয়াডাঙায়। এবার সে হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে। তার শিকার এক যুবক। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে দেখে বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে অবিকল ওই রকম ক্ষত। তা থেকে রক্ত ঝরছে।

    ঘরের দরজা খোলা ছিল?—সুনন্দ প্রশ্ন করে।

    —না।

    —আর জানলা?

    —হ্যাঁ। একটা জানলা খোলা ছিল বটে।

    বুনোকে কেউ দেখেছে নাকি কাছে—পিঠে?—আমি জানতে চাইলাম।

    —উহুঁ। তবে ঢেঙা বলছে, বুনো কাল রাত অবধি জেগে বসেছিল তার উঠোনে। গাঁয়ের লোক ওকেই সন্দেহ করছে।

    বুধন বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রইল। বেচারা ভাইয়ের বিপদের আশঙ্কায় বড় মুষড়ে পড়েছে।

    সুনন্দ বুধনকে জিজ্ঞেস করল, ওই যে ঝাউবাংলো, ওর মালিককে চিনিস?

    —হুঁ। চিনি। লম্বা পারা মানুষ। কুকুর নিয়ে ঘোরে।

    —আচ্ছা, ওই বাবু কাল রাতে তোদের গ্রামে গিয়েছিল?

    —কই না তো!

    —উনি মহুয়াডাঙায় গিয়েছেন কখনো?

    —হ্যাঁ। গেছে অনেকবার।

    —কী করতে যায়?

    —চোখে নল লাগিয়ে পাখি দেখে।

    —রক্তচোষার ব্যাপারে কিছু জানেন নাকি?

    —তা তো জানিনা বাব। তবে একদিন দূর থেকে দেখেছি, ঢেঙামাঝির সঙ্গে কী সব কথা বলছিল।

    বুধন চলে যেতে সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র কাল রাতে মহুয়াডাঙার দিকে গিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামে ঢোকেন নি। কোথায় গিয়েছিলেন তবে? আশ্চর্য!

    আমি উত্তর দিলাম—হয়তো মাঠে মাঠে পায়চারি করেছেন। লোকটি বেশ রহস্যময়।

    হুঁ।—সুনন্দ একটু মাথা নাড়ে।

    তখনও রোদের তেজ বাড়েনি। দুজনে বেড়াতে বের হলাম। ঝাউবাংলোর সামনে দেখি, প্রতাপ রুদ্র প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরছেন। হাতে চেনে বাঁধা সেই বিরাট কুকুর।

    সুনন্দ সোজা এগিয়ে গেল ভদ্রলোকের দিকে। অমনি বাঘের মতো কুকুরটা গরগর করে উঠে চেনে টান দিল। থমকে দাঁড়াল সুনন্দ। প্রতাপ রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল, নমস্কার। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। আপনাকে প্রায়ই দেখি। এটা কী জাতের কুকুর জিজ্ঞেস করব ভাবি।

    রুদ্ৰ স্থির চোখে কয়েক মুহূর্ত সুনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি! আবার একটু কৌতুকের আভাস রয়েছে যেন। সুনদর অবস্থা দেখে মজা পেয়েছেন। সুনন্দ কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। বারবার আড় চোখে কুকুরটাকে দেখছে।

    আপনি কুকুর ভালবাসেন?—ভরাট কণ্ঠস্বর।

    —আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —এটা ম্যাস্টিফ।

    ওঃ, দারুণ কুকুর! আচ্ছা আপনি তো অনেক জন্তু—জানোয়ার পুষেছেন, দেখাবেন আমাদের? সুনন্দ আলাপ জমাবার চেষ্টা করল।

    প্রতাপ রুদ্রের মুখে কিন্তু কোনো আগ্রহ ফোটে না। আমাদের আর এক প্রস্থ আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর বললেন, দেখাতে পারি এক শর্তে।

    —কী?

    —মাত্র একবার দেখাব এবং আর কাউকে জুটিয়ে আনা চলবে না। কাউকে এ খবর বলাও চলবে না। লোকজন এলে আমার কাজের ক্ষতি হয়।

    বেশ তাই হবে।—সুনন্দ তৎক্ষণাৎ রাজি।

    আসুন।—প্রতাপ বাবু আহ্বান জানালেন।

    নেপালি দরোয়ান গেট খুলে দিল। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। একজন পরিচারক এসে। নীরবে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে কুকুরটা নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। পরিচারকটি এ দেশীয় নয়। দারুণ যণ্ডামার্কা জোয়ান। কাকর—বিছানো পথ ধরে চলতে চলতে রুদ্র জেনে নিলেন আমাদের পরিচয়।

    প্রতাপবার একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, আমাদের কালেকশনে কিন্তু বাঘ—সিংহ নেই। সবই ছোট জীবজন্তু। সাধারণত যে সব পশু—পাখি কেউ পোযে না, আমি তাদের পোষ মানাবার চেষ্টা করি। ওদের চরিত্রের খুঁটিনাটি স্টাডি করি।

    আমরা বাগানের ভিতরে চললাম। বাগানের এক জায়গায় পর পর পনেরো—ষোলটা বড় বড় খাঁচা। খাঁচাগুলো তারের জালে ঘেরা। মাথায় খড়ের চাল। কোনোটাতে রয়েছে। জন্তু, কোনোটায় পাখি। ঠিক কলকাতা চিড়িয়াখানায় যেমন দেখেছি, তেমনি করে রাখা। হয়েছে জীবজন্তু।

    প্রতাপ রুদ্র একটার পর একটা খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে চিনিয়ে দিতে লাগলেন। লোকটির চেহারা ও কথাবলার ভঙ্গিতে জোরালো ব্যক্তিত্বের ছাপ।

    এক ফাঁকে তিনি বললেন, আমি বয়সে অনেক বড়। আশা করি তুমি বললে আপত্তি নেই।

    আমরা সরবে জানালাম—না না আপত্তির কী আছে?

    প্রতাপ রুদ্র দেখাতে থাকেন, এই এক জোড়া ডিঙ্গো। অস্ট্রেলিয়ার বুনো কুকুর। কিছুতেই পোষ মানে না। তবে আমি কিছুটা বাগ মানাতে পেরেছি।

    তিনি পকেট থেকে বিস্কুট বের করে খাঁচার ভিতর ছুঁড়ে দিলেন। অনেকটা আমাদের দেশি কুকুরের মতো চেহারা। মেটে লাল রঙের ডিঙ্গো দুটো বিস্কুট খেয়ে লেজ নাড়তে লাগল। তারপর রুদ্র দেখালেন, এই হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালা।

    প্রাণীটি ঠিক যেন ক্ষুদে ভালুক। রুদ্র বললেন, এ ভাল্লুক নয়। ভাল্লুক স্তন্যপায়ী। এরা মারসিউপিয়ান। অর্থাৎ পেটের তলায় থলিতে বাচ্চা বয়ে বেড়ায়। যেমন ক্যাঙ্গারু।

    একটা খাঁচার সামনে দাঁড়াতেই কালো—সাদা নোমওলা বেঁজি জাতীয় দুটো জন্তু দাঁত খিঁচিয়ে উঠল। রুদ্র বললেন, উদ্ভারিন। উত্তর আমেরিকার বেঁজি। খুব হিংস্র।

    এরপর দেখলাম, মাদাগাস্কারের লেমুর ও শ্লথ। আফ্রিকার বনবিড়াল। দক্ষিণ আমেরিকার ধেড়ে ইঁদুর এগুটি ইত্যাদি নানা অদ্ভুত জন্তু।

    তারপর পাখি। কতরকম রঙবেরঙের পাখি। বেশির ভাগেরই নাম শুনিনি। কোনোটা ভারি সুন্দর শিস দিচ্ছে। গাছের ছায়ায় দাঁড়ের ওপর সরু চেন পা বাঁধা এক কাকাতুয়া বসে ছিল। তার গায়ের পালক ধবধবে সাদা মাথায় হলদে ঝুঁটি। কালো বাঁকা ঠোঁট। আমরা কাছে যেতে চোখ পাকিয়ে তড়বড় করে পরিষ্কার গলায় বলতে লাগল গুড মর্নিং, গুড মর্নিং। নমস্কার, নমস্কার।

    রুদ্র বললেন, ও তাক বুঝে মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে শিখেছে।

    রুদ্র হাত নাড়তে কাকাতুয়া বলে উঠল, বাই বাই!

    সুনন্দ প্রশ্ন করল, মিস্টার রুদ্র, এসব পশু—পাখি আপনি যোগাড় করেন কীভাবে?

    —কিনে আনি নানা দেশ থেকে। দু—একটা নিজেও ধরেছি।

    আমাদের মাথার ওপর ছোট্ট অদ্ভুতদর্শন একটা কালো রঙের বাঁদর গাছের ডালে লেজ, পাকিয়ে মাথা নিচু করে দোল খাচ্ছিল। তার ভাঁটার মতো চোখ। মস্ত লেজ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন দেশি বাঁদর?

    —বাঁদর নয়। একরকম ভাম। ব্রাজিল থেকে এনেছি। নাম কিংকাজু। এমনি লেজে ঝোলার অভ্যাস একমাত্র সাউথ আমেরিকার প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায়।

    রুদ্র একবার শিস দিতে কিংকাজুটি তড়াক করে নেমে এসে তার পিঠে চড়ে বসল। পরক্ষণেই লম্বা লাফে গাছে উঠে গেল।

    রুদ্র বললেন, আমি দু মাস আগে সাউথ আমেরিকা থেকে ফেরার সময় কতগুলো স্পেসিমেন এনেছিলাম। তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভাল পোষ মেনেছে।

    সুনন্দ উসখুস করছিল। এবার কথাটা পাড়ল—মিস্টার রুদ্র, সেদিন আপনাকে মহুয়াডাঙা গ্রামের কাছে দেখলাম; বায়নাকুলার দিয়ে কী যেন দেখছিলেন—

    রুদ্র জবাব দিলেন, পাখি দেখছিলাম।

    সুনন্দ বলল, জানেন, ওই গ্রামে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে।

    কী? রুদ্র ভুরু কোঁচকালেন।

    —রাত্তির বেলা ঘুমন্ত লোককে কীসে যেন কামড়াচ্ছে। কী কামড়ায়, যখন কামড়ায়, কেউ টের পায় না ঘুম ভেঙে দেখে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছে। গ্রামের লোক খুব ভয় পেয়ে গেছে।

    —কেন?

    —ওদের ধারণা অলৌকিক কাণ্ড। মানে কোনো রক্তচোষা পিশাচ বা দানোর কীর্তি।

    ও।—সংক্ষিপ্ত উত্তর। প্রতাপ বাবু বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর অন্য কথা কয় করলেন। অর্থাৎ এ বিষয়ে আর আলোচনা করতে চান না।

    সুনন্দ উৎল্পভাবে বলল, আপনি বুঝি অনেক দেশ ঘুরেছেন?

    —হ্যাঁ, তা ঘুরেছি।

    —কোথায় কোথায়?

    —ইউরোপের সব জায়গায়। তাছাড়া মিডল—ইস্ট।

    —আপনার কাছে গল্প শুনতে আসব কিন্তু।

    সরি, এখন নয়। আপাতত কদিন আমি ব্যস্ত আছি।—অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় প্রতাপ বাবু। সুনন্দর আগ্রহকে থামিয়ে দিলেন।

    প্রতাপবাবুর ব্যবহার শেষ দিকে বেশ রূঢ় মনে হল। আমাদের বসতেও বললেন না। চিড়িয়াখানা দেখা হয়ে যেতে আবার সোজা গেট অবধি আমাদের এগিয়ে দিলেন।

    ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম, সুনন্দ কী বুঝলি?

    —বুঝলাম যে প্রতাপ বাবু মহুয়াডাঙার ঘটনা জানেন। কিন্তু অন্যদের কাছে ফঁস করতে রাজি নন।

    দ্বিতীয়ত উনি এখন ব্যস্ত।—আমি মন্তব্য করলাম।

    পরদিন বাজার থেকে এসে সুনন্দ বলল, বুঝলি অসিত, প্রতাপবাবু সম্পর্কে একটু খোঁজ—খবর করলাম। লোকটির অতীত সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না। শুধু জানলাম, উনি একজন প্রাণিতত্ত্ববিদ এবং অনেক দেশ—বিদেশে ঘুরেছেন। এখানকার লোকেদের সঙ্গে পরিচয় সামান্য। বিচিত্র স্বভাব। আগের বছর একদল বেদে এসে আস্তানা গেড়েছিল মাঠে। তারা সাপ খেলা দেখাত। নাচগান করত। জড়িবুটি ওষুধ বিক্রি করত। প্রতাপ বাবুর সঙ্গে তাদের বেশ দহরম মহরম হয়। আবার মাস ছয় আগে এক তান্ত্রিক সাধু এসে শালবনের ভিতর কিছুদিন ছিল। তার কাছেও প্রতাপ বাবুকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। তবে লোকটা নাকি পশু—পাখির বিষয়ে একজন এক্সপার্ট। কলকাতা চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট একবার ওর সঙ্গে কয়েকটা জন্তু নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলেন।

    সেদিন সন্ধ্যার ঝোঁকে দেখলাম প্রতাপবাবু ঝাউবাংলো থেকে বেরিয়ে খরস্রোতা নদীর দিকে চলে গেলেন। সঙ্গে কুকুরটা নেই। আমরা নদীর ব্রিজে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। রাত হল। কিন্তু প্রতাপবাবু ফিরলেন না।

    সুনন্দ উঠল—চল তো একবার মাঠে।

    —প্রতাপ রুদ্রের খোঁজে?

    হুঁ—সুনন্দ মহুয়াডাঙার পথে পা চালাল। কিছুটা গিয়েই থমকে দাঁড়ালাম দুজনে। জনমানবহীন সেই বিশাল আঁধার মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে কেমন গা ছমছম করতে লাগল। চারদিক নিঝুম। থেকে থেকে কোনো রাতজাগা পাখির ক্ষীণ তীক্ষ্ণ ডাক শোনা যাচ্ছে। মাথার ওপর অগণিত তারা হিরের কুচির মতো ঝিকমিক করছে। আচমকা কতগুলো শিয়াল সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল—হুয়া—হুয়া—হুয়া।

    প্রান্তরে কোথাও আলোর চিহ্ন দেখতে পেলাম না। খানিক পরে সুনন্দকে ঠেলা মেরে বললাম, চল ফিরি।

    সুনন্দ নীরবে ফিরে চলল।

    বুধন এল তিনদিন পরে। মহুয়াডাঙায় গতকাল আবার সেই রক্তলোভী নিশাচরের উপদ্রব ঘটেছে। আবার আক্রমণ হয়েছে ঢেঙা মাঝির ওপর।

    ঢেঙা এবার শুয়েছিল ঘরের ভিতর। পাশে ছিল তার বউ। বউ—ই আবিষ্কার করে, ঢেঙার গলায় একটা কাটা জায়গা থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। ঢেঙা কিন্তু তখন অঘোরে ঘুমচ্ছে। মেঝেয় অনেক রক্ত পড়ে শুকিয়ে গেছে। বেশ অবসন্ন হয়ে পড়েছে ঢেঙা। রক্তপাতের। চেয়ে ভয়েই কাতর হয়েছে বেশি।

    বুধন জানাল যে, গ্রামের লোক ক্ষেপে উঠেছে। তাদের মতে, এ নিশ্চয়ই বুনোর প্রতিশোধ। কারণ ঢেঙা ওর নামে মোড়লের কাছে লাগিয়েছিল। বুনোকে খুন করার শলা—পরামর্শ হচ্ছে। বুধন শুনেছে। বুনোর আর নিস্তার নেই।

    সুনন্দ জিজ্ঞেস করল, ঝাউবাংলোর বাবু মহুয়াডাঙায় গিয়েছিল নাকি এর মধ্যে?

    —হ্যাঁ গিয়েছিল। তবে গাঁয়ে ঢোকেনি। মাঠে ঘুরছিল পাখি দেখতে। পাখি ধরার ফাঁদ পাতছিল গাছে।

    —রাতের বেলা গ্রামের ভিতর কোনো বাইরের লোককে দেখা গেছে? সুনন্দ জানতে চাইল।

    উঁহু।—বুধন মাথা নাড়ল।

    আমরা দুজনে সেদিন সকালে মহুয়াডাঙায় এক রাউন্ড টহল দিয়ে এলাম। বুনোর হাবভাব আরও অস্বাভাবিক মনে হল। দুর্দান্ত লোকটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। আড়চোখে কেবল তাকাচ্ছে চারধারে। ছটফট করছে। বারবার তার দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে বারন্দায় চাটাইয়ে শোওয়া তার রুগণ মেয়ের দিকে। সে মুরগি দিল। পয়সা নিল। কিন্তু কথাবার্তা বলল না। ঠিক যাবার আগে সুনন্দ তাকে বলল, বুনো তোর মেয়েকে হাসপাতালে দে। ও ভালো হয়ে যাবে।

    অমনি বুনোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—হবে? বেশ। আজই দিয়ে দি হাসপাতালে। তুই ঠিক করে দে বাবু।

    সুমন্দ বলল, এত তাড়াতাড়ি হবে নারে। আমি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে তোকে জানাব।

    বুনো যেন দমে গেল। মনে হল, মেয়েকে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে ফেলতে পারলে ও নিশ্চিন্ত হয়।

    মহুয়াডাঙা ছেড়ে চলে আসবার সময় সুনন্দ বলল, লক্ষ করলি, বুনো ভয় পেয়েছে?

    উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। হয়তো মেয়ের জন্যেই ওর ভাবনা বেশি। কিন্তু লোকটা সত্যি দে দোষী না  নির্দোষ আমি এখনো ঠিক বুঝছি না।

    সুনন্দ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে বা নিরপরাধ। তবে

    সুনন্দ আর কিছু বলে না।

    বিকালে সুনন্দ বলল, মামার চেনা এক ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে আসি। স্টেশনের কাছে থাকেন।

    আমি গেলাম না। জমাট এক ডিটেকটিভ বই শুরু করেছি। বললাম, আমি মুরগিটা বেঁধে রাখব। তুই ঘুরে আয়।

    সুনন্দর ফিরতে রাত আটটা হল। রাতে খাওয়ার পর বারান্দায় বসে গল্প করতে লাগলাম। শুক্লপক্ষ চলছে। কিন্তু একট মেঘ জমেছে। তাই চাঁদের আলো তেমন ফোটেনি। কেমন ঘোলাটে ভাব। অনেক দূরে দূরে। কয়েকটা বৈদ্যুতিক আলো ঝকঝক করছে। আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে দু—চারটে মিটমিটে তারা। এমন নিস্তব্ধ রাত কলকাতায় টের পাওয়া যায় না।

    আমি বললাম, জানিস সুনন্দ, মহুয়াডাঙার এই রহস্য নিয়ে আমার মাথায় একটা থিওরি এসেছে।

    —কী?

    —ড্রাকুলা ফিল্মটা দেখেছিস?

    —না।

    —গল্পটা শুনেছিস?

    —হ্যাঁ, শুনেছিলাম। কিন্তু—

    বললাম, আমি ড্রাকুলা ফিল্মটা দেখেছি। বইটাও পড়েছি। মনে আছে, রুমেনিয়ার এক জমিদার কাউন্ট ড্রাকুলা ছিল ভ্যাম্পায়ার। অর্থাৎ মানুষরূপী রক্তশোষক প্রেত। সে ঘুমন্ত মানুষের বা মানুষকে সম্মোহন করে তার রক্ত শুষে খেত। মহুয়াডাঙার কেসটা অনেকটা যেন সেই রকম।

    সুনন্দ ঝাঁপিয়ে উঠল, দূর—যতসব বাজে সংস্কার। তাছাড়া ড্রাকুলা—ফ্রাকুলা বিদেশি ব্যাপার। এদেশে ড্রাকুলার কথা কখনো শোনা যায়নি।

    আমি বললাম, মনে রাখিস, প্রতাপ রুদ্র বহুদিন বিদেশে কাটিয়েছে। ওর ব্যাকগ্রাউন্ড কেউ জানে না। অবশ্য ওই বুনোও ভ্যাম্পায়ার হতে পারে।

    সুনন্দ আমার দিকে তাকিয়ে গলা দিয়ে শুধু শব্দ করল, হুম্।

    আশ্চর্য ব্যাপার। এর পর সুন্দর কথাটথা কমে গেল। কিছু জিজ্ঞেস করলে হুঁ—হ্যাঁ করে দায়সারা গোছের জবাব দেয়। অন্যমনস্কভাবে মাথার চুল টানছে কেবল। ও লক্ষণ চিনি। সুনন্দর মস্তিষ্কে কোনো চিন্তা ঘুরঘুর করছে। নিশ্চয়ই আমার ডাকুলার আইডিয়াখানা লেগে গেছে। মনে মনে হাসলাম। আমি মোটেই সিরিয়াসলি ডাকুলার কথা ভাবিনি। রহস্য করেছিলাম মাত্র।

    পরদিন সকালে চা এবং কিঞ্চিৎ টা গলাধঃকরণ করেই সন হুট করে কোথায় বেরিয়ে  ফিরে এল, মিনিট পনের বাদে। জানতে চাইলাম, কোথায় গিয়েছিলি?

    —ঝাউবাংলোয়?

    —কেন?

    —প্রতাপ বাবুর সঙ্গে দেখা করতে।

    —হল দেখা?

    —না। দরোয়ান বলল, বাবু ব্যস্ত আছেন। এখন দেখা হবে না।

    কী জন্যে গিয়েছিলি?—আমার মনে একটা সন্দেহ উঁকি দেয়।

    ছিল দরকার।—সুনন্দ এর বেশি কিছু বলে না।

    —হুঁ, বুঝেছি। প্রতাপ রুদ্র সত্যি সত্যি ড্রাকুলা জাতীয় জীব কিনা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলি। ঠিক আছে, একটা বুদ্ধি দিচ্ছি। শোন এরপর যেদিন দেখা হবে, প্রতাপবাবুকে একটা চকলেট বা বিস্কুট অফার করবি। যদি খেয়ে ফেলে, তবে আমাদের থিওরি টিকল না। আর যদি না খায়, তাহলে ও নির্ঘাৎ রক্তচোষা। কারণ কাউন্ট ড্রাকুলা টাটকা রক্ত ছাড়া কিছু খেত না।

    আমার রসিকতায় সুনন্দ কিন্তু একটুও হাসল না। গোমড়া মুখে বসে রইল।

    দুপুরে খাবার পর সুনন্দ বলল, অসিত, টেনে ঘুমিয়ে নে। আজ রাতে আর ঘুম নেই বরাতে।

    কেন?—আমি চমকালাম।

    —কারণ আজ রাতে আমরা প্রতাপ রুদ্রকে ফলো করব।

    —অর্থাৎ তোর বিশ্বাস, প্রতাপ রুদ্রই হচ্ছে মহুয়াডাঙার নিশাচর আততায়ী। লোকটা পিশাচ। মানুষের রক্ত চুষে খায়। ধেৎ এই বিজ্ঞানের যুগে এসব ধারণা স্রেফ অচল। আমি তখন তামাশা করছিলাম।

    সুনন্দ গম্ভীরভাবে বলল, প্রতাপ রুদ্রের আসল পরিচয় আমি জানি না। প্রমাণ না পেয়ে। আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসব না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস মহুয়াডাঙার রহস্যের পিছনে ওর হাত আছে। কেন উনি প্রায়ই রাতে গ্রামের দিকে যান?

    আমি বললাম, যদি আজ রাতে উনি মহুয়াডাঙার দিকে না যান?

    —আজ নয়তো কাল যেদিনই যাবে, আমরা প্রতাপ রুদ্রকে ফলো করার জন্যে তৈরি থাকব।

    —অর্থাৎ এখন থেকে আমাদের রাতে ঘুমের দফা গয়া। আমার মেজাজ একদম বিগড়ে গেল। কিন্তু সুনন্দ যখন জেদ ধরেছে, ও ঠিক যাবেই। ও যা একরোখা আর ডানপিটে, আমি যেতে না চাইলে একাই যাবে। অথচ ওকে একা ছেড়ে দেওয়াও চলে না।

    বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। নির্জন নদীতটে কতরকম পাখির কাকলি। ঝিরঝিরে বাতাসে ঠাণ্ডা আমেজ। ভারি আরামদায়ক। আমার ও সুনন্দর কিন্তু এসব উপভোগ করার মতো মনের অবস্থা নয়। ঝোঁপের পিছনে লুকিয়ে অস্থির ভাবে অপেক্ষা করছি—কখন আসবে প্রতাপ রুদ্র।

    সহসা দেখলাম সেই দীর্ঘ ঋজু দেহ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে এই পথে। তার গায়ে কালচে রঙের পাঞ্জাবি ও হালকা হলুদ রঙা পায়জামা।

    প্রতাপ রুদ্র ব্রিজ ছাড়ালেন। তারপর খানিক এগিয়ে মাঠে নামলেন। অর্থাৎ আজও তাঁর লক্ষ্য মহুয়াডাঙা। নজর করলাম প্রতাপ বাবুর কাঁধে ঝুলছে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ।

    সুনন্দ বলল, এগিয়ে যাক। বেশ দূর থেকে ফলো করব। নইলে দেখে ফেলতে পারে।

    প্রতাপ রুদ্রের চলমান মূর্তি ক্রমে মাঠের মধ্য দিয়ে দূরে সরে যায়। তারপর ঢাল জটি নেমে চোখের বাইরে চলে গেল। তখন আমরা বেরিয়ে এলাম।

    পা টিপে টিপে এগোচ্ছি। কখনও ঢিবি বা পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছি। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমস্ত পশ্চিম দিগন্তে সিঁদুর—বরন হয়ে উঠল। অপরূপ সেই দৃশ্য। প্রতাপবাবুকে শেষবারের মতো দেখলাম মাঠের মধ্যে সেই যে বিরাট বটগাছটা, তার নীচে। তারপর অদৃশ্য হলেন।

    বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বসে রইলাম পাথরের আড়ালে। আবার দেখলাম প্রতাপবাবু আবির্ভূত হয়েছেন।

    গাছের কাছে একটা বড় চ্যাটালো পাথর পড়েছিল। বেদির মতো দেখতে। প্রতাপবাবু তার ওপর বসলেন। তার পিঠ আমাদের দিকে। গাছের দিকে মুখ। স্থিরভাবে বসে আছেন। আমরা খানিক কাছে এগিয়ে গেলাম।

    অবাক হয়ে দেখলাম প্রতাপবাবু পাথরের ওপর সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। চুপচাপ শুয়ে রয়েছেন নিথর হয়ে। আমরা আর একটু এগোলাম। প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে একটা পাথরের স্কুপের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে খাঁজের ফাঁক দিয়ে লক্ষ রাখলাম প্রতাপ রুদ্রকে।

    ক্রমে দিনের আলো একেবারে নিভে গেল। একটির পর একটি তারা জ্বলে উঠল আকাশপটে। ফিকে একটু চাঁদের আলো ফুটল। আবছা দেখা যাচ্ছে চারপাশ। সামনে বটগাছটাকে যেন ঘোর কালো পাথরে তৈরি একটা পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছে। তার গায়ে অজস্র জোনাকি পোকার মিটিমিটে আলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। বাঁ পাশে দূরে মহুয়াডাঙা গ্রামখানির গাছপালার সীমারেখা আকাশের গায়ে ফুটে উঠেছে। গ্রামে কোনো আলো নেই। ভেসে আসছে না মাদলের আওয়াজ। মানুষের কণ্ঠধ্বনি বা কুকুরের ডাক। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা বিভীষিকায় গোটা গ্রাম যেন বোবা হয়ে গেছে। পাথরের ওপর শায়িত প্রতাপ রুদ্রকে শুধু অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। ঠিক একই ভাবে তিনি শুয়ে আছেন। কদের মতলব কী? বোধহয় রাত আরও গম্ভীর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

    ঝিঁঝির একঘেয়ে রব ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। আমরা দুজনে কাঠের মতো বসে থাকি। প্রবল উত্তেজনায় বুকের ভিতর যেন হাতুড়ির ঘা পড়ছে, এবার কী ঘটবে? কী হবে এবার?

    বেশিক্ষণ কাটেনি। হঠাৎ এক চিৎকার শুনলাম। মানুষের গলা। কিন্তু অদ্ভুত আওয়াজ। বুঝি রূদ্ধ আক্রোশ এবং আর্তনাদ মিশে আছে সেই স্বরে। তারপরই চ্যাঁ চ্যাঁ করে এক অপার্থিব টানা তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। মনে হল, আমাদের উলটো দিকে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে প্রায় পঁচিশ—ত্রিশ হাত দূরে সেই শব্দের উৎপিত্তস্থ

    সঙ্গে সঙ্গে প্রতাপবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে শব্দ লক্ষ্য করে বেগে ছুটে গেলেন। সুনন্দ আমার হাত ধরে টানল—আয় কুইক।

    প্রতাপ রুদ্রের হাতের জোরালো টর্চ জ্বলে উঠল। সেই আলোতে দেখলাম, একটা বড় পাথরের চাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দানবের মতো একটা মূর্তি। কেশরের মতো ফাঁপানো চুলের রাশি তার মুখের অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। ধড়াস করে উঠল হৃৎপিণ্ড। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর চিনতে পারলাম—বুনো। তার হাতে একটা বল্লম। বুনো মাত্র। দিকে তাকিয়ে আছে।

    প্রতাপবাবুও মুহূর্তের জন্য থেমেছিলেন। তারপরই দৌড়ে গিয়ে বুনোর সামনে বসে পড়লেন। আমরাও হোঁচটা খেতে খেতে এগোলাম।

    ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি প্রতাপবাবু মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছেন আর তার ডান হাতের মুঠোয় ছটফট করছে কী একটা জীব। প্রতাপবাবুর বাঁ হাতের টর্চ আর ডান হাতের ওপর আলো ফেলল। আমি ভীষণ আশ্চর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে, এ যে একটা বাদুড়!

    বাদুড়টা ছোট্ট। শিয়ালের মুখের মতো দেখতে তার মুখ। দুটো চকচকে ড্যাবড্যাবে চোখ। খাড়া খাড়া কান। ছুঁচোলো কয়েকটা দাঁত হিংস্রভাবে বেরিয়ে আছে।

    প্রতাপবাবু তার ডানা দুটো চেপে ধরেছেন। সে ক্রমাগত মুণ্ডু ঘুরিয়ে কামড়াবার চেষ্টা। করছে। আমাদের দেখে বুনো কর্কশ গলায় বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল।

    প্রতাপবাবু চমকে ফিরলেন। তাঁর টর্চের আলো পড়ল আমাদের মুখে—এ কী, তোমরা এখানে!

    সুনন্দ উত্তর দিল, হ্যাঁ, আমরা। আশা করি চিনতে পারছেন। একটু অসময়ে দেখা হয়ে গেল।

    তারপর প্রতাপবাবুর স্তম্ভিত দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে সুনন্দ বলল, অসিত, এটা কিন্তু সাধারণ বাদুড় নয়, ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। মিস্টার রুদ্র এবার আপনি

    সুনন্দ আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিল। রুদ্রের চাবুকের মতো প্রশ্ন তাকে থামিয়ে দিল।

    —এটা ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু তুমি জানলে কী করে? কে বলেছে?

    —অনুমান, মিঃ রুদ্র, অনুমান। কাল অসিত আমায় ড্রাকুলার গল্প শোনাল। বলল। ড্রাকুলার মতো কোনো ভ্যাম্পায়ার নিশ্চয়ই মহুয়াডাঙার লোকের রক্ত শুষে খাচ্ছে। অমনি একটা সম্ভাবনার উদয় হল আমার মনে। ওসব ভুতুড়ে গল্প আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু একটা নতুন ক্ল মাথায় এল। ভূতপ্রেতপিশাচ নয়—বাদুড়। রক্তপায়ী বাদুড়। ভ্যামপায়ার ব্যাট। ভ্যামপায়ার ব্যাটের রক্ত পানের বর্ণনা আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম। মহুয়াডাঙার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তা অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। স্রেফ দুইয়ে—দুইয়ে চার।

    আমি বললাম যাঃ, এখানে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু আসবে কোথা থেকে? ইমপসিবল।

    সুনন্দ উত্তর দেয়—জানি, ভারতবর্ষে ভ্যাম্পায়ার ব্যাট নেই। একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তবে প্রতাপবাবু মাত্র দু মাস আগে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কিছু পশু—পাখি নিয়ে এসেছেন। অতএব এ প্রাণীটি নিশ্চয়ই তাঁর আমদানি। কী, ঠিক বলিনি, মিস্টার রুদ্র?

    প্রতাপবাবু স্তব্ধ হয়ে সুন্দর কথা শুনছিলেন। এবার শান্ত কণ্ঠে বললেন, কারেক্ট। তোমার অনুমানের প্রশংসা করি। এর নাম ডেসমোডাস। এক জাতীয় ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। আমি সাউথ আমেরিকা থেকে আনিয়েছিলাম এদের ধরন—ধারণ রিসার্চ করতে।

    এরপর সুন্দর মুখ থেকে যে কথাগুলি উচ্চারিত হল, তা শুনে আমি হকচকিয়ে গেলাম।

    —মিঃ রুদ্র, আপনি কিন্তু ধরা পড়ে গেছেন। এবার আপনার নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ করতে। হবে।

    খেলা! নিষ্ঠুর! কী বলছ যা তা?—প্রতাপবাবু রীতিমতো ধমকে উঠলেন।

    নির্বিকারভাবে সুনন্দ বলল, কেন না বোঝার কী আছে? অতি সরল বাক্য। আপনি আপনার ওই পোষা জীবটিকে রাতের পর রাত মহুয়াডাঙার নিরীহ লোকদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন তার রক্ত—পিপাসা মেটাতে। খেলাটা নিষ্ঠুর বৈকি!

    রুদ্রের ঠোঁটে বক্র হাসি জেগে উঠল। ধীর স্বরে বললেন, এবার তোমার অনুমান ফেল করেছেন সুনন্দবাবু। এ বাদুড় আমার পোষ মানেনি আর আমি একে মহুয়াডাঙার মানুষদের ওপর লেলিয়ে দিইনি।

    তাহলে রাতে এখানে আসতেন কেন?—সুনন্দর কণ্ঠে অবিশ্বাস।

    —আসতাম এই পলাতক জীবটিকে ধরবার উদ্দেশ্যে। একজোড়া ডেসমোডাস এনেছিলাম। একটা মরে গেল, আর একটা খাঁচা থেকে পালাল। কয়েকদিন পরেই মহুয়াডাঙার ঘটনা কানে এল। বুঝলাম ডেস্মোডাসটি এই গ্রামের কাছে আস্তানা গেড়েছে। জায়গাটা পরীক্ষা করে ধারণা হল, এই বটগাছের কোটরে ও আশ্রয় নিয়েছে। গাছের গায়ে জাল খাটালাম। সারা রাত জেগে থাকতাম গাছের কাছে, যদি ফাঁদে পড়ে এই আশায়। অন্য বাদুড়ের মতোই ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দিনের বেলা অন্ধকার গুহায়, ঘন পাতার ছায়ায় বা গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকে। কেবল রাতে বেরোয়। চারদিন আগে বুঝলাম আমার ধারণা সঠিক। কারণ সেদিন সন্ধ্যায় আমি যখন ওই পাথরে বসেছিলাম, বাদুড়টা আমার মাথার ওপর দিয়ে কয়েকবার পাক খেয়ে উড়ে গেল। বোধহয় আমার রক্ত পানের মতলবে ছিল। টর্চের আলোয় তাকে চিনতে অসুবিধা হয়নি। তারপর থেকে একটা হাতে—ছোঁড়া জাল আনতাম সঙ্গে। চুপচাপ পাথরের ওপর শুয়ে টোপ ফেলতাম।

    প্রতাপবাবু একটু দম নিলেন। আবার গম্ভীর স্বরে বলতে লাগলেন, কাল ছুঁড়েছিলাম জাল। একটুর জন্যে ফস্কে গেল। নাউ, আমার মিস্টিরিয়াস মুভমেন্টের কারণ ক্লিয়ার। ওঃ গুডলাক! স্পেসিমেনটা জীবন্ত ধরতে পেরেছি। শুধু একটা ডানা জখম হয়েছে। এই লোকটা কিছু দিয়ে মেরেছে বোধহয়।

    প্রতাপবাবু পকেট থেকে একটা ছোট জালের থলি বের করে বাদুডটাকে তার মধ্যে পুরে বন্দি করে ফেললেন ও থলির মুখ চেন টেনে বন্ধ করে দিলেন।

    সুনন্দ অপ্রস্তুত সুরে বলল, সরি, প্রতাপবাবু। কিন্তু এই বাদুডের কথা মহুয়াডাঙার লোকদের বলেননি কেন? ওরা কী ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছে জানেন।

    প্রতাপবাবু বললেন, জানাইনি ভয়ে। জানলে ওরা হয়তো ক্ষেপে গিয়ে হাঙ্গামা বাঁধাত। তার চেয়ে ভয় ছিল, ওরা বাগে পেলে আমার দুর্লভ স্পেসিমেনটিকে মেরে ফেলবে। দিনের বেলা এই বিরাট বটগাছের অগুণতি কোটর হাতডে খুঁজে বাদুড়টা ধরা অসম্ভব ছিল। ওঁ বিষধর সাপ থাকতে পারে। তবে গ্রামের লোক বাদুড়কে মারতে চাইলে কোটরে টেরে বাইরে থেকে ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিলেই খতম। তাই চেষ্টায় ছিলাম, নিজেই। গবে কৌশলে। ও যখন রাতে বেরোবে তখন।

    —প্রতাপবাবু আপনার ওই মহামূল্যবান স্পেসিমেনটির জন্যে গ্রামের একজন লোক যে প্রাণ হারাতে বসেছে, সে খবর রাখেন? আমি বলে ফেললাম।

    সে কী! কে? কেন?—প্রতাপবাবুর চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে।

    বুনোর দিকে আঙুল দেখায় সুনন্দ—এই লোকটির বিপদ। গ্রামের লোকের সন্দেহ, ও—ই দানো হয়ে রাত্তিরে মানুষের রক্ত শুষে খাচ্ছে। ওকে খুন করার প্ল্যান হচ্ছে।

    বুনো এতক্ষণ স্থিরভাবে দাঁড়িয়েছিল। উদগ্রীব হয়ে আমাদের উত্তেজিত কথাবার্তার মর্ম গ্রহণের চেষ্টা করছিল। সে বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল। এক ঝাপ্পড় দিলাম।

    আমার মনে এক প্রশ্ন জাগে। জিজ্ঞেস করি, বুনো, এখানে কী করছিলি তুই?

    বুনো বলল, পাহারা দিচ্ছিলেম। সেই রক্তখেকো দানোটাকে ধরব বলে। দেখলেম তোরা তিনজনা মাঠের মধ্যে ঘুরছিস। তাই লুকিয়ে নজর রাখছিলেম পাথরের পিছনে শুয়ে।

    সুনন্দ বলল, বুনো, দানোটাকে তুই ধরে ফেলেছিস। আসলে দানো পিশাচ নয়। এই বাদুড়টাই আসামি। ও—ই ঘুমন্ত লোকের রক্ত শুষে খায়।

    বাদুড় রক্ত খায়?—কথাটা যেন বুনোর বিশ্বাস হল না।

    সুনন্দ বলল, দেশি বাদুড় খায় না। এটা বিদেশি বাদুড়। ফল—পাকুড় খায় না। শুধু রক্ত খায়। মানুষ বা পশু—পাখির তাজা রক্ত। মানুষের চামড়া নরম। তাই এরা মানুষের গায়ে দাঁত ফোঁটাতে বেশি পছন্দ করে।

    বুনো বিস্ফারিত নেত্রে কয়েক মুহূর্ত দেখল বন্দি বাদুড়টাকে। তার সমস্ত শরীর ফলে ফুলে উঠল। বিকৃত মুখে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ওঠে বুনো, ওটা বাদুড় নয়, শয়তান। শয়তান। ওটাকে আমি মেরে ফেলব। শেষ করে দেব। দে, দে, ওটা দে আমায়।

    হাতের বল্লম ফেলে দিয়ে বুনো একলাফে প্রতাপ বাবুর দিকে এগিয়ে গেল। প্রতাপবাবর ডান হাতে বন্দি বাদুড়। তিনি বাঁ হাতে বুনোকে ঠেকালেন। আমি আর সুনন্দও তৎক্ষণাৎ জাপটে ধরলাম বুনোকে।

    উঃ, কী প্রচণ্ড জোর লোকটার গায়ে! ঝট্কা দিয়ে আমাদের দুজনকে প্রায় ছাড়িয়ে ফেলে সে বারবার প্রতাপবাবর হাত থেকে বাদুড়টা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। আমরা দুজন না আটকালে ও নির্ঘাৎ বাদুড়টা কেড়ে নিয়ে মেরে ফেলত। ধাক্কা খেয়ে প্রতাপবাবুর হাত থেকে টর্চ খসে পড়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিলাম টর্চটা।

    বুনোর গলা দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বের হচ্ছে। অনেকদিনের জমা হওয়া শঙ্কা ও ক্ষোভ যেন ক্রোধের রূপ নিয়ে ফেটে পড়তে চাইছে। আমরা প্রাণপণে বোঝাই—বুনো, শোন শোন, এই বাদুড়টা আর কোনো উৎপাত করবে না। ওকে খাঁচায় আটকে রাখা হবে। ইত্যাদি।…

    তবু বুনোর রাগ পড়ে না। সে কেবলই ফুঁসছে। একটা ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। সুনন্দ হঠাৎ বলে উঠল, বুনো শোন, ডাক্তারবাবু বলেছেন তোর মেয়ের চিকিৎসা করবেন। তোর মেয়েকে হাতপাতালে ভর্তি করে নেবেন।

    বুনোর বজ্র—কঠিন পেশীগুলি অমনি কেমন শিথিল হয়ে গেল। সব ভুলে গভীর আগ সুনন্দর দিকে চেয়ে সে বলল, আমার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে? ডাক্তারবাবু বলেছে?

    যাবে বৈকি। নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে।—সুনন্দ আশ্বাস দিল।

    কার অসুখ?—প্রতাপবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

    —বুনোর মেয়ের। মেয়েটির একটা পা আঘাত লেগে খোঁড়া হয়ে গেছে।

    —হুঁ আমি দেখেছি মেয়েটিকে। ভেরি স্যাড কেস।

    সুনন্দ বলল, আমার মামার বন্ধু ডাক্তার চ্যাটার্জী বলেছেন, মেয়েটির ট্রিটমেন্ট করবেন। তবে হাসপাতালে রাখতে হবে। তার খরচ আছে। দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়।

    রুদ্র বললেন, বুনোর মেয়ের চিকিৎসার সব খরচ আমি দেব। এ আমার ঋণ শোধ। তুমি বুনোকে বলে দাও।

    সুনন্দ বুনোকে বলল—শুনলি, বাবু কী বললেন?

    বুনো প্রতাপবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর সে জ্বলন্ত চোখে নিরীক্ষণ করল জালে বদ্ধ বাদুড়টিকে। বিড়বিড় কি যেন বকতে লাগল নিজের মনে। বোঝা গেল। ওই বাদুড়ের ওপর তার রাগ ও বিদ্বেষ কিছুমাত্র কমেনি। বাদুড়ের মালিক সম্বন্ধেও তার মন রীতিমতো সন্দিগ্ধ।

    আমি বললাম, বুনো, এই রক্তচোষা বাদুড়ের কথা তুই বলিস নি কাউকে। বরং গ্রামের লোককে জানিয়ে দে, তুই মন্ত্রের জোরে দানোটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিস। তোর খুব খাতির হবে গাঁয়ে।

    হুঁ।—বুনো তার আঁকড়া চুলো মাথাখানা কঁকালো অর্থাৎ আমার পরামর্শ তার মনে ধরেছে। সে একবার ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল গ্রামের দিকে। বলে উঠল, যাই মেয়েটা একা রইছে।

    মাটি থেকে বল্লমটা কুড়িয়ে নিয়ে বুনো সহসা দৌড়তে শুরু করল।

    ম্লান জ্যোৎস্নালোকে উন্মুক্ত প্রান্তরের বুক ছুঁয়ে বুনোর সুদীর্ঘ ছায়ামূর্তি যেন উড়ে চলল। ক্রমে সে হারিয়ে গেল দূর অন্ধকারে।

    চ্যাঁ—এ! একটা বিশ্রী চেরা আওয়াজে আমাদের চমক ভাঙল। মহুয়াডাঙার রক্তচোষা তার বন্দিদশার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

  • বাস্তেন দ্বীপে অভিযান

    বাস্তেন দ্বীপে অভিযান

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    সুনন্দ হঠাৎ খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, দাঁড়া। সামনে একটা ছিনতাই কেল মনে হচ্ছে। দেখি ব্যাপারটা? দুজনে স্তব্ধ হয়ে যাই। একটু সরে গেলাম পাশে গাছের ছায়ার আড়ালে। চুপচাপ দেখতে থাকি।

     কলকাতা শহর। রাত দশটা বাজে প্রায়। আমি আর বন্ধু সুনন্দ গিয়েছিলাম গঙ্গার ধারে বেড়াতে বেড়াতে এবং আড্ডা মারতে। ওখানে আরও কয়েকজন বন্ধু প্রায়ই জমা হই সন্ধে থেকে।

    হেঁটে ফিরছিলাম রাজভবনের গা ঘেঁষে। এসপ্ল্যানেড় অবধি হেঁটে গিয়ে বাস ধরব। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। গরম কমেছে কলকাতায়। তবে শীত পড়েনি তেমন। ভালোই লাগছিল হাঁটতে। ফুটপাতে তখন পথচারীর সংখ্যা বেশ কম। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে। হু হু করে মাঝে মাঝে। রাজভবনের পাঁচিলের ধারে ধারে গাছগুলোর লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে ফুটপাতে। এক ফালি চাঁদ আবছা আলো ছড়াচ্ছে আকাশে। স্ট্রিট লাইটগুলো অবশ্য জ্বলছে। আলো—আঁধারি মিশেল বেশ রহস্যময় পরিবেশ।

    আমাদের আগে ষাট—সত্তর ফুট দূরে একটি লোকও এগোচ্ছিল ওই ফুটপাত ধরে। গঙ্গার কাছ থেকেই সে আমাদের সামনে সামনে যাচ্ছিল। বেঁটেখাটো প্যান্টসার্ট পরা মানুষটি ধীরে সুস্থে হাঁটছিল আমাদের মতোই। দেখলাম, হঠাৎ যেন অন্ধকার যুঁড়ে দুটো লোক সামনে খাটো লোকটির পথ আগলে দাঁড়াল। মনে হয় পাচিলের ধারে লোক দুটো গাছের ছায়ায় মিশে ঘাপটি মেরে ছিল শিকারের আশায়।

    দুটো লোকের একজন বেঁটে মানুষটিকে মুঠো পাকিয়ে নিচু স্বরে বলছে কিছু। তার ভাবভঙ্গি সুবিধের নয়। দ্বিতীয় জন পাশের দিকে সরে গেল। দেখলাম যে পথ আগলানো আগন্তুক বেঁটে মানুষটির প্যান্টের পকেটে স্রেফ হাত ঢুকিয়ে দিল। হয়তো মানিব্যাগের আশায়।

    পথচারী বেঁটে মানুষটি এতক্ষণ কিছু বলছিল মৃদুস্বরে আর কেবলই ঘাড় নাড়ছিল। এবার সে তড়িৎগতিতে হাত চালাল। সঙ্গে সঙ্গে তার সামনের লোকটি উলটে পড়ল ফুটপাতে। কিন্তু পাশে থাকা দ্বিতীয়জন কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করল বেঁটে পথচারীটিকে। লোকটি বসে পড়ে মাথা চেপে। ভূপতিত ছিনতাইকারী এই সুযোগে উঠে দাঁড়িয়েছে।

    সুনন্দ বলল, ছোট। আটকাতে হবে।

    সুনন্দ দৌড়ল। পিছু পিছু আমি।

    যে লোকটা মেরেছিল সে ঝুঁকে তার শিকারের পকেট হাতড়াচ্ছে। দ্বিতীয় ছিনতাইকারীও কাছে এসে দেখছে। আমাদের পায়ের শব্দে লোক দুটো ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে না দেখতেই সুনন্দ ঝুঁকে পড়ার পশ্চাদদেশে কষাল ভারী জুতোর প্রচণ্ড এক লাথি। লোকটা ছিটকে উলটে পড়ল ফুটপাতে। আমি দ্বিতীয় ছিনতাইকারীর মুখে মারলাম এক মোক্ষম ঘুষি। আক শব্দ করে সে মুখ চেপে টলমলিয়ে পিছিয়ে গেল।

    সুনন্দর লাথি খাওয়া লোকটা কিঞ্চিৎ সামলে উঠে দাঁড়াচ্ছে, দেখি তার হাতে একখানা ছুরি। চকচক করে ওঠে স্ট্রিট লাইটের আলোয় ছুরির সরু লম্বা ফলা। কিন্তু সুনন্দ তাকে আক্রমণের সুযোগই দেয় না। ফের এক লাথি কষায় লোকটার ছুরি ধরা হাতে কনইয়ের কাছে। ছুরি খসে পড়ে হাত থেকে। ব্যথায় কাতরে ওঠে লোকটা। তারপর ঘুরে মারল। টেনে দৌড়। তার ছিনতাইয়ের সাধ উবে গেছে। দ্বিতীয় লোকটাও প্রাণপণে অনুসরণ করল সঙ্গীকে। দুজনে রাস্তা পেরিয়ে মিলিয়ে গেল ময়দানের অন্ধকারে।

    সুনন্দ ছুরিটা কুড়িয়ে নেয়। ফলাটা আট ইঞ্চি হবে। দারুণ ধার। ইস, লাভের বদলে ব্যাটাদের লোকসানই হয়ে গেল। আমরা এবার সেই বেঁটে মানুষটির দিকে নজর দিই।

    লোকটি তখনো ফুটপাতে বসে। হতভম্ভ দৃষ্টি। এক হাতে চেপে আছে নিজের মাথার এক পাশ। লোকটিকে তুলে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় পরীক্ষা করি। নাঃ রক্ত গড়াচ্ছে না। তবে লেগেছে খুব। ওর যন্ত্রণাকাতর মুখ দেখেই মালুম হচ্ছে। লোকটির মাথায় পরা কাউন্টি—ক্যাপ জাতীয় মোটা কাপড়ের টুপি তার মাথাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এযাত্রা।

    পথচারীকে দেখে আমরা অবাক। লোকটি বাঙালি নয়। মনে হল ভারতীয়ই নয়। মঙ্গোলীয় ধাঁচের মুখ। চিনা, বর্মী বা মালয়িদের মতন দেখতে। গড়ন ছোটখাটো হলেও মজবুত। লোকটি খানিক সামলিয়ে বলল, থাঙ্কু মিস্তার। ইউ ছেভ মি। ওঃ। সে নিজের মাথায় হাত বোলায় টুপিটা খুলে।

    আমরা দেখলাম, কাটেনি বটে কিন্তু মাথার এক জায়গায় বেশ ফুলে উঠেছে।

    কয়েকজন পথচারী ইতিমধ্যে জুটে গেছে চারপাশে। প্রশ্ন হয়—

    —কী হয়েছে দাদা?

    —কেসটা কী?

    —ছিনতাই করছিল। জবাব দেয় সুনন্দ।

    —নিয়েছে কিছু?

    —মেরেছে বুঝি? লোকটা তো মনে হচ্ছে চিনেম্যান।

    —হুঁ বিদেশি। তাই মনে হচ্ছে। জানাই আমি।—তবে নিতে পারেনি কিছু। আমরা কয়েক ঘা লাগাতেই পালাল লোক দুটো। আমরা একটু দূরে পিছনে ছিলাম ভাগ্যিস। তবে মেরেছে মাথায়। দেখি জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবে? পরিচয় কী? কিছু একটা ব্যবসা তো। করতে হবে।

    —হ্যাঁ হ্যাঁ তা তো বটেই। থানায় নিয়ে যান। ডায়ারি করে দিন। পুলিশই যা করবার করবে।

    —সঙ্গে টাকাকড়ি বেশ আছে বোধহয়। তাই ফলো করছিল। এই লোকগুলোও সুবিধের হয় না। থানায় জমা করে দিন।

    অন্য পথচারী কেউ কিন্তু ওই লোকটিকে থানায় নিয়ে যেতে সাহায্য করতে এগোল না। তারা সুটসাট কেটে পড়ল উপদেশ ঝেড়ে। ফের আমরা তিনজন। চারপাশ মোটামুটি ফাঁকা।

    আক্রান্ত লোকটি এতক্ষণ চুপচাপ অন্যদের কথা শুনছিল। বোধহয় বুঝতে পারছিল। বাকিরা চলে যেতে সে মাথা নেড়ে বলল, নো পুলিশ। নো পুলিশ।

    কে জানে, পুলিশে ছুঁলে আঠারো—ঘা আপ্তবাক্যটি এর জানা আছে হয়তো। যাহোক সুনন্দ তাকে ইংরেজিতে আশ্বাস দেয়, ঠিক আছে, পুলিশে রিপোর্ট করা দরকার নেই। তবে তোমার মাথায় লেগেছে রেশ। ফাস্ট—এড দেওয়া উচিত। হাঁটতে পারবে খানিকটা?

    লোকটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

    ধীরে ধীরে হেঁটে এসপ্ল্যানেডের দিকে যেতে যেতে আমরা লোকটির পরিচয় জানার চেষ্টা করি। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করি, তুমি কয়রা কী? মানে প্রফেশন?

    উত্তর হয়, সেলার।

    জাহাজের নাবিক! বাঃ।

    —দেশ কোথায়? ইন্ডিয়ান?

    —নো। ইন্দোনেশিয়ান।

    আমি ও সুনন্দ চোখাচোখি করি। দারুণ ইন্টারেস্টিং লোক। সুনন্দ আমায় ফিসফিসিয়ে বলে বাংলায়, লোকটাকে সহজে ছাড়ছি না। ওর গল্প শুনতে হবে।

    বটেই তো। আমারও তাই হচ্ছে। সাত—সমুদ্রে ঘোরা জাহাজের নাবিকদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হয় বিচিত্র। আমরা ডাঙার মানুষরা তার কতটুকু জানি বা দেখেছি। সব বিদ্যে বই পড়ে ঠিক জানা যায় না। এসব মানুষ তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লেখেও কদাচিৎ। তবে আগ্রহ দেখালে বলে শুনেছি।

    লোকটি দেখলাম ইংরেজিটা মোটামুটি বলতে ও বুঝতে পারে। কিছু বাংলা হিন্দিও জানে। তবে তেমন সড়গড় নয় কথায়, বোঝে বেশ। আরও নিশ্চয় অনেক ভাষাই কিছুটা জানে। যারা বন্দরে বন্দরে ঘোরে, তারা নানান দেশের ভাষা কাজ চালানোর মতো শিখে ফ্যালে। ইংরেজিতে চিনাদের মতো ট উচ্চারণটা করে ত এবং কিঞ্চিৎ আধো আধো সরে উচ্চারণ। জানলাম যে লোকটির নাম মিকি। মিকি হরতানো। থাকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায়। বছর কুড়ি জাহাজে কাজ করছে। ওদের গ্রামের অনেকেই জাহাজি নাবিক। মিকি ধর্মে বৌদ্ধ। মিকি মালবাহী জাহাজের কাজ করে। ভারতবর্ষের নানা বন্দরে এবং  কলকাতা বন্দরে কয়েকবার এসেছে আগে। ঘুরেছে কলকাতায়। কলকাতার পথঘাট চেনে কিছুটা। ওর জাহাজ খিদিরপুর ডকে ভিড়ে আছে। মাল খালাস চলছে। দিন তিনেক বাদে ফের গান করবে। ছেড়ে যাবে কলকাতা। কয়েকদিন মিকি কলকাতাতেই রয়েছে জাহাজি মাল্লাদের এক আস্তানায়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে আস্তানাটা। ওখানে অনেক চেনা জানা মাল্লা জোটে। আড্ডা হয়। আজ গিয়েছিল জাহাজি অফিসে একজন এদেশি লোকের সঙ্গে দেখা করতে। গল্প করতে করতে রাত হয়ে গেল। হেঁটেই ফিরছিল ওয়েলিংটনে। রাস্তা চেনে। হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে। জাহাজে তো বন্দি জীবন। কোনো বন্দরে নামলেই তার শখ শহরটা হেঁটে দেখে বেড়ানো। আজকের মতো উটকো ঝামেলায় আগে পড়েনি কলকাতায়। তবে অন্য দেশে পড়েছে কয়েকবার। ভাগ্যিস আজ তার পার্সটা খ— না। অনেক টাকা ছিল। আমাদের সে অনেক ধন্যবাদ জানাল এযাত্রা সেভ করার জন্য। দেশে মিকির পরিবার থাকে। স্ত্রী এবং সাত ও পাঁচ বছরের দুটি ছেলে।

    কথা বলতে বলতে এসপ্ল্যানেডে হাজির হলাম। একটা দোকান থেকে বরফ নিয়ে মিকির মাথায় আঘাতের জায়গায় লাগানো হল। বরফ লাগাতে ব্যথা কিছু কমল।

    এরপর সুনন্দ অনুরোধ করল মিকিকে, আজ তোমার জাহাজি আস্তানায় না গেলে। বরং চলো আমাদের বাড়িতে রাতটা কাটাবে। তোমার গল্প শুনব। কত দেশে ঘুরেছ। নিশ্চয় কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে।

    মিকি ইতস্তত করছে দেখে সুনন্দ জোর দেয়, আমাদের কোনো অসুবিধে নেই। আমাদের বাড়িতে থাকি শুধু আমি আর আমার এক মামা। তিনি সায়ান্টিস্ট প্রফেসর হলেও মাই ডিয়ার মানুষ। তোমার সঙ্গে আলাপ হলে খুশি হবেন। বাড়িতে শোবার জায়গা যথেষ্ট। কী খাবে বলো রাতে। দোকান থেকে কিনে নিয়ে যাই। যা যা তোমার পছন্দ।

    —অলরাইত। মিকি রাজি হয়ে যায়।

    সুনন্দ বলে, বুঝলে মিকি, শহুরে লোকের সঙ্গে তো একঘেয়ে দিন কাটাই। তোমার মতো ইন্টারেস্টিং লোকের দেখা পাই খুব কম। তুমি গেলে আমাদের সৌভাগ্য। জানো আমরা খুব বেড়াতে ভালোবাসি। অনেক বেড়িয়েছি দেশে বিদেশে। দুর্গম অঞ্চলে। অচেনা দেশ, সমুদ্র, প্রাণী, গাছপালা আমাদের ভীষণ টানে। তাই তোমায় ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।

    সুনন্দ আমায় বলল, আজ রাতে তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি। বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দে।

    আমি তো তক্ষুনি রাজি।

    এই ঘটনার ফলেই মিকির সঙ্গে সুনন্দর মামাবাবু প্রফেসর প্রাণিবিজ্ঞানী নবগোপাল ঘোষের যোগাযোগ হয়। আর তার ফলেই আমাদের এক নতুন রোমাঞ্চকর অভিযান ও অ্যাডভেঞ্চারের সূত্রপাত। এখন আমাদের নিজেদের পরিচয়টা কিছু জানিয়ে রাখি।

    আমি—অসিত রায়। সুনন্দ মানে সুনন্দ বোস আমার বাল্যবন্ধু। সুনন্দর মামাবাবু শুধু প্রাণিবিজ্ঞানী নয়, জ্ঞান—বিজ্ঞানের নানা শাখায় তার প্রবল আগ্রহ। সুনন্দও প্রাণিবিজ্ঞানের ছাত্র। এম. এস. সি পাস করে এখন রিসার্চ করছে। আপাতত সে কিছু দিন রয়েছে নবগোপালবাবুর বাড়িতে। তার রিসার্চের কাজে মামাবাবুর সাহায্য নিতে।

    নবগোপাল ঘোষ বিয়ে থা করেননি। একা থাকেন। সুনন্দকে পুত্রবৎ স্নেহ করেন। সুনন্দর বন্ধু হিসেবে ছোট থেকেই আমি তাকে চিনি।

    আপাতগম্ভীর দর্শন, মাঝারি স্বাস্থ্য, মাঝারি হাইট, মামাবাবুকে দেখলে আর পাঁচটা সাধারণ ছাপোষা বাঙালি গেরস্থ অধ্যাপকের থেকে আলাদা করা যায় না। কিন্তু ওই মানুষটি প্রচণ্ড অ্যাডভেঞ্চার—প্রিয়।  বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেশায় কত দুর্গম অঞ্চলে যে পাড়ি দিয়েছেন। অনেক সময় সুনন্দ এবং কখনো কখনো আমিও তার সঙ্গী হয়েছি।

    আমার বিষয় অবশ্য ইতিহাস। এম. এ. পাস করে গবেষণা করছি। তবে সুনন্দ ও মামাবাবর সঙ্গ পেয়ে বিজ্ঞানেও যথেষ্ট আগ্রহ জন্মেছে। নতুন দেশ দেখার সুযোগ পেলে আমিও ছাড়ি না।

    মিকিকে নিয়ে গেলাম মামাবাবুর কাছে, ভবানীপুর অঞ্চলে মামাবাবুর বাড়িতে। মামাবাবু মিকির পরিচয় জেনে খুব খুশি হলেন।

    রাতে খাবার আগে ও পরে জমিয়ে গল্প হল। প্রধানত এশিয়া মহাদেশের বন্দরগুলিতেই মিকির যাতায়াত। বন্দরে বন্দরে তার কত আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কাহিনি। কত অজানা দ্বীপ। সে দেখেছে। কত অজানা প্রাণী ও মানুষ। গাছপালা। কত বিপদে যে পড়েছে। প্রথমে কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট থাকলেও পরে দেখলাম মিকি দিব্যি হাসিখুশি মানুষ। তার গল্প বলার ঢংও চমৎকার।

    ভালো ভালো খাবার একপেট খেয়ে মিকি মহাখুশি। জানাল যে অনেক দিন বাদে এমন খাসা ভোজ জুটল তার কপালে। জাহাজের খাদ্য তো বেজায় নীরস। কলকাতায় তার আস্তানার খাবার অতি বাজে। হোটেল রেস্তরাঁয় বেশি খরচ করে ভালো খাওয়া তার সাধ্যের বাইরে। মাইনে তো বেশি নয়। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হয়।

    পরদিন ভোরে উঠেছে মিকি। চা জলখাবার খেয়েছে। খানিক বাদে বিদায় নেবে। মামাবাবু তখন তার বাড়ির বাগানে গাছপালার তদারকি করছেন। মিকি বাগানে গিয়ে দাঁড়ায়। আমরাও সঙ্গ ধরি।

    ইদানীং মামাবাবুর এক নতুন শখ হয়েছে বাগান করা। মামাবাবুর বাড়ির পিছনে কাঠা দুই বাগান করার মতন জমি আছে। সেখানেই তার উদ্যানচর্চা। একটা ছোট গ্রিনহাউসও বানিয়েছেন।

    প্রথামতো চেনা ফুল—ফলের গাছ করায় মামাবাবুর উৎসাহ নেই। নানান বিচিত্র গাছ। লাগাচ্ছেন। নিজের ফর্মুলা অনুযায়ী তাদের সার দিচ্ছেন, যত্ন করছেন। ফলাফলের নোট রাখছেন। অর্থাৎ ওই গাছপালা নিয়ে গবেষণা চলছে। হয়তো সেটাই আসল উদ্দেশ্য।

    আমরা তার বাগান নিয়ে কিছু মন্তব্য করলে মোটেই আমল দেন না। নিজের তালেই। আছেন।

    মিকি ঘুরে ঘুরে বাগান দেখতে দেখতে কয়েকটি গাছের সামনে এসে বলল, এই গাছ দেখেছি একটা দ্বীপে। প্রচুর। তবে সাইজে ঢের বড় বড়। আর পাতার ঝাড় অনেক বেশি।

    —এগুলো কী গাছ জানো? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —না। মিকি মাথা নাড়ে।

    —এগুলো পোস্ত গাছ। পপি প্ল্যান্ট। যা থেকে আফিং হয়। ওপিয়াম।

    —ইজ ইত? মিকি বেশ আগ্রহ দেখায়, আপনি ওপিয়াম তৈরি করেন নাকি?

    —না বাবা। মামাবাবু হাসেন, তাহলে পুলিশে ধরবে। কয়েকটা মাত্র গাছ করেছি একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে।

    —আফিং হয় কী ভাবে? প্রশ্ন মিকির।

    —এর ফলের গা চিরে দিলে রস বেরায়। তাই শুকিয়ে আফিং হয়। আর ক্ষমত ভিতরের বিচি হল পোস্ত। বাঙালিদের প্রিয় খাদ্য। আচ্ছা তুমি কোন দ্বীপে এ গাছ প্রচুর দেখেছিলে বড় বড়? দ্বীপের লোক চাষ করে বুঝি?

    —ও দ্বীপে লোকই থাকে না কেউ। শুধু বাস্তেন সাহেব ছিল। সেই বোধহয় লাগিয়েছিল।

    —দ্বীপটা কোথায়?

    —জাভা সি—তে। ছোট্ট দ্বীপ। বনজঙ্গলে ভরা।

    —তুমি ওখানে গিছলে কেন?

    —গিয়েছিলাম বাধ্য হয়ে, প্রাণ বাঁচাতে। সাধ করে কি ও দ্বীপে যায় কেউ?

    —কী রকম? আমরা সবাই কৌতূহলী।

    —তাহলে একটা লম্বা গল্প ফাঁদতে হয়, জানায় মিকি। বোঝা গেল যে গল্পটা বলতে তার অনিচ্ছা নেই, তবে আমরা শুনব কিনা বুঝতে পারছে না।

    —বলো বলো কী হয়েছিল? আমরা তাড়া লাগাই। বাগানের বেঞ্চিতে আর বেদিতে বসি সবাই।

    মিকি বলতে শুরু করে, সে প্রায় দশ বছর আগের ঘটনা। আমাদের জাহাজ ফিলিপিনস সেলিবিস লম্বক মাদুরা হয়ে যাচ্ছিল জাকার্তায়। মাদুরা ছেড়ে যাবার কিছু পরেই হঠাৎ উঠল। ঝড়। প্রচণ্ড ঝড়। তখন শীতকাল। তখন ওখানে ঝড় কমই হয়। তবে বৃষ্টি হয় প্রায়ই। ঝড়ের দাপটে ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা লেগে আমাদের জাহাজের তলা ফুটো হয়ে ডুবতে লাগল। সবাই প্রাণ বাঁচাতে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল কাছাকাছি কোনো দ্বীপে আশ্রয় নেবার আশায়। একটা লাইফ—বেল্ট জোগাড় করে আমিও ঝাপালাম জলে। ওখানে ছোট বড় প্রচুর দ্বীপ। স্রোত আর বাতাসের টানে ভাসতে ভাসতে প্রথমে উঠলাম এক ছোট্ট ন্যাড়া দ্বীপে। সেখানে মানুষজনের বাস তো নেই—ই। গাছপালাও খুব কম। শুধু অজস্র সামুদ্রিক পাখির আস্তানা। পাখির ডিম খেয়ে কোনোমতে সেখানে দুটো দিন কাটালাম। জোর বৃষ্টি পড়ছে থেকে থেকে। কোনোরকমে পাথরের খাঁজের তলায় মাথা গুঁজে রইলাম। বুঝলাম যে এখানে থাকলে স্রেফ না খেয়ে বা ভিজে অসুখ করে মরব। মাইল দুই দূরে আর একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছিল, একটু যেন বড়। লাইফবেল্ট আঁকড়ে ফের জলে নামলাম। সাঁতরে হাজির হলাম ওই দ্বীপে। ওই দ্বীপেই দেখেছিলাম ওপিয়াম গাছের ঝাড়।

    —সে দ্বীপে মানুষ ছিল না?

    —না। ছোট্ট দ্বীপ। তবে দ্বীপে গাছপালা প্রচুর। ঝরনা রয়েছে একটা। কয়েকটা ছোট পুকুর। বড় উঁচুনিচু। সমতল জায়গা কম। মাঝখানে এক ছোট পাহাড়। গুহাও রয়েছে কয়েকটা। ঘরে দেখে আমি অবাক। কত রকম যে গাছপালা দ্বীপটায়। দেশি বিদেশি। এমন দ্বীপ জন্মে দেখিনি। রীতিমতো গা ছমছম করতে লাগল। রবার গাছ, তাল আনারস আম জাম কাঁঠাল ডুরিয়ান কফি চা পেয়ারা বাঁশ কলা তেঁতুল, আরও কত কী! কত রকম যে ফুল ফুটেছে। অনেক ফুল চোখেই দেখিনি আগে। সেখানেই এই ওপিয়াম গাছ। দেখেছিলাম।

    —পাহাড়ের গায়ে একটু সমতল জায়গায় একটা ভাঙাচোরা কাঠের বাড়ি দেখলাম। কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি। বেশ বড়ই ছিল একসময়। বুঝলাম, মানুষের বাস ছিল সেখানে। কিন্তু তখন জনমনিয্যি নেই।

    —তবে খাবার সমস্যাটা মিটল। খাবার মতো প্রচুর ফল গাছে গাছে। মুরগি আর ছাগল চরছে। বুনো। সামুদ্রিক পাখি আর তাদের ডিমও পাওয়া গেল প্রচুর। বড় একটা ডোবায় সাঁতার কাটছে পাতি হাঁস। ওই ডোবার পাশেই দেখি মস্ত মস্ত ওপিয়াম গাছের ঝাড়।

    আমার সঙ্গে আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা ছিল। ওয়াটারপ্রুফ কেসের মধ্যে রাখা লাইটার। একটা গুহা খুঁজে আশ্রয় নিলাম। আগুন জ্বালালাম। ফল ও ঝলসানো মাংস খেয়ে কাটাতে লাগলাম। নজর রাখছি কোনো নৌকো বা জাহাজের দেখা যদি পাই। চারদিন বাদে দেখি দুটো বড় বড় নৌকো যাচ্ছে দ্বীপের কাছ দিয়ে। কাপড় নাড়িয়ে নানান ইঙ্গিতে ডাকলাম তাদের। ওরা সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল। আমার তুলে নিল। নামিয়ে দিল জাকার্তায়। বেঁচে গেলাম সেযাত্রা।

    —ওই দ্বীপটা সম্বন্ধে খোঁজখবর করেছিলে? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —করেছিলাম বইকি। ওখানকার লোক ওই দ্বীপটাকে বলে—বাস্তেন সাহেবের দ্বীপ। বাস্তেন আইল্যান্ড। ফন বাস্তেন নামে এক ডাচ ওই দ্বীপটায় ছিল অনেক বছর। প্রায় পনেরো বছর। বাস্তেনই নাকি দ্বীপে অত গাছপালা লাগিয়েছিল। তার আগে দ্বীপটায় তেমন গাছপালা ছিল না। তবে নারকেল গাছ ছিল। আর বুনো ঝোঁপঝাড়।

    —বাস্তেন সাহেব ওখানে কী করত? মামাবাবু জানতে চান।

    —অদ্ভুত লোক ছিল নাকি বাস্তেন। খেয়ালি প্রকৃতির। ওখানকার লোকদের মুখে যা শুনেছি। যৌবনে এসেছিল ইন্দোনেশিয়ায়। রবার বাগানে ম্যানেজারি করতে। চার—পাঁচ বছর ছিল আন্দালুস আর জাভায়। এই সময় দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড—ওয়ার বাধল। বাস্তেন কালিমাস্তান মানে বোর্নিও গিয়েছিল কাজে। স্টিমারে জাকার্তায় ফিরতে ফিরতে খবর পায় যে জাপানিরা জাভা অধিকার করে নিয়েছে। সাউথ—ইস্ট এশিয়া আক্রমণ করেছে জাপানিরা। হুড়হুড় করে এগোচ্ছে তাদের ফোর্স। জাপদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে বাস্তেন আর জাকার্তায় ফেরে না। জাভা সি—তে ওই একরত্তি জনমানবহীন দ্বীপে নেমে যায়। সেখানে লুকিয়ে থাকে মাসখানেক। এরপর দেশি জেলেদের নৌকায় চেপে ছদ্মবেশে হাজির হয় আন্দালাসের তীরে। তারপর স্রেফ জঙ্গলে গিয়ে লুকোয়। গভীর অরণ্যে।

    —আন্দালাস কোথায়? সুনন্দ প্রশ্ন করে।

    ইতিহাসের ছাত্র আমি পাণ্ডিত্য ফলাবার সুযোগ হারাই না।

    গম্ভীরভাবে জানাই, আমরা যাকে বলি সুমাত্রা, তারই লোকাল নেম।

    মামাবাবু ও মিকি মাথা নেড়ে সায় দেয়। বুঝি মিকি সুমাত্রা নামটা জানে।

    মিকি বলে চলে, বাস্তেন সাহেব আন্দালাসের পাহাড়—জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল বছর দই। কী করে যে বেঁচে ছিল কে জানে? জঙ্গল যা ঘন। যা বৃষ্টি। বিষাক্ত সাপখোপ। ডিম জানোয়ারও আছে। অবশ্য জঙ্গলের আদিবাসীদের ধরনধারণ ভাষা কিছুটা জানত বাজে,

    —যুদ্ধ থেমে গেলে বাস্তেন বেরিয়ে আসে শহরে। জাপানিরা হেরে গেছে তাই ভয় নেই আর। এরপর বাস্তেন চলে যায় নিজের দেশ হলান্ডে। কিন্তু ফিরে আসে আবার। জার্মানির আক্রমণে ওর অনেক নিকট আত্মীয় নাকি মারা গিয়েছিল। দেশে ওর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশে ওর আর মন টিকছিল না।

    অনেকক্ষণ কথা বলেছে মিকি। মামাবাবু তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এক কাপ কফি খাবে নাকি?

    —তা বেশ। মিকি রাজি।

    কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফের শুরু করে মিকি, বাস্তেন বছর খানেক নানা কাজ করে। ইন্দোনেশিয়ার কয়েক জায়গায়। তারপর নাকি ওই দ্বীপে গিয়ে আস্তানা গাড়ে। চাকরি আর করেনি। বাস্তেনের গাছপালার খুব শখ ছিল। জানতও বেশ গাছপালা সম্বন্ধে। ওই দ্বীপে বাঝেন খুশিমতো গাছ পুঁততে থাকে। দেশ—বিদেশের গাছের চারা বিচি জোগাড় করে, ফুল। ফল অনেক রকম। তাই নিয়েই মেতে থাকত। সমুদ্র পেরিয়ে বড় দ্বীপের শহরে যেত। অবশ্য, তবে খুব কম। দরকার না হলে যেত না শহরে।

    —স্রেফ একা গিয়েছিল? জিজ্ঞেস করি আমি।

    —না। এক মালয়ি যুবককে সঙ্গে নিয়ে যায়। ওর খুব অনুগত ও বিশ্বাসী। দ্বীপে নিজের বাড়ি বানাতে কিছু দেশি মজুরকে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকবার অল্প দিনের জন্য। পরেও মজুর নিয়ে গেছে গাছ কাটতে, জমি কোপাতে, এমনি নানা কাজে। তবে তারা বেশিদিন থাকেনি দ্বীপে।

    —বাস্তেন জাভায় যাওয়া—আসা করত কীভাবে? মামাবাবু জানতে চান।

    —ওদের একটা ছোট মোটর বোট ছিল তাতে। বাস্তেন এবং ওর অনুচর পো দুজনেই বোট চালাতে পারত। কখনো কখনো পো একাই ঘুরে আসত জাভায় সুমাত্রায় বোট চালিয়ে। মাঝে মাঝে জাভা থেকে নৌকা যেত ওই দ্বীপে, দরকারি খাবার—দাবার জিনিসপত্র নিয়ে। বাইরের লোক বেশি আসা পছন্দ করত না বাস্তেন। মাঝিরা যারা যেত দরকারে তাদের মুখেই লোকে শুনত বাস্তেনের নানা কথা। বাস্তেন গাছের চারা আর বীজের খোঁজে যেত জাভা সুমাত্রা আর কাছাকাছি দ্বীপে। অর্ডার দিয়ে আনাত চারা ও বীজ। দ্বীপটা তখন নাকি রীতিমতো রহস্যময় ছিল বাইরের লোকের কাছে।

    —পনেরো বছর পর বাস্তেন কোথায় যায়? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —যায়নি কোথাও। ওখানেই হঠাৎ সে মারা যায় অ্যাকসিডেন্টে। পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে মাথায় চোট পায়। তখন কয়েকজন মাঝি গিয়েছিল ওই দ্বীপে,তারাই এসে প্রথম খবরটা দেয় জাকার্তায়। ওই দ্বীপেই বাস্তেনকে কবর দেওয়া হয়। ওর অনুচর পো বেশি দিন আর থাকেনি ওই দ্বীপে। বাস্তেনের মোটরবোট চালিয়ে, বাস্তেনের বন্দুকটা আর কিছু দামি জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায় মালয়। আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর থেকেই দ্বীপটা জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে দেশি মাঝিরা গিয়েছে ওই দ্বীপে ফলটলের সন্ধানে। কিন্তু বাস করেনি কেউ স্থায়ীভাবে।

    —তুমি বাস্তেন দ্বীপের কথা জানতে না আগে? মামাবাবুর প্রশ্ন।

    —না। আসলে আমাদের দেশটা তো অজস্র দ্বীপের রাজত্ব। জাভা সি, ফ্লোরেস সি, বান্দা সি, চায়না সি, সুলু সি—এমনি কত সাগরে হাজার হাজার ছোট বড় দ্বীপ ছড়িয়ে আছে। বড় দ্বীপগুলোর মোটামুটি খবর রাখলেও খুব ছোটগুলো আমাদের প্রায় অচেনা। বিশেষত আমার। আমি যে কটা জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করেছি তাদের জাহাজ যায় বেশির ভাগ পশ্চিমে বা উত্তরে। বড় পোর্টগুলোয় জাহাজ থামে। সেগুলো চিনি। বাস্তেন দ্বীপের গল্প করে শুধু জাকার্তার জেলেরা আর নৌকার মাঝিরা। তাদের সঙ্গে আমার তত মেলামেশা নেই। জাকার্তায় গেছি অনেকবার। তবে সেখানে জাহাজি নাবিকদের সঙ্গেই মিশেছি বেশি। তাই আগে জানতেম না বাস্তেন দ্বীপের কথা।

    —তুমি অনেক পোর্টে ঘুরেছ তাই না? সুনন্দ বলে।

    —ঘুরেছি বইকি। জাকার্তা, সিঙ্গাপুর, পেনাং, রেঙ্গুন, ব্যাংকক, ক্যালকাতা, কলম্বো, করাচি কতবার গেছি। এদেন ডার্বানও গেছি। ফিলিপাইনসে ম্যানিলা গেছি। ব্রিসবেন গেছি। কালিমাস্তান মানে বোর্নিওতে ম্যাকাসার পোর্টে গেছি অনেকবার। ওই সব পোর্টটাউনে ঘুরেছি। সগর্বে ঘোষণা করে মিকি। বলে, তবে বেকায়দায় পড়ে খুব ছোট বা নির্জন বসতিহীন দ্বীপেও জাহাজ নোঙর ফেলেছে কয়েকবার।

    আমরা হাঁ করে শুনি। ওঃ লোকটার জীবন বটে। কত ঘুরেছে। কত কী দেখেছে!

    মামাবাবুর পিছু পিছু মিকি বাগানে গ্রিনহাউসে ঢোকে। খড়ের চাল, দরমার দেয়াল, ছোট লম্বাটে ঘরটায় নানান অর্কিড় ঝুলছে। ঘরটা বেশ ঠাণ্ডা। তবে রোদ ঢোকে দরমার বেডা সরিয়ে দিলে। ঘরের মেঝেতে লম্বা লম্বা কয়েকটা টবে কিছু পপি গাছ দেখে মিিক বলল, এই গাছ আমি ওই দ্বীপে দেখেছি। এর চেয়ে অনেক বড় বড় সাইজের।

    —এগুলো কী ফুলের গাছ জানো? মামাবাবু প্রশ্ন করেন।

    —না।

    —এগুলোর নাম ক্যালিফোর্নিয়ান পপি। সত্যি তুমি এই গাছ দেখেছ বাস্তেন দ্বীপে? মিকি পপি গাছগুলোর পাতায় হাত দিয়ে দেখে বলল, আলবৎ এই গাছ। তবে সাইজে প্রায় ডবল। ফুল ছিল না মোটে। মাত্র দু—একটা ছোট্ট ছোট্ট ফুল ফুটেছিল এইরকম, এই রং—এর। হুঁ এই গাছই। এই পাতা। আমি তো ভেবেছিলাম লম্বা মোটা পাতার ঘাস। কী নাম বলছেন? পপি।

    —কোথায় দেখলে? মামাবাবু জানতে চান।

    —এক জায়গায় ঝরনার গা থেকে সরু নালা বেরিয়েছে, তার ধারে ধারে ছিল এই পপি গাছ। প্রচুর।

    মিকি তার সমুদ্র ভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার আরও বলে। এমন শহুরে শিক্ষিত শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে তার গল্প শুনছে এ অভিজ্ঞতা তার জীবনে এই প্রথম।

    মামাবাবু কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক। কিছু ভাবছেন যেন? তিনি হঠাৎ বললেন, আচ্ছা মিকি ওই বাস্তেন সাহেবের চলত কীভাবে শুনেছ? মানে দ্বীপে থাকার সময় চাকরি তো করতেন না। খরচাপাতি চালাত কী করে খোঁজ পেয়েছিলে?

    মিকি থমকে গিয়ে একটু ভেবে বলে, হঁ আমিও ভেবেছি ব্যাপারটা। মাঝিদের মখে শুনে যা মনে হয়েছিল বাস্তেনের অনেক জমানো টাকা ছিল জাকার্তার কোনো বাংকে। মোটা মাইনের চাকরি করেছে তো আগে। হয়তো দেশ থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল।

    তবে ওই দ্বীপে থাকার সময়েও বাস্তেনের অন্য রোজগারের পথ ছিল। লোকটি নাকি চমৎকার ছবি আঁকতে পারত। হাতের কাজ ছিল দারুণ। চামড়া আর কাগজের মুখোশ, নকশা আঁকা বাঁশের পাত্র, নানান ডিজাইনের বাতিকের কাজ করা কাপড়—এই সব বানিয়ে এনে কয়েক মাস অন্তর অন্তর বিক্রি করত জাভায়। ভালো ডিমান্দ ছিল ওর হাতের কাজের, শিল্প—দ্রব্যের। এই ভাবেই চালাত খরচ, আমার তাই মনে হয়। জাকার্তার মাঝিদেরও তাই ধারণা।

    —হুম। মামাবাবু ফের আনমনা হয়ে ভাবেন কিছু। এরপর একসময় জিজ্ঞেস করেন মিকিকে, তুমি দেশে ফিরছ কবে?

    —এই পনেরো—কুড়ি দিন বাদে।

    —তারপর থাকবে কিছুদিন দেশে।

    —থাকব। অন্তত মাস তিনেক। বাড়িঘর সারানো, চাষবাসের কাজ আছে।

    মামাবাবু বললেন, শোনো মিকি, মাসখানেক বাদে আমি সিঙ্গাপুর যাব একটা কাজে। আমরা তিনজনেই যেতে পারি। গেলে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। তুমি সুমাত্রা মানে আন্দালাসে থাকো কোথায়?

    —সুমাত্রার দক্ষিণ—পুবে পালেমবাং নামে একটা ছোট শহরের কাছে আমার গ্রাম।

    —সিঙ্গাপুর থেকে তোমার সঙ্গে যোগাযযাগ করব কীভাবে? টেলিফোন বা টেলিগ্রাম করলে?

    মিকি বলে টেলিফোন তো নেই আমার বাসায়। তবে গ্রামের পোস্ট অফিসে টেলিফোন করে আমায় কোনো খবর দিতে বললে জানিয়ে দেবে আমায়। হা টেলিগ্রাম করলে পাব।

    জানতাম যে সিঙ্গাপুরে মামাবাবুর একটা কনফারেন্স আছে ডিসেম্বরের শেষে। সঙ্গে সুনন্দও যাচ্ছে। কথার ভাবে মনে হল আমাকেও হয়তো সঙ্গে নেবেন। মনে মনে আমি পুলকিত। কিন্তু এরপরেই মামাবাবুর কথা শুনে আমি ও সুনন্দ চমকাই।

    —বুঝলে মিকি, আমি ওই বাস্তেন দ্বীপে একবার যেতে চাই। দেখব ওখানকার গাছপালা। তুমি পারবে না আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে যেতে? সেই কদিনের জন্য তোমার যা প্রাপ্য আমি দেব। কিন্তু তোমার হেল্প চাই। আমরা তো চিনি না ওদেশ। তুমিই নৌকা ভাড়ার ব্যবস্থা করবে। খাওয়া থাকা ইত্যাদি সব খরচ আমার। দ্বীপটার গাছপালা আমার দারুণ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। অত কাছে গিয়েও স্বচক্ষে ওই দ্বীপ না দেখে এলে ভারি আপশোস হবে।

    সুনন্দ চিড়বিড়িয়ে ওঠে, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই যে আপনাকে গোয়ায় যেতে হবে অল ইন্ডিয়া জুওলজিকাল সোসাইটির কনফারেন্সে। একটা সেশনে আপনি প্রিসাইড করবেন। কথা দিয়েছেন।

    —যাব না গোয়া। ওদের জানিয়ে দেব। মামাবাবু নির্বিকার।

    শুনে সুনন্দ থ। আমিও। মামাবাবু তো এমন কথার খেলাপ করেন না। আমার মনে হল যে বাস্তেন আইল্যান্ড যাবার প্ল্যান মোটেই গাছগাছড়া দেখার লোভে নিছক শখের ভ্রমণ নয়। মামাবাবুর স্বভাব জানি। অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে। এই নিয়ে এখন প্রশ্ন করলে আসল কারণ ভাঙবেন না। পরে হয়তো নিজেই বলবেন কারণটা।

    —কি মিকি যাবে নিয়ে? মামাবাবু ফের অনুরোধ করেন সাগ্রহে।

    প্রস্তাব শুনে মিকি কেমন মিইয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলে, দশ বছরেরও আগে গিয়েছিলাম ওই দ্বীপে। আর যাইনি ওর কাছ দিয়ে। ওখানকার ছোট দ্বীপগুলো তেমন চিনি না আমি।

    মামাবার মিকির দ্বিধা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, তা লাগুক সময় খুঁজতে। দু—চার দিন নষ্ট হলে আমার ক্ষতি নেই। দ্বীপটায় পা দিলে চিনতে পারবে?

    —তা পারব। দ্বীপের কয়েকটা চিহ্ন মনে আছে।

    —ব্যস ব্যস তাহলেই হল।

    মিকি বলে, পালেমবাংয়ে আমার চেনা একজনের নৌকা আছে। লামপুং বন্দরে তার নৌকা থাকে। ভাড়া খাটে। তাকে বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে তার নৌকা ভাড়া দিতে।

  • কেল্লাপাহাড়ের গুপ্তধন

    কেল্লাপাহাড়ের গুপ্তধন

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    চৈত্র মাস। রতন এসে প্রস্তাব দিল, চল, কেওঞ্ঝরগড় বেড়িয়ে আসি। ছোটকাকার বাড়ি।

    রতন ও আমি ছেলেবেলার বন্ধ। ও ভতত্তের ছাত্র, আপাতত গবেষণা করছে। আমার বিষয় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস। আমিও গবেষণা করছি একটি ফেলোশিপ পেয়ে—প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে।

    কেওঞ্ঝর উড়িষ্যার শহর এইটুকুই জানতাম, তার বেশি কিছু না। তাই প্রথমটা একটু গাঁইগুঁই করছিলাম। রতন তাড়া দিয়ে বলল, চ চ, প্রাগৈতিহাসিক! শুনেছি জায়গাটা দারুণ। যাসনি তো কখনও। দুজনেরই খোরাক মিলবে। ওখানে প্রচুর পাহাড়—জঙ্গল। ছোট বড় পুরনো মন্দির আর মূর্তির ছড়াছড়ি। আমিও ধারে—কাছের খনিগুলো দেখে নেব। আর কাকা কাকিমা দুজনেই গ্র্যান্ড লোক, বুঝলি।

    দিন কয়েকের মধ্যেই কেওঞ্ঝরগড় গিয়ে হাজির হলাম। রতনের কাকা মিস্টার দত্তকে দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়েছিলাম। বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর, লম্বা ভারিক্কি সুপুরুষ চেহারা, রঙ টকটকে ফরসা। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, খুব কম কথা বলেন। নাম করা এনজিনিয়ার।

    প্রথম দিন পরিচয় হবার পর আমায় বলেছিলেন, প্রতাপাদিত্য চৌধুরী। বাঃ, বেশ নাম তো তোমার।

    কেমন ইতিহাসের গন্ধ আছে, তাই না?রতন পাশ থেকে টিপ্পনী কাটে। মিঃ দত্ত একটু হাসেন। ব্যস, আর কথাবার্তা হয়নি তাঁর সঙ্গে। খুব ব্যস্ত মানুষ, তবে সাদাসিধে।

    কাকিমা অবশ্য ভারি আমুদে। আমাদের পেয়ে মহা হৈ—চৈ জুড়ে দিলেন। চট করে জেনে নিলেন, আমি কী কী খেতে ভালবাসি। তিনি খানিক আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেন, আর খানিক রান্নাঘরে ঢোকেন। এই চলল তার রুটিন।

    আসলে রতনকে এঁরা ভীষণ ভালবাসেন। এঁদের ছেলেপুলে নেই। রতনকে দেখেন ছেলের মতন। রতন সুযোগ পেলেই কাকার কাছে বেড়াতে আসে। তবে এবার এসেছে। অনেক দিন পরে। তাই খাতির—যত্নটা কিঞ্চিৎ বেশি।

    কেওঞ্ঝরগড় আসার পর দ্বিতীয় দিন সকালে কাকাবাবুর কোয়ার্টারের সামনে লনে পায়চারি করছি আমি ও রতন, এমন সময় হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন সামনে। শ্যামবর্ণ, নাদুসনুদুস মাঝারি হাইট। গোলগাল হাসি হাসি মুখ, মাথার সামনের দিকে একট টাক। নীল সার্ট ও সাদা ফুলপ্যান্ট পরা। ঝুঁকে পড়ে রতনের হাত আঁকডে ঝাঁকিয়ে বললেন—গ্ল্যাড টু মিট ইউ। এরপরই আমার সঙ্গে একদফা হ্যান্ডশেক।

    —বস মানে দত্ত সাহেব বললেন, আপনাদের একটু ঘুরিয়ে—টুরিয়ে দেখাতে, হেল্প করতে। তারপর রতনের মুখের পানে তাকিয়ে—আপনি বুঝি দত্ত সাহেবের ভাইপো?, হুঁ ঠিক। চেহারায় ভারি মিল।

    এমন হুড়মুড়িয়ে কথা বলছিলেন ভদ্রলোক যে রতন থতমত খেয়ে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি?

    আমি? আমি নন্দদুলাল বোস।

    ভদ্রলোক আমাদের তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জরিপ করতে করতে বেশ সজোরে বিড়বিড় করে চললেন—হুঁ, পঁচিশ ছাব্বিশের বেশি নয়…এ্যাট লিস্ট দশ বছরের সিনিয়ার হব…অতএব ব্রাদার এবং তুমি! কি, আপত্তি আছে?

    খানিকক্ষণ সময় লাগল হেঁয়ালি বোধগম্য হতে। তারপর বলে উঠলাম, না, না, আপত্তির কি? নিশ্চয় তুমি বলবেন। ভদ্রলোক খুশিতে উজ্জ্বল হন। রতন মিটমিটিয়ে দুষ্টু হেসে বলল, আর আমরা যদি ডাকি বোসদা, আপত্তি আছে?

    সার্টেনলি নট।

    বোসদার সঙ্গে দারুণ জমে গেল। পরে জেনেছিলাম উনি কেওঞ্ঝরগড়ে এসেছেন মাত্র দু—বছর। বিয়ে করেছেন বছর তিনেক, তবে ফ্যামিলি, মানে স্ত্রী, থাকেন দেশের বাড়ি বর্ধমানে। বোসদা এখানে থাকেন একা।

    জায়গাটা সত্যি সুন্দর। পুরনো আমলের ছোট্ট শহর। দেশীয় রাজার রাজধানী ছিল। শহরের চারপাশ পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা। কলকাতা থেকে এসে ভারি আরাম লাগে।

    মিস্টার দত্তর গল্প করার ধাত নয়, তবে নজর ঠিক আছে। একদিন চা খাচ্ছি, এমন সময় সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কেমন বেড়াচ্ছ? বোস সব দেখাচ্ছে তো?

    বললাম, নতুন আর পুরনো দুটো রাজপ্রাসাদ দেখেছি। এবার জগন্নাথ মন্দির দেখতে যাব। ধারে—কাছে নাকি অনেক প্রাচীন মন্দির আছে?

    মিস্টার দত্ত বললেন, আছে বৈকি। উড়িষ্যা হচ্ছে মন্দির আর মূর্তির দেশ। পুরী, কোনারক, ভুবনেশ্বরের কথা ছেড়ে দিলেও আমি ঘুরতে ঘুরতে দেখেছি কত অজানা ছোট্ট গ্রামে কী সুন্দর মন্দির আর বিগ্রহ। মাঠে—ঘাটে পাওয়া যায় কত মূর্তি। বিশেষ করে পাথরে তৈরি! সামান্য দামে লোকে সে সব বেচে দেয়। আমার ড্রইংরুমে যে পাথরের যক্ষমূর্তিটা রয়েছে ওটা এক ওভারসিয়ার আমায় প্রেজেন্ট করেছে। কী সুন্দর না?

    সেই দিনই গেলাম জগন্নাথ মন্দির দেখতে। কে জানত সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে এক চমক।

    আমি ও রতন মন্দির দেখছি। দেওয়ালের গায়ে মূর্তি দেখতে দেখতে ঊর্ধ্ব মুখে মন্দিরকে পাক দিচ্ছি। ঠিক একই ভাবে আর একজন ঘাড় উঁচু করে এলো উলটো দিক থেকে। তার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। রঙ কালো। বেশ লম্বা। কেঁকড়া চুল, সার্ট ও ফুলপ্যান্ট পরনে, জোয়ান চেহারা।

    সে মখ ফেরাতেই চমকে রতনকে খোঁচা মারলাম—দেখ, ডাকু।

    আগন্তুকের কানে আমার কথা গিয়েছিল। সে পিটপিটিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে দেখল কয়েক সেকেন্ড। তারপর লাফাতে লাফাতে এসে—অ্যাঁ, তোরা? বলে জাপটে ধরল দুজনকে।

    উঃ কী গায়ে জোর। দম বন্ধ হবার যোগাড। বলি—ছাড় ছাড। তুই এখানে কোত্থেকে?

    ডাকুর সঙ্গে এমন যোগাযোগ হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। ওর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার আশাই মুছে গিয়েছিল মন থেকে। ও ছিল ইস্কলে একটানা পাঁচ বছর ধরে আমাদের দুজনের সহপাঠী। পড়াশুনায় মাঝারি, কিন্তু দারুণ ফুটবল খেলত, আর ডানপিটেমিতে ছিল এক নম্বর ওস্তাদ। ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে ও স্কুল ছেড়ে দেয়। কারণ ওর বাবার আকস্মিক মৃত্যু। তখন ডাকুরা সব ভাইবোন মা—র সঙ্গে কলকাতা ছেড়ে ওদের দেশের বাড়ি মেদিনীপুরে চলে যায়। আর দেখা হয়নি। প্রথমে কয়েকবার চিঠিপত্র লেখালেখি হয়েছে। ক্রমে তাও বন্ধ হয়ে গেছে।

    রতন বলল, হ্যাঁ রে তুই আছিস কেমন? এখানে কী করছিস?

    ডাকু ম্লানমুখে বলল, আছি এক রকম। টিকে আছি। এখানে এসেছি চাকরি করতে।

    কী চাকরি? কদিন হল?

    সামান্য চাকরি ভাই। কেরানিগিরি। দুমাস কেওঞ্ঝরগড়ে এসেছি। উড়িষ্যায় আছি পাঁচ বছর। আগে ছিলাম জাজপুরে। এখানে কোম্পানি একটা নতুন ব্রাঞ্চ খুলেছে, তাই ট্রান্সফার হয়ে এসেছি। বুঝলি, স্কুল ফাইনালের পর আর তো লেখাপড়া এগুল না। আমার গাঁয়ের কাছে কলেজ নেই। শহরে হোস্টেলে থেকে পড়া সম্ভব নয়। তাই দেশেই ছিলাম। যা। সামান্য জমিজায়গা আছে, চাষ—বাস দেখতাম। কিন্তু তাতে কি সংসার চলে? তখন আমার এক আত্মীয় এই চাকরিটা জুটিয়ে দিল। মাইনে কম বলে দুঃখ নেই, কিন্তু বসে বসে একঘেয়ে হিসেব কষতে অসহ্য লাগে। ছোটবেলায় ভাবতাম বড় ফুটবলার হব, হল না। ভাগ্যে। স্কুল ফাইনাল পাস করে নেভিতে ঢুকতে চাইলাম, বাড়িতে কান্নাকাটি করে দিলে আটকে। এখন এই করছি।—

    বড় কষ্ট হল। জানি তো কী ছটফটে প্রাণশক্তি ভরা দুরন্ত ছেলে ছিল ডাকু। বেচারা।

    ডাকু একটু হেসে বলল, তবে একদম ঘেঁতিয়ে যাইনি। সুযোগ পেলেই শিকার করি। বাবার বন্দুকটা আছে। কয়েকটা বড় জানোয়ারও মেরেছি।

    তিনজনে ফিরলাম। বোসদা ডাকুর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন, ব্রাদার ইটি

    রতন বলল, শ্রীযুক্ত শান্তসুবোধ শাসমল ওরফে ডাকু। আমাদের ইস্কুলের বন্ধ। এখানে চাকরি করে।

    ডাকু কেন? বোসদা জানতে চাইল।

    অসম্ভব ডানপিটে ছিল কিনা, তাই স্কুলে ওই খেতাব পায়। বলল রতন।

    বোসদা ডাকুর দিকে চেয়ে বললেন, হুঁ, চেহারাটা কিঞ্চিৎ গুণ্ডে গুণ্ডো বটে। কিন্তু ব্রাদার, এ ব্যক্তি লোক খারাপ নয়। হাসিটি ভারি মিষ্টি।

    আরও দুটো দিন ডাকু আমি আর রতন প্রাণভরে আড্ডা দিলাম। মাঝে মাঝে বোসদাও যোগ দেন। পুরনো দিনের কত গল্প হয়। কত মজার ঘটনা, দুষ্টুমির কথা। কাছাকাছি কী কী দেখতে যাব প্ল্যান করি। এমনি করেই হয়ত আমাদের বাকি দিনকটা কেটে যেত, যদি না রতনের কাকা দেব—বাড়ির মিউজিয়ামের কথা শোনাতেন। কারণ সেই মিউজিয়াম দেখতে গিয়েই আবিষ্কার হল এক রহস্যের সূত্র, যার ফলে জড়িয়ে পড়লাম এক দারুণ রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারে।

    জাজপুরের কাছে দেবদের প্যালেস। লোকে বলে রাজবাড়ি, তবে ঠিক রাজা নয়—খুব বড় জমিদার, আর খুব পুরনো ফ্যামিলি। এই বাড়িতে দুটো দেখবার জিনিস আছে। এক হল অষ্টধাতুর বিগ্রহ, আরেক হল অস্ত্রশস্ত্রের এক বিরাট সংগ্রহশালা। ছোটকাকা দেবমশাইকে খবর দেওয়াতে তিনি আমাদের সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। বলা বাহুল্য, ডাকুকেও আমরা সঙ্গে নিলাম। বোসদারও ইচ্ছে ছিল মিউজিয়াম দেখার, কিন্তু গাড়িতে জায়গা কম; তাছাড়া ব—এর সঙ্গে যাওয়াটাও একটু অস্বস্তিকর, তাই তিনি চেপে গেলেন।

    খুব ভোরে আমরা রওনা হলাম।

    জাজপুর—কেওঞ্ঝর রোড রাস্তাটি ভারি সুন্দর। পিচ বাঁধানো প্রশস্ত সড়ক। আমাদের মোটর চলেছে হু—হুঁ করে। পথের দুপাশে কখনো বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কখনো ঝোঁপঝাড়, হালকা জঙ্গল, কখনও বা উঁচু—নিচু বনময় পাহাড়।

    ডাকু এ পথে যাতায়াত করেছে। চিনিয়ে দিল—ডানদিকে দূরে ওই যে উঁচু পাহাড়, ওর নাম টোমকা। এরপরে আসবে মহাগিরি রেঞ্জ।

    মাঝে মাঝে গ্রাম বা ছোট লোকালয় চোখে পড়ে। পথে রামচন্দ্রপুরে একবার থেমেছিলাম আড়মোড়া ভাঙতে। রামচন্দ্রপুর নাকি পুলিশ স্টেশন। কিন্তু ছোট্ট লোকালয়। দেব—বাড়ি পৌঁছলাম বেলা দশটা নাগাদ।

    জাজপুর—কেওর স্টেশন রোড ছাড়িয়ে, পিচ রাস্তা থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটা চওডা মেঠো রাস্তা ধরে মাইল দুই ঢুকে এক গ্রামে পৌঁছলাম। দেখে মনে হয় এককালে বেশ বর্ধিষ্ণ ছিল এই গ্রাম। গাছপালার আড়াল থেকে সহসা জেগে উঠল উঁচু পাঁচিলে ঘেরা এক প্রকাণ্ড দোতলা অট্টালিকা। লক্ষ করলাম, অট্টালিকার কয়েকটি অংশ খুবই জীর্ণ। বাড়ির চার পাশে পরিখা কাটা ছিল, এখন বুজে গেছে।

    ভিতরে খবর পাঠানো হল।

    বাব খগেশ্বর দেব মহাশয় স্বয়ং বেরিয়ে এলেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। সৌম্যকান্তি দীর্ঘকায় বৃদ্ধ। গায়ের রঙ টক্টকে, মাথা জোড়া টাক, নাকটি টিয়াপাখির মতন। বয়সের ভারে শরীর সামান্য নুইয়ে পড়েছে সামনে।

    কাকাবাবু বললেন একদম সময় পাই না বলে আসা হয়নি অ্যাদ্দিন। তবে মিউজিয়াম দেখার ইচ্ছে ছিল খুবই। এবার এরা ধরল, তাই এসে পড়লাম।

    কাকাবাবু আমাদের পরিচয় দিলেন। বৃদ্ধ হাসিমুখে বললেন, আপনারা এসেছেন, আমার সৌভাগ্য। চলুন ভিতরে।

    বৈঠকখানায় বসে একপ্রস্থ চা—জলখাবার হল। তারপর আমরা খগেশ্বর বাবুর পিছনে পিছনে চললাম মিউজিয়াম দেখতে। আমাদের পিছনে আসছে একজন ভৃত্য। তার হাতে একটা জ্বলন্ত পেট্রোম্যাক্স আলো। দেবমশাইয়ের হাতে এক পেল্লায় চাবি।

    বারান্দার প্রান্তে এক দরজার সামনে থামলেন খগেশ্বরবাবু। দরজায় বিশাল এক তাল ঝলছে। ঝনাৎ করে তালা খুললেন দেবমশাই তারপর ধাক্কা মেরে দরজা ফাঁক করে দিলেন। এবার তিনি পেট্রোম্যাক্সটা চাকরের কাছ থেকে নিজের হাতে নিয়ে ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। পিছনে আমরা চারজন। ভৃত্যটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

    লম্বা হলঘর, উঁচু ছাদ, ভিতরে ভ্যাপসা অন্ধকার। বোধহয় অনেক দিন খোলা হয়ান ঘর। পেট্রোম্যাক্সের তীব্র আলোয় চমকে গিয়ে কয়েকটা চামচিকে আমাদের মাথার ওপর ঘুরপাক খেতে লাগল।

    চতুর্দিকে দেওয়াল জুড়ে টাঙানো অজস্র অস্ত্র আর অস্ত্র। দেওয়াল ঘেঁষে লম্বা লম্বা কাঠের টেবিল পাতা। টেবিলগুলোর ওপরেও সাজানো বিচিত্র অস্ত্রের সম্ভার। ছুরি, ছোরা, তরবারি, ঢাল, বর্শা, বল্লম, টাঙ্গি, দাও, কুঠার, গদা, তীর—ধনুক, শিরস্ত্রাণ, বর্ম…। কত কী। ধাতু, কাঠ, হাড় প্রভৃতিতে তৈরি। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট কামান মখ উচ করে বসানো।

    এ সবই পুরনো আমলের অস্ত্রশস্ত্র। এমন বিপুল সংগ্রহ দেখব ভাবতে পারিনি। আলো পড়ে ধাতুর অংশগুলি চকচক করে উঠল।

    খগেশ্বরবাবু একটা টুলের ওপর আলোটা রাখলেন। বৃদ্ধের শরীর টান টান হয়ে উঠল। চক্ষু উজ্জ্বল। গম্ভীরস্বরে বললেন, আমার পূর্বপুরুষ ক্ষাত্রধর্মের চর্চা করতেন। যুদ্ধ ও শিকার। বাহুবলের সাহায্যে তাঁরা ধনসম্পত্তি উপার্জন করেছিলেন। এই সব অস্ত্রের অধিকাংশই আমাদের বংশের কেউ না কেউ ব্যবহার করেছেন। সবই কিন্তু সেই অতীতে। বহু স্মৃতি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই অস্ত্রগুলির সঙ্গে। দেব বংশে অস্ত্রচর্চা আর হয় না, জমিদারিও আর নেই। আমার ছেলে নাতিরা বন্দুক টলুক বিশেষ পছন্দ করেন না। আসেও খুব কম। আমি বুড়ো মানুষ এই শূন্যপুরী আগলাচ্ছি। জানি না আমার পরে এ বাড়ির কী হাল হবে।

    তার কণ্ঠে সাময়িকভাবে একটা বিষণ্ণতার সুর ধরা পড়ে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার স্বাভাবিক সুর ফিরে আসে, আর উৎসাহ ভরে তিনি আমাদের সব কিছু দেখাতে থাকেন।

    চমৎকার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা ভদ্রলোকের। আমরা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি, কখনো বা কোনো জিনিস হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি।

    হঠাৎ ডাকু একটা ছুরি তুলে নিয়ে মন দিয়ে দেখতে লাগল। ব্যাপারটা খগেশ্বরবাবু লক্ষ করেছিলেন। বললেন, ওটা হানটিং নাইফ। দেশি কারিগরের তৈরি। খুব মজবুত জিনিস।

    এটা কতদিন আছে এখানে? ডাকু প্রশ্ন করল।

    তা অনেক দিন। আমার বাবা ছোটবেলা থেকে এটা দেখেছেন। কে এটা এনেছিল জানি না।

    এই পদ্মফুলটা কেন খোদাই করেছে বাঁটে? জিজ্ঞেস করল ডাক।

    কি পদ্মফুল? আমি ও রতন এবার কাছে গিয়ে ছুরিটা দেখি।

    বাঁটসুদ্ধ প্রায় এক ফুট লম্বা ছুরিখানা। চওড়া ফলা। হাতির দাঁতের বাঁট। বাঁটের ওপর একটা সুন্দর ছোট পদ্মফুলের নকশা খোদাই করা।

    দেবমশাই ডাকুর হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে কারুকার্যটি দেখলেন। তারপর বললেন, খেয়াল—খুশিমতো নকশা করেছে হয়তো। কিংবা কারিগরের নিজস্ব ছাপ হতে পারে, মানে ট্রেডমার্ক।

    ও। ডাকু ছুরি রেখে দিল একটু অন্যমনস্কভাবে।

    ওই সামান্য ছুরি সম্বন্ধে আমাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। কত বড় বড় অদ্ভুত আকৃতির অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, সেগুলোর ওপরই আমাদের বেশি নজর।

    ঘণ্টা দুই পর আমাদের মিউজিয়াম দেখা শেষ হল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় কাকাবাবু বললেন, দেবমশাই আপনাদের মন্দিরের বিগ্রহটি একবার দেখাবেন? খুব নাম শুনেছি।

    দেবমশাই থমকে দাঁড়ালেন। তার মুখ বিমর্ষ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বললেন, খবরটা বোধহয় আপনাদের ওদিকে পৌঁছায়নি এখনো। সমস্ত অলংকার সমেত আমাদের বিগ্রহটি চুরি গেছে।

    সে কী? কবে? কাকা বলে উঠলেন। আমরাও অবাক।

    মাত্র দ—দিন আগে। চুরি নয়, ডাকাতি। চার—পাঁচজন লোক এসেছিল রাতে। মিন্দরের প্রহরীকে অতর্কিতে আঘাত করে বেঁধে ফেলে, মন্দিরের দরজা ভেঙে ঢুকে ভিতরের যাবতীয় দামি জিনিস লট করেছে। গৃহ—দেবতা বিগ্রহ হারিয়েই বেশি কষ্ট পেয়েছি। পুলিশ অনুসন্ধান করছে। তিন হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছি শুধু বিগ্রহের জন্যে। এখন ভাগ্য।

    তিন হাজার টাকা, শুধু বিগ্রহের জন্যে? ডাকু চোখ বড় বড় করে বলে।

    হ্যাঁ। যদি কেউ উদ্ধার করে দেয়। গৃহ—দেবতাকে ফিরে পাওয়াই আমার সবচেয়ে বং কামনা।

    আমরা মনে মনে লজ্জিত হলাম। সত্যি, ভদ্রলোক একবারও বুঝতে দেনান যে এত মন খারাপ। দিব্যি হাসিমুখে সব দেখালেন।

    মিস্টার দত্ত বললেন, ছি ছি, এখন আপনাকে বিরক্ত করা উচিত হয়নি। জানতাম না কিছু।

    ভদ্রলোক যদিও কথাটা উড়িয়ে দিলেন, আমরা তার মনের আসল ভাবটা আন্দাজ করে তাঁকে আর বিরক্ত না করে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

  • ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

    ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

    জসীম উদ্‌দীন

    [book]

    ‘ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায়’ পল্লীকবি জসিম উদ্দীনের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ। গ্রন্থটির প্রকাশিকা নন্দিতা বসু; গ্রন্থপ্রকাশ, ৬-১ রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা -৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কানাই পাল। মুদ্রাকর কার্তিকচন্দ্র পাণ্ডা; মুদ্রণী, ৭১ নং কৈলাসবোস ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৬। গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেলেন—

    আমার ছাত্রজীবনের বন্ধু—

    বিনয়েন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বীরেন ঘোষ

    বীরেন ভঞ্জের

    করকমলে

    জসীম উদ্‌দীন

    ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ ফুটে উঠেছে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের চোখে তিন মহীরূহের চিত্র— বটবৃক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তুলিতাত্ত্বিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, ঝর্ণার মত চঞ্চল কাজী নজরুল ইসলাম। আলোচনায় উঠে এসেছেন আরও অনেকে, এবং কবি জসিম উদ্দীনের স্ট্রাগলিং সময়ের গল্পও।

    কলিকাতায় পড়াশোনা করছিলেন জসীম উদ্দীন। এমনসময় তার সাথে পরিচয় হয় ঠাকুরবাড়ির অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলালের। এই পরমসুহৃদ মোহনলালই তাকে নিয়ে যান রবীন্দ্রনাথেরর কাছে, পরিচয় করিয়ে দেন তাকে।

    যে কবির কবিতা, গল্প আর উপন্যাস এতকাল পড়ে এসেছেন এবার তারঁ সান্নিধ্য পাচ্ছেন তা তরুণ জসীম উদ্দীনকে আন্দোলিত করে, অনুপ্রাণিত করে সাহিত্য চর্চায়। রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতন আর ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত যেন অনেকটা নিয়মিত হয়ে যায় তরুণ কবি জসীম উদ্দীনের জন্য। ঠাকুরবাড়িতে ঘরভাড়া নিয়ে দীর্ঘকাল কাটান তিনি।

    রবীন্দ্রনাথ জসীম উদ্দীনকে কাব্য রচনায় কিভাবে প্রভাবিত করেছেন তার সহজ-সরল অথচ অতিমুগ্ধকর বর্ণনা রয়েছে এই বইতে।

    ঠাকুরবাড়ির আরেক জিনিয়াস অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও জসীম উদ্দীনের বেশভাল সস্পর্ক গড়ে ওঠে। কবি তার সংগৃহীত পল্লীগীতি, পালাগান প্রায়শই অবনীন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ আর গগনেন্দ্রনাথকে শোনাতেন। আর তাঁরাও এই তরুণটিকে স্নেহের চোখে দেখতেন। “নকশিকাঁথার মাঠ” রচনায় অবনীন্দ্রনাথের প্রভাব জসীম উদ্দীন অবলীলায় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। অবন ঠাকুরের সাহচর্য জসীম উদ্দীনের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে সুসমৃদ্ধ করেছে।

    জসীম উদ্দীন রাতারাতি কবি হিসেবে খ্যাতি পাননি। তাকেও অনেক সংগ্রাম করে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়েছে। স্কুল ছাত্র থাকাকালে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলিকাতায় চলে এলেন জসীম উদ্দীন। উদ্দেশ্য ছিল কবি হবেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে হলেন হকার। অচেনা, অজানা কলিকাতায় পত্রিকা ফেরি করে দিন কেটেছে কবির। সেই কাব্যচর্চা, গদ্যচর্চার সংগ্রামকে জসীম উদ্দীন কখনই ভুলতে পারেননি—যার প্রমাণ সেইসব দিনগুলোর কথা অনেকবার তিনি লিখেছেন বইতে।

    ১৯৩১-১৯৩৭ সাল দীর্ঘ ৬ বছর। এই সময়ে পুরোটা বেকার ছিলেন জসীম উদ্দীন। দিনরাত এখানে সেখানে চাকরির আবেদন করে যাচ্ছেন অথচ কাজ হচ্ছে না। কলিকাতার রিপন কলেজ বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বাংলার শিক্ষক পদে আবেদন করলেন। কিন্তু কাজ হ’ল না লবিং নেই বলে। উপায়ন্তর না দেখে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবিঠাকুর মৃদু সুপারিশনামা লিখে দিলেও কাজ হ’ল না, কেননা যাকে জসীম উদ্দীনের বদলে নেয়া হ’ল তার পক্ষে আগেই কবিগুরু সুপারিশ করেছিলেন। যাইহোক, রবীন্দ্রনাথের সুপারিশেই তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গবেষকের পদটা পেলেন বলা চলে।

    আমরা জানি, জসীম উদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু কিভাবে পেলেন সেই চাকরি?

    তখন ঢাবির ভিসি স্যার এফ রহমান। তার কাছে গেলে তিনি সরাসরি জসীম উদ্দীনকে বললেন, জসীম উদ্দীন যদি স্বনামধন্য সাহিত্যিক অধ্যাপক বা রবীন্দ্রনাথের সুপারিশ আনতে পারেন তবে কাজ হতে পারে।

    প্রথমেই, খুশি মনে তিনি গেলেন তার নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় কলিকাতায়। যে দুই নামী অধ্যাপক তাকে পছন্দ করতেন তারা তার হয়ে সুপারিশ করতে রাজি হলেন না কারণ, তাতে হিন্দু চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষেপে যেতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস! এবার তিনি গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবিঠাকুর সাথে সাথে সুপারিশনামা লিখে দিলেন আর তাতেই ঢাবিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারলেন জসীম উদ্দীন—রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্রীক এমনই নানা ঘটনাকে উপজীব্য করে একেবারে সাদামাটা ভাষায় অথচ অতিসুখপাঠ্য করে জসীম উদ্দীন লিখেছেন ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’।

    এবার বলি বইতে নজরুলের প্রসঙ্গে,

    জসীম উদ্দীন যখন কলিকাতায় পত্রিকা ফেরি করতেন, তখন তার সাথে পরিচয় হয় স্বভাবে চিরশিশু নজরুলের সাথে। তার ‘কবিভাই’ নজরুলকে অনেক কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল জসীম উদ্দীনের। আমৃত্যু তিনি স্বভাবে চিরশিশু নজরুলের সাহচর্যে থাকার চেষ্টা করেছেন।

    এবার আসি লেখনী প্রসঙ্গে,

    জসীম উদ্দীনের কী গদ্য, কী পদ্য সবেতেই এক সহজিয়া মনোমুগ্ধকর ছন্দে লেখা আবর্তিত হয়—তার ব্যতিক্রম ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ও হয়নি।

    বেশ সুখপাঠ্য গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘রবি তীর্থে’। এই অধ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা। ‘রবি তীর্থে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন, কাজ, ও ব্যক্তিত্বকে এক নতুন আলোকে দেখতে পাবেন। বিশ্বকবি কোন লেখা মনোমত হওয়ার আগে পর্যন্ত বারবার সংশোধন ও পরিবর্তন করেন, নাটক মঞ্চায়নের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংলাপ আর কাহিনীতে পরিবর্তন করতে থাকেন সবচেয়ে ভালভাবে কাজটি করার জন্য, ভোরে উঠে সারাদিন লেখায় মশগুল থাকেন, আবার তাঁর দর্শন না পেয়ে কোনও দর্শনার্থী ফিরে গেলে মনঃক্ষুণ্ণ হন, সকলের সাথে দেখা এবং কথা বলেন, সাধ্যমত সকলের জন্য করেন, আবার কেউ উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে এলে অবাক হয়ে যান। সাহিত্যের এত দিকে তাঁর বিস্তর পদচারণা, অথচ বিশ্বভারতী আর শান্তিনিকেতনের মত বড় দুটো প্রতিষ্ঠান চালিয়ে গিয়েছেন সফলভাবে। এই বই থেকে জানা যাবে এতরকম কাজ করতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির বাকি সকলের এবং আরও কতজনের কত নীরব ত্যাগ এবং অবদান ইন্ধন জুগিয়েছে।

    বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম ‘অবন ঠাকুরের দরবারে’ এবং তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ‘নজরুল’।

    জানলাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং তাঁর আরও দুই ভাইয়ের সাধনার কথা; ছবি আঁকা নিয়ে তাঁদের দিন রাত পার করে দেয়ার গল্প।

    পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের লেখায় গ্রামবাংলার যে মায়াভরা রূপটা দেখতে পাই, তাঁর লেখায় যে মাটির গন্ধ পাই, সেইরকম মায়া রয়েছে এই বইটা জুড়েও। মিষ্টি সব উপমা, সহজ সরল মুগ্ধতার ভাষা, আর লেখাজুড়ে আপনজনকে নিয়ে লেখার মায়া যে মনের ভেতর থেকে আসা ভালবাসা আর শ্রদ্ধা মিলেই গড়ে উঠেছে— তাতে সন্দেহ হবার অবকাশ নেই।

    পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এমন দরদ দিয়ে বইটা লিখেছেন যে কবির লেখনীর জোরে চোখের সামনে ভেসে উঠে শান্তিনিকেতন, রবিঠাকুর আর অবনঠাকুরের বাসভবন, তাদের সৃষ্টিকর্ম। অবনীন্দ্রনাথের জীবনের শেষদিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির করুণ অবস্থাও কিছুটা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। তবুও পাঠকের ভাল লাগবে অবন ঠাকুরের একাকীত্বের গল্প।

    শেষে এলেন ‘হাবিলদার কবি’ — নুরু — নজরুল ইসলাম। তাঁর সম্পর্কে জসিম উদ্দীন লিখেছেন পর্বতসম দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে রেখে, আক্ষেপ ঢেকে। বোঝা যায়, শুরুতে নজরুলের চাঞ্চল্যমাখা সব কাহিনীর সাথে বড্ড বেখাপ্পা লাগে তার জীবন্মৃত সমাপ্তি।

    ধুমকেতুর মূল শরীর যদি হয় তিরিশ কিলো লম্বা, তাহলে তার ল্যাজ নাকি বড় হয় সূর্যের ব্যাসের সমান। আমাদের বাংলা সাহিত্যের ধুমকেতু —নজরুলের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে বোধহয়। যা দিয়েছেন, তার তৃপ্তি অপেক্ষা; যা দিতে পারতেন, সেই সম্ভাবনার অকাল মৃত্যুর আপসোসটা অনেক অনেক বেশি। গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক।

  • একটু পরে রোদ উঠবে

    একটু পরে রোদ উঠবে

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    গ্রন্থপরিচয়

    প্রচেত গুপ্ত রচিত উপন্যাস ‘একটু পরে রোদ উঠবে’ প্রথম প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৭; প্রকাশক পত্রভারতী। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সৌজন্য চক্রবর্তী। উপন্যাসটির উৎসর্গ পাতায় লেখা আছে—

    পৌলোমী বসু

    ব্রাত্য বসু

    সুজনেষু

    লেখকের কথা

    এক শীত শীত সকালে ঘুম ভেঙে দেখলাম, আকাশ মেঘলা। চারপাশ ধূসর, ঘোলাটে। কেমন একটা থম মারা বিষণ্ণ ভাব। মন খারাপ হয়ে গেল। সেই মন খারাপ কাটাতে নিজেকে বোঝালাম, চিন্তা নেই, একটু পরে রোদ উঠবে। আবার চারপাশ ঝলমল করবে। কোন রূপক নয়, সরাসরি মেঘ কেটে রোদ ওঠবার কথাই ভেবেছিলাম। এই কাহিনিও তাই। আড়ালে অন্য জটিলতা কিছু নেই।

    ভেবেছিলাম, অনেক ভাবনাচিন্তা করে লিখব। পেন চিবোব, মাথার চুল ছিঁড়ব। মোটা মোটা বই থেকে উদ্ধৃতি দেব। ধারাবাহিক উপন্যাস বলে কথা। কাহিনি, চরিত্র, সবাই আমার কাছে তটস্থ হয়ে থাকবে। একটু এদিক-ওদিক করলেই ধমক খাবে। বলা বাহুল্য লেখা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সব আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল। এক সময় দেখলাম, চরিত্র থেকে গল্প পর্যন্ত সবাই হাতের বাইরে! তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো চলছে, কথা বলছে, ভাবছে। শাসন করবার চেষ্টা করলাম। লাভ হল না। লেখক হিসেবে নিজেকে অসহায় লাগল। হাল ছেড়ে দিলাম। যা হয় হোক।

    মজার কথা হল, একটা সময়ের পর বুঝতে পারলাম, হাতের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে কাহিনি, চরিত্র, গল্প বলবার ভঙ্গি নিয়ে লেখক হিসেবে অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছি। তারাও খুব খুশি। ফলে এই কাহিনির ভালো-মন্দর দায় আমার নয়। কাহিনির নিজের।

    কাহিনিতে মজা আরও আছে। কাহিনির নাম ‘একটু পরে রোদ উঠবে’ হলে কী হবে, মূল চরিত্রের নাম বারিধারা। এই উলটো কম্মটি আমি ভেবেচিন্তে করিনি। এটিও নিজের মতো হয়ে গেছে। লেখা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে যা হয় আর কী। ঝকঝকে এই তরুণীটির বুদ্ধি, আধুনিক চিন্তা, প্রতিবাদ, মূল্যবোধ, ভালোবাসা বারিধারার মতোই কাহিনির বিভিন্ন জায়গায় ঝরে ঝরে পড়েছে।

    একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে এই সময়ের কথা বলতে চেয়েছি। কাহিনির বিস্তার অনেকটাই। চরিত্র, ঘটনা অজস্র। চরিত্রদের বয়স একানব্বই থেকে চব্বিশ। ঘটনা ছড়িয়েছে কলকাতা থেকে সুন্দরবনের গ্রাম পর্যন্ত। এই সময়ের প্রেম, রাজনীতি, জাদু বাস্তবতা, লোভ, হিংসা, অপরাধ, মায়া-মমতা, বিশ্বাস ভঙ্গ আর বিশ্বাস গড়া নিয়ে একটা দলিল তৈরির চেষ্টা করেছি। একই সঙ্গে চেষ্টা করেছি, কাহিনিকে সময়োত্তীর্ণ করতে। কতটা পারলাম জানি না।

    অনেকের কাছে কৃতজ্ঞ। আজকাল পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত চাপ না দিলে লেখাটা শুরুই হত না। শৌনক লাহিড়ি উৎসাহ না দিলে লেখাটা আজকাল পত্রিকার রবিবাসরের পাতায় ছিয়াত্তর সপ্তাহ ধরে চালাতেই পারতাম না। ঋণী দেবাশিস চন্দর কাছে। প্রতি সপ্তাহে ঠেলা দিয়ে লেখা বের করে নিয়েছে। কৃতজ্ঞ প্রিয় শিল্পী দেবব্রত ঘোষের কাছে।

    বই আকারে প্রকাশ করবার আগে কিছু পরিমার্জনা করলাম। জানি না, তাতে কাহিনি আরও ভালো হল কিনা।

    পত্রভারতী সংস্থার কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় একটা বিস্ময়কর কাজ করতেন। রবিবার রাতে লেখা পড়ে আমাকে ফোন করতেন। একবারও বাদ যায়নি (উনি দেশের বাইরে না থাকলে)। তাঁর প্রতিক্রিয়া শুনে অবাক হতাম। মনে হত, কাহিনির বহু চরিত্রকেই উনি আমার থেকে অনেক বেশি ভালোবাসেন, অনেক বেশি চেনেন। তাদের প্রতি কোনও অবিচার সহ্য করবেন না। প্রয়োজনে আমার সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত যাবেন। এই বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী সৌজন্যকে ধন্যবাদ। ভারী চমৎকার কাজ করেছেন। ধন্যবাদ পত্রভারতী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে। তারা বহু বছর ধরে আমার জ্বালাতন সহ্য করে চলেছেন। এবারও করলেন।

    দীর্ঘদিন ধরে একটা লেখা চালাতে হলে বাড়ির জোরদার সমর্থন দরকার হয়। সেই জোরদার সমর্থন আমার স্ত্রী মিত্রা, পুত্র সমুদ্র এবং আমার পিসিমার কাছ থেকে। আমার বউদি শ্রাবণী গুপ্ত অপেক্ষা করে আছেন কবে বই প্রকাশ হবে আর কবে তিনি সংগ্রহে রাখবেন। আর আমার দাদা পূষণ গুপ্তর কড়া সমালোচনা শোনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি আমি। আড়াল থেকে আমার ভাই পুষ্কর নিশ্চয়ই আমার লেখা-লিখির ওপর নজর রাখছে।

    সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ আমি আমার পাঠকদের কাছে। ধারাবাহিক প্রকাশের সময় তারা কখনও রাগ করে, কখনও প্রংশসা করে, কখনও অনুযোগ করে, কখনও ভালোবেসে আমার লেখার সঙ্গে থেকেছেন। আমার বিশ্বাস, তারা এই বইয়ের সঙ্গেও থাকবেন।

    ৩১ অক্টোবর, ২০১৬
    সল্টলেক
    প্রচেত গুপ্ত

  • মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

    মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [bname]

    মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

    [এই উপন্যাসের শেষ দিকে একটা দৃশ্য আছে, যেখানে ভজবাবু ডাকাতের দল নিয়ে রাজবাড়ি লুট করতে যাচ্ছেন, সেই দৃশ্যে ভজবাবুর মুখে কিছু গান রয়েছে। এই গানগুলি লিখে দিয়েছেন বিখ্যাত কবি শ্রীনীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।]


    ফটোটা কী করে যে মনোজদের বাসায় এল, তা কেউ জানে। ফটোটা কার, তাও কেউ বলতে পারে না। মনোজদের বাড়িতে অনেকের ফটোর মধ্যে এই ফটোটাও বরাবর আছে। অথচ কেউ ঠিক করে বলতে পারে না যে, এটা কোত্থেকে কবে এসেছিল, ফটোর ছেলেটাই বা কে?

    ফটোটা একটা ছেলের। তার বয়স হবে আট নয় বা দশ। একটা বাংলোবাড়ির সামনের বারান্দার সিঁড়িতে সে বসে আছে। সামনের বাগান থেকে বারান্দায় উঠতে মোট তিন ধাপ সিঁড়ি। ঠিক মাঝের ধাপে ছেলেটা বসে আছে, নীচের সিঁড়িতে পা, ওপরের সিঁড়িতে কনুই রেখে সে একটু পিছনে হেলে বসে আছে। তার পায়ে বুটজুতো আর মোজা, সাদা হাফপ্যান্ট, গায়ে

    ফুলহাতা সোয়েটার, আর সোয়েটারের গলার কাছে সাদা শার্টের কলার বেরিয়ে আছে। ছেলেটা দেখতে ভীষণ সুন্দর। বড় বড় চোখ, লম্বাটে মুখ, চোখা পাতলা নাক, গালগুলো ভরাট, কিন্তু লুচির মতো ফোলা ফোলা নয়। তার চুলে ডানদিকে সিঁথি, আর কপালটার অনেকখানি ঢেকে চুলগুলো পাট করা। ছেলেটা অল্প একটু হাসিমুখে চেয়ে আছে। সেই হাসি আর তাকানো এত জীবন্ত যে, যে-কোনও সময়ে ছেলেটা যেন কথা বলে উঠবে। ছবিটার মধ্যে আরও দুটো অদ্ভুত ব্যাপার আছে। ছেলেটার পিছনে যে বারান্দা, তাতে টেরছা হয়ে রোদ পড়েছে। বারান্দার পিছনে দরজা, দরজায় একটা গোলাপ ফুলের ছাপওলা পর্দা ঝুলছে। সামনে রোদ, কিন্তু পদাটা ছায়ায়, তাই পদার গায়ে গোলাপের ছাপ একটু অস্পষ্ট। আর সেই পদাটা একটুখানি সরিয়ে একটা মুখ উঁকি মেরে আছে। মুখটা খুবই অস্পষ্ট। শুধু সেই মুখে একটু হাসি বোঝা যায়। যেন কেউ হাসিমুখে ছেলেটার ছবি-তোলানো দেখছে। কিন্তু সেই মুখটা ছেলের না মেয়ের, তা বোঝা যায় না। আরও একটা মজার ব্যাপার হল, ছেলেটার বাঁ দিকে একটা কাঁচের গেলাসে তিন পোয়া ভর্তি দুধ রয়েছে। দুধ কিনা তা ঠিক করে বলা যায় না, তবে সাদামতো তরলটা দুধ ছাড়া আর কীই বা হবে। আর সেই প্রায় পৌনে এক গেলাস দুধে মুখ ডুবিয়ে দুধটা খেয়ে নিচ্ছে একটা বেশ বড়সড় মোটা বেড়াল। বেড়ালটার লেজও খুব মোটা। বোঝা যায়, ছেলেটা দুধ খাচ্ছিল, সেই সময়ে ফটো তোলাতে গিয়ে গেলাসটা পাশে রেখেছিল, আর তখন ছেলেটাকে অন্যমনস্ক দেখে বেড়ালটা চুপিচুপি এসে চুরি করে দুধ খেয়ে নিচ্ছে। ছেলেটা টের পায়নি। ছবিটার মধ্যে আরও কিছু কিছু জিনিস লক্ষ করা যায়। যেমন, বারান্দার নীচে বাগানের একটু অংশ ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাগানে অনেক গাঁদা, ক্রিসেনথিমাম, পপি ফুল ফুটেছে। বাংলোবাড়িটার টিনের চাল। বারান্দার ওপরে টিনের চালটার একটু ঢালু অংশ দেখা যায়। বারান্দার থাম বেয়ে একটা লতানে গাছ উঠেছে চালে।

    মনোজ যে কতবার ছবিটা দেখেছে তার হিসেব নেই। ছবিটা দেখতে তার বড় ভাল লাগে। কেন ভাল লাগে তাও সে জানে না। যদি কখনও তার মন খারাপ হয়, বা কখনও কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়, বা মায়ের ওপর অভিমান হয়, তখন সে এসে একা ঘরে ছবিটা বের করে চেয়ে বসে থাকে। ছবি থেকে ছেলেটাও তার দিকে হাসিমুখে চেয়ে থাকে। তখন মনোজের মনের মধ্যে কী যেন হয়, সে ভাবে–এই তো আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। তখন তার মন ভাল হয়ে যায়। মনোজ খুব ছেলেবেলা থেকেই তাদের বাড়িতে ছবিটা দেখে এসেছে। আর ছবিটা বেশ পুরনো, একটু হলদে-হলদে পুরনো ছাপও পড়ে গেছে তাতে। অর্থাৎ ছবিটা অনেক আগে ভোলা হয়েছিল, এবং ছবির ছেলেটা নিশ্চয়ই এখন আর ছোট নেই। সে হয়তো অনেক বড় হয়ে এখন মনোজের কাকা বা বাবার মতো বড় মানুষ হয়ে গেছে। তবু ছবির ছেলেটাকে মনোজ বন্ধু বলেই ভাবে। ভাবতে ভাল লাগে। এই ছবিটার কোনও ঠিকানা নেই, কোথায় কবে তোলা হয়েছিল কেউ জানে না। তাই বাড়ির লোকেরা এই ছবিটা দেখলেই বেশ বিব্রত হত। বলত, এ ছবিটা যে কার কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের কেউ নয় নিশ্চয়ই। মনোজ তাই একটু বড় হয়ে ছবিটা অন্যান্য ছবি থেকে আলাদা করে নিয়ে এসে তার গল্পের বইয়ের তাক-এ একটা ছোটদের রামায়ণ বইয়ের পাতার ভাঁজে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। নিজের কাছেই রাখা ভাল, নইলে কে কবে বাজে ছবি ভেবে ফেলে-টেলে দেবে।

    মনোজদের বাড়িতে অনেক লোক। ঠাকুমা, বাবার এক বুড়ি পিসি, মা, বাবা, দুই কাকা, দিদি, দাদা, দুটো ডলপুতুলের মতো ছোট ভাইবোন। এ ছাড়া বাড়িতে থাকে একটা নিরাশ্রয় বুড়ো লোক, তার বাড়ি বিহারে। একটা বাচ্চা চাকর, একটা রান্নার ঠাকুর, এক বুড়ি ঝি। তা ছাড়া বিস্তর বাইরের লোকজনের রোজ আসা-যাওয়া তো আছেই। যেমন পুরুতমশাই সতীশ ভরদ্বাজ, মাস্টারমশাই দুঃখহরণবাবু, দিদির গানের মাস্টারমশাই গণেশ ঘোষাল, এমনি আরও কত কে!

    উবু হয়ে না বসলে দুঃখহরণবাবু পড়াতে পারেন না। যদি কেউ তাঁকে আসন-পিঁড়ি করে বসিয়ে দেয়, বা চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসতে বলে, তা হলেই দুঃখহরণবাবুর বড় বিপদ। তখন তিনি অঙ্ক ভুল করেন, ইতিহাসের সঙ্গে ভূগোল গুলিয়ে ফেলেন, ইংরেজি ট্রাস্লেশন করতে হিমসিম খান। যেই উবু হয়ে বসলেন, অমনি তাঁর আঙুল দিয়ে পেনসিল বেয়ে হড়হড় করে অঙ্ক, ট্রানস্লেশন, জ্যামিতি সব নেমে আসতে থাকে, মুখে খই ফোটে ইতিহাস আর ভূগোলের।

    সকালবেলাতেই দুঃখহরণবাবুর বিপদ। সেই সময়টায় মনোজের বাবা রাখোহরিবাবু পড়ার ঘরে এসে বসে গম্ভীরভাবে খবরের কাগজ পড়েন। রাখোবাবু ভীষণ রাশভারী লোক, বাড়ির কুকুরটা বেড়ালটা পর্যন্ত তাঁকে ভয় খায়, বাড়ির লোকজনের তো কথাই নেই। কিন্তু সকালবেলাতে রাখোবাবু যে মনোজদের পড়ার ঘরে এসে বসেন তার একটা কারণ আছে। এবাড়িতে একজন মানুষ আছেন, যিনি রাখোবাবুকে মোটেই ভয় খান না, বরং উল্টে রাখোবাবুই তাঁর ভয়ে অস্থির। তিনি রাখোবাবুর পিসিমা আদ্যাশক্তি দেব্যা। বাবার পিসিকে ঠাকুমা ঠাকুরঝি বলে ডাকেন, সেই থেকে মনোজরা সবাই তাঁকে ‘ঠাকুরঝি’ ডাকে। তিনি খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন, সেই থেকে উপোস-টুপোস করে করে বুড়ো বয়সে ভীষণ তেজস্বিনী হয়ে গেছেন। কারও তোয়াক্কা করেন না। তাঁর আবার ভয়ংকর শুচিবাই। সকালে কাঁচা গোবর জলে গুলে সেই জল সারা বাড়িতে ছিটিয়ে দেন। মনোজদের পড়ার ঘরটা বাড়ির বাইরে, বাগানের ধারে। একটেরে ছোট্ট একটু ঘর, তাতে এক ধারে পড়ার টেবিল চেয়ার, অন্য ধারে তক্তপোশের ওপর দুঃখহরণবাবুর বিছানাপত্র। এই ঘর অবধি ঠাকুরঝি আসতে পারেন না, খোঁড়া পায়ে বাগান পেরোতে কষ্ট হয়। তাই এ-ঘরটা গোবরজলের হাত থেকে বেঁচে যায়। রাখোবাবু তাই গোবরের গন্ধ এড়িয়ে নিশ্চিন্তে শ্বাস নেওয়ার জন্য এই ঘরে এসে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে যান, ততক্ষণে ঘরদোরের জল শুকিয়ে যায়।

    রাখোবাবু কড়া ধাতের লোক, আদবকায়দার নড়চড় দেখলে খুব রাগ করেন। তাই সেসময়টায় দুঃখহরণবাবুকে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে হয়। আর ওই এক ঘণ্টায় দুঃখহরণবাবু রাজ্যের ভুলভাল করতে থাকেন। একদিন তিনি ওই অবস্থায় ট্রানস্লেশন করতে গিয়ে তখন হলঘর ভরিয়ে গিয়াছে এই বাক্যটার ইংরেজি করলেন বাই দেন দি হল রুম ওয়াজ ফুলফিলড়। এই ইংরেজি শুনে বাবা তাঁর ইংরেজি খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বিরক্ত হয়ে তাকালেন। ছেলেমেয়ের সামনে মাস্টারমশাইয়ের ভুল ধরলে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা কমে যেতে পারে, সেই জন্য বললেন–”দুঃখবাবু, ইংরিজিটা ঠিকই আছে, তবে একটু কানে কেমন যেন লাগছে। আর একবার অন্যভাবে করুন।” কিন্তু দুঃখহরণবাবু পা ঝুলিয়ে বসে আছেন যে, তার ওপর রাশভারী রাখোবাবুর কথা শুনে আরও ঘাবড়ে গিয়ে খুব শক্ত ইংরেজিতে বললেন–”দি হল’স ফুলফিলমেন্ট ওয়াজ অ্যাচিভড বাই দেন।” শুনে রাখোবাবু আর মুখ তুললেন না। দুঃখহরণবাবুও গোলমালটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু উবু হয়ে না বসলে তাঁর মুড আসে না। তাই তিনি ঠ্যাং দুটো জোর-নাচাতে নাচাতে মুখে ‘হুঁ হুঁ করে একটা শব্দ করে যেতে লাগলেন। দাদা সরোজ, দিদি পুতুল, আর মনোজ চুপিসারে হাসাহাসি করছে।

    শীতকাল। বাগানে, খুব ফুল ফুটেছে। সামনের দিকটায় মস্ত মস্ত গাঁদা ফুটে আছে, সেগুলো এত বড় যে দু হাতে মুঠো করেও বেড় পাওয়া যায় না। মোরগ ফুল, পপি, গোলাপ তো আছেই। ফটফটে রোদে প্রজাপতি আর ফড়িং উড়ছে অনেক, পোকামাকড় টি টি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাগানের অন্য ধারে পালং খেত, ফুলকপি, ওলকপি, ধনেপাতা, বেগুন লাগানো হয়েছে। সেই সবজি খেতে দেহাতি বুড়ো মানুষ রামখিলাওন খুরপি হাতে ঘুরঘুর করছে। যদিও একটা ঠিকে মালী এসে বাগানের কাজ করে যায় রোজ, তবু রামখিলাওন কাজ দেখানোর জন্য বাগানে সব সময়ে কিছু খোঁড়াখুঁড়ি করবেই। চোখে ভাল দেখতে পায় না, অনেক সময়ে গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়ে আলগা করতে গিয়ে শেকড়বাকড় উপড়ে ফেলে। আগাছা তুলতে গিয়ে ফুলগাছ তুলে ফেলে দিয়ে আসে। বকুনি খেলে খুব গম্ভীরভাবে থাকে, যেন এ-সব বকাবকি তার তেমন গায়ে লাগে না। গতবার ঠাকুমার চশমা পালটানো হল, আর রামখিলাওন ঠাকুমার পুরনো চশমাটা চেয়ে নিল। সেই চশমাটা এখন সব সময়ে চোখে পরে থাকে। তাতে যে সে ভাল দেখতে পায় তা নয়। কিন্তু এমন ভাব দেখায় যে খুব ভাল দেখছে। চশমা পরে ইজ্জতও বেড়ে গেছে তার। বাজারের কাছে দেশওয়ালী ভাইদের কাছে চশমা পরে যাওয়ায় সেখানে তার খাতিরও নাকি বেড়ে গেছে। বাড়ির চাকর রঘু তাকে ‘রামু বলে ডাকলে বা তুই-তোকারি করলে সে ভারী চটে যায়। রঘু তাই তাকে আজকাল রামুবাবু বলে ডেকে আপনি-আজ্ঞে করে। কিন্তু সন্ধে হলেই রঘু নানা কায়দা করে রোজ রামুকে ভূতের ভয় দেখাবেই।

    আজ দুঃখহরণবাবুর ভুলভাল কিছু বেশি হচ্ছে। দাদা সরোজকে ইতিহাস বোঝাতে গিয়ে তিনি বরাবার ওয়ার্ড মিনিং বোঝাতে লাগলেন, ইতিহাস বইতে দুটো ব্যাখ্যাও দাগিয়ে দিলেন। পুতুলকে সুদকষা বোঝাতে গিয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বললেন, “মুখস্থ যেন ভুল না হয়, আর দাঁড়ি কমা সেমিকোলন সম্পর্কে সাবধানে থাকবে।” মনোজের ভুগোল বই খুলেও তিনি গোলযোগ করে ফেললেন, পশ্চিমবঙ্গের কোন্ কোন্ জেলায় ধান ও পাট জন্মায় তা বলতে গিয়ে তিনি বারবার নর’ শব্দের রূপ এনে ফেলছিলেন। তাই শুনে রাখোবাবু বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লেন। ঘরে গোবরের গন্ধ, পড়ার ঘরে ভুলভাল পড়ানো, কোথায় আর যাবেন! তাই বাগানে পায়চারি করতে করতে দেখেন, রামু একমুঠো দুব্বো ঘাস, কয়েকটা কড়াইশুটি আর একটা গাজর বাগান থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

    রাখোবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ওসব কোথায় নিচ্ছিস রে রামু? দেখি, কী তুলেছিস?”

    রামু একগাল হেসে হাতের জিনিসগুলো দেখিয়ে বলল, “বুড়ি মা পাঠালেন কিছু ধনেপাতা, কাঁচা লঙ্কা আর একটা মুলো তুলে আনতে।”

    রাখোবাবু রেগে অস্থির। বললেন, “স্টুপিড, কবে থেকে বলছি হাসপাতাল থেকে চোখের ছানি কাটিয়ে আয়। কিছুতেই শুনবি না? কোন্ আকেলে তুই লঙ্কা বলে কড়াইশুটি, মুলো মনে করে গাজর আর ধনেপাতার বদলে গুচ্ছের ঘাস তুললি। আজই চল্ তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাব, চোখ কাটিয়ে আসবি।”

    শুনে রামু ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল। রাখোবাবু রাগারাগি করতে করতে ভিতরবাড়িতে চলে গেলেন। পড়ার ঘরে দুঃখবাবু চেয়ারের ওপর টপ করে উবু হয়ে বসতেই তাঁর চেহারা পাল্টে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি ধান ও পাটের জেলা ঝরঝরে মুখস্থ বলতে লাগলেন, সুদকষা জল করে দিলেন, ইতিহাসের সন-তারিখ সুন্ধু আকবরের খুড়তুতো ভাইয়ের নাম পর্যন্ত তাঁর মনে পড়ে গেল।

    ঠাকুমা বামাসুন্দরী ডালের বড়ি দিচ্ছিলেন রোদে বসে। একটা কাক তাঁকে অনেকক্ষণ ধরে জ্বালাতন করছে। কাকটার সাহসেরও বলিহারি! এ বাড়িতে ঠাকুরঝি জেগে থাকতে বেড়াল কুকুর কাকপক্ষী ঢুকতে বড় একটা সাহস পায় না। কে কোথাকার এঁটোকাঁটা আঁস্তাকুড় টেনে আনে ঘরে, সেই ভয়ে ঠাকুরঝি লাঠিটি হাতে সারা বাড়ি খোঁড়া পায়ে ডিং মেরে-মেরে ঘুরে বেড়ান। কত কুকুর, বেড়াল, কাকপক্ষী যে তাঁর হাতে রামঠ্যাঙ্গা খেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ইদানীং তিনি শুধু লাঠির ওপর ভরসা না-রেখে পেয়ারা গাছের ডাল কাটিয়ে একটা গুলতি বানিয়ে নিয়েছেন। গুলতির যে চামড়ার অংশটুকুতে গুড়ল ভরতে হয়, সে-জায়গাটায় চামড়ার বদলে কয়েক পাল্লা ন্যাকড়ার পট্টি লাগিয়ে নিয়েছেন, চামড়া ছুঁতে পারেন না। গুলতি ছুঁড়ে ছুঁড়ে ঠাকুরঝির হাতের টিপও হয়েছে চমৎকার। সট সট করে গুড়ল ছোড়েন, ঠিক গিয়ে বেড়ালের লেজের লোম খসিয়ে দেয়, কাকপক্ষীর ডানার পালক ঝরে যায়, কুকুরের ঠ্যাং খোঁড়া হয়। এ বাড়িতে আদ্যাশক্তি আছেন জেনেও কাকটা ঘুরঘুর করছে। তেল-মাখানো কাঁসার থালা, টিনের টুকরো রোদে পেতে দিয়েছেন বামাসুন্দরী, ডাল ফেটাচ্ছেন। ডাল ফেটানোতে তাঁর জুড়ি নেই। বারো মাস ডাল ফেটিয়ে তাঁর ডান হাতে বেশ জোর হয়েছে। পাঞ্জা কষলে মেজকাকা ব্যায়মবীর হারাধনও ঠাকুমাকে হারাতে বেগ পাবেন। তা ঠাকুমা ডাল ফেটাচ্ছেন। কাকটা ঘুরঘুর করছে। ডালে কালোজিরে মেশাবেন বলে কালোজিরের পুরিয়াটা পাশেই রেখেছেন। কাকটা এক ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেল।

    ঠাকুমা চেঁচালেন, “ও ঠাকুরঝি!”

    কিন্তু ঠাকুরঝি তখন কোথায়! কেউ সাড়া দিল না।

    ঠাকুমা বকবক করতে করতে উঠলেন। কাকটা পেঁপে গাছে উঠে বসে ছিল। কী খেয়ালে হুউশ করে উড়ে এসে ঠাকুমার খোঁপায় একটা ছোঁ মারল। তাতে ঘোমটা খসে গেল। ঠাকুমা ফের চেঁচালেন, “ও ঠাকুরঝি! কাকটার ভাবসাব মোটেই ভাল দেখছি না। গুলতিটা নিয়ে এসো?”

    পুরুতমশাই সতীশ ভরদ্বাজ ঘোষালবাড়ির নারায়ণ পুজো সেরে ফিরছেন। এসময়টায় মনোজদের বাড়িতে বসে তিনি খানিক খবরের কাগজ পড়ে যান, যাওয়ার সময়ে গৃহদেবতার ভোগটাও নিবেদন করে যান। এক কাপ চা, দুটো বিস্কুট আর পাঁচটা পয়সা তাঁর রোজকার বরাদ্দ। তিনি উঠোনে ঢুকে দেখেন, বামাসুন্দরী ডালের বাটি ফেলে বারান্দায় উঠে গিয়ে চেঁচামেচি করছেন, কাকটা ফেটানো ডালে নেচে বেড়াচ্ছে, সব ছয়ছত্রখান। বামাসুন্দরী তাঁকে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললেন, “দেখেছেন ঠাকুরমশাই, দজ্জাল কাকের কাণ্ডটা?”

    সতীশ ভরদ্বাজ বড় খাইয়ে মানুষ। বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা, বড় ভুড়ি, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। এবয়সেও জোয়ানমদ্দরা মাছ বা রসগোল্লার কম্পিটিশনে তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না। পাতে পড়তে-না-পড়তে তুলে ফেলেন। লোকে বলে তাঁর নাকি দুটো পোষা ভূত আছে, খাওয়ার সময়ে আবডাল থেকে তারাই সব তুলে খেয়ে ফেলে। নইলে ঠাকুরমশাই কি আর ওই অত চারটে মানুষের সমান খাবার খেতে পারেন? তবে সতীশ ভরদ্বাজ যে ভূত পোষেন, এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রায় সময়েই দেখা যায়, খবরের কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎ তিনি ‘উঁ’ বলে যেন কার নিঃশব্দ ডাকে সাড়া দেন, ঘাড় ঘুরিয়ে হঠাৎ যেন কার সঙ্গে ফিসফিস করে খানিক কথা বলে নেন, আবার কখনও হঠাৎ রাস্তাঘাটে চেঁচিয়ে ‘হাঁদু’, ‘ভুঁদু’ বলে কাদের ডাকাডাকি করেন। এইসব কারণে সবাই তাঁকে খানিকটা ভয় খায়।

    কাকের কাণ্ড দেখে সতীশ ভরদ্বাজ দাঁড়িয়ে গেছেন।

    কিছুক্ষণ দেখেটেখে একটা শ্বাস ফেলে খড়মের শব্দ তুলে বারান্দায় উঠে এলেন। তাঁর জন্য রোদে গদিওলা মোড়া পেতে রাখা আছে, তাইতে বসে বললেন, “কাক! এবাড়িতে মা আদ্যাশক্তি থাকতে কাক আসবে কোত্থেকে! তেমন সাহসী কাকই বা কই?”

    ঠাকুমা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেন, “ওই দেখুন লক্ষ্মীছাড়া এক বাটি মাসকলাইবাটা নষ্ট করল। কত কষ্ট করে ফেটিয়েছি।”

    “ও কাক নয় মা।” সতীশ ভরদ্বাজ গম্ভীর হয়ে বলেন।

    “তবে কী?”

    সতীশ ভরদ্বাজ আবার একটা শ্বাস ছাড়েন।

    রঘু এসে খবরের কাগজ দিয়ে গেল। সতীশ ভরদ্বাজ কাগজ খুলে আইন-আদালতের খবর পড়তে-পড়তে বললেন, “চল্লিশ বছর আগে জয়দেবপুরে একবার এই রকম কাকের পাল্লায় পড়েছিল মোক্ষদা ঠাকুমা। দেখতে অবিকল দাঁড়কাক, কিন্তু তার হাবভাব আর দুষ্টুবুদ্ধিতে ঠাকুমা অস্থির। রোজ এসে সব লণ্ডভণ্ড কাণ্ড করে যায়। তীর-ধনুক, ঢিল-পাটকেল, কাকতাড়ুয়া কোনও কিছুকে গ্রাহ্য করে না। সবশেষে জ্বালাতন হয়ে ডেকে পাঠাল আমাকে। গিয়েই বুঝলাম কাকের রূপ ধরে এ কোনও আত্মা-টাত্মা এসেছে। বললাম, এ কাক তো তাড়ালে যাবে না ঠাকুমা, নারায়ণ-পুজো দাও, আর শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করাও। সেই করতেই কাকটা যে পালাল, আর এল না। এ কাকটাকেও দেখুন না, যেন ঠিক কাক। কিন্তু কাকের মতো ব্যবহার কি? একটু লক্ষ করলেই দেখবেন, এ-পাখিটা কাকের চেয়েও কালো, ওর লাফানোটাও কাকের মতো নয়। এসব কিসের লক্ষণ সে আমি জানি। বাড়িতে একটা অমঙ্গল না হয়!”

    ঠাকুমা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে কথা নেই।

    আর এ-সময়ে গোয়ালঘরের দিক থেকে সোরগোল উঠল, রঘু আর বুড়ি কি কিরমিরিয়া চিৎকার করে বলছে, “ঠাকুরঝি পড়ে গেছে, ঠাকুরঝি পড়ে গেছে।”

    তা এরকম সোরগোল প্রায়ই ওঠে। ঠাকুরঝি সাত দিনে সাতবার আছাড় খান। লোকে বলে, ওইটাই তাঁর নেশা। তাঁর হবি। যেখানে কেউ কোনওদিন পড়ে যায় না এমন শুকনো সমতল জায়গাতেও ঠাকুরঝি তাঁর বরাদ্দ আছাড়টা খেয়ে নেন। শোনা যায়, দেশের বাড়িতে সেই ঢাকা জেলার গ্রামে থাকতেও তিনি প্রায়ই ঘরের পাটাতনে মই বেয়ে পুরনো তেঁতুল কি আমচুড় পাড়তে উঠে আছাড় খেতেন, পুকুরঘাটে পড়তেন, উঠোনে হড়কাতেন, এমন কী খোঁটায় বাঁধা গরু পর্যন্ত তাঁকে দেখলে দৌড়ে এসে দড়ির প্যাঁচ মেরে ফেলে দিত। অত সব আছাড় খেয়ে খেয়েই তাঁর পা একটু খোঁড়া, হাতও একটু বাঁকা, গ্রামদেশে তো হাড় জোড়া দেওয়ার ডাক্তার ছিল না, গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার পট্টি বেঁধে ছেড়ে দিত। ভাঙা হাড় বাঁকা হয়ে জোড়া লেগে যেত।

    ঠাকুরঝি আছাড় খেয়েছেন শুনে পড়া ভণ্ডুল হয়ে গেল। মনোজ, সরোজ, পুতুল তিন ভাই-বোন যথাক্রমে ভূগোল, অঙ্ক, ইতিহাস ফেলে দৌড়ে উঠে এল। দুঃখবাবু উবু হয়ে বসে মন দিয়ে অঙ্ক কষছিলেন। অনেকক্ষণ বাদে টের পেলেন যে, সামনে ছাত্রছাত্রীরা কেউ নেই।

    ভারী বিরক্ত হয়ে তিনি তখন গানের মাস্টারমশাই গণেশ ঘোষালের ঘরে গেলেন দুটো গল্প করতে। গিয়ে দেখেন, সেখানেও এক গোলমাল।

    গণেশবাবু আত্মহত্যা করবেন বলে চালের বিমের সঙ্গে একটা মোটা দড়ির ফাঁস ঝুলিয়ে দড়িটা টেনেটুনে দেখছেন।

    দুঃখবাবু বললেন, “এ কী?”

    দৃশ্য দেখে দুঃখহরণবাবু চমকে উঠলেন না। মাসের মধ্যে দু-তিনবার গণেশ ঘোষাল আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকেন। দুঃখবাবু দড়িটা দেখে বললেন, “ভাল বাঁধা হয়নি।”

    গণেশবাবু ফাঁসটা ধরে একটু ফুল খেয়ে বলেন, “না, দিব্যি শক্ত হয়েছে।“

    দুঃখবাবু মাথা নেড়ে বলেন, “দড়িটাও বেশ পুরনো, মাঝখানে ফেঁসে বেরিয়ে আছে। ফাঁস গলায় দিয়ে ঝুলবার সময়ে যদি দড়ি ছিঁড়ে যায় তো পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে।”

    গণেশবাবু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “ভাঙে ভাঙুক। ভারী তো তুচ্ছ হাত-পা। মরতে গেলে হাত-পায়ের চিন্তা করলে চলে না মশাই।”

    দুঃখবাবু ভেবে চিন্তে বলেন, “সে অবশ্য ঠিক। দড়িটা কি গোয়াল থেকে আনলেন নাকি?”

    গণেশবাবু মাথা নেড়ে বলেন, “হ্যাঁ। গরুর গলা থেকে খুলে এনেছি। বদমাশ গরুটা ঢুসিয়ে দিতে এসেছিল, কোনওক্রমে বেরিয়ে এসে দরজার ঝাঁপটা টেনে দিয়েছিলাম ভাগ্যিস।”

    দুঃখবাবু চেয়ারে পা তুলে বসে বললেন, “এই সকালবেলাতেই মরতে চাইছেন কেন? সকালবেলাটা সুইসাইড করার পক্ষে ভাল না। হুটহাট লোকজন এসে পড়তে পারে। এসব গভীর রাতে করতে হয়, যখন কেউ এসে বাঁচাতে পারবে না।”

    “ঃ।” বলে গণেশবাবু দুঃখবাবুর দিকে একটু কটমট করে চেয়ে থেকে বললেন, “গভীর রাত পর্যন্ত আমি জেগে থাকতে পারি না। এত ঘুম পায় যে, মরা-টরার কথা মনেই থাকে না।”

    “আজকে কী হয়েছিল যে, মরতে যাচ্ছেন?”

    গণেশবাবু মুখখানা ভার করে চোখ ছলছলিয়ে বললেন, “আবার কী! সেই সুরে ভুল। সকালে বসে হংসধ্বনি রাগটার ওপর একটু ঘষামাজা করছিলাম, পরপর দুবার তালে লয়ে ভুল হয়ে গেল। কালু মিশিরের শিষ্য আমি, আমার ভুল হওয়ার মানে তো পৃথিবীতে প্রলয় হয়ে যাওয়া। গুরুজি তো আজ প্রায় ত্রিশ বছর হল দেহ রক্ষা করেছেন, তবু যখন সকালে রেওয়াজ করতে বসি তখন যেদিন ঠিকঠাক সুরে-লয়ে-তালে গাই সেদিন নির্ঘাত শুনতে পাই অনেক দূর থেকে যেন মৃদু একটা তবলায় ঠেকা দেওয়ার শব্দ আসছে। গায়ে কাঁটা দেয় মশাই, পরিষ্কার বুঝতে পারি স্বর্গে বসে গুরুজি আমার গান শুনছেন, আর তবলার ঠেকা দিয়ে দিয়ে সম আর ফাঁক দেখিয়ে দিচ্ছেন। কখনও কখনও তারিফ করে ‘কেয়াবাত’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।”

    “ওরে বাবা, দুঃখবাবু বলে ওঠেন। অবশ্য কথাটা তিনি গণেশবাবুর গুরুজির কথা শুনে বলেননি, আসলে তাঁকে এ সময়ে কুটুস করে একটা ছারপোকা কামড়েছিল। তিনি উবু হয়ে বসেই চেয়ারে ছারপোকা খুঁজতে লাগলেন।

    গণেশবাবু চোখ মুছে বলেন, “জীবন তুচ্ছ, তালেই যদি ভুল হল, লয়ই যদি গোল পাকাল, তা হলে বেঁচে থেকে লাভ কী?”

    ছারপোকা খুঁজতে খুঁজতে দুঃখবাবু বলেন, “কাজটা ভাল করেননি।”

    “না না, বেশ করছি। আপনি আমাকে বাধা দেবেন না। মরে গুরুজির কাছে যাব, তিনি আমাকে মুখোমুখি পেয়ে পায়ের নাগরাটা দিয়ে আচ্ছাসে জুতোপেটা করবেন, তবে আমার শান্তি। একাজে আমাকে বাধা দেবেন না দুঃখবাবু।”

    দুঃখবাবু বিরক্ত হয়ে বলেন, “কে বাধা দিচ্ছে! মরতে হয় মরুন, তা বলে গোয়াল থেকে দড়িটা আনা আপনার ঠিক হয়নি। একটু আগেই গোয়ালঘর থেকে চেঁচামেচি আসছিল, বোধহয় আদ্যাশক্তিদেবী গোয়ালে গোবর আনতে গিয়েছিলেন, সেই সময়ে ছাড়া গরুটা তাঁকে বুঝি খুব টুসিয়ে দিয়েছে। ও গরুটা রামু ছাড়া কাউকে মানে না! এখন যদি সকলে গরুটা কে ছাড়ল তা খুঁজে দেখতে গিয়ে আপনার ঘরে এসে চোরাই দড়িটা পায় তো বড় লজ্জার কথা।”

    গণেশবাবুর মুখটা শুকিয়ে গেল, বললেন, “তাই তো!”

    “সব কিছুই ভেবেচিন্তে করতে হয়। গলায় দড়ি দেওয়ারও একটা ক্যালকুলেশন আছে। হু-হুঁ! পটেশ্বর ওঝা রেল লাইনে গলা দিতে গিয়েছিল তার বউয়ের সঙ্গে রাগারাগি করে। রাতে গিয়ে লাইনে গলা দিয়ে পড়ে রইল, কিন্তু গাড়ি আর আসে না। পটেশ্বরকে খাতির করতে গাড়ি তো আর আগেভাগে এসে পড়তে পারে না, তারও টাইম আছে। তা পটেশ্বর অপেক্ষা করতে করতে কখন লাইনে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ভোরবেলা গাড়ি এল, কিন্তু অনেক দূর থেকেই ড্রাইভার সাহেব রেল লাইনে মানুষ শুয়ে আছে দেখে গাড়ি থামিয়ে ইঞ্জিনের কু দিল। সেই কু শুনে ঘুম ভাঙতেই পটেশ্বর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে ভাবল, যাক বাবা, মরা-টরা হয়ে গেছে। ব্যথাট্যথাও খুব একটা পেতে হয়নি। এই ভেবে সে ঘাড়ে হাত দিতে ঘাড়খানা আস্ত দেখে আরও খুশি হয়ে হয়ে গেল। ভাবল, মরার পর বোধহয় কাটা ঘাড় ফের জোড়া লেগে যায়। এই সময়ে ড্রাইভারসাহেব নেমে এসে পটেশ্বরকে এই মার কি সেই মার। বলে–রেল লাইনটা তোমার মামদোগিরির জায়গা? সেই মার খেয়ে পটেশ্বর পনেরো দিন হাসপাতালে ছিল। ক্যালকুলেশনের ভুলে তার মরাও হল না, বরং মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকতে হল। তাই বলছিলাম।”

    আদ্যশক্তিদেবী আছাড় খেয়েছেন শুনলে কেউ আজকাল আর অবাক হয় না। কেউ যদি কাউকে গিয়ে বলে, জানো, আদ্যাশক্তি দেবী আছাড় খেয়েছেন? তা হলে যাকে বলা হয় সে একটু অবাক হয়ে বলবে, হ্যাঁ, সে আর বলার কী? উনি তো প্রায়ই তো খেয়ে থাকেন। ওটাই ওঁর অভ্যাস, নেশা।

    তবু কেউ যদি আছাড় খায়ই, সে আদশ্যক্তি দেবীই হোন বা আর যে কেউ হোক, নিয়ম হল লোজন গিয়ে তাকে ধরাধরি করে তুলবে। গোয়ালঘরের চেঁচামেচি শুনে তাই সবাই দৌড়ে গেল।

    গিয়ে দেখে, গোয়ালঘরের এক কোণে যেখানে মনোজের কাকা বৈজ্ঞানিক এবং ব্যায়ামবীর হারাধন গোবর গ্যাস তৈরি করার জন্য বিশাল এক গর্তে গোবরের তাল জমিয়ে রেখে পচাচ্ছিল সেখানে আদ্যাশক্তিদেবীর অর্ধেক ডুবে আছে। তিনি নিঃশব্দে চেঁচাচ্ছেন। অর্থাৎ তাঁর মুখ নড়ছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।

    রাখোবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, “এ নিশ্চয়ই হারিকেনের কাজ।”

    বুড়ি ঝি কিরমিরিয়ার অভ্যাস হল, বাড়িতে কোনওরকম ঘটনা ঘটলেই সে বিলাপ করে কাঁদতে বসবে। রাখোবাবু যদি মনোজকে বকেন তো কিরমিরিয়া কাঁদতে বসে। পুতুলের ড্রইং-এর খাতা হারালেও কারও কিছু নয়, কিরমিরিয়া বিলাপ করতে বসল–ও বাবাগো, খখাঁকির খাতাটা কোথায় গেল গো? খোঁকির এখন কী হবে গো! ইস্কুলের দিদিমণি এখন খোঁকিকে বকবে গো! সারাদিন তার বিলাপের জ্বালায় সবাই অস্থির। এখন বাড়িতে যাই ঘটুক, কিরমিরিয়াকে কেউ কিছু খবর দেয় না।

    প্রায় দুদিন কিরমিরিয়া বিলাপ করেনি। বিলাপ না করলে তার পেট ফেঁপে যায়, খিদে নষ্ট হয়ে মুখে অরুচি হয়। রোগাও হয়ে যায় সে। দুদিন বাদে আজ জবর ঘটনা দেখে কিরমিরিয়া গিয়ে গোবরে অর্ধেক ডুবে-থাকা আদ্যাশক্তি দেবীর মুখের সামনে উবু হয়ে বসে মনের সুখে কেঁদেকেটে বিলাপ করতে লাগল, “ও ঠাকুরঝি গো, এত জায়গা থাকতে তুমি কেন গোবরে গিয়ে পড়লে গো! উঠোনে পড়লে না, পুকুরে পড়লে না, ছাদ থেকে পড়লে, গোবরে গিয়ে পড়লে গো! এখন তোমারই বা কী হবে, গোবরেই বা কী হবে গো?”

    খবর পেয়ে পাড়ার লোকজনও সব এসে জুটেছে। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে শ্রুতিধর ঘোষ। শ্রুতিবাবুর এক অভ্যাস, কিছু দেখলে বা শুনলে তাঁর আর-একটা কিছু মনে পড়ে যায়। কিন্তু ঠিক মনে পড়ে বলেও বলা যায় না। কী যেন একটা মনে আসি-আসি করে, কিন্তু আসে না। যেমন একবার দুঃখবাবুর পেটের ব্যথা হওয়ায় তিনি এসে বললেন, “পেটের ব্যথার তিনটে খুব ভাল ওষুধ আমি জানি।”

    “কী বলুন তো!” দুঃখবাবু খুব উৎসাহের সঙ্গে বলেন।

    তখন অনেকক্ষণ চিন্তা করে শুতিবাবু বললেন, “একটা হল গিয়ে ইয়ে, মানে ওই আর কী!”

    রাখোবাবু পাশেই ছিলেন, বললেন, “আর দুটো?”

    শুতিবাবু আবার চিন্তা করে বললেন, “আর একটা যেন কী! আর তৃতীয় ওষুধটার নাম ভুলে গেছি।”

    তবু সবসময়েই শুতিবাবুর কী যেন মনে-পড়ি-পড়ি করে, এই যেন এক্ষুনি মনে পড়ে যাবে, প্রায় এসে গেছে মাথায়।

    সেই শুতিবাবু আদ্যাশক্তির অবস্থা দেখে বললেন, “গোবরে..গোবরে…কী যেন?”

    তার ভাইপো ফচকে ফটিক বলল, “গোবরে পদ্মফুল?”

    “না, না। গোবরে আর একটা কী যেন!”

    “গুবরে পোকা।”

    “দুর ফাজিল।” সুতিবাবু রেগে যান। তারপর রাখোবাবুর দিকে চেয়ে বলেন, “ব্যাপারটা কী হল মশাই? গোবরে পিসিমা কেন?”

    রাখোবাবু খুব ভেবেচিন্তে বলেন, “আমরাও তাই ভেবে মরছি। তবে মনে হয় এটা হারিকেনের কাজ।”

    “হারিকেন!” বলতে গিয়েই শুতিবাবুর আবার কী যেন মনে আসি-আসি করে। ভাবতে ভাবতে বলেন, “হারি,হারি! হারি আপ কী-একটা কথা আছে না? তার মানে বলতে চাইছেন, হারি মানে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পিসিমার এই দশা! এখন প্রশ্ন হল কেন, কেন এই হারি! হারি কেন? তাই না?”

    রাখোবাবু বিরক্ত হয়ে বলেন, “মোটই না। আমাদের বদমাশ গরুটার নাম হারিকেন। হারিকেন হচ্ছে একরকমের সামুদ্রিক ঝড়। ও বাচ্চা ছেলেও জানে। আমাদের গরুটা ঝড়ের মতো দৌড়য়, অঁতোয়, বেড়া ভাঙে, গাছ ওপড়ায় বলে ওর ওই নাম রাখা হয়েছে। মনে হচ্ছে সেই গরুটাই পিসিমাকে গুঁতিয়ে নিয়ে গোবরে ফেলেছে। কিন্তু গরুটা তো বেশ ভাল করে বাঁধা ছিল, একটু বাদে তাকে মাঠে নিয়ে গিয়ে রঘু খোঁটা পুঁতে দিয়ে আসবে কথা ছিল। সেটা ছাড়া পেল কীভাবে?”

    এক গাল হেসে শুতিবাবু বললেন, “ওই হল। হারিকেনের গুঁতোর ভয়ে হারি করতে গিয়ে তাড়াতাড়ি পিসিমা গোবরে পড়েছেন। কিন্তু গোবর নিয়ে কী একটা কথা আছে, কিছুতেই মনে পড়ছে না।”

    এই বলে শুতিবাবু ভাবেন। ফটিক বলে, “যাঁড়ের গোবর।”

    “দূর।“

    “মাথায় গোবর।” ফটিক ফের বলে।

    শ্রুতিবাবু তার দিকে কটমট করে তাকান।

    ফটিক ফচকে হেসে বলে, “পালোয়ান গোবরবাবু?”

    কিরমিরিয়া একটু কান্না থামিয়ে কথাবার্তা শুনে নিয়ে ফের ডুকরে ওঠে, “ও বাবা গো, হারিকেনটাই বা কোথায় গেল গো! সে যে এখনও ভাল করে সকালের জাবনা খায়নি গো! সে যে না খেয়ে খেয়ে ল্যাজে গোবরে হয়ে যাবে গো!”

    “ওই!” শ্রুতিবাবু চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “ওই মনে পড়েছে। ল্যাজে গোবরে! হেঃ হেঃ, এ যে দেখছি পিসিমার একেবারে ল্যাজে গোবরে অবস্থা!”

    আদ্যাশক্তিদেবী বুক সমান গোবরের গর্তের মধ্যে পোঁতা। ঘন গোবরের টালের ভিতর থেকে নিজে নিজে বেরিয়ে আসবেন সে সাধ্য নেই। ঘন মধুর মধ্যে পড়লে মাছি যেমন আটকে যায়, তাঁর অনেকটা সেই দশা। অনেকক্ষণ চেঁচামেচি করায় গলা বসে গেছে, বাক্য বেরোচ্ছে না। তিনি দুহাত বাড়ির সবাইকে বলতে চাইছেন, “ওরে তোরা আমাকে টেনে তোল।”

    কিন্তু সেকথায় কেউ কান দিচ্ছে না।

    দুঃখবাবু আর গণেশবাবু এসে গোয়ালঘরে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। গণেশবাবুর চাঁদরের তলায় গরুর দড়িটা সুকোনো আছে, কিন্তু সেটা বের করতে সাহস হচ্ছে না।

    মনোজ দুঃখবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “মাস্টারমশাই গোবরের ইংরিজি কী?”

    “কাউডাংগ।”

    “আর পিসিমা হল আন্ট, না?”

    “হ্যাঁ।”

    “তা হলে গোবরে পিসিমা কেন, এর ইংরিজি হবে হোয়াই আন্ট ইজ ইন কাউডাংগ, না মাস্টারমশাই?”

    “হুঁ।”

    “ল্যাজে গোবরের ইংরিজি কী হবে মাস্টারমশাই?”

    দুঃখবাবু বলতে পারলেন না। সন্তর্পণে একবার রাখোবাবুর দিকে তাকালেন। রাখোবাবু ভ্রূ কুঁচকে দুঃখবাবুর দিকেই চেয়ে ছিলেন। বললেন, “এরকম ছোটখাটো সব ঘটনার ভিতর দিয়ে শেখালে ছেলেদের শিক্ষা ভাল হয়। ল্যাজে গোবরের ইংরিজিটা ওকে শিখিয়ে দিন দুঃখবাবু।”

    দুঃখবাবু দুঃখের সঙ্গে মাথা চুলকোলেন। বললেন, “টেইল ইন কাউডাংগ। অ্যান্ড কাউডাংগ ইন টেইল।”

  • ডানাওলা মানুষ

    ডানাওলা মানুষ

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    বাংলা আধুনিক ছোটগল্পের জগতে বিনোদ ঘোষাল পরিচিত নাম। লেখালেখির বয়স বেশি নয়, কিন্তু খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পাঠকের কাছে সাদরে গৃহীত হয়েছেন। বিনোদের গল্পের মূল উপজীব্য আলো নয়, অন্ধকার। আনন্দ নয়, আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, অসহায়তা। সেই অর্থে বিনোদ ব্ল্যাক স্টোরি রাইটার। এই সময়ের মানুষের কথা তাঁর কলমে বড় নির্মমভাবে উঠে আসে। তাঁর লেখার সব থেকে বড় গুণ হল পাঠযোগ্যতা। পাঠক তার লেখা একবার পড়তে শুরু করলে ছাড়তে পারবেন না। এই সংকলনের গল্পগুলির মধ্যে রয়েছে আমাদের মতোই খুব সাধারণ মানুষের কথা। অথচ তার আবেদন কলমের মুন্‌শিয়ানায় হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন।

    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বইটি অর্জন করে সর্বভারতীয় সাহিত্য অকাদেমির প্রথম যুবা পুরস্কার।

    ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয় ‘ডানাওলা মানুষে’র প্রথম পত্র ভারতী সংস্করণ। এই সংস্করণের গল্প সংখ্যা পনেরটি, প্রচ্ছদ এঁকেছেন গৌতম দাশ, এবং অলংকরণ করেছেন রাজীব পাল। এই সংস্করণটি ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক পত্র ভারতী, ৩/১ কলেজ রো, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত এবং হেমপ্রভা প্রিন্টিং হাউস, ১/১ বৃন্দাবন মল্লিক লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে মুদ্রিত হয়।

    গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় ‘বাবাকে’।

    এই গ্রন্থে প্রকাশিত গল্পগুলো হল—

    লেখকের কথা

    আমাদের বাড়িতে ড্রেসিং টেবিলে বাবার একান্ত নিজস্ব একটি ড্রয়ার ছিল। তার চাবি থাকত বাবা পইতেয় বাঁধা। মাঝেমধ্যে ওটা খুলে গোপনে কী সব খুটখাট করত। আমার, মা-র, দিদির কারও অধিকার ছিল না সেই ব্যক্তিগত দেরাজে উঁকি দিই। ছোট্টবেলা থেকে আমার ভীষণ কৌতূহল ছিল দেরাজটির ভেতর কী আছে জানার। কিন্তু কোনওদিন সেই সুযোগ মেলেনি। শ্মশানে বাবার শরীর থেকে চাবি সমেত পইতেটা ছিঁড়ে নিয়েছিলাম। ঘাটকাজের দিন রাত্রে হঠাৎ চাবিটার কথা মনে পড়ল। ড্রয়ারটা খুলতে গিয়ে কেমন শিরশির করেছিল আমার গোটা শরীর, মনে হচ্ছিল এই যেন বাবা ধমকে উঠবে। খুললাম ওটা। বাবার গায়ের গন্ধ দেরাজটার ভেতর। হাত বাড়িয়ে একে একে বার করতে থাকলাম কিছু পুরোনো তামার পয়সা, ঠাকুর-দেবতার ছবি, কিছু পুরোনো চাবি যাদের তালা নেই, কয়েকশো টাকা, বাবার নিজের লেখা একটা ডায়েরি আর…আর ক্লিপে আটকানো একগাদা বিভিন্ন মাপের খাতার, ডায়েরির কাগজ।

    যে লেখাগুলো আমি লিখে অপছন্দ হত বলে দলা পাকিয়ে ঘরের এখানে-ওখানে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম—বাবা কখন যে সেগুলোকে আমার আড়ালে তুলে নিয়ে নিজের প্রিয় দেরাজে যত্ন করে রেখে দিত। সেজন্যই কি আমাকে মাঝেমধ্যে বলত, ভালো না লাগলেও ফেলিস না কোনওদিন কাজে লাগবে। কেন জানি না তারপর থেকেই বোধহয় আমি কোনও লেখা পছন্দের না হলেও ফেলি না, কোথাও রেখে দিই। নিজের বইয়ের ভূমিকা লিখতে বসে আচমকা সবার আগে কেন কে জানে এই ঘটনাটাই মনে পড়ল! আর কী লিখব ভূমিকায়?

    ছোট থেকে শখের নাটক (পরে গ্রুপ) আর ছবি আঁকতেই ভালোবাসতাম। আর একটু বয়স বাড়ার পর ছবি আঁকা কমে গিয়ে কবিতা এল। তারা স্রেফ ডায়েরির মধ্যেই থাকত। কোনওদিন সূর্যের আলো দেখেনি। কলেজ পাশ করে বন্ধুরা সব দু-বেলা পাড়ার রিকশা স্ট্যান্ডে রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে বিড়ি টানি আর আড্ডা দিই। আমাদের এক বন্ধুর মা মারা গেল। ক্যান্সার হয়েছিল। খুব সুন্দর দেখতে ছিল কাকিমাকে। হাসপাতাল থেকে যখন বাড়িতে আনা হল তার মৃতদেহ, তাকিয়ে দেখি চেনা যাচ্ছে না। মৃত্যুর পর কাকিমার অমন সুন্দর মুখটা কেমন যেন হয়ে উঠেছে। সহ্য হয়নি আমার দৃশ্যটা। তারপর শ্মশানে গেছি। কাকিমাকে দাহ করে বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু মাথার ভেতর কী যেন একটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কী সব যেন বলার জন্য ভেতর থেকে ঠেলা দিচ্ছে। ক’দিন পর গলগল করে বেরিয়ে গেছিল একটা লেখা। গল্পই। লিখে বেশ হালকা লাগল। পড়েই রইল লেখাটা। তার বেশ কিছু কাল পর আমার এক দাদা স্থানীয় সাহিত্যিকবন্ধু আমাকে নিয়ে গেল এক সাহিত্যসভায়। বলল নিজের কোনও লেখা থাকলে নিয়ে আসবি। পড়বি।

    কোনও লেখা তো নেই। মনে পড়ল ওই লেখাটা। ওটাই নিয়ে গেলাম। পড়লাম। সবার ভালো লাগল। বলল ‘দেশ’ পত্রিকায় পাঠাতে। পাঠিয়ে দিলাম। মাসে কয়েকের মধ্যে ছেপেও গেল সেটা। আমার প্রথম গল্প, ‘একটু জীবনের বর্ণনা’। যেদিন দেশ পত্রিকার চিঠি এসেছিল বাড়িতে, বাবার সে কী আনন্দ! বার বার চিঠিটা খুলে পড়েছিল। হাতে নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর করেছিল। সেই থেকেই শুরু। সেটা দু-হাজার তিন সাল।

    কী লিখতে চাই। কেন লিখি। এই সব প্রশ্ন নিজেকে করলে উত্তর পাই না। ভেতরটা চুপ মেরে থাকে। সারা দেয় না। কাজেই ওসব প্রশ্ন থাক। শুধু এটুকু মনে হয় আসলে আর সব মানুষের মতন আমিও বড় অসহায়। আর সেই অসহায়তাটা বার বার নানাভাবে নিজের কাছে লুকোতে গিয়ে বার বারই ধরা পড়ে যাই। এই কষ্টটাই মাঝেমধ্যে লিখে ফেলি। খুব যে লিখতে পারি তা নয়। চেষ্টা করি।

    কৃতজ্ঞ থাকব সেই সব পাঠকদের কাছে, যারা একবারের জন্য হলেও আমার প্রথম বইটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখলেন, কিংবা চোখ ছোঁওয়ালেন। অথবা এসব কিছুই করলেন না।

    দ্বিতীয় সংস্করণ প্রসঙ্গে

    ডানাওলা মানুষের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের দাযিত্ব নিলেন খুব স্বাভাবিকভাবেই পত্র ভারতীর ত্রিদিবদা। ‘খুব স্বাভাবিকভাবেই’ এই কারণে বললাম, প্রকাশক এবং সুলেখক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় আমার মতো তরুণ লেখকদের উৎসাহ দিতে সবসময় একপা এগিয়ে। সব থেকে বড় কথা একজন তরুণ লেখকের বই প্রকাশ করার আগেও সেই বই নিয়ে তার ভাবনা-চিন্তা এবং যত্ন দেখবার মতো।

    এই বইয়ের নতুন সংস্করণ নিয়েও অনেক আলোচনা পরিকল্পনা তার সঙ্গে সাক্ষাতে এবং টেলিফোনে হয়েছে। কীভাবে বইটিকে আরও সুন্দর এবং আকর্ষণীয় করা যায় সে বিষয়ে তাঁর ভাবনা আবারও আমাকে অবাক করেছে।

    বইটি নতুন চেহারায় প্রকাশিত হল। পাঠকদের ভালো লাগলে কৃতিত্ব অবশ্যই প্রকাশকের।

    কলকাতা বইমেলা ২০১৫
    নবগ্রাম, হুগলি
    বিনোদ ঘোষাল
  • রূপনগরের পিশাচিনী

    রূপনগরের পিশাচিনী

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    ‘রূপনগরের পিশাচিনী’ গ্রন্থটি রচনা করেছেন বিনোদ ঘোষাল; এই গ্রন্থে একটি উপন্যাস ও পাঁচটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্পের বিষয় বস্তু মোটামুটি প্রেম আর যৌনতা বিষয়ক। ‘রূপনগরের পিশাচিনী’র প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০১৯, মাঘ ১৪২৫। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে – “প্রাচীন ভারতবর্ষের সকল গণিকাকে”।

    গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে উপন্যাস ‘রূপনগরের পিশাচিনী’; এটির নামেই গ্রন্থের নাম। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দেব সাহিত্য কুটিরের ১৪২৫ বঙ্গাব্দের ‘শারদীয়া নবকল্লোলে’। ‘রুপনগরের পিশাচিনী’ নাম শুনে মনে হতে পারে রূপনগর নামক কোন নগরের এক পিশাচিনীর কাহিনী এটি; কিন্তু না, এটি একটি ভিন্নধারার উপন্যাস— প্রাপ্তমনস্ক রূপকথা। ‘রূপনগরের পিশাচিনী’তে লেখকের অসাধারণ লেখন শৈলীর প্রকাশ পেয়েছে।

    কলকাতার উপকণ্ঠে গড়ে উঠেছে এক অত্যাধুনিক শহর— কাল্পনিক রূপকথার শহর— রূপনগর। উপন্যাসের শুরুতে এই শহর সম্পর্কে লেখক জানাচ্ছেন— “কলকাতা শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে গড়ে উঠেছে আরেকটি শহর। নাম রূপনগর। রূপে, আভিজাত্যে সে প্রতিদিন গুনে গুনে দশ-বিশ গোল দেয় কলকাতাকে।”

    “প্রাচীন ভারতবর্ষের এক শহরের সেট তৈরি। কী নিখুঁতভাবে গড়া এই নগরী। প্রতিটি বাড়ি যেন পাথর কুঁদে গড়া। অসামান্য সব ভাস্কর্য বাড়িগুলির গায়ে, পথের দুইপাশে। সব ভাস্কর্যই নারী ও পুরুষের মিলনভঙ্গি।”

    সেই রূপনগরে রয়েছ প্রাচীন ভারতবর্ষের আদলে গড়া রূপমঞ্জরী। যার সাথে মিল আছে প্রাচীন ভারতের খাজুরাহোর। এখানে প্রতিভাময়ী গণীকাদের চাকরি দেওয়া হয়, কেননা, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে ‘কামকলা’ যেমন একটা শিল্প ছিল, রূপনগরেও কামকলা তদ্রূপ শিল্প। প্রথমে মনে হতে পারে কলকাতার পাশেই কেন গড়ে উঠল রূপনগর? এরপর মনে পড়বে, কলকাতার ঠিক কাছেই তো রয়েছে সোনাগাছি; সেখানে কাম জীবিকার উপায় মাত্র, সেখানে কামের কোন শৈল্পিক সুষমা নেই। কিন্তু এই রূপনগরের কাম হল একটা খেলা— একটা শিল্প।

    যাকে বলা হল ‘রূপনগরের পিশাচিনী’, যাকে নিয়ে এই কাহিনী সেও একজন গণীকা। তার নাম রূপসা যার আছে এক আশ্চর্য শক্তি যার জন্যে দেশ-দেশান্তর থেকে ছুটে আসে পুরুষের দল। সেই শ্যামবর্ণা রূপসার শরীর ভোগ করে ধর্ষকামী চেতনা শীতল করতে সারাপৃথিবী থেকে ছুটে আসা ধনকুবেরা।

    রূপনগর এমন একটি নগর যেখানে যে যখন খুশি, রাস্তা-ঘাটে, ছাদে যৌনসঙ্গম করতে পারে। তবুও পুরুষেরা কেন তার কাছেই ছুটে আসে?

    রূপসার উপকথায় লেখা আছে তার প্রেম থেকে যৌন ব্যবসায় উঠে আসার কথা; আছে দীপুদার সাথে বটতলাতে প্রথম চুম্বনের ও দীপুদার যৌনাঙ্গ শক্ত হবার কথা। আরও আছে তার দাদা বিলু তার খদ্দের নিয়ে আসার কথা। এই সব উপকথার মধ্যেই একদিন সেই রূপনগরে প্রবেশ ঘটল এক অন্যরকম পুরুষের যার স্পর্শে রূপসার জীবন গেল বদলে। কী ঘটল? কি আশ্চর্য শক্তি ছিল রুপসার? কে সেই পুরুষ?

    এইসব প্রশ্নের জবাব পেতে পড়ে ফেলুন ‘রূপনগরের পিশাচিনী’।

    শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহল থেকে দুরে পালাতে কৌশিক নিজের বন্ধুর দাদার সাহায্যে এসে উঠেছিল উত্তরপাড়ার এক নিরিবিলি সুপ্রাচীন পোড়োবাড়িতে। সেখানে পৌঁছাতেই সে অনুভব করে এক মিষ্টি গন্ধ আর এক নারী অবয়বের। কে সেই নারী? কি ছিল সেই গন্ধে?

    ‘রূপনগরের পিশাচিনী’তে যে সকল গল্প রয়েছে—

  • গোঁসাইবাগানের ভূত

    গোঁসাইবাগানের ভূত

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [bname]

    গোঁসাইবাগানের ভূত


    কিছু ভুতুড়ে কথা

    এই উপন্যাসটি শারদীয় ‘আনন্দমেলা’-য় প্রথম বেরোনোর পরই অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল, রামনামকে ভূতের যদি এতই ভয় তবে ভূতের নিজের নাম কেন নিধিরাম? ভারি শক্ত প্রশ্ন। মাথাটাকে চুলকে আমি তখন বোঝালাম, নামের ‘রাম’ আর ‘রামনাম’ তো এক নয়! নিধিরামের যে রাম, তার সঙ্গে দশরথের বড় ছেলের সম্পর্ক নেই কোনো। তাছাড়া সাপের বিষ কি সাপকে লাগে? তারপর ফের প্রশ্ন উঠল, তাই যদি হবে তবে রাম কবিরাজের নাম শুনে ভূত পালায় কেন? সেও তো নাম। আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, তা বটে। তবে কিনা কবিরাজ মশাইয়ের নামটা একেবারে সোজাসুজি রাম, তার আগে বা পরে কিছু যুক্ত নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, ভূতের মনস্তত্ত্বও বোঝা ভার। কখনো তারা রামনাম শুনে আঁতকে ওঠে, কখনো কোনো কোনো রামকে তারা কেয়ারই করে না। আবার ধরো না কেন, কোনো ভূত যদি ভুল করে বে-খেয়ালে রাম কবিরাজের নাম করেই বসে, তাহলে আমাদের কী করার আছে? ভূতেরও তো ভুল হয়! পুরো ব্যাপারটাই ভারি গণ্ডগোলের। আমি তাই লেখাটা শোধরালাম না। রামনাম আর রামের নাম নিয়ে গণ্ডগোল সহ-ই বইটা ছাপা হল। তোমরা বরং কোনো ভাল ভূত পেলে তার কাছ থেকে সত্যি কথাটা জেনে নিও।

  • উপমহাদেশ

    উপমহাদেশ

    আল মাহমুদ

    [book-name]

    গ্রন্থকথা

    ‘উপমহাদেশ’ কবি আল মাহমুদ রচিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জীবনচিত্রকে আশ্রয় করে লেখা উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা না গেলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা, হিংস্রতা, যুদ্ধের মাঝে প্রেম, দেশপ্রেম সব কিছুরই প্রতিচ্ছবি সত্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন লেখক। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবেই বিবেচিত।

    মুক্তিযুদ্ধের এমন একটি দিক এ উপন্যাসে উঠে এসেছে যেদিকটা নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না। ইতিহাসের প্রধান স্রোতের অনালোচিত এই দিকটি তুলে ধরাই এই উপন্যাসের একমাত্র সার্থকতা।

    কবি হাদী মীর। ঢাকায় পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ান তিনি। ঢাকা যখন পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানিদের দখলে চলে গেছে, চারিদিকে পাকিস্তানিদের অমানবিক অত্যাচার ও লুটপাটের কারণে লোকেরা ঢাকা ছেড়ে প্রথমে গ্রামে এবং গ্রামেও না টিকতে পেরে ভারতে পাড়ি দেন। সেই দলের একজন কবি সাহেব। তিনি তার স্ত্রীর থেকে বিছিন্ন হয়ে তার জন্য বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করে থেকে ভারতে যাবার সিদ্দান্ত নেন। কবির বোন ও ভগ্নিপতি একজন মুক্তি যোদ্ধাকে দিয়ে চিঠি লিখে দিয়ে কবিকে খুব শীঘ্র ভারতে চলে যেতে বলেন। তিনি অন্য এক মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে জানতে পারেন যে কবির স্ত্রী হামিদা নিরাপদে কলকাতায় পৌঁছে গেছে।

    ভৈরব ও আশুগঞ্জে যখন পাক হানাদরেরা এসে অত্যচার শুরু করলে সেখানকার সকলে নবাবপুরে এসে পালিয়ে বাঁচে এবং সেখান থেকেই নৌকায় করে ভারতে যাবার জন্য রওয়া দেয়। এদেরই সাথে কবি আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা আনিস এদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। নৌকায় মোট ৩০জন লোক যেতে পারে কিন্তু সেখানে ৩২ জন্য ওঠার পরেও দুটি মেয়ে সীমা ও নন্দিনী এসে কান্না কাটি শুরু করে। সীমার স্বামী ঢাকায় গিয়ে আর ফিরতে পারে নি। সীমা একটা স্কুলের শিক্ষিকা। হিন্দুদের বাড়ীতে থাকাটা এখন খুব কঠিন হয়ে যাওয়াতে স্বামীর ফেরার অপেক্ষা না করে বোন নন্দিনীকে নিয়ে সে পথে বের হয়েছে। দুই বোন এসে অনেক কান্না কাটি করার পর কবি জোর করে আনিসকে বলে তাদেরও নৌকায় তুলে নেয়।

    কিছু দূর যাবার পর গুলির শব্দ শুনে সবাই খুব ভয় পেয়ে যায়। পাকিস্তান টহলদারের তাদের নৌকাটা অন্ধকারে দেখতে না পারলেও অনুমান করতে পেরেছে। অনেক সাবধানে তারা একটা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়িয়ে উপরে উঠলে চারিদিক থেকে কিছু লোক তাদের ঘিরে ধরে। সবার হাতে অস্ত্র থাকলেও তারা মুক্তি বাহিনীর লোক নয়। নকশাল বাহিনীর লোক। অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা সাথে আছে জানলে বিপদ হতে পারে ভেবে আনিস পানিতে ডুব দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। নন্দিনীকে স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে এবং কাছাকাছি কোন গ্রামে কবির পরিচিত আত্মীয়ের কথা বলে তাদের হাত থেকে বেঁচে যায় তারা।

    অন্ধকারের মাঝে লাইন ধরে একজন আর একজনের কাপড় ধরে পথ চলতে চলতে সকলে একটা মাঠের কাছে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এখানে এসে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যায়।

    সাথে যে কয়জন মহিলা ছিল তার সবাই নিম্ন শ্রেণীর কৃষক পরিবারে। এর মাঝে সীমা ও নন্দিনী সম্ভ্রান্ত পরিবারের,  তার উপর দেখতে সুন্দরী। রাজাকারদের সাথে কবির তর্কাতর্কির ফলে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কবি, সীমা ও নন্দিনীকে আটকে রাখে। সীমা ও নন্দিনীর পরনের শাড়ী খুলে কবিকে খুব শক্ত করে বেঁধে নির্জন গ্রামের একটি বাড়ীর ঘরে আটকে রাখে তাদের। কবির পাশের ঘরে সীমা ও নন্দিনীকে।

    কবিকে অনেক শারীরিক অত্যচার সহ্য করতে হয় ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ করে কবির কানে ভেসে আসে কোন নারীর আর্ত চিৎকার ও গোংরানি। এটা কি সীমা ও নন্দিনীর রাজাকারদের হাত থেকে সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ না কি কবির স্বপ্ন…?

    মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে অনেক উপন্যাস, সেগুলোর প্রতিটি নিজস্ব স্বকীয়তা উদ্ভাসিত। বিষয়বস্তু এক হলেও অনুভূতি সবসময় নতুন। লেখকের বর্ণনাতে চোখের সামনে চলে এসেছে সেই সময়টা। তবে লেখক ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলের আর্দশ ও উদ্দেশ্যকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে সেই সময় তাদের অবস্থা ও সরকার পক্ষের সাথে তাদের সম্পর্কটাও।

    আরও একটা নাড়া দেবার মত একটা বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন, সেই সময়ের ভারতীয় কবি সাহিত্যিকদের মানসিক অবস্থা ও আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ ও সহযোগিতা।

    পাঠক উপন্যাসটিকে প্রশংসা যেমন করেছেন তেমনি নিন্দাও করেছেন কেউ কেউ—কৃত্রিম সংলাপ, এলোমেলো বাক্য বিন্যাস, উদ্ভট ও অন্তঃসারশূন্য কাহিনী, সর্বোপরি কাঁচা হাতে জোরপূর্বক লেখা। কারও মতে ‘বাস্তবতা বহির্ভূত একেকটা ঘটনার অবতারণা’! মাত্র কয়েকদিন আগে রাজাকারদের হাতে সারারাত ধরে নির্যাতিতা নন্দিনী কী করে হাদী মীর বা তার পরিবারের সাথে এতো স্বচ্ছন্দ মেলামেশা করে অথবা হাদী মীরের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কী করে তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে এত আগ্রহী হয় ‘একজন বীরাঙ্গানা’? যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন বা যারা নীলিমা ইব্রাহিমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বা শাহীন আখতারের “তালাশ” পড়েছেন, তাদের কাছে ‘উপমহাদেশে’র কাহিনী উদ্ভট এবং বাস্তবতা বহির্ভূত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

    অপরদিকে হাদী মীর এমন একজন দুর্বল চরিত্রের মানুষ, বোন-দুলাভাইয়ের বাসায় একটা বিবাহিত মানুষ পরনারীকে নিয়ে তাদের সামনে শুয়ে থাকছে! আদব লেহাজ বলে যদি এদের কিছু থাকে! যুদ্ধের দোহাই দিয়ে কত কিছুই না দেখালেন এই বইতে আল মাহমুদ! আর শেষটায় তো দুই নারীকে নিয়ে হাদী মীরের সংসারকেও জায়েজ করে দিলেন ধর্মের দোহাই দিয়ে। হামিদা নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে যতটা না সম্মান আদায় করে নিয়েছিল, শেষটায় এসে ওর এই ব্যাপারটা একদমই ভাল লাগল না। বইয়ের সমাপ্তির প্রয়োজনে কত কীই না করেছেন লেখক!

    সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা কবি আল মাহমুদ, যুদ্ধের সময় কলিকাতাতে তাঁর কবিতা চর্চা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এমন সমালোচনা একেবারে অমূলক নয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি বর্তমান থাকলেও যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। এর প্রমাণ রয়েছে ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসের পরতে পরতে।

    গল্পে যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে লেখক ব্যর্থ, হয়ত সেই চেষ্টাও করেননি তিনি! বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে অদ্ভুত, অবাস্তব, যুক্তিহীন এক প্রেমকাহিনী। পাশাপাশি লম্বা লম্বা অসংলগ্ন সংলাপ অপ্রাসঙ্গিক লেগেছে অনেকাংশেই। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী নেতাকর্মীদের অবদানের যে চিত্র আল মাহমুদ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন সেটাও ফিকে হয়ে গেছে প্রেমকাহিনীকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে!

    ‘উপমহাদেশ’ থেকে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি—

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে নীতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু স্বতন্ত্র দলের অংশগ্রহণের কথা আমরা জানি। বামপন্থী এরকম একটি দলের (সম্ভবত কাল্পনিক) কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছে এই বইতে। ভারতের নকশাল পন্থীদের সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে তাদের কিছু অপারেশনেরও কথা বইতে এসেছে। বিষয়টি একেবারে অনৈতিহাসিক।

    বইয়ের শুরুতেই একটা জায়গায় দেখা যায় জিঘাংসা বশত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা একজন রাজাকারের কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করছে। এটা আসলে সম্ভব ছিল? অথবা এমন ঘটনার কল্পনা করে তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারদের একই সারীতে দাঁড় করালেন?

    উপন্যাসের শেষের দিকে এসে— নন্দিনী যে ক্যাম্পে ট্রেইনিং নিতে যায় ওখানেও দেখা যায় ‘মেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মানেই পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের দেহ দান করলেই কর্তব্য শেষ’ এইরকম একটা অনাচার। এই ব্যাপারগুলো কতটুকু সত্যি বলে বিশ্বাস করা যায়? এই ঘটনার কথা ইতিপূর্বে কেউ বলেছেন বা লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে এমন ঘটনার উল্লেখ আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে আল মাহমুদ যে খানিকটা “Devil’s Advocacy” করেছেন এদিক থেকে ব্যাপারটা ভালই লেগেছে।

    এখানে লক্ষ্য করার মত আরেকটা ব্যাপার হল, ইমাম আর পারুলের পরিবারের অবস্থা—যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয় নিয়েও দেখা যায় সরকারের বড় পদে চাকরী করার দরুন রাজার হালে দিনাতিপাত করছেন—তাদের টেবিলে রুটি-মাখন, মুরগী, কলের বিশুদ্ধ পানি এবং তাদের মেয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে। এই ব্যাপারটা বেশ চোখে লাগে। তবে এই পরিবারটিতে সম্ভবত সেই পরিবারের ছায়া পড়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আল মাহমুদ যে পরিবারে আশ্রয় পেয়ে বাবুগিরি করে কলকাতায় সময় কাটিয়েছিলেন—

    আল মাহমুদ মূলত একজন কবি। কবি হলেও কথাসাহিত্যে পারদর্শীতা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। তবে যতগুলো পড়েছি এই বইটা ভিন্ন মনে হয়েছে। একটা যুদ্ধ ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কে কতখানি প্রভাব ফেলে তা বোঝাতে চেয়েছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং তাদের সংঘাতের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা বোধকরি খুব কম ঔপন্যাসিকই লিখেছেন। তবে যে জিনিসটা অন্য কোথাও পাইনি তা হ’ল মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক প্রতিশোধ স্বরূপ রাজাকার পরিবারের উপর পাশবিক অত্যাচার। এমন ঘটনা যুদ্ধের সময় ঘটেছিল কিনা জানা নেই।

    সৈয়দ হাদী মীরকে খুবই দূর্বল চিত্তের মানুষ মনে হয়েছে, যখন তিনি দুইটি নারীর দিকেই ঝুঁকেছেন তবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের বেলায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। হামিদা বানু ও নন্দিনী ভট্টাচার্য দুইজনই স্বাধীনচেতা নারী হলেও স্বভাবে বৈপরীত্য রয়েছে। কবির ভগ্নিপতি ও ভগ্নি— তৌফিক ইমাম ও পারুলের আরাম আয়েশের জীবন যুদ্ধকালীন কলকাতায় অবস্থানরত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জীবনযাপনের চিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

    ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে “মিলন ইসলাম”কে।

    এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখকের বক্তব্য হুবহু তুলে দিচ্ছি— “এ বইয়ের সকল চরিত্রই কাল্পনিক। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন কবি সাহিত্যিক, আমলা, বুদ্ধিজীবীর নাম উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে কেবল মুক্তিযুদ্ধে তাদের সম্পৃক্ততাকে সম্মানিত করতে। তারা সর্বস্ব ত্যাগ করে এই সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন বলেই। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের কাহিনীর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। উপন্যাস তো উপন্যাসই। —লেখক।

    আমরাও কবি আল মাহমুদের ‘উপন্যাস তো উপন্যাসই’ কথাটাকে গুরুত্ব দিয়ে মেনে নিচ্ছে, ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসই, এতে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা বা ইতিহাসের ছিঁটেফোটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন নেই।

  • মিসির আলি অমনিবাস

    মিসির আলি অমনিবাস

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    সমকালীন কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন, এখনও আছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। গ্রন্থজগতের পরিসংখ্যান বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করছে। এই কথাশিল্পীর সৃজনশীলতার ক্ষমতা ইতোমধ্যেই প্রায় কিংবদন্তীতুল্য।

    কিশোর থেকে বৃদ্ধ, স্বল্পশিক্ষিত থেকে বুদ্ধিজীবী পণ্ডিত—সকলেই তাঁর উপন্যাসের আগ্রহী পাঠক, অথবা টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর কাহিনীর নাট্যরূপায়ণের বিমুগ্ধ দর্শক। কোন ক্ষমতায় এভাবে সকলকে কাছে টানেন হুমায়ূন আহমেদ? চিত্রল গতিময় সহজ ভাষাবিন্যাস। অভাবনীয় ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ঘটানোর মনোহারী কৌশল। কল্পনা হার মেনে যায় এমন অকল্পনীয় বিদ্যুন্নিভ সংলাপ। এবং তাঁর কাহিনীতে ছড়ানো জীবন কখনোই আমাদের চেনা মধ্যবিত্ত সমাজসত্যের বাইরে ছোটাছুটি করে না। মধ্যবিত্ত-জীবনের আশা-নিরাশা, অনিশ্চিতি এবং দোলাচলপ্রবণ মূল্যবোধ, তার সামান্য লাভ ও সামান্য ক্ষতির বন্ধনে আততিময় অস্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদের যে-কোন উপন্যাস ধারণ করে আছে তাঁর সৃজনীসত্তার মনন-কল্পনার এ-সকল উপাদান। সাধারণ মানুষের কাতর জীবন চূর্ণকণায় ছড়িয়ে থাকে তাঁর লেখায়।

    যখন প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ বেরোয়, তখন প্রথিতযশা অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছিলেন, “হুমায়ূন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবনরসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব।” এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের। তারপর ক্রমাগত পথচলার প্রবাহে একের পর এক সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়ে চলেছেন এ-দেশের পাঠকসমাজকে। পণ্ডিত সমালোচক ও হৃদয়বান গল্পপ্রেমিক উভয়েরই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করে চলেছেন।

    একই সঙ্গে অতিপ্রজ অথচ শিল্পরুচিময় লেখক তাঁর মতো আর কেউ এই মুহূর্তে আছেন কিনা সন্দেহ। প্রতি বৎসর অব্যাহত গতিতে তাঁর ফসলের ডালা ভরে উঠছে।

    হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জ গ্রামে, ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর তারিখে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে গবেষণা করে ১৯৮২ সালে পি-এইচ. ডি. ডিগ্রী অর্জন করেছেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নশাস্ত্রে অধ্যাপনারত। লেখক-জীবনে সাফল্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সে, ১৯৮১ সালে, ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ প্রাপ্তির মাধ্যমে। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন শিশু একাডেমী ও লেখক শিবির পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার।

    ২০১১ সালের সেপ্টেম্বের মাসে তার মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯শে জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

    সিরিজ পরিচয়

    ‘মিসির আলি’, বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় চরিত্র। মিসির আলি কাহিনীগুলো রহস্যমাত্রিক। মিসির আলির কাহিনীগ‌ুলো ঠিক গোয়েন্দা কাহিনী নয়, কিংবা ‘ক্রাইম ফিকশন’ বা ‘থ্রিলার’-এর মতো খুনি-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং যুক্তিনির্ভর কাহিনীর বুনটে বাঁধা। অনেক ক্ষেত্রে একে রহস্যগল্প বলা চলে। চারিত্রিক দিক দিয়ে মিসির আলি চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি হিমু চরিত্রটির পুরোপুরি বিপরীত। তরুণ হিমু চলে প্রতি-যুক্তির (anti-logic) তাড়নায়, অপরপক্ষে বয়োজ্যেষ্ঠ মিসির আলি অনুসরণ করেন বিশ‌ুদ্ধ যুক্তি (pure-logic)। এই যুক্তিই মিসির আলিকে রহস্যময় জগতের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনে সাহায্য করে। সেসব কাহিনীর প্রতিফলন ঘটেছে মিসির আলি সম্পর্কিত প্রতিটি উপন্যাসে।1

    চরিত্র রূপায়ণ

    ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণের সময়ে নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে স্ত্রীর সাথে গাড়িতে ভ্রমণের সময় মিসির আলি চরিত্রটির ধারণা মাথায় আসে।2 এই ঘটনার অনেকদিন পরে তিনি মিসির আলি চরিত্রের প্রথম উপন্যাস ‘দেবী’ রচনা করেন।3

    চরিত্রের স্বরূপ

    উপন্যাসের কাহিনী অনুসারে মিসির আলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান” (Abnormal Psychology) বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক4 (খণ্ডকালীন)5। শুধুমাত্র একজন শিক্ষক হিসেবেই নন, তার অনুসারীদের কাছেও তিনি বেশ মর্যাদাবান একজন চরিত্র হিসেবে উল্লিখিত। সেজন্য উপন্যাস বা বড় গল্পে, মিসির আলিকে বোঝাতে লেখক ‘তার’ লেখার পরিবর্তে সম্মানসূচক ‘তাঁর’ শব্দটির ব্যবহার করে থাকেন।

    মিসির আলির বয়স ৪০-৫০-এর মধ্যে। তার মুখ লম্বাটে। সেই লম্বাটে মুখে এলোমেলো দাড়ি, লম্বা উসকো-খুসকো কাঁচা-পাকা চুল। প্রথম দেখায় তাকে ভবঘুরে বলে মনে হতে পারে; কিছুটা আত্মভোলা। তার হাসি খুব সুন্দর, শিশুসুলভ। মিসির আলির স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।6

    তিনি মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন এবং নানাবিধ রহস্যময় ঘটনা নিয়ে অসীম আগ্রহ রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের নিজের ভাষ্যে7:

    “মিসির আলি এমন একজন মানুষ, যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে। যে পৃথিবীতে চোখ খুলেই কেউ দেখে না, সেখানে চোখ বন্ধ করে দেখার এক আশ্চর্য ফলবতী চেষ্টা।”

    চরিত্রটির পরিচিতি দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলছেন:8

    “মিসির আলি একজন মানুষ, যাঁর কাছে প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলা বড় কথা, রহস্যময়তার অস্পষ্ট জগৎ যিনি স্বীকার করেন না।”

    মিসির আলি চরিত্রে হুমায়ূন আহমেদ, পরস্পর বিপরীতধর্মী দুটি বৈশিষ্ট্য ‘যুক্তি’ এবং ‘আবেগ’কে স্থান দিয়েছেন।9

    মিসির আলি একজন ধূমপায়ী। তিনি ‘ফিফটি ফাইভ’ ব্র্যান্ডের সিগারেট খান। তবে তিনি প্রায়ই সিগারেট ছেড়ে দেবার চেষ্টা করেন। তার শরীর বেশ রোগাটে আর রোগাক্রান্ত। নানারকম রোগে তার শরীর জর্জরিত: লিভার বা যকৃৎ প্রায় পুরোটাই অকেজো, অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে, রক্তের উপাদানে গড়বড়, হৃৎপিণ্ড ড্রপ বিট দেয়।10 এজন্য কঠিন এসব রোগের পাশাপাশি সাধারণ যেকোনো রোগই তাকে বেশ কাহিল করে ফেলে। ফলে প্রায়ই অসম্ভব রোগাক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে থাকতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।

    মিসির আলি যুক্তিনির্ভর একজন মানুষ বলেই অনেক সাহসী। ভূতাশ্রিত স্থানেও রাত কাটাতে তিনি পিছপা হোন না, বরং এজন্য থাকেন যে, তাতে তিনি রহস্যময়তার ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারবেন। মিসির আলির অনেকগ‌ুলো পারঙ্গমতার মধ্যে অন্যতম হলো তিনি যে কাউকে, বিশেষ করে ঠিকানাওয়ালা মানুষকে, খুব সহজে অজানা স্থানেও খুঁজে বের করতে পারেন। এজন্য তিনি টেলিফোন ডিরেক্টরি, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, টিভি-বেতার-এর লাইসেন্স নম্বর11, পুলিশ কেস রিপোর্ট, হাসপাতালের মর্গের সুরতহাল (পোস্টমোর্টেম) রিপোর্ট12 ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। মিসির আলি প্রকৃতির বিস্ময়ে বিস্মিত হলেও প্রচণ্ড যুক্তির বলে বিশ্বাস করেন প্রকৃতিতে রহস্য বলে কিছু নেই।13 মিসির আলি ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে একজন নাস্তিক। মিসির আলি সিরিজের প্রথম উপন্যাস “দেবী”-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে তিনি নিজেকে নাস্তিক বলে অভিহিত করেছেন। তবে কিছু জায়গায় তাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী অর্থাৎ একজন আস্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।14

    মিসির আলি মূলত নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, মোটামুটি সব উপন্যাসে তাকে এভাবেই রূপায়িত করা হয়। কিন্তু “অন্য ভুবন” উপন্যাসে মিসির আলি বিয়ে করে ফেলেন বলে উল্লেখ আছে। তিনি বিয়ে করেন নীলুফারকে, যার প্রথম আবির্ভাব ঘটে দেবী উপন্যাসে। পরবর্তীতে “নিশীথিনী” উপন্যাসে লেখক মিসির আলির প্রতি নীলুফারের আবেগ দেখিয়েছেন। পরের অনেক উপন্যাসে এই সাময়িক আবেগ দেখা গেলেও মিসির আলি সব আবেগ, ভালোবাসার ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থাপন করেছেন।‌ তাই পরবর্তী উপন্যাসগুলিতে আবার তাকে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এপ্রসঙ্গে লেখক নিজেই স্বীকার করেন যে, “এটি বড় ধরনের ভুল” ছিল। মিসির আলির মতো চরিত্র বিবাহিত পুরুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেই ভুল শোধরে পরবর্তী উপন্যাসগুলোতে আবার মিসির আলিকে নিঃসঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করেন লেখক। ফলে মিসির আলি চরিত্রটি যা দাঁড়ায়: মিসির আলি ভালবাসার গভীর সমুদ্র হৃদয়ে লালন করেন, কিন্তু সেই ভালবাসাকে ছড়িয়ে দেবার মত কাউকেই কখনও কাছে পান না। ভালবাসার একাকিত্বে জর্জরিত মিসির আলির নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে বিভিন্ন সময় কিশোরবয়সী কাজের লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন: “আমি এবং আমরা” উপন্যাসে “বদু” নামের একটি, ১৫-১৬ বছরের কাজের ছেলের উল্লেখ রয়েছে। “দেবী” ও “নিশীথিনী” গল্পে হানিফা নামে একটা কাজের মেয়ে ছিল। এরকম কাজের লোককে মিসির আলি লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেন। আবার “অন্য ভূবন” উপন্যাসে “রেবা” নামের একটি কাজের মেয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

    মিসির আলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত সারমর্ম করতে হুমায়ূন আহমেদই লিখেন: মিসির আলি নিঃসঙ্গ, হৃদয়বান, তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী।15 কাহিনী অনুসারে তিনি অকৃতদার। চরিত্রটি লেখকেরও, প্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।

    মিসির আলি চরিত্রটি এতটাই পাঠক জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, অনেকেই তাকে রক্তমাংসের মানুষ ভাবতে শুরু করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই জিজ্ঞাসিত হন যে, মিসির আলি কি কোনো বাস্তব চরিত্রকে দেখে লেখা কিনা। এর নেতিবাচক উত্তর পেয়ে অনেকেই আবার মিসির আলি চরিত্রটির মধ্যে লেখকেরই ছায়া খুঁজে পান। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদই উত্তর করেন:16

    “না, মিসির আলিকে আমি দেখিনি। অনেকে মনে করেন লেখক নিজেই হয়তো মিসির আলি। তাঁদেরকে বিনীতভাবে জানাচ্ছি— আমি মিসির আলি নই। আমি যুক্তির প্রাসাদ তৈরি করতে পারি না এবং আমি কখনও মিসির আলির মতো মনে করি না প্রকৃতিতে কোনো রহস্য নেই। আমার কাছে সব সময় প্রকৃতিকে অসীম রহস্যময় বলে মনে হয়”

    কিন্তু এই অভয়বাণী সত্ত্বেও নলিনী বাবু B.Sc উপন্যাসে লেখককেই মিসির আলির ভূমিকায় দেখা যায়, এবং তিনি যে মিসির আলি থেকে আলাদা কিন্তু তার স্রষ্টা তার স্পষ্ট উল্লেখ করেন:

    “আমি (লেখক) এই ভেবে আনন্দ পেলাম যে, সালেহ চৌধুরী (লেখকের সফরসঙ্গী) মিসির আলিকে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে দেখছেন না। অতি বুদ্ধিমান মানুষও মাঝে মাঝে বাস্তব-অবাস্তব সীমারেখা মনে রাখতে পারেন না।17

    গণমাধ্যমে মিসির আলি

    বাংলাদেশ টেলিভিশন

    ১৯৮৭ সালে ছোটপর্দায় মিসির আলীর প্রথম আবির্ভাব। তখন হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস দেবীর বয়স হয়েছিল মাত্র দুই বছর। জনপ্রিয় চরিত্রটির ভূমিকায় আবুল হায়াত প্রথম অভিনয় করেন। অন্য ভুবনের সে এবং পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে অন্য ভুবনের ছেলেটা, মোট দুটি নাটকের মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া, প্রয়াত অভিনেতা আবুল খায়ের একবার এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

    বেসরকারি টেলিভিশন

    বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগ‌ুলোর মধ্যে, এনটিভিতে মিসির আলিকে নিয়ে অনিমেষ আইচ তিনটি নাটক নির্মাণ করেন। “বৃহন্নলা” উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে নির্মিত প্রথম নাটকে মিসির আলির ভূমিকায় শতাব্দী ওয়াদুদ অভিনয় করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে একই নির্মাতার পরবর্তী নাটক নিষাদ এ মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেন আশীষ খন্দকার। মিসির আলীকে নিয়ে লেখা ছোটগল্প স্বপ্ন সঙ্গিনী অবলম্বনে অনিমেষ আইচের তৃতীয় নাটকে হুমায়ুন ফরিদী অভিনয় করেন। নির্মাতা রেদোয়ান রনির নাটকেও একবার মিসির আলী চরিত্রের দেখা মিলেছিল।

    বাংলা চলচ্চিত্রে

    ২০১৮ সালে মিসির আলিকে প্রথম বড় পর্দায় আনেন অনম বিশ্বাস তার দেবী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এটি হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলিকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস দেবী অবলম্বনে নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটিতে চঞ্চল চৌধুরী মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করেন।

    প্রকাশনা

    মিসির আলি সংক্রান্ত উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রথম পর্যায়ে আলাদা আলাদা বই আকারে বের হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা চরিত্রটির পাঠক সমাদর বিবেচনা করে তা সংকলিত আকারেও প্রকাশ করে। এরকম সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতীক প্রকাশনা সংস্থার “মিসির আলি অমনিবাস” নাম তিন খণ্ডে মিসির আলির সকল উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করে। এছাড়াও মিসির আলির সমস্ত উপন্যাস নিয়ে (মিসির আলি UNSOLVED, “মিসির আলি আপনি কোথায়?”, “পুফি” এবং “যখন নামিবে আঁধার” ব্যতীত) অনন্যা প্রকাশনা সংস্থা মিসির আলি সমগ্র নামে একটি বই প্রকাশ করে। বইটি ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয়। কলকাতার কাকলি প্রকাশনী দুই খণ্ডে সম্প্রতি মিসির আলি সমগ্র প্রকাশ করেছে।

    মিসির আলি অমনিবাস

    ক্রম

    শিরোনাম প্রথম প্রকাশ

    প্রকাশক

    দেবী জুন ১৯৮৫

    অবসর প্রকাশনা, ঢাকা

    নিশীথিনী ১৯৮৮

    প্রতীক প্রকাশনী

    নিষাদ ১৯৮৯

    প্রতীক প্রকাশনী

    অন্যভুবন ১৯৮৭

    অনন্যা প্রকাশন

    বৃহন্নলা আগস্ট ১৯৮৯

    প্রতীক প্রকাশনী

    ভয় (গল্পগ্রন্থ) মে ১৯৯১

    আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা

    বিপদ ১৯৯১

    শিখা প্রকাশনী, ঢাকা

    অনীশ মে ১৯৯২

    অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা

    মিসির আলি অমনিবাস-১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১০

    মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

    সময় প্রকাশন, ঢাকা

    ১১

    আমি এবং আমরা ১৯৯৩

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১২

    হিমুর দ্বিতীয় প্রহর18 ১৯৯৭

    কাকলী প্রকাশনী

    ১৩

    তন্দ্রাবিলাস ২০০৯

    অন্বেষা প্রকাশন

    ১৪

    আমিই মিসির আলি ফেব্রুয়ারি ২০০০

    অন্যপ্রকাশ, ঢাকা

    ১৫

    বাঘবন্দী মিসির আলি জুন ২০০১

    অনন্যা

    ১৬

    কহেন কবি কালিদাস ২০০৫

    দিব্যপ্রকাশ

    ১৭

    মিসির আলি অমনিবাস-২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১৮

    হরতন ইশকাপন ২০০৮

    ১৯

    মিসির আলির চশমা ফেব্রুয়ারি ২০০৮

    অন্যপ্রকাশ, ঢাকা

    ২০

    মিসির আলি!আপনি কোথায়? ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    সময় প্রকাশন, ঢাকা

    ২১

    মিসির আলি UNSOLVED জুলাই ২০০৯

    কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা

    ২২

    হিমু মিসির আলি যুগলবন্দি ২০১১

    আফসার ব্রাদার্স ঢাকা

    ২৩

    পুফি ২০১১

    অনন্যা

    ২৪

    যখন নামিবে আঁধার ২০১২

    অন্যপ্রকাশ

    ২৫

    মিসির আলী অমনিবাস-৩ ২০১৩

    প্রতীক প্রকাশনী

  • দেবী

    দেবী

    মাঝরাতের দিকে রানুর ঘুম ভেঙে গেল।

    তার মনে হল ছাদে কে যেন হাঁটছে। সাধারণ মানুষের হাঁটা নয়, পা টেনে-টেনে হাঁটা। সে ভয়ার্ত গলায় ডাকল, ‘এই, এই।’ আনিসের ঘুম ভাঙল না। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অল্প-অল্প বাতাস। বাতাসে জামগাছের পাতায় অদ্ভুত এক রকমের শব্দ উঠছে। রানু আবার ডাকল, ‘এই, একটু ওঠ না। এই।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘কে যেন ছাদে হাঁটছে।’

    ‘কী যে বল! কে আবার ছাদে হাঁটবে? ঘুমাও তো।’

    ‘প্লীজ, একটু উঠে বস। আমার বড় ভয় লাগছে।’

    আনিস উঠে বসল। প্রবল বর্ষণ শুরু হল এই সময়। ঝমঝম করে বৃষ্টি।  জানালার পর্দা বাতাসে পতপত করে উড়তে লাগল। রানু হঠাৎ দেখল, জানালার শিক ধরে খালিগায়ে একটি রোগামতো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির দু’টি হাতই অসম্ভব লম্বা। রানু ফিসফিস করে বলল, ‘ওখানে কে?’

    ‘কোথায় কে?’

    ‘ঐ যে জানালায়।’

    ‘আহ্, কী যে ঝামেলা কর! নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে।’

    ‘একটু বাতিটা জ্বালাও না।’

    ‘রানু, তুমি ঘুমোও তো।’

    আনিস শোবার উপক্রম করতেই ছাদে বেশ কয়েক বার থপথপ শব্দ হল। যেন কেউ-একজন ছাদে লাফাচ্ছে।

    রানু চমকে উঠে বলল, ‘কিসের শব্দ হচ্ছে?’

    ‘বানর। এ জায়গায় বানর আছে। কালই তো দেখলে ছাদে লাফালাফি করছিল।‘

    ‘আমার বড় ভয় করছে। একটু উঠে গিয়ে বাতি জ্বালাও না। পায়ে পড়ি তোমার।’

    আনিস বাতি জ্বালাল। ঘড়িতে বাজে দেড়টা। ছাদে আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবু রানুর ভয় কমল না। সে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল। আনিস বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এ-রকম করছ কেন?’

    ‘কেন জানি অন্য রকম লাগছে আমার। একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।’

    ‘কী স্বপ্ন?’

    ‘দেখলাম আমি যেন …’

    কথার মাঝখানে হঠাৎ রানু থেমে গেল। কে যেন হাসছে। ভারি গলায় হাসছে। রানু কাঁপা স্বরে বলল, ‘হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছ? কে যেন হাসছে।’

    ‘কে আবার হাসবে! বানরের শব্দ। কিংবা কেউ হয়তো জেগে উঠেছে দোতলায়।’ আনিস লক্ষ করল, রানু খুব ঘামছে। চোখ-মুখ রক্তশূন্য। বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। দেশলাই জ্বালাতে-জ্বালাতে বলল, ‘কী স্বপ্ন দেখছিলে?’

    ‘দিনের বেলা বলব।’

    ‘কী যে সব কুসংস্কার তোমাদের। এখনো ভয় লাগছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘ভয়টা কিসের? চোর-ডাকাতের, না ভূতের?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘ঠিক আছে, বাতি জ্বালানোই থাক। বাতি জ্বালিয়েই ঘুমাব আজকে। এখন বল দেখি, কী স্বপ্ন দেখলে।’

    ‘দিনের বেলা বলব।’

    ‘আহ্, বল না! বললেই ভয় কেটে যাবে।’

    রানু আনিসের বাঁ হাত শক্ত করে চেপে ধরল। থেমে থেমে বলল, ‘দেখলাম, একটা ঘরে আমি শুয়ে আছি। একটা বেঁটে লোক এসে ঢুকল। তারপর দেখলাম, সে আমার শাড়ি টেনে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।’

    আনিস শব্দ করে হাসল।

    রানু বলল, ‘হাসছ কেন?’

    ‘হাসব না? এটা কি একটা ভয় পাওয়ার স্বপ্ন?’

    ‘তুমি তো সবটা শোন নি।’

    ‘সবটা শুনতে হবে না। পরে কী হবে তা আমার জানা। তুমি যা দেখেছ তা হচ্ছে একটা সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি। যুবক-যুবতীরা এ-রকম স্বপ্ন প্রায়ই দেখে।’

    ‘আমি দেখি না।’

    ‘তুমিও দেখ। মনে থাকে না তোমার।’

    ‘আমি স্বপ্ন খুব কম দেখি। যা দেখি তা সব সময় সত্যি হয়। তোমাকে তো বলেছি অনেক বার।’

    আনিস চুপ করে রইল। রানু এই কথাটি প্রায়ই বলে। বিয়ের রাতে প্রথম বার বলেছিল। আনিস সেবারও হেসেছে। রানু অবাক হয়ে বলেছে, ‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না, না?’

    ‘নাহ্।’

    ‘আমি আপনার গা ছুঁয়ে বলছি, বিশ্বাস করুন আমার কথা।’

    রানু এমনভাবে বলল, যেন আনিসের বিশ্বাসের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আনিস শেষ পর্যন্ত হাসিমুখে বলল, ‘ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম, এখন দয়া করে আপনি-আপনি করবে না।’ রানু ফিসফিস করে বলল, ‘আপনার সঙ্গে যে আমার বিয়ে হবে, সেটাও আমি জানতাম।’

    ‘এটাও স্বপ্নে দেখেছিলে?’

    ‘হুঁ। দেখলাম, একটি লোক খালিগায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেটের কাছে একটা মস্ত কাটা দাগ। লোকটিকে দেখেই মনে হল, এর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আমি তাকে বললাম, কেটেছে কীভাবে? আপনি বললেন, ‘সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলাম।’

    আনিস সে-রাতে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে নি। তার পেটে একটা কাটা দাগ সত্যি-সত্যি আছে, এই মেয়েটির সেটা জানার কথা নয়। তবে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কাটে নি। জামগাছ থেকে পিছলে পড়ে কেটেছে। ব্যাপারটা কাকতালীয়, বলাই বাহুল্য। মাঝে-মাঝে এমন দু’-একটা জিনিস খুব মিলে যায়। তবুও কোথায় যেন একটা ক্ষীণ অস্বস্তি থাকে।

    বাইরে বৃষ্টি খুব বাড়ছে। ঝড় হবে বোধহয়। শোঁ-শোঁ আওয়াজ হচ্ছে জানালায়। একটি কাঁচ ভাঙা। প্রচুর পানি আসছে ভাঙা  জানালা দিয়ে, শীত-শীত করছে।

    ‘রানু, চল ঘুমিয়ে পড়ি।’

    ‘সিগারেট শেষ হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    বিছানায় ওঠামাত্র প্রবল শব্দে বিদ্যুৎ চমকাল। বাতি চলে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। শুধু এ-অঞ্চল নয়, সমস্ত ঢাকাই বোধ করি অন্ধকার হয়ে গেল। আনিস বলল, ‘ভয় লাগছে রানু?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আচ্ছা, হাসির গল্পটল্প কর। এতে ভয় কমে যায়। বল একটা গল্প।’

    ‘তুমি বল।’

    আনিস দীর্ঘ সময় নিয়ে এক জন পাদ্রী ও তিনটি ইহুদি ও তিনটি মেয়ের গল্প বলল। গল্পের এক পর্যায়ে শ্রোতাকে জিজ্ঞেস করতে হয়—পাদ্রী তখন কী বলল? এর উত্তরটি হচ্ছে পাঞ্চ লাইন। কিন্তু কিচ্ছু জিজ্ঞেস করল না রানু। সে কি শুনছে না? আনিস ডাকল, ‘এই রানু, এই!’ রানু কথা বলল না। বাতাসের ঝাপ্টায় সশব্দে  জানালার একটি পাল্লা খুলে গেল। আনিস বন্ধ করবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই রানু তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল, ‘তুমি যেও না। খবরদার, যেও না!’

    ‘কী আশ্চর্য, কেন?’

    ‘একটা-কিছু জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।’

    ‘কী যে বল!’

    ‘প্লীজ, প্লীজ।’

    রানু কেঁদে ফেলল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘তুমি গন্ধ পাচ্ছ না?’

    ‘কিসের গন্ধ?’

    ‘কর্পূরের গন্ধের মতো গন্ধ।‘

    এটা কি মনের ভুল? সূক্ষ্ম একটা গন্ধ যেন পাওয়া যাচ্ছে ঘরে। ঝন্‌ঝন্ করে আরেকটা কাঁচ ভাঙল। রানু বলল, ‘ঐ জিনিসটা হাসছে। শুনতে পাচ্ছ না?’ বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আনিস কিছু শুনতে পেল না।

    ‘তুমি বস তো। আমি হারিকেন জ্বালাচ্ছি।’

    ‘না, তুমি আমাকে ধরে বসে থাক।’

    আনিস অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘তুমি ঐ জানালাটার দিকে আর তাকিও না তো!’

    আনিস লক্ষ করল, রানু থরথর করে কাঁপছে, ওর গায়ের উত্তাপও বাড়ছে। রানুকে সাহস দেবার জন্যে সে বলল, ‘কোনো দোয়া-টোয়া পড়লে লাভ হবে? আয়াতুল কুর্সি জানি আমি। আয়াতুল কুর্সি পড়ব?’

    রানু জবাব দিল না। তার চোখ বড়-বড় হয়ে উঠেছে। মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে নাকি? শ্বাস ফেলছে টেনে-টেনে।

    ‘এই রানু, এই।’

    কোনোই সাড়া নেই। আনিস হারিকেন জ্বালাল। রান্নাঘর থেকে খুটখুট শব্দ আসছে। ইঁদুর, এতে সন্দেহ নেই। তবু কেন জানি ভালো লাগছে না। আনিস বারান্দায় এসে ডাকল, ‘রহমান সাহেব, ও রহমান সাহেব।’ রহমান সাহেব বোধহয় জেগেই ছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে বেরুলেন।

    ‘কী ব্যাপার?’

    ‘আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘হাসপাতালে নিতে হবে নাকি?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘আপনি যান, আমি আসছি। এক্ষুণি আসছি।’

    আনিস ঘরে ফিরে গেল। মনের ভুল, নিঃসন্দেহে মনের ভুল। আনিসের মনে হল, সে ঘরের ভেতর গিয়ে দাঁড়ানোমাত্র কেউ-একজন যেন দরজার আড়ালে সরে পড়ল। রোগা, লম্বা একটি মানুষ। আনিস ডাকল, ‘রানু।’ রানু তৎক্ষণাৎ সাড়া দিল, ‘কি?’

    ইলেকট্রিসিটি চলে এল তখনই। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই রহমান সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ‘এখন কেমন অবস্থা?’ রানু অবাক হয়ে বলল, ‘কিসের অবস্থা? কী হয়েছে?’

    রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। আনিস বলল, ‘তোমার শরীর খারাপ করেছিল, তাই ওঁকে ডেকেছিলাম। এখন কেমন লাগছে?’

    ‘ভালো।’

    রানু উঠে বসল। রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘এখন আমি ভালো।’

    রহমান সাহেব তবুও মিনিট দশেক বসলেন। আনিস বলল, ‘আপনি কি ছাদে দাপাদাপি শুনেছেন?’

    ‘সে তো রোজই শুনি। বাঁদরের উৎপাত।’

    ‘আমিও তাই ভাবছিলাম।’

    ‘খুব জ্বালাতন করে। দিনে-দুপুরে ঘর থেকে খাবারদাবার নিয়ে যায়।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জ্বি। নতুন এসেছেন তো! কয়েক দিন যাক, টের পাবেন। বাড়িঅলাকে বলেছিলাম গ্রিল দিতে। তা দেবে না। আপনার সঙ্গে দেখা হলে আপনিও বলবেন। সবাই মিলে চেপে ধরতে হবে।’

    ‘জ্বি, আমি বলব। আপনি কি চা খাবেন নাকি এক কাপ?’

    ‘আরে না না। এই রাত আড়াইটার সময় চা খাব নাকি, কী যে বলেন! উঠি ভাই। কোনো অসুবিধা দেখলে ডাকবেন।’

    ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। রানু চাপা স্বরে বলল, ‘এই রাত-দুপুরে ভদ্রলোককে ডেকে আনলে কেন? কী মনে করলেন উনি।’

    ‘তুমি যা শুরু করেছিলে! ভয় পেয়েই ভদ্রলোককে ডাকলাম।’

    ‘কী করেছিলাম আমি?’

    ‘অনেক কাণ্ড করেছ। এখন তুমি কেমন, সেটা বল।‘

    ‘ভালো।’

    ‘কী রকম ভালো?’

    বেশ ভালো।’

    ‘ভয় লাগছে না আর?’

    ‘নাহ্।’

    রানু বিছানা থেকে নেমে পড়ল। সে বেশ সহজ ও স্বাভাবিক। ভয়ের কোনো চিহ্নও নেই চোখে-মুখে। শাড়ি কোমরে জড়িয়ে ঘরের পানি সরাবার ব্যবস্থা করছে।

    ‘সকালে যা করবার করবে। এখন এসব রাখ তো।’

    ‘ইস্, কী অবস্থা হয়েছে দেখ না!’

    ‘হোক, এস তো এদিকে।’

    রানু হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে এল।

    ‘এখন আর তোমার ভয় লাগছে না?’

    ‘না।’

    ‘জানালার পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে ছিল বলেছিলে?’

    ‘এখন কেউ নেই। আর থাকলেও কিছু যায় আসে না।’

    আনিস দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরাল। হালকা গলায় বলল, ‘এক কাপ চা করতে পারবে?’

    ‘চা, এত রাতে!’

    ‘এখন আর ঘুম আসবে না, কর দেখি এক কাপ।’

    রানু চা বানাতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি ফোটার শব্দ হল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝম করে। রানু একা-একা রান্নাঘরে। কে বলবে এই মেয়েটিই অল্প কিছুক্ষণ আগে ভয়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিল! ছাদে আবার ঝুপঝুপ শব্দ হচ্ছে। এই বৃষ্টির মধ্যে বানর এসেছে নাকি? আনিস উঠে গিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিল। হালকা গলায় বলল, ‘ছাদে বড় ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে।’ রানু জবাব দিল না।

    আনিস বলল, ‘এই বাড়িটা ছেড়ে দেব।’

    ‘সস্তায় এ-রকম বাড়ি আর পাবে না।’

    ‘দেখি পাই কি না।’

    ‘চায়ে চিনি হয়েছে তোমার?’

    ‘হয়েছে। তুমি নিলে না?’

    ‘নাহ্, রাত-দুপুরে চা খেলে আমার আর ঘুম হবে না।’

    রানু হাই তুলল। আনিস বলল, ‘এখন বল তো তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত।’

    ‘কোন স্বপ্নের কথা?’

    ‘ঐ যে স্বপ্ন দেখলে! একটা বেঁটে লোক।’

    ‘কখন আবার এই স্বপ্ন দেখলাম? কী যে তুমি বল।’

    আনিস আর কিছু বলল না। চা শেষ করে ঘুমুতে গেল। শীত-শীত করছিল। রানু পা গুটিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো শুয়েছে। একটি হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে আনিসকে। তার ভারি নিঃশ্বাস পড়ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। জানালায় নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে। মানুষের মতোই লাগছে ছায়াটাকে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে। মনে হচ্ছে মানুষটি হাত নাড়ছে। ঘরের ভেতর মিষ্টি একটা গন্ধ। মিষ্টি, কিন্তু অচেনা।

    আনিস রানুকে কাছে টেনে আনল। রানুর মুখে আলো এসে পড়েছে। কী যে মায়াবতী লাগছে! আনিস ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। ওদের বিয়ে হয়েছে মাত্র ছ’ মাস। আনিস এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নি। প্রতি রাতেই রানুর মুখ তার কাছে অচেনা লাগে। অপরূপ রূপবতী একটি বালিকার মুখ, যাকে কখনো পুরোপুরি চেনা যায় না। আনিস ডাকল, ‘রানু, রানু।’ কোনো জবাব পাওয়া গেল না। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন রানু। আনিসের ঘুম এল না। শুয়ে শুয়ে ঠিক করে ফেলল, রানুকে ভালো এক জন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অফিসের কমলেন্দুবাবু এক ভদ্রলোকের কথা প্রায়ই বলেন, খুব নাকি গুণী লোক। মিসির সাহেব। দেখালে হয় এক বার মিসির সাহেবকে।

    রানু ঘুমের ঘোরে খিলখিল করে হেসে উঠল। অপ্রকৃতিস্থ মানুষের হাসি শুনতে ভালো লাগে না, গা ছমছম করে।

  • চতুর্থ কল্প : চণ্ডেশ্বর

    চতুর্থ কল্প : চণ্ডেশ্বর

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    চতুর্থ কল্প : চণ্ডেশ্বর

    আমি চোলেছি;—কি সন্ধান কোরে এলেম, লক্ষ্য বস্তু পেলেম কি না, ভাবতে ভাবতে চোলেছি। অমরকুমারীর নাম এখনো ব্রজকিশোরী। আমার মুখে অবগুণ্ঠন না থাকলে ব্রজকিশোরী আমারে চিনতেন; অবগুণ্ঠন রেখে আমি এক প্রকার ভালই কোরেছিলেম; আমার চেনাই দরকার ছিল, আমারে সেখানে চেনা অমরকুমারীর পক্ষে এখন ততটা দরকার ছিল না। যদি আমি প্রকাশ হোতেম, খোলা মুখে যদি অমরকুমারীর সঙ্গে আমার কথাবার্তা চোলতো, তা হোলে রাতারাতি অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরে আনতে পাত্তেম। অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকবার অগ্রে সেইটি একবার আমি ভেবেছিলেম; সে ভাবের উদয় হবামাত্রই পরিণামবিবেচনার নূতন উপদেশ আমি প্রাপ্ত হই; সেই উপদেশেই সতর্কতা আসে, সেই সতর্কতায় অবগুণ্ঠনে মুখাবরণ।

    “আমি হরিদাস, গুপ্তসন্ধানে তোমার তত্ত্ব অবগত হয়ে আমি তোমাকে উদ্ধার কোত্তে এসেছি,” খোলা-মুখে দেখা দিয়ে, নির্জনে অমরকুমারীকে এই কথা যদি আমি বোলতেম, অমরকুমারী অবশ্যই রাত্রিকালে গুপ্তভাবে আমার সঙ্গে সে বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসতেন, বাড়ীর কেহই কিছু জানতে পাত্তো। সে উপায় আমি অবলম্বন কোল্লেম না কেন, তার একটি কারণ ছিল।

    চোরেরা অমরকুমারীকে চুরি কোরেছে, দূরদেশে এনে একজন ভদ্রলোকের বাড়ীতে লুকিয়ে রেখেছে, কাহাকেও কিছু না জানিয়ে গোপনে আমি যদি অমরকুমারীকে বাহির কোরে আনতেম, চোরের উপর বাটপাড়ী করা হতো, সেটা নিশ্চয়, কিন্তু প্রকারান্তরে আমিই চোর হোতেম। চোরের মত কাজ আমি কোরবো না, বীরের মত পরাক্রম দেখাবো, এই আমার প্রতিজ্ঞা; গুপ্ত ভাবে চোরা জিনিস চুরি কোরে আনলে সে প্রতিরক্ষা হতো না, সেই কারণেই অমরকুমারীর কাছে আত্মপ্রকাশ করি নাই।

    বাসায় এসে আমি পৌঁছিলেম। সূর্য তখন স্বর্ণবর্ণ পরিত্যাগ কোরে রজতবর্ণ ধারণ কোরেছেন, বেলা অনুমান আটটা। রাত্রে আমি কোথায় ছিলেম, হরিহরবাবুর এই প্রশ্নে আমি উত্তর দিলেম, “কার্যগতিকে স্থানান্তরে আটক থাকতে হয়েছিল, ফলাফল একটু পরেই আপনি জানতে পারবেন।”

    হরিহরবার প্রশ্নে যখন আমি ঐ উত্তর দিই, মণিভূষণ তখন সেইখানে উপস্থিত ছিলেন; আমার মুখের ভাব দেখে মণিভূষণ কিরুপ অনুমান কোল্লেন, তখন আমি ঠিক বুঝতে পাল্লেম না, মণিভূষণ কিন্তু অধিকক্ষণ ধৈর্যধারণ কোত্তে না পেরে ইঙ্গিতে আমারে নিকটে ডাকলেন, আমি তাঁর কাছে সোরে গেলেম; যে ঘরে মণিভূষণের রাত্রিযাপন হয়, আমার হাত ধরে সেই ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে সাগ্রহস্বরে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কোথায় তুমি আটক পোড়েছিলে? কারা তোমাকে আটক কোরেছিল? একরাত্রি আটক রেখে অমনি অমনি ছেড়ে দিলে, তবে বোধ হয়, তারা তোমার শত্রুপক্ষের কেহ নয়?”

    মৃদুহাস্য কোরে আমি বোল্লেম, “সকাল সকাল প্রস্তুত হও, কালবিলম্ব না কোরে ঢাকা যেতে হবে; শত্রু-মিত্রের পরিচয় সেইখানেই পাবে।”

    আমার হাতের উপর মণিভূষণের হাত, আমার চক্ষের দিকে মণিভূষণের চক্ষ, নির্নিমেষচক্ষে আমার চক্ষু নিরীক্ষণ কোরে, মণিভূষণ মুহূর্তকাল নীরব হয়ে থাকলেন; কি তিনি বুঝলেন, কি তিনি বোলবেন, তৎক্ষণাৎ সেটি আমি অনুমান কোত্তে অক্ষম হোলেম না। একটু পরেই মণিভূষণ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সন্ধান কিছু পেয়েছ কি?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “হাতের বস্তু যতক্ষণ হাতে না আসে, সন্ধান হয়েছে বোলে ততক্ষণ শ্লাঘা প্রকাশ করা উচিত হয় না। তুমি ঢাকায় চল, সন্ধানের ফলাফল—আশার ফলাফল—আমাদের পরিশ্রমের ফলাফল ঢাকা সহরেই পূণতা প্রাপ্ত হবে;—ফলের পূর্ণতা প্রাপ্ত হবে;—ফলের পূর্ণতার নাম পরিপক্কতা;—তুমি ঢাকায় চল; বাঙ্গলায় একটা কথা আছে, “বেরাল কাঁধে কোরে শীকার করা”—আমারে কাঁধে কোরে শীকার করবার অনুমতিলাভের জন্য তুমি ঢাকায় চল। উভয়েই আমরা উভয়ের কথা বুঝলেম, সময়মত স্নানাহার সমাপন করা হলো, হরিহরবাবু কর্মস্থলে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, সেই সময় আমি সম্মুখে গিয়ে জানালেম, “অমরকুমারীর সন্ধান হয়েছে; দুদিন একটু একটু উড়াভাষা সন্ধান, গত রজনীতে নিঃসংশয়। হরণকর্তারা আপাততঃ অদৃশ্য, কিন্তু অমরকুমারীকে আমরা যখন হস্তগত কোত্তে পারবো, করালমূর্তি ধারণ কোরে তারা তখন রঙ্গস্থলে দর্শন দিবে, ঘোরসংগ্রাম উপস্থিত করবার উপক্রম কোরবে, ভবিষ্যৎ জানতে পেরেও আমি ভয় পাচ্ছি না; আমারে আক্রমণ করবার জন্য যারা করালমুর্তি ধারণ কোরে আসবে, উত্তম অবসরে সেই ক্ষেত্রে আমিই তাদের করালতর করালমূর্তির করাল হস্তে সমর্পণ কোরে দিব; তাদের দেখে আমি ভয় পাব না, তারাই বরং আমারে দেখে প্রাণের ভয়ে কম্পিত হবে; শীঘ্রই আপনি আমার এই সকল বাক্যের সার্থকতা অনুভব কোরবেন, অধিক বাক্যব্যয় এখন নিষ্প্রয়োজন। আমরা ঢাকায় যাব; আমি আর মণিভূষণ। আপনি অনুগ্রহ কোরে দুটি লোক আমাদের সঙ্গে দিন, অচেনা জায়গায় আমরা যেন ফাঁপরে না পড়ি। এখন আপনি কেবল এইটকু জেনে রাখুন, এই মাণিকগঞ্জের উত্তরপ্রান্তে একটি ভদ্রলোকের বাড়ীতে অমরকুমারী আছে।”

    হরিহরবাবুর বদন প্রফুল্ল, ধীরে ধীরে আমার পৃষ্ঠদেশে করাপর্ণ কোরে প্রফুল্লবদনে তিনি বোল্লেন, “বাহাদুর তুমি! এত অল্পবয়সে এতদূর কার্যপটুতা তুমি অভ্যাস কোরেছ, আশ্চর্যের কথা বটে! ঈশ্বর তোমার মনস্কামনা পর্ণ করুন। দেখো, ঢাকায় যাচ্ছ, সাবধান;— সাবধানে সাবধানে সকল কাজ কোরো। ঠোকো না!”

    নতমস্তকে আমি নমস্কার কোল্লেম। আমাদের ঢাকা-যাত্রার বন্দোবস্ত কোরে দিয়ে, শেষকালে হরিহরবাবু, বোল্লেন, “ঢাকা-কোর্টের অনেকগুলি উকিলের সঙ্গে আমার আলাপ আছে, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম শিবশঙ্কর মল্লিক; তিনি বিদ্বান, বহুদর্শী, বিশেষরূপ আইনজ্ঞ; আমার নাম কোরে তাঁরে তুমি বোলো, মোকদ্দমার বিবরণ ভাল কোরে বুঝিয়ে দিও, শীঘ্র শীঘ্র সুচারুরূপে কার্য নিৰ্বাহ হবে।”

    শিবশঙ্কর মল্লিকের নামটি আমি মুখস্থ কোরে রাখলেম। ইংরাজী আদালতের কাজ, পাঁচরকমে খরচপত্র অধিক হয়, শতাধিক মুদ্রা আমি সঙ্গে রাখলেম, হরিহরবাবুর একজন সরকার আর একজন চাপরাসী আমাদের সঙ্গে থাকলো; কি জানি, কখন কি রকম বাতাস ফেরে, ছদ্মবেশ সঙ্গে রাখতেও বিস্মত হোলেম না; চাপকানের পকেটে থাকলো দুটি গুলীভরা পিস্তল। হাসি পায়। অস্ত্রশিক্ষা হয়ে অবধি পিস্তল আমি সঙ্গে রাখি; নখিন্দরের পিতা চাঁদ সদাগর সৰ্বক্ষণ যেমন হেঁতালের লাঠিকে আপন সঙ্গের সাথী কোরে রাখতেন, কোন প্রকার সঙ্কটস্থলে যাত্রা করবার সময় আমিও সেই রকমে জোড়া জোড়া পিস্তল সঙ্গে রাখি; কেবল রাখি, এই মাত্র, ব্যবহারে আসে না; তথাপি রাখি; আপদস্থলে নিরাপদের জন্য সাবধান থাকা ভাল। হরিহরবাবু কর্মস্থলে গেলেন, তাঁর চাপরাসী আমাদের জন্য একখানি নৌকা ঠিক কোরে দিলে, আবশ্যকমত জিনিসপত্র সঙ্গে লয়ে আমরা নৌকাআরোহণ কোল্লেম; আমি, মণিভূষণ, সরকার আর চাপরাসী। শীঘ্র গমনের বন্দোবস্ত। নৌকায় আটজন দাঁড়ী, একজন মাঝি।

    বুড়ীগঙ্গার উপরে ঢাকা সহর। পূর্বে আমি আর কখনো ঢাকায় যাই নাই, ঢাকা আমি নূতন দেখলেম। বুড়ীগঙ্গার পূৰ্বতীরে সহর, পশ্চিমতীরে প্রসিদ্ধ মিয়া সাহেবের সুন্দর অট্টালিকা, গঙ্গাবক্ষ থেকে সেই অট্টালিকার সুদৃশ্য সুপ্রশস্ত সোপানাবলী দৃষ্ট হয়। উত্তম শোভা। নগরের শোভা দর্শন করা আমার তখনকার কার্য ছিল না, নগরে উপস্থিত হয়েই অগ্রে আমরা আদালতে উপস্থিত হোলেম। বেলা প্রায় তৃতীয় প্রহর। ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস ভঙ্গ হবার পূর্বেই দরখাস্ত করা চাই, শিবশঙ্কর মল্লিকের অন্বেষণ কোল্লেম; ফৌজদারী কোটে তখন তিনি ছিলেন না, দেওয়ানী কোটেই সাক্ষাৎ কোল্লেম, মাণিকগঞ্জের হরিহরবাবুর নাম কোরে আমার বক্তব্যগুলি সংক্ষেপে তারে বোল্লেম; হরিহরবাবু বলেন নাই, আপন ইচ্ছায় আমি শিববাবুকে ষোলটি টাকা ফী দিলেম, তিনি উদযোগী হয়ে তৎক্ষণাৎ দরখাস্তের মুসাবিদা কোরে দিলেন, এক টাকা তহরী নিয়ে তাঁর মুহুরি শীঘ্র শীঘ্র সেই দরখাস্তখানি পরিষ্কার কোরে নকল কোল্লেন, মণিভূষণ সেই দরখাস্তে আপন নাম দস্তখৎ কোরে দিলেন, উকীলের দ্বারা দরখাস্ত দাখিল হলো। বহরমপুরের আদালতের কথাও সেই দরখাস্তে লেখা ছিল, দরখাস্তের সঙ্গে বহরমপুরের ম্যাজিস্ট্রেটের প্রেরিত রূবকারিখানি পেস হলে, উকীলের সঙ্গে ইতিমধ্যে সেরেস্তাদার পেস্কারের গুপ্তবন্দোবস্ত হয়েছিল, তাঁদের সহায়তায় সেইদিনেই হাকিমের হুকুমমত পুলিশের নামে পরোয়ানা বাহির হয়ে গেল। এজলাস ভঙ্গ হয় হয়, এমন সময় শিবশঙ্করবাবুকে আমি চুপি চুপি বোল্লম, “কেবল পুলিশের দ্বারা সে কার্য সুসিদ্ধ হওয়া সন্দেহস্থল, মেয়েটিকে উদ্ধার করবার সময় একজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট সেইখানে উপস্থিত থাকলে ভাল হয়।” মুখে মুখে সেই কথাটি হাকিমকে জানিয়ে শিবশঙ্করবাবু সেরেস্তাদারের মুখের দিকে চাইলেন, হাকিমও সেই প্রার্থনা মঞ্জুর কোল্লেন, মণিভূষণের মূল দরখাস্তের পৃষ্ঠে সেইরকম হুকুম লেখা হলো, হাকিম সাহেব আসনত্যাগ কোরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সেই হুকুমের নীচে স্বাক্ষর কোরে দিলেন। আমার উদ্বেগ দূর হয়ে গেল।

    সন্ধ্যা হলো। রাত্রিকালে কোথায় থাকি? নৌকায় বাস করা সুবিধাজনক বোধ হলো না; বিশেষতঃ লোকের মুখে শুনলেম, বুড়ীগঙ্গার উত্তরাংশে ডাকাতের ভয় আছে, রাত্রিকালে তারা সময়ে সময়ে নৌকা মারে, নৌকায় বাস করা সুবিধাজনক বোধ হলো না, শিবশঙ্করবাবুর বাসাতেই রাত্রিবাস করা গেল।

    পুলিশের দারোগা যাবেন, জমাদার যাবেন, বরকন্দাজ যাবে, সকলের উপর একজন ডেপুটিবাবু। একজন উকীল সঙ্গে থাকলে ভাল হয়, আমার মনে এই ভাবের উদয় হলো; শিবশঙ্করবাবুকে সেই কথা আমি বোল্লম; যুক্তিসিদ্ধ বিবেচনা কোরে সহানুভূতিপ্রাপ্ত নিম্নশ্রেণীর একজন উকীলকে তিনি আমাদের সঙ্গে দিলেন, আমরা মাণিকগঞ্জে যাত্রা কোল্লেম।

    যত সময়ে যাওয়া যায়, নৌকাতে দাঁড়ীর সংখ্যা অধিক থাকাতে তদপেক্ষা অল্পসময়ে আমরা মাণিকগঞ্জে পৌঁছিলেম। অসময়ে হরিহরবাবু তখন বাসায় ছিলেন না, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হলো না, কোর্টের ফলাফলের কথা বলাও হলো না, সুতরাং লক্ষ্যস্থলেই অগ্রে আমরা উপস্থিত হোলেম। যে বাগানে আমি ধনঞ্জয় ঘটকের সঙ্গে পরামর্শ কোরেছিলেম, সেই বাগানের আটচালাঘরে আমরা সকলেই খানিকক্ষণ বিশ্রাম কোল্লেম। বিশ্রামকালে ডেপুটিবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “যে মেয়েটি এখানে আছে, যেটিকে উদ্ধার কোত্তে হবে, সেটি যে সেই মেয়ে, এমন সনাক্ত করবার লোক কেহ এখানে আছে?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “সনাক্ত করবার লোক এই দরখাস্তকারী মণিভূষণ দত্ত, আর একজন সনাক্ত করবার লোক আমি স্বয়ং, আমরা এই দুজন ভিন্ন এখানকার আর কেহ সে বালিকাকে চিনবে না। যে বাড়ীতে আছে, সে বাড়ীর লোকেরা কেবল চেহারা চিনতে পারবে, আসল পরিচয় দিতে পারবে না। আপনি হাকিম, আপনার কাছে যদি কিছু বেয়াদবী হয়, অনুগ্রহ কোরে মাপ কোরবেন, সনাক্তের বদলে আমি একটি নূতন কথা বলতে চাই। সেই বাড়ীতে আপনি চলুন; আপনার কাছে সেই বালিকাকে যখন আনা হবে, আমি আর মণিভূষণ সেই সময় আপনার কাছে গিয়ে দাঁড়াব, আমরা বেশ জানি, বালিকার নাম অমরকুমারী; এখানে যারা এনেছে, তারা নাম দিয়েছে ব্রজকিশোরী। নামের কথা এখন থাকুক, আপনার কাছে আমরা দুজনে দাঁড়াব; অমরকুমারীই হোক অথবা ব্রজকিশোরীই হোক, সেই বালিকা যদি আমাদের দুজনকে চিনতে পারে, তা হোলে আপনার হৃদ-প্রত্যয় জমিবে কি না?”

    বিকশিতনেত্রে আমার মুখপানে চেয়ে ডেপুটিবাবু একটু হাস্য কোল্লেন। দারোগামহাশয় মুখ ভারী কোরে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন। মণিভূষণকে কোন কথা আমি শিখিয়ে না দিই, সেইরূপ ভাব জানিয়ে দারোগা আমারে তাঁর নিজের কাছে ডাকলেন, তাঁর কাছে আমি গেলেম, মণিভূষণ ডেপুটিবাবুর নিকটেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। দারোগা আমায় জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সে মেয়েটি চুরি গিয়েছে কতদিন? তোমার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক? মণিভূষণের সঙ্গে কি সম্পর্ক? সে মেয়ে এই গ্রামে আছে, কেমন কোরে তুমি জানতে পেরেছ? কত দিন হলো, এই গ্রামে তুমি এসেছো? মেয়েটির বয়স কত? তোমার সঙ্গে জানা-শুনা কত দিন?”

    এই প্রকারের অসংখ্য প্রশ্ন। সকল প্রশ্নই নিরর্থক। ভাবি আমি কিছু, বুঝতে পাল্লেম না। পুলিশের লোকেরা এক এক সময়ে ফরিয়াদীকে, আসামীকে, সাক্ষীগণকে এই রকম অনর্থক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কোরে অন্যমনস্ক করবার চেষ্টা করেন, আসলকথায় কাহারো কাহারো ভুল হয়ে যায়, কেহ কেহ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে, গল্প প্রসঙ্গে অনেক ভাল ভাল লোকের মুখে এই রকম আমি শুনেছি। দারোগার প্রশ্নাবলীর উত্তরে ডেপুটিবাবুর অলক্ষিতে অগোচরে চুপি চুপি আমি বোল্লেম, “রসনাকে বিরাম দিতে আপনি কি ইচ্ছা করেন না? ও সকল প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক হোলে হুকুমের অগ্রে ম্যাজিস্ট্রেট অবশ্যই আমারে জিজ্ঞাসা কোত্তেন, আমারে না করুন, দরখাস্তকারী এই মণিভূষণ, এই মণিভূষণকেও তিনি এই সব কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেন। আবশ্যক ছিল না, আবশ্যক নাই, এই কারণেই আদালতে ও সকল কথা উত্থাপিত হয় নাই। কেন আপনি মাথা বকান? কেন আপনি মুখে ব্যথা করান? আপনার পুজার উপকরণ আমার কাছেই আছে, ষোড়শোপচারে না পারি, পঞ্চোপচারে পূজা দিব।”

    দারোগা তখন হাস্য কোল্লেন। বন্দোবস্ত সব ঠিক। প্রাতঃকালে এসে মাণিকগঞ্জে আমরা পৌঁছিলেম, সেই উদ্যানেই আহারাদি করা হলো, বিশ্রামের পর আমরা সকলে একত্র হয়ে বাবু রমণীবল্লভের বাড়ীর নিকটে গিয়ে উপস্থিত হোলেম। পুলিশের লোকের পুলিশের সাজপরা, পুলিশ দেখলেই ভদ্রলোকের ভয় হয়; বিশেষতঃ গ্রাম্যলোকেরা অধিক ভয় পায়। নিকটে নিকটে যাদের বাড়ী, তারা সব ভয়ের কথা বলাবলি কোত্তে কোত্তে আপনাদের বাড়ীর দরজা বন্ধ কোরে দিলে; রাস্তা দিয়ে যারা চোলে যাচ্ছিল তারাও মুখ ফিরিয়ে ফিরিয়ে ভয়ে ভয়ে চেয়ে দেখে হন হন কোরে অন্যদিকে চোলে যেত লাগলো; “কোথায় কার বাড়ীতে চুরি হয়েছে, কোথায় ডাকাতী হয়েছে, কোথায় বুঝি দাঙ্গা হয়েছে, কে কারে বুঝি খুন কোরেছে, কার কি সৰ্বনাশ হয় দেখ, গাঁয়ের ভিতর পুলিশ প্রবেশ কোরেছে!” পথে পথে যারা ছিল, তাদের সকলের মুখেই এই রকম কথা; মনে মনে আপনাদের যেন কোন বিপদ গণনা কোরে সকলেই সেই দিক থেকে সোরে গেল; রমণীবল্লভের বাড়ীর মধ্যে আমরা প্রবেশ কোল্লেম।

    বাড়ীর ভগ্নদশা, একাংশমাত্র সম্প্রতি মেরামত করা হয়েছে, সেই অংশই সদর ছিল। এখন সেই সদরমহলকেই দুই অংশে ভাগ কোরে সদর মফঃস্বল চিহ্নিত করা হয়েছে। পূজার দালানের খাটালে খাটালে জানালা-দরজা বোসিয়ে মধ্যে মধ্যে প্রাচীর দেওয়া; এখন আর দালান বোলে চেনা যায় না, ঘরগুলি এখন বৈঠকখানা। প্রাঙ্গণের দুইধারে পূর্বে বৈঠকখানা ছিল, সে সব এখন নাই, সমভূমি; সেই সকল ভূমিতে ছোট ছোট ফলের গাছ, বেগুনগাছ, লাউগাছ ইত্যাদি দৃষ্ট হয়। দালানের পশ্চিম অংশে ছোট রকম অন্দর-মহল। বৈঠকখানার মধ্যদরজাটি খোলা ছিল, সদর-বাড়িতে লোকজন কেহ ছিল না, আমরা সেই বৈঠকখানার মধ্যে প্রবেশ কোরে দেখলেম, বাবুলোকের বৈঠক খানার উপযুক্ত আসবাবপত্র কিছুই ছিল না, সেকেলে ধরনের পুরাতন একখানা কেদারা আর দু-ধারে বড় বড় দুখানা বেঞ্চ পাতা; মেজেতে বহু পরাতন একখানা সপ মোড়া, সেই সপের উপর দুটি পিতলের বৈঠকে দুটি কলী হুকা; বৈঠকের নিকটে ছোট ছোট খোপ কাটা কাটা একটা মাটির বাক্স; খোপে খোপে চকমকীর পাথর ইস্পাত, আধপোড়া সোলা, কয়লা, এক জোড়া কলিকা আর তামাকপোড়া ছাই। এই পর্যন্ত বৈঠকখানার আসবাব। কেদারাখানিতে ডেপুটিবাবুর আসন দিয়ে আমরা সেই দুইখানি বেঞ্চে সারি সারি উপবেশন কোল্লেম, পুলিশের বরকন্দাজেরা আর হরিহরবাবুর চাপরাসিটি বাহিরের বারান্দায় হাজির থাকলো।

    আমি জানতেম, বাবু রমণীবল্লভ বাড়ীতে ছিলেন না; কাহাকে সংবাদ দেওয়া যায়, কি রকমেই বা কার্য হয়, পুলিশের সম্মুখে কেই বা মুরুব্বি হয়ে দাঁড়ায়, এই সব আমি ভাবছি, এমন সময় ভিতরমহল থেকে একটি স্ত্রীলোক বেরিয়ে এলো। দেখেই আমি চিনলেম, সেই রেবতী। ঢাকায় যাওয়াতে আদালতের কাজকর্মে তিন চারদিন আমার বিলম্ব হয়েছিল, ইতিমধ্যে হয় তো রমণীবল্লভবাবু ফিরে এসে থাকবেন, এইরূপ অনুমান কোরে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে রেবতীকে আমি কিছু জিজ্ঞাসা কোরবো মনে কোচ্ছি, সময় হলো না। দালানের উপর পুলিশের লোক দেখেই রেবতী আঁৎকে উঠলো, “ও মা! এরা সব কে গো! এখানে এ সব থানা-পুলিশ কেন গো!” আতঙ্কে এই সব কথা বোলতে বোলতে রেবতী বাড়ীর ভিতর ছুটে পালালো।

    “ভয় নাই রেবতী, ভয় নাই, পালিয়ো না, শুনে যাও, বড়বাবু বাড়ী এসেছেন কি না, সেই কথা আমরা জানতে এসেছি।”—অভয়বাক্যে নরম সুরে বার বার আমি এই সব কথা বোলে পাছু ডাকতে লাগলেম, রেবতী সাড়া দিলে না।

    নাম ধোরে আমি ডেকেছি, তবে হয় তো আমি চেনা, যথার্থ চেনা কি না, সেইটি জানবার অভিপ্রায়ে রেবতী একবার ভিতরদিকে অঙ্গ লুকিয়ে দরজার পাশ থেকে উঁকি মেরে আমারে দেখলে, চিনতে পাল্লে না, তখনি আবার মুখখানি লুকিয়ে নিলে। রেবতী তখন পালায় নাই, দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়েছিল; উঁকি মেরে যখন মুখ লুকালে, সে সময় আবার আমি নাম ধোরে ডেকে উদ্দেশে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বাবুরা কেহ বাড়ী আছেন কি?”

    উত্তর পেলেম না। একটু পরে ছোট ছোট দুটি বাবু আদুড়-গায়ে বেরিয়ে এসে বৈঠকখানায় প্রবেশ কোল্লেন। দিব্য চেহারা, একটির বয়স অনুমান ষোড়শ বর্ষ, দ্বিতীয়টি ত্রয়োদশ অথবা চতুর্দশবর্ষীয়। দেখেই আমি বুঝতে পাল্লেম, কারা তাঁরা। সত্যই যেন কতদিনের চেনা, সেই ভাবে বড়টিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার দাদাবাবু কি বাড়ী এসেছেন?”

    যেন একটু চোমকে উঠে বাবুটি উত্তর কোল্লেন, “এসেছেন। শেষরাত্রে এসেছেন, একটু অসুখ আছে, আহার করেন নাই, ঘুমুচ্ছেন।”

    রেবতীর উদ্দেশেও আমার কথা, এই বাবুটির সঙ্গেও আমার কথা; হাকিম অথবা দারোগা ততক্ষণ পর্যন্ত একটিও কথা কোইলেন না। বাবুটিকে সবোধন কোরে আমি আবার বোল্লম, “বেলা এখন শেষ হয়ে এসেছে, অসুখশরীরে এতক্ষণ পর্যন্ত নিদ্রা যাওয়া ভাল নয়, সংবাদ দাও।” এই পর্যন্ত বোলে, ডেপুটিবাবুর দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ কোরে সেই বাবুটিকে পুনৰ্বার আমি বোল্লেম, “বড়বাবুকে গিয়ে বল, এই ডেপুটিবাবু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে এসেছেন, ঢাকা সদর-স্টেসনের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ইনি, বিশেষ প্রয়োজন আছে, সাক্ষাৎ করা নিতান্ত আবশ্যক, সংবাদ দাও।”

    ডেপুটিবাবুর দিকে চাইতে চাইতে বাবুটি বাড়ীর ভিতর চোলে গেলেন, ছোটবাবুটি আমাদের কাছে থাকলেন; আমার কাছেই এসে বোসলেন। মুখপানে চেয়ে চেয়ে আমার মনে একটি নূতন বুদ্ধি যোগালো। ছোট ছোট ছেলেরা মিথ্যাকথা জানে না, মিথ্যাকথা বলে না; এই ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা কোল্লে অনেক দুর সত্যক বাহির হোতে পারে। পারে বটে, কিন্তু আমি কে? উপস্থিত ব্যাপারে উপরপড়া হয়ে আমার কোন কথা জিজ্ঞাসা করা অধিকারবহির্ভূত। ডেপুটিবাবুর মুখের দিকে আমি চাইলেম, ডেপুটিবাবু আমার মনের ভাব বুঝলেন, চেয়ারখানি আমাদের দিকে একটু সোরিয়ে এনে বালকটিকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “ব্রজকিশোরী নামে একটি মেয়ে তোমাদের বাড়ীতে আছে?”

    বালক।—আছে।

    ডেপুটি।—কোথা থেকে এসেছে?

    বালক।—তিনজন লোক আমার দাদার কাছে তাঁরে রেখে গিয়েছে। বিয়ে হবে।

    ডেপুটি।—মেয়েটি এখানে কি করে?

    বালক।—কাঁদে।

    ডেপুটি।—কার সঙ্গে বিয়ে হবে?

    বালক।—( প্রাঙ্গণের দিকে চাহিয়া) ঐ দাদা আসছেন। দুই হতে নয়নমার্জন কোত্তে কোত্তে বালকের দাদাটি সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। পূৰ্বে আমার দেখা ছিল না, তথাপি স্থির বুঝলেম, তিনিই বাবু রমণীবল্লভ। ঘরে প্রবেশ কোরেই চঞ্চলনেত্রে ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত কোত্তে কোত্তে বিরক্তবদনে বাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আপনারা কে? আপনারা এখানে কেন এসেছেন? বাহিরে পুলিশের লোক খাড়া আছে, ওরাই বা এখানে কেন?”

    ও সকল প্রশ্নে আমার উত্তর করা ভাল হয় না, আমি চুপ কোরে থাকলেম; ডেপুটিবাবু স্বয়ং উত্তর দিলেন, “আপনি বসুন। জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের আদেশে আমরা এখানে এসেছি, পুলিশও এসেছে। আপনাকে গুটিকত কথা জিজ্ঞাসা করা আমাদের দরকার। আপনি বসুন।”

    বেঞ্চে আমরা বোসে ছিলেম, একটু সোরে সোরে স্থান দিলেম, বড়বাবু বোসলেন। অতঃপর প্রশ্নোত্তর।

    ডেপুটি।—ব্রজকিশোরী নামে একটি বালিকা আপনার বাড়ীতে আছে, যারা সেটিকে এখানে এনে রেখে গিয়েছে, তাদের আপনি জানেন কি না?

    রমণীবাবু।—আমার উপর এরূপ প্রশ্ন করবার আপনার কি অধিকার?

    ডেপুটি।—অধিকারের কথা পূর্বেইে আপনাকে বলা হয়েছে। জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের আদেশ। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আপনার মুখে ঐ প্রশ্নের উত্তর চান। আমি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের প্রতিনিধি; আমার কাছেই উত্তর দিতে আপনি বাধ্য। বলুন, তাদের আপনি জানেন কি না?

    রমণীবাবু।—পূর্বে জানা-শুনা ছিল না, হঠাৎ একদিন একটি মেয়ে সঙ্গে কোরে তিনটি ভদ্রলোক এখানে আসেন। সেই তিনজনের মধ্যে একজন সেই মেয়েটির পিতা। তিনি গরিব, এই গ্রামে একজন ধনবান পাত্রে মেয়েটি তিনি সম্প্রদান কোরবেন।

    ডেপুটি।—আপনি যে তিনজনকে ভদ্রলোক বোলছেন, হুজুরে দরখাস্ত হয়েছে, সেই তিনজন লোক একটা ভয়ানক কুচক্রের দলভুক্ত চোর, জুয়াচোর, বিখ্যাত বদমাস। মেয়েটিকে তারা মুর্শিদাবাদ থেকে চুরি কোরে এনেছে। মেয়েটির নাম ব্রজকিশোরী নয়, সত্যনাম অপ্রকাশ আছে। মেয়েটিকে আপনি আমার কাছে একবার আনয়ন করন, সত্যতত্ত্ব আমার অবগত হওয়া অগ্রে আবশ্যক।

    রমণী।—তা আমি পারি না। পিতা যারে বিশ্বাস কোরে আমার কাছে গোছিয়ে রেখে গিয়েছেন, তারে আমি পুলিশের কাছে হাজির কোত্তে অসম্মত; তাতে আমার লজ্জা আছে; তেমন কার্যে বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিপন্ন হোতে পারে।

    ডেপুটি।—হাঁ, তা হোতে পারে বটে, বিশ্বাসঘাতক হওয়া ভদ্রলোকের উচিত নয়। আচ্ছা, সেই তিনজন লোককে আপনি হাজির করুন।

    রমণী।—যতদিন পরে তাঁদের আসবার কথা, ততদিন পরে যদি আবশ্যক হয়, তবে আমি তাঁদের হাজির কোত্তে পারবো; এখন পারি না।

    ডেপটি।—উত্তম। ততদিনের মধ্যে পুলিশ যদি পারে, হাজির করবার চেষ্টা পাবে; এখন আপনি সেই মেয়েটিকে আমার কাছে হাজির করুন। অবিবাহিতা কুমারী, বয়স অল্প; তথাপি হিন্দু পরিবারের ব্যবহার অনুসারে পরদানসীন মহিলাগণের রীত্যনুসারে সেই মেয়েটির মুখের কথাগুলি আমি শ্রবণ কোরবো।

    রমণী।—তা আপনি পারেন না। আমার কাছে ইজ্জত রেখে যিনি নিশ্চিন্ত হয়ে কেহরে গিয়েছেন, তাঁর কন্যাকে আপনার কাছে উপস্থিত কোরে আমি তাঁর ইজ্জতের কেউ কোত্তে পারবো না।

    ডেপুটি।—উত্তম। আপনার নিজ পরিবারের রমণীগণকে আপনি অন্য গৃহে সোরে থাকতে বলুন, আমি অতঃপুরে প্রবেশ কোরে সেই কুমারীর এজাহার গ্রহণ কোরবো।

    রমণী।—আমি খুন করি নাই, ডাকাতী করি নাই, আমার নামে কোন নালিশ নাই, আপনি আমার বাটিতে খানা-তল্লাসী কোত্তে চান, এটা আইনের মর্ম নয়।

    ডেপটি।—আপনি একটু সাবধান হয়ে কথা কবেন। মেয়ে-চুরি মামলা, আপনি সেই মামলার আসামীগণের বানিকার, খুনী-ডাকাতী মামলার তাদারকে আইন যেরুপ উপদেশ দেয়, এ মামলাতেও আইনের সেইরূপ উপদেশ। আমি বে-আইনী কার্য কোত্তে এসেছি কিবা বে-আইনী কার্য কোত্তে উদ্যত হোচ্ছি, এমন কথা যদি পুনরায় আপনি বলেন, তা হোলে—

    রমণী।—তা হোলে আপনি কি কোরবেন?

    ডেপুটি।—কুইন ভিকটোরিয়ার নামে আমি আপনাকে পুলিশের হেপাজাতে সমপর্ণ কোরবো।

    রমণী।—করুন, আমি প্রস্তুত আছি।

    ডেপটি।—অধিকক্ষণের কার্য নয়। মনে করুন, তাই আপনি আছেন। এখনো আমি ভালকথায় বলছি, মেয়েটিকে আপনি এইখানে হাজির করুন।

    দালানের মাঝে মাঝে প্রাচীর দিয়ে ঘর করা হয়েছিল, পশ্চাদ্দিকে খড়খড়ি ছিল, সেই খড়খড়ির পশ্চাতে অন্দরের দিকে দর-দালান; ডেপুটি ম্যাজিষ্টেটের মুখে ঐরুপ বাক্য উচ্চারিত হবামাত্র সেই দর-দালানে কতকগুলি স্ত্রীলোকের বসনের খসখস শব্দ আর বদনে ভয়গুঞ্জনসূচক অস্ফুট শব্দ শ্রুতিগোচর হলো। সেই দিকে চেয়ে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “মা সকল! আপনারা ভয় পাবেন না, ভয় দেখাবার মত কোন কার্য আমি কোরবো না; ভদ্রলোকের পরিবারের সঙ্গে যে রকম ব্যবহার কোত্তে হয়, আমিও ভদ্রসন্তান, তা আমি ভাল জানি। আমি আইনের চাকর, আইন কাহারও মান-মর্যাদা নষ্ট করে না। ব্রজকিশোরী নামে যে মেয়েটি এই বাড়িতে আছে, সেটির সত্যনাম ব্রজকিশোরী কি না, কোন পরিচিত লোককে ব্রজকিশোরী এখানে চিনতে পারেন কি না, সেইটি আমি জানবো; মেয়েটিকে একবার আমি দেখবো।”

    অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে রমণীবল্লভ বোলে উঠলেন, “এ আপনার বেজায় জুলুম। ভদ্রলোকের কন্যা ভদ্রলোকের বাড়িতে রয়েছে, তার আবার সত্যনাম মিথ্যানাম আছে, এ সব কথা আপনি কি বলেন?”

    ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “সত্যমিথ্যা নাম নিশ্চয়ই আছে। শুধু তাই নয়; মেয়েটি কি জাতি, তাও আপনি জানেন না; অথচ একজন সুবর্ণ-বণিকের সঙ্গে সেই মেয়ের বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির কোরেছেন, মধ্যস্থ হয়ে মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়েছেন, দুহাজার টাকায় বিক্রয় করবার বন্দোবস্ত হয়েছে, এ সব কথা কি আপনি অস্বীকার কোত্তে পারেন?”

    বাবু রমণীবল্লভের আরক্তবদন অকস্মাৎ পাণ্ডুবর্ণ হয়ে এলো, আমতা আমতা কোরে কি যেন বোলবেন, চেষ্টা পেলেন, স্পষ্টকথা ফুটলো না। কাছেই তিনি বোসে ছিলেন, আমি বেশ দেখলেম, তিনি যেন একটু একটু কাঁপতে লাগলেন। সেই সময় দারোগাকে সম্বোধন কোরে ডেপুটিবাবু হকুম দিলেন, “এই গ্রামে ধনঞ্জয় ঘটক, আর বংশী পোদ্দার নামে দুটি লোক আছে, আপনার বরকন্দাজদের বলুন, অবিলম্বে সেই দুইজনকে এখানে হাজির করে।”

    রমণীবল্লভের কাঁপুনি বাড়লো। মাথা হেঁট কোরে তখন তিনি কম্পিত স্বরে বোল্লেন, “অত ফ্যাঁসাদে কাজ নাই, তাদের তলব দিবার দরকার নাই, ব্রজকিশোরীকে আপনি দেখতে চাচ্ছেন, ব্রজকিশোরীকে আমি আনিয়ে দিচ্ছি, ব্রজকিশোরীকে দেখুন, যে যে কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে ইচ্ছা হয়, করুন, ঘটককে, পোদ্দারকে তলব দিবার দরকার নাই।”

    অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে মৃদ হাস্য কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “তিনটিই আমার দরকার; ব্রজকিশোরীকেও দরকার, ধনঞ্জয়কেও দরকার, বংশীকেও দরকার। ব্রজকিশোরীকে যারা এখানে রেখে গিয়েছে, তারা চোর; যারা যারা চোরের সহায়তা করে,—জ্ঞানেই হোক, অজ্ঞানেই হোক, যারা যারা চোরের সহায়তা করে, বিচারস্থলে তাদের সকলকেই আকর্ষণ করা অবশ্য কর্ত্তব্য।”

    রমণীবল্লভের মুখে আর বাক্য থাকিল না; আসন থেকে উঠে ম্লানবদনে তিনি একবার অন্দরের দিকে গেলেন। দারোগার আদেশে দুইজন বরকন্দাজ পূর্বকথিত দুইব্যক্তির অন্বেষণে গেল। যে বেঞ্চখানিতে আমরা বোসে ছিলেম, তারই ঠিক পশ্চাতে এক সুদীর্ঘ বাতায়ন; সম্মুখদিকে খড়খড়ির পাখি বন্ধ, ভিতরদিকে অর্গল বন্ধ ছিল; আমি জানতে পাল্লেম, ভিতরদিক থেকে ধীরে ধীরে সেই অর্গল উদ্ঘাটিত হলো। দ্বার উন্মুক্ত। যখন বন্ধ থাকে, তখন দেখায় যেন গবাক্ষ; বাস্তবিক সেটা খড়খড়িযুক্ত দরজা; সদরে অন্দরে গতিবিধির একটা দ্বিতীয় দ্বার। ভিতরদিকে দর-দালান; সেই দর-দালানে স্ত্রীলোকেরা ছিলেন, দ্বার উন্মুক্ত হবামাত্র তাঁরা সকলেই দুইধারে সোরে সোরে দাঁড়ালেন, চৌকাঠের উপর রমণীবল্লভ। তাঁর পশ্চাতে অর্ধ অবগুণ্ঠনবতী একটি বালিকা; বুঝতে না পারুক, আমি বুঝলেম, কে সেই বালিকা। বালিকার দর্শন কোরেই আমার নয়নযুগল উৎফুল্ল।

    বাবু রমণীবল্লভ আমাদের দিকে সোরে এলেন, স্ত্রীলোকেরা আমাদের দেখতে না পান, সেই রকমে আমরাও একটু সোরে সোরে বোসলেম; খড়খড়ির কপাটে হস্তাপর্ণ কোরে বালিকাটি সেই চৌকাঠের ধারে নতমুখী হয়ে দাঁড়ালেন।

    ডেপুটিবাবু সেই সময় আপনার চেয়ারখানি সেই খড়খড়ির দিকে সোরিয়ে নিয়ে, স্থিরনয়নে একবার বালিকাটির আপাদমস্তকে নিরীক্ষণ কোল্লেন; কুমারীকন্যা, অবগুণ্ঠনবসনে পূর্ণ বদনমণ্ডল আবৃত ছিল না, মুখখানিও তিনি দেখলেন; আমরা একটু তফাতে তফাতে গা-ঢাকা ছিলেম, কুমারী আমাদের দেখতে পেলেন না। সুধীর বিনম্রবচনে কুমারীকে সম্বোধন কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “মা! আমি এখানকার মেজেষ্টার, তোমার কোন ভয় নাই, যে যে কথা আমি তোমারে জিজ্ঞাসা কোরবো, কাহারো উপরোধ অনুরোধ মনে না কোরে নিয়ে তুমি সেই কথাগুলির উত্তর দিও।”

    কুমারীকে আমরা তখন দেখতে পাচ্ছিলেম না, ডেপুটিবাবুর কথায় কুমারী কি প্রকার সঙ্কেত জানালেন, তাও আমরা দেখতে পেলেম না, একটি কথাও শুনতে পেলেম না, ডেপুটিবাবু প্রশ্ন আরম্ভ কোল্লেন।

    প্রথম প্রশ্ন।—তোমার নাম কি?

    কুমারী।— (ধীরস্বরে) অমরকুমারী।

    ডেপুটি।—তোমার আর কোন নাম আছে?

    কুমারী।—না।

    ডেপটি।—এখানে ব্রজকিশোরী নামে আর কোন বালিকা আছে?

    কুমারী।—এই বাড়ীর লোকেরা আমারেই ব্রজকিশোরী বলেন।

    ডেপুটি।—কেন বলেন?

    কুমারী।—যারা আমারে এখানে এনে এই বাবুর বাড়ীতে রেখে গিয়েছে, তারা আমার সত্যনামটি গোপন কোরে ঐ নামে পরিচয় দিয়েছে।

    ডেপটি।—কারা তোমাকে এখানে এনেছে?

    কুমারী।—তাদের সকলকে আমি চিনি না। একজনকে চিনি, সে লোকটিও তার নিজের নাম প্রকাশ করে নাই।

    ডেপটি।—তুমি তার আসল নাম জান?

    কুমারী।—জানি।

    ডেপুটি।—কি?

    কুমারী।—জটাধর।

    ডেপুটি।—সেই জটাধর এখানে কি নামে পরিচয় দিয়েছে?

    কুমারী।—চণ্ডেশ্বর।

    ডেপুটি।—চণ্ডেশ্বরের সঙ্গে আর কে কে ছিল?

    কুমারী।—চিনি না।

    ডেপুটি।—হাঁ তা তো শুনেছি, কিন্তু তারা কজন? তাদের নাম তুমি জানতে পেরেছ?

    কুমারী।—চণ্ডেশ্বর ছাড়া আর দু-জন; একজনের নাম গণেশ্বর, আর একজনের নাম মিয়াজান।

    ডেপুটি।—তাদের সঙ্গে তুমি এখানে কেন এসেছিলে?

    কুমারী।—চোখ-মুখ বেঁধে তারা আমারে চুরি কোরে এনেছে।

    ডেপুটি।—কোথা থেকে এনেছে?

    কুমারী।—মুর্শিদাবাদ থেকে।

    ডেপুটি।—যাদের নাম তুমি বোল্লে, তারাই তোমারে চুরি কোরেছে? সে কথা তুমি ঠিক বোলতে পার?

    কুমারী।—না, তারা চুরি করে নাই, চোরেরা এক জায়গায় এনে জটাধরের হাতে—যে লোক এখন চণ্ডেশ্বর সেজেছে, সেই জটাধরের হাতে ধোরে দেয়। গণেশ্বর আর মিয়াজান সেইখানে এসে জোটে।

    ডেপুটি।—যারা চরি কোরেছিল, তাদের নাম তুমি জানতে পেরেছিলে?

    কুমারী।—চোরের নাম কেমন কোরে জানবো?

    ডেপুটি।—এ বাড়ীর বাবুকে তুমি আর কখন দেখেছিলে?

    কুমারী।—না।

    ডেপুটি।—এ বাড়ীতে এখন তুমি থাকতে ইচ্ছা কর?

    কুমারী।—না থেকে আর কোথায় যাবো? আমার কেহ নাই।

    ডেপুটি।—তবে যে শুনছি, তোমার পিতা তোমার এই বাবুর কাছে গোছিয়ে রেখে গিয়েছেন।

    কুমারী।—মিথ্যাকথা। আমার জন্মের পর অবধি পিতা আমার নিরুদেশ। মা ছিলেন, সম্প্রতি তিনিও স্বর্গে গিয়েছেন। যে লোক আমারে তাঁর মেয়ে বোলে পরিচয় দেয়, সে আমাদের কেহই নয়।

    এইখানে রমণীবাবুর দিকে দৃষ্টিপাত কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “কেমন বাবুজী! মেয়েটির কথাগুলি শুনলেন? চোরে চুরি কোরে এনেছে, একটা দুষ্টলোক এই মেয়ের পিতা বোলে পরিচয় দিচ্ছে, সেই লোকের কথায় বিশ্বাস কোরে এই বালিকাকে আপনি আপন বাড়ীতে আটক রেখেছেন, আইনের ক্ষমতায় আমরা এই অপহৃতা বালিকাকে উদ্ধার কোত্তে চাই, আপনি আমল দিতে চান না। আইনের চক্ষে আপনিও অপরাধী হোতে পারেন।”

    রমণীবাবুর মুখে বাক্য নাই। আমার দিকে আর মণিভূষণের দিকে নেত্রসঙ্কেত কোরে ডেপুটিবাবু আমাদের উভয়কেই নিকটে আহ্বান কোল্লেন; সওয়াল-জবাব শ্রবণের নবীন উৎসাহে আমার হৃদয় তখন পূর্ণ হোচ্ছিল, পূর্ণ উৎসাহে তৎক্ষণাৎ আমরা তাঁহার নিকটবর্তী হোলেম। আমাদের ঠিক সম্মুখে অমরকুমারী।

    আমাদের দিকে অঙ্গলিনির্দেশ কোরে, সস্নেহ সম্বোধনে ডেপুটিবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “দেখ দেখি অমরকুমারি, দেখ দেখি মা, ভাল কোরে চেয়ে দেখ দেখি, এই দুটি বাবুকে তুমি চিনতে পার কি না?”

    অমরকুমারীর সজল পদ্মনেত্র আমাদের উভয়ের মুখের দিকে উত্তোলিত, নেত্রপট সজল উজ্জ্বল। এক একবার এমন হয়, আকাশে মেঘ থাকে না, অথচ অকস্মাৎ বৃষ্টি আসে। অমরকুমারীর চক্ষে আমি সেই ভাব দর্শন কোল্লেম। সজল পদ্মনেত্র; লাবণ্য-হিল্লোলে স্বভাবতঃ সৰ্বক্ষণ ঢল ঢল করে; আমাদের প্রতি সেই নেত্র নিক্ষিপ্ত হবামাত্রই দর দরধারে অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো, সমষ্টিতে চেয়ে থেকেই বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে মৃদুগুঞ্জনে অশ্রমুখী কুমারী তিনবার উচ্চারণ কোল্লেন, “হরিদাস! মণিভূষণ! দাদা!”

    ক্ষণেকের জন্য হাকিমিত্ব বিস্মৃত হয়ে বন্ধুত্বের অমৃতস্বরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “কেঁদো না মা, কেঁদো না! অবস্থা আমি সমস্তই বুঝলেম। এই দুটি বালক তোমার আত্মীয়, এই দুটি বালক তোমার উদ্ধারের নিমিত্ত বিস্তর আয়াস, বিস্তর কষ্ট, বিস্তর অর্থ ব্যয় স্বীকার কোচ্ছেন, তোমারে উদ্ধার কোরে এই দুই বালকের হস্তেই সমপর্ণ করা হবে, তুমি কেঁদো না।”

    অমরকুমারীর চক্ষে জল দেখে আমার চক্ষও শুষ্ক থাকলো না, কুমারীর অলক্ষিতে আমিও ঘন ঘন আমার সিক্তনেত্র মার্জন কোত্তে লাগলেম; বিনা প্রশ্নে ডেপুটিবাবুর দিকে চেয়ে অমরকুমারী বোলতে লাগলেন “চণ্ডেশ্বর পাষণ্ড, তার অসাধ্য কর্ম নাই। এই হরিদাস আমার পরম বন্ধু; এই মণিভূষণ আমার দাদা হন, মণিভূষণের পিতা শান্তিরাম দত্ত আমার পিতৃতুল্য, রক্ষাকর্তা, আশ্রয়দাতা; তাঁর আশ্রয় থেকেই চোরেরা আমাকে চুরি কোরেছে! সেইখানেই আমি ফিরে যাব! আপনি দয়া করুন, হরিদাসের সঙ্গে-মণিভূষণের সঙ্গে মুর্শিদাবাদেই আমি ফিরে যাবো।”

    হাকিমের সঙ্গে অমরকুমারীর কথা হোচ্ছিল, সে সময় আমার কথা কওয়া উচিত বিবেচনা করি নাই, কিন্তু কুমারীর কাতরতা দেখে আমি আর চুপ কোরে থাকতে পাল্লেম না, হাকিমের অনুমতি নিয়ে আশ্বাসবচনে বোল্লেম, “কেঁদো না, অমরকুমারি! সেই জন্যই আমরা এসেছি; কত ঠাঁই ঘরে ঘরে, অজ্ঞাত-লোকমুখে বার্তা পেয়ে এ অঞ্চলে আমরা এসেছি, বহরমপুরে মোকদ্দমা হোচ্ছে, তোমারে যারা চুরি কোরেছিল, তাদের মধ্যে দুজন চোর সেই খানে ধরা পোড়েছে, হাজতে আছে, সর্দার আসামীটা ধরা পোড়লেই চুড়ান্ত বিচার হবে। এই ডেপুটিবাবুর অনুগ্রহে তোমারে আমরা উদ্ধার কোরে নিয়ে যাব। সর্দার আসামীটা কে জান? এখানকার চণ্ডেশ্বর, ওরফে জটাধর, ওরফে রক্তদন্ত। সেই লোকটা নিরুদ্দেশ। আমি সেই—

    কথা আমার শেষ হলো না। থানার বরকন্দাজেরা দৌত্যকার্য সমাধা কোরে ফিরে এলো, সঙ্গে এলো ধনঞ্জয় ঘটক আর বংশীধর পোদ্দার। ডেপুটিবাবু সেই দুজনকে যে যে কথা জিজ্ঞাসা করা আবশ্যক বিবেচনা কোল্লেন, সেই সকল প্রশ্নে যে প্রকার উত্তর পেলেন, তাতে কোরে আমার উক্তিগুলিই সপ্রমাণ হলো। রমণীবাবুর সহধর্মিণীর সততা স্মরণ কোরে রমণীবাবুকে দোষমুক্ত করবার ইচ্ছা আমার মনে মনে জাগছিল, কিন্তু ধনঞ্জয়ের কথাপ্রমাণে সেই ইচ্ছাকে ফলবতী করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। ধনঞ্জয় বোল্লে, “বাবু রমণীবল্লভ একদিন আমারে ডেকে অনুরোধ করেন, একটা বর দেখ। টাকাওয়ালা হওয়া চাই। পরমসুন্দরী কন্যা, কুমারীকাল উত্তীর্ণ, জাতি-কুল-বিচার আবশ্যক করে না, টাকাওয়ালা বর দেখ। সেই অনুরোধে আমি এই বংশী পোদ্দারকে যোগ্যপাত্র ঠিক কোরেছি। বংশী পোদ্দার নগদ দুহাজার টাকা পণ দিবে, আমি আর রমণীবাবু উভয়েই ঘটক, উভয়ে আমরা ৫০০৲ টাকা পাব, মেয়েটি যারা এনেছে, তারা পাবে দেড় হাজার, এইরূপ বন্দোবস্ত। কথা যখন ধার্য হয়, কন্যাপক্ষের লোকেরা তখন এই বাড়ীতে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা তিনজন, কন্যার পিতার নাম চণ্ডেশ্বর।”

    তদন্তের আর কোন অঙ্গ বাকী থাকলো না। হাকিম তখন রমণীবাবুকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এ সম্বন্ধে আপনার আর কি বক্তব্য আছে? বুঝতে পাল্লেন, সমস্তই জাল, পূৰ্বেই বুঝেছিলেন, টাকার খাতিরে জুয়াচোর লোকের মুরব্বিগিরী কোত্তে হবে; সেটি না বুঝলে ‘জাতিকুলের আবশ্যক করে না’ ঘটকের প্রতি এমন আম-হুকুম দিতে কখনই আপনার সাহস হতো না। আপনি ভদ্র-সন্তান, বংশমর্যাদা আছে, মান-সম্ভ্রম আছে, এমন ঘৃণিত কার্যে আপনার প্রবৃত্তি, বড়ই আশ্চর্য! অমরকুমারীকে আমরা ঢাকায় নিয়ে চোল্লেম, আপনাকেও সেখানে যেতে হোচ্ছে, ঘটকালী কোরেছেন ধনঞ্জয়, বর হয়েছেন বংশী পোদ্দার এ দুজনকেও আমি ছাড়তে পাচ্ছি না, আপনারা তিনজনে পুলিশের নজরবন্দীতে থাকবেন। যারা এই অমরকুমারীকে আপনার বাড়ীতে রেখে গিয়েছে, এক সপ্তাহের মধ্যে আপনি তাদের হাজির কোরে দিবেন, এই মর্মে একবার লিখে দিতে হবে।”

    অন্দরের দিকে স্ত্রীলোকের ক্রন্দনধ্বনি সমুত্থিত। বৌমার সদ্ব্যবহার স্মরণ কোরে, মা-লক্ষ্মীর মত শান্তমূর্তি মনে কোরে মনে মনে আমি কাতর হোলেম। বুদ্ধির দোষে, অর্থ-লোভে রমণীবাবু আপন ফাঁদে আপনি জোড়িয়ে পোড়েছেন, হাকিমের সাক্ষাতে জাল-জুয়ারি প্রকাশ হয়ে পোড়লো, রক্ষা করা দুঃসাধ্য, তথাপি পুলিশের হস্তে বাবু যাতে বেইজ্জৎ না হন, সে বিষয়ে আমি বিশেষ যত্নবান থাকবো, এইরূপ স্থির কোল্লেম।

    আর সেখানে কালবিলম্ব করা নিষ্প্রয়োজন। ডেপুটিবাবু প্রস্তুত হোলেন। ঢাকা থেকে দুখানি নৌকা এসেছিল, আর একখানি বজরা ভাড়া করা হলো, বজরাতে অমরকুমারীকে তুলে দিবার সময় ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “বালিকার সঙ্গে একজন স্ত্রীলোক রাখা চাই।” সে স্ত্রীলোক কোথায় পাওয়া যায়, অনেক বিবেচনা কোরে রমণীবাবুকে আমি বোল্লেম, “আপনার বাড়ীর সেই দাসীটি, যার নাম রেবতী, সেই রেবতীকে আমাদের সঙ্গে যেতে বলুন; অমরকুমারীকে রেবতী ভালবাসে, বিদেশিনী ব্রজকিশোরী এখন অমরকুমারী হয়েছেন, এ পরিচয়ে, রেবতী অবশ্য আমোদিনী হয়েছে, অমরকুমারীর সঙ্গে রেবতী থাকলেই ঠিক হবে।”

    ললাটে সৰ্বশিরা বকুঞ্চিত কোরে বাবু রমণীবল্লভ তীব্রদৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চাইলেন। আমি রেবতীর নাম জানি, এটা অবশ্য তাঁর পক্ষে বিষম বিস্ময়কর বোধ হলো। আরো আমি কান পেতে শুনলেম, বাড়ীর মেয়েরাও সেই কথা নিয়ে বিস্ময়ে বিস্ময়ে চুপি চুপি গুঞ্জন কোত্তে লাগলেন। একজন বোল্লেন, “এ ছেলে কে গো! এ ছেলে আমাদের রেবতীর নাম কেমন কোরে জানলে?”

    আর কেমন কোরে জানলে। এ ছেলে কোথাকার কত কথা জানে, কৈফিয়ৎ দিবার সময় ঘটে না; এ ক্ষেত্রেও সময় ঘোটলো না, ডেপুটিবাবুর অনুরোধে রমণীবাবুর সম্মতিতে রেবতী আমাদের সঙ্গিনা হলো। বজরাতে আমি, মণিভূষণ, অমরকুমারী, রেবতী, আর একজন পুলিশ-প্রহরী; একখানি নৌকায় ডেপুটিবাবু রমণীবাবু আর একজন পুলিশ-প্রহরী, আর একখানি নৌকায় দারোগার সঙ্গে বাকী লোকগুলি সব; হরিহরবাবুর সরকার আর চাপরাসীও সেই নৌকায় থাকলো।

    আমরা ঢাকায় চোল্লেম। একবার ইচ্ছা হয়েছিল, একখানি চিঠি লিখে হরিহরবাবুকে এই কার্যের ফলাফল জ্ঞাপন করি, অমরকুমারীর উদ্ধার সংবাদে হরিহরবাবু তুষ্ট হবেন, মনে মনে সেটি আমি বুঝেছিলেম, কিন্তু চিঠি লেখা হলো না। আমি কোথায় গেলেম, কি কোল্লেম, ঢাকার আদালতে কার্যফল কি প্রকার দাঁড়ালো, কিছুই তিনি জানতে পাল্লেন না, অবসর অভাবে চিঠি লেখা হলো না। এইবার ঢাকা পৌঁছে চিঠি লিখবো। দরিয়ায় আমাদের তরণী ভাসলো।

    বহু শ্রম, বহু আয়াস, বহু বাদানুবাদ, বহু চিন্তা, আর বহুতর নীরস বিষয়ের আলোচনার পর, মানুষের মনে স্বভাবতই একটু আমোদ-কৌতুকের ভাব উদয় হয়। নূতন উৎসাহে জলপথ তরণী-আরোহণযাত্রা; বারিসিক সুশীতল সমীরণ-সেবনে চিত্ত প্রফুল্ল; অনেকদিন অদর্শনের পর অমরকুমারীর দর্শনলাভ; এই সকল সুখসংযোগে আমার মনে একটু আমোদকৌতুকের ভাবোদয়। মৃদু বাতাসে হেলে দুলে তরণী চোলেছে; দাঁড়ীমাঝীরা অভ্যাসমত জাতীয়সুরে জংলা রাগিণীতে গান ধোরেছে; আমরা অনেক দূরে এসে পোড়েছি। সেই সময় রেবতীকে নিয়ে একটু কৌতুক করবার ইচ্ছা হলো। যতক্ষণ আমরা তরণীতে আছি, ততক্ষণ রেবতী একটিও কথা কয় নাই, অমরকুমারীও নীরব, মণিভূষণের সঙ্গে আমার দুটি একটি কথা চোলছিল, সে কথার প্রসঙ্গ অন্য প্রকার। অমরকুমারীর সঙ্গে সত্য কি আমার একটিও কথা হয় নাই?—হয়েছিল, কথা কিন্তু ওষ্ঠরসনায় নয়, চক্ষে চক্ষে। রেবতীর সঙ্গেও সেই রকম চক্ষে চক্ষে কথা।

    এইবার আমি রেবতীর মুখের কথা শুনবো। রেবতীর দিকে একটু সোরে গিয়ে তার মুখপানে চেয়ে সকৌতুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা রেবতি! সেই চণ্ডেশ্বর! নামটি কিন্তু বেশ। শুনলে একটু একটু ভয় হয়, কিন্তু দেখলে বোধ হয় ততটা ভয় থাকে না। রেবতি! তুমি সেই চণ্ডেশ্বরকে দেখেছ; বাড়ীতে এসেছিল, নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কথা কোয়েছ; আচ্ছা বল দেখি, চণ্ডেশ্বরের চেহারা কেমন? চণ্ডেশ্বরের গলার আওয়াজ কেমন?”

    একদৃষ্টে আমার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে রেবতী কিয়ৎক্ষণ পূৰ্ববৎ নিস্তব্ধ হয়ে থাকলো। পুনরায় যখন আমি ঐ দুই প্রশ্ন কোল্লেম, তখন আমার আগ্রহ বুঝতে পেরে রেবতী উত্তর কোল্লে “চণ্ডেশ্বর?—চণ্ডেশ্বরের চেহারা তুমি শুনবে? কেন গা? তুমি কি রামায়ণ পড় নাই? লঙ্কাকাণ্ড?—পড় নাই? —নল, নীল, গয়, গবাক্ষ, হনুমান, জাম্বুবান, এ সব কি তুমি পড় নাই? চণ্ডেশ্বরের চেহারাটা ঠিক সেই রকম। একবার মনে হয় বাঁদর, একবার মনে হয় ভাল্লুক। চণ্ডেশ্বর দু-পায়ে চলে; দু-পায়ে না চোলে চণ্ডেশ্বর যদি চারপায়ে চোলতো, তা হোলেই ঠিক মানাতো; পিঠের উপর মস্ত একটা ঢিবি, চারি পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ালে তাকে আর মানুষ বোলে চিনতে হতো না। আধখানা বাঁদর, আধখানা ভাল্লুক। গলার আওয়াজটাও ভাল্লুকের মতন।”

    কিছুই সন্দেহ ছিল না, তথাপি রেবতীর মুখের বর্ণনা শুনে, সম্পূর্ণ সংশয়শূন্য হোলেম। রেবতীর বর্ণনায় কবিত্বের ভাব অনুভূত হলো। চণ্ডেশ্বরকে যদি ঢাকায় পাওয়া যায়, গলায় দড়ী বেঁধে রেবতীর হাত দিয়ে তারে একবার নাচাবো, অন্তরে হাস্য রেখে সেই ইচ্ছাকে হৃদয়ে আমি স্থান দিয়ে রাখলেম।

    রেবতী আমার সঙ্গে কথা কোচ্ছে, চণ্ডেশ্বরের রূপবর্ণনা শুনে আমি আমোদ কোচ্ছি, প্রসঙ্গ ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা রেবতি! সম্প্রতি একদিন সন্ধ্যাকালে তোমাদের বাড়ীতে কে একটি বিদেশিনী গিয়েছিল, জলের ঘাটে যার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল, সেই বিদেশিনীটি তোমার চক্ষে কেমন ঠেকেছিল?”

    অন্যমনকে চোমকে উঠে, চকিতনেত্রে আবার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে রেবতী উত্তর কোল্লে, “সে বিদেশিনীর কথা তুমি কি কোরে জানতে পাল্লে? সন্ধ্যাকালে এসেছিল, ভোরবেলা পালিয়েছিল, তার কথা তুমি কার মুখে শুনলে?”

    ও কথায় যেন আমি কান দিলেম না, মুখে হাসি আসছিল, সে হাসি চেপে রেখে, গম্ভীরবদনে আবার আমি প্রশ্ন কোল্লেম, “আচ্ছা রেবতি! ব্রজকিশোরীকে দেখে সে বিদেশিনী তেমন কোরে ঘোমটা টেনে মুখ ঢেকেছিল কেন?”

    ক্রমশঃ রেবতীর মনে বেশী বেশী বিস্ময়ের আবির্ভাব। অমরকুমারীর মুখের দিকে চেয়ে দেখলেম, এবারে অমরকুমারীর মুখেও বিলক্ষণ বিস্ময়ের লক্ষণ প্রতিভাত। কৌতুকের নূতন তরঙ্গ প্রবাহিত। রেবতীর মুখে কোন উত্তর পাওয়া গেল না; মুখের বাক্যে পাওয়া গেল না, কিন্তু মুখের ভঙ্গীতে বেশ উত্তর পাওয়া গেল। আশ্চর্য জ্ঞান।

    তৃতীয়বার আমি বোল্লেম, বিদেশিনী গণনা জানে, হাত-মুখ দেখে মানুষের ভাগ্যের ভবিষৎ ফলাফল বোলতে পারে না দেখেও বোলতে পারে! ঘোমটা দিয়ে ব্রজকিশোরীর ভাগ্যফল বোলেছিল হাতও দেখে নাই, মুখও দেখে নাই, কিছুই করে নাই; ঘোমটার ভিতর হয় তো জ্যোতিষবিদ্যার পুঁথি রাখে। অদ্ভুত বিদেশিনী। গণকঠাকুরেরা পুরুষমানুষ, মেয়েরা বলে গণৎকার, কিন্তু সেই বিদেশিনী গণকঠাকুরও হোতে পারে না, গণৎকারও হোতে পারে না। জ্যোতিষবিদ্যাতে আগে আগে স্ত্রীজাতির অধিকার ছিল। তুমি রেবতী, তুমি যদি রাজা বিক্রমাদিত্যের আমলে রাক্ষসের দেশে, রাক্ষসীদের কাছে জ্যোতিষবিদ্যা শিক্ষা কোত্তে, তুমিও একজন খনাবতী, লীলাবতী হোতে পাত্তে। আচ্ছা, সেকালের কথা যাক, সেই বিদেশিনী অত গণনা কি কোরে জানতে পেরেছিল?”

    এ বারেও রেবতী উত্তর দিলে না। অমরকুমারীর দিকে মুখ ফিরিয়ে প্রশান্তবদনে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তুমি জানো অমর? তুমিই ত ব্রজকিশোরী ছিলে? ঘোমটা-ঢাকা বিদেশিনী তোমার ঐ মুখখানি না দেখেই সাফ সাফ বোলেছিল, ‘চোরে চুরি কোরেছে, এ কষ্ট থাকবে না, হারানিধি প্রাপ্ত হবে, শীঘ্র তুমি মুক্তি পাবে।” এ সব কথা কেমন কোরে জেনেছিল? কেমন কোরে বলেছিল? ফল তো দেখছি ঠিক হয়েছে, শীঘ্রই তুমি মুক্তি পেয়েছ, চোরের সন্ধান হোলেই এখন সব আপদ চুকে যায়। হবেও তা, কিন্তু বল দেখি অমরকুমারি, সে বিদেশিনী কোথায় গেল?”

    এইবার একটু হেসে অমরকুমারী বোল্লেন, “তুমিও যে দেখছি, দিব্যি গণৎকার হয়েছ! তুমিই কেন বল না, সে বিদেশিনী কোথায় গেল? এসেছিল, বোলেছিল, পালিয়েছিল, এ সব তুমি জানতে পেরেছ, আগাগোড়া সব কথা বোলতে পেরেছে, কোথায় গেল, সেটি কি তুমি জানতে পার না?”

    আমি মনে কোল্লেম হাসি; কিন্তু হাসলেম না; সমভাবে সমম্বরেই বোল্লেম, “তাই তো আমি ভাবছি! বিদেশিনী কোথায় গেল, তোমারে দেখা দিয়ে চুপি চুপি পালিয়ে গেল, আমি একবার সেই বিদেশিনীকে যদি দেখতে পাই, গোটাকতক মনের কথা জিজ্ঞাসা করি। অন্বেষণ কোরে বেড়াচ্ছি, ধোত্তে পাচ্ছি না; একটিবার দেখা হলে আগেই জিজ্ঞাসা করি চণ্ডেশ্বরের সন্ধান। তুমি কি বলতে পার, তোমারে এক জায়গায় ফেলে রেখে চণ্ডেশ্বর কোথায় লুকিয়েছে? পার বোধ হয়? তুমিও বিদেশিনী ছিলে, সেটিও বিদেশিনী হয়ে এসেছিল; দুটি বিদেশিনী মিলন হয়েছিল, বিদেশিনীর ছায়া তোমার গায়ে লেগেছে; বিদেশিনীর গায়ের বাতাস তোমার গাত্র স্পর্শ কোরেছে; তুমিও বোধ হয়, একটি গণৎকার হয়ে আছ; আমিও যেন তাই দেখছি। বল দেখি, সেই পাষণ্ড চণ্ডেশ্বর এখন কোথায়?”

    হস্তসঞ্চালন কোরে অমরকুমারী বোল্লেন, “বোলো না, বোলো না হরিদাস! ও নাম আমার কানের কাছে আর তুমি বোলো না। শুনলেই আমার গা কাঁপে; প্রাণ ধড়ফড় করে! তিনটে নাম একরকম ভয় দেখায়! যে নামটা তুমি দিয়েছ, সেই নামটাতেই আরো বেশী ভয়!”

    রেবতী দেখলে, অমরকুমারীর সঙ্গে আমার অনেকদিনের আলাপ, চণ্ডেশ্বরের সঙ্গেও আমার অনেকদিনের পরিচয়, আশ্চর্য মনে কোরে ব্যগ্রতা জানিয়ে, রেবতী আমারে বোল্লে, “তুমি বাপু হরিদাস! তুমি সব জানো, তুমি সব পারো, তুমিও গণনা জানো, বিদেশিনীর সব কথা তুমি ঠিক ঠিক বোলচো; বাপু হরিদাস! আমার একটি কথা কি তুমি রাখবে?”

    কি জানি কি কথা, কি কথা বলবার জন্য রেবতী ও রকম ব্যগ্রতা জানাচ্ছে, শীঘ্র স্থির কোত্তে না পেরে, প্রশ্নের উপর প্রশ্ন দিয়ে আমি জানতে চাইলেম, রেবতীকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কি তোমার কথা?”

    মুখখানি একটু ম্লান কোরে রেবতী তখন বোল্লে, “কথা আমার আর কিছুই নয়, হাকিমের লোকেরা আমাদের বড়বাবুটিকে ধোরেছে, আড়াল থেকে শুনে শুনে কথার ভাবে আমি বুঝতে পেরেছি, হাকিমবাবুটি তোমার খুব বশীভূত; আমাদের বাবুটিকে হাকিম যেন ছেড়ে দেন, বিনা দোষে কোন রকম শাস্তি না দেন, এইটি আমার কথা। চোর হলো চণ্ডেশ্বর, চোর হলো তার দলের লোকেরা, আমাদের বাবু কি অপরাধে ধরা পড়েন, বাবু আমাদের নেহাৎ ভালমানুষ। যে যা বলে, তাই তিনি শোনেন, তাই তিনি করেন, এই তাঁর দোষ। তুমি বাছা, বাবুটিকে খোলসা কোরে দিও, সৰ্বমঙ্গলা তোমার মঙ্গল কোরবেন।”

    সৰ্বমঙ্গলাকে স্মরণ কোরে আশ্বাসবাক্যে আমি বোল্লেম, “তোমাদের বৌমাটি সৰ্বমঙ্গলা, সেই সৰ্বমঙ্গলার পূণ্যবলে সকল দিকে মঙ্গল হবে, তোমাদের অমরকুমারীকে শ্রীবিষ্ণঃ!—তোমাদের ব্রজকিশোরীকে জিজ্ঞাসা কর, চণ্ডেশ্বরের সঙ্গে তোমাদের বাবুর বন্দোবস্তের কথাটা সত্য কি না? সে কথা যদি সত্য না হয়, রমণীবাবু বেকসুর খালাস পাবেন; ধনঞ্জয় ঘটক বন্দোবস্তের কথা প্রকাশ কোরেছে, তাতে বাবতে ৫০০৲ টাকা বখরা পাবে, এই কথা বোলেছে; এ কালের ঘটকেরা সব বলে; এখনকার ঘটকেরা প্রায়ই মিথ্যাবাদী হয়, আদালতেও তার প্রমাণ আছে। বাবু যদি ধনঞ্জয়ের কথাটা মিথ্যা বলেন, তা হোলে বাবুর নামে কোন দোষ দাঁড়াতে পারবে না।”

    হাঁ কোরে আমার কথাগুলি শুনে রেবতী যেন সকল কথার সারমর্ম অক্ষরে অক্ষরে গ্রাস কোল্লে; কিন্তু অন্যকথার দিকে বেশী মনোযোগ না রেখে, বিস্মিত নয়নে অমরকুমারীর দিকে একবার চেয়ে, সমষ্টিতে আবার আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে, সমান বিস্ময়ে বোল্লে, “কে গা তুমি হরিদাস? কোথা কে তুমি এসেচ? আমাদের বৌমাটি সৰ্বমঙ্গলা সে কথা তুমি কেমন কোরে জানলে?”

    কথাও সত্য। রেবতীর বৌমাটিকে আমি কেমন কোরে জানলেম? আমার কথা শুনে রেবতীরও যেমন বিস্ময়, অমরকুমারীরও তদ্রূপ বিস্ময়। সে বিস্ময় ভঞ্জন করবার কৈফিয়ৎ কি?

    অবসর মন্দ নয়। সত্য কৈফিয়তেই এখানে কাজ হবে। রেবতীর বিস্ময়সচক প্রশ্নে প্রথমে উত্তর না দিয়ে অমরকুমারীকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “সে রাত্রে সেই যে সেই বিদেশিনী ঘরের ভিতর ঘোমটা দিয়ে তোমার সঙ্গে কথা কোয়েছিল, তুমি কি সেই বিদেশিনীকে তখন চিনতে পেরেছিলে?”

    অমরকুমারী বোল্লেন, “তাও কি তুমি সম্ভব মনে কর? কখন যারে দেখি নাই, ঘোমটাতেই যার মুখ ঢাকা ছিল, তারে আমি চিনবো এমন কথা কেন তোমার মনে এলে? কি ভেবেই বা তুমি জিজ্ঞাসা কোল্লে?”

    মৃদু হাস্য কোরে আমি বোল্লেম, “বৌমাকে আমি কেমন কোরে জেনেছি, রেবতী আমার মুখে সেই কথা শুনতে চায়; বিদেশিনীকে তুমি চিনতে পোরছিলে কি না, কেমন কোরে তেমন কথা আমার মনে এলো, আমার মুখে তুমি সেই কথা শুনতে চাও; সমস্যা বিষম। অমরকুমারী! এ সমস্যা-পূরণে আমি যদি এখন হৃদয়-কপাট মুক্ত করি, তোমরা উভয়েই মহা বিস্ময়াপন্ন হবে।”

    বক্রনয়নে আমার দিকে দৃষ্টিপাত কোরে অমরকুমারী বোল্লেন, “আমার আর এখন মহা বিস্ময়াপন্ন হবার কিছুই বাকী নাই, এ সকল মহা বিস্ময়ের শেষ কত দূরে, তাও এখন আমি জানতে পাচ্ছি না। এই বিস্ময়ের উপর যদি আবার নূতন বিস্ময় উৎপাদন কোরে দাও, তাতে আমি অভিভূত হব না। যেটা যখন অভ্যাস হয়ে আসে, যতই ভয়ঙ্কর হোক, যতই কষ্টকর হোক, যতই বিস্ময়কর হোক, তাতে আর ততটা গুরত্ব থাকে না। তুমি বল, রেবতী যে কথা তোমারে জিজ্ঞাসা কোরেছে, সে কথার উত্তরে যা তুমি বোলতে চাও, প্রকাশ কোরে বল, বিস্ময়কে আলিঙ্গন কোত্তে আমি ভালবাসি।”

    বাবু মণিভূষণ আমাদের তিনজনের ঐরূপ রহস্যোক্তি একমনে শ্রবণ কোচ্ছিলেন, কি যে সে সব কথা, সে সব কথার মর্মই বা কি, কিছুই তিনি অবধারণ কোত্তে পাচ্ছিলেন না; তাঁর মুখের ভাব দেখে, আমি বুঝতে পাচ্ছিলেম, বাজে কথা মনে কোরে তিনি একটু একটু বিরক্ত হোচ্ছিলেন। যাঁরা বিরক্ত হন, তাঁরা বিরক্ত থাকুন, মণিভূষণকে বিরক্ত রেখে অমরকুমারীকে আমি বোল্লেম, “অমর! এক বিষয়ে তোমাদের উভয়েরই আগ্রহ; তোমরা উভয়েই শ্রবণ কর। আমিই সে বিদেশিনী।”

    আমার মুখের দিকে চেয়ে রেবতী অবাক, রেবতীর মুখের দিকে চেয়ে অমরকুমারী চমকিতা, আমার মুখের দিকে চেয়ে মণিভূষণের চক্ষু নির্নিমেষ। তিনজনেই নিৰ্বাক। আমি বোলতে লাগলেম, “সত্য অমরকুমারী! আমিই সেই বিদেশিনী। তোমার অন্বেষণে নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে শেষে আমি মাণিকগঞ্জে উপস্থিত হই, জলের ঘাটে নারীবেশে রেবতীর সঙ্গে দেখা হয়; রেবতী আমারে বিদেশিনী পরিচয়ে বৌমার কাছে নিয়ে যায়, সেইখানে আমি বৌমাকে দেখি, স্নেহ-বাৎসল্য-মাখা মধুর বচনগুলি শ্রবণ কোরে অপ্রত্যাশিত স্নেহ-দয়া প্রাপ্ত হয়ে, বৌমার প্রতি আমার ভক্তি হয়। তার পর তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার অভিলাষ প্রকাশ করি। তুমি দর্শন দাও, চিনতে পার কি না পার, পরীক্ষার জন্য সেই সময় আমি অবগুণ্ঠন ধারণ কোরেছিলেম।”

    ঘন ঘন করতালি দিয়ে অমরকুমারী ঘন ঘন হাস্য কোত্তে লাগলেন। সমভাবে নিৰ্বাক থেকে রেবতী কেবল ঘন ঘন আমার দিকে দৃষ্টিপাত কোত্তে লাগলো, মণিভূষণ বিস্ময় প্রকাশ কোরে বারংবার আমারে বাহাদুরী দিলেন। কোন দিকেই আমার মন থাকলো না, আমি বোলতে লাগলেম, “অমরকুমারী! লোকমুখে কিছু কিছু, সন্ধান পেয়ে তোমারে দর্শন করবার জন্য নারীবেশে সেই বাড়ীতে আমি গিয়েছিলেম। তোমরা হয় তো মনে কোচ্ছ কৌতুক, মণিভূষণ মনে কোত্তে পারেন কৌতুক, রেবতী মনে কোত্তে পারে কৌতুক, কিন্তু তুমি পার না। অমরকুমারী! নারীবেশে সাজিয়ে দিয়ে বীরভূমে তুমি আমার প্রাণরক্ষা কোরেছিলে, নারীবেশে মাণিকগঞ্জে আমি তোমার উদ্ধারকামনায় গৃহস্থ লোকের অন্দরমহলে প্রবেশ কোরেছিলেম; ন্যূনকল্পে কৃতকার্য হয়েছি; নারীবেশকে নমস্কার করি। সংসারে নারীজাতি শক্তিরূপিণী; নারী যদি মহাশক্তির অনুগ্রহে নিজশক্তি পরিচালন করেন, সংসারের সকল কার্যই শুভ হয়; সৰ্বদা সকল স্থলেই সে শক্তির উচিত ব্যবহার হয় না বোলেই অনর্থ ঘটে। রমণীবাবুর সহধর্মিণীকে ভক্তির চক্ষে আমি দর্শন কোরেছি; দয়ার চক্ষে রেবতীকে আমি দর্শন করি, স্নেহের চক্ষে তোমারে আমি দর্শন করি, হৃদয়ে অহরহ তোমার মূর্তি ভাবি; শক্তিপূজায় সর্বদা আমার আনুরক্তি, শক্তির কৃপাতেই স্ত্রীবেশধারণে আমার মঙ্গল ফললাভ হয়েছে। মুখে সামান্য অবগঠন ছিল, সেইজন্য তুমি আমারে চিনতে পার নাই।”

    অকস্মাৎ অমরকুমারীর মুখমণ্ডল রক্তিম আভায় রঞ্জিত হয়ে উঠলো। স্ত্রীজাতিসূলভ গৌরবে স্ফূর্তিমতী হয়ে গৌরবিণী বোল্লেন, “আমি তোমারে চিনতে পেরেছিলেম। অবগুণ্ঠনে মুখখানি ঢাকা ছিল, কণ্ঠস্বর ঢাকা ছিল না; কণ্ঠস্বরে অনেকবার আমি মনে কোরেছিলেম, হরিদাসের কথা, শুধু মনে করাই তখন সার হয়েছিল, মনের কথা ফুটে বলবার সুবিধা ঘটে নাই; কিন্তু আমি চিনেছিলেম।”

    আমাদের উভয়ের মুখের দিকে চেয়ে, অমরকুমারীকে লক্ষ্য কোরে, চঞ্চলস্বরে রেবতী বোল্লে, “তুমি চিনতে পেরেছিলে, আশ্চর্য কথা নয়, হরিদাসকে তুমি অনেকবার দেখেচ, অনেকবার হরিদাসের মুখের কথা তুমি শুনেচ, ঘোমটার ভিতর থেকে কথা কোইলেও আওয়াজ তুমি বুঝতে পেরেছিলে, প্রকাশ কর নাই, এ কথাও অসম্ভব হতে পারে না; আমি—আমিও কিন্তু হরিদাসকে চিনিচি। সেই রাত্রে নারীবেশধারী হরিদাসের গুটিকতক, কথা আমি শুনেছিলেম, কণ্ঠস্বর আমার মনে ছিল, আজ যখন হরিদাসের মুখের কথা শুনি, তখনি মনে হয়েছিল, এখনো শুনচি, এখনো মনে হচ্ছে, সেই বিদেশিনীর কথা আর হরিদাসের কথা ঠিক একরকম; গলার সুরও যেমন, মিষ্ট মিষ্ট কথাগুলিও সেই রকম। হরিদাস তোমারে উদ্ধার কোল্লেন, তুমি সুখী হোলে, কিন্তু তোমরা আমাদের ফেলে চোলে যাবে, তাই মনে কোরে আমার প্রাণ কেমন কোচ্চে।”

    অমরকুমারীর সঙ্গে রেবতীর এই রকম কথা, তার পর আমারে সম্বোধন কোরে রেবতী পুনৰ্বার বল্লে, “দেখ বাবা! দেখ হরিদাস! আমার কথাটি ভুলে থেকো না; আমাদের বাবুটি যাতে কোরে কোন বিপদে না পড়েন, তাঁরে যাতে আসামী হোতে না হয়, এই উপকারটি তুমি কোরো।”

    “বাবু যদি কোন দোষে লিপ্ত না থাকেন, হাকিমের বিচারেই তিনি নিষ্কৃতিলাভ কোরবেন, এই আমার বিশ্বাস। তিনি বিপদে পড়েন, তেমন ইচ্ছা আমার নয়। তাঁর অনুকলে হাকিমকে কথা বলা যদি আমার আবশ্যক হয়, অবশ্য তা আমি বোলবো। সেজন্য তুমি ভেবো না।”—রেবতীকে এই রকমে আশ্বস্ত কোরে মণিভূষণের সঙ্গে উপস্থিত ক্ষেত্রের কথোপকথনে আমি প্রবৃত্ত হোলেম।

    ঢাকা শহরের সদরঘাটে আমাদের তরণী পৌঁছিল। রাত্রিকাল। সঙ্গে স্ত্রীলোক, কোথায় যাওয়া যায়? বেশীক্ষণ চিন্তা কোত্তে হলো না। ডেপুটিবাবু ব্রাহ্মণ। আমাদের প্রতি তাঁর যত্নও যথেষ্ট। রাত্রিকালে তাঁর বাড়ীতেই আমরা উঠলেম। বিনা কষ্টে নিরুদ্বেগে সেই বাড়ীতেই আমরা রাত্রিযাপন কোল্লেম। আমি মনে কোরেছিলেম, হয় তো অমরকুমারীকে নিয়ে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সমীপে উপস্থিত হোতে হবে, সেখানে হয় তো শাখাপল্লব-সম্বলিত আসল মোকদ্দমার আসল বিবরণ এজাহার কোত্তে হবে, কিন্তু ডেপুটিবাবুর অনুগ্রহে সে কষ্টটা আমাদের স্বীকার কোত্তে হলো না; ডেপুটিবাবু নিজেই উপরওয়ালার কাছে রিপোর্ট দিলেন, অপহৃতা কন্যাকে উদ্ধার করা হয়েছে; কন্যা মুর্শিদাবাদে যে বাড়ীতে ছিল, সেই বাড়ীর অধিকারীর উপযুক্ত পুত্র মণিভূষণ দত্ত, সেই মণিভূষণের হস্তে কন্যাটিকে সমর্পণ করা হয়েছে, এই মর্মে রিপোর্ট। সে রিপোর্টে আরো লেখা ছিল, মূল আসামী নিরুদ্দেশ; সম্ভবতঃ যোগের আসামী রমণীবল্লভ ভৌমিক, ধনঞ্জয় ঘটক, আর বংশীধর পোদ্দার, এই তিনজনকে আদালতে উপস্থিত করা হয়েছে।

    আমাদের আর আদালতে যেতে হলো না, ডেপুটিবার বাড়ীতেই এক দিন এক রাত্রি আমরা বাস কোল্লেম। রাত্রিকালে ডেপুটিবাবু আমারে নিজগৃহে আহ্বান কোরে বল্লেন, “অমরকুমারীকে নিয়ে তোমরা দেশে যাও, এখানকার পুলিশের একজন প্রহরী তোমাদের নিরাপদের জন্য সঙ্গে থাকবে; চণ্ডেশ্বর, গণেশ্বর আর মিয়াজান, এই তিনজনের নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হচ্ছে; তারা গ্রেপ্তার হয়ে এলে মুর্শিদাবাদে চালান হবে; মূল মোকদ্দমা মুর্শিদাবাদে; শাখা-মোকদ্দমার বিচার এখানে হবে না। রমণীবল্লভ, ধনঞ্জয়, আর বংশী পোদ্দার এই তিনজনের হাজার টাকা তাইনে মুছলকা নিয়ে আপাততঃ তাদের খালাস দেওয়া হলো। তারা যদি মূল আসামীদের হাজির কোতে পারে, যোগাযোগ যদি প্রমাণ না হয়, তবে তারা আসামী-শ্রেণীভুক্ত হবে না। মোকদ্দমা বিচারের সময় তাদের কিন্তু একবার মুর্শিদাবাদে যাওয়া আবশ্যক হবে। তোমরা এখন দেশে যাও।”

    সে রাত্রের এই পর্যন্ত কথা। পরদিন প্রভাতে আমরা মাণিকগঞ্জে যাত্রা কোল্লেম। রেবতী তখন আর আমাদের তরণীতে থাকলো না। বাবুদের নৌকাতেই তারে যেতে হলো। বাবুদের নৌকায় রমণীবাবু ধনঞ্জয় আর বংশীধর, সেই নৌকায় রেবতী।

    আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে রেবতী যখন বাবুদের নৌকায় যায়, চক্ষে অঞ্চল দিয়ে রেবতী তখন কেঁদে গেল। কিসের মায়ায় রেবতী কাঁদলো, তা আমি বুঝতে পাল্লেম। অমরকুমারীকে ভালবেসেছিল, অল্পক্ষণের পরিচয়ে আমার প্রতিও একটু স্নেহ বোসেছিল, বিশেষতঃ আমিই যেন তার বাবুটিকে আপাততঃ অব্যাহতি দিবার হেতু হোলেম; এই তিন কারণে, আমাদের বিরহে, আর বাবুর খালাসের আনন্দে রেবতী সেই সময় কেটে গেল। কথাবার্তার ভাবে আমি বুঝেছিলেম, রেবতীর শরীরে মায়া-মমতা কিছু বেশী।

  • পঞ্চম কল্প : পদ্মায় প্রাণ যায়

    পঞ্চম কল্প : পদ্মায় প্রাণ যায়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    পঞ্চম কল্প : পদ্মায় প্রাণ যায়

    যে বজরায় ঢাকায় আসা হয়েছিল, সেই বজরায় আরোহণ কোরে আমরা মাণিকগঞ্জে চোল্লেম। আমরা ছয় জন;—আমি, মণিভূষণ, অমরকুমারী, হরিহরবাবুর সরকার, হরিহরবাবুর চাপরাসী আর ঢাকার পুলিশ-প্রহরী।

    মনে আনন্দ আছে, অথচ আসামীরা ধরা পোড়ছে না, গুপ্তভাবে কোথায় কি প্রকারে ওৎ কোরে থাকে, কোথায় কি প্রকারে কখন কি বিপদ ঘটায়, সেই বিষয়ে কিছু কিছু, আশঙ্কাও আছে। আমার জীবনের কেমন এক গ্রহফল, চিন্তাশূন্য আমি থাকতে পারি না। নিশ্চিন্ত থাকায় যে সুখ, সে সুখ যেন আমার ভাগ্যে নাই, তাই আমি সৰ্বদা ভাবি। বজরায় বোসে বোসে অমরকুমারীর সঙ্গে কথা কোচ্ছি, মণিভূষণের সঙ্গে কথা কোচ্ছি, চিন্তারাক্ষসী বুকের ভিতর খেলা কোচ্ছে! রাশিচক্রের গতির ন্যায় কত পরিবর্তনে কত প্রকার চিন্তা আমার মনের ভিতর উদয় হচ্ছে, ঠিক রাখতে পাচ্ছি না। বর্ধমানে সর্বানন্দবাবুর খুনের পর রক্তদন্ত আমারে ধোরে এনেছে, সর্বানন্দবাবু পরিবারেরা কে কেমন আছেন, কোন সংবাদ পাই না, মোহনবাবুর সঙ্গে মধ্যে মধ্যে দেখা হয়েছিল, শ্বশুরবাড়ীর সংবাদ তিনি কিছুই বলেন নাই। আশালতা; স্নেহময়ী বালিকা আশালতা; রক্তদন্ত যে দিন আমারে ধোত্তে যায়, সেই দিন বালিকা আমার অনুকলে পিতার কাছে কত কথাই বোলেছিল। হায় হায়! আশালতার বিবাহের আয়োজনের সময়েই সর্বানন্দবাবুর প্রাণ গেল! কারা যে তাঁরে কেটে গেল, পুলিশ তার কিছুই কিনারা কোতে পাল্লে না; আজ পর্যন্ত খুনী আসামীর সন্ধান হলো কি না, তাও কিছ, জানা গেল না। জানা যাবেই বা কিরূপে? মোহনবাবুর মোহন চক্রে তদবধি আমি নানাস্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছি; কোথাও স্থির হয়ে থাকতে পাচ্ছি। বর্ধমানের সংবাদ আমারে কে এনে দিবে?

    রক্তদন্ত আমার শত্রু; জাতশত্রু; প্রাণসংহার কোত্তে চায়! তেমন শত্রুতা তার সঙ্গে আমার কি আছে, কিছুই আমি জানি না। কাশীতে জেনেছি, মোহনলালবাবুর গুপ্ত উপদেশে রক্তদন্ত আমার উপরে দৌরাত্ম্য করে। সে কথাটাই বা কি? মোহনবাবুর কাছে আমি কি অপরাধে অপরাধী, মোহনবাবু কেন আমার শত্রু, তাও আমার অজ্ঞাত। তাঁর শ্বশুরবাড়ীতে আমি ছিলেম, মহাবিপদসময়ে সেইখানে আশ্রয় পেয়েছিলেম, এই আমার অপরাধ, মোহনবাবু আমারে সে আশ্রয় ছাড়িয়ে নিজ বাড়ীতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যেতে আমি সম্মত হই নাই, এই আমার অপরাধ। সে অপরাধে প্রাণে মারবার সংকল্প হয়, এটা আমার স্বপ্নের অগোচর ছিল।

    চিন্তার স্রোত একটানা বহে না, জোয়ার-ভাঁটার ন্যায় গতির তারতম্য অনুভূত হয়, নানা দিকে শাখা-প্রশাখা প্রবাহিত হয়ে থাকে। মোহনলালবাবু একবার আমার প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন, সে প্রসন্নতা দীর্ঘকালস্থায়ী হয় নাই। বারাণসীধামে রমেন্দ্রবাবুর নিকটে একদিন আমি মোহনলালের চরিত্রের একটু একটু ছায়া-চিত্র অঙ্কিত কোচ্ছিলেম, গুপ্তভাবে শ্রবণ কোরে মোহনবাবু আবার আমার উপর খড়াহস্ত; অল্পদিনের সেই প্রসন্নতা অল্পদিনেই উড়ে যায়; তদবধি চক্ষে চক্ষে তার সঙ্গে আর আমার দেখা-সাক্ষাৎ হোচ্ছে না, কিন্তু গোপনে গোপনে তাঁর দুষ্টচক্র সমভাবেই ঘূর্ণিত হোচ্ছে। অমরকুমারী-হরণের এই যে ভয়ানক চক্র, আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি, এ চক্রের মূলেও মোহনবাবু দণ্ডধর! অমরকুমারীকে উদ্ধার কোরে আমি নিশ্চিন্ত হোতে পাচ্ছি না। চক্রের নায়কেরা-উপনায়কেরা নিরাপদে মুক্ত আছে। আমার শান্তিপথে তারা বিষম কণ্টক; তবে আমি নিশ্চিত থাকি কিরূপে?

    নিশ্চিত সুখ আমার ভাগ্যে নাই। আমার সম্মুখে অমরকুমারী; অমরকুমারীর চন্দ্রমুখ আমি দর্শন কোচ্ছি, অমরকুমারীর অমৃতময়ী বাণী আমি শ্রবণ কোচ্ছি, তথাপি যেন চিত্তে সুখ নাই; চিতার অনলে আমার হৃদয় দগ্ধ হোচ্ছে। কবির বাণী অখণ্ডনীয়। কবি বলেন, চিতা আর চিন্তা এই উভয়ের মধ্যে চিন্তাই গরীয়সী, কেন না, চিতা কেবল মৃতদেহ দাহ করে, চিতা সৰ্বদা সজীব প্রাণীকে দাহ করে! সেই চিন্তার প্রখর অনলে আমি দগ্ধীভূত। এক এক সময় এক একটি আনন্দের হেতু উপস্থিত হয়, চিন্তার অনল সেই হেতুগুলিকে তখনি দগ্ধ কোরে ফেলে। এখন আমার সেইরূপ অবস্থা।

    মাণিকগঞ্জে তরণী পৌঁছিল। হরিহরবাবুর বাসায় আমরা উত্তীর্ণ হোলেম। বাসায় পরিবার থাকেন না, কিন্তু বাসাবাড়ী দু-মহল। ভিতরমহলে অমরকুমারীকে রাখা হলো, বাসায় দাসী আর পাচিকা অমরকুমারীর সঙ্গিনী হয়ে থাকলো। হরিহরবাবু অমরকুমারীর রূপ দর্শন কোল্লেন; যত কষ্টে, যত কৌশলে, যত ব্যয়ে, যত শ্রমে অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরেছি, আমার মুখে সেই সব কথা শ্রবণ কোল্লেন; তত অল্প বয়সে তত সৃষ্টি আমি কোরেছি, স্নেহবশে প্রশংসা কোরে আমারে সাধুবাদ দিলেন; ভক্তিভাবে আমি তাঁরে অভিবাদন কোল্লেম।

    মাণিকগঞ্জে তিন দিন। দীনবন্ধুবাবু আমার কোন সমাচার প্রাপ্ত হোচ্ছেন না। চিঠি লিখে সংবাদ দেওয়া, তাও ঘোটে উঠছে না, সমস্তই অনিশ্চিত ছিল, অনিশ্চিত সংবাদে বন্ধুলোকের উদ্বেগ বৃদ্ধি করা হয় মাত্র; সেই কারণেই মুর্শিদাবাদে আমি চিঠি লিখি নাই। তৃতীয় দিবসের রজনীযোগে হরিহরবাবুকে সেই সব কথা আমি বোল্লেম; আর কালবিলম্ব না কোরে মুর্শিদাবাদে ফিরে যাওয়া আমার ইচ্ছা; এই নিবন্ধ জানালেম। একটু চিন্তা কোরে তিনি বল্লেন, “আর একটি দিন অপেক্ষা কর। মণিভূষণ আর তুমি, দুজনেই ছেলেমানুষ, অমরকুমারী বালিকা; যেতে হবে অনেকদূর, ভয়ঙ্করী পদ্মানদী, পদ্মার তরঙ্গে বড় বড় সাহসী পুরুষেরও হৃদয় কম্পিত হয়; উপযুক্ত বন্দোবস্ত কোরে, উপযুক্ত লোকজন সঙ্গে দিয়ে, একদিন পরে আমি তোমাকে পাঠাব; আর একটি দিন মাত্র অপেক্ষা কর।”

    একটি দিন আমি অপেক্ষা কোল্লেম। সেই দিন দীনবন্ধুবাবুর নামে আর শান্তিরাম দত্তের নামে দুইখানি চিঠি লিখে, আমি স্বহস্তে ডাকঘরে দিয়ে এলেম। সে দিন আমার আর অন্য কার্য ছিল না, দিনমানে হরিহরবাবুও বাড়ীতে ছিলেন না, মণিভূষণের সঙ্গে আনুসঙ্গিক নানাপ্রকার গল্পে দিনমান আমি অতিবাহিত কোল্লেম। সন্ধ্যার পর হরিহরবাবুর বাসায় এলেম। আমাদের মুর্শিদাবাদে যাত্রার সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক হলো। অমরকুমারীর সঙ্গে দুজন দাসী থাকবে আর নৌকার হেপাজাতের জন্য পাঁচজন পাইক থাকবে, রন্ধনকার্যের জন্য একটি ব্রাহ্মণবালকও সঙ্গে যাবে, এইরূপ বন্দোবস্ত। সঙ্গে আমার যে টাকাগুলি ছিল, সমস্তই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে, অতি অল্পমাত্র অবশিষ্ট, হরিহরবাবু আর একশত টাকা আমারে ঋণস্বরূপ প্রদান কোল্লেন, মুর্শিদাবাদে পৌঁছে সেই টাকা আমি পাঠাব, এইরূপ অঙ্গীকার কোল্লেম।

    পরদিন মধ্যাহ্নের পূর্বে আহারাদি কোরে আমরা নৌকাররাহণ কোল্লেম, আমাদের জন্য বড় একখানি বজরা, আর রন্ধনের জন্য আর একখানি নৌকা ভাড়া করা হলো, বজরা আমাদের পদ্মানদীতে প্রবেশ কোল্লে, আমরা পদ্মাগর্ভে ভাসলেম। পূর্ণ বর্ষাকাল নয় তথাপি পদ্মার এ কূল ও কূলে দেখা যায় অল্পবাতাসেও পদ্মানদীতে তুফান হয় তরঙ্গে তরণীগুলি যেন নৃত্য কোত্তে থাকে। আমরা যে দিন পদ্মায়, সে দিন অল্প অল্প হাওয়া ছিল, তরঙ্গ প্রবল ছিল, বাতাসের গতি উত্তরদিকে, পদ্মা একটানা, দক্ষিণবাহিনী, উজানে তরণী চোলেছে, যে দিকে স্রোত, বায়ু সে দিকে অনুকূল ছিল না, কাজে কাজে দ্রূতগমনে বাধা হোচ্ছিল, এক ঘণ্টার পথে দুই ঘণ্টা অতীত। বজরার সারেং পাকালোক, নদীর যেখানে যেখানে চড়া, যেখানে যেখানে গভীরতা, সারেঙের সে সব জায়গা ঠিক ঠিক জানা ছিল; বেলা যখন প্রায় অবসান, সারেং সেই সময় মধ্যস্রোত পরিত্যাগ কোরে কিনারা ধোল্লে, কিনারায় কিনারায় মৃদুগতিতে তরণী চোল্লো, দশ হাত দূরেই তীরভূমি। মধ্যস্থল দিয়া গেলে কোন তীরের কোন বস্তু স্পষ্ট নজর হয় না, কিনারা থেকে একপারের সকল বস্তুই দেখা যায়। এক এক বার আমি তীরের দিকে চেয়ে দেখছি, লোকজন চলাচল কোচ্ছে, গরু-বাছুর চোরে বেড়াচ্ছে, এক একটা জঙ্গলের উপর বড় বড় কাক বোসে আছে, দূর থেকে দেখলে বোধ হয়, যেন এক একটা কৃষ্ণবর্ণ খাসী; এ অঞ্চলের লোকের মুখে কাকের নাম ‘কৌয়ো।’ ঠাঁই ঠাঁই অনেক গাছপালাও দেখা গেল, দূরে দূরে এক একখানা বাড়ীও দেখতে পেলেম, কিন্তু ক্রমশই লোকালয় অদৃশ্য, যে স্থানে আমরা এসে পোড়লেম, সে দিকে মানুষের গতিবিধিও বড় কম। পশ্চাতে আমি চেয়ে দেখলেম, একখানিও নৌকা দেখা গেল না, দূরে দূরে ক্ষুদ্রাবয়ব এক একখানি নৌকার পালদণ্ড দেখা গেল, কিন্তু সে সকল নৌকারও গতি অন্যদিকে। এক এক জায়গায় ইলিশমাছ ধরার ডিঙ্গী; জেলেরা স্ফূর্তিতে গান কোত্তে কোত্তে মাছ ধোরে বেড়াচ্ছে, এক এক ক্ষেপে বহু মৎস্য আটক পোড়ছে, দেখতেই এক তামাসা।

    আমাদের তরণী ক্রমশই অগ্রসর; সূর্যও ক্রমশঃ পশ্চিমাভিমুখে অগ্রসর; মাছধরা নৌকাও ক্রমশঃ বিরল; তীরভূমি জনশূন্য, আমার বোধ হলো যেন, কোন একটা প্রশস্ত প্রান্তরের উপর দিয়ে আমরা ভেসে ভেসে যাচ্ছি, সম্মুখে পশ্চাতে বামে দক্ষিণে আর একখানিও নৌকা নাই। পদ্মাবক্ষে নৌকাযোগে যাঁরা নূতন যাত্রী, বিস্তার দর্শনে, তরঙ্গ দর্শনে তাঁদের ভয় হয়, যখন আবার অন্য নৌকা দৃষ্টিগোচর হয় না তখন আরো সেই ভয়ের বৃদ্ধি হয়। সূর্যদেব ডুবে যাচ্ছেন, ডুবুডুবু মূর্তিতে পদ্মার জলতলে তরঙ্গে তরঙ্গে কম্পিত হোচ্ছেন, বোধ হোচ্ছে যেন, সমস্ত দিন পরিশ্রমের পর দিনপতি ঠাকুর পদ্মাজলে স্নান কোত্তে নেমেছেন। ধরাতল অন্ধকার হয়ে আসছে; যে সময়ের নাম গোধুলি, সেই সময় অতি নিকট; আমার অন্তরে অল্প অল্প আশঙ্কার উদয়, অকারণে কেন তখন আশঙ্কা, নিজের মন নিজে জানতে পাল্লেও সে আশঙ্কার হেতুনির্দেশ করা দুরহ। এক একবার তীরের দিকে আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি, একটিও লোক নাই, সে জায়গাটায় চলাচলের রাস্তা আছে কি না, তাও ঠিক জানা গেল না, অনাবশ্যক বিবেচনায় সারেঙকেও কিছু জিজ্ঞাসা কোল্লেম না।

    তরণী চোলেছে, তীরের বৃক্ষশাখাও যেন চোলেছে। হঠাৎ দেখি, এক জায়গায় প্রকাণ্ড একটা বৃক্ষতলে একজন লোক। মাথায় প্রকাণ্ড একটা পাগড়ী; গায়ে বোধ হলে তুলাভরা চাপকান, হাতে একগাছা মানুষপ্রমাণ যষ্টি। লোকটা সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, কোন দিকে তার দৃষ্টি, অনেকক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখেও আমি সেটা ঠিক কোত্তে পাল্লেম না, অনুভবে বুঝলেম যেন, পদতলের মৃর্তিকার দিকেই চেয়ে আছে, অন্যদিকে দৃষ্টি নাই। গোধূলির অল্প অল্প অন্ধকার, লোকটার মুখখানা কি রকম, স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো না; মুখে দৃষ্টিগোচর হলো না বটে, কিন্তু মনের ভিতর কেমন একরকম সন্দেহ দাঁড়ালো, কারণ উপস্থিত নাই, তথাপি আমি একটু একটু ভয় পেলেম।

    ভয়ের সময় আপন মনে সাহস আনয়ন করা ভাল, ভয়কে অতিক্রম করা যাক না যাক, সাহসের প্রবোধে কতকটা আশ্বস্ত হওয়া যায়। মনে কোল্লেম, হয় তো পথিক লোক, কিম্বা হয় তো, কোন আদালতের পেয়াদা, কি হয় তো কোন জমীদারের পাইক। এই একপ্রকার প্রবোধ। ভয়ের সময় সাধ্যানুসারে অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা করাও ভাল। লোকটার দিকে আর চাইলেম না, তরণীও ক্রমে ক্রমে সে জায়গা ছাড়িয়া গেল। যে বস্তু দেখবো না, যে দিকে চাইবো না মনে করা যায়, সেই বস্তু দেখতে সেই দিকে চাইতে আগেই যেন প্রবৃত্তি আসে, সেইরকম উপদেশ দেয়, মানুষের প্রবৃত্তির এই একটা ধর্ম যেন সাধারণ। পশ্চাতে ফিরে ফিরে দুই তিনবার সেই বৃক্ষের দিকে আমি চাইলেম, যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ চাইলেম, শেষে চেয়ে চেয়ে দেখি, সে লোক সেখানে আর নাই। আতঙ্ক, উপেক্ষা, তাচ্ছল্য, এই তিনের পরপর মল্লযুদ্ধ। সে যুদ্ধ দেখবার লোক নাই, আমার চক্ষ কি দেখেছে, আমার মন কি ভেবেছে, চক্ষুই জানলে, মনই জানলে, কাহাকেও আমি কিছু বোল্লেম না; লোকটার কথা যেন ভুলেই গেলেম। অন্য বিষয়ে একটু চিন্তা কোরে, অমরকুমারীকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা অমর ডেপুটিবাবুকে তুমি বোলেছিলে, একটা লোকের নাম চণ্ডেশ্বর। আচ্ছা, চেহারা তুমি জান, পাপিষ্ঠ জটাধর ওখানে চণ্ডেশ্বর নাম ধোরেছিল, যেটা ঠিক হোতে পারে, কিন্তু আর একটা লোকের নাম তুমি বোলেছ, গণেশ্বর। আচ্ছা, শোনবার ত তোমার ভুল হয় নাই? ঠিক মনে কর দেখি, গণেশ্বর কি ঘনশ্যাম?”

    অমরকুমারী বোল্লেন, “শোনবার ভুল হয় নাই। ঠিক শুনেছি, তার নাম গণেশ্বর; কিন্তু ভাই! চণ্ডেশ্বর এক একবার সেই লোকটাকে ঘনশ্যাম বোলে ডাকতে ডাকতে বড় বড় দাঁত দিয়ে জিব কামড়ে ফেলেছিল, তাও আমি দেখেছি। বোধ করি, সেই লোকটার দুটো নাম; এক নাম গণেশ্বর, এক নাম ঘনশ্যাম।”

    আপন মনেই আমি বোলে উঠলেম, “ওঃ! ঘনশ্যামটাও তবে নাম ভাঁড়িয়েছে! যে সব কাজ তারা করে, সে সব কাজে নামভাঁড়ান, বেশ লুকান, বড়ই দরকার। ঘনশ্যামটা গণেশ্বর হয়েছে, জটাধরটা চণ্ডেশ্বর সেজেছে, তবে সেই যার নাম মিয়াজান, সে লোকটাও হয় তো ঠিক নামে পরিচয় দেয় নাই; সে লোকটাও হয় তো আর কিছু হবে। যাই হোক, জটাধরের নাম ভাঁড়ান ফস্কা গেরো;—বিধাতার গঠনের উপর কারিকুরি খাটে না; বানরের মত মুখ ভালকের মত লোম, উটের মত কুব্জ, সে লোক সামান্য একটা নাম ভাঁড়িয়ে কত দিন লুকিয়ে থাকতে পারে? চেনালোকের চক্ষে পোড়লেই সব বুজরুকী ভেঙে যাবে। থাক তারা। ইংরেজী পুলিশের দক্ষতা যদি পরীক্ষামূখে খাঁটি দাঁড়ায়, পুলিশ যদি কর্তব্যজ্ঞানটা করে, তা হোলৈ ভণ্ডলোকেরা কদাচ নামের আবরণে অব্যাহতি লাভ কোতে পারবে না।”

    আমার মুখপানে চেয়ে অমরকুমারী বল্লেন, ‘আমিও তাই মনে করি। তিনটে লোকেই জালমানুষ সেজেছে, তিনটে লোকেই নাম ভাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে, মিয়াজানটার কথা ঠিক আমি বোলতে পাচ্ছি না, কেন না, সে চেহারার লোক পূৰ্বে আর কোথাও আমি দেখি নাই; কিন্তু যে লোকটার নাম গণেশ্বর, তারে আমি দেখেছি। বীরভূমে যে রাত্রে জটাধর তোমার প্রাণবিনাশের মন্ত্রণা কোরেছিল, সেই রাত্রে সেই চেহারার একটা লোক জটাধরের কাছে বোসে ছিল, তারে আমি দেখেছি।”

    পূর্বকথা স্মরণ কোরে সবিস্ময়ে আমিও বোল্লেম, “আমিও তাই বুঝেছি। গণেশ্বরটাই ঘনশ্যাম। জটাধরের কাছে বোসে ছিল, তুমি গিয়ে আমারে খবর দিলে, মেয়েমানুষ সাজিয়ে দিলে, খিড়কী দিয়ে যখন আমি পালাই, আড়ে আড়ে সদরের দিকে চেয়ে দেখেছিলেম, জ্যোৎস্না ছিল কি না,—ঠিক তাই! জটাধর আর ঘনশ্যাম। মিয়াজানটাকে এখনো ঠিক জানা যাচ্ছে না; ধরা পোড়লেই ধরা যাবে।”

    এই সব কথা আমাদের হচ্ছে, নদীতীরে বৃক্ষতলে কিছু পূৰ্বে যে লোকটাকে আমি দেখেছিলেম, সে লোকটার কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছি, অমরকুমারী তারে দেখেন নাই, মণিভূষণও দেখেন নাই, অমরকুমারী যদি দেখতেন, মিয়াজানের আকারের সঙ্গে সেই লোকের আকারের সাদৃশ্য আছে কি না, বোধ হয় ধোত্তে পাত্তেন। আমার বোধ হোচ্ছে, সেই লোকটাই মিয়াজান, তিনজনেই তারা এই অঞ্চলে আছে। মাণিকগঞ্জে আমি এসেছিলেম, ঢাকায় আমি গিয়েছিলেম, অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরেছি গোপনে গোপনে এ সব সন্ধান তারা রেখেছে, কোন দিকে আমরা যাই, সঙ্গে আমাদের কত লোক, সেই সন্ধান জানবার জন্যই সেই লোক সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, এই আমার অনুমান।

    অমরকুমারী ভয় পাবেন, এই ভেবে সে অনুমানের কথা অমরকুমারীকে আমি বোল্লেম না; মনের অনুমান আমার মনের ভিতরেই চাপা থাকলো। সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, আকাশে চাঁদ উঠেছে, নক্ষত্র উঠেছে, দিনমান অপেক্ষা একটু জোরে জোরে বাতাস উঠেছে, আকাশপানে আমি চেয়ে আছি। চন্দ্রমণ্ডল প্রায় ষোলকলা পূর্ণ রূপখানি কিন্তু সৰ্বক্ষণ আমার নয়নগোচর হোচ্ছে না, এক একদিক থেকে এক একখানি তরল মেঘ এসে চাঁদের ছবিখানি ঢাকা দিয়ে ফেলছে, মেঘেরা চোলে যাচ্ছে, চাঁদ আবার একটু একটু হাসি-মুখে প্রকাশ হোচ্ছেন। আবার মেঘ আসছে, আবার চাঁদ ঢাকছে, চোলতী মেঘের অবিরণে চন্দ্রমা অধিকক্ষণ লুক্কায়িত থাকছেন না। তরল শুভ মেঘ যখন চন্দ্রগাত্র আচ্ছাদন করে, চন্দ্রমণ্ডল তখন পাণ্ডুবর্ণ দেখায়। আমাদের তরণী চোলেছে; আমি দেখছি, পাণ্ডুচন্দ্র আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চোলেছেন।

    একটা জায়গায় এসে বজরাখানি থামলো; পশ্চাতের নৌকাখানিও সেই খানে নোগর করা হলো, রন্ধনাদির আয়োজন।

    শশধর মেঘমুক্ত। পদ্মার বক্ষে কৌমুদীহার শোভমান; আকাশ নীল চন্দ্র-নক্ষত্র সেই নীলাকাশে মণি-মরকত; পদ্মা-সলিলের গর্ভেও মণি-মরকত-খচিত নীলাকাশের নির্মল ছায়া, তরণীর গবাক্ষপথে মুখ বাহির কোরে সেই শোভা আমি দর্শন কোত্তে লাগলেম; শশিবিভূষিণী রজনীতে প্রকৃতির শোভা যেমন সুন্দর দেখায়, ভাবুকের মন সে সৌন্দর্যে অপরিচিত নয়, ভাবুকের ভাবে চিরবঞ্চিত থাকলেও সেই নৈশ শোভা সন্দর্শনে আমার নয়ন-মন পুলকিত হোতে লাগলো। সেইখানে আমি দেখলেম, প্রবল পদ্মার আর একটি স্রোত চন্দ্রকিরণে রজতবর্ণ ধারণ কোরে সমানবেগে দক্ষিণদিকে চোলে যাচ্ছে। ভূগোলে লেখা আছে, সে রকম নদীর নাম শাখানদী। আমাদের সারেং অবশ্য ভূগোলবিদ্যায় অপণ্ডিত, বাংলা স্কুলের ছাত্রও নয়, তথাপি তারে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ নদীটির নাম কি?”

    সারেং একটি গল্প বোল্লে। যে ভাষায় তার বর্ণনা, আমাদের পাঠকমহাশয়েরা সে ভাষায় রসাস্বাদনে তৃপ্তিলাভ না কোত্তে পারেন, এই বিবেচনায় আমি আমার নিজের ভাষায় সারেঙের কথাগুলি এইখানে সুপ্রণালীক্রমে লিপিবন্ধ কোল্লেম।

    এইখানে পদ্মাতীরে একটি লোকালয় ছিল; অনেকগুলি লোকের বাস। এক বৎসর বৈশাখমাসে কি একটা যোগ হয়, সেই যোগে গঙ্গাস্নানে মহা ফল। অগ্রে যারা সে সংবাদ পেয়েছিল, যে দেশে গঙ্গা আছেন, সেই দেশে তারা গঙ্গাস্নানে গিয়েছিল; পূৰ্বে যারা সংবাদ পায় নাই, পদ্মাকে গঙ্গার ভগ্নীবিশ্বাসে পদ্মাস্নানেই তারা যোগফল লাভ করবার আশা করে। গ্রামে একঘর ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাঁর ধর্মপত্নী সেই যোগে পদ্মাস্নানে অভিলাষিণী হন। বাড়ীতে একজন দাসী ছিল, তার নাম গৌরী। প্রভাতের গৃহকার্যে গৌরীকে নিযুক্ত রেখে ব্রাহ্মণী শীঘ্র শীঘ্র পদ্মাস্নানে আসেন। বেলা চারি দণ্ডের মধ্যে যোগ ছিল, গৌরীও স্নানার্থিনী, গৃহকর্মে তার বেলা হোতে লাগলো, গৌরী বড় ব্যাকুলা, এক হস্তে গৃহমার্জনী-ঝাঁটা, অপর হস্তে গোময়ের হাঁড়ী, সেই অবস্থাতেই গৌরী পদ্মাস্নানে ছুটলো; পথে একটি ফলগাছে অনেকগুলি ফুল ফুটেছিল, একটা কচুপাতা ছিড়ে নিয়ে গৌরী গুটিকতক ফল তুলে নিলে। আবার ছুট! সকলেই জানেন, পদ্মায় মধ্যে মধ্যে মহা ভাঙ্গন হয়; গৌরী আসছে;—আসতে আসতে দেখলে, পথের মাঝখানে শক্ত ভূমিতে একটা চিড়;—প্রখর সূর্যাতপে মাটি যেন ফেটে গিয়েছে, সেই রকমের একটা চিড়;—সেই ফাটোলে অল্প অল্প জল। ওদিকে সূর্যদেব অনেক দূরে উঠে এসেছেন, বেলা চারি দণ্ড হবার দেরী নাই, ততক্ষণের মধ্যে পদ্মার স্রোত প্রাপ্ত হওয়া অসম্ভব, গৌরী এইরূপে বিবেচনা কোল্লে। যোগ ফুরায়, কি হয়, সাত পাঁচ ভেবে গৌরী সেই ফাটোলের ধারেই বোসে গেল; ঝাড়, হাঁড়ি সেইখানে রেখে, কচুপাতার ফুলগুলিতে অঞ্জলি পূর্ণ কোরে সেই ফাটোলের জলেই পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ কোল্লে। অপর্ণমাত্রেই ফাটোলের বিস্তার; জলস্রোত দক্ষিণদিকে ছুটলো; গৌরী কেঁদে উঠলো; “নিলে না মা! আমার পুজো নিলে না মা! দাসী বোলে অবহেলা কোরে চোলে যাচ্চো? আমি তোমায় ছাড়বো না, দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে আমিও যাবো।” স্রোত ক্রমশই দক্ষিণদিকে প্রবাহিত; ঝাড়ু, হাঁড়ি তুলে নিয়ে গৌরীও সেই স্রোতের ধারে ধারে প্রধাবিতা; স্রোত ক্রমশই বিস্তৃত, ক্রমশই বেগবান যেখানে ফাটোল ধোরেছিল, তার আধ ক্রোশ পর্যন্ত জলশায়ী হয়ে গেল। ধারে ধারে গৌরী ছুটেছে; নূতন জলস্রোত যতই ছোটে, গৌরীও ততই ছোটে; জল দাঁড়ায় না; হুঁ হুঁ শব্দে দক্ষিণদিকে গতি দেখতে দেখতে সেই স্রোত মহা বেগবতী নদী। গৌরীর হাতে ঝাঁটা ছিল, স্রোতের জলে নিক্ষেপ কোল্লে, পদ্মা পদ্মা বোলে ডাকতে লাগলো, উভরায় চীৎকার; পদ্মা উত্তর দিলেন না, গতিও থামলো না, সমানবেগে ছুট; গৌরীরও সমানবেগে ছুট। পূৰ্বদেশের লোকেরা আমাদের হাঁড়িকে পাতিল বলে; খানিক দূর গিয়ে গৌরী তার হাতের সেই গোলা-হাঁড়িটা সেই জলে ফেলে দিলে; স্রোত ছুটেছে, গৌরীও ছুটেছে; গৌরী আর পারে না;—পাল্লেনা; কেবল মা মা, পদ্মা পদ্মা, বোলে উচ্চরবে ডাক দিতে লাগলো;—ডাকেও কিছু হলো না;—গৌরী শেষকালে মা মা বোলতে বোলতে সেই স্রোতের জলে ঝাঁপ দিলে;—গৌরীকে কোলে কোরে পদ্মাবতী সমুদ্রের দিকে ছুটলেন। গৌরীর নামে পদ্মার সেই শাখানদীর নাম গৌরী-নদী; তীরবর্তী গ্রামবাসীরা এই গৌরী-নদীর নাম দিয়েছে, গড়ুই নদী;—ইংরেজরা নাম দিয়েছেন গোরাই। গৌরী যেখানে ঝাঁটা ফেলে দিয়েছিল, সে স্থানের নাম ঝাঁটাদহ, যে স্থানে পাতিল (হাঁড়ি) ফেলে দিয়েছিল, সে স্থানের নাম পাতিলদহ, যে স্থানে মা মা বোলে ডাক দিয়েছিল, সে স্থানের নাম ডাকদহ। সেই ডাকদহের বর্তমান নাম কুষ্টিয়া। পদ্মানদীতে যাঁদের গতিবিধি আছে, তাঁরা সকলেই জানেন, কুষ্টিয়া, কুমারখালি, পাংসা প্রভৃতি স্থানের নীচে দিয়ে যে নিশ্চলসলিলা নবনদী প্রবাহিতা, সেই নদীর নাম গড়াই নদী;—গৌরী নামের অপভ্রংশে গড়ুই নামের উৎপত্তি।

    পদ্মার এক শাখানদী গৌরী। সারেঙের মুখে গৌরী নদীর উৎপত্তিবিবরণ শ্রবণ কোরে আমরা চমৎকৃত হোলেম। ওদিকে আমাদের রন্ধনকার্য সমাপ্ত হলো, আমরা আহার কোল্লেম। রাত্রি প্রায় দেড় প্রহর অতীত। আমার ইচ্ছা ছিল, সেইখানেই সে রাত্রে নঙ্গর ফেলে প্রভাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা, কিন্তু সারেঙ আমার সে অনুরোধ রক্ষা কোল্লে না। সারেঙ বেল্লে, “দিব্য চাঁদনী রাত্রি, ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় বেশ যাওয়া যাবে; এই বোলেই তরণী খুলে দিলো। তখনো জোর হাওয়া, তখনো পদ্মায় তরঙ্গ, তখনো আকাশে অল্প অল্প মেঘ, তখনো এক একবার চন্দ্রচ্ছতি মেঘাবৃত। তরণী চোল্লো, কতদূর চোলে গেল, কেবল আমাদের তরণীই চোলেছে, যতদূর চেয়ে দেখি, অগ্রে পশ্চাতে আর একখানি তরণীও দেখতে পাই না। সারেং আমাদের তরণীখানি ধারে ধারেই নিয়ে যাচ্ছে অল্প দূরেই ডাঙ্গা।

    সময় প্রায় নিশীথ। সেই সময় পশ্চাদ্দিকে আমি চেয়ে দেখি, দূরে একখানা নৌকা আসছে, যাত্রীনৌকা। অন্য নৌকা, নির্ণয় কোত্তে পাল্লেম না, খানিকক্ষণ সেই দিকে চেয়ে থাকলেম, ক্রমশই সেই নৌকা আমাদের নৌকার দিকে অগ্রসর। আমাদের নৌকা অপেক্ষা সে নৌকার গতি দ্রুত, দেখতে দেখতে নিকটর্তী তখন আমি দেখলেম, সে নৌকায় অনেক দাঁড়; ঝুপ ঝুপ শব্দে দাঁড় পোড়ছে, নৌকাখানা যেন তীরবেগে ছুটেছে। সে ধরনের নৌকা পূৰ্বে আর কখন আমি দেখি নাই; কিসের নৌকা, দেখবার জন্য কৌতূহল জন্মিল। সারেঙকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, সারেঙ উত্তর কোলে, “ছীপ নৌকা; শিকারী লোকেরা ঐ রকম নৌকায় বড় বড় নদীতে বেড়ায়।”

    কেবল ঐ পর্যন্তই আমি জানতে পাল্লেম। বড় বড় নদীতে শিকারী নৌকা, বিচরণ করে। নদীতে কি রকম শিকার পায়, সেটা আমি হৃদয়ঙ্গম কোত্তে পাল্লেম না। ছীপনৌকা অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের নৌকার নিকটবর্তী হলো, দেখলেম, সেই ছীপের একজন লোক ক্ষুদ্র একটা লণ্ঠন হাতে কোরে ইতস্ততঃ একবার সঞ্চালন কোল্লে, পরক্ষণেই গড়ুম গড়ুম শব্দে নৌকার ভিতর থেকে বন্দুকের আওয়াজ হলো, শব্দে আমার বুক কেঁপে উঠলো। জলের উপর বন্দুকের আওয়াজ হোলে শব্দ আরো বেশী হয়, অনেকক্ষণ পর্যন্ত প্রতিধ্বনি থাকে; জলে স্থলে, উভয় স্থানে প্রতিধ্বনি হয়। অজ্ঞাত কারণে আমার অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হলো। না জানি, রাত্রিকালে কি বিপদ ঘটে, ওখানা যদি ডাকাতের নৌকা হয়, ডাকাতেরা যদি আমাদের নৌকায় প্রবেশ করে, কি উপায়ে অমরকুমারীকে রক্ষা কোরবো, সেই ভাবনাতেই আমার ভয়। ছীপ-নৌকা তীরবেগে ছুটে আসছে; আর বিশ হাত অগ্রসর হোলেই আমাদের নৌকার উপরে পোড়বে। তখন আমাদের কি উপায় হবে? আমাদের বিপদ ঘটবার কোন হেতু আছে, সারেঙ সেটা জানতো না, দাঁড়ীমাঝীরাও জানতো না, সুতরাং তারা ভয় পেলো না; পূৰ্বাপর ঘটনা স্মরণ কোরে আমার কিন্তু ভয় হলো। পুনৰ্বার সেই শিকারী নৌকায় বন্দুকের আওয়াজ। আমি নিরস্ত্র ছিলেম না, আমার সঙ্গে পিস্তল ছিল, ছীপের দিকে চেয়ে পিস্তল বাগিয়ে আমি সতর্ক থাকলেম।

    ছীপখানা প্রায় ৮০ হাত দীর্ঘ। বহর কম। কত লোক সেই ছীপে ছিল, দেখা গেল না, কোন দেশের লোক, তাও জানা গেল না, ছীপের দুই মুখে দুগাছা দীর্ঘ দীর্ঘ লাঠি, লাঠির মাথায় নিশান উড্ডীয়মান, সম্মুখের নিশান রক্তবর্ণ, পশ্চাতের নিশান কৃষ্ণবর্ণ। ছীপ আমাদের নিকটবর্তী হোলে সারেঙকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এই কি শিকারী নৌকা?” সারেঙ তখন একটু ইতস্ততঃ কোরে যেন একটু কুণ্ঠিতভাবে উত্তর কোল্লে, “ওদিকে আপনারা চাইবেন না, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাও কবেন না, রাত্রিকালে এ রকম ছীপ-নৌকায় কত লোক কত রকম মতলবে ফেরে, বুঝে উঠা যায় না।”

    সারেঙের কথায় আমার আশংকা হলো। নিশান দর্শন কোরে আমি মনে কোচ্ছিলেম, হয় তো পুলিশের নৌকা হবে; সারেঙ বোল্পে, মতলবের কথা। কারা কি মতলবে রাত্রিকালে জলে জলে বেড়ায়, সে অঞ্চলের লোকেরা সে তত্ত্ব জানতে পারে, আমাদের জানা অসম্ভব। ছীপের দিকে আমি চেয়ে থাকলেম। বায়ুবেগে অতিক্রম কোরে নক্ষত্ৰবেগে ছীপখানা ছুটে আসছে, দেখতে দেখতে আমাদের তরণীর কাছে এসে পোড়লো, গায়ে গায়ে ঠেকাঠেকি হয় হয় এইরূপ গতিক; একজৃষ্টে সেই দিকে আমি চেয়ে আছি; ঠেকাঠেকি হলো না। সাঁ সাঁ কোরে ছীপখানা আমাদের বজরা ছাড়িয়ে প্রায় দশ হাত দূরে বেরিয়ে গেল। যে প্রকার দ্রুতগতি, তাতে আমি মনে কোল্লেম, অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের চক্ষের অন্তর হয়ে যাবে, ভয়ের কারণ থাকবে না।

    হরিহরবাবুর প্রেরিত পাইকেরা আমাদের পশ্চাতের নৌকায় ছিল। ছীপখানা বেরিয়ে যাবার পর তারা পরস্পর চুপি চুপি কি বলাবলি কোরে আমাদের বজরায় এসে উঠলো। তাদের মুখের ভাব দেখে আমি বুঝলেম, তারা যেন কোন রকম অমঙ্গলের আশঙ্কা কোচ্ছিল। অমরকুমারীকে সাবধানে রাখবার জন্য দাসী-দুজনকে আর মণিভূষণকে আমি সতর্ক কোরে দিলেম। আমি যে দিকে লক্ষ্য রাখছিলেম, মণিভূষণ তা দেখতে পান নাই; অমরকুমারীও কিছু জানতে পারেন নাই। বজরার কামরা মধ্যে তাঁরা নিয়ে নিশ্চিন্ত। ছীপের দিকে আমি চেয়ে আছি, অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে, নদীর স্রোত অপেক্ষাও অধিকবেগে ছীপখানা চোলেছে। পুনৰ্বার গড়ুম গড়ুম শব্দে সেই ছীপ নৌকায় বন্দুকের আওয়াজ।

    মণিভূষণ ইতিপূৰ্বে সারেঙের কথা শুনেছিলেন; অমরকুমারীও শুনেছিলেন, সেই কথাই তাঁদের মনে ছিল; শিকারী নৌকা, শিকারীরা বন্দুকের আওয়াজ করে, তাই তাঁরা কোন রকম আতঙ্ক অনুভব কোল্লেন না। না করাই আমার ইচ্ছা। বন্দুকধ্বনি শ্রবণ কোরে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমি সেই অল্প-দৃষ্ট ছীপের দিকে চেয়ে থাকলেম, গতির ভাবে বুঝলেম, ফিরেছে, যে দিকে যাচ্ছিল, সে দিকে আর গেল না, আমাদের নৌকার দিকেই আসতে লাগলো। এবার কিন্তু গতি তত দ্রুত নয়, কিঞ্চিৎ শ্লথগতি, কিঞ্চিৎ ধীরে ধীরে গতি। যদিও ছীপখানা তখন অনেক দুরে, তথাপি শঙ্কাসূচক মৃদুস্বরে আমাদের লক্ষ্য কোরে সারেঙ বোল্লে, “সাবধান!” আমিও প্রতিধনি কোল্লেম, “সাবধান!” পাইকেরা পূর্বেই হয় তো জানতে পেরেছিল: গতিক বড় ভাল নয়; তাদের মধ্যে যে লোকটি সর্দার, সারেঙকে সম্বোধন কোরে যথাসম্ভব অনুচ্চস্বরে সেই লোকটি বোল্লে, “কিনারায় ধর, নোঙ্গর কর।”

    সর্দারের কথায় সারেঙের নিভীর্কতায় যেন আঘাত পেলে। কিনারায় ধরা অথবা নঙ্গর করা তার মত হলো না; বজরা এতক্ষণ যে ভাবে চোলছিল, তদপেক্ষা কিছু মৃন্দবেগে চালনের নিমিত্ত চালকগণকে অনুমতি দিল। পাইকেরা ব্যতিব্যস্ত। তাদের চাঞ্চল্য দর্শনে আমিও ক্ষেত্ৰকর্ম-বিধানের অবসর প্রতীক্ষায় প্রস্তুত হয়ে থাকলেম। যে দিকে স্ত্রীলোকেরা, সেই দিকে মণিভূষণকে রেখে আমি সম্মুখভাগে দরজা বন্ধ কোরে বহির্দিকে দাঁড়ালেম।

    আর সময় নাই। ছীপখানা একবার মৃদুগতি ধারণ কোরেছিল, পুনৰ্বার দ্রূতগতি। আমাদের বজরা চোলেছে, ছীপখানাও চোলেছে, অবিলম্বেই কাছাকাছি। আমরা আছি দশ হাত দূরে পশ্চাতে, ছীপ আছে দশ হাত দূরে অগ্রে এই সময় এক ঘূর্ণন। সচরাচর সোজা পথে যেতে যেতে পাড়ি দিবার সময় নৌকা যেমন আড়ে আড়ে খেয়া দিবার জন্য ঘুরে যায়, ছীপখানা সেই রকমে এক ঘূর্ণনে ঘুরে এসে আড়ে আড়ে দাঁড়ালো। বলা হয়েছে, ছীপখানা প্রায় ৮০ হাত লম্বা, নদীর এক কিনারা থেকে জলভাগের ৮০ হাত পর্যন্ত আটক পোড়ে গেল। বোধ হলো যেন, অর্ধপদ্মায় সেতুবন্ধ। আমাদের বজরা আর অগ্রসর হবার পথ পেলো না, ৮০ হাত ঘুরে আবার স্রোতোপথে উপস্থিত হবার অগ্রেই ছীপের লোকের আক্রমণে কোথায় আমরা তলিয়ে যাব, ঠাঁইকিনারা থাকবে না। বিপদ আসন্ন। ছীপের লোকেরা আমাদের উপরেই লক্ষ্য কোরে আসছে। সারেং বোলেছিল, শিকারী নৌকা; আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে একপ্রকার সেই কথাই ঠিক হয়। শিকারী নৌকাই বটে। আমরাই সেই শিকারীদের শিকার।

    চিন্তার অবসর নাই, বাক্যের অবসর নাই; ছীপখানা সেই ভাবে সোরে সোরে এসে আমাদের বজরার মুখের কাছে লাগলো। গোলন্দাজী জাহাজের ছিদ্রপথে যেমন বিভীষণ তোপধ্বনি হয়, জলদগর্জনের ন্যায় সেই ছীপে ঘন ঘন সেই প্রকার বন্দুকধ্বনি! রণতরীর সঙ্গে রণতরীর যুদ্ধ; সমুদ্রপথে সে যুদ্ধ যাঁরা দর্শন কোরেছেন, তুলনাকে একটু ছোট কোরে ভেবে তাঁরা এখন মনে করুন, পদ্মাবক্ষে সেইরুপ জলযুদ্ধের উপক্ৰম! আমাদের তরণীখানি রণতরণী নয়, তাদৃশ যোদ্ধাপতিও উপস্থিত নাই, মহাসঙ্কট উপস্থিত। ত্রাহি মধুসদন!

    ঝপ ঝপ কোরে ৮/১০ জন অস্ত্রধারী লোক ছীপের উপর থেকে আমাদের বজরার উপর লাফিয়ে পোড়লো। ডাকাতী করবার অগ্রে মফস্বলের ডাকাতেরা বিকট চীৎকারে যে প্রকার কুকী দেয়, সেই সকল লোক সেই প্রকারে বিকট চীৎকার আরম্ভ কোল্পে, সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকধ্বনি, সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারবিঘূর্ণন। ছীপে কত লোক ছিল, অনুমান কোত্তে না পেরেও আমাদের পাইকেরা মালসাট মেরে দাঁড়ালো; আক্রমণকারীরা দশজন, পাইকেরা আটজন। রাত্রিকালে পদ্মাবক্ষে বিপদ হয়, পাইকেরা সেটা জানতো; তারা প্রস্তুত ছিল, কেবল লাঠিমাত্র ভরসা নয়, ছোট ছোট তলোয়ার, ভুজালি, ছোট ছোট বন্দুক তারা সঙ্গে এনেছিল; মহা বিপদের সম্ভাবনা বুঝে, আমাদের দাঁড়ী-মাঝীরাও তরণীচালন পরিত্যাগ কোরে পাইকের দলে যোগ দিলে; আমি তখন কি করি; পকেটে পিস্তল ছিল, পিস্তল বাগিয়ে যোদ্ধাদলের পশ্চাতে দাঁড়ালেম। ঘোরতর যুদ্ধ। ছীপখানা ক্ৰমশঃ ঘুরে ঘুরে আমাদের বজরাকে প্রদক্ষিণ কোত্তে লাগলো। দুর্গানাম স্মরণ কোরে, সাহসে ভর কোরে, দুই তিন বার আমি পিস্তলের আওয়াজ কোল্লেম। কোন দিকেই লক্ষ্য ছিল না, সুতরাং সে আওয়াজে কিছুই ফল হলো না। তরণীমধ্যে স্ত্রীলোক তিনটার অস্ফুট আর্তনাদ! মণিভূষণ তাঁদের সান্ত্বনা কোত্তে লাগলেন; “ভয় নাই, ভয় নাই” বোলে আমিও বাহির থেকে সাধ্যমত অভয় দিতে লাগলেম; কে কার কথা শুনে, কে কারে অভয় দেয়, কে কারে সান্ত্বনা করে, মহা কলরবে প্রকৃতি প্রতিধ্বনিত! তলোয়ারে তলোয়রে যুদ্ধ, বন্দুকে বন্দকে যুদ্ধ! দুই পক্ষে পাঁচ সাত জন অস্ত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত! পদ্মার জল অনেক দূর পর্যন্ত রক্তিম! এই অবসরে ছীপারোহী আরো জনকতক লোক আমাদের বজরায় এসে উঠলো বহুলোকের পদভরে বজরাখানি যেন ডুবুডুবু হয়ে দোল খেতে লাগলো। আমার পিস্তলের গুলীবারুদ নিঃশেষিত! একজনের হস্তের একখানা তলোয়ার ছিনিয়ে নিয়ে আমি বৈরীদলের সম্মুখীন হোলেম; খেলাঘরের ছেলেরা যেমন ছোট ছোট ছুরী দিয়ে কলাগাছ কাটে বলবান দস্যুর সম্মুখে আমার অস্ত্রধারণও সেইরুপ কলাগাছ-কাটার প্রয়াসের ন্যায় ব্যর্থ হয়ে গেল; তবু, আমি ইতস্ততঃ তলোয়ার ঘুরিয়ে দুই একজন বিপক্ষের ঊরুতে বাহুতে রক্তপাত কোরে দিলেম। পাইকেরা সুশিক্ষিত মল্ল; তলোয়ার-খেলাতেও বিলক্ষণ নিপুণ, তারা আমার অঙ্গরক্ষক, তারা আমারে পশ্চাদিকে সোরিয়ে সোরিয়ে আপনারাই রণক্ষেত্রে বীরত্ব প্রকাশ কোত্তে লাগলো; তাদের আবরণে আমার গাত্রে কোন রকম আঘাত লাগলো না, কিন্তু রণরক্তে আমার অঙ্গ ভিজে গেল।

    যথভঙ্গ! পাইকপক্ষেও বন্দুক ছিল; কিন্তু তলোয়ারের যুদ্ধেই তারা বৈরী-দলকে বিপর্যস্ত কোরে তুল্লে। গোলন্দাজেরা যখন বন্দুক লক্ষ্য করে, তখন তারা নীচু হয়ে গুড়ি মেরে বসে, মাথার উপর দিয়ে গুলী চোলে যায়। বন্দুকধারীরা যখন নীচদিকে গুলী করে, তখন তারা লম্ফ দিয়ে কুলালচক্রের ন্যায় ঘুরে ঘুরে ঠিক যেন শূন্যপথে ক্রীড়া করে; পায়ের নীচে দিয়ে গুলী চোলে যায়। চমৎকার শিক্ষা। আমাদের দাঁড়ী-মাঝীরাও সে বিপদে অল্প সাহস প্রকাশ কোল্লে না। আমারে আক্রমণ করা, তরণী মধ্যে প্রবেশ কোরে অমরকুমারীকে হরণ করা দস্যুদলের আসল মতলব; অর্থলোভেই এই নৈশযুদ্ধে তারা প্রবৃত্ত হয় নাই; সেটি আমি বেশ বুঝলেম। প্রতিপক্ষকে ঠেলে ঠেলে তারা কেবল আমার দিকেই রুকে রুকে আসে, তরণীর খড়খড়ী ভেঙে ভিতরে প্রবেশ কোত্তে চায়; আমার পক্ষের লোকেরা বিশেষ বীরত্ব দেখিয়ে পদে পদেই তাদের গতি অবরোধ করে; বিপক্ষেরা কিছুতেই অভিসন্ধি সিদ্ধ কোত্তে সমর্থ হয় না। আমাদের পাইকেরা একপ্রকার ব্যূহ-রচনা জানে; অল্পলোক হলেও দিব্য একটি অর্ধচন্দ্রাকার ব্যূহ-রচনা কোরেছিল; বোম্বেটেরা বহু চেষ্টা কোরেও সে ব্যূহভেদ কোত্তে পাল্লে না।

    আমি স্থির কোল্লেম, বোম্বেটে। জলপথে যারা ডাকাতী করে, জলপথে যারা মানুষ মারে, তারাই সব বোম্বেটে। আমার লোকেরা আমারে ঢেকে ঢেকে রাখছে। আকাশের তরল মেঘমালা তখন অন্তর হয়ে গিয়েছে, সুধাকর তখন মেঘমুক্ত হয়ে সমুজ্জ্বল সুধাকর পরিবর্ষণ কোচ্ছেন, রক্ষক লোকগুলির বাহু পার্শ্ব দিয়ে বোম্বটে লোকের চেহারাগুলো আমি উঁকি মেরে মেরে দেখছি; ভয়ঙ্কর চেহারা! কতক লোকের ফিরিঙ্গী সজ্জা, মুখে ফিরিঙ্গী দাড়ী, গলায় ফিরিঙ্গী বগলোস, মাথায় ফিরিঙ্গী টোপ; কতক লোকের মাথায় বড় বড় পাগড়ী, গালে গাল-পাট্টা, গায়ে বুকবন্দ চাপকান, চাপকানের উপর লাল কাপড়ের কোমরবন্ধ; কতক লোকের মাথা নেড়া, মুখে কালী, কালীর উপর চুনের গোঁফ, চুণের ভ্রূ, গা আদুড়, হিন্দুস্থানী ধরনের মালকোঁচার উপর সবুজ কাপড়ের কোমরবন্ধ, কতক লোক কাফ্রিদের মতন কৃষ্ণবর্ণ, মাথায় সেই রকম কোকড়া কোঁকড়া চুল, নীলবর্ণ ইজেরপরা; বুঝা গেল ছদ্মবেশ; যেহেতু, ঠোঁটে আর নাকে কাফ্রি লক্ষণের অভাব।

    নদীতীরে বৃক্ষতলে যে লোকটাকে আমি দেখেছিলেম, সেই দীর্ঘকার লোকটা সেই দলের মধ্যে ছিল, তুলাভরা চাপকানে আর প্রকাণ্ড পাগড়ীতে আমি তারে সনাক্ত কোত্তে পাল্লেম, কে যে কি, কারা যে তারা, কেন যে আমাদের উপর তাদের আক্রোশ, তা আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। একবার মনে কোরেছিলেম, চণ্ডেশ্বরের চক্র; অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরেছি, গোপনে গোপনে জানতে পেরে, সেই রাগে চণ্ডেশ্বর এই বোম্বেটোর দল ভাড়া কোরে এনেছে, কিন্তু ফিরিঙ্গী, কাফ্রী, পেশোয়ারী, এ সব লোক কোথাকার? সব লোক চণ্ডেশ্বরের আয়ত্তাধীন হবে, এমন তো আমি বিশ্বাস কোত্তে পাল্লেম না। তুলাভরা চাপকানধারী বৃহৎ পাগড়ীওয়ালা বৃহদাকার লোকটাই এই দস্যুদলের দলপতি, সে লোকটা কে? আকারে বুঝেছিলেম পঞ্জাবী, কিন্তু নিকটে মুখের চেহারা দেখে, পূৰ্বদেশবাসী বাঙালী বোলেই বোধ হলো; চাপকান-পাগড়ীতে বিদেশী সেজে এই বোম্বেটে-দলের মুরব্বী হয়েছে। এই লোকটাই হয় তো এখানে চণ্ডেশ্বরের পৃষ্ঠপোষক, শেষকালে এই সিদ্ধান্তই মনে এলো।

    আমার তখন সিদ্ধান্ত করবার সময় নয়; তরণীর উপর উভয় দলে মল্লযুদ্ধ বেধে গিয়েছে। অস্ত্রশস্ত্র ত্যাগ কোরে উভয় দলের হাতা-হাতি, মুষ্টামুষ্টি, লাথা-লাথি, হুড়া-হুড়ি, জড়াজড়ি, মাথা-ঠোকাঠুকি আরম্ভ হয়েছে। জনকতক লোক রক্তবমি কোত্তে কোত্তে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দুই একটা লোকের চক্ষু ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। একটা লোক দাঁতকপাটি লেগে মজ্জিত হয়ে পোড়েছে। তখনো যুদ্ধের বিরাম হোচ্ছে না, ছীপের উপর থেকে তখনো মাঝে মাঝে বন্দুকের আওয়াজ হোচ্ছে, সে সব কেবল ফাঁকা আওয়াজ, এইরুপ আমি স্থির কোল্লেম, কেন না, এক জায়গায় ঘরদল পরদল উভয়দল জমা, বন্দুকের গুলীতে কোন দলের কোন লোকের প্রাণ যাবে, বন্দুকওয়ালারা তা জানে না; শুধু কেবল আমাদের ভয় দেখাবার জন্যই ফাঁকা আওয়াজ কোচ্ছিল, বন্দুকে গোলাগুলী ছিল না। থাকুক আর নাই থাকুক, অমরকুমারীর ক্রন্দনে আমার প্রাণ ছটফট কোচ্ছিল। বন্দুকের ধ্বনিতে আমার কিছুই ভয় ছিল না।

    ছীপের ভিতর ভীষণ চীৎকারধনি। ভীষণগর্জনে চার পাঁচজনে একসঙ্গেই চীৎকার কোরে বোলে উঠলো, “ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে!”

    এতক্ষণ বরং একটু ভরসা ছিল, ঐরূপ গর্জনধ্বনি শ্রবণ কোরে আমার প্রাণ উড়ে গেল! ক্ষণেকের মধ্যে আশা-ভরসা ফুরালো! বোম্বেটেরা দলে পুরু, অবহেলেই আমাদের বজরাখানি ডুবিয়ে দিতে পারে। এইবারেই প্রাণ গেল! অনেক বিপদেই অনেকবার পোড়েছি, ভগবান রক্ষা কোরেছেন, এবার এই পদ্মাবক্ষে বোম্বেটের হাতেই প্রাণ গেল! পদ্মার কাছে আমরা কোন অপরাধ করি নাই, পদ্মার জলে প্রাণ যায়! পদ্মাগর্ভে আজ আমাদের জীবতেই সমাধি হয়! মা পদ্মা! এই কি তোমার মনে ছিল? বিদেশী নিরপরাধী বালক আমি, বিদেশিনী নিরপরাধিনী বালিকা অমরকুমারী; মা পদ্ম! তুমি কি এই রাত্রে বিষম বদন-ব্যাদান কোরে আমাদের দুটিকে গ্রাস কোরে ফেলবে? এতগুলি প্রাণী তোমার গর্ভে জীবন বিসর্জন দিবে, নরনারী-ভক্ষণে তোমার অভ্যাস আছে, জীবনগ্রহণে তুমি মায়া-দয়া রাখ না, কিন্তু মা! তুমি আমাদের মা গঙ্গার সহোদরা; গঙ্গা আমাদের পতিতপাবনী দয়াময়ী, তুমিও দয়াময়ী, তুমি আমাদের প্রতি দয়া কর!”

    মনে মনে এই মন্ত্রে আমি পদ্মাবতীর স্তব কোল্লেম; পদ্মার প্রবল স্রোত আমার স্তবে কর্ণপাত না কোরে সাগরসঙ্গমে সমভাবে ছুটে চোল্লো; ছীপের লোকেরা আবার পূর্বরূপ উৎকট-স্বরে সঙ্গীলোকগুলোকে হুকুম দিতে লাগলো, “ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে!”

    ভয় দেখাবার হকুম নয়। সত্যই তারা মোরিয়া হয়েছে; সত্যই বজরাখানি ডুবিয়ে দিবে। আর আমাদের অব্যাহতি নাই! যারা সন্তরণ জানে, তারা পরিত্রাণ পেতে পারে। আমি সন্তরণ জানি, পদ্মাস্রোতে সন্তরণে প্রাণরক্ষা যদি সম্ভব হয়, আমি পরিত্রাণ পেলেও পেতে পারি, কিন্তু স্বর্ণপ্রতিমা অমরকুমারীকে পদ্মার জলে বিসর্জন দিয়ে সংসারে আমি বেঁচে থাকবো, তাও কি কখনো হয়? আর দুটি স্ত্রীলোক অমরকুমারীর সহচরী হয়ে এসেছে, তাদের কি অপরাধ? বোলতে গেলে আমিই তাদের রক্ষক, দৈববিপাকে নয়, আমারই কারণে দস্যুপরাক্রমে তরণী ডুবছে, সেই দুটি স্ত্রীলোক জলে ডুবে প্রাণ হারাবে, আমি স্ত্রীহত্যার পাতকী হব, এ প্রাণে আমার কাজ কি? ত্রাহি মধুসদন! ত্রাহি মা দুর্গা! ত্রাহি সৰ্বমঙ্গলে! দীনের প্রতি সদয় হয়ে এই বিপদে রক্ষা কর?”

    ঘোর বিপদে কাতর হয়ে আবার আমি বিপদ-বারণ মধুসূদনের স্তব কোল্লেম, বিপদ-বারিণী ব্ৰহ্মময়ীকে ডাকলেন; আবার আমার কর্ণে সেই ভীমগর্জন প্রবেশ কোল্লে,—“ডুবিয়ে দে। ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে!”

    বার বার তিনবার! আর বিলম্ব নাই। মণিভূষণের উদ্দেশে উচ্চকণ্ঠে আমি বোলে উঠলেম, “ভাই মণিভূষণ! ভাই! অমরকুমারী থাকলেন, অমরকুমারীকে রক্ষা কোরো! বহরমপুরের মোকদ্দমা আমি দেখতে পেলেম না; দীনবন্ধু বাবুকে আমার এই শেষবার্তা জানিও; প্রাণ যায়! আমার জন্য এতগুলি লোকের প্রাণ যায়! ভাই! আমি যদি আগে মরি, তোমরা নিরাপদে থাকবে; মঙ্গলময় মহেশ্বর তোমাদের নিরাপদে রাখবেন। আমি কাহারো শত্রু নই, আমার শত্রু এতো! আমার জন্য বোম্বেটেরা পদ্মার অগাধজলে এ তরণী ডুবাবে! না ভাই! তা আমি দেখবো না! পৃথিবীতে আমি থাকবো না! অমরকুমারীকে তুমি দেখো! অমরকুমারীকে তুমি রক্ষা কোরো! জন্মের মত আমি বিদায় হোলেম!”

    কথাগুলি আমি বোল্লম, কিন্তু চক্ষে আমার এক বিন্দুও জল এলো না। লম্ফ দিয়ে বজরার ছাদের উপর আমি উঠলেম। যে দিকে বেশী জল, সেই দিকে ঝাঁপ দিয়ে পোড়বো, পদ্মার সঙ্গে মহাসাগরে ভেসে যাব, দুই হস্ত উর্ধ্বে তুলে, সেই সঙ্কল্প সিদ্ধ করবার উদযোগ কোচ্ছি, আমার লোকেরা আমারে নিবারণ করবার নিমিত্ত কাতরে টানাটানি কোচ্ছে, এমন সময় এক দৈব অনুগ্রহ।

    যে দিক থেকে আমরা আসছি, সেই দিকে অকস্মাৎ ঘন ঘন গোটাকতক বন্দুকের ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেল। সকলের কর্ণ সেই দিকে স্থির, সকলের চক্ষু সেই দিকে চকিত। আমি তখন একপ্রকার মোরিয়া, জলে ঝাঁপ দিতে উদ্যত, আমার আর তখন ভাল-মন্দ ভাবনা করবার আবশ্যক ছিল না, তথাপি আমি সেই দিকে একবার চাইলেম। চক্ষু তখন সে কার্যে আমার কোন উপকারে এলো না, কিছুই দেখা গেল না; পদ্মার জলরাশি চন্দ্রালোকে যেমন জলময় প্রান্তরের ন্যায় ধূ ধূ কোচ্ছিল, চক্ষু আমার সেই রূপ অবলোকন কোল্লে। বন্দুকধ্বনি আমার কর্ণে এসেছিল, শরতের জলদ-গর্জনের ন্যায় গড় গড় নাদে পুনৰ্বার সেই প্রকার আগ্নেয়াস্ত্রের গম্ভীরধনি; জলে স্থলে প্রতি ধ্বনি। শব্দ কেবল কর্ণে প্রবেশ কোচ্ছে, কোথা থেকে শব্দ আসছে, তা কিছু, দেখা যাচ্ছে না। চেয়ে আছি, খানিক পরে দেখলেম, সাধারণ খেয়া-নৌকার ন্যায় একখানি তরণী বায়ুভরে ছুটে আসছে, সেই তরণী থেকেই বন্দুকের আওয়াজ আসছে। দেখতে দেখতে সেই নৌকা নিকটবর্তী, আর একখানা বৃহৎ ছীপ। দুর থেকে ক্ষুদ্র নৌকা মনে হয়েছিল, তা নয়, বৃহৎ ছীপ। যে ছীপের উপর বোম্বটেরা আমাদের প্রাণের উপর আক্রমণ কোচ্ছিল, সেই ছীপের পূৰ্বগতি অপেক্ষা আগন্তুক ছীপের গতিবেগ আরো অধিক দ্রুত; সে ছীপেরও দুইদিকে দুই নিশান; সে দুই নিশান ঘোর রক্তবর্ণে রঞ্জিত।

    আমি মনে কোল্লেম, আর একদল ডাকাত! একদলের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়াই দুর্ঘট হয়েছিল, তার উপর আর এক দল; গ্রহদেবতারা নিতান্তই বাম! পদ্মাগর্ভে শয়ন করাই আমাদের নিয়তি! ঝাঁপ দিয়ে পড়ি, আমার লোকেরা আমার হাত ধরে টানাটানি কোচ্ছে, ছাড়াবার জন্য আমি ধস্তাধস্তি কোচ্ছি, ইতিমধ্যেই নূতন ছীপখানা বিদ্যুতবেগে পশ্চিমদিকে খানিকদর ভেসে গেল। কেন গেল, তাও আমি বুঝতে পাল্লেম; পূর্বাগত বোম্বেটে নৌকা আড়ভাবে পদ্মাপ্রসারের অনেকদূর পর্যন্ত জুড়ে ছিল, আধখানা পদ্মায় যেন নৌ-সেতু হয়েছিল, সে স্থান দিয়ে অন্য নৌকার চলাচলের পথ ছিল না, কাজেই নূতন ছীপখানা তফাৎ দিয়ে ঘুরে গেল। গেল কি এলো, একটু পরেই চিনতে পাল্লেম।

    ঘন ঘন বন্দুকের আওয়াজ। আওয়াজে আওয়াজে দুই ছীপে শব্দযুদ্ধ। তখন আমার মনে হলো, নূতন নৌকাখানা ডাকাতের নৌকা নয়; বিপন্ন লোকের কোন রক্ষাকর্তা ঐ নৌকার অধিকারী। আমাদের বজরার মাঝীমাল্লারা আকাশে হাত তুলে আনন্দধ্বনি কোরে উঠলো। বোম্বেটে ছীপ আর এই নূতন ছীপ পাশা-পাশি; ছীপে ছীপে তুমুল যুদ্ধ। প্রথমতঃ বন্দুকে বন্দুকে যুদ্ধ।

    আমি কিঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ হোলেম। সারেং এসে আমার কানে কানে বেল্লে, সিপাহী-ছীপ;—সেনাদলের সিপাহী আর রণবেশধারী পুলিশ-প্রহরী একত্র সমবেত। ভগবান আমাদের রক্ষার জন্য এই অভয়া তরণী প্রেরণ কোরেছেন।”

    একবার পদ্মার দিকে আর একবার সেই দুই রণতরীর দিকে আমি নয়ন ফিরালেম। যুদ্ধাস্ত্রের গর্জনশব্দে পদ্মা যেন নৃত্য আরম্ভ কোরেছিল; পদ্মার সেই ভয়ঙ্করী মূর্তি দেখতে দেখতে বজরার ছাদের উপর থেকে আমি নামলেন। হতাশে জলে ঝাঁপ দিবার শেষ সঙ্কল্পটা তখন একরকম ভুলেই গেলেম। যুদ্ধদর্শনের কৌতূহলে মন যখন একপ্রকার উন্মত্ত হয়ে উঠলো। ভয় নাই, ভয় নাই, আশ্বাসবাক্যে ভীরুলোকগুলিকে নিজেই আমি অভয় দিতে লাগলেম।

    ছীপে ছীপে যুদ্ধ। এক ছীপে বোম্বেটেদল, এক ছীপে সিপাহীদল। প্রায় ২৫ জন সিপাহী আপনাদের ছীপ থেকে সুশোণিত অসি হস্তে বেম্বেটে ছীপে লাফিয়ে এলো; একটু পরে আরো ২৫ জন। উভয় দলে তলোয়ারযুদ্ধ। কাটা-কাটি, রক্তারক্তি, লোমহর্ষণ কাণ্ড! আমরা তখন নিশ্চেষ্ট। রক্ষাকর্তা পরমেশ্বর, কিন্তু পরমেশ্বর স্বয়ং বাহুবিস্তার কোরে কোন বিপদক্ষেত্রেই বিপদগ্রস্ত প্রাণী-পুঞ্জকে রক্ষা কোত্তে আসেন না, এক একটা উপলক্ষ্য হয়; এখানে আমাদের রক্ষার উপলক্ষ্য ঐ নবাগত সিপাহী-ছীপ। পর পর যুদ্ধে কত লোক নিহত, কত লোক আহত, গণনা করা গেল না, কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই আমি দেখতে পেলেম, বোম্বেটেরা সকলেই পুলিশ-প্রদত্ত অলঙ্কার পরিধান কোরে, ঘন ঘন বেত্রাঘাতে ছীপের উপর যেন নৃত্য কোত্তে লাগলো। দুঃসাহসিক দুরন্ত লোকেরা নির্ঘাত প্রহারেও, নিদারুণ যন্ত্রণাতেও ক্রন্দন করে না, তপ্তলৌহে অঙ্গদাহ কল্লেও শীঘ্র তাদের চক্ষে জল আসে না; যে সকল লোক পুলিশের হাতে বাঁধা পড়লো, রোদন দূরে থাক, চক্ষে জল আসা দূরে থাক, তাদের কাহারো মুখে একটি ক্ষুদ্রবাক্যমাত্রও উচ্চারিত হলো না।

    যুদ্ধের অবসান। প্রকৃতি একপ্রকার স্থির। পদ্মা একপ্রকার শান্ত। আমরা একপ্রকার নির্ভয়। এই সময় সিপাহী-ছীপের একটি ভদ্রলোক আমাদের বজরায় এলেন। দর্শনমাত্রেই আমি চিনলেম, অমরকুমারী-উদ্ধারের যিনি আমাদের প্রধান উত্তরসাধক হয়েছিলেন, তিনিই সেই উদারাশয় ডেপুটিবাবু। সাদরে আমার মস্তকে হস্তাপর্ণ কোরে মধুরবচনে তিনি বোল্লেন, “হরিদাস! তোমরা তো সকলে অক্ষত শরীরে আছ? দুরাত্মারা কেহই তো বালিকা অমরকুমারীর অঙ্গস্পর্শ কোত্তে পারে নাই?”

    বাবুকে অভিবাদন কোরে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, বোম্বেটেরা কেহই আমাদের অঙ্গে আঘাত কোত্তে পারে নাই; আমার সঙ্গের পাইকেরা, আর বজরার মাঝী-মাল্লারা বিশেষ বীরত্ব প্রদর্শন কোরেছে। বজরার মধ্যে অমরকুমারী কুশলে আছেন। আপনি আমাদের এ বিপদের সংবাদ কি প্রকারে প্রাপ্ত হেলেন?”

    ঈষৎ হাস্য কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “সে সব কথা পরে বোলছি। এখন দেখ দেখি, তোমার সঙ্গী লোকেদের মধ্যে অক্ষতশরীরে ক-জন জীবিত আছে?” ডেপুটিবাবু ঐ কথা বল্লেন, সেই জন্যই আমার সেই কথাটা তখন মনে হলো। অত লোকের সঙ্গে অল্পলোকে অতক্ষণ যুঝেছে, আমাদের বাঁচিয়েছে, এই তো তাদের মহাপরাক্রমের পরিচয়; তার উপর আরো বেশী;— সাতটি লোক আমাদের জন্য প্রাণবিসর্জন কোরেছে;—দাঁড়ী-মাঝী এগারজন, সারেং একজন, পাইক আটজন, এই কুড়িজনের মধ্যে তেরজন জীবিত। পাইকেরা সুশিক্ষিত খেলোয়াড়, তথাপি তাদের মধ্যেও দুটি লোক বোম্বেটের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মারা গিয়েছে। আমাদের প্রাণের জন্য অপর লোকে প্রাণ দিলে, বড়ই পরিতাপের কথা! ডেপুটিবাবুও তজ্জন্য আক্ষেপ প্রকাশ কোল্লেন। উপায় নাই, এইমাত্র প্রবোধ।

    আমার পক্ষে এই কথা; অপরপক্ষে ডেপুটিবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, বোম্বেটে-দলে কতগুলা লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?” বাবু উত্তর কোল্লেন, “পূর্ণসংখ্যা জানা যায় নাই। আমাদের উপস্থিতির অগ্রে কজন ঘাল হয়েছে, সিপাহী-যুদ্ধে কজন কাটা পোড়েছে, ঠিক জানা গেল না। কতক মৃতদেহ নদীর জলে ডুবেছে, কতক দেহ ভেসে গিয়েছে, যুদ্ধের সময় জনকতক ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে জলে পোড়ে সাঁতার দিয়ে পালিয়েছে। এগারোটা মৃতদেহ ছীপের উপর পোড়ে আছে, একুশটা জখম, তাদের বন্ধন করা হয় নাই, অবশিষ্ট ৩৫ জনকে হাতকড়ী-বাঁধা গিয়েছে। আমি একটি নিশ্বাস ফেলে বোল্লম, “তবেই তো বড় গোলমাল। যে সকল দেহ ডুবে গিয়েছে, ভেসে গিয়েছে, যে সকল লোক সাঁতার দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, তাদের মধ্যে মুখচেনা লোক যদি আমি দুটো-একটা ধোত্তে পাত্তেম, তা হোলে অনেকটা সংশয়ভঞ্জন হতো, সে উপায় থাকলো না। পূৰ্বে আমি আপনাকে বোলেছি, অকারণে আমার শত্রু অনেক। বিশেষতঃ অমরকুমারীকে যারা মাণিকগঞ্জে এনেছিল, তারা দূরদেশে যায় নাই। আমাদের মারবার জন্য কিম্বা ফাঁদ পেতে ধরবার জন্য বোম্বেটে দলের নিয়োগ-কর্তা তারাই; সে বিষয়ে আর সন্দেহ থাকছে না। প্রকাশ্যে তারা তিনজন;—সেই তিনজনের মধ্যে বোম্বেটে-দলে কেহ উপস্থিত ছিল কি না, নির্ণয় করা কঠিন হবে। তবু আচ্ছা, বন্দীদলে, জখমীদলে, ছীপে পতিত মৃতদলে, তাদের মধ্যে কাহাকেও চেনা যায় কি না, চেনালোক তাদের ভিতর আছে কি না, একবার আমি দেখবো।”

    ডেপুটিবাবু আমারে বোম্বেটে-নৌকায় নিয়ে গেলেন। মরা ১১ জন সকলের স্কন্ধে মুণ্ড ছিল, একে একে আমি দেখলেম, চেনা গেল না; জখমী ২১ জন—তাদেরে সকলের মুখ দেখলেম, চেনা গেল না;—বন্দী ৩৫ জন;—হাতে হাতকড়ী, পায়ে বেড়ী, গলায় শিকল;—গুড়ের নাগরীর মত সারি সারি বোসে আছে; বিকট-শিকট-মুখে মিটমিট কোরে চেয়ে চেয়ে দেখছে, একখানা মুখও চেনা গেল না। চিনলেম কেবল একটা লোককে। পাঞ্জাবীধরনের পাগড়ী মাথায় দিয়ে যে দীর্ঘাকার লোকটা নদীর ধারে বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে ছিল, গায়ে তুলাভরা চাপকান, বন্দীদলে সেই লোক বিদ্যমান। তারে চিনেই বা আমার কি ফল? সে লোককে পূৰ্বে আমি দেখি নাই, দেখা দিয়ে পূৰ্বে যে আমার কোনপ্রকার শত্রুতাচরণ করে নাই, তারে চিনে মোকদ্দমাপ্রমাণের কোন সূত্ৰই আমি পাব না, সে লোকটা হয় তো বোম্বেটেদলের গুপ্ত গোয়েন্দা—গুপ্তচর! বিচারের সময় বোম্বেটেদের সঙ্গেই তার দণ্ড হবে, আমাদের মূল মোকদ্দমার সঙ্গে সে লোকের কোন সংস্রব নাই।

    তবে হাঁ, একটা কথা, সেই সময় আমার মনে পোড়ল। অমরকুমারী বোলেছিলেন, তিনটে লোকের মধ্যে একটা লোকের নাম মিয়াজান। এই লোকটা যদি সেই মিয়াজান হয়, জিজ্ঞাসা কোল্লে এ যদি সত্যকথা বলে, তা হোলে বোধ হয়, চণ্ডেশ্বর নামধারী রক্তদন্তের সন্ধানটা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। ডেপুটিবাবুর অনুমতি গ্রহণ কোরে সেই লোকের নাম আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম। লোক তো প্রথমে কথাই কোইলে না, শেষকালে সিপাহীলোকের ধমকে, পায়ের জুতার ঠোক্করে, বন্দুকের কু’দোর গুতোতে হাউ হাউ কোরে বোল্লে, “মাদু।”

    এক কথায় সব ফর্শা। মুখের চেহারা দেখেও জানতে পারা গেল, নামটা সত্য হোক না হোক, লোকটা বাস্তবিক হিন্দু। মুসলমানের মুখে আর হিন্দুর মুখে অনেক প্রভেদ দৃষ্ট হয়। একটু চিন্তা কোরে দ্বিতীয়বার ডেপুটিবাবুর অনুমতি নিয়ে পুনরায় সেই লোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা মাধু, তুমি কি কখনো কোন জায়গায় কোন লোকের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে মিয়াজান নামে পরিচয় দিয়াছিলে?”

    লোক তখন দুই চক্ষু রক্তবর্ণ কোরে, সক্রোধে বারকতক অধরোষ্ঠ দংশন কোরে সগর্জনে বোল্লৈ, “হুঁ—উ—উ—উ—উম!”—জনান্তিকে ডেপুটিবাবু তখন আমারে বোল্লেন, ‘বজ্জাৎ বদমাসলোকের মুখে সত্যকথা বাহির করা এক প্রকার অসাধ্য! এখানে ও প্রকার প্রশ্ন করা নিষ্ফল। বিচারের সময় কোন সূত্রে যদি কিছু প্রকাশ হয়, অবশ্যই তুমি সে সব কথা জানতে পারবে।”

    আর আমরা ছীপ-নৌকায় থাকলেম না, বজরায় উঠে এলেম। এগারটা মৃতদেহ পদ্মার জলে নিক্ষেপ করবার হকুম হলো। আমাদের পক্ষে যে সাতজন মারা গিয়েছিল, তাদের দেহ পাওয়া গেল না; পদ্মার স্রোতে অন্বেষণ করাও বিফল, সুতরাং পদ্মাগর্ভেই তাদের চিরবিশ্রাম।

    আমরা বজরায় এলেম। যুদ্ধের সময় কামরায় প্রবেশের দ্বার আমি বন্ধ কোরে রেখেছিলেম, উন্মুক্ত কোরে কামরার মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম; আমি আর ডেপুটিবাবু। কপাল পর্যন্ত ঘোমটা ঢেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অমরকুমারী একধারে বোসে থাকলেন, অঞ্চলসঞ্চালনে দাসীরা তাঁরে বাতাস কোত্তে লাগলো, মণিভূষণও আমাদের দিকে সোরে এলেন। অমরকুমারীর দিকে চেয়ে প্রসন্নবদনে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “ভয় নাই মা! শত্রুনিপাত হয়েছে! তোমরা নিরাপদ হয়েছ!”—হুলস্থূলের সময় অমরকুমারী একবার মূর্চ্ছা গিয়েছিলেন, অনেক কষ্টে মূর্চ্ছাভঙ্গ করা হয়েছে, মণিভূষণের মুখে এই কথা শুনে, আমি একবার অমরকুমারীর সম্মুখে গেলেম, শত্রুনিপাত হয়েছে, তোমরা নিরাপদ হয়েছ, এই বোলে ডেপুটিবাবুর বাক্যের প্রতিধ্বনি কোল্লেম। অমরকুমারী একবার উজ্জ্বলনয়নে আমার দিকে চেয়ে বক্রনয়নে ডেপুটিবাবুর দিকে কটাক্ষ কোরে নীরবে নতমুখী হোলেন। আমি অতঃপর ডেপুটিবাবুর নিকটে এসে, আমার সেই প্রশ্ন পুনরুত্থাপন কোল্লেম, “পদ্মার উপর বোম্বেটের হাতে আমরা বিপদে পোড়েছি, এ সংবাদ আপনি কি প্রকারে প্রাপ্ত হোলেন?”

    পকেটে কি একখানি কাগজ ছিল সেইখানি বাহির কোরে একবার দেখে, আবার সেখানি পকেটে রেখে, শান্তস্বরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “তোমরা বিপদে পোড়েছ, সংবাদ পেয়ে তরণীসজ্জা কোরে এত শীঘ্র ঢাকা থেকে আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি, এমন অসম্ভব কথা তুমি মনে কোত্তে পার না। মাণিকগঞ্জের ওভারসীয়ার হরিহরবাবু তোমার আপনার লোক;—হাঁ, অবশ্যই আপনার লোক, উপকারী বন্ধু;—বজরা ছেড়ে তোমরা রওনা হবামাত্র, তিনি একজন বিশ্বাসী ভদ্রলোককে শীঘ্র শীঘ্র ঢাকায় প্রেরণ করেন। ষোলদাঁড়ী পানসীতে সেই লোকটি অবিলম্বে আমার কাছে উপস্থিত হয়, একখানি পত্র আমাকে দেয়। আমার সঙ্গে হরিহরবাবুর আলাপ আছে, পত্রপাঠমাত্র পত্রের কথাগুলি আমি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের গোচর করি; তুমি শত্ৰুবেষ্টিত, পদ্মায় বোম্বেটের ভয়, এই সব অবস্থা জানিয়ে তোমার রক্ষাবিধানের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে আমি বিশেষরূপ অনুরোধ করি; যেরূপ সজ্জায় আমি এসেছি, সেইরূপ সজ্জা প্রয়োজন, আমিই সেই প্রস্তাব করি। বর্তমান ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবটি অতিশয় সদাশয়; অবিলম্বে তিনি আমার প্রার্থনা পূর্ণ করেন। আমি বোধ করি, তোমরা এদিকে অধিক দূর আসতে না আসতেই আমরা অধিক দাঁড়ী-নিযুক্ত কোরে ঢাকায় গঞ্জঘাট থেকে ছীপখানা খুলে দিই, শীঘ্র রওনা হয়েছিলেম বোলেই এখানে আমরা উপস্থিত হোতে পেরেছি।”

    উদ্দেশেই হরিহরবাবুকে প্রণাম কোরে, ঢাকার প্রধান ম্যাজিস্ট্রেটকে ধন্যবাদ দিয়ে, সমীপোবিষ্ট ডেপুটিবাবুকে আমি অভিবাদন কোল্লেম। উপরে বোলেছি, দৈব অনুগ্রহ; বিপদে বিপদভঞ্জন মধুসদনকে আমি ডেকেছি, বিপদনাশিনী মা দুর্গাকে আমি ডেকেছি, ডাকবার অগ্রেই তাঁরা হরিহরবাবুকে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে আর এই ডেপুটিবাবুটিকে সদয়ভাবে ভবিষ্যজ্ঞান বিতরণ কোরেছিলেন, তাতেই আমাদের রক্ষা হলো, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ থাকলো না; এই জন্যই আমি বোলেছি, দেব অনুগ্রহ। বিপত্তিকাণ্ডারী হরি শ্রীমধুসদন! বিপত্তিনাশিনী দুর্গা ভবনিস্তারিণী। এই দুটি বাক্য সার্থক। মধুসূদনে যাঁদের বিশ্বাস নাই, দুর্গা-নামে যাঁদের ভক্তি নাই, তাঁরা আমারে যদি উপহাস করেন সে উপহাস আমি পরমাদরে মাথা পেতে গ্রহণ কোরবো।

    আমরা পরিত্রাণ পেলেম। বিপদের রজনী দীর্ঘ হয়; দীর্ঘ রজনীর অবসান। ডেপুটিবাবুর সঙ্গে যখন আমি কথা কোচ্ছি, তখন ঊষাকাল; ব্রাহ্মমুহূর্ত সমাগত; অল্পে অল্প সূর্যমণ্ডলের আরক্ত ছবি পূৰ্বগগনে সমূদিত। তিথি ছিল কৃষ্ণপ্রতিপদ, প্রতিপদের চন্দ্র পশ্চিমগগনে অস্ত যাচ্ছেন, নূতন প্রভাকর পূৰ্বগগনে উদয় হোচ্ছেন। সুপ্রশস্ত নদীবক্ষে তরণীর উপর থেকে প্রকৃতির সেই শোভা কি চমৎকার দেখায়, যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই সেটি অনুভব কোত্তে পারবেন। সমুদ্রযাত্রী লোকের মুখে আমি শুনেছি, মধ্যসমুদ্র থেকে সেই দৃশ্য আরো সুন্দর দেখায়, আরো চমৎকার! নয়ন মন উভয়ই বিমুগ্ধ হয়।

    ধূসরবসনা ঊষা তুষারসিক্ত হয়ে লজ্জাবনতবদনে প্রস্থান কোল্লেন, দিনমণি সপ্রকাশ। আমি তখন ডেপুটিবাবুকে বোল্লেম, “এখন আমরা তবে বিদায় হোতে পারি? দিনের বেলা নদীতে আর বোম্বেটের ভয় থাকবে না, দিনের বেলা নূতন বোম্বেটেরা আর আমাদের ধোত্তে আসবে না, আপনার অনুগ্রহে পরম উপকৃত হোলেম; মহা বিপদে জীবনরক্ষা হলো। আপনার মহত্ত্বের নিকটে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকলেম। এখন অনুমতি হয়, বজরা খুলে দিই।”

    মৃদু হাস্য কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “তাই বুঝি তুমি মনে কোরেছ? এত বড় কাণ্ডটা কেবল জলের উপরেই শেষ হয়ে গেল, এই বুঝি তোমার বিশ্বাস? তা নয় হরিহরিদাস, তা নয়। অল্পবয়সে সাহসে তুমি ধন্য, কিন্তু সংসারের বিষয়জ্ঞানে এখনো তুমি অপরিপক্ক। ব্যাপার ছোট নয়। ছীপনৌকায় আমোদ কোরে পদ্মানদীতে আমরা মাছ ধোত্তে এসেছিলেম, শীকার ধোরে আমোদ কোরে ফিরে চোল্লেম, তাও নয়। বিচার আছে। তোমারেও আর একবার ঢাকায় যেতে হবে। এই ভীষণ ব্যাপারের মূল উপলক্ষ্য তুমি। তোমার তরণী আক্রমণের উদ্দেশেই বোম্বেটেদল জমায়েত, তোমার লোকের সঙ্গেই বোম্বেটেদের প্রথম যুদ্ধ। উভয় পক্ষেই খুন-জখম; এ অবস্থায় বিচারস্থলে তোমার সাক্ষ্যই অগ্রগণ্য। তোমারে আর একবার ঢাকায় যেতে হবে। বোম্বেটে নৌকা নদী বেয়ে যাচ্ছিল, আমরা ছুটে এসে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কোরেছি; কত নৌকা অমন যায়, কোন একটা অকু ঘটনা না হলে পুলিশ তাদের ধরে না, বিনা প্রমাণে নৌকার লোককে বোম্বেটে বোলে ধরাও যায় না, প্রমাণ আবশ্যক; প্রমাণের জন্যই অগ্রে তোমারে দরকার হবে। তুমি আমাদের সঙ্গে ঢাকায় চল।”

    আর আমার কোন ওজর-আপত্তি খাটলো না। আবার আমারে ঢাকায় ফিরে যেতে হলো। আমাদের বজরায় ডেপুটিবাবু থাকলেন। ডেপুটিবাবুর ছীপে সিপাহী শান্ত থাকলো, বোম্বেটেদের ছীপে পুলিশ-পাহারায় জখমী লোকেরা আর বন্দীলোকেরা থাকলো। আমরা ঢাকায় চোল্লেম। বজরার গতি মৃদু ছীপের গতি দ্রুত। একসঙ্গে কি প্রকারে যাওয়া যায়, সেই তত্ত্ব একবার আমার মনে উঠেছিল, কিন্তু ডেপুটিবাবুর বন্দোবস্তে তিন তরণীর গতি সমান কোরে দেওয়া হলো। সৰ্বপ্ৰথমে গ্রেপ্তারী আসামী নৌকা, মধ্যস্থলে আমার বজরা, পশ্চাতে সিপাহী। তিন তরণীর সমান গতি।

  • নিশীথিনী

    নিশীথিনী

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    নিশীথিনী

    মিসির আলির ধারণা ছিল, তিনি সহজে বিরক্ত হন না। এই ধারণাটা আজ ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। যে-রিকশায় তিনি উঠেছেন, তার সীটটা ঢালু। বসে থাকা কষ্টের ব্যাপার। তার চেয়েও বড় কথা, দু’ মিনিট পরপর রিকশার চেইন পড়ে যাচ্ছে।

    এখন বাজছে দশটা তেইশ। সাড়ে দশটায় থার্ড ইয়ার অনার্সের সঙ্গে তাঁর একটা টিউটরিআল আছে। এটা কোনোক্রমেই ধরা যাবে না। যে হারে রিকশা এগুচ্ছে, তাতে ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে তাঁর আরো পনের মিনিট লাগবে। এ-কালের ছাত্ররা এতক্ষণ তাদের টীচারদের জন্যে  অপেক্ষা করে না।

    মিসির আলি তাঁর বিরক্তি ঢাকবার জন্যে একটা সিগারেট ধরালেন। ঠিক তখন পঞ্চম বারের মতো রিকশার চেইন পড়ে গেল। রিকশাওয়ালার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে চেইন পড়ার ব্যাপারটায় সে আনন্দিত। গদাইলশকরী চালে সে নামল এবং সামনের চাকাটা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করতে লাগল!

    চেইন পড়ে গেলে কেউ চাকা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করে বলে তাঁর জানা ছিল না। রুক্ষ গলায় বললেন, ‘এ রকম করছ কেন?’

    রিকশাওয়ালা জবাব দিল না। গরম চোখে তাকাল এবং মিসির আলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একটা বিড়ি ধরাল। মিসির আলি রাগ সামলাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কুড়ি থেকে এক পর্যন্ত উল্টো দিকে গুনলেন। জীবনানন্দ দাশের ‘মনে হয় একদিন’ কবিতার প্রথম চার লাইন মৃদু স্বরে আওড়ালেন। মিসির আলির ধারণা, কিছু-কিছু কবিতা মানুষের অস্থিরতা কমিয়ে দেয়। ‘মনে হয় একদিন’ এমন একটি কবিতা।

    কিন্তু আজ তাঁর রাগ কমছে না। রিকশাওয়ালা কঠিন মুখ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে। মিসির আলির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

    মিসির আলি নিজেকে সামলাবার জন্যেই ভাবতে লাগলেন—তিনি নিজে যদি সিগারেট ধরাতে পারেন, তাহলে এই লোকটি পারবে না কেন? জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে বেচারা ক্লান্ত ও বিরক্ত। এক জন ক্লান্ত ও বিরক্ত মানুষের নিশ্চয়ই বিশ্রাম করার অধিকার আছে। তিনি হালকা গলায় বললেন, ‘নাম কি তোমার?’

    ‘সামসু।’

    ‘বাড়ি কোথায় তোমার সামসু?’

    ‘বাড়ি-ঘর নাই।’

    ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার। সামসু, রিকশা চালাও। ক্লাস মিস হবে।’

    সামসু কোনো পাত্তাই দিল না। রাস্তার পাশে পেচ্ছাব করতে বসে গেল। তার বসার ভঙ্গি থেকেই বোঝা যাচ্ছে সে সহজে উঠবে না, বসেই থাকবে। এই লোকটি কি কোনো-একটি অজ্ঞাত কারণে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছে?

    মিসির আলি রিকশা থেকে নেমে পড়লেন। পাঁচ টাকা ভাড়া ঠিক করা ছিল, তিনি ছ’টাকা দিলেন। সহজ স্বরে বললেন, ‘নাও, ভাড়া নাও। আমি হেঁটে চলে যাব।’

    সাধারণত রিকশাওয়ালাদের সবচেয়ে ময়লা ন্যাতন্যাতে নোটগুলো দেয়া হয়। মিসির আলি তাকে দিয়েছেন কচকচে নতুন নোট। এটা তিনি করলেন এই আশায়, যাতে সামসু নামের এই উদ্ধত যুবকটি তাঁর আচরণের জন্যে লজ্জিত বোধ করে।

    এ-রকম কাণ্ডকারখানা মিসির আলি সাহেব করে থাকেন। একবার বাসে তাঁর পাশে সুখী-সুখী চেহারার এক বুড়ো বসল। দু’ জনের সীট। কিন্তু বুড়ো অকারণে পা ফাঁক করে তাঁকে চাপ দিতে লাগল। বিশ্রী কাণ্ড! মিসির আলি খানিকক্ষণ চাপ সহ্য করলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘আপনার বোধহয় অল্প জায়গায় বসার অভ্যেস নেই, আপনি বরং একাই এখানে আরাম করে বসুন।’

    মিসির আলি ভেবেছিলেন, লোকটি এতে লজ্জিত ও বিব্রত হবে। সে-রকম কিছু হল না। লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’ জনের জায়গা দখল করে পা দোলাতে লাগল। এরা অসুখী মানুষ। নিজেদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এরা—অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে অসুখী মানুষের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে কেন ভাবতে ভাবতে মিসির আলি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। মাথার ওপর জুন মাসের গনগনে আকাশ। রাস্তাঘাট তেতে উঠেছে। বাতাসের লেশমাত্রও নেই। এ-বছর অসম্ভব গরম পড়েছে। এই অসহ্য গরমে রিকশাওয়ালারা মানুষ টানে কীভাবে কে জানে! মিসির আলি সামসু নামের উদ্ধত যুবকটির জন্যে এক ধরনের মায়া অনুভব করলেন।

    ক্লাস ফাঁকা। আসমানী রঙের জামদানি শাড়ি পরা একটি মেয়ে শুধু সেকেন্ড বেঞ্চে বসে আছে। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা। এটা একটা নতুন ব্যাপার। ইউনিভার্সিটির মেয়েরা মাথায় ঘোমটা দেয় শুধু আজানের সময়।

    মিসির আলি ঢুকতেই মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। তিনি অপ্রস্তুত স্বরে বললেন, ‘দেরি করে ফেললাম। সবাই চলে গেছে নাকি?’

    ‘জ্বি স্যার।’

    ‘তুমি বসে আছ কেন? তুমি কেন ওদের সঙ্গে গেলে না?’

    মেয়েটি মৃদু স্বরে বলল, ‘স্যার, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?’

    ‘হ্যাঁ, চিনতে পারছি। তোমার নাম নীলু।’

    ‘জ্বি।’

    ‘তুমি তো এই ক্লাসের নও।’

    ‘জ্বি-না।’

    ‘তাহলে?’

    ‘আমি স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে বসে আছি। আমি রুটিনে দেখেছি, আজ আপনার এখানে ক্লাস।’

    মিসির আলি ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তোমার কি বিয়ে হয়েছে? মাথায় ঘোমটা, তাই বললাম। নতুন বিয়ে-হওয়া মেয়েরা প্রথম দিকে ঘোমটা পরে।’

    ‘আমার বিয়ে হয় নি।

    ‘ও, আচ্ছা।’

    ‘আপনার সঙ্গে আমার খুব একটা জরুরি কথা আছে স্যার।’

    ‘বল।’

    ‘আমি স্যার অনেকটা সময় নিয়ে কথাটা আপনাকে বলতে চাই। আমি কি স্যার আপনার বাসায় যেতে পারি?’

    ‘বাসায় আমার কিছু ঝামেলা আছে।’

    ‘তাহলে স্যার, আপনি কি আমাদের বাসায় একটু আসবেন? আমার খুব দরকার।’

    ‘ঠিক আছে, যাব।’

    ‘আমাদের বাসার ঠিকানা কি আপনার মনে আছে? এক বার গিয়েছিলেন আমাদের বাসায়। আমাদের বাসার দোতলায় আপনার এক জন পরিচিত মহিলা থাকতেন। রানু নাম।’

    ‘আমার মনে আছে।’

    ‘স্যার, আপনি কি আজই আসবেন? আমার খুব দরকার।’

    মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে। এই মেয়ের নাম নীলু, কিন্তু কোনো-এক বিচিত্র কারণে তাকে অবিকল রানুর মতো দেখাচ্ছে।

    ‘স্যার, আপনি কি আজই যাবেন?’

    ‘ঠিক আছে রানু।’

    ‘আমার নাম কিন্তু স্যার নীলু।’

    মিসির আলি লক্ষ করলেন, মেয়েটা হাসছে। যেন তাকে রানু বলায় সে খুশি। এটাই যেন আশা করছিল।

    ‘আমাদের বাসার ঠিকানা কি লিখে দেব?’

    ‘লিখে দিতে হবে না। আমার মনে আছে।’

    ‘আসবেন কিন্তু স্যার।’

    ‘আসব। আমি আসব।’

    ‘যাই স্যার, স্লামালিকুম।’

    নীলু উঠে দাঁড়াল। এত সুন্দর মেয়েটি। শ্যামলা গায়ের রঙ। চোখে-মুখে তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু তবু এমন মায়া জাগিয়ে তুলছে কেন? মিসির আলি লজ্জিত বোধ করলেন। তাঁর বয়স একচল্লিশ। এই বয়সের এক জন মানুষের মনে এ-জাতীয় তরল ভাব থাকা উচিত নয়। তা ছাড়া এই মেয়েটি তাঁর ছাত্রী।

    মিসির আলি শূন্য ক্লাসে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা জিনিস নিয়ে তিনি ভাবছেন। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা কেন? এই মেয়েটি দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাসে আসছে না কেন? মেয়েটি চলে যাবার সময়ও একটা অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। সোজাসুজি হেঁটে গেছে, এক বারও পেছনে ফিরে তাকায় নি। মেয়েরা সাধারণত পেছন ফিরে তাকায়।

    সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি মৃতা মেয়ের ছাপ আছে নীলুর মধ্যে। যেভাবেই হোক আছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।

    তিনি সিগারেট ধরালেন।

    প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না—কথাটা কি সত্যি? তাঁর মনে হল, সত্যি নয়। প্রকৃতির কাজই হচ্ছে নানান রকম রহস্য সৃষ্টি করা—মানুষের কাজ হচ্ছে সেই রহস্যের কুয়াশা সরিয়ে দেয়া। এমন একদিন কি আসবে, যখন কেউ বলবে না—দেয়ার আর মেনি থিংকস ইন হেভেন্‌ অ্যাণ্ড আর্থ…।

    ‘আরে, মিসির আলি সাহেব না? এখানে কী করছেন? একা-একা ক্লাসে বসে আছেন কেন?’

    তিনি দাড়িওয়ালা এই লোকটাকে চিনতে পারলেন না। হাতে রেজিস্ট্রি খাতা, কাজেই অধ্যাপক হবেন! মুখখানা হাসি-হাসি। পান খেয়ে দাঁত লাল করে ফেলেছেন। পান-খাওয়া লোকজন কি কিছুটা নম্র স্বভাবের হয়? মিসির আলির মনে হল, পান এবং স্বভাবের ভেতর কোনো-একটা সম্পর্ক আছে। তিনি যে ক’ জন পানবিলাসী লোককে চেনেন, তাদের সবাই সদালাপী।

    ‘কি, কথা বলছেন না কেন? কিছু ভাবছেন নাকি?’

    মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। শান্ত ও নরম স্বরে বললেন, ‘জ্বি-না, কিছু ভাবছি না।’

    ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?’

    ‘জ্বি-না।’

    দাড়িওয়ালা অধ্যাপক অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। মিসির আলি বিব্রত বোধ করলেন। কাউকে চিনতে পারছি না বলা—তাকে প্রায় অপমান করার শামিল। বিশেষ করে অধ্যাপক শ্রেণীর মানুষরা এ ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর।

    ‘সত্যি চিনতে পারছেন না?’

    ‘জ্বি না। আমার একটা প্রবলেম আছে, কিছুই মনে থাকে না।’

    ‘মাসখানেক আগে আমি আপনার কাছে এক জন রোগী নিয়ে গিয়েছিলাম—ফিরোজ নাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র।’

    ‘ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আপনি ফিরোজের দুলাভাই।’

    ‘হ্যাঁ দুলাভাই।’

    ‘এবং আপনার নাম হচ্ছে নাজিমুদ্দিন। হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট।’

    ‘এই তো চিনতে পারছেন।’

    ‘চিনতে পারছি এসোসিয়েশন থেকে। একটা মনে পড়লে, অন্যগুলো মনে পড়তে থাকে। এসোসিয়েশন অব আইডিয়াস।’

    ‘ফিরোজ তো অনেকখানি ইমপ্রুভ করেছে। এত অল্প সময়ে যে আপনি এতটা করবেন, আমরা কেউ কল্পনাও করি নি। দারুণ ব্যাপার।’

    মিসির আলি কিছু বললেন না। ফিরোজ আজ বিকেলে তাঁর কাছে আসবে। প্রতি সোমবার ফিরোজের সঙ্গে তাঁর একটি সেশন হয়। অথচ নীলুকে বলে রেখেছেন, আজ যাবেন তাদের বাসায়। তাঁর কাজকর্ম ইদানীং এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? বয়স বাড়ছে।

    ‘মিসির আলি সাহেব।’

    ‘জ্বি?’

    ‘চলুন, লাউঞ্জে বসে চা খাওয়া যাক।’

    ‘চলুন।’

    ‘আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? কী ভাবছেন এত?’

    ‘কিছু ভাবছি না।’

    তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। দীর্ঘনিঃশ্বাসটি কেন ফেললেন, এই নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন। অকারণে তো কেউ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে না। সবকিছুর পেছনেই কারণ থাকে। এই জগতে কার্যকারণ ছাড়া কিছুই হয় না, সবই লজিক। জটিল লজিক। জটিল কিন্তু অভ্রান্ত। লজিকের বাইরে এক চুলও কারোর যাবার ক্ষমতা নেই।

  • নিষাদ

    নিষাদ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছেন। রোগা লম্বা এক জন মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারণ লোকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমেও ফুল হাতা ফ্লানেলের শার্ট, ফুলপ্যান্টটি চকচকে কাপড়ের তৈরী। ছাঁটের ধরন দেখে মনে হয় সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেট থেকে কেনা। এ ধরনের ছাঁটের প্যান্ট ঢাকায় এখন চালু নেই। পায়ের জুতা জোড়া ঝকঝক করছে। মনে হচ্ছে এখানে আসবার আগে জুতা পালিশ করেছে। মিসির আলি লোকটির বয়স আন্দাজ করবার চেষ্টা করলেন। কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে হবার কথা। এই বয়সের যুবকদের চেহারায় এক ধরনের আভা থাকে। যৌবনের আভা। এর তা নেই। অল্প বয়সে চুলও পেকেছে বলে মনে হচ্ছে। কানের পাশে রুপোলি ছোঁয়া। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’

    সে জবাব দিতে দেরি করছে। যেন এই প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। মিসির আলি আবার বললেন, ‘আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আপনি মনে হয় আগেও কয়েক বার এসেছিলেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘এক বার একটি চিঠি লিখে গিয়েছিলেন, তাই না? লিখেছিলেন——সোমবার সন্ধ্যায় আসব।’

    ‘জ্বি স্যার।’

    ‘আমি কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আপনি আসেন নি।’

    ‘একটা কাজ পড়ে গিয়েছিল স্যার।’

    লোকটি খুব সহজেই স্যার বলছে। তার মানে ছোট কোনো চাকরি করে। অফিসের প্রায় সবাইকে বোধহয় স্যার বলতে হয়, যে-কারণে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খারাপ অভ্যাস। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কী করেন?’

    ‘সামান্য একটা কাজ করি। বলার মতো কিছু না।’

    ‘আসুন। ভেতরে আসুন।’

    ‘আজ যাই স্যার। আরেক দিন আসব।’

    মিসির আলি অত্যন্ত অবাক হলেন। এই লোকটি বারবার তাঁর খোঁজে আসছে, চিঠি লিখে যাচ্ছে। আজ দেখা হল, কিন্তু সে থাকতে চাচ্ছে না। মনের ভেতর বড় রকমের কোনো দ্বিধার ভাব আছে, যা সে কাটাতে পারছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি চলে যেতে চাচ্ছেন, চলে যাবেন। কিছুক্ষণ বসে যান। আমার কাছে কেন এসেছেন, সেটা বলুন।’

    ‘অন্য আরেক দিন আসব।’

    ‘সেদিন হয়তো আমাকে পাবেন না। আমি বাসায় খুব কম থাকি। আমার অনেক ঝামেলা।’

    লোকটি খুবই অস্বস্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকল। জুতা জোড়া নিয়ে একটু চিন্তা করছে। খুলে ফেলবে কি ফেলবে না। মিসির আলি লক্ষ করলেন, লোকটি নিজেই বসার ঘরের দরজা বন্ধ করছে। ছিটকিনি লাগানোর চেষ্টা করছে। এটাও হয়তো তার অভ্যাস। সে খুব সম্ভব তার ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। তাই যদি হয়, তাহলে লোকটি থাকে একা। যে বাড়িতে অনেকগুলি মানুষ থাকে, সে-বাড়ির কেউ ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগানোর অভ্যাস করবে না।

    মিসির আলি বললেন, ‘এ-বাড়ির ছিটকিনি লাগানোর একটা বিশেষ কায়দা আছে। আপনি পারবেন না। আপনি বসুন, আমি লাগাচ্ছি।’

    লোকটি বসল। বসার ভঙ্গি বিনীত। হাত মুঠি করে কোলের উপর রাখা। ঈষৎ কুঁজো হয়ে বসেছে। গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। অতিরিক্ত ফর্সা হবার কারণেই বোধহয় চেহারায় খানিকটা মেয়েলি ভাব চলে এসেছে। অবশ্যি এটা জোড়া ভুরু ও পাতলা ঠোঁটের কারণেও হতে পারে। এই ধরনের ছেলেদেরকেই স্কুলে সবাই ‘মেয়ে’ বলে খেপায়। এবং উঁচু ক্লাসের কিছু বখা ছেলে বিশেষ কারণে এদের বন্ধুত্ব কামনা করে।

    মিসির আলি বললেন, ‘আপনার নাম কি?’ লোকটি জবাব দিল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। এখন সে তাকাচ্ছে জানালা দিয়ে। মিসির আলি অবাক হয়ে বললেন, ‘নাম বলতে কি আপনার আপত্তি আছে?’

    ‘জ্বি-না।’

    ‘তাহলে নাম বলুন। নাম দিয়েই শুরু করা যাক।’

    ‘আমার নাম রইসুদ্দিন।’

    ‘শুধু রইসুদ্দিন! নাকি রইসুদ্দিনের সঙ্গে অন্য কিছু আছে?’

    ‘মোঃ রইসুদ্দিন।’

    দেখুন ভাই, আপনি কিন্তু ঠিক নামটা বলছেন না। মিথ্যা কথা বলায় যারা অভ্যস্ত নয়, তারা যখন মিথ্যা বলে, তখন তাদের গলা কেঁপে যায়। খুব দ্রুত চোখের পাতা পড়ে এবং খানিকটা ব্লাশ করে। আপনার বেলায় এর সব ক’টি হয়েছে।’

    ‘আমার ভালো নাম মুনির। ডাক নাম টুনু।’

    ‘চা খাবেন?’

    ‘জ্বি স্যার, খাব।’

    ‘আপনি আরাম করে বসুন, আমি চা বানিয়ে আনছি। ঘরে কাজের কোনো লোক নেই। সব আমাকেই করতে হবে। আপনি আমার কাছে কি জন্যে এসেছেন তা এখন বলবেন? না চা খেয়ে বলবেন?’

    ‘স্যার আমি খুব বিপদে পড়েছি।’

    ‘বিপদে পড়লে লোকজন যায় পুলিশের কাছে। আমার কাছে কেন? আমি তো পুলিশ নই।’

    ‘অন্য রকম বিপদ। আপনি না শুনলে বুঝবেন না। আগে শুনতে হবে।’

    ‘বেশ শুনছি, তাতে লাভ হবে কি?’

    ‘আপনি অনেকের অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন—আমি অনেক কিছু আপনার সম্পর্কে শুনেছি।’

    ‘শুনেছেন, খুব ভালো কথা। কী শুনেছেন, জানি না। তবে আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখি, আমার দৌড় খুব সামান্য। আমি অ্যাবনরমেল সাইকোলজি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছি—এই পর্যন্তই।’

    মুনির মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো কথা সে শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার বাসা কোথায়?’

    মুনির তার জবাব দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল। অর্থাৎ সে তার ঠিকানা জানাতে ইচ্ছুক নয়। মিসির আলি চা বানাতে গেলেন। ঘরে কোনো খাবার নেই। বিস্কিট-টিস্কিটজাতীয় কিছু দিতে পারলে ভালো হত। লোকটি ক্ষুধার্ত। হয়তো অফিস শেষ করে সরাসরি চলে এসেছে। কিছু খাওয়া হয় নি। কিংবা বিকেলে কিছু খাবার মতো সামর্থ্য নেই। এটি হওয়াই স্বাভাবিক। নিম্ন আয়ের মানুষরা এ-দেশে পশুর জীবন-যাপন করে।

    মিসির আলি চা নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন। কেউ নেই। দরজা ভেজানো। লোকটি এক ফাঁকে উঠে চলে গিয়েছে। নিঃশব্দ প্রস্থান যাকে বলে। মিসির আলি হেসে ফেললেন। এ-জীবনে তিনি অনেক বিচিত্র মানুষ দেখেছেন। তাদের অদ্ভুত আচার-আচরণের সঙ্গে তিনি পরিচিত। এই লোকটির প্রস্থান ঘটনা হিসেবে তেমন অদ্ভুত নয়, তবু বেশ মজার। তবে নিঃশব্দ প্রস্থানের এই ঘটনার ব্যাখ্যা বেশ সরল। লোকটি যে-বিপদের কথা বলতে এসেছিল, শেষ মুহূর্তে ঠিক করেছে তা সে বলবে না। এ-রকম মনে করারও অনেকগুলি কারণ হতে পারে। প্রথম কারণ—সম্ভবত মিসির আলিকে দেখে তার আশাভঙ্গ হয়েছে। মনে হয়েছে, এই লোকটিকে দিয়ে কাজ হবে না। দ্বিতীয় কারণ—বিপদটা এমন শ্রেণীর যা বলার মতো মনের জোর তার নেই।

    ‘স্যার, আসব?’

    মিসির আলি চমকে উঠলেন। লোকটি ফিরে এসেছে। তার চোখে-মুখে অপ্রস্তুত ভঙ্গি। যেন সে বড় ধরনের অপরাধ করে এসেছে। এই অপরাধের জন্যে সে লজ্জিত, অনুতপ্ত।

    ‘কোথায় গিয়েছিলেন?’

    ‘আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট আনতে গিয়েছিলাম। বেশি কিছু দেবার সামর্থ্য স্যার আমার নেই। আমি দরিদ্র মানুষ।’

    তিনি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন। বেনসন এণ্ড হেজেস, নির্ঘাৎ পঞ্চাশ টাকার মতো খরচ হয়েছে। লোকটি আগের মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখের পাতা পর্যন্ত ফেলছে না।

    ‘আমাকে কী বলতে এসেছেন, বলুন।’

    লোকটি কিছু বলল না। মিসির আলি সিগারেট ধরিয়ে হালকা স্বরে বললেন, ‘যদি বলতে না-চান বলার দরকার নেই। আসুন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করি। গরম কেমন পড়েছে বলুন।’

    ‘খুব গরম পড়েছে স্যার।’

    ‘এই প্রচণ্ড গরমে ফ্লানেলের শার্ট গায়ে দিয়েছেন কেন? আপনার গরম লাগছে না?’

    ‘আমার আর কোনো ভালো শার্ট নেই। আমি দরিদ্র।’

    ‘দরিদ্র হওয়াতে লজ্জাবোধ করার কিছু নেই। ধনী ব্যক্তিদের বরং লজ্জিত হওয়া উচিত। আপনার চা-টা মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। গরম করে আনব?’

    ‘জ্বি না।’

    লোকটি ঠাণ্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। যেন সে একটি অপ্রিয় দায়িত্ব পালন করছে।

    ‘আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি কিছু বলবেন?

    ‘জ্বি স্যার, বলব।’

    ‘বলুন।’

    মুনির চুপ করে আছে। ইনহিবিশন বলে একটা ব্যাপার আছে। এটা হচ্ছে তাই। প্রথম বাধাটি সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মিসির আলির মনে হল, লোকটি নিঃসঙ্গ প্রকৃতির। একা-একা থাকে। মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যেস নেই। যা সে বলতে চায়, তা বলার জন্যে তাকে প্রচুর সাহস সঞ্চয় করতে হবে। মিসির আলি তাকে সময় দিলেন।

    বাইরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আকাশ থমথমে। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় আসবে সম্ভবত। আসুক। এই গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না। ইচ্ছা করছে কোনো একটা পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে।

    ঘর অন্ধকার। বাতি জ্বালান দরকার। মিসির আলি বাতি জ্বালালেন না। ইনহিবিশন কাটানোর জন্যে অন্ধকার একটা চমৎকার জিনিস।

    মুনির মূর্তির মতো বসে আছে। সে এবার ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে কথা বলা শুরু করল। তার গলার স্বর মিষ্টি। শুনতে ভালো লাগে। গলার স্বরে কোথাও যেন একটি ধাতব চরিত্র আছে। মেয়েদের গলার স্বরে তা মানিয়ে যায়। পুরুষদের সঙ্গে ঠিক মানায় না।

  • অন্যভুবন

    অন্যভুবন

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    দুপুরবেলা কাজের মেয়েটি মিসির আলিকে ডেকে তুলল। কে নাকি দেখা করতে এসেছে। খুব জরুরি দরকার।

    মিসির আলির রাগে গা কাঁপতে লাগল। কাজের মেয়েটিকে বলে দেয়া ছিল কিছুতেই যেন তাঁকে তিনটার আগে ডেকে তোলা না হয়। এখন ঘড়িতে বাজছে দু’টা দশ। যত জরুরি কাজই থাকুক, এই সময় তাঁকে ডেকে তোলার কথা নয়। মিসির আলি রাগ কমাবার জন্যে উল্টো দিকে দশ থেকে এক পর্যন্ত গুনলেন। গুন-গুন করে মনে-মনে গাইলেন—আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে এত পাখি গায়—। এই গানটি গাইলে তাঁর রাগ আপনাতেই কিছুটা নেমে যায়। কিন্তু আজ নামছে না। কাজের মেয়েটির ভাবলেশহীন মুখ দেখে তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। তিনি গম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘রেবা।’

    ‘জ্বি।’

    ‘আর কোনো দিন তুমি আমাকে তিনটার আগে ডেকে তুলবে না।’

    ‘জ্বি আইচ্ছা।’

    ‘দুটো থেকে তিনটা এই এক ঘণ্টা আমি প্রতিদিন দুপুরে ঘুমিয়ে থাকি। এর নাম হচ্ছে সিয়াস্তা। বুঝলে?’

    ‘জ্বি।’

    ‘ঘড়ি দেখতে জান?’

    ‘জ্বি-না।’

    মিসির আলির রাগ দপ করে নিভে গেল। যে-মেয়ে ঘড়ি দেখতে জানে না, সে তাকে তিনটার সময় ডেকে তুলবে কীভাবে? রেবা মেয়েটি নতুন কাজে এসেছে। তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে।

    ‘রেবা।’

    ‘জ্বি?’

    ‘আজ সন্ধার পর তোমাকে ঘড়ি দেখা শেখাব। এক থেকে বার পর্যন্ত সংখ্যা প্রথম শিখতে হবে। ঠিক আছে?’

    ‘জ্বি, ঠিক আছে।’

    ‘এখন বল, যে-লোকটি দেখা করতে এসেছে, সে কেমন?’

    রেবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মানুষ মানুষের মতোই, আবার কেমন হবে! তার এই সাহেব কী-সব অদ্ভুত কথাবার্তা যে বলে! পাগলা ধরনের কথাবার্তা!

    ‘বল বল, চুপ করে আছ কেন?’

    মিসির আলি বিরক্ত হলেন। এই মেয়েকে কাজ শেখাতে সময় লাগবে। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘মানুষকে দেখতে হবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, বুঝতে পারছ?’

    মেয়েটি মাথা নাড়ল। মাথা নাড়ার ভঙ্গি থেকেই বলে দেয়া যায়, সে কিছুই বোঝে নি। বোঝার চেষ্টাও করে নি। সে শুধু ভাবছে, এই লোকটির মাথায় দোষ আছে। তবে দোষ থাকলেও লোকটা ভালো। বেশ ভালো। রেবা এ-পর্যন্ত দু’টি গ্লাস, একটা পিরিচ এবং একটা প্লেট ভেঙেছে। একটা কাপের বোঁটা আলগা করে ফেলেছে। সে তাকে কিছুই বলে নি। একটা ধমক পর্যন্ত দেয় নি। ভালো মানুষগুলি একটু পাগল-পাগলই হয়ে থাকে।

    মিসির আলি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন। একটি সিগারেট বের করে হাত দিয়ে গুঁড়ো করে ফেললেন। তিনি সিগারেট ছাড়বার চেষ্টা করছেন। যখনই খুব খেতে ইচ্ছা করে, তিনি একটি সিগারেট বের করে গুঁড়ো করে ফেলেন, এবং ভাবতে চেষ্টা করেন একটি সিগারেট টানা হল। এতে কোনো লাভ হচ্ছে না, শুধু মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাচ্ছে।

    ‘রেবা।’

    ‘জ্বি?’

    ‘এখন আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব, তুমি উত্তর দেবে। তোমার উত্তর থেকে আমি ধারণা করতে পারব, যে-লোকটি এসেছে সে কী রকম।’

    রেবা হাসল। তার বেশ মজা লাগছে।

    ‘প্রথম প্রশ্ন, যে লোকটি এসেছে সে গ্রামে থাকে না শহরে?’

    ‘গেরামে।’

    ‘লোকটি বুড়ো না জোয়ান?’

    ‘জোয়ান।’

    ‘রোগা না মোটা?’

    ‘রোগা।’

    ‘কী কাপড় পরে এসেছে?’

    ‘মনে নাই।’

    ‘কাপড় পরিষ্কার না ময়লা?’

    ‘ময়লা।’

    ‘হাতে কী আছে? ব্যাগ বা ছাতা, এ-সব কিছু আছে?’

    ‘না।’

    ‘চোখে চশমা আছে?’

    ‘না।’

    মিসির আলি থেমে-থেমে বললেন, ‘তোমাকে যে-প্রশ্নগুলি করলাম, সেগুলি মনে রাখবে। কেউ আমার কাছে এলে, আমি এইগুলি জানতে চাই। বুঝতে পারছ?’

    ‘জ্বি।’

    ‘এখন যাও, আমার জন্যে এক কাপ চমৎকার চা বানাও। দুধ-চিনি কিচ্ছু দেবে না। শুধু লিকার। বানানো হয়ে গেলে চায়ের কাপে এক দানা লবণ ফেলে দেবে।’

    ‘লবণ?’

    ‘হ্যাঁ, লবণ!’

    মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। বসার ঘরে যে-লোকটি এসেছে তাকে দেখা দরকার। রেবার কথামতো লোকটি হবে গ্রামের, ময়লা কাপড় পরে এসেছে। জোয়ান বয়স। হাতে কিছুই নেই। এই ধরনের এক জন লোকের তাঁর কাছে কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

    বসার ঘরে যে লোকটি বসে ছিল, সে রোগা নয়। পরনে গ্যাভার্ডিনের স্যুট। হাতে চামড়ার একটি ব্যাগ। বয়স পঞ্চাশের উপরে। চোখে চশমা। মিসির আলি মনে-মনে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। রেবা মেয়েটির পর্যবেক্ষণশক্তি মোটেই নেই। একে বেশি দিন রাখা যাবে না। মিসির আলি বসে-থাকা লোকটিকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে লাগলেন।

    তিনি ঘরে ঢোকার সময় লোকটি উঠে দাঁড়ায় নি। দাঁড়াবার মতো ভঙ্গি করেছে। বসে থাকার মধ্যেও একটা স্পর্ধার ভাব আছে। লোকটি তাকিয়ে আছে সরু চোখে। যেন সে কিছু একটা যাচাই করে নিচ্ছে। মিসির আলি বললেন, ‘ভাই, আপনার নাম?’

    ‘আমার নাম বরকতউল্লাহ্। আমি ময়মনসিংহ থেকে এসেছি।’

    ‘কোনো কাজে এসেছেন কি?’

    ‘হ্যাঁ, কাজেই এসেছি। আমি অকাজে ঘোরাঘুরি করি না।’

    ‘আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘আপনার কাছে না-এলে, আপনার ঘরে বসে আছি কেন?’

    ‘ভালোই বলেছেন। এখন বলুন, কী ব্যাপার। অল্প কথায় বলুন।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব থমথমে গলায় বললেন, ‘আমি কথা কম বলি। আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না।’

    তিনি লক্ষ করলেন, লোকটি আহত হয়েছে। তার চোখ-মুখ লাল। মিসির আলি খুশি হলেন। লোকটি বড় বেশি স্পর্ধা দেখাচ্ছে।

    ‘বরকতউল্লাহ্ সাহেব, চা খাবেন?’

    ‘জ্বি না, আমি চা খাই না। আমার যা বলার তা আমি খুব অল্প কথায় বলে চলে যাব।’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘অল্প কথায় কিছু বলতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনার অভ্যাস হচ্ছে বেশি কথা বলা। আপনি চা খাবেন কি না, তার জবাব দিতে গিয়ে একটি দীর্ঘ বাক্য বলেছেন। আপনি বলেছেন—জ্বি না, আমি চা খাই না। আমার যা বলার তা আমি খুব অল্প কথায় বলে চলে যাব। এই বাক্যটিতে সতেরটি শব্দ আছে।’

    বরকতউল্লাহ সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত হল। মিসির আলি মনে-মনে হাসলেন। কাউকে বুদ্ধির খেলায় হারাতে পারলে তাঁর খুব আনন্দ হয়।

    ‘বরকতউল্লাহ্ সাহেব, আপনি কী চান?’

    ‘আপনার সাহায্য চাই। তার জন্যে আমি আপনাকে যথাযথ সম্মানী দেব। আমি ধনাঢ্য ব্যাক্তি না-হলেও দরিদ্র নই! আমি চেকবই নিয়ে এসেছি।’

    ভদ্রলোক কোটের পকেটে হাত দিলেন। মিসির আলির খানিকটা মন-খারাপ হয়ে গেল। ধনবান ব্যক্তিরা দরিদ্রের কাছে প্রথমেই নিজেদের অর্থের কথা বলে কেন ভাবতে লাগলেন।

    বরকতউল্লাহ্ বললেন, ‘আমি কি আমার সমস্যাটার কথা আপনাকে বলব?’

    মিসির আলি বললেন, ‘তার আগে জানতে চাই, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি এমন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নই যে, ময়মনসিংহের এক জন লোক আমার নাম জানবে।’

    বরকতউল্লাহ্ নিচু স্বরে বললেন, ‘আমি খুঁজছি এক জন ভালো সাইকিয়াটিস্ট, যাঁর কাছে আমি অকপটে আমার কথা বলতে পারব। যে আমার কথায় লাফিয়ে উঠবে না, আবার অবিশ্বাসের হাসিও হাসবে না। আমি জানি, আপনি সে-রকম এক জন মানুষ। কী করে জানি, তা তেমন জরুরি নয়।’

    মিসির আলির মনে হল লোকটা বেশ বুদ্ধিমান, গুছিয়ে কথা বলতে জানে। যার মানে হচ্ছে, গুছিয়ে কথা বলার অভ্যেস তার আছে। লোকটি সম্ভবত এক জন ব্যবসায়ী। সফল ব্যবসায়ীদের নানান ধরনের লোকজনের সঙ্গে খুব গুছিয়ে কথা বলতে হয়।

    ‘বরকতউল্লহ্ সাহেব, আপনি কি এক জন ব্যবসায়ী?’

    ‘হ্যাঁ, আমি এক জন ব্যবসায়ী।’

    ‘কত দিন ধরে ব্যবসা করছেন?’

    ‘প্রায় দশ বছর। এখন করছি না।’

    ‘কিসের ব্যবসা?’

    ‘আপনি আমাকে জেরা করছেন কেন বুঝতে পারছি না।’

    ‘আপনার সমস্যা নিয়ে আমি মাথা ঘামাব কি না, তা জানার জন্যে জেরা করছি। যদি আপনাকে আমার পছন্দ হয়, তবেই আপনার কথা শুনব। সবার সমস্যা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।’

    ‘যথেষ্ট পরিমাণ টাকা পেলেও না?’

    ‘না। আমার সম্পর্কে ভালোরকম খোঁজখবর আপনি নেন নি। যদি নিতেন, তাহলে জানতেন যে, আমি টাকা নিই না।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইলেন। তিনি তাঁর সামনে বসে থাকা রোগাটে লোকটিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কথাবার্তা বলছে অহঙ্কারী মানুষের মতো, কিন্তু বলার ভঙ্গিটি সহজ ও স্বাভাবিক।

    ‘আপনি টাকা নেন না কেন, জানতে পারি কি?’

    ‘নিশ্চয়ই পারেন। টাকা নিলেই এক ধরনের বাধ্যবাধকতা এসে পড়ে। আমি তার মধ্যে যেতে চাই না। অন্যের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা আমার পেশা নয়, শখ। শখের ব্যাপারে কোনোরকম বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। কি বলেন?’

    ‘ঠিকই বলছেন। আমি আপনার সব প্রশ্নের জবাব দেব। কী জানতে চান বলুন?’

    ‘আপনার পড়াশোনা কতদূর?’

    ‘এম এ পাশ করেছি। পলিটিক্যাল সায়েন্স।’

    ‘আপনি বলছেন ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন, কেন?’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব আপনাকে পরে দেব। অন্য প্রশ্ন করুন।’

    ‘আপনি বিবাহিত?’

    ‘হ্যাঁ। আমার ন’ বছর বয়েসী একটি মেয়ে আছে।’

    ‘আপনার সমস্যা এই মেয়েকে নিয়েই, নয় কি?’

    ‘জ্বি হাঁ। কী করে বুঝলেন?’

    মেয়ের কথা বলার সময় আপনার গলার স্বর পাল্টে গেল, তা থেকেই আন্দাজ করছি। আপনার স্ত্রী মারা গেছেন কত দিন হল?

    ‘প্রায় নয় বছর হল। স্ত্রী মারা গেছেন, সেটা কী করে বলতে পারলেন?’

    ‘বাচ্চাদের কোনো সমস্যা হলে মা নিজে আসেন। এ ক্ষেত্রে আসেন নি দেখে সন্দেহ হয়েছিল। তা ছাড়া বিপত্নীক মানুষদের দেখলেই চেনা যায়।’

    ‘আমি কি এবার আমার ব্যাপারটা বলব?’

    ‘বলুন।’

    ‘সংক্ষেপে বলতে হবে?’

    ‘না, সংক্ষেপে বলার দরকার নেই। চা দিতে বলি?’

    ‘জ্বি-না, আমি চা খাই না। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিতে বলুন, খুব ঠাণ্ডা। তৃষ্ণা হচ্ছে।’

    ‘আমার ঘরে ফ্রীজ নেই। পানি খুব ঠাণ্ডা হবে না।’

    ভদ্রলোক তৃষ্ণার্তের মতোই পানির গ্লাস শেষ করে দ্বিতীয় গ্লাস চাইলেন। মিসির আলি বললেন, ‘আরেক গ্লাস দেব?’

    ‘আর লাগবে না।’

    ‘আপনি তাহলে শুরু করুন। আপনার মেয়ের নাম কি?’

    ‘তিন্নি।’

    ‘বলুন তিন্নির কথা।’

    ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। সম্ভবত মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছেন। কিংবা বুঝে উঠতে পারছেন না, ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করবেন। মিসির আলি লক্ষ করলেন, ভদ্রলোকের কপালে সূক্ষ্ম ঘামের কণা জমতে শুরু করেছে। মিসির আলি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, ন’ বছর বয়েসী একটি মেয়ের এমন কী সমস্যা থাকতে পারে যা বলতে গিয়ে এমন অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়।

    ‘বলুন, আপনার মেয়ের কথা বলুন।’ ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।

    ‘আমার মেয়ের নাম তিন্নি।…

    ওর বয়স ন’ বছর। মেয়ের জন্মের সময় ওর মা মারা যায়। মেয়েটিকে আমি নিজেই মানুষ করি। আমি মোটামুটিভাবে এক জন স্বচ্ছল মানুষ। কাজেই আমার পক্ষে বেশ কিছু কাজের লোকজন রাখা কোনো সমস্যা ছিল না। তিন্নিকে দেখাশোনার জন্যে অনেকেই ছিল। কিন্তু তবু মেয়েটির বেশির ভাগ দায়িত্ব আমিই পালন করেছি। দুধ বানানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো—সবই আমি করতাম। বুঝতেই পারছেন, মেয়েটি আমার খুবই আদরের। সব বাবার কাছেই তাদের ছেলেমেয়ের আদর থাকে, কিন্তু আমার মধ্যে বাড়াবাড়ি রকমের ছিল।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, এখন নেই?’

    ভদ্রলোক এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তাঁর মেয়ের কথা বলে যেতে লাগলেন। তিনি এমন একটি ভঙ্গি করলেন, যেন প্রশ্নটি শুনতে পান নি।

    ‘তিন্নির বয়স যখন এক বৎসর, তখন লক্ষ করলাম, ও অন্যান্য শিশুদের মতো নয়। সাধারণত এক বৎসর বয়সেই শিশুরা কথা বলতে শুরু করে। তিন্নির বেলা তা হল না। সে কথা বলা শিখল না। বড়-বড় ডাক্তাররা সবাই দেখলেন। তাঁরাও কোনো কারণ বের করতে পারলেন না। মেয়েটি কানে শুনতে পায়। তার ভোকাল কর্ড ঠিক আছে। কিন্তু কথা বলে না! কেউ কিছু বললে মন দিয়ে শোনে–এই পর্যন্তই।

    ‘ই এন টি স্পেশালিস্ট প্রফেসর আলম বললেন, অনেক বাচ্চাই দেরিতে কথা শেখে। এর বেলাও তাই হচ্ছে। দেরি হচ্ছে। আপনি আপনার মেয়ের সঙ্গে দিন-রাত কথা বলবেন। ও শুনে-শুনে শিখবে।…

    ‘আমি প্রফেসর আলমের পরামর্শমতো প্রচুর কথা বলতাম। গল্প পড়ে শোনাতাম। সিনেমায় নিয়ে যেতাম। কিন্তু কোনো লাভ হল না। মেয়েটি একটি কথাও বলল না।…

    ‘ওর যখন ছ’ বছর বয়স তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। দিনটি আমার পরিষ্কার মনে আছে–জুলাই মাসের তিন তারিখ, শুক্রবার। আমি দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমুচ্ছি। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। জ্বরজ্বর ভাব। হঠাৎ তিন্নি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগাল, এবং পরিষ্কার গলায় বলল, “বাবা, অসময়ে ঘুমুচ্ছ কেন?”…

    ‘আপনি বুঝতেই পারছেন আমি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি। তিন্নি কথা বলেছে। একটি দু’টি শব্দ নয়, পুরো বাক্য বলেছে। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছে। কোনো রকম জড়তা নয়, অস্পষ্টতা নয়। বিস্ময় সামলাতে আমার দীর্ঘ সময় লাগল। আমি এক সময় বললাম, ‘তুই কথা বলা জানিস?’

    ‘তিন্নি হাসি মুখে বলল, “হ্যাঁ। কেন জানব না?”…

    “এত দিন কথা বলিস নি কেন?”…

    ‘তিন্নি তার জবাব দিল না। ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল, যেন সে খুব মজা পাচ্ছে। এটা যেন চমৎকার একটা রসিকতা, কথা না-বলে বাবাকে বোকা বানানো।…

    ‘মিসির আলি সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, নতুন এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে উঠতে আমার সময় লাগল। তবে আমি ঠাণ্ডা ধরনের মানুষ। আমি কোনো কিছু নিয়েই হৈচৈ শুরু করি না। প্রথমে নিজে বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু তিন্নির ব্যাপারটা আমি কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ করে কথা বলা শুরু করা ছাড়াও তার মধ্যে অনেক বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল।’

    এই পর্যন্ত বলেই বরকতউল্লাহ্ সাহেব থামলেন। পানি খেতে চাইলেন। মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। বরকতউল্লাহ্ সাহেব নিচু গলায় আবার কথা শুরু করলেন।

    ‘আমি লক্ষ করলাম, তিন্নি সব প্রশ্নের জবাব জানে।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। সব প্রশ্নের জবাব জানে মানে?’

    ‘আপনাকে উদাহরণ দিলে ভালো বুঝবেন। ধরুন, আমি তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ষোলর বর্গমূল কত? সে এক মুহূর্ত ইতস্তত না-করে বলবে ‘চার’ – যদিও সে অঙ্কের কিছুই জানে না। যে-মেয়ে কথা বলতে পারে না, তাকে অঙ্ক শেখানোর প্রশ্নই ওঠে না।

    ‘আপনাকে আরেকটি উদাহরণ দিই। এক দিন বাসায় ফিরে তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বল তো মা আজ নয়াবাজারে কার সঙ্গে দেখা হয়েছে?’ সে সঙ্গে-সঙ্গে বলল, ‘হালিম সাহেবের সঙ্গে।’

    ‘হালিম আমার বাল্যবন্ধু। তিন্নি তাকে চেনে না। তার সঙ্গে আমার মেয়ের কোনো দিন দেখা হয় নি। হালিমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, এটা তিন্নির জানার কোনো কারণ নেই। মিসির আলি সাহেব, বুঝতেই পারছেন, আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তার কিছুদিন পর আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।…

    ‘রাতের বেলা তিন্নিকে নিয়ে খেতে বসেছি। হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। আমি হারিকেন জ্বালানোর জন্যে বললাম। কেউ হারিকেন খুঁজে পেল না। প্রয়োজনের সময় কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। টর্চ আনতে বললাম–তাও কেউ পাচ্ছে না। আমি বিরক্ত হয়ে ধমকাধমকি করছি। তখন তিন্নি বলল, ‘বাতি চলে গেলে সবাই এত হৈচৈ করে কেন?’…

    আমি বললাম, “অন্ধকার হয়ে যায়, তাই।”…

    “অন্ধকার হলে কী অসুবিধা?”

    “অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না, সেটাই অসুবিধা।”

    “তুমি দেখতে পাও না?” …

    “শুধু আমি কেন, কেউই পায় না। আলো ছাড়া কিছুই দেখা যায় না মা।”

    ‘তিন্নি খুবই অবাক হল, বিস্মিত গলায় বলল, “কিন্তু আমি তো অন্ধকারেও দেখতে পাই। আমি তো সব কিছু দেখছি।”

    ‘প্রথম ভাবলাম, সে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু না, ঠাট্টা নয়। সে সত্যি কথাই বলছিল। সে অন্ধকারে দেখে। খুব পরিষ্কার দেখে।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব থামলেন। রুমাল বের করে চশমার কাঁচ পরিষ্কার করতে লাগলেন। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার মেয়ের প্রসঙ্গে আরো কিছু কি বলবেন?’ তিনি না-সূচক মাথা নাড়লেন।

    ‘আর কিছুই বলার নেই?’

    ‘আছে। কিন্তু এখন আপনাকে বলতে চাই না।’

    ‘কখন বলবেন?’

    ‘প্রথম আপনি আমার মেয়েকে দেখবেন। ওর সঙ্গে কথা বলবেন। তারপর আপনাকে বলব।’

    ‘ঠিক আছে। আপনার মেয়ের এখন বয়স হচ্ছে নয়। মেয়ের অস্বাভাবিকতাগুলি তো আপনার অনেক আগেই চোখে পড়েছে। কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন?’

    ‘না। ডাক্তার এর কী করবে?’

    ‘কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট?’

    ‘না। আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর কাছে আমি এসেছি।’

    ‘মেয়ের এই ব্যাপারগুলি আপনি মনে হচ্ছে লুকিয়ে রাখতে চান।’

    ‘হ্যাঁ, চাই। কেন চাই, তা আপনি আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বললেই বুঝবেন।’

    ‘আপনি মেয়ের মা সম্পর্কে কিছু বলুন।’

    ‘কী জানতে চান?’

    ‘জানতে চাই তিনি কেমন মহিলা ছিলেন। তাঁর মধ্যে কোনো রকম অস্বাভাবিকতা ছিল কি না।’

    ‘না, ছিল না। তিনি খুবই স্বাভাবিক মহিলা ছিলেন।’

    ‘আপনি ভালোমতো জানেন?’

    ‘হ্যাঁ, ভালোমতোই জানি। আমি এগার বছর আমার স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়েছি। তিন্নি আমাদের শেষ বয়সের সন্তান। এগার বছরে এক জন মানুষকে ভালোমতো জানা যায়।’

    ‘তা জানা যায়। আচ্ছা, আপনার মেয়ের এই ব্যাপারগুলি কি বাইরের অন্য কাউকে বলেছেন?’

    ‘না, কাউকেই বলি নি। আপনি বুঝতেই পারছেন, এটা জানাজানি হওয়ামাত্রই একটা হৈচৈ শুরু হবে। পত্রিকার লোক আসবে, টিভির লোক আসবে। আমি ভাবলাম, কিছুতেই এটা করতে দেওয়া উচিত হবে না। এখন মিসির আলি সাহেব, দয়া করে বলুন—আপনি কি আমার মেয়েটাকে দেখবেন?’

    ‘হ্যাঁ, দেখব।’

    ‘কবে যাবেন ময়মনসিংহ?’

    ‘আপনি কবে যাবেন?’

    ‘আমি আগামীকাল রাতে যাব। রাত দশটায় একটা ট্রেন আছে—নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস।’

    মিসির আলি সহজ স্বরে বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গেই যাব।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘আমার সঙ্গে যাবেন!’

    ‘হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে যাব। কোনো অসুবিধে হবে?’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব মাথা নাড়লেন। কোনো অসুবিধা হবে না। এই লোকটিকে তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। যে প্রথমে তাঁর কথাই শুনতে চায় নি, সে এখন…। কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষ আছে এই পৃথিবীতে!

  • বৃহন্নলা

    বৃহন্নলা

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    অতিপ্রাকৃত গল্পে গল্পের চেয়ে ভূমিকা বড় হয়ে থাকে।

    গাছ যত-না বড়, তার ডালপালা তার চেয়েও বড়। এই গল্পেও তাই হবে। একটা দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে শুরু করব। পাঠকদের অনুরোধ করছি তাঁরা যেন ভূমিকাটা পড়েন। এর প্রয়োজন আছে।

    আমার মামাতো ভাইয়ের বিয়ে।

    বাবা-মা’র একমাত্র ছেলে, দেখতে রাজপুত্র না হলেও বেশ সুপুরুষ। এম. এ পাস করেছে। বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করা এবং গ্রুপ থিয়েটার করা—এই দুইয়ে তার কর্মকাণ্ড সীমিত।

    বাবা-মা’র একমাত্র ছেলে হলে যা হয়—বিয়ের জন্যে অসংখ্য মেয়ে দেখা হতে লাগল। কাউকেই পছন্দ হয় না। কেউ বেশি লম্বা, কেউ বেশি বেঁটে, কেউ বেশি ফর্সা, কেউ বেশি কথা বলে, আবার কেউ-কেউ দেখা গেল কম কথা বলে। নানান ফ্যাঁকড়া।

    শেষ পর্যন্ত যাকে পছন্দ হল, সে-মেয়ে ঢাকা ইডেন কলেজে বিএ পড়ে— ইতিহাসে অনার্স। মেয়ের বাবা নেই। মা’র অন্য কোথায় বিয়ে হয়েছে। মেয়ে তার বড়চাচার বাড়িতে মানুষ। তিনিই তাকে খরচপত্র দিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন।

    আমার মামা এবং মামী দু’ জনের কেউই এই বিয়ে সহজভাবে নিতে পারলেন না। যে-মেয়ের বাবা নেই, মা আবার বিয়ে করেছে—পাত্রী হিসেবে সে তেমন কিছু না। তা ছাড়া সে খুব সুন্দরীও না। মোটামুটি ধরনের চেহারা। আমার মামাতো ভাই তবু কেন জানি একবারমাত্র এই মেয়েকে দেখেই বলে দিয়েছে—এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে না। মেয়ের বাবা নেই তো কী হয়েছে? সবার বাবা চিরকাল থাকে নাকি? মেয়ের মা’র বিয়ে হয়েছে, তাতে অসুবিধাটা কী? অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, তাঁর তো বিয়ে করাই উচিত। এমন তো না যে, দেশে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ।

    মামা-মামীকে শেষ পর্যন্ত মত দিতে হল, তবে খুব খুশিমনে মত দিলেন না, কারণ মেয়ের বড়চাচাকেও তাঁদের খুবই অপছন্দ হয়েছে। লোকটা নাকি অভদ্রের চূড়ান্ত। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। চামার টাইপ।

    বিয়ের দিন তারিখ হল।

    এক মঙ্গলবার কাকডাকা ভোরে আমরা একটা মাইক্রোবাস এবং সাদা রঙের টয়োটায় করে রওনা হলাম। গন্তব্য ঢাকা থেকে নব্বই মাইল দূরের এক মফস্বল শহর। মফস্বল শহরের নামটা আমি বলতে চাচ্ছি না। গল্পের জন্যে সেই নাম জানার প্রয়োজনও নেই।

    তেত্রিশ জন বরযাত্রী। অধিকাংশই ছেলেছোকরা। হৈচৈয়ের চূড়ান্ত হচ্ছে। এই মাইক বাজছে, এই মাইক্রোবাসের ভেতর ব্রেক ডান্স হচ্ছে, এই পটকা ফুটছে। ফাঁকা রাস্তায় এসে মাইক্রোবাসের গিয়ারবক্সে কী যেন হল। একটু পরপর বাস থেমে যায়। সবাইকে নেমে ঠেলতে হয়। বরযাত্রীদের উৎসাহ তাতে যেন আরো বাড়ল। শুধু আমার মামা অসম্ভব গম্ভীর হয়ে পড়লেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘এটা হচ্ছে অলক্ষণ। খুবই অলক্ষণ। রওনা হবার সময় একটা খালি জগ দেখেছি, তখনি মনে হয়েছে একটা কিছু হবে। গিয়ারবক্স গেছে, এখন দেখবি চাকা পাংচার হবে। না হয়েই পারে না।’

    হলও তাই। একটা কালভার্ট পার হবার সময় চাকার হাওয়া চলে গেল। মামা বললেন, ‘কি, দেখলি? বিশ্বাস হল আমার কথা? এখন বসে বসে আঙুল চোষ।’

    স্পেয়ার চাকা লাগাতেও অনেক সময় লাগল। মামা ছাড়া অন্য কাউকে বিচলিত হতে দেখলাম না।

    বরযাত্রীদের উৎসাহ মনে হল আরো বেড়েছে। চিৎকার হৈচৈ হচ্ছে। একজন গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র বিয়েবাড়িতে পৌঁছানোর পরই সবার উৎসাহে খানিকটা ভাটা পড়ল।

    মফস্বল শহরের বড় বাড়িগুলি সাধারণত যে-রকম হয়, সে-রকম একটা পুরনো ধরনের বাড়ি। এইসব বাড়িগুলি এমনিতেই খানিকটা বিষণ্ণ প্রকৃতির হয়। এই বাড়ি দেখে মনে হল বিরাট একটা শোকের বাড়ি। খাঁ-খাঁ করছে চারদিক। লোকজন নেই। কলাগাছ দিয়ে একটা গেটের মতো করা হয়েছে, সেটাকে গেট না-বলে গেটের প্রহসন বলাই ভালো। একদিকে রঙিন কাগজের চেইন, অন্য দিকে খালি। হয় রঙিন কাগজ কম পড়েছে, কিংবা লোকজনের গেট প্রসঙ্গে উৎসাহ শেষ হয়ে গেছে। আমার মামা হতভম্ব। বরযাত্রীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ব্যাপারটা কি?

    হাফশার্ট-পরা এক চ্যাংড়া ছেলে এসে বলল, ‘আপনারা বসেন। বিশ্রাম করেন।’

    আমি বললাম, ‘আর লোকজন কোথায়? মেয়ের বড়চাচা কোথায়?’

    সেই ছেলে শুকনো গলায় বলল, ‘আছে, সবাই আছে। আপনারা বিশ্রাম করেন।’

    আমি বললাম, ‘কোনো সমস্যা হয়েছে?’

    সেই ছেলে ফ্যাকাসে হাসি হেসে বলল, ‘জ্বি-না, সমস্যা কিসের?’ এই বলেই সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। আর বেরুল না!

    বসার ঘরে চাদর পেতে বরযাত্রীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা। বারান্দায় গোটা দশেক ফোল্ডিং চেয়ার। বিয়েবাড়ির সজ্জা বলতে এইটুকুই।

    মামা বললেন, ‘বলেছিলাম না অলক্ষণ? এখন বিশ্বাস হল? কী কাণ্ড হয়েছে কে জানে! আমার তো মনে হয় বাড়িতে মেয়েই নেই। কারোর সঙ্গে পালিয়েটালিয়ে গেছে। মুখে জুতোর বাড়ি পড়ল, স্রেফ জুতোর বাড়ি।’

    মামা অল্পতেই উত্তেজিত হন। গত বছর তাঁর ছোটখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছে। উত্তেজনার ব্যাপারগুলি তাঁর জন্যে ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমি মামাকে সামলাতে চেষ্টা করলাম। হাসিমুখে বললাম, ‘হাত-মুখ ধুয়ে একটু শুয়ে থাকুন তো মামা। আমি খোঁজ নিচ্ছি কী ব্যাপার।’

    মামা তীব্র গলায় বললেন, ‘হাত-মুখটা ধোব কী দিয়ে, শুনি? হাত-মুখ ধোবার পানি কেউ দিয়েছে? বুঝতে পারছিস না? এরা বেইজ্জতির চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।’

    ‘কী যে বলেন মামা!’

    ‘কথা যখন অক্ষরে-অক্ষরে ফলবে, তখন বুঝবি কী বলছি। কাপড়চোপড় খুলে ন্যাংটো করে সবাইকে ছেড়ে দেবে। পাড়ার লোক এনে ধোলাই দেবে। আমার কথা বিশ্বাস না-হয়, লিখে রাখ।’

    মামার কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই খালিগায়ে নীল লুঙ্গি-পরা এক লোক প্লাস্টিকের বালতিতে করে এক বালতি পানি এবং একটা মগ নিয়ে ঢুকল। পাথরের মতো মুখ করে বলল, ‘হাত-মুখ ধোন। চা আইতাছে।’

    মামা বললেন, ‘খবরদার কেউ চা মুখে দেবে না, খবরদার! দেখি ব্যাপার কী।’

    ভেতরবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে। বিয়েবাড়িতে কান্না কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু এই কান্না অস্বাভাবিক লাগছে। মধ্যবয়স্ক এক লোক এক বিশাল কেটলিতে করে চা নিয়ে ঢুকল।! আমি তাঁকে বললাম, ‘ব্যাপার কী বলেন তো ভাই?’ সেই লোক বলল, ‘কিছু না।’

    ভেতরবাড়ির কান্না এই সময় তীব্র হল। কান্না এবং মেয়েলি গলায় বিলাপ। কান্না যেমন হঠাৎ তুঙ্গে উঠেছিল, তেমনি হঠাৎই নেমে গেল। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মেয়ের বড়োচাচা ঢুকলেন। ভদ্রলোককে দেখেই মনে হল তাঁর ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। তিনি নিচু গলায় যা বললেন, তা শুনে আমরা স্তম্ভিত। কী সর্বনাশের কথা! জানলাম যে কিছুক্ষণ আগেই তাঁর বড়ছেলে মারা গেছে। অনেক দিন থেকেই অসুখে ভুগছিল। আজ সকাল থেকে খুব বাড়াবাড়ি হল। সব এলোমেলো হয়ে গেছে এই কারণেই। তিনি তার জন্যে লজ্জিত, দুঃখিত ও অনুতপ্ত। তবে যত অসুবিধাই হোক— বিয়ে হবে। আজ রাতে সম্ভব হবে না, পরদিন।

    এই কথা বলতে-বলতে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

    আমার মামা খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। অল্পতে রাগতেও পারেন, আবার সেই রাগ হিমশীতল পানিতে রূপান্তরিত হতেও সময় লাগে না। তিনি মেয়ের বড়চাচাকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কেঁদে ফেললেন। কাতর গলায় বললেন, ‘আপনি আমাদের নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমাদের কিচ্ছু লাগবে না, আপনি বাড়ির ভেতরে যান বেয়াই সাহেব।’

    অদ্ভুত একটা অবস্থা! এর চেয়ে যদি শুনতাম মেয়ে পালিয়ে গেছে, তাও ভালো ছিল। কারো ওপর রাগ ঢেলে ফেলা যেত।

    আমরা বরযাত্রীরা খুবই বিব্রত বোধ করছি। স্থানীয় লোকজন এখন দেখতে পাচ্ছি।

    তারা বোধহয় এতক্ষণ ভেতরের বাড়িতে ছিলেন। আমরা বসার ঘরেই আছি। খিদেয় একেক জন প্রায় মরতে বসেছি। খাবার কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। এই পরিস্থিতিতে খাবারের কথা জিজ্ঞেসও করা যায় না। একজন মামাকে কানে-কানে এই ব্যাপারে বলতেই তিনি রাগী গলায় বললেন, ‘তোমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে—এত বড় একটা শোকের ব্যাপার, আর তোমরা খাওয়ার চিন্তায় অস্থির! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এক রাত না খেলে হয় কী? খবরদার, আমার সামনে কেউ খাবারের কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবে না।’

    আমরা চুপ করে গেলাম। বার-তের বছরের ফুটফুটে একটি মেয়ে এসে পানভর্তি একটা পানদান রেখে গেল। কাঁদতে-কাঁদতে মেয়েটি চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। এখনও কাঁদছে।

    মামা মেয়েটিকে বললেন, ‘লক্ষ্মী সোনা, তোমাদের মোটেই ব্যস্ত হতে হবে না। আমাদের কিছুই লাগবে না।’

    রাত আটটার দিকে থাকা এবং খাওয়ার সমস্যার একটা সমাধান হল। স্থানীয় লোকজন ঠিক করলেন, প্রত্যেকেই তাঁদের বাড়িতে একজন-দু’জন করে গেস্ট নিয়ে যাবেন। বিয়ে হবে পরদিন বিকেলে।

    আমাকে যিনি নিয়ে চললেন, তাঁর নাম সুধাকান্ত ভৌমিক। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। বেঁটেখাটো মানুষ। শক্তসমর্থ চেহারা। এই বয়সেও দ্রুত হাঁটতে পারেন। ভদ্রলোক মৃদুভাষী। মাথার চুল ধবধবে সাদা। গেরুয়া রঙের একটা চাদর দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন বলেই কেমন যেন ঋষি-ঋষি লাগছে।

    আমি বললাম, ‘সুধাকান্তবাবু, আপনার বাসা কত দূর?’

    উনি বললেন, ‘কাছেই।’

    গ্রাম এবং মফস্বলের লোকদের দূরত্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাদের ‘কাছেই’ আসলে দিল্লি হনুজ দূর অস্তের মতো। আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই।

    অগ্রহায়ণ মাস। গ্রামে এই সময়ে ভালো শীত থাকে। আমার গায়ে পাতলা একটা পাঞ্জাবি। শীত ভালোই লাগছে।

    আমি আবার বললাম, ‘ভাই, কত দূর?’

    ‘কাছেই।’

    আমরা একটা নদীর কাছাকাছি এসে পড়লাম। আঁতকে উঠে বললাম, ‘নদী পার হতে হবে নাকি?’

    ‘পানি নেই, জুতো খুলে হাতে নিয়ে নিন।’

    রাগে আমার গা জ্বলে গেল। এই লোকের সঙ্গে আসাই উচিত হয় নি। আমি জুতো খুলে পায়জামা গুটিয়ে নিলাম। হেঁটে নদী পার হওয়ার কোনো আনন্দ থাকলেও থাকতে পারে। আমি কোনো আনন্দ পেলাম না, শুধু ভয় হচ্ছে কোনো গভীর খানাখন্দে পড়ে যাই কি না। তবে নদীর পানি বেশ গরম।

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনাকে কষ্ট দিলাম।’

    ভদ্রতা করে হলেও আমার বলা উচিত, ‘না, কষ্ট কিসের!’ তা বললাম না। নদী পার হয়ে পায়জামা নামাচ্ছি, সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি ছেলের কে হন?’

    ‘ফুপাতো ভাই।’

    ‘বিয়েটা না-হলে ভালো হয়। সকালে সবাইকে বুঝিয়ে বলবেন।’

    ‘সে কী!’

    ‘মেয়েটার কারণে ছেলেটা মরল। এখন চট করে বিয়ে হওয়া ঠিক না। কিছুদিন যাওয়া উচিত।’

    ‘কী বলছেন এ-সব!’

    ‘ছেলেটা সকালবেলা বিষ খেয়েছে। ধুতরা বীজ। এই অঞ্চলে ধুতরা খুব হয়।’

    ‘আপনি বলছেন কী ভাই?’

    ‘ছেলের বাবা রাজি হলেই পারত। ছেলেটা বাঁচত। গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ। তার “না” মানেই না।’

    ‘ছেলে-মেয়ের এই প্রেমের ব্যাপারটা সবাই জানে নাকি?’

    ‘জানবে না কেন? মফস্বল শহরে এইসব চাপা থাকে না। আপনাদের শহরে অন্য কথা। আকছার হচ্ছে।’

    আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এ কী সমস্যা! বাকি পথ দু’ জন নীরবে পার হলাম।

    পুরোপুরি নীরব বলাটা বোধহয় ঠিক হল না। ভদ্রলোক নিজের মনেই মাঝে-মাঝে বিড়বিড় করছিলেন। মন্ত্রটন্ত্র পড়ছেন বোধহয়।

    ভদ্রলোকের বাড়ি একেবারে জঙ্গলের মধ্যে। একতলা পাকা দালান। প্রশস্ত উঠোন। উঠোনের মাঝখানে তুলসী মঞ্চ। বাড়ির লাগোয়া দু’টি প্রকাণ্ড কামিনী গাছ। একপাশে কুয়া আছে। হিন্দু বাড়িগুলো যেমন থাকে, ছবির মতো পরিচ্ছন্ন। উঠোনে দাঁড়াতেই মনে শান্তি-শান্তি একটা ভাব হল। আমি বললাম, ‘এত চুপচাপ কেন? বাড়িতে লোকজন নেই?’

    ‘না।’

    ‘আপনি একা নাকি?’

    ‘হুঁ।’

    ‘বলেন কী! একা-একা এত বড় বাড়িতে থাকেন!’

    ‘আগে অনেক লোকজন ছিল। কিছু মরে গেছে। কিছু চলে গেছে ইণ্ডিয়াতে। এখন আমি একাই আছি। আপনি স্নান করে ফেলুন।’

    ‘স্নান—ফান লাগবে না। আপনি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন, তাহলেই হবে।’

    ‘একটু সময় লাগবে, রান্নার জোগাড় করতে হবে।’

    ‘আপনি কি এখন রান্না করবেন?’

    ‘রান্না না করলে খাবেন কী? বেশিক্ষণ লাগবে না।’

    ভদ্রলোক গামছা, সাবান এবং একটা জলচৌকি এনে কুয়ার পাশে রাখলেন।

    ‘স্নান করে ফেলুন। সারা দিন জার্নি করে এসেছেন, স্নান করলে ভালো লাগবে। কুয়ার জল খুব ভালো। দিন, আমি জল তুলে দিচ্ছি।’

    ‘আপনাকে তুলতে হবে না। আপনি বরং রান্না শুরু করুন। খিদেয় চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে।’

    ‘এই লুঙ্গিটা পরুন। ধোয়া আছে। আজ সকালেই সোডা দিয়ে ধুয়েছি। আমার আবার পরিষ্কার থাকার বাতিক আছে, নোংরা সহ্য করতে পারি না।’

    ভদ্রলোক যে নোংরা সহ্য করতে পারেন না, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তিনি রান্না করতে বসেছেন উঠোনে। উঠোনেই পরিষ্কার ঝকঝকে দুটো মাটির চুলা। সুধাকান্তবাবু চুলার সামনে জলচৌকিতে বসেছেন। থালা, বাটি, হাঁড়ি সবই দেখি দু’ বার তিন বার করে ধুচ্ছেন।

    ‘সুধাকান্তবাবু?’

    ‘বলুন।’

    ‘আপনি বিয়ে করেন নি?’

    ‘না।’

    ‘চিরকুমার?’

    ‘ঐ আর কি।’

    ‘আপনি করেন কী?’

    ‘শিক্ষকতা করি। হাই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। মনোহরদি হাই স্কুল।’

    ‘রান্নাবান্না আপনি নিজেই করেন?’

    ‘হ্যাঁ, নিজেই করি। এক বেলা রান্না করি। এক বেলা ভাত খাই, আর সকালে চিঁড়া, ফলমূল—এ-সব খাই।’

    ‘কাজের লোক রাখেন না কেন?’

    ‘দরকার পড়ে না।’

    ‘খালি বাড়ি পড়ে থাকে, চুরি হয় না?’

    ‘না। চোর নেবে কী? আমি এক জন দরিদ্র মানুষ। আপনি স্নান করে নিন। স্নান করলে ভালো লাগবে।’

    অপরিচিত জায়গায় ঠাণ্ডার মধ্যে গায়ে পানি ঢালার আমার কোনোই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সুধাকান্তবাবু মনে হচ্ছে আমাকে না ভিজিয়ে ছাড়বেন না। লোকটি সম্ভবত শুচিবাইগ্রস্ত।

    কুয়ার পানি নদীর পানির মতো গরম নয়, খুব ঠাণ্ডা। পানি গায়ে দিতেই গা জুড়িয়ে গেল। সারা দিনের ক্লান্তি, বিয়েবাড়ির উদ্বেগ, মৃত্যুসংক্রান্ত জটিলতা—সব ধুয়ে-মুছে গেল। চমৎকার লাগতে লাগল। তা ছাড়া পরিবেশটাও বেশ অদ্ভুত। পুরনো ধরনের একটা বাড়ি। ঝকঝকে উঠোনের শেষ প্রান্তে শ্যাওলা ধরা প্রাচীন কুয়া। আকাশে পরিষ্কার চাঁদ। কামিনী ফুলের গাছ থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি গন্ধ। এক ঋষির মতো চেহারার চিরকুমার বৃদ্ধ রান্না বসিয়েছেন। যেন বিভূতিভূষণের উপন্যাসের কোনো দৃশ্য।

    ‘সুধাকান্তবাবু?’

    ‘বলুন।’

    ‘রান্নার কত দূর?’

    ‘দেরি হবে না।’

    ‘একা-একা থাকতে আপনার খারাপ লাগে না?’

    ‘না, অভ্যেস হয়ে গেছে।’

    ‘বাসায় ফিরে আপনি করেন কী?’

    ‘তেমন কিছু করি না। চুপচাপ বসে থাকি।’

    ‘ভয় লাগে না?’

    সুধাকান্তবাবু এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না।

    খাবার আয়োজন সামান্য, তবে এত চমৎকার রান্না আমি দীর্ঘদিন খাই নি। একটা কিসের যেন ভাজি, তাতে পাঁচফোড়নের গন্ধ—খেতে একটু টক-টক। বেগুন দিয়ে ডিমের তরকারি, তাতে ডালের বড়ি দেওয়া। ডালের বড়ি এর আগে আমি খাই নি। এমন একটা সুখাদ্য দেশে প্রচলিত আছে তা-ই আমার জানা ছিল না। মুগের ডাল। ডালে ঘি দেওয়াতে অপূর্ব গন্ধ।

    আমি বললাম, ‘সুধাকান্তবাবু, এত চমৎকার খাবার আমি আমার জীবনে খাই নি। দীর্ঘদিন মনে থাকবে।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি ক্ষুধার্ত ছিলেন, তাই এত ভালো লেগেছে। রুচির রহস্য ক্ষুধায়। যেখানে ক্ষুধা নেই, সেখানে রুচিও নেই।’

    আমি চমৎকৃত হলাম।

    লোকটির চেহারাই শুধু দার্শনিকের মতো না, কথাবার্তাও দর্শনঘেঁষা।

    সুধাকান্তবাবু উঠোনে পাটি পেতে দিলেন। খাওয়াদাওয়ার পর সিগারেট হাতে সেখানে বসলাম। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করা যেতে পারে। সুধাকান্তবাবুকে অবশ্যি খুব আলাপী লোক বলে মনে হচ্ছে না। এই যে দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে আছি, তিনি এর মধ্যে আমার নাম জানতে চান নি। আমি কী করি তাও জানতে চান নি। আমি এই মানুষটির প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ বোধ করছি, কিন্তু এই লোকটা আমার প্রতি কোনো আগ্রহ বোধ করছে না। অথচ আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যারা মাস্টারি করে, তারা কথা বলতে খুব পছন্দ করে। অকারণেই কথা বলে।

    প্রায় মিনিট পনের আমরা চুপচাপ বসে থাকার পর সুধাকান্তবাবু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন একা-একা আমি এই বাড়িতে থাকতে ভয় পাই কি না, তাই না?’

    আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ভয় পাই। প্রায় রাতেই ঘুমুতে পারি না, জেগে থাকি। ঘরের ভেতর আগুন করে রাখি। হারিকেন জ্বালান থাকে। ওরা আগুন ভয় পায়। আগুন থাকলে কাছে আসে না।’

    আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কারা?’

    তিনি জবাব দিলেন না।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি ভূতপ্রেতের কথা বলছেন?’

    ‘হ্যাঁ।’

    আমি মনে-মনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। পৃথিবী কোথায় চলে গিয়েছে এই বৃদ্ধ তা বোধহয় জানে না। চাঁদের পিঠে মানুষের জুতোর ছাপ পড়েছে, ভাইকিং উপগ্রহ নেমেছে মঙ্গলের মরুভূমিতে, ভয়েজার ওয়ান এবং টু উড়ে গেছে বৃহস্পতির কিনারা ঘেঁষে, আর এই অঙ্কের শিক্ষক ভূতের ভয়ে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রাখছে। কারণ, অশরীরীরা আগুন ভয় পায়।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি ওদের দেখেছেন কখনো?’

    ‘না।’

    ‘ওদের পায়ের শব্দ পান?’

    ‘তাও না।’

    ‘তাহলে?’

    ‘বুঝতে পারি।’

    ‘বুঝতে পারেন?’

    ‘জ্বি। আপনি যখন আছেন, আপনিও বুঝবেন।’

    ‘ওদের কাণ্ডকারখানা দেখতে পাব, তাই বলছেন?’

    ‘হুঁ, তবে ওদের না, এক জন শুধু আসে।’

    ‘তাও ভালো যে এক জন আসে। আমি ভেবেছিলাম দলবল নিয়ে বোধহয় চলে আসে। নাচ গান হৈ-হল্লা করে।’

    ‘আপনি আমার কথা একেবারেই বিশ্বাস করছেন না?’

    ‘ঠিকই ধরেছেন, বিশ্বাস করছি না। অবশ্যি এই মুহূর্তে আমার গা ছমছম করছে। কারণ, আপনার পরিবেশটা ভৌতিক।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ওরা কিন্তু আছে।’

    আমি চুপ করে রইলাম। এই বৃদ্ধের সঙ্গে ভূত আছে কি নেই, তা নিয়ে তর্ক করার কোনো অর্থ হয় না। থাকলে থাকুক।

    ‘আমার কাছে যে আসে, সে একটা মেয়ে।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জ্বি, এগার-বার বছর বয়স।’

    ‘বুঝলেন কী করে তার বয়স এগার-বার? আপনাকে বলেছে?’

    ‘জ্বি-না। অনুমান করে বলছি।’

    ‘তার নাম কি? নাম জানেন?’

    ‘জ্বি না।’

    ‘সে এসে কী করে?’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘মেয়েটি যে আসছে এই কি যথেষ্ট নয়? তার কি আর কিছু করার প্রয়োজন আছে?’

    আমি চুপ করে গেলাম। আসলেই তো, অশরীরী এক বালিকার উপস্থিতিই তো যথেষ্ট। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি নিজেও হয়তো দেখতে পারবেন।’ আমি চমকে উঠলাম। ভদ্রলোক সহজ স্বরে বললেন, ‘আমি ছাড়াও অনেকে দেখেছে।’

    সুধাকান্তবাবু ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন এবং তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বিকট একটা হাসি শুনলাম। উঠোন কাঁপিয়ে গাছপালা কাঁপিয়ে হো-হো করে কে যেন হেসে উঠল। সুধাকান্তবাবু পাশে না থাকলে অজ্ঞানই হয়ে যেতাম। আমি তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কে, কে?’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ওটা কিছু না।’

    আমি ভয়-জড়ানো গলায় বললাম, ‘কিছু না মানে?’

    ‘ওটা খাটাশ। মানুষের মতো শব্দ করে হাসে।’

    ‘বলেন কী। খাটাশের নাম তো এই প্রথম শুনলাম। এ তো ভূতের বাবা বলে মনে হচ্ছে। এখনো আমার গা কাঁপছে।’

    ‘জল খান। জল খেলে ভয়টা কমবে।’

    সুধাকান্তবাবু কাঁসার গ্লাসে করে পানি নিয়ে এলেন। খাটাশ নামক জন্তুটি আরেক বার রক্ত হিম করা হাসি হাসল। সুধাকান্তবাবু যদি কিছু না বলতেন তাহলে ভূতের হাসি শুনেছি, এই ধারণা সারা জীবন আমার মনের মধ্যে থাকত।

    লোকটার প্রতি এই প্রথম আমার খানিকটা আস্থা হল। আজগুবি গল্প বলে ভয় দেখান এই লোকের ইচ্ছা নয় বলেই মনে হল। এ-রকম ইচ্ছা থাকলে, এই ভয়ংকর হাসির কারণ সম্পর্কে সে চুপ করে থাকত।

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ঐ মেয়েটার কথা শুনবেন?’

    ‘হ্যাঁ, শোনা যেতে পারে। তবে আমি নিজে অবিশ্বাসী ধরনের মানুষ, কাজেই গল্পের মাঝখানে যদি হেসে ফেলি কিছু মনে করবেন না।’

    ‘এই গল্পটা কাউকে বলতে ভালো লাগে না। অবশ্যি অনেককে বলেছি। এখানকার সবাই জানে।’

    ‘আপনার গল্প এখানকার সবাই বিশ্বাস করেছে?’

    সুধাকান্তবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি যদি এখানকার কাউকে একটা মিথ্যা কথাও বলি, এরা বিশ্বাস করবে। এরা আমাকে সাধুবাবা বলে ডাকে। আমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে কোনো মিথ্যা কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। আমি থাকি একা-একা। আমার প্রয়োজনও সামান্য। মানুষ মিথ্যা কথা বলে প্রয়োজন এবং স্বার্থের কারণে। আমার সেই সমস্যা নেই। এইসব থাক, আমি বরং গল্পটা বলি।’

    ‘বলুন।’

    ‘ভেতরে গিয়ে বসবেন? এখানে মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা লাগছে। অগ্রহায়ণ মাসে হিম পড়ে।’

    ‘আমার অসুবিধা হচ্ছে না, এখানেই বরং ভালো লাগছে। গ্রামে তেমন আসা হয় না। আপনি শুরু করুন।’

    সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করতে গিয়েও শুরু করলেন না। হঠাৎ যেন একটু অন্য রকম হয়ে গেলেন। যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু দেখতে চেষ্টা করছেন। খসখস শব্দ হল। নতুন কাপড় পরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, সে-রকম। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কাঁচের চুড়ির টুং-টুং শব্দের মতো শব্দ। আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

    সুধাকান্তবাবু ফ্যাকাসে মুখে হাসলেন। আমি বললাম, ‘কিসের শব্দ হল?’

    তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘ও কিছু না, আপনি গল্প শুনুন। আজ ঘুমিয়ে কাজ নেই, আসুন গল্প করে রাত পার করে দিই।’

    গা-ছমছমে পরিবেশ। বাড়ির লাগোয়া ঝাঁকড়া কামিনী গাছ থেকে কামিনী ফুলের নেশা-ধরান গন্ধ আসছে। কুয়ার আশেপাশে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে নিভছে। উঠোনের চুলা থেকে ভেসে আসছে পোড়া কাঠের গন্ধ। আকাশ-ভরা নক্ষত্রবীথি।

    সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করলেন।