Blog

  • পথিক শিশু

    পথিক শিশু

    পথিক শিশু

    নাম-হারা তুই পথিক শিশু এলি অচিন দেশ পারায়ে।

    কোন নামের আজ পরলি কাঁকন? বাঁধনহারার কোন্ কারা এ?

    আবার মনের মতন করে

    কোন নামে বল ডাকব তোরে?

    পথভোলা তুই এই সে ঘরে

    >ছিলি ওরে, এলি ওরে বারে বারে নাম হারায়ে।

    ওরে জাদু, ওরে মানিক, আঁধার ঘরের রতন-মণি!

    ক্ষুধিত ঘর ভরলি এনে ছোট্ট হাতের একটু ননী।

    আজ কেন রে নিবিড় মুখে

    কান্না-সায়র উথলে বুকে?

    নতুন নামে ডাকতে তোকে

    ওরে কে কণ্ঠ রুখে? পাঁচ-ফাগুনের জুঁই-চারা এ!

    আজ মন-পাখি ধায় মধুরতম নাম আশিসের শেষ ছাড়ায়ে।

  • নিরুদ্দেশের যাত্রী

    নিরুদ্দেশের যাত্রী

    নিরুদ্দেশের যাত্রী

    নিরুদ্দেশের পথে যেদিন প্রথম আমার যাত্রা হল শুরু

    নিবিড় সে কোন্ বেদনাতে ভয়-আতুর এ বুক কাঁপল দুরু দুরু।

    মিটল না ভাই চেনার দেনা, অমনি মুহুর্মুহু

    ঘর-ছাড়া ডাক করলে শুরু অথির বিদায়-কুহু –

    উহু উহু উহু!

    হাতছানি দেয় রাতের শাঙন,

    অমনি বাঁধে ধরল ভাঙন,

    ফেলিয়ে বিয়ের হাতের কাঙন –

    আমি খুঁজি কোন্ আঙনে কাঁকন বাজে গো!

    বেরিয়ে দেখি, ছুটছে কেঁদে বাদলি হাওয়া হু হু,

    মাথার ওপর দৌড়ে টাঙন, ঝড়ের মাতন,

    দেয়ার গুরু গুরু।

    পথ হারিয়ে কেঁদে ফিরি, ‘আর বাঁচিনে!

    কোথায় প্রিয় কোথায় নিরুদ্দেশ?’

    কেউ আসে না, মুখে শুধু ঝাপটা মারে

    নিশীথ-মেঘের আকুল চাঁচর কেশ!

    ‘তালবনা’তে ঝঞ্ঝা তাথই হাততালি দেয়, বজ্রে বাজে তূরী,

    মেখলা ছিঁড়ি পাগলি মেয়ে বিজলি-বালা নাচায় হিরের চুড়ি

    ঘুরি ঘুরি ঘুরি

    (ও সে) সকল আকাশ জুড়ি!

    থামল বাদল রাতের কাঁদা,

    ভোরের তারা কনক-গাঁদা,

    ফুটল, ও মোর টুটল ধাঁধা –

    হঠাৎ ও কার নূপুর শুনি গো?

    থামল নূপুর, ভোরের তারাও বিদায় নিল ঝুরি!

    এখন চলি সাঁঝের বধূ সন্ধ্যাতারার চলার পথে গো!

    আজ অস্তপারের শীতের বায়ু কানের কাছে বইছে ঝুরু ঝুরু॥

  • আশা

    আশা

    আশা

    মহান তুমি প্রিয়

    এই কথাটির গৌরবে মোর চিত্ত ভরে দিয়ো॥

    অনেক আশায় বসে আছি যাত্রা-শেষের পর

    তোমায় নিয়েই পথের পারে বাঁধব আমার ঘর–

    হে চির-সুন্দর!

    পথ শেষ সেই তোমায় যেন করতে পারি ক্ষমা,

    হে মোর কলঙ্কিনী প্রিয়তমা!

    সেদিন যেন বলতে পারি, ‘এসো এসো প্রিয়,

    বক্ষে এসো এসো আমার পূত কমনীয়!’

    হায় হারানো লক্ষ্মী আমার! পথ ভুলেছ বলে

    চির-সাথী যাবে তোমার মুখ ফিরিয়ে চলে?

    জান ওঠে হায় মোচড় খেয়ে চলতে পড়ি টলে–

    অনেক জ্বালায় জ্বলে প্রিয় অনেক ব্যথায় গলে!

    বারে বারে নানান রূপে ছলতে আমায় শেষে,

    কলঙ্কিনী! হাতছানি দাও সকল পথে এসে

    কুটিল হাসি হেসে?

    ব্যথায় আরো ব্যথা হানাই যে সে!

    তুমি কি চাও তোমার মতোই কলঙ্কী হই আমি?

    তখন তুমি সুদূর হতে আসবে ঘরে নামি–

    হে মোর প্রিয়, হে মোর বিপথগামী!

    পথের আজও অনেক বাকি,

    তাই যদি হয় প্রিয়–

    পথের শেষে তোমায় পাওয়ার যোগ্য করেই নিয়ো॥

  • মানিনী

    মানিনী

    মানিনী

    মূক করে ওই মুখর মুখে লুকিয়ে রেখো না,

    ওগো কুঁড়ি, ফোটার আগেই শুকিয়ে থেকো না!

    নলিন নয়ান ফুলের বয়ান মলিন এদিনে

    রাখতে পারে কোন সে কাফের আশেক বেদীনে?

    রুচির চারু পারুল বনে কাঁদচ একা জুঁই,

    বনের মনের এ বেদনা কোথায় বলো থুই?

    হাসির রাশির একটি ফোঁটা অশ্রু অকরুণ,

    হাজার তারা মাঝে যেন একটি কেঁদে খুন!

    বেহেশতে কে আনলে এমন আবছা বেথার রেশ,

    হিমের শিশির ছুঁয়ে গেছে হুরপরিদের দেশ!

    বরষ পরের দরশনের কই সে হরষণ,

    মিলবে না কি শিথিল তোমার বাহুর পরশন?

    শরম টুটে ফুটুক কলি শিশির-পরশে

    ঘোমটা ঠেলে কুণ্ঠা ফেলে সলাজ হরষে।

  • নিকটে

    নিকটে

    নিকটে1

    বাদলা-কালো স্নিগ্ধা আমার কান্ত এল রিমঝিমিয়ে,

    বৃষ্টিতে তার বাজল নুপূর পায়জোরেরই শিঞ্জিনী যে।

    ফুটল উষার মুখটি অরুণ, ছাইল বাদল তাম্বু ধরায়;

    জমল আসর বর্ষা-বাসর, লাও সাকি লাও ভর-পিয়ালায়।

    ভিজল কুঁড়ির বক্ষ-পরাগ হিম-শিশিরের আমেজ পেয়ে

    হমদম! হরদম দাও মদ, মস্ত্ করো গজল গেয়ে!

    ফেরদৌসের ঝরকা বেয়ে গুল-বাগিচায় চলচে হাওয়া,

    এই তো রে ভাই ওক্ত খুশির, দ্রাক্ষারসে দিলকে নাওয়া।

    কুঞ্জে জরীন ফারসি ফরাস বিছিয়েচে আজ ফুলবালারা,

    আজ চাই-ই চাই লাল-শিরাজি স্বচ্ছ-সরস খোর্মা-পারা!

    মুক্তকেশী ঘোর-নয়না আজ হবে গো কান্তা সাকি,

    চুম্বন এবং মিষ্টি হাতের মদ পেতে তাই ভরসা রাখি!

    কান্তা সাথে বাঁচতে জনম চাও যদি কওসর-অমিয়,

    সুর বেঁধে বীণ সারেঙ্গিতে খুবসে শিরীন শরাব পিয়ো!

    খুঁজবে যেদিন সিকান্দারের বাঞ্ছিত আব্-হায়াত কুঁয়ায়,

    সন্ধান তার মিলবে আশেক দিল-পিয়ারার ওষ্ঠ চুমায়!

    খামখা তুমি মরছ কাজী শুষ্ক তোমার শাস্ত্র ঘেঁটে,

    মুক্তি পাবে মদখোরের এই আল-কিমিয়ার পাত্র চেটে!

  • অবসর

    অবসর

    অবসর

    লক্ষ্মী আমার! তোমার পথে আজকে অভিসার,

    অনেক দিনের পর পেয়েছি মুক্তি-রবিবার।

    দিনের পর দিন গিয়েছে হয়নি আমার ছুটি,

    বুকের ভিতর ব্যর্থ কাঁদন পড়ত বৃথাই লুটি

    বসে   ঢুলত আঁখি দুটি!

    আহা আজ পেয়েছি মুক্ত হাওয়া

    লাগল চোখে তোমার চাওয়া

    তাইতো প্রাণে বাঁধ টুটেছে রুদ্ধ কবিতার।

    তোমার তরে বুকের তলায় অনেক দিনের অনেক কথা জমা,

    কানের কাছে মুখটি থুয়ে গোপন সে-সব কইব প্রিয়তমা!

    এবার শুধু কথায় গানে রাত্রি হবে ভোর

    শুকতারাতে কাঁপবে তোমার নয়ন-পাতার লোর

    অভি-মানিনীরে মোর!

    যখন   তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি

       মলিন মুখে ফুটবে হাসি,

       হিম-মুকুরে উঠবে ভাসি

       অরুণ ছবি তার।

  • স্মরণে

    স্মরণে

    স্মরণে

    আজ
    নতুন করে পড়ল মনে মনের মতনে
    এই
    শাঙন সাঁঝের ভেজা হাওয়ায়, বারির পতনে।
    কার কথা আজ তড়িৎ-শিখায়
    জাগিয়ে গেল আগুন লিখায়,
    ভোলা যে মোর দায় হল হায়
    বুকের রতনে।
    এই
    শাঙন সাঁঝের ভেজা হাওয়ায়, বারির পতনে॥
    আজ
    উতল ঝড়ের কাতরানিতে গুমরে ওঠে বুক
    নিবিড় ব্যথায় মূক হয়ে যায় মুখর আমার মুখ।
    জলো হাওয়ার ঝাপটা লেগে
    অনেক কথা উঠল জেগে
    পরান আমার বেড়ায় মেগে
    একটু যতনে।
    এই
    শাঙন সাঁঝের ভেজা হাওয়ায়, বারির পতনে।
  • পূবের হাওয়া

    পূবের হাওয়া

    পূবের হাওয়া

    ‘পূবের হাওয়া’ প্রকাশের কালক্রমে কাজী নজরুল ইসলামের সপ্তম কাব্যগ্রন্থ। প্রথম প্রকাশকাল আশ্বিন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ (অক্টোবর ১৯২৫)। প্রকাশক মজিবল হক, বি,কম্, ভোলা বরিশাল। মুদ্রাকর মজিবল হক, বি,কম্। ওরিয়েণ্টাল প্রিণ্টার্স লিমিটেড, ২৬/৯/১এ, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা।  পৃষ্ঠা: ২+৫০। দাম পাঁচ সিকা। প্রকাশক ‘একটি কথা’য় বলেন—

    ‘পূবের হাওয়া’য় পঞ্চাশটি কবিতা যাওয়ার কথা। এবার সাঁইত্রিশটি গেল; পর বারে সব কটি দেওয়া যাবে।

    প্রথম সংস্করণের মোট ৩৭টি কবিতা ও গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ২৬টি কবিতা ও গান ‘ছায়ানট’ কাব্যগ্রন্থে পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছিল।  নিম্নে সেগুলোর তালিকা প্রদান করা হল এবং বন্ধনীর ভিতরে ‘ছায়ানট’ কাব্যে প্রকাশিত শিরোনাম দেওয়া হল—

    শিরোনাম

    পূবের হাওয়ায়
    ছায়ানটে
    অনাদৃতা
    অভিমানিনী
    গৃহহারা
    দহন-মালা
    দুপুর অভিসার
    দূরের পথিক
    নিরুদ্দেশের যাত্রী
    নিশীথ-প্রীতম্
    পথিক-শিশু
    পুলক
    প্রণয়-হুল
    বরষায়
    বাঁশি বাজিল
    বিজয়িনী
    বিদায়-বাঁশী
    বেদন-হারা
    বেদনা মানিক
    মরমী
    রেশমী-ডোর
    শেষের ডাক
    শেষের প্রিতম্
    স্নেহতুরা
    স্নেহ-পরশ
    স্নেহ-ঋণী

    ‘ছায়ানট’ কাব্যে প্রকাশিত উল্লিখিত ২৬টি কবিতা ও গানের যেগুলো হুবহু ‘পূর্বের হাওয়া’ কাব্যে সঙ্কলিত হয়েছে সেগুলো ‘পূর্বের হাওয়া’র বর্তমান সংস্করণে বর্জন করা হয়েছে। তবে ‘ছায়ানট’ ও ‘পূবের হাওয়া’ সংস্করণে যে সকল কবিতা ও গানে পাঠভেদ আছে সেইগুলো বর্তমান সংস্করণে রাখা হয়েছে।

    ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘মুক্তি-বার’ কবিতাটির শেষস্তবকের প্রথম পঙ্‌ক্তি ‘তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি …’ ‘পূবের হাওয়া’য় হয়েছে এরূপ—

    যখন   তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি …’

    ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘পরশ-পূজা’ কবিতাটির ষষ্ঠ পঙ্‌ক্তি ‘পূবের হাওয়া’য় হয়েছে এরূপ—

    আহা পরশ তোমার জাগ্‌ছে যে গো এই সে, দেহে মম,

    কম  সরস হরষ-সম॥

    নবম পঙ্‌ক্তি হয়েছে এরূপ—

    তোমার  বাহুর বুকের শরম-ছোঁওয়ার আকুল কাঁপন আছে—

    মদির  অধীর পূলক নাচে॥

    এবং ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ পঙ্‌ক্তিদ্বয় হয়েছে এরূপ—

    আমি  চুমোয় চুমোয় ডুবাবো এই সকল দেহ মম—

    ওগো  শ্রাবণ-প্লাবণ সম॥

    ‘দূরের পথিক’ কবিতাটির প্রারম্ভ ‘পূবের হাওয়া’য় এরূপ—

    আজ অমন কর গো বারে-বারে জল-ছলছল চোখে চেয়ো চেয়ো না,

    শুধু  বিদায়ের গান গেয়ো না।

    ‘পুলক’ কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবক ‘পূবের হাওয়া’য় এরূপ—

    তার অবুঝ বনের সবুজ সুরে

    মাঠের নাটে পুলক পুরে,

    ঐ গহন বনের পথটি ঘুরে বাজিয়ে বাঁশী আসছে দূরে

    কচি পাতা দূত ওরি॥

    ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘শেষের গান’ অনেক শব্দ পরিবর্তন করে ‘শেষের ডাক’ শিরোনামে ‘পূবের হাওয়া’য় মুদ্রিত হয়েছে; তাই গানটি পূবের হাওয়ার বর্তমান সংস্করণে রাখা হয়েছে।

    ‘ছায়ানটের’ ‘মুক্তিবার’ কবিতার নাম ‘পূবের হাওয়া’য় ‘অবসর’। ‘অবসর’ কবিতার দ্বাদশ চরণের পরে আছে—

    অভিমানিনীরে মোর।

    ‘মুক্তিবারে’ এ চরণটি নেই।

    ছায়ানটের ‘নিরুদ্দেশের যাত্রী’ কবিতার একবিংশ ও দ্বাবিংশ চরণ দুটি এরূপ—

    থামল বাদল-রাতের কাঁদা

    হাসলো আবার টুটলো ধাঁধা।

    পূবের হাওয়ায় ‘নিরুদ্দেশের যাত্রী’ কবিতায় চরণ দুটি এরূপ—

    থামল বাদল রাতের কাঁদা

    ভোরের তারা কনক-গাঁদা।

    ছায়ানটের ‘চিরশিশু’ কবিতার শেষ তিন চরণ—

    ওরে ও কে কণ্ঠ রুখে

    উঠছে কেন মন ভারায়ে।

    অস্ত হতে এলে পথিক উদয় পানে পা বাড়ায়ে॥

    পূবের হাওয়ায় ‘পথিক শিশু’ কবিতার শেষ দুটি চরণ এরূপ—

    ওরে ও কে কণ্ঠ রুখে? পাঁচ ফাগুনের যুঁই-চারা এ

    আজ মন-পাখি ধায় মধুরতম নাম আশীষের শেষ ছাড়ায়ে।

    ছায়ানটের ‘দহনমালা’ কবিতার দ্বিতীয় চরণের ‘বদল দিয়ে’ এবং ষষ্ঠ চরণের ‘দু’হাতে পূরে’ পূবের হাওয়ার ‘দহনমালা’ কবিতায় যথাক্রমে ‘বদল করে’ ও ‘দু’ হাত ভরে’ হয়েছে।

    ছায়ানটের ‘বিধুরা পথিক-প্রিয়া’ ও পূবের হাওয়ার ‘পথিক-বধূ’ কবিতার প্রথম একাদশ চরণের পাঠ অভিন্ন। তারপরে ‘পথিক-বধূ’ কবিতায় পাই—

    পরদেশী কোন শ্যামল বঁধূর শুনতো বাঁশি সারাক্ষণ গো?

    চুমচো কারে? ও নয় তোমার পথিক-বঁধূর

    চপল হাসির হা-হা

    তরুণ ঝাউএর কচি পাতায় করুণ অরুণ কিরণ

    ও যে আ-হা

    দূরের পথিক ফিরে নাক আর (আহা আ-হা)

    ও সে সবুজ দেশের অবুঝ পাখি

    কখন্ এসে যাচবে বাঁধন, চল পাখি ঘরকে চল!

    ওকি? চোখে নাম্‌লো কেন মেঘের ছায়া ঢল ছল॥

    ছায়ানটের ‘ছলকুমারী’র প্রথম স্তবকের শেষ দুই চরণ এবং দ্বিতীয় স্তবকের প্রথম চরণে পাঠভেদ পাওয়া যায় পূবের হাওয়ার ‘প্রণয়-ছল’ কবিতায়। সেখানে—

    আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে

    অনামিকায় গড়িয়ে আঁচল গাল দুটিকে ঘামায়॥

    সবাই যখন ঘুমে মগন দুরু দুরু বুকে তখন

    আমায় চুপে চুপে

    রূপান্তরিত হয়েছে—

    আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে

    গাল দুটিকে ঘামায়॥

    অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল

    দুরু দুরু বুকে

    সবাই যখন ঘুমে মগন তখন আমায় চুপে চুপে।

    এই কবিতায় আরও কিছু পরিবর্তন লক্ষযোগ্য। যেমন— ‘ছলকুমারীর’র ‘সইরা হাসে দেখে তাহার’ ‘প্রণয়-ছলে’ ‘সইরা হাসে দেখে ছুঁড়ির’ এবং প্রথমোক্ত কবিতার—

    কি যে কথা সেই তা জানে

    ছলকুমারী নানান ছলে আমারে সে জানায়

    দ্বিতীয়োক্ত কবিতায়

    চলতে চাদর পরশ হানে

    আমারো কি নিতুই পথে তারি বুকের জামায়।

    ছায়ানটের ‘বাদল-দিনে’ কবিতার চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক এবং ষষ্ঠ স্তবকের প্রথম চরণদুটি পূবের হাওয়ার ‘বরষা’ কবিতায় নেই।

    এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত নতুন ১২টি কবিতা ও গান এবং সেগুলো সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল—

    ‘স্মরণে’ ১৩২৭ শ্রাবণে (জুলাই-আগষ্ট ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) ৩য় বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় ‘গান’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। শিরোনামের নীচে লেখা ছিল— “সুর—হিন্দুস্থানী—কাজরী”। তাতে দ্বিতীয় স্তবকের পঞ্চম পঙ্‌ক্তি ছিল নিম্নরূপ—

    তাই  পরাণ আমার বেড়ায় মেগে

    সে কা’র যতনে।

    ‘বাদল-প্রাতের শরাব’ আষাঢ় ১৩২৭ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক জুন-জুলাই ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনামের নীচে বন্ধনীতে লেখা ছিল—‘হাফিজ-এর ছন্দ ও ভাব অবলম্বনে’। ‘পূবের হাওয়ায় কবিতাটির শিরোনাম দেওয়া হয় ‘নিকটে’। এই কবিতাটি সম্বন্ধে ১৩২৭ বঙ্গাব্দ ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ শ্রীমোহিতলাল মজুমদার বলেন—

    ‘বাদল-প্রাতের শরাব’ শীর্ষক কবিতায় ইরানের পুষ্পসার ও দ্রাক্ষাসার ভরপুর হইয়া উঠিয়াছে। এ কবিতাটিতেও কবির ‘মস্ত’ হইবার ও ‘মস্ত’ করিবার ক্ষমতা প্রকাশ পাইয়াছে। বাঙ্গালি মাত্রেই ইহার উচ্ছল রসাবেশ অন্তরে অনুভব করিবে। কবির লেখনী জয়যুক্ত হউক।

    ‘মানিনী’ ১৩২৭ বৈশাখের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় ‘মানিনী বধূর প্রতি’ শিরোনামে বের হয়েছিল।

    ‘আশা’ ১৩২৭ পৌষের ‘সওগাতে’ ‘কলঙ্কী প্রিয়’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। বন্ধনীতে লেখা ছিল— ‘গান—বাউলের সুর’।

    ‘শরাবান্ তহুরা’ [‘নার্গিস বাগ্ মেঁ বাহার কি আগ্ মেঁ’] গানটি ১৯৩০ সালে রচিত বলে শ্রদ্বেয় মুজফ্‌ফর আহমদ ১৯৬৬ সালের ২রা আগস্ট তারিখে লেখা তাঁর একপত্রে (১৩৮১ সালের নজরুল একাডেমী পত্রিকায় প্রকাশিত] উল্লেখ করেছেন।

    ‘বিরহ-বিধুরা’ ১৩২৭ মাঘের ‘মোসলেম ভারতে’ ছাপা হয়েছিল। পাদটীকায় লেখা ছিল— “কাবুলী-কবি ‘খোশহাল’-এর হিন্দুস্থানে নির্বাসন-কালীন তাঁহার সহধর্মিনীর লিখিত একটি কবিতার ভাব অবলম্বনে’।

  • কুলি-মজুর

    কুলি-মজুর

    কুলি-মজুর

    দেখিনু সেদিন রেলে,

    কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!

    চোখ ফেটে এল জল,

    এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

    যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,

    বাবু সাব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।

    বেতন দিয়াছ? – চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!

    কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল?

    রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,

    রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,

    বল তো এ-সব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা

    কার খুনে রাঙা? – ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।

    তুমি জান নাকো, কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,

    ওই পথ, ওই জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!

    আসিতেছে শুভদিন,

    দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!

    হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,

    পাহাড়-কাটা সে পথের দু-পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,

    তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

    তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;

    তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরই গান,

    তাদেরই ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!

    তুমি শুয়ে রবে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,

    অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!

    সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে

    এই ধরণীর তরণির হাল রবে তাহাদেরই বশে!

    তারই পদরজ অঞ্জলি করি মাথায় লইব তুলি

    সকলের সাথে পথে চলি যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!

    আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত পীড়িতের মাখি খুন,

    লালে লাল হয়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!

    আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,

    রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!

    আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,

    মাতামাতি করে ঢুকুক্‌ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!

    সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়ুক আমাদের এই ঘরে,

    মোদের মাথায় চন্দ্র-সূর্য তারারা পড়-ক ঝরে!

    সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি

    এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।

    একজনে দিলে ব্যথা-

    সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।

    একের অসম্মান

    নিখিল মানব-জাতির লজ্জা – সকলের অপমান!

    মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,

    ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!

  • সাম্য

    সাম্য

    সাম্য

    গাহি সাম্যের গান–

    বুকে বুকে হেথা তাজা সুখ ফোটে, মুখে মুখে তাজা-প্রাণ!

    বন্ধু, এখানে রাজা-প্রজা নাই, নাই দরিদ্র-ধনী,

    হেথা পায় নাকো কেহ খুদ-ঘাঁটা, কেহ দুধ-সর-ননী।

    অশ্ব-চরণে মোটর-চাকায় প্রণমে না হেথা কেহ,

    ঘৃণা জাগে নাকো সাদাদের মনে দেখে হেথা কালা-দেহ।

    সাম্যবাদী-স্থান

    নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান।

    নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গির্জা-ঘর,

    নাইকো পাইক-বরকন্দাজ নাই পুলিশের ডর।

    এই সে স্বর্গ, এই সে বেহেশ্‌ত, এখানে বিভেদ নাই,

    যত হাতাহাতি হাতে হাত রেখে মিলিয়াছে ভাই ভাই!

    নেইকো এখানে ধর্মের ভেদ শাস্ত্রের কোলাহল,

    পাদরি-পুরুত-মোল্লা-ভিক্ষু এক গ্লাসে খায় জল।

    হেথা স্রষ্টার ভজনা-আলয় এই দেহ এই মন,

    হেথা মানুষের বেদনায় তাঁর দুখের সিংহাসন!

    সাড়া দেন তিনি এখানে তাঁহারে যে-নামে যে-কেহ ডাকে,

    যেমন ডাকিয়া সাড়া পায় শিশু যে-নামে ডাকে সে মাকে!

    পায়জামা প্যান্ট ধুতি নিয়া হেথা হয় নাকো ঘুঁষোঘুঁষি,

    ধুলায় মলিন দুখের পোশাকে এখানে সকলে খুশি।

  • রাজা-প্রজা

    রাজা-প্রজা

    রাজা-প্রজা

    সাম্যের গান গাই

    যেখানে আসিয়া সম-বেদনায় সকলে হয়েছি ভাই।

    এ প্রশ্ন অতি সোজা,

    এক ধরণির সন্তান, কেন কেউ রাজা, কেউ প্রজা?

    অদ্ভুত দর্শন–

    এই সোজা কথা বলি যদি ভাই, হবে তাহা সিডিশন!

    প্রজা হয় শুধু রাজ-বিদ্রোহী, কিন্তু কাহারে কহি,

    অন্যায় করে কেন হয় নাকো রাজাও প্রজাদ্রোহী!

    প্রজারা সৃজন করেছে রাজায়, রাজা তো সৃজেনি প্রজা,

    কৃতজ্ঞ রাজা তাই কি প্রজায় ধরে করে দিল খোজা?

    বন্ধু হাসিছ চুটে,

    আপনার ঘরে হয়ে আছি সব গোলাম নফর মুটে!

    আপনার পুরুষত্ব অন্যে সঁপিয়া কী পেনু দাম?

    আগলাতে রাজা-রাজ্য-হারেম হয়েছি খোজা গোলাম!

    এ ব্যথা কাহারে কই,

    যার ঘর তার ঘর নয় আর নেপো মারে এসে দই!

    যাদের লইয়া রাজ্য, রাজ্যে নাই তাহাদেরই দাবি,

    রাজা-দেবতার অনন্ত ভোগ, আমরা খেতেছি খাবি!

    এ নিয়ে নালিশ কার কাছে করি, জয় রাজাজি কী জয়!

    আমাদের হয় সুবিচার, নাই রাজারই বিচারালয়!

    গুরু গুরু বাজে যুদ্ধ-ডঙ্কা, দলে দলে ছুটে ছেলে,

    হেসে বুক চিরে কলসি কলসি তাজা খুন দিল ঢেলে।

    কলিজা-ছিদ্রে দীর্ঘশ্বাস ফুঁ দিয়া বাজায় শাঁখ,

    ঘরে ঘরে উঠে ক্রন্দন-উলু, চালে চালে ওড়ে কাক;

    প্রস্তুত হল পথ–

    বাজা শাঁখ বাজা, ওই দেখা জয়-লক্ষ্মীর রথ!

    মাগো কাঁদ তোরা, আদুরি বোনেরা ধূলায় লুটায়ে পড়,

    সিঁথায় সিঁদুর নাই দিলি বধূ, চল থেমে গেছে ঝড়।

    ফেরেনি ছেলেরা ফেরেনি ভাইরা? ফেরোনিকো পতি? ওরে,

    দুঃখ কী? ওরা স্থান পেয়েছে যে জয়-লক্ষ্মীর ক্রোড়ে!

    আজিকে রাজ্যময়

    শোকের তুফান ছাপাইয়া উঠে–জয় রাজাজি কী জয়!

    বাজা রে ডঙ্কা বাজা–

    এতদিন পরে কেল্লা ছাড়িয়া বাহির হয়েছে রাজা।

    নিহত আহত বীরেরে মাড়ায়ে ছুটেছে রাজার রথ,

    যুদ্ধ-ফেরত খঞ্জ পঙ্গু পালা পালা ছাড় পথ!

    বন্ধু এমনই হয়–

    জনগণ হল যুদ্ধে বিজয়ী, রাজার গাহিল জয়।

    প্রজারা জোগায় খোরাক-পোশাক, কী বিচার বলিহারি,

    প্রজার কর্মচারী নন, তাঁরা রাজার কর্মচারী!

    মোদেরই বেতন-ভোগী চাকরেরে সালাম করিব মোরা,

    ওরে ‘পাবলিক সারভেন্ট’দেরে আয় দেখে যাবি তোরা!

    কালের চরকা ঘোর,

    দেড়শত কোটি মানুষের ঘাড়ে–চড়ে দেড়শত চোর।

    এ আশা মোদের দুরাশাও নয়, সেদিন সুদূরও নয় –

    সমবেত রাজ-কণ্ঠে যেদিন শুনিব প্রজার জয়!

  • নারী

    নারী

    নারী

    সাম্যের গান গাই–

    আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!

    বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,

    অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

    বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,

    অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।

    নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?

    তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।

    অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,

    ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।

    এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,

    নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।

    তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছ তার প্রাণ?

    অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।

    জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য-লক্ষ্মী নারী,

    সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি।

    পুরুষ এনেছে যামিনী-শান্তি-, সমীরণ, বারিবাহ!

    কামিনী এনেছে যামিনী-শান্তি, সমীরণ, বারিবাহ।

    দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীথে হয়েছে বধূ,

    পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে, নারী যোগায়েছে মধু।

    শস্যক্ষেত্র উর্বর হল, পুরুষ চালাল হল,

    নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।

    নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে

    ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।

    স্বর্ণ-রৌপ্যভার

    নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হয়েছে অলঙ্কার।

    নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,

    যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।

    নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’

    জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!

    জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,

    মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।

    কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,

    কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

    কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,

    বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?

    কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী,

    প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।

    রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,

    রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।

    পুরুষ হৃদয়হীন,

    মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।

    ধরায় যাঁদের যশ ধরে নাকো অমর মহামানব,

    বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,

    খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা।

    লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা!

    নারী সে শিখাল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,

    দীপ্ত নয়নে পরাল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।

    অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,

    বুকে করে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!

    তিনি নর-অবতার–

    পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি কুঠার।

    পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর –

    নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।

    সে-যুগ হয়েছে বাসি,

    যে যুগে পুরুষ দাস ছিল নাকো নারীরা আছিল দাসী!

    বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,

    কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি।

    নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর-যুগে

    আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!

    যুগের ধর্ম এই –

    পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

    শোনো মর্ত্যের জীব!

    অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!

    স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী

    করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?

    আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,

    আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!

    চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,

    মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেলো নারী, ভেঙে ফেলো ও শিকল!

    যে-ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ!

    দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

    ধরার দুলালী মেয়ে!

    ফির না তো আর গিরি-দরি-বনে পাখী-সনে গান গেয়ে।

    কখন আসিল ‘প্লুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,

    ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!

    সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হতে আছ মরি

    মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।

    ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!

    আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!

    পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও-পদাঘাতে

    লুটায়ে পড়িবে ও চরণ-তলে দলিত যমের সাথে!

    এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,

    যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।

    সেদিন সূদূর নয়—

    যেদিন ধরণি পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!

  • মিথ্যাবাদী

    মিথ্যাবাদী

    মিথ্যাবাদী

    মিথ্যা বলেছ বলিয়া তোমায় কে দিল মনস্তাপ?

    সত্যের তরে মিথ্যা যে বলে স্পর্শে না তারে পাপ।

    গোটা সত্যটা শুধু তো সত্যকথা বলাতেই নাই,

    মিথ্যা কয়েও সত্যনিষ্ঠ হতে পারি আমরাই!

    সত্যবাক সে বড়ো কিছু নয়, কজন সত্যবান?

    সত্যবাদীরা কজন দিয়াছে সত্যের তরে প্রাণ?

    অন্তরে যারা যত বেশি ভীরু যত বেশি দুর্বল,

    নীতিবিদ তারা তত বেশি করে সত্য-কথন ছল।

    সত্যকামেরও নমস্য যারা সত্যনিষ্ঠ বীর –

    সত্যের তরে হাসিতে হাসিতে যারা দিল নিজ শির!

    হয়তো তাহারা অনেক মিথ্যা বলেছে জীবন ভরে,

    তবু তারা বীর – তারা দিল প্রাণ সত্য-রক্ষা তরে।

    সত্য লইয়া করিছে ওজন কে উনি মুদির মতো?

    মনে মনে ভাবে কী কাজই করিনু আমি সে বিজ্ঞ কত!

    বলি ওহে বাপু সত্য-ব্যাপারী, সত্য কি চাল ডাল?

    কোথা কয় রতি সত্য কমিল, তাই নিয়ে দেবে গাল!

    সত্য মুদির তথ্য–

    অমুক বীরের জীবনে কমেছে হুঁহুঁ এতটুকু সত্য!

    ও কে আসে বাবা? সত্যেরে তবু এরা মাপে, ও যে গণে।

    দশটি কথায় বাঁধিল সত্য, হেসে মরি মনে মনে!

    বাটখারা আর রশি নিয়ে এল সত্যের পিসি-মাসি,

    মাপিয়া মাপিয়া ভরিল বস্তা, গুণে গুণে বাঁধে খাসি।

    বন্ধু, শুনো না কূট-তর্কের যত হাতি ঘোড়া উট,

    সত্যনিষ্ঠা থাকে যদি প্রাণে, বেপরোয়া বলো ঝুট!

  • বারাঙ্গনা

    বারাঙ্গনা

    বারাঙ্গনা

    কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?

    হয়ত তোমায় স্তন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।

    না-ই হলে সতী, তবু তো তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি;

    তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, তারা আমাদের জ্ঞাতি;

    আমাদেরই মতো খ্যাতি যশ মান তারাও লভিতে পারে,

    তাহাদের সাধনা হানা দিতে পারে সদর স্বর্গ-দ্বারে! –

    স্বর্গবেশ্যা ঘৃতাচী-পুত্র হল মহাবীর দ্রোণ,

    কুমারীর ছেলে বিশ্ব-পূজ্য কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন.

    কানীন-পুত্র কর্ণ হইল দানবীর মহারথী

    স্বর্গ হইতে পতিতা গঙ্গা শিবেরে পেলেন পতি,

    শান্তনু রাজা নিবেদিল প্রেম পুন সেই গঙ্গায় –

    তাঁদেরই পুত্র অমর ভীষ্ম, কৃষ্ণ প্রণমে যাঁয়!

    মুনি হল শুনি সত্যকাম সে জারজ জবালা-শিশু,

    বিস্ময়কর জন্ম যাঁহার – মহাপ্রেমিক সে জিশু!-

    কেহ নহে হেথা পাপ-পঙ্কিল, কেহ সে ঘৃণ্য নহে,

    ফুটিছে অযুত বিমল কমল কামনা-কালিয়-দহে!

    শোনো মানুষের বাণী,

    জনমের পর মানব জাতির থাকে নাকো কোনো গ্লানি!

    পাপ করিয়াছি বলিয়া কি নাই পুণ্যেরও অধিকার?

    শত পাপ করি হয়নি ক্ষুন্ন দেবত্ব দেবতার।

    অহল্যা যদি মুক্তি লভে, মা, মেরি হতে পারে দেবী,

    তোমরাও কেন হবে না পূজ্যা বিমল সত্য সেবি?

    তব সন্তানে জারজ বলিয়া কোন্‌ গোঁড়া পাড়ে গালি,

    তাহাদের আমি এই দুটো কথা জিজ্ঞাসা করি খালি –

    দেবতা গো জিজ্ঞাসি –

    দেড়শত কোটি সন্তান এই বিশ্বের অধিবাসী –

    কয়জন পিতামাতা ইহাদের হয়ে নিষ্কাম ব্রতী

    পুত্রকন্যা কামনা করিল? কয়জন সৎ-সতী?

    কজন করিল তপস্যা ভাই সন্তান-লাভ তরে?

    কার পাপে কোটি দুধের বা”চা আঁতুড়ে জন্মে মরে?

    সেরেফ্‌ পশুর ক্ষুধা নিয়া হেথা মিলে নরনারী যত,

    সেই কামানার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!

    শুনো ধর্মের চাঁই–

    জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!

    অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,

    অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!

  • চোর-ডাকাত

    চোর-ডাকাত

    চোর-ডাকাত

    কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে?

    চারিদিকে বাজে ডাকাতি ডঙ্কা, চোরেরই রাজ্য চলে!

    চোর-ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ?

    জিজ্ঞাসা করো, বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?

    বিচারক! তব ধর্মদণ্ড ধরো,

    ছোটোদের সব চুরি করে আজ বড়োরা হয়েছ বড়ো!

    যারা যত বড়ো ডাকাত-দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ

    তারা তত বড়ো সম্মানী গুণী জাতি-সংঘেতে আজ।

    রাজার প্রাসাদ উঠিছে প্রজার জমাট-রক্ত-ইঁটে,

    ডাকু ধনিকের কারখানা চলে নাশ করি কোটি ভিটে।

    দিব্যি পেতেছ খল কলওলা মানুষ-পেষানো কল,

    আখ-পেষা হয়ে বাহির হতেছে ভূখারি মানব-দল!

    কোটি মানুষের মনুষ্যত্ব নিঙাড়ি কলওয়ালা

    ভরিছে তাহার মদিরা-পাত্র, পুরিছে স্বর্ণ-জালা!

    বিপন্নদের অন্ন ঠাসিয়া ফুলে মহাজন-ভুঁড়ি

    নিরন্নদের ভিটে নাশ করে জমিদার চড়ে জুড়ি!

    পেতেছে বিশ্বে বণিক-বৈশ্য অর্থ-বেশ্যালয়,

    নীচে সেথা পাপ-শয়তান-সাকি, গাহে যক্ষের জয়!

    অন্ন, স্বাস্থ্য, প্রাণ, আশা, ভাষা হারায়ে সকল-কিছু

    দেউলিয়া হয়ে চলেছে মানব ধ্বংসের পিছু পিছু।

    পালাবার পথ নাই,

    দিকে দিকে আজ অর্থ-পিশাচ খুঁড়িয়াছে গড়খাই।

    জগৎ হয়েছে জিন্দানখানা, প্রহরী যত ডাকাত –

    চোরে-চোরে এরা মাসতুতো ভাই, ঠগে ও ঠগে স্যাঙাত।

    কে বলে তোমায় ডাকাত, বন্ধু কে বলে করিছ চুরি?

    চুরি করিয়াছ টাকা ঘটি, বাটি, হৃদয়ে হানোনি ছুরি!

    ইহাদের মতো অমানুষ নহ, হতে পার তস্কর,

    মানুষ দেখিলে বাল্মীকি হও তোমরা রত্নাকর!

  • পাপ

    পাপ

    পাপ

    সাম্যের গান গাই!–

    যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।

    এ পাপ-মুলুকে পাপ করেনিকো কে আছে পুরুষ-নারী?

    আমরা ত ছার;–পাপে পঙ্কিল পাপীদের কাণ্ডারি!

    তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল,

    দেবতার পাপ-পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল!

    আদম হইতে শুরু করে এই নজরুল তক সবে

    কম-বেশি করে পাপের ছুরিতে পুণ্যে করেছে জবেহ্‌।

    বিশ্ব পাপস্থান

    অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্‌!

    ধর্মান্ধরা শোনো,

    অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!

    পাপের পঙ্কে পুণ্য-পদ্ম, ফুলে ফুলে হেথা পাপ!

    সুন্দর এই ধরা-ভরা শুধু বঞ্চনা অভিশাপ।

    এদের এড়াতে না পারিয়া যত অবতার আদি কেহ

    পুণ্যে দিলেন আত্মা ও প্রাণ, পাপেরে দিলেন দেহ।

    বন্ধু, কহিনি মিছে,

    ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব হতে ধরে ক্রমে নেমে এসো নীচে,–

    মানুষের কথা ছেড়ে দাও, যত ধ্যানী মুনি ঋষি যোগী

    আত্মা তাঁদের ত্যাগী তপস্বী, দেহ তাঁহাদের ভোগী!

    এ-দুনিয়া পাপশালা,

    ধর্ম-গাধার পৃষ্ঠে এখানে শূণ্য-ছালা!

    হেথা সবে সম পাপী,

    আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!

    জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,

    টুপি পরে টিকি রেখে সদা বলো যেন তুমি পাপী নও।

    পাপী নও যদি কেন এ ভড়ং, ট্রেডমার্কার ধুম?

    পুলিশী পোশাক পরিয়া হয়েছ পাপের আসামী গুম্!

    বন্ধু, একটা মজার গল্প শোনো,

    একদা অপাপ ফেরেশ‌্তা সব স্বর্গ-সভায় কোনো

    এই আলোচনা করিতে আছিল বিধির নিয়মে দুষি –

    দিন রাত নাই এত পূজা করি, এত করে তাঁরে তুষি,

    তবু তিনি যেন খুশি নন – তাঁর যত স্নেহ দয়া ঝরে

    পাপ-আসক্ত কাদা ও মাটির মানুষ-জাতিরই পরে!

    শুনিলেন সব অন্তর্যামী, হাসিয়া সবারে কন,—

    মলিন ধুলার সন্তান ওরা বড় দুর্বল মন,

    ফুলে ফুলে সেথা ভুলের বেদনা-নয়নে , অধরে শাপ,

    চন্দনে সেথা কামনার জ্বালা, চাঁদে চুম্বন-তাপ!

    সেথা কামিনীর নয়নে কাজল, শ্রোনিতে চন্দ্রহার,

    চরণে লাক্ষা, ঠোঁটে তাম্বুল, দেখে মরে আছে মার!

    প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান,

    বুকে বুকে সেথা বাঁকা ফুল-ধনু, চোখে চোখে ফুল-বাণ।

    দেবদূত সব বলে, ‘প্রভু, মোরা দেখিব কেমন ধরা,

    কেমনে সেখানে ফুল ফোটে যার শিয়রে মৃত্যু-জরা!’

    কহিলেন বিভু-‘তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ যে দুইজন

    যাক্‌ পৃথিবীতে, দেখুক কি ঘোর ধরণির প্রলোভন!’

    ‘হারুত’ ‘মারুত’ ফেরেশতাদের গৌরব রবি-শশী

    ধরার ধুলার অংশী হইল মানবের গৃহে পশি।

    কায়ায় কায়ায় মায়া বুলে হেথা ছায়ায় ছায়ায় ফাঁদ,

    কমল-দিঘিতে সাতশো হয়েছে এই আকাশের চাঁদ!

    শব্দ গন্ধ বর্ণ হেথায় পেতেছে অরূপ-ফাঁসী,

    ঘাটে ঘাটে হেথা ঘট-ভরা হাসি, মাঠে মাঠে কাঁদে বাঁশী!

    দুদিনে আতশি ফেরেশতা প্রাণ- ভিজিল মাটির রসে,

    শফরী-চোখের চটুল চাতুরী বুকে দাগ কেটে বসে।

    ঘাঘরী ঝলকি গাগরী ছলকি নাগরী ‘জোহরা’ যায় –

    স্বর্গের দূত মজিল সে রূপে, বিকাইল রাঙা পায়!

    অধর-আনার-রসে ডুবে গেল দোজখের নার-ভীতি

    মাটির সোরাহি মস্তানা হল আঙ্গুরি-খুনে তিতি!

    কোথা ভেসে গেল সংযম-বাঁধ, বারণের বেড়া টুটে,

    প্রাণ ভরে পিয়ে মাটির মদিরা ওষ্ঠ-পুষ্প-পুটে।

    বেহেশ্‌তে সব ফেরেশ্‌তাদের বিধাতা কহেন হাসি–

    ‘হারুত মারুতে কি করেছে দেখো ধরণি সর্বনাশী!’

    নয়না এখানে যাদু জানে সখা এক আঁখি-ইশারায়

    লক্ষ যুগের মহা-তপস্যা কোথায় উবিয়া যায়।

    সুন্দর বসুমতী

    চিরযৌবনা, দেবতা ইহার শিব নয়–কাম রতি!

  • মানুষ

    মানুষ

    মানুষ

    গাহি সাম্যের গান—

    মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্‌ ।

    নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

    সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি। –

    ‘পূজারি দুয়ার খোলো,

    ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হল!’

    স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,

    দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয়!

    জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ

    ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোলো বাবা, খাইনিকো সাত দিন।’

    সহসা বন্ধ হল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,

    তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!

    ভুখারি ফুকারি কয়,

    ‘ঐ মন্দির পূজারির, হায় দেবতা, তোমার নয়!’

    মসজিদে কাল শিরনী আছিল,-অঢেল গোস্ত–রুটি

    বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি,

    এমন সময় এল মুসাফির গায়ে আজারির চিন,

    বলে,‘ বাবা, আমি ভূখা-ফাকা আমি আজ নিয়ে সাত দিন!’

    তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা –‘ভ্যালা হ’ল দেখি ল্যাঠা,

    ভূখা আছ মরো গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস ব্যাটা?’

    ভূখারি কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল –‘তা হলে শালা

    সোজা পথ দেখ!’ গোস–রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!

    ভুখারী ফিরিয়া চলে,

    চলিতে চলিতে বলে–

    ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,

    আমার ক্ষুধার অন্ন তা বলে বন্ধ করনি প্রভু!

    তব মস্‌জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।

    মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’

    কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?

    ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!

    খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?

    সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!

    হায় রে ভজনালয়,

    তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!

    মানুষেরে ঘৃণা করি’

    ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি!

    ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে,

    যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,

    পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,

    মানুষ এনেছে গ্রন্থ; –গ্রন্থ’ আনেনি মানুষ কোনো!

    আদম দাউদ ঈশা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ

    কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবির,-বিশ্বের সম্পদ,

    আমাদেরই এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে

    তাঁদেরই রক্ত কম-বেশি করে প্রতি ধমনিতে রাজে!

    আমরা তাঁদেরই সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরই মতন দেহ,

    কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।

    হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,

    আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।

    হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ইশা,

    কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?

    কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?

    হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!

    অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,

    আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,

    তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়

    ওই একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!

    হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটির-বাসে

    জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!

    যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে

    আজিও বিশ্ব দেখেনি,– হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!

    ও কে? চণ্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!

    ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।

    আজ চণ্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট,

    তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।

    রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!

    হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!

    চাষা বলে কর ঘৃণা!

    দেখো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!

    যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,

    তারাই আনিল অমর বাণী – যা আছে রবে চিরকাল।

    দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,

    তারই মাঝে কবে এল ভোলানাথ-গিরিজায়া, তা কি চিনি!

    তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,

    দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।

    সে মার রহিল জমা –

    কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!

    বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দুচোখে স্বার্থ-ঠুলি,

    নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।

    মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,

    তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?

    তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে

    তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!

    তোমারি কামনা-রাণী

    যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি।

  • ঈশ্বর

    ঈশ্বর

    ঈশ্বর

    কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’

    কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?

    হায় ঋষি দরবেশ,

    বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।

    সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,

    স্রষ্টারে খোঁজো–আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!

    ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেশ দর্পণে নিজ-কায়া,

    দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাঁহার ছায়া।

    শিহরি উঠো না, শাস্ত্রবিদেরে কোরো নাকো বীর ভয়-

    তাহারা খোদার খোদ্‌ ‘ প্রাইভেট সেক্রেটারি’ তো নয়!

    সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!

    আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!

    রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে –

    রত্নাকরের খবর তা বলে পুছো না ওদের ভুলে।

    উহারা রত্ন-বেনে,

    রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে।

    ডুবে নাই তারা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,

    শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।

  • সাম্যবাদী

    সাম্যবাদী

    সাম্যবাদী

    গাহি সাম্যের গান–

    যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

    যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।

    গাহি সাম্যের গান!

    কে তুমি?–পারসি? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?

    কনফুসিয়াস? চার্বাক-চেলা? বলে যাও, বলো আরও!

    বন্ধু, যা-খুশি হও,

    পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুথি ও কেতাব বও,

    কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক–

    জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব পড়ে যাও, যত শখ–

    কিন্তু, কেন এ পণ্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?

    দোকানে কেন এ দর কষাকষি?–পথে ফুটে তাজা ফুল!

    তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,

    সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!

    তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,

    তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।

    কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?

    হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!

    বন্ধু, বলিনি ঝুট,

    এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।

    এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,

    বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,

    মস্‌জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,

    এইখানে বসে ঈশা, মুসা পেল সত্যের পরিচয়।

    এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,

    এই মাঠে হল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।

    এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি

    ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি।

    এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,

    এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!

    মিথ্যা শুনিনি ভাই,

    এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

  • সাম্যবাদী (কাব্য)

    সাম্যবাদী (কাব্য)

    সাম্যবাদী (কাব্য)

    কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে (পৌষ,১৩৩২) প্রকাশিত হয়। প্রকাশক মৌলভী শামসুদ্দীন হুসেন, বেঙ্গল পাবলিশিং হোম, ৫ নূর মহম্মদ লেন, কলিকাতা। ১৫ নং নয়ান চাঁদ [দত্ত] ষ্ট্রীট, কলিকাতা, মেটকাফ প্রেসে শ্রীমণিভূষণ মুখার্জী কর্তৃক মুদ্রিত হয়। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২, মূল্য দুই আনা। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় বেশিরভাগই মানবিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

    ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১লা পৌষ মুতাবিক ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে ৩৭নং হ্যারিসন রোড, কলিকাতা হতে ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ে’র সাপ্তাহিক মুখপত্ররূপে ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সম্পাদক ছিলেন কবির পল্টনের বন্ধু মণিভূষণ মুখার্জী এবং কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন মরহুম শামসুদ্দীন হুসেন। লাঙলের বিশেষ (প্রথম) সংখ্যায় ‘সর্ব্বপ্রধান সম্পদ’রূপে ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়।

    ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে মোট ১১টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছিল; কবিতাগুলো হচ্ছে— ‘সাম্যবাদী’, ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘চোর-ডাকাত’, ‘বারাঙ্গানা’, ‘মিথ্যাবাদী’, ‘নারী’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘সাম্য’ ও ‘কুলি-মজুর’। পরে ‘সাম্যবাদী’সহ এর চারটি কবিতা ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে সঙ্কলিত হয়। আমাদের এই সংস্করণে ‘সাম্যবাদী’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের পাঠ অনুসৃত হয়েছে।

    ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের সবগুলো কবিতাতেই মানুষের সমতা নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কবির বিশ্বাস মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে পরিচিত হয়ে ওঠা সবচেয়ে সম্মানের। নজরুলের এ আদর্শ আজও প্রতিটি মানুষের জীবনপথের প্রেরণা। কিন্তু মানুষ সম্প্রদায়কে ব্যবহার করে রাজনীতি করে, দুর্বলকে শোষণ করে, এখনও একের বিরুদ্ধে অন্যকে উস্কে দেয়। একজনের প্রতি অন্যজনকে বিমুখ করার ষড়যন্ত্র করে। নজরুল এ কবিতায় মানুষের অন্তর ধর্মের ওপর জোর প্রদান করেন। ধর্মগ্রন্থ পড়ে অর্জিত জ্ঞান যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে প্রয়োজন মানবিকতাবোধ। কবি বলেছেন, মানুষের হৃদয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন মন্দির কাবা নেই। কবি সকল মত, সকল পথের উপরে স্থান দিয়েছেন মানবিকতা। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলিম সকলকে একই মায়ের সন্তানের মত ভেবেছেন। নজরুল মানবিক মিলবন্ধনের জন্য সঙ্গীত রচনা করেছেন। বাণী ও সুরের মাধ্যমে মানবতার সুবাস ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

    নজরুল ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা অন্যান্য তীর্থক্ষেত্রের মত পবিত্র মনে করেছেন মানুষের হৃদয়কে। এ হৃদয় যদি পবিত্র থাকে, হৃদয়ে যদি কারো প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ না থাকে, সকলের প্রতি সমদর্শিতা থাকে তাহলে পৃথিবী হবে সুখের আবাসস্থল। সাম্যবাদ মানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিৰ্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিত এ মতবাদ। কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় সব ধরনের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাম্যবাদের বাণী প্রচার করেছেন।