হুগলী
১৭ই আষাঢ় ১৩৩২

হুগলী
১৭ই আষাঢ় ১৩৩২

তখনও অস্ত যায়নি সূর্য, সহসা হইল শুরু
অম্বরে ঘন ডম্বরু-ধ্বনি গুরুগুরুগুরু গুরু।
আকাশে আকাশে বাজিছে এ কোন্ ইন্দ্রের আগমনি?
শুনি, অম্বুদ-কম্বু-নিনাদে ঘন বৃংহিত-ধ্বনি।
বাজে চিক্কুর-হ্রেষা-হর্ষণ মেঘ-মন্দুরা-মাঝে,
সাজিল প্রথম আষাঢ় আজিকে প্রলংকর সাজে!
ঘনায় অশ্রু-বাষ্প-কুহেলি ঈশান-দিগঙ্গনে,
স্তব্ধ-বেদনা দিগ্বালিকারা কী যেন কাঁদনি শোনে!
কাঁদিছে ধরার তরুলতাপাতা, কাঁদিতেছে পশুপাখি,
ধরার ইন্দ্র স্বর্গে চলেছে ধূলির মহিমা মাখি।
বাজে আনন্দ-মৃদঙ গগনে, তড়িৎ-কুমারী নাচে,
মর্ত্য-ইন্দ্র বসিবে গো আজ স্বর্গ-ইন্দ্র কাছে!
সপ্ত-আকাশ-সপ্তস্বরা হানে ঘন করতালি,
কাঁদিছে ধরায় তাহারই প্রতিধ্বনি – খালি, সব খালি!
হায় অসহায় সর্বংসহা মৌনা ধরণি মাতা,
শুধু দেব-পূজা তরে কি মা তোর পুষ্প হরিৎ-পাতা?
তোর বুকে কি মা চির-অতৃপ্ত রবে সন্তান-ক্ষুধা?
তোমার মাটির পাত্রে কি গো মা ধরে না অমৃত-সুধা?
জীবন-সিন্ধু মথিয়া যে-কেহ আনিবে অমৃত-বারি,
অমৃত-অধিপ দেবতার রোষ পড়িবে কি শিরে তারই?
হয়তো তাহাই, হয়তো নহে তা,–এটুকু জেনেছি খাঁটি,
তারে স্বর্গের আছে প্রয়োজন, যারে ভালোবাসে মাটি।
কাঁটার মৃণালে উঠেছিল ফুটে যে চিত্ত-শতদল,
শোভেছিল যাহে বাণী কমলার রক্ত-চরণ-তল,
সম্ভ্রমে-নত পূজারি মৃত্যু ছিঁড়িল সে-শতদলে –
শ্রেষ্ঠ অর্ঘ অর্পিবে বলি নারায়ণ-পদতলে!
জানি জানি মোরা, শঙ্খ-চক্র-গদা যাঁর হাতে শোভে–
পায়ের পদ্ম হাতে উঠে তাঁর অমর হইয়া রবে।
কত সান্ত্বনা-আশা-মরীচিকা, কত বিশ্বাস-দিশা
শোক-সাহারায় দেখা দেয় আসি, মেটে না প্রাণের তৃষা!
দুলিছে বাসুকি মণিহারা ফণী, দুলে সাথে বসুমতী,
তাহার ফণার দিনমণি আজ কোন্ গ্রহে দেবে জ্যোতি!
জাগিয়া প্রভাতে হেরিনু আজিকে জগতে সুপ্রভাত,
শয়তানও আজ দেবতার নামে করিছে নান্দীপাঠ!
হে মহাপুরুষ, মহাবিদ্রোহী, হে ঋষি, সোহম্-স্বামী!
তব ইঙ্গিতে দেখেছি সহসা সৃষ্টি গিয়াছে থামি,
থমকি গিয়াছে গতির বিশ্ব চন্দ্র-সূর্য-তারা,
নিয়ম ভুলেছে কঠোর নিয়তি, দৈব দিয়াছে সাড়া!
যখনই স্রষ্টা করিয়াছে ভুল, করেছ সংস্কার,
তোমারই অগ্রে স্রষ্টা তোমারে করেছে নমস্কার।
ভৃগুর মতন যখনই দেখেছ অচেতন নারায়ণ,
পদাঘাতে তাঁর এনেছ চেতনা, কেঁপেছে জগজ্জন!
ভারত-ভাগ্য-বিধাতা বক্ষে তব পদ-চিন ধরি
হাঁকিছেন, ‘আমি এমনি করিয়া সত্য স্বীকার করি।
জাগাতে সত্য এত ব্যাকুলতা এত অধিকার যার,
তাহার চেতন-সত্যে আমার নিযুত নমস্কার।’
আজ শুধু জাগে তব অপরূপ সৃষ্টি-কাহিনি মনে,
তুমি দেখা দিলে অমিয়-কণ্ঠ বাণীর কমল-বনে!
কখন তোমার বীণা ছেয়ে গেল সোনার পদ্ম-দলে,
হেরিনু সহসা ত্যাগের তপন তোমার ললাট-তলে!
লক্ষ্মী দানিল সোনার পাপড়ি, বীণা দিল করে বাণী,
শিব মাখালেন ত্যাগের বিভূতি কণ্ঠে গরল দানি।
বিষ্ণু দিলেন ভাঙনের গদা, যশোদা-দুলাল বাঁশি,
দিলেন অমিত তেজ ভাস্কর, মৃগাঙ্ক দিল হাসি।
চীর গৈরিক দিয়া আশিসিল ভারত-জননী কাঁদি,
প্রতাপ-শিবাজী দানিল মন্ত্র, দিল উষ্ণীষ বাঁধি।
বুদ্ধ দিলেন ভিক্ষাভাণ্ড, নিমাই দিলেন ঝুলি,
দেবতারা দিল মন্দার-মালা, মানব মাখাল ধূলি।
নিখিল-চিত্ত-রঞ্জন তুমি উদিলে নিখিল ছানি –
মহাবীর, কবি, বিদ্রোহী, ত্যাগী, প্রেমিক, কর্মী, জ্ঞানী!
হিমালয় হতে বিপুল বিরাট, উদার আকাশ হতে,
বাধা-কুঞ্জর তৃণসম ভেসে গেল তব প্রাণ-স্রোতে।
ছন্দ-গানের অতীত হে ঋষি, জীবনে পারিনি তাই
বন্দিতে তোমা, আজ আনিয়াছি চিত্ত-চিতার ছাই!
বিভূতি-তিলক! কৈলাস হতে ফিরেছ গরল পিয়া,
এনেছি অর্ঘ্য শ্মশানের কবি ভস্ম-বিভূতি নিয়া!
নাও অঞ্জলি, অঞ্জলি নাও, আজ আনিয়াছি গীতি,
সারা জীবনের না-কওয়া-কথার ক্রন্দন-নীরে তিতি!
এত ভালো মোরে বেসেছিলে তুমি, দাওনিকো অবসর
আমারেও ভালোবাসিবার, আজ তাই কাঁদে অন্তর!
আজিকে নিখিল-বেদনার কাছে মোর ব্যথা কতটুক্,
ভাবিয়া ভাবিয়া সান্ত্বনা খুঁজি, তবু হা হা করে বুক!
আজ ভারতের ইন্দ্র-পতন, বিশ্বের দুর্দিন,
পাষাণ বাংলা পড়ে এককোণে স্তব্ধ অশ্রুহীন।
তারই মাঝে হিয়া থাকিয়া থাকিয়া গুমরি গুমরি ওঠে,
বক্ষের বাণী চক্ষের জলে ধুয়ে যায়, নাহি ফোটে!
দীনের বন্ধু, দেশের বন্ধু, মানব-বন্ধু তুমি,
চেয়ে দেখো আজ লুটায় বিশ্ব তোমার চরণ চুমি।
গগনে তেমনই ঘনায়েছে মেঘ, তেমনই ঝরিছে বারি,
বাদলে ভিজিয়া শত স্মৃতি তব হয়ে আসে ঘন ভারী।
পয়গম্বর ও অবতার-যুগে জন্মিনি মোরা কেহ,
দেখিনিকো মোরা তাঁদেরে, দেখিনি দেবের জ্যোতির্দেহ।
কিন্তু যখনই বসিতে পেয়েছি তোমার চরণ-তলে,
না জানিতে কিছু না বুঝিতে কিছু নয়ন ভরেছে জলে।
সারা প্রাণ যেন অঞ্জলি হয়ে ও-পায়ে পড়েছে লুটি,
সকল গর্ব উঠেছে মধুর প্রণাম হইয়া ফুটি।
বুদ্ধের ত্যাগ শুনেছি মহান, দেখিনিকো চোখে তাহে,
নাহি আপশোশ, দেখেছি আমরা ত্যাগের শাহানশাহে,
নিমাই লইল সন্ন্যাস প্রেমে, দিইনিকো তাঁরে ভেট,
দেখিয়াছি মোরা ‘রাজা-সন্ন্যাসী’ প্রেমের জগৎ-শেঠ।
শুনি, পরার্থে প্রাণ দিয়া দিল অস্থি বনের ঋষি;
হিমালয় জানে, দেখেছি দধীচি গৃহে বসে দিবানিশি!
হে নবযুগের হরিশচন্দ্র! সাড়া দাও, সাড়া দাও!
কাঁদিছে শ্মশানে সুত-কোলে সতী, রাজর্ষি ফিরে চাও!
রাজকুলমান পুত্র-পত্নী সকল বিসর্জিয়া,
চণ্ডাল বেশে ভারত-শ্মশান ছিলে একা আগুলিয়া,
এসো সন্ন্যাসী, এসো সম্রাট, আজি সে শ্মশান-মাঝে,
ওই শোনো তব পুণ্যে জীবন-শিশুর কাঁদন বাজে!
দাতাকর্ণের সম নিজ সুতে কারাগার-যূপে ফেলে
ত্যাগের করাতে কাটিয়াছ বীর বারেবারে অবহেলে।
ইব্রাহিমের মতো বাচ্চার গলে খঞ্জর দিয়া
কোরবানি দিলে সত্যের নামে, হে মানব নবি-হিয়া।
ফেরেশতা সব করিছে সালাম, দেবতা নোয়ায় মাথা,
ভগবান-বুকে মানবের তরে শ্রেষ্ঠ আসন পাতা!
প্রজা-রঞ্জন রাম-রাজা দিল সীতারে বিসর্জন,
তাঁরও হয়েছিল যজ্ঞে স্বর্ণ-জানকীর প্রয়োজন;
তব ভাণ্ডার-লক্ষ্মীরে রাজা নিজ-হাতে দিল তুলি
ক্ষুধা-তৃষাতুর মানবের মুখে, নিজে নিলে পথ-ধূলি।
হেম-লক্ষ্মীর তোমারও জীবনযাগে ছিল প্রয়োজন,
পুড়িলে যজ্ঞে, তবু নিলে নাকো দিলে যা বিসর্জন!
তপোবলে তুমি অর্জিলে তেজ বিশ্বামিত্র-সম,
সারা বিশ্বের ব্রাহ্মণ তাই বন্দিছে নমো নমো!
হে যুগ-ভীষ্ম। নিন্দার শরশয্যায় তুমি শুয়ে
বিশ্বের তরে অমৃতমন্ত্র বীর-বাণী গেলে থুয়ে।
তোমার জীবনে বলে গেলে – ওগো কল্কি আসার আগে
অকল্যাণের কুরুক্ষেত্রে আজও মাঝে মাঝে জাগে
চিরসত্যের পাঞ্জজন্য, কৃষ্ণের মহাগীতা,
যুগে যুগে কুরু-মেদ-ধূমে জ্বলে অত্যাচারের চিতা।
তুমি নবব্যাস, গেলে নবযুগ-জীবন-ভারত রচি,
তুমিই দেখালে – ইন্দ্রেরই তরে পারিজাত-মালা, শচী!
আসিলে সহসা অত্যাচারীর প্রাসাদ-স্তম্ভ টুটি
নব-নৃসিংহ-অবতার তুমি, পড়িল বক্ষে লুটি
আর্ত-মানব-হৃদি-প্রহ্লাদ, পাগল মুক্তি-প্রেমে!
তুমি এসেছিলে জীবন-গঙ্গা তৃষাতুর তরে নেমে।
দেবতারা তাই স্তম্ভিত হেরো দাঁড়ায়ে গগন-তলে,
নিমাই তোমারে ধরিয়াছে বুকে, বুদ্ধ নিয়াছে কোলে।
তোমারে দেখিয়া কাহারও হৃদয়ে জাগেনিকো সন্দেহ
হিন্দু কিংবা মুসলিম তুমি অথবা অন্য কেহ।
তুমি আর্তের, তুমি বেদনার, ছিলে সকলের তুমি,
সবারে যেমন আলো দেয় রবি, ফুল দেয় সবে ভূমি।
হিন্দুর ছিলে আকবর, মুসলিমের আরংজিব,
যেখানে দেখেছ জীবের বেদনা, সেখানে দেখেছ শিব!
নিন্দা-গ্লানির পঙ্ক মাখিয়া, পাগল, মিলন-হেতু
হিন্দু-মুসলমানের পরানে তুমিই বাঁধিলে সেতু!
জানি না আজিকে কী অর্ঘ্য দেবে হিন্দু-মুসলমান,
ঈর্ষাপঙ্কে পঙ্কজ হয়ে ফুটুক এদের প্রাণ।
হে অরিন্দম, মৃত্যুর তীরে করেছ শত্রু জয়,
প্রেমিক! তোমার মৃত্যু-শ্মশান আজিকে মিত্রময়!
তাই দেখি, যারা জীবনে তোমায় দিল কণ্টক-হুল,
আজ তাহারাই এনেছে অর্ঘ্য নয়ন-পাতার ফুল!
কে যে ছিলে তুমি, জানি নাকো কেহ, দেবতা কি আওলিয়া,
শুধু এই জানি, হেরে আর কারে ভরেনি এমন হিয়া।
আজ দিকে দিকে বিপ্লব-অহিদল খুঁজে ফেরে ডেরা,
তুমি ছিলে এই নাগ-শিশুদের ফণি-মনসার বেড়া।
তুমিই রাজার ঐরাবতের পদতল হতে তুলে
বিষ্ণু-শ্রীকর-অরবিন্দরে আবার শ্রীকরে থুলে!
তুমি দেখেছিলে ফাঁসির গোপীতে বাঁশির গোপীমোহন
তোমার ভগ্ন চাকায় জড়ায়ে চালায়েছে এরা রথ,
আপন মাথার মানিক জ্বালায়ে দেখায়েছে রাতে পথ।
আজ পথ-হারা আশ্রয়হীন তাহারা যে মরে ঘুরে,
গুহা-মুখে বসি ডাকিছে সাপুড়ে মারণমন্ত্র সুরে!
যেদিকে তাকাই কূল নাহি পাই, অকূল হতাশ্বাস,
কোন শাপে ধরা স্বরাজরথের চক্র করিল গ্রাস?
যুধিষ্ঠিরের সম্মুখে রণে পড়িল সব্যসাচী,
ওই হেরো, দূরে কৌরবসেনা উল্লাসে ওঠে নাচি।
হিমালয় চিরে আগ্নেয়-যান চিৎকার করি ছুটে,
শত ক্রন্দন-গঙ্গা যেন গো পড়িছে পিছনে টুটে!
স্তব্ধ-বেদনা গিরিরাজ ভয়ে জলদে লুকায় কায় –
নিখিল অশ্রু-সাগর বুঝিবা তাহারে ডুবাতে চায়!
টুটিয়াছে আজ গর্ব তাহার, লাজে নত উঁচু শির,
ছাপি হিমাদ্রি উঠিছে প্রণাম সমগ্র পৃথিবীর!
ধূর্জটি-জটাবাহিনী গঙ্গা কাঁদিয়া কাঁদিয়া চলে,
তারই নীচে চিতা–যেন গো শিবের ললাটে অগ্নি জ্বলে!
মৃত্যু আজিকে হইল অমর পরশি তোমার প্রাণ,
কালো মুখ তার হল আলোময়, শ্মশানে উঠিছে গান!
অগুরু-পুষ্প-চন্দন পুড়ে হল সুগন্ধতর,
হল শুচিতর অগ্নি আজিকে, শব হল সুন্দর।
ধন্য হইল ভাগীরথীধারা তব চিতা-ছাই মাখি,
সমিধ হইল পবিত্র আজি কোলে তব দেহ রাখি।
অসুরনাশিনী জগন্মাতার অকাল উদ্বোধনে
আঁখি উপাড়িতে গেছিলেন রাম, আজিকে পড়িছে মনে,
রাজর্ষি! আজি জীবন উপাড়ি দিলে অঞ্জলি তুমি,
দনুজদলনী জাগে কিনা – আছে চাহিয়া ভারতভূমি।
হুগলি
১১ই আষাঢ় ১৩৩২

চিত্ত-কুঁড়ি-হাসনাহেনা মৃত্যু-সাঁঝে ফুটল গো!
জীবন-বেড়ার আড়াল ছাপি বুকের সুবাস টুটল গো!
এই তো কারার প্রাকার টুটে
বন্দি এল বাইরে ছুটে,
তাই তো নিখিল আকুল-হৃদয় শ্মশান-মাঝে জুটল গো!
ভবন-ভাঙা আলোর শিখায় ভুবন রেঙে উঠল গো।
২
স্ব-রাজ দলের চিত্তকমল লুটল বিশ্বরাজের পায়,
দলের চিত্ত উঠল ফুটে শতদলের শ্বেত আভায়।
রূপের কুমার আজকে দোলে
অপরূপের শিশ-মহলে,
মৃত্যু-বাসুদেবের কোলে কারার কেশব ওই গো যায়,
অনাগত বৃন্দাবনে মা যশোদা শাঁখ বাজায়!
৩
আজকে রাতে যে ঘুমুল, কালকে প্রাতে জাগবে সে।
এই বিদায়ের অস্ত-আঁধার উদয়-উষায় রাঙবে রে!
শোকের নিশির শিশির ঝরে,
ফলবে ফসল ঘরে-ঘরে,
আবার শীতের রিক্ত শাখায় লাগবে ফুলেল রাগ এসে।
যে মা সাঁঝে ঘুম পাড়াল, চুম দিয়ে ঘুম ভাঙবে সে।
৪
না ঝরলে তাঁর প্রাণ-সাগরে মৃত্যু-রাতের হিম-কণা
জীবন-শুক্তি ব্যর্থ হত, মুক্তি-মুক্তা ফলত না।
নিখিল-আঁখির ঝিনুক-মাঝে
অশ্রু-মানিক ঝলত না যে!
রোদের উনুন না নিবিলে চাঁদের সুধা গলত না।
গগন-লোকে আকাশ-বধূর সন্ধ্যা-প্রদীপ জ্বলত না।
৫
মরা বাঁশে বাজবে বাঁশি, কাটুক না আজ কুঠার তায়,
এই বেণুতেই ব্রজের বাঁশি হয়তো বাজবে এই হেথায়।
হয়তো এবার মিলন-রাসে
বংশীধারী আসবে পাশে
চিত্ত-চিতার ছাই মেখে শিব সৃষ্টি-বিষাণ ওই বাজায়।
জন্ম নেবে মেহেদি-ঈশা ধরার বিপুল এই ব্যথায়।
৬
কর্মে যদি বিরাম না রয়, শান্তি তবে আসত না!
ফলবে ফসল – নইলে নিখিল নয়ন-নীরে ভাসত না।
নেইকো দেহের খোসার মায়া,
বীজ আনে তাই তরুর ছায়া,
আবার যদি না জন্মাত, মৃত্যুতে সে হাসত না।
আসবে আবার – নইলে ধরায় এমন ভালো বাসত না!
হুগলি
১৬ই আষাঢ় ১৩৩২

[জয়জয়ন্তী কীর্তন]
খোলো মা দুয়ার খোলো
প্রভাতেই সন্ধ্যা হল
দুপুরেই ডুবল দিবাকর গো।
সমর শয়ান ওই
সুত তোর বিশ্বজয়ী
কাঁদনের উঠছে তুফান ঝড় গো॥
সবারে বিলিয়ে সুধা,
সে নিল মৃত্যু-ক্ষুধা,
কুসুম ফেলে নিল খঞ্জর গো!
তাহারই অস্থি চিরে
দেবতা বজ্র গড়ে
নাশে ওই অসুর অসুন্দর গো॥
ওই মা যায় সে হেসে।
দেবতার উপরে সে,
ধরা নয়, স্বর্গ তাহার ঘর গো।
যাও বীর যাও গো চলে
চরণে মরণ দলে
করুক প্রণাম বিশ্ব-চরাচর গো॥
তোমার ওই চিত্ত জ্বেলে
ভাঙ্গালে ঘুম ভাঙ্গালে
নিজে হায় নিবলে চিতার পর গো।
বেদনার শ্মশান-দহে
পুড়ালে আপন দেহে,
হেথা ক নাচবে না শংকর গো॥
আরিয়াদহ
৬ আষাঢ়, ১৩৩২

‘চিত্তনামা’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাব্যগ্রন্থ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ২রা আষাঢ় ১৩৩২ বঙ্গাব্দ (১৬ জুন ১৯২৫ খৃষ্টাব্দ) মঙ্গলবার, দার্জিলিঙে পরলোকগমন করেন। দেশবন্ধুর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে নজরুল অর্ঘ্য, অকাল-সন্ধ্যা, সান্ত্বনা, ইন্দ্রপতন, রাজভিখারী নামে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন যেগুলো সমকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ (১৯২৫ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট) মাসে কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বেঙ্গল লাইব্রেরির তালিকা থেকে জানা যায়, গ্রন্থটি ১৮ই কার্ত্তিক ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক ৪ নভেম্বর ১৯২৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশের তারিখ নিয়ে সংশয় রয়েছে, কেননা, ‘ছায়ানট’ ও ‘চিত্তনামা’ কাব্যে প্রকাশকাল মুদ্রিত হয়নি, অধিকন্তু বেঙ্গল লাইব্রেরীর তালিকায় ‘ছায়ানটে’র প্রকাশকাল ২২ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ এবং ‘চিত্তনামা’র প্রকাশকাল ৪ নভেম্বর ১৯২৫ বলে উল্লিখিত হয়েছে। এই সব তারিখ গ্রন্থপ্রকাশের প্রকৃত তারিখ নাও হতে পারে তবুও ‘বাংলা একাডেমি’ প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’ জন্মশতবর্ষ সংস্করণে চিত্তনামার আগে ছায়ানটের স্থান দেওয়া হয়েছে। আমরাও এই ক্রম অনুসরণ করে ‘চিত্তনামা’কে ‘ছায়ানটে’র পরে স্থান দিয়েছি।
‘চিত্তনামা’ কাব্যের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন দীনেশরঞ্জন দাশ। কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে। তিনি ছিলেন খুবই স্নেহশীলা নারী। পাঠকমাত্রেই জানেন নজরুলের মধ্যে ছিল মাতৃস্নেহ পাবার আগ্রহ; কেননা, কোন বিশেষ অজ্ঞাত কারণে নিজের মায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক খুব একটা ভাল ছিল না। নজরুল বাসন্তী দেবীকে মা বলে ডাকতেন। কবি ‘চিত্তনামা’র উৎসর্গ পাতায় লেখেন—
মাতা বাসন্তী দেবীর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দে—
‘চিত্তনামা’ সম্পর্কে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘প্রবাসী’ বলেন—
“৪০ পাতা বইয়ের দাম এক টাকা। … বইয়ের কবিতাগুলি পড়িয়া ভাল লাগিল। লেখকের দেশবন্ধুর প্রতি ভক্তি প্রতি ছত্রে প্রকাশ পাইয়াছে। বইখানির বাঁধান, ছাপা, কাগজ—সবই খুব ভাল।”
‘অর্ঘ্য’ সম্পর্কে শ্রীপ্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন—
“দেশবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে কবি কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে ‘অর্ঘ্য’ গানটি লেখেন ১৩৩২ সালের ৩রা আষাঢ়। দেশবন্ধুর শবাধারে রচনাটি মালার সঙ্গে অর্ঘ্য-স্বরূপ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।”
— [কাজী নজরুল, ৩৭ পৃষ্ঠা]
‘অকালসন্ধ্যা’ ১৩৩২ শ্রাবণের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনামের নিচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘জয় জয়ন্তী কীর্ত্তন—একতালা’। পাদটীকায় লেখা ছিল : ‘স্বর্গীয় দেশবন্ধুর শোকযাত্রার গান’।
‘সান্ত্বনা’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দের আষাঢ় পঞ্চম বর্ষের ৩১ সংখ্যক ‘বিজলী’তে বের হয়।
‘ইন্দ্রপতন’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১২ই আষাঢ় তারিখের ‘আত্মশক্তি’তে প্রকাশিত হয়। এ-সম্পর্কে চৌধুরী শামসুর রহমান লিখেছন—
“‘ইন্দ্রপতন’ সাপ্তাহিক ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকায়ই ছাপা হয়েছিল। … কবি তাঁর এ কবিতায় মহান নেতার গুণকীর্তন করতে গিয়ে তাঁকে নবীদের সাথে তুলনা ক’রে উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে বলে ফেলেছিলেন : ‘হে মানব-আম্বিয়া।’ তা ছাড়া, কবিতাটিতে এমন আরও কতকগুলি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ইসলামী ভাবধারার অনুকূল নয়। এ সব ত্রুটির প্রতি কবির দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে খোলা চিঠির আকারে লেখা আমার প্রবন্ধ মফঃস্বলের কাগজ ‘বগুড়ার কথা’য় দীর্ঘ দুপৃষ্ঠা স্থান নিয়ে প্রকাশিত হয়। আমার এ প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলমান সমাজে তৎকালে সাড়া প’ড়ে গিয়েছিল। … পরে যখন কবিতাটি তাঁর ‘চিত্তনামা’ বইয়ে প্রকাশিত হয়, কবি নজরুল তখন আপত্তিকর লাইনগুলি সংশোধন করে এবং কোনো কোনো লাইন বাদ দিয়েই তা ছেপেছিলেন।”
— [পঁচিশ বছর, ৪২-৪৪ পৃষ্ঠা]
কবিতাটি গ্রন্থব্ধ হওয়ার কালে ‘হে মানব-আম্বিয়া’ পদটি পরিবর্তিত হয় ‘হে মানব নবি-হিয়া’ রূপে এবং তার চারটি পঙ্ক্তি পরিবর্জিত হয়। যতদূর মনে পড়ে, পরিত্যক্ত পঙ্ক্তিগুলি ছিল এরূপ:
জন্মিলে তুমি মোহাম্মদের আগে, হে পুরষবর!
কোরানে ঘোষিত তোমার মহিমা, হতে পয়গাম্বর।
যে জ্যোতি পারেনি সহিতে স্বয়ং মুসা-ও কোহ-ই-তুরে,
সেই জ্যোতি তুমি রেখেছিলে তব নয়ন-মণিতে পুরে।
‘রাজভিখারী’ ১৩৩২ শ্রাবণের ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
উৎসর্গ
মাতা বাসন্তী দেবীর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দে—
নজরুল ইসলাম

সমস্তিপুরের ট্রেন-পথে
ফাল্গুন ১৩৩০
[কার্তিক ১৩২৯]

বহরমপুর জেল
অগ্রহায়ণ ১৩৩১ [১৩৩০]

(ঝড় : পূর্ব-তরঙ্গ)
আমি ঝড় পশ্চিমের প্রলয়-পথিক–
অসহ যৌবন-দাহে লেলিহান-শিখ
দারুণ দাবাগ্নি-সম নৃত্য-ছায়ানটে
মাতিয়া ছুটিতেছিনু, চলার দাপটে
ব্রহ্মাণ্ড ভণ্ডুল করি। অগ্রে সহচরী
ঘূর্ণা-হাতছানি দিয়া চলে ঘূর্ণি-পরী
গ্রীষ্মের গজল গেয়ে পিলু-বারোয়াঁয়
উশীরের তার-বাঁধা প্রান্তর-বীণায়।
করতালি-ঠেকা দেয় মত্ত তালিবন
কাহারবা-দ্রুততালে।–আমি উচাটন
মন্মথ-উম্মদ আঁখি রাগরক্ত ঘোর
ঘূর্ণিয়া পশ্চাতে ছুটি, প্রমত্ত চকোর
প্রথম-কামনা-ভিতু চকোরিণী পানে
ধায় যেন দুরন্ত বাসনা-বেগ-টানে।
সহসা শুনিনু কার বিদায়-মন্থর
শ্রান্ত শ্লথ গতি-ব্যথা, পাতা-থরথর
পথিক-পদাঙ্ক-আঁকা পুব-পথ-শেষে।
দিগন্তের পর্দা ঠেলি হিম-মরু-দেশে
মাগিছে বিদায় মোর প্রিয়া ঘূর্ণি-পরী,
দিগন্ত ঝাপসা তার অশ্রুহিমে ভরি।
গোলে-বকৌলির দেশে মেরু-পরিস্থানে
মিশে গেল হাওয়া-পরী। অযথা সন্ধানে
দিক্চক্ররেখা ধরি কেঁদে কেঁদে চলি
শ্রান্ত অশ্বশ্বসা-গতি। চম্পা-একাবলী
ছিন্ন ম্লান ছেয়ে আছে দিগন্ত ব্যাপিয়া,—
সেই চম্পা চোখে চাপি ডাকি, ‘পিয়া পিয়া’!
বিদায়-দিগন্ত ছানি নীল হলাহল
আকণ্ঠ লইনু পিয়া, তরল গরল –
সাগরে ডুবিল মোর আলোক-কমলা,
আঁখি মোর ঢুলে আসে – শেষ হল চলা!
জাগিলাম জন্মান্তর-জাগরণ-পারে
যেন কোন্ দাহ-অন্ত ছায়া-পারাবারে
বিচ্ছেদ-বিশীর্ণ তনু, শীতল-শিহর!
প্রতি রোমকূপে মোর কাঁপে থরথর।
কাজল-সুস্নিগ্ধ কার অঙ্গুলি-পরশ
বুলায় নয়ন মোর, দুলায়ে অবশ
ভার-শ্লথ তনু মোর ডাকে – ‘জাগো পিয়া।
জাগো রে সুন্দর মোরি রাজা শাঁবলিয়া।’
জল-নীলা ইন্দ্রনীলকান্তমণি-শ্যামা
এ কোন মোহিনী তন্বী জাদুকরী বামা
জাগাল উদয়-দেশে নব মন্ত্র দিয়া
ভয়াল-আমারে ডাকি –‘হে সুন্দর পিয়া!’
–আমি ঝড় বিশ্ব-ত্রাস মহামৃত্যুক্ষুধা,
ত্র্যম্বকের ছিন্নজটা–ওগো এত সুধা,
কোথা ছিল অগ্নিকুণ্ড মোর দাবদাহে?
এত প্রেমতৃষা সাধ গরল প্রবাহে?–
আবার ডাকিল শ্যামা, ‘জাগো মোরি পিয়া!’
এতক্ষণ আপনার পানে নিরখিয়া
হেরিলাম আমি ঝড় অনন্ত সুন্দর
পুরুষ-কেশরী বীর! প্রলয়কেশর
স্কন্ধে মোর পৌরুষের প্রকাশে মহিমা!
চোখে মোর ভাস্বরের দীপ্তি-অরুণিমা
ঠিকরে প্রদীপ্ত তেজে! মুক্ত ঝোড়ো কেশে
বিশ্বলক্ষ্মী মালা তার বেঁধে দেন হেসে!
এ কথা হয়নি মনে আগে,–আমি বীর
পরুষ পুরুষ-সিংহ, জয়লক্ষ্মী-শ্রীর
স্নেহের দুলাল আমি; আমারেও নারী
ভালোবাসে, ভালোবাসে রক্ত-তরবারি
ফুল-মালা চেয়ে! চাহে তারা নর
অটল-পৌরুষ বীর্যবন্ত শক্তিধর!
জানিনু যেদিন আমি এ সত্য মহান –
হাসিল সেদিন মোর মুখে ভগবান
মদনমোহন-রূপে! সেই সে প্রথম
হেরিনু, সুন্দর আমি সৃষ্টি-অনুপম!

বন কে বলে রে ভাই, আমাদের তপোবন,
গঙ্গাজলঘাটি, বাঁকুড়া
আষাঢ় ১৩৩২

কল-কলকল ছল-ছলছল কল-কলকল ছল-ছলছল॥
চল-চঞ্চল কল-কলকল ছল-ছলছল ছল-ছলছল।
হুগলী
আষাঢ় ১৩৩১

কুমিল্লা
জ্যৈষ্ঠ ১৩২৯

চাঁদ হেরিতেছে চাঁদমুখ তার সরসীর আরশিতে।
ছুটে তরঙ্গ বাসনাভঙ্গ সে অঙ্গ পরশিতে॥
হেরিছে রজনি রজনি জাগিয়া
চকোর উতলা চাঁদের লাগিয়া,
কাঁহা পিউ কাঁহা ডাকিছে পাপিয়া
কুমুদীরে কাঁদাইতে॥
না জানি সজনি কত সে রজনি কেঁদেছে চকোরী পাপিয়া,
হেরেছে শশীরে সরসী-মুকুরে ভীরু ছায়াতরু কাঁপিয়া।
কেঁদেছে আকাশে চাঁদের ঘরনি
চির-বিরহিণী রোহিণী ভরণী,
অবশ আকাশ বিবশা ধরণি
কাঁদানিয়া চাঁদনীতে॥
হুগলী
ফাল্গুন ১৩৩১

কুমিল্লা
আষাঢ় ১৩২৯

দেওঘর
পৌষ ১৩২৭

কার বাঁশি বাজিল
নদীপারে আজি লো?
নীপে নীপে শিহরণ কম্পন রাজিল –
কার বাঁশি বাজিল?
বনে বনে দূরে দূরে
ছল করে সুরে সুরে
এত করে ঝুরে ঝুরে
কে আমায় যাচিল?
পুলকে এ-তনুমন ঘন ঘন নাচিল।
ক্ষণে ক্ষণে আজি লো কার বাঁশি বাজিল?
কার হেন বুক ফাটে মুখ নাহি ফোটে লো!
না-কওয়া কী কথা যেন সুরে বেজে ওঠে লো!
মম নারী-হিয়া মাঝে
কেন এত ব্যথা বাজে?
কেন ফিরে এনু লাজে
নাহি দিয়ে যা ছিল?
যাচা-প্রাণ নিয়ে আমি কেমনে সে বাঁচি লো?
কেঁদে কেঁদে আজি লো কার বাঁশি বাজিল?
কলিকাতা
চৈত্র ১৩২৮

১
আদর-গর-গর
বাদর দর-দর
এ-তনু ডর-ডর
কাঁপিছে থর-থর।
নয়ন ঢল-ঢল
সজল ছল-ছল,
কাজল কালো জল
ঝরে লো ঝরঝর।
২
ব্যাকুল বন-রাজি শ্বসিছে ক্ষণে ক্ষণে,
সজনি! মন আজি গুমরে মনে মনে।
বিদরে হিয়া মম
বিদেশে প্রিয়তম,
এ জনু পাখি সম
বরিষা-জরজর।
৩
কাহার ও মেঘোপরি গমন গম-গম?
সখী রে মরি মরি, ভয়ে গা ছম-ছম।
গগনে ঘন ঘন
সঘনে শোনো-শোনো
ঝনন রণরণ –
সজনি ধরো ধরো।
৪
জলদ-দামা বাজে জলদে তালে তালে,
কাজরি-নাচা নাচে ময়ূর ডালে ডালে।
শ্যামল মুখ স্মরি
সখিয়া বুক মোরি
উঠিছে ব্যথা ভরি
আঁখিয়া ভরভর।
৫
বিজুরি হানে ছুরি চমকি রহি রহি
বিধুরা একা ঝুরি বেদনা কারে কহি।
সুরভি কেয়া-ফুলে
এ হৃদি বেয়াকুলে,
কাঁদিছে দুলে দুলে
বনানী মর-মর।
৬
নদীর কলকল, ঝাউয়ের ঝল-মল,
দামিনী জ্বলজ্বল, কামিনী টল-মল।
আজি লো বনে বনে
শুধানু জনে জনে,
কাঁদিল বায়ুসনে
তটিনী তরতর।
৭
আদুরি দাদুরি লো কহো লো কহো দেখি,
এমন বাদরি লো ডুবিয়া মরিব কি?
একাকী এলোকেশে,
কাঁদিব ভালোবেসে,
মরিব লেখা-শেষে,
সজনি সরো সরো।
কলিকাতা
শ্রাবণ ১৩২৮

অধর নিসপিস
নধর কিসমিস
রাতুল তুলতুল কপোল;
ঝরল ফুল-কুল,
করল গুল ভুল
বাতুল বুলবুল চপল॥
নাসায় তিলফুল
হাসায় বিলকুল,
নয়ান ছলছল উদাস,
দৃষ্টি চোর-চোর
মিষ্টি ঘোর-ঘোর,
বয়ান ঢলঢল হুতাশ।
অলক দুলদুল
পলক ঢুল ঢুল,
নোলক চুম খায় মুখেই,
সিঁদুর মুখটুক
হিঙুল টুকটুক,
দোলক ঘুম যায় বুকেই।
ললাট ঝলমল
মলাট মলমল
টিপটি টলটল সিঁথির,
ভুরুর কায় ক্ষীণ
শুরুর নাই চিন,
দীপটি জ্বলজ্বল দিঠির।
চিবুক টোল খায়,
কী সুখ-দোল তায়
হাসির ফাঁস দেয় – সাবাস।
মুখটি গোলগাল,
চুপটি বোলচাল
বাঁশির শ্বাস দেয় আভাস।
আনার লাল লাল
দানার তার গাল,
তিলের দাগ তায় ভোমর;
কপোল-কোল ছায়
চপল টোল, তায়
নীলের রাগ ভায় চুমোর॥
কুমিল্লা
ফাল্গুন ১৩২৮

কুমিল্লা
আষাঢ় ১৩২৮

দৌলতপুর, কুমিল্লা
জ্যৈষ্ঠ ১৩২৮