২. সংজ্ঞা ও প্রবণতাসমূহ

বিশ্বায়নের সংজ্ঞা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অর্থনৈতিক চিন্তার দৃষ্টিকোণ থেকে মেঘনাদ দেশাই (২০০২,২৯৯) বিশ্বায়নের নিম্নরূপ সংজ্ঞা নির্ধারণ 76569a, ‘Globalization, as this phase has come to be known, is a combination of deregulated capital movements, advances in information communication/transport technologies, and a shift in the ideology away from social democracy and statism towards neo-liberalism and libertarianism.’ (ইতিহাসের এই পর্যায়ে যা বিশ্বায়ন নামে পরিচিত তা হচ্ছে, অনিয়ন্ত্রিত পুঁজির সঞ্চরণ, তথ্য বিনিময়/যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রগতি ও সামাজিক গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রবাদের অবস্থান থেকে নব্য উদারনীতিবাদ ও লাগামহীন ব্যক্তিবাদে পরিবর্তনের সমাহার)। দেশাই তার। সংজ্ঞায় আদর্শের ভূমিকা অতিরঞ্জিত করেছেন। বাজার-মৌলবাদের সমর্থকেরা। মুখে রাষ্ট্রবাদের বিপক্ষে বললেও এখনো রাষ্ট্রবাদ পরিণত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বব্যাংকের (২০০৯) হিসাব অনুসারে ২০০৭ সালে চীনে সরকার মোট জাতীয় উৎপাদের ১১.৪ শতাংশ ব্যয় করে। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সরকার জাতীয় উৎপাদের ২১.৬ শতাংশ ব্যয় করে; যুক্তরাজ্যে এই হার ছিল ৪০.৮ শতাংশ, ফ্রান্সে ৪৪.৫ শতাংশ। এসব উপাত্ত থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বিশ্বায়নের ফলে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকায় বৈপ্লবিক সংকোচন ঘটেনি। উপরন্তু দেশাই-এর সংজ্ঞা মতো বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বে বাণিজ্য ও অভিবাসনে নাটকীয় পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়নি।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জোসেফ ই স্টিগলিজ ও জগদীশ ভাগবতী বিশ্বায়নের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। স্টিগলিজের (২০০২, ৯) মতে, ‘Fundamentally, it is the closer integration of the countries and the peoples of the world which has been brought about by the enormous reductions of costs of transportation and communication and the breaking down of artificial barriers to the flows of goods, services, capital, knowledge, and (to a lesser extent) people across borders. (মূলত বিশ্বায়ন হচ্ছে যোগাযোগ ও পরিবহন-ব্যয় দ্রুত হ্রাসের ফলে এবং পণ্য, সেবা, পুঁজি, জ্ঞানের প্রবাহে এবং (অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায়) মানুষের সীমান্ত অতিক্রম করে চলাচলের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রগুলির ও বিশ্বের মানুষের নিবিড়তর সংহতি)। এই সংজ্ঞা অনুসারে বিশ্বায়ন হচ্ছে কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রগুলির ও মানুষের মধ্যে একত্রীভূত হওয়ার প্রবণতা।

জগদীশ ভাগবতীর (২০০৪, ৩) সংজ্ঞাতেও একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘Economic globalization constitutes integration of national economies into the international economy through trade, direct foreign investment (by corporations and multinationals), short term capital flows, international flows of workers and humanity generally and flows of technology.’ (বাণিজ্য, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ করপোরেশন ও বহুজাতিক সংস্থার উদ্যোগে], স্বল্পমেয়াদি পুঁজির প্রবাহ, সাধারণভাবে মানুষ ও বিশেষ করে, শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক চলাচল এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিগুলির আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একীকরণ)।

বিশ্বায়ন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি, সমাজজীবন ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিশ্বায়নের টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ অ্যান্টনি গিডেঙ্গ সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বায়নের সংজ্ঞা রচনা করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বায়ন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বায়নের কারিগরি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মাত্রাও রয়েছে। অ্যান্টনি গিডেন্স (১৯৯৯,৩০-৩১) লিখেছেন, ‘Globalization … at any rate, is not only, or even primarily, about economic interdependence, but about the transformation of time and space in our lives.’ (fasthan caigalt অবস্থাতেই শুধু বা এমনকি প্রধানত পারস্পরিক আর্থিক নির্ভরশীলতা-সংক্রান্ত নয়, এর বিষয় হচ্ছে আমাদের জীবনে সময় ও স্থান সম্পর্কে ধারণার রূপান্তর।) প্রাক-বিশ্বায়নকালে দিবা ও রাত্রি আমাদের জীবনে তারতম্য সৃষ্টি করত। বিশ্বায়িত ভুবনে সারা বছর ২৪ ঘণ্টা বিরামহীন কাজ চলে। প্রাক-বিশ্বায়নকালে দেশের বাইরের কোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব অনুভূত হতে সময় লাগত। এখন যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে যেকোনো স্থানে গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতা হয়েছে খর্বিত। তাই পরিবর্তনের ঢেউ রাষ্ট্রের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখা সম্ভব হয় না। বিশ্বায়ন একদিকে মানুষকে বৈশ্বিক শক্তির দিকে আকর্ষণ করছে, অন্যদিকে স্থানিক শক্তির উদ্ভব বৈশ্বিক শক্তিকে প্রতিহত করছে।

দুটি কারণে বিশ্বায়নের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। প্রথমত, বিশ্বায়ন একটি অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। এই চলমান প্রক্রিয়া খনো চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করেনি। কাজেই বিশ্বায়নকে চিহ্নিত করতে হয় কতগুলি জায়মান (emerging) প্রবণতার ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বায়নের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। কাজেই বিশ্বায়নের সব মাত্রাকে চিহ্নিত করা সহজ নয়। তাই বিশ্বায়নের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা না করে বিশ্বায়নের মূল প্রবণতাগুলিকে চিহ্নিত করা অত্যাবশ্যক। নিচে বিশ্বায়নের প্রধান প্রবণতাগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

অর্থনৈতিক প্রবণতাসমূহ

বিশ্ববাণিজ্যের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ : অতি প্রাচীনকাল থেকে দুর্গম গিরি-পর্বত, শ্বাপদসংকুল অরণ্যানী, বিভীষিকাময় মরুভূমি ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র অতিক্রম করে বণিকেরা দূর-দূরান্ত থেকে অচেনা পণ্য নিয়ে এসেছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় ছিল অত্যন্ত বেশি এবং পথে লুণ্ঠনকারী বা জলদস্যুদের হাতে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি ছিল অত্যধিক। তাই বিশ্ববাণিজ্যের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিশ্ববাণিজ্যের বড় ধরনের সম্প্রসারণ ঘটে পঞ্চদশ শতকের পর। পঞ্চদশ শতক থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিশ্বের স্থলবাণিজ্য সম্পর্কে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য উপাত্ত নেই। তবে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে বিশ্ববাণিজ্য প্রধানত জলপথনির্ভর হয়ে পড়ে। তাই সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী জাহাজের সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্ববাণিজ্যের প্রবণতা প্রক্ষেপণ করা যেতে পারে। তবে প্রাচীনকালে সব জাহাজই ছিল পালের জাহাজ। তাই সারণি ৮.২-এ সমুদ্রবাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী জাহাজের হিসাব পালের জাহাজের ক্ষমতার ভিত্তিতে করা হয়েছে।

সারণি ৮.২
বিশ্ববাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী জাহাজগুলির ধারণক্ষমতা

১৪৭০

৩২০

১৫৭০

৭৩০

১৬৭০

১৪৫০

১৭৮০

৩৯৫০

১৮২০

৫৮৮০

১৯০০

৯৬১০০

১৯১৩

১৭১০০০

উৎস : অ্যাংগাস ম্যাডিসন (২০০১, ৯৫)

প্রয়োজনীয় উপাত্তের অনুপস্থিতিতে জাহাজের পরিবহনক্ষমতাকে বিশ্ববাণিজ্যের পরিবর্ত বা proxy হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। সারণি ৮.২-এর উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৪৭০ থেকে ১৯১৩–এই ৪৫৩ বছর কালে পরিমাণের ভিত্তিতে বিশ্ববাণিজ্য ৫৩৪ গুণ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির বেশির ভাগই বেড়েছে ১৮৫০ থেকে ১৯১৩ সময়কালে। ১৮৭০ সালের পরবর্তী সময়কালে বিশ্ববাণিজ্য সম্প্রসারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত উপাত্ত সারণি ৮.৩-এ দেখা যাবে।

সারণি ৮.৩
১৮৭০ থেকে ২০০১ সময়কালে বিশ্ববাণিজ্যের সম্প্রসারণ

বছরবিশ্বের স্থূল জাতীয় উৎপাদে বিশ্বের রপ্তানির অংশ (শতাংশ)
১৮৭০

৪.৬

১৯১৩

৭.৯

১৯৫০

৫.৫

১৯৭৩

১০.৫

১৯৯৮

১৭.২

২০০৯

২১.৪

উৎস: অ্যাংস ম্যাডিসন (২০০১, ১২৭)

২০০৯ সালের উপাত্ত বিশ্বব্যাংক (২০১২, ২০০ ও ২০৮)

সারণি ৮.৩ থেকে দেখা যাচ্ছে, স্কুল জাতীয় উৎপাদের অংশ হিসেবে বিশ্বে মোট রপ্তানি ১৮৭০ থেকে ২০০৯ সময়কালে ৪.৬ থেকে ২১.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। লক্ষণীয় যে এই হার অব্যাহতভাবে বাড়েনি। ১৯১৩ থেকে ১৯৫০ সময়কালে অর্থাৎ দুটি মহাযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে স্কুল জাতীয় উৎপাদে রপ্তানির হিস্সা কমে আসে। ১৯৫০ থেকে ১৯৯৮ সময়কালে স্কুল জাতীয় উৎপাদের হিস্‌সা হিসেবে রপ্তানির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বাড়ে। এই সময়টিতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের জয়যাত্রা শুরু হয়। পরিমাণের দিক দিয়ে ১৮৭০ থেকে ১৯৯০ সময়কালে রপ্তানি ৫০ গুণের বেশি বেড়েছে।

বিশ্ববাণিজ্যের এই অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের একটি বড় কারণ হলো পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যয় হ্রাস। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাহাজের ভাড়া কমতে থাকে। ১৮৭০ সালে লন্ডনে শিকাগোর তুলনায় গমের দাম ৫৮ শতাংশ বেশি ছিল; ১৯১৩ সালে এই ব্যবধান মাত্র ১৬ শতাংশে নেমে আসে। এই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যয় হ্রাসের ফলে ইউরোপে খাদ্যশস্যের দাম ৪০ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে লন্ডন ও ফিলাডেলফিয়ার মধ্যে লোহার দামের ব্যবধান ৮৫ থেকে ১৯ শতাংশে হ্রাস পায়। (বিশ্বব্যাংক, ২০০৯, ১৭৪)। একটি প্রাক্কলন থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭০-২০০৫ সময়কালে পরিবহন ব্যয় অর্ধেক হয়ে গেছে (বিশ্বব্যাংক, ২০০৯, ১৭৫)। সড়ক পরিবহনের ব্যয় গত তিন দশকে প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। ১৯৫৫ ও ২০০৪ সালের মধ্যে বিমানে প্রতি টন পরিবহন ব্যয় ৩.৮৭ থেকে মাত্র ০.৩০ ডলারে নেমে আসে। প্রত্যক্ষ পরিবহন ব্যয় যেখানে কমেনি, সেখানেও পরিবহনের সময় কমিয়ে এবং পরিবহনের গুণগত মান বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে ব্যয় হ্রাস করা হয়েছে।

(২) অভূতপূর্ব অভিবাসনের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের মধ্যে নতুন বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে ১৯৭০ থেকে ২০০৫ সময়কালে বিশ্বে অভিবাসী জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ১৯৭০ সালে বিশ্বে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৮.২ কোটি। ২০০৫ সালে এই সংখ্যা ১৮ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ১৯৬০ সালে উন্নত দেশগুলিতে অভিবাসীদের হার ছিল ৪.৪ শতাংশ। ২০০৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ১১.৪ শতাংশে। এই অভিবাসীদের মধ্যে দুটি শ্রেণী রয়েছে : স্থায়ী ও অস্থায়ী। অস্থায়ী অভিবাসীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে অস্থায়ী অভিবাসীদের প্রেরিত অর্থের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান রয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত চার দশকে অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ১৯৭০ সালে প্রবাসী শ্রমিকদের স্বদেশে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের কম ছিল। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ৪১৬.১ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। অবশ্য এ ধরনের বৃদ্ধির প্রতিফলন অভিবাসীদের সংখ্যার হিসাবে এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বে অভিবাসীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০০৫ সালে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৩ কোটিতে। অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে অভিবাসীর সংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখ বেড়েছে। বছরে গড়ে অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে ৬৬ লাখ। বিশ্বে অঞ্চলভেদে অর্থনৈতিক সুবিধার তারতম্যের ফলে উন্নত দেশগুলি যদি অবাধ অভিবাসনের সুযোগ দিত, অভিবাসীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যেত। কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে অভিবাসন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। অভিবাসন শুধু প্রেরিত অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সহায়তা করছে না। অভিবাসন প্রযুক্তির হস্তান্তর, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে অভিবাসন মানুষের আন্ত-মহাদেশীয় চলাচল উৎসাহিত করে অতি অল্প সময়ে নতুন নতুন রোগজীবাণু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, এইচআইভি/এইডস রোগ ১৯৬০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করে এবং পরবর্তী তিন দশকে সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের অভিবাসন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জৈব হামলা বা biological invasion স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজনবি (exotic) প্রাণী ও উদ্ভিদ আবহমান পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। এ ধরনের জৈব হামলার বিবরণ ক্রিস ব্রাইটের (১৯৯৮) Life out of Bounds: Bio invasion in a Borderless World গ্রন্থে পাওয়া যাবে। এখানে শুধু দুটি উদাহরণ দেওয়া হলো। প্রশান্ত মহাসাগরে গুয়াম দ্বীপে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত কোনো বাদামি গেছো সাপ (Brown tree snake) ছিল না। এ ধরনের সাপ পাপুয়া নিউ গিনিতে ছিল। ১৯৫০-এর দশকে পাপুয়া নিউ গিনি থেকে মার্কিন সেনারা গুয়ামে আসার সময়ে তাদের মালপত্রের সঙ্গে কিছু বাদামি গেছো সাপ গুয়ামে ঢুকে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যে এই সাপ সারা গুয়ামে ছড়িয়ে পড়ে। এখন এই সাপের বংশধরেরা গুয়ামে মানুষসহ সকল প্রাণীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দ্বীপে মোট ১৪ প্রজাতির পাখি ছিল। এর মধ্যে বহিরাগত সাপ ১২ প্রজাতির পাখি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করেছে। বিভিন্ন ধরনের টিকটিকিও অবলুপ্ত হয়ে গেছে। আজনবি উদ্ভিদের দৌরাত্ম্যের আরেক বড় প্রমাণ হলো দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কচুরিপানার বিস্তার। বহিরাগত কচুরিপানার উপদ্রবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদ ভিক্টোরিয়াতে স্থানীয় মাছ উধাও হয়ে গেছে। (ক্রিস ব্রাইট, ১৯৯৮)। কচুরিপানা নিয়ে একই ধরনের সমস্যা দেখা গিয়েছে বাংলাদেশেও। জাহাজের খোলে, উড়োজাহাজের চাকার ভেতরে, শূন্য কনটেইনারে আজনবি পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, গাছপালা, লতাপাতা ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন।

(৩) তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী তাৎক্ষণিক ও অব্যাহত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একীভূত আর্থিক বাজার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে। বিশ্বব্যাপী তথ্যের অবাধ লেনদেনে দুটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমত, তথ্য আদান-প্রদানে ব্যয়ের অকল্পনীয় হ্রাস সম্ভব হয়েছে। ১৯৩০ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনে টেলিফোন করতে প্রতি মিনিটে খরচ হতো ২৫০ ডলার। এখন এই খরচ কয়েক সেন্ট। ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রায় বিনা পয়সায় এ ধরনের যোগাযোগ সম্ভব। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে বাণিজ্যিকভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহার দাবানলের মতো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯০-এর প্রথম দিকে শুরু হয়ে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৩৬.০৯ কোটি ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপিত হয়। ২০১১ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২৬.৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের ৩২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। উত্তর আমেরিকাতে ৭৮.৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট সংযোগ গ্রহণ করেছে। ইউরোপে ৬১.৩ ব্যক্তি ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। তবে এশিয়া (২৬.২ শতাংশ) ও আফ্রিকায় (১৩.৬ শতাংশ) এই হার এখনো অনেক কম। নিরবচ্ছিন্ন ও তাৎক্ষণিক যোগাযোগের ভিত্তিতে বিশ্বের অর্থবাজার ক্রমশ একটি একীভূত বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট (BIS)-এর হিসাব অনুসারে ২০১০ সালে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে প্রতিদিন (অধিকাংশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে) গড়ে ৩.৯৮ ট্রিলিয়ন (তিন লাখ ৯৮ হাজার কোটি) ডলারের লেনদেন হয়। একটির ওপরে একটি ১০০ ডলারের নোট সাজিয়ে রাখলে এক ট্রিলিয়ন ডলারের স্কুপের উচ্চতা হবে ১২০ মাইল (অ্যান্টনি গিডেন্স, ১৯৯৯, ১০)। ২০১০ সালে বৈদেশিক মুদ্রার যে লেনদেন হয়, তা ১০০ ডলারের নোট দিয়ে সাজালে ৪৭৭ মাইল উঁচু স্তূপ হবে। বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রতিনিয়ত তাৎক্ষণিক লেনদেন চলছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যেকোনো অভিঘাত অর্থবাজারের মধ্য দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। টমাস এল ফ্রিডম্যানের (২০০০, ১১২) ভাষায়, এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বৈদ্যুতিন বিনিয়োগকারীর পাল বা electronic herd। এসব বিনিয়োগকারীর ব্যবহার গরু-ছাগলের পালের সঙ্গে তুলনীয়। গরু-ছাগলের পাল যখন ছোটে, তখন সবাই একই দিকে দৌড়ায়। এসব বৈদুতিন বিনিয়োগকারী অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একবার একজন বিনিয়োগকারী কোনো কারণে উদ্বিগ্ন হলে অন্যরা এ বাজার থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে থাকে। এই বাজার তাই অতিমাত্রায় অস্থিতিশীল।

প্রতি মুহূর্তে তারা বিনিয়োগের মূল্যায়ন করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে থাকে। তাদের আস্থা ধরে রাখা তাই অত্যন্ত দুরূহ। টমাস এল ফ্রিডম্যান (২০০০, ১১৪) তাই যথার্থই লিখেছেন, ‘Democracies vote about a government’s policies once every two or four years. But the Electronic Herd votes every minute of every hour of every day.’ (গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাররা প্রতি দুই বা চার বছরে সরকারের নীতিগুলির মূল্যায়ন করে। কিন্তু বৈদ্যুতিন (বিনিয়োগকারীর পাল প্রতিদিন প্রতি ঘন্টার প্রতি মুহূর্তে তাদের আস্থা বা অনাস্থা ব্যক্ত করে)।

(৪) স্থানীয় উৎসের পরিবর্তে বাইরের উৎসের উপকরণ ব্যবহারের ফলে বিশ্ব উৎপাদন-ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাক-বিশ্বায়ন পর্বে রাষ্ট্রের ও উৎপাদকদের লক্ষ্য ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। প্রতিটি রাষ্ট্র শুল্কের প্রাচীরের অন্তরালে দেশজ শিল্পগুলিকে সংরক্ষণ করত। তাই রাষ্ট্র চাইত যে দেশে প্রস্তুত সব পণ্যে শুধুই দেশজ উপাদান ব্যবহৃত হবে। অন্যদিকে আয়তনজনিত সুবিধা লাভের জন্য দেশজ উৎপাদকেরা নিজেদের কারখানাতেই সব উপাদান তৈরির চেষ্টা করত। এই প্রক্রিয়ায় অনেক শিল্পই ওপর থেকে নিচের স্তর পর্যন্ত সব উপকরণই নিজেরা প্রস্তুত করে। অর্থনীতিবিদেরা এ প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন vertical integration (উল্লম্ব সংযুক্তি) বা ওপর থেকে নিচ স্তর পর্যন্ত সব উপকরণ একই কারখানায় উৎপাদন। বিশ্বায়নের ফলে এ দুটি প্রবণতাই বহুলাংশে উল্টে যায়। আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফোর্ড বা ক্রিসলার কোম্পানির মোটরগাড়ির উপকরণ ও যন্ত্রাংশ একই মোটরগাড়ি কোম্পানি তৈরি করে না। এমনকি অধিকাংশ উপকরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তুত হয় না। অধিকাংশ উপাদানই বাইরে থেকে আমদানি করা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তুত একটি গাড়ির উপকরণ বিশ্লেষণ করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে গাড়িটির মাত্র ৩৭ শতাংশ মূল্য সংযোজন ওই দেশে হয়। গাড়িটির ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন হয় কোরিয়াতে, গাড়িটির মোট উৎপাদন ব্যয়ের ১৭.৫ শতাংশ যায় জাপানে। ডিজাইন বাবদ জার্মানরা পায় ৭.৫৮ শতাংশ। তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের জন্য পায় ৪ শতাংশ। গাড়িটির বিজ্ঞাপন ও বিপণনের জন্য যুক্তরাজ্যে যায় ২.৫ শতাংশ। কম্পিউটার ও হিসাবসংক্রান্ত কাজ করে আয়ারল্যান্ড ও বারবডোজ। তারা পায় উৎপাদন খরচের ১.৫ শতাংশ। এমনকি, যেসব পণ্য দেশজ সংস্কৃতির প্রতাঁকের মর্যাদা অর্জন করেছে সেগুলিও প্রকৃতপক্ষে বিদেশে প্রস্তুত। এ প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অতি জনপ্রিয় বারবি (Barbie) পুতুলের অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা মনে করে যে বারবি পুতুল আমেরিকানদের একান্তই নিজস্ব। বাস্তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রে যে বারবি পুতুল বিক্রয় করা হয় তার প্লাস্টিক আসে তাইওয়ান থেকে, চুল আনা হয় জাপান থেকে, পুতুলের কাপড় আসে চীন থেকে, রং ও ছাঁচ আমেরিকান। পুতুলগুলো সংযোজন। করা হয় ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে। এগুলির বিপণন করে একটি মার্কিন কোম্পানি।

এসব পরিবর্তনের ফলে উৎপাদন-প্রক্রিয়া থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার তাগিদ তিরোহিত হয়েছে। টমাস এল ফ্রিডম্যান (২০০৫) এসব পরিবর্তনের নাম দিয়েছেন Flattener বা প্রতিযোগিতার অন্তরায় অপসারক। কারিগরি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনের পদ্ধতি ও সংগঠনে পরিবর্তন হয়েছে। ফ্রিডম্যানের মতে বিশ্বায়নের ফলে উৎপাদন-ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন হয়েছে তার পেছনে রয়েছে নিম্নলিখিত ১০ ধরনের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন : (১) নির্দেশ অর্থনীতির অবসানের সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিকেন্দ্রীকৃত উৎপাদকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। (২) ইন্টারনেটের মাধ্যমে সব উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন। (৩) মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কম্পিউটারগুলির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ। (৪) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ। (৫) আউটসোর্সিং কোম্পানি বা দেশের বাইরে থেকে উপকরণ ও সেবা সংগ্রহ। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলেই এর প্রসার সম্ভব হয়েছে। (৬) অফশোরিং বা ব্যয় হ্রাসের জন্য দেশের বাইরে উৎপাদন স্থানান্তর। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি ছাড়া এটিও সম্ভব ছিল না। (৭) অব্যাহত জোগানের শৃঙ্খল বা supply chaining। কমম্পিউটার ভিত্তিক এই ব্যবস্থা উৎপাদক, খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাকে এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করে। (৮) ইনসোর্সিং বা ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির জোগান-শৃঙ্খল নিশ্চিত করার জন্য সারা বিশ্বে মাল বা পত্র বিতরণে সক্ষম UPS (United Parcel Service)-এর মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ও প্রসার হয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিক্রেতার পক্ষে কম মূল্যে বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন সেবা প্রদান করে। (৯) গুগল (Google) বা ইয়াহু (Yahoo)-এর মতো তথ্য ভান্ডারের মাধ্যমে সব মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া। শক্তিশালী অনুসন্ধান যন্ত্র ব্যবহার করে সবাই অতি সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ পায়। (১০) কম্পিউটারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যন্ত্রপাতির উদ্ভব, যা ব্যক্তির ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোন, আই পডস ইত্যাদি। এসব সাংগঠনিক ও কারিগরি পরিবর্তন উৎপাদন ও বিপণন-ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব রেখেছে। প্রথমত, উৎপাদকেরা এখন আর স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছে না। তাদের পরনির্ভরশীলতা ক্রমশ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, নতুন ব্যবস্থায় ছোট উৎপাদকেরা প্রতিযোগিতার ক্ষমতা অর্জন করছে। আজকের পৃথিবীতে ক্ষুদ্র শুধু সুন্দরই নয়, কার্যক্ষমও বটে। উপরন্তু বৈদ্যুতিন যোগাযোগ-ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে নতুন বিপণন-ব্যবস্থাও গড়ে উঠছে, যা ই-কমার্স নামে পরিচিত।

উন্নত দেশগুলি থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এসব পরিবর্তন স্থানান্তরের বাহন হচ্ছে বহুজাতিক করপোরেশনগুলি। বিশ্বে যত পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলি। অনেক কোম্পানির বিক্রির পরিমাণ এত বেশি যে কোনো কোনো দেশের মোট জাতীয় উৎপাদও এর তুলনায় তুচ্ছ। ২০০৯ সালে ওয়াল মার্টের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৪১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই বছরে বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদ ছিল মাত্র ৮৯.৩ বিলিয়ন ডলার। মুনাফার নেশায় বিভোর এসব ‘মেগা কোম্পানি নিয়ে তাই উন্নয়নশীল দেশগুলিতে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

রাজনৈতিক প্রবণতাসমূহ

প্রচলিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অবক্ষয় ও আন্তর্জাতিক খবরদারি প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী হচ্ছে। অতি প্রাচীনকাল থেকে বৈদেশিক বাণিজ্যকে হার-জিতের খেলা (zero sm game) হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে বাইরের পণ্য আমদানি করলে দেশের সম্পদ পাচার হয়ে যায়। তাই দীর্ঘদিন ধরে সবাই মেনে নিয়েছেন যে সার্বভৌম রাষ্ট্রের তার বহির্বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অবারিত অধিকার রয়েছে। অথচ মূলধারার অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন যে বাণিজ্য হচ্ছে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক একটি ব্যবস্থা (win-win game)। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণের জন্য শুল্ক ও বাণিজ্য সম্পর্কে সাধারণ চুক্তি (GATT) কাঠামোর আওতায় আলোচনা শুরু হয়। ৮ পর্ব (round) আলোচনার মাধ্যমে ১৯৪৫ থেকে ১৯৯৫ সময়কালে গড় শুল্কের হার ৮৫ শতাংশ হ্রাস করা হয়। বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক অন্তরায়কে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে উরুগুয়ে পর্ব আলোচনার মাধ্যমে শক্তিশালী বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (World Trade Organization) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের সব সদস্য অঙ্গীকার করেছে যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে ঘোষিত হারের চেয়ে ঊর্ধ্ব হারে কখনো শুল্ক আরোপ করা যাবে না। অর্থাৎ প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র তাদের ইচ্ছেমতো শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে। উপরন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান না মানলে তার শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে । বাণিজ্য সম্পর্কে আন্তরাষ্ট্র বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনি কাঠামো স্থাপিত হয়েছে। উপরন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা তদারক করছে। শ্রম অধিকার নিশ্চিত করছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অবক্ষয়ের পাশাপাশি জাতিসংঘের আইনগত ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। জাতিসংঘের অনেক সদস্যরাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্রবীভবনের ফলে পৃথিবীতে রাজনৈতিক ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কুক্ষিগত হয়েছে। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বও খণ্ডিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষভাবে করে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মাধ্যমে এ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

বিশ্বায়ন বনাম স্থানিকায়নের (localization) দ্বন্দ্ব দেখা গেছে। পারস্যের প্রাচীন অধিবাসীরা বিশ্বাস করতেন যে শুভ (Ahura Mazda) এবং অশুভ (Ahriman) অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। তেমনি বিশ্বায়ন ও স্থানিকায়নের মতো দুটি বিপরীতমুখী শক্তিও বর্তমান বিশ্বে একই সঙ্গে সক্রিয়। বিশ্বায়নের ব্যাপ্ত পরিসরে মানুষের আত্মপরিচয় অবলুপ্তির হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এ অবস্থায় স্থানিকায়নের প্রাচীর মানুষের আত্মপরিচয় বাঁচিয়ে রাখছে। বিশ্বায়নের হুমকি মোকাবিলার জন্য মানুষ তার স্থানিক সত্তাকে আঁকড়ে ধরেছে। বিশ্বায়ন দূরকে নিকট করলেও স্থানিকায়ন পরকে আপন করতে দেয়নি।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিধিনিষেধ সৃষ্টি করে বিশ্বায়ন রাষ্ট্রের ক্ষমতা রাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার নেই। এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে চায়। তারা চায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। জনগণ চায় অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ। এই দাবি মূলত দুভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। পুরোনো রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গড়ার দাবি উঠছে। ১৯৯০ সালে বিশ্বে মোট রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ১৩৮। গত দুই দশকে এই সংখ্যা বেড়ে ১৯২-এ উন্নীত হয়েছে। এখনো অনেক শিল্পোন্নত দেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের দাবি শোনা যাচ্ছে। ইংল্যান্ড ও কানাডার মতো শিল্পোন্নত দেশে সোচ্চার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে। যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেখা দেয়নি সেখানেও রয়েছে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার দাবি। এ অবস্থাতে বর্তমান জাতিরাষ্ট্রগুলি ওপর ও নিচ–দুই দিক থেকেই অবান্তর হয়ে পড়ছে। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেল ঠিকই বলেছেন, বর্তমান প্রক্রিয়াতে বড় বড় সমস্যা সমাধানের জন্য রাষ্ট্র অনেক ছোট (কারণ এসব সমস্যার সমাধান করতে হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে); আর ছোট ছোট সমস্যা সমাধানের জন্য রাষ্ট্র অনেক বড় (কেননা, এতে দরিদ্র মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশীদারত্ব নেই)।

ওপর দিক থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি রাষ্ট্রের ক্ষমতা খর্ব করেছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে ব্যক্তি খাত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি (NGOs) অনেক দায়িত্বের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে বিশ্বায়িত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায় বর্তমান বিশ্বে hollowing of state বা রাষ্ট্রের ফাপা হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সাংস্কৃতিক প্রবণতা

বিশ্বায়নের ফলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন। প্লেগ-মহামারির মতো ইংরেজি ভাষা পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ম্যাকডোনাল্ডের মতো চটজলদি খানার দোকানগুলি। পৃথিবীর সর্বত্র একই ধরনের খাবার পরিবেশন করছে। বিশ্বায়ন শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে না, সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সব সংস্কৃতিকে সমরূপ করছে। এ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির ওপর। মূল ধারার ওপরও আঘাত আসছে। তবে সংস্কৃতিভেদে এর তীব্রতা ভিন্ন। আজকের দুনিয়াতে অধিকাংশ মানুষ দুই নৌকাতে পা দিয়ে আছে; দুটি নৌকা তাকে দুই দিকে টানছে, একটি টানছে বিশ্বায়নের স্রোতোধারায়, অন্যটি স্থানিকায়নের দিকে। কোথাও কোথাও ঘটছে সমন্বয়। আমেরিকান কায়দায় টমাস এল ফ্রিডম্যান এর নাম দিয়েছেন Glocalism (Globalism + Localism) বা স্থানিকের বিশ্বায়ন। এই প্রক্রিয়াতে সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের উপাদানগুলি যুক্ত হলেও তা তার স্থানিক সত্তা বজায় রাখছে। কিন্তু সর্বত্র দুটি বিপরীতমুখী উপাদানের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব হচ্ছে না। আজ বিশ্বে অনেক মানুষই তার নিজ গৃহে পরবাসী। ঘর যেখানে ছিল সেখানেই আছে, তবে ঘরের এত পরিবর্তন হয়েছে যে তাকে আর নিজের ঘর বলে মনেই হয় না।