৩. বিশ্বায়নের পরিণাম

বিশ্বায়নের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের একটি বড় কারণ হলো বিশ্বায়ন মানুষের জীবনযাত্রার মান দীর্ঘ মেয়াদে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে চলেছে। সারণি ৮.৪-এ বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে স্থিরীকৃত মূল্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাবে।

সারণি ৮.৪
১৯৫০-১৯৯৮ সময়কালে স্থিরীকৃত (১৯৯০ সালের আন্তর্জাতিক ডলারে) মূল্যে মাথাপিছু আয়ের প্রবণতা

বছরপশ্চিম ইউরোপযুক্তরাষ্ট কানাডা অস্ট্রেলিয়াপূর্ব ইউরোপসাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নলাতিন আমেরিকাএশিয়াআফ্রিকাবিশ্ব
১৯৫০৪৫৯৪৯২৮৮২১২০২৮৩৪২৫৫৪৭১৩৮৫২২১১৪
১৯৬০৬৯৩০১০৯৯৬৩০৭৫৩৯৩৫৩১৬৭১০৩২১০২৪২৭৮১
১৯৭০১০২৯৭১৪৫৯৭৪৩১৫৫৫৬৯৪০১৬১৫৩৬১৩১১৩৭৪৯
১৯৮০১৩৩২৬১৮০৫৭৫৭৮০৬৪৩৭৫৪১৩২০৩৬১৪৮৪৪৫২১
১৯৯০১৫৯৮৮২২৩৫৬৫৪৩৭৬৮৭১৫০৫৫২৭৮১১৩৮৫৫১৫৪
১৯৯৮১৭৯২১২৬১৪৬৫৪৬১৩৮৯৩৫৭৯৫৩৫৬৫১৩৬৮৫৭০৯
সূত্র : অ্যাংগাস ম্যাডিসন (২০০১, ৩৩০)

১৯৫০-১৯৯৮ সময়কালে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ২৫৫ কোটি। ১৯৯৮ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৬০০ কোটিতে উন্নীত হয়। জনসংখ্যার বিস্ফোরণ সত্ত্বেও এই সময়কালে বিশ্বে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি (২.৭৪ গুণ) বেড়েছে। তবে পৃথিবীর সর্বত্র মাথাপিছু আয় একই হারে বাড়েনি। অঞ্চলভেদে প্রবৃদ্ধির হারে তারতম্য রয়েছে। এই সময়ে এশিয়াতে মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ (৪৮ বছরে ২৯০ শতাংশ)। সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়াতে (৪৮ বছরে মাত্র ৩০ শতাংশ)। এর একটি বড় কারণ হলো ১৯৯০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা উবে যাওয়ার পর রাশিয়াতে মাথাপিছু আয়ের দ্রুত হ্রাস ঘটে। অবশ্যই বিশ্বায়নের ফলে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলি। উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায় তাদের মাথাপিছু আয় অনেক বেশি বেড়েছে।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিশ্লেষণ থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বিশ্বায়ন উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে বিশ্বের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়িয়েছে। তবে এ আয় বৃদ্ধির সুফল শুধু বড়লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা গরিব মানুষদের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রমেও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। সারণি ৮.৫-এ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দারিদ্র্যের হারের প্রবণতা দেখা যাবে।

সারণি ৮.৫
আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখার ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিদরিদ্রের সংখ্যা ও হারের প্রবণতা, ১৯৮১-২০০৫ (১.২৫ ডলারে দারিদ্র্যসীমা ধরে নিয়ে ২০০৫ সালে পিপিপি মূল্যে)

অঞ্চল১৯৮১ সালে মোট দরিদ্রের পরিমাণ (কোটি)১৯৮১ সালে দারিদ্রের হার (শতাংশ)২০০৫ সালে মোট দারিদ্রের পরিমাণ (কোটি)২০০৫ সালের দারিদ্রের হার (শতাংশ)
পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল১০৭.২৭৭.৭৩১.৬১৬.৮
(চীন)(৮৩.৫)(৮৪)(২০.৮)(১৫.৯)
ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া০.৭১.৭১.৭৩.৭
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান৪.৭১২.৯৪.৫৮.২
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা১.৪৭.৯১.১৩.৬
দক্ষিণ এশিয়া৫৪.৮৫৯.৪৫৯.৬৪০.৩
(ভারত)(৪২)(৫৯.৮)(৪৫.৬)(৪১.৬)
সাব সাহারা আফ্রিকা২১.১৫৩.৪৩৮.৮৫০.৯
বিশ্ব১৯০৫১.৯১৩৭.৪২৫.২
উৎস: বিশ্বব্যাংক, ২০১১, ৬৬

বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে ১৯৮১ থেকে ২০০৫ সাল সময়কালে বিশ্বায়ন দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক হয়েছে। ১৯৮১ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৪৫২ কোটি। ২০০৫ সালে এই সংখ্যা ৬৪৭ কোটিতে উন্নীত হয়। এই সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যা ১৯৫ কোটি বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও বিশ্বে অতিদরিদ্রের সংখ্যা ১৯০ কোটি থেকে ১৩৭.৪ কোটিতে নেমে আসে। অর্থাৎ ৩৪ বছরে ৫২.৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে। বিশ্বে দারিদ্র্যের হার ১৯৮১ সালে ছিল ৫১.৯ শতাংশ। এই হার ২০০৫ সালে কমে ২৫.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সাফল্যের সুফল অবশ্য সব অঞ্চল সমানভাবে ভোগ করতে পারেনি। এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ হলো চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতি। এই অঞ্চলে ১৯৮১ থেকে ২০০৫ সময়কালে ৯০.৪ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করে। এই অঞ্চল বাদ দিলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সর্বসাকল্যে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে। পূর্ব ইউরোপ আর উপসাহারা আফ্রিকাতে ও দক্ষিণ এশিয়াতে অতিদরিদ্রের মোট পরিমাণ বেড়েছে। বিশ্বায়নের ফলে কোনো কোনো অঞ্চল উপকৃত হয়েছে, আবার কোনো কোনো অঞ্চল অপকৃত হয়েছে । বিশ্বায়নের সমর্থকেরা দাবি করে থাকেন, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্বায়নে অংশগ্রহণের ফলেই অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। গত তিন দশক ধরে যে ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে এ ধরনের উন্নয়ন এর আগে পৃথিবীর কোনো দেশে কখনো ঘটেনি। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ৫৭ বছরে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ কোটি লোকের মাথাপিছু আয় স্থিরীকৃত মূল্যে দ্বিগুণ করা সম্ভব হয়। এতেই তাবৎ পৃথিবী হতবাক হয়ে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের এই পর্যায়কে শিল্প বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ তিন দশক ধরে চীনে প্রায় ১৩০ কোটি লোকের মাথাপিছু আয় প্রতি ১০ বছর বা তার কম সময়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের তুলনায় আজকের চীনে শিল্প বিপ্লব আয়তনের দিক থেকে প্রায় ৭৪০ গুণ বড়। শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডে শুরু হয়েছিল। আজকে চীনে ‘মেগা’ বা অতিকায় শিল্প বিপ্লব হচ্ছে। সাম্প্রতিক কালে ভারতের ১১৫ কোটি লোকের মাথাপিছু আয় যে হারে বাড়ছে তা-ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন নজির। চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা এ কথাই প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বায়নের ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর। টমাস এল ফ্রিডম্যান (২০০২) মনে করেন যে বিশ্বায়ন কারিগরি পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ব-অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার অন্তরায়গুলি দূর করে উন্নয়নশীল দেশগুলির উন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

অবশ্য সবাই বিশ্বায়নের অমিত সম্ভাবনা নিয়ে এক মত নন। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ স্টিগলিজ (২০০৬, ২৯২) বলছেন, ‘For much of the world, globalization as it has been managed seems like a pact with the devil. A few people in the country become wealthier; GDP statistics, for what they are worth, look better, but ways of life and basic values are threatened.’ (699179 50965 60 পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে বিশ্বায়নকে শয়তানের সঙ্গে আঁতাত বলে প্রতীয়মান হয়। দেশে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি সম্পদশালী হয়ে ওঠে, মোট জাতীয় উৎপাদ, এর তাৎপর্য যা-ই হোক না কেন, বেড়েছে। তবু জীবনযাত্রা ও মৌল মূল্যবোধগুলি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে)। স্টিগলিজের বক্তব্য কিছুটা ঠিক, তবে পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশ্বায়নের ফলে যে বিপুল সম্পদের সৃষ্টি হচ্ছে তার সুষম বণ্টন হচ্ছে না। এর ফলে বৈষম্য বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। অ্যান্টনি গিডেন্সের (১৯৯৯, ১৫) একটি প্রাক্কলন থেকে দেখা যায়, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৮ সময়কালে বিশ্বের জাতীয় উৎপাদে দরিদ্রতম ২০ শতাংশ মানুষের হিস্সা ২.৩ থেকে ১.৪ শতাংশে নেমে গেছে। কিন্তু এর জন্য বিশ্বায়ন দায়ী নয়। বিশ্বায়ন থেমে গেলেই বিশ্বে অসাম্য কমে যাবে না। এই অনুমানের পক্ষে দুটি যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, ভারত ও চীনে বিশ্বায়নের ফলে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। ধনী ও দরিদ্র দেশগুলির মধ্যে ব্যবধান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনুন্নত দেশগুলিতে বিশ্বায়নের মাত্রা কম। উন্নত দেশগুলির অর্থব্যবস্থায় বিশ্বায়নের প্রভাব অনেক বেশি। অথচ দেখা যাচ্ছে যে অনুন্নত দেশগুলিতে ধনবৈষম্য উন্নত দেশগুলির চেয়ে অনেক বেশি (সারণি ৮.৬)।

সারণি ৮.৬ থেকে দেখা যাচ্ছে, শিল্পোন্নত জি-৮ দেশগুলিতে যেখানে বিশ্বায়নের মাত্রা অনেক বেশি, সেখানে ধনবৈষম্য অপেক্ষাকৃত অনেক কম। পক্ষান্তরে নামিবিয়া, মাইক্রোনেশিয়া, বোতসোয়ানা বা হাইতির মতো দেশে যেখানে বিশ্বায়ন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, সেখানে ধনবৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এসব উপাত্ত থেকে প্রতীয়মান হয় যে বিশ্বায়ন দীর্ঘ মেয়াদে একটি রাষ্ট্রের ভেতরে ধনবৈষম্য হ্রাস করে। বিশ্বায়ন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করে। এ ধরনের সমাজে প্রতিভাবান ব্যক্তিরা তাদের মেধা ব্যবহার করে অতি অল্প সময়ে বিপুল বিত্তের অধিকারী হতে পারেন। প্রাক-বিশ্বায়ন পর্যায়ে বিশ্বের সেরা ধনীদের পর্যায়ে উন্নীত হতে কয়েক প্রজন্মের নিরবচ্ছিন্ন সাফল্যের প্রয়োজন হতো। অথচ বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিল গেটসের মতো

সারণি ৮.৬
জিনি সূচকের (Gini Index) ভিত্তিতে পৃথিবীর সবচেয়ে অসম বণ্টনের দেশের সঙ্গে জি-৮ ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির তুলনা

জিনি সূচকের ভিত্তিতে সর্বাধিক ধনবৈষম্যের দেশজিনি সূচকজি-৮, বাংলাদেশ, ভারত, চীনজিনি সূচক
নামিবিয়া ৭৪.৩রাশিয়া ৪২.৩
মাইক্রোনেশিয়া ৬১.১যুক্তরাষ্ট্র ৪০.৮
বোতসোয়ানা ৬১.০যুক্তরাজ্য ৩৬.০
হাইতি ৫৯.৭ইতালি ৩৬.০
অ্যাঙ্গোলা ৫৮.৬ফ্রান্স ৩২.৭
কলম্বিয়া ৫৮.৫ক্যানাডা ৩২.৬
দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৭.৮জার্মানি ২৮.৩
হন্ডুরাস ৫৭.৭জাপান ২৪.৯
বলিভিয়া ৫৭.৩চীন ৪১.৫
বেলিজ ৫৪.৪ভারত ৩৬.৮
বাংলাদেশ ৩১.০
উৎস: বিশ্বব্যাংক (২০২১)

ব্যক্তিরা নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে দুই-তিন দশকের মধ্যে বিশ্বের সর্বাধিক ধনী ব্যক্তির স্থান দখল করতে পারেন। এ ধরনের সমাজে সচলতার (social mobility) মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের। যে-কেউ অতি অল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। তাই এ ধরনের সমাজে ধনবৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সীমিত থাকে।

অর্থনৈতিক অসাম্যের সমস্যা বিশ্বায়ন সৃষ্টি করেনি। বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অনেক আগেই অর্থনৈতিক অসাম্য একটি উদ্বেগজনক সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ্বায়ন বন্ধ হয়ে গেলেই এর সমাধান মিলবে না। অনুরূপভাবে পরিবেশদূষণের সমস্যাও বিশ্বায়নের একক অবদান নয়। তবে বিশ্বায়নের অব্যাহত জয়যাত্রা পরিবেশদূষণের সমস্যাকে তীব্রতর ও বিস্তৃততর করেছে। বিশ্বায়নের সব সমস্যারই উদ্ভব হয়েছে বিশ্বের পুঁজিবাদ-ব্যবস্থা থেকে। যদিও সমস্যাগুলি পুরোনো, তবু বিশ্বায়নের তিনটি সমস্যা উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় অঞ্চলেই গভীর শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

প্রথম সমস্যা হলো অ-শিল্পায়ন বা deindustrialization। অ-শিল্পায়ন হচ্ছে শিল্প উৎপাদনে কর্মসংস্থানের হ্রাস। প্রধানত দুটি কারণে শিল্প উৎপাদনে চাকরির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রথমত, বিশ্ববাণিজ্যে পরিবর্তনের ফলে কোনো কোনো দেশ তাদের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজার হারাচ্ছে। সেসব দেশে ওসব রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট শিল্প একেবারে উঠে যাচ্ছে অথবা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে এসব শিল্পে কর্মসংস্থান কমে গেছে। এ ধরনের দেশে নতুন শিল্প স্থাপিত না হলে সামগ্রিকভাবে শিল্পে কর্মসংস্থান কমে যায়। এ ধরনের অ-শিল্পায়ন অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ও উনবিংশ শতাব্দীর উষালগ্নে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম দেখা দেয় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে । ইংরেজদের বাংলা জয়ের আগে ঢাকা শহর ছিল বিশ্বে মসলিনের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক। ইংরেজ বণিকদের কাছে ঢাকা মসলিনের বাজার হারায়। ফলে হাজার হাজার তাঁতি তাদের কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে চাষবাস শুরু করে। দ্বিতীয় ধরনের অ-শিল্পায়ন ঘটে কারিগরি পরিবর্তনের ফলে । উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম লোক দিয়ে বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশের কাছে বাজার না হারালেও কর্মসংস্থান কমে যায়।

বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় অঞ্চলেই নানাভাবে শিল্প উৎপাদনে কর্মসংস্থান কমছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক প্রাক্কলন থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭০ সালে সব শিল্পোন্নত দেশে মোট শ্রমিকদের ২৮ শতাংশ শিল্প উৎপাদনে নিয়োজিত ছিল। এই হার ১৯৯৪ সালে ১৮ শতাংশে নেমে আসে। ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প উৎপাদনে নিয়োজিত ২৯ লাখ শ্রমিক চাকরি হারায়। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (২০০৮) হিসাব অনুসারে, ২০০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫ লাখ শিল্পশ্রমিক চাকরি হারায়। ২০০৮ সালের মধ্যে শিল্প-উৎপাদনে নিয়োজিত আরও ৬ লাখ শ্রমিক বেকার হয়। এই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করে উন্নত বিশ্বের শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে উন্নয়নশীল দেশগুলির সস্তা শ্রমিকেরা তাদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে দেশজ শিল্পের সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে বৈদেশিক পণ্যের অবাধ আমদানির সুযোগ সৃষ্টির ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অনেক স্থানীয় শিল্প উঠে গেছে এবং অনেক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। তাই উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় অঞ্চলেই শ্রমিকেরা বিশ্বায়নকে অভিশাপ মনে করে।

বিশ্বায়নের সমর্থকেরা অবশ্য এসব যুক্তি মানেন না। তারা দাবি করেন যে বিশ্বায়ন যেমন একদিকে পতনোম্মুখ বা সূর্যাস্ত-শিল্পে (sunset industry) কর্মসংস্থান হ্রাস করেছে তেমনি অন্যদিকে উদীয়মান বা। সূর্যোদয়-শিল্পে (sunrise industry) নতুন চাকরি সৃষ্টি করেছে। জোসেফ শুমপিটারের ভাষায় অ-শিল্পায়ন হলো সৃষ্টিশীল ধ্বংস (creative destruction)। বিশ্বায়নের ফলে মাথাপিছু আয়ের নাটকীয় বৃদ্ধি পণ্য ও সেবার চাহিদা অনেক বাড়িয়েছে। ফলে অনেক নতুন চাকরি সৃষ্ট হয়েছে। উপরন্তু উন্নত দেশগুলিতে যেসব চাকরি কমেছে তার জন্য শুধু বিশ্বায়ন দায়ী নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি গবেষণা (রবার্ট রথর্ন ও রমনা রামস্বামী, ১৯৯৯) থেকে দেখা যাচ্ছে, ৫৫ থেকে ৬৬ শতাংশ কর্মসংস্থান কমেছে উন্নত দেশগুলির ভেতরে কারিগরি পরিবর্তন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে। মাত্র ৪৫ থেকে ৩৩ শতাংশ চাকরি হ্রাস পেয়েছে বিশ্ববাণিজ্যের সম্প্রসারণের ফলে।

বিশ্বায়নের সমর্থকদের যুক্তি মেনে নিলেও শ্রমবাজারে বিশ্বায়নের তিনটি কুফল অস্বীকার করা যাবে না। প্রথমত, বিশ্বায়ন নতুন চাকরি সৃষ্টি করলে সেসব চাকরিতে পুরোনো শিল্পে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকেরা বহাল হয় না। সকল। ছাঁটাইকৃত শ্রমিক নতুন কাজের জন্য যথেষ্ট যোগ্য নয়। যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন কাজের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না, তারা বেকারই থেকে যায়। নতুন চাকরি পায় নতুন শ্রমিকেরা।

দ্বিতীয়ত, অনেক ছাঁটাইকৃত শ্রমিক চাকরি পেলেও পুরোনো চাকরির সমপর্যায়ের চাকরি পায় না। যেসব চাকরি পায় সেখানে মজুরি কম। কাজেই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের আয় কমে যায়।

তৃতীয়ত, শ্রমিকদের অন্যায় ও অত্যাচার রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। শিল্পে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ফলে শ্রমিক ইউনিয়নগুলির সদস্যসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। শ্রমিকেরা চাকরি হারানোর ভয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে উৎসাহী নয়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ৩৫ শতাংশ ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য ছিল। ১৯৯৫ সালে এই হার মাত্র ১১ শতাংশে নেমে এসেছে (রবার্ট কুটনার, ১৯৯৭, ৯৯-১০০)। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১১ সালে এই হার ১১.৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। সারা পশ্চিমা জগতেই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন দুর্বল হয়ে আসছে (অ্যান্টনি গিডেন্স, ১৯৯৩, ৩১৫)। বেকারত্বের উচ্চহার, স্ব-কর্মসংস্থানের দ্রুত প্রসার, অতীতে যেসব শিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের প্রাধান্য ছিল সেসব শিল্পের অবক্ষয় (যেমন বাংলাদেশের পাটশিল্প), দ্রুত কারিগরি পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও ট্রেড ইউনিয়নের দাপট কমে গেছে। তাই শ্রমিক সংগঠনগুলির তাদের কাছে অনভিপ্রেত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে গেছে।

বিশ্বায়নের দ্বিতীয় সমস্যা হলো নতুন নতুন ঝুঁকির ছোঁয়াচে প্রভাব বা contagion effect। পুঁজিবাদী অর্থনীতি একটি অস্থিতিশীল ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় প্রায়ই অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। প্রাক-বিশ্বায়ন যুগে এক দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার আগে সব ক্ষেত্রে না হলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে রাষ্ট্রের অনেক বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের ওপর বিধিনিষেধের উল্লেখ করা যেতে পারে। পুঁজি খাতে মুদ্রা অবাধে বিনিময়যোগ্য (freely convertible) করার আগে কেউ ভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করলে পূর্ব অনুমতি ছাড়া সে দেশ থেকে পুঁজি প্রত্যাহার করতে পারত না। কিন্তু মুদ্রাকে অবাধ বিনিময়যোগ্য করার ফলে কোনো দেশে অর্থনীতিতে অভিঘাত দেখা দিলে সে দেশ থেকে তাৎক্ষণিক পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হয়। এর ফলে অভিঘাতের প্রভাব অনেক ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের প্রভাব শুধু এক দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৯৭-৯৮ সালে পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের ঘটনা স্মরণ করা যায়। ১৯৯৭ সালে থাই মুদ্রার (বাথ) দ্রুত অবমূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারের হিড়িক পড়ে যায়। এতে স্থানীয় মুদ্রার মূল্যে ধস নামে, শেয়ারের দাম আকস্মিকভাবে কমে যায় এবং নতুন বিনিয়োগ উবে যায়। এর বছর খানেক পর রাশিয়াতে অনুরূপ সংকট দেখা দেয়। জানুয়ারি ১৯৯৯-এ একই ধরনের সংকট দেখা দেয় ব্রাজিলে। ইন্দোনেশিয়াতে মাথাপিছু আয় প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমে যায়। অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এশীয় দেশে মাথাপিছু আয় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ হ্রাস পায়। এ ধরনের সংকট পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নতুন নয়। তবে বিশ্বায়নের আগে কোনো অর্থনৈতিক অভিঘাত এত তাড়াতাড়ি এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে স্থানিক অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

বিশ্বায়নের সমর্থকেরা ও অনেক সমালোচক মনে করেন যে এ সমস্যা সাময়িক। জগদীশ ভাগবতী (২০০৪, ২০১) মনে করেন যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে অবাধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ব্যাংক-ব্যবস্থা ও বিধিবিধান গড়ে ওঠেনি। কাজেই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে এ ধরনের সমস্যার নিরসন সম্ভব। জোসেফ স্টিগলিজ (২০০২, ২২৬) বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচক। তবু তিনি মনে করেন যে অতি তাড়াতাড়ি ভুল পদ্ধতিতে বিশ্বায়ন চাপাতে গিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক শাসনপ্রণালি (governance system) পরিবর্তন করে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

অবাধ বিনিময়যোগ্য মুদ্রাব্যবস্থা সম্পর্কে ভাগবতী ও স্টিগলিজের বক্তব্য মেনে নিলেও মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে থাকবেন তত দিন অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা থাকবেই। ঝুঁকির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে risk, যার অর্থ হলো অজানা সমুদ্রে যাত্রা। দ্রুত কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন সমাজে অনেক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করছে। কাজেই সব সময়ে সব ক্ষেত্রে এসব অস্থিতিশীলতা দূর করা সম্ভব নয়। অস্থিতিশীলতা হচ্ছে পুঁজিবাদের কাঠামোগত সমস্যা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি প্রধান নিয়ন্ত্রক হচ্ছে ঝুঁকি। অ্যান্টনি গিডেন্স (১৯৯৯, ২৫) যথার্থই লিখেছেন, ‘Capitalism is actually unthinkable and unworkable without it [risk].’ (প্রকৃতপক্ষে ঝুঁকি ছাড়া পুঁজিবাদ অচিন্তনীয় ও অকার্যকর)। ঝুঁকির সমস্যা বিশ্বায়নের আগেও ছিল। কিন্তু বিশ্বায়নের সঙ্গে এতে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এত দিন ঝুঁকি ছিল প্রধানত প্রাকৃতিক। ঝড়, ঝঞ্ঝা, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, মহামারি, মন্বন্তর সবই প্রাকৃতিক কারণে ঘটত। বিশ্বায়নের যুগে ঝুঁকি শুধু প্রকৃতিই সৃষ্টি করছে না। মানুষ নিজেও ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। অধ্যাপক গিডেন্স এ ধরনের ঝুঁকির নাম দিয়েছেন ‘manufactured risk বা বানানো ঝুঁকি। বানানো ঝুঁকি মনুষ্যসৃষ্ট। মানুষ এমন ধরনের কারিগরি পরিবর্তন ঘটাচ্ছে যার প্রভাব কী ঘটবে আমরা জানি না। যে পণ্য বা সেবা এখনো সৃষ্টি হয়নি তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য গড়ে উঠছে ভবিষ্যৎ বাজার (future market)। এ ধরনের ঝুঁকিই বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় প্রাধান্য লাভ করছে। বানানো ঝুঁকি হচ্ছে নতুন। পুরোনো ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পুরোনো ঝুঁকি সম্পর্কে সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন। কিন্তু নতুন ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত। তাই বানানো ঝুঁকির সংখ্যা যত বাড়বে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাও তত বেড়ে যাবে।

তৃতীয়ত, বিশ্বায়নের বাহন হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলি (Multinational/ Transnational Corporations)। ১৯০০ সালে বহুজাতিক কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৭ হাজার। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে মূল প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮২ হাজার আর ৮ লাখ ৮ হাজার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে তাদের সহযোগী। বিশ্বের মোট জাতীয় উৎপাদের এক-চতুর্থাংশ বাজারজাত করে বহুজাতিক কোম্পানিরা। বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির মোট বিক্রির পরিমাণ বিশ্বের অনেক দেশের মোট জাতীয় উৎপাদের অনেক বেশি (সারণি ৮.৭)।

সারণি ৮.৭
২০০৯ সালে বিশ্বের বৃহত্তম ১০টি বহুজাতিক কোম্পানির মোট বিক্রয়ের সঙ্গে নির্বাচিত দেশগুলির মোট জাতীয় উৎপাদের তুলনা

বহুজাতিক কোম্পানিমোটর বিক্রিয়ের পরিমাণ
(বিলিয়ন ডলারে)
নির্বাচিত রাষ্ট্র মোট জাতীয় উৎপাদের পরিমাণ
(বিলিয়ন ডলারে)
ওয়াল মার্ট ৪১৩বাংলাদেশ ৮৯
এক্সন মোবিল ৩১০মালদ্বীপ
রয়াল ডাচ শেল ২৭৮ভুটান
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ২৪৬কুয়েত ১৪৮
সৌদি আরাম-কো ২১৬নিউজিল্যান্ড ১২৬
টয়োটা ২০৬নেপাল ১২
স্যামসুং ১৭৮আফগানিস্তান ১৪
শেভরন ১৭১ভিয়েতনাম ৯৭
সাইনপোক ১৬৫পাকিস্তান ১৬১
আইএনজি ১৬৫শ্রীলঙ্কা ৪২
উৎস : বহুজাতিক কোম্পানির উপাত্ত Wikipedia থেকে এবং জাতীয় উৎপাদের উপাত্ত বিশ্বব্যাংক (২০১১) থেকে সংগৃহীত।

২০০৯ সালে বিশ্বের বৃহত্তম ১০টি বহুজাতিক কোম্পানির মোট বিক্রয়ের সঙ্গে নির্বাচিত দেশগুলির মোট জাতীয় উৎপাদের তুলনা

সারণি ৮.৭ থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯ সালে ভারত ছাড়া বাকি ছয়টি দেশের মোট জাতীয় উৎপাদের পরিমাণ ছিল ৩০৭ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ওয়াল মার্টের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৪১৩ বিলিয়ন ডলার আর এক্সন মোবিল বিক্রয় করে ৩১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিশ্বের দশম বহুজাতিক কোম্পানি আইএনজির বার্ষিক বিক্রয়ের পরিমাণ হলো প্রায় ১৬৫ বিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে মোট জাতীয় উৎপাদের পরিমাণ এর চেয়ে কম। উপসাহারা আফ্রিকার সব দেশের সম্মিলিত মোট জাতীয় উৎপাদ ওয়াল মার্টের মোট বিক্রয়ের চেয়ে কম। কাজেই যেকোনো বড় বহুজাতিক কোম্পানি, যেসব দেশে তারা ব্যবসায় করে, তাদের চেয়ে আর্থিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। এর ফলে এরা অনেক সময় সার্বভৌম রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। তাদের পছন্দ না হলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। ইরান ও মিসর থেকে ল্যাটিন আমেরিকা পর্যন্ত সর্বত্র তারা সরকার উচ্ছেদের পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছে। উপরন্তু তারা পৃথিবীর অনেক দেশে পরিবেশদূষণের দায়ে অভিযুক্ত। কিন্তু তারা এতই শক্তিমান যে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃত্বকে অগ্রাহ্য করতে দ্বিধা বোধ করে না। যেমন, ভোপালের রাসায়নিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন কারবাইড ভারতীয় আদালতে তাদের প্রধান নির্বাহীর বিচার করতে দেয়নি। বাংলাদেশে নাইকো নামক বহুজাতিক কোম্পানি মাগুরছড়ায় বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে । কোনো কোনো বহুজাতিক কোম্পানি উন্নত দেশে নিষিদ্ধ ওষুধ ও কীটনাশক উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিক্রয় করছে। এ ধরনের পুঁজিকে ভাগবতী নাম দিয়েছেন Gung-ho capitalism বা ষণ্ডমার্কা পুঁজিবাদ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলির এসব গর্হিত আচরণ সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। মনে করা হয়, বহুজাতিক কোম্পানিদের বিনিয়োগ কর্ম সৃষ্টিতে ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়ক হয়। সামগ্রিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলি বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ হিসেবেই গণ্য করে।