Tag: আসাদ বিন হাফিজ

  • গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    ‘গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র প্রথম উপন্যাস। এটি লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের মে মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় অক্টোবর ১৯৯৭ সালে এবং তৃতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের বইমেলায়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    উপন্যাসটি রচিত হয়েছে টানা, প্রায় এক হাজার অনুচ্ছেদে। অনলাইনে একসাথে এত দীর্ঘ লেখা পড়ে পাঠক ক্লান্তিবোধ করবেন, তাই আমরা বইটিকে কয়েকটি অনুচ্ছদে বিভক্ত করে প্রকাশ করেছি। অবশ্যই লক্ষ্য রাখা হয়েছে যাতে কোন পরিচ্ছেদে কাহিনী বর্ণনার ছেদ না পড়ে।

    গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান

    জাদুল আসাদির তাঁবুতে বিশ্রাম নিচ্ছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। শিরস্ত্রাণ খোলেননি। তাঁবুর বাইরে সশস্ত্র দেহরক্ষীরা পাহারা দিচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য রক্ষীবাহিনীর কমাণ্ডার একটু অন্যদিকে গেলেন। একজন গার্ড পর্দা ঈষৎ ফাঁক করে উঁকি দিল তাবুর ভেতর। দু’চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন সুলতান। গার্ড বাইরে দাঁড়ানো চারজন সঙ্গীর দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ করে খুলল একবার। সে চারজন দেহরক্ষী অন্যদের সাথে গল্প জুড়ে দিল।

    তাঁবুতে ঢুকল প্রথম রক্ষী। খঞ্জর হাতে নিল। বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে গেল ঘুমন্ত সুলতানের দিকে। খঞ্জর বাগিয়ে ধরে হাত উপরে তুলল। সালাহুদ্দীনের বুক লক্ষ্য করে যখন নেমে আসছিল হাত, ঠিক সে মুহূর্তে পাশ ফিরলেন তিনি। রক্ষীর আঘাত গিয়ে পড়ল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর শিরস্ত্রাণে।

    বিদ্যুৎ গতিতে দাঁড়িয়ে গেলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। নিমিষেই ঘটনা আঁচ করে নিলেন। নিজের বাছাই করা দেহরক্ষী আক্রমণ করছে দেখেও হতবাক হলেন না।

    রক্ষী শিরস্ত্রাণের পাশ কেটে মাটিতে গেঁথে যাওয়া খঞ্জর টেনে তুলছিল। পলকে পূর্ণ শক্তিতে রক্ষীর মুখে ঘুসি মারলেন সালাহুদ্দীন। মট করে হাড় ভাঙ্গার শব্দ হল। বিকট শব্দ করে চিৎ হয়ে পরে গেল রক্ষী।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবী রক্ষীর হাত থেকে ছিটকে পড়া খঞ্জর নিজের হাতে তুলে নিলেন। চিৎকার শুনে বাইরে থেকে ছুটে এল দু’জন রক্ষী।

    ‘ওকে বেঁধে ফেল।’ নির্দেশ দিলেন সুলতান।

    কিন্তু ওরা সুলতানের আদেশ অমান্য করে উল্টো তাঁকেই আক্রমণ করে বসল। একা খঞ্জর দিয়ে দুই রক্ষীর তলোয়ারের মোকাবেলা করতে লাগলেন সালাহুদ্দীন। তাঁবুর ভেতর শুরু হলো অসম এক লোমহর্ষক লড়াই।

    দু’এক মিনিটের মধ্যেই অন্য গার্ডরাও ভেতরে প্রবেশ করল। অবাক বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তারা তাকিয়ে রইল সালাহুদ্দীন ও রক্ষীদের অসম লড়াইয়ের দিকে। সম্বিত ফিরে এলে একজন এগিয়ে এসে আঘাত করল রক্ষীদের। দেখাদেখি অন্য রক্ষীরাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবার রক্ষীরা দুই দল হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করল। আপন পর পার্থক্য করতে না পেরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী।

    সংঘর্ষ থেমে গেল। দু’জন নিহত হল এই সংঘর্ষে। আহত হল কয়েকজন, পালিয়ে গেল একজন। তদন্ত শেষে দেখা গেল দেহরক্ষীদের সাতজন ছিল ঘাতক দলের সদস্য। গুমাস্তিগীন নামে খলিফা সালেহের এক কেল্লাধিপতি সালাহুদ্দীনকে হত্যার জন্য এদের নিয়োগ করেছিল।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে হত্যা করার এ ধরনের কয়েকটি প্রচেষ্টা পরপর ব্যর্থ হল। এ হত্যা পরিকল্পনার হোতা ছিল সাইফুদ্দীন। সাইফুদ্দীন ছিল সালাহুদ্দীনের চাচাতো ভাই খলিফা আস-সালেহের একজন আমীর। যে সময়ের কথা বলছি, তখন মুসলিম বিশ্বের প্রধান হলেও কার্যত ইসলামী দুনিয়া ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত। বিভিন্ন প্রদেশের গভর্ণরগণ সুলতান উপাধি ধারণ করে বলতে গেলে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। এ ঘটনার পর একদিন ভোরে সাইফুদ্দীনকে লক্ষ্য করে একটি চিঠি পাঠালেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। তাতে তিনি লিখলেন, “খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জানো না সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা।’

    চিঠিটি লিখেছিলেন তিনি ১১৭৫ সালের এপ্রিল মাসে। খলিফা সালেহ এবং সাইফুদ্দীন খৃষ্টানদের সহযোগিতায় সালাহুদ্দীনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। পরাজিত হয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেল সাইফুদ্দীন। তার তাঁবুতে পাওয়া গেল অগণিত সম্পদ। পাওয়া গেল খাঁচায় বন্ধী রঙবেরঙের পাখি, এক ঝাঁক সুন্দরী তরুণী, নর্তকী, গায়িকা। বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্র আর পিপা ভর্তি মদ।

    সালাহুদ্দীন খাঁচায় দুয়ার খুলে দিলেন, পাখীরা উড়ে গেল উন্মুক্ত আকাশে। নর্তকী, গাায়িকা আর তরুণীদের মুক্ত করে দিলেন। চিঠি লিখলেন আমীর সাইফুদ্দীনের কাছে, ‘তোমরা বেঈমানী করে খৃষ্টানদের সহযোগিতায় আমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছ। একবারও কি ভেবেছ, তোমাদের এ ষড়যন্ত্র ইসলামী বিশ্বের মানচিত্র মুছে দিতে পারে? যদি আমাকেই ঈর্ষা কর, যদি আমিই তোমাদের শত্রু হয়ে থাকি, মেরে ফেল আমায়। দু’বার সে চেষ্টাও করেছ। সফল হওনি, আবার না হয় চেষ্টা করে দেখ। এবার সফল হলে হতেও পার।

    ‘যদি নিশ্চয়তা দিতে পারো, আমাকে হত্যা করলে ইসলাম আরো গৌরবোজ্জ্বল হবে, তবে আমার মাথা কেটে তোমাদের পায়ের কাছে রেখে দিতে বলব। মনে রেখো, অমুসলিম কখনো মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না। ইতিহাস এর সাক্ষী। ফ্রান্স সম্রাট এবং রিমাণ্ডের মতো খৃষ্টানকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সহযোগিতা করছ বলে তোমরা ওদের বন্ধু। ওরা সফল হলে ওদের প্রথম শিকার হবে তোমরাই। এরপর পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের নামও মুছে যাবে।

    ‘তোমরা যোদ্ধা জাতির সন্তান। সৈন্য হওয়া তোমাদের জাতীয় পেশা। প্রতিটি মুসলমানই আল্লাহর সৈনিক। তার জন্য শর্ত কেবল ঈমান ও সৎকাজ। খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জানো না সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা। অনুরোধ করি, আমার সাথে সহযোগিতা কর। জিহাদে শরীক হও,  না হলে কমপক্ষে বিরোধীতা কোরো না। আমি তোমাদের কোন শাস্তি দেব না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।’

    —সালাহুদ্দীন আইয়ূবী।

    এ সব যুদ্ধের ফলে অজস্র যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে এসেছিল। বন্দীর সংখ্যা ছিল অগণিত। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে তিন ভাগে ভাগ করলেন। এক ভাগ যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে তাদের মুক্ত করে দিলেন। এক ভাগ দিলেন সৈন্য এবং গরীবদের। তৃতীয় ভাগ পাঠিয়ে দিলেন নিজামুল মুল্‌ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই তিনি শিক্ষা লাভ করেছিলেন। নিজের জন্য এবং জেনারেলদের জন্য কিছুই রাখেননি। বন্দীদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। কিছু অমুসলিমও ছিল, সালাহুদ্দীনের মহানুভবতায় ওরা তার আনুগত্য গ্রহণ করে সোবাহিনীতে ভর্তি হয়ে গেল।

    ইবনে সাবার ফেদাই গ্রুপ দু’বার সালাহুদ্দীনকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করেছিল। ফেদাইদেরকে ঐতিহাসিকগণ  ঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দু’-দু’বারই তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। তৃতীয় আক্রমণ হল খৃষ্টান এবং সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করার পর। সাইফুদ্দীন পালিয়ে গুপ্তঘাতক দলের সাহায্য কামনা করল।

    সালাহুদ্দীনের প্রায় একশো বছর আগে হাসান ইবনে সাবা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন উপদলের জন্ম দিয়েছিল। নিজেদের পরিচয় দিত মুসলমান হিসেবে। কিছু অলৌকিক কাজ দেখিয়ে মানুষকে অনুসারী বানাতো। সুন্দরী তরুণী, মদ, হিপটোনিজম এবং চাটুকারিতা ছিল ওদের পুঁজি। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ছিল বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ঘাতক দল। ওরা মানুষকে হত্যা করত গোপনে।

    এরা ছিল সতর্ক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং দুঃসাহসী। এরা পোশাক আশাক এবং ভাষা পরিবর্তন করে বড় বড় জেনারেলের দেহরক্ষীর চাকরী নিত। সময় সুযোগ বুঝে এমন ভাবে সারতো হত্যার কাজ, নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীকে কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যেত না। ধীরে ধীরে ইবনে সাবার দল ঘাতকদল হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে ওরা ছিল পারদর্শী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হত্যার কাজে ব্যবহার করত বিষ। সুন্দরী যুবতীরা মদের সাথে এ বিষ মিশিয়ে দিত।

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে রূপসী নারী দিয়ে বা মদ খাইয়ে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। তিনি এ দুটো থেকেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেন সতর্কভাবে। ফলে আকস্মিক আক্রমণ ছাড়া তাঁকে হত্যা করার অন্য কোন পথ ছিল না। কিন্তু বিশ্বস্ত ও নিবেদিত প্রাণ দেহরক্ষীদের উপস্থিতিতে তাও ছিল অসম্ভব। সালাহুদ্দীন ভেবেছিলেন পরাজয়ের পর সালেহ এবং সাইফুদ্দীন আর মাথা তুলে দাঁড়াবে না। সম্মিলিত বাহিনীর অহমিকা চুর্ণ হবার পর সালাহুদ্দীনের সাথে টক্কর দেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সংশোধন হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল ওরা।

    বিজয়ের পর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তাঁর অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখলেন। দখল করলেন গাজাসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী— দুঃসাহসী এক যোদ্ধা, অসাধারণ এক সেনাপতি। ইসলামের শত্রুরা আজও তাকে সম্বোধন করে ‘গ্রেট সালাদীন’ বলে, মুসলমানরা স্মরণ করে জাতীয় বীর হিসাবে।

    মুসলিম মিল্লাতের ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লেখা রয়েছে তাঁর নাম। খৃষ্টান জগৎ তাঁর সাহস, বুদ্ধিমত্তা আর রণকৌশলের কথা কোনদিন ভুলতে পারবে না। ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে তাঁর জয় পরাজয়ের বিস্ময়কর কাহিনী। কিন্তু ক্রুশের ধ্বজাধারীরা মদ আর রূপের মায়াজালে যে ষড়যন্ত্রের বিস্তার ঘটিয়েছিল, নিজেদের সে সব অপকর্মের চমকপ্রদ কাহিনী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি।

    ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। মিসরের গভর্ণর এবং সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলেন সালাহুদ্দীন। তিনি ছিলেন রাজপরিবারের সন্তান। অল্প বয়সেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মনে করতেন শাসক রাজা নয়, শাসক হলো ইসলামের রক্ষক। বুদ্ধি হওয়ার পর তিনি দেখেছিলেন মুসলিম শাসকদের অনৈক্য। বিলাসপ্রিয় শাসকবর্গ সুন্দরী রমণী আর মদে আকণ্ঠ ডুবেছিল। গাদ্দারী, বিলাসিতা আর অবিশ্বাসের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যৎ।

    রাষ্ট্রের কর্ণধারদের হারেমের শোভা বর্ধন করছিল ইহুদী আর খৃষ্টান যুবতীরা। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব সুন্দরী রমনীদের রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল মানুষের ইসলামী জোশ আর স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বার আবেগ অনুভূতি।

    এ সুযোগে খৃষ্টান শাসকগণ একের পর এক ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো দখল করে নিচ্ছিল। মুসলিম শাসকবর্গ প্রজার রক্ত শুষে খৃষ্টানদেরকে বাৎসরিক কর প্রদান করত। ওদের সেনা শক্তির ভয়ে সর্বক্ষণ তটস্ত হয়ে থাকত। খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে ভোগবিলাসের হারেমে বন্দী রেখে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব দখলের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছিল।

    সালাহুদ্দীন শিক্ষা লাভ করেছিলেন নিজাম-উল-মুলক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে শিক্ষার্থীদেরকে খালেছ ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলার ব্যবস্থা ছিল। আর সে জন্যই ঘাতকদলের প্রথম শিকার ছিলেন নিজাম-উল-মুলক। রোমানদের রাজ্যবিস্তারে তিনি ছিলেন বড় বাঁধা। এ বাঁধা দূর করার জন্য তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

    সালাহুদ্দীন এখানেই সেনা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। প্রশাসনিক কাজে তাঁকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন নুরুদ্দীন জঙ্গী। মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার সকল গুণাবলী এখানেই অর্জন করেছিলেন তিনি। সালাহুদ্দীন আইয়ূবী গোয়েন্দা বৃত্তি, কমাণ্ডো অভিযান এবং গেরিলা অপারেশনকে সবচে’ বেশী গুরুত্ব দিতেন। তিনি দেখেছিলেন গুপ্তচর বৃত্তিতে খৃষ্টান জগৎ অনেক অগ্রসর। মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা আর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। সালাহুদ্দীন অত্যন্ত ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে এর মোকাবিলা করেছিলেন।

    তিনি মিসরের গভর্ণর ও সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলে শুরু হল ষড়যন্ত্র। বড় বড় জেনারেলরা এ পদের জন্য ছিল লালায়িত। তাঁরা যখন দেখল তাঁদের আশায় গুড়ে বালি, তখন ক্ষুব্ধ জেনারেলগণ ষড়যন্ত্র শুরু করল তাঁর বিরুদ্ধে।

    ওদের ধারণায় সালাহুদ্দীন একজন বালকমাত্র। এ পদের যোগ্যতা তাঁর মধ্যে নেই। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে জেনারেলদের সে ধারণা ভেঙে গেল। সালাহুদ্দীন কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। সৈন্যদের জন্য ভোগবিলাস এবং মদ নিষিদ্ধ করলেন। মনোনিবেশ করলেন ওদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে। ফলে অল্প দিনেই সেনাবাহিনী সুশৃংখল ও সুসংগঠিত হয়ে উঠল। অল্পবয়স্ক অর্বাচীন বালক বলে তাঁকে যারা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখছিল, টনক নড়ে উঠল তাদের।

    সালাহুদ্দীন খৃষ্টান শক্তির মোকাবিলার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। মুক্ত ফিলিস্তিনে শ্বাস নেয়ার দুর্মর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনীকে সে ভাবে গড়ে তুলতে লাগলেন তিনি। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘যে খোদা আমাকে মিসরের গভর্ণর করেছেন, অবশ্যই তিনি ফিলিস্তিনও মুক্ত করবেন।’ তাঁর এ ঘোষণার জন্য কেবল খৃষ্টানই নয়, খৃষ্টানপন্থী মুসলমান আমীর ওমরারাও তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়াল। বাইরের শত্রুর চাইতে ঘরের শত্রুরা হয়ে উঠল তাঁর জন্য অধিকতর বিপজ্জনক।

    নতুন গভর্ণরের অভ্যর্থনার আয়োজন করা হল। আয়োজন করলেন জেনারেল নাজি। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক তিনি। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী ছাড়াও বেসামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত। মুচকি হেসে একে একে সকলের সাথে করমর্দন করলেন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। কণ্ঠে স্নেহ-ভালবাসার উষ্ণ পরশ। কোন কোন অফিসারের ঠোঁটে কুটিল হাসি। দৃষ্টিতে ঘৃণা আর উপহাস। ওদের ধারণা, নুরুদ্দীন জঙ্গীর সাথে সুসম্পর্ক এবং রাজপরিবারের সন্তান বলেই সালাহুদ্দীন গভর্ণর হতে পেরেছেন। এক প্রবীণ অফিসার আরেকজনের কানে কানে বলল, ‘এখনো শিশু, আমরা পেলে পুষে নেব।’

    অনুষ্ঠানে তাঁকে শিশুই মনে হচ্ছিল। জেনারেল নাজির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন সালাহুদ্দীন। কপাল কুঞ্চিত হল ঈষৎ। করমর্দনের জন্য হাত প্রসারিত করলেন। নাজি তোষামুদে দরবারীদের মত সালাহুদ্দীনকে কুর্নিশ করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমো খেয়ে বললেন, ‘আপনার জীবন রক্ষার্থে আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও বিলিয়ে দেব। আপনি আমাদের কাছে মাননীয় জঙ্গীর আমানত।’

    ‘ইসলামের চাইতে আমার জীবনের দাম বেশী নয় সম্মানিত জেনারেল।’ সালাহুদ্দীন বললেন, ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্ত সংরক্ষণ করে রাখুন। খৃষ্টান ষড়যন্ত্রের ঘণঘটা মুসলিম বিশ্বের আকাশে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।’

    জবাবে মৃদু হাসলেন নাজি। যেন তাঁকে রূপ কথার গল্প শোননো হচ্ছে। নাজি ছিল ফাতেমী খেলাফতের সিপাহসালার। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক। সৈন্যদের সবাই ছিল সুদানের অধিবাসী। তাঁর বাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত। বলতে গেলে এরা ছিল নাজির ব্যক্তিগত সৈন্য। নাজি ছিল মুকুটহীন সম্রাট।

    তখন মুসলিম দেশগুলোর কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করছিল খৃষ্টান জগৎ। মিসর এবং আশপাশের শাসকদের জন্য নাজি ছিল এক ত্রাস। তাঁর মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রভূমি। ভেড়া দেখলে নেকড়ের যেমন দাঁত বেরিয়ে আসে, সালাহুদ্দীনকে দেখে নাজিরও তেমনি দাঁত বেরিয়ে এসেছিল। সালাহুদ্দীন তাঁর এ ক্রুর হাসির মর্ম না বুঝলেও এটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, এ শক্তিধর জেনারেলকে তাঁর প্রয়োজন।

    ‘হুজুর অনেক দূর থেকে এসেছেন। খানিক বিশ্রাম করে নিন।’ নাজি বলল।

    ‘যে কঠিন দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে, আমি তার যোগ্য নই। এ দায়িত্বভার আমার বিশ্রাম এবং নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে। প্রথমে অফিসে গেলেই কি ভাল হয় না?’

    ‘হুজুর কি আগে খেয়ে নেবেন?’ বলল একজন অফিসার।

    একটু ভেবে ওদের সাথে হাঁটা দিলেন সালাহুদ্দীন। দু’সারিতে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র গার্ডবাহিনী। ওদের হাতের অস্ত্র এবং পেশীবহুল বলিষ্ঠ দেহ দেখে তাঁর চেহারায় হেসে উঠল আনন্দের দ্যুতি। দরজার কাছে পৌঁছতেই চেহারায় এ আলো হঠাৎ নিভে গেল। তার বদলে হতাশার আঁধার এসে গ্রাস করল তাঁকে।

    দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন রূপসী তরুণী। তাদের পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে রেশম কোমল চুল। পরনে পাতলা পোশাক। হাতে ফুলের ঝুড়ি। সালাহুদ্দীনের পথে ওরা ফুল ছুঁড়তে লাগল। সাথে সাথে বেজে উঠল দফ ও রবাবের সুর ঝঙ্কার।

    থমকে দাঁড়ালেন সালাহুদ্দীন। ডানে বাঁয়ে নাজি এবং তাঁর সহকারীরা। ভারতীয় রাজরাজড়াদের মত ওরা নুয়ে তাঁকে সামনে চলার জন্য অনুরোধ করল।

    ‘সালাহুদ্দীন ফুল মাড়ানোর জন্য আসেনি।’ গমগম করে উঠল সালাহুদ্দীনের কণ্ঠ। ঠোঁটে শ্লেষের হাসি। যে হাসি দেখতে ওরা অভ্যস্ত নয়।

    ‘হুজুর চাইলে আমরা আকাশের তারা এনে দিতে পারি’ নাজি বলল।

    ‘আমাকে খুশী করতে হলে একটা জিনিসই আমার পথে ছড়ানো যেতে পারে।’

    ‘আদেশ করুন।’ মুখ খুলল নাজি’র সহকারী, ‘কোন জিনিস আপনাকে তুষ্ট করতে পারবে।’

    ‘খৃষ্টানদের লাশ।’ মৃদু হেসে বললেন সালাহুদ্দীন।

    ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল অফিসারের।

    মুহূর্তে বদলে গেল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর চেহারা। দু’ চোখ থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল আগুনের হল্‌কা। বললেন, ‘মুসলমানদের জীবন ফুলশয্যা নয়। আপনারা কি জানেন না খৃষ্টানরা মুসলিম বিশ্বকে ইঁদুরের মত কেটে টুকরো টুকরো করে চলছে?’

    তাঁর গম্ভীর কণ্ঠের ধ্বনি বদলে দিল ঘরের পরিবেশ। প্রতিটি শব্দ থেকে বিস্ফোরিত হচ্ছিল প্রচণ্ড ক্রোধ। ‘আমাদের মেয়েদের উলঙ্গ করে ওদের ইজ্জত পদদলিত করেছি বলেই আজ আমরা ফুল মাড়াতে পারছি। শুনুন, আমার দৃষ্টি আটকে আছে ফিলিস্তিনে। আপনারা কি আমার পথে ফুল বিছিয়ে মিশর থেকে ইসলামকে বিদায় করতে চাইছেন?’

    তিনি চারদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমার পথ থেকে ফুল সরিয়ে নাও। এ ফুলে পা পড়লে আমার হৃদয় কাঁটার ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। সরিয়ে দাও মেয়েদের। আমি চাই না ওদের সোনালী চুলে জড়িয়ে গিয়ে আমার তরবারী গতি হারিয়ে ফেলুক।’

    ‘হুজুরের ইজ্জত সম্মান……।’

    ‘আমাকে আর কখনো হুজুর বলবে না।’ ঝাঁঝের সাথে বললেন তিনি। মনে হল শব্দের তীব্র আঘাতে ওদের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেয়া হয়েছে। ‘তোমরা যার কালেমা পড়েছ হুজুর তো তিনি। আমি তাঁর দাসানুদাস মাত্র। সে হুজুরের জন্য আমার জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে চাই। তাঁর পয়গাম আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি। খৃষ্টান জগৎ ওই পয়গাম ছিনিয়ে নিয়ে রোম উপসাগরে ডুবিয়ে দিতে চাইছে। ডুবিয়ে দিতে চাইছে মদের দরিয়ায়। আমি বাদশা হয়ে এখানে আসিনি।’

    নাজির চোখের ইশারায় মেয়েরা ফুল কুড়িয়ে দরজা থেকে সরে গেল। দ্রুতপায়ে ভেতরে ঢুকলেন সালাহুদ্দীন। প্রশস্ত কক্ষ। ফুল দিয়ে সাজানো বিশাল টেবিল। টেবিলে নানা রকম সুস্বাদু খাবার।

    খাবারে দৃষ্টি বুলিয়ে তিনি তাকালেন সহকারী সালারের দিকে।

    ‘মিসরের সব মানুষ কি এমন খাবার খেতে পারে?’

    ‘না হুজুর’। সহকারীর জবাব, ‘গরীবরা তো এসব খাবার স্বপ্নেও দেখে না।’

    ‘তোমরা কোন্ সমাজের লোক? যারা এমন খাবার স্বপ্নেও দেখে না ওরা কি তোমাদের চেয়ে ভিন্ন জাতি?’

    সকলেই নির্বাক।

    ‘এখানে যত চাকর-বাকর এবং ডিউটিরত সেপাই রয়েছে সবাইকে ডেকে নিয়ে এসো। এ খাবার ওরা খাবে।’

    সালাহুদ্দীন আইয়ূবী একটা রুটির সাথে ক’টুকরা তরকারী তুলে তড়িঘড়ি খাওয়া শেষ করলেন। এরপর নাজিকে সাথে নিয়ে হাঁটা দিলেন গভর্ণর হাউসের দিকে।

    দু’ঘন্টা পর। গভর্ণর হাউস থেকে বেরিয়ে এল নাজি। দ্রুত এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। এক লাফে ঘোড়ায় চড়ে দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল।

    রাত নেমেছে। নাজি খাস কামরায় কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুকে নিয়ে মদের আসর বসিয়েছে। নাজি বলল, ‘যৌবনের তেজ কয়েক দিনের মধ্যেই ঠাণ্ডা করে দেব। কমবখ্‌ৎ বলল কি জান? বলল, কাবার প্রভুর শপথ! মুসলিম বিশ্ব থেকে খৃষ্টানদের বিতাড়িত করে তবে আমি বিশ্রাম নেব।’

    ‘সালাহুদ্দীন আইয়ূবী? হুহ্!’ সহকারী সালারের কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর। ‘ইসলামী রাষ্ট্রের দম ফুরিয়ে গেছে সে এ খবরও জানে না। এখন তো সুদানীরা দেশ চালাবে।’

    অন্য এক কমাণ্ডার প্রশ্ন করল, ‘পঞ্চাশ হাজার ফৌজের সবাই সুদানী একথা তাঁকে বলেননি। বলেননি যে ওরা আপনার নির্দেশে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না?’

    ‘তোমার কি মাথা খারাপ এডরোস? আমি বরং তাঁকে নিশ্চয়তা দিয়েছি। বলেছি আপনারা ইশারা পেলে আমার সৈন্যরা খৃষ্টানদের ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু…’

    থেমে গেল নাজি।

    ‘কিন্তু কি?’

    ‘মিসরের লোকদেরকে ফৌজে ভর্তি করার জন্য সে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ ফৌজ এক এলাকার থাকা নাকি উচিৎ নয়। সে মিসরের লোকদেরকে আমার সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে।’

    ‘আপনি কি বললেন?’

    ‘বলেছি আপনার নির্দেশ পালন করা হবে। কিন্তু আমি তা করব না।’

    ‘তার মনমানসিকতা কেমন বুঝলেন?’

    ‘একরোখা জেদী।’

    ‘আপনার বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার সামনে সে এখনো শিশু। নতুন গভর্ণর হয়ে এলো তো! কদিন পরই পদের নেশায় পেয়ে বসবে।’

    ‘আমি তাঁর এ নেশা দূর করবো না। নেশায় নেশায় তাকে নিঃশেষ করব।’

    ওরা অনেকক্ষণ ধরে সালাহুদ্দীনকে নিয়ে কথা বলল। নতুন গভর্ণর এই মুকুটহীন সম্রাটের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে কি পদক্ষেপ নেয় হবে তাও আলোচিত হল।

    অন্যদিকে সালাহুদ্দীন তাঁর সহকারীদের বলছিলেন, ‘আমি এখানে রাজা হয়ে আসিনি। কাউকে রাজত্ব করতেও দেবো না।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমাদের সামরিক শক্তির প্রয়োজন। এখানকার সেনাবাহিনীর গঠন পদ্ধতি আমার পছন্দ নয়। পঞ্চাশ হাজর ফৌজের সবাই সুদানী। অথচ সব এলাকার লোকেরই সৈন্য হবার অধিকার আছে। এভাবে ওদের জীবনের মানও উন্নত হতে পারে। সব এলাকা থেকে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার জন্য আমি নাজিকে বলে দিয়েছি।’

    ‘নাজি কি আপনার নির্দেশ পালন করবে?’ একজন সহকারী প্রশ্ন করল।

    ‘কেন, সে কি আমার হুকুম অমান্য করবে নাকি?’

    ‘করতেও পারে। ফৌজের সর্বময় কর্তা তিনি। তিনি কারো নির্দেশ পালন করেন না, বরং অন্যকে তাঁর নির্দেশ পালনে বাধ্য করেন।’

    এ কথায় সালাহুদ্দীন একটু নীরব রইলেন। তবে তাঁর চেহারায় কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। তিনি কি ভাবছেন তা বুঝে উঠার আগেই আলী বিন সুফিয়ানকে রেখে অন্যদের বিদায় জানালেন তিনি।

    আলী মধ্য বয়সী এক চৌকস গোয়েন্দা লিডার। কুশলী, সাহসী এবং অসম্ভব বাকপটু। গুপ্তচর বৃত্তির জন্য সে বিশ্বস্ত ও নিবেদিতপ্রাণ কিছু লোককে ট্রেনিং দিয়ে পারদর্শী করে তুলেছে। তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব গোয়েন্দা দল। আকাশ থেকে তারকা ছিনিয়ে আনতে বললেও যারা পিছপা হবে না। চিন্তা চেতনার দিক থেকে সে ছিল আইয়ূবীর সমমনা। সালাউদ্দীন তাকে বাগদাদ থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন।

    ‘শুনলে আলী! এরা বলল, কারো হুকুম পালন করতে নয়, নাজি হুকুম দিতে অভ্যস্ত!’

    ‘শুনলাম তো। চিনতে ভুল না করলে বলব, লোকটি ধুরন্ধর ও বড় ধরনের ক্রিমিনাল। তার ব্যাপারে আগে থেকেও আমি কিছুটা জানি। জনগণের টাকায় লালিত সেনাবাহিনী এখন তার নিজস্ব ফৌজ। তার ষড়যন্ত্রের ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ‘সব এলাকার লোকই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার প্রয়োজন’ আপনার এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী এবং সঠিক হয়েছে। আমার তো আশংকা হচ্ছে সুদানী সৈন্যরা প্রয়োজনের সময় আপনার হুকুম অমান্য করে তারই অনুগত্য করবে। বলা যায় না, ফৌজের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি পরিবর্তন করে নাজিকে আপনার অপসারণও করতে হতে পারে।’

    ‘না, নাজির মত প্রভাবশালী ব্যক্তিকে এখনই বিরূপ করতে চাই না। এ মুহূর্তে তাঁকে অপসারণ করা ঠিক হবে না। নিজেদের রক্ত ঝরানোর জন্য আমি অস্ত্র হাতে নেইনি, আমাদের তরবারী শত্রুর জন্য। আমি আগে ভালবাসা দিয়ে তাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করব। তুমি বর্তমান সেনাবাহিনী আমাদের কদ্দুর কাজে আসবে তা-ই বোঝার চেষ্টা কর।’

    ‘আপনার ভালবাসা তাকে শুধরাতে পারবে বলে মনে হয় না’।

    সালাহুদ্দীন যা ভেবেছিলেন নাজি ততটা সহজ ছিল না। ভালবাসা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। তার সব প্রীতি এবং মমতা ছিল ক্ষমতার সাথে। ক্ষমতার প্রশ্নে সে ছিল অত্যন্ত কঠোর। মানুষ হিসাবে ছিল অসম্ভব ধূর্ত। ষড়যন্ত্র ছিল তার হাতিয়ার। কাউকে ফাঁসাতে চাইলে তার সাথে মোমের মত কোমল ব্যবহার করত। সালাহুদ্দীনের সাথে তার ব্যবহার ছিল অনুগত দাসানুদাসের মত। তার সামনে সে কখনো বসত না। সালাহুদ্দীনের প্রতিটি কথায় জি-হুজুরীর ভূমিকা পালন করত।

    নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে মিসরের সকল অঞ্চল থেকেই সেনা ভর্তি শুরু করে দিয়েছিল। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। সালাহুদ্দীনও তাকে একটু একটু পছন্দ করা শুরু করেছেন। নাজি তাকে আশ্বাস দিয়েছিল, সেনাবাহিনী আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়। ফৌজের পক্ষ থেকে নতুন গভর্ণরকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার প্রস্তাবও দিল সে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি তার এ আমন্ত্রণ মুলতবী রাখলেন।

    রাত নেমেছে। নিজের কক্ষে দু’জন কমাণ্ডার নিয়ে মদ পান করছিল নাজি। মৃদু লয়ে বাজছে সংগীতের সুর মুর্ছনা। তালে তালে নাচছে দু’জন নর্তকী। পায়ে নুপুর নেই। বে আব্রু দেহের ভাঁজে ভাঁজে মাদকতা। প্রহরী ভেতরে এসে নাজির কানে কানে কি যেন বলল।

    মদির আবেশে মত্ত নাজির আনন্দে বিঘ্ন ঘটাবার সাহস কারও ছিল না। কিন্তু এ আসর থেকে তাকে কোন্ সময় তুলে নেয়া যায় প্রহরী তা জানত।

    উঠে দাঁড়াল নাজি। প্রহরী তাকে একটি কক্ষে নিয়ে গেল। সুদানী পোশাক পরে একজন লোক বসে আছে। সাথে এক যুবতী।

    নাজিকে দেখে দু’জন উঠে দাঁড়াল। যুবতীর রূপ মাধুর্য দেখে নাজি খানিক হতভম্বের মত তাকিয়ে রইল। সে নারী শিকারী। শুধু ভোগের জন্যই নয়, বড় বড় অফিসারদের ব্লাকমেল অথবা তাদেরকে হাতে রাখবার জন্যও সুন্দরী যুবতীদের ব্যবহার করত নাজি। কসাই যেমন পশু দেখলে গোশত পরিমাণ করতে পারে, সেও প্রথম দেখাতেই বুঝত কাকে দিয়ে কোন কাজ করানো যাবে। নারী ব্যবসায়ীরা প্রায়শই তার কাছে মেয়ে নিয়ে আসত।

    বিক্রেতা যুবতীর ব্যাপারে বলল, ‘দারুণ স্মার্ট। নাচতে পারে, গাইতে পারে, মুখের মধুতে পাথরও গলিয়ে দিতে পারে।’

    নাজি ওর ইন্টারভিউ নিয়ে চমৎকৃত হল। ভাবল, একটু তৈরী করে নিলে যে কোন কাজেই ব্যবহার করা যাবে।

    দাম দস্তুর শেষে টাকা নিয়ে চলে গেল লোকটি। নাজি ওকে নিয়ে চলে এল জলসা ঘরে। নাচতে বলল তরুণীকে। দেহের বাড়তি কাপড় ফেলে দিয়ে দু’পাক ঘুরতেই হা হয়ে গেল তিন দর্শক। ফ্যাকাশে হয়ে গেল আগের দু’নর্তকীর চেহারা। নতুন মেয়েটার সামনে ওরা এখন মূল্যহীন বাসি ফুল।

    আসর ভেঙে দিল নাজি। নতুন মেয়েটাকে রেখে সকলকে বিদায় করে দিল।

    ‘নাম কি সুন্দরী?’

    ‘আমার নাম জুলি’।

    ‘তোমাকে যে দিয়ে গেল সে বলেছে, তুমি নাকি পাথর গলাতে পার। আমি তোমার সে যোগ্যতা যাচাই করতে চাই।’

    ‘কে সে পাথর?’

    ‘মিসরের নতুন গভর্ণর। যিনি একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কও।’

    ‘সালাহুদ্দীন আইয়ূবী?’

    ‘হ্যাঁ, যদি তাকে বশে আনতে পার তবে তার ওজন সমান সোনা তোমার পুরষ্কার।’

    ‘তিনি কি মদ পান করেন?’

    ‘না, মুসলমান শূকরকে যেমন ঘৃণা করে, সে মদ, নারী, নাচ, গান এবং ভোগবিলাসকে তেমনি ঘৃণা করে।’

    ‘শুনেছি আপনার কাছে এমন সব যুবতী রয়েছে যাদের দেহের যাদু নীল নদের স্রোতকেও রুদ্ধ করে দিতে পারে। ওরা কি ব্যর্থ?’

    ‘এখনও পরীক্ষা করে দেখিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এ কাজ করতে পারবে। সালাহুদ্দীনের বিশ্বাস এবং চরিত্র সম্পর্কে আমি তোমাকে বিস্তারিত বলব।’

    ‘তাকে কি বিষ খাওয়াতে হবে?’

    ‘এখন নয়। তার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। আমি চাই সে তোমার মত রূপসীর আঁচলে বাঁধা পড়ুক। এরপর তাকে আমার পাশে বসিয়ে মদ খাওয়াব। মারতে চাইলে তোমার প্রয়োজন নেই, ঘাতক দলকে দিয়ে সহজেই তা করানো যায়।’

    ‘তার মানে আপনি দুশমনি নয় বন্ধুত্ব চাইছেন?’

    জুকির বুদ্ধিমত্তায় নাজি কতক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

    ‘হ্যাঁ জুকি।’

    ওর রেশম কোমল চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল নাজি, ‘আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। এমন বন্ধুত্ব, যেন সে আমার কথায় উঠে এবং বসে। এর পর কি করতে হবে তা আমি জানি।’ থামল নাজি।

    একটু ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘একটা কথা তোমাকে বলা প্রয়োজন। সালাহুদ্দীনের হাতেও একটা চাল আছে। তোমার রূপ যৌবনের ওপর তার চাল বিজয়ী হলে তুমি বাঁচতে পারবে না। সালাহুদ্দীনও তোমায় বাঁচাতে পারবে না। তোমার জীবন আমার হাতে। এ জন্যই তোমার সাথে এত খোলামেলা কথা বলছি। নইলে আমার মত জেনারেল তোমার মত এক গনিকার সাথে এভাবে আলাপ করত না।’

    ‘অনাগত ভবিষ্যত বলে দেবে কে ধোঁকা দেয়। এবার বলুন তার কাছে আমি পৌঁছব কিভাবে?’

    ‘আমি তার সম্মানে এক সংবর্ধনার আয়োজন করতে যাচ্ছি। রাতে তার শয়ন কক্ষে তোমায় ঢুকিয়ে দেব।’

    ‘ঠিক আছে, এর পরের কাজ হবে আমার।’

  • সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান

    সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান

    ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবীর কমান্ডো অভিযান’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র দ্বিতীয় উপন্যাস। ‘গাজী সালাহুদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযানে’র মত এটিও লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের মে মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১২তে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    রূপের ফাঁদে

    কায়রো থেকে দু’মাইল দূরে এক বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের এক দিকে বালিয়াড়ি, ছোট ছোট পাহাড়। বাকি তিন দিকে দিগন্ত বিস্তৃত বালুর সমুদ্র।

    এ মাঠ আজ লাখ মানুষের পদভারে কম্পিত। উট, ঘোড়া আর গাধায় চড়ে এসেছে মানুষ। তবে বেশীর ভাগ এসেছে পায়ে হেঁটে। চার পাঁচ দিন থেকে জমা হচ্ছে দর্শক। ভিড়ের চাপে দলিত মথিত হচ্ছে কায়রোর বাজার। সরাইখানায় উপচে পড়া ভিড়।

    এরা এসেছে সরকারী ঘোষণা শুনে। এক হপ্তা পর অনুষ্ঠিত হবে সামরিক মহড়া। মিসরের সেনাবাহিনী ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজী, অসিখেলা সহ বিভিন্ন যুদ্ধের খেলা দেখাবে। অসামরিক লোকও এসব খেলায় অংশ নিতে পারবে।

    এতে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীনর দু’টো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, যারা মিসরের সেনাবাহিনীকে দুর্বল ভাবছে তাদের ভুল ধারণা দূর করা।

    পাঁচ-ছ’ দিন আগে থেকেই লোকজন আসছে। এতে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীন বেজায় খুশী। দর্শক এক লাখ হলে নতুন সেনা ভর্তি হবে পাঁচ হাজার।

    কিন্তু সরকারী এ ঘোষণায় আলী ছিলেন উদ্বিগ্ন।

    ‘মাননীয় সুলতান!’ বললেন তিনি ‘এক লাখ দর্শক হলে এর মধ্যে এক হাজার থাকবে শক্রর গুপ্তচর। মেয়েরা আসছে গ্রাম থেকে। এদের বেশীর ভাগ সুদানী। সুদানী মেয়েরা অত্যন্ত ফর্সা, খ্রিষ্টান মেয়েরা অনায়াসে এদের সাথে মিশে যেতে পারবে।’

    ‘তোমার সমস্যা আমি বুঝতে পারছি আলী। কিন্তু এ মহড়া কেন জরুরী তা তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ। তোমার সংস্থার তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দাও।’

    ‘আমি মেলার বিপক্ষে নই সুলতান। এটা যে খুবই প্রয়োজন তাও বুঝি। আপনাকে উৎকণ্ঠায় ফেলতে চাইনি, মেলা কি সমস্যা নিয়ে আসছে তাই শুধু বলতে চাইছি।’

    কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিনি পতিতালয়। এ সব পতিতালয় রাতভর খদ্দেরে পূর্ণ থাকে।

    শহরের বাইরেও কিছু তাঁবু টানানো হয়েছে। আমার ব্রাঞ্চের রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু তাঁবু রয়েছে ভাসমান পতিতাদের। সারারাত নাচগানের আসর জমজমাট থাকে ওসব তাঁবুতে। আগামীকাল মেলা, এর মধ্যে নর্তকীরা দর্শকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রচুর অর্থ।’

    ‘মেলা শেষ হয়ে গেলে এসব থাকবে না। এর ওপর আমি কোন বিধি নিষেধ আরোপ করতে চাই না। মিসরীদের নৈতিক চরিত্র উন্নত নয়। দীর্ঘ দিনের সাংস্কৃতিক আবহ দু’একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

    সেনাবাহিনীতে লোক বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য আমার প্রচুর দর্শক প্রয়োজন। তুমি জান আলী আমাদের অনেক সৈন্য প্রয়োজন। সামরিক এবং বেসামরিক অফিসারদের বৈঠকেও আমি এ দিকটা ব্যাখ্যা করেছি।’

    ‘মিটিংয়ে আপনি বড় বেশী খোলামেলা আলোচনা করেছেন। আপনাকে এ থেকে বিরত রাখতে পারিনি সুলতান। আমার গোয়েন্দা দৃষ্টি বলছে, এসব অফিসারদের অর্ধেক আপনার অনুগত নয়। আপনি জানেন, অনেকে আপনাকে সইতে পারছে না। কারো কারো আন্তরিকতা ও আনুগত্য রয়েছে সুদানীদের সাথে। আমি এদের পেছনে একজন করে টিকটিকি লাগিয়ে রেখেছি। ওরা নিয়মিত আমাকে খোঁজ খবর দিচ্ছে।’

    ‘কোন বিপজ্জনক তৎপরত কি ধরা পড়েছে?’

    ‘না, তবে পদমর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এরা রাতে সন্দেহজনক তাঁবু এবং মিনি পতিতালয় গুলোতে যাতায়াত করে। দু’জন তো দুটি নর্তকীকে বাঁদীতেই নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে আমার মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দু’টি পাল তোলা নৌকা, দশদিন আগে নৌকাগুলো রোম উপসাগরের পাড়ে দেখা গেছে।’

    ‘এ তে বিশেষ এমন কি রয়েছে?’

    ‘স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ওদের তৎপরতা রহস্যজনক। ওখানকার সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার পর দু’জন করে বিভিন্ন স্থানে পাহারা বসানো হয়েছে। খ্রিষ্টানরা যেন আকস্মিক আক্রমণ করতে না পারে এজন্য গোয়েন্দা বিভাগের কিছু লোক স্থানীয় বেদুঈন এবং জেলেদের পোশাকে ওখানে ঘোরাফিরা করছে। কিন্তু বিশাল সাগর সৈকতে নজর রাখার জন্য এদের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। বিশেষ করে যেখানে যেখানে সাগর থেকে চ্যানেল ভেতরে ঢুকেছে সে এলাকায় নজর রাখা ওদের পক্ষে সম্ভব নয়।

    দিন দশেক আগে একটা চ্যানেল থেকে দু’টো পাল তোলা নৌকাকে বেরোতে দেখা গেছে। হয়ত রাতে এসেছিল। দু’জন দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার ছুটে গিয়েও ওদের ধরতে পারেনি, নৌকা দু’টো তখন সাগরের বেশ ভেতরে চলে গেছে। ওগুলো জেলে নৌকা ছিল না। নিশ্চয়ই সাগরের ওপার থেকে এসেছিল।

    আমাদের সৈন্যরা পাহাড়ের ফাঁক ফোঁকড় এবং মরুভূমির বিশাল এলাকা খুঁজেও কিছুই পায়নি। নৌকায় কারা ছিল, কেন এসেছে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছি না। দিগন্ত বিস্তৃত বিশাল মরুভূমিতে ওদের খুঁজে বের করা কেবল কঠিন নয়, অসম্ভবও।’

    আলী আরও বলল, ‘দেড়মাস থেকে মেলার সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। এ খবর ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছা বিচিত্র নয়। সংবাদ পেলে ওদের গোয়েন্দারা আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কায়রোতে মেয়ে কেনা বেচা শুরু হয়েছে। ক্রেতারা সাধারণ নাগরিক নয়। ব্যবসায়ী, প্রশাসক এবং সেনাবাহিনীর পদস্থ ব্যক্তি ও পতিতাদের দালালরা এসব মেয়েদের কিনছে। এদের মধ্যে খ্রিষ্টান মেয়েও থাকতে পারে, শুধু পারে না, আমি মনে করি অবশ্যই আছে।’

    এসব সংবাদে সালাহুদ্দীন সালাহুদ্দীন উৎকষ্ঠিত হলেন না।

    রোম উপসাগরের পাড়ে খ্রিষ্টানশক্তি পরাজিত হয়েছে বছর খানেক আগে। ওখানে এখন কোন ছাউনিও নেই। আলী বিন সুফিয়া কিছু গোয়েন্দা নিয়োগ করলেও ওরা তেমন শক্তিশালী নয়। সংবাদ এসেছে খ্রিষ্টান গুপ্তচরে ছেয়ে গেছে মিসর।

    মিসরের ব্যাপারে তাদের পরিকল্পনা এখনও জনা যায়নি। শোনা যায় বাগদাদ এবং দামেশকে ওদের তৎপরতা বেশী। বিশেষ করে সিরিয়ার মুসলিম আমীর-ওমরারা মদ আর বিলাসিতায় ডুবে যাচ্ছে।

    রোম উপসাগরের যুদ্ধের সময় নুরুদ্দীন জঙ্গী খ্রিষ্টান রাজ্য আক্রমণ করে ওদের সন্ধি করতে বাধ্য করেছিলেন। বন্দীদের মধ্যে রিনান্ট নামের একজন সেনাপতিও ছিল। ওরা মুসলমান বন্দীদের হত্যা করায় জঙ্গী ওদের ছাড়েননি।

    সুলতান জঙ্গী মুসলিম বিশ্বকে সফল নেতৃত্ব দিচ্ছেন সালাহুদ্দীনের এ বিশ্বাস ছিল। তবুও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী তৈরি করছিলেন। তিনি চাইছিলেন মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার সাথে সাথে আরবকে মুক্ত করতে। একই সময়ে আক্রমণ এবং মিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট রাখার জন্য প্রচুর সৈন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেমত নতুন সেনা ভর্তি হচ্ছিল না।

    পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে তার বিরোধী শক্তি ছিল প্রবল, আনুগত্য ছিল যৎসামান্য। নূরুদ্দিন জঙ্গী কিছু সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। মিসরের একটি ফৌজ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো দেখেনি। সুলতান সালাহুদ্দীনকেও দেখেনি ওরা। এজন্যই মেলার আয়োজন।

    মেলার সময় অফিসার এবং কমান্ডারদের তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মেশার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন ওদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে। ‘ওদের বোঝাতে হবে আমরা সবাই এক। সবাই চাই আল্লাহ এবং রসূলের দ্বীনকে প্রসারিত করে এ ভূখন্ডকে খ্ৰীষ্টানদের আধিপত্য মুক্ত করতে।’

    মেলার আগের দিন আলী সালাহুদ্দীন আয়ুবীকে বললেন, ‘সুলতান, শক্রর গুপ্তচরদের আমি ভয় পাই। যেসব মুসলিম ভায়েরা বেঈমানদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে, তাদের নিয়ে আমি শঙ্কিত। এদের ঈমান দৃঢ় হলে চরদের সমগ্র বাহিনীও আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারত না। নবাগতা নর্তকীদের দিয়ে ওরা জাল ফেলছে। এরপরও আমার বাহিনী দিনরাত তৎপর রয়েছে।’

    ‘তোমার লোকদের বলো দুশমনের চরদের হত্যা না করে জীবিত গ্রেফতার করতে। ওরা শক্রর জন্য চোখ এবং কান কিন্তু আমাদের জন্য ভাষা। ওদের কাছ থেকে তুমি সব খবর সংগ্রহ করতে পারবে।’

    ○ ○ ○

    মেলার দিনের সূর্য হেসে উঠল পূর্বকাশে। বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠের তিন দিকে দর্শকদের উপচেপড়া ভীড়! পাহাড়ের দিক সংরক্ষিত ওদিকে কাউকে যেতে দেয়া হয়নি।

    বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। বন্যার উত্তাল সাগরের গর্জনের ন্যায় ভেসে এল অশ্বক্ষুরধ্বনি। ধুলোয় ভরে গেল আকাশ। দু’হাজারের ও বেশী ঘোড়া ছুটে আসছে তীব্র গতিতে।

    প্রথম ঘোড়া মাঠে প্রবেশ করল। আরোহী সালাহুদ্দীন আয়ুবী। তার দু’পাশে পতাকাবাহী। পেছনে অশ্বারোহী দল।

    ঘোড়ার পিঠ রঙীন চাদরে সুশোভিত। আরোহীদের হাতে বর্শা। কোমরে তরবারী। বর্শার মাথায় রঙীন কাপড়ের তৈরী ছোট ছোট ঝাণ্ডা। মাঠে প্রবেশ করেই গতি কমিয়ে দিলেন তিনি। দুলকি চালে এগুচ্ছে ঘোড়াগুলো। সওয়াররা বসে আছে মাথা উঁচিয়ে। টানটান বুক। চোখে মুখে দৃঢ়তা।

    নিস্তব্ধতা নেমে এল দর্শকদের মাঝে। অর্ধবৃত্তের মত দাঁড়িয়ে আছে দর্শক। পেছনের দর্শকরা ঘোড়ার পিঠে। তারও পেছনে উট। প্রতিটাতে দুতিন জন করে দর্শক।

    দাঁড়ানো দর্শকদের সামনে একখানে চাদোয়া টানানো, নীচে চেয়ার পাতা। ব্যবসায়ী, বড় বড় অফিসার এবং শহরের সন্মানিত ব্যক্তিরা বসেছেন ওখানে।

    প্রথম সারিতে বসে আছেন কায়রোর মসজিদ সমূহের ইমামগণ। এরা সকলেই সালাহুদ্দীনের শ্রদ্ধাভাজন। ধর্মীয় গুরু এবং আলেমদের তিনি বেশী ভালবাসেন। অনুমতি ছাড়া তাদের মজলিসে বসেন না।

    সালাহুদ্দীন আইয়ুবী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নির্দেশ দিয়েছিলেন সবার সাথে সুস্পর্ক গড়ে তুলতে।

    এ সচিবদেরই একজন খাদেমুদ্দীন আল বারক। আলী বিন সুফিয়ানের পর সুলতানের সবচে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনীর সকল গোপন পরিকল্পনা তিনি জানেন। যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং ম্যাপ থাকত তার কাছে।

    খাদেমুদ্দীন আল বারকের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দেহে আরবীয় সৌষ্ঠব। সপ্রতিভ, সুপুরুষ।

    মঞ্চে তার পাশে এসে বসল একটা মেয়ে। অপূর্ব সুন্দরী। যুবতীর সাথে এসেছে একজন পুরুষ। বয়স ষাটেরও বেশী। ধনাট্য ব্যবসায়ী মনে হচ্ছে তাকে।

    সামনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে যুবতী বার বার তাকাচ্ছে আল বারকের দিকে। কয়েকবারই মেয়েটার তাকানো লক্ষ্য করলেন আল বারক।

    যুবতী আবার তাকাল তার দিকে। চোখাচোখি হতেই সুন্দর করে হাসল মেয়েটা। এভাবে বেশ কবার চোখাচোখি হল তাদের, প্রতিবারই মিষ্টি মধুর হাসি উপহার পেল আল বারক। আবারও হাসতে যাবে, সাথে আসা বুড়োর দৃষ্টি পড়ল তার ওপর, সাথে সাথে ঠোঁট থেকে হাসি উবে গেল মেয়েটার।

    দর্শকদের সামনে দিয়ে পেরিয়ে গেল ঘোড়সওয়াররা। এগিয়ে আসছে উষ্ট্রারোহী বাহিনী।

    উটগুলোকে সাজানো হয়েছে রঙবেরঙের কাপড় দিয়ে। বাঁকানো ঘাড়ের শীর্ষে গর্বোদ্ধত মাথা। আরোহীদের হাতে দীর্ঘ বাটঅলা বল্লম। ফলার খানিক নীচে তিন ফিট চওড়া এবং দেড় ফিট লম্বা রঙিন কাপড় বাধা। উড়ছে বাতাসে। সওয়ারের কাঁধে ধনু। উটের পালানে বাধা রঙীন তুনীর। আরোহীদের দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। হাবভাবে রাজসিক ভাব।

    উটগুলো দেখতে দর্শকদের উটের মত হলেও ওগুলো যে সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত ওদের ছন্দোবদ্ধ গতি দেখলেই তা বোঝা যায়। চলনে এমন একটা রাজসিক ভাব, মনে হয় ভিনগ্রহ থেকে এসেছে।

    আল বারক আবার চাইল মেয়েটার দিকে। চোখে চোখ রাখল। মেয়েটার চোখ থেকে একই সাথে ঝরে পড়ছে আত্মনিবেদন, আকুতি আর নীরব আমন্ত্রণ।

    বিদ্যুৎ খেলে গেল আল বারকের শরীরে। যুবতীর ঠোঁটে ভেসে উঠল লাজনম্র হাসি। বুড়োর দিকে দৃষ্টি পড়তেই যুবতীর চোখে মুখে নেমে এল একরাশ ঘৃণা ও হতাশা।

    আল বারকের স্ত্রী চার সন্তানের জননী। এ মুহুর্তে স্ত্রীর কথা ভুলে গেলেন তিনি। তাকিয়ে রইলেন যুবতীর দিকে। বাতাসে উড়ছে সুন্দরীর রেশমী নেকাব। কখনও এসে পাশে বসা আল বারকের বুকে, মুখে লুটিয়ে পড়ছে।

    আল বারক আলতো হাতে সরিয়ে দিল সে কাপড়। লজ্জা জড়ানো কণ্ঠে ক্ষমা চাইল যুবতী।

    মৃদু হাসলেন তিনি। বললেন, ‘আরে না না, এতে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে?’

    উষ্ট্রারোহীদের পেছনে পদাতিক ফৌজ, তীরন্দাজ আর তলোয়ারবাজ। পরনে সামরিক পোশাক। অপলক চোখে তাকিয়ে রইল দর্শকরা। প্রতিটি সৈনিকই সুঠাম দেহী। চেহারায় আনন্দের দ্যুতি।

    গর্বোদ্ধত বুকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। দর্শকরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুলতান সালাহুদ্দীন তা-ই চাইছিলেন।

    সবশেষে এল সাজোয়া বাহিনী। প্রতিটি কামানের পেছনে একটা করে এক্কাগাড়ী। গাড়ীতে বড় বড় পাথর এবং বিভিন্ন সাইজের ভাঁড়। ভাঁড়ে দাহ্য পদার্থ।

    ধীরে ধীরে দর্শকদের সামনে দিয়ে এরাও পেরিয়ে গেল।

    দীর্ঘ চক্কর দিয়ে ফিরে এলেন সুলতান সালাহুদ্দীন। সামনে পতাকাবাহী। ডানে, বায়ে এবং পেছনে গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা। তারও পেছনে সেনাপতিদের ঘোড়া।

    সুলতান ঘোড়া থামালেন। দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে সালাম দিয়ে লাফিয়ে নামলেন ঘোড়া থেকে। চলে গেলেন চাঁদোয়ার নীচে।

    দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাল সবাই। তিনি সালামের জবাব দিয়ে নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসলেন।

    আরোহী এবং পদাতিক সৈন্যরা পাহাড়ের আড়াল হয়ে গেল। ফাঁকা ময়দান। এক দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার মাঠে প্ররেশ করল। একহাতে ঘোড়ার বলগা, অন্যহাতে উটের রশি। মধ্য মাঠে এসে ঘোড়ার পিঠে দাড়িয়ে পড়ল সওয়ার। লাগাম ছেড়ে দিয়ে উটের পিঠে লাফিয়ে পড়ল। আবার ফিরে এল চলমান অশ্বের পিঠে। এরপর লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। ঘোড়া এবং উটের সাথে ছুটে গেল কিছুদূর। আবার একলাফে ছুটন্ত ঘোড়ায় উঠে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল।

    সামান্য ডানে ঝুঁকলেন আল বারক। তার মুখ এবং মেয়েটার মাথার-মাঝে দু’তিন ইঞ্চি ফাঁক। মেয়েটা তাকে দেখল। হাসল আল বারক। মেয়েটার ঠোঁটে এখনও সেই লাজুক হাসি। এদিকে চোখ পড়তেই কপাল কুঞ্চিত হল বৃদ্ধের। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে।

    সহসা পাহাড়ের দিক থেকে উড়ে এল কতগুলো মাটির পাতিল। মাঠে পড়ে ফেটে গেল পাতিলগুলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তরল পদার্থ। আশপাশে একশ গজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। ভিজে গেল মাঠ।

    পাহাড়ের টিলায় ভেসে উঠল দু’জন তীরন্দাজের মুখ। আগুনের ফিতা বাঁধা তীর ছুঁড়ল ওরা। ভেজা মাঠে তীর পড়তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন।

    একদিক থেকে ছুটে এল চারজন ঘোড়সওয়ার। আগুনের কাছে এসেও থামল না। তীব্র গতিতে ছুটিয়ে দিল ঘোড়া। অবাক দর্শকরা ভাবল ওরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু আগুনের ভেতর দিয়ে ছুটতে দেখা গেল ওদের। বেরিয়ে গেল অপর দিক দিয়ে।

    দর্শকদের শ্লোগানে প্রকম্পিত হল আকাশ বাতাস। দু’জন আরোহীর কাপড়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। ছুটন্ত ঘোড়া থেকে লাফ দিল ওরা। গড়গড়ি খেল বালিতে। নিবে গেল পোশাকের আগুন।

    আল বারকের দৃষ্টি মাঠে নেই। বার বার তাকাচ্ছে যুবতীর দিকে। প্রতিবারই মিষ্টি করে হাসছে তরুণী। আবার দৃষ্টি ফিরে যাচ্ছে বুড়োর দিকে। হঠাৎ বৃদ্ধ উঠে গেলেন। মেয়েটাকে তার সাথে আসতে দেখেছে আল বারক।

    ‘তোমার আব্বা উঠে গেলেন কেন?’ প্রশ্ন করলেন তিনি।

    ‘বৃদ্ধ আমার পিতা নন, স্বামী।’

    ‘স্বামী!’ আল বারকের কণ্ঠে অবাক বিস্ময়। ‘তোমার পিতা মাতাই, কি এ বিয়ে দিয়েছেন!’

    ‘সে আমায় কিনে নিয়েছে।’ যুবতীর নিঃস্পৃহ জবাব।

    ‘গেলেন কোথায়?

    ‘আপনার সাথে আমার চোখাচোখির ব্যাপারটা আঁচ করে রাগ করে চলে গেছেন। সন্দেহ করছেন আপনার জন্য আমার আকর্ষণ রয়েছে।’

    ‘সত্যিই কি আমার জন্য তোমার আকর্ষণ রয়েছে।’

    লজ্জায় নত হল যুবতীর চোখ। ঠোঁটে বিনম্র হাসি। অক্ষুট কণ্ঠে বলল, ‘ওকে আর সহ্য করতে পারছি না। হাঁফিয়ে উঠেছি। কেউ আমাকে এ বুড়োর হাত থেকে মুক্তি না দিলে আত্মহত্যাই করব।’

    মাঠে সৈন্যরা সেনা নৈপূণ্য দেখাচ্ছিল। মল্লযুদ্ধ, অসি চালনা, তীরন্দাজী। দর্শক এ ধরনের ক্রীড়ানৈপুন্য আগে কখনও দেখেনি।

    এতকাল এরা দেখে এসেছে সুদানীদের। ওদের হামবড়া ভাবের অন্ত ছিল না। অফিসাররা রাস্তায় বেরুত রাজ রাজড়ার মত। তাদের সঙ্গী সেনাদল গ্রামবাসীদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত।

    চারণভূমি থেকে ওরা লুট করত পশু। কারো কাছে ভাল জাতের উট বা ঘোড়া থাকলে জোর করে নিয়ে যেত। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, সেনাবাহিনী তৈরী করা হয় জনগণের উপর অত্যাচার করার জন্য।

    কিন্তু সালাহুদ্দীন আয়ূবীর ফৌজ ছিল তারচে ভিন্ন। যারা মহড়ায় অংশ নেয়নি, তাদের ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল দর্শকদের মাঝে। জনসাধারণকে বোঝাতে হবে ফৌজ তাদেরই ভাই এবং বন্ধু। শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী সৈনিকদের জন্য ছিল কঠোর শাস্তি।

    আল বারক মহড়া সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়লেন। ভুলে গেলেন সুলতানের নির্দেশ। যুবতী তার বিবেকের উপর চেপে বসল।

    আল বারক তাকে ভাললাগার কথা বললেন। আহ্বানে সাড়া দিল যুবতী। একান্তে দেখা করতে বললেন আল বারক।

    যুবতী বলল, ‘আমি তার কেনা বাঁদি ও আমাকে বন্দী করে রেখেছে। তার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে আসা সম্ভব নয়। ঘরে তার চারজন স্ত্রী। ওরাও আমার উপর দৃষ্টি রাখে।’

    স্বীয় পদমর্যাদার কথা ভুলে গেলেন আল বারক। টিনেজারদের মত সাক্ষাতের জন্য বিভিন্ন স্থানের নাম উল্লেখ করতে লাগলেন। একটি স্থান তরুণীর পসন্দ হল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের পোড়োবাড়ী। শহরের বাইরে। ভবঘুরেরাই কেবল ওখানে যায়।

    ‘ঠিক আছে, আমি ওখানে আসতে পারি, যদি আপনি আমাকে ওর হাত থেকে বাঁচানোর ওয়াদা দেন।’

    ‘অবশ্যই। ঐ বুড়োর হাত থেকে তোমাকে মুক্ত করার ওয়াদা করছি আমি।’

    ‘কখন আসব?’

    ‘আজ রাতে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন। কি, আসবে তো?’

    মেয়েটি আবারো সেই সলজ্জ হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা।’

    ○ ○ ○

    কায়রোতে রাত নেমেছে।

    মেলা শেষ হয়েছে দু’দিন আগে। দর্শকরা যে যার বাড়ী ফিরে গেছে। অস্থায়ী পতিতালয়গুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে সরকারী নির্দেশে। সন্দেহজনক পুরুষ ও নারীদের খুঁজছিল গোয়েন্দারা।

    মেলার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। দু’দিনে চার হাজার যুবক সেনা ফৌজে ভর্তি হয়েছে।

    আল বারক চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরনে সাধারণ পোশাক। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলেন কেউ দেখছে কিনা। না, কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই বুঝতে পেরে নিশ্চিন্তে রওনা দিলেন পুরনো সেই ভাঙা বাড়ীর দিকে।

    ঘুমিয়ে পড়েছে মরুভূমি। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে থেকে থেকে ডেকে উঠছে পাহাড়ী শেয়াল। মেয়েটা বলেছিল সে বন্দিনী। সবসময় চোখে চোখে রাখা হয়। তবুও আসবে এ আশায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। আত্মরক্ষার জন্য একটা খঞ্জর সাথে নিয়েছেন।

    নারীর পাগল করা রূপের মোহ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। হৃদয় হয় ভয় শূন্য। আল বারক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হলেও এখন অবিবেচক যুবক।

    ভাঙা বাড়ীটার কাছে একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে, আপাদমস্তক ঢাকা। ছায়াটা মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলেন। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে ঢুকে গেলেন ভেতরে।

    অন্ধকার কক্ষ। পাখা ঝাপটানোর শব্দ হল। হঠাৎ গালে চড় মারল কেউ। সাথে সাথে ভেসে এল চি, চি, শব্দ। বাদুড়। ওরা বড় বড় নখ দিয়ে মুখ আঁচড়ে দেবে ভেবে ভয় পেয়ে বসে পড়লেন তিনি।

    বাদুরগুলো উড়ে বেড়াতে থাকল। ভয় পেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। উড়ন্ত বাদুড়ে ভরে গেল কক্ষ। চি চি শব্দ করতে করতে বেরিয়ে এল বাদুড়গুলোও।

    সতর্ক প্রহরায় থাকা এক বন্দিনী যুবতী কি করে এ ভয়ংকর পোড়োবাড়িতে আসবে এ কথা তিনি একবারও ভাবলেন না। উঠোনে দাঁড়িয়ে ভীত চোখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন।

    কারো পায়ের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। খঞ্জর হাতে তুলে নিলেন তিনি। মাথার উপর বাদুড় উড়ছে, পাখা ঝাপটানোর শব্দ হচ্ছে। আল বারক চাপা কণ্ঠে ডাকলেন, ‘আছেফা।’

    এ নামই তাকে বলেছিল মেয়েটা।

    ‘আপনি এসেছেন!’ আছেফার কণ্ঠ।

    ছুটে এসে আল বারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘শুধু আপনার জন্যই এ ভয়ঙ্কর স্থানে এসেছি। তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। বুড়োকে মদের সাথে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। দেরী হলে জেগে উঠতে পারে।’

    ‘মদের সাথে বিষ মিশাতে পারলে না?’

    ‘আমি কখনও মানুষ হত্যা করিনি। একজন পর-পুরুষের সাথে এভাবে ভয়ঙ্কর স্থানে আসব, তাও কি ভেবেছি কখনও!’

    আল বারক যুবতীকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। হঠাৎ পেছনের পথ আলোময় হয়ে উঠল। তার আগমন পথে জ্বলে উঠল দু’টো মশাল। এক ঝটকায় আছেফাকে পেছনে নিয়ে এলেন তিনি। এরা কি প্রেতাত্মা না মেয়েটার পেছনে এসেছে, ভাবছেন আল বারক।

    গর্জে উঠল একটা কণ্ঠ, ‘দু’টোকেই জবাই করে ফেল।’

    মশাল নিয়ে এগিয়ে এল চারজন বলিষ্ঠ জোয়ান। একজনের হাতে বর্শা, তিনজনের হাতে তরবারী।

    মশাল মাটিতে পুঁতে দিল ওরা। আলোয় ভরে গেল আঙ্গিনা। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত ওরা আল বারকের চার পাশে ঘুরতে লাগল। আছেফা তার পেছনে।

    বারান্দা থেকে শব্দ এল, ‘পেয়েছ? জীবন্ত ছেড়ো না কাউকে।’ মেয়েটার বুড়ো স্বামীর আওয়াজ।

    আছেফা পেছন থেকে সামনে চলে এল। ঘৃণা এবং ক্ৰোধকম্পিত কষ্ঠে বলল, ‘এসো, এগিয়ে এসো। খুন কর আমাকে। এ জীবনে আমার আর বাঁচার সাধ নাই। বুড়ো পাঠা, টাকার জোরে আমার জীবনটা তুমি ধ্বংস করে দিয়েছ।’

    আমার এ যৌবনকে তুমি কি দিতে পেরেছ? আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আল্লার গজব পড়বে তোমার ওপর। তোমাকে আমি ঘৃণা করি। আমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি। ওকে আমিই এখানে আসতে বলেছি…’

    আছেফা ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে।

    ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন সশস্ত্র লোক। বর্শাধারী এগোল আছেফার দিকে। বর্শার ফলা তার পেটে ঠেকিয়ে বলল, ‘ছিনাল মাগী, আর একটা কথাও না। মরবি তো মর, তার আগে ফলাটা দেখে নে। জাহান্নামে তোর নাগরকে আগে পাঠাব, না তোকে?’

    এক ঝটকায় বর্শা ধরে ফেলল আছেফা। হ্যাচক টানে কেড়ে নিয়ে আল বারক থেকে সরে গেল খানিক। এরপর বর্শা উঁচিয়ে বলল, ‘আয়, এগিয়ে আয়। দেখি একে আমার আগে কে হত্যা করে।’

    ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তম্ভিত। আল বারক খঞ্জর হাতে এগিয়ে এলেন। মেয়েটা বর্শাধারীকে আক্রমণ করল। পিছিয়ে গেল সে।

    তার সঙ্গীরা আল বারককে আক্রমণ না করে আক্রমণের পাঁয়তারা করছিল। ইচ্ছে করলে ওরা অনেক আগেই তাকে হত্যা করতে পারত।

    আছেফা ধমকাচ্ছিল। আঘাত করছিল লক্ষ্যহীন ভাবে।

    আল বারক এক ব্যক্তিকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করল। তার পেছনে ছুটে এল দু’জন, একলাফে আছেফা ওদের পেছনে চলে গেল। ইচ্ছে করলে বর্শা মেরে ওদের ঘায়েল করতে পারত আছেফা। কিন্তু খঞ্জর দিয়ে তরবারীর মোকাবিলা করা যায় না।

    বুড়ো একদিকে দাঁড়িয়ে হস্বিতম্বি করছিল। আক্রমণ প্রতি আক্রমণে কেটে গেল কিছু সময়। কেউ আহত হয়নি। আঁচড়ও লাগেনি কারও গায়ে। এবার বৃদ্ধ বলল, ‘থামো!’

    যুদ্ধ থেমে গেল।

    ‘এমন বিশ্বাসঘাতিনীকে আমি আর বাড়ীতে নেবো না। জানতাম না ও এত দজ্জাল। জোর করে নিয়ে গেলে কখন আমাকে মেরেই ফেলবে!’

    ‘আমি তোমাকে এর মূল্য পরিশোধ করে দেব।’ আল বারক বলল, ‘তুমি একে কত দিয়ে কিনেছিলে?’

    ‘আমার সম্পদের অভাব নেই। ওকে আমি আপনাকে উপহার দিলাম। আমি অবাক হচ্ছি আপনার প্রতি ওর ভালবাসা দেখে। কি পরিমাণ ভালবাসা থাকলে নিজের জীবন বিপন্ন করে এতগুলো লোকের মোকাবিলা করতে পারে একবার ভেবে দেখেছেন? ও যুদ্ধবাজ বংশের মেয়ে তো, এক যোদ্ধার ঘরেই ওকে মানাবে ভাল।’

    তাছাড়া আপনি প্রশাসনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। সুলতানের এক অনুরাগী হিসাবে আপনাকে আমি অসন্তুষ্ট করতে পারি না। আমি ব্যবসায়ী মানুষ, সারাদিন ব্যস্ত থাকি বাইরে। আর এ বুড়ো বয়সে ওর মত যুবতী ঘরে রাখাও বিপজ্জনক। আমি ওকে তালাক দিলাম। এবার ও আপনার জন্য বৈধ।’

    করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল সে। অস্ত্রধারীদের দিকে ফিরে বলল, ‘এই চল, খবরদার, এই ঘটনা কাউকে বলবি না।’

    লোকগুলো মশাল তুলে ফিরে গেল। অবাক চোখে ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন আল বারক। তার পায়ের নীচে মাটি কাঁপতে লাগল। কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল বৃদ্ধ তার সাথে প্রতারণা করেছে। পথে লুকিয়ে থেকে দু’জনকেই হত্যা করবে।

    আছেফার হাত থেকে বর্শা হাতে নিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন ভাঙা বাড়ি থেকে।

    আছেফার হাত ধরে দ্রুত হাঁটছিলেন তিনি। বারবার তাকাচ্ছিলেন ডানে, বাঁয়ে, পেছনে। সামান্য শব্দেও চমকে উঠে থেমে যেতেন। অন্ধকারেই চাইতেন এদিক ওদিক। ধীরে ধীরে হাঁটা ধরতেন আবার। শহরে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

    আছেফা থামল। তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনি কি আমায় বিশ্বাস করেন!’

    আল বারক তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগের কারণে কিছুই বলতে পারলেন না।

    এ ঘটনার পর দেখা গেল আল বারক নয়, মেয়েটাই তাকে কিনে নিয়েছে। তার মনে হচ্ছিল আছেফা তার জন্য পাগল। শুধু তার জন্য এতগুলো লোকের সাথে একা লড়াই করেছে আছেফা।

    আছেফা তার রূপের জালে আটকে ফেলেছে তাকে। আল বারক স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলল। সে স্থান দখল করল আছেফা।

    সে যুগে মেয়েদের ক্রয় বিক্রয় চলত। স্ত্রীর কোন মর্যাদা ছিল না। চারজন স্ত্রী রাখাকে পুরুষের অধিকার মনে করা হত। বিত্তশালীরা পুষত রক্ষিতা। মুসলমান ওমরাদেরকে নারীরাই ধ্বংস করেছে। স্বামীদের সন্তুষ্ট করার জন্য স্ত্রীরাই সুন্দরী মেয়ে খুঁজে এনে স্বামীদের উপহার দিত।

    আল বারক আছেফাকে নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। সবাই তখন ঘুমিয়ে। সকালে স্ত্রী দেখল স্বামীর বিছানায় এক অনিন্দ্যসুন্দর যুবতী। এতে সে মোটেই অসন্তুষ্ট হলো না। ভাবল, এমন দু’একজন স্ত্রী বা রক্ষিতা পোষার ক্ষমতা তার স্বামীর রয়েছে। ও আসায় তার কিছুটা দায়িত্ব বরং কমবে। কিন্তু একবারও ভাবল না, আজ থেকে তার ভালবাসা হারিয়ে গেছে।

    একদিন যে মেয়েরা পুরুষের সাথে কাফেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এখন তারা শুধুমাত্র পুরুষের ভোগের সামগ্রী—এ কথা ভাবতে কষ্ট হতো সালাহুদ্দীনর। এতে সমাজের অর্ধেক শক্তিই নিঃশেষ হয়নি বরং এরা জাতির পৌরুষকেও নিঃশেষ করে দিয়েছে।

    ব্যবসায়ী পণ্যের মত মেয়েদের নিলাম হত। অপহরণ, খুন ধর্ষণের ঘটনা ঘটত অহরহ। তিনি নারীদের এ অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইলেন।

    নারীকে পুরুষের এবং পুরুষকে নারীর এই অনাহুত মোহ থেকে মুক্ত করতে তিনি ‘এক স্বামীর এক স্ত্রী’ শ্লোগান তোললেন। তিনি জানতেন দু’তিনজন স্ত্রী এবং রক্ষিতার মালিক আমীর ওমরারা সরাসরি এর বিরোধিতা করবে। কারণ, এরাই ছিল নারীদের প্রধান খরিদ্দার।

    নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সালাহুদ্দীন কুমারী মেয়েদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করতে চাইলেন। এতে হারেমগুলো শূন্য হবে। নারী ফিরে পাবে মর্যাদা। কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না আসা পর্যন্ত তা সম্ভব ছিল না।

    সমাজে তার শত্রুর পরিমাণ ছিল যথেষ্ট। তিনি জানতেন, বিশ্বাসঘাতকের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি জানতেন না তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী, রাষ্ট্রীয় এবং সামরিক গোপন পরিকল্পনার রক্ষক আল বারকও এক রূপসীর ফাঁদে পড়েছেন। প্রেমের অভিনয় দিয়ে যে রূপসী তাকে আপন কর্তব্য ভুলিয়ে দিচ্ছিল।

    ○ ○ ○

  • সুবাক দুর্গে আক্রমণ

    সুবাক দুর্গে আক্রমণ

    ‘সুবাক দুর্গে আক্রমণ’ আসাদ বিন হাফিজ রচিত ‘ক্রুসেড সিরিজে’র তৃতীয় উপন্যাস। সিরিজের প্রথম দু’টি উপন্যাসের মত এটিও লিখিত হয়েছে ‘আবদুল হক’ অনূদিত ‘আলতামাশে’র ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকী’র ছায়া অবলম্বনে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে। লেখক নিজেই এটির প্রকাশক। বইটির সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১২তে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রীতি প্রকাশন, ৪৩৫/ক বড় মগবাজার, ঢাকা ১২১৭। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের।

    বইটি সম্পর্কে শেষ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে— “গাজী সালাহুদ্দীন সেই অসামান্য সেনাপতি, অজস্র কুটিল ষড়যন্ত্র, ভয়াবহ সংঘাত আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য থেকে যিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। খ্রিস্টানরা চাচ্ছিল দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিতে, তাদের সহযোগিতা করছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় মুসলিম আমীর ওমরারা। কৈশোরেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন অস্ত্র, জীবন পার করেছেন এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠে মানুষ। বীরত্ব ও মহানুভবতার এমন সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার কারণে শত্রুর চোখেও হয়ে উঠেছেন ‘গ্রেট সালাদীন’।

    “ইতিহাসে তাঁর সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিজয়ের বিস্তর কাহিনী থাকলেও পাশ্চাত্য লেখকরা খ্রিস্টানদের লেলিয়ে দেয়া সেইসব গুপ্তচররূপী ছলনাময়ী রূপসী নারীদের কথা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে, যারা বার বার আঘাত হেনেছে সালাহুদ্দীনকে।

    “সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সেইসব অকথিত কাহিনী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনের শিহরিত ও রোমাঞ্চকর বর্ণনায় ভরপুর ‘ক্রুসেড’ সিরিজের ভূবনে সবাইকে স্বাগতম।”

    এই সিরিজের পূর্বের দুটি গ্রন্থের মত এটিও ‘ইসলামী উপন্যাস’ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও নারীদেহের অত্যধিক সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ভাষা ইসলামী সাহিত্যের সাথে বেমানান মনে করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ইতিহাস নির্ভর কাহিনী হলেও এর সাথে প্রকৃত ইতিহাসের মিল খুব সামান্যই। বলা চলে এটি নিছক সাহিত্য।

    বিষের ছোঁয়া

    কায়রোর উপশহরের এক মসজিদ। একদিন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে শহরতলীর সে মসজিদের কাছে এসে থামল আটজন অশ্বারোহী। মসজিদ থেকে সামান্য দূরে এক সরাইখানার ফটকে এসে ঘোড়া থেকে নামল ওরা। ঘোড়াগুলো তুলে দিল সরাইখানার লোকজনের হাতে। তারপর দু’জন দু’জন করে চারটে দলে ভাগ হয়ে ওরা মসজিদের চারদিকটা ভাল করে ঘুরে দেখল।

    এশার নামাজের আযান হল। ওরা একে একে এসে প্রবেশ করল মসজিদে। প্রথম সারিতে নামাজ পড়ল চারজন, চারজন দাঁড়াল মসজিদের ভিতরের সর্বশেষ কাতারে।

    নামাজ শেষ হল, মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন ইমাম সাহেব। লোকজন প্রতিদিনের মত আজও ইমাম সাহেবের ওয়াজ শোনার জন্য যে যার জায়গায় বসে পড়ল।

    ওয়াজ শুরু করলেন ইমাম সাহেব। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ‘ইমাম সাহেব! আল্লাহ আপনার জ্ঞানের আলো আরও বাড়িয়ে দিক। আপনার খ্যাতি শুনে আমরা আটজন অনেক দূর থেকে এসেছি। সমস্যা মনে না করলে জিহাদের বিষয়ে কিছু বলুন। জিহাদের তাৎপর্য আমরা বুঝি না। লোকজন বলছে আমাদের নাকি জিহাদের ভুল অর্থ বুঝানো হয়েছে।’

    ‘আমরা জিহাদ সম্পর্কে আপনার বয়ান শুনতে চাই।’ সাতটি কণ্ঠ একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হল।

    একজন বলল, ‘এ হচ্ছে সময়ের দাবী। আমাদের জিহাদের ভুল ব্যাখ্যা শোনানো হয়েছে। আমরা সঠিক অর্থ জানতে চাই।’

    ‘কোরআনের নির্দেশ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘কোরানের বাণী মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া আমার দায়িত্ব। একবার নয়, হাজার বার আমি আপনাদের কাছে জিহাদের তাৎপর্য তুলে ধরতে প্রস্তুত। জিহাদের অর্থ অন্যের জমি দখল করা বা কারও গলা কাটা নয়। হত্যা, মারামারি বা খুনাখুনিও জিহাদ নয়।’ তিনি কোরানের আয়াত পড়ে বললেন, ‘এ আমার কথা নায়, খোদার কালাম। সর্বোত্তম জেহাদ হচ্ছে নিজের নফস বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করা। তাইতো আমি বলি, পাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই হচ্ছে আসল জিহাদ। তোমরা শোননি, ইসলাম তরবারীর জোরে নয়, প্রেম এবং ভালবাসা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জিহাদের অর্থ বলদে গেছে। এর অর্থ পরিবর্তন করেছে ক্ষমতালোভীরা। খ্রিষ্টানরা অন্যের দেশ দখল করাকে ধর্মযুদ্ধ বলে। মুসলমানও একই উদ্দেশ্যে লড়াই ও ঝগড়া করাকে জিহাদ বলে। আর এসব কথা বলে ক্ষমতাসীন শাসকরা। তারা এসব বলে তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। মানুষকে ধর্মের কথা বলে যুদ্ধে লিপ্ত করে রাজা বাদশারা। এতে রাজাদের শাসন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের।’

    ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবীও কি মানুষকে অন্যায়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছেন?’ প্রশ্ন করল একজন।

    ‘না! তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হোক। বড়রা তাকে যা বলেছে, আন্তরিকতার সাথে তাই তিনি পালন করছেন। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে তার মনে ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে। ভেবে দেখো—খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়! দু’জন নবীর কথাইতো এক। হযরত ঈসা (আ.) প্রেম ভালবাসার কথা বলেছেন। আমাদের নবীও মানুষকে ভালবাসতে বলেছেন। তাহলে এসব যুদ্ধ বিগ্রহ এল কোত্থেকে! আল্লাহর জমিনে যারা নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করে মানুষকে গোলামে পরিণত করতে চায় এসব তাদের আবিষ্কার।

    আমি মিসরের সম্মানিত আমীরের কাছে যাব। তাঁকে বোঝাব জিহাদের সত্যিকার তাৎপর্য। অশিক্ষা এবং অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে তিনি যা করছেন এ হচ্ছে সত্যিকারের জিহাদ। খোতবা থেকে খলিফার নাম মুছে তিনি বড় জিহাদ করেছেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। শিশুদেরকে খোদার নামে যুদ্ধবিগ্রহ শেখানো হচ্ছে। এদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তীর  ও তরবারী। এ তীর ও তরবারী ওরা কোথায় ব্যবহার করবে? অবশ্যই কিছু মানুষ দেখিয়ে বলতে হবে, এরা তোমাদের শত্রু। এদের নিশ্চিহ্ন কর।’

    ইমাম সাহেবের কণ্ঠে ছিল অবর্ণনীয় আকর্ষণ। যাদুগ্রস্তের মত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল শ্রোতারা। তিনি আবার শুরু করলেন, ‘তোমাদের শিশুদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। তাদের সাথে তোমরাও আগুনে পুড়বে। তোমরাই ওদেরকে পাপের পথে নিক্ষেপ করেছ। সেনাপিত এবং সম্রাটগণ তোমাদের স্বর্গে নিয়ে যেতে পারবে না। শুধু দ্বীন ইসলামের প্রদীপধারী ইমাম এবং আলেমরাই স্বর্গ দিতে পারবে। সমগ্র জীবন নামাজ পড়লে এবং ভাল কাজ করলেও মানুষের রক্তে রঙ্গীন হাত দোজখে নিক্ষিপ্ত হবে।

    তোমরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত প্রদান কর। কোষাগার হল সরকারের, সরকার গরীব নয়। যাকাত হল গরীবের অধিকার। তোমাদের যাকাতের টাকায় অস্ত্র এবং ঘোড়া কিনে মানুষকে হত্যা করা হয়। যাকাত দিয়ে তোমরা বেহেস্তে যাবে, অথচ এখন পাপের ভাগী হচ্ছ। এজন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত দেয়া যাবে না।’

    ইমাম সাহেব আলোচনার বিষয় ঘুরিয়ে বললেন, ‘অনেক কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। বলারও কেউ নেই। মানুষের মধ্যে রয়েছে একটা কামজ রিপু। এ এক জৈবিক সত্বা। তোমাদের কি নারীর প্রয়োজন হয় না! এ হচ্ছে স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা। আল্লাহই এ চাহিদা তৈরী করেছেন। তোমরা এ চাহিদা পূরণ করতে পার। এ জন্যই আল্লাহ একসঙ্গে চার স্ত্রী ঘরে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন স্ত্রীও যদি না রাখতে পার তবে টাকার বিনিময়ে কোন নারীর কাছে আকাঙ্ক্ষা পুরণ করতে যাওয়া অপরাধ হবে কেন? এ চাহিদা এ আকাঙ্ক্ষা তো খোদারই দান। তাই নিরূপায় হলে এ চাহিদা তোমাদেরকে অন্ধগলিতে নিয়ে যায়। এ অপরাধ নয়। এরপরও পাপ থেকে বেঁচে থেকো, কোন পুরুষের কাছে যেয়ো না। কারণ, কোরানে আছে, পুরুষের কাছে যাওয়ার অপরাধে আল্লাহ আ’দ ও সামুদ জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

    এক থেকে চার পর্যন্ত যত ইচ্ছে বিয়ে করতে পার। নিজের স্ত্রী এবং মেয়েদেরকে ঘরের ভেতর রাখবে। আমি দেখেছি যুবতী মেয়েদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শেখানো হচ্ছে ঘোড়সওয়ারী, অসি চালনা এবং আহতকে প্রাথমিক চিকিৎকা দানের পদ্ধতি। ওরা যুদ্ধে যাবে। আহতদের সেবা করবে। প্রয়োজনে যুদ্ধ করবে। ফলে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হবে। এ চরম পাপ। এ পাপ থেকে নিজে বেঁচে থাকো। যারা মসজিদে আসে না তাদেরকেও বলো। খোদার বিধানে কেউ হস্তক্ষেপ করো না। এ বড়ই গুণার কাজ।’

    ইমাম সাহেবের ওয়াজ শেষ হল। বসার স্থান না পেয়ে দাঁড়িয়েই অনেক শ্রোতা। একজন একজন করে হুজুরের সাথে হাত মিলিয়ে সবাই ফিরে যেতে লাগল। কেউবা ঝুঁকে তাঁর হাতে চুমো খেলো।

    ইমাম সাহেবের সামনে দু’জন লোক বসা। পরণে জুব্বা। মাথায় পাগড়ি। জরির কাজ করা রুমালে ঢাকা মুখের একাংশ। কাল দীর্ঘ দাড়ি। পোশাকে আশাকে মধ্যবিত্ত মনে হয়। একজনের এক চোখ হলুদ কাপড়ে বাঁধা। বললেন, হুজুর, ‘জিহাদ সম্পর্কে আরও কিছু বলুন।’

    ‘তোমার চোখে কি হয়েছে?’

    ‘হুজুর, আমার এক চোখ খারাপ।’

    ইমাম সাহেব তাকালেন সঙ্গীর দিকে। সঙ্গীটির মুখের একাংশ রুমালে ঢাকা, ঘন দাড়ি। এ দু’জন ছাড়া সবাই চলে গেছে।

    ‘তোমাদের সন্দেহ এখনও দূর হয়নি?’ মৃদু হেসে ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন।

    ‘সন্দেহ দূর হয়েছে।’ জবাব দিল একচোখা লোকটি। ‘আমরা সম্ভবত আপনাকেই খুঁজছি। মিসরের অর্ধেকটা চষে বেড়িয়েছি আপনার জন্য। আমাদেরকে ভুল ঠিকানা দেয়া হয়েছিল।

    ‘অর্ধেক মিসরেও আমার মত আলেম পাওনি?’

    ‘খুঁজেছি তো আপনাকে। আমরা কি সঠিক স্থানে আসিনি? ওয়াজ শুনে মনে হল আমরা আপনাকেই চাইছি।’

    বাইরের দিকে তাকালেন ইমাম সাহেব। বললেন, ‘আবহাওয়া কেমন হবে জানি না।’

    ‘বৃষ্টি আসবে।’ একচোখা লোকটির জবাব।

    ‘পরিষ্কার আকাশ।’

    ‘আমরা মেঘের সৃষ্টি করব।’ বলেই হেসে উঠল লোকটি। ইমাম সাহেব মুচকি হেসে ফিসফিসিয়ে বললনে, ‘কোত্থেকে এসেছ?’

    ‘এক মাস ছিলাম ইস্কান্দারিয়া, তার আগে সুবাক।’

    ‘মুসলমান?’

    ‘ঘাতক দলের সদস্য। মুসলমান মনে করতে পারেন।’

    এবার দু’জনই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

    ‘আপনাকে ওস্তাদ মানছি।’ লোকটির সঙ্গী বলল। ‘এ যে আপনিই আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না।’

    ‘আপনি ব্যর্থ হতে পারেন না।’

    ‘সাফল্য অত সহজ নয়।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘সালাহুদ্দীনকে তোমরা চেন না। আমি জিহাদ এবং জীবন সম্পর্কে এদের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছি। কিন্তু সালাহুদ্দীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সফল হতে দিচ্ছে না। জিহাদ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য তোমরা কেন আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলে?’

    ‘সুবাক থেকে আমাদের বলা হয়েছে এটিই আপনরার বড় পরিচয়।’ জবাব দিল একচোখা লোকটি। ‘আপনার বলা প্রতিটি কথাই ওখানে আমাদে শোনানো হয়েছে। আমাদের আরও বলা হয়েছে, আপনার ওয়াজে অবশ্যই যৌনতার প্রসঙ্গ থাকবে। এসব শিখতে আপনি নিশ্চয় অনেক পরিশ্রম করেছেন?’

    ‘আমার নাম কি?’

    ‘আপনি কি আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন? সন্দেহ করছেন আমাদের? পরস্পরের পরিচিতির জন্য নাম নয় আমরা বিভিন্ন সংকেত ব্যবহার করি।’

    ‘তোমরা কি জন্য এসেছ?’

    ‘ঘাতকদল কি কাজ করে?’

    ‘আমার কাছে পাঠানো হয়েছে কেন?’

    ‘একটা উষ্ট্রীর জন্য। আপনার কাছে দু’টি রয়েছে। আপনার কাছে আসার কথা ছিল না। আপনি হয়ত খবর পেয়েছেন সালাহুদ্দীনের এক কমাণ্ডার রজবের কাছে সুবাক থেকে তিনটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। একটা ছিল আমাদের জন্য। কিন্তু দু’টাই মারা গেছে। রজবের কাটা মাথা আর সবচে সুন্দরী উষ্ট্রীটা সালাহুদ্দীনের হাতে পৌঁছেছে। ওটাও শেষ।’

    ‘হ্যাঁ, শুনেছি।’ ইমাম সাহেবের বিষন্ন কণ্ঠ। ‘আমাদের অনেক ক্ষতি হল। সালাহুদ্দীনের এক শক্তিশালী সেনাপতি আমাদের হাতে ছিল। তাকেও জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভেতরে চল, এসব কথার জন্য এ স্থান উপযুক্ত নয়।’

    দু’জনই ইমাম সাহেবের সাথে বেরিয়ে গেল।

    ইমাম সাহেব দু’জনকে নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। বাড়িটি পরিচ্ছন্ন। দু’ তিনটা কামরা পেরিয়ে একটি কামরার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ওদের সামনে পুরনো এক দরজা। দরজায় তালা লাগানো। মনে হয় দীর্ঘ দিন থেকে খোলা হয়নি। এক পাশে জানালা। ইমাম সাহেব হাত লাগালেন। জানালার পাল্লা খুলে গেল। সবাই ভেতরে তাকাল। সাজানো গোছানো কক্ষ। দেয়ালে ঝুলছে সোনার তৈরী ক্রুশ। একপাশে যিশুর অন্যদিকে মা মেরীর হাতে আঁকা ছবি। ইমাম সাহেব বললেন, ‘আমার গীর্জা। আমার আশ্রয়।’

    ‘আকস্মিক বিপদ থেকে বাঁচার জন্য কি ব্যবস্থা রেখেছেন?’ একচোখা লোকটি প্রশ্ন করল। ‘ক্রুশ এবং ছবিগুলো এভাবে রাখা ঠিক হয়নি।’

    ‘এখানে আসার দুঃসাহস কেউ করবে না।’ ইমাম সাহেব হেসে বললেন। ‘মুসলমানরা সরল এবং আবেগপ্রবণ জাতি। হালকা যুক্তি আর আবেগময় কথায় ওরা জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। জৈবিক  চাহিদা মানুষের বড় দুর্বলতা। আমি এ দুর্বলতা উস্কে দিচ্ছি। এদের শিখাচ্ছি চারটে বিয়ে করা ফরজ। ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছি অশ্লীলতার দিকে। ধর্মের নামে মুসলমানকে দিয়ে ভাল-মন্দ দুটোই করানো যায়। হাতে কোরান দেখলে এরা মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নেয়। এ আমার সফল অভিজ্ঞতা। আমি এমন একদল লোক তৈরী করব যারা কোরান হাতে নিয়ে মসজিদে বসেই জিহাদ এবং সৎকর্ম নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আমি মেয়েদের ব্যাপারে ওদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করে দিচ্ছি। সালাহুদ্দীন মেয়েদের সামরিক ট্রনিং দিচ্ছে। আমি ওদের ঘরের কোণে বন্দী রেখে অর্ধেক জনশক্তি বেকার করে দেব।’

    ‘সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছাড়ানো উচিৎ।’ একচোখা লোকটির সঙ্গী বলল। ‘সালাহুদ্দীনের বড় সাফল্য, তিনি ফৌজ এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। এ মহূর্তে যদি ঘোষণা করেন, ফিলিস্তিন জয় করব, তবে মিসরের সব মানুষ তার সঙ্গী হবে।’

    ‘তিনি এমন ঘোষণা দেবেন না। কারণ তিনি বুদ্ধিমান। আবেগপ্রবণ লোক তিন পছন্দ করেন না। একশ’ উত্তেজিত জনতার চেয়ে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিককে তিনি বেশী প্রাধান্য দেন। তিনি সস্তা শ্লোগান দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করার লোক নন, তিনি বাস্তববাদী। মানুষকে বাস্তবতা আর প্রশিক্ষণ থেকে দূরে রেখে আবেগপ্রবণ করাই আমাদের কাজ। চিন্তা ছেড়ে দেবে মুলসমানরা। অবাস্তব আবেগে উত্তেজিত হবে। থমকে যাবে শত্রুর নিক্ষিপ্ত প্রথম তীর দেখে। আবেগ ছাড়া ওদের সব কিছুই আমরা নিঃশেষ করে দেব। দেখনি ওয়াজে আমি সালাহুদ্দীনের কেমন প্রশংসা করেছি।’

    ‘এসব কথা পরে হবে। আমরা উষ্ট্রী দুটো দেখতে চাই। তারপর বলুন, আমাদের কিভাবে আশ্রয় দেবেন। ও দু’জন ছাড় এখানে কি অন্য কোন লোক থাকে?’

    ‘না, এখানে আর কেউ থাকে না।’

    ইমাম সাহেব এখন সন্দেহমুক্ত। আলাপচারিতা থেকে তিনি নিঃসন্দেহ হয়েছেন যে এরা গোপন ঘাতক দলের সদস্য। তিনি তালা খুলে কামরায় প্রবেশ করে বসতে দিলেন ওদের।

    ‘আপনারা বসুন, আমি ওদের নিয়ে আসছি।’

    কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। একটু পর ফিরে এলেন সঙ্গে দুই অপরূপা যুবতীকে নিয়ে। দু’জনই আরব্য রজনীর পরীদের মত অপূর্ব সুন্দরী। পরনে মখমলের কালো ঘাগরায় সোনালী জরির কাজ, উপরে দুধে-আলতা রঙের হাতাকাটা মিনি ব্লাউজের ওপর পাতলা রেশমী ওড়না। চোখে মুখে স্নিগ্ধ কমনীয়তার কোমল পরশ। কচি লাউ ডগার মত সতেজ আর পেলব ত্বক।

    লোকজন জানে এরা ইমাম সাহেবের স্ত্রী। আপাদমস্তক বোরকায় ঢেকে ওদের এখানে আনা হয়েছিল। এখন বোরকা নেই। দেহের বেশীল ভাগ উন্মুক্ত। ওদের সাথে যুবতীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে আলমারী থেকে মদের বোতল বের করলেন ইমাম সাহেব। গ্লাস ভরলেন। লোক দু’জন ছু’ল না, এমনকি এক নজর দেখেই চোখ ধাঁধাঁনো যুবতীদের দিক থেকেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।

    ‘আগে কাজের কথা বলি, তারপর এসব হবে।’ বলল একচোখা লোকটি।

    ‘আমরা দু’জনকে হত্যা করতে চাই।’ সঙ্গীর কণ্ঠ, ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবী এবং আলী বিন সুফিয়ান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তাদের আমরা কখনও দেখিনি। ওদেরকে চিনিয়ে দেবেন। আপনি কি দেখেছেন কখনও?’

    ‘এতবেশী, এখন অন্ধকারেও ওদের চিনতে পারব। ওদের চেনাই ছিল আমার এ অভিযানের প্রথম কাজ। আলী ভীষণ ঘাগু। ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ। তবে ছদ্মবেশে এলেও আমি তাকে ঠিকই চিনতে পারব।’

    ‘সালাহুদ্দীনের ব্যাপারে কি অভিমত?’ একচোখা লোকটি বলল।

    ‘তাকেও চিনতে কষ্ট হবে না।’

    একচোখা লোকটি কানের কাছে তুলে আনলেন হাত। এক ঝটকায় খুলে আনলেন কৃত্রিম দাড়ি, গোঁফ। ছুঁড়ে ফেললেন দূরে। টেনে ছিঁড়ে ফেললেন চোখের হলুদ পর্দা। মুর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন ইমাম সাহেব। হাঁ হয়ে গেছে মুখ। বিষ্ফারিত চোখ। আতঙ্কিত মেয়ে দু’টো একবার তাকাচ্ছিল ছদ্মবেশী লোকটির দিকে আবার দেখছিল ভয়ে পাংশু হয়ে যাওয়া ইমাম সাহেবের মুখের দিকে। ভয়, আতঙ্ক আর উদ্বেগ মেশানো কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল ইমাম সাহেব, ‘সালাহুদ্দীন আয়ুবী!’

    ‘হ্যাঁ বন্ধু! আমি সালাহুদ্দীন আয়ুবী, তোমার খ্যাতি শুনে ওয়াজ শুনতে এসেছিলাম।’

    সঙ্গীর দাড়ি মুঠোয় চেপে এক ঝটকায় খুলে ফেললেন সুলতান আয়ুবী।

    ‘হ্যাঁ চিনি।’ ইমামের কণ্ঠে পরাজয়। ‘আলী বিন সুফিয়ান।’

    আকস্মাৎ মেয়ে দু’টো ঘুরে পেছনের আলমিরার ওপর থেকে ছুরি টেনে নিল। সালাহুদ্দীন আয়ুবী ও আলী বিন সুফিয়ান ওদের ক্ষিপ্রতা দেখে মোটেও অবাক হলেন না। ওরা যে সব রকমের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তা ওদের ক্ষিপ্রতা দেখেই বুঝে নিলেন।

    ওরা যখন মেয়েদের তৎপরতা দেখছিলেন সেই ফাঁকে ইমাম সাহেব পেছনে হাত চালিয়ে বের করে আনলেন তরবারী। চোখের পলকে আঘাত করলেন সালাহুদ্দীনের মাথায়।

    সালাহুদ্দীন আয়ুবী এ আঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। চকিতে সরে দাঁড়ালেন তিনি।

    ততক্ষণে দু’জনই জুব্বার বেতর থেকে তরবারী বের করে নিয়েছেন।

    তরবারী চালনায় দক্ষ হলেও আরবের বিখ্যাত দুই বীরের সামনে দাঁড়াতে পারল না ওরা।

    আলী মেয়েদের ছুরি ধরা হাতের কনুই বরাবর ছেড়ে লাথি চালালেন। সাঁই করে ছুটে গিয়ে ছুরি দুটো দেয়ালে ঠক করে বাড়ি খেল।

    সালাহুদ্দীনের তলোয়ার স্পর্শ করল ইমামের তরবারী। তলোয়ারে তলোয়ার ঠেকিয়ে চাপ বাড়ালেন তিনি। পেছনে সরে যেতে চাইল ইমাম। সালাহুদ্দীন ওর দু’পায়ের ফাঁকে নিজের পা ঢুকিয়ে দিয়ে ওকে আরেকটু ঠেলে দিলেন পিছনে। ফলে তাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে পড়ে গেল ছদ্মবেশী ইমাম। হাত থেকে ছিটকে গেল তলোয়ার।

    আলী এগিয়ে এসে অস্ত্রগুলো তুলে নিল এক এক করে। সালাহুদ্দীন আলীকে বললেন, ‘বাইরে তোমার যে বন্ধুরা আছে ডাক তাদের।’

    বেরিয়ে গেলেন আলী। ফিরে এলেন অস্ত্রধারী ছ’জন সঙ্গীকে নিয়ে। এতক্ষণ এরা বাইরে পাহারা দিচ্ছিল।

    পরদিন মসজিদের সামনে জনতার প্রচণ্ড ভীড় জমে উঠল। ইমাম এবং মেয়ে দু’টোকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল জনতার সামনে। ছদ্মবেশী ইমাম সাহেব কিভাবে জিহাদ আর যৌনতার বিরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা তুলে ধরা হল জনতার সামনে।

    সালাহুদ্দীন আবেগময় ভাষায় বললেন, ‘মুসলিম ভাইয়েরা আমার! আমার কাছে ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর কালাম ও রাসূলের সুন্নাহ। প্রিয় নবী (সা.) যা বলেছেন ও করেছেন ইসলাম বলতে আমি তাকেই বুঝি, এর বেশীও না কমও না। পরহেজগারীর নামে দিনরাত মসজিদ ও খানকায় পড়ে থাকার নাম ইসলাম হতে পারে না। আল্লাহ যেমন জামাতে নামাজ পড়ার কথা বলেছেন তেমনি বলেছেন নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এটাই ইসলাম।

    আপনারা দেখতে পেয়েছেন কিভাবে সুফী ও দরবেশ সেজে আমাদেরকে কর্মবিমুখ করার সুগভীর চক্রান্তে মেতে উঠেছে শয়তানরা। যেখানে প্রিয় নবীর সহধর্মিনীরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, ছুটে গেছেন জেহাদের ময়দানে, পূর্ণ্যময়ী মহিলা সাহাবীগণ শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন, সেখানে পর্দার নামে আমাদের অর্ধেক জনশক্তিকে গৃহবন্দী করার পায়তারা করছে। যেন রাসূলের চাইতে তারা ইসলাম বেশী বুঝে, সাহাবীদের চাইতে তারা বেশী মুত্তাকী ও পরহেজগার। এ ধরণের আলেমদের ব্যাপারে আপনারা সতর্ক থাকবেন, এরা আলেম নয় খ্রিষ্টানদের চর। ইসলাম কোন ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। আমাদের মেয়েরা অবশ্যই পর্দা করবে, তবে ততটুকুই, যতটুকু করার জন্য ইসলাম তাদের নির্দেশ দিয়েছে। আবার আমাদের মেয়েরা সমাজিক ক্রিয়াকর্মেও অংশগ্রহণ করবে, তাবে ততটুকুই, যতটুকু করার অধিকার ইসলাম তাদের দিয়েছে।

    ঘরে আগুন লাগলে পর্দার জন্য মেয়েদের ঘরের ভেতর পুড়ে মরতে হবে ইসলাম যেমন এ কথা বলে না, তেমনি খোলামেলা শরীরে রাস্তায় ঘুরে বেহায়াপনা ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অবাধ লাইসেন্সও দেয় না ইসলাম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মধ্যমপন্থী জাতি। আমরা আমাদের মাতা-ভগ্নীদেরকে বাজারের পণ্য বানাতে পারি না, এ ধরনের যে কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে, সেই সাথে শরিয়ত নির্ধারিত পন্থায় ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণের সকল সুযোগ তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে তাদের মর্যাদা ও অধিকারকেও নিশ্চিত করতে হবে।

    বন্ধুরা আমার, ওরা আমাদের ভালবাসার মন্ত্র শোনায়, মানবতার কথা বলে। আমরা ওদের মত ঘৃণার বেলুনের ওপর ভালবাসার রঙিন মোড়ক লাগাই না। আমরা মানুষকে ভালবাসি হৃদয়ের গভীর মমতা দিয়ে। আমাদের আদর্শ সেই মহামানব, প্রতিদিন চলার পথে কাটা বিছিয়ে রাখার পরও নিঃসঙ্গ অসুস্থ বুড়িকে সেবা দিয়ে যিনি আপন করে নিতে পারেন।

    ভালবাসা ও সেবার ক্ষেত্রে জাত-পাতের কোন ভেদাভেদ করতে শিখিনি আমরা। আমাদের নবী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় সে আমার উম্মত নয়। এর চে’ অধিক মানব প্রেমের কথা কে কবে বলেছে? যার মাঝে এতটুকু মানব প্রেমের সৃষ্টি না হবে সে মুসলমান হবে কেমন করে। ভেবে দেখুন, যদি আমরা নবীর উম্মতই হতে না পারলাম তবে আমাদের এতসব এবাদত বন্দেগী কোন কাজে লাগবে?

    তাই তো আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে মানবতারই জয় ঘোষিত হয়। ইসলাম চায় মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। তাই মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা একজন মুজাহিদের পবিত্র দায়িত্ব। মানুষের আহার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য চেষ্টা করা আমাদের কাছে নিছক দুনিয়াবী কাজ নয়, বরং একজন সত্যিকার মুজাহিদের কাছে এটুকু ইসলামের ন্যুনতম দাবী। এ দাবীকে পাশ কাটিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি না আমরা। আবার আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার চেষ্টা বাদ দিয়ে কেবল দুনিয়াবী সমস্যার সমাধান করাকেও আমরা ইসলাম মনে করতে পারি না।

    প্রিয় ভাইয়েরা, আমাদের সংগ্রাম তাই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর সংগ্রাম। ওরা আমাদের অস্ত্রের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে আমরা রক্তপিপাসু। না, ক্ষমার মহত্তম দৃষ্টান্ত আমরাই দেখাতে পারি। এক ফোটা রক্ত না ঝরিয়েও আমরা মক্কা জয় করতে পারি। তারপরও আমাদের নবীকে অর্ধশতাধিক লড়াই পরিচালনা করতে হয়েছিল কি জন্য? মানবতার অপমান আমরা বরদাস্ত করতে পারি না। মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আমরা আপোষ করতে পারি না। আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছি নিপীড়িত মজলুম মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। চোর যদি ধর্মের কাহিনী শুনতো তবে আমাদের অস্ত্র হাতে নেয়ার প্রয়োজন হত না। কিন্তু আমরা জানি, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।

    সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আমাদের এ লড়াই অব্যহত থাকবে। খ্রিষ্টানদের যে কোন হামলা ও ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেয়ার জন্য সবসময় সজাগ ও প্রস্তুত থাকার জন্য আমি আপনাদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।’

    সালাহুদ্দীনের বক্তৃতার পর খ্রিষ্টান গোয়েন্দাদের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেয়া হল। অবাক বিস্ময়ে জনতা শুনল ছদ্মবেশী ইমাম এবং মেয়ে দু’টোর স্বীকারোক্তি।

    তারপর জনতাকে একজন একজন করে লাইনে দাঁড় করিয়ে ইমাম সাহেবের ঘরে নিয়ে দেখানো হল ক্রুশ, মেরী আর যিশুর মূর্তি। সাধারণ মানুষের সামনে খুলে গেল এক ছদ্মবেশী খ্রিষ্টান গোয়েন্দার অপকর্মের নমুনা।

    * * *

    সুলতানের নির্দেশে সমগ্র দেশে গুপ্তচরের নিশ্ছিদ্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন আলী বিন সুফিয়ান। খ্রিষ্টান গোয়েন্দায় ভরে গিয়েছিল দেশ। ইসলামী সংস্কৃতি বিনষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্র সুলতানকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

    একজন ইমাম ইসলামী চিন্তাধারা পাল্টে দিচ্ছে সংবাদ পেয়েও তিনি তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেননি। বলেছিলেন, ‘আলী! ধর্ম আজ বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হতে শুরু করেছে। ইমাম সাহেব হয়ত এমন কোন উপদলের লোক। অথবা তিনি মনগড়া তাফসীর করছেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমি প্রশাসক—আলেম নই, যদি তাকে গুপ্তচর মনে কর ভালভাবে যাঁচাই বাছাই করে নাও। আমার চাইতে একজন ইমামের মর্যাদা অনেক উর্ধে।’

    গোয়োন্দা হলে চিনে ফেলতে পারে এ জন্য আলী নিজে মসজিদে যাননি। ক’জন লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দশ থেকে বার দিন গিয়েছে ওরা। আলীকে শুনিয়েছে ইমামের বক্তৃতার হুবহু বর্ণনা।

    আলী সুলতানকে বললেন, ‘লোকটা গোয়োন্দা না হলেও ভ্রান্ত আকিদার। তাকে ধরা উচিৎ। সে এমনভাবে জিহাদের ব্যাখ্যা করছে যা শুধু একজন শত্রুর পক্ষেই করা সম্ভব।’

    সুলতান মনোযোগ দিয়ৈ আলীর কথা শুনে বললেন, ‘ব্যাপারটা মসজিদ এবং ইমাম সম্পর্কে। কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগে আরেকটু যাচাই করা দরকার।’

    অবশেষে সুলতান সিদ্ধান্ত নিলেন আলী সহ নিজেই যাবেন ইমামের ওয়াজ শুনতে।

    আহমদ কামালের গ্রেফতার করা মেয়েটার কাছ থেকে আলী জেনে নিয়েছিলেন খ্রিষ্টান গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত কোড বা সংকেত। মেয়েটা বলেছিল, ‘গোয়েন্দারা কেউ কারো নাম বলে না। ‘আমরা মেঘ নিয়ে আসব’ বলে পরস্পরকে পরিচিত হতে হয়। সুলতান তাই করেছিলেন। ধরা পড়ল ইমাম।

    ওদের তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়ে তদন্ত শুরু করলেন গোয়েন্দা প্রধান।

    তদন্তে জানা গেল, কায়রো উপশহরের এ মসজিদ জামে মসজিদ না হলেও মুসল্লীর অভাব নেই। এলাকাটায় মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত লোকের বাস। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় এখানকার লোকগুলো জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। ফলে বেশিরভাগ লোকই কুসংস্কারে বিশ্বাসী। ওরা সহজেই মন ভোলানো আবেগময় কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

    ছ’সাত মাস ধরে এলাকার মসজিদের কথা সবার মুখেমুখে। নতুন পেশ ইমাম এশার পর এমন ওয়াজ করেন যা কেবল মর্মস্পর্শীই নয়, অভিনব ও চিত্তাকর্ষকও।

    ঘটনার বিবরণে জানা গেল, ‘একদিন দু’জন স্ত্রীসহ একজন লোক এল গাঁয়ে। উঠল এক ব্যাক্তির ঘরে। দেখতে আলেমের মত। মসজিদে আসা যাওয়া করতে লাগলেন তিনি। ধীরে ধীরে ইমাম সাহেবের ভক্ত হয়ে গেলেন নতুন আলেম।

    পনর ষোল দিন পর একদিন ইমাম সাহেব মসজিদে এলেন না। খবর নিয়ে জানা গেল তিনি অসুস্থ।

    হাকীম সাহেব তার বাসায় গিয়ে দেখলেন ইমাম সাহেবের পেটে ব্যাথা। কোন ওষুধ কাজ হল না। তিন দিন পর মারা গেলেন ইমাম সাহেব। ইমাম সাহেব যেদিন অসুস্থ হন সেদিন আগন্তুক আলেম গ্রামে ছিলেন না, আগে যেখানে থাকতেন সেখান থেকে জিনিসপত্র আনতে গেছেন।

    ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর দিন ফিরে এলেন তিনি।

    পরনে লাল জুব্বা, ফর্সা চেহারা, ধূসর দাড়ি, মধুর তেলওয়াত। ইমাম সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘আহা! অমন ভাল লোক আর হয় না। উনি তো চলে গেলেন, এখন আমাদের কি হবে?’

    ‘কি হবে মানে?’

    ‘না, বলছিলাম, এখন তো আমাদে একজন ইমাম দরকার।’

    ‘তা দরকার বৈকি। তবে কিছু মনে না করলে বলব, আপনার যা এলেম-আমল এ দায়িত্বটা যদি আপনি নেন তবে আমাদের আর কোন দুশ্চিন্তা থাকে না।’

    তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বরলেন, ‘আপনারা সবাই চাইলে এ দায়িত্ব আমি নিতে পারি। এখানে থাকলে নিরিবিলিতে কিছু এবাদত বন্দেগীর সুযোগ পাবো। যদিও শহরে ইমামতি করেই দিন কাটাতাম কিন্তু হৈ-হাঙ্গামা এ বয়সে আর ভাল্লাগেনা বলেই এখানে চলে এসেছি।’

    তার কথায় লোকজন খুবই খুশি হল। ইমাম হিসাবে এমন একজন অভিজ্ঞ আলেম পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। এলাকার গণ্যমান্য লোকজন সামান্য পরামর্শের পর তাকেই ইমাম হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিল।

    বেতন নিয়ে তিনি কোন দরকষাকষি করলেন না। বললেন, ‘আপনারা যা বিবেচনা করে দেবেন তাতেই আমার হবে। তবে কারো দেওয়া নজরানা, হাদিয়া বা তোহফা আমি গ্রহণ করতে পারবো না। আমার দরকার শুধু খাওয়া-পরা ও স্ত্রীদের নিয়ে পর্দা পুশিদা মত থাকার মত একটা বাড়ি।’

    লোকজন মসজিদের পাশেই কায়েক কামরার একটি বাড়ী খালি করে দিল। সবার সামনে তিনি বাড়ীতে এসে উঠলেন। সাথে দুই স্ত্রী। স্ত্রী দু’জনই বোরকা পড়া, হাতে দস্তানা, পায়ে মোজা। লোকজন হুজুরের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সরবরাহ করল। তার ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হল সবাই। সকলকে মোহিত করল তার সুরেলা কণ্ঠের যাদু।

    মসজিতে আযান দিলেন মৌলভী সাহেব। আযানের শব্দে নিরবতা ছেয়ে গেল সমগ্র এলাকায়। যেন ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে পবিত্র এক সুর। সুরের মূর্চ্ছনায় মসজিদে ছুটে এল মানুষ। যারা বাড়ীতে নামাজ পড়তেন ছুটে এলেন তারাও। এশার পর সমবেত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে ওয়াজ করলেন তিনি। বললেন, প্রতিরাতে এভাবে ওয়াজ করবেন।

    সুরেলা কণ্ঠের প্রতিদিন রাতে এশার নামাজের পর নিয়মিত ওয়াজ করে যাচ্ছেন ইমাম সাহেব। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর খ্যাতি। ছ’সাত মাসের মধ্যে তিনি পুরো এলাকায় সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। তার ভক্তের সংখ্যা বেড়ে চলল প্রতিদিন। অনেকে মুরিদও হল। এ মসজিদে আগে জুম্মা পড়া হত না, তিনি প্রথম জুম্মা চালু করলেন।

    চারদিকে ইমাম সাহেবের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে ওয়াজ শুনতে ছুটে আসতে লাগল দূর-দূরান্তের লোকেরা। তার আলোচনায় স্থান পেত ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো। ইবাদাত এবং ভালবাসা ছিল প্রধান বিষয়। মানুষকে বুঝাতেন, মানুষ নিজে তার ভাগ্য গড়তে পারে না। মানুষ এক দুর্বল কিটাণুকীট। খোদার হাতেই মানুষের ভাগ্য। ওয়াজের সময় পবিত্র কোরান থাকত তার হাতে। মন্ত্রমুগ্ধের মত শ্রোতারা তার কথা শুনত। তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশংসা করে বলতেন, ‘মিসরের সৌভাগ্য যে, তার মত এমন এক ব্যক্তিত্বকে পেয়েছে শাসক হিসাবে।’

    তিনি জিহাদের নুতন ব্যাখ্যা দিলেন। মানুষ নির্দ্বিধায় তা মেনে নিল।

    সুলতান আইউবী খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে জেহাদে শরীক হওয়ার আহ্বান জানালে দু’টো কারণে এ এলাকার লোকারা ব্যাপকভাবে তাতে সাড়া দিয়েছিল। প্রথম কারণটি ছিল অর্থনৈতিক। সুলতান সৈন্যদের যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা দিতেন।

    দ্বিতীয় কারণ, সালাহুদ্দীন আইউবীর দেয়া জ্বালাময়ী ভাষণ। তিনি যখন বললেন, ‘খ্রিষ্টানরা পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের চিহ্ন মুছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হল জিহাদের ময়দানে ঝাড়িয়ে পড়া’ তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ঈমানের শিখা জ্বলে উঠল। জিহাদ যে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ সুলতান ওদেরকে তা ভালভাবেই বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে ইসলামের জন্য জীবন দেওয়ার উদগ্র বাসনা নিয়েই ওরা সুলতানের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিল। এদের বিশ্বাসে চিড় ধরাবার জন্যই ইমামরূপী গোয়োন্দা এখানে আশ্রয় গেড়েছিল।

  • ভয়ংকর ষড়যন্ত্র

    ভয়ংকর ষড়যন্ত্র

    দীর্ঘদিন থেকে সুলতান মিসরে অনুপস্থিত। বেড়ে গেছে বিরোধীদের তৎপরতা। খ্রিস্টানরা উস্কে দিয়েছে পদচ্যুত ফাতেমী খেলাফতের অংশীদারদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন। খ্রিস্টান গোয়েন্দায় ভরে গেছে সমগ্র কায়রো। অর্থ আর নারী দেহের উষ্ণতায় নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে সুলতানের বিশ্বস্ত কয়েকজন। গোয়েন্দা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ইহুদি যুবতীদের কুটজালে ধরা ‍দিয়েছে প্রশাসনের উচ্চভিলাষী কতিপয় কর্মকর্তা। ওদের জাতীয় চেতনাবোধ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ক্ষমতার মোহে বিভোর এসব ব্যাক্তিদের হারেমের শোভাবর্ধন করছিল খ্রিস্টানদের রুপসী গোয়েন্দা যুবতীরা।

    ঘাতক দলের সদস্যরা ছিল আরও তৎপর। মিসর এখন ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের লীলাভূমি। অবস্থা এমন যে, কেবলমাত্র কোন অলৌকিক ঘটনাই মিসরকে রক্ষা করতে পারে।

    খ্রিস্টানদের সহযোগিতায় সুদানীরা মিসর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সেনাবাহিনীর এক অংশ বিদ্রোহের জন্য তৈরী। ভারপ্রাপ্ত গভর্নরের চোখে ঘুম নেই। সালাহুদ্দীন আইউবী সময়মত না এলে মিশর রক্ষা করা যাবে না। একসঙ্গে ভেতরের এবং বাইরের মোকাবিলা করা ভারপ্রাপ্ত গভর্ণরের পক্ষে সম্ভব নয়।

    খিজরুল হায়াত। দ্বীনদার এবং বিশ্বস্ত। মিসরের অর্থ সচিব। সাদামাটা জীবন পছন্দ করেন, অমায়িক। সুলতান নিজেই তাকে অর্থ সচিবের পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার সাথে মিসরের অর্থনীতি পুনঃ বিন্যাস করেছেন তিনি। এক রাতে বাইরে থেকে ফিরেছেন হায়াত। সবেমাত্র বাড়িতে পা রেখেছেন। আঁধার ফুঁড়ে ছুটে এল একটা তীর। বিধঁল খিজরুল হায়াতের পিঠে। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। উপর হয়ে পড়ে গেলেন তিনি। কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এল ব্যথাভরা চিৎকার। চিৎকার শুনে চাকর বাকররা ছুটে এল। ছুটে এল পরিবার পরিজন। ঘটনার আকস্মিকতায় থ’ হয়ে গেছে সবাই। কারও মুখে কথা নেই। মারা গেছেন খিজরুল হায়াত। একজন চাকর লক্ষ্য করল মৃত্যুর পূর্বে তিনি মাটিতে কিছু লেখার চেষ্টা করছিলেন। চাকরটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। মাটিতে লিখা মুসলেহ। ‘হ’ টা অর্ধেক লিখেছেন হত্যাকারীর পুরো নাম লিখার পূর্বেই মারা গেছেন তিনি। লিখাটা সংরখন করে লাশটা তুলে নেওয়া হল। একজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলকিসের কাছে। গিয়াস ছিলেন সুলতানের বিশ্বস্ত। আলী বিন সুফিয়ানের মত অপরাধ দমনে অভিজ্ঞ।

    সংবাদ পেয়েই ছুটে এলেন গিয়াস বিলকিস। গভীর মনযোগ দিয়ে নামটি দেখলেন। ততোক্ষণে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান মুসলেহ উদ্দিনও ছুটে এসেছেন। গিয়াস দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলেন তাকে। সন্তর্পণে মাটির লেখাটা পা দিয়ে মুছে ফেললেন।

    ‘যত তারাতাড়ি সম্ভব হত্যাকারীকে খুঁজে বের করুন।’ বললেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। ‘আগামীকাল ভোরেই আমি অপরাধীকে দেখতে চাই।’

    ‘আমি অপরাধীকে খুঁজে বের করব স্যার।‘ পুলিশ প্রধানের কন্ঠ।

    সবাই ফিরে গেলেন। রাতে গিয়াস খিজরুল হায়াতের সহকারী অফিস স্টাফসহ তার নিকটস্থ লোকদের ডেকে পাঠালেন। ওদের কাছে জানা গেল, আজ হায়াত সচিবদের এক মিটিংয়ে অংশগ্রহন করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সহকারি। মিটিংয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে সামরিক বাজেটের প্রসঙ্গ আসে। হায়াত বললেন, ‘সুলতান সুবাকে নতুন ফৌজ ভর্তি করেছেন। ওদের বেতনাদি দিতে হলে মিসরে অপ্রয়োজনীয় বাজেট কমাতে হবে।’

    এর বিরোধীতা করলেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি বললেন, ‘নতুন সৈন্য ভর্তি করার পূর্বে আমাদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। এমনিতেই সেনাবাহিনী সাদা হাতীতে পরিণত হয়েছে। মিসরের ফৌজ অশান্ত হয়ে আছে। তাদের অভিযোগ, সুবাকে প্রাপ্ত গনিমতের মাল থেকে তাদেরকে কিছুই দেওয়া হয়নি।’

    ‘আপনি কি জানেন না, গনিমতের সম্পদ ভাগ-বাটোযারা করে দেয়ার নিয়ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে?’

    হায়াত বললেন, ‘চমৎকার সিদ্ধান্ত। যারা গনিমতের জন্য যুদ্ধ করে তাদের ভেতর জাতীয় চেতনাবোধ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকে না।’

    এক পর্যায়ে এ আলোচনা বিতর্কে রূপ নিল। উত্তেজিত হয়ে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান বললেন, ‘সুলতান মিসরীয় সৈন্যদের সাথে ভাল ব্যবহার করেন না, যেমনটি করেন সিরীয় এবং তুর্কি সৈন্যদের সাথে।’

    ‘মনে হচ্ছে খ্রিস্টান এবং ফাতেমীরা আপনার মুখ দিয়ে কথা বলছে।’

    উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে মিটিং সমাপ্ত করে দেওয়া হল। অর্থ সচিবের সহকারী জানালেন, মিটিং শেষে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান স্যারের অফিসে এলেন। এখানেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হল। স্যার উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে বললেন, ‘আমি সুলতানের কাছে এ প্রসঙ্গ তুলব। বলব, আপনি ভর জলসায় সবাইকে বুঝাতে চেয়েছেন যে সেনাবাহিনী অশান্ত। আপনি বলেছেন, সুলতান সবার সাথে সমান ব্যবহার করেন না এবং গনিমতের মাল মিসরের সৈন্যদের না দিয়ে অন্য সৈন্যদের দিচ্ছেন। এছাড়া আপনি আমাকেও আপনার দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধান কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় বললেন, ‘তুমি বেঁচে থাকলে তো সুলতানকে এসব জানাবে।’

    উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে গিয়াস কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। কারণ পুলিশ বিভাগ তার অধীন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলার পূর্বে অবশ্যই প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকতে হবে। পুলিশ প্রধান বুঝলেন এ হত্যা ব্যাক্তিগত কারণে হয়নি। তিনি গোপনে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন।

                                                   

    পুলিশ প্রধান বিভিন্ন প্রমাণে যা জানলেন, তা হল, হত্যা ঘটনার দু’দিন পর মুসলেহ উদ্দীন রাতে বাসায় ফিরলেন। প্রথম স্ত্রী তাকে ডেকে নিলেন নিজের কক্ষে। তিনি ঢুকতেই স্ত্রী বিশটা আশরাফি তার সামনে রেখে বললেন, ‘খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী এ বিশ আশরাফি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।’ স্ত্রী এক টুকরা কাগজ স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। তাতে লেখা ছিল- ‘পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টুকরা স্বর্ণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু দিয়েছেন বিশ আশরাফি। আপনার স্ত্রীর কাছে দিয়ে গেলাম। আমাদের ধোকা দিয়েছেন। এখন একশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দিতে হবে। তা নয়তো একটা তীর খিজরুল হায়াতের মত আপনার হৃদপিন্ডেও গেঁথে যাবে।’

    মুসলেহ উদ্দীনের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কিছুটা সংযত হয়ে বললেন, ‘তুমি কি বলছ? ওরা কারা? কাউকে আমি কোন আশরাফি দেয়ার কথা বলিনি। বিশ্বাস কর, হায়াতের হত্যার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।’

    তুমিই হায়াতকে হত্যা করেছ। কি কারণে জানি না, তবে তুমি যে তার হত্যাকারি এতে কোন সন্দেহ নেই।’

    মুসলেহ উদ্দীনের প্রথম স্ত্রী সাবেরা। বয়স ত্রিশের কোঠায়, সুন্দরী। দেহের গাঁথুনি এখনও অটুট। পুরুষকে আকর্ষণ করার মত রূপ এখনও তার রয়েছে। মাস খানেক পূর্বে অপরূপা একজন তরুনীকে বাড়ি নিয়ে এসেছেন মুসলেহ উদ্দীন। এরপর থেকেই প্রথম স্ত্রীর কক্ষে যাওয়া বন্ধ। কয়েক দিনই তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সাবেরা, কিন্তু তিনি যাননি। তখন একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বেআইনী ছিল না। স্ত্রীরাও এতে কিছু মনে করতেন না। হত্যাকারীদের চিঠি পেয়ে ভড়কে গেলেন সাবেরা। স্বামীর অকল্যাণ কল্পনায় কেঁপে উঠল তার মন। এজন্যই তাকে ‍নিজের কক্ষে ডেকে এনেছিলেন।

    ‘মুখ বন্ধ রাখবে সাবেরা।’ গম্ভীর কন্ঠে বললেন মুসলেহ উদ্দীন। ‘এ হচ্ছে আমার দুশমনের একটা চাল। তারা তোমার এবং আমার মাঝে শত্রুতা সৃষ্ঠি করতে চাইছে।’

    ‘আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা ছাড়া তোমার মনে কি অন্য কিছু আছে?’

    ‘তোমায় আমি ভালবাসি সাবেরা। সেই প্রথম দিনের মত। তুমি কি ওদের কাউকে চিনতে পেরেছ?’

    ‘ওরা মুখোশ পরেছিল। তবে তোমার মুখোশ খুলে গেছে। তোমায় আমি চিনে গেছি।’

    স্বামী কিছু বলতে চাইছিলেন। তাকে কিছু বলতে না দিয়ে সাবেরা বলল, ‘সম্ভবতঃ তুমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করেছ। জেনে ফেলেছে সচিব। এ জন্যই গোপন আততায়ীর মাধ্যমে তাকে খুন করেছ।’

    ‘কেন আমায় মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ। কোষাগারের অর্থ আমি কেন আত্মসাৎ করতে যাব?’

    ‘তোমার না হলেও যে ফিরিংগী মেয়েটাকে বিয়ে ছাড়া সাথে রেখেছ তার প্রয়োজন আছে। তোমার মদ কেনার জন্য টাকার দরকার। যদি মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে চাও তবে বল ঘোড়াগাড়ী বোঝাই করে কি এনেছ? তোমার হারেমে প্রতিদিন নতুন নর্তকী আসছে বিনে পয়সায়? তোমার মদের আসরে যে টাকা খরচ হয় তা কোত্থেকে আসে?’

    ‘চুপ কর সাবেরা। ওরা কারা আমাকে একটু খোঁজ নিতে দাও। ইস! কি ভয়ংকর চাল চেলেছে। ক’দিন পরই সত্যি ঘটনা তুমি বুঝতে পারবে।’

    ‘না, আমি চুপ থাকব না। আমার বুকে তুমি প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ। মিসরের সব লোককে ডেকে ডেকে একথা বলব। অলি-গলিতে চিৎকার করে বলব তুমি খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী। হত্যা করেছ আমার ভালবাসা। এ হত্যার প্রতিশোধ আমি নিব।

    স্ত্রীকে অনেক অনুনয় বিনয় করে মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমাকে দু’দিন সময় দাও। দু’দিনের মধ্যেই আমি ওদের খুঁজে বের করে প্রমাণ করব হায়াতকে আমি হত্যা করিনি। পুলিশ প্রধান সন্দেহজনক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে আসল খুনীকেও পাকড়াও করতে পারবে।’

    পেরিয়ে গেল রাত। পর দিনও। মুসলেহ উদ্দিন বাড়ি ফেরেননি। ফিরিংগী মেয়েটাকেও কোথাও দেখা গেল না। সন্ধায় বাড়ি ফিরলেন মুসলেহ উদ্দিন। সোজা চলে গেলেন স্ত্রীর কক্ষে। আদুরে গলায় কথা বললেন। শোনালেন ভালবাসার কথা। সাবেরা তার ধোকার জালে পা দিতে চাইলেন না। কিন্তু জাত খেলুড়ে মুসলেহ উদ্দীনের কপট ভালবাসার ফাঁদে এক সময় ধরা দিলেন স্ত্রী।’

    ‘আমি দু’দিন পর্যন্ত ওই দু’জন কে খুঁজছি। এখনও পাইনি। আশা করি পেয়ে যাব। আমি যে হত্যাকারী নই তখন তোমায় আশ্বস্ত করতে পারব।’

    আরও অনেক কথা বললেন মুসলেহ উদ্দীন। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন সাবেরা। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। চাকর-বাকরদের ছুটি দিয়ে দিলেন। সমগ্র বাড়িতে নেমে এল কবরের নিরবতা। পাহারাদার কুকুরটাকে বাড়ির এক কোণে বেঁধে রেখে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন মুসলেহ উদ্দিন।

    মাঝ রাত। বাইরের পার্টিশন ঘেঁষে দাঁড়াল এক মুখোশধারী। তার কাঁধে পিঠে দাঁড়াল দ্বিতীয় জন। তৃতীয় ব্যাক্তি তার কাঁধে উঠে পার্টিশনের ভেতর লাফিয়ে পড়ল। খুলে দিল প্রহরীহীন ফটক। বাড়ির করিডোরে উঠে এল তিনজনে। এগিয়ে চলল বিড়ালের মত নিঃশব্দে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওরা সাবেরার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকল তিনজন। একজন হাত ছোঁয়াল সাবেরার মুখে। স্বামীর হাত ভেবে আকড়ে ধরে সে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

    কোন জবাব না দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল একজন। বেঁধে দিল হাত। পাজা কোলা করে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে কাঁধে তুলে নিল। চাকর বাকর কেউ নেই। বিনা বাধায় ওরা বেরিয়ে গেল। খানিক দূরে একটা গাছের সাথে তিনটে ঘোড়া বাঁধা ছিল। রশি খুলে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল তিনজন। বস্তা তুলে নিল একজন। মিসর পিছনে ফেলে ইস্কান্দারিয়ার দিকে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো।

    সকালে চাকর-বাকররা ফিরে এল। মুসলেহ উদ্দীন ওদেরকে সাবেরার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তন্ন তন্ন করে সারা বাড়ি খোঁজা হল। সাবেরা কোথাও নেই। এক চাকরাণীকে একান্তে ডেকে নিলেন মুসলেহ উদ্দীন। অনেকক্ষণ কথা বললেন দু’জন। এরপর তাকে নিয়ে গেলেন পুলিশের কাছে। মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমার স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার বিশ্বাস হায়াতকে ওই হত্যা করিয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি যে মুসলেহ উদ্দীনের স্ত্রী। কিন্তু পারেননি। এই চাকরাণীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।’

    পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের জবাবে চাকরাণী বলল, ‘পরশু রাতে দু’জন লোক এসেছিল। আমার মুনিব তখন ছিলেন না। দেখলাম মুখোশ পরা দু’ব্যাক্তি, ওরা বেগম সাহেবের সাথে দেখা করতে চাইল। বাড়িতে কোন পুরুষ না থাকায় আমি বললাম, এখন দেখা হবে না। ওরা বলল, ‘বেগম সাহেবের এই বিশটি আশরাফি ফেরত দিতে এসেছি।’ আমি বেগম সাহেবকে বলতেই তিনি দু’জনকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমাকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। বললেন, ‘কেউ এলে যেন তাকে সতর্ক করে দেই।’

    বাইরে থেকে আমি শুনলাম দু’জন কঠোর ভাষায় কথা বলছে আর বেগম সাহেবা অনুনয় বিনয় করছেন। তিনি আরও বললেন, আলি বিন সুফিয়ানের সহকারী হাসানকে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দেবেন। এই বিশ আশরাফি বেগম সাহেবা কিভাবে দিয়েছেন আমি জানি না। ওরা পঞ্চাশ আসরাফি দাবী করছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘তোমরা ভুল লোককে মেরেছ। হাসানকে মারতে পারনি।’

    ওরা বলল, ‘তুমি যে সময়ের কথা বলেছ ঠিক সে সময় এ লোকটি বাড়িতে ঢুকেছিল। লোকটি হাসান না অন্য কেউ আমরা দেখিনি। আমরা তীর ছুঁড়ে পালিয়ে গেছি।’

    পঞ্চাশ আশরাফি দেয়ার জন্য ওরা বেগম সাহেবাকে চাপ দিচ্ছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘আসল লোককে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দুটো সোনার টুকরা দেব।’ কিন্তু ওরা বলল, ‘যে কাজ করেছি আগে তার বিনিময় দাও, তারপর অন্য কাজ।’ বেগম সাহেবা অস্বীকার করায় ওরা বলল, ‘টাকা কিভাবে ওসুল করতে হয় আমরা জানি।’ এরপর ওরা দু’জন চলে গেল। বেগম সাহেবা আমায় ডেকে বললেন, ‘খবরদার, এসব কথা কাউকে বলবে না। আমাকে তিনি দুটো আশরাফিও দিয়েছেন। আজ সকালে তার কক্ষে গিয়ে দেখি তিনি নেই। আমার মন বলছে টাকা না দেয়ায় সে দু’জন লোকই তাকে অপহরণ করেছে।’

    পুলিশ প্রধান মুসলেহ উদ্দীনকে বসিয়ে রেখে চাকরাণীকে নিয়ে অন্য কক্ষে চলে এলেন।

    ‘এবার বল এ কথা তোমায় কে শিখিয়েছে, মুসলেহ উদ্দীন, না সাবেরা?’

    ‘এ জবানবন্দী আমার নিজস্ব।’

    ‘সত্যি করে বল সাবেরা কোথায়? কার সাথে গিয়েছে?’

    চাকরাণী ভয় পেয়ে গেল। পুলিশ প্রধানকে কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারল না। গিয়াস বললেন, ‘কিভাবে সত্যি কথা বের করতে হয় আমি জানি। তুমি এখন ফিরে যেতে পারবে না। পুলিশের শাস্তি সেলের কথা শুনেছ?’

    বিবর্ণ হয়ে গেল চাকরাণীর চাহারা। সে জানত, পুলিশের শাস্তি সেলে সত্য মিথ্যা আলাদা হওয়ার আগে দেহের হাড়গোড় আলাদা হয়ে যায়। সে কাঁদতে লাগল।

    ‘দেখুন, আমি এক গরীব মেয়ে। সত্যি কথা বললে মুনিব শাস্তি দেবেন। মিথ্যা বললে আপনারা।’

    ‘তোমার কোন ভয় নেই। তোমার নিরাপত্তার জিম্মা আমি নিচ্ছি।’

    চাকরাণী বলল, ‘হত্যার দ্বিতীয় দিন একজন মুখোশধারী এসেছিল। মুনীব বাড়ি ছিলেন না। লোকটা ছিল ফটকের বাইরে। বেগম সাহেবা ভিতরে। কি কথা হয়েছে আমরা কেউ শুনিনি। মুখোশধারী চলে গেলে বেগম সাবেরা ফিরে এলেন। হাতে ছিল একটা প্যাকেট। একরাত পর মুনীব আমাদের সবাইকে একরাতের জন্য ছুটি দিলেন।’

    ‘ইতিপূর্বেও কি সবাইকে সারা রাতের জন্য ছুটি দিয়েছিলেন?’

    ‘কখনও না। একজন ছুটিতে গেলে অন্য সবাই থাকত। আরো আশ্চর্য হল, কুকুরটাকে কখনও বেঁধে রাখা হয় না। ভয়ংকর কুকুর। অপরিচিত লোক দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ে। সে রাতে মুনিব নিজেই গেলেন কুকুরটাকে বেঁধে রাখতে।’

    ‘মুসলেহ উদ্দীনের সাথে সাবেরার সম্পর্ক কেমন ছিল?’

    ‘ইদানীং খুব খারাপ। মুনিব একটা সুন্দরী ফিরিংগী মেয়েকে বাড়ি আনার পর থেকে বেগম সাহেবার সাথে কথা বলেন না।’

    চাকরাণীকে বসিয়ে রেখে পুলিশ প্রধান উঠে গেলেন। ফিরে এলেন দু’জন সিপাই নিয়ে। সিপাইরা মুসলেহ উদ্দীনের দু’বাহু ধরে নিয়ে যেতে চাইল। প্রতিবাদ করলেন তিনি। পুলিশ প্রধান বললেন, ‘একে জেলে নিয়ে যাও। তার বাড়ি সীল করে পাহারার ব্যবস্থা কর। কাউকে বাইরে যেতে দেবে না।’

    কায়রোর উত্তরে এক সবুজ শ্যামল প্রান্তর। দুরত্ব অনেক। চারপাশে উঁচুনিচু পাহাড়। পাহাড় থেকে প্রান্তর ছুয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা ধারা। পূব আকাশ রাংগা হয়ে উঠেছে। অপহরণকারীরা ঘোড়া থামাল। নেমে এল তিনজন। বস্তার মুখ খুলে সাবেরাকে বের করে আনল। মুখের কাপড় সরিয়ে হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিল। সাবেরা অচেতন না হলেও অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করল। চিৎকার করারও শক্তি নেই। ওরা তাকে পানি পান করাল। খেতে দিল খেজুর আর রুটি। শীতল বাতাসে ওর শক্তি ফিরে এল। আচম্বিত সাবেরা উঠে দাঁড়াল। দৌড়ে টিলার আড়ালে চলে গেল। একজন মুখোশধারী ঘোড়ায় চেপে ছুটল ওর পেছনে। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল সাবেরা। মুখোশধারী তাকে ঘোড়ায় তুলে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এল।

    ‘পালিয়ে যেতে চাইলে যাও।’ বলল একজন। ‘কোথায় যাবে? এখান থেকে একজন শক্তিশালী পুরুষও এভাবে কায়রো পৌঁছাতে পারবে না।’

    সাবেরা কেঁদেকেটে ওদের গালাগালি করতে লাগল।

    ‘কায়রো ফিরে যেতে চাইলে যাও। কিন্তু ওখানে গেলেও মরবে। তোমার স্বামীই তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।’

    ‘মিথ্যে কথা।’

    ‘মিথ্যে নয়, সত্য। মজুরী হিসেবে তোমায় দিয়েছে। তোমার হাতে আমরাই আশরাফি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি তাকে বলেছ সে সচিবকে হত্যা করেছে। তুমি আরও বলেছ, এসব কথা পুলিশ প্রধানকে বলে দেবে। আগে থেকেই সে তোমার ওপর বিরক্ত। ফিরিংগী মেয়েটা তার মন দখল করে রেখেছে। মেয়েটা কে, কোথা থেকে এসেছে তোমাকে তা বলা যাবে না। পরদিন তোমার স্বামী আমাদের কাছে এল। আস্ত বেঈমান। বলেছিল কাজটা করলে পঞ্চাশ আশরাফি আর দু’টি সোনার টুকরা দেবে। কিন্তু কাজ শেষে পাঠাল বিশ আশরাফি। আমরা তোমাকে ব্যবহার করলাম। তোমার কাছে টাকা দেয়ার অর্থ যেন তুমিও ব্যাপারটা জানতে পার। বুদ্ধিটা কাজে লেগেছে। পরদিন পঞ্চাশ আশরাফি দিল। স্বর্ণের টুকরা দিল না। আমরা বললাম, ‘এখন পঞ্চাশে চলবে না। আরও বেশী দিতে হবে। না দিলে খবরটা পুলিশ প্রধানের কানে তুলে দেব।’

    তার জন্য সমস্যা ছিল ব্যাপারটা তুমি জেনে ফেলেছ। সে বলল, ‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাও। ওকে বিক্রি করে অনেক টাকা পাবে।’

    সাবেরার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সে হতভম্বের মত তিন অপহরণকারীকে দেখতে লাগল। মুখোশের মাঝখান দিয়ে দুটো করে চোখ দেখা যাচ্ছে। হিংস্র এবং ভয়ংকর। ওদের কণ্ঠে কোন হিংস্রতা ছিল না। ওরা বরং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে, এখান থেকে পালানো সম্ভব নয়।

    ‘আমি তোমাকে একবার দেখেছিলাম’, বলল একজন।

    ‘তোমার স্বামীর প্রস্তাব শুনে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে তোমাকে কত বিক্রি করা যাবে মনে মনে হিসাব করলাম। তুমি যুবতী, সুন্দরী। তোমাকে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। আমরা রাজি হলাম।’ তোমার স্বামী বলল, ‘রাতে আমার চাকর-বাকররা থাকবে না। কুকুরটাকেও বেঁধে রাখা হবে। রাতে এসে ওকে তুলে নিও।’ এ পারশ্রমিক না পেলে আমরা তাকে হত্যা করতাম। অপহরণ করতাম ফিরিংগী মেয়েটাকে। আমরা রাতে তোমাকে তুলে নিয়ে এলাম।’

    ‘তোমাকে এসব কথা বলার কারণ, তুমি স্বামীর ঘরের কথা ভুলে যাও।’ বলল দ্বিতীয় জন। ‘আমরা অসহায় কোন নারীর সম্ভ্রম নষ্ট করিনা। আমরা ব্যবসায়ী। অপহরণ এবং টাকার বিনিময়ে হত্যা করা আমাদের পেশা। তিনজন পুরুষ একজন নারীকে অপহরণ করে ভোগ করার মধ্যে কোন গর্ব নেই।’

    ‘তোমরা কি আমাকে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে বিক্রি করবে?’ কাঁপা কণ্ঠে সাবেরা জিজ্ঞেস করল। ‘শেষ পর্যন্ত এই কি হবে আমার কপালের লিখা?’

    ‘না, খারাপ কাজের জন্য জংলী এবং বেদুইন মেয়েদের ক্রয় করা হয়। তুমি সম্মানিতা গৃহ বধু। কোন আমীরের ঘরেই তুমি যাবে। আমরাও দামটা বেশী পাব। এখন কান্নাকাটি বন্ধ কর। কাঁদলে চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে বাজারে-মেয়ে হিসাবেই বিক্রি করতে হবে। এবার শুয়ে পড়। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও।’

    সাবেরা আশ্চর্য হয়েছে এতক্ষণ সময়ের মধ্যে এদের কেউ তার সাথে অশালীন আচরণ করেনি দেখে। মনে মনে স্বস্তিও পেয়েছে। রাতভর বস্তাবন্দী থেকে সমস্ত শরীর ব্যথা করছে। চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়ল ও। ঘুম ভেংগে গেল হঠাৎ। তার মাথায় চাপে আছে ভয় এবং আতংক। মনের দিক থেকে সে এ পরিণতিকে গ্রহণ করতে পারছে না। আড়চোখে তাকাল তিনজনের দিকে। ঘুমুচ্ছে ওরা। একবার ভাবল খঞ্জর বের করে ওদের হত্যা করে। বাতিল করে দিল চিন্তাটা। একা তিনজনের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চোখ পড়ল পাশে বাঁধা ঘোড়ার ওপর। পিঠে জিন বাঁধা। ও উঠে পড়ল। আলতো পায়ে এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। সূর্য নেমে গেছে টিলার ওপাশে। কায়রো কোন দিকে জানে না ও। তবুও বাঁচতে হলে পালাতে হবে ওকে। প্রয়োজনে বিশাল মরুর বিস্তারে ধুকে ধুকে মরবে, তবুও এদের হাতে সম্ভ্রম নষ্ট হতে দেবে না। আলগোছে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল সাবেরা। ছুটিয়ে দিল ঘোড়া।

    ঘোড়ার পদশব্দে তিনজনের ঘুম ভেংগে গেল। দু’জন দুটো ঘোড়ায় চেপে ছুটল তার পেছনে। টিলার বেষ্টনী থেকে বের হবার পথ জানা নেই সাবেরার। সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল এক পাহাড়। পেছনে তাকাল ও। ধাওয়াকারীরা কাছে চলে এসেছে। ঘোড়াসহ পাহাড়ে উঠতে লাগল সাবেরা। উপরে উঠে তাকাল বিপরীত দিকে, পথ পেয়ে গেল। নেমে এল নীচে। ধাওয়াকারীরাও তার পেছনে আসছে। কাছে চলে এসেছে ওরা। সামনে সমুদ্র। সমুদ্রের দিক থেকে আসছে চারজন উস্ট্রারোহী। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না ও। সাবেরা চিৎকার শুরু করলঃ ‘বাঁচাও, বাঁচাও, ডাকাতের হাত থেকে বাঁচাও।’

    ঘোড়া পৌঁছে গেল উস্ত্রারোহীদের কাছে। উস্ট্রারোহীদের দেখে মুখোশধারীরা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল। ওদের পিছু নিল উটের আরোহীরা। একজন ধনুকে তীর জুড়ে দু’জনকে লক্ষ্য করে ছুড়ল। বিঁধল এক ঘোড়ার ঘাড়ে। ঘোড়ার লাফালাফিতে পড়ে গেল সওয়ার। চার জন মিলে ওপর অশ্বারোহীকে ঘিরে ফেলল। একজনের পক্ষে চারজন তীরন্দাজের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, সে আত্মসমর্পণ করল। সাবেরা ওদের বলল, ‘এদের একজন ওপাশে রয়েছে।’ ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া আরোহীসহ তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা হল।

    এ চারজন উস্ট্রারোহী ছিল সুলতান সালাহুদ্দীনের সেনা বাহিনীর সদস্য। সাগর উপকূল এবং সমগ্র মরুভূমিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনা দল পেট্রোল ডিউটিতে রত ছিল। আচম্বিত শত্রুর আক্রমণ যেন না আসতে পারে এ জন্যই এই ব্যবস্থা। এরা কয়েক বারই বিপজ্জনক খ্রিস্টান গোয়েন্দাদের ধরে সুলতানের সামনে হাজির করেছে। সাবেরা সৈন্যদেরকে অপহরণের পুরো কাহিনী শোনাল। সে বলল, ‘উপ-রাস্ট্রপ্রধান আমার স্বামী। এ তিন ভাড়াটে খুনীদের দিয়েই তিনি অর্থ সচিবকে হত্যা করিয়েছেন। আমাকেও তুলে দিয়েছেন এদের হাতে।’

    তিন অপহরণকারীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হল। হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দুটো ঘোড়ায় করে ওদেরকে সৈন্যরা কমাণ্ডারের কাছে নিয়ে গেল। সাবেরা বসল উটের পিঠে। সূর্য ডোবার পূর্বেই এরা চার মাইল পথ অতিক্রম করল। সামনের মরুদ্যানে তাঁবু টানানো। ডিউটিরত সেনা দলের হেড কোয়ার্টার। ওরা সাবেরাকে নিয়ে গেল কমাণ্ডারের সামনে। কঠোর প্রহরায় তিন অপহরণকারীকে বসানো হল তাঁবুর বাইরে। আগামীকাল এদের কায়রো পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

                                                   

    খ্রিস্টানদের পদতলে পিষ্ট হচ্ছিল প্রিয় ফিলিস্তিন। মুসলমানদের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল পবিত্র ভূমির বালুকারাশি। দুর্দশার কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়ছিল অত্যাচারের অগ্নি বৃষ্টি। অসহনীয় নির্যাতনের দুঃসহ ব্যথায় কাৎরাচ্ছিল তৌহিদী জনতা। এমনি এক দুঃসময়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পা রাখলেন ফিলিস্তিনের মাটিতে।

    সুবাক এখন মুসলমানদের দখলে- দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ সংবাদ ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হৃদয়ে জ্বেলে দিল আশার প্রদীপ। অনাগত মুক্তির আনন্দে হিল্লোলিত হল প্রাণ। কিন্তু ওদের এ অব্যক্ত আনন্দ দুর্বিসহ বেদনা হয়ে দেখা দিল। খ্রিস্টানরা প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে দিল জেরুজালেম এবং আশপাশের জেলাগুলোর মুসলিম বসতি। এভাবেই মুসলমানদের ওপর সুবাক দুর্গ হারানোর শোধ তুলতে লাগল ওরা।

    মুসলমানদেরকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘৃণ্য তৎপরতায় মেতে ওঠা খ্রিস্টানরা সুবাকের পর ক্রাক নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ল। সালাহুদ্দীন যেন ক্রাক আক্রমণ করতে না পারে এ জন্য ক্রাকে চলল নির্বিচারে মুসলিম হত্যা। বুদ্ধির খেলায় হেরে গেছে ওরা। হাতছাড়া হয়েছে সুবাক দুর্গ। ক্রাক হাতছাড়া করা যাবে না। স্তব্ধ করে দিতে হবে সালাহুদ্দীনের অগ্রযাত্রা। ক্রাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করার পাশাপাশি তাই ওরা স্থানীয় মুসলমানদের শিরদাড়া ভেংগে দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। এখানেও খোলা হল বেগার ক্যাম্প। সামান্য সন্দেহ হলেই মুসলমানদেরকে নিক্ষেপ করতে লাগল সে ক্যাম্পে।

    ‘ফিলিস্তিন বিজয় আমাদের মহান উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্রাক থেকে নির্যাতিত মুসলমানদেরকে বের করে আনা তারচে বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।’ সুলতান সালাহুদ্দীনকে বলল গোয়েন্দা সংস্থার একজন গ্রুপ কমাণ্ডার, নাম তালাত চেঙ্গিস। তালাত একজন তুর্কী মুসলমান। সুবাক থেকে পালিয়ে যাওয়া খ্রিস্টানদের ছদ্মবেশে ক্রাকে পৌঁছে ছিল সে। ফিরে এসেছে তিন মাস পরে। গোয়েন্দা প্রধানের সামনেই তালাত সুলতানকে ক্রাকের রিপোর্ট দিচ্ছিল। ‘যে সব খ্রিস্টান সৈন্য’ লুকিয়ে ক্রাক পৌঁছেছে ওদের অবস্থা ভাল নয়। সহসা যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে পারবে না ওরা। তবে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে ওরা স্থানীয় মুসলমানদের ওপর। পুরুষদেরকে এলোপাথাড়ি গ্রেপ্তার করছে। মেয়েরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। আমরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য ওখানকার মুসলিম যুবকদেরকে গোপনে সঙ্গঠিত করতে শুরু করেছিলাম। কিছু যুবক পালিয়ে এসে ভর্তিও হয়েছে। কিন্তু চারদিকে খ্রিস্টান সৈন্য থাকায় অধিকাংশই ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আসতে পারছে না। তাছাড়া পরিবার-পরিজন ছেড়ে আসতে অনেকের অসুবিধা হচ্ছে।

    সবচে বিপদের কথা হল, কারো ওপর সন্দেহ হলেই তাকে বেগার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখনই ক্রাক আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে এ নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া আমাদের কর্তব্য।’

    এর আগে গোয়েন্দারা বলেছিল সুলতান ক্রাক আক্রমণ করলে রিমাণ্ড তার বাহিনী নিয়ে পেছন থেকে আক্রমণ করবে। সুলতানও সেনা অফিসারদের কাছে পূর্বেই এমন আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন। এ জন্য সেনা সদস্য বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল।

    সুলতান সালাহুদ্দীন তালাতকে বিদায় দিয়ে আলীকে বললেন, আবেগের দাবী হচ্ছে এ মুহূর্তে ক্রাক আক্রমণ করা। ওখানকার মুসলমানরা কি কষ্টের মধ্যে আছে আমি বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, শক্তি সঞ্চয় না করে আক্রমণ করো না। নিশ্চিত না হয়ে আক্রমণ করা যুদ্ধনীতির পরিপন্থী। আলী! আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে পুরুষদের। ইসলামের ইতিহাসে ওরা হচ্ছে নামহারা শহীদ। যে কোন জাতিকেই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এমন কোরবানী দিয়ে যেতে হয়। ওদের আব্রু, জীবন এবং ওদের দ্বীনের হেফাজতের জন্যই আমি ফিলিস্তিন শত্রুমুক্ত করতে চাই। সাধারণভাবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য আক্রমণ ও লুটপাট ছাড়া কিছুই নয়। যারা স্বীয় জাতির সন্তানদের ভুলে যায়, মুখ বুজে সহ্য করে শত্রুর নির্যাতন, তারা হয়ে যায় ডাকাত ও দস্যুদের সহযোগী। শত্রুর ওপর প্রতিশোধ না তুলে পরস্পরের সম্পদ লুণ্ঠন করে ওরা। প্রতারিত করে অন্যকে। ওদের শাসকরা গরীবের সম্পদ লুটে ভোগ বিলাসে মত্ত হয়। শত্রুরা আক্রমণ করলে অমূলক হম্বিতম্বি করে জনগণকে ধোকা দেয়। শত্রুর সঙ্গে গোপন আঁতাত করে। দেশের কোন অংশ ওদেরকে ছেড়ে দিয়ে রক্ষা করে গদী। ভোগ বিলাসের জন্যই ওরা শুষে নেয় জনগণের শেষ রক্তবিন্দু।

    অনেক জাতির শাসকগণ কেবল রাজ্য বিস্তারের মোহে যুদ্ধ করেছে। বিলাসিতার সময়টা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বইয়ে দিয়েছে রক্তের বন্যা। আজ পৃথিবী থেকে ওদের নামও মুছে গেছে। খ্রিস্টানদের মত আমরাও লড়াইকারী। কিন্তু দু’জনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে আমাদের ধর্মের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য। এসেছে আমাদের নারীদের অধিকার করে ওদের গর্ভ থেকে খ্রিস্টান জন্ম দেয়ার জন্য। আমরা আত্মরক্ষার জন্য এবং আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য লড়াই করছি। খ্রিস্টানদের এ ঝড়কে প্রতিরোধ করতে না পারলে আমরা বিবেকহীন, আত্মমর্যাদা শূন্য বলে পরিচিত হবো। আর যদি আমরা বাড়িতে বসে ওদের আক্রমণের অপেক্ষা করি তবে নিশ্চয়ই আমরা ভীত ও কাপুরুষ বলে চিহ্নিত হবো। প্রতিরোধর নিয়ম হলো, যখনি দুশমন তোমাকে হত্যা করার জন্য তরবারী কোষমুক্ত করবে, আঘাত করার পূর্বেই তোমার তলোয়ার তার শিরোচ্ছেদ করবে। সে আগামী কাল আক্রমণ করতে আসবে জানলে আজই তার মোকাবেলায় নেমে যাও যাতে সে আর আঘাত করার সুযোগ না পায়।’

    ‘নূরুদ্দীন জঙ্গীর কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায় না?’ আলী বললেন, ‘সাহায্য পেলে সাথে সাথেই আমরা ক্রাক আক্রমণ করতে পারতাম।’

    ‘না, তাঁর কাছে সবসময় এমন সৈন্য থাকা দরকার, আমরা পেছন থেকে আক্রান্ত হলে তিনি যেন ওদেরকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারেন।’ সালাহুদ্দীন বললেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার পক্ষপাতি নই, বরং গেরিলাদের পাঠিয়ে আমরা ওদের ঘুম হারাম করে দিতে পারি। আমার বিশ্বাস, আমাদের গুপ্তচর এবং গেরিলারা মিলে শত্রুর মূল উপড়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু ওখানকার নিরপরাধ মুসলমানদেরকে এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। কারণ, কমাণ্ডো বাহিনী কাজ শেষে এদিক ওদিক পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওখানকার নিষ্পাপ মুসলমান ভাই-বোনগুলো পালাতে পারবে না, তারা শত্রুর হাতে নিঃশেষ হয়ে যাবে। বিকল্প হিসেবে ওদেরকে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসা যায় কিনা দেখ। আক্রমণ করার জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে আমরা অনেক নতুন রিক্রুটও পেয়ে যাব।’

    ‘আমার মনে হয় এখানকার মুসলমানদের ব্যাপারে আমাদের পলিসি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।’ বলল খ্রিস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।

    ক্রাকের এক দুর্গে ক’জন খ্রিস্টান সম্রাট, উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মিটিং চলছিল। পরাজিত সেনাবাহিনীর দিকে তাকাতেই ওদের ক্রোধ বেড়ে যাচ্ছিল। এ পরাজয়কে ওরা বদলে দিতে চাইছিল বিজয় দিয়ে। এদের মধ্যে কেবল হরমুনই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করছিলেন। ক্রাকের মুসলমানদের ওপর চলছিল অবর্ণনীয় নির্যাতন। তিনি বললেন, ‘আপনারা এখানকার মুসলমানদের সাথে যেমন ব্যবহার করেছেন আমরাও সুবাকে তেমন করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে আমাদেরই এক গুপ্তচর মেয়ে বিপজ্জনক এক বন্দীকে পালাতে সাহায্য করেছিল। সে সুবাক দুর্গের সব কিছু দেখে গেছে। তাছাড়া সালাহুদ্দীন দুর্গপ্রাচীর যেভাবে ভেংগেছে এতে ভেতরের মুসলমানদেরও হাত ছিল। আমাদের ব্যবহারে ওরা এতটা বিরক্ত ছিল যে, জীবন বাজি রেখে ওরা সালাহউদ্দীনের সাহায্য করেছে। এরাই ছিল সালাহুদ্দীন সেনাবাহিনীর পথ প্রদর্শক।’

    ‘এ জন্যই আমরা এখানকার মুসলমানদের সাহস এবং আবেগ নিঃশেষ করার জন্য এরূপ নির্যাতন করছি।’ বলল এক সেনা কমাণ্ডার।

    ‘তার পরিবর্তে ওদেরকে আপনাদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করুন, ওরা আপনাদের সাহায্য করবে।’ বলল হরমুন। ‘আমায় অনুমতি দিলে ধর্মান্তরিত না করেই ওদেরকে খ্রিস্টানদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করব। তখন ওরা মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।’

    ‘ভুলে যাচ্ছ হরমুন!’ মুখ খুললেন সম্রাট রিমাণ্ড। ‘দু’একজন মুসলমানকে নারী দেহ আর টাকার লোভ দেখিয়ে গাদ্দারে পরিণত করা যায় কিন্তু গোটা সেনাবাহিনীকে গাদ্দার বানানো যায় না। হরমুন, ওদের ওপর নির্ভর করো না। ওদের আমরা বন্ধু বানাতে চাইনা, আমরা মুসলমানদেরকে নির্বংশ করতে চাই। কোন অমুসলিম কোন মুসলমানকে ভালবাসলে এর অর্থ হচ্ছে সে ইসলামকেই ভালবাসে। অথচ আমরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাই। ক্রাক, জেরুজালেম, ওফা এবং আদলিসা যেখানেই খ্রিস্টানদের শাসন রয়েছে সেখানেই মুসলমানদের ওপর এতটা নির্যাতন কর যেন ওরা মরে যায়। না মরলেও খ্রিস্টানদের সামনে মাথানত করে রাখে।’

    ‘মুসলমানদের সাথে এখানে যা করা হচ্ছে সালাহুদ্দীন আইউবী নিয়মিত তার খবর পাচ্ছেন।’ হরমুন বলল, ‘আপনারা তাকে ক্রাকে তাড়াতাড়ি আক্রমণ করতে বাধ্য করছেন। আপনারা ভুলে যাচ্ছেন আমাদের সেনাবাহিনী এ মুহূর্তে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত নেই।’

    ‘তবে কি এখানকার মুসলমানদেরকে মাথায় তুলে নাচব! বুঝতে পারছি না বন্দীদেরকে হত্যা না করে কেন আমরা লালন পালন করছি।’ জবাব দিলেন গে অব লুজিনাম।

    ‘কারণ মুসলমান বন্দীদের হত্যা করলে সালাহুদ্দীন আমাদের বন্দীদের হত্যা করবে। আমাদের কাছে রয়েছে ওদের তিনশ লোক, ওদের কাছে রয়েছে আমাদের তেরশ বন্দী।’

    ‘একজন মুসলমান সৈন্য হত্যার বিনিময়ে আমরা চারজন খ্রিস্টান সৈন্য হারাতে পারি না’, বললেন শাহ অগাস্টাস।

    ‘সালাহুদ্দীন আমাদের যে সব সৈন্যদের বন্দী করেছে ওরা ভীরু, কাপুরুষ। যুদ্ধ করার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব গ্রহণ করেছে। ওদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। আমাদের হাতে মরার চাইতে বরং মুসলমানদের হাতে মরাই ভাল। নিশ্চিন্তে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করার পক্ষপাতি আমি।’ একজন সেনা কমাণ্ডার দাঁড়িয়ে বলল।

    ‘স্থানীয় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে, বন্দীদের হত্যা করে আমরা কি সালাহুদ্দীনকে পরাজিত করতে পারব? এখন আমাদের সামনে সমস্যা হল সালাহুদ্দীন আক্রমণ করলে কিভাবে বাধা দেব, কিভাবে সুবাক দুর্গ পুনরুদ্ধার করব। আপনার কথামত ক্রাকের সব মুসলমানদের মেরে ফেললাম। তারপর কি হবে? শত্রু কি নিশ্চিহ্ন হবে? তারচে সালাহুদ্দীনের মত আমরাও আমাদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করছি না কেন?’ বলল একজন।

    ‘মিশরে আমাদের গোয়েন্দারা কি কাজ করছে অনুগ্রহ করে হরমুন কি বলবেন?’ বলল আরেক সেনা কমাণ্ডার।

    ‘হ্যাঁ, আমাদের গোয়েন্দারা আশানুরূপ কাজ করছে। সালাহুদ্দীন সুবাক কেল্লায়। তার অনুপস্থিতিতে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কায়রোর উপ-রাষ্ট্রপতি মুসলেহ উদ্দীন ফাতেমীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। মুসলেহ উদ্দিন সালাহুদ্দীনের বিশ্বস্ত। এখন আমাদের হাতে ফাতেমীরা গোপনে একজনকে খলিফা নির্বাচন করে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের সেনা অফিসাররা সুদানী বাহিনী তৈরী করছে। কায়রোতে সালাহুদ্দীনের ফৌজের দু’জন উপ-সেনাপ্রধান আমাদের লোক। সুদানীরা আক্রমণ করলেই ফাতেমীরা বিদ্রোহ করবে।’

    ‘ভুলে যাচ্ছ কেন, মিসরের সংবাদ পেলে সালাহুদ্দীন ক্রাক দুর্গ আক্রমণ মুলতবী রেখে ছুটে যাবে।’ বললেন রিমাণ্ড, ‘এখানেই রাখতে হবে তাকে। এমনভাবে বিরক্ত করতে হবে যেন তার সৈন্যরা মিসর যাবার পথ না পায়।’

    হরমুন বললেন, ‘আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, মিসরে তার যে ক’জন সৈন্য রয়েছে ওরা কিছু করতে পারবে না। ওদের বুঝানো হয়েছে যে, সুলতান তোমাদেরকে গনিমতের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছেন। হাজার হাজার সুন্দরী যুবতী ধরা পড়েছে, ওদেরকে সৈন্যদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করছে প্রশাসনের লোকেরা। আমি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি, গোটা সেনাবাহিনী সুদানীদের পক্ষ অবলম্বন করবে। এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য সালাহুদ্দীনকে এখানকার ফৌজ নিয়ে যেতে হবে। ততোক্ষণে কায়রো হবে ফাতেমী খেলাফতের পদানত। আমরা সালাহুদ্দীনকে আক্রমণ করব না। কায়রোতে স্থান না পেয়ে বিশাল মরুতে ঘুরে ঘুরে একদিন …

    ‘কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, খলিফার গদিও কিন্তু টিকে থাকেনি।’

    হরমুন বলল, ‘তার কারণ, ইসলামী সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থের দিকে নিবদ্ধ হল সকলের দৃষ্টি। ফলে, একে একে ছুটে যেতে থাকল বিজিত এলাকাগুলো। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা এখন আরবে অবস্থান করছি।

    প্রথম দিককার জেনারেলগণ ইসলামী রাজ্যের সীমানা যদ্দুর বিস্তৃত করেছিল, সালাহুদ্দীন আইউবী সে পর্যন্ত যেতে চাইছেন। তার সবচে বড় গুণ হচ্ছে, তিনি খেলাফত বা প্রশাসনের তোয়াক্কা করেন না। তার চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিসরের খেলাফত। তিনি তাকে পদচ্যুত করেছেন। সাহস, দূরদর্শিতা এবং সামরিক শক্তি নিজের হাতে থাকার কারণেই তিনি এমনটি করতে পেরেছেন।’

    মজলিশে পিন পতন নিরবতা নেমে এল। হরমুনই নিরবতা ভাঙল আবার, ‘বেসমারিক নেতৃত্বের লক্ষ্য ক্ষমতার মসনদ। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা অর্থ, নারী এবং মদে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুলতান তাদের এ দুর্বলতা বুঝতে পেরেছেন। আমরা কেবল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তাদেরকেই হাত করছি। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের দ্বিতীয় টার্গেট। সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে হলে তাদেরকে জনগণের কাছে হেয় করতে হবে। আমি এ কাজটিই করছি। এ ব্যাপারে আপনারা হয়ত আমার সাথে একমত হবেন না, তবুও আমি বলব, মুসলমানদের হাতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে সে।

    মুসলমানদের মানসিকতা আপনারা এখনও বুঝেননি, এ জন্যেই আমার কিছু কিছু পদক্ষেপ ও পরামর্শকে আপনারা ভাল চোখে দেখেন না। প্রশিক্ষণের সময় যদি মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে, তোমরা দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী, সিংহাসন উপহার দিলেও ওরা সৈন্য হয়ে থাকতেই পছন্দ করবে। কিন্তু যদি ওদের ভেতর আত্মপূজা, নারী লিপ্সা এবং মদে অভ্যস্ত করে দেওয়া যায় তবে আপন ধর্ম ছেড়ে দিতেও ওরা কণ্ঠিত হবে না। আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী প্রশাসনের লোকেরা দ্বিতীয় দায়িত্বটিই পালন করছে।’

    ‘তবে প্রশাসনের লোকদের মত সেনা ফৌজকে অত সহজে গাদ্দার বানানো যায় না। প্রশাসনের প্রতিটি লোকই রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সৈন্যরা সবাই তেমনটি দেখে না।’ হরমুনের কথার মাঝখানে বললেন অগাস্টাস।

    ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, তবে এটাও ঠিক, তাদের নবীর পরে খেলাফতের জন্য মুসলমানরাই পরস্পর যুদ্ধ করেছিল।’

    ‘কিন্তু জেনারেলগণ ঈমানদারীর সাথে দায়িত্ব পালন করে, এমনকি অন্য দেশ দখল করে খেলাফতের অন্তর্ভূক্ত করেছে।’

    ‘হ্যাঁ, মজাটা এখানেই। জেনারেলরা ঈমানদারীর প্রমাণ দিলেও খলিফারা তার কোন মূল্য দেয়নি, এমনকি খলিফারা তাদের সাথে ভাল ব্যবহার পর্যন্ত করেনি। ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়েছে।’

    সালাহুদ্দীন আইউবীকে যুদ্ধের ময়দানে হারানো সম্ভব নয়। কারণ, তাঁর প্রতিটি সৈন্য তাঁর মতই জানবাজ। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা এতটাই অবগত যে, মৃত্যু তাদের কোন ভীতির সৃষ্টি করে না।

    আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, তিনি শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করেন না, নিজেও লড়াই করেন। তাকে কোন খলিফা বা বেসামরিক নেতৃত্ব থেকে নির্দেশ নিতে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন পাকা মুসলমান। তাঁর কথা হচ্ছে, আমি সরাসরি খোদা এবং কোরআনের হুকুম পালন করি। আমাদের বাগদাদের গোয়েন্দারা বলেছে, নুরুদ্দীন জঙ্গী যেসব পরামর্শ পাঠিয়েছেন সালাহুদ্দীন তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রথমতঃ একজন বড় মুফতি ফতোয়া দিয়েছেন খেলাফতের কেন্দ্র থাকবে বাগদাদ। বিভিন্ন দেশের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে খলিফা সেনা প্রধানের সাথে পরামর্শ করবেন। দ্বিতীয়তঃ সামরিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খলিফা কোন হস্তক্ষেপ করবেন না। তৃতীয়তঃ খোৎবায় খলিফার নাম উচ্চারণ করা হবে না। সালাহুদ্দীন আরো নির্দেশ দিয়েছে যে, খলিফা বা তার মনোনীত কোন ব্যক্তি বা কোন কেল্লাদার বাইরে বের হলে জনগণ ফুলের তোড়া নিয়ে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না। খলিফার সম্মানে কোন শ্লোগান দেওয়া যাবে না।

    সালাহুদ্দীন আইউবীর বড় সাফল্য হল, তিনি শিয়া-সুন্নীর মতভেদ দূর করে দিয়েছেন। এখন শিয়াদের অনেকেই সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে আসীন। শিয়া আলেমদের তিনি বুঝিয়েছেন, ইসলামে নেই এমন কোন কাজ যেন তারা না করেন। এতে আমাদের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দল উপদল থাকলে আমাদের সুবিধা। এখন আমরা প্রশাসনের মধ্যে সালাহুদ্দীন এবং সেনাবাহিনীর বিরোধী মনোভাব তৈরী করছি।’

    ‘এ মনোভাব স্থায়ী করতে হবে।’ মুখ খুললেন ফিলিপ অগাস্টাস। ‘শুধু সালাহুদ্দীনই আমাদের শত্রু নয়, আমাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। আমাদের চেষ্টা হবে সালাহুদ্দীনের মৃত্যু হলে এ জাতি যেন অন্য কোন সালাহুদ্দীনের জন্ম দিতে না পারে। ওদের আকিদা বিশ্বাসে কুসংস্কার ঢুকিয়ে দাও। প্রতিটি লোকের চিন্তায় থাকবে রাজা হওয়ার স্বপ্ন। ওদেরকে বিলাসিতার গহীনে ডুবিয়ে দাও। দেখবে একজন অন্য জনের মাথা কাটছে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, একদিন এরা ক্রুশের গোলামে পরিণত হবে। ওদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ওদের ধর্ম খ্রিস্টবাদের রঙে রঙ্গীন হবে। ক্ষমতার লোভে একজন আরেকজনকে অন্যজনকে হত্যা করবে। সাহায্য চাইবে আমাদের কাছে। তখন হয়ত আমরা কেউ বেঁচে থাকব না। আমাদের আত্মা ওদের এ পরিণতি দেখে খুশি হবে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইহুদীরা নিজের যুবতী মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার কর। ইহুদীরা জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনকে নিজের মনে করে, এজন্য ওরা আমাদের দুশমন। কিন্তু সে কথা বলার সময় এটা নয়। ওদের বল, জেরুজালেম তোমাদের। শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন তোমাদেরকেই দেব। তোমরা এখন আমাদের সহযোগিতা কর। তবে ইহুদীরা অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের মানসিকতা বুঝতে পারলেই মুসলমানদের সাথে যোগ দেবে। সতর্কতার সাথে ফিলিস্তিনিদের লোভ দেখিয়ে ওদের সম্পদ এবং যুবতীদের ব্যবহার কর। বিজয় আমাদের হবেই।

                                                   

  • ভয়াল রজনী

    ভয়াল রজনী

    পাগলটাকে আর আঘাত করলো না ওসমান। জুতা খুলে মসজিদের ভেতরে ঢুকল দু’জন। ক্রুশটা এখনও তার হাতে। ভেতরে গিয়ে বললো ‘তোমার নাম কি যুবক?’

    ‘ওসমান’।

    ‘আমি মুসলমান, তুমি কখন থেকে আমার পিছু নিয়েছো?’

    ‘সারা দিন তোমার পিছনে হেঁটেছি, কিন্তু সুযোগ হয়নি’।

    ‘আমাকে কেন মারতে চাইছো?’

    ‘কারণ আমি ইসলাম এবং সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে কোন কথা সহ্য করি না’। তুমি পাগল হও আর যেই হও আমি তোমাকে হত্যা করবো’।

    ‘কিন্তু আমাকে হত্যা করলে ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের কি উপকার হবে?’

    ‘জানি না তবে ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের একজন দুশমন কমবে’।

    ‘তুমি কি যে-ই  ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের বিরোধীতা করবে তাকেই হত্যা করবে?’

    ‘অবশ্যই। সুযোগ পেলে আমি কাউকেই ছাড়বো না’।

    ‘তুমি কাকে ইসলামের বড় দুশমন মনে করো?’

    ‘অবশ্যই খৃষ্টানদের। তবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মত শক্তি এখনো আমার হয়নি। হলে তাদেরও আমি ছাড়বো না’।

    ‘ইসলাম ও সালাহউদ্দীনের বিরোধীতা করলে তাদের হত্যা করতে হবে এই বুদ্ধি তোমায় কে দিয়েছে?’

    ‘কেউ এ কাজ করতে আমাকে বলেনি। আমি নিজে থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি’।

    ‘তুমি কি একাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো, নাকি তোমার সাথে আরো কেউ আছে?’

    ‘আমি একাই’

    আরো কয়েকটা প্রশ্ন করে পাগল লোকটা বললো, ‘তোমার মত একজন যুবকই আমার প্রয়োজন। তুমি নিজ থেকে এসেছো ভালই হয়েছে। ভেবেছিলাম এমন লোক পেতে আমার বেশ কষ্ট হবে’।

    ‘শোন, আমি সালাহুদ্দীনের একজন গোয়েন্দা। খৃষ্টানদের ধোকা দেয়ার জন্য পাগলের অভিনয় করছি। সফর করেছি এই পোষাকেই। তোমার সাথে কিছু কথা বলবো মন দিয়ে শোন- মনে রেখ মসজিদে হঠাৎ কেউ এসে পড়লে আমি আগের মত আজেবাজে কথা শুরু করবো পাগিলরা যেমন করে আরকি’!

    তুমি এমন ভাব করবে যেন আমার কথা মনযোগ দিয়ে শুনছো।

    যা বলার আমি দ্রুত বলছি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মুসল্লীদের মধ্যেও ওদের গুপ্তচর থাকতে পারে, এজন্য নামাযের আগেই কথা শেষ করতে হবে’।

    ওসমান কখনো গোয়েন্দা দেখেনি। ও জানতো না গোয়েন্দারা অসাধারন মেধবী হয়ে থাকে। ও অবাক হয়ে গোয়েন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সামান্য কয়েকটা প্রশ্ন করেই গোয়েন্দা লোকটি যুবককে চিনে নিয়েছে। বুঝেছে এ যুবক যথেষ্ট হুশিয়ার, বিশস্ত এবং আবেগপ্রবণ।

    ‘শোন ওসমান তোমার মত আরো কয়েকজন যুবক ও যুবতী যোগাড় করো। তাদের মন্মানসিকতাও তোমার মত হতে হবে। তাদেরকে তোমার মতই হতে হবে সাবধান ও বিশ্বস্ত। তাদের মানসিকতা তৈরী হয়ে গেলে শুরু হবে তোমাদের আসল কাজ। তোমাদেরকে প্রতিটি মুসলমাওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করতে হবে, সুলয়ান সালাহুদ্দীন বেচে আছেন এবং সুস্থ আছেন। তোমরা আরো প্রচার করবে, ক্রাক থেকে মাত্র কয়েক মাত্র কয়েক ঘণ্টার দুরত্বে অবস্থান করছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ক্রাক আক্রমনের জন্য মুসলিম বাহিনী শুধু প্রস্তুতই নয়, ওরা খৃষ্টান বাহিনীর আহার নিদ্রা হারাম করে রেখেছে। কায়রোর পরিস্থিতিও এখন পুরপুরি শান্ত। ওখান থেকে সকল ষড়যন্ত্রের মূল উপড়ে ফেলা হয়েছে’।

    ওসমানের বুকের ধুপধুপানি বেড়ে গেল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বললো, আপনি ঠিক বলছেন?

    ‘ওসমান, তোমার আর আমার স্বপ্ন এক। আমি যে স্বপ্নের বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছি আর তুমি আবেগে ভেষে বেড়াচ্ছ। এখন আর এভাবে ভেসে বেড়ালে চলবে না। আজ থেকে তুমি ভাববে, তুমিও আইয়ুবীর একজন সৈনিক। শোন আমি যা বলছি তা ঠিকই বলছি’।

    ‘আপনি সালাহুদ্দীন আইয়ুবীকে দেখেছেন?

    ‘হ্যা যুবক উনি আমাকে এখেনে পাঠিয়েছেন। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, উনি সছেন এই খবর এখানকার জনগনকে জানিয়ে দেয়া। তোমাকে দিয়েই এই কাজ শুরু হলো’।

    ‘সুলতান কখন আক্রমন করবেন? আমর তার পথ চেয়ে বসে আছি। আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তিনি বাইরে থেকে আক্রমন করলে আমরা ভেতর থেকে খৃষ্টানদের উপর ঝাপিয়ে পড়বো। আল্লাহর দোহাই লাগে, তাকে তাড়াতাড়ি আক্রমন করতে বলুন’।

    ‘বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে যুবক। প্রথমে শোন সুলতান আইয়ুবী কি বলেছেন। এরপত প্রতিটি যুবকের হৃদয়ে তা গেঁথে দাও। সুলতান বলেছেন, ক্র্যাকের মুসলিম যুবকদের বলে দাও তোমরাই ইসলামের রক্ষক। আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করতে হলে তোমাদের জিহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। তুমি তাদেরকে আমার জীবনের কাহিনী শুনাবে’।

    তিনি তার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে আরো বলেছেন, আমি প্রথম যুদ্ধ করেছি শৈশবে। একটি দুর্গে অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। নেতৃত্বে ছিলেম আমার চাচা। তিনি আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন ‘ভয় পেয়ো না। এখন ভয় পেলে ভয়ে ভয়ে কেটয়ে যাবে সারাটা জীবন। ইসলামের পতাকাবাহী হতে চাইলে এখনি পতাকা তুলে নাও। বেরিয়ে যাও দুশমনের ব্যুহ ভেদ করতে। আবার ফিরে এসো। ঝাপিয়ে পড় শত্রুর উপর’।

    সেদিন আমি ভয় পাইনি। তিনমাস অবরুদ্ধ ছিলাম। না খেয়ে থেকেছি। শেষ পর্যন্ত শত্রুর অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলাম। অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা প্রথমে খেয়েছি শত্রুর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া খাবার। দানা পানির অভাবে আমাদের যে সব ঘোড়া মরে গিয়েছিল তা পুরন করেছি শত্রুর ঘোড়া দিয়ে।

    সুলতান আরো বলেছেন, আমার জাতির সন্তানদের বলবে, শত্রু আমাদের ভালবাসার অস্ত্র দিয়ে আক্রমন করেছে। যদিও এটা মোটেও ভাল্বাসা নয়ব্রং ভালবাসার নামে প্রতারনার ফাদ মাত্র।

    ওরা জানে না প্রতারনা কি জিনিস, শুধু জানে ভালবাসার মিথ্যা অভিনয় করতে। মনে রেখ, কোন অমুসলিম মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না।

    খ্রীস্ট্রান শক্তি যুদ্ধের ময়দানে টিকতে পারে নি। ওদের সব পরিকল্পনা আমরা ধুলার সাথে মিশিয়ে দিয়েছি। ওরা এখন মুসলমান জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের হৃদয় থেকে বের করে দিতে চাইছে ইসলামী জাতীয়তাবোধ।

    সারা দুনিয়ার মুসলমান এক জাতি। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। শত্রুরা এ ভ্রাত্বের বন্ধন ছিন্ন করার উস্কানী দিচ্ছে।

    ওরা ধর্মের প্রতি প্রীতি ও ভালবাসার পরিবর্তে আমাদের কিশোর ও যুবকদের হৃদয়ে সৃষ্টি করতে চাচ্ছে পুঞ্জীভুত ঘৃনার পাহাড়। এ জন্য ওরা ব্যবহার করছে নানা রকম বিপজ্জনক অস্ত্র। ইসলামের কথা যারা বলে, ইসলামের পথে যারা চলে, তাদের ন্না অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে গালি দেওয়া হচ্ছে মোল্লা, গোড়া, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এসব বলে। এভাবে আগামী প্রজন্মের মন বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ওপর।

    মুসলিম যুবকদের বলবে, দুশমন আমাদের ওপর সর্বপ্লাবী হামলা শুরু করে দিয়েছে। সম্মুখ সমরের পাশাপাশি মানসিক চোরাগুপ্তা হামলা করছে। এর জন্য ব্যবহার করছে ভয়ংকর সব অস্ত্র। এ সব অস্ত্রের নাম হলো সম্পদের প্রতি মোহ, বিলাসিতা, আলস্য এবং দায়িত্বহীনতা।

    এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য খ্রীস্টান এবং ইহুদী শক্তি সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। ইহুদীরা নিজেদের যুবতী মেয়েদেরকে লেলিয়ে দিয়েছে তোমাদের পেছনে। তারা তোমাদের পাশবিক শক্তিকে উসকে দিচ্ছে।

    ওরা আমাদের যুবকদের হাতে তুলে দিচ্ছে নানা রকম নেশার দ্রব্য। সৃষ্টি করছে মাদকাশক্তি। কোন জাতি ধ্বংস হওয়ার জন্য এ দুটো অভ্যাসই যথেষ্ট।

    তুমি যুবকদের বলবে, পাপী মানুষের পরকালের জন্য নির্ধারিত রয়েছে নরকের কঠিন যন্ত্রণা। তুমি এ দুটো অভ্যাস পৃথিবীতেই তোমাদের জন্য নরক যন্ত্রণা নিয়ে আসবে। তোমরা যাকে আজ স্বর্গের আনন্দ ভাবছো, দু’দিন বাদে দেখবে তা আসলে জাহান্নামের শাস্তি।

    এখনি সচেতন না হলে একদিন তোমরা হবে খ্রীস্টানদের গোলাম। ওরা তোমাদের বোনদের আব্রু নষ্ট করবে। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকবে কোরানের ছেঁড়া পাতা, মসজিদ হবে ঘোড়ার আস্তাবল। চোখের সামনে তোমাদের বাড়িঘর জ্বলবে দাউ দাউ করে।

    সুলতান আরো বলেছেন, মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে চাইলে নিজের ঐতিহ্য কখনো ভুলে যেয়ো না। দুশমন একদিকে তোমাদেরকে উত্যক্ত করছে, অন্যদিকে সম্পদ আর নারীদের লোভ দেখাচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে,  মুসলমান কোন বিলাসপ্রিয় জাতি নয়। মুসলমান সম্পদের দাস হয় না, বরং সম্পদকেই তারা দাসে পরিনত করে। প্রয়োজন হলে খেজুর পাতার চাটাইতে বসে আমরা পৃথিবরী শাসন করতে পারি।

    রোম ও পারস্যের সম্রাটদের সুবিশাল প্রাসাদ আর অতুলনীয় শানশওকত ও তৈজসপত্রের চেয়ে আমাদের কাছে বেশী প্রিয় তেজী ঘোড়া আর জং হীন তলোয়ার। আমাদের মূলধন কোরআন আর হাদীস, আমাদের আসল সম্পদ ঈমান আর আমল। সহায় আমাদের আল্লাহ। বিশ্বাস ও কর্মের দৃঢ়তাই আমাদের রক্ষাকবচ।

    তুমি ওদেরকে বলবে, বিলাসদ্রব্য, সম্পদ আর নারী দেহের লোভ দেখিয়ে ওরা তোমাদেরকে গোলামীর শিকলে বাঁধতে চাইছে। তলোয়ারকে ভয় পেয়েই এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে ওরা।

    হে আমার জাতির সন্তানেরা, নিজের হাতে নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ো না।

    হে আমার জাতির সন্তানেরা, নিজের হাতে নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ো না। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাও।

    মনে রেখো, অত্যাচারী শাসক সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে। প্রতিপক্ষকে জুলুম অথবা অর্থ দিয়ে পরাভূত করতে চায়। অত্যাচারকে ভয় পেয়ো না। পা দিও না লোভের ফাঁদে।

    তোমরাই জাতির ভবিষ্যত। আমরা অতীত হয়ে গেছি। জাতির অস্তিত্ব এখন নির্ভর করছে তোমাদের হাতে। তোমরা সচেতন হলে জাতি বাঁচবে, তোমরা ঘুমিয়ে থাকলে জাতি মারা যাবে।

    শত্রু তোমাদের মন-মানসিকতার সোনালী ঐতিহ্য অপবিত্র চিন্তা ধারার কালো নেকাবে ঢেকে দিতে চায়। ওরা চায় পৃথিবরীর বুক থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। এর মোকাবেলায় চাই অফুরন্ত সাহস আর হিম্মত।

    তোমরা যদি সাহসের সাথে সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকতে পারো বুকের ভেতর, আর প্রতিটি মুহুর্ত সে স্বপ্নকে বুকে নিয়ে নির্ভয়ে পথ চলতে পারো, দেখবে, প্রতিটি সূর্যোদয় তোমাদের জন্য সফল ও বিজয়ের বার্তা বয়ে আনবে।

    তোমাদেরকে ভয় পায় বলেই এ কুটিল পথ বেছে নিয়েছে ওরা। শুরু করেছে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। মুমীন ঈমান বিকিয়ে দেয় না বলেই তো অস্ত্রের লড়াইতে নামতে হয় ওদের। কিন্তু যদি তোমাদের ঈমানী চেতনা নষ্ট করা যায় তবে আর অস্ত্রের লড়াইকে প্রয়োজন কি?

    মনে রেখো, যে হৃদয়ে ঈমানের আগুন নেই সে দেহে ওদের আঘাত করারও প্রয়োজন নেই। কারণ, কোন দেহ কাঠামোর সাথে ওদের কোন বিরোধ নাই, ওদের বিরোধ তো বিশ্বাসের সাথে, ঈমানের সাথে, তাওহীদের সাথে।

    তোমাদের হিরন্ময় বিশ্বাস ও চেতনার বিনাশ সাধনই ওদের একমাত্র টার্গেট। সে টার্গেটে পৌঁছার জন্যই ওদের এতসব সাংস্কৃতিক হামলা।

    দুঃখের বিষয়, প্রাণে না মেরেও যে আমাদের হত্যা করা যায় এ কথা ওরা বুঝলেও আমরা সহজে বুঝতে চাই না। তাই মুসলমানদের মত জীবন যাপন করা করেও আমরা মুসলমান বলে দাবী করতে পারি নিজেদেরকে।

    হে যুবক বন্ধুরা, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ, ভবিষ্যতে ওদের প্রতিটি কাজের ওপর নিবদ্ধ রেখো তোমাদের সজাগ দৃষ্টি। তাহলেই দেখতে পাবে ওদের প্রতিটি কাজের পেছনে এক অন্তর্গুঢ় লক্ষ্য রয়েছে। আর সে লক্ষ্যটি হচ্ছে তোমাদের ইসলামী চেতনার বিনাশ সাধন করা, ধর্মীয় ভাবধারার প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। তোমরা যে মিশনারী জাতি, তোমাদের ওপর যে খেলাফতের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে সে কথা তোমাদের ভুলিয়ে দেয়।

    বেঈমানরা তোমাদেরকে কি অবস্থায় নিয়ে এসেছে তা তো আজ নিজেরাই দেখতে পাচ্ছো। হে আমার যুবক বন্ধুরা, তোমরা মানসিকভাবে ওদের গোলামীর নিগড়ে একবার বন্দী হলে সমগ্র মুসলিম জাতিরও একই পরিণতি হবে। কারণ, মুসলিম উম্মাহ আর কিছুই নয়, সে তো তোমাদের সমষ্টি মাত্র।

    সময়ের এক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আজ তাই তোমাদের কাছেই আমি আকুল আহবান জানাচ্ছি, এসো, সংকীর্ণতা পরিহার করো। ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে বাঁচানোর কোন চিন্তা মনেও এনো না, সেটা হবে আত্মহত্যার শামিল। জোট বাঁধো, ঐক্যবদ্ধ হও, এক হয়ে রুখে দাঁড়াও শত্রুর বিরুদ্ধে’।

    সুলতানের বাণী শোনানোর পর মুসলিম গোয়েন্দাটি এবার ওসমান সালেমকে তার কাজ ও কর্মপদ্ধতি কি হবে সে বিষয়ে বলতে লাগল।

    ‘আমাদের প্রধান সেনাপতি বলেছেন, আবেগ তাড়িত হয়ে কোন কাজ করো না। কেবল আবেগ দিয়ে সময়ের গতিকে রোধ করা যায় না। সব সময় খেয়াল রাখবে, আবেগ যেন দূরদর্শীতার উপর বিজয়ী না হয়।

    কখনো এত্তজিত হবে না। সংযম এবং সতর্কতার সাথে কাজ করবে। এই সংযম ও সতর্কতাই বিজয়ের চাবিকাঠি।

    আমার আরও দু’জন সঙ্গী বিভিন্ন রূপ নিয়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে।

    এবার শোন তোমার কাজ কি হবে। এ মুহুর্ত থেকে বিশ্বস্ত মুসলমানদের বাড়িতে গোপনে তীর, ধনুক এবং বর্শা তৈরী করে লুকিয়ে রাখবে।

    যুবক, বৃদ্ধ, কিশোর সবাইকে অস্ত্রের ট্রেনিং নিতে হবে। তবে সাবধান, এ কাজ করতে হবে গোপনে। শত্রুরা যেন কোন মতেই তোমাদের প্রস্তুতির টের না পায়।

    ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে নারীদেরকেও অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেবে। জেহাদ কেবল পুরুষের জন্যই নয়, নারী পুরুষ সবার জন্য ফরজ।

    ইহুদী মেয়েদের কথা যেন কেউ কানে না তোলে। তাদের কোনো কথা বিশ্বাস করবে না। ওরা মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করার জন্য এবং জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য নানা কৌশলে নানা কথা প্রচার করবে।

    সন্দেহ করতে পারে এমন কোন কথা ওদের সাথে বলবে না। কারও সাথে ঝগড়াঝাটি করবে না। ফালতু ঝগড়ায় জড়িয়ে নিজেদের শক্তি ও সময় অপচয় করবে না।

    প্রথমে সঙ্গঠিত হয়ে একজনকে নেতা নির্বাচন করে নিও। প্রত্যেকের তৎপরতা নেতার নজরে থাকবে। তার অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো পদক্ষেপ নেবে না। নেতা বানাবে এমন একজনকে, যে পরহেজগার, যে তোমাদের মধ্যে সবচে ত্যাগী, নির্লোভ আর বিচক্ষণ।

    শত্রুর গতিবিধির ওপর ভালভাবে লক্ষ্য রাখবে। তুমি কি করছো সেটা বড় কথা নয়, শত্রু কি করছে সেটাই বড় কথা। কারণ শত্রুর ক্ষমতা ও শক্তি খর্ব করার ওপর নির্ভর করছে তোমার বিজয়।

    প্রতিপক্ষ আগামীকাল কি পদক্ষেপ নেবে তা যদি তুমি আজ জানতে না পারো তবে তার আগামীকালের অগ্রযাত্রাকে কিছুতেই তুমি প্রতিহত করতে পারবে না। ফলে নিজে কি করছো তা যেমন তোমানের নখদর্পনে থাকবে ঠিক একই ভাবে শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপও তোমাদের নখদর্পনে থাকতে হবে’।

    সূর্য ডুবো ডুবো। মসজিদের পেশ ইমামা এলেন। তাকে দেখে ক্রশ হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল পাগলা। মসজিদের ভেতর তার কণ্ঠ ভেসে এল, ‘মুসলমান! ক্রুশের আশ্রয়ে এসো। তোমাদের ইসলাম মরে গেছে’।

    ওসমানের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন বৃদ্ধ ইমাম।

    ‘এখানে কি করছিলে’ ঝাঝের সাথে ওসমানকে প্রশ্ন করলেন ইমাম।

    ‘ওকে ভেতরে বসিয়ে রেখেছিলে কেন? কেন তাকে শেষ করে দাওনি? তোমার দেহে কি মুসলিম পিতার রক্ত নেই? আমি বৃদ্ধ না হলে ওকে জীন নিয়ে পালিয়ে যেতে দিতাম না’।

    ‘ওকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই আমি ওর পিছু নিয়েছিলাম’।

    ইমামকে খঞ্জর দেখিয়ে বললো ওসমান। ‘আল্লাহর শোকর ও আমার আঘাত ক্রুশ দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছে। লোকটা পাগল নয়। ইহুদী বা খ্রিষ্টানও নয়। ও মুসলমান। সুলতান সালাহুদ্দীনের বাণী নিয়ে এসেছে’।

    ইমামকে সুলতানের পয়গাম শুনিয়ে ওসমান বললো, ‘আমি এর বাস্তবায়ন করবো। আজ সন্ধ্যা থেকৈই নেমে পড়বো কাজে’।

    একটু ভেবে নিয়ে ওসমান আবার বললো, ‘কিন্তু আমাদের একজন নেতা প্রয়োজন। আপনি কি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন? ভেবে দেখুন! সরকার জানতে পারলে প্রথমেই নেতার মস্তক উড়িয়ে দেবে’।

    ‘আমি এ জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকব মসজিদে দাঁড়িয়ে এমন কথা কি বলতে পারি? তবে আমি নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য কি না সে ফয়সালা করবে জাতি’।

    ‘আমি মসজিদের এ পবিত্র অংগনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, আমার জীবন, সন্তান-সন্ততি এবং ধন-সম্পদ ইসলামের জন্য উৎসর্গ করে দেবো’।

    সামান্য বিরতি নিয়ে তিনি আবেগের সাথে বললেন, ‘প্রিয় সন্তান, সালাহ উদ্দীন সালাহুদ্দীনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা গভীরভাবে মনে গেঁথে নাও। তিনি ঠিকই বলেছেন, যুবকরাই হচ্ছে দ্বীন এবং জাতির ভবিষ্যত রক্ষক। ইচ্ছে করলে এর আশার আলো জ্বালাতে পারে আবার ইচ্ছে করলে সমাজকে আঁধারেও ঢেকে দিতে পারে’।

    তিনি আরো বললেন, ‘কোন মুসলমান যুবক যখন কোনো ইহুদী বা খ্রিষ্টান যুবতীর দিকে তাকিয়ে থাকে তখন সে এ কথা ভাবে না যে, তার বোনও অন্যের কু দৃষ্টির শিকার হতে পারে।

    প্রিয় যুবক! খোদার এই ঘরে দাঁড়িয়ে আজ এই মুহুর্ত থেকে প্রতিজ্ঞা করো, সালাহ উদ্দীনের পয়গাম কার্যকরী করার জন্য জীবনপণ চেষ্টা করবে’।

                                                   

    নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে গেল ওসমান। বাড়ি গিয়েই ছোট বোন আল নূরকে নিরালায় ডেকে নিল। তাকে শোনাল সুলতান সালাহুদ্দীনের বাণী।

    বলল, ‘বোন! আমাদের দ্বীন এবং জাতি তোমার কাছে অনেক বড় ত্যাগের প্রত্যাশী। তুমি অন্তপুরবাসী নারী –আজ থেকে এ চিন্তা ছেড়ে দাও। মুসলিম নারীদের জেহাদের জন্য প্রস্তুত কর’।

    ওসমান তাকে আরো বলল, ‘আমি তোমাকে খঞ্জর এবং তীর, ধনুক ও তলোয়ারের ব্যবহার শিখাবো। তবে কাজ করতে হবে খুব সাবধানে, কেউ যেন সন্দেহ করতে না পারে আমরা কি করছি’।

    আজ নূর আবেগে ওসমানের হাত চেপে ধরল।

    ‘আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ভাইয়া।

    আমার বান্ধবীরাও দেশ এবং জাতির জন্য কি করা যায় সে ভাবনায় বেশ কিছুদিন যাবত অস্থির। আমরা তো এতকাল পুরুষের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম, এবার ভাবছিলাম আমরাও কিছু করতে পারি কি না’।

    ওসমান বললো, ‘সুলতান এবং মুসলিম বাহিনীর ব্যাপারে এতদিন আমরা যা শুনেছি সব মিথ্যা, সব গুজব। প্রতিটি মুসলমানের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের কানে সঠিক খবর পৌঁছে দিতে হবে। তবে মনে রেখো, মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট গাদ্দার এবং খ্রিষ্টানদের গোয়েন্দাও রয়েছে’।

    কয়েকটা বাড়ির উল্লেখ করে ওসমান বললো, ‘আগে এসব বাড়ির মেয়েদের হাত করে নাও। এরপর সতর্কতার সাথে তাদেরকে বলো, তোমাদের পুরুষগুলি জাতির সাথে গাদ্দারী করছে। ওদের বলো, খ্রিষ্টান এবং ইহুদী মেয়েদের ভালবাসার অভিনয় নিরেট প্রতারণা মাত্র। এ হচ্ছে আমাদের জাতির বিরুদ্ধে এক ধরনের ফাঁদ’।

    ‘রিনিকে এখানে আসতে বারন করবো? তোমার সাথেও তো ওর সম্পর্ক রয়েছে’। বলল আল নুর।

    ‘ওকে যা বলার আমিই বলবো। তুমি কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেল

    বে, শেষে আবার ঝামেলায় পড়ে যাই’।

    ‘ঠিকই বলেছেন, ও ভীষণ বুদ্ধিমতি এবং সতর্ক’।

    ‘ওকে কিছু বলার দরকার নাই, যা বলার আমি নিজেই বলবো’।

    ওস্মান নিজের ঘর থেকে কাজ শুরু করে দিল।

    রিনি একজন খৃস্ট্রান যুবতী।সুন্দরী। ওসমানদের বাড়ির অল্প দূরে ওদের বাড়ি। রিনির পিতা বর্তমানে এখানকার পুলিশ প্রধান। ওর পুরো নাম রিনি আলেকজেণ্ডার। রিনি আল নুরের বন্ধু। কিন্তু ওসমানকে দেখলে ওরচোখে মুখে আনন্দের দ্যুতি হেসে উঠতো। ওসমান এড়িয়ে চলতো তাকে।তার ধারনা খৃস্ট্রান মেয়েটা এখানে গোয়েন্দাগিরি করতে আসে। তবে ও যেন ওসমানকে সন্দেহ না করে করে এ জন্য কখনও কখনও তার সাথে হাসি ঠাট্টাও করতো।

    ওসমান ভাবলো, এখন রিনিকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করা উচিত। ছোট বোনকে সামরিক ট্রেনিং দিতে হবে, রিনিকে তা জানানো যাবে না।

    রিনিকে কিভাবে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করবে এ নিয়ে ওসমান সারাদিন ভাবল। গভীর ভাবনা চিন্রাত পর একটা বুদ্ধি এল তার মাথায়।

    পরদিন ওসমান আল নূরকে ডেকে বললো, ‘রিনি যখন আমাদের বাড়িতে আসে তখন তুমি তাকে কোন ছুতো দেখিয়ে বাইরে নিয়ে যেও। এভাবে কয়েকদিন এড়িয়ে চললে দেখবে একদিন ও নিজে থেকেই এখানে আসা বন্ধ করে দেবে’।

  • আবারও সংঘাত

    আবারও সংঘাত

    ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত রোদের তীব্রতা ছড়িয়ে সূর্য উঠল ক্রাক দুর্গের চারপাশে। মরুভূমির বালুতে ছড়িয়ে পড়ল প্রচণ্ড উত্তাপ। সংকল্পে অটল উভয় বাহিনী। খৃষ্টানরা শপথ নিয়েছে মেরীর নামে, এবার আইয়ুবিকে তারা কিছুতেই রেহাই দেবে না, জীবন নিয়ে ফিরতে দেবে না আইয়ুবীর একজন সৈনিককেও। সংকল্পে অটল সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীও। তাঁর শপথ, যে কোন মূল্যে ক্রাক দুর্গ সে দখল করবেই। ক্রাকের মুসলমানদের ওপর যে জুলুম করা হচ্ছে তার অবসান ঘটাতে না পারলে তাঁর আত্না কিছুতেই শান্তি পাবে না।

    সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খৃস্টানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ ক্রাকের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানলেন। তীব্রগতিতে ঝাপিয়ে পড়লেন দুর্গ রক্ষীদের ওপর। তাঁর ক্ষীপ্রতা ও দুঃসাহস দেখে স্তম্ভিত গয়ে গেল খৃস্টান সৈন্যরা। সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদের তীর প্রাচীর রক্ষীদের গায়ে আঘাত হানার আগ পর্যন্ত খৃস্টানরা বুঝতেই পারল না, তারা আক্রান্ত হয়েছে।

    গোয়েন্দা বিভাগ সুলতান আইয়ুবীকে আশ্বাস দিয়েছিল, তিনি দুর্গে আঘাত হানলে ক্রাক শহরের মুসলমানরা ভেতর থেকে সহায়তা দেবে তাদের। সুলতান আইয়ুবীর যে সব কমান্ডো আগেই শহরে প্রবেশ করেছিল। তারাও ভেতর থেকে দুর্গের দেয়াল ভেঙে সুলতানের অভিযানকে সফল করতে সহায়তা দেবে।

    ক্রমাগত চারদিন বিরতিহীন লড়াই চললো উভয় পক্ষে। জয়-পরাজয় এখনো অনিশ্চিত। সুলতান যত তীব্র থেকে তীব্রতর করছে আঘাত, প্রতিরোধও ততই তীব্র হচ্ছে।

    অবরোধের পঞ্চম দিন। গোয়েন্দা এসে সুলতান আইয়ুবীকে সংবাদ দিল, ‘কয়েকজন মুসলমান ভেতর থেকে শহরের দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আফসোস! সফল হওয়ার আগেই তারা সবাই শহীদ হয়ে গেছে। এদের মধ্যে কয়েকজন মেয়েও ছিল। সবচে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এদের মধ্যে একজন খৃস্টান মেয়েও ছিল। গোয়েন্দা আরও জানালো, তাদের এ বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। এ দলের মধ্যে একজন মুসলমান খৃস্টানদের গুপ্তচর ছিল। সে এ অভিযানের সংবাদ খৃস্টানদের জানিয়ে দেয়ার ফলেই শত্রুরা গোপনে ওঁৎ পাতার সুযোগ পায় এবং দলটি দেয়ালের কাছে পৌঁছলে অতর্কিতে তাদের ঘেরাও করে ফেলে। মুজাহিদরা প্রাণপণ মোকাবেলা করে একে একে সকলেই শহীদ হয়ে যায়, কিন্তু কেউ ময়দান ছাড়েনি। তাদের অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর খৃস্টানরা আরো সতর্ক হয়ে যায় এবং শহরের প্রতিটি গলিতে গোয়েন্দা লাগিয়ে দেয় যাতে মুসলমানদের যে কোন তৎপরতা সম্পর্কে তারা জানতে পারে। ফলে এখন ভেতর থেকে দেয়াল ভাঙার আশা করা বৃথা।’

    এ খবরে মুসলমানদের আশা নৈরাশ্যে রূপান্তরিত হওয়ার উপক্রম হল। ঘটনা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। খৃস্টানরা যখন মুসলমান যুবক ও যুবতীদের লাশগুলো সনাক্ত করতে পারল তখন টাটা বুঝতে পারলো, মুসলমান যুবক ও যুবতীরা জীবন বাজি রেখে আইয়ুবীকে মদদ দিতে এক পায়ে খাড়া। তারা তখন মুসলমানদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশী চালালো। মুসলিম যুবক-যুবতীদের এলোপাথারি ধরাপাকড় শুরু করলো। ধরাপাকড়ের সময় তারা মেয়েদেরকেও রেহাই দিল না। কেবলমাত্র বুড়োদেরকেই তারা নিজেদের ঘরে থাকার সুযোগ দিল। যুবকদেরকে ধরে এনে পাঠাল বেগার ক্যাম্পে আর যুবতীদেরকে দুর্গের সেনা ব্যারাকে নিয়ে বন্দী করে রাখলো। এই মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মহত্যা করে সম্ভ্রম বাঁচালো, বাকীরা শিকার হলো সৈনিকদের অত্যাচার ও দুর্ব্যবহারে।

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গোয়েন্দার রিপোর্ট মনোযোগ দিয়ে শোনলেন। দুঃখ ও বেদনায় হাহাকার করে উঠলো তার হৃদয়। মুসলমানদের এমন কঠিন মূল্য ও কুরবানীর জন্য তাঁর নিজেকেই দায়ী বনে মনে হলো। মনে হলো, সে যদি এ অভিযান শুরু না করতো তবে শহরের মুসলমানদের এখুনি এ দুঃসহ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।

    নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদদের আত্মত্যাগের এ কাহিনী শুনে তিনি মনে মনে বললেন, এই দুঃখজনক ঘটনা পেরেছে কেবল একজন মুসলমানদের গাদ্দারীর কারণে। একজন গাদ্দার মুসলিম মুজাহিদদের এত বড় একটি দলকে অবলীলায় ধংস করে দিল। তিনি আফসোস করে বললেন, মুসলমানদের মধ্যে সবসময় এমন কিছু লোক থাকে যারা আল্লাহর পথে জীবন কুরবানী করে জীবনকে সফল করতে চায়। আবার কিছু মুসলমান এমনও থাকে যারা আল্লাহর ওপর তাদের যে ঈমান আছে সেই ঈমানকে কাফেরের পদতলে বিসর্জন দিয়ে জীবনকে বুরবাদ করে দেয়। স্বার্থের ফাঁদে আটকে পড়ে তারা ইসলামকে ক্ষতি করতে চায়। এই গাদ্দাররাই ইসলামের ইতিহাসের সবচে বড় দুশমন।

    গাদ্দারদের কথা মনে হতেই সুলতান আইয়ুবীর চেহারায় ফুটে উঠল সীমাহীন ক্রোধের আগুন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে অন্য হাতে আঘাত করে বললেন, ‘যে কোন মূল্যে অনতিবিলম্বে ক্রাক দখল করতে হবে। আমি সেইসব গাদ্দারদের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে চাই। যাদের গাদ্দারীর কারণে জাতি বার বার জিল্লতির গর্তে পড়ে যায়।’

    সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা সংস্থার অফিসার জাহেদার তাবুতে প্রবেশ করলো। সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আজ রাতেই আমি চূড়ান্ত আঘাত হান্তে চাই। ক্রাকের পিছন দিকের কোন্ অংশ সবচে দুর্বল আমার জানা দরকার। এ ব্যাপারে তোমার পরামর্শ কি?’

    ‘যে কোন পদক্ষেপের একটা অর্থ থাকা দরকার।’ জাহেদা বললো, ‘চূড়ান্ত আঘাত হানার সময় এখনো আসেনি বলেই আমি মনে করি। সম্ভবত আরো কিছু দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

    ‘কেন, কেন এমনটি মনে হচ্ছে তোমার! তুমি কি কোন নতুন খবর পেয়েছ?’ সুলতান আইয়ুবীর প্রশ্ন।

    ‘আপনি যে সফলতার আশা নিয়ে শত্রুদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন তাতে আপনি পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। শত্রুরা এখনো যথেষ্ট মজবুত। চূড়ান্ত হামলার আগে তাদের মানসিকভাবে আঘাত করা দরকার।’

    জাহেদান কথা বলেছিল নির্ভীকভাবে। সুলতান আইয়ুবী তাঁর সমস্ত অধস্তনদের বলে রেখেছিলেন, তারা যেন তাকে বাদশাহ মনে করে কুর্নিশ না জানায়। কখনও কোন পরামর্শ দিতে চাইলে বীরত্বের সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়েই দেয়। আর সমালোচনার কিছু থাকলে তাও যেন তারা খোলাখুলি বলে ফেলে। জাহেদান সেই নির্দেশ অনুসারেই সাহসিকতার সাথে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করল।

    জাহেদান গোয়েন্দা বিভাগের উর্ধতন অফিসার। তাদের চোখ-কান সজাগ সতর্ক থাকে। গোয়েন্দাদের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, তারা অন্ধকারেও দেখতে পায় এবং দূরবর্তী শত্রুর কানাঘুষা শুনতে পায়।

    সুলতান আইয়ুবী গোয়েন্দাদের মতামতের যথেষ্ট মূল্য দিতেন। তিনি জানতেন, গোয়েন্দাদের রিপোর্ট ছাড়া কোন যুদ্ধেই বিজয় অর্জন করা যায় না। আর যে সময় খৃস্টানরা মুসলিম রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরে গোয়েন্দাদের জালের মত ছড়িয়ে রেখেছে সে সময় গোয়েন্দাদের প্রয়োজন তা আরো অনেক বেশি। সুলতান আইয়ুবীর এখন প্রয়োজন অসাধারণ প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও পরীক্ষিত গোয়েন্দা। এ বিষয়টি তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন দক্ষ ও বিশ্বস্ত এক বিশাল গোয়েন্দা বাহিনী। এ ব্যাপারে তিনি পূর্ণ সফলতা লাভ করেছিলেন।

    এ বাহিনীর হাসান বিন আব্দুল্লাহ ও জাহেদানের মতামতকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তাদের তৎপরতা ও সুচিন্তিত পরামর্শের ফলেই তিনি খৃস্টানদের অনেকগুলো আঘাত ব্যর্থ করে দিতে পেরেছেন।

    গোয়েন্দাদের তৎপরতার ফলেই তিনি জানতে পেরেছিলেন, খৃস্টানরা ক্রাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার সাথে সাথে দুর্গের বাইরে মরুভূমিতে অনেক সৈন্য লুকিয়ে রেখেছে। মুসলমানরা চূড়ান্ত আঘাত হানার সাথে সাথে ওরা পেছন থেকে এসে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

    জাহেদান বললো, ‘মরুভূমি ও পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা খৃস্টান সৈন্যদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে খৃস্টানরা এবার কেল্লার বাইরে যুদ্ধ করতে চায়। তাদের কোন ব্যবস্থা না করেই কেল্লা অবরোধ করায় শত্রুরা যথেষ্ট লাভবান হয়ে গেল।’

    ‘তারা কি এরই মধ্যে আমাদের কোন বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে বসেছে?’ সুলতান সালাহউদ্দিন অস্থির হয়ে প্রশ্ন করেন।

    ‘না এখনো করেনি। তবে তাদের তৎপরতা দেখে বুঝতে পারছি, তারা আমাদের দুর্বল অংশে আঘাত করার জন্য আজ সন্ধ্যা নাগাদ রওনা হয়ে যাবে।’ জাহেদান উত্তর দিল, ‘খবর পেয়েছি, খৃস্টান অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহীরা থাকবে এ অভিযানে। পদাতিক বাহিনীকে তারা খুব কম ব্যবহার করবে। তারা আমাদের ডান ও বাম দিক থেকে আক্রমণ চালাবে। খৃস্টানদের এক বিশাল বাহিনী এ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। অসম্ভব নয়, এতে আমাদের অবরোধ ভেঙে যাবে।’

    ‘আমি তোমাকে ও তোমার গোয়েন্দা বিভাগকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি, যারা এ সংবাদ নিয়ে এসেছে।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আমি জানি আমি যে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি তা বড় কঠিন ও ভয়াবহ। তবু আমি তোমাদের সকলকে আশ্বাস দিচ্ছি, খৃস্টান সৈন্যরা আমাদের যে শূন্য স্থান পূরণ করতে ও অবরোধ ভাঙতে আসছে, আমি তাদেরকে সেই শূন্য স্থানেই নির্মূল করে দেব। আল্লাহ আমাদের নেগাহবান। যদি তোমাদের মাঝে কোন গাদ্দার না থাকে তবে আল্লাহ তোমাদেরকে অবশ্যই বিজয় দান করবেন।’

    একজন সালার বললেন, ‘যদি আপনি আদেশ দেন তবে আমাদের সংরক্ষিত সৈন্যদের একটি বাহিনী খৃস্টানদের পৌঁছার পূর্বেই সেখানে পাঠিয়ে দেই। তাহলে অবরোধের শূন্য স্থান পূরণ হয়ে যাবে এবং খৃস্টানদের আক্রমণ ও পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’

    সুলতান আইয়ুবীর মুখে কোন অস্থিরতা ও দুর্ভাবনার সামান্যতম ভাবও প্রকাশ পাচ্ছিল না। তিনি জাহেদানকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার রিপোর্ট সম্পূর্ণ সত্যি হলে তুমি কি আমাকে আরো কিছু তথ্য দিতে পারবে? তুমি কি বলতে পারবে খৃস্টান সৈন্যরা কোন সময় আক্রমণস্থলে পৌঁছবে?’

    ‘এরই মধ্যে তারা তাদের গোপন আস্তানা গুটিয়ে রওনা হয়ে গেছে। তাদের অগ্রাভিযান খুবই দ্রুত।’ জাহেদান উত্তরে আরো বলল, ‘তাদের সাথে কোন তাবু বা খাদ্যশস্য আসছে না, তা পরে আসবে। মনে হয় তারা রাস্তায় কোথাও বিশ্রাম নিবে না। যদি তারা এ গতিতে আস্তে থাকে তবে তারা মধ্য রাতের সামান্য আগে বা প্রে এসে পৌঁছে যাবে।’

    ‘আল্লাহ করুক তারা যেন রাস্তায় কোথাও না থামে।’ সুলতান আইয়ুবি বললেন, তারা তো ক্লান্ত, অভুক্ত ও পিপাসার্ত ঘোড়া ও উট নিয়ে যুদ্ধ করবে না। সমারাঙ্গনে এসে পশুগুলোকে বিশ্রাম ও খাবার দেবে। সেই সুযোগে তারা দেখতে পাবে, আমরা যে অবরোধ করে রেখেছি তার মাঝে কোথাও কোন ফাঁক আছে কি না।’

    সুলতান আইয়ুবী সালারদের বললেন, খৃস্টানরা আমাদের ফাঁদে পড়তে আসছে।’

    তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘কেল্লার পেছন দিকে আমরা অবরোধের যে ফাঁক রেখেছি সে স্থান আরও ফাঁক করে দাও। দু’পাশে দান ও বামের বাহিনীকে জানিয়ে দাও, তাদের ওপর পিছন থেকে আক্রমণ আসছে। তারা যেন তাদের বাহিনীকে আরও দৃঢ় ও সতর্ক করে নেয় এবং শত্রুদেরকে যেন মাঝখানে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়। আর কোন তীরন্দাজ যেন আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তীর না চালায়।’

    এরপর সুলতান রিজার্ভ পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের কয়েকটি দলে ভাগ করলেন। তাদের নির্দেশ দিলেন, ‘সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাহতে তোমরা অবরোধের দুর্বল স্থানের যতটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছে যাবে, কিন্তু নিজেদের অবস্থান যেন দুশমন টের না পায়। তোমরা লক্ষ্য করেছো। যেখানে আমরা অবরোধ দুর্বল রেখেছি সে এলাকাটা সমান ময়দানও নয়, মরুভূমিতে মত বালুকা প্রান্তরও নয়। সে অঞ্চল টিলা, উপত্যকা ও গিরিখাদে পরিপূর্ণ। সহজেই তোমরা সেখানে আত্মগোপন করতে পারবে।’

    সুলতান আইয়ুবী টহল গ্রুপের কমান্ডারকে ডাকলেন। বললেন, ‘খৃস্টান বাহিনীর পিছনে যে খাদ্যদ্রব্য ও রসদপত্র আসছে তা রাতেই রাস্তায় লুট করতে হবে।’ তিনি তাকে আরও কিছু জরুরী আদেশ দিয়ে তাবু থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। সঙ্গে নিলেন কয়েকজন সালারকে। চললেন রণক্ষেত্রের দিকে।

    সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আত্মতুষ্টিতে বিভোর হওয়ার মত লোক ছিলেন না। তিনি সমস্ত পরিকল্পনা আবার খতিয়ে দেখলেন এবং অবরোধকে কেল্লার কাছ থেকে আরেকটু দূরে সরিয়ে নিতে বললেন। তিনি যুদ্ধরত অফিসারদের বললেন, ‘খৃস্টানদের অধিকার থেকে দুর্গ মুক্ত করা সহজ নয়। প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ টিকিয়ে রাখতে হবে।’

    তিনি বললেন, দুর্গের প্রাচীরের ওপর থেকে বৃষ্টির মত তীর বর্ষণ করছে খৃস্টানরা। এ তীর বৃষ্টি ভেদ করে কেল্লার দরোজা পর্যন্ত পৌছা অসম্ভব। তিনি মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসতে বললেন। কারণ, এ তীরের মোকাবেলায় পালটা আক্রমণ করার কোন যুক্তি ছিল না।

    সুলতান আইয়ুবী কেল্লার প্রধান ফটকের লড়াইয়ের অবস্থা দেখতে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। প্রচণ্ড উৎসাহ, উদ্দীপনা আত্নবিশ্বাস নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল ফটকের মুজাহিদরা। একদল মুজাহিদ তখন বিপুল বিক্রমে দ্রুত কেল্লার প্রাচীরের ওপরে তীর বর্ষণ করে যাচ্ছিল। ছয়টি মেনজানিক আগুন ছুঁড়ে মারছিল প্রাচীরের ওপর। দেয়ালের ওপরে যেখানে তীর ও অগ্নি বর্ষণ হচ্ছিল সেখানে কোন খৃস্টান সৈন্য দেখা যাচ্ছিল না। দেয়াল ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। সুলতান আইয়ুবী দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এসব।

    তাঁর প্রায় চল্লিশজন সৈন্য হাতে বর্শা ও কোদালি নিয়ে দেয়ালের দিকে দ্রুত ছুটে গেল এবং দেয়ালের পাশে গিয়ে পৌঁছালো। কেল্লার প্রাচীর মাটি ও পাথরের গাথুনী দিয়ে তৈরি। তারা দেয়াল ভাঙা শুরু করলো। তাদের নিরাপদ রাখার জন্য কেল্লার ওপরে তীর ও অগ্নিবর্ষণ অব্যাহত রাখলো মুজাহিদরা, যাতে কেল্লার ওপর উঠে শত্রুরা তীর বর্ষণ করতে না পারে এবং কেল্লার দেয়াল ভাঙায় বাঁধা সৃষ্টি না হয়।

    মুজাহিদদের এই সাহস ও তৎপরতা দেখে সুলতান আইয়ুবী বলে উঠলেন, ‘সাবাস! সাবাস মুজাহিদ!’

    সহসা দুর্গের প্রাচীরের ওপর চিৎকার শোনা গেল। সুলতানের চোখ সেই স্থানে নিবদ্ধ হলো, যেখানে আইয়ুবীর নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদরা দেয়াল ভাঙছিল। তিনি দেখলেন, অসংখ্য খৃস্টান সৈন্যের মাথা ও কাঁধ দেখা যাচ্ছে। তাদের হাতে বড় বড় বালতি ও ড্রাম। তীর বৃষ্টির ফাঁক গলে তারা প্রাচীরের ওপর উঠে এল এবং বালতি ও ড্রামে কাঠ ভিজিয়ে তাতে আগুন দিয়ে তা ছুঁড়ে মারতে লাগল নিচে। প্রজ্জ্বলিত কাঠ ও জ্বলন্ত অঙ্গার সেইসব মুজাহিদের ওপর গিয়ে পড়ছিল, যারা নিচে দেয়াল ভাঙছিল। মুজাহিদরা আরো এগিয়ে গিয়ে তীর বর্ষণ শুরু করলে অসংখ্য খৃস্টান আহত হলো সে তীরের আঘাতে। দেয়ালের ওপর ছুটে আসা তীরে মুজাহিদদের তীরন্দাজ বাহিনীর কিছু লোকও আহত এবং শহীদ হয়ে গেলেন।

    শেষে উভয় দিক থেকে এমনভাবে তীর বর্ষণ হতে লাগলো, যেন বাতাসে তীরের জাল বিছিয়ে রাখা হয়েছে। জানবাজ মুজাহিদরা তখনও দেয়াল ভাঙছিল।

    দেয়াল ভাঙা কোন সহজ ব্যাপার ছিল না। কারণ কেল্লার দেয়াল যেমন চওড়া তেমনি মজবুত। এদিকে দেয়ালের ওপর থেকে এই জানবাজদের ওপরে তীর বর্ষণ করা সম্ভব ছিল না বলে তাদের ওপরে জ্বলন্ত কাঠ বর্ষিত হচ্ছিল। কিন্তু এই কাঠ বর্ষণের কাজও সহজ ছিল না। যারাই এগিয়ে আসতো এ কাজে তারাই মুসলিম তীরন্দাজদের তীরের নিশানায় পরিণত হতো।

    ওপরে যখন প্রবল তীর বৃষ্টি হচ্ছিল তখনও নিচে প্রজ্জ্বলিত আগুন এড়িয়ে দেয়াল ভাঙায় অটল ছিল মুজাহিদরা। কিন্তু আগুন যখন তাদের ঘিরে ধরল তখন আর সেখানে টিকতে পারল না। মুজাহিদদের অনেকেই তখন এর মাঝে অগ্নিদগ্ধ হয়ে শাহাদত বরণ করলেন। বাকীরা দৌড়ে ফিরে এলো মূল বাহিনীর কাছে। অনেকের কাপড়ে আগুন লেগে গিয়েছিল, পথের মাঝে মুখ থুবরে পড়ে গেল তাদের কেউ কেউ। কেউবা ফিরতে গিয়ে দুশমনের তীরের আঘাতে লুটিয়ে পড়লো মাঝপথে। বলতে গেলে এভাবে মুজাহিদদের প্রায় সকলেই শহীদ হয়ে গেলেন।

    পাঁচিলের ওপরে পরিখা থাকায় খৃস্টানরা বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। মুসলিম বাহিনী সামান্য পিছিয়ে খৃস্টানদের তীরের আওতার বাইরে চলে এল।

    লড়াই চলছিল মূল ফটককে কেন্দ্র করে। খৃস্টান বাহিনীর দৃষ্টি মুসলমানদের মূল বাহিনীর দিকে, মুসলমানরা তাকিয়ে ছিল খৃস্টানদের দিকে। হঠাৎ মুসলমানরা দেখতে পেল ফটকের অনেক দূর থেকে দশজন মুজাহিদ দেয়াল ঘেঁষে শত্রুদের দৃষ্টি এড়িয়ে ফটকের দিকে এগিয়ে আসছে। শত্রুর দৃষ্টি যাতে তাদের দিকে না পড়তে পারে সে জন্য মুসলমানরা আবার এগিয়ে এল এবং পুনরায় পূর্ণ উদ্যমে তীর বৃষ্টি শুরু করল। দশজনের মুজাহিদ দলটি এই সুযোগে দেয়ালের সাথে সেঁটে গিয়ে দ্রুত ফটকের পাশে পৌঁছে গেল। ওখানে পৌঁছে তারা দ্রুত দেয়ালের পাথর খুলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা অনেকগুলো পাথর খুলে দেয়ালের গায়ে বেশ বড় রকমের একটি গর্ত তৈরি করে ফেললো।

    খৃস্টানরা টের পেয়ে আবার আগুনের গোলা ছুঁড়তে শুরু করল নিচে। কিন্তু এবার সে সব গোলা মুজাহিদদের তেমন ক্ষতি করলে পারল না। কারণ বিপদ দেখলেই ওরা দেয়ালের গর্তে সেঁধিয়ে গিয়ে আত্নরক্ষা করলে লাগল। দু’জন অগ্নি নিক্ষেপকারী ড্রামের আড়াল নিয়ে ঝুঁকে মুজাহিদদের দিকে আগুনের মশাল নিক্ষেপ করতে চাইল, অকস্মাৎ মুসলিম বাহিনীর তীর এসে বিদ্ধ করল তাদের। খৃস্টান সৈন্য দু’জন বিকে তীরের আঘাত খেয়ে পিছনে পড়ার পরিবর্তে দেয়াল থেকে ছিটকে সামনের দিকে পড়ল। তাদের শরীরের বাড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল ড্রামটি এবং মুহূর্তে আগুনের স্তুপে পরিণত হলো আশেপাশে পুরো এলাকা। সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য দু’জন সেই অগ্নিকুন্ডে পড়ে ভস্ম হয়ে গেল, সে সাথে মুজাহিদ দশজনও হারিয়ে গেল সেই বিশাল অগ্নিকুন্ডে

    সুলতান আইয়ুবী ঘোড়া হাকিয়ে দ্রুত কমান্ডারের কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমাদের ওপরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। ইসলামের ইতিহাস এইসব জানবাজদের নাম সবসময় স্মরণ করবে যারা আল্লাহর নামে অগ্নিকুন্ডে ঝাপিয়ে পড়তেও পিছপা হয়নি। এখন তোমরা এ পথ ছেড়ে দাও এবং পিছু সরে আসো। এত তাড়াতাড়ি তীর ও সৈনিক নিঃশেষ করবে না। খৃস্টানরা এই কেল্লার জন্য এত বেশি আত্নত্যাগ করছে যার কোন ধারণাই আমরা করতে পারি না। আমরাও এত বেশি কুরবানী দিব যার ধারণা খৃস্টানদের কাছে নেই।’

    কমান্ডার বললো, ‘আরেকটু চেষ্টা করলেই এখান দিয়ে দেয়াল ভাঙা যাবে আর আমরা এই পথে আপনাকে কেল্লার ভেতরে নিয়ে যেতে পারবো।’

    ‘আল্লাহ তোমার আশা পূরণ করুন।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘তোমার মুজাহিদদেরকে বাঁচিয়ে রাখো। খৃস্টানরা এখন বাইরে থেকে আক্রমণ চালাবে। তোমাকে সম্ভবত বাইরেও যুদ্ধ করতে হবে। অবরোধ সুদৃঢ় রাখো। চোখ-কান খোলা রেখে খানিক জিরিয়ে নাও, আমরা খৃস্টানদের এবার ক্ষুধা-তৃষ্ণার সাথে লড়াই করতে পাঠাবো।’

    সৈন্যদেরকে পিছনে সরিয়ে আনলেন কমান্ডার। কমান্ডার সুলতান আইয়ুবীকে বললো, ‘আপনার অনুমতি পেলে আমি শহীদদের লাশগুলো উঠিয়ে আনতে চাই।’

    ‘হ্যাঁ! সুলতান আইয়ুবি বললেন, ‘নিয়ে আসো। কোন শহীদের লাশ যেন বাইরে পড়ে না থাকে।’

    সুলতান আইয়ুবী চলে এলেন ওখান থেকে। এই জানবাজ সৈন্যরা যেভাবে তাদের বন্ধুদের লাশগুলো উঠিয়ে আনলো, সেও এক কল্পনাতীত দৃশ্য। বন্ধুদের লাশ উঠাতে গিয়ে শাহাদাতের নজরানা পেশ করলো আরো কয়েকজন জানবাজ মুজাহিদ।

    সুলতান আইয়ুবী অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি এমনভাবে চলাফেরা করলেন যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে তিনি কোথায় আছেন। তিনি তাঁর বাহিনী থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন। একাধিক টিলা, উঁচু প্রান্তর ও গিরিপথ পার হয়ে তিনি এক টিলার ওপর ঘোড়া থেকে নামলেন এবং সাবধানে শুয়ে পড়লেন যাতে শত্রুরা তাকে দেখতে না পায়। টিলার ওপর থেকে তিনি কেল্লা ও শহর দেখতে পাচ্ছিলেন। অন্যদিকে প্রায় মাইলখানেক বিস্তৃত অঞ্চল নজরে ভাসছিল তাঁর। তিনি সাবধানে টিলার প্রতিটি এলাকা গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন এবং ঘুরে ফিরে সবকিছু দেখলেন।

    এই গভীর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান করতে করতে সূর্য ডুবে গেল। তিনি সেখানেই অবস্থান করতে থাকলেন। সন্ধ্যার একটু পর তাঁকে সংবাদ দেয়া হলো, নির্দেশ মোতাবেক তীরন্দাজ ও পদাতিক বাহিনী আসছে। তিনি গুপ্তচরকে বললেন, ‘বাহিনীকে সাবধানে আত্নগোপন করতে বলো আর কমান্ডারদেরকে বলো আমার সাথে অবিলম্বে দেখা করতে।’

    বিভিন্ন গ্রুপের কমান্ডাররা বাহিনীকে লুকিয়ে রেখে দেখা করলো এসে সুলতানের সাথে। সুলতান আইয়ুবী পথ-নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে নিজ নিজ বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

    রাত ক্রমে বাড়তে থাকলো। মরুভূমিতে নেমে এল নিশুতি প্রহর। চারদিক সুনসান নীরবতা। মাঝ রাতের দিকে এই নিস্তব্ধ নীরবতা ছাপিয়ে দূর থেকে ভেসে এল সম্মিলিত অশ্বখুরের মৃদু কিন্তু বলিষ্ঠ শব্দ। উন্মাতাল প্লাবন কোন বাঁধ ভেঙে ছুটে আসতে শুরু করলে যেমন শব্দ হয় অনেকটা সে রকম। শব্দ ক্রমে জোরালো হতে থাকল।

    সুলতান সে শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়েছিলেন অপলক নেত্রে। আকাশে ছিল ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। নরম জোসনায় ব্যপ্ত ছিল সমগ্র চরাচর। অনেকক্ষণ ধরে সুলতান শুনছেন সম্মিলিত অশ্ব খুরধ্বনি। অস্পষ্টতা থেকে সে শব্দ একসময় স্পষ্ট হলো। স্পষ্ট শব্দ ক্রমে আরো জোরালো হলো, কিন্তু এই ফকফকা জোসনায়ও কোন বাহিনী নজরে এল না তাঁর। ইয়িনি নিবিষ্ট মনে তাকিয়েছিলেন উন্মুক্ত মরুভূমির দিকে। বুঝতে পারছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই ধেয়ে আসা বাহিনী তাঁর দৃষ্টিসীমায় আঘাত হানবে।

    অবশেষে একসময় তাঁর অন্তহীন প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। দূর দিগন্তে চলন্ত রেখা ফুটে উঠলো। ক্রমে সে রেখা বড় হতে থাকলো। একসময় খৃস্টান বাহিনীর অশ্বারোহী দলটি টিলা ও উচ্চভূমি অঞ্চল পেরিয়ে এল। তাদের পিছনে এল উষ্ট্রারোহী দলও। এদের সৈন্য সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন তিন হাজারের কম। তবে সে সময়ের ঘটনা প্রবাহের যা বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে দশ থেকে বারো হাজারের মত বলে উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ ঐতিহাসিক।

    বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন প্রসিদ্ধ খৃস্টান সম্রাট রিমান্ত। সে এই আক্রমণের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ের আড়ালে তাবু টানিয়ে অপেক্ষা করছিল। তার পরিকল্পনা ছিল ভোর রাতে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বাহিনীর ওপর সে অতর্কিত আক্রমণ চালাবে। কচুকাটা করবে আইয়ুবীর ঘুমন্ত প্রতিটি সৈনিককে। বার বার আইয়ুবী খৃস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করেছিল, এবার তার প্রতিশোধ নেবে রিমান্ত। চিরতরে মিটিয়ে দেবে আইয়ুবীর যুদ্ধের সাধ।

    খৃস্টান সৈন্যরা ঘোড়া ও উটের পিঠ থেকে নেমে এলো নিচে। ঘোড়ার সাথে বাঁধা ঘোড়ার আহার্য দানার ব্যাগ ঘোড়ার সামনে ঝুলিয়ে দিল। আরোহীদের আদেশ দেয়া হলো সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে। রিমান্ত বললো, ‘মা মেরীর সন্তানেরা। তোমাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হতে চলেছে। খৃস্টান জাতির সম্মান ও মর্যাদার বৃদ্ধি করার জন্য আল্লাহ তোমাদের মনোনীত করেছে। তোমরা মুসলমানদের ওপর আঘাত হানবে অতর্কিতে। ওরা যখন হাতিয়ার রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। তোমরা আক্রমণ চালাবে একদল নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর। ফলে তেমন কোন মোকাবেলার সম্মুখীন তোমাদের হতে হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আমি শুধু চাই, তোমরা এওম্ন দ্রুত ও তীব্র আঘাত হানবে, যাতে দুশমন কোনরকম প্রতিশোধের সুযোগ না পায়।’

    সুলতান আইয়ুবী এবং তাঁর পর্যবেক্ষকগণ খৃস্টান সৈন্যদলকে ভালভাবেই লক্ষ্য করছিল। এতবড় বাহিনী দেখে আইয়ুবী ঠিক বুঝলো, খৃস্টানরা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে।

    ভোর রাত। আদম সুরাত হেলে পড়েছে আকাশের একদিকে। চাঁদ পশ্চিম দিগন্তে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। মধ্যরাতের উজ্জ্বল আলো এখন অনেকটা ম্রিয়মান। সারা রাত কুয়াসজা ঝরে সে আলো আরো ফিকে করে দিয়েছে। মরা জোসনায় এখন আর সবকিছু আগের মত স্পষ্ট দেখাও যায় না।

    সে অস্পষ্ট আলোতেই সুলতান দেখলেন খৃস্টান বাহিনী তৎপর হয়ে উঠেছে। ঢিলেঢালা ভাব কাটিয়ে ওরা তৈরী হচ্ছে যুদ্ধের জন্য। অশ্বারোহীরা চেপে বসছে ঘোড়ায়। ওদের হাতে বর্শা ও তলোয়ার। ওরা সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালো। রিমান্ত দেখলেন তার বাহিনী প্রস্তুত। বললেন, ‘যিশুর সৈনিকরা, সামনে বাড়ো।’

    নড়ে উঠলো বাহিনী। ঘোড়াগুলো পা তুললো সামনের দিকে, ঠিক এই সময় আইয়ুবী বললেন, ‘তীর ছুঁড়ো।’

    সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো মুজাহিদদের তীর বর্ষণ। আইয়ুবীর হুকুম মত প্রথম পশলা গেল পিছন সারির ওপর দিয়ে। ঘোড়ার পিঠেই মুখ থুবড়ে পড়লো খৃস্টান সৈনিকদের সে সারিটি। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘোড়ার পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল নিচে।

    বিরতি ছাড়াই ছুটে এল দ্বিতীয় পশলা। আঘাত করল সাওয়ারহীন ঘোড়াগুলোকে। গায়ে তীর বিদ্ধ হতেই লাগামহীন ঘোড়াগুলো ছুট লাগালো এদিক ওদিক। ডানে, বায়ে, সারির মাঝখান দিয়ে, যেদিক পারলো ছুটলো উর্ধ্বশ্বাসে। বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়লো পুরো বাহিনী জুড়ে। বাহিনীর সামনে থেকে খৃস্টান কমান্ডার বুঝতেই পারলো না, ব্যাপারটা কি? কেন এত বিশৃংখলা?

    সে রাগের মাথায় চিৎকার করে গালাগালি শুরু করে দিল। এর পরের আঘাতটা এল উটের বহরের ওপর। ঘোড়ার মতই উটগুলোও দৌড় লাগালো দিশেহারা হয়ে। ফলে মুহূর্তে সমস্ত সেনাবাহিনীতে ছড়িয়ে পড়ল সীমাহীন আতংক।

    এরপর কখনো তীর ছুটে আসতে লাগলো ডান দিক থেকে, কখনো বাম দিক থেকে, কখনো পেছন থেকে। দলে দলে খৃস্টান ফৌজ তীরবিদ্ধ হতে লাগল। তাদের আর্ত চিৎকার প্রভাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিল। যখন ভোরের আলো ফুটে উঠল পাহাড় ও টিলার ফাঁক-ফোকর তখন রিমান্ত পরিষ্কার বুঝতে পারল, খৃস্টান বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর কঠিন বেষ্টনীর মধ্যে আটকা পড়ে গেছে।

    সে জানতে পারল না, কি পরিমান মুসলমান সৈন্য এ অভিযানে অংশ নিয়েছে! তাদের সংখ্যা কি খুবই বেশি? তার মনে হলো, জীবনের অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে তার। জীবনে অনেকবারই মুসলমানদের মুখোমুখি হয়েছে রিমান্ত, কিন্তু এতটা অসহায় অ অনিশ্চয়তা আর কখনো তাকে গ্রাস করেনি। এ যেন এক অবধারিত মৃত্যু ফাঁদ। যে পথে তারা এই গিরি অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল সে পথ আগলে রেখেছে মুজাহিদরা। ডানে-বায়ে পাহাড়ে টিলায় মুসলিম তিরন্দাজ বাহিনী। পাহাড় ও টিলার ফোঁকড় গলে সামনে বেরিয়ে যাবার যে সংকীর্ণ পথ, সে পথও মুজাহিদদের দখলে। খোলা ও সমতল জায়গায় দাঁড়িয়ে মুসলিম তীরন্দাজদের নিশানা হওয়া ছাড়া যেন এখন তাদের আর কিছুই করার নেই।

    রিমান্ত যে পথে এসেছিল সে পথে ফিরে যাওয়ার জন্য একবার ছুটে গেল সেদিকে, কিন্তু মুজাহিদদের প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হলো। যাবার চেষ্টা করলো সংকীর্ণ পথে সামনের দিকে বেরিয়ে যাওয়ার, কিন্তু তাড়া খেয়ে সেখান থেকেও ফিরে এল বাঘের মুখে পড়া ভয়ার্ত হরিনীর মত। ময়দানের মাঝখানে ছুটে এলেই পাহাড়, টিলার পাথর অ ঝোপের আড়ালে থেকে ছুটে আসতো ঝাঁক ঝাঁক তীর।

    মুজাহিদদেরকে আগেই আইয়ুবী সবকিছু বুঝিয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘রিমান্ত আসছে বিপুল শক্তি নিয়ে এবং চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য। অতএব তাকে তোমাদের সেভাবেই অভ্যর্থনা জানাতে হবে।’

    সুলতানের কথায় মুজাহিদরা এই আক্রমণকে সানন্দে গ্রহণ করার মানসিকতা নিয়েই প্রস্তুত হয়েছিল। ফলে রিমান্তের বাহিনীর বিশালতা দেখে তারা মোটেও ঘাবড়ে যায়নি।

    অবরোধকারী মুজাহিদরা এবার খৃস্টানদের সামনে যাওয়ার পথ থেকে সরে গেল। বিজয়ের আশা ছেড়ে ওই পথে পালিয়ে যাওয়ার জন্য রিমান্ত ঘোড়া ছুটালো। পাথর ও ঝোপের আড়ালে বসে মুজাহিদরা যখন দেখলো ধূলির মেঘ তুলে খৃস্টানরা ছুটছে বেস্টনী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তখন তারা সংকেত পাঠালো বেস্টনীর বাইরের মুজাহিদদের কাছে। প্রস্তুত হয়েই ছিল মুজাহিদরা। ধূলার মেঘ নিয়ে যখন অশ্বারোহী দল সেই ফাঁক গলে পরবর্তী বেস্টনীতে বেরিয়ে এল, দু’পাশ থেকে মুজাহিদরা টুটে পড়ল তাদের ওপর। তারা কোথা দিয়ে কেমন করে আক্রান্ত হলো, এ কোথা বুঝার আগেই চোখের পলকে বিপুল সংখ্যক খৃস্টান সৈন্য ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। খৃস্টান সৈন্যরা অনুভব করলো, তারা খাঁচায় বন্দী শিকারের মত অসহায়। এগুনোর পথ রুদ্ধ দেখে আবার পিছনে হটলো ওরা, চলে এল মাঠের ঠিক মধ্যিখানে।

    সমতল এলাকাটি ছিল বেশ বড়সড়। মাঝখানের অনেকটা অংশ দু’পাশের পাহাড় থেকে মারা তীরের আওতার বাইরে থাকায় ওখানে আশ্রয় নিল ওরা।

    সুলতান আইয়ুনী এই যুদ্ধের পরিচালনা ও তদারক নিজেই করছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর কৌশল এবারও তাদেরকে ভয়, আতঙ্ক এবং নিরাশার অন্ধকারে ছুঁড়ে মারল। তারা যেদিকেই যায় দেখতে পায় সামনে বাঁধার পাহাড়। মধ্যিখানের ওই নিরাপদ অঞ্চলটুকু থেকে সামান্য এদিক ওদিক হলেই পাশ থেকে ছুটে আসতো ঝাঁক ঝাঁক তীর।

    খৃস্টান সেনাপতি রিমান্ত তার বাহিনীকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ে চড়ার নির্দেশ দিল। হঠাৎ একযোগে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ওরা ছুটল পাহাড়ের দিকে। কিন্তু মুজাহিদদের তীর বৃষ্টি সব কটি দলকেই আবার ফেরত পাঠাল মাঠের মাঝখানে। সুলতান আইয়ুবীর কমান্ডাররা তাঁর নির্দেশ অনুসারে সামনাসামনি যুদ্ধ করার কোন সুযোগই দিল না খৃস্টানদের।

    বেলা গড়িয়ে চলল। রোদের উত্তাপ বাড়ল। সূর্য উঠে এল মাথার ওপর। খৃস্টানদের ঘোড়াগুলো ক্ষুধা অ পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। সৈনিকরা হয়ে পড়ল ক্লান্ত অ বিপর্যস্ত। তারা চারণভূমি অ পানির সন্ধানে তৎপর হল। দুপুর পর্যন্ত কোন রসদ পৌঁছলো না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল রিমান্ত। কমান্ডারদের ডেকে বৈঠকে বসল। বলল, ‘খাদ্য শস্য তো সকালেই এসে যাওয়ার কথা ছিল!’

    কয়েকজন অশ্বারোহী রসদ নিয়ে আসা বাহিনীর খবর নেওয়ার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মুসলমান তীরন্দাজদের হাতে মারা পড়ল। কিন্তু যদি তারা জীবিত বেরিয়েও যেতে পারতো, তবু কোনদিন আর তাদের রসদ সামগ্রী নিয়ে আসা বাহিনীর সাক্ষাৎ পেতো না তারা। কারণ রাতের অন্ধকারেই সুলতানের পাঠানো টহল বাহিনী পথিমধ্যে তাদের পাকড়াও করে। তাদের অভিযান ছিল খুবই সফল। রসদবাহী দলটিকে তারা সহজেই ঘায়েল করতে সক্ষম হয়। কাফেলার রক্ষীদের হত্যা করে রাতের অন্ধকারেই তারা খৃস্টানদের সমস্ত রসদপত্র কব্জা করে নিয়ে আসে মুজাহিদ শিবিরে।

    দুপুরের একটু পর সুলতান আইয়ুবী তার সংরক্ষিত সৈন্যদলকে ডেকে পাঠালেন এবং রিমান্তের বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে রাখার নির্দেশ দিতে রাত থেকে যে বাহিনী যুদ্ধ করছিল তাদের নিয়ে তাবুতে ফিরে গেলেন।

    যদি মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা খৃস্টানদের সমানও হতো তবু তিনি সামনাসামনি খৃস্টানদের আক্রমণ করে নিঃশেষ করে দিতেন তাদের। কিন্তু বাহিনী স্বল্পতার জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত রইলেন সুলতান। তিনি মুজাহিদ বাহিনীর শক্তি ও সৈন্য অপচয় করতে চান না। তাই শত্রু সেনাদেরকে তিনি আতংকিত ও ব্যতিব্যস্ত রাখলেন ঠিকই কিন্তু তাদের জীবন বায়ু নিভিয়ে দেয়ার জন্য কোন বেপরোয়া পদক্ষেপ ও চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়ালেন না। বরং বাঘ যেমন বাগে পাওয়া শিকার নিয়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকে তেমনি তিনিও ময়দানে দুশমনকে সম্পূর্ণ বেষ্টনীর মধ্যে রেখে টিলা ও পাহাড় অঞ্চলের ঝোপের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে রইলেন। তিনি জানতেন, যতই সম্য অতিবাহিত হবে খৃস্টানরা ধীরে ধরে অকেজো হয়ে যাবে।

    কিন্তু খৃস্টানদের এভাবে অবরোধ করে রাখতে গিয়ে তাদের নিজেদেরেও যতেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছিল। খৃস্টানদের বৃহৎ শক্তিকে বেঁধে রাখতে গিয়ে সুলতানও তার সমস্ত রিজার্ভ আটকে ফেলেছিলেন। এখন এসব সৈন্যদেরকে আর অন্য কোন কাজে ব্যবহার করার সুযোগ থাকল না।

    সুলতান আইয়ুবী রিমান্তের বাহিনীকে আটক করার পর তানুতে ফিরে এসে মূল বাহিনীকে শহর অবরোধ আরো কঠোর ও জোরালো করার আদেশ দিলেন। খৃস্টানরা আর বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পেল না। প্রতিদিন কোন না কোন স্থানে মুজাহিদদের আক্রমণ হতেই থাকলো। এভাবেই অতিবাহিত হতে লাগলো একেকটা দিন। সুলতান আইয়ুবী শহর ও কেল্লার চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। কোন স্থান থেকেই দেয়াল ভাঙার কোন সুযোগ দেখা যাচ্ছিল না।

    অবরোধ করার পর ষোল দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। সন্ধ্যার সময় সুলতান নিজের তাবুতে বসে অফিসার ও সহকর্মীদের সাথে কথা বলছিলেন। আলোচনা হচ্ছিল কেল্লায় প্রবেশ করার কি উপায় বের করা যায় এই নিয়ে। সুলতানের এক দেহরক্ষী তাবুর ভেতরে প্রবেশ করে সংবাদ দিল, ‘সুদান থেকে এক দূত এসেছে।’

    আইয়ুবী বললেন, ‘তাকে জলদি ভেতরে নিয়ে এসো।’

    রক্ষী বেরিয়ে যেতেই সুলতান স্বগতোক্তি করে বললেন, ‘আল্লাহ করুন যেন সংবাদ ভাল হয়।’

    কাসেদ ভেতরে এলে সুলতান সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পারলেন। সে কোন সংবাদ বাহক নয়, একটি সেনাদলের কমান্ডার! সুলতান আইয়ুবী অস্থির হয়ে বললেন, ‘কি খবর, তুমি কি কোন সুসংবাদ নিয়ে এসেছো?’

    কমান্ডার না সূচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললো, ‘প্রধান সেনাপতি যে সুসংবাদ প্রত্যাশা করছেন তেমন কোন সুখবর এখনো আনতে পারিনি, কারন সুদানে এখনও আমাদের বিজয় অর্জিত হয়নি। আবার এ কারণে সংবাদ খারাপও নয় যে, আমরা এখনও পরাজিত হইনি এবং পিছুও হটিনি।’

    ‘তার মানে পরাজয় অ পিছু হটার আলামত দেখা যাচ্ছে, তাই না?’ সুলতান প্রশ্ন করলেন।

    ‘অনেকটা সে রকমই।’ কমান্ডার উত্তরে বললো, ‘এ অবস্থায় এখন আমরা কি করব এ ব্যাপারে আপনার আদেশ জানার জন্যই আমি এসেছি। আমাদের এখন সেনা সাহায্য ভীষণ প্রয়োজন। যদি আমাদের এই প্রয়োজন পূরণ না হয় তবে পিছু হটা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না আমাদের।’

    সুলতান আইয়ুবী ময়দানের বিশদ বিবরণ শোনার আগেই তার জন্য খাবার আনলেন এবং বললেন, ‘তুমি খেতে থাকো এবং খেতে খেতে ময়দানের খুঁটিনাটি সব আমাকে খুলে বলো।’

    সুলতান আইয়ুবীর অনুপস্থিতিতে তাঁর ভাই তকিউদ্দিন মিশরের শাসক রূপে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি মিশর ও সুদানের সীমানার কাছে ফেরাউনের শাসনকালের কিছু ধ্বংসাবশেষের খবর পান। খৃস্টানরা তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য জঘন্য ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। তারা প্রচার করে যে, ‘এসব প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ দখল করার জন্য সুদান শিঘ্রই মিশর আক্রমণ করতে যাচ্ছে।’

    এ গুজন শোনার পর তিনিই আগ বাড়িয়ে সুদান আক্রমণ করার সংকল্প ঘোষণা করলেন। তাঁর সেনাপতি অ উপদেষ্টাগণ তাকে তাঁর ভাই সুলতান আইয়ুবীর অনুমতি নিয়ে আক্রমণ করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু তকিউদ্দিন বললেন, ‘ভাই এখন ক্রুসেডের বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন, এ অবস্থায় আমি তাঁকে বিরক্ত করতে চাই না।’ এই বলে তিনি সুদানের ওপর আক্রমণ করে বসলেন।

    তকিউদ্দিন আবেগের উন্মাদনায় আক্রমণ করে বসলেন ঠিকই কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য যে বিচক্ষণতা অ দক্ষতা থাকা দরকারর তা তার ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, বিচক্ষণতা থাকলে তিনি এই অনাহুত যুদ্ধে জরিয়েও পড়তেন না! যাই হোক, যখন তকিউদ্দিন দেখলেন যুদ্ধের অবস্থা সুবিধের নয় তখন তিনি এই কমান্ডারকে ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। একজন কাসেদ না পাঠিয়ে কমান্ডারকে পাঠানোর কারণ, সে যুদ্ধ ক্ষেত্রের সবিশেষ বর্ণনা সুলতান আইয়ুবীর কাছে বুঝিয়ে বলতে পারবে।

    সুলতান আইয়ুবী আগেই এই যুদ্ধের খবর পেয়েছিলেন। শুধু এতটুকু জানতে পেরেছিলেন, তকিউদ্দিন সুদানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।

    কমান্ডার সুলতান আইয়ুবীকে শোনাল যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ। বললো, ‘তকিউদ্দিন বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু আবেগ ও উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে সুদাম আক্রমণের আদেশ দিয়েছিলেন।’

    সুলতান জানতেন, তকিউদ্দিনের চেতনা ও আবেগ সুলতান আইয়ুবীর থেকে ভিন্ন ছিল না, ভিন্ন ছিল দুই ভাইয়ের বিচার-বিবেচনা ও বিচক্ষণতা। তকিউদ্দিন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা সৎ উদ্দেশ্যে এবং ইসলামী প্রেরণা থেকেই নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছিলেন। নিজের গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট এবং উপদেষ্টাদের মতামতের ওপর পূর্ণ গুরুত্ব ও খেয়াল দেননি।

    তিনি শুধু সেই রিপোর্টের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যাতে সুদানীদের ট্রেনিং নেওয়া এবং আক্রমণের প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। তকিউদ্দিন শত্রুদেরকে প্রস্তুত হওয়ার আগেই বশীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু এর শেষ পরিণাম কি তা জানার চেষ্টা করেননি। সুদানীদের সামরিক শক্তি কেমন ও কত বেশি তাও খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করেননি তিনি। বুঝতে চেষ্টা করেননি, তারা যুদ্ধে কত শক্তি প্রয়োগ করবে এবং কত শক্তি রিজার্ভ রাখবে। তাদের কি পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম আছে তারও খবর নেননি। জানতে চাননি তাদের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী কত? তার চেয়েও বড় কথা, ময়দানে কি ধরণের প্রতিরোধের মোকাবেলা তাকে করতে হনে সে কথা না জেনেই তিনি আক্রমণের হুকুম দিয়েছিলেন। এমনকি মিশরের রাজধানী থেকে সে অঞ্চল কর দূরে এবং কেওম করে সেখানে নিজেদের রসদপত্র পাঠাবেন এর কিছুই না ভেবেই তিনি এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

    সুদানীরা তকিউদ্দিনের বাহিনীকে সীমান্তে কন বাঁধা প্রদান করল না। তারা তাকে সুদান সীমান্ত থেকে দূর পর্যন্ত ভেতরে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিল। শেষে এমন এক স্থানে এনে ফেললো, যেখানে নিষ্ঠুর মরুভূমি তাদের মৃত্যুর জন্য ভয়াল ফাঁদ পেতে রেখেছে। যেখানে প্রাণের কোন অস্তিত্ব নেই, নেই এক ফোটা পানির ব্যবস্থা।

    তকিউদ্দিনের বাহিনী প্রকৃতপক্ষে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর রণ কৌশল অনুযায়ী যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার এবং সংখ্যায় কম হয়েও শত্রুর বড় বড় বাহিনীকে তছনছ করে দেয়ার সামর্থ্য রাখতো। তবে এ জন্য কুশলী সেনানায়কের নেতৃত্বের প্রয়োজন। এ সৈন্যদলকে শুধুমাত্র সুলতান আইয়ুবীই কমান্ড ও ব্যবহার করতে পারতেন।

    সুলতান আইয়ুবী সম্মুখ যুদ্ধের সংঘর্ষ সবসময় এড়িয়ে চলতেন। তিনি সৈন্যদের প্রস্তুত করেছিলেন কমান্ডো লড়াইয়ের উপযুক্ত করে। ক্ষিপ্রতা, গতিশীলতা ও অতর্কিতে আঘাত হানা *** এ বাহিনীর কোন জুড়ি ছিল না। কিন্তু তকিউদ্দিন কৌশলবিহীন শুধু সৈন্য সমাবেশ করে যুদ্ধ করায় অভ্যস্ত ছিলেন। এ বাহিনীতে দক্ষ, পরীক্ষিত ও জানবাজ সৈন্য ছিল। কিন্তু তাদের সঠিক ব্যবহার করার নেতা একমাত্র সুলতান আইয়ুবীই ছিলেন।

    সুদানে আক্রমণ করা মানে, সুলতান আইয়ুবীর এক বিরাট বাহিনীকে বেহুদা বন্দী করে রাখা। খৃস্টানরা এটাই চাচ্ছিল। আর এ জন্যই তারা এরকম চাল চেলেছে। তকিউদ্দিনের বাহিনীকে কৌশলে সুদানের গভীর অভ্যন্তরে নিয়ে তাদের মনোপুত স্থানে কার্যত বন্দী করে রেখেছে। আর তাদের ওপর সুলতান আইয়ুবীর কৌশল অবলম্বন করে রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ চালাচ্ছে। তকিউদ্দিন উট, ঘোড়া এবং সৈন্যদের জন্য এক ফোটা পানিও পাচ্ছে না কোথাও।

    কমান্ডো বাহিনীর সালার অবস্থার নাজুকতা উপলব্ধি করে এক সময় বললো, ‘আমাদেরকে আপনি মরুভুতিতে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিন। আমরা মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের মত সরে পড়বো। এরপর অতর্কিত হামলার মোকাবেলায় আমরাও ওদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাবো এবং কাছ থেকেই ছিনিয়ে আনবো আমাদের খাদ্য ও পানীয়।’

    কিন্তু তকিউদ্দিন এতে বাহিনী সংকোচিত হয়ে পড়বে বলে আশংকা করলেন। ভাবলেন, এতে কেন্দ্রীয় কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। ফলে, তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং এ ধরনের চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিতে বললেন তাকে।

    যখন রসদপত্র বা খাদ্যশস্যের প্রশ্ন উঠে তখন তাদের মনে জেগে ওঠে অজানা শংকা। তারা বর্ডার থেকে এত দূরে চলে এসেছে যে, স্বাভাবিক অবস্থায়ও এখানে রসদ পৌছতে কয়েক দিন লেগে যাওয়ার কথা। আর এখন তো রাস্তায় রসদ বহর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ষোলআনা। যে কোন জায়গায়, যে কোন সময় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা আছে। এ আতংকজনক অবস্থায় পথ চলা নিরাপদ নয় বলেই বহরের প্রতিটি সৈনিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

    কমান্ডো বাহিনীর এ আশংকা অচিরেই সত্য প্রমাণিত হলো। একদিন তারা খবর পেলো, তাদের খাদ্যশস্যবাহী বহর আক্রান্ত হয়ছে এবং শত্রুরা সমস্ত খাদ্যশস্য, রসদপত্র ও বাহনের জন্য নিয়ে আসা পশু লুট করে নিয়ে গেছে। এ ঘটনার পর কমান্ডো বাহিনীর প্রধান আবারো তকিউদ্দিনের কাছে তার প্রস্তাব পেশ করল। কিন্তু তকিউদ্দিন এ প্রস্তাব তো গ্রাহ্যই করলেন না বরং এ জন্য তাকে তিরষ্কার করলেন। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও তকিউদ্দিনের সাথে তার বাকবিতণ্ডা হলো এবং তকিউদ্দিন তাকে কড়া ধমক লাগালেন।

    কমান্ডার বললো, ‘আমরা আপনার নেতৃত্বে যুদ্ধ করতে এসেছি, যুদ্ধ করবো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শত্রুরা রাতের আঁধারে এসে আমাদের খাদ্যশস্য লুট করে নিয়ে যাবে আর আমরা তা চুপ করে দেখবো। লড়াইয়ের স্বার্থে আপনাকে কোন পরামর্শ দিতে পারবো না।’

    তকিউদ্দিন ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘তুমি সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছো। তোমার কাছ থেকে আমার যুদ্ধ করা শিখতে হবে না।’

    কমান্ডার উত্তরে বললো, ‘আমাকে মাফ করবেন, আপনি সুলতান তকিউদ্দিন, সুলতান সালাহউদ্দিন নন। আমরা যুদ্ধ করতে শিখেছি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে নয়। সিপাহসালার হিসেবে তিনি আমাদেরকে যুদ্ধ করতে শিখিয়েছেন আমরা সে ভাবেই যুদ্ধ করতে চাই। সা জীবন আমরা কমান্ডো ট্রেনিং পেয়েছি। আমরা শিখেছি কি করে শত্রুর পেটের মধ্যে ঢুকে তাদের পেট কেটে বেরিয়ে আসতে হয়। আপনার সৈন্যরা ক্ষুধায় মরছে আর তাদের খাবার ও রসদপত্র শত্রুরা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা শত্রুদের রসদ ছিনিয়ে নিয়ে নিজের সৈন্যদেরকে পেট ভরাতে অভ্যস্থ।’

    তকিউদ্দিনের চোখে পানি এসে গেল। তিনি জানতেন কমান্ডার কি প্রেরণা ও আবেগ নিয়ে কথা বলছে। রাগের পরিবর্তে তার মাঝেও এসে ভর করলো আবেগ। তিনি সেই আবেগ দমন করে বললেন, ‘আমি সেই জাতি বারিতালাকে ভয় করি। নিজে নিরাপদ অবস্থানে থেকে আমি এই জানবাজদের কি করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেই বলো?’

    ‘এ কথা আপনার আগেই ভাবা উচিত ছিল। এভাবে আপনার আক্রমণ করা উচিত হয়নি। কিন্তু এখন আর এ কথা ভেবে লাভ নেই। আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আল্লাহর নামে জীবন কুরবানী করতে ভয় পায়। মুজাহিদ যতবেশী মৃত্যুর কাছাকাছি হয় ততই সে আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করে। আমরা এখন দুশমনদের ফাঁদে পড়ে আছি। এ অভিযানে আমরা যদি বিজয় অর্জন করতে না পারি তবে শাহাদাতের গৌরব থেকে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না।’

  • দূর্গপতন

    দূর্গপতন

    যে রাতে আলী বিন সুফিয়ান সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে বলছিলেন, যুদ্ধ থেকে আগত সেনাবাহিনী মিশরে অবস্থানরত সৈন্যদের ওপর রেগে আগুন হয়ে আছে, সেই রাতে এক রহস্যময় পীর কায়রো থেকে বহু দূরে একটি খেজুর বাগানে তাবু টানিয়ে বসেছিলেন। তার একটা নিয়ম ছিল, তিনি দিনের বেলা এবং চাদনী রাতে কারো সাথে দেখা করতেন না। অন্ধকার রাত তার কথা বলার ও সাক্ষাতের সময়। তার মাহফিল অসংখ্য মোমবাতির আলোয় এমনভাবে সাজানো হতো, যেখানে আলো-আধারীর রহস্যময় এক জগত তৈরী হয়ে যেতো। সেই আলোর প্রভাব উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে যাদুর মত কাজ করতো। –

    তিনি যেখানে তাবু টানিয়ে দলবল নিয়ে বসেছিলেন, তার অদূরেই গ্রামের ভক্তকুল বসেছিল তাজিমের সাথে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মিশরীয় মুসলমান, কিছু ছিল সুদানী হাবশী। সেই গ্রামে একটি মসজিদ ছিল। মসজিদের ইমাম ছিলেন একজন শান্তশিষ্ট নিরীহ আলেম। এক যুবক দু’মাস যাবত তার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করতে আসতো। যুবকের নাম মাহমুদ। সে দূরের একটি গ্রাম থেকে আসতো। পড়ার প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ।

    তবে তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ ছিল, সেই গ্রামের একটি মেয়ের প্রতি। মেয়েটির নাম সাদিয়া।

    সাদিয়াও ভালবাসতো মাহমুদকে। প্রায় প্রতিদিনই মাহমুদের আসার পথে এক উপত্যকার ঢালে মেয়েটি বকরী চড়াতো এবং মাহমুদ এলে তাকে তার বকরীর দুধ পান করতে দিতো।

    গ্রাম থেকে দূরে সেই নির্জন চারণভূমিতেই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সাদিয়া সেখানে তার চারটি বকরী ও দুটি উটকে তখন পানি পান করাচ্ছিল। মাহমুদ পিপাসায় কাতর হয়ে পানি পান করার জন্য এগিয়ে গেল মেয়েটির কাছে। সাদিয়া তার হাতে পানি তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথেকে এসেছেন?’

    ‘আমি!’ বলল মাহমুদ, অই ওদিক থেকে।

    যাবেন কোথায়?”

    মাহমুদ উল্টো দিকে ইশারা করে বলল, ওদিকে।

    সাদিয়া মাহমুদের কথা শুনে হেসে উঠল, বারে! জায়গার কোন নাম নেই?”

    নাম দিয়ে কি করবে তুমি? এ দুনিয়ার সবটাই আল্লাহর, আর আমি তার খলিফা। মানে, এ দুনিয়াটাই আমার। ফলে আমার যেখানে খুশি সেখানে যাবো, তাতে তোমার কি?’ মাহমুদের এমন আজব উত্তরে খিলখিল করে হেসে উঠল সাদিয়া।

    ‘হাসলে কেন?”

    “তওবা, তওবা! সাদিয়া তার দু’গালে মৃদু চাপড় দিয়ে বললো, তাইতো! কত বড় আস্পর্ধা আমার! ছোটখাট কোন দেশের বাদশার সামনে হাসাই যেখানে বেয়াদবী, সেখানে দুনিয়ার সম্রাটের পাশে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি! না, না, এ মহা অন্যায়। হুজুর আমাকে মাফ করে দিন। ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাত জোড় করল সাদিয়া।

    এবার হেসে উঠল মাহমুদও, বাহ! আমাকে একেবারে সম্রাট বানিয়ে দিলে!’

    এভাবেই ওদের প্রথম আলাপ পরিচয় হয়। মাহমুদ মুসলমান শুনে সাদিয়া তার সাথে অন্তরঙ্গ ব্যবহার করে। খুশি। হয়। তার চোখে মুখে সে খুশির ঝিলিক দেখতে পায় মাহমুদ। ঠোঁটে দেখতে পায় লাজরাঙা মধুর হাসি। দু’জনেরই দু’জনকে ভাল লেগে যায়। আলাপ জমে ওঠে।

    মাহমুদের কথা শুনতে খুব ভাল লাগছে সাদিয়ার। ও তার বলার ভঙ্গিতে মুসলিম সৈন্যদের সম্পর্কে আগ্রহ ও সমর্থন প্রকাশ পাচ্ছিল। .

    সে যখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সম্পর্কে প্রশ্ন করলো, তখন মাহমুদ তার উচ্ছসিত প্রশংসা করলো। সাদিয়া জানতে চাইলো, যিনি,আকাশ থেকে নেমে এসেছেন এবং মৃতকে জীবিত করতে পারেন সেই পীরের চেয়েও কি তিনি বেশি কামেল ও মহাপুরুষ?

    সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী কোন মৃতকে জীবিত করতে পারেন না। উত্তরে বলল মাহমুদ, তিনি পৃথিবী থেকে অন্ধকার ও অশান্তি দূর করে মানুষকে শান্তি ও আলোতে নিয়ে আসেন।

    সাদিয়া বললো, তবে যে শুনেছি, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী একজন খুনি। তিনি নাকি হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর। সুযোগ পেলেই তিনি মানুষ হত্যা করেন?

    তোমাকে কে বললো তিনি লোকজনকে হত্যা করেন?

    ‘আমাদের গ্রাম দিয়ে যে সব পথিক যাওয়া আসা করে তাদের মুখে শুনেছি। তারা বলে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব খারাপ লোক। তার দীলে কোন রহম নেই। এমনিতে সে নাকি খুব ভালো ভালো কথা বলে। আমাদের মত নামাজ রোজাও করে। কিন্তু হিংস্রতাই নাকি তার সব ভাল কাজ বরবাদ করে দিয়েছে।’

    তোমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব কি বলেন?’ মাহমুদ প্রশ্ন করলো।

    তিনি অন্য রকম বলেন, বলল সাদিয়া। তিনি বলেন সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী ইসলামের আলো সমগ্র মিশর ও সুদানে বিকশিত করতে এসেছেন। আর ইসলামই আল্লাহর একমাত্র সত্য দ্বীন।

    সাদিয়ার কাছ থেকেই সে জানতে পারলো, তাদের গ্রামে ইদানিং এমন সব লোক আসা যাওয়া করে, যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও তাদের আচার আচরণে ইসলামের নমুনা পাওয়া যায় না। তারা এমন সব কথা বলে, যাতে মানুষের মনে ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে যায়। তারা বলে, সমাজ ও সভ্যতা কখনো এক জায়গায় বসে থাকে না। সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবন যাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদেরও সময়ের সাথে এগিয়ে যেতে হবে। শুধু ইসলাম নিয়ে বসে থাকলে হবে না।

    আমার এক চাচা জিজ্ঞেস করেছিল, কেন হবে না?’

    তারা বললো, “কেমন করে হবে? আপনি কি কোরআনের কোন শব্দ পাল্টাতে পারবেন? যদি না পারেন তবে পুরোনো কোরআনকে জীবন বিধান মেনে নিয়ে আপনি কি করে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলবেন?

    চাচা বললেন, “তাহলে কি আমরা কোরআন ছেড়ে দিব, ইসলাম ছেড়ে দিব”?

    ‘না, না, তা ছাড়বেন কেন? আমরা কি তাই বলেছি। আমরা কি মুসলমান নই? আমরা কোরআন পড়বো, নামাজ রোজাও করবো। কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্যসহ দুনিয়াবী কাজে ইসলামকে টেনে এনে অপবিত্র করবো না। রাজনীতিতে ইসলামকে জড়াবো না। তাহলে ইহকালও রক্ষা পাবে, পরকালও রক্ষা পাবে। রাসূল যখন দুনিয়ায় এসেছিলেন তখন তিনি সে সময়ের আলোকে জীবন ধারণ করেছেন, আমরাও আমাদের সময়ের দাবীকে উপেক্ষা করতে পারি না, এ কথাই আমরা বলতে চাচ্ছি।”

    ‘সময়ের দাবী কি?” চাচা জিজ্ঞেস করেছিলেন।

    সময়ের দাবী হচ্ছে, এখন মানুষ অনেক সভ্য হয়েছে। পাঁচশো বছর আগে মানুষ যেমন বর্বর ছিল এখন আর তেমন নেই। এমন অনেক সমস্যা আছে যা আমরা আলাপ আলোচনা করে সমাধান করতে পারি। এ জন্য অহেতুক যুদ্ধের কোন দরকার পড়ে না। দুশমন বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে তা ফিরিয়ে দেয়া অনুচিত। দিলে তাতে নিজেরই ক্ষতি হয়। মারামারিতে কখনো এক পক্ষ মরে না, দু’পক্ষই মারা পড়ে তাতে। তাই কারো সাথে শক্রতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব এ নীতি গ্রহণ করে অশান্তির পরিবেশ থেকে ফিরে আসাই এখন সময়ের দাবী।”

    মাহমুদ সাদিয়ার সাথে আলাপ করে অনেক কিছুই জানতে পারলো। বুঝলো, ইসলামের পক্ষে যারা কাজ করছে তাদের চরিত্র হননের কাজে নেমেছে দুশমন। আর কেউ না জানুক, মাহমুদ তো জানে সুলতান আয়ুবীর মনে মানুষের জন্য কী অপরিসীম দরদ নিজের জীবন বিপন্ন করে আইয়ুবী এত যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন তা কেবল মানুষ ও মানবতার কল্যাণের জন্য। ধন-দৌলত বা অন্য কিছুর জন্য তাঁর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোন দরকার নেই।

    সাদিয়াকে সে বলল, সাদিয়া, তুমি যা শুনেছো সবই ৷ ভুল। ইসলামের দুশমনদের মিথ্যা প্রচারণা। যারা এসব কথা বলেছে তারা মুসলমান কি অমুসলমান আমার জানা নেই। হয়তো জন্মসূত্রে তারা মুসলমান। কিন্তু মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই কেউ মুসলমান হয়ে যায় না। তুমি জানো, নূহ নবীর সন্তান কেনান ইসলাম গ্রহণ করেনি। ফলে নবীর সন্তান হয়েও সে মুসলমান হতে পারেনি। অন্য দিকে হাজার হাজার কাফের ইসলামের নীতি ও আদর্শকে গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে।

    আজকে যারা ইসলামের শত্রুদের চক্রান্তে পড়ে কোরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে কথা বলছে, যতই তারা নামাজ রোজা করুক, নিজেদের মুসলমান বলে দাবী করুক, তারা যে ইসলামের স্বপক্ষ শক্তি নয় এতে কোন সন্দেহ নেই! ইসলামের বিপক্ষ শিবিরে অবস্থান করে এবং ইসলামের বিপক্ষ শিবিরে থেকে কেউ মুসলমান থাকতে পারে বলে আমার জানা নেই। মোনাফিকদের অবস্থান নাকি কাফেরের চাইতেও নিচে। কাল হাশরের মাঠে এদেরকে মুসলমানের দলে রাখা হবে, না মোনাফিকের দলে, সে চিন্তা আমার নয়, যারা এ কাজ করছে তারাই করুক। আমি শুধু বলবো, এরা এখন যা করছে তা ইসলামের জন্য ক্ষতিকারক।

    কিন্তু খুন খারাবি তো আসলেই খারাপ। তুমি কি মারামারি সমর্থন করে?

    সাদিয়া তুমি তো জান পৃথিবীতে মহানবী (স) এর চেয়ে দয়ালু কোন মানুষ আজ পর্যন্ত আসেননি এবং ভবিষ্যতেও আসবেন না। কেবল মিত্র নয়, নিজের আত্মীয়স্বজন নয়, সঙ্গী সাহাবী নয়, পৃথিবীর সব মানুষকে ভালবাসতেন তিনি। এমনকি শক্রকেও। তাইতো তাঁকে কাহিনী ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। যে বুড়ি প্রতিদিন তাঁর চলার পথে কাঁটা দিত, অসুখের সময় তাকেও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন রাসূল। তুমি কি খুনি বলে ঘৃণা করবে। এই মহামানবকে?’

    মাহমুদের কথায় অবাক হয় সাদিয়া, কেন? তাঁকে ঘৃণা করবো কেন? তিনি তো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মানুষ। শুধু মুসলমানরাই নয়, অনেক অমুসলমানও তাঁকে শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে।”

    মাহমুদ বলে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী যেমন মানুষ হত্যা করে, যুদ্ধ করে, তিনিও জীবনে তেমনি অসংখ্য যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করলেই কেউ খুনি হয় না, বরং যুদ্ধ করে মানবতার শক্রদের বিনাশ না করলে অন্যায় হয়। আইয়ুবীও তেমনি মানবতার শক্ৰদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ইসলামের দুশমনরা তাই তাঁকে দেখতে পারে না, তাঁকে খুনি, সন্ত্রাসী বলে সমাজে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়।’

    মাহমুদের কথায় সাদিয়ার মনের সব সন্দেহ দূর হয়ে যায় |

    মাহমুদ বলে, ‘চলি সাদিয়া। আল্লাহ চাইলে আবার আমাদের দেখা হবে।’

    মাহমুদের মিষ্টি ব্যবহার এবং তার ব্যক্তিত্ব সাদিয়ার কোমল মনে গভীর রেখাপাত করে। মাহমুদের ভাষার মাধুর্য ও চিন্তার স্বচ্ছতায় বিস্ময়বোধ করে সে। আবারো তার সাথে কথা বলার জন্য অধীর হয়ে উঠে তার মন। বলে, “আমি প্রতিদিন বেশির ভাগ সময় এখানেই বকরী ও উট চরাতে আসি। যদি এ পথে কখনো আসেন দেখা করে গেলে খুশি হবো।’

    ‘অবশ্যই তোমার সাথে দেখা করবো আমি।’ বলল মাহমুদ।

    মাহমুদ সাদিয়ার হৃদয়ে এক অশান্ত ঢেউ তুলে চলে গেল সেখান থেকে। একাকী, পেরেশান অবস্থায় সাদিয়া তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘কে তুমি যুবক? কোথেকে এলে তুমি আমার মনোবীণায় সুর বাজাতে! আমার হৃদয় সাগরে অশান্ত ঢেউ জাগাতে? তোমার পোষাকপরিচ্ছদ এ অঞ্চলের মত হলেও তোমার চেহারা, তোমার আকৃতি, তোমার কথা বলার ভঙ্গি বলে, তুমি এ অঞ্চলের কেউ নও।

    সাদিয়ার সন্দেহ সত্য ছিল। মাহমুদ বিন আহমদ কোন পল্লী এলাকার মানুষ ছিল না। সে ছিল আলেকজান্দ্রিয়া শহরের বাসিন্দা। আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের একজন চৌকস কর্মী। কয়েক মাস ধরে তার দায়িত্ব পড়েছে সীমান্ত এলাকায়। সেই থেকে সে এই পল্লী অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    নিজের পরিচয় সে যথেষ্ট গোপন রেখেছিল। তার সাথে আরও কয়েকজন গোয়েন্দা এ অঞ্চলে কাজ করছে। তারাও বিভিন্ন বাহানায় ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামে গ্রামে। মাঝেমধ্যে তারা একত্রে মিলিত হয়। তারা যে সব খবর সংগ্রহ করতে পারে তা নিয়মিত এক সার্থীকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় কায়রো। এভাবেই আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দারা সীমান্ত এলাকায় এক অদৃশ্য গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

    সাদিয়াদের পাশের গ্রামের দু’টি মসজিদের ইমামের ব্যাপারে সে এরই মধ্যে সন্দেহজনক খবর পেয়েছে। জানা গেছে, ওই দুই মসজিদে নতুন ইমাম এসেছে। আগে এই দুই মসজিদে কোন বাঁধাধরা ইমাম ছিল না। গ্রামের মরুকবীদের যিনি যখন উপস্থিত থাকতেন তিনিই নামাজ পড়াতেন।

    নতুন ইমাম এসে জিহাদের বিরুদ্ধে ওয়াজ শুরু করল। কুরআনের আয়াত পাঠ করে তার ভুল তাফসীর ও ব্যাখ্যা দিতে লাগল। রহস্যময় পীরকে তারা সত্য বলে প্রচার করল এবং পীরের সাথে দেখা করে ফয়েজ ও বরকত লাভের উপদেশ দিতে লাগল জনগণকে। মাহমুদ এই ইমাম দু’জনের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কায়রো রিপোর্ট পাঠিয়েছে।

    সাদিয়ার কাছ থেকে জানতে পারল তাদের গ্রামের ইমাম সুলতান আইয়ুবীর ভক্ত এবং ইসলামের নিশানবাহী। এ খবর শুনে সে খুব খুশি হলো। মনে মনে ভাবল, সাদিয়ার তথ্য কতটা সঠিক একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

    সে সাদিয়াদের গ্রামের মসজিদে গিয়ে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করলো। ইমাম সাহেবকে মাহমুদ বললো, ‘আমি ধর্মীয় জ্ঞান লাভের জন্য উস্তাদ খুঁজে বেড়াচ্ছি। আপনি কি কষ্ট করে আমাকে একটু দ্বীনি তালিম দেবেন?

    ইমাম সাহেব মাহমিদের প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে বললেন, যুবক, তোমার প্রস্তাব আমি সানন্দে কবুল করলাম। দ্বীনি তালিম নেয়ার প্রতি তোমার আগ্রহ দেখে আমি খুবই খুশি হয়েছি। ইচ্ছে করলে তুমি কাল থেকেই তালিম নিতে আসতে পারো।

    পরের দিন থেকেই মাহমুদ নিয়মিত ইমামের কাছে তালিম নিতে শুরু করল।

    ইমাম সাহেব মসজিদে একাই থাকতেন। ইসলামের সঠিক শিক্ষা জনগণের মধ্যে প্রচার করায় পীরপন্থী লোকেরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। মুসল্লীদেরকে উত্তেজিত করতে লাগল তারা। তিনি অনুভব করলেন, মুসল্লীদের উত্তেজিত করার এ কাজে খৃস্টানদের অনুচররাও সক্রিয়। ক্রমেই অবস্থার অবনতি ঘটতে লাগল। এক সময় জীবনের নিরাপত্তা নিয়েই শংকিত হয়ে পড়লেন তিনি। ভাবলেন, এখন তার একজন সঙ্গী দরকার।

    একদিন তিনি মাহমুদকে বললেন তুমি ইচ্ছা করলে এখানেই থাকতে পারো। তাতে তোমার পড়াশোনার সুবিধা হবে।’

    মাহমুদের পক্ষে সারাদিন মসজিদে আটকে থাকা সম্ভব ছিল না। সে ইমাম সাহেবকে বললো, দু’তিন দিন পর পর বাড়ী যাওয়ার সুযোগ পেলে এখানে থাকতে আমার আপত্তি নেই।’

    ইমাম সাহেব একটু হাসলেন এবং জানতে চাইলেন, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’

    মাহমুদ ইমাম সাহেবের কাছে তার আসল ঠিকানা বলল না। সে বেশ দূরের সীমান্তবতী একটি গ্রামের নাম বলে দিল।

    ইমাম সাহেব এবার জোরে হেসে ফেললেন এবং আস্তে করে বললেন মাহমুদ বিন আহমদ আমি তোমার বুদ্ধিমত্তায় ও তৎপরতায় খুবই খুশি। দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের প্রত্যেকেরই এমন সজাগ ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আমি আগেই শুনেছিলাম, আলেকজান্দ্রিয়ার মুসলমানরা দায়িত্বের ব্যাপারে খুবই নিষ্ঠাবান ও নির্ভরশীল হয়। তোমাকে দেখে এর সত্যতার প্রমাণ পেলাম।”

    মাহমুদ এমন চমকে উঠলো যে, ভয় পেয়ে সে দাঁড়িয়ে গেল। সে মনে করল, ইমাম সাহেব ক্রুসেডের চর এবং তার কাছে তার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে। সে মুহুর্তে আকস্মিক হামলা মোকাবেলা করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেল। ইমাম সাহেব কথা শেষ করলেও সে একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল এবং পেরেশান হয়ে ইমাম সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো, কোন দিক থেকে প্রথম আঘাতটা আসবে।

    ইমাম সাহেব তাকে বেশীক্ষণ এই সন্দেহের রাজ্যে থাকতে দিলেন না। তিনি বললেন, আমি অনুভব করছি, কমপক্ষে তোমার কাছে আমার গোপনীয়তা রক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আমিও তোমার মত আইয়ুবীর গোয়েন্দা বিভাগের একজন সামান্য খাদেম। তোমার যে সব সঙ্গী সাখী এ অঞ্চলে কাজ করছে তাদের প্রায় সকলকেই আমি চিনি। অবশ্য আমি জানি, আমাকে তোমরা কেউই চেনো না। কারণ, শক্রদের ওপর দৃষ্টি রাখার সাথে সাথে আমাদের গোয়েন্দাদের তৎপরতার ওপরও দৃষ্টি রাখা আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্ব পালনের জন্যই ইমাম হিসাবে এখানে আছি।’ –

    কিছু মনে করবেন না, আপনি যে পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করছেন তাতে আপনার আরো হুশিয়ার হওয়া উচিত। মাহমুদ আশ্বস্ত হয়ে বললো, ‘আমার কাজে আপনি খুশি হয়েছেন, কিন্তু আমার সামনে আপনি নিজেকে যেভাবে উন্মুক্ত করে দিলেন তাতে আমি খুশি হতে পারিনি। একটু অসতর্কতাই শত্রুর কাছে আপনার পরিচয় ফাঁস করে দিতে পারে।”

    আমি অসতর্ক নই মাহমুদ, আমি তোমার পরিচয় জানি।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তোমার কাছে আমার আসল রূপ প্রকাশ করার। আমার আরও দু’জন সঙ্গী ছদ্মবেশে এখানে জনসাধারণের সাথে মিশে আছে। আমার আরও লোকের প্রয়োজন। তুমি আমার কাছে চলে আসায় ভালই হয়েছে।

    এই গ্রামে শক্রদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তুমি হয়তো সে পীর সম্পর্কে শুনেছো, যে অজ্ঞাত ভবিষ্যতের খবর বলতে পারে আর মৃতদের জীবিত করতে পারে বলে গুজব ছড়াচ্ছে। এই গ্রামও সেই গুজবে মেতে উঠেছে। আমি গ্রামবাসীদের বলেছি, এসব মিথ্যা প্রচারণা, মৃত লাশের মধ্যে কেউ প্রাণ দিতে পারে না।”

    কিন্তু গুজব যাদুর মত ছড়িয়ে পড়ায় লোকেরা আমার কথায় কান দিচ্ছে না, আমার বিরুদ্ধে এখানে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। আমি এখন আরো সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি। ইদানিং তাই আর মসজিদ থেকে বেশি বের হই না। এ ব্যাপারেই তোমাকে আমার পাশে দরকার।

    আমার এখন সঙ্গী প্রয়োজন। এখানকার যে সব লোককে ধোঁকায় ফেলে বিপথগামী করা হচ্ছে তাদেরকে ইসলামের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যই এ সঙ্গী দরকার আমার। তোমাকে একটা ঘটনার কথা বলি, পনেরো বিশ দিন আগে রাতে আমার কাছে দু’জন লোক আসে। আমি তখন হুজরাখানায় একা ছিলাম। লোক দু’জনের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। তারা আমাকে হুমকি দিয়ে বললো, এখান থেকে চলে যাও।

    আমি বললাম, কোথায় যাবো! আমার যে কোন ঠিকানা নেই।’

    তারা বললো, যদি এখানে থাকতে চাও তবে তালিম দেয়া বন্ধ করো আর সেই পীরের কথা বলো, যিনি আকাশ থেকে খোদার সঠিক দ্বীন নিয়ে এসেছেন।

    আমি মুখোশপরা ওই আগন্তুক দু’জনের সাথে মোকাবেলা করতে পারতাম। অন্ত্র আমি সবসময় সাথেই রাখি। কিন্তু আমি দু’জনের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের হত্যা করলে কিংবা নিজে আহত বা নিহত হলে তো আর সমস্যা মিটে যাবে না। আমি তাই খুব ধীরস্থিরভাবে চিন্তাভাবনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বললাম, ঠিক আছে, আজ থেকে তোমাদের কথা মতই চলবো। আমাকে নিজেদেরই একজন মনে করতে পারো এখন থেকে।

    তারা বললো, এ ওয়াদা মত চললে তুমি তোমার কাজের যথাযোগ্য পুরস্কার পাবে। তোমাকে আর হত্যা করার দরকার হবে না। তার বদলে তুমি পাবে ধন-দৌলত, অঢেল স্বর্ণমুদ্রা।

    ‘তারপরে কি আপনি আপনার ওয়াজের স্টাইল পাল্টে ফেলেছেন?” মাহমুদ প্রশ্ন করে।

    যতটুকু পারা যায়। ইমাম সাহেব বললেন, “আমি এমনভারে কথা বলি যাতে দু’কুলই রক্ষা পায়। স্বর্ণমুদ্রা লাভের আশায় নয়, সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই এ কৌশল গ্রহণ করতে হয়েছে আমাকে।

    তিনি আরো বললেন কি করে তোমাদের খবর দেবো এ নিয়ে আমি পেরেশান ছিলাম। তোমাকে ও তোমার সাখীদের খুঁজে বেড়াতে বাইরে গেলে তাতে সবারই জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যেতো। এ জন্য আল্লাহ নিজেই তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যেদিন থেকে আমার কাছে তুমি তালিম নেয়া শুরু করেছো সেদিন থেকেই আমার মস্তবড় একটা দুর্ভাবনা দূর হয়ে যায়।’

    ‘আপনি কি রাতে একাই থাকেন?”

    ‘হ্যাঁ, পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় আমার একা থাকা ঠিক হচ্ছে না। তার চেয়ে তুমি কেউ কিছু মনে করবে না।

    জ্বি, আপনি ঠিকই বলেছেন।

    গ্রামে দুশমনের তৎপরতা খুবই বেড়ে গেছে। এদের মোকাবেলা করার জন্য আমার এখন শক্তির প্রয়োজন। গ্রামে আমার কিছু ভক্ত আছে, ওরা আমার সাথে সহযোগিতা করবে। এদিকে তোমরা থাকায় সে শক্তি আরো বৃদ্ধি পেলো। কিন্তু অবস্থা যা তাতে বড় ধরনের বাহিনী দরকার হতে পারে। তাহলেই আমি বিপদে পড়ে যাবো। সীমান্তের কোন রক্ষী কমাণ্ডারের ওপর বিশ্বাস বা ভরসা করা এখন ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। শক্ররা স্বর্ণমুদ্রা ও সুন্দরী নারী দিয়ে তাদের হাত করে রেখেছে। তারা মাসিক বেতন নেয় আমাদের সরকার থেকে আর কাজ করে শক্রদের।”

    সেদিন থেকে মাহমুদ বিন আহমদ তার কাছেই থেকে গেল। ইমাম সাহেব তাঁর কয়েকজন ভক্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন মাহমুদের।

    কিছু দিন ধরে মিশরের পল্লী অঞ্চলে শুরু হয়েছে এক নতুন ফেতনা। গ্রামের অশিক্ষিত মূৰ্খ লোকদের কুসংস্কারকে কেরামতি দেখিয়ে সে কোমলমতি সরল লোবগুলোর ঈমান ক্রয়ের চেষ্টা করছে। ব্যবসাটা যথেষ্ট লাভজনক ; কেবল ভক্তি আর শ্রদ্ধাই নয়, দেদার মালকড়িও আসছে এতে।

    এই পীর কোথাও আস্তানা গাড়ে না। আজ এখানে, কাল ওখানে ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের লোকেরা তার পথের দিকে চেয়ে থাকে উন্মুখ হয়ে। একজন আরেকজনকে বলে, বড় কামেল পীর, আহা! কী দ্বীনদার, কত পরহেজগার। তিনি মানুষের মনের কথা পর্যন্ত বলে দিতে পারেন।’

    আহা! শুধু তাই নাকি, উনি তো মানুষের ভবিষ্যতও দেখতে পারেন!

    শুনেছি উনার কাছে গিয়ে কিছু বলতে হয় না? মানুষের চেহারা দেখেই নাকি সব কিছু বুঝে ফেলেন উনি। বলে দেন তার বিপদের কথা? অসুখ নিয়ে গেলে কিছু জিজ্ঞেস না করেই অসুধ দিয়ে দেন? আরেকজন জানতে চায়।

    ‘তো আর বলছি কি! তিনি মানুষের ভূত-ভবিষ্যত সব দেখেন, সব বলতে পারেন।

    আমি তো শুনেছি তিনি মৃতকেও জীবিত করে দিতে পারেন | কেউ দেখে, কেউ না দেখেই এ পীরের ভক্ত হয়ে যায়। গ্রামের সরল মানুষগুলো তার কেরামতির কথা এমন অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, এতটা ভয় ও ভক্তি তারা আল্লাহর কালামকেও করে না। তার কথার সত্যাসত্য যাচাই করার প্রয়োজনও মনে করে না কেউ। লোকজনের বিশ্বাস, এ পীর আকাশ থেকে নেমে এসেছে। খোদার সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ। তার কাছে যা চাওয়া যাবে তাই পাওয়া যাবে।

    পথিকরা পথ চলতে চলতে গল্প করতো এ পীরের পীর সাহেব কি কি কেরামতি দেখিয়েছে। অন্যজনই বা পেছনে পড়ে থাকবে কেন, সে আরো অবাক করা কাহিনী শোনাতো তাকে। এভাবে এ পীরের কেরামতির অদ্ভুতসব কাহিনী মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল সীমান্ত এলাকার সর্বত্র।

    কিছু লোক তাকে নবীর মত মানতে শুরু করল। কেউ বললো, ইনি বৃষ্টি দিতে পারেন। এভাবে আজগুবী গল্পে ভরে গেল দেশ-গ্রাম।

    তারা পীর সাহেবকে এমন ভক্তি শ্রদ্ধা করতো যে, পীর পারতো। এমনকি নিজের জীবনটা দিয়ে দিতেও প্রস্তুত ছিল কেউ কেউ।

    এ যাবত কেউ পীরের বিশ্বাস ও আকিদা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করেনি। কারণ গ্রামের এ সব অশিক্ষিত মানুষরা তখনও আদিম যুগের মতই অন্ধ বিশ্বাসে বাস করত। তারা বিদ্যাবুদ্ধি থেকে বঞ্চিত ছিল বলে, যে তাদেরকে একটু আশার বাণী শোনাতে পারতো তার সামনেই সিজদায়পড়ে যেত।

    এই জনগণের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। তাদের পূর্ব অভাবে সে আলোর আভা দিনে দিনে স্নান হয়ে গিয়েছিল। বাপ মুসলমান ছিল বলে তারা নিজেদেরও মুসলমান মনে করতো, কিন্তু ইসলামের সঠিক ধারনা না থাকায় যে যা বুঝায় তাকেই তারা ইসলাম বলে মনে করতে থাকে।

    এসব গ্রামে মসজিদ ছিল। আল্লাহর ঘর কাবার দিকে ফিরে পাচ ওয়াক্ত নামাজও আদায় করতো অনেকে। কিন্তু ইসলামের সঠিক আকিদা ও বিশ্বাসকে জানার ও বুঝার জন্য কোন চেষ্টা ওদের ছিল না।

    যেমন সমাজ তেমনি ছিল তাদের ইমাম। ইমাম সাহেব তার ইমামতি ঠিক রাখার জন্য এবং লোকদের ভক্তি শ্রদ্ধা আদায় করার জন্য নানা রকম আজগুবী ও অমূলক কথা শোনাতো মুসল্লিদের। ইমাম তাদের বললো, কুরআন এক মহাপবিত্র কিতাব, সাধারণ মানুষের উচিত নয় তা স্পর্শ করা। কুরআন পড়বেন ইমাম সাহেবরা। ইমামরা যা বলবেন, সাধারণ মানুষের উচিত সেই মত কাজ করা। তাহলেই পাবে। এটাই ইসলামের পথ, এ পথেই রয়েছে তাদের ইহ ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ।

    এই ইমাম সাহেবরা মানুষকে শোনাতো অদৃশ্য জগতের কথা। পরকালের নানা শাস্তি ও বিপদের কথা। তারা মানুষকে বলতো, সবকিছুরই একটা গোপন দিক আছে, আর ইসলামের যে গোপন তত্ত্ব তা কেবল ইমাম সাহেবই জানেন। মৃত্যুর পর তোমরা এক অনন্ত জীবনে প্রবেশ করবে। এ দুনিয়ার সুখ আসল সুখ নয়, পরকালের জীবনই মানুষের আসল জীবন। সেই জীবনে সফলতা লাভ করতে হলে তোমাদেরকে ইমাম সাহেবের কথা মতো চলতে হবে।’

    এসব ইমামরা মানুষের মনে আল্লাহর ভয় না ঢুকিয়ে ইমামের ভয় ঢুকাতো। তারা এসব শিখেছিল সেই মহা ক্ষমতাবান পীর সাহেবের কাছ থেকে। এভাবে এই মূখ দুর্বল করে ফেলে। ফলে মানুষ ইমামদের ভয় করতে শিখল, ধর্মকে ভয় করতে শিখল। ইমামরা তাদের সত্য মিথ্যা যা বলতো, তারা তা সবই বিশ্বাস করতো।

    এসব ভণ্ড ইমাম ও ইমামদের নেতা সেই ভণ্ড পীরের পাল্লায় পড়ে তারা নানা অমূলক কথা বিশ্বাস করতে লাগল। তারা বিশ্বাস করতো, অদৃশ্য শক্তি ক্ষেপে গেলে মরুভূমিতে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়। বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ অদৃশ্য শক্তির আর্তনাদ ও কান্নার শব্দ। মানুষের রোগ-ব্যাধি হয় জীন-ভূতের নজর থেকে। সাধারণ মানুষ এই অদৃশ্য শক্তিকে দেখতে পায় না। কেবল ইমাম ও পীরই পারেন এইসব ভূতপেত্নী ও অদৃশ্য শক্তিকে বশ করতে, তাদের খুশি করতে।

    এভাবে একদল প্রতারক লোক মানুষের রোগ ব্যাধির চিকিৎসক হয়ে গেল। কোন হুজুর কয়টা ভূত তার কজায় রেখেছে তার ওপর নির্ভর করতো তার মর্যাদা।

    আল্লাহর চেয়ে এই সব অজ্ঞাত শক্তির ভয়েই মানুষ বেশি ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো। যে যতো গায়েবের ভয় দেখাতে পারতো মানুষ তার কথাই বেশি করে বিশ্বাস করতো। ফলে গ্রামের এসব অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত মানুষের অন্তরে ইসলামের মূল বিশ্বাস ছিল খুবই দুর্বল।

    এই পীর ও পীরভক্ত ইমামরা মানুষকে কুসংস্কার ও অন্ধ। বিশ্বাসে এমনভাবে নিমগ্ন করে ফেলল, যার প্রভাব থেকে লোকজনকে মুক্ত করা এবং ইসলামের সত্য সঠিক পথে নিয়ে চাইতে পারে এ কথা তাদের জানা ছিল না। তারা বরং সেই পীর ও ইমামের আশায় বসে থাকতো, যে তার বকরীর গায়ে ফু দিলে বকরী দুধ বেশি দেবে, যার ফু দেয়া পানি খেলে তার অসুখ সেরে যাবে, যে ছুয়ে দিলে বন্ধ্যা নারীর সন্তান হবে এবং যাকে গাছের প্রথম খেজুরগুলো দিয়ে দিলে রুজি রোজগার বেড়ে যাবে।

    সে যুগে দেশের সীমানা আজকের মত এত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা থাকতো না। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী তার সাম্রাজ্যের সীমানা একটি কাগজের ওপর একে নিয়েছিলেন। তিনি হিসাব করে দেখলেন ধমীয় গোমরাহীর এই উৎপাত সীমান্ত অঞ্চলেই বেশি।।

    রাষ্ট্রীয় সীমানার ব্যাপারে আইয়ুবী অবশ্য অন্য রকম ধারনা পোষণ করতেন। তিনি বলতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের স্থায়ী সীমারেখা বলে কিছু নেই, যেখানে ইসলামী শাষন ব্যবস্থা চালু আছে সেটা ইসলামী রাষ্ট্র, আর যেখানে মানব রচিত মতবাদ চালু আছে সেটা অনৈসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য, তার অধিবাসী এবং শাসক যদি মুসলমান হয় তবুও।

    মিশরের সীমান্তবতী গ্রামগুলোতে সুযোগ পেলেই খৃষ্টানরা সরাসরি আক্রমণ চালাতো। একদিন সে আক্রমণ বন্ধ করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু করল। ইসলামী আদর্শের ঈমানী চেতনা নষ্ট করার জন্য তারা এক ব্যক্তিকে পীর বানিয়ে পাঠিয়ে দিল সেই সীমান্তবর্তী গ্রামাঞ্চলে। এ আগ্রাসনের উদ্দেশ্য ছিল দুটাে, প্রথমত মুসলমানদের আকিদা নষ্ট করা। দ্বিতীয়ত নিজস্ব মতবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা।

    খৃষ্টানদের প্রধান আক্রোশ ছিল কোরআনের ওপর। কারণ, কুরআন জিহাদকে মুসলমানের ওপর ফরজ করে দিয়েছে। মানুষের ওপর জুলুম, অত্যাচার হলে তা থেকে তাদের বাচানোর জন্য মুসলমানরা যে লড়াই করে, কোরআন তাকেই জিহাদ বলেছে। কোরআন মুসলমানদের ওপর এই জিহাদকে ফরজ, মানে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে।

    যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদদের মধ্যে যে প্রচণ্ড আবেগ ও অনুপ্রেরণা দেখা যায়, তা কুরআনের এ ঘোষণারই ফল। অনুভূতি নিয়েই আসে। এ অনুভূতি তাদের অন্তরে জ্বলজ্বল করে জুলতে থাকে বলেই তারা হতে পারে এত বেপরোয়া, এত দুঃসাহসী। প্রাণের কোন মায়া নেই তাদের, কারণ কোরআন তাদের বলে দিয়েছে, মোজাহিদ কোনদিন মরে না। যে আল্লাহ তাকে তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, লড়াই করতে করতে যুদ্ধের মাঠ থেকে জীবনের চূড়ান্ত কাছে। এদের বলা হয় শহীদ। আরেক দল যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে গাজী হয়ে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়। ময়দান থেকে ওরা ফেরে শাহাদাতের গৌরব লাভের অপূর্ণ আকাঙ্খা নিয়ে।

    গনিমতের মাল তাদের জন্য হালাল কিন্তু তারা গনিমতের মালের আশায় তারা কখনও যুদ্ধ করে না। অন্য দিকে খৃস্টানরা যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায়। যুদ্ধ জয়ের চেয়ে লুটপাটের দিকেই তাদের নজরটা থাকে বেশি।

    সেই রহস্যময় পীর সম্পর্কে সীমান্তের গ্রামগুলোতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, আকাশ থেকে এসেছেন তিনি খোদার দ্বীন নিয়ে এসেছেন তিনি। তিনি মৃতকে জীবিত করতে পারেন। মানুষের সেবা করার জন্য সঙ্গী সাখী নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

    যারা তাকে দেখেছে তারা বলে, হুজুরের দাড়ি উজ্জ্বল সাদা, গায়ের রং ফর্সা, মাথার চুল লম্বা ও ঢেউ খেলানো। তার টানা টানা চোখে যেন চাদের আলো, দাত মুক্তার মত। স্বচ্ছ। বীরের মত টান টান সিনা আর বলিষ্ঠ শরীর।

    হুজুরের সাথে থাকে উটের লম্বা বহর আর অনেক খাদেম। মানুষ ভক্তি ভরে হুজুরকে যে নজরানা দেয় সে সব বহন করে এ উটের কাফেলা। তিনি শহর-বন্দরে যান না, দুঃখী মানুষের সেবা করার জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। গ্রামের পাশে তাবু খাটিয়ে কয়েকদিন সেখানে থাকেন। আশপাশের গ্রামের লোকদের দুঃখ দূর করে চলে যান অন্য এলাকায়।

  • ফেরাউনের গুপ্তধন

    ফেরাউনের গুপ্তধন

    ফেরাউনের গুপ্তধন

    ১১৭৪ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। কায়রো থেকে আঠারো মাইল দূরে এক জায়গায় এসে তিনটি উট দাঁড়িয়ে পড়ল। প্ৰত্যেক উটের ওপর একজন করে আরোহী, তাদের শরীর ও মুখ নেকাবে ঢাকা। একজন আরোহী পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল। তারপর কাগজটির ভাঁজ খুলে গভীর মনযোগ দিয়ে দেখে সঙ্গীদের বললো, “এই সে জায়গা!’

    সে সঙ্গীদের সামনে অগ্রসর হওয়ার ইশারা করে নিজেও এগিয়ে গেল। ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র সঙ্গীরাও তাদের উট সামনে বাড়ালো।

    সামনে দুটি টিলা মুখোমুখি দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে। দুই টিলার মাঝখানে চিকন একটি রাস্তা। রাস্তাটি এতই সরু, একটি উট কোনরকমে যেতে পারে ওই পথে।

    তিনজনই লাইন ধরে উটসহ ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরের অবস্থাও একই রকম। দু’পাশে সুউচ্চ দেয়াল। মনে হয়, কোন পাহাড়ি টিলা নয়, মানুষের তৈরী কোন শক্ত পাঁচিল। পাঁচলটি অনেক দিনের পুরোনো এবং এখানে ওখানে ভাঙা। সেই ভাঙা দিয়ে তাকালে দেখা যায় সীমাহীন বালির সমুদ্র এবং পাহাড়।

    অঞ্চলটি তিন-চার মাইলব্যাপী বিস্তৃত। টিলা এবং পাহাড়গুলো কোথাও লম্বা, কোথাও গোল। সর্বত্র ছোট বড় অসংখ্য টিলা ও পাহাড়ের ছড়াছড়ি। তার মাঝে অল্প কিছু সমতল উপত্যকা।

    টিলা ও পাহাড়ে দেবদারু গাছের মত কিছু খাঁড়া স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো এত উঁচু এবং খাঁড়া যে, মনে হয়, কোথাও কোথাও তা হাজার ফিট উঠে গেছে।

    সূর্য্য অস্ত যাওয়ার এখনও অনেক বাকী। অথচ এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে এখানে, আধাঁর ক্রমেই গ্ৰাস করছে এলাকাটি। স্তম্ভগুলো ভূতের আকৃতি নিতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, অসংখ্য ভূত এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

    টিলার খাঁড়া পাহাড়গুলো দূর্গম। যেমন উঁচু তেমন দেয়ালের মত একটানা খাঁড়া। মনে হয়, দিনের বেলায়ও কোথাও কোথাও সূর্যের আলো প্রবেশ করে না।

    এই ভূতুড়ে দুৰ্গম পাহাড়ি রাস্তায় অনেক দিন মানুষের পা পড়েনি। কোন কালে কেউ-প্ৰবেশ করেছিল কিনা তাও ঠিক বুঝা যায় না। ‘মনে হয়, এর ভেতরে কখনও কেউ প্ৰবেশ করার দুঃসাহস করেনি।” ঘাড় ফিরিয়ে সঙ্গীদের বলল ওদের দলনেতা।

    ‘কেন করবে? ভেতরে প্রবেশ করার প্রয়োজন হলে তবে তো করবে? মরুভূমিতে যাত্রীদের শুধু পানির প্রয়োজন হয়। এমন শুকনো নিরস বালির পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা যেখানে দিনের আলোও ঠিকমত পড়ে না সেখানে পানি খুঁজতে আসবে কোন পাগলে?”

    এক সঙ্গী জবাব দিল নেতার প্রশ্নের। আরেকজন বলল, ‘জায়গাটা চলাচলের কোন পাশেও পড়ে না। বহু দূর দিয়ে যাওয়ার সময় কোন কাফেলার চোখে পড়লে বলে, কায়রো এখনো আঠারো মাইল দূরে রয়েছে। এই দূরত্ব মাপার কাজ ছাড়া এই মৃত্যু উপত্যকা কোন দিন কারো কাজে লেগেছে?’

    লোক মুখে এই এলাকা সম্পর্কে কিছু ভয়ংকর গল্প প্রচলিত আছে। এলাকাটাকে কেউ বলে মৃত্যু উপত্যকা, কেউ বলে শয়তানের পাহাড়। লোকজন বলাবলি করে, এই অঞ্চলে শয়তানের প্ৰেতাত্মারা বাস করে। অভিশপ্ত শয়তানকে যখন আল্লাহ আকাশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তখন শয়তান নাকি এখানে এসে অবতরণ করেছিল। তারপর থেকে শয়তানের প্রেতাত্মারা এই অঞ্চলটিকে তাদের স্থায়ী ঘাঁটি বানিয়ে নেয়।

    এই অঞ্চল সামরিক দিক থেকেও এমন কোন গুরুত্বপূৰ্ণ স্থান নয় যে, সৈন্যদের তা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে, ফলে কখনো কোন সৈন্য বা সেনাবাহিনীও এর ভেতরে প্রবেশ করেনি।

    অঞ্চলটি শুধু দুৰ্গম নয়, নানা কুসংস্কারপূর্ণ গল্পের কারণে ভীতিপ্ৰদও। ফলে মানুষজন কখনো বালুকারাশিতে পরিপূর্ণ এই মৃত্যু উপত্যকায় আসতে সাহস পায়নি; মরুভূমির হিংস্র প্রাণী ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই। এই প্রথম তিনজন আগন্তুক এই ভয়ংকর অঞ্চলে প্রবেশ করল। এখানে তাদের কতটা বিপদের মোকাবেলা করতে হবে তার কোন পরোয় করল না তারা।

    পায়ে সংকীর্ণ পথে এগিয়ে চলল। কারণ, উট তিনটি নিরূপায়। তাদের চালক যেখানে তাদের চালিয়ে নিয়ে যায় সেখানে তাদের যেতেই হবে।

    হাজার হাজার বছর আগের পুরোনো একটি নকশা আছে এই অভিযাত্রীদের কাছে। নকশাতে যে জায়গার চিত্র আকা তার সাথে এলাকাটি হুবহু মিলে যায়। শুধু একটি রেখা সামান্য সন্দেহের সৃষ্টি করে। রেখাটি একটি নদীর। কিন্তু তারা প্রচুর ইতিহাস ঘেটে দেখেছে, কোন কালেও এখানে কোন নদী ছিল না।

    বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জায়গাটি এক নজর ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্যই তাদের আজকের এ অভিযান।

    কিছু দূর এগুনোর পর, তারা দেখতে পেল অপেক্ষাকৃত একটি নিচু অঞ্চল লম্বালম্বিভাবে এগিয়ে গেছে। অঞ্চলটি দুই টিলার মধ্যবতী সংকীর্ণ রাস্তা থেকে বেশি দূরে নয়।

    একটি ফোকড় গলে সংকীর্ণ জায়গা দিয়ে বেড়িয়ে এল অভিযাত্রী দল। এখন তারা সেই দীর্ঘ নিচু অঞ্চলটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অঞ্চলটি পাশে দশ বারো গজের বেশি নয়।

    দলনেতা উটের ওপর থেকে নেমে এল নিচে। হেঁটে নিচু অঞ্চলের বালিয়াড়ির মধ্যে নেমে গেল। সঙ্গী দু’জন উটের ওপর বসে থেকে দেখতে লাগল নেতার কাজকর্ম।

    মাঝামাঝি এসে দলনেতা নিচু হয়ে একমুঠো বালি তুলে নিল হাতে। গভীর মনযোগ দিয়ে পরীক্ষা করল। হাতের বালি ফেলে দিয়ে লম্বা করে দৃষ্টি মেলে দিল বালির সমুদ্রে। খুশিতে ভরে উঠল তার হৃদয়-মন। সে নিশ্চিত, শত শত বছর আগে এখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো। এই নিম্নাঞ্চল নিশ্চয়ই কোথাও আটকে না গিয়ে কোন গতিপথ ধরে নীলনদের দিকে চলে গেছে।

    সে ফিরে এল উটের কাছে। সঙ্গী আরোহীদের আশ্বস্ত করে বললো, “আমরা ঠিক জায়গায়ই এসে পৌঁছেছি।”

    এই আরোহীদের দলনেতা ইটালীর মার্ক লী। সে নিজে এবং সঙ্গী দুজনও খৃস্টান। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর বিশ্বস্ত কমান্ডার আহমদ দারবীশ গোপনে খৃস্টানদের সাথে হাত মিলিয়ে ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্সের কবর অনুসন্ধানে পাঠিয়েছে এদের।

    নকশা অনুযায়ী ঠিক জায়গাতেই এসে পৌঁছেছে ওরা। এই মৃত্যু উপত্যকাতেই আছে ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্সের কবর।

    এতে আরোহীদের খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু মার্ক লী খুশি হতে পারলো না। অঞ্চলটি লম্বা এবং প্রস্থ উভয় দিকেই কয়েক মাইল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে কয়েক হাত লম্বা একটি কবর খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়।

    মার্ক লী তার সঙ্গীদের বললো, “এই সে জায়গা, নিজেকে খোদা বলে দাবী করত যে ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্স, তার শেষ আশ্রয়স্থল। তাকিয়ে দেখো এর বিপুল বিস্তৃতি। আহমদ, দরবীশ ও হরমন আমাদেরকে এক ব্যর্থ অভিযানে পাঠিয়ে দিয়েছে। এত বড় এলাকা চষে একটি কবর খুঁজে বের করা কেবল কঠিন নয়, বলতে গেলে অসম্ভব। তারা আমাদেরকে দিয়ে এমন এক অসাধ্য সাধন করতে চায়, হাজার বছর ধরে চেষ্টা করেও মানুষ যা জয় করতে পারেনি।”

    সঙ্গীরা অভিযানের গুরুত্ব অনুধাবন করে কেমন বিমর্ষ ও চিন্তিত হয়ে পড়ল। এ অভিযানে তাদের ব্যক্তিগত কোন আগ্ৰহ ছিল না। তারা চাচ্ছিল ফিরে যেতে। কিন্তু কমাণ্ডারকে এমন কোন পরামর্শ দেয়ার সাহস ছিল না তাদের। তারা তো হুকুমের গোলাম। মার্ক লী এক কঠিন হৃদয়ের কমাণ্ডার। সহজে হার মানার পাত্র সে নয়। নিজের বুদ্ধি ও সাহসের ওপর যথেষ্ট আস্থা নিয়েই কাজ করে সে। কাজের সময় অহেতুক বাগড়া দেয়াকে সে পছন্দ করে না।

    আগে আগে যাচ্ছে মার্ক লী, পেছনে সঙ্গী দু’জন। ওরা যত এগুলো ততই ওরা দেখতে পেলো পার্বত্য অঞ্চলের রূপ ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। এখানকার মাটির রঙ ঘন বাদামী। কোথাও তা পাল্টে গিয়ে দেখা যাচ্ছিল খয়েরী, কোথাও বা লাল মেটে-রঙ।

    বালির পাহাড়ের পাশেই কোথাও ছোট্ট একটু উপত্যকা। তার পাশেই হয়ত কোন টিলা সোজা খাঁড়া হয়ে উঠে গেছে উপরের দিকে।

    ধীর পায়ে এগুচ্ছে দলটি। এগুচ্ছে আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিচ্ছে আশপাশের পরিবেশ।

    হঠাৎ ডান দিকে টিলার মাঝখানে একটি ফাটল নজরে পড়ল মার্কালীর। দেখে মনে হয় কোন প্রবল ভূমিকম্প এসে দেয়াল ফাঁক করে দিয়ে গেছে।

    মার্ক লী ফাটলটির কাছে এসে বাইরে চোখ রাখল; দেখল, সে ফাটল একটি সরু গলি তৈরী করেছে। গলিটি বহুদূর পৰ্যন্ত চলে গেছে, এত দূর যে শেষ মাথা দেখা যায় না।

    গলিটিতে প্ৰবেশ করার সিদ্ধান্ত নিল মার্ক লী। কিন্তু গালিটি এতই চিকন যে, ওই পথে উট নিয়ে প্ৰবেশ করা কষ্টকর।

    মার্ক লী কোন বাধাই মানলো না, সে তার উট সেই ফাটলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।

    উটের হাঁটু দুই পাশের দেয়ালে ঘষা খাচ্ছে। মার্ক লী নিজের পা গুটিয়ে উটের পিঠের ওপর তুলে দিল। অন্য আরোহীরাও তাই করল।

    আরোহীর নির্দেশে এগিয়ে যাচ্ছে উট, তাতে দেয়ালের গায়ে বার বার ঘষা খাচ্ছে তার শরীর। উটের হাঁটুর বাড়ি ও গায়ের ঘষার ফলে দেয়ালের মাটি নিচে খসে পড়ছে।

    ফাটলের দু’পাশের দেয়াল অনেক উঁচু। উটের ধাক্কা খেয়ে কেঁপে উঠতে লাগল সে দেয়াল। আরোহীদের মনে হতে লাগল, এই বুঝি তা ভেঙে ওদের ঘাড়ের ওপর পড়বে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তেমন কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।

    একবার যদি তাতে ধ্বস নামে। তবে আরোহীসহ পিষে যাবে সবাই। তাই, মার্ক লীসহ সবাই খুব সাবধানে অগ্রসর হতে লাগল।

    পথটা ক্রমেই উপরের দিকে উঠে গেছে। যথেষ্ট সতর্কতার সাথে অনেকটা পথ এগুনোর পর ওরা দেখতে পেল, দূরে, অনেক উপরে টিলার দুই পাশ এক হয়ে মিশে গেছে।

    দুপাশের দেয়াল উঁচু থাকায় ওদের পথটা ছিল অন্ধকার, তবে উপরের দিকে আলো দেখা যাচ্ছে। এ থেকে তারা বুঝতে পারলো, দিনের আলো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আর যেখানে পথটা শেষ হয়েছে তারপরে নিশ্চয়ই প্ৰশস্ত কোন উপত্যকা আছে।

    গলি ক্রমশঃ সুড়ঙ্গের আকার ধারণ করলো। উটের পায়ের শব্দ ধ্বনি-প্ৰতিধ্বনি তুলে ভীতিকর আওয়াজে রূপান্তরিত হলো। এতেও মার্ক লী থামলো না, সঙ্গীদের নিয়ে এগিয়েই চললো।

    এক সময় অন্ধকার কমে গিয়ে আলোর বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করল। মার্ক লী বুঝল, সুড়ঙ্গ শেষ হয়ে এসেছে প্ৰায়। একটু পরেই তারা সুরঙ্গের মুখে গিয়ে উপস্থিত হল।

    উটের পিঠে থাকায় সুড়ঙ্গের মুখের সমতল জায়গাটি তারা হাতের নাগালের মধ্যে পেয়ে গেল সহজেই। তারা নেমে এল সেখানে। কিন্তু উটকে উপরে তোলা তত সহজ হলো না। অনেক কসরত করে, রশি দিয়ে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে অনেক কষ্টে উটকে টেনে আনা হল।

    মানসিক চাপ ও শারীরিক কসরতের কারণে সবাই খুব কাহিল হয়ে পড়েছিল। তিনজনই বসে পড়ল মাটির ওপর।

    একটু সুস্থির হয়ে নজর বুলালো আশপাশে। দেখলো সেখানে একটি বড় দুর্গের দেয়াল এখনো মাথা খাঁড়া করে দাঁড়িয়ে আছে।

    মার্ক লী দুর্গটির কাছে গেল। এটি কোন মানুষের সৃষ্ট দুর্গ ছিল না, বরং এ ছিল প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এক কেল্লা। চারপাশের পাহাড়ের আকৃতি এমন ছিল যে, বাইরের দিকটা ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। ফলে, চারদিক থেকে আবদ্ধ হয়ে এলাকাটি দুর্গের রূপ নিয়েছে। পাহাড়ের উঁচু নিচু চূড়াগুলোকে মনে হচ্ছিল দুর্গের গম্বুজ।

    মার্কলী সঙ্গীদেরকে উটগুলো সেখানেই বসিয়ে দেয়ার জন্য বলল।

    উটগুলো বসিয়ে দেয়ার পর ওরা পায়ে হেঁটে দুর্গ এলাকাটা ঘুরে দেখতে শুরু করলো।

    পাহাড় ঘেরা দুর্গটা গোলাকার। পা টিপে টিপে হাঁটতে হচ্ছে ওদের। কারণ, বালি মিশ্ৰিত মাটিতে পা দিলেই ঢালুর দিকে হড়কে যাচ্ছিল পা। কোন চলাচলের রাস্তা ছিল না ওখানে। এই বালি ও মাটিই প্ৰমাণ করছে, শত শত বছর ধরে কোন পা পড়েনি এখানে।

    আগে আগে চলছে মার্কালী, সঙ্গীরা তার পিছনে। হঠাৎ প্ৰাণ ছ্যাৎ করে উঠল মার্ক লীর। সে কথা বলতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠনালী স্তব্ধ হয়ে গেছে তার। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে, পা দুটো যেন মাটির সাথে গেথে গেছে।

    সঙ্গীরাও থমকে দাঁড়াল। মার্ক লী কেন দাঁড়িয়েছে বুঝার চেষ্টা করছে তারা। মার্ক লী যেদিকে অবাক করা চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকে তাকাল তারা। দেখল, সামনে, এখান থেকে সোজা নিচের দিকে পাহাড়েরই একটা অংশের ওপাশে একটা মন্দির দাঁড়িয়ে আছে।

    মার্কলী বলল, “ওটা কি কোন মন্দিরের চূড়া।”

    ‘চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত একটা মন্দির দেখেও আপনি জিজ্ঞেস করছেন!’ সঙ্গীদের চোখে অজানা আশার ঝিলিক খেলে গেল।

    ওরা পাহাড়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে পা টিপে টিপে চলছিল। বাম দিকে বহু দূর খাঁড়া নেমে গেছে পাহাড়ের শক্ত দেয়াল। ওদিকে তাকালে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। অনেক নিচে দেখা যায় এবড়ো থেবেড়ো বালি ও পাথরের স্তুপ। পা পিছলে কোন রকমে সেখানে একবার গড়িয়ে পড়লে হাড়গোড় ছাতু হয়ে যাবে। তাই খাদের উল্টো দিক দিয়ে পা টিপে টিপে এগুচ্ছিল ওরা।

    রাস্তাটা ভয়ানক দুৰ্গম। বিপদজনকভাবে সরু ও খাঁড়াভাবে নেমে গেছে বেশ কিছুটা পথ। মার্ক লীর সঙ্গীদের বুকটা দুরুদুরু করে উঠল। একজন তো তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলে, “আপনি কি মনে করেন, ফেরাউন দ্বিতীয় রিম্যান্সের লাশ এই বিপদসংকুল পথ দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?’

    ‘আহমদ দরবেশের নক্সা তো তাই বলে,’ মার্ক লী বললো, ‘যে পর্যন্ত আমি নকশা বুঝতে পেরেছি। তাতে যাওয়ার রাস্তা এটিই। রিম্যান্সের লাশের বাক্সটি হয়তো অন্য কোন পথে নেয়া হয়েছে। হয়ত পাহাড়ের খাঁজের ভেতরে সুরঙ্গ পথ থাকতে পারে। সে সব গোপন পথের সন্ধান পরে করবো। আগে নকশার নির্দেশ মত কত দূর যাওয়া যায় দেখতে চাই।”

    “এ ধরনের অভিযানে গোপন পথই সাধারণত অভিযাত্রীকে তার ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। প্রকাশ্য রাস্তা দিয়ে কেউ গুপ্তধন বয়ে বেড়ায় না।” এক সঙ্গী তার মতামত ব্যক্ত করল।

    “আমারও মনে হয় যে, গোপন রাস্তা দিয়েই সম্রাটের লাশ বহন করা হয়েছে। আমাদের তা খুঁজে পেতে হবে। তাহলেই কেবল তার কবর পর্যন্ত যাওয়ার আশা করতে পারি আমরা।”

    “তোমাদের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করছি না। তবে মনে রাখতে হবে, শত শত বছর ধরে প্রাকৃতিক ঝড়ঝঞা এবং বাতাসের তোড়ে পৃথিবীর মানচিত্র অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এতকাল পর সে সব গোপন রাস্তা আদৌ আছে কি নেই, তাই তো আমরা জানি না! আমি তোমাদের নিয়ে অন্ধের মত মরুভূমিতে সুই খুঁজতে চাই না। তারচেয়ে নিশানা ধরে এগিয়ে দেখতে চাই এই সব নকশা আসলেও কোন কাজের কিনা? নকশা ঠিক থাকলে কবর পর্যন্ত আমরা পৌঁছেও যেতে পারি।” বলল মার্ক লী।

    “যদি বেঁচে থাকি!” হতাশ কণ্ঠে বলল তার এক সঙ্গী।

    ‘কোন সন্দেহ নেই।” মার্ক লী বললো, ‘তবে কবর খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকলে আমাদের আর কোন অভাব থাকবে না।’

    একটা পাথরের সাথে রশি বেঁধে, রশি ধরে ঝুলে তারা অনেক কষ্টে সেই বিপদজনক পথটুকু পার হয়ে এল।

    আস্তে আস্তে রাস্তার প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়তে লাগল। কিছু দূর নিচে নামার পর রাস্তা আবার ওপর দিকে উঠতে শুরু করল।

    এখন তারা পাহাড়ের এমন জায়গা পাড়ি দিচ্ছিল, যেখানে দুটি পাহাড় একত্রে মিশে চূড়ার দিকে এগিয়ে গেছে এবং সেখান থেকে আবার শুরু হয়েছে বিপদজনক ঢাল। মার্ক লী সেখানে পৌঁছে ঢাল বেয়ে সোজা নিচে না নেমে বাম দিকের পাহাড়ে আরোহণ করতে লাগলো।

    প্ৰায় একশো গজের মত উপরে উঠার পর তাদের সামনে একটি সুড়ঙ্গ পথ চোখে পড়লো। মার্ক লী সঙ্গীদের নিয়ে সেই সুড়ঙ্গ পথে ঢুকে পড়ল। পথটি ক্রমশ: নিচের দিকে চলে গেছে।

    সুড়ঙ্গ পথে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেল ওরা। তারপর সহসাই সুড়ঙ্গ শেষ গেল এবং তারা ছোট একটুখানি ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে এল।

    ফাঁকা জায়গায় এসেই তারা সামনে তাকিয়ে দেখতে পেল দূর দূরান্ত পর্যন্ত পাহাড়ের অসংখ্য ছোট বড় স্তম্ভ আকাশের দিকে মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভগুলো নিরেট পাথরের এবং পরস্পর গায়ের সাথে লাগানো। প্রতিটি স্তম্ভ থেকেই অসংখ্য চোখা মাথা বেরিয়ে আছে। দৃশ্যটা খুবই ভীতিজনক। এসব স্তম্ভ না মাড়িয়ে সামনে এগুনোর আর কোন পথ নেই। অথচ তা মাড়াতে গেলে হাত-পা জখম হওয়ার আশংকা ষোল আনা।

    খুবই সতর্কতার সাথে কঠিন পাথরের ফাঁক গলে ওরা ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগলো। কয়েকবার বাঁক ঘুরে ডানদিকে আবার একটু খোলা জায়গা পেল ওরা। জায়গাটুকু গোলাকার। একটা মঞ্চের মত। এখানকার আবহাওয়াই শুধু নয়, পায়ের নিচের মাটিও অসম্ভব গরম বোধ হলো। আশপাশের পাহাড়গুলোতে শেষ বিকেলের রোদ চমকাচ্ছে।

    মার্ক লী অনুভব করলো, এখানকার মাটিতে এমন কোন ধাতু মিশ্ৰিত আছে যে কারণে এলাকাটা উত্তপ্ত হয়ে আছে। গোল মঞ্চসদৃশ এই উপত্যকার চারদিকই পাহাড় ঘেরা। এক পাশে কয়েক গজ লম্বা একটি ফোঁকড়া। ওরা সেই ফোঁকড়ের কাছে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে তিনজনই পিছনে সরে এল। ওরা দেখল, ফোঁকড়ের মুখ পর্যন্ত অনেক গভীর ও বিশাল এক খাদ। খাদের তলদেশে উত্তপ্ত বালুকা রাশি চমকাচ্ছে এবং সেখান থেকে একেবেঁকে কম্পমান ধোঁয়া উঠে আসছে উপর দিকে। ইটের ভাটায় আগুন জ্বালাবার সময় যে কালো ধোঁয়া বেরোয় এর ধোঁয়া তেমন কালো নয়, বরং ডায়িং ফ্যাক্টরীর বাম্পের মত সাদা।

    এই গভীর খাদের মাঝখানে একটি প্রাকৃতিক দেয়াল। দেয়ালটি চওড়ায় মাত্র এক গজ, নিচে উপরে সমান চওড়া। যদি মার্ক লীদের ওপারে যেতেই হয় তবে এ প্রাচীর পার হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। দু’পাশের পাহাড়চূড়া এত উঁচু যে তা টপকানোর প্রশ্নই উঠে না।

    মার্কালীর মনে হল, সে এখন পুলসিরাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই পথটুকু পার হতে পারলেই সামনে বেহেশত। বেহেশতে তাকে যেতেই হবে এবং পঞ্চাশ গজের মত দীর্ঘ এই দেয়াল পার হতে হবে তাকে।

    মার্ক লীর এক সাথী বললো, “এই দেয়ালের ওপর দিয়ে যাওয়ার চেয়ে আমাকে আত্মহত্যার অন্য কোন উপায় বলে দিন।’

    ‘গুপ্তধনের ভান্ডার রাজপথে পড়ে থাকে না!” মার্ক লী বললো, “আমাদের এ রাস্তা পার হতেই হবে।’

    “কিন্তু টুপ করে নিচের জাহান্নামে গিয়ে পড়লে ওই গুপ্তধন খাবে কে?” অপর সঙ্গী বললো।

    “আমরা কি পবিত্র ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করিনি, ইসলামের ধ্বংস সাধনের জন্য আমরা এ জীবন উৎসর্গ করবো?” মার্ক লী বললো, ‘যুদ্ধের ময়দানে কি আমাদের সঙ্গীরা অকাতরে প্রাণ দিচ্ছে না?”

    ‘লড়াইয়ের ময়দানে জান দেয়া আর বেহুদা আগুনে ঝাপ দেয়া এক কথা নয়। আমরা ইচ্ছে করলেই এখান থেকে ফিরে গিয়ে আহমদ দারবীশকে বলতে পারবো, শত শত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখন আর নকশার রাস্তা খুঁজে পাওয়ার কোন উপায় নেই। সে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে নদী ছিল সেখানে ধুধু বালি ও পাহাড়ী প্রান্তর। আর নক্সার যেখানে পাহাড়ী উপত্যকা দেখানো হয়েছে সেখানে এখন কিছুই নেই।”

    “কিন্তু আমি কাপুরুষ হতে পারবো না। মিথ্যা কথাও বলতে পারবো না। এই দেয়াল আমার মনেও ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমি সে ভয় তাড়িয়ে দিয়েছি। তোমরাও ভয় ডর মুছে ফেলো মন থেকে। এ প্রাচীর বেয়ে আমি ওপারে যাবোই। আমাকে সঙ্গ না দিলে তোমরা ক্রুশের কাছে প্রতারক বলে সাব্যস্ত হবে। আর প্রতারকদের শাস্তি খুব বেদনাদায়ক হয়। আমি আগে আগে যাচ্ছি, তোমরা আমাকে অনুসরণ করো। মাথা চক্কর দিলে বা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে বসে পড়ে আত্মরক্ষা করবে। এমনভাবে বসে যাবে, যেন ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছে। সাহস ফিরে এলেই আবার এগুতে থাকবে।”

    সহসা সেই গরম বাতাস জোরে বইতে শুরু করল। বালি উড়তে লাগলো। সেই সাথে খাদের ভেতর থেকে ভেসে এল মেয়েদের কান্নার স্বর। যেন দু’তিনজন নারী এক সাথে কান্না জুড়ে দিয়েছে।

    মার্কলী ও তার সঙ্গীরা কান খাঁড়া করে শুনতে লাগলো সে কান্নার ধ্বনি। কান্না শুরু হয়েছিল মিহি সুরে বিলাপের মত, এখন তার পরিবর্তে ভেসে আসতে লাগল বিকট আওয়াজ। মার্ক লী ও তাঁর সঙ্গীরা ভয় পেয়ে গেল।

    ‘এই জাহান্নামে কোন মানুষই বেঁচে থাকতে পারে না। নিশ্চয়ই এসব প্রেতাত্মার কাণ্ড!” ভয়ে ভয়ে বলল এক সঙ্গী।

    ‘না, এ কোন মানুষের কান্না নয়।’ মার্ক লী বললো, “কোন প্ৰেতাত্মা বা কোন জীবিত প্রাণীর স্বরও নয়! এটা বাতাসের খেলা। বাতাস একটু জোরে বইতে শুরু করায় কোথাও আঘাত খেয়ে ঐ সুরের সৃষ্টি হয়েছে। বাঁশিতে যেমন বাঁশরিয়া ফু দিয়ে সুর তোলে, তেমনি কোথাও এমন কোন ছিদ্র বা সুড়ং আছে যাতে বাতাস ঢুকে এ রকম সুর ও আওয়াজ তুলছে। বাতাস যত জোরে বইবে সুর তত বিকট হবে। এতে ভয় পাবার কিছু নেই।’

    মার্ক লীর কথাই সত্যি, এ অঞ্চলের বিভিন্ন টিলার মধ্যে লম্বা লম্বা সুডুং ছিল। বাতাস সে সুডুংগুলোর এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতো। যখন এ বাতাস তোছরাভাবে বইতো তখনি এ ধরনের ধ্বনি শোনা যেতো। দমকা বাতাস প্রবল বেগে বইতে শুরু করলে মনে হতো প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করছে একদল ডাইনী।

    নিচে গভীর ও বিস্তৃত খাদ। চারপাশে ভয়ালদৰ্শন উলঙ্গ পাহাড় আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো কান্নার আওয়াজ যে কাউকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মার্ক লীকে তা ভীত সন্ত্রস্ত করতে ব্যর্থ হলো।

    কিন্তু তার সাথীদের উপর ভীতি এমন প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করল যে, মার্ক লীর এত কথার পরও তাদের মন থেকে সে ভয় দূর হলো না। তারা এই আওয়াজকে বাতাসের কারসাজি বলে মানতে পারছিল না। তাদের মনে হচ্ছিল, পাশেই কোথাও নারী ও প্ৰেতাত্মারা ক্ৰন্দন করছে। যে কান্নার ধ্বনি তারা নিজ কানে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। মার্ক লীর যুক্তিতর্ক এ সত্যকে আড়াল করতে পারছে না।

    বাতাস প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছিল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল কান্নার কোরাস।

    বাতাসের তোড়ে উড়ে আসা ধুলোবালির ঝাপটা লাগছিল ওদের চোখে মুখে। সেই সাথে ছিল স্নায়ুতন্ত্রে আঘাতকারী কুয়াশা রঙের ধোঁয়া। জমিন থেকে উড়ে আসা হালকা ধুলোবালির মেঘ আর ধোঁয়ার কারণে বেশি দূর দৃষ্টি যাচ্ছিল না। মার্ক লী ও তার সঙ্গীরা এই প্রাকৃতিক দুৰ্যোগ মাথায় নিয়ে ওভাবেই ওখানে দাঁড়িয়ে রইল।”

    বেশ কিছুক্ষণ ওখানে অপেক্ষা করার পরও মার্ক লী যখন দেখল দুৰ্যোগ মোটেই কমছে না। তখন সে সঙ্গীদের বলল, “এখানে বেশীক্ষণ থাকলে তোমরা পাগল হয়ে যাবে। এর থেকে নিস্তার পেতে চাইলে ওপারে চলো।”

    এই দুর্যোগের মধ্যেই মার্ক লী দেয়ালের উপর প্রথম পা রাখল। দুর্যোগের ফলে একটা সুবিধা হলো তার, ভয়াবহ খাদের নিচ পর্যন্ত দৃষ্টি গেলে মাথায় যে চক্কর দিত। তার হাত থেকে বেঁচে গেল সে।

    মার্ক লী পা দিয়েই বুঝল, দেয়ালটি খুবই কাঁচা এবং দুর্বল। প্রাচীরের বালি ও মাটির মধ্যে পা দেবে গেলো তার। কিন্তু তাতে তার সংকল্পে কোন বিঘ্ন ঘটলো না। সে তার দ্বিতীয় পাটিও তুলে আনলো প্রাচীরের ওপর। নিজের অজান্তেই নিচের দিকে দৃষ্টি চলে গেল তার। খাদের গভীরতার কথা মনে হতেই আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো সর্ব শরীর। কিন্তু তলদেশ চোখে না পড়ায় ভয়কে সে তাড়িয়ে দিতে পারলো।

    মার্ক লী কয়েক কদম এগিয়ে গেল। ক্ৰন্দনের আওয়াজ আরও বেড়ে গেল মনে হয়। এখন তার পায়ের নিচে ভঙ্গুর দেয়াল, দুই পাশে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন গভীর খাদ। ডানে-বায়ে ধরার মত কোন কিছু নেই। প্রবল বাতাসের ঝাপটা লাগছে মার্ক লীর গায়ে। দমকা হাওয়ার ধাক্কায় একদিকে কাত হয়ে যাচ্ছে শরীর। দেহের ওজন মনে হচ্ছে কমে যাচ্ছে।

    সে ঘাড় ঘুরিয়ে সাথীদের বললো, “ভয় নেই, সাহস করে পা রাখো, দেখবে আমার মতই চলতে পারছো! ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে অগ্রসর হও! নিচের দিকে মোটেই তাকাবে না। মনে মনে কল্পনা করো, তোমরা মাটির উপর দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে চলছো।’

    সঙ্গী দু’জন অসহায়ভাবে একে অন্যের দিকে তাকাল। মার্ক লীকে ছাড়া একাকী ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতেও ভয় হচ্ছিল ওদের, আবার মার্ক লীর মত দেয়াল পাড়ি দিতেও ওদের বুক দুরুদুরু করে কাঁপছিল।

    মার্ক লীর তাগাদা পেয়ে একজন অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মত দেয়ালের উপরে পা তুলে দিল। তার দেখাদেখি অন্যজনও। উঠে এল প্রাচীরের ওপর। কয়েক কদম এগুনোর পর যখন সে। বুঝতে পারল দেয়ালের ওপর উঠে এসেছে তখনই একজনের গা কাঁপুনি শুরু হল। কাঁপতে কাঁপতেই কয়েক কদম অগ্রসর হয়ে গেল লোকটি। তারপর দুলতে দুলতে যখন মনে হলো সে পড়ে যাচ্ছে, দেয়ালের ওপর বসে পড়ে আঁকড়ে ধরল।

    সঙ্গীর অবস্থা দেখে অন্যজনের মনেও এ ভয় সংক্রামিত হল, সাথে সাথে কাঁপতে কাঁপতে সেও বসে পড়ল প্রাচীরের ওপর। অবস্থাটা এখন আরো নাজুক হয়ে উঠল। সামনে এখনো অনেক পথ বাকী, পেছনে ফিরে যাবে সে উপায়ও নেই, কারণ দেয়াল এতই সংকীর্ণ যে এখানে ঘুরে বসার ঝুঁকিও নিতে পারছে না। উপায়ান্তর না পেয়ে সঙ্গী দু’জন স্থবির হয়ে মরার মত পড়ে রইল দেয়ালের ওপর।

    মার্ক লী তাদের মনোেবল বাড়াতে চাইল। বলল, “ঠিক আছে, তোমাদের আর উঠে দাঁড়াবার দরকার নেই। হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আস।”

    ওরা সম্মোহিতের মত মার্ক লীর হুকুম তামিল করল। প্ৰায় অর্ধেক পথ এগিয়ে এসেছে ওরা। মাঝামাঝি পৌঁছে, মার্ক লী দেখলো, মাঝখানে দেয়াল একটু ভাঙ্গা ও নিচের দিকে ঢালু হয়ে গেছে। সেখানে চওড়া এত কম যে, দাঁড়িয়ে থেকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। এবার মার্ক লীও বসে পড়লো।

    সঙ্গীরা বসে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছিল, সে তাদের মত বসলো না। ঘোড়ার আরোহীরা যেভাবে দুই, ঠ্যাং দুই দিকে বুলিয়ে দিয়ে বসে সেভাবে দেয়ালের দুদিকে পা বুলিয়ে বসলো সে। দেয়ালের চওড়া ক্রমশ কমে আসছিল। মার্ক লী দুহাত দুদিকে দিয়ে লেংড়া মানুষের মত ঘষটে ঘষটে আস্তে করে নিচে নেমে গেল এবং ভাঙা অংশটুকু পার হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তাকে অনুসরণ করে তার এক সাথীও পার হয়ে এল ভাঙা অংশ। কিন্তু তৃতীয়জন ভাঙা জায়গায় নামতে গিয়ে হঠাৎ পিছলে গেল। তাল সামলাতে গিয়ে পাশ থেকে ছুটে গেল তার হাত। ভয় ও আতংকে আর্ত চিৎকার করে উঠল লোকটি, মার্ক লী আমাকে ধরো।”

    কিন্তু তার কাছে এগিয়ে যাওয়ার সময় পেল না কেউ। তার আগেই সে একদিকে ছিটকে পড়ল। “বাঁচাও” বলে বুক ফাটা একটা আর্ত চিৎকার শুধু শুনতে পেল ওরা, কিন্তু তাকে আর দেখতে পেল না। সেই চিৎকারের শব্দ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে গোল এবং ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এক সময় মিলিয়ে গেল।

    তারা তার পতনের শব্দ শোনার জন্য কান পেতে রইল, কিন্তু তেমন কোন শব্দ শুনতে পেল না। বাতাসে ভেসে বেড়ানো নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকারের নিচে চাপা পড়ে গেল তার পতনের শব্দ। মার্ক লী নিচে তাকালো, কিছুই দেখা গোল না।

  • উপকূলে সংঘর্ষ

    উপকূলে সংঘর্ষ

    উপকূলে সংঘর্ষ

    আলীর গোয়েন্দা বাহিনীর তিন সদস্য ইমরান, রহিম, রেজাউল। আক্রায় এসেছিল ওরা শত্রুর গতিবিধি ও পরিকল্পনা জানতে। এরই মধ্য অনেক তথ্য ওরা সংগ্রহও করেছে। দলনেতা ইমরানের কাছে এমন কিছু তথ্য এলো যা এখনি সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী ও সুলতান আইয়ুবীকে জানানো দরকার। ওরা আক্রা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো, এমন সময় হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল রহিম।

    যখন রহিমের রিপোর্ট করার কথা, তখন সে না আসায় তাকে খুঁজতে গিয়েছিল ইমরান। গিয়ে জানলো, যে বাড়িতে সে থাকতো এবং তার মালিকের কাজ করতো সেখান থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

    কেন রহিমকে বরখাস্ত করা হয়েছে এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিল না কেউ। রহিমকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল ইমরান। একজন গোয়েন্দা যে কোন সমস্যা প্রথমে তার দলনেতাকে জানাবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু রহিম তা করেনি। কিন্তু কেন? তবে কি রহিম শত্রুর হাতে? এসব চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো ইমরানের মাথায়।

    কমান্ডার হিসেবে রহিমের সন্ধান নেয়া তারই দায়িত্ব। একবার ভাবলো, রেজাউলের সাথে যোগযোগ করে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, পরস্থিতি না বুঝে রেজাউলের সাথে দেখা করতে যাওয়াও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে সে আর রেজাউলের ওখানে গেল না।

    ইমরান শংকিত হলো এই ভেবে, যদি রহিম গ্রেফতার হয়েই থাকে তবে তা মারাত্বক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই অবস্থায় চাপে পড়ে দুই বন্ধুর সন্ধান বলে দিতে পারে রহিম। তখন তাদেরও ধরা পরতে হবে। এই চিন্তায় ইমরানকে অস্থির করে তুললো।

    একজন গোয়েন্দার ধরা পড়া বা মারা যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু ভয় ও চিন্তার কারণ, সে তার অন্যান্য সাথীদের নাম বলে দিলে পুরো মিশনকেই ধ্বংসের মুখে পড়ে যায়।

    যে গোপন তথ্যের জন্য তারা এখানে এসেছিলো, তা তাদের হাতে এসে গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরে পড়া দরকার। শেষ মুহূর্তে এসে এ ধরণের একটা সমস্যা পুরো মিশনকেই শেষ করে দিতে পারে।

    একদিকে আত্মরক্ষা করে নিরাপদে আক্রা থেকে বেরিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে বন্ধুকে খুঁজে বের করার কঠিন দায়িত্ব- কোনটা করবে ইমরান? কিভাবে করবে? এক সুকঠিন দায়িত্বের বোঝা তাড়া করতে লাগলো ইমরানকে।

    সূর্য ডুবে যাওয়ার এখনও কিছুটা দেরী। রেজাউল আস্তাবলের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। চারটি ঘোড়া এসে আস্তাবলের মুখে থামলো। একজন আরোহী ঘোড়ার পিঠে লাশের মত একজনকে ফেলে রেখেছিল। তার সামনেই তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামানো হলো। নামানোর পর লোকটিকে দেখেই রেজাউলের শরীরের সমস্ত রক্ত ঠান্ডা হীম হয়ে গেল। এ লোক আর কেউ নয় তারই সহযোগী, বন্ধু রহিমের। তার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।

    আরোহীদের সবাইকে চেনে রেজাউল। সবাই অফিসার। রহিমকে নামানোর পর এক অফিসার রেজাউলকে ডাকলো। এই অফিসার রেজাউলকে বেশ পছন্দ করতো, তাকে ডাকতো ফ্রান্সিস বলে। অফিসারের ডাক শুনে বাস্তবে ফিরে এল রেজাউল। দৌড়ে গেল অফিসারের কাছে। কিন্তু তার পা তখন চলতে চাচ্ছিল না। সে ভাবছিল, তাকেও কি গ্রেফতার করা হবে।

    ‘এই চারটি ঘোড়া ভেতরে নিয়ে যাও।’ অফিসার রেজাউলকে বললো, ‘সহিসকে বুঝিয়ে দিয়ে এসে বন্দীকে ওই কামরাই নিয়ে চলো।’ রহিমকে দেখিয়ে বললো অফিসার।

    রেজাউলকে যখন ফ্রান্সিস বলে ডাকলো, তখন সে ভাবলো, রহিম তাদের বিষয়ে এখনো কিছু বলেনি। এ খৃস্টান অফিসার এখনও তাকে সহিস ফ্রান্সিস বলেই জানে। এই ভেবে সে একটু সাহস ফিরে পেল।

    রেজাউল অফিসারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই বন্দী কে? এ লোক কি চুরি করেছে?’

    ‘এ বেটা সালাহউদ্দিন আইয়ূবীর গোয়েন্দা!’ তিরস্কারের ভঙ্গিতে বললো অফিসার, ‘এখন এই গোপন কুঠুরীতে পড়ে গোয়েন্দাগিরি করবে। যাও, ঘোড়া নিয়ে যাও।’

    এই ফাঁকে রেজাউল ও রহিম একে অন্যের চোখে চোখ রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়। চোখে চোখে কথা হয় তাদের। ধরা পড়লে চোখের ইশারায় কিভাবে কথা বলতে হবে সে সংকেত তাদের আগেই ঠিক করা ছিল।

    যদি কোনদিন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, পরস্পর কথাও বলতে পারবে না, তখন ইশারায় অন্যকে পালিয়ে যাওয়ার যে সংকেত দেয়ার কথা, রহিম রেজাউলকে সে সংকেত দিল। কিন্তু রেজাউল তার উল্টো অর্থ করে বসল। সে ভাবল, এখন পালিয়ে যাওয়ার সংকেত দেয়ার মানে হচ্ছে, রহিম আমাদের পরিচয় এখনো ফাঁস করেনি। ফলে সে পালিয়ে না গিয়ে রহিমকে উদ্ধার করার কোন সুযোগ সৃষ্টি হয় কিনা সে জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।

    যদিও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য প্রচন্ড ঝুঁকি ছিল তবু সঙ্গীর কথা চিন্তা করে সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না। কারণ সে জানতো, এ ধরা পড়ার মানে কি এবং এর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে।

    বন্দীশালায় একজন গোয়েন্দার ওপর কেমন উৎপীড়ন হয় তা তার অজানা নয়। সে জানে, উদ্ধার করা সম্ভব না হলে রহিমকে এখন মরতে হবে। কিন্তু মরাটাই বড় কথা নয়, এ মৃত্যু যে কত বড় যন্ত্রণাদায়ক সে কথা ভেবেই শিউরে উঠল তার শরীর।

    রেজাউল এও জানতো, রহিমকে এখন যে কামরায় রাখা হবে সেখান থেকে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হব

    ইমরান গির্জা সংলগ্ন এক কামরায় অস্থির চিত্তে পায়চারী করছে আর চিন্তা করছে, রহিম নিখোঁজ হয়ে গেল কোথায়? এখন তাকে আমি কোথায় খুঁজে বেড়াবো?

    এমন সময় কামরার দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। রেজাউল প্রবেশ করলো ভেতরে। সে ভেতরে এসেই দরজা বন্ধ করে, ভীত কন্ঠে ফিসফিস করে বললো, ‘রহিম ধরা পড়েছে।’

    সে যেমন দেখেছে ইমরানকে সব খুলে বললো। শেষে বললো, ‘সে এখনো আমাদের কথা কিছু বলেনি।’

    ‘যদিও বলেনি কিন্তু টর্চার সেলে গেলেই বলে দেবে।’ ইমরান বললো, ‘সেই দোজখের নির্যাতনে মুখ বন্ধ রাখা সহজ ব্যাপার না।’

    অবস্থা ভয়াবহ জটিল। এ অবস্থায় কি করা যায় তা নির্ধারনের দু’জনে পরামর্শে বসলো। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। তারা এখনই বেরিয়ে যাবে, না রহিমকে মুক্ত করার চেষ্টা করবে?

    রেজাউল বললো, ‘আমাদের সামনে সংকটটি খুবই স্পর্শকাতর ও জটিল। এ মূহুর্তে সামান্য ভুল আমাদের জন্য মারাত্বক বিপদ ডেকে আনবে।’

    ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো এবং একটা ভুল এরই মধ্য আমরা করেও ফেলেছি। ভুলটা হলো, আমরা একটু বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। গোয়েন্দা বিভাগের কর্মীদের অসীম ধৈর্য ও সহ্যগুনের প্রয়োজন। আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছু করা আমাদের সাজে না।’

    ‘যদি নিজেদের কোন সাথী বিপদে পড়ে?’

    ‘যদি তাকে সাহায্য করতে গেলে অন্যদেরও ফেঁসে যাওয়ার ভয় থাকে, তবে তাকে সাহায্য করতে যাওয়া বোকামী। রেজাউল, আবেগের বশে চলার সময় এটা নয়।’

    ইমরানের কথায় রেজাউলের আবেগে মোটেও ভাটা পড়লো না। সে জেদের সাথে বললো, ‘রহিমের মত সুন্দর ও সাহসী বন্ধুকে বন্দী রেখে আমরা পালাতে পারি না। তাকে মুক্ত করার চেষ্টা আমি অবশ্যই চালাবো।’

    ‘অসম্ভব!’ ইমরান বললো, ‘এমন ভয়ঙ্কর সংকল্প ত্যাগ করো, নইলে আমরা উভয়েই বিপদে পড়বো। সবচেয়ে বড় কথা, যে তথ্যের জন্য আমরা এখানে এসেছিলাম, তা আমরা পেয়ে গেছি। সবার আগে এ তথ্য পৌঁছানো আমাদের জন্য ফরজ।’

    রেজাউল বললো, ‘আমি যেখানে থাকি সেখানেই রহিমকে রাখা হয়েছে। ফলে তাকে মুক্ত করার একটা চেষ্টা করার সুযোগ আছে আমার। এ সুযোগ না থাকলে আমি কোন অনুরোধ করতাম না। আমাকে অন্তত একটা দিন সময় দাও, যদি এর মধ্য সফল না হই তবে আমার আর কোন আফসোস থাকবে না। নইলে তার মৃত্যুর জন্য আজীবন কষ্ট হবে আমার।’

    ‘কিন্তু তুমি কিভাবে একটা বাহিনীর মুখের গ্রাস কেড়ে নেবে?’

    রেজাউল বললো, ‘আমি একা ঠিকই, কিন্তু সেখানে এরই মধ্য অনেকে আমার বন্ধু হয়ে গেছে। তাদের সাহায্য আমি পাবো। যদি তার কাছে একবার পৌঁছাতে পারি, তবে তাকে মুক্ত করার পথ একটা পেয়েই যাবো আশা করি।’

    ‘কিন্তু যদি ব্যর্থ হও, যদি নিজেও ধরা পড়ে যাও দুশমনের হাতে?’

    ‘যদি আমি ধরা পড়ি, তুমি তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যাবে এখান থেকে। আমাদের মুক্ত করার জন্য বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবে না। যে তথ্য পাচার করা দরকার সেই গোপন তথ্য সবই তোমার কাছে আছে। তুমি পালাতে পারলেই আমাদের মিশন সফল হয়ে যাবে। আমি রহিমকে ছাড়া যাবো না। ওর জন্য আমাকে ছেড়ে দাও।’

    ইমরান আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকল। রহিমের জন্য তার যে মায়া ছিল না বা কষ্ট হচ্ছিল না, তা নয়। কিন্তু কর্তব্য-চিন্তা তাকে কঠোর করে তুলেছিল। ইমরানকে দুর্বল হতে দেখে রেজাউল এবার বলল, ‘ঠিক আছে, আমার কথা শোন। রহিমের মুক্তির যদি কোন উপায় না দেখি , তবে রাতেই আমরা বের হয়ে যাবো। তুমি সজাগ থেকো, আমি তার খবর নিয়ে রাতের যে কোন সময় এসে তোমাকে রিপোর্ট করে যাবো। ওকে মুক্ত করার কোন সম্ভাবনা থাকলেই কেবল আমি অপেক্ষা করবো, নইলে তোমার সঙ্গী হবো।’

    ‘ঠিক আছে, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, আমি ঘোড়ার ব্যবস্থা করে রাখছি।’

    রেজাউল তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। রাস্তায় পথ চলার সময়ও তার মাথায় রহিমের মুক্তির চিন্তাই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছিল। রহিমকে মুক্ত করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। সে কোন সাধারণ চোর ডাকাত ছিল না, সে ছিল এক রাষ্ট্রীয় অপরাধী। সেনানিবাসের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বন্দী সে। কিন্তু রেজাউলের আবেগ তাকে দুঃসাহসী ও বেপরোয়া করে তুলল। আর সেই আবেগের বশে সে তার মূল দায়িত্বও ভুলে গেল।

    ইমরানের দায়িত্ব ছিল ঘোড়ার ব্যবস্থা করা। কিন্তু ঘোড়ার ব্যবস্থা করাও সহজ হলো না। পাদ্রীর বডিগার্ডদের ঘোড়া সেখানে থাকে ঠিকই, কিন্তু পাহারাদারদের দৃষ্টি এড়িয়ে সেখান থেকে ঘোড়া চুরি করা ছিল বলতে গেলে অসম্ভব।

    তখন পর্যন্ত রহিমকে কয়েদখানায় পাঠানো হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে গোয়েন্দা বিভাগের দুই পাষন্ড অফিসারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দারা ধরা পড়লে তাদের কাছ থেকে তথ্য ও গোপন কথা আদায় করাই প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায়। সবাই জানে, গোয়েন্দারা কখনও একা থাকে না, তাদের একটি সংঘবদ্ধ দল থাকে। একজন ধরা পড়লে তার কাছে থেকেই তার সাথীদের সন্ধান পাওয়া যায়।

    রহিমের কাছ থেকে এ সকল তথ্য আদায় করার জন্য তাকে এক কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘একজন গোয়েন্দা হিসেবে অনেক গোপন খবরই তোমার জানা থাকার কথা। বলো, আমাদের কি কি গোপন খবর তুমি সংগ্রহ করেছো?’

    রহিম উত্তরে বললো, ‘আমি তোমাদের কোন গোপন বিষয়ই জানি না।’

    ‘বণিকের মেয়ের সাথে তোমার কেমন সম্পর্ক ছিল?’

    ‘আমাদের দু’জনের মধ্য গভীর ভালবাসার সম্পর্ক রয়েছে।’

    ‘রয়েছে নয়, বলো, ছিল। কখন তুমি এলিসাকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা করো?’

    ‘আলিসার বিয়ে এক বৃদ্ধ অফিসারের সাথে হতে যাচ্ছিল, সে কারণে সে বাড়ী থেকে পালিয়েছিল এবং আমাকেও সঙ্গে নিয়েছিল।’

    ‘তুমি কি জানো, তুমি কেমন করে ধরা পড়লে?’

    ‘না!’ রহিম উত্তর দিল, ‘আমি শুধু এটুকুই জানি, আমি ধরা পড়েছি।’

    ‘তুমি আরও অনেক কিছুই জানো।’ এক অফিসার বললো, ‘সব কথা বলে দাও, তোমাকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না।’

    ‘আমি এটুকুই জানি, আমি আমার দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পুর্ণ অসচেতন হয়ে পড়েছিলাম। তার ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এখন আমি আমার পাপ ও কর্তব্যে অবহেলার শাস্তি ভোগ করবো। তোমরা আমাকে যে ধরণের কষ্ট ও শাস্তি দিতে চাও, দিতে পারো, আমি হাসি মুখেই আমার পাপের শাস্তি গ্রহন করবো।’

    ‘তোমার দীলে কি এখনো আলিসার জন্য ভালবাসা আছে?’

    ‘হ্যাঁ, এখনও আছে।’ রহিম বললো, ‘আর চিরকাল থাকবে। আমি তাকে সঙ্গে কায়রো যেতে চেয়েছিলাম, সেখানে ইসলামী বিধান মতে সংসার গড়তে চেয়েছিলাম।’

    ‘আমি যদি বলি, সে তোমার সাথে প্রতারণা করেছে, তুমি তা মানবে?’

    ‘না।’ রহিম বললো, ‘যে আমার জন্য তার পিতা-মাতা ও বাড়িঘর ত্যাগ করতে পারে, সে কখনও ধোঁকা দিতে পারে না। বরং তাকে অন্য কেউ ধোঁকা দিয়েছে।’

    ‘যদি আমি আলিসাকে তোমার সামনে হাজির করি, তবে কি তুমি বলবে, তোমার সাথে আক্রাতে আর কতজন এসেছে? এখন তারা কোথায় আছে?’

    রহিম চুপ করে রইল, এ প্রশ্নের কোন জবাব দিল না।

    তাকে আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তুমি কি বলবে, তুমি এখান থেকে কোন কোন গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছে?’

    এবারও রহিম নিরুত্তর। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এক অফিসার এগিয়ে এসে তার মাথা উপরে তুলে ধরলো। রহিমের দুই চোখে তখন টলমল করছে অশ্রু।

    অফিসার বারবার একই প্রশ্ন করল, কিন্তু সে এর কোন জবাব দিল না। সে অস্বীকার করে এ কথা বলল না যে, আমার কোন সঙ্গী সাথী নেই। আবার কে কোথায় আছে সে কথাও বলল না। স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিল, তার ভেতর চরম টানাপোড়েন চলছে। সে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। সে এ প্রশ্নের জবাব দেবে কি দেবে না, দিলে কি দেবে ঠিক করতে পারছে না। তার চেহারা বলছিল, আলিসার জন্য এখনো সে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে।

    ‘তোমাকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে।’ এক অফিসার বললো, ‘আমরা চেয়েছিলাম তোমার কষ্ট কমাতে। এ জন্য তোমাকে একাধিকবার সুযোগ দেয়া হয়েছে। বার বার একই প্রশ্ন করার পরও তুমি কোন জবাব দাওনি। কিন্তু কি করে একজন বেয়াড়া গোয়েন্দার কাছ থেকে কথা আদায় করতে হয় সে কথা তোমার অজানা থাকার কথা নয়। তবু যখন তুমি কথা বলছো না, বাধ্য হয়ে আমাকে সে পথই ধরতে হবে। শেষ পর্যন্ত তুমি যখন একটি হাড় ও মাংসের স্তুপ হয়ে যাবে তখন আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না। তুমি বাঁচবে কি মরবে আমার সে চিন্তা করার দরকার নেই। তবে যদি এখনো উত্তর দিয়ে দাও, তবে অনেক কষ্টের হাত থেকে বেঁচে যাবে তুমি। আর আলিসার কথা যদি জানতে চাও তো বলি, আলিসা চায় না তুমি এত তাড়াতাড়ি দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাও। তোমার সাথে এই যে ভাল ব্যবহার করা হচ্ছে এটাও অনেকটা আলিসার জন্যই।’

    ‘রাজ সাক্ষীকে ক্ষমা করার একটা বিধান দুনিয়া জোড়াই চালু আছে। ইচ্ছে করলে সে সুযোগ তুমি নিতে পারো। তাহলে আলিসার একটা ইচ্ছা পূরণ করার অবকাশ পাবো আমরা। তোমাকে নিয়ে ঘর বাধার যে স্বপ্ন আলিসা দেখছে, তার সে স্বপ্ন পূরণ হবে। আলিসাকে যদি তুমি চাও তবে সে সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’

    অফিসার বলে চললো, ‘এটা কয়েদখানা নয়। তুমি এখন একজন অফিসারের কামরায় আছো। যদি তুমি চিন্তা করার সময় চাও তবে আজ রাত তোমাকে এখানেই রাখা হবে।’

    রহিম নিরব, নিস্তদ্ধ। বোবা চোখ মেলে সে ফ্যালফ্যাল করে অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল।

    অফিসারদেরও তেমন ভয় ছিল না যে, সে পালিয়ে যাবে। উঠানে ও সামনে সব সময় পাহারাদার থাকে। তাছাড়া সামরিক এলাকার কড়া পাহারা থেকে পালিয়ে ও যাবেই বা কোথায়?

    এক অফিসার তার সঙ্গীকে বললো, ‘কেন তুমি অযথা সময় নষ্ট করছো। একে গোপন ঘরে নিয়ে যাও। লোহার উত্তপ্ত শলাকা তার গায়ে লাগাও, দেখবে সে সব কথাই গড়গড় করে বলে দিচ্ছে। যদি তাতেও কাজ না হয় তবে ক্ষুধা ও পিপাসায় ফেলে রেখো দু’একদিন।’

    অন্য অফিসার তাকে ইশারায় কামরার বাহিরে আসতে বললো। দুজনই বাইরে এলে সে বললো, ‘আমার পরীক্ষা অন্যরকম বন্ধু। এ কথা ভুলে যেওনা, এরা মুসলমান। তুমি এ পর্যন্ত কতজন মুসলমানের কাছ থেকে গোপন তথ্য বের করেছ? তুমি কি জান, এই কমবখত জাত একবার যদি মুখ বন্ধ করে তবে মরে যাবে, তবুও মুখ খুলবে না। এ বেটা তো বলেই দিয়েছে, সমস্ত উৎপীড়ন ও শাস্তি তার গোনাহের সাজা হিসেবে গ্রহন করে নিবে।’

    ‘এ বেটা দেখছি পাকা মুসলমান!’

    ‘হ্যাঁ, একে টর্চার সেলে নিলেও সে বলবে, আমি কিছু জানি না। আমার উদ্দেশ্য ওকে হত্যা করা নয়, আমার শুধু জানা দরকার, তার সাথীরা কে কোথায় আছে? আর জানা দরকার, মিশরে আমাদের আক্রমণ করার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে তথ্য সে জানে কি না।’

    ‘ওর বাবারও তা জানা সম্ভব নয়।’ অন্য অফিসার বললো, ‘হাইকমান্ডের মুষ্টিমেয় অফিসার ছাড়া এ বিষয়ে আর কেউই অবগত নয়। এই গোয়েন্দা বণিকের মেয়ের ভালবাসায় বন্দী হয়ে আছে, তার তো দুনিয়ার আর কোন খবরের দরকার নেই। আমার তো এ কথাও বিশ্বাস হচ্ছে না, আলিসাই তাকে গ্রেফতার করিয়েছে। কারণ, সে এখনও এই উজবুকের প্রেমে পাগল হয়ে কান্নাকাটি করছে।’

    অফিসার তাকে নিয়ে কামরার বাহিরে এল। বললো, ‘বুদ্ধু, আলিসাকেই আমি এ ব্যাপারে ব্যবহার করতে চাই। আলিসাকে আজ এই কামরাতেই এনে রাখা হবে। আমি আশা করি, যে গোপন রহস্য আমরা কয়েকদিন চেষ্টা করেও স্বীকার করাতে পারবো না, আলিসার মত যুবতী মেয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেই গোপন খবর জেনে নিতে পারবে।’

    ‘একটা মেয়ের উপর এতটা ভরসা করা কি ঠিক হবে?’ সন্দেহের সুর সঙ্গী অফিসারের কন্ঠে।

    ‘এখনও তোমার মনে সন্দেহ কাজ করছে। শোন, তুমি তো এখনও সব কথা শোনইনি। আলিসা ফিরে এসে যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা জানতে পারলে বুঝতে, আলিসা কতটা কাজের। এ বন্দীর কাছ থেকে কথা বের করার দায়িত্ব যেহেতু আমাদের দু’জনের, তাই সব কথা তোমার জানা দরকার।

    আলিসা ঐ লোকটাকে গভীরভাবে ভালবাসতো। একজন নির্যাতীত খৃষ্টান ও উদ্বাস্তু পরিচয়ে লোকটা তাদের কাছে আশ্রয় নেয়। পরিচয়ের সময় এ যুবক তার নাম বলে, ‘ইলিমোর’।

    আলিসার বাবা কমান্ডার ওয়েস্ট মেকর্ডের সাথে মেয়ের বিয়ে পাকা করলে মেয়ে ওই বিয়েতে বেঁকে বসে। কমান্ডার মেকর্ডকে আলিসা ‘বুড়ো ভাম’ বলে গালি দেয় এবং অপমান করে।

    বাপ চাচ্ছিল কমান্ডারকে মোটা ঘুষ হিসেবে কন্যা দান করতে। কিন্তু সুদর্শন যুবক ইলিমোরের প্রেমে পড়ে মেয়ে তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে বসল।

    মেকর্ড যুবককে খুন করার হুমকি দিলে ঘটনা জটিল আকার ধারণ করে। নিরুপায় হয়ে ওরা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পালিয়ে যাওয়ার সময় যুবকটি যখন অনুভব করল, এখন আর ধরা পড়ার সম্ভাবনা নেই, তখন রাতে বিশ্রামের সময় সে তার আসল পরিচয় ফাঁস করে দেয় আলিসার কাছে। আলিসাকে সে বলে, ‘আমি ইলিমোর নই, আমার নাম রহিম। আমি একজন মুসলমান এবং আইয়ুবীর গোয়েন্দা।’

    আলিস মনে করেছিল, ইলিমোর তামাশা করছে। কিন্তু এ যুবক তাকে বিশ্বাস করায়, সে মোটেও হাসি তামাশা করছে না, বাস্তবিকই মুসলমান এবং তার নাম রহিম।

    রহিম জানতো না, আলিসার মনে মুসলমানদের প্রতি প্রচন্ড ভয় এবং ঘৃণা জমা হয়ে আছে। খুব শিশুকাল থেকেই এই ভীতি ও ঘৃণা জন্ম নিয়েছিল তার মনে। রহিমের এ কথাও জানা ছিল না, সে একজন অন্ধ খৃষ্ট ভক্ত ও খৃষ্ট ধর্মের একনিষ্ট অনুসারী। তার ধর্মপ্রীতি এত প্রবল যে, এ জন্য সে দুনিয়ার সব কিছু ত্যাগ করতে পারে।

    আলিসা যখন বুঝলো, তার প্রেমিক তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তখন তার হৃদয়ে ভয়ের এক শিহরণ বয়ে গেল। তার মনে হলো, যে লোক ভালবাসার নামে প্রতারণা করতে পারে, সে লোক পারে না এমন কোন অপকর্ম নেই। এ ধরণের লোক কখনো বিশ্বস্ত হতে পারে না।

    এ লোক একবার তাকে কায়রো নিয়ে যেতে পারলে তার ভাগ্যে কি ঘটবে কল্পনা করে শিউরে উঠল আলিসা। সে শুধু নিজেই তাকে ভোগ করবে, অন্যের দ্বারা তাকে নষ্ট করবে না এর নিশ্চয়তা কি?

    যে লোক তাকে মিথ্যা কথা বলে ঘর থেকে বের করতে পারে সে লোক সাধ মিটে গেলে যদি তাকে অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেয় তাহলে কি করতে পারবে আলিসা?

    শিশুকাল থেকে মন-মগজে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ও খারাপ ধারণা জমা ছিল, সেই সব ভয়ংকর দৃশ্য আলিসার সামনে ভেসে উঠতে লাগল। প্রেমিকের বিরুদ্ধে বিষিয়ে উঠল তার মন।

    আলিসার মনে মুসলমান প্রেমিকের চেয়ে ধর্মের প্রতি ভালবাসা প্রবল হয়ে উঠল। রাতে তার প্রেমিক ঘুমিয়ে গেলে ঘৃণাভরে তাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে এল আলিসা।

    তার মনে তখন প্রতিশোধের দাউ দাউ আগুন। প্রতিশোধ স্পৃহায় তার চেহারা তখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। সে এ কথা একবারও ভাবল না, আক্রা ফিরে গেলে তার বাবা তার সাথে কেমন ব্যবহার করবে? ভাবল না, সেই বুড়ো অফিসার আবার হামলে পড়বে তাকে বিয়ে করার জন্য। তার মনে তখন একটাই চিন্তা, একটাই শপথ, যে করেই হোক মুসলমানদের অনিষ্ট করতে হবে। সর্বাবস্থায় তাদের শত্রু মনে করতে হবে। ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য ক্রুশের নামে শপথ নিল সে।

    আলিসা ছিল খুব সাহসী ও চতুর মেয়ে। পালাবার ব্যাপারে সে এক নিখুঁত পরিকল্পনা তৈরী করল। রহিমকে তার মনোভাব কিছুই জানতে না দিয়ে সেও শুয়ে পড়ল তার সাথে। রহিম যখন গভীর ঘুমে মগ্ন তখন আলিসা ঘোড়ার ওপর আরোহন করে এমন চুপিসারে পালিয়ে আসে যে, রহিম তার কিছুই টের পায়নি।

    যে পথে গিয়েছিল সেই পথেই ফিরে এলো আলিসা। ভোর হওয়ার আগেই আক্রা এসে পৌঁছলো। বাবার কাছে গিয়ে সব অপরাধ স্বীকার করে রহিম সম্পর্কে সব কথা বলে দিলো তাকে।

    তার পিতা তখনই কমান্ডার ওয়েস্ট মেকর্ডকে এই ঘটনাটি জানালো। কমান্ডার তিনজন সৈন্য সাথে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল রহিমের সন্ধানে।

    সকালে ঘুম থেকে জেগে রহিম দেখে ঘোড়াসহ আলিসা উধাও। অগত্যা সে মরুভূমি থেকে লোকালয়ে পৌঁছার জন্য পায়ে হেঁটেই রওনা দিল। কিন্তু পায়ে হেঁটে সে আর কতদুর যাবে? মেকর্ড-এর হাতে অচিরেই ধরা পড়লো সে। এখন সেই প্রেমিক গোয়েন্দা আমাদের হাতে।’

    ‘কিন্তু রহিম জানে না, আলিসা তাকে ধোঁকা দিয়েছে?’

    ‘না। এ জন্যই আমি এখন আলিসাকে ব্যবহার করতে চাই। আমি রহিমকে খুব ভাল খাবার খেতে দেবো এবং আরাম আয়েসে রাখবো যাতে সে বিভ্রান্ত হয়।’

    সেনানিবাসের অফিসার্স কোয়ার্টার। সকল চাকর-বাকর ও লোকজনের মুখে একই কথা, একজন মুসলিম গোয়েন্দা ধরা পড়েছে। রেজাউলও ফ্রান্সিস পরিচয়ে সেই চাকরদের সঙ্গে আছে। অন্যদের সাথে সেও সমান তালে মুসলিম গোয়েন্দাকে গালমন্দ করে যাচ্ছে।

    সে গালমন্দ করছে, আর জোরে জোরে চিৎকার করে বলছে, ‘এই গোয়েন্দাকে ফাঁসি দেয়া হোক। আর তা না হলে তাকে ঘোড়ার পিছনে বেঁধে ঘোড়া ছুটানো হোক।’

    রেজাউল জানে রহিম এখনও সেই কামরাতেই আছে। রেজাউলের মত অন্যরাও বন্দীকে কয়েদখানায় পাঠানো হচ্ছে না দেখে আশ্চর্য হচ্ছিল। বাবুর্চীখানার এক লোক বললো, ‘কয়েদীকে আজ অফিসারের খাবার দেয়া হবে।’

    যখন সে সত্যি সত্যি কয়েদীর জন্য অফিসারের খাবার নিয়ে গেলো তখন সকলেই একে অন্যের মুখের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো।

    রেজাউলের বিস্ময় তখন চরমে। সে বাবুর্চীখানার লোককে এক সময় আড়ালে পেয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘এর মানে কি? মুসলমান গোয়েন্দাকে এত জামাই আদর করা হচ্ছে কেন? যে খাবার আমাদের ভাগ্যে জুটে না সে খাবার দেয়া হচ্ছে কয়েদীকে! তবে কি এ লোক আসলে কোন গোয়েন্দা নয়?’

    ‘কি বলছো তুমি! তুমি তো জানো না, এ বড় ভয়ংকর গোয়েন্দা!’ চাকর তার বিদ্যা জাহির করে বললো, ‘অফিসার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন, আমি নিজে তার মুখ থেকে শুনেছি, এ কয়েদীকে কেবল ভাল খাবারই দেয়া হবে না, তার জন্য নাকি রুপসী কোন মেয়েও জোগাড় করা হয়েছে। খাওয়া দাওয়ার পর সেই মেয়েকে তার কামরায় পাঠিয়ে দেয়া হবে।’

    ‘বলো কি!’ চোখে মুখে চরম বিস্ময় ফুটিয়ে বললো রেজাউল।

    ‘হ্যাঁ, এই মেয়ে নাকি গোয়েন্দার পেট থেকে কথা বের করবে।’ বলল চাকর।

    রহিমের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আলিসাকে নিয়ে তার কামরার দিকে এগিয়ে গেল অফিসার দু’জন। কামরার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। আলিসাও দাঁড়াল তাদের সাথে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল অফিসারের দিকে।

  • সর্প কেল্লার খুনী

    সর্প কেল্লার খুনী

    সর্প কেল্লার খুনী

    দামেশকে সুলতান আইয়ুবী বীর বেশে প্রবেশ করলেন, সঙ্গে মাত্র সাতশ অশ্বারোহী। কি করে এই স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এমন বিপুল বিজয় সাধন করলেন তিনি, সে এক বিষ্ময়ের ব্যাপার। এ ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে ছিল সুলতান আইয়ুবীর জান-কবুল অগ্রগামী সৈন্যদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা। এ জান-কবুল অগ্রগামী বাহিনী ছিল সেসব গোয়েন্দাদের, যাদের কেউ কেউ বণিকের বেশে, কেউ নিরিহ পথচারী সেজে, কখনো একাকী, কখনো দু’জন, কখনো তিন বা চার জনের ছোট ছোট দলে দামেশকে প্রবেশ করেছিল। দামেশকের সাধারণ মানুষের সাথে একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিল তারা। কুলি-মজুর থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, পথচারী, এমনকি ছাউনিতেও ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছিল এসব গোয়েন্দারা। পরিবেশ পরিস্থিতিকে সুলতান আইয়ুবীর অনুকূলে আনার জন্য জনমতকে প্রভাবিত করা এবং সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য সুলতানের পক্ষে আছে তাদেরকে সংগঠিত করাই ছিল তাদের মূল কাজ।

    এভাবে সুলতানের আগমনের পূর্বেই দামেশকের পরিস্থিতি তারা সুলতানের স্বপক্ষে নিয়ে আসে। সুলতান আইয়ুবী দামেশকের ফটকে পৌঁছলে সুলতানের জন্য দামেশকের দরজা খুলে দেয়ার যে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয় জনগণের পক্ষ থেকে, মূলত তারাই সে চাপের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এসব গোয়েন্দাদের প্রায় সবাই ছিল চৌকস ও বুদ্ধিদীপ্ত। আলী বিন সুফিয়ান গোয়েন্দাগিরিতে ঝানু এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শীদের বাছাই করে এ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। যে কোন ধরনের পরিস্থিতে ঠান্ডা মাথায় কাজ করার জন্য
    পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেয়েছিল এরা সুলতানের কাছ থেকে।

    প্রতিটি গোয়েন্দাই ছিল সব ধরনের অস্ত্র ব্যাবহারে অভ্যস্ত এবং সব রকমের বিপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পটু। তারা কেবল বুদ্ধিদীপ্ত এবং বিচক্ষণই ছিল না, তারা দুঃসাহসী এবং বেপরোয়াও ছিল। আল্লাহর কাছে জীবন বিলিয়ে দেয়ার উদগ্র কামনা ছিল সবার অন্তরে। শাহাদাত লাভের জন্য তাদের প্রতিটি অন্তর ছিল উদগ্রীব।

    তাই তারা অবলীলায় এমন সব ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারতো, যা সাধারণভাবে কেউ চিন্তা করতেও ভয় পেতো। এ আবেগ শুধু সামরিক ট্রেনিং দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন হতো নৈতিক প্রশিক্ষণ।

    আলী তার বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এমনভাবে তৈরি করতেন, যাতে তাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস জন্মে, দ্বীনের প্রতি সৃষ্টি হয় অপরিসীম ভালবাসা ও মহব্বত। হৃদয় ভরপুর থাকে শাহাদাতের তামান্নায়।

    ইসলামের জন্য নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে শরীক হতে হতো তাদের। এ চেতনার কারনেই এসব অভিযানে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়তো জেহাদের আবেগময় জযবা নিয়ে। এমনি একদল নিবেদিতপ্রাণ যুবকদের নিয়েই সুলতান আইয়ুবী তার কমান্ডো বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। সুলতান আইয়ুবী তার বাহিনী নিয়ে দামেশক যাত্রা করার আগেই বাছাই করা এ কমান্ডো ও গোয়েন্দাদের দামেশক যাত্রা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওরা রওনা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হলে তাদের সামনে এক আবেগময় ভাষণ দিলেন তিনি।

    ভাষণের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বললেন, ‘যদি দামেশকের সেনাবাহিনী মোকাবেলার জন্য ময়দানে নেমে আসে, তাহলে তোমাদের প্রতি আমার নির্দেশ রইল, শহরের মধ্যে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দেবে। উত্তেজিত জনগণকে নিয়ে ছুটে আসবে ফটক প্রাঙ্গণে। ভেতর থেকে গেট খুলে দিতে চেষ্টা করবে শহরের।’

    জনমতকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এদের কোন জুড়ি ছিল না। সুলতানের পক্ষের লোকদের সংগঠিত করে সুবিশাল জঙ্গী মিছিলের মাধ্যমে খলিফার অনুগত লোকদের মনে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করে, সুলতান ফটকে
    পৌঁছার আগেই সুলতানের এসব জানবাজ কমান্ডো ও গোয়েন্দারা শহরের অবস্থান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

    এক ফরাসি কথাশিল্পী তার কাহিনীতে এ যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সুলতান আইয়ুবীর যুদ্ধবাজ কমান্ডোরা স্বাভাবিক মানুষ ছিল বলে মনে হয় না। ইসলামের ধর্মীয় আবেগ তাদের উন্মাদ বানিয়ে ফেলেছিল! নইলে জেনেশুনে এভাবে হাসতে হাসতে মরণ সাগরে ঝাঁপ দিতে পারতো না ওরা। জেহাদী জযবা এক ধরণের মানসিক রোগ। পতঙ্গ যেমন আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ছুটে যায়, এ রোগে ধরলে মানুষও তেমনি ছুটে যায় মরণ সাগরে ঝাঁপ দিতে।

    তাঁর হয়তো জানা নেই, এ জেহাদী জযবাই একজন মানুষকে মুজাহিদে রূপান্তরিত করে। এ আবেগের সাথে পরিচয় নেই বলেই ফরাসি লেখক তাকে ‘ধর্মীয় উন্মাদনা’ ও ‘মানসিক রোগ’ বলে খাটো করে দেখছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, মুসলমানদের কাছে এ আবেগ বা জযবার মূল্য কত! এর স্বাদ কত মধুর ও তৃপ্তিদায়ক! প্রকৃত মুসলমানের জীবন তো ধন্য হয় এই আবেগ ও জযবাকে সম্বল করেই!

    এ জানবাজ গোয়েন্দাদেরই নেতা আলী বিন সুফিয়ান। তার দুই সহকর্মী হাসান বিন আব্দুল্লাহ ও জায়েদানকে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজ হাতে। যুদ্ধ কৌশলে তারা এতটাই পারদর্শী ও দক্ষ হয়ে উঠে যে, এখন সেনানায়করাও তাদের কাছে শিখতে পারবে। আলী তাদেরকেই পাঠিয়েছিলেন দামেশকে।

    সুলতান আইয়ুবী দামেশক রওনা হবার আগে বললেন, ‘আলী, কায়রোর আভ্যন্তরীণ অবস্থা ভাল না। এ অবস্থায় কায়রোকে অরক্ষিত রেখে অভিজানে বের হওয়া আমার সাজে না। কিন্তু ওস্তাদ জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর আহাজারী এবং মিল্লাতের দুর্দিন ডাকছে আমাকে। আমি চাই, আমি যে কয়দিন কায়রোতে অনুপস্থিত থাকবো, তুমি থাকবে কায়রোতে। খ্রিস্টান ক্রীড়নকদের হাত থেকে দামেশকে মুক্ত করে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এর হেফাজতের জিম্মা থাকবে তোমার ওপর। মিশরে খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের তৎপরতা আশংকাজনক হারে বেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে কারণে তোমাকে খুবই হুশিয়ার থাকতে হবে।

    এ কারণেই সুলতানের সাথে অভিযানে আসতে পারেন নি আলী। পরিবর্তে সুলতানকে সামগ্রিক সহায়তাদানের জন্য হাসান বিন আবদুল্লাহকে আগেই দামেশকের পথে পাঠিয়ে দিলেন। দামেশকের সুলতানের জানবাজ গেরিলা ও গোয়েন্দাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো এই হাসান বিন আবদুল্লাহ।

    খ্রিস্টানদের তল্পীবাহক কতিপয় স্বার্থপর আমীর ষড়যন্ত্র করে জঙ্গীর নাবালক সন্তান আল মালেকুস সালেহকে খলিফা ঘোষণা করলে মুসলিম মিল্লাতের স্বার্থে জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী সুলতান আইয়ুবীকে দামেশক অভিযানের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। এ আবেদনে সাড়া দিয়ে সুলতান যখন দামেশক এসে পৌঁছলেন তখন সেখানকার বেশীর ভাগ সৈন্যই কমান্ডার তাওফীক জাওয়াদের সেনা কমান্ডে ছিল। খলিফার দেহরক্ষী রেজিমেন্ট, পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী অবশ্য তার নেতৃত্বে ছিল না। এরা ছাড়া মূল সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যই সেনাপতি জাওয়াদের নেতৃত্বে সুলতান আইয়ুবীর আনুগত্য কবুল করে নিলে সুলতান এসব সৈন্যদেরকে তার নিজ বাহিনীর সাথে একীভূত করে নিলেন।

    দামেশকে আইয়ুবীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তথাকথিত খলিফা এবং তার মন্ত্রণাদাতা ওমরারা দামেশক ছেড়ে পালিয়ে গেল। তাদের সাথে গেল তাদের প্রতি অনুগত সৈন্য ও খলিফার দেহরক্ষী বাহিনী।

    তাদের ভয় এবং আশংকা ছিল, সুলতানের আইয়ুবীর সৈন্যরা তাদের পিছু ধাওয়া করবে। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী তা করলেন না। সেনাপতিদের কেউ কেউ পালিয়ে যাওয়া খলিফা ও আমীরদের পিছু ধাওয়া করার অনুমতি চাইলে তিনি তাদের বারণ করলেন।

    তারা আশংকা প্রকাশ করে বললো, ‘কিন্তু ওরা আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে বাইরের সাহায্য নিয়ে অভিযান চালাতে পারে!’

    আরেকজন বললো, ‘খ্রিস্টানরা তো ওদের সাহায্য করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে!’

    সুলতান আইয়ুবী ওদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি কখনও অন্ধকারে পথ চলি না। আপনারা অস্থির হবেন না। ওরা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং কারা কারা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে আমি তা দেখতে চাই। আমার চোখ ও কান ওদের সাথেই সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করছে!

    ঐ হতভাগারা এত তাড়াতাড়ি আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে পারবে না। আমি শুধু দেখতে চাই, ক্রুসেড বাহিনীর দৃষ্টি কোন দিকে? তারা কি মিশরের দিকে নজর দেয়, না দামেশকের দিকে, ওটাই এখন দেখার বিষয়।’

    সুলতানের কথার উপর আর কথা চলে না, তাই সবাই চুপ করে গেল। সুলতান খানিক বিরতি দিলেন। একটা গুমোট নিস্তব্ধতা বয়ে গেল সবার উপর দিয়ে।

    নিস্তব্ধতা ভাঙলেন সুলতান নিজেই। বললেন, ‘সম্ভবত ওরাও অপেক্ষা করছে, আমি কি পদক্ষেপ নেই তা দেখার জন্য। এমনও হতে পারে, তারা আমার চাল বুঝেই তাদের চাল চালবে। অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আপনারা নিয়মিত সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকুন, পুরোদমে যুদ্ধের মহড়া চালাতে থাকুন। সময় এলে গাদ্দার আমীরদের শায়েস্তা করার জন্য আমি ওদেরকে আপনাদের হাতেই তুলে দেবো।’

    সুলতান আইয়ুবী যাদেরকে তাঁর চোখ ও কান বলেছিলেন, তারা আর কেউ নয়, আলীর গোয়েন্দা বিভাগের সেই জানবাজ বাহিনী। এদের অধিকাংশই মিশরের বাসিন্দা, তবে সবাই নয়, এ অঞ্চলের বেশ কিছু সদস্য আছে এ দলে।

    খলিফা আল মালেকুস সালেহ ও তাঁর আমীর ওমরারা দামেশক থেকে পালানোর সময় তাদের সাথে সুলতানের এসব গোয়েন্দাদের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। এই পলাতকদের সংখ্যা মোটেই কম ছিল না।

    সমস্ত আমীর, উজির, কিছু জমিদার, প্রশাসনের অনেক অফিসার ও করমছারি, যারা খলিফার পক্ষে ছিল, সবাইকেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন আইয়ুবী। পলাতকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যার মত পালিয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেন আলীর গোয়েন্দারা। তারা সহজেই মিশে যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের সাথে।

    খলিফা আল মালেকুস সালেহ ও তার পোষ্য আমীররা প্রতিশোধের জন্য কি ধরণের তৎপরতা চালায় এটা দেখাই তাদের উদ্দেশ্য। সেই সাথে খ্রিস্টানরা তাকে কেমন সাহায্য দেয়, কিভাবে দেয় তাও লক্ষ্য করার দায়িত্ব ছিল তাদের উপর। হাসান বিন আবদুল্লাহ নিজের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করে সুলতান বা আলীর সাথে পরামর্শ ছাড়াই এসব গোয়েন্দাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে পলায়নপর লোকদের সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সে ভাল করেই জানতো, তার এই সিদ্ধান্ত এক সময় অবশ্যই সুফল বয়ে আনবে। পরে সুলতানকে এ ব্যাপারে অবহিত করলে তিনি খুবই খুশী হন এবং সন্তোষ প্রকাশ করে তার পিঠ চাপড়ে দেন।

    এ গোয়েন্দাদেরই একজন মাজেদ বিন মুহাম্মদ হেজাযী। অত্যন্ত সুপুরুষ ও সুন্দর চেহারার যুবক। শারীরিক গঠন মাঝারী, তবে সুগঠিত। আল্লাহ তার মুখে এমন মাধুর্য দান করেছিলেন যে, তার কথা যাদুর মত প্রভাব বিস্তার করতো।

    গোয়েন্দাদের প্রায় সবাই দক্ষতা ও গুণাবলীতে একই রকম হলেও মাজেদ বিন মুহাম্মদ ছিল বিস্ময়কর ব্যাতিক্রম। তার নৈপুণ্য ও দক্ষতা ছিল অতুলনীয়।

    গোয়েন্দাদের প্রায় সবাই সুন্দর ও সুগঠিত স্বাস্থের অধিকারী ছিল। তাদের এ সুন্দর স্বাস্থ্য ও লাবণ্যের একটি বিশেষ কারণ ছিল, তারা কেউ নেশা করতো না, অলস এবং আরামপ্রিয় জীবন যাপন করতো না। নিয়মিত ব্যায়াম এবং শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের কারণে তাদের চেহারায় সব সময় প্রশান্তির প্রলেপ মাখা থাকতো। তাদের চরিত্রের দৃঢ়তা, ইস্পাতের মতো অনড়, অটল মনোবল এবং প্রবল ও অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তির মূলে ছিল ইসলাম। ইসলামী আদর্শের পরিপূর্ণ জ্ঞান ও অনুশীলন তাদেরকে দিয়েছিল এক অনড় দৃঢ়তা। তাদের কথা ও কাজে প্রকাশ পেতো সে দৃঢ়তার ছাপ।

    মাজেদ বিন মুহাম্মদ হেজাযী কাজে কর্মে তার সঙ্গীদের চাইতেও চৌকশ এবং ইস্পাত কঠিন ছিল। হৃদয় ছিল চেহারার চাইতেও অনুপম সুন্দর আর মহৎ। এরুপ সৌন্দর্য নিয়েই সে দামেশক থেকে পালাচ্ছিল। একটি আরবী ঘোড়ার ওপর বসেছিল সে। তার কোমরে ঝুলছিল সুদ্রিশ তলোয়ার। ঘোড়ার জিনের সাথে বাঁধা ধারালো বর্শা চমকাচ্ছিল রোদের কিরণ লেগে। ঘোড়া এগিয়ে যাচ্ছিল ধীর গতিতে। আর সে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিল দূর দিগন্তে।

    একাকী পথ চলছে মাজেদ হেজাযী। যাচ্ছে হলবের দিকে। পথে অনেক লোকই চোখে পরলো তার। অনেকে তার মতো হলবের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে একজনকেও বেছে নিতে পারলো না, যার সাথে পথ চলা যায়, যাকে সফর সঙ্গী করা যায় নিঃশঙ্ক চিত্তে।

    সে মনে মনে একজন সম্ভ্রান্ত সহযাত্রী খুঁজছিল। খুঁজছিল এমন সহযাত্রী, যে তার মিশনের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে। এমন সহযাত্রী সে-ই হতে পারে, যে লোক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার, আমীর বা খলিফা আল মালেকুস সালেহর নিকতাত্তিয়, বন্ধু বা আপনজন।

    খলিফা আল মালেকুস সালহকে খুঁজে ফিরছিল তার চোখ ও মন। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস ও করলো, খলিফা কোন দিকে গেছে জানে কিনা। কিন্তু কেউ খলিফার কোন সন্ধান দিতে পারলো না।

    সে ভালো মতোই জানতো, আল মালেকুস সালেহ তার পিতা নূরুদ্দিন জঙ্গীর গুণ বা সাহস কোনটাই পায়নি। খলিফার গুণ–বৈশিষ্ট্যের কোন ছিটেফোঁটা নেই তার মধ্যে। সে এগারো বছরের এক চঞ্চল বালক মাত্র। তাকে খ্রিস্টানদের চক্রান্তে সুযোগ সন্ধানী ও লোভী আমীররা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাজ্যের সিংহাসনে বসিয়েছে। নামে মাত্র খলিফা বালিক সালেহ, প্রকৃত শাসক সেই স্বার্থবাদী আমীররা।

    সে চিন্তা করে দেখলো, এ নাবালক খলিফার পক্ষে একা কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। কোথায় যেতে হবে, কি করতে হবে, তাই তো তার জানা থাকার কথা নয়!

    ক্ষমতা হারা হলেও সে ঘোষিত খলিফা। ফলে চক্রান্তকারীরা কিছু করতে চাইলে অবশ্যই তাকে সামনে রাখবে। নিশ্চয়ই এখনো সে আমীর, উজির এবং সভাষদবর্গ পরিবেষ্টিত হয়েই পথ চলছে। আর সে কাফেলার সাথে আছে রাজকীয় ধন-দৌলত ও অর্থসম্পদ বোঝাই উটের সারি।

    মাজেদ হেজাযী মনে মনে ভাবছিল, যদি সে কাফেলার সন্ধান পাই, তবে আল মালেকুস সালেহের ভক্ত হয়ে সেই কাফেলার সাথে যুক্ত হয়ে যাবো।

    একবার সে কাফেলার দেখা পেলে কি করতে হবে জানা আছে তার। কি করে অচেনা লোকের আপন হওয়া যায়, কি করে তাদের মনের কথা বের করে আনা যায়, সেসব কৌশল অন্যদের চাইতে ভালই রপ্ত করেছে সে।

    কিন্তু কোথায় সে কাফেলা? তার শূন্য দৃষ্টি বার বার এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করলো। কিন্তু কাঙ্খিত কাফেলা, নিদেনপক্ষে সঙ্গী করার মতো পছন্দসই কোন ব্যক্তিকেও সে খুজে পেল না।

    সামনে পাহাড়ী এলাকা। পাহাড়ের পাদদেশে শস্যক্ষেত ও ফলের বাগান। একটু বিশ্রামের আশায় সেই বাগানের এক গাছের নিচে বসলো মাজেদ।

    অল্প দূরে এক জায়গায় দুটি ঘোড়া দেখতে পেল। ওদিকে তাকাতেই তার একটু উপরে সবুজ ঘাসের উপর একজন লোককে শুয়ে থাকতে দেখলো। দৃষ্টি আরেকটু উপরে তুলতেই তার নজর পড়লো একটি মেয়ের উপর। মেয়েটিও তার মতো শুয়ে আছে।

    ওখান থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সে গাছের নিচে শুয়ে পড়লো। শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবছে, হঠাৎ একটি ঘোড়া বিকট শব্দে ডেকে উঠলো।

    সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো ঘোড়ার পাশে শায়িত লোকটি। উঠে বসতেই তার নজর পড়লো মাজেদ হেজাযীর উপর। মাজেদ হেজাযীও ঘোড়ার ডাক শুনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছিল সেদিকে, চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের। লোকটির পোশাক পরিচ্ছদ বলছিল, সে কোন খান্দানী বংশের লোক।

    মনে হয় সে লোক ও মনে মনে কোন পছন্দসই সফর সঙ্গী খুঁজছিল। মাজেদ হেজাযীকে দেখে তার পছন্দ হয়ে গেল এবং ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো।

    মাজেদ হেজাযী সাড়া দিল তার ডাকে। সে শোয়া থেকে উঠে ওদের দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে অপরিচিতের সাথে মুছাফাহ করলো।

    মেয়েটিও ততক্ষণে উঠে বাসেছে। ওর বয়স বেশী নয়। দেখলে মনে হয়, কৈশর উত্তীর্ণ এক নবীন যুবতী। লাবণ্য ও সৌন্দর্য মাখামাখি হয়ে লেপ্টে আছে মেয়েটির অঙ্গ জুড়ে। গলায় হীরের হার। পোশাকে জৌলুসের ছাপ। এরা যে সাধারণ কেউ নয়, তা কাউকে বলে দিতে হয় না।

    লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মাজেদ এক পলক তাকিয়েই বুঝে ফেললো, এরা কারা।

    ‘তুমি কে?’ লোকটি জিজ্ঞেশ করলো, ‘তুমি কি দামেশক থাকে আসছো?’

    ‘হ্যাঁ, আমি দামেশক থেকেই এসেছি!’ মাজেদ বললো, ‘কিন্তু এখন দেয়ার মতো কোন পরিচয় নেই। ভাগ্যই এখন একমাত্র পরিচয়। তার কন্ঠ থেকে একরাশ হতাশা ঝড়ে পড়লো। হতাশ কন্ঠেই সে প্রশ্ন করলো, ‘আপনারা কোথায় যাবেন?’

    ‘মনে হয় আমরা একই পথের পথিক!’ লোকটি মুচকি হেসে উত্তর দিলো, ‘ধরো, তোমারই মতো মঞ্জিলহীন মুসাফির!’

    কথা বলতে বলতে লোকটি ভাল করে মাজেদ হেজাযীর দিকে। বললো, ‘আমি কি ধরে নেবো, ভাগ্যই তোমার মতো যুবককে আমাদের সংগী বানিয়ে দিয়েছে।’

    ‘অপরিচিত যাকে-তাকে সঙ্গী করা ঠিক নয় সাহেব। বিশেষ করে যার সাথে এমন সুন্দরী মেয়ে থাকে, আর সে মেয়ের গলায় থাকে এমন মূল্যবান হার!’ মেয়েটির গলার দিকে ইঙ্গিত করলো সে।

    লোকটি এতে মোটেও বিব্রত না হয়ে বললো, ‘তোমার মতো সঙ্গী পাওয়া আসলেও ভাগ্যের ব্যাপার। বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী সঙ্গী বিপদের বন্ধু। সাহস কেমন আছে জানি না, তবে বুদ্ধি যে সতেজ তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’

    এবার মাজেদ হেজাযীও হেসে দিল। বললো, ‘আপনি কি করে আমাকে আস্থাভাজন ভাবলেন, আমি খারাপ লোকও তো হতে পারি।’

    ‘সে তোমার চেহারাতেই লেখা আছে। শোন, আমাদের মতো তুমিও আইয়ুবীর তাড়া খেয়ে দামেশক ছেরেছো। বিপদগ্রস্ত লোকেরা সব সময়ই একে অন্যের সহায়ক হয়। বলতে পারো, আইয়ুবীই আমাদের পরস্পরকে বন্ধু বানিয়ে দিয়েছে।’

    ‘এটা আপনি ঠিকই বলেছেন। অবশ্যই আমরা একে অন্যকে সাহায্য করবো। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, জীবন দিয়ে হলেও আমি আপনাদের সাহায্য করবো।’

    ‘আইয়ুবী কি আমাদের তাড়া করতে পারে? তুমি কি তেমন কোন আভাস পেয়েছো?’

    ‘তাড়া করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার সাথে সৈন্য খুবই কম বলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য পাঠাতে পারে নি। শহরের নিয়ন্ত্রণ আয়ত্তে এলেই সে আমাদের খুঁজে বের করার জন্য চারদিকে সৈন্য পাঠিয়ে দিবে।’

    ‘খুবই দুশ্চিন্তার কথা।’

    ‘কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা!’

    ‘কি?’

    ‘একটু আগে আমি রাস্তায় দুটো লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। শুনেছি ওরা ডাকাতের হাতে মারা গেছে। দামেশক থেকে পলাতক লোকদের ওপর হামলা করতে শুরু করেছে ডাকাতরা, এটা খুবই ভয়ের কথা। কারণ, আমরা যারা পালাচ্ছি, তার সবাই পরস্পর বিচ্ছিন্ন। অনেকেই সহায় সম্পদ সঙ্গে নিয়ে পালাচ্ছি। ডাকাতদের জন্য এ এক সুবর্ণ সুযোগ। আমাদের জান-মাল ছিনিয়ে নেয়ার এ সুযোগ ওরা হাত ছাড়া করবে বলে মনে হয় না।’

    মাজেদের কথা শুনে মেয়েটির আকর্ষণীয় চেহারা হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সে তার সঙ্গীর দিকে তাকালো ভয়ার্ত ও করুণ চোখে। লোকটির অবস্থাও ভালো নয়। তার মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে দুশ্চিন্তার ছায়া পড়লো।

    ‘তুমি তো আমাদের বড় দুর্ভাবনায় ফেলে দিলে যুবক।’

    ‘না, না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তবে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা দরকার। সাবধান থাকলে অনেক বিপদই এড়ানো যায়।’

    ‘কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আইয়ুবী আর ডাকাতদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উভয়েই লুটেরা, খুনী এবং নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী। এদের কারো মধ্যেই দয়ামায়ার চিহ্নও নেই!’

    ‘ঠিক বলেছেন। ইনি আপনার কি হয়?’ মেয়েটির দিকে ইশারা করে জানতে চাইল মাজেদ।

    ‘ও আমার স্ত্রী।’

    ‘দামেশকে আর কয়জন স্ত্রী ছেড়ে এসেছেন?’ মাজেদ হেজাযী আবার জিজ্ঞেস করলো।

    ‘চার জন।’

    ‘আল্লাহর হাজার শুকুর যে, আপনি আপনার পঞ্চম স্ত্রীকে নিয়ে নিরাপদে শহর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে পেরেছেন!’

    ‘তিরস্কার করছো! আমি তো তাও একজন স্ত্রী সঙ্গে এনেছি, কিন্তু তুমি তো তাও আনো নি!’

    ‘কোন নারীকে নিয়ে শর ছাড়ার মতো অবস্থা আর নেই। তাছাড়া …’

    লোকটি তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি আইয়ুবীর সৈন্যদের কি অবস্থায় দেখে এসেছো? তারা কি শহরে লুটতরাজ শুরু করে দিয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ, মাজেদ হেজাযী বললো, ‘ সেখানে এখন ভয়ানক লুটপাট চলছে। আমি…’

    ‘দামেশকের কোথায় তোমার বাড়ি? সেখানে তুমি করতে?’

    ‘সে পরিচয় আমি কাউকে বলতে চাই না।’

    ‘বুঝেছি, তুমি আমাদের বিশ্বাস করতে পারছো না। ঠিক আছে, আস্থা না এলে বলার দরকার নেই। তবে বললেও তোমার কোন ক্ষতি আমাদের দিয়ে হতো না।’

    ‘না, না, কি বলছেন আপনি। আমি মোটেই আপনাদের অবিশ্বাস করছি না। আমার পরিচয় শুনতে আপনাদের ভাল লাগবে না বলেই আমি ইতস্তত করছি।’

    ‘কি যে বলো। তুমি যা তাই তোমার পরিচয়। নিজের আসল পরিচয় প্রকাশে কোন রকম হীনমন্যতা থাকা উচিৎ নয় কারো। তুমি নিঃসঙ্কোচে তোমার পরিচয় বলতে পারো, আমরা কিছুই মনে করবো না।’

    ‘আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর একজন সালার।’

    সঙ্গে সঙ্গে লোকটার মুখের হাসি অদৃশ্য হয়ে গেলো। কম্পিত কন্ঠে বললো, ‘আমাদের সাথে যে টাকাকড়ি আছে সব নিয়ে যাও। কিন্তু আমাদের কোন ক্ষতি করো না। তোমার কাছে আমি করজোড়ে প্রার্থনা করছি, আমাদের ওপর রহম করো, দয়া করে একটু প্রাণ ভিক্ষা দাও।’

    মাজেদ হেজাযী হো হো করে হেসে উঠলো। বললো, ‘অর্থ, সম্পদ ও নারীর চিন্তা মানুষকে কাপুরুষ ও দুর্বল বানিয়ে দেয়। আমি বেঁচে থাকতে কেউ আপনাদের গায়ে আঁচড়ও দিতে পারবে না। আর সম্পদের কথা বলছেন? এ সম্পদ আপনাদের। কেউ তা ছিনিয়ে নিতে চাইলে এ তলোয়ার তার জবাব দেবে। আসলে আপনাদের কাছে এখনো আমার আসল পরিচয় বলতেই পারিনি।’

    ‘মুহতারাম! আমাকে বলুন আপনি কে? দামেশকে আপনি কি পদে ছিলেন এবং আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

    ‘আমি সত্যি কথাই বলেছি, আমি আইয়ুবীর সৈন্য ঠিকই, তবে পলাতক। আসলে আমি জঙ্গীর সৈন্য। তিনি আমাকে আইয়ুবীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। জঙ্গীর নুন খেয়েছি আমি, আজ মরহুম জঙ্গীর পুত্রের এ দুর্দিনে তার পাশে না দাঁড়ালে নিমকহারামী হবে। তাই আইয়ুবীর ওখান থেকে পালিয়ে এসেছি। এবার আপনার পরিচয় বলুন। আশা করি আপনার অন্তরঙ্গ হিতৈষী ও জানবাজ রক্ষক হিসাবে আমার মতো আর কাউকে পাবেন না। আমরা উভয়েই একই নৌকার যাত্রী। এখন থেকে আপনাদের যে কোন বিপদে আমাকে আপনাদের পাশেই পাবেন।’

    ‘আমি দামেশকের শহরতলীর এক জমিদার। দরবারে আমার যথেষ্ট প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ছিল। রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা এবং যুদ্ধ পলিসি নির্ধারণে আমার মতামতের গুরূত্ত অনেক। খলিফার রক্ষী বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিয়োগ দিয়েছি আমি। তিনি আমাকে তার একান্ত আপনজন বলেই ভাবতেন। আমার বেরুতে একটু দেরী না হলে তার সাথে একত্রে যাওয়ার কথা ছিল আমার।’

    ‘কি সৌভাগ্য আমার! খলিফার একজন অন্তরঙ্গ বন্ধুর সেবা করার সুযোগ পাচ্ছি আমি! আপনি কি এখন তার কাছেই যাচ্ছেন?’

    ‘হ্যাঁ, খলিফা আল মালেকুস সালেহ সঙ্গী সাথীদের নিয়ে হলব গিয়ে উঠবেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকেও হলব পৌঁছতে বলেছেন তিনি।’

    ‘আমিও হলবেই যাচ্ছিলাম। তিনি ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হলবই এখন তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান।’

    ‘তোমাকে পেয়ে আমার খুবই উপকার হলো। জমিদারীর সবকিছু দামেশকে ফেলে এলেও সোনাদানা ও হীরা-জহরত যথেষ্টই সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বিদেশে মান সম্মান, প্রতিপত্তি সবই তো কিনতে হবে এ অর্থের বিনিময়ে! আফসোস হচ্ছে আমার চার বিবির জন্য! ওদেরকে চাকর-বাকরের হাতে রেখে এসেছি। কিন্তু লুটপাট শুরু হলে এ চাকররাই আমার বাড়ি লুট করবে না, তার নিশ্চয়তা কি?’

    ‘ও নিয়ে এখন আফসোস করে লাভ নেই। ছোট বিবিকে সঙ্গে আনতে পেরেছেন, এও কি কম কথা!’

    ❀ ❀ ❀

  • চারদিকে চক্রান্ত

    চারদিকে চক্রান্ত

    চারদিকে চক্রান্ত

    খলিফা আল মালেকুস সালেহ ও খৃস্টান সামরিক উপদেষ্টারা উইণ্ডসারের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় মিলিত হয়েছেন। উইন্ডসার খৃস্টান সম্রাট রিমাণ্ডের দূত হয়ে এসেছেন হলবে। নৈশভোজের পর আছে জমজমাট নৃত্যানুষ্ঠান। সবাই সমবেত হয়ে অপেক্ষা করছিল উইণ্ডসারের জন্য। তার আসার সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কেন তিনি বিলম্ব করছেন দেখার জন্য অবশেষে মেহমানখানায় লোক পাঠানো হলো।

    একটু পর।

    উইণ্ডসারকে ডাকতে যাদের পাঠানো হয়েছিল ফিরে এল তারা। উইণ্ডসার নয়, তার বদলে তাদের সাথে আসরে এসে পৌঁছলো উইণ্ডসারের লাশ।

    উইণ্ডসারের অপেক্ষায় এতক্ষণ যারা পথ চেয়ে বসেছিল, হতবিহ্বল হয়ে পড়লো তারা। কেমন করে তিনি নিহত হলেন, কেন হলেন, কিছুই তারা বুঝতে পারলো না। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই থ’ বনে গেল।

    লাশ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল খৃস্টান উপদেষ্টা ও সামরিক অফিসাররা। তারা উইণ্ডসারকে খুবই বিজ্ঞ এবং ক্ষমতাধর অফিসার হিসাবে জানতো। এ ঘটনাকে তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারলো না।

    ক্ষিপ্ত খৃষ্টানরা খলিফা আল মালেকুস সালেহ, তাঁর আমীর, উজির ও সামরিক অফিসারদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে লাগলো। পারে তো তাদের ধরে মারে, এমনি অবস্থা। যে অকথ্য ভাষায় গালাগালি হচ্ছিল, অন্য সময় হলে হয়তো খলিফার সামরিক অফিসাররা ঝাঁপিয়ে পড়তো তাদের ওপর। কিন্তু এ আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওরা বিহ্বল ও ভেঙ্গে পড়লো। প্ৰতিবাদের সব ভাষা হারিয়ে ওরা বোবা পাথর হয়ে গেল।

    শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় তারা ভীত-সন্ত্রস্তও হয়ে পড়লো। কারণ, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মোকাবেলায় তারা খৃষ্টানদেরকে নিজেদের অভিভাবক ও রক্ষক মনে করতো। তাদের ওপর ভরসা করেই তারা আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খৃস্টান সম্রাটের দূত হত্যার ফলে তারা নিজেদের জীবন নিয়েই শঙ্কিত হয়ে পড়লো।

    গদিচ্যুত খলিফা ও আমীররা ছিল মেরুদণ্ডহীন। খৃস্টানদের তোষামোদী করার মধ্যেই খুঁজে ফিরতো নিজেদের স্বার্থ ও সাফল্য। খৃস্টানরা যখন যা বলতো তাই মেনে নিত মাথা নত করে।

    এ ঘটনায় স্বার্থপর মুসলিম নেতাদের অবস্থা খুবই করুণ হয়ে উঠল। কোন বড় রকমের অপরাধ করলে চাকর-বাকররা যেমন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে, এরাও তেমনি দাঁড়িয়ে রইল ক্ষিপ্ত খৃস্টানদের সামনে।

    কেউ কোন প্ৰতিবাদ না করায় এক সময় কমে এল গালাগালির তোড়। খৃস্টানদের এক সামরিক অফিসার বললো, ‘সন্ধ্যায় ফটক বন্ধ হয়ে গেছে। অতএব খুনী রাতের মধ্যে শহর থেকে বেরোতে পারবে না। সকাল হওয়ার আগেই খুনীকে খুঁজে বের করো। প্রয়োজন হলে শহরের প্রতিটি ঘরে তল্লাশী চালাও। পুরো সেনাবাহিনীকে লাগাও এ কাজে।”

    আরেক খৃস্টান অফিসার ধমক দিয়ে বললো, “হা করে দেখছো কি? যাও, মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ঘরে ঘরে তল্লাশী চালাও। তাদের সাথে এমন ব্যবহার করো, যেনো আতংকগ্ৰস্ত মানুষ ভয়ে স্বেচ্ছায় খুনীকে তুলে দেয় সৈন্যদের হাতে।’

    ‘জী! জী! যাচ্ছি।’ এক মুসলমান আমীর বললো, ‘আমি সৈন্যদের এখুনি আদেশ দিয়ে দিচ্ছি, ভোরের আগেই যেনো খুনীকে পাকড়াও করা হয়। সমস্ত শহরে যেন এখনি ছড়িয়ে পড়ে সেনাবাহিনী।’

    ‘না, তা হয় না!’ এক কেল্লাধিপতি বললো, ‘এমন হতে পারে না। তল্লাশী শুধু সেই বাড়ীতেই নেয়া যেতে পারে, যার ওপর সন্দেহ করা যায়। সাক্ষী নেই, প্রমাণ নেই, অভিযোগ নেই, অথচ শহরের অভিজাত ও সন্ত্রান্ত ঘরগুলোতে আচানক গজবের মত টুটে পড়বে সেনাবাহিনী, তা হয় না।’

    এতগুলো গণ্যমান্য অফিসার, খৃস্টানদের সামরিক উপদেষ্টা, আমীর-ওমরা এবং স্বয়ং খলিফা যেখানে উপস্থিত ও নিরব, সেখানে কেউ রিমান্ডের সামরিক অফিসারের হুকুম অমান্য করতে পারে এবং এমন জোরের সাথে তার প্রতিবাদ করতে পারে, এ কথা কেউ কল্পনাও করেনি। সকলেই বিস্মিত হয়ে তাকালো তার দিকে। দেখলো, এ বলিষ্ঠ কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে হেম্মাত দুর্গের অধিপতি জুরদিকের কণ্ঠ থেকে।

    ইতিহাস জুরদিকের পুরো নাম উল্লেখ করেনি। তার সম্পর্কে শুধু এটুকুই বলেছে, ‘তিনি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বন্ধু ছিলেন।’

    কিন্তু এটা সে সময়ের কথা, তখনো তিনি সুলতান আইয়ুবীর বন্ধু হননি। আস সালেহের অনুগত সৈন্য এবং একটা দুর্গের প্ৰধান হিসাবেই এ ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তিনি। সম্মিলিত বাহিনীর পরামর্শ সভারও তিনি সদস্য ছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যেসব পরিকল্পনা তৈরী হচ্ছিল, তাতে তারও অংশ ছিল উল্লেখযোগ্য।

    কিন্তু মুসলমানদের ‘জাত’ ধরে যখন খৃস্টানরা গালাগালি করছিল, তখন তার মধ্যে জেগে উঠলো স্বজাত্যবোধ। রাতের আঁধারে ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানের ঘরে হানা দেয়ার কথা শুনে আর চুপ থাকতে পারলেন না। বললেন, ‘এখানকার অধিকাংশ পরিবার মুসলিম। তারা সবাই পর্দানশীন। আমি তাদের বেইজ্জতি সহ্য করতে পারবো না। এসব ভদ্র ও পর্দানশীন ঘরে সৈন্যরা বেপরোয়া তল্লাশী চালালে তাতে আমাদেরই সন্মানের হানি ঘটবে।’

    ‘খুনী এ শহরেই আছে।’ এক খৃস্টান ক্ষীপ্ত কষ্ঠে বলল, ‘প্রয়োজনে আমরা সমস্ত শহর তছনছ করে ফেলবো, প্ৰতিশোধ নেবো।’

    ‘উইণ্ডসার ছিলেন উচ্চ সামরিক অফিসার, তার খুনের বদলা নিতে গিয়ে কারো ইজ্জত সম্মানের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই আমাদের।’ আরেক উত্তেজিত খৃস্টানের কণ্ঠ।

    ‘তাহলে তোমাদের অফিসারের খুনের জন্য আমাদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের ঘর তল্লাশীরও কোন প্রশ্ন আসে না। উইণ্ডসার কত বড় অফিসার ছিলেন তা নিয়ে আমারও কোন পরোয়া নেই।’ জুরদিক রাগে কাপতে কাঁপতে বললেন।

    ‘জুরদিক! তুমি চুপ করো।’ কিশোর খলিফা আদেশের সুরে বললেন, ‘এ সামরিক মেহমানরা বহু দূর থেকে আমাদের সাহায্য করতে এসেছেন। তুমি কি মেহমানদারীও ভুলে গেছে? অকৃতজ্ঞ হয়ো না!! খুনীকে আমাদের ধরতেই হবে।” খলিফার সমর্থনে আরো অনেকেই কণ্ঠ উচ্চকিত করলো।

    ‘আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে থাকতে পারি এবং আছিও।” জুরদিক বললো, “কিন্তু নিজের জাতির বিরুদ্ধে যেতে পারি না। খলিফাতুল মুসলেমিন! যদি আপনি দেশের নাগরিকদের অপমান ও পেরেশান করেন। তবে নাগরিকরা আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। আপনি সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যে রণক্ষেত্র তৈরী করছেন সেটা অকেজো হয়ে যাবে।”

    “আমরা কোন জাতির পরোয়া করি না।” রিমাণ্ডের সামরিক উপদেষ্টা বললো, “আমরা খুনীদের খুঁজে বের করবোই। তারা যে বাড়ীতেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদেরকে পাকড়াও করে শুলে চড়াবো। এ হত্যাকাণ্ড নিশ্চয়ই সালাহউদ্দিন আইয়ুবী চালিয়েছে। তার পোষা কুকুরদের কখনো ক্ষমা করবো না আমরা।’

    “হে, আমার বন্ধুগণ!” জুরদিক বললেন, “তোমাদের মাত্র একজন অফিসারের খুন তেমন কোন বড় ব্যাপার নয়। তোমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যা করতে বহুবার বহু চেষ্টা করেছ। এই সেদিনও ফেদাইনদের পাঠিয়েছিলে তাকে খুন করতে। আমার জানা মতে তারা চার চার বার প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছ।

    তোমরা তাকে হত্যা করতে পারোনি, সে ভিন্ন ব্যাপার। সেটা তোমাদের অযোগ্যতা বা অদক্ষতা। আমি তোমাদের সে প্ৰচেষ্টাকে অন্যায় বলবো না। শত্রু যারই হোক, তারা একে অপরকে হত্যা করার চেষ্টা করেই থাকে। যদি উইণ্ডসারকে সুলতান আইয়ুবীই হত্যা করে থাকে, তবে পার্থক্য শুধু এই, তোমরা আইয়ুবীকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, আর তিনি তোমাদের অফিসারকে হত্যা করতে সফল হয়েছেন। তোমরাও তার এমন অনেক অফিসারকে হত্যা করেছো। কিন্তু তিনি জনগণকে সে জন্য হয়রানী ও কোন পেরেশানিতে ফেলেননি।”

    কিন্তু জুরদিকের এ বক্তৃতায় কোনই কাজ হলো না, না এতে খৃস্টানরা সন্তুষ্ট হলো, না মুসলমানদের বিবেক জাগ্রত হলো। বরং সমস্ত মুসলমান আমীর ও অফিসাররা একযোগে জুরদিকের বিরুদ্ধে কথা বলতে লাগলো। তারা খৃস্টানদের অসন্তুষ্ট করতে চায় না। কিন্তু জুরদিক সকলের সম্মিলিত মতামতকে উপেক্ষা করে তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

    তিনি বললেন, “ভদ্রতা ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে অন্যায়ভাবে নাগরিকদের হয়রানী করার কোন অধিকার নেই আমাদের। তোমরা সবাই বললেই একটা অন্যায় ন্যায় হয়ে যাবে না। সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে তাদের জান-মাল ও ইজত-আব্রুর হেফাজত করার শপথ নিতে হয়েছে আমাকে। সে শপথের কসম, বিনা ওয়ারেন্টে আমি শহরের কোন ঘরেই তল্লাশী চালাতে দেবো না।”

    “তবে কি আমরা মনে করবো, তুমি এ খুনের সাথে জড়িত?” এক খৃস্টান বললো, ‘আমার সন্দেহ হচ্ছে, ‘তুমি আইয়ুবীর বেতনভুক কৰ্মচারী!’

    ‘হলবের কোন বাড়ীতে অন্যায়ভাবে তল্লাশী চালানোর প্রতিবাদ করার অর্থ যদি হয় সে খুনী, তবে এ অপবাদ মাথায় নিতে আমার কোন আপত্তি নেই।” জুরদিক বললেন, “এবং এ কারণে কেউ যদি আমাকে আইয়ুবীর কর্মচারী ভাবে, তার সে ভাবনা দূর করার জন্য কোন অন্যায় আবদার রক্ষা করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

    “আমি যতক্ষণ এখানে আছি ততক্ষণ আমার আদেশই চলবে।” খৃস্টান এক সামরিক অফিসার বললো।

    ‘তোমাদেরকে আমরা ভাড়া করেছি আমাদের সহযোগিতা করার জন্য। এ জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিকও দেয়া হয়েছে তোমাদের।” জুরদিক বললেন, “এখানে আমাদের আদেশই চলবে। কোন ভাড়াটিয়ার আদেশ মেনে চলতে শিখিনি আমরা।”

    রাগে বিকৃত হয়ে গেল খৃস্টান অফিসারদের চেহারাগুলো। দাঁতে দাঁত চেপে একজন বললো, “আমরা এখানে তোমাদের চাকর হিসাবে আসিনি, এসেছি উপদেষ্টা হিসাবে। আমাদের উপদেশ মেনে চলতে তোমরা বাধ্য।”

    “এটা আমার দেশ। আমরা মুসলমান। অবস্থা আমাদের আপোষে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। যদি তুমি নি:স্বাৰ্থভাবে এখানে আমাদের সাহায্য করার জন্য এসে থাকো, তবে আমি তোমার সঙ্গে আছি। কিন্তু আমি সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই, আমার জাতির ওপর কোন নিপীড়নমূলক জুলুম চালানো হলে আমি তার প্রতিশোধ নেবো।”

    সুস্থভাবে আলোচনার কোন পরিবেশ ছিল না সেখানে। এই বাকবিতণ্ডা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য দু’জন প্রভাবশালী আমীর জুরাদিককে ধরে টেনে হিঁচড়ে কামরার বাইরে নিয়ে গেল।

    জুরাদিককে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর খৃষ্টানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অন্য এক আমীর বললো, দয়া করে আপনারা আমার কথা একটু শুনুন। অবস্থা যা, তাতে জুরাদিককে অসন্তুষ্ট করা যাবে না। এ ব্যক্তিকে জোর করে বশ করা সম্ভব নয়। তার কেল্লার সমস্ত সৈন্য তার ইশারায় জীবন দিয়ে দিতেও পিছপা হবে না। শক্তি নয়, তাকে কৌশলে কাবু করতে হবে। আপনারা যদি একটু ধৈর্য ধরেন, তবে তা খুব কঠিন হবে না।’

    তারপর সে খৃস্টানদের সামনে তার পরিকল্পনা তুলে ধরলো। খৃস্টানরা নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে জুরাদিককে আবার ভিতরে নিয়ে আসতে বললো। সে এলে তাকে বলা হলো, “ঠিক আছে, জনগণকে হয়রানী করা হবে না। তবে খুনীদেরকে খুঁজে বের করারও প্রচেষ্টা চলবে।”

    জুরদিক বললেন, “ঠিক আছে। বাড়াবাড়ি না করলে আমি নিজেও চেষ্টা করবো খুনীকে পাকড়াও করতে।”

    তিন চারদিন পর জুরদিক হলব থেকে যাত্রা করলেন। তিনি তার কেল্লা হেম্মাতে যাচ্ছিলেন। তিনি শহরে থাকা অবস্থায় তার উপস্থিতিতেই খুনীদের ব্যাপারে অনেক অনুসন্ধান ও তল্লাশী চালানো হয়। কিন্তু তার নিষেধ অগ্রাহ্য করে কোন ঘরেই ব্যাপক তল্লাশী চালানো হয়নি দেখে তৃপ্ত মনেই যাচ্ছিলেন তিনি।

    খৃস্টানরা সেদিনের অপমানের কথা ভুলেনি। তারা জুরদিকের দিকে লক্ষ্য রাখছিল। আর অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মনে মনে নানা রকম ফন্দি আটছিল।

    জুরদিকের সঙ্গে ছিল দশ বারো জন রক্ষী যোদ্ধা। তারাও জুরদিকের মত অশ্বাপূষ্ঠে সমাসীন। মরুভূমির বালিয়াড়ি মাড়িয়ে ওরা পাহাড়ী এলাকায় উঠে এল। চারপাশের পাহাড় চূড়া ও উঁচু-নিচু টিলার মাঝখান দিয়ে সরু পাহাড়ী রাস্তা এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে। জুরাদিকরা এগিয়ে চললো সেই সংকীর্ণ পথ ধরে।

    সামনে জুরদিক, পেছনে রক্ষী সেনারা সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ কোথেকে ছুটে এলো দুটি তীর। বিদ্ধ হলো জুরদিকের ঘোড়ার মাথায়।

    তীর দুটো জুরদিককে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হলেও হঠাৎ ঘোড়া লাফিয়ে উঠে মাথা তোলায় অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন জুরাদিক।

    দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাগলা ঘোড়ার মত বেসামাল ভঙ্গিতে এলোপাথাড়ি ছুটতে লাগলো ঘোড়া। ছুটে এলো আরও দুটো তীর।

    জুরদিকের ভাগ্যই বলতে হবে, এবারও নিশানা ব্যর্থ হলো দুশমনের, তীর দুটো আগের মতই আঘাত করলো ঘোড়ার গায়ে।

    শূন্যে লাফিয়ে পড়লো ঘোড়া, পিঠ থেকে আরোহীকে ফেলে দেয়ার জন্য শুরু করলো প্ৰচণ্ড দাপাদাপি। ডাইনে বায়ে পা জুড়ে সামাল দিতে চাইল মরণযন্ত্রণা।

    জুরদিক অশ্বারোহণে ছিলেন অসম্ভব পটু। তিনি ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়লেন। মুহুর্তে নিজেকে ছুড়ে দিলেন এক পাথরের আড়ালে।

    পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল রক্ষীরা। তারপর ক্ষিপ্ৰগতিতে ছুটল তীরের উৎস সন্ধানে। মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়লো এদিক-ওদিক।

    দু’জন করে পাঁচটি দলে ভাগ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ওরা।

    এলাকাটা এমন জটিল, কাউকে খুঁজে পাওয়া বা ধরা খুবই মুশকিল। জুরদিক বুঝলো, এটা ভাড়াটে খুনীর কাজ। নিশ্চয়ই তাকে হত্যা করার জন্য এদেরকে খৃস্টানরা লেলিয়ে দিয়েছে।

    ওই ঘটনার পর থেকে খৃস্টানরা জুরাদিককে সুলতান আইয়ুবীর বন্ধু বলে সন্দেহ করতে লাগলো। তারা জানে, জুরদিক সাহসী এবং বীর যোদ্ধা। তাকে হত্যা করতে হলে প্রফেশনাল খুনীদেরই নিয়োগ করতে হবে।

    জুরদিক সন্তৰ্পনে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে উঠে গেলেন এক টিলার ওপরে। ওখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে মেলে ধরলেন দৃষ্টি। অসংখ্য ছোট ছোট টিলা আর বিবৰ্ণ প্ৰান্তর ছাড়া কোন জন মানুষের ছায়াও চোখে পড়ল না তাঁর।

    রক্ষীরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আততায়ীদের খুঁজে ফিরছিল। হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলল, “জলদি এদিকে ছুটে আসো সবাই! আমি ওদের দেখে ফেলেছি। ধরতে হলে ওদের ঘিরে ফেলতে হবে।”

    চিৎকার শুনে অন্য রক্ষীরা ছুটলো সেই দিকে। একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়েছিল তিনজন লোক। সবাই মুখোশ পরা। কিন্তু তাদের কাছে কোন তীর ধনুক নেই।

    একটু দূরে পাহাড়ের এক খাঁজে তিনটি ঘোড়া ছিল। কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে পালানোর কোন চেষ্টা করেনি তারা।

    মুখোশের কারণে ওদের চেহারা দেখা যাচ্ছিল না, শুধু দেখা যাচ্ছিল চোখ দুটোর নড়াচড়া। তাদের ধরে নিয়ে এসে জুরদিকের কাছে হাজির করা হলো। “তোমাদের ধনুক ও তীর কোথায়?” জুরদিক প্রশ্ন করলেন।

    “আমাদের কাছে কোন তীর ধনুক নেই, অস্ত্র বলতে শুধু তলোয়ার আছে।” একজন বললো।

    ‘শোন।’ জুরদিক শান্ত কন্ঠে বললেন, ‘তোমাদের চারটি তীরই লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে, আমাকে হত্যা করতে পারেনি। তোমাদের কপাল খারাপ, তোমরা ধরাও পড়ে গেছে। এখন অযথা মিথ্যা বলে নিজেদের অপরাধ আর বাড়িও না!”

    “তীর!” ওরা আশ্চর্য হয়ে বললো, “আমরা কারো ওপর তীর চালাইনি, আমরা নিরীহ মুসাফির! একটু বিশ্রামের জন্য এখানে থেমে ছিলাম। আবার যাত্রা করতে যাবো এমন সময় এই লোকেরা আমাদের ঘেরাও করে ধরে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।”

    জুরদিক হেসে বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে শত্রু মনে করি না। যদি তা করতাম। তবে তোমাদের তিনজনের গর্দান এতক্ষণে মাটিতে গড়াগড়ি যেত। আমি জানি, তোমরা ভাড়াটে খুনী। আমাকে শুধু বলো, আমাকে হত্যার জন্য তোমাদের কে পাঠিয়েছে? তোমরা সত্য কথা বলে এখান থেকে চলে যাও, তোমাদের কিছুই বলা হবে না।”

    দুই মুখোশধারী কসম করে বললো, “আমরা জানিনা কে বা কারা আপনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। এ ব্যাপারে আমাদের কোন ভূমিকা নেই, আমরা নিরপরাধ।”

    কিন্তু তৃতীয় মুখোশধারী কোন কথা বললো না, সে নিরবে তাকিয়ে রইল জুরদিকের দিকে।

    “তোমরা বোকামী করে নিজেদেরকে বিপদে ফেলো না।” জুরদিক বললেন, “অন্যের জন্য নিজের প্রাণ হারাতে যেয়ো না। আমি তো বলেছি, আমি তোমাদের কোন শাস্তি দেবো। না। সত্য কথা বললে এখনই তোমাদের মুক্ত করে দেবো।’

    মুখোশধারীরা তবুও ইতস্তত: করতে লাগলো, কেউ মুখ খুললো না।

    “এদের মুখোশ খুলে দাও।” জুরদিক তার রক্ষীদের বললেন, “এদের দেহ তল্লাশী করো, সব হাতিয়ার কেড়ে নাও।”

    দুই মুখোশধারী চোখের পলকে তলোয়ার টেনে বের করে দ্রুত পিছনে হটে গেল। তৃতীয় মুখোশধারী ছুটে গিয়ে লুকালো তাদের পিছনে। কারণ তার কাছে তলোয়ারও ছিল না।

    জুরদিক হো হো করে হেসে বললেন, “তোমরা কি এতগুলো রক্ষীর মোকাবেলা করতে চাও? একজনের তো আবার তলোয়ারও নেই! যাক, আমি তোমাদেরকে আরও একবার সুযোগ দিচ্ছি এবং এটাই তোমাদের জন্য সর্বশেষ সুযোগ। এরপর আমি বাধ্য হবো তোমাদের ওপর রক্ষীদের লেলিয়ে দিতে। ওরা তোমাদের হাড্ডি-মাংস এক করে দিলে আমাকে দোষ দিও না!”

    রক্ষীরা তাদের ঘিরে রেখেছিল। ওদের একজন বললো, “আমরাও শেষ বারের মত বলছি, আমরা কেউ তোমাদের ওপর তীর চালাইনি। যে কাজ আমরা করিনি জীবনের মায়ায় তা স্বীকার করলে আসল অপরাধীরা নিস্কৃতি পেয়ে যাবে। আমাদেরকে খুন করলেও তাতে তোমার কোন লাভ হবে না।” রক্ষী কমাণ্ডার তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কি জানি কি সন্দেহ হলো, সে টান মেরে তৃতীয় মুখোশধারীর মুখোশ খুলে ফেললো।

    তার কাছে কোন তলোয়ার ছিল না। মুখোশ খুলে যেতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তার চেহারা। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল। মুখোশের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক সুন্দরী যুবতীর মুখ।

    জুরদিক বললেন, “ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো।”

    দুই মুখোশধারীই বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে পিছনে ঘুরে মেয়েটির পাশে দণ্ডায়মান রক্ষীর বুকে তলোয়ার ধরে চ্যালেঞ্জের সুরে বললো, যতক্ষণ আমাদের কাছে সব কথা খুলে না বলবে এবং আমাদের সমস্ত কথা না শুনবে, ততক্ষণ এই মেয়ে কারো কাছে যেতে পারবে না।”

    আরা আরো বললো, ‘আমরা জানি, তোমাদের হাতে আমাদের মরতে হবে। আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোমরা এনেছো তাতে আমাদেরকে তোমরা ছাড়বে না। তবে আমরাও তোমাদের বলতে চাই, এই মেয়েকে তোমরা জীবিত পাবে না। আর অন্তত তোমাদের অর্ধেক লোক এই সংঘর্ষে শেষ হয়ে যাবে।”

    জুরদিক তখনও শান্ত। তিনি মুখোশধারীদের লক্ষ্য করে বললেন, “তোমরা আমার কাছে আর কি শুনতে চাও? আমার কথা তো আমি পরিস্কার করেই বলেছি, তোমরা ভাড়াটে খুনী, আর এই মেয়েটাকে তোমরা পেয়েছো কাজের অগ্রিম হিসাবে।”

    “তোমার দুটি কথাই ভুল।” এক মুখোশধারী বললো, “আমরা যদি অপরাধী হই তবে সে অপরাধ হচ্ছে, একজন খৃস্টান গোয়েন্দা ও তার সহকারী এক খৃস্টান মেয়েকে আমরা হত্যা করেছি। এটাকে আমরা কোন গোনাহের কাজ মনে করি না। আমাদের দুর্ভাগ্য, পালানোর পথে আমরা তোমাদের হাতে ধরা পড়লাম। কিন্তু আমরা খুশী এই কারণে, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। এক নির্যাতীত মুসলিম বোনকে খৃস্টানদের কবল থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি।”

    “তোমার এ গল্প সত্য হলে আমাকে বলো, তোমরা কে, কোথেকে এসেছে এবং কোথায় যাচ্ছে?”

    “আমরা হলব থেকে এসেছি এবং আমাদের গন্তব্য এখন দামেশক।”

    ‘উইণ্ডসার ও খৃস্টান মেয়েটিকে কি তোমরাই হত্যা করেছো?” জুরদিক জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু আমার ওপর তীর চালালে কেন তোমরা? আমি তোমাদের শত্ৰু না বন্ধু তাই বা জানলে কি করে?”

    “আমি আগেও বলেছি, আমরা তোমার ওপর তীর চালাইনি, তবে তোমাকে আমি ভালমতই চিনি। তোমার নাম জুরাদিক এবং তুমি হেম্মাত দুর্গের অধিপতি।’ মুখোশধারী বললো, “আর এটাও ভাল করে জানি, তুমি সুলতান আইয়ুবীর শত্রু। কিন্তু তাই বলে তোমাকে হত্যা করার কোন প্রয়োজন পড়েনি আমাদের।

    আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। তারই সাহায্যে আমরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হবো। লড়াইয়ের ময়দানে হয় তোমরা খুন হবে নয়তো আত্মসমৰ্পণ করে বন্দীত্ব বরণ করবে আমাদের। শক্রকে না জানিয়ে আমরা কারো ওপর আঘাত করি না।

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হাসান বিন সাব্বাহ বা শেখ মান্নান নন। তিনি চ্যালেঞ্জ করে যুদ্ধ করেন, চুরি করে কাউকে হত্যা করেন না।

    উইণ্ডসার ও তার সঙ্গী মেয়েটি খুন হয়েছে নিজের দোষে। ওরা আমাদের চ্যালেঞ্জ না করলে ওদের আমরা হত্যা করতাম না। ওদের খুন হওয়ার পেছনে সুলতান আইয়ুবীর কোন আদেশ বা ইচ্ছা ছিল না।”

    সে জুরদিকের ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো, অনতিদূরে ঘোড়াটি মরে পড়ে আছে। তার মাথা ও গায়ে এখনো বিধে আছে আততায়ীর বিষাক্ত তীর।

    মুখোশধারী জুরাদিককে লক্ষ্য করে বললো, “আমরা যে তীর ছুড়িনি তা যদি প্রমাণ করতে চাও তাহলে তোমাদের যে কেউ ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে যাও। আমাদের দু’জনের কোন একজনের হাতে তীর-ধনুক দাও। এরপর যত খুশী তীরবেগে অশ্ব চালাও, ডাইনে ও বায়ে এঁকে বেঁকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করো, আমাদের যাকে বলবে সে ছুটন্ত অশ্বপৃষ্ঠ থেকে একটি মাত্র তীর ছুড়বে। যদি সে তীর মিস হয় তবে আমাদের গর্দান উড়িয়ে দিও, আমাদের কোন আপত্তি থাকবে না। আমরা এমন তীরন্দাজ নই, কোন টার্গেটে তীর ছুড়লে তা ব্যর্থ হবে। আমরা তীর ছুড়লে এখন আমাদের কথা শোনার জন্য তুমি আর বেঁচে থাকতে না।”

    “তুমি দেখছি অসাধারণ সৈনিক!” জুরদিক বললেন, “তুমি কি সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীতে আছো?”

    ‘সে প্রশ্ন করার কোন অধিকার নেই তোমার।” মুখোশধারী বললো, “তুমি কি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যদলের লোক ছিলে না? তুমি কি ইসলামী জেহাদে বীর মুজাহিদ হিসাবে লড়াই করোনি? সামান্য কেল্লার অধিপতি হওয়ার লোভ তোমার মাথা এমনভাবে বিগড়ে দিয়েছে, এখন তুমি নিজেকে চিনতে পারছো না, তোমার জাতিকে চিনতে পারছে না। ক্ষমতা ও সম্মানের লোভে যে লোক নিজের আত্মার হাহাকার শুনতে পায় না, আমার পরিচয় দিয়ে তার কি কাজ? কাফেরদের সাথে যে নিজের ভবিষ্যত জুড়ে দিয়েছে, সে লোক ইসলামের মুজাহিদদের চিনবে কি করে!” জুরদিক স্তব্ধ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো মুখোশধারীর দিকে। তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। বিষাক্ত তীরের চেয়েও বক্তার কথার তীর তার বুক যেন ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। মুখোশধারী থামতেই জমাট নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই টিলার চূড়ায়। বাতাসের হাহাকারের ফিসফিসানি শুনতে পেলেও জুরদিকের আত্মার ক্ৰন্দন ও হাহাকার কেউ শুনতে পেল না।

    “তুমি গাছের সেই বিচ্ছিন্ন ডাল, যে ডালের ভাগ্যে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরা ছাড়া কোন গতি নেই।” অপর মুখোশধারী বলল, “তুমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নও যে, সুলতান আইয়ুবী তোমাকে হত্যা করার জন্য পেরেশান হবেন। তোমাকে মেরে ফেলে মুক্তি দিয়ে লাভ নেই, বরং সারা জীবন বেঁচে থেকে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্য করলেই তোমার উচিৎ সাজা হবে। যে খৃস্টানদের পুতুল হয়ে কাজ করছে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সে খৃস্টানরাই তোমাকে হত্যা করবে।”

    “তুমি হলবে গিয়েছিলে শরাব পান করতে, আমোদ-ফুর্তি করতে। গিয়েছিলে এ মেয়ের নাচ দেখে চোখ সার্থক করতে।” প্রথম মুখোশধারী বললো, “কিন্তু একবারও ভাবলে না, এই নর্তকীরা কারা!”

    মুখোশধারীর পেছন থেকে এবার কথা বলে উঠল মেয়েটি, “আমি এক মুসলিম মেয়ে। আমাকে জোর করে ধরে এনে খৃষ্টানরা তাদের আসরে আমাকে নাচতে বাধ্য করেছে, আমার শরীর নিয়ে খেলেছে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, আমি আপনাদেরই এক হতভাগী মেয়ে। আপনারা এতই আত্মবিস্মৃত ও নির্লজ্জ হয়ে গেছেন, নিজের কন্যাকে নষ্ট করতেও আপনাদের বিবেকে বাঁধে না, একটু ঘূণাবোধও জাগে না।’

    মেয়েটির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। সে উদগত কান্নার গমক সামলে আবার মুখ খুললো, “আমি খৃস্টানদের সাথে সাত আট বছর কাটিয়ে এসেছি। দেখেছি তাদের, যাদের আপনারা বন্ধু বানিয়ে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারলে গর্ববোধ করেন। আমি তাদের অন্তরের সেইসব গোপন কথা শুনেছি, যা কোনদিন আপনাদের কানে আসে না। তাদের সে অট্টহাসি শুনেছি আমি, যা আপনারা শুনতে পান না। ওরা বন্ধুত্বের কথা বলে মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়। এক মুসলমানকে লেলিয়ে দেয় অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর আপনারা যখন তাদের উস্কানিতে পরম্পর যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন তারা মদের পেয়ালা হাতে নিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আর আমাদের বলে, ‘নাচো সুন্দরী, নাচো!’

    পাহাড়ের মতই স্তব্ধ অটল পাথর হয়ে গেছেন জুরাদিক। তার কণ্ঠে কোন ভাষা নেই, চোখে পলক নেই, অঙ্গে নেই জীবন্ত মানুষের স্বাভাবিক নড়াচড়া।

    রক্ষীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এমন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন জাদরেল ব্যক্তিত্ব কি করে লোকগুলোর এ রূঢ় তিরস্কার নিরবে সহ্য করছেন?

    গভীর চিন্তার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন স্মৃতি ভেসে উঠছিল মনের পর্দায়। মনে পড়লো, রিমাণ্ডের সামরিক উপদেষ্টাদের সাথে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের কথা। হলবের ঘরে ঘরে তল্লাশীর বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়ানোর কথা। খলিফা এবং আমীরদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া অগ্রাহ্য করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা।

    তিনি শান্ত, ভদ্র ও নম্র সুরে মুখোশধারীদের বললেন, “আমি তোমাদেরকে আমার কেল্লায় নিয়ে যেতে চাই”

    ‘কয়েদী বানিয়ে?”

    জুরদিক সকলকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “না! মেহমান হিসাবে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, তোমাদের তলোয়ার তোমাদের কাছেই থাকবে।”

    নিশ্চিন্ত মনে ঘোড়ায় চড়ে বসলো সবাই। জুরদিকের ঘোড়া মারা গিয়েছিল, তিনি এক রক্ষীর ঘোড়া নিয়ে তাতে উঠে বসলেন। কাফেলা এগিয়ে চললো হেম্মাত দুর্গের দিকে।

    কাফেলা সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। সরু রাস্তা ধরে দু’তিনটি টিলা অতিক্রম করার পর অকস্মাৎ দুটো ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল। সকলেই চাইল শব্দের উৎসের দিকে। দেখা গেল এক টিলার আড়াল থেকে বেরিয়ে দুটো ঘোড়া তীব্ৰ বেগে হলবের দিকে ছুটে পালাচ্ছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাদের সাথে রয়েছে তীর ও ধনুক।

    ‘এরাই সম্ভবত তোমাদের খুনী।’ বললো এক মুখোশধারী।

    সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধাওয়া করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো ওরা।

    মুখোশধারীরাও ছুটলো তাদের পেছনে। দু’জনই কোষবদ্ধ তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছে। মেয়েটিও সঙ্গী হলো কাফেলার।

    রক্ষীরা ঘোড়া ছুটিয়ে ছুটছিল তাদের পিছনে। সবাইকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল দুই মুখোশধারী।

    সামনে বালির টিলা, টিলার ওপারে বাঁক নিয়েছে রাস্তা। পালিয়ে যাওয়া আরোহীরা মোড় ঘুরে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। ধাওয়াকারীরা এখনো বেশ পেছনে।

    মুখোশধারী দু’জন তীব্ৰ গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দূরত্ব অনেক কমিয়ে এনেছিল। কিন্তু তখনো আততায়ীরা ধরা ছোয়ার বাইরে।

    মোড় ঘুরেই আততায়ী দু’জন গতি কমিয়ে আনলো ঘোড়ার। কাঁধ থেকে ধনুক নামিয়ে ধনুকে তীর জুড়ে পিছু ধাওয়াকারীদের ওপর তীর চালাল। ধাওয়াকারীরা তখনো তীরের আওতার বাইরে, তাই লক্ষ্যভ্ৰষ্ট হয়ে গেল তীর। কিন্তু পিছু ধাওয়াকারীদের জন্য তা বিপদ ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

    মুখোশধারী দু’জন ধাওয়াকারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। টিলার কারণে ওদের দেখতে পায়নি আততায়ী। মোড় ঘুরেই ওরা ওদের সামনে পড়ে গেল। মাত্র কয়েক গজের ব্যবধান। দু’পক্ষই পরস্পরকে দেখে ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে গেল। আততায়ী দু’জন তীর চালাতে চেষ্টা করলো, কিন্তু মুখোশধারীরা তাদের সে সুযোগ দিল না। একজন ঝাপিয়ে পড়ে এক আততায়ীর ঘোড়ার পিছনে তলোয়ারের কোপ বসিয়ে দিল।

  • গোপন বিদ্রোহী

    গোপন বিদ্রোহী

    গোপন বিদ্রোহী

    সে রাতটি ছিল যদিও অমাবশ্যার, কিন্তু মিশরের আকাশ ছিল আয়নার মত স্বচ্ছ। আকাশে হীরার মত জ্বলজ্বল করছিল অসংখ্য তারা। কোনটি উজ্জ্বল, আবার কোনটি অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল। কোনটি খাঁটি মোতির মত চমকাচ্ছে।

    কায়রো শহর গভীর নিদ্রায় মগ্ন। কেউও ভাবতেও পারেনি, কায়রোর এই শান্তিপ্রিয় ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপরই এক সময় শুরু হয়ে যাবে কিয়ামতের বিভীষিকা।

    কায়রোর সেনাবাহিনী ও শহর রক্ষীরা ঘুমিয়ে ছিল। শুধু জেগে ছিল কতিপয় টহলদার সৈনিক। কিন্তু তারা জেগে থাকলেও সতর্ক ছিলনা। প্রতিদিনের মত নিশ্চিন্তে বসে বসে গল্পগুজব করছিল। হাতিয়ারগুলো পড়েছিল একপাশে, অবহেলায়।

    সীমান্ত রক্ষীরাও নির্বিকার। উত্তাপ ও উত্তেজনাহীন। একটি সাদামাটা দিন পার করে ক্যাম্প-খাটে ঘুমিয়ে পড়েছে। নীলনদ সংলগ্ন ফাঁড়ির ডিউটিরত দুই প্রহরী শুধু এখনও পথে। নদীর তীর ধরে এগিয়ে চলেছে ওদের ঘোড়াগুলো। ঘোড়ার উপর বিরহ কাতর চিত্তে বসে আছে দুই প্রহরী। এগিয়ে যাচ্ছে ওরা বণিক দলের সুন্দরী মেয়েদের কাছে।

    পাশের ক্যাম্পটি এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কাছাকাছি। সে ফাঁড়ির সিপাইদেরও দায়িত্ব সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু শান্তিময় নিরুপদ্রপ সময় সৈন্যদের অলস ও অকর্মণ্য বানিয়ে দিয়েছিল, ফলে দায়িত্বের ব্যাপারে কেউ সচেতন ছিল না।

    কয়েকটি নৌকা বোঝাই সুদানী হাবশী সৈন্য প্রবেশ করল মিশরের মাটিতে। দুই ক্যাম্পের চার টহল সৈনিক তখন ডুবে আছে চার সুন্দরীর প্রেম সাগরে।

    জোহরা ও তার সাথী নর্তকী তাদের তাঁবুতে শুয়েছিল। সঙ্গের পুরুষরা প্রকাশ্যে নিদ্রা গেলেও ভেতরে ভেতরে সবাই ছিল সজাগ, উৎকর্ণ ও সতর্ক। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছে, আজকের রাতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপর থেকে নির্দেশ এসেছে, ‘রাতে আহাম্মকের মত ঘুমিয়ে না থেকে সবাই সতর্ক থেকো।’

    ওদের উপর আরও নির্দেশ এসেছে, ‘বাইরের কোন লোককে নদীর পারে আসতে দেবে না। পাহাড়ি অঞ্চলের ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেবেনা কাউকে। যদি কেউ যেতে চায় তবে তাকে ধরে এনে বন্দী করে রাখবে।’ বনিক ও বাদক উভয় দলের জন্য এই একই হুকুম ছিল।

    অন্ধকার রাত। চাঁদ নেই আকাশে, মেঘও নেই। মেঘমুক্ত প্রকৃতি তারার আলোয় ঈষৎ আলোকিত। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে সবাই। অনেকক্ষন পর এক বাজনাদার উঠে বসলো বিছানায়। তাঁবু থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ভাল করে পরখ করে দেখলো। ক্যাম্পের চারদিকে চক্কর দিল একবার। এরপর জোহরা ও নর্তকী যে তাঁবুতে শুয়েছিল, ওখানে গেল। তাঁবু ফাঁক করে উঁকি দিল ভেতরে, কিন্তু কিছুই দেখা গেল না।

    লোকটি এদিক ওদিক চাইলো আবার। না, কেউ কোথাও নেই। চট করে ভেতরে ঢুকে গেল লোকটি। অন্ধকারে হাতড়িয়ে দেখলো বিছানায়। মনে হলো, যা সন্দেহ করেছিল তাই ঘটেছে।

    আগুন জ্বালালো সে। দেখলো জোহরা নেই, সে পালিয়েছে। অন্য মেয়েটি গভীর ঘুমে অচেতন। শুয়ে আছে এলোমেলো অবস্তায়। বাজনাদার তাকে আর জাগালো না। এ মেয়েকে জাগিয়ে কি লাভ? জোহরা কোথায় গেছে এ মেয়ের চাইতে ওইতো বেশী জানে। নিশ্চিত, পাশের ক্যাম্পের কমান্ডারের কাছে গেছে জোহরা। এ ছাড়া সে আর কোথায় যাবে?

    জোহরা পালিয়েছে, এটা তেমন ভয়ের ছিলনা। কিন্তু ভয়ের কারন হলো, জোহরা যখন ফিরে আসবে তখন কমান্ডারও চলে আসতে পারে। প্রহরীদের না দেখলে কমান্ডার তাদের খোঁজাখুঁজি করবে। এমনও হতে পারে সে নদীর তীরে চলে যেতে পারে।

    যে খবর এতদিন বাইরের দুনিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছে, লুকিয়ে রাখা হয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে, সে খবর ফাঁস হয়ে যেতে পারে মুহূর্তে!

    বাজনাদার তার দুই সাথীকে জাগালো। তাদেরকে জানালো, ‘জোহরা পালিয়েছে। নিশ্চয়ই সে ওই ক্যাম্পের কমান্ডারের কাছে গেছে।’

    ‘বলো কি! যদি সে কমান্ডারকে নিয়ে ফিরে আসে!’

    ‘তা আসতেই পারে। চলো এক কাজ করি। নদীর তীর থেকে দূরে ওদের আসার পথে ওঁৎ পেতে থাকি। যদি কমান্ডার মেয়েটার সঙ্গে চলে আসে এবং আমাদের গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে দু’জনকেই ধরে আমাদের কমান্ডারের কাছে পৌঁছে দেবো।’

    ‘তাই ভালো, চলো। যদি প্রয়োজন পড়ে তবে দু’জনকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেবো, কিন্তু কিছুতেই এ গোপনীয়তা ফাঁস হতে দেবো না।’ আরেকটু উৎসাহ নিয়ে বললো সঙ্গী।

    পাহাড়ের সেই দুর্গম অঞ্চল। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় নিরেট এক পাথরের জগৎ, কিন্তু ভিতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে পাহাড়ী অঞ্চলটি দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। এলাকাটি দুর্গম বলে সেখানে মানুষের কোন যাতায়াত নেই। লোক চলাচলের পথ থেকেও অঞ্চলটি বেশ দূরে।

    জনশ্রুতি আছে, এখানে ফেরাউনের প্রেতাত্বারা বাস করে। ফেরাউন যাদের হত্যা করেছিল তাদের প্রেতাত্বারাও নাকি বাস করে এখানেই। লোকেরা একথাও বলে, এ দু’ধরনের প্রেতাত্বারা মাঝে মধ্যেই এখানে যুদ্ধ বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ে। কোন লোক এ এলাকায় ঢুকে পড়লে সে আর অক্ষত বেরিয়ে আসতে পারে না। তার শরীর থেকে সব মাংস উধাও হয়ে যায়। কংকাল ছাড়া আর কিছুই থাকেনা তার শরীরে।

    বহুদিন আগের কথা। এ পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন পাহাড় কেটে ফেরাউনদের বড় বড় মূর্তি বানানো হয়েছিলো। নিচ থেকে পাহাড় খুঁড়ে তার মধ্যে তৈরী করা হয়েছিল রাজকীয় মহল। এসব মহলে ছিল বড় বড় কামরা।

    দীর্ঘদিন এ কামরাগুলোতে কোন মানুষ প্রবেশ করেনি। মহলগুলোও ছিল জনমানব শুন্য। প্রহরীদের দৃষ্টি এড়িয়ে এ কামরাগুলোতেই এসে আশ্রয় নিল সুদানী কুচক্রীরা।

    যে রাতের ঘটনা, সে রাতে মাটির তলার এ মহল ও কামরাগুলোতে ছিলও আলোর ছড়াছড়ি। হাজার হাজার হাবশী সেনার পদভারে সরগরম হয়ে উঠেছিল গোটা পার্বত্য অঞ্চল। এ পাহাড়শ্রেণীর এক জায়গায় চারদিকে পাহাড় বেষ্টিত এক বিশাল মাঠ। মাঠটি ছিল মনোরম সবুজ ঘাসে ভরা।

    ওখানে সমবেত করা হলো সুদান থেকে আনা নিগ্রো হাবশী যোদ্ধাদের। সবাই এসে সমবেত হলে হাবশীদের ধর্মগুরু চিৎকার করে বললো, ‘উঁচু স্বরে কথা বলো না কেউ। একটু পরই তোমাদের সামনে হাজির হবেন তোমাদের ভগবান। মনের মধ্যে ভক্তি ও বিশ্বাস দৃঢ় করো। ভয় করো তার আক্রোশকে।’

    ভয় ও আশংকায় কানে কানে কথা বলতেও ভুলে গেল লোকগুলো। সবচেয়ে বড় পাহাড়টার দিকে মুখ করে বসে ছিল ওরা। পাহাড়টির নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত খোদাই করা এক বিশাল মূর্তি। আবু সাম্বালের মূর্তি বলে পরিচিত এটা। হাবশীদের বলা হলো, ‘এটাই তোমাদের ভগবানের মূর্তি। আজ এ মূর্তি মানুষের রূপ নিয়ে সবার সামনে উপস্থিত হবে।’

    সহসা মেঘের গর্জনের মত গুরুগম্ভীর গর্জন ভেসে এলো। হাবশীরা আগে থেকেই চুপ করে ছিল। এ গর্জন শোনার পর তাদের নিঃশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে গেল। এরপরই ভেসে এলো আরও একটি আওয়াজ, ‘ভগবান জেগে উঠছেন। সামনের পাহাড়ের দিকে থাকাও।’

    গুরুগম্ভীর জোরালো কণ্ঠের ধ্বনি। পাহাড়ে ও উপত্যকায় এ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো বার বার।

    এরপরই আকাশে দেখা গেলো দুটো উড়ন্ত অগ্নিশিখা। শিখা দুটো পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেল এবং পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেলো। সাথে সাথে সেখান থেকে ছড়িয়ে পরলো সহস্র আগুনের টুকরো। এ অগ্নিশিখায় আলোকিত হয়ে উঠলো আবু সাম্বালের মূর্তি।

    মূর্তির মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়লো আলো। দেখা গেলো, সে বিশাল মূর্তির চোখ মিটমিট করছে। তার মুখ বারবার খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, সবারই মনে হলো, মূর্তির মুখ ডানে বায়ে দুলছে।

    হাবশীগুলোর ধর্মগুরু ভক্তিতে সিজদায় পড়ে গেলো। তার দেখাদেখি সিজদায় লুটিয়ে পড়লো মাঠে সমবেত হাজার হাজার নিগ্রো সৈন্য।

    ধর্মগুরু একটু পর সিজদা থেকে মাথা তুলে বললো, ‘সবাই ভগবানের কাছে মন খুলে প্রার্থনা করো।’

    লোকগুলো সিজদা থেকে মাথা তুললো। দু’হাত প্রসারিত করে প্রার্থনা জানাতে লাগলো ওরা।

    ধর্মগুরু উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, ‘হে আগুন ও পানির খোদা! মরুভূমির তপ্ত বালুর খোদা! নদীতে পানি দেয়ার খোদা! আমরা তোমাকে দেখেছি। তুমি আমাদের বলে দাও, তোমার পদতলে আমরা কত মানুষ বলি দেবো। পুরুষ দেবো, না নারী দেবো?’

    ‘একটি পুরুষ ও একটি নারী।’ পাহাড়ের দিক থেকে শব্দ হলো, ‘তোমরা এখনও আমাকে দেখোনি। আমি মানুষের রূপ নিয়ে তোমাদের সামনে আসছি। যদি তোমরা আমার শত্রুদের শেষ না করো, তবে তোমাদের সকলকে এ পাহাড়ের পাথর বানিয়ে রাখবো। তোমরা চিরদিন রৌদ্রে পুড়তে থাকবে। তোমাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করবে, মরুভুমির বালু তাদের রক্ত চুষে নেবে। তোমরা অপেক্ষা করো, একটু পরই আমি দর্শন দেবো তোমাদের।’

    সারা মাঠে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। অগ্নিশিখা ধিরে ধিরে কমে আসতে লাগলো। পাহাড়ের মধ্যে হাবশীদের ধর্মীয় সঙ্গীত বেজে উঠলো। বহু লোকের সমবেত কণ্ঠের এ সঙ্গীত। এ সঙ্গীত শুধু তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই বাজানো হয়। কণ্ঠের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজছিল ঢোল তবলা, এটাই রীতি। নীচে বসে হাজার হাজার হাবশী মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনছিল এ সঙ্গীত। চারদিকে পাহাড় বেষ্টিত খোলা মাঠে বসে রাতের এ আবছা অন্ধকারে গান শুনতে শুনতে ওদের মনে হচ্ছিল, ওরা কোন অদৃশ্যলোকে পৌঁছে গেছে। অপার্থিব কোন জগত থেকে ভেসে আসছে হৃদয় মথিত করা গান।

    জোহরা বসেছিল কমান্ডারের তাঁবুতে। তার কণ্ঠে উচ্ছসিত আবেগের জোয়ার। সে কমান্ডার কে বলছিলো, ‘যদি আমি তোমাকে না দেখতাম তবে সারা জীবন নেচে গেয়ে, অন্যের মনতুষ্টি করেই হয়তো কাটিয়ে দিতাম। তোমাকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে, আমি এক বাপের আদরের মেয়ে, কোন অসভ্য নির্লজ্জ নর্তকী নই। যদি আজ হঠাৎ কোন কারণে তুমি মারা যাও, মনে করবো আমার বাবা মারা গেছেন। আমি আবার নতুন করে এতিম হয়ে যাবো। যারা আমাকে নর্তকী হিসাবে ভাড়া এনেছিল তাদের সাথে আমার লেনদেন শেষ হয়ে গেছে। ওরা হয়তো আমাকে আমার মালিকের হাতে ফিরিয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু আমি আর তার কাছেও ফিরে যেতে চাই না। এখন থেকে আমি এখানেই থাকবো। আমি আমার বাবার কাছে থাকবো।’

    ‘দুর পাগলী! এটা সেনা ক্যাম্প না! এখানে তো তোকে রাখা যাবে না।’

    ‘যদি আমাকে এখানে রাখতে অসুবিধা হয়, তবে আমাকে তোমার গ্রামের বাড়ী পাঠিয়ে দাও।’ জোহরা জেদ ধরে বললো, ‘যদি আশ্রয় দিতে না পারো তবে আমাকে মেরে ফেলো, কিন্তু আমাকে ফিরে যেতে বলো না, কিছুতেই আমি আর ফিরে যাবো না।’

    ‘না জোহরা, অবুঝ হয়ো না। এমন জেদ করো না, যা রক্ষা করা আমার সাধ্যের অতীত।’ কমান্ডার বললো, ‘এখন তুমি বাড়ী ফিরে যাও। আমি ওয়াদা করছি, তোমাকে তোমার বাড়ী পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবো। তুমি তোমার কায়রোর ঠিকানা দিয়ে যাও আমাকে। যখন আমি ছুটি পাবো তখন তোমাকে সেখান থেকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে যাবো।’

    কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না জোহরা। অবশেষে অনেক বলে কয়ে জোহরাকে ফেরত যেতে রাজি করালো কমান্ডার।

    কিছুক্ষণ পর। কমান্ডার দুটো ঘোড়া প্রস্তুত করে জোহরাকে বললো, ‘চলো, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’

    ঘোড়ার উপর চড়ে বসলো ওরা। চলতে শুরু করলো ঘোড়া।

    জোহরা কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘রাতের অন্ধকারে এখানে এত নৌকা আসে আসে কেন? দিনের বেলা তো এত নৌকা দেখি না!’

    ‘কি! নৌকা?’ কমান্ডার আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন দিক থেকে আসে?’

    ‘ঐ দিক থেকে।’ সে সুদানের দিকে ইঙ্গিত করলো।

    ‘তুমি জানলে কি করে?’

    ইদানিং রাতে আমার ঘুম আসে না। কখনো কখনো মাঝ রাতে বিছানা থেকে উঠে তাঁবুর বাইরে গিয়ে বসে থাকি। আপনার এখান থেকে বিদায় নিয়ে প্রথম যেদিন নদী পারের ক্যাম্পে গিয়ে উঠলাম, কিছুতেই ঘুম আসছিল না। রাতে পালিয়ে আপনার কাছে ছুটে এলাম। ভোর রাতে আপনি যখন আমাকে পৌঁছে দিলেন, ফিরে দেখি সেই ক্যাম্পের এক লোক না ঘুমিয়ে বসে আছে।

    আমাকে সে জেরা করলো, কোথায় গিয়েছিলাম, কেন গিয়েছিলাম, ইত্যাদি। আমি নদীর পাড়ে হাঁটতে গিয়েছিলাম বলে তাকে এড়িয়ে গেলাম।

    সে আমাকে শাসিয়ে বললো, তাকে না জানিয়ে যেনো ক্যাম্পের বাইরে কোথাও না যাই।

    কিন্তু পরদিন ঘুম না আসায় মাঝ রাতে তাঁবুর বাইরে এলাম। দেখলাম, ওখানকার কাণ্ডকারখানা। প্রথম রাতে দেখলাম তিনটি, পরের রাতে দু’টি বিরাট বিরাট পাল তোলা নৌকা এসে কূলে ভিড়লো। নৌকার সাদা পাল রাতের অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

    নৌকাগুলো নদীর পাড়ে লাগলে বহু লোকের গুঞ্জন শোনা গেল। আমি অন্ধকারে লুকিয়ে এগিয়ে গেলাম নদীর ঘাটের দিকে। তাকিয়ে সব দেখলাম।’

    ‘কি দেখলে?’ বিস্মিত কমান্ডার প্রশ্ন করলো।

    ‘দেখলাম নৌকা থেকে বহু লোক নেমে এল। এরপর তারা গাছের তল দিয়ে হেঁটে সোজা পাহাড়ের দিকে চলে গেল এবং পাহাড়ের মধ্যে সবাই অদৃশ্য হয়ে গেল।’

    ‘তুমি কি আমাদের দু’জন সিপাইকে টহল দিতে দেখোনি?’ কমান্ডার জিজ্ঞেস করলো, ‘তারা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে টহল দেয়। তাদের ডিউটি থাকে এই নদীর পাড়ে।’

    ‘না।’ জোহরা উত্তর দিলো, ‘আমি কখনও কোন সিপাইকে এখানে ডিউটি করতে দেখিনি। দিনের বেলা দু’জন সিপাই আসে, কাফেলার ক্যাম্পেই তারা আহার-নিদ্রা করে। একদিন আমি এক সিপাইকে একটি মেয়ের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখেছি। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল।’

    জোহরার জানা ছিল না সীমান্তে কি কাণ্ডকারখানা চলছে আর কি হতে যাচ্ছে। সীমান্ত প্রহরীদের দায়িত্ব সম্পর্কেও তার কোন জ্ঞান ছিল না। তার এটাও জানা ছিল না, রাতে বা দিনে সুদানীদের নৌকা এদিকে আসা উচিত কি অনুচিত। সে সরল মনে যে প্রশ্ন করেছে, কমান্ডারের জন্য তার মধ্যে ছিল ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ খবর। জোহরা যা বলেছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে সে অত্যন্ত জরুরি ও অতি গোপনীয় এক তথ্যই সরবরাহ করেছে।

    জোহরার কথায় কমান্ডার চমকে সজাগ হয়ে উঠলো। জোহরাকে বললো, ‘এসো, আজ এ নদীর পাড়েই ঘুরে বেড়াই।’ তারা নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছলো। নদীর তীর ধরে পাশাপাশি ধীরে ধীরে চলতে লাগলো ওরা। কমান্ডারের দৃষ্টি নদীর উপরে ছুটে বেড়াতে লাগলো। ওরা পথ চলছিল নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে। রাস্তাটা বৃক্ষের ছায়ায় বেশ অন্ধকার। হঠাৎ নদীর মাঝে একটু আলোর আভা দেখা গেল। মনে হল কোন লণ্ঠনের আলো। পরে আরও একটি আলো দেখা গেল। পরে অকস্মাৎ দুটো আলোই এক সঙ্গে নিভে গেল।

    এদিকে নদীর কূলেও একটি আলো জ্বলে উঠেই সঙ্গে সঙ্গে আবার নিভে গেল। কমান্ডার কোথাও প্রহরীদের দেখতে পেলো না।

    কমান্ডার নদীর তীর থেকে একটু উপরে যেখানে প্রহরীদের সেন্ট্রি রুম, সেখানে গেল। নাম ধরে ডাকলো সিপাইদের, কিন্তু কোথাও তাদের কোন সাড়া নেই। কমান্ডার আবারও উচ্চস্বরে ডাকলো, তবুও কোন উত্তর পাওয়া গেল না।

    জোহরাকে নিয়ে কমান্ডার সতর্কতার সাথে আবার নিচে নেমে এলো।

    সামনের নদীতে দুটো নৌকার সাদা পাল দেখা যাচ্ছে। কমান্ডার অধীর হয়ে উঠলো। তার সাথে যে জোহরা নামের একটি মেয়ে আছে সে কথাও বেমালুম ভুলে গেল।

    সে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। জোহরাও তার পেছন পেছন ঘোড়া ছুটালো। কমান্ডার ছুটছে আর সিপাইদের ডেকে যাচ্ছে চাপা স্বরে।

    ডিউটিতে আসা সৈন্য দু’জন তখন পাহাড়ের আড়ালে অভিসারে মত্ত। হঠাৎ তাদের কানে কমান্ডারের ডাক পৌঁছলো। তারা দ্রত সেখান থেকে উঠে ছুটে গেল যেখানে তাদের ঘোড়া রেখেছিল, সেখানে। যেখানে তাদের ঘোড়া বাঁধা ছিল সেখানে গিয়ে দেখলো দুটো ঘোড়াই গায়েব হয়ে গেছে। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো। তাকিয়ে দেখলো, দূরে কারা যেন তাদের ঘোড়া নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

    কমান্ডারের ঘোড়া আগে, জোহরার ঘোড়া পিছনে, দু’জনেই ছুটছে সমানে। হঠাৎ অন্ধকার থেকে কে যেন বললো, ‘তুমি যাদের ডাকছো তারা অনেক আগে চলে গেছে।’

    ‘তোমরা কে?’ কমান্ডার জিজ্ঞেস করলো, ‘সামনে এসো।’

    ‘আমরা মুসাফির মানুষ।’

    অন্ধকার থেকে দুটো ঘোড়া কমান্ডারের দিকে এগিয়ে এলো। কমান্ডার তলোয়ার বের করলো।

    ‘রাতে কোন মুসাফিরের অশ্বে আরোহন এবং সীমান্তে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরির মানে জানো তোমরা?’ কমান্ডার ওদের চ্যালেঞ্জ করলো।

    ওরা কমান্ডারের কাছে এসে থেমে গেল। একজন বললো, ‘ওদিকে দেখুন, ওরা আসছে।’ যখনই কমান্ডার সেদিকে তাকিয়েছে, লোক দু’জন হঠাৎ আক্রমন করে বসলো তার উপর। ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিতে চাইল ঘোড়া থেকে। পতন ঠেকাতে হাতিয়ার ফেলে ঘোড়ার পিঠ খামচে ধরলো কমান্ডার।

    লোক দু’জন জাপটে ধরলো তাকে। এমন শক্ত ভাবে চেপে ধরলো, তার নড়ারও ক্ষমতা রইল না। একজন দ্রত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল কমান্ডারকে। এরপর ছুটল মেয়েটার উদ্দেশ্যে। দ্রুত তাকেও বেঁধে ফেলল। যে লোক কমান্ডারকে ধরে রেখেছিল সে ঘোড়াকে তারা দিল এগিয়ে যাবার জন্য।

    ঘোড়া যখন চলতে শুরু করলো, ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো কমান্ডারের। অন্ধকারের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল আরও একজন। সে কমান্ডারের ঘোড়ায় চড়ে বসে তাকে ধরে থাকলো।

    জোহরা চিনতে পারলো, এরা সেই বাজনাদার, যারা তাকে ভাড়া করে এনেছিল। আসলে এরা ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদানী কমান্ডো সৈন্য। কমান্ডারের ডাক–চিৎকারে ওরা সতর্ক হয়ে গিয়েছিল এবং অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জোহরা ও কমান্ডারকে আটক করতে সক্ষম হলো।

    প্রহরীদের ঘোড়া এরাই চুরি করেছিল। সেই ঘোড়ায় চড়ে কমান্ডার ও জোহরাকে নিয়ে এগিয়ে চললো ওরা।

    তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো, ‘এদেরকে জীবিত নিয়ে চলো। উপর থেকে আদেশ আছে, কোন সন্দেহজনক লোক পেলে জীবিত ধরে নেয়ার।’

    কমান্ডার জোহরাকে নিয়ে ওরা পাহাড়ের দিকে রওনা দিলো। নদীর ঘাট থেকে রওনা হবার সময় কমান্ডার দেখলো, নৌকার মধ্য থেকে কালো হাবশীরা দল বেঁধে নেমে আসছে। সঙ্গে প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী।

    দুর্ভেদ্য দুর্গের মত পাহাড়ী অঞ্চলের হাজার হাজার হাবশী অপলক চোখে তাকিয়ে আছে আবু সাম্বালের মূর্তির দিকে। ধীরে ধীরে উড়ন্ত আলোর শিখাগুলো নিভে এলো। ধর্মীয় সঙ্গীতের মোহময় সুর ক্রমাগত বেজে চলেছে। সেই সুরের মূর্ছনা আঘাত হানছে হাবশীদের হৃদয়তন্ত্রীতে। যাদুর মত তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে রক্ত কণিকায়। সে প্রভাবে উদ্বেলিত ও উত্তেজিত হয়ে উঠছে ওদের হৃদয়গুলো। অন্তরে খেলা করছে অজানা শিহরনের বিমুগ্ধ স্রোত।

    যে অল্প ক’জন হাবশী নিজ চোখে ভগবানকে দেখার দুর্লভ সৌভাগ্য পাচ্ছে, নিজেকে তাদের একজন ভেবে গর্ব ও অহংকারে স্ফীত হয়ে উঠছে বর্বর হাবশীদের বুকগুলো। ওরা নিজেদেরকে এখানে অনুপস্তিত হাবশীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সৌভাগ্যবান ভাবতে লাগলো।

    এক সময় থেমে গেল পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তোলা সঙ্গীতের সেই সুর। তখনি পাহাড়ের উপর আবার দেখা গেল বিদ্যুতের চমক। মনে হলো আকাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে সোনালী বিদ্যুতের কণা। এক সময় তা আবার এসে স্থায়ী হলো মূর্তির সম্মুখভাগে। আলোয় আলোময় হয়ে গেল মাথার উপরের আকাশ।

    আবু সাম্বালের মূর্তির ওপর কোত্থেকে এলো এই আলো, কেউ জানতে পারলো না। মনে হচ্ছিল, অপার্থিব এ আলো ঠিকরে পড়ছে আবু সাম্বালের মূর্তি থেকে। নিজের আলোতেই তার চেহারা আলোময় হয়ে উঠেছে।

    হঠাৎ আলো নিভে গেল! একটু পর আবার যখন সেখানে আলো ফুটলো, দেখা গেল, আবু সাম্বালের মুখ দিয়ে একজন লোক বেরিয়ে এসে মূর্তির বিশাল ঠোঁটের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে।

    তার পিছনে এসে দাঁড়াল আরও চারজন লোক। ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা লোকগুলোর শরীর। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীরই সেই চাদরের নিচে। শুধু মুখগুলো আবরণ মুক্ত। সামনের লোকটিকে সম্রাটের মত দেখাচ্ছিল। তার মাথায় রাজ মুকুট। রাজ মুকুটের ওপর সাপের এক বিশাল ফণা। সেই ফণা থেকে আগুনের হল্কা বেরুচ্ছে। সে আগুনের হল্কার আলো এসে পড়ছে সম্রাটের গায়ের ওপর।

    কোত্থেকে কেমন করে এই আলো আসছে কেউ বুঝতে পারল না। কিন্তু সেই আলো তার গায়ের তারকাখচিত কাপড়ে যখন পড়ছিল, তখন তা চমকাচ্ছিল দ্যুতি ছড়িয়ে।

    তার এক হাতে বর্শা ও অন্য হাতে খোলা তলোয়ারও চমকাচ্ছিল। সাদা চাদর পরা লোকগুলো তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।

    পিনপতন নীরবতা মাঠ জুড়ে। ভয় আর মুগ্ধতার আবেশে নিথর হয়ে আছে লোকগুলো।

    সেই নিরবতা খান খান হয়ে গেল পেছনের চার সাদা চাদরওয়ালার গুরুগম্ভীর উচ্চ রবে, ‘ভগবান নেমে এসেছেন মাটির পৃথিবীতে! খুব ভাল করে দেখে নাও তাকে। তারপর সিজদায় লুটিয়ে পড়ে প্রার্থনা করো তার কাছে।’

    মাঠের দশ হাজার হাবশী সৈন্য একসাথে সিজদায় পড়ে গেল।

    একটু পর আবার শোনা গেল গুরুম্ভীর ধ্বনি, ‘মাথা উঠাও, ভাল করে দেখে নাও ভগবানকে।’

    সেজদা থেকে মাথা তুলল লোকগুলো। ভক্তিমাখা চোখে তাকালো ভগবানের দিকে।

    ভগবান তার তলোয়ার উর্ধে তুলে ধরে পাথরের সাথে আটকে রাখা অদৃশ্য রশির মই বেয়ে মূর্তির পায়ের পাতায় এসে দাঁড়াল। তার দেখাদেখি নেমে এলো তার সঙ্গীরাও। উপস্তিত লোকগুলোর মনে হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে ওরা উড়ে পাতালে নেমে এসেছে।

    মূর্তির পায়ের পাতা দুটো বিশাল এবং উঁচু মঞ্চের মত দেখাচ্ছিল মাঠ থেকে। যেমন মঞ্চ বানানো হয় কোন মাঠে সভা করার সময়। লোকগুলো বসেছিল সেই মঞ্চের সামনে। সারা মাঠ ছিল অন্ধকার। কিন্তু ভগবান ও তার সঙ্গীদের ওপর কোত্থেকে যেন কোমল আলো এসে পড়ছিল। সেই আলোয় সৈনিকরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল তাদের।

    এ সময় সবাইকে বিস্মিত ও অবাক করে চারজন অপ্সরী সেই আলোতে প্রবেশ করলো। তাদের পরণে পাতলা ঘাগরা। পিঠে পরীর মত দুই ডানা। মাথার চুলগুলো খোলা। মেয়েরা পরীর মত উড়ার ভঙ্গিতে ভগবানের চারপাশে নৃত্যের তালে তালে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যেতো আবার খনিক বাদে ছুটে আসতো নাচতে নাচতে। নাচের তালে তালে উড়তো ওদের মাথার চুল, পরীর ডানা।

    পাহাড়ে যখন ভগবানের এই খেলা ও লীলা চলছিল ঠিক সে সময় চারজন লোক কমান্ডার ও জোহরাকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো।

    তারা পর্বতের ভেতর ফেরাউনদের তৈরী মহলের এক কামরায় ওদের বন্দী করে রেখে একজনকে বাইরে পাঠিয়ে দিল। একটু পর সে অন্য একজনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো বন্দীদের কাছে।

    ‘এ লোক মিশরের বর্ডার ক্যাম্পের কমান্ডার আর মেয়েটি আমাদের ভাড়া করা নর্তকী। যখন আমাদের নৌকা থেকে হাবশীরা তাদের মালসামান ও রসদপত্র নামাচ্ছিল, তখন নদীর পাড়ে ওদের পেয়ে ধরে নিয়ে এসেছি।’ নবাগত লোকটিকে বললো সে।

    কমান্ডার ও জোহরাকে ভাল করে দেখলো লোকটি। তার মুখে ফুটে উঠলো হাসি। বললো, ‘তুমি এদেরকে ঠিক সময়েই নিয়ে এসেছো। এই জংলী হাবশীরা মানুষের কোরবানীর জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। আমরাও আলকিন্দির আদেশে ঘোষণা দিয়েছি, ভগবানের আদেশ মত একজন পুরুষ ও একজন নারীকে কোরবানী দেয়া হবে।’ আমার ওপর হুকুম ছিল, ‘যেখান থেকে পারো একটি পুরুষ ও একজন নারীকে ধরে এনে দাও।’ আমি এখন মানুষ খোঁজার বিপদ থেকে বেঁচে গেলাম। ভালই হলো। তোমরা এক কঠিন সমস্যার সমাধান করে দিয়েছো, এ জন্য তোমাদের ধন্যবাদ।’

    ‘মনে হচ্ছে আমরা সফল হবো, কারন প্রতিটি কাজেই আমরা ভাগ্যের সহায়তা পাচ্ছি। এত সহজে কোরবানি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি।’ বললো অন্যজন।

    একজন বললো, ‘হাবশীদের খুব শখ ছিল তাদের ভগবানকে দেখার। তাদের সে শখও পূরণ হয়েছে।’

    ‘আমরা হাবশীদের ভগবানকে কি কৌশলে দেখিয়েছি, তা যদি দেখতে, তবে তুমিও তার ভক্ত হয়ে যেতে।’

    ‘দেখার বড় লোভ ছিল, কিন্তু তা আর পারলাম কই? নিশ্চয়ই খুব জমকালো অনুষ্ঠান হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ, পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল এন্ডারসনের ওপর। ওর কাজকর্ম তো তুমি জানোই, সব কাজই সে নিখুঁত দক্ষতার সাথে করে।

    প্রথমে সামনের পাহাড় থেকে দু’টি তীর নিক্ষেপ করে। তীর দুটোতে ছিল অগ্নিশিখা। তীর দুটো যেখানে পড়ে সেখানে এবং তার আশেপাশে আগেই তেল ও পেট্রোল জাতীয় বস্তু ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তীর দুটো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আগুন ধরে গেল। মূর্তির মুখ আলোকিত হয়ে উঠল তাতে। এন্ডারসন কেমন করে জানিনা, সে আলোয় এমন একটি ভাব এনে দিল, মনে হলো, মূর্তিটি হাসছে, নড়াচড়া করছে। আলোর কারসাজিতে আমরাও দেখলাম, মূর্তিটির চেহারা ডানে বায়ে নড়াচড়া করছে।’

    ‘এরপর কি হলো? হাবশীদের মাঝে এর কি প্রতিক্রিয়া দেখা গেল?’ আগ্রহের সাথে জানতে চাইল সে।

    ‘তারা সবাই সিজদায় পড়ে গেল। এদিকে আস্তে আস্তে আলো নিভে গেল। আমরা আবার পেট্রোল ঢাললাম পাহাড়ে, মূর্তির গায়ে। হাবশীরা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে বসে কাঁপছিল। অন্ধকারে আমরা আলকিন্দিকে পোশাক পরিয়ে মূর্তির কোলে বসিয়ে দিলাম। তার সঙ্গী হলো চারজন।

    মূর্তির উপরে ‘সামেন’ পাহাড় থেকে অত্যন্ত সফল ভাবেই আলো নিক্ষেপ করা সম্ভব হয়েছিল। নিচে থেকে সামেন পাহাড়ের অগ্নিশিখা দেখতে পাচ্ছিল না কেউ, একটি বিরাট আয়নার সাহায্যে সেই আলো ফেলা হলো মূর্তির ওপর। আলোর কিরণে আলোকিত মূর্তি দেখে মনে হচ্ছিল, এ আলো মূর্তির নিজস্ব আলো।

    তারপর আলকিন্দি যখন ভগবান সেজে দেখা দিল তখন আমাদের মেয়েরা স্বর্গের অপ্সরী সেজে তার চারপাশে এমনভাবে নাচলো, মনে হলো আমরা তখন স্বর্গেই আছি। তার সামনে দিয়ে সবাই নত হয়ে হেঁটে যাবে। তাদেরকে বলতে হবে, ভগবান স্বয়ং যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন।’

    ‘বন্দী কমান্ডার ও জোহরাকে কি আজই কোরবানি করা হবে?’

    ‘সে সিদ্ধান্ত হাবশীরাই নেবে। সম্ভবত তারা দু’চারদিন তাদেরকে পেলে পুষে বশ মানাবে। তাদের কিছু ধর্মীয় নিয়ম পদ্ধতি পালন করাবে।’

    তাদের কথার মাঝখানেই কিছু লোকের পদধ্বনি ও হাসির শব্দ কানে এল। ওরা তাকিয়ে দেখলো, আলকিন্দি ও তার চার সাথী এগিয়ে আসছে।

    আলকিন্দি কাছে এলে ওরা বললো, ‘একজন পুরুষ ও একজন নারীকে হঠাৎ হাতে পাওয়া গেছে। এ দু’জনকেই বলীর জন্য হাবশীদের হাতে সমর্পণ করা যেতে পারে।’

    আলকিন্দি জিজ্ঞেস করলো না, মানুষ দু’টি কে বা কারা। সে মাথা থেকে রাজমুকুট নামিয়ে বন্দীরা যে কামরায় ছিল সেখানে প্রবেশ করল। কমান্ডার ও জোহরা বন্দী অবস্থায় চুপচাপ বসেছিল সেখানে। কমান্ডারের পরণে সামরিক পোশাক ছিল না, আলকিন্দি তাকে চিনতে পারল না। কিন্তু কমান্ডার আলকিন্দিকে ঠিকই চিনতে পারল।

    কামরার বাইরে লোক দু’জন যখন ওদের নিয়ে আলাপ করছিল তখনও কয়েকবারই কমান্ডার আল কিন্দির নাম শুনে ছিল। তাকে দেখতে পেয়ে তাই কমান্ডার খুব অবাক হয়নি, কিন্তু তিনি এখানে কি করছেন সে বুঝতে পারল না।

    আলকিন্দি কামরা থেকে বেরোতে বেরোতে বলল, ‘ঠিক আছে, ওদেরকে হাবশীদের ধর্মীয় নেতার কাছে তুলে দাও।’

    আল কিন্দির এ কথায় কমান্ডার নিশ্চিত হয়ে গেল, তাকে ও জোহরাকে কোরবানী দেয়ার ফায়সালা চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

    আল কিন্দি বেরিয়ে গেলে একজন বললো, ‘কমান্ডারের ভাগ্যটাই খারাপ, নইলে বলীর পাঠা সেই হতে যাবে কেন?’

    ‘আরে রাখো, এ তো সবে শুরু। এই বলী যখন হাবশীদের পাগল করে তুলবে রক্তের জন্য, তখন তো কায়রোর সব কমান্ডারই বলীর পাঠা হয়ে যাবে।’ বললো তার সঙ্গী। এ কথা শুনে সঙ্গীটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

    ❀ ❀ ❀

  • পাপের ফল

    পাপের ফল

    পাপের ফল

    মেয়েদের সাথে ভেতরের কামরায় বসে কথা বলছিলেন শামস বখত ও সাদ বখত। বডিগার্ড এসে খবর দিল, ‘কাজী সাহেব এসেছেন।’ মেয়েদের বসিয়ে রেখে দুই ভাই ড্রইং রুমে চলে এলেন কাজী সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য। মধ্য বয়সী লোক কাজী আবুল ফজল ইবনুল খাশিব। হারান প্রদেশের প্রধান কাজী তিনি, গুমাস্তগীনের খুব প্রিয়ভাজন ব্যক্তি। ওদের প্রবেশ করতে দেখেই কাজী সাহেব উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘শুনলাম হলব থেকে দূত এসেছে! সে নাকি খাসা উপহারও এনেছে?’

    ‘হ্যাঁ!’ সাদ বখত বললেন, ‘কেল্লা প্রধান শুয়ে আছেন বলে দূতকে আমরা এখানেই বসিয়ে রেখেছি। উনি উঠলেই ওখানে পাঠিয়ে দেবো।’

    ‘ভাল করেছো! আমি খলিফার পাঠানো উপহার দুটোই দেখতে এসেছি।’ ইবনুল খাশিব চোখ টিপে বললেন, ‘ওগুলো এক নজর দেখিয়ে দাও না আমায়।’

    দুই ভাই কাজীর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে ভালই জানতো! গুমাস্তগীনের উপর তার কি রকম প্রভাব তাও অজানা ছিল না ওদের। মেয়ে দু’টিকে না দেখালে সে যে ঝামেলা করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই ঝামেলা এড়াতে শামস বখত মেয়ে দু’জনকে তার সামনে এন দেখালেন। কাজী মেয়েগুলোকে যখন দেখলো তখন তার চোখে অবাক করা ঘোর লেগে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘বাহবা, তোফা! তোফা! এত সুন্দরী!’ শামস বখত মেয়ে দু’টিকে আবার ভেতরের কামরায় পাঠিয়ে দিলেন। কাজী বললেন, ‘এদেরকে আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি নিজেই ওদেরকে গুমাস্তগীনের কাছে নিয়ে যাব।’ তার চোখে তখন শয়তান নাচছে।

    ‘আপনি কাজী মানুষ!’ শামস বখত বললেন, ‘জাতির কাছে আপনার মর্যাদা গুমাস্তগীনের চেয়েও উর্ধে। আপনার হাতে রয়েছে ন্যায় বিচারের মানদন্ড। একি বলছেন আপনি!’

    ‘তুমি তো এক সামরিক বোকা পাঠা।’ কাজী সাহেব হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘তুমি নগর জীবনের স্বাদ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ, আনাড়ি! এসব তুমি বুঝবে না। সেই কাজী বা বিচারক মরে গেছে, যাদের হাতে আল্লাহর আইন, ইনসাফ ও ন্যায়দন্ড ছিল। তারা শাসককে ভয় করতো না, ভয় করতো শুধু আল্লাহকে। বরং শাসকগোষ্ঠীই ভয় পেতো কাজীদের, কখন জনসাধারণের ওপর অন্যায়-অবিচারের জন্য তাদের ধরে বসে! এখন শাসকরা তাকেই কাজী বানায়, যারা সরকারের অন্যায়-অবিচারকেও জায়েয বলে ঘোষনা দিতে পারে। আইনকে নয়, শাসককে খুশী রাখাই এখন কাজীদের কাজ। ভুলে যাচ্ছো কেন, আমি আল্লাহর মনোনীত কাজী নই, আমি কাজী হয়েছি আমার শাসক সম্মানিত গুমাস্তগীনের ইচ্ছায়।’

    ‘এ জন্যই তো তোমাদের মন মগজে এখন কুফরী বাসা বেঁধে আছে।’ সাদ বখত বললেন, ‘তোমার আর দোষ কি, শাসকই যেখানে ঈমান বিক্রি করে বসে আছে সেখানে তার কাজী তো ঈমান নিলামে তুলবেই! তোমার মত কাজীও আজ রাসূলের উম্মত, এটাই জাতির দূর্ভাগ্য। তোমাদের মত কাজীদের প্রশ্রয় পেয়েই আমাদের শাসক ও আমীররা আজ মেয়েদের সম্ভ্রম ও সতীত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার পায়।’

    তিনি আরো বললেন, ‘এ মেয়েরা তোমার মতই কোন মুসলমান ঘরের কন্যা! নিজের কন্যাদের সাথে কেউ অশালীন ব্যবহার করে?’

    সেনাপতি শামস বখত যত গুরুত্ব দিয়েই কথাগুলো বলুক না কেন, কাজীর মনে তা কোন রেখাপাত করলো না। কাজী তার কথাকে হাসি ঠাট্টা দিয়ে উড়িয়ে দিতে চাইলো। শয়তান তাকে এতদূর অগ্রসর করে দিল যে, সে সেনাপতিকে তিরষ্কার করতেও ছাড়লো না। হেসে বললো, ‘হিন্দুস্তানী মুসলমানরা যে এত নিরস জানতাম না। তোমরা ভারতবর্ষ ছেড়ে এখানে মরতে এলে কেন?’ কাজীর এ তিরষ্কারে সত্যি সত্যি আহত হলেন শামস বখত। গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘শোন কাজী! আমাকে তিরষ্কার করো আর যা-ই করো, আমার কথাগুলো একটু মন লাগিয়ে শোনো! আমি তোমাকে শুধু এ জন্যই সম্মান করছি, তুমি একজন বিচারক। কিন্তু ভুলে যেওনা, তুমি আমার অধীনস্ত একজন কমান্ডার ছিলে! এই তো তোমার পরিচয়! শুধু তোষামোদ ও চাটুকারিতার জোরে তুমি এই পদে উন্নিত হয়েছো। আমি তোমার সম্মানকে অক্ষুন্ন রেখেই বলছি, আমরা কেন হিন্দুস্তান থেকে এসেছি তা শুনে নাও।

    ছয়শ বছর আগে মুহাম্মদ বিন কাশিম নামে এক যুবক তার এক মুসলিম বোনের আর্ত চিৎকার শুনে সুদূর আরব থেকে ভারতের মাটিতে পদার্পন করে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন। নারীর ইজ্জত ও সতীত্বকে মুসলমান কতটা গুরুত্ব দেয় সেই যুবকের আবেগের দিকে তাকালে তা তুমি বুঝতে পারতে! তুমি কি জান, ভারতবর্ষ এখান থেকে কত দূরে ও কোথায়? তুমি অনুমান করতে পারো, ঐ যুবক কেমন করে তার সৈন্য বাহিনী উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে গিয়ে পৌছেঁছিলো? তুমি তো নিজেও একজন সৈনিক ছিলে! চিন্তা করতে পারো, কেন্দ্র থেকে এত দূরে, কোন রকম সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার যেখানে কোন সুযোগ নেই, খাদ্য ও রসদের কান ব্যবস্থা নেই, সেখানে কোন প্রেরণা ও শক্তি বলে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন? শুধু ছুটে যাননি, যুদ্ধ করে সেখানে বিজয় লাভ করেছিলেন?

    স্থূল কামনা বাসনা ত্যাগ করে এর প্রকৃত রহস্যটা একটু বুঝতে চেষ্টা করো! তিনি এমন সব অসুবিধা ও বাঁধা অতিক্রম করে বিজয় লাভ করেছিলেন, যেখানে বিজয়ের কথা চিন্তাই করা করা যায় না! তিনি শুধু বিজয় লাভই করেননি, তিনি ভারতবাসীর মনও জয় করেছিলেন। আর কোন প্রকার অত্যাচার ও আগ্রাসন ছাড়াই সেই কুফরিস্তানে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

    আমরা কেন এখানে এসেছি এবার সেই কথা বলি।

    যিনি এক বোনের সম্ভ্রম বাঁচাতে ও ইসলামের আলো জ্বালাতে হিন্দুস্তান গিয়েছিলেন আল্লাহর সেই মুজাহিদদের মৃত্যুর পর এলো তাদেঁর উত্তরসূরীদের যুগ। ধীরে ধীরে তাদের ঈমানী চেতনায় ঘুণ ধরলো। মানবতা ও সভ্যতার বাহকরা হয়ে পড়লো অলস ও বিলাসপ্রিয়। এমন লোকেরা ক্ষমতায় চলে এলো, যারা মুসলিম নামধারী কিন্তু ইসলামের অনুসারী নয়। স্বার্থান্ধ বাদশাহদের হাতে ভুলুন্ঠিত হলো মুজাহিদদের আদর্শ। ইসলাম সীমিত হয়ে পড়লো মানুষের ব্যক্তিগত আচার আচরণ। আবার অন্যায় ও অবিচার চেপে বসলো মানুষের কাঁধে। মানবতা হলো বিপর্যস্ত।

    ক্রমে আরো অবনতি ঘটলো সেখানকার। হিন্দু রাজারা অথর্ব মুসলমান শাসকদের ওপর প্রধান্য বিস্তার করলো, যেমন এখানে খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ইসলামী শাসনের বিলোপ ঘটলো। মুসলিম সাম্রাজ্য ক্রমশঃ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে লাগলো। যখন আমরা যুবক হলাম, সেখানকার মুসলিম শাসনের অবস্থা দেখে দুঃখ ও হতাশায় ছেয়ে গেল আমাদের মন। মুহাম্মদ বিন কাশিম ও তাঁর সাথীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে ইসলাম বিতাড়িত। বিশ্ব ইসলামী খেলাফতের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তারা শুধু আরবের কেন্দ্রীয় শাসন মুক্ত নয়, ইসলামের সামাজিক ন্যায়নীতি থেকেও মুক্ত হয়ে গেল। সামাজিক সুবিচার ও শান্তি থেকে বঞ্চিত মানুষের আত্মার ক্রন্দন আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। আমরা যোদ্ধা বংশের সন্তান। এসব অনাচার ও অশান্তি যখন আমাদের সহ্যের সীমা অতিক্রম করলো, মুহাম্মদ বিন কাশিমের মত আরেকজন সেনাপতির সন্ধানে আমরা দুই ভাই দেশ ছাড়লাম।

    আমরা হিন্দুস্তানের সেই নির্যাতীত মানুষের দূত, যারা ব্যাকুল চিত্তে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে কাশিমের মত এক ত্রাণকর্তার।

    আরবের সাথে ভারতের মুসলমানদের যে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, ভ্রাতৃত্বের দাবী নিয়ে আবার তা জোড়া দিতে এসেছি আমরা। আমরা যখন সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গীর সাথে দেখা করলাম, তিনি বললেন, ‘এখন আমরা হিন্দুস্তানের দিকে কেমন করে অগ্রসর হই? তাকিয়ে দেখো, আরবের ভূমি ভরে গেছে বিশ্বাসঘাতক ও গাদ্দারে। কয়েকটা দিন সবুর করো, এসো এই আরবকে গাদ্দার মুক্ত করে সাচ্চা মুজাহিদদের হাতে তুলে দেই এই শাসনভার। তারপর তোমাদের নিয়ে আমি ছুটে যাব ভারতের সেই মজলুম ভাইদের পাশে।’ কিন্তু আরবে এত বেশী গাদ্দার তৈরী হয়ে গেছে আমাদের জানা ছিল না। নুরুদ্দিন জঙ্গী এক সেক্টরে দুশমনকে পরাজিত করতে না করতেই আরো পাঁচ জায়গায় বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠে। গাদ্দারদের মোকাবেলা করতে গেলে আঘাত হানে কাফের খৃস্টানরা। খৃস্টানদের মোকাবেলা শুরু করলে মাথা তুলে দাঁড়ায় গাদ্দাররা।

    এই করে করেই তিনি নিঃশেষ হয়ে গেলেন। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করলো খৃস্টানরা। তাদের মোকাবেলায় জেহাদের ঝান্ডা তুলে ধরলেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। এসব দেখে শুনে আমাদের আফসোস ও দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হলো। ভারতের ভূখন্ডে মুসলমানদের উপরে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে হিন্দুরা, আর এ ভূখন্ডে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে খৃস্টানরা। মরহুম জঙ্গী আমাদেরকে তাঁর সামরিক বিভাগে ঠাঁই দিয়েছিলেন। যখন গুমাস্তগীন, সাইফুদ্দিন ও আজিম উদ্দিনরা গোপনে খৃস্টানদের সাথে আঁতাত করলো, তখন সুলতান জঙ্গী আমাদের দু’ভাইকে গুমাস্তগীনের সৈন্য বিভাগে পাঠিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য, আমরা যেন তাঁর ওপরে সতর্ক দৃষ্টি রাখি। সে গোপনে কি করে, কাদের সাথে যোগাযোগ রাখে এসব দেখার জন্যই আমরা এখানে আছি। নিশ্চয় ভারতবর্ষ থেকে আমরা কেন এখানে এসেছি এ প্রশ্নের জবাব পেয়েছো তুমি?’

    ‘অর্থাৎ তোমরা দুই ভাই এখানে গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছো?’ কাজী ইবনুল খাশিবের কন্ঠ থেকে ব্যঙ্গাত্মক সুর ভেসে এলো।

    ‘কাজী! আমার কথা বুঝতে চেষ্টা করো।’ শামস বখত ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো, আমাদের মুসলমান আমীররা সেই বীর মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, যারা খৃস্টানদের নাগপাশ থেকে মুসলমানদের মুক্ত ও রক্ষা করতে চায়। আজকের দূত মারাত্মক সংবাদ বহন করে এনেছে।’

    তিনি চিঠির সারমর্ম তাকে শুনিয়ে বললেন, ‘গুমাস্তগীনের ওপর তোমার প্রভাব রয়েছে, তুমি তাকে বাঁধা দিতে পারো। তুমি যদি আমাদের সাথে একমত হও, তবে এসো, আমরা গুমাস্তগীনকে বুঝাই, তাকে আমাদের মতে ফিরিয়ে আনি। এসো, গাদ্দারদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেয়ে সুলতান আইয়ুবীর সাথে মিলে যাওয়ার জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করি। তা না হল তাকে এমন পরাজয় বরণ করতে হবে, যার বেদনা তাকে সারা জীবন ভোগ করতে হবে। এমনও হতে পারে, তাকে সারা জীবন কারাগারে বন্দী কাটাতে হবে। এখনও চিন্তা করার সময় আছে।’

    ‘তার আগে আমি তোমাদের দুই ভাইকে সারা জীবনের মত কারারুদ্ধ করবো।’ কাজী ইবনুল খাশিব বললো, ‘মেয়ে দুটিকে আমার কাছে দিয়ে দাও।’ কাজী সেই কামরার দিকে পা বাড়ালো, যেখানে মেয়ে দু’টি বসে ছিল।

    সাদ বখত তার পথ আগলে দাঁড়ালো। সে সাদ বখতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে ক্ষীপ্ত সাদ বখত রাগে তার মুখে জোরে এক ঘুঁষি মারলো। প্রচন্ড ঘুঁষি খেয়ে উল্টে পড়ে গেল কাজী ইবনুল খাশিব। শামস বখত সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি তার একটি পা কাজীর গলার উপরে চেপে ধরলেন। কাজী কিছুক্ষণ ছটফট করে ঠান্ডা হয়ে গেল। মারা গেল কাজী। কাজীকে হত্যা করার কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছিল না এ দুই ভাইয়ের। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাই ঘটে গেল।

    দুই ভাই চিন্তা করে দেখলো, এখন গ্রেফতার হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই তাদের। শামস বখত তার দুই অফিসারকে ডাকলেন। একজনকে বললেন, ‘জলদি চারটি ঘোড়া প্রস্তুত করো।’ অন্য জনকে বললেন, ‘ঘোড়া প্রস্তুত হলে মেয়েদেরকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিও।’ তিনি দ্রুত সাদ বখতের সাথে কিছু জরুরী আলাপ সারলেন। ততক্ষণে চারটি ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে সেখানে হাজির করা হলো। অন্য অফিসার মেয়েদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন শামস বখতের দরজায়। ঘোড়া ও মেয়েদের প্রস্তুত দেখে দুই ভাই এগিয়ে গেলেন সেখানে। শামস বখত মেয়েদের বললেন, ‘তোমাদের সাথে আর আলাপ করার সময় নেই। জলদি ঘোড়ায় চড়ে বসো। আমার লোক তোমাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেবে।’

    মেয়েরা পরিস্থিতির নাজুকতা বুঝতে পারল। তারা কথা না বাড়িয়ে দ্রুত গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসলো। দু’জন বিশ্বস্ত কমান্ডোকে তীর-ধনুক ও তলোয়ার নিয়ে অপর দু’টি অশ্বে আরোহন করতে নির্দেশ দিলেন সেনাপতি শামস বখত। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম তামিল করলো ওরা। এরপর সেনাপতি শামস বখত ও তার ভাই সাদ বখত তাদের সাথে করে কেল্লার ফটক পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন। সেনাপতির নির্দেশে প্রহরীরা কেল্লার ফটক খুলে দিল। পুরো দলটিকে নিয়ে তিনি কেল্লার বাইরে বেরিয়ে এলেন।

    প্রহরীদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে এসে তিনি তাদের চারজনকে বিদায় জানালেন। দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাদের বললেন, ‘তোমরা সোজা সুলতান আইয়ুবীর কাছে চলে যাবে। ওখানে পৌঁছে বলবে, আমি পাঠিয়েছি তোমাদের।’

    গুমাস্তগীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতো কমান্ডোরা। চারটি ঘোড়া প্রাণপ্রণে ছুটে চললো আর রিস্তানের দিকে। সেনাপতি দু’জনেরও ওদের সাথেই পালিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু কি চিন্তা করে ওরা আবার দূর্গে ফিরে এলো।

    গুমাস্তগীন ততক্ষণে জেগে উঠেছিল। সেনাপতির মহল খালি থাকায় খালিফার দূত ওখান থেকে বেরিয়ে চলে এলো গুমাস্তগীনের মহলে। মহলের প্রহরী গুমাস্তগীনকে খবর দিল, ‘এক দূত আপনার সাথে সাক্ষাত করতে চায়।’ গুমাস্তগীন বললো, ‘ঠিক আছে, তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।’

    দূত ভেতরে প্রবেশ করলে গুমাস্তগীন তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কে তুমি? কোত্থেকে এসেছো?’

    দূত তার পরিচয় দিয়ে বললো, ‘আমি মহামান্য খলিফা আল মালেকুস মালেহের দরবার থেকে এসেছি।’ সে খলিফার চিঠির কথা বললো এবং সঙ্গে যে সব উপহার সামগ্রী নিয়ে এসেছে সেগুলোর কথাও বললো গুমাস্তগীনকে।

    শামস বখত ও সাদ বখত ফিরে এসে গুমাস্তগীনের মহলে গেল। গুমাস্তগীন তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়ে দুটি কোথায়?’

    শামস বখত জবাব দিলেন, ‘ওরা নিরাপদ স্থানে চলে গেছে।’

    গুমাস্তগীন রক্ত চক্ষু মেলে ক্ষীপ্ত কন্ঠে বললেন, ‘তার মানে?’

    ‘তার মানে খুব সোজা। এ দুই মেয়ে ছিল মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমি চাইনি ওদের ইজ্জত নষ্ট হোক। তাই আমি ওদেরকে এমন স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছি, যেখানে তাদের ইজ্জত-আবরু রক্ষা পাবে।’

    গুমাস্তগীন রাগে তার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। দূত বললো, ‘শুধু তাই নয়, এ দু’জন মিলে আপনার কাজীকেও খুন করে ফেলেছে!’

    ‘হোয়াট?’ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গুমাস্তগীন তার প্রহরীদের ডাকলো। বললো, ‘এদের পাকড়াও করো।’ দূতকে নিয়ে গুমাস্তগীন সেনাপতি শামস বখতের বাসায় গেলো। দেখলো, সত্যি, সেখানে কাজীর লাশ পড়ে আছে। দূত পাশের কামরায় বসে সেনাপতিদের সাথে কাজী সাহেবের যে বদানুবাদ ও আলোচনা শুনেছিল, সে সব কথা গুমাস্তগীনকে খুলে বললো। গুমাস্তগীন সেনাপতি শামস বখত ও তার ভাই সাদ বখতকে সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন।

    হারানের দূর্গ থেকে বের হয়ে চার অশ্বারোহী যখন প্রানপণে ছুটছিল সুলতান আইয়ুবীর দিকে, সুলতান আইয়ুবী তখন হাসান বিন আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘এখনও হারানের সেনাপতিদের কাছ থেকে কোন সংবাদ এলো না?’

    সেনাপতি শামস বখত ও সেনাপতি সাদ বখতের সংবাদের জন্য সুলতান আইয়ুবী যখন পেরেশান, ওরা তখন কাজী ইবনুল খাশিবের হত্যা এবং আস সালেহের দরবার থেকে নিয়ে আসা দুই মেয়েকে দূর্গ থেকে বের করে দেয়ার অপরাধে কারাগারে বন্দী। ঠিক সে সময় আস সালেহের আর একজন দূত মুসাল দূর্গের অধিপতি গাজী সাইফুদ্দিনের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। গাজী সাইফুদ্দিন খেলাফতের অধীনে মুসাল প্রদেশ ও তার আশেপাশের এলাকার শাসক ছিলেন। কিন্তু নুরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে মুসালের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষনা দেন।

    সাইফুদ্দিন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বংশের লোক হলেও তার বিরোধী ছিলো। সাইফুদ্দিন নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করায় মুসাল আর ইসলামী সাম্রাজ্যের অংশ রইল না। নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তিনি সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে পরিচালিত জোটে যোগ দিয়েছিলেন।

    তার ভাই আজিম উদ্দিন একজন দক্ষ ও পরীক্ষিত জেনারেল। সাইফুদ্দিনের সেনা বাহিনীর হেড অব দ্যা কমান্ড এই আজম উদ্দিন। অন্যান্য মুসলিম আমীরদের মতই সাইফুদ্দিনও ছিলো ভোগ বিলাস প্রিয় এক শাসক। তার হেরেমেও ছিল দেশী বিদেশী সুন্দরী মেয়ের ছড়াছড়ি। ছিল নর্তকী ও গায়িকার দল।

    এ ছাড়া তার ছিল পাখী পোষার এক অদ্ভুত শখ। অসংখ্য মেয়ের মত অসংখ্য পাখীতে ভরা ছিল তার মহল। রং-বেরংয়ের বিচিত্র পাখী খাঁচায় সাজিয়ে তাদের সাথে গল্প করতো সে। সুন্দরী নারী ও রং বেরংয়ের পাখী, দুটোই ছিল তার আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম। আজিম উদ্দিনের সামরিক যোগ্যতা ও নৈপূন্যের ওপর আস্থা ছিল তার। তার আশা ছিল, সুলতান আইয়ুবীকে পরাজিত করে তার রাজ্য আরো বাড়িয়ে দিতে পারবে আজিম উদ্দিন। এই আশায় সাইফুদ্দিন ও হারান দূর্গের অধিপতি গুমাস্তগীন এবং তথাকথিত খলিফা আল মালেকুস সালেহের মত খৃস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতো। খৃস্টানরা সাইফুদ্দিনকে আশ্বাস দিয়েছিলো, সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তারা তাকে সামরিক সাহায্য দিবে যাবে।

    এভাবে সুলতান আইয়ুবীর অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছলো, তার বিরুদ্ধে মুসলানদেরই তিনটি শক্তি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো।

    হলবে আল মালেকুস সালেহ, হারানে গুমাস্তগীন ও মুসালে সাইফুদ্দিন। এই তিনটি মুসলিম শক্তির কেউ কারো চেয়ে কম ছিল না, সামরিক বিচারে এদের কাউকে উপেক্ষা করার মতও ছিল না। এ তিনটি বৃহৎ শক্তি ছাড়াও এদের প্রভাবাধীন ছোট ছোট শেখদের রাজ্য, মুসলিম নবাবদের পরগনার সংখ্যা ছিল অসংখ্য। এরাও সবাই এই তিন শক্তির সাথে ঐক্যজোটে শামিল হয়েছিল। তারা সবাই ঐক্যজোট হয়েছিল বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই একে অন্যকে ভয় করতো।

    স্বার্থের ঐক্য তাদের মানসিক দূরত্ব ঘুচাতে পারেনি। তারা কেউ চায়নি, অন্যেরা তার চেয়ে বেশী শক্তিশালী হোক। তাদের অবস্থা ছিল সেই পুকুরের মাছের মত, যেখানে ছোট বড় সব মাছ একত্রে থাকে ঠিক, কিন্তু ছোট মাছগুলো সব সময় বড় মাছগুলোকে ভয় পায়। কোন সুযোগে কে তাকে গিলে ফেলে এই ভয়ে তটস্ত থাকে সব সময়। আর আশা করে, বেঁচে থাকলে সেও একদিন বিশাল মাছ হবে।

    সুলতান আইয়ুবী তার ছড়িয়ে দেয়া গোয়েন্দাদের মাধ্যমে বিরোধীদের এ অনৈক্যের সব খবরই নিয়মিত পেয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি কোন বিপদের ঝুঁকি নিতে রাজী ছিলেন না বলে সব সময়ই এ সত্যও স্বরণে রাখতেন, তাঁর সামনে তিনটি বড় সামরিক শক্তি দাঁড়িয়ে আছে। তারা আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে। যে কোন মুহূর্তে ওরা একা একা বা এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তার বাহিনীর উপর।

    এ কথাও সব সময় মনে রাখতেন, এ তিনটি বাহিনীর সেনাপতি, কমান্ডার ও সৈন্যরা সবাই মুসলমান। তাদের সামরিক শিক্ষা, নৈপূন্য ও বীরত্বও একই ধরনের। এ গুনগুলো ওরা মুসলমান বলেই পেয়েছে। এসব গুন ও যোগ্যতা আল্লাহ অন্য কোন জাতিকে দেননি।

    চার-পাঁচ গুন খৃস্টান বাহিনীকে এ মুসলিম বাহিনীর যে কোন দল পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। সেই খৃস্টানরা যতই উন্নত সামরিক অস্ত্র, লৌহ বর্ম, শিরস্ত্রান ও তাজাদম ঘোড়াই ব্যবহার করুক না কেন, তাতেও তাদের পরাজিত হওয়ার কোন আশংকা নেই। সুলতান আইয়ুবী হলব অবরোধ করে মর্মে মর্মে এ সত্য উপলব্ধি করেছেন। এটাই প্রথম ঘটনা, যেখানে মুসলিম সৈন্য মুসলিম সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

    হলব শহরের মুসলমান জনসাধারণ ও সৈন্যরা যেখানে যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছে, শহরের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে যেভাবে জীবন উৎসর্গ করেছে, তার নজীর শুধু মুসলমানই দেখাতে পারে। এই বীরত্বের কথা সুলতান আইয়ুবী তার মন থেকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না।

    সুলতান আইয়ুবীর কেবলি মনে পড়ছে, তিনি ‘মুসলমান হয়ে মুসলমানদের ওপর অভিযান চালিয়েছেন’, এই অপবাদের কথা।

    আব্বাসীয় খেলাফতের এক আমীর এ অপবাদ ছড়াচ্ছিল। তাকে মিশর থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল খৃস্টানদের সাথে যোগসাজশের অভিযোগে। অথচ প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন রূপ।

    সুলতান আইয়ুবী খৃস্টানদের কবল থেকে ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার অভিযানে বেরোলে খৃস্টানদের পদলেহী শাসকরা তার পথ আগলে দাঁড়ায়। ফলে তিনি বাধ্য হন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে।

    এ সত্য গোপন করে তার বিরুদ্ধে ইসলামী জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ অপবাদ ছড়াচ্ছিল দুশমন। ক্ষমতার লোভে অন্ধ শাসকরা এভাবেই চেষ্টা করছিল ইসলামী জনতাকে জেহাদের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে।

    মুসলমানদের প্রথম কেবলা এখানে কাফেরের অধীন, সুলতান আইয়ুবী কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছিলেন না। জেরুজালেমকে শত্রুমুক্ত করার চিন্তা অহর্ণিশ ঘুরপাক খেতো তার মাথায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপের পিছনে কাজ করতো এই চিন্তা। এ চিন্তা কখনো তাকে এক জায়গায় শান্তিতে বসতে দেয় নি।

    পথের প্রতিটি বাঁধা সরিয়ে তিনি কেবল সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। দুশমনের বাঁধা, গাদ্দারের গাদ্দারী তার পথ রোধ করতে পারেনি কখনো। তার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে ছিল জেরুজালেমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দুর্মর আকাঙ্খা।

    ইহুদীদের পরিকল্পনাও তার অজ্ঞাত ছিল না। তিনি ভালমতই জানতেন, ইহুদীরা ধুরন্ধর ও অসম্ভব কূটকৌশলী। এমন ধুরন্ধর জাত পৃথীবিতে আর দ্বিতীয়টি নেই। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছিলেন, কেন পবিত্র কোরাআন একমাত্র ইহুদীদেরকেই মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু বলে ঘোষনা করেছে।

    তারা কখনো সম্মুখ যুদ্ধে উপস্থিত হয় না। যুদ্ধের ময়দানে তারা লেলিয়ে দেয় মাথা মোটা খৃস্টানদেরকে। বিনিময়ে তাদের দেয় অঢেল আর্থিক সুবিধা। এই সুবিধার পরিমাণ চিন্তা ও কল্পনারও অতীত। এভাবেই খৃস্টনদের বন্ধুত্ব ক্রয় করে নিয়েছে ওরা। আর এই বন্ধুত্বের উসিলায় তাদের বিবেক এবং মাথাগুলোও তারা কিনে নিয়েছে।

    খৃস্টানরা এখন বিশ্বময় দৃশ্যতঃ সবচেয়ে বেশী বিত্ত বেসাতের মালিক। ইহুদীরা তাদের শুধু এই সম্পদই দান করেনি, তাদের অসাধারণ সুন্দরী, রূপসী মেয়েদেরকেও তুলে দিয়েছে ওদের হাতে। এই মেয়েরা কেবল রুপে গুণেই অনন্যা নয়, ইহুদীদের জাতীগত কুটবুদ্ধি এবং চাতুর্যেও এরা অতুলনীয়া।

    খৃস্টানদের জাতীগতভাবে কব্জা করার পর এবার এসব মেয়েদের ওরা লেলিয়ে দিচ্ছে গাদ্দার মুসলিম আমীরদের পেছনে। নিজেরা না এসে ওদের পাঠাচ্ছে খৃস্টানদের মাধ্যমে। সেই সাথে সেই একই লোভ, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রলোভন!

    এ ষড়যন্ত্রের কথা যখনই মনে হয় তখনই সুলতান আইয়ুবী কাতর হয়ে পড়েন। খৃস্টানরা তাদের পেছনে ছায়ার মত লেগে আছে। উচ্চ পদস্থ সামরিক আফিসার, দুর্ধর্ষ সেনা কমান্ডার, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজ্যের আমীর ওমরা, এমন কে নেই, যাদের পেছনে ওরা লাগেনি! এরা শত্রুর বেশে আসে না, আসে বন্ধুর বেশে। ফলে ওদের মোকাবেলা করা কত যে দূরূহ তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে! কত ভাবে ও কত কায়দায় যে ওরা মুসলমানদেরকে মুসলমানের বিরুদ্ধে কাজে লাগায় তার কোন ইয়ত্তা নেই।

    যাদের টোপ গেলাতে পারে না, তাদের কাজে লাগায় একভাবে, যারা টোপ গেলে তাদের অন্যভাবে। মোট কথা, ওদের নজরে পড়লে কারো রেহাই নেই। আজ মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধের উস্কানী দিচ্ছে তাদেরই নিয়োজিত লোকজন। তাদেরই নীলনকশায় মুসলমানরা পরষ্পরের বিরুদ্ধে তাক করেছে অস্ত্র।

    এমন কঠিন সময়ে সব সময় চোখ-কান খোলা না রাখলে পতন অনিবার্য। সুলতান আইয়ুবী তাই তার বাহিনীকে সদা সতর্ক ও সর্বদা প্রস্তুত অবস্থায় রেখেছেন। সামরিক বিভাগকে তিনি এমন ট্রেনিং দিয়েছেন এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে এমন সচল রেখেছেন, দুশমনের যে কোন চাল ও পরিকল্পনা চাইতে যা সবসময় অধিক কার্যকর ও ফলপ্রসু। ফলে শত্রুরা কোন ময়দানেই মুজাহিদদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তারা তাদের মেধা, মনন, শ্রম ও যোগ্যতাকে এমনভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিল যে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য লাভের হকদার হয়ে উঠেছিল তারা।

    মুসাল প্রদেশে গিয়ে পৌঁছলো হলবের দূত। সঙ্গে তার সুলতান আল মালেকুস সালেহের চিঠি ও উপহার সামগ্রী। এখানেও উপহার হিসাবে পাঠানো হয়েছে অন্যান্য সামগ্রীর সাথে হারানের মত দুই সুন্দরী মেয়েকে।

    হারান কেল্লার অধিপতি গুমাস্তগীনের কাছে পাঠানো মেয়ে দুটিকে সেনাপতি শামস বখত ও সাদ বখত নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের পাঠাতে গিয়ে হত্যা করেছিলেন কাজী ইবনুল খাশিবকে। আর সেই অপরাধে নিজেরা বরণ করেছিলেন করাগারের বন্দী জীবন। কিন্তু মুসালের গভর্ণর সাইফুদ্দিন তার উপহার ও পয়গাম ঠিকমতই পেয়েছিলো। মেয়ে দুটি তার অন্দর মহলের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুললো। হলবের দূত তাকেও সে রকম চিঠিই দিলো, যে রকম চিঠি গুমাস্তগীনকে দিয়েছিলো।

    তাতে আরো উল্লেখ ছিল, ‘খৃস্টানরা হলববাসীদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরন করেনি। ওরা একবার যেহেতু ধোঁকা দিয়েছে, আবারো দিতে পারে। ফলে তাদের আশ্বাসের ওপর ভরসা করা যায় না।

    আবার চারদিকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন, তাদের বন্ধুত্ব সরাসরি অস্বীকার করাও এ মুহূর্তে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার উত্তম পন্থা হলো, নিজেরা পরষ্পর ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও ঐক্যবদ্ধভাবে সুলতান আইয়ুবীর ওপর আক্রমণ চালানো। সাফল্যের সম্ভাবনা দেখলে তারা যে তাদের দুয়ার খোলা রাখবে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু রিস্ক নিয়ে তারা আমাদের বিজয়ী করতে আসবে না।

    সুলতান আইয়ুবী এখন আর রিস্তান পর্বতের দূর্গম শৃঙ্গের ওপর তাঁবু টানিয়ে বসে আছেন। ভাল খেলোয়াড়ও খেলতে খেলতে এক সময় ভুল করে বসে। পাগল গাছের মাথায় চড়ে ভাবে, কেউ আর তার নাগাল পাবে না। আমাদের জন্য এ এক মহা সুযোগ! আমরা একসাথে তাঁকে আক্রমণ করলে আর খৃস্টানরা একটু সহায়তা করলে তাকে সহজেই পরাস্ত করা সম্ভব।

    আমি তো মনে করি, তার সাথে যুদ্ধ করার ও প্রয়োজন হবে না, কেবল অবরোধ করে বসে থাকলে একদিন খাদ্যাভাবেই ধরাশায়ী হয়ে যাবে।

    এ চিঠিতেও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সেখানে বরফ গলতে শুরু করেছে। গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, সুলতান আইয়ুবীর সামরিক শৃংখলা বরফ গলা পানির প্রবাহে তছনছ হয়ে গেছে। আমাদের ঐক্যজোটের তিন শরীক একত্রে সামরিক অভিযান চালালে, পাহাড়ী প্রান্তরেই সুলতান আইয়ুবীকে পরাজিত ও চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারবো।’

    চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ‘গুমাস্তগীনকেও অনুরূপ চিঠি দেয়া হয়েছে। আশা করি আমাদের ঐক্যবদ্ধ সামরিক জোটকে কার্যকরী করতে আপনিও সচেষ্ট হবেন। সময় নষ্ট না করে আপনার সৈন্য বাহিনী ঐক্যজোটের কমান্ডে নিয়ে আসুন, যাতে সুলতান আইয়ুবীকে পরাজিত করে আমরা আমাদের নিজ নিজ রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি।’ সাইফুদ্দিন এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে তার ভাই আজিম উদ্দিন, দু’জন সিনিয়ার জেনারেল এবং মুসালের সম্মানিত খতিব ইবনুল মাখদুম কাকবুরীকে ডেকে পাঠালেন। সকলে সমবেত হলে তিনি খলিফার চিঠি সবার সামনে পুনরায় পাঠ করলেন। এরপর তিনি সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনারা সকলেই জানেন, আমরা সুলতান আইয়ুবীর বিরোধী। তার আনুগত্য করার কোন ইচ্ছে আমাদের নেই। আমার দেহের শিরায় যে রক্ত প্রবাহিত, তার দেহের শিরাতেও ঠিক একই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। এখন আপনারা বলুন, এ পত্রের আমি কি জবাব দেবো?’

    ‘এ ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা কি?’ জানতে চাইলেন খতীব ইবনুল মাখদুম কাকবুরী। ‘আমার ইচ্ছে, প্রকাশ্যে এই ঐক্যজোটে যোগ দেয়া। কিন্তু শর্ত থাকবে, যে এলাকা আমাদের সৈন্য দ্বারা বিজিত হবে সে এলাকা আমাদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। সেখানে অন্য কেউ আধিপত্যের দাবী করতে পারবে না।’

    এক সেনাপতি বললো, ‘আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারচেয়ে উত্তম আর কোন সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আমাদের সৈন্যরা যে এলাকা জয় করবে, সে এলাকার হকদার আপনি, এতে কারো কোন আপত্তির প্রশ্ন উঠতে পারে না।’

    ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খৃস্টান ও সুদানীদের পরাজিত করতে পারলেও আমাকে পারবে না। কারন আমাদের উভয়ের শরীরে একই রক্তধারা প্রবাহিত এবং আমি তার যুদ্ধ কৌশল ভাল করেই জানি।’ বললো সাইফুদ্দিন।

    অপর এক সেনাপতি বললো, ‘আপনি আপনার সৈন্য বাহিনী ঐক্যবদ্ধ জোটে শামিল করে দিন কিন্তু সৈন্য পরিচালনার কমান্ড আপনার হাতেই রাখবেন। আপনি আপনার সৈন্য বাহিনীকে এমনভাবে পরিচালনা করবেন, যেন আমাদের সফলতা হলব ও হারানের থেকে সম্পূর্ন পৃথক থাকে।’

    ‘শাহানশাহে মুসাল! আমি আপনার আদেশের ওপর জীবন কোরবানী করে দেবো।’ প্রথম সেনাপতি বললো, ‘আমরা আপনাকে এই মুসলিম সাম্রাজের শাহানশাহ বানিয়ে দেবো, যে স্বপ্ন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী দেখছেন।’

    ‘গাজী সালাহউদ্দিনের মাথা এনে আপনার পদতলে রেখে দেবো।’ বললো অপর সেনাপতি, ‘তার সৈন্য বাহিনীকে আর রিস্তানের পাহাড়ী এলাকা থেকে বেরই হতে দেবো না। আপনি সত্বর যুদ্ধ যাত্রার আদেশ দিন। আমাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধ যাত্রার জন্য সম্পূর্ন প্রস্তুত হয়ে আছে।’

    দুই সেনাপতিই উচ্ছাস ও আগ্রহে টইটম্বুর। কার চেয়ে কে বেশী তাবেদারী ও খোশামুদি করতে পারে তার যেন প্রতিযোগিতা চলছিল। সেনাপতি আজিম উদ্দিন চুপচাপ বসে শুনছিলো ওদের বক্তব্য। খতীব ইবনুল মাখদুম কখনও সেনাপতিদের মুখের দিকে, আবার কখনো সাইফুদ্দিনের মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলেন ওদের মনোভাব।

    ‘আজিম উদ্দিন, তোমার কি ধারনা?’ সাইফুদ্দিন তাঁর ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘আপনার এই সিদ্ধান্তে আমরা একমত, আমরা সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।’ আজিম উদ্দিন বললো, ‘কিন্তু আমাদের সেনাপতিদের এমন আবেগপ্রবণ কথা শোভা পায় না, যেমন আমাদের দুই সেনাপতি বলেছেন। সুলতান আইয়ুবীকে এতটা হালকভাবে দেখা কোন অভিজ্ঞ সেনাপতির কাজ নয়।

    আমি বলছি না, সুলতান আইয়ুবীকে আমরা পরাজিত করতে পারবো না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, যিনি অল্প ক’জন সৈন্য নিয়ে খৃস্টানদের বহুগুণ সৈন্যের মোকাবেলা করে তাদের পরাজিত করেছেন, যিনি মরুভূমির সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের বরফ ঢাকা প্রান্তরে যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করতে পারেন, যিনি সম্রাট রিমান্ডের সৈন্য বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছেন, তিনি বরফ গলা পানি প্রবাহের মধ্যেও ভালমতই যুদ্ধ করতে পারবেন, এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই।

    আমাদের আগেই খুশী হওয়ার কোন কারন নেই। শক্রকে কোন সময় দুর্বল ভাবতে হয় না। আপনি নিজেই চিন্তা করুন, যাঁর সঙ্গে আপনি যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন, তার সামরিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কেমন? চিন্তা করুন সেই যুদ্ধের ময়দানের কথা, যেখানে কেবল তার সৈন্যরাই যুদ্ধ করবে না, জিততে হলে আপনাকেও সেখানে যুদ্ধ করতে হবে। তার সৈন্যদের মোকাবেলায় আপনার সৈন্যরা সে ময়দানে যুদ্ধ করতে কতটা বেশী পারঙ্গম, সেটাও আপনাকে চিন্তা করতে হবে।’

    এরপর আজিম উদ্দিন সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদের যোগ্যতা ও গুণের প্রশংসা শুরু করলো। সুলতান আইয়ুবীর রণকৌশল সম্পর্কে আলোচনা করলো বিজ্ঞ সেনাপতির মতো।

    এরপর যে ময়দানে যুদ্ধ হচ্ছে সে ময়দানের অবস্থার ওপর আলোকপাত করে বললো, ‘বরফ গলতে শুরু করেছে এবং বসন্তের ঋতুতে প্রবল বর্ষনের সম্ভাবনাও আছে। এ বৎসর বৃষ্টি একটু দেরিতেই হচ্ছে। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যরা এখনও তাঁবুতেই আছে। কিন্তু ঘোড়া তো আর তাঁবুর মধ্যে নেই। এ সময় তাদের সামরিক অশ্বগুলো নিশ্চয় পর্বতের গুহায় ও গাছের নিচে আছে। উট ও ঘোড়া এ অবস্থায় বেশীক্ষণ সবল ও সুস্থ থাকে না।

    আমরা এ আশাও করতে পারি, আইয়ুবীর সৈন্যরা পাহাড়ী অঞ্চলের ভয়ংকর শীতে থাকতে থাকতে বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছে। আবার এ কথাও খেয়াল রাখতে হবে, যদি আমাদের সৈন্য হলব ও হারানের সৈন্যদের সাথে মিশিয়ে ফেলি, তবে সুলতান আইয়ুবী আমাদের সকলকে অবরোধ করে ফেলতে পারে।

    বিশেষ করে এ কথাও স্মরণ রাখা দরকার, মুসলমান সৈন্যরা যখন অন্য মুসলিম বাহিনীর সামনা-সামনি হবে, তখন এমনও হতে পারে, তারা পরষ্পর যুদ্ধ করার পরিবর্তে আপোষে মিলেও যেতে পারে।

    তারা একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার উন্মুক্ত করবে, কিন্তু সেই তলোয়ার সহসাই আবার কোষবদ্ধও হয়ে যেতে পারে। রক্ত প্রবাহের পরিবর্তে এক অন্যের সাথে মেতে উঠতে পারে কোলাকুলিতে।’

    ‘আজিম উদ্দিন!’ সাইফুদ্দিন তার কথার মাঝখানে বলে উঠলেন, ‘তুমি একজন সৈনিক! তুমি শুধু রক্ত, তীর ও তলোয়ারের চমক সম্পর্কেই চিন্তা করতে পারো, বাকী খবর আমার কাছে শুনে নাও। যুদ্ধের চাল আমারাও কম জানি না। মুসলমান সৈনিককে কেমন করে মুসলমানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করানো যায় শিখে নাও আমার কাছ থেকে।

  • তুমুল লড়াই

    তুমুল লড়াই

    তুমুল লড়াই

    হলব, হারান ও মুশালের সেনাবাহিনী মার্চ করে রণাঙ্গণে ছুটে আসছিল। এদিকে সুলতান আইয়ুবীর পক্ষে কায়রো থেকে যে সাহায্য আসার কথা, তাও যে কোন সময় এসে পৌঁছে যেতে পারে। শত্রুদের আক্রমণ আগে হয়, নাকি মিশর থেকে সৈন্য সাহায্য আগে এসে পৌঁছে, এটাই এখন দেখার বিষয়। এ নিয়েই অধীর ছিলেন সুলতান। কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন, কায়রোর সাহায্য ছাড়া শত্রুর এ তুমুল অভিযান ঠেকানো যাবে না। কিন্তু সাহায্য আসার আগেই যদি আক্রমণ এসে যায়, তাহলে! এ নিয়েই চরম উৎকণ্ঠা ও পেরেশানীতে ভুগছিলেন তিনি। সময় কাটাচ্ছিলেন নানা রকম চিন্তা ভাবনা ও পরিকল্পনায়। বুদ্ধির শেষ শক্তিটুকুও ব্যয় করছিলেন এ কাজে। যদি সাহায্য আসার আগেই শত্রু আক্রমণ করে বসে, তবে এ সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে কেমন করে যুদ্ধ চালাবেন তার অসম্ভব সব পরিকল্পনা শোনাচ্ছিলেন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের। তাদের নির্দেশ দিয়ে বলছিলেন, ‘কমান্ডো বাহিনীকে পূর্ণ মাত্রায় প্রস্তুত ও সতর্ক রাখো। কখন সাহায্য এসে পৌঁছবে জানা নেই আমাদের, কিন্তু এদিকে আক্রমণ দ্রুত এগিয়ে আসছে। কমাণ্ডো বাহিনী দিয়েই তাদের আক্রমণ ঠেকাতে হবে।’

    সুলতানের পেরেশানী দেখে এক সেনাপতি বললেন, ‘আল্লাহর যা মঞ্জুর তাই হবে। এটা তো দুর্গ নয় যে, আমরা অবরোধের মধ্যে পড়ে যাবো। আমরা পাহাড়ের টিলা ও উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমনভাবে যুদ্ধ করবো, যেন দুশমন সহসা আমাদের দুর্বলতা টের না পায়।’

    অধিকাংশ সেনাপতি এবং কমাণ্ডোরাও এ নিয়েই ভাবছিলেন। বাইরে প্রকাশ না করলেও ভেতরে সবার মাঝেই বিরাজ করছিল টান টান উত্তেজনা।

    সন্ধ্যার লালিমা মুছে গেল। পাহাড়ের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁবুগুলো ঢেকে গেল রাতের আধাঁরে। দেখতে দেখতে রাত গভীর হলো। মুজাহিদরা শুয়ে পড়লো যে যার তাঁবুতে। যাদের ডিউটি ছিল তাঁবু পাহারার, তারা চলে গেল ডিউটিতে। কিন্তু অস্থিরতা ও পেরেশানীর কারণে কেউ ভালমত ঘুমাতে পারলো না। সেনাপতিদের তাঁবুর মধ্যে রাতভর প্রদীপ জ্বলতে থাকল। না ঘুমিয়ে যুদ্ধের নকশা এঁকে চললেন তারা। সুলতানের তাঁবুতেও প্রদীপ জ্বলছিল। তিনি ময়দান ও সেই পার্বত্য এলাকার নকশা আঁকলেন, যেখানে মনে মনে মোকাবেলা করবেন বলে ঠিক করেছেন।

    রোজার সেহরী খাওয়ার জন্য নাকারা বেজে উঠলো। সৈন্যরা দ্রুত গিয়ে শামিল হলো দস্তরখানে। সুলতানও এসে ওদের সাথে যোগ দিলেন। ঠিক সে সময় দু’জন সংবাদবাহক দু’দিক থেকে এসে পৌঁছলো সুলতাদের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে দু’টি খবরই তিনি এক সাথে পেয়ে গেলেন।

    প্রথম কাসেদ জানালো, ‘কায়রোর সৈন্য সাহায্য এসে গেছে। আজ ভোরেই আপনি ওদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করতে পারবেন।’

    দ্বিতীয় কাসেদ বললো, ‘শত্রু সৈন্য রণাঙ্গণ থেকে মাত্র আট-দশ মাইল দূরে এসে অবস্থান নিয়েছে। সম্ভবতঃ আগামী কাল ওরা আমাদের ওপর চড়াও হবে।’

    সুলতান তার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে জানতে চাইলেন শত্রুর সর্বশেষ গতিবিধির খবর। গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল কমাণ্ডার শত্রুর গতিবিধির বর্ণনা দিতে গিয়ে বললো, ‘শত্রুরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এক দল সামনে, দ্বিতীয় দল নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মাঝখানে রয়েছে, তৃতীয় দল অনেক পেছনে থেকে অনুসরণ করছে তাদের।’

    সুলতান আইয়ুবীর যা জানার দরকার ছিল, তা জেনে গেছেন। তিনি গোয়েন্দা বিভাগের কমাণ্ডারকে বললেন, ‘তুমি গিয়ে কমাণ্ডো দলের কমাণ্ডার ও কায়রো থেকে আসা সেনাদলের হাইকমাণ্ডকে জলদি ডেকে আনো। তাদের বলবে, আমি তাদেরকে আমার সাথেই সেহরী খাবার দাওয়াত দিয়েছি।’

    গোয়েন্দা বিভাগের কমাণ্ডার বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দু’হাত উপরে তুলে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন। উপস্থিত সৈন্যরাও হাত তুলল তাঁর সাথে। মোনাজাত শেষ করে তিনি বললেন, ‘তোমরা খাওয়া শুরু করো, আমি ওদের সাথে পরে বসবো।’

    তিনি নিজের তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং ওরা এসে পৌঁছার আগেই দু’রাকাত নফল নামাজ সেরে নিলেন। নামাজ শেষে তিনি আবার আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছেন, এ সময় কমান্ডো দলের কমান্ডার এসে পৌঁছলো। তার একটু পরেই কায়রো থেকে আসা বাহিনীর সালার এসে ঢুকল তাঁবুতে।

    সেহরীর সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল, সুলতান মেহমানদের সামনে সেহরীর খাবার পরিবেশন করার হুকুম দিলেন। খেতে খেতেই ওদের সাথে আলাপ শুরু করলেন সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী। প্রশ্ন করলেন, ‘কায়রো থেকে কত সৈন্য নিয়ে এসেছো?’

    সালার সৈন্যের পরিমান অবহিত করলো সুলতানকে। প্রয়োজনের তুলনায় এ সাহায্য সেনার পরিমাণ কমই ছিল, কিন্তু তাতে মোটেও বিচলিত হলেন না সুলতান। সংকট মুহুর্তে এটাকেই তিনি আল্লাহর রহমত মনে করলেন। বললেন, ‘আর অস্ত্রশস্ত্র?’

    কায়রো থেকে আনা অস্ত্রশস্ত্রের বিবরণ শুনে সুলতানের মন প্রশান্তিতে ভরে গেল। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল যথেষ্ট পরিমান ছোট-বড় মিনজানিক কামান, আর সেই সাথে গোলা বারুদও ছিল প্রচুর।

    সাহায্য হিসাবে আসা সৈন্যের পরিমাণ কম হলেও এরা সবাই ছিল চৌকস যোদ্ধা। পুরো বাহিনী থেকে বাছাই করে গঠন করা হয়েছিল এ বাহিনী। অভিযানের আগে ওদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। পরিমাণে অল্প হলেও ময়দানে ওরা কি ভয়ংকর তুফান সৃষ্টি করতে পারবে, জানতেন সুলতান। তাঁর শুধু একটিই আফসোস হলো, এ এলাকার পাহাড় ও টিলার প্রতিটি খাজের সাথে ওদের পরিচয় করানোর সময় পেলেন না তিনি।

    ইতিমধ্যে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হাসান বিন আবদুল্লাহও এসে পৌঁছলেন সেখানে। তিনি বললেন, ‘এইমাত্র হলব থেকে আমার এক গোয়েন্দা এসেছে। সে খবর এনেছে, খৃস্টানরা সম্মিলিত বাহিনীর তিনটি গ্রুপকেই তীর-ধনুক, গোলা-বারুদ এবং পাঁচশ করে ঘোড়া সাহায্য হিসাবে পাঠিয়েছে। গোয়েন্দা বলেছে, সে ওদের অভিযানে বেরিয়ে পড়তে দেখে এসেছে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, গোলা বারুদের ড্রামে উটের পিঠ বোঝাই হয়ে আছে। তবে কাফেলার সৈন্যদের মধ্যে কোনরকম উত্তেজনা ও সতর্কতার ভাব নেই। তারা পথ চলছে এলোমেলো ভাবে, নিরুদ্বিগ্ন মনে। খৃষ্টানরা ওদেরকে কয়েকটি করে মিনজানিক কামানও দিয়েছে। বুঝা যাচ্ছে, শত্রুরা এ যুদ্ধে প্রচুর মিনজানিক কামানও দিয়েছে। বুঝা যাচ্ছে, শত্রুরা এ যুদ্ধে প্রচুর মিনজানিক কামান ব্যবহার করবে। তাদের সাথে প্রচুর গোলা বারুদ এবং অগ্নি নিক্ষেপকারী তীরও রয়েছে।

    খাওয়ার পর সুলতান আইয়ুবী কমান্ডো দলের কমান্ডারকে কাছে ডাকলেন। তাকে বললেন, ‘তোমাকে তো সবকিছু আগেই বুঝিয়ে বলেছি। এখন তোমার কাজ কি করে আঞ্জাম দেবে সেটা তুমিই ভাল বুঝবে। তবে পরিকল্পনার সময় মনে রাখবে, যে পর্যন্ত শত্রুরা আক্রমণ না করে, সে পর্যন্ত তাদের ওপর কোন অতর্কিত আক্রমণ চালাবে না। সংবাদ অনুযায়ী তারা সোজা হেম্মাতের পর্বতশ্রেণী ধরে এগিয়ে আসছে। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে তাদের গতি থেমে যাবে। আমি চাই না তারা ওভাবে মাঝপথে বাঁধাপ্রাপ্ত হোক। তোমাদের জানা দরকার, আমি পাল্টা আক্রমণ করতে চাই না। শত্রুরা আমার আক্রমণ বুঝতে পারবে তখনি, যখন আমি পিছন থেকে তাদের ওপর কেয়ামতের ঝড় তুলবো। আমার এ কথা তোমরা খেয়াল রাখবে।’

    তিনি তাকে আরো বললেন, ‘আমাদের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হবে তখন, যখন শত্রুরা পিছন আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। তারা তখন ভয়ে এদিক-ওদিক পালাতে চেষ্টা করবে। তোমরা লক্ষ্য রাখবে, এ পাহাড়ী এলাকা থেকে যেন শত্রুদের একটি সৈন্যও পালিয়ে যেতে না পারে। তাদের অধিকাংশকে জীবিত ধরে বন্দী করবে। কারণ তারা মুসলমান। যখন ওরা তোমাদের হাতে বন্দী হবে, তখন তারা হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝতে পারবে। অন্তত আমি তাই আশা করি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে এসে যারা তীর ছুঁড়বে এবং আমাদের তীরে বিদ্ধ হয়ে মারা যাবে, তাদের মৃত্যু আমরা ঠেকাতে পারবো না।’

    তিনি কমাণ্ডারকে আরো বললেন, ‘তোমরা এ খবরও পেয়েছো, শত্রুরা প্রচুর গোলা-বারুদ বোঝাই করে সঙ্গে করে নিয়ে আসছে। এগুলো ব্যবহার করার সুযোগ ওদের দেয়া যাবে না। তোমরা দশ-বারো জন দক্ষ কমাণ্ডো নিয়ে ছোট ছোট কয়েকটি গ্রুপ তৈরী করো। তাদের দায়িত্ব হবে গোলা-বারুদের স্তুপে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া। দিনের বেলা ওরা ভাল করে দেখে নেবে গোলা বারুদের স্তুপ কোথায় আছে। তারপর রাতে চুপিসারে ওখানে পৌঁছে আগুন ধরাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, শত্রুরা এখনও নদীর কাছে আসেনি। তোমরা তোমাদের ঘোড়াগুলোকে দানাপানি খাইয়ে প্রস্তুত করে রাখো। নিজেদের মশকগুলোও পূর্ণ করে রাখো পানি দিয়ে। আবহাওয়া এখানে খুব ঠান্ডা। এটা মরুভূমিও নয় যে, কেউ এখানে পিপাসায় মরে যাবে। তবুও এটা যুদ্ধ পলিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, পানির অভাব সৈন্যদের দিশেহারা করে ফেলে।’

    কমাণ্ডারকে বিদায় করে তিনি কায়রো থেকে আসা সৈনিকদের সালারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তোমরা সবসময় মনে রাখবে, এটা মিশরের মরু অঞ্চল নয়। এখানকার পার্বত্য অঞ্চলে শীত খুব বেশী। সূর্য উঠলেও শরীর গরম হয় না। দিনের বেলায়ও শরীর গরম করতে হয় ছুটাছুটি করে। ‘সুযোগ মত আঘাত হানো, আর যে কোন দিকে পালিয়ে যাও’ এই পলিসিতে এখানে তোমাদের যুদ্ধ করতে হবে। এখানে লুকানোর যথেষ্ট সুযোগ ও জায়গা আছে। কি করে অতর্কিত আক্রমন করে দ্রুত পালিয়ে আসতে হয় সে প্রশিক্ষণ তোমরা পেয়েছো। কিন্তু তোমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এখানে ময়দান খুবই সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ। মরুভূমিতে তোমরা কয়েক মাইল চক্কর দিয়ে শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালাতে, ইচ্ছেমত পায়তারা করার জন্য সীমাহীন প্রান্তর পেয়ে যেতে। কিন্তু এখন এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টিলার মাঝখানে সীমাবদ্ধ ময়দানে তোমাদেরকে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। এখন আর সে সময় নেই যে, তোমাদেরকে পাহাড়ী অঞ্চলের প্রতিটি টিলা ও সমতলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। তাই এখানে নিজের বুদ্ধি বিবেককে সর্বোত্তম কাজে লাগাতে হবে তোমাদের। তীরন্দাজদেরকে পাথরের আড়ালে থেকেই নিশানা ঠিক করতে বলবে। আর ঘোড়াসওয়ারদের বলবে, ওরা যেন ওদের ঘোড়াগুলোকে কখনও উঁচু স্থানে নিয়ে না যায়। এখানে চড়াই উৎরাই এত বেশী যে, বার বার ওপর-নিচ করতে গেলে ঘোড়াগুলো দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’

    তিনি মিশর থেকে আগত সৈন্যদের সংরক্ষিত অবস্থায় রাখলেন। তাদের নেতৃত্ব দিলেন সুলতাদের সাথে অবস্থানকারী সেনা অফিসারদের হাতে। কারণ এসব সেনাপতিদের হাতেই ছিল বর্তমান যুদ্ধের বিস্তারিত প্ল্যান ও নকশা।

    ❀ ❀ ❀

    পাহাড়ের চূড়ায় ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়লো আজানের সুমধুর সুর। সুলতান আইয়ুবী পোশাক পাল্টে তাঁবুর ভেতরই ফজরের সুন্নত আদায় করলেন। তারপর কোষমুক্ত তরবারী তুলে নিলেন হাতে। সুলতানের হাতের মুঠিতে এখন খাপ মুক্ত তলোয়ার। তিনি নিবিষ্ট মনে তলোয়ারের ধার ও চমক দেখতে লাগলেন। সহসা উদ্বেলিত আবেগে নড়ে উঠলো তার হৃদয়তন্ত্রী। তিনি তলোয়ার খাপে ভরে কেবলার দিকে মুখ করে হাত তুললেন আকাশের দিকে। চোখ বন্ধ করে আল্লাহর দরবারে মিনতিমাখা স্বরে বলতে লাগলেন, ‘হে মহান রাজাধিরাজ, হে সর্বশক্তিমান! যদি এ যুদ্ধে আমার পরাজয়ে তুমি সন্তুষ্ট হও, তবে তাতেই আমি রাজি-খুশী। আর যদি এ যুদ্ধে তুমি আমাকে সফলতা দান করো, তবে তা হবে তোমার অপার করুণা। সে ক্ষেত্রে তোমার দরবারে জানাই লাখো শুকরিয়া। আজ এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, যারা তোমার প্রিয় হাবীব রাসূলে মকবুলের উম্মত বলে দাবী করছে নিজেদের। অথচ ইসলামের দুশমনদের প্ররোচনায় তারাই আজ ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে। যদি আমার ফয়সালা তোমার দৃষ্টিতে না-জায়েজ হয়, তবে হে আল্লাহ! তুমি তোমার কুদরতি মদদে তা আমাকে জানিয়ে দাও। আমি আমার তলোয়ার খাপে পুরে সরে দাঁড়াবো এ লড়াই থেকে। কারণ তুমি তো আমার অন্তরের খবর জানো, জানো আমার এ লড়াই বীরের খেতাব অর্জন বা রাজ্য জয়ের জন্য নয়!

    আমি তো শুধু ঐসব নারী ও শিশুদের আত্মার ক্রন্দন শুনে ছুটে এসেছি ময়দানে, যাদের মান ও সম্ভ্রম লুট করা হয়েছে কেবল এই অপরাধে যে, তারা তোমার রাসূলের উম্মত ছিল। হে আল্লাহ, আমাকে তোমার অসহায় বান্দাগণ ডাকছে। ডাকছে সেইসব বনি আদম, যারা মুসলমান হওয়ার অপরাধে কাফেরদের হাতে এখনো কঠিন উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে। আমি তো অস্ত্র ধরেছি তোমার দ্বীনের শ্রেষ্ঠত্ব ও তোমার প্রিয় হাবীবের উম্মতের মান-সম্ভ্রম রক্ষা করতে। কেবল এ জন্যই আমি অনবরত মরুভূমি, অরণ্য, আর পাহাড়ে, পর্বতে মাথা কুটে মরছি। আমি এগিয়ে চলেছি ইসলামের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসকে কাফেরদের অবৈধ অধিকার থেকে মুক্ত করতে, ওখানকার নিগৃহীত মুসলমানদের জান-মাল ও ইজ্জত বাঁচাতে। রাসূলের উম্মতেরই কিছু লোক আমার এ অগ্রযাত্রার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। হে প্রভু! তুমি আমাকে ইঙ্গিতে বলে দাও, তাদের রক্ত প্রবাহ করা আমার জন্য বৈধ না অবৈধ! হে আল্লাহ! আমি পথভ্রষ্টদের কাতারে শামিল হতে চাই না। যা সঠিক, যা সত্য, যা তোমার পছন্দ তুমি আমাকে সে পথে পরিচালিত করো। তোমার আলোর ইশারা দেখাও প্রভু। আর যদি আমার পথই সঠিক হয়ে থাকে, তবে আমাকে শক্তি দাও, সাহস দাও, ধৈর্য ও হিম্মত দান করো।’

    তিনি সিজদায় পড়ে গেলেন এবং এ অবস্থায় অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলেন। এক সময় মাথা তুললেন তিনি। দাঁড়িয়ে সহসা তিনি দৃপ্ত পায়ে বাইরে চলে এলেন। তাঁর চলার ভঙ্গিতে ছিল বলিষ্ঠতা ও গাম্ভীর্য। তিন দৃঢ় পদক্ষেপে সেখানে যাচ্ছিলেন, যেখানে অন্যান্য সেনা কমাণ্ডার ও সৈন্যরা জামায়েতে নামাজের জন্য একত্রিত হয়েছিল। ততক্ষণে নামাজের জামায়াত দাঁড়িয়ে শামিল হয়ে গেলেন জামাতে। তাঁর এক পাশে তাঁর বাবুর্চি ও অন্য পাশে এক কমাণ্ডারের আর্দালী এসে দাঁড়িয়ে গেল জামাতে।

    নামাজ শেষ করে সুলতান আইয়ুবী হিম্মাত পর্বতশ্রেণীর চূড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। রাস্তায় পর পর চারজন কাসেদের দেখা পেলেন তিনি। তারা মৌখিকভাবে সংবাদ পেশ করল সুলতানের কাছে। এরা ছিল তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্য। এদের দায়িত্ব ছিল হারান, হলব ও মুশালের সম্মিলিত বাহিনীর গতিবিধি ও তৎপরতার সংবাদ বয়ে আনা। এ কাজ রাত দিন অনবরত চলছিল। সুলতান আইয়ুবি কাসেদদের বিদায় দিয়ে এগিয়ে চললেন। তার সঙ্গে ছিলেন সেনাপতি শামস বখত। তাঁর ভাই শাদ বখতকে সুলতান অন্যত্র নিয়োগ করে ছিলেন।

    ‘শত্রুদের সম্পর্কে যে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আপনার কি মনে হয়, আমরা এ সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে পারবো?’শামস বখত জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘আমার কাছে এটা কোন সমস্যাই নয় যে, শত্রুরা কত সৈন্য এনেছে ও আমাদের কাছে কত সৈন্য আছে।’সালাহউদ্দীন আইয়ুবী উত্তর দিলেন, ‘আমি অস্থির হচ্ছি শুধু এই ভেবে, শত্রুরা এখনও কেন আক্রমণ চালাচ্ছে না। আমাদের ঐ মুসলমান ভাইদের কাছে খৃষ্টান উপদেষ্টা ও গোয়েন্দা আছে। খৃষ্টানরা কি এতই আনাড়ী হয়ে গেল যে, তারা জানতেও পারলো না, মিশর থেকে আমাদের সাহায্য আসছে, আর আমরা সাহায্য ছাড়া যুদ্ধ করতে পারবো না? যদি শত্রুরা তৎপর হতো তবে হয়তো এ সমস্যার একটা সমাধান বেরিয়ে আসতো। শত্রুরা কেন এভাবে এসে বসে আছে, আর আমাদেরকে এত সময় দিচ্ছে যে, আমরা সাহায্য পর্যন্ত পেয়ে গেলাম, তাই আমার বুঝে আসছে না। আমরা তাদের গতিবিধির খবর পেয়ে যাচ্ছি, আমাদের সামরিক অশ্বগুলোকে পানি পান করাতে পারছি; এ সুযোগ ওরা কেন দিচ্ছে তাই ভাবছি আমি। আমার সন্দেহ হচ্ছে, শত্রুরা এমন কোন চাল চালবে, যা হয়ত আমরা চিন্তু করতে পারছি না। আমার অবাক লাগছে এ জন্য, এরা তো এখানে খেল তামাশা করতে আসেনি।’

    ‘যতদূর আমি এদের সম্পর্কে জানি, এদের কাছে কোন চাল নেই।’শামস বখত বললেন, ‘আল্লাহর উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে, আল্লাহই তাদের মন ও মস্তিষ্কে মোহর মেরে দিয়েছেন। কারণ তারা হকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তাদের চোখের ওপর পর্দা পড়ে গেছে। আমি তাদের আচরণে কোন গভীর ও ভয়ংকর বিপদ আছে বলে মনে করি না।’

    ‘ভাই শামস বখত! সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আমারও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা আছে, কিন্তু আমি অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তবটাই দেখে থাকি। সত্যের ওপর মিথ্যাও কখনো কখনো বিজয়ী হয়। যখন সত্যের অনুসারীরা বাতিলের কাছে নতজানু হয় অথবা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভূল করে, বিজয় তাদের কাছ থেকে পালিয়ে যায় অনেক দূরে। সত্য সব সময় চায় কোরবানী, যদি আমরা কোরবানী দিতে প্রস্তুত থাকি তবে সত্যের জয় অবশ্যই হবে। বাতিলের যে শক্তি আছে, তার মোকাবেলা আমরা যুদ্ধের ময়দানেই করবো। আমাদের দৃষ্টি সব সময় সত্যের দিকে সদা সতর্ক রাখতে হবে। সেই সাথে শরীর ও মনের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করতে হবে সত্যকে বিজয়ী করার জন্য। এর পরে যা ঘটে তা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এখন আমাদের যেমন আনন্দিত হওয়া উচিত নয়, তেমনি হতাশ হওয়ারও কোন কারণ নেই।’

    তিনি অশ্বপৃষ্ঠ থেকে অবতরণ করলেন। সেনাপতি শামস বখত, দু’জন উপদেষ্টা ও রক্ষীরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সুলতানের দেখাদেখি তারাও সবাই অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে পড়লেন। সেনাপতি শামস বখত এবং দু’জন উপদেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি উঁচু পাহাড়ী টিলায় পৌঁছলেন। টিলার উল্টো পাশে তাঁদের সামনে এক বিরাট সমতল উপত্যকা। উপত্যকাটি পর্বত শৃঙ্গের পাশ দিয়ে সামনে প্রশস্ত হয়ে এগিয়ে গেছে। সামনের উপত্যকাটির মতই তাদের পিছনেও সমান্তরাল উচ্চ ভূমি। তার মাঝ দিয়ে একটি গিরিপথ এগিয়ে গেছে এঁকেবেঁকে। টিলার পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মিশেছে সামনের উপত্যকায়। বিশাল মাঠের মত খোলা উপত্যকাটি এতক্ষণ লুকিয়েছিল এই টিলার আড়ালে। সুলতান ও তাঁর সঙ্গীরা টিলায় উঠে দাঁড়াতেই তাঁদের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই খোলা ময়দান। তাঁরা তাকিয়ে দেখলো, অদূরে ময়দানের মাঝে শত শত তাঁবু টানানো। একদিকে সৈন্যদের ঘোড়ার সারি বাঁধা। সিপাইরা সেখানে ঘোরাফিরা করছে। কেউ কেউ শুয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের দেখে হচ্ছিল, তাদের মনে এমন কোন ভয় নেই যে, তাদের ওপর কোন বাহিনী কখনো আক্রমণ করে বসতে পারে। যদি তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতো হবে তাদের তাঁবু মাটিতে পড়ে থাকতো। তাদের অশ্বপৃষ্ঠে জীন আঁটা থাকতো। ‘এই বাহিনীর সেনাপতি ও কমাণ্ডারদেরেকে আমি যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তোমরা তিনজন তা আবার শুনে নাও।’সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এমনও হতে পারে, তোমাদের আগেই আমি মারা যেতে পারি। যুদ্ধ শুরু হবার শুরুতেই যদি আমি মারা যাই তবে যুদ্ধের দায়িত্বভার তোমরা গ্রহণ করবে। আমি তাদেরকে বলে দিয়েছি, তোমরা তাঁবু টানিয়ে থাকতে পারো, অবসর অবস্থায় তোমরা ঘোরাফেরাও করতে পারো, কিম্বা এদিক-ওদিক বসে বা শুয়ে থাকতে পারো, কিন্তু তাঁবুতে তোমরা সব সময় অস্ত্র প্রস্তুত রাখবে আর ঘোড়ার পিঠে জীন এঁটে রাখবে। শত্রুর গোয়েন্দারা তোমাদের দেখছে। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও, তোমরা শত্রুদের কোন খবর রাখো না। যখন শত্রু সৈন্য উপস্থিত হবে, তখন তোমরা এমন ভাব করবে, যেন খুব ভয় পেয়ে গেছো। তোমরা সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করবে না। শত্রু যদি তোমাদের আক্রমণ করে উপত্যকায় চলে আসে, তখন তোমরা যুদ্ধ করতে করতে আস্তে আস্তে পিছু হটে যাবে, যাতে তাদের পুরো সৈন্যদল এ উপত্যকায় এসে যায়। তারপর তারা যখন আমাদের ঘেরাওয়ের মধ্যে আটকে যাবে তখন শত্রুদের পিছু হটার সুযোগ দিও।

    সুলতান আইয়ুবী দুই সমান্তরাল উপত্যকার মাঝামাঝি গিরিপথের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘আমি আমার এ সৈন্যদের বলে দিয়েছি, তারা যেন এ গলির মধ্যে এসে আবার ফিরে যায়। তাদেরকে কোথায় একত্রিত হতে হবে সে স্থানও বলে দিয়েছি। তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে সে জায়গা দেখিয়ে বললেন, ‘এ দলগুলোকে শত্রুদের পিছনে যেতে হবে। এ উপত্যকায় আমরা শত্রুদের অভ্যর্থনার জন্য যে ব্যবস্থা করে রেখেছি, তা তোমরা জানো। বন্ধুগণ! তোমরা স্মরণ রেখো, এখানে আমাদের কোন অঞ্চল অথবা কোন দুর্গ জয় করা লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু শত্রুদেরকে অসহায় ও নিষ্ক্রিয় করা, যাতে তারা আমাদের পথ থেকে সরে দাড়াঁয়।

    আমি মুসলমান ভাইদেরকে দুশমন ভাবতে লজ্জাবোধ করি; কিন্তু অবস্থার চাপে আজ তাই করতে বাধ্য হচ্ছি। আমি এদের ধ্বংস করতে চাই না, চাই নিরস্ত্র করতে। আমি নির্দেশ দিয়ে রেখেছি, যতদূর সম্ভব অধিক সংখ্যক শত্রকে জীবিত বন্দী করতে। যুদ্ধ বন্দী হিসেবে আটকানোর পর আমি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করবো, তোমরা মুসলমান, তোমরা আল্লাহর সৈনিক। তোমাদের বাদশাহ তোমাদেরকে ইসলামের শত্রুদের খেলার পুতুল বানাতে চাচ্ছে।’

    সেনাপতি শামস বখত বললেন, ‘কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে সে জাতির মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দাও’খৃষ্টানরা এখন এ নীতিকে সফলভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

    ‘মুসলমান জাতির দৃষ্টান্ত বারুদের মত।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এ জাতির আবেগে ঈমানী আগুন জ্বালাতে হবে। তাদের আবেগের উত্তপ্ত বারুদের স্তুপে যদি কোন রকমে একবার ঈমানী আগুনের ছোঁয়া লাগানো যায়, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বোমার মত বিস্ফোরণ ঘটবে। মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে, বিলাসপ্রিয় রাজা বাদশা আর সাধারণ জনগণ সবার মাঝেই এ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। মানুষের আবেগ বারুদের চাইতেও তীব্রতর হয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে। যদি কখনো জাতীয় জীবনে তেমন বিস্ফোরণ ঘটে তবে দুনিয়ার কোন শক্তির সাধ্য নেই তাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে। যদি তাদের আবেগের ঘরে এ আগুন জ্বালানো না যায়, তবে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াভহ পরিণতি। তখন এ জাতির আর কোন সহায় থাকবে না। খৃষ্টানরা তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে। জাতির নেতা ও আমীররা রাজ্য ও ক্ষমতার লোভে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাবে মৃত্যু ধ্বংসের দিকে। তারা একে অপরকে ধোঁকা দিয়ে নিজেই মুসলিম সাম্রাজ্যের বাদশাহ হতে গিয়ে ধ্বংস হবে নিজেরা, ধ্বংস করবে মিল্লাতকে। আমি এদের রাজ্য লিপ্সা ও ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সঠিক ইসলামের পথে আনার চেষ্টা করছি মাত্র। আমার সামনে ইসলামের সুরক্ষা ও বিস্তার ঘটানো ছাড়া আর কোন কাজই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

    ❀ ❀ ❀

    হিম্মাত পর্বত শ্রেণীর অল্প দূরেই হারানের দুর্গ। দুর্গাধিপতি গুমাস্তগীন নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি তার সেনাপতি ও ছোট বড় কমাণ্ডারদের একত্রিত করে বললেন, ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খৃষ্টানদের পরাজিত করতে পারেন, কিন্তু যখন তিনি তোমাদের সামনে আসবেন, আমর বিশ্বাস, তখন শিয়ালের সকল চালই ব্যর্থ হয়ে যাবে। তিনি এ দেশের লোক নন, কুর্দিস্তানের বাসিন্দা। তোমরা আরব, পাক্কা মুসলমান। তিনি যত বড় ধূর্ত ও প্রতারকই হোক না কেন, তার প্রতারণার ফাঁদে আমরা পা দিতে পারি না। তিনি এদেশ দখল করে এ অঞ্চলের বাদশাহ হতে চান। আমি তার যুদ্ধের কলা-কৌশল তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি।

    তাঁর কাছে বর্তমানে খুব অল্প সৈন্য আছে। তিনি সেই সামান্য সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের বেষ্টনীর মধ্যে পড়ে আছেন। একটু আগে গোয়েন্দা জানিয়েছে, তার সৈন্যরা তাঁবুর মধ্যে শুয়ে আরাম করছে। তাদের ঘোড়াগুলোও যুদ্ধের অবস্থায় নেই। এটা দুই কারণে হতে পারে, এক. তাঁর হয়ত বিশ্বাস, আমরা তাঁকে পরাজিত করতে পারবো না। অথবা তাঁর ধারণা, আমরা তার ওপর আক্রমণ করারই সাহস পাবো না। কিছুদিন পর তিনি আমাদের কাছে আপোষের জন্য দূত পাঠাতে পারেন। কিন্তু আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমরা তাঁর সঙ্গে কোন আপোষ মীমাংসা করবো না। তিনি তো এখন আমাদের হাতে বন্দী। যদি তাকে জীবিত দেখাতে না পারি তবে তাঁর লাশ তোমাদেরকে অবশ্যই দেখাবো। তোমাদের সৈন্যদের বলে দাও, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইমাম মেহেদী নন, কোন পয়গম্বরও নন। আর তার সেনাবাহিনীতে কোন জ্বীন-ভূতও নেই। আমরা তার সৈন্য বাহিনীকে অতর্কিত আক্রমণ করে শেষ করে দেবো। তাদের কাউকে পালানোর সুযোগ দেবো না।’

    তিনি তাঁর শ্রোতাদের উত্তেজিত করে নিজের বিশ্রাম কক্ষে চলে গেলেন। তার বিশ্রাম কক্ষ মানে রাজ প্রসাদের মত জমকালো এক তাঁবু। সে বিশাল কামরা জুড়ে বিছানো ছিল রঙিন গালিচা। গালিচার ওপর শাহী পালঙ্ক পাতা। পালঙ্কের পাশে মদের সুরাহী ও সুদৃশ্য পিয়ালা সাজিয়ে রাখা। ভেতর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল রাজ মহলের কামরা। আশেপাশে আরো অনেক তাঁবু, যেগুলো সৈন্যদের তাঁবু থেকে পৃথক ও মনোরমভাবে সুসজ্জিত ছিল। এগুলোতে নাচ-গানের মেয়েরা থাকতো। এসব তাঁবুর পাহারায় পাহারাদার নিযুক্ত ছিল।

    গুমাস্তগীন ভাষণ শেষ করেই দ্রুত তার কামরায় ঢুকে গেলেন। তিনি ভেতরে প্রবেশ করতেই লাইন ধরে সুন্দরী মেয়েরা খাবারের সাজানো ডালি হাতে ভেতরে প্রবেশ করলো। গুমাস্তগীনের ইঙ্গিত পেয়ে ওরা খাবার পরিবেশন শুরু করলো। মদের সুরাহী এলো। গুমাস্তগীন নয়জন মেহমানকে সাথে নিয়ে খেতে বসলেন।

    নয়জন মেহমানই খাবার প্লেটের ওপর যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লো। তারা গোস্তের বড় বড় টুকরো হাতে নিয়ে গ্রোগ্রাসে গিলতে শুর করলো। সেই সাথে মদও পান করতে লাগলো পানির মত। মদের প্রভাবে খাওয়া শেষ হবার আগেই ওদের চোখে নেশার ঘোর লেগে গেল। চোখগুলো হয়ে উঠল রক্তের মত লাল।

    তিন চারজন যুবতী তাদের পিয়ালায় মদ ঢেলে দিচ্ছিল। ওরা খাচ্ছিল আর সুযোগ পেলেই মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছিল। কেউ মেয়েদের বাহু ধরে টেনে নিজের কোলে বসাতে চাচ্ছিল। এভাবে খাওয়া ও মেয়েদের উত্যক্ত করার কাজ একই সাথে চলতে থাকে। ওমাস্তগীন তাদের এ অসভ্য আচরণ দেখে হাসতে থাকেন। কিন্তু সে হাসিতে আনন্দ না বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছিল, ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না।

    খাওয়ার পর্ব শেষ হলে গুমাস্তগীন মেয়েদের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন এবং মেহমানদের সাথে গল্প-গুজবে মেতে উঠলেন। এক সময় বললেন, ‘এখন আর গল্প করার সময় নেই। এখন তোমাদের যেতে হবে সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর কাছে। খবরদার, এবারের আঘাত যেন শুন্যে না যায়।’

    ‘আপনি যদি আমাদেরকে থামিয়ে এ মেহমানদারীতে আটকে না রাখতেন, তবে এতক্ষণে আপনি শুনতে পেতেন, সালাহউদ্দীন আইয়ুবী আর এ দুনিয়ায় নেই।’এক ব্যক্তি বললো।

    এরা ছিল হাসান বিন সাবাহার সেই নয় ফেদাইন খুনী, যাদেরকে তাদের মুর্শিদ শেখ মান্নান ত্রিপলী থেকে সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিল। এরা প্রকাশ্যে মানুষ হিসেবে পরিচিত হলেও স্বভাবে ছিল বন্য পশুরও অধম। তারা প্রত্যেকে তাদের ডান হাতের মাঝের আঙ্গুল কেটে দশ ফোটা রক্ত পিয়ালায় রেখে তার সঙ্গে মদ ও হাশিশ মিশিয়ে পান করে নিলো। তারপর তারা গুমাস্তগীনেকে স্বাক্ষী রেখে শপথ করলো, ‘সুলতান আইয়ুবীকে এ যাত্রায় হত্যা করবো আর হত্যা করতে না পারলে কেউ জীবিত ফিরে আসবো না।’

    শেখ মান্নান তাদেরকে দুনিয়াত্যাগী দরবেশের পোশাকে পাঠিয়েছিল। তাদের হাতে ছিল তসবীহ, গলায় ছিল কোরআন। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা যেন এই পোশাকে, এই ভঙ্গিতেই সুলতান আইয়ুবীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়। সুলতাতের কাছে তাদের বক্তব্য হবে, মুসলমানের বিরুদ্ধে যেন কোন মুসলমান যুদ্ধ না করে। তারা বিবাদমান উভয় দলের মধ্যে আপোষ করার দায়িত্ব নেবে এবং শালিসী করতে গিয়ে এক গোপন বৈঠকে তারা সুলতান আইয়ুবীকে হত্য করবে।

    শেখ মান্নান পথটি ভালই বেছে নিয়েছিল। কারণ সুলতান আইয়ুবী ধার্মিক ব্যক্তিদেরকে সমাদরে পাশে বসাতেন ও তাদের কথা আগ্রহের সাথে শুনতেন। তার দ্বিতীয় দুর্বলতা ছিল, কেউ মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার দায়িত্ব নিলে তিনি তাকে স্বাগত জানাতে কখনো কার্পন্য করতেন না। কারণ তিনি মনে করতেন, এতে খৃষ্টানদের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও আক্রমণের সুযোগই নষ্ট হবে।

    আপোষ রফার জন্য তিনি নিজেও হলব ও অন্যান্য স্থানে দূত পাঠিয়েছিলেন, যারা অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিল। কিন্তু এখন এই জোব্বা পরা সুফী মানুষগুলো, যারা জোব্বার ভেতরে খঞ্জর ও তলোয়ার লুকিয়ে তাকে ধোঁকা দিতে আসছে, তাদেরকে সরল বিশ্বাসে সহজেই সাদর অভ্যর্থনা জানাবেন, এমনটি আশা করা মোটেই অন্যায় ছিল না। আর তিনি এমনটি করলে তাকে তারা সহজেই হত্যা করতে পারবে, এ বিশ্বাসও তাদের ছিল। ত্রিপোলী থেকে যাত্রা করে তারা সোজা হারানে গিয়ে পৌঁছেছিল। গুমাস্তগীনকে তার খৃষ্টান উপদেষ্টারা বলেছিল, সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে আসা এ নয় ফেদাইন খুনীকে যেন তিনি সহযোগিতা করেন। এ জন্যই তিনি তাদেরকে সঙ্গে করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধ না করেই যদি সুলতানকে হত্যা করা যায় তবে সে চেষ্টাই আগে করা উচিত।

    তাদের বিদায় জানাতে গিয়ে গুমাস্তগীন বললেন, ‘আমি তোমাদের সাফল্য কামনা করছি। কিন্ত সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সম্পর্কে তোমাদের যথেষ্ট হুশিয়ার থাকতে হবে। তোমরা যে সুফীর বেশ ধরেছ তাতে তার সন্দেহ হতে পারে। কারণ কয়েকবার হত্যা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তিনি এখন আরও সতর্ক থাকবেন। তাঁর সাথে আরও দু’জন হুশিয়ার ব্যক্তি আছে, একজন আলী বিহ সুফিয়ান ও অন্যজন হাসান বিন আবদুল্লাহ। এরা প্রথম দৃষ্টিতেই মানুষের অন্তরের কথা পর্যন্ত পড়ে নিতে পারে। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী আমি জানতে পেরেছি। যদিও আলী বিন সুফিয়ান এখন কায়রোতে অবস্থান করছেন কিন্তু হাসান বিন আবদুল্লাহ তাঁর কাছেই আছে।

    সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে আগন্তুক দেখা করতে এলে একাধিক সেনাপতি ও হাসান বিন আবদুল্লাহ তাদেরকে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন। যদি তাদের সন্দেহ হয় তবে তারা দেহ তল্লাশীও নিতে পারে।

    সুলতান আইয়ুবী বা হাসান বিন আবদুল্লাহর মনে এমন ধারণা আসতেই পারে, তোমাদের এ প্রস্তাবের পেছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে। নয়তো হঠাৎ আজ তোমাদের মনে এ আপোষের চিন্তা এলো কেন? আইয়ুবী আরও জিজ্ঞেস করতে পারেন, যে প্রশ্নের কোন সদুত্তর তোমরা দিতে পারবে না। তাতে তোমাদের মুখোশ খুলে যাবে। তিনি নিজে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। ধর্ম ও ইতিহাসে তার গভীর পাণ্ডিত্যের কথা সবার জানা। তাছাড়া তোমাদের মুখে দাড়ি ছাড়া দরবেশীর আর কোন চিহ্ন নেই। তোমাদের চার জনেরই দাড়ি এখনও ছোট। তাতে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে, মাত্র মাসখানেক আগে থেকে তোমরা দাড়ি বাড়ানো শুরু করেছো। তোমাদের চেহারায় মদ হাশিশের নেশা এখনও লেগে আছে। তোমাদের চেহারায় পবিত্রতার এমন কোন লেশ মাত্রও নেই, যা দেখে তিনি প্রভাবিত হবেন। বিদায় জানানোর মুহুর্তে এ কথাগুলো তোমাদের বলে দেয়া আমি জরুরী মনে করেছি। আশা করি আমার এ স্পষ্ট উচ্চারণে তোমরা কেউ অসন্তুষ্ট হওনি।’

    কথাগুলো শুনে নয়জনের একজনও কোন প্রতি উত্তর করলো না। তবে তাদের নেতা বললো, ‘হ্যাঁ, আমরা আপনার প্রত্যেকটি কথায় একমত! যদি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আমাদেরকে সুফী দরবেশ মনে করে আপ্যায়ন করেন, সম্মান করেন এবং তাঁর তাঁবুতে ডেকে নিয়ে যানি, তবে আমার এ সাথীরা তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আমাদের কারোরই সুফী দরবেশদের আদব কায়দা ভাল করে জানা নেই। এ অবস্থায় আপনি কোন পরামর্শ দিলে আমরা তা বিবেচনা করে দেখতে পারি।’

    ‘আমার মাথায় খুবই সহজ ও ঝুঁকিহীন পদ্ধতি আছে।’

    গুমাস্তগীন বললেন, ‘আমি তোমদেরকে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সাজিয়ে হিম্মাত পর্বত শ্রেণীতে পাঠাতে চাই। তার রক্ষীবাহিনীতে খুব বাছাই করে লোক নিয়োগ করা হয়। নিয়োগের আগে তাদের বংশ পরিচয়ও নেয়া হয়। সে কারণে তোমরা যাওয়ার সাথে সাথেই রক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ পাবে, তা মনে করো না। অবশ্য একটি কাজ করলে সফল হওয়ার সম্ভানা আছে। গোয়েন্দা জানিয়েছে, দামেশকের লোকেরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পক্ষে বিরাট উদ্দীপনা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য আসছে। সুলতান আইয়ুবী সে সব স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে নিচ্ছেন। তোমরা এ সুযোগ নিতে পারো।’

    তিনি একটি কাঠের বাক্স খুললেন। তার মধ্য থেকে নতুন পোশাক বের করে ফেদাইনদের বললেন, ‘তোমরা এই পোশাক পরে সুলতান আইয়ুবীর কাছে যেও। এটা তাঁর রক্ষীবাহিনীর পোশাক। তোমাদের একজনের হাতে সুলতান আইয়ুবীর পতাকা থাকবে। অন্য আটজনের হাতে লাঠির সাথে সেনাবাহিনীর পতাকা থাকবে। তোমরা সোজাসুজি সুলতান আইয়ুবীর কাছে যেতে চাইবে। কিন্তু তাঁর রক্ষীরা তোমাদের বাঁধা দিলে তোমরা আবেগ ও উদ্দীপনার সাথে বলবে, আমরা স্বেচ্ছাসেবক, দামেশক থেকে এসেছি। আমরা সুলতান আইয়ুবীর রক্ষী দলে ভর্তি হতে চাই। এ জন্য আমরা তার রক্ষী দলের পোশাক পর্যন্ত তৈরী করে নিয়ে এসেছি। সুলতান আইয়ুবীর হেফাজতের জন্য আমরা আমাদের জীবন কোরবান করতে চাই। আমাদেরকে সুলতান আইয়ুবীর রক্ষী দলে অথবা কমাণ্ডো বাহিনীতে ভর্তি করে নাও। তারা গড়িমসি করলে বলবে, আমরা কিছুতেই ফিরে যাবো না। কিন্তু শেষ পর্যন্তও তোমাদেরকে সুলতানের কাছে যেতে না দিলে অনুনয় বিনয় করে বলবে, আমরা অনেক দূর থেকে বড় আশা নিয়ে এসেছি। আমাদেরকে অন্তত একবার সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দাও, তিনি আমাদের আর্জি মঞ্জুর না করলে আর তোমাদের বিরক্ত করবো না।

    আমি তোমাদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তিনি আবেগের বড় মূল্য দেন। তিনি তোমাদের সাথে অবশ্যই সাক্ষাৎ করবেন। লাঠির মাথায় পতাকা জড়ানো বর্শা তো তোমাদের হাতেই থাকবে। যদি তিনি বাইরে সাক্ষাৎ দেন, তবে তোমরা ঘোড়া ছুটিয়ে তার কাছে যাবে। কিন্তু অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নামবে না। কাছে গিয়ে বর্শা দিয়ে দেহ ঝাঝরা করে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে আসবে। তোমরা সকলেই তো জীবন বাজী রেখে শপথ করেছো। আমার মনে হয় সাহস ও বুদ্ধি খাঁটিয়ে কাজ করতে পারলে তোমরা সকলেই জীবিত ফিরে আসতে পারবে। আমার বিশ্বাস, সুলতান আইয়ুবীকে ক্ষত-বিক্ষত দেখলে তার সৈন্যদের মাঝে নৈরাশ্য নেমে আসবে। যুদ্ধ করার পরিবর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। যখন সৈন্যরা হতবিহবল হয়ে ভাবতে থাকবে, এমনটি কি করে ঘটলো, কি হলো, কি ব্যাপার এবং এ নিয়ে হৈ চৈ করতে থাকবে তখন তোমরা ঘোড়া ছুটিয়ে নির্বিঘ্নে চলে আসতে পারবে। আমি তোমাদেরকে এমন তাজাদম আরবী ঘোড়া দিচ্ছি, যেগুলোর পিছু ধাওয়া করা বাতাসের পক্ষেও অসম্ভব।’

    ‘এটা তো খুবই চমৎকার পরিকল্পনা!’ফেদাইন খুনীদের সরদার উৎসাহিত হয়ে বললো, ‘আমাদের সেই সাথী হতভাগারা আনাড়ী ও কাপুরুষ ছিল। কি লজ্জার কথা, তারা শয়ন অবস্থায় পেয়েও তাকে হত্য করতে পারলো না, উল্টো তাঁরই হাতে মারা গেল। আর যারা বেঁচে গেল তারা ধরা পড়লো। এখন আমরা যাচ্ছি, যদি আমরা তার শিরচ্ছেদ করতে নাও পারি, তবে একথা অবশ্যই শুনতে পাবেন, সুলতান আইয়ুবী আর জীবিত নেই।’

    ‘আর আমি যদি তাঁকে হত্যা করে ফিরে আসতে পারি তবে? তবে….’এক ফেদাই হেরেমের সুন্দরী মেয়েদের দিকে ইশারা করে শয়তানী হাসি হেসে বললো, ‘ওই সুন্দরীকে আমার চাই।’

    গুমাস্তগীনও শয়তানী হাসি হেসে বললেন, তোমাদের মধ্যে যেই জীবিত ফিরে আসুক, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে খুন করে আসতে পারলে আমি তাকে এমন পুরস্কার দেবো, যাতে তার দীল ঠাণ্ডা হয়। খৃষ্টানরা তাকে যে পুরস্কার দেবে তার থেকে অনেক বেশী ধন-সম্পদ আমি তাকে দেব, যে ধন-সম্পদের কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। আর তোমাদের মধ্যে যে সুলতান আইয়ুবীর শির কেটে আনতে পারবে, তাকে তার পছন্দ মত দু’টি সুন্দরী মেয়ে চিরদিনের মত দান করে দেবো।’

    ফেদাইনদের চোখগুলো লোভে বড় হয়ে গেল। সেখানে খেলা করতে লাগল চিকচিকে অসভ্য উল্লাস। তারা খুশীতে চিৎকার দিয়ে উঠল এবং হো হো করে হাসতে লাগলো। গুমাস্তগীন তাদের ধমক দিয়ে বললেন, ‘থামো। আগে কাজ পরে পুরস্কার। এসো তোমাদেরকে দামেশক থেকে হিম্মাত পর্বতশৃঙ্গের দিকে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেই। তোমরা এখান থেকে বেরিয়ে ঘুরপথে দূর দিয়ে ঘুরে দামেশকের রাস্তায় গিয়ে পৌঁছবে। কিন্তু লক্ষ্য রাখবে, রাস্তায় কেউ তোমরা কে এবং কোত্থেকে আসছো জিজ্ঞেস করলে শুধু এ কথাই বলবে, আমরা দামেশক থেকে আসছি। এখন যুদ্ধের ময়দানে যাচ্ছি। কারণ রাস্তায় তোমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গোয়েন্দা ও কমাণ্ডো বাহিনীর সামনে পড়বে। যাও, এখন বিশ্রাম করো, রাতে যাত্রা করবে।’

    ‘রাতে! কেন, এখন রওনা করা যায় না?’এক ফেদাইন জিজ্ঞেস করলো।

    ‘না, দিনের বেলা এখান থেকে রেরোনো ঠিক হবে না।’গুমাস্তগীন উত্তর দিলেন, ‘তোমাদেরকে অনেক রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। দু’দিন পর গিয়ে পৌঁছবে সেখানে। আস্তে ধীরে পথ চলবে। ঘোড়াগুলোকে কিছুতেই ক্লান্ত করবে না। ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়লে পালানো সময় বিপদে পড়ে যেতে পারো।’

    গুমাস্তগীন কাঠের বাক্স থেকে পোশাক বের করে ওদের হাতে দিতে দিতে বললেন, ‘নাও, পরে দেখো গায়ে ঠিকমতো লাগে কিনা!’এরপর আস্তাবলের দারোগাকে ডেকে বললেন, ‘একটু আগে যে ঘোড়াগুলোকে আমি বেছে আলাদা করে রেখেছি, এদের জন্য সে নয়টি ঘোড়া নিয়ে এসো।’

    মাঝ রাতের পর নয়জন অশ্বারোহী ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সোজা দামেশকের পথে রওয়ানা হলো। অগ্রবর্তী অশ্বারোহীর হাতে সুলতান আইয়ুবীর পতাকা, অন্য আটজনের বর্শার ফলকের মাথায় সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীর ছোট ছোট পতাকা জড়ানো।

    গুমাস্তগীন যে দিন তার সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের সামনে উত্তেজিত ভাষণ দিয়েছিলেন, সে দিনেরই ঘটনা। হলবে সাইফুদ্দিনও তার সৈন্যদের সামনে অনুরূপ আগুন ঝরা ভাষণ দান করলেন।

    সাইফুদ্দিনের ভাষণ শেষে সৈন্যদের সামনে উঠে দাঁড়ালেন হলবের সেনাপতি। ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তিনি বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর বজ্রকণ্ঠে সৈন্যদের বললেন, ‘এই সেই সালাহউদ্দিন, যিনি গত বছরও হলব অবরোধ করেছিলেন। তোমরাই এ সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও তাঁর অপরাজেয় বাহিনীকে বিতাড়িত করেছিলে। কাবার প্রভূর কসম! সুলতান সালাহউদ্দিন ও তাঁর বাহিনী যে দূর্গ বা শহর অবরোধ করে, জয় ছিনিয়ে না নেয়া পর্যন্ত তারা ক্ষান্ত হয় না। সেই তিনি কেন হলব জয় করতে পারলেন না? কেন অবরোধ উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন? কারণ তোমরা সিংহ! তোমরা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করার সৈনিক! তোমরা শহর থেকে বাইরে বেরিয়ে তাঁর ওপর যে আক্রমণ চালিয়েছিলে, তিনি সে আক্রমণ সহ্য করতে পারেননি। বিজয় তাদেরই হয়, যাদের আল্লাহ বিজয় দান করেন। আর আল্লাহ তাদেরই বিজয় দান করেন, যাদের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি তোমাদের ওপর ছিল বলেই তোমরা সেদিন বিজয়ী হয়েছিলে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ওপর আল্লাহ কেমন করে খুশী থাকবেন? তিনি তো ডাকাত! লুটেরা! তিনি অবৈধভাবে দামেশকের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছেন। তার দাপটের কাছে মানুষের জান-মাল নিরাপদ নয়, নিরাপদ নয় নারীর সম্মান ও ইজ্জত। তার কারণেই আমাদেরকে দামেশক ছেড়ে হলবে আসতে হয়েছে। হে আল্লাহর সৈনিক! মুসলমান হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছো, আইয়ুবীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার সময় এ কথা চিন্তা করার কোন অবকাশ নেই। ওই মুসলমান কাফেরের চেয়েও খারাপ, যে মুসলমানের দেশ কেড়ে নিয়ে সেখানে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে। এ জালেম আমাদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। আর কুরআন জালেমের বিরুদ্ধে জেহাদ করাকে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ করে দিয়েছে। তাই তোমাদের যদি দেশের ওপর মায়া থাকে, নিজের ওপর মায়া থাকে আর নিজের বুকে থাকে ঈমানী আগুন, তাহলে জালেম আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জেহাদ করা, তাকে হত্যা করে দেশ এবং জাতিকে রক্ষা করা তোমাদের ওপর ফরজ হয়ে গেছে।

    হে খেলাফতের রক্ষীরা! তোমাদের শত্রু খৃষ্টানরা নয়, তোমাদের শত্রু এখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও তাঁর সৈন্য বাহিনী। খৃষ্টানদেরকে মুসলমানের শত্রু তিনিই বানিয়েছেন। নূরুদ্দিন জঙ্গী জাতির ওপরে সবচে বড় অবিচার করে গেছেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে মিশরের আমীর করে। অথচ এ ব্যক্তি সামান্য একটি সেনাদলের কমাণ্ডার হওয়ারও যোগ্য ছিল না। আমি তাকে আমার বাহিনীতে সাধারণ সৈন্য হিসেবেও রাখবো না।

    বন্ধুরা! ‘পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে’আইয়ুবীর এখন সেই পাখা গজিয়েছে। মৃত্যুই তাকে টেনে নিয়ে এসেছে এ পাহাড়ী অঞ্চলে। এখন তাঁর সামনে আছে তোমাদের উদ্যত তলোয়ার ও বর্শা। সামনে আছে তোমাদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী। আর তাঁর পিছনে নিরেট পাহাড় ও পার্বত্য অঞ্চল।

    তোমাদের এ বিশাল বাহিনী তার গুটিকয় সৈন্যের সামনে যখন যাবে, আমার আফসোস হচ্ছে, পিঁপড়ের মত পিষে মারার জন্য অনেকেই তার কোন সৈন্য ভাগে পাবে না।

    বন্ধুরা আমার! তোমাদেরকে হলব অবরোধের প্রতিশোষ নিতে হবে। প্রতিশোষ নিতে হবে তার জুলুম ও বর্বরতার। এখন যদি তোমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে সেই পাহাড়ী প্রান্তরে পিষে মারার জন্য ছুটে না যাও, তবে মনে রেখো, এই অহংকারী জালেম আবারও সোজা হলবের পথ ধরবে। কারণ তাঁর দৃষ্টি হলবের দিকেই নিবদ্ধ হয়ে আছে। তিনি তোমাদেরকে তার গোলাম বানাবে, তোমাদের বোন ও বেটিরা তার সেনাপতিদের হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে, যদি তোমরা এটা না চাও, তবে এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি আমার এ কথার গুরুত্ব বুঝতে না পারো, তবে তাকাও নূরুদ্দিন জঙ্গীর মাসুম সন্তানের দিকে। যে নূরুদ্দিন জঙ্গী সারাটা জীবন মিল্লাতের সেবায় কাটালো, বলো, কি অপরাধ করেছিল তার নাবালেগ সন্তান? কেন তাকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হতে হলো? কে করলো তার এতবড় সর্বনাশ? তাকাও মুশালের আমীর সাইফুদ্দিনের দিকে। তাকাও হারানোর দুর্গাধিপতি গুমাস্তগীনের দিকে। কেন সবাই আজ আইয়ুবীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে? কেবল আইয়ুবী হকের পথে আছে আর অন্য সবাই মিথ্যাবাদী? আইয়ুবী! তুমি আর কতো ধোঁকা দেবে আমাদের? নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আর কতো রক্ত ঝরাবে মুসলমানের? সালাহউদ্দিন! ক্ষমতার নেশায় ইসলামের তিন-তিনটি শক্তির বিরুদ্ধে একত্রে মাথা তুলতে গিয়ে যে বোকামী তুমি করেছো, এবার তার মাশুল দিতে হবে। তোমাকে দলিত-মথিত করার জন্য ওই দেখো যুদ্ধের ময়দানে ছুটে আসছে মুসলমানদের সম্মিলিত সামরিক শক্তি।

    বন্ধুরা আমার! জাতির গাদ্দারকে পিষে মারার এ অভিযানে তোমরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকার পাত্র নও, এ কথা তোমাদের প্রমাণ করতে হবে। দেশ, জাতি ও ঈমানের স্বার্থে আপন ভাইদের গলায় ছুরি চালাতেও তোমাদের কারো হাত কাপবে না, আমি কি তোমাদের কাছে এ আশা করতে পারি?’

    সৈন্যরা ততক্ষণে তেতে আগুন হয়ে উঠেছে। ভেতরে সবার মনে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন। সেনাপতির প্রশ্নের জবাবে সৈন্যরা আবেগ ও উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে সমস্বরে ধ্বনি তুললো, ‘আইয়ুবীর গোলামী, মানি না মানবো না; বুকের ভেতর জ্বলছে আগুন, নিভবে পেলে আইয়ুবীর খুন; আইয়ুবীর খুন চাই, আইয়ুবী তোর রক্ষা নাই!’সৈনিকদের গগন বিদারী শ্লোগানে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো।

    সাইফুদ্দিন হাত ইশারায় সৈন্যদের থামতে বললেন। তাদের শোরগোল একটু কমলে তিনি বললেন, ‘কেবল শ্লোগান দিলে হবে না। এ মুহূর্তে আমাদের কি করণীয় সে সম্পর্কে আলেমদের ফতোয়া শোন।’তিনি দু’জন আলেমের ফতোয়া সৈন্যদের সামনে পড়ে শোনালেন। ফতোয়ায় বলা হলো, ‘আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জেহাদ করা প্রতিটি সক্ষম মুসলমানের জন্য ফরজ। যারা যুদ্ধ করবে, যুদ্ধের সময় তাদের কারো রোজা রাখার দরকার নেই।’

    এ ফতোয়ায় সৈন্যরা খুবই খুশী হলো। সাইফুদ্দিন বললেন, ‘আমরা সে সময় আক্রমণ চালাবো, যখন সালাহউদ্দিনের সৈন্যরা রোজা রেখে দুর্বল হয়ে পড়বে। আমাদের পরের মঞ্জিল হবে দামেশক। কারণ অপরিসীম সম্পদ ও অর্থ পড়ে আছে সেখানে। দু’দিন পর সে সব সম্পদ হবে তোমাদের।’

    একদিকে সম্মিলিত বাহিনী তাদের প্রস্তুতি শেষ করে তৈরী হচ্ছিল যুদ্ধের জন্য। অন্যদিকে সুলতান আইয়ুবী তার সৈনিকদেরকে আট-দশ জনের ছোট ছোট কমাণ্ডো গ্রুপে ভাগ করে তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যুদ্ধের পরকিল্পনা। সুলতান আইয়ুবী তাঁর সৈন্যদেরকে কোন উত্তপ্ত ভাষণ দিয়ে বা আবেগময় কথা বলে তাদের উত্তেজিত করার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তাঁর দৃষ্টি শুধু ঐ জমিনের ওপর স্থির ছিল, যে ময়দানে তাঁকে যুদ্ধ করতে হবে। সে ময়দানের উঁচু-নিচু টিলা-টক্কর থেকে কিভাবে অধিক থেকে অধিকতর সুবিধা লাভ করতে পারবেন, তাই শুধু চিন্তা করছিলেন তিনি। তিনি কথা বলছিলেন সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট ভাষায়। আর এসব কথা বলছিলেন কেবল তাঁর জুনিয়র ও সিনিয়র কমাণ্ডারদের সাথে। তার প্রতিটি কথাতেই ছিল বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়।

    তিনি কেবল তখনই একটু বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, যখন তাঁর ফিলিস্তিনী মুসলমান ভাইদের কথা স্মরণ হয়।

    তাদের উদ্ধারের পথে বাঁধা হয়ে আছে আজ তারই স্বজাতি মুসলমানরাই মুসলমানদের অগ্রগতির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এ কথা স্মরণ হলেই তিনি বেদনায় বিমর্ষ হয়ে পড়েন। আফসোস‍! এ সমস্যার কোন সহজ সমাধান নেই। আপোষ-মীমাংসার জন্য দূত পাঠিয়ে এ জন্য তিনি নিজেকে লজ্জিতও করেছেন। তাই এখন যুদ্ধ ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

    তিনি মিশর থেকে আসা সৈন্য সাহায্য কিভাবে ব্যবহার করবেন সে পরিকল্পনা সমাপ্ত করেছেন। এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন শত্রুর আত্রমণের। শত্রুর পথপানে চেয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে জ্বালা ধরে গেল। তিনি তার উপদেষ্টাদের বললেন, শত্রুরা হয়ত চাচ্ছে, আমি পাহাড়ী এলাকার বাইরে গিয়ে ওদেরকে আক্রমণ করি। কিন্তু আমি পাহাড়ী এলাকা ছাড়তে একদম প্রস্তুত নই।’

    সুলতান আইয়ুবী যদি চাইতেন, তবে তিনি তাঁর কমাণ্ডো বাহিনী দিয়ে শত্রুদের ক্যাম্প এরই মধ্যে তছনছ ও ধ্বংস করে দিতে পারতেন। তাঁর যুদ্ধের এটা একটা বিশেষ পদ্ধতি। কিন্তু এবারই প্রথম তিনি তাঁর এ বিশেষ পদ্ধতিটি ব্যবহার করেননি। কমাণ্ডো বাহিনীকে তিনি সজ্জিত করে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, শত্রুরা কোন চালে যুদ্ধ করতে চাচ্ছে। এ জন্য তিনি গভীর মনযোগের সাথে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করে চলেছেন।

    দামেশক। সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী নেই, কিন্তু তাঁর শৌর্য বীর্য নিয়ে ঝলসে উঠলেন তাঁর বিধবা স্ত্রী। যুদ্ধের ময়দানে যেতে পারেননি তিনি, যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। তার মতে এ যুদ্ধ সুলতান আইয়ুবীর নয়, এ যুদ্ধ সমগ্র জাতির। তিনি আরও মনে করেন, কোন ক্ষুদ্র ময়দানে এ যুদ্ধ সীমাবদ্ধ নয়, যুদ্ধ চলছে সমগ্র দেশে। অতএব তিনি যেখানে আছেন সেখানে থেকেই এ যুদ্ধে ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন।

  • উমরু দরবেশ

    উমরু দরবেশ

    উমরু দরবেশ

    ইসহাকের গাঁয়ের বাড়ী। নিজের বাড়ীতেই তার একাধিক ঘোড়া ছিল, সেখান থেকে দু’টো ঘোড়া প্রস্তুত করা হলো। ইসহাকের গ্রেফতারীর খবর শুনে গ্রামের লোকজন জমা হয়েছিল সেখানে। ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যা প্রস্তুত হয়ে যখন ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করলো তখন বিকেল। গ্রামের লোকজন সুদানী কমান্ডারের কথা বিশ্বাস করে ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে কমান্ডারের সাথে বিদায় জানালো।

    দিন থাকতে থাকতেই তারা দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল পার হয়ে এলো। তারা যখন সে অঞ্চলের শেষ প্রান্তে, তখন সন্ধ্যার লালিমা মুছে গিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে মরুভূমিতে পড়তেই অন্ধকার ফিকে হয়ে এলো। রাতের প্রথম প্রহর। বিরতিহীনভাবে তারা পথ চলছে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে ক্ষুদ্র এক কাফেলা। তিন জন মাত্র যাত্রী, তাও আবার দু’জন মেয়ে। ক্ষুদ্র কাফেলা নিয়ে মরুভূমিতে পথ চলা খুবই বিপদজনক, কিন্তু সেদিকে কারো খেয়াল নেই। বালিয়াড়ি মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কাফেলা। নিরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। রাস্তায় কোথাও কেউ নেই।

    এক অচেনা পুরুষের সাথে এগিয়ে চলেছে দুই পর্দানসীন মহিলা। স্বামীর চিন্তায় বিভোর ইসহাকের স্ত্রী। আহত বাপের কথা ভাবছে কিশোরী কন্যা। দুনিয়ার আর কোন খেয়াল নেই ওদের। চোখে কোন নিদ্রা নেই। অন্তরে নেই কোন ভয়। পার্বত্য অঞ্চলের মহিলা হওয়ায় অশ্বারোহণেও ওদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সে অঞ্চলের প্রতিটি নারী পুরুষ শিশুকাল থেকেই ঘোড় সাওয়ার ও তীরন্দাজী শিখে রাখে। পুরুষের মত সে অঞ্চলের নারীরাও সমান দুঃসাহসী।

    তিনটি ঘোড়াই মরুভুমি ধরে এগিয়ে চলেছে। কমান্ডারের মন প্রফুল্ল। তার আনন্দের কারণ, ছলনা করে দুই মুসলিম পর্দানসীন মহিলাকে সে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসতে পেরেছে।

    ❀ ❀ ❀

    পচাগলা লাশের পাশে ইসহাক তার কামরায় বসেছিল। এ লাশ রাখা হয়েছিলো তাকে অসুস্থ ও দুর্বল করার জন্য। কিন্তু ইসহাকের এ নিয়ে কোন বিকার ছিল না। তার শারীরিক অনুভূতি হারিয়ে গিয়েছিল। সে লাশের সাথে এমনভাবে কথা বলত, যেন লাশটি জীবিত। লাশের দুর্গন্ধের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল।

    দৈহিক চেতনা না থাকলেও আত্মার ও চিন্তার শক্তি তার নষ্ট হয়নি। সে ভেবে দেখল, আজ সারাদিন তাকে কামরার বাইরে নেয়া হয়নি। সন্ধ্যার পরও কেউ তাকে বিরক্ত করতে আসেনি। সে খুবই অবাক হলো। এমন বিশ্রাম দেয়ার মানে কি? কেন আজ কোন নির্যাতন করা হলো না? তবে কি সুদানি সেনাপতি নিরাশ হয়ে গেছে? এখন তাহলে ওকে নিয়ে ওরা কি করবে? কামরায় শুয়ে বসে এসবই ভাবছিল সে।

    ❀ ❀ ❀

    কমান্ডার মেয়ে দু’জনকে সাহস ও শক্তি জোগানোর জন্য ওদের সাথে গল্প জুড়ে দিল। সে ইসহাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওদের শোনাচ্ছিল বীরত্ব ও সাহসের গল্প। মা ও মেয়ে খুব আগ্রহ সহকারে শুনছিল ওর কথা।

    সুদানী সেনাপতিকে তার সঙ্গের অফিসার বললো, ‘আপন কন্যা ও স্ত্রীর অপমান কি কেউ সহ্য করতে পারে? আমার বিশ্বাস, কমান্ডার ওদের দু’জনকে নিয়ে আসছে।’

    ‘আমি ইসহাককে বলবো, যতক্ষণ তুমি এবং তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা সুদানী বাহিনীতে যোগ না দেবে, ততক্ষণ তোমার স্ত্রী ও কন্যাকে মুক্তি দেয়া হবে না। তাঁদের ওপরও তোমার মতোই নির্যাতন চালানো হবে। আশা করি, এতে করে ইসহাক তার মত পাল্টাতে বাধ্য হবে,’ বললো সেনাপতি।

    ‘সকাল নাগাদ আমাদের কমান্ডারের ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে,’ অফিসার বললো।

    ‘হয়তো তার আগেও এসে যেতে পারে,’ সেনাপতি বললো, ‘এ লোক খুব হুশিয়ার।’

    রাত। কারাগারের সেই সিপাহী, যে কমান্ডারের পর ইসহাকের বাড়ীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলো, সে একাকি মরুভূমির বালির টিলা একের পর এক অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি রাস্তা অতিক্রম করে ফেলেছে। বিরামহীন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেই পার্বত্য অঞ্চলের দিকে। আকাশে চাঁদ নেই। উন্মুক্ত মরুভূমির রাতের স্বচ্ছতা সম্বল করে পথ চলছে সে। চাঁদ না থাকলেও তারকার আলোতে পথ চলতে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। বেশি দূর দেখা যায় না, তবে কোথাও কোন আওয়াজ হলে তা অনেক দূর থেকেও ভেসে আসে।

    আনমনে পথ চলছে সে, হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার পদধ্বনি কানে এলো। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। খেয়াল করে দেখল, সামনের দিক থেকে একাধিক ঘোড়া এগিয়ে আসছে প্রহরী এক বালির টিলার পেছনে ঘোড়া সমেত লুকিয়ে পড়লো।

    একটু পর পদধ্বনি আরো স্পষ্ট হলো, সেই সাথে ভেসে এলো ওদের কথার আওয়াজ। প্রহরী টিলার আড়ালে বসে ওঁৎ পেতে দেখল তিনটি ঘোড়া ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সে তলোয়ার হাতে নিলো।

    ওরা আরো খানিকটা এগিয়ে এলো। এখন সে কমান্ডারের কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ইসহাকের ব্যাপারেই আলাপ করছে কমান্ডার। কমান্ডারের কণ্ঠ শুনেই প্রহরী চিনতে পারলো তাকে। ওই তো সেনাপতির পাঠানো কমান্ডার! তাহলে নিশ্চয়ই সাথের দু’জন দরবেশ ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যা!

    প্রহরী ভাবছিল, দরবেশের বাড়ী গিয়ে সে ওদের হুশিয়ার করবে। কমান্ডার যে এত তাড়াতাড়ি ওদের বের করে নিয়ে আসতে পারবে, তা ছিল তার ধারণার বাইরে। সে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সংঘর্ষ ছাড়া এখন ওদের মুক্ত করার কোন পথ নেই। কিন্তু মুশকিল হলো, যাদের সে মুক্ত করতে চাচ্ছে, তারা জানেই না সে ওদের হিতাকাঙ্ক্ষী। লড়াই শুরু হলে মেয়ে দু’জনও তার প্রতিপক্ষে লড়বে। কারণ এরা পাহাড়ী নারী। লড়াইকে ওরা ভয় পায় না। একা তিনজনের বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া বোকামী। তার ওপর পুরুষটি কোন সাধারণ লোক নয়, একজন চৌকস কমান্ডার। কিন্তু এ ছাড়া যে আর কোন গত্যন্তর নেই! সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, সে লড়বে। নিশ্চয়ই ভাগ্য তাকে সহায়তা করবে। কারণ সে এক দরবেশ মানুষের পরিবারকে রক্ষা করতে যাচ্ছে। দরবেশের দোয়ার কি কোন মূল্য নেই!

    ওরা প্রহরীর একদম কাছে চলে এসেছে। তারার আলোয় সে ওদের ভাল করে লক্ষ্য করলো। কমান্ডার ওদের নিয়ে নিশ্চিত মনে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে কোন সতর্কতার ভাব নেই। তলোয়ারটি অবহেলায় তার কোমরে ঝুলছে। মেয়েদের সাথে কোন তলোয়ার নেই, সারা শরীর ও মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা থাকায় খঞ্জর আছে কি না তাও স্পষ্ট বুঝা গেল না।

    ওরা ওকে অতিক্রম করে গেল। ঘোড়াসহ আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো প্রহরী। এক মুহূর্তে ভাল করে দেখে নিল ওদের অবস্থান। তারপর পিছু ধাওয়া করে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। তার অশ্বের পদধ্বনি কমান্ডারকে চমকে দিল। সে থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল পিছন ফিরে। সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার বের করে পিছনে ঘুরলো। মুহূর্তে কমান্ডারের কাছে পৌঁছে গেল প্রহরী। তার ঘোড়ার গতি ছিল তীব্র। ছুটন্ত অবস্থায় ঘোড়ার ওপর থেকে কমান্ডারকে এমন জোরে আঘাত করলো, ডান হাত কেটে পড়ে গেল কমান্ডারের।

    ঘোড়া ঘুরিয়ে সে আবার ফিরে এলো কমান্ডারের কাছে। কমান্ডারের তখন আর লড়াই করার ক্ষমতা নেই। সে চিৎকার করে দয়া ভিক্ষা চাইল, কিন্তু প্রহরী তার ঘাড়ে আবারো তলোয়ারের আঘাত করলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল কমান্ডার।

    সঙ্গের একমাত্র পুরুষ মানুষটি ধরাশায়ী হওয়ায় পর্দানসীন মা ও মেয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। ইসহাকের স্ত্রী মেয়েকে বললো, ‘পালাও! ডাকাত মনে হচ্ছে।’

    প্রহরী ঘোড়া নিয়ে তাঁদের পথ আটকে দাঁড়ালো এবং বললো, ‘এখানে কোন ডাকাতের দল নেই, আমাকে ভয় পেয়ো না। আমিই বরং তোমাদেরকে এক ডাকাত ও প্রতারকের হাত থেকে রক্ষা করলাম। এক বন্দীকে দেখতে গিয়ে তোমরা নিজেরাই বন্দী হয়ে পড়ো, তা আমি চাই না। এখন আর কারাগারে যাওয়ার দরকার নেই। তোমরা তোমাদের গ্রামের বাড়ীতে ফিরে যাও। আমাকেই যদি ভয়, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমাদের সাথে যাচ্ছি না। যতক্ষণ তোমাদের নিরাপদ মনে না করবো, ততক্ষণ তোমাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে আমি তোমাদের অনুসরণ করবো। আরো বলছি, এখানে আর কেউ নেই, আমি একাই তোমাদেরকে এক ভয়ঙ্কর বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলাম। এ লোক বন্দী দরবেশ ইসহাকের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য তোমাদের অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করতে চেয়েছিল।’

    মা ও মেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল! কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বুঝতে পারলো না। অনেকক্ষন পর্যন্ত মা-মেয়ে ওভাবেই ওখানে স্তব্ধ বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেষে ইসহাকের স্ত্রী বললো, ‘কি বলছেন আপনি? আমরা যে এর কিছুই বুঝতে পারছি না! আসল ব্যাপারটা কি খুলে বলুন তো?’ প্রহরী কমান্ডারের ঘোড়ার লাগাম তার ঘোড়ার জীনের সাথে বেঁধে বললো, ‘আগে আপনাদের বাড়ি চলুন, ওখানে গিয়েই সব বলবো। মরুভূমিতে রাত কাটানো নিরাপদ নয়।‘ ওরা ফিরে চললো বাড়ীর দিকে। ইসহাকের স্ত্রী বিস্ময় ও কৌতূহল দমন করতে না পেরে একটু পর বললো, ‘তিনি কি আসলেই বন্দী এবং আহত?’

    ‘হ্যাঁ, তিনি এখন কারাগারেই আছেন। না, তিনি আহত ছিলেন না, তবে তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে। সে নির্যাতনের ধকল সয়ে তিনি এখনো কিভাবে বেঁচে আছেন সে রহস্য আমার জানা নেই। আমরা বিশ্বাস করি, তার কাছে আল্লাহর অলৌকিক শক্তি আছে।‘

    ‘তার ওপর এ অকথ্য নির্যাতনের কারণ কি?’

    ‘তাকে সুদানী সেনাবাহিনীতে নিতে চাইছে সরকার। তাকে বলা হচ্ছে, তুমি বললেই তোমার পাহাড়ি এলাকার মুসলমানরা সুদানী সৈন্য বাহিনীতে ভর্তি হবে। সরকার চাচ্ছে, তিনি এবং তার কবিলার লোকেরা সুদান সরকারের আনুগত্য স্বীকার করুক। কিন্তু তিনি তা মানছেন না।‘

    ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন। কিন্তু কমান্ডার আমাদের কেন নিতে এসেছিল?’

    প্রহরী উত্তরে বললো, ‘তার সামনে তোমাদের সম্ভ্রম নষ্ট করার হুমকি দিয়ে তাকে শর্ত মানতে বাধ্য করাতে চাচ্ছিল সরকার। যাকে আমি হত্যা করেছি, সে এক ফৌজি কমান্ডার। এ উদ্দেশ্যেই সেনাপতি তোমাদেরকে নিতে পাঠিয়েছিল তাকে। আমি বিষয়টি জেনে তার পিছনে লেগেছিলাম। আমি খুশি যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।‘

    ‘তুমি কে?’ ইসহাকের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি মুসলমান?’

    ‘আমি সে কারাগারের প্রহরী।‘ সে উত্তর দিল, ‘না, আমি মুসলমান নই।‘

    ‘তবে কেন তুমি এ ঝুঁকি নিতে গেলে? আমাদের জন্য তোমার এমন সমবেদনার কারণ কি?’

    ‘তার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তাতে তার মরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বেহুশও হননি। আমি এবং আমার সঙ্গীদের বিশ্বাস, তার কাছে অলৌকিক শক্তি আছে। তিনি মুক্ত হতে পারলে সে শক্তি দিয়ে আমাদের ভাগ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন। কিন্তু তাকে মুক্ত করার কোন উপায় এখনো আমরা বের করতে পারিনি। এর মধ্যেই তোমাদের সর্বনাশ করার জন্য সেনাপতি ষড়যন্ত্র করছে জানতে পেরে আমরা তা বানচাল করার সিদ্ধান্ত নেই। এ কারনেই আমি এখানে ছুটে এসেছি।‘ প্রহরী বললো।

    ‘মানুষের ভাগ্য একমাত্র আল্লাহই পরিবর্তন করতে পারেন। ভাগ্য পরিবর্তনের অলৌকিক ক্ষমতা কোন মানুষের নেই। তিনি এমন ওয়াদা করতে পারেন না। আর যদি তিনি এমনটি বলে থাকেন তাহলে ভুল বলেছেন।’ বললো ইসহাকের স্ত্রী।

    ‘কি বলছেন আপনি!’ প্রহরী বললো, ‘তার অলৌকিক ক্ষমতা তো আমি নিজের চোখে দেখেছি! এই যে আমাকে দেখুন, আমি মুসলমান নই। কারাগারের সামান্য এক প্রহরী। আমার এমন সাহস বা শক্তি নেই, যা নিয়ে আমি গর্ব করতে পারি। কিন্তু দেখুন, কি দুঃসাহসিক কাজ করলাম? আমাদের সেনাপতির মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়ার শক্তি আমি কোথায় পেলাম? কি করে সামান্য প্রহরী হয়ে নিজের কমান্ডারকে খুন করলাম? আপনারা ছিলেন তিনজন, তারপরও কি করে আমি আপনাদের আক্রমণ করার সাহস পেলাম? এসবই তার গায়েবী শক্তি। তিনি সত্যি অলৌকিক ক্ষমতাধর। আপনি কেন তাকে আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছেন?’

    ইসহাকের স্ত্রী এই অন্ধ বিশ্বাসী লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। কি করে সে এ বিশ্বাস ভাঙবে বুঝতে পারলো না।

    সকাল বেলা। ইসহাকের বাড়ীর সামনে চারটি ঘোড়া এসে থামলো। ঘোড়া থেকে নেমে দরজার কড়া নাড়ল ইসহাকের বিবি। ইসহাকের বাবা দরজা খুলে সামনে পুত্রবধু, নাতি ও তাঁদের সাথে আরও একজন অপরিচিত লোককে দেখে খুবই আশ্চর্য হলেন। হা করে তিনি তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে।

    ‘হাঁ করে দেখছ দাদু? আমাদের ঢুকতে দাও।’

    নাতনীর কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে সরে দাঁড়ালেন তিনি। ভেতরে ঢুকে বুড়োর প্রশ্নের জবাবে আবারো সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত বলতে হলো প্রহরীকে। শুধু বললো না, কারাগারে ইসহাকের ওপর কি নির্যাতন হচ্ছে।

    ইসহাকের বাবা তৎক্ষণাৎ কবিলার লোকদের ডেকে পাঠালেন। লোকেরা জড়ো হলে প্রহরী তাদেরকে বললো, ‘পাহাড়ী অঞ্চলের সমস্ত মুসলমান সুদানের সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে সুদান সরকার ইসহাককে মুক্তি দিতে রাজী হয়েছে। শর্ত একটাই, তোমাদের সবাইকে সুদানের আনুগত্য কবুল করতে হবে।’

    লোকেরা বললো, ‘ইসহাক কি বলেছে?’

    ‘ইসহাক তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তোমরা আমাকে জীবনে শেষ করে ফেললেও আমি আমার জাতির সাথে গাদ্দারি করতে পারবো না, কাউকে তোমাদের আনুগত্য কবুল করতেও বলবো না।’

    শুধু ইসহাকের কবিলা নয়, এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর পাহাড়ী অঞ্চলের সমস্ত মুসলমানরাই উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সুদান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়লো ওরা। একজন বললো, ‘এটা আল্লাহর জমিন! এখানে নাস্তিক সুদান সরকারের আধিপত্য চলবে না। আমরা ইসহাকের ওপর অত্যাচারের বদলা নেবো।’

    ‘আমরা কারাগারে আক্রমন চালিয়ে ইসহাককে মুক্ত করে আনবো।’ বললো অন্য একজন।

    ‘তোমরা তা পারবে না।’ প্রহরী বললো, ‘জেলখানা বড়ই দুর্ভেদ্য, সেখান থেকে কাউকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।’

    ‘তুমি কারাগারের প্রহরী, তুমি আমাদের সাহায্য করলে আমরা নিশ্চয়ই তাকে মুক্ত করতে পারবো।’ ইসহাকের বাবা বললেন।

    ‘আমি গরীব ও সাধারন এক প্রহরী মাত্র।’ সে বললো, ‘আমি আপনার বেটাকে মুক্ত করতে কিইবা সাহায্য করতে পারবো? তাকে আমি সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। তার এক নগন্য ভক্ত হিসাবে আমি আমার জীবনও দিতে তার জন্য বিলিয়ে দিতে পারি। এতে যদি আপনাদের কোন উপকার হয়, আমি প্রস্তুত। শুধু আমার গরীব পরিবারকে আপনারা একটু দেখবেন।’

    ‘তুমি যদি সত্যি তার ভক্ত হয়ে থাকো তবে তার আদর্শকে গ্রহন করো। তাহলে তুমি আমাদের সবার ভাই হয়ে যাবে। ভাইয়ের জন্য এমন কোন কোরবানী নেই, যা আমরা করতে পারিনা। মুসলমান হয়ে যাও, আর এখানে চলে আসো।’ ইসহাকের বাবা তাকে বললেন, ‘আমাদের এ পাহাড়ী অঞ্চলই আমাদের দুনিয়ার জান্নাত। এখানে পানির ঝর্ণাধারা আছে, আছে শস্য-শ্যামল মাঠ ও নানা রকম ফলের গাছ। এখানকার মাটি এমন ফসল দেয়, যে কৃষিকাজ করে না, সেও ক্ষুধার্ত থাকে না। এটা আমাদের ওপর আল্লাহর এক বিশেষ রহমত। এ পাহাড়ী এলাকা আমাদের কেল্লা! আমাদের দুর্গ! আমরা এখানে সবাই স্বাধীন। তুমি তোমার পরিবার পরিজন নিয়ে আমাদের এখানে চলে আসো, তোমার ভাগ্য বদলে যাবে।’

    এ প্রস্তাব প্রহরীর খুবই মনপূত হলো। সে এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ইসহাকের বাবার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে ইসলাম কবুল করলো সে। বুড়ো তাকে সন্তানের মর্যাদা দিয়ে তার কাছেই রেখে দিলেন।

    ভোরের সূর্য অনেক উপরে উঠে এসেছে। সুদানী সেনাপতি অধীর আগ্রহে কমান্ডারের জন্য প্রতীক্ষা করছিল, কিন্তু তার কোন খবর নেই। ক্রমশঃ সময় গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল, তবু দেখা নেই কমান্ডারের। শংকিত হয়ে উঠলো সেনাপতি, তার কি কোন বিপদ হলো? নাকি সে পথ হারিয়ে ফেলেছে?

    অনেক ভেবেচিন্তে শেষে সেনাপতি তার এক অফিসারকে ডাকলো। বললো, ‘কমান্ডার যে পথে গেছে সে পথে যাও, প্রয়োজন হলে ইসহাকের বাড়ী পর্যন্ত চলে যাবে। তারা রওনা না করলে তাদেরকে দ্রুত পাঠিয়ে দেবে, আর পথে থাকলে তাড়াতাড়ি আসতে বলবে। তুমি ওদের সাথে আসার অপেক্ষা না করে খবর নিয়ে আগেই চলে আসবে।’

    ইসহাক একা পড়েছিল কামরায়। কামরায় পচা লাশ গলে মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কারাগারের প্রহরীরা, যারা কারাগারের দুর্গন্ধে অভ্যস্থ ছিল, তারাও ইসহাকের কামরার কাছ ঘেঁষতো না বিশ্রী গন্ধের ভয়ে। এক প্রহরী নাকে কাপড় বেঁধে ইসহাকের কাছে গিয়ে বললো, ‘আরে আহাম্মক! এ দুর্গন্ধ কেমন করে সহ্য করছো? এরা তোমাকে যা মানতে বলে, মেনে নাও আর এখান থেকে বিদায় হও। এ মরার গন্ধে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।’

    ‘আমার কোন দুর্গন্ধ লাগছে না।’ ইসহাক বললো, ‘এ তো মরা লাশ নয়, শহীদ! শহীদরা মরে না। আমি রাতে ওর সাথে কত গল্প করি!’

    ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ। প্রহরী বললো, ‘লাশের এমন দুর্গন্ধে কেউ পাগল না হয়ে পারে!’

    ইসহাক হেসে বললো, ‘হবে হয় তো বা!’

    সে লাশের পাশে বসে হৃদয়ের সমস্ত আবেগ ঢেলে পবিত্র কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতে লাগলো।

    দিন গড়িয়ে রাত এলো। তারপর সে রাতও অতীত হয়ে গেল। প্রত্যুষে ফিরে এলো সেনাপতির পাঠানো অফিসার। এক দিনেই তার বয়স যেন বেড়ে গেছে দশ বছর। চেহারা বিবর্ণ, মলিন। এক দিকে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি, অন্যদিকে বর্ণনার অতীত চাক্ষুস এক মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা। সে যা দেখে এসেছে তা বর্ণনা করার ভাষা ছিল না তার।

    সেনাপতি বললো, ‘কি হয়েছে খুলে বলো!’

    ‘পথে মরুভূমির মাঝামাঝি গিয়েছি, মাথার ওপর শকুন চক্কর দিচ্ছিল। এলাকাটা উঁচুনিচু বালুর টিলায় পরিপূর্ণ। আরেকটু এগুতেই দেখতে পেলাম এক স্থানে শকুন মরা খাচ্ছে। মরার পাশে পড়ে আছে তলোয়ার, তার জুতা, ছেঁড়া কাপড়। লাশটি কার চেহারা দেখে চেনার উপায় নেই। কেবল বীভৎস নয়, জঘন্য, কদাকার। আমার মনে সন্দেহ জাগলো। ভয় হলো, এটা আমাদের কমান্ডারের লাশ নয় তো! কৌতূহলের বশে লাশের কাছে এগিয়ে গেলাম। তাড়া করতেই শকুনরা সরে গেল একটু দূরে। তার খঞ্জর ও কোমরবন্ধ দেখে নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ, এটা আমাদের পাঠানো কমান্ডারেরই লাশ। আমি কতক্ষণ থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিভাবে, কেন তিনি মারা গেলেন সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি পাহাড়ী অঞ্চলের দিকে আরো কিছু পথ এগিয়ে গেলাম। বালিতে তার ঘোড়ার পদচিহ্ন খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেলাম, তার ঘোড়া পাহাড়ী অঞ্চলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। ফিরতি পথে তার সাথে ছিল আরো দু’টো ঘোড়া। এতে প্রমাণ হয়, তিনি ইসহাকের পরিজনদের সাথে নিয়েই ফিরছিলেন। আমি কমান্ডারের লাশ পেলেও তার সাথীদের লাশ পাইনি। তার মৃত্যুর কারণ আমার কাছে স্পষ্ট নয়। ইসহাকের লোকেরা তাকে হত্যা করলে গ্রামেই করতে পারতো, আর তাকে বিশ্বাস না করলে তার কন্যা ও বিবিকে ওর সাথে আসতে দিত না। পথে এক কিশোরী ও এক নারী আমাদের কমান্ডারকে হত্যা করবে, এমনটা কল্পনাও করা যায় না। তাহলে কে তাকে হত্যা করলো? কোন ডাকাত দল পড়েছিল ওদের ওপর, তেমন কোন প্রমাণও পাইনি। সেই থেকে আমি অস্থির।’

    সুদানী সেনাপতি বললো, ‘এ নিয়ে এত উতলা হওয়ার কিছু নেই। নিশ্চয়ই সব কিছুই আমরা জানতে পারবো। সে অঞ্চলে আমাদের যে গোয়েন্দারা কাজ করছে তারা ওই অঞ্চলেরই মুসলমান। সংবাদ সংগ্রহে তারা বেশ দক্ষ। ইসহাক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তারাই সরবরাহ করেছিল। সে অঞ্চলে ইসহাকের অসম্ভব প্রভাব প্রতিপত্তির খবরও তারাই দিয়েছে। একটু সবুর করো, সব খবরই আমরা পেয়ে যাবো।’

    হলও তাই। সন্ধ্যার পর দুই গোয়েন্দা এসে উপস্থিত হলো সেনাপতির কাছে। তারা জানালো, ‘কমান্ডার ইসহাকের মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ঠিকই রওনা দিয়েছিল। আপনার কারাগারের এক সিপাহী তাকে হত্যা করে মেয়ে দু’জনকে তাদের বাড়ীতে পৌঁছে দেয়।’

    ‘আমাদের কারাগারের প্রহরী! কি নাম তার?’

    ‘তার নাম ইরাজ মেহের।’ গোয়েন্দারা বললো সেনাপতিকে।

    সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যা সুদান সরকারের কাছে তুলে ধরলো। সরকার এ নিয়ে পরামর্শ করলো তাদের খৃস্টান উপদেষ্টাদের সাথে। খৃস্টান উপদেষ্টারা পরামর্শ দিল, ‘এ ব্যাপারে তোমরা নীরব থাকো। এ নিয়ে মুসলমানদের ওপর অভিযান চালানোর বোকামী করো না। তাদেরকে অন্য কোন ভালো পদ্ধতিতে বন্ধু বানাতে চেষ্টা করো। খুব বেশী হলে তোমরা গোপনে শুধু সেই সিপাহীকে হত্যা করতে পারো, যে তোমাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। তাতে মুসলমানরা বুঝবে, তোমাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায় না। যদি ইসহাক তোমাদের শর্ত গ্রহণ না করে, তবে অন্য মুসলমান কয়েদীদের মানাও, আর ইসহাকের ওপর উৎপীড়ন অব্যাহত রাখো।’

    ইসহাকের ওপর নির্যাতন চলতেই থাকলো। সেনাপতি তার ওপর কমান্ডার হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নির্যাতনের মাত্রা এতই বাড়িয়ে দিল যে, জ্ঞান হারাল ইসহাক।

    রাতে সে বেহুশ হয়ে পড়েছিল এক কুঠরির মধ্যে। যখন জ্ঞান ফিরলো, কুঠরি অন্ধকার। কামরার বাইরে মশাল জ্বলছে। ইসহাক পাশ ফিরে শুতে গেল, তার হাত গিয়ে পড়লো কারো শরীরে। সে মনে করলো, এটা সেই লাশ, যা কয়েক দিন ধরে পড়ে আছে কামরায়। কিন্তু একটু পর তার মনে হলো, কেউ যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সে ভাবলো, হয়ত মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটেছে তার। তার শরীর অবশ লাগছিল, তাই সে আর উঠে দেখতে চেষ্টা করলো না, আসলেই কামরায় কোন মানুষ আছে কিনা?

    একটু পর কামরায় কারো নড়ে উঠার শব্দ হলো। এবার চমকে উঠলো ইসহাক। চোখ মেলে সে চাইলো কামরার ভেতর। বাইরে থেকে আসা আবছা আলোয় সে পরিষ্কার দেখতে পেলো, তার পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে এবং সে লোকটিই নড়াচড়া করছে। ইসহাক লোকটির মুখের উপর ঝুঁকে তার দিকে গভীরভাবে তাকালো। না, এটা কোন লাশ নয়, একজন জ্যান্ত মানুষ। আর এটা তার সেই কামরাও নয়, যেখানে বারবার তাকে রাখা হতো। এটা অন্য কোন কামরা। ইসহাকের মনে হলো, লোকটিও এতক্ষন বেহুশ ছিল, ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরছে। একটু পর লোকটিও চোখ খুললো। অন্ধকারের মধ্যেই ইসহাক তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কে তুমি?’

    লোকটি ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘উমরু দরবেশ!’

    ‘ও, হো! উমরু দরবেশ!’ ইসহাক অভিভূত হয়ে বললো, ‘আমি ইসহাক!’

    সুলতান আইয়ুবী এ পর্যন্ত বলে একটু দম নিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এরা একে অপরকে ভাল করেই চিনতো। উমরু দরবেশও আমার একটি সেনাদলের কমান্ডার ছিল। সেও পাহাড়ী অঞ্চলের মুসলমান কবিলার লোক। উমরু দরবেশ ইসহাকের সাথে একই অভিযানে যুদ্ধবন্দী হয়। ইসহাকের নাম শুনেই সে উঠে বসলো।

    ‘তোমাকে কি শর্ত দিয়েছে?’ ইসহাক জিজ্ঞেস করলো।

    ‘বলছে, তুমি আলেম ও হুজুর সেজে দেশে যাও।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘লোকদের নছিহত করো, তাদের বুঝাও, সুলতান আইয়ুবী দেশ ও ইসলামের শত্রু। আরও বলছে, আমরা তোমাকে ট্রেনিং দিয়ে দেবো, তোমাকে রাজার হালে রাখবো। আর আমাদের রঙমহলের যে সুন্দরী মেয়েকে পছন্দ করো তাকে চিরকালের জন্য উপহার দিয়ে দেবো তোমাকে।’

    উমরু দরবেশ জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার কাছ থেকে কোন শর্ত আদায় করতে চাচ্ছে?’

    ‘তারা বলছে, তোমরা সম্প্রদায়ের সমস্ত মুসলমানদের সুদান সরকারের অনুগত করে দাও।’ ইসহাক উত্তর দিল, ‘তার বিনিময়ে আমাকে আমাদের এলাকার আমীর বানিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এরা পাহাড়ী মুসলমানদের সুদানী সেনাবাহিনীতে শামিল করতে চায়।’

    ‘আমার মনে হয়েছিল, তোমার উপর ওপর খুব নির্যাতন করছে ওরা।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘জানি না আমাদের দু’জনকে কেন একই কামরায় বন্দী করলো। সম্ভবতঃ এতে কোন মঙ্গল নিহীত আছে। আমিও চাচ্ছিলাম, তোমার সাথে আমার দেখা হোক। আমি একটি পথ চিন্তা করেছি; সে কাজ করার আগে তোমার সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। ভালই হলো, তুমি আমার কাছে এসে গেছো।’

    ‘কি চিন্তা করেছো?’

    ‘তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো, এরা আমাদের ছাড়বে না।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘আমরা আর কতদিন নির্যাতন সহ্য করবো? এভাবে হয়তো আরো দু’চার দিন বেঁচে থাকবো, কিন্তু মরণ আমাদের এখানেই হবে। এখানে আরও কিছু সুদানী মুসলমান বন্দী বেঁচে আছে। কেউ না কেউ তাদের জালে আটকাবেই। আমি ভয় পাচ্ছি, আমাদের সাথীদের প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দেবে। পথ একটাই, তা হলো, এদের শর্ত মেনে নেয়া। আমার ইচ্ছা তুমিও এদের শর্ত মেনে নাও। তারপর মুক্ত হয়ে নিজের এলাকায় গিয়ে বিশ্রাম নাও। নয়তো সুযোগ মতো রাতের আঁধারে সেখান থেকে পালিয়ে মিশর চলে যেও। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।

    এদিকে আমি তাদের কথা মেনে নেই। তারা আমাকে যে শিক্ষা দেয়, তাই গ্রহণ করি। তাদের নির্দেশ মত বহুরূপী সেজে চলে যাই নিজের কবিলার কাছে। তারপর তারা যেন সুদানীদের কোন চক্রান্তে না পড়ে সে জন্য তাদের হুশিয়ার করি। যদি আমি তাদের সাথী হতে পারি, তবে আমি তোমাকে এখান থেকে বের করার চেষ্টা করবো।’ সে আরো বললো, ‘এমনও তো হতে পারে, আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের কবিলার ওপর সুদানীরা আক্রমণ করে বসবে!’

    ইসহাক বললো, ‘পাহাড়ী মুসলমানরা সহজে অস্ত্রসমর্পন করার মত নয়।’

    ‘কিন্তু সৈন্যদের শক্তির কাছে কতদিন ওরা টিকে থাকতে পারবে?’

    ‘আমাদের কোরবানী ওদের ঈমানকে মজবুত করবে।’ উমরু দরবেশ বলল, ‘কিন্তু বেরোতে পারলে আমরা মিশর থেকে কমান্ডো সাহায্য পাবো। বর্তমানে আমাদের প্রয়োজন, দু’জনের অন্ততঃ একজনের এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া। যদি আমরা দু’জনই তাদের শর্ত মেনে নিয়ে বের হতে পারি, তবে আরও ভাল হয়।‘

    ‘আমি এখন কারাগারেই থেকে যাই।’ ইসহাক বললো, ‘তুমি একাই তাদের ধোঁকা দাও। আমরা দু’জনই যদি এক সাথে তাদের শর্ত মেনে নেই, তবে তাদের সন্দেহ হতে পারে। তারা চিন্তা করবে, দু’জন রাতে একই কামরায় থেকে এ পরিকল্পনা করেছে। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে, ‘আমি এদের উৎপীড়ন সহ্য করতে থাকি, তুমি মুক্ত হয়ে যাও।’

    সকালে কারাগারের দরজা খোলা হলো। এক সেপাই বর্শা দিয়ে ইসহাকের গায়ে খোঁচা মেরে ধমক দিয়ে বললো, ‘এই উল্লুক, উঠ।’

    ইসহাক উঠলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেল প্রহরী। সঙ্গে সঙ্গে কামরার দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

    কিছুক্ষন পর কামরায় ঢুকল আরেক সুদানী অফিসার। সে উমরু দরবেশকে বললো, ‘আজও যদি তুমি অস্বীকার করো, তবে আমি কল্পনা করতে পারি না, তোমার শরীরে কি পরিমাণ শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু আমরা তোমাকে মরতে দেবো না। তুমি এ দুনিয়াতেই দোজখ দেখতে পাবে। প্রতিদিন মরবে, প্রতিদিন বাঁচবে।’

    ‘আমাকে কোন ভালো জায়গায় নিয়ে চলো।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘আমাকে একটু সুস্থ মাথায় ভাবতে দাও, এখানে আমি কিছুই চিন্তা করতে পারছি না।’

    ‘তুমি চাইলে আমি তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারি।’ অফিসার বললো, ‘তুমি সেখানে জান্নাতের পরীদের সাথে খেলা করবে। যদি তারপরও অস্বীকার করো, তবে যতদিন বেঁচে থাকবে, শুধু কপাল চাপড়াবে আর আফসোস করবে। পরে কেঁদে বললেও আর তোমাকে বিশ্বাস করা হবে না, সুযোগ দেয়া হবে না।’

    উমরু দরবেশ যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বললো, ‘আমি আর এ অত্যাচার সইতে পারছি না।’

    ‘তাহলে বলো, আমাদের শর্ত কবুল করেছো?’

    ‘না, তা হবে না। আগে আমাকে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে দাও। কিসে আমার কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ আমাকে হিসাব করে দেখতে হবে। যে দিকে পাল্লা ভারী হবে আমি সেদিকেই যাবো।’

    সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে গেল সেই সুরম্য কামরায়, ইসহাককে আগে যেখানে রাখা হয়েছিল। একটু পর ডাক্তার এলো। তার শরীর পরীক্ষা করে ঔষধ দিল। উন্নতমানের খাবার দিল। আর ওদিকে সুদানী সেনাপতি ইসহাকের শরীর গুড়ো করছিল।

    রাতে সেনাপতি এলো উমরু দরবেশের কাছে। বললো, ‘তুমি কি আমাদের শর্ত মানতে রাজী আছো?’

    উমরু দরবেশ বললো, ‘তোমরা তোমাদের ওয়াদা ঠিক রাখবে তো?’

    ‘বিলকুল। ওতে আমাদের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। বিনিময় ছাড়া কে কাজ করে, বলো? তুমি আমাদের খুশি করবে, আমরা তোমাকে খুশি করবো।’

  • টার্গেট ফিলিস্তিন

    টার্গেট ফিলিস্তিন

    টার্গেট ফিলিস্তিন

    উমরু দরবেশ, আশী ও দুই কমান্ডো পাহাড়ী অঞ্চল ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছে। তারা যাচ্ছে সুদানের রাজধানী খার্তুমের দিকে। তখনো তীব্র গতিতে ছুটছে তাদের ঘোড়া। উমরু দরবেশ ঘোড়ার গতি না কমিয়ে সেই ছুটন্ত অবস্থাতেই সহযাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বললো, ‘আমাদের খুব জলদি সেখানে পৌঁছতে হবে। আশী! তুমি ক্লান্ত বোধ করলে আমার পিছনে এসে বসতে পারো! কারণ অল্প সময়ে আমি দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিতে চাই। ওদের কোন গোয়েন্দা আমাদের আগেই সেখানে পৌঁছে যাক, তা আমি চাই না। এমন কিছু ঘটে গেলে তার যে খেসারত দিতে হবে, তা আমি সইতে পারবো না।’

    উমরু দরবেশের এ আশঙ্কা অমূলক ছিল না। সুদানের এক গোয়েন্দা তখন রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যাচ্ছিল সুদানের রাজধানী খার্তুমের দিকে। চোখের সামনে সঙ্গীদের সবাই ধরা পড়ে যেতে দেখে জনতার ভীড় থেকে এই গোয়েন্দা এক পা, এক পা করে নিরাপদ দূরত্বে সরে এসেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল। আলী বিন সুফিয়ানের লোকেরা টের পেয়ে তাকে ধাওয়া করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের ধোঁকা দিয়ে কৌশলে যে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

    যখন সে বুঝতে পারলো, ধাওয়াকারীদের এ যাত্রা খসাতে পেরেছে, তখনি তার মনে চিন্তা জাগলো, ওরা জানে আমি খার্তুম যাবো। সাবধান করবো সুদান সরকারকে। ফলে খার্তুম পৌঁছার আগ পর্যন্ত ওরা আমাকে ধাওয়া করবে। এ কথা মনে হতেই সে খার্তুমের পথ ছেড়ে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল ঘোড়ার মুখ। উদ্দেশ্য, ধাওয়াকারীদের চোখে ধূলো দিয়ে ঘুর পথে খার্তুমের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

    অনেক পথ ঘুরে খার্তুমের পথ ধরায় সে যে উমরু দরবেশের দল থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে এ তথ্য তার জানা ছিল না। জানা ছিল না, ভিন্ন এক মিশন নিয়ে আশী এবং উমরু দরবেশও ছুটে চলেছে খার্তুমের পথে।

    ছুটে চলেছে সুদানী গোয়েন্দা। সঙ্গীবিহীন একাকী পথ চলছে সে। মনের ভেতর তোলপাড় করছে কত কথা! গতকাল উমরু দরবেশের অভিনয় দেখে ভাবছিল, মিশন শুধু সফলই নয়, আশাতীত সাফল্যের খবর দিতে পারবে সে সুদানী সরকারকে। বলবে, শুধু পাহাড়ী অঞ্চল নয়, সারা দেশেই উমরু দরবেশের এ ভেলকিবাজী দেখানো উচিত। অথচ কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে এখন সে খার্তুমই যাচ্ছে, কিন্তু সাফল্যের পরিবর্তে তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে নিজেদের শোচনীয় ব্যর্থতার খবর। তাদের গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে এ সংবাদ সে কোন মুখে শোনাবে সরকারকে! এ সংবাদ পেয়ে সরকার বাহাদুর কেমন ব্যবহার করবে তার সাথে!

    পথ চলছে সুদানী গোয়েন্দা। তার সব ক্ষোভ ও রাগ গিয়ে পড়লো আশীর ওপর। নিশ্চয়ই এ বিপর্যয়ের পেছনে উমরু দরবেশের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধন রয়েছে। উমরু দরবেশকে বিশ্বাস করা যায় না বলেই তো আশীকে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ মেয়ে কি এতই আনাড়ী যে, সে এ ষড়যন্ত্রের কিছুই টের পেলো না! নাকি আশী নিজেও জড়িয়ে পড়েছে এ ষড়যন্ত্রের সাথে! সে সিদ্ধান্ত নিল, উমরু দরবেশ এবং আশীর ব্যাপারে তার সন্দেহের কথাও সে সরকারকে জানাবে।

    একই ঘটনার জের ধরে খার্তুম ছুটে যাচ্ছে দুই ভিন্ন কাফেলা। একদল ভাবছে, সেনাপতিকে মিথ্যা সংবাদ জানিয়ে ইসহাককে তারা মুক্ত করবে, পারলে সুদানের কারাগার থেকে ছিনিয়ে আনবে তাদের সহযোগী বন্ধুদের। অন্যজন ভাবছে, একবার খার্তুম পৌঁছে নেই, উমরু দরবেশ ও আশীকে কারাগারের ভাত না খাইয়ে ছাড়ছি না এবার।

    আল্লাহর জ্যোতির রহস্য দেখার অদম্য আগ্রহ মানুষের চোখেমুখে খেলা করছিল। আলী বিন সুফিয়ানের পেছন পেছন দল বেঁধে মশালের আলোতে পাহাড় চূড়ায় উঠছিল লোকগুলো। আলী বিন সুফিয়ানের সাথে তাঁর কমান্ডো এবং সেই ইমাম সাহেবও ছিলেন, যিনি উমরু দরবেশের কাহিনী শুনিয়েছিলেন তাঁকে।

    পাহাড়ের চূড়ায় আলীর কমান্ডোরা দুই গোয়েন্দাকে বেঁধে অপেক্ষা করছিল। মশাল নিয়ে লোকজনকে উপরে আসতে দেখলো তারা। এক কমান্ডো নিজের হাতের মশাল উঁচু করে ধরলো, যাতে লোকেরা তাদের দেখতে পায়।

    ঘটনার আকস্মিকতায় ধৃত দুই গোয়েন্দা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। প্রথমে ভেবেছিল, তারা ভূতের পাল্লায় পড়েছে। কিন্তু লোকজনকে পাহাড়ে চড়তে দেখেই হুশ হলো তাদের। একজন আলীর কমান্ডোদের বললো, ‘আমাদের সাথে চলো। তোমরা যা চাবে তাই দেব। দয়া করে আমাদের ছেড়ে দাও।’

    ‘তোমরা কি সব মুসলমানকেই গাদ্দার মনে করো? চাইলেই যে কারো ঈমান কিনে নেয়া যায়, দুনিয়া এতই সহজ!’ উত্তরে বললো এক কমান্ডো।

    ‘দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও দোজখের আগুনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তোমরা নিজের জাতিকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিলে। প্রতারণার জাল বিছিয়ে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছিলে নিজের ভাই-বেরাদার ও কওমকে। আগে এর বদলা উশুল করি, তারপর তোমাদের আবেদন বিবেচনা করা যাবে।’ বললো অপর কমান্ডো।

    ‘ঐ যে, ওরা আসছে!’ এক গোয়েন্দা ভয়ে চেঁচিয়ে বললো, ‘লোকজন আমাদেরকে হাতের নাগালে পেলে পাথর মেরেই হত্যা করে ফেলবে। আমাদের ওপর রহম করো। মৃত্যু বড় কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক। আমাদের বাঁচাও, বিনিময়ে তোমরা যা চাও তাই দেবো। বলো তো, সারা জনম গোলাম হয়ে থাকবো তোমাদের, তবু আমাদের বাঁচাও! আমাদের কাছে অনেক সোনা-দানা আছে, আমাদেরকে ওপাশ দিয়ে নিচে নিয়ে চলো, সব তোমাদের দিয়ে দেবো।’

    মশাল যত উপরে উঠছিল, দুই বন্দীর আতংক ও অস্থিরতা ততই বেড়ে যাচ্ছিল। বন্দীদের সব অনুনয় বিনয় বিফলে গেলে শেষে একজন বললো, ‘তাহলে অন্তত এটুকু দয়া করো, তোমাদের কাছে তলোয়ার আছে, সেই তলোয়ার দিয়ে আমাদের গর্দান উড়িয়ে দাও, তবু আমাদেরকে জনতার আক্রোশ থেকে বাঁচাও।’

    ‘জনতার আক্রোশ থেকে নয়, আল্লাহর আক্রোশ থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করো। যে পাপ ও অপরাধ তোমরা করেছো, আল্লাহ তোমাদের কি কঠিন শাস্তি দেবেন, সেই চিন্তা করো আগে।’

    মশাল নিয়ে জনতা তাদের কাছে এসে থামলো। আলী বিন সুফিয়ান কমান্ডোদের এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন, যাতে জনতা ওদেরকে হাতের নাগালের মধ্য না পায়। লোকজন ওদের চার পাশ ঘিরে দাঁড়ালো। বন্দী দু’জন দুই হাটুর ফাঁকে এমনভাবে মুখ লুকালো, যেন কেউ ওদের মুখ দেখতে না পায়। ভীড় বেশী দেখে আলী বিন সুফিয়ান বললেন, ‘হাত ধরাধরি করে সবাই আরো পেছনে সরে যাও, ঘেরাও আরো বড় করো, যাতে সবাই দেখতে পারে।’

    কমান্ডোরা জনতার ভীড়কে আরো পেছনে ঠেলে দিল। এরপর এক কমান্ডার হাতের মশাল বন্দীদের সামনে দুই পাথরের ফাঁকে আটকে দিয়ে এসে দাঁড়াল দুই বন্দীর পেছনে। দুই হাতে মাথার চুল ধরে ঝটকা টানে জনতার সামনে উন্মুক্ত করে দিল তাদের চেহারা। জনগণ লোক দু’জনকে দেখে খুবই বিস্মিত হলো, কারণ তারা দু’জনই এ এলাকার লোক।

    ‘এই সেই তুরের তাজাল্লি দেখানোর লোক।’ আলী বিন সুফিয়ান লোকদের বুঝিয়ে বললেন, ‘এরা কিভাবে সেই জ্যোতি তৈরী করতো এখন নিজেরাই তা তোমাদের করে দেখাবে।’

    তাঁর হাতের ইশারায় কমান্ডোরা দুই বন্দীকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। বললো, ‘জনতার আক্রোশ থেকে বাঁচতে চাইলে যা বলছি জলদি করো। নইলে তোমাদেরকে জনতার হাতে ছেড়ে দিতে আমরা বাধ্য হবো। আর যদি আমাদের কথা মত কাজ করো, তাহলে তাদের আক্রোশ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবো আমরা।’

    ওরা পাথরের ওপর ওদের ঢেলে দেয়া পেট্রোলের দিকে তাকালো। এখনো তা শুকিয়ে যায়নি। কাছেই পড়ে আছে সেই পাত্রটি, যেটিতে রাখা ছিল সেই তেল।

    তাদের একজন এগিয়ে সেই তেলের ওপর মশাল ছোঁয়াতেই দপ করে জ্বলে উঠল আগুন।

    আলী বিন সুফিয়ান পাত্রটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘এই পাত্রে সেই জ্বালানি তেল ভর্তি ছিল, যে তেল আমি আগে কাপড়ে ঢেলে দেখিয়েছি। সেই তেল এখানে ঢেলে দেয়া হয়েছে। আমি আমার চারজন লোককে সন্ধ্যার আগেই এখানে গোপনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তারা এখানে এসে লুকিয়ে থাকায় উমরু দরবেশের এ লোকেরা ওদের দেখতে পায়নি। গতকালের মতই এরা অপেক্ষা করছিল, কখন উমরু দরবেশ মশাল উঁচিয়ে ইশারা করবে। উমরু দরবেশের ইশারা পেলেই এরা পাথরের ওপর ঢেলে রাখা এই তেলের উপর আগুন ধরিয়ে দিত। আর তোমরা সেই আলোকে তুরের তাজাল্লি মনে করে বিভ্রান্ত হয়ে বাড়ী ফিরে যেতে। কিন্তু আজ আমার লোকেরা আগুন লাগানোর আগেই এদের বেঁধে ফেলায় উমরু দরবেশ বার বার মশাল নাড়ার পরও পাহাড়ের চূড়ায় তোমরা কোন আলো দেখতে পাওনি।’

    ‘এরা ছিল তিনজন।’ এক কমান্ডো বললো, ‘এদের অন্য একজন আমাদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে এসে নিহত হয়, তার লাশ গাছের নিচে পড়ে আছে।’

    আলী বিন সুফিয়ানের ইশারায় নিহত লোকের লাশও সেখানে টেনে নিয়ে এলো কমান্ডোরা। আলী বিন সুফিয়ান ধৃত গোয়েন্দাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা এ জনপদের মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করার মিশন নিয়ে সুদানের কাফের সরকারের পক্ষ থেকে এখানে কাজ করছিলে, একথা অস্বীকার করতে পারবে? বলো, আমি কি মিথ্যা বলছি?’

    ‘আমাকে ক্ষমা করুন!’ একজন ভীত কম্পিত স্বরে বললো, ‘আপনি যা বলেছেন তা বিলকুল সত্যি।’

    ‘তোমরা কি এ এলাকার মুসলমান নও?’

    ‘হ্যাঁ।’ দু’জনই মাথা নত করে সম্মতি জানালো।

    ‘খৃস্টান ও সুদানী কাফেররা কি তোমাদেরকে এ কাজের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়নি?’

    ‘হ্যাঁ, তারাই দিয়েছে।’

    ‘আর তোমরা তোমাদের জাতিকে ধোঁকা দিয়ে এবং নিজের ধর্মকে ধ্বংস করে তাদের কাছ থেকে ভাতা ও পুরস্কার নাও?’

    ‘হ্যাঁ। আমরা এর বিনিময়ে পুরস্কার ও ভাতা পেয়ে থাকি।’

    একজন উত্তর দিল, ‘তবে আজ থেকে তওবা করছি, জীবনে আর কখনো এমনটি করবো না। আপনি দয়া করে এবারের মত আমাদের ক্ষমা করে দিন।’

    অপর জন বললো, ‘আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। আমরা ওয়াদা করছি, এরপর থেকে জাতির জন্য, ধর্মের জন্য আমরা আমাদের জীবনকে বিলিয়ে দেবো।’

    এ সময় অকস্মাৎ এক ব্যক্তি জনতার ভিতর থেকে ছুটে এসে তলোয়ারের আঘাতে দুই বেঈমানের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিৎকার করে উঠল, ‘বেঈমান, এখনো ভন্ডামী!’ এরপর তলোয়ার আলীর পায়ের কাছে রেখে দিয়ে বললো, ‘যদি আমি অপরাধী হয়ে থাকি, যদি সবার কাছে আমি খুনী হয়ে থাকি, তবে এ তলোয়ার দিয়েই আমাকে হত্যা করা হোক।’

    গাদ্দারদের মাথা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, আলীর পায়ের কাছে পড়ে ছিল লোকটির রক্তাক্ত তলোয়ার, আলী তাকালেন ইমাম সাহেবের দিকে।

    ইমাম সাহের ভরাট ও দরাজ কন্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এ লোক খুনী নয়। এই হত্যা শরিয়তে জায়েজ!’

    আলী বিন সুফিয়ান এবার উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখনও কি কারো মনে কোন প্রকার সন্দেহ আছে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করার নাম করে এরা তোমাদের ঈমানকে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছিল?’

    সমস্বরে সবাই বললো, ‘না। আল্লাহর হাজার শোকর যে, আপনি সময় মত এসে আমাদেরকে গোমরাহীর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।’

    ভোর রাত। এক স্থানে ঘোড়া থামালেন উমরু দরবেশ। আলী এবং কমান্ডোদের বললো, ‘খানিক বিশ্রাম নিয়ে নাও। ঘোড়াগুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ওদেরও একটু বিশ্রাম প্রয়োজন।’

    রাজধানীর পথে ছুটে চলা সুদানী গোয়েন্দা মধ্য রাত পর্যন্ত একটানা পথ চললো। শেষে ঘুম আর ক্লান্তির কাছে পরাজিত হয়ে এক জায়গায় থেমে গেল বিশ্রামের জন্য। তাঁবু টানিয়ে শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লো সে। এ গোয়েন্দার তো আর জানা ছিল না, উমরু দরবেশ তার আগেই সদলবলে যাত্রা করেছে রাজধানী খার্তুমের দিকে। জানা থাকলে এমন বিশ্রামের কথা হয়তো সে চিন্তাও করতো না।

    ফজরের নামাজ পর্যন্ত বিশ্রাম নিল উমরু দরবেশের দল। সূর্য উদয়ের সাথে সাথেই কাফেলা নিয়ে তিনি আবার যাত্রা শুরু করলেন। উমরু দরবেশ ছিলেন একজন জাত সৈনিক। কমান্ডোরাও তাই। ফলে দুর্গম পথের কষ্ট সহ্য করা তাদের জন্য নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু আশী মেয়ে মানুষ। তার ওপর নবীন বয়স। প্রতিপালিত হয়েছে শাহী মহলের আদর সোহাগ ও বিলাসিতায়। যদিও কষ্ট সহ্যের ট্রেনিং ছিল কিন্তু তা কেবল ট্রেনিং পর্যন্তই, কোন দিন তার মুখোমুখি হতে হয়নি।

    বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছে কাফেলা। রোদের উত্তাপ গায়ে এসে কামড় বসাতে শুরু করেছে, আশীর দিকে তাকালেন উমরু দরবেশ। তার চেহারায় রাত জাগার ক্লান্তি, মুখটা মলিন। মেয়েটির এ বিমর্ষ রূপ দেখে মায়া হলো উমরু দরবেশের। বললো, ‘আশী! তোমার সুন্দর মুখখানা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে।’

    ‘এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়িনি তো!’ আশীর সংক্ষিপ্ত জবাব।

    ‘তাছাড়া, তোমার তো রাত জাগার অভ্যাস নেই, তাই দু’চোখে লেগে আছে ক্লান্তি ও ঘুমের ঘোর। এক কাজ করো, তুমি চলে এসো আমার ঘোড়ার পিঠে, তাতে কষ্ট একটু লাঘব হবে।’ আশী একটু হাসলো, কিন্তু মুখে কিছু বললো না।

    একটু পর। আশীর চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছিল। ঘুমিয়ে পড়লে ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে পারে। উমরু দরবেশ আবারও বললো, ‘আশী! তোমার ঘোড়া ছেড়ে চলে আসো। আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখো, তাহলে পড়বে না ঘোড়া থেকে।’

    আশী এবারও হাসলো, ম্লান হাসি। কিছু দূর গিয়ে এক কমান্ডো উমরু দরবেশকে বললো, ‘মেয়েটা তো পড়ে যাবে!’

    উমরু দরবেশ নিজের ঘোড়া নিয়ে গেলেন আশীর ঘোড়ার পাশে এবং লাগাম টেনে ধরে থামিয়ে দিলেন তার ঘোড়া। আশী জেগে উঠলো। উমরু দরবেশ বললো, ‘আমার সামনে এসে বসো।’

    ‘আমি কারো সাহায্য চাই না।’ আশী বললো, ‘আমিই বরং সাহায্য করবো তোমাদের। আমাকে আমার অঙ্গীকার পূরণ করতে দাও। আমার মা-বাবার হত্যা ও আমার মান সম্ভ্রম নষ্টের প্রতিশোধ নিতে হবে আমাকে। আমি জেগে থাকার চেষ্টা করছি।’

    ঘোড়া আবার চলতে লাগলো। কিছু দূর গিয়ে এক সময় আশী ঠিকই ঘুমিয়ে পড়লো। উমরু দরবেশ পাশেই ছিলেন, নইলে মাটিতে পড়ে যেত আশী।

    তিনি ঘোড়া থামিয়ে আশীকে কিছু না বলেই তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের ঘোড়ার সামনে বসিয়ে দিলেন। এক কমান্ডো তার ঘোড়ার জ্বীনের সাথে আশীর ঘোড়া বেঁধে নিল। আবার যাত্রা করলো কাফেলা।

    ঘোড়া ছুটছে পূর্ণ গতিতে। আশী এবার আর ঘুমকে তাড়াতে চেষ্টা করলো না। সে মাথাটি আস্তে করে উমরু দরবেশের বুকে ঠেকিয়ে গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়লো।

    আশীর খোলা চুল উমরু দরবেশের চোখে মুখে আঘাত হানছিল। দেহ ও চুলের ঘ্রাণ আছড়ে পড়ছিল তার নাসারন্ধ্রে। কিন্তু এমন চুল ও দেহের পরশ তাঁর মনের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি, যেমন এক যুবতী ও যুবকের মনে প্রভাব ও ক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাঁর মনে আশীর সেই কথা গুলো বাজতে লাগলো, ‘তোমার কোলে বসে আমার ছোট বেলায় বাবার কোলে বসার আনন্দ ও নিরাপত্তার কথা মনে পড়ছে। আজ যেমন তুমি আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আগলে রেখেছিলে, সেদিনও আমার বাবা আমাকে এমনিভাবে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বুকে চেপে রেখেছিল।’

    আশী কিছুদিন আগে যখন এ পথে পাহাড়ী অঞ্চলে যাচ্ছিল তখন মরুভূমিতে রাতে নেকড়ে বাঘের ডাক শুনে ভয়ে উমরু দরবেশের বুকে লাফিয়ে পড়ে এ কথা বলেছিল। উমরু দরবেশের মনে এখন সে কথাগুলোই নীরবে বার বার ভেসে উঠছিল। উমরু দরবেশের মনে হলো, সে তাকে আরো বলছে, ‘উমরু দরবেশ! আমি মুসলমানের মেয়ে, আমাকে আর খৃস্টানদের হাতে তুলে দিও না। আমার চোখের সামনে রক্ত! রক্ত! রক্ত! সে রক্ত আমার বাবার! সে রক্ত আমার মায়ের! বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র মাটিতে মিশে আছে সে রক্ত। উমরু দরবেশ! তোমার শিরাতে কি হাশেম দরবেশের রক্ত বইছে না? তাহলে তোমাকে সে রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে হবে, যে রক্ত বাইতুল মুকাদ্দাসের মাটি একদিন চুষে নিয়েছিল আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে। তোমাকে ফিলিস্তিনের সম্মান ও সম্ভ্রম ডেকে বলছে, হে আল্লাহর বান্দা! হে আখেরী নবীর খোশ-নসীব উম্মত! তোমাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসকে মন থেকে মুছে ফেলো না! জীবন তো কল্যাণের পথে ব্যয় করার জন্যই! সেই প্রথম কেবলাকে নাপাক দুশমনের হাত থেকে উদ্ধার করো। ওরে হাশিম দরবেশের বেটা! এ কাজে তুমি যদি এগিয়ে না যাও তবে মরেও যে তুমি শান্তি পাবে না!’

    উমরু দরবেশের ঘোড়ার গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। কমান্ডোরাও গতি বাড়ালো তাদের ঘোড়ার। বাতাসের বেগে ছুটছে ঘোড়াগুলো। এক কমান্ডো তার ঘোড়া নিয়ে গেল উমরু দরবেশের কাছে। বললো, ‘উমরু দরবেশ! সামনে কোন ফাঁড়ি থেকে ঘোড়া বদলানোর যদি সুযোগ থাকে তবে কিছু বলতে চাই না। আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে ঘোড়াগুলোকে এভাবে শেষ করা উচিৎ হবে না! বলি কি! দয়া করে একটু আস্তে চালান!’

    উমরু দরবেশ কমান্ডোর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ঘোড়ার গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনলেন। বললো, ‘আল্লাহ জাল্লে শানুহু আমাদের সঙ্গে আছেন। ঘোড়া ক্লান্ত হবে না।’

    তাদের কথার শব্দ এবং গতিতে ছন্দপতন ঘটায় আশীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে ভীত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম!’

    ‘ভালই ঘুমিয়েছো!’ উমরু দরবেশ বললো, ‘আরো ঘুমুবে?’

    ‘না, আর কোন ঘুমের প্রয়োজন নেই আমার। তোমার স্পর্শ আবার আমার মনে নতুন করে ঈমানী জোশ পয়দা করে দিয়েছে। এখন আমি আগেই চাইতেও তীব্র গতিতে ছুটতে পারবো।’

    ‘তাহলে যাও! নিজের ঘোড়ায় আরোহণ করো। ইনশাআল্লাহ সন্ধ্যা নাগাদ আমরা পৌঁছে যেতে পারবো।’

    আলী বিন সুফিয়ান সেই গ্রামে গেলেন, যে গ্রামে উমরু দরবেশ প্রথম রাতে কেরামতি দেখিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করেছিল। তিনি তার কমান্ডো বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেন, তারা যেন সমস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং উমরু দরবেশের ভিলকিভাজীর মুখোশ উন্মোচন করে আসল তথ্য জনগনকে অবহিত করে। গোয়েন্দা বাহিনী গ্রামের সাধারণ মানুষের পোশাকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো এবং উমরু দরবেশের ভন্ডামী ধরা পড়ার কাহিনী লোকজনকে বলে বেড়াতে লাগলো। ইমাম সাহেব তার মুসল্লীদের সামনে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে উজ্জীবিত করে তোললেন মুসল্লীদের। তিনি বললেন, ‘সুদানীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তোমাদের প্রস্তুত ও সতর্ক থাকতে হবে। সামরিক অভিযানে ব্যর্থ হয়ে ওরা এখানকার মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। আমাদের ঈমান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারো নেই। আমরা এ পাহাড়ী অঞ্চলকে স্বাধীন মুসলিম রাজ্য মনে করি। এখানে দীর্ঘকাল ধরে যে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শাসন চালু আছে তাই বহাল থাকবে। যদি এখানে নতুন করে কোন গাদ্দার ও গোয়েন্দা পয়দা হয়, তাহলে তাদের করুণ ও দুঃখজনক পরিণতির জন্য তারা নিজেরাই দায়ী থাকবে।’

    আলী বিন সুফিয়ান বিরাট ঝুঁকি নিয়ে এ অঞ্চলে পা দিয়েছিলেন। আল্লাহর রহমতে এবং তাঁর বিচক্ষণ ও সাহসী পদক্ষেপের ফলে অল্পতেই এ ষড়যন্ত্রের মূল উৎপাটিত হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ান এবার তার কমান্ডো বাহিনীকে দু’ভাগে বিভক্ত করলেন।

    ❀ ❀ ❀

    সুদানের কারাগার থেকে মুক্ত করে ইসহাককে একটি সুন্দর বাড়ীতে রাখা হয়েছিল। তাঁকে সেখানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হতো। তার সেবাযত্নের জন্য ছিল পর্যাপ্ত দাসদাসী। লোকজন তাকে যথেষ্ট সম্মান ও সমীহ করতো। নির্যাতন তো দূরের কথা, কেউ আর নতুন কোন প্রস্তাব নিয়ে এসে তাকে বিরক্তও করতো না! মনে মনে বেশ স্বস্তি অনুভব করলেন তিনি।

    রাতের খাওয়া দাওয়ার পর ইসহাক তার কামরায় একাকী বসেছিলেন। ভাবছিলেন উমরু দরবেশের কথা। সে এখন কি করছে? সেকি ফাঁকি দিতে পেরেছে সুদানীদের? নাকি ওদের হাত থেকে মুক্ত হতে গিয়ে নতুন করে বিপদের জড়িয়ে পড়েছে? তাঁর গোপন ইচ্ছা ফাঁস হয়ে গেলে তাঁর ভাগ্যে কি ঘটবে মনে হতেই শিউরে উঠলেন তিনি।

    ইসহাক এখন কি করবেন সে কথাই চিন্তা করছিলেন। তিনি তাঁর সামনে দু’টি নতুন বিপদ দেখতে পেয়ে আঁৎকে উঠলেন। প্রথমতঃ উমরু দরবেশ কারাগারের কঠিন শাস্তির ভয়ে সুদানীদের খেলনায় পরিণত হতে পারে। দ্বিতীয়তঃ উমরু দরবেশ তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ধরা পড়তে পারে ওদের হাতে। দুই অবস্থাতেই ইসহাকের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে। উমরু দরবেশের কথা ভাবতে গিয়ে এ আশংকা মনে উদয় হতেই এক ধরণের ভয়, শিহরণ ও ব্যস্ততা অনুভব করলেন তিনি। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘরময় পায়চারী করতে লাগলেন। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন, উমরু দরবেশের জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। যা করার তার নিজেকেই করতে হবে। ইসহাক নিজস্ব পরিকল্পনায় পালানোর কথা ভাবতে লাগলেন। কিন্তু কিভাবে পালাবেন তার কোন পথ খুঁজে পেলেন না।

    সুদানীদের জন্য তিনি এক মূল্যবাদ কয়েদী! সে জন্য সুদান সরকার তার ওপর কড়া পাহারার ব্যবস্থা রেখেছে। উমরু দরবেশ তাঁর কাছ থেকে পৃথক হওয়ার সময় বলেছিল, সুদানী মুসলমানদেরকে সুদান সরকারের অনুগত বানানোর প্রস্তাবে রাজি হলে সরকার তাকে মুক্ত করে দেবে। তাহলে উমরু দরবেশ কি এখন মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করার কাজ করে যাচ্ছে! ইসহাক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিল। ভাবছিল, এ জাহান্নাম থেকে মুক্তির তবে কি কোন পথ নেই? সূর্য অস্ত গিয়েছে খানিক আগে। চারজন অশ্বারোহী সুদানের রাজধানী খার্তুমে প্রবেশ করলো। ডানে বায়ে না তাকিয়ে ওরা সোজা সামরিক হেডকোয়ার্টারে গিয়ে থামলো। উমরু দরবেশ জানেন, কোথায় যেতে হবে ও কার সঙ্গে দেখা করতে হবে। তাকে নতুন চিন্তাধারার ট্রেনিং এখানেই দেয়া হয়েছিল। রক্ষীদের কাছে পৌঁছেই উমরু দরবেশ বললো, ‘জলদি আমাকে সেনাপতির কাছে পৌঁছে দাও।’

    রক্ষী কমান্ডার দ্রুত তাকে সেনাপতির কাছে নিয়ে গেল।

    ‘ব্যর্থ হয়ে ফিরেছ নাকি সফল হয়েছ?’ উমরু দরবেশকে দেখতে পেয়েই সেনাপতি প্রশ্ন করলো।

    ‘ভাল সংবাদ এর কাছেই শোনো!’ উমরু দরবেশ আশীর দিকে ইশারা করে বললো, ‘হয়তো আমার কথা তোমার বিশ্বাস নাও হতে পারে।’

    ক্লান্তি ও অবসাদে কামরায় প্রবেশ করেই আশী পালংকের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে পড়লো। উমরু দরবেশের কথা শুনে মদির কটাক্ষ হেনে তৃপ্তির হাসি হেসে বললো, ‘ভনিতা রাখো তো দরবেশ! সব কিছু দ্রুত খুলে বলো। এখনো অনেক কাজ বাকী আছে, জলদি করো। কারন আমাদের হাতে সময় বেশী নেই।’

    ‘আমাদের মিশন এত তাড়াতাড়ি সফল হবে, এমন আশা আমাদের মোটেই ছিল না।’ উমরু দরবেশ বললেন। তিনি কিভাবে কি করেছেন সব খুলে বললেন। কেমন করে ভেজা কাপড়ে আগুন ধরালেন, কেমন করে তুরের তাজাল্লি দেখালেন, সব।

    ‘আর তাঁর কথা বলার সময় সম্মোহনের যে আবেগ তৈরী হতো, সবকিছু জানা না থাকলে আমিও তো মজে যেতাম!’ আশী উমরু দরবেশের কাজের প্রশংসা করতে গিয়ে অভিভূত কন্ঠে বললো, ‘লোকেরা তাঁর কথা মুগ্ধ বিস্ময়ে গিলতো। মনে হতো, লোকগুলোর আলাদা কোন অস্তিস্ব নেই, সবকিছু নিস্প্রাণ, নির্জীব। কেবল প্রাণময় সত্তা উমরু দরবেশ। সে যদি রহীমকে বলতো, তোমার নাম রাম, লোকগুলো হয়তো তাই বিশ্বাস করতো।’

    ‘কেন, কেউ কি এ পর্যন্ত আপনাকে আমাদের সাফল্যের সংবাদ দেয়নি?’ উমরু দরবেশ প্রশ্ন করলেন।

    ‘না! কেউ আসেনি!’ সুদানী সেনাপতি বললো, ‘আমি তো তোমাদের নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম তোমাদের মিশনের খবর শোনার জন্য।’

    উমরু দরবেশ এ কথা শুনে একটু আশ্বস্ত হলেন। যাক, এখনও সে গোয়েন্দা এসে পৌঁছেনি, যে আলীর গোয়েন্দাদের চোখে ধূলো দিয়ে জনতার মধ্য থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। উমরু দরবেশ সেনাপতির কথা বিশ্বাস করলো। কারণ সে গোয়েন্দা জানতো না উমরু দরবেশ খার্তুমের পথ ধরেছে। ফলে তার চলার গতি সেই আবেগ ও শঙ্কা কাজ করেনি, যে ভয় তাড়িত করেছে উমরু দরবেশদের। সমান গতিতে আসলেও তার এসে পৌঁছতে সময় লাগার কথা। কারণ তাড়া খেয়ে সে নিশ্চয়ই সোজা পথে আসবে না। ঘুর পথে আসতে গেলে সময় তো একটু বেশী লাগবেই।

    উমরু দরবেশ সুদানী গোয়েন্দার আগমন বিলম্বে খুশী হলো। সবাইকে বোকা বানিয়ে ইসহাককে নিয়ে সরে পড়ার এটাই সুযোগ। ওই গোয়েন্দা এসে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে আসল ঘটনা জানাজানি হয়ে যাবে। তখন উমরু দরবেশের ভাগ্যে আগের মত আর কারাগারের জীবনও জুটবে না। একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর কোন শাস্তিই বরাদ্দ করে না এমন অপরাধীর জন্য।

    ‘এখন আমার ইসহাকের প্রয়োজন।’ কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই উমরু দরবেশ বললো, ‘আমি সেখানকার মুসলমানের মগজ ধোলাই করেছি। আমি তাদের সুদান সরকারের অনুগত হতেও রাজী করাতে পেরেছি। আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে তাদের মনে ঘৃণা ও শত্রুতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। তাদের অন্তরে আমি এ ধারনা বদ্ধমূল করতে পেরেছি যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ফেরাউনের উত্তরসুরী। এখন প্রয়োজন সুদানের সুদানের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য তাদেরকে ডাক দেয়া। এ ডাক কেবল সেই দিতে পারে, যে সেখানকার মুসলমানের আস্থাভাজন ও বিশ্বাসী নেতা। যদি তেমন কাউকে দিয়ে একবার সেখানকার মুসলমানদের এ আহবান জানাতে পারেন, আমার বিশ্বাস, সে এলাকা পুরোপুরি আপনাদের করায়ত্বে এসে যাবে। আমি জানি এবং যাচাই করেও দেখেছি, তাদের একমাত্র বিশ্বস্ত নেতা ইসহাক। সে ছাড়া আর এমন কেউ নেই, যার ডাকে তারা বিনা প্রশ্নে সাড়া দেবে।’

    ‘কিন্তু ইসহাককে কে বোঝাবে?’ সুদানী সেনাপতি বললো, ‘আমি তো তাকে সে এলাকার আমীর করার লোভও দেখিয়েছি। তাকে এমন কঠিন শাস্তি দিয়েছি, যে শাস্তি ঘোড়াও সহ্য করতে পারে না। আশীকে পাঠিয়েছিলাম তাকে বশ করতে, সেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।’

    ‘এখন আমাকে চেষ্টা করতে দিন।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘তাকে কারাগার থেকে বের করে সেই কামরাতে আনুন, যেখানে আপনি তাকে এবং আমাকে একদিন রেখেছিলেন। আপনি তার শত্রু, কিন্তু আমি তার সঙ্গী এবং বন্ধু।’

    ‘তুমি কি আশী কি দিয়ে আরেকবার চেষ্টা করবে?’ সুদানী সেনাপতি বললো।

    ‘না!’ উমরু দরবেশ বললো, ‘এখন আমি আমার কথার যাদুতে তাকে বাধ্য করবো। আমি তার ওপর সেই সম্মোহন বিদ্যা প্রয়োগ করবো, যে বিদ্যার কারণে আমার বংশ দরবেশ বংশ হিসাবে পরিচিত। কেবল একটি রাত, আশা করি সূর্য উঠার আগেই সে আমার জালে বন্দী হবে। আমি বেশী সময় নিতে চাই না। সে এলাকায় আমার অনুপস্থিতি দীর্ঘ হলে তাদের ঘোর কেটে যেতে পারে। ঘোর কাটার আগেই আমি তাদের শোনাতে চাই সে আহবান, যে আহবান শোনানোর জন্য আপনারা এতকাল ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আপনি জানেন, সেখানে মিশরের গোয়েন্দা রয়েছে। আমি সেখানে যে যাদু চালিয়েছি সে যাদুর প্রভাব নষ্ট করা মত সুযোগ আমি মিশরী গোয়েন্দাদের দিতে চাই না।’

    সুদানী সেনাপতি উমরু দরবেশের দুই সঙ্গী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। উমরু দরবেশ বললো, ‘এরা আমার দুই মুরীদ! এরা আমার এমন ভক্ত হয়ে গেছে যে, বাড়ীঘর ছেড়ে মরার আগ পর্যন্ত আমার খেদমতে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় চলে এসেছে। ভেবে দেখলাম, কাজকর্ম করানোর জন্য দু’একজন লোক সঙ্গে থাকলে ভালই হয়। তাই ওদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দিয়েছি।’

    উমরু দরবেশের সেই কাংখিত কামরায় নিয়ে আসা হলো ইসহাককে। সেনাপতি নিজে ইসহাকের সাথে দেখা করে বললো, ‘আমি তোমাদের জাতীয় প্রেরণা ও বিশ্বাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। তোমার এক বন্ধু উমরু দরবেশ তোমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি আশা করি, তোমাদের সাক্ষাৎ প্রীতিপ্রদ হবে।’

    ‘আমাকে কারাগারের জঘন্য পরিবেশে রাখো, তারচেয়ে জঘন্য নরকের পরিবেশে রাখো অথবা তোমাদের মহলেই রাখো, অত্যাচার করো বা লোভ দেখাও, আমাকে আমার পথ থেকে এক চুলও সরাতে পারবে না।’ ইসহাক বললো, ‘তুমি আমাকে মৃত্যুকূপে নিয়ে যাও অথবা রাজপ্রাসাদে, আমি ঈমান বিক্রি করবো না। বন্ধুত্ব আর শত্রুতা সবই আমার কাছে সমান। সব কিছুর ওপর থাকবে আমার বিশ্বাস, আমার ঈমান।’

    সুদানী সেনাপতি হেসে দিল, কামরায় প্রবেশ করলো উমরু দরবেশ। উমরু দরবেশকে দেখেই ইসহাক বলে উঠলো, ‘তোমার চেহারাই বলে দিচ্ছে, তুমি এ কাফেরদের কাছে তোমার ঈমান বিক্রি করে দিয়েছো। তোমার স্বাস্থ্য, তোমার চেহারা ও চোখ বলছে, তুমি খুব আরামেই আছো। আমার সঙ্গে কেন দেখা করতে চাও?’

    ‘আমি তোমার চেহারায় আমার মত মুক্তির আনন্দ ও চমক দেখতে চাই।’ উমরু দরবেশ বললো, ‘একটু আমাকে বলার সুযোগ দাও, কিছুক্ষণের জন্য তোমার মন, তোমার বুদ্ধি আমার কাছে সঁপে দাও। ধৈর্য ও শান্ত মনে আমার কথা শোনো! তাতে তোমার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে না। আমি তোমার ঈমান কিনতে আসিনি। ঈমান নিয়ে ব্যবসা আমি করি না। আমি তোমার বন্ধু, তোমার মঙ্গলাকাংখী। কিসে তোমার কল্যাণ, কিসে অকল্যাণ, কিসে মঙ্গল, কিসে অমঙ্গল- এটুকুই শুধু আমি তোমার সাথে খোলাখুলি ও অন্তরঙ্গ পরিবেশে আলাপ করতে চাই।’

    এ আলাপের সময় সুদানী সেনাপতি পাশেই দাঁড়িয়েছিল। ইসহাক তাদের এক মূল্যবান কয়েদী। তার ব্যাপারে কোন রকম ঝুঁকি নিতে রাজী নয় সেনাপতি। উমরু দরবেশও একসময় কয়েদী ছিল। উমরু দরবেশ ধোঁকাও তো দিতে পারে! তাদের দু’জনকে এক কামরায় গোপন আলাপের সুযোগ দেয়া সমীচিন মনে হলো না সেনাপতির। তাই এ আলাপের সময় সে পাশে দাঁড়িয়েই রইলো।

    এ আলাপের জায়গাটি কারাগার ছিল না। কিন্তু তাই বলে নিরাপত্তাহীনও ছিল না। চারজন পাহারাদার নিযুক্ত আছে এ বাড়ীতে। দু’জন প্রহরী সামনের ফটকে, অন্য দু’জন পিছনের সংকীর্ণ দরজায়। তাদের সাথে আছে বর্শা ও তলোয়ার। আরো আছে তীর ধনুক। ইচ্ছে করলেই কেউ পালিয়ে যেতে পারবে এমন নয়। উমরু দরবেশ ও ইসহাক এখান থেকে পালিয়ে যাবে এমন কোন ভয় বা আশঙ্কা ছিল না সেনাপতিরও।

    উমরু দরবেশ চাচ্ছিলেন সেনাপতি সেখান থেকে চলে যাক, কিন্তু যাওয়ার কোন লক্ষণই দেখা গেল না সেনাপতির হাবভাবে। তার উপস্থিতিতে উমরু দরবেশ ইসহাককে খোলাখুলি কিছু বলতেও পারছে না, ওদিকে যে কোন সময় পাহাড়ী গোয়েন্দা এসে সবকিছু ফাঁস করে দিতে পারে। ভেতরে ভেতরে প্রচন্ডভাবে অস্থির হয়ে পড়লেন উমরু দরবেশ।

    আশী গোসল ও বিশ্রামের জন্য পাশের কামরায় চলে গিয়েছিল। সে চলে এলে হয়তো সুদানী সেনাপতিকে সরানোর একটা কায়দা বের করতে পারতো। কিন্তু তার এদিকে আসার নামগন্ধও নেই। সুদানী সেনাপতি শিকড় গেড়ে বসে আসে এক আসনে। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে মূল্যবান কয়েকটি ঘণ্টা। হয়তো সে গোয়েন্দা শহরের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। সে এসে পড়লেই সমস্ত ব্যাপারটা তালগোল পাকিয়ে যাবে।

  • গাদ্দার

    গাদ্দার

    গাদ্দার

    পাহাড়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল সাইফুদ্দিন গাজীর নেতৃত্বে এগিয়ে আসা সম্মিলিত বাহিনীর তিন শক্তি। সহসা আকাশ কালো করা ভয়ংকর এক ধূলিঝড় এসে আপতিত হলো ওদের ওপর। সামনে, আশপাশে, চারদিকে কিছুই দেখা যায় না। ঝড় এত প্রবল বেগে ধাবিত হলো ওদের ওপর দিয়ে, কেউ সামলে উঠার আগেই সম্মিলিত বাহিনী তছনছ হয়ে গেল। সামরিক শৃংখলা ভেঙে যার যার মত ছত্রভঙ্গ হয়ে ওরা ছুটলো পাহাড়ের বড় বড় পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে বাঁচার আশায়। ঘোড়া ও উটগুলো ছুটলো লাগামহীনভাবে। সেনাপতি ও কমাণ্ডাররা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেল। ঝড় থেমে গেলে আবার গুছিয়ে নেয়া যাবে এমনটি ভাবারও অবকাশ পেল কেউ।

    ঝড়ের বেগ ক্রমে আরও প্রবল থেকে প্রবলতর আকার ধারণ করলো। কেউ কেউ বালির নিচে পুরোপুরি ডুবে গেল। ঝড়ের আঘাতে আহত হয়ে ময়দানে পড়ে রইলো কেউ। যুদ্ধের মালসামান, অস্ত্র ও গোলাবারুদ বালিচাপা পড়লো অধিকাংশই।

    এদিকে সুলতান আইয়ুবী ঝড়ের মত এগিয়ে আসা শত্রু বাহিনী বা এই প্রাকৃতিক ধূলিঝড়, কোনকিছু সম্পর্কেই অবগত ছিলেন না। তিনি ব্যস্ত ছিলেন তার রুটিনওয়ার্ক অনুযায়ী সৈনিকদের প্রশিক্ষণ কাজে। সহসা দিগন্তে ধূলিমেঘ দেখেই সচকিত হলেন তিনি। ভাবলেন, এ কি করে সম্ভব? কি করে গোয়েন্দাদের চোখে ধূলো দিয়ে দুশমন ফৌজ এত কাছে চলে এলো? কিন্তু এটা যে মরু সাইমুম তখনো ভাবতেই পারেননি তিনি।

    ছুটে আসা দুশমন বাহিনীর অযাচিত ও আকত্মিক হামলা মোকাবেলা করার জন্য তিনি নিজের বাহিনীকে প্রস্তুত হওয়ার হুকুম দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন এক পাহাড় চূড়ায়, যাতে দুশমন বাহিনীর আকার ও অবস্থা বুঝতে পারেন।

    ততক্ষণে বাদামী ঝড় গাঢ় হতে শুরু করেছে। ঝড়ের এ প্রকৃতি দেখে প্রমাদ গুণলেন তিনি। এ তো দুশমন ফৌজের আগমন বার্তা নয়! এ যে মরুভূমির দুঃস্বপ্ন সাইমুম ঝড়!

    তিনি উৎকট পেরেশানী নিয়ে মুহূর্তে আবার ছুটে এলেন বাহিনীর কাছে। বললেন, যে যেখানে পারো লুকাও! যার যার অস্ত্র নিয়ে বসে পড়ো পাথরের আড়ালে। দুশমন নয়, এখনি তোমাদের ওপর আঘাত হানবে মরু সাইমুম!’

    তাঁবু গুটানোরও সময় পেল না সৈনিকরা, যার যার মত ছুটলো আত্মরক্ষা করতে।

    এক সময় ঝড় থামলো। পাহাড় ও পাথরের গোপন আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো সৈনিকরা। দেখলো, তাঁবুর কোন চিহ্নও নেই সেখানে। খাদ্য ও মালসামানের বহর লণ্ডভণ্ড। সৈন্যরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়লো উড়িয়ে নেয়া মালামালের সন্ধানে। এভাবেই আল্লাহ সত্যপথের পথিকদের সাহায্য করেন। হয়তো দুই মুসলিম নারীর প্রাণের আকুতি ও প্রার্থনা আল্লাহর আরশে কাঁপন তুলেছিল। হারেস ও দাউদের মত জানবাজদের আত্মত্যাগে খুশী হয়েছিলেন আল্লাহ জাল্লে শানুহু। দুই মুসলিম মেয়ের আবেগ ও প্রেরণার ইজ্জত রক্ষার্থে আল্লাহ এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন আইয়ুবীর বাহিনীকে।

    হারেস ও দাউদ! ফৌজি ও তার ভাবী! ঈমানের পরশদীপ্ত চারটি খাঁটি সোনা। আল্লাহর দ্বীনের জন্য জান কবুল করা চার বীর মুজাহিদ!

    আইয়ুবীর বিরুদ্ধে তিন মুসলিম গাদ্দারের সম্মিলিত বাহিনী যখন ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে তুর্কমান, এ খবর, আইয়ুবীর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য ছুটছিল দাউদ ও হারেস। কিন্তু দুশমনের গোয়েন্দা বাহিনীর চোখে ধরা পড়ে যায় ওরা। ওদের ধাওয়া করে দুশমনের গোয়েন্দা বাহিনী। আক্রান্ত হয় ওরা। বীরের মত লড়াই করে ওরা সর্বশক্তি দিয়ে, কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারে না।

    ওরা মারা গেছে ভেবে দুশমনরা ফিরে যায়। মৃত্যুপথযাত্রী দাউদ বুঝতে পারে তুর্কমান সে কোনদিনই পৌঁছতে পারবে না। কোনদিন সে আর সুলতান আইয়ুবীকে গিয়ে বলতে পারবে না, দুশমন ছুটে আসছে অতর্কিত হামলা করতে। তবু প্রাণ থাকতে সে আশা ছাড়তে রাজি নয়, সে কোন রকমে এ খবর ফৌজিদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

    বাড়িতে যুবতী ফৌজি ও তার ভাবী ছাড়া আর কেউ নেই। এক মুজাহিদের লাশ ও বাড়ি আল্লাহর হাওলা করে দিয়ে এ খবর নিয়ে অবলা দুই নারী ছুটলো তুর্কমান।

    অনেক দূরের পথ, পথে পদে পদে বিপদ, কিন্তু ঈমানের কাছে সব বিপদ হার মানে। ওরা ছুটে চলে তুর্কমান।

    পথে ফৌজি দেখতে পায় পাহাড়ের কোলে পড়ে আছে এক মুসাফিরের লাশ। ওরা এগিয়ে যায় লাশের কাছে। দেখতে পায় ওটা লাশ নয়, তারই আপন ভাইয়ের আহত রক্তাক্ত দেহ। সেই রক্তাক্ত দেহকে বুকে জড়িয়ে ফৌজি ও তার ভাবী আবার ছুটতে শুরু করে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয়, ব্যথা সবকিছু ছাপিয়ে তাদের মাথায় তখন একটাই চিন্তা, কতক্ষণে তারা পৌঁছবে তুর্কমান, সতর্ক করবে আইয়ুবী ও তার বাহিনীকে। এ সময়ই নেমে আসে সেই প্রলয়ংকরী মরু ঝড় সাইমুম।

    এই ঘটনা প্রমাণ করে, এক বোন তার আহত ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে মুসলিম মুজাহিদদের বিরুদ্ধে কাফেরদের অতর্কিত আক্রমণের খবর পৌঁছানোর জন্য জীবন বাজী রেখে যখন ছুটে যাবে মুসলিম ছাউনিতে, ভাই মারা যাচ্ছে এ নিয়ে দু:খ করারও সময় পাবে না বোন, এই আবেগ ও প্রেরণা যেখানে থাকবে, সেখানে আল্লাহর সাহায্য যুগে যুগে। এমনিভাবে হেফাজত করবে মুজাহিদদের।

    ❀ ❀ ❀

    সুলতান আইয়ুবীর ক্যাম্পের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ঝড়ে উড়ে গেছে তাঁবু, বাঁধা উট ও ঘোড়া ছুটাছুটি করে শোচনীয় অবস্থা করেছে নিজেদের। বালির সাথে ছোট ছোট পাথরকুচির আঘাত শরীরে বিদ্ধ হয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিল মানুষ-পশু সবাইকে। আহতদের আর্তচিৎকার ভুতপ্রেতের কান্নার মত চারদিক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। সূর্য তখনও অস্ত যায়নি, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন সূর্যকে ঝড় উড়িয়ে নিয়ে গেছে। ঝড়ের প্রচণ্ডতা একটু কমতেই কমাণ্ডাররা চিৎকার দিয়ে সৈন্যদের সতর্ক ও তালাশ করতে শুরু করলো। তখনো ঝড় বইছে হালকা, এলোমলো ভাবে।

    তিন চারজন সিপাই এক বিরাট পাথরের আড়ালে আচ্ছন্নের মত বসেছিল। পাশ দিয়ে একটি ঘোড়াকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে দেখলো ওরা। ঘোড়ার ওপর আরোহীও আছে। সিপাইরা চিৎকার করে ডাকলো, ‘এদিকে! এদিকে এসো! পড়ে যাবে তো! এমন ঝড়ের সময় কেউ ঘোড়ায় সওয়ার হয়!’

    আরেকজন অবাক হয়ে বললো, “আরে, কি বলছো! আরোহী তো দেখছি মহিলা!’

    তখনি পেছনের ঘোড়াটিও চোখে পড়লো ওদের। একজন বললো, দু’জন মহিলা!’

    এ দুই মহিলা ছিল ফৌজি ও তার ভাবী। সিপাইরা ভাবলো ঝড়ের কবলে পড়ে এরা রাস্তা ভুলে এদিকে এসে পড়েছে।

    ‘ঘোড়ার লাগমটা টেনে ধরো, পাথরের আড়ালে আশ্রয় নাও।’

    আমাদেরকে সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছে দাও। ফৌজি সিপাইদের উদ্দেশ্য করে বললো।

    ‘আরে মারা পড়বে তো! ঝড় থামুক। সুলতান আইয়ুবীকে কি দরকার তোমাদের!’ পেরেশান হয়ে প্রশ্ন করলো এক সিপাই।

    ঝড়ের শব্দ উপেক্ষা করে কর্কশ কণ্ঠে ফৌজি চিৎকার দিয়ে বললো, “আহাম্মক! আমাকে জলদি সুলতান আইয়ুবীর কাছে নিয়ে চলো। তিনি কোথায়? আমি খুব জরুরী সংবাদ নিয়ে এসেছি। এ সংবাদ এখনি তাকে জানাতে হবে, নইলে তোমরা সবাই মারা পড়বে।’

    সিপাইরা ঘোড়ার উপরে রক্তাক্ত এক লোককেও দেখতে পেলো। তারা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে অতি কষ্টে সুলতান আইয়ুবীর তাঁবু পর্যন্ত নিয়ে গেলো ওদের। কিন্তু সেখানে কোন তাঁবু ছিল না, ঝড়ে তাঁবু কোথায় উড়ে গেছে কেউ জানে না।

    এক কমাণ্ডার তাদের দেখে এগিয়ে এলো। বললো, ‘কি ব্যাপার! কি চাও তোমরা এখানে?’

    ‘আমরা সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে দেখা করতে চাই এবং এক্ষুণি।’ ফৌজি কর্তৃত্বের সুরে বললো কমাণ্ডারকে।

    কমাণ্ডার আর কোন প্রশ্ন না করে ওদেরকে সুলতান আইয়ুবীর কাছে নিয়ে গেল। সুলতান আইয়ুবী তখন এক বিরাট পাথরের আড়ালে বসেছিলেন।

    এই প্রলয়ংকরী ঝড় উপেক্ষা করে দু’জন মেয়েকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি জলদি উঠে দাঁড়ালেন। পাথরের আড়াল ছেড়ে কয়েক কদম এগিয়ে এলেন তাদের দিকে।

    প্রথমেই হারেসকে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নামানো হলো। সে তখনও জীবিত। ফৌজি দ্রুত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সুলতান আইয়ুবীর মুখখামুখি দাঁড়ালো। বললো, ‘মাননীয় সুলতান! সম্মিলিত শক্ৰদল আক্রমণের জন্য প্রবলবেগে ধেয়ে আসছে। তারা একদম কাছে চলে এসেছে। যে কোন সময় তারা আপনার বাহিনীর ওপর চড়াও হয়ে যাবে।’ সে দাউদের লেখানো চিঠি সুলতান আইয়ুবীর কাছে হস্তান্তর করলো।

    হারেস হাত তুলে ইশারায় সুলতানকে কাছে ডাকলো। সুলতান চিঠি না পড়েই এগিয়ে গেলেন তার কাছে। হারেস ফিসফিস করে কিছু বললো। তখনো কথা শেষ হয়নি তার, জবান বন্ধ হয়ে গেল তার। চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে গেল এক মুজাহিদ, যেন এ কয়টি কথা বলার জন্যই সে এতক্ষণ বেঁচে ছিল।

    একটু পরই ঝড় পুরোপুরি থেমে গেল। সুলতান আইয়ুবী তার সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের ডাকলেন! জরুরী ভিত্তিতে আদেশ দিলেন, ‘তাঁবু মেরামতের প্রয়োজন নেই। সৈন্যদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলল। কমাণ্ডো বাহিনীর সৈন্যদের জলদি তলব করো।’

    তিনি সেনাপতিদের কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝিয়ে বললেন। বললেন, ‘ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করতে হবে।’

    ঝড়ের বেগ পুরোপুরি শান্ত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এলো। সাইফুদ্দিনের নাস্তানাবুদ বাহিনী একে একে তাঁবুর স্থলে ফিরে আসতে লাগলো। তাঁবু নেই, অস্ত্র নেই, খাদ্যভাণ্ডারও লণ্ডভণ্ড। বালির নিচে চাপা পড়া অস্ত্রপাতি খুঁজে বের করতে লেগে গেল কেউ। কেউ ছড়িয়ে পড়লো আশেপাশে, উদ্দেশ্য, উড়িয়ে নেয়া তাঁবু খুঁজে বের করা। আহত সৈনিকদের সেবা করছিল কেউ, কেউ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

    রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেল সাইফুদ্দিনের। আক্রমণতো দূরের কথা, আক্রমণের চিন্তাও এলো না তার মনে। সবকিছুই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। উট ও ঘোড়া এদিকে ওদিক ছুটে গিয়েছিল। সেগুলো গুছাতে ও বেঁধে রাখতে রাতের অর্ধেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। এসব করতে করতে সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়লো, চোখে নেমে এলো রাজ্যের ঘুম।

    সুলতান আইয়ুবীর ক্যাম্পে তখন সাজ সাজ রব। যুদ্ধের তৎপরতা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। সাইফুদ্দিনের কোন ধারণাই ছিল, তাদের থেকে দুই তিন মাইল দূরে কি ঘটছে।

    সন্ধ্যার পরপরই আইয়ুবী একদল কমাণ্ডোকে ক্যাম্পের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। ওদের বলে দিলেন, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনী কোথায় ক্যাম্প করেছে এবং তাদের এখন অবস্থা কি সব তথ্য নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবে।’

    ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে এলো ওরা। মধ্য রাতের আগেই আইয়ুবীর সৈন্যরা মার্চ করলো। সাইফুদ্দিনের ক্যাম্পের চারদিকে অবস্থান নিয়ে ওঁৎ পেতে বসে রইলো ওরা।

    সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীকে অতর্কিতে আক্রমণ করার জন্য হলব থেকে বীর বিক্রমে ছুটে আসা সম্মিলিত বাহিনী তখন আইয়ুবীর বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ইচ্ছে করলেই আইয়ুবী এখন ওদের নিকেশ করে দিতে পারেন, কিন্তু তিনি তার বাহিনীকে বললেন, ‘রাতের আঁধারে কেউ দুশমনকে আঘাত করতে যেয়ো না। এতে যারা মারা পড়বে তারা তোমাদেরই ভাই। যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব তোমাদের।’

    ❀ ❀ ❀

    সকাল হলো। সম্মিলিত বাহিনী তখনো ভীষণ অগোছালো। তাদের তাঁবু ও খাদ্যশস্য উড়ে গেছে। ভয়ার্ত ঘোড়ার ছুটাছুটিতে বহু সৈন্য আহত। তারপরও সৈন্যদেরকে তড়িঘড়ি করে সাজানো শুরু হলো। তাতেই কেটে গেল দিনের অর্ধেক বেলা।

    সাইফুদ্দিন তার তিন বাহিনীর সেনাপতিকে একত্র করে আদেশ দিলেন, ‘জলদি তৈরী হয়ে নাও। সালাহউদ্দিন জানে না আমরা তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছি। এখনও সে নিশ্চয়ই অপ্রস্তুত অবস্থায় আছে। ঝড়ে আমাদের যতই ক্ষতি হোক, আমরা আমাদের অবশিষ্ট সৈন্য নিয়েই তার বাহিনীর ওপর সরাসরি আক্রমণ চালাবো।’

    দিনের শেষ প্রহরে তারা আক্রমণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করলো। সম্মিলিত সেনাদলের ডাইনে ও বামে উভয় পাশেই পার্বত্য এলাকা, পর্বত জুড়ে পাথর ও ঝোপঝাড়। তারা সবে রওনা শুরু করেছে, ঝোঁপঝাড় ও পাথরের আড়াল থেকে শুরু হলো প্রবল তীর বর্ষণ।

    সাইফুদ্দিনের বাহিনী প্রথমে থমকে দাঁড়াল, পরে অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করার পরিবর্তে আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ওরা যেই সামনের দিকে পা বাড়াল, সামনে থেকে শুরু হলো আগুনের গোলা বর্ষণ। হাঁড়িতে কাপড় ভরে তাতে জ্বালানী তেল ও পেট্রোল ঢেলে দূর থেকে নিক্ষিপ্ত হতে লাগলো আগুনের গোলা। সম্মুখ বাহিনীর ওপর এসে পড়তে লাগলো আগুনের লেলিহান শিখা।

    আক্রমণের গতি থেমে গেল। সাইফুদ্দিন তার বাহিনী পিছনে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো।

    আক্রমণের প্ল্যান পাল্টে নতুন ভাবে সৈন্য সমাবেশ করার কথা ভাবছিল সাইফুদ্দিন, কিন্তু ভাবনা কার্যকরী করার কোন সময় পেল না, যেই তারা পিছনের দিকে সরিয়ে নিল তাদের সৈন্য, তখনই শুরু হলো পিছন থেকে কঠিন আক্রমণ। এ আক্রমণের গতি এত তীব্র ছিল যে, ময়দানে সৈন্যদেরকে শৃংখলাবদ্ধ রাখাই দায় হয়ে পড়লো সাইফুদ্দিনের পক্ষে।

    এটা ছিল সুলতান আইয়ুবীর বিশেষ আক্রমণ পদ্ধতি। দুশমনকে ঘেরাও করে তাদের সব আশা-ভরসা চুরমার করে দিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত সৈন্যদের আত্মসমর্পনে বাধ্য করাই এ আক্রমণের লক্ষ্য।

    এ জন্য দরকার ত্রাস সৃষ্টি করা। সুলতান এবার সে পদক্ষেপই নিলেন। ওরা যে চারদিক থেকে ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েছে এ কথা বুঝিয়ে দেয়ার পর এবার পিছন থেকে তীরবেগে অশ্বারোহী বাহিনী ছুটিয়ে দিলেন তাদের ওপর। অশ্বারোহী বাহিনী বর্শা ও তলোয়ারের আঘাত হেনে সাইফুদ্দিনের বাহিনী তছনছ করে দিয়ে একদিক থেকে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। সাইফুদ্দিনের বাহিনীর মনে হলো, তারা কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে। কারণ মুহূর্তের জন্য মাত্র তারা আইয়ুবীর বাহিনীকে দেখতে পেয়েছিল, ওরা একদিক দিয়ে ঢুকে আবার নিমেষেই গায়েব হয়ে গেল অন্যদিক দিয়ে। দুই পাশ থেকেও একই সাথে আক্রমণ চললো। সাইফুদ্দিনের কেন্দ্রীয় কমাণ্ড শেষ হয়ে গেল।

    একটুপর নেমে এলো রাত। সাইফুদ্দিনের বাহিনী রাতের আঁধারে পাহাড়ে চড়ে আত্মরক্ষা করতে চেষ্টা করলো। কিন্তু ওখানে ওঁৎ পেতে থাকা আইয়ুবীর কমাণ্ডোরা সহজেই তাদেরকে টার্গেট বানিয়ে নিল।

    পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, থেকে থেকে ভেসে আসছিল আহত সৈনিকদের আর্ত চিৎকার। রাতেও বিরতি দিয়ে ঝটিকা আক্রমণ চলতে লাগলো অশ্বারোহী বাহিনীর।

    সাইফুদ্দিন আশ্রয় নিল পাহাড়ের এক খাঁজের ভেতর। তাঁর বাহিনীর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। কারণ ওরা সামান্য নড়াচড়া করলেই পাহাড় থেকে তাদের ওপর ছুটে আসে তীরের প্রবল বর্ষণ।

    সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডোা বাহিনী সারা রাত সাইফুদ্দিনের বাহিনীর ওপর কমাণ্ডো আক্রমণ চালিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে রাখলো তাদের। ময়দানে কোথাও তারা পা জমাতে পারলো না। কোথাও একটু সুস্থির হয়ে বসতে পারলো না তারা।

    ভোর। সুলতান আইয়ুবী এক উঁচু পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের অবস্থা দেখছিলেন। তাঁর বাহিনী যুদ্ধের শেষ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তিনি কাসেদকে তাঁর রিজার্ভ বাহিনীর কমাণ্ডারের কাছে পাঠালেন।

    কাসেদ কমাণ্ডারের কাছে পৌঁছার কিছুক্ষণ পর। সুলতানের রিজার্ভ অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দল আকাশবাতাস কাঁপিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের পেছনে ছুটে এলো পদাতিক বাহিনী। প্রচণ্ড বিক্রমে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো সাইফুদ্দিনের বাহিনীর ওপর। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশবাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। ময়দান জুড়ে তখন চলছিল এক মহা প্রলয়কাণ্ড!

    সাইফুদ্দিনের বাহিনীর যুদ্ধ করার কোন ক্ষমতাই রইল না আর। আইয়ুবীর বাহিনীর তুমুল আক্রমণের মুখে মুখ থুবড়ে পড়লো ওরা। এ আক্রমণ প্রতিহত করার সব যোগ্যতা ও ক্ষমতা হারিয়ে তারা চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লো।

    রাতভর প্রচণ্ড ভীতি ও শঙ্কার মধ্যে ৭কাটিয়েছে ওরা। ভোরে যখন সুলতান আইয়ুবীর অশ্বারোহী বাহিনী ছুটে এলো তাদের দিকে, প্রথম আক্রমণেই সাইফুদ্দিনের সৈন্যবাহিনীর মনোবল একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল। দেখতে দেখতে সাইফুদ্দিনের মনোবলও ভেঙ্গে গেল। তার চোখের সামনে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। নিজের বাহিনীর দিকে তাকিয়ে সাইফুদ্দিন দেখলো, তার এত কষ্টের সাজানো বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে। এখন তারা তার কমাণ্ডোর নাগালের বাইরে। যুদ্ধ করার যোগ্যতা হারিয়ে আত্মসমর্পন শুরু করেছে ওরা। যারা আত্মসমর্পন করছে না তারা আইয়ুবীর অশ্বারোহী বাহিনীর পদতলে পিষ্ট হচ্ছে নির্বিচারে। সঙ্গীর দুরবস্থা দেখে পাশের জন অস্ত্র সমর্পণ করে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

    সুলতান আইয়ুবীর যে সৈন্যদল এতক্ষণ পিছনে ছিল তারা বিজয় গর্বে সাইফুদ্দিনের বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে দাঁড়ালো। ডানে ও বায়ে পাহাড়ের ওপর থেকে কমাণ্ডোরা বিজয় উল্লাস করছে। মাঝখানে সাইফুদ্দিনের সৈন্যবাহিনী যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। আত্মরক্ষার শেষ অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে আত্মসমর্পনের পথ। এখন কমাণ্ডারের নেতৃত্বেই সৈনিকরা দলে দলে অস্ত্র সমর্পন করে বন্দীত্ব কবুল করে নিচ্ছে।

    সাইফুদ্দিনের ক্যাম্পে যখন বিজয়ী বাহিনী পৌঁছল, তখন সেখানে মদের সুরাহী, কিছু সংখ্যক আনন্দকন্যা ও খেদমতগার ছাড়া সাইফুদ্দিন বা তার রক্ষীদের কেউ ছিল না।

    ক্যাম্প এবং ক্যাম্পের আশপাশ থেকে যেসব কয়েদীদের ধরা হলো, তারা বললো, প্রধান সেনাপতি সাইফুদ্দিনকে তারা শেষ বারের মত উপত্যকার আড়ালে অদৃশ্য হতে দেখেছে, এরপর তার আর কোন খবর তারা জানে না। সাইফুদ্দিন কোথায় গেছে সে খবর কেউ বলতে পারলো না।

    সুলতান আইয়ুবী হুকুম দিলেন, ‘তোমরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ো। খুঁজে দেখো সাইফুদ্দিন কোথায় লুকিয়েছে। সে পালিয়ে যাওয়া মানেই আবারও তাকে ষড়যন্ত্র করার অবকাশ দেয়া।’

    সাথে সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো আইয়ুবীর বাহিনী। তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো পাহাড়ের অন্ধিসন্ধি। পাহাড় ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ঘুরে এলো ওরা, কিন্তু কোথাও তাকে আর পাওয়া গেল না। সাইফুদ্দিন পালিয়েছে! নিজের সেনাবাহিনীকে সুলতান আইয়ুবীর দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়ে কোন ফাঁকে কোথায় পালিয়ে গেছে সাইফুদ্দিন তার বাহিনীও তা জানতে পারেনি।

    ❀ ❀ ❀

    গভীর রাত। তুর্কমানের সবুজ প্রান্তরের নিরাপদ এক তাঁবুতে বসেছিল ফৌজি। সামনে তার শহীদ ভাইয়ের লাশ। সফেদ কাপড়ে ঢাকা সে লাশের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে বলছিল, আমি রক্তের নদী পার হয়ে এসেছি। এ নদীতে কোন সেতু নেই। হারেস! ভাই! আমি তোমার ফরজ আদায় করেছি, আমার দায়িত্ব শেষ!

    সুলতান আইয়ুবী যখন তার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন, তখন ফৌজি জিজ্ঞেস করলো, ‘সুলতান! কি সংবাদ? আমার ভাইয়ের রক্ত তো বৃথা যায়নি ত?’

    ‘আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করেছেন। তুমিই বিজয়ীনী হে প্রিয় বেটি! হে বীর কন্যা! তুমি….’ তিনি আর বলতে পারলেন, অশ্রুতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

    তুর্কমানের মহা সমর শেষ হয়েছে। সুলতান আইয়ুবীর সেনাপতি ও কমাণ্ডাররা যুদ্ধের ক্লান্তি ভুলে তাকিয়েছিল ময়দানের দিকে। আল মালেকুস সালেহ, সাইফুদ্দিন ও গুমাস্তগীনের ঐক্যবদ্ধ সামরিক জোটের কাপুরুষিত আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে পেরে তারা আনন্দিত। কিন্তু আইয়ুবীর চোখে সে আনন্দের রেশও নেই। যদিও বিপুল সংখ্যক পরাজিত সৈন্যকে অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করতে পেরেছেন, কিন্তু এ যুদ্ধে আহত ও নিহত সৈনিকের সংখ্যাও কম নয়। সেদিকেই বিমর্ষ নয়নে তাকিয়েছিলেন তিনি।

    সুলতান আইয়ুবীর সামনে পড়েছিল শত্রুদের লাশ, আহতরা ছটফট করছিল। তীরবিদ্ধ উট ও আহত ঘোড়াগুলো তখনো ময়দান জুড়ে ছুটাছুটি করছে। তাদের পদতলে পিষে মরছে আহত শত্রু সৈন্যরা।

    শত্রুদের যে সকল সৈন্য পালাতে পারেনি, তারা অস্ত্র সমর্পণ করে আশ্রয় নিয়েছিল আইয়ুবীর সৈন্যদের ঘেরাওয়ের ভেতর। অসংখ্য ঢাল, তলোয়ার, বর্শা, তীর, ধনুক, তীরকোষ, তাঁবু ও সৈন্যদের ব্যক্তিগত মালামাল, নগদ অর্থ ও অন্যান্য দামী মালসামান জমা করছিল আইয়ুবীর সৈন্যদের সামনে।

    দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মালামাল সংগ্রহ করে আনছিল আইয়ুবীর রিজার্ভ বাহিনীর সৈন্যরা।

    সুলতান আইয়ুবী সম্মিলিত বাহিনীর সুপ্রিম কমাণ্ডোর হেডকোয়ার্টার সাইফুদ্দিন গাজীর পরিত্যক্ত তাঁবুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই সে তাঁবু, যেখানে একটু আগেও জাতির এক গাদ্দার অবস্থান করছিল। মুজাহিদদের তলোয়ারের চমক দেখে তার সৈন্যরা যখন নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পনের পথ ধরলো, এ গাদ্দারের সে সাহসটুকুও আর অবশিষ্ট ছিল না। আত্মসমর্পনের পরিবর্তে পালিয়ে গেল সে। পালিয়ে গেল ভীরু ও কাপুরুষের মত, নিজের বাহিনী এবং সমস্ত মালসামান ও সৈন্যসামন্ত ফেলে রেখে। তার সাথে যেসব মেয়ে, নর্তকী, গায়িকা এবং বাজনাদারেরা ছিল, যেসব সোনার মোহর ও বাক্স ভর্তি নগদ টাকা-পয়সা ছিল, সবই পড়েছিল সেখানে।

    তার সৈন্যদের বেতন ও খরচের টাকা এবং সুলতান আইয়ুবীর লোকদের দলছুট করানোর জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সে রিজার্ভ করে রেখেছিল, সমুদয় সম্পদ পড়েছিল বেওয়ারিশ হয়ে। সাইফুদ্দিনের তাঁবুও ছিল মূল্যবান কাপড়ের। রেশমী কাপড়ের পর্দা ও সামিয়ানা দিয়ে সুন্দর এক মহল বানিয়ে নিয়েছিল সে নিজের জন্য।

    সে যুগের যুদ্ধ ময়দানে রাজমহলের সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা থাকতো রাজা-বাদশাহদের জন্য। সাইফুদ্দিন কেবল একজন সেনানায়কই ছিল না, সেই সাথে একজন শাসকও ছিল। ফলে মদের সুরাহী, রঙ বেরঙয়ের পিয়ালা, গায়িকা, নর্তকী সবই তার সঙ্গে ছিল। কিন্তু প্রাণের মায়া এমন এক মায়া যে, এর জন্য দুনিয়ার সবকিছুই ত্যাগ করা যায়। সাইফুদ্দিনও তাই করেছিল, সবকিছু ফেলে সে পালিয়ে গিয়েছিল অজানা গন্তব্যে।

    সুলতান আইয়ুবী কারুকার্যখচিত বর্ণালী কাপড়ের এই মনোমুগ্ধকর মহল তাকিয়ে দেখছিলেন। তার দৃষ্টি পড়লো রাজকীয় পালঙ্কের ওপর, যেখানে পড়ে আছে এক শাহী তলোয়ার। এর বাট ও খাপ কারুকার্য খচিত। সাইফুদ্দিন কি তাহলে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে, তলোয়ারের মত নিত্য সাথী অস্ত্র নিতেও ভুলে গেছে!

    সুলতান আইয়ুবী তলোয়ারটি হাতে উঠিয়ে নিলেন। তলোয়ারটি খাপমুক্ত করতেই তার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। তিনি তলোয়ারটির চমক দেখে পাশে দাঁড়ানো এক সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বললেন, মুসলমানের তলোয়ারে যখন নারী ও মদের ছায়া পড়ে, তখন তা আর তলোয়ার থাকে না, তা হয়ে যায় নিষ্ক্রিয় এক টুকরো লোহা। অস্ত্র হিসাবে তার আর কোন মূল্য থাকে না। এই তলোয়ার ফিলিস্তিন বিজয়ের জন্য তৈরী হয়েছিল। কিন্তু খৃস্টানরা পাপের মধ্যে ডুবিয়ে এটাকে কাঠের তলোয়ারের মত নিষ্ক্রিয় ও দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত করেছে। তলোয়ার ধরার হাতে যদি মদের ছোঁয়া লাগে, সে হাতের অস্ত্র রক্তের পরশ থেকে বঞ্চিত হয়।’

    সেই মনোরম প্রশস্ত তাঁবুতে সুন্দরী অর্ধ উলঙ্গ যুবতী মেয়েরা, ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল। তাদের ভাগ্যে এখন কি মুসিবত নেমে আসবে সে কথাই মনে মনে কল্পনা করছিল ওরা। বিজয়ী সৈন্যদের হাতে এখন তাদের কি গতি হবে, কেমন ব্যবহার করা হবে তাদের সাথে এই চিন্তায় ও ভয়ে। গলা শুকিয়ে আসছিল তাদের।

    এমন আকর্ষণীয় দেহবল্লরী ও যুবতী নারী দেখলে কে না পশু হয়ে যায়! যদি আইয়ুবীর সৈন্যদের মধ্যে সেই পশুত্ব জেগে উঠে তাহলে তাদের হয়তো দোষ দেয়া যাবে না, কিন্তু কতজন পশুর বর্বরতা তারা সইতে পারবে? তারা যখন এইসব সাতপাঁচ ভাবছিল, তখনই তাদের কানে এলো সুলতান আইয়ুবীর আদেশ।

    ‘এসব মেয়েদের এখান থেকে নিয়ে যাও। তারা এখন স্বাধীন। তারা যে যেখানে যেতে চায় তাদের সসম্মানে এবং পূর্ণ নিরাপত্তা ও হেফাজতের সাথে সেখানে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো।’

    এ কথা শুনে তারা আরও ভীত হয়ে পড়লো। তারা ভাবলো, এসবই কথার কথা, তাদেরকে অসহায় পেয়ে সৈন্যদের হাতে তুলে দেয়ার এটা একটা কৌশলমাত্র।

    তাদের মধ্য থেকে এ সময় এক মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, ‘মাননীয় সুলতান! আপনি জানেন, আমরা অসহায়, কিন্তু আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, আমর নিরপরাধ। এ যুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের কোন হাত বা ভূমিকা ছিল না। আপনাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। শুনেছি আপনি নারীর বেইজ্জতি পছন্দ করেন না। দয়া করে আমাদেরকে আপনার সৈন্যদের হাতে তুলে দেবেন না।

    জানি, আমাদের ইজ্জতের কোন দাম নেই। কিন্তু আমাদের অসহায়ত্বের দিকে তাকিয়ে আমাদের ওপর রহম করুন। এমন শাস্তি আমাদের দিয়েন না, যা সইবার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা আপনার মহানুভবতা ও বিরত্বের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’

    তার কণ্ঠের ভাষার চাইতেও তার চোখের ভয়-বিহবলতা সুলতানের মনে দাগ কাটলো বেশী। তিনি মেয়েটির আবেদন মঞ্জুর করে বললেন, আমার সৈনিকদের কাছে থাকলেও তোমাদের কোন অমর্যাদা ও ভয়ের কারণ ছিল না। তবু তোমরা যখন এতোই ভয় পাচ্ছো, তখন তোমাদেরকে আমার হেফাজতেই রাখা হবে। আমার পক্ষ থেকে তোমাদর দেখাশোনা করবে আমার নিজস্ব রক্ষী ও রিজার্ভ বাহিনী।

    সুলতান আইয়ুবী যুদ্ধের ময়দানে নারীর সংশ্রব মোটেই সহ্য করতেন না। তিনি তাদেরকে নিজ নিজ ইচ্ছামত যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার জন্য কে কোথায় যেতে চায় জানতে চাইলেন। বললেন, ‘তোমরা এখানে মোট কত জন আছে এবং কে কোথায় যেতে চাও?’

    জবাবে তারা নিজেদের সংখ্যা উল্লেখ করে সুলতানকে জানালো, ‘আমরা এখানে এখন যারা উপস্থিত আছি, সবাই মুসলমান। আমাদের সাথে আরো দুটি মেয়ে ছিল, তারা ছিল খৃস্টান। আমাদের মুনীব চলে যাওয়ার পর থেকে সে দু’জনও নিঁখোজ আছে। তারা দুজনই ছিল সাইফুদ্দিনের খুব প্রিয় এবং সব সময় তারা মুনীবের সাথে লেগে থাকতো। মনে হয় তারা দু’জন মুনীবের সাথেই পালিয়ে গেছে।’

    সুলতান এবং তার সেনাপতিরাও এ কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হলেন যে, সেই মেয়ে দুটি সাইফুদ্দিনের সাথেই পালিয়ে গেছে। এতে কোন সন্দেহ বা দ্বিমতের অবকাশ রইলো না এ জন্য যে, তারা জানতেন, কোন মুসলমান শাসকই তখন খৃস্টানদের বেস্টনীর বাইরে ছিল না। খৃস্টানদের চর সব সময় তাদের ঘিরে রাখতে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘিরে রাখার এ দায়িত্বটি পালন করতে হতো কোন না কোন খৃস্টান যুবতীর। তারাই ছিল বলতে গেলে তার পৃষ্ঠপোষক, উপদেষ্টা এবং মনোরঞ্জক।

    সে যুগে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিজয়ীরা প্রতিপক্ষের মালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। অধিকাংশ সৈন্য পরাজিত সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের তাঁবু ও ক্যাম্প লুট করার জন্য ছুটে যেতো। হেডকোয়ার্টার লুটের সুযোগ পেলে তো কোন কথাই নেই। সেখানকার সব সম্পদ, নারী ও মদ আপন দখলে নেয়ার জন্য চলতো প্রতিযোগিতা। ঝড়ের মত লুটপাট চলতো। আর এ লুটপাট চালাতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বেঁধে যেতো দাঙ্গা-ফ্যাসাদ। কখনো কখনো এ দাঙ্গার ফলে, লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যেতো সেখানে।

    কিন্তু সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বাহিনীর অবস্থা ছিল ভিন্ন। তাঁর কঠোর আদেশ ছিল, কেউ যেন গনিমতের মালে হাত না দেয়। যত বড় সামরিক অফিসারই হোক না কেন, কারো সাধ্য ছিল না সুলতানের আদেশ অমান্য করে গনিমতের মাল কুক্ষিগত করে। গনিমতের মাল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নির্দিষ্ট বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করা হতো। সংগৃহীত মালামাল বন্টনের দায়িত্ব পালন করতেন সুলতান নিজে।

    তুর্কমানের যুদ্ধ শেষ। মালামাল সংগ্রহের পর সৈনিকরা গনিমতের মাল বন্টনের ব্যাপারে সুলতান আইয়ুবীর নির্দেশের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তিনি এ সম্পর্কে কোন মন্তব্য বা আদেশ জারী না করে সৈনিকদের হুকুম দিলেন ময়দান থেকে নিজেদের এবং শত্রুদের সকল আহত সৈনিককে এনে তাদের সেবা ও চিকিৎসা করার।

    সুলতানের নির্দেশ পেয়ে সারা ময়দান ঘুরে যেখানে যত জখমী সৈনিক ছিল তাদেরকে এক জায়গায় এনে জড়ো করা হলো। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল তাদের আহত স্থানে ঔষধ লাগিয়ে ব্যাণ্ডেজ করার কাজ। চিকিৎসকদের সাথে এ কাজে হাত লাগালো সাধারণ সৈন্যরাও। স্বপক্ষ ও বিপক্ষের সকল আহত সৈনিকের চিকিৎসা ও মলম পট্টির কাজ শেষ হলে সুলতান দ্বিতীয় নির্দেশ জারী করলেন।

    ‘এবার আমাদের আহত মুজাহিদ এবং আহত যুদ্ধ বন্দীদের পৃথক করে দাও।’

    সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীতে ডিসিপ্লিন রক্ষার গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক। তিনি সামরিক বাহিনীর শৃংখলা ভঙ্গকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলে তার বাহিনী ছিল খুবই সুশৃংখল। এই যুদ্ধে কিছুসংখ্যক শত্রু সৈন্য এলোমেলোভাবে যে যেদিকে পারে পালিয়েছিল। সুলতানের বাহিনী পালিয়ে যাওয়া এসব সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেছিল। কিন্তু তাদের ট্রেনিং এমন ছিল যে, পিছু ধাওয়া করার সময়ও তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক অটুট রাখতো। সুলতান আইয়ুবী তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে বেশী দূর যেতে নিষেধ করেছিলেন।

    যুদ্ধের সময় তিনি একদল সৈন্যকে ময়দানের ডানে ও বামে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের ওপর নির্দেশ ছিল, সুলতানের পরবর্তী হুকুম না পাওয়া পর্যন্ত তারা যেন তাদের অবস্থানে সুশৃংখলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। যুদ্ধ শেষ হলেও সেই বাহিনীকে তিনি সেখান থেকে সরে আসার নির্দেশ দেননি। ফলে তারা তখনো পূর্ব অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল।

    আহত সৈন্যদের আলাদা করার পর রিজার্ভ বাহিনীর সালার সুলতানের কাছে এগিয়ে গেল। সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, ‘সুলতান, শত্রুদের অস্ত্রশস্ত্র, মালসামান, ঘোড়া সবই সংগ্রহ করা হয়েছে। গনিমতের এসব মাল সম্পর্কে আপনার আদেশ কি?’

    সুলতান পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে। বললেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়েছে এ কথা তোমাকে কে বললো? খুশীতে বিভোর হওয়ার মত সময় এখনও আসেনি আমাদের। আমার শিক্ষা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে তো চলবে না, বিজয়ের পূর্ণতা পাওয়ার আগে গনিমত বন্টনের কথা আমি কখনোই ভাবি না। আমার বিবেচনায় আমরা শত্রুদের একটি বৃহৎ দলকে বিচ্ছিন্ন করেছি মাত্র। কিছু সংখ্যক সৈন্য নিহত এবং কিছু সৈন্যকে আমরা বন্দীও করেছি ঠিক, কিন্তু আমার বিশ্বাস, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। আমাদের বাহিনী কি কোন পার্শ্ব আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে? না, হয়নি। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। মূল বাহিনীর ডানে বায়ে রক্ষী বাহিনী মোতায়েন না করে ময়দানে আসার কথা নয় সাইফুদ্দিনের। আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমাদের উভয় পাশে এখনও শত্রু বাহিনী ওঁৎ পেতে আছে। ময়দানে না আসার কারণে এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী ও সুরক্ষিত থাকার কথা ওদের। তারা যোদ্ধা সৈনিক, যদিও ঈমান বেচা গাদ্দার। কিন্তু এত আনাড়ী নয় যে, তাদের যে ব্যাটেলিয়ান যুদ্ধে অংশ নেয়নি, তারা বিনা যুদ্ধেই ফিরে যাবে? মনে হয়, সুরক্ষিত দল পলাতক সৈন্যদের গুছিয়ে নিয়ে আবার আক্রমণ চালাবে।’

    ‘তাদের কেন্দ্রীয় কমাণ্ড তো শেষ হয়ে গেছে, সম্মানিত সুলতান!’ এক সেনাপতি বললো, ‘সৈন্য থাকলেও এখন তাদের কমাণ্ড করার আর কেউ নেই।’

    ‘আছে, কেউ না থাকুক খৃস্টানরা তো আছে। যাদের সাথে এতক্ষণ যুদ্ধ করলে তারা আমাদের মূল শত্রু নয়, এরা তো আসলে খৃস্টানদের হাতের পুতুলমাত্র। খৃস্টানরা নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলতেই থাকবে।

    সুলতান আইয়ুবী আরো বললেন, যদিও কোন দিক থেকে কোন সংবাদ আসছে না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, খৃস্টানরা কাছেই কোথাও গোপনে সৈন্য ও অস্ত্র মজুদ করে রেখেছে। এটা পার্বত্য এলাকা। এখানে আছে অসংখ্য গলিঘুপচি। উঁচু টিলার আড়ালে আছে গভীর নিম্নাঞ্চল। কোথাও কোথাও আবার গভীর জঙ্গলও রয়েছে। ফলে এই অরণ্য বা টিলার আড়ালে কি আছে কিছুই দেখা যায় না। এই সুবিধাটুকুই ভোগ করছে দুশমন। লুকিয়ে আছে দৃষ্টির অন্তরালে।

    ‘তেমন কিছু হলে আমরা কি খবর পেতাম না? আমাদের টহল বাহিনীর চোখে কি কিছুই ধরা পড়তো না?’ বললো এক সেনাপতি।

    ‘শত্রু ও বিষধর সাপকে কখনও বিশ্বাস করতে নেই, মরার সময়ও তা দংশন করে বসে। বেশ কিছু দিন হলো আমি সাইফুদ্দিনের সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের কোন সংবাদ পাচ্ছি না তোমরা সবাই জানো, মুজাফফরুদ্দিন এত সহজে পালানোর মত সেনাপতি নয়। খৃস্টানদের সহযোগিতা নিয়ে কখন মুজাফফরুদ্দিন ময়দানে আসে আমি তারই অপেক্ষা করছি। তোমরাও চারদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখো। সৈন্যদের সংহত করে প্রস্তুত রাখো তাদের। আমি মুজাফফরুদ্দিনকে যতটুকু চিনি, তাতে তোমাদের এ নিশ্চয়তা দিতে পারি, এই সাপ অবশ্যই আমাদের ওপর ছোবল হানবে, মৃত্যুপথযাত্রী হলেও সে চেষ্টা করবে শেষবারের মত আমাদের ওপর এক প্রচণ্ড আক্রমণ চালাতে।’

    ❀ ❀ ❀

  • বিষাক্ত ছোবল

    বিষাক্ত ছোবল

    বিষাক্ত ছোবল

    আন নাসের ও তার সাথীরা মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে প্রখর সূর্যতাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। মরুভূমির সেই জাহান্নাম থেকে তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো দুই নারী। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, এটা মরুভূমির তামাশা, এই দুর্গম প্রান্তরে মেয়ে আসবে কোথেকে। পরে মেয়েরা যখন ওদের পানি ও খাবার দিয়ে জীবন্ত করে তুললো, তখন ওরা ভাবলো, এরা মেয়ে নয়, জ্বীন বা পরী হবে।

    ছোটবেলা থেকে জ্বীন-পরীদের গল্প শুনতে শুনতে জ্বীন ও পরীর ভয় আন নাসেরের মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। যদিও জীবনে কোনদিন জ্বীনপরী দেখেনি, তবু গল্প শুনতে শুনতে কল্পনায় তাদের যে ছবি খোদাই করা ছিল, এ মেয়েদের দেখে সে কল্পনা যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিল। মরুভূমির জাহান্নামে দুই অনিন্দ্যসুন্দর মেয়েকে দেখে সে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, এরাই সে কল্পনার জ্বীন।

    মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে সে তার সাথীদের নিয়ে শেষ পর্যন্ত জ্বীনের খপ্পরে এসে পড়লো? ভাবনাটা মনে আসতেই এক অজানা ভয় ও শিহরণ ঘিরে ধরলো তাকে।

    সেই মেয়েরা পানির সাথে বিশেষ ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে সম্মোহিত করে ওদেরকে এনে তুললো এক দুর্গে। দুর্গে আসার পর এক সময় তাদের নেশার ঘোরে কেটে গেল। আন নাসেরের কাছে এগিয়ে এলো এক মেয়ে। তার প্রশ্নের জবাবে বললো, ‘আমরা জ্বীন-পরী কিছু নই, তোমাদের মতই রক্ত-মাংসের মানুষ।’

    আন নাসের চারদিকে তাকিয়ে দেখলো। তার অভিজ্ঞ চোখ বললো, এটা একটা দুর্গ। জ্বীন-পরীদের এমন দুর্গের প্রয়োজন হয় না। মেয়েটি তাহলে সত্যি কথাই বলেছে! এরা জ্বীন-পরী কিছু নয়! তাহলে কি ওরা মেয়েদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেরাই পায়ে হেঁটে এসে ঢুকে পড়েছে দুশমনের দুর্গে? এতক্ষণে আন নাসের বুঝতে পারলো, সে এবং তার সাথীরা কি ভয়ংকর জালে আটকা পড়েছে।

    কি করে এ জাল কেটে বেরিয়ে যাওয়া যায় এ নিয়েই ভাবছিল আন নাসের। তার সাথীরা তখনও ঘুমিয়ে, মেয়েটি আবার ফিরে এলো। বললো, ‘তুমি জানতে চাচ্ছিলে তোমরা এখন কোথায় এবং কেন তোমাদের এখানে নিয়ে এসেছি। কেন এনেছি এ প্রশ্নের জবাব এখন দেয়া সম্ভব নয়, তবে তোমরা এখন কোথায় তা বলে দিতে পারি।’

    আন নাসের উদগ্রীব হয়ে বললো, ‘কোথায়?’

    ‘এটা একটা কেল্লা।’

    ‘এটা যে কেল্লা তা তুমি না বললেও জানি। কিন্তু কেল্লাটি কোথায় অবস্থিত, কি এর নাম, এখানে কারা থাকে।’

    ‘এ কেল্লার নাম আছিয়াত। এটা ফেদাইনদের কেল্লা। এখানে ফেদাইন নেতা শেখ মান্নান বাস করেন। ফেদাইনদের সম্পর্কে তুমি কিছু জানো?’

    ‘হ্যাঁ জানি!’ আন নাসের উত্তর দিল, ‘খুব ভাল করেই জানি। আর এখন এটাও জানতে পারলাম, তুমি আসলে কে? আমি শুনেছিলাম, ফেদাইনদের দলে সুন্দরী মেয়েরাও কাজ করে। তুমি তাহলে সেই সুন্দরীদের একজন?’

    ‘আমার সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।’ মেয়েটি উত্তর দিল, ‘আমার নাম লিজা!’

    ‘তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকলে তোমরা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে কেন? তোমার সাথে তো আরও একটি মেয়ে ছিল, সে কোথায়?’

    ‘হ্যাঁ! আমার সাথে অন্য যে মেয়েটি ছিল তার নাম কারিশমা। সেও এখানেই আছে।’ লিজা বললো, কেন তোমাদের এখানে এনেছি, সে কথা বলা যাবে না। তবে কেমন করে এনেছি, সেটা বলতে পারি। তোমাদেরকে নেশা খাইয়ে সম্মোহিত করে এখানে এনেছি।’

    সে এই পর্যন্ত বলে শেষ করেছে, এমন সময় কামরার দরোজায় এসে দাঁড়ালো কারিশমা। কারিশমা চোখের ইশারায় লিজাকে বাইরে ডাকলো, লিজা বাইরে চলে গেল। আন নাসের খাটে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো।

    তার কাছে এখন অনেক কিছুই পরিষ্কার। মরুভূমির মহা বিস্তারে হারিয়ে যাওয়ার পর যে মেয়েরা তাদের পানি ও খাবার দিয়েছিল, ওরা আসলে জ্বীন নয়, মানুষ। ওরা তাদেরকে নেশাগ্রস্ত করে নিয়ে এসেছে চরম এক সন্ত্রাসী গ্রুপ ফেদাইনদের কেল্লায়। ফেদাইনরা বেশ সুসংগঠিত এবং তাদের সংগঠন আরবের সব কয়টি দেশে বিস্তৃত। ওদের মূল পরিচয় ওরা প্রফেশনাল গুপ্তঘাতক। পয়সার বিনিময়ে ওরা যে কাউকে যে কোন সুরক্ষিত স্থানেও অবলীলায় খুন করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারে। কে বা কারা লোকটির হত্যাকারী সে হদিস কেউ কোনদিন বের করতে পারে না। এ ধরনের ভয়ংকর খুনীদের আস্তানা বা কেল্লা থেকে বের হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

    ‘এখানে কি করছো?’ কারিশমা জিজ্ঞেস করলো, ‘লোকটির সাথে এমন ঘনিষ্ট হয়ে বসার সময় তোমার কি একবারও মনে হয়নি, মুসলমানরা ঘৃণার পাত্র! তুমি কি শেষে গাদ্দারী করবে নাকি?’

    লিজার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। চেহারা ভাবলেশহীন, নির্বিকার। মুখে কোন কথা নেই। একদিন আবেগের বশে এবং অন্যের প্ররোচনায় পড়ে মুসলমান নেতাদের চরিত্র হননের যে পেশা গ্রহণ করেছিল, এখন সে কথা মনে হতেই নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মাল।

    দিনে দিনে এই জঘন্য পেশার প্রতি তার ঘৃণা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেলো, নিজেকে এই পেশা থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবলো সে। কিন্তু যখন মনে হলো, এ পথে আসা যায়, কিন্তু যাওয়া যায় না, তখন ঘৃণা রূপ নিল প্রতিশোধ স্পৃহায়। কিভাবে নিজের ওপর প্রতিশোধ নেবে, কোন কূল না পেয়ে সে এ পরিবেশ থেকে পালানোর পথ খুঁজতে লাগলো। এ সময়ই ওদের হাতে এসে পড়ে আন নাসেররা।

    ‘আমিও যুবতী মেয়ে!’ কারিশমা তাকে বললো, ‘আন নাসেরের মত সুদর্শন যুবক, যে কোন যুবতীর হৃদয় দখল করতে পারে। তাকে আমারও ভাল লাগে। সত্যি বলছি, এমন আকর্ষণীয় যুবককে ভাল না বেসে পারা যায় না। যদি তুমি বলো, তাকে তুমি ভালবেসে ফেলেছে, তাতে আমি আশ্চর্য হবে না। আমি বুঝতে পারছি, বুড়ো মুসলিম আমীর ও সেনাপতিদের বিরুদ্ধে তোমার মনে ঘৃণা জমে উঠেছে। কিন্তু তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা মনে করো, স্মরণ করো তোমার শপথের কথা, এই মুসলমানরা তোমার শত্রু। এদের অনিষ্ট করার শপথ নিয়েছে তুমি।’

    ‘না! তা নয় কারিশমা!’ লিজা অধীর হয়ে বললো, ‘আমার সঙ্গে তার তেমন কোন ভাব হয়নি, যে জন্য তুমি আমাকে তিরস্কার করতে পারো।’

    ‘তবে তার কাছে কেন এসেছে, কেন তার সাথে ঘনিষ্টভাবে মিশছো?’

    ‘আমি এখন সে বর্ণনা দিতে পারবো না।’ লিজা বিরক্ত কঠে বললো, ‘জানি না আমার মাথায় হঠাৎ এমন খেয়াল কেন এলো, কেন তার পাশে গিয়ে বসতে ইচ্ছে জাগলো মনে।’

    ‘তার সাথে কি কি কথা হয়েছে তোমার?’

    ‘তেমন কোন বিশেষ কথা হয়নি।’ লিজা বললো।

    ‘তুমি তোমার দায়িত্ব পালনে খুব অবহেলা করছে। কারিশমা বিরক্তি প্রকাশ করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো, ‘এটা বিশ্বাসঘাতকতা। তুমি জাননা বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি?‘

    ‘জানি। মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু কারিশমা, তুমি শুনে রাখো!’ লিজা বললো, “আমি ঐ বুড়োর খায়েশের খেলনা হবো না। ফেদাইনদের নেতা বলে শেখ মান্নান তোমার কাছে যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, আমার কাছে সে একজন খুনী ও সন্ত্রাসী মাত্র। যদি সে আমার ওপর শক্তি প্রয়োগ করে তবে আমি তাকে খুন করবো। নয়তো নিজেই শেষ হয়ে যাবো।’

    কারিশমা এ কথা শুনে একদম পাথর হয়ে গেল। আসলে সে উজ্জ্বল পাথরই ছিল, যার রং ও উজ্জ্বলতা সবাইকে আকৃষ্ট করে। সবাই তাকে আপন করে পেতে চায়। কিন্তু পাথরের তো কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। কিন্তু লিজা ততদূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারেনি। নারীর সহজাত কামনা-বাসনা, ভাললাগা-ভালবাসা থেকে এখনো নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারেনি।

    কারিশমা তাকে বললো, ‘আমি কল্পনাও করতে পারিনি, তুমি এত বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে। বুঝলে তোমাকে আমি এখানে আনতাম না।’

    “আমি কি তোমার পায়ে পড়েছিলাম যে, আমাকে ওখানে নিয়ে চলো!’ শ্লেষ মেশানো কণ্ঠে বললো লিজা।

    রাগ করলো না কারিশমা। বললো, ‘এ কোল্লাটাই সবচে কাছে ছিল, তাই প্রথম মঞ্জিল হিসাবে এখানে এসেছি। নয়তো এক টানে ত্রিপলী পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব ছিল না আমাদের পক্ষে। তা ছাড়া আমাদের মত দুই নারীর পক্ষে চারজন কমান্ডোকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সামাল দেয়ার ঝুঁকিও আমি নিতে চাচ্ছিলাম না।’

    ‘ কিন্তু আমাকে এক হিংস্র পশুর হাতে তুলে দেয়ার ঝুঁকি তো ঠিকই নিতে পারলে।’ লিজার ক্ষুদ্ধ কণ্ঠ।

    কারিশমা দরদভরা কণ্ঠে বললো, ‘তোমার কাছে অঙ্গীকার করছি, শেখ মান্নানের কবল থেকে তোমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করবো।’

    ‘তাহলে এখান থেকে জলদি পালিয়ে যাওয়ার একটা উপায় বের করে।’

    ‘সে চেষ্টা আমি করছি, কিন্তু মহাপ্রভুর দোহাই, তুমি আমাকে কথা দাও, বন্দীদের সাথে তুমি আর কোন রকম দহরম মহরম করবে না।’

    ‘সত্যি কথা বলবো কারিশমা!’ লিজা বললো, ‘আমি এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই কমাণ্ডোদের সাহায্য নেবো। কারণ শেখ মানের সাথে আমি যে ব্যবহার করেছি, তাতে আমি নিশ্চিত, সে আমাদের এখান থেকে বেরোতে দেবে না। না তুমি নিজে বের হতে পারবে, না আমাকে বের করতে পারবে। কিন্তু এরা দক্ষ কমাণ্ডো, এদের বীরত্বের অনেক বিশ্বয়কর গল্প-কাহিনী লোক মুখে প্রচলিত। এদের সামান্য সুযোগ দিলেই এরা পালিয়ে যেতে পারবে। চাই কি সে সহযোগিতার বিনিময়ে তোমাকে-আমাকেও সঙ্গে নিতে রাজি হবে। এ ছাড়া আর কোন পথ নেই।’

    ‘আমি এদের বীরত্ব ও সাহসের প্রশংসা করি। স্বীকার করি এরা কুশলীও। তোমার কথাই ঠিক, সুযোগ পেলে ওরা পালিয়ে যেতে পারবে।’ কারিশমা বললো, ‘কিন্তু তুমি কি চিন্তা করে দেখেছো, এরা আমাদের দু’জনকে বের করে নিয়ে যেতে পারলে আমাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবে? তুমি কি মনে করে তারা আমাদেরকে আমাদের ঠিকানায় পৌঁছে দেবে নিশ্চয়ই তারা তা করবে না, তারা আমাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। আমার কথা শোনো! মিথ্যা আশ্রয় খুঁজতে চেষ্টা করো না।

    কারিশমা থামলো। লিজাও চুপ। কারো মুখে কোন কথা নেই। কারিশমার কথাগুলো নিয়ে ভাবছে লিজা। এক সময় কারিশমাই পূনরায় মুখ খুললো। বললো, গোসল করে পোশাক পাল্টে নাও। আজ রাতে শেখ মান্নানের খাস কামরায় খাওয়ার দাওয়াত রয়েছে। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি, তার সাথে তোমার ব্যবহার ও আদব-কায়দা কেমন হবে। তুমি তাকে অপছন্দ করো এমন মনোভাব যেন তার সামনে বিন্দুমাত্র প্রকাশ না পায়। এটাও যেন প্রকাশ না পায়, তুমি তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি এইমাত্র খবর পেলাম, হারানের গভর্ণর গুমাস্তগীন এখানে এসেছে।

    তুমি তো ভাল করেই জানো, গুমাস্তগীন সুলতান আইয়ুবীয় ঘোরতর দুশমন। ফলে তাকেও আমরা আমাদের উৎকৃষ্ট বন্ধু মনে করি। আমরা খুব কষ্ট করে এই মুসলমান শাসকদের হাত করেছি, তাদেরকে বন্ধু বানিয়েছি। এরা সবাই আমাদের অগ্রযাত্রার একমাত্র প্রতিবন্ধক সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে এমন কোন আচরণ করো না, যাতে তারা অসন্তুষ্ট হতে পারে।

    ❀ ❀ ❀

    কারিশমার ডাকে লিজা বেরিয়ে যেতেই আন নাসের গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। তার মনের সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। এরা যে জ্বীন-পরী কিছু নয়, আসলেই রক্ত মাংসের মানুষ, এ কথাটা বুঝতে এতো দেরী হলো কেন, তাই ভেবে আফসোস হলো তার।

    এদিকে লিজার আচরণও তাকে অধীর করে তুললো। লিজা বলেছে, নেশাগ্রস্ত করে তাদেরকে এখানে আনা হয়েছে। আন নাসের অনুভব করলো, তার এ কথায় সত্যতা আছে। কারণ মরুভূমির সব কথাই তার মনে আছে, কিন্তু ওদের সাথে সাক্ষাতের পর থেকে যা ঘটেছে তার সব স্মৃতি স্পষ্ট নয়। যদি তাই হয় তাহলে ওরা তার দুশমন। কিন্তু দুশমন হলে মেয়েটি তার প্রতি সদয় হবে কেন?

    অনেক ভেবেও এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর পেলো না আন নাসের। লিজা তাকে আরও বলেছে, আন নাসের ও তার সাথীরা এখন ফেদাইন গ্রুপের হাতে। অথচ মেয়েটি নিজে ফেদাইন নয়, তাহলে সে কে? ফেদাইন না হয়েও কেন তবে তারা ফেদাইনদের আস্তানায় এসে উঠেছে।

    সে ভাবলো, অস্বীকার করলেও এই মেয়ে দুটি কি ফেদাইন দলেরই কর্মী হতে পারে না। কারণ ফেদাইনরাই মেয়ে ও নেশা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চেষ্টা করে। ফেদাইনদের হাতে আছে হরেক রকম নেশা জাতীয় দ্রব। এত বিচিত্র নেশার দ্রব্য আর কারো কাছে নেই। কমাণ্ডো ট্রেনিংয়ের সময় ফেদাইনদের নেশা জাতীয় দ্রব্য সম্পর্কে তাদেরকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে এবং এই নেশা থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকে বিশেষ ভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কি লাভ হলো সেই সাবধান বাণীতে এই সুন্দরী মেয়েরা তো সেই নেশার অস্ত্র দিয়েই তাদের ঘায়েল করে এখানে নিয়ে এর সে তার সঙ্গীদেরকে জাগালো। তারাও জেগে উঠে দুর্গের এক কামরায় নিজেদের আবিষ্কার করে আন নাসেরের মতই বিস্মিত হলো। বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে ওরা আন নাসেরের মুখের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।

    ‘বন্ধুগণ!’ আন নাসের তাদের বললো, ‘আমরা ফেদাইনদের জালে আটকা পড়ে গেছি। এই কেল্লার নাম আছিয়াত কেল্লা। এটা ফেদাইনদের হেডকোয়ার্টার। ফেদাইন নেতা শেখ মান্নানও এখানেই থাকেন।

    যে মেয়ে দুটি আমাদের ধরে এনেছে তারা জ্বীন-পরী নয়, আমাদের মতই মানুষ। আমি এখনও বলতে পারছি না, এরা আমাদের সাথে কি ব্যবহার করবে। তবে আমরা সাবধান ও সতর্ক না হলে আমাদের পরিণতি হবে ভয়ংকর।’

    আন নাসের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে আরো বললো, ‘তোমরা সবাই জানো, ফেদাইনরা গুপ্তঘাতক। এ জন্য তারা সুহেকসহ নানা রকম বিদ্যা প্রয়োগ করে থাকে। তাদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সোজা ব্যাপার নয়। যদি আমরা কখনো এই কামরা থেকে বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাই, তবে আমাদের প্রথম কাজ হবে এ কেল্লা থেকে পালানোর কৌশল বের করা। আপাতত তোমরা এ নিয়ে কোন কথা বলবে না, সবাই নীরব থাকবে। যদি এরা কিছু জিজ্ঞেস করে তবে সংক্ষেপে উত্তর দেবে। মনে রেখো, এই শয়তানদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়।’

    ‘এরা কি আমাদের কারাগারে পাঠাবে?’ আন নাসেরের এক সাথী প্রশ্ন করলো।

    ‘যদি কারাগারে পাঠায় তবে আমাদের খুশী হওয়ারই কথা।’ আন নাসের বললো, ‘কিন্তু এরা আমাদের মন-মগজে নতুন চিন্তা ঢুকাতে চায়। হাশিশ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য দিয়ে আমাদের বিবেক ও বুদ্ধি গুলিয়ে দিতে চায়। সুন্দরী মেয়ে দিয়ে আমাদের চিন্তা-চেতনায় ভোগের স্পৃহা জাগাতে চায়। ভুলিয়ে দিতে চায় আমাদের ধর্ম ও ঈমান।

    ‘পালানো ছাড়া আমাদের মুক্তির আর কোন পথ নেই।’ আন নাসেরের এক সাথী বললো।

    ‘পালাতে না পারলে আমরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো, কিন্তু ঈমান হারাতে পারবো না।’ অন্য একজন বললো।

    ‘হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আমাদের খুবই সাবধান থাকতে হবে।’ আন নাসের বললো, “ওদেরকে আর নেশা খাওয়ানোর সুযোগ দেয়া যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা করে পালানো, লড়াই অথবা মৃত্যু- এর যে কোন একটা বেছে নেবো আমরা, কিন্তু কিছুতেই তাদের মুঠোর ভিতর ঢুকবো না।’

    সারাদিন কেটে গেল। উল্লেখযোগ্য তেমন আর কিছু ঘটলো না সারাদিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে গেল সূর্য।

    সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসতেই এক লোক কামরার মধ্যে বাতি দিয়ে গেল। সে কারো সঙ্গে কোন কথা বলল না। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছিল তাদের। সারাদিন তাদের কিছুই খেতে দেয়নি। তারা ভেবেছিল, বাতি যখন দিয়েছে, আবারও পাঠাবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হলো না। বাইরে থেকে সেই যে কামরা বন্ধ করে চলে গেলো লোকটি, তারপর থেকে আর কোন লোকের দেখা নেই।

    একটু দূরে কেল্লার মধ্যে শেখ মান্নানের মহল সাজানো হয়েছে। গুমাস্তগীনের সম্মানে বাড়তি আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরা কামরার মধ্যে বসে শুনতে পাচ্ছিল নারী ও পুরুষের সম্মিলিত কলকাকলি। সেখানে উৎসব চলছিল। সমবেত অফিসারদের মধ্যে পরিবেশন করা হচ্ছিল খাবার ও মদ। উৎসব হলের পাশেই শেখ মান্নানের খাস কামরা। ওখানেও খাবার পরিবেশন করা হলো। দামী মদের বোতল সাজিয়ে রাখা হলো টেবিলে। বিভিন্ন ধরনের খাবারের সুগন্ধে কামরার পরিবেশ মাতোয়ারা।

    আহার্য সামগ্রী সামনে নিয়ে বসে আছে শেখ মান্নান। তার ডাইনে কারিশমা ও বামে লিজা। সামনে গুমাস্তগীন। শেখ মান্নান গুমাস্তগীনকে বললো, “নিন, খাওয়া শুরু করুন।’

    ওরা খাওয়া শুরু করলো। চার কমাণ্ডো তাদের কামরায় বসে সুস্বাদু খাবারের সুবাস পাচ্ছিল। এতে তাদের ক্ষুধা আরো বেড়ে গেল।

    হারান দুর্গের অধিপতি গুমাস্তগীন সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গীর ওফাতের পর নিজেকে স্বাধীন শাসক রূপে ঘোষণা করে আশপাশের অঞ্চল নিয়ে একটি রাজ্য গঠন করেছিল। সেই সুবাদে সে বিশেষ সম্মানিত মেহমান ছিল শেখ মান্নানের।

    খেতে খেতে গুমাস্তগীন শেখ মান্নানকে বললো, ‘তুমি জানো সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে আল মালেকুস সালেহ ও সাইফুদ্দিনের যে সম্মিলিত বাহিনী তুর্কমান অভিমুখে যাত্রা করেছিল, সে বাহিনীতে আমার সৈন্যও শামিল ছিল। এই সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে। আমি নিজে আমার সৈন্যদের সাথে ময়দানে যেতে পারিনি।’ সাইফুদ্দিন বললো, ‘সম্মিলিত বাহিনীর কমাণ্ড একক হাতে না থাকলে যুদ্ধে বিশৃংখলা দেখা দেবে, তাই আমি যাইনি। ভেবেছিলাম সাইফুদ্দিন এ যুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দিতে পারবে। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল তো জানো। এ যুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়েছে।’

    ‘হ্যাঁ, বড়ই আফসোসের কথা। এমনটি আমরা আশা করিনি। যুদ্ধের কমান্ড আপনার হাতে থাকলে হয়তো এমনটি হতো না।’ গুমাস্তগীন বললো, আমি নিজেদের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে চাই না। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের জন্য যেসব কৌশল ও টেকনিক ব্যবহার করা দরকার ছিল, তা তিনি করতে পারেননি। এ যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রথম যে কাজটি করা দরকার ছিল, তা হলো খৃস্টানদেরকে ময়দানে টেনে আনা। তিনি খৃষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রাখার দাবী করলেও তাদের কাছ থেকে কোন রকম সামরিক সাহায্য আদায় করতে পারেননি।’

    ‘হ্যাঁ, এটা তার বড় ব্যর্থতা।’

    “সে তাদের উপদেষ্টা ও গোয়েন্দাদের সাহায্য নেয়ার পরিবর্তে উন্নত মানের মদ, সুন্দরী মেয়ে ও নগদ মূল্য নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু যুদ্ধ করার জন্য দরকার অস্ত্র ও সেনা, এ দুটোই সে চায়নি ওদের কাছে।’

    গুমাস্তগীন ছিল কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ও ষড়যন্ত্রে ওস্তাদ। শত্রুরা মাটির নিচে লুকিয়েও রেহাই পেতো না তার হাত থেকে। বন্ধুদেরকেও সে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিত না। সে ছিল চরম ক্ষমতালিপ্সু। ছলে বলে কৌশলে রাজ্যের পরিধি বাড়ানোই ছিল তার একমাত্র স্বপ্ন।

    আইয়ুবীকে সম্মুখ সমরে হারানো যাবে না জানতো বলেই সে নিজে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি। আবার সম্মিলিত শক্তি যাতে বুঝে সে তাদেরই একজন, এ জন্য পরাজিত হবে জেনেও নিজের বাহিনী পাঠিয়েছিল সে অভিযানে।

    গুমাস্তগীন তার ক্ষমতার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করতো সুলতান আইয়ুবীকে। ফলে সে ছিল সুলতান আইয়ুবীর সবচে কঠিন দুশমন। সম্মুখ যুদ্ধ নয়, গুমাস্তগীন বিশ্বাস করতো আইয়ুবীকে ধ্বংস করতে হবে ষড়যন্ত্রের পিচ্ছিল পথে। গোপনে তাকে হত্যা করতে হবে। আর এ কাজে ওস্তাদ শেখ মান্নানের ফেদাইন গুপ্তঘাতক দল। তাই যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে সে এসেছিল শেখ মান্নানকে ভাড়া করতে, তাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করতে।

    শেখ মান্নানও সুলতান আইয়ুবীর হত্যার ষড়যন্ত্রে খুবই উৎসাহী ছিল। তার ভাল মতোই জানা ছিল, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীই একমাত্র ব্যক্তি, যার সামরিক শক্তি ঈমানী চেতনায় পরিপূর্ণ। সমরনায়ক হিসাবে যেমন অপ্রতিদ্বন্দ্বী আইয়ুবী, ঈমানী বলেও তেমনি অতুলনীয়। এ ধরনের লোকের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যাওয়া যেমন বিপদজনক, তেমনি এমন লোককে বাঁচিয়ে রাখাও ভয়ের। কারণ অন্যায় আধিপত্য বিস্তার আইয়ুবী কিছুতেই মেনে নেবে না।

    ফলে তুমানের সমর শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম মিল্লাতের দুই গাদ্দার এসে মিলিত হলো একত্রে। আইয়ুবী যখন তলোয়ার দিয়ে লিখছিল নিজের ভাগ্যের ফয়সালা, তখন শেখ মান্নান ও গুমাস্তগীন আছিয়াত কেল্লায় বসে তার ভাগ্য নির্ধারণের জল্পনা কল্পনা করছিল।

    সুলতান আইয়ুবীকে হত্যার এমন কৌশল আবিষ্কার করাই তাদের এ বৈঠকের উদ্দেশ্য, যেন অন্যান্য বারের মত এবারের হত্যা প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়।

    গুমাস্তগীন আছিয়াত দুর্গে পৌঁছে ছিল কারিশমা ও আন নাসেররা পৌঁছার একদিন আগে। তখনো সে জানতো না, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর কাছে কেমন মার খেয়েছে। সৈন্যবাহিনীকে সমরাঙ্গণে পাঠিয়ে দিয়েই সে নেমে পড়েছিল ষড়যন্ত্রমূলক কাজে। আর এ কাজ শেখ মান্নানকে ছাড়া অসম্ভব ভেবেই ছুটে এসেছিল আছিয়াত দুর্গে।

    ❀ ❀ ❀

    ‘ভাই গুমাস্তগীন!’ শেখ মান্নান খাওয়া বন্ধ করে বললো, ‘তোমার বাহিনীও তো তুর্কমান সমরাঙ্গণ থেকে পালিয়েছে। তুমি শুধু শুনেছ সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তাদের কি হাল হয়েছে বিস্তারিত জানো না। এ জন্যই এদেরকে এখানে ডেকেছি। সে কারিশমা ও লিজাকে দেখিয়ে বললো, এরা যুদ্ধের সময় ময়দানে ছিল। সব কিছু নিজ চোখে দেখেছে। আগে ওদের কাছ থেকে যুদ্ধের বিস্তারিত খবর শোন।’

    গুমাস্তগীন তাকালো কারিশমাদের দিকে। কারিশমা গুমাস্তগীনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো যুদ্ধের কাহিনী। কি করে সুলতান আইয়ুবী অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্মিলিত সৈন্যদলকে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দিল। কি করে সাইফুদ্দিন নিজের সৈন্যদেরকে ময়দানে রেখেই গোপনে পালিয়ে গেল, সবিস্তারে বললো সে।

    গুমাস্তগীন নীরবে শুনলে তার কাহিনী। ‘আমাকে আমার বন্ধুরাই লাঞ্ছিত ও অপমানিত করলো।’ গুমাস্তগীন লজ্জায় ও রাগে বলতে লাগলো, “আমি সাইফুদ্দিনকে তিন বাহিনীর হেড অব দ্যা কমাণ্ড করতে মোটেই রাজি ছিলাম। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনলো না, জানি না আমার সৈন্যরা কি অবস্থায় আছে।’

    ‘খুবই শোচনীয় অবস্থায় আছে।’ কারিশমা বললো, ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী পলাতক সৈন্যদের নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে দিচ্ছে না। ধাওয়া করে পাকড়াও করছে তাদের।’

    ‘ ভাই মান্নান! তুমি জানো আমি এখানে কেন এসেছি।’ গুমাস্তগীন বললো।

    ‘হ্যাঁ, জানি আপনি সুলতান সালাহউদ্দিনের হত্যার পরিকল্পনা করতে এসেছেন।’ শেখ মান্নান বললো।

    ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো।’ গুমাস্তগীন বললো, ‘এর বিনিময়ে তুমি যা চাইবে তাই আমি দিতে রাজি! সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করো ভাই!’

    ‘আমি খৃষ্টান ও সাইফুদ্দিনের অনুরোধে চারজন ফেদাইন খুনীকে আপনি আসার আগেই এ কাজে পাঠিয়ে দিয়েছি।’ শেখ মান্নান বললো, ‘কিন্তু তাকে হত্যা করা খুবই কঠিন। বার বার চেষ্টা করেও আমরা সফল হতে পারিনি। এবারও যে পারবো তার কোন নিশ্চয়তা এ মুহূর্তে আমি আপনাকে দিতে পারবো না।’

    ‘আমার কাছ থেকে পৃথক ভাবে বখশিশ নাও।’ শুমাস্তগীন বললো, ‘নতুন লোক দাও, যারা এ কাজে দক্ষ। আর তাদেরকে আমার অধীনে দাও, যেন আমি সরাসরি তাদের পরিচালনা কতে পারি।’

    ‘আমি যে চারজন খুনী পাঠিয়েছি, তারা আমার বাছাই করা চার খুনী।’ শেখ মান্নান বললো, ‘আমার কাছে খুনী গ্রুপের অভাব নেই। কিন্তু আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছি অন্য কারণে।’

    ‘কেন?’ গুমাস্তগীন বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আইয়ুবী কি তোমাকে কোন কেল্লা টেক্কা দিয়ে দিল নাকি?’

    ‘না!’ শেখ মান্নান উত্তর দিল, ‘কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে খুন করার জন্য আমি আমার বহু মূল্যবান ফেদাইন খুনী শেষ করে ফেলেছি। আমার পাঠানো ঘাতকরা তাকে ঘুমন্ত অবস্থায়, খঞ্জরের আক্রমণ চালিয়েছে, কিন্তু দেখা গেছে, আইয়ুবী নয়, সে নিজেই নিহত হয়ে গেছে। তার ওপর আমার দক্ষ তীরন্দাজরা তীর বর্ষণ করেছে, কিন্তু সে তীর তাকে স্পর্শও করতে পারেনি। আমার কেন যেন মনে হয়, সুলতান আইয়ুবীর ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া আছে। তার মধ্যে এমন কিছু আছে, যে শক্তির বলে তিনি খঞ্জর ও তীরের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে যান। আমার গোয়েন্দারা বলেছে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ওপর যতবার আক্রমণ চালানো হয়েছে, ততবারই তিনি সে আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়েছেন অলৌকিকভাবে। আক্রমণ হলে তিনি ভীত বা রাগান্বিত হতেন না। আক্রমণ প্রতিহত করে এমনভাবে হাসতেন, যেন কিছুই হয়নি।’

    ‘ভাই মান্নান, রাখো তো এসব প্যাঁচাল। আগে বলল, কতো চাও?’ গুমাস্তগীন বিরক্ত হয়ে বললো, ‘আমি সুলতান আইয়ুবীকে আর জীবিত দেখতে চাই না। আনাড়ী খুনীদের ব্যর্থতার কাহিনী বাদ দিয়ে কাজের কথায় আসো।’

    ‘আনাড়ী নয়, আমি যাদের পাঠিয়েছিলাম, তারা প্রত্যেকেই এ কাজে ওস্তাদ ছিল।’ শেখ মান্নান বললো, ‘আইয়ুবী ছাড়া তাদের হাত থেকে কেউ কোনদিন বাঁচতে পারেনি। তারা মৃত্যুকে ভয় করার মত লোক ছিল না। আমার কাছে এখনও এমন ওস্তাদ লোক রয়েছে, যারা বহু গুপ্তহত্যার নায়ক। তারা এমন কৌশলে হত্যাকাণ্ড চালায় যে, কাকপক্ষীও টের পায় না। কিন্তু ভাই গুমাস্তগীন, আমি আমার এত মূল্যবান ফেদাইনদের আর এমনভাবে বৃথা নষ্ট করতে পারবো না। তোমরা তিন বাহিনীর সম্মিলিত শক্তি নিয়েও তার কিছু করতে পারলে না, আর আমার মাত্র তিন-চারজন ফেদাইনকে দিয়ে কেমন করে তাকে হত্যা করাতে চাও?’

    ‘বুঝেছি, তুমি আইয়ুবীর শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেছ।’

    ‘না! আমি ভয় পাইনি। সুলতান আইয়ুবীর সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই।’ শেখ মান্নান বললো, ‘হাসান বিন সাব্বাহ পয়গাম্বর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমাদের এই দল পেশাদার খুনী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। বুঝলে ভাই গুমাস্তগীন! আমি এখন একটি পেশাদার খুনীচক্রের নেতা! প্রশ্নটা ভয়ের নয়, প্রশ্নটা পেশার। এখন যদি সুলতান আইয়ুবী আমাকে টাকা দিয়ে বলে তোমাকে হত্যা করতে, তবে আমি তোমাকেও হত্যা করতে পারবো।’

    ‘কিন্তু সালাহউদ্দিন আইবী কাউকে কাপুরুষের মত টাকা দিয়ে হত্যা করান না।’ লিজা বললো, ‘সেই কারণেই তিনি কাপুরুষদের আঘাতে ও ষড়যন্ত্রে মৃত্যবরণ করছেন না।’

    ‘বাহ! তুমি এই বয়সেই বুঝতে শিখেছো যে, যে কাপুরুষ নয়, তাকে কাপুরুষরা হত্যা করতে পারে না!’ শেখ মান্নান তাকে কাছে টেনে নিয়ে আদরের ছলে বললো।

    গুমাস্তগীন আশাহত হয়ে শুম মেরে বসে রইলো। শেষ মান্নান তাকে বললো, ‘ভাই গুমাস্তগীন, তুমি, সাইফুদ্দিন ও আল মালেকুস সালেহ এবং খৃষ্টানরা শুধু এই কারণে পরস্পর বন্ধু সেজে রয়েছে যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তোমাদের সবারই শত্রু! নতুবা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে কোন বন্ধুত্বের বন্ধন নেই। আহা, আমাকে বলো তো, আইয়ুবীকে হত্যা করে তোমরা কি লাভ করতে চাও? তিনি মারা গেলে তখন তো তোমরা নিজেরাই মারামারি করে মরবে।’

    গুমাস্তগীন চুপ। সে এসব প্রশ্নের কোনই জবাব দিল না। শেখ মান্নান আবার বললো, “ভাই গুমাস্তগীন! খুব মনোযোগ সহকারে আমার কথা শুনে নাও! আইয়ুবীকে হত্যা করতে পারলেও তোমরা নতুন করে এই সাম্রাজ্যের এক ইঞ্চি জায়গাও দখলে নিতে পারবে না। এ সাম্রাজ্য এখনো আইয়ুবীই ধরে রেখেছেন। তিনি তার সৈনিকদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনা ও জেহাদী জযবা সৃষ্টি করে রেখেছেন, সে কারণেই এখনো খৃস্টানরা এখানে দাঁত বসাতে পারছে না। তুমি যদি কাউকে হত্যা করতেই চাও, তবে সাইফুদ্দিনকে টার্গেট নাও। সাইফুদ্দিনকে হত্যা করে মুশেলের ওপর তোমার আধিপত্য কায়েম করো। অবশ্য তাকে তুমি নিজেই হত্যা করতে পারবে, এ জন্য আমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই। সে তোমাকে বন্ধু হিসেবে জানে এবং তোমরা উভয়েই মিত্র বাহিনীর সদস্য। তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে পারো অথবা সুযোগমত আক্রমণ করেও হত্যা করতে পারো।’

    শেখ মান্নানের দীর্ঘ বক্তব্য শেষ হলো। গুমাস্তগীন গভীর চিন্তায় ডুবে রইলো এ বক্তব্য শুনে। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললো, ‘হ্যাঁ, তুমি সাইফুদ্দিনকেই হত্যা করার ব্যবস্থা করো। বলো, এর বিনিময়ে তুমি কি চাও?’

    ‘তোমার সখের হারান দুর্গ!’ শেখ মান্নান বললো।

    ‘তোমার মাথাটা তো ঠিক আছে, মান্নান!’ গুমাস্তগীন বললো, ‘ইয়ার্কী রাখো। হীরা, জহরত, অর্থ, সম্পদ ও বিত্ত দিয়ে তোমার মূল্য চাও।’

    ‘ধন-রত্নের বিনিময়ে তোমাকে চারজন লোক দিতে পারি।’ শেখ মান্নান বললো, ‘কিন্তু এরা আমার গুপ্ত বাহিনীর সদস্য নয়। ওরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর স্পেশাল কমাতো। তাদেরকে এই দুই মেয়ে হাশিশ পান করিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আমার কাছে এরা খুবই মূল্যবান সম্পদ। আমি এদেরকে অন্য কারো হাতে ছেড়ে দেয়ার কথা কখনো চিন্তাও করিনি, কারণ এমন যোগ্য ও দক্ষ কমাণ্ডো কোথাও পাওয়া যায় না। কপাল গুণে ওদের পেয়ে গেছি আমি। তুমি তো জানো, ফেদাইনদের হরেক রকম নেশার দ্রব্য ও সম্মোহন বিদ্যা যে কোন মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে। এই পরীরা তাদেরকে হাশিশের নেশায়; তাদের রূপ-যৌবনের নেশায়, এমন যোগ্য বানিয়ে নিবে যে, এরা শেষ পর্যন্ত আপন বাবা-মাকেও হত্যা করতে পিছপা হবে না।

    এই সম্পদ আমি হাত ছাড়া করতাম না, কিন্তু আমি তোমাকে নিরাশ করতে চাই না। তুমি কষ্ট করে এবং বড় আশা নিয়ে আমার কাছে এসেছে, এ জন্যই আমি এদেরকে তোমার হাতে তুলে দিতে রাজি হলাম। তুমি ওদের নিয়ে যাও, কিছু দিন এদেরকে আমার পরীদের দিয়ে স্বপ্নের জান্নাত দেখাও। তাদেরকে তোমার মহলের রাজকুমার বানিয়ে নাও। গোপনে মাত্রানুযায়ী হাশিশ পান করাও এবং কায়দা করে মদের মধ্যে ডুবিয়ে দাও, দেখবে তোমার ইশারায় ওরা নাচবে।’

    ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডোরা এত কচি খোকা নয়, যেমন তুমি বুঝাতে চাচ্ছে।’ গুমাস্তগীন বললো।

    ‘তুমি তো জানো গুমাস্তগীন, আমাদেরকে ফেদাইন বলা হয়। আমরা মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে খেলা করি।’ শেখ মান্নান বললো, ‘আমরা আমাদের শিকারকে মনভোলানো স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যাই। সম্মোহিত করে তাদেরকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাই যে, তার সামনে যা বলা হয় তাকেই সে বাস্তব মনে করে নেয়। তার সামনে নারীর সুন্দর ছবি একে বলো, এ হচ্ছে বেহেশতের হুর, সে তাই বিশ্বাস করবে। হাতে পাথর দিয়ে বলো, এ হচ্ছে স্বর্ণের টুকরো, সে তার হাতে স্বর্ণের টুকরোই দেখতে পাবে। তাকে নারীর বাহুলগ্ন করে দাও, খুব কম মূল্যে তার ঈমান ও বিশ্বাস কিনতে পারবে।’

    শেখ মান্নান তাকে আরো বললো, ‘তুমি এই চারজনকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও। একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, এরা তোমার উদ্দেশ্য সফল করতে পারবে না।’ শেখ মান্নান একটু হেসে বললো, ‘তুমি তোমার নিজেকে নিয়েই চিন্তা করো। নারী, মদ ও বিলাসিতা তোমাকে কোথা থেকে কোথায় নামিয়ে নিয়ে এসেছে তুমি মুসলমান হয়েও মুসলমানের শত্রু হয়ে গিয়েছে।’

    দরদাম ঠিক করে শেখ মান্নান, আন নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে তুলে দিল শুমাস্তগীনের হাতে। বললো, ‘এদেরকে কারাগারে রেখে না বরং রাজপুত্রের মত রাখবে।’

    গুমাস্তগীন তার পরামর্শ মেনে নিল। খাওয়া দাওয়ার পর এই বলে বিদায় নিল, দু’একদিনের মধ্যেই কমাণ্ডোদের নিয়ে আমি রওনা করতে চাই।’

    ‘আপনি আমার মেহমান। যতক্ষণ খুশী থাকবেন, যখন ইচ্ছে বললেন, আমি আপনার যাত্রার ব্যবস্থা করবো।’ বললো শেখ মান্নান।

    ❀ ❀ ❀

  • খুনী চক্রের আস্তানায়

    খুনী চক্রের আস্তানায়

    খুনী চক্রের আস্তানায়

    গুমাস্তগীন তাকে ধোঁকা দিয়ে গেছে, এই রাগে জ্বলছে শেখ মান্নানের সারা শরীর। গুমাস্তগীনের পিছু নেয়ার জন্য সে যে সৈন্য পাঠিয়েছিল, তার মধ্যে মাত্র দু’জন ফিরে আসতে পেরেছে। বাকীরা লিজাকে ছিনিয়ে আনা তো দূরের কথা, নিজেদের জীবনটা পর্যন্ত বাঁচাতে পারেনি। তার সৈন্যরা এমন অথর্ব, ভাবতেই রাগ তার মাথায় উঠে যাচ্ছে। কোথায় গুমাস্তগীন, লিজা ও কারিশমাকে চিলের মত ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে আসবে উন্মুক্ত মরুভূমি থেকে, তা নয়, একজন মাথামোটা ভীতুর ডিম, যে তার কাছে এসেছিল যুদ্ধ না করে আইয়ুবীর হাত থেকে বাঁচার জন্য গুপ্তঘাতক ভাড়া করতে, তার হাতে মার খেয়ে মরে গেছে তার সৈন্যরা, এটা কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। এ নিশ্চয়ই আইয়ুবীর সেই কমাণ্ডোদের কাজ, কারিশমা ও লিজা যাদেরকে পাকড়াও করে তুলে দিয়েছিল আমার হাতে, ভাবছে শেখ মান্নান। নিজের মনেই সে স্বীকার করল, সময়ের আগে এভাবে ওদের বাইরে বের করা ঠিক হয়নি। সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্বে আসার পর এমন ভুল সে আর করেনি। এ ভুলের খেসারত দিতে হলো তাকে একদল জানবাজ অনুচর হারিয়ে।

    ফেদাইন সন্ত্রাসীদের একটা খ্যাতি আছে, তারা সাধারণত কোন কাজে হাত দিলে ব্যর্থ হয় না। অপারেশন সফল করার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই তারা কাজে নামে। ফেদাইন খুনীদের এমন পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেয়া হয়, যার সাথে অন্য কারো তুলনা, হতে পারে না। মৃত্যুকে তারা ভয় পায় না। তাদেরকে ভাল করেই বুঝিয়ে দেয়া হয়, মরণ সাগরে যারা ঝাঁপ দিতে পারে, মরণকে কেবল তারাই জয় করতে পারে। তাই তারা সহজে পরাজিত হয় না।

    লিজাকে উঠিয়ে আনার জন্য ওদের পাঠিয়েছিল সে। তারা লিজাকে ধরে আনতে পারেনি ঠিক, কিন্তু কারিশমাকে উঠিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে। লিজাকে হারানোর বেদনা কারিশমাকে দিয়ে দূর করা কি সম্ভব? না কিছুতেই তা নয়, অনুভব করলো শেখ মান্নান। যদিও কারিশমা সুন্দরী, রূপসী কিন্তু লিজার চোখে যে নিবেদনের আর্তি আছে, মায়াময় মোহনীয়তা আছে, জৌলুসহীন অন্তরঙ্গতা আছে, তা কোথায় পাবে কারিশমা! তার চোখে যে মাদকতা আছে সেখানে আছে জৌলুসের সমারোহ, আছে অভিজ্ঞতার প্রলেপ ও চাতুর্যের সজীবতা। কিন্তু লিজার সহজ সরল নমনীয়তা ও ভীতিময় নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে যে নিবেদনের আর্তি ও বিহবলতা আছে তার কিছুই নেই সেখানে। দু’জনই সুন্দরী, কিন্তু সেই সুন্দরের মধ্যে কি যোজন যোজন দূরত্ব! কল্পনায় লিজার সেই বিমুগ্ধ রূপের কথা স্মরণ করে অস্থির চিত্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শেখ মান্নান।

    লিজাকে মুঠোর মধ্যে পেয়েও ভোগ করতে পারেনি এর জন্য শেখ মান্নান দায়ী করল কারিশমাকে। কারিশমা বাঁধা না দিলে তার অন্তরের চাহিদা এতক্ষণ অপূর্ণ থাকতো না। লিজা নেই, লিজাকে না পাওয়ার প্রতিশোধ এখন কারিশমার কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? কি শাস্তি দিলে তার অন্তরের জ্বালা দূর হবে?

    বারান্দায় দীর্ঘক্ষণ পায়চারী করেও এর কোন ফায়সালা করতে পারল না শেখ মান্নান। তখন প্রহরীকে ডেকে বললো, ‘কারিশমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দাও।’

    পড়ন্ত বেলা। আছিয়াত দূর্গের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে প্রহরীরা বিকেলের মিঠে রোদের কোমল উত্তাপ উপভোগ করছে। কোন রকম ভয়ভীতি বা শঙ্কার লেশও নেই কারো চোখে। হঠাৎ তাদের নজরে পড়লো দূর দিগন্তে এক খণ্ড ধূলিঝড়, এ রকম ধূলিঝড় একাধিক কারণে সৃষ্টি হয়, কিন্তু কোন টাই সুখকর নয়। সব কারণের মধ্যেই ভয় ও আশঙ্কার বার্তা থাকে। ওরা লক্ষ্য করলো, ধূলিঝড়টি আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে এবং এদিকেই এগিয়ে আসছে। ওরা অজানা আশঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে রইল সেই ধূলিঝড়ের দিকে।

    সময় গড়িয়ে চলল। ওরা অনুভব করল, এটা মরু সাইমুম নয়, কোন কাফেলার দূরন্ত অশ্বখুরের আঘাতে সৃষ্ট বালির সমুদ্র যেন উড়ে আসছে ওদের দিকে। প্রহরীরা এই নিয়েই কথা বলছিল। এত বড় কাফেলা এদিকে কেন আসছে? ওরা কি শত্রু, না মিত্র? ওরা এসব বলাবলি করছে আর তাকিয়ে দেখছে ঝড়ের গতি।

    তখনো ধূলিঝড় অনেক দূরে। দূর থেকেই ওরা দেখতে পেল শত শত অশ্বারোহী ছুটে আসছে কেল্লার দিকে। প্রহরীরা বিলম্ব না করে নাকারা বাজিয়ে দিল। নাকারার আওয়াজ কানে যেতেই কেল্লার কমাণ্ডাররা ছুটল উপরে। প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে ওরাও দেখলো সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সঙ্গে সঙ্গে ওরা আবার নিচে নেমে গেল এবং নিজ নিজ বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হুকুম দিল।

    হুকুম দিয়েই ওরা আবার ছুটল প্রাচীরের ওপরে। ততক্ষণে ধূলিঝড় আরো অনেক কাছে চলে এসেছে। ওরা নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে কেল্লার ভেতরে ও প্রাচীরের ওপর পজিশন নিল। ছুটে আসা সৈন্য বাহিনী কেল্লার কাছে এসেই কেল্লার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং কেল্লা অবরোধ করে দাঁড়িয়ে গেল।

    শেখ মান্নান মোকাবেলার আদেশ দিয়ে বলল, ‘বড় তাজ্জব ব্যাপার। ফেদাইন বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে এসে আবার কার মরার শখ হল!’

    তার হুকুমে কেল্লার প্রাচীরের ওপর তীরন্দাজ বাহিনী পজিশন নিয়ে বসে গেল। শেখ মান্নান বলল, “এখনি তীর বর্ষণের দরকার নেই। আগে দেখে নিই কাদের এ দুঃসাহস হলো।’

    প্রাচীরের ওপর পজিশন নেয়া তীরন্দাজরা তীর বর্ষণ না করে চুপচাপ বসে রইল। তারা লক্ষ্য করতে লাগলো, আক্রমণকারীদের গতিবিধি।

    সুলতান আইয়ুবী কেল্লার ভেতরের সব রকম তথ্যই পেয়ে গিয়েছিলেন আন নাসেরের কাছ থেকে। আন নাসের নিজেও সৈন্য দলের সাথে ছিল, সে সুলতানকে জানাচ্ছিল কেল্লার কোথায় কি আছে।

    সুলতানের নির্দেশে দুটি মিনজানিক কামান সেট করা হলো। আন নাসের শেখ মান্নানের মহলটি কোথায় ও কতটা দূরত্বে দেখিয়ে দিল কামান চালকদের।

    তাঁর নির্দেশিত স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে একটা পাথর নিক্ষিপ্ত হলো মিনজানিকের সাহায্যে। পাথরটি যথাস্থানেই আঘাত হানলো, মান্নানের মহলের দেয়াল ফুটো হয়ে গেল সে আঘাতে। আর অপেক্ষা করার উপায় নেই। কারা আক্রমণ করেছে বুঝে নিয়েছে শেখ মান্নান।

    আইয়ুবীর কমাণ্ডোদেরকে গুমাস্তগীনের কাছে বিক্রি করে যে ভুল আমি করেছিলাম তার প্রায়শ্চিত্ত করার সময় হয়ে গেছে, ভাবলো শেখ মান্নান। সে তার সৈন্যদের এ হামলার জবাব দেয়ার নির্দেশ দিল।

    কেল্লার উপর থেকে শুরু হলো তীর বর্ষণ। কিন্তু সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা তখনো তীরের আওতার বাইরে। শেখ মান্নানের ফেদাইন বাহিনীর তীর বর্ষণ কোনই কাজে এল না, আইয়ুবীর একজন সৈন্যও আহত হলো না তাতে।

    আইয়ুবীর নির্দেশে এবার কেল্লার মধ্যে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলো মিনজানিকের কমাণ্ডার। বোমা শেখ মান্নানের মহলের অনতিদূরে গিয়ে ফাটলো। বোমা ফেটে চারদিকে ছড়িয়ে গেল পেট্রোল। কিন্তু তাতে কেল্লার কোন ক্ষতি হলো না। শেখ মান্নান বা ফেদাইনরা বুঝতে পারল না, এ বোমা হামলার মাধ্যমে তাদের জন্য কত বড় বিপদ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কেল্লার ভেতর।

    আইয়ুবী এবার সেখানে আগুন লাগানো তীর নিক্ষেপের হুকুম দিলেন। তীরন্দাজ মুজাহিদরা তীর ছুঁড়লো, কিন্তু পেট্রোলের কাছে নিতে পারলো না কোন তীর। তীর সেখানে নিতে হলে তাদেরকে কেল্লার আরো কাছাকাছি যেতে হবে। যেখানে এখন তারা পজিশন নিয়ে আছে সেখানে থেকে লক্ষ্যস্থলে তীর কিছুতেই পৌঁছানো সম্ভব নয়।

    আইয়ুবী পুরো বিষয়টি গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন। তিনি তীরন্দাজদের বললেন, ‚শাহাদাতের পেয়ালা পান করতে আগ্রহী এমন তিনজনকে এ মুহূর্তে আমার দরকার। কারা এ দায়িত্ব নিতে চাও?’

    সঙ্গে সঙ্গে পাশের সব ক’জন তীরন্দাজ, যারা আইয়ুবীর আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল, উঠে দাঁড়িয়ে গেল। তিনি ওদের মধ্য থেকে তিনজনকে বেছে নিলেন।

    তিনি তাদের বললেন, ‘পেট্রোল ভেজা জায়গায় তীর পৌঁছতে পারে এমন দূরত্বে এগিয়ে তীর ছুঁড়বে তোমরা। আমি আবার তীর ছোঁড়ার হুকুম দেয়ার সাথে সাথে তোমরা ছুটে যাবে পাঁচিলের দিকে। আমাদের তীর তোমাদের কাভার দেয়ার চেষ্টা করবে। দুশমনের তীর আঘাত হানলেও আশা করি তোমরা তোমাদের দায়িত্ব সফলতার সাথেই সমাধা করতে পারবে।’

    সুলতান আবার তীর ছোড়ার হুকুম দিতেই ওই তিন তীরন্দাজ ছুটল পাঁচিলের দিকে। বেশী দূর যেতে পারেনি, তার আগেই দুশমনের তীর ঝাঁপিয়ে পড়লো ওদের ওপর। হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগে এক তীরন্দাজ তার তীরে আগুন জ্বেলে ফোন মতে ছুঁড়ে মারল। সৌভাগ্যক্রমে তাতেই কাজ হল। তীরটি দেয়াল অতিক্রম করে গিয়ে পড়ল পেট্রোলের ছিটকে পড়া কোন অংশে, তাতেই আগুন ধরে গেল সেখানে।

    সহসা সে আগুন নিকটেই পেট্রোলের মূল অংশ স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। শেখ মান্নানের মহল ভরে গেল সে অগ্নিশিখায়। আইয়ুবী আরও কয়েকটি মিঞ্জানিক বোমা নিক্ষেপ করার হুকুম দিল। সাথে সাথে পালিত হলো সে হুকুম। বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল প্রজ্জ্বলিত আগুনের শিখা।

    আছিয়াত দূর্গে তখন চরম এক অবস্থা। শেখ মান্নানের লোকেরা গুপ্তঘাতক হিসাবে খ্যাতিমান ছিল। তাদের যত বীরত্ব সব ছিল নিঃসঙ্গ মানুষের ওপর। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দক্ষ হলেও সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং তাদের ছিল না। তার ওপর এই অতর্কিত অগ্নির ছোবল ছিল তাঁদের ধারনার বাইরে। ফলে অচিরেই তারা অনুভব করল, কেয়ামতের বিভীষিকা শুরু হয়ে গেছে তাদের উপর দিয়ে।

    শেখ মান্নানের অবস্থা আরও করুণ। তার মনে হলো, হাবিয়া দোযখের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সে। চারদিকে দাউ দাউ আগুন। সে আগুন সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণ পর তাকে গ্রাস করে ফেলবে।

    তার সৈন্যদের কারো অবস্থায়ই এমন নয় যে, তারা আইয়ুবীর বাহিনীর মোকাবেলা করে। যারা পাঁচিলের ওপর ছিল তারা নেশাগ্রস্ত মানুষের মত ঘোরের মধ্যে তখনো তীর চালিয়ে যাচ্ছিল। নিচের সৈন্যরা আচ্ছন্ন হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল অগ্নিশিখার তাণ্ডব। আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছিল এখান থেকে ওখানে।

    শেখ মান্নান যুদ্ধের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিল। কেল্লার উপরে সাদা পতাকা উড়িয়ে দিল সে। সুলতান আইয়ুবী যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন। থেমে গেল দু’পক্ষের তীরবৃষ্টি।

    তীরবৃষ্টি থামতেই চারদিক নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রোদের উত্তাপ আগেই কমে গিয়েছিল, এখন এই নীরবতার মধ্যে চুপিসারে এসে হানা দিল সন্ধ্যার অন্ধকার।

    সুলতান আইয়ুবীর নির্দেশে এক সালার সেই নীরবতা ভঙ্গ করে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করল, ‘শেখ মান্নান, সুলতান তোমাকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিচ্ছেন। কেল্লা থেকে বেরিয়ে এসে তোমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’

    কিছুক্ষণ পর। কেল্লার দরজা খুলে গেল। শেখ মান্নান দু’তিনজন সেনাপতি ও কমাণ্ডারকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এল। সুলতান আইয়ুবী অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে তাদের স্বাগত জানালেন। সাধারণত কোন কেল্লাধিপতিকে যেভাবে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বরণ করা হয়, তেমন কোন উৎসাহ বা ঘটা দেখালেন না সুলতান। কারণ সুলতানের কাছে মান্নান কোন যোদ্ধা বা বীর ছিল না, ছিল এক জঘন্য পাপী ও খুনী।

    তারা যখন সুলতান আইয়ুবীর কাছে এল, তিনি তাদের বসতেও বললেন না। সুলতান তার তাঁবুর সামনে এক আসনে বসেছিলেন। আইয়ুবীর দুই সেনাপতি শেখ মান্নান ও তার সঙ্গীদেরকে হাজির করলো সুলতানের সামনে।

    ‘মান্নান!’ সুলতান আইয়ুবী গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘এখন তুমি কি চাও?’

    ‘প্রাণ ভিক্ষা চাই!’ শেখ মান্নান পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বললো।

    “আর তোমার দূর্গ?’ সুলতান আইয়ুবী জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘আপনার যে সিদ্ধান্ত তাই মেনে নেবো।’

    “তোমার সৈন্যসামন্ত নিয়ে এক্ষুণি বেরিয়ে যাও।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, “তোমরা কোন জিনিস সঙ্গে নিতে পারবে না। তোমার বাহিনীকে গুছিয়ে নাও, কোন সেনা কমাণ্ডার ও সৈন্যের কাছে অস্ত্রশস্ত্র থাকতে পারবে না। এখান থেকে সম্পূর্ণ খালি হাতে বের হয়ে যাবে তোমরা। তোমার কয়েদখানায় যেসব কয়েদী আছে, তাদের সেখানেই থাকতে দাও। আর স্মরণ রেখো, ইসলামী সাম্রাজ্যের কোন সীমানাতেই যেন তোমাকে না দেখি। সোজা খৃস্টানদের সীমানায় গিয়ে থামবে। তোমাকে এ যাত্রা মৃত্যুদণ্ড দিলাম না, কিন্তু ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আর কোন চক্রান্ত বা অপকর্ম করলে তার যথাযথ সাজা তোমাকে ভোগ করতে হবে।’

    তিনি আরো বললেন, ‘তুমি যে চারজন ফেদাইনকে পাঠিয়ে ছিলে আমাকে হত্যা করার জন্য, তারা সবাই নিহত হয়েছে। তুমি সাদা পতাকা উড়িয়েছে বলে এবারকার মত তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি কুরআনের নির্দেশের অনুসারী। আমি বলতে পারি না, খোদা তোমাকে ক্ষমা করবেন কি না। কিন্তু আমি বলছি, তুমি এবং তোমার ফোইন খুনীরা যদি নিজেদের মুসলমান হিসাবে দাবী করা ত্যাগ না করে তবে তোমাকে ও তোমার দলকে আমি ভূমধ্যসাগরে ডুবিয়ে দিতে বাধ্য হবো।’

    সূর্য ডুবতে বসেছে। সন্ধ্যার লালিমায় বিষন্নতার ছোঁয়া। মানুষের আবছা সুদীর্ঘ ছায়া মাথা নত করে দিগন্তের পাড়ে চলে যাচ্ছে। সেই ছায়া শেখ মান্নানের। মান্নান একা নয়, তার সাথে আছে তার এতদিনের সহচরবৃন্দ। নতমুখী, মানুষের দীর্ঘ মিছিল হারিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টির অন্তরালে। সেই মিছিলের পুরোভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছে শেখ মান্নান। পরাজিত মানুষের অভিনব এক কাফেলা। কাফেলায় শরীক হয়েছে নানা বিচিত্র অপরাধী। কেউ খুনী, কেউ মাদক ও নারীর দালাল, কেউ ছিনতাইকারীদের সর্দার, কেউ প্রতারক ও ফেরেববাজ, কেউ লুটেরাদের নেতা, কেউ সম্মোহন বিদ্যায় পারদর্শী গণক ও ভাগ্য গণনাকারী। এদেরই কেউ গুপ্তঘাতক দলের সেনাপতি, কেউ কমাণ্ডার ও সৈন্য।

    পেশাদার খুনীরা মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে অপরাধ জগতের রথী মহারথীরা। এটা স্বপ্ন না বাস্তব এই দ্বিধায় ভুগছে এখনো কেউ কেউ। তাদের এই দ্বিধার কারণ তাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অপকর্মের দীর্ঘ ফিরিস্তি। কারণ তারা জানে, তারা এমন সব অপরাধ করেছে, যার কোন ক্ষমা নেই। যদি সেই অপরাধের শাস্তি দেয়ার জন্যই তাইয়বী এসে থাকে তাহলে তো তার উচিত ছিল আমাদেরকে হত্যা করা। অথচ সে আমাদের গায়ে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত দেয়নি। আবার ভাবছিল, আমরা কি তারা, যাদের ভয়ে রাজা উজির আমীরদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

    এসব ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে গেল দুর্ধর্ষ ফেদাইন সন্ত্রাসীরা। দুর্ভাগ্য তাদের, যাওয়ার সময় তারা কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। তাদের উট, ঘোড়া, অস্ত্র, মানুষকে মোহগ্রস্ত করার নানা সরঞ্জাম, আসবাবাদি সব কিছু কেল্লার মধ্যে ফেলেই তাদের পথে নামতে হয়েছে।

    সূর্য পরিপূর্ণভাবে অস্ত যাওয়ার আগেই সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনী দূর্গের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে নিল। কারাগার থেকে বের করে আনা হল কয়েদীদের। শেখ মান্নানের মহল ও কেল্লার গুপ্ত কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হল বেশুমার সোনা, রূপা, হীরা, জহরত ও অফুরন্ত মণিমাণিক্য।

    ❀ ❀ ❀

    সুলতান আইয়ুবী এই কেল্লাকে একজন সেনাপতির দায়িত্বে ছেড়ে দিয়ে সেই রাতেই কোহে সুলতানে যাত্রা করলেন। তিনি এখন আর বেশী দেরী করতে চান না। পরিকল্পিত অবশিষ্ট কাজগুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধা করে ফেলতে চান। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নতুন অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন। অভিযানের শুরুতেই আচমকা এক রাতে তিনি এজাজ দুর্গ অবরোধ করে বসলেন। হলবের আমীর এজাজ দুর্গকে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসাবে গড়ে তুলেছিল। কারণ এই ঘাঁটিই হলব শহর ও প্রদেশের প্রধান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

    হলবের আমীর তার সেনাবাহিনীর মূল শক্তিকেন্দ্র হিসাবে এজাজ দূর্গকে গড়ে তোলার ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এই ঘাটির সব সৈন্য ছিল তারুণ্যে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। সবাই ছিল ক্লান্তিহীন, সতেজ ও সবল। তিনি এই বাহিনীকে আইয়ুবীর মোকাবেলা করার জন্য উপযুক্ত ট্রেনিং ও পর্যাপ্ত রসদ সরবরাহ করে রেখেছিলেন। কিন্তু এই সৈনিকদের অধিকাংশই ছিল এমন, পর্যাপ্ত ট্রেনিং পেলেও যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি লড়াই করার অভিজ্ঞতা যাদের ছিল না।

    সুলতান আইয়ুবী জানতেন তাদের রণপ্রস্তুতির কথা। বিশেষ করে সুলতানের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়ে তারা যে দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তাতে তাদের সাহস ও শক্তির অহংকারই মূর্ত হয়ে উঠেছিল। তাই এ কেল্লা খুব সহজেই দখল করতে পারবেন, তেমনটি সুলতান আশাও করেননি। তিনি জানতেন, এজাজ দূর্গে তিনি তুমূল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবেন। তাই কেল্লাটি দখল করার মত পর্যাপ্ত রণপ্রস্তুতি নিয়েই তিনি এখানে এসেছিলেন।

    এ কেল্লা অবরোধ করার মধ্যে একটি সামরিক ঝুঁকি বিদ্যমান ছিল, সুলতান সে বিষয়টিও নজরে রেখেছিলেন। এই ঝুঁকি হচ্ছে, হলবের সেনাবাহিনী। তিনি কেল্লা অবরোধ করে বসে থাকলে আত্মসমর্পণ না করে কেল্লার কোন সৈনিক বাইরে আসতে পারবে না ঠিক, কিন্তু পিছন থেকে হলবের সেনাবাহিনী আক্রমণ করে বসতে পারে। তাই তিনি এমন একটি ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন, যাতে হল থেকে কোন বাহিনী এলে তাদেরও উপযুক্ত আদর-আপ্যায়নে কোন ক্রটি না ঘটে।

    সুলতান আইয়ুবীর একটা সুবিধা ছিল এই, তুর্কমান রণাঙ্গণ থেকে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে হলবের বাহিনীও চরম পরাজয় স্বীকার করে হতোদ্যম ও ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসেছিল। তাদের এখন যুদ্ধ করার সাহস, শক্তি ও মনোবল কিছুই অবশিষ্ট নেই।

    এজাজ দুর্গ। হলবের অনুগত বাহিনী জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলেছে। এজাজ দূর্গ রক্ষার সাথে জড়িয়ে পড়েছে তাদের জীবন-মরণ। পুরো একটা দিন ও রাত তারা সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদেরকে কেল্লার কাছে আসতে দেয়নি। প্রাচীর ভাঙার জন্য যে দলটিকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন সুলতান, অনেক চেষ্টা করেও দেয়ালের কাছে যেতে পারেনি তারা। কারণ প্রাচীরের ওপর থেকে এমন প্রবল বেগে তীর বর্ষিত হচ্ছিল, জীবন বাজি রেখে চেষ্টা করেও দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয় কারো পক্ষে, তার আগেই তীরের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে তার বুক। তাই নিশ্চল ঝুঁকি নেয়ার মধ্যে কোন কল্যাণ খুঁজে পায়নি দলটি।

    পরের দিন। সুলতান আইয়ুবী অবরোধ তীব্রতর করার কথা ভাবলেন। তিনি তাঁর বাহিনীর অফিসার ও কমাণ্ডারদের ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে বললেন, কালকের চেয়ে আজকের আক্রমণ আরেকটু জোরালো করো, যাতে ওরা উপলব্ধি করতে পারে, সময় যত যাবে ততই কঠিন হবে ওদের বেঁচে থাকা। আমি ওদের হত্যা করার পরিবর্তে আত্মসমর্পণ করাতে চাই। তোমাদের টার্গেট হবে ওদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা। সেনাবাহিনী সুলতানের নির্দেশ মোতাবেক কাজে নেমে পড়ল। শক্তিশালী মিঞ্জানিক দ্বারা ভারী ভারী পাথর নিক্ষেপ করে, পেট্রোল ভর্তি হাঁড়ি নিক্ষেপ করে এবং সেই পেট্রোলে অগ্নি তীর বর্ষণ করে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আইয়ুবীর সৈন্যরা দুর্গ এবং দুর্গ-প্রাচীরে এক ভয়াবহ ত্রাসের পরিবেশ তৈরী করে ফেলল।

    প্রাচীরের উপরের তীরন্দাজরা অনেকেই আগুনে ঝলসে গেল। কেউ কেউ কেল্লার ভেতর লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করল। কেল্লার ভেতর অগ্নিশিখা কতটা বিস্তৃত হলো দেখার উপায় না থাকলেও প্রাচীরের অবস্থা আইয়ুবীর সৈন্যরা সচক্ষে দেখতে পাচ্ছিল। প্রাচীরের ওপর জায়গায় জায়গায় যেসব সেন্ট্রিবক্স ছিল সেখানে থেকে তখনো কিছু তীরন্দাজ প্রাণপণে তীর ছুঁড়ে যাচ্ছিল।

    এমন সময় পেট্রোল বোঝাই একটি হাঁড়ি গিয়ে পড়ল কেল্লার একদম গেটের কাছাকাছি। কিছু পেট্রোল পড়লো পাঁচিলে, কিছু ছিটকে গিয়ে পড়ল গেটে। আইয়ুবীর তীরন্দাজরা সেই পেট্রোলে অগ্নি-তীর ছুঁড়ে মারল। সাথে সাথে সেখানে জ্বলে উঠল দাউ দাউ আগুন। পাঁচিল থেকে সে আগুন লাফিয়ে পড়ল কেল্লার গেটে; জ্বলতে শুরু করলো কেল্লার প্রধান ফটক। এই সুযোগে প্রাচীর ভাঙা বাহিনী ছুটল পাঁচিল ভাঙতে। কিন্তু সেন্ট্রিবক্স থেকে বেপরোয়া তীর বর্ষণ করে তাদের অনেককেই শহীদ করে দিল এজাজের দূর্গ রক্ষীরা।

    কেল্লার ভেতর অগ্নিগোলা নিক্ষেপের জন্য মিঞ্জানিক চালকদের কয়েকজন মিঞ্জানিক পাঁচিলের আরো কাছাকাছি নিয়ে গেল। এদের উপরও বেপরোয়া তীর চালাল পাঁচিলের ওপর থেকে কয়েকজন তীরন্দাজ। এতে বেশ কিছু মিঞ্জানিক চালক ও সৈন্য আহত এবং শহীদ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে ওরা আবার মিঞানিক পিছনে সরিয়ে নিয়ে এল।

    সুলতান আইয়ুবী সবকিছু তদারক করছিলেন। তিনি মিঞানিক চালকদেরকে খুব সতর্কতার সাথে সেন্ট্রিবক্স টার্গেট করতে বললেন। তাই করা হলো। দেখা গেল দুটি সেন্ট্রিবক্স ভারী পাথরের আঘাতে গুড়িয়ে গেল। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল ওখান থেকে তীর আসা।

    এবার আরেকদল পাঁচিল-ভাঙা সৈনিক ছুটল গেটের দিকে। শন শন করে অন্য সেন্ট্রিবক্স থেকে ছুটে এল কয়েকটি তীর। কয়েকজন মুজাহিদ লুটিয়ে পড়ল ময়দানে। বাকীরা সঙ্গীদের লাশ পেছনে ফেলেই এগিয়ে গেল সামনে। কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল, এমন কিছু কুরবানী ছাড়া কেল্লা দখল করা সম্ভব নয়। একজন শহীদ হলে সেখানে ছুটে যেতো আরো কয়েকজন জিন্দাদীল মুজাহিদ।

    আইয়ুবী বুঝতে পারলেন, লড়াই একটি পরিণতির দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। আক্রমণ আরেকটু তীব্রতর করতে পারলে লড়াই আগামী কালের জন্য মূলতবী করার প্রয়োজন পড়বে না।

    কেল্লার গেট তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে। লোহার ফ্রেম থেকে খসে খসে পড়ে যাচ্ছে কাঠের জ্বলন্ত টুকরা। ওদিকে সুলতানের আদেশ পেয়ে সমানে পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল মিঞ্জানিক চালকরা। তীরন্দাজরা এগিয়ে টার্গেট স্থির করে তীর বর্ষণ শুরু করে দিল। তারপরও কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়।

    একটু পর। আইয়ুবীর একদল জানবাজ গেটের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তারা বন্ধুদের লাশ এবং জ্বলন্ত আগুনকে অগ্রাহ্য করে গেটের কাঠ খুলতে শুরু করে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গেটের লোহার ফ্রেম ছাড়া উধাও হয়ে গেল সব কাঠ। এখন অনায়াসেই পদাতিক বাহিনীর সদস্যরা দুর্গে প্রবেশ করতে পারবে।

    এ সুযোগটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন সুলতান। তিনি পদাতিক বাহিনীকে এগিয়ে যাওয়ার হুকুম দিলেন। এগিয়ে গেল পদাতিক বাহিনী।

    ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে রাতের আঁধার। থেমে গেছে পাথর ও অগ্নিগোলা নিক্ষেপ। দাউ দাউ আগুনের প্রচণ্ডতা কমে গিয়ে এখানে ওখানে যে টুকরো টুকরো অগ্নিশিখা জ্বলছে তাতে কেল্লার ভেতরের অন্ধকার যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠল। কারণ সে আগুন সামান্য এলাকা আলোকিত করে পাশের অন্ধকারকে আরো ঘন অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছিল।

    গেটে তখনো লোহার ফ্রেমটুকু রয়ে গিয়েছিল। যে কারণে ওখান দিয়ে অশ্বারোহীদের প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। প্রাচীর ভাঙার যে দলটি ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল তারা লোহার ফ্রেম সরানোর চেষ্টা করছিল। এ সময় একদল পদাতিক অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সাঁ করে ভেতরে ঢুকে গেল। তাদের পেছন পেছন ঢুকল আরেকটি দল।

    এজাজের দুর্গ রক্ষীরা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর তীর বর্ষণ করছিল। কেউ কেউ লুটিয়ে পড়ছিল সে তীরের আঘাতে। বাকীরা ঢুকে যাচ্ছিল কেল্লার অভ্যন্তরে।

    কেল্লার ভেতরে সৈনিকদের যে ব্যারাক ছিল তার সামনে সঙ্গীণ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একদল কেল্লা রক্ষী। আইয়ুবীর পদাতিক বাহিনী হামলে পড়লো তাদের ওপর। রক্তক্ষয়ী তলোয়ার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল সেখানে।

    পদাতিক বাহিনীর জানবাজ সৈন্যরা প্রাণপণে লড়াই করে চলেছে। ততক্ষণে গেটের লোহার ফ্রেমটি সরিয়ে ফেলতে সমর্থ হলো ওখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী। সুলতান আইয়ুবী এবার সাঁড়াশী অভিযানের জন্য অশ্বারোহী দলকে এগিয়ে যাবার হুকুম দিলেন।

    অশ্বারোহী বাহিনী খোলা গেট দিয়ে ঝড়ের বেগে ঢুকে গেল ভেতরে। এজাজ দুর্গের তীরন্দাজরা ছাদের ওপর থেকে তীরের বন্যা বইয়ে দিল। আইয়ুবীর বাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহীদের লাশে ভরে গেল সামনের চত্বর। যুদ্ধের এ পর্যায়ে এসে এমন কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে, আইয়ুবীর বাহিনী এতটা ধারনা করেনি। তারা চরম কোরবানী দিয়ে যাচ্ছিল। লড়াই চলছিল তীব্রতর, দু’পক্ষেই হতাহত হচ্ছিল সমান তালে। আইয়ুবীর সৈনারা লাশ ডিঙ্গিয়ে আরো ভেতরে প্রবেশ করলো।

    এ যুদ্ধ ছিল বড় রক্ত ঝরা যুদ্ধ। এজাজ দুর্গের সৈন্যরা প্রচণ্ড সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল। গেটের লৌহ কপাট ভেঙে পড়ায় দলে দলে অশ্বারোহী বাহিনী ভেতরে প্রবেশ করলো। প্রাণপণে প্রতিরোধ করেও ওদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারল না এজাজের দুর্গরক্ষীরা।

    সুলতান আইয়ুবী ভেতরে প্রবেশ রত অশ্বারোহীদের হুকুম দিলেন কেল্লার মধ্যে স্থানে স্থানে আগুন লাগিয়ে দিতে। তাতে অন্ধকার কিছুটা কমবে। শত্রু-মিত্র চিনতে সুবিধা হবে। আর সবচে বড় ফায়দা যেটি হবে, তা হলো, সর্বত্র আগুন ধরিয়ে দিলে কেল্লার অভ্যন্তরে আতংক বৃদ্ধি পাবে। এখন ওরা ক্ষয়ক্ষতি প্রত্যক্ষ করতে পারছে না বলে যে সাহস ও মনোবল নিয়ে লড়াই করতে পারছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান দেখলে তাতে, ভাটা পড়বে। কেল্লার সর্বত্র আগুন জ্বলতে শুরু করলে ওরা, বুঝতে পারবে, আইয়ুবীর বাহিনী কেল্লার সবখানে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। হয়তো এরই মধ্যে তাদের কোন কোন সাথী আত্মসমর্পণও করে ফেলেছে। এই চিন্তা একবার কারো মনে ঢুকে গেলে সে নিজেও আত্মসমর্পণের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে।

    সঙ্গে সঙ্গে সুলতানের নির্দেশ কার্যকর করা হলো। কেল্লার বিভিন্ন স্থাপনার ওপর আগুন লাগিয়ে দিল আইয়ুবীর বাহিনী। এতক্ষণ এজাজ দুর্গের যে সেনাদল বীরত্ব নিয়ে লড়াই করছিল, তারা দেখতে পেল, তাদের অস্ত্রাগারে আগুন জ্বলছে। আগুন জ্বলছে ঘোড়ার আস্তাবলে, খাদ্যগুদামে, তাদের থাকার ব্যারাকে, এমনকি অফিসার্স কোয়ার্টারে। পশুর জন্য রাখা শুকনো ঘাস ও খড়ের গুমাদের আগুন আকাশ, আলোকিত করে ফেলেছে।

    এ কেল্লাটি হলব শহর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। রাতে হলববাসী দেখলো, এজাজ দুর্গের যেখানে সেখানে আগুন আর আগুন। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পাক খাচ্ছে ধোঁয়ার কালী। আকাশ লাল করে সে ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। একটার পর একটা অগ্নিশিখা কেবল বাড়ছেই। মনে হচ্ছে, এজাজ দুর্গে আগুনের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।

    সুলতান আইয়ুবী এজাজ দুর্গ অবরোধ করেছেন, হলববাসী এ সংবাদ আগেই পেয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে হলবের সেনাবাহিনী প্রধান চিন্তায় পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেনানায়কদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন। বললেন, ‘অবস্থা ভাল মনে হচ্ছে না। আইয়ুবীর বাহিনী নিশ্চয়ই এজাজ দুর্গে ঢুকে পড়েছে। এখন তাদের সাহায্যে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। আমরা আইয়ুরীর বাহিনীর পিছন থেকে আঘাত করলে সে উভয় সংকটে পড়ে যাবে। দুদিক থেকে আক্রান্ত হলে তার অবস্থা হবে করুণ চাই কি সে আত্মসমর্পণও করে বসতে পারে।’

    কেউ কেউ এ প্রস্তাব সমর্থন করলেও অধিকাংশ সেনাপতি এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করল। তাদের একদল বলল, “এজাজ দুর্গ নয়, এখন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করা উচিত। আইয়ুবী এজাজ দুর্গ দখল করে বসে থাকবে না। সে অবশ্যই হলব আক্রমণ করবে। তার হলব প্রবেশ কি করে রোধ করা যায়, এটিই এখন মন্তু ভাবনার বিষয়।

    সেনাপতি বললো, “সে জন্যই তো আমি এই মুহূর্তে তাকে পিছন থেকে চ্যালেঞ্জ করে বসতে চাই। সে এজাজ দুর্গে পরাজিত হলে কখনো হলব আক্রমণ করতে পারবে না।’

    ‘কিন্তু আমরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে আরো বড় বিপদ হাত পারে।’ বলল এক সেনাপতি, ‘তাঁর কোন বাহিনী এই মুহুর্তে শহরের বাইরে ওঁৎ পেতে বসে নেই, এমন নিশ্চয়তা আমরা কেউ দিতে পারবো না। সে ক্ষেত্রে আমরা শহর থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে ওরা শহরে ঢুকে পড়বে। বিনা বাধায় ও বিনা যুদ্ধে ওরা এই শহর দখল করে নেবে। এমন সুযোগ আমরা ওদের কিছুতেই দিতে পারি না।’

    ‘আমি ভাবছি অন্য কথা।’ বলল আরেক সেনাপতি। ‘আমাদের বাহিনী এইমাত্র একটা রক্তাক্ত লড়াই থেকে ফিরল। আইয়ুবীর হাতে চরম মার খেয়ে পরাজিত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় ফিরে এসেছে ওরা। তারা আহত, রক্তাক্ত ও ক্লান্ত। তাদের মধ্যে এখনো বিরাজ করছে আইয়ুবী আতঙ্ক। ওরা এখন যুদ্ধ করার যোগ্য নেই। এ অবস্থায় আমরা চাইলেও ওদেরকে এখন আইয়ুবীর বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারবো না। এজাজ দুর্গের তাজাদম সৈন্যরাই যদি নিজেদের ভাগ্যের বিপর্যয় রোধ করতে না পারে তবে আমাদের এ হতোদ্যম বাহিনী কি করে ওদের রক্ষা করার জিম্ম নেবে?”

    সুলতান আইয়ুবী যখন এজাজ দুর্গ অবরোধ করেন তখন আল মালেকুস সালেহের বয়স তেরো কি চৌদ্দ। এখন আর সে শিশু নয়। শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হয়েছে তার বয়স। কিছু কিছু বুঝতে শিখেছে রাজনীতির খেলা।

    হলবে নিজের প্রাসাদে বসে সে দেখলো এজাজ দুর্গের লেলিহান আগুনের শিখা। যা বুঝার বুঝে নিল সে।

    সে সময় সাইফুদ্দিন এবং গুমাস্তগীনও হলবেই ছিল। গতকালের ঘটনা মনে পড়ে গেল তার। আইয়ুবী এজাজ দুর্গ অবরোধ করেছে এ খবর যখন হলবে পৌঁছে তখন এ দুজনই দরবারে ছিল। এজাজ দুর্গের অবস্থা ও করণীয় নিয়ে দু’জনের মধ্যে তর্ক বেঁধে যায়। এই বিতর্ক এমন তিক্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, গুমাস্তগীন সাইফুদ্দিনকে হত্যা করার হুমকী পর্যন্ত দেয়।

    আল মালেকুস সালেহ ওদের এ বিতর্ক গভীর মনযোগের সাথে লক্ষ্য করে। গুমাস্তগীন এবং সাইফুদ্দিনের হাব-ভাব, আচরণ, চাহনী ও প্রতিটি কথা থেকে সে বুঝতে চেষ্টা করে ওদের দু’জনকে। ঝগড়ার এক পর্যায়ে সাইফুদ্দিন সম্মিলিত বাহিনীর সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় এবং নিজের অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে হল ত্যাগ করে চলে যাবে বলে জানায়।

    আল মালেকুস সালেহ বুঝতে পারে, সম্মিলিত বাহিনীতে থাকলেও এরা আসলে একে অপরের শত্রু। গুমাস্তগীন যে আক্রোশ দেখালো, তাতে সে অনুভব করলো, এ লোকটি সুবিধের নয়, সে আসলে বন্ধুবেশী এক ষড়যন্ত্রকারী। অবশেষে সে এই ঝগড়ায় হস্তক্ষেপ করে এবং সাইফুদ্দিনকে আশ্বস্ত করার জন্য গুমাস্তগীনকে কারাগারে বন্দী করে। বন্দী গুমাস্তগীন আল মালেকুস সালেহের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র পাকাতে শুরু করলে সে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। আল মালেকুন্স সালেহ তখন তাকে কারাগারেই হত্যা করতে বাধ্য হয়।

    এজাজ দুর্গ। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত দুর্গের সৈন্যরা অসমর্পণ করতে শুরু করল। এই অবরোধ ও যুদ্ধে সুলতান আইয়ুবীর বিজয় হলো বটে, কিন্তু এ বিজয়ের জন্য তাঁকে অনেক বেশী মূল্য দিতে হল। সেনা বাহিনীর যে দলটি প্রথম কেল্লার মধ্যে প্রবেশ করেছিল, এ যুদ্ধে তাদের অধিকাংশই শাহাদাত বরণ করেছিল। এজাজের দুর্গ রক্ষীরা প্রমাণ করে দিয়েছিল, তারা কাপুরুষ বা ভীরু নয়।

    এজাজ দুর্গ জয় করার পর সুলতান আইয়ুবী বিলম্ব না করে দ্রুত হলব শহর অবরোধ করে নিলেন। হলব শহর ছিল এজাজ দুর্গের খুবই সন্নিকটে। হলব শহরেব সৈন্যরা রাতভর দেখেছে এজাজ দুর্গের বিভীষিকা। জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখা শুধু নয়, আহতদের আর্ত চিৎকারের ক্ষীণ আর্তনাদ তাদের অন্তরে ভয়ের শিহরণ বইয়ে দিয়েছে। অজানা শংকায় কেঁপেছে তাদের হৃদয়গুলো।

    যুদ্ধ করার সব প্রেরণা ও সাহস তাতেই উবে গিয়েছিল। ভোরে যখন ওরা দেখতে পেল, কাল রাতে যারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল এজাজ দুর্গে, এখন তাই এ শহর অবরোধ করে বসে আছে, ভয়ের হীমশীতল স্রোত তাদের কণ্ঠতালু পর্যন্ত শুকিয়ে ফেলল। তারা এজ দুর্গের রাতের বিভীষিকাময় দৃশ্যের কথা স্মরণ করে। ভীতসন্ত্রস্ত হরিণীর মত পালাবার পথ তালাশ করতে লাগল।

    হলবাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল এ ভীতির শিহরণ। তারা আইয়ুবীর সাথে তাদের অতীত আচরণের কথা স্মরণ করে ভাবছিল আইয়ুবী না জানি তাদের জন্য কি কঠিন শাস্তি বরাদ্দ করে।

    পালাবার সব পথ বন্ধ। শহরের চারদিক আইয়ুবীর সৈন্যরা ঘেরাও করে রেখেছে। এ অবস্থায় কিছুই করার নেই দেখে জনসাধরণ ঘরের ভেতর দরজা জানালা বন্ধ করে বনে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগল। কারণ শহরের সেনাবাহিনী যে সুলতান আইয়ুবীকে প্রতিরোধ করার শক্তি হারিয়েছে সে কথা বুঝতে কারো কোন কষ্ট হচ্ছিল না। আইয়ুবী তাদের জন্য কি শাস্তি নির্ধারণ করে তাই দেখার জন্য দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগল শহরের প্রতিটি নাগরিক, এমনকি সৈন্যরা পর্যন্ত।

    ❀ ❀ ❀

    অবরোধের দ্বিতীয় দিন। আল মালেকুস সালেহের এক দূত এলো সুলতান আইয়ুবীর কাছে। দূত সুলতানের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করল। সুলতান ভেবেছিলেন, আল মালেকুস সালেই হয়তো কোন সন্ধি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু চিঠি খুলে তিনি তাজ্জব হয়ে গেলেন। এটি কোন সন্ধি প্রস্তাব ছিল না, ছিল এক আবেগময় ছোট্ট চিরকুট, যা পড়ে সুলতান আইয়ুবী হতভম্ব হয়ে গেলেন।

    চিঠিটা ছিল এমন: ‘সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী মরহুমের শিশু কন্যা সুলতান আইয়ুবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।’

    এই মেয়েটির নাম শামসুন নেছা। সে আল মালেকুস সালেহের ছোট বোন। বয়স মাত্র নয় কি দশ। আল মালেকুস সালেহ যখন দামেশক থেকে বিপথগামী আমীরদের প্ররোচনায় হলবে পালিয়ে আসে, তখন সে তার ছোট বোনকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার মা মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রাজিয়া খাতুন দামেশকেই থেকে যান। কারণ তিনি বিপথগামী আমীরদের ষড়যন্ত্র ধরতে পেরেছিলেন। সুলতান আইয়ুবীই যে মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর সত্যিকার অনুসারী এবং ইসলামের একনিষ্ঠ সেবক, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

    সুলতান আইয়ুবী দূতকে নির্দেশ নিলেন, ‘যাও, সেই মেয়েকে নিয়ে এসো।’

    মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর কন্যা অনুমতি পেয়ে সুলতানের সামনে এসে হাজির হলো। তার সাথে এল আল মালেকুস সালেহের দুই সেনাপতি।

    সুলতান আইয়ুবী তাকে কাছে পেয়েই বুকে টেনে নিলেন। তখন তাঁর হৃদয়ে বইছে আবেগের বন্যা। তিনি নূরুদ্দিন জঙ্গীর শিশু কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কেঁদে ফেললেন। অনেকক্ষণ মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখার পর কিছুটা শান্ত হয়ে মেয়েটিকে পাশে বসিয়ে বললেন, ‘তোমরা কেমন আছো মা? তোমার ভাই ভাল আছে?’ মেয়েটি বিহবল কণ্ঠে বলল, ‘আমরা ভাল আছি মামা। ভাইয়া আপনাকে এ চিঠিটা দিতে বলেছে।’ বলে সে ওড়নার ভেতর থেকে একটি চিঠি বের করে দিল।

    সুলতান চিঠিটি নিয়ে পড়লেন। তাতে আল মালেকুস সালেহ পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে লিখেছে,

    ‘আজ থেকে আমি আপনার আনুগত্য স্বীকার করে নিলাম। বিপথগামী আমীরদের প্ররোচনায় এতদিন আপনার বিরোধীতা করে যে অন্যায় করেছি, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আমার কারণে ইসলামের অগ্রযাত্রায় যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল আপনার অধীনে বাকী জীবন কাজ করে আমি তার কাফফারা আদায় করতে চাই। আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, ইসলামের দুশমন, গাদ্দার গুমান্তগীনকে হত্যা করা হয়েছে। এখন থেকে হারান কেল্লা ও তার রাজ্য আপনার অধীন। আশা করি আপনি আমাকে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দেবেন।’

    ইতি

    আপনার স্নেহের সালেহ।

  • পাল্টা ধাওয়া

    পাল্টা ধাওয়া

    পাল্টা ধাওয়া

    ত্রিপলীর খৃস্টান রাজ দরবার। বিভিন্ন খৃস্টান সম্রাটরা এসে এখানে মিলিত হয়েছেন। উদ্দেশ্য, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও সর্বপ্লবী হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। মুসলমানদের ওপর চূড়ান্ত হামলার লক্ষ্যেই এ সম্মেলন। সম্মেলনে অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করছে দুই বিশ্বস্ত খৃস্টান, ভিক্টর ও চেঙ্গিস।

    রাজকীয় উর্দি পরে দু’জনই মেহমানদের সামনে ঘোরাফেরা করছিল। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছিল তাদের। মেহমানদের অনেকেই এদের আগে থেকে চেনে। ওরা মেহমানদের বিশ্বাসভাজন তো বটেই, কারো কারো প্রিয়ভাজনও।

    ক্রুসেডদের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান হরমন। তিনিই অনেক যাচাই-বাছাই করে ওদেরকে এ চাকরীতে নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু আসলে এরা দু’জনই ছিল সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা। গোয়েন্দা হিসাবে তারা দু’জনই ছিল চৌকস। অসম্ভব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ না হলে হরমনের মত উস্তাদ গোয়েন্দার সন্ধানী দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তাদের পক্ষে এখানে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।

    দেখতে শুনতেও দু’জনই ছিল স্মার্ট। এখানে তাদের চাকরী হওয়ার এটাও একটা কারণ যে, তাদের উভয়েরই চেহারা সুন্দর, দেহ কাঠামো সুঠাম, সবল ও পৌরুষদীপ্ত। রাজকীয় মেহমানখানায় কাজ করার উপযুক্তই বটে।

    ভিক্টর তার প্রকৃত নামেই সবার কাছে পরিচিত। কারণ সে আসলেই খৃস্টান। রাশেদ চেঙ্গিস ছিল তুরস্কের নাগরিক, মুসলমান। খৃস্টানদের কাছে সে তার নিজের দেয়া খৃষ্টান ছদ্মনামে পরিচিতি ছিল। এ জন্য কোন খৃস্টানই তার আসল নাম জানতো না এবং সে যে মুসলমান তাও জানতো না।

    গভীর রাত পর্যন্ত চলল সম্মেলনের কাজ। আহারাদি, মদপান ও আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে রাত পার করে দিল সম্রাটগণ। বিশ্বস্ত খাদেমের মতই হাসি মুখে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সেবা করে যাচ্ছিল।

    মাঝ রাতের পর মিটিং শেষ হলো। তখন তারা ছুটি পেল নিজ নিজ কামরায় যাওয়ার।

    ‘আমরা দুজন একই সাথে চাকরী ও ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকতে পারি না।’ ভিক্টর বললো, ‘এ সংবাদ অন্য কাউকে দিয়ে কায়রো পাঠাতে হবে। এমন বিশ্বস্ত লোক কাকে পাওয়া যায় বলতো?’

    ‘ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে হবে।’ রাশেদ চেঙ্গিস বললো, ‘তিনি ভাল বলতে পারবেন, কে দ্রুত ও বিশ্বস্ততার সাথে এ সংবাদ কায়রো পৌঁছাতে পারবে। তবে যেই যাক, তাকে বিশ্বস্ত হতে হবে।’ সে আরো বলল, ‘আমি আজই এ সংবাদ দিয়ে কাউকে পাঠানোর দরকার মনে করছি না। এখনো খৃস্টান সম্রাটরা যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেনি। যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও পরিপূর্ণ তথ্য নিয়েই কায়রোতে লোক পাঠানো দরকার। অসম্পূর্ণ সংবাদ দিয়ে সুলতান আইয়ুবীকে হয়রান পেরেশান করার কোন মানে নেই।’

    ‘না, আমি এটুকুকেই অনেক বড় খবর মনে করি। ইমাম সাহেবকে বলা দরকার, ক্রুসেড বাহিনী বিশাল শক্তি নিয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে। যাতে তিনি এ খবর কায়রো পৌঁছে দিতে পারেন।’ ভিক্টর বললো, ‘সুলতান আইয়ুবী এতে করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পাবেন। এখনো যেসব দিকে তাঁর দুর্বলতা রয়েছে দ্রুত তা সংশোধন করে নিতে পারবেন। অভাবগুলো দ্রুত পূরণের জন্য সচেষ্ট হতে পারবেন। পরে যখন বিস্তারিত পরিকল্পনা পাবো তখন সে খবরও পাঠাবো।’

    ‘কিন্তু বার বার যাতায়াত করলে হরমনের গুপ্তচরদের নজরে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে!’

    ‘আর এমন যদি হয়, কোন খবর পাঠানোর আগেই আমরা ধরা পড়ে গেলাম!’

    ‘কেন, তোমার কি নিজের প্রতি আস্থা নেই?’

    ‘নিজের প্রতি আস্থা আমার ঠিকই আছে, কিন্তু তোমার প্রতি নেই। শোন!’ ভিক্টর চেঙ্গিসকে বললো, “যে সময় মেহমানরা আক্রমণের কথা বলছিল, তখন আমি তোমাকে লক্ষ্য করে দেখেছি। তুমি মদের পিয়ালা সম্রাট রিমাণ্ডের সামনে সাজিয়ে রাখতে রাখতে একবার থেমে গিয়েছিলে। তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তুমি তার কথার দিকে খেয়াল করছে। আমি তোমার চেহারা দেখছিলাম। খবরটি শুনে তোমার চেহারায় প্রফুল্ল ভাব ফুটে উঠেছিল। আমি জানতাম, এত দামী তথ্য পাওয়ার পর আতংক বা খুশীর ভাব ফুটে উঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার ভুলে গেলে চলবে না, হরমনও এখানে উপস্থিত আছেন। হরমন আলী বিন সুফিয়ানের সম পর্যায়ের গোয়েন্দা। আমি তোমাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হরমনের দিকেও তাকিয়েছিলাম। আমার তখন আশংকা হলো, তিনি তোমাকে লক্ষ্য করছেন। তাই তো বলছি, ভাই, আমাদের নিঃশ্বাসের কোন বিশ্বাস নেই।’

    ‘হরমনের কাছে আমি কোন অপরিচিত লোক নই।’ রাশেদ চেঙ্গিস বললো, ‘আমার সম্পর্কে তিনি সন্দেহ অনেক আগেই শেষ করেছেন। এখন ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

    ‘ভয় করার কথা বলছি না, সাবধান হওয়ার কথা বলছি।’ ভিক্টর বললো, ‘আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা শত্রুর পেটের মধ্যে বাস করছি।’

    ‘তা ঠিক। কিন্তু ভাই, যাই বলো, আমিও তো একজন মানুষ। মানবিক ত্রুটিবিচ্যুতির উর্ধ্বে কি করে উঠি!’

    ‘সে জন্যই তো তোমাকে সাবধান করছি। তুমি তো জানো না আজ হরমনের ওপর কি নির্দেশ জারী করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি মানুষকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার জন্য বলা হয়েছে তাকে। আর তাকে এই ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে, এ ক্ষেত্রে তিনি যা ভাল মনে করবেন, সেটাই আইন। তিনি কাউকে সন্দেহ করলে এবং সেই সন্দেহের বশে কাউকে খুন করলেও কেউ তার কাছে কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারবে না।’

    ‘বলো কি! এ ব্যাপারে তার হাতে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ, শোন, এসব কথা এখন থাক। আগে কাজের কথায় আসি। তুমি এখনি সোজা মসজিদে চলে যাও। সবাই এখন ঘুমিয়ে আছে। এই সুযোগে আজকের আলোচনা ইমাম সাহেবকে বিস্তারিত জানিয়ে এসো। যদি কায়রোতে যাওয়ার মত লোক পাওয়া যায়, তবে যেন দ্রুত অকে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর যদি ওদিক থেকে কেউ এসে থাকে, তবে আমার সাথে দেখা না করে যেন ফিরে না যায়।’

    শহরের এক মসজিদের ইমাম সুলতান আইয়ুবীর গোপন সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন। সেই সুবাদে মসজিদটিও মুসলিম গোয়েন্দাদের গোপন আড্ডায় পরিণত হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ানের কোন গোয়েন্দা গোপন কোন খবর পেলে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে সে তথ্য দিয়ে আসে। ইমাম সাহেব আবার সে খবর অন্য গোয়েন্দা মারফত জায়গা মত পৌঁছে দেন।

    ভিক্টর কখনও মসজিদে যায় না। সে বলে, “আমি মুসলমানও না, নামাজ-কালামও জানি না। আর মসজিদের ইজ্জত-সম্মান বিষয়েও কোন জ্ঞান নেই আমার। আমি কেন মসজিদে যাবো?’

    তার এ কথা যেমন খাঁটি, তারচেয়ে বেশী খাঁটি, সে এক হুশিয়ার গোয়েন্দা। অযথা মসজিদে যাওয়ার ঝুঁকি সে কেন  নিতে যাবে! মসজিদে মুসল্লী বেশে ক্রুসেড গোয়েন্দা নেই, এমন তো নয়। অনেক মুসল্লীই আছে, যারা পাকা গোয়েন্দা। তারা খৃস্টানদের চর হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তারা মসজিদের মুসল্লীদের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখে এবং তাদের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে। এ জন্যই দেখা যায়, আইয়ুবীর প্রতি সামান্য দরদ রাখে এমন বেশীর ভাগ মুসলমানই গ্রেফতার হয়ে যায়।

    রাশেদ চেঙ্গিসও দিনের বেলা এবং প্রকাশ্যে কখনো মসজিদে যায় না। কারণ সে নিজেও খৃস্টান পরিচয়েই সবার কাছে পরিচিত। কোন খৃস্টান মসজিদে গেলে প্রথম দর্শনেই সে সন্দেহভাজনদের তালিকায় পড়ে যাবে। যে লোক খৃস্টান রাজসভায় মদ পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে, মসজিদের তার কি দরকার? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর সে দিতে পারবে না। তাই যখনি প্রয়োজন পড়ে, তখন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে ইমামের সাথে দেখা করতে যায়। ইমাম সাহেবের কামরা মসজিদের সাথে লাগোয়। কামরার দরজা মসজিদের বারান্দার দিকে। বারান্দা দিয়ে উঠে দরজায় ধাক্কা দিলে দেখা যাবে, দরজাটি ভেতর থেকে ভেজানো বা আটকানো। তখন নিয়ম মাফিক সাংকেতিক টোকা দিতে পারলেই সে দরজা খুলে যাবে।

    রাশেদ চেঙ্গিস তার পোষাক পরিবর্তন করলো। গায়ে জোব্বা ও মাথায় পাগড়ী বেঁধে নিল মুখে কৃত্রিম দাড়িও লাগাল। এরপর কামরা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল। আদেশ অনুযায়ী তাকে সব সময় ক্লীন সেভ থাকতে হয়। গোপন মিশনে যাওয়ার সময় সে কৃত্রিম দাড়ি লাগিয়ে বের হয়, যাতে কারো চোখে পড়লেও সহজে ধরা না পড়ে।

    একজন পাক্কা হুজুর সেজে রাস্তায় নামে সে। রাজ দরবারের বাইরে তাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোয়ার্টার আছে। সেখানেই থাকে সে এবং ভিক্টর। তাই বেরোতে কোন অসুবিধা হয়নি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতি জ্বলছে। সে যতটা সম্ভব আলো এড়িয়ে পথ চলছিল।

    রিমাণ্ডের পারিষদ এবং সেনা অফিসার ছাড়াও ওখানে জমায়েত হয়েছিল অনেক মেহমান। তারা বিভিন্ন খৃস্টান সাম্রাজ্যের সম্রাট বা সেনাপতি। সম্রাট রিনাল্ট, তার অনেক নাইট এবং অফিসারও সেখানে উপস্থিত ছিল। আরও ছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের সেনা কর্মকর্তাবৃন্দ।

    এইসব সম্মানিত মেহমানদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন সম্রাট রিমাণ্ড। আলাপ-আলোচনা ও যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেটুকু সময় ব্যয় হতো তার বাইরে বাকী সময়টুকু তারা কাটিয়ে দিত আমোদ-স্ফুর্তি ও মাতলামী করে। অধিকাংশ রাত তারা পার করতো মদ ও মেয়ে নিয়ে।

    দরবারে ছিল অভিজাত শ্রেণীর পেশাদার নিশিকন্যাদের রমরমা ভাব। উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা মেতে উঠে স্ত্রী বদল খেলায়। ফলে রাতে শহর জুড়ে একটা উৎসব উৎসব ভাব চলে এলো।

    রাশেদ চেঙ্গিস তার কামরা থেকে বেরিয়ে পথে নেমেই বিপাকে পড়ল। কোথায় সে একটু নিরিবিলিতে পথ চলবে, গোপনে দেখা করবে ইমাম সাহেবের সাথে, তা নয়, পথ ভর্তি লোকজন। পথের পাশে বিভিন্ন দেশের সৈনিকরা তাঁবু টানিয়ে নিয়েছে। সেই সব তাঁবুতে, এমনকি পথের মধ্যেও অসভ্যপনা চলছিল। বেসামাল মাতাল জোড়া এমন ভাবে পথ চলছে, যেন ওটা ওদের ড্রয়িং রুম।

    সে এই সব জুটির দৃষ্টি এড়িয়ে কৌশলে রাস্তা পার হয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত সে বিপদসীমা পার হয়ে শহরের সাধারণ আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করলো। একটু পর গিয়ে হাজির হলো সেই মসজিদের পাশে।

    মসজিদটি এক মুসলিম মহল্লার অভ্যন্তরে। এখানে কোন কোলাহল ছিল না, আশেপাশে কেউ জেগে আছে বলেও মনে হলো না তার। সে বারান্দা পেরিয়ে ইমাম সাহেবের দরজায় গিয়ে হাজির হলো। এদিক-ওদিক ভাল ভাবে লক্ষ্য করে কামরায় প্রবেশ করতে যাবে, এমন সময় কারো আলতো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। থমকে দম আটকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল সে। শব্দটি গলি পেরিয়ে মসজিদের মোড়ের কাছে এসে নীরব হয়ে গেল।

    রাশেদ চেঙ্গিস অনেকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। আর কোন শব্দ নেই। সে ভাবল, তবে কি এটা মনের ধোঁকা? নাকি ভুল শুনলাম? সে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আবার এসে গলি মুখে উঁকি দিল। না, আশেপাশে কেউ নেই।

    রাশেদ চেঙ্গিস ভাবলো, হয়তো কোন কুকুরের পদধ্বনি ছিল ওটা। সে তার মনকে শান্ত করে ইমাম সহেবের কামরার দরজায় ধাক্কা দিল। খুলে গেল দরোজা। রাশেদ চেঙ্গিস ভেতরে প্রবেশ করে ইমাম সাহেবকে সব কথা খুলে বলল।

    ‘ক্রুসেড বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য এখানে জড়ো হয়েছে।’ চেঙ্গিস বললো, ‘সবচেয়ে বড় দলটি নিয়ে এসেছে সম্রাট রিনাল্ট। ত্রিপলীর সেনাবাহিনী আগে থেকেই এখানে আছে। অন্যান্য সম্রাটরাও তাদের বাহিনী এসে পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করছে। কায়রোতে এ সংবাদ তাড়াতাড়ি পাঠানো দরকার। সৈন্য অভিযানের আগেই এ বার্তা সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদের সম্বর্ধনার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারবেন।’

    ‘তুমি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে এসেছো। আমি এ খবর কায়রো পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। তুমি আর কিছু বলবে?’

    ‘আমরা যদি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে অভিযানের আগেই কমান্ডো হামলা চালিয়ে এই বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা সব। বিষয়টি আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখবেন। আর যদি এটা সম্ভব না হয় তবে তাদেরকে অভিযানের মাঝ পথে বাঁধা দেয়া যেতে পারে।’

    ‘তোমার কথার অর্থ হচ্ছে, কমান্ডোদের বলতে হবে, তারা যেন শক্রদের রসদপত্র পথেই জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দেয়।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘আমি এ কাজ করাতে পারবো, কিন্তু করাব না। তুমি হয়তো শুনে থাকবে, যে সব অধিকৃত শহরে আমাদের কমাণ্ডো বাহিনী ক্রুসেড বাহিনীর ক্ষতি সাধন করেছে, সেখানে নিরীহ মুসলমানদের বস্তিগুলোর কি অবর্ণনীয় দুর্দশা হয়েছে। সে এলাকার মুসলমানদের জীবন জাহান্নামের মতই কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। ক্রুসেড বাহিনী প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে অনুসন্ধান করেছে। আমাদের পর্দানশীন নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে গেছে ওরা। কিশোর ও যুবকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। বুড়োদেরকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে ওদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করাচ্ছে।’

    আমি বিষয়টি সুলতান আইয়ুবীকে জানিয়েছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘মুসলমান নাগরিকদের জান ও মালের ক্ষতি হতে পারে এমন ভয় থাকলে সেই শহরে কমাণ্ডো অভিযান চালানো যাবে না। শত্রুদের খাদ্যসামগ্রী তাদের বাহিনীর সাথে আসতে থাকুক। সময়মত সেগুলোর ব্যবস্থা আমি করবো।’

    ‘আমি আরো বিস্তারিত রিপোর্ট আপনাকে দু’চার দিনের মধ্যেই দিচ্ছি।’ চেঙ্গিস বললো, ‘আপনি এখন আরও বেশী সাবধান থাকবেন। এখানকার গোয়েন্দা সংস্থা খুব বেশী তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা এখন পশু-পাখীকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।’

    “ঠিক আছে, এ নিয়ে ভেবো না। তুমিও সাবধানে থেকো।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘আগামী কাল ভোরেই আমি কাউকে কায়রো পাঠিয়ে দেবো।’

    রাশেদ চেঙ্গিস মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। এবার সে আর চোরের মত লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই গলি পথ ধরে হাঁটতে লাগল।

    সে যেই রাস্তার মোড় ঘুরলো, তখন আবারও কারো পায়ের চাপা শব্দ শুনতে পেল। সে পিছন ফিরে তাকালো, অন্ধকার গলিপথে কাউকে দেখতে পেল না। তবে এবারের শব্দটা এত স্পষ্ট ছিল যে, এটা আর অমূলক ধারণা রইল না, কেউ তাকে অনুসরণ করছে, এই সন্দেহ দৃঢ় তার বিশ্বাসে পরিণত হলো। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পিছন ফিরে আবার গলিপথে ঢুকে বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলো। কিন্তু না, কাউকেই দেখা গেল না।

    সে আবার ফিরতি পথ ধরলো এবং দ্রুত হেঁটে তার ঠিকানায় পৌঁছে গেল। কামরায় পৌঁছে সে তার কৃত্রিম দাড়ি খুলে পুরাতন কাপড়ের বাণ্ডিলে তা লুকিয়ে রাখলো। তারপর সে তার পোষাক পাল্টাল, যেমন পোষাক সাধারণত খৃস্টানরা পরিধান করে। এখন আর কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারবে না।

    ভিক্টর ও চেঙ্গিস চেষ্টা করছিল, ক্রুসেড বাহিনী কোথায় আক্রমণ চালাবে এবং তাদের অভিযানের ধরণ কি হবে তা জানার জন্য।

    ত্রিপলীতে সেনা সমাবেশ বেড়েই চলছিল। গোয়েন্দাদের আনাগোনা এবং ছুটাছুটিও বেড়ে গিয়েছিল। এই দুই গোয়েন্দা চোখ কান খোলা রেখে প্রত্যেকের গতিবিধি জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

    সম্রাট রিমাণ্ডেরে দায়িত্ব ছিল মেহমানদের আতিথেয়তা করা। কারণ তার রাজধানীতেই এই সমাবেশ হচ্ছে।

    এক রাতে তিনি সমস্ত খৃষ্টান সম্রাট, উচ্চ সামরিক অফিসার ও অন্যান্য শাসকবৃন্দকে নৈশভোজের দাওয়াত দিলেন। এই রাতটি ছিল চেঙ্গিস ও ভিক্টরের জন্য অসম্ভব ব্যস্ততার রাত।

    সম্রাট রিমান্ড মেহমানদেরকে উত্তম আপ্যায়ন ও দামী মদ পরিবেশনের জন্য হুকুম দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যস্ততা বেড়ে গেল। তারা জানতো, এই ব্যস্ততা ও সতর্কতার প্রয়োজন ততক্ষণ, যতক্ষণ মেহমানরা সজ্ঞানে থাকে। মেহমানরা মদের নেশায় বিভোর হয়ে গেলে সেই সতর্কতার আর প্রয়োজন পড়ে না। তখন ভোজসভার কর্মচারীদের জন্য সৃষ্টি হয় সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগে অনেকেই দু’চার পেগ মদ সরিয়ে রাখে। পছন্দের খাবারটা একটু চেখে দেখে। আর কেউ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রাজ-রাজরাদের লীলাখেলা ও অসভ্যতা।

    এই ভোজ সভা ছিল নারী-পুরুষের অবাধ মিলনকেন্দ্র। তার মধ্যে যুবতী মেয়েরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল যুবতী সাজা বৃদ্ধারাও।

    ভিক্টর ও চেঙ্গিস উভয়েই খাবার ও মদ পরিবেশনের তদারকিতে খুবই ব্যস্ত ছিল। এক যুবতী রাশেদ চেঙ্গিসের কাছ থেকে দু’তিন বার মদ চেয়ে নিল। চেঙ্গিস প্রত্যেকবারই কোন বয়কে ডেকে মদ দিতে বললো।

    মেহমানরা অনেকেই সম্রাট রিমাণ্ডকে ঘিরে বসে বসে গল্প গুজব করছিল। কেউ বসেছিল হলরুমের ভেতর, কেউ বারান্দার খোলামেলা পরিবেশে ছোট ছোট টেবিলে জুটি বেঁধে আলাপ করছিল। কেউ আবার নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়ার আশায় বাগানে নেমে পড়েছিল।

    যে যুবতী বার বার চেঙ্গিসের কাছে মদ চাচ্ছিল, আবারও সে হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী চেঙ্গিস তার কাছে যেতেই সে বলল, ‘আমি যতবার তোমার কাছে মদ চেয়েছি ততবারই তুমি বয়-বেয়ারা দিয়ে ত পাঠিয়ে দিয়েছে। এক যুবতীকে খুশী করার জন্য তুমি কি নিজের হাতে একবার পরিবেশন ধ্বতে পারো না?”

    ‘জী, কেন নয়। চেঙ্গিস বিনয়ের হাসি হেসে বলল, ’আমি এখুনি এনে দিচ্ছি।’

    ‘উহু, এখানে নয়।’ মেয়েটি মুচকি হেসে বললো, ’আমি বাগানে যাচ্ছি, ওখানে নিয়ে এসো।’

    চেঙ্গিস মদের একটি সুন্দর সুরাহী ও পিয়ালা নিয়ে বাগান চলে গেল। মেয়েটা আগেই ওখানে গিয়ে বসেছিল। রাতে প্রাসাদের আঙ্গিনায় চমৎকার সাজানো গুছানো বাগান সেখানেও মেহমানরা জোড়ায় জোড়ায় বসে গল্প করছি সেই সাথে চলছিল সমানে পানাহার।

    কিন্তু এই মেয়েটি বাগানের এক টেবিলে একাকীই বসেছি এতে চেঙ্গিস একটু বিষ্মিত হলো। কারণ এখানে কেউ একা নেই, সবাই ব্যস্ত আপন আপন সঙ্গীর সাথে। এতসব জুটির মাঝে তাকে বড় বেমানান লাগছিল।

    এমন সুন্দরী ও যুবতী মেয়ের তো একা থাকার কথা নয়। ভাবল চেঙ্গিস, তার চারপাশে তো এতক্ষণে ভ্রমরের ভিড় লেগে যাওয়ার কথা! সে মেয়েটির পিয়ালায় মদ ঢালতে ঢালতে বললো, ‘আপনার আর কিছু লাগবে?’

    ‚না, ধন্যবাদ।’ মেয়েটি সৌজন্য প্রকাশ করে বলল, ‘আমার আর যা লাগবে তা তুমি দিতে রাজি হবে কিনা তাই ভাবছি।’

    আরো অবাক হলো চেঙ্গিস। জিজ্ঞেস করলো, ‘বলুন, কি লাগবে আপনার?’

    ‘দেখতেই পাচ্ছো আমি একা। তোমার সাথে একটু কথা বললে অসুবিধা আছে?’

    বিনয়ের সাথে বললো চেঙ্গিস, ‘না, না। বলুন কি জানতে চান?’

    ‘তোমার দেশ কোথায়?’

    সে ইউরোপের একটি অঞ্চলের নাম বললো।

    ‘এখানে কতদিন আছো?’

    ‘বলতে পারেন শিশুকাল থেকেই। আমার বাবা ছিলেন সম্রাট রিমাণ্ডের রাজ পরিবারের কর্মচারী। এখন আমি তার সামান্য গোলাম।’

    ‘বাহ! তাহলে তো দেখছি, তুমি রাজ পরিবারেরই একজন। অন্তত এ রাজ পরিবারের যত কাহিনী তোমার জানা আছে, অনেকেরই তা নেই।’

    ‘হ্যাঁ, বলতে পারেন এ আমার পরম সৌভাগ্য।’ বিনয়ের সাথে বলল চেঙ্গিস।

    ‘তোমার এ সৌভাগ্যে সামান্য ভাগ বসানোর লোভ হচ্ছে। আমি কি তোমার কাজের ক্ষতি করছি?”

    ‘না, না। আপনাদের সেবা করাই তো আমার কাজ! বলুন, কি বলবেন।’

    ‘তাহলে তুমি আরো কিছুক্ষণ আমাকে সঙ্গ দাও।’ মেয়েটি তার পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘নাও, তুমিও সামান্য পান করে নাও।’

    ‘না, না। একি বলছেন আপনি! আমি আপনার সামান্য গোলাম মাত্র!’ তার কণ্ঠ থেকে অকৃত্রিম বিস্ময় ও বিনয় ঝরে পড়ল, ‘আপনি আমার মুনীবের মেহমান! একি করে সম্ভব!’

    ‘রাখো তো ওসব কথা! এখানে তোমার সংকোচের কিছু নেই। আমি নিজেই তো তোমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’ মেয়েটির কণ্ঠে অন্তরঙ্গতা। সে পাত্রটি বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এই মুহূর্তে কিছুক্ষণের জন্য না হয় তুমি সম্রাট হয়ে যাও, আর আমাকে তোমার দাসী মনে করো।’ মেয়েটি তার হাত ধরে তৃষ্ণার্ত হাসি হেসে বলল, ‘আমার চোখে তুমি এখন পরদেশী এক শাহজাদা! আর আমি এখানকার শাহজাদী! কই, নাও! ধরো তো এটা! আমার মেহমানকে আমি কিছু খেতে দেবো না!’

    চেঙ্গিস বিব্ৰত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, ‘আপনি এখানে একা কেন? আপনার সঙ্গী কোথায়?’

    ‘আমার সঙ্গী আমার পাশেই আছে।’ মেয়েটি রহস্যময় কণ্ঠে বলল, ‘আমার মন যারে চায় তাকেই তো সঙ্গী করা উচিত, কি বলো? যাদের আমি ঘৃণা করি তাদের সাথে কেমন করে হেসে খেলে বেড়াই।’ মেয়েটি উত্তর দিল। ‘আমার যাকে ভাল লাগছে, আমি তাকেই পাশে ডেকে নিয়েছি। তুমি তো আমার হাত থেকে পিয়ালা গ্রহণ করলে না?’

    ‘যদি কেউ দেখতে পায়, তবে আমাকে শুলে চড়াবে।’ চেঙ্গিস ভয়ার্ত ধরে বললো।

    ‘কিন্তু যদি তুমি আমার নিবেদন প্রত্যাখ্যান করো, তবে আমিই তোমাকে শুলে চড়াবো।’ মেয়েটি হেসে বললো, ‘পাগল! তোমাকে আমার ভাল লেগেছে বলেই না তোমাকে এখানে ডেকে এনেছি।’

    মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো এবং তার কাঁধে হাত রেখে কানে কানে বললো, ‘তুমি আমাকে নিরাশ করো না যুবক।’ তখনও তার ঠোঁটের কোণে লেগেছিল ভূবন মোহিনী হাসি।

    “কিন্তু আমি তো এখন মদ পান করতে পারবো না। এখন যে আমি ডিউটিতে আছি!’ চেঙ্গিস আড়ষ্ট কণ্ঠে বললো।

    ‘আচ্ছা, নাই বা করলে মদ পান।’ মেয়েটি তার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো, ‘কিন্তু আমি যখন ও যেখানেই ডাকি, সেখানে তোমাকে হাজির হতে হবে।’

    রাশেদ চেঙ্গিস এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে ধারণা করলো, এই মেয়ে কোন বৃদ্ধ জেনারেলের স্ত্রী হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, তার স্বামী অন্য কোন নারী নিয়ে মেতে আছে। তারই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এ মেয়ে তাকে বাছাই করেছে।

    সে ছিল এক বিচক্ষণ গোয়েন্দা। তাই মেয়েটির আচরণে সে সামান্য বিচলিতও হলো না। এমন সুন্দরী ও অভিজাত যুবতী তার বন্ধুত্বের আকাংখা করেছে, এটা তার কাছে কোন নতুন ঘটনা নয়। চেঙ্গিস এতটাই সুদর্শন ও আর্ষণীয় দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী যে, এর আগেও তাঁকে এমন ব্রিতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।

    খৃস্টান সম্রাট ও অফিসারদের মাহফিলগুলো সুন্দরী ও আকর্ষণীয় মেয়েরাই সরগরম করে রাখে। এর আগেও একাধিক মেয়ে চেঙ্গিসের সাথে সম্পর্ক করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু চেঙ্গিস তার কর্তব্যের খাতিরে তাদের এড়িয়ে গেছে। সুলতান আইয়ুবী তাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, সে দায়িত্ব পালনে কোন ক্রটি ঘটতে পারে এমন কোন কিছুর সাথে সে নিজেকে জড়াতে চায় না।

    আলী বিন সুফিয়ান তাকে ট্রেনিং দেয়ার সময় তার মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এই চিন্তা, নিজের কর্তব্যকেই সব সময় প্রাধান্য দেবে। কখনো এমন কিছুর সাথে নিজেকে জড়াবে না, যাতে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। মেয়ে মানুষের কাছ থেকে সাবধান থাকবে। কখনো আপন বিবি ছাড়া অন্য কারো দিকে নজর দেবে না। মনে রাখবে, দুশমন তোমাদের ঘায়েল করার জন্য যেটি সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করবে তার নাম মেয়ে। যারা অন্য নারীর প্রেমে পড়ে যায় বা নেশা ও বিলাসিতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে; আপন দায়িত্ববোধের কথা তাদের স্মরণ থাকে না। তারা ধীরে ধীরে দায়িত্বহীন হয়ে যায়। তার মন-মগজে মদ ও নারীর মোহ এমন বিষের ন্যায় কাজ করে যে, সে ধীরে ধীরে তার ঈমানও হারিয়ে ফেলে। অতএব নেশা ও নারী থেকে সব সময় দূরে থাকবে।’

    সম্রাট রিমাণ্ডের রাজপ্রাসাদে এসে সে দেখেছে, রাজার খেয়াল কাকে বলে। এখানে সম্রাট যখন যাকে ইচ্ছা চাকরী প্রদান করে এবং যাকে ইচ্ছা চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। রাজার ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব যাদুর মত। এখানে এমন কেউ নেই, যে তাকে প্রশ্ন করতে পারে।

    এখানে এসে সে আর যে জিনিসটি দেখে অবাক হয়েছে, তাহলো খৃস্টানদের চরিত্র। এদের কাছে চরিত্র বলে কিছু নেই। নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনাকে তারা গর্বের বিষয় বলে মনে করে। তাই এখানকার মেয়েরা এমন খোলামেলা প্রেম নিবেদন করলেও সে আর অবাক হয় না।

    একজন গোয়েন্দা হিসাবে সে তখন চিন্তা করছিল, মেয়েটির কাছ থেকে তার কিছু পাওয়ার আছে কিনা। সে চিন্তা করে দেখল, এই মেয়েকে ব্যবহার করে সে এমন কিছু তথ্য পেতে পারে, যা অন্যভাবে পাওয়ার উপায় নেই। মেয়েটি যখন তাকে বলছিল, আমি যখন ও যেখানেই ডাকি সেখানে তোমাকে হাজির হতে হবে’ তার এ বক্তব্যে ধমক বা আদেশের সুর ছিল না বরং ছিল আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের আবেদন। চেঙ্গিস এটা ভাল করে বুঝেছিল বলেই সেও মেয়েটির হাসির উত্তরে হাসি মুখেই সে প্রস্তাব কবুল করে নিয়েছিল। হাসির বিনিময়ে হাসি দিয়েই সে তার শিকারকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করেছিল।

    ‘এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন।’ চেঙ্গিস বললো, ‘আপনি বরং মেহমানদের কাছে চলে যান।’

    ‘অনুমতি দেবো, তার আগে বলো, তুমি ঠিক ঠিক আসবে তো?’

    ‘আসবো। সময় পেলেই আমি আপনার ডাকে সাড়া দেবো, কথা দিলাম।’ চেঙ্গিস বললো, ‘কিন্তু আমি তো আপনার ঠিকানা জানি না। আপনি কার স্ত্রী?’

    ‘স্ত্রী নই, আশ্রিতা!’ মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক সেনা অফিসারের নাম উল্লেখ করে বললো, ‘হতভাগার কাছে অঢেল , ধন-সম্পদ আছে। আর এই সম্পদের জোরে যে, আমার মত মেয়েদের কিনে নিয়ে তার হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। আমি একা নই, আরো বেশ কিছু মেয়ে আছে তার, যাদের সাথে সে দাসী-বাদীর মত ব্যবহার করে। কিন্তু কে যে তার মনের মানুষ তা আমরা কেউ জানি না।’

    ‘এত লোভ না করে ওখান থেকে চলে এলেই পারেন!’

    ‘না, তা আমরা পারি না। সে আমাকে মুক্তি দিতে নারাজ। বলে, তোমার কোন সাধ-আহলাদ আমি অপূর্ণ রাখবো না। তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? সেই গর্দভ সম্পদের দম্ভটুকুই চেনে, নারীর মন চেনার সময় কোথায় তার!

    যখন বুঝেছি এ লোকের হৃদয়ে দয়া, মায়া, প্রেম বলতে কিছু নেই তখন থেকেই তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সেই ঘৃণা এখন আমার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আছে। এই চাপ সহ্য করা আমার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্ত যখন তোমাকে দেখলাম, কেন জানি না, তোমাকে আমার ভাল লেগে গেল। বিশ্বাস করো, তুমি আমার কাছে প্রথম পুরুষ, যাকে আমি অন্তর দিয়ে বেছে নিয়েছি। আমি তোমার কাছ থেকে শারিরীক বা দৈহিক কোন তৃপ্তির পিয়া নই। পিপাসা আমার অন্তরের, পিপাসা আমার ভালবাসার। তোমাকে দেখে চোখের পানিতে আমি সে পিপাসা নিবাবণ করতে পারবো। দোহাই লাগে, তুমি আমার দৃষ্টির আড়ালে যেও না। আমাকে পাষাণপুরীতে ফেলে রেখে দূরে কোথাও পালিয়ে যেও না। যদি এমন করো তবে আমার ওপর জুলুম করা হবে। আমি সব সইতে পারবো, কিন্তু এ অত্যাচার সইতে পারবো না। এখন যাও, তোমার অনেক সময় আমি নিয়ে ফেলেছি, আর নয়। কাল রাতে আমি নিজেই তোমাকে খুঁজে নেবো, কষ্ট করে তোমাকে আমার কাছে যেতে হবে না।’

    যে সময় রাশেদ চেঙ্গিস বাগানে মেয়েটির সাথে কথা বলছি, ভিক্টর তখন মেহমানদের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। সে মেহমানদের আপ্যায়ন করছিল ঠিকই কিন্তু তার কান পড়েছিল ক্রুসেড লিডারদের আলোচনায়। তারা আলোচনা করছিল, কোন দিকে অভিযান চালালে সুবিধা হবে। কোথায় আক্রমণ করলে আইয়ুবী সহজে ধরাশায়ী হবে, এইসব।

    এসব আলোচনা থেকে সে তার প্রয়োজনীয় কথা মনে মনে টুকে নিচ্ছিল। কিন্তু তখনও আলোচনা ও পরামর্শ চলছে। সেদিকে কান পেতে দ্রুত হাতে কাজ করছে ভিক্টর।

    রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটির কাছ থেকে ছুটি পেয়ে মেহমানদের মধ্যে এসে পড়লো। ঘুরতে ঘুরতে সে সম্রাট রিনাল্টের পাশে চলে এলো। রিনাল্ট তখন তার সাথীদের বলছে, তোমরা কোন চিন্তা করো না। এবার আমি এত বেশী সামরিক শক্তি নিয়ে এসেছি, আমার তো মনে হয়, আমি একাই আইয়ুবীকে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারবো। ভাবতে পারো, আমার সাথে আছে আড়াইশো নাইট। যাদের প্রত্যেকের আণ্ডারে আছে আলাদা বাহিনী। এক নাইটকে পরাজিত করলে আরেক নাইট এগিয়ে যাবে তার বাহিনী নিয়ে। আইয়ুবী একা কয়টা বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে পারবে?’

    এভাবে রিনাল্ট শক্তির বড়াই করছিল আর বড় ধরনের সফলতা ছিনিয়ে এনে দেবে বলে দাবী করছিল সঙ্গীদের কাছে।