Tag: অসম্পন্ন গ্রন্থ

  • জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    [book]

    মূল: ডা. জাকির নায়িক

    অনুবাদ: তাহের আলমাহদী

    ভূমিকা

    ‘জাকির আবদুল করিম নায়িক’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামী চিন্তাবিদ, ধর্মপ্রচারক, বক্তা ও লেখক; তিনি ‘ডাক্তার জাকির নায়িক’ নামেই সমধিক বিখ্যাত। তিনি ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করেন, তিনি তাঁর কাজের সুবিধার্থে ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিভিন্ন ভাষায় ‘পিস টিভি নেটওয়ার্ক’ পরিচালিত হয়ে থাকে।

    জাকির আবদুল করিম নায়েক ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটার্স হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি কিশিনচাঁদ চেল্লারাম কলেজে ভর্তি হন। তিনি মেডিসিনের ওপর টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড নাইর হসপিটালে ভর্তি হন। অতঃপর, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ মুম্বাই থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন সার্জারি বা এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

    ১৯৮৭ সালে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক ‘আহমদ দিদাতে’র সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন, তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯১ সালে তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং আইআরএফ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্ত্রী ফারহাত নায়েক, ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের (IRF) নারী শাখায় কাজ করেন। এই কারণে তাঁকে ‘আহমদ প্লাস’ বলা হয়ে থাকে।

    এছাড়াও তিনি মুম্বাইয়ের ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং ইউনাইটেড ইসলামিক এইডের প্রতিষ্ঠাতা, যা দরিদ্র ও অসহায় মুসলিম তরুণ-তরুণীদের বৃত্তি প্রদান করে থাকে।

    ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনে’র ওয়েবসাইটে তাকে “পিস টিভি নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষক ও আদর্শিক চালিকাশক্তি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই চ্যানেলটি ‘সমগ্র মানবতার জন্য সত্য, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, সৌহার্দ্য ও জ্ঞানের’ প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে বলে এর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ২০১৬ সালে, একটি প্রেস কনফারেন্সে, জাকির নিজেকে নন-রেজিস্ট্যান্ট ইন্ডিয়ান (এনআরআই) বা বছরের অর্ধেকের বেশি সময় প্রবাসে বসবাসকারী ভারতীয় হিসেবে দাবি করেন।

    নায়েক বর্তমানে মালেশিয়ায় স্থায়ী নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।

    ‘পিস টিভি’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁর বক্তৃতা প্রায় দশ কোটি দর্শকের নিকট পৌঁছে যায়। তাকে ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ’, ‘অনুমেয়ভাবে ভারতের সালাফি মতাদর্শের অনুসারী সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি’, ‘টেলিভিশনভিত্তিক-ধর্মপ্রচারণার রকস্টার এবং আধুনিক ইসলামের একজন পৃষ্ঠপোষক’ এবং ‘পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ইসলাম ধর্মপ্রচারক’ বলা হয়ে থাকে। বহু ইসলামি ধর্মপ্রচারকদের সাথে তার ভিন্নতা হল, তার বক্তৃতাগুলো পারস্পারিক আলাপচারিতা ও প্রশ্নোত্তরভিত্তিক, যা তিনি আরবি কিংবা উর্দুতে নয় বরং ইংরেজি ভাষায় প্রদান করেন, এবং অধিকাংশ সময়েই তিনি ঐতিহ্যগত আলখাল্লার পরিবর্তে স্যুট-টাই পরিধান করে থাকেন।

    পেশাগত জীবনে তিনি একজন চিকিৎসক হলেও ১৯৯১ সাল থেকে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। ইসলাম এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর তার বক্তৃতাসমূহ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

    তিনি প্রকাশ্যে ইসলামে শ্রেণীবিভাজনকে অস্বীকার করে থাকেন, তবুও অনেকে তাকে সালাফি মতাদর্শের সমর্থক বলে মনে করেন এবং অনেকে তাঁকে ‘ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারকারী’ একজন ‘আমূল-সংস্কারবাদী’ ইসলামিক ‘টেলিভেগানিস্ট’ বা ‘তহবিল সংগ্রহকারী টেলিভিশন ধর্মপ্রচারক’ বলে সমালোচনা করে থাকেন। বর্তমানে ভারত, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তাঁর ধর্মপ্রচার নিষিদ্ধ। বলা হয়ে থাকে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরের তুলনায় এর ভেতরেই তাঁর সমালোচকের সংখ্যা বেশি।

    ‘ডা. জাকির নায়িক’ শাইখ মোহাম্মাদ রাশিদ আল মাখতুম এ্যাওয়ার্ড ফর ওয়ার্ল্ড পিস কর্তৃক  ‘ইসলামিক পারসোনালিটি অব ২০১৩’, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান টুয়ানকু আব্দুল হালিম মুয়াদজাম শাহ ‘ডিস্টিংগুইশড ইন্টারন্যাশনাল পারসোনালিটি এওয়ার্ড’, শারজাহ শাসক সুলতান বিন মোহাম্মেদ আল কাশিমি কর্তৃক ‘শারজাহ এওয়ার্ড ফর ভলান্টারি ওয়ার্ক, ২০১৪’, গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া জাম্মেহ কর্তৃক ‘ইন্সাইনিয়া অব দ্য কমান্ডার অব দ্য ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক অব দ্য গাম্বিয়া’, গাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘অনারারি ডক্টরেট (ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস)’, রাজকীয় সাউদী আরব কর্তৃক ‘বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ লাভ করেন।

    মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও জাকির নায়েক তার বক্তব্য ও মতের জন্য বিভিন্ন স্থানে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

    ২০১৬ সালে ‘হুসনি টাইগার’ নামক স্বঘোষিত শিয়া দল কর্তৃক জাকির নায়েকের মাথার বিনিময়ে ১৫ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। একই সালের ১৩ জুলাই, ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেত্রী’ ‘সাধ্বী প্রাচী’ জাকির নায়েকের শিরশ্ছেদকারীকে ৫০ লক্ষ রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেন।

    জাকির নায়েকের বিভিন্ন সময়ের প্রদত্ত বক্তৃতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আমন্ত্রিত ও অনামন্ত্রিত শ্রোতৃগণ অংশগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা পরবর্তীতে মূল ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। জাকির নায়িকের প্রকাশিত বক্তৃতামালা বাংলায় অনূদিত হয়েছে, এর মধ্যে বাছাই করা গ্রন্থগুলোর সমন্বয়ে ‘জাকির নায়িক বক্তৃতামালা’ বা ‘জাকির নায়িক লেকচার সমগ্র’ বা ‘জাকির নায়িক উপদেশ সমগ্র’ নামে গ্রন্থ সঙ্কলিত হয়েছে।

  • আল-কুরআনের শিক্ষা

    আল-কুরআনের শিক্ষা

    আল-কুরআ’নের শিক্ষা, উর্দু ভাষায় লিখিত তাফহীমুস্‌ সুন্নাহ সিরিজের ২২তম সংখ্যা। মূল লেখক মুহাম্মদ ইকবাল কীলানী, বাংলায় অনুবাদ করেছেন আবুদুল্লাহিল হাদী মুহাম্মদ ইউসুফ। গ্রন্থটির প্রকাশ করেছে ‘মাকতাবা বাইতুস্‌সালাম’, রিয়াদ সাউদী আরব।

    আল-কুরআনের শিক্ষা : বিষয় সূচী।

  • বিদ্যাসাগর

    বিদ্যাসাগর

    বিদ্যাসাগর

    সমালোচনা-সংবলিত

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী।

    “শকুন্তলা-রহ, “ইংরেজের জর,” “তিতুমীর,
    “গান, “মহাৱাণ স্বর্ণী,” “বঙ্গে বর্গী” ও
    “ভরতপুরের যুদ্ধ গ্রন্থ-প্রণেতা

    বিহারিলাল সরকার

    প্রণীত।

    চতুর্থ সংস্করণ।

    কলিকাতা, ১২ নং হরীতকী বাগান লেন, শান্ত-প্রকাশ কার্যালয় হইতে শ্রীহরিপদ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।

    ১৩২৯ সাল।

    কলিকাতা, ৩০ নং হরীতকী বাগান লেন, “পশুপতি যন্ত্রে” শ্রীরাজকুমার রায় কর্তৃক মুদ্রিত।

    উৎসর্গ-পত্র

    যাঁহার সহায়তায় পবিত্র সাহিত্য-মন্দিরের এক প্রান্তে
    প্রবেশ করিবার প্রকৃত পথ পাইয়াছিলাম,
    সেই শ্রদ্ধাস্পদ সহৃদয় সুহৃদ-সহায়
    শ্রীযুক্ত কেদারনাথ মিত্রকে
    এবং
    যাঁহার সহৃদয়তায় কেদারনাথকে সুহৃদস্বরূপে পাইয়াছিলাম,
    সেই প্রিয়তম মিত্র শ্রীযুক্ত নৃত্যগোপাল বসুকে
    দীনের এ সামান্য সাহিত্য-সম্বল
    বিদ্যাসাগর” উৎসৃষ্ট
    হইল।

  • চোখের চাতক

    চোখের চাতক

    চোখের চাতক

    ‘চোখের চাতক’ প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মুতাবিক ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে। প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রীসতীশচন্দ্র রায়, সুধা প্রেস, ১৯৮/১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+৭৮; মূল্য এক টাকা, রাজ-সংস্করণ ১৷৹ (পাঁচ সিকা)। এতে ৫৩টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু ‘সূচী’তে আছে ৫১টি গান। গ্রন্থটির উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল—

    কল্যাণীয়া বাণী-কণ্ঠী

    শ্রীমতী প্রতিভা সোম

    জয়যুক্তাসু।

    ‘আমার কোন্ কূলে আজ ভিড়ল তরী’ ১৩৩৬ আশ্বিনের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘কে তুমি দূরের সাথী’ ১৩৩৬ শ্রাবণের ‘কল্লোলে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘আমার সাম্পান যাত্রী না লয়’ এবং ‘তোমায় কূলে তুলে বন্ধু’ ১৩৪৩ ফাল্গুণের ‘বুলবুলে’ ‘চট্টল-গীতিকা’ শিরোনামে উদ্ধৃত হয়।

    ‘ওরে মাঝি ভাই’ ১৩৩৫ ফাল্গুনের ‘আঁধার রাতে কে গো একেলা’ ১৩৩৬ আষাঢ়ের এবং ‘জনম জনম গেল আশা-পথ চাহি’ ১৩৩৬ অগ্রহায়ণের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘ওরে মাঝি ভাই’ রচনার স্থান ও তারিখ— ‘চট্টগ্রাম, জানুয়ারি ১৯২৯।’

    ‘পেয়ে কেন নাহি পাই হৃদয়ে মম’ ১৩৩৫ সালে ঢাকার ‘জাগরণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ‘জাগরণ’ হতে ১৩৩৬ অগ্রহায়ণের ‘সঞ্চয়ে’ উদ্ধৃত হয়।

    ‘না মিটিতে সাধ মোর নিশি পোহায়’ ১৩৩৬ কার্তিকের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘পর-জনমে দেখা হবে প্রিয়’ ১৩৩৭ অগ্রহায়ণের ‘উত্তরা’য় প্রকাশিত হয়।

    ‘কে ডাকিলে আমারে আঁখি তুলে’ ১৩৩৬ পৌষের এবং ‘কার বাঁশী বাজে মুলতান-সুরে’ ১৩৩৬ মাঘের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

  • সুকুমার সাহিত্য সমগ্র

    সুকুমার সাহিত্য সমগ্র

    সুকুমার সাহিত্য সমগ্র

    উপেন্দ্রকিশোর রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমারের জন্ম ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দে। ১৯০৬-এ পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন দুই বিষয়েই অনার্স নিয়ে বি. এস্‌সি পাশ করার পর ১৯১১-য় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি লাভ করে মুদ্রণ বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি বিলেতে যান। লণ্ডনে ও ম্যাঞ্চস্টারে অধ্যয়ন করেন তিনি ও তাঁর গবেষণার জন্য সম্মানিত হন। ১৯১৩-য় উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনায় ছোটদের সচিত্র মাসিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’ প্রকাশিত হয়। সুকুমার দেশে ফেরার কিছু কাল পরে ১৯১৫-য় উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। সুকুমার ইউ রায় অ্যাণ্ড সন্‌স কার্যালয়ের পরিচালনার এবং ‘সন্দেশ’ সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘সন্দেশ’-এর পাতাতেই তাঁর অধিকাংশ ছোটদের লেখা—গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ধাঁধা ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। শুধু নিজের লেখা নয়, ‘সন্দেশ’-এর অন্যান্য লেখকদের রচনার জন্যও অজস্র ছবি এঁকেছেন তিনি। ‘হ য ব র ল’, ‘আবোল তাবোল’, জাতীয় আজগুবি চালের বেঠিক বেতাল ভুলের ভবের গদ্য ও পদ্য রচনা ছাড়াও শিল্প সাহিত্য ভাষা ধর্ম বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিষয়ক গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সক্রিয় ছিল তাঁর লেখনী।

    আড়াই বছর কালাজ্বরে ভূগে ১৯২৩-এ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে সুকুমার রায় ১০০ গড়পার রোডের বাড়িতে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর কিছু দিন আগেও তিনি শুয়ে শুয়ে সন্দেশের জন্য ছবি এঁকেছেন, প্রচ্ছদ রচনা করেছেন, গল্প কবিতা লিখেছেন। ‘আবোল তাবোল’-এর ডামি কপিটিও রোগশয্যায় তৈরি করেছেন। কিন্তু বইটি ছেপে বেরোবার ন’ দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়।

  • মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন সৃষ্ট একটি কাহিনী-চরিত্র। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ধ্বংস পাহাড় প্রচ্ছদনামের প্রথম গ্রন্থটি থেকে শুরু করে সেবা প্রকাশনী থেকে মাসুদ রানা সিরিজে এই চরিত্রকে নিয়ে চার শতাধিক গুপ্তচরবৃত্তীয় কাহিনীর বই প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজের প্রথম দুইটি বই মৌলিক হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার বইয়ের ভাবানুবাদ বা ছায়া অবলম্বনে রচিত হওয়া বইয়ের আধিক্য দেখা যায়। তবে আরও কিছু মৌলিক বই বের হয়েছিল। মাসুদ রানার চরিত্রটিকে মূলত ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সৃষ্ট জেমস বন্ড চরিত্রটির বাঙালি সংস্করণ হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন লেখক। কিন্তু বর্তমানে সিরিজটি বাংলা বই এর জগতে স্বকীয় একটি স্থান ধরে রেখে পথ চলছে।

    চরিত্র পরিচয়

    “বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। বিচিত্র তার জীবন। অদ্ভুত রহস্যময় তার গতিবিধি। কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর সুন্দর এক অন্তর। পদে পদে তার বিপদ-শিহরন-ভয় আর মৃত্যুর হাতছানি।”

    আকর্ষণীয় বিষয়াবলী

    1. মাসুদ রানার প্রকাশিত ৪০০টি বইয়ের কোনটিতেই তার মায়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
    2. রানাকে নিয়ে বিস্মরণ বইটির কাহিনী অবলম্বনে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাসুদ রানা তৈরি হয় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে। ছবির পরিচালক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)।
    3. বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটক প্রাচীর পেরিয়ে তৈরি হয় মাসুদ রানার কাহিনী পিশাচ দ্বীপ অবলম্বনে, যার চিত্রনাট্য লেখেন আতিকুল হক চৌধুরী। মাসুদ রানা এবং সোহানা চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে নোবেল এবং বিপাশা হায়াত।
    4. মাসুদ রানার ধ্বংস পাহাড় বইটির উর্দু সংস্করণ বের হয়, যার নাম ছিলো মউত কা টিলা।
    5. মাসুদ রানা সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর, এবং কাল্পনিক সংস্থা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর সদস্য, এবং তার সাংকেতিক নাম MR-9। এছাড়া রানা এজেন্সি নামক একটি গোয়েন্দা সংস্থাও রানা পরিচালনা করে থাকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে তথা ১৯৭১-এর আগের বইগুলোতে সংস্থাটির উল্লেখ থাকতো পি.সি.আই বা “পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স” হিসেবে।

    সহায়ক চরিত্রসমূহ

    মাসুদ রানার সহায়ক চরিত্রে প্রথমেই মেজর জেনারেল রাহাত খানের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (বিসিআই) এর প্রধান। তারই তত্বাবধানে রানা নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া তার কাজে সহায়তা করে থাকে সোহেল, সলিল, সোহানা, রূপা, গিলটি মিয়া প্রমুখ চরিত্রও। সাগর-সঙ্গম বইটি লিখতে গিয়ে কোনো এক বই থেকে কাছাকাছি একটা চরিত্র পেয়ে সেটাকেই কাহিনীর উপযোগী করে বসাতে গিয়ে লেখক নিজের অজান্তেই তৈরি করে ফেলেছেন গিলটি মিয়া চরিত্রটিকে। চরিত্রটির বাচনভঙ্গি তিনি তার মায়ের থেকে পেয়েছেন, যিনি হুগলির মানুষ হলেও কলকাতা শহরে বড় হয়েছিলেন। তারই মুখের ভাষা একটু অদলবদল করে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন গিলটি মিয়ার মুখে। সিরিজের ‘সোহেল’ চরিত্রটি খানিকটা জেমস বন্ডের বন্ধু ফিলিক্স লেইটারের আদলে গড়া। ‘সোহানা’ হলো লেখকের কল্পনার বাঙালি মেয়ে।

    এছাড়া মাসুদ রানার চিরশত্রুদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য হলো বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরী, উ সেন প্রমুখ। ‘কবীর চৌধুরী’ এসেছে সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা সিরিজের চরিত্র থেকে।

    চরিত্রের ছায়া

    1. মেজর জেনারেল রাহাত খান: প্রখ্যাত সাংবাদিক রাহাত খানকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
    2. মাসুদ রানা: নাম দেওয়া হলো লেখকের বন্ধু গীতিকার মাসুদ করিম ও মেবারের রাজা রানা প্রতাপ সিংহের নাম মিলিয়ে।

    আলোচিত শত্রু

    কবীর চৌধুরী: মাসুদ রানা সিরিজের ‘ধ্বংসপাহাড়’ বই প্রথম কবীর চৌধুরীর আবির্ভাব দেখা যায়। কবীর চৌধুরী খলচরিত্র হিসেবে বেশ প্রভাবশালী। বিজ্ঞান আর মানবতা নিয়ে তার ভাবনার কথা জানা যায়। গবেষনামুখী চরিত্র কবীর চৌধুরী। সুলতা রায়ের সঙ্গে রানার বিয়ে না হাওয়া, অনীতা গিলবার্ট আর সোহানা চৌধুরীকে রানা কাছ থেকে সরিয়ে দেন কবীর চৌধুরী। বইসমূহ: ধ্বংসপাহাড়, রানা! সাবধান!!, নীল আতংক : ১, ২, শয়তানের দূত, ব্ল্যাক স্পাইডার : ১, ২, পাগল বৈজ্ঞানিক, পালাবে কোথায় : ১, ২, প্রেতাত্মা : ১, ২, জিম্মি, নকল রানা : ১, ২, স্পর্ধা : ১, ২, মরণকামড় : ১, ২, আবার সেই দুঃস্বপ্ন : ১, ২, সেই পাগল বৈজ্ঞানিক, ভাইরাস x-99, মুক্তিপণ, চীনে সংকট, অশুভ প্রহর, কনকতরী, মহাবিপদ সংকেত, অন্ধকারের বন্ধু, শয়তানের দ্বীপ।

    কাহিনী সংগ্রহ

    মাসুদ রানার অধিকাংশ কাহিনীই বিভিন্ন বিদেশী লেখকের বই থেকে ধার করা। এলিস্ট্যার ম্যাকলীন (Alistair MacLean), রবার্ট লুডলাম (Robert Ludlum), জেমস হেডলি চেজ (James Headley Chase), উইলবার স্মিথ (Wilber Smith), ক্লাইভ কাসলার (clive cussler), ফ্রেডরিক ফরসাইথ(frederick forsyth)-সহ বহু বিদেশী, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যিকের লেখা কাহিনী থেকে ধার করে মাসুদ রানার কাহিনী লেখা হয়।

    কখনও কোনো বই বিদেশী কোনো একক বই থেকেই অনুবাদ করা হয়, আবার কখনও একাধিক বই মিলিয়ে লেখা হয়। যেমন: সিরিজের তৃতীয় বই স্বর্ণমৃগ লেখা হয়েছিলো ইয়ান ফ্লেমিঙের ৩টি কাহিনীর সহায়তা নিয়ে -লিভ অ্যান্ড লেট ডাই, গোল্ড ফিঙ্গার ও অন হার ম্যাজেস্টি’য সিক্রেট সার্ভিস। একাধিক বই থেকে লেখার ক্ষেত্রে প্রথমে যেখানে যেমনটা দরকার একটা কাঠামো তৈরি করে নিয়ে মাসুদ রানার উপযোগী অংশটুকু বইগুলো থেকে নেয়া হয়। তবে একক বই থেকে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে এমন অনেক কাহিনীও পাওয়া যায় যেগুলো সাধারণত তেমন একটা পরিবর্তনের দরকার হয় না।

    ইতিহাস

    ১৯৬০ – এর দশকে কাজী আনোয়ার হোসেনের কুয়াশা সিরিজ চলছিলো সেবা প্রকাশনী থেকে। তখন জনৈক মাহবুব আমিনের সমালোচনায় তিনি থ্রিলার সিরিজ সম্বন্ধে বৈশ্বিক একটা ধারণা লাভ করেন। মাহবুব আমিনই আনোয়ার হোসেনকে ডক্টর নো বইটি উপহার দিলে আনোয়ার হোসেন নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ পান এবং মাহবুব আমিনের প্রেরণায় ছাপতে শুরু করেন মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই ধ্বংস-পাহাড়। সেই বইটি লেখা হয়েছিলো লেখকের সেগুনবাগিচার বাসার দোতলায় বসে। বইটি লিখতে ৮-৯ মাসের মতো লেগেছিলো। লেখক, প্রথমে খসড়া একটা প্লট সাজিয়েছিলেন: ‘কুয়াশা’ সিরিজের আদলে, এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কাপ্তাই শহরের কাছে একটা পাহাড়ের ভেতর অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি নিয়ে গোপন গবেষণা করছিলো। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে বিশাল লেকের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়টা। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো পাকিস্তানের কোনো শত্রু দেশের সরবরাহ করা শক্তিশালী ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেবে বাঁধটা। আর সেটা ঠেকাবে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট মাসুদ রানা। এই প্লটকে বাস্তবসম্মত করতে লেখক স্বয়ং ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কাপ্তাই, কক্সবাজার প্রভৃতি স্থানে। একাজেই ব্যয় দীর্ঘ একটা সময়। সমস্যা দেখা দিলো তৎকালীন বাংলাদেশে এরকম ঢঙে লেখার চল ছিল না বাংলা ভাষায়, থ্রিলার ধারণ করার উপযোগী ভাষাও শিখতে লাগলেন ঠেকে ঠেকে, প্রয়োজনেই তৈরি করে নিতে হয়েছিলো লেখকের নিজস্ব একটা ধরন। শেখ আবদুল হাকিম তাই নিজের লেখায় ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না, বারবার কাটাকাটি করে পাণ্ডুলিপির চেহারাটাই বিগড়ে দিলেন। তৃতীয়বার পরিষ্কার করে আবার লিখলেন গোটা কাহিনীটাই। শেষ পর্যন্ত নিজের অসন্তুষ্টি নিয়েই ছাপার জন্য প্রেসে দিয়েছিলেন, এমনকি প্রুফ রিড করার সময়ও প্রচুর সম্পাদনা করেছিলেন লেখক। এমনকি প্রকাশিত অবস্থায় হাতে পাওয়া বইটিতেও লেখক নিজে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যদিও পাঠক ঠিকই সাদরে গ্রহণ করে নেয় মাসুদ রানাকে।

    রানা’র চেহারার ক্ষেত্রে লেখক চেয়েছিলেন পাঠকই নিজেকে রানা’র জায়গায় বসিয়ে ভাবুক, তাই তিনি রানা’র চেহারার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা দেননি। প্রথম দিককার বইগুলোতে ভারতীয় গোয়েন্দা কাহিনীর প্রভাব লেখক যে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা নয়। তবে কয়েকটি বই লেখার পাশাপাশি অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, ডেসমন্ড ব্যাগলি, হ্যামন্ড ইনস, ফ্রেডেরিক ফোরসাইথ, পিটার বেঞ্চলি, কেন ফোলেট, ক্লাইভ কাসলার, এডওয়ার্ড এস আরনস, কলিন ফর্বস, জেরার্ড ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক হিগিন্স, এ জে কুইনেল, জিওফ্রি জেনকিনস, উইলবার স্মিথ প্রমুখ বড় বড় থ্রিলার লেখকের বই পড়তে পড়তে রানার চরিত্র ক্রমেই আলাদা রূপ পেতে শুরু করে।

    নামকরণ

    মাসুদ রানা’র নামকরণ করা হয় দুজন বাস্তব মানুষের নামের অংশ মিলিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন তার স্ত্রী, আধুনিক সংগীতশিল্পী ফরিদা ইয়াসমিনের সাথে পরামর্শ করে নামটি নির্বাচন করেন। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন:

    “আমাদের দুজনেরই বন্ধু স্বনামধন্য গীতিকার মাসুদ করিমের ‘মাসুদ’ আর আমার ছেলেবেলার হিরো (নায়ক) ইতিহাসে পড়া মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংহ থেকে ‘রানা’ নিয়ে নাম হলো মাসুদ রানা।”

    ক্রান্তিকাল

    কখনও কখনও এমনও হয় যে, মাসুদ রানা সিরিজ বন্ধ হবার উপক্রম হয়। প্রথমবার এমনটা হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীন হবার আগে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রানার স্বর্ণমৃগ বইটি নিষিদ্ধ (ban) করেছিলো, লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন এতে চ্যালেঞ্জ করায় গোটা সিরিজই বন্ধ করে দেওয়ার জোগাড় করেছিলেন ক্ষুব্ধ এক সরকারি কর্মকর্তা। দ্বিতীয়বার, মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন জন টেলিফোনে হুমকি দিতে শুরু করেছিলো, কেননা স্বাধীনতার আগে ভারত কেবল একটা দেশ থাকলেও যুদ্ধের সময়কার অন্যতম মিত্র দেশ ভারত, স্বাধীনতার পরে নিকটবর্তী বন্ধু দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। এতে সিরিজের প্রথম দিককার বইগুলোতে ভারতকে শত্রুপক্ষ করে সাজানো কাহিনীগুলো সাধারণ্যের রোষানলে পড়ে। তখন সেবা’র কর্ণধার বাধ্য হয়ে প্রথম দিককার কয়েকটি বই থেকে ভারতবিরোধী অংশগুলো বর্জন করে নেন, এমনকি ২টি বই পুণর্লিখনও করা হয়েছিলো। তৃতীয়বার, প্লট সংকটের কারণে আটকে গিয়েছিলো সিরিজটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর (১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে) কোনো দেশ আর বাংলাদেশের শত্রু রইল না, অথচ শত্রুদেশ ছাড়া গুপ্তচর-কাহিনী হয় না। সেটা সামাল দেয়ার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরে রানা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি খুলে গুপ্তচরবৃত্তির পাশাপাশি সিরিজটিতে গোয়েন্দা, অ্যাডভেঞ্চার, ট্রেজার-হান্ট, এমনকি বিজ্ঞানকল্প ও পিশাচ কাহিনী টেনে আনা হয়েছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিমা লেখকরা যখন শত্রু হারিয়ে দিশেহারা, উপায়ান্তর না দেখে রানা সিরিজও খাঁটি গুপ্তচরবৃত্তি থেকে সরে এসে হয়ে পড়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতির আদলে চলতে শুরু করে।

    ভ্রান্তি

    মাসুদ রানা সিরিজের ক্রিমিনাল বইটি বের হওয়ার পর দেখা গেলো যে, ঐ একই কাহিনী নিয়ে আগেই বন্দী গগল নামে একটি বই বেরিয়েছিলো। এধরনের ভুল এই সিরিজে একবারই হয়েছিল।

    বিভিন্ন মাধ্যমে মাসুদ রানা

    মাসুদ রানা চরিত্রটি নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় মাসুদ রানা সিরিজের ‘বিস্মরণ’ অবলম্বনে, ১৯৭৩ সালে। আর ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। পরিচালনায় ছিলেন মাসুদ পারভেজ তথা পরবর্তীকালের জনপ্রিয় অভিনেতা সোহেল রানা। তার পরিচালিত প্রথম ছবি এটি। বিশ বছরের বেশি সময় পর পরবর্তীকালে লেজার ভিশনের ব্যানারে এই চলচ্চিত্রটি ডিভিডি আকারে বাজারে আসে। বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে প্রথম প্যাকেজ নাটক প্রাচীর পেরিয়ে এর কাহিনী রচনা করা হয় শেখ আবদুল হাকিম রচিত মাসুদ রানা সিরিজের পিশাচ দ্বীপ নামক বই থেকে। কাহিনীর নাট্যরূপ প্রদান করেন আতিকুল হক চৌধুরী। ১৯৯৪ সালে প্রচারিত এই নাটকটিতে মাসুদ রানার ভূমিকায় অভিনয় করেন জনপ্রিয় মডেল তারকা নোবেল আর তার বিপরীতে সোহানার ভূমিকায় অভিনয় করেন বিপাশা হায়াত। খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন কে. এস. ফিরোজ।

    সমালোচনা

    মাসুদ রানা সিরিজটি সাধারণ বাঙালি পাঠকের ঘরে যে একেবারে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে, তা কিন্তু নয়। ষাট দশকের শুরুতে মাসুদ রানা সিরিজের বইয়ে উল্লেখিত নর-নারীর বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতাশ্রয়ী সম্পর্কের বিবরণ পাঠকসমাজকে কিছুটা হলেও থমকে দিয়েছিলো। প্রথম দিকে এমনটাই হয়েছিলো যে, ‘প্রজাপতি’ মার্কাওয়ালা বইগুলো পড়াই নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো বাঙালি সমাজে। যারা এসকল পেপারব্যাক বই পড়তো, তাদেরকেও খারাপ নজরে দেখা হতো। বর্তমানে ইন্টারনেটের দৌলতে মাসুদ রানা সিরিজ ভারতের বাঙালীদের ভেতরেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

    মাসুদ রানা’র প্রতি নানাভাবে সমালোচনা শুরু হলে সেবা প্রকাশনী প্রথমবারের মতো বইয়ের শেষে “আলোচনা” বিভাগ চালু করে। যাতে লেখকের বক্তব্য থেকে সমালোচনাগুলোর জবাব দেয়া সম্ভব হয়। সমালোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে যেমন ছিলো কাহিনী ধার করে লেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনি ছিলো কোনো চরিত্রের মৃত্যুজনিত অতি ঠুনকো বিষয়, কেননা বইয়ের কোনো প্রিয় চরিত্রের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করা হতো লেখককে। চরিত্রের মৃত্যুজনিত বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিলো খোদ রানা’র মৃত্যুতে। অগ্নিপুরুষ বইটিতে মাসুদ রানা, নেপল্‌সের কারাদারেলি হাসপাতালে মারা যায় এবং তাকে কবর দিয়ে দেশে ফেরেন অন্য চরিত্র, মেজর জেনারেল রাহাত খান। অবশ্য পরে লেখক তা কাটিয়ে ওঠেন সামান্য একটি সুযোগ পেয়ে গিয়ে; কারণ ঐ কাহিনীর শেষাংশে রাতের আঁধারে রানার মতো দেখতে এক লোককে পুলিশের লঞ্চ থেকে গোজো দ্বীপে নামতে দেখে পাঠক হয়তো রানা মারা যায়নি মনে করে আশান্বিত হোন।

    লেখকস্বত্ব নিয়ে বিতর্ক

    ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের লেখক হিসাবে কাজী আনোয়ার হোসেনের নাম প্রকাশিত হলেও, শেখ আবদুল হাকিম এবং ইফতেখার আমিন নামে দুইজন লেখক নিজেদের এর মূল লেখক হিসেবে দাবি করেছেন এবং স্বত্ব ও রয়্যালটি দাবি করে তারা কপিরাইট রেজিস্টার অফিসে অভিযোগ করেছেন। শেখ আবদুল হাকিম কপিরাইট অফিসে অভিযোগ করেছেন, এ পর্যন্ত কুয়াশা সিরিজ ও মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি বই তিনি লিখেছেন। অপরদিকে ইফতেখার আমিন দাবি করেছেন মাসুদ রানা সিরিজে তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ৫৮টি।

    লেখকস্বত্ব নিয়ে বিতর্কের অবসান

    ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শেখ আব্দুল হাকিম ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে স্বত্ব বা মালিকানা দাবি করে সেবা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কপিরাইট আইনের ৭১ ও ৮৯ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দাখিল করেন।

    এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইনি লড়াই শেষে ২০২০ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে দাবি করা মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি এবং কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে স্বত্ব পেতে যাচ্ছেন শেখ আবদুল হাকিম।

    বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রায়ে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু সমাধান ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে কপিরাইট বোর্ড বা বিজ্ঞ আদালত থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবেদনকারীর দাবি করা ও তালিকাভুক্ত বইগুলোর প্রকাশ বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য প্রতিপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হলো। এছাড়া প্রতিপক্ষকে আবেদনকারীর কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করা প্রকাশিত বইগুলোর সংস্করণ ও বিক্রিত কপির সংখ্যা এবং বিক্রয় মূল্যের হিসাব বিবরণী এ আদেশ জারির তারিখের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

    এ বিষয়ে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘শেখ আবদুল হাকিমের দাবি করা ২৬০টি মাসুদ রানার বইয়ের মধ্যে একটি এবং কুয়াশার ৫০টি বইয়ের মধ্যে ছয়টিতে লেখক হিসেবে তার নামে কপিরাইট করা আছে। বাকিগুলোর কপিরাইট করা নেই। তবে সেগুলো তার লেখা এটি তিনি প্রমাণ করেছেন। তবে কপিরাইট অন্তর্ভুক্তির কারণে তাকে প্রতিটি বইয়ের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে। এরপর প্রতিটি বইয়ের লেখক হিসেবে তার নাম যাওয়ার পাশাপাশি, কপিরাইটও তার হয়ে যাবে।’

    তিনি বলেন, ‘কাজী আনোয়ার হোসেন চাইলে অবশ্যই আমাদের এ রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারবেন। তা অবশ্যই ৯০ দিনের মধ্যে। এখানে তিনি হেরে গেলে, হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন।’

    কপিরাইট অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শেখ আবদুল হাকিম অভিযোগ করার পর অভিযোগকারী ও প্রতিপক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতিতে ওই বছরের ১১ ও ৩০ সেপ্টেম্বর এবং ৪ নভেম্বর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে উভয়পক্ষ সপক্ষে নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেন। দাখিল করা অভিযোগের বিষয়ে প্রতিপক্ষ লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন। প্রতিপক্ষের লিখিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাদী পুনরায় সপক্ষে লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করেন। পরবর্তীতে অভিযোগকারীর দাখিল করা যুক্তির বিষয়ে প্রতিপক্ষ পুনরায় লিখিত যুক্তিতর্ক পেশ করেন।

    বিষয়টি বেশ জটিল এবং দেশের প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে লেখক ও প্রকাশকের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে, এর সন্তোষজনক ও সুষ্ঠু সমাধানের উদ্দেশ্যে উক্ত অভিযোগের বিষয়ে এদেশের বিখ্যাত ও প্রথিতযশা কয়েকজন লেখক ও প্রকাশক এবং সেবা প্রকাশনীর সাবেক ব্যবস্থাপকের লিখিত মতামত চাওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন লেখক বুলবুল চৌধুরী ও শওকত হোসেন, প্রখ্যাত শিল্পী হাসেম খান এবং সেবা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক ইসরাইল হোসেন খান। তাদের লিখিত মতামতের ওপর ভিত্তি করেই রোববার রায় দেওয়া হয়েছে।

    কপিরাইট অফিসের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। শুনানি শেষে ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ১৪ জুনের ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে রুল জারি করেন। পরবর্তীতে কাজী আনোয়ার হোসেনের করা রিট ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আদালত খারিজ করে দেন। এর ফলে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বই এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের স্বত্ব পান প্রয়াত লেখক শেখ আবদুল হাকিম। কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষের আইনজীবী হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানান।

    সিরিজের বই

    সেবা প্রকাশনী কর্তৃক মাসুদ রানা সিরিজে এই পর্যন্ত মোট ৪৬৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে বইগুলিতে মোট ৩২০টি গল্প আছে (অনেক বইয়ের দুটি, এমনকি তিনটি ভলিউম থাকায় এমনটি হয়েছে)

    চলচ্চিত্র

    1. মাসুদ রানা (১৯৭৪) : ১৯৭৪ সালে মাসুদ রানার কাহিনী নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। যার পরিচালক ছিলেন মাসুদ পারভেজ।
    2. মাসুদ রানা : মাসুদ রানা সিরিজ নিয়ে জাজ মাল্টিমিডিয়া একটি চলচ্চিত্র নির্মান করছে। একটি আপাতবাস্তব টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মাসুদ রানার চরিত্র খুঁজে বের করা হবে। চলচ্চিত্রটির বাজেট ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি বাজেটের চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির ৫০ শতাংশ হবে হলিউডে, ৪০ শতাংশ হবে বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে। আর বাকি ১০ শতাংশ থাইল্যান্ড বা এমন এলাকাগুলোতে। চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফার এবং পরিচালক প্রায় সবাই হলিউডের। অমিতাভ রেজা চৌধুরীও চলচ্চিত্রটির সাথে যুক্ত থাকবেন।

    তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া।

  • আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

    আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

    একজন ব্যক্তি তার এক জীবনে সেই ইংরেজ আমলের খিলাফত আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্যায় হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত দেখেছেন। এই সময়টায় রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন পঞ্চাশেরও বেশি বছর। জড়িয়েছেন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনায়। পঞ্চাশ বছর কোনো মুখের কথা নয়, এ এক মহাকাল। তার জীবনটা এমন এক সুইট স্পটে ছিল, যে সময়টায় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে বড় বড় ঘটনা ঘটছে। আর তিনিও সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন সেসবে। তার এই লম্বা সময়ের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিকথাই হলো এই বই।

    আবুল মনসুর আহমদ একজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও সাহিত্যিক। এক ‘ফুড কনফারেন্স’ গল্প দিয়েই সাহিত্য জগতে অমর হয়ে আছেন। তার উপর ছিলেন মেধাবী ছাত্র, সুবক্তা ও সংগঠক। এতগুলো বৈশিষ্ট্য একসাথে যার মধ্যে আছে তার কাজ ও কর্ম ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান হবে তা খুবই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, তিনি বর্তমান ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা।

    যুক্ত ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেস আন্দোলনে, সেখানে বাঙালি নিম্নবর্গীয় মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্নে মতের মিল না হওয়ায় কংগ্রেস ছেড়ে তৈরি করেন প্রজা সমিতি আন্দোলন। যা পরে কৃষক-প্রজা সমিতি এবং আরো পরে কৃষক-প্রজা পার্টি হিসেবে কাজ পরিচালনা করে। এ পার্টি পরবর্তীতে এ কে ফজলুল হকের প্রধানমন্ত্রীত্বে নিখিল বাংলায় (পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা) সরকার গঠন করে।

    জনমানুষের রাজনৈতিক দাবি বাস্তবায়নে কৃষক-প্রজা পার্টি সরকারের অসফলতায় হতাশ হয়ে পরে যুক্ত হন মুসলিম লীগে। মুসলিম লীগ তখন ভারতবর্ষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে ভারতীয় মুসলমানদের অধিকারের আন্দোলন করছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের ভূমিকায় হতাশ হয়ে যুক্ত হন আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ)-এ। পূর্ব বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগকে হারাতে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কোয়ালিশনে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব করেন। যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

    হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি কেন্দ্রের শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বেশ কিছু দিন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তার মন্ত্রীত্বের দায়িত্বকালে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রীসভা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, তাই তিনিও বাংলার উপকারের জন্য বেশিদিন সময় পাননি। (আফসোস, এত বছর পরেও পাকিস্তান স্বাভাবিক হয়নি। আজ অবধি পাকিস্তানের কোনও মন্ত্রীসভা পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। ইমরান খানের মন্ত্রীসভা তার শেষ উদাহরণ।)

    তার এই বিস্তৃত রাজনৈতিক জীবনের ঘটনা, স্মৃতিকথা ও মতামত উঠে এসেছে প্রায় সাত শত পৃষ্ঠার এ বইটিতে। বইয়ের নাম ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ সে হিসেবে খুবই সার্থক।

    বইটিকে ইতিহাসও বলা যাবে না, আবার স্মৃতিকথাও বলা যাবে না। ইতিহাস আর স্মৃতিকথার মিশ্রণ। ইতিহাস বলা যাবে না এ কারণে, তার সময়ে এমন অনেক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে যেগুলোয় তিনি যুক্ত থাকতে পারেননি। যেসবে যুক্ত থাকতে পারেননি যেগুলো তিনি বলেননি। সেসবই বলেছেন যেসবে তিনি যুক্ত ছিলেন। আবার পুরোপুরি স্মৃতিকথাও বলা যাবে না, কারণ এতে তিনি ইচ্ছে করেই নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু এড়িয়ে গিয়েছেন। যেমন তিনি যে আসনে নির্বাচিত হলেন, নিশ্চয় তার জন্য অনেক খাটতে হয়েছে, অনেক ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সেসবের কিছুই তিনি উল্লেখ করেননি। সেগুলোই উল্লেখ করেছেন যেগুলো ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ব্যক্তির সাথে জড়িত। নিজেকে এক পাশে রেখে এক রকম নির্মোহ লেখা।

    এতে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ও এসেছে, তবে সংক্ষেপে। কারণ তিনি ততদিনে বুড়িয়ে গিয়েছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও মন্থর হয়ে গিয়েছে। তারপরেও ঘটনাবলীর হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে যে যে মতামত দিয়েছেন তা ইতিহাসের ও রাজনীতির পাঠকের জন্য অমূল্য।

    উনার লেখার ধাঁচটাও দারুণ। শুরুর শ দুয়েক পৃষ্ঠা হাস্যরসে ভরা। এমন রসাত্মক পন্থায় কথাগুলো বলেছেন বা ঘটনাগুলো তুলে এনেছেন, পাঠকের জন্য কোনো চাপই মনে হবে না। এমন করতে করতে কখন যে ঢুকে যেতে হবে পাঠের ম্যারাথন দৌড়ে বোঝাই যাবে না। মোটা বইয়ের পড়ায় একবার মন বসে গেলে তা আর উঠে না। মোটা বই পড়ার এই একটা অন্যরকম মজা।

    বইটি সকলের পড়া উচিত। সচেতন পাঠকের জন্য অবশ্যপাঠ্য। আমাদের ইতিহাস বিষয়ে আমাদের পপুলার কালচারে আমরা যা পড়ে এসেছি, যা জেনেছি সেসব থেকে দূরে গিয়ে ভিন্ন এক ডাইমেনশনে নিয়ে যাবে পাঠককে। দায়িত্ববান পাঠকের জন্য যা খুবই দরকার। মনে হবে, আমরা ইতিহাসে যা পড়েছি, যা জেনেছি তা পর্যাপ্ত নয়।

    যেহেতু এটা রাজনীতির ইতিহাসের বই, তাই এ বই নিয়ে অনেক পাঠকের অনেক মত-দ্বিমত তৈরি হবে। আসলে হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজনীতি নানা মানুষের নানা মতের জিনিস। দ্বিমত-ভিন্নমত সেখানে নিত্য বিষয়। এ ধরনের বিষয়গুলোতে এডপ্ট করে আমাদের এগিয়ে যাবার ক্ষমতা যত বেশি হবে, পাঠক হিসেবে আমাদের পরিপক্কতাও তত বাড়বে।

  • ঈমানদীপ্ত দাস্তান

    ঈমানদীপ্ত দাস্তান

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর শাসনকাল। পৃথিবী থেকে বিশেষত, মিশর থেকে ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলে ক্রুশ প্রতিষ্ঠার ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে খৃস্টানরা। ক্রুসেডাররা সালতানাতে ইসলামিয়ার উপর নানামুখী সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনার পাশাপাশি বেছে নেয় নানারকম কুটিল ষড়যন্ত্রের পথ। গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা ও চরিত্র-বিধ্বংসী ভয়াবহ অভিযানে মেতে উঠে তারা। মুসলমানদের নৈতিক শক্তি ধ্বংস করার হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে অর্থ, মদ আর ছলনাময়ী রূপসী মেয়েদের। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হাই কমান্ড ও প্রশাসনের উচ্চস্তরে একদল ঈমান-বিক্রেতা গাদ্দার তৈরি করে নিতে সক্ষম হয় তারা।

    ইসলামের মহান বীর মুজাহিদ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পরম বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, দুঃসাহসিকতা ও অনুপম চরিত্র মাধুরী দিয়ে সেইসব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ছিনিয়ে আনেন বিজয়।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে অস্ত্র হাতে খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ লড়েছিলেন, খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর যে অস্ত্রের আঘাত হেনেছিল, ইতিহাসে ক্রুসেড যুদ্ধ নামে তার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু সালতানাতে ইসলামীয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত খৃস্টানদের নাশকতা, গুপ্তহত্যা ও ছলনাময়ী রূপসী নারীদের লেলিয়ে দিয়ে মুসলিম শাসক ও আমীরদের ঈমান ক্রয়ের হীন ষড়যন্ত্র এবং সুলতান আইউবীর তার মোকাবেলা করার কাহিনী এড়িয়ে গেছেন অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ। সেইসব অকথিত কাহিনী ও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুঃসাহসিক অভিযানের রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী নিয়ে রচিত হলো সিরিজ উপন্যাস ‘ঈমানদীপ্ত দাস্তান’।

    বইটির মূল লেখক পাকিস্তানের প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ। পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত মূল বইটির নাম ‘দাস্তান ঈমান ফারোশোঁ কী’ (ঈমান বিক্রেতাদের আখ্যান)। আল্লাহ তাআলার পরম অনুগ্রহে আট খণ্ডে ‘দাস্তান ঈমান ফারোশোঁ কী’র বাংলা অনুবাদ করেন মুহম্মদ মহিউদ্দীন।

    ভয়াবহ সংঘাত, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঈমানদীপ্ত কাহিনীতে ভরপুর এই সিরিজ বইটি ঘুমন্ত মুমিনের ঝিমিয়েপড়া ঈমানী চেতনাকে উজ্জীবিত ও শাণিত করে তুলতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পাশাপাশি বইটি পূর্ণমাত্রায় উপন্যাসের স্বাদও যোগাবে।

  • কিতাবুত তাওহীদ : তাওহীদের মাসায়েল

    কিতাবুত তাওহীদ : তাওহীদের মাসায়েল

    কিতাবুত তাওহীদ বা তাওহীদের মাসায়েল, উর্দু ভাষায় লিখিত তাফহীমুস্‌ সুন্নাহ সিরিজের প্রথম কিতাব। উর্দু নাম, তাওহীদ কি মাসায়েল; লেখক, মুহাম্মদ ইকবাল ইবনে ইদরীস কীলানী; ব্যবস্থাপক, হারুনুর রশিদ কিলানী; প্রকাশক, হাদীস পাবলিকেশন্স, ২ শিটমহল রোড, লাহোর; প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ১৯৯৭। বাংলায় কিতাবটির একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত মুহাম্মদ হারুন আযিযী নদভীর অনুবাদ। এটি প্রকাশ করেছে দারুস-সালাম, রিয়াদ, সাউদী আরব। এডুলিচারের জন্য গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন তাহের আলমাহদী। ধর্মীয় গ্রন্থের সাহিত্যমান থাকা জরুরি নয়, এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যে কোন গ্রন্থেরই সাহিত্যমান থাকা জরুরি। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ পবিত্র কুরআনুল কারীম। সাহিত্যমানের বিবেচনা করেই কিতাবটিকে অনুবাদে হাত দিয়েছেন তাহের আলমাহদী। আশাকরি, তার অনূদিত গ্রন্থটি যেকোন পাঠকের ভাল লাগবে।

    মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, গ্রন্থটির লেখক ও অনূবাদককে তিনি কবুল করুন এবং অনূদিত গ্রন্থটির মাধ্যমে বাংলাভাষী পাঠকদের আক়ীদায়ে তাওহীদকে মজবুত করুন। আমীন!

    ( ءَأَرْبَابٌۭ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ ٱللَّهُ ٱلْوَٰحِدُ ٱلْقَهَّارُ ) ٣٩

    ভিন্ন ভিন্ন বহু রব উত্তম, না মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ্‌?

    —সূরা ইউসুফ, আয়াত ৩৯

    ⁑          ⁑          ⁑

    تَعَــالَوْا إِلىٰ كَلِمَــةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنـا وَ بَيْنَكُــمْ

    হে মানুষ! এমন এক কালিমার দিকে এসো যা তোমাদের ও আমাদের মাঝে অভিন্ন।

    • ওহে বনি ইসরাঈল! তোমাদের বিশ্বাস যে, উজাইর আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র ছিলেন এবং এটাও স্বীকার কর যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কখনও তোমরা বিবেচনা করেছ কি, আল্লাহর সত্তা হচ্ছে “হাইয়্যু” ও “কাইউম” এবং তাঁর পুত্রেরও এইসব গুণাবলী থাকা উচিত ছিল, তবে উজাইর আলাইহিস সালামের মৃত্যু হ’ল কেন? যিনি মৃত্যুবরণ করেন তিনি কি করে আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?
    • ওহে মরিয়ম পুত্র ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র এবং এটাও স্বীকার কর যে, তাঁকে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছে। কখনও চিন্তা করে দেখেছ কি, আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও যে কারও উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ার পরও তাঁর পুত্র এত দুর্বল ও অসহায় কেন ছিলেন যে তাঁকে ক্রুশে চড়ানো হয়েছিল, যাকে ক্রুশে চড়িয়ে হত্যা করা যায় তিনি কি করে আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?
    • ওহে হিন্দুগণ! তোমরা তো তেত্রিশ কোটি দেবতায় বিশ্বাস কর। তোমাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দেবতা রাখে, যেন, একেক জনের জন্য একেক দেবতা যারা নিজ নিজ ভক্তের প্রয়োজন মেটাতে এবং আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ করতে সক্ষম। যেন বাকী বত্রিশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই জন দেবতা তার প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। কখনও ভেবেছ কি, বত্রিশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই জন দেবতা যেখানে প্রয়োজন মেটাতে ও আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ করতে সক্ষম নন, তাহলে একজন কি করে সক্ষম হবেন?
    • ওহে বৌদ্ধগণ! তোমাদের বিশ্বাস যে, গৌতম বুদ্ধ মহাসত্যের সন্ধানে বছরের পর বছর মাঠে, জঙ্গলে, মরুভূমিতে পড়েছিলেন। কখনও কি ভেবেছ যে ব্যক্তি মহাসত্যের সন্ধানে দীর্ঘ সময় ঘুরে বেড়ালেন তিনি কি করে মহাসত্য হতে পারেন?
    • ওহে নিষ্পাপ ইমামদের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, জগতের ছোট বড় সকল কিছু ইমামের আদেশের অধীন এবং তোমাদের দাবী হচ্ছে, ‘আহলে বাইতে’র উপর যা মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা এসেছিল ওই সব কিছু এসেছিল আবু বাকার রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহু ও উমর রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহুর কারণে। একবারও কি ভেবে দেখেছ যে, জগতের ছোট বড় সব কিছু যাদের হুকুমের অধীন তাদের উপর মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা কী করে আসতে পারে? আর যাঁর উপর মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা আসতে পারে তিনি কী করে পৃথিবীর সব কিছুর উপর হুকুমদাতা ও সর্বশক্তিমান হন কী করে?
    • ওহে বুজুর্গানে দীন ও আওলিয়াদের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, আলী হাজওয়েরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মানুষকে ভাণ্ডার দিয়ে থাকেন; খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তুফান থেকে মুক্তি দান করে থাকেন; আবদুল ক়াদীর জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যাবতীয় বালা-মসিবত দূর করে থাকেন; ইমাম বরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি হতভাগাকে ভাগ্যবান করে থাকেন এবং সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছেলে সন্তান দান করে থাকেন। কখনও কি চিন্তা করে দেখেছ, যখন আলী হাজওয়েরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন ভাণ্ডার কে দান করতেন? যখন মুঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন তুফান থেকে মুক্তি দিতেন কে? যখন আবদুল ক়াদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন বালা-মসিবত কে দূর করতেন? যখন ইমাম বরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন হতভাগাকে ভাগ্যবান কে করতেন? যখন সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন সন্তান কে দান করতেন?
    • ওহে দুনিয়ার মানুষ! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো! আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ শিক্ষায় কখনও স্ববিরোধ থাকতে পারে না। কিন্তু তোমাদের আকাইদ ও চিন্তাধারায় থাকা স্ববিরোধ এটা প্রমাণ করে যে, তোমাদের আকাইদ ও চিন্তাধারা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়।

    অতএব, হে দুনিয়ার মানুষ! এমন এক কালিমার দিকে এসো—

    • যার শিক্ষায় কোন স্ববিরোধ নেই;
    • যা মানব জাতির আত্মাকে প্রশান্তি ও দেহকে মুক্তি দান করে;
    • যা মানব জাতিকে মর্যাদা, সম্মান ও মহত্ত্ব প্রদান করে;
    • যা মানব জাতিকে শান্তি ও নিরাপত্তা, সাম্য ও ন্যায়বিচার, সাম্য ও স্বাধীনতা; ভাতৃত্ব ও ভালবাসা ইত্যাদি উচ্চমানের মানবীয় গুণাবলীর নিশ্চয়তা প্রদান করে;
    • যা মানব জাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়।

    সেই এক মাত্র কালিমা হলো—

    لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ

    আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।

  • সিরাজদ্দৌলা

    সিরাজদ্দৌলা

    ‘সিরাজদ্দৌলা’র পঞ্চম সংস্করণ অবলম্বনে পরিবর্দ্ধিত ও সংশোধিত কলেবরে এই নূতন সংস্করণ মুদ্রিত হইল।

    Calcutta Historical Soeiety কর্ত্তৃক আহূত বিচারসভায় অন্ধকূপ-হত্যা সম্বন্ধে গ্রন্থকার ইংরাজীতে যে বক্তৃতা করেন, তাহা Journal of the calcutta Historical Society. Vol. XI. Part I. Serial No. 21 পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। পূর্ব্ব পূর্ব্ব কয়েক সংস্করণে তাহা শ্রীযুক্ত বিমলাচরণ মৈত্রেয় বি-এল কর্ত্তৃক বঙ্গভাষায় অনূদিত হইয়া এই গ্রন্থের শেষভাগে মুদ্রিত হইয়াছে। এই সংস্করণে সমীচীন বোধে সেই অনূবাদের পরিবর্ত্তে মূল ইংরাজী প্রবন্ধটিই পরিশিষ্টরূপে গ্রন্থান্তে সংযোজিত হইল। আশা করি ইহাতে অনেকের কৌতূহল চরিতার্থ হইবে।

  • প্যারীচাঁদ রচনাবলী

    প্যারীচাঁদ রচনাবলী

    বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’; এবং প্রথম ঔপন্যাসিক প্যারীচাঁদ মিত্র। উপন্যাসটি তিনি লিখেছিলেন টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে। বাংলা গদ্যে সাধু ভাষা যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছিল, তখন টেকচাঁদ ঠাকুর উপন্যাস লিখলেন চলিত ভাষায়, একেবারে লোকমুখে ব্যবহৃত ভাষায়। পণ্ডিতেরা হতভম্ব হলেও উপন্যাসটি প্রকাশলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত আলোচনা-সমালোচনার রয়েছে সমান তালে। টেকচাঁদ ঠাকুর বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণ এবং বিবর্তনের ইতিহাসে এক বিশেষ উল্লেখযোগ্য নাম; তাঁর আলালের ঘরের দুলালে ব্যবহৃত ভাষাই প্রকৃত বাংলা ভাষার উদাহরণ। বিগত আড়াইশ বছরে বাংলা গদ্য সাহিত্যের ভাষারীতিতে বিস্তর বিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও আলালের ঘরের দুলালের ভাষা এবং বর্তমান লোকজ ভাষার পার্থক্য যৎসামান্য। তিনি বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের স্ফুটনোম্মুখ যুগে পুরোপুরি না হলেও অন্ততঃ অংশত জীবনের সাথে শিল্পের সংযোগ ঘটাতে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। ভাষা ব্যবহারে কথ্যরীতির অনুসরণ তাকে বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্টতা এনে দেয়।

    প্যারীচাঁদ মিত্রের সমস্ত সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমাদের আয়োজন ‘প্যারীচাঁদ রচনাবলী’; এটি নূতন বা মৌলিক কাজ নয়, বরং ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ১২ই অগ্রহায়ণ মুতাবিক ২৯ নবেম্বর ১৯৭১ সালে ডক্টর অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় মণ্ডল বুক হাউস, ৭৮/১, মহাত্মা গান্ধী রোড, কলিকাতা -৯ থেকে প্রকাশিত ‘প্যারীচাঁদ রচনাবলী’র অনলাইন/ডিজিটাল সংস্করণ মাত্র। সেই সংস্করণে ডক্টর অসিতকুমার যে ‘ভূমিকা’টি লিখেছিলেন তা এই রকম—

    ভূমিকা

    প্রাককথন॥

    বাংলাদেশ, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালী-মানসিকতার দিক থেকে উনিশ শতক, বিশেষতঃ এর দ্বিতীয়ার্ধ একটি ঐশ্বর্যবান কাল প্রবাহরূপে বিবেচিত হতে পারে। উনিশ শতকের গোড়া থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা, জীবনাদর্শ, সমাজপ্ৰণালী ও চিত্তপ্রকর্ষ সুখসুপ্ত মধ্যযুগীয় বাঙালীর নিদ্রানিমীল নয়নে প্রথম সূর্যালোকের জ্ঞানাঞ্জনশলাকা বুলিয়ে মাথার উপরে সীমাহীন আকাশ এবং পায়ের তলায় সীমাবদ্ধ পৃথিবীর নতুন পরিচয় উদ্‌ঘাটিত করল।

    মধ্যযুগে বাঙালী-মানস বিশেষভাবে ছিল গোষ্ঠিসচেতন, গ্রামীণ ও ধর্মীয় ভাবাবেগে আত্মলীন। চৈতন্যদেবের প্রভাবে নতুনভাবে মানুষের মহিমা প্রতিষ্ঠিত হল বটে, কিন্তু সে-মানুষ বৈকুণ্ঠের দিকেই হাত বাড়িয়েছিল, ভৌমবৃন্দাবনকে ভাববৃন্দাবনের তুরীয়লোকে তুলে ধরেছিল। মধ্যযুগ অতিক্রান্ত হল ইতিহাস-দেবতার অনিবার্য অঙ্গুলিসঙ্কেতে। আধুনিক যুগ বাঙালী-মানসে নতুন ছায়াপাত্ত করল। বাংলা গল্পই হল নবযুগের উজ্জীবনমগ্ন। দেশে ও কালে বাঙালী চেতনার সম্প্রসারণে বাংলা গদ্য অসাধারণ ক্রিয়াশীল হল। সাময়িকপত্রে, প্রবন্ধনিবন্ধে, রংতামাসা-ভাঁড়ামিতে, ধর্মান্দোলনে এবং সামাজিক আচার-ব্যবহারে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করে বাংলা গদ্য চেতনার জড়ত্বের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করল। সর্বোপরি কথা-সরিৎসাগরে আখ্যানের তরঙ্গ তুলে বাংলা গদ্য উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধেই যৌবনের দার্ঢ্য অর্জন করল। বাংলা গদ্যই বাঙালীর যথার্থ বঙ্গদর্শন, আত্মদর্শনও বটে। সেই প্রসঙ্গে স্বনামধন্য প্যারীচাঁদ মিত্রের (টেকচাঁদ ঠাকুর) নাম সর্বাগ্রে মনে পড়বে, মনে পড়বে তাঁর রচিত কৌতুকরসসিঞ্চিত গল্প-কাহিনী, নীতি-মার্গীয় আখ্যান, আধ্যাত্মিক রূপক উপন্যাস, আরও নানাধরনের ছোটবড়ো প্রবন্ধনিবন্ধের কথা। ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’ এই ছদ্মবেশে আবির্ভূত হয়ে ‘ইয়ং বেঙ্গল’দের নেতৃস্থানীয়, ডিরোজিওর শিষ্য, কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিক প্যারীচাঁদ বাংলা গদ্যসাহিত্যে সরস রচনার গুণে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। সাহিত্যের কথা ছেড়ে দিলেও, আরও নানা দিক দিয়ে তিনি বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

  • আলালের ঘরের দুলাল

    আলালের ঘরের দুলাল

    আলালের ঘরের দুলাল

    PREFACE.

    The above original Novel in Bengali being the first work of the kind, is now submitted to the publie with considerable diffidence. It chiefly treats of the pernicious effects of allowing children to be improperly brought up, with remarks on the existing system of education, on self-formation and religioni eulture, and is illustrative of the condition of Hindu society, manners, customs, de. and partly of the state of things in the Moffusil. The work has boon written in a simple style, and to foreigners desirous of sequiring an idiomatic knowledge of the Bengali language and an aoguaintance with Hindu domestic life, it will perhaps be found useful. The writer thinks it well to add that a large portion of this Tale appeared originally in a monthly publication, which met with the approval of the number of friends, at whose request he han been induced to conclude and publish it in the present form.

    Price per copy,             …            …            12 Annas, cash.

    ভূমিকা।

    অন্যান্য পুস্তক অপেক্ষা উপন্যাসাদি পাঠ করিতে প্রায় সকল লোকেরই মনে স্বভাবতঃ অনুরাগ জন্মিয়া থাকে এবং যে স্থলে এতদ্দেশীয় অধিকাংশ লোক কোন পুস্তকাদি পাঠ করিয়া সময় ক্ষেপণ করিতে রত নহে সে স্থলে উক্ত প্রকার গ্রন্থের অধিক আবশ্যক, এতদ্বিবেচনায় এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি রচিত হইল। ইহার তাৎপর্য্য কি পাঠ করিলেই প্রকাশ হইবে। এ প্রকার পুস্তক লেখনের প্রণালী এতদ্দেশ মধ্যে বড় প্রচলিত নাই, ইহাতে প্রথমোদ্যমে অবশ সদোষ হইবার সম্ভাবনা, পাঠকবর্গ অনুগ্রহ করিয়া ঐ দোষ ক্ষমা করিবেন। গ্রন্থের নির্ঘণ্ট দেখিলেই গল্পসকলের আভাস ও অন্যান্য প্রকরণ জানা যাইবে।

    পুস্তকের মূল্য,             …            …            ৸৹ নগদ।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ১. বাবুরাম বাবুর পরিচয়—মতিলালের বাঙ্গালা, সংস্কৃত ও ফার্সী শিক্ষা।

    বৈদ্যাবাটীর বাবুরাম বাবু বড় বৈষয়িক ছিলেন। তিনি মাল ও ফৌজদারী আদালতে অনেক কর্ম করিয়া বিখ্যাত হন। কর্মকাজ করিতে প্রবৃত্ত হইয়া উৎকোচাদি গ্রহণ না করিয়া যথার্থ পথে চলা বড় প্রাচীন প্রথা ছিল না – বাবুরাম সেই প্রথানুসারেই চলিতেন। একে কর্মে পটু – তাতে তোষামোদ ও কৃতাঞ্জলি দ্বারা সাহেব-সুবাদিগকে বশীভূত করিয়াছিলেন এজন্য অল্পদিনের মধ্যেই প্রচুর ধন উপার্জন করিলেন। এদেশে ধন অথবা পদ বাড়িলেই মান বাড়ে, বিদ্যা ও চরিত্রের তাদৃক্ গৌরব হয় না। বাবুরাম বাবুর অবস্থা পূর্বে বড় মন্দ ছিল, তৎকালে গ্রামে কেবল দুই এক ব্যক্তি তাঁহার তত্ত্ব করিত। পরে তাঁহার সুদৃশ্য অট্টালিকা বাগ বাগিচা তালুক ও অন্যান্য ঐশ্বর্য সম্পত্তি হওয়াতে অনুগত ও অমাত্য বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা অসংখ্য হইল। অবকাশ কালে বাটিতে আসিলে তাঁহার বৈঠকখানা লোকারণ্য হইত, যেমন মেঠাইওয়ালার দোকানে মিষ্ট থাকিলেই তাহা মক্ষিকায় পরিপূর্ণ হয় তেমন ধনের আমদানি হইলেই লোকের আমদানি হয়। বাবুরামবাবুর বাটীতে যখন যাও তাঁহার নিকট লোক ছাড়া নাই—কি বড়, কি ছোট, সকলেই চারিদিকে বসিয়া তুষ্টিজনক নানা কথা কহিতেছে, বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিরা ভঙ্গিক্রমে তোষামোদ করিত আর এলোমেলো লোকেরা একেবারেই জল উঁচু-নিচু বলিত। এইরূপে কিছু কাল যাপন করিয়া বাবুরাম বাবু পেন্‌সন লইলেন ও আপন বাটীতে বসিয়া জমিদারী ও সওদাগরী কর্ম করিতে আরম্ভ করিলেন।

    লোকের সর্ব প্রকারে সুখ প্রায় হয় না ও সর্ব বিষয়ে বুদ্ধিও প্রায় থাকে না। বাবুরাম বাবু কেবল ধন উপার্জনেই মনোযোগ করিতেন। কি প্রকারে বিষয় বিভব বাড়িবে, কি প্রকারে দশজন লোক জানিবে— কি প্রকারে গ্রামস্থ লোক-সকল করজোড়ে থাকিবে— কি প্রকারে ক্রিয়াকাণ্ড সর্বোত্তম হইবে— এই সকল বিষয় সর্বদা চিন্তা করিতেন। তাঁহার এক পুত্র ও দুই কন্যা ছিল। বাবুরামবাবু বলরাম ঠাকুরের সন্তান, এজন্য জাতিরক্ষার্থ কন্যাদ্বয় জন্মিবামাত্র বিস্তর ব্যয় ভূষণ করিয়া তাহাদের বিবাহ দিয়াছিলেন, কিন্তু জামাতারা কুলীন, অনেক স্থানে দারপরিগ্রহ করিয়াছিল— বিশেষ পারিতোষিক না পাইলে বৈদ্যবাটীর শ্বশুরবাটীতে উঁকিও মারিত না। পুত্র মতিলাল বাল্যাবস্থা অবধি আদর পাইয়া সর্বদা বাইন করিত—কখন বলিত বাবা চাঁদ ধরিব—কখন বলিত বাবা তোপ খাব। যখন চীৎকার করিয়া কান্দিতে আরম্ভ করিত নিকটস্থ সকল লোক বলিত ঐ বান্‌কে ছেলেটার জ্বালায় ঘুমান ভার! বালকটি পিতা-মাতার নিকট আস্কারা পাইয়া পাঠশালায় যাইবার নামও করিত না। যিনি বাটীর সরকার তাঁহার উপর  শিক্ষা করাইবার ভার ছিল। প্রথম প্রথম গুরু মহাশয়ের নিকটে গেলে মতিলাল আঁ আঁ করিয়া কান্দিয়া তাঁহাকে আঁচড় ও কামড় দিত—গুরুমহাশয় কর্তার নিকট গিয়া বলিতেন, মহাশয়! আপনার পুত্রকে শিক্ষা করান আমার কর্ম নয়। কর্তা প্রত্যুত্তর দিতেন—ও আমার সবেধন নীলমণি—ভুলাইয়া টুলাইয়া গায় হাত বুলাইয়া শেখাও। পরে বিস্তর কৌশলে মতিলাল পাঠশালায় আসিতে আরম্ভ করিল। গুরুমহাশয় পায়ের উপর পা, বেত হাতে, দেয়ালে ঠেসান দিয়া ঢুল্‌ছেন ও বল্‌ছেন “ল্যাখ রে ল্যাখ।” মতিলাল ঐ অবকাশে উঠিয়া তাঁহার মুখের নিকট কলা দেখাচ্ছে আর নাচ্ছে — গুরুমশায় নাক ডাকিতেছেন—শিষ্য কি করিতেছে তাহা কিছুই জানেন না। তাঁহার চক্ষু উন্মীলিত হইলেই মতিলাল আপন পাততাড়ির নিকট বসিয়া কাগের ছা বগের ছা লিখিত। সন্ধ্যাকালে ছাত্রদিগকে ঘোষাইতে আরম্ভ করিলে মতিলাল গোলে হরিবোল দিত—কেবল গণ্ডার এণ্ডা ও বুড়িকা ও পণিকার শেষ অক্ষর বলিয়া ফাঁকি সিদ্ধান্ত করিত,—মধ্যে মধ্যে গুরুমহাশয় নিদ্রিত হইলে তাঁহার নাকে কাটি দিয়া ও কোঁচার উপর জলন্ত অঙ্গার ফেলিয়া তীরের ন্যায় প্রস্থান করিত। আর আহারের সময় চুনের জল ঘোল বলিয়া অন্য লোকের হাত দিয়া পান করাইত। গুরুমহাশয় দেখিলেন বালকটি অতিশয় ত্রিপণ্ড, মা সরস্বতীকে একবারে জলপান করিয়া বসিল, অতএব মনে করিলেন যদি এত বেত্রাঘাতে সুযুত না হইল, কেবল গুরুমারা বিদ্যাই শিক্ষা করিল তবে এমত শিষ্যের হাত হইতে ত্বরায় মুক্ত হওয়া কর্তব্য, কিন্তু কর্তা ছাড়েন না—অতএব কৌশল করিতে হইল। বোধ হয় গুরুমহাশয়গিরি অপেক্ষা সরকারি ভাল, ইহাতে বেতন দুই টাকা ও খোরাক-পোষাক—উপরি লাভের মধ্যে তালপাত কলাপাত ও কাগজ ধরিবার কালে এক একটা সিধে ও এক এক জোড়া কাপড় মাত্র, কিন্তু বাজার সরকারি কর্মে নিত্য কাঁচা কড়ি। এই বিবেচনা করিয়া কর্তার নিকট গিয়া কহিলেন—মতিবাবুর কলাপাত ও কাগজ লেখা শেষ হইয়াছে এবং এক প্রস্থ জমিদারী কাগজও লেখান গিয়াছে। বাবুরামবাবু এই সংবাদ পাইয়া আহ্লাদে মগ্ন হইলেন, নিকটস্থ পারিষদেরা বলিল— না হবে কেন! সিংহের সন্তান কি কখন শৃগাল হইতে পারে?

    পরে বাবুরাম বাবু বিবেচনা করিলেন ব্যাকরণাদি ও কিঞ্চিত ফার্সী শিক্ষা করানো আবশ্যক। এই স্থির করিয়া বাটীর পূজারী ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিলেন—কেমন হে তোমার ব্যাকরণ ট্যাকরণ পড়াশুনা আছে? পূজারী ব্রাহ্মণ গণ্ড মুর্খ—মনে করিল যে চাউল-কলা পাই তাতে তো কিছুই আঁটে না—এত দিনের পর বুঝি কিছু প্রাপ্তির পন্থা হইল, এই ভাবিয়া প্রত্যুত্তর করিল— আজ্ঞে হাঁ, আমি কুইনমোড়ার ঈশ্বরচন্দ্র বেদান্তবাগীশের টোলে ব্যাকরণাদি একাদিক্রমে পাঁচ বৎসর অধ্যয়ন করি, কপাল মন্দ, পড়াশুনার দরুন কিছুই লাভবান হয় না, কেবল আদা জল খাইয়া মহাশয়ের নিকট পড়িয়া আছি। বাবুরাম বাবু বলিলেন—তুমি অদ্যাবধি আমার পুত্রকে ব্যাকরণ শিক্ষা করাও। পূজারী ব্রাহ্মণ আশা বায়ুতে মুগ্ধ হইয়া মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের দুই-এক পাত শিক্ষা করিয়া পড়াইতে আরম্ভ করিলেন। মতিলাল মনে করিলেন গুরুমহাশয়ের হাত হইতে তো মুক্ত হইয়াছি এখন এ বেটা চাউলকলাখেকো বামুনকে কেমন করিয়া তাড়াই? আমি বাপ মার আদরের ছেলে—লিখি বা না লিখি, তাঁহারা আমাকে কিছুই বলিবেন না—লেখাপড়া শেখা কেবল টাকার জন্য—আমার বাপের অতুল বিষয়—আমার লেখাপড়ায় কাজ কি? কেবল নাম সহি করিতে পারিলেই হইল। আর যদি লেখাপড়া শিখিব তবে আমার এয়ারবক্সিদিগের দশা কি হইবে? আমোদ করিবার এই সময়,—এখন কি লেখা-পড়ার যন্ত্রণা ভাল লাগে?

    মতিলাল এই স্থির করিয়া পূজারী ব্রাহ্মণকে বলিল—অরে বামুন, তুই যদি হ, য, ব, র, ল, শিখাইতে আমার নিকট আর আস্‌বি ঠাকুর ফেলিয়া দিয়া তোর চাউল-কলা পাইবার উপায় সুদ্ধ ঘুচাইয়া দিব— কিন্তু বাবার কাছে গিয়া একথা বললে ছাতের উপর হতে তোর মাথায় এমন এক এগারঞ্চি ঝাড়িব যে তোর ব্রাহ্মণীকে কালই হাতের নোয়া খুলিতে হইবে। পূজারী ব্রাহ্মণ হ, য, ব, র, ল প্রসাদাৎ ক্ষণেক কাল হ, য, ব, র, ল হইয়া থাকিলেন পরে আপনা আপনি বিচার করিলেন—ছয় মাস প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়াছি এক পয়সাও হস্তগত হয় নাই, আবার “লাভঃ পরং গোবধঃ” —প্রাণ নিয়া টানাটানি—এক্ষণে ছেড়ে দিলে কেঁদে বাঁচি। পূজারী ব্রাহ্মণ যৎকালে এই সকল পর্যালোচনা করিতেছিলেন মতিলাল তাঁহার মুখাবলোকন করিয়া বলিল—বড় যে বসে বসে ভাবছিস্? টাকা চাই? এই নে—কিন্তু বাবার কাছে গিয়া বল্‌গে আমি সব শিখেছি। পূজারী ব্রাহ্মণ কর্তার নিকট গিয়া বলিল—মহাশয় মতিলাল সামান্য বালক নহে—তাহার অসাধারণ মেধা, যাহা একবার শুনে তাহাই মনে করিয়া রাখে। বাবুরাম বাবুর নিকট একজন আচার্য ছিল—বলিল, মতিলালের পরিচয় দিবার আবশ্যক নাই। উটি ক্ষণজন্মা ছেলে— বেঁচে থাকিলে দিক্‌পাল হইবে।

    অনন্তর পুত্রকে ফার্সী পড়াইবার জন্য বাবুরাম বাবু একজন মুন্‌সি অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। অনেক অনুসন্ধানের পর আলাদি দরজির নানা হবিবলহোসেন তেল কাঠ ও ১৷৷৹ টাকা মাহিনাতে নিযুক্ত হইল। মুন্‌সি সাহেবের দন্ত নাই, পাকা দাড়ি, শনের ন্যায় গোঁফ, শিখাইবার সময় চক্ষু রাঙা করেন ও বলেন, ‘আরে বে পড়’ ও কাফ গাফ আয়েন গায়েন উচ্চারণে তাঁহার বদন সর্বদা বিকট হয়। একে বিদ্যা শিক্ষাতে কিছু অনুরাগ নাই তাতে ঐরূপ শিক্ষক অতএব মতিলালের ফার্সি পড়াতে ঐরূপ ফল হইল। এক দিবস মুন্‌সি সাহেব হেঁট হইয়া কেতাব দেখিতেছেন ও হাত নেড়ে সুর করিয়া মস্‌নবির বয়েত পড়িতেছেন ইত্যবসরে মতিলাল পিছন দিগ্ দিয়া একখান জ্বলন্ত টিকে দাড়ির উপর ফেলিয়া দিল। তৎক্ষণাৎ দাউদাউ করিয়া দাড়ি জ্বলিয়া উঠিল। মতিলাল বলিল—কেমন রে বেটা শোরখেকো নেড়ে আমাকে পড়াবি? মুন্‌সি সাহেব দাড়ি ঝাড়িতে ঝাড়িতে ও তোবা তোবা বলিতে বলিতে প্রস্থান করিলেন এবং জ্বালার চোটে চিৎকার করিয়া বলিলেন—এস্ মাফিক বেতমিজ আওর বদ্‌জাৎ লেড়্‌কা কবি দেখা নেই—এস্ কাম্‌সে মুল্কমে চাস কর্ণা আচ্ছি হ্যায়। এস্ জেগে আনা বি হারাম হ্যায়—তোবা-তোবা-তোবা!!!


    আলালের ঘরের দুলাল

    ২. মতিলালের ইংরাজী শিখাবার উদ্‌যোগ ও বাবুরাম বাবুর বালীতে গমন

    মুন্‌সি সাহেবের দুর্গতির কথা শুনিয়া বাবুরামবাবু বলিলেন—মতিলাল তো আমার তেমন ছেলে নয়—সে বেটা জেতে নেড়ে—কত ভাল হবে? পরে ভাবিলেন যে ফার্সির চলন উঠিয়া যাইতেছে, এখন ইংরেজী পড়ান ভাল। যেমন ক্ষিপ্তের কখন কখন জ্ঞানোদয় হয় তেমনি অবিজ্ঞ লোকেরও কখন কখন বিজ্ঞতা উপস্থিত হয়। বাবুরাম বাবু ঐ বিষয় স্থির করিয়া বিবেচনা করিতে লাগিলেন আমি বারাণসী বাবুর ন্যায় ইংরেজী জানি—‘‘সরকার কম স্পিক নাট’’ আমার নিকটস্থ লোকেরাও তদ্রূপ বিদ্বান্, অতএব একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট পরামর্শ লওয়া কর্তব্য। আপন কুটুম্ব ও আত্মীয়দিগের নাম স্মরণ করাতে মনে হইল বালীর বেণীবাবু বড় যোগ্য লোক। বিষয়কর্ম করিলে তৎপরতা জন্মে। এজন্য অবিলম্বে একজন চাকর ও পাইক সঙ্গে লইয়া বৈদ্যবাটীর ঘাটে আসিলেন।

    আষাঢ় শ্রাবণ মাসে মাঝিরা বৈঁতির জাল ফেলিয়া ইলিস মাছ ধরে ও দুই প্রহরে সময় মাল্লারা প্রায় আহার করিতে যায় এজন্য বৈদ্যবাটীর ঘাটে খেয়া কিম্বা চল্‌তি নৌকা ছিল না। বাবুরাম বাবু চৌগোঁপ্পা—নাকে তিলক—কস্তাপেড়ে ধুতি পরা—ফুলপুকুরে জুতা পায়—উদরটি গণেশের মত—কোঁচান চাদরখানি কাঁধে—একগাল পান—ইতস্ততঃ বেড়াইয়া চাকরকে বলছেন—ওরে হরে! শীঘ্র বালী যাইতে হইবে দুই চার পয়সায় একখানা চল্‌তি পান্‌সি ভাড়া কর তো। বড় মানুষের খানসামারা মধ্যে মধ্যে বেআদব হয়, হরি বলিল—মোশায়ের যেমন কাণ্ড! ভাত খেতে বস্তেছিনু—ডাকাডাকিতে ভাত ফেলে রেখে এস্তেচি—ভেটেল পান্‌সি হইলে অল্প ভাড়ায় হইত—এখন জোয়ার—দাঁড় টান্‌তে ও ঝিঁকে মার্‌তে মাঝিদের কাল ঘাম ছুটবে—গহনার নৌকায় গেলে দুই চার পয়সা হতে পারে—চল্‌তি পান্‌সি চার পয়সার ভাড়া করা আমার কর্ম নয়—এ কি থুতকুড়ি দিয়া ছাতু গোলা?

    বাবুরাম বাবু দুটো চক্ষু কট্‌কট্ করিয়া বলিলেন—তোবেটার বড় মুখ বেড়েছে—ফের যদি এমন কথা কবি তো ঠাস্ করে চড় মার্‌বো। বাঙালী ছোট জাতিরা একটু ঠোকর খাইলেই ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপে, হরি তিরস্কার খাইয়া জড়সড় হইয়া বলিল—এজ্ঞে না, বলি এখন কি নৌকা পাওয়া যায়? এই বল্‌তে বল্‌তে একখানা বোট গুণ টেনে ফিরিয়া যাইতেছিল, মাঝির সহিত অনেক কস্তাকস্তি ধস্তাধস্তি করিয়া ৷৷৹ ভাড়া চুক্তি হইল—বাবুরাম বাবু চাকর ও পাইকের সহিত বোটের উপর উঠিলেন। কিঞ্চিৎদূর আসিয়া দুই দিগ্ দেখিতে দেখিতে বলিতেছেন—ওরে হরে! বোটখানা পাওয়া গিয়াছে ভাল—মাঝি! ও বাড়ীটা কার রে? ওটা কি চিনির কল? অহে চকমকি ঝেড়ে এক ছিলিম তামাক সাজো তো? পরে ভড় ভড় করিয়া হুঁকা টানিতেছেন—শুশুকগুলা এক এক বার ভেসে ভেসে উঠ্‌তেছে—বাবু স্বয়ং উঁচু হইয়া দেখ্‌তেছেন ও গুন গুন করিয়া সখীসম্বাদ গাইতেছেন—‘‘দেখে এলাম শ্যাম তোমার বৃন্দাবন ধাম কেবল আছে নাম।’’ ভাঁটা হাওয়াতে বোট সাঁ সাঁ করিয়া চলিতে লাগিল—মাঝিরাও অবকাশ পাইল—কেহ বা গলুয়ে বসিল, কেহ বা বোকা ছাগলের দাড়ি বাহির করিয়া চারি দিগে দেখিতে লাগিল ও চাটগেঁয়ে সুরে গান আরম্ভ করিল ‘‘খুলে পড়বে কানের সোনা শুনে বাঁশির সুর’’—

    সূর্য অস্ত না হইতে হইতে বোট দেওনাগাজীর ঘাটেতে গিয়া লাগিল। বাবুরামবাবুর শরীরটি কেবল মাংসপিণ্ড—চারি জন মাঝিতে কুঁতিয়া ধরাধরি করিয়া উপরে তুলিয়া দিল। বেণীবাবু কুটুম্বকে দেখিয়া ‘‘আস্‌তে আজ্ঞা হউক, বস্‌তে আজ্ঞা হউক’’ প্রভৃতি নানবিধ শিষ্টালাপ করিলেন। বাবুর বাটীর চাকর রাম তৎক্ষণাৎ তামুক সাজিয়া আনিয়া দিল। বাবুরাম বাবু ঘোর হুঁকারি, দুই এক টান টানিয়া বলিলেন—ওহে হুঁকাটা পীসে পীসে বল্‌ছে, খুড়া খুড়া বল্‌ছে না কেন? বুদ্ধিমান লোকের নিকট চাকর থাকিলে সেও বুদ্ধিমান্ হয়। রাম অমনি হুঁকায় ছিঁচ্‌কা দিয়া—জল ফিরাইয়া—মিঠেকড়া তামাক সেজে—বড় দেকে নল করে হুঁকা আনিয়া দিল। বাবুরাম বাবু হুঁকা সম্মুখে পাইয়া একবারে যেন ইজারা করিয়া লইলেন—ভড়র ভড়র টানছেন— ধুঁয়া সৃষ্টি করছেন—ও বিজর বিজর বক্‌ছেন।

    বেণীবাবু। মহাশয় একবার উঠে একটা পান খেলে ভাল হয় না?

    বাবুরাম বাবু। সন্ধ্যা হল—আর জল খাওয়া থাকুক্—এ আমার ঘর—আমাকে বল্‌তে হবে কেন?

    দেখ মতিলালের বুদ্ধিশুদ্ধি ভাল হইয়াছে—ছেলেটিকে দেখে চক্ষু জুড়ায়, সম্প্রতি ইংরেজী পড়াইতে বাঞ্ছা করি—স্বল্প অল্প মাহিনাতে একজন মাস্টার দিতে পার?

    বেণীবাবু। মাস্টার অনেক আছে, কিন্তু ২০/২৫ টাকা মাসে দিলে একজন মাঝারি গোছের লোক পাওয়া যায়।

    বাবুরাম বাবু। কতো— ২৫ টাকা!!! অহে ভাই, বাটীতে নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপ—প্রতিদিন একশত পাত পড়ে—আবার কিছুকাল পরেই ছেলেটির বিবাহ দিতে হইবে। যদি এত টাকা দিব তবে তোমার নিকট নৌকা ভাড়া করিয়া কেন এলাম?

    এই বলিয়া—বেণীবাবুর গায়ে হাত দিয়া হা হা করিয়া হাসিতে লাগিলেন।

    বেণীবাবু। তবে কলিকাতার কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়া দিউন। একজন আত্মীয় কুটুম্বের বাটীতে ছেলেটি থাকিবে, মাসে ৩/৪ টাকার মধ্যে পড়াশুনা হইতে পারিবে।

    বাবুরাম বাবু। এত? তুমি বলে কয়ে কমজম করিয়া দিতে পারো না? স্কুলে পড়া কি ঘরে পড়ার চেয়ে ভাল?

    বেণীবাবু। যদ্যপি ঘরে একজন বিচক্ষণ শিক্ষক রাখিয়া ছেলেকে পড়ানো যায় তবে বড় ভাল হয়, কিন্তু তেমন শিক্ষক অল্প টাকায় পাওয়া যায় না, স্কুলে পড়ার গুণও আছে—দোষও আছে। ছেলেদিগের সঙ্গে একত্র পড়াশুনা করিলে পরস্পরের উৎসাহ জন্মে কিন্তু সঙ্গদোষ হইলে কোন কোন ছেলে বিগড়িয়া যাইতে পারে, আর ২৫/৩০ জন বালক এক শ্রেণীতে পড়িলে হট্টগোল হয়, প্রতিদিন সকলের প্রতি সমান তদারকও হয় না, সুতরাং সকলের সমানরূপ শিক্ষাও হয় না।

    বাবুরাম বাবু। তা যাহা হউক—মতিকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিব, দেখেশুনে যাহাতে সুলভ হয় তাহাই করিয়া দিও। যে সকল সাহেবের কর্মকাজ করিয়াছিলাম এক্ষণে তাহাদের কেহ নাই—থাকিলে ধরে পড়ে অমনি ভর্তি করিতে পারিতাম। আর আমার ছেলে মোটামুটি শিখিলেই বস্ আছে, বড় পড়াশুনা করিলে স্বধর্মে থাকিবে না। ছেলেটি যাহাতে মানুষ হয় তাহাই করিয়া দিও—ভাই সকল ভার তোমার উপর।

    বেণীবাবু। ছেলেকে মানুষ করিতে গেলে ঘরে বাইরে তদারক চাই। বাপকে স্বচক্ষে সব দেখ্‌তে হয়—ছেলের সঙ্গে ছেলে হইয়া খাট্‌তে হয়। অনেক কর্ম বরাতে চলে বটে কিন্তু এ কর্মে পরের মুখেঝাল খাওয়া হয় না।

    বাবুরাম বাবু। সে সব বটে—মতি কি তোমার ছেলে নয়? আমি এক্ষণে গঙ্গাস্নান করিব—পুরাণ শুনিব—বিষয় আশয় দেখিব—আমার অবকাশ কই ভাই? আর আমার ইংরেজী শেখা সেকেলে রকম। মতি তোমার—তোমার—তোমার!!! আমি তাকে তোমার কাছে পাঠাইয়া দিয়া নিশ্চন্ত হইব, তুমি যা জান তাই করিবে কিন্তু ভাই! দেখো যেন বড় ব্যয় হয় না—আমি কাচ্ছাবাচ্ছাওয়ালা মানুষ—তুমি সকল তো বুঝতে পার?

    অনন্তর অনেক শিষ্টালাপের পর বাবুরামবাবু বৈদ্যবাটীতে প্রত্যাগমন করিলেন।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ৩. মতিলালের বালীতে আগমন ও তথায় লীলাখেলা পরে ইংরাজী শিক্ষার্থে বহুবাজারে অবস্থিতি

    রবিবারে কুঠীওয়ালারা বড় ঢিলে দেন—হচ্ছে হবে—খাচ্ছি খাব—বলিয়া অনেক বেলায় স্নান আহার করেন—তাহার পরে কেহ বা বড়ে টেপেন—কেহ বা তাস পেটেন—কেহ বা মাছ ধরেন—কেহ বা তবলায় চাঁটি দেন— কেহ বা সেতার লইয়া পিড়িং পিড়িং করেন—কেহ বা শয়নে পদ্মনাভ ভাল বুঝেন—কেহ বা বেড়াতে যান—কেহ বা বহি পড়েন। কিন্তু পড়াশুনা অথবা সৎ কথার আলোচনা অতি অল্প হইয়া থাকে। হয় তো মিথ্যা গালগল্প কিংবা দলাদলির মোট, কি শম্ভু তিনটা কাঁঠাল খাইয়াছে এই প্রকার কথাতেই কাল ক্ষেপণ হয়। বালীর বেণীবাবুর অন্য প্রকার বিবেচনা ছিল। এদেশের লোকদিগের সংস্কার এই যে স্কুলে পড়া শেষ হইলে লেখাপড়ার শেষ হইল। কিন্তু এ বড় ভ্রম, আজন্ম মরণ পর্যন্ত সাধনা করিলেও বিদ্যার কুল পাওয়া যায় না, বিদ্যার চর্চা যত হয় ততই জ্ঞান বৃদ্ধি হইতে পারে। বেণীবাবু এ বিষয় ভাল বুঝিতেন এবং তদনুসারে চলিতেন। তিনি প্রাতঃকালে উঠিয়া আপনার গৃহকর্ম সকল দেখিয়া পুস্তক লইয়া বিদ্যানুশীলন করিতেছিলেন। ইতিমধ্যে চৌদ্দ বৎসরের একটি বালক—গলায় মাদুলি—কানে মাকড়ি, হাতে বালা ও বাজু, সম্মুখে আসিয়া টিপ করিয়া একটি গড় করিল। বেণীবাবু এক মনে পুস্তক দেখিতেছিলেন বালকের জুতার শব্দে চম্‌কিয়া উঠিয়া দেখিয়া বলিলেন, “এসো বাবা মতিলাল এসো—বাটীর সব ভাল তো?” মতিলাল বসিয়া সকল কুশল সমাচার করিল। বেণীবাবু কহিলেন—অদ্য রাত্রে এখানে থাক কল্য প্রাতে তোমাকে কলিকাতায় লইয়া স্কুলে ভর্তি করিয়া দিব। ক্ষণেক কাল পরে মতিলাল জলযোগ করিয়া দেখিল অনেক বেলা আছে। চঞ্চল স্বভাব—এক স্থানে কিছু কাল বসিতে দারুণ ক্লেশ বোধ হয়—এজন্য আস্তে আস্তে উঠিয়া বাটীর চতুর্দিকে দাঁদুড়ে বেড়াইতে লাগিল— কখন ঢেঁস্কেলের ঢেঁকিতে পা দিতেছে—কখন বা ছাতের উপর গিয়া দুপদুপ করিতেছে—কখন বা পথিকদিগকে ইট পাটকেল মারিয়া পিট্টান দিতেছে; এইরূপে দুপদাপ করিয়া বালী প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল—কাহারো বাগানে ফুল ছেঁড়ে—কাহারো গাছের ফল পাড়ে—কাহারো মট্‌কার উপর উঠিয়া লাফায়—কাহারো জলের কলসী ভাঙিয়া দেয়।

    বালীর সকল লোকেই ত্যক্ত হইয়া বলাবলি করিতে লাগিল—এ ছোঁড়া কে রে? যেমন ঘরপোড়া দ্বারা লস্কা ছারখার হইয়াছিল আমাদিগের গ্রামটা সেইরূপ তচ্‌নচ্‌ হবে নাকি? কেহ কেহ ঐ বালকের পিতার নাম শুনিয়া বলিল—আহা বাবুরাম বাবুর এ পুত্র—না হবে কেন? “পুত্রে যশসি তোয়েচ নরাণাং পুণ্যক্ষণম্‌।”

    সন্ধ্যা হইল—শৃগালদিগের হোয়া হোয়া ও ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ শব্দে গ্রাম শব্দায়মান হইতে লাগিল। বালীতে অনেক ভদ্রলোকের বসতি—প্রায় অনেকের বাটীতে শালগ্রাম আছেন এজন্য শঙ্খ-ঘণ্টা ধ্বনির ন্যূনতা ছিল না। বেণীবাবু অধ্যয়নানন্তর গামোড়া দিয়া তামাক খাইতেছেন— ইত্যবসরে একটা গোল উপস্থিত হইল। পাঁচ সাত জন লোক নিকটে আসিয়া বলিল—মশাই গো! বৈদ্যবাটীর জমিদারের ছেলে আমাদের উপর ইট মারিয়াছে—কেহ বলিল—আমার ঝাঁকা ফেলিয়া দিয়াছে—কেহ বলিল আমাকে ঠেলে ফেলে দিয়াছে—কেহ বলিল আমার মুখে থুতু দিয়াছে—কেহ বলিল আমার ঘিয়ের হাঁড়ি ভাঙিয়াছে। বেণীবাবু পরদুঃখে কাতর—সকলকে তুষেতেষে ও কিছু কিছু দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন, পরে ভাবিলেন এ ছেলের তো বিদ্যা নগদ হইবে—এক বেলাতেই গ্রাম কাঁপিয়া দিয়াছে—এক্ষণে এখান হইতে প্রস্থান করিলে আমার হাড় জুড়ায়।

    গ্রামের প্রাণকৃঞ্চ খুড়ে, ভগবতী ঠাকুরদাদা ও ফচ্‌কে রাজকৃষ্ণ আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—বেণীবাবু এ ছেলেটি কে? —আমরা আহার করিয়া নিদ্রা যাইতেছিলাম—গোলের দাপটে উঠে পড়েছিলাম—কাঁচা ঘুম ভাঙাতে শরীরটা মাটি মাটি করিতেছে। বেণীবাবু কহিলেন—আর ও কথা কেনে বল? একটা ভারি কর্মভোগে পড়িয়াছি—আমার একটি জমিদার ষণ্ডা কুটুম্ব আছে—তাহার হ্রস্ব দীর্ঘ কিছুই জ্ঞান নাই—কেবল কতকগুলো টাকা আছে। ছেলেটিকে স্কুলে ভর্তি করাইবার জন্য আমার নিকট পাঠাইয়াছে—কিন্তু এর মধ্যেই হাড় কালি হইল—এমন ছেলেকে তিনদিন রাখিলেই বাটীতে ঘুঘু চরিবে। এইরূপ কথোপকথন হইতেছে—জন কয়েক চেংড়া পশ্চাতে মতিলাল— “ভজ নর শম্ভুসুতেরে” বলিয়া চিৎকার করিতে করিতে আসিল। বেণীবাবু বলিলেন—ঐ আসছে রে বাবু—চুপ কর—আবার দুই-এক ঘা বসিয়ে দেবে না-কি? পাপকে বিদায় করিতে পারিলে বাঁচি। মতিলাল বেণীবাবুকে দেখিয়া দাঁত বাহির করিয়া ঈষদ্ধাস্য করত কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিত হইল। বেণীবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন—বাবু কোথায় গিয়েছিলে? মতিলাল বলিল—মহাশয়দের গ্রামটা কত বড় তাই দেখে এলেম।

    পরে বাটীর ভিতর যাইয়া মতিলাল রাম চাকরকে তামাক আনিতে বলিল। অম্বুরি অথবা ভেলসায় সানে না—কড়া তামাকের উপর কড়া তামাক খাইতে লাগিল। রাম তামাক যোগাইয়া উঠিতে পারে না—এই আনে—এই নাই। এইরূপ মুহুর্মুহু তামাক দেওয়াতে রাম অন্য কোন কর্ম করিতে পারিল না। বেণীবাবু রোয়াকে বসিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিলেন ও এক-এক বার পিছন ফিরিয়া মিট মিট করিয়া উঁকি মারিয়া দেখিতে লাগিলেন।

    আহারের সময় উপস্থিত হইল। বেণীবাবু অন্তঃপুরে মতিলালকে লইয়া উত্তম অন্ন-ব্যঞ্জন ও নানা প্রকার চর্চ্য চোষ্য লেহ্য পেয় দ্বারা পরিতোষ করাইয়া তাম্বুলগ্রহণান্তর আপনি শয়ন করিতে গেলেন। মতিলাল শয়নগারে গিয়া পান তামাক খাইয়া বিছেনার ভিতর ঢুকিল। কিছু কাল এপাশ ওপাশ করিয়া ধড়মড়িয়া উঠিয়া এক-এক বার পায়চারি করিতে লাগিল ও এক-এক বার নীলু ঠাকুরের সখীসংবাদ অথবা রাম বসুর বিরহ গাইতে লাগিল। গানের চোটে বাটীর সকলের নিদ্রা ছুটে পালাইল।

    চণ্ডীমণ্ডপে রাম ও কাশীজোড়া নিবাসী পেলারাম মালী শয়ন করিয়াছিল। দিবসে পরিশ্রম করিলে নিদ্রাটি বড় আরামে হয়, কিন্তু ব্যঘাত হইলে অত্যন্ত বিরক্তি জন্মে। গানের চিৎকারে চাকরের ও মালীর নিদ্রা ভাঙিয়া গেল।

    পেলারাম। অহে বাপা রাম! এ সড়ার চিড়কারে মোর লিদ্রা হতেছে না—উঠে বাগানে বীজ গুঁড়া কি পেড়াইব?

    রাম। (গা মোড় দিয়া) আরে রাত ঝাঁ ঝাঁ কচ্চে—এখন কেন উঠ্‌বি? বাবু ভাল নালা কেটে জল এনেছে—এ ছোঁড়া কান ঝালা-পালা কল্লে—গেলে বাঁচি।

    পরদিন প্রভাতে বেণীবাবু মতিলালকে লইয়া বৌবাজারের বেচারাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাটীতে উপস্থিত হইলেন। বেচারাম বাবু কেনারামবাবুর পুত্র—বুনিয়াদী বড় মানুষ—সন্তানাদি কিছুই নাই—সাদাসিধে লোক কিন্তু জন্মাবধি গঁর্ণখাঁদা—অল্প অল্প পিট্‌পিটে ও চিড়চিড়ে। বেণীবাবুকে দেখিয়া স্বাভাবিক নাকিস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন “আরে কও কি মনে করে?”

    বেণীবাবু। মতিলাল মহাশয়ের বাটীতে থাকিয়া স্কুলে পড়িবে—শনিবার শনিবার ছুটি পাইলে বৈদ্যবাটী যাইবে। বাবুরামবাবুর কলিকাতায় আপনার মত আত্মীয় আর নাই এজন্য এই অনুরোধ করিতে আসিয়াছি।

    বেচারাম। তার আটক কি—এও ঘর সেও ঘর। আমার ছেলেপুলে নাই—কেবল দুই ভাগিনেয় আছে—মতিলাল স্বচ্ছন্দে থাকুক।

    বেচারাম বাবুর নাকিস্বরের কথা শুনিয়া মতিলাল খিল খিল করিয়া হাসিতে লাগিল। অমনি বেণীবাবু উহুঁ উহুঁ করত চোখ টিপ্‌তে লাগিলেন ও মনে করিলেন এমন ছেলে সঙ্গে থাকিলে কোথাও সুখ নাই। বেচারাম বাবু মতিলালের হাসি শুনিয়া বলিলেন—বেণী ভায়া! ছেলেটা কিছু বেদ্‌ড়া দেখতে পাই যে? বোধ হয় বালককালাবধি বিশেষ নাই পাইয়া থাকিবে। বেণীবাবু অতি অনুসন্ধনী—পূর্বকথা সকলি জানেন, আপনিও ভুগেছেন—কিন্তু নিজ গুণে সকল ঢেকে ঢুকে লইলেন—গুপ্ত কথা ব্যক্ত করিলে মতিলাল মারা যায়—তাহার কলিকাতায় থাকাও হয় না ও স্কুলে পড়াও হয় না। বেণীবাবু নিতান্ত বাসনা সে কিছু লেখাপড়া শিখিয়া কোন প্রকার মানুষ হয়।

    অনন্তর অন্যান্য প্রকার অনেক আলাপ করিয়া বেচারাম বাবুর নিকট হইতে বিদায় হইয়া বেণীবাবু মতিলালকে সঙ্গে করিয়া শরবোরণ সাহেবের স্কুলে আসিলেন। হিন্দু কলেজ হওয়াতে শরবোরণ সাহেবের স্কুল কিঞ্চিৎ মেড়ে পড়িয়াছিল এজন্য সাহেব দিন রাত্রি উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন—তাঁহার শরীর মোটা—ভুরুতে রোঁ ভরা—গালে সর্বদা পান—বেত হাতে—এক একবার ক্লাসে ক্লাসে বেড়াইতেন ও এক একবার চৌকিতে বসিয়া গুড়গুড়ি টানিতেন। বেণীবাবু তাঁহার স্কুলে মতিলালকে ভর্তি করিয়া দিয়া বালীতে প্রত্যাগমন করিলেন।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ৪. কলিকাতায় ইংরাজী শিক্ষার বিবরণ, শিশুশিক্ষার প্রকরণ, মতিলালের কুসঙ্গ ও ধৃত হইয়া পুলিশে আনয়ন।

    প্রথম যখন ইংরাজেরা কলিকাতায় বাণিজ্য করিতে আইসেন, সে সময়ে সেট বসাখ বাবুরা সওদাগরী করিতেন, কিন্তু কলিকাতার একজনও ইংরাজী ভাষা জানিত না। ইংরাজদিগের সহিত কারবারের কথাবর্তা ইশারা দ্বারা হইত। মানব স্বভাব এই যে, চাড় পড়িলেই ফিকির বেরোয়, ইশারা দ্বারাই ক্রমে ক্রমে কিছু কিছু ইংরাজী কথা শিক্ষা হইতে আরম্ভ হইল। পরে সুপ্‌রিম্ কোর্ট্ স্থাপিত হইলে, আইন-আদালতের ধাব্‌কায় ইংরাজী চর্চা বাড়িয়া উঠিল। ঐ সময় রামরাম মিশ্রী ও আনন্দিরাম দাস অনেক ইংরাজী কথা শিখিয়াছিলেন। রামরাম মিশ্রীর শিষ্য রামনারায়ণ মিশ্রী উকিলের কেরানিগিরি করিতেন ও অনেক লোকের দরখাস্ত লিখিয়া দিতেন, তাঁহার একটি স্কুল ছিল তথায় ছাত্রদিগকে ১৪/১৬ টাকা করিয়া মাসে মাহিনা দিতে হইত। পরে রামলোচন নাপিত, কৃষ্ণমোহন বসু প্রভৃতি অনেকেই স্কুল-মাস্টারগিরি করিয়াছিলেন। ছেলেরা তামস্‌ডিস্‌ পড়িত ও কথার মানে মুখস্থ করিত। বিবাহে অথবা ভোজের সভায়, যে ছেলে জাইন ঝাড়িতে পারিতে, সকলে তাহাকে চেয়ে দেখিতেন ও সাবাস বাওহা দিতেন।

    ফ্রেন্‌কো ও আরাতুন পিট্রস প্রভৃতির দেখাদেখি শরবোরণ সাহেব কিছু কাল পরে স্কুল করিয়াছিলেন। ঐ স্কুলে সম্ভ্রান্ত লোকের ছেলেরা পড়িত।

    যদি ছেলেদিগের আন্তরিক ইচ্ছা থাকে, তবে তাহারা যে স্কুলে পড়ুক আপন আপন পরিশ্রমের জোরে কিছু না কিছু অবশ্যই শিখিতে পারে। সকল স্কুলেরই দোষ গুণ আছে, এবং এমন এমন অনেক ছেলেও আছে যে এ স্কুল ভাল নয়, ও স্কুল ভাল নয় বলিয়া, আজি এখানে কালি ওখানে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়—মনে করে, গোলমালে কাল কাটাইয়া দিতে পারিলেই বাপ-মাকে ফাঁকি দিলাম। মতিলাল শরবোরণ সাহেবের স্কুলে দুই-একদিন পড়িয়া, কালুস সাহেবের স্কুলে ভর্তি হইল।

    লেখাপড়া শিখিবার তৎপর্য এই যে, সৎ স্বভাব ও সৎ চরিত্র হইবে—সুবিবেচনা জন্মিবে ও যে যে বিষয় কর্মে লাগিতে পারে, তাহা ভাল করিয়া শেখা হইবে। এই অভিপ্রায় অনুসারে বালকদিগের শিক্ষা হইলে তাহারা সর্বপ্রকারে ভদ্র হয় ও ঘরে বাহিরে সকল কর্ম ভালরূপ বুঝিতেও পরে—করিতেও পারে। কিন্তু এমত শিক্ষা দিতে হইলে, বাপ-মারও যত্ন চাই—শিক্ষকেরও যত্ন চাই। বাপ যে পথে যাবেন, ছেলেও সেই পথে যাবে। ছেলেকে সৎ করিতে হইলে, আগে বাপের সৎ হওয়া উচিত। বাপ মদে ডুবে থাকিয়া ছেলেকে মদ খেতে মানা করিলে, সে তাহা শুন্‌বে কেন? বাপ অসৎ কর্মে রত হইয়া নীতি উপদেশ দিলে, ছেলে তাকে বিড়াল তপস্বী জ্ঞান করিয়া উপহাস করিবে। যাহার বাপ ধর্মপথে চলে তাহার পুত্রের উপদেশ বড় আবশ্যক করে না—বাপের দেখাদেখি পুত্রের সৎ স্বভাব আপনা আপনি জন্মে ও মাতারও আপন শিশুর প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। জননীর মিষ্টি বাক্যে, স্নেহে এবং মুখচুম্বনে শিশুর মন যেমন নরম হয়, এমন কিছুতেই হয় না। শিশু যদি নিশ্চয়রূপে জানে যে এমন এমন কর্ম করিলে আমাকে মা কোলে লইয়া আদর করিবে না, তাহা হইলেই তাহার সৎ সংস্কার বদ্ধমূল হয়। শিক্ষকের কর্তব্য যে শিষ্যকে কতকগুলা বহি পড়াইয়া কেবল তোতা পাখী না করেন। যাহা পড়িবে তাহা মুখস্থ করিলে স্মরণশক্তির বৃদ্ধি হয় বটে, কিন্তু তাহাতে যদ্যপি বুদ্ধির জোর ও কাজের বিদ্যা না হইল, তবে সে লেখাপড়া শেখা কেবল লোক দেখাবার জন্য। শিষ্য বড় হউক বা ছোট হউক, তাহাকে এমন করিয়া বুঝাইয়া দিতে হইবেক যে, পড়াশুনাতে তাহার মন লাগে—সেরূপ বুঝান শিক্ষার সুধারা ও কৌশলের দ্বারা হইতে পারে—কেবল তাঁইস করিলে হয় না।

    বৈদ্যবাটীর বাটীতে থাকিয়া মতিলাল কিছুমাত্র সুনীতি শেখে নাই। এক্ষণে বহুবাজারে থাকিতে হিতে বিপরীত হইল। বেচারাম বাবুর দুই জন ভাগিনেয় ছিল, তাহাদের নাম হলধর ও গদাধর, তাহারা জন্মাবধি পিতা কেমন দেখে নাই। মাতার ও মাতুলের ভয়ে এক একবার পাঠশালায় গিয়া বসিত, কিন্তু সে নামমাত্র, কেবল পথে ঘাটে—ছাতে মাঠে—ছুটাছুটি হুটোহুটি করিয়া বেড়াইত। কেহ দমন করিলে দমন শুনিত না—মাকে বলিত, তুমি এমন করো তো আমরা বেরিয়ে যাব। একে চায় আরে পায়—তাহারা দেখিল মতিলালও তাহাদেরই একজন। দুই-এক দিনের মধ্যেই হলাহলি গলাগলি ভাব হইল। এক জায়গায় বসে—এক জায়গায় খায়—এক জায়গায় শোয়। পরস্পর এ ওর কাঁধে হাত দেয় ও ঘরে-দ্বারে বাহিরে-ভিতরে হাত ধরাধরি ও গলা জড়াজড়ি করিয়া বেড়ায়। বেচারাম বাবুর ব্রাক্ষ্ণণী তাহাদিগকে দেখিয়া এক এবার বলিতেন—আহা এরা যান এক মার পেটের তিনটি ভাই।

    কি শিশু কি যুবা কি বৃদ্ধ ক্রমাগত চুপ করিয়া, অথবা এক প্রকার কর্ম লইয়া থাকিতে পারে না। সমস্ত দিন রাত্রির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মে সময় কাটাইবার উপায় চাই। শিশুদিগের প্রতি এমন নিয়ম করিতে হইবেক যে তাহারা খেলাও করিবে—পড়াশুনাও করিবে। ক্রমাগত খেলা করা অথবা ক্রমাগত পড়াশুনা করা ভাল নহে। খেলাধুলা করিবার বিশেষ তাৎর্পয এই যে, শরীর তাজা হইয়া উঠিলে তাহাতে পড়াশুনা করিতে অধিক মন যায়। ক্রমাগত পড়াশুনা করিলে মন দুর্বল হইয়া পড়ে—যাহা শেখা যায় তাহা মনে ভেসে ভেসে থাকে— ভাল করিয়া প্রবেশ করে না। কিন্তু খেলারও হিসাব আছে, যে-যে খেলায় শারীরিক পরিশ্রম হয়, সেই খেলাই উপকারক। তাস পাশা প্রভৃতিতে কিছুমাত্র ফল নাই—তাহাতে কেবল অলস্য স্বভাব বাড়ে—সেই আলস্যেতে নানা উৎপাত ঘটে। যেমন ক্রমাগত পড়াশুনা করিলে পড়াশুনা ভাল হয় না, তেমন ক্রমাগত খেলাতেও বুদ্ধি হোঁতকা হয়। কেননা খেলায় কেবল শরীর সবল হইতে থাকে—মনের কিছুমাত্র শাসন হ্য় না, কিন্তু মন একটা না একটা বিষয় লইয়া অবশ্যই নিযুক্ত থকিবে, এমন অবস্থায় তাহা কি কুপথে বই সুপথে যাইতে পারে? অনেক বালক এইরূপেই অধঃপাতে গিয়া থাকে।

    হলধর, গদাধর ও মতিলাল গোকুলের ষাঁড়ের ন্যায় বেড়ায়— যাহা মনে যায় তাই করে— কাহারো কথা শুনে না— কাহাকেও মানে না। হয় তাস—নয় পাশা— নয় ঘুড়ি—পায়রা—নয় বুলবুল, একটা না একটা লইয়া সর্বদা আমোদেই আছে।

    খাবার অবকাশ নাই—শোবার অবকাশ নাই—বাটীর ভিতর যাইবার জন্য চাকর ডাকিতে আসিলে, অমনি বলে—যা বেটা যা, আমরা যাব না। দাসী আসিয়া বলে অগো মা-ঠাকুরানী যে শুতে পান না। তাহাকেও বলে—দূর হ হারামজাদী! দাসী মধ্যে মধ্যে বলে, আ মরি, কী মিষ্ট কথাই শিখেছ! ক্রমে ক্রমে পাড়ার যত হতভাগা লক্ষ্ণীছাড়া—উনপাজুরে—বরাখুরে ছোঁড়ারা জুটিতে আরম্ভ হইল। দিবারাত্রি হট্রগোল—বৈঠকখানায় কান পাতা ভার—কেবল হো হো শব্দ— হাসির গর্‌রা ও তামাক-চরস গাঁজার ছররা, ধোঁয়াতে অন্ধকার হইতে লাগিল। কার সাধ্য সে দিক দিয়া যায়— কার বাপের সাধ্য যে মানা করে। বেচারাম বাবু এক একবার গন্ধ পান—নাক টিপে ধরেন আর বলেন— দূঁর দূঁর।

    সঙ্গদোষের ন্যায় আর ভয়ানক নাই। বাপ-মা ও শিক্ষক সর্বদা যত্ন করিলেও সঙ্গদোষে সব যায়, যে স্থলে ঐরূপ যত্ন কিছুমাত্র নাই, সে স্থলে সঙ্গদোষে কত মন্দ হয়, তাহা বলা যায় না।

    মতিলাল যে সকল সঙ্গী পাইল, তাহাতে তাহার সুস্বভাব হওয়া দূরে থাকুক, কুস্বভাব ও কুমতি দিন দিন বাড়িতে লাগিল। সপ্তাহে দুই-এক দিন স্কুলে যায় ও অতিকষ্টে সাক্ষিগোপালের ন্যায় বসিয়া থাকে। হয় তো ছেলেদের সঙ্গে ফট্‌কি নাট্‌কি করে— নয় তো সিলেট লইয়া ছবি আঁকে— পড়াশুনায় পাঁচ মিনিটও মন দেয় না। সর্বদা মন উড়ু উড়ু, কতক্ষণে সমবয়সীদের সঙ্গে ধুমধাম ও আহলাদ আমোদ করিব! এমন এমন শিক্ষকও আছেন যে, মতিলালের মতো ছেলের মন কৌশলের দ্বারা পড়াশুনায় ভেজাইতে পারেন। তাঁহারা শিক্ষা করাইবার নানা প্রকার ধারা জানেন—যাহার প্রতি যে ধারা খাটে, সেই ধারা অনুসারে শিখা দেন। এক্ষণে সরকারী স্কুলে যেরূপ ভড়ুঙ্গে রকম শিক্ষা হইয়া থাকে, কালুস সাহেবের স্কুলেও সেইরূ্প শিক্ষা হইত। প্রত্যেক ক্লাসের প্রত্যেক বালকের প্রতি সমান তদারক হইত না—ভারি ভারি বহি পড়িবার অগ্রে সহজ সহজ বহি ভালরূপে বুঝিতে পারে কি-না, তাহার অনুসন্ধান হইত না—অধিক বহি ও অনেক করিয়া পড়া দিলেই স্কুলের গৌরব হইবে এই দৃঢ় সংস্কার ছিল— ছেলেরা মুখস্ত বলে গেলেই হইল, —বুঝুক না বুঝুক জানা অবশ্যক বোধ হইত না এবং কি কি শিক্ষা করাইলে উত্তরকালে কর্মে লাগিতে পারিবে তাহারও বিবেচনা হইত না। এমতো স্কুলে যে ছেলে পড়ে তাহার বিদ্যা শিক্ষা কপালের বড় জোর না হইলে হয় না।

    মতিলাল যেমন বাপের বেটা—যেমন সহবাস পাইয়াছিল—যেমন স্থানে বাস করিত—যেমন স্কুলে পড়িতে লাগিল তেমনি তাহার বিদ্যাও ভারি হইল। এক প্রকার শিক্ষক প্রায় কোনো স্কুলে থাকে না, কেহ-বা প্রাণান্তিক পরিশ্রম করিয়া মরে—কেহ বা গোঁপে তা দিয়া উপর চাল চলিয়া বেড়ায়। বটতলার বক্রেশ্বরবাবু কালুস সাহেবের সোনার কাটি রুপার কাটি ছিলেন। তিনি যাবতীয় বড় মানুষের বাটীতে যাইতেন ও সকলেকেই বলিতেন—আপনার ছেলের আমি সর্বদা তদারক করিয়া থাকি—মহাশয়ের ছেলে না হবে কেন! সে তো ছেলে নয় পরশ পাথর! স্কুলের উপর উপর ক্লাসের ছেলেদিগকে পড়াইবার ভার ছিল, কিন্তু যাহা পড়াইতেন, তাহা নিজে বুঝিতে পারিতেন কি-না সন্দেহ। এ কথা প্রকাশ হইল ঘোর অপমান হইবে, এজন্য চেপে চুপে রাখিতেন। বালকদিগকে কেবল মথন পড়ায়তেন—মানে জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, ডিক্সনেরী দেখ। ছেলেরা যাহা তরজমা করিত, তাহার কিছু না কিছু কাটাকুটি করিতে হয়, সব বজায় রাখিলে মাস্টারগিরি চলে না, কার্য শদ্ব কাটিয়া কর্ম লিখিতেন, অথবা কর্ম শব্দ কাটিয়া কার্য লিখিতেন—ছেলেরা জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, তোমরা বড় বে-আদব, আমি যাহা বলিব তাহার উপর আবার কথা কও? মধ্যে মধ্যে বড়মানুষের ছেলেদের লইয়া বড় আদর করিতেন ও জিজ্ঞাসা করিতেন—তোমাদের অমুক জায়গার ভাড়া কত—অমুক তালুকের মুনাফা কত? মতিলাল অল্প দিনের মধ্যে বক্রেশ্বরবাবুর অতি প্রিয়পাত্র হইল। আজ ফুলটি, কাল ফলটি, আজ বইখানি, কাল হাত-রুমালখানি আনিত, বক্রেশ্বরবাবু মনে করিতেন মতিলালের মত ছেলেদিগকে হাতছাড়া করা ভাল নয়—ইহারা বড় হইয়া উঠিলে আমার বেগুন ক্ষেত হইবে! স্কুলের তদারকের কথা লইয়া খুঁটিনাটি করিলে আমার কি পরকালে সাক্ষী দিবে?

    শারদীয় পূজার সময় উপস্থিত—বাজারে ও স্থানে স্থানে অতিশয় গোল—ঐ গোলে মতিলালের গোলে হরিবোল বাড়িতে লাগিল। স্কুলে থাকিতে গেলে ছটফটানি ধরে—একবার এদিগে দেখে—এবার ওদিগে দেখে—একবার বসে—একবার ডেক্স বাজায়,—এক লহমাও স্থির থাকে না। শনিবারে স্কুলে আসিয়া বক্রেশ্বরবাবুকে বলিয়া কহিয়া হাপ স্কুল করিয়া বাটী যায়। পথে পানের খিলি খরিদ করিয়া, দুই পাশে পায়রাওয়ালা ও ঘুড়িওয়ালা দোকান দেখিয়া যাইতেছে—অম্লান মুখ, কাহারও প্রতি দৃক্‌পাত নাই, ইতিমধ্যে পুলিশের একজন সারজন ও কয়েকজন পেয়াদা দৌড়িয়া আসিয়া তাহার হাত ধরিল। সারজন কহিল—তোমারা নাম পর পুলিশমে গেরেফ্‌তারি হুয়া—তোমকো জরির জানে হোগা। মতিলাল হাত বাগড়া বাগড়ি করিতে আরম্ভ করিল। সারজন বলবান—জোরে হিড় হিড় করিয়া টানায়া লইয়া যাইতে লাগিল। মতিলাল ভূমিতে পড়িয়া গেল—সমস্ত শরীরে ছড়াই গিয়া ধুলায় পরিপূর্ণ হইল, তবুও একবার ছিনিয়া পলাইতে চেষ্টা করিতে লাগিল, সারজনও মধ্যে মধ্যে দুই এক কিল ও ঘুষা মারিতে লাগিল। অবশেষে রাস্তায় পড়িয়া বাপকে স্মরণ করিয়া কাঁদিতে লাগিল, এক এক বার তাহার মনে উদয় হইল যে কেন এমন কর্ম করিয়াছিলাম—কুলোকের সঙ্গী হইয়া আমার সর্বনাশ হইল। রাস্তায় অনেক লোক জমিয়া গেল। এ ওকে জিজ্ঞাসা করে—ব্যাপারটা কি? দুই একজন বুড়ী বলাবলি কেইতে লাগিল, আহ, কার বাছাকে এমন করিয়া মারে গা—ছেলেটির মুখ যেন চাঁদের মতো—ওর কথা শুনে আমাদের প্রাণ কেঁদে উঠে।

    সূর্য অস্ত না হইতে হইতে মতিলাল পুলিশে আনীত হইল, তথায় দেখিল যে হলধর, গদাধর ও পড়ার রামগোবিন্দ, দোলগোবিন্দ প্রভৃতিকেও ধরিয়া আনিয়াছে। তাহারা সকলে অধোমুখে একপাশে দাঁড়াইয়া আছে। বেলাকিয়র সাহেব ম্যাজেস্ট্রেট—তাঁহাকে তজ্‌বিজ্‌ করিতে হইবে, কিন্তু তিনি বাটী গিয়াছেন, এজন্য সকল আসামীকে বেনিগারদে থাকিতে হইল।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ৫. বাবুরামবাবুকে সংবাদ দেওনার্থে প্রেমনারায়ণকে প্রেরণ, বাবুরামের সভাবর্ণন, ঠকচাচার পরিচয়, বাবুরামের স্ত্রীর সহিত কথোপকথন, কলিকাতায় আগমন, প্রভাতকালীন কলিকাতার বর্ণন, বাবুরামের বাঞ্ছারামের বাটীতে গমন, তথায় আত্নীয়দিগের সহিত সাক্ষাৎ ও মতিলাল সংক্রান্ত কথোপকথন।

    “শ্যামের নাগাল পালাম না গো সই—ওগো মরমেতে মরে রই”—টক্‌—টক্‌—পটাস্‌—পটাস্‌, মিয়াজান গাড়োয়ান এক একবার গান করিতেছে—টিটকারি দিতেছে ও শালার গোরু চলতে পারে না বলে লেজ মুচড়াইয়া সপাৎ সপাৎ মারিতেছে। একটু একটু মেঘ হইয়াছে—একটু একটু বৃষ্টি পড়িতেছে—গোরু দুটা হন্‌ হন্‌ করিয়া চলিয়া একখানা ছকড়া গাড়ীকে পিছে ফেলিয়া গেল। সেই ছকড়ায় প্রেমনারায়ণ মজুমদার যাইতেছিলেন—গাড়ীখানা বাতাসে দোলে—ঘোড়া দুটা বেটো ঘোড়ার বাবা—পক্ষিরাজের বংশ—টংয়স টংয়স ডংয়স ডংয়স করিয়া চলিতেছে—পটাপট্‌ পটাপট্‌ চাবুক পড়িতেছে কিন্তু কোনোক্রমেই চাল বেগড়ায় না। প্রেমনারায়ণ দুইটা ভাত মুখে দিয়া সওয়ার হইয়াছেন—গাড়ীর হোঁকোঁচ হোঁকোঁচে প্রাণ ওষ্ঠগত। গোরুর গাড়ী এগিয়ে গেল তাহাতে আরো বিরক্ত হইলেন। এ বিষয়ে প্রেমনারায়ণের দোষ দেওয়া মিছে—অভিমান ছাড়া লোক পাওয়া ভার। প্রায় সকলেই আপনাকে আপনি বড় জানে। একটুকু মনের ক্রটি হইলেই কেহ কেহ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে—কেহ কেহ মুখটি গোঁজ করিয়া বসিয়া থাকে। প্রেমনারায়ণ বিরক্ত হইয়া আপন মনের কথা আপনি বলিতে লাগিলেন—চাকরি করা ঝাক্‌মারি—চাকরে কুকুরে সমান—হুকুম করিলে দৌড়িতে হয়। মতে, হলা, গদার জ্বালায় চিরকালটা জ্বলে মরেছি—আমাকে খেতে দেয় নাই—শুতে দেয় নাই—আমার নামে গান বাঁধিত—সর্বদা ক্ষুদে পিঁপড়ার কামড়ের মতো ঠাট্টা করিত—আমাকে ত্যক্ত করিবার জন্য রাস্তার ছোঁড়াদের টুইয়ে দিত ও মধ্যে মধ্যে আপনারাও আমার পেছনে হাততালি দিয়া হো হো করিত। এ সব সহিয়া কোন্‌ ভাল মানুষ টিকিতে পারে? ইহাতে সহজ মানুষ পাগল হয়। আমি যে কলিকাতা ছেড়ে পলাই নাই এই আমার বাহাদুরি—আমার বড় গুরুবল যে অদ্যাপিও সরকারগিরি কর্মটি বজায় আছে। ছোঁড়াদের যেমন কর্ম তেমনি ফল। এখন জেলে পচে মরুক—আর যেন খালাস হয় না—কিন্তু এ কথা কেবল কথার কথা, আমি নিজেই খালাসের তদ্বিরে যাইতেছি। মানিবওয়ারি কর্ম, চারা কি? মানুষকে পেটের জ্বালায় সব করিতে হয়।

    বৈদ্যবাটীর বাবুরামবাবু বাবু হইয়া বলিয়াছেন। হরে পা টিপিতেছেন। এক পাশে দুই—একজন ভট্টাচার্য বসিয়া শাস্ত্রীয় তর্ক করতেছে—আজ লাউ খেতে আছে—কাল বেগুন খেতে নাই—লবণ দিয়ে দুগ্ধ খাইলে সদ্যগোমাংস ভক্ষণ করা হয় ইত্যাদি কথা লইয়া ঢেঁকির কচ্‌কচি করিতেছেন। এক পাশে কয়েকজন শতরঞ্চ খেলিতেছে। তাহার মধ্যে একজন খেলোয়াড় মাথায় হাত দিয়া ভাবিতেছে—তাহার সর্বনাশ উপস্থিত উঠসার কিস্তিতেই মাত। এক পাশে দুই-একজন গায়ক যন্ত্র মিলাইতেছে—তানপুরা মেঁও মেঁও করিয়া ডাকিতেছে। এক পাশে মুহুরীরা বসিয়া খাতা লিখিতেছে —সম্মুখে কর্জদার প্রজা ও মহাজন সকলে দাঁড়াইয়া আছে—অনেকের দেনা-পাওনা ডিক্রি ডিস্‌মিস হইতেছে—বৈঠকখানা লোকে থই থই করিতেছে। মহাজনেরা কেহ কেহ বলিতেছে—মহাশয় কাহারো তিন বৎসর—কাহারো চার বৎসর হইল আমরা জিনিস সরবরাহ করিয়াছি, কিন্তু টাকা না পাওয়াতে বড় ক্লেশ হইতেছে—আমরা অনেক হাঁটহাঁটি করিলাম—আমাদের কাজকর্ম সব গেল। খুচরা খুচরা মহাজনেরা যথা—তেলওয়ালা, কাঠওয়ালা, সন্দেশওয়ালা তাহারাও কেঁদে ককিয়ে কহিতেছে—মহাশয় আমরা মারা গেলাম—আমাদের পুঁটিমাছের প্রাণ—এমন করিলে আমরা—কেমন করে বাঁচিতে পারি? টাকার তাগাদা করিতে করিতে আমাদের পায়ের বাঁধন ছিড়িয়া গেল, —আমাদের দোকান-পাট সব বন্ধ হইল, মাগ ছেলেও শুকিয়ে মরিল। দেওয়ানজী এক একবার উত্তর করিতেছে—তোরা আজ যা, টাকা পাবি বই কি—এত বকিস্ কেন? তাহার উপর যে চোড়ে কথা কহিতেছে অমনি বাবুরামবাবু চোখ-মুখ ঘুরাইয়া তাহাকে গালিগালাজ দিয়া বাহির করিয়া দিতেছেন। বাঙালী বড়মানুষ বাবুরা দেশসুদ্ধ লোকের জিনিস ধারে লন—টাকা দিতে হইলে গায়ে জ্বর অইসে —বাক্সের ভিতর টাকা থাকে কিন্তু টাল-মাটাল না করিলে বৈঠকখানা লোকে সরগরম ও জমজমা হয় না। গরীব-দুঃখী মহাজন বাঁচিল কি মরিল তাহাতে কিছু এসে যায় না, কিন্তু এরূপ বড়মানুষি করিলে বাপ পিতামহের নাম বজায় থাকে। অন্য কতকগুলা ফতো বড়মানুষ আছে—তাহাদের উপরে চাকন চিকণ, ভিতরে খ্যাঁড়। বাহিরে কোঁচার পত্তন ঘরে ছুঁচার কীর্তন, আয় দেখে ব্যয় করিতে হইলেই যমে ধরে—তাহাতে বাগানও হয় না—বাবুগিরিও চলে না। কেবল চটক দেখাইয়া মহাজনের চক্ষে ধূলা দেয় —ধারে টাকা কি জিনিস পাইলে দুআওরি লয়— বড় পেড়াপীড়ি হইলে এর নিয়ে ওকে দেয় অবশেষে সমন-ওয়ারিন বাহির হইলে বিষয়-আশয় বেনামী করিয়া গা ঢাকা হয়।

    বাবুরামবাবুর টাকাতে অতিশয় মায়া—বড় হাত ভারি—বাক্স থেকে টাকা বাহির করিতে হইলে বিষম দায় হয়। মহাজনদিগের সহিত কচ্‌কচি ঝক্‌ঝকি করিতেছেন, ইতিমধ্যে প্রেমনারায়ণ মজুমদার আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং কলিকাতার সকল সমাচার কানে কানে বলিলেন। বাবুরামবাবু শুনিয়া স্তব্ধ হইয়া থাকিলেন —বোধ হইল যেন বজ্র ভাঙিয়া তাহার মাথায় পড়িল। ক্ষণেক কাল পরে সুস্থির হইয়া ভাবিয়া মোকাজান মিয়াকে ডাকাইলেন। মোকাজান আদালতের কর্মে বড় পটু। অনেক জমিদার নীলকর প্রভৃতি সর্বদা তাহার সহিত পরামর্শ করিত। জাল করিতে —সাক্ষী সাজাইয়া দিতে— দারোগা ও আমলাদিগকে বশ করিতে —গাঁতের মাল লইয়া হজম করিতে —দাঙ্গা-হাঙ্গামের জোটপাট ও হয়কে নয় করিতে নয়কে হয় করিতে তাহার তুল্য আর একজন পাওয়া ভার। তাহাকে আদর করিয়া সকলে ঠকচাচা বলিয়া ডাকিত, তিনিও তাহাতে গলিয়া যাইতেন এবং মনে করিতেন আমার শুভক্ষণে জন্ম হইয়াছে— রমজান ঈদ শবেবরাত আমার করা সার্থক — বোধ হয় পীরের কাছে কষে ফয়তা দিলে আমার কুদ্‌রত আরও বাড়িয়া উঠিবে। এই ভাবিয়া একটা বদনা লইয়া অজু করিতেছিলেন, বাবুরামবাবুর ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে তাড়াতাড়ি করিয়া আসিয়া নির্জনে সকল সংবাদ শুনিলেন। কিছুকাল ভাবিয়া বলিলেন — ডর কি বাবু? এমন কত শত মকদ্দমা মুই উড়াইয়া দিয়েছি — এ বা কোন ছার? মোর কাছে পাকা পাকা লোক আছে — তেনাদের সাথে করে লিয়ে যাব — তেনাদের জবানবন্দিতে মকদ্দমা জিত্‌ব, কিছু ডর কর না — কেল খুব ফজরে এসবো, এজ্ চললাম।

    বাবুরামবাবু সাহস পাইলেন বটে, তথাপি ভাবনায় অস্থির হইতে লাগিলেন। আপনার স্ত্রীকে বড় ভালবাসিতেন, স্ত্রী যাহা বলিতেন সেই কথাই কথা — স্ত্রী যদি বলিতেন এ জল নয় — দুধ, তবে চোখে দেখিলেও বলিতেন এ জল নয় — এ দুধ — না হলে গৃহিণী কেন বলবেন? অন্যান্য লোকে আপন আপন পত্নীকে ভালবাসে বটে, কিন্তু তাহারা বিবেচনা করিতে পারে যে স্ত্রীর কথা কোন্ বিষয়ে ও কতদূর পর্যন্ত শুনা উচিত। সুপুরুষ আপন পত্নীকে অন্তকরণের সহিত ভালবাসে কিন্তু স্ত্রীর সকল কথা শুনিতে গেলে পুরুষকে শাড়ী পরিয়া বাটীর ভিতর থাকা উচিত। বাবুরামবাবু স্ত্রী উঠ বলিলে উঠিতেন — বস বলিলে বসিতেন। কয়েক মাস হইল গৃহিণীর একটি নবকুমার হইয়াছে — কোলে লইয়া আদর করিতেছেন — দুই দিকে দুই কন্যা বসিয়াছে, ঘরকন্নার ও অন্যান্য কথা হইতেছে, এমতো সময়ে কর্তা বাটীর মধ্যে গিয়ে বিষণ্ণভাবে বসিলেন এবং বলিলেন—গিন্নী! আমার কপাল বড় মন্দ—মনে করিয়াছিলাম মতি মানুষমুনুষ হইলে তাহাকে সকল বিষয়ের ভার দিয়া আমরা কাশীতে গিয়া বাস করিব, কিন্তু সে আশায় বুঝি বিধি নিরাশ করলেন।

    গৃহিণী। ওগো—কি—কি—শীঘ্র বলো, কথা শুনে যে আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল—আমার মতি তো ভাল আছে?

    কর্তা। হাঁ—ভাল আছে—শুনিলাম পুলিশের লোক আজ তাহাকে ধরে হিঁচুড়ে লইয়া গিয়া কায়েদ করিয়াছে।

    গৃহিণী। কি বল্লে?—মতিকে হিঁচুড়িয়া লইয়া গিয়া কায়েদ করিয়াছে? ওগো, কেন কয়েদ করেছে? আহা বাছার গায়ে কতই ছড় গিয়াছে, বুঝি আমার বাছা খেতেও পায় নাই—শুতেও পায় নাই! ওগো কি হবে? আমার মতিকে এখুনি আনিয়া দাও।

    এই বলিয়া গৃহিণী কাঁদিতে লাগিলেন—দুই কন্যা চক্ষের জল মুছাইতে মুছাইতে নানা প্রকার সান্ত্বনা করিতে আরম্ভ করিল। গৃহিণীর রোদন দেখিয়া কোলের শিশুটিও কাঁদিতে লাগিল।

    ক্রমে ক্রমে কথাবার্তার ছলে কর্তা অনুসন্ধান করিয়া জানিলেন মতিলাল মধ্যে মধ্যে বাড়িতে আসিয়া মায়ের নিকট হইতে নানা প্রকার ছল করিয়া টাকা লইয়া যাইত। গৃহিণী এ কথা প্রকাশ করেন নাই—কি জানি কর্তা রাগ করিতে পারেন—অথচ ছেলেটিও আদুরে—গোসা করিলে পাছে প্রমাদ ঘটে। ছেলেপুলের সংক্রান্ত সকল কথা স্ত্রীলোকদিগের স্বামীর নিকট বলা ভাল। রোগ লুকাইয়া রাখিলে কখনই ভাল হয় না। কর্তা গৃহিণীর সহিত অনেকক্ষণ পর্যন্ত পরামর্শ করিয়া পরদিন কলিকাতার যে স্থানে যাইবেন তথায় আপনার কয়েকজন আত্মীয়কে উপস্থিত হইবার জন্য রাত্রিতেই চিঠি পাঠাইয়া দিলেন।

    সুখের রাত্রি দেখিতে দেখিতে যায়। যখন মন চিন্তার সাগরে ডুবে থাকে তখন রাত্রি অতিশয় বড় বোধ হয়। মনে হয় রাত্রি পোহাইল কিন্তু পোহাইতে পোহাইতেও পোহায় না। বাবুরামবাবুর মনে নানা কথা, নানা ভাব, নানা কৌশল, নানা উপায় উদয় হইতে লাগিল। ঘরে আর স্থির হইয়া থাকিতে পারিলেন না, প্রভাত না হইতে ঠকচাচা প্রভৃতিকে লইয়া নৌকায় উঠিলেন। নৌকা দেখিতে দেখিতে ভাঁটার জোরে বাগবাজারের ঘাঁটে আসিয়া ভিড়িল। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়াছে—কলুরা ঘানি জুড়ে দিয়েছে—বলদেরা গোরু লইয়া চলিতেছে—ধোবার গাধা থপাস থপাস করিয়া যাইতেছে—মাছের ও তরকারির বাজরা হু-হু করিয়া আসিতেছে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা কোশা লইয়া স্নান করিতে চলিয়াছেন—মেয়েরা ঘাটে সারি সারি হইয়া পরস্পর মনের কথাবার্তা কহিতেছে। কেহ বলিছে, বাপ ঠাকুরঝির জ্বালায় প্রাণটা গেল—কেহ বলে, আমার শাশুড়ী মাগী বড় বৌকাঁটকি—কেহ বলে, দিদি, আমার আর বাঁচতে সাধ নাই—বৌছুঁড়ী আমাকে দু’পা দিয়া থেত্লায়, বেটা কিছুই বলে না; ছোঁড়াকে গুণ করে ভেড়া বানিয়েছে—কেহ বলে, আহা অমন পোড়া জাও পেয়েছিলাম দিবারাত্রি আমার বুকে বসে ভাত রাঁধে,—কেহ বলে, আমার কোলের ছেলেটির বয়স দশ বৎসর হইল— কবে মরি কবে বাঁচি এই বেলা তার বিয়েটি দিয়ে নি।

    এক পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আকাশে স্থানে স্থানে কানা মেঘ আছে। রাস্তাঘাট সেঁত সেঁত করিতেছে। বাবুরামবাবু এক ছিলিম তামাক খাইয়া একখানা ভাড়া গাড়ী অথবা পাল্কির চেষ্টা করিতে লাগিলেন কিন্তু ভাড়া বনিয়া উঠিল না—অনেক চড়া বোধ হইল। রাস্তায় অনেক ছোঁড়া একত্র জমিল। বাবুরামবাবুর রকম সকম দেখিয়া কেহ কেহ বলিল—ওগো বাবু, ঝাঁকা মুটের উপর বসে যাবে? তাহা হইলে দু-পয়সায় হয়। তোর বাপের ভিটে নাশ করেছে—বলিয়া যেমন বাবুরাম দৌড়িয়া মারিতে যাবেন অমনি দড়াম করিয়া পড়িয়া গেলেন। ছেঁড়াগুলো হো হো করিয়া দূরে থেকে হাততালি দিতে লাগিল। বাবুরামবাবু অধোমুখে শীঘ্র একখানা লকাটে রকম কেরাঞ্চিতে ঠকচাচা প্রভৃতিকে লইয়া উঠিলেন এবং খন্ খন্ ঝন্ ঝন্ শব্দে বাহির সিমলের বাঞ্ছারামবাবুর বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বাঞ্ছারামবাবুর বৈঠকখানায় উকিল বটলর সাহেবের মুৎসুদ্ধি—আইন-আদালত মামলা-মকদ্দমায় বড় ধড়িবাজ। মাসের মাহিনা ৫০ টাকা কিন্তু প্রাপ্তির সীমা নাই, বাটীতে নিত্য ক্রিয়াকাণ্ড হয়। তাহার বৈঠকখানায় বালীর বেণীবাবু, বহুবাজারের বেচারাম বাবু, বটতলার বক্রেশ্বরবাবু আসিয়া অপেক্ষা করিয়া বসিয়াছিলেন।

    বেচারাম। বাবুরাম। ভাল দুধ দিয়া কালসাপ পুষিয়াছিলে। তোমাকে পুনঃপুনঃ বলিয়া পাঠাইয়াছিলাম আমার কথা গ্রাহ্য করো নাই—ছেলে হতে ইহকালও গেল—পরকালও গেল। মতি দেদার মদ খায়—জোয়া খেলে—অখাদ্য আহার করে। জোয়া খেলিতে খেলিতে ধরা পড়িয়া চৌকিদারকে নির্ঘাত মারিয়াছে। হলা, গদা ও আর-আর ছোঁড়ারা তাহার সঙ্গে ছিল। আমার ছেলেপুলে নাই। মনে করিয়াছিলাম হলা ও গদা এক গণ্ডুষ জল দিবে এখন সে গুড়ে বালি পড়িল। ছোঁড়াদের কথা আর কি বলিব? দূঁর দূঁর।

    বাবুরাম। কে কাহাকে মন্দ করিয়াছে তাহা নিশ্চয় করা বড় কঠিন —এক্ষণে তদ্বিরের কথা বলুন।

    বেচারাম। বাবুরাম যা ইচ্ছা তাই করো—আমি জ্বালাতন হইয়াছি—রাত্রে ঠাকুরঘরের ভিতর যাইয়া বোতল বোতল মদ খায়—চরস গাঁজার ধোঁয়াতে কড়িকাট কালো করিয়াছে—রূপা-সোনার জিনিস চুরি করিয়া বিক্রি করিয়াছে। আবার বলে একদিন শালগ্রামকে পোড়াইয়া চুন করিয়া পানের সঙ্গে খাইয়া ফেলিব। আমি আবার তাহাদের খালাসের জন্য টাকা দিব? দূঁর দূঁর।

    বক্রেশ্বর। মতিলাল এত মন্দ নহে—আমি স্বচক্ষে স্কুলে দেখিয়াছি তাহার স্বভাব বড় ভাল —সে তো ছেলে নয়, পরেশ পাথর, তবে এমনটা কেন হইল বলতে পারি না।

    ঠকচাচা। মুই বলি এসব ফেল্‌ত বাতের দরকার কি? ত্যাল-খেড়ের বাতেতে কি মোদের প্যাট ভরবে? মকদ্দমাটার বনিয়াদটা পেকড়ে সেজিয়া ফেলা যাওক।

    বাঞ্ছারাম। (মনে মনে বড় আহলাদ—মনে করিতেছেন বুঝি চিড়া-দই পেকে উঠিল) কারবারী লোক না হইলে কারবারের কথা বুঝে না। ঠকচাচা যাহা বলিতেছেন তাহাই কাজের কথা। দুই-একজন পাকা সাক্ষীকে ভাল তালিম করিয়া রাখিতে হইবে—আমাদিগকে বটলর সাহেবকে উকিল ধরিতে হইবে—তাতে যদি মকদ্দমা জিত না হয় তবে বড় আদালতে লইয়া যাব—বড় আদালতে কিছু না হয়—কৌন্সেল পর্যন্ত যাব,—কৌন্সেলে কিছু না হয় তো বিলাত পর্যন্ত করিতে হইবে। এ কি ছেলের হাতে পিটে? কিন্তু আমাদিগের বটলর সাহেব না থাকিলে কিছুই হইবে না। সাহেব বড় ধমিষ্ঠ—তিনি অনেক মকদ্দমা আকাশে ফাঁদ পাতিয়া নিকাশ করিয়াছেন আর সাক্ষীদিগকে যেন পাখী পড়াইয়া তইয়ার করেন।

    বক্রেশ্বর। আপদে পড়িলেই বিদ্যা-বুদ্ধির আবশ্যক হয়। মকদ্দমার তদ্বির অবশ্যই করিতে হইবেক। বেতদ্বিরে দাঁড়াইয়া হারা ও হাততালি খাওয়া কি ভাল?

    বাঞ্ছারাম। বটলর সাহেবের মতো বুদ্ধিমান উকিল আর দেখতে পাই না। তাঁহার বুদ্ধির বলিহারি যাই। এ সকল মকদ্দমা তিনি তিন কথাতে উড়াইয়া দিবেন। এক্ষণে শীঘ্র উঠুন—তাঁহার বাটিতে চলুন।

    বেণী। মহাশয় আমাকে ক্ষমা করুন। প্রাণ বিয়োগ হইলেও অধর্ম করিব না। খাতিরে সব কর্ম করতে পারি কিন্তু পরকালটি খোয়াইতে পারি না। বাস্তবিক দোষ থাকলে দোষ স্বীকার করা ভাল—সত্যের মার নাই—বিপদে মিথ্যা পথ আশ্রয় করিলে বিপদ বাড়িয়া উঠে।

    ঠকচাচা। হা-হা-হা-হা—মকদ্দমা করা কেতাবী লোকের কাম নয়—তেনারা একটা ধাব্‌কাতেই পেলিয়ে যায়। এনার বাত মাফিক কাম করলে মোদের মেটির ভিতর জলদি যেতে হবে—কেয়া খুব।

    বাঞ্ছারাম। আপনাদের সাজ করিতে দোল ফুরাল। বেণীবাবু স্থিরপ্রজ্ঞ —নীতিশাস্ত্রে জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, তাঁহার সঙ্গে তখন একদিন বালীতে গিয়া তর্ক করা যাইবেক। এক্ষণে আপনারা গাত্রোত্থান করুন।

    বেচারাম। বেণীভায়া! তোমার যে মত আমার সেই মত—আমার তিন কাল গিয়েছে—এককাল ঠেকেছে, আমি প্রাণ গেলেও অধর্ম করিব না—আর কাহার জন্যে বা অধর্ম করিব? ছোঁড়ারা আমার হাড় ভাজা ভাজা করিয়াছে—তাদের জন্যে আমি আবার খরচ করিব—তাদের জন্য মিথ্যা সাক্ষী দেওয়াইব? তাহারা জেলে যায় তো এক প্রকার আমি বাঁচি। তাদের জন্যে আমার খেদ কি? তাদের মুখ দেখিলে গা জ্বলে উঠে—দূঁর দূঁর!!!

  • বাবরের আত্মকথা

    বাবরের আত্মকথা

    বাবরের আত্মকথা

    জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর, ভারতবর্ষের মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুর পর মাত্র বার বৎসর বয়সে ফারগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন। পারস্যের পূর্ব সীমান্তের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য যা বর্তমানে চীনা তুর্কিস্থানের আওতাভূক্ত। রাজধানী ছিল আন্দেজান। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফারগানা থেকে বিতাড়িত হন। তবে ১৫০৪ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে দখল করেন কাবুল। এরপর সমরখন্দ দখলের চেষ্টা করেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে ভারতের দিকে মন দেন। ভারতে তখন লোদী বংশের শাসন হলেও বিভিন্ন অঞ্চল ছিল প্রায় স্বাধীন। ১৫২৪ সালে বাবর প্রথম লাহোর দখল করেন। কিন্তু ফিরে যেতে বাধ্য হন। ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন।

    জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালে; তিনি বেঁচে ছিলেন ৪৮ বছর, এর মধ্যে রাজত্ব করেছেন ৩৬ বছর।  রাজা হবার পর ভারতজয় পর্যন্ত মোটামুটি সব ঘটনাই আত্মচরিতে লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি।

    “রজব মাসের আঠাশে তারিখ বৃহস্পতিবার বৈকালিক নামাজের সময় আমি আগ্রাতে প্রবেশ করি। সুলতান ইব্রাহিমের প্রাসাদেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়।

    ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে আমি যখন কাবুল জয় করি, সেইসময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত তখনি সর্বদাই এই আশা পোষণ করে এসেছি যে হিন্দুস্থান আমি জয় করবই করব। কিন্তু কখনও কখনও আমার আমীরদের অসদাচরণ— কারণ আমার ভারত জয়ের অভিলাষ তাদের মনোঃপুত ছিল না— এবং কখনও কখনও আমার ভাইদের গুপ্ত ষড়যন্ত্র ও বিরুদ্ধতা আমাকে এই দেশ জয় করার জন্য অভিযান চালান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে। ফলে, হিন্দুস্থানের প্রদেশগুলি এতদিন আমার আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল। অবশেষে এইসব বাধা দূর হল। এখন ছোট বড় ধনী নির্ধন, সাধারণ এমন কেউ নেই যে আমার এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে একটি কথাও উচ্চারণ করার সাহস রাখে।”

    তিনি আরো লিখেছিলেন, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও বিশ্বাসই তাঁকে হিন্দুস্থান দখলে সহায়তা করেছে। “তারই কৃপায় আমি পরাক্রমশালী শত্রুকে পরাজিত করে এই বিশাল হিন্দুস্থান জয় করার গৌরব লাভ করেছি। এই কৃতকার্যতা আমার নিজ শক্তিতে হয়েছে কিংবা আমার এই সৌভাগ্য আমার নিজের চেষ্টায় লাভ করেছি একথা আমি কখনই মনে করি না।”

    ১৫২৬ থেকে পরবর্তী চার বছরে বাবর দৃঢ়ভাবে তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার বিস্তার ছিল আফগানিস্তান থেকে বাংলা। হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত।

    বাবর মারা যান ১৫৩০ সালে। এ সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনি হল— তাঁর পুত্র হুমায়ুন রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। বাবর তিনবার তার শয্যা প্রদক্ষিণ করে আল্লাহর কাছে এই ফরিয়াদ করেন যেন পুত্রের রোগ পিতার ওপর বর্তায়। হুমায়ুন সুস্থ হয়ে উঠতে থাকেন, বাবর রোগাক্রান্ত হন এবং সুস্থ হয়ে তিনি আর ওঠেননি। গুলবদন এই তথ্য দিয়েছেন। তবে ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ মনে করেন, হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠার পর বাবর দু’ থেকে তিন মাস অসুস্থ ছিলেন। রামশরণ শর্মা মনে করেন, ইব্রাহিম লোদির মা তাঁকে বিষ খাইয়েছিলেন। গুলবদনও তা লিখেছেন।

    শচীন্দ্রনাথ রায় বাবরের আত্মজীবনী অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজি ভাষ্য থেকে। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে কলকাতা থেকে তা প্রকাশিত হয়েছিল। শচীন্দ্রনাথ তাঁর ভূমিকায় এই আত্মজীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন যার বাবর একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত টিকেছিল।

     বাবর ছিলেন একাধারে বীর সৈনিক ও সুচতুর রাজনীতিবিদ। শুধু তাই নয়—তিনি ছিলেন দার্শনিক এবং কবি। ফারসী ভাষায় লেখা তাঁর কবিতাগুলি সুন্দর। তুর্কি ভাষাতে গদ্য ও পদ্য রচনায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তিনি। তিনি শিকারে পারদর্শী ছিলেন। উদ্যান রচনায় তার অনেক অর্থ ও সময় ব্যয় হত। তিনি পুষ্প-বিলাসী ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেই অনেক সময় ফুলের বাগানে প্রবেশ করতেন এবং একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যেতেন। তাঁর লেখায় যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনার পাশেই ফুলের বিবরণ দেখা যায়। তাঁর পরিবার পরিজনের প্রতি ব্যবহার প্রীতিপূর্ণ ছিল। বীর ছিলেন, কিন্তু নির্মম ছিলেন না তিনি।

    সুতরাং তিনি যে ভাল যোদ্ধা ছিলেন সে সম্পর্কে বিতর্ক নেই। কিন্তু তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই বাবরী তাকে অমর করে রেখেছে। উল্লেখ্য, বাবর তাঁর মাতৃভাষা তুর্কিতে আত্মজীবনী লিখেছিলেন যার সাহিত্য গুণও অনন্য। মোঘলদের আর যারা আত্মজীবনী লিখেছেন, তাঁরা লিখেছেন ফার্সিতে।

    এই আত্মজীবনী ফার্সি ভাষায় প্রথম দু’বার অনূদিত হয়। অনুবাদ করেন পায়েন্দা খান ও আবদুর রহিম খানই খানান।

    তারপর ফরাসি, ওলন্দাজ, ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থটি অনূদিত হয়। তবে বেভারিজের করা অনুবাদকে প্রামাণ্য বলে মনে করা হয়, কারণ তিনি তুর্কি থেকে অনুবাদ করেছিলেন যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২১ সালে। অন্যরা অনুবাদ করেছিলেন ফারসি থেকে।

    শচীন্দ্রলাল রায় অনূদিত ‘বাবরের আত্মকথা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মিত্র ও ঘোষ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা ১২; প্রকাশক এস. এন. রায়। মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীফণিভূষণ হাজরা, গুপ্তপ্রেস, ৩৭/৭ বেনিয়াটোলা লেন, কলিকাতা।

    সাড়ে পাঁচ টাকা মূল্যমানের বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কানাই পাল, এবং প্রচ্ছদ মুদ্রিত হয়েছিল ‘ফোটোটাইপ সিণ্ডিকেট’ থেকে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করে অনুবাদক লিখেছিলেন—

    বকু, নারায়ণকে

    —বড়দাদা

  • ঊনপঞ্চাশী

    ঊনপঞ্চাশী

    ঊনপঞ্চাশী

    ‘শ্রীউপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ রচিত রম্যগল্পগ্রন্থ ‘ঊনপঞ্চাশী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৯ বঙ্গাব্দ মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দে। প্রকাশক শ্রীনৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১২ নং রমরতন বোস লেন, শ্যামবাজার, কলিকাতা। গ্রন্থটির মূল্য ছিল ১৷৽ পাঁচ সিকা। ‘ঊনপঞ্চাশী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে। প্রকাশক শ্রীবরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, আত্মশক্তি লাইব্রেরী, ১৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।

    ‘উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ (৬ জুন ১৮৭৯—৪ এপ্রিল ১৯৫০) একজন বাঙালি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, সম্পাদক ও লেখক। তাঁর রচিত বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হল ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’। অন্তঃপুরে সাধক, প্রথম গুণের লেখক এবং জন্মগত দেশপ্রেমিক ছিলেন উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯০৮ সালের ২ মে মানিকতলা গার্ডেন হাউস থেকে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও অন্যান্যদের সঙ্গে মুজাফফরপুর বোমা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

    হুগলি জেলার চন্দননগরের গোন্দলপাড়ায় ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন উপেন্দ্রনাথ। অল্প বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে ভারবর্ষের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান, পরে আবার সংসারে ফিরে আসেন। উপেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত রমানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র। চন্দননগরের ডুপ্লে কলেজ থেকে এফ. এ. পাশ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে যোগ দিলেও ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্য পড়া শেষ করতে পারেন নি। কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। কলকাতার ডাফ কলেজে বি. এ. পাঠরত অবস্থায় ‘যুগান্তর’ দলের সংস্পর্শে আসেন। ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের সময় তিনি ‘যুগান্তর’ ও ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯০৭ সালে বিখ্যাত আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় মানিকতলার বাগানবাড়ী থেকে অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কানাইলাল দত্ত, দেবব্রত বসু, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল ও আরও অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে উপেন্দ্রনাথও ধরা পড়েন। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সেলুলার জেলে তাঁর দীর্ঘ বারো বছর কারাবাসের কাহিনী নিয়ে লেখেন নির্বাসিতের আত্মকথা বইটি। মুক্তি লাভের পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নারায়ণ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন, বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সঙ্গে বিজলী পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর পর তিনি নিজ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক আত্মশক্তি। দেশ বিরোধী লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার আবার উপেন্দ্রনাথকে ৩ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। ১৯২৬-এ মুক্ত পেয়ে ফরোয়ার্ড, লিবার্টি, অমৃতবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ করতেন। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে আমৃত্যু তিনি দৈনিক বসুমতী পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। শেষ জীবনে হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত হন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন, এর মধ্যে ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’ সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হল — উনপঞ্চাশী, পথের সন্ধান, ধর্ম ও কর্ম, স্বাধীন মানুষ, জাতির বিড়ম্বনা, ভবঘুরের চিঠি, অনন্তানন্দের পত্র, বর্তমান জগত ইত্যাদি।

  • ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    [writer]

    তাঁর পূর্বসূরী বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে ইতিহাস বর্ণময় হয়ে উঠেছিল, আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে ইতিহাস গল্পময়। ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসের লেখক হিসেবে শরদিন্দুর নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের পরেই উচ্চারিত। ‘বহু দূরকালের সামান্য কয়খানা ঘটনার কঙ্কালের মধ্যে তিনি প্রতিভার মন্ত্রবলে প্রাণসঞ্চার’ করে যে-কালজয়ী আখ্যানমালা রচনা করেছিলেন তা যেন সর্বকালের ‘ঐতিহাসিক’ সম্পদ।

    ইতিহাস সম্পর্কে শরদিন্দুর আজন্ম আগ্রহ ছিল। তিনি ছিলেন ভারতের অতীত ইতিহাসের একনিষ্ঠ পাঠক। ফলে, প্রায় লেখকজীবনের গোড়া থেকেই তিনি ইতিহাসের ভেতরে গল্পের অনুসন্ধান করেছেন, ইতিহাসকে গল্পের ভেতরে বন্দি করেছেন অভিনব কৌশলে। সুকুমার সেন দেখিয়েছেন : ‘প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত শরদিন্দুবাবুর ঐতিহাসিক গল্পের কালপ্রসার। এর মধ্যে কোথাও গল্পের পরিবেশ গল্পরসের তীক্ষ্ণতার হানি করেনি। দূরের দৃশ্যপটকে নিকটে এনে দূরের মানুষকে কাছের মানুষ করতে পেরেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।’

    এই বিষয়ে তিনি ছিলেন সার্থক ও সতর্ক স্রষ্টা। এক সাক্ষাৎকারে শরদিন্দু বলেছিলেন : ‘ইতিহাস থেকে চরিত্রগুলো কেবল নিয়েছি; কিন্তু গল্প আমার নিজের। সর্বদা লক্ষ্য রেখেছি কি করে সেই যুগকে ফুটিয়ে তোলা যায়। যে সময়ের গল্প তখনকার রীতি নীতি, আচার ব্যবহার, অস্ত্র, আহার, বাড়িঘর ইত্যাদি খুঁটিনাটি সব জানা না থাকলে যুগকে ফুটিয়ে তোলা যায় না। এরপর আছে ভাষা। ঐতিহাসিক গল্পের ভাষাও হবে যুগোপযোগী।’

    রহস্য সন্ধানী ব্যোমকেশ বক্সীর অমর স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিহাস-আশ্রিত গল্প-উপন্যাসে কাহিনী ও ইতিহাস যুগপৎ ‘জীবন্ত’ হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধযুগ, গৌড়বঙ্গ, চৈতন্যযুগ, প্রাক-মুঘল কিংবা মুঘল যুগ অথবা অদূর অতীতের পোর্তুগীজ-ইংরেজ অধিকৃত বাংলার সমকাল দুর্নিবার হয়ে উঠেছে কল্পনা ও বর্ণনার অশেষ গুণে, রচনা ও গল্পরসের অনিবার্য সৃষ্টিতে। তিনি বলতেন : ‘ইতিহাসের গল্প লিখেই বেশি তৃপ্তি পেয়েছি।’ পরিশ্রমী সম্পাদনায় দুই মলাটের মধ্যে সাজিয়ে দেওয়া শরদিন্দুর সমস্ত ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস (পাঁচটি) এবং গল্প (সতেরোটি) পাঠকদেরও তৃপ্তি দেবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

    প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৯৮

    প্রচ্ছদ: সুব্রত চৌধুরী

    অলংকরণ: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

    প্রকাশকের নিবেদন

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমুদয় ঐতিহাসিক গল্প ও উপন্যাস ইতিপূর্বে প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ ও তৃতীয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এই কাহিনীগুলি একত্রে বর্তমানে ‘ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র’ নামে প্রকাশিত হল।

    শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ খণ্ডে সুকুমার সেন মহাশয়ের লেখা ভূমিকার ঐতিহাসিক গল্প সম্পর্কে মন্তব্য-অংশটি বর্তমান সঙ্কলনের পরিশিষ্ট অংশে পুনর্মুদ্রিত হল।

  • কল্লোল যুগ

    কল্লোল যুগ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    কল্লোল যুগ

    ‘কল্লোল যুগ’ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত কল্লোল যুগ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশ, আশ্বিন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ; প্রকাশক, শমিত সরকার, এম. সি. সরকার অ্যাণ্ড সন্স প্রাইভেট লি., ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৭৩। মুদ্রক, সাধনকুমার গুপ্ত, শ্রীরাধাকৃষ্ণ প্রিণ্টিং, ২১ বি, রাধানাথ বোস লেন, কলিকাতা ৬।

    উৎসর্গ

    দীনেশরঞ্জন দাস

    গোকুলচন্দ্র নাগের

    উদ্দেশে উৎসর্গ

  • ঈশ্বরের বাগান

    ঈশ্বরের বাগান

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পৃথিবীপৃষ্ঠের পাঁচ ভাগের চার ভাগই জল। অলৌকিক জলযানে চড়ে সেই জল, সমুদ্র পেরিয়ে আমাদের ছোটবাবু অবশেষে ভিড়ল সেই একাংশ ভূমিতে, যেন ঈশ্বরের বাগানে।

    শৈশবে সোনা, কৈশোরে বিলু, জাহাজী জীবনে সে সোনাবাবু, যৌবনে থিতু হয়ে গেল শেষে এক টুকরো জমিতে, অতীশ দীপঙ্কর পরিচয়ে। এই বাগানের জীবন যুদ্ধে তার নানা ভূমিকা। বাবা-মায়ের মেজ সন্তান, দুই ছেলে মেয়ের পিতা, এক নারীর স্বামী, তাছাড়াও কারখানার ম্যানেজার, এভাবে সে বিভিন্নজনের অবলম্বন।

    একটা সময়, যখন সে ছিল ছোটবাবু, বনিকে সমুদ্র পার করে ডাঙ্গায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল তার, এখনো মনে হয় চারিদিকে সমুদ্রের মাঝে বোট নিয়ে ডাঙার সন্ধানে হাল ধরে আছে সে, কিন্তু এবার বোটে বনি নেই, এবার ডাঙায় পৌঁছে দিতে হবে মিন্টু, টুটুল, নির্মলাকে। সে জীবনে, জাহাজের কাপ্তান ছিল স্যালি হিগিনস, এখন জাহাজের কাপ্তান সে নিজেই।

    উপন্যাসের বিভিন্ন প্লটকে জোড়া দিয়েছে অতীশ। অতীশের সংসার যুদ্ধ দিয়ে আরম্ভ, তারপর এসেছে নীতির যুদ্ধ, কখনো বা ঈশ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ। সব যুদ্ধ সামাল দিয়ে অতীশ ফিরে গেছে সুদূর অতীতের স্মৃতিতে, আবার খুলেছে দেওয়া-নেওয়ার সেই জীর্ণ খাতাটা। মিলিয়ে দেখছে ঈশ্বরের এই বাগানে কার কতটুকু অধিকার, কারোই কি হার-জিত হয় এই যুদ্ধে?

    জীবিকার নিমিত্তে কলকাতা শহরে কারখানার ম্যানেজারের কাজ নেয় অতীশ। শৈশব কেটেছে যার সোনালি বালির নদীর চরে, অসীম সমুদ্র ও বিস্তৃত আকাশের মাঝে যার যৌবনের প্রাক্কাল, কলকাতা শহরের এই কড়ায়-গণ্ডায় জীবন তার কাছে কোলাহলের মতো লাগে। লেখার মাঝে এই কোলাহল, ফুটপাতের নোংরা আবর্জনা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ময়লার স্তুপে ঝুপড়ি গেড়ে পাগলের বাস; নগ্ন শ্বেতাঙ্গ নারী-মূর্তি, অয়েল পেইন্টিং এ সাজানো অভিজাত বসবার ঘর — দুয়ের মাঝে শুধু একটা প্রাচীর। দু’জনে বেশ আছে দিব্যি। মাঝে মাঝে যখন নর্দমার মাছি সুগন্ধে ভরা অভিজাত ঘরে প্রবেশ করে, তখন দেখা যায় খানিকটা ত্রাস।

    জীবনের গতি প্রচণ্ড এখানে। ব্যয়ের গতি যদি ছাড়িয়ে যায় আয়ের গতিকে, তবেই গণ্ডগোল। এছাড়াও আছে সন্তানকে বড় স্কুলে ভর্তি করার প্রতিযোগিতা। বাইরের ঘরে একটা তক্তপোষ, শোবার ঘরে একটা বড় আয়না— এমনই বেড়েই চলেছে জীবনে অভাবের লিস্টি। কারখানার উপার্জন সীমিত, লেখালিখি থেকে হাতে একটা অঙ্ক আসে অতীশের।

    দেশভাগের এই চতুর্থ ও শেষ উপন্যাসে লেখক যেন আরো বেশি করে ব্যক্তিসত্তার মধ্যে ডুবে গেছেন। বলে দিতে হয় না এই অতীশ দীপঙ্কর যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। উপন্যাসের নায়ক অতীশকে তিনি যত পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন, সেসব নিজেই পার করে এসেছেন জীবনের বিভিন্ন অঙ্কে।

    বিভিন্ন নারীকে পরিক্রমণ করে আমাদের এই উপন্যাসের নায়কের জীবন। যৌবনে সেই পরিক্রমণ আরও গভীর। তার সৌম্য চেহারা, নম্র আচরণ আকর্ষণ করে চারপাশের নারীদের। বহু নায়িকা তাই তার এই জীবন নামের উপন্যাসে।

    বারবার লেখক নারী-পুরুষের কামপ্রবৃত্তিকে তুলে এনেছেন। আমাদের এই উপমহাদেশে চায়ের টেবিলে আলোচনায় সে প্রসঙ্গ আসে না, অথচ মানুষের শরীরের রন্ধে রন্ধে যে গোপন আকাঙ্ক্ষা সূচ ফুটায় লেখক বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

    অথচ এত গোপন এই কর্মধারা, জীবনের চলাফেরায় তার কোনো অস্তিত্ব আছে মনে হয় না। কিংবা মুখোশ পরে থাকা সংসারে, আসলে সেই প্রবল ইচ্ছের তাড়নাতেই মানুষের এই ধর্মশাস্ত্র, বীজ বপন এবং আবাদ।

    বড় ভাল লেগেছে এই জায়গাটা। হাওয়াকে সৃষ্টি না করলে আদম কি সেই পাপে জড়াত?

    কুম্ভবাবুর চরিত্রটা নজর কাড়ে। আমিও যেন সংসারে এমন প্রচুর মানুষ দেখলাম। কর্তাব্যক্তিদের সাথে হে হে করে আলাপ করে যারা পকেটে টাকা গোছাচ্ছে। অত্যন্ত আপনার মত ব্যবহার, কিন্তু কি, পকেটে টাকা পুরার গ্রিডি আলগরিদম ছাড়া মগজে আর কিছুই নেই।

    সংসার, দাম্পত্য ছাড়িয়ে উপন্যাস মোড় পাল্টায়। বিদেশি আলোকচিত্রের একটা প্রদর্শনী। অ আজার বালথাজার। ফরাসি চলচ্চিত্রটির কিছুই অনুধাবন করতে পারে না অতীশ। না পারলেও দর্শকসারিতে খুঁজে পায় অতীতের একটি দরজা। বর্তমানে কি অতীতের প্রশ্নের উত্তর মেলে। নাকি জীবনটাই সেই সিনেমার মতোন, অনুধাবনের অতীত।

    অ আজার বালথাজার।

    হিন্দুর বাড়িতে মুসলিমের প্রবেশ বারণ, আবার হিন্দু সম্প্রদায়কে ছাড়তে হ’ল দেশ। আমরা কি কারো প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি? যে ঈশ্বরের জন্য আমরা পরস্পরকে ঘৃণা করেছি, কোথায় পেয়েছি তার সান্নিধ্য… ধর্মভীরু পিতার সন্তান অতীশ। যৌবন ছুঁতেই তার ঈশ্বর বিশ্বাস ফেটে চৌচির। কুম্ভ বাবু আপনার তো ঈশ্বর আছে আমার তাও নেই।

    ঈশ্বরকে আমরা নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করি, হয়ত টের পাই না কত বড় অবলম্বন সে আমাদের বেঁচে থাকার। জীবনের যাবতীয় টেনশন ঈশ্বরের কাঁধে ছেড়ে না দিলে, কত অসহায় আমরা।

    সেই ঈশ্বরই আবার আমাদের যুদ্ধের কারণ।

    ঈশ্বর আপনার জন্ম দিয়ে আমরা ঠিক করিনি। আপনি না জন্মালেই পারতেন ঈশ্বর।

    আবারও মোড় নেয় উপন্যাস। এই চূড়ান্ত মোড়ে অতীতের জালে ধরা দেয় অতীশ।

    আমি ভুলতে চেয়েছি। দেশের কথা ভাবলেই ক্ষোভে জ্বলে উঠতাম। তোরা আলাদা দেশ দাবি করলি! আমাদের মানুষ মনে করলি না। আমরা কোথায় যাব, কোথায় গিয়ে উঠব ভাবলি না। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। বাংলাদেশ, এমন সোনার বাংলা, তাকে পূর্ব-পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়লি। ক্ষোভ হবে না! কেন আমাদের চলে আসতে হল। আমরা তোদের পর হয়ে গেলাম। একই জল মাটিতে নিশ্বাস ফেলেছি—বড় হয়ে উঠেছি, দেশান্তরী করে ছাড়লি!

    দেশভাগ স্তিমিত ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় উপন্যাসে। এখানে অতীন বাবু সোনার শৈশবের সেই ভূখণ্ডকে আবার তুলে এনেছেন। এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। হিন্দুদের তাড়িয়ে কি ভাল ছিল এ দেশ? বাঙালি ও পাকিস্তানি মুসলিমে কি ভাগাভাগি লাগেনি?

    এত ভাগাভাগি কেন মিঞা সাব! ভাগের শেষ আছে! যত ভাগ করবেন শরীর তত পঙ্গু হয়ে যাবে না?

    প্রায় শেষে চলে এসেছি আমরা। জীবনে শেষকৃত্যের কাছাকাছি হলে, সেই ঈশ্বরকে স্মরণ করি আমরা। সেই একি বাণী উচ্চারিত হয় আমাদের মগজে, যাকে পৃথক প্রমাণ করার জন্য আমরা যুদ্ধ চালিয়েছি সারাটা জীবন।

    তারপর সর্বতোভাবে ফলন্মোথ অদৃষ্ট বশত প্রথমে জলময় সমুদ্র উৎপন্ন হইল। অতঃপর সেই জলময় সমুদ্র হইতে প্রকাশমান জগতের নির্মাণে সমর্থ ব্রহ্মা আবির্ভূত হইলেন। তিনি যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্র কে সৃষ্টি করলেন— তাহাতে দিন রাত্রি হইতে লাগিল। দিন রাত্রি হওয়ায় সংবৎসর সৃষ্টি হইল। অনন্তর ব্রহ্মা পৃথিবী, আকাশ, স্বর্গ এবং মহঃ প্রভৃতি লোকের সৃষ্টি করিলেন।

    কেমন করে তোমরা আল্লাহতে অবিশ্বাস কর, যখন তোমরা ছিলে মৃত আর তিনি করলেন জীবিত? পুনরায় যিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন, আর পুনরায় জীবিত করবেন, তখন ফিরিয়ে আনা হবে তোমাদের তাঁর কাছে।

    হাউ হি মাস্ট রিজয়েস ইন অল হিজ ওয়ার্ক। দ্য আর্থ ট্রেমবেলড্ অ্যাট হিজ গ্ল্যান্স। দ্য মাউন্টেনস বার্স্ট ইনটু ফ্লেম অ্যাট হিজ টাচ। ইউ উইল সিঙ টু দ্য লর্ড অ্যাজ লঙ অ্যাজ ইউ লিভ। ইউ উইল প্রেইজ গড টু ইয়োর লাস্ট ব্রেথ।

    উপন্যাসের শুরুটা হয় পাগল হাঁকছে দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। আবার ঠিক শেষে অতীন বাবু আমাদের এই দূরত্বের অঙ্কটা মিলিয়ে দিতে চান।

    মা তুমি বড় বৃক্ষ। দাঁড়িয়ে আছ ডালপালা মেলে। ফুল ফোটে। ফল ধরে। হাওয়ায় কে কোথায় সব বীজ উড়িয়ে নিয়ে যায়। জল পড়ে। শস্য দানার মতো তারাও মাটির নিচে শেকড় চালিয়ে দেয়। বড় দূরের হয়ে যায় সব কিছু। সারা পৃথিবী জুড়ে কত গাছপালা, ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে তারও ফুল ধরে ফল হয়। আবার ঝড়ো হাওয়ায় বীজ উড়িয়ে কোন এক সুদূরে নিয়ে যায়। আমরা তোমার সেই বীজ উড়ে গেছি।

    সোনা ট্রিলজির প্রথম পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। দ্বিতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’। শেষ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’। প্রথম পর্বে যে সোনা, দ্বিতীয় পর্বে— ছোটবাবু, শেষ পর্বে— অতীশ দীপঙ্কর। তিন পর্বে একই ব্যক্তিসত্তা ভিন্নতর সত্যে উদ্ভাসিত। যেমন একই শক্তি মহাজাগতিক নিয়ন্ত্রণে নানা ব্যঞ্জনার নিত্য প্রকাশিত। তিনটি পর্বই স্বয়ংসম্পূর্ণ। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের পটভূমি—প্রকৃতি। অলৌকিক জলযানের পটভূমি—অনন্ত অসীম সমুদ্র। আর ঈশ্বরের বাগান, নগর জীবনের এক নীরস ইট কাঠের গদ্যময় জগৎ। শৈশব, বয়ঃসন্ধিকাল পার হয়ে সোনা এখন ঈশ্বরের বাগানে অতীশ দীপঙ্কর—এক পরিণত মানুষ। পৃথিবীটা তার কাছে এখন প্রকৃতির মতো নিরন্তর সুষমামণ্ডিত নয় অথবা সমুদ্র এবং আকাশের মতো উদার নয়। নগর জীবনে সে শুভ-অশুভের দ্বন্ধে ক্ষতবিক্ষত। ঈশ্বর এবং প্রেতাত্মা দুই তাকে নিয়ত তাড়া করছে।

    ঈশ্বরের বাগানের প্রথম অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছে করুণা প্রকাশনী, অক্টোবর ২০০০এ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুব্রত চৌধুরী।

    উৎসর্গ

    সমরেশ বসু

    দিব্যেন্দু পালিত

    শ্রীমান শুভাশিস ব্যানার্জী

    বামাচরণ মুখোপাধ্যায়

  • অদ্ভূতুড়ে সিরিজ

    অদ্ভূতুড়ে সিরিজ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের অদ্ভুতুড়ে চমৎকার একটা সিরিজ। ছোটদের জন্য রচিত প্রায় চল্লিশের বেশি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজ’। শিশু-কিশোরদের জন্য এই লেখাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সহজ সরল সরস বর্ণনা। প্রচুর হাস্যরস ও রহস্য মেশানো এই সিরিজের বইগুলোতে গল্পের সঙ্গে সাসপেন্সও রয়েছে। হাস্যরস ভূতের ভয় আর অলৌকিক সব ঘটনার সমন্বয়ে গল্পের প্লটগুলো শিশু মনে আলাদা দোলা দেয়। তার রচনা কৌশলে অভিভূত শিশুরা বিশ্বাস করতে শেখে, ভূত তো খারাপ হতেই পারে না, তারা থেকে থাকলে শুধু আমাদের সঙ্গে লুডো খেলার জন্যই আছে, বা আমাদের হোম টাক্স করে দেয়ার জন্য। মজার মজার ভূত, আধপাগলা সব অঙ্ক স্যার, শুচিবাই পিসিমা দিয়ে তৈরি, অদ্ভুতুড়ে সিরিজের ছোট্ট শহরগুলি শিশু মনের বড্ড কাছের এবং প্রিয়।

    শিশু কিশোরদের জন্য লেখা হলেও সিরিজটি সব বয়সী পাঠকই পড়ে বেশ আনন্দ পায়। সিরিজের গল্প গুলোর বিশেষত হচ্ছে একটা সাথে আরেকটা তেমন কোন যোগসাজ নেই। ফলে আপনি যেকোনো একটি গল্প দিয়েই পড়তে শুরু করতে পারেন। এই সিরিজের প্রতিটি বইয়ের চরিত্রগুলো বেশ অদ্ভুত ও মজার। কোন কোন বইয়ে ভিন গ্রহের এলিয়েনদের কথাও আছে।

    এডুলিচার পাঠশালায় প্রকাশিত অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলো হচ্ছে—

  • দূরবীন

    দূরবীন

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    গ্রন্থকথা

    সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় দু-বছরেরও বেশি কাল ধরে ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল ‘দূরবীন’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জোরালো, সংবেদনশীল কলমে অন্যতম মহৎ সৃষ্টি। চলমান শতাব্দীর দুইয়ের দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে আটের দশক পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ের প্ৰেক্ষাপটে সামাজিক জীবনের যাবতীয় পরিবর্তনকে এক আশ্চর্য কৌতুহলকর বিশাল কাহিনীর মধ্য দিয়ে ধরে রাখার প্রয়াসেরই অভিনন্দিত ফলশ্রুতি ‘দূরবীন’ উপন্যাস।

    তিন প্রজন্মের এই কাহিনীতে প্রথম প্রজন্মের প্রতিভূ জমিদার হেমকান্ত। এ-উপন্যাসের সূচনায় দেখা যায়, হেমকান্তের হাত থেকে কুয়োর বালতি জলে পড়ে গেছে, আর এই আপাততুচ্ছ ঘটনায় হেমকান্ত আক্রান্ত হচ্ছেন মৃত্যুচিন্তায়। বিপত্নীক হেমকান্ত ও রঙ্গময়ী নামের প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক পুরোহিত্যকন্যার, গোপন প্রণয়কাহিনী ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য পারিবারিক কাহিনী নিয়ে এ-উপন্যাসের প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় প্রজন্মের নায়ক কৃষ্ণকান্ত। দেবোপম রূপ ও কঠোর চরিত্রবল বালক কৃষ্ণকান্তকে দাঁড় করিয়েছে পিতা হেমকান্তের বিপরীত মেরুতে। স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ কৃষ্ণকান্তের ব্ৰহ্মচর্য-গ্রহণ ও দেশভাগের পর তাঁর আমূল পরিবর্তন—এই নিয়ে এ-উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাহিনী। তৃতীয় ও শেষ প্রজন্মের নায়ক ধ্রুব, বিশ শতকের উপান্তপর্বে এক দিগভ্ৰষ্ট, উদ্ধত বিদ্রোহী যুবা। ধ্রুবর স্ত্রী রেমি, যার সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তার। কখনও ভালবাসা, কখনও উপেক্ষা, কখনও-বা প্রবল বিরাগ। অথচ রেমির ভালবাসা সাত-আঘাতেও অবিচল। একদিকে রেমির সঙ্গে সম্পর্ক অন্যদিকে পিতা কৃষ্ণকান্তের মধ্যে সেই ব্ৰহ্মচারী ও স্বদেশের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণসত্তাটিকে খুঁজে না-পাওয়ার ব্যর্থতায় ক্ষতবিক্ষত ধ্রুবর আশ্চর্য কাহিনী নিয়েই শেষ পর্ব। শুধু তিন প্রজন্মের তিন নায়কের ব্যক্তিগত কাহিনীর জন্যই নয়, এ-উপন্যাসের বিশাল প্রেক্ষাপটে আরও বহু বিচিত্র ও কৌতুহলকর শাখা-কাহিনী, এবং এর চালচিত্রে স্বদেশী আন্দোলন, দেশভাগ ও স্বাধীনতা পরবর্তী উত্তাল দিনরাত্রির এক তাৎপর্যময় উপস্থাপনার জন্যও ‘দূরবীন’ চিহ্নিত হবে অবিস্মরণীয় সৃষ্টিরূপে।

    শুধুদূরকেই কাছে আনে না, উল্টো করে ধরলে কাছের জিনিসও দূরে দেখায় দূরবীন। ‘দূরবীন’ উপন্যাসের নামকরণে যেমন সূক্ষ্মতা, রচনারীতিতেও তেমনই অভিনবত্ব এনেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। দ্বিস্তর এই উপন্যাসে সেকাল ও একাল, অতীত ও বর্তমান এক অনন্য কৌশলে একাকার।

    শীর্ষেন্দুর লেখাতে সময় হচ্ছে মুখ্য বিষয়। তাঁর এই অসাধারণ কীর্তি ‘দূরবীন’ এ লেখক উনিশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রজন্মগত ব্যবধান (জেনারেশন গ্যাপ) খুব সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    উপন্যাসটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মূলত হেমকান্ত এবং ধ্রুবর জবানীর মাধ্যমে। কিন্তু আসলে এদের দুজনের কেউই এই উপন্যাসের মূল নায়ক নন। আসল নায়ক হচ্ছেন কৃষ্ণকান্ত। উপন্যাসটা দুইটা অংশে বিভক্ত, আর দুই অংশের বর্ণনাই লেখক চমৎকার ভাবে লিখে গিয়েছেন। শতাধিক পরিচ্ছেদের বিশাল উপন্যাস; কিন্তু কোথাও খারাপ লাগে নি। বিজোড় পরিচ্ছেদ গুলো (১, ৩, ৫…) প্রথম কাহিনীর অন্তর্গত এবং জোড় পরিচ্ছেদ গুলো (২, ৩, ৪…) দ্বিতীয় কাহিনীর অন্তর্গত। কেউ যদি প্রথম অংশ গুলো পড়ে শেষ করেন, তবে দ্বিতীয় অংশে তিনি প্রথম অংশের পর থেকে ধারাবাহিক বর্ণনা পাবেন! আর গল্পের প্রয়োজনেই এখানে রেমি এবং ধ্রুবর যে মধ্যে যে ভালোবাসার টানাপোড়েনের চিত্র আঁকা হয়েছে তার মধ্যেও অনেক সময় আবেগে ডুবে গিয়েছি। কখনো মনে হয়েছে যে রেমিই ঠিক আবার কখনও মনে হয়েছে যে ধ্রুবই ঠিক। গল্পের প্রয়োজনে অনেক চরিত্রেরই আগমন ঘটেছে যার প্রত্যেকটিই উপভোগ্য।

    এছাড়াও উপন্যাসটিতে ইংরেজদের হাত থেকে ভারতের স্বাধীনতার চিত্র খুব বড় ভাবে না হলেও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার একটা চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অংশের ঘটনাস্থল আমাদের বাংলাদেশ এই এবং দ্বিতীয় অংশের ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গ। প্রথম অংশটুকুতে কৃষ্ণকান্তের সংগ্রাম এবং সাফল্য এবং দ্বিতীয় অংশে এর পরিণতি এবং কৃষ্ণকান্ত ও ধ্রুব এর মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরা হয়েছে।

    ‘দূরবীন’ উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালের বইমেলায়; মুদ্রণ সংখ্যা ৩৩০০। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে ফণিভূষণ দেব কর্তৃক ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত এবিং আনন্দ প্রেস অ্যাণ্ড পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু কর্তৃক পি ২৮৪ সি আই টি স্কিম নং ৬ এম কলকাতা ৭০০ ০৫৪ থেকে মুদ্রিত। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন অমিয় ভট্টাচার্য। উপন্যাসটির প্রথম বিশ্ববাণী সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৭২ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠে; প্রকাশক ব্রজকিশোর মণ্ডল, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, ৯/১ বি মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা-৯। মুদ্রাকর পার্বতীচরণ রায়, দি গৌতম প্রিণ্টিং ওয়ার্কস প্রা. লি. ২০৯, এ বিধান সরণি, কলকাতা-৬।

    বর্তমান সংস্করণে অনুসৃত হয়েছে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৮৬, দ্বাবিংশ মুদ্রণ জানুয়ারি ২০২২। এই সংস্করণের প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুব্রত চৌধুরী।

    “রা-সা”

    পূজনীয়

    শ্রীঅমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (বড়দা)

    শ্রীচরণকমলেষু

  • হরিদাসের গুপ্তকথা

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    গ্রন্থপরিচয়

    ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ নামের বইটি বেশ দুষ্প্রাপ্য। বইটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে এটি বোধহয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আপাত নিষিদ্ধ ধরনের কোন বই। কিন্তু বইটি এককালে বেশ জনপ্রিয় ছিল। বইটির লেখক শ্রীভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩১০ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ মোটামুটি ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে। নিঃসন্দেহে বইটি তারও আগে লেখা হয়েছিল। আর কাহিনীর ঘটনাক্রম তারও বেশকিছু বছর আগেকার। উপন্যাসটি চার খণ্ডে বিভক্ত।

    কাহিনীর নায়ক হল হরিদাস নামের একটি ছেলে। কাহিনীর আরম্ভের সময়ে তার বয়স চোদ্দ বছর। মোটামুটি হিসাব করে দেখা যায় তার জন্ম ইংরেজি ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে চোদ্দ বছর বয়েসে হরিদাসের যাত্রা শুরু হয় এক গ্রামের পাঠশালা থেকে। সে নিজের কোন পরিচয় জানত না। পাঠশালার গুরুমশাইয়ের বাড়িতে সে লালিত। গুরুমশাইয়ের মৃত্যুর পর সে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে বাধ্য হয়। এরপর সাত-আট বছর নানা ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে দিয়ে এই দরিদ্র সহায় সম্বলহীন অনাথ বালক কিভাবে নিজের পরিচয় জানল এবং পরিশেষে বিরাট ধনী জমিদারে পরিণত হল তারই রোমাঞ্চকর আখ্যান এই বই।

    উপন্যাসটিতে হরিদাসের নায়িকাও উপস্থিত। তার নাম অমরকুমারী। নানা বিপত্তি পেরিয়ে শেষ অবধি হরিদাস এবং অমরকুমারীর মিলন হয়।

    উপন্যাসটিতে প্রচুর চরিত্র। উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে প্রতিটি চরিত্রেরই পরিণাম দেখানো হয়েছে। নানা রকম নাটকীয়তায় ভরপুর এই উপন্যাস। শেষে এসে সব কিছুকেই একটি বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব রহস্যেরই সমাধান করা হয়েছে। বইটিকে একটি অ্যডভেঞ্চারের গল্প বললেও ভুল হয় না। প্রায় ৬৮০ পাতার বইটিতে প্রচুর রোমাঞ্চকর ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে। নানা রকম চুরি, ডাকাতি, জালিয়াতি, খুন-খারাপি, আত্মহত্যা, কিডন্যাপিং, পুলিশ-দারোগা, মামলা-মোকদ্দমা, ভূতুড়ে ঘটনা এবং ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ঠাসা। সিপাহী বিদ্রোহের চাক্ষুষ বর্ণনাও এতে স্থান পেয়েছে।

    ঊনবিংশ শতকের বাঙলি এবং ভারতীয় জীবনের নানা বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা এতে রয়েছে। এর সাথে আরো যুক্ত হয়েছে নানা রকম কেচ্ছা এবং ব্যাভিচারের ঘটনা। এবং প্রেমের ঘটনাও কিছু কম নেই। তখনকার সমাজব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়। বাঙালি বাড়িতে ব্যভিচারের ঘটনা যে কত বেশি ছিল তার বর্ণনা পড়লে অবাক হতে হয়। অনেক পুরুষই কোন আত্মীয় মহিলার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রাখতেন এবং অনেক সময়ে বিপদে পড়লে তাদের নিয়ে গৃহত্যাগও করতেন। বেশিরভাগ সময়েই তাঁরা বারাণসীর মত কোন তীর্থস্থানে গিয়ে নাম পরিচয় এবং সম্পর্ক ভাঁড়িয়ে থাকতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মানও আদায় করতেন।

    লেখক লিখছেন যে– “বাঙ্গালীদলের বেশী কলঙ্ক। জাতিতে জাতিতে, জাতিতে বিজাতিতে, সম্পর্কে সম্পর্কে, সম্পর্কে নিঃসম্পর্কে, বাঙ্গালী নর-নারী পাপলিপ্ত হলেই নিরাপদের আশাতে কাশীতে পালিয়ে আসে; মাতুলের ঔরসে ভগিনী-পুত্রী, পিতৃব্যের ঔরসে ভ্রাতৃকুমারী, ভ্রাতার ঔরসে বিমাতৃকুমারী, ভাগিনেয়ের ঔরসে মাতুলানী, জামাতার ঔরসে শ্বশ্রু-ঠাকরানী, শ্বশুরের ঔরসে যুবতী পুত্রবধূ গর্ভবতী হলেই কাশীধামে পালিয়ে আসে! গর্ভগুলি নষ্ট কোত্তে হয় না, কাশীর পবনের প্রসাদে বংশ-রক্ষা হয়।”

    মনে রাখতে হবে এই বর্ণনার সময়কাল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহেরও আগের! খুনোখুনির ঘটনাও বেশ কিছু আছে। আর আছে সেই সময়ের ভালো-খারাপ পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা। উপন্যাসটিতে পুলিশকে বেশ করিৎকর্মা হিসাবেই দেখানো হয়েছে। তবে তারা যে উৎকোচ গ্রহনেও সিদ্ধহস্ত তার ঈঙ্গিতও রয়েছে।

    কাহিনীর পটভূমিকাও বদলেছে বারে বারে। তৎকালীন ভারতবর্ষের নানা তীর্থস্থানের বর্ণনাও এতে রয়েছে। পশ্চিমের গুজরাট থেকে আরম্ভ করে পূর্বের ত্রিপুরা পর্যন্ত উপন্যাসটির ব্যাপ্তি। কাহিনী ছুঁয়ে গেছে ভারতের বিভিন্ন শহর যেমন বরোদা, আমেদাবাদ, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, পাটনা, বারাণসী, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, বর্ধমান, কানপুর, গৌহাটি। এই কাহিনী যে সময়ের সেই সময়ে ভারতে রেলপথ ছিল না বা সবে স্থাপিত হতে আরম্ভ করেছে। তাই বিভিন্ন স্থানে যাওয়াও অনেক কষ্টকর ছিল এবং তাতে বিপদের ভয়ও ছিল যথেষ্ট।

    হরিদাসের নিজের বক্তব্য ও মন্তব্য থেকে লেখকের ব্যক্তিতের বিষয়েও জানতে পারি। ইংরেজ শাসন বিষয়ে তিনি বেশ খুশি তবে সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তিনি উভয় পক্ষেরই নৃশংসতার জন্য সমালোচনা করেছেন। রানী ভিক্টোরিয়াকে তিনি ভক্তি করতেন। তিনি ছিলেন বাল্যবিবাহ এবং জাতিভেদ প্রথার একজন সমর্থক। এবং অসবর্ণ বিবাহ প্রথার বিরোধী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ এবং উপকারী।‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ একটি উপন্যাস হলেও পড়লেই বোঝা যায় যে এটির পিছনে অনেক সত্য, লেখকের নিজের চোখে দেখা ঘটনাও রয়েছে। এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিবরণও বলা যায়। তাই ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের একটি চমৎকার বর্ণনা আমরা পাই।