Blog

  • তূর্য-নিনাদ

    তূর্য-নিনাদ

    তূর্য-নিনাদ

    [গান]

    কোরাস :
    (আজ) ভারত-ভাগ্য-বিধাতার বুকে গুরু-লাঞ্ছনা-পাষাণ-ভার,
    আর্ত-নিনাদে হাঁকিছে নকিব, – কে করে মুশকিল আসান তার?

    মন্দির আজি বন্দির ঘানি,

    নির্জিত ভীত সত্য, বদ্ধ রুদ্ধ স্বাধীন আত্মার বাণী,

    সন্ধি-মহলে ফন্দির ফাঁদ, গভীর আন্ধি-অন্ধকার!

    হাঁকিছে নকিব – হে মহারুদ্র চূর্ণ করো এ ভণ্ডাগার॥

    রক্তে-মদের বিষ পান করি

    আর্ত মানব; স্রষ্টা কাতর সৃষ্টির তাঁর নির্বাণ স্মরি!

    ক্রন্দন-ঘন বিশ্বে স্বনিছে প্রলয়-ঘটার হুহুংকার, –

    হাঁকিছে নকিব – অভয়-দেবতা, এ মহাপাথার করহ পার॥

    কোলাহল-ঘাঁটা হলাহল-রাশি

    কে নীলকণ্ঠ গ্রাসিবে রে আজ দেবতার মাঝে দেবতা সে আসি?

    উরিবে কখন ইন্দিরা, ক্রোড়ে শান্তির ঝারি সুধার ভাঁড়?

    হাঁকিছে নকিব – আনো ব্যথা-ক্লেশ-মন্থন-ধন অমৃত-ধার॥

    কণ্ঠ ক্লিষ্ট ক্রন্দন-ঘাতে,

    অমৃত-অধিপ নর-নারায়ণ দারুময় ঘন মনোবেদনাতে।

    দশভুজে গলে শৃঙ্খল-ভার দশপ্রহরণধারিণী মার –

    হাঁকিছে নকিব – ‘আবিরাবির্ম এধি’ হে নব যুগাবতার!

    মৃত্যু-আহত মৃত্যুঞ্জয়,

    কে শোনাবে তাঁরে চেতন-মন্ত্র? কে গাহিবে জয় জীবনের জয়?

    নয়নের নীরে কে ডুবাবে বলো বলদর্পীর অহংকার? –

    হাঁকিছে নকিব – সে দিন বিশ্বে খুলিবে আরেক তোরণ-দ্বার॥

  • জাগৃহি

    জাগৃহি

    জাগৃহি

    [তোটক ছন্দ]
    ‘হর
    হর হর শংকর হর হর ব্যোম’ –
    একী
    ঘন রণ-রোল ছায়া চরাচর ব্যোম!
    হানে
    ক্ষিপ্ত মহেশ্বর রুদ্র পিনাক,
    ঘন
    প্রণব-নিনাদ হাঁকে ভৈরব-হাঁক
    ধু ধু
    দাউ দাউ জ্বলে কোটি নর-মেধ-যাগ,
    হানে
    কাল-বিষ বিশ্বে রে মহাকাল-নাগ!
    আজ
    ধূর্জটি ব্যোমকেশ নৃত্য-পাগল,
    ওই
    ভাঙল আগল ওরে ভাঙল আগল!
    বোলে
    অম্বুদ-ডম্বুর কম্বু বিষাণ,
    নাচে
    থই-তাতা থই-তাতা পাগলা ঈশান!
    দোলে
    হিন্দোলে ভীম-তালে সৃষ্টি ধাতার,
    বুকে
    বিশ্বপাতার বহে রক্ত-পাথার!
    ঘোর
    নির্ঘোষে ‘মার মার’ দৈত্য, অসুর,
    প্রেত,
    রক্ত-পিশাচ, রণ-দুর্মদ সুর।
    করে
    ক্রন্দসী-ক্রন্দন অম্বর রোধ –
    ত্রাহি
    ত্রাহি মহেশ হে সম্বরো ক্রোধ!
    সুত
    মৃত্যু-কাতর, হাহা অট্টহাসি
    হাসে
    চণ্ডী চামুণ্ডা মা সর্বনাশী।
    কাল-
    বৈশাখী ঝঞ্ঝারে সঙ্গে করি –
    রণ-
    উন্মাদিনী নাচে রঙ্গে মরি!
    উর-
    হার দোলে নরমুণ্ড-মালা,
    করে
    খড়্গ ভয়াল, আঁখে বহ্নি-জ্বালা!
    নিয়া
    রক্তপানের কী অগস্ত্য-তৃষা
    নাচে
    ছিন্ন সে মস্তা মা, নাইকো দিশা!
    ‘দে রে
    রক্ত দে রক্ত দে’ রণে ক্রন্দন,
    বুঝি
    থেমে যায় সৃষ্টির হৃৎ-স্পন্দন!
    জ্বলে
    বৈশ্বানরের ধু ধু লক্ষ শিখা,
    আজ
    বিষ্ণু-ভালে লাল রক্ত-টিকা!
    শুধু
    অগ্নি-শিখা ধু ধু অগ্নি-শিখা,
    শোভে
    করুণার ভালে লাল রক্ত-টিকা!
    রণ-
    শ্রান্ত অসুর-সুর-যোদ্ধৃ-সেনা,
    শুধু
    রক্ত-পাথার, শুধু রক্ত-ফেনা!
    একী
    বিশ্ব-বিধ্বংস নৃশংস খেলা,
    কিছু
    নাই কিছু নাই প্রেত-পিশাচে মেলা।
    আজ
    ঘরে ঘরে জ্বলে ধু ধু শ্মশান মশান –
    হোক
    রোষ অবসান, ত্রাহি ত্রাহি ভগবান!
    আজি
    বন্ধ সবার পূতি-গন্ধে নিশাস,
    বিষে
    বিশ্ব-নিসাড়, বহে জোর নাভিশ্বাস!
    দেহো
    ক্ষান্ত রণে, ফেলো রঙ্গিণী বেশ,
    খোলো
    রক্তাম্বর মাতা সম্বরো কেশ!
    এ তো
    নয় মাতা রক্তোন্মত্তা ভীমা!
    আজ
    জাগৃহি মা, আজ জাগৃহি মা।
    তব
    চরণাবলুণ্ঠিত মহিষ-অসুর,
    হল
    ধ্বংস অসুর, লীন শক্তি পশুর।
    তবে
    সম্বরো রণ, হোক ক্ষান্ত রোদন–
    হোক
    সত্য-বোধন আজ মুক্তি-বোধন!
    এসো
    শুদ্ধা মাতা এই কাল-শ্মশানে
    আজ
    প্রলয়-শেষে এই রণাবসানে!
    জাগো
    জাগো মানব-মাতা দেবী নারী!
    আনো
    হৈম ঝারি, আনো শান্তি-বারি!
    এসো
    কৈলাস হতে মা গো মানস-সরে,
    নীল
    উৎপল-দলে রাঙা আঁচল-ভরে।
    এসো
    কন্যা উমা, এসো গৌরী রূপে,–
    বাজো
    শঙ্খ শুভ, জ্বালো গন্ধ ধূপে!
    আজ
    মুক্ত-বেণি মেয়ে একাকী চলে,
    ওই
    শেফালি-তলে হেরো শেফালি-তলে।
    ওড়ে
    এলোমেলো অঞ্চল আশ্বিন-বায়,
    হানে
    চঞ্চল নীল চাওয়া আকাশের গায়!
    ঘোষে
    হিমালয় তার মহা হর্ষ-বাণী, –
    এল
    হৈমবতী, এল গৌরী রানি।
    বাজো
    মঙ্গল শাঁখ, হোক শুভ-আরতি,
    এল
    লক্ষ্মী-কমলা, এল বাণী-ভারতী।
    এল
    সুন্দর সৈনিক সুর কার্তিক,
    এল
    সিদ্ধি-দাতা, হেরো হাসে চারিদিক!
    ভরা
    ফুল-খুকি ফুল-হাসি শিউলির তল,
    আজ
    চোখে আসে জল, শুধু চোখে আসে জল!
    নিয়া
    মাতৃ-হিয়া নিয়া কল্যাণী-রূপ
    এল
    শক্তি স্বাহা, বাজো শাঁখ, জ্বালো ধূপ!
    ভাঁজো
    মোহিনী সানাই, বাজো আগমনি-সুর,
    বড়ো
    কেঁদে ওঠে আজ হিয়া মাতৃ-বিধুর।
    ওঠে
    কণ্ঠ ছাপি বাণী সত্য পরম –
    বন্-
    দে মাতরম্। বন্‌দে মাতরম্!
  • সেবক

    সেবক

    সেবক

    সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়,

    নেই কি রে কেউ সত্যসাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়?

    শিকলগুলো বিকল করে পায়ের তলায় মাড়ায়, –

    বজ্র-হাতে জিন্দানের1 ওই ভিত্তিটাকে নাড়ায়?

    নাজাত2-পথের আজাদ3 মানব নেই কি রে কেউ বাঁচা,

    ভাঙতে পারে ত্রিশ কোটি এই মানুষ-মেষের খাঁচা?

    ঝুটার পায়ে শির লুটাবে, এতই ভীরু সাঁচা? –

      

    ফন্দি-কারায় কাঁদছিল হায় বন্দি যত ছেলে,

    এমন দিনে ব্যথায় করুণ অরুণ আঁখি মেলে,

    পাবক-শিখা হস্তে ধরি কে তুমি ভাই এলে?

    ‘সেবক আমি’ – হাঁকল তরুণ কারার দুয়ার ঠেলে।

      

    দিন-দুনিয়ায় আজ খুনিয়ার রোজ-হাশরের4 মেলা,

    করছে অসুর হক-কে না-হক, হক-তায়ালায়5 হেলা!

    রক্ষ-সেনার লক্ষ আঘাত বক্ষে বড়োই বেঁধে,

    রক্ষা করো, রক্ষা করো, উঠতেছে দেশ কেঁদে।

    নেই কি রে কেউ মুক্তি-সেবক শহিদ হবে মরে,

    চরণ-তলে দলবে মরণ ভয়কে হরণ করে,

    ওরে        জয়কে বরণ করে –

    নেই কি এমন সত্য-পুরুষ মাতৃ-সেবক ওরে?

    কাঁপল সে স্বর মৃত্যু-কাতর আকাশ-বাতাস ছিঁড়ে,

    বাজ পড়েছে, বাজ পড়েছে ভারতমাতার নীড়ে!

      

    দানব দলে শাস্তি আনে নাই কি এমন ছেলে?

    একী দেখি গান গেয়ে ওই অরুণ আঁখি মেলে

    পাবক-শিখা হস্তে ধরে কে বাছা মোর এলে?

    ‘মা গো আমি সেবক তোমার! জয় হোক মা-র।’

    হাঁকল তরুণ কারার-দুয়ার ঠেলে!

      

    বিশ্বগ্রাসীর ত্রাস নাশি আজ আসবে কে বীর এসো

    ঝুট শাসনে করতে শাসন, শ্বাস যদি হয় শেষও।

    – কে আজ বীর এসো।

    ‘বন্দি থাকা হীন অপমান!’ হাঁকবে যে বীর তরুণ, –

    শির-দাঁড়া যার শক্ত তাজা, রক্ত যাহার অরুণ,

    সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের,

    খোদার রাহায় জান দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের।

    দেশের পায়ে প্রাণ দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের,

    সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের।

    হঠাৎ দেখি আসছে বিশাল মশাল হাতে ও কে?

    ‘জয় সত্যম্’ মন্ত্র-শিখা জ্বলছে উজল চোখে।

    রাত্রি-শেষে এমন বেশে কে তুমি ভাই এলে?

    ‘সেবক তোদের, ভাইরা আমার! – জয় হোক মা-র!’

    হাঁকল তরুণ কারার দুয়ার ঠেলে!

  • ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : তিরোভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : তিরোভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্
    [তিরোভাব]

    এ কী বিস্ময়! আজরাইলেরও জলে ভর-ভর চোখ!

    বে-দরদ দিল্ কাঁপে থর-থর যেন জ্বর-জ্বর শোক।

    জান-মরা তার পাষাণ-পাঞ্জা বিলকুল ঢিলা আজ,

    কব্‌জা নিসাড়, কলিজা সুরাখ, খাক চুমে নীলা তাজ।

    জিব্‌রাইলের আতশি পাখা সে ভেঙে যেন খান খান,

    দুনিয়ার দেনা মিটে যায় আজ তবু জান আন্-চান!

    মিকাইল অবিরল

    লোনা    দরিয়ার সবই জল

    ঢালে    কুল মুল্লুকে, ভীম বাতে খায় অবিরল ঝাউ দোল।

    এ কি    দ্বাদশীর চাঁদ আজ সেই? সেই রবিয়ল আউওল?

    ঈশানে কাঁপিছে কৃষ্ণ নিশান, ইস্‌রাফিলের ও প্রলয়-বিষাণ আজ

    কাতরায় শুধু! গুমরিয়া কাঁদে কলিজা-পিষানো বাজ!

    রসুলের দ্বারে দাঁড়ায়ে কেন রে আজাজিল শয়তান?

    তারও বুক বেয়ে আঁশু ঝরে, ভাসে মদিনার ময়দান!

    জমিন্-আশমান জোড়া শির পাঁও তুলি তাজি বোর্‌রাক্,

    চিখ্ মেরে কাঁদে ‘আরশে’ র পানে চেয়ে, মারে জোর হাঁক!

    হুরপরি শোকে হায়

    জল-    ছলছল চোখে চায়।

    আজ    জাহান্নমের বহ্নি-সিন্ধু নিবে গেছে ক্ষরি জল,

    যত    ফিরদৌসের নার্গিস-লালা ফেলে আঁশু-পরিমল।

    মৃত্তিকা-মাতা কেঁদে মাটি হল বুকে চেপে মরা লাশ,

    বেটার জানাজা কাঁদে যেন – তাই বহে ঘন নাভি-শ্বাস!

    পাতাল-গহ্বরে কাঁদে জিন, পুন মলো কি রে সোলেমান?

    বাচ্চারে মৃগী দুধ নাহি দেয়, বিহগীরা ভোলে গান!

    ফুল পাতা যত খসে পড়ে, বহে উত্তর-চিরা বায়ু,

    ধরণির আজ শেষ যেন আয়ু, ছিঁড়ে গেছে শিরা স্নায়ু!

    মক্কা ও মদিনায়

    আজ    শোকের অবধি নাই!

    যেন    রোজ-হাশরের ময়দান, সব উন্মাদসম ছুটে।

    কাঁপে    ঘন ঘন কাবা, গেল গেল বুঝি সৃষ্টির দম টুটে।

    নকিবের তূরী ফুৎকারি আজ বারোয়াঁর সুরে কাঁদে,

    কার তরবারি খান খান করে চোট মারে দূরে চাঁদে?

    আবুবকরের দর দর আঁশু দরিয়ার পারা ঝরে,

    মাতা আয়েষার কাঁদনে মুরছে আশমানে তারা ডরে!

    শোকে উন্মাদ ঘুরায় উমর ঘূর্ণির বেগে ছোরা,

    বলে ‘আল্লার আজ ছাল তুলে নেব মেরে তেগ্ , দেগে কোঁড়া।’

    হাঁকে ঘন ঘন বীর –

    ‘হবে,   জুদা তার তন শির,

    আজ যে বলিবে নাই বেঁচে হজরত – যে নেবে রে তাঁরে গোরে।’

    আজ দারাজ দস্তে তেজ হাতিয়ার বোঁও বোঁও করে ঘোরে!

    গুম্বজে কে রে গুমরিয়া কাঁদে মসজিদে মস্‌জিদে?

    মুয়াজ্জিনের হোশ্ নাই, নাই জোশ চিতে, শোষ হৃদে!

    বেলালেরও আজ কণ্ঠে আজান ভেঙে যায় কেঁপে কেঁপে,

    নাড়ি-ছেঁড়া এ কী জানাজার ডাক হেঁকে চলে ব্যেপে ব্যেপে!

    উস্‌মানের আর হুঁশ নাই কেঁদে কেঁদে ফেনা উঠে মুখে,

    আলি হাইদর ঘায়েল আজি রে বেদনার চোটে ধুঁকে!

    আজ    ভোঁতা সে দুধারি ধার

    ওই    আলির জুলফিকার!

    আহা    রসুল-দুলালি আদরিণী মেয়ে মা ফাতেমা ওই কাঁদে,

    ‘কোথা    বাবাজান।’ বলি মাথা কুটে কুটে এলোকেশ নাহি বাঁধে!

    হাসান-হুসেন তড়পায় যেন জবে-করা কবুতর,

    ‘নানাজান কই!’ বলি খুঁজে ফেরে কভু বার কভু ঘর।

    নিবে গেছে আজ দিনের দীপালি, খসেছে চন্দ্র-তারা,

    আঁধিয়ারা হয়ে গেছে দশ দিশি, ঝরে মুখে খুন-ঝারা!

    সাগর-সলিল ফোঁপায়ে উঠে সে আকাশ ডুবাতে চায়,

    শুধু         লোনা জল তার আঁশু ছাড়া কিছু রাখিবে না দুনিয়ায়।

    খোদ    খোদা সে নির্বিকার,

    আজ    টুটেছে আসনও তাঁর!

    আজ        সখা মহ্‌বুবে বুকে পেতে দুখে কেন যেন কাঁটা বেঁধে,

    তারে        ছিনিবে কেমনে যার তরে মরে নিখিল সৃষ্টি কেঁদে!

    বেহেশ্‌ত     সব আরাস্তা আজ, সেথা মহা ধুম-ধাম,

    গাহে        হুরপরি যত, ‘সাল্লালাহু আলায়হি সাল্‌লাম।’

    কাতারে কাতারে করজোড়ে সবে দাঁড়ায়ে গাহিছে জয়, –

    ধরিতে না পেরে ধরা-মা-র চোখে দর দর ধারা বয়।

    এসেছে আমিনা আবদুল্লা কি, এসেছে খদিজা সতী?

    আজ        জননীর মুখে হারামণি-পাওয়া-হাসা হাসে জগপতি!

    ‘খোদা,    একী তব অবিচার!’

    বলে    কাঁদে সুত ধরা-মা-র।

    আজ        অমরার আলো আরও ঝলমল, সেথা ফোটে আরও হাসি,

    শুধু         মাটির মায়ের দীপ নিভে গেল, নেমে এল অমা-রাশি

                      *    *    *    *    *

    আজ        স্বরগের হাসি ধরার অশ্রু ছাপায়ে অবিশ্রাম

    ওঠে        একী ঘন রোল – ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম।’

    কুঞ্জিকা

    ঈমান—বিশ্বাস। বিশ্ব-বয়তুল্লাহ্—বিশ্বরূপ ‘কাবা’ বা আল্লার ঘর। ওয়ে—ওগো, বাছা। মারহাবা—সাবাস। ‘সরওয়ারে কায়েনাত’—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। ‘শর্‌ওয়ান’—নওশেরওয়ান নামক পারস্যের বিখ্যাত দানশীল বাদশাহ্। বান্দা—হুজুরে-হাজির গোলাম, বন্দনাকারী। ফেরাউন, শাদ্দাদ, নমরুদ, মার্‌ওয়ান—বিখ্যাত ঈস্বরদ্রোহী সব। তাজি—দ্রুতগামী অশ্ব। বোর্‌রাক—উচ্চৈঃশ্রবার মত স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অশ্ব। আসমান—আকাশ। পরওয়ান—পরোয়ানা। সাচ্চারই—সত্যেরই। বোরহান—প্রমাণ। রোয়ে—কাঁদে। আমিনা—হজরত মোহাম্মদ (সা) জননীর নাম। খোদার হাবিব—আল্লার বন্ধু (হজরতের খেতাব)। আবদুল্লাহ্—হজরতের স্বর্গগত পিতা। রুহ্—আত্মা। ‘গমি’—দুঃখ। ‘গমি’ নাই—দুঃখ করো না। ভরপুর—পূর্ণ। ‘কমি’—অপূর্ণ। ‘কমি’ নাই—আজ কিছু অপূর্ণ নাই।

    আজরাইল—যমদূত। বে-দরদ—নির্মম। সুরাখ—ঝাঁঝরা। খাক্—মাটি। নীলা তাজ—আজরাইলের মাথার তাজ নীলবর্ণ। জিবরাইল—প্রধান ফেরেশতা ও স্বর্গীয় বার্তাবহ। আতশি—অগ্নিময়। মিকাইল—একজন ফেরেশতার নাম। কুল মুল্লুকে—সর্বদেশে। ইসরাফিল—প্রলয়-বিষাণধারী ফেরেশতা। রসুল—প্রেরিত পুরুষ। আজাজিল—শয়তানের নাম। তাজি বোর্‌রাক—বোররাক নামক স্বর্গীয় ঘোড়া। আরশ—খোদার সিংহাসন। ফিরদৌস—বেহেশ্‌ত, স্বর্গবিশেষের নাম। নার্গিস লালা—ফুলের নাম।

    তন্—দেহ। দরাজ দস্তে—বিশাল হাতে। জুলফিকার—হজরত আলীর দুধারী তলোয়ার। মাহ্‌বুব—প্রিয়।

  • ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : আবির্ভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : আবির্ভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্
    [আবির্ভাব]

     
      নাই   তা—জ
     
      তাই   লা—জ?
    ওরে
    মুসলিম, খর্জুর-শিষে তোরা সাজ!
    করে
    তসলিম হর কুর্নিশে শোর আওয়াজ
    শোন
    কোন মুজ্‌দা সে উচ্চারে হেরা আজ
     
          ধরা-মাঝ!

    উরজ-য়্যামেন নজ্‌দ হেজাজ তাহামা ইরাক শাম
    মেশের ওমান তিহারান স্মরি কাহার বিরাট নাম।

     
    পড়ে   ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম।
     
        চলে     আঞ্জাম
     
        দোলে  তাঞ্জাম
    খোলে
    হুর-পরি মরি ফিরদৌসের হাম্মাম!
    টলে
    কাঁখের কলসে কওসর ভর, হাতে আব-জমজম জাম।
    শোন
    দামাম কামান তামাম সামান নির্ঘোষি কার নাম
    পড়ে
    ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লাম।’
     
     মস্  তান!
     
     ব্যস  থাম্!
    দেখ
    মশ্‌গুল আজি শিস্তান-বোস্তান,
    তেগ
    গর্দানে ধরি দারোয়ান রোস্তাম।
    বাজে
    কাহারবা বাজা, গুলজার গুলশান
     
          গুলফাম!
    দক্ষিণে দোলে আরবি দরিয়া খুশিতে সে বাগে-বাগ,
     
    পশ্চিমে নীলা ‘লোহিতে’র খুন-জোশিতে রে লাগে আগ,
    মরু
    সাহারা গোবিতে সব্‌জার জাগে দাগ!
     
          নূরে    কুর্শির
      
          পুরে    ‘তূর’-শির,
    দূরে
    ঘূর্ণির তালে সুর বুনে হুরি ফুর্তির,
    ঝুরে
    সুর্খির ঘন লালি উষ্ণীষে ইরানি দূরানি তুর্কির!
    আজ
    বেদুইন তার ছেড়ে দিয়ে ঘোড়া ছুড়ে ফেলে বল্লম
    পড়ে
    ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাললাম।’
      
          ‘সাবে    ঈন’
      
          তাবে    ঈন
    হয়ে
    চিল্লায় জোর ‘ওই ওই নাবে দীন !
    ভয়ে
    ভূমি চুমে ‘লাত্ মানাত’ -এর ওয়ারেশিন ।
    রোয়ে
    ওয্‌যা-হোবল ইবলিস খারেজিন , –
      
          কাঁপে    জীন্ !
      
    জেদ্দার পূবে মক্কা মদিনা চৌদিকে পর্বত,
      
    তারই মাঝে ‘কাবা’ আল্লার ঘর দুলে আজ হর ওক্‌ত্‌,
    ঘন
    উথলে অদূরে ‘জম-জম’ শরবৎ!
      
          পানি    কওসর,
      
          মণি    জওহর
    আনি
    ‘জিবরাইল’ আজ হরদম দানে গওহর,
    টানি
    মালিক-উল-মৌত জিঞ্জির – বাঁধে মৃত্যুর দ্বার লৌহর।
    হানি
    বরষা সহসা ‘মিকাইল’ করে ঊষর আরবে ভিঙা,
    বাজে
    নব সৃষ্টির উল্লাসে ঘন ‘ইসরাফিল’ -এর শিঙা!

      
          জন্   জাল
      
          কঙ্   কাল
    ভেদি,
    ঘন জাল মেকি গণ্ডির পঞ্জার
    ছেদি,
    মরুভূতে একী শক্তির সঞ্চার!
    বেদি
    পঞ্জরে রণে সত্যের ডঙ্কার
      
                  ওংকার!
      
    শঙ্কারে করি লঙ্কার পার কার ধনু-টংকার
      
    হুংকারে ওরে সাচ্চা-সরোদে শাশ্বত ঝংকার?
    ভূমা-
    নন্দে রে সব টুটেছে অহংকার!
      
          মর-  মর্মরে
      
          নর-  ধর্ম রে
    বড়ো
    কর্মরে দিল ইমানের জোর বর্ম রে,
    ভর্
    দিল্ জান্ – পেয়ে শান্তি নিখিল ফিরদৌসের হর্ম্য রে!
    রণে
    তাই তো বিশ্ব-বয়তুল্লাতে মন্ত্র ও জয়নাদ –
    ‘ওয়ে
    মার্‌হাবা ওয়ে মার্‌হাবা এয়্ সর্‌ওয়ারে কায়েনাত !’
      
          শর- ওয়ান
      
          দর্- ওয়ান
    আজি
    বান্দা যে ফেরউন শাদ্দাদ নমরুদ মারোয়ান;
    তাজি
    বোর্‌রাক্ হাঁকে আশমানে পর্‌ওয়ান, –
    ও যে
    বিশ্বের চির সাচ্‌চারই বোর্‌হান –
      
                  ‘কোর-আন’!
      
    ‘কোন্ জাদুমণি এলি ওরে’ – বলি রোয়ে মাতা আমিনায়
      
    খোদার হবিবে বুকে চাপি, আহা, বেঁচে আজ স্বামী নাই!
    দূরে
    আব্‌দুল্লার রুহ্ কাঁদে, “ওরে আমিনারে গমি নাই –
    দেখো
    সতী তব কোলে কোন্ চাঁদ, সব ভর-পুর ‘কমি’ নাই।’
      
          ‘এয়্  ফর্ জন্দ’ –
      
           হায়   হর্‌দম্
    ধায়
    দাদা মোত্‌লেব কাঁদি, – গায়ে ধুলা কর্দম!
    ‘ভাই।
    কোথা তুই?’ বলি বাচ্চারে কোলে কাঁদিছে হাম্‌জা দুর্দম!
    ওই
    দিক্‌হারা দিক্‌পার হতে জোর-শোর আসে, ভাসে ‘কালাম’ –
    ‘এয়
    ‘শাম্‌সোজ্জোহা বদরোদ্দোজা কামারোজ্জমাঁ’ সালাম!’

      

    কুঞ্জিকা

    তাজ—মুকুট। তসলিম—সালাম, প্রণাম। শোর্-আওয়াজ—বিরাট বিপুল ধ্বনি। মুজ্‌দা—খোশ খবর, সুসংবাদ। হেরা—আরবের হেরা নামক পর্বত। এই গিরি-গুহায় হজরত মোহাম্মদ (সা) সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। উরজ্, য়্যামেন, নজ্‌দ, হেজাজ, তাহামা—আরবের পাঁচটি প্রদেশের নাম। ইরাক—মেসোপটেমিয়া প্রদেশ। শাম—সিরিয়া প্রদেশ। মেসের—মিশর দেশ। ওমান—আরবের এক ছোট রাজ্য। সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম—আরবী ভাষায় উচ্চারিত ‘দরূদ’ বা শান্তিবাণী। মুসলমান মাত্রেই হজরতের নামের শেষে এই ‘দরূদ’ পাঠ করা একান্ত কর্তব্য। ইহার অর্থ— ‘তাঁহার উপর খোদার শান্তি ও করুণাধারা বর্ষিত হউক।’

    আন্‌জাম—আয়োজন। তান্‌জাম—সওয়ারি। ফিরদৌস—স্বর্গ। হাম্মাম—স্নানাগার। কওসর—অমৃত। ভর—ভরা, পূর্ণ। হুর-পরী—অপ্সরী-কিন্নরী। আব্-জম্‌জম্—মক্কার ‘জমজম’ নামক কূপের পবিত্র পানি। জাম—পেয়ালা। দামাম—দামামা। তামাম—সমস্ত। সামান—সাজ-সরঞ্জাম।

    মস্‌তান—মস্তানা, পাগলা। ব্যস্ থাম—ব্যস, থামো! শিস্তান-বোস্তান—শিস্তানের ফুলবাগিচা। তেগ—তলোয়ার। গর্দানে—স্কন্ধে। রোস্তাম—পারস্যের জগদ্‌বিখ্যাত দিগ্‌বিজয়ী বীর। কাহার্‌বা—তালের নাম। গুল্‌জার—মাৎ। গুল্‌শান—পুষ্প-বাটিকা। গুল্‌ফাম—গোলাবি রঙ্গিন। আরবী দরিয়া—আরব সাগর। খুশিতে বাগে বাগ্—আহ্লাদে আটখানা। নীলা—নীলবর্ণ জলবিশিষ্ট। লোহিতে—লোহিত সমুদ্রের। খুন-জোশিতে—রক্ত-উত্তেজনায়। আগ—আগুন। সাহারা, গোবি—দুই বিশাল মরুভূমির নাম। সব্‌জার—হরিতের। নূরে—জ্যোতিতে। লালী—অরুণিমা। ইরানি—পারস্যের অদিবাসী। দুরানি—কাবুলি। তুর্কি—তুরস্কের অধিবাসী।

    ‘সাবেঈন’—আরবের মূর্তিপূজকগণ। ‘তাবেঈন’—আজ্ঞাবহ। চিল্লায়—চিৎকার করে। ‘দীন’—সত্যধর্ম। ‘লাত্ মানাত’—আরবের মূর্তিপূজকগণের ঠাকুরের নাম। ওয়ারেশিন—উত্তরাধিকারীগণ, (এখানে) ঐ মূর্তিসমূহের দলবল।

    ‘ওয্‌যা হোবল’—আরব মূর্তি-পূজারীদের দুই প্রধান প্রতিমা। ইব্‌লিস—শয়তান। খারেজিন—এক বদমায়েশ সম্প্রদায়। জিন—দৈত্য; genii. জেদ্দা—জেদ্দা বন্দর। মদিনা—শহর (‘মদিনা’ নামক শহর নয়)। ‘কাবা’—মক্কার বিশ্ববিখ্যাত মস্‌জিদ। হর্ ওক্ত—সর্বদা। হর্‌দম্— সদাসর্বদা। গওহর—মতি। মালিক-উল-মৌত—ফেরেশতার (স্বর্গীয় দূত) নাম; জীবের জীবন-সংহার এই যমরাজের হাতে। জিঞ্জির—শৃঙ্খল। ‘মিকাইল’—ফেরেশতা। ভিঙ্গা—সরসা। ইস্‌রাফিল—প্রলয়-বিষাণ-মুখে এক ফেরেশতা। জঞ্‌জাল—জঞ্জাল। কঙ্‌কাল—কঙ্কাল। সরোদ—এক তারের যন্ত্রের নাম।

  • আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    গাইবি আবার কণ্ঠছেঁড়া বিষ-অভিশাপ-সিক্ত গান।

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    আয় রে আমার বাঁধন-ভাঙার তীব্র সুখ

    জড়িয়ে হাতে কালকেউটে গোখরো নাগের

    পীত চাবুক!

    হাতের সুখে জ্বালিয়ে দে তোর সুখের বাসা ফুল-বাগান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    বুঝিসনি কি কাঁদায় তোরে তোরই প্রাণের সন্ন্যাসী!

    তোর অভিমান হল শেষে তোরই গলার নীল ফাঁসি!

    (তোর) হাসির বাঁশি আনলে বুকে যক্ষ্মা-রুগির রক্ত-বান,

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    ফানুস-ফাঁপা মানুষ দেখে, হায় অবোধ

    ছুটে এলি ছায়ার আশায়,

    মাথায় তেমনি জ্বলছে রোদ।

    ফাঁকির ফানুস ছাই হল তোর,

    খুঁজিস এখন রোদ-শ্মশান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    তুই যে আগুন, জল-ধারা চাস কার কাছে?

    বাষ্প হয়ে যায় উড়ে জল সাগর-শোষা তোর আঁচে।

    ফুলের মালার হুলের জ্বালায় জ্বলবি কত অগ্নি-ম্লান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    অগ্নি-ফণী! বিষ-রসানো জিহ্বা দিয়ে দিস চুমা,

    পাহাড়-ভাঙা জাপটানি তোর – ভাবিস সোহাগ-সুখ-ছোঁওয়া!

    মৃত্যুও যে সইতে নারে তোর সোহাগের মৃত্যু টান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

    সুখের লালস শেষ করে দে, স্বার্থপর!

    কাল-শ্মশানের প্রেত-আলেয়া! তুই কোথা বল

    বাঁধবি ঘর?

    ঘর-পোড়ানো ত্রাস-হানা তুই সর্বনাশের লাল-নিশান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    তোর তরে নয় শীতল ছায়া,

    পান্থ-তরুর প্রেম-আসার,

    তুই যে ঘরের শান্তি-শত্রু,

    রুদ্র শিবের চণ্ড মার।

    প্রেম-স্নেহ তোর হারাম যে রে

    কসাই-কঠিন তুই পাষাণ!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    সাপ ধরে তুই চাপবি বুকে

    সইবে না তোর ফুলের ঘা,

    মারতে তোকে বাজ পাবে লাজ

    চুমুর সোহাগ সইবে না!

    ডাক-নামে ডাক তোর তরে নয়,

    আহ্বান তোর ভীম কামান।

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    ফণীমনসার কাঁটার পুরে

    আয় ফিরে তুই কালফণী,

    বিষের বাঁশি বাজিয়ে ডাকে নাগমাতা –

    ‘আয় নীলমণি!’

    ক্ষুদ্র প্রেমের শূদ্রামি ছাড়,

    ধর খ্যাপা তোর অগ্নি-বাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

  • কৈফিয়ত

    কৈফিয়ত

    কৈফিয়ত

    ‘অগ্নিবীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম দিয়ে তাতে যেসব কবিতা ও গান দেব বলে এতকাল ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলাম, সেইসব কবিতা ও গান দিয়ে এই ‘বিষের বাঁশি’ প্রকাশ করলাম। নানা কারণে ‘অগ্নিবীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম বদলে ‘বিষের বাঁশি’ নামকরণ করলাম। বিশেষ কারণে কয়েকটি কবিতা ও গান বাদ দিতে বাধ্য হলাম। কারণ ‘আইন’-রূপ ‘আয়ান ঘোষ’ যতক্ষণ তার বাঁশ উঁচিয়ে আছে, ততক্ষণ বাঁশিতে তথাকথিত ‘বিদ্রোহ’-রাধার নাম না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ওই ঘোষের পো-র বাঁশ বাঁশির চেয়ে অনেক শক্ত। বাঁশে ও বাঁশিতে বাঁশাবাঁশি লাগলে বাঁশিরই ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা, বাঁশি হচ্ছে সুরের, আর বাঁশ হচ্ছে অসুরের।

    এই বাঁশি তৈরির জন্য আমার অনেক বন্ধু নিঃস্বার্থভাবে অনেক সাহায্য করেছেন। তাঁরা সাহায্য না করলে এ বাঁশির গান আমার মনের বেণুবনেই গুমরে মরত। এঁরা সকলেই নিঃস্বার্থ নিষ্কলুষ প্রাণ-সুন্দর আনন্দ-পুরুষ। আমার নিখরচা কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ পাওয়ার লোভে এঁরা সাহায্য করেননি। এঁরা সকলেই জানেন, ওসব বিষয়ে আমি একেবারে অমানুষ বা পাষাণ। এঁরা যা করেছেন তা স্রেফ আনন্দের প্রেরণায় ও আমায় ভালোবেসে। সুতরাং আমি ভিক্ষাপ্রাপ্ত ভিক্ষুকের মতো তাঁদের কাছে চিরচলিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁদের আনন্দকে খর্ব ও ভালোবাসাকে অস্বীকার করব না। এঁরা যদি সাহায্য হিসাবে আমায় সাহায্য করতে আসতেন তাহলে আমি এঁদের কারুর সাহায্য নিতাম না। যাঁরা সাহায্য করে মনে মনে প্রতিদানের দাবি পোষণ করে আমায় দায়ী করে রাখেন, তাঁদের সাহায্য নিয়ে আমি নিজেকে অবমানিত করতে নারাজ। এতটুকু শ্রদ্ধা আমার নিজের উপর আছে। স্রেফ তাঁদের নাম ও কে কোন মালমশলা জুগিয়েছেন তাই জানাচ্ছি – নিজেকে হালকা করার আত্মপ্রসাদের লোভে।

    এ ‘বিষের বাঁশি’র বিষ জুগিয়েছেন আমার নিপীড়িতা দেশমাতা, আর আমার ওপর বিধাতার সকল রকম আঘাতের অত্যাচার।

    বাঁশ জুগিয়েছেন সুলেখক ঔপন্যাসিক বন্ধু সনৎকুমার সেন। এ-বাঁশকে বাঁশি করে তুলেছেন – ‘বাণী’ যন্ত্র দিয়ে ওই যন্ত্রাধিকারী বিখ্যাত স্বদেশ-সেবক আমার অগ্রজ-প্রতিম পরম শ্রদ্ধাস্পদ ললিতদা ও পাঁচুদা। তাঁদের যন্ত্রের সাহায্য না পেলে এ-বাঁশি শুধু বাঁশই রয়ে যেত। এই বাঁশি গায়ের অদ্ভুত বিচিত্র নকশাটি কেটে দিয়েছেন প্রথিত-যশা কবি-শিল্পী – আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু – ‘কল্লোল’-সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ। এই সবের তত্ত্বাবধানের ভার নিয়েছিলেন দেশের-কাজে-উৎসর্গ-প্রাণ আমার পরম শ্রদ্ধার বন্ধু মৌলবি মঈনউদ্দিন হোসেন সাহেব বি. এ. (নূর লাইব্রেরি)। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, ডি. এম. লাইব্রেরির গোপালদা এই গান শোনাবার জন্য ঢোল শোহরৎ দেওয়ার ভার নিয়েছেন।

    এত বন্ধুর এত চেষ্টা সত্ত্বেও অনেক দোষত্রুটি রয়ে গেল আমার অবকাশ-হীনতা ও অভিমন্যুর মতো সপ্তরথী-পরিবেষ্টিত ক্ষতবিক্ষত অবস্থার জন্য। যাঁরা আমায় জানেন, তাঁরা জানেন, আমার বিনা কাজের হট্টমন্দিরে অবকাশের কীরকম অভাব এবং জীবনের কতখানি শক্তি ব্যয় করতে হয় দশ দিকের দশ আক্রমণ ব্যর্থ করবার জন্য। যদি অবকাশ ও শান্তি পাই, তাহলে দ্বিতীয় সংস্করণে এর দোষত্রুটি নিরাকরণের চেষ্টা করব। ইতি –

    হুগলি

    ১৬ শ্রাবণ, ১৩৩১

    নজরুল ইসলাম

  • উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    বাংলার অগ্নি-নাগিনি মেয়ে মুসলিম-মহিলা-কুল-গৌরব

    আমার জগজ্জননী-স্বরূপা মা

    মিসেস এম. রহমান সাহেবার

    পবিত্র চরণারবিন্দে –

    এমনই প্লাবন-দুন্দুভি-বাজা ব্যাকুল শ্রাবণ মাস–

    সর্বনাশের ঝান্ডা দুলায়ে বিদ্রোহ-রাঙা-বাস

    ছুটিতে আছিনু মাভৈঃ-মন্ত্র ঘোষি অভয়কর,

    রণ-বিপ্লব-রক্ত-অশ্ব কশাঘাত-জর্জর!

    সহসা থমকি দাঁড়ানু আমার সর্পিল-পথ-বাঁকে,

    ওগো নাগমাতা, বিষ-জর্জর তব গরজন-ডাকে!

    কোথা সে অন্ধ অতল পাতাল-বন্ধ গুহার তলে,

    নির্জিত তব ফণা-নিঙড়ানো গরলের ধারা গলে;

    পাতাল-প্রাচীর চিরিয়া তোমার জ্বালা-ক্রন্দন-চূর

    আলোর জগতে এসে বাজে যেন বিষ-মদ-চিক্কুর!

    আঁধার-পীড়িত রোষ-দোদুল সে তব ফণা-ছায়া-দোল

    হানিছে গৃহীরে অশুভ শঙ্কা, কাঁপে ভয়ে সুখ-কোল।

    ধূমকেতু-ধ্বজ বিপ্লব-রথ সম্ভ্রমে অচপল,

    নোয়াইল শির শ্রদ্ধা-প্রণত রথের অশ্বদল!

    ধূমকেতু-ধূম-গহ্বরে যত সাগ্নিক শিশু-ফণী

    উল্লাসে ‘জয় জয় নাগমাতা’ হাঁকিল জয়-ধ্বনি!

    বন্দিল, উর নাগ-নন্দিনী ভেদিয়া পাতাল-তল!

    দুলিল গগনে অশুভ-অগ্নি পতাকা জ্বালা-উজল!

    তারপর মা গো কোথা গেলে তুমি, আমি কোথা হনু হারা,

    জাগিয়া দেখিনু, আমারে গ্রাসিয়া রাহু রাক্ষস-কারা!

    শৃঙ্খলিতা সে জননীর ব্যথা বাজিয়া এ ক্ষীণ বুকে

    অগ্নি হয়ে মা জ্বলেছিল খুন, বিষ উঠেছিল মুখে,

    শৃঙ্খল-হানা অত্যাচারীর বুকে বাজপাখি সম

    পড়িয়া তাহারে ছিঁড়িতে চেয়েছি হিংসা-নখরে মম,—

    সে আক্রমণ ব্যর্থ কখন করেছে কারার ফাঁদ,

    বন্দিনী দেশ-জননীর সাথে বেঁধেছে আমারে বাঁধ।

    হাতে পায়ে কটি-গর্দানে মোর বাজে শত শৃঙ্খল,

    অনাহারে তনু ক্ষুধা-বিশীর্ণ, তৃষায় মেলে না জল,

    কত যুগ যেন এক অঞ্জলি পাইনিকো আলো বায়ু,

    তারই মাঝে আসি রক্ষী-দানব বিদ্যুতে বেঁধে স্নায়ু –

    এত যন্ত্রণা তবু সব যেন বুকে ক্ষীর হয়ে ওঠে,

    শত্রুর হানা কণ্টক-ক্ষত প্রাণে ফুল হয়ে ফোটে!–

    এরই মাঝে তুমি এলে নাগমাতা পাতাল-বন্ধ টুটি

    অচেতন মম ক্ষত তনু পড়ে তব ফণা-তলে লুটি!

    তোমার মমতা-মানিক-আলোকে চিনিনু তোমারে মাতা,

    তুমি লাঞ্ছিতা বিশ্বজননী! তোমার আঁচল পাতা

    নিখিল দুঃখী নিপীড়িত তরে; বিষ শুধু তোমা দহে

    ফণা তব মা গো পীড়িত নিখিল ধরণির ভার বহে! –

    আমারে যে তুমি বাসিয়াছ ভালো ধরেছ অভয়-ক্রোড়ে,

    সপ্ত রাজার রাজৈশ্বর্য মানিক দিয়াছ মোরে,

    নহে তার তরে, – সব সন্তানে তুমি যে বেসেছ ভালো,

    তোমার মানিক সকলের মুখে দেয় যে সমান আলো,

    শুধু মাতা নহ, জগন্মাতার আসনে বসেছ তুমি,–

    সেই গৌরবে জননী আমার, তোমার চরণ চুমি!

    হুগলি

    ১৬ শ্রাবণ, ১৩৩১

    তোমার নাগ-শিশু

    নজরুল ইসলাম

  • বিষের বাঁশী

    বিষের বাঁশী

    বিষের বাঁশী

    ‘বিষের বাঁশী’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৬ই শ্রাবণ—আগষ্ট ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কবি নিজেই হুগলি থেকে ‘বিষের বাঁশী’ প্রকাশ করেন। নামপৃষ্ঠায় এর মুদ্রণসংখ্যা ২২০০ বলে উল্লিখিত ছিল এবং লেখা ছিল, “গ্রন্থকার কর্তৃক সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত”। গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪+৬০, মূল্য এক টাকা ছয় আনা এবং “সোল এজেণ্ট ও প্রাপ্তিস্থান— ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা।” এই গ্রন্থে ২৭টি কবিতা রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের বাজেয়াপ্ত ৫টি গ্রন্থের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রকাশের অব্যবহিত পরে তৎকালীন ভারত সরকার ২২ অক্টোবর ১৯২৪ সালে ‘বিষের বাঁশী’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয় ২৭ এপ্রিল ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে।

    ‘বিষের বাঁশী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় নূর লাইব্রেরি, ১২/১ সারেঙ্গ লেন, তালতলা, কলিকাতা থেকে ১৩৫২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে। বাংলা একাডেমি ‘নজরুল রচনাবলী’তে আবদুল কাদির এই সংস্করণের পাঠ অনুসরণ করেছিলেন। রচনাবলীর নতুন সংস্করণে ‘বিষের বাঁশী’র প্রথম দুই সংস্করণের পাঠ মিলিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।

    প্রথম সংস্করণে উৎসর্গপত্রটি ছিল গ্রন্থের শুরুতে, দ্বিতীয় সংস্করণে তা কৈফিয়তের পরে আনা হয়। প্রথম সংস্করণের ‘জাগৃহী’ কবিতার শিরোনাম সংশোধিত হয়ে দ্বিতীয় সংস্করণে হয় ‘জাগৃহি’—বাংলা একাডেমি শেষেরটিই গ্রহণ করেছে। কৈফিয়তে মূলে ডি. এম. লাইব্রেরির ‘গোপাল-দা’ প্রসঙ্গে যে বাক্যটি ছিল, তা দ্বিতীয় সংস্করণে বর্জিত হয়েছে।

    ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি মিসেস্ এম. রহমান [মুসাম্মাৎ মাসুদা খাতুন : জন্ম ১৮৮৪ খ্রি. মৃত্যু ২০শে ডিসেম্বর ১৯২৬ খ্রি.] সাহেবার উদ্দেশে রচিত। মিসেস্ এম. রহমান এদেশে নারী-অধিকার-আন্দোলনের একজন অগ্রনায়িকা ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা, সওগাত, সহচর, সাম্যবাদী, ধূমকেতু, লাঙল, অভিযান প্রভৃতি সাময়িকপত্রে বহু প্রবন্ধ ও ছোটগল্প লেখেন। তাঁর ‘মা ও মেয়ে’ নাম অসমাপ্ত উপন্যাসখানি ১৩২৯ আষাঢ় হতে ধারাবাহিকভাবে মাসিক ‘সহচর’ পত্রে প্রকাশিত হয়। তাঁর ‘চানাচুর’ পুস্তকের ‘আমাদের দাবী’, ‘পর্দা বনাম প্রবঞ্চনা’, ‘নারীর বন্ধন’ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি তৎকালে পাঠকমহলে আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল।

    ‘ফাতেমা-ই-দোয়াজদহম : আবির্ভাব’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে এবং ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম : তিরোভাব’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় বের হয়।

    ‘জাগৃহি’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৩০শে শ্রাবণ ১ম বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘ধূমকেতু’তে ‘জাগরণী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    ‘তুর্য-নিনাদ’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যক মাসিক ‘বসুমতী’তে বের হয়।

    ‘বোধন’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত হয়। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : “সূর—যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ।” তার পাদটীকায় লেখা ছিল : “হাফিজের ‘য়ুসোফে গুম্ গশ্‌তা বাজ্‌ আয়েদ্‌ ব-কিনান গম্ মখোর’ গজল অবলম্বনে।” কবিতাটির প্রথম (এবং পরবর্তী চারটি স্তবকের প্রত্যকটির শেষে পুনরাবৃত্ত) শ্লোকটি ছিল এরূপ—

    দুঃখ কি ভাই! হারানো য়ুসোফ কিনানে আবার আসিবে ফিরে;
    দলিত শুষ্ক এ মরুভু পুনঃ হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে।

    ‘উদ্বোধন’ গানটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ২য় বর্ষের ৬ষ্ঠ সংখ্যক ‘সওগাতে’ ছাপা হয়েছিল।

    ‘মরণ-বরণ’ গানটি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিকে ৪র্থ বর্ষের তৃতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বন্দী-বন্দনা’ গানটি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘে ৮ম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যক ‘নারায়ণে’ এবং ৪র্থ বর্ষের চতুর্থ সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকায় রচনা-স্থান ছাপা আছে : “কান্দিরপাড়, কুমিল্লা।” ‘নারায়ণে’ শিরোনামের নীচে লেখা ছিল ‘মল্লার—তেওরা’। তাতে শেষাংশ ছিল এইরূপ—

    আজি
    ধ্বনিছে দিগ্বধু শঙ্গ দিকে দিকে,
     
    গগনে কা’রা যেন চাঁহিয়া অনিমিখে
    ভারত হোমশিখা জ্বলিল জয়টিকা
     
    পরাতে ও কপালে।
    সে
    কারা মুক্তি-কারা যেখানে ভৈরব-রুদ্র-শিখা জ্বলে।
     
    কোরাস; জয় হে বন্ধন-মৃত্যু শঙ্কাজয়ী।
     
    মুক্তি-কামী জয়।
     
    স্বাধীন-চিত জয়। জয় হে॥

    ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় পঞ্চম স্তবকের শেষ চরণটি ছিল এরূপ—

    ‘সে কারা নহে কারা যেখানে ভগবান-রুদ্র-শিখা জ্বলে॥’

    ‘বন্দনা-গান’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘সাধনা’ পত্রিকায় ‘বিজয়-গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। রচনা-স্থান : ‘কান্দিরপাড়, কুমিল্লা।’

    ‘শিকল-পরার গান’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয়। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘খাম্বাজ—দাদ্‌রা’। তাতে কবির কৃত ‘স্বরলিপি’ও ছাপা হয়েছিল।

    ‘চরকার গান’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘ভারতী’তে ছাপা হয়। বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘খাম্বাজ—কীর্তন—দাদ্‌রা’। সে সংখ্যাতে ‘চরকার গানে’র স্বরলিপিও ছাপা হয়েছিল। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে নজরুল ইসলাম ‘চরকার গান’ গেয়েছিলেন।

    ‘জাতের বজ্জাতি’ গানটি ‘জাত-জালিয়াত’ শিরোনামে ‘বিজলী’তে ছাপা হয়। পাদটীকায় লেখা ছিল : ‘মাদারীপুর শান্তি-সেনা চারণ-দলের জন্য লিখিত অপ্রকাশিত নাটক থেকে।’ ‘বিজলী’ হতে গানটি ১৩৩০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণের ‘উপাসনা’য় ‘উদ্ধৃত’ হয়েছিল।১৩৩০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে ষষ্ঠ বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য়ও গানটি ‘জাত-জালিয়াত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বিজয়-গান’ ১৩২৮ শ্রাবণের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়। রচনা-স্থান : ‘কান্দিরপাড়, কুমিল্লা’।

    ‘পাগল পথিক’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে বের হয়েছিল। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘সুর—মেঘ-ছায়ানট; তাল—দাদ্‌রা’।

    ‘বিদ্রোহীর বাণী’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘ভারতী’তে ‘এবার তোরা সত্য বল্’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘ঝড়’ [পশ্চিম তরঙ্গ] ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যক ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

  • সে যে চাতকই জানে

    সে যে চাতকই জানে

    সে যে চাতকই জানে

    সে যে
    চাতকই জানে তার মেঘ এত কী,
    যাচে
    ঘন ঘন বরিষন কেন কেতকী,
    চাঁদে
    চকোরই চেনে আর চেনে কুমুদী,
    জানে
    প্রাণ কেন প্রিয়ে প্রিয়তম চুমু দি!

      

  • শেষ প্রার্থনা

    শেষ প্রার্থনা

    শেষ প্রার্থনা

    আজ
    চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ বরষের শেষে
      
    এমনি কাটে আসছে-জনম তোমায় ভালোবেসে।
      
          এমনি আদর, এমনি হেলা
      
          মান-অভিমান এমনি খেলা,
      
          এমনি ব্যথার বিদায়-বেলা
      
                এমনি চুমু হেসে,
    যেন
    খণ্ডমিলন পূর্ণ করে নতুন জীবন এসে!
    এবার
    ব্যর্থ আমার আশা যেন সকল প্রেমে মেশে!
    আজ
    চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ বরষের শেষে!

      

    যেন
    আর না কাঁদায় দ্বন্দ্ব-বিরোধ, হে মোর জীবন-স্বামী!
    এবার
    এক হয়ে যাক প্রেমে তোমার তুমি আমার আমি!
      
          আপন সুখকে বড়ো করে
      
          যে দুখ পেলাম জীবন ভরে,
      
          এবার তোমার চরণ ভরে,
      
                নয়নজলে ভেসে
    যেন
    পূর্ণ করে তোমায় জিনে সব-হারানোর দেশে,
    মোর
    মরণ-জয়ের বরণমালা পরাই তোমার কেশে।
    আজ
    চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ-বিদায়ের শেষে।

      

  • আশা

    আশা

    আশা

    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে,
    আমার
    লুটিয়ে-পড়া দেহ তখন ধরবে কি ওই কোলে?
      
          বাড়িয়ে বাহু আসবে ছুটে?
      
          ধরবে চেপে পরানপুটে?
      
          বুকে রেখে চুমবে কি মুখ
      
                নয়নজলে গলে?
    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে!

      

    তুমি
    এতদিন যা দুখ দিয়েছ হেনে অবহলা,
    তা
    ভুলবে না কি যুগের পরে ঘরে-ফেরার বেলা?
      
          বলো বলো জীবন-স্বামী
      
          সেদিনও কি ফিরব আমি
      
          অন্তকালেও ঠাঁই পাব না
      
                ওই চরণের তলে?
    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে!

      

  • কবি-রাণী

    কবি-রাণী

    কবি-রাণী

    তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।

    আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি॥

    আপন জেনে হাত বাড়ালো-

    আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,

    বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা

    পুবের অরুণ রবি,—

    তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?

      

    আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,

    আমার আশা বাইরে এল তোমার হঠাৎ আসায়।

    তুমিই আমার মাঝে আসি

    অসিতে মোর বাজাও বাঁশি,

    আমার পূজার যা আয়োজন

    তোমার প্রাণের হবি।

    আমার বাণী জয়মাল্য, রাণি! তোমার সবই।

      

    তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।

    আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।

      

  • সাধের ভিখারিণী

    সাধের ভিখারিণী

    সাধের ভিখারিণী

    তুমি
    মলিন বাসে থাক যখন, সবার চেয়ে মানায়!
    তুমি
    আমার তরে ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়!
      
          জানি প্রিয়ে জানি জানি,
      
          তুমি হতে রাজার রানি,
      
          খাটত দাসী, বাজত বাঁশি
      
              তোমার বালাখানায়
    তুমি
    সাধ করে আজ ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়।

      

    দেবী!
    তুমি সতী অন্নপূর্ণা, নিখিল তোমার ঋণী,
    শুধু
    ভিখারিকে ভালোবেসে সাজলে ভিখারিনি
      
          সব ত্যজি মোর হলে সাথি,
      
          আমার আশায় জাগছ রাতি,
      
          তোমার পূজা বাজে আমার
      
              হিয়ার কানায় কানায়!
    তুমি
    সাধ করে আজ ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়।

      

  • মুখরা

    মুখরা

    মুখরা

    আমার
     কাঁচা মনে রং ধরেচে আজ,
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?
    আমার
     কাঁচা মনে রং ধরেচে আজ,

      

      
          আমার ভুবন উঠচে রেঙে
      
          তাঁর পরশের সোহাগ লেগে,
      
          ঘুমিয়ে ছিনু দেখনু জেগে মা,
    আমায়
    জড়িয়ে বুকে দাঁড়িয়ে আছেন নিখিল হৃদয়-রাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

    আমায়
    দিনের আলোয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী!
      
    মা গো, আমি আর কি মিথ্যা লজ্জা করে পারি?
    আমায়
    দিনের আলোয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী।
      
          জগৎ যারে পায় না সেধে
      
          সেই সে যখন সাধছে কেঁদে
      
          আমার চরণ বক্ষে বেঁধে মা,
    আমি
    বাঁধব না চুল, এই ভালো মোর ভিখারিনির সাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

    আমার
    কীসের সজ্জা, কীসের লজ্জা, কীসের পরানপণ?
    মা গো
    বক্ষে আমার বিশ্বলোকের চির-চাওয়া ধন,
    আমার
    কীসের সজ্জা, কীসের লজ্জা, কীসের পরানপণ?

      

      
          বিশ্ব-ভুবন যার পদছায়
      
          সেই এসে হায় মোর পদ চায়,
    আমার
    সুখ-আবেগে বুক ফেটে যায় মা,
    আজ
    লাজ ভুলেছি, সাজ ভুলেছি, ভুলেছি সব কাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

  • পিছু-ডাক

    পিছু-ডাক

    পিছু-ডাক

    সখি!
    নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি আর মনে?
      
    সেথা তোমার নতুন পূজা নতুন আযোজনে!
      
          প্রথম দেখা তোমায় আমায়
      
          যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
      
          যেথায় প্রতি ধূলি-কণায়,
      
                    লতাপাতার সনে –
      
    নিত্য চেনার বিত্ত রাজে চিত্ত-আরাধনে,
      
    শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।

      

    সেথা
    তুমি যখন ভুলতে আমায়, আসত অনেক কেহ,
    তখন
    আমার হয়ে অভিমানে কাঁদত যে ঐ গেহ।
      
              যেদিক পানে চাইতে সেথা
      
              বাজতে আমার স্মৃতির ব্যথা,
      
                        নতুন আলাপনে।
      
    আমিই শুধু হারিয়ে গেলেম হারিয়ে-যাওয়ার বনে॥

      

    আমার
    এত দিনের দূর ছিল না সত্যিকারের দুর,
    ওগো
    আমার সুদুর করতে নিকট ঐ পুরাতন পুর।
      
          এখন তোমার নতুন বাঁধন
      
          নতুন হাসি, নতুন কাঁদন,
      
          নতুন সাধন, গানের মাতন
      
                    নতুন আবাহনে।
      
    আমারই সুর হারিয়ে গেল সুদুর পুরাতন।

      

    সখি!
    আমার আশাই দুরাশা আজ, তোমার বিধির বর,
    আজ
    মোর সমাধির বুকে তোমার উঠবে বাসর-ঘর!
      
          শূণ্য ভরে শুনতে পেনু
      
          ধেনু-চরা বনের বেণু-
      
           হারিয়ে গেনু হারিয়ে গেনু
      
                        অস্ত–দিগঙ্গনে।
      
    বিদায় সখি, খেলা-শেষ এই বেলা-শেষের খনে!
      
    এখন তুমি নতুন মানুষ নতুন গৃহকোণে।

      

  • আশান্বিতা

    আশান্বিতা

    আশান্বিতা

    আবার কখন আসবে ফিরে সেই আশাতে জাগবে রাত,

    হয়তো সে কোন নিশুত রাতে ডাকবে এসে অকস্মাৎ

    সেই আশাতে জাগব রাত।

    যতই কেন বেড়াও ঘুরে

    বরণ-বনের গহন জুড়ে

    দূর সুদূরে,

    কাঁদলে আমি আসবে ছুটে, রইতে তুমি নারবে নাথ,

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    কপট! তোমার শপথ-পাহাড় বিন্ধ্যসম হোক না সে,

    ঝড়ের মুখে খড়ের মতন উড়বে তা মোর নিশ্বাসে।

    একটি ছোট্ট নিশ্বাসে।

    রাত্রি জেগে কাঁদছি আমি

    শুনবে যখন, হে মোর স্বামী,

    সুদূরগামী!

    আগল ভেঙে আসবে পাগল, চুমবে সজল নয়ন-পাত,

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    জানি সখা, আমার চোখের একটি বিন্দু অশ্রুজল,

    নিববে তাতেই তোমার বুকের অগ্নি-সিন্ধু নীল গরল,

    আমার চোখের অশ্রুজল।

    তোমার আদর-সোহাগিনি

    তাই তো কাঁদায় নিশিদিনই

    এ অধীনী,

    ভুলবে জানি তোমার রানি গরবিনির সব আঘাত।

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    আসবে আবার পদ্মানদী, দুলবে তরি ঢেউ-দোলায়,

    তেমনি করে দুলব আমি তোমার বুকের পরকোলায়।

    দুলবে তরি ঢেউ-দোলায়।

    পাগলি নদী উঠবে ক্ষেপে,

    তোমায় তখন ধরব চেপে,

    বক্ষ ব্যেপে,

    মরণ-ভয়কে ভয় কি তখন, জড়িয়ে কণ্ঠ থাকবে হাত।

    সেই আশাতে জাগব রাত।

    পোড়া চোখের জল ফুরায় না, কেমন করে আসবে ঘুম?

    মনে পড়ে শুধু তোমার পাতাল-গভীর মাতাল চুম,

    কেমন করে আসবে ঘুম?

    আজ যে আমার নিশীথ জুড়ে

    একলা থাকার কান্না ঝুরে

    হুতাশ সুরে,

    পোবের হাওয়ায় কাঁদবে সে সুর, আসবে পছিম হাওয়ার সাথ!

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    বিজলি-শিখার প্রদীপ জ্বেলে ভাদর রাতের বাদল মেঘ,

    দিগ্‌বিদিকে খুঁজছে তোমায় ডাকছে কেঁদে বজ্র-বেগ –

    দিগ্‌বিদিকে খুঁজছে মেঘ।

    তোমার আশায় ওই আশা-দীপ

    জ্বালিয়েছে আজ দিক ভরে নীপ,

    হে রাজ-পথিক

    আজ না আসো, এসো যেদিন দীপ নিবাবে ঝঞ্ঝাবাত।

    সেই আশাতে জাগব রাত।

  • অভিশাপ

    অভিশাপ

    অভিশাপ

    যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,

    অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে।

      

    ছবি আমার বুকে বেঁধে

    পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে

    ফিরবে মরু কানন গিরি,

    সাগর আকাশ বাতাস চিরি

    যেদিন আমায় খুঁজবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে।

      

    স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে

    কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,-

    জাগবে হঠাৎ চমকে!

    ভাববে বুঝি আমিই এসে

    বসনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,

    ধরতে গিয়ে দেখবে যখন-

    শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!

    বেদ্‌নাতে চোখ বুঁজবে-

    বুঝবে সেদিন বুজবে।

      

    গাইতে বসে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্‌বে যখন কান্না,

    বলবে সবাই-‘সেই যে পথিক তার শেখানো গান না?’

    আসবে ভেঙে কান্না।

    পড়বে মনে আমার সোহাগ,

    কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ।

    পড়বে মনে অনেক ফাঁকি

    অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি

    ঘন ঘন মুছবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

      

    আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভরবে তোমার অঙ্গন,

    তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ,

    কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!

    শিউলি-ঢাকা মোর সমাধি

    পড়বে মনে, উঠবে কাঁদি।

    বুকের মালা করবে জ্বালা,

    চোখের জলে সেদিন বালা

    মুখের হাসি ঘুচবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে।

      

    আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি,

    থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রীই!

    আসবে শিশির-রাত্রি।

    থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন,

    থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন,

    বঁধুর বুকের পরশনে

    আমার পরশ আনবে মনে-

    বিষিয়ে ও-বুক উঠবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

      

    আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে নাকো আর সে-

    তোমার সুখে পড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে,

    আসবে নাকো আর সে!

    পড়বে মনে, মোর বাহুতে

    মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে,

    মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!

    সেই স্মৃতি নিত্ ওই-বিছানায়

    কাঁটা হয়ে ফুটবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

      

    আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে,

    সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে-

    দুলবে তরী রঙ্গে,

    পড়বে মনে সে কোন্‌ রাতে

    এক তরীতে ছিলে সাথে,

    এমনি গাঙ ছিল জোয়ার,

    নদীর দুধার এমনি আঁধার

    তেম্‌নি তরী ছুটবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

      

    তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,

    আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়তো হবে অন্ধ-

    সখার কারা-বন্ধ!

    বন্ধু তোমার হানবে হেলা

    ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;

    দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,

    বইতে প্রাণের শান্ত এ-ভার

    মরণ-সনে যুঝবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

      

    ফুটবে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী,

    আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদনী-

    চৈতী-রাতের চাঁদনী।

    ঋতুর পরে ফিরবে ঋতু,

    সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু!

    চাইবে কেঁদে নীল নভো গা-য়,

    আমার মতন চোখ ভ’রে চায়

    যে-তারা তায় খুঁজবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

      

    আসবে ঝড়ি, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন,

    কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন-

    টুটবে যবে বন্ধন!

    পড়বে মনে, নেই সে সাথে

    বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে-

    আপনি গালে যাচবে চুমা,

    চাইবে আদর, মাগবে ছোঁয়া,

    আপনি যেচে চুমবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে।

      

    আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হানত,

    সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হয়ে শ্রান্ত–

    আসবে তখন পান্থ।

    হয়ত তখন আমার কোলে

    সোহাগ-লোভে পড়বে ঢলে,

    আপনি সেদিন সেধে কেঁদে

    চাপবে বুকে বাহু বেঁধে,

    চরণ চুমে পূজবে-

    বুঝবে সেদিন বুঝবে!

  • পূজারিণী

    পূজারিণী

    পূজারিণী

    এত দিনে অবেলায়-

    প্রিয়তম!

    ধূলি-অন্ধ ঘূর্ণি সম

    দিবাযামী

    যবে আমি

    নেচে ফিরি রুধিরাক্ত মরণ-খেলায়-

    এত দিনে অ-বেলায়

    জানিলাম, আমি তোমা জন্মে জন্মে চিনি।

    পূজারিণী!

    ঐ কণ্ঠ, ও-কপোত- কাঁদানো রাগিণী,

    ঐ আঁখি, ঐ মুখ,

    ঐ ভুরু, ললাট, চিবুক,

    ঐ তব অপরূপ রূপ,

    ঐ তব দোলো-দোলো গতি-নৃত্য দুষ্ট দুল রাজহংসী জিনি-

    চিনি সব চিনি।

      

    তাই আমি এতদিনে

    জীবনের আশাহত ক্লান্ত শুষ্ক বিদগ্ধ পুলিনে

    মূর্ছাতুর সারা প্রাণ ভরে

    ডাকি শুকু ডাকি তোমা,

    প্রিয়তমা!

    ইষ্ট মম জপ-মালা ঐ তব সব চেয়ে মিষ্ট নাম ধরে!

    তারি সাথে কাঁদি আমি-

    ছিন্ন-কন্ঠে কাঁদি আমি, চিনি তোমা, চিনি চিনি চিনি,

    বিজয়িনী নহ তুমি-নহ ভিখারিনী,

    তুমি দেবী চির-শুদ্ধ তাপস-কুমারী, তুমি মম চির-পূজারিণী!

    যুগে যুগে এ পাষাণে বাসিয়াছ ভালো,

    আপনারে দাহ করি, মোর বুকে জ্বালায়েছ আলো,

    বারে বারে করিয়াছ তব পূজা-ঋণী।

    চিনি প্রিয়া চিনি তোমা, জন্মে জন্মে চিনি চিনি চিনি!

    চিনি তোমা বারে বারে জীবনের অস–ঘাটে, মরণ-বেলায়।

    তারপর চেনা-শেষে

    তুমি-হারা পরদেশে

    ফেলে যাও একা শুন্য বিদায়-ভেলায়!…..

    *    *    *    *    *

    আজ দিনান্তের প্রান্তে বসি আঁখিনীরে তিতি

    আপনার মনে আনি তারি দূর-দূরানে-র স্মৃতি-

    মনে পড়ে-বসনে-র শেষ-আশা-ম্লান মৌন মোর আগমনী সেই নিশি,

    যেদিন আমার আঁখি ধন্য হ’ল তব আখি-চাওয়া সনে মিশি।

    তখনও সরল সুখী আমি- ফোটেনি যৌবন মম,

    উন্মুখ বেদনা-মুখী আসি আমি ঊষা-সম

    আধ-ঘুমে আধ-জেগে তখনো কৈশোর,

    জীবনের ফোটো-ফোটো রাঙা নিশি-ভোর,

    বাধাবন্ধহারা

    অহেতুক নেচে-চলা ঘূর্ণিবায়ু-পারা

    দুরন্ত গানের বেগ অফুরন্ত হাসি

    নিয়ে এনু পথভোলা আমি অতিদূর পরবাসী।

    সাথে তারি

    এনেছিনু গৃহ-হারা বেদনার আঁখিভরা বারি।

    এসে রাতে-ভোরে জেগে গেয়েছিনু জাগরণী সুর-

    ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিলে তুমি কাছে এসেছিলে,-

    হাসি হেরে কেঁদেছিনু-‘তুমি কার পোষাপাখী কান্তার-বিধুর?’

    চোখে তব সে কী চাওয়া! মনে হল যেন

    তুমি মোর ঐ কন্ঠ ঐ সুর-

    বিরহের কান্না-ভারাতুর

    বনানী-দুলানো,

    দখিনা সমীরে ডাকা কুসুম-ফোটানো বন-হরিণী-ভুলানো

    আদি জন্মদিন হতে চেন তুমি চেন!

    তারপর-অনাদরে বিদায়ের অভিমান-রাঙা

    অশ্রু-ভাঙা-ভাঙা

    ব্যথা-গীত গেয়েছিনু সেই আধ-রাতে,

    বুঝি নাই আমি সেই গান-গাওয়া ছলে

    কারে পেতে চেয়েছিনু চিরশূন্য মম হিয়া-তলে,

    শুধু জানি, কাঁচা-ঘুমে জাগা তব রাগ-অরুণ-আঁখি-ছায়া

    লেগেছিল মম আঁখি-পাতে।

    আরো দেখেছিনু, ঐ আঁখির পলকে

    বিস্ময়-পুলক-দীপ্তি ঝলকে ঝলকে

    ঝলেছিল, গলেছিল গাঢ় ঘন বেদানার মায়া,-

    করুণায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল বিরহিণী অন্ধকার নিশীথিনী-কায়া!

    তৃষাতুর চোখে মোর বড় যেন লেগেছিল ভালো

    পূজারিণী! আঁখি-দীপ-জ্বালা তব সেই সিগ্ধ সকরুণ আলো। –

    তারপর-গান গাওয়া শেষে

    নাম ধরে কাছে বুঝি ডেকেছিনু হেসে।

    অমনি কী গর্জে-ওঠা রুদ্ধ অভিমানে

    (কেন কে সে জানে)

    দুলি উঠেছিল তব ভুরু-বাঁধা স্থির আঁখি-তরি,

    ফুলে উঠেছিল জল, ব্যথা-উৎস-মুখে তাহা ঝরঝর পড়েছিল ঝরি!

    একটু আদরে এত অভিমানে ফুলে-ওঠা, এত আঁখি-জল,

    কোথা পেলি ওরে কার অনাদৃতা ওরে মোর ভিখারিনি,

    বল মোরে বল।

    এই ভাঙা বুকে

    ওই কান্না-রাঙা মুখ থুয়ে লাজ-সুখে

    বল মোরে বল-

    মোরে হেরি কেন এত অভিমান?

    মোর ডাকে কেন এত উথলায় চোখে তব জল?

    অ-চেনা অ-জানা আমি পথের পথিক

    মোরে হেরে জলে পুরে ওঠে কেন এত ঐ বালিকার আঁখি অনিমিখ?

    মোর পানে চেয়ে সবে হাসে,

    বাঁধা-নীড় পুড়ে যায় অভিশপ্ত তপ্ত মোর শ্বাসে;

    মণি ভেবে কত জনে তুলে পরে গলে,

    মণি যবে ফণী হয়ে বিষদগ্ধ মুখে

    দংশে তার বুকে,

    অমনি সে দলে পদতলে!

    বিশ্ব যারে করে ভয় ঘৃণা অবহেলা,

    ভিখরিণী! তারে নিয়ে এ কি তব অকরুণ খেলা?

    তারে নিয়ে এ কি গূঢ় অভিমান? কোন অধিকারে

    নাম ধরে ডাকটুকু তাও হানে বেদনা তোমারে?

    কেউ ভালোবাসে নাই? কেই তোমা করেনি আদর?

    জন্ম-ভিখারিনী তুমি? তাই এত চোখে জল, অভিমানী করুণা-কাতর!

    নহে তাও নহে-

    বুকে থেকে রিক্ত-কন্ঠে কোন্‌ রিক্ত অভিমানী কহে-

    ‘নহে তাও নহে!’

    দেখিয়াছি শতজন আসে এই ঘরে,

    কতজন না চাহিতে এসে বুকে করে,

    তবু তব চোখে-মুখে এ অতৃপ্তি এ কী স্নেহ-ক্ষুধা

    মোরে হেলে উছলায় কেন তব বুক-ছাপা এত প্রীতি-সুধা?

    সে রহস্য রাণী!

    কেহ নাহি জানে-

    তুমি নাহি জান-

      আমি নাহি জানি।

    চেনে তা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ-

    কোথা হতে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান! ….

    নাহি বুঝিয়াও আমি সেদিন বুঝিনু তাই, হে অপরিচিতা!

    চির-পরিচিতা তুমি, জন্ম জন্ম ধরে অনাদৃতা সীতা!

    কানন-কাঁদানো তুমি তাপস-বালিকা

    অনন্তকুমারী সতী, তব দেবপূজার থালিকা

    ভাঙিয়াছি যুগে যুগে, ছিঁড়িয়াছি মালা

    খেলা-ছলে; চিন-মৌনা শাপভ্রষ্টা ওগো দেববালা!

    নীরবে সয়েছ সবই-

    সহজিয়া! সহজে জেনেছ তুমি, তুমি মোর জয়লক্ষ্মী, আমি তব কবি।

      

    *    *    *    *    *

      

    তারপর-নিশি শেষে পাশে বসে শুনেছিনু তব গীত-সুর

    লাজে-আধ-বাধ-বাধ শঙ্কিত বিধুর;

    সুর শুনে হল মনে- ক্ষণে ক্ষণে

    মনে-পড়ে-পড়ে-না এ হারা-কন্ঠ যেন

    কেঁদে কেঁদে সাধে, ‘ওগো চেন মোরে জন্মে জন্মে চেন।’

    মথুরায় গিয়ে শ্যাম, রাধিকার ভুলেছিল যবে,

    মনে লাগে- এই সুর গীত-রবে কেঁদেছিল রাধা,

    অবহেলা-বেঁধা-বুক নিয়ে এ যেন রে অতি-অন-রালে ললিতার কাঁদা

    বন-মাঝে একাকিনী দময়ন্তী ঘুরে ঘুরে ঝুরে,

    ফেলে-যাওয়া নাথে তার ডেকেছিল ক্লান–কন্ঠে এই গীত-সুরে।

    কান্তে- পড়ে মনে

    বনলতা সনে

    বিষাদিনী শকুন্তলা কেঁদেছিল এই সুরে বনে সঙ্গোপনে।

    হেম-গিরি-শিরে

    হারা-সতী উমা হয়ে ফিরে

    ডেকেছিল ভোলানাথে এমনি সে চেনা কন্ঠে হায়,

    কেঁদেছিল চির-সতী পতি প্রিয়া প্রিয়ে তার পেতে পুনরায়!…

    চিনিলাম বুঝিলাম সবই-

    যৌবন সে জাগিল না, লাগিল না মর্মে তাই গাঢ় হয়ে তব মুখছবি।

    তবু তব চেনা-কন্ঠ মম কন্ঠসুর

    রেখে আমি চলে গেনু কবে কোন পল্লিপথে দূরে!….

    দুদিন না যেতে যেতে একী সেই পুণ্য গোমতীর কূলে

    প্রথম উঠিল কাঁদি অপরূপ ব্যথাগন্ধ নাভিপদ্মমূলে!

    খুঁজে ফিরি কোথা হতে এই ব্যাথাভারাতুর মদগন্ধ আসে-

    আকাশ বাতাস ধরা কেঁপে কেঁপে ওঠে শুধু মোর তপ্ত ঘন দীর্ঘশ্বাসে।

    কেঁদে ওঠে লতা-পাতা

    ফুল পাখি নদীজল

    মেঘ বায়ু কাঁদে সবি অবিরল,

    কাঁদে বুকে উগ্রসুখে যৌবন-জ্বালায়-জাগা অতৃপ্ত বিধাতা!

    পোড়া প্রাণ জানিল না কারে চাই,

    চিৎকারিয়া ফেরে তাই -‘কোথা যাই,

    কোথা গেলে ভালোবাসাবাসি পাই?

    হু-হু করে ওঠে প্রাণ, মন করে উদাস-উদাস,

    মনে হয়-এ নিখিল যৌবন-আতুর কোনো প্রেমিকের ব্যথিত হুতাশ!

    চোখ পুরে লাল নীল কত রাঙা, আবছায়া ভাসে, আসে-আসে-

    আসে – আসে –

    কার বক্ষ টুটে

    মম প্রাণপুটে

    কোথা হ’তে কেন এই মৃগ-মদ-গন্ধ-ব্যথা আসে?

    মন-মৃগ ছুটে ফেরে; দিগন-র দুলি ওঠে মোর ক্ষিপ্ত হাহাকার-ত্রাসে!

    কস্তুরী হরিণ-সম

    আমারি নাভির গন্ধ খুঁজে ফেলে গন্ধ-অন্ধ মন-মৃগ মম!

    আপনারই ভালোবাসা

    আপনি পিইয়া চাহে মিটাইতে আপনার আশা!

    অনন্ত অগস্ত্য-তৃষাকুল বিশ্ব-মাগা যৌবন আমার

    এক সিন্ধু শুষি বিন্দু-সম, মাগে সিন্ধু আর!

    ভগবান! ভগবান! এ কি তৃষ্ণা অনন অপার!

    কোথা তৃপ্তি? তৃপ্তি কোথা? কোথা মোর তৃষ্ণা-হরা প্রেম-সিন্ধু অনাদি পাথার!

    মোর চেয়ে স্বেচ্ছাচারী দুরন্ত- দুর্বার!

    কোথা গেলে তারে পাই

    যার লাগি এত বড় বিশ্বে মোর নাই শান্তি নাই।

      

    ভাবি আর চলি শুধু, শুধু পথ চলি

    পথে কত পথবালা যায়,

    তারই পাছে হায় অন্ধ বেগে ধায়

    ভালোবাসা-ক্ষুধাতুর মন

    পিছু ফিরে কেহ যদি চায় – অভিমানে জলে ভেসে যায় দুনয়ন!

    দেখে তারা হাসে

    না চাহিয়া কেহ চলে যায়, ‘ভিক্ষা লহ’ ব’লে কেহ আসে দ্বার-পাশে।

    প্রাণ আরো কেঁদে ওঠে তাতে

    গুমরিয়া ওঠে কাঙালের লজ্জাহীন গুরু বেদনাতে!

    প্রলয়-পয়োধি-নীরে গর্জে-ওঠা হুহুঙ্কার-সম

    বেদনা ও অভিমানে ফুলে ফুলে দুলে ওঠে ধূ-ধূ

    ক্ষোভ-ক্ষিপ্ত প্রাণ-শিখা মম!

    পথ-বালা আসে ভিক্ষা-হাতে,

    লাথি মেরে চুর্ণ করি গর্ব তার ভিক্ষা-পাত্র সাথে।

    কেঁদে তারা ফিরে যায়, ভয়ে কেহ নাহি আসে কাছে;

    অনাথপিন্ডদ-সম

    মহাভিক্ষু প্রাণ মম

    প্রেম-বুদ্ধ লাগি’ হায় দ্বারে দ্বারে মহাভিক্ষা যাচে,

    “ভিক্ষা দাও, পুরবাসি!

    বুদ্ধ লাগি ভিক্ষা মাগি, দ্বার হতে প্রভু ফিরে যায় উপবাসী!’

    কত এল কত গেল ফিরে,

    কেহ ভয়ে কেহ-বা বিস্ময়ে!

    ভাঙা-বুকে কেহ,

    কেহ অশ্রু-নীরে-

    কত এল কত গেল ফিরে!

    আমি যাচি পূর্ণ সমর্পণ,

    বুঝিতে পারে না তাহা গৃহ-সুখী পুরনারীগণ।

    তারা আসে হেসে,

    শেষে হাসি-শেষে

    কেঁদে তারা ফিরে যায়

    আপনার গৃহ স্নেহচ্ছায়ে –

    বলে তারা, ‘হে পথিক! বল বল তব প্রাণ কোন ধন মাগে?

    সুরে তব এত কান্না, বুকে তব কার লাগি এত ক্ষুধা জাগে?’

    কী যে চাই বুঝে নাকো কেহ,

    কেহ আনে প্রাণমন কেহবা যৌবনধন,

    কেহ রূপ দেহ।

    গর্বিতা ধনিকা আসে মদমত্তা আপনার ধনে

    আমারে বাঁধিতে চাহে রূপ-ফাঁদে যৌবনের বনে। …

    সর্ব ব্যর্থ, ফিরে চলে নিরাশায় প্রাণ

    পথে পথে গেয়ে গেয়ে গান-

    “কোথা মোর ভিখারিনি পূজারিনি কই?

    কোথা গেলে ভালোবাসাবাসি পাই?

    যে বলিবে-‘ভালোবেসে সন্ন্যাসিনী আমি

    ওগো মোর স্বামী!

    রিক্তা আমি, আমি তব গরবিনি, বিজয়িনী নই।”

    মরু মাঝে ছুটে ফিরি বৃথা

    হুহু করে জ্বলে ওঠে তৃষা –

    তারি মাঝে তৃষ্ণা-দগ্ধ প্রাণ

    ক্ষণেকের তরে কবে হারাইল দিশা।

    দূরে কার দেখা গেল হাতছানি যেন-

    ডেকে ডেকে সে-ও কাঁদে-

    ‘আমি নাথ তব ভিখারিনি,

    আমি তোমা’ চিনি,

    তুমি মোরে চেন।’

    বুঝিনু না, ডাকিনীর ডাক এ যে,

    এ যে মিথ্যা মায়া,

    জল নহে, এ যে খল, এ যে ছল মরীচিকা-ছায়া!-

    ‘ভিক্ষা দাও’ ব’লে আমি এনু তার দ্বারে,

    কোথা ভিখারিনী? ওগো এ যে মিথ্যা মায়াবিনী,

    ঘরে ডেকে মারে।

    এ যে ক্রূর নিষাদের ফাঁদ,

    এ যে ছলে জিনে নিতে চাহে

    ভিখারীর ঝুলির প্রসাদ।

    হল না সে জয়ী,

    আপনার জালে পড়ে আপনি মরিল মিথ্যাময়ী।

      

    *    *    *    *    *

      

    কাঁটা-বেঁধা রক্ত মাথা প্রাণ নিয়ে এনু তব পুরে,

    জানি নাই ব্যথাহত আমার ব্যথায়

    তখনও তোমার প্রাণ পুড়ে।

    তবু কেন কতবার মনে যেন হত,

    তব স্নিগ্ধ মদিন পরশ        মুছে নিতে পারে মোর

    সব জ্বালা সব দগ্ধ ক্ষত।

    মনে হত প্রাণে তব প্রাণে যেন কাঁদে অহরহ-

    ‘হে পথিক! ঐ কাঁটা মোরে দাও, কোথা তব ব্যথা বাজে

    কহো মোরে কহো!

    নীরব গোপন তুমি মৌন তাপসিনী,

    তাই তব চির-মৌন ভাষা

    শুনিয়াও শুনি নাই, বুঝিয়াও বুঝি নাই ঐ ক্ষুদ্র চাপা-বুকে

    কাঁদে কত ভালোবাসা আশা!

      

    *    *    *    *    *

      

    এরি মাঝে কোথা হতে ভেসে এল মুক্তধারা মা আমার

    সে ঝড়ের রাতে,

    কোলে তুলে নিল মোরে, শত শত চুমা দিল সিক্ত আঁখি-পাতে।

    কোথা গেল পথ-

    কোথা গেল রথ-

    ডুবে গেল সব শোক-জ্বালা,

    জননীর ভালোবাসা এ ভাঙা দেউলে যেন দুলাইল দেয়ালির আলা!

    গত-কথা গত-জন্ম হেন

    হারা-মায়ে পেয়ে আমি ভুলে গেনু যেন।

    গৃহহারা গৃহ পেনু, অতি শান্ত- সুখে

    কত জন্ম পরে আমি প্রাণ ভরে ঘুমাইনু মুখ থুয়ে জননীর বুকে।

    শেষ হল পথ-গান গাওয়া,

    ডেকে ডেকে ফিরে গেল হা-হা স্বরে পথসাথী তুফানের হাওয়া।

      

    *    *    *    *    *

      

    আবার আবার বুঝি ভুলিলাম পথ-

    বুঝি কোন্‌ বিজয়িনী-দ্বার প্রানে- আসি’ বাধা পেল পার্থ-পথ-রথ।

    ভুলে গেনু কারে মোর পথে পথ খোঁজা,-

    ভুলে গেনু প্রাণ মোর নিত্যকাল ধরে অভিসারী

    মাগে কোন পূজা,

    ভুলে গেনু যত ব্যথা শোক,-

    নব সুখ-অশ্রুধারে গলে গেল হিয়া, ভিজে গেল অশ্রুহীন চোখ।

    যেন কোন্‌ রূপ-কমলেতে মোর ডুবে গেল আঁখি,

    সুরভিতে মেতে উঠে বুক,

    উলসিয়া বিলসিয়া উথলিল প্রাণে

    এ কী ব্যগ্র উগ্র ব্যথা-সুখ।

    বাঁচিয়া নূতন করে মরিল আবার

    সীধু-লোভী বাণ-বেঁধা পাখী। ….

    … ভেসে গেল রক্তে মোর মন্দিরের বেদী-

    জাগিল না পাষাণ-প্রতিমা,

    অপমানে দাবানল-সম তেজে

    রুখিয়া উঠিল এইবার যত মোর ব্যথা-অরুণিমা।

    হুঙ্কারিয়া ছুটিলাম বিদ্রোহের রক্ত-অশ্বে চড়ি

    বেদনার আদি-হেতু স্রষ্টা পানে মেঘ অভ্রভেদী,

    ধূমধ্বজ প্রলয়ের ধূমকেতু-ধুমে

    হিংসা হোমশিখা জ্বালি’ সৃজিলাম বিভীষিকা

    স্নেহ-মরা শুষ্ক মরুভূমে।

    … এ কী মায়া! তার মাঝে মাঝে

    মনে হত কতদূরে হতে, প্রিয় মোর নাম ধরে যেন

    তব বীণা বাজে!

    সে সুদূর গোপন পথের পানে চেয়ে

    হিংসা-রক্ত-আঁখি মোর অশ্রুরাঙা বেদনার রসে যেত ছেয়ে।

    সেই সুর সেই ডাক স্মরি স্মরি

    ভুলিলাম অতীতের জ্বালা,

    বুঝিলাম তুমি সত্য-তুমি আছে,

    অনাদৃতা তুমি মোর, তুমি মোরে মনে প্রাণে যাচ,

    একা তুমি বনবালা

    মোর তরে গাঁথিতেছ মালা

    আপনার মনে

    লাজে সঙ্গোপনে।

    জন্ম জন্ম ধরে চাওয়া তুমি মোর সেই ভিখারিনী। –

    অন্তরের অগ্নি-সিন্ধু ফুল হয়ে হেসে উঠে কহে- ‘চিনি, চিনি।

    বেঁচে ওঠ মরা প্রাণ! ডাকে তোরে দূর হতে সেই-

    যার তরে এত বড় বিশ্বে তোর সুখ-শান্তি- নেই!’

    তারি মাঝে

    কাহার ক্রন্দন-ধ্বনি বাজে?

    কে যেন রে পিছু ডেকে চীৎকারিয়া কয়-

    ‘বন্ধু এ যে অবেলায়! হতভাগ্য, এ যে অসময়!’

    প্রাণে শুধু ভেসে আসে জন্মন্তর হতে যেন বিরহিণী ললিতার কাঁদা!

    ছুটে এনু তব পাশে

    উর্ধ্বশ্বাসে;

    মৃত্যু-পথ অগ্নি-রথ কোথা পড়ে কাঁদে, রক্ত-কেতু গেল উড়ে পুড়ে,

    তোমার গোপান পূজা বিশ্বের আরাম নিয়া এলো বুক জুড়ে।

      

    *    *    *    *    *

      

    তারপর যা বলিব হারায়েছি আজ তার ভাষা;

    আজ মোর প্রাণ নাই, অশ্রু নাই, নাই শক্তি আশা।

    যা বলিব আজ ইহা গান নহে, ইহা শুধু রক্ত-ঝরা প্রাণ-রাঙা

         অশ্রু-ভাঙা ভাষা।

    ভাবিতেছ, লজ্জাহীন ভিখারীর প্রাণ-

    সেও চাহে দেওয়ার সম্মান!

    সত্য প্রিয়া, সত্য ইহা, আমিও তা স্মরি

    আজ শুধু হেসে হেসে মরি!

    তবু শুধু এইটুকু জেনে রাখো প্রিয়তমা, দ্বার হতে দ্বারান্তরে

    ব্যর্থ হয়ে ফিরে

    এসেছিনু তব পাশে, জীবনের শেষ চাওয়া চেয়েছিনু তোমা।

    প্রাণের সকল আশা সব প্রেম ভালোবাসা দিয়া

    তোমারে পূজিয়াছিনু, ওগো মোর বে-দরদি পূজারিণি-প্রিয়া!

    ভেবেছিনু, বিশ্ব যারে পারে নাই তুমি নেবে তার ভার হেসে,

    বিশ্ব-বিদ্রোহীরে তুমি করিবে শাসন

    অবহেলে শুধু ভালোবাসে।

    ভেবেছিনু, দুর্বিনীত দুর্জয়ীরে জয়ের গরবে

    তব প্রাণে উদ্ভাসিবে অপরূপ জ্যোতি, তারপর একদিন

    তুমিই মোর এ বাহুতে মহাশক্তি সঞ্চারিয়া

    বিদ্রোহীর জয়লক্ষ্মী হবে।

    ছিল আশা, ছিল শক্তি, বিশ্বটারে টেনে

    ছিঁড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেব এনে!

    কিন্তু হায়! কোথা সেই তুমি? কোথা সেই প্রাণ?

    কোথা সেই নাড়ী-ছেঁড়া প্রাণে প্রাণে টান?

      

    এ-তুমি আজ সে-তুমি তো নহ;

    আজ হেরি-তুমিও ছলনাময়ী,

    তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী!

    কিছু মোরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখ কিছু বাকী,-

    দুর্ভাগিনী! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি?

    মোর বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান,

    তাঁর দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ণ, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে,

    তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে তার প্রাণ।

    লোভে আজ তব পূজা কলুষিত, প্রিয়া,

    আজ তারে ভুলাইতে চাহ,

    যারে তুমি পূজেছিলে পূর্ণ মন-প্রাণ সমর্পিয়া।

    তাই আজি ভাবি, কার দোষে-

    অকলঙ্ক তব হৃদি-পুরে

    জ্বলিল এ মরণের আলো কবে পশে?

    তবু ভাবি, এ কি সত্য? তুমিও ছলনাময়ী?

    যদি তাই হয়, তবে মায়াবিনী অয়ি!

    ওরে দুষ্ট, তাই সত্য হোক।

    জ্বালো তবে ভালো করে জ্বালো মিথ্যালোক।

    আমি তুমি সুর্য চন্দ্র গ্রহ তারা

    সব মিথ্যা হোক;

    জ্বালো ওরে মিথ্যাময়ী, জ্বালোতবে ভালো করে

    জ্বালো মিথ্যালোক।

      

    *    *    *    *    *

      

    তব মুখপানে চেয়ে আজ

    বাজসম বাজে মর্মে লাজ;

    তব অনাদর অবহেলা স্মরি স্মরি

    তারি সাথে স্মরি মোর নির্লজ্জতা

    আমি আজ প্রাণে প্রাণে মরি।

    মনে হয়-ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, ‘মা বসুধা দ্বিধা হও!

    ঘৃণাহত মাটিমাখা ছেলেরে তোমার

    এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলো হতে অন্ধকারে টেনে লও!

    তবু বারে বারে আসি আশা-পথ বাহি

    কিন্তু হায়, যখনই ও-মুখপানে চাহি-

    মনে হয়,-হায়,হায়, কোথা সেই পূজারিণী,

    কোথা সেই রিক্ত সন্ন্যাসিনী?

    এ যে সেই চির-পরিচিত অবহেলা,

    এ যে সেই চির-ভাবহীন মুখ!

    পূর্ণা নয়, এ যে সেই প্রাণ নিয়ে ফাঁকি-

    অপমানে ফেটে যায় বুক!

    প্রাণ নিয়া এ কি নিদারুণ খেলা খেলে এরা হায়!

    রক্ত-ঝরা রাঙা বুক দলে

    অলক্তক পরে এরা পায়!

    এর দেবী, এরা লোভী, এরা চাহে সর্বজন-প্রীতি!

    ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ,

    পূজা হেরি ইহাদের ভীরু-বুকে তাই জাগে এত সত্য-ভীতি।

    নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো,

    এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরও।

    ইহাদের অতিলোভী মন

    একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়,

    যাচে বহু জন।…..

    যে পূজা পূজিনি আমি স্রষ্টা ভগবানে,

    যারে দিনু সেই পূজা সে-ই আজি প্রতারণা হানে!

      

    *    *    *    *    *

      

    বুঝিয়াছি, শেষবার ঘিরে আসে সাথী মোর মৃত্যু-ঘন আঁখি,

    রিক্ত প্রাণ তিক্ত সুখে হুঙ্কারিয়া উঠে তাই,

    কার তরে ওরে মন, আর কেন পথে পথে কাঁদি?

    জ্বলে ওঠ এইবার মহাকাল ভৈরবের নেত্রজ্বালাসম ধকধক,

    হাহাকার-করতালি বাজা! জ্বালা তোর বিদ্রোহের রক্তশিখা অনন্ত পাবক।

    তারি সাথে স্মরি মোর নির্লজ্জতা

    আন তোর বহ্নি-রথ, বাজা তোর সর্বনাশী তূরী!

    হান তোর পরশু-ত্রিশূল! ধ্বংস কর এই মিথ্যাপুরী।

    রক্ত-সুধা-বিষ আন্‌ মরণের ধর টিপে টুঁটি!

    এ মিথ্যা জগৎ তোর অভিশপ্ত জগদ্দল চাপে হোক কুটি-কুটি!

      

    *    *    *    *    *

      

    কন্ঠে আজ এত বিষ, এত জ্বালা,

    তবু, বালা!

    থেকে থেকে মনে পড়ে-

    যতদিন বাসিনি তোমারে ভালো,

    যতদিন দেখিনি তোমার

    বুক-ঢাকা রাগ-রাঙা আলো,

    তুমি ততদিনই

    যেচেছিলে প্রেম মোর, ততদিনই ছিলে ভিখারিনী।

    ততদিনই এতটুকু অনাদরে বিদ্রোহের তিক্ত অভিমানে

    তব চোখে উছলাতো জল, ব্যথা দিত তব কাঁচা প্রাণে;

    একটু আদর-কণা একটুকু সোহাগের লাগি

    কত নিশি-দিন তুমি মনে কর, মোর পাশে রহিয়াছ জাগি

    আমি চেয়ে দেখি নাই; তারই প্রতিশোধ

    নিলে বুঝি এতদিনে! মিথ্যা দিয়ে মোরে জিনে

    অপমান ফাঁকি দিয়ে করিতেছ মোর শ্বাস-রোধ!

      

    আজ আমি মরণের বুক থেকে কাঁদি-

    অকরুণা! প্রাণ নিয়ে এ কি মিথ্যা অকরুণ খেলা!

    এত ভালোবেসে শেষে এত অবহেলা

    কেমনে হানিতে পার, নারী!

    এ আঘাত পুরুষের,

    হানিতে এ নির্মম আঘাত, জানিতাম মোরা শুধু পুরুষেরা পারি।

    ভাবিতাম, দাগহীন অকলঙ্ক কুমারীর দান,

    একটি নিমেষ মাঝে চিরতরে আপনারে রিক্ত করি দিয়া মন-প্রাণ

    লভে অবসান।

    ভুল, তাহা ভুল

    বায়ু শুধু ফোটায় কলিকা,

    অলি এসে হরে নেয় ফুল!

    বায়ু বলী, তার তরে প্রেম নহে প্রিয়া!

    অলি শুধু জানে ভালো

    কেমনে দলিতে হয় ফুল-কলি-হিয়া!

      

    *    *    *    *    *

      

    পথিক-দখিনা-বায়ু আমি চলিলাম বসন্তের শেষে

    মৃত্যুহীন চিররাত্রি নাহি-জানা দেশে!

    বিদায়ের বেলা মোর ক্ষণে ক্ষণে ওঠে বুকে আনন্দাশ্রু ভরি

    কত সুখী আমি আজ সেই কথা স্মরি!

    আমি না বাসিতে ভালো তুমি আগে বেসেছিলে ভালো,

    কুমারী-বুকের তব সব স্নিগ্ধ রাগ-রাঙা আলো

    প্রথম পড়িয়াছিল মোর বুকে মুখে-

    ভুখারীর ভাঙা বুকে পুলকের রাঙা বান ডেকে যায় আজ সেই সুখে!

    সেই প্রীতি, সেই রাঙা সুখ-স্মৃতি স্মরি

    মনে হয় এ জীবন এ জনম ধন্য হল- আমি আজ তৃপ্ত হয়ে মরি।

    না-চাহিতে বেসেছিলে ভালো মোরে তুমি-শুধু তুমি,

    সেই সুখে মৃত্যু-কৃষ্ণ অধর ভরিয়া

    আজ আমি শতবার করে তব প্রিয় নাম চুমি।

      

    *    *    *    *    *

      

    মোরে মনে পড়ে

    একদা নিশীথে যদি প্রিয়

    ঘুশায়ে কাহারও বুকে অকারণে বুক ব্যথা করে,

    মনে করো, মরিয়াছে, গিয়াছে আপদ;

    আর কভু আসিবে না

    উগ্র সুখে কেহ তব চুমিতে ও-পদ-কোকনদ।

    মরিয়াছে-অশান্ত অতৃপ্ত চির-স্বার্থপর লোভী,

    অমর হইয়া আছে-রবে চিরদিন

    তব প্রেমে মৃত্যুঞ্জয়ী

    ব্যথা-বিষে নীলকণ্ঠ কবি!

  • চপল সাথী

    চপল সাথী

    চপল সাথী

    প্রিয়!
    সামলে ফেলে চলো এবার চপল তোমার চরণ!
    তোমার
    ওই চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন-মরণ।

      

     
    কোথায় দূরে নূপুর বাজে তোমার পায়ে,
     
    হেথায় রোদন আমার ওঠে উথলায়ে,
     
    তোমার উদাসীন ওই বিষম চলার ঘায়ে
     
    আজ কাঁপে আমার সকল শরম-ভরম।
    এখন
    ওই দ্বিধাহীন চরণ করো মোর বুকে সম্বরণ।
    তোমার
    ওই চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন-মরণ।

      

    তুমি
    চলার ঝোঁকে দেখছ না হায় পড়ছে চরণ কোথায়,
     
    ওগো    চপল পরান-প্রিয়!
    হেরো
    এবার তোমার পা পড়েছে আমার বুকের ব্যথায়
     
    এখন ধীরে চরণ নিয়ো।
     
    তোমার ওই যে দোলন দোদুল-দোলা-চলায়,
     
    আজ পথ-পাগলের পথের নেশা ভোলায়,
     
    এবার থামাও সে দোল আমার বুকের তলায়,
     
    আর সরিয়ো না মোর ব্যথায়-বাজা চরণ।
     
    আমার ব্যথায় রেঙে হোক ও-চরণ নিখিল-মনোহরণ।

      

    ওই
    অধীর চরণ চলার নেশায় হলে বিপথগামী
     
          আমি বাঁচব কি আর প্রিয়?
    তোমার
    বিপথ সে যে আমার তরে মৃত্যু-আঘাত, স্বামী!
     
          এখন ধীরে চরণ নিয়ো!

      

     
    ওগো জানি শুধু চলার সুখে
     
    তুমি পা ফেলেছ আমার ব্যথার বুকে,
     
    ওই চলাই তোমার আমার গভীর দুখে,
     
    শেষে প্রেম হয়ে সে করল অবতরণ।
    আজ
    একা তোমার নয় ও-চরণ আমার নিখিল শরণ!
    তোমার
    ওই চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন মরণ!
    প্রিয়
    সামলে ফেলে চলো এবার চপল তোমার চরণ।