Blog

  • অবেলার ডাক

    অবেলার ডাক

    অবেলার ডাক

     

    অনেক করে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে,

    আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারেবারে॥

     

    আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে,

    চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্‌তে আঘাত ভোরের ঘুমে।

    ভাব্‌তুম তখন এ কোন্‌ বালাই!

    করত এ প্রাণ পালাই পালাই।

    আজ সে কথা মনে হয়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে।

    অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে॥

     

    তরুণ তাহার ভরাট বুকের উপ্‌চে-পড়া আদর সোহাগ

    হেলায় দু-পায় দলেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ?

    এই চরণ সে বক্ষে চেপে

    চুমেছে, আর দু-চোখ ছেপে

    জল ঝরেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে,।

    এমনি দারুণ হতাদরে করেছি মা, বিদায় তারে।

     

    দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা,

    দ্বার হতে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা।

    ভেবেছিলাম আমার কাছে

    তার দরদের শান্তি আছে,

    আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিনতে নেরে দেবতারে।

    ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে॥

     

    পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী,

    মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিনতে পারি?

    তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা

    নিইনি, নিইনি মণির মালা,

    দেবতা-আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে।

    পূজারিকে চিনলাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।

     

    আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি?

    ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী।

    ওরে আমার ভালোবাসা!

    কোথায় বেঁধেছিলি বাসা

    যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে?

    নিশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’

     

    সে যে পথের চিরপথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া?

    দূর হতে মা দূরান্তের ডাকে তাকে পথের ছায়া।

    মাঠের পারে বনের মাঝে

    চপল তাহার নূপুর বাজে,

    ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে,

    ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে?

     

    মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার?

    তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার।

    তাই মা আমার বুকের কবাট

    খুলতে নারল তার করাঘাত,

    এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে,

    আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে॥

     

    সোহাগে সে ধরতে যেত নিবিড় করে বক্ষে চেপে,

    হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ-বুক উঠত কেঁপে।

    রাজ ভিখারীর আঁখির কালো,

    দূরে থেকেই লাগ্‌ত ভালো,

    আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্রু-ভারে।

    ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনের তরে।

     

    আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা

    চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা,

    আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে

    এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে

    গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ করে দিই এ আমারে!

    যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন পারে?

     

    আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শান্তি-আরাম

    চুরি করে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম।

    হে বসনে-র রাজা আমার!

    নাও এসে মোর হার-মানা-হারা!

    আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে,

    দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে!

     

    তোমার কথাই সত্য হল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে,

    দাবাললের দারুণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে।

    জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার,

    ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার

    মূকের বুকে দেব্‌তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে।

    বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা করছ কারে?

     

    স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চলে যাওয়ার সাথে,

    এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখরাতে।

    ঘুম ভাঙাতে আস্‌বে না সে

    ভোর না হতেই শিয়র পাশে,

    আসবে না আর গভীর রাতে চুম চুরির অভিসারে,

    কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।

     

    আজ পেলে তাঁয় হুম্‌ড়ি খেয়ে পড়তুম মাগো যুগল পদে,

    বুকে ধরে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে।

    বসতে দিতাম আধেক আঁচল,

    সজল চোখের চোখ-ভরা জল

    ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে,

    আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।

     

    দেখতে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী,

    মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে বলত,‘আমি ভালোবাসি!’

    বলতে গিয়ে সুখ-শরমে

    লাল হয়ে গাল উঠত ঘেমে,

    বুক হতে মুখ আসত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে,

    দেখতুম মাগো তখন কেমন মান করে সে থাকতে পারে!

     

    এমনি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে

    তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে।

    চোখের জলের ঋণী করে,

    সে গেছে কোন দ্বীপান্তরে?

    সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূর পারে?

    ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে?

     

    তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর,

    চৌচির হয়ে পড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর।

    চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে

    ধরার সাগর অশ্রু ছেপে,

    উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে,

    ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে।

     

    ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন করে?

    তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে!

    শুনতে শুনতে তোমার কোলে

    ঘুমিয়ে পড়ি। – ও কে খোলে

    দুয়ার ও মা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে?

    ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর-পারে!

     

    সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে,

    যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে!

    তবু কেন থাকি থাকি,

    ইচ্ছা করে তারেই ডাকি!

    যে কথা মোর রইল বাকী হায় যে কথা শুনাই কারে?

    মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!

     

    যাই তবে মা! দেকা হলে আমার কথা বলো তারে-

    রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে?

    মাগো আমি জানি জানি,

    আসবে আবার অভিমানী

    খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে,

    বলো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!

  • পুবের চাতক

    পুবের চাতক

    পুবের চাতক

      

    সকাল-সাঁঝে চেয়ে থাকি পুব-গগনের পানে

    কেন যে তা তার আঁখি আর আমার আঁখিই জানে।

    নদীপারের দেশে থাকি এমনি তারও আঁখি-পাখি

    দিগ্‌বালিকার পুব-কপোলে চাওয়ার পাখা হানে।

    চাওয়ায় চাওয়ায় চুমোচুমি রোজ মোদের ওইখানে।

      

    মোদের চোখের চুমুর মিলন ভোরের তারার পুবে,

    সেই মিলনের ভরাট পুলক অস্তঘাটে ডুবে।

    হারা সে চোখ নতুন করে ভোরের আলোয় উঠে ভরে

    নিশি-জাগা আঁখির লালি লাগে ঊষার প্রাণে।

    দূরের দেখা দুইটি চাওয়ায় করুণ রেখা টানে।

      

    উদয়ঘাটে হাসে যখন পোড়ারমুখি শশী

    শশীর মুখে চেয়ে ভাবি শশী তো নয় দোষী।

    তার চোখে ওই কাজল-রাগই রুচির চাঁদে করলে দাগি

    কলঙ্কী চাঁদ কাজল-আঁখির সজল চাওয়ার বাণে।

    দোষী শশীর কলঙ্ক তার আঁখির স্মৃতি আনে।

      

    পুবের দেশের চাতক আমি চাই নাকো আন্ পানে,

    তাই তো সে-ও তার চাহনি পুব গগনেই হানে।

    সে থাকে মোর উদয়-দেশে তাই সে দেশে ভালোবেসে

    তাকাই না গো পিছন পানের অস্তমরূদ্যানে,

    পাছে তাহার বাজে ব্যথা কোমল অভিমানে।

      

    যেদিন আমি বিদায় নেব শেষের খেয়া বেয়ে

    জানি না তার আঁখি সেদিন থাকবে কোথায় চেয়ে।

    তাই তো এমন মিটিয়ে ক্ষুধা চোখ ভরে পিই চোখের সুধা

    দূরের বেদন ভুলায় মোর ওই চাউনি-তরঙ গানে।

    এবার এ চোখ হারিয়ে গেলাম পুবের পরিস্থানে।

  • সমর্পণ

    সমর্পণ

    সমর্পণ

      

    প্রিয়!

    এবার আমায় সঁপে দিলাম, তোমার চরণ-তলে

    তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।

    তোমার আঁখি কাজল-কালো

    অকারণে লাগল ভালো

    লাগল ভালো,

    পথিক আমার পথ ভুলাল

    সেই নয়নের জলে।

    আজকে বনের পথ হারালেম ঘরের পথের ছলে।

    তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।

      

    আজ‍ দিগ্‌বালিকার আঁখি-পাতা অনেক দূরের কানন-ছায়ে

    কাঁপচে অভিমানে,

    একলা আমার পথ দেখাত ওই বালিকাই চপল পায়ে

    দিক হতে দিক-পানে।

    মুঠার মানিক ঠেলে পায়ে

    এলেম তোমার কুটির ছায়ে

    চরণ-ছায়ে,

    শ্রান্তি আমার দাও মুছায়ে

    দীপ-ঢাকা অঞ্চলে

    আপন মালা পরাও বালা পরাও আমার গলে।

    এবার আমায় সঁপে দিলাম তোমার চরণতলে।

  • উপেক্ষিত

    উপেক্ষিত

    উপেক্ষিত

    কান্না-হাসির খেলার মোহে অনেক আমার কাটল বেলা,

    কখন তুমি ডাক দেবে মা, কখন আমি ভাঙব খেলা?

    অজানাকে আনতে জিনে,

    জগৎটাকে ফেলনু চিনে,

    চাই যারে মা তায় দেখি নে

    ফিরে এনু তাই একেলা

    পরাজয়ের লজ্জা নিয়ে বক্ষে বিঁধে অবহেলা।

      

    আজকে বড়ো শ্রান্ত আমি আশায় আশায় মিথ্যা ঘুরে,

    ও মা এখন বুকে ধরো, মরণ আসে ওই অদূরে!

    সৃষ্টিটাকে পায়ের তলে

    এসেছি মা হেলায় দলে,

    হৃদয় শুধু জিনতে বলে

    খেয়ে এনু পায়ের ঠেলা।

    আর সহে না মাগো এখন আমায় নিয়ে হেলাফেলা।

      

    বিশ্বজয়ের গর্ব আমার জয় করেছে ওই পরাজয়,

    ছিন্ন-আশা নেতিয়ে পড়ে, ও মা এসে দাও বরাভয়!

    চারদিকে মা প্রবঞ্চনা

    ভালোবাসার গিলটিসোনা,

    আজ মণি কাল ধূলিকণা,

    জুয়ার হাট এই প্রেমের মেলা!

    খুইয়েছি সব সাধের খেলায়, বুক ভেঙেছে হেলার ঢেলা।

    এখন তুমি নাও মা কোলে, নয় অকূলে ভাসাই ভেলা।

  • ব্যথা-গরব

    ব্যথা-গরব

    ব্যথা-গরব

      

    তোমার কাছে নাই অজানা কোথায় আমার ব্যথা বাজে।

    ওগো প্রিয়! তবু এত ছল করা কি তোমার সাজে?

    কেন তোমার অনাদরে বক্ষ আমার ডুকরে ওঠে,

    চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে, কলজে ছিঁড়ে রক্ত ছোটে,

    এ অভিমান ব্যথাটি মোর

    জানি, জান, হে মনচোর,

    তবু কেন এমন কঠোর

    বুঝতে পারি না যে!

    অবহেলা না পুলক-লাজে।

      

    যখন ভাবি আমার আদর কতই তোমায় হানে বেদন,

    বুকের ভিতর আছড়ে পড়ে অসহায়ের হুতাশ রোদন

    যতই আমায় সইতে নার

    আঁকড়ে ততই ধরি আরও;

    মারো প্রিয় আরও মারো

    তোমার আঘাত-চিহ্ন রাজে

    যেন আমার বুকের মাঝে।

      

    মনে পড়ে সেদিন তুমি ঘুমিয়েছিলে অঘোর ঘুমে

    এ দীন কাঙাল এসেছিল তোমার পায়ের আঙুল চুমে।

    আমার অশ্রু-আঘাত লেগে

    চমকে তুমি উঠলে জেগে

    চরণ আঘাত করলে রেগে

    সেই পরশের সান্ত্বনা যে

    আজও আমার মর্মে রাজে।

      

    এমনি তোমার পদ্মপায়ের আঘাত-সোহাগ দিয়ো দিয়ো

    এই ব্যথিত বুকে আমার,  ওগো নিঠুর পরান-প্রিয়!

    সেই পদ-চিন বক্ষে রেখে

    ভগবানে কইব ডেকে

    ‘ছাই ভৃগুপদ,  যাও হে দেখে

    কী কৌস্তুভ এ হিয়ায় বাজে!’

    মরবে হরি হিংসা-লাজে।

      

    বিষ্ণুজয়ী ভালোবাসার গর্বে এ বুক উঠবে দুলে,

    সর্বহারার হাহাকার আর কাঁদবে নাকো চিত্ত-কূলে।

    এই যে তোমার অবহেলা

    তাই নিয়ে মোর কাটবে বেলা,

    হেলাফেলার বসবে মেলা,

    একলা আমার বুকের মাঝে,

    সুখে দুখে সকল কাজে।

  • পথহারা

    পথহারা

    পথহারা

    বেলা শেষে উদাস পথিক ভাবে,

    সে যেন কোন অনেক দূরে যাবে –

    উদাস পথিক ভাবে।

     

    ‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে,

    ‘নয় তোরে নয়’ বলে একা তাকে;

    পথের পথিক পথেই বসে থাকে,

    জানে না সে কে তাহারে চাবে।

    উদাস পথিক ভাবে।

     

    বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে

    আঁধার মাথায় দিগবধূদের কেশে,

    ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে

    শৈলমূলে শৈলবালা নাবে –

    উদাস পথিক ভাবে।

     

    বাতি আনি রাতি আনার প্রীতি,

    বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি,

    বিজন ঘরে এখন সে গায় গীতি,

    একলা থাকার গানখানি সে গাবে –

    উদাস পথিক ভাবে।

     

    হঠাত্‍ তাহার পথের রেখা হারায়

    গহন বাঁধায় আঁধার-বাঁধা কারায়,

    পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায়

    আর কি পূবের পথের দেখা পাবে

    উদাস পথিক ভাবে।

  • পউষ

    পউষ

    পউষ

    পউষ এলো গো!

    পউষ এলো অশ্র”-পাথার হিম পারাবার পারায়ে

    ওই যে এলো গো-

    কুজঝটিকার ঘোম্‌টা-পরা দিগন-রে দাঁড়ায়ে॥

    সে এলো আর পাতায় পাতায় হায়

    বিদায়-ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়,

    অস্ত-বধূ (আ-হা) মলিন চোখে চায়

    পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যা-তারায় হারায়ে॥

     

    পউষ এলো গো-

    এক বছরের শ্রানি- পথের, কালের আয়ু-ক্ষয়,

    পাকা ধানের বিদায়-ঋতু, নতুন আসার ভয়।

    পউষ এলো গো! পউষ এলো-

    শুক্‌নো নিশাস্‌, কাঁদন-ভারাতুর

    বিদায়-ক্ষণের (আ-হা) ভাঙা গলার সুর-

    ‘ওঠে পথিক! যাবে অনেক দূর

    কালো চোখের কর”ণ চাওয়া ছাড়ায়ে॥’

  • বেলাশেষে

    বেলাশেষে

    বেলাশেষে

    ধরণী দিয়াছে তার

    গাঢ় বেদনার

    রাঙা মাটি-রাঙা ম্লান ধূসর আঁচলখানি

    দিগন্তের কোলে কোলে টানি।

    পাখি উড়ে যায় যেন কোন্ মেঘ-লোক হতে

    সন্ধ্যাদীপজ্বালা গৃহপানে ঘরডাকা পথে।

    আকাশের অস্ত-বাতায়নে

    অনন্ত দিনের কোন্ বিরহিণী কনে

    জ্বালাইয়া কনক-প্রদীপখানি

    উদয়-পথের পানে যায় তার অশ্রু-চোখ হানি?

    ‘আসি’-বলে-চলে-যাওয়া বুঝি তার প্রিয়তম আশে,

    অস্ত-দেশ হয়ে ওঠে মেঘবাষ্পভারাতুর তারই দীর্ঘশ্বাসে।

    আদিম কালের ওই বিষাদিনী বালিকার পথ-চাওয়া চোখে –

    পথপানে-চাওয়া-ছলে দ্বারে-আনা সন্ধ্যাদীপালোকে

    মাতা বসুধার মমতার ছায়া পড়ে।

    করুণার কাঁদন ঘনায় নত-আঁখি স্তব্ধ দিগন্তরে!

    কাঙালিনি ধরা-মা-র অনাদি কালের কত অনন্ত বেদনা

    হেমন্তের এমনই সন্ধ্যায় যুগযুগ ধরি বুঝি হারায় চেতনা।

     

    উপুড় হইয়া সেই স্তূপীকৃত বেদনার ভার

    মুখ গুঁজে পড়ে থাকে; ব্যথা-গন্ধ তার

    গুমরিয়া গুমরিয়া কেঁদে কেঁদে যায়

    এমনই নীরবে শান্ত এমনই সন্ধ্যায়। …

    ক্রমে নিশীথিনী আসে ছড়াইয়া ধুলায়-মলিন এলোচুল,

    সন্ধ্যাতারা নিবে যায়, হারা হয় দিবসের কূল। …

     

    তারই মাঝে কেন যেন অকারণে হায়

    আমার দু-চোখ পুরে বেদনার ম্লানিমা ঘনায়।

    বুকে বাজে হাহাকার-করতালি,

    কে বিরহী কেঁদে যায়, ‘খালি, সব খালি।

    ওই নভ, এই ধরা, এই সন্ধ্যালোক,

    নিখিলের করুণা যা-কিছু তোর তরে তাহাদের অশ্রুহীন চোখ।’

    মনে পড়ে – তাই শুনে মনে পড়ে মম

    কত না মন্দিরে গিয়া পথের সে লাথি-খাওয়া ভিখারির সম

    প্রসাদ মাগিনু আমি –

    ‘দ্বার খোলো, পূজারি দুয়ারে তব আগত যে স্বামী!’

    খুলিল দুয়ার, দেউলের বুকে দেখিনু দেবতা,

    পূজা দিনু রক্ত-অশ্রু, দেবতার মুখে নাই কথা।

    হায় হায় এ যে সেই অশ্রুহীন-চোখ,

    কেঁদে ফিরি, ওগো এ কী প্রেমহীন অনাদর-হানা দেবলোক!

    ওরে মূঢ়! দেবতা কোথায়?

    পাষাণ-প্রতিমা এরা, অশ্রু দেখে নিষ্পলক অকরুণ মায়াহীন

    চোখে শুধু চায়।

    এরাই দেবতা, যাচি প্রেম ইহাদেরই কাছে,

    অগ্নি-গিরি এসে যেন মরুভূ-র কাছে হায় জল-ধারা যাচে।

     

    আমারই সে চারি পাশে ঘরে ঘরে করে পূজা কত আয়োজন,

    তাই দেখে কাঁদে আর ফিরে ফিরে চায় মোর ভালবাসা-ক্ষুধাতুর মন,

    অপমানে পুন ফিরে আসে,

    ভয় হয়, ব্যাকুলতা দেখি মোর কি জানি কখন কে হাসে।

     

    দেবতার হাসি আছে, অশ্রু নাই;

    ওরে মোর যুগ-যুগ অনাদৃত হিয়া, আয় ফিরে যাই । …

    এই সাঁঝে মনে হয়, শূন্য চেয়ে আরও এক মহাশূন্য রাজে

    দেবতার-পায়ে-ঠেলে এই শূন্য মম হিয়া-মাঝে।

    আমার এ ক্লিষ্ট ভালোবাসা,

    তাই বুঝি হেন সর্বনাশা।

    প্রেয়সীর কণ্ঠে কভু এই ভুজ এই বাহু জড়াবে না আর,

    উপেক্ষিত আমার এ ভালোবাসা মালা নয়, খর তরবার।

  • দোদুল দুল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল

    (আরবি ‘মোতাকারিব্’ ছন্দ)

      

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল্।

    বেণির বাঁধ

    আলগ্-ছাঁদ,

    আলগ্-ছাঁদ

    খোঁপার ফুল,

    কানের দুল

    খোঁপার ফুল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

      

    অলক-ছায়

    কপোল ছায়,

    পরশ চায়

    অলস চুল

    বিনুন্-বিন্

    কেশের উল

    দোদুল দুল!

    দোদুল দুল!

      

    অসম্বৃত্

    কাঁখের ভিত্

    অসম্বৃত্

    পিঠের চুল,

    লোহিত পীত

    নোলক দুল

    দোদুল দুল!

    দোদুল দুল!

      

    সোহাগ-ঘায়

    দোলন-গায়

    কাঁপন খায়

    আপন পায়,

    পায়ের নখ

    মাথার চুল

    দোদুল দুল!

    দোদুল দুল!

     

    পরাগ-ফাগ

    ছড়ায় আজ

    শিরাজ-বাগ

    ইরান-গুল,

    দোলন-দোল

    দে বুল্‌বুল্,

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

      

    কাঁকন চায়

    নাচন ফিন

    রিমিক ঝিম

    ঝিমিক ঝিম।

    আঁচল-বীণ

    চাবির রিং

    বুলায় নিঁদ

    ঢুলায় ঢুল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

      

    নিশাস-রেশ

    কাঁপায় বেশ

    মোতিয়া হার

    হিয়ার দেশ,

    কাঁপায় শেষ

    প্রাণের কূল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

      

    বুকের কোল

    আদর ঘায়

    দোলায় দোল,

    দোলায় দোল

    শরম-লোল

    মরম-মূল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

     

    কলস-কাঁখ

    পুকুর যায়,

    আঁচল চায়

    চুমায় ধুল

    দখিন হাত

    ঝুলন ঝুল

    দোদুল দুল

      

    কাঁকাল ক্ষীণ

    মরাল গ্রীব

    ভুলায় জড়্ –

    ভুলায় জীব,

    গমন-দোল্

    অতুল তুল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

      

    হাসির ভাস,

    ব্যথার শ্বাস,

    চপল চোখ,

    আঁখির লাস,

    নয়ন-নীর

    অধর-ফুল

    রাতুল তুল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

      

    মৃণাল-হাত,

    নয়ন-পাত,

    গালের টোল

    চিবুক দোল

    সকল কাজ

    করায় ভুল,

    প্রিয়ার মোর

    কোথায় তুল?

    কোথায় তুল

    কোথায় তুল?

    স্বরূপ তার

    অতুল তুল,

    রাতুল তুল

    কোথায় তুল

    দোদুল দুল

    দোদুল দুল!

  • আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

      

    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–
    মোর
    মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

      

      
    আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে
      
    বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে।
      
    আসল হাসি, আসল কাঁদন
      
    মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,
      
    মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।
    ওই
    রিক্ত বুকের দুখ আসে –
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

      

      
    আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ
      
    সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস,
      
    ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস,
      
    গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে!
      
    ওই   ধূমকেতু আর উল্কাতে
      
    চায়   সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,
    আজ
    তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

      

      
    আজ   হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন,
      
          মদন মারে খুন-মাখা তূণ
      
          পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল
      
          ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে
      
    গো    দিগ বালিকার পীতবাসে;
    আজ
    রঙন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
      
    আজ   কপট কোপের তূণ ধরি,
      
    ওই   আসল যত সুন্দরী,
      
    কারুর পায়ে বুক-ডলা খুন, কেউ বা আগুন,
      
    কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে।
      
    তাদের প্রাণের বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না
      
    বাণীর বীণা মোর পাশে,
    ওই
    তাদের কথা শোনাই তাদের
      
    আমার চোখে জল আসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
      
    আজ আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর,
      
    আসল নিকট, আসল সুদূর
      
    আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
      
    পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে!
    ওই
    আসল আশিন শিউলি শিথিল
      
    হাসল শিশির দুবঘাসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–

      

      
    আজ জাগল সাগর, হাসল মরু
      
    কাঁপল ভূধর, কানন তরু
      
    বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান
      
  • দুটি কথা

    দুটি কথা

    দুটি কথা

    সে আজ বন্দী। তার সত্য-মুক্ত প্রাণ যে ভৈরব-রুদ্র-ছায়ানটের হিল্লোলে নৃত্য-পাগল ছন্দে এক অভিনব সৃষ্টি-রচনা করে গেল, – সে আজ মুক্ত। কোনো রাজ-শক্তির ভ্রুকুটি সে মানে না, কোনো লৌহ-নিগড় কোনোদিন তারে বাঁধতে পারে না – সে আপনার তালে নেচে চলে, আর পায়ের তলায় গুঁড়িয়ে যায় কত রক্ত-নয়ন, কত শাসন-বচন, কত শাস্তি-রচন। সে যে প্রলয়ানন্দে-ভরা রুদ্রনটের নৃত্য, ছন্দ যে তার কাল-বৈশাখীর নর্তনের মতো এলোমেলো, সুর যে তার সৃষ্টির ব্যথা-গৌরব ভরা। সুর আজ স্বেচ্ছাচারী, সুর-রাজ বন্দী।

    সে আজ বন্দী। তবু সে একদিন যুগযুগান্ত-সঞ্চিত রুদ্ধহিমানীর বুকে অগ্নিকণা এনে দিয়েছিল, তার রুদ্র-বীণে কোন্ সর্বভুক দেবতা তার চিরমন্দির গড়ে নিল, আর সেই অগ্নি-বীণে তার দিবস-নিশার দহন-আলোয় আপন অন্তরে তার চিরবাসরের চিতা রচনা করে নিল, – সবার আড়ালে, সবার গোপনে, সবার উপরে – মানবের হাসি-কান্না, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের বহু বহু দূরে; – সেখানে বসে সে তার অন্তর-অলকায় যে গাথা গেয়ে চলেছে তাতে বন্ধনের কৃষ্ণ রেখা নেই, দুর্বল কম্পিত হিয়ার ক্ষীণ রাগিণী নেই – সেখানে সে আর তার অন্তর-দেবতা, নিখিল নরনারী বাইরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধ দুয়ার দেখে ফিরে আসে শুধু।

    সে আজ বন্দী। রাজার দেওয়া লৌহ-নিগড়ে তার অন্তরের বিদ্রোহী-বীর কোন দেবতার আশিস-নির্মাল্য দেখতে পেল, তাই সাদরে বরণ করে নিল তাকে আপনার গলে। তারপর একদিন যখন বাংলার যুবক আবার জলদমন্দ্রে বাধা-বন্ধহারা হয়ে স্বাধীনচিত্ত ভরে বাংলার চিরশ্যামল চির-অমলিন মাতৃমূর্তি উন্মাদ আনন্দে বক্ষে টেনে নেবে, সেই শুভ আরতিলগ্নে ইমনকল্যাণ সুরে যে নহবতের রাগিণী বেজে উঠবে, তাতে হে কবি, তোমার প্রেম-বৈভব-গাথা – তোমার অন্তর-বহ্নি-ব্যথা সন্ধ্যা-রাগ-রক্তে আপনি বেজে উঠবে; জননীর শ্যামবক্ষে তোমার স্মৃতি ব্যথা-ভারাতুর হয়ে সকল পূজার মাঝে বারে বারে তোমাকেই স্মরণ করিয়ে দেবে, – হে কবি, সে আজ নয়। ইতি

    শ্রীপবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়।

  • দোলন-চাঁপা

    দোলন-চাঁপা

    দোলন-চাঁপা

    ‘দোলনচাঁপা’ বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। ১৩৩০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মাসে ‘দোলন-চাঁপা’ কাব্যগ্রন্থটি আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হয়।

    ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের দুর্গাপূজোর আগে ধুমকেতু পত্রিকায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে বিদ্রোহাত্মক কবিতাটি প্রকাশের জন্য তাকে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত কবিকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। এই সময় ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যের কবিতাগুলি রচিত হয়। জেল কর্তৃপক্ষের অগোচরে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ওয়ার্ডারদের সাহায্যে তার সব কবিতাই বাইরে নিয়ে আসেন। কবির নির্দেশমত আর্য পাবলিশিং হাউস এ কবিতাগুলো দিয়ে ‘দোলনচাঁপা’ প্রকাশ করে।

    ‘দোলনচাঁপা’ প্রথম সংস্করণের প্রকাশক শরচ্চন্দ্র গুহ, আর্য পাবলিশিং হাউস, কলেজ ষ্ট্রিট মার্কেট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা ৬+৫৪; মূল্য এক টাকা চার আনা। প্রথম সংস্করণ এই কাব্যগ্রন্থে ১৯টি কবিতা ছিল। সূচিপত্রের আগে মুখবন্ধরূপে সংযোজিত কবিতা “আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে” ১৩৩০ বঙ্গাব্দের (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ) জ্যৈষ্ঠ মাসের কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের আগে, আনুমানিক ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে। এর প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডি. এম লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা ৮+৫৪, মূল্য পাঁচ সিকা।

    তৃতীয় সংস্করণে (শ্রাবণ ১৩৬১ বঙ্গাব্দ) কবিতার অদলবদল করা হয়েছে। প্রথম সংস্করণের পউষ, পথহারা, অবেলার ডাক, পূজারিণী, অভিশাপ, পিছু-ডাক, কবি-রাণী কবিতাগুলি বাদ দিয়ে হংসদূতী, সে যে চাতকই জানে তার মেঘ এত কি, লাল নটের ক্ষেতে, মদালস ময়ূর-বীণা কার বাজে গান, না মিটিতে সাধ মোর বেণুকা, তোমার ফুলের মত মন, বরষা, ঐ নীল গগনের নয়ন-পাতায়, মাত্‌লা-হাওয়া, সবুজ শোভার ঢেউ খেলে যায়, বনমালি, বেদনা-অভিমান, নিশীথ-প্রতিম, অ-বেলায়, হার-মানা-হার, বেদনা-মণি, পরণ-পূজা, অনাদৃতা, নীলপরী, হে-ভীতু, অকরুণপিয়া, মরমী, মুক্তি-বার, বিরাগিনী, হারামণি, প্রিয়ার রূপ, পাপড়ি-খোলা, বিধুরা পথিক, প্রিয়া, প্রতিবেশিনী, বাদল-দিনে, মনের মানুষ, কার বাঁশি বাজিল, দহনমালা, দুপুর-অভিসার, শেষের গান, রৌদ্র-দগ্ধের গান, আলতা-স্মৃতি কবিতাগুলি সংযেজিত করা হয়েছে। এই কবিতাগুলি “ছায়ানটে”র অন্তর্গত ছিল।

    বর্তমান এডুলিচার সংস্করণে ‘বাঙলা একাডেমি’ প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’ জন্মশতবর্ষ সংস্করণ অনুসরণ করা হয়েছে। এই সংস্করণে তৈরি হয়েছে ‘দোলন-চাঁপা’র প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণের অনুসরণে। উল্লেখ্য, প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন নেই।

    এই কাব্যের মুখবন্ধ-রূপে লেখা কবিতাটি ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ শিরোনামে ১৩৩০ জ্যৈষ্ঠে প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যাক ‘কল্লোল’-এ প্রকাশিত হয়।

    ‘দোদুল দুল’ ১৩২৮ চৈত্রের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয়েছিল এবং ‘প্রবাসী’ হতে ১৩২৯ মাঘের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘পউষ’ রচিত হয়েছিল ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। কবি তখন কলিকাতার প্রেসিডেন্সী জেলে বিচারাধীন বন্দী। ‘পউষ’ ১৩২৯ মাঘের এবং ‘পথহারা’ ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘ব্যথা-গরব’ ১৩২৯ চৈত্রের মাসিক ‘বসুমতী’তে এবং ‘সমর্পণ’ ১৩২৯ চৈত্রের ‘ভারতী’তে বের হয়।

    ‘অবেলার ডাক’ ১৩৩০ জ্যৈষ্ঠের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘অভিশাপ’ ১৩৩০ শ্রাবণের এবং ‘আশান্বিতা’ ১৩৩০ আশ্বিনের ‘কল্লোল’-এ ছাপা হয়েছিল।

  • রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী কাজী নজরুল ইসলাম লিখিত একটি প্রবন্ধ। নজরূল সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। সেই পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে ও নিষিদ্ধ হয়। নজরুলকে জেলে আটক করে রাখার পর তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি লিখিতভাবে আদালতে উপস্থাপন করেন চার পৃষ্ঠার বক্তব্য। তাই রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে পরিচিত। ১৯২৩ সালের ৭ ই জানুয়ারি কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে বসে তিনি এই চার পৃষ্ঠার জবানবন্দী রচনা করেন। পরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা যেমন, ১৩২৯ সালের ১২ই মাঘ তারিখের ‘ধূমকেতু’, ১৩২৯ মাঘের ‘প্রবর্তক’, ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘উপাসনা’ এবং ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘সহচর’ প্রভৃতি সাময়িকপত্রে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রকাশিত হয়। ‘ধূমকেতু’র মামলায় এই ‘জবানবন্দী’ আদালতে দাখিল করা হয়েছিল। পুস্তিকাকারে এর দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়; কবির নূতনতম প্রতিকৃতি-সম্বলিত দ্বিতীয় সংস্করণের দাম ছিল দুই আনা।

    এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:

    “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।… আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।

    ‘আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির মৃত্যু হবে না।’ কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরি করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং বাঁশির সৃষ্টির কৌশলে, অতএব দোষ বাঁশির নয়, সুরেরও নয়, দোষ তার, যিনি আমার কণ্ঠে তার বীণা বাজান, … সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়। সত্যদ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মের আলোকে ন্যায়ের দুয়ারে তা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্যস্বরূপ। …তাকে শাস্তি দেয়ার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নেই। তাকে বন্দী করার মতো পুলিশ বা কারাগার আজো সৃষ্টি হয়নি। …বিচারক জানে আমি যা বলছি, যা লিখেছি, তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে। কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই বিচারাসন কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচার, এ বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে? ভগবানকে? এ বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? রাজা, না ভগবান? না আত্মপ্রসাদ?

    আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এত ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো এটা কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এত দিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষ রূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসনকিষ্ট বন্দী সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই আমি রাজদ্রোহী?

    নজরুল সৃষ্টিকর্তাকে নিজের বিচারক হিসেবে ধরেছেন। জবানবন্দিতে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য আকুতি ফুটে উঠেছে।

    মূলপ্রবন্ধ : রাজবন্দীর জবানবন্দী

    আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী! তাই আমি রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।

    একধারে রাজার মুকুট; আরধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আরজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড। রাজার পক্ষে রাজার নিযুক্ত রাজবেতনভোগী, রাজকর্মচারী। আমার পক্ষে – সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য – জাগ্রত ভগবান।

    আমার বিচারককে কেহ নিযুক্ত করে নাই। এ মহাবিচারকের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা, ধনী-নির্ধন, সুখী-দুঃখী সকলে সমান। এঁর সিংহাসনে রাজার মুকুট আর ভিখারির একতারা পাশাপাশি স্থান পায়। এঁর আইন – ন্যায়, ধর্ম। সে আইন কোনো বিজেতা মানব কোনো বিজিত বিশিষ্ট জাতির জন্য তৈরি করে নাই। সে আইন বিশ্ব-মানবের সত্য-উপলব্ধি হতে সৃষ্ট; সে আইন সর্বজনীন সত্যের, সে আইন সার্বভৌমিক ভগবানের। রাজার পক্ষে – পরমাণু পরিমাণ খণ্ড-সৃষ্টি; আমার পক্ষে – আদি অন্তহীন অখণ্ড স্রষ্টা।

    রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে – রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ অর্থ; আমার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ।

    রাজার বাণী বুদ্‌বুদ্, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র।

    আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়-দ্রোহী নয়, সত্য-দ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তাহা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্য-স্বরূপ।

    সত্য স্বয়ং প্রকাশ। তাহাকে কোনো রক্ত-আঁখি রাজদণ্ড নিরোধ করতে পারে না। আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম্-প্রকাশের বীণা, যে বীণায় চির-সত্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল। আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে? একথা ধ্রুব সত্য যে, সত্য আছে, ভগবান আছেন – চিরকাল ধরে আছে এবং চিরকাল ধরে থাকবে। যে আজ সত্যের বাণীকে রুদ্ধ করেছে, সত্যের বীণাকে মূক করতে চাচ্ছে, সে-ও তাঁরই এই ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র সৃষ্ট অণু। তাঁরই ইঙ্গিতে-আভাসে, ইচ্ছায় সে আজ আছে, কাল হয়তো থাকবে না। নির্বোধ মানুষের অহংকারের আর অন্ত নাই; সে যাহার সৃষ্টি, তাহাকেই সে বন্দি করতে চায়, শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু অহংকার একদিন চোখের জলে ডুববেই ডুববে।

    যাক, আমি বলছিলাম, আমি সত্যপ্রকাশের যন্ত্র। সে যন্ত্রকে অপর কোনো নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করলেও করতে পারে, ধ্বংস করলেও করতে পারে; কিন্তু সে-যন্ত্র যিনি বাজান, সে-বীণায় যিনি রুদ্র-বাণী ফোটান, তাঁকে অবরুদ্ধ করবে কে? সে-বিধাতাকে বিনাশ করবে কে? আমি মরব, কিন্তু আমার বিধাতা অমর। আমি মরব, রাজাও মরবে, কেননা আমার মতন অনেক রাজবিদ্রোহী মরেছে, আবার এমনই অভিযোগ-আনয়নকারী বহু রাজাও মরেছে, কিন্তু কোনো কালে কোনো কারণেই সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হয়নি – তার বাণী মরেনি। সে আজও তেমনই করে নিজেকে প্রকাশ করেছে এবং চিরকাল ধরে করবে। আমার এই শাসন-নিরুদ্ধ বাণী আবার অন্যের কণ্ঠে ফুটে উঠবে। আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির সুরের মৃত্যু হবে না; কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরী করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং আমার বাঁশি সৃষ্টির কৌশলে। অতএব দোষ বাঁশিরও নয় সুরেরও নয়; দোষ আমার, যে বাজায়; তেমনই যে বাণী আমার কণ্ঠ দিয়ে নির্গত হয়েছে, তার জন্য দায়ী আমি নই। দোষ আমারও নয়, আমার বাণীরও নয়; দোষ তাঁর – যিনি আমার কণ্ঠে তাঁর বাণী বাজান। সুতরাং রাজবিদ্রোহী আমিও নই; প্রধান রাজবিদ্রোহী সেই বাণী-বাদক ভগবান। তাঁকে শাস্তি দিবার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নাই। তাঁহাকে বন্দি করবার মতো পুলিশ বা কারাগার আজও সৃষ্টি হয় নাই।

    রাজার নিযুক্ত রাজ-অনুবাদক রাজভাষায় সে-বাণীর শুধু ভাষাকে অনুবাদ করেছে, তাঁর প্রাণকে অনুবাদ করেনি। তাঁর সত্যকে অনুবাদ করতে পারেনি। তার অনুবাদে রাজানুগত্য ফুটে উঠেছে, কেননা, তার উদ্দেশ্য রাজাকে সন্তুষ্ট করা, আর আমার লেখায় ফুটে উঠেছে সত্য, তেজ আর প্রাণঙ কেননা আমার উদ্দেশ্য ভগবানকে পূজা করা; উৎপীড়িত আর্ত বিশ্ববাসীর পক্ষে আমি সত্য-বারি, ভগবানের আঁখিজল! আমি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি।

    আমি জানি এবং দেখেছি – আজ এই আদালতে আসামির কাঠগড়ায় একা আমি দাঁড়িয়ে নেই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্যসুন্দর ভগবানও দাঁড়িয়ে। যুগে যুগে তিনি এমনই নীরবে তাঁর রাজবন্দি সত্য-সৈনিকের পশ্চাতে এসে দণ্ডায়মান হন। রাজ-নিযুক্ত বিচারক সত্য-বিচারক হতে পারে না। এমনই বিচার প্রহসন করে যেদিন খ্রিস্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হল, গান্ধিকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল, সেদিনও ভগবান এমনই নীরবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁহাদের পশ্চাতে। বিচারক কিন্তু তাঁকে দেখতে পায়নি, তার আর ভগবানের মধ্যে তখন সম্রাট দাঁড়িয়েছিলেন, সম্রাটের ভয়ে তার বিবেক, তার দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গেছিল। নইলে সে তার এই বিচারাসনে ভয়ে বিস্ময়ে থরথর করে কেঁপে উঠত, নীল হয়ে যেত, তার বিচারাসন সমেত সে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।

    বিচারক জানে আমি যা বলেছি, যা লিখেছি তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে, কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই যে বিচারাসন – এ কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচারক, এর বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে, ভগবানকে? এই বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? – রাজা না ভগবান? অর্থ না আত্মপ্রসাদ?

    শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির নিকট। কিন্তু বেলাশেষের শেষ-খেয়া এ প্রবীণ বিচারককে হাতছানি দিচ্ছে, আর রক্ত-উষার নব-শঙ্খ আমার অনাগত বিপুলতাকে অভ্যর্থনা করছে; তাকে ডাকছে মরণ, আমায় ডাকছে জীবন; তাই আমাদের উভয়ের অস্ত-তারা আর উদয়-তারার মিলন হবে কিনা বলতে পারি না। না, আবার বাজে কথা বললাম।

    আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো – এ কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চক্ষুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষরূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসন-ক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী? এ ক্রন্দন কি একা আমার? না – এ আমার কণ্ঠে ওই উৎপীড়িত নিখিল-নীরব ক্রন্দসীর সম্মিলিত সরব প্রকাশ? আমি জানি, আমার কণ্ঠের ওই প্রলয়-হুংকার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আর্তপীড়িত আত্মার যন্ত্রণা-চিৎকার। আমায় ভয় দেখিয়ে মেরে এ ক্রন্দন থামানো যাবে না! হঠাৎ কখন আমার কণ্ঠের এই হারা-বাণীই তাদের আরেক জনের কণ্ঠে গর্জন করে উঠবে।

    আজ ভারত পরাধীন না হয়ে যদি ইংলন্ডই ভারতের অধীন হত এবং নিরস্ত্রীকৃত উৎপীড়িত ইংলন্ড-অধিবাসীবৃন্দ স্বীয় জন্মভূমি উদ্ধার করবার জন্য বর্তমান ভারতবাসীর মতো অধীর হয়ে উঠত, আর ঠিক সেই সময় আমি হতুম এমনই বিচারক এবং আমার মতোই রাজদ্রোহ-অপরাধে ধৃত হয়ে এই বিচারক আমার সম্মুখে বিচারার্থ নীত হতেন, তাহলে সেই সময় এই বিচারক আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা বলতেন, আমি তো তাই এবং তেমনি করেই বলছি!

    আমি পরম আত্মবিশ্বাসী! তাই যা অন্যায় বলে বুঝেছি, তাকে অন্যায় বলেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি, – কাহারও তোষামোদ করি নাই, প্রশংসার এবং প্রসাদের লোভে কাহারও পিছনে পোঁ ধরি নাই, – আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই – সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য-তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, – তার জন্য ঘরের-বাইরের বিদ্রুপ, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত আমার উপর পর্যাপ্ত পরিমাণে বর্ষিত হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুর ভয়েই নিজের সত্যকে, আপন ভগবানকে হীন করি নাই, লাভ-লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম-উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা; আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহংকার নয়, আত্ম-উপলব্ধির আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। আমি অন্ধ-বিশ্বাসে, লাভের লোভে, রাজভয় বা লোকভয়ে মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারি না, অত্যাচারকে মেনে নিতে পারি না। তাহলে যে আমার দেবতা আমায় ত্যাগ করে যাবে। আমার এই দেহ-মন্দির জাগ্রত দেবতার আসন বলেই তো লোকে এ-মন্দিরকে পূজা করে, শ্রদ্ধা দেখায়, কিন্তু দেবতা বিদায় নিলে এ শূন্য মন্দিরের আর থাকবে কি? একে শুধাবে কে? তাই আমার কণ্ঠে কাল-ভৈরবের প্রলয়তূর্য বেজে উঠেছিল, আমার হাতে ধূমকেতুর অগ্নি-নিশান দুলে উঠেছিল, সে সর্বনাশা নিশানপুচ্ছে মন্দিরের দেবতা নট-নারায়ণ-রূপ ধরে ধ্বংস-নাচন নেচেছিলেন। এ ধ্বংস-নৃত্য নব সৃষ্টির পূর্ব-সূচনা। তাই আমি নির্মম নির্ভীক উন্নত শিরে সে নিশান ধরেছিলাম, তাঁর তূর্য বাজিয়েছিলাম। অনাগত অবশ্যম্ভাবী মহারুদ্রের তীব্র আহ্বান আমি শুনেছিলাম, তাঁর রক্ত-আঁখির হুকুম আমি ইঙ্গিতে বুঝেছিলাম। আমি তখনই বুঝেছিলাম, আমি সত্য রক্ষার, ন্যায়-উদ্ধারের বিশ্ব-প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। বাংলার শ্যাম শ্মশানের মায়ানিদ্রিত ভূমিতে আমায় তিনি পাঠিয়েছিলেন অগ্রদূত তূর্যবাদক করে। আমি সামান্য সৈনিক, যতটুকু ক্ষমতা ছিল তা দিয়ে তাঁর আদেশ পালন করেছি। তিনি জানতেন, প্রথম আঘাত আমার বুকেই বাজবে, তাই আমি একবার প্রলয় ঘোষণার সর্বপ্রথম আঘাতপ্রাপ্ত সৈনিক মনে করে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করেছি! কারাগার-মুক্ত হয়ে আমি আবার যখন আঘাত-চিহ্নিত বুকে, লাঞ্ছনা-রক্ত ললাটে, তাঁর মরণ-বাঁচা চরণমূলে গিয়ে লুটিয়ে পড়ব, তখন তাঁর সকরুণ প্রসাদ চাওয়ার মৃত্যুঞ্জয় সঞ্জীবনী আমায় শ্রান্ত, আমায় সঞ্জীবিত, অনুপ্রাণিত করে তুলবে। সেদিন নতুন আদেশ মাথায় করে নতুন প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ আমি, আবার তাঁর তরবারি-ছায়াতলে গিয়ে দণ্ডায়মান হব। সেই আজও-না-আসা রক্ত-উষার আশা, আনন্দ, আমার কারাবাসকে – অমৃতের পুত্র আমি, হাসি-গানের কলোচ্ছ্বাসে স্বর্গ করে তুলবে। চিরশিশু প্রাণের উচ্ছল আনন্দের পরশমণি দিয়ে নির্যাতিত লোহাকে মণিকাঞ্চনে পরিণত করবার শক্তি ভগবান আমায় না চাইতেই দিয়েছেন! আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই; কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন। আমার অসমাপ্ত কর্তব্য অন্যের দ্বারা সমাপ্ত হবে। সত্যের প্রকাশ-ক্রিয়া নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচারকে দগ্ধ করবে। আমার বহ্নি-এরোপ্লেনের সারথি হবে এবার স্বয়ং রুদ্র ভগবান। অতএব, মাভৈঃ! ভয় নাই।

    কারাগারে আমার বন্দিনী মায়ের আঁধার-শান্ত কোল ও অকৃতী পুত্রকে ডাক দিয়েছে, পরাধীনা অনাথিনি জননীর বুকে এ হতভাগ্যের স্থান হবে কিনা জানি না, যদি হয় বিচারককে অশ্রু-সিক্ত ধন্যবাদ দিব। আবার বলছি, আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই। আমি ‘অমৃতস্য পুত্রঃ’। আমি জানি –

    ওই অত্যাচারীর সত্য পীড়ন

    আছে, তার আছে ক্ষয়;

    সেই সত্য আমার ভাগ্য-বিধাতা

    যার হাতে শুধু রয়।

    প্রেসিডেন্সি জেল, কলিকাতা
    ৭ জানুয়ারি, ১৯২৩।
    রবিবার – দুপুর

  • জাগরণী

    জাগরণী

    জাগরণী

    বকুল! জা-গো! জাগো বকুল, এই পল্লিমাঠের পথের পাশে মেঠো গানের সহজ সুরে জাগো। জাগো তারই রেশের ছোঁয়ায়! জাগো বেদন নিয়ে, পল্লিশিশুর মুক্ত-বিথার প্রাণ নিয়ে, পল্লিতরুণের তাজা খুনের তীব্র কাঁপুনি নিয়ে। জাগো – জাগো বকুল, জাগো! শরম-রাঙা পাপড়ি কটি তোমার খুলে দাও – ছড়িয়ে দাও এই নবীন আষাঢ়ের কালো মেঘের জোলো ঝাপটায়। সংকুচিতা, ভীতা, ত্রস্তা বকুল! ছোট্ট বকুল! জাগো! জাগো – পরাগ-মাখা পবিত্র তোমার ধৌত-করুণ চাউনি নিয়ে, – এই বাদর-রাগিণী-আহত বাদল-প্রাতে। তোমার পরিমলের উদাস সুরভি নিয়ে এসে আমেজ দাও রাজার যত গুল-ভরা বাগিচায়। অনাদৃতা তুমি, তাই বলে তোমার ওই এক নিশ্বাসের সুরভিটুকু নিয়ে গর্বিতার মতো এসো না। এসো তুমি আধ-মুকুলিত-যৌবনা নববধূর মতো ধীর-মন্থর চরণে – পায়ের মুখর পায়জোর সামলে! লাজ-জড়িমা-জড়িত তোমার বুক ভরে থাকে যেন পূত শালীনতার সংযম আর প্রশান্ত প্রীতির স্নিগ্ধ-শান্তি! জাগো বকুল, জাগো! তুমি যেখানে ফোটো, সেই পল্লিতেই আছে আমাদের সত্যিকার বাংলা, – বাঙালির আসল প্রাণ।

    আমাদের এই শাশ্বত বাঙালির সুষুপ্ত, ঘুমে-ভরা অলস-প্রাণ জাগিয়ে তোলো তোমার জাগরণের সোনার কাঠি দিয়ে! তাদের ফুলের প্রাণে দাগ বসিয়ে দিয়ো তোমার মদির বাসের উন্মাদনার ছুরি হেনে! জাগো বকুল, জাগো! ওই রাজবাগানের ফুলবালাদের সালাম করো, আর তোমার অশ্রু-ভরা অভিনন্দন জানাও। ছোট্ট তুমি, এই পল্লি-বাটের পায়ে-চলার-পথ থেকে তাগিদে তোমার বুকভরা ভক্তি-ভালোবাসা নিবেদন করো। তোমার ওই পরাগালক্ত নিবেদিত অর্ঘ্য নিয়ে সে গুলবাহার-ভরা সুন্দরীদের বলো, – “ওগো, আমি ছোট্ট বকুল – নেহাত ছোট্ট! আমি জেগেছি! তাও সে অনেক দূরে পল্লির অচিন পথে! তোমরা আমায় ঘৃণা কোরো না! আমি আনব শুধু আমার পল্লিদুলালদের বুকের বেদন, তাদের খাপছাড়া আকুল আবদার, আর যুগ যুগ ধরে – পিষ্ট ক্লিষ্ট প্রাণের ব্যথা বিজড়িত সহজ চিন্তার স্মৃতি। এ বাছাদেরও ঘৃণা কোরো না, অবহেলা এদের প্রাণে বড্ড বাজবে! শিশু এরা – কুঁড়ি এরা, এখনও ফোটেনি। এরা তোমাদের দেশের হাওযার উড়িয়ে দেওয়া রেণুকা।

    দিয়ো গো দিয়ো, তোমাদের ওই রানির স্নেহের শুধু একটু রেণু, উড়িয়ে দিয়ো দখিন বায়ে এদের পানে! আহা, অনাদৃত বিড়ম্বিত হতভাগা, এরা, ঘৃণা কোরো না এদের।’’…জাগো বকুল, জাগো! ঝোড়ো হাওয়ায় আর জোলো মেঘে তোমায় ডাক দিয়েছে। জাগো – জাগো, পল্লিবুকের বেদন নিয়ে, পল্লিশিশুর ঝরণা-হাসি নিয়ে, আর তরুণদের সবুজ বুকের অরুণ খুনের উষ্ণগতি নিয়ে! জাগো, বকুল জাগো!! জাগো যৌবনের জয়টিকা নিয়ে!!!

  • জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    জাতীয় (ন্যাশনাল) বিদ্যালয় লইয়া একটু খোঁচা দিয়াছি, তাহা অন্য কোনো ভাব-প্রণোদিত হইয়া নয়। জাতীয় জিনিস লইয়া জাতির প্রত্যেকেরই ভালো-মন্দ বিচার করিয়া দেখিবার অধিকার আছে। তাহা ছাড়া, ‘মুনিনাঞ্চ মতিভ্রমঃ’, ভুল সকলেরই হয়; নিজের ভুল নিজে দেখিতে পায় না। অতএব আমাদেরই জাতীয় বিদ্যালয়ের যে ভুল আমাদের চোখে পড়িবে, তাহা আমাদেরই শোধরাইয়া লইতে হইবে। প্রথম কোনো বড়ো কাজ করিতে গেলে অনেক রকম ভ্রম-প্রমাদ হওয়া স্বাভাবিক জানি, এবং তাহাকে ক্ষমা করিতেও পারা যায় – যদি জানি যে তাঁহারা জানিয়া ভুল করিতেছেন না। কিন্তু যদি দেখি যে, এই সব হোমযজ্ঞের হোতারা জানিয়া শুনিয়া ভুল করিতেছেন বা জাতীয় শিক্ষা-রূপ পবিত্র জিনিসের নামেই নিজ-নিজ স্বার্থসিদ্ধির পথ খুঁজিতেছেন, তাহা হইলে হাজার অপ্রিয় হইলেও আমাদিগকে তাহা লইয়া আলোচনা করিতে হইবে। পবিত্র কোনো জিনিসে কীট প্রবেশ করিতে দেখিয়া চুপ করিয়া থাকাও অপরাধ। এই জাতীয় বিদ্যালয়ে কাঁচা কাঁচা অধ্যাপক নিয়োগ লইয়া যে ব্যাপার চলিতেছে, তাহা হাজার চেষ্টা করিলেও চাপা দেওয়া যাইবে না; ‘মাছ দিয়া শাক ঢাকা যায় না’। কাঁচা অধ্যাপক মানে বয়সে কাঁচা নয়, বিদ্যায় কাঁচা। আমাদের আর সবই ভালো, কেবল বে-বন্দোবস্তই হইতেছে ‘গুণরাশিনাশী।‘ গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতন তদুপরি আবার আমাদের একগুঁয়েমিও আছে। দোষ করিতেছি জানিয়া শুনিয়াও তাহা শুধরাইব না। যাঁহারা দেশের মঙ্গলের জন্য সকল স্বার্থ বলিদান দিয়া গোলামখানা হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন মনে করিয়াছিলাম, আজ যদি কর্মগতিকে দেখিতে পাই বা বুঝিতে পারি যে, তাঁহারা অন্য এক স্বার্থের লোভে বা বেশি লাভের সম্ভাবনায় ওরকম লোকদেখানো ত্যাগ দেখাইয়েছেন, তাহা হইলে বড়ো কষ্ট বোধ হয়। এখন কিন্তু অনেকেরই কার্য দেখিয়া সেই রকম বোধ হইতেছে। যে সব অধ্যাপক গোলামখানা ছাড়িয়া আমাদের বাহবা লইয়াছেন, তাঁহাদিগকেই যে জাতীয় বিদ্যালয়ের অধ্যাপক করিতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। কেননা তাঁহারা কখনও এই ত্যাগের বদলে আর একটা বড়োরকম লাভের আশায় এ ত্যাগ দেখান নাই। যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে আরও অনেকে লাফাইয়া উঠিয়া এইরকম মিথ্যা ভণ্ডামির ত্যাগ দেখাইতে ছুটিতে পারে। কেননা, ইহাতে তাঁহাদের ক্ষতি তো হইলই না, উলটো দেশময় একটা বাহবা পড়িয়া গেল যে, অমুক লোকটা একেবারে ত্যাগের চূড়ান্ত করিয়াছে – একেবারে বুদ্ধদেব! কিন্তু এ মিথ্যাকে আর যেই প্রশ্রয় দেন, আমরা প্রশ্রয় দিতে পারি না। মঙ্গল উৎসবে মিথ্যার অমঙ্গল কিছুতে প্রবেশ করিতে দিব না। আমরা অন্তর হইতে বলিতেছি, সত্যকে এড়াইয়া চলিয়ো না, ইচ্ছা করিয়া বা স্বার্থান্ধ হইয়া এমন মহৎ অনাবিল অনবদ্য জিনিসকে পঙ্কিল-কলঙ্কিত করিয়ো না, – যদি বুঝি তুমি বুঝিবার দোষে তাহা করিতেছ, ভণ্ডামি করিতেছ না, তবে তোমায় প্রাণ হইতে দেশবাসী ক্ষমা করিবে, স্নেহের দাবি লইয়া তোমার ভুল শুধরাইয়া দিবে, এবং তোমার গায়ে কাঁটাটি ফুটিতে দিবে না। যে সত্যিকার ত্যাগী তাঁহার পায়ে কাঁটা ফুটিলে আমরা দাঁত দিয়া তুলিয়া দিতে রাজি আছি। দোষ রাজতন্ত্রের নয়, দোষ আমাদেরই। আমরাই নিত্য নিতুই মঙ্গলের নামে, দেশের নামে নিজের স্বার্থ বাগাইয়া তো লইতেছি। এই ভণ্ডামি আর মোনাফেকিই তো সর্বনাশের মূল। প্রথমে আমাদিগকে মানুষ হইতে হইবে, স্বার্থের মায়া ত্যাগ করিয়া সত্যকে বড়ো করিয়া দেখিতে শিখিতে হইবে, তাহার পর যেন বড়ো কাজে হাত দিই। সেবার জাতীয় বিদ্যালয় অঙ্কুরেই বিনষ্টপ্রায় হইয়াছিল, এবারও যদি ওইরকম হয়, তাহা হইলে লজ্জায় আর মুখ দেখাইবার জো থাকিবে না। যাহার সত্যিকার কর্মী, তাঁহারাও কী অসত্যের জঞ্জাল হইতে মাথা ঝাড়া দিয়া উঠিবেন না? মিথ্যাকে সহ্য করার মতো কাপুরুষতা আর পাপ নাই। মহান কোনো কাজে অতি প্রিয়জনের দোষ থাকিলেও তাহা লুকাইলে চলিবে না। লোকলজ্জা বা মুখচোরা জিনিসটাই আমাদিগকে এমন দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছে। বন্ধুর মর্যাদার চেয়ে সত্যের মর্যাদা অনেক উপরে।

    তাহা ছাড়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম কী? স্টান্ডার্ডেরই বা কোনো একটা নিয়ম-কানুন বা প্রোগ্রাম আদি আছে কি? হইবে কখন? সকলেই তো দেখি, বসিয়া বসিয়া মাছি মারিতেছেন। অথচ কাঁদুনি গাহিতেছেন, ‘ছেলে জুটিতেছে না, আবার গোলামখানায় গিয়া ঢুকিতেছে’, ইত্যাদি! কিন্তু এই সব কাণ্ড দেখিয়া কয়জন বদসাহসী ছেলে ইহাতে আসিতে পারে? ভালো করিয়া কোমর বাঁধিয়া লাগিয়া যাও তো, দেখিবে তোমায় তখন ডাকিতে হইবে না – আপনিই তোমার অঙ্গন-ভরা লক্ষ তরুণ কণ্ঠে ‘হাজির’ ‘হাজির’ রব উত্থিত হইবে। তোমার মন্ত্রে তবে সে তোমার দোষ বা ক্ষমতার অভাব, তাহা মন্ত্রের দোষ নয়। নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা বলিয়া আক্ষেপ করা – ধৃষ্টতা আর বোকামি মাত্র।

    আমরা চাই, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি এমন হউক, যাহা আমাদের জীবনশক্তিকে ক্রমেই সজাগ, জীবন্ত করিয়া তুলিবে। যে শিক্ষা ছেলেদের দেহ-মন দুইকেই পুষ্ট করে, তাহাই হইবে আমাদের শিক্ষা। ‘মেদা-মারা’ ছেলের চেয়ে সে হিসাবে ‘ডাংপিটে’ ছেলে বরং অনেক ভালো। কারণ পূর্বোক্ত নিরীহ জীবরূপী ছেলেদের ‘জান’ থাকে না; আর যাহার জান নাই, সে-‘মোর্দা’ দিয়া কোনো কাজই হয় নাই, আর হইবেও না। এই দুই শক্তিকে – প্রাণশক্তি আর কর্মশক্তিকে একত্রীভূত করাই যেন আমাদের শিক্ষার বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয়, ইহাই আমাদের একান্ত প্রার্থনা। শত্তুর যেন ইহাকে গোলামখানা বা তেলাম-খানা না বলিতে পারে।

  • জাতীয় শিক্ষা

    জাতীয় শিক্ষা

    জাতীয় শিক্ষা

    কথায় বলে, ‘টকের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে তেঁতুলতলে বাসা।’ আজকাল ‘জাতীয় শিক্ষা’, ‘জাতীয় শিক্ষা’ বলিয়া যে বিপুল সাড়া পড়িয়া গিয়াছে দেশে, ইহার প্রতিও উক্ত ব্যাঙ্গোক্তি দিব্যি খাটে! সরকারি বিদ্যালয়ে বিদ্যা লয় হয় বলিয়াই যদি আমরা তাহাকে তালাক দিই , তাহা হইলে আমরা আমাদের শিক্ষার পরিপুষ্টির জন্য বা মনের মতো শিক্ষা দিবার জন্য যে বিদ্যাপীঠ খাড়া করিয়াছি বা করিব, তাহা কিছুতেই ওই সরকারি বিদ্যালয়েরই নামান্তর বা রূপান্তর হইবে না। তাহা হইলে টকের ভয়ে আমরা বৃথাই বাঁধা বাসা ফেলিয়া পলাইয়া আসিলাম, কেননা আবার আমাদের আর একরকম ‘টকবৃক্ষ’-এরই ছায়াতলে আশ্রয় লইতে হইল।

    ‘শুনিয়াছি, ‘বন্দেমাতরম’-এর যুগে যখন স্বদেশি জিনিসের সওদা লইয়া দেশময় একটি হইহই ব্যাপার, রইরই কাণ্ড পড়িয়া গিয়াছিল, তখন অনেক দোকানদার বা ব্যবসায়ীগণ বিলাতি জিনিসের ট্রেডমার্ক বা চিহ্ন দিব্যি চাঁচিয়া-ছুলিয়া উঠাইয়া দিয়া তাহাতে একটি স্বদেশি মার্কা মারিয়া লোকের নিকট বিক্রয় করিতেন। এখন যে-পদ্ধতিতে জাতীয় শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ আশা-ভরসাস্থল নব-উদ্ভাবিত জাতীয় বিদ্যালয়ে দেওয়া হইতেছে, তাহাও ঠিক ওই রকম বিলিতি শিক্ষারই ট্রেডমার্ক উঠাইয়া ‘স্বদেশি’ মার্কা লাগাইয়া দেওয়ার মতো। শিক্ষায় যা একটু মৌলিকতা দেখা যাইতেছে, তাহা কিন্তু বিশেষ দ্রষ্টব্য নয়। ওরকম এক-আধটু নূতনত্ব যে কেহ একটি নূতন জিনিসে লাগাইতে পারে। যদি আমাদের এই জাতীয় বিদ্যালয় ওই সরকারি বিদ্যাপীঠেরই দ্বিতীয় সংস্কাররূপে আত্মপ্রকাশ করে, তাহা হইলে আমরা কিছুতেই উহাকে আমাদের জাতীয় বিদ্যালয় বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না, বা গৌরবও অনুভব করিতে পারি না। যাহা আমাদের সম্পূর্ণ নিজস্ব নয়, যাহা অন্যের ভুল দাগে দাগা-বুলানো মাত্র, তাহাকে কী বলিয়া কোন্ লজ্জায় ‘হামারা’ বলিয়া বুক ঠুকিয়া তাহাদেরই সামনে দাঁড়াইব – যাহাদিগকে মুখ ভ্যাংচাইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছি আবার তাহাদেরই হুবহু ‘হনুকরণ’ করিতেছি। জাতীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষা-পদ্ধতি ও শিক্ষাদাতা কর্তাদের সম্বন্ধে আমরা আজ পর্যন্ত যাহা জানিতে পারিয়াছি, তাহা খারাপ বলিতে আমাদেরই বক্ষে বাজিতেছে; কিন্তু সত্যকে অস্বীকার করিয়া ভণ্ডামি দিয়া কখনও মঙ্গল উৎসবের কল্যাণ-প্রদীপ জ্বলিবে না। শুধু চরকা দিয়া সুতা কাটানো ছাড়া এ ন্যাশনাল বিদ্যালয়ে তেমন কিছু নূতন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় নাই, যারা সম্পূর্ণরূপে আমাদের দেশের ছেলেদের মনের বা এদেশের আবহাওয়ার উপযোগী। এসবই ইংরেজি কায়দা-কানুনকে যেন মাথায় পগ্‌গ ও পায়ে নাগরা জুতা পরাইয়া এদেশি করা; অথবা সাহেবকে ধুতি ও মেমকে শাড়ি পরাইয়া বাবু ও বিবি সাজানো গেছে। এর পূর্বে স্বদেশি যুগে যখন আর একবার এইরকম জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল, তখনও এই ব্যাপার ঘটিয়া সব কিছু পণ্ড হইয়া গিয়াছিল।

    এসব দোষ তো আছেই, তাহা ছাড়া এমন ব্যাপার এখানে অনুষ্ঠিত হইতেছে তাহা কিছুতেই মার্জনা করা যায় না। যাঁহারা জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রফেসর বা অধ্যাপক নিযুক্ত হইতেছেন, তাঁহার সকলেই কী নিজ নিজ পদের উপযুক্ত? কত উপযুক্ত লোককে ঠকাইয়া শুধু দুটো বক্তৃতা ঝাড়ার দরুন ইহারা অনেকেই নিজের রুটির জোগাড় করিয়া লইয়াছেন ও লইতেছেন। আজ আমরা তাঁহাদের নাম প্রকাশ করিলাম না। যদি এখনও এই রকম ব্যাপার চলিতে থাকে, তবে বাধ্য হইয়া আরও অপ্রিয় সত্যকথা আমাদিগকে বলিতে হইবে। পবিত্রতার নামে, মঙ্গলের নামে এমন জুয়াচুরিকে প্রশ্রয় দিলে আমাদের ভবিষ্যৎ একদম ফরসা! দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন বা দেশের লোক কতকগুলি ভূতের বাথান ও আখড়া পাকাইবার জন্য বুকের রক্তসম টাকার আড়ি হুড়মুড় করিয়া ঢালিয়া দেন নাই। তাঁহারা টাকা ঢালিয়া দিয়াছেন ইংরাজি মেম-ভারতীয় জুতোপরা পায়ে নয়, বাগ্‌দেবী ভারতী-বীণাপাণির কমল পায়ে। এর চেয়ে উপযুক্ত লোক পাওয়া যাইতেছে না বলিয়া ‘খোঁড়া ওজর’ দেখাইলে চলিবে না, তাঁহারা ইহার জন্য চেষ্টা করিয়াছেন কি?

  • সত্য-শিক্ষা

    সত্য-শিক্ষা

    সত্য-শিক্ষা

    তোরণে তোরণে ভৈরব-বিষাণ বাজিয়া উঠিয়াছে – ‘জাগো পুরবাসী!’ দিকে দিকে মঙ্গল শঙ্খে তাহারই প্রতিধ্বনি উঠিয়া আমাদের রক্তে রক্তে ছায়ানটের নৃত্যরাগ তুলিয়াছে। এই যে আমাদের জীবনের উন্মাদ নট-নৃত্য, এ শুধু বিশ্বের কল্যাণ-মুক্তিতে নয়, এই মুক্তি-যুগে আমরাও আমাদের ভাবী সিংহ-দ্বারের পূর্বতোরণে নহবতের বাঁশি শুনিয়াছি বলিয়া। তাই আর আমরা শুধু দার্শনিকের ভিতরের যুক্তিতে সন্তুষ্ট নই, এখন চাই বাইরের ব্যবহারিক জীবনে মুক্তি। এই ‘আজাদি’র সাড়া না পাইলে আমাদের জীবনে আজ এমন তরুণের উচ্ছৃঙ্খলতা, সবুজের স্বেচ্ছাচারিতা দেখা দিত না। রক্তনিশান লইয়া আজ আমাদের নূতন করিয়া যাত্রা শুরু; এই শোভাযাত্রার দুর্মদ অগ্রযাত্রী আমাদের যে কিশোর আর তরুণের দল, সর্বাগ্রে তাহাদিগেরই অন্তরে বাহিরে ‘আজাদি’র নেশা জমাইয়া তুলিতে হইবে। কারণ, ইহাদের মৃত্যুবিদ্রোহে অলস ভীরু জীবন পথযাত্রীর বুকে সাহস সঞ্চর হইবে। আমরা কিন্তু আমাদের এই উন্মুক্ত উদার প্রাণগুলির চারিপাশে নিত্য বন্ধন-বাধা সৃজন করিয়া তাহাদিগের উচ্ছল গতিকে অচল করিতেছি। তাই বিজাতির বিভিন্ন শৃঙ্খল কাটিয়া জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার কথা শুনিয়া আমরা আজ এত আনন্দধ্বনি করিতেছি। যাহাতে এই জাগরণ-যুগের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ এই জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বাহিরে না হইয়া অন্তরে হয়, সেই জন্যই আমরা এ-সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করিতেছি। আজ ইংরাজের সহযোগিতা বর্জন করিতেছি বলিয়াই যে রাগের মাথায় যেন-তেন-প্রকারেণ দুই-একটা ঠাটকবাজিগোছ জাতীয় স্কুল-কলেজ দাঁড় করাইয়া সরিয়া পড়িতে হইবে, তাহা নয়; অসহযোগিতার মৌসুম না আসিলেও জাতীয়তার দিক দিয়া আমাদের জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। বিজাতীয় অনুকরণে আমরা ক্রমেই আমাদের জাতীয় বিশেষত্ব হারাইয়া ফেলিতেছি। অধিকাংশ স্থলেই আমাদের এই অন্ধ অনুকরণ হাস্যাস্পদ ‘হনুকরণে’ পরিণত হইয়া পড়িয়াছে। পরের সমস্ত ভালো-মন্দকে ভালো বলিয়া মানিয়া লওয়ায়, আত্মা, নিজের শক্তি ও জাতীয় সত্যকে নেহাতই খর্বই করা হয়। নিজের শক্তি, স্বজাতির বিশেষত্ব হারানো মনুষ্যত্বের মস্ত অবমাননা। স্বদেশের মাঝেই বিশ্বকে পাইতে হইবে, সীমার মধ্যেই অসীমের সুর বাজাইতে হইবে। তাই, এই সহযোগিতা বর্জনের দিনে ‘খোশখবর কা ঝুটা ভি আচ্ছা’ স্বরূপ আমাদের দীর্ঘ পরিপোষিত আশার কার্যে পরিণত হইবার কথা শুনিয়া গভীর তৃপ্তি অনুভব করিতেছি।

    জাতীয় বিশেষত্বের উপর ভিত্তি করিয়া আমাদের ভাবী দেশসেবকের চরিত্র ও জীবন গঠিত হইবে, বিদেশের বিজাতীর বিষাক্ত বাষ্প লাগিয়া তাহাদের মঞ্জরিত জীবন-পুষ্প শুকাইয়া যাইবে না, বলপ্রয়োগে তাহাদিগকে মিথ্যা স্বজাতি-স্বদেশে-অনাস্থা শিখাইয়া আত্মশক্তিকে অবিশ্বাসী অলস অকেজো করিয়া তোলা হইবে না, – ইহা কী কম সুখের কথা! তাহারা শিখিবে দেশের কাহিনি, জাতির বীরত্ব, ভ্রাতার পৌরুষ, স্বধর্মের সত্য – দেশের ভাইয়ের কাজ হইতে – তাহারা শিখিবে বীরের আত্মোৎসর্গ, কর্মীর ত্যাগ ও কর্ম, নির্ভীকের সাহস, দেশের উদাহরণে উদ্‌বুদ্ধ হইয়া, – ইহা কী কম আনন্দের কথা! তাই আবার বলিতেছি, শুধু হুজুগে মাতিলে চলিবেনা, গলাবাজির চোটে স্টেজ ফাটাইয়া তুলিলে হইবে না, – আমরা দেখিতে চাই কোন্ নেতার চেষ্টায় কোন্ দেশ-সেবকের ত্যাগে কতটা জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হইল। আমরা দেখিতে চাই, আমাদের কতগুলি তরুণের বুকে এই মহাশিক্ষার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইল! আমরা দেশ-সেবক চিনিব ত্যাগে, বক্তৃতায় নয়। আমরা দেখিতে চাই কবির ভবিষ্যদ্‌বাণী – ‘আসিবে সে দিন আসিবে’ গান দিকে দিকে বৈতালিক-কণ্ঠে বিঘোষিত হইতেছে, – ‘দিন আগত ওই!’

  • ভাব ও কাজ

    ভাব ও কাজ

    ভাব ও কাজ

    ভাবে আর কাজে সম্বন্ধটা খুব নিকট বোধ হইলেও আদতে এ জিনিস দুইটায় কিন্তু আশমান-জমিন তফাৎ।

    ভাব জিনিসটা হইতেছে পুষ্পবিহীন সৌরভের মতো, একটা অবাস্তব উচ্ছ্বাস মাত্র। তাই বলিয়া কাজ মানে যে সৌরভবিহীন পুষ্প, ইহা যেন কেহ মনে করিয়া না বসেন। কাজ জিনিসটাই ভাবকে রূপ দেয়, ইহা সম্পূর্ণভাবে বস্তুজগতের।

    তাই বলিয়া ভাবকে যে আমরা মন্দ বলিতেছি বা নিন্দা করিতেছি, তাহা নহে; ভাব জিনিসটা খুবই ভালো। মানুষকে কব্জায় আনিবার জন্য তাহার সর্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁয়া দিয়া তাহাকে মাতাইয়া না তুলিতে পারিলে তাহার দ্বারা কোনো কাজ করানো যায় না, বিশেষ করে আমাদের এই ভাব-পাগলা দেশে। কিন্তু শুধু ভাব লইয়াই থাকিব, লোককে শুধু কথায় মাতাইয়া মশগুল করিয়াই রাখিব, এও একটা মস্ত বদ-খেয়াল। এই ‘ভাব’কে কার্যের দাসরূপে নিয়োগ করিতে না পারিলে ভাবের কোনো সার্থকতাই থাকে না। তাহা ছাড়া ভাব দিয়া লোককে মাতাইয়া তুলিয়া যদি সেই সময় গরমাগরম কার্যসিদ্ধি করাইয়া লওয়া না হয়, তাহা হইলে পরে সে ভাবাবেশ কর্পূরের মতো উড়িয়া যায়। অবশ্য, এখানে কার্যসিদ্ধি মানে স্বার্থসিদ্ধি নয়। যিনি ভাবের বাঁশি বাজাইয়া জনসাধারণকে নাচাইবেন, তাঁহাকে নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষি হইতে হইবে। তিনি লোকদিগের সূক্ষ্ম অনুভূতি ও ভাবকে জাগাইয়া তুলিবেন মানুষের কল্যাণের জন্য, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। তাঁহাকে একটা খুব মহত্তর উদ্দেশ্য ও কল্যাণ কামনা লইয়া ভাবের বন্যা বহাইতে হইবে, নতুবা বানভাসির পর পলি পড়ার মতো সাধারণের সমস্ত উৎসাহ ও প্রাণ একেবারে কাদাঢাকা পড়িয়া যাইবে। এই জন্য কেহ কেহ বলেন যে, লোকের কোমল অনুভূতিতে গা দেওয়া পাপ। কেননা, অনেক সময় অনুপযুক্ততা-প্রযুক্ত ইহা হইতে সুফল না ফলিয়া কুফলই ফলে। আগে হইতে সমস্ত কার্যের বন্দোবস্ত করিয়া বা কার্যক্ষেত্র তৈয়ার রাখিয়া তবে লোকদিগকে সোনার কাঠির ছোঁয়া দিয়া জাগাইয়া তুলিতে হইবে। নতুবা তাহারা যখন জাগিয়া দেখিবে যে, তাহারা অনর্থক জাগিয়াছে, কোনো কার্য করিবার নাই, তখন মহা বিরক্ত হইয়া আবার ঘুমাইয়া পড়িবে এবং তখন আর জাগাইলেও জাগিবে না। কেননা, তখন যে তাহারা জাগিয়া ঘুমাইবে এবং জাগিয়া ঘুমাইলে তাহাকে কেহই তুলিতে পারে না। তাহা অপেক্ষা বরং কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভালো, সে-ঘুম ঢোল কাঁসি বাজাইয়া ভাঙানো বিচিত্র নয়।

    এ কথাটা যে একটা মস্ত সত্যি, তাহা এতদিনে আমরা ঠেকিয়া শিখিয়াছি। এই যে সেদিন একটা হুজুগে মাতিয়া হুড়মুড় করিয়া হাজার কতক স্কুল-কলেজের ছাত্রদল বাহির হইয়া আসিল, কই তাহারা তো তাহাদের এই সৎ সংকল্প, এই মহৎ ত্যাগকে স্থায়ীরূপে বরণ করিয়া লইতে পারিল না। কেন এমন হইল? একটা সাময়িক উত্তেজনার মুখে এই ত্যাগের অভিনয় করিতে গিয়া ‘স্পিরিট’কে কী বিশ্রী ভাবেই না মুখ ভ্যাংচানো হইল! যাহারা শুধু ভাবের চোটে না বুঝিয়া না শুঝিয়া শুধু একটু নামের জন্য বা বদনামের ভয়ে এমন করিয়া তাহাদের ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তির পবিত্রতা নষ্ট করিল, তাহারা কী দরকার পড়িলে আবার কাল এমনই করিয়া বাহির হইয়া আসিতে পারিবে? আজ যাহারা মুখে চাদর জড়াইয়া কল্যকার ত্যক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মুখটি চুন করিয়া ঢুকিল, কাল দেশের সত্যিকার ডাক আসিলে তাহারা কী আর তাহাতে সাড়া দিতে পারিবে! হঠকারিতা করিয়া একবার যে ভোগটা ভুগিল বা ভ্রম করিল, তাহারই অনুশোচনাটা তাহারা কিছুতেই মন হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিবে না। – বাহিরে যতই কেন লি-পরওয়া ভাব দেখাক না। এখন সত্যিকার ডাক শুনিয়া প্রাণ চাহিলেও সে লজ্জায় তাহাতে আসিয়া যোগদান করিতে পারিবে না। এইরূপে আমরা আমাদের দেশের প্রাণশক্তি এই তরুণদের ‘স্পিরিট’টাকে কুব্যবহারে আনিয়া মঙ্গলের নামে দেশের মহা শত্রুতা সাধনই করিতেছি না কি? রাগিবার কথা নয়, এখন ইহা রীতিমতো বিবেচনা-সাপেক্ষ। আমাদের এই আশা-ভরসাস্থল যুবকগণ এত দুর্বল হইল কীরূপে বা এমন কাপুরুষের মতো ব্যবহারই বা করিল কেন? সে কি আমাদের দোষে নয়? সাপ লইয়া খেলা করিতে গেলে তাহাকে দস্তুরমতো সাপুড়ে হওয়া চাই, শুধু একটু বাঁশি বাজাইতে পারিলেই চলিবে না। আজ যদি সত্যিকার কর্মী থাকিত দেশে, তাহা হইলে এমন সুবর্ণ সুযোগ মাঝ-মাঠে মারা যাইত না। ত্যাগী অনেক আছেন দেশে, কিন্তু কর্মীর অভাবে বা তথাকথিত কর্মী নামে অভিহিত লোকদের সত্য সাধনার অভাবে তাঁহারা কোনো ভালো কাজে আর কোনো অর্থ দিতে চাহেন না, বা অন্য কোনোরূপ ত্যাগ স্বীকার করিতেও রাজি নন। কী করিয়া হইবেন? তাঁহারা তাঁহাদের চোখের সামনে দেখিতেছেন যে, কত লোকের কত মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ধন দেশের নামে, কল্যাণের নামে আদায় করিয়া বাজে লোকে নিজেদের উদর পূর্ণ করিতেছে। যাঁহারা সত্যিকার দেশকর্মী – সে বেচারা সত্যি কথা স্পষ্টভাবে বলিতে গিয়া এই সব কর্মীদের কারচুপিতে পুয়াল চাপা পড়িয়া গিয়াছে, বেচারারা এখন ভালো বলিতে গেলেও এই সব মুখোশ-পরা ত্যাগী মহাপুরুষগণ হট্টগোল বাধাইয়া লোককে সম্পূর্ণ উলটা বুঝাইয়া দিয়া তাহাকে একদম খেলো, ঝুটা ইত্যাদি প্রমাণ করিয়া দেন। সহজ জনসাধারণের সরল মন এসব না ধরিতে পারার দরুন তাহাদের মন অতি অল্পেই ওই সত্যিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষাইয়া উঠে। ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ কথাটা মস্ত সত্যি কথা।

    তাহা হইলে এখন উপায় কী? এক সহজ উপায় এই যে, এখন হইতে জনসাধারণের বা শিক্ষিত কেন্দ্রের উচিত, ভাবের আবেগে অতিমাত্রায় বিহ্বল হইয়া কান্ডাকাণ্ড ভালোমন্দ জ্ঞান হারাইয়া না ফেলা। ভাব জিনিসটা মদের নেশার চেয়েও গাঢ়। পাঁড়-মাতালরা বলে, ‘মদ খাও, কিন্তু তোমায় যেন মদে না খায়।’ আমরাও বলিব, ভাবের সুরা পান করো ভাই, কিন্তু জ্ঞান হারাইয়ো না। তাহা হইলে তোমার পতন, তোমার দেশের পতন, তোমার ধর্মের পতন, মনুষ্যত্বের পতন! ভাবের দাস হইয়ো না, ভাবকে তোমার দাস করিয়া লও। কর্মে শক্তি আনিবার জন্য ভাব-সাধনা করো। ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে জাগাইয়া তোলো, কিন্তু তাই বলিয়া কর্মকে হারাইয়ো না। অন্ধের মতো কিছু না বুঝিয়া না শুনিয়া ভেড়ার মতো পেছন ধরিয়া চলিয়ো না। নিজের বুদ্ধি, নিজের কর্মশক্তিকে জাগাইয়া তোলো। তোমার এই ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যই দেশকে উন্নতির দিকে, মুক্তির দিকে আগাইয়া লইয়া যাইবে। এসব জিনিস ভাব-আবিষ্ট হইয়া চক্ষু বুঁজিয়া হয় না। কোমর বাঁধিয়া কার্যে নামিয়া পড়িতে হইবে এবং নামিবার পূর্বে ভালো করিয়া বুঝিয়া-সুঝিয়া দেখিয়া লইতে হইবে, ইহার ফল কী। শুধু হোড়ের মতো বা উদ্‌মো ষাঁড়ের মতো দেয়ালের সঙ্গে গা ঘেঁসাইয়া নিজের চামড়া তুলিয়া ফেলা হয় মাত্র। দেয়াল-প্রভু কিন্তু দিব্যি দাঁড়াইয়া থাকেন। তোমার বন্ধন ওই সামনের দেয়ালকে ভাঙিতে হইলে একেবারে তাহার ভিত্তিমূলে শাবল মারিতে হইবে।

    আবার বলিতেছি, আর ভাবের ঘরে চুরি করিয়ো না। আগে ভালো করিয়া চোখ মেলিয়া দেখো। কার্যের সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার কথা অগ্রে বিবেচনা করিয়া পরে কার্যে নামিলে তোমার উৎসাহ অনর্থক নষ্ট হইবে না। মনে রাখিও, তোমার ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে অন্যের প্ররোচনায় নষ্ট করিতে তোমার কোনো অধিকার নাই। তাহা পাপ – মহাপাপ!

  • লাট-প্রেমিক আলি ইমাম

    লাট-প্রেমিক আলি ইমাম

    লাট-প্রেমিক আলি ইমাম

    হায়দ্রাবাদের নিজামের প্রধানমন্ত্রী সার সৈয়দ আলি ইমাম বিলাতে গত ১১ মার্চ রাত্রে লর্ড এবং লেডি রিডিং-এর সম্মানার্থে এক ভোজ দিয়াছিলেন। সেই ভোজসভায় বক্তৃতা দিবার সময় তিনি মি. মন্টেগুকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাইয়া বলেন, মি. মন্টেগু ভারতের কল্যাণের জন্য, মুক্তির জন্য প্রবল প্রতিবন্ধক সত্ত্বেও ভীষণ যুদ্ধ (অবশ্য বাকযুদ্ধ) করিয়াছেন। লর্ড হার্ডিঞ্জ আশ্চর্য তৎপরতার সহিত গত ১৯১৪ সালের মহাবিপদের সময় ভারতীয় সৈন্যদিগকে চটপট আসরে নামাইয়া ভারতীয়দিগের ভীষণ রাজভক্তির কথা সপ্রমাণ করিয়াছেন। লর্ড রিডিং ভারতের লাটগিরি করিতে স্বীকৃত হইয়া ব্যক্তিগত স্বার্থত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন! তাঁহার এই নিঃস্বার্থ বলিদানে ভারত কৃতার্থ হইয়া যাইবে! ভারতের বর্তমানে যে সংকটাপন্ন অবস্থা, তাহাতে এই রকম একজন গুণসম্পন্ন প্রতিভান্বিত ইংরাজ রাজপুরুষের ভয়ানক দরকার ছিল। তিনি লর্ড রিডিংকে ভরসা দিয়া আরও বলেন যে, ভারতের জন্য বা সাম্রাজ্যের মঙ্গলের জন্য যাহা কিছু করিতে হইবে, তাহাতেই তিনি (না ডাকিতেই) গিয়া হাত লাগাইতে পিছ-পা নন।… লর্ড রিডিং প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘আমি সার আলি ইমামের সব নয়। (অ্যাঁ,– যার জন্যে চুরি করি, সেই বলে চোর!) যে কোনো মহাপুরুষই হউন, ত্রিশ কোটি লোকের উপর হর্তাকর্তা বিধাতা হওয়াটা তাঁহার পক্ষে বড়ো সোজা কথা নয়। পরম করুণাময় চরম প্রসন্ন না হইলে কোনো ভায়ার এ (গয়াসুরের) পাদপদ্ম লাভ হয় না। (অত্যধিক আনন্দে ‘মনে মনে’ ঈশ্বরকে নমস্কার!) মস্ত বড়ো একটা বিরাট রকমের মহাপদ-প্রাপ্তির জন্য আমি লাটের মলাটে নিজের নাম লিখাইতে রাজি হই নাই, আমাকে ওই পদের সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত লোক ভাবিয়া লাট নিযুক্ত করা হইয়াছে বলিয়া আমার এই স্বার্থত্যাগ!’ লর্ড রিডিং এইখানেই না থামিয়া হুড়মুড় করিয়া আরও বলিতে থাকেন যে, তিনি যে এত বিস্তৃততর একটা স্থান ও কাজ দেখাইবার সুযোগ পাইলেন ইহার জন্য তিনি গর্বিত। এইবার তিনি দেখাইয়া দিবেন যে, তাঁহার কার্যক্ষমতা কত বেশি। এতদিন তাঁহাকে আইন অনুসারে বিচার নিষ্পত্তি করিতে হইয়াছে, কিন্তু এইবার তিনি বিবেক দিয়া বিচার করিতে পারিবেন। তাই এই ভারতত্রাতার পদমঞ্জুরি। তিনি ‘বহু আশা করিয়া’ ভারত-যাত্রা করিতেছেন যে, ভারত পৌঁছিয়াই তিনি দেশব্যাপী এমন এক জলবায়ুর সৃষ্টি করিয়া ফেলিবেন, যাহাতে গবর্নমেন্ট আর ভারতীয় জনসাধারণের মধ্যে পরস্পরের একটা সহানুভূতিপূর্ণ বোঝাপড়া বা লেখাপড়া হইয়া যাইবে। জাতিবর্ণ নির্বিশেষে প্রজাপালন করিবেন বলিয়া তিনি মহৎ আশা করেন! আশ্চর্য কথাই কী না শুনিলাম! তাঁহার স্কন্ধে কত বড়ো দায়িত্বের জোয়াল চড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে ভাবিয়া তিনি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় কাতর মিনতি জানাইবেন, যেন তিনি তাঁহার ওই গর্দানের জোয়ালোপযুক্ত হন!

    মি. মন্টেগু তখন উঠিয়া নিজামের, তাঁহার প্রধানমন্ত্রী সার আলি ইমাম সাহেবের ও তাঁহার বেগম সাহেবার স্বাস্থ্য কামনা করিয়া …নিজাম যে গত যুদ্ধের সময় লোক-লশকর গোলাগুলি দিয়া ইংরাজের ইজ্জত রক্ষা করেন, তজ্জন্য খুব গরমাগরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। যদিও ভারতের অবস্থা এখন জটপাকানো জটার মতোই জটিলতাপূর্ণ, তবুও তাঁহার আশা আছে, এ-সব জট খুলিয়া যাইবে, এবং ইংরাজ ও ভারতীয়দের মধ্যে একটা নূতন যুগের নব প্রেরণার আজানুলম্বিত বাহুর আবির্ভাব হইয়া পরস্পরকে নিবিড় প্রেমে জড়াজড়ি করিয়া কষিয়া বাঁধিবে!

    ইহার উপরে আর আমাদের কথা নাই! এ যেন একেবারে ‘দুধকে দুধ, জলকে জল!’

    সবাই তো নিজের নিজের মনের মতন কথাগুলি দিব্যি আওড়াইয়া গেলেন, কিন্তু যাহাদের জন্য এত নাড়ির টান ইঁহাদের, তাহাদের কেমন লাগিল বা লাগিবে সেটা কি ভাবিয়া দেখিয়াছেন? রাজতন্ত্র, স্বেচ্ছাতন্ত্র বা আমলাতন্ত্রের মজাই হইতেছে এই যে, কর্তারা কেবল নিজের দিকটাই দেখেন। নিজেদের সুখ-সুবিধাটাই তাঁহাদের লক্ষ্য – বাকি সব চুলোয় যাক, তাঁহাদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই!

    সার আলি ইমাম এখন লাট হইবার আশায় কত রকম ঢলানই ঢলাইবেন, এবং কর্তাদের মনস্তুষ্টির জন্য কত রকমেই না পুচ্ছ নাড়িয়া নিজের কৃতজ্ঞতা ও প্রভুভক্তি জানাইবেন, কিন্তু সে আশা কি সফল হইবে শেষ পর্যন্ত? ভারতের বিনা-জবাবদিহির লাট-মসনদে বসা লইয়াও তিনি যাঁহার নিঃস্বার্থ ত্যাগ দেখিয়া বিনাইয়া-বিনাইয়া গুণ ব্যাখ্যা করিলেন বা খোত্‌বা পড়িলেন, তিনিই কি না তাঁহার মুখের উপর এমন অপমানটা করিয়া বসিলেন, “না ভাই, না এতে আমার স্বার্থত্যাগের কোনো সুগন্ধই নাই – আমি বুদ্ধদেব নই; ত্রিশ কোটি মানুষ-মেষের রাখাল, পঞ্চাশটি হাজার করে টাকা মাসোহারা (যা দিয়া ইংলণ্ডে দু-পাঁচটা লয়েড জর্জ কিনতে পাওয়া যায়), এ কী ভাই সবই ফাঁকি , স লভ্য কি গেছ ভুলে?” লর্ড রিডিং সাংঘাতিক লোক, তাই খাঁটি সত্যকথা (তা যত বড়োই অপ্রিয় হউক না) একেবারে মুখের উপর চাঁচাছোলা ভাষায় বলিয়া দিয়াছেন! এঁদের কাছে বাবা ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় নাই, সোজা কথা। সোজাসুজি বলিয়া দেওয়া, – ব্যস! ইহাতে তুমি রাগো, তো ঘরে বেশি করিয়া ভাত খাইবে! এ তো আর এদেশি রাজা-মহারাজ নন যে, দুটো চাটুবাক্যের আঁচ দিয়াই তাঁহাদিগকে ননীর মতন গলাইয়া ফেলিবে!

    সার আলি ইমামকে শুধু জিজ্ঞেস করি, আমাদের গায়ের দাগগুলো কী এমন করিয়া মাখন ডলিলেই এত শীঘ্র মিলাইয়া যাইবে? –

    ‘সেথা যে বহে নদী নিরবধি সে ভোলেনি,
    তারই যে স্রোতে আঁকাবাঁকা বাঁকা চোখা বাণী,
    এখনও গুঁতোর রেখা আছে লেখা পিঠের কূলে! –
    আজই জী সবি ফাঁকি, সেকথা কী গেছ ভুলে?’

  • শ্যাম রাখি না কুল রাখি

    শ্যাম রাখি না কুল রাখি

    শ্যাম রাখি না কুল রাখি

    বিহারের শাসনকর্তা লর্ড সিংহ বাহাদুর ভয়ানক মুশকিলে পড়িয়া গিয়াছেন। ঠিক যেন সাপে ছুঁচো গেলা গোছ। ছাড়িতেও পারেন না, গিলিতেও পারেন না। সহযোগিতা বর্জন আন্দোলন বিহারে যেরকম জোরে চলিতেছে, সেরূপ আর কোথাও নয়। মহাত্মা গান্ধিও এই লইয়া সেদিন ‘ইয়ং ইণ্ডিয়ায়’ বিহারের জোর প্রশংসা করিয়াছেন। এই ব্যাপারে বিহার গবর্নমেন্ট দস্তুর মতো বেসামাল হইয়াছেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। কেননা ইহার ছোটো শাসন-কর্তারা রাগের বা ভয়ের চোটে যখন তখন যা-তা করিয়া বসিতেছেন। সেদিন পুরুলিয়ায় ডেপুটি কমিশনার উকিলদিগকে ধমকাইতে গিয়া অপ্রতিভের একশেষ হইয়াছেন। তার পর মহকুমায়-মহকুমায়, জেলায়-জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটগণ যে রকম সৃষ্টিছাড়া হুকুম জারি করিতেছেন, তাহা দেখিয়া বুঝা যায় যে, বাস্তবিকই এবার তাঁহারা চটিয়াছেন। মদের উপকারিতা লইয়া যে সরকারি ইস্তাহার জারি হইয়াছিল, তাহার কেলেঙ্কারি আর বলিলাম না। লর্ড সিংহ বাহাদুর বড়ো অসময়ে লাট ও শাসনকর্তা হইয়াছেন। এখন তিনি দেশের লোকের মন জোগাইয়া চলিতে পারেন না, আবার তাঁহার অধীন বিলিতি শাসনকর্তাদিগকেও জোর করিয়া কিছু বলিতে পারেন না, পাছে তাঁহারা তাঁহার বিরুদ্ধে ধর্মঘট করিয়া বসেন! দেশের লোক এখন যাহা চায়, তাও যদি আবার তিনি বিনা বাধায় চলিতে দেন, তাহা হইলে তো আবার তাঁহাকে একদিনেই পাততাড়ি গুটাইতে হয়।

    আর তাহা ছাড়া দেশের লোকের বর্তমান দাবি-দাওয়া পূর্ণ করাও তাঁহার ক্ষমতার বাহিরে। একটা প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে আমরা যতটা স্বাধীন মনে করি, আসলে তিনি ততটা স্বাধীন নন। তিনিও প্রকারান্তরে শুধু তাঁহার উপরওয়ালারই হুকুম তামিল করেন, বলা যাইতে পারে। কাজেই বুঝিয়া হউক, না বুঝিয়া হউক, দেশের লোকে তাঁহার উপর বিষম চটিয়া উঠিতেছে এবং নানান রকমের টীকাটিপ্পনীও কাটিতেছে! এ হুলের বিষজ্বালা তাঁহাকে অতি কষ্টে নীরবেই সহ্য করিতে হইতেছে, কেননা, আমরা ছেলেবেলার পদ্যপাঠে পড়িয়াছি, ‘অসহ্য জ্ঞাতির বাক্য সহ্য নাহি হয়, সাপের মাথায় যেন ব্যাঙে প্রহারয়!’ কিন্তু ইহাতে তাঁহার দুঃখ-কষ্ট অনুভব করা উচিত নয়। কেননা, সর্বপ্রথম দেশীয় শাসনকর্তা বলিয়া দেশের লোক তাঁহার নিকট অনেক কিছু আশা করিয়াছিল। কিন্তু কর্মের বা গ্রহের ফেরে সমস্ত ওলট-পালট হইয়া গেল। এখন তিনি দেশের লোককে সন্তুষ্ট করিতে পারেন না এবং খুব কষিয়া কড়া শাসন চালাইয়া তাহাদিগের মুখ বন্ধ বা তাহাদের দোরস্ত করিতেও পারেন না। কেননা, বেশি জোরজবরদস্তি করিলে দেশের লোক আরও বেশি খেপিয়া উঠিবে। মানুষের চামড়া কিছু গণ্ডারের চামড়া নয়, অতএব দেশ-ভাই- এর ও আঘাত হয়তো তাঁহার গায়ে দারুণ বাজিবে। আজ যদি বিহারের শাসনকর্তা কোনো ইংরেজ হইতেন, তাহা হইলে হয়তো দেশবাসী বিহার লইয়া এত বেশি আলোচনা করিত না। অথবা তিনি যে প্রদেশেরই লাট হইতেন, সেই প্রদেশের শাসন ইত্যাদি ব্যাপারে দেশের লোক বেশি করিয়া চোখ রাখিত। দেশীয় শাসনকর্তার নিকট দেশ-ভাই-এর একটু বেশি অধিকারের দাবি বাড়াবাড়ি বোধ হইলেও অন্তত অন্যায় নয়।

    এ তো গেল এদিককার কথা। অন্য পিঠ – অর্থাৎ তাঁহার অধীন ইংরেজ শাসনকর্তারা যত বেশি প্রভুভক্তি ও কর্মকুশলতাই দেখান না কেন, এদেশি ‘নেটিভ’ শাসনকর্তার অধীন হইয়া থাকিতে তাঁহাদের মর্মস্থলে বেশ একটু বাজে এবং হিংসাও হয়। ইউরোপীয় গবর্নর থাকিলে তাঁহারা (বিশেষ করিয়া বিহার প্রদেশ বলিয়া) অনায়াসে দেশি লোককে নেটিভ, নিগার ইত্যাদি বলিয়া এ-গোলমালে খুব একচোট গালি-গালাজ করিয়া গায়ের ঝাল আর রসনার চুলকানি মিটাইতেন। কিন্তু এখন আর ও রকম গালি-গালাজ দিতে পারিবেন না, কেননা তাহা হইলে প্রকারান্তরে লর্ড সিংহকেই গাল দেওয়া হইবে। অথচ তাঁহারা এটুকুও বুঝিয়াছেন যে, ইউরোপীয় শাসনকর্তার আমল অপেক্ষা তাঁহারা অধিকতর স্বাধীনভাবে এখন দেশকে শাসাইতে পারিবেন। কেননা, যতই হোক দেশীয় গবর্ণর তো! তিনি কিছুতেই ইহাদের এই নীতিকে একদম বদ্ধ করিয়া দিতে পারিবেন না। কেননা তখন এই ইউরোপীয় ‘ডিমিনিউটিভ’ শাসনকর্তারা দল বাঁধিয়া ইহার বিরুদ্ধে হই রই মার লাগাইয়া উপরওয়ালার কানে ঝালাপালা লাগাইয়া দিবে। এই সব এবং এই রকম আরও নানান গতিকে লর্ড সিংহ বাহাদুর চুপ করিয়া ভাবিতেছেন, ‘শ্যাম রাখি কী কুল রাখি!’ তিনি এখন প্রাণপণে দু-নৌকায় পা দিয়া আছেন বলিলেই হয়। কেননা, এখন তিনি হতাশ হইয়া বলিতেছেন, প্রকারান্তরে আমি গান্ধিজিকে সমর্থন করিতেছি। তাঁহার মতো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করাই আমার কাজ।

    কিন্তু অবস্থা ক্রমেই যেরকম বিগড়াইয়া যাইতেছে, তাহাতে তাঁহার আর এ ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’ ভাব চলিবে না।

    আমরা তাঁহাকে আক্রমণ করিতেছি না, বরং তাঁহার এ ত্রিশঙ্কুর মতো অবস্থা দেখিয়া সহানুভূতি প্রকাশ করিতেছি। দোষ তাঁহারও নয়, আমাদেরও নয়, এ দোষ বুরোক্রাসির বা স্বেচ্ছাতন্ত্রের।

    যতক্ষণ দেশের আদত শাসনকর্তা স্বেচ্ছাতান্ত্রিক, যতক্ষণ দেশ পরাধীন থাকে, ততক্ষণ দেশীয় ছোটোখাটো শাসনকর্তারা কিছুতেই লোককে সন্তুষ্ট করিতে পারেন না। আজ যদি লর্ড সিংহ ভারতের বড়োলাটও হন, তাহা হইলে তিনি দেশের জন্য তেমন কিছু করিতে পারিবেন না। তাঁহাকে অধিকাংশ সময়েই তাঁহার বিবেক-বিরুদ্ধ কার্য করিতে হইবে। দেশীয় লোক যত বড়ো পদই পান, তবু তিনি যে দেশীয় বা ‘নেটিভ’ একথা ইংরেজ কর্তারাও ভুলিবেন না, আর তিনি নিজেও ভুলিতে পারিবেন না। আজ যদি লর্ড সিংহ একটু দেশের লোকের দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন, তাহা হইলে সকলে বুঝিতে পারিবেন, ইংরেজ মন্ত্রীর দল কীরকম আপিস-তাপিস করিয়া উঠেন। তখন স্পষ্টই দেখিতে পাইবেন – ‘এক যাত্রায় পৃথক ফল!’ এ দোষ কাহারও নয় ভাই – দোষ আমাদের এই কালো চামড়ার!