Author: কাজী নজরুল ইসলাম

  • প্রভাতী

    প্রভাতী

    প্রভাতী

    ভোর হলো

    দোর খোলো

    খুকুমণি ওঠ রে!

    ওই ডাকে

    জুঁই-শাখে

    ফুল-খুকি ছোটরে!

    খুকুমণি ওঠ রে!

    রবি মামা

    দেয় হামা

    গায়ে রাঙা জামা ঐ,

    দারোয়ান

    গায় গান

    শোন ঐ, ‘রামা হৈ!’

    ত্যাজি নীড়

    করে ভিড়

    ওড়ে পাখি আকাশে,

    এন্‌তার

    গান তার

    ভাসে ভোর বাতাসে।

    চুল্‌বুল্‌

    বুল্‌বুল্‌

    শিস্ দেয় পুষ্পে,

    এইবার

    এইবার

    খুকুমণি উঠবে!

    খুলি হাল

    তুলি পাল

    ঐ তরী চললো,

    এইবার

    এইবার

    খুকু চোখ খুললো।

    আলসে

    নয় সে

    ওঠে রোজ সকালে

    রোজ তাই

    চাঁদা ভাই

    টিপ দেয় কপালে।

    উঠ্‌ল

    ছুট্‌ল

    ঐ খোকা খুকি সব,

    “উঠেছে

    আগে কে”

    ঐ শোনো কলরব।

    নাই রাত

    মুখ হাত

    ধোও, খুকু জাগো রে!

    জয়গানে

    ভগবানে

    তুষি বর মাগো রে।

  • লিচু চোর

    লিচু চোর

    লিচু চোর

    বাবুদের তাল-পুকুরে

    হাবুদের ডাল-কুকুরে

    সে কি বাস করলে তাড়া,

    বলি থাম একটু দাড়া।

    পুকুরের ঐ কাছে না

    লিচুর এক গাছ আছে না

    হোথা না আস্তে গিয়ে

    য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে

    গাছে গো যেই চড়েছি

    ছোট এক ডাল ধরেছি,

    ও বাবা মড়াত করে

    পড়েছি সরাত জোরে।

    পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,

    সে ছিল গাছের আড়েই।

    ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,

    ধুমাধুম গোটা দুচ্চার

    দিলে খুব কিল ও ঘুষি

    একদম জোরসে ঠুসি।

    আমিও বাগিয়ে থাপড়

    দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়

    লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,

    দেখি এক ভিটরে শেয়াল!

    আরে ধ্যাত শেয়াল কোথা?

    ভেলোটা দাঁড়িয়ে হোথা!

    দেখে যেই আঁতকে ওঠা

    কুকুরও জুড়লে ছোটা!

    আমি কই কম্ব কাবার

    কুকুরেই করবে সাবাড়!

    ‘বাবা গো মা গো’ বলে

    পাঁচিলের ফোঁকল গলে

    ঢুকি গ্যে বোসদের ঘরে,

    যেন প্রাণ আসল ধড়ে!

    যাব ফের? কান মলি ভাই,

    চুরিতে আর যদি যাই!

    তবে মোর নামই মিছা!

    কুকুরের চামড়া খিঁচা

    সে কি ভাই যায় রে ভুলা-

    মালির ঐ পিটুনিগুলা!

    কি বলিস ফের হপ্তা!

    তৌবা-নাক খপ্তা।

  • হোঁদলকুঁৎকুতের বিজ্ঞাপন

    হোঁদলকুঁৎকুতের বিজ্ঞাপন

    হোঁদলকুঁৎকুতের বিজ্ঞাপন

    মিচকে-মারা কয় না কথা মনটি বড়ো খুঁতখুঁতে।

    ‘ছিঁচকাঁদুনে’ ভ্যাবিয়ে ওঠেন একটু ছুঁতেই না ছুঁতে।

    ড্যাবরা ছেলে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে থেকে গাল ফুলান,

    সন্দেশ এবং মিষ্টি খেতে – বাসরে বাস – এক জাম্বুবান!

    নিম্নমুখো-যষ্টি ছেলে দশটি ছেলে লুকিয়ে খান,

    বদমায়েশির মাসি পিসি, আধখানা চোখ উঁচিয়ে চান!

    হাঁদারা হয় হদ্দ বোকার, সব কথাতেই হাঁ করে!

    ডেঁপো চতুর আধ-ইশারায় সব বুঝে নেয় ঝাঁ করে!

    ভোঁদা খোকার নামটি ভুঁদো বুদ্ধি বেজায় তার ভোঁতা।

    সব চেয়ে ভাই ইবলিশ হয় যে ছেলেদের ঘাড় কোঁতা।

    পুঁয়ে-লাগা সুঁটকো ছেলে মুখটা সদাই মুচকে রয়!

    পেটফুলো তার মস্ত পিলে, হাত-পাগুলোও কুঁচকে রয়!

    প্যাঁটরা ছেলের য়্যাব্বড়ো পেট, হাত নুলো আর পা সরু!

    চলেন যেন ব্যাংটি হো হো উ-র্ গজ-ঢাক গাল পুরু!

    গাবদা ছেলের মনটি সাদা একটুকুতেই হন খুশি,

    আদর করে মা তারে তাই নাম দিয়েছেন মনটুসি।

    ষাঁড়ের নাদ সে নাদুস নুদুস গোবর-গণেশ যে শ্রীমান,

    নাঁদার মতন য়্যাভ ভুঁড়ি তাঁর চলতে গিয়ে হুমড়ি খান!

    ছ্যাঁচড় ছেলে বেদড় ভারি ধুমসুনি খায় সব কথায়।

    উদমো ছেলে ছটফটে খুব একটুকুতেই উতপুতায়!

    ফটকে ছেলে ছটকে বেড়ায় আঁটি তারা বজ্জাতের,

    দুষ্টু এবং চুলবুলেরা সবখানে পায় লজ্জা ঢের।

    বোঁচা-নাকা খাঁদা যে হয় নাম রেখো তার চামচিকে,

    এসব ছেলে তেঁদড় ভারী ডরায় না দাঁত-খামচিকে!

    টুনিখুকির মুখটি ছোটো টুনটুনি তার মন সরল,

    ময়না-মানিক নাম যার ভাই মনটি তারও খুব তরল!

    গাল টেবো যাঁর নাম টেবি তাঁর একটুকুতেই যান রেগে।

    কান-খড়কে মায়ের লেঠা, রয় ঘুমুলেও কান জেগে।

    খুদে খুকির নামটি টেপু মা-দুলালি আবদেরে।

    ডর-পুকুনে আঁতকে ওঠে নাপতে দেখে আঁক করে!

    পুঁটুরানি বাপ-সোহাগি, নন্দদুলাল মানিক মা-র,

    দাদু বুড়োর ন্যাওটা যে ভাই মটরু ছাগল নামটি তার!

    ভুতো ছেলে ঠগ বড়ো হয়, ভয় করে না কাউকে সে,

    নাই পরোয়া যতই কেন কিল আর থাপড় দাও ঠেসে।

    দস্যি ছেলে ভয় করে না চোখ-রাঙানি ভূত-পেরেত,

    সতর-চোখি জুজুর খোঁজে বেড়িয়ে বেড়ায় রাত বিরেত!

    ডানপিটেরা ঝুলঝাপপুর গুলি-ডাণ্ডায় মদ্দ খুব!

    বাঁদরা-মুখোর ভ্যাংচিয়ে মুখ দাঁত খিঁচে বে-হদ্দ হুব!

    বীর বাদল সে – দেশের তরে প্রাণ দিতে ভাই যে শিখে,

    আনবে যে সাত-সাগর-পারের বন্দিনী দেশ-লক্ষ্মীকে!

    কেউ যদি ভাই হয় তোমজদের এমনিতরো মর্দ ফেরো,

    হো হো! তাকে পাঠিয়ে দেব বাচ্চা হোঁদল কুতকুতের!

  • ঠ্যাং-ফুলি

    ঠ্যাং-ফুলি

    ঠ্যাং-ফুলি

    হো-হো-হো উররো হো-হো!

    হো-হো-হো উররো হো-হো

    উররো হো-হো

    বাস কী মজা!

    কে শুয়ে চুপ সে ভুঁয়ে,

    নারছে হাতে পাশ কী সোজা!

    হো-বাবা! ঠ্যাং ফুলো যে!

    হাসে জোর ব্যাংগুলো সে

    ড্যাং তুলো তার

    ঠ্যাংটি দেখে!

    ন্যাং ন্যাং য়্যাগগোদা ঠ্যাং

    আঁতকে ওঠায় ডানপিটেকে!

    এক ঠ্যাং তালপাতা তার

    যেন বাঁট হালকা ছাতার!

    আর পাটা তার

    ভিটরে ডাগর!

    যেন বাপ! গোবদা গো-সাপ

    পেট-ফুলো হুস এক অজাগর!

    মোদোটার পিসশাশুড়ি

    গোদ-ঠ্যাং চিপসে বুড়ি

    বিশ্ব জুড়ি

    খিসসা যাহার!

    ঠে-ঠে ঠ্যাং নাক ডেঙা ডেং

    এই মেয়ে কি শিষ্যা তাহার?

    হাদে দেখ আসছে তেড়ে

    গোদা-ঠ্যাং ছাঁতসে নেড়ে,

    হাসছে বেড়ে

    বউদি দেখে!

    অ ফুলি! তুই যে শুলি

    দ্যাখ না গিয়ে চৌদিকে কে!

    বটু তুই জোর দে ভোঁ দৌড়,

    রাখালে! ভাঙবে গোঁ তোর

    নাদনা গুঁতোর

    ভিটিম ভাটিম!

    ধুমাধুম তাল ধুমাধুম

    পৃষ্ঠে,—মাথায় চাটিম চাটিম!

    ‘ইতু’ মুখ ভ্যাংচে বলে–

    গোদা ঠ্যাং ন্যাংচে চলে

    ব্যাং ছা যেন

    ইড়িং বিড়িং!

    রাগে ওর ঠ্যাং নড়ে জোর

    য়্যাদ্দেখেছিস—তিড়িং তিড়িং!

    মলিনা! অ খুকুনি!

    মা গো! কী ধুকপুকুনি

    হাড়-শুগুনি

    ভয়-তরাসে!

    দেখে ইস ভয়েই মরিস

    ন্যাংনুলোটার পাঁইতারাকে।

    গোদা-ঠ্যাং পুঁচকে মেয়ে

    আসে জোর উঁচকে ধেয়ে

    কুঁচকে কপাল,

    ইস কী রগড়!

    লেলিয়ে দে ঢেলিয়ে!

    ফোঁস করে ফের! বিষ কী জবর!

    ইন্দু! দৌড়ে যা না!

    হাসি, তুই বগ দেখা না!

    দগ্‌ধে না!

    তোল তাতিয়ে!

    রেণু! বাস, রেগেই ঠ্যাঙাস,

    বউদি আসুন বোলতা নিয়ে!

    আর না খাপচি খেলো!

    ওলো এ আচ্ছি যে লো,

    নাচছি তো খুব

    ঠ্যাং নিয়ে ওর!

    ব্যাচারির হ্যাঁস-ফ্যাসানির

    শেষ নেই, মুখ ভ্যাংচিয়ে জোর!

    ধ্যাত! পা পিছলে যে সে

    পড়ে তার বিষ লেগেছে

    ইস! পেকেছে

    বিষ-ফোঁড়া এক!

    সে ব্যথায় ঠ্যাং ফুলে তাই

    ঢাক হল পা-র পিঠ জোড়া দেখ!

    আচ্ছু! সত্যি সে শোন

    কারুর এক রত্তি সে বোন,

    দোষ নেই এতে

    দোষ নিয়ো না!

    আগে তোর ঠ্যাং ফুলে জোর,

    তারপরে না দস্যিপনা!

    আয় ভাই আর না আড়ি,

    ভাব কর কান্না ছাড়ি,

    ঘাড় না নাড়ি,

    কসনে ‘উহুঁ’!

    লক্ষ্মী! ধ্যাত, শোক কী?

    ছিঁচ-কাঁদুনে হসনে হুঁ হুঁ!

    উষাদের ঘর যাবিনে?

    লাগে তোর লজ্জা দিনে?

    বজ্জাতি নে

    রাখ তুলে লো!

    কেন? ঠ্যাং তেড়েং বেড়েং?

    হাসবে লোকে? বয়েই গেল!

  • পিলে-পটকা

    পিলে-পটকা

    পিলে-পটকা

    উটমুখো সে সুঁটকো হাশিম,

    পেট যেন ঠিক ভুঁটকো কাছিম!

    চুলগুলো সব বাবুই দড়ি –

    ঘুসকো জ্বরের কাবুয় পড়ি!

    তিন-কোনা ইয়া মস্ত মাথা,

    ফ্যাচকা-চোখো; হস্ত? হাঁ তা

    ঠিক গরিলা, লোবনে ঢ্যাঙা!

    নিটপিটে ঠ্যাং সজনে ঠ্যাঙা!

    গাইতি-দেঁতো, উঁচকে কপাল

    আঁতকে ওঠেন পুঁচকে গোপাল!

    নাক খাঁদা ঠিক চামচিকেটি!

    আর হাসি? দাঁত খামচি সেটি!

    পাঁচের মতন থুতনো ব্যাঁকা!

    রগঢিলে, হুঁ ভূতনো ন্যাকা!

    কান দুটো টান – ঠিক সে কুলো!

    তোবড়ানো গাল, টিকটা ছুলো!

    বগলা প্রমাণ ঘাড়টি সরু,

    চেঁচান যেন ষাঁড় কী গোরু!

    চলেন গিজাং উরর কোলা ব্যাং,

    তালপাতা তাঁর ক্ষুর-ওলা ঠ্যাং!

    বদরাগি তায় এক-খেয়ালি

    বাস রে! খেঁকি খ্যাঁক-শেয়ালি!

    ফ্যাঁচকা-মাতু, ছিঁচকাঁদুনে,

    কয় লোকে তাই মিচকা টুনে!

    জগন্নাথী ঠুঁটো নুলো,

    লোম গায়ে ঠিক খুঁটোগুলো!

    ল্যাবেন্ডিসি নড়বড়ে চাল,

    তুবড়ি মুখে চড়বড়ে গাল!

    গুজুর-ঘুণে, দেড়-পাঁজুরে,

    ল্যাডাগ্যাপচার, ন্যাড়-নেজুড়ে!

    বসেন সে হাড়-ভাঙা ‘দ’,

    চেহারা দেখেই সব মামা ‘থ’!

    গিরগিটে তার ক্যাঁকলেসে ঢং

    দেখলে কবে, ‘ধেত, এ যে সং!’

    খ্যাঙরা-কাটি আঙলাগুলো,

    কুঁদিলে শ্রীমুখ বাংলা চুলো!

    পেটফুলো ইয়া মস্ত পিলে,

    দৈবাতে তায় হস্ত দিলে

    জোর চটিতং, বিটকেলে চাঁই!

    ইঁট খাবে নাকো সিঁটকেলে ভাই!

    নাক বেয়ে তার ঝরচে সিয়ান,

    ময়রা যেমন করছে ভিয়ান!

    স্বপন দেখেন হালকা নিঁদে –

    কুইনাইন আর কালকাসিঁদে!

    বদন সদাই তোলো হাঁড়ি,

    গুড়ামুড়ি খান ষোলো আড়ি!

    ঠোকরে সবাই ন্যাড়া মাথায় –

    শিলাবিষ্টি ছেঁড়া ছাতায়!

    রাক্ষুসে ভাত গিলতে পারে

    বাপ রে, বিড়াল ডিঙতে নারে!

    হন না ভুলেও ঘরের বাহির,

    কাঁথার ভিতর জ্বরের জাহির!

    পড়বে কি আর, দূর ভূত ছাই,

    ওষুধ খেতেই ফুরসত নাই!

    বুঝলে? যত মোটকা মিলে

    বাগাও দেখি পটকা পিলে!

    বাজবে পেটে তাল ভটাভট

    নাক ধিনাধিন গাল ফটাফট!

    ঢাকডুবাডুব ইড়িং-বিড়িং

    নাচবে ফড়িং তিড়িং তিড়িং!

    চুপসো গালে গাব গুবাগুব

    গুপি-যন্তর বাজবে বাঃ খুব!

    দিব্যি বসে মারবে মাছি,

    কাশবে এবং হাঁচবে হাঁচি!

    কিলবিলিয়ে দুটো ঠ্যাং

    নড়বে যেমন ঠুঁটো ব্যাং!!

  • দুর্দিনের যাত্রী

    দুর্দিনের যাত্রী

    দুর্দিনের যাত্রী

    ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে শ্রাবণ মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দের ১১ই আগস্ট অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা বের হয়। নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’তে যে-সকল সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ লেখেন তারই কতকগুলি সংগ্র করে ৫৪ পৃষ্ঠার পুস্তিকা ‘দুর্দিনের যাত্রী’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক নজরুল ইসলাম (কবি স্বয়ং)। মুদ্রাকর শ্রী অমূল্যচন্দ্র ভট্টাচার্য, ভট্টাচার্য প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ৪নং বৃন্দাবন পাল বাই লেন, কলিকাতা। মূল্য ছয় আনা। পুস্তিকাখানিতে প্রকাশকালের উল্লেখ নেই। নানা তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নির্দেশ করেছেন, দুর্দিনের যাত্রী গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের অক্টোবরে। গ্রন্থটি বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

    দুর্দিনের যাত্রী গ্রন্থে প্রকাশিত সকল প্রবন্ধই ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ভাদ্র থেকে কার্তিকে প্রকাশিত ধূমকেতুর বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল’ ৮ই ভাদ্র; ‘তবুড়ী বাঁশীর ডাক’ ১২ই ভাদ্র’; ‘মোরা সবাই স্বাধীন : মোরা সবাই রাজা’ ১৬ই ভাদ্র এবং ‘স্বাগত’ ২৮ই ভাদ্র; ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’ ৫ই আশ্বিন; এবং ‘আমি সৈনিক’ ১৪ই কার্তিক তারিখে ধূমকেতুতে প্রকাশিত হয়েছিল।

  • আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল

    আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল

    আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল

    এস ভাই, পথের সাথী বন্ধুরা আমার, এস আমাদের লক্ষ্মীছাড়ার দল! আজ শনি এসেছে তোমাদের পোড়া-কপালে বাসি ছাই-এর পাণ্ডুর টিকা পরিয়ে দিতে। এস আমার লক্ষ্মীছাড়া গৃহহারা ভাইরা! আজ ঝর-ঝর বারিধারার সুরে সুরে কান্না উঠেছে–‘হায় গৃহহীন, হায় পথবাসী, হায় গতিহারা!’ এই ‘আকাশ-ভাঙা আকুল ধারার’ মাঝে নাঙ্গা শিরে আদুল গায়ে বেরিয়ে এস–বেরিয়ে এস আমার পথের সাথীরা। তোমাদের জন্য গৃহ নাই, তোমাদের জন্য দয়া নাই, করুণা নাই, এই দুর্দিনে তোমাদের ঘরে ডেকে নেবার কেউ নেই, তোমাদের ডাক দিয়েছে ঐ ঝড়-বাদলের উতল হাওয়া আর মাটির মায়ের সিক্ত কোল। তোমাদের জন্যে কোনো গৃহের বাতায়নে কালো চোখের করুণ কামনা ঝিলিক মারে না, তোমাদের অভাবে এ দুর্দিনে কারুর মন্দিরে শূন্যতার ধ্বনি বাজে না, তোমাদের অভাবে কারুর হৃদয় পীড়িত হয়ে ওঠে না। এস আমার অনাদৃত লাঞ্ছিত ভাইরা, আমরাই নতুন করে আমাদের জ্বালার জগৎ সৃষ্টি করব! শনি হবে আমাদের কপালে জয়টিকা, ‘ধূমকেতু’ হবে আমাদের রথ, মরুভূমি হবে আমাদের মাতৃক্রোড়, মৃত্যু হবে আমাদের বঁধু। এস–এস আমার লক্ষ্মীছাড়ার দল! ত্যক্ত শতমুখী আমাদের বিজয়কেতন, মড়ার মাথা আমাদের রক্তদেউল-দ্বারে মঙ্গল-ঘট, গরল আমাদের তৃষ্ণার জল, দাবানল-শিখা আমাদের মলয়বাতাস, নিদাঘ-আতপ আমাদের তৃপ্তি, জাহান্নাম আমাদের শান্তি-নিকেতন। এস আমার শনির শাপদৃপ্ত ভাইরা! আমরা জয়নাদ করব অমঙ্গল আর অভিশাপের। সদ্য পুত্রহীনা জননী আর স্বামীহারা সদ্য-বিধবার সৃষ্টি-কাঁপানো ক্রন্দন আমাদের মাধবী-উৎসবের গান, মৃত্যু-কাতর মুখের যন্ত্রণা আমাদের হাসি, আর ওই যে ঘরে ঘরে মায়ের মমতা, বোনের স্নেহ, প্রেয়সীর ভালোবাসা – ঐ আমাদের চোখের জল। ঐ যে গৃহীর শান্তি, তৃপ্তি, আনন্দ, ঐ আমাদের কান্না। ঐ তরুণ কালো চোখের দীপ্তি আমাদের শিকল, ঐ শূন্য হিয়ার ব্যথিত কামনা আমাদের কারাগার। ঐ শ্মশান-মশান-চারিণী চণ্ডী আমাদের বীণাবাদিনী। মহামারি, মারিভয়, ধ্বংস আমাদের উল্লাস। রক্ত আমাদের তিলক, রৌদ্র আমাদের করুণা। এরই মাঝে আমাদের নবসৃষ্টির অভিনব তপস্যা শুরু হবে। এস আমার রুদ্রতাপস তরুণের দল। সান্ধ্য-শ্মশান আর গোরস্থান আমাদের সান্ধ্য-সম্মিলনী, আলেয়া আমাদের সান্ধ্যপ্রদীপ, মড়া-কান্না আর পেচক-শিবাদি-রব আমাদের মঙ্গল হুলুধ্বনি। মরীচিকা আমাদের লক্ষ্য, আঘাত আমাদের আদর, মার আমাদের সোহাগ। সর্বনাশ আমাদের স্নেহ, বজ্র-মার আমাদের আলিঙ্গন। উল্কা আমাদের মালা-খসা ফুল, সাইক্লোন আমাদের প্রিয়ার এলোকেশ। সূর্যকুণ্ড আমাদের স্নানাগার, অনন্ত নরক আমাদের বিরাম-কুঞ্জ।

    এই অমঙ্গল অভিশাপ আর শনির জ্বালানো রুদ্র-চুল্লির মধ্যে বসে তোমাদের নবসৃষ্টির সাধনা করতে হবে। তোমাদের এই রুদ্র তপস্যার প্রভাবে সকল নরকাগ্নি ফুল হয়ে ফুটে উঠবে, যেমন ‘ইব্রাহিমের’ পরশে ‘নমরুদের’ জাহান্নম ফুল হয়ে হেসে উঠেছিল। এস আমার অভিনব তরুণ তপস্বীর দল! তোমাদের ধ্বংসের নামে আহ্বান করছি। এস।

  • তুবড়ি বাঁশির ডাক

    তুবড়ি বাঁশির ডাক

    তুবড়ি বাঁশির ডাক

    ঐ শোন–

    পুব সাগরের পার হতে কোন্ এল পরবাসী।

    শূন্যে বাজায় ঘন ঘন

    হাওয়ায় হাওয়ায় শনশন

    সাপ খেলাবার বাঁশি।

    বেরিয়ে এস, বেরিয়ে এস বিবর থেকে ‘অগ্নি-বরণ নাগ-নাগিনী’ তোমাদের নিযুত ফণা দুলিয়ে। ওই শোনো, সাপুড়ের তুবড়ি বাঁশির ডাক ‘ঘন ঘন হাওয়ায় হাওয়ায় শনশন শনশন’! এস আমার বিষধর কাল-কেউটের দল! তোমাদের বিবর ছেড়ে বেরিয়ে এস বেরিয়ে এস এই দিনের রৌদ্র সিন্ধু-কূলে। তটিনী-তীরের কেতকী কুসুমে কুসুমে জড়িয়ে আছে যারা, কেয়ামূলের গোপন তলে আত্মগোপন করে আছে যারা, সেই নাগ-নাগিনীদেরে মনসার পূজা-বেদী হতে আজ ডাক এসেছে। ঐ শোন তাঁর দূত বাজায়, ‘ঘন ঘন হাওয়ায় হাওয়ায় শন্‌শন্‌ শন্‌শন্‌।’ তোমাদের আদিমাতা অগ্নিনাগিনী আজ গগনতলে বেরিয়ে এসেছে তার পুচ্ছে কোটি কোটি নাগ-শিশু খেলা করছে, ঐ শোন তার ডাক ঘনঘন শন্‌শন্‌! ঐ শোন সাপুড়ের গভীর গুরুগুরু ডম্বরু-রব। তারই রবে বিপুল উল্লাসে পুচ্ছ সাপটি উঠেছে দিকে দিকে নাগপুরে নাগ-নাগিনী, অধীর আবেগে বাসুকির ফণা দুলে দুলে উঠছে–বিসুবিয়াসের বিপুল রন্ধ্র দিয়ে তার নাসার বিষ-ফুৎকার শুরু হয়েছে। বেরিয়ে এস–বেরিয়ে এস; বিবরের অন্ধকার হতে এই রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত দিবালোকে হে আমার বিষধর কাল-ফণীর দল। তোমাদের বিষ-দাঁতের ছোবলে ছোবলে ধরণি জর্জরিত হয়ে উঠুক, তোমাদের অত্যুগ্র নিশ্বাসে নিশ্বাসে আকাশ তাম্রবর্ণ হয়ে উঠুক, বাতাসে বাতাসে জ্বালাদগ্ধ অগ্নি-দাহন হু-হু-হু-হু করে ছুটে যাক, তোমাদের কর্কশ পুচ্ছে জড়িয়ে বসুমতীর টুঁটি টিপে ধর। তোমাদের বিষ-জরজর পুচ্ছকে চাবুক করে হান–হান– মার এই মরা নিখিলবাসীর বুকে মুখে। বিষের রক্ত-জ্বালায় তারা মোচড় খেয়ে খেয়ে একবার শেষ আর্তনাদ কর উঠুক। খসে খসে পড়ুক তাদের রক্ত-মাংস-অস্থি তোমাদের বিষ-তিক্ত চাবুকের আঘাতে আঘাতে। গর্জন করো, গর্জন করো আমার হলাহলশিখ ভুজঙ্গ শিশুর দল! বিপুল রোষে তোমরা একবার ফণা তুলে তোমাদের পুচ্ছের উপর ভর করে দাঁড়াও, বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠুক শুধু তোমাদের নিযুত কাল-ফণা। আকাশে-বাতাসে দুলুক শুধু তোমাদের নাগ-হিন্দোল। পাতালপুরের নিদ্রিত অগ্নিসিন্ধুতে ফুঁ দাও, ফুঁ দাও – ফুঁ দিয়ে জ্বালাও তাকে। আসুক নিখিল অগ্নিগিরির বিশ্ব-ধ্বংসী অগ্নিস্রাব, ভস্মস্তূপে পরিণত হোক এ-অরাজক বিশ্ব। ভগবান তার ভুল শোধরাক। এ খেয়ালের সৃষ্টিকে, অত্যাচারকে ধ্বংস করতে তোমাদের কোটি ফণা আস্ফালন করে ভগবানের সিংহাসন ঘিরে ফেলুক। জ্বালা দিয়ে জ্বালাও জ্বালাময় বিধি ও নিয়মকে।

    এস আমার অগ্নি-নাগ-নাগিনীর দল! তোমাদের পলক-হারা রক্ত-চাওয়ার জাদুতে হিংস্র পশুর রক্ত হিম করে ফেলো, তোমাদের বিপুল নিশ্বাসের ভীম আকর্ষণে টেনে আনো ঐ পশুগুলোকে আমাদের অগ্নি-অজগরের বিপুল মুখগহ্বরে। আকাশে ছড়াও হলাহল-জ্বালা, নীল আকাশ পাংশু হয়ে উঠুক! রবি-শশী-তারা গ্রহ-উপগ্রহ সব বিষ-দাহনে নিবিড় কালো হয়ে উঠুক, বাতাস খুন-খারাবির রঙে রেঙে উঠুক। বিদ্যুতে –বিদ্যুতে তোমাদের অগ্নি-জিহ্বা লকলক করে নেচে উঠুক, বৈশাখী-ঝড়ের দোলায় দোলায় গর্জনে গর্জনে তোমাদের শ্বাস-হুংকার ফুঁসে ফুঁসে উঠুক। ঢালো তোমাদের সঞ্চিত বিষ ঐ মহাসিন্ধু নদনদীর বারি-রাশির মাঝে – টগবগ করে ফুটে উঠুক এই বিপুল জলরাশি – আর তার বুকে তোমাদের বিষ-বিন্দু বুদ্‌বুদ্ হয়ে ভেসে বেড়াক।

    আজ ‘ভাসান’-উৎসবের দিন। মনসার পূজা-বেদিতে তোমাদের সঞ্চিত বিষ উদ‍্গীরণের আহ্বান এসেছে। এস – এই ধূমকেতু-পুচ্ছের অযুত অগ্নি-নাগ-নাগিনীর মাঝে কে কোথায় আছ কোন্ বিবরের অন্ধকারে লুকিয়ে, হে আমার পরম প্রিয় বিষধর কালফণীর দল! এই অগ্নিনাগ-বাসে তোমাদেরও বিষ-চক্র-লাঞ্ছিত ফণা এসে মিলিত হোক, তোমাদের বিষ-নিশ্বাস-প্রশ্বাসে ধূমকেতুর-ধূম আরও – আরও ধূমায়িত হয়ে উঠুক।

    ঐ শোন–শোন

    ঘন ঘন শন শন

    সাপ খেলাবার বাঁশি।

  • মোরা সবাই স্বাধীন : মোরা সবাই রাজা

    মোরা সবাই স্বাধীন : মোরা সবাই রাজা

    মোরা সবাই স্বাধীন : মোরা সবাই রাজা

    একবার শির উঁচু করে বলো দেখি বীর, ‘মোরা সবাই স্বাধীন, সবাই রাজা!’ দেখবে অমনি তোমার পূর্ব-পুরুষের রক্ত-মজ্জা-অস্থি দিয়ে গড়া রক্ত-দেউল তাসের ঘরের মতো টুটে পড়েছে, তোমার চোখের সাত-পুরু-করে বাঁধা পর্দা খুলে গেছে, তিমির রাত্রি দিক-চক্রবালের আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছে। তোমার হাতে-পায়ে গর্দানে বাঁধা শিকলে প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে বলো দেখি বীর–‘মোরা সবাই স্বাধীন, সবাই রাজা!’ দেখবে অমনি তোমার সকল শিকল সকল বাঁধন টুটে খান খান হয়ে গেছে।

    স্বরাজ মানে কী? স্বরাজ মানে, নিজেই রাজা বা সবাই রাজা; আমি কারুর অধীন নই, আমরা কারুর সিংহাসন বা পতাকাতলে আসীন নই। এই বাণী যদি বুক ফুলিয়ে কোনো ভয়কে পরোয়া না করে মুক্তকণ্ঠে বলতে পার, তবেই তোমরা স্বরাজ লাভ করবে, স্বাধীন হবে, নিজেকে নিজের রাজা করতে পারবে; নইলে নয়।

    কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘আমার রাজা আমি’–বাণী বলবার সাহস আছে কোন্ বিদ্রোহীর? তার সোজা উত্তর–যে বীর কারুর অধীন নয়, বাইরে-ভিতরে যে কারুর দাস নয়, সম্পূর্ণ উদার, মুক্ত! যার এমন কোনো গুরু বা বিধাতা নেই যাকে ভয় বা ভক্তি করে সে নিজের সত্যকে ফাঁকি দেয়, শুধু সে-ই সত্য স্বাধীন, মুক্ত স্বাধীন। এই অহম্-জ্ঞান আত্মজ্ঞান–অহংকার নয়, এ হচ্ছে আপনার ওপর অটল বিরাট বিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে, নিজের শক্তির ওপর আস্থা না থাকলে, মানুষ কাপুরুষ হয়ে যায়, ক্লীবত্ব প্রাপ্ত হয়। পরকে ভক্তি করে বিশ্বাস করে শিক্ষা হয় পরাবলম্বন, আর পরাবলম্বন মানেই দাসত্ব। এই মনের পরাবলম্বন বা গোলামিই আমাদের চির-গোলাম করে রেখেছে। আমাদের তেত্রিশ কোটি লোকের তেত্রিশ কোটি দেবতা, অর্থাৎ আমাদের ভারতে তেত্রিশ কোটি মানুষের সকলেরই নির্ভরতা তাদের স্ব-স্ব দেবতার ওপর! সবাই বলেন, দেবতা আছেন–আর তাঁরা নেই। অর্থাৎ কিনা, এটা নাস্তিকের দেশ, স্ব-হীন দেশ। অতএব এ স্ব-হীন দেশ যদি বলে যে, স্বরাজ লাভ করব, তাহলে যে তাদেরে উপহাস করে আর ওই নাস্তিকের বুকে লাথি মারে, অন্যায় করে বলে তো মনে হয় না–উলটো উপকারই করে। যার অন্তরে আপন সত্য আপন ভগবান সহজে জাগে না, তাদের ভগবান এমনি করে বুকে লাথি খেয়ে তবে জাগে। যারা আমাদেরে পায়ের তলায় রেখে আমাদের বুকে পদাঘাত করছে, মুখে থুথু দিচ্ছে, তারা আমার নমস্য। সে-অসুরের পায়ের ধুলো আমি মাথায় নিই, যে-অসুর ভীরু দেবতাকে পদাঘাত করে পৌরুষ শেখায়, তার লুপ্ত দেবত্বকে সিংহ-বিক্রমে জাগিয়ে তোলে। যে জাগ্রত ওসমান সুপ্ত জগৎসিংহকে ভীম-পদাঘাতে যুদ্ধে উদ্‌বুদ্ধ করে, তাকে আমি নমস্কার করি। যে ভৃগু নিদ্রিত ভগবানের বুকে লাথি মেরে জাগায়, সে ভৃগুকে আমি প্রণাম করি। যে নরমুণ্ড-মালিনী চন্ডী নিদ্রিত শিবের বুকে তাণ্ডব নৃত্য করে প্রলয়-করতালি বাজিয়ে তাঁকে জাগিয়ে তোলে. সেই অশিব-নাশিনীর উদ্দেশে আমার কোটি কোটি নমস্কার। শিবকে জাগাও, কল্যাণকে জাগাও। আপনাকে চেনো। বিদ্রোহের মতো বিদ্রোহ যদি করতে পার, প্রলয় যদি আনতে পার, তবে নিদ্রিত শিব জাগবেই, কল্যাণ আসবেই। লাথির মতো যদি লাথি মারতে পার, তা হলে ভগবানও তা বুকে করে রাখে। ভৃগুর মতো বিদ্রোহী হও, ভগবানও তোমার পায়ের ধুলো নেবে। কাউকে মেনো না, কোনো ভয়ে ভীত হয়ো না বিদ্রোহী। ছুটাও অশ্ব, চালাও রথ, হানো অগ্নিবান, বাজাও দামামা-দুন্দুভি! বলো, যে যায় যাক সে, আমি আছি। বলো আমিই নূতন করে জগৎ সৃষ্টি করব। স্রষ্টার আসন থরথর করে কেঁপে উঠুক!‌ বলো, কারুর অধীনতা মানি না, স্বদেশিরও না, বিদেশিরও না। যে অপমান করে তার চেয়ে কাপুরুষ হীন সে-ই, যে অপমান সয়। তোমার আত্মশক্তি যদি উদ্‌বুদ্ধ হয়ে ওঠে তবে বিশ্বে এত বড়ো দানব-শক্তি নেই, যা তোমাকে পায়ের তলায় ফেলে রাখে। নির্যাতন যদি সয়ে থাক, তবে সে দোষ তোমারই। নিজের দুর্বলতার জন্য অন্যের শক্তির নিন্দা কোরো না।

    জাগো অচেতন, জাগো! আত্মাকে চেনো! যে মিথ্যুক তোমার পথে এসে দাঁড়ায়, পিষে দিয়ে যাও তাকে, দেখবে তোমারই পতাকা-তলে বিশ্ব শির লোটাচ্ছে। তোমারই আদর্শে জগৎ অধীনতার বাঁধন কেটে মুক্ত উদার আকাশতলে এক পঙ্‌ক্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে।

  • স্বাগত

    স্বাগত

    স্বাগত

    ‘খোশ-আমদেদ!’ স্বাগত হে দেশবন্ধু! হে বীরেন্দ্র! তোমাদের এই তিমির রাত্রির অবসানে আমরা আমাদের স্বাগত সম্ভাষণ জানাচ্ছি। তোমরা ফিরে এস এই বাংলার শ্মশানে।

    জ্বালিয়ে রেখেছি এই শ্মশান-চিতার হোম-শিখা ; এস ঋষি, হোতা হও। এস তবে, কপালে শ্মশান-ভস্মের পাংশু টিকা পরিয়ে দিই। দেখেছ, কী ভীষণ ধূমকূণ্ডলী উঠেছে বাংলার আকাশ বাতাস ছেয়ে। বলো ঋষি, “বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান!” এস ঋত্বিক, উচ্চারণ করো শব-সাধনার মন্ত্র। এই শবের মাঝে শিব জাগাতে হবে। পারবে?—তবে এস। এই নাও মড়া, এই ধরো নর-কঙ্কাল—স্তূপে স্তূপে সাজানো। আর কী চাও ঋষি? ঐ দেখো শৃগাল, ঐ দেখো কুক্কুর—ঐ দেখো শকুন—মড়ার পচা মাংস নিয়ে টানাটানি খাওয়া-খাওয়ি করছিল। জ্যান্ত মানুষের সাড়া পেয়ে পালিয়ে গেল। ঐ দেখো. শ্মশানে নাচছে ভূত-প্রেত-ডাকিনী-যোগিনী,—এই ভূতে-ভরা শ্মশানে এসে তোমাদেরও যেন ভূতে না পায়—সাবধান ঋষি! তোমরা ছিলে অন্ধকারের শান্তিতে, স্নিগ্ধ কালো অন্ধকার তোমাদের মায়ের মতো কোলে করে রেখেছিল। এখন এলে শ্মশানের বিকট অট্টহাসি, করুণ আর্তনাদ আর প্রলয়-নৃত্যের ভীম কোলাহলের মাঝে।

    ভয় পাচ্ছ কি ঋষি? সাবধান! এ কাল-শ্মশানে এসে সবাই ভয় পায়, ভূত-যোনিগ্রস্ত হয়। তাই আবার বলি, সাবধান! এখানে বড়ো ক্রন্দন, বড়ো জ্বালা। সইতে পারবে? এখানে মায়ের কোল নেই, পিতার মঙ্গলহস্ত নেই ভগিনীর স্নেহ নেই, এখানে কল্যাণীর মঙ্গলদীপ জ্বলে না। কেউ পথ দেখাতে নেই। অভাব, বেদনা, আঘাত, মার, বিদ্রুপের চাবুক-জ্বালা, অনাদর, অপমান, এই সপ্ত নরক হাঁ করে আছে গ্রাস করবার জন্যে। এই জাহান্নমের মধ্যে বসে পুষ্পের হাসি হাসতে পারবে?—তবে এস ঋষি, এস! বন্ধনভয়-রাজভয়-বিজেতা বীর তোমরা, এই শ্মশানে শবের মাঝে এসে বসো। শিব আর অন্নপূর্ণাকে এই মড়ার মুল্লুকে যদি কোনোদিন আনতে পার, তবে সেইদিন তোমাদের নমস্কার করব। আজ তোমাদের জন্যে আমাদের নমস্কার নেই।

    এই শ্মশানে আছে শুধু পিশাচের খলখল অট্টহাস, আর অসহায়ের করুণ নাড়িছেঁড়া মর্মভেদী ক্রন্দন! তা নিতে চাও?—তবে নাও। কিন্তু তা সইবে না ঋষি। আবার বলি, আজ তোমাদের জন্যে গৃহের মঙ্গল-শঙ্খ নয়,–তোমাদের জন্যে স্রকচন্দন নয়, তোমাদের জন্যে আলোর দেয়ালি উৎসব নয়, কল্যাণহস্তের মঙ্গল দীপশিখা তোমাদের জন্য নয়,—তোমাদের জন্যে এই শ্মশানের ধূম আর ভস্ম অট্টহাস্য আর ক্রন্দন রক্ত আর অশ্রু-মৃত্যু আর ভীতি! এরই মাঝে হে চিত্তরঞ্জন, হে বীরেন্দ্র! তোমাদের জন্য ধূলার আসন পাতা। তোমরা এস। স্বাগত!1

  • মেয়্ ভুখা হুঁ

    মেয়্ ভুখা হুঁ

    মেয়্ ভুখা হুঁ

    পাগলি মেয়ের কী খেয়াল উঠল, হঠাৎ দুপুর রাতে ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    মঙ্গল-ঘট গেল ভেঙ্গে, পুরনারীর হাতে শাঁখ আর বাজে না, শাঁখাও গেল টুটে। ভীত শিশু মাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলে,

    ‘মা, ও কে কাঁদে?’

    মা বললে, ‘চুপ কর, ও পাগলি, ও ভুলুনি, ছেলে ধরতে এসেছে।’

    পাশে ছিল দস্যি ছেলে ঘুমিয়ে। সে লাফিয়ে উঠে বললে, ‘মা আমি দেখব পাগলিকে!’

    মা ঠাস করে ছেলের গালে এক চড় কষিয়ে বললে, ‘দস্যি ছেলে! কথার ছিরি দেখ, ওই ডাইনি মাগিকে দেখবেন! শুয়ে থাক গিয়ে চুপটি করে। ষাট! ষাট!’

    কিন্তু ছেলে আর ঘুমায় না। তার কাঁচা রক্তের পুলক-নাচা চঞ্চলতায় এক অভিনব সুর বাজতে লাগল।

    ‘মেয়্ ভুখা হুঁ।’

    সে সুর – সে ক্রন্দন কাছে – আরও – আরও কাছে এসে যেন তারই দোরের পাশ দিয়ে কেঁদে গেল অনেক দূরের পুবের পানে। সে ক্রন্দন যত দূরে যায়, দস্যি ছেলের রক্ত ততই ছায়ানটের নৃত্য-হিন্দোলায় দুলতে থাকে, ভূমিকম্পের সময় সাগরদোলানির মতো। ছেলে দোর খুলে সেই ভুখারিনির কাঁদন লক্ষ করে ঝড়ের বেগে ছুটল। মা বার কতক ডেকে দোরে লুটিয়ে পড়ল। সে অসম্ভবকে দেখবে, সে ভয়কে জয় করবে।

    এলোকেশে জীর্ণা শীর্ণা ক্ষুধাতুর মেয়ে কেঁদে চলেছে, ‘মেয়্ ভুখা হুঁ।’ তার এক চোখে অশ্রু আর চোখে অগ্নি। দ্বারে দ্বারে ভুখারিনি কর হানে আর বলে, ‘মেয়্ ভুখা হুঁ! মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    বুড়োর দল নাক সিঁটকিয়ে ভাল করে তাকিয়াটা আঁকড়ে ধরে, তরুণ যারা তারা চমকে বাইরে বেরিয়ে আসে, আর মা-রা ভয়ে বুকের মানিককে বুকে চেপে ধরে।

    স্ত্রী ঘুমের মাঝে স্বামীর ভুজ-বন্ধন ছাড়িয়ে হঠাৎ বাতায়ন খুলে ভেজা-গলায় শুধোয়, কে এমন করে কেঁদে যায়? এমন ঝড়-বাদলের নিশীথে স্বামী স্ত্রীকে আরও জোরে বুকে চেপে ধরে ভীত জড়িত কণ্ঠে বলে, ‘আহা, যেতে দাও না –’

    ভুখারিনির পেছনে দস্যি ছেলের দলটা বেশ দল-পুরু হয়ে উঠল। তারা সেই ঝঞ্ঝারাতের উদাসিনীকে ঘিরে উদ্দাম চঞ্চল আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,

    ‘তুমি কি চাও ভুখারিনি, – অন্ন?’

    উদাসিনী ছলছল চোখে আর এক দোরে কর হেনে কেঁদে ওঠে, ‘মেয়্ ভুখা হুঁ।’

    ‘অন্ন চাও না? তবে কী চাও, – বস্ত্র?’

    এবার কণ্ঠস্বরে আরও কান্না আরও তিক্ততা ফুটে ওঠে, – ‘মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    উদাসিনী রাজপুরীর প্রান্তে এসে পড়ল।

    অধীর ক্ষিপ্ত কণ্ঠে দস্যি ছেলের দল চিৎকার করে উঠল, “বল বেটি, কী চাস, নইলে তোর একদিন কী আমাদের একদিন, – কী চাস তুই? আশ্রয়?”

    ভুখারিনি কিন্তু কথাও কয় না, ফিরেও তাকায় না। একটা একটানা বেদনা-ক্রন্দন-ধ্বনি তার আর্তকণ্ঠে বারবার গুমরে ওঠে –‘মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    দস্যি ছেলেগুলো এবার সত্যি সত্যিই খেপে উঠল। তাদের কৃপাণ একবার কোষমুক্ত হয়ে আবার কোষবদ্ধ হল। এ যে নারী – মা।

    কিন্তু রক্ত তাদের তখন অগ্নিগিরি-গর্ভের বহ্নি-সিন্ধুর মতো গর্জন করে উঠেছে, তাদের নিশ্বাসে নিশ্বাসে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। আর পারে না, সব বুঝি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবার।

    উদাসিনী এক গভীর অরণ্যের প্রান্তে এসে ছিন্ন-কণ্ঠ কপোতিনীর মতো আর্তস্বরে কেঁদে উঠল, – ‘মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    ঝঞ্ঝা যেন মুখে চাবুক খেয়ে হঠাৎ থেমে গেল। বনের দোলা, নদীর ঢেউ, বৃষ্টির মাতামাতি সমস্ত তার বেদনায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল। দিগন্ত-কোল থেকে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ রক্ত-আঁখি মেলে বেরিয়ে এল। বনের শ্বাপদকুল উদাসিনীর পায়ের তলায় মাথা গুঁজে শুয়ে পড়ল। নিস্তব্ধ – নিঝঝুম।

    সে কী অকরুণ নিস্তব্ধতা। কানের কাছে কোন্ না-শোনা সুরের অগ্নিঝংকার যেন অবিরাম করাত চলার মতো শব্দ করতে লাগল – ঝিম ঝিম ঝিম-ম্।

    সেই সুর উচ্চ হতে উচ্চতর হয়ে শেষে খাদের দিকে নামতে লাগল।

    এইবার যেন, ‘বাজে রে বাজে ডমরু বাজে – হৃদয় মাঝে, ডমরু বাজে।’

    এই কি বিশ্ব ঘোরার প্রণব নিনাদ? এক সাথে তিনটা উল্কা আকাশ ফুঁড়ে ধরণির বুকে এসে পড়ল। যে যেন খ্যাপা ভোলানাথের ছেঁড়া ত্রি-শূল, অথবা তাঁরই ত্রি-নয়ন হতে ঝরে পড়া তিন ফোঁটা অগ্নি-অশ্রু।

    দুষ্ট মেয়ে গঙ্গা কলকল কলকল করে হেসে উঠে সব নিস্তব্ধতা ভেঙে দিলে। দিগচক্র-রেখায়-রেখায় বনানীপুঞ্জ দুলে দুলে উঠল, সে যেন উলসিত শিবের জটাচাঞ্চল্য।

    পাগলি আবার কেঁদে উঠল, ‘মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    দস্যি ছেলের দল এবার সত্যি সত্যিই অধৈর্য হয়ে উঠল। উদাসিনীর কেশাকর্ষণ করে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘বল বেটি কী চাস?’

    হরিত-বনের বুক চিরে বেরিয়ে এল রক্ত-কাপালিক। ভালে তার গাঢ় রক্তে আঁকা ‘অলক্ষণের তিলক-রেখা।’ বুকে তার পচা শবের গলিত দেহ। আকাশে খড়্গ উৎক্ষিপ্ত করে কাপালিক হেঁকে উঠল, – ‘বেটি রক্ত চায়!’

    কে যেন একটা থাবা মেরে সূর্যটাকে নিবিয়ে দিলে।

    দস্যি ছেলেরা হঠাৎ তাকিয়ে দেখে কোথাও কিছু নেই। শুধু অনন্ত প্রসারিত শ্মশান, তার মাঝে পাগলি বেটি ছিন্নমস্তা হয়ে আপনার রুধির আপনি পান করছে আর চ্যাঁচাচ্ছে, ‘মেয়্ ভুখা হুঁ – ‘মেয়্ ভুখা হুঁ!’

    তরুণের দল ভীম হুঙ্কার করে উঠল, ‘বেটি রক্ত চায়! বেটি রক্ত চায়!’

    মহা উৎসব পড়ে গেল ছেলেদের মধ্যে – তারা যজ্ঞ করবে। এবার মায়ের পূজার বলি হল মায়ের ছেলেরাই।

    শ্মশান আজ নিস্তব্ধ, জগৎ-সৃষ্টির পূর্ব মুহূর্তে বিশ্ব যেমন নিস্পন্দ হয়ে গেল, তেমনি স্তব্ধাহত।

    ****

    রক্ত-যজ্ঞের পরের দিন কৈলাসে জগদ্ধাত্রী অন্নপূর্ণা দশ হাতে করুণা, স্নেহ আর হাসি বিলাচ্ছে দেখলাম। বললুম, বেটি জগদ্ধাত্রীও বটে। কাল তার ছেলেরা বলি হয়ে বেটির ক্ষুধা মেটালে, আর আজ সে দিব্যি অন্নপূর্ণা সেজে আনন্দ বিলোচ্ছে।

    একরাশ ফোটা শিউলি পুবের হাওয়ায় উড়ে এসে আমায় চুম্বন করে গেল। কেমন করুণ শান্তিতে মন যেন আমার কানায় কানায় ভরে উঠল।

    ও হরি! দেখি কী, অন্নপূর্ণা বেটির ঘরের একপাশে তার ছিন্নমস্তা ভৈরবী মূর্তির মুখোশটা পড়ে রয়েছে। ভোলানাথ তো হেসেই অস্থির।

    আরও দেখলুম কালকার রক্ত-যজ্ঞের আহুতি ওই দস্যি ছেলের সব কটাই জলজ্যান্ত বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে। যে-দশটা ছেলে নীলকণ্ঠ শিবের কাছে, তাদের কন্ঠ সব নীল। সে নীল দাগ তাদের টুঁটি টিপে মারার – ফাঁসির দাগ। আর যে-দলটা অন্নপূর্ণার ভাঁড়ার ঘরের পাশে জটলা করছে, তাদের কণ্ঠে লাল দাগ। ঘাতকের হানা খড়্গ-রক্ত প্রেয়সীর শরম-রঞ্জিত চুম্বনের মতো তাদের কণ্ঠ আলিঙ্গন করে রয়েছে।

  • পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?

    পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?

    পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?

    ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’

    বনানী-কুন্তলা ষোড়শী বনের বুক চিরে বেরিয়ে এসে পথ-হারা পথিককে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’

    সেদিন দিশেহারা পথিকের মুখে উত্তর জোগায়নি। সুন্দরের আঘাতে পথিকের মুখে কথা ফোটেনি।

    পথিক সেদিন সত্যই পথ হারিয়েছিল।

    হে আমার গহন-বনের তরুণ-পথিক দল! আজ সেই বনানী-কুন্তলা ভৈরবী-সূতা আবার বনের বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে – চোখে তার অসংকোচ দৃষ্টির খড়্গ-ধার, ভালে তার কাপালিকের আঁকা রক্ত-তিলক, হাতে তার অভয় তরবারি – সে আবার জিজ্ঞাসা করছে – ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’

    উত্তর দাও, হে আমার তরুণ পথ-যাত্রী-দল! ওরে আমার রক্ত-যজ্ঞের পূজারি ভায়েরা! বল, তোরাও কি আজ সৌন্দর্যাহত রূপ-বিমূঢ় পথহারা পথিকের মতো মৌন নির্বাক চোখে ওই ভৈরবী রূপসির পানে চেয়ে থাকবি? উত্তর দে মায়ের পূজার বলির নির্ভীক শিশু!

    বল, ‘মাভৈঃ! আমরা পথ হারাই না! আমাদের পথ কখনও হারায় না। বল, আমাদের এ-পথ চির-চেনা পথ – এই বনের বুকে রক্ত-আঁকা পথ।’

    বল, ওরে রক্ত-পথের পথিক! ‘এই বনের পথই আমাদের চির চেনা পথ। হাটের পথিকের পায়ে-চলার পথ আমাদের জন্য নয়। সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত কণ্টক-কুণ্ঠিত বিপথে আমাদের চলা। ওগো ভৈরবী মেয়ে! এ রক্ত-পথিকের দল, নবকুমারের দল নয়।’

    ভৈরবী রূপসি আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’

    এবার বল আমার বন্য তরুণ দল, ‘ওগো, আমরা পথ হারাইয়াছি, ঘরের পথ হারাইয়াছি, বনের পথ হারাই নাই।’

    অকুণ্ঠিতা অনবগুণ্ঠিতা বন-বালার চোখে কুণ্ঠার ছায়াপাত হোক, পরাজয়ের লাজ-অবগুণ্ঠন পড়ুক!

    নিবিড় অরণ্য। তারই বুকে দোলে, দোলে, মহিরুহ সব দোলে – বনস্পতি-দল দোলে – লতা-পাতা সব দোলে! দোলে তারা সবুজ খুনের তেজের বেগে। তারই মাঝে চলে – চলে আমার বন্য-হিংস্র বীরের দল। তাদেরে পথ দেখায় কাপালিকের রক্ত-তিলক পরা ভৈরবী মেয়ে।

    অদূরে কাপালিকের রক্ত-পূজার মন্দির। মন্দিরে রক্ত-ভুখারিনির তৃষ্ণাবিহ্বল জিহ্বা দিয়ে টপটপ করে পড়ছে কাঁচা খুনের ধারা। দূরে হাজার কণ্ঠের ভৈরব-গান শোনা গেল –

    তিমির হৃদয়-বিদারণ জলদগ্নি নিদারুণ।

    জয় সঙ্কট সংহর। শঙ্কর। শঙ্কর।

    রক্ত-পাগলি বেটির পায়ের চাপে শিব আর্তনাদ করে উঠল। রক্ত-মশাল করে ভৈরবপন্থীর কণ্ঠ শোনা গেল আরও কাছে –

    বজ্র-ঘোষবাণী, রুদ্র শূলপাণি,

    মৃত্যু-সিন্ধু-সন্তর। শঙ্কর! শঙ্কর!!

    আবার শিব মোচড় খেয়ে উঠল, কিন্তু শব তার বুকে চেপে।

    মন্দির থরথর করে কাঁপতে লাগল। উলসিত বনানী ঝড়ের ফুঁ দিয়ে নাচতে লাগল।

    কাপালিকের রক্ত-আঁখি দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। আর দেরি নাই, ওই আসে রক্ত-পূজার বলি। ছেড়ে দে বেটি, ছেড়ে দে শিবকে, কল্যাণকে উঠে দাঁড়াতে দে।

    ইন্দ্রের বজ্রে ঘন ঘন শঙ্খধ্বনি হতে লাগল।

    মেঘ-ডম্বরুতে বোধনের বাজনা বাজতে লাগল।

    বিজলি মেঘের বজ্র-কড়া-নাড়ার মতো বাইরে দস্যি মেয়ে কড়কড় করে কড়া নেড়ে হেঁকে উঠল, ‘দোর খোলো, পূজা এসেছে।”

    বাইরে ঝড়ের দোলার তালে তালে ভৈরবপন্থীর দল নাচতে লাগল –

    কী আনন্দ কী আনন্দ কী আনন্দ,

    দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ,

    নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে,

    তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ।

    ঝনঝন শব্দে মন্দির দ্বার খুলে গেল। কাপালিক বেরিয়ে এল, নয়নে তার দারুণ হিংসা-বহ্নি, স্কন্ধে তার বিজয়-কৃপাণ। মন্দিরের অঙ্গনে নৃত্য চলতে লাগল –

    ‘তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ’। ভৈরবী হাঁকালে, ‘আর দেরি কী?’

    ****

    বনানী তেমনই দোলে – দোলে – দোলে। একটা কাতরানি, একটা ব্যথিতার ক্রন্দনের মতো কী যেন দোলে – দোলে বনানীর পাগলামিতে।

    কখন পূজা শেষ হয়ে গেছে। কখন ঘন্টা বাজল, কখন বলি দেওয়া হল, তা কেউ জানলে না। শুধু মন্দিরের শুভ্র বেদি রক্তে ভেসে গেছে। শব-পাগলি বেটির চরণ শিবের বুক থেকে শিথিল হয়ে যেন নামতে চাইছে। বেটির পায়ে একরাশ কাঁচা হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করছে, যেন সদ্য-ছিন্ন রক্ত-জবার জীবন্ত কাতরানি।

    একরাশ ছিন্ন-মুণ্ড খেপী বেটির পানে ছলছল চোখে তখনও তাকাচ্ছে।

    আকাশ থেকে অগ্নিরথ নেমে এল। বলিদানের তরুণরা তাতে চড়ে যখন ঊর্ধ্বে – ঊর্ধ্বে – আরও ঊর্ধ্বে উঠে যেতে লাগল, তখন বন্য মেয়ে কাপালিক-কন্যারও দুই গণ্ড বেয়ে টসটস করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে করুণ-কণ্ঠে আর একবার জিজ্ঞাসা করল, – ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’ তারপর শঙ্করী বেটির রক্ত-মাখা পায়ে লুটিয়ে পড়ল। কাপালিকের খড়্গ আর একবার নৃত্য করে উঠল। ভৈরবী শুধু বললে, ‘মা!’

    এবার করালী বেটির অশ্রুহীন চোখেও অশ্রুপুঞ্জ দুলে উঠল।

    ততক্ষণে অগ্নিরথ-যাত্রীদলের উত্তর ভেসে এল, ‘পথ হারাই নাই দেবী! ওই খড়্গ-চিহ্নিত রক্ত-পথই শিব জাগাবার পথ।’

  • আমি সৈনিক

    আমি সৈনিক

    আমি সৈনিক

    এখন দেশে সেই সেবকের দরকার যে-সেবক সৈনিক হতে পারবে।

    সেবার ভার নেবে নারী কিংবা সেই পুরুষ, যে-পুরুষের মধ্যে নারীর-করুণা প্রবল। নারীর ভালোবাসা আর পুরুষের ভালোবাসা বিভিন্ন রকমের। নারীর ভালোবাসায় মমতা আর চোখের জলের করুণাই বেশি। পুরুষের ভালোবাসায় আঘাত আর বিদ্রোহই প্রধান।

    দেশকে যে নারীর করুণা নিয়ে সেবা করে, সে পুরুষ নয়, হয়তো মহাপুরুষ। কিন্তু দেশ এখন চায়, মহাপুরুষ নয়। দেশ চায়, সেই পুরুষ যার ভালোবাসায় আঘাত আছে, বিদ্রোহ আছে। যে দেশকে ভালোবেসে শুধু চোখের জলই ফেলবে না, সে দরকার হলে আঘাতও করবে, প্রতিঘাতও বুক পেতে নেবে, বিদ্রোহ করবে। বিদ্রোহ করা, আঘাত করার পশুত্ব বা পৈশাচিকতাকে যে অনুভূতি নিষ্ঠুরতা বলে দোষ দেয় বা সহ্য করতে পারে না, সেই অনুভূতিই হচ্ছে নারীর অনুভূতি, মানুষের ওইটুকুই হচ্ছে দেবত্ব। যারা পুরুষ হবে, যারা দেশ-সৈনিক হবে, তাদের বাইরে ওই পশুত্বের বা অসুরত্বের বদনামটুকু সহ্য করে নিতে হবে। যে-ছেলের মনে সেবা করবার, বুকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার ইচ্ছাটা জন্মগত প্রবল, তার সৈনিক না হওয়াই উচিত। দেশের দুঃখ-আর্ত পীড়িতদের সেবার ভার এইসব ছেলেরা খুব ভালো করেই করতে পারবে। যেমন উত্তরবঙ্গের বন্যা-পীড়িতদের সেবা সাহায্য। বাংলার ত্যাগী ঋষি প্রফুল্লচন্দ্র আজ মায়ের মমতা নিয়ে দু-হাতে অন্নবস্ত্র বিলোচ্ছেন, এ রূপ জগদ্ধাত্রীর, এ রূপ অন্নপূর্ণার, এ রূপ, এ মূর্তি তো রুদ্রের নয়, প্রলয়ের দেবতার চোখে এমন মায়ের করুণা ক্ষরে না। এই যে হাজার হাজার ছেলেরা এই আর্তদের সেবার জন্য দু-বাহু বাড়িয়ে ছুটেছে, এ-ছোটা যে মায়ের ছোটা, এ-করুণা, এ-সেবা-প্রবণতা নারীর, দেবতার। আমরা এঁদের পূজা করি, এঁদের দেবত্বের কাছে মাথা অবনত করি, কিন্তু এতে তো দেশের বাইরের মুক্তি স্বাধীনতা আনবে না। রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, প্রফুল্ল বাংলার দেবতা, তাঁদের পূজার জন্য বাংলার চোখে জল চির-নিবেদিত থাকবে। কিন্তু সেনাপতি কই? সৈনিক কোথায়? কোথায় আঘাতের দেবতা, প্রলয়ের মহারুদ্র? সে-পুরুষ এসেছিল বিবেকানন্দ, সে-সেনাপতির পৌরুষ-হুংকার গর্জে উঠেছিল বিবেকানন্দের কণ্ঠে।

    ওরে আমার ভারতের সেরা, আগুন খেলার সোনার বাংলা! কোথায় কোন্ অগ্নিগিরির তলে তোর বুকের অগ্নি-সিন্ধু নিস্তব্ধ নিস্পন্দ হয়ে পড়ল? কোন্ অলস-করা করুণার দেবতার বাঁশির সুরে সুরে তোর উত্তাল অগ্নি-তরঙ্গ-মালা স্তব্ধ-নিথর হয়ে পড়ল? কোথায় ভীমের জন্মদাতা পবন? ফুঁ দাও, ফুঁ দাও এই নিবন্ত অগ্নিসিন্ধুতে, আবার এর তরঙ্গে তরঙ্গে নিযুত নাগ-নাগিনীর নাগ-হিন্দোলা উলসিয়া উঠুক। ওগো করুণার দেবতা, প্রেমের বিধাতা, বাঁশির রাজা! তোমরা মুক্ত বিশ্বের, তোমরা এ ঘুমন্ত দাস-অলস ভারতের নও। এই অলস জাতিকে তোমাদের সুরের অশ্রুতে আরও অলস-উতল করে তুলো না। তোমাদের সুরের কান্নায় কান্নায় এদের অলস আর্ত আত্মা আরও কাতর, আরও ঘুম-আর্দ্র হয়ে উঠল যে। এ সুর তোমাদের থামাও। আঘাত হানো, হিংসা আনো, যুদ্ধ আনো, এদেরে এবার জাগাও, কান্নাকাতর আত্মাকে আর কাঁদিয়ো না।

    আমরা যে আশা করে আছি, কখন সে মহা-সেনাপতি আসবে যার ইঙ্গিতে আমাদের মতো শত কোটি সৈনিক বহ্নি-মুখ পতঙ্গের মতো তার ছত্রতলে গিয়ে ‘হাজির হাজির’ বলে হাজির হবে। হে আমার অজানা প্রলয়ংকর মহা-সেনানী, তোমায় আমি দেখি নাই, কিন্তু তোমার আদেশ আমি শুনেছি, আমি শুনেছি। আমায় যুদ্ধ-ঘোষণার যে তূর্য-বাদনের ভার দিয়েছ, সে ভার আমি মাথা পেতে নিয়েছি। এ যে তোমার হুকুম। সাধ্য কি, আমি তার অমান্য করি? হে আমার অনাগত অব্যক্ত মহাশক্তি! বাজাও, বাজাও, এমনি করে আমার কণ্ঠে তোমার প্রলয় শিঙা বাজাও! তোমার রণভেরি আমারই ক্ষীণ কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠুক। ঘরের পরের সকল মার, সকল আঘাত যেন নির্বিকার চিত্তে, হাসিমুখে সহ্য করে আমি তোমারই দেওয়া তূর্যে যুদ্ধ-ঘোষণা করতে পারি। হে আমার অপ্রকাশ মহাবিদ্রোহী, তুমিই আমায় বল দিয়ো। যেদিন তুমি আসবে সেদিন যেন তোমারই পতাকা-তলে তোমার দেওয়া তরবারি-করে, রক্ত-সৈনিক-বেশে দাঁড়াতে পারি। সেদিন কলিজার শোণিত-মাখা তরবারি তোমার পদতলে অর্ঘ্য দিয়ে তোমার রক্ত-আঁখির প্রসাদ-চাওয়ায় বঞ্চিত না হই। যখন দুশমনের বর্শাফলক আমার বুকে বিদ্ধ হয়ে আমায় সৈনিকের গৌরব-দীপ্ত মরণের অধিকারী করবে, যখন আমার রক্তহীন দেহ ধুলায় লুটিয়ে পড়বে সেদিন-তুমি বোলো প্রভু, ‘বৎস! তুমি তোমার কর্তব্য করেছ।’ মনে করি হয়তো এ তূর্য-বাদনের শক্তি আমার নাই, কিন্তু ছাড়তে তো পারি না, তোমার অব্যক্ত শক্তি, আমায় ছাড়তেও দেয় না, পিছুতেও দেয় না। সে ক্রমেই অগ্রে আরও অগ্রে ঠেলে নিয়ে যায়। আমার অসম্পূর্ণতা, আমার অপ্রকাশ, যা তোমার চোখে ক্ষমার, তা যে অন্যের চক্ষে অপরাধের, প্রভু। আমার বিদ্রোহের মাঝে যেটুকু অহংকার, শুধু সেইটুকু আমার হোক, তুমি শুধু বলো – আমার কণ্ঠে এসো বলো – ‘এ বিদ্রোহ আমার।’

    ওই অহংকারের দুর্নামটুকু আমি মাথা পেতে নিতে পারি, সেই শক্তি আমায় দাও। আমার মাঝে বিদ্রোহী বেশে যখন এলে, হে আমার অনাগত মহাবিদ্রোহী বিপুল শক্তি, তখন তো বুঝিনি যে, আমায় শুধু বাইরের আঘাত, ঘরের মারটুকুর অধিকারী করে নিলে, তখন তো বুঝিনি যে, এই বিদ্রোহের প্রসাদ, এ কল্যাণ-ক্ষীরটুকু তোমার। আজ শুধু ডাকছি, আর ডাকছি, আমায় এবার তোমার যুদ্ধ-পতাকা-তলে ডেকে নাও, মরণের মাঝে ডেকে নাও। আমায় দেওয়া তোমার তূর্য-কেতন অন্য সৈনিককে দাও।

    সেবার মাঝে আমায় সাড়া দিবার অধিকারী করলে না। বললে, –

    ‘আর্তের অশ্রুমোচন আমার নয়, আমার রণ-তূর্য। আমি প্রলয়ের, আমি প্রেমের নই। আমি রুদ্রের, আমি করুণার নই। আমি সেবার নই, আমি যুদ্ধের। আমি সেবক নই, আমি সৈনিক। আমি পূজার নই, আমি ঘৃণার। আমি অবহেলার, আমি অপমানের। আমি দেবতা নই, আমি হিংস্র, বন্য, পশু। আমি সুন্দর নই, আমি বীভৎস। আমি বুকে নিতে পারি না, আমি আঘাত করি। আমি মঙ্গলের নয়, আমি মৃত্যুর। আমি হাসির নয়, আমি অভিশাপের।’ হে আমার মাঝের তিক্ত শক্তি, রুদ্রজ্বালা, বিষ-দাহন! হে আমার যুগে যুগে নির্মম নিষ্ঠুর সৈনিক-আত্মা, তোমায় আমি যেন প্রশংসার লোভে খাটো না করি। তোমাকে দেবতা বলে প্রকাশ করবার ভণ্ডামি যেন কোনোদিন আমার মাঝে না আসে। আমি নিজে যতটুকু, ঠিক ততটুকুই যেন প্রকাশ করি। যুগে যুগে পশু-আমার, সৈনিক-আমার জয় হউক!!

  • সর্বহারা

    সর্বহারা

    সর্বহারা

    ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে, মুতাবিক ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের অক্টোবরে। প্রকাশক ব্রজবিহারী বর্মণ রায়, বর্মণ পাবলিশিং হাউস, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২+৬৪, মূল্য এক টাকা ছয় আনা। তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়— সর্বহারা, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, ধীবরের গান, ছাত্রদলের গান, কাণ্ডারী হুঁশিয়ার, সাম্যবাদী, ফরিয়াদ, আমার কৈফিয়ৎ, প্রার্থনা ও গোকুল নাগ— এই এগারটি কবিতা।

    ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে কলিকাতার ‘নলেজ হোম’ থেকে ‘সর্বহারা’ কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এতে ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’র কিছু কবিতা এবং গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত কিছু কবিতা সঙ্কলিত হয়। এই সংস্করণের মুখবন্ধ রচনা করেন রবীউদ্দীন আহমদ। এই সংস্করণের সঙ্কলিত কবিতাগুলি হল—কৃষাণের গান (সর্বহারা), শ্রমিকের গান (সর্বহারা), ধীবরের গান (সর্বহারা) চোর-ডাকাত (সাম্যবাদী), মিথ্যাবাদী (সাম্যবাদী), রাজা-প্রজা (সাম্যবাদী), সাম্য (সাম্যবাদী), প্রার্থনা (সর্বহারা), চাষার গান, ছাদপেটার গান, চীন ও ভারত, নারী, চাষীর গান, এই দেশ কার, বিদায় মাভৈ, জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ ও শ্রীমান আবদুল মুহিত চৌধুরী স্নেহভাজনেষু। শেষের নয়টি কবিতা গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত ও বেশির ভাগই সর্বহারা প্রকাশের অনেক পরে লিখিত। এই সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত নারী ও ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের নারী স্বতন্ত্র কবিতা। ‘সর্বহারা’ গ্রন্থের মূল উৎসর্গপত্র বদলে দিয়ে এই সংস্করণে ‘উৎসর্গ—মুজফ্‌ফর আহমদ-কে’ মুদ্রিত হয়। ‘সর্বহারা’র বর্তমান সংস্করণে প্রথম সংস্করণের পাঠ ও ক্রম অনুসৃত হয়েছে।

    ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি ‘সর্বহারা’ শিরোনামে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    কাব্যে গৃহিত ‘সর্বহারা’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২৫শে চৈত্র সংখ্যা ‘লাঙল’ পত্রিকায়।

    ‘কৃষাণের গান’ প্রথম প্রকাশিত হয় ৮ই পৌষ ১৩৩২ সংখ্যা ‘লাঙলে’।

    ‘শ্রমিকের গান’ প্রথম প্রকাশিত হয় ৬ই ফাল্গুন ১৩৩২ সংখ্যা ‘লাঙলে’। ২৩শে মাঘ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক ৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ তারিখে কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা-সম্মিলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে উদ্বোধনী সঙ্গীতরূপে কবি কর্তৃক ‘শ্রমিকের গান’ গীত হয়েছিল।

    ‘ধীবরের গান’ ৪ঠা চৈত্র ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক ১৮ই মার্চ ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙল’ পত্রিকায় ‘জেলেদের গান’ শিরোনামে ছাপা হয়; পাদটীকায় মুদ্রিত ছিল: ‘মাদারিপুরে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনের উদ্বোধন—সঙ্গীত’। উক্ত সম্মিলনী সম্পর্কে সে সংখ্যার লাঙলে বলা হয়— ‘গত ১১ই ও ১২ই মার্চ (২৭শে ও ২৮শে ফাল্গুন) তারিখে ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর শহরে মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশন হয়। ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় সভাপতি শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয় ষ্টিমার যোগে আসেন। তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার মজুমদার ও শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন।”

    ‘ছাত্রদলের গান’ ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের মে মাসে কৃষ্ণনগরে ছাত্র ও যুব-সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত রূপে কবি কর্তৃক গীত হয়েছিল।

    ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘বঙ্গবাণী’তে বের হয়েছিল। তার পাদটীকায় লেখা ছিল— ‘কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মিলনীতে গীত।’ ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ২২শে মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত রূপে কবি কর্তৃক গীত হয়েছিল। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ‘কালি-কলম’ পত্রিকায় গানটি কবি কৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়।

    ‘আমার কৈফিয়ৎ’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ৫ম বর্ষের ৪১ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘গোকুল নাগ; ১৩৩২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘কল্লোলে’ ছাপা হয়েছিল। গোকুলচন্দ্র নাগ ১৯২২ হতে ১৯২৫ পর্যন্ত ‘কল্লোল’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘সোনার ফুল’ ও উপন্যাস ‘পথিক’ সুপরিচিত। তিনি ১৩৩২ সালের ৮ই আশ্বিন একত্রিশ বৎসর বয়সে দার্জিলিঙে পরলোকগমন করেন।

  • মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)-র  শ্রীচরণারবিন্দে

    মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)-র শ্রীচরণারবিন্দে

    মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)-র

    শ্রীচরণারবিন্দে

    সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার।

    তুমি কোনদিন কারো করনি বিচার,

    কারেও দাওনি দোষ। ব্যথা-বারিধির

    কূলে ব’সে কাঁদ’ মৌনা কন্যা ধরণীর

    একাকিনী! যেন কোন্‌ পথ-ভুলে-আসা

    ভিন্‌-গাঁ’র ভীর” মেয়ে! কেবলি জিজ্ঞাসা

    করিতেছে আপনারে, ‘ এ আমি কোথায়?’

    দূর হ’তে তারাকারা ডাকে, আয় আয়!

    তুমি যেন তাহাদের পলাতকা মেয়ে

    ভুলিয়া এসেছ হেথা ছায়া-পথ বেয়ে!

    বিধি ও অবিধি মিলে মেরেছে তোমায়

    মা আমার-কত যেন! চোখে-মুখে, হায়

    তবু যেন শুধু এক ব্যথিত জিজ্ঞাসা-

    ‘ কেন মানে? এরা কা’রা! কোথা হ’তে আসে

    এই দুঃখ ব্যথা শোক?’ এরা তো তোমার

    নহে পরিচিত মাগো, কন্যা অলকার!

    তাই সব স’য়ে যাও নির্বাক নিশ্চুপ,

    ধূপেরে পোড়ায় অগ্নি-জানে না তা ধূপ!

      

    দূর-দূরান-র হ’তে আসে ছেলে-মেয়ে,

    ভুলে যায় খেলা তা’রা তব মুখ চেয়ে!

    বলে, ‘তুমি মা হবে আমার?’ ভেবে কী যে!

    তুমি বুকে চেপে ধর, চক্ষু ওঠে ভিজে

    জননীর কর”ণায়! মনে হয় যেন

    সকলের চেনা তুমি, সকলেরে চেন!

      

    তোমারি দেশের যেন ওরা ঘরছাড়া

    বেড়াতে এসেছে এই ধরণীর পাড়া

    প্রবাসী শিশুর দল। যাবে ওরা চ’লে

    গলা ধ’রে দুটি কথা ‘মা আমার’ ব’লে!

    হয়তো ভুলেছ মাগো, কোনো একদিন,

    এমনই চলিতে পথে মরু-বেদুইন-

    শিশু এক এসেছিল। শ্রান্ত কন্ঠে তার

    বলেছিল গলা ধরে — ‘মা হবে আমার?’…

    হয়ত আসিয়াছিল, যদি পড়ে মনে,

    অথবা সে আসে নাই-না এলে স্মরণে!

    যে-দুরন- গেছে চ’লে আসিবে না আর,

    হয়ত তোমার বুকে গোরস্থান তার

    জাগিতেছে আজো মৌন, অথবা সে নাই!

    এমন ত কত পাই-কত সে হারাই..

    সর্বসহা কন্যা মোর! সর্বহারা মাতা!

    শূন্য নাহি রহে কভু মাতা ও বিধাতা।

    হারা-বুকে আজ তব ফিরিয়াছে যারা-

    হয়ত তাদেরি স্মৃতি এই ‘সর্বহারা’!

    ৩৭ হ্যারিসন রোড,

    কলিকাতা,

    ১৬ ভাদ্র ১৩৩৩

  • সর্বহারা

    সর্বহারা

    সর্বহারা

    ব্যথার সাতার-পানি-ঘেরা

    চোরাবালির চর,

    ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস

    সেই চরে তোর ঘর?

    শূন্যে তড়িৎ দেয় ইশারা,

    হাট তুলে দে সর্বহারা,

    মেঘ-জননীর অশ্র”ধারা

    ঝ’রছে মাথার’ পর,

    দাঁড়িয়ে দূরে ডাকছে মাটি

    দুলিয়ে তর”-কর॥

    কন্যারা তোর বন্যাধারায়

    কাঁদছে উতরোল,

    ডাক দিয়েছে তাদের আজি

    সাগর-মায়ের কোল।

    নায়ের মাঝি! নায়ের মাঝি!

    পাল তু’লে তুই দে রে আজি

    তুরঙ্গ ঐ তুফান-তাজী

    তরঙ্গে খায় দোল।

    নায়ের মাঝি! আর কেন ভাই?

    মায়ার নোঙর তোল্‌।

    ভাঙন-ভরা ভাঙনে তোর

    যায় রে বেলা যায়।

    মাঝি রে! দেখ্‌ কুরঙ্গী তোর

    কূলের পানে চায়।

    যায় চ’লে ঐ সাথের সাথী

    ঘনায় গহন শাঙন-রাতি

    মাদুর-ভরা কাঁদন পাতি’

    ঘুমুস্‌ নে আর, হায়!

    ঐ কাঁদনের বাঁধন ছেঁড়া

    এতই কি রে দায়?

    হীরা-মানিক চাসনিকো তুই,

    চাস্‌নি ত সাত ক্রোর,

    একটি ক্ষুদ্র মৃৎপাত্র-

    ভরা অভাব তোর,

    চাইলি রে ঘুম শ্রান্তিহরা

    একটি ছিন্ন মাদুর-ভরা,

    একটি প্রদীপ-আলো-করা

    একটু-কুটীর-দোর।

    আস্‌ল মৃত্যু আস্‌ল জরা,

    আস্‌ল সিঁদেল-চোর।

    মাঝি রে তোর নাও ভাসিয়ে

    মাটির বুকে চল্‌!

    শক্তমাটির ঘায়ে হউক

    রক্ত পদতল।

    প্রলয়-পথিক চ’ল্‌বি ফিরি

    দ’লবি পাহাড়-কানন-গিরি!

    হাঁকছে বাদল, ঘিরি’ ঘিরি’

    নাচছে সিন্ধুজল।

    চল্‌ রে জলের যাত্রী এবার

    মাটির বুকে চল্‌ ॥

    লাঙল অফিস — কলিকাতা

    ২৪ চৈত্র, ১৩৩২

  • কৃষাণের গান

    কৃষাণের গান

    কৃষাণের গান

    ওঠ রে চাষি জগদ্‌বাসী ধর কষে লাঙল।
    আমরা
    মরতে আছি – ভালো করেই মরব এবার চল॥
    মোদের
    উঠান-ভরা শস্য ছিল হাস্য-ভরা দেশ
    ওই
    বৈশ্য দেশের দস্যু এসে লাঞ্ছনার নাই শেষ,
    ও ভাই
    লক্ষ হাতে টানছে তারা লক্ষ্মী মায়ের কেশ,
    আজ
    মা-র কাঁদনে লোনা হল সাত সাগরের জল॥
    ও ভাই
    আমরা ছিলাম পরম সুখী, ছিলাম দেশের প্রাণ
    তখন
    গলায় গলায় গান ছিল ভাই, গোলায় গোলায় ধান,
    আজ
    কোথায় বা সে গান গেল ভাই কোথায় সে কৃষাণ?
    ও ভাই
    মোদের রক্ত জল হয়ে আজ ভরতেছে বোতল॥
    আজ
    চারদিক হতে ধনিক বণিক শোষণকারীর জাত
    ও ভাই
    জোঁকের মতন শুষছে রক্ত, কাড়ছে থালার ভাত,
    মোর
    বুকের কাছে মরছে খোকা, নাইকো আমার হাত।
    আর
    সতী মেয়ের বসন কেড়ে খেলছে খেলা খল॥
    ও ভাই
    আমরা মাটির খাঁটি ছেলে দূর্বাদল-শ্যাম,
    আর
    মোদের রূপেই ছড়িয়ে আছেন রাবণ-অরি রাম,
    ওই
    হালের ফলায় শস্য ওঠে, সীতা তাঁরই নাম,
    আজ
    হরছে রাবণ সেই সীতারে – সেই মাঠের ফসল॥
    ও ভাই
    আমরা শহিদ, মাঠের মক্কায় কোরবানি দিই জান।
    আর
    সেই খুনে যে ফলছে ফসল, হরছে তা শয়তান।
    আমরা
    যাই কোথা ভাই, ঘরে আগুন বাইরে যে তুফান!
    আজ
    চারিদিক হতে ঘিরে মারে এজিদ রাজার দল॥
    আজ
    জাগ রে কৃষাণ, সব তো গেছে, কীসের বা আর ভয়,
    এই
    ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়।
    ওই
    বিশ্বজয়ী দস্যুরাজার হয়-কে করব নয়,
    ওরে
    দেখবে এবার সভ্যজগৎ চাষার কত বল॥

    হুগলী

    অগ্রহায়ণ, ১৩৩২

  • শ্রমিকের গান

    শ্রমিকের গান

    শ্রমিকের গান

    ওরে
    ধ্বংস-পথের যাত্রীদল!
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    আমরা
    হাতের সুখে গড়েছি ভাই,
    পায়ের সুখে ভাঙব চল।
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ও ভাই
    আমাদেরই শক্তিবলে
    পাহাড় টলে তুষার গলে
    মরুভূমে সোনার ফসল ফলে রে!
    মোরা
    সিন্ধু মথে এনে সুধা
    পাই না ক্ষুধায় বিন্দু জল।
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ও ভাই
    আমরা কলির কলের কুলি,
    কলুর বলদ চক্ষে-ঠুলি
    হিরা পেয়ে রাজ-শিরে দিই তুলি রে!
    আজ
    মানবকুলের কালি মেখে
    আমরা কালো কুলির দল।
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    আমরা
    পাতাল ফেড়ে খুঁড়ে খনি
    আমি ফণীর মাথার মণি,
    তাই পেয়ে সব শনি হল ধনী রে!
    এবার
    ফণীমনসার নাগ-নাগিনি
    আয় রে গর্জে মার ছোবল!
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    যত
    শ্রমিক শুষে নিঙড়ে প্রজা
    রাজা-উজির মারছে মজা,
    আমরা মরি বয়ে তাদের বোঝা রে।
    এবার
    জুজুর দল ওই হুজুর দলে
    দলবি রে আয় মজুর দল!
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ও ভাই
    মোদের বলে হতেছে পার,
    হপ্তা রোজে সপ্ত পাথার,
    সাঁতার কেটে জাহাজ কাতার কাতার রে!
    তবু
    মোরাই জনম চলছি ঠেলে
    ক্লেশ-পাথারের সাঁতার-জল!
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    আজ
    ছ-মাসের পথ ছ-দিনে যায়
    কামান-গোলা, রাজার সিপাই
    মোদের শ্রমে মোদেরই সে কৃপায় রে!
    ও ভাই
    মোদের পুণ্যে শূন্যে ওড়ে
    ওই জ্ঞুঁড়োদের উড়োকল!
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ও ভাই
    দালান-বাড়ি আমরা গড়ে
    রইনু জনম ধুলায় পড়ে,
    বেড়ায় ধনী মোদের ঘাড়ে চড়ে রে!
    আমরা
    চিনির বলদ চিনিনে স্বাদ
    চিনি বওয়াই সার কেবল।
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ও ভাই
    আমরা মায়ের ময়লা ছেলে
    কয়লা-খনির বয়লা ঠেলে
    যে অগ্নি দিই দিগ্‌বিদিকে জ্বেলে রে!
    এবার
    জ্বালবে জগৎ কয়লা-কাটা
    ময়লা কুলির সেই অনল।
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ও ভাই
    আমাদের কাজ হলে বাসি
    আমরা মুটে কল-খালাসি!
    ডুবলে তরি মোরাই তুলতে আসি রে!
    আমরা
    বলির মতন দান করে সব
    পেলাম শেষে পাতাল-তল
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    মোদের
    যা ছিল সবই দিইছি ফুঁকে,
    এইবারে শেষ কপাল ঠুকে
    পড়ব রুখে অত্যাচারীর বুকে রে!
    আবার
    নূতন করে মল্লভূমে
    গর্জাবে ভাই দল-মাদল!
    ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল॥
    ওই
    শয়তানি চোখ কলের বাতি
    নিবিয়ে আয় রে ধ্বংস-সাথি!
    ধর হাথিয়ার, সামনে প্রলয়-রাতি রে!
    আয়
    আলোক-স্নানের যাত্রীরা আয়
    আঁধার-নায়ে চড়বি চল!
    ধর হাতুড়ি তোল কাঁধে শাবল॥

    কৃষ্ণনগর

    ২০ মাঘ, ১৩৩২

  • ধীবরদের গান

    ধীবরদের গান

    ধীবরদের গান

    আমরা
    নীচে পড়ে রইব না আর
    শোন রে ও ভাই জেলে,
    এবার উঠব রে সব ঠেলে!
    ওই বিশ্ব-সভায় উঠল সবাই রে,
    ওই
    মুটে মজুর হেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    আজ
    সবার গায়ে লাগছে ব্যথা
    সবাই আজই কইছে কথা রে,
    আমরা
    এমনি মরা, কই নে কিছু
    মড়ার লাথি খেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    আমরা
    মেঘের ডাকে জেগে উঠে
    পানসিতে পাল তুলি।
    আমরা
    ঝড়-তুফানে সাগর-দোলার
    নাগরদোলায় দুলি।
    ও ভাই
    আকাশ মোদের ছত্র ধরে
    বাতাস মোদের বাতাস করে রে।
    আমরা
    সলিল অনিল নীল গগনে
    বেড়াই পরান মেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    হায়
    ভাই রে, মোদের ঠাঁই দিল না
    আপন মাটির মায়ে
    তাই
    জীবন মোদের ভেসে বেড়ায়
    ঝড়ের মুখে নায়ে।
    ও ভাই
    নিত্য-নূতন হুকুম জারি
    করছে তাই সব অত্যাচারী রে,
    তারা
    বাজের মতন ছোঁ মেরে খায়
    আমরা মৎস্য পেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    আমরা
    তল করেছি কতই সে ভাই
    অথই নদীর জল,
    ও ভাই
    হাজার করেও ওই হুজুরদের
    পাইনে মনের তল।
    আমরা
    অতল জলের তলা থেকে
    রোহিত-মৃগেল আনি ছেঁকে রে,
    এবার
    দৈত্য-দানব ধরব রে ভাই
    ডাঙাতে জাল ফেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    আমরা
    পাথর-জলে ডুব-সাঁতার দিই
    মরেও নাহি মরি,
    আমরা
    হাঙর-কুমির-তিমির সাথে
    নিত্য বসত করি।
    ও ভাই
    জলের কুমির জয় করে কি
    কুমির হল ঘরের ঢেঁকি রে,
    ও ভাই
    মানুষ হতে কুমির ভালো
    খায় না কাছে পেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    ও ভাই
    আমরা জলে জাল ফেলে রই,
    হোথা ডাঙার পরে
    আজ
    জাল ফেলেছে জালিম যত
    জমাদারের চরে।
    ও ভাই
    ডাঙার বাঘ ওই মানুষ-দেশে
    ছেলে-মেয়ে ফেলে এসে রে,
    আমরা
    বুকের আগুন নিবাই রে ভাই,
    নয়ন-সলিল ঢেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    ও ভাই
    সপ্ত লক্ষ শির মোদের ভাই
    চৌদ্দ লক্ষ বাহু,
    ওরে
    গ্রাস করেছে তাদের ভাই আজ
    চৌদ্দজনা রাহু।
    যে
    চৌদ্দ লক্ষ হাত দিয়ে ভাই
    সাগর মথে দাঁড় টেনে যাই রে,
    সেই
    দাঁড় নিয়ে আজ দাঁড়া দেখি
    মায়ের সাত লাখ ছেলে।
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    ও ভাই
    আমরা জলের জল-দেবতা,
    বরুণ মোদের মিতা,
    মোদের
    মৎস্যগন্ধার ছেলে ব্যাসদেব
    গাইল ভারত-গীতা।
    আমরা
    দাঁড়ের ঘায়ে পায়ের তলে
    জলতরঙ্গ বাজাই জলে রে,
    আমরা
    জলের মতন জল কেটে যাই,
    কাটব দানব পেলে
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥
    আমরা
    খেপলা জাল আর ফেলব না ভাই,
    একলা নদীর তীরে,
    আয়
    এক সাথে ভাই সাত লাখ জেলে
    ধর বেড়াজাল ঘিরে।
    ওই
    চৌদ্দ লক্ষ দাঁড় কাঁধে ভাই
    মল্লভূমির মল্ল-বীর আয়রে,
    ওই
    আঁশ-বটিতে মাছ কাটি ভাই,
    কাটব অসুর এলে!
    এবার
    উঠব রে সব ঠেলে॥

    কৃষ্ণনগর

    ২৪ ফাল্গুন, ১৩৩২

  • ছাত্রদলের গান

    ছাত্রদলের গান

    ছাত্রদলের গান

    আমরা শক্তি আমরা বল
    আমরা ছাত্রদল।
    মোদের
    পায়ের তলায় মুর্সে তুফান
    উর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।
    আমরা ছাত্রদল॥
    মোদের
    আঁধার রাতে বাধার পথে
    যাত্রা নাঙ্গা পায়,
    আমরা
    শক্ত মাটি রক্তে রাঙাই
    বিষম চলার ঘায়!
    যুগে-যুগে সিক্ত হল
    রক্ত মোদের পৃথ্বীতল!
    আমরা ছাত্রদল॥
    মোদের
    কক্ষচ্যুত ধুমকেতু-প্রায়
    লক্ষহারা প্রাণ,
    আমরা
    ভাগ্যদেবীর যজ্ঞবেদীর
    নিত্য বলিদান।
    যখন
    লক্ষ্মীদেবী স্বর্গে ওঠেন,
    আমরা পশি নীল অতল,
    আমরা ছাত্রদল॥
    আমরা
    ধরি মৃত্যু-রাজার
    যজ্ঞ-ঘোড়ার রাশ,
    মোদের
    মৃত্যু লেখে মোদের
    জীবন-ইতিহাস!
    হাসির
    দেশে আমরা আনি
    সর্বনাশী চোখের জল।
    আমরা ছাত্রদল॥
    সবাই যখন বুদ্ধি যোগায়,
    আমরা করি ভুল।
    সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব,
    আমরা ভাঙি কূল।
    দারুণ-রাতে আমরা তরুণ
    রক্তে করি পথ পিছল!
    আমরা ছাত্রদল॥
    মোদের
    চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল
    বক্ষে ভরা বাক্‌,
    কন্ঠে মোদের কুন্ঠ বিহীন
    নিত্য কালের ডাক।
    আমরা
    তাজা খুনে লাল করেছি
    সরস্বতীর শ্বেত কমল।
    আমরা ছাত্রদল॥
    ওই
    দারুণ উপপ্লবের দিনে
    আমরা দানি শির,
    মোদের মাঝে মুক্তি কাঁদে
    বিংশ শতাব্দীর!
    মোরা
    গৌরবেরই কান্না দিয়ে
    ভরেছি মার শ্যাম আঁচল।
    আমরা ছাত্রদল॥
    আমরা রচি ভালোবাসার
    আশার ভবিষ্যৎ
    মোদের
    স্বর্গ-পথের আভাস দেখায়
    আকাশ-ছায়াপথ!
    মোদের চোখে বিশ্ববাসীর
    স্বপ্ন দেখা হোক সফল।
    আমরা ছাত্রদল॥

    কৃষ্ণনগর

    ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩