Author: কাজী নজরুল ইসলাম

  • কাণ্ডারী হুশিয়ার!

    কাণ্ডারী হুশিয়ার!

    কাণ্ডারী হুশিয়ার!

    কোরাস :

    দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার

    লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার!

    দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,

    ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?

    কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত।

    এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার!!

    তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!

    যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান!

    ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,

    ইহাদের পথে, নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার!!

    অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,

    কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!

    “হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

    কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!

    গিরি-সংকট, ভীরু যাত্রীরা, গুরু গরজায় বাজ,

    পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ

    কাণ্ডারী! তুমি ভূলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?

    ‘করে হানাহানি, তবু চল টানি’, নিয়াছ যে মহাভার!

    কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,

    বাঙ্গালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!

    ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর

    উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।

    ফাঁসির মঞ্চে যারা গেয়ে গেল জীবনের জয়গান,

    আসি’ অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?

    আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রান?

    দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!

    কৃষ্ণনগর

    ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩

  • ফরিয়াদ

    ফরিয়াদ

    ফরিয়াদ

    এই ধরণীর ধূলি-মাখা তব অসহায় সন্তান

    মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদি-পিতা ভগবান!-

    আমার আঁখির দুখ-দীপ নিয়া

    বেড়াই তোমার সৃষ্টি ব্যাপিয়া,

    যতটুকু হেরি বিস্ময়ে মরি, ভ’রে ওঠে সারা প্রাণ!

    এত ভালো তুমি? এত ভালোবাসা? এত তুমি মহীয়ান্‌?

    ভগবান! ভগবান!

    তোমার সৃষ্টি কত সুন্দর, কত সে মহৎ, পিতা!

    সৃষ্টি-শিয়রে ব’সে কাঁদ তবু জননীর মতো ভীতা!

    নাহি সোয়াস্তি নাহি যেন সুখ,

    ভেঙে গড়ো, গড়ে ভাঙো, উৎসুক!

    আকাশ মুড়েছ মরকতে-পাছে আঁখি হয় রোদে ম্লান।

    তোমার পবন করিছে বীজন জুড়াতে দগ্ধ প্রাণ!

    ভগবান! ভগবান!

    রবি শশী তারা প্রভাত-সন্ধ্যা তোমার আদেশ কহে-

    ‘এই দিবা রাতি আকাশ বাতাস নহে একা কারো নহে।

    এই ধরণীর যাহা সম্বল,-

    বাসে-ভরা ফুল, রসে-ভরা ফল,

    সু-স্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল, পাখীর কন্ঠে গান,-

    সকলের এতে সম অধিকার, এই তাঁর ফরমান!’

    সকলের ভগবান!

    শ্বেত পীত কালো করিয়া সৃজিলে মানবে, সে তব সাধ।

    আমরা যে কালো, তুমি ভালো জান, নহে তাহা অপরাধ!

    তুমি বল নাই, শুধু শ্বেতদ্বীপে

    জোগাইবে আলো রবি-শশী-দীপে,

    সাদা র’বে সবাকার টুঁটি টিপে, এ নহে তব বিধান।

    সন্তান তব করিতেছে আজ তোমার অসম্মান!

    ভগবান! ভগবান!

    তব কনিষ্ঠ মেয়ে ধরণীরে দিলে দান ধুলা-মাটি,

    তাই দিয়ে তার ছেলেদের মুখে ধরে সে দুধের বাটি!

    ময়ূরের মতো কলাপ মেলিয়া

    তার আনন্দ বেড়ায় খেলিয়া-

    সন্তান তার সুখী নয়, তারা লোভী, তারা শয়তান!

    ঈর্ষায় মাতি’ করে কাটাকাটি, রচে নিতি ব্যবধান!

    ভগবান! ভগবান!

    তোমারে ঠেলিয়া তোমার আসনে বসিয়াছে আজ লোভী,

    রসনা তাহার শ্যামল ধরায় করিছে সাহারা গোবী!

    মাটির ঢিবিতে দু’দিন বসিয়া

    রাজা সেজে করে পেষণ কষিয়া!

    সে পেষণে তারি আসন ধসিয়া রচিছে গোরস্থান!

    ভাই-এর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে বীরের আখ্যা পান!

    ভগবান! ভগবান!

    জনগণে যারা জোঁক সম শোষে তারে মহাজন কয়,

    সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।

    মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ,

    মাটির মালিক তাঁহারাই হন-

    যে যত ভন্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান।

    নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান।

    ভগবান! ভগবান!

    অন্যায় রণে যারা যত দড় তারা তত বড় জাতি,

    সাত মহারথী শিশুরে বধিয়া ফুলায় বেহায়া ছাতি!

    তোমার চক্র রুধিয়াছে আজ

    বেনের রৌপ্য-চাকায়, কি লাজ!

    এত অনাচার স’য়ে যাও তুমি, তুমি মহা মহীয়ান্‌ ।

    পীড়িত মানব পারে না ক’ আর, সবে না এ অপমান-

    ভগবান! ভগবান!

    ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা শঙ্কা নাহি ক’ আর!

    ‘মরিয়া’র মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে ‘মার মার!’

    রক্ত যা ছিল ক’রেছে শোষণ,

    নীরক্ত দেহে হাড় দিয়ে রণ!

    শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়, সেই হাড়ে ওঠে গান-

    ‘জয় নিপীড়িত জনগণ জয়! জয় নব উত্থান!

    জয় জয় ভগবান!’

    ১০

    তোমার দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বী সকলে কবির ভোগ,

    এই পৃথিবীর নাড়ী সাথে আছে সৃজন-দিনের যোগ।

    তাজা ফুল ফলে অঞ্চলি পুরে

    বেড়ায় ধরণী প্রতি ঘরে ঘুরে,

    কে আছে এমন ডাকু যে হরিবে আমার গোলার ধান?

    আমার ক্ষুধার অন্নে পেয়েছি আমার প্রাণের ঘ্রাণ-

    এতদিনে ভগবান!

    ১১

    যে-আকাশে হ’তে ঝরে তব দান আলো ও বৃষ্টি-ধারা,

    সে-আকাশ হ’তে বেলুন উড়ায়ে গোলাগুলি হানে কা’রা?

    উদার আকাশ বাতাস কাহারা

    করিয়া তুলিছে ভীতির সাহারা?

    তোমার অসীম ঘিরিয়া পাহারা দিতেছে কা’র কামান?

    হবে না সত্য দৈত্য-মুক্ত? হবে না প্রতিবিধান?

    ভগবান! ভগবান!

    ১২

    তোমার দত্ত হসে-রে বাঁধে কোন্‌ নিপীড়ন-চেড়ী?

    আমার স্বাধীন বিচরণ রোধে কার আইনের বেড়ী?

    ক্ষুধা তৃষা আছে, আছে মোর প্রাণ,

    আমিও মানুষ, আমিও মহান্‌!

    আমার অধীনে এ মোর রসনা, এই খাড়া গর্দান!

    মনের শিকল ছিঁড়েছি, পড়েছে হাতের শিকলে টান-

    এতদিনে ভগবান!

    ১৩

    চির-অবনত তুলিয়াছে আজ গগনে উ”চ শির।

    বান্দা আজিকে বন্ধন ছেদি’ ভেঙেছে কারা-প্রাচীর।

    এতদিনে তার লাগিয়াছে ভালো-

    আকাশ বাতাস বাহিরেতে আলো,

    এবার বন্দী বুঝেছে, মধুর প্রাণের চাইতে ত্রাণ।

    মুক্ত-কন্ঠে স্বাধীন বিশ্বে উঠিতেছে একতান-

    জয় নিপীড়িত প্রাণ

    জয় নব অভিযান!

    জয় নব উত্থান!

    হুগলি,

    ৭ আশ্বিন ১৩৩২

  • আমার কৈফিয়ৎ

    আমার কৈফিয়ৎ

    আমার কৈফিয়ৎ

    বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,

    কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!

    কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে

    ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!

    যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’

    দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!

    কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!

    বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।

    পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।

    কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।

    কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!

    কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!

    গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!

    প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’

    আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’

    অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।

    সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’

    যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!

    মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,

    ‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!

    ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,

    যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!

    ‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!

    হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’

    আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।

    ‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!

    ‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,

    ‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’

    গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!

    স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!

    নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!

    ‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’

    ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-

    যুগের না হই, হজুগের কবি

    বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,

    দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!

    কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?

    হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!

    বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,

    রাজ-সরকার রেখেছেন মান!

    যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু

    শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?

    বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,

    হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!

    যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,

    মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,

    তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।

    হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!

    আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!

    প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে

    ‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!

    বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়

    গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে

    নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।

    ১০

    বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,

    গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!

    রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,

    স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,

    চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।

    মাতা কয়, ওরে চুপ্‌ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্‌ চেয়ে!

    ১১

    ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,

    বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।

    কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,

    স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!

    কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন

    কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?

    ১২

    আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!

    কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস

    এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!

    টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।

    মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!

    হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!

    ১৩

    বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!

    দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।

    রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,

    তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,

    বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!

    অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!

    ১৪

    পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,

    মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

    প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

    যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!

    কলিকাতা

    ১ আশ্বিন ১৩৩২

  • প্রার্থনা

    প্রার্থনা

    প্রার্থনা

    [গান]

    এসো যুগ-সারথি নিঃশঙ্ক নির্ভয়।

    এসো চির-সুন্দর অভেদ অসংশয়।

    জয় জয়।

    জয় জয়।

    এসো বীর অনাগত

    বজ্র-সমুদ্যত।

    এসো অপরাজেয় উদ্ধত নির্দয়।

    জয় জয়।

    জয় জয়।

    হে মৌনী জন-গণ-

    বেদনা-বিমোচন-

    যুগ-সেনানায়ক! জাগো জ্যোতির্ময়।

    জয় জয়।

    জয় জয়।

    ওঠে ক্রন্দন ওই,

    এসো বন্ধন-জয়ী।

    জাগে শিশু, মাগে আলো, এসো অরুণোদয়।

    জয় জয়।

    জয় জয়।

    কলিকাতা

    ১ আশ্বিন ১৩৩২

  • গোকুল নাগ

    গোকুল নাগ

    গোকুল নাগ

    না ফুরাতে শরতের বিদায়-শেফালি,

    না নিবিতে আশ্বিনের কমল-দীপালি,

    তুমি শুনেছিলে বন্ধু পাতা-ঝরা গান

    ফুলে ফুলে হেমন্তের বিদায়-আহবান!

    অতন্দ্র নয়নে তব লেগেছিল চুম

    ঝর-ঝর কামিনীর, এল চোখে ঘুম

    রাত্রিময়ী রহস্যের; ছিন্ন শতদল

    হ’ল তব পথ-সাথী; হিমানী-সজল

    ছায়াপথ-বিথী দিয়া শেফালি দলিয়া

    এল তব মায়া বধূ ব্যথা-জাগানিয়া!

    এল অশ্রু হেমনে-র,এল ফুল-খসা

    শিশির-তিমির-রাত্রি; শ্রান- দীর্ঘশ্বাসা

    ঝাউ-শাখে সিক্ত বায়ু ছায়া-কুহেলির

    কয়ে গেল, দুলে দুলে কাঁদিল বনানী!

    তুমি দেখেছিলে বন্ধু ছায়া কুহেলির

    অশ্রু-ঘন মায়া-আঁখি, বিরহ-অথির

    বুকে তব ব্যথা-কীট পশিল সেদিন!

    যে-কান্না এল না চোখে, মর্মে হ’ল লীন,

    বক্ষে তাহা নিল বাসা, হ’ল রক্তে রাঙা

    আশাহীন ভালবাসা, ভাষা অশ্রু-ভাঙা!

    বন্ধু, তব জীবনের কুমারী আশ্বিন

    পরিল বিধবা বেশ করে কোন্‌ দিন,

    কোন্‌ দিন সেঁউতির মালা হ’তে তার

    ঝরে গেল বৃন-গুলি রাঙা কামনার-

    জানি নাই; জানি নাই, তোমার জীবনে

    আসিছে বিচ্ছেদ-রাত্রি, অজানা গহনে

    এবে যাত্রা শুরু তব, হে পথ-উদাসী!

    কোন্‌ বনান-র হ’তে ঘর-ছাড়া বাঁশী

    ডাক দিল, তুমি জান। মোরা শুধু জানি

    তব পায়ে কেঁদেছিল সারা পথখানি!

    সেধেছিল, এঁকেছিল ধূলি-তুলি দিয়া

    তোমার পদাঙ্ক-স্মৃতি।

    রহিয়া রহিয়া

    কত কথা মনে পড়ে! আজ তুমি নাই,

    মোরা তব পায়ে-চলা পথে শুধু তাই

    এসেছি খুঁজিতে সেই তপ্ত পদ-রেখা,

    এইখানে আছে তব ইতিহাস লেখা।

    জানি নাকো আজ তুমি কোন্‌ লোকে রহি

    শুনিছ আমার গান হে কবি বিরহী!

    কোথা কোন্‌ জিজ্ঞাসার অসীম সাহারা,

    প্রতীক্ষার চির-রাত্রি, চন্দ্র, সুর্য, তারা,

    পারায়ে চলেছ একা অসীম বিরহে?

    তব পথ-সাথী যারা-পিছু ডাকি’ কহে,

    ‘ওগো বন্ধু শেফালির, শিশিরের প্রিয়!

    তব যাত্রা-পথে আজ নিও বন্ধু নিও

    আমাদের অশ্রু-আর্দ্র এ স্মরণখানি!’

    শুনিতে পাও কি তুমি, এ-পারের বাণী?

    কানাকানি হয় কথা এ-পারে ও-পারে?

    এ কাহার শব্দ শুনি মনের বেতারে?

    কতদূরে আছ তুমি কোথা কোন্‌ বেশে?

    লোকান্তরে না সে এই হৃদয়েরই দেশে

    পারায়ে নয়ন-সীমা বাঁধিয়াছ বাসা?

    হৃদয়ে বসিয়া শোন হৃদয়ের ভাষা?

    হারায়নি এত সূর্য এত চন্দ্র তারা,

    যেথা হোক আছ বন্ধু, হওনিকো হারা!…

    সেই পথ, সেই পথ-চলা গাঢ় স্মৃতি,

    সব আছে! নাই শুধু সেই নিতি নিতি

    নব নব ভালোবাসা প্রতি দরশনে,

    আরো প্রিয় ক’রে পাওয়া চির প্রিয়জনে—

    আদি নাই, অন- নাই, ক্লানি- তৃপ্তি নাই—

    যত পাই তত চাই-আরো আরো চাই,—

    সেই নেশা, সেই মধু নাড়ী-ছেঁড়া টান

    সেই কল্পলোকে নব নব অভিযান,—

    সব নিয়ে গেছ বন্ধু! সে কল-কল্লোল,

    সে হাসি-হিল্লোল নাই চিত-উতরোল!

    আজ সেই প্রাণ-ঠাসা একমুঠো ঘরে

    শূন্যের শূন্যতা রাজে, বুক নাহি ভরে!

    হে নবীন, অফুরন- তব প্রাণ-ধারা।

    হয়ত এ মরু-পথে হয়নি ক’ হারা,

    হয়ত আবার তুমি নব পরিচয়ে

    দেবে ধরা; হবে ধন্য তব দান ল’য়ে

    কথা-সরস্বতী! তাহা ল’য়ে ব্যথা নয়,

    কত বাণী এল, গেল, কত হ’ল লয়,

    আবার আসিবে কত। শুধু মনে হয়

    তোমারে আমরা চাই, রক্তমাংসময়!

    আপনারে ক্ষয় করি’ যে অক্ষয় বাণী

    আনিলে আনন্দ-বীর, নিজে বীণাপাণি

    পাতি’ কর লবে তাহা, তবু যেন হায়,

    হৃদয়ের কোথা কোন্‌ ব্যথা থেকে যায়!

    কোথা যেন শূন্যতার নিঃশব্দ ক্রন্দন

    গুমরি’ গুমরি’ ফেরে, হু-হু করে মন! …

    বাণী তব- তব দান- সে তা সকলের,

    ব্যথা সেথা নয় বন্ধু! যে ক্ষতি একের

    সেথায় সান্ত্বনা কোথা? সেথা শানি- নাই,

    মোরা হারায়েছি,- বন্ধু, সখা, প্রিয়, ভাই! …

    কবির আনন্দ-লোকে নাই দুঃখ-শোক,

    সে-লোকে বিরহে যারা তারা সুখী হোক!

    তুমি শিল্পী তুমি কবি দেখিয়াছে তারা,

    তারা পান করে নাই তব প্রাণ-ধারা!

    ‘পথিকে’ দেখেছে তারা দেখেনি ‘গোকুলে’,

    ডুবেনি ক’-সুখী তা রা-আজো তা’রা কূলে!

    আজো মোরা প্রাণা”ছন্ন, আমরা জানি না

    গোকুল সে শিল্পী গল্পী কবি ছিল কি-না!

    আত্মীয়ে স্মরিয়া কাঁদি, কাঁদি প্রিয় তরে

    গোকুলে পড়েছে মনে-তাই অশ্রু ঝরে! …

    * *  * *

    না ফুরাতে আশা ভাষা, না মিটিতে ক্ষুধা,

    না ফুরাতে ধরণীর মৃৎ-পাত্র-সুধা,

    না পূরিতে জীবনের সকল আস্বাদ-

    মধ্যাহ্নে আসিল দূত! যত তৃষ্ণা সাধ

    কাঁদিল আঁকড়ি’ ধরা, যেতে নাহি চায়!

    ছেড়ে যেতে যেন সব স্নায়ু ছিঁড়ে যায়!

    ধরার নাড়ীতে পড়ে টান! তরুলতা

    জল বায়ু মাটি সব কয় যেন কথা!

    যেয়ো নাকো যেয়ো নাকো যেন সব বলে-

    তাই এত আকর্ষণ এই জলে স্থলে

    অনুভব করেছিলে প্রকৃতি-দুলাল!

    ছেড়ে যেতে ছিঁড়ে গেল বক্ষ, লালে লাল

    হ’ল ছিন্ন প্রাণ! বন্ধু, সেই রক্ত ব্যথা

    র’য়ে গেল আমাদের বুকে চেপে হেথা!

    হে তরুণ, হে অরুণ, হে শিল্পী সুন্দর,

    মধ্যাহ্ন আসিয়াছিলে সুমেরু-শিখর

    কৈলাসের কাছাকাছি দারুণ তৃষ্ণায়,

    পেলে দেখা সুন্দরের, স্বরগ-গঙ্গায়

    হয়ত মিটেছে তৃষ্ণা, হয়ত আবার

    ক্ষুধাতুর!-স্রোতে ভেসে এসেছে এ-পার

    অথবা হয়ত আজ হে ব্যথা-সাধক,

    অশ্রু-সরস্বতী কর্ণে তুমি কুরুবক!

    হে পথিক-বন্ধু মোর, হে প্রিয় আমার,

    যেখানে যে লোকে থাক করিও স্বীকার

    অশ্রু-রেবা-কূলে মোর স্মৃতি-তর্পণ,

    তোমারে অঞ্জলি করি’ করিনু অর্পণ!

    * *  * *

    সুন্দরের তপস্যায় ধ্যানে আত্মহারা

    দারিদ্র্যে দর্প তেজ নিয়া এল যারা,

    যারা চির-সর্বহারা করি’ আত্মদান,

    যাহারা সৃজন করে, করে না নির্মাণ,

    সেই বাণীপুত্রদের আড়ম্বরহীন

    এ-সহজ আয়োজন এ-স্মরণ-দিন

    স্বীকার করিও কবি, যেমন স্বীকার

    করেছিলে তাহাদের জীবনে তোমার!

    নহে এরা অভিনেতা, দেশ-নেতা নহে,

    এদের সৃজন-কুঞ্জ অভাবে, বিরহে,

    ইহাদের বিত্ত নাই, পুঁজি চিত্তদল,

    নাই বড় আয়োজন,নাই কোলাহল;

    আছে অশ্রু, আছে প্রীতি, আছে বক্ষ-ক্ষত,

    তাই নিয়ে সুখী হও, বন্ধু স্বর্গগত!

    গড়ে যারা, যারা করে প্রাসাদ নির্মাণ

    শিরোপা তাদের তরে, তাদের সম্মান।

    দুদিনে ওদের গড়া প’ড়ে ভেঙে যায়

    কিন্তু স্রষ্টা সম যারা গোপনে কোথায়

    সৃজন করিছে জাতি, সৃজিছে মানুষ

    অচেনা রহিল তা’রা। কথার ফানুস

    ফাঁপাইয়া যারা যত করে বাহাদুরী,

    তারা তত পাবে মালা যমের কস’রী!

    ‘আজ’টাই সত্য নয়, ক’টা দিন তাহা?

    ইতিহাস আছে, আছে অবিষ্যৎ, যাহা

    অনন- কালের তরে রচে সিংহাসন,

    সেখানে বসাবে তোমা বিশ্বজনগণ।

    আজ তারা নয় বন্ধু, হবে সে তখন,-

    পূজা নয়-আজ শুধু করিনু স্মরণ।

    হুগলি

    ৩০ কার্তিক ১৩৩২

  • রুদ্রমঙ্গল

    রুদ্রমঙ্গল

    রুদ্রমঙ্গল

    ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ সঙ্কলনের প্রথম প্রকাশকাল জানা যায় না, কেননা মুদ্রিত পুস্তিকায় প্রকাশকালের উল্লেখ নেই। ৭৮ পৃষ্ঠার পুস্তিকা ‘রুদ্রমঙ্গলে’র মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীঅমূল্যচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, ‘ভট্টাচার্য্য প্রিণ্টিং ওয়ার্কস’, ২ নিবেদিতা লেন, বাগবাজার, কলিকাতা। মূল্য আট আনা।

    আলী আহমদ উল্লেখ করেছেন ‘রুদ্রমঙ্গল’ বর্মণ পাবলিশিং হাউস, কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রকাশনা সংস্থা হয়ত গ্রন্থটির পরিবেশক ছিলেন। প্রকাশকাল উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭৭— ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রকাশের পরে বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, প্রকাশকাল ১৯৭৭ হলে বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই, কেননা, ততদিনে বঙ্গীয় সরকার বিলুপ্ত হয়েছে। তবে, স্বাধীনতা লাভের পরে ১৯৭৭ সালে গ্রন্থটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে থাকবে।

    ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১লা ভাদ্র, ‘আমার পথ (‘ধূমকেতুর পথ’ শিরোনামে) ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে শ্রাবণ, ‘মোহর্‌রম’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১৬ই ভাদ্র, ‘বিষবাণী’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে ভাদ্র, ‘ক্ষুদিরামের মা’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২রা আশ্বিন এবং ‘ধূমকেতুর পথ’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে আশ্বিন তারিখের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি ছিল অর্ধসাপ্তাহিক, এর মালিক ও সম্পাদক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম স্বয়ং।

    ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল মুতাবিক ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১৯শে চৈত্র শুক্রবার কলিকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। সেই উপলক্ষে নজরু ইসলাম ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ২৬শে আগষ্ট মুতাবিক ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৯ই ভাদ্র তারিখের ‘গণবাণী’তে ‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং ২রা সেপ্টেম্বর মুতাবিক ১৬ই ভাদ্র তারিখের ‘গণবাণী’তে ‘হিন্দু-মুসলমান’ লেখেন।

  • রুদ্রমঙ্গল (প্রবন্ধ)

    রুদ্রমঙ্গল (প্রবন্ধ)

    রুদ্রমঙ্গল (প্রবন্ধ)

    নিশীথ রাত্রি। সম্মুখে গভীর তিমির। পথ নাই। আলো নাই। প্রলয়-সাইক্লোনের আর্তনাদ মরণ-বিভীষিকার রক্ত-সুর বাজাচ্ছে। তারই মাঝে মাকে আমার উলঙ্গ করে টেনে নিয়ে চলেছে আর চাবকাচ্ছে যে, সে দানবও নয়, দেবতাও নয়, রক্ত-মাংসের মানুষ। ধীরে ধীরে পিছনে চলেছে তেত্রিশ কোটি আঁধারের যাত্রী। তারা যতবার আলো জ্বালাতে চায়, ততবারই নিভে নিভে যায়। তাদের আর্তকণ্ঠে অসহায়ের ক্রন্দন, ‘বোধন না হতে মঙ্গলঘট ভেঙেছে –’। শুধু ক্রন্দন, শুধু হা-হুতাশ – শক্তি নাই, সাহস নাই।

    কোথায় আঘাতের দেবতা! আঘাত করো, আঘাত করো তাদেরে, যারা চোখের সামনে মায়ের অপমান দেখে শুধু ক্রন্দন করে, প্রতিকারের পন্থার অন্বেষণে উন্মত্ত উল্লাসে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে না! অবমানিত হয়ে যাদের চোখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত না হয়ে অশ্রজল নির্গত হয়, তাদের আঘাত করো, আঘাত করো হে আঘাতের দেবতা! মারো তাদের বুকে মুখে পিঠে – মারো তাদেরে। জাগাও তাদের আত্মসম্মান! পৌরুষ তাদের হুংকার দিয়ে পড়ুক অত্যাচারের বুকে।

    এ কী বেদনা! এ কী ক্রন্দন! উৎপীড়িতের আর্তনাদে, ‘মজলুমের ফরিয়াদে’ আকাশের সারা গায়ে আজ জ্বালা, বাতাসের নিশ্বাসে ব্যথা, মাতা বসুমতীর বুক ফেটে নির্গত হচ্ছে অগ্নিস্রাব আর ভস্মধূম। অত্যাচারীর ভীম নিষ্পেষণে বাসুকির অচল ফণা থরথর করে কাঁপছে, এই ভূমিকম্পের কম্পিতা ধরণিকে অভয়-তরবারি এনে সান্ত্বনা দেবে, কে আছ বীর? আনো তোমার প্রলয়-সুন্দর করাল-কমনীয় হস্ত! আনো তোমার রক্ত-কৃপাণের বিদ্যুৎ-হাসি, আনো তোমার মারণ-মঙ্গল অভয়-অসি! হে আমার ধ্বংসের দেবতা, একবার এই মহাপ্রলয়ের বুকে তোমার ফুলের হাসি দেখাও! স্তূপীকৃত শবের মাঝে শিবের জটার কচি শশী হেসে উঠুক! এই কুৎসিত অসুন্দর সৃষ্টিকে নাশ করো, নাশ করো হে সুন্দর রুদ্র-দেবতা! এই গলিত আর্ত সৃষ্টির প্রলয়-ভস্মটিকা পরে নবীন বেশে এসে দেখা দাও!

    জাগো জনশক্তি! হে আমার অবহেলিত পদপিষ্ট কৃষক, হে আমার মুটে-মজুর ভাইরা! তোমার হাতে এ-লাঙল আজ বলরাম-স্কন্ধে হলের মতো ক্ষিপ্ত তেজে গগনের মাঝে উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠুক, এই অত্যাচারীর বিশ্ব উপড়ে ফেলুক – উলটে ফেলুক! আনো তোমার হাতুড়ি, ভাঙো ওই উৎপীড়কের প্রাসাদ – ধূলায় লুটাও অর্থপিশাচ বল-দর্পীর শির। ছোঁড়ো হাতুড়ি, চালাও লাঙল, উচ্চে তুলে ধরো তোমার বুকের রক্ত-মাখা লালে-লাল ঝান্ডা! যারা তোমাদের পায়ের তলায় এনেছে, তাদের তোমরা পায়ের তলায় আনো। সকল অহংকার তাদের চোখের জলে ডুবাও। নামিয়ে নিয়ে এসো ঝুঁটি ধরে ওই অর্থ-পিশাচ যক্ষগুলোকে। তোমাদের পিতৃ-পুরুষের রক্ত-মাংস-অস্থি দিয়ে ওই যক্ষের দেউল গড়া, তোমাদের গৃহলক্ষ্মীর চোখের জল আর দুধের ছেলের হৃৎপিণ্ড নিঙড়ে তাদের ওই লাবণ্য, ওই কান্তি। তোমাদের অভিশাপ-তিক্ত মারি-বিষ-জ্বালা লাগিয়ে তাদের সে-কান্তি, সে-লাবণ্য জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দাও : বলো নির্জিত ভাইরা আমার, বলো উৎপীড়িত বোনেরা আমার, বলো বেদনাতুর অভাব-ক্লিষ্ট নর-নারী–

    জয় ভৈরব জয় শংকর

    জয় জয় প্রলয়ংকর

    শংকর! শংকর!

    মারো তোমার ত্রিশূল ছুঁড়ে, দুলাও তোমার সর্বনাশের ঝাণ্ডা, কে আছ ভৈরব-পন্থী নর-নারী আর হাঁকো – হাঁকো, –

    জয় ভৈরব জয় শংকর!

    জয় জয় প্রলয়ংকর!

    শংকর! শংকর!

  • আমার পথ

    আমার পথ

    আমার পথ

    আমার এই যাত্রা হল শুরু

    ওগো কর্ণধার,

    তোমারে করি নমস্কার।

    ‘মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে’ ‘জয় প্রলয়ংকর’ বলে ‘ধূমকেতু’কে রথ করে আমার আজ নতুন পথে যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। আমি প্রথমে আমার যাত্রা-শুরুর আগে আমার সত্যকে সালাম জানাচ্ছি–নমস্কার করছি। যে-পথ আমার সত্যের বিরোধী, সে-পথ ছাড়া আর কোন পথই আমার বিপথ নয়! রাজভয়–লোকভয় কোন ভয়ই আমায় বিপথে নিয়ে যাবে না। আমি যদি সত্যি করে আমার সত্যকে চিনে থাকি, যদি আমার অন্তরে মিথ্যার ভয় না থাকে, তাহলে বাইরের কোন ভয়ই আমার কিছু করতে পারবে না। যার ভিতরে ভয়, সেই তার ভয় পায়। আমার বিশ্বাস, যে নিজেকে চেনে, তার আর কাউকে চিনতে বাকি থাকে না। অতএব যে মিথ্যাকে চেনে, সে মিছামিছি তাকে ভয়ও করে না। যার মনে মিথ্যা, সে-ই মিথ্যাকে ভয় করে। নিজেকে চিনলে মানুষের মনে আপনা-আপনি এত বড়ো একটা জোর আসে যে, সে আপন সত্য ছাড়া আর কারুক্‌খে কুর্নিশ করে না–অর্থাৎ কেউ তাকে ভয় দেখিয়ে পদানত রাখতে পারে না। এই যে নিজেকে চেনা, আপনার সত্যকে আপনার গুরু, পথ-প্রদর্শক কান্ডারি বলে জানা, এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়। এটা আত্মকে চেনার সহজ স্বীকারোক্তি। আর যদিই এটাকে কেউ ভুল করে অহংকার বলে মনে করেন, তবু এটা মন্দের ভাল–অর্থাৎ মিথ্যা বিনয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভাল–লাখ গুণে ভাল। অনেক সময় খুব বেশি বিনয় দেখাতে গিয়ে নিজের সত্যকে অস্বীকার করে ফেলা হয়। ওতে মানুষকে ক্রমেই ছোটো করে ফেলে, মাথা নীচু করে আনে। ওরকম মেয়েলি বিনয়ের চেয়ে অহংকারের পৌরুষ অনেক–অনেক ভাল।

    অতএব এই অভিশাপ-রথের সারথির স্পষ্ট কথা বলাটাকে কেউ যেন অহংকার বা স্পর্ধা বলে ভুল না করেন।

    স্পষ্ট কথা বলায় একটা অবিনয় নিশ্চয় থাকে; কিন্তু তাতে কষ্ট পাওয়াটা দুর্বলতা। নিজেকে চিনলে, নিজের সত্যকেই নিজের কর্ণধার মনে জানলে নিজের শক্তির উপর অটুট বিশ্বাস আসে। এই স্বাবলম্বন, এই নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস করতেই শিখাচ্ছিলেন মহাত্মা গান্ধিজি। কিন্তু আমরা তাঁর কথা বুঝলাম না, ‘আমি আছি’ এই কথা না বলে সবাই বলতে লাগলাম, ‘গান্ধিজি আছেন।’ এই পরাবলম্বনই আমাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেললে। একেই বলে সবচেয়ে বড়ো দাসত্ব। অন্তরে যাদের এত গোলামির ভাব, তারা বাইরের গোলামি থেকে রেহাই পাবে কী করে? আত্মকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে। এই আত্মনির্ভরতা যেদিন সত্যি সত্যিই আমাদের আসবে, সেই দিনই আমরা স্বাধীন হব, তার আগে কিছুতেই নয়। নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে অন্য একজন মহাপুরুষকে প্রাণপণে ভক্তি করলেই যদি দেশ উদ্ধার হয়ে যেত, তাহলে এই তেত্রিশ কোটি দেবতার দেশ এতদিন পরাধীন থাকত না। আত্মকে চেনা, নিজের সত্যকে নিজের ভগবান মনে করার দম্ভ–আর যাই হোক, ভণ্ডামি নয়। এ-দম্ভতে শির উঁচু করে, পুরুষ করে, মনে একটা ‘ডোন্ট কেয়ার’-ভাব আনে। আর যাদের এই তথাকথিত দম্ভ আছে, শুধু তারাই অসাধ্য সাধন করতে পারবে।

    থাক ‘ধূমকেতু’-রথ সম্বন্ধে একটু বলা যাক এখন। শুনেছি নাকি ঝগড়ার আদি নারদ মুনি ঢেঁকিতে চড়ে স্বর্গ হতে আসতেন। অর্থাৎ তাঁর ওই ঢেঁকি অমঙ্গলসূচক ছিল, ও ঢেঁকি দেখা গেলেই মর্ত্যলোকে মনে করত এইবার একটা বিষমঝগড়া-ফ্যাসাদ মারামারি কাটাকাটি লেগে যাবে। আর নাকি হতও তাই। আমির মনে করি কি, এই ধূমকেতুই ছিল তাঁর ঢেঁকি বা অগ্নিরথ। কেন না, ধূমকেতুর উদয় হলেই ওই রকম ঝগড়া-ফ্যাসাদ মারামারি কাটাকাটি কুড়ুম তালে লেগে যায়। বিপ্লব-বিদ্রোহ আর মহাপ্রলয় আনে। আমি হামজার পুথিতেও আছে যে উম্মর উম্মিরা এইরকম কোন একটা ঢেঁকি কুলো নিয়ে গগন-মার্গে চলাফেরা করতেন। তার দুটো লাইন এখনও মনে পড়ে–

    কাগজের ঢাল মিয়াঁর তালপাতার খাঁড়া।

    আর লড়ির গলায় দড়ি দিয়ে বলে চল হামারা ঘোড়া।

    ‘সারথি’মানে এই অগ্নি-এরোপ্লেন ধূমকেতুর পাইলট বা চালানেওয়ালা।

    এ-ধূমকেতু’ ঝগড়া-বিবাদ আনবে না, তবে প্রলয় যদিই আনে, তাহলে সেটার জন্যে দায়ী ধূমকেতুর দেবতা,–সারথি নয়। এ-দেশের নাড়িতে-নাড়িতে অস্থিমজ্জায় যে পচন ধরেছে, তাতে এর একেবারে ধ্বংস না হলে নতুন জাত গড়ে উঠবে না। যার ভিত্তি পচে গেছে তাকে একদম উপড়ে ফেলে নতুন করে ভিত্তি না গাঁথলে তার ওপর ইমারত যতবার খাড়া করা যাবে, ততবারই তা পড়ে যাবে। প্রলয় আনার যে দুর্দম অসম-সাহসিকতা, ‘ধূমকেতু’ যদি তা না আনতে পারে, তবে তাতে অমঙ্গলের চেয়ে মঙ্গলই আনবে বেশি।

    দেশের যারা শত্রু, দেশের যা-কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি তা সব দূর করতে ‘ধূমকেতু’হবে আগুনের সম্মার্জনী! ‘ধূমকেতু’র এমন গুরু বা এমন বিধাতা কেউ নেই, যার খাতিরে সে সত্যকে অস্বীকার করে কারুর মিথ্যা বা ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেবে। ‘ধূমকেতু’ সে-দাসত্ব হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। ‘ধূমকেতু’ কোনদিনই কারুর বাণীকে বেদবাক্যি বলে মেনে নেবে না, যদি তার সত্যতা প্রাণে তার সাড়া না দেয়। না বুঝে বোঝার ভণ্ডামি করে পাঁচ জনের শ্রদ্ধা আর প্রশংসা পাবার লোভ ‘ধূমকেতু’ কোনদিনই করবে না।

    ভুলের মধ্য দিয়ে গিয়েই তবে সত্যকে পাওয়া যায়। কোন ভুল করছি বুঝতে পারলেই আমি প্রাণ খুলে তা স্বীকার করে নেব! কিন্তু না বুঝেও নয়, ভয়েও নয়। ভুল করছি বা করেছি বুঝেও শুধু জেদের খাতিরে বা গোঁ বজায় রাখবার জন্যে ভুলটাকেই ধরে থাকব না। তাহলে ‘ধূমকেতু’র আগুন সেই দিনই নিবে যাবে। একমাত্র মিথ্যার জলই ‘ধূমকেতু’-শিখাকে নিবাতে পারবে। তাছাড়া ধূমকেতুকে কেউ নিবাতে পারবে না।

    ‘ধূমকেতু’ কোন সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মানুষ-ধর্মই সবচেযে বড়ো ধর্ম। হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোন্খানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে যেখানে প্রাণের মিল, আদত সত্যের মিল, সেখানে ধর্মের বৈষম্য, কোন হিংসার দুশমনির ভাব আনে না। যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে, যে নিজের ধর্মের সত্যকে চিনেছে, সে কখনও অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।

    …দেশের পক্ষে যা মঙ্গলকর বা সত্য, শুধু তাই লক্ষ্য করে আমরা এই আগুনের ঝান্ডা দুলিয়ে পথে বাহির হলাম।

    জয় প্রলয়ংকর!

  • মোহর্‌রম

    মোহর্‌রম

    মোহর্‌রম

    ফিরে এসেছে আজ সেই মোহর্‌রম—সেই নিখিল-মুসলিমের ক্রন্দন-উৎসবের দিন। কিন্তু সত্য করে আজ কে কেঁদেছে বলতে পার হে মুসলিম? আজ তোমার চোখে অশ্রু নাই। আজ ক্রন্দন-স্মৃতি তোমার উৎসবে পরিণত! তোমার অশ্রু আজ ভণ্ডামি, ক্রন্দন আজ কৃত্রিম কর্কশ চিৎকার। চুপ রও কাপুরুষ। ‘হায় হাসান, হায় হোসেন!’ বলে মিথ্যা বীভৎস চিৎকার করে আর মা ফাতেমার পুত্র-শোকাতুর আত্মাকে পীড়িত করে তুলো না। এ ক্রন্দন-অভিনয় দেখিয়ে আল্লার মুখ আর কালো করে দিয়ো না। তোমাদের ঐ যে উদ্দাম বুক-চাপড়ানির বীভৎসতা, সে ব্যর্থ হয়নি ভীরুর দল! সে আঘাত আল্লার হাবিব হজরত মোহাম্মদের (দঃ) বুকে গিয়ে বেজেছে। যাঁরা ধর্মের জন্যে সত্যের জন্যে জান কোরবান করেছেন, আজ সেই শহীদ বীরদের জন্যে ক্রন্দন অভিনয় করে আর তাঁদের আত্মার অপমান কোরো না নৃশংস অভিনেতার দল!

    তোমার ধর্ম নাই, অস্তিত্ব নাই, তোমার হাতে শম্‌শের নাই, শির নাঙ্গা, তোমার কোরআন পর-পদদলিত, তোমার গর্দানে গোলামির জিঞ্জির, যে শির আল্লার আরশ ছাড়া আর কোথাও নত হয় না, সেই শিরকে জোর করে সেজ্‌দা করাচ্ছে অত্যাচারী শক্তি–আর তুমি করছ আজ সেই শহীদদের–ধর্মের জন্য স্বাধীনতার জন্য শহীদদের–‘মাতমে’র অভিনয়! আপসোস আপসোস—মুসলিম! আপসোস!!

    কোথায় কারবালা-মাতম তা কি দেখেছ, অন্ধ? একবার চোখ খুলে দেখো, দেখবে কোথায় কারবালার দুপুরে মাতম হাহাকার-রবে ক্রন্দন করে ফিরছে। আজ কারবালা শুধু আরবের ঐ ধু-ধু সাহারার বুকে নয়, ঐ ফোরাত নদীর কূলে নয় – আজ কারবালার হাহাকার ঐ নিখিল নিপীড়িত মুসলিমের বুকের সাহারায়, তোমার অপমান-জর্জরিত অশ্রু-নদীর কূলে!

    মা ফাতেমা আরশের পায়া ধরে কাঁদছেন, স্কন্ধে তাঁর হাসানের বিষ-মাখা নীল পিরান আর হোসেনের খুন-মাখা রক্ত-উত্তরীয়। পুত্র-হারার আকুল ক্রন্দন খোদার আরশ কেঁপে উঠছে।

    হে যুগে যুগে শোক-অভিনেতা মুসলিমের দল! থামাও–থামাও মা ফাতেমার ক্রন্দন–থামাও আল্লার আরশের ভীতি-কম্পন। তোমার স্বাধীনতাকে তোমার সত্যকে তোমার ধর্মকে যে-এজিদের বংশধরেরা লাঞ্ছিত নিপীড়িত করছে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের ভূ-অবলুণ্ঠিত শির উঁচু হয়ে উঠুক। তোমার ইসলামকে অক্ষতদেহ উন্নতশির করে রাখো, তোমার স্বাধীনতা তোমার সত্যকে রক্ষা করো, দেখবে পুত্রশোকাতুরা জননী মা ফাতেমার ক্রন্দন থেমে গিয়েছে, আল্লার আরশের কম্পন থেমেছে।

    ঐ শোনো কাসেমের অতৃপ্ত আত্মা ফরিয়াদ করে ফিরছে–তৃষ্ণা, তৃষ্ণা!’ কে দেবে এ-তৃষ্ণাতুর তরুণকে তৃষ্ণার জল? এ-তৃষ্ণা আবে-জমজম আবে-কওসরেও মিটবার নয়। এ-কারবালার মরু-দগ্ধ পিয়াসী চায় নিখিল-মুসলিম তরুণের রক্ত, ধর্ম আর স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে প্রাণ-বলিদান। কে আছ অরুণ-খুনের তরুণ-শহীদ মুসলিম, কাসেমের এ-তৃষ্ণা এ-ক্রন্দন-তিক্ততা মেটাবে?

    ঐ শোনো সদ্য স্বামীহারা বালিকা সকীনার মর্মভেদী ক্রন্দন, সে চায় না তার স্বামী কাসেমের প্রাণ, সে চায় ইসলামের স্বাধীনতা-রক্ষার জন্যে কাসেমের মতো প্রাণ-বলিদান।

    আজ নিখিল মুসলিম-অঙ্গন তোমার কারবালা-প্রান্তরে হে মুসলিম! তার মাঝে আকুল অবিশ্রাম-ক্রন্দন গুমরে ফিরেছে–‘তৃষ্ণা–তৃষ্ণা!’

    আল্লার পানে তাকাও, রসুলের দিকে চেয়ে দেখো, মা ফাতেমা, হজরত আলীর মাতম শোনো, কাসেমের, সকীনার–অতৃপ্তির আকুল কাঁদন-রনরনি শোনো, কচি শিশু আসগরের তীর-বেঁধা কাঁচা কলিজার খুন-খারাবির কথা স্মরণ করো, আর তোমার কর্তব্য নির্ধারণ করো, হে মুসলিম! মোহর্‌রমের খুন-খারাবি আজ তোমার লক্ষ্য স্থির করে দিক। আজিন!

  • বিষ-বাণী

    বিষ-বাণী

    বিষ-বাণী

    মাভৈঃ! মাভৈঃ!! ভয় নাই, ভয় নাই–ওগো আমার বিষ-মুখ অগ্নি-নাগ-নাগিনীপুঞ্জ! দোলা দাও, দোলা দাও তোমাদের কুটিল ফণায় ফণায়। তোমাদের যুগ যুগ-সঞ্চিত কাল-বিষ আপন আপন সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে ফেলো। তোমাদের বিভূতি-বরণ অঙ্গ কাঁচা বিষের গাঢ় সবুজ রাগে রেঙে উঠুক। বিষ সঞ্চয় করো, বিষ সঞ্চয় করো–হে আমার তিক্ত-চিত ভুজঙ্গ তরুণ দল! তোমাদের ধরবে কে? মারবে কে? যে ধরতে আসবে, তার হাড়-মাংস খসে খসে পড়বে উগ্র বিষের দাহনে। কোন্ দুঃসাহসী বন্দী করবে তোমাদেরে? কারার লৌহদণ্ড দারুণ বিষ-দাহনে খসে গলে পড়বে। অত্যুগ্র নিশ্বাস-বহ্নিতে কারার কন্দরে-কন্দরে ধুধু ধুধু করে আগুন–আগুন জ্বলে উঠবে। তোমার তড়িৎ-জিহ্বার মুহূর্ত-ইঙ্গিতে জল্লাদের হাতে খড়্গ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, ফাঁসির রজ্জু ভস্ম হয়ে যাবে। বিষ সঞ্চয় করো, হে আমার হলাহল-পুরবাসী কূটনাগ-নাগিনিকুল। এত–বিষ এমন বিষ–যা শুধু জ্যান্ত অবস্থাতেই অত্যাচারে দগ্ধে মারবে না, মরবার পরও যে বিষ শ্বাশত সম-তেজা সম-উগ্র হয়ে থাকবে। নিদাঘ মধ্যাহ্নের তাপ-দগ্ধ রুদ্র-বৈশাখী ঝড়ে ঝড়ে চিতায়-ভস্মীভূত তোমাদের বিষ স্ফুলিঙ্গ উড়ে বেড়াবে দিগন্তের কোলে কোলে–গৃহীর প্রাঙ্গনে প্রাঙ্গনে, বলদর্পীর মহলে-মহলে। মা ডুকরে কেঁদে উঠবে, আর বিষ-জ্বালায় শিশু-পুত্র তার আর্তনাদ করে করে নীল হয়ে, শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়ে মাতৃক্রোড়ে মরতে থাকবে, যেমন কারবালা কচি শিশু আসগর ‘তৃষ্ণা তৃষ্ণা’ করে জহরমাখা তীর খেয়ে মরেছিল!

    তোমাদের গোরস্থানে তোমাদের শ্মশানে বিষ-বায়ু দিনে ঘূর্ণিরূপে শিস দিয়ে ঘুরে বেড়াবে আর রাতে অনির্বাণ আলেয়া-শিখা হয়ে নেচে নেচে বেড়াবে। ঐ শ্মশানে, ঐ গোরস্তানে যে যাবে, সে আর জ্যান্ত ফিরে আসবে না।

    মরেও তোমাদের বিষ যাবে না, প্রতি অস্থিকণায়, প্রতি মৃত্তিকা-পরমাণুতে তোমাদের উদ্‌গারিত কূট-হলাহল মিশ্রিত থাকবে। সে-অস্থি যার গায়ে বিঁধবে, সে দগ্ধমৃত্তিকার যার গায়ে ছোঁয়া লাগবে সে তখনই বিষ-জর্জরিত, ভস্ম হয়ে যাবে। চাই এত জ্বালাময় হলাহল, এমনই মারিভয়-হানা মারিবিষ। তোমাদেরে দেহ হবে সহস্র বৃশ্চিক কোটি হুল-বহুল। যে তোমাদেরে বাঁধতে আসবে, ঐ সহস্র বৃশ্চিক-যুক্ত কোটি হুল একসাথে তাকে উগ্র রোষে দংশন হানবে।

    * * *

    আমাদের কাছে প্রেম ভণ্ডামি, করুণা বিদ্রুপ, প্রণয় কশাঘাত, প্রীতি ভীরুতা।

    আমাদের বিবাহের লাল চেলি দেশশত্রুর রক্ত-রাঙা উত্তরীয়, ভীম-তরবারি আগ্নেয়াস্ত্র আমাদের শয়নসাথী, ফাঁসির রশি আমাদের প্রিয়ার ভুজবন্ধন।

    মড়ামুখ দেখে আমাদের গৃহত্যাগ, রক্ত-ঝরা প্রাণ, ঝাঁঝরা-করা বক্ষ নিয়ে রণাঙ্গনে আমাদের আরাম-শয়ন। বুকে প্রতিদ্বন্দ্বীর বেয়নেটের সঙ্গিন-ঘাত, সে যেন আমার মাতৃহারা পুত্রের অভিমান-মার। স্কন্ধে ঘাতকের ভীম খড়্গাঘাত, সে যেন আমাদের প্রিয়ার কোল হতে দুষ্টু আদরিণী মেয়ের ঝাঁপিয়ে পড়া।

    আমরা যাকে হিংসা করি, তাকে শুধু মেরেই ক্ষান্ত হই না, তার বক্ষ বিদীর্ণ করে কাঁচা হৃৎপিণ্ড চিবিয়ে খাই, তার মাংস নিয়ে লোফালুফি খেলি, তার রক্তে তৃষ্ণা মেটাই, তার হাড্ডিচূর্ণ দিয়ে নস্য নিই। তার মাথার খুলি আমাদের পানপাত্র, তার মগজ আমাদের প্রদীপের রওগান।

    আমরা শয়তানের চেয়েও ক্রূর, পিশাচের চেয়েও নির্মম অকরুণ, ভূত-প্রেত-ডাকিনী-যোগিনীর চেয়েও ভয়াল, সতীহারা শিবের চেয়েও উন্মাদ, ভৃগুর চেয়েও বিদ্রোহী।

    প্রতিহিংসা আমাদের ক্ষমা, পায়ের নীচে এনে বুকে হাঁটু গেড়ে বসে টুঁটি টিপে ধরে হাত জিভ বের করে তবে দয়া। রৌদ্র-শুষ্ক বীভৎসতা আমাদের সুন্দর-পূজা।

    আমাদের যুক্তি-তর্ক নাই, কাণ্ডাকাণ্ডজ্ঞান নাই, আমরা খেয়ালী, অতি বড়ো পাষণ্ড নরাধম নারকী পশু। আমরা গাল খেয়ে বুক চাপড়াই, প্রশংসা শুনে মুখে থুথু দি।

    নরকের রাজা যে-কাজ করতে শিউরে উঠে, আমরা হাসতে হাসতে তা করে যাই।

    আমরা অবিনশ্বর। আমাদের একজন যায়, একশো জন আসে। আমাদের একবিন্দু রক্ত ভূতলে পড়লে একলক্ষ বিদ্রোহী নাগশিশু বসুমতী বিদীর্ণ করে উঠে আসে। আমরা অদম্য। আমাদের একজন বাঁধা পড়লে একশো জন ছাড়া পায়, সহস্র ভুজঙ্গ ছুটে এসে তার স্থান পূর্ণ করে।

    আমরা দেশ-শত্রু বিভীষণের মহাকালান্তক কাল। আমরা অকাট্য ব্রহ্মশাপ! পরীক্ষিতের মতো, লখিন্দরের মতো দুর্ভেদ্য ছিদ্রহীন দুর্গের মধ্যে থাকলেও দেশবিদ্রোহীকে আমরা তক্ষক হয়ে, সূত্ররূপী কালসাপ হয়ে দংশন করে মারি।

    আমাদের বিদ্রোহ যারা দেশ জয় করেছে তাদের উপর নয়, আমাদের বিদ্রোহ দেশদ্রোহীদের উপর। যখন আইরিশ তরুণ দেশদ্রোহী রবার্ট এমেটকে ফাঁসি দিয়ে তাকে তিন খণ্ড করে কেটে রাস্তার মোড়ে টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তার সেই খণ্ডিত দেহে লেখা হয়েছিল, ‘How a traitor should be treated’–দেখো, দেশদ্রোহীর দুর্দশা–সেই দুর্দশার কথা স্মরণ করো, হে দেশদ্রোহী মাতৃহন্তা বিভীষণের দল।

    তোমাদের নামে শেষ ঘণ্টা বেজেছে মায়ের রক্ত-মন্দির অঙ্গনে। তোমাদের বিরুদ্ধে অসুর-নাশিনী দনুজ-দলনী মা-র রক্ত-তৃষাতুর জিহ্বা লক-লক করে উঠেছে।

    এসো আমার মণিহারা কালফণীর দল, তোমাদের প্রেমের কেতকী-কুঞ্জ ছেড়ে অন্ধকার বিবর ত্যাগ করে। এসো মায়ের আমার শ্মশান-শায়িত আঘাত-জর্জরিত মৃত্যু শয্যা পার্শ্বে। হয় মৃত-সঞ্জীবনী আনো, নয় ভাল করে চিতাগ্নি জ্বলে উঠুক! বলো, মাভৈঃ! মাভৈঃ!! বলো–

    হর হর শংকর

    বলো, জয় ভৈরব জয় শংকর

    জয় জয় প্রলয়ংকর

    শংকর! শংকর!!

  • ক্ষুদিরামের মা

    ক্ষুদিরামের মা

    ক্ষুদিরামের মা

    ক্ষুদিরামের ফাঁসির সময়ের একটা গানে আছে, ক্ষুদিরাম বলছে –

    ‘আঠার মাসের পরে

    জনম নেব মাসীর ঘরে, মা গো,

    চিনতে যদি না পার মা

    দেখবে গলায় ফাঁসি–’

    একবার বিদায় দে মা ফিরে আসি।

    সেই হারা-ক্রন্দনের আশ্বাস-গান শুনে আজও অতি বড় পাষাণী মেয়েরও চোখে জল আসে, গা শিউরে ওঠে। আমাদের মত কাপালিকেরও রক্ত-আঁখি আঁখির সলিলে টলটল করে ওঠে। কিন্তু বলতে পার কি দেশের জননীরা, আমাদের সেই হারা-ক্ষুদিরাম তোমাদের কার ঘরে এসেছে? তোমরা একবার তোমাদের আপন আপন ছেলের কণ্ঠের পানে তাকাও, দেখবে–তাদের প্রত্যেকের গলায় ক্ষুদিরামের ফাঁসির নীল দাগ। ক্ষুদিরাম ছিল মাতৃহারা। সে কোন্ মাকে ডেকে আবার আসব বলে আশ্বাস দিয়ে গেছে, কেঁদে গেছে, তা যদি বুঝতে বাংলার মা-রা, তাহলে তোমাদের প্রত্যেকটি ছেলে আজ ক্ষুদিরাম হত। ক্ষুদিরাম ছেলেবেলায় মা হারিয়ে–পেয়েছিল সারা দেশের মায়েদের। মায়ের স্নেহের ক্ষুধা তার মেটেনি, তোমাদের সকলকে মা বলে ডেকেও সে তৃপ্ত হয়নি, তাই আবার আসব বলে কেঁদে গেছে। এবার অভিমানী ছেলে মায়ের ঘরে আসবে না, মাসীর ঘরে আসবে। কিন্তু অভিমানী হলে কী হয় মা, ও ছিল বোকা ছেলে, তাই বুঝতে পারেনি যে, মাসীর ঘর বলে অভিমান করে যার ঘরে আসতে চেয়েছে, সেও যে মায়েরই ঘর। সবাই যে তার মা।

    মায়ের সাড়া পায় নাই, মা-রা তাকে কোলে নেয়নি, তাই অভিমানে সে আত্মবলিদান দিয়ে আত্ম-নির্যাতন করে মায়েদের অনাদরের প্রতিশোধ নিয়েছে। যাবার বেলায় দস্যি ছেলে এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলে গেল না। হায় হতভাগা ছেলে! সে কাঁদবে কার জন্যে? যার জন্যে কাঁদবার কেউ নেই, তার চোখের জল যে লজ্জা, তার কাঁদাটাও যে অপমান, মা। দস্যিছেলে সব চোখের জলকে কণ্ঠের নীচে ঠেলে রাখলে। ফাঁসি পরে নীলকণ্ঠ হবার আগেই ব্যথায় নীলকণ্ঠ হয়ে গেল। প্রাণের তিক্ত ক্রন্দনের জ্বালা তার কেউ দেখলে না, দেখলে শুধু কিশোর ঠোঁটের অপূর্ব হাসি। ফাঁসি হতে আর দু-চার মিনিট বাকি, তখনও সে তার নিজের ফাঁসির রশির সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত যে, ফাঁসির রজ্জুতে মোম দেওয়া হয় কেন! তোমরা কী ভাবছ মা যে, কী সাংঘাতিক ছেলে বাপু! কিন্তু ছেলে যতই সাংঘাতিক হোক, সত্যি করে বল দেখি মা, ঐ মাতৃহারার তোমাদেরই মুক্তির জন্য ফাঁসিতে যাওয়ার কথা শোনার পরেও কি তোমরা নিজেদের দুলালদেরে বুকে করে শুয়ে থাকতে যন্ত্রণা পাও না? ঐ মাতৃহারার মরা লাশ কি তোমাদের মা ছেলের মধ্যে এসে শুয়ে একটা ব্যবধানের পীড়া দেয় না? নিজের ছেলেকে যখন আদর করে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় যাবতীয় সামগ্রী খাওয়াও, নিবিড় স্নেহে বুকে চেপে ধরে শুয়ে ঘুম পাড়াও, একটু অসুখ করলে তেত্রিশ কোটি দেবতার পায়ে মাথা-মুড়-খোঁড়, তখন কি এই মাতৃহীন ক্ষুদিরামের কথা–তারই মত আরও সব লক্ষ্মীছাড়া মাতৃহারাদের কথা মনে হয়ে তোমাদের বুকে কাঁটার মত বেঁধে না? তোমাদের এত স্নেহ এত মায়া কি অনুশোচনায় লজ্জায় সংকুচিত হয়ে ওঠে না? বল মা, উত্তর দাও! আজ ঐ ক্ষুদিরামের মত শত লক্ষ্মীছাড়া ছেলে এসে তোমাদেরে তোমাদের মাতৃহৃদয়ের নামে জিজ্ঞাসা করেছে, উত্তর দাও! জানি মা, উত্তর দিতে পারবে না, মুখে কথা ফুটবে না। তুমি বলতে যাবে, কিন্তু অমনি তোমার মনের মা তোমার মুখ টিপে ধরবে। বোবা হয়ে যাবে মা, বোবা হয়ে যাবে, মুখ কালো হয়ে যাবে অনুতাপের দগ্ধ অনুশোচনায়।

    মানুষের মন আর আত্মা এমনই বালাই মা যে, পরের দুঃখ দেখে তার নিজের ভোগ বিস্বাদ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে মা-দের। মাতৃহারা এক পাশে দাঁড়িয়ে জল-ছলছল চোখে যদি চায়, তাহলে তোমার হাত উঠবে না মা তোমার ছেলের মুখে কিছু তুলে দিতে, আপনি শিথিল হয়ে যাবে। এটাও সওয়া যায়। কিন্তু যদি কোন মাতৃহারা বিদ্রোহ করে কারুর কাছে কিছু না চায়। মাথা উঁচু করে কোন মায়ের ঘরের পানে না তাকিয়ে তার রুক্ষ কেশ লক্ষ্মীছাড়া মূর্তির রুদ্রকেতন উড়িয়ে চলে যায়, ডাকলেও ঘরের পানে তাকায় না, মায়ের ডাকে চোখ ছলছল না করে উলটো আত্মনির্যাতন করে তোমাদের চোখের সামনে,–তাহলে মায়ের মন কেমন করে ওঠে বল দেখি? হে আমার দেশের জননীরা! তোমাদের কাছে এসেছে তেমনই বিদ্রোহী লক্ষ্মীছাড়া মাতৃহারার দল, তাদের হারানো ক্ষুদিরামকে খুঁজে নিতে। ভয় কোরো না, বিদ্রুপ কোরো না এদেরে মা, এরা ভিখারী ছেলে নয়। আমরা মায়ের বিদ্রোহী ছেলে, আমরা তোমাদের কাছে করুণ ভিক্ষা করতে আসিনি, আসবও না। আমরা এসেছি আমাদের দাবি নিয়ে, আমাদের হারানো ক্ষুদিরামকে ফিরে নিতে। সে যে আমাদের মাতৃহারার দলের, সে তোমাদের নয়, মা।

    আমাদের মা নাই। আমাদের মা দয়া করে আমাদের ছেলেবেলাতেই আমাদেরে ফেলে স্বর্গে গেছেন, তাঁরা আর করুণা করে কখ্‌খনো ফিরে আসবেন না। তাঁরা জানতেন আমরা সবাই ক্ষুদিরাম, আমাদেরে মায়া করে আমাদের মা-রা লক্ষ্মী ছেলে করে তোলেন নি, তাঁরা আমাদের পথের ধুলোয় ফেলে ক্ষুদিরামের নামে রেখে গেছেন।

    ক্ষুদিরাম গেছে, কিন্তু সে ঘরে ঘরে জন্ম নিয়ে এসেছে কোটি কোটি ক্ষুদিরাম হয়ে। তোমরা চিনতে পারছ না, মা, তোমরা মায়ায় আবদ্ধ। ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও আমাদের ক্ষুদিরামকে–তোমাদের ছেলেদেরে ছেড়ে দাও, ওরা আমাদের–আমাদের লক্ষ্মীছাড়ার দলের। ওরা মায়েদের নয়, ওরা ঘরের নয়, বনের। ওরা হাসির নয়, ফাঁসির। ঐ যে কণ্ঠ হাত দিয়ে জড়িয়ে বুকে চেপে ধরছ, ঐ কণ্ঠে ফাঁসির নীল দাগ লুকানো আছে। ছেড়ে দাও মা, ছেড়ে দাও, ওরা তোমার নয়; আমার নয়, ওরা দেশের, ওরা বলিদানের, ওরা পূজার!

    কোথায় ভাই ক্ষুদিরাম? আঠার মাসের পরে আসবে বলে গেছে, এসেওছ প্রতি ঘরে ঘরে। কিন্তু আঠারো বছর যে কেটে গেল ভাই, সাড়া দাও সাড়া দাও আবার, যেমন যুগে যুগে সাড়া দিয়েছ ঐ ফাঁসি-মণ্ডপের রক্ত-মঞ্চে দাঁড়িয়ে। তোমার সাথে আমাদের বারবার দেখাশোনা ঐ ফাঁসি-পরা হাসিমুখে! আর একবার সাড়া দিয়েছিলে তুমি আয়র্ল্যাণ্ডে রবার্ট এমেট নামে। সেদিনও এমনই তরুণ বয়সে তুমি ফাঁসির কৃষ্ণ-আলিঙ্গন, খড়্গের সুনীল চুম্বন পেয়েছিলে। হারা-প্রিয়া ‘সারা’র আলিঙ্গনপরশ তোমার জন্য নয়, কমলার প্রসাদ তোমার জন্য নয়, তোমার প্রিয়ায় তুমি এমনই বারে বারে পাবে আবার বারে বারেই হারাবে, তোমার প্রিয়ার চেয়েও প্রিয়তম ঐ ফাঁসির রশি। কোথায় কোন্ মাতৃ-বক্ষে, কোন্ ‘সারা’র কোন্ কমলার কুঞ্জে আপন ভুলেছ, হে ক্ষুদিরামের জাগ্রত আত্মা! সাড়া দাও। সাড়া দাও! এসো আবার ফাঁসিমঞ্চে, আর একবার নতুন করে আমাদের সেই চির-নূতন চির-পুরাতন গান ধরি–

    ‘আঠার মাসের পরে

    জনম নেব মাসীর ঘরে, মা গো,

    চিনতে যদি না পার মা

    দেখবে গলায় ফাঁসি–’

    একবার বিদায় দে মা ফিরে আসি।

  • ‘ধূমকেতু’র পথ

    ‘ধূমকেতু’র পথ

    ‘ধূমকেতু’র পথ

    অনেকেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছেন, ‘ধূমকেতু’-র পথ কী? সে কী বলতে চায়? এর দিয়ে কোন্ মঙ্গল আসবে ইত্যাদি।

    নীচে মোটামুটি ‘ধূমকেতু’র পথনির্দেশ করছি।

    প্রথম সংখ্যায় ধূমকেতুতে ‘সারথির পথের খবর’ প্রবন্ধে একটু আভাস দিবার চেষ্টা করেছিলাম, যা বলতে চাই, তা বেশ ফুটে ওঠেনি মনের চপলতার জন্য। আজও হয়তো নিজেকে যেমনটি চাই তেমনটি প্রকাশ করতে পারব না, তবে এই প্রকাশের পীড়ার থেকেই আমার বলতে-না-পারা বাণী অনেকেই বুঝে নেবেন – আশা করি। পূর্ণ সৃষ্টিকে প্রকাশ করে দেখাবার শক্তি হয়তো ভগবানেরও নেই, কোনো স্রষ্টারই নেই। মানুষ অপ্রকাশকে আপন মনের পূর্ণতা দিয়ে পূর্ণ করে দেখে।

    সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।

    স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথি এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ-দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশান-ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনও। আমাদেরও এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।

    পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।

    আর এই বিদ্রোহ করতে হলে – সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে, – আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ!

    বলতে হবে, – যে যায় যাক সে, আমার হয়নি লয়!

    কথাটা শুনতে হয়তো একটু বড়ো রকমের হয়ে গেল। একটু সহজ করে বলবার চেষ্টা করি। আর এইটাই ধূমকেতুর সবচেয়ে বড়ো বলা।

    আমি যতটুকু বুঝতে পারি, তার বেশি বুঝবার ভান করে যেন কারুর শ্রদ্ধা না প্রশংসা পাওয়ার লোভ না করি। তা সে মহাত্মা গান্ধিরই মতো হোক আর মহাকবি রবীন্দ্রনাথেরই মতো হোক কিংবা ঋষি অরবিন্দেরই মতো হোক, আমি সত্যিকার প্রাণ থেকে যতটুকু সাড়া পাই রবীন্দ্র, অরবিন্দ বা গান্ধির বাণীর আহ্বানে, ঠিক ততটুকু মানব। তাঁদের বাণীর আহ্বান যদি আমার প্রাণে প্রতিধ্বনি না তোলে, তবে তাঁদের মানব না। এবং এই ‘মানি না’ কথাটা সকলের কাছে মাথা উঁচু করে স্বীকার করতে হবে। এতে হয়তো লোকের অনেক নিন্দা-বদনাম-অপবাদ শুনতে হবে, কিন্তু আমি আমার কাছে ঠিক থাকব। তাঁদেরে বা তাঁদের মতো ঠিক না বুঝেও যদি লোকের কাছে বলে বেড়াই যে, আমি গান্ধি-ভক্ত বা রবীন্দ্র-ভক্ত বা অরবিন্দ-ভক্ত, তাতে অনেকের শ্রদ্ধা-প্রশংসা লাভ করব, কিন্তু আসলে তো সেটা ফাঁকি দিয়ে নেওয়া। এতে অন্যকে প্রবঞ্চনা করে খুব বাহবা নিতে পারি, কিন্তু আমার অন্তরের দেবতা অর্থাৎ আমার আমি তো তাতে দিন দিন ক্লিষ্ট-পীড়িতই হয়ে উঠবে। অন্যায় করলে, পাপ করলে অন্তরে যে পীড়া উপস্থিত হয়, মানুষের সেইটুকুই সচেতন ভগবান, সেইটুকুই সত্য।

    সকলেরই অন্তরে এমন একটা কিছু আছে, যেটা মিথ্যা সইতে পারে না। তা নিজেরই হোক আর পরেরই হোক। সেটাকে সব সময় হয়তো জিদের বশে স্বীকার করি না, কিন্তু নিজেকে তো আর ফাঁকি দেওয়া চলে না। যখন ফাঁকি দিয়ে লোকের কাছ থেকে বাহবা নিয়ে ঘরে ফিরি, তখন আমার ওই বাহবা অর্জনের ফাঁকির কথা মনে হয়ে প্রাণে যেন কেমন এক অসোয়াস্তি কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। ওই অসোয়াস্তিই হচ্ছে অনুশোচনা বা অনুতাপ। যাকে সদাসর্বদা তার কৃতকর্মের বা হঠকারিতার জন্য এই রকম অনুশোচনা বা অনুতাপের তুষানলে দগ্ধ হতে হয়, সে ক্রমেই ভীরু, কাপুরুষ হয়ে যেতে থাকে, সে তখন বাক-সর্বস্ব হয়ে ওঠে ফোঁপরা ঢেঁকির মতো। তার দিয়ে আর কোনোদিন কোনো বড়ো কিছুর আশা করা যায় না। আমাদের সকালের মধ্যে নিরন্তর এই ফাঁকির লীলা চলেছে। এই বাংলা হয়ে পড়েছে ফাঁকির বৃন্দাবন। কর্ম চাই সত্য, কিন্তু কর্মে নামবার বা নামাবার আগে এই শিক্ষাটুকু ছেলেদেরে, লোকেদেরে রীতিমতো দিতে হবে যে, তারা যেন নিজেকে ফাঁকি দিতে না শেখে, আত্মপ্রবঞ্চনা করে করে নিজেকেই পীড়িত করে না তোলে।

    আমি জীবনে অনেক আত্মপ্রবঞ্চনা করে করে অন্তরে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করেছি, কত রাত্রি অনুশোচনায় ঘুম হয় নাই। এখন সে-সব ভুল বুঝতে পেরেছি। এখন সোজা এই বুঝেছি যে, আমি যা ভালো বুঝি, যা সত্য বুঝি, শুধু সেইটুকু প্রকাশ করব, বলে বেড়াব, তাতে লোকে নিন্দা যতই করুক, আমি আমার কাছে আর ছোটো হয়ে থাকব না, আত্ম-প্রবঞ্চনা করে আর আত্মনির্যাতন ভোগ করব না।

    যাঁকে আমি ঠিক বুঝতে পারছি নে, তাঁকে বুঝবার ভান করলে তাঁকে অপমানই করা হয়। কারণ, পূজা মানে দেবতাকে সত্যি করে চিনে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া। যাঁকে আমি সত্য করে বুঝতে পারিনি, তাঁকে পূজা করতে যাওয়া মানে তাঁর অপমান করা। মিথ্যা মন্ত্রের উচ্চারণে দেবতা পীড়িতই হয়ে ওঠেন দিন দিন, প্রসাদ দেন না।

    কিন্তু মানুষের এমনই দুর্বলতা যে, এই শ্রদ্ধা-প্রশংসা পাওয়ার লোভটুকুকে কিছুতেই সে জয় করতে পারছে না। সমাজে থেকে সমাজের শ্রদ্ধা লাভের জন্য তাকে জেনে-শুনে অনেক মিথ্যা আচরণ করতে হয়। ‘ধূমকেতু’ এখন এইটুকু প্রচার করতে চায় যে, দেশ-উদ্ধারের জন্য যারা সৈনিক হতে চায়, অন্তত তারা যেন সর্বাগ্রে এই দুর্বলতা, এই লোভটুকু জয় করবার ক্ষমতা অর্জন করে তবে কোনো কাজে নামে। সত্যিকার প্রাণ না নিয়ে কাজে নামলে তাতে কাজ পণ্ডই হয় বেশি।

    অনেকেই লোভের বা নামের জন্য মহাত্মা গান্ধির অহিংস আন্দোলনে নেমেছিলেন। কিন্তু আত্ম-প্রবঞ্চনা নিয়ে নেমেছিলেন বলে অন্তর থেকে সত্যের জোর পেলেন না, আপনি সরে পড়লেন। রবীন্দ্র-অরবিন্দ-ভক্তদের মধ্যেও ওই একই প্রবঞ্চনা-ফাঁকি এসে পড়েছে। এরা অন্ধভক্ত, চোখওয়ালা ভক্ত নয়, বীর-ভক্ত নয়। এরা বুঝেও বোঝে না যে, পূজার নামে এরা তাঁদেরে অপমান করছে, বড়ো করবার নামে তাঁদেরে লোকচক্ষুতে আরও খাটোই করে তুলছে। এদের এতটুকু দুঃসাহস নেই যে, যেটুকু বুঝতে পারছে না সেটুকু ‘বুঝতে পারছিনি’ বলে বুঝে নিতে, পাছে তাঁর গুরুর কাছে সে কম বুদ্ধিমান হয়ে পড়ে বা গুরুর রোষদৃষ্টিতে পড়ে। এ-সব অন্ধলোক দিয়ে কোনো কাজ হবে না। কেননা, অন্তরে মিথ্যা আর ফাঁকি নিয়ে কাজে নামলে কাজেও মস্ত ফাঁক পড়ে যায়। যাঁকে বুঝি না, যাঁর মত বুঝতে পারি না, তাঁর মুখের সামনে মাথা উঁচু করে বলতে হবে যে, আপনার মত বুঝতে পারছিনে বা আপনার এ-মত এই-এই কারণে ভুল। তাতে যিনি সত্যকার দেবতা, তিনি কখনই রুষ্ট হবেন না, বরং তোমার সরলতা ও সত্যপ্রিয়তার দুঃসাহসিকতার জন্য শ্রদ্ধাই করবেন। বিদ্রোহ মানে কাউকে না-মানা নয়, বিদ্রোহ মানে যেটা বুঝি না, সেটাকে মাথা উঁচু করে ‘বুঝি না’ বলা। যে-লোক তার নিজের কাজের জন্য নিজের কাছে লজ্জিত নয়, সে ক্রমেই উচ্চ হতে উচ্চতর স্তরে স্বর্গের পথে উঠে চলবেই চলবে। আর যাকে পদে পদে তার ফাঁকি আর মিথ্যার জন্য কুণ্ঠিত হয়ে চলতে হয়, সে ক্রমেই নীচের দিকে নামতে থাকে, এইটাই নরক-যন্ত্রণা। আমার বিশ্বাস, আত্মার তৃপ্তিই স্বর্গসুখ। আর আত্মপ্রবঞ্চনার পীড়াই নরক-যন্ত্রণা। ‘ধূমকেতু’র মত হচ্ছে এই যে, তোমার মন যা চায়, তাই করো।

    ধর্ম, সমাজ, রাজা, দেবতা কাউকে মেনো না। নিজের মনের শাসন মেনে চলো। গান্ধির মত যদি প্রাণ থেকে না মানতে পার, বাস্, লোকের নিন্দা-বদনামের ভয়ে তা মেনো না, রবীন্দ্র-অরবিন্দের মত ঠিক মেনে নিতে পারছ না, বাস, মাথা উঁচু করে বলো, ‘বুঝতে পারছি না’। অন্ধ-ভক্তির অন্ধতায় যা বোঝ না তা, ‘বুঝি না’ বলো, দেখবে অপূর্ব তৃপ্তি-পুলকে আত্মা তোমার কানায় কানায় ভরে উঠছে। তখন নিন্দা-অপমান তোমার গায়ে লাগবে না। নিজে যতটুকু ভালো মনে কর, করো, তার চেয়ে মুক্তি আর নেই প্রাণের। ইংরেজের সহযোগিতা করে যদি দেশ উদ্ধার হবে তুমি প্রাণ হতে নিজকে ফাঁকি না দিয়ে বিশ্বাস কর, তবে তাই করো, কারুর নিন্দা ও অপবাদকে ভয় কোরো না। কিংবা যদি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করলে দেশের মুক্তি হবে না মনে কর, তাই বলো বুক ফুলিয়ে। অত্যাচারীকে অত্যাচারী বলো। তাতে আসে আসুক বাইরের নির্যাতন, ইংরাজের মার, তাতে তোমার অন্তরের আত্মপ্রসাদ আরও বেড়েই চলবে!

    মিথ্যাকে মিথ্যা বললে, অত্যাচারীকে অত্যাচারী বললে যদি নির্যাতন ভোগ করতে হয়, তাতে তোমার আসল নির্যাতন ওই অন্তরের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না। প্রাণের আত্মপ্রসাদ যখন বিপুল হয়ে ওঠে, তখন নির্যাতকের আগুন ওই আনন্দের এক ফুঁতে নিবে যায়। ইব্রাহিম যখন বিদ্রোহী হয়ে নমরুদের অত্যাচারকে অত্যাচার আর তার মিথ্যাকে মিথ্যা বলে প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন, তখন নমরুদ তাঁকে ধরে এক বিরাট অগ্নি-জাহান্নমের সৃষ্টি করে তাতে নিক্ষেপ করলে। কিন্তু ইব্রাহিমের কোথাও ফাঁকি ছিল না বলে, সত্যের জোর ছিল বলে তাঁর আত্মপ্রসাদ ওই বিপুল আনন্দের এক ফুঁতে সমস্ত জাহান্নম ফুল হয়ে হেসে উঠল। ইব্রাহিমের মনে যদি এতটুকু ফাঁকি থাকত, তবে তখনই নমরুদের আগুন তাঁকে ভস্মীভূত করে দিত।

    ভগবানের বুকে লাথি মারবার অসমসাহসিকতা নিয়ে বেরিয়েছিলেন মহাবিদ্রোহী ভৃগু। কেননা সে তাঁকে বোঝেনি, তাঁর ভুলকে ভুল বলে শোধরাবার চেষ্টা করেছিল, ভগবান যখন তা শুনলেন না, ঘুমিয়ে রইলেন তখন ভৃগু ভগবানের বুকে লাথি মেরে জাগালে। ভগবানও ভৃগুর পদ-চিহ্ন সগৌরবে বক্ষে ধারণ করলেন। ভাবতে চক্ষে জল আসে। কিন্তু ভগবানের যারা বিদ্রোহী নয়, গো-বেচারি ভক্ত, ভগবানকে প্রভু ভেবে জনম-জনম কাটিয়ে দিলে সাধনায়, তাদেরে হয়তো সিদ্ধি তিনি দিলেন, কিন্তু তাদের কারুর পদাঘাতকে তো বুকে ধারণ করে দেখালেন না। এর আসল মানে হচ্ছে, সত্যকে জানবার যার বিপুল সত্য ইচ্ছা থাকে, তার আঘাতও সহ্য করে, বুকে করে নিয়ে তার সত্য-নিষ্ঠা, সত্য জাগাবার আকাঙ্ক্ষাকে জগতের ভীরু কাপুরুষ ভণ্ড-ভক্তদের চোখের সামনে দেখায় যে, এই ফাঁকির পূজারির ক্রন্দনে সত্য জাগে না। সত্যকে জাগাবার জন্য বিদ্রোহ চাই, নিজেকে শ্রদ্ধা-প্রশংসার লোভ থেকে রেহাই দেওয়া চাই।

  • মন্দির ও মসজিদ

    মন্দির ও মসজিদ

    মন্দির ও মসজিদ

    ‘মারো শালা যবনদের!’ ‘মারো শালা কাফেরদের!’ – আবার হিন্দু মুসলমানি কাণ্ড বাধিয়া গিয়াছে। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, তারপর মাথা-ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল। আল্লার এবং মা কালীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিৎকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল, দেখিলাম – তখন আর তাহারা আল্লা মিয়া বা কালী ঠাকুরানির নাম লইতেছে না। হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে, – ‘বাবা গো, মা গো!’ – মাতৃপরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে!

    দেখিলাম, হত-আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাহাদের বেদি চিরকলঙ্কিত হইয়া রহিল।

    মন্দির-মসজিদের ললাটে লেখা এই রক্তকলঙ্ক-রেখা কে মুছিয়া ফেলিবে, বীর?

    ভবিষ্যৎ তাহার জন্য প্রস্তুত হইতেছে!

    সেই রুদ্র আসিতেছেন, যিনি ধর্ম-মাতালদের আড্ডা ওই মন্দির-মসজিদ-গির্জা ভাঙিয়া সকল মানুষকে এক আকাশের গম্বুজ-তলে লইয়া আসিবেন।

    জানি, স্রষ্টার আপনি-মোড়ল ‘প্রাইভেট সেক্রেটারি’রা হ্যাট খুলিয়া, টুপি তুলিয়া, টিকি নাচাইয়া আমায় তাড়না করিবে, তবু ইহাদের পতন হইবে। ইহারা ধর্ম-মাতাল। ইহারা সত্যের আলো পান করে নাই, শাস্ত্রের অ্যালকোহল পান করিয়াছে।

    পুসিফুট জনসন মাতালদের বিরুদ্ধে অভিযান করিয়া বহু মার খাইয়াছেন।

    মুহম্মদকে যাহারা মারিয়াছিল, ইশা-মুসাকে যে-সব ধর্ম-মাতাল প্রহার করিয়াছিল, তাহাদেরই বংশধর আবার মারিতেছে মানুষকে – ইশা-মুসা মুহম্মদের মতো মানুষকে!

    যে-সব অবতার-পয়গম্বর মানুষের মার হইতে মানুষকে বাঁচাইতে আসিয়া মানুষের মার খাইয়া গেলেন, তাঁহারা আজ কোথায়? মানুষের কল্যাণের জন্য আসিয়াছিলেন যাঁহারা, তাঁহাদেরই মাতাল পশু শিষ্যেরা আজ মানুষের সর্ব অকল্যাণের হেতু হইয়া উঠিল।

    যিনি সকল মানুষের দেবতা, তিনি আজ মন্দিরের কারাগারে, মসজিদের জিন্দানখানায় গির্জার gaol-এ বন্দি। মোল্লা-পুরুত, পাদরি-ভিক্ষু জেল-ওয়ার্ডের মতো তাহাকে পাহারা দিতেছে। আজ শয়তান বসিয়াছে স্রষ্টার সিংহাসনে।

    একস্থানে দেখিলাম, ঊনপঞ্চাশ জন ভদ্র-অভদ্র হিন্দু মিলিয়া একজন শীর্ণকায় মুসলমান মজুরকে নির্মমভাবে প্রহার করিতেছে, আর একস্থানে দেখিলাম, প্রায় ওই সংখ্যাক মুসলমান মিলিয়া একজন দুর্বল হিন্দুকে পশুর মতো মারিতেছে। দুই পশুর হাতে মার খাইতেছে দুর্বল অসহায় মানুষ। ইহারা মানুষকে মারিতেছে যেমন করিয়া বুনো জংলি বর্বরেরা শূকরকে খোঁচাইয়া মারে। উহাদের মুখের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, উহাদের প্রত্যেকের মুখ শয়তানের চেয়েও বীভৎস, শূকরের চেয়েও কুৎসিত! হিংসায়, কদর্যতায় উহাদের গাত্রে অনন্ত নরকের দুর্গন্ধ!

    উহাদের দুই দলেরই নেতা একজন, তাহার আসল নাম শয়তান। সে নাম ভাঁড়াইয়া কখনও টুপি পরিয়া পর-দাড়ি লাগাইয়া মুসলমানদের খ্যাপাইয়া আসিতেছে, কখনও পর-টিকি বাঁধিয়া হিন্দুদের লেলাইয়া দিতেছে, সে-ই আবার গোরা সিপাই গুর্খা সিপাই হইয়া হিন্দু-মুসলমানদের গুলি মারিতেছে! উহার ল্যাজ সমুদ্রপারে গিয়া ঠেকিয়াছে, উহার মুখ সমুদ্রপারের বুনো বাঁদরের মতো লাল!

    দেখিলাম, আল্লার মসজিদ আল্লা আসিয়া রক্ষা করিলেন না, মা-কালীর মন্দির কালী আসিয়া আগলাইলেন না! মন্দিরের চূড়া ভাঙিল, মসজিদের গম্বুজ টুটিল!

    আল্লার এবং কালীর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আকাশ হইতে বজ্রাঘাত হইল না মুসলমানদের শিরে, ‘আবাবিলের’ প্রস্তর-বৃষ্টি হইল না হিন্দুদের মাথার উপর।

    এই গোলমালের মধ্যে কতকগুলি হিন্দু ছেলে আসিয়া গোঁফ-দাড়ি-কামানো দাঙ্গায় হত খায়রু মিয়াঁকে হিন্দু মনে করিয়া ‘বলো হরি হরিবোল’ বলিয়া শ্মশানে পুড়াইতে লইয়া গেল, এবং কতকগুলি মুসলমান ছেলে গুলি খাইয়া হত দাড়িওয়ালা সদানন্দ বাবুকে মুসলমান ভাবিয়া ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়িতে পড়িতে কবর দিতে লইয়া গেল।

    মন্দির এবং মসজিদ চিড় খাইয়া উঠিল, মনে হইল যেন উহারা পরস্পরের দিকে চাহিয়া হাসিতেছে!

    মারামারি চলিতেছে। উহারই মধ্যে এক জীর্ণা-শীর্ণা ভিখারিনি তাহার সদ্যপ্রসূত শিশুটিকে বুকে চাপিয়া একটি পয়সা ভিক্ষা চাহিতেছে। শিশুটির তখনও নাড়ি কাটা হয় নাই। অসহায় ক্ষীণ কণ্ঠে সে যেন এই দুঃখের পৃথিবীতে আসার প্রতিবাদ করিতেছিল। ভিখারিনি বলিল, “বাছাকে আমার একটু দুধ দিতে পারছি না বাবু। এই মাত্র এসেছে বাছা আমার! আমার বুকে এক ফোঁটা দুধ নেই!” তাহার কণ্ঠে যেন বিশ্ব-জননী কাঁদিয়া উঠিল। পাশের একটি বাবু বেশ একটু ইঙ্গিত করিয়া বিদ্রুপের স্বরে বলিয়া উঠিল, “বাবা!এই তো চেহারা, এক ফোঁটা রক্ত নেই শরীরে, তবু ছেলে হওয়া চাই!”

    ভিখারিণী নিষ্পলক চোখে তাকাইয়া রহিল লোকটার দিকে। সে কী দৃষ্টি! চোখদুটো তার যেন তারার মতো জ্বলিতে লাগিল। ও যেন নিখিল হতভাগিনী নারীর জিজ্ঞাসা! এমনই করিয়া নির্বাক চোখে তাহারা তাকাইয়া থাকিয়াছে তাহারই দিকে – যে তাহার সর্বনাশ করিয়াছে। আমি যেন তার দৃষ্টির অর্থ বুঝিতে পারিলাম। সে বলিতে চায়, “পেটের ক্ষুধা এত প্রচণ্ড বলিয়াই তো দেহ বিক্রয় করিয়াও সে ক্ষুধা মিটাইতে হয়!”

    যে-লোকটি বিদ্রুপ করিল সে-ই হয়তো ওই শিশুর গোপন পিতা! সে না হয়, তারই একজন আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু অথবা তাহারই মতো মানুষ একজন ওই শিশুর জন্মদাতা!

    ওই যে এক আকাশ তারা, উহারা ইহারই মতো দুর্ভাগিনি ভুখারিনিদের চোখ, অনন্তকাল ধরিয়া ভোগ-তৃপ্ত বিশ্ববাসীকে কী যেন জিজ্ঞাসা করিতেছে।

    তিনদিন পরে আবার দেখিলাম, পথে দাঁড়াইয়া সেই ভিখারিনি। এবার তাহার বক্ষশূন্য। চক্ষুও তাহার শূন্য। যেদিন শিশু ছিল তার বুকে, সেদিন চক্ষে তার দেখিয়াছিলাম বিশ্বমাতার মমতা। অনন্ত নারীর করুণা সেদিন পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিয়াছিল তাহার চোখের তারায়, তাই সে সেদিন অমন সিক্ত কাতর কণ্ঠে ভিক্ষা চাহিতেছিল। আজ তাহার মনের মা বুঝি-বা মরিয়া গিয়াছে তাহার শিশুর সাথে। আজও সে ভিক্ষা চাহিতেছে, কিন্তু আর সে কাতরতা নাই তাহার কণ্ঠে, আজ যেন সে চাহিবার জন্যই চাহিতেছে! …

    আমায় সে চিনিল। আমি সেদিন তাহাকে আমার ট্রাম ভাড়ার পয়সা ছয়টি দিযাছিলাম। – ভিখারিনির শুষ্কচক্ষে হঠাৎ অশ্রুপুঞ্জ দুলিয়া উঠিল! আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘তোর ছেলে কোথায়?’ সে ঊর্ধ্বে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইল। তাহার পর একটু থামিয়া আমায় বলিল, ‘বাবু, আমার সাথে একটু আসবেন?’ আমি সাথে সাথে চলিলাম।

    পথের ধারে কৃষ্ণচূড়ার গাছ। তারই পাশে ডাস্টবিন। শহরের যত আবর্জনা জমা হয় ওই ডাস্টবিনে। আমি শিহরিয়া উঠিলাম। ভিখারিনি ডাস্টবিনের অনেকগুলো আবর্জনা তুলিয়া ময়লা ন্যাকড়া জড়ানো কী একটা যেন তুলিয়া লইয়া ‘জাদু আমার সোনা আমার’ বলিয়া উন্মাদিনীর মতো চুমা খাইতে লাগিল।

    এই তাহার খোকন। – এই তাহার জাদু, এই তাহার সোনা! ভিখারিনি ইহার পর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল। তাহার পর শিশুটিকে আবার ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করিয়া বলিতে লাগিল, “বাবু, ওই পয়সা কয়টি দিয়ে সেদিন একটা খারাব-হয়ে-যাওয়া বার্লির টিন কিনেছিলুম। এ-কয়দিন ছেলেটাকে দিয়েছি ঠাণ্ডা জলে গুলে শুধু ওই পচা বার্লি আমিও খেয়েছি একটু করে – যদি আমার বুকে দুধ আসে! দুধ এল না এই হাড়-চামড়ার শরীরে! এক ফোঁটা দুধ পেলে না বাছা আমার, এই তিন দিনের মধ্যে! শেষে আর বার্লিও দিতে পারলুম না, আজ সে চলে গেল! ভালোই হয়েছে, বাছা আমার এবার খুব বড়ো লোকের ঘরে জন্মায় যেন। একটু পেটে দুধ খেয়ে বাঁচবে!”

    চলে গেল ভিখারিনি আবার ভিক্ষা মাগতে!

    ডাস্টবিন হইতে ভিখারিনির পুত্রকে বুকে তুলিয়া লইয়া আমি চলিলাম গোরস্থানের দিকে।…

    কাল এমনি করিয়া প্রতি বৎসর বাংলার দশ লক্ষ সন্তানের মরা লাশ বুকে ধরিয়া চলিতেছে শ্মশানের পানে, গোরস্থানের পথে।

    যাইতে যাইতে দেখিলাম, সেদিনও মন্দির আর মসজিদের ইট-পাথরের স্তূপ লইয়া হিন্দু-মুসলমান সমানে কাটাকাটি করিতেছে।

    শিশুর লাশ-কোলে আমি বহুক্ষণ সেখানে দাঁড়াইয়া রহিলাম। শিশুর লাশ যেন একটা প্রতিকার প্রার্থনা, একটা কৈফিয়ত তলবের মতো দেখাইতে লাগিল। ধর্ম-মদান্ধদের তখন শিশুর লাশের দিকে তাকাইয়া দেখিবার অবসর ছিল না। তাহারা তখন ইট-পাথর লইয়া বীভৎস মাতলামি শুরু করিয়া দিয়াছে!

    এমনি করিয়া যুগে যুগে ইহারা মানুষকে অবহেলা করিয়া ইট-পাথর লইয়া মাতামাতি করিয়াছে। মানুষ মারিয়া ইট-পাথর বাঁচাইয়াছে। বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া বঙ্গ-জননী তাহার দশ লক্ষ অনাহার-জীর্ণ রোগশীর্ণ অকালমৃত সন্তানের লাশ লইয়া ইহাদের পাশ দিয়া চলিয়া যাইতেছেন, ইহাদের ভ্রুক্ষেপ নাই। ইহারা মানুষের চেয়ে ইট-পাথরকে বেশি পবিত্র মনে করে! ইহারা ইট-পূজা করে! ইহারা পাথর-পূজারী!

    ভূতে-পাওয়ার মতো ইহাদেরে মন্দিরে পাইয়াছে, ইহাদেরে মসজিদে পাইয়াছে। ইহাদের বহু দুঃখ ভোগ করিতে হইবে!

    যে দশ লক্ষ মানুষ প্রতি বৎসর মরিতেছে শুধু বাংলায়, – তাহারা শুধু হিন্দু নয়, তাহারা শুধু মুসলমান নয়, তাহারা মানুষ – স্রষ্টার প্রিয় সৃষ্টি!

    মানুষের কল্যাণের জন্য ওই-সব ভজনালয়ের সৃষ্টি, ভজনালয়ের মঙ্গলের জন্য মানুষ সৃষ্ট হয় নাই। আজ যদি আমাদের মাতলামির দরুন ওই ভজনালয়ই মানুষের অকল্যাণের হেতু হইয়া উঠে – যাহার হওয়া উচিত ছিল স্বর্গ-মর্ত্যের সেতু – তবে ভাঙিয়া ফেলো ওই মন্দির-মসজিদ! সকল মানুষ আসিয়া দাঁড়াইয়া বাঁচুক এক আকাশের ছত্রতলে, এক চন্দ্র-সূর্য-তারা-জ্বালা মহামন্দিরের আঙিনাতলে!

    মানুষ তাহার পবিত্র পায়ে-দলা মাটি দিয়া তৈরি করিল ইট, রচনা করিল মন্দির-মসজিদ। সেই মন্দির-মসজিদের দুটো ইট খসিয়া পড়িল বলিয়া তাহার জন্য দুই শত মানুষের মাথা খসিয়া পড়িবে? যে এ কথা বলে, আগে তাহারই বিচার হউক।

    দুইটা ইটের ঋণ যদি দুই শত মানুষের মাথা দিয়া পরিশোধ করিতে হয়, তবে বাঙালি জাতির যে এই বিপুল দেহ-মন্দির হইতে দশ লক্ষ করিয়া মানুষ খসিয়া পড়িতেছে প্রতি বৎসরে শোষণ-দৈত্যের পেষণে, এই মহা-ঋণের পরিশোধ হইবে কত লক্ষ মানুষের মাথা দিয়া?

    মন্দির-মসজিদের চূড়া আবার গড়িয়া উঠিবে এই মানুষেরই পায়ে-দলা মাটি দিয়া, পবিত্র হইয়া উঠিবে এই মানুষেরই শ্রমের পবিত্রতা দিয়া ; শুধু তাহারাই আর ফিরিয়া আসিবে না, যাহারা পাইল না একটু আলো, একটু বাতাস, এক ফোঁটা ওষুধ, দু চামচ জল-বার্লি! যাহারা তিলে তিলে মরিয়া জাতির হৃদয়হীনতার প্রায়শ্চিত্ত করিতেছে! যাহাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়া সমগ্র জাতি মরিতেছে তিলে তিলে!

    আমি ভাবি, যখন রোগ-শীর্ণ জরা-জীর্ণ অনাহার-ক্লিষ্ট বিবস্ত্র বুভুক্ষু সর্বহারা ভুখারিদের দশ লক্ষ করিয়া লাশ দিনের পর দিন ধরিয়া ওই মন্দির-মসজিদের পাশ দিয়া চলিয়া যায়, তখন ধসিয়া পড়ে না কেন মানুষের ওই নিরর্থক ভজনালয়গুলো? কেন সে ভূমিকম্প আসে না পৃথিবীতে? কেন আসে না সেই রুদ্র – যিনি মানুষ-সমাজের শিয়াল-কুকুরের আড্ডা ওই ভজনালয়গুলো ফেলবেন গুঁড়িয়ে – দেবেন মানুষের ট্রেডমার্কার চিহ্ন ওই টিকি-টুপিগুলো উড়িয়ে?

    মন্দির-মসজিদের সামনে বাজনা বাজাইলে হয় তার প্রতিকার, আসে তার জন্যে মুদ্রা হাজার হাজার, আসে তার জন্য ছাপ্‌পর ফুঁড়িয়া নেতার দল – গো-ভাগাড়ে শকুনি পড়ার মতো। – শুধু দশ লক্ষ লাশের আর প্রতিকার হইল না।

    মানুষের পশু-প্রবৃত্তির সুবিধা লইয়া ধর্ম-মদান্ধদের নাচাইয়া কত কাপুরুষই না আজ মহাপুরুষ হইয়া গেল।

    সকল কালে সকল দেশে সকল লাভ-লোভকে জয় করিয়াছে তরুণ। ওগো বাংলার তরুণের দল – ওগো আমার আগুন খেলার নির্ভীক ভাইরা, ওই দশ লক্ষ অকালমৃতের লাশ তোমাদের দুয়ারে দাঁড়াইয়া! তারা প্রতিকার চায়!

    তোমরা ওই শকুনির দলের নও, তোমরা আগুনের শিখা, তোমাদের জাতি নাই। তোমরা আলোর, তোমরা গানের, তোমরা কল্যাণের। তোমরা বাহিরে এসো, এই দুর্দিনে তাড়াও ওই গো-ভাগাড়ে-পড়া শকুনি দলকে!

    আমি শুনিতেছি মসজিদের আজান আর মন্দিরের শঙ্খধ্বনি। তাহা এক সাথে উত্থিত হইতেছে ঊর্ধ্বে – স্রষ্টার সিংহাসনের পানে। আমি দেখিতেছি, সারা আকাশ যেন খুশি হইয়া উঠিতেছে।

  • হিন্দু-মুসলমান

    হিন্দু-মুসলমান

    হিন্দু-মুসলমান

    একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন : দ্যাখো, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে?

    হিন্দু-মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারেবারে গুরুদেবের ওই কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, যে এ-ন্যাজ গজালো কী করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ওই সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় – তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক – তারাই হয়ে ওঠে পশু। যে সব ন্যাজওয়ালা পশুর হিংস্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে – শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই, যত ভয় হয় সেই সব পশুদের দেখে – যাদের হিংস্রতা ভিতরে, যাদের শিং মাথা ফুটে বেরোয়নি! শিংওয়ালা গোরু-মহিষের চেয়ে শৃঙ্গহীন ব্যাঘ্র-ভল্লুকজাতীয় পশুগুলো বেশি হিংস্র – বেশি ভীষণ। এ হিসেবে মানুষও পড়ে ওই শৃঙ্গহীন বাঘ-ভালুকের দলে। কিন্তু বাঘ-ভালুকের তবু ন্যাজটা বাইরে, তাই হয়তো রক্ষে। কেননা, ন্যাজ আর শিং দুই-ই ভেতরে থাকলে কীরকম হিংস্র হয়ে উঠতে হয়, তা হিন্দু-মুসলমানের ছোরামারা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না।

    যে প্রশ্ন করছিলাম, এই যে ভেতরের ন্যাজ, এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতে ও দাড়িতে। টিকিপুর ও দাড়িস্তানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি। পশু সাজবার মানুষের এ কী ‘আদিম’ দুরন্ত ইচ্ছা! – ন্যাজ গজাল না বলে তারা টিকি দাড়ি জন্মিয়ে যেন সান্ত্বনা পেল!

    সেদিন মানব-মনের পশু-জগতে না জানি কী উৎসবের সাড়া পড়েছিল, যেদিন ন্যাজের বদলে তারা দাড়ি-টিকির মতো কোনো কিছু একটা আবিষ্কার করলে‌!

    মানুষের চিরন্তন আত্মীয়তাকে এমনি করে বৈরিতায় পরিণত করা হল দেয়ালের পর দেয়াল খাড়া করে। ধর্মের সত্যকে সওয়া যায, কিন্তু শাস্ত্র যুগে যুগে অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলেই তার বিরুদ্ধে যুগে যুগে মানুষও বিদ্রোহ করেছে। হিন্দুত্ব মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায়, কিন্তু তাদের টিকিত্ব দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা ওই দুটোই মারামারি বাধায়। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা হয়তো পণ্ডিত্ব! তেমনই দাড়িও ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব! এই দুই ‘ত্ব’ মার্কা চুলের গোছা নিয়েই আজ এত চুলোচুলি! আজ যে মারামারিটা বেধেছে, সেটাও এই পণ্ডিত-মোল্লায় মারামারি, হিন্দু-মুসলমানে মারামারি নয়। নারায়ণের গদা আর আল্লার তলোয়ারে কোনো দিনই ঠোকাঠুকি বাধবে না, কারণ তাঁরা দুইজনেই এক, তাঁর এক হাতের অস্ত্র তাঁরই আর এক হাতের ওপর পড়বে না। তিনি সর্বনাম, সকল নাম গিয়ে মিশেছে ওঁর মধ্যে। এত মারামারির মধ্যে এইটুকুই ভরসার কথা যে, আল্লা ওরফে নারায়ণ হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। তাঁর টিকিও নেই, দাড়িও নেই। একেবারে ‘ক্লিন’। টিকি-দাড়ির ওপর আমার এত আক্রোশ এই জন্য যে, এরা সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষকে যে তুই আলাদা আমি আলাদা। মানুষকে তার চিরন্তন রক্তের সম্পর্ক ভুলিয়ে দেয় এই বাইরের চিহ্নগুলো।

    অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্যে এসেছি, আমি ক্রিশ্চানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি – আলোর মতো, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তেরা বললে, কৃষ্ণ হিন্দুর, মুহম্মদের ভক্তেরা বললে, মুহম্মদ মুসলমানদের, খ্রিস্টের শিষ্যেরা বললে, খ্রিস্ট ক্রিশ্চানদের। কৃষ্ণ-মুহম্মদ-খ্রিস্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি! আর এই সম্পত্তিত্ব নিয়েই যত বিপত্তি। আলো নিয়ে কখনও ঝগড়া করে না মানুষে, কিন্তু গোরু-ছাগল নিয়ে করে। বেশ মনে আছে, ছেলেবেলায় আমরা সূর্য নিয়ে ঝগড়া করতাম। এ বলত আমাদের পাড়ার সূর্য বড়ো ; ও বলত আমাদের পাড়ার সূর্য বড়ো! আমাদের গভীর বিশ্বাস ছিল, প্রত্যেক পাড়ায় আলাদা আলাদা সূর্য ওঠে! স্রষ্টা নিয়েও ঝগড়া চলেছে সেই রকম। এ বলছে আমাদের আল্লা ; ও বলছে আমাদের হরি। স্রষ্টা যেন গোরু-ছাগল! আর তার বিচারের ভার পড়েছে জাস্টিস সার আবদুর রহিম, পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য প্রভৃতির ওপর! আর বিচারের ফল মেডিক্যাল কলেজ গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে!

    নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে যখন দেখি, একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ-প্রশ্ন করবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান। একজন মানুষ ডুবছে, এইটেই হয়ে ওঠে তার কাছে সবচেয়ে বড়ো, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে। হিন্দু যদি উদ্ধার করে দেখে লোকটা মুসলমান, বা মুসলমান যদি দেখে লোকটা হিন্দু – তার জন্য তো তার আত্মপ্রসাদ এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয় না। তার মন বলে, ‘আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছি – আমারই মতো একজন মানুষকে।’

    কিন্তু আজ দেখছি কী? ছোরা খেয়ে যখন খায়রু মিয়াঁ পড়ল, আর তাকে যখন তুলতে গেল হালিম, তখন ভদ্র সম্প্রদায় হিন্দুরাই ছুটে আসলেন, “মশাই করেন কী? মোচলমানকে তুলছেন! মরুক ব্যাটা!” তারা ‘অজাতশ্মশ্রু’ হালিমকে দেখে চিনতে পারেনি যে সে মুসলমান। খায়রু মিয়াঁর দাড়ি ছিল। ছোরা খেয়ে যখন ভুজালি সিং পড়ল পথের উপর, তাকে তুলতে গিয়ে তুর্কিছাঁট-দাড়ি শশধর বাবুরও ওই অবস্থা!

    মানুষ আজ পশুতে পরিণত হয়েছে, তাদের চিরন্তন আত্মীয়তা ভুলেছে। পশুর ন্যাজ গজিয়েছে ওদের মাথার ওপর, ওদের সারা মুখে। ওরা মারছে লুঙ্গিকে, মারছে ল্যাঙ্টকে; মারছে টিকিকে, দাড়িকে! বাইরের চিহ্ন নিয়ে এই মূর্খদের মারামারির কি অবসান নেই?

    মানুষ কি এমনই অন্ধ হবে যে, সুনীতিবাবু হয়ে উঠবেন হিন্দু-সভার সেক্রেটারি এবং মুজিবর রহমান সাহেব হবেন তঞ্জিম তবলিগের প্রেসিডেন্ট?…

    রাস্তায় যেতে যেতে দেখলাম, একটা বলদ যাচ্ছে, তার ন্যাজটা গেছে খসে। ওরই সাথে দেখলাম, আমার অতি বড়ো উদার বিলেত-ফেরত বন্ধুর মাথায় এক য়্যাব্বড়ো টিকি গজিয়েছে!

    মনে হল, পশুর ন্যাজ খসছে আর মানুষের গজাচ্ছে!

  • ফণী-মনসা

    ফণী-মনসা

    ফণী-মনসা

    ‘ফণী-মনসা’ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মুতাবিক ১৯২৭ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন কবি নিজেই, যদিও ঠিকানা ছাপা হয়েছিল ‘বর্মণ পাবলিশিং হাউসের’, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫৪, মূল্য পাঁচ সিকা।

    ‘সব্যসাচী’ ২৩শে পৌষ ১৩৩২ মুতাবিক ৭ই জানুয়ারি ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ ১৭ই মাঘ ১৩৩২ তারিখে ৫ম বর্ষের ১০ম সংখ্যক ‘বিজলী’তে ‘বন্দিনী’ শিরোনামে বের হয়েছিল।

    ‘আশীর্বাদ’ শামসুন নাহারের ‘পুণ্যময়ী’ পুস্তকের ‘প্রশস্তি’।

    ‘সাবধানী ঘণ্টা’ ১৩৩১ কার্তিকের কল্লোলে ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখিয়াছেন—

    “মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল আপিসে বসে লিখেছিল একবৈঠকে।”

    [কল্লোল যুগ, ৮৯ পৃষ্ঠা]

    ‘শনিবারের চিঠি’তে ‘আমি ব্যাঙ’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে নজরুল ইসলাম তা মোহিতলাল মজুমদারের রচনা বলে মনে করেন। তাই প্রতিক্রিয়ায় ‘কল্লোল’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩৩১) তিনি লেখেন ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’।

    ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ অনেক স্থানে পরিবর্তিত হয়ে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। মূল কবিতাটি নিম্নে সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হল।

    সর্বনাশের ঘণ্টা

    রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা।

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা।

    হে দ্রোণাচার্য! আজি এই নব জয়যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    শিষ্য তোমার, দাও গুরু দাও তব রূপ-মসি ছানি’

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি।

    তোমার নীচতা ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি

    উদ্‌গারো গুরু শিষ্যের শিরে, তব বুক হোক খালি।

    বন্ধু গো! গুরু! দূষিত দৃষ্টি দূর করো, চাহ ফিরে,

    শয়তানে আজ পেয়েছে তোমায়, সে যে পাঁক ঢালে শিরে!

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা,

    যে ভোগানন্দ দাসেদের গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজ তাহাদেরি বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি।

    হে অস্ত্রগুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়-কেতু, হলে কুক্কুর-কুরু-নেতা।

    ভোগ-নরকের নারকীর দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী

    ব্রহ্ম-অস্ত্র ব্রহ্ম-দৈত্যে দিয়া, হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ-রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত

    সে কমল ঘিরি নেমেছে মরাল কত সহস্র শত।

    কোথা সে দিঘীর উচ্ছল জল কোথা সে কমল রাঙা;

    হেরি শুধু কাদা শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা!

    সেই কাদা মাখি চোখে-মুখে তুমি সাজিয়াছ ছি ছি সং,

    বাঁদর-নাচের ভালুক হয়েছ; হেসে মরি দেখে ঢং!

    অন্ধকারের বিবর ছাড়িয়া বাহিরিয়া এস গুরু,

    হেরো দিবালোকে—বাঁদরের বেদে কেটেছে গুম্ফ ভুরু।

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি,

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানি।

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভাল, করিয়াছে পূজা নিতি,

    তাহাদের হানে অতি লজ্জার ব্যথা আজ তব স্মৃতি।

    নপুংসক ঐ শিখণ্ডী আজ রথের সারথি তব—

    হানো বীর তব বিদ্রূপ-বাণ, সব বুক পেতে লব

    ভীষ্মের সম, যদি তাহে শর-শয়নের বর লভি;

    তুমি যত বল, আমিই সে রণে জিতিব অস্ত্র-কবি!

    তুমি জানো, তুমি সম্মুখ-রণে পারিবে না পরাজিতে,

    আমি তব কাল যশোরাহু সদা শঙ্কা তোমার চিতে।

    রক্ত অসির কৃষ্ণ মসির যে কোনো যুদ্ধে, গুরু,

    তুমি নিজে জানো তুমি অশক্ত, তাই করিয়াছ শুরু

    চোরা-বাণ ছোঁড়া বেল্লিকপনা বিনামা-আড়ালে থাকি,

    ন্যক্কার-আনা নপুংসকেরে রথ-সম্মুখে রাখি।

    হেরো গুরু আজ চারিদিকে হতে ধিক্কার অবিরত

    ছি ছি বিষ ঢালি জ্বালায় তোমার পুরানো প্রদাহ-ক্ষত।

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভাল মোর অপরাধ নহে।

    কালীয়-দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালিদহে।

    তাহার সে দাহ তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জ্বলুনির চোটে। তুমি পাও কোন্ সুখ

    দগ্ধ-মুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি!

    শিব-সুন্দর-সত্য তোমার লভিল এ কি এ গতি?

    যদিই অসতী হয় বাণী মোর, কালের পরশুরাম

    কঠোর কুঠারে নাশিবে তাহারে, তুমি কেন বদনাম

    কিনিতেছ গুরু! কেন এত তব হিয়া-দগ্‌দগি জ্বালা?

    হোলির রাজা কে সাজাল তোমারে পরায়ে বিনামা-মালা?

    তোমার গোপন দুর্বলতারে, ছি ছি করে মসীময়

    প্রকাশিলে গুরু, এই খানে তব অতি বড় পরাজয়।

    তুমি ভিড়িও না গো-ভাগাড়ে-পড়া চিল-শকুনের দলে,

    শতদল-দলে তুমি যে মরাল শ্বেত-সায়রের জলে।

    ওঠ গুরু, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুন,

    নিন্দার নহ, নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন!

    উঠ গুরু উঠ, লহ গো প্রণাম, বেঁধে দাও হাতে রাখি,

    ঐ হেরো শিরে চক্কর মারে বিপ্লব-বাজপাখি।

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহ—

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের বিদ্রোহ-বারিবাহ।

    দোতালায় বসি উতলা হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী,

    এ নহে কবির, এ কাঁদন ওঠে নিখিল-মর্ম ছানি।

    বিদ্রূপ করি উড়াইবে এই বিদ্রোহ-তেতো জ্বালা

    সুরের তোমরা, কি করিবে তবু হবে কান ঝালাপালা

    অসুরের ভীম অসি-ঝনঝনে, বড় অসোয়াস্তি-কর!

    বন্ধু গো এত ভয় কেন? আছে তোমার আকাশ-ঘর!

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ মলো? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি।

    বারীন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা,

    লাল বাংলার হুমকানি,—ছি ছি এত অসত্য ও মা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখা গো আমায় ধরো ধরো! মা গো, কত জানে এরা ছল!

    সই লো আমার কাতুকুতু-ভাব হয়েছে যে, ঢলে পড়ি!

    আঁচলে জড়ায়ে পা চলে না আর, হাত হতে পড়ে ছড়ি!

    শ্রমিকের গাঁতি বিপ্লব-বোমা, আ ম’লো তোমরা মরো!

    যত সব বাজে বাজখাঁই সুর, মেছুনি-বৃত্তি ধরো!

    যারা করে বাজে দুখভোগ ত্যাগ, আর রাজরোষে মরে,

    ঐ বোকাদের ইতর ভাষায় গালি দাও খুব করে।

    এই ইতরামি বাঁদরামি-আর্ট আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে

    হন্যে কুকুর পেট পালি আর হাউ হাউ মরি কেঁদে।

    এই শয়তানি করে দিনরাত বলো আর্টের জয়!

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ-ভ্যাংচানো নয়!

    আপনার নাক কেটে দাদা এই পরের যাত্রা ভাঙা,

    ইহাই হইল আদর্শ আর্ট, নাকি-সুর, কান-রাঙা!

    আর্ট ও প্রেমের এই সব মেড়ো মাড়োয়ারি দলই জানে,

    কোনো বিদ্রোহ অসন্তোষের রেখা নাই কোনখানে!

    সব ভুয়ো দাদা, ও-সবে দেশের কিছুই হইবে নাকো,

    এমনই করিয়া জুতো খাও আর মলমল-মল মাখো!

    জ্ঞান-অঞ্জন-শলাকা তৈরি হতেছে এদের তরে,

    দেখিবে এদের আর্টের আঁটুনি একদিনে গেছে ছুঁড়ে!

    বন্ধু গো! গুরু! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে তুলা,

    ঐ হেরো পথে গুর্খা-সেপাই উড়াইয়া যায় ধূলা!

    ঐ শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার,

    ভূধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার!

    তোমার আর্টের বাঁশরির সুরে মুগ্ধ হবে না এরা,

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আর্টশালা হবে নেড়া!

    প্রেমও আছে গুরু, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,

    ভাল নাহি লাগে, ভাল ছেলে হয়ে, ছেড়ে যাও, মানা নাই!

    আমি বলি— গুরু, বলো তাহাদেরে কোন বাতায়ন-ফাঁকে

    সজিনার ঠ্যাঙা সজনিরই মত হাতছানি দিয়ে ডাকে!

    যত বিদ্রুপই করো গুরু, তুমি জান এ সত্য-বাণী,

    কারুর পা চেটে মরিব না; কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটাবে না পিলে; মরিব যেদিন মরিব বীরের মত,

    ধরা-মা’র বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত।

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস—

    ততদিন সখা সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!

    ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ কবিতার উত্তরে পরলোকগত কবি মোহিতলাল মজুমদার ৮ই কার্তিক ১৩৩১ তারিখের সাপ্তাহিক ‘শনিবারে চিঠি’র বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যায় তার জবাব দেন ‘দ্রোণ-গুরু’ কবিতায়। নিম্নে কবিতাটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হল—

    দ্রোণ-গুরু

    [কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধকালে দ্রোণাচার্য কুরু সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হইলে, তিনি প্রাচীন ও অকর্মণ্য বলিয়া দ্রোহ-বিদ্বেষী কর্ণের বিদ্বেষ আরও বাড়িয়া যায়। এদিকে দ্রোণ-শিষ্য অর্জুনের কৃতিত্বও ক্রণের দুঃসহ হইয়া ওঠে। এই বিদ্বেষের কথা মহাভারতে উল্লিখিত আছে। কিন্তু নিম্নলিখিত ঘটনাটির কথা মূল মহাভারতে নাই। কর্ণাটদেশে প্রচলিত মহাভারতের তামিল-সংস্করণের একটি গাধা অবলম্বনে এই কবিতা রচিত হইয়াছে। দ্রোণাচার্যের মনে অর্জুনের প্রতি আন্তরিক স্নেহ নষ্ট করিবার জন্য, এবং তাঁহার উপর যাহাতে গুরুর নিদারুণ অভিশাপ বর্ষিত হয় এই উদ্দেশ্যে, অর্জুন কর্তৃক লিখিত বলিয়া একখানি গুরুদ্রোহসূচক কুৎসাপূর্ণ পত্র দ্রোণাচার্যের নিকট প্রেরিত হয়। বলা বাহুল্য, এই কৌশল সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়াছিল।]

    কি বলিস তুই অশ্বত্থামা! আমি মরে যাই লাজে!

    আমি ব্রাহ্মণ, তবু বলিব না—ক্ষত্রিয়কুল-মাঝে

    হেন কাপুরুষ আছে কোনো ঠাঁই—ভীরু, আত্মম্ভরি—

    মিথ্যা দম্ভ গর্বের ভরে আপনারে বড় করি

    আপনার পূজা ষোড়শোপচারে মাগে যে গুরুর কাছে!

    অনুষ্ঠানের ত্রুটি পাছে হয়, সদা সেই ভয় আছে!—

    তাহারি লাগিয়া আক্রোশ করি শিষ্য হইয়া বীর

    বন্যবরাহ হনন করা সে ঘৃণ্য ব্যাধের তীর

    চিৎকার সহ নিক্ষেপ করে বাতাসের সনে রণ—

    বলে পাণ্ডব—কৌরব-গুরু আমি সে প্রিয়জন।

    পাণ্ডব সেকি? কোন পাণ্ডব? কে বা সে ছন্নমতি?

    আমার নিকটে অস্ত্রশিক্ষা!—হায় একি দুর্গতি!

    বলে, সে পার্থ!—কৃষ্ণ-সারথী! নব-অবতার নর!

    মহাবিপ্লব যুগান্তরের নবীন য]পদের সভাতলে,

    মুগ্ধ হইল লক্ষ্যভেদের অপূর্ব কৌশলে;

    যার বীরত্বে বিস্মিত নিজে শঙ্কর ত্রিপুরারি—

    দানিল দিব্য পাশুপত যারে দানবদহনকারী,

    যার প্রতিভায় ব্রাহ্মণ-দ্রোণ ব্রহ্মণ্যের চেয়ে

    মানিয়াছে বড় ক্ষাত্র-মহিমা শিষ্য যাহারে পেয়ে,

    —এই লিপি তার!—অশ্বত্থামা! হয়েছিস উন্মাদ?

    কি কথা বলিস? কে শুনালে তোরে এ হেন মিথ্যাবাদ?

    —অর্জুন?—আরে ছিছি, ছিছি ছিছি! তার হেন দুর্মতি!

    তার মুখে হেন অনার্য-বীণা!—আপন গুরুর প্রতি,

    মিথ্যা রটনা—এই অপবাদ মিথ্যার অভিনয়ে

    পটু হবে সেই! অসি ছেড়ে শেষে মসির পাত্র লয়ে

    —ছিটাইছে কালি, রণ-অঙ্গনে অঙ্গনা-রীতি ধরে!—

    রমণীর মত বাতাসে ভেজায়ে কোন্দল শুরু করে!

    বিরাটপুরীর অজ্ঞাতবাসে বৃহন্নলার কথা

    মনে আছে বটে—অকীর্তিকর!—সেথাকার বাচালতা

    পুরন্ধ্রীদের কুৎসা-কলহ, সেই নট-নটী লীলা

    স্বভাব নষ্ট করেছিল বুঝি? আজো অন্তঃশীলা

    নপুংসকের বিকৃত শোণিত কিণাঙ্ক-করমূলে

    বহিছে নাড়িতে? হায়, হতভাগ্য এখনো যায়নি ভুলে।

    গুরুনিন্দার পাতকের ভয় এতটুকু মনে নাই।

    আজ তুমি বড়! গুরুমারা চোর! তুমি মহাবীর, তাই

    এটা ক্ষুদ্র মশকের হুল সহিতে পারো না তুমি!

    —অত্যাচারীর খড়্‌গ ভাঙিবে, রাখিবে ভারত-ভূমি!

    হুলের আঘাতে, কুরুক্ষেত্রে ফেলে দিয়া গাণ্ডীব,

    রথ হতে নামি মৃত্তিকা ’পরে মাথা ঠোকে ঢিব্ ঢিব্!

    নারায়ণী-সেনা হাসিছে অদূরে, রঙ্গ দেখিছে তারা,

    আমার মাথা যে হেঁট হয়ে যায়, পশ্চিমে ঐ কারা—

    ফেরুপাল বুঝি—হর্ষিত চিতে চিৎকার করি ওঠে,

    সূর্যের মুখে অস্তমলিন হাসি বুঝি ঐ ফোটে।

    ***

    কেন তোর এই অধঃপতন বল্ দেখি, ফাল্গুনি!

    এই বিদ্বেষ ঈর্ষার জ্বালা কার তরে বল্ শুনি?

    আমি গুরু তোর, একা তোরি গুরু?—আর কেহ নাহি রবে?

    আজিকার এই সমরাঙ্গনে যদি কেউ যশ লভে—

    রণ-কৌশলে আর কেহ যদি আমারে প্রণাম করি

    দূর হতে পায় আমারি শিক্ষা-সাধনার কারিগরি—

    ধর্মক্ষেত্রে সে কি অধর্ম? তোমারি হইবে জয়?

    তোমার দর্পে আর কেহ যদি হেসে কুটি-কুটি হয়,

    সে কি তা মহা ধর্ম-দ্রোহ?—হয় যদি তাই হোক,

    তার লাগি মোর অপরাধ কিবা—কেন তায় এত শোক!

    আজ দেখিতেছি, একদিন সেই নিষাদের নন্দনে

    করেছুনু ঘোর অবিচার আমি মমতা অন্ধ মনে।—

    তোমারি লাগিয়া অঙ্গুলি তার চেয়েছিনু দক্ষিণা,

    সে পাপের সাজা কেবা দিবে আর ক্রুর অর্জুন বিনা

    আজ পুনারায় নবধানুকীর অঙ্গুলি কাটি লয়ে

    পাঠাতাম যদি তোমার সকালে—হর্ষে ও বিস্ময়ে

    গুরুদেব বলি কত বাখানিতে বৃদ্ধের বীরপনা!

    সে আর হবে না আর করিব না ধর্মের বঞ্চনা।

    এতকাল ধরি দিয়াছ যে গুরু-ভক্তির পরিচয়,

    সেই ভাল ছিল, তার বেশি এ যে হয়ে গেল অতিশয়!

    মনে ভেবে দেখো, কিবা মানে তার, কি বুঝিবে রাজগণ,—

    ধিক্কারে আজ মুখরিত হল কুরুদের প্রাঙ্গণ।

    ***

    না—না, না—না, না—না, একি এ প্রলাপ বকিতেছি বারবার!

    অশ্বত্থামা! ফের পড়, লিপি,—হয়নি পরিষ্কার!

    মোর প্রাণাধিক প্রিয়তম সেই কিরীটীর নহে লিপি,

    এ লিখেছে কোন কুলশীলহীন পরের প্রসাদজীবী!

    লেখার মাঝারে ওঠে না ফুটিয়া সেই মনোহর মুখ,

    আজানু-দীর্ঘ সেই বাহু তার, বিরাট বিশাল বুক!

    হ্রস্ব খর্ব এ কোন বামন উপানৎ পরি উঁচা

    হইবারে চায়, চুরি করা চূড়া মাথায় বেঁধেছে ছুঁচা!

    অর্জুন নিজে শ্যাম-কলেবর—কৃষ্ণের সখা সে যে!

    সে কি ঘৃণা করে কৃষ্ণবরণ? বধূ কৃষ্ণার তেজে

    বাহুতে বীর্য, বক্ষে জাগিল যৌবন-ব্যাকুলতা—

    সে করেছে গ্লানি মসীরূপ বলি? সম্ভব নহে কথা!

    এ কোন শবর কিরাতের গালি, অনার্য জাতি-চোর!

    নকল কুলীন! বর্ণ-গর্বে কুৎসা রটায় মোর!

    হয়েছে! হয়েছে! অশ্বত্থামা! জেনেছি এতক্ষণে—

    বীরকুলগ্লানি সেই নিন্দুকে এবার পড়েছে মনে!

    আমি ব্রাহ্মণ, চির-উজ্জ্বল ব্রাহ্মণ্যের শিখা

    ললাটে আমার মিথ্যা-দহন জ্বলে যে সত্যটীকা।

    রাজসভাতলে জনগণমাঝে করি না যে বিচরণ;

    পথ-কুক্কুর নীচ-সহবাস ত্যাজিয়াছি প্রাণপণ।

    তবু যে আমার ধনু নির্ঘোষে টঙ্কার-ঝঙ্গারে

    নিজে গায়ত্রী-ছন্দ-জননী আসিয়া দাঁড়ান দ্বারে।

    আমরা পর্ণ-কুটিরের তলে রাজার দুলাল বীর—

    গড্ডলিকার দল নহে—আসি মাটিতে নোয়ায় শির!

    আমি সাধিয়াছি আর্য-সাধনা-সনাতন সুন্দর!—

    যে-মন্ত্র-বলে শাশ্বতীসমা সদ্‌গতি লভে নর!

    ত্যাজি অনার্য-সৃষ্টপন্থা, অন্ত্যজ-অনাচার,

    ক্ষত্রিয় সাজি ক্ষত্রিয়ে দিছি ব্রাহ্মণ-সংস্কার।

    কর্ণপটহ বিদারণ করি, বিদারিয়া নভোতল।

    পথে পথে ফিরি ইতরের সাথে করি নাই কোলাহল

    যুগ-ধর্মের সুযোগ বুঝিয়া চির-সত্যের গ্লানি

    করি নাই কভু,—যশোলিপ্সার—স্বার্থের আপসানি!

    নিজ হৃদয়ের পুরীষ-পঙ্ক দুই হাতে ছড়াইয়া

    যুগবাণী বলি, ধ্রুব-শাশ্বত পদতলে গুঁড়াইয়া,

    যত মূর্খ ও ষণ্ডমার্কে ভক্তশিষ্য করি,

    এই দেবতার দিবারে করিনি পিশাচের শর্বরী!

    জানিস্ বৎস, কোন মহারথী—এ কোন নূতন গ্রহ,

    মোর সাথে চির-শত্রুতা মানি, বিদ্বেষ দুঃসহ

    পুষিয়াছে মনে?—বৈরী সে, যথা কৃষ্ণের শিশুপাল!—

    সত্যের এই মিথ্যা-বৈরী যুগে যুগে চিরকাল?

    আজ আসিয়াছে নূতন ছদ্মে শিষ্যের সাজ পরি—

    গুরু-শিষ্যের ভক্তি ও স্নেহ কুৎসার লবে হরি!

    চিনেছি তোমারে হে কপটচারী দাম্ভিক দুর্জন!

    বক্ষের মণি অর্জুন নও—পাদুকার অর্জুন!

    বীর সে পার্থ আর্ত হয় না স্বার্থের সঙ্কোচ,

    —গুরুহত্যার পাতকের ভয়ে ললাটের স্বেদ মোছে!

    ব্রজ-আঘাতে হয় না কাতর বীর সে সব্যসাচী—

    তারে কাবু করে গোটা দুই তিন বাতাসের মশা-মাছি!

    তাহারি কারণে উন্মাদ হয়ে করিবে সে গুরুদ্রোহ!

    একি পাপ! একি অহংকারের নিদারুণ সম্মোহ!

    সে কি পাণ্ডব! দ্রোণের শিষ্য ক্ষত্রিয়-চূড়ামণি!—

    খুলে ফেল্ তোর ক্ষত্রিয়-বেশ, ওরে পাণ্ডব-শনি!

    রাধেয় কর্ণ পরিচয় তোর। আর যাহা পরিচয়—

    গুরু ভার্গবে প্রতারণা করি সেজেছিলি শ্রোত্রিয়!

    সেই কীট তোরে ছাড়িল না আজও। সেদিন পড়িলি ধরা

    দংশন সহি।—আজ বিপরীত—হলি যে অর্ধমরা!

    জমদগ্নির অভিশাপ বহি পলায়ে আসিলি চোর!

    জাতি আপনার লুকাতে নারিলি, লজ্জা নাহি যে তোর!

    দ্রোণ-গুরু নয়, সার্থক তোর গুরু সে পরশুরাম—

    বিস্ময় মানি দম্ভে তোমার—রেখেছ গুরুর নাম!

    ***

    ওরে নির্ঘ্‌ণ! আপনি আপন বিষ্ঠার পর্বতে

    চড়ি বসিয়াছ—মনে করিয়াছ আঁধারিবে হেন মতে

    সবিতার মুখ! ঘোর যশো-রবি-রাহু হতে সাধ যায়!

    আরে, আরে, তোর সম্পর্ধায় দেখি জোনাকিও লাজ পায়!

    কেমনে আনিলি হেন কথা মুখে? যজ্ঞের হবিটুকু

    সন্তর্পণে রাখিয়াছি ঢেকে, তাও হেরি চাকু-চুকু

    করিয়া লেহন, সাধ যায়—সেথা উগারিতে একরাশি

    অমেধ্য যে সব উদরে রাজিছে—কতকালকার বাসি,

    চুরি করা যত গরহজমের!—পথে প্রান্তরে যার

    সৌরভ পেয়ে এতদিন পরে ভরিয়াছে সংসার

    লালা ও পঙ্কবিলাসীর দল—শবভুক নিশাচর,

    শকুনি, গৃধিনী, শৃগালের পাল—রসনা-তৃপ্তিকর

    পাইয়াছ ভোজ! ভাবিয়াছ বুঝি সেই রস উপাদেয়?

    দেব-যজ্ঞের আহুতি সে ঘৃত সোমরস হবে হেয়?

    উন্মাদ—তুই উন্মাদ! তাই পতনের কালে আজ

    বিষ-বিদ্বেষ উথলি উঠেছে, নাই তোর ভয় লাজ!

    আমারে করেছে কুরু-সেনাপতি কৌরব-নৃপমণি,

    তাই হিংসায় পুরীষ-ভাণ্ডে মাছি ওঠে ভনভনি!

    তাই তাড়াতাড়ি পার্থের নামে কুৎসার ছল ধরে

    তারি নামে লিপি পাঠালি আমারে কুৎসিত গালি ভরে

    আমি ব্রাহ্মণ, দিব্যচক্ষে দুর্গতি হেরি তোর—

    অধঃপাতের দেরি নাই আর, ওরে হীন জাতি-চোর!

    আমার গায়ে যে কুৎসার কালি ছড়াইলি দুই হাতে—

    সব মিথ্যার শাস্তি হবে সে এক অভিসম্পাতে,

    গুরু ভার্গব দিল যা তুহারে! ওরে মিথ্যার রাজা।

    আত্মপূজার ভণ্ড পূজারী! যাত্রার বীর সাজা

    ঘুচিবে তোমার, মহাবীর হওয়া মর্কট-সভাতলে!

    দুর্দিনের এই মুখোশ-মহিমা তিতিবে অশ্রুজলে!

    অভিশাপরূপী নিয়তি করিবে নিদারুণ পরিহাস

    চরমক্ষণে মেদিনী করিবে রথের চক্র গ্রাস!

    মিথ্যায় ভুলি যে মহামন্ত্র গুরু দিয়েছিল কানে,

    বড় প্রয়োজনে পড়িবে না মনে, সে বিফল সন্ধানে

    নিজেরি অস্ত্র নিজেরে হানিবে—শেষ হবে অভিনয়,

    এতদিন যাহা নেহারি সকলে মেনেছিল বিস্ময়!

    ‘বিদায়-মাভৈ’ ১৩৩০ চৈত্রের ‘প্রবাসী’তে এবং ‘বাংলার মহাত্মা’ ১৩৩২ জ্যৈষ্ঠে ৫ম বর্ষের ২৬শ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অশ্বিনীকুমার’ ২১শে মাঘ ১৩৩২ মুতাবিক ৪ঠা জানুয়ারি ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙল’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। রবিশালের কর্মযোগী অশ্বিনীকুমার দত্তের মৃত্যুতে এই শোক-কবিতা রচিত।

    ‘ইন্দু-প্রয়াণ’ কবিতাটির ২৪শ চরণ কবিপত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলাম কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণে মুদ্রিত আছে এইরূপ—

    এবারে হে কবি করিব পূর্ণ এ চির-কবি পুরে! …

    এই পঙ্‌ক্তিটি প্রথম সংস্করণে ছিল এইরূপ—

    এবার হে কবি করিব পূর্ণ ঐ চির-কবি পুরে! …

    ‘দিল-দরদী’ ১৩২৮ আশ্বিনের ‘মোসলেম-ভারতে’ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে কবিতার শেষ দুই চরণ ছিল এরূপ—

    বাদশা কবি! সালাম জানায় বুনো তোমার ছোট্ট ভাই!

    কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর যায় ডুবে যায় সব কথাই।

    কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১০ই আষাঢ় মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দের ২৫শে জুন রাত্রি ২৷৷৹ (আড়াইটায়) দুরন্ত ব্রঙ্কাইটিস্ রোগে দেহত্যাগ করেন। তাঁর স্মরণে নজরুল ইসলাম ১৩২৯ শ্রাবণে দ্বিতীয় বর্ষ ৩৩শ সংখ্যক ‘বিজলী’তে লেখেন ‘সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ’ কবিতা।

    ‘সত্য-কবি’ ভারতী পত্রিকায় ‘কবি সত্যেন্দ্র’ শিরোনামে এবং ‘সত্যন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি’ মাসিক বসুমতীতে ‘প্রত্য-প্রয়াণ-গীতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতী’ হতে ‘কবি সত্যেন্দ্র’ ১৩২৯ আষাঢ়ের ‘উপাসনা’য় উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘অন্তর-ন্যাশনাল-সঙ্গীত’, ‘রক্ত-পতাকার গান’ ও ‘জাগর-তূর্য’ যথাক্রমে ১৩৩৪ সালের ৮ই বৈশাখ, ১৫ই বৈশাখ ও ২২শে বৈশাখ তারিখের ‘গণবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘যুগের আলো’ ১৩৩৩ ফাল্গুনের ‘যুগের আলো’তে এবং ‘পথের দিশা’ ‘অগ্রদূত’-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘যা শত্রু পরে পরে’ ১৩৩৩ আশ্বিনে বর্ধমানের ‘শক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; ‘শক্তি’ হতে ২৫শে আশ্বিন ১৩৩৩ তারিখে ‘গণবাণী’তে উদ্ধৃত হয়েছিল।

  • সব্যসাচী

    সব্যসাচী

    সব্যসাচী

    ওরে ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাপা প্রাচী,

    গৌরীশেখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী!

    দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া

    জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া,

    মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি।’

    নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী!

    বিরাট কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে,

    গান্ডিব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে!

    বাজিছে বিষাণ পাঞ্চজন্য,

    সাজে রথাশ্ব, হাঁকিছে সৈন্য,

    ঝড়ের ফুঁ দিয়া নাচে অরণ্য, রসাতলে দোলা লাগে,

    দোলায় বসিয়া হাসিছে জীবন মৃত্যুর অনুরাগে!

    যুগে যুগে মরে বাঁচে পুন পাপ দুর্মতি কুরুসেনা,

    দুর্যোধনের পদলেহী ওরা, দুঃশাসনের কেনা!

    লঙ্কাকান্ডে কুরুক্ষেত্রে,

    লোভ-দানবের ক্ষুধিত নেত্রে,

    ফাঁসির মঞ্চে কারার বেত্রে ইহারা যে চির-চেনা!

    ভাবিয়াছ, কেহ শুধিবে না এই উৎপীড়নের দেনা?

    কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,

    আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।

    আজি সম্রাট কালি সে বন্দী,

    কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দ্বী!

    কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,

    তারই বুক ফেটে আসে নৃসিংহ, যারে করে পদাহত!

    আজ যার শিরে হানিছে পাদুকা কাল তারে বলে পিতা,

    চির-বন্দিনী হতেছে সহসা দেশ-দেশ-নন্দিতা।

    দিকে দিকে ওই বাজিছে ডঙ্কা,

    জাগে শংকর বিগত-শঙ্কা!

    লঙ্কা-সায়রে কাঁদে বন্দিনী ভারত-লক্ষ্মী সীতা,

    জ্বলিবে তাঁহারই আঁখির সুমুখে কাল রাবণের চিতা!

    যুগে যুগে সে যে নব নব রূপে আসে মহাসেনাপতি,

    যুগে যুগে হন শ্রীভগবান যে তাঁহারই রথ-সারথি!

    যুগে যুগে আসে গীতা-উদ্‌গাতা

    ন্যায়-পান্ডব-সৈন্যের ত্রাতা।

    অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী,

    শিবের খড়্গে তখনই মুণ্ড হারায়েছে প্রজাপতি!

    নবীন মন্ত্রে দানিতে দীক্ষা আসিতেছে ফাল্গুনি,

    জাগো রে জোয়ান! ঘুমায়ো না ভূয়ো শান্তির বাণী শুনি-

    অনেক দধীচি হাড় দিল ভাই,

    দানব দৈত্য তবু মরে নাই,

    সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি!

    জাগো রে জোয়ান! বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!

    দক্ষিণ করে ছিঁড়িয়া শিকল, বাম করে বাণ হানি’

    এসো নিরস্ত্র বন্দীর দেশে হে যুগ-শস্ত্রপাণি!

    পূজা করে শুধু পেয়েছি কদলী,

    এইবার তুমি এসো মহাবলী।

    রথের সুমুখে বসায়ো চক্রী চত্রুধারীরে টানি,

    আরসত্য সেবিয়া দেখিতে পারি না সত্যের প্রাণহানি।

    মশা মেরে ওই গরজে কামান—‘বিপ্লব মারিয়াছি’।

    আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি!

    মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,

    টিকি দাড়ি নিয়ে আজও বেঁচে আছি!

    বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,

    যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার মরে বাঁচি!

    হুগলি,

    কার্তিক, ১৩৩২

  • দ্বীপান্তরের বন্দিনী

    দ্বীপান্তরের বন্দিনী

    দ্বীপান্তরের বন্দিনী

    আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী?

    মা-র কতদিন দ্বীপান্তর?

    পুণ্য বেদির শূন্যে ধ্বনিল

    ক্রন্দন—‘দেড় শত বছর।’…

    সপ্ত সিন্ধু তেরো নদী পার

    দ্বীপান্তরের আন্দামান,

    রূপের কমল রূপার কাঠির

    কঠিন স্পর্শে যেখানে ম্লান,

    শতদল যেথা শতধা ভিন্ন

    শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-ঘায়,

    মন্ত্রী যেখানে সান্ত্রি বসায়ে

    বীনার তন্ত্রী কাটিছে হায়,

    সেখান হতে কি বেতার-সেতারে

    এসেছে মুক্ত-বন্ধ সুর?

    মুক্ত কি আজ বন্দিনী বাণী?

    ধ্বংস হল কি রক্ষ-পুর?

    যক্ষপুরীর রৌপ্য-পঙ্কে

    ফুটিল কি তবে রূপ-কমল?

    কামান গোলার সীসা-স্তূপে কি

    উঠেছে বাণীর শিশমহল?

    শান্তি-শুচিতে শুভ্র হল কি

    রক্ত সোঁদাল খুন-খারাব?

    তবে এ কীসের আর্ত আরতি,

    কিসের তরে এ শঙ্খারাব?…

    সাত সমুদ্র তেরো নদী পার

    দ্বীপান্তরের আন্দামান,

    বাণী যেথা ঘানি টানে নিশিদিন,

    বন্দী সত্য ভানিছে ধান,

    জীবন-চুয়ানো সেই ঘানি হতে

    আরতির তেল এনেছ কি?

    হোমানলে দিতে বাণীর রক্ষী

    বীর ছেলেদের চর্বি ঘি?

    হায় শৌখিন পূজারি, বৃথাই

    বেদির শঙ্খে দিতেছ ফুঁ,

    পুণ্য বেদির শূন্য ভেদিয়া

    ক্রন্দন উঠিতেছে শুধু!

    পূজারি, কাহারে দাও অঞ্জলি?

    মুক্ত ভারতী ভারতে কই?

    আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক,

    সত্য বলিলে বন্দী হই,

    অত্যাচারিত হইয়া যেখানে

    বলিতে পারি না অত্যাচার,

    যথা বন্দিনী সীতা সম বাণী

    সহিছে বিচার-চেড়ীর মার,

    বাণীর মুক্ত শতদল যথা

    আখ্যা লভিল বিদ্রোহী,

    পূজারি, সেখানে এসেছ কি তুমি

    বাণী পূজা-উপচার বহি?

    সিংহেরে ভয়ে রাখে পিঞ্জরে,

    ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল,

    ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল,

    বাণীর কমল খাটিবে জেল!

    তবে কি বিধির বেতার-মন্ত্র

    বেজেছে বাণীর সেতারে আজ,

    পদ্মে রেখেছে চরণ-পদ্ম

    যুগান্তরের ধর্মরাজ?

    তবে তাই হোক। ঢালো অঞ্জলি,

    বাজাও পাঞ্চজন্য শাঁখ!

    দ্বীপান্তরের ঘানিতে লেগেছে

    যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক!

    হুগলি,

    মাঘ, ১৩৩১

  • প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    যায় মহাকাল মূর্ছা যায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    যায় অতীত

    কৃষ্ণ-কায়

    যায় অতীত

    রক্ত-পায়—

    যায় মহাকাল মূর্ছা যায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    যায় প্রবীণ

    চৈতি-বায়

    আয় নবীন-

    শক্তি আয়!

    যায় অতীত

    যায় পতিত,

    ‘আয় অতিথ,

    আয় রে আয় –’

    বৈশাখী-ঝড় সুর হাঁকায় –

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    ওই রে দিক্-

    চক্রে কার

    বক্রপথ

    ঘুর-চাকার!

    ছুটছে রথ,

    চক্র-ঘায়

    দিগ্‌বিদিক

    মূর্ছা যায়!

    কোটি রবি শশী ঘুর-পাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    ঘোরে গ্রহ তারা পথ-বিভোল, –

    ‘কাল’-কোলে ‘আজ’খায় রে দোল!

    আজ প্রভাত

    আনছে কায়,

    দূর পাহাড়-

    চূড় তাকায়।

    জয়-কেতন

    উড়ছে কার

    কিংশুকের

    ফুল-শাখায়।

    ঘুরছে রথ,

    রথ-চাকায়

    রক্ত-লাল

    পথ আঁকায়।

    জয়-তোরণ

    রচছে কার

    ঐ উষার

    লাল আভায়,

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়।

    গর্জে ঘোর

    ঝড় তুফান

    আয় কঠোর

    বর্তমান।

    আয় তরুণ

    আয় অরুণ

    আয় দারুণ,

    দৈন্যতায়!

    ভয় কী আয়!

    ঐ মা অভয়-হাত দেখায়

    রামধনুর

    লাল শাঁখায়!

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    বর্ষ-সতী-স্কন্ধে ঐ

    নাচছে কাল

    থই তা থই

    কই সে কই

    চক্রধর,

    ঐ মায়ায়

    খণ্ড কর।

    শব-মায়ায়

    শিব যে যায়

    ছিন্ন কর

    ঐ মায়ায় —

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    কৃষ্ণনগর,

    ৩০ চৈত্র, ১৩৩২

  • আশীর্বাদ

    আশীর্বাদ

    আশীর্বাদ

    কল্যাণীয়া শামসুন নাহার খাতুন

    জয়যুক্তাসু

    শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ

    তারই বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ-বাতির সিন্ধু-দীপ।

    শাশ্বত সেই দীপান্বিতার দীপ হতে আঁখি-দীপ ভরি

    আসিয়াছ তুমি অরুণিমা-আলো প্রভাতি তারার টিপ পরি।

    আপনার তুমি জান পরিচয় – তুমি কল্যাণী তুমি নারী –

    আনিয়াছ তাই ভরি হেম-ঝারি মরু-বুকে জমজম-বারি।

    অন্তরিকার আঁধার চিরিয়া প্রকাশিলে তব সত্য-রূপ –

    তুমি আছ, আছে তোমারও দেবার, তব গেহ নহে অন্ধ-কূপ।

    তুমি আলোকের – তুমি সত্যের – ধরার ধুলায় তাজমহল, –

    রৌদ্র-তপ্ত আকাশের চোখে পরালে স্নিগ্ধ নীল কাজল!

    আপনারে তুমি চিনিয়াছ যবে, শুধিয়াছ ঋণ, টুটেছে ঘুম,

    অন্ধকারের কুঁড়িতে ফুটেছ আলোকের শতদল-কুসুম।

    বদ্ধ কারার প্রকারে তুলেছ বন্দিনীদের জয়-নিশান –

    অবরোধ রোধ করিয়াছে দেহ, পারেনি রুধিতে কণ্ঠে গান।

    লহো স্নেহাশিস – তোমার ‘পুণ্যময়ী’র ‘শাম‍্‍স্1’ পুণ্যালোক

    শাশ্বত হোক! সুন্দর হোক! প্রতি ঘরে চির-দীপ্ত রোক।

    হুগলি,

    ১৯ মাঘ, ১৩৩১

  • মুক্তিকাম

    মুক্তিকাম

    মুক্তিকাম

    স্বাগত বঙ্গে মুক্তিকাম!

    সুপ্ত বঙ্গে জাগুক আবার লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম!

    শোনাও সাগর-জাগর সিন্ধু-ভৈরবী গান ভয়-হরণ,–

    এ যে রে তন্দ্রা, জেগে ওঠ তোরা, জেগে ঘুম দেওয়া নয় মরণ!

    সপ্ত-কোটি কু-সন্তান তোরা রাখিতে নারিলি সপ্তগ্রাম?

    খাসনি মায়ের বুকের রুধির? হালাল খাইয়া হলি হারাম!

    মৃত্যু-ভূতকে দেখিলি রে শুধু, দেখিলি না তোরা ভবিষ্যৎ,

    অস্ত-আঁধার পার হয়ে আসে নিত্য প্রভাতে রবির রথ!

    অহোরাত্রিকে দেখেছে যাহারা সন্ধ্যাকে তারা করে না ভয়,

    তারা সোজা জানে রাত্রির পরে আবার প্রভাত হবে উদয়।

    দিন-কানা তোরা আঁধারের প্যাঁচা, দেখেছিস শুধু মৃত্যু-রাত,

    ওরে আঁখি খোল, দেখ তোরও দ্বারে এসেছে জীবন নব-প্রভাত!

    মৃত্যুর ‘ভয়’ মেরেছে তোদেরে, মৃত্যু তোদেরে মারেনি, ভাই!

    তোরা মরে তাই হয়েছিস ভূত, আলোকের দূত হলিনে তাই!

    জীবন থাকিতে ‘মরে আছি’ বলে পড়িয়া আছিস মড়া-ঘাটে,

    সিন্ধু-শকুন নেমেছে রে তাই তোদের প্রাণের রাজ-পাটে!

    রক্ত মাংস খেয়েছে তোদের, কঙ্কাল শুধু আছে বাকি,

    ওই হাড় নিয়ে উঠে দাঁড়া তোরা ‘আজও বেঁচে আছি’ বল ডাকি!

    জীবনের সাড়া যেই পাবে, ভয়ে সিন্ধু-শকুন পালাবে দূর,

    ওই হাড়ে হবে ইন্দ্র-বজ্র, দগ্ধ হবে রে বৃত্রাসুর!

    এ মৃতের দেশে, অমৃত-পুত্র, আনিবে কি সেই অমৃত-ঢল –

    যাতে প্রাণ পেয়ে মৃত সগরের দেশ এ বঙ্গ হবে সচল?

    জ্যান্তে-মরা এ ভীরুর ভারতে চাই নাকো মৃত-সঞ্জীবন,

    ক্লীবের জীবন-সুধা আনো, করো ভূতের ভবিষ্যৎ সৃজন!

    হুগলি

    ২০ পৌষ, ১৩৩১