Blog

  • চার

    চার

    বুড়ো রাত বাড়তে লাগলো ধীরে ধীরে।

    কাল কি হবে কেউ জানে না।

    রাস্তায় পুলিশ নেমেছে। পুলিশের গাড়ি ইতস্তত ছুটোছুটি করছে।

    পথঘাটগুলো জনশূন্য।

    একটা খালি রক পেয়ে তার উপরে গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়লো গফুর। দুটো শাড়ি

    কিনেছে সে।

    এক শিশি আলতা।

    কিছু চুড়ি।

    একটা নাকফুল।

    সেগুলো বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে নানা কথা ভাবতে লাগলো সে। আমেনার কথা।

    বিয়ের পর কেমন করে সংসার করবে সে কথা।

    আর কোনদিন যদি ছেলেপুলে হয় তার কথা।

    ইচ্ছে করলে সে আজ গ্রামে ফিরে যেতে পারতো। কিন্তু সে যায়নি কারণ সে হরতাল দেখবে।

    হয়তো কোনদিন আর শহরে আসা নাও হতে পারে। তাই হরতাল সে দেখে যাবে।

    দু’ একটা কেনাকাটাও বাকি রয়ে গেছে।

    একটা লাল লুঙ্গি কিনবে সে ভেবেছিলো।

    কয়েক দোকানে ঘোরাঘুরিও করেছিলো।

    কিন্তু ওরা বড় চড়া দাম চায়।

    তাই গফুর ভাবলো, যদি কম দামে পাওয়া যায়। আর দু’ একটা দোকানপাট খোলা থাকে তাহলে সে কিনবে সেটা।

    লাল লুঙ্গি আমেনা ভীষণ পছন্দ করে।

    শুয়ে শুয়ে গফুর দেখলো দুটো পুলিশের গাড়ী ছুটে চলে গেলো রাস্তা দিয়ে। গফুর চোখ বন্ধ করলো।

     

    কবি আনোয়ার হোসেন উত্তেজিতভাবে ঘরের ভেতরে পায়চারি করলেন অনেকক্ষণ ধরে।

    সালেহা ডাকলো—

    কই, শোবে না?

    না।

    শান্ত গলায় জবাব দিলেন কবি—

    জানো সালেহা, আজ বহুদিন পর আমার কি মনে হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে, আমার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেলো। আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। কবিতা লিখতাম। কবিতা ছিল আমার স্বপ্ন। আমার সাধনা। ভেবেছিলাম সারাটা জীবন আমি কবিতা লিখেই কাটিয়ে দেবো। কিন্তু আমি— সেই আমি— দেখ আজ লেজার লিখতে লিখতে ক্লান্ত।

    সালেহা সহানুভূতির সঙ্গে তাকালেন তাঁর দিকে।

    লেখো না কেন? মাঝে মাঝে লিখলেই তো পারো। তুমি তো কবিতা লিখেই আমাকে পাগল করেছিলে, মনে নেই?

    কথাটা শুনে সহসা শব্দ করে হেসে উঠলেন কবি আনোয়ার হোসেন। মনে আছে সালেহা। মনে থাকবে না কেন? শুধু কি জানো! আমার সেই মনটা নেই, যে মন নিয়ে একদিন আমি কবিতা লিখতাম।। আমার সেই মনটা না, লেজারের চাপে দুমড়ে গেছে। মরে গেছে।

    এসো এখন শুয়ে পড়ো।

    সালেহা ডাকলো।

    না!

    আবার বললেন আনোয়ার হোসেন।

    তাঁর সারা মুখে কি এক অস্থিরতা।

    স্ত্রীর কাছে এসে বসলেন তিনি—

    সালেহা, আমি ঠিক করেছি, আমি আর ও চাকরি করবো না। এসব সরকারি চাকরি মানুষকে ক্রীতদাস করে ফেলে। আমি ছেড়ে দেবো। যেখানে আমার সামান্য স্বাধীনতা নেই সেখানে কেন আমি কুলুর বলদের মতো ঘানি টেনে যাবো। আমি আবার কবিতা লিখবো সাহেলা। যে কবিতা পড়ে তোমার একদিন ভালো লেগেছিলো— তেমনি কবিতা লিখবো আমি।

    সালেহার পুরো চেহারায় কে যেন আলকাতরা লেপে দিলো।

    না, না! চাকরি ছাড়া ঠিক হবে না। তাহলে সংসার চলবে কি করে? কবিতা লিখে তো আর টাকা পাবে না তুমি।

    টাকা! টাকাই কি জীবনের সব কিছু সালেহা? মানুষের মন বলে কি কিছুই নেই?

    শোনো। ওসব চিন্তা এখন রাখো।

    সালেহা স্বামীর হাত ধরলো।

    এসো, এখন শুয়ে পড়া যাক। কাল আবার ভোরে ভোরে উঠতে হবে না!

    আমি কিন্তু কাল অফিসে যাবো না।

    কেন?

    আমি হরতাল করবো। ওরা নিষেধ করেছে। বলেছে চাকরি যাবে, যাক সেটা পরোয়া করি না। আমার ভাষার চেয়ে কি চাকরি বড়?

    কাল কি হবে কে জানে। হয়তো মারাত্মক কিছুও ঘটতে পারে। বসে বসে ভাবলো তসলিম। জীবনে এই প্রথম অনুভূতির জন্ম নিলো তার মনে।

    একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙতেই হবে। নইলে আন্দোলন এখানেই শেষ হয়ে যাবে।

    বাংলা ভাষাকে চিরতরে নির্মূল করে দেবে ওরা।

    আর একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙতে গেলে হয়তো পুলিশ গুলিও চালাতে পারে।

    হয়তো তসলিম মারা যাবে।

    নিজের মৃত্যুর কথা ভাবতে গিয়ে সহসা শিউরে উঠলো সে। মনে হলো যেন নিজের মৃত্যুকে সে এ মুহূর্তে প্রত্যক্ষ করছে।

    ভাত খাবেন না!

    সালমার কণ্ঠস্বরে চমকে তাকালো তসলিম।

    সালমা বললো—

    তরকারি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে চলুন।

    বলে চলে যাচ্ছিলো সালমা।

    সহসা পেছন থেকে তাকে ডাকলো তসলিম—

    সালমা, শোন! তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

    সালমা ফিরে তাকালো।

    নীরব দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলো—

    কি বলুন?

    সে চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না তসলিম। চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বললো—

    কথাটা আমার তুমি কিভাবে নেবে জানি না, হয়তো তুমি রাগ করবে—। বলতে গিয়ে থেমে গেলো সে।

    সালমা নীরব।

    কয়েকটি নীরব মুহূর্ত।

    সহসা তসলিম আবার বললো—

    বহুবার ভেবেছি বলবো তোমাকে। বলা হয়নি। হয়তো কোনদিন বলতাম না। কিন্তু আজ কেন জানি না বলতে ভীষণ ইচ্ছে করছে আমার।

    আবার নীরব হলো তসলিম।

    সালমা মাটির দিকে চেয়ে চুপ করে আছে।

    মনে হলো ওর মুখখানা কৃষ্ণচূড়ার রঙে ভরে গেছে।

    সালমা বললো—

    চলুন, এখন খেয়ে নিন। পরে এক সময় না হয় শুনবো ওসব।

    না না সালমা, যদি কাল কোন অঘটন ঘটে। ধরো যদি আমি মারা যাই। তাহলে?

    মেয়েটি শিউরে উঠলো।

    চোখজোড়া মুহূর্তে ছল ছল করে উঠলো তার।

    ছিঃ। এসব কি বলছেন! আপনি মরবেন কেন? আপনি অনেক অনেক দিন বাঁচবেন। আসুন, এখন খেয়ে নিন। চলুন।

    কথাটা শুনবে না?

    না, এখন নয়। পরে শুনবো।

    উত্তরের অপেক্ষা না করেই সামনে থেকে সরে গেল সালমা।

     

    তুমি কি কাল বাইরে বেরুবে, না ঘরে থাকবে?

    বিছানায় শোবার আগে মুখে ক্রিম ঘষতে ঘষতে স্বামীকে প্রশ্ন করলেন বিলকিস বানু।

    হ্যাঁ, বেরুবো বৈকি। বেরুবো না কেন?

    না, বলছিলাম কি যদি হরতাল হয় তাহলে?

    হরতাল মোটেও হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

    বিজ্ঞের মতো জবাব দিলেন মকবুল আহমদ।

    হরতালের সব রাস্তা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।

    যে হরতাল করবে তার লাইসেন্স আমরা কেড়ে নেবো। কেউ যদি অফিসে না আসে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করবো। আমরা জানিয়ে দিয়েছি। পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছি সবাইকে। তারপরও কি কেউ হরতাল করবে বলে মনে হয় তোমার?

    স্লিপিং স্যুটটা পরে নিয়ে বিছানায় এসে শুলেন মকবুল আহমদ। কিন্তু ছাত্ররা হয়তো এক আধটু গোলমাল করতে পারে। তাও আমরা ভেবে রেখেছি।

    ক্রিম ঘষা শেষ হলে বিলকিস বানু বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসলেন।

    আমার কি মনে হচ্ছে জানো? কাল কোন একটা কিছু হয়তো হতেও পারে। তুমি যেদিকে খুশি যেও, কিন্তু ওই ছাত্রদের পাড়ায় গাড়ি নিয়ে যেও না।

    তুমি মিছেমিছি ভাবছো। শুয়ে পড়ো এখন।

    চোখ বন্ধ করে ঘুমোবার চেষ্টা করলেন মকবুল আহমদ।

  • তিন

    তিন

    সদরঘাটে যেখানে অনেকগুলো খেয়ানৌকা ভিড় করে থাকে তার কাছাকাছি একটা ইট টেনে নিয়ে বসে পড়লো গফুর।

    ক্ষিদে পেয়েছে। খাবে।

    পুটলীটা ধীরে ধীরে খুললো সে।

    শহরের লোকজনদের সে বলতে শুনেছে— কাল নাকি হরতাল।

    শহরের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকবে।

    গাড়ি ঘোড়া চলবে না।

    হরতাল কি গফুর বোঝে না।

    পিঠা খেতে খেতে সে নানাভাবে হরতালের একটা অবয়ব চিন্তা করতে লাগলো। কিন্তু হরতালের কোন সঠিক চেহারা নির্ণয় করা তার পক্ষে সম্ভব হলো না।

    সে ভাবলো, এটা হয়তো শহরেরই বিশেষ একটা রীতি কিম্বা নীতি। মাঝে মাঝে শহরের মানুষরা এরকম হরতাল পালন করে থাকে।

    উঠে গিয়ে দু’হাতে বুড়িগঙ্গার পানি তুলে নিয়ে পান করলো গফুর। গামছায় মুখ হাত মুছলো। তারপর ট্যাক থেকে রুমালটা বের করে টাকাগুলো গুণে গুণে বার কয়েক দেখলো সে।

    কাল দোকানপাট বন্ধ থাকবে।

    কেনাকাটা আজকে শেষ করতে হবে।

    মুহূর্তে আমেনার মুখ মনে পড়লো তার।

    কি করছে আমেনা এখন?

    হয়তো পুকুর ঘাটে পানি নিতে এসেছে।

    কিম্বা ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে।

    অথবা কচু বনে ঘুরে ঘুরে কচু শাক তুলছে।

    সাতদিন পরে বিয়ে।

    ভাবতে বড় ভালো লাগলো গফুরের।

    সহসা বিকট একটা আওয়াজ শুনে চমকে তাকাল গফুর।

    দেখলো কয়েকটি ছেলে মুখে চোঙা লাগিয়ে চিৎকার করে বলছে— কাল হরতাল।

    আমাদের মুখের ভাষাকে ওরা জোর করে কেড়ে নিতে চায়।

    আমাদের প্রাণের ভাষাকে ওরা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু আমরা মাথা নোয়াবো না।

    আমরা আমাদের ভাষাকে কেড়ে নিতে দেবো না।

    আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।

    আর সে দাবিতে কাল হরতাল।

    সবাই হরতাল পালন করুন।

    গফুর অবাক হয়ে শুনলো।

    সে ভাবলো কাউকে জিজ্ঞেস করবে ব্যাপারটা কি? কিন্তু সাহস পেলো না। অদূরে একটা লোক তাসের খেলা দেখাচ্ছিল।

    নানা রকম খেলা।

    আজগুবি খেলা।

    গফুর ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে খেলা দেখতে লাগলো।

     

    কিসের হরতাল?

    আমি হরতাল মানি না।

    রিক্সার ব্রেকটা খারাপ হয়ে গেছে। সেটা ঠিক করতে করতে আপন মনে গজ গজ করে উঠলো সেলিম।

    রিক্সা না চালালে আমি রোজগার করবো কোত্থেকে ?

    আমি খাব কি?

    আমার বউ খাবে কি?

    আমার ছেলে খাবে কি?

    ওসব হরতালের মধ্যে আমি নেই।

    ব্রেকটা ঠিক করে সবে রিক্সাটা নিয়ে সামনে এগুতে যাবে সে এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ডাকলো—

    ভাড়া যাবে?

    সেলিম দেখলো একটা ছেলে।

    বোধ হয় ছাত্র।

    হাতে বই।

    বগলে একগাদা কাগজ।

    কোথায় যাবেন স্যার?

    ইউনিভার্সিটি।

    ওঠেন।

    তসলিম রিক্সায় ওঠে বসতেই সেলিম প্রশ্ন করলো—

    আপনারা কালকে হরতাল করছেন কেন? রিক্সা না চালালে আমরা রুজি-রোজগার করবো কেমন করে? হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকবো নাকি।

    মুহূর্ত কয়েক সময় নিলো তসলিম। তারপর ধীরে ধীরে বললো— আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। আর ওরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চায়। উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তাহলে বাংলা ভাষা এ দেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। তোমাকে আমাকে আমাদের সবাইকে উর্দুতে কথা বলতে হবে।

    উর্দু আমি কিছু কিছু জানি।

    সেলিম বিজ্ঞের মতো বললো—

    কিন্তু আমার বউ উর্দু একেবারে বোঝে না। ও মুন্সিগঞ্জের মেয়ে কিনা তাই। তবে ছেলেকে আমি উর্দু বাংলা দুটোই শেখাচ্ছি।

    তসলিম বললো—

    উর্দুর সঙ্গে আমাদের কোন বিরোধ নেই। আমরা উর্দু বাংলা দুটোকেই সমানভাবে চাই।

    কিন্তু হরতাল করছেন কেন?

    হরতালের মাধ্যমে আমরা আমাদের বিক্ষোভ জানাতে চাই। আমাদের প্রতিবাদ জানাতে চাই।

    কিছু না বুঝলেও বার কয়েক ঘাড় দোলালো সেলিম।

     

    সরকারের চাকরি করি বলে কি আমরা আমাদের মতামতটাও বন্ধক দিয়ে দিয়েছি নাকি? আমরা কি ওদের ক্রীতদাস যে ওদের কথামতো আমাদের চলতে হবে।

    চেয়ারে বসে ছটফট করতে লাগলেন কবি আনোয়ার হোসেন।

    বড় কর্তার হুকুম এসেছে। কাল সবাইকে সময় মতো অফিসে হাজির হতে হবে। হরতাল করা চলবে না। যে হাজির হবে না তাকে সাসপেন্ড করা হবে।

    কেন? আমাদের ভাষাটাকে তোমরা জোর করে কেড়ে নিয়ে যাবে? আর আমরা চুপ করে বসে থাকবো? কুকুর বেড়ালেরও নিজস্ব একটা ভাষা আছে। দেখি ওদের মুখ বন্ধ কর দাও তো! তোমাদের ছেড়ে দেবে? কামড়ে আঁচড়ে গায়ের রক্ত বের করে দেবে না? ওসব হুকুম আমি মানি না। যদি চাকুরি যায়, যাবে। মুটেগিরি করবো। দরকার হলে রাস্তায় খবরের কাগজ বিক্রি করবো। কিন্তু আমাকে তোমরা ক্রীতদাস বানিয়ে নিবে সেটা চলবে না।

    রাগে গজ গজ করতে লাগলেন কবি আনোয়ার হোসেন।

    ব্যাস কাল হরতাল। আমি অফিসে যাবো না, যা হয় হোক।

    হিসেবের খাতাটা বন্ধ করে টেবিলের এক কোণে রেখে দিলেন তিনি।

     

    ওসব হরতালের হুমকিতে মাথা নোয়ালে দেশ চলবে না। হরতাল বন্ধ করতে হবে। সভা-সমিতি ভেঙ্গে দিতে হবে। রাস্তায় মিছিল করা বে-আইনী ঘোষণা করতে হবে। তবে ঠাণ্ডা হবে ওরা।

    আমলাদের সামনে লম্বা ভাষণ দিলেন মকবুল আহমদ।

    মন্ত্রীরা ছুটোছুটি করছে।

    এক মুহূর্তের বিশ্রাম নেই।

    নেতারা তর্কবিতর্কে মেতে উঠেছেন।

    আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলছেন।

    যে করেই হোক হরতাল বন্ধ করতে হবে।

    রাস্তায় মিছিল বের করা বে-আইনী করতে হবে।

    পাড়ার মাতব্বরদের ডাকা হয়েছে।

    তাদের সঙ্গে পরামর্শ চলছে।

    যত লোক লাগে আমরা দেবো।

    যত টাকা লাগে আমরা যোগাবো।

    পুলিশের প্রয়োজন হলে পুলিশ দেবো।

    সব কিছু পাবেন আপনারা।

    হরতাল বন্ধ করতে হবে।

    মিছিল বন্ধ করতে হবে।

    মাতব্বররা ঘাড় নোয়ালেন।

    নামাজের সেজদা দেয়ার মতো।

     

    কতগুলো উদ্ধত মুখ।

    ঋজু।

    কঠিন।

    একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো।

    না।

    আমরা মানি না।

    সরকার একশ’ চুয়াল্লিশ ধারা জারী করে আমাদের মুখ বন্ধ করে দেবে। প্রতিবাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে আমাদের। সে অন্যায় আমরা মাথা পেতে নেবো না।

    আইন দিয়ে ওরা আমাদের শৃঙ্খলিত করতে চায়। সে শৃঙ্খল আমরা ভেঙ্গে চুরমার করে দেবো।

    আমরা গরু ছাগল ভেড়া নই যে, প্রয়োজন বোধে খোঁয়াড়ের মধ্যে বন্ধ করে রাখবে।

    তর্কবিতর্ক চললো অনেকক্ষণ ধরে।

    আলোচনার ঝড় উঠলো।

    কেউ বললো—

    আইন, আইন অমান্য করা ঠিক হবে না।

    কেউ বললো—

    এ আইন শোষণের আইন। এ আইন আমরা মানি না।

  • দুই

    দুই

    অর্থ আর প্রাচুর্যের অফুরন্ত সমাবেশ।

    অভাব বলতে কিছু নেই। মকবুল আহমদের জীবনে।

    বাড়ি আছে।

    গাড়ি আছে।

    ব্যাঙ্কে টাকা আছে।

    ছেলেমেয়েদের ইনসুরেন্স আছে কয়েকখানা।

    ব্যবসা একটা নয়।

    অনেক। অনেকগুলো।

    পানের ব্যবসা।

    তেলের ব্যবসা।

    পাটের ব্যবসা।

    পারমিটের ব্যবসা।

    সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁকে।

    কখনো নেতার বাড়িতে।

    কখনো আমলাদের সভা-সমিতিতে।

    তাঁর জীবনেও দুঃখ অনেক।

    দুটো পাটকল বসাবার বাসনা ছিল। একটার কাজও এখনো শেষ হলো না। শ্রমের দুঃখ।

    বড় ছেলেটাকে বাচ্চা বয়সেই বিলেতে পাঠিয়ে ভালো শিক্ষা দেয়ার ইচ্ছে ছিলো। স্ত্রী তার সন্তানকে কাছ ছাড়া করতে রাজি হলো না। জাগতিক দুঃখ।

    তেলের কলের শ্রমিকগুলো শুধু বেতন বাড়াবার জন্যে সারাক্ষণ চিৎকার করে, আর হরতালের হুমকি দেয়। দুঃখ। উৎপাদনের দুঃখ। কিছু ছেলে ছোকরা এবং গুণ্ডা জাতীয় লোক পথে-ঘাটে মাঠে-ময়দানে মিছিল বের করে। সভা বসিয়ে সরকারের সমালোচনা করে। যাদের টাকা আছে তাদের সব টাকা গরিবদের বিলিয়ে দিতে বলে। দুঃখ। দেশের দুঃখ।

    এই অনেক দুঃখের মধ্যেও একটা আনন্দ আছে তাঁর। যখন সারাদিনের ব্যস্ততার শেষে রাতে ক্লাবের এক কোণে চুপচাপ বসে বোতলের পর বোতল নিঃশেষ করেন তিনি। তখন অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে ওঠে তাঁর চোখ মুখ।

    স্ত্রী বিলকিস বানুর সঙ্গে তাঁর কদাচিৎ দেখা হয়। একই বাড়িতে থাকেন। এক বিছানায় শোয়। কিন্তু কাজের চাপে, টেলিফোনের অহরহ যন্ত্রণায় স্ত্রীর সঙ্গে বসে দু’দণ্ড আলাপ করার সময় পান না তিনি।

    অথচ স্ত্রীকে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন।

    তাঁর সুখ-শান্তির প্রতি লক্ষ্য রাখেন।

    এবং যখন যা প্রয়োজন মেটাতে বিলম্ব করেন না।

    স্বামীর সঙ্গ পান না, সে জন্যে বিলকিস বানুর মনে কোন ক্ষোভ নেই।

    কারণ, সঙ্গ দেওয়ার লোকের অভাব নেই তাঁর জীবনে।

     

    সেলিমও স্বপ্ন দেখে।

    একটা রিক্সা কেনার স্বপ্ন।

    বারো বছর ধরে মালিকের রিক্সা ভাড়ায় চালিয়ে চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে।

    সারাদিনের পরিশ্রম শেষে তিনটি টাকা রোজগার হলে দুটো টাকা মালিককে দিয়ে দিতে হয়। একটা টাকা থাকে ওর।

    সেই টাকায় বউ আর বাচ্চাটাকে নিয়ে দিনের খাওয়া হয়।

    মাসের বাড়ি ভাড়া।

    বিড়ি কেনা।

    আর সিনেমা দেখা।

    পোষায় না তার।

    দেশ কি সে জানে না।

    সভা-সমিতি-মিছিলে লোকগুলো কেন এতো মাতামাতি করে তার অর্থ সে বুঝে না।

    পুলিশেরা যখন ছাত্রদের ধরে ধরে পেটায় তখন সে অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে। কোন মন্তব্য করে না। তার ভাবনা একটাই।

    একটা রিক্সা কিনতে হবে।

    আরো একটা ভাবনা আছে তার। মাঝে মাঝে ভাব।

    ছেলেটা আর একটু বড় হলে তাকেও রিক্সা চালানো শেখাতে হবে।

     

    খেয়াঘাট পেরিয়ে শহরে এলো গফুর।

    বগলে একটা ছোট্ট কাপড়ের পুটলী।

    পুটলীতে বাঁধা একটা বাড়তি লুঙ্গি, জামা, আর কিছু পিঠে।

    শহরে নেমেই সে অবাক হয়ে দেখলো মানুষগুলো সব কেমন যেন উত্তেজনায় উত্তপ্ত।

    এখানে সেখানে জটলা বেঁধে কি যেন আলাপ করছে তারা।

    খবরের কাগজের হকাররা অস্থিরভাবে ছুটাছুটি করছে।

    কাগজ কেনার ধুম পড়েছে চারদিকে।

    সবাই কিনে কিনে পড়ছে ৷

    উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে এদেশের।

    না! না!!

    চিৎকার করে উঠলেন কবি আনোয়ার।

    আমি মানি না।

    স্ত্রী অবাক হয়ে তাকালো তাঁর দিকে।

    স্বামীকে এতো জোরে চিৎকার করতে কোনদিন দেখেনি সে।

    কেন, কি হয়েছে?

    ওরা বলছে বাংলাকে ওরা বাদ দিয়ে দেবে। উর্দু, শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করবে ওরা। জানো সালেহা, যে ভাষায় আমরা কথা বলি, যে ভাষায় আমি কবিতা লিখি, সে ভাষাকে বাদ দিতে চায় ওরা।

    সে কিগো! আমরা তাহলে কোন্ ভাষায় কথা বলবো?

    ভয়ার্ত দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকায় সালেহা।

    না। না। আমি অন্যের ভাষায় কথা বলবো না! আমি নিজের ভাষায় কথা বলবো।

    কবি আনোয়ার হোসেন চিৎকার করে উঠলেন।

    বজ্র থেকে ধ্বনি নিয়ে গর্জন করে উঠলো তসলিম।

    এই সিদ্ধান্ত আমি মানি না।

    আমরা মানি না।

    মানি না!

    মানি না!!

    মানি না!!!

    আমতলায় ছাত্রদের সভাতে অনেকগুলো কণ্ঠ এক সুরে বলে উঠলো, আমরা মানি না।

    বাচ্চারা কোন কিছুই সহজে মানতে চায় না ৷

    তাদের মানিয়ে নিতে হয়।

    আমলাদের সভায় মেপে মেপে কথাগুলো বললেন মকবুল আহমদ। প্রথমে আদর করে দুধ কলা খাইয়ে ওদের মানিয়ে নিতে হয়। তবু যদি না মানে চাবুকটাকে তুলে নিতে হবে হাতে। মানবে না কি? মানতে বাধ্য হবে তখন।

    কতগুলো মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুলে শ্লোগান দিচ্ছে—

    রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।

    আজ পান খাওয়া ভুলে গেলেন কবি আনোয়ার হোসেন। সেদিকে তাকিয়ে চোখজোড়া আনন্দে জ্বল জ্বল করে উঠলো তাঁর।

    ভুলে গেলেন— কখন পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।

    তিনি দেখছেন মিছিলের মুখগুলোকে।

    রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।

    পেছন থেকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল তাঁকে। কি সাব। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কি দেখেন?

    রিক্সা চালক সেলিম।

    তার রিক্সাটা নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে।

    ছেলেগুলো চিৎকার করছে। করুক। ওতে তার কোন উৎসাহ নেই। পারবে না। তুমি দেখে নিও। ওরা জোর করে উর্দুকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারবে না।

    গদগদ কণ্ঠে স্ত্রীকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন কবি আনোয়ার হোসেন। ছেলেরা ক্ষেপেছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে ওরা ছাড়বে না।

    স্ত্রী পান খাচ্ছিলো।

    একটুখানি চুন মুখে তুলে বললো— হ্যাঁ গা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলে তোমার বেতন কি বেড়ে যাবে? ক’টাকা বাড়বে বলতো।

    কি যে হবে দেশের কিছু জানি না। বিদেশের চোর এসে ভরে গেছে পুরো দেশটা।

    স্ত্রীর সঙ্গে বহুদিন পরে আজ কথা বলতে বসলেন মকবুল আহমদ। বাংলা বাংলা করে চিৎকার করছে ওরা। বাংলা কি মুসলমানের ভাষা নাকি? ওটাতো হিন্দুদের ভাষা। হিন্দুরা এদেশটাকে জাহান্নামে নেবে। কথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন বিলকিস বানু।

    কোথায় উর্দু আর কোথায় বাংলা! উর্দু হচ্ছে খানদানী ভাষা।

    আমাদের ফ্যামিলিতে বাবা মা সবাই উর্দুতে কথা বলেন।

     

    উর্দু বাংলা আমি কিছু বুঝি না। আমার সোজা কথা। তোমার ছেলেকে সাবধান করে দাও। ও যদি আবার সে সভা-সমিতি আর আন্দোলন করে তাহলে এদ্দিন প্রমোশন বন্ধ হয়েছিল, এবার আমার চাকরিটাই যাবে।

    তসলিমের পুলিশ বাবা। উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপতে লাগলেন। মাও শিউরে উঠলেন।

    অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভাবতে গিয়ে চোখে পানি এসে গেলো তাঁর।

    তুই কেমন নিষ্ঠুর ছেলেরে।

    তসলিমকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন তিনি।

    তোর মা বাবা ভাই বোনগুলোর কথা ভেবেও কি তুই ওসব ক্ষান্ত দিতে পারিস না? চাকরিটা চলে গেলে আমরা খাবো কি?

    তসলিম নিশ্চুপ।

    সালমা বললো—

    খালুজান ক’দিন ধরে আপনার চিন্তায় চিন্তায় খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন। এসব কাজ না করলেই তো পারেন। কি হবে এসব করে?

    সালমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো তসলিম। এর মধ্যে সালমাকে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো তার। কিন্তু কিছুই বললো না। শুধু বললো—

    তুমি ওসব বুঝবে না।

  • এক

    এক

    কচু পাতার উপরে টল টল করে ভাসছে কয়েক ফোঁটা শিশির।

    ভোরের কুয়াশার নিবিড়তার মধ্যে বসে একটা মাছরাঙা পাখি। ঝিমুচ্ছে শীতের ঠাণ্ডায়। একটা ন্যাংটা ছেলে, বগলে একটি স্লেট আর মাথায় একটা গোল টুপি গায়ে চাদর।

    পায়ে চলা ভেজা পথ ধরে স্কুলে যাচ্ছে।

    অনেকগুলো পাখি গাছের ডালে বসে নিজেদের ভাষায় অবিরাম কথা বলে চলেছে।

     

    কতগুলো মেয়ে।

    ত্রিশ কি চল্লিশ কি পঞ্চাশ হবে। কলসি কলসি

    একটানা কথা বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে না। শুধু বলে যাচ্ছে।

    কতগুলো মুখ।

    মিছিলের মুখ ৷

    রোদে পোড়া।

    ঘামে ভেজা।

    শপথের কঠিন উজ্জ্বল দীপ্তিতে ভাস্বর।

    এগিয়ে আসছে সামনে।

    জ্বলন্ত সূর্যের প্রখর দীপ্তিকে উপেক্ষা করে।

    সহসা কতগুলো মুখ।

    শাসনের-শোষণের-ক্ষমতার-বর্বরতার মুখ।

    এগিয়ে এলো মুখোমুখি।

    বন্দুকের আর রাইফেলের নলগুলো রোদে চিক্‌চিক্ করে উঠলো।

    সহসা আগুন ঠিকরে বেরুলো।

    প্রচণ্ড শব্দ হলো চারদিকে।

    গুলির শব্দ।

    কচু পাতার উপর থেকে শিশির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়লো মাটিতে।

    মাছরাঙা পাখিটা ছুটে পালিয়ে গেলো ডাল থেকে।

    ন্যাংটা ছেলেটার হাত থেকে পড়ে গিয়ে স্লেটটা ভেঙ্গে গেলো।

    পাখিরা নীরব হলো।

    মেয়েগুলো সব স্তব্ধ নির্বাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালো।

    একরাশ কৃষ্ণচূড়া ঝরে পড়লো গাছের ডাল থেকে।

    সূর্যের প্রখর দীপ্তির নিচে একটা নয়— দুটো নয়, অসংখ্য কালো পতাকা এখন।

    উদ্ধত সাপের ফণার মতো উড়ছে।

     

    একুশে ফেব্রুয়ারি।

    সন ঊনিশশ’ বায়ান্ন।

     

    খুব ছোট ছোট স্বপ্ন দেখতো।

    চাষার ছেলে গফুর।

    একটি ছোট্ট ক্ষেত।

    একটি ছোট্ট কুঁড়ে।

    আর একটা ছোট্ট বউ।

    ক্ষেতের মানুষ সে।

    লেখাপড়া করেনি।

    সারাদিন ক্ষেতের কাজ করতো।

    গলা ছেড়ে গান গাইতো।

    আর গভীর রাতে পুরো গ্রামটা যখন ঘুমে ঢলে পড়তো তখন ছোট্ট মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে পুঁথি পড়তো সে, বসে বসে।

    আমেনাকে দেখেছিলো একদিন পুকুর ঘাটে।

    ঘোমটার আড়ালে ছোট্ট একটি মুখ।

    কাঁচা হলুদের মতো রঙ।

    ভালো লেগেছিলো।

    বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে মেয়ের বাবা রাজি হয়ে গেলো।

    ফর্দ হলো।

    গফুরের মনে খুশি যেন আর ধরে না।

    ক্ষেতভরা পাকা ধানের শিষগুলোকে আদরে আলিঙ্গন করলো সে।

    রসভরা কলসিটাকে খেজুরের গাছ থেকে নামিয়ে এনে এক নিঃশ্বাসে পুরো কলসিটাকে শূন্য কর দিলো সে।

    জোয়ালে বাঁধা জীর্ণ-শীর্ণ গরু দুটোকে দড়ির বাঁধন থেকে ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে বললো— যা আজ তোদের ছুটি।

    গফুর শহরে যাবে।

    বিয়ের ফর্দ নিয়ে।

    সব কিছু নিজের হাতে কিনবে সে।

    শাড়ি, চুড়ি, আলতা, হাঁসুলি।

    অনেক কষ্টে সঞ্চয় করা কতগুলো তেল চিট্‌চিটে টাকার কাগজ রুমালে বেঁধে নিলো সে। বুড়িগঙ্গার উপর দিয়ে খেয়া পেরিয়ে শহরে আসবে গফুর। বিয়ের বাজার করতে।

     

    বাবা আহমেদ হোসেন।

    পুলিশের লোক।

    অতি সচ্চরিত্র

    তবু প্রমোশন হলো না তাঁর।

    কারণ, তসলিম রাজনীতি করে।

    ছাত্রদের সভায় বক্তৃতা দেয়।

    সরকারের সমালোচনা করে।

    ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছেন বাবা।

    মেরেছেনও।

    যাঁর ধমকে দাগী চোর, ডাকাত, খুনী আসামীরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতো— তাঁর অনেক শাসন, তর্জন-গর্জনেও তসলিমের মন টললো না। মিছিলের মানুষ সে।

    মিছিলেই রয়ে গেলো।

    মা কাঁদলেন।

    বোঝালেন, দিনের পর দিন।

    আত্মীয়স্বজন সবাই অনুরোধ করলো।

    বললো বুড়ো বাপটার দিকে চেয়ে এসব এবার ক্ষান্ত দাও। দেখছো না ভাইবোনগুলো সব বড় হচ্ছে। সংসারের প্রয়োজন দিন দিন বাড়ছে। অথচ প্রমোশনটা বন্ধ হয়ে আছে।

    কিন্তু নিষ্ঠুর হৃদয় তসলিম বাবার প্রমোশন, মায়ের কান্না, আত্মীয়দের অনুরোধ, সংসারের প্রয়োজন সব কিছুকে উপেক্ষা করে মিছিলের মানুষ মিছিলেই রয়ে গেলো।

    কিন্তু এই নিষ্ঠুর হৃদয়ে কোমল ক্ষত ছিলো।

    সালমাকে ভালবাসতো সে।

    সালমা ওর খালাতো বোন।

    একই বাড়িতে থাকতো।

    উঠতো বসতো চলতো।

    তবু মনে হতো সালমা যেন অনেক—অনেক দূরের মানুষ।

    তসলিমের হৃদয়ের সেই কোমল ক্ষতটির কোন খোঁজ রাখতো না সে। কিংবা রাখতে চাইতো না।

    বহুবার চেষ্টা করেছে তসলিম।

    বলতে বোঝাতে। কিন্তু সালমার আশ্চর্য ঠাণ্ডা চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারেনি সে।

     

    এককালে ভালো কবিতা লিখতেন তিনি।

    এখন সরকারের লেজারে টাকার অঙ্ক থরে থরে লিখে রাখা তাঁর কাজ।

    কবি আনোয়ার হোসেন।

    এখন কেরানি আনোয়ার হোসেন।

    তবু কবি মনটা মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায়। যখন তিনি দিনের শেষে রাতে ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করেন।

    ঝগড়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

    যখন এ দেহ মন জীবন আর পৃথিবীটাকে নোংরা একটি ছেঁড়া কাঁথার মতো মনে হয়, তখন একান্তে বসে কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে তাঁর। আনোয়ার হোসেনের জীবনে অনেক অনেক দুঃখ।

    ঘরে শান্তি নেই। স্ত্রীর দুঃখ।

    বাসায় প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র নেই। থাকার দুঃখ।

    সংসার চালানোর মতো অর্থ কিংবা রোজগার নেই। বাঁচার দুঃখ।

    কবিতা লিখতে বসে দেখেন ভাব নেই। আবেগের দুঃখ।

    শুধু একটি আনন্দ আছে তাঁর জীবনে।

    যখন তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের পানের দোকান থেকে কয়েকটা পান কিনে নিয়ে মুখে পুরে চিবুতে থাকেন। আর পথ চলতে চলতে কবিতা লেখার দিনগুলোর কথা ভাবতে থাকেন। তখন আনন্দে ভরে ওঠে তাঁর সারা দেহ।

    কবি আনোয়ার হোসেন, ঘর আর অফিস, অফিস আর ঘর ছাড়া অন্য কোথাও যান না।

    যেতে ভালো লাগে না, তাই।

    কোনদিন পথে কোন বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে হয়তো একটা কি দুটো কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করেন। তারপর এড়িয়ে যান।

    ভালো লাগে না।

    কিছুই ভালো লাগে না তাঁর।

  • একুশে ফেব্রুয়ারি

    একুশে ফেব্রুয়ারি

    বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন শুধু এদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নতুন চেতনাপ্রবাহ সৃষ্টি করেছিলো। এই চেতনা ছিলো অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক মূল্যবোধসঞ্জাত। আমাদের শিল্প সাহিত্যে যাঁরা এই চেতনার ফসল, তাঁদের ভেতর জহির রায়হানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ ভাষা আন্দোলনে তিনি শুধু যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন তা নয়, তাঁর সাহিত্য প্রেরণার মূল উৎস ছিলো এই আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের উপর প্রথম সার্থক উপন্যাস–আরেক ফাল্গুন-সহ অজস্র ছোটগল্প ও নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। এইসব লেখা এবং তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভাষা আন্দোলনের আবেগ, অনুভূতি তাকে প্রচণ্ডভাবে আপ্লুত করে রেখেছিলো।

    লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের পর জহির রায়হান চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন পঞ্চাশ দশকের শেষে। এই শিল্প মাধ্যমটির প্রতি তার যোগাযোগ অবশ্য আরো আগের।

    ষাট দশকের শুরুতে জহির রায়হান একজন পরিপূর্ণ চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে। এরপর অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে কয়েকটি বাণিজ্যিক ছবি বানালেও তিনি তার লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। বাণিজ্যিক ছবি বানাবার সময় তার শিল্পসত্তা যতটুকু বিপর্যস্ত হয়েছিলো, যে তীব্র মানসিক যাতনার শিকার হয়েছিলেন তিনি কিছুটা লাঘবের জন্য আবার সাহিত্যের দ্বারস্থ হয়েছেন, উপন্যাস লিখেছেন হাজার বছর ধরে। ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি আর কতগুলো কুকুরের আর্তনাদ-এর মতো গল্প লিখে জ্বালা মেটাতে চেয়েছেন।

    কাঁচের দেয়াল বানাবার পর তিনি একুশে ফেব্রুয়ারী নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তবে শিল্পোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়িক দিক থেকে তিনটি অসফল ছবি (কখনো আসেনি, সোনার কাজল ও কাঁচের দেয়াল) বানাবার ফলে একুশে ফেব্রুয়ারী প্রযোজনা করার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। বাধ্য হয়ে তাঁকে বাজারচলতি ছবি বানাতে হয়েছে। তাবে ভবিষ্যতে একুশে ফেব্রুয়ারী বানাবেন এই ইচ্ছা সব সময় সযত্নে লালন করেছেন। তিনি। যখন নিজে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করার পর্যায়ে এলেন, তখন বাধা হয়ে দাঁড়ালো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাঁর পরিকল্পিত একুশে ফেব্রুয়ারী ছিলো একটি রাজনৈতিক ছবি, আইয়ুবের স্বৈরাচার আমলে সে ধরনের ছবি বানানো ছিলো একেবারেই অসম্ভব। এজন্যই তিনি প্রতীকের আশ্রয় নিয়ে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ঊর্মিমুখর দিনগুলোতে বানিয়েছিলেন জীবন থেকে নেয়া। এ ছবিতে একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরী এবং আন্দোলনের দৃশ্যে জহির রায়হানের রাজনৈতিক আবেগের যে তীব্র প্রকাশ ঘটেছে, বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না ভাষা আন্দোলনের শেকড় তার চেতনার কত গভীরে প্রােথিত। এরপর আরো বড় ক্যানভাসে সর্বজাতির সর্বকালের আবেদন তুলে ধরতে চেয়েছিলেন লেট দেয়ার বি লাইট-এ, যে ছবি তিনি শেষ করতে পারেননি। এর কিছুটা আভাষ পাওয়া যাবে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি স্টপ জেনোসাইড-এ। তবু একুশে ফেব্রুয়ারী নির্মাণের পরিকল্পনা তিনি বাতিল করেননি। ৭২-এর দুর্ঘটনায় এভাবে হারিয়ে না গেলে হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বানাতেন তার সেই স্বপ্ন আর আবেগের ছবি।

    বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে জহির রায়হানের অংশগ্রহণ কোন আকস্মিক বা নিছক আবেগতাড়িত ঘটনা ছিলো না। তার রাজনৈতিক জীবন-প্রবাহের স্বাভাবিক গতি তাঁকে যুক্ত করেছিলো এই আন্দোলনের সঙ্গে। যে কারণে শুধু বায়ান্নতে নয়, ঊনসত্তর বা একাত্তরেও তাকে খোলাখুলি আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়াতে হয়েছে। তাঁর সমসাময়িক লেখক শিল্পীদের ভেতর তিনি ছিলেন রাজনীতির প্রতি সবচেয়ে বেশি অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাকে যারা জানেন তারা সবাই স্বীকার করবেন, তিনি সব সময় খোলাখুলি তাঁর রাজনৈতিক মত ব্যক্ত করতেন। এর জন্য তাঁকে যথেষ্ট নিগ্রহের সম্মুখীন হতে হয়েছে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই রাজনীতির জন্যই তাঁকে অকালে হারিয়ে যেতে হয়েছে।

    চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি জহির রায়হান যখন স্কুলের নীচের ক্লাশের ছাত্র, তখন অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারের প্রভাবে তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে এসেছিলেন। শহীদুল্লাহ কায়সার তখন কোলকাতার একজন ছাত্রনেতা। প্রকাশ্যে ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে এবং গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। জহির রায়হান তখন পার্টি-কুরিয়ার ছিলেন। পার্টির আত্মগোপনকারী সদস্যদের মধ্যে চিঠিপত্র ও খবর আদান প্রদানের কাজ করতেন। প্রকাশ্যে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র স্বাধীনতা বিক্রি করতেন। তখনকার দিনে পার্টি কর্মীরাই পার্টির কাগজ বিক্রি করতেন। সেই আমলের একজন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জহির রায়হান সম্পর্কে বলেছেন, তখন ও ভালোভাবে হাফপ্যান্টও পরতে জানতো না। প্রায় বোতাম থাকতো না বলে একহাতে ঢোলা হাফপ্যান্ট কোমরের সাথে ধরে রাখতো। রায়হান ছিল ওর টেকনেম–পার্টি পরিচয়ের ছদ্মনাম (তার পিতৃদত্ত নাম জহিরউল্লাহ)। বড়ভাইর প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিলো। জহির রায়হানের পার্টি জীবনের সূচনা সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানতে পারিনি।

    বায়ান্ন সালে ভাষা আন্দোলনের সময় শহীদুল্লাহ কায়সার আত্মগোপন অবস্থায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছিলেন। জহির রায়হান জানতেন পার্টির নির্দেশ হচ্ছে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার। তিনি পরে বলেছেন, ছাত্রদের মিটিঙেও সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। ছাত্রদের গ্রুপে ভাগ করা হলো। আমি ছিলাম প্রথম দশজনের ভেতর। প্রথম দিকে যারা ১৪৪ ধারা ভেঙেছে পুলিশ ভঁদের গ্রেফতার করে ট্রাকে চাপিয়ে সোজা লালবাগে নিয়ে গেছে। পরে ছাত্রদের মনোভাব দেখে পুলিশ গুলি চালিয়েছিলো। জহির রায়হান কেন প্রথম দশজনের ভেতর ছিলেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বভাবসুলভ স্মিত হেসে বহুবার পরিবারের সদস্যদের কাছে গল্প করেছেন, সিদ্ধান্ত তো নেয়া হলো ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। কিন্তু প্রথম ব্যাচে কারা যাবে? হাত তুলতে বলা হলো। অনেক ছাত্র থাকা সত্ত্বেও হাত আর ওঠে না। কারণ স্যাম্পাসের বাইরে পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে পজিশন নিয়ে বসে আছে। ভাবখানা এই যে, বেরুলেই গুলি করবে। ধীরে ধীরে একটা দুটো করে হাত উঠাতে লাগলো। গুনে দেখা গেলো আটখানা। আমার পাশে ছিলো ঢাকা কলেজের একটি ছেলে। আমার খুব বাধ্য ছিলো। যা বলতাম, তাই করতো। আমি হাত তুলে ওকে বললাম হাত তোল। আমি নিজেই ওর হাত তুলে দিলাম। এইভাবে দশজন হলো।

    জহির রায়হান পরবর্তী সময়ে সরাসরি পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। শহীদুল্লাহ কায়সার যদিও তখন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। জহির রায়হানের সেই সময়ের লেখা কিছুটা রোমন্টিক ও আবেগ বহুল হলেও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রাম তিনি তখনকার গল্প ও উপন্যাসে যথেষ্ট দক্ষতা ও দরদের সঙ্গে এঁকেছেন। প্রথম ছবি কখনো আসেনি এবং দ্বিতীয় ছবি কাঁচের দেয়াল-এর শহরের নিম্নবিত্ত জীবনের দারিদ্র, বেকারত্ব, ব্যবসায়ীদের ধূর্ততা, দুর্নীতি ও বৈষম্যের চিত্র রয়েছে।

    ১৯৬৬ সালে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টির মতাদর্শগত বিরোধের ফলে অপরাপর দেশের মতো এখানকার কমিউনিস্ট পার্টিও দ্বিধাবিভক্ত হয়। শহীদুল্লাহ কায়সারের অবস্থান ছিলো মস্কোপন্থী শিবিরে। জহির রায়হান ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। পার্টি ভাঙার জন্য সরাসরি পার্টির নেতৃস্থানীয় লোকজনদের সমালোচনা করতেন। তাঁর বড় বোন নাফিসা কবির পার্টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না থাকলেও চীনের লাইন সমর্থন করতেন এবং বড়দা শহীদুল্লাহ কায়সারের সঙ্গে কখনো তর্কও করতেন। নাফিসা কবির অবশ্য এই সময়ে বিদেশে থাকতেন, কখনো দেশে এলে পার্টির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ আলোচনা করতেন। এই সময় নাফিসা কবির জহির রায়হানকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা প্রভাবিত করেছিলেন।

    ৬৯ এর অভ্যুত্থানের সময় জহির রায়হান রাজনীতির প্রতি অধিকতর আগ্রহী হলেন এবং এই সময় তিনি পিকিংপন্থী রাজনীতির প্রতি বেশ খানিকটা ঝুঁকে পড়েন। লৌহমানব হিসেবে কথিত আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি রূপকের আশ্রয় নিয়ে জীবন থেকে নেয়া নির্মাণ করেন। জীবন থেকে নেয়ায় যথেষ্ট ভাবাবেগ ও মেলোড্রামা থাকলেও জহির রায়হানের ছবিতে এই প্রথমবার রাজনৈতিক বক্তব্য জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়। ৬৯ এর গণ-আন্দোলনের কিছু প্রামাণ্য দৃশ্য তিনি এই ছবিতে সংযোজন করেছেন। এই দৃশ্যগুলি তোলার জন্য দিনের পর দিন তিনি ক্যামেরা এবং দু-তিন জন সহকারী নিয়ে মিছিলে মিছিলে ঘুরেছেন। এই ছবিতে সংযোজন ২১শে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরীর প্রামাণ্য দৃশ্যটি তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট দুঃসাহসিকতা পূর্ণ কাজ ছিলো। ছাড়পত্র পেতে এই ছবিকে কি রকম ঝুঁকি পোহাতে হয়েছিলো এ কথা সবার জানা আছে। সেন্সরবোর্ডের বাধা পেয়ে জহির রায়হান এই ছবি নিয়ে হৈ চৈ করতে চেয়েছিলেন। যে জন্যে তিনি তখনকার বামপন্থী ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও কয়েকজন প্রতিবাদী সাংবাদিককে এ ছবি দেখিয়েছিলেন সেন্সরের ছড়িপত্র পাওয়ার আগে, যাতে তারা এ নিয়ে আন্দোলন বা লেখালেখি করতে পারেন। দেশের তৎকালীন বিস্ফোরণমুখ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সরকারী কর্তৃপক্ষ কিছু দৃশ্য কেটে রেখে ছবিটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিলো।

    ৭০ সালে জহির রায়হান এক্সপ্রেস পত্রিকা বের করেন এবং এর যাবতীয় খরচ তিনি একাই বহন করতেন। পত্রিকা অবশ্য আগেও অনেক বের করেছেন তিনি। পঞ্চাশ দশকে প্রবাহ, অনন্যা প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ভাবে এক্সপ্রেস ছিলো রাজনীতি সচেতন পত্রিকা। প্রথম দিকে কিছুটা কম। চরিত্র থাকলেও কয়েক সংখ্যা পরই রাজনৈতিক বক্তব্য জোরালোভাবে উপস্থিত হয়। এই সময় তিনি প্রথমবারের মতো মাও সেতুঙের স্বচনা পাঠ করেন এবং এর দ্বারা দারুণ রকম প্রভাবিত হন। তখন এখানে মাও সেতুঙের চিন্তাধারার অনুসারী কমিউনিস্ট গ্রুপগুলি একাধিক দল উপদলে বিভক্ত ছিলো। এদের প্রায় সবার সঙ্গে জহির রায়হান যোগাযোগ রাখতেন, পার্টি ফাণ্ডে মোটা অংকের চাঁদাও দিতেন। ৭১ এর ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি তাঁর মরিস অক্সফোর্ড গাড়িটিও একটি সংগঠনকে সর্বক্ষণ ব্যবহারের জন্যে দিয়েছিলেন। পিকিংপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও জহির রায়হান মস্কোপন্থীদের অনুষ্ঠানাদিতে সময় পেলে যোগ দিতেন। তিনি তাঁর নির্মীয়মান ছবি লেট দেয়ার বি লাইট মস্কো প্রেরণ করার কথাও বলতেন। শহীদুল্লাহ কায়সারের প্রভাব তার উপর এত বেশি ছিলো যে, তার সামনে তিনি সবসময় মস্কোপন্থীদের সমালোচনা থেকে বিরত থাকতেন। তাছাড়া মস্কোপন্থী অনেক লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এমন পর্যায়ে ছিলো যে, নিজে মাও সেতুঙের চিন্তাধারার অনুসারী হয়েও তিনি এদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তিনি পিকিংপন্থীদের ঐক্য মনে প্রাণে কামনা করতেন।

    ৭১ এর ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানী সৈন্যরা এদেশে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ আরম্ভ করে জহির রায়হান এতে এত বেশি বিচলিত বোধ করেন যে, রাতের পর রাত তিনি অস্থির ও নির্মম অবস্থায় কাটিয়েছেন। মাও সেতুঙেৱ সামরিক প্রবন্ধাবলীর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তখন দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের কথা ভাবতেন। পার্টির কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তিনি যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্যই ঢাকা ছেড়ে আগরতলা এবং পরে কোলকাতা চলে যান। কোলকাতায় তিনি প্রচার কাজ সংগঠিত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পতিত হন এবং তাঁকে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হতে হয়। কোলকাতায়

    নয় মাস তাকে দুঃসহ জীবন যাপন করতে হয়েছে। স্টপ জেনোসাইড ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেকটরে সুটিং করতে দেয়নি, এমন কি কোন কোন সেকটর তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিলো। অবশেষে সাত নম্বর সেকটরে তিনি সুটিং এর সুযোগ পেলেন এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বাজেট ও সময়ে এই অপূর্ব ছবিটির নির্মাণ কাজ শেষ করলেন। আওয়ামী লীগ নেতারা ছবি দেখে ছাড়পত্র না দেয়ার জন্যে পশ্চিমবঙ্গের সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। একজন উঁদরেল আওয়ামী লীগ নেতা এই বলে হুমকিও দিয়েছিলেন যে, এই ছবিকে ছাড়পত্র দেয়া হলে তিনি বাংলাদেশ মিশনের সামনে অনশন করবেন।

    পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর কর্তৃপক্ষ এ ছবিকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করায় জহির রায়হানকে দিল্লী পর্যন্ত দৌড়াতে হয়। শহীদুল্লাহ কায়সারের কয়েকজন পুরোনো সহকর্মী ও বন্ধু যারা ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন তাঁদের তদবিরে বহু কাঠখড় পোড়ানোর পর এ ছবিকে ছাড়পত্র দেয়া হলেও জনসমক্ষে এ ছবি প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা জহির রায়হান করতে পারেননি।

    স্টপ জেনোসাইড-এর প্রতি মুজিব নগর সরকারের কিছু নেতা এই কারণেই কুপিত ছিলো যে, এ ছবি শুরু হয়েছে লেনিনের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে, আর শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক (জাগো জাগো সর্বহারা) এর সুর বাজিয়ে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের একটি অংশ তখনও আমেরিকার সাহায্য ও সমর্থন পেতে উন্মুখ ছিলো অথচ এ ছবিতে সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য উত্থাপন করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতারা বাধা দিলেও জহির রায়হানের মস্কোপন্থী ভারতীয় বন্ধুরা এ ছবি মুক্তির ব্যাপারে তাকে যথেষ্ট সাহায্য করায়, তিনি সেই সময় মস্কোপন্থী ভারতীয় বন্ধুদের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করতেন। সেই সময়টা ছিলো জহির রায়হানের রাজনৈতিক বিভ্রান্তির কাল। কারণ তিনি চীনের তখনকার ভূমিকাকে সমর্থন করেননি এবং প্রায় সর্বদাই মস্কোপন্থীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। তবু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও জহির রায়হান কয়েকজন নেতৃস্থানীয় নকশাল নেতার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন এবং অসীম চ্যাটার্জীর সঙ্গে আলোচনাকালে চারু মজুমদারের বিরুদ্ধে বিরূপ ও অশোভন মন্তব্য করার জন্যে তিনি অসীম বাবুর উপর বিরক্তও হয়েছিলেন।

    ৭১ সালের শেষের দিকে জহির রায়হানের কার্যকলাপকে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিও সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছিলো। কোলকাতার মস্কোপন্থী বুদ্ধিজীবীরা জহির রায়হানের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও মস্কোপন্থী পার্টির সঙ্গে জহির রায়হানের কোন যোগাযোগ ছিল না। অক্টোবর মাসে লণ্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য জহির রায়হানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং রিটার্ণ টিকিটও পাঠানো হয়। জহির রায়হানের প্রথমেই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় ট্রাভেল পারমিট সংগ্রহ করতে গিয়ে। এরপর সমস্যা দেখা দেয় মস্কোর ভিসা পেতে। জহির রায়হানের অনুরোধে লণ্ডনের অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা (ঢাকা যাদুঘরের অধ্যক্ষ এনামুল হক ছিলেন আমন্ত্রণকারী) তাকে লণ্ডন যাওয়ার পথে মস্কো হয়ে যাবার টিকিট পাঠিয়েছিলেন। মস্কো দেখার সখ ছিলো জহির রায়হানের অনেক দিনের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিল্লী গিয়েও তিনি মস্কোর ভিসা সংগ্রহ করতে পারেননি এবং এই জন্য তখন ভর লণ্ডন যাওয়া হয়নি। জহির রায়হানের প্রতি সোভিয়েত দূতাবাসের এহেন আচরণে তার মস্কোপন্থী ভারতীয় বন্ধুরা বিস্মিত হলেও যেহেতু তিনি মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সুনজরে ছিলেন না, সে জন্য এই নাজুক পরিস্থিতিতে, মস্কোতে তাদের প্রতি অবিশ্বস্ত জহির রায়হানের উপস্থিতি সোভিয়েত দূতাবাসের কাম্য ছিলো না। মস্কোর ভিসা না পেয়ে জহির রায়হান সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের প্রতি অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

    ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর শহীদুল্লাহ কায়সারের মৃত্যুর সংবাদ শুনে জহির রায়হান একবারেই ভেঙ্গে পড়েন। ১৭ তারিখে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এক হেলিকপ্টারে করে ঢাকা এসে আলবদরের মরণ কামড়ের খবর বিস্তারিত জানতে পারলেন। বিভিন্ন জায়গায় ছুটোছুটি করে হানাদার বাহিনীর সহযোগী বহু চাঁই ব্যক্তির নাম সংগ্রহ করলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন, তিনি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেও দায়ী করেন। তিনি তখন মানসিক দিক থেকে অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। জামাতে ইসলামীর ঘাতক বাহিনী আলবদরদের দ্বারা ধৃত শহীদুল্লাহ কায়সারাকে খোঁজার জন্য পীর-ফকিরেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি। এমন এক জনের খপ্পরে পড়ে তিনি আজমীর পর্যন্ত গিয়েছিলেন।

    ৭২ এর ৩০ জানুয়ারী মিরপুরে তার অগ্রজকে খুঁজতে গিয়েছিলেন সে স্থানটি তখনও ছিলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কিছু লোক ও তাদের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে। তদন্ত করলে হয়তো জানা যেতো সেই অজ্ঞাত টেলিফোন কোত্থেকে এসেছিলো, যেখানে তাঁকে বলা হয়েছিলো শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে আছেন কিংবা মিরপুর থেকে কিভাবে তিনি উধাও হলেন। এটাও বিস্ময় যে, তার অন্তর্ধান সম্পর্কে কোন তদন্ত হয়নি। একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে তার বিশ্বাসই ভাকে এভাবে আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে।

    জহির রায়হান মার্কসীয় দর্শনের অনুসারী হলেও বড়দার মৃত্যু সংবাদে তিনি অদৃষ্টবাদী হয়ে গিয়েছিলেন। এর একটা কারণ এও হতে পারে যে, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন প্রমুখের মূল রচনাবলী তিনি সামান্যই পড়েছেন। কমিউনিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভ্রান্তি, নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা ও বিভক্তিতে তিনি বিক্ষুব্ধ হাতেন, কখনো বা হতাশ হয়ে পড়তেন। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মস্কোপিকিং বিভক্তির পর তিনি পিকিংপন্থী শিবিরে অবস্থান করেও পরবর্তীকালে পিকিংপন্থীদের বিভক্তির সময় কোন বিশেষ দলের পক্ষ নেননি। তার লেখা ও ছবিতে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস পুরোপুরি প্রতিফলিত না হলেও কিছু লেখা ও ছবি থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় জহির রায়হান কোন শিবিরের লোক–প্রগতির না প্রতিক্রিয়ার। নিঃসন্দেহে বলা যায় প্রগতির শিবিরেই তার অবস্থান এবং এই শিবিরে অবস্থানের কারণেই প্রতিক্রিয়ার নির্মম শিকার হয়েছিলেন তিনি।

    বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারী তারিখে রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশ অমান্য করে ছাত্ররা একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভেঙ্গে মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আগেই বলেছি যে দশজন ছাত্র প্রথম মিছিল করে বেরোয় জহির রায়হান ছিলেন তাদের একজন। প্রথম দিকের কয়েকটি দলকে গ্রেফতার করে ট্রাকে তুলে লালবাগের কেল্লার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর গুলি চালানো হয়।

    এই ঘটনাটি জহির রায়হানের একুশে ফেব্রুয়ারীর কাহিনীতেও বিধৃত হয়েছে। এই কাহিনীর ছাত্র নায়ক তসলিম একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙ্গার জন্য বক্তৃতা দেয়। মিছিলে গুলি খেয়ে লাশ হয়ে হাসপাতালে যায়।

    ৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীতে একটি সংকলনের জন্য আমি জহির রায়হানের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু যারা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের এবং অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারের কাছ থেকে লেখা নিয়েছিলাম। প্রত্যেকটি লেখার বিষয়বস্তু ছিলো এক বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারী দিনটিকে তারা কে কিভাবে দেখেছেন। জহির রায়হানের পর্যবেক্ষণের কাছাকাছি দুটি লেখার অংশ এখানে উদ্ধত করছি যা কিনা তাঁর এই কাহিনীর প্রামাণ্যভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এর একটি অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারের অপরটি ঢাকা কলেজে তার সহপাঠী বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরের।

    শহীদুল্লাহ কায়সার লিখেছেন–

    একুশে ফেব্রুয়ারী। ১৯৫২। উনিশ বছর পর একটি বিক্ষুব্ধ দিনের সব কটি মুহূর্তের উত্তেজনা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, রোমাঞ্চ বেদনা স্মরণ করা দুরূহ। অনেক মুখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। অনেক মুখ ঝকঝকে ছবির মত এখনও ভাসছে চোখের সামনে যা আর কোনদিন দেখা যাবে না। অনেক ঘটনা যা সেদিন মুখ্য মনে হয়েছিল আজ গৌণ হয়ে এসেছে। সেদিন যা দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল অভিজ্ঞতার আলোকে আজ তা স্পষ্ট।

    দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আজ নতুন চেতনা এসেছে। এসেছে অনেক তব্রতা। গণসংস্থাগুলো অনেক বেশি সজাগ। তাই আজকের কোন আন্দোলনের সাথে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারীকে তুলনা করা অনুচিত।

    যে এলাকায় একুশের ঘটনা প্রবাহের সূচনা হয় তা আজ চেনা দুষ্কর। সেখানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আজকের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হাসপাতালটা ছিল সেদিনের কলাভবন। যেখানে মেডিকেল হাসপাতালে আউটডাের এবং নার্সের কোয়ার্টার সেখানে ছিল কতগুলো ব্যারাক। তলার দিকে হাত চারেক পর্যন্ত ছিল পাঁচ ইঞ্চি ইটের গাঁথনী, উপটা কঞ্চির বেড়া। শীতের দিনে কুয়াশা এবং শীত হুড়হুড় করে ভেতরে ঢুকে বিছানায় হুমড়ি খেয়ে পড়তো। এটাই ছিল মেডিকেল ছাত্রাবাস। এখানেই গুলি চলছিলো, যার একাংশকে নিয়ে আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

    অনুজ শাহরিয়ার সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে লিখতে বলেছেন। কিন্তু তা লেখা সম্ভব নয়, কেননা এত কিছু লেখার আছে এবং এত কিছু স্মৃতি থেকে খুঁচিয়ে তোলার রয়েছে যা স্বল্প সময়ে সম্ভব নয়। আর এটা এমন একটা দিন এবং এমন একটা বিষয় যা নিয়ে ভাসা ভাসা বা আংশিকভাবে কলম চালান উচিত নয়।

    আগেই বলেছি আজ ওই এলাকাটার পরিবর্তন হয়েছে, আজকের আন্দোলনের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু যে পরিবেশে সেদিনের সগ্রাম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল তার পরিবর্তন এখনও, উনিশ বছর পরও দেখছি না। সেটা হল শাসককূলের স্বৈরাচারী মনোভাব।

    একুশের হরতাল ও জমায়েতকে পণ্ড করার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যারাত্রিতে যখন ১৪৪ ধারা জারি করা হল তখনও কেউ বুঝতে পারেনি পরদিন অর্থাৎ ২১ তারিখে কি ঘটবে। কিন্তু মধ্যরাত্রির মধ্যেই অবস্থাটা পাল্টে গেল। মধ্যরাত্রির মধ্যেই ফজলুল হক হল, ঢাকা হল ও সলিমুল্লা হলের ছাত্ররা মিটিং করে জানিয়ে দিলেন যে তারা পিছ পা হতে রাজী নন। যদি সরকার ভয় দেখিয়ে রক্তচক্ষুর শাসানি ভাষায় রূপান্তরিত করতে চায় তবে এখনই তার ফয়সালা হয়ে যাক। এ মনোভাব এবং সিদ্ধান্ত গোটা আন্দোলনের চেহারাটা পাল্টিয়ে দেয়। তাই আমরা দেখি শুধু পুলিশ নয় মুসলিম লীগের পালা গুণ্ডারা, মহল্লার সর্দাররা স্কুলে স্কুলে ভয় দেখিয়ে বেড়ানো সত্ত্বেও একুশে ফেব্রুয়ারী সব স্কুল কলেজে ধর্মঘট হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

    মেডিকেল কলেজ ছাত্রসংসদ এবং মেডিকেল ছাত্রাবাস ছিল সেদিনের একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর। সারা পাকিস্তানে ঢাকা মেডিকেল কলেজই একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল যেখানে মুসলীম ছাত্রলীগ নামে প্রতিষ্ঠানে কোন কমিটি এমন কি একজন সভ্যও ছিল না। সংগ্রাম কমিটির প্রাণশক্তি ছিল মেডিকেলের ছাত্রসংসদ। সম্ভবতঃ এ কারণেই মেডিকেল ছাত্ররা পুলিশের বিশেষ আক্রমণের লক্ষ্য ছিল।

    গুলি চালনার ধরনটাও লক্ষণীয়। প্রথম কয়েক রাউণ্ডের গুলি মেডিকেল ছাত্রাবাসকে লক্ষ্য করেই চালান হয়। এগার নম্বর, তিন নম্বর, এবং সাত নম্বর ব্যারাকের ঘরের ভেতরে পাঁচ ইঞ্চি দেয়ালে ছেদ করে পড়ার টেবিলে, শোয়ার খাটিয়ার গিয়ে বুলেট বিদ্ধ হয়। প্রথম রাউণ্ডের গুলিতেই বরকত শহীদ হন। এখানে যারা যারা আহত হন তাদের সবগুলো আঘাতই হাঁটুর উপর। মারার জন্যই যে সেদিন গুলি ছোঁড়া হয়েছিল এবং ছাত্রাবাসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়েছিল তাতে লেশ মাত্র সন্দেহ নেই।

    (সচিত্র সন্ধানী ও একুশে ক্রোড়পত্র ফেব্রুয়ারী ১৯৭১)

    জহির রায়হানের সহপাঠী, তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র বোরাহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর একুশে ফেব্রুয়ারীর দিনটি সম্পর্কে লিখছেন–

    বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর ভিড়; বাইরে ১৪৪ ধারা; সকাল দশটা। চিৎকার শ্লোগান। বাইরে পুলিশ। আমরা ঘুরছি, কথা শুনছি; সবাই উত্তেজিত, সবকিছুই অনিশ্চিত, মধ্যে মধ্যে শ্লোগান; রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। আমরা ঘুরছি, কথা শুনছি, নেতারা ব্যস্ত, পরস্পরের উপর ক্রুদ্ধ, মধ্যে মধ্যে শ্লোগান; পুলিশ জুলুম চলবে না। ভিড় বাড়ছে ভিতরে আর রাস্তা ফাঁকা, পুলিশ বাদে।

    হোস্টেলে থাকি, ইন্টারমিডিয়েট ক্লাশের ছাত্র। আমরা কজন হাজির। কেন এসেছি স্পষ্ট। স্বপ্নের মধ্যে মার মুখ, তার একটি শব্দ; বাংলা; আমার মনে এছাড়া আর কিছু নেই। ভিড়; চিৎকার লোগন, সকাল সাড়ে দশটা।

    হঠাৎ দেখি কারা যেন লোহার গেট খুলে দিয়েছে, আর সবাই দুজন দুজন করে রাস্তায়। পুলিশ তৎপর, গ্রেফতার করছে, খোলা গাড়িতে তুলছে, আর শ্লোগান রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই; পুলিশ জুলুম চলবে না। শ্লোগান তো নয় শব্দের প্রতিবাদ।

    আমি আমগাছতলায়, চোখ ঐ সব। আকাশ নির্মম নীল। শব্দ পাগল করে দিচ্ছে পুলিশদের, বেড়ির মতো বাংলাভাষা তাদের ঘিরে ধরেছে, সেই তখন টিয়ারগ্যাস ছুঁড়তে শুরু করেছে তারা। টিয়ারগ্যাস ফাটছে, ধোঁয়ায় একাকার, অসহ্য যন্ত্রণা চোখে মুখে; আমরা ছুটে দোতলায়, সকাল এগারোটা। আধঘন্টা বাদে নিচে এলাম। পিছনের লোহার রেলিং ডিঙ্গিয়ে সঙুক বেয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। খিদেও পেয়েছে। এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়ালাম অনেকক্ষণ। পুরানা পল্টনে পুলের কাছে এক রেস্টুরেন্ট, চা আর খাবার খেলাম। যখন বেরোলাম রাস্তা থমথম করছে। কি ব্যাপার? পুলিশ গুলি চালিয়েছে মেডিকেল কলেজের সামনে। কয়েকজন মারা গেছেন। স্বপ্নের মধ্যে মার মুখের মতো চারপাশে বাংলাদেশ, বাংলাভাষা আর বাংলাকে গুলি করছে কারা কারা—সমস্ত চেতনায় থরথর ঐ প্রশ্ন।

    পিছনের গেট দিয়ে মেডিকেল কলেজে এলাম। রাস্তার ধারেই ছাত্রাবাস, সেখানে জটলা চিকার, শ্লোগান, ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি। বিকেল চারটায়, দৈনিক আজাদের বিশেষ সংখ্যা, কাড়াকাড়ি করে নিলাম। কারা যেন বলল, জেলে কি আজাদ পাঠানো সম্ভব? বন্ধুদের জানান উচিত নয় কি ঘটছে বাইরে?

    আমরা ঠিক করলাম পৌছে দেব। জেলখানার পশ্চিম দিকে উর্দু রোড, মসজিদের উল্টোদিকেই জেলখানার প্রাচীর। মসজিদের মিনারে চড়ে আজাদ ছুড়ে দেয়া হল। জেলখানার মাঠে রাজবন্দীরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা দৌড়ে এসে কুড়িয়ে নিলেন।

    অনলাম সান্ধ্য আইন জারী হয়েছে। বেচারাম দেউড়ীতে ছাত্রাবাস, যখন পৌঁছালাম সান্ধ্য আইনের শুরু। পুলিশের গাড়ী রাস্তায়। কিছু একটা করা দরকার। ছাদে আমরা ঃ রাত্রি বিদীর্ণ করে শ্লোগান উঠছে নানাদিক থেকে। বেচারাম দেউড়ীতে ঢাকা কলেজের তিনটি ছাত্রাবাস, সেইসব ছাদ থেকে আওয়াজ উঠছে, মিলছে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ছাত্রাবাসে, মিলেছে গিয়ে সারা বাংলাদেশে। কোথাও থেকে গুলির শব্দ আসছে। রেডিওতে নূরুল আমীনের গলা। ঘৃণা ঘৃণা ঘৃণা!

    ঘুমতো নয় আশা ও হতাশার নির্যাতন। (প্রাগুক্ত)।

    জহির রায়হানের ঘনিষ্ঠ দুজন, একজন তার অগ্রজ, আরেকজন সহপাঠী–ঠিক এভাবেই বর্ণনা করেছেন বায়ান্ন সালের সেই আগুনঝরা দিনটির কথা। তাঁর অন্য বন্ধুরাও যারা তাঁর কাছাকাছি ছিলেন, প্রায় একইভাবে দেখেছেন এই দিনটিকে। সেদিন যারা ছাত্র ছিলেন অথবা ক্যাম্পাসে ছিলেন, প্রত্যেকের পর্যবেক্ষণই একই ধরনের ছিলো। জহির রায়হানের পর্যবেক্ষণ যে এর চেয়ে আলাদা কিছু ছিলো না–তাঁর আরেক ফরুন বা একুশে ফেব্রুয়ারী পড়লে পরিষ্কার বোঝা যাবে।

    ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি জহির রায়হান একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিটি বানাবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে তিনি আরেক ফাল্গুন যদিও এর আগে লিখেছিলেন, কিন্তু ছবির জন্য ভেবেছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা কাহিনী। শিল্পী মুর্তজা বশীরকে তিনি চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, গল্পের কাঠামো হবে এই রকম চারটি পরিবার সমাজের চারটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে। একটি উচ্চবিত্ত, একটি মধ্যবিত্ত, একটি শ্রমিক ও একটি কৃষক দম্পতি থাকবে, যারা ঘটনাক্রমে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারীর দিনটিতে এমন একটি জায়গায় একত্রিত হবে যেখানে ছাত্রদের মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে। গুলির শব্দ হওয়ার পরই দেখা যাবে একটি কাক আর্ত কণ্ঠে উড়ছে গোটা ঢাকা শহরের আকাশে।

    মুর্তজা বশীর জহির রায়হানের মুখে বলা গল্পটির উপর ভিত্তি করে একুশে ফেব্রুয়ারীর চিত্রনাট্য লেখেন। শ্রমিক চরিত্রটির মুখে ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করার জন্য বস্তিতে ঘুরে শব্দচয়ন করেন। চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ হলে জহির রায়হান এটি এফডিসি স্টুডিওতে জমা দেন। নবারুণ ফিল্মস-এর ব্যানারে নির্মিতব্য এই ছবির জন্য চরিত্র নির্বাচন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিলো। এ ছবিতে অভিনয় করার কথা ছিলো খান আতা, সুমিতা, রহমান, শবনম, আনোয়ার, সুচন্দা, কবরী প্রমুখ চিত্র তারকার। কিন্তু এ ছবি নির্মাণের অনুমতি তাঁকে দেয়া হয়নি। মুর্তজা বশীর আমাকে পরে বলেছেন একুশে ফেব্রুয়ারীর চিত্রনাট্য লেখার জন্য জহির রায়হান তাঁকে অগ্রিম একশ টাকাও দিয়েছিলেন। তাঁর মতে এফডিসিতে খুঁজলে এই চিত্রনাট্যটি পাওয়া যাবে।

    এরপর জহির রায়হান বাণিজ্যিক ছবি বানাবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একুশে ফেব্রুয়ারী বানাবার সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকে। পাঁচ বছর পর জহির রায়হানের একুশে ফেব্রুয়ারীর চিত্বকাহিনী প্রথম প্রকাশিত হয় মাসিক সমীপেষুতে। আমি তখন সাহিত্য-চলচ্চিত্র বিষয়ক এই পত্রিকাটির সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলাম। একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা বেরুবে। জহির রায়হানকে অনুরোধ করলাম একটি উপন্যাস লিখতে বিশেষভাবে বললাম একুশে ফেব্রুয়ারী নামে যে ছবিটি তিনি করার কথা ভেবেছিলেন তার কাহিনীটি দেয়ার জন্য। তিনি জানালেন, চিত্রনাট্যটি হারিয়ে গেছে। পরে তাকে বললাম, লেট দেয়ার বি লাইট নামে যে ছবিটি বানাবার কথা ভাবছেন তার কাহিনীটি দিতে। তিনি রাজী হলেন। কদিন পর হঠাৎ শুনলাম, সচিত্র সন্ধানীর (তখন মাসিক এবং আমাদের পত্রিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী) সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দীন, যিনি কিনা জহির রায়হানের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তাঁর অনুরোধ ফেলতে না পেরে লেট দেয়ার বি লাইট-এর কাহিনীটি আর কত দিন নামে ভাঁকে সন্ধানীর জন্য দিয়ে ফেলেছেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই আমি ক্ষুব্ধ হই এবং জহির রায়হানও আমার আচরণে বিব্রত হন। শেষে তিনি সম্মত হন, আমাদের পত্রিকার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারীর কাহিনীটি দেবেন, তবে শর্ত হচ্ছে। তিনি বলে যাবেন, আমি শুনে শুনে লিখবো।

    জহির রায়হানের ক্ষেত্রে এটি নতুন বা অভিনব কিছু নয়। আমি যখন তাঁর সহকারী হিসেবে ছবিতে কাজ করছি তখন দেখেছি তিনি বলৈ যাচ্ছেন আর তাঁর দুজন সহকারী এক সঙ্গে দুটি ছবির চিত্রনাট্য তিলিখনে ব্যস্ত।

    কখনো তিনি টেপরেকর্ডারে বলে গেছেন, সহকারীরা সেখান থেকে পাঠোদ্ধার করেছেন। তবে তখন আমার এটা মনে হয়েছিলো এভাবে বাজারচলতি ছবির চিত্রনাট্য হয়তো লেখা যেতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়। ফলে তিলিখনের দ্বারা একুশে ফেব্রুয়ারীর কাহিনী লেখার ব্যাপারে আমি খুব একটা আশাবাদী ছিলাম না। দেখা গেলো এ ছাড়া উপায়ও নেই। তিনি ছবির স্যুটিং নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত।

    তখন সম্ভবত ঈদের জন্য কয়েকদিন ছুটি ছিলো। আমি পর পর তিনদিন বসে জহির রায়হানের কথামতো লিখে গেলাম। তিলিখনের জন্য তিনদিন অনেক বেশি সময়, তবু লেখার ফঁাকে ফাকে চিত্রনাট্যের মত ছবির দৃশ্যগুরো বিস্তারিত শুনতে চাইতাম বলে লিখতে গিয়ে সময় বেশি লাগলো। এই শুনতে চাওয়াটাও অস্বাভাবিক ছিলো না। কারণ জহির রায়হানের অধিকাংশ চিত্রনাট্য খসড়ার মতো লেখা। ছবির শট বিভাজনের সময় এমনকি স্যুটিং-এর সময়ও অনেক নতুন উপাদান যোগ হতো। যে কারণে তার চিত্রনাট্য পড়ে বোঝা যাবে না। শেষ পর্যন্ত ছবিটি কি হবে। শুধু একবার এর ব্যতিক্রম দেখেছি। সেটা তার বহুল প্রশংসিত স্টপ জেনোসাইড-এর ক্ষেত্রে। মূল পরিকল্পনায় এ ছবি যেমনটি হওয়ার কথা ছিলো বাস্তবে এর এক চতুর্থাংশও রূপায়িত হয়নি। আমার ধারণা বাজেট সমস্যায় আক্রান্ত না হলে এটি গ্রানাড়া গ্রানাডা মাইন-এর চেয়ে বেশি আবেদন সৃষ্টিকারী ছবি হতে পারতো। দুর্ভাগ্য ছবিটির মূল চিত্রনাট্য চুরি হয়ে গিয়েছে।

    তাঁর সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারীর শ্রুতিলিখনের সময় আলোচনা করতে গিয়ে বুঝেছি আইজেনস্টাইনের ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন আর অক্টোবর তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করেছিলো। লেখা শেষ করার পর তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ছবিটি কবে বানাবেন। তাঁর জবাব ছিলো– এখনো সময় হয়নি।

    ৬৫ সালে মর্তুজা বশীরকে যে একুশে ফেব্রুয়ারীর চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, ৭০-এ সেই কাহিনীতে জহির রায়হান আরো কটি চরিত্র সংযোজন করেছেন। কাকের প্রতীকটি এখানে আছে কিন্তু মুখ্য হচ্ছে কাহিনীর শেষে নদীর প্রতীকটি। ছবি তৈরি হলে এই কাহিনীতে যে আরো বহু প্রতীক ও উপাদান যুক্ত হতো এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে প্রথম ও শেষ দৃশ্যে অনেকগুলো মন্টাজ এফেক্ট-এর কথা তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

    একুশে ফেব্রুয়ারী সমীপেষুতে ছাপার সময় শিল্পী হাশেম খানের কিছু কেঁচও অলঙ্করণ হিসেবে ছাপা হয়েছিলো। জহির রায়হান স্কেচগুলো পছন্দ করেছিলেন।

    সমীপেষুতে প্রকাশিত লেখাটিতে কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছিলো। তাড়াহুড়ো করে ছাপতে গিয়ে কিছু শব্দ ও বাক্য এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো। সংশোধিত কপিটি আমার কাছে থাকায় গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় সংশোধন করেই ছাপা হয়েছে।

    শেষের দিকে জহির রায়হানের সব লেখাই ছিলো চিত্রনাট্যের মতো। এমনকি প্রবন্ধেও তিনি ছোট ছোট বাক্যে চিত্রকল্প নির্মাণ করতেন। একুশে ফেব্রুয়ারী তার একেবারে শেষের রচনা। এরপর বড় কোন লেখায় তিনি হাত দেননি। ছোটখাট কিছু স্কেচ জাতীয় লেখা (অধিকাংশই একুশের স্মরণিকাসমূহের সম্পাদকদের তাগিদে) এবং কয়েকটি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন ৭০-৭১ সালে।

    আঙ্গিকগত বিচারে একুশে ফেব্রুয়ারী আর কত দিন-এর সমশ্রেণীর লেখা এর কোনটাই আরেক ফাল্গন, বরফ গলা নদী, বা হাজার বছর ধরের মতো উপন্যাস নয়। এগুলোকে চিত্রনাট্যের রূপরেখা বা ছবির কাহিনী বলা যেতে পারে। এর ভেতর বহু সংযোজনের অবকাশ আছে। উপন্যাস আকারে লিখতে জহির রায়হান এগুলি অন্যভাবে লিখতেন। আবার ছবি করার সময়ও তিনি আরো বহু কিছু যোগ করতেন। জীবন থেকে নেয়া ছবিতে একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরী যারা দেখেছেন তারা জানেন এই ছবির সেরা অংশ এটি। অথচ চিত্রনাট্যে শুধু প্রভাত ফেরীর উল্লেখ ছিলো। উনসত্তরের অভ্যুত্থানের সময় ২১শে ফেব্রুয়ারীর রাত থেকে তিনি শহীদ মিনারে প্রভাত ফেরীর প্রামাণ্য ছবি তুলেছেন। কয়েকটি পরিকল্পিত দৃশের সঙ্গে

    অনেকগুরো প্রামাণ্য দৃশ্য সম্পাদনার টেবিলে বসে যোগ করে এর আবেদন বহুগুণ বাড়িয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারীর কাহিনীতে মিছিলে গুলির দৃশ্য আছে। জীবন থেকে নেয়া ছবিতে আমরা মিছিলে গুলির দৃশ্য দেখেছি। শেষােক্ত দৃশ্যের চেয়ে প্রথমটি অনেক বেশি শিল্পমণ্ডিত এবং ব্যঞ্জনাধর্মী।

    একুশে ফেব্রুয়ারী যদি ছবি হতো তাহলে এটি সরাসরি একটি রাজনৈতিক ছবি হিসেবে আখ্যায়িত হতো। রাজনৈতিক কাহিনীতে কাল একটি বড় বিষয়। রাজনীতি নির্দিষ্ট সময়ের গীতে এক ধরনের আবেদন সৃষ্টি করে, সময়ের ব্যবধানে সেই আবেদন ফিকে হয়ে যায়, যদি প্রামাণ্যকরণ কাহিনীর প্রধান উপজীব্য হয়। বহু রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত উপন্যাস বা ছবি নির্দিষ্ট সময়ে যতটা আবেদন সম্পন্ন হয় পরবর্তী সময়ে ততোটা নাও হতে পারে। অবশ্য মহৎ শিল্পকর্মের বিষয়টি আলাদা। উদয়ের পথে জাতীয় ছবি এক সময় আদর্শস্থানীয় ছিলো। এখন এর এতটুকু আবেদন আছে বলে মনে হয় না। নিছক সময় বোঝার জন্য বা নির্দিষ্ট সময়ের ছবির চরিত্র বোঝাৱ না এ ধরনের ছবি দেখা যেতে পারে।

    একুশে ফেব্রুয়ারী বায়ান্ন সালের ঘটনা, মূল কাহিনী লেখা এর এক যুগ পরে। রাজনৈতিক কাহিনী হওয়া সত্ত্বেও এর চরিত্রগুলি এখনো এই ছিয়াশি সালেও আধুনিক, মনে হয় সমকালের। আমলা, ব্যবসায়ী, কেরানী, ছাত্র, রিকশাওয়ালা, কৃষক কিম্বা স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, মাতা-পুত্র, প্রেমিক-প্রেমিকা এবং সর্বোপরি শ্রেণীগত যে সম্পর্ক, সব কিছু এখনকার মতোই ক্রিয়াশীল। কয়েকটি শব্দ পরিবর্তন করলে এ কাহিনী উনসত্তরের কিংবা তিরাশিচুরাশির অথবা আগামী দিনের কোন আন্দোলনের হতে পারে। শাসকের ভাষা, শোষকের ভাষা এবং আচরণ এতটুকু বদলায়নি। এ কারণেই একুশে ফেব্রুয়ারী মহৎ সৃষ্টির দাবী করতে পারে, এর আঙ্গিকগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও।

    বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সাধারণভাবে একটি ধারণা রয়েছে এটি বুঝি নিছক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলন। বদরুদ্দীন উমর যদি তিনটি বিশাল খণ্ডে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস (পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি) না লিখতেন আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হতো না সেই সময়কার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা বা ভাষা আন্দোলনে শ্রমিক-কৃষকসহ সাধারণ মানুষের সমর্থন ও অংশগ্রহণের বিষয়টি। জহির রায়হানের একুশে ফেব্রুয়ারী লেখা হয়েছে এই ইতিহাস রচনার আগে। কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের আবেগ ও অংশগ্রহণের বিষয়টি তার এই লেখায় রয়েছে। যেহেতু এটি মূল চিত্রনাট্য নয়, সেজন্য বিস্তারিতভাবে না এলেও কৃষকের প্রতিনিধি গফুর এবং শ্রমিকের প্রতিনিধ সেলিম কাহিনীর শুরুতে কৌতূহলী বহিরাগত হলেও তাদের পরিণতি ছাত্রদের দ্বারা সূচিত এই আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করে। এটি সম্ভব হয়েছে জহির রায়হানের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণে। একুশে ফেব্রুয়ারী কাহিনী রাজনীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠলেও জহির রায়হানের অপরাপর গল্প উপন্যাসের মতো মানবিক উপাদান ও হার্দিক সম্পর্ক এতে অনুপস্থিত নয়। ফলে রাজনৈতিক হওয়া সত্ত্বেও এটি তত্ত্বগন্ধী বা শ্লোগানাক্রান্ত নয়। বর্ণানায় বরং কাব্যিক ব্যঞ্জন রয়েছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কারণ আগেই বলেছি একুশে ফেব্রুয়ারী ছিলো জহির রায়হানের শিল্প-মানসের সৃজনশীল আবেগের অফুরন্ত উত্স।

    শাহরিয়ার কবির।

    ১ ফাল্গুন, ১৩৯২

  • পাঁচ

    পাঁচ

    মেজ ছেলের ঘর।

    স্বামী-স্ত্রী দুজনে বিছানায় শুয়ে। পাশাপাশি।

    কারো চেখে ঘুম নেই।

    দুজনেই ঈষৎ উত্তেজিত।

    মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে তারা অদূর ভবিষ্যতের নানা সমস্যা নিয়ে কিছুটা বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। এখনো তার রেশ চলছে। মেজ বউ বললো। বুঝবে। বুঝবে। আজ বুড়ো মরুক কাল বুঝবে। তুমি তো একেবারে খেয়ালি মানুষ। অত বেখেয়ালি হলে কি চলে? বুড়ো মরে গেলে সব ভাই মিলে তোমাকে ঠকাবে। একটা কানাকড়িও দেবে না তখন বুঝবে।

    আহসানের চোখেমুখে বিরক্তি। আহা। এখনও তো আব্বা মরেনি। মরার আগেই আমাকে এত উত্তেজিত করছো কেন।

    উত্তেজিত করছি কি আর সাধে। ঘরে যে ছেলেপেলেগুলো আছে তাদের কথা আমাকে ভাবতে হবে না? খোদা না করুক, আজ যদি তোমার কিছু একটা হয় তাহলে ওদের নিয়ে আমি দাঁড়াবো কোথায়।

    তুমি একটা ইতর। আস্ত ছোটলোক। মুখ দিয়ে গালাগালিটা এসে গিয়েছিলো। অতি কষ্টে সামলে নিলো আহসান।

    আশ্চর্য। আমি মরে গেলে আমার মৃত্যুটা তার কাছে বড় নয়। বড় হলো মারা যাবার পরে তার দিনকাল কেমন করে চলবে সেটা।

    কেমন করে সে খাবে। পরবে। বাঁচবে।

    বাহরে দুনিয়া। বাহ। মনে মনে ভাবলো আহসান। আমি যখন একেবারে ছোট ছিলাম তখন মা দিনরাত সেবা শুশ্রুষা করে আমাকে মানুষ করেছে। নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছে। আর আমি যখন আরেকটু বড় হলাম তখন আমার বাবা হাড়-ভাঙ্গা খাটুনির রোজগার ব্যয় করে আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। আরও পরে আমি যখন রোজগার করতে শুরু করলাম তখন আমাকে বিয়ে করিয়ে ঘরে বউ এনেছে।

    বউ। পরের মেয়ে।

    ধীরে, ধীরে বাবা মার চেয়ে পরের মেয়েটা আমার আরো আপনার হয়ে দাঁড়ালো। তার দুঃখে আমি কাঁদি। তার আনন্দে আমি হাসি। আর। সে মেয়েটিই কিনা আজ এত স্বার্থপরের মতো চিন্তা করতে পারলো।

    ধুত্তুরী ছাই। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।

    ঘুমোবার চেষ্টা করলো আহসান। কিন্তু ঘুম এলো না।

    একটা সিগারেট শেষ না হতেই আরেকটাজগারেট ধরালো মকবুল। বাড়ির সেজ ছেলে।

    ছোট বউ শুধালো, অত সিগারেট খাচ্ছো কেন?

    মকবুলের চোখজোড়া ঈষৎ লাল। সামনে সরে এসে আস্তে করে বললো, শোন, যদি কোন অঘটন ঘটে তাই তোমাকে জানিয়ে রাখছি। তোমার নামে কিছু টাকা আমি আলাদা করে ব্যাঙ্কে জমা রেখেছি। কিছু শেয়ারও কেনা আছে। ওই ডয়ারের মধ্যে কাগজ-পত্রগুলো রাখা।

    কাউকে কিছু জানিয়ে না কিন্তু আঁ।

    ছোট বউ ঘাড় নেড়ে সায় দিলো, জানাবো না। স্বামীর কাঁধের উপর একখানা হাত রেখে বললো, তোমর কি মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কিছু ঘটবে। তার কণ্ঠস্বরে গভীর উৎকণ্ঠা।

    সিগারেটের ধোঁয়াটা গিলে নিয়ে মকবুল জবাব দিলো, হায়াত মউত সব আল্লার হাতে। কিছু বলাতো যায় না, শোন, মধুকে ভালো মাস্টার রেখে বাড়িতে পড়িয়ো। ও একটা ভালো কোচ পেলে ভবিষ্যতে খুব সাইন করবে।

    অদূরে শুয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকালো মকবুল। উঠে এসে ওর গায়ে মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে আদর করলো সে।

    মনে হলো যেন নিজেকে অনুভব করলো।

    আমার সন্তান।

    ওর সারা দেহে আমার রক্ত ছড়িয়ে।

    ভাবতে গিয়ে অনেকটা হালকা বোধ করলো মকবুল। ছোট বউ এতক্ষণ নীরবে কি যেন ভাবছিলো। সহসা সে বললো, আমার মনে হয় কি জানো।

    মকবুল চমকে তাকালো স্ত্রীর দিকে। কি?

    মনে হয় শামসুটাই মারা যাবে। বলতে গিয়ে একটা ঢোক গিললো ছোট বউ। আর। আর তোমার আব্বা।

    ও। স্ত্রীর দিক থেকে চোখজোড়া নামিয়ে আবার ছেলের দিকে তাকালো মকবুল।

    আরেকটা সিগারেট ধরালো।

    বুড় কর্তা আহমদ আলী শেখ বিছানায় শুয়ে।

    আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি।

    আবার স্বপ্ন দেখছেন।

    ঘরের কোণে অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি নীরবে দাঁড়িয়ে।

    স্বপ্নের মধ্যেই বুড়ো কর্তা ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। কে? কে ওখানে? ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।

    কি চাও তুমি, কেন এসেছো এখানে বুড়ো কর্তা শুধোলেন।

    মূর্তি বললো, আপনার দুটি ছেলের জান কবজ করতে এসেছি আমি। আহমদ আলী শেখ চমকে উঠলেন। ঢোক গিললেন। ধীরে ধীরে শুধোলেন। কোন্ দুটি ছেলের?

    কোন্ দুটি ছেলের জান নেবো সেটা আপনাকেই ঠিক করে দিতে হবে। আপনিই বেছে দিন। অত্যন্ত পরিষ্কার কণ্ঠে জবাব দিলো ছায়ামূর্তি। বুড়ো কর্তা অসহায় শিশুর মতো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।মুখ দিয়ে কোন কথা বলো না তাঁর, মনে হলো হাতপাগুলো সব কাঁপছে।

    সহসা পাশে তাকিয়ে দেখলেন তার চার ছেলে সার বেঁধে আসামীর মতো মাথা নিচু করে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে।

    বুড়ো কর্তা বড় ছেলের দিকে তাকালেন।

    বড় ছেলের মুখ শুকিয়ে গেলো। কাঁপা গলায় অস্পষ্ট স্বরে সে বললো, আমি আপনাকে ভীষণ ভালবাসি আব্বা। আমি আপনার বড় ছেলে। আমি মরে গেলে, আব্বা। আব্বা। আমার অনেকগুলো ছেলেপিলে। আপনি একটু বিবেচনা করে দেখুন আব্বা।

    বুড়ো কর্তা ধীরে ধীরে বড় ছেলের ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে এনে মেজ ছেলের দিকে তাকালেন। মেজ ছেলে ঘামতে শুরু করেছে ততক্ষণে। মুখখানা বিবর্ণ। ফেকাসে।

    কাঁদো কাঁদো গলায় মেজ ছেলে বললো, আব্বা, আমি আপনাকে বেশি ভালবাসি আব্বা। আপনার যখন সেবার অসুখ করেছিলো, আমি সারারাত জেগে আপনার সেবা করেছি। আমি মরে গেলে আব্বা। আব্বা।

    কর্তা এবার সেজ ছেলের দিকে তাকলেন।

    সেজ ছেলে ভয়ে কাঁদছে।

    মনে হলো এখনি মাটিতে গড়িয়ে পড়ে যাবে সে। ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে কোনমতে বললো, আব্বা, আমি আপনার সবচেয়ে আদরের ছেলে। মনে নেই আব্বা। সেবার, আপনার যখন কিছু টাকার দরকার হয়েছিলো তখন কেউ দেয়নি। আমি দিয়েছিলাম। আব্বা, আমি মরে গেলে আমার ছোট বাচ্চাটা, আব্বা।

    বুড়ো আহমদ আলী শেখ এবার ছোট ছেলের দিকে তাকালেন। রোগাক্লিষ্ট ছোট ছেলে বাবার মুখের দিকে চেয়ে শব্দ করে কেঁদে ফেললো। আব্বা আমি আপনার ছোট ছেলে। সবার শেষে দুনিয়াতে এসেছি। আমি এখনো বিয়েশাদিও করিনি আব্বা। এখন আমি মরে গেলে আমার কবরে বাতি দেওয়ারও কেউ থাকবে না আব্বা।

    বুড়ো আহমদ আলী শেখের দুচোখে পানি ভরে এলো। আবেগে থরথর করে কাঁপছে তাঁর দেহ। চার ছেলের দিকে আবার ফিরে তাকালেন তিনি। তারপর সহসা সেই ছায়ামূর্তির দিকে চেয়ে মরিয়া হয়ে বললেন, তুমি। তুমি আমার দুটি ছেলেকে না মেরে তাদের তিন তিনটে বউ আছে আমার ঘরে। তাদের তিনটে বউকে মেরে ফেলল। বউ মারা গেলে বউ পাওয়া যাবে কিন্তু ছেলে মারা গেলে ওদের তো আমি আর ফিরে পাবো না।

    উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বুড়ো আহমদ আলী শেখের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ওঠে বসলেন কর্তা। চারপাশে চেয়ে দেখলেন। ঘর শূন্য। শুধু এককোণে গিন্নী জোহরা খাতুন জায়নামাজে বসে মোনাজাত করছেন।

    ইয়া আল্লাহ। কাউকে যদি মরতে হয় তাহলে সবার আগে আমাকে মারো, আমি বুড়ো হয়ে গেছি। আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। ইয়া আল্লাহ, আমি বেঁচে থাকতে আমার কোন ছেলেমেয়ের গায়ে হাত দিয়ো না। আমার স্বামীর গায়ে হাত দিয়ো না। ইয়া আল্লাহ, আমি যেন তাদের সবার কোলে মাথা রেখে মরতে পারি।

    আহমদ আলী শেখ অবাক দৃষ্টি মেলে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।

    অনেকক্ষণ ধরে।

    সহসা বাড়ির পুরোনো চাকর আবদুলের গলা ফাটানো কান্না আর চিৎকারে সম্বিত ফিরে পেলেন বুড়ো কর্তা।

    আম্মাজান আম্মাজান গো। মইরা গেছে। মইরা গেছে। হন্তদন্ত হয়ে এ ঘরে এসে ঢুকলো আবদুল। ছুটে গিন্নীর দিকে এগিয়ে গেলো। মইরা গেছে। মইরা গেছে গো আম্মাজান।

    কি হয়েছে। জায়নামাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন জোহরা খাতুন। আবদুল বললো, বউডা কেমন কেমন করতেছে। হাতপা খিইচা চিল্লাইতাছে, শরীর ঠাণ্ডা অইয়া গেছে আম্মাজান গো। আম্মাজান জলদি কইরা চলেন। আম্মাজান।

    কি হয়েছে। কর্তা অবাক হলেন।

    বউডা কেমন কেমন করতাছে। শরীর ঠাণ্ডা অইয়া গেছে আম্মাজান গো।

    কি হয়েছে। এবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন আহমদ আলী শেখ।

    কি আর হবে। জোহরা খাতুন উত্তর দিলেন। ওর বউয়ের বোধ হয় ডেলিভারি পেইন উঠেছে। কদিন ধরে বলছি হাসপাতালে দিয়ে আয়। কিন্তু কে কার কথা শোনে। কথাটা সম্পূর্ণ না করেই পাশের ঘরের দিকে ছুটে চলে গেলেন জোহরা খাতুন।

    আবদুল তখনো চিৎকার করছে। আম্মাজান গো মইরা যাইবো। মইরা যাইবো আম্মাজান। বউ আমার মইরা যাইবো। ওর চিৎকার শুনে বাড়ির সবাই এ ঘরে ছুটে এসেছে ততক্ষণে।

    চার ছেলে।

    তিন বউ।

    একমাত্র মেয়ে আমেনা।

    কি হয়েছে?

    আবদুল চিৎকার করছে কেন?

    কিরে কি হয়েছে আবদুল?

    চিৎকার কবি, না বলবি কি হয়েছে।

    কি আর হবে। বুড়ো কর্তা আহমদ আলী শেখ আবদুলের হয়ে জবাব দিলেন। ওই উল্লুকটার কোন কাণ্ডজ্ঞান আছে নাকি। বউয়ের বাচ্চা হবে, হাত পা খিচোচ্ছে তাই দেখে হল্লা শুরু করে দিয়েছে। অপদার্থ কোথাকার। এ

    এমন সময় গিন্নী জোহরা খাতুন আবার এ ঘরে ফিরে এলেন। তার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। হায় হায় হায়। মেয়েটা মারা যাবে গো। এই তোরা কেউ এক্ষুণি ছুটে গিয়ে আশেপাশে কোথাও থেকে একটা ডাভার ডেকে নিয়ে আয় না। মা তার ছেলেদের সবার মুখের দিকে তাকালেন একবার করে। তারা দাঁড়িয়ে রইলি কেন। জলদি যা–

    আবদুল তখনো কাঁদছে। মইরা গেছে। মইরা গেছে গো আম্মাজান।

    চিৎকার করছিস কেন উল্লুক। এখানে চুপচাপ বসে থাক। হঠাৎ রেগে গেলেন বুড়ো কর্তা। তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ইয়ে হয়েছে। এখন এত রাতে কোথা থেকে ডাক্তার ডাকবো শুনি। বড় ছেলে পাশে দাঁড়িয়েছিলো। সে বললো, ডাক্তাররা কি সারারাত জেগে থাকে নাকি।

    মেজ ছেলে বললো, হাজার টাকা দিলেও এখন কোন ডাক্তার আসবে না। সবার মুখের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকে আবার ফিরে গেলেন গিন্নী জোহরা খাতুন।

    আবদুল ততক্ষণে মাটিতে বসে পড়ে কাঁদছে। মইরা গেছে গো আম্মাজান। মইরা গেছে।

    আহা, কাদিস না, কাদিস না। হায়াত মওত সব আল্লার হাতে, আল্লা আল্লা কর। সরে এসে বিছানার ওপর বসলেন আহমদ আলী শেখ। সহসা তিন বউয়ের দিকে চোখ পড়তে ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গে বললেন। তোমরা সব এখানে হা করে দাঁড়িয়ে কেন। গিয়ে একটু দেখো না মেয়েটা বেঁচে আছে, না মরে গেছে।

    শ্বশুরের ধমক খেয়ে তিন বউ তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে পড়লো। আমেনা অনুসরণ করলো তাদের।

    চার ভাই পরস্পরের দিকে একবার করে তাকালো।

    বুড়ো কর্তা কপালে হাত রেখে বিছানার ওপর চুপচাপ বসে।

    অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললো না।

    সহসা আহমদ আলী শেখ নীরবতা ভঙ্গ করলেন। বললেন। ইয়া আল্লাহ। ওই দুঃস্বপ্ন। কি এমনিতে দেখেছি আমি, তখন বলিনি তোমাদের? তোমরা তো বিশ্বাসই করতে চাইলে না। ছেলেদের সবার মুখের ওপর একবার করে চোখ বুলিয়ে বললেন বুড়ো কর্তা।

    আবদুল তখনো কাঁদছে।

    বড় ছেলে মনসুর সহানুভূতির স্বরে বললো, কাঁদিস না আবদুল। কেঁদে কি হবে।

    সামান্য সান্ত্বনায় আরো ভেঙ্গে পড়লো আবদুল। ভাইসাব গো ভাইসাব। পোলার লাইগা। নিজের হাতে ছোট ছোট কাঁথা সিলাই কইরা রাখছিলো গো ভাইসাব।

    আবদুল কাঁদছে।

    আবার নীরবতা নেমে এলো সারা ঘরে।

    চার ভাই আবার পরস্পরের দিকে তাকালো।

    তাদের চোখেমুখে আগের সেই উৎকণ্ঠা এখন আর নেই। মনে হলো ঘুম পাচ্ছে তাদের।

    সহসা মেজ ছেলে বললো, মানুষের কার যে কখন মউত এসে যায় কেউ বলতে পারে।

    বড় ছেলে বললো, ওর বউটা স্বভাবে চরিত্রে বেশ ভালই ছিলো। সেজ ছেলে তাকে সমর্থন করে বললো, সারাদিন চুপচাপ কার্জ কর্ম করতো।

    আবার নীরবতা।

    বুড়ো কর্তা মুখ তুলে আবদুলের দিকে তাকালেন। কাঁদিস না। কাঁদিস কেন। এখন আর কেঁদে কি হবে। তার কণ্ঠস্বরে গভীর সহানুভূতির ছোঁয়া।

    সহসা পাশের ঘর থেকে সদ্যজাত শিশুর কান্নার শব্দে চমকে উঠলো সবাই।

    পরক্ষণে গিন্নী জোহরা খাতুন ছুটে এলেন এ ঘরে। সঙ্গে তিন বউ আর আমেনা।

    ওগো শুনছো। যমজ বাচ্চা হয়েছে গো। যমজ বাচ্চা হয়েছে। ওদের সবার চোখে মুখে হাসির ঝিলিক।

    আবেগের সঙ্গে বললো।

    আবদুল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো ওদের দিকে।

    আঁ উল্লুকটার কাণ্ড দেখেছো। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন আহমদ আলী শেখ। একসঙ্গে দু দুটো ছেলের বাপ হয়ে গেছে হারামজাদা, আবার দাত বের করে হাসে দ্যাখো না। আবদুলের দিকে তেড়ে এলেন বুড়ো কর্তা। যেন হাতের কাছে পেলে এক্ষুণি তাকে দুটো চড় মেরে বসবেন, তিনি।

    গিনী হেসে বললেন, দাঁড়ায়ে রইলে কেন অজু করে এসো তাড়াতাড়ি আজান দাও।

    বুড়ো কর্তা কি বলবেন, কি করবেন ভেবে না পেয়ে বোকার মতো সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিলেন। তারপর দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন কলতলার দিকে।

    বাচ্চা ছেলেটা বিছানায় শুয়ে তখনো ঘুমের ঘোরে পরীক্ষার পড়া মুখস্ত করছে। আর বিড়বিড় করে বলছে, আল্লাহতায়ালা বলিলেন, হে ফেরেস্তা শ্রেষ্ঠ ইবলিশ। আমি তামাম জাহানের শ্রেষ্ঠজীব ইনসানকে পয়দা করিয়াছি। ইহাকে সেজদা কর। ইবলিশ তবু রাজি হইল না। তবু সেজদা করিল না।

  • চার

    চার

    আমেনা তার স্বামীর কাছে চিঠি লিখছিলো তখন। আমি নিরাপদে এসে পেীছেছি। পথে কোন কষ্ট হয়নি। মামা আর মামী আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে রাতের ট্রেনে চাটগাঁয়ে চলে গেছেন। এখানে ভাবীরা আমার দিকে চেয়ে চেয়ে মুখ টিপে হাসছিলো। ভীষণ লজ্জা লাগছিলো আমার। জানো, ওরা কেউ ভাবতেই পারে নি।

    এখানে এসে চিঠি লেখা বন্ধ করলো আমেনা। কি লিখেছে একবার পড়লো।

    না। কিছু হয়নি। আবার লিখতে হবে।

    নতুন কাগজ নিয়ে আবার বসলো আমেনা।

    জানো, আজ রাতে আব্বা একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছেন। ওটা নাকি আমার দাদুও দেখেছিলেন। দেখার দুদিন পরে তিনি আর আমার মেজ চাচা মারা যান।

    আব্বা বলছিলেন নিশ্চয়ই এবারও একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

    জানো, আমার ভীষণ ভয় করছে। তুমি কাছে নেই। মুরব্বিরা বলেন, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত। তাঁদের কোন কথা অমান্য করলে গুনাহ্ হয়।

    আজ মনে হচ্ছে ওরা ঠিকই বলেন।

    তুমি এখানে আসতে নিষেধ করেছিলে। তোমার বাধা না মেনে আমি চলে এসেছি। দেখতে, এসে কি বিপদের মধ্যে পড়েছি।

    ওগো। তুমি আর দেরি করো না। জলদি করে চলে এসো। যদি ছুটি না পাও তাহলে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করো। আমি আর কোনদিন তোমার কথা অমান্য করবো না।

    ওগো। আমার ভীষণ ভয় করছে।

    লিখতে গিয়ে আবার থামলো আমেনা।

    পুরোটা পড়লো।

    তারপর আবার লিখতে শুরু করলো সে।

    ছোট ছেলে শামসু বেশ কিছুদিন ধরে অসুখে ভুগছে। পেটের অসুখ। তেমন সাংঘাতিক কিছু না হলেও দিনে দিনে শরীরটা ক্ষয়ে যাচ্ছে ওর। শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে গেছে দেহটা।

    অনেক কসরতের পর সবেমাত্র ঘুম এসেছে তার।

    ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখছে।

    বাবা যে মূর্তিগুলোর বর্ণনা দিয়েছিলেন তেমনি চারটি মূর্তি।

    মূর্তিগুলো ধীরে ধীরে তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়ালো। আহা, আমাদের ছেলে এবার আমাদের কাছে ফিরে আসবে। খোকন আমাদের।

    মানিক আমাদের।

    আতঙ্কে সমস্ত দেহ হিম হয়ে গেলো শামসুর।

    আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো। মূর্তিগুলো একটা লম্বা ফিতে দিয়ে ওর দেহের মাপ নিচ্ছে। হ্যাঁ, কবরটা কত বড় হবে দেখে নাও।

    দেখো, কবরের মাপ যেন আবার ভুল না হয়।

    তীব্র একটা আর্তনাদের সঙ্গে ঘুম ভেঙ্গে গেলো ওর। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলো শামসু। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো অন্ধকার ঘর খালি। তারপর চিৎকার করে কেঁদে উঠলো সে।

    ও বাবাগো। আব্বা। আম্মারে। আমি তো মরে গেলাম। আব্বাগো আমি তো মরে গেলাম। ও আব্বা।

    চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এলো সে ঘরে।

    কি হয়েছে?

    কি হলো?

    কাঁদছো কেন?

    কি হয়েছে আঁ?

    বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে কাঁদতে শামসু জবাব দিলো, আমি মরে যাবো। মরে যাবো। এইমাত্র ওরা এসে আমার কবরের মাপ নিয়ে গেছে। আম্মা, আম্মাগো বলে মাকে

    জড়িয়ে ধরলো সে।

    মনসুর শুধালো, কারা তোর কবরের মাপ নিয়ে গেছে।

    কান্নার মাঝখানে শামসু বললো, সেই সাদা সাদা মূর্তিগুলো আব্বা যাদের কথা বলছিলো।

    ইয়া আল্লা। বুড়ো কর্তা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ধীরে ধীরে ছেলের পাশে বসলেন তিনি। তারপর এক এক করে ছেলেকে প্রশ্ন করতে লাগলেন।

    মূর্তিগুলো কত লম্বা ছিলো। কোথায় দাঁড়িয়েছিলো। কেমন করে সামনে এলো। কি কথা ওরা বললো।

    হ্যাঁ। সব মিলে যাচ্ছে। হুবহু মিলে যাচ্ছে ওর দেখা স্বপ্নের সঙ্গে। শুধু একটা ব্যতিক্রম। এবার কবরের মাপ নিয়ে গেছে ওরা। ইয়া আল্লা। শিশুর মতো অসহায় দৃষ্টিতে অসুস্থ ছেলেটার দিকে তাকালেন তিনি। শামসু তখনো কাঁদছে।

    গিন্নী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, কাঁদিস না। কাঁদিস না। কেঁদে কি হবে? আল্লা আল্লা কর। আল্লাকে ডাক।

    আম্মা। আম্মাগো। বলে কাঁদতে থাকলো শামসু। গিন্নী তাকে মৃদু তিরস্কার করলেন। আমাকে ডেকে কি হবে, আল্লাকে ডাক।

    শামসু এবার শব্দ করে আল্লাকে ডাকতে শুরু করলো।

    বুড়ো আহমদ আলী শেখ তখনো কপালে হাত রেখে নীরবে বসে। অঘটন যে একটা ঘটবে এ সম্পর্কে তাঁর মনে আর কোন দ্বিধা নেই।

    আজ বিশ বছর এ পরিবারে কেউ মরেনি।

    মৃত্যুর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন আহমদ আলী শেখ।

    আজ মৃত্যু এসে তাঁর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছে।

    মনে মনে আজরাইলের কথা ভাবলেন বুড়ো কর্তা।

    পরলোকের কথা ভাবলেন।

    হাশরের ময়দানের কথা ভাবলেন।

    বেহেস্ত আর দোজখের কথা ভাবলেন।

    তারপর পুত্রকন্যা সবার দিকে তাকালেন তিনি।

    তোমরা যাও। ঘরে যাও। আল্লা যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। ঘরে গিয়ে আল্লা আল্লা করো। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। অনেকদিন হলো তিনি বুড়ো হয়েছেন। কিন্তু বার্ধক্যের অনুষঙ্গগুলো কোনদিন উপলব্ধি করেন নি। আজ মনে পড়েছে। দেহটা ভারভার লাগছে মনে হচ্ছে বুঝি লাঠি ছাড়া তিনি হাঁটতে পারবেন না।

    মনসুর আর তার বউ। দুজনে বিছানায় শুয়ে, ঘুম আসছে না। খোলা দুজোড়া চোখ কড়িকাঠের দিকে চেয়ে।

    সহসা নীরবতা ভাঙলো বড় বউ। শামসুটা বোধ হয় মারা যাবে। কমাস ধরেই তো অসুখে ভুগছে। হ্যাঁলো, সেবার স্বপ্ন দেখেছিলো তখন দুজন মারা গিয়েছিলো তাই না?

    হ্যাঁ।

    এবারো হয়ত দুজন মারা যাবে। স্বামীর দিকে আড়চোখে একবার তাকালো বড় বউ।

    মনসুর কোন উত্তর দিলো না।

    বড় বউ তার একখানা হাত স্বামীর গায়ের উপরে রাখলো।

    কি, ঘুমিয়ে পড়েছো?

    না। একটু নড়েচড়ে শুলো মনসুর তারপর আস্তে করে বললো, আব্বার শরীরটাও তো কদিন ধরে খুব ভালো যাচ্ছে না।

    বুড়ো মানুষ। শরীরেরই বা কি দোষ। স্বামীর দিকে পাশ ফিরলো বড় বউ। হ্যালো, খোদা না করুক, উনি যদি আজ মারা যান তাহলে তোমাদের বিষয় সম্পত্তিগুলোর কি হবে?

    কি আর হবে। সব ভাইরা সমান ভাগে পাবে।

    এটা কিন্তু অন্যায় কথা। বড় বউ উসখুস করলো। তুমি হলে বাড়ির বড় ছেলে। তোমর ভাগে কিছুটা বেশি হওয়া উচিত। এসব নিয়মকানুন কারা করেছে গো?

    যারা করেছে তাদের বিদ্যাবুদ্ধি নিশ্চয়ই তোমার চেয়ে অনেক বেশি ছিলো। মনসুরের কষ্ঠে বিরক্তি।

    বড় বউ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো। উ। বেশি ছিলো না ছাই। নিশ্চয়ই তারাও তাদের বাবার মেজো কিম্বা সেজো ছেলে ছিলো, তাই ও রকম নিয়ম-কানুন করেছে। যাই বলো, আগের দিনের নিয়ম-কানুনগুলো কিন্তু খুব ভালো ছিলো।

    কি ছিলো? মনসুর স্ত্রীর দিকে তাকালো।

    বড় বউ বললো। ওই যে, আগের দিনে শুনেছি বাজা-বাদশারা মারা গেলে তার বড় ছেলে রাজা হতো?

    মনসুর আবার চোখজোড়া কড়িকাঠের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো। অনেক দুশ্চিন্তার মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে সহসা একটা হাসি জেগে উঠলো।

  • তিন

    তিন

    ঘরের মধ্যে বুড়ো কর্তা আহমদ আলী শেখ তাঁর বিছানায় ঘুমোচ্ছন। মাঝে মাঝে মৃদু নাক ডাকছে তার।

    বাচ্চা ছেলেটার চোখেও ঘুম। তবু বসে সে তার পরীক্ষার পড়া মুখস্ত করছে তখননা।

    আল্লাহতায়ালা বলিলেন, ইহাদের সেজদা করো। ইবলিশ বলিলো, হে সর্বশক্তিমান, আপনি যে মানুষ পয়দা করিয়াছেন ইহারা সমস্ত দুনিয়াকে জাহান্নামে পরিণত করিবে। ইহারা পরস্পরের সহিত ঝগড়া করিবে। কলহ করিবে। মারামারি করিবে।

    বুড়ো কর্তা তখুনো নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন।

    সহসা একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন তিনি।

    দেখলেন সর্বাঙ্গ সাদা ধবধবে কাপড়ে ঢাকা চারটে মূর্তি তার ঘরের চারপাশে এসে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে মূর্তিগুলি সামনে এগিয়ে এলো।

    মনে হলো কারো উদ্দেশ্যে যেন সেজদা করলো ওরা। তারপর একসঙ্গে অনেকটা একতালে বুড়ো কর্তার বিছানার চারপাশ ঘিরে দাঁড়ালো ওরা। আহমদ আলী শেখ অবাক হয়ে দেখলেন ওদের। হঠাৎ একটা অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলেন বুড়ো কর্তা। বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। হাত পাগুলো শির শির করছে।

    চারটে মূর্তি মুহূর্তে অসংখ্য মূর্তির রূপ নিলো।

    বুড়ো কর্তা দেখলেন তার মৃত বাবাকে।

    মৃত চাচাকে।

    মৃত ভাইকে।

    আরো অসংখ্য মৃত আত্মীয় স্বজনকে।

    দেখলেন, সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

    ওরা বলছে।

    আহা আমাদের ছেলে এবার আমাদের কাছে ফিরে আসবে।

    আমাদের কোলের মানিককে এবার আমরা আমাদের কাছে নিয়ে যাবো। যাদু আমার জলদি করে চলে এসো।

    থোকন আমার। মানিক আমার জলদি করে চলে এসো। বুড়ো কর্তা শিশু আহমদ আলীকে তার দাদুর কোলে প্রত্যক্ষ করলেন।

    বুড়ো তাকে আদর করছে আর বলছে, মানিক আমার। মানিক আমার। যুবক আহমদ আলী শেখকে দেখে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন বুড়ো কর্তা। দেখলেন, সেই মেয়েটিকে, যার সঙ্গে একবার বিয়ের কথা হয়েছিলো ওঁর। পরে দেনা পাওনা নিয়ে দাদুর সঙ্গে গোলমাল লেগে যাওয়ায় বিয়েটা ভেঙ্গে যায়।

    মেয়েটি হাসলো। আমরা তোমাকে নিতে এসেছি, চলে এসো।

    চলে এসো। চলে এসো। অসংখ্য মূর্তি হাতছানি দিয়ে ডাকলো তাঁকে। বুড়ো কর্তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

    চোখ বড় বড় করে চারপাশে তাকলেন আহমদ আলী শেখ। ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখলেন ঘরে কেউ নেই। শুধু সেই বাচ্চা ছেলেটা পড়ার টেবিলে বসে ঘুমে ঢুলছে।

    সারা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে বুড়ো কর্তার। সহসা প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। হায় হায় একি দেখলাম। একি স্বপ্ন দেখলাম আমি। আল্লারে একি স্বপ্ন দেখলাম। ইয়া খোদা একি স্বপ্ন তুমি দেখালে আমাকে। ও মনসুর। মকবুল। আহসান। হায় হায় একি স্বপ্ন দেখলাম। বুড়ো কর্তার চিৎকারে বাচ্চা ছেলেটা ফিরে তাকালো ওর দিকে। বাড়ির অন্য সবাই আলুথালু বেশে ছুটে এলো সেখানে।

    কি হয়েছে।

    কি হয়েছে।

    আঁ কি হলো? চিৎকার করছে কেন? কি হয়েছে?

    ওদের সকলকে কাছে পেয়ে কিছুটা আস্বস্ত বোধ করলেন আহমদ আলী শেখ। কিন্তু তাঁর সমস্ত শরীর তখনো থরথর করে কাঁপছে।

    কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে বললেন, হায় হায় একি স্বপ্ন দেখলাম। আল্লায় কি দেখালো আমাকে।

    বড় ছেলে বললো, কি হয়েছে আব্বা। কি স্বপ্ন দেখেছেন।

    খুব খারাপ স্বপ্ন।

    মেঝ ছেলে ইষৎ বিরক্তি প্রকাশ করলো, স্বপ্ন দেখে অত চিল্কারের কি হয়েছে। সেজ ছেলে বললো, স্বপ্ন তো সবাই দেখে।

    ছোট ছেলে বললো, আমি অসুস্থ মানুষ। চিৎকার শুনে বুকটা ধড়ফড় করে উঠছে। ভাবলাম কেউ বুঝি মারাই গেলো। উহ্।

    মরেনি, মরেনি। মরবে। বুড়ো কর্তা তার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। মনসুরের মা তোমার মনে আছে আমার আব্বা একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই যে চারটে সাদা কাপড়ে ঢাকা মূর্তি এসে খাটের চারপাশে দাঁড়ালো। মনে নইে। সেই স্বপ্ন দেখার পরদিন তো আব্বা আর মেজ ভাই হঠাৎ কলেরায় মারা গেলেন। মনে নেই।

    হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে। জোহরা খাতুন শিউরে উঠলেন। ইয়া আল্লাহ, এ স্বপ্ন আপনি কেন দেখালেন।

    বুড়ো কর্তা বললেন, বাইশ বছর আগের কথা। মনে হচ্ছে যেন এই সেদিন। আব্বা স্বপ্ন দেখে বললেন খুব খারাপ স্বপ্ন নিশ্চয়ই কোন অঘটন ঘটবে। দেখো, তারপর বাইশ বছর কেটে গেছে। আল্লার কি মেহেরবানি। কিন্তু আজ হঠাৎ আমি সেই স্বপ্ন আবার দেখলাম কেন? বড় ছেলে সান্ত্বনা দিলো, ও কিছু না আব্বা। আপনি শুয়ে পড়ুন।

    না না, তোমরা বুঝতে পারছে না। বুড়ো বললেন, নিশ্চয়ই কোন একটা অঘটন ঘটবে। নইলে এতদিন পরে সে স্বপ্ন আবার দেখলাম কেন আমি। নিশ্চয়ই কেউ মারা যাবে।

    খালি মরার কথা আর মরার কথা। ছোট ছেলে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো, আমি অসুস্থ মানুষ। আমার সামনে খালি মরার কথা।

    সেজ ছেলে বললো, তুই এখানে এসেছিস কেন। গিয়ে ঘুমাগে।

    ঘুম আর হয়েছে। অসুস্থ অবস্থায় এত মরার কথা শুনলে কারো ঘুম হয়!

    হাতের কাছে রাখা গামছাটা তুলে নিয়ে গায়ের ঘাম মুছলেন আহমদ আলী শেখ।

    ঘরের কোণে রাখা পাখাটা এনে শ্বশুরকে বাতাস করতে লাগলো মেজ বউ।

    বুড়ো কর্তা সবার মুখের দিকে একবার করে তাকালেন।

    ছেলেদের দেখলেন।

    বউদের দেখলেন।

    আমেনাকে দেখলেন।

    রসুল আর পেঁচিকে দেখলেন।

    নিজের গিন্নীর দিকে তাকালেন।

    ভরা ফসলের ক্ষেতে পোকা পড়ার পর অসহায় আতঙ্ক নিয়ে একজন চাষী যেমন করে তাকিয়ে থাকে ঠিক তেমন করে।

    আশ্চর্য। মানুষ যে চিরকাল বেঁচে থাকে না। একদিন তাকে এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হয় এতবড় সত্যটাকে আমি কেমন করে ভুলে গিয়েছিলাম।

    নিজের বিছানার এককোণে চুপচাপ বসে তাই ভাবছিলেন মনসুর আলী শেখ।

    দিনরাত আমি শুধু ওকালতির দলিল দস্তাবেজ আর বইপত্র নিয়ে মশগুল ছিলাম।

    কোর্টে গেছি।

    কোর্ট থেকে ফিরে এসেছি।

    মক্কেলদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মামলার নথিপত্র ঠিক করেছি।

    হাকিমের সামনে দাঁড়িয়ে যুক্তিতর্কের মায়াজাল রচনা করে অপরাধীকে বেকসুর খালাস করে নিয়ে এসেছি। হ্যাঁ। সেজন্যে টাকা পয়সা ওরা দিয়েছে আমায়। রোজগার আমি প্রচুর করেছি। কিন্তু সব কিছুই তো ইহকালের জন্যে। পরকালের জন্যে কি করেছি আমি? আজ যদি আমি মারা যাই, হ্যাঁ, আমি জানি সবাই আমার জন্যে কাঁদবে।

    তারপর।

    তারপর আমাকে কব দিয়ে আসবে ওরা।

    একা।

    আমি তখন একা।

    সেই অন্ধকার কবরে তখন সনকির নকির দুই ফেরেস্তা আসবে। ওরা আমাকে জাগাবে।

    প্রশ্ন করবে।

    আমি কে।

    আমার পিতার নাম কি।

    পরকালের জন্যে কি কি করেছি আমি?

    তখন।

    তখন কি জবাব দেবো আমি।

    আমার চোখের সামনে যখন ওরা আমার জীবনের নেকি বদির খাতাটা খুলে ধরবে আর বলবে, জীবনভর তুমি শুধু মানুষকে ধোকা দিয়েছে।

    নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়ার জন্যে অহরহ মিথ্যে কথা বলেছে। মিথ্যে কথা বলতে শিখিয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে।

    তখন।

    তখন কি কৈফিয়ত দেবো আমি ওদের কাছে?

    ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠলেন মনসুর আলী শেখ।

    বড় বউ পানের বাটা সামনে নিয়ে সুপারি কাটছিলো। সহসা প্রশ্ন করলো, আববা যে বললেন ঐটা কি সত্যি?

    কি? অন্যমনস্কভাবে স্ত্রীর দিকে তাকালো মনসুর আলী।

    এই স্বপ্নের কথা। বড় বউ বললো, মানে ওই স্বপ্ন দেখার পর কি সত্যি সত্যি তোমার দাদা আর চাচা মারা গিয়েছিলো।

    হ্যাঁ! নীরবে স্ত্রীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মনসুর আলী।

    সহসা ডাকলো। এই শোন।

    কি?

    আব্বার জায়নামাজটা কোথায়? নিয়ে এসো তো।

    জায়নামাজ দিয়ে কি করবে? বিস্ময়জ্ঞরা দৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে তাকালো বড় বউ।

    মনসুর আলী সংক্ষেপে জবাব দিলো, নামাজ পড়বে।

    সেকি, আজ হঠাৎ নামাঞ্জ পড়ঙে চাইছো?

    না, মানে, কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো মনুসর আলী। তারপর স্ত্রীর উপর রেগে চিৎকার করে উঠলো সে। তোমার ওই মুখে মুখে তর্ক করার অভ্যেসটা এখনো গেলো না। যা বলছি তাই করো। জায়নামাজটা কোথায় আছে খুঁজে নিয়ে এলো।

    স্বামীর কাছ থেকে হঠাৎ এ ধরনের ব্যবহার আশা করেনি বড় বউ। সেই দুঃখেই হয়তো মুখ দিয়ে একটা কটু কথা বেরিয়ে গেলো ওর।

    হুঁ, একরাত নামাজ পড়লেই কি আর সারা বছরের পাপ ধুয়ে যাবে?

    কি? চমকে ফিরে তাকালো মনসুর আলী।

    চোখ দুটো বাঘের চোখের মতো জ্বলছে।

    হ্যাঁ। পাপ আমি করেছি বইকি। কিন্তু কাদের জন্য করেছি। তোমার জন্যে।

    তোমার ছেলেমেয়েদের জন্যে।

    তাদের ভবিষ্যতের জন্যে।

    যে গয়নাগুলো পরে সবার সামনে সগর্বে ঘুরে বেড়াও সেগুলোর কোত্থেকে এসেছে।

    যে ভাত আর মুরগির ঠ্যাং চিবিয়ে খাও সেগুলো কোথেকে এসেছে। স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে আর একটি কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে সাহস পেলো না বড় বউ। নীরবে জায়নামাজের খোঁজে বেরিয়ে গেলো।

    অনেকক্ষণ ধরে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে মেজ ছেলে আহসান। কিন্তু কিছুতেই বইয়ে মন বসছে না তার। অথচ ঘুমও আসছে না। মেজ বউ কিছুক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে উসখুস করে বললো। হ্যাঁ, তুমি একটা ইন্সিওরেন্স করেছিলে না?

    হ্যাঁ, করেছিলাম তো। কিন্তু কেন বল তো?

    এমনি। হঠাৎ মনে পড়লো তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম।

    বইটা বন্ধ করে স্ত্রীর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো আহসান। ধীরে ধীরে একটা মৃদু হাসি জেগে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে।

    মেজ বউ অপ্রস্তুত হয়ে বললো, কি ব্যাপার, অমন করে মুখের দিকে চেয়ে আছো কেন?

    তোমাকে দেখছি আর ভাবছি।

    কি ভাবছো।

    ভাবছি, আমি মরে গেলে তুমি অনেকগুলো টাকা পাবে। ইন্সিওরেন্সের টাকা।

    অকস্মাৎ সারা মুখে যেন কেউ কালি লেপে দিলো তার। বিমর্ষ গলায় মেজ বউ বললো, ছি, আমাকে এত ছোট ভাবলে তুমি চাই না তোমার টাকা, আমি চাই না। বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো দুচোখে অশু রলো ভার।

    মৃদু শব্দে হাসলো আহসান। তোমরা মেয়ে জাতটা বড় অদ্ভুত। মুহর্তে হাসতে পারো, মুহর্তে কাঁদতে পারে। কি যে পার আর কি কি যে পারো না ভেবে পাই না।

    হয়তো কান্নাটাকে রোধ করার জন্যে কি স্বামীর প্রতি প্রচণ্ড অভিমানে ছুটে পাশের বাথরুমে গিয়ে ঢুকলো মেজ বউ।

    শব্দ করে দরজাটাকে মুগ্ধ করে দিলো।

    বাড়ির সেজ ছেলে মকবুল একটা সিগারেট ধরিয়ে ঘন ঘন টানছে আর হিসেবের খাতা দেখছে। ছোট বউ তার পিঠের কাছে এসে দাঁড়ালে মাথার মধ্যে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো। কই উত্তর দিলে না?

    কিসের উত্তর।

    আমি মারা গেলে তুমি আরেকটা বিয়ে করবে, তাই না?

    কি সব বাঙ্গে কথা বলছো। মকবুলের কণ্ঠে বিরক্তি।

    ছোট বউ-এর গলায় অভিমান আহা বলো না। বলো না, আমি মরে গেলে আরেকটা বিয়ে করবে কি না?

    না, করবো না, সংক্ষিপ্ত উত্তর।

    ইস করবো না বললেই হলো। স্বামীর পাশ থেকে বিছানার কাছে সরে গেলো ছোট বউ নিশ্চয়ই করবে। তোমাকে আমি চিনি না ভেবেছে। আজ আমি মরে যাই, কালকেই আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে এনে তুলবে তুমি।

    দেখো। এত ভালো করেই যখন আমাকে চেনো তুমি তখন মিছেমিছি কেন কথা বাড়িয়ে, বারবার আমার হিসেবটা গুলিয়ে দিচ্ছো? রেগে গেলো মকবুল।

    ভ্রূজোড়া বাঁকিয়ে ছোট বউ উত্তর দিলো, খাঁটি কথা বললেই পুরুষ মানুষগুলো অমন ক্ষেপে যায়। সহসা একটা বিশ্রী কান্ড ঘটিয়ে বসলো সে। বিছানার চাদরটাকে একটানে গুটিয়ে নিয়ে একপাশে ছুঁড়ে দিলো। বালিশটাকে ফেলে দিলো মেঝের ওপর। দূর। কার জন্যে গোছাবো এসব। আজ চোখ বুজলেই কাল আরেকটাকে এনে এ বিছানায় শোয়ারে। দূর। দূর।

    হিসেবের খাতা ছেড়ে উঠে এলো মকবুল বাহুতে হাত রেখে কাছে টেনে আনলো তাকে! কি করছো। শোনো, এদিকে এসো। তোমার বয়স কত বলোতো?

    কেন, বয়স জানাতে চাইছো কেন?

    প্রয়োজন আছে। বলো।

    বারে, তুমি জানো না বুঝি।

    তবু বলো না। স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইলো মকবুল।

    মুখখানা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ছোট বউ আস্তে করে উত্তর দিলো, পঁচিশ বছর।

    শোনো, পঁচিশ বছরের মেয়েটি শোনো, অদ্ভুত গলায় কাটা কাটা স্বরে বললো মকবুল। আজ আমি যদি মারা যাই তুমি তোমার বাকি বছরগুলো কি বিয়েসাদি না করে, বিধবার মতো কাটিয়ে দেবে?

    দেবো। নিশ্চয়ই দেবো। গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে জবাব দিলো ছোট বউ। আমাকে কি তোমার মতো হ্যাংলা পেয়েছে যে আরেকটা বিয়ে করবো? তোমার কথাগুলো শুনতে খুব ভালো লাগছে আমার, মকবুল ধীরে ধীরে বললো। কিন্তু বউ শোনো, তুমি পারবে না। এক বছর। দুবছর, দশ বছর পরে হলেও তুমি আরেকটা বিয়ে করবে। ছোট বউ প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলো। মকবুল বাধা দিয়ে বললো, শোনো, এতে অন্যায়ের কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক। আর আমার কথা জানতে চাও? আমি একটু আগে তোমার প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছি সেটা সম্পূর্ণ বানানো। মিথ্যা। তোমাকে সন্তুষ্ট করবার জন্যেই বলেছি। বলেছি, কারণ সংসারে বেঁচে থাকতে হলে এই ছোটখাট মিথ্যে কথাগুলো বলতে হয়। যাকে বলি সেও জানে ওটা মিথ্যে। তবু মিথ্যে সান্ত্বনা পায়। বুঝলে? স্ত্রীর কাছ থেকে সরে গিয়ে আবার হিসেবের খাতা নিয়ে বসলো মকবুল।

    অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো ছোট বউ। এমন নিষ্ঠুর স্বামী কেউ কোনদিন দেখেছে পৃথিবীতে। সে ভাবলো মনে মনে, আর ভাবতে গিয়ে অকারণে ঠোঁটজোড়া বার কয়েক কেঁপে উঠলো তার।

    মনসুরের বড় ছেলে রসুল আর মেজোর বড় মেয়ে পেঁচি। খোলা ছাদের এককোণে দুজনে চুপচাপ বসে। রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন লুকিয়ে ছাদে চলে আসে ওরা। বসে বসে গল্প করে।

    আজ পেঁচি বললো, আমার ভীষণ ভয় করছে রে।

    কেন?

    যদি তুই মারা যাস তাহলে?

    রসুল শব্দ করে হেসে উঠলো, বললো, দূর। দূর। ওসব স্বপ্নের কোন মানে আছে নাকি? বুড়ো কি দেখতে কি দেখেছে। ওসব স্বপ্নে টপ্নে বিশ্বাস করিসনে রে পেঁচি।

    পেঁচি ওর গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, কিরে, খুব যে গলা ছেড়ে হাসছিস।

    কেন, কি হয়েছে?

    কেউ টের পেলে তখন বুঝবি মজা। আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলো পেঁচি। হঠাৎ কি মনে হতে থেমে গেলো। তারপর মৃদু হেসে বললো, এই, তোর জন্যে আজ একটা জিনিস এনেছি রে।

    কি?

    বুকের ভেতর থেকে একটা প্যাকেট বের করে এনে পেঁচি জবাব দিলো, সিগারেট।

    দেখি, দেখিতো। ওর হাত থেকে প্যাকেটটা লুফে নিলো রসুল। কোথায় পেয়েছিস

    চারপাশে এক নজর তাকিয়ে নিয়ে পেঁচি আস্তে করে জবাব দিলো, বাবার পকেট মেরেছি।

    বাহ। তুই আজকাল ভীষণ কাজের মেয়ে হয়ে গেছিসরে পেঁচি। দাঁড়া, একটা এক্ষুণি ধরিয়ে খাই। মরার আগে অন্তত একটা দামী সিগারেট খেয়ে মরি।

    সহসা পেঁচি বাচ্চা মেয়ের মতো হাত পা ছুড়তে শুরু করলো। এই ভলো হবে না বলছি।

    কেন? কি হয়েছে?

    তুই আবার মরার কথা বলছিস কেন আমার ভয় লাগে না বুঝি?

    আরে দূর। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে নাকে মুখে ধোয়া ছাড়লো রসুল। মরার কথা বললেই কি মানুষ মরে না কিরে তোকে বললাম না ওসব স্বপ্ন টপ্ন নিয়ে বেশি মাথা ঘামাসনে পেঁচি। সব বাজে, একেবারে ভুয়ো।

    ওর কথা শুনে কিছুটা আস্বস্ত বোধ করলো পেঁচি। পরক্ষণে আবার প্রশ্ন করলো, আচ্ছা, মানুষ মরে গেলে কোথায় যায় রে?

    যাবে আবার কোথায়। মাটির সঙ্গে মিশে যায়। পা জোড়া দোলাতে দোলাতে জবাব দিলো রসুল। পেঁচি ওর গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, দূর তুই কিছু জানিস না। মানুষ মরে গেলে হয় বেহেস্তে যায়, নইলে দোজখে যায়।

    সিগারেট খেতে খেতে একবার ওর দিকে তাকালো রসুল। কিছু বললো না।

  • দুই

    দুই

    আমেনার দিকে চেয়ে চেয়ে তিন বউ মুখ টিপে হাসলো। বড় বউ বললো : কিরে মাস? ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মুখখানা অনা দিকে সরিয়ে নিলো আমেনা। জানি না। তিন বউ ওকে তিন দিক থেকে হেঁকে ধরলো।

    বল না! বল নারে।

    ইস্ বিয়ে হতে না হতেই

    আমি কিন্তু ঠিক বলে দিতে পারবো।

    কচু! আমেনা মুখ ভেংচালো।

    বড় বউ বললো : জামাই তোকে খুব আদর করে তাই না?

    মেজ বউ বললো : বিয়ের সময় তো খুব হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছিলি এখন কেমন লাগছে আঁ।

    ছোটবউ বললো—এই মিনা শোন। বলে আমেনার মুখটা কাছে টেনে এসে চাপা-স্বরে কানে কানে বললো।

    শফি ভাই বিয়ে করেছে।

    কবে? আমেনা চমকে উঠলো যেন।

    এই তো গত মাসে।

    কোথায়?

    কোথায় ঠিক জানি না, শুনেছি বাড়ির কাছে, টাঙ্গাইলে। বউটা নাকি ভীষণ সুন্দর দেখতে।

    ও। আমেনা কেমন যেন ফেকাসে হয়ে গেলো।

    জোহরা খাতুন এসে তিন বউকে ডাক দিলেন। এই তোমরা এসো, বাচ্চাদের খাওয়ার পাট চুকিয়ে দাও তাড়াতাড়ি। তারপর বুড়োরা খাবে। আমেনা ছোট বউকে তার কাছে রেখে দিলো। তোমরা যাও মা, ছোট ভাবী আমার কাছে এখন থাকুক। একটু গল্প করবে।

    মা আর দুই বউ চলে যেতে আমেনা বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। খানিকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইলো সে। তারপর ধীরে ধীরে বললো।

    পুরুষ মানুষগুলো ভীষণ স্বার্থপর তাই না ভাবী?

    ছোট বড় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ালো। বললো, বিয়ের পর এই তো সেদিন আমাদের এখানে এসেছিলো শফি ভাই। আমিও ছাড়িনি। বেশ করে শুনিয়ে দিয়েছি!

    কি শুনিয়েছো? উঠে আবার বসলো আমেনা। কি কমিয়েছো, বলো না ভাবী?

    বললাম। আপনি একটা এক নম্বরের ধাপ্পাবাজ। খুবতো লম্বা লম্বা কথা বলতেন, মিনাকে আমি আমার প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসি। ওকে ছাড়া আমি এ পৃথিবীতে আর কাউকে চিন্তা করতে পারি না। ওকে না পেলে সারা জীবন আমি আর বিয়ে করবো না। এখন? কি হলো?

    শুনে কি বললো? আমেনার গলার স্বরে ঈষৎ উত্তেজনা। ছোট বউ জবাব দিলো। কি আর বলবে। বলার মুখ আছে। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।

    কিছু বললো না?

    না।

    আমেনা নীরবে কিছুক্ষণ হোট বউয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। আসলে আমি একটা বোকা মেয়ে ভাবী। কেমন করে ওর ফাঁদে পা দিয়েছিলাম ভেবে দেখ তো।

    সম্পর্কে মামাতো ভাই। তাই বাড়ির মধ্যে আসা যাওয়া আর মেলামেশায় কোন বাধা ছিলো না। তুমি তো সব জানো ভাবী।

    প্রথম প্রথম সে কি কথা বলতো?

    কেমন করে তাকিয়ে থাকতো।

    আর আমি দুর্বল হয়ে গেলাম।

    প্রেমে পড়লাম।

    তোমার কাছে তো কিছুই লুকোইনি আমি ভাবী। আর হ্যাঁ ভাবী।

    চিঠিগুলো কোথায় রেখেছো?

    আছে। কাউকে দেখাওনি তো?

    না।

    আল্লাহর কসম?

    আল্লার কসম।

    কোথায় রেখেছো নিয়ে এস তো।

    না, এখন পারবো না। সেই ট্রাঙ্কের মধ্যে এগাদা কাপড় চোপড়ের নিচে। কাল দুপুরে বের করে দেবো। কিন্তু ওগুলো দিয়ে এখন কি করবি তুই?

    পুড়িয়ে ফেলবো। মনে হলো এক্ষুণি কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে আমেনা। সত্যি, আমি একটা বোকা মেয়ে ভাবী। বাবা যখন বিয়ে ঠিক করে ফেললো ভোমরা তো দেখেছো, কত কেঁদেছিলাম আমি।

    তোমরা আমায় বুঝিয়েছিলে। কেঁদে কি হবে। কাঁদিসনে। বিয়ের পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলে কথা কি জানো ভাবী, লোকটার চরিত্র বলতে কিছু নেই। একটা আস্ত ছোটলোক। সহসা চুপ করে গেলো আমেনা।

    স্বামীর কথা মনে পড়লো।

    কেন যেন তাকে এখন আরো বেশি করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে আমেনার। মনে ভাবলো, খেয়েদেয়ে এসে ওর কাছে একটা চিঠি লিখতে হবে।

    নামাজ পড়া শেষ করে বুড়োকর্তা আহমদ আলী শেখ আবার পরিচয় পর্ব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ওকে যখন তুমি দেখেছো তখন সে হাফ প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতো। কিন্তু আমার সেই সেজো ছেলেটাকে বুঝলে আজ, বড় ইচ্ছে ছিলো সি, এস, পি বানাবো। উলক কোথাকার, আবার দাঁত বের করে হাসে দেখ না। তিনি এখন ব্যাবসা করাচ্ছেন। পাটের ব্যবসা। অবশ্য ব্যবসায়-রুজি-রোজগার ভালোই হচ্ছে।

    সহসা বুড়া কর্তার চোখ পড়লো বাচ্চা ছেলেটার দিকে। ঐ দ্যাখো। লেখাপড়া ফেলে তিনি এদিকে হা করে তাকিয়ে আছেন। কাল না তোর পরীক্ষা। ভালোমত পড়াশোনা করো। পড়ে পড়ে পুরো বইটাকে মুখস্ত করে ফেলো। রেজালটা যদি ভালো হয় তাহলে কালাদ থেকে একসের মিষ্টি কিনে খাওয়াবোতোমায়। পড়ো, পড়ো।

    ঠিক এমনি সময় দরজা দিয়ে চোরের মতো ভেতরে এলো দুটি চৌদ্দ পনেরো বছরের ছেলেমেয়ে।

    আহমদ আলী শেখ তা এই যে, কোত্থেকে এলে তোমরা আঁ? কোথায় গিয়েছিলে?

    বাইরে।

    বইয়ে। সেতো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কোথায়?

    ছোট খালার বাসায়।

    এতক্ষণ সেখানে কি করছিলে? তোমাদের না সন্ধের পর বাইরে কোথাও থাকতে নিষেধ করেছিলাম। একটু সুযোগ পেলেই দুজনে ফাঁকি দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরঘুর করো। দাঁড়াও এবার তোমাদের দুজনকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখবো আমি। সহসা মফিজ মামার দিকে তাকালেন আহমদ আলী শেখ। মৃদু হেসে বললেন, আমার বড় নাতি। মনসুরের ছেলে রসুল। আর ওর নাম রেখেছি পেঁচি। মেজোর বড় মেয়ে। দুটিতে বড় ভাব। দাঁড়াও, তোমাদের রোজ রোজ বাইরে যাওয়ার মজা দেখাচ্ছি আমি।

    রসুল আর পেঁচি মাথা নত করে নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর কারো দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেলো। বাচ্চা ছেলেটা এতক্ষণ চেয়ে চেয়ে ওদের দেখছিলো। আড়চোখে একবার বুড়ো কর্তাকে দেখে নিয়ে আবার বইয়ের প্রতি মনোযোগ দিলো। আল্লাহতায়ালা বলিলেন, ইহাদের সেজদা করো। কিন্তু ইবলিশ তবু রাজি হইলো না। ইবলিশ বললো, হে রব্বল আলামীন। ইহারা মাটির তৈরি। আর আমাদের আপনি আগুন দ্বারা তৈরি করিয়াছেন। আমরা আগুনে তৈরি হইয়া কেন মাটির ঢেলাকে সেজদা করিবো।

    জোহরা খাতুনের গলার স্বরে বুড়ো কর্তার চমক ভাঙ্গলো। কি মেহমানকে নিয়ে সারারাত গল্প করবে নাকি! খাবে না? সব ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

    বুড়ো কর্তা সহসা চিৎকার করে উঠলেন। আবদুল, আবদুল, উল্লুক কোথাকার। বাইরে হাত মুখ ধোয়ার পানি দিয়েছিস? জলদি করে দে। এসো মফিজ, হাতমুখ ধুয়ে নাও।

    গিন্নী চলে যাচ্ছিলেন। তাকে ডেকে থামালেন আহমদ আলী শেখ। শোন, মনসুর আহসান ওদের সবাইকে ডাকো। আমেনা কোথায়, না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝি। ওকে তোলো। আজ আমরা সবাই এক সঙ্গে খাবো। ওঘরে জায়গা না হলে, এক কাজ করো, এখানে ফরাশ বিছিয়ে দিতে বলো।

    বড় বউ মেজ বউয়ের কানে কানে প্রশ্ন করলো, মামা মামী কি আজ রাতে এখানে থাকবেন নাকি?

    মেঝে বউ বললো, না, আমেনাকাছিলো ওরা রাতের ট্রেনে চাটগাঁ চলে যাবে।

    যাক বাবা বাঁচোয়া। বড় বউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। আমি তো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, ওদের জায়গা দেব কোথায়।

    ছোট বউ ছুটতে ছুটতে এলো। বড় দস্তরখানটা কোথায়, দেখেছো?

    কেন?

    ওটা পাচ্ছি না। বাইরের ঘরে ফরাশ বিছিয়ে দিতে বললেন মা। সবাই একসঙ্গে ওখানে খাবে। ও, মুখ টিপে হাসলো মেজ বউ। বুড়োর আজ আবার ক্ষেতের ফসল দেখতে ইচ্ছে হয়েছে।

  • এক

    এক

    গলিটা অনেক দূর সরল রেখার মতো এসে হঠাৎ যেখানে মোড় নিয়েছে ঠিক সেখানে আহমদ আলী শেখের বসতবাড়ি।

    বাড়িটা এককালে কোন এক বিত্তবান হিন্দুর সম্পত্তি ছিলো। দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার পর তাদের চব্বিশ পরগণার ভিটেবাড়ি, জমিজমা, পুকুর সব কিছুর বিনিময়ে এ দালানটার মালিকানা পেয়েছেন। মূল্যায়নের দিক থেকে হয়তো এতে তাঁর বেশ কিছু লোকসান হয়েছে, তবু অজানা দেশে এসে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পাওয়া গেলো সে কথা ভেবে আল্লাহর দরগাঁয় হাজার শোকর জানিয়েছেন আহমদ আলী শেখ।

    সেটা ছিলো ঊনিশশো সাতচল্লিশের কথা।

    এটা উনিশশো আটষট্টি।

    মাঝখানে একুশটা বছর পেরিয়ে গেছে।

    সেদিনের প্রৌঢ় আহমদ আলী শেখ এখন বৃদ্ধ। বয়স তাঁর ষাটের কোঠায়।

    বড়ছেলে সাঁইত্রিশে পড়লো।

    মেজুর চৌত্রিশ চলছে।

    সেজু আটাশ।

    ছোট ছেলের বয়স একুশ হলো।

    বড় তিন ছেলের ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। বউরা সব পরস্পর মিলেমিশে থাকে। একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করে না বিবাদ করে না। তাই দেখে আর অনুভব করে কর্তা-গিন্নীর আনন্দের সীমা থাকে না। মনে মনে তারা আল্লাকে ডাকেন। আর বলেন। তোমার দয়ার শেষ নেই। আহমদ আলী শেখের নাতি নাতনীর সংখ্যাও এখন অনেক। বড়র ঘরে পাঁচজন।

    মেজোর দুই ছেলেমেয়ে।

    সেজ পরে বিয়ে করলেও তার ঘরে আট মাসের খুকিকে নিয়ে এবার তিনজন হলো।

    মাঝে মাঝে ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি নাতনীদের সবাইকে এক ঘরে ডেকে এনে বসান আহমদুআলী শেখ।

    তারপর, চেয়ে চেয়ে তাদের দেখেন। একজন চাষী যেমন করে তার ফসলভরা খেতের দিকে চেয়ে থাকে তেমনি সবার দিকে তাকিয়ে দেখেন আহমদ আলী শেখ। আর মনে মনে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন। ইয়া আল্লাহ, ওদের তুমি ঈমান আমানের সঙ্গে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রেখো।

    এখন রাত।

    আহমদ আলী শেখ বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় রোজকার অভ্যেস মতো খবরের কাগজ পড়েন।

    রাজনৈতিক খবরাখবরে তার কোন উৎসাহ নেই। দল গড়ছে। দল ভাঙছে। দফার পর দফা সৃষ্টি করছে। আর বক্তৃতা দিচ্ছে। ভিয়েতনামে ত্রিশ জন মরলো। রোজ মরছে। তবু শেষ হয় না।

    আইয়ুব খানের ভাষণ। আর কাশ্বির। কাশ্মির। পড়তে পড়তে মুখ ব্যথা করে উঠে।

    আহমদ আলী শেখ মামলা মকদ্দমার খবরগুলো খুব মনযোগ দিয়ে পড়েন। আর পড়েন পাটের বাজারে উঠতি পড়তির খবরাখবরগুলো কিংবা নতুন করে কোন দালান, কোঠা, ব্রিজ, কারখানা তৈরির খবর থাকলে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন।

    পড়েন। কারণ, তাঁর বড় ছেলে উকিল।

    সে ছেলে পাটের কারবাড়ি।

    আর মেজ ছেলে ইঞ্জিনিয়ার।

    আহমদ আলী শেখ খবরের কাগজের পাতা উল্টে চলেছেন। অদূরে তাঁর তিন নাতি বসে পরীক্ষার পাঠ মুখস্ত করছে।

    তাদের মধ্যে একজনের চোখ ঘুমে চুলটুল। আরেকজন কি যেন লিখছে। অন্যজন চিৎকার করে পড়ছে।

    আল্লাহ তায়ালা বাবা আদম ও মা হাওয়াকে তৈরি করিলেন এবং ফেরেস্তাদের ডাকিয়া বলিলেন: হে ফেরেস্তাগণ, তোমরা ইহাকে সেজদা কর। সকল ফেরেস্তা তখন নতজানু হইয়া বাবা আদম ও মা হাওয়াকে সেজদা করিল। করিল না শুধু একজন। তাহার নাম ইবলিশ। আল্লাহতায়ালা বলিলেন, হে ফেরেস্তা-শ্রেষ্ঠ ইবলিশ। আমি তামাম জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব ইনসানকে পয়দা করিয়াছি। ইহাদের সেজদা কর। ইবলিশ তবু রাজি হইল না।

    বাচ্চাটা চিৎকার করে পরীক্ষার পড়া পড়ছে।

    গিন্নী, জোহরা খাতুন জায়নামাজে বসে তছবি গুনছেন।

    আহমদ আলী শেখের চোখজোড়া তখনো খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় নিবদ্ধ। এমনি সময় ঘরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

    কাগজ থেকে মুখ তুললেন বুড়ো কর্তা। কে?

    যে ছেলেটা এতক্ষণ পড়ছিলো, সে পড়া থামিয়ে বাইরের ঘরের দিকে তাকালো।

    উঠে এসে বৈঠকখানায় বাতিটা জ্বাললেন আহমদ আলী শেখ। দরোজা খুললেন।

    খুলে সামনে যাকে দেখলেন তাকে এ মুহূর্তে এখানে আশা করেন নি তিনি।

    একমাত্র মেয়ে আমেনা।

    কিরে তুই? কোন খবর নেই, কিছু নেই। হঠাৎ।

    আমেনা বাবাকে সালাম করতে করতে বললো, কেন? ও টেলিগ্রাম করেছিলো পাওনি?

    কই নাতো? বুড়ো কর্তা অবাক হলেন। জামাই আসেনি?

    না।

    তুই একা এসেছিস?

    না। সঙ্গে মফিজ মামা আর মামীও এসেছেন।

    ওঁরা কোথায়? কথাটা বলবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন দুজন। মফিজ মামা আর তার স্ত্রী।

    বুড়ো কর্তা তাদের দেখে চিৎকার করে উঠলেন, আরে তোমরা। এসো, এসো, ভেতরে এসো। ইয়া আল্লাহ, আমি স্বপ্ন দেখছি নাতো। আঁ। সেই বারো তেরো বছর পর দেখা হলো, তাই না?

    মফিজ মামা হাসলেন। হ্যাঁ বারো তেরো বছর হবে। এই, দেখে না, মানুষ চোখের সামনে না থাকলে মল থেকেও দূর হয়ে যায়। সেই কবে থেকে করাচিতে পড়ে আছি। তোমরা একটু খোঁজ খবরও নাও না।

    কথাবলার ফাঁকে তাদেরকে ভেতরের ঘরে নিয়ে এলেন আহমদ আলী শেখ। আবদুল। আবদুল। উকটা গেলো কোথায়। শোন, আমেনার মালপত্রগুলো সব ভেতরে এনে রাখ। তারপর, তোমার চুলগুলো সব পেকে একেবারে সাদয় হয়ে গেছে দেখছি আ? পথে কোন কষ্ট হয়নি তো? ভালো, ভালো কইরে, আহসান মকবুল এরা সব গেলো কোথায়। এদিকে আয় তোদের মফিজ মামা এসেছে। একে চিনতে পারছো? এ হচ্ছে মেজ ছেলে। মানে আহসান। ইঞ্জিনিয়ার! আরে? তোকে অসুস্থ শরীরে এথানে আসতে বললো কে? একে তুমি ঠিক চিনতে পারবে না হে। তখন সে এক্কেবারে বাচ্চা ছিলো। সবার ছোট ছেলে শামছু। পেটের অসুখে ভুগে ভুগে স্বাস্থ্যখানা কি করেছে দেখো না। যাও যাও, তুমি গিয়ে শুয়ে থাকিগে। তারপর তোমার খবর টব কি বললা। উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন মফিজ মামা। দরজার দিকে চো পড়তে থেমে গেলেন। মনসুর না?

    বাড়ির বড় ছেলে মনসূর ওকালতির বইপত্র বগলে বাইরে থেকে ফিরছিলো।

    বুড়ো কর্তা একগাল হেসে বললেন হ্যাঁ হ্যাঁ, মনসুর। এ এখন শহরের জাঁদরেল উকিল। চিনতে পারছো না? ইনি তোমার মফিজ মামা। সালাম করো, সালাম করো। জানো, ওর এখন ভীষণ নামডাক। মনসুর উকিল বললে সারা শহরের লোকে তাকে চেনে।

    সকাল বেলা তো মক্কেলের ভিড়ে বাড়িতে প্রকাই দায় হয়ে পড়ে। হঠাৎ কি মনে হতে বুড়ো চিৎকার করে উঠলেন। আবদুল, আবদুল। ডেকে ডেকে উল্লকটার কোন পাত্তা পাওয়া খায় না।

    আবদুল বাড়ির বয়স্ক চাকর। হস্তদন্ত হয়ে ভেতরে এলো সে।

    কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

    জী। বউডার অসুখ।

    বউটার অসুখ তো তুই ওখানে বসে বসে করছিস কি? উজবুক কোথাকার। রোজ এক কথা কবার করে বলবো। দেখছিস না সাহেব বাইরে থেকে ফিরেছে। বইপত্রগুলো নিয়ে আলমারিতে রাখ। হাত মুখ ধোয়ার পানি দে। আর হ্যাঁ, তুমি বসো। আমি এই ফাঁকে চট করে নামাজটা সেরেনি।

    পাশের ঘরে গিন্নী জোহরা খাতুন তখন মফিজ সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে তার ছেলের বউদের আলাপ পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।

    এ হলো বড় বউ। এ মেজো। আর এ হচ্ছে সেজো। ইনি তোমাদের মামী। করাচিতে ছিলেন তাই এতদি দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।

    মামী চিবুক ধরে বউদের আদর করলেন। আপনাকে দেখে আমার হিংসা হচ্ছে বুবু। দেশের সুন্দর সুন্দর মেয়েগুলোকে বাছাই করে এনে ঘরের বউ বানিয়েছেন।

    তিন বউ লজ্জায় রাঙা হলো।

    ননদিনী আমেনা সহসা শব্দ করে হেসে উঠলো।

    গর্বিত শাশুড়ি জোহরা খাতুন বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, সব আল্লাহর মেহেরবানী।

    ইয়া, ভাই। নইলে এমন সুন্দর আর সংস্বভাবের তিন তিনটি বউ কজন শাশুড়ির ভাগ্যে জোটে।

    জানো ভাবী, আর পাঁচটা শাশুড়ির মতো আমি বউদের সঙ্গে সারাক্ষণ খিটিমিটি করি না। ওরা যেমন আমাকে মানিগণ্যি করে আমিও তেমনি ওদের আদরে সোহাগে রাখি। ওই তো পাশের বাড়ির টোগর মা, কি মাটি দিয়ে আল্লাহ তাকে পয়দা করেছিলো, বুঝলে ভাবী, বাচ্চা বউটাকে দুবেলা পেট ভরে খেতে দেয় না। আর সারাদিন এখনই যাও দেখবে বউটাকে চাকরানীর মতো খাটাচ্ছে। ছি ছি ছি এমন স্বভাব যেন আমার শত্রুরও না হয়। তবে হ্যাঁ। বউদের আমি যে একেবারে শাসল করি না, তা নয়। শাসন করি। মেয়েদের জোরে জোরে কথা বলা উনি মোটই পছন্দ করেন না। উনি বলেন, মেয়েরা এমনভাবে কথা বলবে বাড়িতে কাকপক্ষী আছে কি নাই বোঝা যাবে না। রাজার লোকে বাড়ির বউঝিদের গলার আওয়াজ শুনবে কেন? ওব্রা প্রথম প্রথম অবশ্য সব সময় না মাঝে মধ্যে, একটু হৈ-চৈ করতো। আমি নিষেধ করে দেয়ার পর থেকে কেউ এসে বলুক দেখি আমার কোন বউয়ের গলার আওয়াজ কেমন? তিন বউ নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে হাসলো। জোহরা খাতুন বললেন, একি, তোমরা দাঁড়িয়ে রইলে কেন। আমেনার ঘরটা ঝেড়ে মুছে ঠিক করে দাও। আমার আলমারিতে ধোয়া চাদর আছে একটা বের করে দিও। আর শোন, মশারীর কি হবে? এক কাজ করো, আমার মশারীটাই না হয় ওকে টাঙ্গিয়ে দাও। আমাকে মশায় খায় না। তিনজন একদিকে চললে কেন। একজন রান্নাঘরে যাও। আবদুলের বউটার অসুখ। কাজকর্ম সবু পড়ে আছে। একটু পরে আমার বাচ্চা-কাচ্চারা সব ঘুমিয়ে পড়বে। ওদের সময়মত খাইয়ে দিও। এসো ভাবী, তুমি তো আর এ বাড়িতে কোনদিন আসনি, চলো সবার ঘরদোর দেখবে।

    একে একে মামীকে সবার ঘরে নিয়ে গেলেন জোহারা খাতুন।

    সব ঘব দেখালেন।

    গোলাপত্র!

    চেয়ার টেবিল।

    বাক্স দেরাজ।

    এগুলো সব ছেলেরা নিজেদের রোজগার থেকে কিনেছে। উনি তো বেশ কবছর হলো। পেনসন নিয়েছেন। তারপর থেকে ঘর সংসারের যাবতীয় খরচ ছেলেরাই চালাচ্ছে। আল্লা ওদের রুজি-রোজগারে আরো বরকত দিক। কথা হলো কি ভাৰী, ছেলেপিলেদের বাপ মা এত কষ্ট করে মানুষ করে কেন বুড়ো বয়সে একটু আরামে থাকবে সে জানো তো, আল্লায় দিলে সে আরাম আমরা পেয়েছি।

    জোহরা খাতুনের চোখেমুখে পরিতৃপ্তির হাসি।

    মেয়ে আমেনাকে কোলের কাচ্ছে টেনে এনে বসালেন তিনি। তার গায়ে মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে শুধালেন। জামাই কেমন আছে?

    ভালো।

    তোমাকে একা পাঠালো। সঙ্গে এলো না কেন?

    কেমন করে আসবে। ছুটি পেলে তো? বড় সাহেব ছুটি দিতে চায় না। ও না থাকলে অফিসের সব কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায় কিনা তাই! সেই কবে থেকে আসার জন্যে ছটফট করছি। একা আসবো, সাহস হয় না। শেষে মফিজ মামারা আসছেন শুনে বললাম, আমি ওদের সঙ্গে চলে যাই, তুমি ছুটি পেলে পৱে এসো।

    জামাই কি বললো।

    বলবে আবার কি। চলে আসবো শুনে মুখখানা কালো হায়ে গেলো। জানো মা, ও না আমাকে ছেড়ে এক মুহূর্তও কোথাও থাকতে পারে না। কথাটা বলতে গিয়ে লজ্জায় রাঙা হলো আমেনা। ছি ছি এথা বললো সে। এটা ঠিক হয় নি।

    বুড়ো গিন্নী নিজেও মুহূর্তের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সহসা বললেন, হ্যারে, তুই কাপড়-চোপড় ছাড়বিনে? যা হাতমুখ ধুয়ে নে। দূর থেকে এসেছিল। কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করগে যা। এক গ্লাস দুধ এনে দেবো, খাবি?

    না মা। দুধ খেলে আমার এক্ষুণি বমি হয়ে যাবে। মায়ের সামনে থেকে সরে গেলো মোমেন

    ও চলে গেলে মামীর দিকে তাকিয়ে জোহরা খাতুন মৃদু হাসলেন। বললেন: এখনো একেবারে বাচ্চা রয়ে গেছে। কার সামনে যে কি কথা বলতে হয় কিছু জানে না। ওটা এই ছোটবেলা থেকেই এ রকম। পানের বাটাটা এবার সামনে টেনে নিলেন তিনি। তারপর আবার সংসারের নানা মোলাপের মাঝখানে হারিয়ে গেলেন।

  • কয়েকটি মৃত্যু

    কয়েকটি মৃত্যু

    কয়েকটি মৃত্যু জহির রায়হানের উপন্যাস।

  • চার

    চার

    চারপাশে ধুধু বালির চর।

    আর আলকাতরার মতো যেন অন্ধকার।

    ভয়াবহ ক্লান্তির অবসাদে ভেঙ্গে পড়া তপু আর ইভার দুচোখে গভীর উৎকণ্ঠা।

    একটি জীবন কিছুক্ষণের মধ্যে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেবে। কুড়িয়ে পাওয়া আহত ছেলেটি একটু পরে মারা যাবে। তার চোখ জোড়া বিবর্ণ হয়ে এসেছে, শুকনো ঠোঁট জোড়া ঈষৎ নেড়ে কি যেন বলতে চাইছে সে।

    একটু পানি জোগাড় করতে পারে? ইভা অনুনয়ের সঙ্গে তাকালো তপুর দিকে। ওর মুখে দেব।

    উঠে দাঁড়ালো তপু। সমস্ত অবসাদ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মৃতপ্রায় ছেলেটির জন্যে পানির খোজে বেরিয়ে পড়লো সে।

    তপু ছুটছে।

    চারপাশে শুধু শুকনো বালি আর বালি।

    এক ফোঁটা পানির অস্তিত্ব নেই কোথাও।

    আরো অনেকক্ষণ পর যখন অবসন্ন দেহ আর হতাশ মন নিয়ে ফিরে এলো তপু, তখন আহত ছেলেটি মারা গেছে।

    তৃষ্ণার্ত ঠোঁট জোড়া তার ঈষৎ খোলা।

    পাশে বসে আছে ইভা।

    আর মাটিতে শুয়ে থাকা শিশুটি আকাশের দিকে হাত পা ছুঁড়ে খেলা করছে। মুখে তার নিষ্পাপ হাসি।

    ইভা কাঁদছে। দুগণ্ড বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে তার।

    তপু কিছু বললো না। ওর মাথার উপরে নীরবে একখানা হাত রাখলো শুধু।

    তারপর।

    তারও অনেক অনেক পরে আহত ছেলেটির শেষ কৃত্যের জন্যে একটা কবর খোঁড়ার চেষ্টা করলো ওরা।

    মাটি এখন মনে হলো পাথরের মতো শক্ত।

    ছোট্ট একটা কবর খুঁড়তে গিয়ে রীতিমত হাঁপিয়ে উঠলো দুজনে। কিছু মাটি তোলার পর অবাক হয়ে দেখলো চারপাশ থেকে স্রোতের মতো পানি এসে কবরটা ভরে যাচ্ছে।

    দুহাতে পানি ফেলে দিয়ে কবরটাকে শুকোবার চেষ্টা করলো তপু, পারলো না।

    অফুরন্ত পানি শুধু বেড়েই চলেছে।

    ধীরে ধীরে সেই পানির মধ্যে মৃতদেহটাকে নামিয়ে দিলো ওরা। তারপর বাচ্চাটাকে বুকে তুলে নিয়ে আবার অন্ধকারের মধ্যে পা বাড়ালো দুজনে।

    ইভা মৃদুস্বরে বললো, আমি আর পারছি না।

    তপু বললো। আর একটু পথ। এই পথটুকু পেরিয়ে গেলে আর কোন ভয় নেই ইভা। আমরা তখন নিরাপদ সীমানার মধ্যে গিয়ে পৌঁছবো।

    সামনে একটা জলে ভরা নাতিদীর্ঘ ঝিল।

    দুপাশ তার মখমলের মতো নরম সবুজ ঘাসে ভরা।

    এখানে সেখানে দুএকটা গাছ। ইতস্তত ছড়ানো।

    ঘাসের ওপর এসে বসলো ওরা।

    তপু আর ইভা।

    বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়েছে।

    তাকে বুকের মধ্যে নিয়ে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লো ইভা।

    জানো, ভীষণ ক্লান্তি লাগছে।

    তপুও শুয়ে পড়লো।

    উপরে বিরাট বিশাল সীমাহীন আকাশ।

    আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে তপু বললো, এখন আর আমাদের কোন ভয় নেই ইভা।

    ইভা ওর দিকে চেয়ে মিষ্টি একটু হাসলো। আমি এখন কি ভাবছি বলতে?

    কি ভাবছে?

    বিয়ের পরে আমাদের জীবনটা কেমন হবে, তাই। আমাকে হেড়ে কিন্তু তুমি কোথাও যেতে পারবে না। যেখানে যাবে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। সারাক্ষণ তোমার পাশে পাশে থাকবো।

    কি মজা হবে তাই না?

    আর আমি কি ভাবছি জানো?

    কি?

    আমি যখন সারাদিনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরবো, তখন দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তোমার নাম ধরে ডাকব। আশে পাশের বাড়ির লোকগুলো সবাই চমকে তাকাবে সে দিকে। তুমি দরজা খুলেই আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলবে, এতে দেরি হলো যে

    আমি বলবো। কি বলবো বল তো?

    তুমি বলবে অনেক কাজ ছিলো তাই।

    না না। আমি বলবো। কাজের মাঝখানে তোমাকে নিয়ে একটা মিষ্টি কবিতা লিখেছি, তাই।

    তুমি শব্দ করে হেসে উঠে বলবে। কই দেখি, দেখি। দেখাও না।

    না, এখন না।

    কখন?

    যখন পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই ঘুমিয়ে পড়বে। এই পৃথিবীর একটি মানুষও জেগে থাকবে না। তুমি আমি পাশাপাশি বসবো। দুজনে দুজনকে দেখবো। তখন শোনাববা তোমাকে।

    কি সুন্দর তাই না। ইভা ধীরে ধীরে বললো।

    বাচ্চা ছেলেটা ইভার বুকে মুখ গুঁজে নীরবে ঘুমুচ্ছে।

    তপু আর ইভার চোখেও ঘুম নেমে এলো একটু পরে। বহুদিন পরে ঘুমুছে ওরা।

    শহরটা এখনো মৃত।

    ক্ষতবিক্ষত।

    এখানে সেখানে এখনো অনেক মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে।

    কুকুরের।

    বিড়ালের।

    মানুষের।

    অবাক হয়ে চারপাশে তাকালো তপু আর ইভা।

    জনশূন্য পথ দিয়ে চলতে গিয়ে ক্ষণিকের ভুলে যাওয়া আতঙ্কটা যেন ধীরে ধীরে আবার উঁকি দিতে লাগলো ওদের মনের মধ্যে। তপুর দিকে তাকালে ইভা।

    আমার ভয় করছে।

    না। না। ভয়ের কোনই কারণ নেই ইভা। আমরা এসে পড়েছি।

    একটা বাড়ির সামনে এসে ওরা দাঁড়ালো।

    আমাদের বাড়ি। তপু আস্তে করে বললো।

    ইভা মুখ তুলে বাড়িটাকে এক পলক নিরিখ করলো।

    বার কয়েক কড়া নাড়লো তপু।

    কোন সাড়াশব্দ নেই।

    আবার কড়া নাড়লো।

    আবার।

    সহসা শব্দ করে দরজাটা খুলে গেলো।

    তপু দেখলো। তার মা। বুড়ি মা।

    তিন ভাই।

    আর চৌদ্দ বছরের সেই মেয়েটি।

    তপুকে দেখে চমকে উঠলো সবাই।

    মা। বাবা। ভাই। বোন।

    ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন মা। তপু! তপু! তুই বেঁচে আছিস?

    না। না। পরক্ষণেই প্রচণ্ড শব্দে আর্তনাদ করে উঠলো ইভা।

    তপু চমকে তাকিয়ে দেখলো।

    বুড়ি মায়ের হাতজোড়া রক্তাক্ত। যেন এই একটু আগে, এক সমুদ্র রক্তের মধ্যে হাতজোড়া ডুবিয়ে এসেছেন তিনি।

    বাবার হাতে একটা চকচকে দা। দা-এর ডগা থেকে তাজা রক্ত ঝরে ঝরে পড়ছে। ভাইদের হাতে লোহার শিক। তাজা খুনে ভরা।

    না। না। মায়ের আলিঙ্গন থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো তপু।

    ইভা ততক্ষণে বাচ্চা ছেলেটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আবার ছুটতে আরম্ভ করেছে।

    তীব্রবেগে তাকে অনুসরণ করলো তপু।

    না। না। না।

    শব্দের রাক্ষসগুলো আবার তাড়া করছে পেছন থেকে।

    পাগলা কুকুর নয়।

    শূকর শূকরী নয়।

    কতগুলো মানুষ।

    কতগুলো চেনা মুখ।

    মায়ের। বাবার। ভাইয়ের। বোনের।

    পেছন থেকে ছুটে আসছে। ছুটে আসছে ওদের হত্যা করার জন্যে। প্রাণপণে ছুটছে তপু আর ইভা।

    বাচ্চা ছেলেটা বুকের মধ্যে কাঁদতে শুরু করেছে। তার তীব্র কান্নার শব্দে মনে হলো যেন মৃত শহরটা থরথর করে কাঁপছে। ওকে আরো জোরে বুকের মধ্যে চেপে ধরলো ইভা।

    আমি আর পারি না। আর পারি না। গভীর যন্ত্রণায় পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলো ইভা।

    তপু এসে হাত ধরলো ওর।

    ওরা ছুটছে।

    শব্দের রাক্ষসগুলো তাড়া করছে পেছন থেকে।

    ওরা ছুটছে।

    তারপর।

    অনেক অনেক অন্ধকার পথের শেষে। সহসা নিজেদের সেই অফুরন্ত মিছিলের মাঝখানে আবিষ্কার করলো ওরা।

    তপু আর ইভা।

    একটা সীমাহীন সমুদ্রের পাড় ধরে মানুষগুলো এগিয়ে চলেছে সামনে।

    ছেলে। বুড়ো। মেয়ে। শিশু। যুবক। যুবতী।

    দীর্ঘ পথ চলায় ক্লান্ত অবসন্ন।

    জীর্ণ। শীর্ণ। বিবর্ণ।

    ক্ষতবিক্ষত দেই। আর অবয়ব।

    আমরা কোথায়?

    ভিয়েতনামে না ইন্দোনেশিয়ায়।

    জেরুজালেমে না সাইপ্রাসে।

    ভারতে না পাকিস্তানে।

    কোথায় আমরা?

    জানো, ওরা আমার ছেলেটাকে হত্যা করেছে হিরোশিমায়।

    ওরা আমার মাকে খুন করেছে জেরুজালেমের রাস্তায়।

    আমার বোনটাকে ধর্ষণ করে মেরেছে ওরা আফ্রিকাতে।

    আমার বাবাকে মেরেছে বুখেনওয়াল্ডে গুলি করে।

    আর আমার ভাই। তাকে ওরা ফাঁসে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। কারণ সে মানুষকে ভীষণ ভালোবাসতো।

    বলতে গিয়ে দুচোখের কোণে দুফোঁটা অঞ মুক্তোর মত চিকচিক করে উঠলো বুড়োটার।

    ওর পাশে এসে দাঁড়ালো অপু আর ইভা।

    তারপর সমুদ্রের পাড় ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো ওরা।

    সামনে।

  • তিন

    তিন

    ইভা আর তপু তখন ছুটছে।

    পালাচ্ছে ওরা।

    দীর্ঘ পথ চলায় ওরা ক্লান্ত। বিবর্ণ বিধ্বস্ত।

    তবু জীবনের জন্য।

    বাঁচার জন্যে। সুখের জন্যে।

    ওরা দুটছে।

    সহসা থমকে দাঁড়ালো ওরা।

    ইভা আর তপু।

    দেখলো। সামনে সীমাহীন সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের সৈকতে, অফুরন্ত ঢেউয়ের পটভূমিকায় একটি ক্রুশ আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে। ক্রুশের পেছনে লাল টকটকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

    কে? ক্রুশবিদ্ধ লোকটির দিকে তাকিয়ে সহসা প্রশ্ন করলো ইভা। অনেকক্ষণ কোন জবাব দিলো না তপু। সে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলো।

    তারপর বললো, যিশু। যিশু।

    হ্যাঁ। যিশুখৃষ্ট। ওরা গতকাল তাঁকে হত্যা করেছে।

    দুজোড় চোখ বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।

    যেন এক অনন্ত সময়ের সমুদ্রে হারিয়ে গেছে ওরা।

    সহসা আবার সেই হিংস্র বন্য ধ্বনি তাড়া করে এালো।

    পাগলা কুকুরগুলো খোঁজ পেয়ে গেছে ওদের।

    শূকর শূকরীরা চিৎকার করে আসছে পেছনে।

    ইভার একখানা হাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে আবার ছুটলো তপু।

    প্রাণপণে ছুটছে ওরা।

    সহসা। কিসের সঙ্গে যেন হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলো ওরা। চারপাশে অসংখ্য মৃতদেহ।

    ছেলে। বুড়ো। মেয়ে। শিশু।

    অপু আর ইভা চমকে উঠলো।

    দেখলো। সেই অসংখ্য মৃতদেহের মাঝখানে ওদের দুজনের মৃতদেহও পড়ে আছে।

    নিজের মৃত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো ইভা।

    তাকালো তপু।

    বুশেনওয়ান্ডে।

    না। অসউইজে।

    না। স্ট্যালিনগ্রাডে? অথবা ভিয়েতনামে?

    ভয়ে শিউরে উঠে তপুর বুকে মুখ লুকালো ইভা।

    সহসা কাছাকাছি কোথায় যেন প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করলে তপু। একটা বাচ্চা ছেলে কাদছে।

    দুজনে মাথা তুলে তাকালো ওরা। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। মৃতদেহগুলোর মাঝখান দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো ইভা আর তপু। কিছুদূর এসে দেখলো। একটি মৃত মা মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে। তার স্তন থেকে চুইয়ে পড়া দুধে আর রক্তে মাটি ভিজে গেছে।

    পাশে চার পাঁচ বছরের একটি আহত ছেলে শূন্য দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে ওদের দিকে।

    আর।

    একটি শিশু আকাশের দিকে হাত পা ছুঁড়ে তীব্র কান্না জুড়ে দিয়েছে।

    মৃত মায়ের স্তনের ওপর পরনের কাপড়টা টেনে দিলো ইভা। মাটি ঢেকে দিলো।

    আহত ছেলেটিকে কোলে নিলো তপু।

    শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলো ইভ।

    তারপর আবার ছুটতে লাগলো ওরা।

    সামনে অগুনতি লোক। বাস্তুহারাদের অফুরন্ত মিছিল।

    নানা বর্ণের।

    নানা গোত্রের।

    নানা ধর্মের।

    দীর্ঘ পথ চলায় ক্লান্ত। শীর্ণ। জীর্ণ।

    ক্ষতবিক্ষত অবয়ব।

    ওদের মাঝখানে এসে কিছুক্ষণের জন্যে হতবিহবল হয়ে গেলো ইভা আর তপু।

    তোমরা কোত্থেকে আসছে।

    ইন্দোনেশিয়া থেকে।

    ভিয়েতনাম থেকে।

    গ্রিস থেকে।

    সাইপ্রাস থেকে।

    জেরুজালেম থেকে।

    হিরোশিমা থেকে।

    কোথায় যাচ্ছে? কোথায় যাবে তোমরা?

    আমরা অন্ধকার থেকে আলোতে যেতে চাই।

    আমরা আলো চাই।

    তোমরা কোথায় যাচ্ছে একজন বুড়ো প্রশ্ন করলে ওদের।

    তপু ইতস্তত করে বললো। আমার মা বাবা ভাই বোনের কাছে।

    তোমার নাম? তোমার নাম কি? সহসা আরেকজন শুধালো।

    আমার নাম তপু।

    তপু। লোকটা এগিয়ে এলো সামনে। ও হ্যাঁ। তোমার মায়ের সঙ্গে আমাদের পথে দেখা হয়েছিলো, তিনি তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন আমাদের। তোমার খোঁজ জানতে চাইছিলেন।

    বাচ্চাটা আবার কেঁদে উঠতে ইভা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো।

    মিছিল এগিয়ে গেলো সামনে।

    বুড়ি মা আশ্রিত মানুষগুলোর জন্যে রান্নার আয়োজন করছিলেন। তেরো চৌদ্দ বছরের মেয়েটি সাহায্য করছিলো তাঁকে।

    বুড়ো বাবা তাঁর ঘরে একখানা জায়নামাজের উপরে বসে তছবি শুনছিলেন আনমনে।

    আর বক্সঘরের বাসিন্দারা ওয়োপোকার মত হাত পা গুটিয়ে ঝিমুহিল বসে বসে।

    এমন সময়।

    ঠিক এমনি সময় তপুর মৃত্যুর খবর নিয়ে এলো তিন সন্তানের একজন। সকলকে ডেকে এক ঘরে জড়ো করলো সে। তারপর ধীরে ধীরে বললো।

    বললো। তপু মারা গেছে। তলুকে মেরে ফেলেছে ওরা।

    মুহূর্তে চমকে উঠলো সবাই।

    বুড়ি মা, বাবা চৌদ্দ বছরের মেয়েটি আর দুই ভাই।

    বুকের উপরে হাত দুখানা জড়ো করে ক্ষীণ একটা আর্তনাদের ধ্বনি তুলে ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়লেন বুড়ি মা।

    শুকনো দুচোখ ভিজে এলো।

    মনে হলো যেন সন্তানের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করছেন তিনি।

    তপু মনে পড়ে আছে রাস্তার উপরে উপুড় হয়ে।

    তপুর মৃতদেহ একটি গাছের সঙ্গে ঝুলছে।

    ঘরের ভেতরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে তপু। চারপাশে রক্তের স্রোত বইছে।

    তপুকে ওরা ঘরের কড়িকাঠের সঙ্গে ঝুলিয়ে মেরেছে।

    তপুর মৃতদেহটা ওরা কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।

    তপু মনে পড়ে আছে একটা নর্দমার ভেতর।

    এক মুহূর্তে তপুর করুণ মৃত্যু দৃশ্যগুলো চোখের সামনে যেন দেখতে পেলো ওরা।

    বুড়ি মা। বাবা। তিন সন্তান আর চৌদ্দ বছরের মেয়েটি। সহসা একজন ছুটে গিয়ে ঘরের কোণে রাখা দাটা হাতে তুলে নিলো আরেক ভাই নিলো একটা ছুরি।

    তৃতীয় জন একটা লোহার শিক।

    তিন জোড়া চোখে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে।

    দরজার দিকে এগিয়ে গেলো ওরা।

    সহসা পেছন থেকে দুটে এসে ওদের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন বুড়ো বাবা। না। ওদের তোমরা হত্যা করতে পারবে না।

    কেন?

    কেন?

    কেন?

    তিন কণ্ঠ এক হয়ে প্রশ্ন করলো।

    ওরা তো কোন দোষ করে নি। বুড়ো বাবা জবাব দিলেন। ওরা তোমাদের আশ্রিত। ওরা অসহায়। ওদের কেন হত্যা করবে।

    কারণ ওরা সেই ধর্মের লোক যারা আমার ভাইকে খুন করেছে।

    ওদের জাত এক।

    ধর্ম এক।

    বর্ণ এক।

    গোষ্ঠী এক।

    ভাষা এক।

    ওদের খুন করে আমরা প্রতিশোধ নেবো।

    না। বুড়ো বাবা যেন সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন। জাত, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী আর ভাষা এক বলে ওরা দোষী নয়। ওরা তো তপুকে খুন করে নি।

    ওরা করে নি, ওদের জাতভাইরা করেছে। সহসা বাঘিনীর মতো স্বামীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বুড়ো মা। সরে যাও সামনে থেকে। সরে যাও।

    বাক্সঘরের মধ্যে জানোয়ারের মতো থাকা মানুষগুলো তখন পরম নির্ভরতায় ঘুমুচ্ছে।

    মই বেয়ে উপরে উঠে এলো তিন ভাই।

    ধীরে ধীরে দরজাটা খুললো ওরা।

    ওদের চোখে মুখে রক্তের নেশা। মনে হলো যেন মানুষের চেহারা সরে গিয়ে কতগুলো হিংস্র বন্য পশুর মুখ ওদের কাঁধের ওপর ঝুলছে।

    একটা বাচ্চা ছেলে ঘুমন্তু মায়ের স্তন নিয়ে খেলা করছিলো। সহসা শব্দ করে হেসে উঠলো সে।

    তাঁর হাসির শব্দে চমকে উঠলো তিন তস্কর।

    হাত থেকে দা আর ছুরি নিচে মেঝেতে খসে পড়ার আওয়াজে বাক্সঘরের বাসিন্দারা জেগে গেলে সবাই। ওরা অবাক হয়ে খোলা দরজায় দাঁড়ানো তিন ভাই এর দিকে তাকালো।

    ওদের সে দৃষ্টি যেন সহ্য করতে পারলো না তিন ভাই।

    ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে নিলো।

    একজন বললো, ও কিছু না। তোমরা কেমন আছে দেখতে এসেছিলাম। ঘুমোও এখন। ঘুমিয়ে পড়ো।

    দরজাটা আবার বন্ধ করে দিলো।

  • দুই

    দুই

    মায়ের মন আতঙ্কে শিউরে উঠলো।

    এখানেও জীবনের কোন অস্তিত্ব নেই।

    প্রশস্ত পথ জুড়ে ভাঙ্গা কাচের টুকরো। ইটের টুকরো।

    আর মৃতদেহ।

    কুকুরের।

    বিড়ালের।

    পাখির।

    আর মানুষের।

    চারপাশে একবার তাকালো তপু।

    ধ্বনির পশুরা তাড়া করছে ওকে।

    ডানে। বাঁয়ে। সামনে। পেছনে।

    চারপাশে থাকে।

    তপু ছুটছে। পালাচ্ছে সে প্রাণপণে।

    সহসা সামনে একটা খোলা দরজা পেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো সে। ওটা একটা সিঁড়িঘর। ঘোরান সিঁড়ির উৎস মুখে লুকিয়ে থাকার মতো এক টুকরো অন্ধকার। ভেতরে এসে তার আত্মগোপন করলো তপু।

    শব্দের রাক্ষসগুলো তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

    নিঃশ্বাস বন্ধ করে নীরবে বসে বসে নিজের হৃৎপিণ্ডের দ্রুত ধাবমান গতিটাকে আয়ত্বের অধীন আনার চেষ্টা করতে লাগলো সে। ভাঙ্গার শব্দ শুনলো।

    কাছে কোথায় যেন সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলছে ওরা।

    একটা আর্তনাদ শোনা গেলো। না। না।

    তপু এবার যে ঘরে এসে আশ্রয় নিলো তার কোন কিছুই অক্ষত নেই।

    বিছানা। আসবাব। বই। কাপড়। কাচ। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে মেঝেতে।

    তপুর মনে হলো ওর হাত পা সব ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে।

    দাঁড়াবার শক্তি হারিয়ে ফেলছে সে। ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালো।

    কাকে যেন খুঁজলো। অস্পষ্ট স্বরে ডাকলো সে। ইভা।

    কোন সাড়া নেই।

    পাশের বাথরুমে খোলা কল থেকে একটানা পানি পড়ার শব্দ হচ্ছে। বেসিন উপচে পানি গড়িয়ে পড়ছে নিচে। বাথটবে কয়েকটা মৃতদেহ। রক্ত আর পানির মধ্যে ডুবে আছে।

    ইভার মা।

    বাবা।

    ছোট ভাই।

    মরিয়া হয়ে ইভাকে খুঁজতে লাগলো তপু।

    কয়েকটা কাচের টুকরো ছিটকে গেলো মেঝের ওপর।

    ইভা। ইভা।

    আবার সেই পশুদের চিৎকার।

    কবাটের আড়ালে আত্মগোপন করতে গিয়ে পিঠের সঙ্গে নরোম কি যেন ঠেকলো তার। সভয়ে পিছিয়ে আসতে ইভার চেতনাহীন দেহটা মেঝের ওপরে গড়িয়ে পড়লো।

    ইভা! তপু চমকে উঠলো।

    ইভার ধমনি দেখলো সে।

    বুকে মাথা রেখে তার হৃদপিণ্ডের শব্দ শোনার চেষ্টা করলো। বেঁচে আছে।

    দুহাত ভরে বেসিন থেকে পানি এনে ওর মুখের ওপর ছিটিয়ে দিলো সে।

    ইভা চোখ মেলে তাকিয়ে চিৎকার করে আবার চোখ বন্ধ করলো। না। না। দোহাই তোমাদের আমাকে মেরো না। আমাকে মেরো না।

    তপু ডাকলো। শোন ইভা, আমি তপু। চেয়ে দেখো, আমি তপু। জবার মতো লাল চোখ জোড়া আবার খুললো মেয়েটি। যেন কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। সহসা শিশুর মতো কেঁদে উঠে তপুর বুকে মুখ লুকালো মেয়েটি।

    আকাশ কালো করা জমাট মেঘগুলো বৃষ্টির রূপ নিয়ে অফুরন্ত ধারায় ঝরে পড়ছে। মাটিতে। আর অসংখ্য অগণিত লোক সেই বর্ষণের তীব্রতাকে উপেক্ষা করে এক হাঁটু পানি আর কাদা ডিঙ্গিয়ে হেঁটে চলেছে।

    নানা বর্ণের।

    নানা বয়সের।

    কেউ দীর্ঘ পথ চলায় ক্লান্ত।

    কেউ জরাগ্রস্থ।

    কেউ আবার হিংস্র দানবের নখরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত।

    ওরা পালাচ্ছে।

    আমরা এখন কোথায়? একজন আর একজনকে প্রশ্ন করলো। আমরা এখন কোথায়?

    ইন্দোনেশিয়ায়। না ভিয়েতনামে। না সাইপ্রাসে।

    কোথায় আমরা।

    জানি না।

    আমার বাড়িঘরগুলো ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। জমি দখল করে নিয়েছে। আলু ওদের ক্ষমা করবে ভেবেছো। কোন দিনও না।

    ঘর। বাড়ি। মাটি ছেড়ে আসা মানুষগুলো এক হাঁটু পানি আর কাদা ডিঙ্গিয়ে হেঁটে চলেছে। আর তাদের মাঝখানে বুড়ি মা ঘুরে ঘুরে সবার কাছে যাচ্ছেন। সকলকে দেখছেন। সবার চেহারার দিকে খুঁটিয়ে তাকাচ্ছেন তিনি। তাঁর সন্তানকে খুঁজছেন। আপনারা কেউ দেখেছেন কি তাকে? আসার পথে কোথাও দেখেছেন কি? মাথায় ঝাক ঝাঁকড়া চুল। শ্যামলা রঙ। দেখতে বেশ লম্বা। আপনারা কেউ দেখেছেন কি? সবার কাছে একটি প্রশ্নই করেছেন বুড়ি মা। হা হা। ওর কপালের বাঁ পাশে একটা কাটা দাগ আছে। ছোট বেলায় বিছানা থেকে পড়ে কেটে গিয়েছিলো। আপনার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিলো কি?

    সবার কাছে ওই একটি প্রশ্ন করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন মা। কিন্তু কেউ সঠিক উত্তর দিতে পাচ্ছে না।

    সবাই নিজের ভাবনা আর চিন্তায় মগ্ন। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অন্যের কথা নিয়ে দু’দণ্ড আলাপ করার অবকাশ নেই।

    আপনি দেখেছেন কি? ওর নাম তপু। হ্যাঁ, আমার ছেলের নাম। ও নামে কাউকে দেখেছেন কি?

    তপু, তাই না? হ্যাঁ মনে হচ্ছে দেখা হয়েছিলো। মানে ঠিক কোথায় দেখা হয়েছিলো স্মরণ করতে পাচ্ছি না। অত কি আর মনে থাকে মা। গ্রামকে গ্রাম ওরা পুড়িয়ে ছাই করে দিলো। কত মেরেছে জিজ্ঞেস করছো? তার কি কোন হিসেব আছে। এক বছর নদীতে কোন স্রোত ছিল না। মরা মানুষের গাদাগাদিতে সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। শকুনরা ছিড়ে ছিড়ে খেয়েছে দু’বছর ধরে। এখনো খাচ্ছে।

    মা আতঙ্কে শিউরে উঠলেন।

    নিজের সন্তানের নির্মম মৃত্যুর কথা ভেবে অবিরাম বৃষ্টি ধারার মাঝখানে নীরবে দাঁড়িয়ে

    দু’চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু, বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে, দু’গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নিচে।

    তুমি কাঁদছো কেন গো। কেঁদে কি হবে। আমার দিকে চেয়ে দেখো। আমি তো কাঁদি না। অফুরন্ত মিছিলের একজন বললো। ওরা আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে হিরোশিমায়। আমার মাকে খুন করেছে জেরুজালেমর রাস্তায়। আমার বোনটা এক সাদা কুত্তার বাড়িতে বাঁদী ছিলো। তার প্রভু তাকে ধর্ষণ করে মেরেছে আফ্রিকাতে। আমার বাবাকে হত্যা করেছে ভিয়েতনামে। আর আমার ভাই, তাকে ফাঁসে ঝুলিয়ে মেরেছে ওরা। কারণ সে মানুষকে ভীষণ ভালবাসতো।

    কিন্তু আমি তো কাঁদি না। তুমি কাঁদছ কেন?

    বিষণ্ণ বুড়ি মা স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেই লোকটার দিকে। লোকটা থামলো না। এক হাঁটু পানি আর কাদা ডিঙ্গিয়ে সে এগিয়ে গেলো সামনে। সহস্র শরণার্থীর অবিরাম মিছিলে।

    পাগলা কুকুরের হলা বেড়েই চলেছে।

    মরিয়া হয়ে ওরা তাড়া করছে তপুকে। ইভাকে।

    ওরা দুজনের ছুটছে। প্রাণপণে।

    টুকরো টুকরো ইটে ভরা শহুরে রাস্তাগুলোতে আলো ঝলমল করছে। আর ওরা অন্ধকার খুঁজছে।

    একটুখানি অন্ধকার পেলে তার ভেতরে দু’জনে আত্মগোপন করবে ওরা। সহসা তপু একটা ইটের টুকরো তুলে নিলো হাতে। রাস্তার পাশে জ্বলা বাতি লক্ষ্য করে ইটটা ছুঁড়ে মারলো সে।

    বাতি নিভে গেলো।

    কাচের টুকরোগুলো ছিটকে গেলো নিচে।

    আরেকটা বাত্তি নিভে গেলো।

    এক নতুন খেলায় মেতেছে ওরা।

    ইভা আর তপু।

    ইট সগ্রহ করে এগিয়ে দিচ্ছে ইভা।

    আর একটার পর একটা বাতি ভেঙ্গে চলেছে তপু।

    ঝলমলে আলো সরে গিয়ে অন্ধকার নেমে এলো পথে। আর সেই অন্ধকারের এককোণে নীরবে লুকালো ওরা দুজনে।

    পাগলা কুকুরগুলো হন্যে হয়ে খুঁজেছে ওদের।

    শূকরছানাগুলো চিৎকার জুড়েছে সারা পথ জুড়ে।

    তপুর সারা দেহ গড়িয়ে অঝোরে ঘাম ঝরছে।

    ইভার বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত তালে।

    ইভা। তপু ডাকলো।

    কি। ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো ইভা।

    ভয় লাগছে।

    না। তুমি পাশে থাকলে আমি ভয় পাই না।

    আচ্ছা ইভা। তপু আবার বললো, তুমি আমাকে ভালবাসতে গেলে কেন বল তো?

    জানি না। ইভা মিষ্টি করে হাসলো। ভালো লেগেছে। ভালো লাগে। তাই ভালোবাসি।

    গির্জার ঘণ্টাগুলো মৃদু শব্দে বেজে উঠলো।

    বুড়ো পাদ্রি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন।

    দোরগোড়ায় কারা যেন করাঘাত করছে।

    বুড়ো পাদ্রি মুহূর্তের জন্যে কি যেন ভাবলেন।

    তারপর এগিয়ে এসে দরজাটা খুলে দিলেন তিনি।

    ইভা আর তপু বাইরে দাঁড়িয়ে।

    ওদের বিপর্যস্ত চেহারা আর বসনের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলেন বুড়ো পাদ্রি।

    আমরা আপনার এখানে একটু আশ্রয় পেতে পারি কি? শুধু একটা রাতের জন্যে?

    ওদের মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বুড়ো পাদ্রি।

    দূরে শূকর শূকরীর হল্লা শুনলেন।

    ইঙ্গিতে ওদের ভেতরে আসতে বললেন তিনি।

    দরজাটা ভালোভাবে বন্ধ করে দিলেন।

    গির্জার ভেতরে এক প্রশান্ত নীরবতা।

    শুধু ওদের পায়ে চলার শব্দগুলো উঁচু দেয়ালের গায়ে লেগে করুণ এক প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করছে।

    একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে এনে ওদের আশ্রয় দিলেন বুড়ো পাদ্রি।

    এখানে কেউ তোমাদের খোঁজ পাবে না। নিশ্চিত থাকতে পারো।

    বুড়ো পাদ্রি শুধোলেন, তোমরা কি ক্ষুধার্ত কিছু খাবে?

    ওরা ঘাড় নেড়ে যায় দিলো।

    দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বুড়ো পাদ্রি ফিরে যাচ্ছিলেন, হয়তো খাবারের খোজে। সহসা নিচে প্রার্থনালয় থেকে অসংখ্য কষ্ঠের চিৎকার ধ্বনি শুনলেন।

    বিস্মিত হলেন তিনি।

    সামনে এসে দেখলেন।

    প্রার্থনালয় ভরে গেছে সাদা ধবধবে মানুষের ভিড়ে।

    বুড়ো পাদ্রিকে দেখে চিকার করে উঠলো ওরা।

    ওই নিগ্রোগুলোকে ওখান থেকে বের করে দাও। আমাদের হাতে ছেড়ে দাও।

    না, না, ওরা তো নিগ্রো নয়। বুড়ো পাদ্রি বিড়বিড় করে বললেন। তোমরা ভুল করছে। ওরা নিগ্রো নয়।

    মিথ্যে কথা। সাদা ধবধবে মানুষগুলো আবার চিৎকার জুড়ে দিলো। আমরা দেখেছি, একটা নিগ্রো ছেলে আর মেয়েকে তুমি গির্জার মধ্যে আশ্রয় দিয়েছে। বের করে দাও ওদের।

    বুড়ো পাদ্রি ব্রিত বোধ করলেন।

    ফিরে এসে ভেজানো দরজাটা খুলে ইভা আর তপুকে দেখলেন তিনি।

    দেখলেন। একটি নিগ্রো ছেলে আর একটি উয়ে ভীত সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।

    মুহূর্তের জন্যে হতবিহ্বল হয়ে গেলেন বুড়ো পাদ্রি।

    বিশ্বাস হলো না।

    আবার দেখলেন।

    আবার তাকালেন।

    না। নিগ্রো ছেলে আর মেয়ে তো নয়। ইভা আর তপু বসে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখছে তাঁকে। এতক্ষণে শ্বাস নিলেন তিনি প্রাণ ভরে।

    প্রার্থনালয়ের কাছে সেই সাদা ধবধবে মানুষগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াবার অভিলাষে ফিরে এসে বুড়ো পাদ্রি দেখলেন, প্রার্থনালয় শূন্য। শূন্য চেয়ারগুলোতে একটি মানুষের অস্তিত্বও নেই। বার কয়েক মাথা নাড়লেন তিনি।

    অস্বস্তিতে।

    তারপর পকেট থেকে ক্ষুদ্র বাইবেলটা বের করে জোরে জোরে আবৃত্তি করতে লাগলেন বুড়ো পাদ্রি।

    বদ্ধঘরের মধ্যে নীরবে বসে বসে অনেকক্ষণ ধরে বুড়ো পাদ্রির বাইবেল পাঠ শুনলো ইভা আর তপু।

    সহসা তপু শুধালো, কি ভাবছে ইভা।

    ইভা বললো, যদি পৌঁছতে না পারি?

    নিশ্চয়ই পারবো। তবু সাহস দিলো তাকে।

    ইভা আবার বললো, কিন্তু সেখানেও যদি কথাটা শেষ করলো না সে। শুধু মুখ তুলে তাকালো তপর দিকে।

    ওখানে ভয়ের কিছু নেই ইভা। তবু ধীরে ধীরে জবাব দিলো।

    ওখানে আমার মা আছেন। বাবা আছেন। আমার তিনটে ভাই আছে আর একটি বোন। ওরা সবাই তোমাকে পেলে খুব খুশি হবে ইভা। তুমি দেখে নিও। ওরা ভীষণ ভালবাসবে তোমায়।

    আমি শুধু তোমার ভালবাসা চাই। আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে এলো ইভা। সারাটা জীবন শুধু তোমাকে ভালবাসতে চাই। আমি তোমার সন্তানের মা হতে চাই তপু। আমি একটা সুন্দর ঘর বাঁধতে চাই। আমি সুখ চাই। শান্তি চাই। বলতে বলতে দুচোখ ভরে অশ্রু জমে এলো তার।

    তপু ধীরে ধীরে ইভার মুখখানা কাছে টেনে নিলো। চোখের কোণে জমে থাকা অর্শ বিন্দুগুলো আঙ্গুলের স্পর্শে আদর করে মুছে দিয়ে বললো, কেঁদো না ইভা। কাঁদছো কেন? ইভা আস্তে করে বললো, বাবা মার কথা ভীষণ মনে পড়ছে তাই।

    বাক্সঘরের মধ্যে আশ্রিত ঊনিশ জন মানুষ।
    বাচ্চা। বুড়ো। পুরুষ। মেয়ে। যুবক। যুবতী।
    আর আসন্ন সন্তান-সম্ভবা মহিলাটি।

    খোয়াড়ের মধ্যে হাঁস মোরগগুলো যেমন গাদাগাদি হয়ে থাকে তেমনি। তেমনি আছে ওরা। কতগুলো মানুষ।

    জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে। সাধারণ এক আতঙ্কের দ্বন্দে ক্ষতবিক্ষত। একটু নড়াচড়া করার পরিসর নেই। মাথা সোজা কঝে বর্সবে সে সুযোগ নেই। কারণ বুকের কাছ থেকে মাথাটা তুলতে গেলেই ছাদের সঙ্গে লাগে।

    মই বেয়ে উঠে বাক্সঘরের দরজা খুললেন বুড়ি মা।

    এক টুকরো আলো এসে ছড়িয়ে পড়লে ওদের চোখেমুখে। কয়েক ঢেউ বাতাসে পোকা-মাকড়ের মতো মানুষগুলো নড়েচড়ে উঠলো। বুড়ি মা খাবার নিয়ে এসেছেন।

    ঊনিশ জোড়া ক্ষুধার্ত চোখ ঝাঁপিয়ে পড়লো খাবারের থালার উপরে। খাবারগুলো গোগ্রাসে গিলতে লাগলো ওরা।

    বুড়ি মা স্নেহার্দ্র দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, বাইরে এখন গোলমাল কিছুটা কমেছে। আপনারা নিচে নেমে এসে কিছুক্ষণ চলাফেরা করুন।

    হাত পাগুলো ছড়িয়ে বসুন।

    ঊনিশ জোড়া চোখ কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো।

    ওদের নিচে নামার জন্যে মইটা ধরে দাঁড়ালেন বুড়ি মা।

    কিন্তু বাক্স থেকে বেরুতে গিয়ে ওরা অনুভব করলো হাত পাগুলো আর সোজা করতে পারছে না। বুকের কাছ থেকে মাথাটা তুলতে গিয়ে দেখলো মেরুদণ্ডে টান পড়ছে। ব্যথা লাগছে।

    দীর্ঘদিন একটা বাক্সের মধ্যে হাত পা গুটিয়ে বন্দি হয়ে থাকতে থাকতে ওরা ধীরে ধীরে দ্বিপদ থেকে চতুষ্পদু হয়ে গেছে।

    তবু হাত পাগুলো সোজা করে দাঁড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো ওরা।

    চতুষ্পদ মানুষগুলো।

    সহসা বাইরে আবার সেই হিংস্রতার ধ্বনি শোনা গেল।

    সচকিত হলো ঊনিশটি প্রাণ।

    বিকলাঙ্গ মানুষগুলো পাখির মতো কিচমিচ শব্দ তুলে মইটার উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। তালাটা বন্ধ করে দিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন মা।

    বুড়ো বাবা বিছনায় বসে বসে তছবি গুনছেন।

    তিন সন্তান উৎকর্ণ হয়ে বন্য ধ্বনি শুনছে।

    চৌদ্দ বছরের মেয়েটি হঠাৎ বললো, বাবা, কারা যেন কড়া নাড়ছে। বুড়ো বাবা অস্বস্তিতে ছবি নামিয়ে রাখলেন। তিনি সন্তানের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললেন, বাতিগুলো সব নিভিয়ে দাও। বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠলো তার।

    মা চৌদ্দ বছরের মেয়েটিকে কাছে টেনে নিলেন। কানে কানে বললেন, ওঘরে গিয়ে ওদের একেবারে চুপ থাকতে বলে এসো। যেন কোন রকম শব্দ না করে, যাও। বলে স্বামীর দিকে তাকলেন তিনি। দরজায় করাঘাতের মাত্রা উচ্ছ্বল হয়ে পড়ছে। বুড়ো বাবা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। দরজা খুলে দেবেন তিনি।

    বুড়ি মা।

    তাঁর তিন সন্তান।

    আর চৌদ্দ বছরের মেয়েটি।

    সবাই গভীর উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে সিঁড়ির মাথায় নীরবে দাঁড়িয়ে। বুড়ো বাবা দরজা খুললেন। বাইরে থেকে বন্য হিংস্রতা চিৎকার করে উঠলো। বাড়ির ভেতর থেকে ওদের বের করে দাও।

    এখানে কেউ নেই। বিশ্বাস করে। এখানে কেউ নেই। বুড়ো বাবা এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন।

    মিথ্যে কথা।

    মিথ্যে কথা।

    মিথ্যে কথা।

    এক সঙ্গে অনেকগুলো কণ্ঠ চিত্তার জুড়লো তোমরা কাদের আশ্রয় দিয়েছে আমরা জানি। নিজেদের ভালো চাও তো ওদের আমাদের হাতে দিয়ে দাও।

    তোমরা ভুল করছে। আমাদের এখানে কেউ নেই।

    কিন্তু ওরা বিশ্বাস করতো না। বুড়ো বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ভেতরে এসে ঢুকলো ওরা। তারপর পুরো বাড়িটা তচনচ করে ফেলতে লাগলো।

    বাক্সঘরে তখন কবরের নীরবতা।

    মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেয়ে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলো ওরা।

    ভয়ে।

    আতঙ্কে।

    আর সেই মুহূর্তে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাটির প্রসব বেদনা উঠেছে। একটি সন্তানের জন্ম দিচ্ছে সে। ঊনিশ জন মৃতপ্রায় মানুষ চরম উৎকণ্ঠার সঙ্গে শিশুটির জন্য প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

    না। না। এখন নয়।

    এখন নয়।

    মুমূর্ষু মহিলাটি যন্ত্রণার অস্থিরতায় বারবার নিজের ঠোঁট কামড়াচ্ছে আর ঘর্মাক্ত দেহটাকে আয়ত্তে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

    সেও চায় না এ মুহূর্তে শিশুটির জন্ম হোক।

    কিন্তু! সবাইকে হতাশ করে দিয়ে ঊনিশ জন মানুষের অভিসম্পাত কুড়োতে কুড়োতে শিশুটি ভূমিষ্ট হলো।

    আর সঙ্গে সঙ্গে, দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে, ঊনিশ জনের একজন সেই বাচ্চাটির গলা টিপে ধরলো।

    নিচে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ওরা এখন এ ঘরে এসে আশ্রিত মানুষগুলোকে খুঁজছে। প্রসূতির চোখ জোড়া হয়তো পৃথিবীর প্রতি ঘৃণায় একবার কুঞ্চিত হলো। তারপর বিবর্ণ মণিতে প্রাণের চিহ্ন রইলো না। আর বাচ্চাটার সঙ্গে সঙ্গে তার মা-ও মারা গেলো।

    মৃত মহিলার স্বামী হতবিহ্বল দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আকিয়ে রইলো সেদিকে। সহসা কান্নার আবেগে ভেঙ্গে পড়তে গিয়ে নিজেই মুখখানা দুহাতে চেপে ধরলো।

    না। না। এখন নয়।

    এখন কান্নাও নয়।

    এখন শুধু নীরবে দুটি মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করো আর নিজেদের আসন্ন মরণ সম্ভাবনার কথা ভেবে ঈশ্বরকে মনে মনে ডাকে।

    মৃত্যুর বন্যতার শব্দ এখন আর শোনা যাচ্ছে না।

    ওরা কান পাতলো।

    ভাল করে শোনার চেষ্টা করলো।

    শুনলো। বুড়ি মা নিচে থেকে বলছেন। আর ভয়ের কিছু নেই, ওরা চলে গেছে।

    বুড়ি মার কণ্ঠস্বর শুনে মৃত মহিলার স্বামী পরক্ষণে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।

    তার মৃত স্ত্রীর জন্যে। তার মৃত নবজাতকটির জন্যে।

  • এক

    এক

    তবু মানুষের এই দীনতার বুঝি শেষ নেই।

    শেষ নেই মৃত্যুরও।

    তবু মানুষ মানুষকে হত্যা করে।

    ধর্মের নামে।

    বর্ণের নামে।

    জাতীয়তার নাম।

    সংস্কৃতির নামে।

    এই বর্বরতাই অনাদিকাল ধরে আমাদের এই পৃথিবীর শান্তিকে বিপন্ন করেছে।

    হিংসার এই বিষ লক্ষ কোটি মানব সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

    জীবনকে জানবার আগে।

    বুঝবার আগে।

    উপভোগ করার আগে।

    ঘৃণার আগুনে পুড়িয়ে নিঃশেষ করেছে অসংখ্য প্রাণ।

     

    কিন্তু মানুষ মরতে চায় না।

    ওরা বাঁচতে চায়।

    এই বাঁচার আগ্রহ নিয়েই গুহা-মানর তার ও হেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

    সমুদ্র সাঁতরেছে।

    পাহাড় পর্বত পেরিয়েছে।

    ইতিহাসের এক দীর্ঘ যন্ত্রণাময় পক্ষ পেরিয়ে সেই গুহা-মানর এগিয়ে এসেছে অন্ধকার থেকে আলোতে।

    বর্বরতা থেকে সভ্যতার পথে।

    মানুষের এ এক চিরন্তন যাত্রী।

    জ্ঞানের জন্যে।

    আলোর জন্যে।

    সুখের জন্যে।

    তবু আলো নেই।

    তবু অন্ধকার।

     

    অন্ধকারের নিচে সমাহিত মৃত নগরী।

    প্রাণহীন।

    যেন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত তার অবয়ব।

    দীর্ঘ প্রশস্ত পথগুলোতে কবরের শূন্যতা।

    ভাঙ্গা কাচের টুকরো। ইটের টুকরো। আর মৃতদেহ।

    কুকুরের।

    বিড়ালের।

    পাখির।

    আর মানুষের।

    একটা।

    দুটো।

    তিনটে।

    অগণিত। জীবনের স্পন্দনহীন নগরী শুধু এক শব্দের তাদের হাতে বন্দি।

    যেন অসংখ্য হিংস্র জানোয়ার বন্য ক্ষুধার তাড়নায় চিৎকার করছে।

    যেন অনেকগুলো পাগলা কুকুর।

    কিম্বা রক্তপিপাসু সিংহ।

    বাঘ। অথবা একদল মারমুখো শূকর শূকরী।

     

    আর সেই বন্যতার ভয়ে ভীত একদল মানুষ নোংরা অন্ধকারে একটি ঘরের ভেতরে; ইঁদুর যেমন করে তার গর্তের মধ্যে জড়সড় হয়ে বসে থাকে, তেমনি বসে আছে।

    আতঙ্কে অস্থির মুখ, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে যেন কষ্ট হচ্ছে ওদের।

    একদল ছেলে বুড়ো মেয়ে।

    যুবক। যুবতী।

    আর একটি সন্তান-সম্ভবা মহিলা।

    অন্ধকারের আশ্রয়ে নিজেদের গোপন করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওরা।

    একটা বাচ্চা ছেলে খুকখুক করে কাশলো।

    সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঘুরে তাকালো ওর দিকে।

    দৃষ্টিতে যেন আগুন ঝরছে। খবরদার, আর শব্দ করো না।

    যদি না পারো দুহাতে চেপে রাখো।

    নইলে ওরা আমাদের অস্তিত্বের কথা টের পেয়ে যাবে।

    তাহলে কারো রক্ষা নেই।

    অন্তঃসত্ত্বা মহিলাটি স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে ওয়ে। যন্ত্রণাকাতর মুখে চারপাশে তাকাচ্ছে সে।

    সবাই তাকে দেখছে। শব্দ করো না।

    কয়েকটা আরশুলা আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেয়ালের গায়ে।

    সহসা কার যেন পায়ের শব্দ শোনা গেলো বাইরে।

    মুহূর্তে সবার মুখ ফেকাসে হয়ে গেলো। শ্বা

    স বন্ধ হলো।

    এই বুঝি মৃত্যু এলো।

    দরজার কড়াটা নড়ে উঠলো। শুনুন। দরজা খুলুন। আমি আপনাদের নিয়ে যেতে এসেছি। পাশের বাড়ির বুড়ি মায়ের কণ্ঠস্বর। বিশ্বাস করুন। আমি আপনাদের বাঁচাতে এসেছি। কোন ভয় নেই। দরজা খুলুন।

    কয়েকটা নীরব মুহূর্ত।

    ভেতর থেকে কেউ কোন উত্তর দিলো না ওরা।

    কে যেন চাপা স্বরে বললো, না না, দরজা খুলো না। ওদের কোন বিশ্বাস নেই। বাইরে শব্দ শুনতে পাচ্ছে না? ওরা ওই বুড়িটাকে পাঠিয়েছে। আমাদের খুন করবে।

    সেই শব্দের দানব ধীরে ধীরে কাছে, আরো কাছে এগিয়ে আসছে।

    শুনুন। দরজা খুলুন। নইলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। দোহাই আপনাদের দরজা খুলুন। আবার সেই বুড়ি মার কণ্ঠস্বর।

    একটা ছেলে সামনে এগিয়ে যেতে আরেকজন পেছন থেকে ধরে ফেললো। কোথায় যাচ্ছে?

    দরজা খুলে দেবো।

    না। না। না। অনেকগুলো কণ্ঠস্বর এক সঙ্গে প্রতিবাদ করলো।

    না। না। না।

    কেন?

    ওরা আমাদের মেরে ফেলবে।

    মরতে হলে বিশ্বাস করেই মরবো। ছেলেটি ছুটে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো।

    এক ঝলক আলো এসে পড়লো আতঙ্কিত মুখগুলোর ওপরে। একটা চাপা আর্তনাদ করে ওরা পরস্পরের বাহুর নিচে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলো। না। না। আমরা আলো চাই না।

    দুয়ারে দাঁড়িয়ে বুড়ি মা। হাতে তার জ্বলন্ত একটা মোমবাতি। চোখ জোড়া শান্ত। মিঞ্চ।

    আমরা বেঁচে থাকতে আপনাদের ভয়ের কিছু নেই। কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। আসুন। আমার সঙ্গে আসুন আপনারা।

    অনেকগুলো ভয়ার্ত চোখ। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে।

    আসুন। আমার সঙ্গে আসুন।

    আসন্ন মৃত্যুর চেয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে ওরা শ্রেয় মনে করলো।

    হয়ত ভাই, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো ওরা।

    বুড়ি মাকে অনুসরণ করে এগিয়ে এলো সামনে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাটিকে দুজনে দুদিক থেকে সাবধানে তুলে নিলে। ধুলোয় ভর্তি অপরিসর করিডোর দিয়ে কয়েকটা ইঁদুর ছুটে বেরিয়ে গেলো এপাশ থেকে ওপাশে। চমকে উঠলো সবাই।

    মোমবাতির সলতেটা বার কয়েক কেঁপে আবার স্থির হয়ে গেলো।

    ও কিছু না। ইঁদুর। বুড়ি মা সবার দিকে তাকিয়ে ভরসা দিলো।

    করিডোরটা যেখানে শেষ হয়ে গেছে সেখানে একটা সরু সিঁড়ি। সিঁড়ির মাথায় এসে বুড়ি মা দেখলেন তাঁর তিন সন্তান সামনে দাঁড়িয়ে। কাছে যেতে ওরা এক পাশে সরে দাঁড়ালো।

    মনে হলো মায়ের আচরণে ওরা সন্তুষ্ট হইতে পারে নি। মা এগিয়ে গেলেন সামনে।

    একটা ছোট্ট গলির মতো ঘর। রান্নাঘর ওটা।

    বারো তেরো বছরের একটি মেয়ে চুলোয় অ্যাঁচ দিচ্ছিলো। ঘুরে তাকালো ওদের দিকে।

    তার চোখেমুখে কৌতূহল।

    ঘরের মাঝখানে ছাদের কাছাকাছি কাঠ দিয়ে তৈরি একটা বাক্সঘর।

    সিঁড়ি লাগানো।

    বুড়ি মা বললেন, ভয়ের কিছু নেই। আপনারা এর মধ্যে লুকিয়ে থাকুন। আমি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেব। কেউ টের পাবে না।

    আশ্রিত মানুষগুলো বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে।

    আমি জানি ওর মধ্যে থাকতে আপনাদের ভীষণ অসুবিধে হবে। কিন্তু প্রাণের চেয়ে প্রিয়, আর কিছু নেই পৃথিবীতে।

    কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে বাক্সঘরের মধ্যে উগেলো ওরা।

    ঊনিশ জন মানুষ।

    বাচ্চা। বুড়ো। পুরুষ। মেয়ে। যুবক। যুবতী।

    আর আসন্ন সন্তান-সম্ভবা মহিলাটি।

    বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দিলেন বুড়ি মা। সিঁড়িটা এক পাশে সরিয়ে রাখলেন।

    রাস্তায় সহস্র ধ্বনির একত্রিত পাশবিক চিৎকার।

    পশুরা হল্লা করছে।

    এটা তুমি ঠিক করলে না মা।

    দোরগোড়ায় সন্তানের কাছ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হলেন বুড়ি মা।

    কেন? কি হয়েছে? স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সন্তানের দিকে তাকালেন তিনি।

    প্রথম জন বললো, কেউ যদি টের পায় তাহলে?

    দ্বিতীয় জন বললো, তাহলে ওরা আমাদেরকেও মেরে ফেলবে।

    তৃতীয় জন বললো, এটা ঠিক করলে না মা।

    মা তিনজনের দিকে তাকালেন। ধীরে ধীরে বললেন, কতগুলো নিরপরাধ মানুষকে আমাদের চোখের সামনে মেরে ফেলবে আর আমরা চেয়ে দেখবো। তপুর কথা ভাব একবার। তোমাদের ভাই। সে এখন কোথায়? তাকে যদি কেউ মেরে ফেলে। সহসা থামলেন বুড়ি মা।

    মুহূর্তে তাঁর মুখখানা বিষাদে ছেয়ে গেলো। আস্তে করে ধালেন, তপুর কোন খোঁজ বের করতে পারলে না তোমরা

    না।

    পশুরা হল্লা করছে বাইরে।

  • আর কত দিন

    আর কত দিন

    আর কত দিন (১৯৭০) – জহির রায়হান। অবরুদ্ধ ও পদদলিত মানবাত্নার আন্তর্জাতিক রূপ এবং সংগ্রাম ও স্বপ্নের আত্নকথা।

  • উপসংহার

    উপসংহার

    সকালের ডাকে আসা চিঠিখানা বারকয়েক নেড়েচেড়ে দেখলো লিলি। আঁকাবাঁকা অক্ষরে মাহমুদের নাম আর ঠিকানা লেখা। অপরিচিত হস্তাক্ষর।

    দুপুরে সে বাসায় এলে লিলি বললো, তোমার চিঠি এসেছে একখানা। টেবিলের ওপর রাখা আছে।

    খামটা ছিড়ে চিঠিখানা পড়লো মাহমুদ।

    শাহাদাত লিখেছে ভৈরব থেকে।

    মাহমুদ,

    অনেক দিন তোমার কোন খোঁজ-খবর পাই নি। জানি না কেমন আছো। আজ বড় বিপদে পড়ে চিঠি লিখছি তোমাকে। জানি এ বিপদ থেকে তুমি কেন কেউ উদ্ধার করতে পারবে না আমায়। তবু মানসিক অশান্তির চরম মুহূর্তে নিজের দুঃখের কথা ব্যক্ত করার মতো তুমি ছাড়া আর কাউকে পেলাম না। তাই লিখছি।

    আমেনার যক্ষ্মা হয়েছে।

    ঢাকা থাকতেই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দিয়েছিলো। এখন বোধ হয় তার শেষ দিন ঘনিয়ে এলো।

    তুমি হয়তো অবাক হয়ে ভাবছো, এতদিন পরে এ খবরটা তোমাকে জানাতে গেলাম কেন। আসলে আমিও এ ব্যাপারে প্রায় অজ্ঞ ছিলাম। আমাকে সে কিছুতেই জানতে দেয় নি। মাঝে মাঝে লক্ষ করতাম, একটানা অনেকক্ষণ ধরে খক্‌খক করে কাশতো সে। বড় বেশি কাশতো। কখনো কখনো তার কাপড়ে রক্তের ছিটেফোটা দাগ দেখে প্রশ্ন করেছি। কিন্তু কোন উত্তর পাই নি। আবার, একদিন রাতে অকস্মাৎ রক্তবমি করতে করতে মুছা গেল সে। ডাক্তার ডাকলাম। রোগী দেখে তিনি ভীষণ গালাগাল দিলেন আমায়। বললো, তক্ষুনি ঢাকায় নিয়ে যেতে।

    কিন্তু, আমেনা কিছুতে রাজী হলো না।

    তার স্বভাব তোমার অজানা নয়।

    একদিন ভাইদের অমতে সে বিয়ে করেছিলো আমায়। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলো মাথা উঁচিয়ে। সেসব কথা তুমি জানো। ভাইদের কাছ থেকে লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিলো তাকে। আজ তাদের সামনে তিল তিল করে মরতে সে রাজী নয়। টাকা-পয়সার জন্যে হাত পাতবে এ কথা কল্পনাও করতে পারে না সে।

    এদিকে আয় বড় কমে গেছে। দোকানের অবস্থা খুব ভালো নয়। লোকের হাতে টাকা নেই, চাহিদা থাকলেও জিনিসপত্র কিনবে কি দিয়ে?

    জীবনে কিছুই করতে পারলাম না মাহমুদ।

    আমেনার জন্যও যে এ মুহূর্তে কিছু করতে পারবো, ভরসা হয় না। সারাটা জীবন ও শুধু আমাকে দিয়ে গেলো। ওকে আমি কিছু দিতে পারলাম না। দোয়া করো, ওর সঙ্গে আমিও যেন কবরে যেতে পারি।

    এ দুনিয়াতে এর চেয়ে বড় কোন চাওয়া কিংবা পাওয়া আর নেই আমার। ছেলে-মেয়েগুলোর জন্য মাঝে মাঝে ভাবনা হয়। খোদা দিযেছেন, খোদাই চালিয়ে নেবেন ওদের। এতক্ষণ শুধু নিজের কথা লিখলাম, কিছু মনো করো না।

    তোমাদের দিনকাল কেমন চলছে জানিও। লিলি কেমন আছে? মিতাকে আমার চুম্বন দিয়ো।

    তোমার শাহাদাত।

    চিঠিখানা একবার পড়ে শেষ করে আবার পড়লো মাহমুদ। তারপর চোয়ালে হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে বসে কিছু ভাবলো সে। মিতাকে কোলে নিয়ে লিলি এসে দাঁড়ালো পাশে। মৃদু গলায় শুধালো কার চিঠি ওটা?

    মাহমুদ বললো, শাহাদাত লিখেছে।

    লিলি জানতে চাইলো, ওরা ভালোতো?

    মাহমুদ চিঠিখানা এগিয়ে দিলো ওর দিকে।

    লিলির পড়া শেষ হলে মাহমুদ আস্তে করে বললো, আমাকে এক্ষণি আবার বেরুতে হচ্ছে লিলি।

    এই বেলায় কোথায় যাবে? লিলি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো।

    মাহমুদ ধীর গলায় বললো, আমেনাকে এখানে নিয়ে আসার জন্যে একখানা টেলিগ্রাম করবো ভাবছি।

    লিলির মুখখানা অকস্মাৎ স্নান হয়ে গেলো। ইতস্তত করে সে বললো, এখানে আনবে?

    মাহমুদ লক্ষ করলো লিলি ভয় পেয়েছে। একটা যক্ষ্মা রোগীকে বাসায় আনা হবে, বিশেষ করে যে ঘরে একটি বাচ্চা মেয়ে রয়েছে সেখানে, ভাবতে আতঙ্ক বোধ করছে লিলি।

    ওর খুব কাছে এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললো, আমার যদি কোন কঠিন অসুখ হয় তাহলে কি আমাকে তুমি দূরে সরিয়ে দিতে পারবে লিলি? তবে ওর জন্যে তুমি ভয় করছো কেন?

    লিলি গম্ভীর কষ্ঠে জবাব দিলো, ওটা যা ছোঁয়াচে রোগ-না, ওকে এখানে আনতে পারবে না তুমি। মিতাকে বুকের মধ্যে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরলে সে।

    দেখো তোমাদের এ স্বভাবটা আমার একেবারে পছন্দ হয় না, সহসা রেগে উঠলো মাহমুদ সব সময় নিজেকে নিয়ে চিন্তা করো তোমরা। লিলির চোখে-মুখে কোন ভাবান্তর হলো না। মিতাকে কোলে নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সে।

    মাহমুদ নীরব।

    পায়ের শব্দে লিলি ফিরে তাকিয়ে দেখলো বাইরে বেরিয়ে গেল মাহমুদ। রাস্তায় নেমে, কাছের পোস্টাফিস থেকে শাহাদাতকে একখানা টেলিগ্রাম করে দিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে আবার ফিরে এলো মাহমুদ। এসে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে পড়লো সে।

    লিলি এখনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হাতের নখ খুঁটছে। মিতাকে সে একটু আগে শুইয়ে দিয়েছে তার দোলনায়।

    ঈষৎ তন্দ্রায় চোখজোড়া জড়িয়ে আসছিলো মাহমুদের। লিলির ডাকে চোখ মেলে তাকালো সে।

    লিলি কোমল কণ্ঠে ডাকলো, শুনছো?

    মাহমুদ আস্তে শুধালো, কী?

    আমি বলছিলাম কি, টেলিগ্রাম করে কি হবে, ওর কাছে এসে বসলো লিলি–তারচে, তুমি নিজে গিয়ে দেখে এসো ওকে।

    লিলির কণ্ঠস্বরটা এখন সহানুভূতির সুরে ভরা।

    মাহমুদ দুহাতে ওকে কাছে টেনে নিয়ে মৃদু স্বরে বললো, আমি জানতাম লিলি, তুমি ওকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবে না।

    লিলি সলজ্জ হেসে ঘুমন্ত তার দিকে তাকালো এক পলক, কিছু বললো না। কাল মিতার জন্মদিন। রাতে শুয়ে শুয়ে সে ব্যাপারে আলোচনা করেছে ওরা। মাহমুদ বলেছে বেশি লোককে ডাকা চলবে না, ওতে অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ হয়।

    ওর বাহুর উপর মাথা রেখে লিলি শুধিয়েছে, তুমি কাকে বলতে চাও?

    মাহমুদ মৃদু স্বরে বলেছে, রফিককে বলবো, আর বলবো নঈমকে।

    আমি মনসুরকে বলে দিয়েছে, বউকে সঙ্গে নিয়ে সে আসবে। লিলি আস্তে করে বলেছে, তসলিমকেও খবর দিয়েছি।

    মাহমুদ সংক্ষেপে বলেছে, ঠিক আছে।

    তারপর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা।

    ভোরে উঠে হাতমুখ ধুয়ে চা-নাস্তার পরে মাহমুদ যখন বেরুতে যাবে তখন লিলি স্মরণ করিয়ে দিলো, যাদের বলার আছে এই বেলা বলে এসো। আর শোন, ভৈরব কবে যাচ্ছো তুমি?

    যাওয়ার পথে থামলো মাহমুদ। থেমে বললো, দেখি, কাল কিংবা পরশু যাবো। আমেনা যখন মেয়ে নিশ্চয় আসতে চাইবে না, টেলিগ্রামটা পেয়েছে কিনা কে জানে। কাটা কাটা কথাগুলো বলে রাস্তায় নেমে এলো সে।

    জিন্নাহ এভিনুতে নতুন অফিস করেছে রফিক।

    এখন আর অন্যের অধীনে কাজ করছে না, সে নিজস্ব কোম্পানি খুলেছে একটা। স্বাধীন ব্যবসা। বড় বড় কনট্রাক্ট পাচ্ছে আজকাল। রাস্তা মেরামত, বাড়ি ঘর তৈরি কিংবা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ইট, চুন, সুরকি ও লোহা-লক্কর সরবরাহের কনট্রাক্ট। প্রেস হয়ে যখন রফিকের অফিসে এসে পৌঁছলো মাহমুদ, তখন বেশ বেলা হয়েছে। বাইরের ঘরে কয়েকজন কর্মচারী নীরবে কাজ করছে। তাদের একপাশে নঈমকে দেখতে পেলো মাহমুদ। মস্ত বড় একটা খাতার উপর ঝুঁকে পড়ে কি যেন হিসেব করছে। ওর দিকে চোখ পড়তে ইশারায় কাছে ডাকলো, মাহমুদ যে, কি মনে করে?

    মাহমুদ বললো, কাল মিতার জন্মদিন, তাই তোমাদের নেমন্তন্ন করতে এলাম। রফিক আছে কি?

    আছে। পর্দা ঝুলানো চেম্বারটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে নঈম বললো, একটু আগে এসেছে। যাওনা, দেখা করো গিয়ে। এই শোনো–।

    হঠাৎ কি মনে হতে ওকে আবার কাছে ডাকলো নঈম–তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে, ভীষণ সিরিয়াস কথা, বসো বলছি।

    মাহমুদ বসলো।

    সামনে খোলা খাতাটা বন্ধ করে এক পাশে ঠেলে রেখে দিলো নঈম।

    চার পাশে তাকিয়ে নিয়ে চাপা গলায় ধীরে ধীরে বললো, রফিক একটা মেয়েকে ভালবাসতো মনে আছে তোমার?

    হ্যাঁ, মাহমুদ মাথা দুলিয়ে সায় দিলো?

    সে মেয়েটা এখনো তাকে ভালোবাসে।

    হুঁ।

    আজ কদিন ধরে রফিক কি বলছে জানো?

    না।

    বলছে–বলতে গিয়ে বার কয়েক নড়েচড়ে বসলো নঈম–রফিক বলছে মেয়েটাকে নাকি আমাকে বিয়ে করতে হবে।

    সেকি? মাহমুদ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। তুমি করতে যাবে কেন?

    দেখতো মজা। ঠোঁটের ফাঁকে মিটিমিটি হাসলো নঈম। এককালে ভালবাসতো রফিক একথা ঠিক, এখন সেসব কোথায় উবে গেছে। কিন্তু মেয়েটা ভীষণ হ্যাংলা, কিছুতে ওর পিছু ছাড়বে না। এখন হয়েছে কি–বলতে গিয়ে আরো সামনে ঝুঁকে এলো সে, চাপা গলায় বললো, মেয়েটা প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে। এবোরসন করার জন্য চাপ দিয়েছিলো রফিক। কিন্তু মেয়েটা কিছুতে রাজী হচ্ছে না। মাঝখান থেকে বড় বিপদে পড়ে গেছে রফিক। তাই আজ কদিন ধরে সে আমায় ধরে বসেছে। বলছে আমার বেতন আরো বাড়িয়ে দেবে আর বিয়ের খরচ-পত্র সব নিজে বহন করবে। নঈম হাসলো।

    মাহমুদ নীরব। সারা দেহ পাথর হয়ে গেছে।

    ওকে চুপ থাকতে দেখে নঈম আবার বললো, বন্ধু হিসেবে ওর এ দুঃসময়ে ওকে বাঁচানো উচিত সেকথা আমি বুঝি কিন্তু– কিছু বলতে গিয়ে ইতস্তত করছিলো নঈম। সহসা উঠে দাঁড়ালো মাহমুদ।

    ওকি চললে কোথায়? বসো। নঈম অবাক চোখে তাকালো ওর দিকে। মাহমুদ মৃদু গলায় বললো, কাজ আছে, চলি এখন।

    রফিকের সঙ্গে দেখা করবে না?

    না।

    দ্রুতপায়ে বেরিয়ে আসছিলো মাহমুদ। পেছনে রফিকের উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ালো সে। আরে মাহমুদ যে, ওকি, এসে চুপি চুপি আবার চলে যাচ্ছো? মাহমুদকে পেয়ে অধীনস্থ কর্মচারীদের উপস্থিতি যেন ভুলে গেছে সে। এগিয়ে এসে ওর একখানা হাত চেপে ধরে বললো, এসো তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার, চেম্বারে এসো।

    মাহমুদ বললো, না, আমার কাজ আছে, যাই এখন।

    কাজ কাজ আর কাজ। কাজ কি শুধু তোমার একলার। আমি বেকার নই। আমারও কাজ আছে। এসো, একটু বসে যাবে। মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে চেম্বারে ফিরে আসার পথে আড়চোখে একবার নঈমের দিকে তাকালো রফিক। লম্বা খাতাটার ওপর ঝুঁকে পড়ে গভীর মনোযোগসহকারে হিসেব মিলাচ্ছে সে।

    সোনালি রঙের কেস থেকে একটা সিগারেট বের করে দুঠোঁটের ফাকে গুঁজে দিলো রফিক, আরেকটা সিগারেট মাহমুদকে দিলো, তারপর বললো, তোমরা আসো না। এলে কত ভাল লাগে সে আর কি বলবো। এইতো সারাদিন ব্যস্ত থাকি। যখর একটু অবকাশ পাই তখন তোমাদের কাছে পাই নে! কেমন আছো বলো। বউ আর মেয়ে ভালো আছে তো? কলিং বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকলো, দুকাপ চা আনার ফরমায়েশ দিলো। তারপর আবার বলতে লাগলো খোদাবক্সের দোকানে আজকাল যাও না? আমিও যাই না অনেকদিন হলো। সেদিন পাশ দিয়ে আসছিলাম। দেখলাম বেশ চলছে ওর রেস্তোরাঁ। আজকাল রেকর্ডে সারাদিন ধরে হিন্দি গান বাজায় সে। দেয়ালে অনেকগুলো ফিল্মস্টারের ছবি বুলিয়ে রেখেছে, তাই না? একটানা কথা বলে গেলেও মাহমুদ লক্ষ করলো অবচেতন মনে কি যেন ভাবছে রফিক।

    চা খেয়ে নিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালো সে। চেয়ারে হেলান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললো, নঈমের আমি একটা বিয়ে দিতে চাই, দিন দিন ও বড় খেয়ালি হয়ে যাচ্ছে, ওর সংসারী হওয়া উচিত। আড়চোখে একবার মাহমুদের দিকে তাকালো সে।

    মাহমুদ বললো, তুমি নিজে কি চিরকুমার থাকবে নাকি?

    না, না, মোটেই না। সামনে এগিয়ে টেবিলের ওপর দুহাতের কনুই রেখে পরক্ষণে জবাব দিলো, তবে হ্যাঁ, আপাতত ও ধরনের কোন প্ল্যান নেই আমার। সময় কোথায় বল, সময় থাকলে তবু চিন্তা করা যেতো।

    মাহমুদ মৃদু হাসলো।

    রফিক ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সহসা বললো, নঈমকে তুমি একটু বোঝাতে পারো? তোমার কথা সে নিশ্চয় শুনবে। ওর জন্যে ভালো একটি মেয়ে ঠিক করেছি আমি। কিন্তু, ও রাজী হচ্ছে না। বললাম, সব খরচ আমার তবু–

    আরো কিছু যেন বলতে যাচ্ছিলো সে, মাহমুদ মাঝখানে বাধা দিয়ে বললো, ওর জন্যে অত মাথা ঘামিয়ে মূল্যবান নষ্ট করা কি উচিত? বলে উঠে দাঁড়ালো মাহমুদ। চলি আজ।

    আরে শোন, দাঁড়াও। রফিক পেছনে থেকে ডাকলো। কি জন্যে এসেছিলে কিছু বললে না তো?

    এমনি। বলে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এলো সে। পাখার নিচে বসেও এতক্ষণে রীতিমত ঘেমে উঠেছে মাহমুদ।

    মিতার জন্মদিনে বড় রকমের কোন আয়োজন করে নি ওরা। কিছু প্যাস্ট্রি, ডালমুট আর কলা। এক কাপ করে চা সকলের জন্যে। বিকেলে আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে এলো।

    মনসুর আর সেলিনা। তসলিম আর নঈম। ছোট ঘরে বেশি লোককে বসাবার জায়গা নেই। তাই অনেককে বলতে পারেনি ওরা। তবু ছোটখাট আয়োজনটা বেশ জমে উঠলো অনেকক্ষণ।

    মিতাকে আগের থেকে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলো লিলি। কোলে নিয়ে সবাই আদর করলো তাকে।

    সেলিনা বললো, দেখতে ঠিক মায়ের মত হয়েছে।

    মনসুর বললো, রঙটা পেয়েছে বাবার।

    লিলি বললো মেয়ে হয়ে বিপদ হলো, ছেলে হলে তোমাদের জামাই বানাতাম।

    সেলিনা বললো, আমার কিন্তু ছেলে হবে, দেখো লিলি আপা।

    মনসুর বললো, আমি কিন্তু মেয়ে চাই।

    সেলিনা ঠোঁট বাকিয়ে বললো, তুমি চাইলেই হলো নাকি?

    হয়েছে মান-অভিমানের পালাটা তোমরা বাসায় গিয়ে করো–লিলি হেসে বললো।

    এখন সবাই মিলে মিতার স্বাস্থ্য পান করবে এসো।

    মেয়েকে মাহমুদের কোলে বাড়িয়ে দিয়ে, খাবারগুলো এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখলো লিলি।

    সবার অনুরোধে নঈম একটা গান শোনালো ওদের।

    তারপর খাওয়ার পালা।

    প্যাস্ট্রি। ডালমুট। কলা। সবশেষে চা ৷

    তসলিমের দিকে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে লিলি মৃদু হেসে বললো, তুমি একা এলে, রানুকে আনলে না যে?

    তসলিম লজ্জা পেয়ে বললো, আসার কথা ছিলো। কিন্তু বাসা থেকে বেরুতে পারেনি ও।

    লিলি মুখ টিপে আবার হাসলো ওর বাবা-মা বুঝি ওকে কড়া নজরে রেখেছে আজকাল?

    তসলিম দ্রুত ঘাড় নাড়িয়ে বললো, হ্যাঁ।

    মনসুর চায়ের কাপে চুকুম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বিয়ের দিন তারিখ কি এখনো ঠিক হয় নি?

    না, এখনো কথাবার্তা চলছে। মৃদু জবাব দিলো তসলিম। লিলি আবার ঠোঁট টিপে হাসলো, বেচারা বড় অস্থির হয়ে পড়েছে। তসলিম লজ্জায় লাল হয়ুএ গিয়ে বললো, হুঁ তোমাকে বলেছে আর কী। শুধু শুধু বাজে কথা বলো।

    চা-নাস্তা শেষ হলে আরো অনেকক্ষণ গল্প করলো ওরা। সিমেনা নিয়ে আলোচনা করলো। পত্র-পত্রিকা আর রাজনীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলো। তারপর একে একে বিদায় নিয়ে চলে গেলো সবাই।

    মিতাকে কোলে নিয়ে আদর করছিলো মাহমুদ। লিলি বললো তোমার কি হয়েছে বলতো, সবাই বললো, তুমি একটা কথাও বললে না?

    মাহমুদ হাত বাড়িয়ে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললো, তুমি তো জানো লিলি, অতিরিক্ত হুল্লোড় ভালো লাগে না আমার।

    তাই বলে বুঝি একটা কথাও বলতে হবে না? কপট অভিমান করে লিলি বললো, ওরা কি মনে করলো বল তো?

    কেন, তুমিতো কথা বলেছে সবার সাথে। মাহমুদ জবাব দিলো মৃদু গলায়। মিতা ঘুমিয়ে পড়েছে কোলে।

    লিলি বিছানায় নিয়ে শোয়াল তাকে। কপালে একটু চুমু খেয়ে আদর করলো। গায়ের কাপড়টা মিতার আস্তে করে টেনে দিলো সে।

    টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে সার সার বই। মাহমুদ বইগুলো উলটে খোঁজ করছিলো খাতাটা।

    লিলি কাছে এসে বললো, কি খুঁজছো?

    মাহমুদ বললো, আমার সেই খাতাটা সেই লাল কভার দেয়া।

    লিলি বললো, তুমি বসো, আমি খুঁজে দিচ্ছি।

    মিতার পাশে এসে বসলো মাহমুদ। লিলি বইগুলো উল্টে পাল্টে খোঁজ করছিলো খাতাটা। হঠাৎ একটা বই থেকে কি যেন পড়ে গেলো মাটিতে। উপুড় হয়ে ওটা হাতে তুলে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো লিলি।

    মাহমুদ বললো, কি ওটা? বলতে বলতে লিলির পেছনে এসে দাঁড়ালো সে।

    লিলির হাতে একখানা ফটো। গ্রুপ ফটো। হাসমত আলী, মাহমুদ, সালেহা বিবি, মরিয়ম, হাসিনা সকলে আছে। তসলিম তুলেছিলো ওটা, আজও মনে আছে মাহমুদের।

    ফটোর দিকে চেয়ে মৃদু গলায় লিলি জিজ্ঞেস করলো, ক-বছর হলো?

    মাহমুদ ওর কাঁধের ওপর হাত জোড়া রেখে বললো, পাঁচ বছর।

    পাঁচটা বছর চলে গেছে, তাই না? লিলির দৃষ্টি তখনো হাতে ধরে রাখা ফটোটার উপর। ধীরে ধীরে মাহমুদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর মুখে চোখ তুলে তাকালো লিলি। চোখজোড়া পানিতে টলমল করছে ওর।

    দুজনে মৌন।

    দুজনে নীরব।

    মাহমুদের গলা জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো লিলি। বুকটা অস্বাভাবিক কাঁপছে ওর। অসহায়ের মত কাঁপছে।

    ওর ঘনকালো চুলগুলোর ভেতর সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে মাহমুদ মৃদু গলায় বললো, কেন কাঁদছো লিলি। জীবনটা কি কারো অপেক্ষায় বসে থাকে? আমাদেরও একদিন মরতে হবে। তখনো পৃথিবী এমনি চলবে। তার চলা বন্ধ হবে না কোনদিন। যে-শক্তি জীবনকে চালিয়ে নিয়ে চলেছে তার কি কোন শেষ আছে লিলি?

  • তারও আগে যা ঘটেছিল

    তারও আগে যা ঘটেছিল

    সরু গলিটা জুড়ে ধীরে ধীরে এগুতে লাগলো রিক্সাটা। কিছুদূর এলে, মরিয়ম বললো, এবার নামতে হবে লিলি। সামানে আর রিক্সা যাবে না। বলতে বলতে রিক্সা থেকে নেমে পড়লো সে। তার পিছু পিছু লিলিও নামল নিচে।

    চারপাশে নোঙরা আবর্জনা ছড়ানো। কলার খোসা, মাছের আমিষ, মরা ইঁদুর, বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পায়খানা–সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। দুর্গন্ধে এক-মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।

    আঁচলে নাক ঢেকে লিলি বললো, আর কতদূর?

    এই তো আর অল্প একটু–বলে সামনে হাত দিয়ে দেখালো মরিয়ম।

    এদিকে গলিটা আরো সরু হয়ে গেছে। একজনের বেশি লোক পাশাপাশি হেঁটে যেতে পারে না। মরিয়ম আগে লিলিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছে। নাকে ওর শাড়ি দিতে হয় নি, রোজ দুবেলা এ পথে আসা যাওয়া করতে করতে এসব দুর্গন্ধ ওর নাক-সহ্য হয়ে গেছে। আরো খানিকটা পথ হেঁটে এসে একটা আস্তর-ওঠা লাল দালানের সামনে দাঁড়ালো মরিয়ম।

    লিলি বললো, এটা বুঝি তোমাদের বাসা?

    মরিয়ম মাথা নেড়ে সায় দিলো, হ্যাঁ।

    দোরগোড়ায় একটা নেড়ি কুকুর বসে বসে গা চুলকাচ্ছিলো।

    ওদের দেখে এক পাশে সরে গেলো সে। এতক্ষণে নাকের উপর চেপে রাখা আঁচলটা নামিয়ে নিলো লিলি।

    দরজাটা পেরুলে একটা সরু বারান্দা। দুপাশে দুটো কামরা। একটিতে মাহমুদ থাকে। আরেকটিতে মরিয়ম আর হাসিনা। বারান্দার শেষ প্রান্তে আরো একটি কামরা আছে। ওটাতে মা আর বাবা থাকেন। দুলু আর খোকনও থাকে ওখানে। ও ঘরটার পেছনে পাকঘর আর কুয়োতলা। কুয়োতলায় যেতে হলে মা-বাবার কামরার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। অন্য কোন পথ নেই।

    ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকিয়ে দেখছিলো লিলি।

    মরিয়ম বললো, এসো।

    ওর নিজের কামরাটায় লিলিকে এনে বসালো মরিয়ম। একপাশে চওড়া একখানা চৌকির ওপর বিছানা পাতা। দুটো বালিশ পাশাপাশি সাজানো। একটা হাসিনার আর একটা মরিয়মের। দেয়ালে ঝোলান আলনার সাথে তাদের কাপড়গুলো সুন্দর করে গোছানো। তার নিচে একটা কেরোসিন কাঠের টেবিল। টেবিলে বই-খাতা রাখা। আর কোন আসবাব নেই ঘরে। আছে একটা মাদুর। ওটা মেঝেতে বিছিয়ে পড়ে ওরা।

    বিছানার ওপর এসে বসলো লিলি, এটা বুঝি তোমার ঘর?

    হাতের বই-খাতাগুলো টেবিলের ওপর রেখে মরিয়ম জবাব দিলো, হ্যাঁ, হাসিনা আর আমি থাকি এখানে।

    এ ঘরে অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে দুলু এসে উঁকি মারছিলো ভেতরে। ওকে দেখে মরিয়ম বললো, দুলু, মা কোথায় রে?

    দুলু ভাঙ্গা গলায় বললো, পাকঘরে।

    মরিয়ম বললো, আমার ছোট বোন দুলু, সবার ছোট ও।

    লিলি কাছে ডাকলো ওকে, এস, এদিকে এস।

    ওর ডাক শুনে গুটিগুটি পায়ে পিছিয়ে গেলো দুলু। তারপর ছুটে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো সে।

    মরিয়ম বললো, তুমি বসো লিলি, আমি এক্ষুণি আসছি। বলে আলনা থেকে গামছাটা নামিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সে।

    মায়ের ঘরটা খালি। বাবা অফিস থেকে ফেরেন নি এখনো। খোকন আর হাসিনা স্কুলে। মাহমুদ বোধ হয় এখনো ঘুমুচ্ছে ওর ঘরে। সারা রাত ডিউটি দিয়ে এসে সারাদিন ঘুমোয় ও।

    কুয়ো থেকে এক বালতি পানি তুলে, মুখ হাত ধোবার জন্যে কাপড়টা গুটিয়ে নিয়ে ভালো করে বসলো মরিয়ম।

    পাকঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে মা শুধালেন, কে এসেছে রে মরিয়ম?

    মরিয়ম মুখে পানি ছিটোতে ছিটোতে জবাব দিলো, আমার এক বান্ধবী।

    মা জানতে চাইলেন, এক সঙ্গে পড়তো বুঝি?

    মরিয়ম বললো, হ্যাঁ।

    মা আর কোন প্রশ্ন করলেন না। ভাতগুলো মজে এসেছে, এখনি নামিয়ে ফেন ঢালতে হবে। তারপর জলের কড়াটা চড়িয়ে দিতে হবে চুলোর উপর। মরিয়ম পাকঘরে এসে ঝুঁকে পড়ে বললো, এক কাপ চা দিতে পারবে, মা?

    সালেহা বিবি বললেন, দেখি, চা পাতা আছে কিনা, বলে চুলোর পেছনে রাখা কৌটোগুলোর দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। অনেকগুলো কৌটা রাখা আছে সেখানে। কোনটাতে মরিচ, কোনটায় হলুদ, রসুন কিংবা পেয়াজ। মাঝখান থেকে একটা তুলে নিয়ে খুলে দেখলেন সালেহা বিবি। তারপর বললেন, দুকাপ আন্দাজ আছে। তুই যা আমি করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। হঠাৎ কি মনে হতে পেছন থেকে তাকে আবার ডাকলেন সালেহা বিবি, শুধু চা দেবো?

    কিছু আছে কি? মরিয়ম প্রশ্ন করলো, থাকলে দাও।

    মা ঘাড় নাড়লেন, নেই। থাকবার কি উপায় আছে ওই দুলু আর খোকনটার জন্যে। কাল মাহমুদ কিছু বিস্কুট এনেছিলো, সাধ্য কি যে লুকিয়ে রাখবো। আজ সকালে বের করে দুজনে খেয়ে ফেলেছে।

    ‘যদি পার, বাইরে থেকে কিছু আনিয়ে দিও মা।’ যাবার সময় বলে গেলো মরিয়ম। মায়ের ঘর থেকে সে শুনতে পেলো, ও ঘরে কার সঙ্গে কথা বলছে লিলি। বোধ হয় হাসিনা ফিরেছে স্কুল থেকে। বাংলাবাজারে পড়ে সে ক্লাস এইটে। লম্বা দোহারা গড়ন। রঙটা শ্যামলা। সরু নাক। মুখটা একটু লম্বাটে ধরনের। বাড়ির অন্য সবার চেয়ে চেহারা একটু ভিন্ন রকমের ওর। চোখ জোড়া বড় হলেও তার মণিগুলো কটা কটা। বাঁ চোখের নিচে একটা সরু কাটা দাগ। ছোটবেলায় দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে বঁটির ওপর পড়ে গিয়ে কেটে গিয়েছিলো। সে চিহ্নটা এখনো মুছে যায় নি।

    এ ঘরে এসে মরিয়ম দেখলো লিলির পাশে বসে গল্প জমিয়েছে হাসিনা। আপনার শাড়িটা কত দিয়ে কিনেছেন?

    লিলি বললো, মনে নেই, বোধ হয় আঠারো টাকা।

    হাসিনা বললো, কি সুন্দর, আমিও কিনবো একখানা। কোত্থেকে কিনেছেন আপনি?

    লিলি জবাব দিলো নিউ মার্কেট থেকে।

    হাসিনা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শাড়িটা দেখতে লাগলো। ওর ওই স্বভাব- কারো পরনে একটা ভালো শাড়ি কিংবা ব্লাউজ দেখলে অমনি তার দাম এবং প্রাপ্তিস্থান জানতে চাইবে এবং সেটা কেনার জন্য বায়না ধরবে। কিনে না দিলে কেঁদেকেটে একাকার করবে। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রাখবে হাসিনা। মরিয়ম এসে বললো, ওর সঙ্গে তোমার আলাপ হয়েছে কি লিলি ও আমার ছোট বোন হাসিনা।

    লিলি হেসে বললো, নতুন করে পরিচয় দিতে হবে না, ও নিজেই আলাপ করে নিয়েছে।

    হাসিনা বললো, আপার কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। বলে হঠাৎ কি মনে হতে ওর দিকে ঘুরে বসে সে আবার বললো, আচ্ছা আপনি বলুন তো, আপা সুন্দর না আমি সুন্দর। ওর প্রশ্ন শুনে হেসে দিলো লিলি। মরিয়ম বললো, নতুন কেউ এলেই ওই এক প্রশ্ন ওর–আপা সুন্দর, না আমি সুন্দর।

    ক-দিন বলেছি তুমি সুন্দর, তুমি সুন্দর, আমি কুৎসিত, হলো তো?

    গলার স্বর শুনে মনে হলো ও রাগ করেছে। আসলে মনে মনে হাসছে মরিয়ম। কারণ সে জানে যে, হাসিনার চেয়ে ও অনেক বেশি সুন্দর। রঙটা ওর ফর্সা, ধবধবে। মায়ের দেহ-লাবণ্যের উত্তরাধিকারী হয়েছে সে। চেহারাটাও মায়ের মত সুশ্রী। আর চোখজোড়া খুব বড় না হলেও হাসিনার মত কটা নয়।

    মা বলেন, ও ঠিক আমার মত হয়েছে, স্বভাবটাও আমারই পেয়েছে সে, আর তোরা হয়েছিস তোদের বাবার মত ছন্নছাড়া।

    এ নিয়ে রোজ মায়ের সঙ্গে ঝগড়া বাধায় হাসিনা। বলে, তুমি তো সব সময় ওর প্রশংসাই করো, আমরা যেন কিছু না।

    শুনে মা হাসেন।

    লিলিও হাসলো আজ। হেসে বললো, মরিয়ম ঠিকই বলেছে। ও দেখতে কুৎসিত। তুমি ওর চেয়ে অনেক সুন্দর হাসিনা।

    শুনে হাসিনা বড় খুশি হলো। লিকলিকে বেণিজোড়া দুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। বললো, আপনি বসুন, আমি এক্ষুণি আপনার জন্য চা বানিয়ে আনছি। বলে ঘর থেকে বেরুতে যাবে এমন সময় বারান্দায় মাহমুদের তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেলো, ক’দিন বলেছি আমার বইপত্র ঘাঁটাঘাটি করিস নে, তবু রোজ তাই করবি। এরপর আমি তোকে মাথার ওপরে তুলে আছাড় মারবো হাসিনা।

    হাসিনার খোঁজে এ ঘরে এসে মুহূর্তে চুপসে গেলো মাহমুদ। লিলির দিকে অপ্রস্তুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর যেমন হন্তদন্ত হয়ে এসেছিলো, তেমনি দ্রুত বেরিয়ে গেলো।

    ও চলে যেতে আঁচলে মুখ চেপে ঘরময় লুটোপুটি খেলো হাসিনা। মরিয়ম ধমকের সুরে বললো, আবার হাসছে দেখ না, লজ্জা-শরম বলে কিছু যদি থাকতো। ক’দিন দাদা নিষেধ করে দিয়েছে ওর বইপত্র না ঘটতে তবু– কথাটা শেষ করলো না মরিয়ম।

    একদিন মাহমুদের বই ঘাঁটতে গিয়ে একটা এক টাকার নোট পেয়েছিলো হাসিনা। আরেক দিন একটা আট আনি। সেদিন থেকে যখনি মাহমুদ বাইরে বেরিয়ে যায় তখনি ওর বইপত্র ওলটায় গিয়ে সে। মরিয়মের ধমক খেয়ে চুপ করে গেলো হাসিনা। পরক্ষণে কি মনে হতে লিলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো, আপনার ক্যামেরা আছে লিলি আপা?

    লিলি বললো, কেন ক্যামেরা দিয়ে কি করবে তুমি?

    হাসিনা বললো, ছবি তুলবো।

    তাই নাকি? লিলি মৃদু হেসে বললো, না ভাই, ক্যামেরা আমার নেই। বিমর্ষ হয়ে লিলির জন্য চা আনতে গেলো হাসিনা।

    একটা পিরিচে দুটো সন্দেশ আর দুটো রসগোল্লা। পাশে রাখা দুকাপ গরম চা। দেখে চোখজোড়া বিস্ফারিত হলো হাসিনার। নাচের তালে জোড় ঘুরনী দিয়ে টুপ করে বসে পড়লো সে, মা আমি একটা খাবো। বলে এক মুহূর্তও দেরি না করে পিরিচ থেকে একটা রসগোল্লা তুলে নিয়ে মুখে পুরে দিলো সে।

    সালেহা বিবি কড়াইতে পানি ঢেলে ডাল চড়াচ্ছিলেন, পেছনে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি–ওকি হচ্ছে, ওকি হচ্ছে হাসিনা।

    রসগোল্লাটা গিলে ফেলে হাসিনা বললো, অমন করছো কেন, একটা তো খেয়েছি, আরো তিনটে আছে।

    সালেহা বিবির ইচ্ছে হলো চুলের গোছা ধরে মুখে একটা চড় বসিয়ে দিতে ওর, শুধু তিনটে ইয়ে মেহমানের সামনে কেমন করে দেয়, অ্যাঁ? তোদের নিয়ে আর পারি নে আমি। খাওয়ার জন্য এত হা-হা কেন তোদের, রসগোল্লা কি দেখিস নি জীবনে?

    মায়ের ভর্ৎসনা শুনে মুখ কালো করলো হাসিনা। চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো ওর। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, আমায় যে তুমি দেখতে পারো না তা আমি জানি। আপার মেহমান এসেছে বলে আজ মিষ্টি আনিয়েছো। আমার কেউ এলে এক কাপ চা-ও দিতে না।

    আঁচলে চোখ মুছে ধুপধাপ শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলো সে। এখন ছাদে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে হাসিনা।

    শুধু একটা সন্দেশ খেলো লিলি।

    দুলু এসে উঁকি দিচ্ছিলো দোর গোড়ায়। তার হাতে একটা সন্দেশ তুলে দিলো সে। অবশিষ্ট একটা রসগোলা পড়ে রইলো প্লেটের ওপর। সালেহা বিবি অনুরোধ করলেন, কি হাত তুলে বসে রইলে যে, ওটা খেয়ে নাও।

    লিলি বললো, না, আর খাবো না। মিষ্টি বেশি খাই নে আমি। মরিয়ম তুমি খাও। হাসিনা গেলো কোথায়?

    মরিয়ম কিছু বলার আগে সালেহা বিবি জবাব দিলেন, কোথায়, ছাদে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ দিচ্ছে। বলে আর সেখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলেন না তিনি। চুলোর ওপর ডাল চড়িয়ে এসেছেন সে কথা মনে পড়তে দুলুর হাত ধরে বেরিয়ে গেলেন সালেহা বিবি। দুলুর চোখজোড়া তখনো পিরিচে অসহায়ভাবে পড়ে থাকা রসগোল্লাটার দিকে নিবদ্ধ ছিলো। যাবার পথেও বার কয়েক সেদিকে তাকিয়ে গেলো সে।

    শহরে সন্ধ্যা নামার অনেক আগে এখানে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। বাইরে যখন বিকেল এ গলিতে তখন রাত। আর বাইরে যখন ভোর হয় তখনো এ গলিতে তমসায় ঢাকা থাকে। অনেক বাধা ডিঙিয়ে, অনেক প্রাসাদের চুড়ো পেরিয়ে তবে এখানে প্রবেশের অধিকার পায় সূর্য। এ পাড়ার বাসিন্দাদের বড় সাধনার ধন সে। তাই বেলা দুপুরে যখন এক চিলতে রোদ এসে পড়ে এই হীন দালানগুলোর ওপর তখন তার বাসিন্দারা বড় চঞ্চল হয়ে উঠে। ভিজে কাপড়-চোপড়গুলো রোদে বিছিয়ে দেয় তারা। খানিক পরে ধীরে ধীরে আবার সূর্যটা নেমে যায় পশ্চিমে। কে যেন জোর করে টেনে নিয়ে যায় তাকে। তখন এখানে অন্ধকার। অন্ধকার শুধু। বাইরে চোখ পড়তে লিলি বললো, চলো, এবার উঠা যাক মরিয়ম, রাত হয়ে এলো। মরিয়ম বললো, একটু বসো, মাকে বলে আসি।

    গলির মাথায় এসে লিলিকে বিদায় দিলো মরিয়ম। ও বাসায় যাবে এখন। মরিয়ম যাবে নারিন্দায়, ছাত্রী পড়াতে। রিক্সায় উঠে লিলি বললো, কাল আবার দেখা হবে ম্যারি।

    আদর করে মাঝে মাঝে মরিয়মকে ম্যারি বলে সম্বোধন করে সে।

    ও চলে গেলে কিছুক্ষণ ওদিকে তাকিয়ে রইল মরিয়ম। তারপর মাথার ওপরের কাপড়টা আরো একটু টেনে দিয়ে রাস্তার পাশ ধরে এগিয়ে গেলো সে।

    রোজ পায়ে হেঁটে ছাত্রীর বাড়ি যায় মরিয়ম।

    পায়ে হেঁটে ফিরে আসে।

    রিক্সায় যদি আসা-যাওয়া করে তাহলে হিসেব করে দেখেছে সে যা পায় তার অর্ধেকটা ব্যয় হয়ে যায়। তাছাড়া হাঁটতে যে খুব খারাপ লাগে ওর, তা নয়। মাসের শেষে ত্ৰিশটা টাকা পাওয়ার আনন্দ হাঁটার ক্লান্তির চেয়ে অনেক বেশি অনেক সুখপ্রদ।

    দুপাশের দোকানপাট, লোকজন দেখতে দেখতে এমনি পায়ে চলার পথে অনেক কিছু ভাবে মরিয়ম। বাবার কথা। মায়ের কথা। মাহমুদের কথা। আর নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া সেই বিপর্যয়ের কথা। অনেক কিছু ভাবে মরিয়ম। ইদানীং সেলিনার বড় বোনের দেবর মনসুরের কথাও মাঝে মাঝে ভাবনার মধ্যে এসে যায়। সেলিনা ওর ছাত্রীর নাম।

    মনসুর আজকাল বড় বেশি আসা-যাওয়া করছে ওদের বাসায়। প্রায় বিকেলেই আসে। বিশেষ করে মরিয়ম যখন সেলিনাকে পড়াতে যায় তখন। মরিয়ম ভাবে এবার থেকে লোকটা এলে তার সাথে আর কথা বলবে না সে। কে জানে মনে কী আছে লোকটার। কোন বদ উদ্দেশ্যও তো থাকতে পারে। মানুষের মনের খবর জানা সহজ নয়। জাহেদকে কত কাছ থেকে দেখেছিলো মরিয়ম তবুও কি তার মনের গোপন কথাটি জানতে পেরেছিলো কোনদিন? যদি এক মুহূর্ত আগেও জানতে পারতো তাহলে এমন একটা বিপর্যয় ঘটতে দিতো না মরিয়ম।

    দোরগোড়ায় পা দিতেই ভেতরে মনসুরের গলার স্বর শোনা গেলো।

    আজ আগে থেকেই এসে বসে আছে লোকটা।

    ওর সামনে দিয়ে নিঃশব্দে ভেতরে চলে এলো মরিয়ম।

    সোজা সেলিনার ঘরে।

    ওর ঘরটা বড় সুন্দর করে সাজানো আর বেশ পরিপাটি। একপাশে নতুন কেনা একখানা খাটের উপর সেলিনার বিছানা। নীল রঙের একখানা বেড কভার দিয়ে ঢাকা। মাথার কাছে একটা গোল টিপয়, তার উপর ফুলদানিতে বহু বর্ণের ফুল সাজানো। দেখে মনে হয় তাজা ফুল। আসলে কাগজের তৈরি।

    দেয়ালে কয়েকখানা ছবি টাঙ্গানো। কোন এক শিল্পীর আঁকা একখানা পোট্রেট।

    এ ঘরে ছিলো না সেলিনা। খবর পেয়ে এসে কপালে হাতের তালু ঠেকিয়ে বললো, আজ পড়বো না আপা, শরীরটা ভালো লাগছে না।

    মরিয়ম সহানুভূতির সাথে বললো, কি হয়েছে?

    ধপ করে বিছানার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে সেলিনা জবাব দিলো, মাথাটা ভীষণ ধরেছে আপা।

    মরিয়ম জানে এটা মিথ্যে কথা। যেদিন পড়ায় ফাঁকি দেবার ইচ্ছে থাকে সেদিন একটা কিছু ছুতো বের করে বসে সেলিনা। কোনদিন মাথা ব্যথা। কোনদিন পেট কামড়। কোনদিন বমি বমি ভাব। মরিয়ম কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, সত্যি তোমার মাথা ব্যথা করছে সেলিনা?

    সেলিনা পাশ ফিরে শুয়ে বললো, তুমি সব সময় আমায় সন্দেহ কর আপা।

    মরিয়ম বললো, এতদূর হেঁটে এসে না পড়িয়ে ফিরে যেতে আমার খারাপ লাগে কিনা, তাই।

    ওই যা, হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সেলিনা, তুমি বসো আপা, আমি এক্ষুণি আসছি। বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো সে। খানিকক্ষণ পরে আবার ফিরে এলো। হাতে তিনখানা দশ টাকার নোট। মরিয়মের হাতে নোটগুলো গুঁজে দিয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো সেলিনা, সত্যি বলছি আপা, মাথাটা আজ ভীষণ ধরেছে।

    মরিয়ম জানে হাজার বুঝালেও, ওকে আর এখন পড়াতে বসানো যাবে না। এখানে বুঝি হাসিনার সঙ্গে মিল আছে ওর। হাসিনাও এমনি ফাঁকি দেয় লেখাপড়ায়। গালাগাল করেও বইয়ের সামনে বসানো যায় না। এঘর থেকে ওঘরে পালিয়ে বেড়ায়। ছাদে গিয়ে বসে থাকে।

    বাবা বলেন, ছোট বেলায় তোমরাও এমন ছিলে। এখনও কম বয়স ওর, বুদ্ধি হয় নি, বুদ্ধি হলে তখন আর বকবিকি করতে হবে না; আপনা থেকেই পড়তে বসবে।

    মা বলেন, ওর বুঝি অল্প বয়স? আসছে মাসে তেরো পেরিয়ে চৌদ্দয় পড়বে। ও বয়সে মরিয়মকে দেখি নি। ওকে পড়তে বলতে হতো? আসলে তুমি ওকে বড় বেশি লাই দিচ্ছো। দেখবে ওর কিছু হবে না জীবনে।

    বাবা সব সময় হাসিনার পক্ষ নেন। মা মরিয়মের। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে কথাই ভাবছিলো মরিয়ম।

    সেলিনা জিজ্ঞেস করলো, কি ভাবছো আপা?

    না, কিছু না। হাতের নোটগুলো ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়ে মরিয়ম বললো, তাহলে আমি চলি সেলিনা, তোমার মাকে বলো আমি এসেছিলাম। কাল আবার দেখা হবে, কেমন?

    সেলিনা পাশ ফিরে শুয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললো, আচ্ছা।

    বারান্দায় দাঁড়িয়ে পা বাড়াতে গতি যেন শ্লথ হয়ে এলো তার। বৈঠকখানা ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনসুর। লম্বা গড়ন। সরু দেহ। পরনে একটা ঢোলা পায়জামা আর গায়ে ঘি রঙের মিহি পাঞ্জাবি। পায়ের শব্দে ওর দিকে ফিরে তাকালো মনসুর। একেবারে ওর মুখোমুখি। চোখজোড়া মাটিতে নামিয়ে নিয়ে ওর পাশ কেটে চলে যাবে ভাবছিলো মরিয়ম।

    একি এসেই ফিরে চললেন যে? চলার পথে তার প্রতিরোধ করলো মনসুর।

    সেলিনা আজ পড়বে না। ছোট্ট উত্তরটা দিয়ে চলে যাচ্ছিলো মরিয়ম।

    মনসুর বললো, চলুন আমিও যাবো ওপথে।

    ওর নিজের তরফ থেকে কোন আমন্ত্রণ না জানালেও, কিছুদূর পিছুপিছু তারপর পাশাপাশি রাস্তায় নেমে এলো মনসুর।

    আজ প্রথম নয়। এর আগেও এ ধরনের প্রস্তাব সে পেয়েছে মনসুরের কাছ থেকে। শুধু প্রস্তাব নয়, মরিয়মকে বাসার কাছাকাছি এগিয়ে দিয়েও গেছে সে।

    মরিয়মের ভালো লাগে নি। বড় বিরক্তিকর মনে হয়েছে এই অনাহুত সঙ্গদান। কথাবার্তা যে খুব হয়েছে রাস্তায় তা নয়। একদিন জিজ্ঞেস করছিলো, মরিয়ম কোথায় থাকে। আর একদিন জানতে চেয়েছিলো, পরীক্ষা কেমন দিয়েছ মরিয়ম। এছাড়া এমনও দিন গেছে, যে দিন সারা পথ নীরবে হেটেছে ওরা। বাসার কাছাকাছি তেমাথায় এসে মনসুর বলেছে আচ্ছা আসি এবার। আপনি তো ও পথে যাবেন, আমি এ পথে। কিছুদূর গিয়ে লোকটা রিক্সা নিয়েছে তা ঠিক লক্ষ্য করেছে মরিয়ম। মরিয়ম জানে বেশ টাকা-পয়সা আছে লোকটার, রিক্সা কেন ইচ্ছা করলে মোটরে চড়ে চলাফেরা করতে পারে। তবু এ পথটা মরিয়মের সঙ্গে হেঁটে আসতো মনসুর।

    রাস্তায় নেমে মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলো মরিয়ম; কেন সে নিষেধ করলো না লোকটাকে? ইচ্ছে করলে তো মুখের ওপর জবাব দিতে পারতো। বলতে পারতো আপনি সঙ্গে আসুন তা পছন্দ হয় না আমার। দয়া করে আর পিছু নেবেন না। ইচ্ছে করলে আরো রূঢ় গলায় আসতে নিষেধ করতে পারতো মরিয়ম। তবু কেন, একটা কথাও বলতে পারলো না সে?

  • উপসংহারের আগে

    উপসংহারের আগে

    উত্তরের জানালাটা ধীরে ধীরে খুলে দিলো লিলি। এক ঝলক দমকা বাতাস ছুটে এসে আলিঙ্গন করলো তাকে। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে পড়লো হাতের উপর। নিকষকালো চুলগুলো ঢেউ খেলে গেলো। কানের দুল জোড়া দোলনার মত দুলে উঠলো। নীল রঙের পর্দাটা দুহাতে টেনে দিলো সে। তারপর, বইয়ের ছোট আলমারিটার পাশে, যেখানে পরিপাটি করে বিছানা, বিছানার ওপর দুহাত মাথার নিচে দিয়ে মাহমুদ নীরবে শুয়ে, সেখানে এসে দাঁড়ালো লিলি। আস্তে করে বসলো তার পাশে। ওর দিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে থেকে মাহমুদ বললো, আমি যদি মারা যেতাম, তাহলে তুমি কি করতে লিলি?

    আবার সেকথা ভাবছো? ওর কণ্ঠে ধমকের সুর।

    মাহমুদ আবার বললো, বল না তুমি কি করতে?

    কাঁদতাম। হলতো? একটু নড়েচড়ে বসলো লিলি। হাত বাড়িয়ে মাহমুদের চোখ জোড়া বন্ধ করে দিয়ে বললো, তুমি ঘুমোও, প্লিজ ঘুমোও এবার। নইলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে যে। আজ ক’রাত ঘুমোও নি সে খেয়াল আছে?

    মাহমুদ মুখের ওপর থেকে হাতখানা সরিয়ে দিলো ওর, কি বললে লিলি, তুমি কাঁদতে, তাই না?

    না কাঁদবো কেন, হাসতাম। কপট রাগে মুখ কালো করলো লিলি। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পাকঘরের দিকে চলে গেলো সে। মাহমুদ নাম ধরে বারকয়েক ডাকলো, কিন্তু কোন সাড়া পেলো না। পাকঘর থেকে থালা-বাসন নাড়ার শব্দ শোনা গেলো। বোধ হয় চুলায় আঁচ দিতে গেছে লিলি।

    চোখ জোড়া বন্ধ করে ঘুমোতে চেষ্টা করলো সে। ঘুম এলো না। বারবার সেই ভয়াবহ ছবিটা ভেসে উঠতে লাগলো ওর স্মৃতির পর্দায়। যেন সব কিছু দেখতে পাচ্ছে সে। সবার গলার স্বর শুনতে পাচ্ছে। মা ডাকছেন তাকে, মাহমুদ, ‘বাবা বেলা হয়ে গেলো, বাজারটা করে আন তাড়াতাড়ি।’ চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো সে। সমস্ত শরীর শিরশির করে কাঁপছে তার।

    বুকটা দুরুদুরু করছে। ভয় পেয়েছে মাহমুদ। তবু আশেপাশে তাকালো সে। মাকে যদি দেখা যায়। কিন্তু তার নজরে এলো না। এলো একটা আরশুলা, বইয়ের আলমারিটার ওপর নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়াচ্ছে সেটা। তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল মাহমুদ।

    একটু পরে পাকঘর থেকে এক গ্লাস গরম দুধ হাতে এ ঘরে এলো লিলি। ওকে দেখতে পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলো মাহমুদ। একটুকাল নীরব থেকে বললো, আমি মরলাম না কেন, বলতে পারো লিলি?

    সে কথার জবাব দিলো না। বিছানার পাশে গোল টিপয়টার ওপর গ্লাসটা নামিয়ে রাখলো।

    মাহমুদ আবার জিজ্ঞেস করলো, কই আমার কথার জবাব দিলে না তো।

    লিলি বললো, দুধটা খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

    আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।

    কী প্রশ্ন?

    আমি মরলাম না কেন?

    লিলি ফিক্‌ করে হেসে দিয়ে বললো, ‘আমার জন্যে।’ বলে আবার গম্ভীর হয়ে গেলো সে। দুধের গ্লাসটা ওর মুখের কাছে এগিয়ে ধরে বললো, নাও, দুধটা খেয়ে নাও।

    কয়েক ঢোক খেয়ে মাহমুদ সরিয়ে দিলো গ্লাসটা, আমার বমি আসছে।

    লেবু দেবো? সামনে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলো লিলি।

    মাহমুদ মাথা নাড়লো, না।

    লিলি ওর চুলের ভেতর হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, বড় বেশি চিন্তা করো তুমি, ওসব ভেবে কি কোন কুল-কিনারা পাবে? এখন ঘুমাও লক্ষ্মীটি।

    ধীরে ধীরে চোখ বুজলো মাহমুদ।

    একটু পরে ঘুমিয়ে পড়লো সে। ওর হাতখানা কোলের ওপর থেকে নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে উঠে পড়লো লিলি। কল-গোড়ায় গিয়ে হাতমুখ ধুলো। পা টিপে টিপে ঘরে এসে আলনা থেকে তোয়ালেটা নাবিয়ে নিয়ে মুখ মুছলো। আয়নাটা সামনে রেখে ঘন কালো চুলগুলো আঁচড়ে নিলো। পরনের শাড়িটার দিকে একবার তাকালো সে। না, এতেই চলবে। বাইরে বেরুবার আগখান দিয়ে একবার এসে নিঃশব্দে মাহমুদকে দেখে গেলো লিলি। তারপর টেবিলের উপর থেকে তালাটা তুলে নিয়ে হাল্কা পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলো দরজায়। টেনে দেখলো ভালোভাবে লেগেছে কিনা। তারপর চাবিটা ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়ে রাস্তায় নেমে এলো লিলি। কাছাকাছি কোন রিক্সা চোখে পড়লো না।

    আশেপাশে কোন রিক্সাস্ট্যান্ডও নেই। বেশ কিছুদূর হেঁটে গিয়ে তারপর পাওয়া যেতে পারে একটা।

    ব্যাগটা খুলে, পয়সা নিয়েছে কিনা দেখলো লিলি। নিয়েছে সে। কিছু খুচরো আর দুটো এক টাকার নোট।

    এই দুপুর রোদে বেশিদূর হাঁটতে হলো না। খানিক পথ আসতে একটা রিক্সা পাওয়া গেলো। হাত বাড়িয়ে তাকে থামালো লিলি, ভাড়া যাবে? আজিমপুর গোরস্থানে যাবো। কত নেবে?

    আট আনা, মেমসাব।

    কোন দ্বিরুক্তি না করে রিক্সায় উঠে বসলো লিলি।

    বিকেলে বাসায় ফিরে এসে তালাটা খুলতে গিয়ে হাত কাঁপছিলো তার। সাবধানে দরজাটা খুললো। এখনো ঘুমুচ্ছে মাহমুদ। কপালে মৃদু ঘাম জমেছে তার। কাছে এসে শাড়ির আঁচল দিয়ে সস্নেহে তার কপালটা মুছে দিলো সে। তারপর অতি ধীরে ধীরে নিজের মুখখানা নামিয়ে এনে ওর মুখের ওপর রাখলো লিলি। গভীর আবেগের অস্পষ্ট স্বরে বললো, এর বেশি কিছু আমি চাই নে তোমার কাছে। চিরকাল এমনি করে যেন তোমাকে পাই।

    মাহমুদ নড়েচড়ে উঠে ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে বললো, মরলে মানুষ কোথায় যায় লিলি?

    লিলি মুখ তুলে সভয়ে তাকালো ওর দিকে। ঘুমের মধ্যেও সেই একই চিন্তা করছে লোকটা। দিনে রাতে এভাবে যদি মৃত্যুর কথা ভাবতে থাকে তাহলে হয়তো একদিন পাগল হয়ে যাবে মাহমুদ। না, তার এই ভয়াবহ পরিণতির কথা কল্পনা করতে পারে না লিলি। এ পরিণাম প্রতিহত করতে হবে। ভালবাসার বাঁধ দিয়ে ধ্বংসের প্লাবন রোধ করবে সে।

    বিছানার পাশে বসে অনেকক্ষণ তার গায়ে, মাথায়, মুখে হাত বুলিয়ে দিলো লিলি। যেন হাতের স্পর্শে ওর হৃদয়ের সকল ব্যথা আর সমন্ত যন্ত্রণার উপশম করে দিতে পারবে। তার ভেতরে বেদনার সামান্য চিহ্নটিও থাকতে দেবে না লিলি। থাকবে শুধু আনন্দ। অনাবিল হাসি। তৃপ্তিভরা শান্ত-স্নিন্ধ সুন্দর জীবন। যেখানে অশ্রু নেই। বিচ্ছেদ নেই। হাহাকার নেই। প্রেম প্রীতি আর ভালবাসার একচ্ছত্র আধিপত্য সেখানে।

    লিলি ভাবছিলো।

    দুয়ারে মৃদু কড়া নাড়ার শব্দে উঠে দাঁড়ালো সে। সাবধানে দরজাটা খুলতেই দেখলো মনসুর দাঁড়িয়ে।

    উনি এখন কেমন আছেন? ভেতরে এসে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলো মনসুর।

    লিলি চাপা কষ্ঠে বললো, ভালো।

    ঘুমুচ্ছেন দেখছি। বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো মনসুর, কখন ঘুমিয়েছেন?

    অনেকক্ষণ হলো। মাহমুদের গায়ের কাপড়টা একটু টেনে দিয়ে লিলি বললো, আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।

    মনসুর বললো, না, এখন বসব না। উনি কেমন আছেন দেখতে এসেছিলাম। কাল সকালে আবার আসবো আমি। রাতে অবস্থা যদি খারাপের দিকে যায় তাহলে আমাকে খবর দিবেন।

    আচ্ছা। লিলি ঘাড় নেড়ে সায় দিলো।

    যাবার আগে, টাকা-পয়সার কোন প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলো মনসুর।

    লিলি সংক্ষেপে বললো, না।

    প্রয়োজন হলে সঙ্কোচ না করে চাইবেন। লিলির চোখে চোখ রেখে মনসুর কাতর কষ্ঠে বললো, দয়া করে আমাকে পর ভাববেন না।

    না না সে কি কথা। দ্রুত মাথা নেড়ে লিলি বললো, ওকে, প্লিজ ভুল বুঝবেন না আপনি৷

    মনসুর চলে গেলে আবার বিছানার পাশে এসে বসলো লিলি।

    ছোট্ট শিশুর মত ঘুমুচ্ছে মাহমুদ। নির্লিপ্ত প্রশান্তির কোলে আত্মসমাহিত সে। ভবিষ্যতের দিনগুলো এমনি কাটুক।

    অর্থের প্রাচুর্য সে চায় না। এই ছোট্ট ঘরে, নিরবচ্ছিন্ন প্রেমের আলিঙ্গনে নির্বাক প্রবাহে কেটে যাক দিন। এই শুধু তার চাওয়া। কিন্তু এ যেন একটা অতি সুন্দর কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। লিলি ভাবে, মাহমুদের সঙ্গে বিয়ে হলে পর, এই যে একটা অনাবিল জীবনের কথা ভাবছে সে, সে জীবন কি বাস্তবে রূপায়িত হবে?

    তবু মানুষ তাই চায়।

    লিলিও চাইছে।

    কে জানে মরিয়মও হয়তো তাই চেয়েছিলো।

    আর সেই দুষ্ট মেয়ে হাসিনা। সেও কি এমনি অন্ধকার ঘন সন্ধ্যায় বসে, এমনি কোন কল্পনার জাল বুনেছিলো?

  • বরফ গলা নদী

    বরফ গলা নদী

    বরফ গলা নদী প্রথম প্রকাশিত হয় ‘উত্তরণ’ সাময়িকীতে; গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দে। অর্থনৈতিক কারণে বিপর্যস্ত ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায়ত্ব গাথা।