Blog

  • দশম অধ্যায়

    দশম অধ্যায়

    দশম অধ্যায়
    প্রতিপত্তি-পরিচয়, ফোর্ট উইলিয়ম্‌ কলেজের কার্য্যত্যাগ, সংস্কৃত কলেজের আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারীর পদে নিয়োগ, কলেজের সংস্কার, তেজস্বিতা, গুণগ্রাহিতা, ভ্রাতৃবিয়োগ, কলেজের কার্য্য ত্যাগ ও সখের কাজ।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে চাকুরী করিবার সময় কেবল সিবিলিয়ন সাহেব সম্প্রদায় কেন; তাৎকালিক এ দেশীয় অনেক সম্পত্তিশালী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহিতও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ঘনিষ্টতা হইয়াছিল। এই সময় মুরশিদাবাদের স্বর্গীয়া মহারাণী স্বর্ণময়ীর স্বামী রাজা কৃষ্ণনাথের সহিত তাঁহার আলাপ পরিচয় হয়। মুরশিদাবাদ রাজপরিবারের কর্ম্মচারিগণ তাঁহার যথেষ্ট সম্মান করিতেন। ১৮৪৭ খৃষ্টাব্দে ১২৫৪ সালে মৃত রাজার উইল সম্বন্ধে যে মোকদ্দমা হয়, তাহাতে নবীনচন্দ্র নামে এক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিয়াছিলেন,—“রাজা কৃষ্ণনাথ ইংরেজিতে যে উইল করিয়াছিলেন, রাজার ইচ্ছানুসারে আমি পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাহায্যে সেই উইলের বাঙ্গালা অনুবাদ করি। আমি অনুবাদ করি এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহা লিখেন। উইল অনুবাদের সময় বিদ্যাসাগর মহাশয় ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের প্রধান পণ্ডিত ছিলেন। এক্ষণে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারী সেক্রেটারী।1

    পরে মুরশিদাবাদ রাজপরিবার এবং স্বয়ং মহারাণী স্বর্ণময়ীর সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এতাদৃশ ঘনিষ্ঠতা হইয়াছিল যে, বিদ্যাসাগর মহাশয় আবশ্যক হইলে, মহারাণীর নিকট অর্থ ঋণ লইতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। বিদ্যাসাগর মহাশয় রাজ-পরিবারের কর্ম্মচারিগণকে যেরূপ নানা বিষয়ে সাহায্য করিতেন, মহারাণীর নিকটও তিনি সেইরূপ অনেক বিষয়ে সাহায্য পাইতেন। এ সম্বন্ধে চিঠি-পত্রাদি যথাপ্রসঙ্গে স্থানান্তরে প্রকাশিত হইবে।

    ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের মার্চ্চ মাসে বিদ্যাসাগর মহাশয় ফোর্ট-উইলিয়ম্ কলেজের কার্য্য পরিত্যাগ করেন। এই সময় সংস্কৃত কলেজের আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারী রামমাণিক্য বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের মৃত্যু হয়। বাবু রসময় দত্ত তখন সংস্কৃত কলেজের সেক্রেটারী ছিলেন। তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একজন সবিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারীর পদ গ্রহণ করিলে সংস্কৃত কলেজের প্রকৃতই অনেক উন্নতি হইবে, ইহাই তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। তবে এ পদের বেতন পঞ্চাশ টাকা ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজেও পঞ্চাশ টাকা বেতন পাইতেন; সুতরাং এ পদের জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় যে ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পদ ত্যাগ করিবেন না, রসময় বাবুর ইহাও ধারণা হইয়াছিল; কিন্তু তাঁহার ঐকান্তিক ইচ্ছা, বিদ্যাসাগর মহাশয় এই পদ গ্রহণ করেন। তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে এই পদে অধিষ্ঠিত করিবার দৃঢ় সংকল্প করিয়া, ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের ২৮শে মার্চ্চ শিক্ষা-বিভাগে এক পত্র লেখেন। এই পত্রে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারী করিবার জন্য তাঁহার সবিনয় অনুরোধ ছিল। এই পদের বেতন বৃদ্ধি করিয়া দিবার জন্যও তিনি যথেষ্ট উপরোধ করিয়াছিলেন। তিনি স্পষ্টই লিখিয়াছিলেন, এ পদের বেতন বৃদ্ধি না হইলে বিদ্যাসাগরের ন্যায় এক জন উপযুক্ত লোক পাওয়া দুরূহ। রসময় বাবু যে পত্র পাঠাইয়াছিলেন, তাহার সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পদপ্রার্থনার আবেদনপত্র ও প্রশংসাপত্রাদি পাঠান হইয়াছিল।

    রসময় দত্তের পত্র ও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রশংসাপত্রাদি পাইয়া, শিক্ষা-বিভাগের তৎকালিক সেক্রেটারী এ, ফজে, মৌয়েট্ এম, ডি, সাহেব অতি সন্তোষসহকারে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সংস্কৃত কলেজের আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারীর পদে নিযুক্ত করিতে স্বীকার করেন। তবে তিনি সে সময় পদের বেতন বৃদ্ধি করিতে সম্মত হন নাই।

    মৌয়ে্ট সাহেব ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের ২রা এপ্রেল রসময় বাবুকে এই মর্ম্মে পত্র লেখেন,—“ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারী পদে নিযুক্ত করা হইল, কিন্তু আপাততঃ তাঁহার বেতন বৃদ্ধি হইবে না। পরে কার্য্য বুঝিয়া বেতন বৃদ্ধি করিবার সম্ভাবনা রহিল।”

    ৪ঠা এপ্রেল এই পত্রের এক অনুলিপি ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট প্রেরিত হইয়াছিল। রসময় বাবু তাঁহাকে আসিষ্টেণ্ট সেক্রেটারীর পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। তিনি বুঝাইয়া বলেন,—“তুমি যদি এ পদ গ্রহণ কর, তাহা হইলে কলেজের উন্নতি হইবে। কলেজের উন্নতি হইলে নিশ্চিতই বেতন বৃদ্ধি হইবে।”

    বেতন বৃদ্ধির আশা বুঝিয়া এবং রসময় বাবুর অনুরোধ রক্ষা না করা অন্যায় ভাবিয়া, বিদ্যাসাগর মহাশয় পদগ্রহণে সম্মত হন। এই এপ্রিল মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারী হন।

    সংস্কৃত কলেজের আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারী পদ গ্রহণ করিলে পর বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুরোধে তাঁহার দ্বিতীয় ভ্রাতা দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন মহাশয় ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পণ্ডিতপদে নিযুক্ত হন। ইতিপূর্ব্বে বিদ্যাসাগর মহাশয় মার্সেল সাহেবকে বলিয়া কহিয়া কলিকাতার তালতলা-নিবাসী দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের হেড-রাইটার-পদে নিযুক্ত করিয়া দেন।

    সংস্কৃত কলেজের আসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারী হইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় কলেজের অনেক সংস্কার সাধন করেন। পূর্ব্বে শিক্ষকই কি, আর ছাত্রই কি, কলেজে আসিবার বা যাইবার কাহারও কোন বাঁধাবাঁধি, আঁটা-আঁটি নিয়ম ছিল না। এক দিন বিদ্যাসাগর মহাশয় সকল অধ্যাপকের আগমনের বহু পূর্ব্বে সমাগত হইয়া কলেজের প্রবেশ দ্বারের সম্মুখভাগে আপন মনে পদ চারণা করিতেছিলেন। পণ্ডিতাগ্রগণ্য স্মার্ত ভরতচন্দ্র শিরোমণি, তাহা লক্ষ্য করিয়া অপরাপর অধ্যাপকদিগকে কহিলেন,—“ওগো আর আমাদের বিলম্বে আসা চলিবে না, বিদ্যাসাগর অগ্রে আসিয়া কৌশলে আমাদিগকে তাহা জানাইতেছেন।” তৎপর দিবস হইতে তাঁহারা সকলে যথাসময়ে উপস্থিত হইতে লাগিলেন। বিদ্যাসাগর, শিরোমণি প্রভৃতির ছাত্র ছিলেন। সুতরাং তিনি মুখে কোন কথা বলিতে কুণ্ঠিত হইতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়, অনেক বিষয়ে সুকৌশলে সুব্যবস্থা ও সুনিয়ম করিয়া দেন। তিনি সংস্কৃত কলেজে প্রথম কাষ্ঠের পাশ প্রচলিত করেন। কোন ছাত্র এই পাশ না লইয়া বাহিরে যাইতে পারিত না। কাহারও সেক্রেটারীর অনুমতি ব্যতীত কোন কাজ করিবার অধিকার ছিল না। ইনি যে সকল কবিতা অশ্লীল মনে করিয়াছিলেন, তাহা সংস্কৃত পাঠ্যসাহিত্য হইতে তুলিয়া দেন। সাহিত্য শ্রেণীতে অঙ্কশিক্ষার ব্যবস্থা ইঁহার দ্বারা প্রবর্ত্তিত হয়। পূর্ব্বে এ ব্যবস্থা ছিল না।

    এই সময়ে হিন্দু কলেজের “প্রিন্‌সিপল” কার্ সাহেবের সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটু মনোবাদ ঘটিয়াছিল। একদিন বিদ্যাসাগর মহাশয় কার্ সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান। সাহেব তখন টেবিলের উপর পা তুলিয়া বসিয়াছিলেন। তিনি তদবস্থায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গে কথা কহেন। ইহাতে বিদ্যাসাগর মহাশয় আপনাকে অপমানিত জ্ঞান করেন; সে দিন তৎসম্বন্ধে কোন কথা না কহিয়া ফিরিয়া আসেন। আর একদিন কার্ সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় পূর্ব্ব কথা স্মরণ করিয়া আপনার পাদুকা-শোভিত পা দুখানি টেবিলের উপর তুলিয়া দেন, অধিকন্তু সাহেবকে বসিতেও বলেন নাই। সাহেব সে দিন সংক্ষুব্ধ মনে ফিরিয়া আসিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ব্যবহারের কথা শিক্ষাসমাজের সেক্রেটারী মৌয়েট্ সাহেবকে বিদিত করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট কৈফিয়ৎ চাওয়া হয়। কৈফিয়তে বিদ্যাসাগর মহাশয় কার্ সাহেবের দুর্ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। মৌয়েট্ সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তীব্র তেজস্বিতা দেখিয়া সন্তুষ্ট হন।

    বিদ্যাসাগর মহাশয় চিরকাল গুণের পক্ষপাতী ছিলেন। এই সময় সংস্কৃত কলেজে সাহিত্য শাস্ত্রের অধ্যাপকপদ শূন্য হয়। বাবু রসময় দত্ত তখনও কলেজের সেক্রেটারী ছিলেন। তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে এই পদে নিযুক্ত হইতে অনুরোধ করেন। শুনিতে পাই, এ পদ গ্রহণ করিলে অনেকটা কর্ত্তৃত্ব লোপ হইবে এবং কর্ত্তৃত্ব লোপ হইলে, কলেজের শিক্ষা-প্রণালীর শ্রীবৃদ্ধি সম্বন্ধে অনেকটা অন্তরায় ঘটিবে ভাবিয়া, তিনি এ পদ গ্রহণে অসম্মত হন; তবে এ পদে যাহাতে একজন প্রকৃত গুণবান্ উপযুক্ত লোক নিযুক্ত হন, ইহাই তাঁহার সম্পূর্ণ চেষ্টা ছিল। সেই সময় তাঁহার বাল্য-সহাধ্যায়ী মদনমোহন তর্কালঙ্কার কৃষ্ণনগর কলেজের প্রধান পণ্ডিত ছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় জানিতেন, তর্কালঙ্কার মহাশয় সাহিত্য-শাস্ত্রে সবিশেষ বুৎপন্ন। তিনি যোগাড়যন্ত্র করিয়া, তর্কালঙ্কার মহাশয়কে এই পদে নিযুক্ত করেন। তর্কালঙ্কার মহাশয়ের আসিবার পূর্ব্বে বিদ্যাসাগর মহাশয় দিন কতক সাহিত্য-শ্রেণীতে পড়াইয়াছিলেন।

    এই সময়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চতুর্থ ভ্রাতা দ্বাদশবর্ষীয় বালক হরচন্দ্রের ওলাউঠায় মৃত্যু হয়। ভ্রাতৃশোকে বিদ্যাসাগর মহাশয় মৃত-কল্প হন। ভ্রাতার মৃত্যু সময়ে তিনি দেশে উপস্থিত ছিলেন। কার্য্যবশে তাঁহাকে কলিকাতায় আসিতে হইয়াছিল বটে; কিন্তু ভ্রাতৃ-শোকে তিনি পাঁচ ছয় মাস এক রকম আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়াছিলেন বলিলে হয়।

    এই দুর্ঘটনার পর সংস্কৃত কলেজের সেক্রেটারী রসময় দত্তের সহিত তাঁহার মনোবাদ ঘটে। তিনি শিক্ষা-প্রণালী সম্বন্ধে যে সব প্রস্তাব করিতেন, তাহা সময় সময় সেক্রেটারীর অনুমোদিত হইত না। মতান্তর মনোবাদের কারণ। তেজস্বী বিদ্যাসাগর কর্ম্ম পরিত্যাগ করেন। পদত্যাগ করিতে দেখিয়া আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, স্বজন, পরিজন সকলে অবাক হইলেন। কেহ কেহ বলিলেন, বিদ্যাসাগর কার্য্য পরিত্যাগ করিলেন বটে; কিন্তু এত বড় সংসার চালাইবেন কিসে? সত্য সত্য ইহা ঘোরতর অবিমৃষ্যকারিতা; কিন্তু তেজস্বী বিদ্যাসাগর দিগ্বিজয়ী বীরের ন্যায় অচল অটল ভাবে ও অম্লান বদনে উত্তর দিলেন,—“আলু, পটোল বেচিয়া খাইব, মুদীর দোকান করিব, তবুও যে পদে সম্মান নাই, সে পদ লইব না।” এ সময় তাঁহার বাসায় অনেকগুলি অনাথ বালক অন্নবস্ত্র পাইত। তিনি তাহাদের কাহাকেও অন্নবস্ত্রে বঞ্চিত করেন নাই। মধ্যম ভ্রাতা ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে চাকুরী করিয়া যে পঞ্চাশটা টাকা পাইতেন, তাহাই একমাত্র উপায় ছিল। এই টাকায় বাসাখরচ চলিতে লাগিল। মাসে মাসে পঞ্চাশ টাকা ঋণ করিয়া বাড়ীতে পাঠাইতে হইত। রাজকৃষ্ণ বাবুর নিকট শুনিয়াছি, “পদ পরিত্যাগের পর তাঁহাকে একটা দিনের জন্যও মলিন বা বিষণ্ন দেখা যায় নাই। পূর্ব্বের ন্যায় তিনি তেমনই হিমগিরিবৎ গাম্ভীর্য্যপূর্ণ। মুখ দেখিয়া মনে হইত না, তাঁহার মনে কোন কষ্ট কি দুঃখ আছে।” অনন্যোপায় সামান্যাবস্থাপন্ন ব্যক্তির পক্ষে এরূপ পদত্যাগ দুষ্কর নিশ্চিতই; কিন্তু যাঁহাদের ভিতরে তেজ আছে, যাঁহাদের আত্মশক্তি ও সামর্থ্যের উপর অচল বিশ্বাস আছে, তাঁহাদের পক্ষে ইহা বিচিত্র কিছুই নহে।

    ১৮৪৯ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত বিদ্যাসাগর মহাশয় কোন চাকুরীতে পুনঃ প্রবৃত্ত হন নাই। এই সময় হিন্দী ও ইংরেজী বিদ্যায় তাঁহার অনেকটা ব্যুৎপত্তি হইয়াছিল। আনন্দকৃষ্ণ বাবু বলিয়াছিলেন,—“তাঁহার মুখে সেক্সপিয়রের আবৃত্তি শুনিয়া আমরা বিমোহিত হইতাম।” শিক্ষা-সমাজের অধ্যক্ষ মার্সেল্‌ সাহেবের অনুরোধে বিদ্যাসাগর মহাশয় কাপ্তেন ব্যাঙ্ক সাহেবকে কয়েক মাস হিন্দী ও বাইবেল শিক্ষা দেন। ব্যাঙ্ক সাহেব মাসিক ৫০৲ পঞ্চাশ টাকার হিসাবে তাঁহাকে কয়েক মাসের বেতন একেবারে দিতে চাহেন; তিনি কিন্তু তাহা লয়েন নাই।

  • নবম অধ্যায়

    নবম অধ্যায়

    নবম অধ্যায়
    বাসুদেব চরিত ও সাহিত্য-সন্ধান।

    ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে প্রবেশ করিবার পর, বিদ্যাসাগর মহাশয় কলেজের কর্ত্তৃপক্ষ কর্ত্তৃক সুপাঠ্য বাঙ্গালা গদ্য পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করিবার জন্য অনুরুদ্ধ হন। সেই অনুরোধের বশবর্ত্তী হইয়া তিনি “বাসুদেব-চরিত” নামক একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। “বাসুদেব-চরিত” শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধ অবলম্বন করিয়া রচিত। “বাসুদেব-চরিতে” শ্রীমদ্ভাগবতের কোন কোন স্থান পরিত্যক্ত; কোন কোন স্থানের ভাবমাত্র গৃহীত এবং কোন কোন স্থান অবিকল ভাষান্তরিত। ইহা অবলম্বন বা অনুবাদ হউক; লিপি-মাধুর্য্যে ও ভাষা সৌন্দর্ঘ্যে মূল সৃষ্টিসৌন্দর্য্যের সমীপবর্ত্তী।

    “বাসুদেব-চরিত” বাঙ্গালা গদ্য গ্রন্থের আদর্শস্থল। হিন্দু সন্তানের ইহা প্রকৃত পাঠ্য। বাঙ্গালী হিন্দু পাঠকের দুর্ভাগ্য বলিতে হইবে, “বাসুদেব-চরিত” ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের কর্ত্তৃপক্ষ কর্ত্তৃক অনুমোদিত হয় নাই। যে “বাসুদেব-চরিতে” ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণব্রহ্মত্ব প্রতিপাদিত, তাহা খৃষ্টান সাহেব সিবিলিয়ন্ কর্ত্তৃক যে অননুমোদিত হইবে, তাহা আর বিচিত্র কি?

    “বাসুদেব-চরিতে” ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণ লীলা প্রকটিত; পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে ভগবদাবির্ভাবের পূর্ণ প্রকটন। বিদ্যাসাগর মহাশয় অবশ্য মনে করিয়াছিলেন, ইহাতে শ্রীকৃষ্ণের ব্রহ্মত্ব বিকসিত হইলেও, সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদমাত্র ভাবিয়া সাহেব সিবিলিয়ন্‌গণ ইহাকে সাদরে উপাদেয় বাঙ্গালা-পাঠ্যরূপে গ্রহণ করিবেন। বস্তুতঃ ইহা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচিত প্রথম গ্রন্থ হইলেও অনুবাদের গুণে, ভাষার লালিত্য-মাধুর্য্যে, বর্ণনার বিকাশচাতুর্য্যে এবং ভাব-সম্ভারের যথাযথ বিন্যাসে, ইহা বাঙ্গালা ভাষা-শিক্ষার্থী সাহেব-সিবিলিয়ন্‌দের যে অতি আদরণীয় পাঠ্য হইয়াছিল, তাহার আর সন্দেহ নাই। ইহার পূর্ব্বে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষায় লিখিত এমন সুন্দর বাঙ্গালা গদ্যগ্রন্থ আর ছিল না। অনেক সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এই ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পাঠার্থীদের জন্য বাঙ্গালা পাঠ্য পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন; কিন্তু কোন পাঠ্যই এমন সুপাঠ্য হয় নাই; সুপাঠ্য কি, কদর্য্য ভাষার জন্য তাহার অধিকাংশই অপাঠ্য হইয়াছিল।2 কেবল “ফোর্ট উইলিয়ম” কলেজের পাঠ্য কেন, যে সময় “বাসুদেব-চরিত” রচিত হয়, সেই সময় এবং তাহার পূর্ব্বে যে সকল বাঙ্গালা গদ্য গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল, তাহার কোনখানি ভাষা-পরিপাটতে, বাসুদেব চরিতের সহিত তুলনীয় হইতে পারে না। ভাষার নমুনাস্বরূপ “বাসুদেব চরিতের” কিয়দংশমাত্র এইখানে উদ্ধৃত করিলাম,—

    “এক দিবস দেবর্ষি নারদ মথুরায় আসিয়া কংসকে কহিলেন, মহারাজ! তুমি নিশ্চিন্ত রহিয়াছ, কোনও বিষয়ের অনুসন্ধান কর না; এই যাবৎ গোপ ও যাদব দেখিতেছ, ইহারা দেবতা, দৈত্যবধের নিমিত্ত ভূমণ্ডলে জন্ম লইয়াছে এবং শুনিয়াছি, দেবকীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়া নারায়ণ তোমার প্রাণসংহার করিবেন, এবং তোমার পিতা উগ্রসেন এবং অন্যান্য জ্ঞাতিবান্ধবেরা তোমার পক্ষ ও হিতাকাঙ্খী নহেন; অতএব, মহারাজ! অতঃপর সাবধান হও, অদ্যাপি সময় অতীত হয় নাই, প্রতিকার চিন্তা কর। এই বলিয়া দেবর্ষি প্রস্থান করিলেন। কংস শুনিয়া অতিশয় কুপিত হইল এবং তৎক্ষণাৎ সপুত্র বসুদেব-দেবকীকে আনাইয়া তাঁহাদিগের সমক্ষে পুত্রের প্রাণনাশ করিল এবং তাঁহাদিগকে কারাগারে নিগড় বন্ধনে রাখিল। অনন্তর নিজ পিতা উগ্রসেনকে দূরীভূত করিয়া স্বয়ং রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করিতে লাগিল এবং প্রলম্ব, বক, চামুর, তৃণাবর্ত্ত প্রভৃতি দুর্বৃত্ত সৈন্যগণের সহিত পরামর্শ করিয়া যদুবংশীয়দের উপরি নানাপ্রকার অত্যাচার করিতে লাগিল। তাহারা প্রাণভয়ে পলাইয়া কুরু, কেকয়, শাম্ব, পাঞ্চাল, বিদর্ভ, নিষধ আদি নানাদেশে প্রচ্ছন্নবেশে বাস করিতে লাগিলেন। কেহ কেহ কংসের শরণাপন্ন ও মতানুযায়ী হইয়া মথুরাতে অবস্থান করিলেন।

    ****

    “অনন্তর অষ্টম মাস পূর্ণ হইলে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমীর অর্দ্ধরাত্র সময়ে ভগবান্ ত্রিলোকনাথ দেবকীর গর্ভ হইতে আবির্ভূত হইলেন। তৎকালে দিক্ সকল প্রসন্ন হইল, গগনমণ্ডলে নির্ম্মল নক্ষত্রমণ্ডল উদিত হইল, গ্রামে নগরে নানা মঙ্গল বাদ্য হইতে লাগিল। নদীতে নির্ম্মল জল ও সরোবরে কমল, প্রফুল্ল হইল। বন উপবন প্রভৃতি মধুর মধুকরগীতে ও কোকিলকলকলে আমোদিত হইল এবং শীতল সুগন্ধি মন্দ মন্দ গন্ধবহ বহিতে লাগিল। সাধুগণের আশয় ও জলাশয় সুপ্রসন্ন হইল। দেবলোকে দুন্দুভিধ্বনি হইতে লাগিল। সিদ্ধ, চারণ, কিন্নর, গন্ধর্ব্বগণ গীতিস্তুতি করিতে লাগিল। বিদ্যাধরীগণ অপ্সরাদিগের সহিত নৃত্য করিতে লাগিল। দেব ও দেবর্ষিগণ হর্ষিতমনে পুষ্পবর্ষণ করিতে লাগিল। মেঘসকল মন্দ মন্দ গর্জ্জন করিতে লাগিল।”

    রাজা রামমোহন রায়
    রাজা রামমোহন রায়। ছবি: ইন্টারনেট।

    কেবল সংস্কৃত-ভাযাভিজ্ঞ পণ্ডিতের রচিত বাঙ্গালা ভাষায় এ পরিপাটী কি কম প্রশংসনীয়। সংস্কৃতে অভিজ্ঞ হইলেই যে এরূপ বাঙ্গালা ভাষা লিখিবার শক্তি হয়, এ কথা বলিতে পারি না। রাজা রামমোহন রায়, রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও পাদরী কৃষ্ণ মোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তো সংস্কৃত ভাষায় অল্প-বিস্তর অধিকার লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহারা বাঙ্গালা গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টিসাধন জন্য সামান্য প্রয়াস পান নাই। বাঙ্গালা ভাষার পুষ্টিসাধনকল্পে তাঁহারাও কম সহায় নহেন। সে জন্য তাঁহারা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় চিরস্মরণীয় হইবার যোগ্যপাত্র, সন্দেহ নাই।3 তাঁহারাও কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায়, বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল বাঙ্গালা ভাষার পুস্তক প্রণয়নে সমর্থ হন নাই। তুলনায় সমালোচনা করিবার জন্য, তাঁহাদেরও প্রত্যেকের ভাষার একটু একটু নমুনা প্রকাশ করিলাম।

     রাজা রামমোহন রায় “পৌত্তলিকদিগের ধর্ম্ম প্রণালী,” “বেদান্তের অনুবাদ,” “কঠোপনিষদ্,” “বাজসনের-সংহিতোপনিষদ,” “মাণ্ডুক্যোপনিষদ্,” “পথ্যপ্রদান” প্রভৃতি কয়েকখানি পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন। “পথ্য প্রদান” হইতে ভাষার একটু নমুনা দিলাম,—

    “বাস্তবিক ধর্ম্মসংহারক অথচ ধর্ম্মসংস্থাপনাকারী নাম গ্রহণপুর্ব্বক যে প্রত্যুত্তর প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা সমুদায়ে দুই শত অষ্টাত্রিংশৎ পৃষ্ঠ সংখ্যক হয়, তাহাতে দশ পৃষ্ঠ পরিমিত ভূমিকা গ্রন্থারম্ভে লিখেন। এই দশ পৃষ্ঠে গণনা করা গেল যে, ব্যঙ্গ ও নিন্দাসূচক শব্দ ভিন্ন স্পষ্ট কদুক্তি বিংশতি শব্দ হইতে অধিক আমাদের প্রতি উল্লেখ করিয়াছেন—এইরূপ সমগ্র পুস্তক প্রায় দুর্ব্বাক্যে পরিপুষ্ট হয়। ইহাতে এই উপলব্ধি হইতে পারে যে, দ্বেষ ও মৎসরতায় কাতর হইয়া ধর্ম্মসংহারক শাস্ত্রীয় বিবাদচ্ছলে এইরূপ কটূক্তি প্রয়োগ করিয়া অন্তঃকরণের ক্ষোভ নিবারণ করিতেছেন, অন্যথা দুর্ব্বাক্য প্রয়োগ বিনা শাস্ত্রীয় বিচার সর্ব্বথা সম্ভব ছিল।”

    কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
    রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় : ছবি উইকিসংকলন

    কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় “ষড়্‌দর্শন সংগ্রহ” “বিদ্যাকল্পদ্রুম4” প্রভৃতি পুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাঁহার বিদ্যাকল্পদ্রুম হইতে ভাষার একটু নমুনা দিলাম,—

    “এতদ্দেশের প্রাচীন ইতিহাস পুস্তকে অনেক অনেক নরপতি ও বীরদিগের দেবপুত্ররূপে বর্ণনা আছে, ইহাতে বোধ হয়, পুরাকালীন লোকদের সত্যাপেক্ষা অদ্ভুত বিবরণে অধিক আদর ছিল এবং পুরাণলেখকেরা কবিতার ছন্দোলালিত্যাদির প্রতি অনুরক্ত হইয়া শব্দবিন্যাস করত পাঠকবর্গের মনোরঞ্জনপুরঃসর বিবিধ বিষয়ে উপদেশ করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন; সুতরাং অবিকল ইতিবৃত্ত লিখিয়া স্ব স্ব কল্পনাশক্তিকে খর্ব্ব করেন নাই। কাব্য ও অলঙ্কারের রসে রসিক হইয়া স্ব স্ব কবিত্ব ও নৈপুণ্য প্রকাশপূর্ব্বক সাধারণের সন্তোষ করিয়া উল্লিখিত সুরবীর রাজাদিগের মানের গৌরব করিবেন, তাঁহাদিগের ইহাই বিশেষ তাৎপর্য্য ছিল।”

    রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র “বিবিধার্থ-সংগ্রহ” নামক বাঙ্গালা মাসিক পত্র প্রকাশ করিয়া আপনার বিদ্যাবুদ্ধি ও গবেষণার পরিচয়ের সঙ্গে, বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি-সাধন কামনারও পরিচয় দিয়াছেন। তাঁহার ভাষার একটু নমুনা দিলাম,—

    “পরন্তু এতদ্দেশীয় মহাশয় জনসকল যদি একত্র হওত ঈষদনুগ্রহাবলোকন করিয়া স্বদেশীয় মঙ্গলবৃদ্ধির উৎসাহ জন্মাইবার ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে নানা উপায় দ্বারা তদভিষ্ট সিদ্ধ হইতে পারে। ভদ্র ভদ্র স্থানে অথবা গ্রামে গ্রামে সাধারণের সার্ব্বকালিক বংশপরম্পরায় উপকারার্থে গ্রামভেটি ও বারইয়ারির ধন অথবা তত্রত্য প্রত্যেক ব্যক্তি কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ মাসিক দান দ্বারা গ্রন্থালয় স্থাপন করিলে কোন ব্যক্তির ব্যয়ক্লেশ হইবে না, অথচ অতুল উপকার। গ্রন্থের অভাব প্রযুক্ত অনেকে নানা শাস্ত্রালোচনার যোগ্য হইয়াও স্বয়ং গ্রন্থসংগ্রহ অপারকবোধে আলস্যের হস্তে পতিত হন। অনেকের ইতিহাস ও ভূগোলবৃত্তান্ত শ্রবণে ও পঠনে স্বতই ইচ্ছা জন্মে, কিন্তু তাদৃশ গ্রন্থাদির অভাবপ্রযুক্ত নিরর্থক ভৌতিক ও তান্ত্রিক গল্পজল্পনাতে কালযাপন করেন।”

    “আমরা পল্লিগ্রামবাসী জনের প্রতি অমর্যাম্বিত হইয়া দুর্ব্বল পরামর্শ পক্ষের উল্লেখ করিতেছি; কিন্তু তাহাই যে সর্ব্বত্রেরই রীতি হউক, এমত আমাদের অভিসন্ধি নহে।”

    “এতদ্রুপ ভদ্র ধনাঢ্য পল্লীগ্রাম অনেক আছে যে, তাহাতে প্রতি বৎসর মিথ্যা কর্ম্মোপলক্ষে অনেক ব্যক্তি শত শত টাকার বারুদ পোড়াইয়া ক্ষণিক আমোদ করেন, মিথ্যা সং নির্ম্মাণ করিয়া কত শত মুদ্রা ব্যয় করেন। এমত সকল গ্রামে এক একটি উত্তম গ্রন্থালয় না থাকা তত্তদ্ গ্রামস্থ ব্যক্তিদিগের কি পর্য্যন্ত নিন্দাকর, তাহা তাঁহারাই বিবেচনা করিয়া দেখুন।”

    রাজেন্দ্রলাল মিত্র
    রাজেন্দ্ররাল মিত্র। ছবি: ইন্টারনেট

    ইঁহাদের গ্রন্থ হইতে অনেক সার কথার শিক্ষা লাভ হয়, সন্দেহ নাই; ভাষাও অনেকটা ব্যাকরণ-দোষাদিশূন্য, কিন্তু ভাষার বিশদতা ও প্রাঞ্জলতার অভাব জন্য, ইঁহাদের রচনা যে অনেকটা দুর্ব্বোধ হইয়া পড়িয়াছে, তৎসম্বন্ধে কাহারও দ্বিধা থাকিতে পারে না। বাগ্‌বিন্যাসের দীর্ঘতা ও ছত্র-সন্নিবেশের বিশৃঙ্খলতা হেতু এই সব রচনা মনোহারিণী হইতে পারে নাই। কতকটা ইংরেজী প্রণালীর অনুবর্ত্তী হওয়ায়, ইঁহাদের লিপিপদ্ধতি অনেকটা জটিল হইয়া পড়িয়াছে।

    এই তিন জনের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ের ভাষা দুর্ব্বোধ। রাজেন্দ্রলালের ভাষা কতকটা ভাল বটে, কিন্তু ইহা কৃষ্ণ বন্দ্যর অপেক্ষা দুর্বোধ। কৃষ্ণ বন্দ্যর ভাষা কতকটা জটিল বটে; কিন্তু অপেক্ষাকৃত প্রাঞ্জল। কেবল “বাসুদেব চরিতে” নহে, ইহার পরে রচিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনেক গ্রন্থই সংস্কৃত প্রণালীমতে দীর্ঘ সমাসযুক্ত শব্দপ্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু সেই শব্দ বা বাক্য এমনই যথাভাবে যথাস্থানে সন্নিবেশিত হইয়াছে যে, তাহা কোনরূপে শ্রুতিকটু হয় নাই; বরং তাহা মধুর মৃদঙ্গ নিনাদবৎ পাঠক ও শ্রোতার কর্ণমূলে এবং হৃদয়ের অন্তঃস্থলে অপূর্ব্ব সুখ-সঞ্চার করিয়া থাকে। লিপিপদ্ধতি একরূপ হইলেও বিষয়ের লঘুতা ও গুরুতা অনুসারে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচিত পুস্তকাবলীতে ভাষা-প্রয়োগের সারল্য ও গাম্ভীর্য্যের তারতম্য বহুপ্রকারে দেখিতে পাইবে। এ সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের অদ্ভূত শক্তি! বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচনায় ব্যর্থ বাক্যপ্রয়োগ অতীব বিরল। তিনি যেখানে যে বাক্যটা প্রয়োগ করিয়াছেন, মনে হয়, তাহা তুলিয়া লইয়া তৎসমসংজ্ঞক অন্য বাক্য প্রয়োগ করা দুরূহ। এ শক্তির পরিচয় প্রথম হইতেই তাহার “বাসুদেবচরিতে”।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পাঠ্য পুস্তক ব্যতীত, ‘বাসুদেবচরিত’ রচিত হইবার পূর্ব্বে অন্যান্য অনেক মহাত্মা বাঙ্গালা গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টি-সাধন জন্য পুস্তক রচনা করিয়াছেন। এ জন্য কেরি, মার্সমান্ প্রভৃতি মিশনরী বাঙ্গালীর আশীর্ব্বাদপাত্র। তবে ইঁহারাও যে ভাষার সম্যক্ পরপাটীকরণে বা পরিপুষ্টিসাধনে কৃতকার্য্য হন নাই, বাঙ্গালী পাঠকমাত্রেই তাহা বিদিত আছেন। মিশনরী ভাষার একটু নমুনা এইখানে দিলাম,—

    “এক বড় বিলেতে অনেক বেঙ্গের বসতি ছিল। তাহার ধারে কতকগুলি বালক হঠাৎ খাপরা খেলা খেলিতে লাগিল; আর জলে একজাই খাপরা বৃষ্টি করিতে লাগিল; ইহাতে ক্ষীণ ও ভীত বেঙ্গেদের বড় দুঃখ হইল। শেষে সকল হইতে সাহসী এক বেঙ্গ বিল হইতে উপরে মুখ বাড়াইয়া কহিল, হে প্রিয় বালকেরা! তোমরা এত ত্বরাতেই কেন আপন জাতির নিষ্ঠুর স্বভাব শিক্ষহ?”

    রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রীযুক্ত রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    যে অংশ উদ্ধৃত হইল, তাহাতে বুঝা যায়, ভাষা অনেকটা সরল বটে; কিন্তু ইংরেজীর ভাব-ভাঙ্গা; আর গঠন-প্রণালী ইংরেজীরই অনুকৃতি। বিজাতীয় লেখকদিগের নিকট ইহা অপেক্ষা অধিক আশা করা যায় না।

    কেরি, মার্সমান প্রভৃতি মিশনরী ভিন্ন অনেক সিবিলিয়ান্ সাহেব ও বাঙ্গালী মনস্বী, সংবাদপত্র এবং পুস্তকাদি প্রকাশ করিয়া বাঙ্গালা ভাষার পুষ্টি-সাধনের যথেষ্ট পরিচয় দিয়াছেন।5 স্থানান্তরে যথা প্রসঙ্গে সংবাদপত্রের আলোচনা করিব। এখানে বাঙ্গালা ভাষার পুষ্টিপরিচায়ক কয়েকখানি পুস্তকের উল্লেখ করিব মাত্র। এতদুল্লেখে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচনা-প্রকৃষ্টতা ও বাঙ্গালার চরম পুষ্টিকারি কতক উপলব্ধ হইবে।

    প্রকৃত বাঙ্গালা গদ্য-সাহিত্যের সৃষ্টি-কাল নির্ণয় করা দুরূহ। তবে আমরা প্রায় তিন শত বৎসরের পূর্ব্বে লিখিত যে গল্প-সাহিত্যের পুঁথি দেখিয়াছি, তাহার আলোচনা করিলে প্রতীত হয়, প্রকৃত গদ্য সাহিত্যের সৃষ্টি ইহার বহু পুর্ব্বে।6 ইহার ভাষা তেজোময়ী ও প্রাণময়ী না হউক, ইহার গঠনপ্রকারে মনে হয়, প্রকৃত গদ্য-সাহিত্য সৃষ্টির কাল নির্ণয় করা দুষ্কর। এইখানে ভাষার একটু নমুনা দিলাম,—

    “তাহার রূপ কি। স্বরূপ প্রকৃতিতে জড়িতা। বাহ্যজ্ঞান রহিত। তেঁহ নিত্য চৈতন্য। তাহাকে জানিব কেমনে। তেঁহ আপনাকে আপনি জানান। যে জন চেতন সেই চৈতন্য। অতএব স্বরূপ রূপ এক বস্তু হয়। বর্ত্তমান অনুমান এই এইরূপ। * * * তাঁহার নাম কি। সপ্ত স্বর্গ পাতাল কি কি। ভূলোক, ভবলোক, সুরলোক, মহোলোক, জনলোক, তপলোক, শান্তিলোক এই সপ্ত স্বৰ্গ। * *। তেঁহ প্রথম পুরুষ। তার নাসাগ্রে ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি।”

    ইহা অবশ্য পুষ্টাঙ্গ ভাষার পরিচায়ক নহে। ক্রিয়া, অব্যয়, বিশেষণ প্রভৃতির যথাবিন্যাসে ও যথাপ্রয়োগে ভাষার পুষ্টি-অপুষ্টি বা পরিণতি অপরিণতির-বিচার হয়। ইহাতে তাহার পরিচয় প্রমাণের সম্যক্ অসদ্ভাব। গ্রন্থখানি নরোত্তম দাস নামক এক ব্যক্তির লিখিত। পুঁথিখানি আট পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ; প্রশ্নোত্তর-সমাবেশে কতকগুলি শাস্ত্রীয় গূঢ়তত্ত্ব অবলম্বনে রচিত। “তেঁহ” এই কর্ত্তৃকারকের প্রয়োগে অনুভব হয়, ইহা চৈতন্যের সময়ে বা তাঁহার অব্যবহিত পরবর্ত্তী সময়ে প্রণীত হইয়াছে। যাহা হউক, ইহাকেও ভাষার সৃষ্টিকল্প বলিয়া ধরিয়া লইলে এবং ইহার ভাষা-প্রণালীর আলোচনা করিলে বলা যাইতে পারে, ইংরেজী গদ্য সাহিত্য-সৃষ্টিকল্প প্রাচীনত্বের বড় গৌরব করিতে পারে না।

    স্যর জন্ মাণ্ডেভাইল্ ইংরেজী সাহিত্য-গদ্যের সৃষ্টিকর্ত্তা বলিয়া ইংরেজী সাহিত্য-সমাজে পরিচিত।7 ১৩০০ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৩৭১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত মাণ্ডেভাইলের আবির্ভাব কাল। তাঁহার পূর্ব্বে রচিত দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর যে রচনাখণ্ড পাওয়া যায়, তাহা ইংরেজী গদ্য সাহিত্যের মধ্যে গণ্য নহে। মাণ্ডেভাইলের রচিত ইংরেজী গ্রন্থের ভাষা-গঠনের সহিত অধুনা ইংরেজী ভাষা-গঠনের তুলনা করিলে যে তারতম্য অনুভূত হয়, নরোত্তমদাস-রচিত গ্রন্থের ভাষার সহিত আধুনিক ভাষার তুলনা করিলে, সে তারতম্য বোধ হয় না। প্রাকৃত ভাষার সহিত বাঙ্গালা কি হিন্দী ভাষার যে তারতম্য, মাণ্ডেভাইল-রচিত পুস্তকের ভাষার সহিত আধুনিক ভাষার সেইরূপ তারতম্য বলিলে, বোধ হয় অত্যুক্তি হয় না। এইটুকু বঝাইবার জন্য, মাণ্ডেভাইলের ভাষার একটু নমুনা দিই—

    “And zce schulle understonds that I have put this Boke out of Latyn in to French, and transolater it azen out of Frensche in to Enghysche, that very man of my Nacioun undirstonde it.”

    নরোত্তম-রচিত ভাষার সহিত, আধুনিক ভাষার তুলনা করিলে, গঠন প্রক্রিয়ার তারতম্য বড় অনুভূত হইবে না। অবশ্য রচনার প্রণালী ও প্রথার তারতম্য অনেকটা পরিলক্ষিত হইবে। মাণ্ডেভাইলের ভাষার সৃষ্টির পরিচয় হইতে পারে, পুষ্টির নহে। নরোত্তমের ভাষার ঈষদ্ পুষ্টিরই লক্ষণ। তবে ১৮০০ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে বা তাহার কিঞ্চিৎ পুর্ব্বে, বাঙ্গালা-গদ্য-সাহিত্যের প্রকৃত পুষ্ট-প্রারম্ভ।

    নরোত্তমদাস-রচিত গদ্য-সাহিত্য-রচনার পর হইতে উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভের পুর্ব্ব পর্য্যন্ত বাঙ্গালা গদ্য-সাহিত্যের কিরূপ অবস্থা ছিল, তাহার প্রকৃত তত্ত্ব নির্ণয় করিবার কোন প্রকৃষ্ট প্রমাণ-নিদর্শন এ পর্য্যন্ত পাই নাই। তবে এই সময়ের মধ্যে লিখিত চিঠিপত্র, কবুলতি প্রভৃতিকে গদ্য-সাহিত্যের নিদর্শনস্বরূপ ধরিলে, গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টিসম্বন্ধে নিতান্ত নিরাশ হইতে হয়।

    বাঙ্গালা গদ্য-সাহিত্যের সৃষ্টি প্রাচীনত্বসম্বন্ধে ইংরেজী সাহিত্যসৃষ্টির নিকট অনেকটা গৌরবশালী হইলেও পুষ্টিসম্বন্ধে প্রকৃতই হীনতর, তাহার আর সন্দেহ কি? ইংরেজী গদ্য-সাহিত্যের যে রূপ শনৈঃ শনৈঃ ক্রম-পুষ্টিসাধন হইয়াছে, বাঙ্গালার সেরূপ হয় নাই। চতুর্দ্দশ শতাব্দী হইতে উনবিংশ শতাব্দী পর্য্যন্ত যে সব ইংরেজী গ্রন্থকার আবির্ভূত হইয়াছেন, তাঁহাদিগের গ্রন্থাদির সমালোচনা করিলে, ইংরেজী গদ্য সাহিত্যের পুষ্ট-প্রক্রিয়া, অতীব বিস্ময়াবহ ব্যাপারের মধ্যে পরিগণিত হয়। ইংরেজের বাণিজ্য বিস্তার ও রাজ্য প্রসার ইংরেজী গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টি-প্রসারে অবশ্য প্রধান সহায়। ইংরেজী প্রসারের অন্ততম একটা বিশিষ্ট কারণ লক্ষিত হয়; ইংরেজী গদ্য সাহিত্যে একটা সুআদর্শ পাইয়াছিল। ফরাসীর পরিপুষ্ট গদ্য-সাহিত্য, ইংরেজী গদ্য-সাহিত্যের প্রকৃষ্ট আদর্শ। বাঙ্গালীর পরাধীনতা ও দরিদ্রতা সাহিত্যপুষ্টির প্রবল অন্তরায়। ইংরেজী শিক্ষার প্রাধান্যহেতু বাঙ্গালা পাঠের প্রবৃত্তিহ্রাস এবং প্রকৃত আদর্শের অসদ্ভাব বাঙ্গলা-সাহিত্যের উন্নতিপক্ষে অন্যতম অনাহত প্রতিবন্ধক। অধুনা ইংরেজী কতকটা আদর্শ বটে; কিন্তু তদ্দ্বারা বাঙ্গালা-সাহিত্য বিসদৃশ বিজাতীয় ভাবাপন্ন হইয়া পড়িতেছে। এই জন্য বাঙ্গালা সাহিত্যের সর্ব্বাঙ্গীন শ্রীবৃদ্ধি সুদূরপরাহত বলিয়া মনে হয়। তবে ইহা অনেকটা পুষ্টির দিকেই অগ্রসর হইতেছে।

    “বাসুদেব চরিত” রচিত হইবার পূর্ব্বে বঙ্গালা-ভাযার পুষ্টিসাধক যে সব পুস্তক প্রচারিত হইয়াছিল, তাহাদের প্রত্যেকের আলোচনা করিয়া, ভাষার বিজ্ঞান-সন্মত ক্রমোন্নতির প্রমাণ প্রদর্শন করা এখানে একরূপ অসম্ভব। যাহারা পুষ্টি-ক্রমের একটা সোজা পরিচয় লইতে চাহেন, তাঁহারা পাদরী ইয়াটস্ সাহেব প্রণীত “বঙ্গভাষার উপক্রমণিকা”(“Introduction to the Bengali Language.”) নামক গ্রন্থের দুই খণ্ড পুস্তক পাঠ করিলে কতকটা কৌতুহল চরিতার্থ করিতে পারেন। ১৮০০ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮৪০ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত যাঁহারা বাঙ্গালা পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন, ইয়াটস্ সাহেব তাঁহাদের অধিকাংশের ভাষা নমুনাস্বরূপ উদ্ধৃত করিয়াছেন। এই ইয়াটস্ সাহেবই বলিয়াছেন,—“প্রকৃত বাঙ্গালা অতি সম্ভ্রান্ত ভাষা। এমন কোন ভাব নাই, যাহা ন্যায়ত তেজের সহিত, বাঙ্গলা ভাষায় প্রকাশ করিতে পারা যায় না। তবে বাঙ্গালা পাঠ্য বিরল।8” অদ্য ইয়াটস্ সাহেব জীবিত থাকিলে, তাঁহার মনের এ ক্লেশ একেবারে না হউক, কতকটা দূরীকৃত হইতে পারিত।

    ভাষার পুষ্টিতত্ত্বনির্ণয় করিতে হইলে, প্রাচীনতম সাহিত্যের আলোচনা করা কর্ত্তব্য; অন্ততঃ বিদ্যাসাগর-বিরচিত ‘বাসুদেব চরিতে’র ভাষা বুঝাইতেও তাহার প্রয়োজন; কিন্তু এখানে সে সম্বন্ধে আলোচনার স্থানাভাব; এতৎসম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা পাঠকের বিরক্তিকর হইবার সম্ভাবনা, তবে কতকটা কৌতুহলনিবৃত্তির জন্য কয়েকখানি পুস্তকের উল্লেখ করিলাম।

    প্রথমে “তোতা-ইতিহাসে’র উল্লেখ করা উচিত। এখানি “তোতা-কাহিনী” নামক উর্দ্দু পুস্তকের অনুবাদ। হিন্দীতেও “শুকবাহাত্তরী” নামক এইরূপ একখানি পুস্তক আছে। তোতা অর্থাৎ শুকপক্ষীর মুখে গল্পচ্ছলে কয়েকটি প্রসঙ্গ। ইহার লিপিপ্রণালী বিশুদ্ধ নয়; ভাষাও গ্রাম্যদোষ বর্জ্জিত নয়, স্থানে স্থানে বিজাতীয় ভাব-ব্যক্তিরও অভাব নাই; সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে অযথা গ্রাম্যবাক্য প্রয়োগে অনেক স্থান শ্রুতিকটু হইয়াছে। তবে শব্দপ্রয়োগ সরল ও সহজ। একটু নমুনা দিলাম,—

    “পূর্ব্বকালে ধনবানদের মধ্যে আমদ-সুলতান নামে একজন ছিলেন; তাহার প্রচুর ধন ও ঐশ্বর্য্য এবং বিস্তর সৈন্য-সামন্ত ছিল; একসহস্ৰ অশ্ব পঞ্চশত হস্তী নবশত উষ্ট্র ভারের সহিত তাঁহার দ্বারে হাজির থাকিত। কিন্তু তাঁহার সন্তানসস্তুতি ছিল না। এই কারণ তিনি দিবারাত্রি ও প্রাতে ও সন্ধ্যাতে ঈশ্বরপূজকদের নিকট গমন করিয়া সেবার দ্বারা সন্তানের প্রার্থনা করিতেন। কতক দিবস পরে ভগবান্ সৃষ্টিকর্ত্তা সূর্য্যের ন্যায় বদন চন্দ্রের ন্যায় কপাল অতি সুন্দর এক পুত্র তাহাকে দিলেন। আমদ সুলতান ঐ সন্তান পাইয়া বড় প্রফুল্লিতচিত্ত পুষ্পবৎ বিকসিত হইয়া সেই নগরস্থ প্রধান লোক আর মন্ত্রী ও পণ্ডিত এবং শিক্ষাগুরু আর ফকিরদিগকে আহ্বানপুর্ব্বক আনয়ন করিয়া বহুমূল্য খেলাৎ বস্ত্রাদি দিলেন। যখন সেই বালকের সপ্তম বৎসর বয়ঃক্রম হইল, তখন আমদ সুলতান একজন বিদ্বান লোকের স্থানে পড়িবার জন্যে সেই পুত্রকে সমর্পণ করিলেন। কতক দিবসেতে সেই বালক আরবী ও পারসী শাস্ত্রের সমুদয় পুস্তক পড়িয়া সমাপ্ত করিয়া রাজসভার ধারামতে কথোপথন আর বসন উঠন শিক্ষা করিলেন। তার পর রাজার আর সভাস্থ লোকদের পসন্দেতে উৎকৃষ্ট হইলেন।”

    “তোতা ইতিহাস” কাহার লিখিত, তাহা জানিতে পারা যায় নাই; তবে যে ইহা এদেশীয় লোকের লিখিত, ইয়াটস্ সাহেব তাহার স্পষ্ট পরিচয় দিয়াছেন। এদেশীয়ের লিখিত হইলেও ইহার বাঙ্গালা কতকটা পাদরীদের বাঙ্গালার মত।

    ১৮০২ খৃষ্টাব্দে রামরাম বসুর লিখিত “লিপিমালা” প্রকাশিত হয়। পত্রের উত্তর-প্রত্যুত্তরচ্ছলে সকল প্রবন্ধই লিখিত। লিখনপ্রণালী প্রায়ই পূর্ব্বোক্তরূপ। তবে অপেক্ষাকৃত মার্জিত; কিন্তু ভাষা জটিল। নমুনা এই—

    “তোমাদিগের মঙ্গলাদি সমাচার অনেক দিবস পাই নাই, তাহাতেই ভাবিত আছি। সমাচার বিশেষরূপ লিখিবা। চিরকাল হইল তোমার খুল্লতাত গঙ্গা পৃথিবীতে আগমন হেতু সমাচার প্রশ্ন করিয়াছিলেন, তখন তাহার বিশেষণ প্রাপ্ত হইতে পারেন নাই।”

    ১৮০৪ খৃষ্টাব্দে “রাজাবলী” নামে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কতকগুলি হিন্দু ও মুসলমান রাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ লইয়া ইহা লিখিত। ইহার ভাষা কতকটা পুষ্টতর বটে; কিন্তু দূরান্বয়তাপ্রযুক্ত শ্রুতিকঠোর। নমুনা,—

    ‘শকাদি পাহাড়ী রাজার অধর্ম্ম ব্যবহার শুনিয়া, উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রজাদিত্য সসৈন্য দিল্লিতে আসিয়া শকাদিত্য রাজার সহিত যুদ্ধ করিয়া তাহাকে যুদ্ধে জয় করিয়া, আপনি দিল্লীতে সম্রাট্ হইলেন। * * এক দিবস ধাররাজ বিক্রমাদিত্যকে ও ভৃত্য হরিকে আপন নিকটে আনাইয়া উপদেশ করিতে লাগিলেন, অরে বাছারা, বিদ্যাহীন যে মনুষ্য সে পশু; অতএব নানা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদিগকে যত্নেতে প্রসন্ন করিয়া তাঁহাদের প্রমুখাৎ আপনার হিত শুনিয়া ও বেদ ও ব্যাকরণাদি বেদাঙ্গ ও ধর্ম্মশাস্ত্র ও জ্ঞানশাস্ত্র ও নীতিশাস্ত্র ও ধনুর্ব্বেদ ও গন্ধর্ব্ববিদ্যা ও নানাবিধ শিল্পবিদ্যা উত্তমরূপে অধ্যয়ন কর, এই সকল বিদ্যাতে বিলক্ষণ বিচক্ষণ হও; ক্ষণমাত্র বৃথা কালক্ষেপ করিও না ও হস্তি, অশ্ব রথারোহণেতে সুদৃঢ় হও ও নিত্য ব্যায়াম কর ও লম্ফেতে উল্লম্ফেতে ও ধাবনেতে ও গড়চক্রভেদেতে ও ব্যূহরচনাতে ও ব্যূহভঙ্গেতে নিপুণ হও।”

    মৃতুঞ্জয় শর্ম্মার লিথিত “বত্রিশসিংহাসন”ও এই সময়ে কতকটা এই প্রণালীতে লিখিত হয়। ইহার ভাষা “তোতা ইতিহাস” ও “লিপিমালা” অপেক্ষা অনেকটা ভাল; তবে কষ্ট-কল্পিত; সুতরাং ইহাতে রসমাধুর্য্যের অভাব। নমুনা,—

    “এক দিবস রাজা অবন্তীপুরীতে সভা মধ্যে দিব্য সিংহাসনে বসিয়াছেন, ইতোমধ্যে এক দরিদ্রপুরুষ আসিয়া রাজার সম্মুখে উপস্থিত হইল, কথা কিছু কহিল না। তাহাকে দেখিয়া রাজা মনের মধ্যে বিচার করিলেন যে, লোক যাত্রা করিতে উপস্থিত হয়, তাহার মরণকালে যেমন শরীরের কম্প হয় এবং মুখ হইতে কথা নির্গত হয় না ইহারও সেইমত দেখিতেছি, অতএব বুঝিলাম ইনি যাত্রা করিতে আসিয়াছেন, কহিতে পারেন না।”

    ইহার পর রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় কর্ত্তৃক প্রণীত মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের চরিত্র উল্লেখযোগ্য। ইহা ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে প্রথমে শ্রীরামপুরে ও পরে ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে লণ্ডনে মুদ্রিত হয়। বাঙ্গালী ভাষায় ইংরেজীধরণে বাঙ্গালা জীবনী, বোধ হয় ইহাই প্রথম। ইহার ভাষা সরল ও সহজ; পরস্তু ইহাতে অধিকতর পুষ্টিরও পরিচয়; কিন্তু শব্দ-লালিত্যের বড়ই অসদ্ভাব। নমুনা এই,—

    “তাহাতে পাত্র নিবেদন করিলেন, মহারাজ, আমরা পুরুষানুক্রমে এ রাজ্যের পাত্র, কিন্তু স্বৰ্গীয় মহারাজা বা আর আর প্রকার সুখ্যাতি করিয়াছেন, যজ্ঞ কেহ করেন নাই। মহারাজ এই বাক্য শ্রবণ করিয়া পাত্রকে কহিলেন আমি অতি বৃহৎ যজ্ঞ করিব, তুমি আয়োজন কর।”

    ইহার পর এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের “বাসুদেব চরিত” প্রকাশিত হইবার পূর্ব্বে রামজয় তর্কালঙ্কার প্রণীত “সাংখ্য ভাষা-সংগ্রহ”, লক্ষ্মীনারায়ণ ন্যায়ালঙ্কার প্রণীত “মিতাক্ষরাদপর্ণ,” কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন প্রণীত “ন্যায়-দর্শন,” “পুরুষ-পরীক্ষা,” “হিতোপদেশ”, “জ্ঞান-চন্দ্রিকা,” “প্রবোধ-চক্রিকা” পুস্তক প্রকাশিত হয়। ইহার মধ্যে “পুরুষ-পরীক্ষা,” “হিতোপদেশ,” “প্রবোধ-চন্দ্রিকা,” প্রভৃতি ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পাঠ্য ছিল।9 এই কয়খানি পুস্তক প্রায় এক প্রণালীতে লিখিত, তবে ইহাদের ভাষা পূর্ব্বোক্ত পুস্তকের ভাষা অপেক্ষা পুষ্টতর, লিপি পদ্ধতি বিশুদ্ধতর, সংস্কৃত শব্দ-প্রয়োগ বহুল। বাক্যাড়ম্বরে ও দুরান্বয়তা হেতু জটিল, নীরস ও সন্ধি প্রয়োগদোষে শ্রুতি-কঠোর। শ্রুতিসুখকারিতার জন্যই তো সন্ধি-নিয়ম। সকল পুস্তকের ভাষা-নমুনা উদ্ধার করিবার স্থান হইবে না। “পুরুষ-পরীক্ষা” হইতে একটু নমুনা দিলাম,—

    “বঞ্চক কহিতেছে, তো রাজকুমায় আমি স্বাভাবিক লুব্ধ বণিক্ তোমার ধন লইয়া বাণিজ্যার্থে বৃহন্নৌকারোহণ করিয়া সাগর-পারে গিয়াছিলাম। সেখানে ক্রীতবস্তু বিক্রয় করিয়া মূল ধন হইতে একশত গুণ লাভ পাইয়া তথা হইতে আসিতে সমুদ্রের তটের নিকটে আমার বৃহত্তরণী মগ্ন হইল, তাহাতেই আমার সকল ধন নষ্ট হইল, এখন প্রাণমাত্রাবশিষ্ট হইয়া আসিয়াছি। সে যাহা হউক, আমি পুর্ব্বে তোমার নিকট অপরাধ করিয়াছি, তন্নিমিত্ত তুমি আমার প্রাণদণ্ড কর।”

    এখানে আর একখানি পুস্তক উল্লেখযোগ্য। এ খানি জন্‌সন্‌কৃত “রসলাসে”র অনুবাদ। ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে মহারাজ কালীকৃষ্ণ বাহাদুর কর্ত্তৃক অনুবাদিত ও প্রকাশিত হয়। ইহার ভাষা জটিল; পরন্তু ইহা শব্দালঙ্কারপূর্ণ। ভাষা অশুদ্ধ নহে; তবে ব্যাকরণ ও অলঙ্কারের অসামঞ্জস্য এবং অন্বয়ের দোষ আছে। সেই জন্য জটিল। নমুনা এই,—

    “ইমলাক উত্তর করিলেন, সুখ দুঃখের কারণ নানাবিধ এবং অনিশ্চিত আর সদা পরস্পর ক্লান্ত এবং নানাসম্বন্ধে চিত্রবিচিত্র ও অপূর্ব্ব নানাঘটনাধীন হয়। অতএব যিনি আপনাকে অতি নির্ব্বিবাদে নির্দ্ধারিত করেন, তিনি অবশ্য জীবিত থাকিয়া, বিবেচনার ও অনুসন্ধানে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইবেন।”

    ভাষার যে নমুনা দিলাম, ইহাতে ১৮০০ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভ হইতে ১৮৪০ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা গদ্যের যে কয়টা ক্রম হইয়াছে, পাঠক তাহার কতক আভাস পাইলেন। প্রথম ক্রম,— পাদরীদের লেখা। দ্বিতীয় ক্রম—এদেশীয় লেখকদের লিখিত “তোতা ইতিহাস,” “লিপিমালা,” “রাজাবলী,” “কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের চরিত্র”, “বত্রিশ সিংহাসন” প্রভৃতি; তৃতীয় ক্রম—ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পাঠ্য পুস্তক,—“পুরুষ-পরীক্ষা,” “হিতোপদেশ” প্রভৃতি। তিনটী ক্রমেই পুষ্টতরতার পরিচয়। এখন পাঠক বুঝুন, “বাসুদেব চরিতের” ভাষা আরও কত পুষ্টতর। ইহার প্রণালী-পথ সম্পূর্ণ নূতন। এমন বিশুদ্ধ ও সুখবোধ ভাষা পূর্ব্বে কোন গ্রন্থেই ছিল কি? বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষার সরলতা ও সুখবোধতার প্রমাণ স্বরূপ পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয় একটি রহস্যজনক দৃষ্টান্ত দিয়াছেন,—

    “এক সময়ে কৃষ্ণনগর রাজবাটীতে স্থানীয় কোনও বিষয়ের বিচার হয়। সিদ্ধান্ত স্থির হইলে একজন পণ্ডিত তাহা বাঙ্গালায় লেখেন। সেই রচনা শ্রবণ করিয়া একজন অধ্যাপক অবজ্ঞা প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিয়াছিলেন,—এ কি হয়েছে? এ যে বিদ্যাসাগরী বাঙ্গালা হয়েছে। এ যে অনায়াসে বোঝা যায়।”

    ভাষা পুষ্টিকারিত্বের কৃতিত্ব বিদ্যাসাগরের অনুবাদে আরম্ভ। বিলাতের জন্‌সন্, মিল্টন্, স্কট্, কার্‌লাইল্ প্রভৃতি প্রায় সকল প্রতিপত্তিশালী লেখককে প্রথম প্রথম অনুবাদে হাত পাকাইতে হইয়াছিল। অনুবাদ হউক, “বাসুদেব-চরিতে” উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় আছে। প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধ বাঙ্গালায় কিরূপে অবিকল সুন্দর অনুবাদ করিতে হয়, বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহার পথ দেখাইলেন। তবে “বাসুদেব-চরিতের” অনুবাদের ভাষা ও লিপিভঙ্গী অপেক্ষা তাঁহার পরবর্ত্তী অনুবাদ ও প্রবন্ধাদির লিপিভঙ্গী যে অধিকতর পরিমার্জ্জিত ও বিশুদ্ধীকৃত হইয়াছে, তৎপক্ষে সন্দেহ নাই। Voyage to Abysinia (ভয়েজ টু আবিসিনিয়া) নামক গ্রন্থের জন্‌সন্ সর্ব্বপ্রথম যে গদ্যানুবাদ করিয়াছিলেন, তাহার লিপিপদ্ধতির সহিত তৎকৃত পরবর্ত্তী পুস্তকাদির লিপি পদ্ধতির তুলনা করিলে যেমন তারতম্য অনুভূত হয়, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পরবর্ত্তী গ্রন্থাদির লিপিপদ্ধতির সহিত এ অনুবাদের লিপিপদ্ধতির তুলনা করিলে তেমনই তারতম্যবোধ হইবে।

    বঙ্গভাষার যতই উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি হউক, বঙ্গবাসীকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট চিরঋণী থাকিতে হইবে। তাঁহার লিপিভঙ্গী ও বাগ্‌বিন্যাস-চাতুরী যেন “নিতুই নব।” অবিকল অনুবাদ হইয়াছে; কিন্তু ভাবভঙ্গ আদৌ হয় নাই।

    স্বল্পাক্ষরে যিনি বহু ভাব প্রকাশ করিতে পারেন, তিনি শক্তিশালী লেখক বলিয়া পরিচিত। ভাব-পূর্ণ সংযমিত শব্দ-প্রয়োগে যিনি নিপুণ, তিনি সুলেখক নামে প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের যে এ প্রতিষ্ঠা আছে, তাহা তাঁহার ভাষান্তরিত ও প্রণীত পুস্তক এবং অন্যান্য ভাষান্তরিত ও সঙ্কলিত পুস্তকাবলীর মুখবন্ধ, প্রস্তাবনা প্রভৃতি পাঠ করিলে সহজে উপলব্ধ হয়।

    অনুবাদে এবং লিপিচাতুর্য্যে অক্ষয়কুমার দত্তেরও কৃতিত্ব কম নহে। ভাষার পরিশুদ্ধি ও সুপদ্ধতি সম্বন্ধে অক্ষয়কুমার বিদ্যাসাগরের সমকক্ষ; তবে বিদ্যাসাগরের ন্যায় অক্ষয়কুমারের ভাষায় বৈচিত্র্য নাই, বিদ্যাসাগরের ভাষা একসুরে বাঁধা, কিন্তু তাহাতে রাগালাপের বৈচিত্র্য বহুল। এ ভাষায় খেয়াল, ধ্রুপদ, টপ্পা, চুট্‌কী সবই আছে। অক্ষয়কুমার দত্তের ভাষা এক সুরে বাঁধা, কিন্তু ইহাতে রাগালাপের বৈচিত্র্য নাই। বিদ্যাসাগরের ভাষায় মৃদঙ্গ, তবলা, ঢোল, খোল সকল যন্ত্রের তাল পাইবে; অক্ষয়কুমারের ভাষায় কেবল মৃদঙ্গের আওয়াজ।

    যাহা হউক, “বাসুদেব-চরিতের” ন্যায় উপাদেয় পাঠ্যও ফোর্টউইলিয়ম্ কলেজের কর্ত্তৃপক্ষ কর্ত্তৃক পরিত্যক্ত হইয়াছিল। খৃষ্টান সাহেবেরা এ পুস্তকের অনুমোদন করেন নাই; তজ্জন্য দুঃখ নাই; দুঃখ এই, একখানি সুপাঠ্য পুস্তকে হিন্দুসন্তানেরা বঞ্চিত হইয়াছেন; দুঃখ এই, বিদ্যাসাগর মহাশয় এইরূপ ভগবানের অবতার-প্রতিপাদক পুস্তক আর লেখেন নাই। চিরকাল কিছু তাঁহাকে সাহেব সিবিলিয়নদের জন্য পাঠ্য লিখিতে হয় নাই। প্রবৃত্তি ও ইচ্ছা থাকিলে তিনি হিন্দুসন্তানদের জন্য এইরূপ পরকালের শিক্ষণীয় সুপাঠ্য পুস্তক লিখিতে পারিতেন। তিনি সাহেবদের জন্য এরূপ গদ্য লেখেন নাই, হিন্দু-সন্তানদের জন্যই বা লিখিয়াছেন কৈ? সে প্রবৃত্তি বা ইচ্ছা থাকিলে ভাষা-সম্পদ্ সীতার বনবাসেও তাহার পরিচয় পাইতাম। আরও দুঃখের বিষয়, “বাসুদেব-চরিত” মুদ্রিত হয় নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় জীবিতাবস্থায় এ পুস্তক মুদ্রিত করিবার জন্য ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু সে সময় তিনি পুস্তকের পাণ্ডুলিপি খুঁজিয়া পান নাই। তাঁহার পুত্র নারায়ণ বাবু ঐ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি অনেক কষ্টে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছেন। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের ব্রহ্মত্ব-প্রতিপাদিনী আদ্যন্ত লীলা-কথা সম্বন্ধে এক হিন্দী প্রেমসাগর10 ভিন্ন বাঙ্গালায় এমন সুললিত গদ্য আর দ্বিতীয় নাই। আমরা নারায়ণবাবুর নিকট পুস্তকের জীর্ণ পাণ্ডুলিপি দেখিয়াছি। ইহাতে কোন বৎসর বা তারিখের উল্লেখ নাই, ১৮৪২ খৃষ্টাব্দ এবং ১৮৪৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে যে কোন সময়ে ইহা লিখিত হইয়াছিল।

  • অষ্টম অধ্যায়

    অষ্টম অধ্যায়

    অষ্টম অধ্যায়
    প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তি, বাঙ্গালা চিঠি, শিক্ষা-বিভাগের পরিবর্ত্তন, পিতার কার্য্য-ত্যাগ, বাসার অবস্থা, সহৃদয়তার পরিচয়, প্রতিশ্রুতি-পালন, চলচ্ছক্তির প্রমাণ, বীরসিংহে কৌতুক, দুর্ব্বলে দয়া, মাতৃ-ভক্তি, সংস্কৃত-রচনা, তেজস্বিতা, পদ-পরিবর্ত্তন ও গুণগ্রাহিতা।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে চাকুরি করিবার পূর্ব্বে পাঠ্যবস্থাতেও বিদ্যাসাগর মহাশয়, নিজ-গুণগ্রামে শিক্ষাবিভাগের কর্ত্তৃপক্ষের প্রীতিপাত্র হইয়াছিলেন। তখনও তাঁহার অনেকটা প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তি হইয়াছিল। তাই, তিনি দর্শন-পাঠকালে অধ্যাপক পণ্ডিত নিমচাঁদ শিরোমণি মহাশয়ের মৃত্যু হওয়ায়, চেষ্টা করিয়া পণ্ডিত জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চাননকে তৎপদে অধিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে তাঁহার প্রতিপত্তি অধিকতর পরিবর্দ্ধিত হইয়াছিল। মার্সেল সাহেব তাঁহাকে বড় শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় কোন বিষয়ের জন্য অনুরোধ করিলে তিনি তৎসাধনে কৃতকার্য্য না হইয়া ক্ষান্ত হইতেন না।

    এই সময় সংস্কৃত কলেজের দুই জন ব্যাকরণাধ্যাপকের পদ শূন্য হয়। তখন বাবু রসময় দত্ত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ঐ পদের প্রার্থী হইয়াছিলেন।9 ইনি তখন কলেজের পাঠ সমাপ্ত করিয়াছিলেন। ঐ পদের জন্য কিন্তু একটা পরীক্ষা দিবার ব্যবস্থা হইয়াছিল। বিদ্যাভূষণ মহাশয় পরীক্ষা দিয়া প্রথম হইয়াছিলেন। কি কারণে বলা যায় না, রসময় দত্ত ইঁহাকে সেই পদটী না দিয়া তাড়াতাড়ি পুস্তকালয়ের অধ্যক্ষপদে নিয়োজিত করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়, এ কথা মার্সেল্ সাহেবকে অবগত করান। মার্সেল্ সাহেব তদানীন্তন “এডুকেশন্ কৌন্সিলের” সেক্রেটরী ডাক্তার মৌয়েটকে ঐ কথা বলেন। মৌয়েট্ সাহেব রসময় বাবুর বন্দোবস্ত বিপর্য্যস্ত করিয়া দিয়া বিদ্যাভূষণ মহাশয়কে ঐ পদে নিযুক্ত করেন।11

    পণ্ডিতবর ৺রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয়, স্বীয় বাঙ্গালা ভাষার “সাহিত্য-বিষয়ক প্রস্তাব” নামক পুস্তকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতিপত্তি-সম্বন্ধে এইরূপ লিখিয়াছেন,—

    “মার্সেল্ সাহেব বিদ্যাসাগরের সহিত যত ঘনিষ্ঠ হইতে আরম্ভ করিলেন, ততই তাঁহার বিদ্যা, বুদ্ধি, চরিত্র, তেজস্বিতা, উদারতা প্রভৃতি সন্দর্শনে যৎপরোনাস্তি প্রীত হইতে লাগিলেন। তদবধি সকল বিষয়েই বিদ্যাসাগরের কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতেন এবং তদীয় মত গ্রহণ ব্যতিরেকে প্রায় কোন কর্ম্ম করিতেন না। ঐ সময়ে ডাক্তার মৌয়েট্ সাহেব এডুকেশন কৌন্সিলের সেক্রেটরী ছিলেন। তিনি সময়ে সময়ে সংস্কৃত বিদ্যা ও হিন্দুধর্ম্মসংক্রান্ত কোন কথা জানিবার প্রয়োজন হইলে মার্সেল্ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেন; মার্সেল্ সাহেব, বিদ্যাসাগর দ্বারা মৌয়েট্ সাহেবের জিজ্ঞাস্য বিষয়ের মীমাংসা করিয়া লইতেন। এই সূত্রে মৌয়েট্ সাহেবের সহিত বিদ্যাসাগরের পরিচয় হয়। তদবধি ইনি বিদ্যাসাগরের প্রতি অত্যন্ত সন্মান ও বিশ্বাস করিতেন। ক্রমে ক্রমে তাঁহার পরমাত্মীয় ও যারপর নাই হিতৈষী হইয়া উঠিয়াছিলেন।”

    মার্সেল্ সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট সংস্কৃত পড়িতেন। তিনি বেশ বাঙ্গলা শিখিয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গে বাঙ্গালায় কথাবার্ত্তা কহিতে ভালবাসিতেন। আবশ্যক হইলে বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহাকে বাঙ্গালায় চিঠিপত্র লিখিতেন। এক বার তাঁহার বাড়ীতে আত্মীয়ের অসুখ হওয়ায়, তিনি কার্য্যে উপস্থিত হইতে পারেন নাই। এই কথা বলিয়া বাঙ্গলায় চিঠি লিখিয়া পাঠাইয়া দেন, চিঠিখানি এইখানে প্রকাশ করিলাম,—

    শ্রীশ্রীদুৰ্গা

    শরণং।

    সবিনয় নিবেদনং—

    অদ্য আমার পিতৃব্যপুত্ত্রের প্রাতঃকালাবধি চারি বার ভেদ হইয়াছে ২০ ড্রপ্ লডেনম্ দেওয়াতে আপাততঃ প্রায় এক ঘণ্টা ভেদ বন্ধ রহিয়াছে কিন্তু একেবারে নিবৃত্ত হইয়াছে এমত বোধ হয় না অতএব তাঁহার নিকটে থাকা অত্যাবশ্যক। সুতরাং অদ্য যাইতে পারিলাম না ত্রুটিমার্জ্জনে আজ্ঞা হয়। কিমধিকমিতি ২৮ নবেম্বর ১৮৪৩

    আজ্ঞাবর্ত্তিনঃ

    শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মণঃ।

    এ পত্রের শিরোভাগে “শ্রীশ্রীদুৰ্গা শরণং” লেখা আছে। ইহা বিশ্বাস, কি অভ্যাসের ফল, ঠিক করিয়া তাহা বলিবার উপায় নাই। তবে তখনকার পক্ষে বিশ্বাসের ফল বলিয়া একেবারে অবিশ্বাস করাও যাইতে পারে না। তখনও ত তিনি অবিমিশ্র সংস্কৃত শিক্ষারই ফলভোগী ছিলেন। তবে ইহার পরবর্ত্তী কালে যখন তিনি ইংরেজী-বিদ্যায় বুৎপন্ন হইয়া ইংরেজী-ভাষাদৰ্শিত শিক্ষা-প্রণালীর পূর্ণমাত্রায় পোষকতা করিতেছিলেন, যখন হিন্দুচিত ক্রিয়ানুষ্ঠানে বিরত ছিলেন, তাঁহার কোন কোন চিঠিপত্রের শিরোনামেও “শ্রীদুৰ্গা শরণং” বা “শ্রীশ্রীহরিঃ সহায়ঃ” দেখা যায়। কোন সময়ে তিনি একবার সুকিয়া ষ্ট্রীট নিবাসী ডাক্তার চন্দ্রমোহন ঘোষের বাড়ীতে বসিয়া পাইকপাড়ার রাজবাটীতে এক পত্র লিখিয়াছিলেন। পত্র লেখা হইলে পর চন্দ্রমোহন বাবু একবার পত্র খানি দেখিতে চাহিলেন। ইহাতে বিদ্যাসাগর মহাশয় হাস্য করিয়া বলিলেন,—“তুমি যাহা ভাবিতেছ, তাহা নহে; এই দেখ, শ্রীশ্রীহরিঃ সহায়ঃ লিখিয়াছি।” ইহাতে মনে হয়, তিনি যে কারণে চটি জুতা পায়ে দিতেন, থান-ধুতি, মোটা চাদর পরিতেন, ভট্টাচার্য্যের মতন মাথা কামাইতেন, সেই কারণেই পত্রের শিরোভাগে ঐরূপ লিখিতেন। ইহাকে হয় তো তিনি বাঙ্গালীর জাতীয়ত্বের একটা অঙ্গ মনে করিতেন।

    এ পত্রের আর একটা বিশেষত্ব আছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের গ্রন্থাদিতে অধুনা ভূরি ভুরি ইংরাজী মতানুযায়ী বিরামচিহ্নাদি দেখিতে পাওয়া যায়, এ পত্রে তাহার একটীমাত্র নাই।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের চাকুরীতে প্রবৃত্ত হইবার পরই, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তদানীন্তন শিক্ষাবিভাগের একটা বিশিষ্ট পরিবর্ত্তন দেখিতে হয়। শিক্ষাবিভাগের সহিত তাঁহার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ সংঘটিত হইয়াছিল। শিক্ষাবিভাগের অধীন হইয়া তন্মতানুসারে তাঁহাকে শিক্ষাপ্রণালীর অনেক প্রবর্ত্তন ও পরিবর্ত্তন করিতে হইয়াছিল। এরূপ অবস্থায় শিক্ষাবিভাগের কি ছিল, কি পরিবর্ত্তন হইয়াছিল, তাহার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ বলিয়া রাখা ভাল। পরিবর্ত্তনে শিক্ষণ-প্রণালীর কিরূপ তারতম্য হইয়াছিল, তাহাও কতকটা বুঝিয়া রাখা উচিত।

    ইতিপূর্ব্বে শিক্ষাবিভাগের পরিচালন-ভার, “কমিটী অব পব্‌লিক ইনষ্ট্রক্‌শন্” নাম্নী সভার হস্তে বিন্যস্ত ছিল। এই সভা ১৮২৩ খৃষ্টাব্দে বা ১২৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সভা প্রতিষ্ঠিত হইবার পর, ১২ বৎসর প্রাচ্যশিক্ষাপ্রচলনকারী এবং পাশ্চাত্যশিক্ষা প্রবর্ত্তনপ্রয়াসীদের দ্বন্দ্ব চলিতেছিল। শেষে মেকলের মতামত প্রভাবে প্রথমোক্ত দলের পরাভব হয়। ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে বা ১২৪৬ সালে তদানীন্তন গবর্ণর লর্ড অক্‌লণ্ডের এই মর্ম্মে এক “মিনিট” প্রকাশিত হয়,—“ইয়ুরোপীয় সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের শিক্ষা ইংরাজীতে হইবে বটে; তবে বর্ত্তমান প্রাচ্য বিদ্যালয়গুলিও পুরা দমে চলিবে। ইংরাজীতে ছাত্রদিগকে যেমন উৎসাহ দেওয়া যাইতে পারে, প্রাচ্য-বিদ্যার্থীদিগকেও সেইরূপ উৎসাহ দেওয়া হইবে; পরন্তু ইংরাজীর সঙ্গে এ দেশীয় ভাষার শিক্ষা চলিবে; যে যাহা পছন্দ করে সে তাহাই শিখিবে।” অতঃপর “কমিটী অব্ পাবলিক্ ইন্‌ষ্ট্ৰক্‌শন” এই শিক্ষা-প্রণালীর পর্য্যালোচনার প্রতি দৃষ্টি রাখিলেন। ইহার পর ইংরাজী শিক্ষার বেগ খরতর হইয়াছিল। ইতিপূর্ব্বে ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে বা ১২৪২ সালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদত্ত হয়। ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দে বা ১২৪৪ সালে আদালত হইতে পার্সী ভাষা উঠিয়া যায়। এদেশীয় বিচারকর্ত্তাদের উপর অধিকতর বিস্তৃত ভাবে কার্য্যভার অর্পিত হয়। সুতরাং নূতন শিক্ষা-প্রণালীর কার্য্যও প্রশস্ততর হইতে থাকে। কমিটী বাঙ্গালাকে নয়টী সার্কেলে অর্থাৎ অংশে বিভক্ত করেন। প্রত্যেক ভাগে একটা করিয়া কলেজ বসান হইয়াছিল।12 প্রত্যেক ভাগের অন্তর্ভূত প্রত্যেক জেলায় একটা ইংরাজী-বাঙ্গালা স্কুল প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছিল। ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে বা ১২৫৯ সালে কমিটী শিক্ষা-বিভাগের ভার অধিকতর শক্তিশালিনী সভা “কৌন্সিল অব এডুকেশনের” উপর অর্পণ করেন। এই কৌন্সিলের অধীনে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে অনেক কার্য্য করিতে হইয়াছিল। পরবর্ত্তী ঘটনায় কৌন্সিলের কার্য্যকলাপের ফল উদ্ঘাটিত ও আলোচিত হইবে।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কার্য্যকালে, ১৮৪৪ খৃষ্টাব্দে বা ১২৫১ সালে তদানীন্তন বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ বাঙ্গালা ভাষা-শিক্ষার নিমিত্ত পাশ্চাত্য বিদ্যালয়ের আদর্শে গঠিত বাঙ্গালা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। চারি বৎসরের মধ্যে এইরূপ একশত একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এই সব বিদ্যালয়ের সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সম্পর্ক ছিল। এই সকল বিদ্যালয় বাঙ্গালা ভাষার প্রসার-প্রবর্ত্তনের জন্য সৃষ্ট হয়; পরস্তু বাঙ্গালা পাঠ্যে বিজাতীয় ভাব-প্রণোদনের সম্পূর্ণ সহায় হইয়াছিল। সেইজন্য এই সমস্ত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা-কথাটা এইখানে বলিয়া রাখিলাম।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের কার্য্যকালে একদিন পথে পিতা ঠাকুরদাসের কি একটা দুর্ঘটনা উপস্থিত হয়। কাহারও কাহারও মুখে শুনি, অশ্বের পদাঘাতে তিনি আহত হন; কিন্তু এ কথার সত্যতা সম্বন্ধে কেহই দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত নহেন। যাহা হউক, এই সময় বিদ্যাসাগর মহাশয় পিতাকে কর্ম্ম পরিত্যাগ করিতে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন,—“বাবা! এখন তো আমি মাসে ৫০৲ পঞ্চাশ টাকা পাইতেছি, স্বচ্ছন্দে সংসার চলিবে, আপনি আর কেন পরিশ্রম করেন? আপনি দেশে গিয়া থাকুন।”

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিতান্ত অনুরোধে পিতা ঠাকুরদাস কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া দেশে যাইয়া বিশ্রাম করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহাকে মাসে মাসে ২০৲ কুড়ি টাকা পাঠাইয়া দিতেন এবং নিজের বাসায় ৩০৲ ত্রিশ টকা খরচ করিতেন। এই সময় বাসায় তাঁহার দুই সহোদর, দুই জন পিতৃব্যপুত্র, দুই জন পিসতুতো ভাই, এক জন মাসতুতে ভাই এবং অনুগত ভৃত্য স্ত্রীরাম নাপিত, এই কয়জনের অবস্থিতি হইত।13 এতদ্ব্যতীত দুই চারি জন অতিরিক্ত লোক ও প্রায়ই দুই বেলা আহার পাইত। বাসার সকলকেই পর্যায়ক্রমে রন্ধন করিতে হইত। বিদ্যাসাগর মহাশয় ও রন্ধন করিতেন। তা না করিলে কি ৩০৲ ত্রিশ টাকায় এতগুলি লোকের অন্নসংস্থান হয়? বিদ্যাসাগরের নিকট কি শিখিবার বস্তু ছিল ও আছে, পাঠক! তাহা বুঝিতে কি এখনও বাকি রহিল? ৫০৲ পঞ্চাশ টাকা-বেতনভোগী বাঙ্গালীর মধ্যে এরূপ কৃচ্ছসাধ্য ব্যবস্থা কয় জনের দেখিতে পাও?

    এই সময়ে মার্সেল্ সাহেব সংস্কৃত কলেজের “জুনিয়র্” ও “সিনিয়র্” পরীক্ষার পরীক্ষক হন। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সংস্কৃত প্রশ্ন প্রস্তুত করিয়া সাহেবের সাহায্য করিতে হইত। ব্যাকরণ, কাব্য, স্মৃতি, বেদান্ত প্রভৃতি সকল প্রশ্ন তিনি নিজেই লিখিয়া দিতেন। ভাবি তাই একটা মানুষ এত কাজ কি করিয়া করিতেন? ভাবি, আর মুহুর্ত্তে মুহুর্ত্তে বিস্ময়বিমূঢ় হইয়া পড়ি। কিন্তু আবার যখন বিলাতের বিখ্যাত রাজনীতিজ্ঞ কব্‌ডেনের কথা মনে হয়— “আমি ঘোড়ার মতন এক মুহূর্ত্ত বিশ্রাম না করিয়া খাটিতেছি”; যখন ভাবি,— “রোমক সম্রাট্ সীজর্ আল্পস্ হইতে সৈন্য সঞ্চালন করিবার সময় লাটীন অলঙ্কারশাস্ত্র সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন,”—তখনই মনকে প্রবোধ দিই, শক্তিশালী ব্যক্তির ইহ জগতে অসাধা কি? এই গুণে তো পশুর উপর মনুষ্যের রাজত্ব; সামান্যের উপর অসামান্যের প্রভুত্ব।

    পাঠ্যাবস্থায় যখন সামান্য বৃত্তি পাইতেন, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহা হইতেও অন্নার্থী ও বস্ত্রার্থীকে সাধ্যানুসারে অন্ন-বস্ত্র দান করিতেন। এখন তিনি ৫০৲ পঞ্চাশ টাকা বেতনভোগী। ২০৲ কুড়ি টাকা পিতার নিকট পাঠাইতেন, আর ৩০৲ ত্রিশ টাকা মাত্র বাসা খরচের জন্য রাখিতেন। এই ৩০৲ ত্রিশ টাকার মধ্যেও তিনি বাসাখরচ চালাইয়া, আবশ্যকমত সাধ্যানুসারে অন্নবস্ত্রার্থী এবং পীড়িত ব্যক্তির সাহায্য করিতেন।

    ১৮৪৩ খৃষ্টাব্দে বা ১২৫০ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক গঙ্গাধর তর্কবাগীশের বিসূচিকা পীড়া হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয় সংবাদ পাইয়া, ডাক্তার দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে সঙ্গে লইয়া তর্কবাগীশ মহাশয়ের বাসায় উপস্থিত হন। ডাক্তার তাঁহার চিকিৎসা করেন এবং বিদ্যাসাগর নিজ হস্তে মলমূত্র পরিষ্কার করিয়া দেন। তিনি নিজে ঔষধের মূল্য দিয়াছিলেন। কোন অনাথ দুঃস্থ লোক পীড়িত হইলে, তিনি স্বয়ং গিয়া তাহার সেবা-শুশ্রুষা করিতেন এবং তাহাকে বাঁচাইবার জন্য নিজের ব্যয়ে সাধ্যানুসারে ঔষধ-পথ্য যোগাইতেন।

    একবার নারিকেল-ডাঙ্গায় অধ্যাপক জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চাননের ভাগিনেয় ঈশানচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের ওলাউঠা হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয় রাত্রিকালে তথায় উপস্থিত হইয়া তাহার চিকিৎসা করান। তিনি নিজের বাসা হইতে মাদুর-বিছানা লইয়া গিয়া রোগীর শয্যার ব্যবস্থা করিয়া দেন। রাজকৃষ্ণ বাবু বলেন, “তাঁহাকে প্রায়ই এইরূপ করিতে হইত। তাঁহার সে অকৃত্রিম দয়ার কার্য্য—কি সব আমার স্মরণ আছে? আর কতই বা বলিব মহাশয়, আর কতই বা শুনিবেন? সে সব কথা স্মরণ হইলে সেই দয়াবতারের সেই করুণ মূর্ত্তি হৃদয়ে জাগরূক হয়। তাঁহার কথা ভাবিলে বুক ফাটিয়া যায়! চক্ষের জল রাখিতে পারি না! আহা! তেমন দয়ালু দাতা কি আর এ জগতে দেখিব?”

    একবার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাসার সম্মুখে কোন এক ব্যক্তির ভৃত্য ওলাউঠা-রোগাক্রান্ত হয়। যাহার ভৃত্য, তিনি তাহার হাত ধরিয়া তাহাকে রাস্তায় বাহির করিয়া দেন। আহা! সে অনাথ পীড়িতের এমন কেহই ছিল না যে, তাহার মুখে একটু জল দেয়। দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর সংবাদ পাইয়া তখনই গিয়া পীড়িত ভৃত্যকে বুকে করিয়া তুলিয়া আনিয়া, আপনার শয্যায় শয়ন করাইয়া দেন। তাঁহার অবিরাম যত্ন-শুশ্রুষায় এবং সুহৃদ্‌-চিকিৎসকের চিকিৎসায় রোগী দুই চারি দিনের মধ্যে আরোগ্য লাভ করে।

    বিদ্যাসাগর মহাশয় সুবিধা পাইলেই আত্মীয় বন্ধু-বান্ধব এবং গুণবান্ কৃতবিদ্য লোকের চাকুরি করিয়া দিতেন। কোন কোন সময়ে তিনি অপরের জন্য ক্ষতিস্বীকার করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। এই সময় সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের প্রথম শ্রেণীর অধ্যাপকের পদ শূন্য হয়। মার্সেল্ সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ঐ পদ গ্রহণ করিতে অনুরোধ করেন। ঐ পদের বেতন ৮০৲ আশী টাকা। পঞ্চাশ টাকার বেতনভোগী বিদ্যাসাগর ঐ পদ-গ্রহণে অসম্মত হন। তাহার কারণ এই—

    তিনি পূর্ব্বে তৎকালিক বহু-শাস্ত্রাধ্যাপক তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয়কে যেরূপেই হউক কোন একটি চাকুরি করিয়া দিব বলিয়া প্রতিশ্রুত ছিলেন এবং উপস্থিত পদে তর্কবাচস্পতি মহাশয় উপযুক্ত ব্যক্তি বলিয়া তাঁহার ধারণা ছিল। সুযোগ পাইয়া তিনি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করিবার চেষ্টা পাইলেন। এই পদে তর্কবাচস্পতি মহাশয় যাহাতে নিযুক্ত হন, তাহার জন্য তিনি মার্সেল্ সাহেবকে অনুরোধ করেন। বিদ্যারত্ন মহাশয় লিখিয়াছেন, “যখন সাহেব, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে এই পদ গ্রহণ করিবার জন্য অনুরোধ করেন, তখন তিনি বলেন, মহাশয়, টাকার প্রত্যাশা করি না, আপনার অনুগ্রহ থাকিলেই, আমি চরিতার্থ হইব।” বিদ্যাসাগর মহাশয় এরূপ চাটুবাক্য প্রয়োগ করিবেন, তাঁহার জীবন-সমালোচনা করিলে এরূপ সিদ্ধান্ত করিতে সাহস হয় না। কেহ কেহ বলিতে পারেন যে, প্রকৃত প্রতিশ্রুতির কথা বলিলে সাহেব হয়তো তাঁহাকে অহঙ্কারী মনে করিবেন, সুতরাং কথা রক্ষার সম্ভাবনা থাকিবে না, তাই তিনি সাহেবকে এইরূপ তুষ্টিকর কথা বলিয়াছিলেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর আত্মগোপন করিয়া সাহেবের তুষ্টিকর কথা বলিবেন, এ কথায় বিশ্বাস করিতে কাহারও প্রবৃত্তি হইবে না; আর মার্সেল্ সাহেবও আত্মতুষ্টিকর কথায় বিমূঢ় হইয়া পড়িবেন, এ ধারণাও আমাদের নাই। যাহা হউক, মার্সেল্ সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথায় তর্কবাচস্পতি মহাশয়কেই উক্ত পদে নিযুক্ত করিতে চাহেন। যে দিক্ দিয়াই হউক, ইহা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্বার্থত্যাগের সজীব সঙ্কেত। এরূপ প্রলোভন পরিত্যাগ করিতে একটু হৃদয়-বলের প্রয়োজন। জর্ম্মণ পণ্ডিত হীনের জীবনী-পাঠে তদানীন্তন মনস্বী রঙ্কিনের এইরূপ স্বার্থত্যাগের পরিচয় পাওয়া যায়। রঙ্কিনকে একবার একটী উচ্চ পদ দিবার প্রস্তাব হয়, তিনি কিন্তু হীনকে ঐ পদের উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া উক্ত পদ তাঁহাকেই দিবার জন্য অনুরোধ করেন। এই ব্যাপার কেবল বিদ্যাসাগরের স্বার্থত্যাগের পরিচয় নহে; প্রতিশ্রুতি-রক্ষা করিতে তাঁহাকে কিরূপ কঠোরতা সহ্য করিতে হইয়াছিল, তাহারও প্রমাণ পাইবেন।

    যে সময়ে তর্কবাচস্পতি মহাশয়কে নিযুক্ত করিবাব কথা হয়, সেই সময়ে তর্কবাচস্পতি মহাশয় অম্বিকা কাল্‌নায় অবস্থিতি করিয়া তেজারতীর “কারবার” করিতেছিলেন; এতদ্ব্যতীত তথায় তাঁহার একটী টোলও ছিল। তাঁহাকে সোমবারে প্রয়োজন; কিন্তু শনিবারে কথা হয়। পত্র পাঠাইলে সময়ে পত্র পৌঁছিবার সম্ভাবনা নাই; পৌঁছিলেও তর্কবাচস্পতি মহাশয় এ কার্য্য স্বীকার করিবেন কি না, তাহার স্থিরতা ছিল না। এই জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই দিনই একজন আত্মীয়কে সঙ্গে লইয়া কালনাভিমুখে যাত্রা করেন। কলিকাতা হইতে কালনা ২৪-২৫ ক্রোশ দূর। তিনি ও সেই সঙ্গী আত্মীয় সারারাত পদব্রজে চলিয়া পরদিন তর্কবাচস্পতি মহাশয়ের বাটীতে উপস্থিত হন। তর্কবাচস্পতি ও তাঁহার পিতাঠাকুর বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুখে তাঁহার গমন কারণ জানিয়া চমৎকৃত হইলেন এবং শতবার ধন্যবাদ করিলেন। প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য বিদ্যাসাগর অনায়াসে ও অক্লেশে এত পথ শ্রম সহ্য করিয়াছেন এ কথা ভাবিয়া তাঁহারা বিস্ময়-বিহ্বলচিত্তে স্পষ্টাক্ষরে বলিলেন—“ধন্য বিদ্যাসাগর! তুমিই নরাকারে দেবতা।” যাহা হউক, শুনিয়াছি, এ পদগ্রহণে তর্কবাচস্পতি মহাশয়ের কি একটা আপত্তি উপস্থিত হইয়াছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় আপত্তি খণ্ডন করিয়া তাঁহাকে এ পদগ্রহণে সম্মত করান। পর দিন তিনি আবার সেই আত্মীয় সঙ্গে কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হন। তর্কবাচস্পতি মহাশয় সঙ্গে আসেন নাই; প্রশংসাপত্রাদি বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং আনিয়া মার্সেল্ সাহেবকে প্রদান করেন। মার্সেল্ সাহেব তর্কবাচস্পতি মহাশয়কে নিযুক্ত করিবার জন্য গবর্ণমেণ্টকে অনুরোধ করেন। পরে তর্কবাচস্পতি মহাশয় কলিকাতায় আসিয়া পদপ্রাপ্ত হন।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এ “পথ-চলা”র কথাটা কবি-কল্পনা বলিয়া যেন মনে হয়। সত্য সত্যই কিন্তু তাঁহার “পথ-চলা” শক্তি এমনই ছিল। তাঁহার “পথ-চলা” সম্বন্ধে কত কথাই শুনিয়াছি। উত্তরকালে তিনি রোগভগ্ন দেহে যেরূপ চলিতে পারিতেন, একজন ভীম কলেবর সুদৃঢ় দেহসম্পন্ন যুবকও তেমন চলিতে পারেন কি না, সন্দেহ। তাঁহার উত্তরকালেও কিরূপ হাঁটিবার শক্তি ছিল, প্রসঙ্গ ক্রমে তাহার এইখানে দুই একটী দৃষ্টান্ত দিলাম,—

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দৌহিত্র শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতি মহাশয় আমাদিগকে বলিয়াছেন,—“এক দিন কর্ম্মটাড়ে আমি, দাদা মহাশয় এবং আর কয়েক জন প্রাতর্ভ্রমণে বহির্গত হইবার উদ্‌যোগ করি। আমি বলিলাম, “দাদা মহাশয়। আজ আপনাকে দেখি, আপনি কেমন আমাদের অপেক্ষা হাঁটিয়া যাইতে পারেন।” দাদা মহাশয় ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন,—“ভাল, তাহাই হইবে।” এই বলিয়া আমরা সকলেই হাঁটিতে আরম্ভ করিলাম। আমাদের সঙ্গীরা পশ্চাতে পড়িয়া থাকিলেন; আমি কেবল তাঁহার সঙ্গে যাইতে লাগিলাম; কিয়দ্দূর যাইয়া দেখি, দাদা মহাশয় আমাকে পরিত্যাগ করিয়া চটি জুতা পায়ে চট্ চট্ করিতে করিতে অনেক দূর অগ্রসর হইয়া পড়িয়াছেন। আমি চেষ্টা করিয়াও তাঁহাকে ধরিতে পারিলাম না। দাদা মহাশয় দূর হইতে হাসিতে হাসিতে বলিলেন,—“হারাবি না?” আমি অবাক!

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বলিয়াছেন,—“সংস্কৃত কলেজে চাকুরি করিবার সময় এক দিন বাবার বীরসিংহ হইতে কলিকাতায় এক দিনে আসিবার প্রয়োজন হয়। তিনি তাড়াতাড়ি বাহির হইবার উদ্‌যোগ করেন। সেই সময়ে মদন মণ্ডল নামে একজন পাইক বাবাকে বলিল,—‘দাদাঠাকুর, আমি তোমার সঙ্গে কলিকাতায় যাইব।’ বাবা বলিলেন,—‘তুমি আমার সহিত হাঁটিতে পারিবে?’ সে স্বীকার করিল। পরে উভয়েই হাঁটিতে লাগিলেন। চার ক্রোশ পথ আসিয়া মদন মণ্ডল দেখিল, বাবা তাহাকে ছাড়িয়া ৩-৪ রসি অগ্রসর হইয়াছেন। সে ‘হা রা রা’ করিয়া, লাঠি ঘুরাইয়া, আপনি দু-চার পাক ঘুরিয়া, দ্রুতপদে বাবাকে ধরিবার চেষ্টা করিল এবং ছুটিয়া বাবাকে ধরিল। উভয়ে আবার চলিতে আরম্ভ করিলেন। দশ বার ক্রোশ দূরে গিয়া মদন বাবাকে বলিল,—‘দেখ, আজ আর কলিকাতায় যাওয়া হইবে না, এই চটিতে থাকা যাক্।’ বাবা হাসিয়া বলিলেন, ‘আমাকে যাইতেই হইবে। তুমি এই পয়সা লইয়া চটিতে থাক; কাল তখন যাইও।’ মদন চটিতে রহিয়া গেল। বাবা কলিকাতায় আসিলেন।”

    বিদ্যাসাগর মহাশয় পূর্ব্বে এক দিনে হাঁটিয়া বাড়ী যাইতেন এক দিনে বাড়ী হইতে কলিকাতায় আসিতেন। বীরসিংহ গ্রাম হইতে ১০-১২ দশ বার ক্রোশ দূরে মসাট নামক স্থানে দাঁড়াইয়া একটী করিয়া ডাব খাইতেন মাত্র। যখন তিনি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন, তখনও তিনি প্রায় হাঁটিয়া যাইতেন, এমন কি সঙ্গীদের মোট-বোঝা ভারি হইলে, তিনি তাহাদের মোট-বোঝা কতক নিজের মস্তকে লইয়া হাঁটিতেন। একবার পথে তিনি এইরূপ অবস্থায় যাইবার সময় কলেজের দুই জন দ্বারবানের সম্মুখে পতিত হন। দ্বারবানেরা তাঁহার তদবস্থা দেখিয়া তাঁহার মোট লইবার চেষ্টা করে, তিনি কিন্তু তাহাদিগকে মিষ্ট কথায় বিদায় দিয়া আপনি মোট বহিয়া চলিয়া যান।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে চাকুরি করিবার সময় বিদ্যাসাগরের বাড়ী যাইবার যেরূপ সুযোগ ঘটিত, সংস্কৃত কলেজের চাকুরির সময় সেরূপ ঘটিত না। ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে চাকুরি করিবার সময় তিনি প্রায়ই বাড়ী যাইতেন। বাড়ী গিয়া প্রতিবেশীর তত্ত্ব লওয়া, আর্ত্তপীড়িতের শুশ্রূষা করা, তাঁহার কার্য্য ছিল। এতৎসম্বন্ধে দুই একটী দৃষ্টান্ত এইখানে প্রদত্ত হইল।

    বাড়ী যাইলেই বিদ্যাসাগর মহাশয় মধ্যে মধ্যে ভ্রাতা এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন সঙ্গে মধ্যাহ্নে নিমন্ত্রণ খাইতে যাইতেন। পথে কৌতুক করিবার জন্য কোন নালা নর্দ্দমা দেখিলে তিনি লাফাইয়া পার হইতেন এবং মধ্যম ভ্রাতাকে সেই নালা নর্দ্দমা পার হইবার জন্য উপরোধ করিতেন। মধ্যম ভ্রাতা বাহাদুরী দেখাইবার জন্য কখন কখন লাফাইতে গিয়া পড়িয়া যাইতেন। সেই সঙ্গে হো হো হাসি রব হইত। তিনি মধ্যম ভ্রাতাকে লইয়া এইরূপ কৌতুক প্রায়ই করিতেন।

    এক বার তিনি বীরসিংহ গ্রাম হইতে হাঁটিয়া আসিতেছিলেন। এক মাঠের মাঝে তিনি দেখিলেন, একটী অতি বৃদ্ধ কৃষক মোট মাথায় করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। বিদ্যাসাগর মহাশয় জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন, লোকটীর বাড়ী সেখান হইতে ২/৩ দুই তিন ক্রোশ দূরে। তাহার যুবক-পুত্ত্র, তাহার মস্তকে বোঝা চাপাইয়া দিয়া তাহাকে বাড়ী পাঠাইয়াছে। বৃদ্ধ এখন চলচ্ছক্তিহীন। বৃদ্ধের অবস্থা দেখিয়া এবং পুত্ত্রের ব্যবহারের কথা শুনিয়া, চক্ষের জলে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বক্ষঃস্থল ভাসিয়া গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধের মস্তক হইতে সেই বোঝা আপন মস্তকে তুলিয়া লইলেন এবং বৃদ্ধকে সঙ্গে করিয়া তাহার বাড়ী পর্য্যন্ত গেলেন। তিনি সেই মোট বৃদ্ধের বাড়ীতে পৌঁছিয়া দিয়া, আবার হাঁটিয়া কলিকাতায় আসেন।

    এমন অনেক শুনিয়াছি, সব কথা বলিবার স্থান হইবে না। পাঠক ইহাতেই অবশ্য বুঝিয়াছেন, বিদ্যাসাগরের চলচ্ছক্তি কিরূপ অসামান্য। বল দেখি, মস্তিষ্ক ও দেহের এরূপ শক্তি-সমবায় ইহ সংসারে অতি বিরল কি না? আর কোন বাঙ্গালীর এমন দেখিয়াছ কি? কেবল কি তাই? এমন অনাত্মপরতা বা কয় জনের আছে বল দেখি? বল, বুদ্ধি, দয়া,—তিনটীর একত্র সমাবেশ, বড় ভাগ্যবান্ না হইলে কাহারও হয় কি? একধারে যে ত্রিবেণীর ত্রিধারা, ইহার উপর আবার মাতৃভক্তির মন্দাকিনীধারা পূর্ণোচ্ছ্বাসে প্রবাহিত। এই খানে তাহারও একটু পরিচয় দিব। ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে কার্য্য করিবার সময় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তৃতীয় ভ্রাতার বিবাহ সম্বন্ধ হইয়াছিল। বীরসিংহ গ্রাম হইতে জননী পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন,—“তুমি অতি অবশ্য আসিবে।” মাতৃভক্ত বিদ্যাসাগর আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি তখন মার্সেল্ সাহেবের নিকট ছুটীর জন্য প্রার্থনা করিলেন; ছুটী কিন্তু পাইলেন না। তখন তিনি ভাবিলেন,—আমাকে না দেখিয়া মা মরিবেন! অত্যন্ত কৃতঘ্ন আমি, মাতৃ-আজ্ঞা পালন করিতে পারিলাম না। হা ধিক! শত ধিক্।” সকলেই বাড়ী গিয়াছেন; বিদ্যাসাগর মহাশয় শূন্য প্রাণে ও উদাস মনে সারারাত্রি কাঁদিয়া কাঁদিয়া কাটাইলেন। পর দিন প্রাতঃকালে তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন,—“ছুটী না পাই, কর্ম্ম পরিত্যাগ করিব, অদ্য কিন্তু বাড়ী নিশ্চিতই যাইব।” তিনি মার্সেল্ সাহেবকে গিয়া বলিলেন,—“ছুটী না দেন, কর্ম্ম পরিত্যাগ করিলাম,— মঞ্জুর করুন; চাকুরীর জন্য জননীর অশ্রু-জল সহ্য করিতে পারিব না।” সাহেব স্তম্ভিত হইলেন! ভাবিলেন,—“কি এ অদ্ভুত মাতৃভক্তি!” তিনি আর দ্বিরুক্তি না করিয়া প্রসন্নচিত্তে তখনই ছুটী মঞ্জুর করিলেন। ছুটী পাইয়াই বিদ্যাসাগর মহাশয় বাসায় অসিলেন এবং বেলা তিনটার সময় ভৃত্যকে সঙ্গে লইয়া যাত্রা করিলেন। আষাঢ় মাস —আকাশ ঘনঘটায় আচ্ছন্ন,—মুহুর্মুহুঃ কড় কড় বজ্রধ্বনি, চকিতে বিদ্যুৎ-চমকানি-অবিরাম বাত্যা প্রবাহিনী,—মূষলধারে বৃষ্টি,—পথ ঘাট কদমাক্ত। বিদ্যাসাগর কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ না করিয়া, মাতৃ-উদ্দেশে উৰ্দ্ধশ্বাসে চলিতে লাগিলেন। সন্ধ্যার সময় ভূত্য শ্রীরামের অনুরোধে তাঁহাকে সে রাত্রি, কৃষ্ণরামপুরের এক দোকানে অবস্থিতি করিতে হয়। তখনও ১২।১৩ বার তের ক্রোশ পথ অবশিষ্ট। পরদিন প্রত্যুষে তিনি আবার চলিতে লাগিলেন। শ্রীরাম ক্লান্ত হইয়া পড়িয়ছিল। তাহার বাড়ী নিকটস্থ কোন গ্রামে। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহাকে বাড়ী. যাইতে বলিলেন। শ্রীরাম কিন্তু প্রভুর বিপদাশঙ্কায় সঙ্গ ছাড়িল না। সে ধীরে ধীরে প্রভূর পদানুসরণ করিতে লাগিল। কিয়দ্দুর গিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় ক্ষুধার্ত্ত ও ক্লান্ত শ্রীরামকে একটা দোকানে ফলারে বসাইয়া বলিলেন,—“শ্রীরাম এই পয়সা লও,– বাড়ী বাড়ী যাও।” এই কথা বলিয়া তিনি দ্রুতপদে তীরবেগে চলিতে আরম্ভ করিলেন। শ্রীরাম সঙ্গ লইতে পারিল না। ক্রমে বিদ্যাসাগর মহাশয় দামোদর নদের তীরে উপস্থিত হইলেন। বিষম বর্ষায় দামোদরে খরতর একটানা স্রোত,—‘দুকুল-ভরা’,—‘কানে কান জল!’

    গ্রীষ্মকালে দামোদরে সামান্য-মাত্র জল থাকে; এমন কি হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। বর্ষাকালে কিন্তু ইহা প্রলয়ঙ্করী সংহারমূর্ত্তি ধারণ করে। আজ সেই দামোদর বাত্যাবিক্ষোভিত বারিধিবৎ ভীষণ সংহারমূর্ত্তি ধারণ করিয়াছে। বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখিলেন,— পারাপারের নৌকা অন্য পারে। তাঁহার বন্ধু বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পিতা, ভ্রাতা, ভগিনী, যুবতী বনিতা14—সবই আছে; আজ কিন্তু বিদ্যাসাগর ভাবিতেছেন,—“তাঁহার কেহই নাই–আছেন কেবল,—জননী”। বিদ্যাসাগর বাহ্যজ্ঞান শূন্য;— অন্তরে বাহিরে কেবল সেই অন্নপূর্ণা মাতৃ-মূর্ত্তি! অনন্ত বিশ্ব-ব্যোম ব্যাপিনী মাতৃ-মূর্ত্তি। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। নৌকার অপেক্ষা না করিয়া, তিনি উচ্চকণ্ঠে ‘মা, মা’ বলিয়া ডাকিয়া দামোদরের জলে ঝাঁপ দিলেন।

    দেখিতে দেখিতে বিদ্যাসাগর সাঁতার দিয়া দামোদর পার হইয়া গেলেন। বিদ্যাসাগর কি নিজ-বলে সে দুর্জ্জয় দামোদর পার হইলেন? মানুষের শক্তিতে কি তাহা কুলায়? এ ব্যাপার দেখিয়া মনে হয়, মাতৃভক্তের কাতর ক্রন্দনে স্থির থাকিতে না পারিয়া, স্বয়ং মাতৃরূপিণী মহামায়া বিদ্যাসাগরকে বুকের ভিতর করিয়া লইয়া, সেই দুরন্ত দামোদর পার করিয়া দিয়াছিলেন। পার হইয়া বিদ্যাসাগর আবার চলিতে আরম্ভ করিলেন। পথে তাঁহাকে দ্বারকেশ্বর নদ সাঁতরাইয়া পার হইতে হয়। মাঠের মাঝে ‘কুড়ান খালের’ নিকট সন্ধ্যা উপস্থিত হয়। এই খানে ভয়ানক দস্যুর ভয় ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় অকুতোভয়ে মাতৃপদ স্মরণ করিয়া চলিতে লাগিলেন। রাত্রি ৯ নয়টার সময় তিনি বাড়ীতে উপস্থিত হন। উপস্থিত হইয়া দেখেন, বর বিবাহ করিতে গিয়াছে; মা কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া, অনাহারে পড়িয়া আছেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় এক বার উচ্চ কণ্ঠে ডাকিলেন,—“মা! মা! আমি এসেছি।” বিদ্যাসাগরের কণ্ঠস্বর বুঝিয়া মা ঘরের বাহিরে আসিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তখন মাও কাঁদেন, পুত্রও কাঁদেন। উভয়েই অনাহারে ছিলেন। উচ্ছ্বাস-বেগের হ্রাস হইলে পর, মাতা ও পুত্র একত্র আহার করিতে বসেন।

    বহুতর বিদেশীয়-গ্রন্থ পাঠক বহুতর মাতৃভক্ত বিদেশীয় পুরুষের নাম শুনিয়া থাকেন। জনসন্, জেনারল্ ওয়াশিংটন্ প্রভৃতির মাতৃভক্তি অতুলনীয় বলিয়া পরিকীর্ত্তিত; কিন্তু বল দেখি, বাঙ্গালী বিদ্যাসাগরের এ মাতৃভক্তির তুলনা হয় কি? শুনিয়াছি, রোমক-বীর সম্রাট্ সিজর্, যখন ইংলণ্ড-বিজয়-মানসে সাগর পার হইবার উপক্রম করেন, তখন ভয়ানক ঝড়-বৃষ্টি উপস্থিত হইয়াছিল। তাঁহাকে জাহাজে উঠিতে অনেকেই নিষেধ করেন; কিন্তু তিনি কাহারও নিষেধ শুনেন নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন দামোদরে ঝাঁপ দিবার উপক্রম করেন, তখন নিকটস্থ জনকয়েক লোক তাঁহাকে পাগল ভাবিয়া, সে দুষ্কর কার্য্যে বাধা দেয়; বিদ্যাসাগর কোন বাধা মানেন নাই। বাহ্য জগতে উভয়ের অবস্থা এইরূপ; অন্তর্জগতের ক্রিয়া নিশ্চিতই ভিন্নরূপ। এক জনের বিজয়বাসনা; অপরের মাতৃপূজা। বল দেখি, পাঠক! কাহার সাহস প্রশংসনীয়? এ জগতে কোন্ বীর স্মরণীয়? বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির এই একটা মাত্র দৃষ্টান্ত পাইলেন; পরে আরও বহু প্রকার পাইবেন।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়, বাল্য-রচনায় যেমন সুন্দর সুপাঠ্য কবিতা রচনা করিতে পারিতেন, যৌবনেও তাঁহার সেইরূপ কবিতা রচনা করিবার শক্তি ছিল। তিনি যখন ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের পণ্ডিত, তখন কষ্ট-নামে এক সিবিলিয়ন সাহেব তাঁহাকে নিজের নামে একটী কবিতা রচনা করিতে অনুরোধ করেন। অনুরোধের বশে নিম্নলিখিত কবিতাটা রচিত হইযাছিল,—

    “শ্রীমান্ রবর্টকষ্টোঽদ্য বিদ্যালয়মুপাগতঃ।

    সৌজন্যপূর্ণৈরালাপৈর্নিতিরাং মামতোষয়ৎ॥

    সহিষ্পদ্‌গুণসম্পন্নঃ সদাচাররতঃ সদা।

    প্রসন্নবদনো নিত্যং জীবত্বব্দশতং সুখী॥”

    কষ্ট সাহেব সন্তুষ্ট হইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ২০০৲ দুই শত টাকা পুরস্কার দিতে প্রস্তুত হন। তিনি তাহা গ্রহণ না করিয়া কলেজে জমা দিতে বলেন। সাহেব তাহাই করেন। যে ছাত্র সংস্কৃত রচনায় প্রথম হইতেন, তিনি এই টাকা হইতে ৫০৲ পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার পাইতেন। ৪ চারি বৎসর ৪ চারিটী ছাত্র এই পুরস্কার পাইয়াছিলেন। ইহার নাম হইয়াছিল, “কষ্ট-পুরস্কার”। বিদ্যাসাগর মহাশয নিজে টাকা না লইয়া সংস্কৃত চর্চ্চার শুভোদ্দেশে ৪ চারিটী স্বদেশীয় পণ্ডিতকে প্রকারান্তরে এই টাকা দেওয়াইলেন। কষ্ট সাহেবের দ্বিতীয় অনুরোধে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিম্নলিখিত শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন;—

    “দোষৈর্ব্বিনাকৃতঃ সর্ব্বৈঃ সর্ব্বৈরাসেবিতো গুণৈঃ।

    কৃতী সর্ব্বাসু বিদ্যাসু জীয়াৎ কষ্টো মহামতিঃ॥

    দয়াদাক্ষিণ্যমাধুর্য্যগাম্ভীর্য্যপ্রমুখাঃ গুণাঃ।

    নরবর্ত্মরতে নূনং রমস্তেঽস্মিন্ নিরন্তরম্॥

    সদাসদালাপরতেনিত্যং সৎপথবর্ত্তিনঃ।

    সর্ব্বলোকপ্রিয়স্যাস্য সম্পদস্ত সদা স্থিরাঃ॥

    অস্য প্রশান্তচিত্তস্য সর্ব্বত্র সমদর্শিনঃ।

    সর্ব্বধর্ম্মপ্রবীণস্য কীর্ত্তিরায়ুশ্চ বৰ্দ্ধতাম্॥

    বিদ্যাবিবেকবিনয়াদিগুণৈরুদারৈঃ।

    নিঃশেষলোকপরিতোষকরশ্চিবায়॥

    দূরং নিরস্তখলদুর্ব্বচনাবকাশঃ।

    শ্রীমান্ সদা বিজয়তাং নু রবর্ট কষ্টঃ॥”

    কষ্ট সাহেব যখন এই কবিতা রচনা করিতে অনুরোধ করেন, তখন তিনি পঞ্জাবের সবিলিয়ান্ পদ হইতে চির-বিদায় লইয়া বিলাত যাইবার উপক্রম করিতেছিলেন।

    অতঃপর উত্তর-চরিত, শকুন্তলা ও মেঘদূতের সংক্ষিপ্ত টীকা ভিন্ন বিদ্যাসাগর মহাশয় এ ভাবে আর কোন শ্লোকাদি রচনা করিয়াছিলেন কি না, তাহার বিশিষ্ট প্রমাণ নাই। তিনি যে এ ভাবে আর সংস্কৃত গদ্য বা পদ্য রচনা করিয়াছিলেন, এমন বোধও হয় না। সংস্কৃত-রচনায় তাঁহার প্রবৃত্তি ছিল না। আধুনিক লোকে প্রকৃত বিশুদ্ধ সংস্কৃত রচনা করিতে পারে, এ বিশ্বাস তাঁহার ছিল না। একদিন মেঘদূতের স্বরচিত টীকা দেখিয়া তিনি স্বীয় দৌহিত্রের নিকট একটু হাসিয়া বলিয়ছিলেন,—“ওরে আমি বেশ সংস্কৃত লিখেছি তো।”

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে অধ্যাপনার কালে বিদ্যাসাগর মহাশয় সাহেবদের পরীক্ষক হইতেন। তদুপলক্ষে বিদ্যারত্ন মহাশয় লিখিয়াছেন,—“পরীক্ষায় পাস না হইলে, কোন কোন সিবিলিয়নকে দেশে ফিরিয়া যাইতে হইত। এ কারণ মার্সেল সাহেব দয়া করিয়া ঐ সিবিলিয়নদের কাগজে নম্বর বাড়াইয়া দিতে বলিতেন। অধ্যক্ষের কথা না শুনিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় ন্যায়ানুসারে কার্য্য করিতেন। উপরোধ করিলে ঘাড় বাঁকাইয়া বলিতেন, অন্যায় দেখিলে কার্য্য পরিত্যাগ করিব। এ কারণ সিবিলিয়ন্‌ ছাত্রগণ ও অধ্যক্ষ মার্সেল সাহেব তাহাকে আন্তরিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিতেন।”

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এরূপ ন্যায়পরতা অসম্ভব নয়; কিন্তু রাজকৃষ্ণ বাবুর মুখে মার্সেল সাহেবের যেরূপ সদাশয়তা ও সৎসাহসিকতার কথা শুনি, তাহাতে তিনি বিদ্যাসাগরকে এরূপ প্রস্তাব করিয়াছিলেন, এ কথা হঠাৎ স্বীকার করিতে যেন মন চাহে না। তবে স্বজাতি-প্রেমের কথা স্বতন্ত্র।

  • সপ্তম অধ্যায়

    সপ্তম অধ্যায়

    কার্য্যাভাস, চাকুরিতে প্রবেশ, সাহেবের গুণগ্রাহিতা, ফোর্ট উইলিয়ম্‌ কলেজ, ইংরেজি শিক্ষা, অক্ষয়কুমার দত্তের সহিত পরিচয়, মহাভারত-অনুবাদ ও অধ্যাপনা প্রণালী।

    পাঠ্যাবস্থার অবসানে কার্য্য-কালের প্রারম্ভ। এইবার কার্য্যবীর বিদ্যাসাগর কার্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। কার্য্যময় সংসারে কার্য্যের কীর্ত্তি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বহু প্রকারের। পাঠক! বাল্যকালে ও পাঠ্যবস্থায় যে অপরিসীম শ্রমশীলতা, যে প্রগাঢ় একাগ্রতা, যে অবিচলিত আত্মনির্ভরতা এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও বহ্নিবর্ষিণী তেজস্বিতা দেখিয়াছেন, কার্য্যক্ষেত্রেও তাহার প্রচুর প্রমাণ ও পরিচয় পাইবেন।

     বিপদে নির্ভীকতা, কর্ত্তব্যপালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞতা, নৈরাশ্যে সজীবতা এবং সর্ব্বাবস্থায় নিরভিমানিতা ও সর্ব্বকার্য্যে নিঃস্বার্থতা দেখিতে চাহেন তো পাঠক দেখিবেন, বিদ্যাসাগরের জীবনে, কার্য্যাবস্থার প্রারম্ভ হইতে দেহাবসানের পুর্ব্বাবস্থা পর্য্যন্ত। করুণার কথা আর কি বলিব? বলিয়াছি তো, তাহার তুলনা নাই। এ বহু-বর্ণময় ভারতভূমিতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সকল কার্য্য সর্ব্বসম্মত হওয়া সম্ভব নহে এবং হয়ও নাই; কিন্তু সকল কার্য্যে যে সেই শ্রমশীলতা, সেই দৃঢ়তা, সেই নির্ভীকতা, সেই বুদ্ধিমত্তা এবং সেই বিদ্যাবত্তা, সকল সময়েই পূর্ণমাত্রায় পরিচালিত হইত, তাহা তাঁহার জীবনী-পর্য্যালোচনায় নিঃসন্দেহে প্রতিপন্ন হইবে। তিনি সকল কার্য্যে সকল সময়ে স্বাধিকারভূতা ও স্বকীয় বিদ্যা বুদ্ধিসম্মতা শক্তির আমূল সঞ্চালন ও পূর্ণ প্রয়োগ করিতেন। এক কথায় বলি, এমন এক-টানা খর স্রোত ইহ সংসারে মনুষ্যজীবনে বড়ই দুর্লভ! এইবার তাহার পূর্ণ পরিচয়। করুণার পরিচয় অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে পাইবেন। কর্ম্মীর কার্য্যাভাবে যে কখন কর্ম্মাবস্থার হয় না, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন তাহার প্রমাণ। তাহা সর্ব্ব সময়ে সকলের অনুকরণীয় এবং শিক্ষণীয়। কর্ম্মীর কার্য্যাভাব যে কখন থাকে না, বিদ্যাসাগরের কর্ম্মাবস্থার প্রথম হইতে তাহার প্রমাণ। বিখ্যাত ইংরেজি গ্রন্থকার সিডন্‌ স্মিথ বলিয়াছেন,—

    “সকলে যেন কার্য্যে নিযুক্ত থাকেন। যাহার যেরূপ প্রকৃতি, তিনি যেন তদনুসারে উচ্চ কার্য্যে নিযুক্ত হন। আপন কার্য্য যথাসাধ্য সাধন করিয়াছেন, এইটী বুঝিয়াই যেন তিনি মরিতে পারেন।”12

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কার্য্যারম্ভ ১২৪৮ সালের অগ্রহায়ণ বা ১৮৪১ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। এখানে কার্য্য অর্থে চাকুরী বুঝিতে হইবে। কার্য্যের অবশ্য সুবিশাল অর্থ—মনুষ্যজীবনের করণীয় মাত্র। বিদ্যাসাগর মহাশয়, যখন সংস্কৃত কলেজের পাঠ সমাপন করেন, তখন ফোর্ট উইলিয়ম্‌ কলেজের প্রধান পণ্ডিতের পদ শূন্য হয়।15 বিদ্যাসাগর মহাশয় তখন বীরসিংহ গ্রামে। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের তাৎকালিক সেক্রেটারী মার্সেল্ সাহেব তাঁহাকে তথা হইতে আনাইয়া এই পদে অভিষিক্ত করেন। এইখানে মার্সেল্ সাহেবের গুণগ্রাহিতার একটু পরিচয় দেওয়া প্রয়োজনীয়।

    প্রধান পণ্ডিতের পদ শূন্য হওয়ায় অনেকে সেই পদের প্রার্থী হন। কলিকাতা বহুবাজার-মলঙ্গপাড়া-নিবাসী কালিদাস দত্ত মার্সেল্ সাহেবের সবিশেষ সুপরিচিত ছিলেন। মার্সেল্ সাহেব কালিদাস বাবুকে বড় ভালবাসিতেন। কালিদাস বাবুর সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ, —তাঁহার একজন পরিচিত পণ্ডিত ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের প্রধান পণ্ডিতপদে নিযুক্ত হন। মার্সেল্ সাহেব কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ঐ পদে নিযুক্ত করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি জানিতেন, বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃত ভাষায় সবিশেষ ব্যুৎপন্ন; অধিকন্তু একজন অসামান্য শক্তিশালী বুদ্ধিমান ব্যক্তি।

    কালিদাস বাবু সাহেবের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া দ্বিরুক্তি করিলেন না; বরং আনন্দসহকারে সাহেবের সে সৎপ্রস্তাবের সম্পূর্ণ পোষকতা করেন। কালিদাস বাবু ঈশ্বরচন্দ্রের দক্ষতা ও বিদ্যাবুদ্ধিমত্তা-সম্বন্ধে আদৌ সন্দিহান ছিলেন না।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের প্রধান পণ্ডিত করা, মার্সেল্ সাহেবের একান্ত ইচ্ছা, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পিতা এ সংবাদ পাইয়া, বীরসিংহগ্রাম হইতে পুত্রকে কলিকাতায় লইয়া আসেন। মার্সেল্ সাহেবের এই গুণগ্রাহিতা দেখিয়া অনেকেই সাহেবকে ধন্যবাদ করিয়াছিলেন। সত্য সত্যই মার্সেল্ সাহেব প্রকৃত সহৃদয় গুণগ্রাহী লোক ছিলেন। তদানীন্তন সিবিলিয়ান, সওদাগরপ্রভৃতি সকল সাহেব সম্প্রদায়ের প্রায় এইরূপ সহৃদয়তা ও গুণগ্রাহিতার পরিচয় পাওয়া যাইত।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের প্রধান পণ্ডিতের বেতন ৫০ পঞ্চাশ টাকা। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পূর্ব্বে মধুসূদন তর্কালঙ্কার মহাশয় এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁহার মৃত্যু হওয়ায় বিদ্যাসাগর মহাশয় এই পদ প্রাপ্ত হন।

    বিলাত হইতে যে সকল সিবিলিয়ান ভারতে চাকুরী করিতে আসিতেন, তাহাদিগকে এই ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে বাঙ্গালা, হিন্দী, উর্দু ও পার্শী শিখিতে হইত। ইহাতে উত্তীর্ণ হইতে পারিলে তাঁহারা কর্ম্মে নিযুক্ত হইতে পারিতেন। এই সকল ভাষার সাহেব পরীক্ষকদিগকে সাহায্য করিবার এবং সিবিলিয়ানদিগকে শিক্ষা দিবার জন্য পণ্ডিত ও মৌলবী নিযুক্ত থাকিতেন। যে সময় বিদ্যাসাগর মহাশয় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের প্রধান পণ্ডিত হন, সে সময় এখনকার মত বিলাতে প্রতিযোগিনী সিবিলিয়ান-পরীক্ষা ছিল না। তখন মনোনীত হইয়া তত্রত্য “হালিবরী কলেজে” পড়িতে হইত এবং তৎপরে সিবিলিয়ান হইয়া এদেশে আসিতে হইত।16 এই সকল সিবিলিয়ান তখন “রাইটার্স অব্ দি কোম্পানী” নামে অভিহিত হইতেন। এই জন্য তাঁহারা যে বাড়ীতে থাকিতেন, তাহার নাম ছিল, “রাইটার্স বিল্ডিং”। এই রাইটার্সবিল্ডিং হইতে বর্ত্তমান “রাইটার্স বিল্ডিং” নাম। এখন কলিকাতার যেখানে “রাইটার্স বিল্ডিং” তখন সেইখানেই ছিল। সিবিলিয়ানগণ এই “রাইটার্স বিল্ডিং” এ বাস করিতেন। এখানে সিবিলিয়ান সাহেবদের নাচ, ভোজ, আমোদ-প্রমোদ যথারীতি সম্পন্ন হইত। বাড়ীর মধ্যস্থলে “ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজ” ও তাহার “আফিস্” ছিল। আফিসে পণ্ডিত ও মৌলবী ব্যতীত, “হেড রাইটার” বা “কেসিয়ার” এবং তদধীন দুই তিনটী কেরাণী কার্য্য করিতেন।

    ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজ সিবিলিয়ানদের আশ্রয়-স্থল ছিল, এ জন্য ইহা সাহেবসম্প্রদায়ের নিশ্চিতই চির-স্মরণীয়; কিন্তু ইহা অপর বিশেষ কারণেও বাঙ্গালীর হৃদয়ে চির-জাগরূক থাকিবে। এই ফোর্ট উইলিয়ম্‌ কলেজ, বিদ্যাসাগরের ইহ-যুগসম্মত ভবিষ্যৎ সৌভাগ্য গৌরবের সুত্রপাত হয়। ইহার পরিচয় পাঠক পরবর্ত্তী ঘটনাবলীতে প্রাপ্ত হইবেন; কিন্তু ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজের চির-স্মরণ-যোগ্যতার জন্য গুরুতর কারণ আছে। ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজ বাঙ্গালী গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টি-কল্পে অন্যতম শক্তিশালী সহায়। বাঙ্গালা গদ্য-সাহিত্যের সৃষ্টিকাল নির্ণয় করা বড় দুরূহ। কেহ বলেন, শ্রীচৈতন্যদেবের সময় ইহার সৃষ্টি। তিনি যে কৃষ্ণযাত্রা করিয়াছিলেন, তাহা গদ্য-সাহিত্য-সৃষ্টি-কল্পে প্রধান সহায়। কেহ বলেন, তাহা নয়; তাহার পরবর্ত্তী কালে ইহার সৃষ্টি। চৈতন্যমঙ্গল গান হইবার পূর্ব্বে যে “গৌর-চন্দ্রিকা” কীর্ত্তন হইত, তাহা গদ্যে লিখিত ছিল। সেই গদ্যে বাঙ্গালা-গদ্যসাহিত্যর স্রোতস্বতীর উৎপত্তি-স্থান। আমরা কিন্তু তিন চারি শত বৎসরের পূর্ব্বে লিখিত একখানি বাঙ্গালা গদ্য পুঁথি দেখিয়াছি। যাহা হউক, তাহা লইয়া এক্ষণে বিচার করিবার প্রয়োজন নাই। ১৮০০ খৃষ্টাব্দের গদ্য-সাহিত্যের অস্তিত্ব সত্ত্বেও উহা অনেকটা দুর্ব্বল ও নির্জীব ছিল। ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর, গদ্য সাহিত্য-পাঠের প্রয়োজনীয়তা-পীড়নে পাঠ্য-গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টিকল্পে দৃষ্টি পতিত হয়। ফলে ইহার পর অনেকগুলি পাঠ্য গদ্য-পুস্তক প্রণীত হইয়াছিল। সেগুলি গদ্য সাহিত্যের পুষ্টিকল্পে অনেকটা সহায় হইলেও পূর্ণ পুষ্টির পরিচায়ক নয়। সে পরিচয় অনেকটা বিদ্যাসাগর প্রণীত পাঠ্য পুস্তকে প্রতিভাত। ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজ গদ্য-সাহিত্যের পুষ্টিকল্পহেতু বাঙ্গালীর আশীর্ব্বাদপাত্র বটে; কিন্তু বাঙ্গলা গদ্যসাহিত্য পাঠ্যে ধর্ম্মাভাব প্রণোদনের কতক উত্তর সাধক! ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে থাকিয়া সিবিলিয়ানদিগকে মাসে মাসে পরীক্ষা দিতে হইত। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার একটা সময় নিৰ্দ্ধারিত ছিল। সেই সময়ের মধ্যে উত্তীর্ণ হইতে না পারিলে, সিবিলিয়ানদিগকে বিলাতে প্রতিগমন করিতে হইত। বিদ্যাসাগর মহাশয় মাসে মাসে পরীক্ষার কাগজপত্র দেখিতেন। এতদ্ভিন্ন মাসেল্ সাহেব তাঁহার নিকট সংস্কৃত কাব্যাদি পাঠ করিতেন। অধ্যাপনায় পণ্ডিত হইলেও কার্য্যে ইংরেজের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সম্পর্ক; সুতরাং তাঁহার ইংরেজি শিখিবার প্রয়োজন হইল। তদ্ব্যতীত তাঁহাকে হিন্দী পরীক্ষারও কাগজপত্র দেখিতে হইত; কাজেই হিন্দী শিক্ষারও প্রয়োজন দাঁড়াইল। ইংরেজি শিক্ষা অপেক্ষা হিন্দী শিক্ষা অপেক্ষাকৃত সহজ; কেননা, বাঙ্গালা ও সংস্কৃতের সঙ্গে হিন্দীর অনেকটা সাদৃশ্য। তিনি মাসকতক পরিশ্রম করিয়া একজন হিন্দী ভাষায় অভিজ্ঞ পণ্ডিতের নিকট হিন্দী শিখিয়া লইলেন।

    ইংরেজি শিক্ষা অপেক্ষাকৃত কষ্টকর; বিশেষতঃ চাকুরী অবস্থায়; কিন্তু বিদ্যাসাগরের মত অসাধারণ শ্রমশীল এবং অসীম অধ্যবসায়ী ব্যক্তির নিকট কোন কার্য্য কষ্টকর? তাহা হইলে অন্যান্য সাধারণের সহিত তাঁহার বিশেষত্ব রহিল কোথায়? সাধারণের সহিত অসাধারণের পার্থক্য সর্ব্ব সময়ে সর্ব্ব দেশে। তাহা না হইলে পঞ্চাশ টাকার বেতনভোগী একজন সামান্য কর্ম্মচারী, সংসারের সর্ব্বোচ্চ পথে, ভবিষ্য বংশধরদিগের জন্য সজীব পদাঙ্ক রাখিয়া যাইতে পারেন কি? বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন প্রথমে “প্রিণ্টার”; রালে ছিলেন সামান্য সৈনিক পুরুষ; ইংলণ্ডের কবি-গুরু চসর ছিলেন সৈনিক পুরুষ; সেক্সপিয়ার ছিলেন নাট্যশালার নট; আর কত নাম করিব? ইঁহারা যে গুণে বড়, বিদ্যাসাগর ও সেই গুণে বড়; ইঁহাদের পার্থক্য সাধারণ হইতে যে গুণে, বিদ্যাসাগরেরও পার্থক্য সেই গুণে।

    পৃথিবীতে যাঁহারা সর্ব্বোচ্চ প্রতিভাশালী বলিয়া পরিচিত, পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্য্যালোচনা করিলে বুঝা যাইবে, তাঁহারাই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক কর্ম্মশীল; এমন কি, তাঁহাদের অধিকাংশকে অতি হীন কার্য্যে নিযুক্ত হইতে হইয়াছে। এই জন্য বলিতে হয়, প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ, মানুষের সহিষ্ণুতায় এবং শ্রমশীলতায়। প্রতিভার কার্য্যে বিরাম বা বিরতি কোন কালে থাকে না। ওয়াসিংটন বাল্যকালে পাঠ্যাবস্থার অবসরে রসিদ, ছাড়, হাতচিঠি প্রভৃতি নকল করিতেন। বিদ্যাসাগরের প্রতিভা বাল্য কাল হইতেই পরিপুষ্ট তাঁহার শ্রমশীলতায়। পাঠ্যাবস্থায় কাজ না থাকিলে এবং আবশ্যক না হইলেও যিনি অবসরে পুঁথি নকল করিয়া কার্য্যানুরাগিতার পরিচয় দিতেন, তাঁহার পক্ষে এই অবস্থায় চাকুরীর অত্যাবশ্যক ইংরেজি শিক্ষাটা আর কষ্টকর কি? বিখ্যাত ইতিহাস-লেখক নিবো চাকুরী করিতে করিতে অবসর সময়ে আরব্য, রোমান এবং অন্যান্য “শ্লাবনিক” ভাষা শিখিয়া ফেলিয়াছিলেন।

    বিদ্যাসাগরের ন্যায় একজন অতি শ্রমশীল বুদ্ধিমান ব্যক্তির যে ইংরেজিটা শিখিয়া লইবেন, তাহার আর বিচিত্র কি? ইংরেজি শিক্ষার উপর তাঁহাকে আরও গুরুতর পরিশ্রম-সাপেক্ষ কার্য্যের ভার লইতে হইয়াছিল। এই সময় তাঁহার নিকট সন্ধ্যাকালে ও প্রাতঃকালে অনেকেই সংস্কৃত ব্যাকরণ ও কাব্যাদি পড়িতে আসিতেন। এই সকল লোককে পড়াইয়া তিনি আবার স্বয়ং ইংরেজি পড়িতেন।

    এই সময় কলিকাতার বহুবাজার-পঞ্চাননতলায় নিতাই সেনের বাড়ীতে তাঁহার বাসা ছিল। এই বাড়ীর বাহিরে দুইটী বড় বড় ঘর ছিল। একটা ঘরে তিনি ও তাঁহার ভ্রাতারা থাকিতেন এবং অপর ঘরে অন্যান্য আত্মীয়েরা বাস করিতেন। পরে এখান হইতে অতি নিকটে হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠকখানা বাটীতে বাসা উঠিয়া যায়।

    বিদ্যাসাগর ডাক্তার নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের নিকট প্রত্যহ প্রাতে ইংরেজি শিক্ষা করিতেন। নীলমাধব বাবু কলিকাতা তালতলার স্বর্গীয় ডাক্তার দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছাত্র ছিলেন। দুর্গাচরণ বাবু তখন ডাক্তার হন নাই। তিনি হেয়ার সাহেবের স্কুলে দ্বিতীয় শিক্ষক ছিলেন। দুর্গাচরণ বাবু এই সময়ে প্রায় প্রত্যহ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাসায় অসিতেন। ক্রমে তাঁহার সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ঘনিষ্ঠ সৌহার্দ্য হয়। দুর্গাচরণ বাবু ডাক্তার হইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তাঁহার হৃদয়ের কার্য্যে অনেক সহায়তা করিতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় দুর্গাচরণ বাবুর সহায়তায় ও চিকিৎসায় অনেক আর্ত্ত-পীড়িতের কষ্ট নিবারণ করিতে সমর্থ হইতেন। নীলমাধব বাবুর নিকট কিছুদিন ইংরেজী শিখিয়া বিদ্যাসাগর হিন্দুকলেজের অন্যতম ছাত্র রাজনারায়ণ গুপ্তের নিকট রীতিমত ইংরেজি শিক্ষা করেন।17 ইরেজী অঙ্ক শিখিবার জন্যও বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রায়ই শোভাবাজার-রাজবাটীতে স্বৰ্গীয় আনন্দকৃষ্ণ বসু, অমৃতলাল মিত্র এবং স্বগীয় শ্রীনাথ ঘোষের নিকট যাইতেন।18 অঙ্ক শিখিবার জন্য তাঁহার যথেষ্ট চেষ্টা ছিল; কিন্তু বিষয়টা তাঁহার তত প্রীতিপদ হয় নাই; অথচ ইহাতে অনেকটা সময় অনর্থক অতিবাহিত হইত; তদুপরি বিষয়টা তাঁহার নীরস বলিয়া বিবেচিত হইত; অগত্য তিনি তাহা হইতে বিরত হন।

    বিদ্যাসাগর মহাশয় অঙ্কবিদ্যা-চর্চ্চা পরিত্যাগ করিয়া স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-মার্গ অবলম্বন করিয়াছিলেন। ইহার চরম ফল,— আত্মোৎকর্ষ। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালযের বিমিশ্র শিক্ষাপ্রণালীতে অনেকের আত্মোৎকর্ষে ব্যাঘাত ঘটিয়া থাকে। ইংলণ্ডের কোন কোন কর্ত্তৃপক্ষ এ কথা স্বীকার করিয়াছেন। আধুনিক বিমিশ্র শিক্ষা-প্রণালী প্রবর্ত্তিত হইবার পূর্ব্বে, অনেকের স্বাভাবিকী প্রবৃত্তি পরিচালনার সুযোগ ঘটিয়াছিল। সেই জন্য অনেকে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-সম্মত বিষয়ে ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়া আত্মোৎকর্ষের পরিচয় দিতে পারিতেন। এ আত্মোৎকর্ষ-তত্ত্ব সম্বন্ধে ১৩০১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের “সাধনায়”19 চিন্তাশীল লেখক শ্রীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর কয়েকটা যুক্তি-সঙ্গত কথা বলিয়াছেন। কথাগুলি এই —

    “যদি কোন পাঠশালা বা বিশ্ববিদ্যালয় তাহার অধীনস্থ ছাত্রদিগকে এক ছাঁচে ঢালিবার চেষ্টা করে, অর্থাৎ তাহাদের প্রত্যেকের নিজত্ব না ফুটাইয়া তুলিয়া যদি একটা সাধারণ আদর্শে সকলকেই গঠিত করিবার প্রয়াস পায়, তবে বুঝা যায় যে, সে পাঠশালা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত শিক্ষাবিধানে নিতান্ত অযোগ্য ও অসমর্থ। প্রকৃত শিক্ষা কি? না, আত্মোৎকর্ষ স্বাধন—উন্নতি সাধন। যাহা আত্মার অভ্যন্তরে গৃঢ়ভাবে থাকে, তাহা উপর দিকে আনা—উন্নয়ন করা—নিজত্বের কর্ষণ করা—নিজেকে নিজের যথার্থ অনুরূপ করিয়া তোলা। কোন ব্যক্তিবিশেষকে একটা স্থানীয় আদর্শের কিম্বা লৌকিক আদর্শের অনুরূপ করিয়া গঠন করিতে গেলে, শিক্ষার উদ্দ্যেশ্য বিফল হইয়া যায়।

    স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-প্রণোদনে আত্মোৎকর্ষের কিরূপ সুবিধা, তাহার দৃষ্টান্ত-স্বরূপ, পুত্রব্লো ও কলরাডোর সরকারী পাঠশালার “ব্যক্তিগত শিক্ষা প্রণালীর” কথা উল্লিখিত হইয়াছে। এখানকার বিদ্যালয়ে “প্রতোক ঘরে কতকগুলি ছাত্র পৃথক পৃথক ভাবে আপন আপন কাজ করে, শিক্ষক তাহাদিগকে সারি সারি দাঁড় করাইয়া কিংবা মনোরঞ্জন করিবার চেষ্টা করিয়া অথবা লেকচার দিয়া কিংবা ব্যাখ্যা করিয়া সময় নষ্ট করেন না। তিনি কেবল প্রত্যেকের ডেস্কের নিকট গিয়া ছাত্রদিগের সহকারি-স্বরূপ হইয়া উৎসাহ ও উপদেশ প্রদান করেন।”

    শিক্ষা-সাধন-সম্বন্ধে যে কথা, বৃত্তি-নির্ব্বাচন-সম্বন্ধেও সেই কথা। এতৎ-সম্বন্ধেও ১৩০০ সালের চৈত্র মাসের সাধনায় জ্যোতিরিন্দ্র বাবু লিখিয়াছেন,—“অনেক সময় দেখা যায়, যে কর্ম্ম যাকে সাজে, সে কর্ম্ম সে পায় না বা করে না। যে ডাক্তার হইবার উপযুক্ত, সে হয় তো আইন ব্যবসায় অবলম্বন করিয়াছে, যে আইন ব্যবসায়ের উপযুক্ত, সে হয় তো ইঞ্জিনিয়রের কাজ করিতেছে। এইরূপ অনুপযোগী কাজে প্রবেশ করিয়া কেহই সফলতা লাভ করিতে পারে না,—তাহার সমস্ত পরিশ্রম পণ্ড হইয়া যায়।” জ্যোতিরিন্দ্র বাবুর মতে কে কোন, কাজের উপযুক্ত, তাহা তাহার দৈহিক ও মানসিক লক্ষণে কতক বুঝা যায়। কোন কোন য়ুরোপীয় দার্শনিকের ও এই মত; কিন্তু এরূপ মতমীমাংসার অনেক সময় ব্যত্যয় দেখা যায়। ডাক্তার গিলবার্ট মীমাংসা করেন, যাহারা বুদ্ধিজীবী ও প্রতিভাশালী, তাঁহাদের মস্তক বৃহৎ; কিন্তু আলেকজাণ্ডার, জুলিয়স সিজর, ফ্রেডরিক দি গ্রেট্, বায়রন, বেকন, প্লেটো, আরষ্টটল প্রভৃতি প্রতিভাশালী লোকদিগের মস্তক সম্বন্ধে আলোচনা করিলে, বিপরীতে মীমাংসায় উপস্থিত হইতে হয়।

    এরূপ অবস্থায় দৈহিক-মানসিক লক্ষণ নির্ণয়ে, বৃত্তি-নির্ব্বাচনের অব্যর্থতা স্বীকার করিতে কখন কখন দ্বিধা হয় না কি? বংশ-পরম্পরাগত বৃত্তি-সাধনায় সেরূপ দ্বৈধ ভাব থাকিবার কথা নয়। যাঁহারা এ কথা মানিবেন, তাঁহারা হিন্দুর জাতিভেদের গৌরব ঘোষণা করিবেন।

    বিদ্যাসাগর মহাশয় অঙ্ক শাস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া আনন্দকৃষ্ণ বাবুর নিকট সেক্সপীয়র পড়িবার জন্য প্রায়ই তিনি শোভাবাজার রাজবাটীতে যাতায়াত করিতেন। এই সময় তিনি রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের নিকট পরিচিত হন। এক দিন মধ্যাহ্নে রাজা বাহাদুর আহারান্তে মুখপ্রক্ষালন করিতেছিলেন, সেই সময় বিদ্যাসাগর মহাশয় রাজবাটীতে আনন্দকৃষ্ণ বাবুর নিকট যাইতেছিলেন। হঠাৎ তাঁহার প্রতি রাজা বাহাদুরের দৃষ্টি পতিত হয়। তিনি পার্শ্বস্থ একটা আত্মীয়কে জিজ্ঞাসা করেন,—“ঐ যে হৃষ্টপুষ্ট তেজঃপুঞ্জময় ব্রাহ্মণ-যুবকটী যাইতেছেন, উনি কে? উঁইার মুখে যেন প্রতিভার প্রভা ফাটিয়া পড়িতেছে। উহাকে ডাকিয়া আন তো।” আত্মীয়টী তখনই বিদ্যাসাগরকে রাজা-বাহাদুরের নিকটে ডাকিয়া লইয়া যান। রাজা-বাহাদুর তখন তাঁহার নিকট তাঁহার আনুপূর্ব্বিক পরিচয় গ্রহণ করেন। তিনি বিদ্যাসাগরের কথা-বার্ত্তায় যথেষ্ট সত্তোষ লাভ করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে বুদ্ধিমান বলিয়াও বুঝিয়াছিলেন। তখন তিনি,—“বিদ্যাসাগর” উপাধিধারী একটা ব্রাহ্মণযুবক মাত্র। সে “বিদ্যাসাগরে” বিশ্ব বিশ্রুতি সংঘটিত হয় নাই। তখনকার বিদ্যাসাগর, এখনকার বিদ্যাসাগর ছিলেন না। এই শোভাবাজার-রাজবাটীতে অক্ষয়কুমার দত্তের সহিত বিদ্যাসাগরের আলাপ পরিচয় হয়। তখন অক্ষয় বাবু তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।20 তত্ত্ববোধিনীর সহিত আনন্দকৃষ্ণ বসু প্রমুখ অন্যান্য অনেক কৃতবিদ্যের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। আনন্দকৃষ্ণ বাবুর মুখে শুনিয়াছি,—“বিদ্যাসাগর ও অক্ষয় বাবু উভয়েই রাজবাটীতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ইংরেজি, অঙ্ক ও সাহিত্য পড়িতে যাইতেন। তাঁহারা ছাদের উপর বসিয়া খড়ি দিয়া, অঙ্ক পাতিয়া, জ্যামিতির প্রতিজ্ঞা পুরণ করিতেন। মাস পাঁচ ছয় পরে বিদ্যাসাগর অঙ্কবিদ্যা পরিত্যাগ করেন। ইহাতে তাঁহার প্রবৃত্তি ছিল না। অতঃপর তিনি সেক্সপীয়র পড়িতেন। ইহা শীঘ্রই আয়ত্ত্বও করিয়াছিলেন।”

    তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় যিনি যাহা লিখিতেন, আনন্দকৃষ্ণ বাবু প্রমুখ কৃতবিদ্য ব্যক্তিদিগকে তাহা দেখিয়া আবশ্যকমত সংশোধনাদি করিয়া দিতে হইত। এক দিন বিদ্যাসাগর মহাশয় আনন্দ বাবুর বাড়ীতে বসিয়াছিলেন, এমন সময় অক্ষয়কুমার বাবুর একটা লেখা তথায় উপস্থিত হয়। আনন্দ বাবু বিদ্যাসাগর মহাশয়কে অক্ষয়কুমার বাবুর লেখাটা পড়াইয় শুনাইয়া দেন। অক্ষয়কুমার বাবু পূর্ব্বে যে সব অনুবাদ করিতেন, তাহাতে কতকটা ইংরেজি ভাব থাকিত। বিদ্যাসাগর মহাশয় অক্ষয়কুমার বাবুর লেখা দেখিয়া বলিলেন,—“লেখা বেশ বটে; কিন্তু অনুবাদের স্থানে স্থানে ইংরেজী ভাব আছে।” আনন্দকৃষ্ণ বাবু, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তাহা সংশোধন করিয়া দিতে বলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও সংশোধন করিয়া দেন। এইরূপ তিনি বার কতক সংশোধন করিয়া দিয়াছিলেন। অক্ষয় বাবু সেই সুন্দর সংশোধন দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইতেন। তখনও কিন্তু তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে জানিতেন না। লোক দ্বারা প্রবন্ধ প্রেরিত হইত এবং লোক দ্বারা ফিরিয়া আসিত। তিনি সংশোধিত অংশের বিশুদ্ধ-প্রাঞ্জল বাঙ্গালা দেখিয়া ভাবিতেন,— এমন বাঙ্গালা কে লেখে? কৌতুহল নিবারণার্থ তিনি এক দিন স্বয়ং আনন্দ বাবুর নিকট উপস্থিত হন এবং তাঁহার নিকট বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পরিচয় পান। আনন্দকৃষ্ণ বাবুর পরিচয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত পরে তাঁহার আলাপ-পরিচয় হয়। ইহার পর অক্ষয় বাবু যাহা কিছু লিখিতেন, তাহা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে দেখাইয়া লইতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও সংশোধন করিয়া দিতেন। পরস্পরের প্রগাঢ় সৌহার্দ্য সংগঠিত হয়।

    সাহিত্য-ক্ষেত্রে অপূর্ব্ব শুভ সংযোগ। এ শুভ সংযোগের দিন বাঙ্গালীর চির-স্মরণীয়। উভয়ে বাঙ্গালা ভাষার পুষ্টিসাধনের জন্য জীবন উৎসর্গ করিয়ছিলেন। আডিসন্‌ ষ্টিলের শুভ সংযোগে ইংরেজী সাহিত্য প্রসারের শুভলক্ষণ ভাবিয়া আজিও বিলাতবাসী ইংরেজ আনন্দে উৎফুল্ল হন। হয় তো অনেক আধুনিক ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙ্গালী, এই শুভসংযোগের দিনকে জাতীয় উৎসবের দিন বলিয়া মনে করিয়া থাকেন; কিন্তু বাঙ্গালার অক্ষয়কুমার ও বিদ্যাসাগরের এ শুভ সংযোগ কয় জন বাঙ্গালী স্মরণ করেন?

    অক্ষয়কুমার বাবুর প্রস্তাবে এবং তত্ত্ববোধিনী সভার অন্যান্য সভ্যগণের সমর্থনে, বিদ্যাসাগর মহাশয় তত্ত্ববোধিনী সভার অন্তর্গত “পেপার-কমিটীর” অন্ততম সদস্য পদে প্রতিষ্ঠিত হন।21 এই সূত্রে তিনি স্বৰ্গীয় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু মানাস্পদ হইয়াছিলেন। বলিয়া রাখি, ব্রাহ্ম-সমাজেব সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোন সম্বন্ধ ছিল না। “পেপার কমিটী” বা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সঙ্গে সম্বন্ধ ছিল, কেবল সাহিত্যের সংস্রবে, ধর্ম্মের টানে নহে। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় কোন প্রবন্ধ প্রকাশ করিবার পূর্ব্বে, অক্ষয় বাবুকে ও তৎসম্বন্ধে “পেপার-কমিটী”র সভ্যদিগের মতামত লইতে হইত। তাহার একটী প্রমাণ নিম্নে প্রকাশ করিলাম,—

    “কবিরপন্থীদিগের বৃত্তান্ত-বিষয়ক পাণ্ডুলেখ্য প্রেরণ করিতেছি, যথাবিহিত অনুমতি করিবেন।”

    তত্ত্ববোধিনী সভা,

    ১৭৭০ শক, ১৪ই আষাঢ়।

    } শ্রীঅক্ষয়কুমার দত্ত

    “গ্রন্থ-সম্পাদক।”

    “প্রেরিত প্রস্তাব পাঠে পরিতোষ পাইলাম। ইহা অতি সহজ ও সরল ভাষায় সুচারুরূপে রচিত ও সঙ্কলিত হইয়াছে। অতএব পত্রিকায় প্রকাশ বিষয়ে আমি সন্তুষ্ট চিত্তে সম্মতি প্রদান করিলাম। ইতি—

    “শ্ৰীঈশ্বরচন্দ্ৰ শৰ্ম্মা।”

    “শ্ৰীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উক্ত পাণ্ডুলেখ্যের স্থানে স্থানে যে সকল পরিবর্তন করিয়াছেন, তাহা অতি উত্তম হইয়াছে।”

    শ্রীশ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়।

    অক্ষয়কুমার দত্তের যত্নে বিদ্যাসাগর মহাশয় ১৭৭০ শকের ফাল্গুন মাসে বা ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার ৬৭ সংখ্যায় মহাভারতের বাঙ্গালা অনুবাদ প্রকাশ করিতে আরম্ভ করেন। আদি পর্ব্বের কিয়দংশ মাত্র প্রকাশিত হইয়াছিল। অনুবাদের একটু নমুনা এই –

    “নারায়ণ ও সৰ্ব্বনরোত্তম নর এবং সরস্বতী দেবীকে প্রণাম করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

    কোন কালে কুলপতি শৌনক নৈমিষারণ্যে দ্বাদশ বার্ষিক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ঐ সময়ে এক দিবস ব্রতপরায়ণ মহর্ষিগণ দৈনন্দিন কর্ম্মাবসানে একত্র সমাগত হইয়া কথা প্রসঙ্গে কালযাপন করিতেছেন, এই অবসরে সূত লোমহর্ষণপুত্ত্র পৌরাণিক উগ্রশ্রবা বিনীতভাবে তাঁহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। নৈমিষারণ্যবাসী তপস্বিগণ দর্শনমাত্র অদ্ভূত কথা শ্রবণ-বাসনাপরবশ হইয়া, তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া চতুর্দ্দিকে দণ্ডায়মান হইলেন। উগ্রশ্রবা বিনয়নম্র ও কৃতাঞ্জলি হইয়া অভিবাদনপূর্ব্বক সেই সমস্ত মুনিকে তপস্যার কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। পরে সমুদয় ঋষিগণ স্ব স্ব আসনে উপবিষ্ট হইলে তিনিও নির্দ্দিষ্ট আসনে নিবিষ্ট হইলেন। অনন্তর তাঁহার শ্রান্তি দূর হইলে, কোন ঋষি কথাপ্রসঙ্গ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে পদ্মপলাশলোচন সূতনন্দন! তুমি এক্ষণে কোথা হইতে আসিতেছ এবং এতকাল কোথায় ভ্রমণ করিলে বল।”22

    কিছু দিন অনুবাদ মুদ্রিত হইবার পর, ৺কালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সম্মতি লইয়া মহাভারতের অনুবাদ প্রকাশ করিতে থাকেন কালীপ্রসন্ন বাবু ইহা স্বীকার করিয়া গিয়াছেন, ‘মহাভারতানুবাদ সময়ে অনেক স্থলে অনেক কৃতবিদ্য মহাত্মার নিকট আমাকে ভূয়িষ্ট সাহায্য গ্রহণ করিতে হইয়াছে, তন্নিমিত্ত তাঁহাদিগের নিকট চিরজীবন কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রহিলাম। আমার অদ্বিত্ম সহায় পরম শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং মহাভারতের অনুবাদ করিতে আরম্ভ করেন এবং অনুবাদিত প্রস্তাবের কিয়দংশ কলিকাতা ব্রাহ্ম সমাজের অধীনস্থ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ক্রমান্বয়ে প্রচারিত ও কিয়দ্ভাগ পুস্তকাকারেও মুদ্রিত করিয়াছিলেন; কিন্তু আমি মহাভারতের অনুবাদ করিতে উদ্যত হইয়াছি শুনিয়া, তিনি কৃপাপরবশ হইয়া সরল হৃদয়ে মহাভারতানুবাদে ক্ষান্ত হন। বাস্তবিক বিদ্যাসাগর মহাশয় অনুবাদে ক্ষান্ত না হইলে, আমার অনুবাদ হইয়া উঠিত না। তিনি কেবল অনুবাদেচ্ছা পরিত্যাগ করিয়াই নিশ্চিন্ত হন নাই। অবকাশানুসারে আমার অনুবাদ দেখিয়া দিয়াছেন ও সময়ে সময়ে কার্য্যোপলক্ষে যখন আমি কলিকাতায় অনুপস্থিত থাকিতাম, তখন স্বয়ং আসিয়া আমার মুদ্রাযন্ত্রের ও ভারতানুবাদের তত্ত্বাবধারণ করিয়াছেন। ফলতঃ বিবিধ বিষয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট পাঠ্যাবস্থাবধি আমি যে কত প্রকারে উপকৃত হইয়াছি, তাহা বাক্য বা লেখনী দ্বারা নির্দেশ করা যায় না।” মহাভারত অষ্টাদশ পর্ব্ব অনুবাদের উপসংহার—(১৭৮৮)।

    মহাভারত অনুবাদ করিবার পূর্ব্বে বিদ্যাসাগর মহাশয় “বাসুদেবচরিত” ও “বেতাল-পঞ্চবিংশতি” এই দুই খানি গ্রন্থ অনুবাদ করেন। এই দুই গ্রন্থে তিনি অনুবাদের কৃতিত্ব দেখাইয়া ছিলেন। তাহার বিস্তৃত আলোচনা অন্য অধ্যায়ে হইবে। এই অধ্যায়ে প্রসঙ্গক্রমে মহাভারতের কথা এইখানে প্রকাশ করিলাম। “তত্ত্ববোধিনী” সংস্রবত্যাগের কথাটাও এইখানে বলিয়া রাখি।

    কয়েক বৎসর পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় তত্ত্ববোধিনীর সম্পর্ক পরিত্যাগ করেন।

    তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার উপযুক্ত সম্পাদক ৺অক্ষয়কুমার দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদকতা ত্যাগ করিলে, কানাইলাল পাইনের প্রস্তাবে ও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সমর্থনে, সম্পাদকের বৃত্তি দিবার প্রস্তাব হয়। সেই সময় ৺দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহাতে এই বলিয়া প্রতিবাদী হন, কেবল তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় আয়ে যদি বৃত্তি দেওয়া হয়, তবে তাহা হইতে পারে, তত্ত্ববোধিনী সভার আয় ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার আয় একত্র মিলিত করিয়া তাহা হইতে দেওয়া অবিধি। সাধারণ সভ্যের মতানুসারে কিন্তু উহার বিপরীত ব্যবস্থা ধার্য্য হয়।

    বিদ্যাসাগর মহাশয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা হইতে অক্ষয়কুমারকে মাসিক পঁচিশ ২৫৲ টাকা বৃত্তি দেওয়াইবার প্রধান উদ্‌যোগী।

    “অক্ষয় বাবুর অসাধ্য রোগ তত্ত্ববোধিনী সভার ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার একটী বিপত্তির বিষয়, ইহা বলা বাহুল্য। ঐ সভার সভ্যেরা তন্নিমিত্ত অতিমাত্র দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন হইয়াছিলেন, ইহাও বলা অতিরিক্ত। তাঁহারা ইহার প্রতি কৃতজ্ঞ হইয়া মাসিক বৃত্তি নিৰ্দ্ধারণ করিয়া দেন। দেশমান্য পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় এ বিষয়ের জন্য বিশেষ উদ্‌যোগ পাইয়াছিলেন। তাঁহা কর্ত্তৃক বিরচিত সে বিষয়ের বৃত্তান্ত ১৭৭৯ সতরশ উনআশী শকের (১২৬৪ সালের) কার্ত্তিক মাসের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নিম্নে তাহা উদ্ধৃত হইতেছে,—

    “তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রচারিত হওয়াতে, এতদ্দেশীয় লোকদিগের যে নানা গুরুতর উপকার লাভ হইয়াছে, ইহা বোধবিশিষ্ট ব্যক্তিমাত্রেই স্বীকার করিয়া থাকেন। আদ্যোপান্ত অনুধাবন করিয়া দেখিলে, শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার দত্ত, এই তত্ববোধিনী পত্রিকা-সৃষ্টির প্রধান উদ্‌যোগী এবং এই পরোপকারিণী পত্রিকার অসাধারণ শ্রীবৃদ্ধিলাভের অদ্বিতীয় কারণ বলিয়া বোধ হইবে। তাঁহারই যত্নে ও পরিশ্রমে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সর্ব্বত্র এরূপ আদরভাজন ও সর্ব্বসাধারণের এরূপ উপকারসাধন হইয়া উঠিয়াছে। বস্তুতঃ তিনি অনন্ত-মন ও অনন্য-কর্ম্মা হইয়া কেবল তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধিসম্পাদনেই নিয়ত নিবিষ্টচিত্ত ছিলেন। তিনি এই পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধিসাধনে কৃতসঙ্কল্প হইয়া অবিশ্রান্ত অত্যুৎকট পরিশ্রমদ্বারা শরীরপাত করিয়াছেন বলিলে বোধ হয়, অত্যুক্তি দোষে দূষিত হইতে হয় না। তিনি যে অতি বিষম শিরোরোগে আক্রান্ত হইয়া দীর্ঘকাল অশেষ ক্লেশ ভোগ করিতেছেন, তাহা কেবল ঐ অত্যুৎকট মানসিক পরিশ্রমের পরিণাম, তাহার সন্দেহ নাই। অতএব যিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার নিমিত্ত শরীরপাত করিয়াছেন, সেই মহোদয়কে সহস্র ধন্যবাদ প্রদান করা ও তাঁহার প্রতি যথোচিত কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা আবশ্যক, না করিলে তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্যদিগের কর্তব্যানুষ্ঠানের ব্যতিক্রম হয়। দীর্ঘকাল দুরন্ত রোগে আক্রান্ত থাকাতে, অক্ষয়কুমার বাবুর আয়ের সঙ্কোচ, ব্যয়ের বাহুল্য এবং তন্নিবন্ধন অশেষ ক্লেশ ঘটিবার উপক্রম হইয়া উঠিয়াছে। এ সময় কিছু অর্থসাহায্য করিতে পারিলে, প্রকৃতরূপে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা হয়, এই বিবেচনায় গত শ্রাবণ মাসের দ্বাদশ দিবসীয় বিশেষ সভায় শ্রীযুক্ত বাবু কানাইলাল পাইন প্রস্তাব করেন যে, তত্ত্ববোধিনী সভা হইতে কিছুকালের জন্য অক্ষয় বাবুকে সাহায্য প্রদান করা যায়। তদানুসারে অদ্য সমাগত সভ্যেরা নিৰ্দ্ধারিত করলেন, অক্ষয়কুমার যতদিন পর্য্যন্ত সুস্থ ও স্বচ্ছন্দ শরীর হইয়া পুনরায় পরিশ্রমক্ষম না হন, তত দিন তিনি সভা হইতে আগামী আশ্বিন মাস অবধি পঞ্চবিংশতি মুদ্রা মাসিক পাইবেন। আর ইহাও নির্দ্ধারিত হইল ষে, এই প্রতিজ্ঞার প্রতিলিপি অক্ষয়কুমার বাবুর নিকট প্রেরিত হয় এবং সর্ব্বসাধারণের গোচরার্থ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতেও অবিকল মুদ্রিত হয়। (তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ১৭৯৭ শক, কার্ত্তিক মাস।)23

    তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার এই লিখিত অংশ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচিত। কেমন সুন্দর প্রাঞ্জল রচনা বল দেখি? বাঙ্গালা ভাষার পুষ্টিপ্রারম্ভে এরূপ রচনা, রচয়িতার কৃতিত্বপরিচায়ক নহে কি? সাহিত্যের ইতিহাসে এই সর্ব্বাঙ্গপুষ্ট রচনার স্থান অতি উচ্চ নহে কি? এমন ভাষায়, যিনি প্রাণের এমন কৃতজ্ঞতা উচ্ছ্বসিত করিতে পারেন, তিনি প্রকৃতই বাঙ্গালা সাহিত্য-মন্দিরের জাগ্রত দেবতা নহেন কি? এই ভাষাকে আমরা “কৃতজ্ঞতার” ভাষা বলি, মনে হয়, এ ভাষা না হইলে বুঝি কৃতজ্ঞতার বিকাশ হয় না।

    সাহিত্যের সঙ্গে ধর্ম্মভাব বিজড়িত দেখিয়া এবং কোন কোন বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথ বাবুর সহিত তাঁহার ঠিক মতমিল হইতেছে না বুঝিয়া, অক্ষয়কুমার দত্তের কিছু কাল পরেই বিদ্যাসাগর মহাশয় তত্ত্ববোধিনীর সম্পর্ক ত্যাগ করেন। দুই জন স্বাধীন-চেতা ও তেজস্বী পুরুষের মতসংঘর্ষে পরিণাম এরূপ হওয়া বিচিত্র নহে। চক্‌মকী পাথরের সঙ্গে ইস্পাতের সংঘর্ষণে অগ্নিফুলিঙ্গ নিঃসৃত হয়। এই কারণেই কেশবচন্দ্র সেনপ্রমুখ কয়েক ব্যক্তির সহিত ব্রাহ্মসমাজের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল।

    বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন বাসায় ইংরেজি শিখিতেন, তখন হাইকোর্টের অন্ততম অনুবাদক শ্যামাচরণ সরকার, রামরতন মুখোপাধ্যায়, নীলমণি মুখোপাধ্যায়, রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি অনেকেই তাঁহার নিকট সংস্কৃত শিক্ষা করিতেন। তাঁহার অধ্যাপনা প্রণালী এমনই কৌশলময় যে, অতি দুরূহ বিষয়ও অল্প দিনের মধ্যে সহজে শিক্ষার্থীদিগের আয়ত্ত হইত। সে শিক্ষাপ্রণালীর কথা শুনিয়া সংস্কৃত কলেজের তদানীন্তন পণ্ডিত-মণ্ডলীও চমৎকৃত হইতেন। শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিবার জন্য তিনি কিরূপ যত্ন ও পরিশ্রম করিতেন এবং তাঁহার শিক্ষা দিবার প্রণালীট কিরূপ ছিল, রাজকৃষ্ণ বাবুর সংস্কৃত শিক্ষাতত্ত্বটা বিবৃত করিলে, পাঠক তাহা বুঝিতে পরিবেন।

    রাজকৃষ্ণ বাবু বহুবাজার নিবাসী ৺হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্র। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাসার সম্মুখেই তাঁহার বাড়ী ছিল। তখন তাঁহার বয়স ১৫/১৬ বৎসর। তিনি হিন্দু কলেজে ইংরেজি পড়িয়া এই বয়েসেই পড়া শুনা ছাড়িয়া দেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত তাঁহার আলাপ পরিচয় হইয়াছিল। তিনি প্রত্যহ সকাল সন্ধ্যায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাসায় যাইতেন। এক দিন তিনি দেখিলেন, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মধ্যম ভ্রাতা দীনবন্ধু সুর করিয়া মেঘদূত পড়িতেছেন। সুন্দর সুরলয়ে উচ্চারিত সেই রসপূর্ণ ও ভাবময় শ্লোকের আবৃত্তি শ্রবণ করিয়া রাজকৃষ্ণ বাবু বিমোহিত হইলেন। তখন তাহার সংস্কৃত শিখিবার বাসনা হইল। তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও তাঁহাকে সংস্কৃত শিখাইতে সন্মত হইলেন; কিন্তু তিনি ভাবিতে লাগিলেন, এত বয়সে মুগ্ধবোধ পড়িয়া সংস্কৃত শিখিতে গেলে সংস্কৃত শিক্ষা দুস্কর হইবে; অধিকন্তু অনর্থক সময় নষ্ট হইবে। বিদ্যাসাগর মহাশয় রাজকৃষ্ণবাবুকে বলেন,—“দেখ, আমি যখন মুগ্ধবোধ মুখস্থ করি, তখন ইহার এক বর্ণও বুঝিতে পারি নাই; পরে যখন সংস্কৃত সাহিত্যে অগ্রসর হইলাম, তখন ইহার অর্থ গ্রহণ করিতে সমর্থ হই। তোমাকে মুগ্ধবোধ মুখস্থ করাইয়া সংস্কৃত শিখাইতে হইলে এ বয়সে সংস্কৃত শিখা দায় হইবে। অতএব তোমাকে একটা সহজ উপায়ে ব্যাকরণ শিখাইতে হইবে।” এই বলিয়া তিনি সে দিন রাজকৃষ্ণ বাবুকে বিদায় দেন। রাজকৃষ্ণ বাবুকে বিদায় দিয়া তিনি ব্যাকরণ শিখাইবার একটা সরল পথের অন্বেষণে প্রবৃত্ত হন।

    পর দিন রাজকৃষ্ণ বাবু আসিয়া দেখেন, তাঁহার জন্য ব্যাকরণ শিখিবার সরল ও সহজ উপায় উপস্থিত। চারি ‘তা’ ফুলস্কেপ কাগজে বাঙ্গালা অক্ষরে, বর্ণমালা হইতে ধাতু প্রত্যয়াদি পর্যন্ত মুগ্ধবোধের সারাংশ লিখিত। রাজকৃষ্ণ বাবু দেখিয়া অবাক হইলেন। রাজকৃষ্ণ বাবু আমাদিগকে বলিয়াছেন,—“ইহাই উপক্রমণিকা ব্যাকরণের সুত্রপাত। উপক্রমণিকা ব্যাকরণের পূর্ব্বাভাস এই খানেই তাঁহার মস্তকে প্রবেশ করে। আমি সেই ফুলস্কেপ কাগজে লিখিত ব্যাকরণের সারাংশ এবং তাৎকালিক ব্যাপটিষ্ট প্রেসে মুদ্রিত একথান সংস্কৃত গ্রন্থ পড়িতে আরম্ভ করি। মাস দুই তিন পড়িয়া আমি ব্যাকরণের আভাস কতকটা আয়ত্ত করিয়া লই। তিন চারি মাসের পর আমি মুগ্ধবোধ পড়িতে আরম্ভ করি।” বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শিক্ষা দিবার প্রণালীর গুণে এবং স্বকীয় অসাধারণ অধ্যবসায়ে ও পরিশ্রমবলে রাজকৃষ্ণ বাবু ছয় মাসের মধ্যে মুগ্ধবোধ পড়া সাঙ্গ করেন। পরে তিনি কাব্যাদিপাঠে প্রবৃত্ত হন।  এই সময় সংস্কৃত কলেজে “জুনিয়র্” ও “সিনিয়র্” পরীক্ষা প্রচলিত ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয়, রাজকৃষ্ণ বাবুকে “জুনিয়ার্” পরীক্ষা দিবার জন্য প্রস্তুত হইতে বলেন। রাজকৃষ্ণ বাবুও সম্মত হন; কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয় এক দিন সংস্কৃত কলেজে গিয়া শুনেন, একটা ব্রাহ্মণপণ্ডিত ৮ আটটী টাকা “জুনিয়র্” বৃত্তি পাইতেছেন। ব্রাহ্মণের সেই আটটী টাকায় লেখাপড়া এবং আহারাদি সবই নির্ভর করিত। এ সংবাদ পাইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় ভাবিয়াছিলেন,—“রাজকৃষ্ণের জুনিয়র পরীক্ষা দেওয়া হইবে না; রাজকৃষ্ণ যদি পরীক্ষায় বৃত্তি পায়, তাহা হইলে ব্রাহ্মণের বৃত্তি-রোধ হইবে।” স্বভাবতঃ পরদুঃখকাতর বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণের অবস্থা ভাবিতে ভাবিতে বড় কাতর হইয়া পড়েন। তিনি বাসায় ফিরিয়া আসেন এবং রাজকৃষ্ণ বাবুকে সকল কথা প্রকাশ করিয়া বলেন। রাজকৃষ্ণ বাবু “জুনিয়র্” পরীক্ষা দিবার কামনা পরিত্যাগ করেন। ইহা গুরু-শিষ্যের সহৃদয়তার পরিচায়ক নহে কি? করুণা-স্রোতে উভয়ের বলবতী বাসনা ভাসিয়া গেল। অতঃপর বিদ্যাসাগর মহাশয় রাজকৃষ্ণ বাবুকে “সিনিয়র্” পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে বলেন। “সিনিয়র” পরীক্ষা দিবার প্রস্তাব শুনিয়া রাজকৃষ্ণ বাবু বলেন,—“আমি কি পারিব?” বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন,—“কেন পরিবে না? তবে একটু বেশী পরিশ্রম করিতে হইবে। তুমি যদি প্রত্যহ আহারাদি করিয়া বেলা ৯ টার সময় আমার সহিত ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে যাইতে পার, তাহা হইলে আমি তোমায় পড়াইতে পারি” রাজকৃষ্ণ বাবু সন্মত হন।

    প্রত্যহ ৯ নয়টার সময় আহারাদি করিয়া রাজকৃষ্ণ বাবু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গে ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে যাইতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রায় বেলা ৩ তিনটা পর্য্যন্ত সাহেবদিগকে পড়াইতেন এবং অন্যান্য কাজ করিতেন। ইহার মধ্যে কোন রকমে অবকাশ পাইলেই, তিনি সাহেবের গৃহ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া রাজকৃষ্ণ বাবুকে পড়াইয়া যাইতেন। ৩ তিনটার সময় অফিসের কার্য্য সমাধা হইলেই তিনি সন্ধ্যা পর্য্যন্ত ফোর্ট উইলিয়ম্ কলেজে রাজকৃষ্ণ বাবুকে পড়াইতেন। পরে বাসায় ফিরিয়া আসিয়া উভয়ে আহারাদি সমাপন করিয়া অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় নিযুক্ত হইতেন। ঐ সময় অন্যান্য শিক্ষার্থীদিগকেও শিক্ষা দিতে হইত। রাজকৃষ্ণ বাবু কোন কোন দিন পড়িতে পড়িতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাসায় ঘুমাইয়া পড়িতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহাকে জাগরিত করিয়া পড়াইতেন। এইরূপে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শিক্ষা দিবার সুপ্রণালীতে এবং নিজের অবিচলিত অধ্যবসায়ে রাজকৃষ্ণ বাবু ২৷৷৹ আড়াই বৎসরের মধ্যে ব্যাকরণ, কাব্য ও স্মৃতিশাস্ত্রে শিক্ষিত হন।

    রাজকৃষ্ণ বাবুর অধ্যাপনায় বিদ্যাসাগরের শুদ্ধ শ্রমশীলতা, নহে, উদ্ভাবনীশক্তিমত্তারও সম্পূর্ণ পরিচয়। সময়ের দুনিরীক্ষ্য গতির প্রতি অন্তর্ভেদিনী দৃষ্টি সঞ্চালন করিয়া তিনি স্বকীয় শক্তিমাহাত্ম্যে দুর্জস্ব সিবিলিয়ানদিগকেও কিরূপ মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, পরে তাহার পরিচয় পাইবেন।

    ৪/৫ চারি পাঁচ বৎসরের শিক্ষা ২৷৷৹ আড়াই বৎসরে। কথাটী সহরময় রাষ্ট্র হইল। দলে দলে পণ্ডিতগণ বিদ্যাসাগর ও রাজকৃষ্ণ বাবুকে দেখিবার জন্য আসিতে লাগিলেন। অভূতপর্ব্ব অভিনব পদ্ধতি ও প্রথার প্রতিষ্ঠা এইরূপ। বিখ্যাত স্কচ গ্রন্থকার কারলাইলের নূতন পদ্ধতি ও প্রণালীমতে প্রবন্ধসমূহ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইলে পর, ভুরি ভুরি বিজ্ঞতম বিদ্বন্মণ্ডলী, সুদূর স্কট্‌লণ্ডের পার্ব্বত্যপ্রদেশ “ডমফ্রের” ক্ষেত্রাবাসে গিয়া করলাইলকে দেখিতে যাইতেন। আমেরিকার বিখ্যাত দার্শনিক গ্রন্থকার এমার্সন্ সাহেব কেবল কারলাইলকে দেখিয়া নয়নমন সার্থক করিবার জন্য স্কট্‌লণ্ডে আসিয়াছিলেন।

    ১৮৪৩-৪৪ খৃষ্টাব্দে বা ১২৫০-৫১ সালে রাজকৃষ্ণ বাবু সংস্কৃত কলেজের “সিনিয়র” পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া ১৫ টাকা বৃত্তি পান। পরে ২ দুই বৎসর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া ২০ কুড়ি টাকা করিয়া প্রথম শ্রেণীর বৃত্তি প্রাপ্ত হন। আর এক বার তাঁহার পরীক্ষা দিবার ইচ্ছা ছিল; কিন্তু দারুণ পরিশ্রমে তাঁহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হয়; এমন কি, তিনি মৃতকল্প হইয়াছিলেন। শরীর শোধারইবার জন্য তাঁহাকে স্থানান্তরে যাইতে হয়; সুতরাং আর পরীক্ষা দেওয়া হয় নাই।

  • ষষ্ঠ অধ্যায়

    ষষ্ঠ অধ্যায়

    সংস্কৃত-রচনা, পরীক্ষার ব্যবস্থা, পরীক্ষার রচনা, অনুরোধে রচনা, স্বেচ্ছায় রচনা ও আমাদের বক্তব্য।

    কলেজের পাঠ সমাপ্ত করিয়া ঈশ্বরচন্দ্র চাকুরীতে প্রবৃত্ত হন। পরবর্ত্তী অধ্যায় হইতে তদ্বিবরণের বিবৃতি আরম্ভ হইবে। সংস্কৃত কলেজে পাঠের সময় তিনি যে সব রচনা লিখিয়াছিলেন, তাহার একত্র সমাবেশ হইলে পাঠকগণের পড়িবার সুবিধা হইবে বলিয়া এই অধ্যায়ে সেই সমস্ত সন্নিবেশিত হইল।

    রচনা সাহিত্য-শিক্ষার সবিশেষ সাহায্যকারিণী। রচনায় সাহিত্যের শিক্ষা-পুষ্টির পরিচয়। যে সময় ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজে পড়িতেন, সে সময় রচনার উৎকর্ষ-সাধনজন্য কলেজের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্ত্তৃপক্ষের যথেষ্ট যত্ন চেষ্টা ছিল। কেবল সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত শিক্ষার জন্য নয়, ইংরেজী কলেজেও ইংরেজি শিক্ষার জন্য, রচনার সম্যক্ বিধি-ব্যবস্থা দেখা যাইত। উৎসাহে উৎকর্ষ। এই জন্য ছাত্রবৃন্দের রচনাবিষয়ে উৎসাহ-বৰ্দ্ধনার্থ যথোচিত পারিতোষিক বিতরণের বন্দোবস্ত ছিল। রচনার পরিপটি প্রকৃত পক্ষে পরীক্ষক ও কর্ত্তৃপক্ষের পরম প্রীতি-উৎপাদন করিত। পিতৃদেবের মুখে শুনিয়াছি,—“তখন রচনার জন্য যেমন ছাত্র-শিক্ষকের আগ্রহ দেখা যাইত, এখন আর তেমন বড় দেখা যায় না। এখনকার মত তখন বিশ্ববিদ্যালয়ী বিমিশ্র শিক্ষার বাঁধাবাঁধি তো ছিল না। তখন যাঁহার যে বিষয়ে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থাকিত, তিনি সে বিষয়েরই উৎকর্ষ-সাধনের সুযোগ পাইতেন। যাহার সাহিত্যে প্রবৃত্তি, তিনি সাহিত্যের উৎকর্ষ-সাধনে যত্নশীল হইতেন। গণিত, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়েও সেইরূপ ছিল। অধুনা বিকট বিমিশ্র শিক্ষার বাঁধাবাঁধিতে কোন বিষয়ে প্রকৃষ্ট ব্যুৎপত্তিলাভের সম্ভাবনা থাকে না। তখন সাহিত্যে যাঁহার প্রবৃত্তি থাকিত, রচনায়ও তাহার অনুরাগ দেখা যাইত। সাহিত্যাধ্যাপকগণও তদ্বিষয়ে যথেষ্ট যত্নশীল হইতেন। যে ছাত্র অল্পের ভিতর বহু ভাবময় রচনা লিখিতেন, তিনি প্রশংসিত হইতেন। একবার আমাদের ‘পরিশ্রম’ সম্বন্ধে ইংরেজী রচনার বিষয় ছিল। আমি এ সম্বন্ধে পনর ষোল ছত্র মাত্র লিখিয়াছিলাম; কিন্তু এই পনর ষোল ছত্রের জন্যও পুরস্কার পাইয়াছিলাম; পরন্তু এই সময় হইতে আমি অধ্যাপক ও পরীক্ষকের প্রীতিপাত্র হইয়াছিলাম।”

    সংস্কৃত কলেজে রচনার জন্য পরিতোষিকের ব্যবস্থা থাকিলেও ঈশ্বরচন্দ্র রচনায় বড় অগ্রসর হইতেন না; তাঁহার বিশ্বাস ছিল,— “আমরা সংস্কৃত ভাষায় রীতিমত রচনা করিতে অসমর্থ। যদি কেহ সংস্কৃত ভাষায় কিছু লিখিতেন, ঐ লিখিত সংস্কৃত প্রকৃত সংস্কৃত বলিয়া আমার প্রতীতি হইত না।”1

    ঈশ্বরচন্দ্রের এ বিশ্বাস চিরকাল দৃঢ়বন্ধ ছিল। তাহার কার্য্যাবস্থায় এক জন কোন বিষয় সংস্কৃতে লিখিয়া, তাঁহাকে দেখাইতে গিয়াছিলেন। তিনি তাহার সংশোধন করিয়া দেন। তাঁহার সংশোধন-প্রণালী দেখিয়া রচয়িতা চমৎকৃত হইয়াছিলেন। তিনি বলেন,—“আপনি এমন সুন্দর সংস্কৃত লেখেন, তবে আপনি যে সকল সংস্কৃত গ্রন্থ মুদ্রিত করিতেছেন, তাহার মুখবন্ধে বা বিজ্ঞাপনে বাঙ্গালা লেখেন কেন?” এতদুত্তরে বিদ্যাসাগর মহাশয় একটু হাস্য করিয়া বলেন,—“সংস্কৃত ভাষায় বুৎপত্তি থাকিলেও বিশুদ্ধ সংস্কৃত রচনা দুরূহ বলিয়া আমার বিশ্বাস।”

    বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃত রচনায় সহজে অগ্রসর হইতেন না বটে; কিন্তু যখনই রচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন তখনই সর্ব্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া পারিতোষিক পাইয়াছিলেন।

    টোলে রচনার প্রথা নাই। সংস্কৃত কলেজে প্রথমতঃ তাহা ছিল না। ইংরেজির প্রণালীমতে ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে বা ১২৪৫ সালে, সংস্কৃত কলেজে এ প্রথা প্রবর্ত্তিত হয়। এই বৎসর নিয়ম হয়,— স্মৃতি, ন্যায়, বেদান্ত—এই তিন উচ্চশ্রেণীর ছাত্রদিগকে বার্ষিক পরীক্ষায় গদ্যে ও পদ্যে সংস্কৃত রচনা করিতে হইবে। এই নিয়মানুসারে ঐ বৎসর সংস্কৃত গদ্য “সত্যকথনের মহিমা” সম্বন্ধে, রচনার বিষয় ছিল। বেলা দশটা হইতে ১টা পর্য্যন্ত এই রচনা লিখিবার সময় নির্দ্ধারিত ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় নিম্নে প্রকাশিত রচনা লিখিয়া ১০০৲ এক শত টাকা পুরস্কার পাইয়াছিলেন।

    সত্যকথনের মহিমা।

    সত্যং হি নাম মানবানাং সার্ব্বজনীয়বিশ্বসনীয়তায় হেতুঃ। তথাবিধায়াশ্চ বিশ্বসনীয়তায়াঃ ফলমিহ বহুলমুপলভ্যতে। তথাহি যদি নাম কশ্চিৎ সত্যবাদিতয়া বিনিশ্চিতো ভবতি সর্ব্ব এব নিয়তং তবচসি সম্যগ্‌বিশ্বসন্তি। সত্যবাদী হি সততং সজ্জননসংসদি সাতিশয়ং মাননীয়ঃ সবিশেষং প্রশংসনীয়শ্চ ভবতি।

    যো হি মিথ্যাবাদী ভবতি ন কোঽপি কদাচিদপি তস্মিন্ বিশ্বসিতি। স খলু নিঃসংশয়ং নিরতিশয়ং নিন্দনীয়ো ভবতি, ভবতি চ সর্ব্বত্র সর্ব্বথা সর্ব্বেষাং জনানামবজ্ঞাভাজনম্।

    কিমধিকেন শিশবোঽপি বাললীলাসু যদি কশ্চিন্মিথ্যাবাদিতিয়া প্রতীয়মানো ভবতি ভো ভ্রাতরো নানেনাধমেনাস্মাভিঃ পুনর্ব্যবহর্ত্তব্যম্ অয়ং খলু মৃষাভাষীত্যাদিকাং গিরমুদ্গিরন্তীত্যলং পল্লবিতেন।

    ১০ দশটা হইতে ১ একটা পর্যন্ত উল্লিখিত রচনার জন্য সময় নিৰ্দ্ধারিত ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় এই পরীক্ষার সময় প্রথমে উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিত থাকিবার তাঁহার প্রবৃত্তি ছিল না। পণ্ডিত প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশের সক্রোধ আদেশে তিনি বেলা ১২ বার টার সময় রচনা করিতে প্রবৃত্ত হন। তিনি ভাবিয়াছিলেন, তাঁহার রচনা হাস্যস্পদ হইবে; কিন্তু তদ্বিপরীতে তিনি এই রচনার জন্য পুরস্কার পান।

    দ্বিতীয় বৎসর বিদ্যাসম্বন্ধে রচনা ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র নিম্নে প্রকাশিত রচনার জন্য পুরস্কার পাইয়াছিলেন।

    বিদ্যা

    বিদ্যা দদাতি বিনয়ং বিপুলঞ্চ বিত্তং

    চিত্তং প্রসাদয়তি জাড্যমপাকরোতি

    সত্যামৃতং বচসি সিঞ্চতি কিঞ্চ বিদ্যা

    বিদ্যানৃণাং সুরতরুর্ধরণী তলস্থঃ॥ ১॥

    বিদ্যা বিকাশয়তি বুদ্ধিবিবেকবীর্য্যং

    বিদ্যা বিদেশগমনে সুহৃদদ্বিতীয়ঃ।

    বিদ্যা হি রূপমতুলং প্রথিতং পৃথিব্যাং

    বিদ্যাধনং ন নিধনং ন চ তস্য ভাগঃ॥ ২॥

    রূপং নৃণাং কতিচিদেব দিনানি নূনং

    দেহং বিভূষয়তি ভূষণসন্নিকৰ্ষাৎ।

    বিদ্যাভিধং পুনরিদং সহকারিশূন্য—

    মামৃত্যু ভূষয়তি তুল্যতয়ৈব দেহম্॥৩॥

    অন্যানি যানি বিদিতানি ধনানি লোকে

    দানেন যান্তি নিধনং নিয়তং নু তানি।

    বিদ্যাধনস্য পুনরস্য মহান্‌গুণোঽসৌ

    দানেন বৃদ্ধিমধিগচ্ছতি যৎ সদেদম্॥ ৪॥

    নৈশ্বর্য্যেণ ন রূপেণ ন বলেনাপি তাদৃশী।

    যাদৃশী হি ভবেৎ খ্যাতির্বিদ্যয়া নিরবদ্যয়া॥ ৫॥

    দুর্ব্বলোঽপি দরিদ্রোঽপি নীচবংশভবোঽপি সন্।

    ভাজনং রাজপূজাযয়া নরো ভবতি বিদ্যয়া॥ ৬॥

    বিদ্বৎসভাসু মনুজঃ পরিহীণবিদ্যো

    নৈবাদরং কচিদুপৈতি ন চাপি শোভাম্।

    হাসায কেবলমসৌ নিয়তং জনানাং

    তজজীবিতং বিফলমেব তথাবিধস্য॥ ৭॥

    অজ্ঞানখণ্ডনকরী ধনমানহেতুঃ

    সৌখ্যাপবৰ্গফলমার্গনিদেশিনী চ।

    সা নঃ সমস্তজগতামভিলাষভুমি—

    বিদ্যা নিরস্য জড়তাং ধিয়মাদধাতু॥ ৮॥

    এই কবিতাগুচ্ছে প্রাচীন সংস্কৃত কবিতার মর্ম্ম নিবদ্ধ থাকিলেও উহা একটী বিদ্যার্থীর রচনা বলিয়া বিবেচনা করিলে মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করিতে হইবে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রচনার পক্ষপাতী না হওয়ার পক্ষে ইহাও এক কারণ। ফলতঃ কবিতাগুলি সারল্যে ও মাধুর্য্যে পরিপূর্ণ ও অতিমাত্র স্বাভাবিক।

    প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার সময় জি, টি, মার্শেল সাহেব সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তৃতীয় বৎসর অধ্যক্ষ ছিলেন, বাবু রসময় দত্ত। এ বৎসর অগ্নীধ্র রাজার তপস্যাসংক্রাস্ত বিষয়টী রচনার নিমিত্ত নির্দিষ্ট ছিল। রসময় বাবু কয়েকটী কথা লিখিয়া দিয়া তৎসম্বন্ধে কবিতায় শ্লোক রচনা করিতে বলিয়াছিলেন। তদনুসারে নিয়ে প্রকাশিত কবিতাগুলি রচিত হয়। রসময় বাবু এই কবিতা দেখিয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত হইয়াছিলেন।

    অগ্নীধ্র রাজার উপাখ্যান।

    অগ্নীধ্রো নাম ভূমীন্দ্রঃ প্রজারঞ্জনবিশ্রুতঃ।

    আরাধয়ৎ সুতাকাঙ্ক্ষী গিরিপ্রস্থে প্রজাপতিম্। ১।

    ভগবান্ সোঽথ তজ্‌জ্ঞাত্বা প্রেষয়ামাস সত্বরম্।

    প্রযত্নতঃ পুর্ব্বচিত্তিং নাম কামপি কামিনীম্। ২।

    নৃপতিস্তাং সমালোক্য কান্ত্যা ত্রৈলোক্যমোহিনীম্।

    শ্লোকানুবাচ কতিচিজ্জড়বন্মেহিমাশ্রিতঃ। ৩।

    আলীঢ়নীরদচয়ে শিথরৈরুদগ্রৈ—

    রুচ্চাবচৈরজগরৈরভিতো বিকীর্ণে।

    ক্রব্যাদনৈরগণনৈর্ভয়মাদধানে

    কং নু ব্যবসাসি মুনীশ্বর ভূধরেঽস্মিন্। ৪

    কোদণ্ডযুগ্মমিদমদ্ভুতমম্বুজাক্ষি

    ধৎসে কিমর্থমথবা হরিণোপমানম্।

    বালে বশীকরণবাসনয়া নিতান্ত—

    মস্মাদৃশাং হতদৃশামজিতেন্দ্রিয়াণাম্। ৫।

    বীণাবিমৌ বিবিধবিভ্রমমস্থরৌ তে

    পুঙ্খং বিনাপিরুচিরৌ নিশিতা গ্রভাগৌ।

    ধাতুঃ কটাক্ষপতিতায় হতাশ্রয়ায়

    কর্ম্মৈ প্রযোক্তুমভিবাঞ্ছসি তন্ন বিদ্মঃ। ৬।

    যদ্ দৃশ্যতে সুমুখি বিম্বফলং মনোজ্ঞং

    মধ্যে সুবর্ণপরিকল্পিতবাগুরায়াঃ।

    জানীমহে ন হি করিষ্যতি কস্য যুন—

    শ্চেতোবিহঙ্গমশিশোর্বিপুলাং বিপত্তিম্‌। ৭।

    অস্মিন্‌ নিরাকৃতকলঙ্কশশাঙ্কবিম্বে

    নীলাম্বুজন্মযুগলং যদিদং বিভাতি

    মন্যে সুধাংশুমুখি সংবননং বিধাত্রা

    লোকত্রয়স্ত বিহিতং মহতাদরেণ। ৮।

    যুষ্মচ্ছিখাবিগলিতা ললিতা নিতান্তং

    শিষ্যা ইমে মুনিবরানুগতা ভবস্তম্।

    প্রীতা ভজন্তি বিমলাং কিল পুষ্পবৃষ্টিং

    ধর্ম্মব্রতা মুনিসুতা ইব বেদশাখাম্‌। ৯।

    তস্মাদ্‌বয়ং ভয়পরিল্লববুদ্ধয়ন্তাম্

    অভ্যর্থয়ামহ ইদং চটুলাযতাক্ষি।

    উদ্যন্‌ বিজেতুমবনীং তব বিক্রমোঽয়—

    মস্মাকমস্তু কুশলায় নিরাশ্রয়াণম্॥ ১০॥

    এই নৈসর্গিক মধুরতায় আদিরসাত্মক কবিতা প্রাঞ্জলতাগুণে সকলেরই চিত্ত প্রীত করিবে যেন প্রাচীন কবির লিপিপটুতা পদে পদে প্রতিভাত।

    ১২৪৫ সালে বা ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে জন্‌ মিয়র্‌ নামে এক সিবিলিয়ন্‌ সাহেবের প্রস্তাবে বিদ্যাসাগর মহাশয়, পুরাণ, সূর্য্যসিদ্ধান্ত ও যুরোপীয় মতের অনুযায়ী ভূগোল ও খগোল বিষয়ে এক শত শ্লোক রচনা করিয়া, এক শত টাকা পুরস্কার পাইয়াছিলেন। এই শ্লোকগুলি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবদ্দশায় পুস্তকাকারে মুদ্রিত হইতেছিল। তখন উহার মুদ্রা-কার্য্য সমাপ্ত হয় নাই। তাঁহার মৃত্যুর পর ১২৯৯ সালে ১৫ই বৈশাখে পুস্তক প্রকাশিত হইয়াছে।16 ইহাতে এখন ৪০৮টী শ্লোক দেখা যায়। সুতরাং মিয়র্ সাহেবের নির্দিষ্ট শত শ্লোক অপেক্ষা ইহাতে অতিরিক্ত শ্লোক রহিয়াছে। সেগুলি বোধ হয় পরে রচিত।

    এ পুস্তকের প্রারম্ভে ঈশ্বরচন্দ্রের আস্তিকতা, গুরুদেবপরায়ণতা, বিনয়নম্রতার প্রমাণ রহিয়াছে।

    অস্তিকতার প্রমাণ,—

    যৎক্রীড়াভাণ্ডবদ্ভাতি ব্রহ্মাণ্ডমিদ্ভুতম্।

    অসীমমহিমানং তং প্রণমামি মহেশ্বরম॥ ১।

    বিনয়মম্রতা ও গুরুপরায়ণতার পরিচয়,—

    “জগদ্বর্শন কর্ম্মেদং শর্ম্মণে কিমু মাদৃশ্যম্।

    খদ্যোতানাং তমোনাশোদ্যমো হাস্যায় কন্য ন। ৪।

    তথাপি শরণীকৃত্য17 গুরূণাং চরণং পরম্।

    কিঞ্চিদ্বক্ষ্যামি সংক্ষেপাৎ সুধিয়ঃ শোধয়ন্তু তৎ। ৫।”

    এভাবের এমন প্রমাণ আর পরবর্ত্তী গ্রন্থে পাই না। এইটী বুঝি কেবল অবিমিশ্র সংস্কৃত শিক্ষার ফল।

    খগোল-ভূগোল পুস্তকে যেরূপ বিভাগক্রমে দ্বীপ, বর্ষ, বর্ষখণ্ড এবং জনপদসমূহ বর্ণিত হইয়াছে, তাহাতে অনেক স্থলে পুরাণের অপেক্ষা পুরাণাংশ সুখপাঠ্য ও সুখবোধ্য।

    পুরাণমতে সাতটী পরিচ্ছেদে পৃথক পৃথক্ দ্বীপবর্ণন, অষ্টম পরিচ্ছেদে দ্বীপাতিরিক্ত সত্ত্বযুত ভূমিভাগ, কাঞ্চনভূমি, লোকালোক পর্ব্বত এবং ভূমণ্ডলের পরিমাণ আর নবম পরিচ্ছেদে খগোল বৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে। খগোল বৃত্তান্তে রাশিচক্র, গ্রন্থ-সংস্থান প্রভৃতি সংক্ষেপে বর্ণিত হইয়াছে। পুরাণমতের পরেই সূর্য্যসিদ্ধান্তের মত। সূর্য্যসিদ্ধান্তমতে একটী পরিচ্ছেদ। এক পরিচ্ছেদেই ভূগোল ও খগোল সংক্ষেপে বর্ণিত আছে। তবে ইহাতে ভূগোল অপেক্ষা খগোলের বৃত্তান্ত অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত। পুরাণ ও সূর্য্যসিদ্ধান্তমতে প্রথমে ভূগোল, পরে খগোল। সূর্য্যসিদ্ধান্ত-মতের পরে যুরোপীয় মত। তাহাতে প্রথমে খগোল, পরে ভূগোল। য়ুরোপীয় ভূগোলে আসিয়া, য়ুরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকা ক্রমে বর্ণিত। যুরোপখণ্ডে ইংলণ্ডাদিক্রমে প্রধান দেশগুলি পৃথক পৃথক বর্ণিত। যুরোপীয় ভূগোল-খগোল সংস্কৃত শ্লোকাকারে রচিত হওয়ায় বালকগণের অভ্যাসের সুবিধা। সর্ব্বত্রই রচনা প্রাঞ্জল। এইরূপ সংক্ষিপ্ত সরল, সুখবোধ্য রচনা বিদ্যাসাগরের এতদ্বিষয়ে বিশিষ্ট জ্ঞানের পরিচায়ক। সেই অল্প বয়সে ঈদৃশ ভাষা ও পদার্থ জ্ঞান পূর্ব্বজন্মের সুকৃতি ও ইহজন্মের অধ্যবসায়ের ফল, ইহা একবাক্যে সকলেরই স্বীকার্য্য। য়ুরোপীয় মতের ভূগোল-সংক্রান্ত সংস্কৃত রচনার কয়েকটা উদ্ধৃত হইল—

    “পুরাণসূর্য্যসিদ্ধান্তমতমেবং” প্রদর্শিতম্।

    মতং য়ুরোপপ্রথিতং সংক্ষেপেণাধুনোচ্যতে। ২৩০।

    আধারভূতং সর্ব্বযোং ধাত্রা নির্ম্মিতস্বরম্

    তদন্তরালসংলীনো বর্ত্ততে তপতাম্পতিঃ। ২৩১।

    নাস্ত্যস্য প্রাণসঞ্চারো নায়ঞ্চলতি দূরতঃ।

    তেজোময় পৃথুর্ভূমের্দেশলক্ষ-গুণেন সঃ। ২৩২।

    ভ্রমতো গ্রহচক্রস্য সদা মধ্যস্থলস্থিতঃ।

    উষ্ণতাতেজসী তেভ্যো দদাত্যেষ নিরস্তরম্। ২৩৩।

    সর্ব্বেয়ামেব বন্যানামন্যোকর্ষণং ভবেৎ।

    গুরুণা কৃষ্যতে তত্র লঘুম্বাভিমুখং যতঃ। ২৩৪।

    আকর্ষতি ততো ভানুর্গ্রহান্ স্বাভিমুখৎ সদা।

    তথাকর্ষতি পৃথ্বীন্দুং যতোঽন্য লঘুতা ততঃ। ২৩৫।

    অর্কস্যাকর্ষণাদুর্দ্ধমধস্তাদাত্মনাং তথা।

    ভ্রমন্তি নিয়তং মধ্যদেশে পৃথ্যাদয়ো গ্রহাঃ। ৩৬।

    এক সময় অধ্যাপক জয়গোপাল তর্কালঙ্কার মহাশয় “গোপালায় নমোঽস্তু মে” এই চতুর্থ চরণ নির্দিষ্ট করিয়া এবং একঘণ্টা সময় দিয়া ছাত্রগণকে শ্লোকরচনায় নিযুক্ত করেন। গোপালের কথা কবিতার বিষয়ীভূত হইলে, বিদ্যাসাগর মহাশয় জিজ্ঞাসা করিয়ছিলেন,—“মহাশয়, আমরা কোন্‌ গোপালের বর্ণনা করিব? এক গোপাল আমাদের সম্মুখে বিদ্যমান রহিয়াছেন; এক গোপাল বহুকাল পূর্ব্বে বৃন্দাবনে লীলা করিয়া অন্তহিত হইয়াছেন।” পণ্ডিত মহাশয় হাস্য করিয়া গোকুলের গোপাল সম্বন্ধে লিখিতে বলেন। বিদ্যাসাগরের শ্লোকরচনায় পণ্ডিত মহাশয় সন্তুষ্ট হইয়া, তাহার উৎসাহ বর্দ্ধন করেন। সেই শ্লোকগুলি এই—

    গোপালায় নমোহস্ত মে।

    যশোদানন্দকন্দায় নীলোৎপলদলশ্রিয়ে।

    নন্দগোপালবালায় গোপালায় নমোঽস্তু মে॥ ১॥

    ধেনুরক্ষণদক্ষায় কালিন্দী কূলচারিণে।

    বেণুবাদনশীলায় গোপালায় নমোঽস্তু মে॥ ২॥

    ধৃতপীতদুকূলায় বনমালাবিলাসিনে।

    গোপস্ত্রীপ্রেমলোলায় গোপালায় নমোঽস্তু মে॥ ৩॥

    বৃষ্ণিবংশাবতংসায় কংসধ্বংসবিধায়িতে।

    দৈতেয়কুলকালায় গোপালায় নমোঽস্তু মে॥ ৪॥

    নবনীতৈকচৌরায় চতুৰ্বর্গৈকদায়িনে।

    জগদ্ভাণ্ডকুলালায় গোপালায় নমোঽস্তু মে॥ ৫॥

    ইহাতে বিদ্যাসাগর মহাশয় আর এক শক্তির পরিচয় দিয়াছেন। তিনি যে শ্লোকের পাদপুরণ করিতে পারিতেন, পাঠক এখানে তাহারও প্রমাণ পাইলেন। এ কবিতায় গোপালের প্রতি ভগবদ্ভাব প্রকটিত।

    তর্কালঙ্কার মহাশয়ের অনুরোধে আর একবার সরস্বতী পূজার সময় ঈশ্বরচন্দ্র নিম্নলিখিত রসপূর্ণ কবিতাটী লিখিয়াছিলেন,—

    লুচী-কচুরী-মতিচুর-শোভিতং

    জিলেপি-সন্দেশ-গজ-বিরাজিতম্‌।

    যস্যাং প্রসাদেন ফলারমাপ্নুমঃ

    সুস্বতী সা জয়তান্নিরন্তরম্॥”

    কবিতটির রচনা সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় এইরূপ লিখিয়াছেন,—

    “শ্লোকটী দেখিয়া পূজ্যপাদ তর্কালঙ্কার মহাশয় আহ্লাদে পুলকিত হইয়াছিলেন এবং অনেককে ডাকাইয়া আনিয়া স্বয়ং পাঠ করিয়া শ্লোকটী শুনাইয়াছিলেন।”18

    অল্পায়তনে কি সুন্দর রস-রচনা! ভবিষ্যৎজীবনে কিন্তু এরূপ রচনায় পরিচয় দিবার সুযোগ ঘটে নাই। রসরচনার সে পরিচয় নাই থাকুক; রসালাপের প্রসিদ্ধি অপ্রতুল নয়।

    পরীক্ষার্থী রচনা বা অনুরোধ জন্য রচনা ভিন্ন ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যে স্বেচ্ছায় কিছু কিছু রচনা করিতেন। সকল রচনা পাওয়া যায় নাই। এ সম্বন্ধে তিনি এইরূপ লিপিয়াছেন,—

    “এক আত্মীয় আমার রচনা দেখিবার নিমিত্ত সাতিশয় আগ্রহ প্রকাশ এবং সত্বর ফিরিয়া দিবার অঙ্গীকার করিয়া সমুদায় রচনাগুলি লইয়া যান; বারংবার প্রার্থনা করিয়াও, তাঁহার নিকট হইতে আর ফিরিয়া পাইলাম না। এইরূপে রচনাগুলি হস্তবহির্ভূত হওয়াতে আমি যৎপরোনাস্তি মনস্তাপ পাইয়াছি। পুরাণ কাগজের মধ্যে অনেক অনুসন্ধান করিয়া, যে কয়টী মাত্র পাইয়াছিলাম, তন্মাত্র মুদ্রিত হইল”।24

    স্বেচ্ছাকৃত রচনার মধ্যে “মেঘ” বিষয়িণী একটা কবিতা পাওয়া যায়। সেই কবিতাটা এইখানে প্রকাশিত হইল,—

    মেঘ।

    প্রায় সহায়যোগাৎ সম্পদমধিকর্ত্তূমীশতে সর্ব্বে।

    জলদাঃ প্রাবৃড়পায়ে পরীহিয়ন্তে শ্রিয়া মিতরাম্॥ ১॥

    কিং নিম্নগা জলজমণ্ডলবর্জ্জিতেন

    তোয়েন বৃদ্ধিমুপগন্তুমধীশতে তাম্।

    ন স্যাদজস্রগলিতং যদি পান্থ যুনাং

    সাহায় কামু কিল নির্ম্মলমশ্রীবর্ধম্॥ ২॥

    কান্তাভিসাররসলোলুপমানসানাম্

    আতঙ্ককম্পিতদৃশামভিসারিকাণাম্।

    যদ্ বিঘ্নক্কদ্ দুরিতমজিতবানজস্রং

    কেনাধুনা ঘন তরিষ্যসি তন্ন বিদ্মঃ॥ ৩॥

    ক্ষীণং প্রিয়াবিরহকাতরমণনসং মাং

    নো নির্দ্দয়ং ব্যথয় বারিদ নাত্মবেদিন্।

    ক্ষীণো ভবিষ্যসি হি কালবশং গতঃ সন্

    আস্তে তবাপি নিয়তস্তড়িতা বিয়োগঃ॥ ৪॥

    সর্ব্বত্র সন্নমৃতদন্তটিনীশরীর—

    সংবৃর্দ্ধকন্তনুভূতাং শমিতোপতাপঃ।

    যচ্চাতকেষু করুণাবিমুখোঽসি নিত্যং

    নায়ং মতো জলদ কিং বত পক্ষপাতঃ॥ ৫॥

    লোকোত্তরা যদি চ তোয়দ তে প্রবৃত্তি—

    রেষা যদব্ধিসরিত্যেরসি সঙ্গহেতুঃ।

    জাগর্ত্তি সজ্জনসভাসু তথাপি ঘোরং

    ত্বৎকল্পষং কৃপণপান্থবধূবধোত্থম্॥ ৬॥

    ত্বং হি স্বভাবমলিনস্তব নাশ্যমজং

    ত্বদগর্জ্জিতং বিরহিবর্গনিসর্গবৈরি।

    কস্ত্বাং স্তুবীত বদ তোয়দ লোকসিদ্ধাং

    প্রেক্ষামহে ন যদি জীবনদায়িতাং তে॥ ৭॥

    কাস্তাবিয়োগবিষজর্জ্জরপান্থযুনাং

    ত্বং জীবনপহরণব্রতদীক্ষিতোহসি।

    ত্বামামনস্তি ঘন জীবনদণয়িনং যৎ

    কিং স ভ্রমো ন বদ তৎ স্বয়মেব বুদ্ধা। ৮॥

    গর্জন ভৃশং তত ইতঃ সততং বৃথা কিং

    নো লজ্জসে জলন্ধ পান্থনিতান্তশত্রো।

    আস্তে হি নান্যগতিচাতকপোতচঞ্চু—

    সম্পূরণেঽপি বত যস্য ন শক্তিযোগঃ॥৯॥

    কবি-প্রতিভা।

    জীমূতচাতকগণং নমু বঞ্চয়িত্বা

    মা মুঞ্চ বারি সরসীসরিদর্ণবেষু।

    কং বা গুণং শিরসি সংস্তুততৈললেপে

    তৈলপ্রদানবিধিনা লভতেঽত্র লোকঃ॥ ১০॥

    কবিতায় কি সুন্দর স্বভাব বর্ণন! কি মনোহর অলঙ্কারবিন্যাস! কি সরল সরস রচনা-কৌশল! বিদ্যাসাগর কবি বলিয়া পরিচিত নহেন; কিন্তু কেবল এই একটীমাত্র কবিতা পাঠে বলিতে পারি,—বিদ্যাসাগর স্বভাব কবি! বাল-কবির কি অপূর্ব্ব প্রতিভা! বাল্যকালে বঙ্কিমচন্দ্রও বাঙ্গালায় “বর্ষার মানভঞ্জন” নামে একটী কবিতা লিখিয়াছিলেন।25 ঈশ্বরচন্দ্রের কবিতায় যেমন প্রথমে মেঘের স্বভাব-বর্ণন, পরে বিরহিণীর বিরহ-ব্যঞ্জন; বঙ্কিমচন্ত্রের কবিতাতেও তেমনই প্রথমে বর্ষার স্বভাববর্ণন, পরে মানিনীর মানভঞ্জন। উভয়ই পূর্ণ কবিত্বময়। বাল্যে উভয়ই কবি। উত্তরকালে উভয়েই সাহিত্য-পুষ্টির উত্তরসাধক। তবে পথ ও প্রণালী স্বতন্ত্র।

    রচনার বঙ্গানুবাদ দিলাম না। দিবার প্রয়োজনও নাই। সুচনা যেরূপ সরস ও সরল, তাহাতে যাহাদের সংস্কৃত ভাষায় কিঞ্চিম্মাত্র বোধ আছে, তাঁহারা ইহার রস-মাধুর্য্য হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইবেন। এ রচনাগুলি পড়িলে স্পষ্টই প্রতীতি হয়, সর্ব্ব-রস-বিকাশে এবং ছন্দোবিন্যাসে বিদ্যাসাগর মহাশয় শক্তিমান্‌। বাল্যে যিনি এমন মধুর, সুললিত ও বিশুদ্ধ সংস্কৃত লিখিতে পারেন, প্রবৃত্তি বা অভ্যাস রাখিলে, অথবা নিজ রচনাশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া সংস্কৃত রচনাকল্পে উদাসীন না হইলে, তিনি ভবিষ্যৎ জীবনে উপাদেয় এবং সুপাঠ্য সংস্কৃত গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া সংস্কৃত সাহিত্যের সম্মান রক্ষা করিতে পারিতেন, সন্দেহ নাই। সংস্কৃত ভাষার সংকীর্ণ-প্রচারও বোধ হয় সংস্কৃত গ্রন্থপ্রণয়নের প্রবৃত্তিপ্রণোদনপক্ষে অন্তরায় হইয়াছিল।

  • পঞ্চম অধ্যায়

    পঞ্চম অধ্যায়

    স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা, পিতৃভক্তির পরিচয়, বেদান্ত-পাঠ, পিতৃঋণে কষ্ট, ন্যায়-দর্শনে প্রতিষ্ঠা, ব্যাকরণের অধ্যাপকতা, পাঠ-সমাপ্তি ও প্রশংসাপত্র।

    অলঙ্কারের পাঠ সমাপ্ত হইলে পর, ১২৪৪ সালে বা ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র স্মৃতির শ্রেণীতে প্রবেশ করেন। তৎকালে কলেজে স্মৃতির পূর্ব্বে ন্যায়-দর্শন ও তৎপরে বেদান্ত পড়িতে হইত। ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল, স্মৃতি পড়িয়া, “ল-কমিটি”র পরীক্ষা দিবেন। তৎপরে “ল কমিটি”র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া জজ পণ্ডিতের পদপ্রাপ্তিই তাহার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল।25 কর্ত্তৃপক্ষের অনুগ্রহে তিনি ন্যায়-দর্শন ও বেদান্ত পড়িবার পূর্ব্বে স্মৃতি পড়িবার আদেশ পান। ঈশ্বরচন্দ্রের বয়স তখন ১৭/১৮ সতর আঠার বৎসর হইবে। অদ্ভুত কীর্ত্তি! ভাবিলে বিস্ময়ে রোমাঞ্চিত হইতে হয়। সচরাচর দুই তিন বৎসরে পণ্ডিতগণও স্মৃতির পাঠাভ্যাস করিয়া উঠতে পারিতেন না। বালক ঈশ্বরচন্দ্র ৬ ছয় মাসে পড়া সাঙ্গ করিয়া “ল কমিটি”র পরীক্ষা দেন এবং প্রশংসিতরূপে উত্তীর্ণ হন। এই ছয়মাস কাল তিনি রন্ধনাদি করেন নাই। ছয় মাস কেবল প্রত্যহ দুই তিন ঘণ্টামাত্র নিদ্রা যাইতেন। স্মৃতি তাঁহার কণ্ঠস্থ হইয়াছিল। অধ্যাপক এবং সহপাঠিগণ তাঁহার এতাদৃশ অদ্ভুত শক্তি দেখিয়া আশ্চর্য্যান্বিত হইতেন। এমন নহিলে কি মানুষ ভবিষ্যৎ জীবনে যশস্বী হইতে পারে? বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই অদ্ভুত শক্তির কথা যখনই আমাদের স্মৃতিপথে উদিত হয়, তখনই মহাকবি ভবভূতির সেই স্বল্পাক্ষর গভীরভাবপূর্ণ শ্লোকটী মনে পড়ে,—

    “বিতরতি গুরুঃ প্রাজ্ঞে বিদ্যাং যথৈব তথা জড়ে

    ন চ খলু তয়োর্জ্ঞানে শক্তিং করোত্যপহস্তি বা।

    ভবতি চ তয়োর্ভূয়ান্ ভেদঃ ফলং প্রতি তদ্ যথা

    প্রভবতি শুচির্বিম্বোদ্‌গ্রাহে মণিন মৃদাং, চয়ঃ।”

    ভাবার্থ—গুরু, সুবোধ এবং নির্ব্বোধ বিবিধ ছাত্রকেই সমভাবে বিদ্যা বিতরণ করেন; কিন্তু তদুভয়ের বুঝিবার শক্তি বাড়াইতে বা কমাইতে পারেন না। বিদ্যা-বিষয়ে যে পূর্ব্বোক্ত ছাত্রদ্বয় প্রভূত পার্থক্য প্রাপ্ত হন, ইহা বলা বাহুল্য। নির্ম্মল মণি প্রতিবিম্ব গ্রহণে সমর্থ হয়, মৃৎপিণ্ড কিন্তু হয় না।

    ঈশ্বরচন্দ্র যে সময় “ল কমিটির” পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, সেই সময় ত্রিপুরা জেলায় জজ পণ্ডিতের পদ শূন্য হয়। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া এই পদের জন্য প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা পূর্ণ হইতে বিলম্ব হইল না; কিন্তু পিতা তাহাকে ত্রিপুরায় যাইতে নিষেধ করেন। পিতৃভক্ত পুত্ত্র পিতার অনুরোধে আকাঙ্ক্ষায় জলাঞ্জলি দিলেন। যে পিতার সংসারক্লেশ-লাঘবের জন্য তাঁহার এই পদপ্রার্থনা, সেই পিতা যখন তাহাকে নিষেধ করিতেছেন, তখন কি পিতৃপ্রাণ পুত্র তাহা অগ্রাহ্য করিতে পারেন? পিতা যে তাঁহার একমাত্র আরাধ্য দেবতা এবং মাতাই যে একমাত্র আরাধ্যা দেবী ছিলেন। তাও বটে; আর অদৃষ্টও তাঁহাকে অন্য পথে লইয়া যাইল না। আরও দুইটী বিদ্যা তাহার বাকি ছিল। দর্শনশাস্ত্র পড়া হয় নাই। তিনি জজ-পণ্ডিতের পদ না লইয়া বেদান্ত-শ্রেণীতে প্রবেশ করেন। সেই সময় শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি মহাশয় বেদান্তের অধ্যাপক ছিলেন। বেদান্ত পড়িবার সময় ঈশ্বরচন্দ্র গদ্যরচনায় সর্ব্বোচ্চ হইয়া ১০০৲ এক শত টাকা পুরস্কার পান। কষ্টের জীবনে দুঃখের অন্ত কি সহজে হয়? সকলেই ভগবানের পরীক্ষা বৈ তো নয়।

    পূর্ব্বে একবার বলা গিয়াছে, তৎকালে ঈশ্বরচন্দ্রের তৃতীয় ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র কলিকাতার বাসায় উপনীত হন। বাসায় একটা লোক বাড়িল; সুতরাং তাঁহার কার্য্যও বাড়িল। এতদুপরি মধ্যম পুত্র দীনবন্ধুর বিবাহ দিয়া ঠাকুরদাস বড় ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়েন; কাজেই ব্যয়ের হ্রাস করিতে হইল। এই সময়ের ঘটনার উল্লেখ করিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় এক দিন আমাদিগের কোন বন্ধুর নিকট বলিয়াছিলেন,—“বাল্যকালে আমি অনেক কষ্ট পাইয়াছি; কিন্তু কোন কষ্টকেই এক দিনও কষ্ট বলিয়া ভাবি নাই; বরং তাহাতে আমার উৎসাহ-উদ্যম বৰ্দ্ধিত হইত; কিন্তু ভাইগুলির কোন কষ্ট দেখিলে আমার যে কি অন্তর্যাতনা হইত, তা আর কি বলিব!” বিশ্বপ্রেমিক বিদ্যাসাগরের পক্ষে ইহা বিচিত্র কি!

    যখন পিতা ঠাকুরদাস কলিকাতার বাসার ব্যয় কমাইয়া দেন, শুনিয়াছি, তখন বৈকালের জলখাবার জন্য আধ পয়সার ছোলা আনিয়া ভিজান হইত এবং আধ পয়সার বাতাসা আসিত। ঐ ভিজা ছোলার অর্দ্ধেক আবার রাত্রিকালে আলু-কুমড়ার ব্যঞ্জন প্রস্তুত হইত। প্রাতে রাত্রিতে কুমড়ার ডালনায় পোস্ত দিয়া ছোলার ব্যঞ্জন হইত। ঈশ্বরচন্দ্র দুই বেলা পাক করিতেন। ভাই দুইটার পাতে তরকারী দিবার সময় তিনি চক্ষের জল সংবরণ করিতে পারিতেন না। এই সময় আহারের যেমন কষ্ট, আবার থাকিবার কষ্ট ততোধিক হইয়াছিল। ঠাকুরদাস ঋণগ্রস্ত, ইহার উপর আশ্রয়দাতা সিংহ-পরিবারও ঋণগ্রস্ত। ঠাকুরদাস পুত্রগুলিকে লইয়া তে-তলায় শয়ন করিতেন; কিন্তু জগদ্‌দুর্লভ বাবু তে-তলাটী, এক জনকে ভাড়া দেন; কাজেই পুত্রগুলিকে লইয়া ঠাকুরদাসকে নিয়ে একটী ভদ্র লোকের বাসের অযোগ্য জঘন্য গৃহে বাসা করিতে হয়। কঠোর পরীক্ষা।

    ইহাতেও ঈশ্বরচন্দ্র অকুণ্ঠিত। তিনি এই সময় ন্যায়দৰ্শন-শ্রেণীতে প্রবিষ্ট হন। মহাপণ্ডিত নিমচাঁদ শিরোমণি মহাশয় ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন।26 ন্যায়দর্শনের দ্বিতীয় বৎসরের পরীক্ষায় ঈশ্বরচন্দ্র সর্ব্বপ্রথম হইয়া ১০০৲ এক শত টাকা এবং কবিতারচনায় ১০০৲ এক শত টাকা পুরষ্কার পান। তিনি পাঁচ বৎসরে দর্শনশাস্ত্রের পাঠ সমাপ্ত করেন। আর কেহ ৮/১০ আট দশ বৎসরে তাহা পরিতেন কি না সন্দেহ! প্রতিভা আর কাহাকে বলে? তদীয় ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র বলেন,—“যৎকালে তিনি দর্শন-শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন, তখন দেশে যাইলে অনেকের সহিত তাঁহার বিচার হইত। সকলেই তাঁহার সহিত বিচারে সন্তুষ্ট হইতেন। কুরাণ-গ্রামবাসী স্ববিখ্যাত দর্শনশাস্ত্রবেত্তা রামমোহন তর্কসিদ্ধান্তের সহিত তাঁহার প্রাচীন ন্যায় গ্রন্থের বিচার হয়। বিচারে তর্কসিদ্ধান্ত মহাশয়ের পরাজয় হয়। ইহা শুনিয়া পিতৃদেব তর্কসিদ্ধান্ত মহাশয়ের পদরজ লইয়া দাদার মস্তকে দেন।” এ বিষয়ের জন্য শম্ভুচন্দ্রের উপর নির্ভর করিতে হইল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী-সম্বন্ধে যে সকল মহোদয়ের নিকট হইতে অন্যান্য সকল বিষয়ের নিগূঢ় তত্ত্ব আমরা পাইয়াছি, তাঁহাদের সকলকেই এ কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছি; কিন্তু সদুত্তর পাই নাই। কেহ কেহ তর্কচ্ছলে বলিতে পারেন,—অগ্রজ-সম্বন্ধে তখনকার অনেক কথা পণ্ডিত শম্ভুচন্দ্রের মনে থাকিবারই সম্ভাবনা; অথচ কথাটা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রতিভাশালীর পক্ষে অসম্ভবও নয়। আমরা কিন্তু বিপরীত ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি। দর্শনবিদ্যায় তাঁহার যে রীতিমত পারদর্শিতা জন্মে নাই ও তাঁহাতে যে তাঁহার তাদৃশ প্রবৃত্তিও ছিল না, তাহার গল্প, বিদ্যাসাগর মহাশয় অনেক সময়ে অনেকের নিকট করিতেন।

    ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া কলেজের পাঠ সমাপন করিলে, কলেজ হইতেই “বিদ্যাসাগর”27 উপাধি প্রাপ্ত হন। বিংশতি-বর্ষীয় যুবক—“বিদ্যাসাগর” এমন ভাগ্যবান এ সংসারে কয় জন? ব্যাকরণ, সাহিত্য, দর্শন, স্মৃতি প্রভৃতিতে বিশারদ হয়, বিংশতি বর্ষ বয়ঃক্রমে কয় জন? কি অপূর্ব্ব বুদ্ধি-বিক্রম। কলেজের অধ্যাপকমাত্রেই বিস্মিত! যিনি ব্যাকরণের অধ্যাপক, তিনি ভাবেন,—“আমি ধন্য!” যিনি সাহিত্যের অধ্যাপক, তিনি বলেন,—“আমার অধ্যাপনা সার্থক!” যিনি দর্শন স্মৃতির অধ্যাপক, তিনি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন,— “ঈশ্বরচন্দ্র নিশ্চিতই অসাধারণ-শক্তিসম্পন্ন।” প্রত্যেকেই প্রত্যেক শাস্ত্রের প্রশংসাপত্র প্রদান করেন। প্রশংসাপত্রে সকল বিষয়ের ও তত্তদ্বিবিষয়ক অধ্যাপকের অভিমতি একত্র সমাবেশ দেখিতে পাইবেন, “বিদ্যাসাগর” উপাধি-লিখিত প্রশংসাপত্রে। এই পত্র, কলেজের তদানীন্তন অধ্যক্ষ—রসময় দত্তের স্বাক্ষরিত। ১৭৬৩ শকের (১২৪৮ সালের) ২০শে অগ্রহায়ণের বা ১৭৪১ খৃষ্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বরের প্রদত্ত উক্ত পত্রের অনুলিপি এই—

    “অস্মাভিঃ শ্রীশ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রশংসাপত্রং দীয়তে। অসৌ কলিকাতায়াং শ্রীযুতকোম্পানীসংস্থাপিতবিদ্যামন্দিরে দ্বাদশ বৎসরান পঞ্চ মাসাশ্চোপস্থায়াধোলিখিতশাস্ত্রাণ্যধীতবান।

    ব্যাকরণম্ … … … … শ্রীগঙ্গাধর শর্ম্মভিঃ

    কাব্যশাস্ত্রম্ … … … শ্রীজয়গোপাল শর্ম্মভিঃ

    অলঙ্কারশাস্ত্রম্‌ … … … শ্রীপ্রেমচন্দ্র শর্ম্মভিঃ

    বেদান্তশাস্ত্রম্ … … … শ্রীশম্ভুচন্দ্র শর্ম্মভিঃ

    ন্যায়শাস্ত্রম্ … … … শ্রীজয়নারায়ণ শর্ম্মভিঃ

    জ্যোতিঃশাস্ত্রম্ … … … শ্রীযোগধ্যানশর্ম্মভিঃ

    ধর্ম্মশাস্ত্রঞ্চ … … … … … শ্রীশম্ভুচন্দ্র শর্ম্মভিঃ

    সুশীলতয়োপস্থিতস্যৈতস্যৈতেষু শাস্ত্রেষু সমীচীনা ব্যুৎপত্তি রজনিষ্ট।

    ১৭৬৩ এতচ্ছকাব্দীয় সৌরমার্গশীর্ষম্ বিংশতিদিবসীয়ম্।

    (Sd.) “Rasamoy Dutta, Secretary.

    10 Decr. 1841”

    ঈশ্বরচন্দ্র দুই মাস ৫০৲ পঞ্চাশ টাকা বেতনে ব্যাকরণের দ্বিতীয় শ্রেণীর অধ্যাপক হইয়াছিলেন। এই টাকায় পিতা ঠাকুরদাস গয়া তীর্থ পর্য্যটন করিয়া আসেন। এই দুই মাস কাল মাত্র উহার অধ্যাপনাপরিপাটী দেখিয়া অন্যান্য অধ্যাপক ও ছাত্রবর্গ মুগ্ধচিত্তে তাঁহার সর্ব্বতোমুখী প্রতিভা স্বীকার করেন।

  • চতুর্থ অধ্যায়

    চতুর্থ অধ্যায়

    বিবাহ, শ্বশুরের পরিচয়, অলঙ্কারে প্রতিষ্ঠা, দয়া, সখ, ও শ্রম।

    ঈশ্বরচন্দ্রের ভূয়সী খ্যাতি-প্রতিপত্তি হওয়ায়, নিকটবর্ত্তী গ্রামবাসীদের মধ্যে অনেকে তাঁহাকে কন্যা সমর্পণ করিবার জন্য লালায়িত হন। ক্ষীরপাইনিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের সপ্তমবর্ষীয়া কন্যা দিনময়ীর সহিত তাঁহার বিবাহ হয়। এ বয়সে তাঁহার বিবাহ করিবার আদৌ ইচ্ছা ছিল না; কিন্তু পিতার অনুরোধে তিনি বিবাহ করিতে বাধ্য হন। দিনময়ী পাদুকা-কন্যা। পাদুকা-কন্যার সৌভাগ্য-ফলে স্বামীর লক্ষ্মী অচলা হয়। দিনময়ীর পতির অদৃষ্টে তাহাই হইয়াছিল। ভাগ্যবতী দিনময়ী পুত্রকন্যা রাখিয়া স্বামীর পুর্ব্বে ইহলোক পরিত্যাগ করিয়া নিজ সৌভাগ্যশালিতার এবং শুভগ্রহসম্পন্নতার পরিচয় দিয়া গিয়াছেন। তিনি মৃত্যুর পূর্ব্বে বহুবর্ষব্যাপক কৃচ্ছসাধ্য সাবিত্রী ব্রতের উদ্‌যাপন করিয়াছিলেন। সকল নারীর ভাগ্যে সধবা অবস্থায় এই কঠোর ব্রতের উদ্‌যাপন করা ঘটিয়া উঠে না। অনেককেই অনুদ্‌যাপিত অবস্থায় তনু ত্যাগ করিতে হয়। দিনময়ী প্রকৃত সাধ্বীর মত সকল দিক বজায় করিয়া, পতিপুত্র রাখিয়া দিব্যধামে প্রয়াণ করেন। এইখানে দিনময়ীর পিতা শক্রঘ্ন ভট্টাচার্য্যের একটু পরিচয় দিই। এ পরিচয়ে পরিণামসম্পর্ক আছে। বংশৌরসের সম্বন্ধ বুঝাইবার জন্য এই পরিচয়।

    শক্রঘ্ন ভট্টাচার্য্য অতি তেজস্বী, ক্রোধী ও বলশালী ব্রাহ্মণ ছিলেন। তৎকালে তাঁহার গ্রামে তাঁহার বলবত্তার তুলনা ছিল না; পরন্তু তিনি সহজাত সহৃদয়তা ও উদারতা গুণে সর্ব্বজনের ভক্তি ও প্রীতি আকর্ষণ করিতেন। তাঁহার বলবত্তা ও উদারভার দুই একটী গল্প শুনুন।

    প্রতি বৎসর ক্ষীরপাই নগরে গাজন হইত। ভট্টাচার্য্য এই গাজনের অধিনেতা ছিলেন। গাজন লইয়া সহর প্রদক্ষিণ করা তখনকার নিয়ম ছিল। স্বয়ং শক্রঘ্ন ভট্টাচার্য্য গাজনের সঙ্গে সঙ্গে যাইতেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ একটী পল্লীর লোক তাঁহার বিষম প্রতিপক্ষ হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। তাঁহার বিষম প্রতিজ্ঞা হইয়াছিল, তিনি শক্রঘ্নকে গাজন লইয়া তাঁহার পল্লীতে যাইতে দিবেন না। শক্রঘ্ন ভট্টাচার্য্য ইহা জানিতে পারিয়াছিলেন; কিন্তু বলদৃপ্ত ব্রাহ্মণের প্রতিজ্ঞা হইল, তিনি যে কোন প্রকারে হউক, প্রতিপক্ষের পল্লীতে যাইবেন। তিনি গাজন লইয়া সেই দিকে অগ্রসর হন; কিন্তু গিয়া দেখেন, পল্লীর পথের সন্মুখে একটা হস্তী দণ্ডায়মান, তৎপশ্চাতে কিয়দূরে একখানি রথ; তৎপশ্চাতে আরও দূরে প্রতিপক্ষেরা অবস্থিত ছিলেন। ভট্টাচার্য্য বুঝিলেন এ সব গতিরোধের ব্যবস্থা। তিনি কিন্তু কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ না করিয়া পথ হইতে একখানি ইট্‌ কুড়াইয়া লইলেন। পরে হস্তীর শুণ্ড বগলে চাপিয়া রাখিয়া সেই ইষ্টক খণ্ডদ্বারা হস্তীকে এমনই প্রহার করিলেন যে, হস্তী তাহা সহ্য করিতে না পারিয়া গর্জ্জন করিতে করিতে পলায়ন করিল। পরে ভট্টাচার্য্য সবলে রথখানা একাকী টানিয়া ফেলিয়া দেন। দুর্দ্দান্ত বীরের বিক্রমব্যাপার দেখিয়া প্রতিপক্ষ পলায়ন করেন। ভট্টাচার্য্য ক্রোধান্বিত হইয়া একাকী তাঁহাদের পশ্চাৎ ধাবিত হন। প্রতিপক্ষের দলপতি হালদার ভয়ে বাটীর দ্বার রুদ্ধ করিয়া দেন। ভট্টাচার্য্য পদাঘাতে লৌহকীলকবিশিষ্ট দ্বার ভগ্ন করিয়া বাড়ীতে প্রবেশ করেন। তাঁহার পায়ে একটা লৌহশলাকা ফুটিয়া গিয়াছিল। তাহাতেও তাঁহার ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তাঁহার শ্যালক ও অন্যান্য আত্মীয়বর্গ আসিয়া, তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিয়া বলিলেন,— “ভট্টাচার্য্য করিয়াছ কি, পায়ে যে পেরেক ফুটিয়াছে।” ভট্টাচার্য্য বলিলেন,—“বটে বটে, টানিয়া বাহির করিয়া লও।” পেরেক বাহির করা হইল। ভট্টাচার্য্যের নিবৃত্তি নাই। তিনি প্রতিপক্ষের দলপতি হালদারের অন্বেষণে বাড়ীর ভিতরের দিকে ছুটিলেন। দলপতির লোকেরা ভয়ে তাঁহাকে এমনই স্থানে ভয়ঙ্কররূপে ইষ্টকাঘাত করেন যে, তাহাতে ভট্টাচার্য্য বড় কাতর হইয়া পড়েন। তখন তাঁহার আত্মীয়েরা তাঁহাকে ধরাধরি করিয়া বাড়ীতে লইয়া আসেন।

    প্রতিপক্ষের দল ভাবিলেন,—ভট্টাচার্য্যকে সাংঘাতিক আঘাত লাগিয়াছে; তিনি বোধ হয়, আদালতে নালিশ করিবেন। ভট্টাচার্য্যের মনোগতভাব জানিবার নিমিত্ত তাঁহারা এক জন চর পাঠাইয়া দেন। ভট্টাচার্য্য চরকে দেখিয়াই তাহার অতিপ্রায় বুঝিলেন। তিনি বলিলেন,—“হালদার ভাবিয়াছে, আমি নালিশ করিব। নালিশ করিব কি রে! উকিল পেয়াদাকে পয়সা খাওয়াইব? এবার সে মারিয়াছে, আগামী বারে আমি মারিব। নালিশ-ফৌজদারী করিলে আর গাজন কি থাকিবে?” চর এই কথা শুনিয়া চলিয়া যায়। পরে প্রতিপক্ষ সকলেই তাঁহার বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হন এবং ক্ষমা ভিক্ষা করেন। দলপতি হালদার বলেন,—“ভট্টাচার্য্য! তোমার বলপরীক্ষার জন্যই ঐরূপ করিয়াছিলাম। তুমি দ্বিতীয় ভীম বটে; তোমার শুধু বল নহে; মনুষত্ব্য আছে। তোমার তেজ আছে, তোমার ভবিষ্যৎ ভাবিবার বুদ্ধি আছে। আমায় ক্ষমা কর।”

    হালদারের কথা শুনিয়া ভট্টাচার্য্য বলিলেন,—“এ সব কথায় আর কাজ নাই; আজ আমার বাড়ীতে তোমাদের সকলকে খাইয়া যাইতে হইবে।”

    প্রতিপক্ষগণ ভট্টাচার্য্যের নিমন্ত্রণ পরমানন্দে রক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহারা ভট্টাচার্য্যের বাড়ীতে পরম পরিতোষপূর্ব্বক আহারাদি করিয়া বিদায় লইয়াছিলেন।

    আর এক সময় ভট্টাচার্য্য এক দোকানে বসিয়া আছেন, এমন সময় চারিমণী কলাই-বোঝাই এক ছালা আসিয়া উপস্থিত হয়। উপস্থিত সকলে বলিল,—“ভট্টাচার্য্য! তুমি যদি এই ছা্লা বহিয়া বাড়ী লইয়া যাইতে পার, তাহা হইলে তোমায় এই কলাই দি।” ভট্টাচার্য বলিলেন,—“পারি বটে; কিন্তু সোজা হইয়া যাইব না; দুই পা ও দুই হাত মাটীতে রাখিয়া গরুর মত চলিব; তোমরা আমার পিঠে এক খানি লেপ দিয়া তাহার উপর কলাই চাপাইয়া দিবে।”

    তাহাই হইল। ভট্টাচার্য্য সেখান হইতে প্রায় আধক্রোশ দূরে সেই চারিমণী ছালা বহিয়া বলদের মত হাঁটিয়া বাড়ী গিয়াছিলেন। তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ২০০/৩০০ দুই শ তিন শ লোক গিয়াছিল। বাড়ীতে পৌঁছিলে সকলে ভট্টাচার্য্যকে কলাই লইতে অনুরোধ করে। ভট্টাচার্য্য বলেন —“আমি কলাই কি করিব? কোথায় রাখিব? তোমরা উপযুক্তরূপ চাউল তরি-তরকারী প্রভৃতি লইয়া এস; এই কলায়ে দাইল হউক; রাঁধিয়া বাড়িয়া সবাই আনন্দে আহার করিব।” তাহাই হইল।

    এক সময় ভট্টাচার্য্যের গ্রামস্থ ভুবন ঘোষ নামক এক সদ্‌গোপ নিকটবর্ত্তী একটী খালের নিকট বেণাবনের ভিতর লোক ঠেঙ্গাইয়া মারিত। ঘোষ খুব বলবান ছিল। গ্রামের লোক তাহার জন্য সদা শঙ্কিত থাকিত। এক দিন ভট্টাচার্য্যের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলেন—“শতু! তুই থাকিতে ঘোষ জব্দ হয় না।”  শক্রঘ্ন বলিলেন,—“তাহার আর কি, এত দিনতো বল নাই।” শক্রঘ্ন ঘোষকে জব্দ করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন।

    শত্রুঘ্ন এক দিন প্রাতঃকালে চুপি চুপি গিয়া বেণাবনে লুকাইয়া থাকেন। কিয়ৎক্ষণ থাকিয়া তিনি দেখিলেন, সমস্ত বন আন্দোলিত হইতেছে। তিনি বুঝিলেন, ঘোষ কাহাকে ধরিয়াছে। বাস্তবিক ঘোষ সে দিন এক জন পশ্চিমে খোট্টাকে ধরিয়াছিল। খোট্টাটা খুব বলবান ছিল, ঘোষ তাঁহাকে সহজে পাড়িতে পারে নাই। দুই জনে ধস্তাধস্তি হইতেছিল। ভট্টাচার্য্য এই সময় তাহাদের সন্মুখে উপস্থিত হন। তাঁহাকে দেখিয়া ঘোষ ভায়া শিকার ছাড়িয়া সম্মুখে একটা শিমূল গাছে উঠিয়া পড়ে। এই সময় খোট্টাটা অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছিল। ভট্টাচার্য্য তাঁহাড় মুখে জল দিয়া তাহার চৈতন্য সম্পাদন করেন। পরে তিনি শিমূল বৃক্ষের তলায় গিয়া তাহার উপর উঠিতে চেষ্টা করেন। স্থূলকায় হেতু উঠিতে না পারিয়া তিনি সিমূলতলে দাঁড়াইয়া রহিলেন। পরে তিনি বলিলেন —“ঘোষ! তুই কতক্ষণ থাক্‌বি? তোকে না মারিয়া আমি যাইতেছি না।” ঘোষ গাছের উপর বসিয়া থর থর কাঁপিতে লাগিল। সে কোনমতে গাছ হইতে নামিল না। ঘোষ গাছ হইতে কিছুতেই নামিতেছে না দেখিয়া ভট্টাচার্য্য বলিলেন,—“নামিয়া আয়; আমার পা ছুঁইয়া দিব্যি কর যে, আর এ কাজ করবি না; তা হ’লে এ যাত্রা তোকে ক্ষমা করিব।”

    ঘোষ বলিল,—“তুমি পৈতা ছুইয়া দিব্যি কর, আমি নামিয়া গেলে আমাকে মারবে না, তা হলে আমি নাম্‌বো।”

    ভট্টাচার্য্য হাসিয়া কহিলেন,—“আমি পৈতা ছুঁইয়া দিব্য করিলে তোর বিশ্বাস হইবে কেন?”

    ঘোষ বলিল,—“আমি তোমার পা ছুঁইয়া দিব্যি ক’রলে তুমি বিশ্বাস কর্‌বে; আর তুমি ব্রাহ্মণ, পৈতা ছুঁইয়া দিব্যি কর্‌লে আমি বিশ্বাস করব না?”

    ভট্টাচার্য্য পৈতা ছুঁইয়া দিব্য করিলেন। ঘোষ নামিয়া আসিয়া ভট্টাচার্য্যের পা ছুঁইয়া দিব্য করিল, ভট্টাচার্য্য ক্ষমা করিলেন। ঘোষ চলিয়া গেল। পরে ভট্টাচার্য্য সেই আহত খোট্টাটিকে সঙ্গে লইয়া বাড়ী ফিরিয়া যান। তিনি খোট্টাটিকে যথাযোগ্য আহারাদি করাইয়া বিদায় দেন।

    ভট্টাচার্য্যের প্রতাপে সেই সময় অনেক দস্যু-লেঠাল জব্দ হইয়াছিল।

    একবার তাঁহার পৃষ্ঠব্রণ হয়। ডাক্তার অস্ত্র করিবার পূর্ব্বে “ক্লোরোফরম্” করিয়া তাঁহাকে অজ্ঞান করিবার উপক্রম করেন। তিনি বলিলেন,—“অজ্ঞান করবে কেন? অস্ত্র কর, অমি অজ্ঞান হইয়া আছি।” ডাক্তার ছুরি বসাইলেন, ছুরি ভাঙ্গিয়া গেল। তাঁহার দেহের চর্ম্ম ঠিক হাতীর শুঁড়ের মত কঠিন ছিল। ডাক্তার ভাবনায় পড়িলেন, কি করিবেন। অন্য ছুরি আনিলেও ত কঠিন চর্ম্মে ভাঙ্গিয়া যাইবে। তখন শত্রুঘ্ন নিজে এক উপায় বাহির করিলেন। কামার ঘর হইতে কাস্তিয়ায় ধার দিয়া আনিয়া কাস্তিয়া ক্ষত মুখে প্রবিষ্ট করিয়া কড়, কড়, শব্দে ফোঁড়া কাটা শেষ করিলেন। এতাবৎকাল ভট্টাচার্য্য যাতনাব্যঞ্জক মুখভঙ্গী বা কোন শব্দ না করিয়া অম্লানবদনে বসিয়া রহিলেন।

    দিনময়ী এই তেজস্বী সরল সাহসী পুরুষের কন্যা। ইহার পরিচয় যথাস্থানে পাইবেন। সে পরিচয়ে বংশ-গৌরবের ফল-প্রমাণ। এখন ঈশ্বরচন্দ্রের পাঠ্যপ্রতিষ্ঠার পর্য্যালোচনা করা যাউক।

    পঞ্চদশ বর্ষ বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র অলঙ্কার-শ্রেণীতে প্রবেশ করেন।28 সেই সময় পণ্ডিত প্রবর প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশ মহাশয় অলঙ্কার-শ্রেণীর অধ্যাপন করিতেন। এই শ্রেণীতে ঈশ্বরচন্দ্র অন্যান্য ছাত্র অপেক্ষা অল্পবয়স্ক ছিলেন। এক বৎসরের মধ্যে তিনি সাহিত্যদর্পণ, কাব্যপ্রকাশ, রসগঙ্গাধর প্রভৃতি অলঙ্কার গ্রন্থ পাঠ করেন। অলঙ্কারের বাৎসরিক পরীক্ষায় তিনি সর্ব্বোচ্চ পারিতোষিক প্রাপ্ত হন। তখন পুস্তক ও টাকা পারিতোষিকের ব্যবস্থা ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র এই কয়েকখানি পুস্তক পাইয়াছিলেন–রঘুবংশ, সাহিত্যদর্পণ, রত্নাবলী, মালতীমাধব, মুদ্রারাক্ষস, বিক্রমোর্ব্বশী, মৃচ্ছকটীক।

    একদিন পণ্ডিত প্রবর তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয়ের বাড়ীতে তাঁহাকে সাহিত্যদর্পণের আবৃত্তি করিতে দেখিয়া তাৎকালিক বিখ্যাত দর্শনশাস্ত্রবেত্তা জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন মহাশয় বলিয়াছিলেন,—“এত ছোট ছেলে সাহিত্যদর্পণের এমন সুন্দর আবৃত্তি করিতে পারে, ইহা বড় আশ্চর্য্যের বিষয়।” তর্কপঞ্চানন মহাশয় ঈশ্বরচন্দ্রকে পরীক্ষা করিয়া বলিয়াছিলেন,—“এই বালকের বয়োবৃদ্ধি হইলে, বালক বাঙ্গালা দেশের অদ্বিতীয় লোক হইবে।”

    এই সময় ঈশ্বরচন্দ্র কলেজে মাসিক ৮৲ আট টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হন।29 তিনি যাহা বৃত্তি পাইতেন, তাহা পিতাকে আনিয়া দিতেন। পুত্রের প্রথমাবস্থার বৃত্তিলব্ধ টাকায় পিতা ঠাকুরদাস বীরসিংহ গ্রামের নিকট কতকটা জমি ক্রয় করিয়াছিলেন। এই জমিতে তাঁহার টোল বসাইবার সংকল্প ছিল। টোল বসাইয়া ছাত্র রাখিয়া সংস্কৃত শিক্ষার প্রসারবৃদ্ধি করিবেন, পিতার এই সাধ বরাবর ছিল। পুত্রের বিদ্যা-গৌরব-সংবৃদ্ধির সঙ্গে তাহার চিরপোষিত সাধ সংবর্দ্ধিত হইয়াছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয়, প্রায়ই বন্ধুবান্ধবের নিকট একথা বলিতেন। বীরসিংহ গ্রামে যখন প্রথমে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তখন বিশুদ্ধ সংস্কৃত শিক্ষাই দেওয়া হইত। সংস্কৃতকলেজে ইংরাজী শিক্ষাপ্রবর্তনের সময় ঐ বিদ্যালয়েও ইংরাজী শিক্ষা প্রবর্তিত হইয়াছিল। ঠাকুরদাস কি জানিতেন যে, তাহার পুত্র ভবিষ্যজীবনে টোলের পরিবর্ত্তে গ্রামে উচ্চশ্রেণীর ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপিত করিতে পরিবেন? ঈশ্বরচন্দ্র যে বৃত্তির টাকা পাইতেন, পরে পিতা তাহার সমস্ত লইতেন না।

    ঈশ্বরচন্দ্র বৃত্তির টাকায় হস্তলিখিত পুঁথি ক্রয় করিয়াছিলেন। এই সব পুঁথি তাহার লাইব্রেরীতে বিদ্যমান ছিল। কেবল তাহাই নহে, তিনি বাল্য কাল হইতে পরদুঃখমোচনে ব্রতী হইয়াছিলেন। সেই ক্ষুদ্র বুকখানি অনন্তব্যাপিনী; কিন্তু দয়া যেমন, উপায় তো তেমন নহে; তবুও যে কোন উপায়ে যথাশক্তি দানে, দীনের দুঃখোদ্ধারে তিনি প্রাণান্তপণ করিতেন। অবশিষ্ট যে টাকা থাকিত, তিনি সেই টাকায় জল খাইতেন। জল খাইবার সময় যে সকল বালক তাঁহার নিকটে থাকিত, তিনি তাহাদিগকেও জল খাওয়াইতেন। কাহারও ছেঁড়া কাপড় দেখিলে, নিজের হাতে পয়সা না থাকিলেও, দরওয়ানের নিকট ধার করিয়া তিনি তাহাদের কাপড় কিনিয়া দিতেন। বাসায় কেহ অসিলে, তৎক্ষণাৎ তিনি তাহাকে জল খাওয়াইতেন। সে ভাবিত, ঈশ্বরচন্দ্র বড় মানুষের ছেলে; কিন্তু ঈশ্বর কিসে বড়, তাহা বুঝিত না। সবাই কি বুঝে, বাগানের ছোট চারা আম গাছটী কিসে অমৃতময় সুমিষ্ট আম প্রদান করে। কোন সমবয়স্ক বালকের পীড়া হইলে, ঈশ্বরচন্দ্র সকল কার্য্য পরিত্যাগ করিয়া, তাহার সেবা-শুশ্রুষা করিতেন। কাহারও কোন সংক্রামক পীড়া হইলে, অপর কেহ তাহার নিকট যাইত না; তিনি কিন্তু অম্লানবদনে ও অকুণ্ঠিতচিত্তে তাহার মলমুত্রাদি পরিষ্কার করিতেন।

    বালক বিদ্যাসাগর যখন বীরসিংহ গ্রামে যাইতেন, তখন সর্ব্বাগ্রে গুরুমহাশয় কালীকান্তের বাড়ীতে গিয়া, তাঁহাকে প্রণাম করিতেন। পরে ক্রমে ক্রমে তিনি প্রত্যেক প্রতিবাসীর বাড়ী গিয়া, প্রত্যেকের তত্ত্ব লইতেন। কাহারও পীড়াদি হইলে, তিনি নির্ব্বিকারচিত্তে তাহার সেবাশুশ্রুষাদি করিতেন। এই জন্য তখন বালক বিদ্যাসাগর গ্রামবাসী কর্ত্তৃক দয়াময় নামে অভিহিত হইতেন। তিনি তখন বিদ্যাসাগর হন নাই; কিন্তু দয়ার সাগর হইয়াছিলেন। কুকুরবিড়ালটা মরিলেও তাঁহার চক্ষে জল পড়িত। বালকের কি অসীম দয়া!

    যাঁহারা বাল্য কালে তাঁহার মাননীয় ছিলেন, বয়সে তাঁহারা তাঁহার নিকট সমান সম্মান পাইতেন। তাঁহারা বিদ্যা-বুদ্ধিতে হীন হইলেও, বিদ্যাসাগর বিদ্যাভিমানে বা পদগৌরবে গর্ব্বিত হইয়া, কখনই তাঁহাদের প্রতি অসম্মান প্রকাশ করিতেন না; বরং তাঁহারা পূর্ব্বকার স্নেহভাব বিস্মৃত হইয়া তাঁহার প্রতি সম্মান প্রকাশ করিলে, তিনি কুণ্ঠিত ও লজ্জিত হইতেন। বিদ্যাসাগর যখন কলেজের উচ্চ পদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তখন কলেজের তদনীন্তন কেরাণী রামধন বাবু তাঁহাকে দেখিয়া সসন্ত্রমে গাত্রোত্থান করিতেন। পাঠ্যবস্থায় বিদ্যাসাগর ইহার পরম স্নেহভাজন ছিলেন। ইঁহাকে এইরূপ সসন্ত্রমে সম্মান করিতে দেখিয়া বিদ্যাসাগর একদিন বলিয়াছিলেন,—“আমি আপনার সেই স্নেহপাত্রই আছি, আপনি অমন করিয়া আমাকে লজ্জা দিবেন না।” বিদ্যাসাগরের অমায়িকতা ও বিনয়নম্রতা দেখিয়া রামধন বাবু বিস্মিত হইয়াছিলেন।

    বিদ্যাসাগরের বাল্যকালে সখ্ ও সাধের মধ্যে ছিল, কবির গান শোনা। তিনি সমবয়স্ক বালকদিগকে লইয়া কবির গান করিতেন। কবির গানপ্রিয়তা-সম্বন্ধে এইরূপ একটা গল্প আছে। তিনি যখন চাকুরী করিয়া উপায়ক্ষম হন, তখন এক দিন স্বগ্রাম হইতে কলিকাতায় আসিতেছিলেন। মধ্যে তিনি এক রাত্রি এক চটিতে অবস্থান করেন। প্রাতঃকালে তিনি শুনিলেন, চটীতে এক জন অতি সুমিষ্ট-স্বরে কবির গান গাহিতেছে। তিনি উঠিয়া গিয়া সেই লোকটীর নিকট গমন করিলেন। যতক্ষণ সে গান করিতেছিল, তিনি ততক্ষণ নিঃশব্দে ও আনন্দোৎসুক হৃদয়ে গান শুনিতেছিলেন। গান থামিয়া গেলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন, লোকটীর বাড়ী তথা হইতে ৬/৭ ছয় সাত ক্রোশ দূরে এবং তাহার নিকট কবির গান সংগৃহীত আছে। তিনি তখন তাহাকে বলিলেন,—“ভাই! আমি তোমার সঙ্গে যাইব; আমাকে তোমায় কতকগুলি গান দিতে হইবে।” লোকটি স্বীকার পাইল। পরে তিনি সেই লোকটীর বাড়ীতে গিয়া অনেক গান সংগ্রহ করিয়া আনেন। যেখানে যে কবির গান শুনিতেন, তিনি তাহা সংগ্রহ করিয়া রাখিতেন। তাহার নিকট কবির গানের একখানি প্রকাণ্ড খাতা ছিল। সখের মধ্যে এই কবির গান শোনামাত্র এবং খেলা ছিল কেবল কপাটী ও লাঠী-খেলা। এই সময় সংস্কৃত কলেজে পালোয়ান-কুস্তীর আখড়া ছিল। তিনি, গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রভৃতি সতীর্থগণ মিলিয়া কুস্তি করিতেন। তিনি অনেক সময় সমবয়স্ক বালকদিগের সঙ্গে জুটিয়া মাঠ হইতে ধান কাটিয়া আনিতেন। এই সব কথা এবং বাজার করা, রন্ধন করা প্রভৃতির কথা, বন্ধুবান্ধবদিগের নিকট অবসর-ক্রমে খুলিয়া বলিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় কখন কুণ্ঠিত বা লজ্জিত হইতেন না। ইহাতে তো মহতের মাহাত্ম্য-ক্রটী হয় না; বরং এই সব কথা শ্রোতার মুখ হইতে প্রচারিত হইয়া, সাধারণের অনেক বিষয়ে শিক্ষাস্থানীয় হয়।

    অলঙ্কারের শ্রেণীতে পড়িবার সময় তাহাকে দুই বেলা রন্ধন করিতে হইত। রন্ধন-ভারে ও গুরুতর পাঠপরিশ্রমে তিনি উদরাময় রোগে আক্রান্ত হন। প্রত্যহ রক্তভেদ হইত। কলিকাতায় রোগ আরাম হইল না। অগত্য তাঁহাকে পল্লীগ্রামে যাইতে হইল। সেখানে দিনকতক থাকিলে রোগ সারিয়া যায়। তিনি কলিকাতায় ফিরিয়া আসেন। আবার সেই রন্ধন ও অধ্যয়ন। তবে মধ্যম ভ্রাতা দীনবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকটা সাহায্য করিতেন এবং মধ্যে মধ্যে বাজারও করিয়া দিতেন। একদিন দীনবন্ধু, সন্ধ্যার সময় বাজার করিতে গিয়া, যোড়াসাঁকোর নূতন বাজারের এক স্থানে বসিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত ইতস্ততঃ বহু দিকে অনুসন্ধান করিতে করিতে নূতন বাজারে যাইয়া ভ্রাতাকে নিদ্রিত অবস্থায় দেখিতে পান এবং তথা হইতে তাহাকে তুলিয়া লইয়া আসেন। শুনিতে পাই, ইহার পর হইতে ঈশ্বরচন্দ্র ভ্রাতা দীনবন্ধুকে আর বড় একটা একাকী বাহিরে যাইতে দিতেন না।

  • তৃতীয় অধ্যায়

    তৃতীয় অধ্যায়

    সংস্কৃত কলেজে ভর্ত্তি, সংস্কৃত কলেজের উদ্দেশ্য ও প্রতিষ্ঠা, তাৎকালিক শিক্ষার অবস্থা, ভবিষ্যৎ আভাস, ব্যাকরণ-শিক্ষা, কলেজের অধ্যাপক, বেতন-ব্যবস্থার ফল, পিতার শাসন, ব্যাকরণে প্রতিপত্তি ও পুরস্কার, একগুঁয়েমি, অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়, কাব্যের শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য-কঠোরতা এবং ব্যাকরণ ও কাব্য শিক্ষার ফল।

    ১২৩৬ সালে ২০শে জ্যৈষ্ঠ বা ১৮২৯ খৃষ্টাব্দে ১লা জুন সোমবার ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজে ভর্ত্তি হন।

    ঈশ্বরচন্দ্র যখন সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করেন, তখন সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত শিক্ষারই প্রচলন ছিল। ইংরেজি শিক্ষার অতি সামান্য মাত্র স্বতন্ত্র ব্যবস্থা ছিল। তখনকার সংস্কৃতাধ্যায়ী ছাত্রগণ ইংরেজি পড়িতে বাধ্য ছিলেন না। কেহ ইচ্ছা করিলে ইংরেজি পড়িতেন মাত্র।

    সংস্কৃত কলেজে প্রথমে যে শিক্ষাপ্রণালী প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল, তাহার আলোচনা করিলে আদৌ মনে হয় না, সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি শিক্ষা চালাইবার কর্ত্তৃপক্ষের কোনরূপ সঙ্কল্প ছিল। তখন কেবল দ্বিজসন্তানেরই সংস্কৃত কলেজে প্রবেশাধিকার ছিল। তাঁহারা ঘরের মেজের বিছানার উপর বসিয়া টোলের ধরণে অধ্যয়ন করিতেন; আর অধ্যাপকগণ স্বতন্ত্র আসনে বসিয়া তাকিয়া ঠেসান দিয়া অধ্যাপনা করিতেন।

    কর্ত্তৃপক্ষের অন্তরের উদ্দ্যেশ্য হউক বা না হউক, আমাদিগের দুরদৃষ্টে সে শিক্ষাপ্রণালী সম্পূর্ণরূপে পরিবর্ত্তিত হইয়া গিয়াছে। সেই পরিবর্ত্তনের সুত্রপাত বিদ্যাসাগরের পাঠ্যাবস্থায়; পরিপুষ্ট তাঁহার কার্য্যাবস্থায়।

    ১৮২৪ খৃষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজের প্রতিষ্ঠা-প্রস্তাবে রাজা রামমোহন রায়-প্রমুখ বঙ্গের তাৎকালিক অনেক শক্তিশালী মনীষী ব্যক্তি আপত্তি তুলিয়াছিলেন।

    রাজা রামমোহন রায় সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা-কল্পে প্রকৃতপক্ষে মনস্তাপ পাইয়াছিলেন। ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে যে শিক্ষাকমিশনের অধিবেশন হইয়াছিল, তাহার রিপোর্টে রামমোহন রায়ের সে মনস্তাপের পরিচয় পাওয়া যায়। রিপোর্টে এইরূপ লেখা আছে;—

    “Ram Mohan Ray, the ablest representative of the more advanced members of the Hindu community, expressed deep disappointment, or the part of himself and his countrymen at the resolution of Government to establish a new Sanskrit College instead of a seminary designed to impart instruction in the Arts; Sciences and Philosophy of Europe.”

    রাজা রামমোহন রায় বলিয়ছিলেন— টোলে যেরূপ সংস্কৃত শিক্ষা হইতেছে, তাহাই হউক; বরং তাহার উৎকর্ষসাধনের ব্যবস্থা হউক; কিন্তু সংস্কৃত শিখাইবার জন্য স্বতন্ত্র কলেজের প্রয়োজন নাই। যাহাতে পাশ্চাত্য সাহিত্য, বিজ্ঞানপ্রভৃতির শিক্ষাপ্রসারের জন্য স্বতন্ত্র কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, তদর্থে কর্ত্তৃপক্ষের যত্নশীল হওয়া কর্ত্তব্য। টোলের শিক্ষা অব্যাহত রাখিবার পরামর্শ দেওয়া সাধু কল্পনা সন্দেহ নাই; তবে পাশ্চাত্যশিক্ষাপ্রসারের পরামর্শ দিয়া তিনি ভবিষ্যদ্দর্শিতার পরিচয় দেন নাই। তাৎকালিক ইংরেজী শিক্ষার ফলাফল আলোচনা করিলে আমাদের এ কথার সার্থকতা হৃদয়ঙ্গম হইবে।

    হিন্দু কলেজের প্রসাদে তখন কলিকাতা সহরে উচ্ছৃঙ্খল ইংরেজী শিক্ষার আবর্ত্তে পড়িয়া অনেক হিন্দুসন্তান বিপথগামী ও সমাজদ্রোহী হইয়া পড়িয়াছিলেন। আকস্মিক ইংরেজী শিক্ষার প্রবাহ হিন্দুসমাজকে তখন অনেকটা উদ্বেলিত করিয়াছিল। সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইবার সাত বৎসর পূর্ব্বে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।

    ঈশ্বরচন্দ্র যখন সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করেন, তখন হিন্দু কলেজের অনেক ছাত্র বিজাতীয় বিদেশীয় শিক্ষকের বিজাতীয় শিক্ষাভাব-প্রণোদনে এবং ইংরেজী শিক্ষার বিষময় ফলে বিজাতীয় ভাবাপন্ন হইয়া হিন্দুসমাজে একটা বিষম বিপ্লব ঘটাইবার উপক্রম করিয়াছিলেন। তাঁহাদের পূর্ব্বে যাঁহারা কলেজের শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া সংসারক্ষেত্রে বিচরণ করিতেছিলেন, তাঁহাদের অনেকের অসদাদর্শে হিন্দু কলেজের তৎকালিক অনেক ছাত্রের মতি-গতি বিকৃত হইয়াছিল। প্রসিদ্ধ অধ্যাপক রাজনারায়ণ বসু হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি স্বরচিত চরিতে যে আত্মকথা লিখিয়াছেন, তাহা আমাদের এই মন্তব্যের একটী প্রমাণ হইবে। তিনি লিখিয়াছেন—

    “তখন হিন্দু কলেজের ছাত্রেরা মনে করিতেন যে, মদ্যপান করা সভ্যতার চিহ্ন, উহাতে দোষ নাই। * * তাঁহারা কখনই পানাসক্ত হইতেন না, যদ্যপি তাহা সভ্যতার চিহ্ন মনে না করিতেন। আমাদিগের বাসা তখন পটলডাঙ্গায় ছিল। আমি * *  *  *  প্রভৃতির সহিত কলেজের গোলদীঘিতে মদ খাইতাম এবং এখন যেখানে সেনেট হাউস হইয়াছে, সেখানে কতকগুলি শিক কাবাবের দোকান ছিল, তথা হইতে গোলদীঘির বেল টপকাইয়া, ফটক দিয়া বাহির হইবার বিলম্ব সহিত না, উক্ত কাবাব কিনিয়া আনিয়া আমরা আহার করিতাম। আমি ও আমার সহচরেরা এইরূপ মাংস ও জলস্পর্শশুন্য ব্রাণ্ডি খাওয়া সভ্যতা ও সমাজ-সংস্কারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শক কার্য্য মনে করিতাম। একদা আমি গোলদীঘিতে মদ খাইয়া টুপভূজঙ্গ হইয়া রাত্রিতে বাটীতে আসিলে, মাতাঠাকুরাণী অতিশয় বিরক্ত হইয়া বলেন,—“আমি আর কলিকাতার বাসায় থাকিব না, বোড়ালে গিয়া থাকিব।” পিতাঠাকুর আমার আচরণের বিষয় অবগত হইয়া আমাকে পরিমিত মদ্যপায়ী করিবার জন্য একটা কৌশল অবলম্বন করিলেন। * * সেকালে মুন্সি আমীর আলী সদর দেওয়ানী আদালতে একজন প্রধান উকীল ছিলেন। * * পিতাঠাকুরের সহিত মুন্সি আমীর আলীর অন্তরিক বন্ধুতা জন্মিায়াছিল। মুন্সি সাহেব আমার পিতাঠাকুরকে ‘রাজদার দোস্ত’ বলিতেন। যে বন্ধুকে গোপনীয় কথা বলা যাইতে পারে, পার্শিতে তাহাকে ‘রাজদার দোস্ত’ বলে। প্রতিদিন মুন্সি আমীর আলীর বাটী হইতে আমাদিগের বাসায় একটী টিনের বাক্স অসিত। আমি মনে করিতাম যে, মুন্সি আমীর আলী পিতাঠাকুরকে তরজমার জন্য সদর দেওয়ানীর কাগজপত্র পাঠাইয়া দিয়া থাকেন। * * এক দিন সন্ধ্যার পর আমাকে পিতাঠাকুর তাঁহার লিখিবার ঘরে ডাকিলেন। ডাকিয়া ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। আমি বুঝিতে পারিলাম না যে ব্যাপারটা কি? তাহার পর দেখিলাম, তিনি একটী দেরাজ খুলিয়া একটি কর্কস্ক্রুপ ও একটি সেরীর বোতল ও একটি গুয়াইন গ্লাস বাহির করিলেন। তৎপরে প্রকাণ্ড টিনের বাক্স খোলা হইলে আমি দেখিলাম যে, তাহাতে সদর দেওয়ানীর কাগজ নাই, পোলাও, কোপ্তা রহিয়াছে। পিতাঠাকুর আমাকে বলিলেন,—“তুমি প্রত্যহ সন্ধ্যার পর আমার সঙ্গে এই সকল দ্রব্য আহার করিবে; কিন্তু সেরী মদ দুই গ্লাসের অধিক পাইবে না; যখনই শুনিব, অন্যত্র মদ খাও, সেই দিন অবধি এই খাওয়া বন্ধ করিয়া দিব। কিন্তু আমি এইরূপ পরিমিত পানে সন্তুষ্ট হইতাম না। অন্যত্র পান করিতাম। এইরূপ অপরিমিত মদ্যপানে আমার একটি পীড়া জন্মিল।”

    হিন্দু কলেজে পড়িয়া অনেক হিন্দুসন্তান পাশ্চাত্য সাহিত্য বিজ্ঞানে পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন সন্দেহ নাই, কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় তাঁহাদের অনেকের কিরূপ মতিগতি ঘটিয়াছিল, তাৎকালিক অধ্যাপক হোরেশ হেমান উইলসন সাহেবের রিপোর্টে তাহা প্রকাশ পাইয়াছে। তাঁহার কথা এইখানে উদ্ধৃত করিলাম;–

    “An impatience of the restrictions of Hinduism and a disregard of its ceremonies are openly avowed by many young men of respectable birth and talents,”

    Report of the India Education Commission, P. 257.

    উহার তো ইহাই ভাবার্থ,—অনেক ভদ্রবংশজাত এবং বুদ্ধিমান হিন্দুসন্তান প্রকাশ্যভাবে স্বধর্ম্মে আস্থাশূন্য হইয়াছিলেন। অতঃপর পাঠকের বোধ হয়, আর কোনও সন্দেহ রহিল না।

    তাৎকালিক অনেক ইংরেজি-শিক্ষিত হিন্দুসন্তান ইংরেজের গুণানুকরণে অক্ষম হইয়া দোষাবলীর সম্পূর্ণ অনুকরণ করিয়া বসিয়াছিলেন। ইংরেজ রাজা; ইংরেজ জগতে প্রভূত শক্তিশালী, ইংরেজ সমুন্নত সভ্যজাতি বলিয়া সমগ্র পৃথিবীতে পরিগণিত। সভ্য ইংরেজ যাহা যাহা করিয়া থাকেন, তদানীন্তন ইংরেজি-শিক্ষিত অনেক কৃতী ব্যক্তি তাহা সভ্যতানুমোদিত বলিয়া মনে করিয়াছিলেন।

    প্রকৃত গুণের অনুকরণ বড় সোজা কথা নহে। গুণানুকরণ তাঁহাদের সাধ্যাতীত হইয়াছিল। যাহা সহজসাধ্য এবং অকষ্টকল্প, তাহাই তাঁহাদের অনুকরণীয় হইল। ইংরেজ গরু খান, ইংরেজ মদ খান, ইংরেজ কোটপেণ্টুলেন পরেন, ইংরেজ ঘাড়ের চুল ছাঁটিয়া মস্তকের সন্মুখ ভাগে লম্বা লম্বা চুল রাখেন। এই সব অনায়াসসাধ্য কার্য্যগুলিকে সভ্যতার অঙ্গ ভাবিয়া অনেক ইংরেজিশিক্ষিত হিন্দুসন্তান তদনুকরণে পূর্ণমাত্রায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এমন কি তখন হিন্দু কলেজের অনেক ছাত্র, কলেজের সম্মুখে, গোলদীঘির অনাবৃত প্রাঙ্গণে বসিয়া সুরাপান করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। অনেকে গোমাংস ভক্ষণ করিয়া ভূক্তাবশেষ অস্থিমাংস প্রতিবেশী গৃহস্থের বাড়ীতে নিক্ষেপ করিয়া পরম আনন্দ অনুভব করিতেন। তাঁহারা ভাবিতেন, এরূপ না করিলে, ইহাদের বর্ব্বরতার কলঙ্ক অপনীত হইবে না।

    ইংরেজি শিক্ষার এতাদৃশ বিষময় ফল-সন্দর্শনে সমগ্র হিন্দু-সমাজ সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এক হিন্দু কলেজে রক্ষা ছিল না, তাহার উপর সংস্কৃত কলেজটী ইংরেজী কলেজ হইলে, বোধ হয় ঘরে ঘরে নরক-দৃশ্য দেখিতে হইত। সে সময় সংস্কৃত কলেজ ইংরেজী কলেজের অনুকরণে গঠিত হইলেও, সংস্কৃত শিক্ষার প্রচলন থাকায় উহা হিন্দু-সন্তান ব্রাহ্মণগণের তবুও কতক আশ্রয়স্থল হইয়াছিল।

    তদানীন্তন ইংরেজী শিক্ষার কুফলসন্দর্শনে ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা, বোধ হয় ঈশ্বরচন্দ্রকে সংস্কৃত কলেজে প্রেরণ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র ইংরেজী পড়িয়া, তদানীন্তন ইংরেজি শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের ন্যায় বিকৃত হইয়া না পড়েন, ইহাই ঠাকুরদাসের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ঠাকুরদাস মনে মনে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করিতেন যে, বংশের সকলে যেমন অধ্যাপকমণ্ডলীর মধ্যে অগ্রণী হইয়া আসিতেছেন, দারিদ্র্যনিবন্ধন তিনি নিজে সেই সুখে বঞ্চিত হইলেও যদি তাঁহার পুত্র সেই প্রকার অধ্যাপকমণ্ডলীর শীর্ষ স্থান অধিকার করিতে পারেন, তাহা হইলে তাঁহার পক্ষে পরম গৌরবের বিষয় হইবে। সুতরাং পুর্ব্ব হইতেই তিনি ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত শিক্ষা করিয়া যাহাতে স্বীয় বাটীতে চতুষ্পাষ্ঠী স্থাপনপূর্ব্বক নানাস্থানের বালককে সংস্কৃত বিদ্যা দান দ্বারা যশস্বী হইতে পারেন, তজ্জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন; সুতরাং স্বজনগণের পরামর্শমতে তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে ইংরেজী শিক্ষায় ব্রতী করিতে রাজী হইলেন না। তিনি পুত্রকে সংস্কৃত কলেজে ভর্ত্তি করিয়া দিলেন। গদাধর তর্কবাগীশ মহাশয় সেই সময়ে সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করিতেন। তিনিও ঈশ্বরচন্দ্রকে সংস্কৃত কলেজে ভর্ত্তি করাইবার জন্য ঠাকুরদাসকে বিশেষ ভাবে উৎসাহিত করিয়াছিলেন।

    ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজে শিক্ষিত হইলেও, ইংরেজী শিক্ষার ব্যুহবেষ্টনে আবদ্ধ ছিলেন। এক দিকে হিন্দু কলেজের উন্মাদিনী শিক্ষা, অপর দিকে মিশনরী কলেজের মোহিনী মায়া; তদুপরি শক্তিশালী সাহেব সিবিলিয়নদের গাঢ় ঘনিষ্ঠতা। যে বৎসর ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করেন, তাহার পর বৎসরে পাদরী ডফ্ সাহেবের স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে খৃষ্টানী স্কুল “বিসস্প কলেজ” প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ইংরেজী শিক্ষার অপ্রতিহত ঘাত প্রতিঘাতে হৃদয়বান্, মনস্বী ও তেজস্ব ঈশ্বরচন্দ্রও বিচলিত হইয়াছিলেন। অবিমিশ্র সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করিয়া ও ঈশ্বরচন্দ্র ভাবিছিলেন, ইংরেজী না শিখিলে বর্ত্তমান যুগে সংসারের শ্রীবৃদ্ধিসাধন দুঃসাধ্য। তাই তিনিও সংস্কৃতপাঠসমাপনান্তে কার্য্যাবস্থায় ইংরেজী শিক্ষায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। যখন ফোট উইলিয়ম কলেজে কাজ করেন, তখন ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতিভাদর্শনে প্রীত হইয়া অধ্যক্ষ মেজর মার্শেল সাহেব বলেন, ঈশ্বরচন্দ্র, তুমি ইংরেজী পড়িতে আরম্ভ কর। তাহাতে তুমি জগতে বিশেষ যশস্বী হইবে। তাহার পর বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রথমতঃ ডাঃ নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের নিকট ইংরেজী শিক্ষা করিতে আরম্ভ করেন, তাহার পর ডাঃ ৺দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (বিখ্যাত বাগ্মী শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় মহাশয়ের পিতা) মহাশয়ের নিকট শিক্ষা লাভ করেন; পরে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য শিক্ষক নিযুক্ত করিয়া তিনি ইংরেজী ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপন্ন হইয়াছিলেন।

    সংস্কৃত শিক্ষার ফলেই হউক, আর তাঁহার অলৌকিক দৃঢ়চিত্ততা ও আত্মসম্মানবোধের জন্য হউক, তিনি সর্ব্বতোভাবে দেশীয় ভাব সংরক্ষণে সমর্থ হইয়াছিলেন এবং ইংরেজী শিক্ষার তাৎকালীন ফল কতকটা তাঁহাতেও সংক্রমিত হইয়াছিল কি না, সে সম্বন্ধে তাঁহার ভবিষ্যৎ কার্য্যাবলি হইতে যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যাইবে।

    ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজের ব্যাকরণ শ্রেণীর তৃতীয় বিভাগে ভর্ত্তি হইয়া সন্ধিসুত্র পাঠ করেন।

    সংস্কৃত ব্যাকরণ-শিক্ষা, সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সম্পূর্ণ সাহায্যকারিণী। এই জন্য ভারতে চিরকাল সংস্কৃতশিক্ষার্থীদিগকে সর্ব্বাগ্রে কয়েক বৎসর ধরিয়া ব্যাকরণ অধ্যয়ন করিয়া কণ্ঠস্থ করিতে হয়। মুগ্ধবোধ, পাণিনি, সংক্ষিপ্তসার, কলাপ প্রভৃতিব্যাকরণ পাঠ্য। এই সব ব্যাকরণ সহজে আয়ত্ব করিবার জন্য অনেকে সক্ষিপ্ত সারের “কড়চা” অভ্যাস করিয়া থাকেন।

    ব্যাকরণ শিক্ষার অনুপাতে সংস্কৃত শিক্ষার ব্যুৎপত্তি বিকাশ। সংস্কৃত ব্যাকরণে ব্যুৎপত্তি লাভ করিলে, সংস্কৃত শিক্ষা যেরূপ তলস্পর্শিনী হইয়া থাকে, অধুনা উপক্রমণিকা, কৌমুদী পড়িয়া সেরূপ হয় না। টোলে ব্যাকরণ শিক্ষার যে প্রথা প্রচলিত, প্রথমতঃ সংস্কৃত কলেজে সেই প্রথা প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল। পরে এ প্রথার কিরূপ পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছিল, পাঠক পরে তাহা বুঝিতে পরিবেন।

    ঈশ্বরচন্দ্র যখন ব্যাকরণ শ্রেণীতে ভর্ত্তি হন, তখন কুমারহট্টনিবাসী পণ্ডিতপ্রবর গঙ্গাধর তর্কবাগীশ মহাশয় ব্যাকরণের অধ্যাপক ছিলেন। সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠাকালে অধ্যাপক উইলসন্ সাহেব বঙ্গের কৃতবিদ্য বিচক্ষণ পণ্ডিতগণকে নির্ব্বাচিত করিয়া কলেজের অধ্যাপনাকার্য্যে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। নিম্নলিখিত অধ্যাপক নিম্নলিখিত বিষয়ে অধ্যাপনাকার্য্যে ব্রতী হইয়াছিলেন,— নিমচাঁদ শিরোমণি—দর্শন, শম্ভুচন্দ্র বাচপতি,—বেদান্ত; রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ,—স্মৃতি; ক্ষুদিরাম বিশারদ,—আয়ুর্ব্বেদ, নাথুরাম শাস্ত্রী,—অলঙ্কার; জয়গোপাল তর্কালঙ্কার,—সাহিত্য; গঙ্গাধর তর্কবাগীশ,—ব্যাকরণ; হরিপ্রসাদ তর্কালঙ্কার,—ঐ; হরনাথ তর্কভূষণ,—ঐ; যোগধ্যান মিশ্র,—জ্যোতিষ।

    ঈশ্বরচন্দ্র কলেজে ভর্তি হইলে পিতা ঠাকুরদাস প্রত্যহ নয়টার সময় ঈশ্বরচন্দ্রকে কলেজে দিয়া আসিতেন; আবার স্বয়ং অপরাহ্ন চারিটার সময় লইয়া যাইতেন। ছয় মাস কাল এইরূপ করিতে হইয়াছিল। তাহার পর ঈশ্বরচন্দ্র স্বয়ং কলেজে যাতায়াত করিতেন। ছয় মাস পরে ঈশ্বরচন্দ্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া পাঁচ টাকা বৃত্তি পান।

    ঈশ্বরচন্দ্র বাল্যকালে “বাঁটুল” ছিলেন। ছাতা মাথায় দিয়া যাইলে মনে হইত, যেন একটা ছাতা যাইতেছে। তাঁহার মাথাটা দেহের অনুপাতে একটু বড় ছিল। এই জন্য বালকেরা তাহাকে ‘যশুরে কৈ’ বলিয়া ক্ষেপাইত। বালক ঈশ্বরচন্দ্র সমবয়স্কদের বিদ্রুপোক্তিতে বড় বিরক্ত হইতেন। অনেক সময় তিনি রাগে রক্তমুখ হইয়া উঠিতেন; কিন্তু কথা কহিতে গিয়া আরও হাস্যম্পদ হইয়া পড়িতেন। তিনি তখন বড় ‘তোতলা’ ছিলেন। সেই জন্য সহজে সকল কথা উচ্চারিত হইত না এবং এক একটা কথা উচ্চারণ করিতে কাল-বিলম্ব হইত; সুতরাং তাঁহাতে সমবয়স্ক বালকেরা হাসির মাত্রা চড়াইয়া বিদ্রুপের মাত্রাও বাড়াইয়া দিত। ক্রমে ‘যশুরে কৈ’ নামটা ‘কশুরে যৈ’ শব্দে পরিণত হইয়াছিল। বালকেরা তখন কি বুঝিত,—এই মাথা-মোটা ‘যশুরে কৈ’ কালে কত বড় লোক হইবে? তাহারা কি তখন বুঝিত, মাথা অপেক্ষা বালক ঈশ্বরচন্দের হৃদয়টা কত বৃহৎ?

    বালক বিদ্যাসাগর কলেজে যাহা শিখিয়া আসিতেন, রাত্রিকালে প্রত্যন্ত পিতার নিকট তাঁহার আবৃত্তি করিতেন। তাঁহার জনক মহাশয় সংক্ষিপ্তসার ব্যাকরণ সম্পূর্ণ না হউক, তাহার অধিকাংশ যে জানিতেন, বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহা আত্ম-জীবনীর একাংশে স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। তিনি যে ব্যাকরণ পাঠ করিয়া আয়ত্ত করিতে পারিয়াছিলেন, তাঁহার নিদর্শনও পাইয়াছি। তাঁহার নিকটে যিনি ব্যাকরণ পড়িয়াছিলেন, তিনি রীতিমত ভট্টাচার্য্য হইয়া অধ্যাপকতা করিয়াছেন। প্রত্যহ পুত্রের আবৃত্তি শুনিয়া ব্যাকরণে ঠাকুরদাসের অভিজ্ঞতা বৰ্দ্ধিত হইয়াছিল। পুত্র কোন কথা বিস্মৃত হইলে পিতা তাহা স্মরণ করাইয়া দিতেন। পুত্র বুঝিতেন, তাহার পিতা ব্যাকরণে সবিশেষ ব্যুৎপন্ন। পুত্রের নিকট পিতার প্রকারান্তরে কৌশলে অনুশীলন এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল।

    পুত্রের বিদ্যানুরাগিতা-সম্বৰ্দ্ধনসম্বন্ধে পর-সেবা-নিরত হইয়াও পিতা এক মুহূর্ত্তের জন্য কোনরূপ ত্রুটি করিতেন না। কার্য্যস্থানের কঠোর পরিশ্রমেও তিনি ক্লান্তি বোধ করিতেন না। রাত্রি নয়টার পর বাসায় ফিরিয়া তিনি রন্ধনাদি করিতেন এবং পুত্রকে আহার করাইয়া আপনি আহার করিতেন। তাহার পর পিতা-পুত্রে একত্র শয়ন করিতেন। শেষ রীত্রিতে পিতা, পুত্রের পঠিত বিদ্যার পর্য্যালোচনায় ব্যাপৃত থাকিতেন। মধ্যে মধ্যে তিনি পর-মুখ-শ্রুত নিজের অভ্যস্ত নানাবিধ উদ্ভট শ্লোক পুত্রকে শিখাইতেন।

    ঠাকুরদাস কঠোর-শাসনের পক্ষপাতী ছিলেন। যে দিন তিনি দেখিতেন, ঈশ্বরচন্দ্র ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন, সে দিন তাঁহাকে নিদারুণ প্রহার করিতেন। এক দিন ঈশ্বরচন্দ্র পিতার নিকট চালাকাঠের মার খাইয়া কলেজের তদানীন্তন কেরাণী রামধন গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ীতে পলায়ন করিয়াছিলেন। রামধন বাবু তাঁহাকে অতি যত্নের সহিত বাড়ীতে রাখিয়া অহারাদি করান। পরে তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া বাসায় পৌঁছাইয়া দেন। সময়ে সময়ে পিতার নিকট মার খাইয়া, ঈশ্বরচন্দ্র এমনই আর্ত্তনাদ করিতেন যে, তাহাতে সিংহ-পরিবার উত্যক্ত হইয়া উঠতেন এবং ঠাকুরদাসকে বলিতেন,—“এরূপ প্রহারে হয় তো বালক কোন দিন মারা যাইবে; অতএব যদি এরূপ প্রহার কর, তাহা হইলে এখান হইতে তোমাকে স্থানান্তরে যাইতে হইবে।” ইহাতে প্রহারের মাত্রা কিছু কম হইত। ঈশ্বরচন্দ্রও অনেকটা সাবধান হইয়া চলিতেন। পাছে নিদ্রা আসে বলিয়া, তিনি আপনার চক্ষে সরিষা তেল দিতেন। তেলের জ্বালায় নিদ্রা পলায়ন করিত। বর্ত্তমান যশস্বী খ্যাতনাম কোন কোন ব্যক্তি ঘুম ভাঙ্গাইবার জন্য বাল্যকালে এইরূপ ও অন্যরূপ উপায় অবলম্বন করিতেন, ইহাও আমরা জানি। লেখকের কোন বন্ধু বাল্যকালে ঘুমাইবার পূর্ব্বে পায়ে দড়ি বাঁধিয়া রাখিতেন। দড়ির টানে নিদ্রা ভঙ্গ হইলে, তিনি পাঠাভ্যাসে রত হইতেন। ইনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চস্থান অধিকার করিয়াছিলেন এবং এক্ষণে এক জন অধিক বেতন-ভোগী উচ্চপদস্থ কর্ম্মচারী।

    বুদ্ধিমান্ ও প্রতিভাশালী বালকদিগের জন্য প্রচণ্ড প্রহার পীড়ন বা কঠোর দণ্ড-শাসনের প্রয়োজন হয় না; বরং এ ব্যবস্থায় অনেক সময় বিপরীত ফল ফলিয়া থাকে। যাহারা স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিহীন বা বিদ্যার্জ্জনে অমনোযোগী, তাহাদের তো কিছুতেই কিছু হয় না; পরন্তু এমনও দেখিয়াছি, কঠোর শাসন-পীড়নে অনেক স্বাভাবিক বুদ্ধিমান্ বালক বিভিন্ন মূর্ত্তি ধারণ করিয়াছে। আমাদের এক জন আত্মীয়ের একটা বুদ্ধিমান পুত্র ছিল। পিতা ভাবিতেন, নিয়ত কঠোর শাসনে রাখিতে পারিলে, পুত্রের বিদ্যাবুদ্ধির মাত্রা বাড়িবে। এই বিশ্বাসে পুত্রের সামান্য দোষ দেখিলেই পিতা পুত্রের প্রতি কঠোর প্রহার-পীড়নের ব্যবস্থা করিতেন। ফলে পুত্রের হৃদয়ে পিতৃশাসনের বিভীষিকা এতদূর ঘনীভূত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল যে, পুত্র পিতাকে দেখিলেই দূরে পলায়ন করিত। তখন বহু সাধ্য-সাধনায়ও তাহাকে সমীপবর্ত্তী করা দুঃসাধ্য হইত; সুতরাং যাহার জন্য শাসন, তাহাই ঘুচিয়া গেল। এইরূপ শাসনবিভীষিকার্য্য পুত্র্রের ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতি-পথ রুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল। প্রহার-পীড়ন-ফলে বুদ্ধিমান ঈশ্বরচন্দ্রের অবশ্য সেরূপ হয় নাই। স্বর্গীয় ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের জীবনেও এরূপ শাসন-পীড়নের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁহার পিতাও ঠাকুরদাসের ন্যায় কঠোর শাসনের পক্ষপাতী ছিলেন। আবার ইহাও দেখা যায়, এক জনের বুদ্ধিহীন পুত্র পিতার প্রহার পীড়নেও নির্ব্বুদ্ধিতার সীমা অতিক্রম করিতে না পারিয়া অধঃপাতে গিয়াছে; অপর বুদ্ধিমান্ পুত্র অক্ষত-পৃষ্ঠে জীবনের পথ উজ্জ্বল করিয়াছে। এ সব দৃষ্টান্তের আলেচনায় অদৃষ্টবাদিত্বের পক্ষপাতিত্ব আসিয়া পড়ে না কি?

    ব্যাকরণ শ্রেণীতে বালক ঈশ্বরচন্দ্র অন্য ছাত্র অপেক্ষা অধ্যাপকের প্রীতিপাত্র হইয়াছিলেন। অন্যান্য ছাত্রাপেক্ষা ব্যাকরণ বিদ্যায় তাঁহার অসম্ভাবিত ব্যুৎপত্তি দেখিয়া অধ্যাপক তাঁহার উপর বড় সস্তুষ্ট থাকিতেন। তিনি পাঠান্তে ঈশ্বরচন্দ্রকে আপনার নিকট বসাইয়া উদ্ভট শ্লোক শিখাইতেন। পিতা ও অধ্যাপকের নিকট ঈশ্বরচন্দ্র প্রায় চারি পাঁচ শত উদ্ভট শ্লোক শিখিয়াছিলেন।30

    ব্যাকরণ শ্রেণীতে পড়িয়া তিন বৎসরের মধ্যে তিনি দুই বৎসর প্রচুর পারিতোষিক পাইয়াছিলেন; এক বৎসর পান নাই। সেই বৎসর তিনি মনঃসংক্ষোভে ও অভিমানে সংস্কৃত কলেজ পরিত্যাগ করিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন; কিন্তু পিতা ও অধ্যাপকের অনুজ্ঞায় পারেন নাই। সে বৎসর যে তিনি পারিতোষিক পান নাই, তৎসম্বন্ধে কাহারও কাহারও মত এইরূপ,— “ঐ বৎসর প্রাইস্ সাহেব পরীক্ষক ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র যাহা উত্তর করিতেন, তাহা ভালরূপ বিবেচনাপূর্ব্বক করিতেন; সুতরাং উত্তর দিতে বিলম্ব হইত; কিন্তু প্রায়ই তাহা নির্ভুল হইত। যে বালক বিবেচনা না করিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়াছিল, তাহা ভাল হউক, আর মন্দই হউক, সাহেব তাহকে বুদ্ধিমান জানিয়া অধিক নম্বর দিয়াছিলেন।” সংস্কৃত ব্যাকরণের পরীক্ষায় সাহেব পরীক্ষক সম্বন্ধে এরূপ হওয়া অসম্ভব নহে। সাহেব কেন, কোন কোন টোলের ও কলেজের অধ্যাপকের এরূপ সংস্কার ছিল ও আছে, যে বালক দ্রুত উত্তর করিতে পারে, সে নির্ভুল বলিতেছে; সত্বর উত্তর করায় তাহারা ভুল ধরিতে পারেন না। পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয় দুই একবার ঐরূপ বালকদের দ্বারা প্রতারিত হইয়াছিলেন।

    এই সময় বালক ঈশ্বরচন্দ্রের “একগুঁয়েমী” ফুটিতে আরম্ভ হয়। এই “এক গুঁয়েমীর” দরুণ পিতা অনেক সময় উত্যক্ত হইতেন। পিতা বলিতেন,—“ফরসা কাপড় পরিয়া স্কুলে যাও।” ঈশ্বরচন্দ্র বলিতেন,—“ময়লা কাপড় পরিয়া যাইব।” যে দিন ঈশ্বরচন্দ্র স্নান করিব না মনে করিতেন, সে দিন তাঁহাকে স্নান করান বড়ই দুষ্কর হইত। পিতা তাঁহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়া গঙ্গার ঘাটে বলপুর্ব্বক স্নান করাইয়া দিতেন। অন্য কোন গুরু জন কোন কাজ করিতে বলিলে, ঈশ্বরচন্দ্র যদি মনে করিতেন করিব না, তাহা হইলে কেহই তাঁহাকে তাহা করাইতে পারিতেন না। গুণের মধ্যে এই ছিল, ঈশ্বরচন্দ্র কাহারও কথায় কোন উত্তর না দিয়া কেবল ঘাড় বাঁকাইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেন। এই জন্য পিতা ঠাকুরদাস তাঁহাকে অনেক সময় “ঘাড়কেঁদো” বলিয়া ডাকিতেন। বালক ঈশ্বরচন্দ্রের “একগুঁয়েমীর” কথায় বালক জনসনের “একগুঁয়েমীর” কথা মনে পড়িয়া যায়। বাল্য কালে এক জন ভৃত্য জনসন্‌কে প্রত্যহ স্কুল হইতে লইয়া আসিত। এক দিন ভৃত্যের যাইতে বিলম্ব হওয়ায় বালক জনসন্‌ আপনি স্কুল হইতে বাহির হন এবং পথে চলিয়া যান। স্কুলের কর্ত্রী জানিতে পারিয়া ভাবিলেন, বালক হয় পথ ভুলিয়া অন্যত্র গিয়া পড়িবে, না হয় অন্য কোনরূপ বিপদগ্রস্ত হইবে। এই ভাবিয়া তিনি জনসনের অনুবর্ত্তিনী হন। বালক জনসন্‌ দেখিলেন কর্ত্রী তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতেছেন। তাঁহার শক্তি সম্বন্ধে কর্ত্রী সন্দিহীন হইয়াছেন ভাবিয়া, বালক জনসন্‌ অভিমানে অভিভূত হইলেন এবং অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া উঠিলেন, এমন কি তখনই ফিরিয়া গিয়া কর্ত্রীকে যথাসাধ্য প্রহার করিলেন। জনসনের জীবনীলেখক বসওয়েল তাঁহারি এই “একগুঁয়েমীর” বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞতার দৃষ্টান্ত তুলিয়া বলিয়াছেন,—“জনসনের ভবিষ্যৎ জীবনে ইহার পরিচয় পাওয়া যায়।” বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে আমরাও এই কথা বলিতে পারি।

    ব্যাকরণ পাঠের সময় ১২৩৭ সালে বা ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র কলেজের ইংরেজি শ্রেণীতে প্রবেশ করিয়াছিলেন। ১২৩৩ সালে বা ১৮২৬ খৃষ্টাব্দে এই ইংরেজী শ্রেণী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ভবিষ্য বিশাল ইংরেজি-বৃক্ষের ইহাই বীজাঙ্কুর। ছাত্রের কাজের মতন যৎকিঞ্চিৎ ইংরেজি শিখিতে পারে, ইংরেজি শিখিয়া, ইংরেজি চিকিৎসা-গ্রন্থাদি কতক পরিমাণে সংস্কৃতে ও বাঙ্গালায় অনুবাদ করিতে পারে, এই উদ্দেশ্যে এই ইংরেজি শ্রেণী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। তৎকালে উলষ্টন সাহেব এই শ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন।31 ইহাতে পড়িতে কিন্তু অনেকের প্রবৃত্তি ছিল না। বহু ছাত্রের মধ্যে অল্পসংখ্যকই পড়িত। বিদ্যাসাগর ছয় মাস মাত্র এই শ্রেণীতে পড়িয়াছিলেন, সুতরাং ইংরেজিতে তিনি তাদৃশ জ্ঞান লাভ করেন নাই। তাহার জন্য ভবিষ্যৎ জীবনে অন্য চেষ্টা করিতে হইয়াছিল।

    এইবার বালকের অক্ষুণ্ণ শ্রমশীলতার পরিচয় লউন। ব্যাকরণ শ্রেণীতে তিনি তিন বৎসর ছয় মাস অধ্যয়ন করেন। তিন বৎসরে ব্যাকরণপীঠ সাঙ্গ করিয়া, বাকি ছয় মাস তিনি অমরকোষের মনুষ্যবৰ্গ ও ভটিকাব্যের পঞ্চম সর্গ পর্য্যন্ত পড়িয়াছিলেন। এ অল্প বয়সেও তিনি প্রায় সারা রাত্রি জাগিয়া পাঠাভ্যাস করিতেন। রাত্রি দশটার সময় আহারান্তে ঠাকুরদাস দুই ঘণ্টা জাগিয়া থাকিতেন। ঈশ্বরচন্দ্র তখন নিদ্রা যাইতেন। রাত্রি বারটার সময় পিতা তাঁহাকে তুলিয়া দিতেন। তার পর বালক সমস্ত রাত্রি পড়িতেন। এইরূপ গুরুতর পরিশ্রমে ঈশ্বরচন্দ্রকে মধ্যে মধ্যে পীড়া ভোগ করিতে হইত। এইরূপ অমানুষিক পরিশ্রম বিদ্যাসাগর যাবজ্জীবন করিয়াছিলেন। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র পাঠ্যাবস্থায় এইরূপ পরিশ্রম করিয়া থাকেন বটে; কিন্তু অনেকের ভবিষ্যৎ জীবনে তাঁহা দেখিতে পাওয়া যায় না। পরিশ্রমের কথা তো পরের কথা, দুই পয়সা, উপার্জ্জন করিতে শিখিলে, তাহারা বিলাস-মদ-লালসার সম্পূর্ণ পরবশ হইয় এক একটা “বাবুজী” হইয় পড়েন।

    নবম বর্ষ বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র কলেজে ভর্ত্তি হইয়াছিলেন। একাদশ বৎসর বয়সে তাঁহার উপনয়ন হয়।

    দ্বাদশ বৎসরে ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজের কাব্য শ্রেণীতে প্রবেশ করেন। সেই সময় পণ্ডিতবর জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সাহিত্যাধ্যাপক ছিলেন। মদনমোহন তর্কালঙ্কার ও মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ মহাশয় বালক বিদ্যাসাগরের সঙ্গে পাঠ করিতেন।32 বিদ্যাসাগর মহাশয় অন্যান্য ছাত্র অপেক্ষা অল্পবয়স্ক ছিলেন; কিন্তু তাঁহার অদ্ভুত ধী-শক্তির পরিচয় পাইয়া অধ্যাপকমণ্ডলী বিস্মিত হইতেন। প্রথম বৎসরে ঈশ্বরচন্দ্র রঘুবংশ, কুমারসম্ভব, রাঘব-পাণ্ডবীয় প্রভৃতি সাহিত্য-পরীক্ষায় সর্ব্বপ্রধান স্থান অধিকার করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় বৎসরে তিনি মাঘ, ভারবি, শকুন্তলা, মেঘদূত, উত্তরচরিত, বিক্রমোর্ব্বশী, মুদ্রারাক্ষস, কাদম্বরী, দশকুমারচরিত প্রভৃতি পাঠ করেন। এ সব কাব্য আদ্যোপান্ত তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল। অনুবাদে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। পুস্তক না দেখিয়া তিনি সংস্কৃত নাটকাদি অনর্গল বলিতে পারিতেন। দ্বাদশ বর্ষীয় বালক সংস্কৃত কথা কহিতে পারিতেন। প্রাকৃত ভাষায় কথা কহিতেও তাঁহার কোন সঙ্কোচ হইত না। তদানীন্তন পণ্ডিতগণ তাঁহার অদ্ভুত স্মৃতি-শক্তি ও অশ্রুত-পূর্ব বাক্যবিন্যাস-ক্ষমতা দেখিয়া মোহিত হইতেন এবং প্রায়ই বলিতেন,—“এ বালক পৃথিবীতে অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইবে।” প্রতিভা আর কাহাকে বলে?

    দ্বিতীয় বৎসর সাহিত্য-পরীক্ষায় ঈশ্বরচন্দ্র সর্ব্বপ্রথম হন। হস্তাক্ষরেরর জন্য তিনি প্রতি বৎসর পারিতোষিক পাইতেন। হস্তাক্ষরের প্রশংসা তাঁহার যাবজ্জীবন ছিল। সকল সাহিত্যসেবকের ভাগে এরূপ প্রশংসা ঘটিয়া উঠে না। আধুনিক উচ্চতম সাহিত্য-সেবক ও সাহিত্য-সমালোচকদিগের সংস্রবে থাকিয়া আমাদের কতকটা এই প্রতীতি জন্মিয়াছে। বিদ্যাসাগর মহাশয় অনেক সংস্কৃত পুঁথি স্বহস্তে লিখিয়া লইতেন। পুঁথির লেখা দেখিয়া সকলে তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিতেন। তিনি যে সকল পুঁথি স্বহস্তে লিখিয়া গিয়াছেন, তাহার পঙ্‌ক্তিগুলি দেখিলে মনে হয়, যেন কারপেটে উল বুনিয়া লেখা।

    এই সময় বালক বিদ্যাসাগর জীবন-সংগ্রামে কঠোরতার অভেদ্য ব্যুহ-বিবরে পতিত হন। সে কঠোরতা দরিদ্র হীনাবস্থাপন্ন বালকের অনুকরণীয়, শিক্ষণীয় এবং সর্ব্ব সাধারণের চিরস্মরণীয়। সেই সময় তাঁহার মধ্যম, ভ্রাতা দীনবন্ধু33 শিক্ষার্থ কলিকাতায় আগমন করেন। পাক-কার্য্যের ভার ঈশ্বরচন্দ্রের উপর পতিত হয়। কেবল কি তাই, প্রত্যহ প্রাতঃকালে স্নান করিয়া তিনি বাজারে যাইতেন এবং বাজার হইতে পিতার অবস্থানুসারে আলু, পটোল প্রভৃতি তরি-তরকারী ও মৎস্যাদি ক্রয় করিয়া লইয়া বাসায় ফিরিয়া আসিতেন। তারপর তিনি নিজেই ঝাল হলুদ শিলে বাটিয়া লইতেন। তখন পাথুরে কয়লার প্রচলন হয় নাই। তিনি স্বহস্তে কাঠ চালা করিতেন এবং উনুন ধরাইতেন। বাসায় চারিটী লোক খাইতেন। চারিজনের জন্য ভাত, ডাল মাছের ঝোল রাঁধিয়া তিনি সকলকে আহার করাইতেন এবং আহারান্তে সকলের উচ্ছিষ্ট মুক্ত করিয়া স্বয়ং বাসনাদি ধৌত করিতেন। হলুদ বাটিয়া, কাঠ চিরিয়া, বাসন মাজিয়া সত্য সত্য তাঁহার অঙ্গুলি ও নখ কতকটা খয়িয়া গিয়াছিল। তুমি আমি শুনিলে শিহরিয়া উঠি বটে; বালক ঈশ্বরচন্দ্র ইহাতে কিন্তু অপার আনন্দ ও পরম পরিতোষ লাভ করিতেন। অনেক অবস্থাহীন ব্যক্তি বাল্য কালে এইরূপ কঠোরতার সহিত সংগ্রাম করিয়া ভবিষ্যৎ জীবনে অতুল কীর্ত্তিমান ও যশস্বী হইয়া গিয়াছেন। ডক্তার গুডিব চক্রবর্ত্তীর সম্বন্ধে এইরূপ শুনা যায়। তাঁহাকে একজনের বাসায় রন্ধন করিতে হইত। রন্ধন করিতে করিতে তিনি পুস্তক লইয়া পাঠ করিতেন। তিনি ভবিষ্যৎ জীবনে একজন যশস্বী চিকিৎসক বলিয়া পরিচিত হন। বাল্যে বা যৌবনে কঠোরতার সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া ভবিষ্যৎ জীবনে কোন বিষয়ে কীর্ত্তিমান হইয়াছেন, এমন দৃষ্টান্ত অনেক পাওয়া যায়। দারিদ্র্যের কঠোরতায় ভবিষ্যৎ জীবনোন্নতির বীজ উপ্ত হয়। দারিদ্র্যের নির্ম্মমতায় অসাধারণ চরিত্র, শক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তি প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। কঠোরতার উত্তেজিকা শক্তি দরিদ্রের শিরায় শিরায় শোণিত-প্রবাহে যেন বিদ্যুৎ ছুটায় এবং দারিদ্র্যের আলিঙ্গনে প্রীতি ও প্রফুল্পতা, অধ্যবসায় ও আত্মসংযম সহজসিদ্ধ হইয়া থাকে। এই জন্য রিচার্ বলিয়াছেন,—“এস, দরিদ্র্য এস; তোমায় আলিঙ্গন করি; জীবনে যেন বিলম্ব করিয়া আসিও না।”

    স্পেনের কবি সারবেস্তিসের দারিদ্র্যের কথায় একজন বলিয়াছেন,—

    “ইঁহার দারিদ্র্যে পৃথিবী ধনশালিনী।” অর্থাৎ তাঁহার গ্রন্থে জগৎ উপকৃত।

    সত্যসত্যই তো বুদ্ধিজীবী শক্তিশালী ব্যক্তি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া যে শক্তি ও ক্ষমতা সঞ্চয় করেন, আত্মীয়-পরিজনপরিবৃত অতুল ধনের উপর অধিষ্ঠিত ব্যক্তি অনেক সময় তাহা পারে না। কার্লাইল সাধে কি বলিয়াছেন,—

    “যাহাকে দুঃখদারিদ্র্যের সহিত যুঝিতে হয় নাই; যিনি ঘরে বসিয়া সর্ব্ব সম্পদের প্রহরী বেষ্টিত হইয়া নিশ্চিন্তু থাকেন, তাঁহার অপেক্ষা যিনি দুঃখ দারিদ্রের কঠোর সমরে জয়ী হন, দেখিবে পরিণামে তিনিই বলবস্তুর শূর এবং অধিকতর কর্ম্মঠ বলিয়া সমাজে প্রতিপন্ন হইবেন।”34

    বালক বিদ্যাসাগর রন্ধনাদি করিয়া ভ্রাতা ও পিতাকে মনের আনন্দে আহার করাইতেন এবং সতত আত্মপ্রসাদে প্রফুল্প থাকিতেন। যাঁহাকে আমাদের কঠোর কষ্ট বলিয়া মনে হয়, তাহা তাঁহার মনোমদ স্নিগ্ধ সুখকর বলিয়াই মনে হইত। তিনি রন্ধনের ক্লেশকে ক্লেশ বলিয়া মনে করিতেন না; অধিকন্তু পাঠাভ্যাসে অবিরাম পরিশ্রম করিয়া ও কিছুমাত্র কষ্ট অনুভব করিতেন না। কষ্টের সীমা ছিল না। যে ঘরে তিনি রন্ধন করিতেন, সে ঘরটা অতি জঘন্য ছিল। একে তো ঘরটা বাড়ীর সর্ব্ব নিম্নতলে, তাহার উপর জানালার অভাবে ভয়ানক অন্ধকারময়। নিকটে দুইটা পাইখানা ছিল; সুতরাং ঘরটা সদাই দুর্গন্ধে পূর্ণ থাকিত। মলমূত্রের কীটসকল ‘কিলি-বিলি’ করিয়া ঘরের ভিতর ঢুকিত। ঈশ্বরচন্দ্র রন্ধন করিবার সময় ঘটাতে জল লইয়া বসিয়া থাকিতেন। পোকাগুলো ঘরের ভিতর ঢুকিলে তিনি জল দিয়া ধুইয়া দিতেন। এতদ্ব্যতীত ঘরময় প্রায় আরসুলা ঘুরিয়া বেড়াইত। সময়ে সময়ে ভাতে ব্যঞ্জনে আরসুলা উড়িয়া পড়িত। হঠাৎ কোন দিবস ঈশ্বরচন্দ্র অজ্ঞাতে ব্যঞ্জনের সঙ্গে একটা আরসুলা রাঁধিয়া ফেলিয়াছিলেন। প্রকাশ করিলে বা পাতের নিকট রাখিলে, ভ্রাতা বা পিতা ঘৃণাপ্রযুক্ত আর ভোজন করিবেন না, ইহা ভাবিয়া তিনি আরসুলাটী ব্যঞ্জন সহিত ভক্ষণ করেন।

    আহারের তো এই অবস্থা। শয়নের অবস্থা শুনিলে চমৎকৃত হইতে হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের মুখে তাঁহার শয়নব্যাপারের এইরূপ পরিচয় পাইয়াছি। নারায়ণ বাবু বলেন,—“এক দিন চন্দননগরের বাসা-বাড়ীতে আমি বলিলাম,—‘বাবা! এ ছোট ঘরে শুইতে আপনার কষ্ট হইবে না তো?’ বাবা বলিলেন,—‘বলিস্ কি রে! ছেলে বেলায় বড়বাজারের বাসায় আমি দেড় হাত চওড়া ও দু-হাত লম্বা একটী বারাণ্ডায় প্রত্যহ শয়ন করিতাম। বারাণ্ডার আলিসা আমার বালিস ছিল। আমি বারাণ্ডার মাপে একটা মাজুরী করিয়াছিলাম, সেই মাজুরীতেই শয়ন করিতাম। এক দিন রাত্রিকালে দেখিলাম, সেই মাজুরীরর উপর আমার একটা ভ্রাতা শুইয়া আছে। এ আমি তাহার নিকট গিয়া অনেক ডাকা-ডাকি করিলাম; সে কিন্তু কিছুতেই উঠিল না, তখন আমি তাহার নিজের বিছানায় শুইলাম। শুইবামাত্র আমার গায়ে বিষ্ঠা লাগিয়া গেল। আমি তখন আস্তে আস্তে উঠিয়া একটু মজা করিব বলিয়া যেখানে আমার সাধের বিছানায় ভাইটী শুইয়াছিল, সেইখানে গিয়া তাহাকে ডাকিয়া বলিলাম, উট্‌বি তো ওট্, না হলে তোর গায়ে বিষ্ঠা মাখাইয়া দিব। তখন সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল। তাহাকে উঠিতে দেখিয়া চলিয়া আসিলাম। সে রাত্রিতে আর নিদ্রা হয় নাই।” জগদ্‌দুর্লভ বাবুর বাড়ীর সন্মুখে তিলকচন্দ্র ঘোষ নামক এক ব্যক্তির বাড়ীর নিম্নতলে একটা ঘরে ঈশ্বরচন্দ্র শয়ন করিবার আদেশ পাইয়াছিলেন। তখন তাঁহার তৃতীয় ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র কলিকাতায় থাকিতেন। ভ্রাতা তাঁহার শয্যায় শয়ন করিতেন। বালক বিদ্যাসাগর পাঠাভ্যাস করিয়া অধিক রজনীতে শয়ন করিতেন। এক দিন ভ্রাতা বিছানায় মলত্যাগ করিয়া ফেলিয়াছিলেন। পাছে একথা বলিলে পেটের ব্যারাম হইয়াছে বলিয়া খাইতে না পান, সেই ভয়ে ভ্রাতা মলত্যাগের কথা প্রকাশ করেন নাই | ঈশ্বরচন্দ্র তো তাহা জানিতে পারেন নাই। তিনি প্রাতে উঠিয়া দেখেন, তাঁহার সর্ব্বাঙ্গে বিষ্ঠা। তখন তিনি বিষ্ঠা ধৌত করিয়া স্বহস্তে ভ্রাতার মলমূত্রাদি পরিষ্কার করিয়া দেন। বিদ্যাসাগরের যেমন পিতৃ-মাতৃ-ভক্তি ছিল, তেমনই ভ্রাতৃ-স্নেহ ছিল।

    বালক ঈশ্বরচন্দ্র যখন সাহিত্য-শ্রেণীতে পড়িতেন, তখন তাঁহার উপর এক বেলা রন্ধনের ভার ছিল। রাত্রিকালে পিতা নয়টার সময় বাসায় অসিয়া পাকাদি করিতেন। এত কষ্টে বিদ্যাসাগরের পাঠাভ্যাসে ক্রটি ছিল না। তিনি কলেজে যাইবার সময় পুস্তক খুলিয়া পড়িতে পড়িতে যাইতেন এবং কলেজ হইতে আসিবার সময়ও ঐরূপ করিতেন। চিরকাল তিনি বিলাসে বীতস্পৃহ ছিলেন। সঞ্চয়ে সমর্থ হইয়াও তিনি মোটা কাপড় ও মোটা চাদর ব্যবহার করিতেন। বাল্যেও তাঁহার তাহাই ছিল। জননী চরকায় সুতা কাটিয়া, বস্ত্র প্রস্তুত করিয়া, কলিকাতায় পাঠাইতেন। সেই মোটা কাপড় পরিয়া তিনি কলেজে যাইতেন। বিদ্যাভ্যাসে তাঁহার ক্রটির কথা শুনা যায় নাই। দৈবাৎ একটু ক্রটি হইলে পিতা ঠাকুরদাস ভয়ানক শাসন করিতেন। পুত্ত্রও পিতার শাসনকে বড় ভয় করিতেন। বাল্যাবস্থায় বিদ্যাসাগর সন্ধ্যার মন্ত্র ভুলিয়া গিয়াছিলেন। এ কথা পূর্ব্বে একবার উল্লেখ করিয়া আসিয়াছি। পিতা তাঁহাকে শাসন করেন। এই শাসনে তিনি সন্ধ্যার পুঁথি দেখিয়া সন্ধ্যা মুখস্থ করিয়াছিলেন।

    কাব্যে ও ব্যাকরণে ঈশ্বরচন্দ্রের অসাধারণ বুৎপত্তি অত্যদ্ভুত ব্যাপার। বীরসিংহ গ্রামে আদ্যশ্রাদ্ধাদি উপলক্ষে তিনি এত অল্পবয়সে অনেক সময় সংস্কৃত কবিতা রচনা করিয়া দিতেন। তাঁহার রচনা দেখিয়া তাৎকালিক প্রসিদ্ধ পণ্ডিতমণ্ডলী অবাক হইতেন। মিলটন ত্রয়োদশ বর্ষে কবিতা রচনা করিয়া তাৎকালিক বিলাতী পণ্ডিতবর্গকে মুগ্ধ করিয়াছিলেন।35 জীবিত, সর্ব্বত্র-প্রচারিত ও প্রচলিত ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখিবার চেষ্টামাত্রে যদি মিলটন্ প্রতিভাশালী বলিয়া অভিহিত হইতে পারেন, তাহা হইলে বালক বিদ্যাসাগর অধুনা সংকীর্ণপ্রচার সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিতজনমোহকর কবিতা রচনা করিয়া তদপেক্ষা অধিকতর প্রতিভাশালী বলিয়া কি পরিচিত হইতে পারেন না? সংস্কৃত ভাষা আজ যদি পুর্ব্ব প্রচলিত থাকিত, সংস্কৃত যদি হিন্দুসন্তানের সাধারণ শিক্ষণীয় ও পঠনীয় হইত, তাহা হইলে এই প্রতিভাশালী বাল-কবির মস্তিষ্ক হইতে ভবিষ্য জীবনে অপূর্ব্ব জ্যোতির্ম্ময়ী কবিতা নিঃসৃত হইয়া যে প্রতিভার পূর্ণ বিভায় দিগন্ত উদ্ভাসিত করিত না, তাহাই বা কে বলিতে পারে? বালক বিদ্যাসাগর শ্রাদ্ধ-সভায় সমাগত পণ্ডিতমণ্ডলীর সহিত সংস্কৃত ভাষায় ব্যাকরণের বিচার করিতেন। তাঁহার সংস্কৃত ভাষাভিজ্ঞতা ও কথনশক্তিশীলতার প্রতিপত্তি ক্রমে চারিদিকে প্রচারিত হইল। চারিদিকে ধন্য ধন্য রব উঠিল। লোকে বলিতে লাগিল,— “অদ্বিতীয় পণ্ডিত।”

  • দ্বিতীয় অধ্যায়

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    জন্ম, কোষ্ঠী-বিচার, পাঠশালার শিক্ষা, পাঠশালায় প্রতিভা, বাল্য-চাপল্য, বাল্য-প্রতিভা, কলিকাতায় আগমন, পীড়িত অবস্থায় প্রতিগমন, পুনরাগমন ও শিক্ষার ব্যবস্থা।

    ১২২৭ সালের ১২ই আশ্বিন বা ১৮২০ খৃষ্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দিবা দ্বিপ্রহরের সময় ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন।

    ঈশ্বরচন্দ্র যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন তাহার পিতা ঠাকুরদাস বাড়িতে ছিলেন না। তিনি কুমারগঞ্জের হাটে গিয়াছিলেন। কুমারগঞ্জ বীরসিংহ গ্রামের অৰ্দ্ধ ক্রোশ অন্তরে। হাট হইতে প্রত্যাগমন করিবার সময় তাঁহার সহিত পিতা রামজয়ের পথে সাক্ষাৎ হয়। রামজয় বলিলেন,—“ঠাকুরদাস, আজ আমাদের এঁড়েবাছুর হয়েছে।” রামজয় পৌত্র ঈশ্বরচন্দ্রকেই লক্ষ্য করিয়া রহস্যচ্ছলে এই কথা বলিয়াছিলেন। ইহার ভিতর কিন্তু সদ্যোজাত শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের প্রকৃত পুর্ব্বাভাস নিহিত ছিল। এঁড়ে গরু, যেমন “একগুঁয়ে,” শিশুও তেমনই “একগুঁয়ে” হইবে, দীৰ্ঘদর্শী প্রবীণ রামজয় বোধ হয় শিশুর ললাট লক্ষণ অথবা হস্তরেখাদি দর্শনে বুঝিয়াছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মও “বৃষ রাশিতে”। “বৃষ রাশিতে” জন্মগ্রহণ করিলে “একগুঁয়ে” অথবা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইতে হয়,—

    বৃষবৎ সন্মাৰ্গবৃত্তোঽতিতরাং প্রসন্নঃ সত্যপ্রতিজ্ঞোঽতিবিশালকীর্ত্তিঃ।

    প্রসন্নগাত্রোঽতিবিশালনেত্রো বৃষে স্থিত রাত্রিপতে প্রসূতঃ॥”

    —ভোজ।

    ঈশ্বরচন্দ্রের “একগুঁয়েমি”র পরিচয় তাঁহার জীবনে পরিলক্ষিত হইত। “একগুঁয়ে” লোক দ্বারা ভাল কাজ যেমন অতি ভালরূপে হয়, মন্দ কাজ তেমনই অতি মন্দরূপে হইয়া থাকে। “একগুঁয়েমি”র ফল দৃঢ়প্রতিজ্ঞতা। এই জন্য ষ্টীফেন জিরার্ড, “একগুঁয়ে” কেরাণীকেই নিজের অধীন কর্ম্মে নিযুক্ত করিতেন। ঈশ্বরচন্দ্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি যে কাজ ধরিতেন, সে কাজ না করিয়া ছাড়িতেন না। ভাল মন্দ উভয় কাজে ইহার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে।

    ঠাকুরদাস পিতার কথার প্রকৃত রহস্য বুঝিতে পারেন নাই। তিনি ভাবিইয়াছিলেন, তাঁহাদের বাড়ীতে একটা “এড়েঁ” বাছুর হইয়াছে। সেই সময়ে তাঁহাদের একটা গাভীও পূর্ণগর্ভ ছিল। পিতা-পুত্রে সত্বর বাড়ীতে ফিরিয়া আসিলেন। ঠাকুরদাস গোয়ালে গিয়া দেখিলেন, বাছুর হয় নাই। তখন পিতা রামজয় তাঁহার সুতিকাঘরে লইয়া গিয়া সদ্যোজাত শিশুটিকে দেখাইয়া বলিলেন,—“এই সেই “এড়েঁ”; এবং “এড়েঁ” বলিবার প্রকৃত রহস্যটুকু উদ্ঘাটন করিলেন।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তৃতীয় অনুজ ৺শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয় বলেন,—“তীর্থক্ষেত্র হইতে সমাগত পিতামহ রামজয় বন্দোপাধ্যায় নাড়ীচ্ছেদনের পূর্ব্বে আলতায় ভূমিষ্ঠ বালকের জিহ্বার নিম্নে কয়েকটি কথা লিখিয়া তাঁহার পত্নী দুর্গা দেবীকে বলেন,—লেখার নিমিত্ত শিশুটা কিয়ৎক্ষণ মাতৃদুগ্ধ পায় নাই। বিশেষতঃ কোমল জিহ্বায় আমার কঠোর হস্ত দেওয়ায় এই বালক কিছুদিন তোতলা হইবে। আর এই বালক ক্ষণজন্মা, অদ্বিতীয় পুরুষ ও পরম দয়ালু হইবে এবং ইহার কীর্ত্তি দিগন্তব্যাপিনী হইবে।” বিদ্যারত্ন মহাশয় বলেন,—“তিনি এই সব কথা ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা, মাতামহী ও পিতামহীর মুখে শুনিয়া ছিলেন।” বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বরচিত চরিতে কিন্তু এ কথার উল্লেখ করেন নাই; অধিকন্তু আমাদের বন্ধু বিশ্বকোষ নামক বিবিধ বিষয়ক পুস্তক-সঙ্কলয়িতা শ্রীযুক্ত রায়সাহেব নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের নিকট বিদ্যাসাগর মহাশয় এ কথার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। বন্ধু তাঁহার জীবনীর তত্ত্ব সংগ্রহ করিয়া “বিশ্বকোষে” মুদ্রিত করিবার জন্য তাঁহার নিকট গিয়াছিলেন। তৎকালে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভ্রাতা বিদ্যারত্ন মহাশয় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এ কথার উত্থাপন করিয়াছিলেন; কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন,—“ও সব কথা শুনিও না ও সব অমূলক।”32

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মগ্রহণ করিবার কিয়ৎক্ষপ পরে গ্রহবিপ্র কেনারাম আচার্য্য তাঁহার ঠিকুজি প্রস্তুত করেন। আচার্য্য মহাশয় ঠিকুজি প্রস্তুত করিবার কালে ফল বিচার করিয়া বিস্মিত হন। তিনি বালকের ভবিষ্যৎ জীবন শুভজনক বলিয়া নির্দ্দেশ করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোষ্ঠী গণনায় এইরূপ নির্দ্ধারিত হয়। কোষ্ঠীগণনায় ভবিষ্যৎ জীবনের পূর্ব্বাভাস পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোষ্ঠপর্য্যালোচনায় তাহা প্রতিপন্ন হয়। আমরা নিয়ে তৎপর্য্যালোচনায় প্রবৃত্ত হইলাম।

    শুভমস্ত—শকাব্দাঃ ১৭৪২। ৫। ১১। ১৫। ৪১

    ১৫
    ২০ ৪৩ ৩৪
    ৫২ ৫২
    ৪৭ ১২

    জাতাহঃ

    ১৭৪২ শকের ১২ই আশ্বিন ১৫ দণ্ড ৪১ পল সময়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্ম হয়। তৎকালে ধনুর্লগ্নের উদয় হইয়াছিল। ইঁহার জন্মলগ্নাবধি তৃতীয় স্থানে বৃহস্পতি, চতুর্থ স্থানে রাহু ও শনি, ষষ্ঠে চন্দ্র, অষ্টমে শুক্র, দশমে রবি, বুধ ও কেতু এবং একাদশ স্থানে মঙ্গল গ্রহ বিদ্যমান ছিল।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মকালীন রবি, বুধ, শনি, রাহু ও কেতু এই পাঁচটী গ্রহ কেন্দ্রস্থানে; বুধ স্বক্ষেত্রে এবং চন্দ্র ও বুধ গ্রহ তুঙ্গস্থানে ছিল। সামান্যরূপ বুধাদিত্য-যোগও ছিল।

    একাদি গ্রহ স্বক্ষেত্রে থাকিলে কি ফল?

    “কুলতুল্যঃ কুলশ্রেষ্ঠো বন্ধুমান্যো ধনী সুখী।

    ক্রমান্ন পসমো ভূপ একাদৌ স্বগৃহে স্থিতে॥”

    যাহার একটী গ্রহ স্বক্ষেত্রে থাকে, সেই ব্যক্তি কুলতুল্য হয়। দুইটী থাকিলে কুলশ্রেষ্ঠ, তিনটীতে বন্ধুমান্য, চারিটী হইলে ধনী, পাঁচটীতে সুখী, ছয়টীতে রাজতুল্য এবং সাতটী গ্রহই স্বক্ষেত্রে থাকিলে রাজা হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটী গ্রহ স্বক্ষেত্রে; এইজন্য তিনি কুলোচিত তেজস্বী ছিলেন। একাদিগ্রহ তুঙ্গগত হইলে কি ফল?

    “উৎকৃষ্টাঃ স্ত্রীসুখিনঃ প্রকৃষ্টকার্য্যা রাজপ্রতিরূপকাশ্চ।

    রাজান্ একদ্বিত্রিচতুর্ভির্জায়ন্তের্হতঃ পরং দিব্যাঃ॥”

    ইতি কুটস্থীয়ে। রঘুবংশ ৫সর্গ ১৩ শ্লোকে মল্লিনাথ।

    যাহার একটী গ্রহ তুঙ্গী থাকে, তিনি উৎকৃষ্ট লোক, দুইটী থাকিলে স্ত্রীসুখী, তিনটি থাকিলে উৎকৃষ্ট কার্য্যকারী, চারিটী থাকিলে রাজপ্রতিরূপ, পাঁচটা গ্রহ তুঙ্গী হইলে রাজা হয় এবং নরাকারে অবতীর্ণ-দেবতারই ছয়টী গ্রহ তুঙ্গী হয়। সাতটী গ্রহ একেবারে তুঙ্গী হয় না। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দুইটী গ্রহ তুঙ্গী।

    ধনবত্তাদিযোগ।

    “লগ্নাদতীব বসুমান্ বসুমান্ শশাঙ্কাৎ

    সৌম্যগ্রহৈকপচয়োপগতৈঃ সমস্তৈঃ।

    দ্বাভ্যাং সমোঽল্পবসুমাংশ্চ তদৃনতয়া

    মন্যেষু সৎস্বপি ফলেষ্বিদমুৎকটেন॥”

    দীপিকাযাম্॥

    জন্মকালে লগ্ন হইতে যদি সমস্ত শুভগ্রহ উপচয়গত অর্থাৎ তৃতীয়, ষষ্ঠ, দশম ও একাদশ স্থানগত হয়, তবে অত্যন্ত ধনবান্ হয়। ঐরূপ জন্মরাশি হইতেও যদি সমস্ত শুভগ্রহ উপচয়গত হয়, তবে ধনবান্ হয়। দুইটী গ্রহ যদি লগ্নের বা রাশির উপচয়গত হয়, তবে মধ্যমরূপ ধনবান্ হয় এবং তদপেক্ষা কম থাকিলে সামান্যরূপ ধনবান্ হয়। অন্যান্য ফলসকল অপেক্ষা ইহারই ফল অধিক হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোষ্ঠীতে লগ্ন হইতে বৃহস্পতি, চন্দ্র ও বুধ এবং জন্মরাশি হইতে শুক্র ও বুধ উপচয়গত।

    “বিনয়বিত্তাদীনামধমমধ্যমোত্তমাদ্বিনিরূপণম্।”

    দীপিকায়াং ৬৫ শ্লোকঃ

    “অধমসমবরিষ্ঠান্যর্ককেন্দ্রাদিসংস্থে

    শশিনি বিনয়-বিত্ত-জ্ঞান-ধী-নৈপুণ্যানি।

    অহনি নিশি চ চন্দ্রে স্বাধিমিত্রাংশকে বা

    সুরগুরু সিতদৃষ্টে বিত্তবান্ স্যাৎ সুখী চ॥”

    জন্মকালে চন্দ্র যদি রবির কেন্দ্র (স্বস্থান, চতুর্থ, সপ্তম, দশম) স্থানগত স্থায়, তবে নিয়ম, ধন, জ্ঞান, বুদ্ধি ও নিপুণতা অধমরূপ হয়। চন্দ্র, রবির পণকর (দ্বিতীয়, পঞ্চম, অষ্টম, একাদশ) স্থানে থাকিলে বিনয়াদি মধ্যম রূপ হয়। আর ঐ চন্দ্র যদি রবির আপোক্লিম (তৃতীয়, ষষ্ঠ, নবম, দ্বাদশ) স্থানগত হয়, তবে বিনয়াদি সমস্তই উত্তমরূপ হইয়া থাকে। অথবা চন্দ্র যদি স্বীয় অধিমিত্র গৃহে থাকিয়া বৃহস্পতি বা শুক্র কর্তৃক দৃষ্ট হয়, তবে ধনী ও সুখী হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোষ্ঠীতে চন্দ্র রবির আপোক্লিম-গত; অতএব উহার বিনয়াদি উৎকৃষ্টরূপ ছিল।

    তুঙ্গগত চন্দ্রের ফল।

    “স্থিরগতিং সুমতিং কমনীয়তাং কুশলতাং হি নৃণামুপভোগতাম্।

    বৃষগতো হিমগুর্ভৃশমাদিশেৎ সুকুতিতঃ কৃতিতশ্চ সুখানি চ॥”

    ঢুণ্টিরাজ।

    জন্মকালে চন্দ্র, বৃষরাশিগত হইলে, জাত মানবের স্থির গতি, সদ্‌বুদ্ধি, সৌন্দর্য্য, নৈপুণ্য, উপভোগ এবং স্বীয় পুণ্য ও কার্য্য হইতে সুখ হইয়া থাকে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মকালে বৃষ রাশিতে চন্দ্র ছিল।

    তুঙ্গগত বুধের ফল। ঢুণ্টিরাজীয়-জাতকভরণে—

    “সুবচনানুরতশ্চতুরো নরো লিখনকর্ম্মপরো হি বরোন্নতিঃ।

    শশিসুতে যুবতৌ চ গতে সুখী সুনয়নানয়নাঞ্চলচেষ্টিতৈঃ॥”

    জন্মকালে কন্যারাশিতে বুধ থাকিলে, জাত মানব সদ্‌বক্তা, চতুর, উত্তম লেখক, উন্নতিমান্ এবং সুন্দরী রমণীর নয়নাঞ্চলচেষ্টাদি দ্বারা সুখী হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মকালে কন্যারাশিতে বুধ আছে।

    “লগ্নাৎ কর্ম্মণি তুর্য্যে চ যদি স্যুঃ পাপখেটকাঃ।

    স্বধর্ম্মে নিতরাং তস্য জায়তে চঞ্চলা মতিঃ॥”

    জাতকালঙ্কারটীকাযাম।

    জন্মলগ্নের চতুর্থ ও দশম স্থানে পাপগ্রহ থাকিলে, মানবের স্বধর্ম্মে চঞ্চলা মতি হয়।

    “কমাতুরশ্চিত্তহরোঽঙ্গনানাং স্যাৎ সাধুমিত্রঃ সুতরাং পবিত্রঃ।

    প্রসন্নমূর্ত্তিশ্চ নরো বৃষস্থে শীতদ্যুতৌ ভূমিসুতেন দৃষ্টে॥”

    ঢুণ্টিরাজ।

    জন্মকালে বৃষরাশিস্থ চন্দ্রের উপর মঙ্গলের দৃষ্টি থাকিলে, জাত মনুষ্য কামাতুর, কামিনী-মনোরঞ্জন, সজ্জন-বন্ধু, অত্যন্ত পবিত্র এবং প্রসন্ন মূর্ত্তি হয়।

    “ব্যয়শে তদ্রিপ্‌ফগতে তত্র দৃষ্টি শুভৈর্গ্রহৈঃ।

    দানবীরো ভবেন্নিত্যং সাধুকর্ম্মসু মানবঃ॥”

    শম্ভুহোরাপ্রকাশ।

    যে ব্যক্তির জন্মকালে লগ্নের দ্বাদশ স্থানের অধিপতি গ্রহ, দ্বাদশের দ্বাদশগত হয়, আর ঐ দ্বাদশ স্থানে শুভগ্রহের দৃষ্টি থাকে, তবে সেই ব্যক্তি সৎকর্ম্মে দান-বীর অর্থাৎ অত্যন্ত দাতা হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের লগ্নের দ্বাদশাধিপতি মঙ্গল একাদশ স্থানে আছে এবং ঐ দ্বাদশ স্থানে বৃহস্পতি ও চন্দ্রের দৃষ্টি আছে। উত্তরকালে ইনি একজন প্রসিদ্ধ বদান্য হইয়াছিলেন।

    ইতি সংক্ষেপ।

    শুভগ্রহ সঙ্গে সঙ্গে। ভবিষ্যৎ জীবনের পূর্বাভাস জন্মগ্রহণে। ক্ষণজন্ম বিদ্যাসাগর মহাশয় জন্মগ্রহণ করিলেন; ধীরে ধীরে অলক্ষ্যে দরিদ্র ব্রাহ্মণ পিতা ঠাকুরদাসের কুটীরে একটু লক্ষ্মী-শ্রী দেখা দিল। পাড়ায় পাড়ায় রব উঠিল,—“বাড়ুয্যেদের বাড়ীতে পয়মন্ত ছেলে জন্মিয়াছে।” “পয়মন্তের” প্রতিপত্তি বিদ্যাসাগরের বাল্যকাল হইতে। বাল্যকাল হইতে তিনি প্রতিবাসীর প্রীতিপাত্র।

    পিতামহ রামজয় জাত পৌত্ত্রের নাম রাখিয়ছিলেন,— ঈশ্বর। পঞ্চম বৎসরে ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যারম্ভ হয়। তখন বীরসিংহ গ্রামের অবস্থা তাদৃশ উন্নত ছিল না। গ্রাম্য-পাঠশালায় বালকদিগের বিদ্যারম্ভ হইত। পাঠশালার শিক্ষা সাঙ্গ হইলে, উহারই মধ্যে অবস্থাপন্ন ব্রাহ্মণ-সন্তানের টোলে সংস্কৃত শিক্ষার সুত্রপাত করিতেন। টোলে বিদ্যার পর্য্যাবসান। কেহ কেহ বা জমিদারী সেরেস্তাবিদ্যা শিখিতেন।

    সে সময সনাতন সরকার গ্রামের গুরুমহাশয় ছিলেন। সরকার মহাশয় বড় প্রহারপটু ছিলেন বলিয়া ঠাকুরদাস পুত্ত্রের জন্য অন্য গুরুর অন্বেষণ করেন। কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামক এক কুলীন ব্রাহ্মণ তাঁহার মনোনীত হন। কালীকান্তের নিবাস বীরসিংহ গ্রাম। তিনি কিন্তু ভদ্রেশ্বরের নিকট গোরুটী গ্রামে শ্বশুর বাড়ীতে বাস করিতেন। কালীকান্ত স্বকৃত-ভঙ্গকুলীন। কৌলীন্য-কল্যাণে তাঁহার অনেকগুলি বিবাহ হইয়াছিল। ঠাকুরদাস তাঁহাকে আনাইয়া নিজগ্রামে একটী পাঠশালা করিয়া দেন। বালক বিদ্যাসাগর ও গ্রামের অন্যান্য বালকেরা তাঁহার পাঠশালায় পড়িত। তিনি যত্নসহকারে সকলকে শিক্ষা দিতেন। কালীকান্তের সৌজন্যে প্রতিবাসিমণ্ডলী তাঁহার প্রতি বড় অনুরক্ত ছিল।

    পাঠশালায় প্রতিভার পরিচয়। বালক ঈশ্বরচন্দ্র তিন বৎসরে পাঠশালার পাঠ সাঙ্গ করেন। এই সময় তাঁহার হস্তাক্ষর বড় সুন্দর হইয়াছিল। তখন সর্ব্বত্র হস্তাক্ষর সমাদৃত হইত। হস্তাক্ষর বিবাহের সর্ব্বোচ্চ সুপারিস। গুরু কালীকান্ত, বালক বিদ্যাসাগরের বুদ্ধিমত্তা ও ধৃতি-ক্ষমতা দেখিয়া প্রায় বলিতেন,—“এ বালক ভবিষ্যতে বড় লোক হইবে।” এই সময় বালক বিদ্যাসাগর প্লীহা ও উদরাময় পীড়ায় আক্রান্ত হন। এই জন্য তাঁহাকে জননীর মাতুলালয় পাতুলগ্রামে যাইতে হয়। তাঁহার মধ্যম ভ্রাতা দীনবন্ধু তাঁহাদের সঙ্গে ছিলেন। পাতুল গ্রামে ক্রমাগত ছয় মাস কাল চিকিৎসা হয়। খানাকুল-কৃষ্ণনগরের সন্নিহিত কোঠারা-গ্রামবাসী33 কবিরাজ রামলোচনের চিকিৎসাগুণে বালক বিদ্যাসাগর সে যাত্রা রক্ষা পান। পাতুলগ্রামে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিয়া, তিনি বীরসিংহ গ্রামে পুনরাগমন করেন। পুনরায় কালীকান্তের উপর তাঁহার শিক্ষাভার সমৰ্পিত হয়। কালীকান্ত ঈশ্বরচন্দ্রকে বড় ভাল বাসিতেন। প্রত্যহ সন্ধ্যার পর তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে পাঠশালার চলিত অঙ্কপ্রভৃতি শিক্ষা দিতেন। রাত্রিকালে তাঁহাকে কোলে করিয়া লইয়া বাড়ীতে রাখিয়া আসিতেন। এই কালীকান্তের প্রতি বিদ্যাসাগর মহাশয় চিরকাল ভক্তিমান্ ছিলেন।

    বিদ্যাসাগর বাল্যকালে বড় দুষ্ট ছিলেন। তাঁহার বালকসুলভ অনেক “দুষ্টুমি”রই পরিচয় পাওয়া যায়। অনেকেই তো বাল্যকালে দুষ্টু হইয়া থাকে; কিন্তু সকলের কথা তো আর স্মরণীয় হয় না; পরন্তু ইতিহাসের পৃষ্ঠায়ও স্থান পায় না। ভবিষ্যৎ জীবন যাঁহার উজ্জ্বলতম হয়, তাহার বাল্যজীবন জানিতে লোকের আগ্রহ হইয়া থাকে। তাঁহার বাল্য জীবনের “দুষ্টুমি”টুকু জানিতে কেমন যেন মিষ্ট লাগে। ভগবান মানবাকারে লীলাচ্ছলে কৃষ্ণরূপে গোপগোপীদের ঘরে প্রবেশ করিয়া দুগ্ধ হাঁড়ি ভাঙিতেন; শ্রীশ্রীমহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য বাল্যকালে গঙ্গাতীরে ব্রাহ্মণদের নৈবেদ্য কাড়িয়া খাইতেন; সেক্সপিয়র বাল্যকালে দুষ্টু ছেলেদের সঙ্গে ছুটিয়া হরিণ চুরি করিয়াছিলেন; কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের জ্বালায় তাহার জননী জ্বালাতন হইতেন। কোথায় কিছু নাই, একবার বালক ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ঘরের একখানা সেকেলে সাবেক ছবি দেখিয়া বড় ভাইকে বলিয়াছিলেন,—“দাদা। ছবিখানিতে ঘা-কতক চাবুক লাগাইয়া দাও তো”। বড় ভাই শুনেন নাই। তখন ওয়ার্ডসওয়ার্থ আপনি সপাসপ, চাবুক বসাইয়া দেন। বিলাতী পাদরী ডাক্তার পেলী বাল্যকালে বড় দুষ্টু ছিলেন। তখন তাঁহার জ্বালায় রাত্রিকালে পাড়ার লোক ঘুমাইতে পারিত না। এমন অনেক প্রতিষ্ঠাশালী প্রতিভাবান ব্যক্তির বাল্যজীবনের বাল্য স্বভাবোচিত “দুষ্টুমি”র কথা শুনা যায়। ছেলে দুষ্ট হইলে অনেকে অনেক সময় এই সব দৃষ্টান্তের স্মরণ করিয়া ভবিষ্যতের জন্য বুক বাঁধিয়া থাকেন। এক সময় এক ব্যক্তি একটি পুত্রকে সঙ্গে করিয়া লইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান। বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন,—“এ ছেলেটা ভবিষ্যতে বড় লোক হবে।” আগন্তুক বলিলেন,—“মহাশয়! এ বড় দুষ্ট।” বিদ্যাসাগর মহাশয় বলিলেন,—“দেখ ছেলেবেলায় আমি অমনই ছিলাম; পাড়ার লোকের বাগানের ফল পাড়িয়া চুপি চুপি খাইতাম; কেহ কাপড় শুখাইতে দিয়াছে, দেখিলে, তাহার উপর মলমূত্র ত্যাগ করিয়া আসিতাম; লোকে আমার জ্বালায় অস্থির হইত।”

    বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজ “বাল্য-দুষ্টুমির” কথা নিজে স্বীকার করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত তাঁহার আরও “দুষ্টুমি”র দুই একটা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। মথুর মণ্ডল নামে একজন প্রতিবেশী ছিল। মথুর মণ্ডলের জননী ও স্ত্রী, বালক বিদ্যাসাগরকে বড় ভালবাসিতেন। বালক বিদ্যাসাগর কিন্তু প্রায় প্রত্যহ পাঠশালায় যাইবার সময় মথুরের বাড়ীর দ্বারদেশে মলমূত্র ত্যাগ করিতেন। মথুরের মাতা ও স্ত্রী দুই হস্তে তাহা মুক্ত করিতেন। বধু কোন দিন বিরক্ত হইলে, শাশুড়ী বলিতেন,—“ইহাকে কিছু বলিও না। ইহার ঠাকুরদাদার মুখে শুনিয়াছি, এ ছেলে একজন বড় লোক হইবে।” এক দিন বালক বিদ্যাসাগরের গলায় ধানের “সুঙা” আট্‌কাইয়া গিয়াছিল। তাহাতে তিনি মৃতকল্প হন। পিতামহী অনেক কষ্টে সেই ‘সুঙা’ বাহির করিয়া দিলে তিনি রক্ষা পান। দুষ্ট বালক প্রত্যহ ধান্যক্ষেত্রের পাশ দিয়া যাইতে যাইতে ধানের শিষ তুলিয়া চিবাইয়া খাইত। এক দিন তাঁহার উক্তরূপ ফল ফলিয়াছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সেই বাৰ্দ্ধক্যের শান্ত দান্ত স্থির ধীর মূর্ত্তি দেখিলে কেহ মনে করিতে পারিত না যে, বাল্যে তিনি এত দুষ্ট ছিলেন। বস্তুতঃ প্রায় দেখিতে পাই, অনেকের বাল্যের দুষ্ট প্রকৃতি অধিক বয়সে পরিবর্ত্তিত হইয়া যায়।

    পাঠশালের বিদ্যা সাঙ্গ হইলে, কালীকান্ত, ঠাকুরদাসকে এক দিন বলেন,—“ইহার পাঠশালার লেখা-পড়া সাঙ্গ হইয়াছে; এ বালক বড় বৃদ্ধিমান; ইহাকে তুমি সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া কলিকাতায় রাখ, তথায় ভাল করিয়া ইংরেজী বিদ্যার শিক্ষা দাও।” কালীকান্তের কথা শুনিয়া ঠাকুরদাস বালক বিদ্যাসাগরকে কলিকাতায় আনাই স্থির করেন।

    এই সময় পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের দেহত্যাগ হয়। তাঁহার মুত্যু হইবার পর ১৮২৯ খৃষ্টাব্দে বা ১২৩৬ সালের কার্ত্তিক মাসের শেষ ভাগে ঠাকুরদাস, গুরুমহাশয় কালীকান্তের পরামর্শে ঈশ্বরচন্দ্রকে লইয়া কলিকাতা যাত্রা করেন। সঙ্গে কালীকান্তু ও আনন্দরাম গুটি নামক ভৃত্য ছিল। অষ্টম-বর্ষীয় বালক, গৃহ পরিত্যাগ করিয়া বিদেশে যাইতেছে দেখিয়া, বালক বিদ্যাসাগরের স্নেহময়ী জননী মুক্তকণ্ঠে রোদন করিয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর যেমন মাতৃভক্ত ছিলেন, তাঁহার জননীও তেমনই পুত্ত্রবৎসল ছিলেন।

    পিতা, পুত্র, গুরুমহাশয় এবং ভৃত্য,—চারি জনকেই পদব্রজে কলিকাতায় আসিতে হইয়াছিল। তখন জলপথ বড় সুগম ছিল না। উলুবেড়ের নূতন খালও তখন কাটা হয় নাই। গাঙের মাঝ দিয়া নৌকা করিয়া আসাটাও বড় বিপদ্-সঙ্কুল ছিল। একে তো ঝড়তুফানের ভয়, তাহার উপর দস্যু-ডাকাতের উপদ্রব; কাজেই গৃহস্থ লোক বড় কেই নৌকা করিয়া আসিত না। ব্যবসাদার মহাজনেরা নির্দিষ্ট দিনে জোট বাঁধিয়া যাতায়াত করিত মাত্র। এতদ্ভিন্ন অনেককেই হাঁটা পথে আসিতে হইত। যাতায়াতের সময় অনেকেই মধ্যে মধ্যে চটি বা আত্মীয়বর্গের বাটীতে আশ্রয় লইত। ঠাকুরদাসও সদল-বলে প্রথম দিন পাতুলগ্রামে মামা-শ্বশুরের বাটীতে বিশ্রাম করেন। পর দিন তিনি সন্ধ্যার সময় দশ ক্রোশ দূরস্থিত সন্ধিপুর গ্রামে এক জন আত্মীয় ব্রাহ্মণের বাটীতে থাকেন। পর দিন তাঁহার শেয়াখালা হইতে শালিখার বাঁধা রাস্তা দিয়া কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। ঈশ্বরচন্দ্র যে ধারকতাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিপ্রভাবে ভবিষ্যৎ জীবনে কীর্ত্তিকুশলতা লাভ করিয়াছিলেন, এই পথের মাঝে সেই সুকুমার কোমল বয়সেই তাহার নিদর্শন দেখাইয়াছিলেন। বিশাল বৃক্ষের অঙ্কুরোদ্ভব এইখানে হইল।

    এই পথের মাঝে “মাইল-ষ্টোন” অর্থাৎ পথের দূরত্ব জ্ঞাপক শিলাখণ্ড দেখিয়া বালক ঈশ্বরচন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন,—“বাবা, বাটনা বাটিবার শিলের মতন এটা কি গা?” পিতা ঠাকুরদাস ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন,—“ইহার নাম ‘মাইল-ষ্টোন”—আধক্রোশ অন্তর এইরূপ এক একটা ‘মাইলষ্টোন’ পোতা আছে। ইংরেজী অক্ষরে মাইলের অঙ্ক লেখা।” ঈশ্বরচন্দ্র “মাইলষ্টোন” দেখিয়া ১ হইতে ১০ পর্য্যন্ত ইংরেজি অক্ষর শিখিয়া লইলেন। মধ্যে এক স্থানের “মাইল-ষ্টোন” দেখান হয় নাই। ঈশ্বরচন্দ্র বলেন,—“আমরা একটা, মাইল-ষ্টোন দেখিতে ভুলিয়া গিয়াছি।” গুরুমহাশয় কালীকান্ত বলেন,—“ভুলি নাই, তুমি শিখিয়াছ কি না, জানিবার জন্য তোমাকে দেখাই নাই।”

    ক্রমে সন্ধ্যার সময় তাঁহারা শালিখার ঘাটে গঙ্গা পার হইয়া কলিকাতায় বড়বাজারের দয়েহাটায় শ্রীযুক্ত জগদ্‌দুর্লভ সিংহের বাটীতে উপস্থিত হন। এই জগদ্‌দুর্লভ সিংহের পিতা ভাগবতচরণ সিংহ ঠাকুরদাসকে বাড়ীতে আশ্রয় দিয়াছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের কলিকাতায় আসিবার পূর্ব্বে তাঁহার মৃত্যু হয়। জগদ্‌দুর্লভ বাবু পিতার ন্যায় ঠাকুরদাসকে ভক্তি-শ্রদ্ধা, এমন কি তাঁহাকে পিতৃসম্বোধনও করিতেন। জগদ্‌দুর্লভ একমাত্র বাড়ীর কর্ত্তা। বয়স তাঁহার তখন ২৫ পঁচিশ বৎসর মাত্র। গৃহিণী, জ্যেষ্ঠা, ভগিনী, তাঁহার স্বামী ও দুই পুত্ত্র, এক বিধবা কনিষ্ঠা ভগিনী ও তাঁহার এক পুত্ত্র,—এইমাত্র তাঁহার পরিবার।

    বালক ঈশ্বরচন্দ্র এই পরিবারের বড় প্রীতিপাত্র হইয়াছিলেন। পর দিন প্রাতঃকাল হইতেই এই প্রীতির সূত্রপাত হইয়াছিল। বালক নিজের অদ্ভুত ধারকতা-শক্তিবলে সিংহপরিবারের সকলকেই স্তম্ভিত করিয়াছিলেন। যে দিন সন্ধ্যার সময় বালক ঈশ্বরচন্দ্র কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হন, তাহার পর দিন পিতা ঠাকুরদাস, জগদ্‌দুর্লভ বাবুর কয়েকখানি ইংরেজী বিল ঠিক দিতেছিলেন। সেই সময় বালক ঈশ্বরচন্দ্র বলেন,—“বাবা, আমি ঠিক দিতে পারি।” কেবল বলা নহে; সত্য সত্যই বালক কযেকখানি বিল ঠিক দিয়াছিলেন। একটীও ভুল হয় নাই। উপস্থিত ব্যক্তিগণ চমৎকৃত হইলেন। গুরু কালীকান্ত পুলকিতচিত্তে ও প্রফুল্লবদনে ঈশ্বরচন্দ্রের মুখচুম্বন করিয়া বলিয়া উঠেন,–“বাবা ঈশ্বর, তুমি চিরজীবী হও। তোমায় যে আমি অন্তরের সহিত ভালবাসিতাম, আজ তাহা সার্থক হইল।”

    মানব-জীবনের ইতিহাস পর্য্যালোচনা করিলে ইহা বড় বিস্ময়ের বিষয় বলিয়া মনে হয় না। অসীম প্রতিভাসম্পন্ন বা অপরিমেয় বিদ্যাবুদ্ধিশালী বহুসংখ্যক ব্যক্তির বাল্যকালে ভবিষ্যৎ জীবনের পূর্বাভাসের পরিচয় এইরূপ পাওয়া যায়। ভবিষ্যৎ জীবনে যাঁহার যে শক্তিপুষ্টির প্রতিপত্তি, বাল্যজীবনে তাঁহার সেই শক্তির অঙ্কুরোৎপত্তি। এই জন্য মিণ্টন্‌ বলিয়াছেন,—

    “The childhood shows the man as morning shows the day.”

    প্রাতঃকাল-দৃষ্টে যেমন দিবার বিষয় বুঝা যায়, মানবের বাল্যকাল দৃষ্টে তাঁহার উত্তর কাল তেমনই বোধগম্য হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলিয়াছেন,—

    “Child is the father of man.”

    কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত যখন সাত-আট বৎসরের সময় কলিকাতায় আসেন, তখন এক জন তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন,—“ঈশ্বর, কলিকাতায় কেমন আছ?” ভবিষ্যতের কবি উত্তর দিলেন,—

    “রেতে মশা, দিনে মাছি।

    এই নিয়ে কলকাতায় আছি।”

    বঙ্কিমচন্দ্র এক দিনে “ক, খ” শিখিয়াছিলেন।

    জন্‌সনের অন্যান্য গুণের মধ্যে ধারকতা-শক্তির প্রতিষ্ঠা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক ছিল। যে সময়ে বালক জন্‌সন সবেমাত্র লেখা পড়া শিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, সেই সময়ে এক দিন তাঁহার মাতা তাঁহাকে একখানি প্রার্থনা-পুস্তক মুখস্থ করিতে দেন। মুখস্থ করিতে বলিয়া মাতা উপরে উঠিযা যান। পুত্র পশ্চাৎ পশ্চাৎ গিয়া বলেন,—“মা, মুখস্থ করিয়াছি।” সত্য সত্যই বালক অনায়াসে সমস্ত মুখস্ত বলিয়া গিয়াছিলেন। তিনি দুই বার মাত্র পুস্তকখানি পড়িয়াছিলেন।

    পোপ ১২ বার বৎসর বয়সে কবিতা লিখিয়াছিলেন।36 বাল্যকালে তিনি কবিতা লিখিতেন। তাঁহার পিতার কিন্তু তাহা অভিপ্রেত ছিল না। এই জন্য পিতা তাঁহাকে কবিতা লিখিতে নিষেধ করেন; পোপ কিন্তু তাহা শুনিতেন না। এক দিন তাঁহার পিতা এই জন্য তাঁহাকে প্রহার করেন। প্রহারের পরও বালক কবিতায় বলিয়া ফেলিল,—

    “Papa pao pity take,

    I will no more verses make.”

    মিল্টন্ বাল্যকালে যে পদ্য লিখিয়াছিলেন, তাহা দেখিয়া তাৎকালিক প্রসিদ্ধ লেখকবর্গ বিস্মিত ও লজ্জিত হইয়াছিলেন।

    বিখ্যাত বিলাতী কারিকর (Mechanic) স্মিটন্‌ ছয় বৎসর বয়সে কলের ছাঁচ প্রস্তুত করিয়াছিলেন।

    এরূপ দৃষ্টান্ত অনেক আছে। এ সব অমানুষিকী শক্তিরই পরিচয়। ইহা লইয়া ভাবিতে ভাবিতে কত মহা মহা চিন্তাশীল দার্শনিক ইহ-জগতের সুখৈশ্বর্য্য ভোগবিলাস পরিত্যাগ করিয়া চিন্তার অনন্ত সমুদ্রে ডুবিয়া গিয়াছেন। আমরা ক্ষুদ্র জীব, তাঁহার কি মীমাংসা করিব? তবে যখনই দেখি, তখনই বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া থাকি এবং ভাবিয়া অকূল সমুদ্রে নিমগ্ন হই। সে বিচার-বিতর্কের শক্তি নাই এবং তাহার প্রবৃত্তিও নাই। সবই প্রারব্ধ কর্ম্মের ফল বলিয়া বুঝি এবং তাহা বুঝিয়াই নিশ্চিন্ত হই। আমরা শাস্ত্রবিশ্বাসী শাস্ত্রের কথা মানি। শাস্ত্রের কথা শুনিতে পাই,—বাল্যপ্রতিভা পূর্ব্ব জীবনের সাধনার ফল। ধ্রুব-প্রহ্লাদ পূর্ব্ব জন্মের সাধনার ফলে বাল্যে ভগবদ্ভক্ত হইয়াছিলেন।37

    বালক বিদ্যাসাগরের বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় পাইয়া উপস্থিত সকলেই বিস্মিত হইয়াছিলেন। সকলেরই সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ,— ঈশ্বরচন্দ্রকে কোন একটা ভাল স্কুলে ভর্ত্তি করিয়া দেওয়া হয়। পুত্রের প্রশংসাবাদে পিতা ঠাকুরদাস পুলকিত হইয়া বলেন,— “আমি ঈশ্বরচন্দ্রকে হিন্দু স্কুলে পড়াইব।” উপস্থিত সকলেই বলিলেন,—“আপনি দশ টাকা মাত্র বেতন পান, আপনি পাঁচ টাকা বেতন দিয়া কিরূপে হিন্দু স্কুলে পড়াইবেন?”

    ঠাকুরদাস বলিলেন,—“পাঁচ টাকায় যেরূপে হউক, সংসার চালাইব।” ঠাকুরদাসের হৃদয় তখন উচ্চাকাঙক্ষার প্রজ্বলিত অনল-শিখায় উদ্দীপিত। বালকের প্রতিভা-কথা স্মরণ করিয়া, ব্রাহ্মণ আপনার দারিদ্র্য-দুঃখ বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিলেন। দরিদ্র-ব্রাহ্মণ পূর্ণানন্দে পূর্ণভাবে নিমগ্ন। ঠাকুরদাস পুত্র ঈশ্বরচন্দ্রকে হিন্দু স্কুলে পড়াইবেন বলিয়া স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন; কিন্তু তিন মাস কাল তাহা আর ঘটিয়া উঠে নাই। এই তিন মাস কাল ঈশ্বরচন্দ্র নিকটবর্ত্তী একটী পাঠশালায় যাইতেন। এই পাঠশালার গুরুমহাশয় সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বরচিত চরিতে লিখিয়াছেন—“পাঠশালার শিক্ষক স্বরূপচন্দ্র দাস, বীরসিংহের শিক্ষক কালীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় অপেক্ষা শিক্ষাদান বিষয়ে বোধ হয় অধিকতর নিপুণ ছিলেন।” দুর্ভাগ্যেরর বিষয়, আজ কাল বাঙ্গালা শিক্ষার এরূপ সুনিপুণ গুরুমহাশয় দুর্লভ। এ দুলর্ভতার হেতু লোকের প্রকৃতি-প্রবৃত্তির পরিবর্ত্তন। এখন পাঠশালাও আছে, গুরুমহাশয়ও আছে; নাই সেই তলস্পর্শিনী শিক্ষা; আর নাই সেই সুদক্ষ শিক্ষক; এখনকার পাঠশালা ইংরেজিরই রূপান্তর; গুরু অন্যরূপ হইবে কিসে?

    “কর্ত্তব্যোমহদাশ্রয়ঃ, মহাজনের এই মহাবাণী অবশ্যপালনীয়। এ বাণীর সাক্ষাৎ ফল প্রত্যক্ষীভূত হইয়াছিল, ঈশ্বরচন্দ্রের বাল্য জীবনে। জগদ্‌দুর্লভ সিংহ কেবল যে পিতাপুত্রকে আশ্রয় মাত্র দিয়াছিলেন, তাহা নহে; তাঁহার পরিবাববর্গ ও তিনি স্বয়ং তাঁহাদিগকে যথেষ্ট সমাদর করিতেন। জগদ্‌দুৰ্লভ বাবুর কনিষ্ঠা ভগিনী রাইমণি, বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে পুত্রপেক্ষা ভালবাসিতেন। এই রমণী সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং বলিয়াছেন,—“স্নেহ, দয়া, সৌজন্য, অমায়িকতা, সদ্বিবেচনাপ্রভৃতি সদ্‌গুণ বিষয়ে, রাইমণির সমকক্ষ স্ত্রীলোক এ পর্য্যন্ত আমার নয়ন-গোচর হয় নাই। এই দয়াময়ীর সৌম্য মূর্ত্তি, আমার হৃদয়মন্দিরে দেবীমূর্ত্তির ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হইয়া বিরাজমান্ রহিয়াছে।” প্রসঙ্গক্রমে তাঁহার কথা উত্থাপিত হইলে, তদীয় অকৃত্রিম গুণের কীর্ত্তন করিতে করিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় অশ্রুপাত না করিয়া থাকিতে পারিতেন না।

    বাস্তবিক রাইমণির সেই অকৃত্রিম যত্ন-স্নেহ ব্যতিরেকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কলিকাতায় থাকা দায় হইত। তিনি স্নেহময়ী মাতা ও পিতামহীর কথা ভাবিয়া প্রথম প্রথম বড় ব্যাকুল হইতেন। পিতা সর্ব্বক্ষণ তাঁহার নিকট থাকিতে পারিতেন না। তিনি প্রাতে একপ্রহরের সময় কর্ম্মস্থানে যাইতেন এবং রাত্রি এক প্রহরের সময় বাসায় ফিরিয়া আসিতেন। এই সময় রাইমণি এবং জগদ্‌দুর্লভ বাবুর অন্যান্য পরিবার নানা মিষ্ট কথায় ঈশ্বরচন্দ্রকে ভুলাইয়া রাখিতেন এবং নানাবিধ আহারীয় ও অন্যান্য মন-ভুলান জিনিষপত্র দিয়া অনেকটা সান্ত্বনা করিতেন। এইরূপ অনেক দীনহীন বালক মহদাশ্রয়ে প্রীতিস্নেহে প্রতিপালিত হইয়া পরিণামে কীর্ত্তিমান হইয়া গিয়াছেন। কলিকাতার কোটিপতি রামদুলাল সরকার বাল্যকালে যদি হাটখোলার সেই সদাশয় দত্ত-পরিবারে প্রতিপালিত না হইতেন, তাহা হইলে কে বলিতে পারে, তিনি ভবিষ্যৎ-জীবনে অতুল ধনের অধিকারী হইয়া অক্ষয় কীর্ত্তি-সঞ্চয়ে সমর্থ হইতেন? রামদুলালের বাল্য-দরিদ্রতা এবং দত্ত-পরিবারের তৎপ্রতি সদাশয়তার কথা স্মরণ হইলে বাস্তবিকই মনে এক অচিন্তনীয় ভাবের উদয় হয়। বিলাতের বিখ্যাত গ্রন্থকার জনাথন্ সুইফট্ যদি বাল্যকালে স্যার্ উইলিয়ম্ হামিল্টনের আশ্রয় না লইতেন এবং জার্ম্মাণ পণ্ডিত হিম্‌ ধর্ম্মপিতার সাহায্য না পাইতেন, তাহা হইলে এ জগতে তাহারা ফুটিতেন কি না সন্দেহ।

    বালক বিদ্যাসাগর অগ্রহায়ণ মাসে কলিকাতায় আসিয়াছিলেন; কিন্তু ফাল্গুন মাসের প্রারম্ভে রক্তাতিসার রোগে আক্রান্ত হন। ক্রমে পীড়া এত দূর উৎকট হইয়া পড়ে যে, মল-মূত্রত্যাগে তিনি সর্ব্বদা সাবধান হইতে পারিতেন না। তাঁহার পিতাকে অনেক সময় স্বহস্তে মলমূত্র পরিষ্কার করিতে হইত। ঐ পল্লীর দুর্গাদাস কবিরাজ তাঁহার চিকিৎসা করেন; কিন্তু রোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিল। বীরসিংহ গ্রামে সংবাদ যায়। পিতামহী সংবাদ পাইয়া কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হন। তিনি কলিকাতায় দুই দিন থাকিয়া ঈশ্বরচন্দ্রকে বাড়ী লইয়া যান। তথায় সাত আট দিনের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় ঈশ্বরচন্দ্র সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিয়াছিলেন।

    বৈশাখ মাস পর্য্যন্ত ঈশ্বরচন্দ্র বাড়ীতে ছিলেন। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রারম্ভে পিতা ঠাকুরদাস তাঁহাকে পুনরায় কলিকাতায় আনয়নার্থ বীরসিংহ গ্রামে গমন করেন। এবারও পদব্রজে আসা স্থির হয়। পূর্ব্ব বারে সঙ্গে ভৃত্য ছিল। ভৃত্য মধ্যে মধ্যে বালককে কাঁধে করিয়া আনিয়াছিল। এবার পিতা জিজ্ঞাসিলেন,—“কেমন ঈশ্বর! তুমি চলিয়া যাইতে পরিবে, না আনন্দরামকে সঙ্গে করিয়া লইব?” বালক বাহাদুরী করিয়া বলিল,—“না, আমি চলিয়া যাইতে পারিব।” বিদ্যাসাগরের বাহাদুরীর পরিচয় বাল্য কাল হইতে।

    এবার পিতাপুত্রে চলিয়া আসিয়া প্রথম দিন পাতুলগ্রামে আশ্রয় লন। পাতুলগ্রাম বীরসিংহ হইতে ছয় ক্রোশ দূর। ঈশ্বরচন্দ্রের এ দিন চলিতে কষ্ট হয় নাই। তারকেশ্বরের নিকট রামনগর গ্রামে ঠাকুরদাসের কনিষ্ঠা ভগিনী অন্নপূর্ণাকে দেখিতে যাইবার প্রয়োজন হয়। তিনি তখন পীড়িতা ছিলেন। রামনগর পাতুলগ্রাম হইতে ছয় ক্রোশ দূরবর্তী। পিতাপুত্রে দুই জনে প্রাতঃকালে রামনগর অভিমুখে যাত্রা করেন। তিন ক্রোশ পথ গিয়া, ঈশ্বরচন্দ্র আর চলিতে পারেন নাই। পা টাটাইয়া ফুলিয়া যায়। পিতা বড়ই বিপদগ্রস্ত হন। তখন বেলা দুই প্রহরের অধিক। ঈশ্বরচন্দ্র তখন এক রকম চলচ্ছক্তিলীন। পিতা বলিলেন—“বাবা! একটু চল, আগে মাঠে ফুট তরমুজ খাওয়াইব।” ঈশ্বরচন্দ্র অতি কষ্টে প্রাণপণে হাঁটিয়া অগ্রসর হইয়াছিলেন। সেই মাঠের কাছে গিয়া ফুটতরমুজ খাইলেন। পেটু ঠাণ্ডা হইয়াছিল বটে; পা কিন্তু আর উঠে নাই। পিতা রাগ করিয়া পুত্রকে ফেলিয়া কিয়দ্দূর চলিয়া যান; কিন্তু আবার ফিরিয়া আসিয়া রোরুদ্যমান পুত্রকে কঁধে করিয়া লন। দুর্ব্বলদেহ পিতা। অষ্টম বর্ষের বলবান বালককে কত দূর কাঁধে করিয়া লইয়া যাইবেন? খানিক দূর গিয়া আবার তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে কাঁধ হইতে নামাইয়া দেন; বিরক্ত হইয়া দুই একটা চপেটাঘাত করেন। ঈশ্বরচন্দ্রের উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন ভিন্ন আর কি উপায় ছিল? এখন একেবারে চলচ্ছক্তি-হীন। পিতা আবার পুত্রকে কাঁধে করিলেন, এইরূপ একবার কাঁধে করিয়া, একবাব নামাইয়া একটু একটু বিশ্রামান্তর চলিয়াছিলেন। এইরূপ অবস্থায় তাঁহারা সন্ধ্যার পূর্ব্বে রামনগরে উপস্থিত হন। পর দিন তাঁহারা শ্রীরামপুরে থাকিয়া, তৎপর দিবস কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

    এই বার আবার বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি করিবার কথা। পিতা ঠাকুরদাস ঈশ্বরচন্দ্রকে সংস্কৃত শিখাইবাব মানস করেন। তাঁহার ইচ্ছা, বিদ্যাসাগর সংস্কৃত শিখিলে দেশে তিনি টোল করিয়া দিবেন। এই সময়ে মধুসূদন বাচস্পতি সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করিতেন। তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মাতৃ-মাতুল রাধামোহন বিদ্যাভূষণের পিতৃব্যপুত্র। মধুসূদন বাচস্পতি ঠাকুরদাসকে পরামর্শ দেন – “আপনি ঈশ্বরকে সংস্কৃত কলেজে পড়িতে দেন, তাহা হইলে আপনকার অভিপ্রেত সংস্কৃত শিক্ষা সম্পন্ন হইবে; আর যদি চাকুরী করা অভিপ্রেত হয়, তাহারও বিলক্ষণ সুবিধা আছে; সংস্কৃত কলেজে পড়িয়া যাহারা ল’ কমিটার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাহারা আদালতে জজপণ্ডিতের পদে নিযুক্ত হইতে পারে। অতএব আমার বিবেচনায় ঈশ্বরকে সংস্কৃত কলেজে পড়িতে দেওয়া উচিত। চতুষ্পাঠী অপেক্ষা কলেজে রীতিমত সংস্কৃত শিক্ষা হইয়া থাকে।”

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আত্ম-জীবনীতে এই সকল কথা আছে, অধিকন্তু তিনি লিখিয়া গিয়াছেন,—“বাচস্পতি মহাশয় এই বিষয় বিলক্ষণরূপে পিতৃদেবের হৃদয়ঙ্গম করিয়া দিলেন। অনেক বিবেচনার পর বাচস্পতি মহাশয়ের ব্যবস্থা অবলম্বনীয় স্থির হইল।”

    এই সময় ঠাকুরদাস সংস্কৃত কলেজের ব্যাকরণাধ্যাপক পণ্ডিত গঙ্গাধর তর্কবাগীশের সহিতও এ সম্বন্ধে পরামর্শ করিয়াছিলেন। শেষে সংস্কৃত কলেজে দেওয়াই স্থির হয়।

  • প্রথম অধ্যায়

    প্রথম অধ্যায়

    জন্মস্থান, পুর্ব্ব-বংশ, পিতৃ-পরিচয়, মাতৃ-পরিচয়, পিতামহমাহাত্ম্য, মাতৃব্যাধি ও গর্ভ-লক্ষণে জ্যোতিষী।

    মেদিনীপুর জেলার অন্তর্বর্ত্তী বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মস্থান। পূর্ব্বে ইহা হুগলী জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ভূতপূর্ব্ব বঙ্গেশ্বর স্যার জর্জ কাম্বেলের সময় ইহা মেদিনীপুরের অন্তর্ভূক্ত হয়। সার জর্জ কাম্বেলের শাসন-কাল,—১৮৭১–১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরসিংহ গ্রাম কলিকাতা হইতে ২৬ ক্রোশ দূরবর্তী। কলিকাতা হইতে জলপথে বীরসিংহ গ্রামে যাইতে হইলে গঙ্গা, রূপনারায়ণ নদীপ্রভূতি বহিয়া গিয়া ঘাটালে উপস্থিত হইতে হয়। ঘাটাল হইতে বীরসিংহ গ্রাম আড়াই ক্রোশ।37

    বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মস্থান বটে; কিন্তু তাঁহার পিতৃপিতামহ বা তৎপূর্ব্ব-পুরুষদিগের জন্মস্থান নহে। তাঁহাদের জন্মস্থান হুগলী জেলার অন্তর্গত বনমালিপুর গ্রাম। এই গ্রাম তারকেশ্বরের পশ্চিমে ও জাহানাবাদ মহকুমার পুর্ব্বে চারি ক্রোশ দূরে অবস্থিত। এখন ইঁহাদের কিঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। ইঁহাদের অবস্থা-তুলনায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনীর গুরুত্ব সবিশেষরূপে উপলব্ধি হইবে। এতৎসম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং যাহা লিখিয়াছেন, তাহা উদ্ধৃত হইল।

    “প্রপিতামহ-দেব ভুবনেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের পাঁচ সন্তান। জ্যেষ্ঠ নৃসিংহরাম, মধ্যম গঙ্গাধর, তৃতীয় রামজয়, চতুর্থ পঞ্চানন, পঞ্চম রামচরণ। তৃতীয় রামজয় তর্কভূষণ আমার পিতামহ। বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের দেহত্যাগের পর, জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম, সংসারে কর্ত্তৃত্ব করিতে লাগিলেন। সামান্য বিষয় উপলক্ষে, তাঁহাদের সহিত রামজয় তর্কভূষণের কথান্তর উপস্থিত হইয়া, ক্রমে বিলক্ষণ মনান্তর ঘটিয়া উঠিল। * * * তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া এক কালে, দেশত্যাগী হইলেন।

    “বীরসিংহ গ্রামে উমাপতি তর্কসিদ্ধান্ত নামে এক অতি প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। * * * রামজয় তর্কভূষণ এই উমাপতি তর্কসিদ্ধান্তের তৃতীয়া কন্যা দুর্গা দেবীর পাণিগ্রহণ করেন। দুর্গা দেবীর গর্ভে তর্কভূষণ মহাশয়ের দুই পুত্র ও চারি কন্যা জন্মে। জ্যেষ্ঠ ঠাকুরদাস, কনিষ্ঠ কালিদাস; জ্যেষ্ঠ মঙ্গল, মধ্যম কমল, তৃতীয় গোবিন্দমণি, চতুর্থ অন্নপূর্ণা। জ্যেষ্ঠ ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আমার জনক।

    “রামজয় তর্কভূষণ দেশত্যাগী হইলেন; দুর্গা দেবী পুত্রকন্যা লইয়া বনমালিপুরের বাটীতে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই দুর্গা দেবীর লাঞ্ছনাভোগ ও তদীয় পুত্রকন্যাদের উপর কর্ত্তৃপক্ষের অযত্ন ও অনাদর, এত দূর পর্য্যন্ত হইয়া উঠিল যে, দুর্গা দেবীকে পুত্রদ্বয় ও কন্যাচতুষ্টয় লইয়া, পিত্রালয়ে যাইতে হইল। * * * কতিপয় দিবস অতি সমাদরে অতিবাহিত হইল। দুর্গাদেবীর পিতা, তর্কসিদ্ধান্ত মহাশয়, অতিশয় বৃদ্ধ হইয়াছিলেন; এজন্য সংসারের কর্ত্তৃত্ব তদীয় পুত্র রামসুন্দর বিদ্যাভূষণের হস্তে ছিল।

    ****

    “কিছু দিনের মধ্যেই, পুত্রকন্যা লইয়া, পিত্রালয়ে কালযাপন করা দুর্গা দেবীর পক্ষে বিলক্ষণ অসুখের কারণ হইয়া উঠিল। তিনি ত্বরায় বুঝিতে পারিলেন, তাঁহার ভ্রাতা ও ভ্রাতৃভার্য্যা তাঁহার উপর অতিশয় বিরূপ। * * অবশেষে দুর্গ দেবীকে পুত্রকন্যা লইয়া, পিত্রালয় হইতে বহির্গত হইতে হইল। তর্কসিদ্ধান্ত মহাশয় সাতিশয় ক্ষুব্ধ ও দুঃখিত হইলেন এবং স্বীয় বাটীর অনতিদুরে এক কুটীর নির্ম্মিত করিয়া দিলেন। দুর্গা দেবী পুত্রকন্যা লইয়া, সেই কুটীরে অবস্থিত ও অতি কষ্টে দিনপাত করিত্বে লাগিলেন।

    ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    “ঐ সময়ে, টেকুয়া ও চরকায় সুতা কাটিয়া, সেই সুতা বেচিয়া অনেক নিঃসংশয় নিরুপায় স্ত্রীলোক আপনাদের দিন গুজরান করিতেন। দুর্গা দেবী সেই বৃত্তি অবলম্বন করিলেন। * * তাদৃশ স্বল্প আয় দ্বারা নিজের, দুই পুত্রের ও চারি কন্যার ভরণপোষণ সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নহে। তাঁহার পিতা সময়ে সময়ে, যথাসম্ভব সাহায্য করিতেন; তথাপি তাঁহাদের আহারাদি সর্ব্ববিষয়ে ক্লেশের পরিসীমা ছিল না। এই সময়ে জ্যেষ্ঠ পুত্র ঠাকুরদাসেব বয়ঃক্রম ১৪/১৫ বৎসর। তিনি মাতৃদেবীর অনুমতি লইয়া, উপার্জ্জনের চেষ্টায় কলিকাতা প্রস্থান করিলেন।

    “সভারাম বাচস্পতি নামে আমাদের এক সন্নিহিত জ্ঞাতি কলিকতায় বাস করিয়াছিলেন। তাঁহার পুত্র জগন্মোহন ন্যায়ালঙ্কার, সুপ্রসিদ্ধ চতুর্ভূজ ন্যায়রত্নের নিকট অধ্যয়ন করেন। ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়, ন্যায়রত্ন মহাশয়ের প্রিয় শিষ্য ছিলেন, তাঁহার অনুগ্রহে ও সহায়তায় তিনি, কলিকাতায় বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠাপন্ন হয়েন। ঠাকুরদাস, এই সন্নিহিত জ্ঞাতির আবাসে উপস্থিত হইয়া, আত্মপরিচয় দিলেন এবং কি জন্য আসিয়াছেন, অশ্রুপূর্ণলোচনে তাহা ব্যক্ত করিয়া, আশ্রয় প্রার্থনা করিলেন। ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের সময় ভাল, তিনি অকাতরে অন্ন-ব্যয় করিতেন, এমন স্থলে, দুর্দ্দশাপন্ন আসন্ন জ্ঞাতিসন্তানকে অন্ন দেওয়া দুরূহ ব্যাপার নহে। তিনি সাতিশয় দয়া ও সবিশেষ সৌজন্য প্রদর্শনপূর্ব্বক, ঠাকুরদাসকে আশ্রয় প্রদান করিলেন।

    “ঠাকুরদাস, প্রথমতঃ বনমালিপুরে, তৎপরে বীরসিংহে; সংক্ষিপ্তসার ব্যাকরণ পড়িয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি, ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের চতুষ্পাঠীতে, রীতিমত সংস্কৃত বিদ্যার অনুশীলন করিবেন, প্রথমতঃ এই ব্যবস্থা স্থির হইয়াছিল এবং তিনিও তাদৃশ অধ্যয়ন-বিষয়ে, সবিশেষ অনুরক্ত ছিলেন; কিন্তু, যে উদ্দ্যেশ্যে, তিনি কলিকাতায় আসিয়াছিলেন, সংস্কৃতপাঠে নিযুক্ত হইলে, তাহা সম্পন্ন হয় না। তিনি, সংস্কৃত পড়িবার জন্য, সবিশেষ ব্যাগ্র ছিলেন, যথার্থ বটে, এবং সর্ব্বদাই মনে মনে প্রতিজ্ঞ করিতেন, যত কষ্ট, যত অসুবিধা হউক না কেন, সংস্কৃতপাঠে প্রাণপণে যত্ন করিব; কিন্তু, জননীকে ও ভাই, ভগিনীগুলিকে কি অবস্থায রাখিয়া অসিয়াছেন, যখন তাহা মনে হইত, তখন সে ব্যগ্রতা ও সে প্রতিজ্ঞা, তদীয় অন্তঃকরণ হইতে, একেবারে অপসারিত হইত। যাহা হউক, অনেক বিবেচনার পর, অবশেষে ইহাই অবধারিত হইল, যাহাতে তিনি শীঘ্র উপাৰ্জ্জনক্ষম হন, সেরূপ পড়া-শুনা করাই কর্ত্তব্য।

    “এই সময়ে, মোটামুটি ইঙ্গরেজী জানিলে, সওদাগর সাহেবদিগের হৌসে, অনায়াসে কর্ম্ম হইত। এজন্য সংস্কৃত না পড়িয়া, ইঙ্গরেজী পড়াই, তাহার পক্ষে, পরামর্শসিদ্ধ স্থির হইল। কিন্তু, সে সময়ে, ইঙ্গরেজী পড়া সহজ ব্যাপার ছিল না। তখন, এখনকার মত, প্রতি পল্লীতে ইঙ্গরেজী বিদ্যালয় ছিল না। তাদৃশ বিদ্যালয় থাকিলেও, তাঁহার ন্যায় নিরুপায় দীন বালকের তথায় অধ্যয়নের সুবিধা ঘটিত না। ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের পরিচিত এক ব্যক্তি কার্য্যোপযোগী ইঙ্গরেজী জানিতেন। তাঁহার অনুরোধে; ঐ ব্যক্তি ঠাকুরদাসকে ইঙ্গরেজী পড়াইতে সম্মত হইলেন। তিনি বিষয়কর্ম্ম করিতেন; সুতরাং, দিবাভাগে, তাঁহার পড়াইবার অবকাশ ছিল না। এজন্য, তিনি ঠাকুরদাসকে সন্ধ্যার সময় তাঁহার নিকটে যাইতে বলিয়া দিলেন। তদনুসারে, ঠাকুরদাস, প্রত্যহ সন্ধ্যার, পর তাঁহার নিকটে গিয়া ইঙ্গরেজী পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

    “ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের বাটীতে, সন্ধ্যার পরেই, উপরি লোকের আহারের কাণ্ড শেষ হইয়া যাইত। ঠাকুরদাস ইঙ্গরেজী পড়ার অনুরোধে সে সময় উপস্থিত থাকিতে পারিতেন না; যখন আসিতেন, তখন আর আহার পাইবার সম্ভাবনা থাকিত না; সুতরাং তাঁহাকে রাত্রিতে অনাহারে থাকিতে হইত। এইরূপে নক্তস্তন আহারে বঞ্চিত হইয়া তিনি দিন দিন শীর্ণ ও দুর্ব্বল হইতে লাগিলেন। একদিন তাঁহার শিক্ষক জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এমন শীর্ণ ও দুর্ব্বল হইতেছ কেন? তিনি কি কারণে সেরূপ অবস্থা ঘটিতেছে, অশ্রুপূর্ণনয়নে তাহার পরিচয় দিলেন। ঐ সময়ে সেই স্থানে শিক্ষকের আত্মীয় শূদ্রজাতীয় এক দয়ালু ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া তিনি অতিশয় দুঃখিত হইলেন এবং ঠাকুরদাসকে বলিলেন, যেরূপ শুনিলাম, তাহাতে আর তোমার ওরূপ স্থানে থাকা কোনও মতে চলিতেছে না। যদি তুমি রাঁধিয়া খাইতে পার, তাহা হইলে আমি তোমায় আমার বাসায় রাখিতে পারি। এই সদয় প্রস্তাব শুনিয়া, ঠাকুরদাস, যার-পর-নাই আহ্লাদিত হইলেন এবং পর দিন অবধি তাঁহার বাসায় গিয়া অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।

    “এই সদাশয় দয়ালু মহাশয়ের দয়া ও সৌজন্য যেরূপ ছিল, আয় সেরূপ ছিল না। তিনি দালালি করিয়া, সামান্যরূপ উপার্জ্জন করিতেন। যাহা হউক, এই ব্যক্তির আশ্রয়ে আসিয়া, ঠাকুরদাসের, নির্বিঘ্নে, দুই বেলা আহার ও ইঙ্গরেজী পড়া চলিতে লাগিল। কিছু দিন পরে, ঠাকুরদাসের দুর্ভাগ্যক্রমে তদীয় আশ্রয়দাতার আয় বিলক্ষণ খর্ব্ব হইয়া গেল; সুতরাং, তাঁহার নিজের ও তাঁহার আশ্রিত ঠাকুরদাসের অতিশয় কষ্ট উপস্থিত হইল। তিনি প্রতিদিন, প্রাতঃকালে বহির্গত হইতেন এবং কিছু হস্তগত হইলে, কোনও দিন দেড় প্রহরের, কোনও দিন দুই প্রহরের, কোনও দিন আড়াই প্রহরের সময়, বাসায় আসিতেন; যাহা আনিতেন, তাহা দ্বারা, কোনও দিন বা কষ্টে, কোনও দিন সচ্ছন্দে, নিজের ও ঠাকুরদাসের আহার সম্পন্ন হইত। কোনও কোনও দিন, তিনি দিবাভাগে বাসায় আসিতেন না। সেই সেই দিন, ঠাকুরদাসকে সমস্ত দিন উপবাসী থাকিতে হইত।

    “ঠাকুরদাসের সামান্যরূপ একখানি পিতলের থালা ও একটী ছোট ঘটী ছিল। থালাখানিতে ভাত ও ঘটীটিতে জল খাইতেন। তিনি বিবেচনা করিলেন, এক পয়সার সালপাত কিনিয়া রাখিলে, ১০/১২ দিন ভাত খাওয়া চলিবেক; সুতরাং থালা না থাকিলে, কাজ আটকাইবেক না, অতএব, থালাখানি বেচিয়া ফেলি; বেচিয়া যাহা পাইব, তাহা আপনার হাতে রাখিব। যে দিন, দিনের বেলায় আহারের যোগাড় না হইবেক, এক পয়সার কিছু কিনিয়া খাইব। এই স্থির করিয়া, তিনি সেই থালাখানি, নূতন বাজারে, কাঁসারিদের দোকানে বেচিতে গেলেন। কাঁসারিরা বলিল, আমরা অজানিত লোকের নিকট হইতে পুরাণ বাসন কিনিতে পারিব না, পুরাণ বাসন কিনিয়া কখনও, কখনও বড় ফেসাতে পড়িতে হয়। অতএব আমরা তোমার থালা লইব না। এইরূপে কোনও দোকানদারই সেই থালা কিনিতে সম্মত হইল না। ঠাকুরদাস, বড় আশা করিয়া, থালা বেচিতে গিয়াছিলেন; এক্ষণে, সে আশায় বিসর্জ্জন দিয়া, বিষন্ন মনে বাসায় ফিরিয়া আসিলেন।

    “এক দিন, মধ্যাহ্ন সময়ে ক্ষুধায় অস্থির হইয়া, ঠাকুরদাস বাসা হইতে বহির্গত হইলেন এবং অন্যমনস্ক হইয়া, ক্ষুধার যাতনা ভুলিবার অভিপ্রায়ে, পথে পথে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ ভ্রমণ করিয়া, তিনি অভিপ্রায়ের সম্পূর্ণ বিপরীত ফল পাইলেন। ক্ষুধার যাতনা ভুলিয়া যাওয়া দূরে থাকুক, বড়বাজার হইতে ঠনঠনিয়া পর্য্যন্ত গিয়া, এত ক্লান্ত এবং ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় এত অভিভূত হইলেন যে, আর তাঁহার চলিবার ক্ষমতা রহিল না। কিঞ্চিৎ পরেই, তিনি এক দোকানের সম্মুখে উপস্থিত ও দণ্ডায়মান হইলেন; দেখিলেন এক মধ্যবয়স্কা বিধবা নারী ঐ দোকানে বসিয়া মুড়ি মুড়কি বেচিতেছেন। তাঁহাকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া, ঐ স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, বাপাঠাকুর, দাঁড়াইয়া আছ কেন। ঠাকুরদাস, তৃষ্ণার উল্লেখ করিয়া পানার্থে জল প্রার্থনা করিলেন। তিনি, সাদর ও সস্নেহ বাক্যে, ঠাকুরদাসকে বসিতে বলিলেন এবং ব্রাহ্মণের ছেলেকে শুধু জল দেওয়া অবিধেয়, এই বিবেচনা করিয়া, কিছু মুড়কি ও জল দিলেন। ঠাকুরদাস যেরূপ ব্যগ্র হইয়া, মুড়কিগুলি খাইলেন, তাহা এক দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিয়া, ঐ স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, বাপাঠাকুর আজ বুঝি তোমার খাওয়া হয় নাই। তিনি বলিলেন, না মা আজ আমি, এখন পর্য্যন্ত, কিছুই খাই নাই। তখন, সেই স্ত্রীলোক ঠাকুরদাসকে বলিলেন, বাপাঠাকুর জল খাইও না, একটু অপেক্ষা কর। এই বলিয়া নিকটবর্ত্তী গোয়ালার দোকান হইতে, সত্বর, দই কিনিয়া আনিলেন এবং আরও মুড়কি দিয়া, ঠাকুরদাসকে পেট ভরিয়া ফলার করাইলেন; পরে তাঁহার মুখে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, জিদ করিয়া বলিয়া দিলেন, যে দিন তোমার এরূপ ঘটিবেক, এখানে আসিয়া ফলার করিয়া যাইবে।”38

    ****

    “যে যে দিন, দিবাভাগে আহারেব যোগাড় না হইত; ঠাকুরদাস সেই সেই দিন, ঐ দয়াময়ীর আশ্বাসবাক্য অনুসারে তাঁহার দোকানে গিয়া, পেট ভরিয়া ফলার করিয়া আসিতেন।

    “কিছুদিন পরে ঠাকুরদাস, আশ্রয়দাতার সহায়তায় মাসিক দুই টাকা বেতনে, কোনও স্থানে নিযুক্ত হইলেন। এই কর্ম্ম পাইয়া, তাঁহার আর আহ্লাদের সীমা রহিল না। পূর্ব্ববৎ আশ্রয়দাতার আশ্রয়ে থাকিয়া, আহারের ক্লেশ সহ্য করিয়াও, বেতনের দুইটি টাকা, যথানিয়মে জননীর নিকট পাঠাইতে লাগিলেন। তিনি বিলক্ষণ বুদ্ধিমান ও যার-পর-নাই পরিশ্রমী ছিলেন, এবং কখনও কোনও ওজর না করিয়া সকল কর্ম্মই সুন্দররূপে সম্পন্ন করিতেন; এজন্য, ঠাকুরদাস যখন যাঁহার নিকট কর্ম্ম করিতেন, তাঁহারা সকলেই তাঁহার উপর সাতিশয় সন্তুষ্ট হইতেন।

    “দুই তিন বৎসরের পরেই, ঠাকুরদাস মাসিক পাঁচ টাকা বেতন পাইতে লাগিলেন। তখন তাঁহার জননীর ও ভাইভগিনীগুলির অপেক্ষাকৃত অনেক অংশে কষ্ট দূর হইল। এই সময়ে, পিতামহদেবও দেশে প্রত্যাগমন করিলেন। তিনি প্রথমতঃ বনমালিপুরে গিয়াছিলেন; তথায় স্ত্রী পুত্র কন্যা দেখিতে না পাইয়া, বীরসিংহ আসিয়া পরিবারবর্গের সহিত মিলিত হইলেন। সাত আট বৎসরের পর, তাঁহার সমাগমলাভে, সকলেই আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন। শ্বশুরালয়ে, বা শ্বশুরালয়ের সন্নিকটে, বাস করা তিনি অবমাননা জ্ঞান করিতেন; এজন্য কিছু দিন পরেই, পরিবার লইয়া, বনমালিপুরে যাইতে উদ্যত হইয়াছিলেন। কিন্তু দুর্গা দেবীর মুখে ভ্রাতাদের আচরণের পরিচয় পাইয়া সে উদ্যম হইতে বিরত হইলেন, এবং নিতান্ত অনিচ্ছাপূর্ব্বক বীরসিংহে অবস্থিতি বিষয়ে সম্মতি প্রদান করিলেন। এইরূপে, বীরসিংহগ্রামে আমাদের বাস হইয়াছিল।

    “বীরসিংহে কতিপয় দিবস অতিবাহিত করিয়া, তর্কভূষণ মহাশয়, জ্যেষ্ঠ পুত্র ঠাকুরদাসকে দেখিবার জন্য কলিকাতা প্রস্থান করিলেন। ঠাকুরদাসের আশ্রয়দাতার মুখে, তদীয় কষ্টসহিষ্ণুতা প্রভৃতির প্রভূত পরিচয় পাইয়া, তিনি যথেষ্ট আশীর্ব্বাদ ও সবিশেষ সন্তোষ প্রকাশ করিলেন। বড়বাজারের দয়েহাটায় উত্তর-রাঢ়ীয় কায়স্থ ভাগবতচরণ সিংহ নামে এক সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এই ব্যক্তির সহিত তর্কভূষণ মহাশয়ের বিলক্ষণ পরিচয় ছিল। সিংহ মহাশয় অতিশয় দয়াশীল ও সদাশয় মনুষ্য ছিলেন। তর্কভূষণ মহাশয়ের মুখে তদীয় দেশত্যাগ অবধি যাবতীয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, প্রস্তাব করিলেন, আপনি অতঃপর ঠাকুরদাসকে আমার বাটীতে রাখুন, আমি তাহার আহার প্রভৃতির ভার লইতেছি; সে যখন স্বয়ং পাক করিয়া খাইতে পারে, তখন আর তাহার কোনও অংশে অসুবিধা ঘটিবেক না।

    “এই প্রস্তাব শুনিয়া, তর্কভূষণ মহাশয়, সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন; এবং ঠাকুরদাসকে সিংহ মহাশয়ের আশ্রয়ে রাখিয়া, বীরসিংহে প্রতিগমন করিলেন। এই অবধি ঠাকুরদাসের আহারক্লেশের অবসান হইল। যথাসময়ে আবশ্যকমত, দুই বেলা আহার পাইয়া তিনি পুনর্জন্ম জ্ঞান করিলেন। এই শুভ ঘটনার দ্বারা, তাঁহার যে কেবল আহারের ক্লেশ দূর হইল, এরূপ নহে, সিংহ মহাশয়ের সহায়তায় মাসিক আট টাকা বেতনে এক স্থানে নিযুক্ত হইলেন। ঠাকুরদাসের আট টাকা মাহিয়ানা হইয়াছে শুনিয়া তদীয় জননী দুর্গা দেবীর আহ্লাদের সীমা রহিল না।

    “এই সময়ে ঠাকুরদাসের বয়ঃক্রম তেইশ চব্বিশ বৎসর হইয়াছিল। অতঃপর তাঁহার বিবাহ দেওয়া আবশ্যক বিবেচনা করিয়া তর্কভূষণ মহাশয় গোঘাট-নিবাসী রামকান্ত তর্কবাগীশের দ্বিতীয় কন্যা ভগবতী দেবীর সহিত, তাঁহার বিবাহ দিলেন।39 এই ভগবতী দেবীর গর্ভে আমি জন্ম গ্রহণ করিয়াছি। ভগবতী দেবী, শৈশবকালে মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন।”

    রামকান্ত তর্কবাগীশ শব-সাধনায় সিদ্ধ হইতে গিয়া উন্মাদগ্রস্ত হইয়া যান। এই জন্য পাতুলগ্রাম-নিবাসী তদীয় শ্বশুর পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ মহাশয় তাহাকে সস্ত্রীক নিজ ভবনে আনিয়া রাখেন। বহুবিধ চিকিৎসাতে তর্কবাগীশ মহাশয় আরোগ্য লাভ করেন নাই। মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি উন্মাদগ্রস্ত ছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জননী ভগবতী সেই জন্য মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হন। তর্কবাগীশ মহাশয়ের দুই কন্যা। ভগবতী দেবী কনিষ্ঠা। ভগবতী দেবীর জননীর নাম গঙ্গা দেবী। ইনি পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের জেষ্ঠ কন্যা। বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের চারি পুত্র ও আর একটি কন্যা ছিল।

    বিদ্যাসাগর জননী ভবগতী দেবী

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তেজস্বিতা, স্বাধীনতা-প্রিয়তা, সত্যবাদিতা ও সরলতা চির-প্রসিদ্ধ। তিনি এই সব গুণ পিতা ও পিতামহের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়া মনে হয়। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ অসীম তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। তিনি কাহারও মুখাপেক্ষা করিতেন না এবং পর-শ্রীকাতর ব্যক্তিবর্গের ভ্রূভঙ্গীতে ভীত হইতেন না। তিনি এইরূপ স্বাধীন-প্রকৃতি লোক ছিলেন বলিয়া তাঁহার শ্যালক ও তৎপক্ষীয় লোক তাঁহার বিপক্ষ ছিলেন। তাঁহার মতে দেশে মানুষ ছিল না, সবই গরু। তিনি যেমন সৎসাহসী, তেমনই নিরহঙ্কার ও সত্যবাদী ছিলেন। ভট্টাচার্য্য ব্রাহ্মণের একটু শ্লেষাত্মক রসিকতার পরিচয় লউন। এক দিন তিনি গ্রামের পথ দিয়া যাইতেছিলেন; এক জন বলিল,—“ও পথ দিয়া যাইবেন না; বড় বিষ্ঠা।” ব্রাহ্মণ উত্তর করিলেন,—“বিষ্ঠা কৈ? সবই তো গোবর, এ দেশে মানুষ কৈ, সবই তো গরু।” কথিত আছে, তিনি যখন গৃহত্যাগ করিয়া তীর্থ পর্য্যটন করেন, তখন এক দিন রাত্রিকালে স্বপ্ন দেখেন,—“তোমার পরিবার তোমার জন্মস্থান বনমালিপুর পরিত্যাগ করিয়া বীরসিংহ গ্রামে বাস করিতেছে। তাহাদের এখন কষ্টের একশেষ।” ইহার পর তিনি বীরসিংহে প্রত্যাগমন করিয়া পুনরায় পরিবারবর্গের ভার গ্রহণ করেন।

    বীরসিংহ গ্রামের ভূস্বামী তাঁহাকে তাঁহার বাস্তুভিটার ভূমিটুকু নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর করিয়া দিতে চাহেন এবং তাঁহার আত্মীয়-স্বজন তাঁহাকে তদগ্রহণার্থ অনুরোধ করেন। তেজস্বী রামজয়ের বিশ্বাস ছিল যে, নিষ্কর ভূমিতে বাস করিলে ভূস্বামী তাঁহার পুণ্যাংশ গ্রহণ করিবেন এবং তাঁহার অহঙ্কার বাড়িবে। এই জন্য তিনি নিষ্কর ভূমি লইতে সন্মত হন নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বরচিত চরিতে পিতামহ সম্বন্ধে এইরূপ লিখিয়াছেন,—

    “তিনি কখন, পরের উপাসনা বা আনুগত্য করিতে পারেন নাই। তাঁহার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল, অন্যের উপাসনা বা আনুগত্য অপেক্ষা প্রাণ ত্যাগ করা ভাল। তিনি একাহারী, নিরামিষাশী, সদাচারপূত ও নৈমিত্তিক কর্ম্মে সবিশেষ অবহিত ছিলেন।”

    রামজয়ের বিপুল হৃদয়-বলের ন্যায় শারীরিক বল ছিল। মনের বল থাকিলে, দেহের বল যেন আপনি আসিয়া পড়ে। দেহ-মনের এমনই নিত্য নিকট সম্বন্ধ। বিদ্যাসাগর মহাশয়ে ইহা আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি; পিতামহ রামজয়ের কথা শুনিয়াছি। রামজয় সর্ব্বদাই লৌহদণ্ড হস্তে নির্ভীকচিত্তে ভ্রমণ করিতেন। এক সময় তিনি বীরসিংহ হইতে মেদিনীপুরে যাইতেছিলেন, পথের মধ্যে এক ভল্লুক তাঁহাকে আক্রমণ করে। তিনি ভল্লুককে দেখিয়াই এক বৃক্ষের অন্তরালে দণ্ডায়মান হন। ভল্লুকও তাঁহাকে ধরিবার চেষ্টা করে। ভল্লুক যেমন দুইটি হস্ত প্রসারণ করিয়া ধরিতে যাইল, তিনি অমনই তাঁহার দুইটি হাত ধরিয়া বৃক্ষে ঘর্ষণ করিতে লাগিলেন। ভল্লুক তখনই মৃতপ্রায় হইয়া পড়িল। রামজয় তাঁহাকে মৃতপ্রায় দেখিয়া চলিয়া যাইবার উপক্রম করিলেন। ভল্লুক কিন্তু তাঁহার পশ্চাদভাগে নখরাঘাত করে। রামজয় অনন্যোপায় হইয়া হস্তস্থিত লৌহদণ্ড-আঘাতে তাঁহার প্রাণনাশ করেন। তাঁহাকে প্রায় মাসাধিক নখরাঘাতের ক্ষতজনিত ক্লেশ ভোগ করিতে হইয়াছিল। মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত নখরাঘাতের চিহ্ন ছিল।

    ঠাকুরদাস কার্যক্ষম হইলে রামজয় পুনরায় তীর্থভ্রমণে বহির্গত হন। বিদ্যাসাগরের জন্মগ্রহণ করিবার পূর্ব্বে তিনি আবার ফিরিয়া আসেন।

    রামজয় যখন বীরসিংহ গ্রামে প্রত্যাগমন করেন, তখন তাঁহার পুত্রবধু ভগবতী দেবী গর্ব্ভবতী; কিন্তু উন্মাদগ্রস্তা।40 ভগবতী দেবী ঈশ্বরচন্দ্রকে গর্ভে ধারণ করিয়া অবধি উন্মাদগ্রস্তা হন। দশ মাস কাল এই উন্মাদ-অবস্থাই ছিল। বিচিত্র ব্যাপার! দশ মাস কাল নানা চিকিৎসায় কোন ফলোদয় হয় নাই; কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রকে প্রসব করিবার পরেই ভগবতী দেবী রোগমুক্তা হন। তিনি আর কখনও এরূপ রোগে আক্রান্ত হন নাই। চিরকালই তিনি অটুট অবস্থাতেই দীনহীন কাঙ্গলকে অন্ন-বস্ত্র বিতরণ করিতেন; পরন্তু স্বয়ং রন্ধন এবং পরিবেশনাদি করিয়া দিবা-রাত্র অতিথি-অভ্যাগত জনকে ভোজন করাইতেন। বিদ্যাসাগরের জননীর মত দয়া-দক্ষিণ্যবতী রমণী প্রায় দেখা যায় না। এই অন্নপূর্ণা স্বর্ণগর্ভা জননীর পরিচয় পাঠক পরে পাইবেন। এই করুণাময়ীরই করুণা-কণা পাইয়া, অতুল মাতৃভক্তিবলে বিদ্যাসাগর মহাশয় জগতে করুণাময় নাম রাখিয়া গিয়াছেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় বলিতেন, যদি আমার দয়া থাকে ত মা’র নিকট হইতে পাইয়াছি, বুদ্ধি থাকে ত বাবার নিকট হইতে পাইয়াছি। ইংরেজী শিক্ষিত যুবক! যদি জর্জ হার্‌বটের সেই বাণীর সার্থকতা দেখিতে চাও, একমাত্র জননীই শত শিক্ষকের সমান দেখিতে পাইবে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জননী-জীবনেও—“One good mother is worth a hundred school-masters.”

    আজকাল অনেক জ্যোতিষ-ব্যবসায়ীর প্রতি লোকে নানা কারণে বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে; কিন্তু পূর্ব্বে এরূপ ছিল না। পুর্ব্বে জ্যোতিষীর গণনার ফল প্রায়ই মিথ্যা হইত না। বিদ্যাসাগর মহাশয় জন্মগ্রহণ করিবার পূর্ব্বে, তদানীন্তন জ্যোতিষী ভবানন্দ ভট্টাচার্য্য মহাশয় গণনা করিয়া বলিয়াছিলেন,—“ভগবতী দেবীর গর্ভে দয়ার অবতার জন্মগ্রহণ করিবেন। ইনি জন্মগ্রহণ করিলে ভগবতী দেবীর রোগ সারিয়া যাইবে।” হইলও তাহাই। ভবানন্দের অব্যর্থ বাণী প্রত্যক্ষীভূত হইল। এইজন্যেই হউক বা অন্য কারণেই হউক, বিদ্যাসাগর মহাশয় জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি চিরকালই ভক্তিমান ছিলেন।

  • সংক্ষিপ্ত তাখরীজ

    সংক্ষিপ্ত তাখরীজ

    মাসীহ দাজ্জালের কিসসা, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ এবং দাজ্জালকে হত্যা করা সম্পর্কে আবূ উমামাহ্ (রাযি.) বর্ণিত হাদীসকে ঘিরে এ সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবীগণের (রাযি.) সূত্রে যা কিছু সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে:

    1. হে লোক সকল! আল্লাহ যেদিন থেকে আদম সন্তানাদি সৃষ্টি করেছেন তখন থেকে যমীনের উপর দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে ভয়ঙ্কর ফিতনা আর নেই [এবং ক়িয়ামাত পর্যন্ত হবেও না। যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী ফিতনাসমূহ থেকে নাজাত পাবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকেও নাজাত পাবে। [আর সে মুসলিমদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না]।
    2. নিশ্চয়ই আল্লাহ যত নাবী পাঠিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই স্বীয় উম্মাতকে [কানা] দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আমিও তোমাদেরকে তার ব্যাপারে সাবধান করছি।
    3. আমি নাবীদের মধ্যে সর্বশেষ নাবী এবং তোমরা উম্মাতসমূহের মধ্যে সর্বশেষ উম্মাত।
    4. সে (দাজ্জাল) অবশ্যই তোমাদের মাঝে প্রকাশ পাবে। এটা অবশ্যই সত্য, এবং তা অতি নিকটেই, আর যা কিছুই ঘটবে তা অতি নিকটে। [দাজ্জাল সর্বপ্রথম ক্রোধের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করবে]। [সে বের হবে না যতক্ষণ না অবস্থা এরূপ হয় যে, মীরাস বণ্টন করা হবে না এবং গণীমাত পেয়ে কোন আনন্দ প্রকাশ করা হবে না]।
    5. আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকাবস্থায় যদি সে বের হয়, তাহলে আমি প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করবো (তাকে দোষারোপ করব)। আর যদি সে আমার পরে বের হয়, তাহলে প্রত্যেককে নিজের পক্ষে দলীল পেশ করতে হবে। তখন মহান আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আমার খলীফাহ স্বরূপ হবেন (অর্থাৎ তিনি মুসলিমদের দাজ্জাল থেকে রক্ষা করবেন)। উম্মু সালামাহ্ হাদীসে রয়েছে: সে যদি আমার মৃত্যুর পরে বের হয় তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে নেককার লোকদের দ্বারা রক্ষা করবেন।
    6. নিশ্চয়ই দাজ্জাল বের হবে [পূর্ব দেশ থেকে] যাকে ‘খুরাসান’ বলা হয়। [আসবাহানের ইয়াহুদীদের মাঝে] তাদের চেহারা হবে ভাঁজযুক্ত। (দাজ্জাল আত্নপ্রকাশ করবে) সিরিয়া ও ইরাকের ‘খাল্লা’ নামক স্থান হতে। আর সে তার ডান ও বামে সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে (তিনবার)।
    7. কেননা, আমি তোমাদের কাছে তার এমন অবস্থা বর্ণনা করব, যা আমার পূর্বে কোন নাবী স্বীয় উম্মাতের কাছে বর্ণনা করেননি। (“উবাদাহ্ হাদীসের রয়েছে : আমি তোমাদের কাছে দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছি। এতদসত্ত্বেও আমার ভয় হয়, তোমরা তাকে চিনতে পারবে না)।
    8. প্রথমে সে বলবে, আমি নাবী এবং আমার পরে কোন নাবী নেই।
    9. অতঃপর সে দাবী করে বলবে, আমি তোমাদের রব! অথচ তোমরা তোমাদের রব্বকে মৃত্যুর পূর্বে দেখবে না।
    10. আর সে হবে কানা। [তার বাম চোখ হবে মিশানো] [যার উপর মোটা চামড়ায় ঢাকা হবে]। [তা যেন উজ্জ্বল নক্ষত্র] [তার ডান চোখ যেন জ্যোতিহীন, আঙ্গুর সদৃশ গোল]। যা উপরে উঠে থাকবে না এবং নীচে থাকবে না।] [সে কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট হবে]। [সাবধান! দাজ্জালের বিষয় তোমাদের কাছে গোপন নয়। আর তোমাদের কাছে গোপন নয় যে, তোমাদের রব্ব কানা নন। দাজ্জালের বিষয় তোমাদের কাছে গোপন নয়। আর তোমাদের কাছে গোপন নয় যে, তোমাদের রব্ব কানা নন।] [তিনবার]। [তোমরা মৃত্যুর আগে তোমাদের রব্বকে দেখবে না]।
    11. সে পৃথিবীতে বিচরণ করবে। আর আকাশ ও যমীন তো আল্লাহ্ই।
    12. [সে হবে বেঁটে, তার পদক্ষেপ হবে দীর্ঘ, মাথার চুল হবে কুঞ্চিত] [সে হবে খুঁতযুক্ত]।
    13. সে হবে কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট লোক। [কুঞ্চিত চুল]।
    14. তার দুই চোখের মাঝে (কপালে) লেখা থাকবে ‘কাফির’। এই লেখা পড়তে পারবে [যারা তার কার্যকলাপ অপছন্দ করবে] অথবা প্ৰত্যেক মু‘মিন ব্যক্তিই পড়তে পারবে, চাই সে অক্ষর হোক বা নিরক্ষর।
    15. তার অন্যতম ফিতনা হলো, তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম [নদী ও পানি] এবং [রুটির পাহাড়]। [সে আত্মপ্রকাশ করবে সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম সদৃশ বস্তু নিয়ে]। ‘তার জাহান্নাম হলো জান্নাত আর জান্নাত হলো জাহান্নাম।’ [মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহকে দাজ্জাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি বললাম, লোকেরা বলাবলি করছে যে, তার সাথে নাকি রুটি ও গোশতের পাহাড় এবং পানির নহর থাকবে? তিনি বলেন: আল্লাহর পক্ষে তো তা এর চাইতে অধিক সহজ] (আরেক হাদীসে এসেছে: [দাজ্জালের সাথে থাকবে দুটি প্রবাহিত নহর। তার একটি বাহ্যিক চোখে দেখা যাবে সাদা পানি আর দ্বিতীয়টি বাহ্যিক চোখে দেখা যাবে জ্বলন্ত আগুন]। [তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ঐ যুগ পাবে, তার উচিত হবে সে যেন সেটা থেকেই পান করে যেটাকে আগুন মনে করবে]। এবং চক্ষু বন্ধ করবে অতঃপর মাথা নত করে পান করবে। কেননা তা হবে প্রকৃতপক্ষে পানি [শীতল মিঠা পানি] [উত্তম পানি] [কাজেই সাবধান! তোমরা (ধোঁকায় পড়ে) নিজেদের ধবংস করো না। (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: যে ব্যক্তি তার নহরে (জান্নাতে) প্রবেশ করবে তার সওয়াব বিনষ্ট হবে এবং পাপ সাব্যস্ত হবে। আর যে ব্যক্তি তার জাহান্নামে প্রবেশ করবে তার জন্য সওয়াব সাব্যস্ত হবে এবং পাপ মোচন হবে)।
    16. যে ব্যক্তি তার আগুনের দ্বারা পরিক্ষিত হবে, সে যেন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং সূরাহ কাহ্‌ফ-এর প্রথমাংশ তিলাওয়াত করে। [কেননা তা পাঠ করলে তোমরা তার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।]
    17. দাজ্জালের অন্যতম ফিতনা হচ্ছে এই, সে জনৈক বেদুইনকে বলবে: আমি তোমার জন্য তোমার পিতা-মাতাকে জীবিত করে দিতে পারলে তুমি কি সাক্ষ্য দিবে যে, নিশ্চয় আমি তোমার রব্ব! তখন সে বলবে: হ্যাঁ, তখন তার জন্য দু’টি শয়তান তার পিতা ও মাতার আকৃতি ধারণ করবে। তারা বলবে: হে বৎস! তার আনুগত্য কর। নিশ্চয় সে তোমার প্রতিপালক।
    18. দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হল, সে এক ব্যক্তিকে পরাভূত করে তাকে হত্যা করবে। এমনকি তাকে করাত দিয়ে দুই টুকরা করে নিক্ষেপ করবে।
    19. দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হলো, সে একটি গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে, [তাদেরকে সে আহবান করবে] কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে। [সে তাদের থেকে সরে যাবে] ফলে তাদের গৃহপালিত পশু ধ্বংস হয়ে যাবে।
    20. দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হলো, সে অন্য আরেকটি গোত্রের পাশ দিয়ে যাবে। [সে তাদেরকে আহ্বান করবে] তখন তারা তাকে সত্য বলে মেনে নিবে [তার ডাকে সাড়া দিবে]। ফলে সে আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের নির্দেশ দিবে এবং আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে। অতঃপর সে যমীনকে শস্য উৎপাদনের নির্দেশ দিলে যমীন শস্য উৎপাদন করবে। যমীন ফসলাদি এমনভাবে উৎপন্ন করবে যে, তাদের পশুগুলো সেদিন সন্ধ্যায় খুব মোটাতাজা এবং পেট ভর্তি করে স্তন ফুলিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে।
    21. দাজ্জাল একটি বিরান (পুরাতন) স্থানে গিয়ে তাকে আদেশ করবে, তোমার গুপ্ত ধনরাশি বের করে দাও। তখন এর ধনরাশি এভাবে তার কাছে এসে পুঞ্জীভূত হবে যেরূপ মৌমাছির ঝাঁক দলে দলে এসে এক জায়গায় একত্রিত হয়।
    22. সে বের হবে [মানুষের মতভেদ ও দলে দলে বিভক্ত হওয়ার যুগে]। [তখন মানুষ পরষ্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, ধর্মকে কিছুই মনে করবে না, এবং আপোষে খারাপ আচরণ করবে। অতঃপর (দাজ্জাল) সকল নদীর ঘাটে আগমন করবে। যমীন তার জন্য এমনভাবে সংকোচন করে দেয়া হবে তা যেন মেষের একটি চামড়া]।
    23. সে বের হবে না যতক্ষণ এ নিদর্শন প্রকাশ না পাবে যে, রোমকরা (সিরিয়ার) আ‘মাক় ও দায়িক় নামক নহরের কাছে অবতীর্ণ হবে। [একদল দুশমন ইসলামপন্থীদের উদ্দেশে একত্রিত হবে এবং একদল ইসলামপন্থীও তাদের উদ্দেশে একত্রিত হবে] অতঃপর মাদীনাহ্ থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী তাদের মোকাবিলার উদ্দেশে রওয়ানা হবে। সেখানে পৌঁছে যখন তাঁরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে, তখন রোমকরা বলবে: আমাদেরকে এবং আমাদের মধ্যকার যারা বন্দী হয়েছে উভয়কে মিলিত হওয়ার সুযোগ দাও, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তখন মুসলিমরা বলবে: মনে রেখ, আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের বন্দীদেরকে ছাড়ব না বা যারা তাদেরকে বন্দী করেছে তাদের সাথে তোমাদেরকে মিলিত হতে দিব না। অতঃপর মুসলিমদের সাথে তাদের তুমুল লড়াই হবে। ঐ যুদ্ধে (উভয় পক্ষের) প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই প্রবল হবে। মুসলিম বাহিনী একদল মুজাহিদকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখবে, যারা বিজয়ী না হওয়ার পূর্বে কিছুতেই ফিরবে না। অতঃপর তারা সারাদিন যুদ্ধে লিপ্ত থাকবে যে পর্যন্ত রাত তাদের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি না করে। রাত হলে এই দল ঐ দল সকলেই এভাবে ফিরে আসবে যে, কেউই বিজয়ী হতে পারেনি। এদিকে মৃত্যুর জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দলটি শেষ হয়ে যাবে। অতঃপর মুসলিমরা মৃত্যুর জন্য আরেকটি দল প্রস্তুত করবে যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরবে না। এরাও রাত এসে অন্তরায় সৃষ্টি না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। অবশেষে রাত এসে গেলে এই দল ঐ দল সবাই অবিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে। আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দলটিও শেষ হয়ে যাবে। অতঃপর মুসলিমরা আরেকটি দলকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করবে যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরে আসবে না। এরাও রাত এসে অন্তরায় সৃষ্টি না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। অবশেষে রাত এসে গেলে এই দল ঐ দল সবাই অবিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে। আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দলটিও শেষ হয়ে যাবে। যখন চতুর্থ দিন আসবে তখন অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হবে]। যুদ্ধে মুজাহিদদের এক তৃতীয়াংশ পরাজয় বরণ করবে, যাদের তাওবাহ আল্লাহ কবূল করবেন না। আর এক তৃতীয়াংশ শাহাদাত বরণ করবে, [এরা] আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম শহীদ গণ্য হবে। আর এক তৃতীয়াংশ জয়ী হবে যারা কখনো পর্যুদস্ত হবে না। [অতঃপর এদেরকেও আল্লাহ পরাজয়ের সম্মুখীন করবেন অথবা চরম অবস্থায় সম্মুখীন করবেন অথবা ধ্বংসের মুখোমুখি পৌঁছাবেন। যাতে এরাও এমন প্রাণপণে যুদ্ধ করবে যার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না বা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি পাখি যখন তাদের আশেপাশে উড়ে যাবে, তখন তাদেরকে অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না। অতিক্রম করতে গেলে মরে মাটিতে পড়ে যাবে। যুদ্ধশেষে কোন পিতার সন্তানদেরকে যাদের সংখ্যা একশো গণনা করা হবে কিন্তু মাত্র একজন ব্যতীত তাদের আর কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে না। তাহলে কিসের গণীমাতে আনন্দ হবে? বা কোন মীরাস বণ্টন করা হবে? কাদের মাঝে বণ্টন করা হবে?]। অবশেষে এরাই কুসতুনতুনিয়া জয় করবে। বিজয় লাভের পর তারা তাদের তরবারিসমূহ যাইতূন গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে গণীমাত বণ্টন করতে থাকবে। এমন সময় হঠাৎ তাদের মধ্যে শয়তান চিৎকার দিয়ে বলে উঠবে: “শুনো, মাসীহ (দাজ্জাল) তোমাদের পরিবার-পরিজনের মধ্যে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে।” এ সংবাদ শুনামাত্র সবাই [হয়রান পেরেশান হয়ে তাদের হাতে যা কিছু আছে, সব পরিত্যাগ করে] কুসতুনতুনিয়া থেকে বেরিয়ে আসবে। এসে দেখবে, কিছুই হয়নি, একটা গুজব মাত্র। [তাদের আগে আগে দশ জন অশ্বারোহী পাঠিয়ে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ঐসব অশ্বারোহীর নাম ও তাদের পিতার নাম, এমনকি তাদের ঘোড়ার রঙ পর্যন্ত আমার জানা আছে। তারা তৎকালীন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে উত্তম অশ্বারোহী বা সেরা অশ্বারোহীদের অন্যতম হবে]। [অতঃপর তারা সিরিয়ায় পৌঁছলে শয়তান (দাজ্জাল) আত্নপ্রকাশ করবে]।
    24. সমগ্র পৃথিবীর তার জন্য সংকোচন করে দেয়া হবে এবং সে তার উপর বিজয়ী হবে। তবে [চারটি মাসজিদ ব্যতীত : মাসজিদুল হারাম, মাদীনাহ্‌র মাসজিদ, তূর এবং মাসজিদে আকসা]।
    25. দাজ্জালের সময়কাল হবে চল্লিশ দিন। তবে প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান, তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান এবং বাকী দিনগুলো তোমাদের এই দিনগুলোর সমান হবে। সাহাবীগণ বললেন, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে তাতে কি বর্তমান এক দিনের সলাত আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন: না, তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, যমীনে তার গতি কেমন হবে? তিনি বললেন: মেঘের গতি যাকে প্রবল বাতাস পিছন থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়।
    26. দাজ্জালের আবির্ভাবের তিন বছর পূর্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। তখন মানুষ চরমভাবে ক্ষুধায় কষ্ট পাবে। প্রথম বছর মহান আল্লাহ আকাশকে তিন ভাগের একভাগ বৃষ্টি আটকে রাখার নির্দেশ দিবেন। আর যমীনকে নির্দেশ দিবেন, ফলে সে তিন ভাগের একভাগ ফসল উৎপন্ন করবে। অতঃপর তিনি আসমানকে দ্বিতীয় বছর একই নিদের্শ দিবেন। তখন তা দুই তৃতীয়াংশ বৃষ্টি বন্ধ রাখবে এবং যমীনকে নির্দেশ দিবেন, ফলে যমীন দুই তৃতীয়াংশ ফসল কম উৎপন্ন করবে। অতঃপর মহান আল্লাহ তৃতীয় বছর একই নির্দেশ দিবেন, তখন সে সম্পূর্ণরূপে বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দিবে। ফলে যমীনে কোন ঘাস জন্মাবে না, কোন সবজি অবশিষ্ট থাকবে না। বরং তা ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ যা চাইবেন।
    27. সে মাক্কাহ্ ও মাদীনাহ্‌য় আসা মাত্রই এর প্রত্যেক প্রবেশ পথে খোলা তরবারি হাতে ফিরিশতাদের দেখতে পাবে।
    28. এমন কোন শহর বাদ থাকবে না যেখানে মাসীহ (দাজ্জালের) আতঙ্ক না ছড়াবে। তবে মাদীনাহ্ ব্যতীত। [সেদিন মাদীনার সাতটি দরজা থাকবে] এর প্রত্যেকটি প্রবেশ পথে দুইজন করে ফিরিশতা নিযুক্ত থাকবেন যারা মাসীহ দাজ্জালের ভয় থেকে একে নিরাপদ রাখবে।”
    29. এমনকি সে তৃণলতা শূণ্য জায়গা [সাইহানাতুল জুরুফ] নামক স্থানে এসে পৌঁছবে। [যা উহুদ পাহাড়ের পিছনে অবস্থিত]। [সে সেখানে তার আসন গাড়বে]।
    30. এরূপ অবস্থায় মাদীনাহ্ তার অধিবাসীদের নিয়ে তিনবার প্রকম্পিত হবে। তখন প্রতিটি মুনাফিক পুরুষ ও নারী মাদীনাহ্ থেকে বেরিয়ে দাজ্জালের কাছে চলে যাবে। অতঃপর মাদীনাহ্ থেকে মন্দ (পাপী লোকেরা) দূরীভূত হবে যেমন হাফর লোহার ময়লা দূর করে থাকে। আর এটাই হলে নাজাত দিবস। [যারা বেরিয়ে দাজ্জালের কাছে যাবে তাদের অধিকাংশ হবে মহিলা]।
    31. দাজ্জাল বের হলে একজন (বিশিষ্ট) ঈমানদার ব্যক্তি তার দিকে রওয়ানা হবে। সংবাদ পেয়ে দাজ্জালের পক্ষ থেকে তার অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হবে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছ? তিনি বলবেন, ঐ ব্যক্তির কাছে যে আবির্ভূত হয়েছে। তখন তারা বলবে, তুমি কি প্রভূর প্রতি ঈমান আনবে না? তিনি বলবেন, আমাদের প্রভূর ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এরপর তারা পরস্পরে বলবে, একে হত্যা কর। তারপর একে অপরকে বলবে, তোমাদের প্রভূ নিষেধ করেছেন যে, তোমরা তাকে না দেখিয়ে কাউকে হত্যা করবে না। অতঃপর তারা তাঁকে দাজ্জালের নিকট নিয়ে যাবে। যখন ঈমানদার ব্যক্তি দাজ্জালকে দেখতে পাবেন তখন বলবেন, হে জনগণ! [আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি] এই তো সেই দাজ্জাল যার কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: আলোচনা করেছেন)। এরপর দাজ্জালের নির্দেশে তাঁর চেহারা ক্ষতবিক্ষত করা হবে। বলা হবে, একে ধরে চেহারা ক্ষতবিক্ষত করে দাও। অতঃপর তাঁর পেট ও পিঠকে পিটিয়ে বিছিয়ে ফেলা হবে। তারপর দাজ্জাল জিজ্ঞেস করবে, আমার প্রতি ঈমান আনবে না? তিনি বলবেন, তুই তো মিথ্যাবাদী। মাসীহ দাজ্জাল বলবে, তোমাদের কি ধারণা, আমি যদি একে হত্যা করার পর জীবিত করি তাহলে কি তোমরা আমার কাজের ব্যাপারে সন্দিহান হবে? তখন তারা বলবে, না]। তখন তাঁকে কুড়াল দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলার জন্য আদেশ করা হবে। তার আদেশে প্রথমে তাকে দুই পা আলগা করে খণ্ড করা হবে [তাকে হত্যা করা হবে]। (নাওয়াস বর্ণিত হাদীসে রয়েছে: তাকে তলোয়ার দিয়ে জোরে আঘাত করবে এবং তাকে দুই টুকরো করে ফেলবে। প্রত্যেকটি টুকরো দুই ধনুকের ব্যবধানে চলে যাবে)। তিনি বলেন, অতঃপর দাজ্জাল খণ্ডিত টুকরাদ্বয়ের মাঝখানে এসে তাকে লক্ষ্য করে বলবে, উঠ! তৎক্ষণাৎ তিনি উঠে দাঁড়াবেন। তিনি বলেন : [অতঃপর তাকে ডাকবে। ডাকা মাত্র সে জীবিত হয়ে তার কাছে আসবে। তখন তার চেহারা হবে উজ্জ্বল, চমকপ্রদ ও হাস্যময়] অতঃপর দাজ্জাল তাকে আবার জিজ্ঞেস করবে, এবার আমার প্রতি ঈমান আনবে কি? তখন তিনি বলবেন, [আল্লাহর শপথ!] আমি তো তোমার সম্পর্কে আরো অধিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। অতঃপর তিনি উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে লোক সকল! মনে রেখ, দাজ্জাল আমার পরে আর কোন মানুষের উপর কর্তৃত্ব চালাতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর দাজ্জাল তাঁকে জবাই করার জন্য ধরবে এবং গলা ও ঘারে তামা জড়িয়ে দিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হবে না। অতঃপর তাঁর হাত পা ধরে তাঁকে নিক্ষেপ করবে। মানুষ ধারণা করবে বুঝি আগুনে ফেলে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাঁকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীনের নিকট এই ব্যক্তি বড় শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবেন।”
    32. অতঃপর ফিরিশতারা দাজ্জালের মুখকে সিরিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দিবেন। [অতঃপর সে ‘ইলিয়া’ পাহাড়ে আসবে। সেখানে এসে সে একদল মুসলিমকে অবরোধ করে রাখবে]। মুসলিমরা তখন কঠিন অবস্থার সম্মুখিন হবে]। [মানুষ দাজ্জাল থেকে পলায়ন করে পাহাড়ে আশ্রয় নিবে। উম্মু শুরাইক বিনতু আবুল আকর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন আরবগণ (মাক্কাহ্ ও মাদীনাবাসী) কোথায় থাকবে? তিনি বললেন: তাদের সংখ্যা খুবই কম হবে]।
    33. তাদের ইমাম হবেন একজন সৎ ব্যক্তি। [রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মাহদী আমাদের আহলে বাইতের মধ্য থেকে হবেন [ফাত়িমার বংশধর থেকে]। আল্লাহ তাঁকে এক রাতে খিলাফাতের যোগ্য করে দিবেন]। [তার নাম হবে আমার নামের মত এবং তার পিতার নাম হবে আমার পিতার নামের মত] [তার ললাট প্রশস্ত ও নাক উঁচু হবে]। [তিনি পৃথিবীকে ন্যায়-ইনসাফ দ্বারা এরূপ পরিপূর্ণ করবেন, যেরূপ তা যুলুম ও পাপাচারে পরিপূর্ণ ছিল] [তিনি সাত বছর রাজত্ব করবেন]। নাবী (সা.) বলেছেন: (আমার উম্মাতের দু’টি দলকে আল্লাহ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবেন: একদল যারা হিন্দুস্থানের জিহাদে অংশ গ্রহণ করবে এবং অপর দলটি হলো যারা ঈসা ইবনু মারইয়ামের সঙ্গী হয়ে দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়বে) এবং তিনি (সা.) বলেন: তোমাদের কেউ এদের দেখা পেলে তাকে আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবে)।
    34. তাদের ইমাম যখন এগিয়ে গিয়ে তাদেরকে নিয়ে ফাজরের সলাত আদায় করতে থাকবেন এমন সময় ঈসা ইবনু মারইয়াম (আকাশ থেকে) ভোর বেলায় অবতরণ করবেন। তিনি দামিস্কের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত সানা মিনারায় অবতরণ করবেন। এ সময় তিনি ওয়াস ও জাফরান রঙের দুটি বস্ত্র পরিহিত অবস্থায় থাকবেন। দু’জন ফিরিশতার পাখায় দু’হাত রেখে অবতরণ করবেন। যখন তিনি মাথা নীচু করবেন হালকা বৃষ্টি হবে আর যখন মাথা উঁচু করবেন, তখন দেহ থেকে মুক্তার বিন্দুর ন্যায় ফোটা গড়িয়ে পড়বে। তাঁর নিশ্বাসের বাতাস পেলে একটি কাফিরও বাঁচতে পারবে না, সব মরে যাবে। এবং তাঁর শ্বাস তাঁর শেষ দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।
    35. [আমার এবং তার (ঈসার) মাঝে কোন নাবী আসবে না। অবশ্য তিনি (আকাশ থেকে) অবতরণ করবেন। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে, তখন তাঁকে এভাবে চিনবে যে, ‘তিনি হবেন মধ্যম আকৃতির, তার দেহের রঙ হবে লাল-সাদা মিশ্রিত, তার পরিধানের কাপড় হবে হালকা হলুদ রঙ বিশিষ্ট দু’খানি চাঁদর এবং তার মাথার চুল ভিজে না থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে ফোটায় ফোটায় পানি ঝরতে থাকবে। তিনি ইসলামের জন্য লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন, ক্রশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর নিধন করবেন এবং জিযিয়া কর রহিত করবেন। মহান আল্লাহ তাঁর সময়ে ইসলাম ছাড়া অন্য সব মতবাদকে ধ্বংস করে দিবেন)। এবং তিনি বলেন: (তখন কেমন হবে যখন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আকাশ থেকে) তোমাদের মাঝে অবতরণ করবেন, আর ইমাম হবেন তোমাদের থেকে। (আরেক বর্ণনায় রয়েছে: তোমাদের থেকেই তোমাদের ইমাম হবে)। ইবনু আবূ যি’ব (এক বর্ণনায়) বলেন: “তোমাদের থেকেই তোমাদের ইমাম হবে।”- এর অর্থ সম্পর্কে তুমি জানো কি? আমি বললাম: আমাকে অবহিত করুন। তিনি বলেন: তোমাদের মহান পরাক্রমশালী বরকতময় আল্লাহর কিতাব ও তোমাদের নাবী (সা.)-এর সুন্নাতের অনুসারী হয়েই তিনি তোমাদের ইমাম হবেন]।
    36. ঈসা (আ.)-কে দেখে উক্ত ইমাম পিছনে সরে যাবেন যেন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.) সামনে গিয়ে লোকদের সলাতে ইমামতি করতে পারেন। [ইমাম বলবেন, আপনি এগিয়ে এসে আমাদের সলাতে ইমামতি করুন] তখন ঈসা (আ.) তাঁর হাত উক্ত ইমামের দুই কাঁধের উপর রেখে বলবেন: [না, আপনারা একে অন্যের আমীর। আল্লাহর পক্ষ থেকে এটা উম্মাতের মর্যাদা] আপনি সামনে যান এবং সলাতের ইমামতি করুন। ফলে তাদের ইমাম তাদের নিয়ে সলাত আদায় করবেন।
    37. অতঃপর দাজ্জাল (ইলিয়া) পাহাড়ে আসবে এবং মুসলিমদের একটি দলকে ঘেরাও করবে। তখন এক ব্যক্তি অবরুদ্ধ মুসলিমদের বলবে, তোমরা এই তাগুতের অপেক্ষায় না থেকে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর সাথে মিলিত হও (শাহাদাত বরণ করো) অথবা আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়ী করেন? অতঃপর তারা তার আদেশ মোতাবেক সকালবেলায় দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
    38. [যখন মুসলিমরা তার মুকাবিলার উদ্দেশে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিবে এবং সমানভাবে সারিবদ্ধ হবে। এমন সময় সলাতের আযান হবে] [ফাজর সলাতের] [তারা সকাল করবেন এমন অবস্থায় যে, তখন ঈসা (আ.) তাদের সাথেই আছেন]। [অতঃপর তিনি লোকদের ইমামতি করবেন। তিনি যখন রুকু‘ থেকে মাথা উঠাবেন তখন বলবেন: সামিআল্লাহু লিমান হামীদাহ, আল্লাহ মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করেছেন এবং মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন]। অতঃপর সলাত শেষে ঈসা ইবনু মারইয়াম বলবেন : দরজা খুলে দাও। তখন দরজা খুলে দেয়া হবে। আর দরজার পিছনে থাকবে দাজ্জাল। তার সঙ্গে থাকবে সত্তর হাজার ইয়াহুদী। তাদের প্রত্যেকের সাথে চাঁদরে আবৃত কারুকার্য খচিত তলোয়ার থাকবে। [ঈসা (আ.) যমীনে অবতরণ করে দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন]।
    39. [অতঃপর ঈসা (আঃ) তাঁর অস্ত্র নিয়ে দাজ্জালের দিকে রওয়ানা হবেন]। যখন দাজ্জাল তাঁকে দেখবে, তখন সে এরূপ বিগলিত হয়ে যাবে যেমন পানিতে লবণ গলে যায়। [যদি তাকে এমনি ছেড়ে দেয় তবুও সে বিগলিত হয়ে হালকা হয়ে যাবে বরং আল্লাহর নাবী (ঈসা) তাকে নিজ হাতে হত্যা করবেন, এবং তিনি ঈমানদার সাথীদেরকে তাঁর বল্লমে ওর রক্ত দেখিয়ে দিবেন]। তিনি তাকে পূর্ব দিকের বাবে লুদে পাবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। [অতঃপর আল্লাহ তাকে ‘আক়াবায়ে আফীক়ের নিকটে ধ্বংস করবেন]।
    40. আল্লাহ ইয়াহুদীদের পরাজিত করবেন। [এবং মুসলিমদেরকে তাদের উপর কর্তৃত্ব দান করবেন]। [এবং মুসলিমরা তাদেরকে হত্যা করবে]। তখন ইয়াহুদীরা আল্লাহর সৃষ্ট যেকোন বস্তুর আড়ালে লুকিয়ে থাকুক না কেন, সে বস্তুকে আল্লাহ বাকশক্তি দান করবেন, চাই তা পাথর, গাছপালা, দেয়াল অথবা কোন জন্তু হোক না। তবে একটি গাছ হবে ব্যতিক্রম, যার নাম গারকাদাহ। একে ইয়াহুদীদের গাছ বলা হয়। সে কথা বলবে না। তবে সে বলবে: হে আল্লাহর মুসলিম বান্দা! এই তো ইয়াহুদী [আমার পিছনেই আছে] তুমি এসো এবং তাকে হত্যা করো।
    41. এর পরে মানুষ দীর্ঘ সাত বছর যাবৎ এমন শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করবে যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন দুশমনি থাকবে না।
    42. ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.) আমার উম্মাতের একজন হবেন। [মুহাম্মাদ (সা.)-কে সত্যায়ন করে এবং তার উম্মাতের একজন হয়ে আসবেন] তিনি হবেন ন্যায়পরায়ণ শাসক ও ইন্‌সাফকারী হিদায়াতপ্ৰাপ্ত ইমাম। [তিনি ইসলামের জন্য লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন] ক্রশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর নিধন করবেন, [তাঁর জন্য সলাতকে একত্র করা হবে], তিনি জিযিয়া কর রহিত করবেন এবং সদাক়াহ উসূল বন্দ করবেন! বকরী ও উটের উপর যাকাত ধার্য বন্ধ হবে এবং লোকদের মাঝে পারষ্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও ক্রোধের অবসান ঘটবে। [তখন মাল-সম্পদ গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যাবে না]। [এমনকি তখন একটিমাত্র সাজদাহ্ দুনিয়া ও এর মধ্যকার সমগ্র বস্তু থেকে উত্তম হবে]। [তখন দা‘ওয়াত হবে একমাত্র রাব্বুল ‘আলামীনের জন্য (অর্থাৎ সবাই একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে)]। — [ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! ইবনু মারইয়াম অবশ্যই রাওহার গিরিপথে তালবিয়া পাঠ করবেন এবং সেখান থেকে হাজ্জ বা ‘উমরাহ করবেন অথবা দুটোই একত্রে করবেন]।
    43. অতঃপর এক সম্প্রদায় লোক ঈসা (আ)-এর সমীপে আসবে যাদেরকে মহান আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। ঈসা (আ) তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে দিবেন এবং জান্নাতে তাদের জন্য নির্ধারিত স্থান সম্পর্কে তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। তিনি এ আলোচনারত অবস্থায় থাকতেই মহান আল্লাহ তাঁর কাছে ওয়াহী নাযিল করবেন: “আমি আমার একদল বান্দাকে বের করে দিয়েছি যাদের সাথে যুদ্ধ করার কারোর ক্ষমতা নেই। সুতরাং আপনি আমার ঈমানদার বান্দাদেরকে তূর পাহাড়ের দিকে নিয়ে একত্র করুন।” এদিকে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াজুজ মাজুজকে ছেড়ে দিবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলগুলো বুহাইরায়ে তাবারিয়া (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে পৌঁছবে এবং তাতে যত পানি আছে সব খেয়ে নিঃশেষ করবে। এরপর শেষ দল এসে বলবে, (পানি কোথায়?) এখানে তো কোন সময় পানি ছিল। [অতঃপর তারা (ইয়াজুজ মাজুজ) ঘুরতে ঘুরতে ‘জাবালে খামার’ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সেটা বাইতুল মুক়াদ্দাসে অবস্থিত একটি পাহাড়। সেখানে পৌঁছে তারা বলবে, আমরা তো যমীনের বাসিন্দাদের মেরে ফেলেছি, এবার চলো আসমানের বাসিন্দাকে হত্যা করবো। এই বলে তারা আকাশের দিকে তীর ছুঁড়তে থাকবে। অবশেষে মহান আল্লাহ তাদের তীরকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন]। এদিকে আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীগণ অবরুদ্ধ অবস্থায় অতিকষ্টে কাল যাপন করবেন। এমনকি একটা গরুর মাথাও তাদের কাছে বর্তমানের একশো স্বর্ণমুদ্রার চেয়ে অধিক শ্রেয় মনে হবে। এরপর আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাদের (ইয়াজুজ মাজুজের) গর্দানে এক প্রকার বিষাক্ত কীট সৃষ্টি করবেন, যার ফলে তারা এক নিমিষে সব মরে যাবে। তারপর আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীগণ যমীনের বুকে নেমে আসবেন। এসে দেখবেন যমীনে এক বিঘত জায়গাও খালি নেই বরং ইয়াজুজ মাজুজের লাশের পঁচাগলা ও তীব্র দুর্গন্ধে যমীন ভরে গেছে। তখন আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলে আল্লাহ একদল পাখি পাঠিয়ে দিবেন, যাদের গর্দান হবে উটের গর্দানের ন্যায়। তারা এগুলো বহন করে আল্লাহর যেখানে ইচ্ছা সেখানে ফেলে দিয়ে আসবে। অতঃপর মহান আল্লাহ প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যা পৃথিবীর আনাচে কানাচে কোন ঘর দুয়ারে না পৌঁছে থাকবে না। তা সমগ্র যমীনকে বিধৌত করে আয়নার মত পরিষ্কার করে দিবে। অতঃপর যমীনকে আদেশ করা হবে—“তোমার ফলমূল শস্যাদি উৎপন্ন করো এবং বরকত ফিরিয়ে দাও।” ঐ সময় বিরাট জনগোষ্ঠি একটিমাত্র আনার ফল খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে এবং একটি আনারের ছালের নীচে ছায়া গ্রহণ করবে। পশুর দুধে যথেষ্ট বরকত হবে। এমনকি একটি দুগ্ধবতী উষ্ট্রী এক বিরাট জনগোষ্ঠির জন্য যথেষ্ট হবে, একটি দুগ্ধবতী গাভী একটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে এবং একটি দুগ্ধবতী বকরী একটি ছোট গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে]। তখন বদল গরু হবে এই এই মুল্যের এবং ঘোড়া স্বল্প মূল্যে বিক্রি হবে। [তিনি (সা.) বলেন: (মাসীহ্ এর পরে যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য সুসংবাদ, মাসীহ্ এর পরে যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য সুসংবাদ। তখন আকাশকে আদেশ দেয়া হবে বৃষ্টি বর্ষণ করতে এবং যমীনকে আদেশ দেয়া হবে ফসলাদী উৎপন্ন করতে। তখন যদি তুমি সাফা (পাহাড়ের) উপরও তোমার বীজ বপন করো তাতে ফসল উৎপন্ন হবে। তখন পরস্পরের মাঝে কোন কৃপণতা, হিংসা ও ক্রোধ থাকবে না]।
    44. প্রতিটি বিষাক্ত জন্তুর বিষ দূরীভূত হবে। [পৃথিবীতে শান্তি-নিরাপত্তা আসবে, তখন সিংহ উটের সাথে চরবে, চিতাবাঘ গরুর সাথে এবং বাঘ বকরীর সাথে চরে বেড়াবে, শিশুরা সাপ নিয়ে খেলা করবে কিন্তু এসব তাদের কোন ক্ষতি করবে না] এমনকি দুধের শিশু তার হাত সাপের মুখে ঢুকিয়ে দিবে কিন্তু সে তার কোন ক্ষতি করবে না। একজন ক্ষুদ্র মানব শিশু সিংহকে তাড়া করবে। সেও তার কোন ক্ষতি করবে না। নেকড়ে বকরীর পালে এমনভাবে থাকবে যে, যেন সে তার (রক্ষক) কুকুর। পৃথিবী শান্তিপূর্ণ হয়ে যাবে। যেমন পানিতে পাত্র পরিপূর্ণ হয়। তখন সকলের কালেমা এক হবে। আল্লাহ ছাড়া কারোর ইবাদাত করা হবে না। যুদ্ধ-বিগ্রহ তার সরঞ্জাম রেখে দিবে। কুরাইশদের রাজত্বের অবসান হবে। যমীন রূপার তৈরি তশতরীর মত হয়ে যাবে। সে এমন ফসল উৎপন্ন করবে যেমন আদম (আ.) এর যুগে উৎপন্ন হতো।
    45. এরপর ঈসা (আ.) পৃথিবীতে চল্লিশ বছর জীবিত থাকার পর ইন্তিকাল করবেন এবং মুসলিমরা তাঁর জানাযার সলাত আদায় করবেন।
    46. তারা যখন এ অবস্থায় থাকবে তখন আল্লাহ [সিরিয়ার দিক থেকে একটা শীতল বাতাস ছেড়ে দিবেন। এ বাতাস তাদের বগলের নীচে প্রভাব ফেলবে (বুক স্পর্শ করবে) এবং তা প্রতিটি মু‘মিন ও প্রতিটি মুসলিমের রুহ কবয করবে। (আর ইবনু ‘উমারের হাদীসে আছে: শীতল বাতাসের স্পর্শ লেগে যমীনের বুকে এমন একটি লোকও জীবিত থাকবে না যার অন্তরে অণু পরিমাণও ঈমান আছে, বরং সবাই প্রাণ ত্যাগ করবে। এমনকি কেউ কোন পাহাড়ের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকলেও সেখানে বাতাস প্রবেশ করে তার জান কবয করবে) এরপর পৃথিবীতে কেবল মন্দ পাপী লোকেরাই জীবিত থাকবে [যাদের ফিতনা পাখির ন্যায় তড়িৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং যাদের স্বভাব পশুর স্বভাব তুল্য হবে। যারা কোন ভাল কাজ চিনবে না এবং মন্দ কাজকে মন্দ বলে জানবে না। অতঃপর শয়তান তাদের কাছে ছবি ধরে এসে বলবে, তোমরা কি আমার কথা শুনবে না? তখন তারা বলবে, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন করুন। এরপর সে মানুষকে মূর্তিপূজার আদেশ করবে। এ সময় তাদের কাছে প্রচুর খাদ্য সম্ভার মজুদ থাকবে, তাদের জীবন সুখ সাচ্ছন্দে কাটবে]। [নারী-পুরুষ গাধার মত প্রকাশে সঙ্গমে লিপ্ত হবে। আর তাদেরই উপরই ক়িয়ামাত ক়ায়িম হবে]।
    47. তারপর এক সময় সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। এর বিকট শব্দ যে শুনবে সে একবার ঘাড় নোয়াবে একবার উপরে উঠাবে। সর্বপ্রথম ঐ শব্দ এমন ব্যক্তি শুনবে, যে তার উটকে পুকুরে গোসল করাতে পানি ঘোলাটে করছে। সিঙ্গার আওয়ায শুনে সে বেহুঁশ হয়ে যাবে। এরপর সব মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে। এরপর মহান আল্লাহ বৃষ্টি ছেড়ে দিবেন অথবা বলেছেন বারিধারা বর্ষণ করবেন যেন তা কুয়াশা বা ছায়া— এ দুইয়ের মধ্যে বর্ণনাকারী সন্দিহান। এ বৃষ্টির ফলে যমীন থেকে মানুষের দেহসমূহ উত্থিত হতে থাকবে। “অতঃপর দ্বিতীয়বার সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। এ ফুঁকের পর সকল মানুষ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবে”— (সূরাহ আয-যুমার : ৬৮)। অতঃপর বলা হবে, হে সমবেত মানবগোষ্ঠী! আস তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সামনে। আর ফিরিশতাদের বলা হবে, “এদেরকে দাঁড় করাও এদের হিসাব নেয়া হবে”— (সূরাহ আস-সাফফাত : ২৪) আবার বলা হবে, জাহান্নামের দলকে বের কর। জিজ্ঞেস করা হবে, কত সংখ্যা থেকে কত? বলা হবে, প্রতি হাজার থেকে নয়শো নিরানব্বই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “এটাই সেই দিন যেদিন তরুণ বালকদের বুড়ো করে দিবে।” (সূরাহ আল-মুয্যাম্মিল : ১৭) “এটাই সেই দিন, যে দিন পায়ের নালাকে অনাবৃত করে ফেলবে।” (সূরাহ আল-কুলাম : ৪২)

    সমাপ্ত

    আল-হামদুলিল্লাহ

  • ধারাবাহিক তাখরীজ

    ধারাবাহিক তাখরীজ

    আবূ উমামাহ্ বর্ণিত হাদীসের প্রত্যেকটি (৪৯টি) অংশের সমর্থনে বর্ণিত বিভিন্ন শাহিদ হাদীসসমূহ। এ অধ্যায়ে আবূ উমামাহ্ বর্ণিত হাদীসের প্রতিটি অংশকে এক একটি অনুচ্ছেদ হিসেবে পৃথক করে তার সমর্থনে বর্ণিত হাদীস সহ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হবে।41

    (আবূ উমামাহ্ বর্ণিত হাদীসের সানাদ যদিও দুর্বল) কিন্তু হাদীসটি সহীহ পর্যায়ের। হাদীসের অংশগুলো পৃথক পৃথকভাবে বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য কিছু অংশ বাদে, যার শাহিদ বর্ণনা অথবা শক্তিশালী করার মতো কিছু আমি পাইনি, যেমন এর বর্ণনা অচিরেই আসছে। পাঠকদের সহজে বুঝার জন্য এর ব্যাখ্যা ও তাখরীজ আমি যথাস্থানে ধারাবাহিকভাবে ক্রমিক নম্বরসহ উল্লেখ করবো। সুতরাং আমি বলব:

    অনুচ্ছেদ ১

    এ অংশের অনেকগুলো হাদীস রয়েছে:

    প্রথম: হিশাম ইবনু ‘আমির হতে মারফূভাবে বর্ণিত এ শব্দে:

    ما بين خلق آدم إلى قيام الساعة خلق أكبر من الدجال (وفي رواية: فتنة أكبر من فتنة الدجال)

    “আদম সৃষ্টি হতে ক়িয়ামাত ক়ায়িম হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দাজ্জালের চেয়ে অধিক ভয়ানক সৃষ্টি আর নেই। (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: অধিক বড় ফিতনা আর নেই)।”

    মুসলিম (৮/২০৭), হাকিম (৪/৫২৮), আহমাদ (৪/২০১২১)। এর অন্য বর্ণনার একটি হচ্ছে হাকিমের বর্ণনা, তাতে অতিরিক্ত রয়েছে:

    “আল্লাহ নিকট।” হাকিম বলেন: বুখারীর শর্তে সহীহ। তবে বুখারী এটি বর্ণনা করেননি। তিনি যেরূপ বলেছেন। সম্ভবত তার শব্দের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। অন্যথায় মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন, যেমন আমি উল্লেখ করেছি। এছাড়া আদ-দানী (১৭৬/২, ১৭৭/১) এবং তিনি বৃদ্ধি করেছেন:

    (قد أكل الطعام ومشى في الأسواق)

    “যে খাদ্য খাবে এবং বাজারে চলাফেরা করবে।”

    দ্বিতীয়: ‘আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফ্‌ফাল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    (ما أهبط الله تعالى إلى الأرض – منذ خلق آدم إلى أن تقوم الساعة – فتنة أعظم من فتنة الدجال وقد قلت فيه قولا لم يقله أحد قبلي: إنه آدم جعد ممسوح عين اليسار على عينه ظفرة غليظة وإنه يبرئ الأكمه والأبرص ويقول: أنا ربكم . فمن قال: ربي الله فلا فتنة عليه ومن قال: أنت ربي . فقد افتتن يلبث فيكم ما شاء الله ثم ينزل عيسى ابن مريم مصدقا بمحمد صلى الله عليه و سلم على ملته إماما مهديا وحكها عدلا فيقتل الدجال) فكان الحسن يقول: ونرى ذلك عند الساعة

    “মহান আল্লাহ আদমকে (আ.) সৃষ্টি থেকে ক়িয়ামাত পর্যন্ত দাজ্জালের চাইতে অধিক বড় ফিতনা অবতীর্ণ করেননি। আর আমি দাজ্জাল সম্পর্কে এমন কথা বলেছি যা আমার পূর্বে কেউ বলেননি। সে হবে কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট লোক। তার বাম চোখ এমনভাবে মিশানো হবে যে, এর উপর মোটা চামড়ায় ঢাকা হবে। সে অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করবে। সে বলবে: আমি তোমাদের রব্ব। জবাবে যে ব্যক্তি বলবে, আমার রব্ব হচ্ছেন আল্লাহ, তার উপর কোন ফিতনা নেই। আর যে ব্যক্তি বলবে, তুমিই আমার রব্ব, সে তো ফিতনায় পতিত হলো। আল্লাহ যতদিন চাইবেন দাজ্জাল তোমাদের মাঝে অবস্থান করবে। অতঃপর ঈসা ইবনু মারইয়াম অবতরণ করবেন মুহাম্মাদ (সা.)-কে সত্যায়নকারী হিসেবে তাঁরই মিল্লাতের একজন হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম ও ন্যায়পরায়ন শাসকরূপে। অতঃপর তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন।”

    হাসান বলতেন: আমরা তা প্রত্যক্ষ করব ক়িয়ামাতের সন্নিকটে।

    হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তাবারানী ‘কাবীর’ ও ‘আওসাত’ গ্রন্থে এবং এর রিজাল সিক়াত। এর কতিপয়ের বৈপরিত্যে কোন সমস্যা নেই। যেমন বলেছেন “মাজমাউয যাওয়ায়িদ” গ্রন্থে (৭/৩৩৬)।

    আর চোখের বাক্যটির শাহিদ বর্ণনা রয়েছে আনাস বর্ণিত হাদীসে এ শব্দে:

    (إن الدجال أعور العين الشمال عليها ظفرة غليظة مكتوب بين عينيه: كافر )

    “দাজ্জালের বাম চোখ হবে কানা। তার চোখের উপর মোটা চামড়ায় ঢাকা হবে। তার দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে লিখা থাকবে: কাফির।” আহমাদ (৩/১১৫, ২০১) সহীহ সানাদে।

    তৃতীয়: হুযাইফাহ হতে। তিনি বলেন:

    ذكر الدجال عند رسول الله صلى الله عليه و سلم فقال: (لأنا لفتنة بعضكم أخوف عندي من فتنة الدجال ولن ينجو أحد مما قبلها إلا نجا منها وما صنعت فتنة منذ كانت الدنيا – صغيرة ولا كبيرة – إلا لفتنة الدجال)

    ‘একদা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট দাজ্জালের উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন: “অবশ্যই আমি তোমাদের পরষ্পরের ফিতনাকে দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও অধিক ভয় করি। যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী ফিতনাসমূহ থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকেও নিরাপত্তা পাবে। দুনিয়ার সূচনা হতে ছোট বড় যত ফিতনা হয়েছে তা দাজ্জালের ফিতনার জন্যই সংঘটিত হয়েছে।”

    আহমাদ (৫/৩৮৯), ইবনু হিব্বান (১৮৯৭)।42

    আমি বলি: এর সানাদ সহীহ এবং রিজাল সিব্বাত, বুখারী ও মুসলিমের রিজাল। আল্লামা হায়সামী বলেন (৭/৩৩৫): ‘হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ, বায্‌যার এবং এর রিজাল সহীহ।’

    চতুর্থ: জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তার হাদীস সামনে আসবে।

    অনুচ্ছেদ ২

    এ অংশের সমর্থনে কয়েকটি হাদীস রয়েছে:

    প্রথম: ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। অতঃপর দাজ্জালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন:

    (إني لأنذركموه وما من نبي إلا وقد أنذره قومه [ لقد أنذره نوح قومه ] ولكني سأقول لكم فيه قولا لم يقله نبي لقومه: [ تعلموا ] أنه أعور وإن الله ليس بأعور)

    “আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক করছি। এমন কোন নাবী নেই যিনি স্বীয় জাতিকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক না করেছেন। [নূহ (আ)] তাঁর কওমকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু আমি শীঘ্রই তার ব্যাপারে এমন কথা বলবো যা অন্যান্য নাবী তার কওমকে বলেননি। তোমরা জেনে রাখ, সে হবে কানা। আর আল্লাহ কানা নন।”

    ‘আবদুর রাযযাক ‘মুসান্নাফ’ ( ১১/৩৯০/২০৮২০), এবং তার থেকে আহমাদ (২/১৪৯)।

    (إن المسيح الدجال أعور العين اليمني كأن عينه عنبة طافية )

    “নিশ্চয়ই মাসীহ দাজ্জালের ডান চোখ কানা। যেন তার চোখ জ্যোতিহীন; ফুলে উঠা আঙ্গুর সদৃশ।”

    এটি বর্ণিত আছে সহীহাহ (হা/১৮৫৭)।

    দ্বিতীয়: আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    ( ما من نبي إلا وقد أنذر أمته الأعور الكذاب ألا إنه أعور وإن ربكم ليس بأعور مكتوب بين عينيه: ك ف ر [ يقرؤه كل مسلم ])

    “এমন কোন নাবী নেই যিনি স্বীয় উম্মাতকে মিথ্যাবাদী কানা দাজ্জাল সম্পর্কে সাবধান না করেছেন। জেনে রাখ, সে হবে কানা, আর তোমাদের রব্ব কানা নন। তার দুই চোখের মাঝখানে লিখা থাকবে: কাফ, ফা, র। [যা প্রতিটি মুসলিম পড়তে পারবে]।”

    বুখারী (১৩/৮৫), মুসলিম (৮/১৯৫), আবূ দাঊদ (২/২১৩), তিরমিযী (২২৪৬) তিনি একে সহীহ বলেছেন, আহমাদ (৩/১০৩, ১৭৩, ২৭৬, ২৯০), হাম্বাল (ক়াফ ৫১/২), ইবনু খুযাইমাহ্ ‘আত্-তাওহীদ’ (৩২ পৃ.), ইবনু মানদাহ (৯৭/১), অতিরিক্ত অংশটুকু মুসলিম, আহমাদ ও অন্যান্য। অন্য অনুচ্ছেদে আবূ সাঈদ আল-খুদরী হতে ‘মাজমাউয যাওয়ায়িদ’ (৭/৩৩৬-৩৩৭) এবং আসমা বিনতু ইয়াযীদ আনসারিয়্যাহ হতে, যা সামনে আসবে। এছাড়া ‘আয়িশাহ্ ও উম্মু সালামাহ্ হতে, যা সামনে আসছে।

    অনুচ্ছেদ ৩

    এ অংশটি পৃথকভাবে দুই বা ততোধিক হাদীসে এসেছে:

    প্রথম: আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত।  তিনি বলেন:

    قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (قلت: وذكر حديث فضل الصلاة في مسجده صلى الله عليه وسلم) (فإني آخر الأنبياء وإن مسجدي آخر المساجد)

    রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (তিনি মাসজিদে নাব্ববীতে সলাত আদায়ের ফাযীলাতের কথা উল্লেখ করেন) “আমিই নাবীদের মধ্যে সর্বশেষ আর মাসজিদ সমূহের মধ্যে আমার এ মাসজিদ হলো সর্বশেষ মাসজিদ।”

    মুসলিম (৪/১৩৫) এর অসংখ্য শাহিদ বর্ণনা রয়েছে। যেমন, একটি প্রসিদ্ধ হাদীস ‘আলী (রাযি.) সম্পর্কে: তুমি আমার কাছে মূসার নিকট হারূনের অবস্থানের মতো। তবে একথা ভিন্ন যে, আমার পরে কোন নাবী নেই!” এটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ, শাইখাইন ও অন্যান্যরা অনেকগুলো সূত্রে।

    দ্বিতীয়: ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত।  নাবী (সা.) বলেছেন:

    (نحن آخر الأمم وأول من يحاسب يقال: أين الأمة الأمية ؟ فنحن الآخرون الأولون)

    “উম্মাতসমূহের মধ্যে আমরাই সর্বশেষ উম্মাত। তবে আমাদের হিসাব হবে সবার আগে। বলা হবে: উম্মী উম্মাত কোথায়? আবির্ভাবে আমরাই সর্বশেষ। জান্নাতে প্রবেশে আমরাই সর্বাগ্রে।”

    ইবনু মাজাহ (২/৫৭৫)।

    আমি বলি: এর সানাদ সহীহ, যেমন আল্লামা বুসাইরী বলেছেন তার ‘আয-যাওয়ায়িদ’ গ্রন্থে (২৬৫/১)।

    তৃতীয়: মু‘আবিয়্যাহ্ ইবনু হাইদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:

    (إنكم وفيتم سبعين أمة أنتم آخرها وأكرمها على الله عز و جل)

    “তোমরা সত্তরটি উম্মাত পূর্ণ করেছ। তোমরাই হলে সর্বশেষ এবং মহান আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত (উম্মাত)।”

    দারিমী (২/৩১৩), আহমাদ (৫/৩, ৫)।

    আমি বলি: এর সানাদ হাসান। এটি রয়েছে মিশকাত (৬২৯৪)।

    অনুচ্ছেদ ৪

    এ অংশের সমর্থনে হুবহু শব্দে আমি হাদীস পাইনি। তবে এর কাছাকাছি পেয়েছি আবূ হুরাইরাহ বর্ণিত হাদীসে। তিনি বলেন: আমি সত্যবাদী ও সত্যায়িত আবূল কাসিমকে বলতে শুনেছি:

    (يخرج أعور الدجال مسيح الضلالة قبل المشرق في زمن اختلاف الناس وفرقة فيبلغ ما شاء الله أن يبلغ من الأرض في أربعين يوما – الله أعلم ما مقدارها – فيلقى المؤمنون شدة شديدة ثم ينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم من السماء فيؤم الناس ( ۱ ) فإذا رفع رأسه من ركعته قال: سمع الله لمن حمده قتل الله المسيح الدجال وظهر المسلمون)

    “পথভ্রষ্টকারী কানা মাসীহ দাজ্জাল বের হবে পূর্বদেশ থেকে মানুষের মতভেদ ও দলাদলির যুগে। আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী যে চল্লিশ দিনে পৃথিবীর যেখানে পৌঁছার পৌঁছবে। এর পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। তখন মু’মিনরা খুবই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। অতঃপর ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন এবং লোকদের ইমামতি করবেন (নেতৃত্ব দিবেন)।43 তিনি যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাবেন তখন বলবেন: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ। আল্লাহ মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করেছেন এবং মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন।”

    আল্লামা হায়সামী বলেন (৭/৩৪৯): হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বাযযার। এর রিজাল সহীহ রিজাল। তবে ‘আলী ইবনুল মুনযিব সিক়াহ রাবী। আর হাফিয বলেন: (১৩/৮৫): এর সানাদ জাইয়্যিদ।’ দেখুন মাওয়ারিদুয যামআন (১৮৯৮)।

    দাজ্জাল বের হওয়া সংক্রান্ত স্পষ্ট হাদীসাবলীর সংখ্যা প্রচুর। যার কিছু শীঘ্রই আসছে ইনশাআল্লাহ তা‘আলা। কিন্তু তাতে দৃঢ় অর্থবোধক শব্দ নেই, যেমন তার উক্তি: (لامحالة) অথবা (إنه لحق)। বরং দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদীসসমূহের প্রত্যেকটি তার বের হওয়ার বিষয়টি জোরদার করেছে, তাকিদ দিয়েছে। আর নাবী (সা.)-এর হাদীসের প্রত্যেকটিই সত্য, হাক়। তিনি সবই সত্য বলেছেন চাই তা সীগায়ে তাকিদ (জোরালো শব্দে) বর্ণিত হোক বা না হোক। “তিনি (মুহাম্মাদ) নিজের পক্ষ হতে খেয়াল মতো কথা বলেন না, তার নিকট যা কিছু ওয়াহী করা হয় তিনি শুধু তা-ই বলেন।” (সূরাহ্ আল-নাজম: ৩, ৪ )

    হ্যাঁ, আদ-দানী ‘আল-ফিতান’ গ্রন্থে (১৪১/১) হাসান হতে মুরসালভাবে ঈসা (আ) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন:

    (وإنه نازل لا محالة فإذا رأيتموه فاعرفوه …)

    “তিনি অবশ্যই অবতরণ করবেন: তোমরা তাকে দেখেই চিনতে পারবে …।”

    হাদীসটি আরো বর্ণনা করেছেন ইবনু হিব্বান (১৯০৪) সালিহ ইবনু ‘উমার হতে, ‘আসিম ইবনু কুলাইব থেকে তার পিতার মাধ্যমে আবূ হুরাইরাহ সূত্রে। তবে তাতে এ কথাটি নেই: “আমি শপথ করে বলছি, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন …।”

    এর সানাদ সহীহ।

    আর ক্রোধান্বিত হওয়ার বাক্যটি রয়েছে মুসলিম (৮/১৯৪), ইবনু হিব্বান (৬৭৫৫), আহমাদ (৫/২৮৪)।

  • আল-বাহলী বর্ণিত হাদীস

    আল-বাহলী বর্ণিত হাদীস

    মাসীহ দাজ্জালের কিস্‌সা, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ ও দাজ্জালকে হত্যা করা সম্পর্কে আবূ উমামাহ আল-বাহিলী (রাযি.) বর্ণিত হাদীস তাখরীজ সহ

    حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ الْمُحَارِبِيُّ، عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ رَافِعٍ أَبِي رَافِعٍ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ السَّيْبَانِيِّ، يَحْيَى بْنِ أَبِي عَمْرٍو عَنْ أَبِي أُمَامَةَ الْبَاهِلِيِّ، قَالَ خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَكَانَ أَكْثَرُ خُطْبَتِهِ حَدِيثًا حَدَّثَنَاهُ عَنِ الدَّجَّالِ وَحَذَّرَنَاهُ فَكَانَ مِنْ قَوْلِهِ أَنْ قَالَ :‏

    1. إِنَّهُ لَمْ تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الأَرْضِ مُنْذُ ذَرَأَ اللَّهُ ذُرِّيَّةَ آدَمَ أَعْظَمَ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ
    2. وَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَبْعَثْ نَبِيًّا إِلاَّ حَذَّرَ أُمَّتَهُ الدَّجَّالَ
    3. وَأَنَا آخِرُ الأَنْبِيَاءِ وَأَنْتُمْ آخِرُ الأُمَمِ
    4. وَهُوَ خَارِجٌ فِيكُمْ لاَ مَحَالَةَ
    5. وَإِنْ يَخْرُجْ وَأَنَا بَيْنَ ظَهْرَانَيْكُمْ فَأَنَا حَجِيجٌ لِكُلِّ مُسْلِمٍ وَإِنْ يَخْرُجْ مِنْ بَعْدِي فَكُلُّ امْرِئٍ حَجِيجُ نَفْسِهِ وَاللَّهُ خَلِيفَتِي عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
    6. وَإِنَّهُ يَخْرُجُ مِنْ خَلَّةٍ بَيْنَ الشَّامِ وَالْعِرَاقِ فَيَعِيثُ يَمِينًا وَيَعِيثُ شِمَالاً ‏.‏ يَا عِبَادَ اللَّهِ أَيُّهَا النَّاسُ فَاثْبُتُوا
    7. فَإِنِّي سَأَصِفُهُ لَكُمْ صِفَةً لَمْ يَصِفْهَا إِيَّاهُ نَبِيٌّ قَبْلِي
    8. إِنَّهُ يَبْدَأُ فَيَقُولُ أَنَا نَبِيٌّ وَلاَ نَبِيَّ بَعْدِي
    9. ثُمَّ يُثَنِّي فَيَقُولُ أَنَا رَبُّكُمْ ‏.‏ وَلاَ تَرَوْنَ رَبَّكُمْ حَتَّى تَمُوتُوا
    10. وَإِنَّهُ أَعْوَرُ وَإِنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ
    11. وَإِنَّهُ مَكْتُوبٌ بَيْنَ عَيْنَيْهِ كَافِرٌ
    12. يَقْرَؤُهُ كُلُّ مُؤْمِنٍ كَاتِبٍ أَوْ غَيْرِ كَاتِبٍ
    13. وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنَّ مَعَهُ جَنَّةً وَنَارًا فَنَارُهُ جَنَّةٌ وَجَنَّتُهُ نَارٌ
    14. فَمَنِ ابْتُلِيَ بِنَارِهِ فَلْيَسْتَغِثْ بِاللَّهِ وَلْيَقْرَأْ فَوَاتِحَ الْكَهْفِ
    15. فَتَكُونَ عَلَيْهِ بَرْدًا وَسَلاَمًا كَمَا كَانَتِ النَّارُ عَلَى إِبْرَاهِيمَ
    16. وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يَقُولَ لأَعْرَابِيٍّ أَرَأَيْتَ إِنْ بَعَثْتُ لَكَ أَبَاكَ وَأُمَّكَ أَتَشْهَدُ أَنِّي رَبُّكَ فَيَقُولُ نَعَمْ ‏.‏ فَيَتَمَثَّلُ لَهُ شَيْطَانَانِ فِي صُورَةِ أَبِيهِ وَأُمِّهِ فَيَقُولاَنِ يَا بُنَىَّ اتَّبِعْهُ فَإِنَّهُ رَبُّكَ ‏.‏
    17. وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يُسَلَّطَ عَلَى نَفْسٍ وَاحِدَةٍ فَيَقْتُلَهَا
    18. وَيَنْشُرَهَا بِالْمِنْشَارِ حَتَّى يُلْقَى شِقَّتَيْنِ ثُمَّ يَقُولُ انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي هَذَا فَإِنِّي أَبْعَثُهُ الآنَ ثُمَّ يَزْعُمُ أَنَّ لَهُ رَبًّا غَيْرِي ‏.‏ فَيَبْعَثُهُ اللَّهُ وَيَقُولُ لَهُ الْخَبِيثُ مَنْ رَبُّكَ فَيَقُولُ رَبِّيَ اللَّهُ وَأَنْتَ عَدُوُّ اللَّهِ أَنْتَ الدَّجَّالُ وَاللَّهِ مَا كُنْتُ بَعْدُ أَشَدَّ بَصِيرَةً بِكَ مِنِّي الْيَوْمَ ‏‏.‏
    19. قَالَ أَبُو الْحَسَنِ الطَّنَافِسِيُّ فَحَدَّثَنَا الْمُحَارِبِيُّ حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ الْوَلِيدِ الْوَصَّافِيُّ عَنْ عَطِيَّةَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏”‏ ذَلِكَ الرَّجُلُ أَرْفَعُ أُمَّتِي دَرَجَةً فِي الْجَنَّةِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ وَاللَّهِ مَا كُنَّا نُرَى ذَلِكَ الرَّجُلَ إِلاَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ حَتَّى مَضَى لِسَبِيلِهِ ‏.‏ قَالَ الْمُحَارِبِيُّ ثُمَّ رَجَعْنَا إِلَى حَدِيثِ أَبِي رَافِعٍ قَالَ ‏: وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يَأْمُرَ السَّمَاءَ أَنْ تُمْطِرَ فَتُمْطِرَ وَيَأْمُرَ الأَرْضَ أَنْ تُنْبِتَ فَتُنْبِتَ
    20. وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يَمُرَّ بِالْحَىِّ فَيُكَذِّبُونَهُ فَلاَ تَبْقَى لَهُمْ سَائِمَةٌ إِلاَّ هَلَكَتْ
    21. وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يَمُرَّ بِالْحَىِّ فَيُصَدِّقُونَهُ فَيَأْمُرَ السَّمَاءَ أَنْ تُمْطِرَ فَتُمْطِرَ وَيَأْمُرَ الأَرْضَ أَنْ تُنْبِتَ فَتُنْبِتَ حَتَّى تَرُوحَ مَوَاشِيهِمْ مِنْ يَوْمِهِمْ ذَلِكَ أَسْمَنَ مَا كَانَتْ وَأَعْظَمَهُ وَأَمَدَّهُ خَوَاصِرَ وَأَدَرَّهُ ضُرُوعًا
    22. وَإِنَّهُ لاَ يَبْقَى شَىْءٌ مِنَ الأَرْضِ إِلاَّ وَطِئَهُ وَظَهَرَ عَلَيْهِ إِلاَّ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةَ
    23. لاَ يَأْتِيهِمَا مِنْ نَقْبٍ مِنْ نِقَابِهِمَا إِلاَّ لَقِيَتْهُ الْمَلاَئِكَةُ بِالسُّيُوفِ صَلْتَةً
    24. حَتَّى يَنْزِلَ عِنْدَ الظُّرَيْبِ الأَحْمَرِ عِنْدَ مُنْقَطَعِ السَّبَخَةِ
    25. فَتَرْجُفُ الْمَدِينَةُ بِأَهْلِهَا ثَلاَثَ رَجَفَاتٍ فَلاَ يَبْقَى مُنَافِقٌ وَلاَ مُنَافِقَةٌ إِلاَّ خَرَجَ إِلَيْهِ
    26. فَتَنْفِي الْخَبَثَ مِنْهَا كَمَا يَنْفِي الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ
    27. وَيُدْعَى ذَلِكَ الْيَوْمُ يَوْمَ الْخَلاَصِ ‏.‏
    28. فَقَالَتْ أُمُّ شَرِيكٍ بِنْتُ أَبِي الْعُكَرِ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَأَيْنَ الْعَرَبُ يَوْمَئِذٍ قَالَ ‏”‏ هُمْ يَوْمَئِذٍ قَلِيلٌ
    29. وَجُلُّهُمْ بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ
    30. وَإِمَامُهُمْ رَجُلٌ صَالِحٌ
    31. فَبَيْنَمَا إِمَامُهُمْ قَدْ تَقَدَّمَ يُصَلِّي بِهِمُ الصُّبْحَ إِذْ نَزَلَ عَلَيْهِمْ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ الصُّبْحَ فَرَجَعَ ذَلِكَ الإِمَامُ يَنْكُصُ يَمْشِي الْقَهْقَرَى لِيَتَقَدَّمَ عِيسَى يُصَلِّي بِالنَّاسِ فَيَضَعُ عِيسَى يَدَهُ بَيْنَ كَتِفَيْهِ ثُمَّ يَقُولُ لَهُ تَقَدَّمْ فَصَلِّ فَإِنَّهَا لَكَ أُقِيمَتْ ‏.‏ فَيُصَلِّي بِهِمْ إِمَامُهُمْ
    32. فَإِذَا انْصَرَفَ قَالَ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلاَمُ افْتَحُوا الْبَابَ ‏.‏ فَيُفْتَحُ وَوَرَاءَهُ الدَّجَّالُ
    33. مَعَهُ سَبْعُونَ أَلْفِ يَهُودِيٍّ كُلُّهُمْ ذُو سَيْفٍ مُحَلًّى وَسَاجٍ
    34. فَإِذَا نَظَرَ إِلَيْهِ الدَّجَّالُ ذَابَ كَمَا يَذُوبُ الْمِلْحُ فِي الْمَاءِ
    35. وَيَنْطَلِقُ هَارِبًا وَيَقُولُ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلاَمُ إِنَّ لِي فِيكَ ضَرْبَةً لَنْ تَسْبِقَنِي بِهَا ‏.‏
    36. فَيُدْرِكُهُ عِنْدَ بَابِ اللُّدِّ الشَّرْقِيِّ فَيَقْتُلُهُ
    37. فَيَهْزِمُ اللَّهُ الْيَهُودَ فَلاَ يَبْقَى شَىْءٌ مِمَّا خَلَقَ اللَّهُ يَتَوَارَى بِهِ يَهُودِيٌّ إِلاَّ أَنْطَقَ اللَّهُ ذَلِكَ الشَّىْءَ لاَ حَجَرَ وَلاَ شَجَرَ وَلاَ حَائِطَ وَلاَ دَابَّةَ – إِلاَّ الْغَرْقَدَةَ فَإِنَّهَا مِنْ شَجَرِهِمْ لاَ تَنْطِقُ – إِلاَّ قَالَ يَا عَبْدَ اللَّهِ الْمُسْلِمَ هَذَا يَهُودِيٌّ فَتَعَالَ اقْتُلْهُ ‏”‏ ‏.‏
    38. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏”‏ وَإِنَّ أَيَّامَهُ أَرْبَعُونَ سَنَةً
    39. السَّنَةُ كَنِصْفِ السَّنَةِ وَالسَّنَةُ كَالشَّهْرِ وَالشَّهْرُ كَالْجُمُعَةِ
    40. وَآخِرُ أَيَّامِهِ كَالشَّرَرَةِ
    41. يُصْبِحُ أَحَدُكُمْ عَلَى بَابِ الْمَدِينَةِ فَلاَ يَبْلُغُ بَابَهَا الآخَرَ حَتَّى يُمْسِيَ ‏”‏ ‏.‏
    42. فَقِيلَ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ نُصَلِّي فِي تِلْكَ الأَيَّامِ الْقِصَارِ قَالَ ‏”‏ تَقْدُرُونَ فِيهَا الصَّلاَةَ كَمَا تَقْدُرُونَهَا فِي هَذِهِ الأَيَّامِ الطِّوَالِ ثُمَّ صَلُّوا ‏”‏ ‏.‏
    43. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏”‏ فَيَكُونُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فِي أُمَّتِي حَكَمًا عَدْلاً وَإِمَامًا مُقْسِطًا يَدُقُّ الصَّلِيبَ وَيَذْبَحُ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَيَتْرُكُ الصَّدَقَةَ فَلاَ يُسْعَى عَلَى شَاةٍ وَلاَ بَعِيرٍ وَتُرْفَعُ الشَّحْنَاءُ وَالتَّبَاغُضُ وَتُنْزَعُ حُمَةُ كُلِّ ذَاتِ حُمَةٍ حَتَّى يُدْخِلَ الْوَلِيدُ يَدَهُ فِي الْحَيَّةِ فَلاَ تَضُرَّهُ
    44. وَتُفِرُّ الْوَلِيدَةُ الأَسَدَ فَلاَ يَضُرُّهَا وَيَكُونُ الذِّئْبُ فِي الْغَنَمِ كَأَنَّهُ كَلْبُهَا
    45. وَتُمْلأُ الأَرْضُ مِنَ السِّلْمِ كَمَا يُمْلأُ الإِنَاءُ مِنَ الْمَاءِ وَتَكُونُ الْكَلِمَةُ وَاحِدَةً فَلاَ يُعْبَدُ إِلاَّ اللَّهُ وَتَضَعُ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا وَتُسْلَبُ قُرَيْشٌ مُلْكَهَا وَتَكُونُ الأَرْضُ كَفَاثُورِ الْفِضَّةِ تُنْبِتُ نَبَاتَهَا بِعَهْدِ آدَمَ حَتَّى يَجْتَمِعَ النَّفَرُ عَلَى الْقِطْفِ مِنَ الْعِنَبِ فَيُشْبِعَهُمْ وَيَجْتَمِعَ النَّفَرُ عَلَى الرُّمَّانَةِ فَتُشْبِعَهُمْ وَيَكُونَ الثَّوْرُ بِكَذَا وَكَذَا مِنَ الْمَالِ وَتَكُونَ الْفَرَسُ بِالدُّرَيْهِمَاتِ ‏”‏ ‏.‏
    46. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا يُرْخِصُ الْفَرَسَ قَالَ ‏”‏ لاَ تُرْكَبُ لِحَرْبٍ أَبَدًا ‏”‏ ‏.‏
    47. قِيلَ لَهُ فَمَا يُغْلِي الثَّوْرَ قَالَ ‏”‏ تُحْرَثُ الأَرْضُ كُلُّهَا
    48. وَإِنَّ قَبْلَ خُرُوجِ الدَّجَّالِ ثَلاَثَ سَنَوَاتٍ شِدَادٍ يُصِيبُ النَّاسَ فِيهَا جُوعٌ شَدِيدٌ يَأْمُرُ اللَّهُ السَّمَاءَ فِي السَّنَةِ الأُولَى أَنْ تَحْبِسَ ثُلُثَ مَطَرِهَا وَيَأْمُرُ الأَرْضَ فَتَحْبِسُ ثُلُثَ نَبَاتِهَا ثُمَّ يَأْمُرُ السَّمَاءَ فِي السَّنَةِ الثَّانِيَةِ فَتَحْبِسُ ثُلُثَىْ مَطَرِهَا وَيَأْمُرُ الأَرْضَ فَتَحْبِسُ ثُلُثَىْ نَبَاتِهَا ثُمَّ يَأْمُرُ اللَّهُ السَّمَاءَ فِي السَّنَةِ الثَّالِثَةِ فَتَحْبِسُ مَطَرَهَا كُلَّهُ فَلاَ تَقْطُرُ قَطْرَةٌ وَيَأْمُرُ الأَرْضَ فَتَحْبِسُ نَبَاتَهَا كُلَّهُ فَلاَ تُنْبِتُ خَضْرَاءَ فَلاَ تَبْقَى ذَاتُ ظِلْفٍ إِلاَّ هَلَكَتْ إِلاَّ مَا شَاءَ اللَّهُ ‏”‏ ‏.‏
    49. قِيلَ فَمَا يُعِيشُ النَّاسَ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ قَالَ ‏”‏ التَّهْلِيلُ وَالتَّكْبِيرُ وَالتَّسْبِيحُ وَالتَّحْمِيدُ وَيُجْرَى ذَلِكَ عَلَيْهِمْ مَجْرَى الطَّعَامِ ‏”‏ ‏.‏
    50. قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ سَمِعْتُ أَبَا الْحَسَنِ الطَّنَافِسِيَّ يَقُولُ سَمِعْتُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ الْمُحَارِبِيَّ يَقُولُ يَنْبَغِي أَنْ يُدْفَعَ هَذَا الْحَدِيثُ إِلَى الْمُؤَدِّبِ حَتَّى يُعَلِّمَهُ الصِّبْيَانَ فِي الْكُتَّابِ ‏.
  • অনুবাদকের কথা

    অনুবাদকের কথা

    বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

    সকল প্রশংসা মহান রব্বুল ‘আলামীনের জন্য এবং দরূদ ও সালাম জানাই নাবী মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতি।

    যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর ‘মাসীহ দাজ্জালের কিস্‌সা’ পুস্তকটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে পেরে সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই। পৃথিবীর বুকে যত ফিতনা ঘটেছে এবং ক়িয়ামাতের পূর্ব পর্যন্ত ঘটবে তার মধ্যে কানা দাজ্জালের ফিতনাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তাই সমস্ত নাবী-রাসূলগণ স্বীয় উম্মাতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন। কাজেই মুসলিমদের এ বিষয়ে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা একান্তই জরুরি। অত্র পুস্তকে আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) প্রথমে দাজ্জাল সম্পর্কে আবূ উমামাহ্ (রা.) বর্ণিত একটি বৃহৎ হাদীস উল্লেখ করেন। অতঃপর তিনি হাদীসের বক্তব্যগুলোকে মোট ৪৯টি অংশে ভাগ করেন এবং প্রতিটি অংশকে এক একটি অনুচ্ছেদ ধারা গণ্য করে তার সমর্থনে অন্যান্য সাহাবায়ি কিরামগণের থেকে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সে সব হাদীস একত্রিত করে তাহক়ীক়ের মাধ্যমে হাদীসগুলোর অবস্থান তুলে ধরেন। পরিশেষ তিনি দাজ্জাল সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে যা কিছু সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে তা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেন। শায়খ আলবানী যেভাবে তাঁর লিখনীকে সাজিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। পুস্তকটি পাঠের মাধ্যমে দাজ্জাল সম্পর্কে যেমন সঠিক জ্ঞান অর্জন করা যাবে, অপরদিকে দাজ্জাল সম্পর্কে যে সব ভুল ধারণা ছিল এবং যঈফ ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রয়েছে তাও অবগত হওয়া যাবে। এই গবেষণামূলক চমৎকার লিখনীর জন্য আমরা সম্মানিত শায়খের প্রতি কৃতজ্ঞ।

    পুস্তক প্রকাশ, অনুবাদ ও প্রুফ সংশোধনে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশেষ করে দীনী ভাই ঈসা মিঞা, জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ আলী, সাজিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনের প্রতি। আল্লাহ সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন—আমীন।

    পরিশেষে সম্মানিত পাঠকের প্রতি অনুরোধ রইলো, অনুবাদের কাজে কোথাও কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে আমাদেরকে জানাবেন। ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে তা সংশোধন করা হবে।

    বিনীত

    আহসানুল্লাহ বিন সানাউল্লাহ

  • আল্লামা আলবানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

    আল্লামা আলবানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

    মহান আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ সুন্নাহ উপস্থাপন করার তাওফীক যে কয়জন বান্দাকে দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে হাফিজ যাহাবী (রহ.) ও হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.)-এর পর আল্লামা নাসিরুদ্দীন (রহ.)-এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর পুরো নাম আবূ ‘আবদুর রহমান মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)।

    জন্ম: যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) ১৯১৪ ঈসায়ী সনে পূর্ব ইউরোপের একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ আলবেনিয়ার রাজধানী কুদরাহতে জন্মগ্রহণ করেন। আলবেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করার কারণে তিনি ‘আলবানী’ নামে অভিহিত হন। তাঁর পিতার নাম নূহ নাতাজী আলবানী।

    শিক্ষা-দীক্ষা: দামিস্কের একটি মাদ্‌রাসা থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তাঁর পিতার বন্ধু শায়খ সায়ীদ আল-বুরহানীর নিকট ফিক্‌হের বিভিন্ন গ্রন্থ এবং আরবী সাহিত্য ও বালাগাত প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। একবার তিনি মিশরের আল্লামা রশীদ রিয়া সম্পাদিত “আল-মানার”-এর একটি সংখ্যায় ইমাম গাযযালী (রহ.)-এর প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধই তাঁকে হাদীস চর্চা ও রিজাল শাস্ত্রের গবেষণায় পিপাসার্ত করে তুলে। পরবর্তীতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, সাধারণ মুসলিমদের সামনে আল্লাহর নাবী ﷺ-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ উপস্থাপন করবেন। আল্লাহ তাঁর এই ইচ্ছাকে বাস্তবরূপ দান করার তাওফীক দান করেছেন এবং তার জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

    কর্মজীবন: আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) নিজেই বলেছেন—‘আল্লাহ আমাকে অসংখ্য সম্পদ দান করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো, আমার পিতা আমাকে ঘড়ি মেরামত করার কাজ শিখানো।’ যৌবনের প্রথম দিকে তিনি ঘড়ি মেরামত করে জীবিকা অর্জন করেন। কিন্তু পাশাপাশি অধিকাংশ সময় তিনি হাদীস অধ্যয়ন ও গবেষণা এবং বই লেখার কাজে ব্যয় করতেন। তিনি মদীনাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। কর্ম জীবনের অধিকাংশ সময়েই তিনি গবেষণা, লেখালেখি ও বক্তৃতা দানে ব্যস্ত থাকেন। হাজার বছর ধরে হাদীস শাস্ত্রের যে খিদমাত হয়নি বিংশ শতাব্দীতে তিনি তা করার তাওফীক লাভ করেন।

    রচনাবলী: আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩০০। তার মধ্যে কয়েকটি হলো, ১. সিলসিলাতুল আহাদীস যঈফাহ্ ওয়াল মাউযূ’আহ; ২. সিলসিলাতুল আহাদীস সহীহাহ; ৩. সহীহ ও যঈফ সুনান আবূ দাউদ; ৪. সহীহ ও যঈফ তিরমিযী; ৫. সহীহ ও যঈফ সুনান নাসাঈ; ৬. সহীহ ও যঈফ সুনান ইবনু মাজাহ; ৭. সহীহ ও যঈফ আদাবুল মুফরাদ; ৮. তাহ্‌ক়ীক় মিশকাতুল মাসাবীহ; ৯. সিফাতু সলাতিন্ নাবী ﷺ; ১০. সলাতুত তারাবীহ; ১১. হাজ্জ, উমরাহ ও যিয়ারাহ; ১২. কিস্‌সাতু মাসীহিদ্‌ দাজ্জাল ইত্যাদি।

    আলবানী সম্পর্কে মতামত: সাউদী আরবের প্রাক্তন গ্রান্ড মুফতি শায়খ ‘আবদুল ‘আযীয বিন বায্ (রহ.) তাঁকে যুগ মুহাদ্দিস নামে অভিহিত করেছেন। ইসলামী যুবকদের বিশ্ব সংগঠন-আন্‌নাদওয়াতুল ‘আ-লামিয়্যাহ লিশ্‌শাবা-বিল ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারী ড. মা-নি’ ইবনু হাম্মাদ আল্‌জুহানী বলেন, আল্লামা আলবানী সম্পর্কে বলা যায় যে, বর্তমান যুগে আকাশের নীচে তাঁর চেয়ে বড় হাদীস বিশারদ আর কেউ নেই। ড. সুহায়িব হাসান বলেন, আলবানী বিংশ শতকের হাদীস শাস্ত্রের মু’জিযাহ (অলৌকিক ঘটনা)।

    মৃত্য: ১৯৯৯ ঈসায়ী সনের ২ অক্টোবর আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) জর্দানের রাজধানী আম্মানে ৮৬ বছর বয়সে ইন্‌তিকাল করেন। হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদানের জন্য বিশ্ববাসী তাঁকে স্মরণ করে রাখবে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন—আমীন।

  • মাসীহ দাজ্জালের কিস্‌সা

    মাসীহ দাজ্জালের কিস্‌সা

    দাজ্জাল!

    মাসীহ দাজ্জালের কিস্‌সা,
    ঈসা আ.-এর অবতরণ ও দাজ্জালকে হত্যা করা সম্পর্কে

    মূল

    আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ.

    অনুবাদ

    আহসানুল্লাহ বিন সানাউল্লাহ

    দাওরা হাদীস : মাদ্‌রাসা মুহাম্মাদিয়া ‘আরাবিয়্যাহ, ঢাকা

    এম. এ. (ফার্স্ট ক্লাস) : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    এম. ফিল. (গবেষক) : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    প্রকাশনায়

    আলবানী একাডেমি

    মোবাইল : 01199149380, 01681276724

    গ্রন্থস্বত্ত্ব

    অনুবাদক কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত

    প্রথম প্রকাশ

    মে ২০১১ ঈসায়ী

    কম্পিউটার কম্পোজ

    আহসান কম্পিউটার্স

    অঙ্গসজ্জায়

    সাজিদুর রহমান

    ওসিআর

    এডুলিচার পাঠশালা

  • অবতরণিকা

    অবতরণিকা

    দ্বিতীয় দাতা-কর্ণ এবং দয়ার সাগর অনাথ-বান্ধব বঙ্গের “বিদ্যাসাগর”, ১৮৯১ খৃঃ অব্দে ২৯শে জুলাই বা ১২৯৮ সালে ১৩ই শ্রাবণ, মঙ্গলবার রাত্রি ২টা ১৮ মিনিটে ইহলোক ত্যাগ করিয়াছেন।

    বলা বাহুল্য,—“বিদ্যাসাগর” বলিলে, ৺ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেই বুঝায়। সেই বিশ্ব-বিশ্রুত “বিদ্যাসাগর” ত্রিংশৎ বৎসর হইল, অমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। এ কর্ম্মক্ষেত্রে সেই কর্ম্ম-শূর আপন কর্ম্ম সাধন করিয়া, অপেক্ষাকৃত অল্পতর ভাগ্যহীন ব্যক্তিবর্গকে কর্ম্মের শিক্ষা-দীক্ষা দিয়া, স্বস্থানে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়াছেন। জীবমাত্রের এই অবস্থা। সেই আদ্যা শক্তি মূলা প্রকৃতির এই ব্যবস্থা। অবোধ মায়াময় জীব আমরা, মায়া-মুগ্ধ হইয়া, এ সব তত্ত্ব বুঝিয়াও, বুঝিতে পারি না। এ অনিত্য সংসারে কেবল বিয়োগবিলাপে অধীর হইয়া পড়ি। তাই বিদ্যাসাগরের স্মৃতিতে এখনও বিয়োগ-বাড়বানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠে। যে যায়, সে ত আর আসে না। যায়, কিন্তু স্মৃতি যে জাগে! স্মৃতি ত নয়, সে যে জ্বালাময়ী জ্বালা! সে জ্বালা জুড়াইব কিসে?

    যাঁহার করুণায় শত শত নিরন্ন নিরাশ্রম, অন্নাশ্রয় পাইত; যাঁহার আশ্রয়ে থাকিয়া, অগণিত অনাথ আতুর দীন হীন দুঃস্থ দরিদ্র অসহায় আত্মীয়-নির্ব্বিশেষে প্রতিপালিত হইত; যাঁহার অপার দয়া-দাক্ষিণ্যে কপর্দ্দকহীন অধমর্ণ, উত্তমর্ণের নিদারুণ নিপীড়ন হইতে রক্ষা পাইত; যাঁহার সহৃদয়তাগুণে মল-মূত্রপুরিত পরিত্যক্ত রুগ্ন পথিক, গৃহে আনীত হইয়া যথাযোগ্য ঔষধ-পথ্য পাইত; যাঁহার জ্বলন্ত জীবন্ত দৃষ্টান্তে অতিবড় কু-পুত্ত্রও অতুল মাতৃভক্তি শিক্ষা পাইত; যাঁহার অসাধারণ অব্যবসায়, অদম্য উদ্যম-উৎসাহ, অকুণ্ঠিত নির্ভীকতা, অলৌকিক শ্রমাকুষ্ঠিতা, অসীম কর্ত্তব্য-পরায়ণতা, অমানুষিক সরলতা দেখিয়া বিদেশী প্রবাসী লোকেও সবিস্ময়ে সহস্ৰ বার মস্তক অবনত করিত, সেই ক্ষণজন্ম ভাগ্যবান্ পুরুষ লোকান্তরিত! বল দেখি, তাঁহার স্মৃতি পাসরি কিসে?

    এখনও চারি দিকে কত কাঙালের পর্ণ-কুটীরে পূর্ণ হাহাকার! এখনও কত অনাথাশ্রমে আকুল প্রাণের মর্ম্মভেদী গভীর চীৎকার! সে সব কথা ভাবিলে চক্ষু ফাটিয়া রক্ত বাহির হয়! সেই করুণপ্রতিম অনুপম করুণাময়ের কথা স্মরণ হইলে হৃদয়ের শোক-সাগর উথলিয়া উঠে।

    বিদ্যা-বুদ্ধিতে “বিদ্যাসাগর” অপেক্ষা বড় অনেক থাকিতে পারেন; কিন্তু দয়া-দক্ষিণ্যে তাঁহা অপেক্ষা বড় অতি অল্প লোক দেখিতে পাই। এমন নিরন্নের অন্নদাতা, ভয়ার্ত্তের ভয়ত্রাতা, বিপক্ষের উদ্ধারকর্ত্তা এবং দীন-হীনের দয়াল পালক পিতা, এ কলিযুগে, এ সংসারে বড় বিরল। তিনি যে দয়ার অপূর্ব্ব অবতার! তিনি যে মুত্তিমতী দয়ার পূর্ণ পুরুষকার! হৃদয়-বলে “বিদ্যাসাগর” বঙ্গের বিরাট পুরুষ।

    এক জন বড় লোক হইলে, সমগ্র দেশ বা জাতি বড় বলিয়া সম্মানিত হয়। মার্কিণ গ্রন্থকার দার্শনিক এমারসন্‌ বড় লোকদের কথায় বলিয়াছেন,—

    “The race goes with us on their credit.”

    কলুষময় কলিকালে, দানে পুর্ণ “সাত্ত্বিকতা” সুদুর্লভ; বিদ্যাসাগরের দানে কিন্তু সাত্ত্বিকতার পূর্ণ বিকাশ। তাঁহার “বিধবা-বিবাহ” প্রচলন-প্রক্রিয়া সম্বন্ধে হিন্দু-সাধারণে একমত হইতে পারে নাই সত্য, কিন্তু তাঁহার দয়া-প্রণোদিত দানের সাত্ত্বিকতা কেহ অস্বীকার করিতে পারিবেন না। দানে বিদ্যাসাগর শাস্ত্রের মর্য্যাদা রক্ষা করিয়াছেন। শাস্ত্রে আছে,—

    “দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেঽনুপকারিণে।

    দেশে কালে চ পাত্রে তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্॥”

    — গীতা ১৭।২০।

    দান করিতে হইবে, ইহা মনে করিয়া দেশ কাল পত্র বিবেচনায়, অপকারীকেও যে দান করা যায়, তাহাকে সাত্ত্বিক দান কহে।

    এরূপ সাত্ত্বিকভাবাপন্ন দানের পরিচয় বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্তে পুনঃ পুনঃ পাইবেন। বিদ্যাসাগর দান করিতেন, জানিতেন কেবল দাতা ও গ্রহীতা। দানের পৌরুষ-প্রকাশে তাঁহার প্রবৃত্তি ছিল না। তিনি দান করিতেন, নামের জন্য নহে। দরিদ্রের সেবা এবং রুগ্নের শুশ্রুষা কেবলমাত্র তাঁহার অকাম-কল্পিত, নিত্য ক্রিয়া ছিল। দেনার দায়ে ঋণী জেলে যাইতে যাইতে পথে বিদ্যাসাগরকে দেখিয়া, বাষ্পাকুললোচনে কাতরভাবে তাঁহার পানে একবার তাকাইলে, চক্ষের জলে তাঁহার বুক ভাসিয়া যাইত। কপর্দ্দক হস্তে না থাকিলেও, তদ্দণ্ডে তিনি ঋণ করিয়া ঋণীর ঋণ পরিশোধ করিতেন।

    এরূপ দান অবশ্য সংসারের পক্ষে সকল সময় সর্ব্বথা অনুকরণীয় ও প্রবর্ত্তনীয় নয়। ইহাতে অনেক সময় বিপদ্‌গ্রস্ত হইতে হয়। বিলাতী কবি গোল্ডস্মিথ্ কতকটা এইরূপ দানশীলতায় মধ্যে মধ্যে বিপদ্‌গ্রস্ত হইয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে অবশ্য কখন সেরূপ হইতে হয় নাই। হইলেও ইহা যে স্বাভাবিকী সহৃদয়তার পরিচায়ক, তাঙ্গতে সন্দেহ কি?

    প্রাসাদ-বিহারী কোটিপতি হইতে “কর্ম্মটাড়ে”র পর্ণকুটির-বাসী অশিক্ষিত দীন হীন সাঁওতাল পর্য্যন্ত জানিত,—“বিদ্যাসাগর দয়ার অবতার।” এই জন্য তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলমান, শিখ, পারসিক, সর্ব্ব দেশের সর্ব্ব জাতির সমান বরণীয় এবং মাননীয়। তাঁহার বিধবা-বিবাহ-প্রচলনের কার্য্যাষ্ঠান সম্বন্ধে যাঁহার বিরুদ্ধবাদী ছিলেন, তাঁহারাও ঐ কার্য্য অতিমাত্র দয়া-প্রবণতার ফল বুঝিতে পারিয়া তাঁহার প্রতি ভক্তিহীন হন নাই। সে দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর কোথায়! সে দানবীর সর্ব্বজনসমাদৃত বিদ্যাসাগর কোথায়!

    যখন শোকের দারুণ শক্তিশেল বুকের উপর, যখন যাতনার অগ্নিস্তূপ মর্ম্মের ভিতর, তখন “জন্মভূমি” পত্রিকায় এ অধম লেখকের উপর বিদ্যাসাগরের জীবনী লিখিবার ভার পড়িয়াছিল। মনে করিয়াছিলাম, জ্বালা জুড়াইলে, সম্পূর্ণ উপকরণ সংগ্রহ করিয়া, জীবনী লিখিতে প্রবৃত্ত হইব। জ্বালা জুড়াইল না; পাঠকগণ কিন্তু অধীর; কাজেই জীবনীর অসম্পূর্ণ উপকরণ লইয়া “জন্মভূমি”তে জীবনী লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। যে কারণে জন্মভূমিতে জীবনী লিখিতে বাধ্য হইয়াছিলাম, সেই কারণে জীবনী পুস্তকাকারে প্রকাশ করি।

    পুস্তকের উপকরণ সম্পূর্ণ না হউক, অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী। সে বিরাট পুরুষের জীবনীর সম্পূর্ণ উপকরণ সংগ্রহ একরূপ সাধ্যাতীত। তবে ইহাতে যথাজ্ঞাতব্য বিষয়ের অভাব যাহাতে না হয়, তাহার জন্য সাধ্যানুসারে প্রয়াস পাইয়াছি।

    জীবনী লেখা হইয়াছে বটে; কিন্তু একেবারে নির্দ্দোষ হইবার সম্ভাবনা কম। কাহারও জীবনী লিখিতে হইলে, গুণাধিক্যের সঙ্গে দোষেরও সম্যক্ সমালোচনায় সমদৰ্শিতার সম্মান সংরক্ষিত হয়। মৃত ব্যক্তির গুণ ভালবাসার জিনিষ; দোষ নিন্দার্হ। কবি সাদে বলিয়াছেন,—

    “Their virtues love, their faults condemn.”

    বিদ্যাসাগর মহাশয় বহুগুণান্বিত হইলেও কেহ কেহ তাঁহার কোনও কোনও কার্য্যে দোষারোপ করিতেন এবং অনেকেরই বিশ্বাস যে, সেই দোষ তাঁহার ভ্রান্তবিশ্বাস-মূলক। কিন্তু তাহা সত্য হইলেও বহুগুণের সমাবেশে তাঁহার গুণের গরিমাই উজ্জ্বল হইয়া উঠে। যাহাই হউক এ সময়ে দোষের সম্যক সমালোচনা করা নানা কারণে অনুচিত। ডাক্তার জনসন্ বলিয়াছেন যে, “যাহার জীবনী লিখিতে হয়, কেবল তাঁহার চরিত্রের উজ্জ্বল ভাগই সমালোচনা করা উচিত নহে; তাহা হইলে তাঁহার অনুকরণ অসম্ভব হইয়া উঠে।” তাঁহারও কিন্তু সে সাহসে কুলায় নাই। তাঁহার সময়ে যে সব কবি ছিলেন, তাঁহাদের অনেকের অনেক কথা বলিতে তিনি কুণ্ঠিত হইয়াছিলেন। তাঁহার কথা এই ছিল,—

    “Walking upon ashes under which the fire was not extinguished.”

    “অনলাভ্যন্তর ভষ্মস্তূপে বিচরণ করিতেছি।”

    সকল দোষত্রুটির সমালোচনা করা অসম্ভব হইলেও, আমরা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোন কোন কার্য্যের জনমত কিরূপ ছিল, তাহা প্রকাশ করিতে সাহসী হইয়াছি। যাহার অনুকরণে সম্প্রদায়বিশেষের মহতী ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া অনেকে দৃঢ় মত পোষণ করেন, তাহা প্রদর্শন না করিলে প্রত্যবায়ভাগী হইতে ইহবে। গুণরাশির সমালোচনা ত অবশ্য কর্ত্তব্য; যেহেতু তাহা একান্ত অণুকরণীয়। বিদ্যাসাগর মহাশয় দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান হইয়াও, কি গুণে সম্রাট-মুকুট-লাঞ্ছন কীর্ত্তির অপুর্ব্ব জ্যোতিষ্মান্ শিরস্ত্রাণ মস্তকে ধারণ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহা বর্ত্তমান কালে অনেকে অবগত নহেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী সমালোচনায় তাহা উদ্ঘাটিত হইবে, সেই হেতু এ জীবনী বোধ হয় বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ লোকসমূহের কথঞ্চিৎ উপকারক ও উপাদেয় হইতে পারিবে।

    যে গুণসংঘাত জন্য লোকের জীবনী লেখা আবশ্যক হয়, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সে গুণ অনেক ছিল। যে গুণ থাকিলে, মানুষ মানুষকে ভালবাসিতে চাহে এবং যে গুণ থাকিলে, মানুষ বাহ্য জগৎ ভুলিয়া, সেই গুণবানের সম্পূর্ণ সত্তায় হৃদয় পূর্ণ করিয়া ফেলে, সে গুণ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনেক ছিল। যিনি এক উদ্ভাবনায় চিন্তরাজ্যের সহজ পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন, তাঁহার জীবনী লেখা আবশ্যক হয়। পাঠক! বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্ভাবনাশক্তির পরিচয় পাইবেন। যিনি প্রতিভাবলে প্রকৃতির উচ্চ স্তরে দণ্ডায়মান হইয়া ইঙ্গিতে উন্নতির সহস্র পথের যে কোন পথ দেখাইয়া থাকেন, আর নিম্ন স্তরের লোকসমূহ তাঁহাকে ধরিবার জন্য স্তর বাহিয়া উঠিতে চেষ্টা করে, তাঁহার জীবনীর প্রয়োজন আছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনীপাঠে এ কথার সার্থকতা সম্যকরূপে প্রতিপন্ন হইবে। প্রকৃত প্রতিভায় “চৌম্বক” আকর্ষণের অসীম শক্তি। মানুষ যেখানে যত দূরেই থাকুক, আকর্ষণ এড়াইবার যো নাই। যেখানে এরূপ একটি “চুম্বক” থাকিবে, সেইখানে কোটি জীব আকৃষ্ট হইবে।

    প্রতিভা স্বর্গের দেবতা। প্রতিভা পূজক সর্ব্বস্ব দিয়া প্রতিভার পূজা করিয়া থাকেন। চিন্তাশীল এমারসন্ বলিয়াছেন,—“তুমি বল,—ইংরাজ কাজের লোক;— জর্ম্মাণ সহৃদয় অতিথি-সেবক;— ভালেনসিয়ার জলবায়ু অতি মনোরম,—সক্রেমেণ্টো পাহাড়ে প্রচুর সোণা পাওয়া যায়; কথা ঠিক বটে; কিন্তু আমি-এ সব সুখশালী, ধনী এবং অতিথি সেবক লোকদিগকে দেখিতে বা নির্ম্মল জলবায়ুর সেবন করিতে অথবা বহুব্যয়ে স্বর্ণ সংগ্রহ করিতে চাহি না। তবে প্রকৃত জ্ঞানশালী ও শক্তিমান্ ব্যক্তিবর্গের আবাসভূমি দেখাইয়া দিতে পারে, এমন যদি কোন চুম্বক-প্রস্তর প্রাপ্ত হই, তাহা হইলে সর্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়া তাহা ক্রয় করি এবং অদ্যই পথে বাহির হইয়া পড়ি।”

    প্রকৃত শক্তিশালী এবং গৌরবান্বিত প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি সর্ব্বত্রই পূজনীয়। তাঁহারা মানুষের আদর্শ। তাঁহারা প্রকৃতির সূক্ষ্ম শক্তির পরিচায়ক। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাঁহাদের শক্তি বিসর্পিত। তাঁহাদের সহবাসে মানুষ সন্তুষ্ট ও শক্তিসম্পন্ন হয়। ভাবে বা কার্য্যে মানুষ তাঁহাদের সঙ্গে থাকিতে চাহে। আমাদের সন্তানসন্ততি বা নগর গ্রামের নামকরণ, তাঁহাদের নামে হইয়া থাকে। ভাষায় তাঁহাদের নামের ভূরি ভূরি প্রয়োগ পাইবে। তাঁহাদের প্রতিকৃতি বা গ্রন্থাদিরূপ কার্য্যাবলী আমাদের ঘরে ঘরে দেখিবে। আমাদের নৈতিক কার্য্যে তাঁহাদের প্রত্যেক কার্য্য স্মৃতিপথে জাগিয়া উঠে। তাঁহাদিগের অন্বেষণ যুবার স্বপ্ন এবং বর্ষিয়ানের জাগরণ কার্য্য। যতদূরে থাকি না, তাঁহাদিগের কার্য্যকলাপ এবং সম্ভবপর হইলে, তাঁহাদিগকে দেখিবার জন্য মন স্বতঃই ব্যাকুল হইয়া উঠে।

    এইরূপ প্রতিভাশালী ব্যক্তির জীবনী প্রয়োজনীয়। এই জন্য এমারসন্ বলিয়াছেন,—

    “The genius of humanity is the real subject whose biography is written in our annals.”

    প্রতিভা মানবের প্রকৃত পদার্থ। প্রতিভাশালীর জীবন ইতিহাসে লিখিত হইয়া থাকে।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনে এমন প্রতিভার বহু পরিচয় পাইবেন। এক একটী প্রতিভাশালী ব্যক্তি যেমন এক একটী বিভাগ অধিকার করিয়া থাকেন, তেমনই বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রকৃতির এক বিশাল বিভাগ লইয়া ব্যাপৃত ছিলেন। মনোবৃত্তির উচ্চ ক্রিয়ানিবন্ধন প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন ব্যক্তি ধ্যানমাত্রে কল্পনায় অন্য সাধারণের অলক্ষ্যে প্রকৃতির সূক্ষ্ম তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিয়া লন। এই জন্য প্লেটো, সেক্সপিয়র, সুইনবর্ণ, গেটে প্রভৃতির এত প্রতিষ্ঠা।

    মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের কার্য্যফল অব্যর্থ। জ্ঞান ও ভাবের শক্তি চিরন্তন ধ্রুব সুখদায়িনী। এ শক্তির তেজ পরীক্ষা করিতে হইলে শক্তিশালী পুরুষের জীবনী পড়িতে হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বহু কার্য্যে এ শক্তির প্রমাণ আছে। বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা স্যার ওয়ালটর র‍্যালের সম্বন্ধে ইংলণ্ডেশ্বরী এলিজাবেথের সচিব লর্ড সিসিল বার্লে বলিয়াছিলেন,—

    “I know he can toil terribly.”

    ওয়ালটর ভয়ানক পরিশ্রম করিতে পারেন। এ কথা শুনিলে যেন বৈদ্যুতিক প্রভাবে সর্ব্বাঙ্গ আলোড়িত হইয়া উঠে। পাঠক! বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী পাঠ করিলে বুঝিতে পরিবেন, বার্লের এই কথা বিদ্যাসাগর মহাশয়ে খাটে কি না। হামডেন্ সম্বন্ধে বিখ্যাত বিলাতী ইতিহাস-লেখক ক্লারেনডন্ বলিয়াছেন,—

    “Who was of an industry and vigilance not to be tired out or wearied by the most laborious; and of parts not to be imposed on by the most subtle and sharp, and of a personal courage equal to his best parts.”

    হামডেন্‌ অকাতরে পরিশ্রম করিতেন; তাঁহার সংপ্রবুদ্ধা তীক্ষ্ণদর্শিতা বিলক্ষণ ছিল। তিনি অতি পরিশ্রমে কাতর ও ক্লান্ত হইতেন না। চতুর তীক্ষ্ণবুদ্ধি লোক তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারিতেন না। তাঁহার বুদ্ধিমত্তা ও উদ্যমশীলতা, শারীরিক সাহস ও মানসিক বল সমান ছিল।

    ইংলণ্ডের প্রথম চার্লসের ভক্ত অনুচর ফক্‌ল্যাণ্ড সম্বন্ধেও ক্লারেনডন্ বলিয়াছেন, —

    “Who was so severe an adorer of truth, that he can as easily have given himself leave to steal, as to dissemble.”

    ফক্‌ল্যাণ্ড এমন সুদৃঢ় সত্যপরায়ণ ছিলেন যে, চুরি করা তাঁহার পক্ষে যেমন অসম্ভব, আত্মগোপন করাও তদ্রূপ অসম্ভব।

    চীন দার্শনিক লু সম্বন্ধে চীন দার্শনিক মেনসয়াস্ বলিয়া ছিলেন,—

    “লুর ব্যবহারের কথা শুনিলে অতি নির্ব্বোধেরও বোধের সঞ্চার হয় এবং অস্থিরচিত্তেরও একাগ্রতা উপস্থিত হয়।”

    বিদ্যাসাগর-জীবনে একাধারে এই হামডেন্, ফক্‌ল্যাণ্ড এবং লুর চরিত্র সমাবেশিত। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী হইতে এই সকলের শিক্ষা হয়। ইহা জীবনীর নৈতিক সার। এই জন্যই কার্লাইল্ বলিয়াছেন,—

    “Not only in the common speech of men, but in all art too—which is or should be concentrated and conserved essence of what men speak and show—Biography is almost the one thing needful.”

    কেবল যে মানুষের সাধারণ কথাবার্ত্তার জন্য জীবনী আবশ্যক হয়, তাহা নহে; মানুষ যাহা কথায় বলে এবং কার্য্যে দেখায়, সেই সকল বিষয়ের সার অংশটুকুর জন্য জীবনী অত্যন্ত আবশ্যক।

    এই জন্য বিদ্যাসাগরের জীবনী প্রয়োজনীয়। আধুনিক জীবনী-লিখন-প্রথা বিদেশীয় অনুকরণ। বিদেশীয় শক্তিশালী বড়লোকমাত্র, বিদ্যাসাগরের প্রীতিপাত্র ছিলেন; অতএব বিদেশীয় শক্তিশালী ব্যক্তিদিগের সহিত তাঁহার তুলনা অযৌক্তিক নহে। কোন না কোন বিদেশীয় শক্তিসম্পন্ন, ব্যক্তির কোন না কোন গুণ তাঁহাতে পরিলক্ষিত হইত।

    “বিদ্যাসাগর চরিত” নামে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্বরচিত অসম্পূর্ণ জীবনী তদীয় পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কর্ত্তৃক প্রকাশিত হয়। কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করিবার পূর্ব্ববর্ত্তী ঘটনাগুলি লইয়া ইহা রচিত। নারায়ণ বাবু লিখিয়াছেন,–“যদি তাঁহার ছাত্রজীবনের ইতিহাস নিজে লিখিয়া যাইতে পারিতেন, তাহা হইলেও তাঁহার জীবন-চরিত সম্পূর্ণ করা সহজ হইত।” নিজের জীবনী নিজে লিখিলে জীবনবিবরণ যে সম্পূর্ণ হয়, তাহাতে আর সন্দেহ কি? এতদ্ব্যতীত জীবনীর বিষয়ীভূত ব্যক্তির ভাষা, মনোবৃত্তি, ধর্ম্মপ্রবৃত্তি, রীতি, নীতিপ্রভৃতির অনেক আভাস পাইবার সুবিধা ও সুযোগ হয়। জনসনের জীবনী লিখিতে বসিয়া জীবনীলেখক বসওয়েল বলিয়াছেন,—

    “Had Dr. Johnson written his own life in conformity with the opinion which he has given, that every man’s life may be best written by himself; had he employed in the preservation of his own history, that clearness of narration and elegance of language in which he has embalmed so many eminent persons, the world would probably have had the most perfect example of biography that was ever exhibited.”

    ডাক্তার জন্‌সন্‌ বলিতেন,—“নিজের জীবন-বৃত্তান্ত মানুষ নিজে উত্তম লিখিতে পারেন।” তিনি যে বিশদ বর্ণনায় এবং সুন্দর রচনায়, বহু সংখ্যক, কীর্ত্তিকুশল ব্যক্তির বিষয় লিপিবদ্ধ করিয়া তাঁহাদিগকে সঞ্জীবিত করিয়াছেন, তাহাতে তিনি যদি স্বয়ং নিজের ইতিহাস লিখিতেন, তাহা হইলে জগৎ তাঁহার নিকটে সর্ব্ববয়বসম্পন্ন জীবনীর উত্তম দৃষ্টান্ত লাভ করিতে পারিত।

    কথাটা ঠিক বটে; কিন্তু আত্মকথার সূক্ষ্ম সমালোচনা হওয়া দুষ্কর। সে ভার বাহিরের লোককে লইতে হয়। আত্মদোষের উদ্ঘাটনে সাহস কয় জনের হইয়া থাকে? রুসোর “কনফেশন্‌” অর্থাৎ ক্রটী-স্বীকার, দুরন্ত দুঃসাহসিকতার কাজ। ভলটয়ার ঠিকই বলিয়াছেন,—

    “There is no man, who has not something hateful in him—no man who has not some of the wild beast in him. But there are few who will honestly tell us how they manage their wild beast.”

    জগতে এমন কোন মানুষ নাই, যাহার কিছু দোষ নাই, এমন মানুষ নাই, যাঁহাতে ঘৃণার্হ কিছুই একেবারেই নাই বা যাঁহার পাশববৃত্তি নাই; কিন্তু সেই প্রবল পাশববৃত্তি জীবনে কেমন করিয়া আয়ত্ত করিয়া রাখিয়াছে, কয়জন লোকে তাহা অকপটে বলিতে পারে?

    মানুষের এমন দোষ ও ত্রুটী থাকিতে পারে যে, তাহা বন্ধুর নিকট প্রকাশ করিতে দ্বিধা হয়। বিখ্যাত ফরাসী গ্রন্থকার শ্যামফোঁ বলিয়াছেন, —

    “It seems to me impossible, in the actual state of society, for any man to exhibit his secret heart, the details of his character as known to himself, and above all, his weaknesses and his vices, to even his best friend.”

    ইহার ভাব এই—

    সমাজের যে অবস্থা, তাহাতে আমার মনে হয়, মানুষ নিজের হৃদয়ের গূঢ় কথা, অথবা যাহা কেবল অন্তরাত্মাই জানেন, আপনার সেই প্রকৃত চরিত্রের গুপ্ত কথা, আপনার মানসিক দুর্ব্বলতা এবং পাপের কথা তাহার অন্তরঙ্গ অভিন্নহৃদয় বন্ধুর নিকটে ও বলিতে পারে না।

    জন্ ষ্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীবনীতে সকল সন্দেহ দূর হয় না। স্কট, মুর্ এবং সাদে আত্মজীবনী লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন; কিন্তু নানাবিধ সঙ্কোচ উপস্থিত হওয়ায়, তাঁহারা তাহা পরিত্যাগ করেন। তবে বিদ্যাসাগর মহাশয় যেরূপ সত্যপরায়ণ ছিলেন তাহাতে তিনি সত্যপ্রকাশে যে অকুণ্ঠিত হইতেন, তাহাতে সন্দেহ নাই।

  • চতুর্থ সংস্করণের বিজ্ঞাপন

    চতুর্থ সংস্করণের বিজ্ঞাপন

    স্বর্গীয় মহাত্মা বিহারীলাল সরকার মহাশয়ের বিদ্যাসাগর-জীবনীর ৪র্থ সংস্করণ প্রকাশিত হইল। বড়ই আক্ষেপের বিষয়, শ্রদ্ধাভাজন বিহারীবাবু তাহার বড় সাধের বর্তমান সংস্করণের প্রকাশ ভার আমার প্রতি অৰ্পণ করিয়া এই গুরুতর কার্য্য সম্পন্ন হইবার পূর্ব্বেই আমাদিগকে শোক-সাগরে ভাসাইয়া অমরধামে গমন করিষ্যছেন।

    এই সংস্করণে বিদ্যাসাগরের অঙ্গ-সৌষ্ঠব সম্পাদনে তাহার সম্পূর্ণ ইচ্ছা ছিল। যথাস্থানে পরিবর্ত্তন ও পরিবর্দ্ধন করিয়া যাতে “বিদ্যাসাগর” সৰ্ব্বসাধারণের আদরণীয় হয়, তদ্বিষয়ে তিনি প্রস্তুত হইয়াছিলেন এবং আমাকে উপদেশ দান করিয়াছিলেন। কিন্তু বিধির বিধানে তাঁহার লোকান্তরের কারণ সেই সাধু সঙ্কল্প কার্য্যে পরিণত হইতে পারে নাই। স্থানে স্থানে সামান্য যাহা পরিবর্ত্তিত হইয়াছে, তাহা বিহারীবাবু নিজেই তাঁহার জীবিতাবস্থায় করিয়া গিয়াছিলেন। যথোপযুক্ত পরিবর্ত্তন ও পরিবর্দ্ধন করিয়া সৰ্ব্বাঙ্গ সুন্দরভাবে গ্রন্থখানি প্রকাশ করিবার জন্যই বিহারী বাবু আমাকে এই কার্য্যের ভার প্রদান করেন, কিন্তু হায়, তাঁহার মৃত্যুতে সেই কার্য্য অসম্পন্নই রহিয়া গেল!

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনের একটা প্রধান কাজ বিধবাবিবাহ প্রচলন, তাহা সৰ্ব্ববাদী সম্মত না হইলেও সেই সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় ও অপরাপর শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতমণ্ডলী যে বিচার ও গবেষণা করিয়া গিয়াছেন, তাহার বিস্তারিত ভাবে আলোচনাপূর্ণ মন্তব্য পাঠ করিতে আজকাল অনেকেই ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া থাকেন। বিহারী বাবুর অভাবে তাঁহার গ্রন্থ মধ্যে ঐ বিষয়ের সমালোচনার সম্ভাবনা না থাকায় পাঠকগণের সন্তুষ্টির জন্য পরিশিষ্টে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবাবিবাহ নামক সম্পূর্ণ গ্রন্থখানি সন্নিবিষ্ট হইল। সুধীগণ তাহা পাঠ করিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পাণ্ডিত্য ও বিচার-কুশলতা দেখিয়া মুগ্ধ হইতে পারিবেন এবং সাধারণ পাঠকগণও বিধবাবিবাহ সম্বন্ধে স্বয়ং চিন্তা করিতে সক্ষম হইবেন। এই সংস্করণে গ্রন্থখানার বিশেষ উৎকর্ষ সাধন করিতে না পারিলেও ছাপা, কাগজ ও বাঁধাই ইত্যাদি সম্বন্ধে যত্ন, চেষ্টা ও ব্যয়ের কোনটী ত্রুটী করা হয় নাই। এক্ষণে পাঠকগণের সহানুভূতি পাইলেই এম সফল বোধ করিব। উপসংহারে আর একটী কথা উল্লেখ করা কর্ত্তব্য মনে করি।

    কলিকাতা ৬২নং আমহার্ষ্ট স্ট্রীট্‌স্থ ‘মেসার্স পুরুষোত্তম কোম্পানীর’ প্রোপ্রাইটার শ্রীযুক্ত বাবু রাজকুমার ভট্টাচার্য্য মহাশয় বিদ্যাসাগরের জন্য সমস্ত কাগজ সরবরাহ না করিলে, ইহা প্রকাশ করিতে কত যে বিলম্ব হইত, তাহা বলা যায় না। তিনি কাগজ প্রদান করিয়াই নিশ্চিন্ত হন নাই, ইহার মুদ্রণেও যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। তজ্জন্য আমি তাঁহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিলাম। ফলতঃ বর্তমান সংস্করণে শ্রদ্ধাষ্পদ রাজকুমার বাবুই এই গ্রন্থের প্রকাশক, আমি উপলক্ষ মাত্র।

    হরিপদ চট্টোপাধ্যায়।

    শাস্ত্রপ্রকাশ কার্যালয়

    ১৫নং হরীতকী বাগান লেন,

    কলিকাতা। ১৯২২।

  • আমার নিবেদন

    আমার নিবেদন

    বিধি বিড়ম্বনায় “বিদ্যাসাগর” যথাসময়ে প্রকাশিত হয় নাই। তিন মাস শয্যাশায়ী ছিলাম। দৌর্ব্বল্য জন্য দুই মাস “বিদ্যাসাগর” সম্বন্ধে কোন কাজ করিতে পারি নাই। ইহা অবশ্য বিড়ম্বনার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহোদর শ্রীযুক্ত শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয়, সর্ব্বপ্রথম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী প্রকাশ করেন। তাঁহার নিকট আমার সর্ব্বাগ্রে কৃতজ্ঞতা-স্বীকার কর্ত্তব্য। “বিদ্যাসাগর” প্রকাশে অনেকেই অনেক প্রকারে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন। পুস্তকের অভ্যন্তরে তাঁহাদের নামোল্লেখ আছে। আমি তাঁহাদের নিকট চির-কৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ রহিলাম।

    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়, আমাকে অনেক চিঠি-পত্র দিয়া সাহায্য করিয়াছেন। তাঁহার নিকট বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন-ঘটিত যে সমুদয় চিঠি-পত্র ছিল, সে সমুদয়ই পাইবার আশা পাইয়াছিলাম। আমার দুরদৃষ্টবশতঃ তাহার কতক হস্তান্তরিত হইয়া পড়ে। যাহা হউক, তিনি আমাকে যে সব দুর্লভ আবশ্যক চিঠি-পত্র দিয়াছেন, তাহার জন্য তাঁহার নিকট আমি চির-ঋণী।

    আমি বহু কষ্টে, বহু শ্রমে এবং অর্থব্যয়ে যে সমস্ত উপকরণ সংগ্রহ করিয়াছি, হয়ত তাহাদের কাহারও কাহারও উপযুক্ত ব্যবহার করিতে পারি নাই। আশা আছে, ভবিষ্যতে আমা অপেক্ষা যোগ্যতর জীবনী-লেখকের হস্তে তাহাদের সদ্ব্যবহার হইবে। আমি যাহা সংগ্রহ করিয়াছি, তাহা যদি কোন সময়, সাধারণের সম্পত্তিরূপে, সাধারণের হিতার্থে নিয়োজিত হয়, তাহা হইলে, আমার সংগ্রহ-শ্রম সার্থক হইবে।

    নানা কারণে, মূল ইংরেজি চিঠি-পত্র প্রকাশ করিতে পারিলাম না। মূলের সৌন্দর্য্য অনুবাদে রক্ষিত হয় না। তবে অনেকটা ভাবগ্রহ হইয়া থাকে। এই জন্য ইংরেজী চিঠি-পত্রাদির বাঙ্গালায় মর্ম্মানুবাদ দিয়াছি।

    ইংরেজী চিঠি-পত্রাদির অনুবাদ সম্বন্ধে আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ বন্ধু শ্রীযুক্ত ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ এম, এ, শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্রনাথ বসু, বি, এল, সোদরপ্রতিম শ্রীমান্ নারায়ণচন্দ্র ঘোষ, বি, এ, শ্রীমান্ কানাইলাল ঘোষ এবং আমার শ্রদ্ধাস্পদ সহকারী শ্রীযুক্ত হরিমোহন মুখোপাধ্যায় অনেকটা সাহায্য করিয়াছেন। ভূতপূর্ব্ব ডাইরেক্টর টনি সাহেব, অনুগ্রহপূর্ব্বক সংস্কৃত-কলেজের পুরাতন কাগজপত্র দেখিবার অনুমতি দিয়াছিলেন। সংস্কৃত-কলেজের ভূতপূর্ব্ব অধ্যক্ষ মহা-মহোপাধ্যায় পণ্ডিত মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন মহাশয়, তৎসম্বন্ধে সহায়তা করিয়াছিলেন। নিম্নলিখিত পত্রে তাহার প্রমাণ,—

    শ্রীশ্রীদুর্গা
    শরণং
    সংস্কৃত কলেজ
    ৮। ৮। ৯২

    সবিনয়নিবেদনমিদম্।

    শ্রীযুক্ত ডিরেক্টর সাহেবের চিঠি আসিয়াছে। ৺বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী সম্বন্ধে কলেজ হইতে যাহা অনুসন্ধান করেন, তাহা পাইতে পারেন। ইতি

    ভবদীয়স্য

    শ্রীমহেশচন্দ্র শর্ম্মা।

    বিদ্যাসাগরকে হিন্দু যে চক্ষে দেখিয়া থাকে এবং হিন্দুর যে চক্ষে দেখা কর্ত্তব্য, বিদ্যাসাগরের কার্য্যালোচনায় তাহা বুঝাইবার প্রয়াস পাইয়াছি। সে সম্বন্ধে কতদূর কৃতকার্য্য হইয়াছি, তাহার বিচার বিজ্ঞ পাঠকগণই করিবেন।

    প্রার্থনা

    মানুষ অপূর্ণ। তাই মানুষের কাজ একেবারে ভ্রমবর্জ্জিত হয় না। আমি মূঢ়, প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, “বিদ্যাসাগরকে” একেবারে ভ্রমশূন্য করিব। বিশেষতঃ ষোড়শ বর্ষাধিক কাল বাঙ্গালা ছাপাখানার সহিত কুটুম্বিতা করিয়াও যখন আমার এইরূপ স্পর্দ্ধিত প্রতিজ্ঞা, তখন আমার মূঢ়তা অপরিমেয় ও অমার্জ্জনীয়। কেবল ছাপাখানার দোহাই দিয়া আত্ম-নিষ্কৃতির প্রয়াস পাইলে, প্রত্যব্যয় হয়। ছাপাখানার ভ্রম অনেকাংশে অক্ষরগত। আমার ভ্রম বিষয়, ভাব ও ভাষা সংক্রান্ত। কেবল ভ্রম কেন, কোন কোন স্থানে ত্রুটি ও সংশয় আছে। আমার সবিনয় নিবেদন, পাঠকবর্গ অনুগ্রপূর্ব্বক অক্ষরগত ভ্রম স্বয়ং সংশোধন করিয়া লইবেন। আত্মকৃত যে ভ্রম-ত্রুটি বুদ্ধিগোচর হইয়াছে, তাহার যথাযোগ্য সংশোধন করিয়া লইতে সঙ্কুচিত নহি। আমার বুদ্ধিগোচর হয় নাই, এমন ভ্রমও থাকিতে পারে। দয়া করিয়া, কেহ তাহা দেখাইয়া দিলে, অকৃতজ্ঞতার কলঙ্কে কলুষিত হইব না।

  • বিদ্যাসাগর

    বিদ্যাসাগর

    বিদ্যাসাগর

    সমালোচনা-সংবলিত

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী।

    “শকুন্তলা-রহ, “ইংরেজের জর,” “তিতুমীর,
    “গান, “মহাৱাণ স্বর্ণী,” “বঙ্গে বর্গী” ও
    “ভরতপুরের যুদ্ধ গ্রন্থ-প্রণেতা

    বিহারিলাল সরকার

    প্রণীত।

    চতুর্থ সংস্করণ।

    কলিকাতা, ১২ নং হরীতকী বাগান লেন, শান্ত-প্রকাশ কার্যালয় হইতে শ্রীহরিপদ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।

    ১৩২৯ সাল।

    কলিকাতা, ৩০ নং হরীতকী বাগান লেন, “পশুপতি যন্ত্রে” শ্রীরাজকুমার রায় কর্তৃক মুদ্রিত।

    উৎসর্গ-পত্র

    যাঁহার সহায়তায় পবিত্র সাহিত্য-মন্দিরের এক প্রান্তে
    প্রবেশ করিবার প্রকৃত পথ পাইয়াছিলাম,
    সেই শ্রদ্ধাস্পদ সহৃদয় সুহৃদ-সহায়
    শ্রীযুক্ত কেদারনাথ মিত্রকে
    এবং
    যাঁহার সহৃদয়তায় কেদারনাথকে সুহৃদস্বরূপে পাইয়াছিলাম,
    সেই প্রিয়তম মিত্র শ্রীযুক্ত নৃত্যগোপাল বসুকে
    দীনের এ সামান্য সাহিত্য-সম্বল
    বিদ্যাসাগর” উৎসৃষ্ট
    হইল।