এ মুগ্ধ হৃদয়ের একটি প্রণাম,
হে মাটি, তোমার ওই পায়ে রাখলাম।

সমুদ্রে অরণ্যে পাহাড়ে মাটিতে খনিতে সমৃদ্ধ
এই সোনা দেশের ধনী মেরুদণ্ডের বনেদি রূপরেখা
সারা পৃথিবীর বিস্মিত চোখে কী অদ্ভুত, কী সুন্দর!
আকাশে আকাশে নীলিমার স্নেহের আভাস
বাতাসে বাতাসে মুক্তিগানের আনন্দোচ্ছ্বাস
জীবনের অন্তস্তলে আনে সূর্যালোকের আশীর্বাদের ফোয়ারা।
এমন সোনার দেশ আর কোথাও আছে কিনা,
আমার জানা নেই।
এই মাটি দিয়েছে আমায় পা রাখবার স্থান,
এই মাটি দিয়েছে আমার ক্ষুধায় অন্ন জল,
এই মাটির বুকে জন্মেছি বেঁচেছি বেড়েছি;
এই মাটিই আমার জীবনে স্বর্গাদপি গরীয়সী!
আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ধনদৌলতের অফুরন্ত ভাণ্ডার,
আমার রাজকোষের সব হীরে পান্না জহরত,
আর আমার এই জীবন্ত প্রাণটার সব কটা টুকরো
এখানে এই মাটির বুকেই আমি কুড়িয়ে পেয়েছি।
এমন সোনার দেশ আর কোথাও আছে কিনা,
আমার জানা নেই।

তারপর কত কাল পার হয়ে গেছে
সেই শিশুর কৈশোর যৌবন স্মৃতি বুকে নিয়ে;
সেই কুঁড়ে ঘরে যে প্রাণের জন্ম হল,
আজ সে যেন বেঁচে রইল অন্য নামে অন্য পরিচয়ে।
কবে তার তথাকথিত মৃত্যু ঘটেছে ইঁট পাথরের ঘরে,
সে কথা ওই ডালিম গাছ আর বলতে পারবে না;
কোন প্রমাণও নেই কুঁড়ে ঘরের বাঁশের বেড়ার ফাকে,
যেখানে সূর্যের আলো আজ পথ হারিয়েছে।
আজ মনে হয়, ওই কুঁড়ে ঘর আর ডালিম গাছটা
অতল পাতালে তলিয়ে গেছে নদীর ভাঙাগড়ার খেয়ালী খেলায়।
প্রভাতের শেষে প্রখর রৌদ্রের তাপে
শিশির বিন্দু যখন বাষ্প হল, আর
ডালিমের রাঙা রঙ ফিকে হল, কিংবা
মাটির বুকে নিরস ইট কাঠ ধাতু তপ্ত হল,
তখন পুনর্জন্মের ধূসর খোলস নিয়ে কঠিন বর্মে আবৃত
কাচঘরের মতো নিদারুণ নির্মম পৃথিবীর মুখোমুখি
দৃপ্ত ভঙ্গিমায় সে দাঁড়ালে, তাকে আদৌ চেনা যায় না।
রঙ করা কাঠপুতলি বিদূষকের পোষাকে বেমানান,
বেকুবের ভূমিকা নিয়ে সে বেঁচে আছে
তোমাদেরই কাছে কাছে, যেখানে চিরমৃত্যু ঘটেছে
তার যত্নলালিত কুশপুত্তলিকার দরিদ্র জন্মস্মৃতির।

বর্ষায় মাটি পেলব কোমল মায়ের মমতাসম,
গ্রীষ্মে কঠিন বজ্রের মতো নিষ্ঠুর রুঢ় ষম।
আমার দেশের মাটি ও মানুষে মিল,
তাদের মনের দুয়ারে নেই তো খিল!

তোমাদের চিনেছি সবই,
তোমরা মুখর আর আমি মুক কবি
নিশিদিন অতৃপ্তির গণন রচি বসে,
মেরুদণ্ড হৃদ্পিণ্ড ক্রমে যায় ধ্বসে।
তাই আজ দেয়ালে দেয়ালে
কালো কালো ইস্তাহার লাগাই খেয়ালে।

তার কথায় কেউ কান দেয় না। যে যার কাজে যায়।
কেউ ভাবে, লোকটি পাগল। দয়া করে ভিক্ষের পয়সা দেয়।
সে তখন মিটিমিটি হাসে আর বলে, ‘ঝড় আসবে’!
তারপর কখনও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে যায়।
কত দিন হয়ে গেল। সেই লোকটিকে আর দেখা যায় না।
কিন্তু সত্যিই ঝড় এল। দেশ জুড়ে বিপ্লবের ঝড়।
যুদ্ধের ঝড়। মহামারী দুর্ভিক্ষের ঝড়। সংগঠনের ঝড়।
সেই প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবলীলার চিহ্ন এখনও মিলিয়ে যায় নি।
উখান পতনে নগর ধ্বংস, রাজপথ ভগ্ন, সমাজ বিধ্বস্ত।
মানুষের জীবনের রূপ বদলের পালা চলে। এ ঝড় কবে থামবে?

আমরা গ্রহ উপগ্রহের মতো আপন আপন গতিপথে
আহ্নিক গতির বার্ষিক গতির মহড়া দিয়ে আয়ুর তহবিল
ক্রমে শূন্য করে আনি। আমরা প্রতেকটি আলাদা মানুষ,
সমাজের গ্রামে শহরে আলাদা এক একটি দুর্গের মতো
পাশাপাশি আমাদের অনিশ্চিত অবস্থান। নদীর ধারার
শুষ্ক রেখায় উপস্থিতির চিহ্ন নিতান্তই ক্ষীণতর। প্রায় শূন্য।
আমাদের অপহৃত অন্তরাত্মা নিরুপায়। প্রেতের দেহে
ক্যালেণ্ডারের পাতায় আয়ুর হিসেব রাখি। ক্রীতদাসের জীবনে
একান্ত অভ্যস্ত এই শতাব্দীর যত মধ্যবিত্ত, দরিদ্র। তোমরা। আমরা
সমাজের ইমারতের ছোট বড় স্তম্ভ। দীর্ণ বক্ষে ঝিমুনির ঘোরে
রুটি মেলে না। ইট পাথর সিমেণ্ট দেখেছি। দেখেছি গৃহ।
এই দেহ রক্ত মাংসের গৃহ অনাদরে অসম্মানে ভগ্নপ্রায়।
সংসারের রঙ্গমঞ্চে স্বামী স্ত্রী ভ্রাতা ভগ্নী মগ্ন অভিনয়ে,
আপন ভূমিকাটুকু স্বভাবতঃ শেষ করে সাজঘরে ঢোকে।
পরস্পরে পরিচিত সহযাত্রী; প্রয়োজনের সীমানার মাঝে
পরিমিত বাক্যালাপ কাষ্ঠ হাসি আদান প্রদানের পালা শেষে
খাঁচার কপাট বন্ধ। রাজনীতির নামে হুজুক। দেশপ্রেমে ভণ্ডামি!
স্বার্থসিদ্ধির সংগ্রাম। সুখের সংজ্ঞা দৈনন্দিন অভিধানে খুঁজি।
নিম্ন মধ্যবিত্তের স্তরে দরিদ্রের পা রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা।
নিম্ন থেকে উচ্চতর স্তর মধ্যবিত্তের কাম্য। তারপর আরও উচ্চে
ধনীর সোপানে গতি যত্নবান শ্রমে কৌশলে। আচারে পোষাকে
অস্বাভাবিক। ছেলেরা মিশনারী স্কুলে ভর্তি হয়। বৌয়েরা মোটরে চড়ে,
পার্টিতে যায়। শহরের হোটেলে বসে বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদিত
মদের গেলাসে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ মিথ্যে প্রমাণিত ফানুষের গতিতে।
তবুও গ্রামের গরীব চাষী অধিক ফলনের আশা রাখে।
মজুরের দৃষ্টি বোনাস, ওভারটাইমের বিলে। কেরানীরা পরিমিত
বাড়তি বেতনহারে উৎসাহী। শ্রমিকের জন্যে দৈনন্দিন অন্নবস্থটুকু।
চাহিদার তারতম্য প্রাপ্তির তুলনামূলক বিচারে সীমাবদ্ধ।

দরিদ্রের জন্ম মৃত্যু, মুল্যে তার হয় না তো মাপ,
অভিধানে লেখা দেখি, যুগে যুগে ক্লীব অভিশাপ।
কার জন্ম কার মৃত্যু, এ হিসাবে কিবা প্রয়োজন?
যম তার খতিয়ালে লিখে রাখে ‘ভ্রম সংশোধন’।

অন্ধকার রাত বাড়ছে। জ্বরও বাড়ছে।
অনন্ত কবিরাজের বাড়ী অনেক দূর।
এত রাত্তিরে ডাকলে বুড়ো সাড়াই দেবে না।
ভালোয় ভালোয় রাতটা পোহালে
যাহোক একটা কিছু ব্যবস্থা করা যাবে
ভাবতে ভাবতে রুগ্ন স্বামীর পায়ের কাছে
মাথাটা রেখে কথন যেন বৌটা ঘুমিয়ে পড়েছে!
শিয়রে ঘটতে ঢাকা জল।
কেরোসিনের লণ্ঠনটা টিমটিম করে জ্বলছে।
বেড়ার ফাঁক দিয়ে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে এসে ঢুকছে।
ঘরের কানাচে কলার ঝোপে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ
ঢিমে তালে টুপটাপ ঝরে পড়ছে।
অনেকক্ষণ আগে রাত ভোর হয়েছে।
বৌয়ের ঘুম ভেঙেছে।
কিন্তু চাষীর ঘুম ভাঙে নি।
তার ঘুম কোনদিনই আর ভাঙবে না।
হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল বৌটা।
কলাঝোপে তখনও কান্নার মতো বৃষ্টির ফোঁটা ঝরছে।
শালের খুঁটির মতে সমর্থ হাত দুখানা
আর তাকে সোহাগ জানাতে পারবে না,
মাঠের ফসল কাটতে পারবে না,
লাঙলের কাস্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

বেদনার হিম চিত্র সেই অভিশপ্ত মৃতের সান্ত্বনার মতো
আকাশের ঈশান কোণে কখনও অখ্যাত তারার ছায়ায় ফোটে,
যখন অন্ধ আক্রোশে গুপ্ত ডিনামাইটে স্মৃতির পাহাড় ভাঙা হয়,
আর তার গোত্রহীন বেমানান সর্বনাশা বস্তুর ঢল
দুর্ভাবনার গহবরে অনায়াসে হারিয়ে যায় পরম উচ্ছৃঙ্খলতায়,
ছন্নছাড়া জীবনের মতো। হৃদয়ের মুক্ত আদালতে
অন্তহীন অবসাদে ভগ্ন যুপকাষ্ঠের ফাঁকে নিরুপায়
অপরাহ্নবেলায় ফুঁপিয়ে কাঁদে ম্রিয়মাণ প্রেমের প্রেতমূর্তি।
অপদার্থ অক্ষরে রচিত বিয়োগান্ত কাহিনীর বিস্মৃত পাণ্ডুলিপি
বিনষ্ট। অপহৃত। অনিয়ত বিরতির নিঃশব্দ সীমারেখা
তাই অস্পষ্ট রঙে ঢেকে রাখে কালের নিষ্টুর প্রহরীরা।

কিন্তু যদু কোনদিনই রেশনের পুরো দাম সংগ্রহ করতে পারে নি,
সে কখনও দিতে পারেনি তার বৌ ছেলেকে
অন্ন বস্তু, রোগে ওষুধপথ্য।
বেচারা যদু বড়ই নিরুপায়!
কাল রাতে আকাশে ঘন কালো মেঘের জটলা,
বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের সর্বনাশা মন্ত্রে বাতাসের ফিসফিসানি,
ছেলেটা জ্বরে বেহুঁস,
বৌটা ক্ষিধের জ্বালায় কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়েছে;
সারাটা দিন ভিখারীর মতো পথে পথে ঘুরে
সামান্য পয়সাও পায় নি। কেউ দেয় না।
ঝিরঝিরে বৃষ্টি এল উপহাসের মতোই।
যদুর ছেঁড়া গেঞ্জীর পিঠ ভিজল।
ক্লান্ত। কপালের ঘাম করছে চোখের কোণে।
কান্না নয়। অশ্র অতীতকালে নিঃশেষিত।
কেরোসিনের অভাবে লণ্ঠন জ্বলে নি।
ঘরখানা অন্ধকারে খাঁ খাঁ করছে
নিঃশব্দ শয়তানির ছলনায়। মায়া মরীচিকা।
অগত্যা যদু নিদারুণ হতাশায় মেঝেয় বসে পড়েছে।
ছুরিখানা হাতের কাছে কোথা থেকে এল?
শানিত ছুরির ফলাকা চোখের দৃষ্টির মতো কঠিন।
ঘরের কানাচে তাল গাছের মাথায় বাড়ের দাপট,
বৃষ্টির ঝাঁক মুহুর্মুহু বর্শার মতো ছুটে আসে,
ঘরের চালের ফুটো থেকে কয়েক ফোঁটা ময়লা জল
যদুর কানের পাশে পড়ল। বিরক্তি
ঘুম। এবার শান্তির ঘুম আসুক।
বাপ বাপ দুটো কোপ। রক্তের নদী।
তারপর পরনের কাপড়ের টুকরোটা পাকিয়ে
চালের বাতায় বেঁধে, সে নিজে ঝুলে পড়ল।
সমাপ্তি।
বড় এবার থামবে।
বৃষ্টিও নিশ্চয়ই থামবে!

পথের মানুষেরা তোমার মূর্তির সামনে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে
তোমাকে অভিবাদন করে। বর্ষের বিশিষ্ট দিনগুলিতে
সরকারী অনুষ্ঠানে জনসাধারণ মাল্যদান করে তোমার পাদমূলে।
সংবাদপত্রে চিত্রসহ তার বিস্তৃত সংবাদ প্রকাশিত হয়।
প্রখর রৌদ্রে প্রবল বর্ষণে দারুণ শীতে, বর্ষের সব ঋতুতে
তুমি স্থির প্রস্তরমূর্তির মতোই দাঁড়িয়ে থাক।
তুমি যে প্রকৃতই প্রস্তরমূর্তি, সে কথা ঠিক তখনই অনুভব করি
যখন দেখি, একটা ক্লাস্ত কাক উড়ে এসে বসে
ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত তোমার তেজী ঘোড়ার লেজের ওপর,
আর তোমার প্রশান্ত চোখ দুটো ধুলোর আবরণে ঢেকে যায়।

প্রাসাদের কুকুরের দিকে কিন্তু সে পরম কৌতুকে
রোজই তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে তার সৌভাগ্যের কথা।
বিলাসী কামরায় বাস। সোহাগের ধন।
অনায়াসে পোষা কুকুর পায় পুষ্টিকর খাদ্য।
তার ভাগ্যে ডাষ্টবিনের ঘৃণ্য কাড়াকড়ি মারামারি,
তারপর হয়ত কোন দিন সামান্য খাদ্য মেলে।
কুৎসিত অবাঞ্চিত কুকুরটা অনাদরে বাঁচে;
পথের ওপর কোনদিন সে নিশ্চয়ই মরে পড়ে থাকবে
অনাহারের যুদ্ধের শেষে পরাজয়ের গ্লানি বুকে নিয়ে।
পথের মানুষের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে,
মানুষে মানুষেও আছে এই পার্থক্য, এই অবিচার।
বস্তুতঃ, মানুষের সমাজেই এমন ব্যবস্থার উৎপত্তি।
একদিকে মানুষেরা বাঁচে। অন্যদিকে মানুষেরাই মরে।
পোষা কুকুর যথাসময়ে তার মনিবের সঙ্গে
আজও বেরিয়েছে দৈনন্দিন ভ্রমণে,
পথের কুকুর তার চিরদুর্বল কণ্ঠকে
হাজার গুণ সবলতর করে কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল, ‘ঘেউ’!
পোষা কুকুর সেদিকে ভ্রূক্ষেপই করে না।
এবার তেড়ে গিয়ে সে ডাকল, ‘ঘেউ ঘেউঘেউ!
বিলাসী কুকুর তার মনিবের গা ঘেঁষে
নিরাপদ আশ্রয় পেতে চাইল।
মনিব তাঁর হাতের বাঁকা ছড়িখানা উঁচিয়ে ধরে
বিরক্তিতে তেড়ে এলেন।
কিন্তু পথের কুকুর বেপরোয়া।
বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে তার চোখে।
শুষ্ক কণ্ঠে ‘ঘেউ ঘেউ’ আর্তনাদে
মরিয়া হয়ে ছুটে গিয়ে
লে কামড়ে দিল পোষা কুকুরের তৈলাক্ত ঘাড়ে।
মনিবের বাঁকা ছড়ির নির্দয় আঘাত তার হাড়সর্বস্ব পিঠে
নির্মমভাবে দাগ কেটে দিল।
তবু অনেক দিনের অনেক বঞ্চনার অন্যায়ের বিরুদ্ধে
তার এই অকপট প্রতিবাদ।

তোমারা জান বলতে কত কথা,
গড়তে জান কত রূপকথা
লে রূপকথা আমার কানে
মর্মভেদী বজ্র হানে,
কই নি কথা, মুক হয়ে সব সয়েছি দিনে রাতে
ব্যর্থ বেদনাতে।
তোমার সাথে আমার থাকে মিল,
যখন মোরা গড়ি কোন মিছিল
‘অন্ন চাই বস্ত্র চাই’ বলে;
আর তা না হলে,
তুমি শাসক, শোষিত আমি; তোমার হাতের দণ্ড
সমাজ জীবন করবে লণ্ডভণ্ড।
তাইতে তো আমি বিস্ময়ে নির্বাক,
পঙ্গু রুগ্ন অথবা যেন গলিত শবের পাঁক।

সুর্যের পারদে নগ্ন রুগ্ন আকৃতির সত্য স্পষ্ট ছায়া পড়ে,
ধূলিমাখা পুরাতন পঞ্জিকার পাতায় যেমন বিজ্ঞাপনে
ম্যালেরিয়া ব্যাধিগ্রস্ত কঙ্কালের বীভৎস চিত্র নড়ে চড়ে।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় ছিন্ন মলিন বস্ত্রে ঘুরি দ্বার থেকে দ্বারে,
অন্নের অন্বেষণে। রুক্ষ্ম কেশ, ক্লান্ত দৃষ্টি, পায়ে কেম্বিসের জুতো,
ঘর্মসিক্ত ললাটে কুঞ্চিত রেখা, ন্যুজ দেহ হতাশায় লাঞ্ছনার ভারে।
সংগ্রামে বিধ্বস্ত। দারিদ্র্যের কশাঘাত পেশীর শক্তি কেড়ে নেয়,
আজন্ম দুঃখের পুরস্কার সম্বল। অভিশাপে জর্জরিত বুক।
জন্মের ঠিকুজীতে ভুল করে বিধাতা সৌভাগ্যের ছাপ নাহি দেয়।
জগতের হাটে ঘাটে ইতস্তত বিচরণ বিকল্প ছদ্মবেশ ধরে,
বহুরূপী কলেবর রঙিন বন্ধলে ঢেকে মুহুর্মুহু সত্তা অপদস্থ,
সূক্ষ্মদেহী আত্মা তবু নতুন আধার লভে ক্রমে জন্মান্তরে।
কার হীন ষড়যন্ত্রে অসংলগ্ন এই জন্ম দুঃস্বপ্ন গহবরে?
আমি আজ প্রতিহিংসাপরায়ণ সেই দুশমনের রাজ্যে স্বর্ণ সিংহদ্বারে
প্রধান দ্বারীর বেশে গুপ্তচর ভূমিকায় রত রব নির্জন প্রহরে।
মিথ্যা নীচ কলঙ্কের অপমানে অত্যাচারে তীব্র যন্ত্রণায়
তার রত্ন সিংহাসনে নির্মম আক্রোশে মোর বজ্রসম অসি
দ্রুতগামী হৃদ্পিণ্ডের বিকৃত চিত্র আঁকে ক্রুর মন্ত্রণায়।
বর্ষার নির্মল জলে রক্তসিক্ত কালো হাত তারপর ধুয়ে নিতে হবে,
হৃদয়ের বাসি ফুল ফেলে দিয়ে সমুদ্রের মৌসুমী বাতাসে,
অন্য নামে পরিচয়ে অন্য কোনখানে জন্ম নিতে হবে গোপন গৌরবে।
স্কুল ধনী অপদার্থ ধনীর প্রাসাদে যদি পঙ্গু দালাল হয়ে যাই,
সুরা নারী ব্যভিচারে জঘন্য নরক গুলজারে জীবন্মৃতের মতন
তস্করের পদক্ষেপে বোরখায় দেহ ঢেকে অন্ধ গুহায় লুকাই।
তার চেয়ে হিমাচলে দুর্গম অঞ্চলে কোন মহর্ষির বেশে
ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন, জীবনের বেদগাঁথা আবৃত্তি আনন্দে
সার্থক অমরত্ব জাগতিক অভিজ্ঞতাহীন ঐশী আকাঙ্ক্ষায় মেশে।
তবু তৃপ্তিহীন যাত্রা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে,
রথচক্র উদ্দাম গতিতে ঘোরে সার্থকতা অন্বেষণের নেশায়;
তারপর অকস্মাৎ ক্ষান্ত হয় পথ চলা আমারই অজান্তে।

তবে কি এই শব্দহীন ক্রন্দনের স্বর নেই, ভাষা নেই, নেই প্রতিধ্বনি,
মূক কণ্ঠের রুদ্ধ ব্যথা বন্ধ অন্ধ আবেগে মুহ্যমান?
দাতা যারা, করুণার ধনের মালিক সব সৌভাগ্যবান,
হয়ত বধির, নয়ত তাচ্ছিল্য ঘৃণা উপেক্ষায়, উগ্র অহঙ্কারে মত্ত;
শূন্য জঠরের নিষ্ঠুর তাড়না কান্নার স্রোতে নিস্তেজ নিঃশব্দ।
অশ্রুর রঙ যদি লাল হয়ে দরদর ঝরে,
তখনও কি ওদের উদ্ধত শ্রবণ এই কাতর প্রার্থনা
ক্রন্দনের করুণ ভাষা মিনতির স্বর শুনতে পাবে না?
যদি হৃদ্পিণ্ড ছিঁড়ে সূর্যকুণ্ডসম জ্বলে বিদ্রোহের তাপে,
স্পন্দনের গতি ক্রমবর্ধমান উত্তাল তাণ্ডবে নৃত্য করে,
তবুও কি সম্রাসের বিভীষিকায় কিছুমাত্র বিচলিত হবে না
মূক বধির প্রস্তর হৃদয়ের নিছক নির্বাক জলছবিরা?

ইতিহাস করে না তো কভু ভুল বীর, তোমা বরণ করিতে
তোমার বিজয় ধ্বজা উড়ায়ে যখনই আসো বরমাল্য নিতে,
রক্তজয়ী দেশকালপাত্র হয় খেলাঘরে পুতুল তোমার,
যুগে যুগে তুমি বীর কর্ণ অর্জুন নেপোলিয়ন হিটলার,
বীরভোগ্যা বসুন্ধরা বিজয় মুকুট তব উন্নত মস্তকে পরায়,
দেশে দেশে ইতিহাস যুগে যুগে তব বন্দনাগীতি গায়।
তুমি বীর, ইউরোপ এশিয়া আফ্রিকা মহাদেশে
সিংহের পৌরুষে কর পদানত নানা জাতি বিক্রমে অক্লেশে,
প্রাচীন কালের সূর্য থেকে কর তেজ বীর্য অস্ত্র আহরণ,
প্রকৃতির তনু দেয় ভাণ্ডারের অফুরন্ত শৌর্য আভরণ,
সহস্র সমুদ্র দেয় তোমার রথের চক্রে দুরন্ত তরঙ্গ দ্রুত গতি,
ত্রিকালের ত্রিনয়ন তব দেহে নিরস্তর সঞ্চারে শক্তিমান জ্যোতি
মত্ত দম্ভে উত্তাপে উদ্বেলিত উন্নত বক্ষ কম্পমান,
দুঃসাহসী পুষ্পরথে চলে তব বিজয় যাত্রার অভিযান।
আসির ঝঙ্কারে কাঁপে থরথর মেদিনীর অন্তর বাহির,
ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসে শিঙা দামামার তব পদধ্বনি তোল, মহাবীর।
দেশমাতৃকার প্রিয় কুলকন্যাদের সাথে শত সহচরী
মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে চন্দনে কুসুমে ধূপে আরতি করি
সুগন্ধি মাল্যদানে শঙ্খ রবে সবে তোমা বরণ করে,
তব স্তুতি কীর্তিগাঁথা কালজয়ী ইতিহাস লেখে তারপরে।

গভীর রাত্তিরে আবছা কুয়াশার চাদরে ঢাকা
প্রাচীন কালের মসজিদের পেছনে ডালিম গাছে আলো ছড়িয়ে
সুগোল নরম চাঁদখানা যখন দেখা দিল,
তখন সহসা মনে পড়ল তোমার কথা, কমল।
উত্তর দিগন্ত থেকে হালকা হাওয়া এল,
ঝিঝি পোকার ডাকও ক্ষীণতর হল,
সবুজ ঘাসের বুক থেকে বিষণ্ণতার প্রলেপ তখন মুছে গেছে।
হাসপাতালের তের নম্বর বেডে তুমি হয়ত যথারীতি
রিক্ত রাত্রির তিক্ততা বুকে নিয়ে অবচেতন মনে ঘুমিয়ে রয়েছ।
গলির মোড়ে তোমার ইদানীংকালের বাসস্থান। হাসপাতাল।
জানালা খুললেই চোখে পড়ে গেটের দু’পাশের দুটো বড় আলো
মহান মৃত্যুর সঙ্গে তোমার বদ্ধ ঘরের বৈদুতিক আলোর আভা
অহেতুক যেন মিশতে চায়। ভাবছি তোমার কথা।
বিশ্বজোড়া চাঁদের আলোর অগ্নিকুণ্ডে যে মহান প্রাণের যজ্ঞ,
তার হোমের আগুনেই তুমি হয়ত আহুতি দিতে চলেছ
তোমার সারা যৌবনের সব গৌরবের মণিরত্নকে!
তোমার চোখ দুটো ছলছল, কণ্ঠ রুদ্ধ। আতঙ্কিত। করুণ।
এই মমতাহীন পৃথিবীকে এতদিন পরে চিরতরে ছেড়ে যেতে
তোমার খুব কষ্ট হয়, কমল। তা আমি জানি।
কিন্তু আমি হলে, মৃত্যুকেই মেনে নিতাম! হ্যাঁ, ঠিকই বলছি!
জন্ম নেবার সঙ্কল্প নিতাম এমন কোন অভিশাপহীন দেশে,
যেখানে মানুষে মানুষে নেই ভেদ, ভাইয়ে ভাইয়ে নেই ক্ষেদ,
শিশুরা যে দেশে আণবিক বোমা নিয়ে খেলা করে না,
অথবা সভ্যতার দাবিতে জল ঘোলা করতে ভয় পায়।
আমি ফিরে পেতে চাই দেশলাইয়ের বদলে চকমকি,
লেখার বদলে হিজিবিজি, কথার বদলে অদ্ভূত সাঙ্কেতিক স্বর।
তোমার হাসপাতালের তপ্ত বেড আমি কোন দিনই চাই না,
আমার মৃত্যুকে আমি নিমন্ত্রণ করব কোন গাছতলায়, অথবা
দুর্গম অরণ্যের পথ ধরে খুঁজে পাওয়া কোন গুহার অন্তরালে।
আমি চাই, আমার এই নশ্বর কঙ্কাল তিলে তিলে মিশুক
এই নগ্ন নিষ্কৃত্রিম কালো মাটির স্তরে মাটিরই মতো।
তোমার কাছে মৃত্যু যখন এসে দাঁড়াবে, বন্ধু,
জেনো তা মৃত্যু নয়, মহামুক্তি মহাবন্ধন থেকে,
হয়ত আশীষলব্ধ মানুষের নতুন কোন দেশে
তোমার জন্যে এসেছে ব্যগ্র নিমন্ত্রণ।
তোমার যাত্রাপথে তাই অনায়াসে অবহেলা করে যেয়ো
এই উগ্র পৃথিবীর বক্র উপহাস।
তুমি যেয়ো, তবু এইখানে এই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে
নিশ্চয়ই তোমাকে আমার মনে পড়বে
এমন কোন আবছা কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাতে
এই পরিচিত হাসপাতালের কাছে।

প্রকৃতিতে মশকেরা সাম্রাজ্যবাদী দস্যু তস্করের গোপন দালাল।
শোষণ পেশায় বিজ্ঞ। ভাণ্ডে তার প্রভূত সঞ্চয় প্রতিদিন।
মজুতের হার বৃদ্ধি। হীন মতলবে দীন দরিদ্রের তাজা রক্তকণা
বিন্দু বিন্দু আহরণ করে যেন মূল্যহীন নমুণার মতো।
মশার জীবিকা ঘৃণ্য রক্তপানে নিষ্ঠুর তামাসার খেলা;
আদিম রিপুর বশে অতর্কিত আক্রমণে নির্মম শোষণে
ক্ষুদ্র প্রাণে অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি সমাপ্তি কখনও
হয় না। তবুও রক্ততৃষ্ণা মত্ত মাতালের দুরন্ত নেশার মতন।
কিন্তু শোষক মশার বংশধারা একদিন জানি, ধ্বংস হবে
আগামী দিনের কৃষ্ণবর্ণ কলঙ্কিত আবরণ উন্মোচনে;
যুগান্তের সঞ্চয়ের গুপ্ত তহবিলে জমা বিন্দু বিন্দু রক্তের সাগর
তিলে তিলে নিক্তিতে মাপা হবে অতীতের বঞ্চনার খাতে।
সক্ষম পাখনা তার দগ্ধ হবে শোষিতের রুদ্র অভিশাপে,
বংশে তার বাতি দিতে কোথা কেউ থাকবে না আনাচে কানাচে।
স্পর্ধিত গুঞ্জন স্তন্ধ হবে। লাল শোণিতের স্বাদের বিস্মৃতি।
মশকের জন্মের জীবিকার ইতিবৃত্ত কালে কালে বিলুপ্ত হবে।

তাসের খেলা যখন জমে উঠে,
রঙের তাসের আসরে সে মহামূল্য মধ্যমণি।
তবু শেষ পর্যন্ত, গোলাম গোলামই রয়ে যায়। খেলার শেষে
তার পদমর্যাদা বাড়ে না মূল্যের চাহিদায়।
সাহেব বিবির আসনের তলায় তার স্থান
নির্দিষ্ট। নিশ্চিত। অতি পরিচিত। অপরিবর্তিত।