Author: তাহের আলমাহদী

  • আমাজনের গহনে

    আমাজনের গহনে

    অজেয় রায়

    [book]

    ভূমিকা

    দুনিয়ায় কত জায়গাতেই তো যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সাধ থাকলেই সাধ্যে, কুলোয় না। তাই মনে মনে বেড়াতে যেতে পারি এমন সুযোগ একমাত্র যাতে পাওয়া যায় তেমন বই পেলে আর কোনো দুঃখ থাকে না। কিন্তু তেমন বই কি সহজে মেলে? যাঁর কল্পনায় ভর করে যাব, তিনি হয়তো যেখানকার কথা বলছেন, সেখানে নিজে তো যান-ই নি, ভালো করে ঠিকমতো খবরাখবরও রাখবার চেষ্টা করেননি। তিনি হয়তো উত্তর মেরুতে পেঙ্গুইন পাখি দেখিয়ে ছাড়বেন আর দক্ষিণ মেরুতে শাদা ভাল্লুক।

    তবে সে রকম বই যে বাংলায় মোটে নেই, তা কেউ যেন না বলে। এই তো আমার হাতে রয়েছে আমাজনের গহনে। যেমন তেমন জায়গায় নয়, সেই দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরের অজানা পেরু আর বলিভিয়ার যে সব অঞ্চলে আমাজন নদীর সব ধারাপথ এখনো পুরোপুরি খুঁজে বার করা হয়নি, সেইখানে যদি যেতে হয় তো আমি অজেয় রায়ের সঙ্গেই যাব। উত্তেজনা রোমাঞ্চ গা-ছমছম করা ভয় আর রুদ্ধশ্বাস উদ্বেগের খোরাক তো পুরোপুরি পাবই, সেইসঙ্গে এইটুকু নিশ্চিত মানব যে প্রাকৃতিক ভৌগোলিক যা সব বিবরণ পাচ্ছি, তার মধ্যে এতটুকু ভুল কোথাও নেই। আমাদের ছোটদের মনগুলোকে সমস্ত পৃথিবীতে সার্থকভাবে ঘুরিয়ে আনবার জন্যে এই আমাজনের গহনের মতো বই আর অজেয় রায়ের মতো লেখকের বড় দরকার।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র

  • ছয়

    ছয়

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    ছয়

    ‘আপনি যাবেন না?’

    ‘তোমার কি মনে হয়?’ দুই চোখে কথা-ভরা হাসি নিয়ে তাকালেন দীনেশদা।

    উজ্জ্বল দৃষ্টির মধ্য দিয়ে এমন বন্ধুতাপূর্ণ হাসি—এ আর দেখিনি কোনোদিন। সে-হাসিতে কোমল স্নেহের স্পর্শ মাখানো। পুঁজিপাটা তাঁর কিছুই ছিল না—শুধু হৃদয়ভরা নীরবনিবিড় স্নেহ আর দুই চোখের এই মাধুৰ্যময় মিত্রতা। যেন বা একটি অন্তিম আশ্রয়ের প্রশ্নহীন প্রতিশ্রুতি। সব হারিয়ে-ফুরিয়ে গেলেও আমি আছি এই অভয় ঘোষণা। তাই দীনেশরঞ্জন ছিলেন “কল্লোলে”র সব-পেয়েছির দেশ। সব-হারানোদের মধ্যমণি।

    দেখতে সুপুরুষ ছিলেন। চৌরঙ্গি অঞ্চলে এস রায়ের খেলার সরঞ্জামের দোকানে যখন চাকরি করতেন, তখন সবাই তাঁকে পার্শি বলে ভুল করত। দু-চার কথা আলাপ করেই বোঝা যেত ইনি যে শুধু বাঙালি তা নন, একেবারে বিশ্বাসী বন্ধুস্থানীয়। অল্প একটু হেসে দু’ চারটি মিষ্টি কথায় দূরকে নিকট ও পরকে আপন করার আশ্চর্য জাদুমন্ত্র জানতেন। একটি বিশুদ্ধ প্রীতিস্বচ্ছ অন্তরের নির্ভুল ছায়া এসে সে চোখে পড়ত বলেই সে-জাদুমন্ত্রের মায়ায় মুগ্ধ না হয়ে থাকা যেত না। এস রায়ের দোকান থেকে চলে আসেন তিনি লিসে স্ট্রিটে এক ওষুধের দোকানে অংশীদার হয়ে। সমবেত রুগীদের এমন ভাবে যত্ন-আত্তি করতেন কে বলবে ইনিই ডাক্তার নন। মানুষের অন্তরে প্রবেশ করবার সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ত্বরান্বিত যে পথ আছে তিনি ছিলেন সেই পথের পথকার। সে পথের প্রবেশে স্বচ্ছ-স্নিগ্ধ হাসি, প্রস্থানে অকপট আন্তরিকতা। এই সময়ে প্রায়ই নিউ মার্কেটে ফুলের স্টলে বেড়াতে আসতেন। ফুল ভালবাসতেন খুব, কিন্তু কেনবার মত স্বচ্ছলতা ছিল না। মাসে দু-এক টাকার কিনতেন বড় জোর, কিন্তু যখনই দোকানের গলিতে এসে ঢুকতেন দোকানীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত—কে কোন ফুল তাকে উপহার দেবে। অম্লান ফুলের মতই যে এর হৃদয় ফুলের জহুরিরা বুঝতে পারত সহজেই। কথা-ভরা উজ্জ্বল চোখ, হাসিভরা মিষ্টি আলাপ আর অনন্যসাধারণ সরল সৌন্দর্যবোধ—সকলের থেকেই কিছু না কিছু আদায় করে নিত অনায়াসে। শুধু ক্ষণজীবনের ফুল নয়, আমার-তোমার ইহজীবনের ভালোবাসা। অজাতশত্রু শুনেছি, কিন্তু এই প্রথম দেখলাম—জাতমিত্র। এই একজন।

    এই ফুলের স্টলে ঢুকেই গোকুলের কাছাকাছি এসে পড়েন। লক্ষ্য করেন একটি উদাসীন বিমনা যুবক ছিন্নবৃন্ত ফুল গুচ্ছের দিকে করুণ চোখে চেয়ে কি ভাবছে। হয়তো ভাবছে ফুল বেচে জীবিকার্জন করতে হবে এ কি পরিহাস! পরিহাসটা আরো বেশি মর্মান্তিক হয় যখন তা আঘ্রাণেও লাগে না—আস্বাদনেও লাগে না। পুরোপুরি অন্তত জীবিকার্জনটাই কর। দীনেশরঞ্জন হাত মেলালেন গোকুলের সঙ্গে। তার বিপণি-বীথি নতুন ছন্দে সাজিয়ে দিলেন, নতুন বাচনে আলাপ করতে লাগলেন হলে-হতে-পারে খদ্দেরদের সঙ্গে। ফুল না নাও অন্তত একটু হাসি একটু সৌজন্য নিয়ে যাও বিনি-পয়সায়। আর এমন মজা, যেই একটু সেই হাসি দেখেছ বা কথা শুনেছ, নিজেরও অলক্ষিতে কিনে বসেছ ফুল। দেখতে-দেখতে গোকুলের মরা গাঙে ভরা কোটালের জোয়ার এল। তবু যেন মন ভরে না। এমন কিছু নেই যার সৌরভ অল্পযায়ী বা অল্পজীবী নয়? যা শুকায় না, বাসি হয় না? আছে নিশ্চয়ই আছে। তার নাম শিল্প, তার নাম সাহিত্য। চলো আমরা সেই সৌরভের সওদা করি। হোন তিনি এ সৃষ্টির কারিক, তবু আমরা পরের জিনিসে কারবার করব কেন? আমরা আমাদের নিজের জিনিস নিজেরাই নির্মাণ করব।

    সেই থেকে ফোর আর্টস বা চতুষ্কলা ক্লাব। আর সেই চতুষ্কলার ক্ষীরবিন্দু “কল্লোল”।

    মুরলীদা, শৈলজা, প্রেমেন আর আমি চারজন ভবানীপুর থেকে এক দলে, আর অন্য দলে ডি-আর, গোকুল, নৃপেন, ভূপতি, পবিত্র, সুকুমার— সকলে সদলবলে হুগলিতে এসে উপস্থিত হলাম। প্ল্যাটফর্মে স্বয়ং নজরুল। “দে গরুর গা ধুইয়ে” অভিনন্দনের ধ্বনি উঠল। পূর্ব-পরিচয়ের নজির এনে ব্যবধানটা কমাবার চেষ্টা করা যায় কিনা সে-কথা ভেবে নেবার আগেই নজরুল সবল আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিলে—শুধু আমাকে নয়, ভনে-জনে প্রত্যেককে। তোমরা হেঁটে-হেঁটে একটু-একটু করে কাছে আস আর আমি লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পড়ে জাপটে ধরি–সাঁতার জানা থাকতে সাঁকোর কি দরকার!

    সেটা বোধ হয় নজরুলের বড় ছেলের আকিকা উৎসবের নিমন্ত্রণ। দিনের বেলায় গানবাজনা, হৈ-হল্লা, রাতে ভুরিভোজ। ফিরতি ট্রেন কখন তারপর? “দে গরুর গা ধুইয়ে।” ফিরতি ট্রেনের কথা ফিরতি ট্রেনকে জিগগেস করো।

    দুপুরে নজরুলকে নিয়ে কেউ-কেউ চলে গেলাম নৈহাটি—সুবোধ রায়ের বাড়ি। সুবোধ রায় মুরলীদার সহপাঠী, তাছাড়া সেই বছরেই তার আর সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের হাতে এসে গিয়েছে “বিজলী”—মহানিশার অন্ধকারে সেই বিদ্যুজ্জ্বালাময়ী কথা। আর তার সঙ্গে আছে কিরণকুমার রায়, সংক্ষেপে কিকুরা। তীক্ষ্ণধী সুজন-রসিক বন্ধু। কিন্তু সে নিজের আত্মপরিচয় দিতে ভালবাসে চিরকেলে সাব-এডিটর বলে। বলেই বয়েৎ ঝাড়ে : এডিটর মে কাম, এডিটর মে গো, বাট আই গো অন ফর এভার। আরো একজন আছেন—তিনি শিল্পী নাম অরবিন্দ দত্ত, সংক্ষেপে এ-ডি। নিপুণ রূপদক্ষ। কিন্তু তিনি বলেন, তার শিল্পের আশ্চর্য কৃতিত্ব তার রঙে-তুলিতে-কাগজে-কলমে তত নয়, যত তার আননমণ্ডলে। কেননা উত্তরকালে তিনি বহু সাধনায় তার মুখখানাকে চার্চিল সাহেবের মুখ করে তুলেছেন। দাঁতের ফাঁকে একটা মোটা চুরুট শুধু বাকি।

    ছোটখাটো বেঁটে মানুষটি এই সুবোধ রায়, অফুরন্ত উচ্চহাস্যের ও উচ্চরোলের ফোয়ারা। প্রচুর পান খান আর প্রচুর কথা বলেন। আর, উচ্চগ্রামের সেই কথায় আর হাসিতে নিজেকে অজস্র ধারায় অবারিত করে দেন। আজো, বহু বৎসর অতিক্রম করে এসেও, সেই সরল খুশির সবল উৎসার যেন এখনো শুনতে পাচ্ছি।

    আসলে সেই যুগটাই ছিল বন্ধুতার যুগ, কমরেডশিপ বা সমর্মিতার যুগ। যে যখন যার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, আত্মার আত্মজনের মত দাঁড়িয়েছে। জিজ্ঞাসা নেই, পরীক্ষা নেই, ব্যবধান নেই। সৃজনসমুদ্রের উর্মিল উত্তালতায় এক ঢেউয়ের গায়ে আরেক ঢেউ—ঢেউয়ের পরে ঢেউ। সব এক জলের কলোচ্ছ্বাস! বাঁধ ভাঙা এক বন্যার বল।

    কল্লোল-যুগের আরেক লক্ষণ এই সুন্দর সৌহার্দ্য, নিকটনিবিড় আত্মীয়তা। একজনের জন্যে আরেকজনের মনের টান। একজনের ডাকে আরেকজনের প্রতিধ্বনি। এক সহমর্মিতা।

    নজরুল বিষের বাঁশি বাজাচ্ছে, আর সে-সুর সে-কথা সবাইর রক্তে বিদ্রোহের দাহ সঞ্চার করছে। গলার শির জোঁকের মত ফুলে উঠেছে, ঝাঁকড়া-চুলে মাথা দোলাচ্ছে অনবরত, আর কখনো-কখনো চড়ার কাছে গিয়ে গলা চিরে যাচ্ছে দুতিন ভাগ হয়ে—সব মিলে হয়ত একটা অশালীন কর্কশতা—কিন্তু সব কিছু অতিক্রম করে সেই উন্মাদনার মাধুর্য–ইহসংসারে কোথাও তার তুলনা নেই। প্রখরতার মধ্যে সে যে কি প্রবলতা, কার সাধ্য তা প্রতিরোধ করে! কার সাধ্য সে অগ্নিমন্ত্রে না দীক্ষা নেয় মনে-মনে! এ তো শুধু গান নয় এ আহ্বান—বন্ধনবর্জনের আর্তনাদ! কার সাধ্য কান পেতে না শোনে! বুক পেতে না গ্রহণ করে।

    এই
    শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল!
    এই
    শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥
    তোদের
    বন্ধ-কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়,
    ওরে,
    ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।
    এই
    বাঁধন পরেই বাঁধন তোদের করব মোরা জয়
    এই
    শিকল-বাঁধা পা নয় এ শিকল ভাঙা কল॥
    ওরে
    ক্রন্দন নয় বন্ধন এই শিকল ঝঞ্চনা
    এ যে
    মুক্তি পথের অগ্রদূতের চরণবন্দনা।
    এই
    লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা,
    মোদের
    অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল॥

    একবার গান আরম্ভ করলে সহজে থামতে চায় না নজরুল। আর কার এমন ভাবের অভাব হয়েছে যে নজরুলকে নিবৃত্ত করে। হারমোনিয়মের রিডের উপর দিয়ে খটাখট খটাখট করে ক্ষিপ্তবেগে আঙুল চালার আর দীপ্তস্বরে গান ধরে :

    মোরা ভাই বাউল চারণ মানি না শাসন বারণ

    জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।

    দেখে ঐ ভয়ের ফাঁসি হাসি জোর জয়ের হাসি

    অ-বিনাশী নাইক মোদের ডর রে॥

    যা আছে যাক না চুলায়, নেমে পড় পথের ধূলায়

    নিশান দুলায় ঐ প্রলয়ের ঝড় রে।

    ধর হাত ওঠরে আবার দুর্যোগের রাত্রি কাবার

    ঐ হাসে মার মূর্তি মনোহর রে॥

    জীবনে এমন কয়েকটা দিন আসে যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে স্মৃতিতে—অক্ষরও মুছে যায় ক্রমে-ক্রমে কিন্তু সেই স্বর্ণচ্ছটা জেগে থাকে আমরণ। তেমনি সোনার আলোয় আলো করা দিন এ। রেখা মুছে গেছে কিন্তু রূপটি আছে অবিনশ্বর হয়ে। দুপুরে গঙ্গায় স্নান, বিকালে গঙ্গায় নৌকাভ্রমণ, রাত্রে আহার—এ একটা অমৃতময় অভিজ্ঞতা। বায়ু, জল, তরু, লতা, তারা, আকাশ সব মধুমান হয়ে উঠেছে— মৃত্যুজিৎ যৌবনের আস্বাদনে। সৃষ্টির উল্লাসে বলীয়ান হয়ে উঠেছে দুর্বার কল্পনা।

    সেই রাত্রে আর গান নেই, সুরু হল কবিতা। প্রেমেন একটা কবিতা আবৃত্তি করলে—বোধ হয়, “কবি নাস্তিক”। “বুক দিলে যে, ভুখ দিলে যে, দুখ দিতে সে ভুলল না, মৃত্যু দিলে লেলিয়ে পিছে পিছে।” আমিও অনুসরণ করলাম। “দে গরুর গা ধুইয়ে।” এরা আবার কবিতাও লেখে নাকি? সবাই অভিনন্দন করে উঠল এই প্রথম ও অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারে। বলো, আরো বলো—আরও যতটা মুখস্থ আছে।

    ফিরতি ট্রেন কখন চলে গিয়েছে। নেমে এসেছে ক্লান্তিহরণ স্তব্ধতা। কিন্তু নৃপেন কাউকে ঘুমুতে দেবে না। যেন একটা ঘরছাড়া অনিয়মের জগতে চলে এসেছি সবাই। দেখলাম, বাড়ি ফিরে না গেলেও চলে, দিব্যি না ঘুমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায় সারারাত। প্রতিবেশী হৃদয়ের উত্তাপের পরিমণ্ডলে এসে নবীন সৃষ্টির প্রেরণা লাভ করা যায়, কেননা আমরা জেনে নিয়েছি, আমরা সব এক প্রাণে প্রেরিত। এক ভবিষ্যতের দিশারী।

    “বিষের বাঁশী”র ভূমিকায় নজরুল দীনেশরঞ্জনকে উল্লেখ করেছিল আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু বলে। দীনেশরঞ্জন বয়সে আমাদের সকলের চেয়ে বড়, কিন্তু আশ্চর্য, বন্ধুতায় প্রত্যেকের সমবয়সী, একেবারে নিভৃততম, দুঃসহতম মুহূর্তের লোক। কি আকর্ষণ ছিল তাঁর, তাঁর কাছে প্রত্যেকের নিঃসঙ্কোচ ও নিঃসংশয় হবার ব্যাকুলতা জাগত। অথচ এত ঘনিষ্ঠতার মাঝেও একদিনের জন্যেও তাঁর জ্যেষ্ঠত্বের সন্ত্রম হারাননি। তাঁর দৃঢ়তাকে উচ্চতাকে অবনমিত করেননি। নিজে আর্টিস্ট ছিলেন, তাই একটি পরিচ্ছন্ন শালীনতা তার চরিত্রে ও ব্যবহারে মিশে ছিল। তারই জন্যে এত আস্থা হত তাঁর উপর। মনে হত, নিজে নিঃসম্বল হলেও নিঃসম্বলদের ঠিক তিনি নিয়ে যাবেন পরিপূর্ণতার দেশে। নিজে নিঃসহায় হলেও নিঃসহায়দের উত্তীর্ণ করে দেবেন তিনি বিপদ-বাধার শেষে শ্যামলিম সমতলতায়।

    দীনেশরঞ্জনের বিদ্রোহ রাজনৈতিক নয়, জীবনবাদের বিদ্রোহ। একটা আদর্শকে সমাজে সংসারে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বৈরাগ্যভূষণ সংগ্রাম। সাংসারিক অর্থে সাফল্য খোঁজেন নি, শুধু একটি ভাবকে সব কিছুর বিনিময়ে ফলবান করতে চেয়েছিলেন। সে হচ্ছে সত্যভাষণের আলো-কে সাহিত্যের পৃষ্ঠায় অনির্বাণ করে রাখা। প্রতিদিনকার সাংসারিক তুচ্ছতার ক্ষেত্রে অযোগ্য এই দীনেশরঞ্জন কত বিদ্রুপ-লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন জীবনে, কিন্তু আদর্শভ্রষ্ট হননি। তাঁর দীপায়নের উৎসবে ডাক দিয়ে আনলেন যত “হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথার” ঘরছাড়াদের। বললেন, অমৃতের পুত্রকে কে বলে গৃহহীন? এই ঘরছাড়াদের নিয়েই ঘর বাঁধব আমি। থাকব সবাই মিলে একটা ব্যারাক বাড়িতে। কেউ বিয়ে করব না। বিভক্ত হব না। থাকব অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠতায়। সাহিত্যের ব্রতে একনিষ্ঠ হব। মৃত্যুর পরে কোনো সহজ সুন্দর পরলোক চাই না, এই জীবনকেই নব-নব সৃষ্টির ব্যঞ্জনায় অর্থ দেব, মূল্য দেব নব-নব পরীক্ষায়।

    কিন্তু গোকুলের বিদ্রোহ সাহিত্যিক বিদ্রোহ। গোকুলকে থাকতে হত তার ব্রাহ্ম মামাবাড়িতে নানারকম বিধি-বিধানের বেঁড়াজালে। সে বাড়িতে গোকুলকে গলা ছেড়ে কেউ ডাকতে পেত না বাইরে থেকে, কোনো মুহূর্তে জামা খুলে খালি-গা হতে পারত না গোকুল। এমন যেখানে কড়া শাসন, সেখান থেকে আর্টস্কুলে গিয়ে ভর্তি হল। তার অভিভাবকদের ধারণা, আর্টস্কুলে যায় যত বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো ছেলে, এবার আর কি, রাস্তায়-রাস্তায় বিড়ি ফুঁকে বেঁড়াও গে। শুধু আর্ট স্কুল নয়, সেই বাড়ি থেকেই সিনেমায় যোগ দিলে গোকুল। “সোল অফ এ শ্লেভ” ছবিতে নামল একটি বিদূষকের পার্টে। সহজেই বুঝতে পারা যায় কত বড় সংঘর্ষ করতে হয়েছিল তার সেদিনকার সেই পরিপার্শ্বের সঙ্গে। নীতি-রীতির কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে। কিছু কিছু তার ছায়া পড়েছে “পথিকে”:

    “মায়া উঠিয়া মুখ ধুইয়া আসিয়া চুল আঁচড়াইতে আঁচড়াইতে গান ধরিল–

    তোমার আনন্দ ঐ এলো দ্বারে

    এলো–এলো–এলো গো!

    বুকের আঁচলখানি I beg your pardon, miss–

    সুখের আঁচলখানি ধূলায় পেতে

    আঙ্গিনাতে মেল গো—’

    নাঃ, আমার মুখটা দেখছি সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে। ভাগ্যিস কেউ ছিল না—‘বুকের আঁচল’ বলে ফেলেছিলাম!

    দীপ্তি হাসিয়া বলিল—বাঃ বাঃ! দিদি, তোকে পারবার যো নেই!

    মায়া। কেন, দোষটা শুধরে নিলাম তাতেও অপরাধ?

    দীপ্তি। ওর নাম দোষ শুধরে নেওয়া? ও ত চিমটি কাটা।

    মায়া। তা হলে আমার দ্বারা হয়ে উঠল না সভ্য হওয়া। তোদের মত ভাল মেয়ের পাশে থেকে যে একটু-আধটু দেখে শুনেও শিখব, তাও দিবি না? আচ্ছা সবাই এত রেগে যায় কেন বলতে পারিস? সেদিন যখন কমলা ঐ গানটা গাইছিল, মিসেস ডি এমন করে তার দিকে তাকালেন যে বেচারীর বুকের আঁচল বুকেই রইল, তাকে আর ধূলায় মেলতে হল না। মিসেস ডি বলে দিলেন, বই-এ ওটা ছাপার ভুল কমল, সুখের আঁচল হবে–

    কমলা বলল—কিন্তু রবিবাবুকে আমি ওটা বুকের আঁচল–

    মিসেস ডি বলিল—তর্ক কোর না, যা বলছি শোন। আর কমলাটারও আচ্ছা বুদ্ধি! না হয় রবিবাবু গেয়েছিলেন বুকের আঁচল–কিন্তু এদিকে বুকের আঁচলটা ধূলায় পাততে গেলে যে ব্যাপারটা হবে তার সম্বন্ধে কবির অনভিজ্ঞতাকে কি প্রশ্রয় দেওয়া উচিত?…”

    “বীরেন্দ্রনাথ বলিলেন—আজকের ব্যাপারের হোষ্টেস কে?

    দীপ্তি। দিদি।

    মায়া ফোঁস করিয়া উঠিল—হাঁ, তা-ত হবেই, ছাই ফেলতে এমন ভাঙা কুলো আর কে আছে বল?

    করুণা বলিলেন—ঝগড়াঝাঁটির দরকার কি? মেয়েদের মত তোদের ত আর সঙ্গে নিয়ে এক টেবিলে খেতে হবে না—তোরা খাওয়াবি।

    মায়া বলিল—তাও ত বটে।

    সুবর্ণ। টেবিলে! তার মানে? ওরা কি কখনো টেবিলে খেয়েছে? একটা বিদ্ঘুটে কাণ্ড না করে তোমরা ছাড়বে না দেখছি। চিবোনো জিনিষগুলো চারদিকে ছড়িয়ে ফেলবে—মুখে ভাত তোলার সময় সর-সর শব্দের সঙ্গে ঝর-ঝর করবে। হাতটা চাটতে চাটতে কনুই পর্যন্ত গিয়ে ঠেকবে–

    মায়া হাসিয়া বলিল, আচ্ছা মা, তুমি কি কোনদিন ওঁদের খেতে দেখেছ?

    সুবর্ণ। দেখব আবার কি। মেসে থাকে, এক সঙ্গে পঞ্চাশজনে মিলে বাইরের কলে চান করে আর চেঁচামেচি কাড়াকাড়ি করে খায়— আমাদের কর্পূরীটোলা লেনের বাড়ীর ছাদ থেকে একটা মেস স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়, ছেলেগুলো শুধু গায়ে বিছানার ওপর শুয়ে শুয়ে পড়ে, আর পড়ে তো কত! খাটের ছৎরিতে ময়লা গামছা আর ঘরের কোণে গামলায় পানের পিক, এ থাকবেই।”

    “কল্যাণী বলিল,–মনিবাবু, আপনি আমার খুব কাছে কাছে থাকুন না–

    মুনি কিছু বুঝিতে না পারিয়া কল্যাণীর মুখের দিকে চাহিল।

    কল্যাণী হাসিয়া বলিল—জানেন না বুঝি, এটা ব্রাহ্মপাড়া। চারপাশের জানালাগুলোর দিকে একটু ভাল করে চেয়ে দেখুন, দেখবেন, কত ছোটবড় কত রকমের সব চোখ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আধঘণ্টার মধ্যেই গেজেট ছাপা হয়ে যাবে। ঐ যে প্রকাণ্ড হলদে রং-এর বাড়ীটা দেখছেন ওটা হচ্ছে মিসেস ডির বাড়ী, ওঁকে চেনেন না?

    মনি ভীতভাবে বলিল—চলুন নীচে যাই, দরকার নেই ওসব গণ্ডগোলে।

    কল্যাণী হাসিয়া বলিল—এই আপনার সাহস?

    মুনি বলিল—তলোয়ারের চেয়ে জিভটাকে আমি ভয় করি। চলুন—

    কল্যাণী বলিল—Its too late. ঐ দেখুন—

    মুনি দেখিল প্রায় প্রত্যেক জানালা হইতে মেয়েরা বিশেষ আগ্রহের সহিত দেখিতেছে।”

    “মিস লতিকা চ্যাটার্জি তাহার মাতাকে বলিল—মা, আমি এই গোল্ড-গ্রে শাড়ীটার সঙ্গে বাফ-ব্লাউজটা পরব?

    মিসেস চ্যাটার্জি। ওটা না তুই মিসেস গুপ্তর পার্টিতে পরে গিয়েছিলি!

    লতিকা। তবে এই ফ্লেম কলারের শাড়ী আর স্যামন পিঙ্ক ব্লাউজটা পরি, কি বল মা?

    মিসেস চ্যাটার্জি। মরি মরি, যে না রূপের মেয়ে, ঠিক যেন কয়লার বস্তায় আগুন লেগেছে মনে হবে।

    তাহার পর মাতা এবং কন্যার মধ্যে যে প্রহসন সুরু হইল তাহার দর্শক কেহ থাকিলে দেখিত, কাপড় জামা ঘরময় ছড়াইয়া লতিকা তাহার উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া হিষ্টিরিয়া-গ্রস্ত রোগীর ন্যায় হাত-পা ছুঁড়িতেছে এবং তাহার মাথার কাছে বসিয়া মিসেস চ্যাটার্জি তাহাকে কিলাইতেছেন।”

    নজরুলের যেমন ছিল “দে গরুর গা ধুইয়ে”, গোকুলের তেমনি ছিল, “কালী কুল দাও মা, নুন দিয়ে খাই”। এমনিতে ক্লান্ত-কঠিন গম্ভীর চেহারা, কিন্তু শুকনো বালি একটু খুঁড়তে পেলেই মিলে যাবে শীতল স্নিগ্ধ জলস্পর্শ। দীনেশ আর গোকুল দু’জনেই সংসার-সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত, দু’জনেই অবিবাহিত—দু’জনের মাঝেই দেখেছি এই স্নেহের জন্যে শিশুর মত কাতরতা। স্নেহ যে কত প্রবল, স্নেহ যে কত পবিত্র, স্নেহ যে মানুষের কত বড় আশ্রয় তা দু’জনেই তাঁরা বেশি করে বুঝতেন বলে তাঁরা দুজনেই স্নেহে এত অফুরন্ত ছিলেন।

    প্রেমেন ঢাকায় ফিরে যাবে, আমি আর শৈলজা তাকে শেয়ালদা স্টেশনে গিয়ে তুলে দিলাম। প্রেমেন লিখলে ঢাকা থেকে :

    অচিন,

    এই মাত্র ‘কল্লোল’ অফিস থেকে সংক্রান্তির ফাইলের সঙ্গে তোর, শৈলজার আর দীনেশবাবুর চিঠি পেলুম।

    সারাদিন মনটা খারাপই ছিল। খারাপ থাকবারই কথা। কলেজে যাই না, এখানেও জীবনটা অপব্যয় করছি। কিন্তু তোদর চিঠি পেয়ে এমন আনন্দ হল কি বলব।

    ভাই, একটা কথা তোকে আগেও একবার বলেছি, আজও একবার বলব—না বলে পারছি না। দ্যাখ ভাই, জীবনে অনেক কিছুই পাইনি, কিন্তু যা পেয়েছি তার জন্যে একবার কৃতজ্ঞ হয়েছি কি? এই বন্ধুদের ভালবাসা—এর দাম কি কোন ভালবাসার চেয়ে কম? এর দাম আমরা সব চুকিয়ে কি দিতে পেরেছি?

    আদিম মানুষ অর্ধসভ্য, মানুষ ছিল একক, হিংস্র। সে আরেকটা পুরুষকে কাছে ঘেঁষতেও দিত না। (উর্দ্ধতনের গোড়ার দিকের কথা বলছি) নারীর প্রতিও তার কাম তখনও প্রেমে রূপান্তরিত হয়নি। তারপর অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবু হুইটম্যান যখন sexless loveএর কথা প্রথম প্রচার করেছিলেন অনেকেই মনে-মনে হেসেছিল, এখনও অনেকে হয়ত হাসে। কিন্তু আমি জানি ভাই, মানুষ পশুত্বের সে-স্তর ছাড়িয়ে এখন যে-স্তরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে সেখানে যৌনসম্বন্ধ ছাড়াও আর একটা সম্বন্ধ মানুষের সঙ্গে মানুষের হওয়া সম্ভব। কথা ভাল করে হয়ত বোঝাতে পারলুম না। তবুও তুই বুঝতে পারবি জানি।

    এই যে প্রেম, মানুষের অন্তরের এই যে নতুন এক প্রকাশ এটা এত দিন সম্ভব ছিল না। যৌনমিলনপিপাসা ও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে দরকারী ক্ষুধা ও প্রবৃত্তিকে নিবৃত্ত করতেই একদিন মানুষের। দিন কেটে যেত। নিজের অন্তরের গভীরতর সত্যকে তলিয়ে খুঁজে বুঝে দেখবার অবসর তার ছিল না। আজ কয়েকজনের হয়েছে বা কয়েকজন সে অবসর করে নিয়েছে।

    জীবনের চরম সার্থকতা এই প্রেমের জাগরণে। যতদিন না এই প্রেম জাগে ততদিন মানুষ খণ্ডিত থাকে, সে নিজেকে পায় না সম্পূর্ণ করে। কিন্তু বন্ধুর মাঝে যেই সে আপনাকে প্রসারিত করে দিতে পারে তখনই সে-খণ্ডতার হীনতা দুঃখ ও লজ্জা থেকে মুক্তি পেয়ে সার্থক হয়। আমি যতদিন বন্ধুকে অন্তর দিয়ে ভালবাসতে না পারি ততদিন আমার দরজা বন্ধ থাকে। যে পথে আনন্দময় পৃথিবীর চলাচল সে-পথ আমি পাই না।

    কথাটাকে কিছুতেই গুছিয়ে ভাল করে বলতে পারছি না, শুধু অন্তরে অনুভব করছি এর সত্য। এইটুকু বুঝতে পারছি প্রিয়া আমার জীবনের যতখানি, বন্ধু তার চেয়ে কম নয়। এই কমরেডশিপের মুল্য হুইটম্যান প্রথম বোঝাতে চেষ্টা করেন। আমরাও একটু বুঝেছি মনে হয়। এখানে হুইটম্যান থাকলে সেই জায়গাটা একটু তুলে দিতুম।

    বন্ধুত্ব, কমরেডশিপ ইত্যাদি কথাগুলো সব জাতির ভাষাতেই বহুকাল ধরে চলে আসছে, কিন্তু এই বন্ধুত্ব কথাটার ভেতরকার অর্থের গভীরতা দিন দিন মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করছে। পঞ্চাশ বছর আগে এ কথাটার মানে যা ছিল আজ তা নেই, আকাশের মত এ কথাটার অর্থের আর সীমা, বিস্ময়ের আর পার নেই।

    আমার অন্তরের দেবতা তোর অন্তরের দেবতার মিলন-প্রয়াসী, তাই তো তুই আমার বন্ধু। আমরা নিজেদের অন্তরের দেবতাকে চিনি না ভাল করে, ক্রমাগত চেনবার চেষ্টা করছি মাত্র। বন্ধুর ভেতর দিয়েই তাকে ভালো করে চিনি।

    শুধু প্রিয়াকে পেল না বলে যে কাঁদে, সে হয় মূর্খ, নয় যৌনপিপাসার স্তরে আবদ্ধ অন্ধ। প্রিয়ার মাঝেও যতক্ষণ না এই বন্ধুকে খুঁজি ততক্ষণ প্রিয়াকে পূর্ণ করে পাই না। যে প্রেম বৃহৎ সে প্রেম মহৎ। সে প্রেম প্রিয়ার মাঝে এই বন্ধুকে খোঁজে বলেই বৃহৎ ও মহৎ। প্রিয়ার মাঝে শুধু নারীকে খুঁজত ও খোঁজে পশু।

    অনেকক্ষণ বললুম। তোর ভাল লাগবে কি এই একঘেয়ে বক্তৃতা? তবু না বলে পারি না, কারণ তুই যে আমার “বন্ধু”।

    দিন-দিন নিজের অজ্ঞাতে একটা বিশ্বাস বাড়ছে যে মৃত্যুই চরম কথা নয়। “কিরণ1” অর্থহীন জীবন বুদ্বদ ছিল না–আরো কিছু–কি?

    চিঠি দিস, ওখানকার সব খবর লিখিস। খুব লম্বা চিঠি দিবি। আভ্যুদয়িকের খবর, ‘কল্লোল’ আফিসের খবর, শৈলজা, মুরলীদা, শিশির, বিনয়ের খবর ইত্যাদি ইত্যাদি সব চাই। পড়াশুনা করছি না মোটে। কি লিখছিস আজকাল? সেদিন যিনি ফল খেতে দিলেন তিনিই কি তোর মা? তোর মাকে আমার প্রণাম দিস।–তোর প্রেমেন্দ্র মিত্র

  • সাত

    সাত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    সাত

    ঘোর বর্ষায় পথ-ঘাট ডুবে গেলেও আড্ডা জমাতে আসতে হবে তোমাকে কল্লোল: আপিসে—তা তুমি ভবানীপুরেই থাকো বা বেলেঘাটায়ই থাকে। আর সোমনাথ আসত সেই কুমোরটুলি থেকে। সোমনাথের যেটা বাড়ি তার নিচেটা চালের আড়ত, সারবাঁধা চালের বস্তায় ভর্তি। উপরে উঠে গিয়ে চালের গাদি পেরিয়ে সোমনাথের ঘর। একটা জলজ্যান্ত প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ শুধু তার ঘরে নয়, চেহারায়ও। গদির মালিকদের পরনে আটহাতি ধুতি, গা খালি, গলায় তুলসীর কন্ঠী। সোমনাথের পরনে ঢিলেঢালা অঢেল পাঞ্জাবি, লম্বা লোটানো কোচা, অতৈললাঞ্ছিত চুল ফাঁপিয়ে-ফাঁপিয়ে ব্যাকব্রাশ করা। সব মিলিয়ে একটা উদ্ধত বিদ্রোহ সন্দেহ নেই, কিন্তু দেখতে যেমন সৌম্যদর্শন, শুনতেও তেমনি অতিনম্র। মোলায়েম মিষ্টি হেসে একটু বা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে, কথায় পরিহাসের রসটাই বেশি। অথচ এদিকে খুব বেশি সিরিয়স—পড়ছে মেডিকেল কলেজে। ডাক্তারি করবে অথচ গল্প লিখছে “ভারতী”তে, কাগজ বের করেছে “ঝর্ণা” বলে। (একটা স্মরণীয় ঘটনার জন্যে ও কাগজের নাম থাকবে, কেননা ও কাগজেই সত্যেন দত্তের “ঝর্ণা” কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।) এ হেন সোমনাথ, হঠাৎ শোনা গেল, ব্রাহ্ম হচ্ছে। সখের ব্রাহ্ম নয়, কেতাদুরস্ত ব্রাহ্ম। গোকুলই খবর নিয়ে এল তার দীক্ষার দিন কবে। স্থান ভবানীপুর সম্মিলন সমাজ। গেলাম সবাই মজা দেখতে। গিয়ে দেখি গলায় মোটা ফুলের মালা পরে সোমনাথ ভাবে গগদ হয়ে বসে আছে আর আচার্য সতীশ চক্রবর্তী ফুল দিয়ে সাজানো বেদী থেকে হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিয়ে তাকে দীক্ষিত করছেন। বহু চেষ্টা করে চোখের সঙ্গে চোখ মিলিয়ে তাকে টলানো  গেল না, ধর্মবিশ্বাসে সে এত অবিচল। ব্যাপার কি? মনোবনবিহারিণী কোনো হরিণী আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু, কি পরিহাস, কিছুকাল পরে বিধিমত হিন্দুমতে সমাজমনোনীত একটি পাত্রীর পাণিগ্রহণ করে বসল। সোমনাথ সাহা কল্লোল যুগের এক ঝলক বাসন্তী হাওয়া।

    সমস্ত বিকেলে হৈ-চৈ-হল্লার পর সন্ধ্যোত্তীর্ণ অন্ধকারে গোকুলের সঙ্গে একান্ত হবার চেষ্টা করতাম। কল্লোল-অপিসে একখানি যে চটের ইজিচেয়ার ছিল তা নিয়ে সারাদিন কাড়াকাড়ি গেছে—এখন, নিভৃতে তাইতেই গা এলিয়েছে গোকুল। পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে বুঝি? সারাদিন সুবোধকে “পথিকে”র শ্রুতলিপি দিয়েছে। তারই জন্যে কি এই ক্লান্তি? মনে হত, শুধু শারীরিক অর্থেই যেন এ ক্লান্তির ব্যাখ্যা হবে না। যেন আত্মার কোন গভীর নিঃসঙ্গতা একটি মহান অচরিতার্থতার ছায়া মেলেছে চারপাশে; হয়তো অন্ধকার আর একটু ঘন ও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেই তার আত্মার সেই গভীর স্বগতোক্তি শুনতে পাব।

    কিন্তু নিজের কথা এতটুকুও বলতে চাইত না গোকুল। বলতে ভালোবাসত ছেলেবেলাকার কথা। সতীপ্রসাদ সেন—আমাদের গোরাবাবু–গোকুলের সতীর্থ, নিত্যি যাওয়া-আসা ছিল তার বাড়িতে, রূপনারায়ণ নন্দন লেনে। গোরাবাবুদের বাড়ির সামনের শীতলাতলায় বৈশাখ মাসে তিন দিন ধরে যাত্রা হত, শলমা-চুমকির পোশাক-পরা রাজা-রাণী-সখির দল সরগরম করে রাখত সেই শীতলাতলা। প্রতি বৎসর গোরাবাবুদের বাড়ির ছাদে বসে সারারাত যাত্রা শুনত গোকুল—একবার কেমন বেহালা নিয়ে এসেছিল সখীদের গানগুলো বেহালায় তুলে নেবার জন্যে। কিংবা বলতে চাইত আর আগের কথা। সেই যখন সাউথ সুবার্বান স্কুলে ফিফ্‌থ ক্লাশে এসে ভর্তি হল। অত্যন্ত লাজুক মুখচোরা ছেলে, ক্লাশের লাস্ট বেঞ্চিতে লুকিয়ে থাকবার চেষ্টা। আলিপুরে মামার বাড়িতে থাকে, মামা ব্রাহ্ম, তাই তার কথাবার্তায় চালচলনে একটা চকচকে গোছগাছ ভাব সকলের নজরে না পড়ে যেত না। তার উপর মার্বেল ডাণ্ডাগুলি চু-কপাটি খেলবে না কোনোদিন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আর নাকি খাতার পাতায় ছবি আঁকে, কবিতা লেখে। রাষ্ট্র হয়ে গেল, ও বেহ্মজ্ঞানী। সে না জানি কি রকম জীব, ছেলেরা মন খুলে মিশত না, কপট কৌতূহলে উঁকিঝুকি মারত। মাস্টার-পণ্ডিতরাও টিটকিরি দিতে ছাড়তেন না। ফোর্থ ক্লাশে যখন পড়ে তখন ওর খাতায় কবিতা আবিষ্কার করে ওর পাশের এক ছাত্র পণ্ডিতমশায়ের হাতে চালান করে দেয়। পড়ে পণ্ডিতমশায় সরাসরি চটে উঠতে পারলেন না, ছন্দেবন্ধে কবিতাটি হয়ত নিখুঁত ছিল। শুধু নাক সিঁটকে মুখ কুঁচকে বলে উঠলেন : ‘এতে যে তোদের রবিঠাকুরের ছায়া পড়েছে! কেন, মাইকেল হেম নবীন পড়তে পারিস না? রবিঠাকুর হল কিনা কবি। তার আবার কবিতা। আহা, লেখার কি নমুনা। রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়, রাজার মেয়ে যেত তথা—’ “তথা”—কথাটা এমন মুখভঙ্গি করে ও হাত নেড়ে উচ্চারণ করলেন যে ক্লাশশুদ্ধ, ছেলেরা হেসে উঠল।

    মেজবৌদি গোকুলের জন্যে খাবার পাঠিয়ে দিলেন। কি করে খবর পেয়েছেন তিনি গোকুল আজ সারাদিন ধরে উপবাসী। বাড়িতে ফিরতে তার দেরি হয় বলে সে সাফাই নিয়েছে বাইরে খেয়ে-আসার। তার মানে, প্রায় দিনই একবেলা অভুক্ত থাকবার। কোনো-কোনদিন আরো নির্জন হবার অভিলাষে সে বলত, চলো, এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত হাঁটি, তার মানে তখন বুঝতে পারিনি পুরোপুরি। তার মানে, গোকুলের কাছে পুরোপুরি ট্র্যামভাড়া নেই।

    অথচ এই গোকুল কোনো-কোনোদিন নৃপেনের পাশ ঘেঁসে বসে অলক্ষ্যে তার বুক-পকেটে টাকা ফেলে দিয়েছে যখন বুঝেছে নৃপেনের অভাব প্রায় অভাবনীয়।

    অথচ যখন কথা বলতে যাও গোকুলের মুখে হাসি আর রসিকতা ছাড়া কিছু পাবে না। সুর করে যখন সে পূর্ববাংলার কবিতা বলত তখন অপরূপ শোনাত :

    পদ্মা-পাইড়া রাইয়তগ লাঠি হাতে হাতে

    গাঙের দিকে মুখ ফিরাইয়া ভাত মাখেন পাতে।

    মাখা ভাতটি না ফুরাতেই ভাইঙ্গা পড়ে ঘর

    সানকির ভাত কোছে ভইরা খোঁজেন আরেক চর।

    টানদেশী গিরস্তগ বাপকালান্যা ঘটি

    আটুজলে ডুব দেন আর বুকে ঠেকে মাটি।

    আপনি পাও মেইল্যা বইস্যা উক্কায় মারেন টান,

    একপ্রহরের পথ ভাইঙ্গা বউ জল আনবার যান!

    সাতাশ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে একটা একদুয়ারী এক চিলতে ঘরে “কল্লোলে”র পাবলিশিং হাউস খোলা হয়। আপিস থাকে সেই পটুয়াটোলা লেনেই। তার মানে সন্ধের দিকের তুমুল আড্ডাটা বাড়ির বৈঠকখানায় না হয়ে হাটের মাঝখানে দোকানঘরেই হওয়া ভালো। সেই চিলতে ঘরে সবাইর বসবার জায়গা হত না, ঘর ছাপিয়ে ফুটপাতে নেমে পড়ত। সেই ঘরকেই নজরুল বলেছিল “একগাদা প্রাণভরা একমুঠো ঘর।” সেই একমুঠো ঘরেই একদিন মোহিতলাল এসে আবির্ভূত হলেন। আমরা তখন এক দিকে যেমন যতীন সেনগুপ্তের পেসিমিজম-এ মশগুল, তেমনি মোহিতলালের ভাবঘন বলিষ্ঠতায় বিমোহিত। মোহিতলালকে আমরা মাথায় তুলে নিলাম। তিনি এসেই কবিতা আবৃত্তি করতে সুরু করলেন, আর সে কি উদাত্তনিস্বন মধুর আবৃত্তি! কবিতার গভীর রসে সমস্ত অনুভূতিকে নিষিক্ত করে এমন ভাবব্যঞ্জক আবৃত্তি শুনিনি বহুদিন। দেবেন সেনই আবৃত্তি করতে ভালোবাসতেন। আজো তাঁর সেই ভাবগদগদ কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি, দেখছি তার সেই অধমুদ্রিত চক্ষুর সূক্ষ্ম শুভ্ররেখা।

    চাহিনা না আনার যেন অভিমানে ক্রূর

    আরক্তিম গণ্ড ওষ্ঠ ব্রজসুন্দরীর,

    চাহিনাক ‘সেউ’ যেন বিরহবিধূর

    জানকীর চিরপা বদন রুচির।

    একটুকু রসে ভরা চাহি না আঙুর

    সলজ্জ চুম্বন যেন নববধূটির,

    চাহিনা ‘গন্না’র স্বাদ, কঠিনে মধুর

    প্রগাঢ় আলাপ যেন প্রৌঢ় দম্পতির।

    কল্লোল-পাবলিশিং হাউস থেকে প্রথম বই বেরোয় সুবোধ রায়ের “নাটমন্দির”—তিনটি একাঙ্ক নাটিকার সঙ্কলন। আর চতুষ্কলা ক্লাবের খানকয় পুরানো বই, “ঝড়ের দোলা” বা “রূপরেখা”—তার বিষয়বিভব। আর, সর্বোপরি, নজরুলের “বিষের বাঁশী” জমায় রেখে হুহু করে যে বেচতে পারছে এই তার ভবিষ্যতের ভরসা।

    তেরোশ একত্রিশ সালের পূজার ছুটিতে কলকাতার বাইরে বেঁড়াতে যাই। সেখানে দীনেশদা আমাকে চিঠি লিখেন :

    সোমবার

    ৩রা কার্তিক, ১৩৩১

    সন্ধ্যা ৭-৩০ টা

    পথের ভাই অচিন্ত্য,

    কিছুদিন হল তোমার সুন্দর চিঠিখানি পেয়ে কৃতার্থ হয়েছি। তোমাকে ছাড়া আমাদেরও কষ্ট হচ্ছে—কিন্তু যখন ভাবি হয়ত ওখানে থেকে তোমার শরীর একটু ভাল হতে পারে তখন মনের অতখানি কষ্ট থাকে না।

    হয়ত এরই মধ্যে পবিত্র ও ভূপতির বড় চিঠি পেয়েছ। কি লিখেছে তারা তা জানি না, তবে এটা শুনেছি যে পত্র দুখানাই খুব বড় করে লিখেছে।

    আজ সারাদিন খুব গোলমালে গেল। এই কিছুক্ষণ আগে মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা আমার শেষ হল। শৈল, মুরলী, গোকুল, নৃপেন, পবিত্র ভূপতি প্রভৃতি কল্লোল আপিস ছেড়ে গেল। আমি স্নান সেরে এসে নিরালায় তাই তোমার কাছে এসেছি। এইটুকু আমার সময়—কিন্তু তাও কেউ কেউ আসেন কিংবা মনের ভিতরই গোলমাল চলতে থাকে।

    কাল রবিবার গেল, মুরলীদার বাড়ীতে সন্ধ্যাবেলা জোর আড্ডা বসেছিল। চা, পান, গান, মান, অভিমান সবই খুব হল। বীরেনবাবু ও জ্ঞানাঞ্জন পাল মহাশয়রাও ছিলেন।

    “রূপরেখা”র বেশ একটা রিভিয়ু বেরিয়েছে Forward-এ কালকের।

    “নাটমন্দির”ও আজ বেরিয়ে গেল। এবার তোমাদের পালা। একখানা করে সবাইকার বের করতেই হবে। কেমন? অন্তত একশটি টাকা আমাকে প্রথম এনে দাও, আর তোমাদের লেখাগুলি, তা হলেই কাজ শুরু করে দিতে পারি।

    প্রেমেন এসেছে ফিরে, তাকেও জোর দিয়েছি। সে তো একটু seriouslyই ভাবছে।

    শৈলজার “রাঙাশাড়ী”খানা যদি পাওয়া যায়—যেতেও পারে—তা হলে তো কথাই নেই।

    তোমার “চাষা-কবি” এখনও পেলাম না কেন? এতই কি কাজ যে কপি করে আজও পাঠাতে পারলে না? তোমার কবিতাটিই যে আগে যাবে, সুতরাং কবিতা পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত করবে। এবারে প্রেমেনের “কমলা কেবিন”টা ফিরিয়ে পেলে হয়তো যাবে। তুমি না থাকাতে তার যথেষ্ট একলা লাগছে বুঝতে পারি। সত্যি, বেচারার একটা আস্তানা নেই যে খাবে থাকবে।

    কিন্তু এরকমই থাকব সব? না, তা হবে না—এই মাটি খুঁড়ে তা হলে শেষ চেষ্টা করে যাব। আমরা তো সইলাম আর বুঝলাম কিছু কিছু। কিন্তু যে কষ্ট নিজেরা পেলাম তা কি পরকে জেনে-শুনে দিতে পারি? ঐ সারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনাগত অযুত সংখ্যক কালকের মানুষের দল, তারা এসেও কি এই ভোগই ভুগবে? আমাদের এই সত্যের নির্বাক যুদ্ধ জয় করে রাখবে বাংলার প্রাণের প্রান্তে-প্রান্তে সবুজ পাতার বাসা। নীড়হারা পথহারা নীল-আকাশের রং-লাগান নীলপাখীর দল একেবারে সোজা সবুজ পাতার বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেবে। পথের বাঁকের বিরাট আয়ুবৃদ্ধ বটগাছ দেখবে বাংলার প্রান্ত হতে প্রান্তে রুক্ষরূপের বক্ষভেদ করে ফুটে আছে অপরাজিতার দল।

    কি জানি কতদূর হবে। যদি না থাকি!

    আহা, বাঁচুক তারা যারা আসছে। বেচারারা কিছু জানে না, বিশ্বাস ভাঙিয়ে সাদা মনের সওদা কিনতে গিয়ে কিনছে কেবল ফুটো আর পচা! তারা যে তখন কাঁদবে। আহা, যদি তাদের মধ্যে এমন কেউ থাকে যে সে ভেঙে পড়বে, পৃথিবীকে অভিশাপ দিয়ে ফেলবে? না, না, তাদের জন্য কিছু রেখে যেতে পারব না আমরা ক’জনে?

    পলিটিক্স বুঝি না, ধর্ম মানি না, সমাজ জানি না—মানুষের মনগুলি যদি সাদা থাকে—ব্যস, তা হলেই পরমার্থ।

    তোমাকে একটা কথা বলছি কানে-কানে। মনটার জন্য একটা চাবুক কেনো। চাবুক মেরো না যেন কখনও, তাহলে বিগড়ে যাবে। মাঝে-মাঝে কেবল সপাং-সপাং করে আওয়াজ করবে—মনের ঘরের যে যেখানে ছিল দেখবে সব এসে হাজির। ভয়ও না ভাঙে, ভয়ও না থাকে–এমনি করে রাখতে হবে।

    আর একটা কথা—ভালবাসাটাকে খুঁজে বেড়িও না। ওটা ঘোড়ার পায়ের নালও নয় আর মাটির তলায় মোহরের কলসীও নয়। হাতড়ে চললেই হোঁচট খাবে। তবে কোথায় আর কবে সত্যিকারের ভালবাসবার মত ভালবাসাটুকুকে পাবে তা জানবার চেষ্টাও করো না। খানেখানে পাওয়া যায়—সবটুকু রসগোল্লায় মত একজায়গার তাল পাকিয়ে রসের গামলায় ভাসে না।

    ঝড়ের দিনে শিল কুড়োয় না ছেলেমেয়েরা? কুড়োতে-কুড়োতে দু’ একটা মুখেই দিয়ে ফেলে আর সব জড় করে একটা তাল পাকায়, সেটা আর চোষে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আর দেখে। কত রঙের খেলা। ঘুরতে থাকে—আর মাঝে-মাঝে ঠাণ্ডা হাত নিজেরই কপালে চোখে বুলোয়। কুড়েবার সময়ও ঝড়ের যেমন মাতন, যারা শিল কুড়োয় তাদেরও তেমনি ছুটোছুটি হট্টগোল! কোনটা ঠকাস করে মাথায় পড়ে, কোনটা পায়ের কাছে ঠিকরে পড়ে গুড়িয়ে যায়, কোনটা বা এক ফাঁকে গলার পাশ দিয়ে গলে গিয়ে বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে। কুড়োনো শেষ হলে আর গোল থাকে না, সব চুপচাপ করে তাল পাকায় আর নিজের সংস্থান ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে।

    বিয়ে করতে চাও? চাকরী দেখ। অন্ততঃপক্ষে দেড়শ টাকার কমে হবেই না। তা-ও নেহাৎ দরিদ্রমতে—প্রেম করা চলবে না। যদি সমাজকে ডিঙিয়ে যেতে চাও তাহলে অন্তত দুশো আড়াই শো।

    শরীরের খবর দিও। লেখা immediately পাঠাবে। দেরী করোই না। ভালবাসা জেনো।

    তোমাদের দীনেশদা

    এর দিন কয়েক পরে গোকুলের চিঠি পাই।

    ‘কল্লোল’

    ১০-২ পটুয়াটোলা লেন, কলিকাতা

    ১১ই কার্তিক, ৩১

    স্নেহাস্পদেষু

    তোমার চিঠি যখন পাই তখন উত্তর দেবার অবস্থা আমার ছিল না। অবস্থা যখন ফিরে পেলাম তখন মনে হল—কি লিখব? লেখবার কিছু আছে কি? চোখের সামনে বসে পবিত্র পাতার পর পাতা তোমায় লিখেছে দেখেছি, ভূপতি নাকি এক ফর্মা ওজনের এক চিঠি লিখেছে, দীনেশ ও সম্ভবত তাই। আর কে কি করেছে তা তুমিই জান, কিন্তু আমার বেয়াদবি আমার কাছেই অসহ্য হয়ে উঠছিল। তাই আজ ভোরে উঠেই তোমাকে লিখতে বসেছি। আমার শরীর এখন অনেকটা ভাল। তোমার প্রথমকার লেখা চিঠিগুলো থেকে যেকথা আমার মনে হয়েছিল তোমার পবিত্রকে লেখা দ্বিতীয় চিঠিতে ঠিক সেই সুরটি পেলাম না। কোথায় যেন একটু গোল আছে। প্রথমে পেয়েছিলাম তোমার জীবনের পূর্ণ বিকাশের আভাস, কিন্তু দ্বিতীয়টা অত্যন্ত melodramatic. দেখ অচিন্ত্য, যে বলে দুঃখকে চিনি, সে ভারী ভুল করে। অনেক দুঃখ পেয়েছি জীবনে কথাটার সুর অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। মনের যে কোন বাসনা ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি অতৃপ্ত থাকলেই যে অশান্তি আমরা ভোগ করি তাকেই বলি দুঃখ, কিন্তু বাস্তবিক ও দুঃখ নয়। যে বুকে দুঃখের বাসা সে বুক পাথরের চেয়েও কঠিন, সে বুক ভাঙ্গে না টলে না। দুঃখের বিষদাঁত ভেঙ্গে তাকে নির্বিষ করে যে বুকে রাখতে পারে সেই যথার্থ দুঃখী। ভিখারী, প্রতারিত, অবমানিত, ক্ষুধার্ত—এরা কেউই দুঃখী নয়। খৃষ্ট দুঃখী ছিলেন না, তিনি চিরজীবন চোখের জল ফেলেছেন, নালিশ করেছেন, অভিশাপ দিয়েছেন, অভিমান করেছেন। গান্ধী যথার্থ দুঃখী। এবার ক্ষুধা, অশান্তি, ব্যথার প্রত্যেকটি stage-এর সঙ্গে মিলিয়ে নাও, বুঝতে পারবে দুঃখ কত বড়। সবাই যে কবি হতে পারে না তার কারণ এই গোড়ায় গলদ। অত্যন্ত promising হয়েও melodramatic monologue-এর সীমা এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তিগত অতৃপ্তি ও অশান্তির ফর্দ করে যায়, তাই সেটাকে মানুষ বলে সখের দুঃখ। যাক বাজে কথা, কতকগুলো খবর দিই।

    হঠাৎ কেন জানি না পুলিশের কৃপাদৃষ্টি আমাদের উপর পড়েছে, আমাদের আপিস দোকান সব খানাতল্লাস হয়ে গেছে, আমরা সবাই এখন কতকটা নজরবন্দী–‘1818 Act 3’-তে।

    নৃপেন বিজলী আপিসে কাজ করছে। শৈলজার ‘বাংলার মেয়ে’ বেরিয়েছে, সে এখন ইকড়ায়। মূরলীর জ্বর হয়েছিল। প্রেমেনের ‘অসমাপ্ত’ আমি পড়েছি, সম্ভবত পৌষ থেকে ছাপব। ভূপতি এখন পুরুলিয়ায়। পথিক ছাপা আরম্ভ হয়েছে, 1st form-এর অর্ডার দিয়েছি। আমাদের চিঠি না পেলেও মাঝে মাঝে যেখানে হোক লিখো। শুভ ইচ্ছা জেনো। ইতি। গোকুলচন্দ্র নাগ।

    নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’র জন্যই পুলিশ হানা দিয়েছিল। মনে করেছিল সবাই এরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী। ভাবনৈতিক সন্ত্রাসবাদীদের দিকে তখনো চোখ পড়েনি। তখন আসেননি তারক সাধু।

    “কাগজে পড়েচো কলকাতায় ধরপাকড়ের ধুম লেগে গেছে।” পবিত্র লিখল : “কাজীর বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ হয়েছে। কল্লোলের আপিস ও দোকান খানাতল্লাসী হয়েছে। সকলের মধ্যেই একটা প্রচণ্ড আশঙ্কাভীতি এসে গেছে। সি আই ডি-র উপদ্রবও সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড রকম বেড়ে গেছে। কলকাতা শহরটাই তোলপাড় হয়ে গেছে। যেখানেই যাও চাপাগলায় এই আলোচনা। যারা ভুলেও কখনও রাজনীতির চিন্তা মনে আনে নাই তাদের মধ্যেও একটা সাড়া পড়ে গেছে–”

    সেই সাড়াটা “কল্লোলে”র লেখকদের মধ্যেও এসে গেল। চিন্তায় ও প্রকাশে এল এক নতুন বিরুদ্ধবাদ। নতুন দ্রোহবাণী। সত্যভাষণের তীব্র প্রয়োজন ছিল যেমন রাজনীতির ক্ষেত্রে, তেমনি ছিল অচলপ্রতিষ্ঠ স্থবির সমাজের বিপক্ষে।

  • লৌহ কপাট

    লৌহ কপাট

    জরাসন্ধ ছদ্মনামের আড়ালে আসল মানুষটি হলেন চারুচন্দ্র চক্রবর্তী (১৯০২-১৯৮১)। অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করে দার্জিলিং-এ ডেপুটি জেলার হিসেবে কর্মজীবন সুরু করেন। তিরিশ বছর নানা জায়গায় কাজ করার পর ১৯৬০ সালে আলীপুর সেণ্ট্রাল জেলের সুপারিন্টেনডেন্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

    তাঁর লেখার বৃহত্তর অংশ জেলের বন্দীদের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। চাকরির কারণে জেল জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে লেখকের। কয়েদীদের কাছ থেকে শুনেছেন তাদের অপরাধের কাহিনী। সেসব কাহিনীর আলোকে লেখা ‘লৌহকপাট’। প্রথম তিনখণ্ড চাকরিজীবনে প্রকাশিত। শেষখণ্ডটি অবসরের পর প্রকাশিত হয়।

    এছাড়া ছোটগল্প এবং ছোটদের জন্য লেখা গল্পও তার বেশ কিছু আছে। তাঁর শিশুদের জন্য নিবেদিত কিছু বই এ প্রথমদিকে তাঁর মূল নাম প্রকাশিত হয়েছিল।

    প্রথম অখণ্ড (চার খণ্ড একত্রে) সংস্করণ – আশ্বিন ১৩৭৫

    প্রচ্ছদপট অঙ্কন : আশু বন্দ্যোপাধ্যায়

    উৎসর্গ

    লৌহকপাটের অন্তরালে যারা শেষ নিশ্বাস রেখে গেল,
    সেই সব বিস্মৃত মানুষের উদ্দেশে

     

    ফ্লাপের  লেখা

    লেখক জরাসন্ধ নিজে বলেছেন, – “এইটুকু শুধু বলতে পারি, জীবনে এমন একটা পথে আমাকে চলতে হয়েছে, যেটা প্রকাশ্য রাজপথ নয়। সে এক নিষিদ্ধ জগৎ। সেখানে যাদের বাস, তাদের ও আমাদের এই দৃশ্যমান জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লৌহদণ্ডের যবনিকা।” এই লৌহদণ্ডের যবনিকার ওপারের কোনো কোনো প্রাণী অকস্মাৎ কোনোদিন খুলেছিল তাদের অন্তরদুয়ার, দেখা গেল তাদেরও আছে বৈচিত্র্যময় জীবনকাহিনী— সুখে সমুজ্জ্বল, দুঃখে পরিম্লান, হিংসায় ভয়ংকর, প্রেমে জ্যোতির্ময়। লৌহকপাট গ্রন্থে তাদেরই কথা লেখক বলেছেন অসীম মমতায় পরম সহানুভূতির সঙ্গে। এই গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ক্লাসিক উপন্যাসের স্থান নিয়েছে।

  • গ্রন্থকারের নিবেদন

    গ্রন্থকারের নিবেদন

    সেকালে সাহিত্যের রসবিচার ও মাননির্ণয় হত রাজদরবারে, একালে হয় পাঠক- দরবারে। সেদিন রাজা এবং অন্তরালবর্তিনী রানীর সামনে বসে সাহিত্যিক তাঁদের চিত্তবিনোদনের চেষ্টা করতেন, আজ তাঁর সামনে অগণিত রাজা-রানী। তাঁদের মনোরঞ্জন অসাধনীয়, অন্তত আমার কাছে। সে নিষ্ফল প্রয়াস আমি সভয়ে পরিহার করে চলেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে পাঠককুলের কোন কোন ইচ্ছা, আবদার কিংবা দাবী পালন করবার চেষ্টা না করে পারিনি।

    এই গ্রন্থ সংকলনের মূল উদ্দেশ্যও তাই। আমার একদল সহৃদয় পাঠক-পাঠিকার ফরমাশ-রক্ষা।

    প্রথম পর্ব লৌহকপাট যখন প্রকাশিত হল, মনে করেছিলাম, এই শেষ। কিন্তু হল না। এল দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয় এবং শেষ পর্যন্ত চতুর্থ।

    আমি তো লিখেই খালাস। সমস্যা দেখা দিল পাঠকমহলে। পাড়ার লাইব্রেরী থেকে প্রথম খণ্ড পড়ে বসে আছেন, দ্বিতীয় আর হাতে আসে না। অনেক দিন অপেক্ষা করে পেলেন চতুর্থ। যাঁরা নিজস্ব লাইব্রেরীতে সব-কটা পর্ব সংগ্রহ করে রাখতে চান, তাঁরাও দেখলেন কাজটা সহজ নয়। চারখণ্ডের প্রকাশক তিনজন। বাংলার বাইরে যাঁরা থাকেন, তাঁদের আরও মুশকিল। কোন্টার জন্যে কাকে অর্ডার দেবেন ভেবে পান না।

    আজকের পাঠকরা লেখকের উপর তুষ্ট হলে বড় একটা মুখ খোলেন না, কিন্তু কোন কারণে রুষ্ট হলে তৎক্ষণাৎ পত্রাঘাত করে বসেন। এই ব্যাপার নিয়ে আমার উপরেও বেশ কিছু পত্র বর্ষণ হল। কেউ কেউ অভিযোগ জানিয়ে নিরস্ত হলেন। কিন্তু অনেকেরই দাবী—চারটি খণ্ড একত্রে পেতে চাই।

    সেই বৃহৎ বস্তুটির আকার এবং কার স্কন্ধে তার ভার চাপানো যায় যখন ভাবছি, তখন স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে এগিয়ে এলেন মিত্র-ঘোষ। আমি দায়মুক্ত হলাম। সেজন্য তাঁদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। কিন্তু বন্ধুবর গজেন্দ্রকুমার মিত্র এবং সুমথনাথ ঘোষের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, তাতে ঐ বস্তুটি ঘটা করে প্রকাশ করাটা কেমন বেখাপ্পা লাগছে। অতএব বিরত রইলাম।

    সেই একই কারণে এই সুবৃহৎ সংকলনের প্রুফ সংশোধন এবং অন্যান্য বহু ঝঞ্ঝাট যাদের পোহাতে হয়েছে, বিশেষ করে আমার তিনটি স্নেহাস্পদ তরুণ বন্ধু—ভানু রায়, মণীশ চক্রবর্তী এবং নৃপেন চক্রবর্তী, তাদেরও মামুলী ধন্যবাদ দিয়ে বিব্রত করতে চাই না।

    এর পিছনে যে পরিশ্রম, তার থেকে আমিও একেবারে বাদ পড়িনি। চারটি পর্ব আগাগোড়া পড়তে হয়েছে এবং নানা জায়গায় কিছু ঘষামাজা ও অদল-বদলও করতে হয়েছে—সাধু ভাষায় যাকে বলে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ইত্যাদি।

  • অবতরণিকা

    অবতরণিকা

    আজকের দিনে লেখক মাত্রেই সাহিত্যিক এবং পাঠক মাত্রেই সমালোচক। অতএব দুশ্চিন্তার কারণ নেই কোনো তরফেই। একদিকে রইল আমার লেখনী, আরেক দিকে রইল আপনার রসনা; আর উভয়ের মধ্যে রইল যথেচ্ছ উদগিরণের অবাধ অধিকার।

    আগের দিনে সাহিত্যের একটা নিজস্ব এলাকা ছিল। শ্যেনচক্ষু সাহিত্যরথীরা লগুড- হস্তে সীমান্ত রক্ষা করতেন। তাঁরা আজ অন্তর্হিত। সাহিত্যের সীমা-রেখাও বিলুপ্তপ্রায় আজকের যাঁরা মহারথী, তাঁদের নয়নে জনতোষণের অঞ্জন, কণ্ঠে গণদেবতার জিন্দাবাদ। তাই সাহিত্যের আসরে চলছে সর্বজনীন দুর্গোৎসব—ঢাক, ঢোল, সানাই, কাঁসি আর লাউড স্পীকারের হুঙ্কার। নিছক রসস্রষ্ট্রা যাঁরা তাঁদের ক্ষীণকণ্ঠ আর শোনা যায় না। কর্কশ কণ্ঠে আস্ফালন করছে ঐতিহাসিকের দম্ভ, দার্শনিকের দ্বন্দ্ব, বৈজ্ঞানিকের বাগাড়ম্বর আর রাষ্ট্রবিদের জিগির। এঁরাই এ যুগের সাহিত্যিক। সাম্যবাদ এবং মন্বন্তর থেকে আরম্ভ করে বুনিয়াদী শিক্ষা ও কালোবাজার—সাহিত্য-মণ্ডপের উদার ছায়াতলে সকলেরই আজ সমান অধিকার।

    আগের দিনে সাহিত্যের একটা নিজস্ব এলাকা ছিল। শ্যেনচক্ষু সাহিত্যরথীরা লগুড- হস্তে সীমান্ত রক্ষা করতেন। তাঁরা আজ অন্তর্হিত। সাহিত্যের সীমা-রেখাও বিলুপ্তপ্রায় আজকের যাঁরা মহারথী, তাঁদের নয়নে জনতোষণের অঞ্জন, কণ্ঠে গণদেবতার জিন্দাবাদ। তাই সাহিত্যের আসরে চলছে সর্বজনীন দুর্গোৎসব—ঢাক, ঢোল, সানাই, কাঁসি আর লাউড স্পীকারের হুঙ্কার। নিছক রসস্রষ্ট্রা যাঁরা তাঁদের ক্ষীণকণ্ঠ আর শোনা যায় না। কর্কশ কণ্ঠে আস্ফালন করছে ঐতিহাসিকের দম্ভ, দার্শনিকের দ্বন্দ্ব, বৈজ্ঞানিকের বাগাড়ম্বর আর রাষ্ট্রবিদের জিগির। এঁরাই এ যুগের সাহিত্যিক। সাম্যবাদ এবং মন্বন্তর থেকে আরম্ভ করে বুনিয়াদী শিক্ষা ও কালোবাজার—সাহিত্য-মণ্ডপের উদার ছায়াতলে সকলেরই আজ সমান অধিকার।

    সমালোচকেরাও পেছনে পড়ে নেই। গতানুগতিক ধারা ত্যাগ করে তাঁরাও বেরিয়ে পড়েছেন নানা অভিনব পথে নব নব সাহিত্যের রস-সন্ধানে। ডক্টরেট যশঃপ্রার্থী জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হল, যাঁর গবেষণার বিষয় শুনলাম ‘বণিক-সাহিত্য’। উপকরণ যে-সব সংগ্রহ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে হাজার কয়েক বিজ্ঞাপন, কয়েক বস্তা ক্যাশমেমো এবং ডজন তিনেক বড় বড় শিল্পপতির বক্তৃতা। কোনো চর্ম-ব্যবসায়ীর বিল-ফর্মে তিনি নাকি এমন ঘনীভূত কাব্য-রসের সন্ধান পেয়েছেন যার আস্বাদন রবীন্দ্র- সাহিত্যেও সুলভ নয়।

    আমার দুর্ভাগ্য, এই রস-গ্রহণের ক্ষমতা থেকে বিধাতা আমাকে বঞ্চিত করেছেন বাণিজ্যলক্ষ্মীর স্বর্ণ-সিংহাসনের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি আমার কারো চেয়ে কম নয়, সরস্বতীর কমলবনে তাকে প্রতিষ্ঠিত দেখলে ব্যথিত হই। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড রূপে দেখা দিক, আপত্তি নেই, কিন্তু সুখী হই না যদি দেখি, তার রূপান্তর ঘটেছে কবির লেখনী কিংবা শিল্পীর তুলিকায়।

    একথা জানি, সাহিত্যের প্রকৃতি সম্বন্ধে আমার এই সংকীর্ণতা বর্তমান কালে অচল। আমার রচনা সম্বন্ধে আমার নিজের ধারণা যাই হোক্, কোনো অতি আধুনিক উদার সমালোচক হয়তো এরই মধ্যে এক অনাস্বাদিত কাব্যরস আবিষ্কার করে বসবেন। সুতরাং আশ্চর্য হবো না, যদি দেখি, আমারও খ্যাতি একদিন ছড়িয়ে পড়েছে জলে, স্থলে এবং অন্তরীক্ষে; ডাক পড়েছে অল্-ইণ্ডিয়া রেডিওর মজদুরমণ্ডলীর অধিবেশনে, কিংবা প্ৰধান অতিথির আসন টলে উঠেছে মফস্বল শহরের কোনো গণ-সাহিত্যের বার্ষিক সভায়। সে দুর্ঘটনা যদি কোনো দিন সত্যিই ঘটে, তবু নিজের কাছে একথা অস্বীকার করি কেমন করে যে, এই লেখনীর রেখায় যে-বস্তু রূপলাভ করল সেটা আর যাই হোক সাহিত্য নয়। জীবনে অনেক কিছু হবার আকাঙ্ক্ষা ছিল; কিন্তু সাহিত্যিক হবো বলে কোনো দিন দুরাশা পোষণ করিনি।

    এই সুজলা সুফলা বাঙলা দেশে ব্যাধির অন্ত নেই। তার মধ্যে আছে দুটি সাধারণ ব্যাধি, যাকে বলা যেতে পারে তার জলবায়ুর ধর্ম—ম্যালেরিয়া ও কাব্য। এদের প্রকোপ থেকে পুরোপুরি রক্ষা পেয়েছে, এমন লোক তো কই একটাও চোখে পড়লো না শিক্ষিত বাঙালীর ঘরে! আমার পরম সৌভাগ্য, ম্যালেরিয়ার আক্রমণে বহুবার ধরাশায়ী হলেও কাব্যের কবলে ধরা দিয়েছিলাম শুধু একটি দিন। সেই প্রথম এবং সেই শেষ।

    গ্রামের ইস্কুলে উপরের দিকে পড়ি। বাৎসরিক পরীক্ষা আসন্ন। রাত জেগে এবং কম্বল জড়িয়ে ইব্রাহিম লোদীর চরিত্র মুখস্থ করছিলাম। অতর্কিতে মানসপটে কবিতার আবির্ভাব। ইতিহাস বন্ধ করে খাতা টেনে নিয়ে লিখলাম—

    চাঁদের আলোয় আজিকে কেন রে
    নেচে ওঠে মোর প্রাণ।।

    বলা প্রয়োজন, সময়টা ছিল কৃষ্ণপক্ষের রাত। চন্দ্রদেবের প্রত্যক্ষ আবির্ভাব সম্ভব ছিল না। দক্ষিণ হাওয়া, ফুলের সৌরভ ইত্যাদি যেসব বাহন আশ্রয় করে কাব্যলক্ষ্মী অবতীর্ণ হয়ে থাকেন, তাদেরও ছিল একান্ত অভাব। তবু কি করে তিনি নিতান্ত অসময়ে আমার স্কন্ধে ভর করেছিলেন, সে রহস্য, আজও ভেদ করতে পারিনি। ভর যেমন করেই করুন, বহু চেষ্টা করেও কবিতার দ্বিতীয় ছন্দে অবরোহণ করাতে পারেননি। তারপর কখন এক সময়ে কাব্যের স্থানে নিদ্রার আগমন হয়েছিল, টের পাইনি। টের পেলাম, হঠাৎ কর্ণদেশে প্রবল আকর্ষণে। মুহূর্ত মধ্যে ইব্রাহিম লোদীর রাজ্যে যখন ফিরে এলাম, সবিস্ময়ে দেখি, আমার কবিতার দ্বিতীয় পংক্তি স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে—

    নাচন থামিয়ে পড় ইতিহাস
    নইলে ছিঁড়িব কান।

    বুঝলাম, অদৃশ্য হস্ত শুধু আমার কর্ণপীড়ন করেই ক্ষান্ত হননি, সেই সঙ্গে নিপুণভাবে করে দিয়েছেন আমার কবিতার পাদপূরণ।

    শুনেছি আমার পূর্বে আর একটিমাত্র কবি এই দুর্লভ অভিজ্ঞতার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তিনি মহাকবি জয়দেব। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের লেখনীস্পর্শে তাঁর কাব্যস্রোত বয়ে চলেছিল বিপুল ধারায়। আর পিসেমশাই-এর শ্রীহস্ত-স্পর্শে আমার কাব্যপ্রবাহ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেল। সেদিন মনে মনে যতই ক্ষুব্ধ হয়ে থাকি না কেন, আমার পরলোকগত পূজনীয় পিসেমশাই-এর উদ্দেশে বারংবার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। শুধু আমার নয়, কৃতজ্ঞতার পাত্র তিনি আপনাদেরও। সেদিন কঠোর হস্তে কাব্য-চিকিৎসা করেছিলেন বলেই আপনারা অন্তত একজন আধুনিক কবির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। নইলে হয়তো দিনের পর দিন এই মুক্ত-হস্ত-নিক্ষিপ্ত রাশি রাশি গদ্য-কবিতার ‘ছেঁড়া মাদুর’, ‘ছ্যাকরা গাড়ি’ কিংবা ‘ভাঙা কোদাল’ আপনাদের কর্ণপটাহ বিদীর্ণ করে দিত।

    আপনাদের সপ্রশ্ন দৃষ্টি আমি লক্ষ্য করছি। কাব্য বা সাহিত্য সম্বন্ধে এই যদি তোমার সত্যিকার মনোভাব, এসব হচ্ছে কি? এর উত্তর আগেই দিয়েছি। এ সাহিত্য নয়, উপন্যাস নয়, এ শুধু—কি, আমি জানি না। যদি বলেন তারই বা কি প্রয়োজন ছিল? আমি নিরুত্তর। প্রয়োজন সত্যিই কিছু নেই। এইটুকু শুধু বলতে পারি, জীবনে এমন একটা পথে আমাকে চলতে হয়েছে, যেটা প্রকাশ্য রাজপথ নয়। সে এক নিষিদ্ধ জগৎ। সেখানে যাদের বাস, তাদের ও আমাদের এই দৃশ্যমান জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লৌহদণ্ডের যবনিকা। তার ওপারে পাষাণ-ঘেরা রহস্যলোক। কিন্তু তারাও মানুষ। তাদেরও আছে বৈচিত্র্যময় জীবনকাহিনী – সুখে সমুজ্জ্বল, দুঃখে পরিম্লান, হিংসায় ভয়ঙ্কর, প্রেমে জ্যোতির্ময়! সেই পাষাণপুরীর দীর্ঘ প্রকোষ্ঠের স্তব্ধ বাতাসে জমে আছে যে অলিখিত ইতিহাস, সভ্য পৃথিবী তাঁর কতটুকুই বা জানে? আমি যে সেখানে বিচরণ করেছি, এই দীর্ঘ জীবন ধরে, প্রভাতে, সন্ধ্যায়, নিভৃত রাত্রির অন্ধকারে—আমিই বা কতটুকু দেখেছি, কতখানিই বা শুনেছি! সে চোখ নেই, সে কান নেই, আর নেই সেই দরদ, যার স্পর্শে অন্ধ হয় চক্ষুষ্মান, বধির হয় শ্রুতিধর।

    একেবারে যে পাইনি, তা হয়তো ঠিক নয়। সেই আঁধারলোকের কোন প্রাণী অকস্মাৎ কোনদিন ‘খুলেছিল তার অন্তরদুয়ার’। প্রবেশের অধিকার পেয়েছিলাম ক্ষণেকের তরে। আহরণ যা করেছি, তোলা আছে স্মৃতির মণিকোঠায়। এখানে যেটুকু দিলাম, সে শুধু আভাস কিংবা তার ব্যর্থ প্রয়াস।

  • প্রথম পর্ব

    প্রথম পর্ব

    ‘লৌহকপাট’ সম্পর্কে একটা খবর হয়তো কিছু কিছু পাঠকের জানা নেই। দেশ পত্রিকার এককালের সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তাঁর ’হীরের নাকছাবি’ বইয়ে এটির উল্লেখ করেছেন। সাগরময় ঘোষের স্কুলের এক বন্ধু তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তার একটি পাণ্ডুলিপি এক সময়ে দেশ পত্রিকার অফিসে এসে জমা দিয়ে যান। এক্সারসাইজ বুক বাঁধানো মোটায় রচনার নাম ‘লৌহযবনিকা’, লেখক ‘বিশ্ববন্ধু’। লেখা বা লেখকের নাম কোনটাই সাগরময়বাবুর কৌতূহল জাগায় নি, পাণ্ডুলিপিটিকে তিনি ড্রয়ারে চালান করেন। এর চার-পাঁচ মাস বাদে বন্ধুর একটা চিঠি পান। একটু কাতরভাবেই বন্ধু লিখেছেন যে, যদি লেখাটা ছাপার অযোগ্য মনে হয়, তাহলে সেটা যেন রেজিস্ট্রিযোগে ওঁর কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে লেখাটার কথা সাগরময়বাবু বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। বন্ধুর চিঠি পেয়ে একটু লজ্জিত হয়েই খাতা খুঁজেপেতে বার করলেন। ফেরত পাঠানোর আগে দুয়েকপাতা পড়তে গিয়ে কখন এক ঘণ্টা সময় কেটে গেছে খেয়ালও হয় নি। খাতাটা সেদিন বাড়ি নিয়ে রাত একটা পর্যন্ত পড়ে শেষ করলেন। তার পনেরো দিন পরেই ‘লৌহযবনিকা’ ‘লৌহকপাট’ নামে আর ‘বিশ্ববন্ধু’র বদলে ‘জরাসন্ধ’ নাম দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। এর কিছুদিন পরে ১৯৫৪ সালে ‘লৌহকপাটে’র প্রথম খণ্ড গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৮ সালে তপন সিংহ সেটি চিত্রায়িত করেন।

  • এক

    এক

    কর্ণজননী কুন্তীদেবী তাঁর সদ্যোজাত সন্তানকে সাগর-তরঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। মহাভারতের এই করুণ কাহিনী আজও আমাদের অশ্রুসিক্ত করে তোলে। কিন্তু আমাদের মাতৃস্বরূপিণী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর যে শত শত সন্তান প্রসব করেই অকূল পাথারে ভাসিয়ে দেন, তাদের জন্যে এক বিন্দু অশ্রুও দেখা দেয় না কারো চোখের কোণে। যদি দিত, এদের নিয়েই রচিত হতে পারত আর একখানা অষ্টাদশ-পর্ব মহাভারত।

    যথানিয়মে আমাকেও আমার স্নেহময়ী Alma Mater গলায় একটা ডিপ্লোমার কবচ ঝুলিয়ে একদিন অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিলেন। ‘দ্বারভাঙ্গার’ জঠর থেকে নিক্ষিপ্ত হলাম ভবসমুদ্রের ঘূর্ণিপাকে। ক্ষুদ্র একটা কেরানীগিরির ভেলা জুটিয়ে দেবার মত না জুটল কোন খেতাবধারী মামা, কোন মুরব্বীকৃতার্থ মেসো কিংবা অন্তত একটি অপুত্রক শাঁসালো- শ্বশুর। সম্বলের মধ্যে ছিল একটা শাদা জীনের প্যান্ট আর নীল-তসরেটের কোট। তারই ঘর্মসিক্ত বক্ষে আশ্রয় নিয়ে ঘাটে ঘাটে ঠোক্কর খেয়ে ভেসে বেড়াতে লাগলাম।

    মাঝে মাঝে হাকিম-শিকারের যখন প্রয়োজন হত, সদাশয় সরকার এই সব বুভুক্ষু ভাসমান প্রাণীদের মুখের সামনে গোটাকয়েক Competitive পরীক্ষার টোপ ফেলতেন। ঝাঁকে ঝাঁকে প্রলুব্ধ হত ডিগ্রীধারীর দল। তারপর দেখা যেত, টোপ গিলছে অনেকেই, কিন্তু ডাঙায় উঠছে দু-চারজন—যারা একেবারে নির্জলা ভালো ছেলে; অর্থাৎ পরীক্ষার খাতায় যাদের মোটা নম্বর, কিন্তু পুলিশের খাতায় কোন নম্বর পড়েনি। বন্ধুদের মধ্যে একদল ইতিমধ্যে ডাঙায় উঠেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ ভরসা দিলেন, কারো হাত থেকে আবার বর্ষিত হল শীতল বারি। তাঁরা বললেন, এ পরীক্ষা নয়, ফাঁদ। চাকরির জন্য চাই একদল তৈলসিক্ত, নস্কন্ধ, বশংবদ গুডবয়। যারা জোয়াল কাঁধে নিয়ে ছুটবে, কিন্তু কোন অবস্থাতেই মাথাচাড়া দেবে না। সে তুমি পারবে না। এহেন সদ্গুণ যে আমার আছে কিংবা কোনদিন আয়ত্ত হবে, ততটা আত্মবিশ্বাস আমার ছিল না। কিন্তু অ্যাপ্লিকেশন আর ইন্টারভিউ তখন এমন বিস্বাদ হয়ে গেছে যে, নেহাত মুখ বদলাবার জন্যেই সরকারী পরীক্ষার টোপ একদিন গিলে ফেললাম।

    শ্রীকান্ত বলে গেছেন, ইংরেজ রাজত্বে ডাক্তারের প্রবল প্রতাপ। কসাইখানার যাত্রীদের পর্যন্ত জবাই হওয়ার অধিকারটুকুর জন্য এদের মুখ চেয়ে থাকতে হয়।

    আমি গোলামখানার যাত্রী। অতএব শুধু ‘পিলেগ্‌ঙ্কা ডগ্‌দরি’ নয়, তার চেয়েও ভয়াবহ এবং ব্যাপকতর ডাক্তারির জন্য আমার এই তুচ্ছ দেহটার তলব পড়ল সর্বশক্তিমান মেডিক্যাল বোর্ডের দরবারে।

    মেডিক্যাল বোর্ড!! জনৈক ভুক্তভোগী ক্ষীণদেহ বন্ধু চোখের জলের ভেতর দিয়ে এ-বস্তুটির নাম দিয়েছিলেন, হাঁড়িকাঠ। তারই স্নেহবেষ্টন কল্পনা করে আমার এই ক্ষীণতর গলদেশ ঘন ঘন শঙ্কিত হয়ে উঠল। বন্ধুরা সান্ত্বনা দিলেন। শুভার্থীরা দিলেন উপদেশ। কেউ বললেন, ডাম্বল ভাঁজ; কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন, হাতী কিংবা বাইসনের চর্বি খাও; কারো বা প্রস্তাব হল—বেড়িয়ে এস কাশ্মীর কিংবা উটকামণ্ড। এদিকে সময় মা চৌদ্দ দিন।

    সকলের শেষে এলেন সবচেয়ে যিনি বিচক্ষণ ব্যক্তি—আমার বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার হরি পাণ্ডা। আমার দুরবস্থা দেখে বিস্তর আপসোস করলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, একটা সোজা রাস্তা আছে। কিন্তু সে কি আপনার পছন্দ হবে? আপনারা হলেন সব—

    বাধা দিয়ে মিনতি করে বললাম, রক্ষে করুন হরিবাবু; এ বিপদে আপনিই একমাত্র ভরসা।

    হরি পাণ্ডা একটুখানি ভেবে চুপিচুপি বললেন, আলুসেদ্ধ খান।

    —আলু সেদ্ধ!

    স্রেফ আলু সেদ্ধ, আর তার সঙ্গে দুবেলা দুটো ভাত। এক হপ্তা পরে আপনার সমস্ত জামাগুলো যদি না বাতিল হয়ে যায়, আমার নাম হরি পাণ্ডা নয়।

    অকূল সমুদ্রে কূল দেখা দিল। পড়ে রইল ডাল তরকারী, মাছ-মাংস, দুধ-ঘি। চৌদ্দ দিন ধরে এক নাগাড়ে চালিয়ে গেলাম ভাত আর আলু সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ আর ভাত।

    ম্যানেজারের অশেষ দয়া। মাসের শেষে পুরো বোর্ডিং চার্জ নিয়েই তিনি আমাকে রেহাই দিয়েছিলেন, উপদেশের মূল্য বাবদ অতিরিক্ত কিছু দাবি করেননি।

    কিন্তু এত সেবা, এত তোয়াজ সত্ত্বেও শরীর মহাশয়ের মন পেলাম না। তার ওজন আর ছাতির মাপ দুটোই আমার বিরুদ্ধ-সাক্ষীর তালিকায় নাম দেখাল। বোর্ডের মুখ গম্ভীর হল। কিন্তু দমে যাওয়া বলে কোন কথা নেই ডাক্তারের অভিধানে। বিপুল পরাক্রমে আরম্ভ হল পরীক্ষা। তিনজন লড়াই-ফেরতা আই. এম. এস-এর সমবেত আক্রমণে আমার শীর্ণ দেহের যে অবস্থা দাঁড়াল, দুরন্ত ছেলের হাতে সেলুলয়েডের পুতুল পড়লে তারও বোধ হয় অতটা দুর্গতি হয় না। পেট টিপে, বুক ঠুকে, দাঁত টেনে, শুইয়ে, বসিয়ে, গলার মধ্যে ডাণ্ডা চালিয়ে, দৌড়-ঝাঁপ করিয়ে এবং আরো অনেক অসহ্য এবং অশ্লীল প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে (যা ডাক্তারের পক্ষেই সম্ভব) আমাকে যখন তাঁরা মুক্তি দিলেন, মনে হল, চাকরির উপযোগী জীবনীশক্তির পরীক্ষা দিতে এসে তার সবটাই এঁদের হাতে নিঃশেষ হয়ে গেল, চাকরি করবার জন্যে আর অবশিষ্ট কিছুই রইল না। কিন্তু কোন্ পুণ্যবলে জানি না, সম্ভবত হরি পাণ্ডার আলুপিণ্ডের কল্যাণে শেষ পর্যন্ত কসাইখানার কর্তারা প্রসন্ন হলেন। পিঠের উপর দাগ পড়ল—ফিট্।

    বৈতরণী কোন রকমে পার হয়ে এলাম। হাকিমির স্বর্গারোহণে আর বাধা রইল না। শুভানুধ্যায়ীরা চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বন্ধুদের উৎসাহের মরাগাঙে জোয়ার দেখা দিল। কংগ্রাচুলেশনের তুফান তুলে তাঁরা আমাকে হাবুডুবু খাইয়ে দিলেন। কিন্তু ডাক আসে কই? আমার সে ছাপমারা গদিটা কি শূন্যই থেকে যাবে? দিনের পর দিন চলে গেল। হিজ ম্যাজেস্টিস সার্ভিস-এর বার্তা বহন করে একখানা বাদামী রঙয়ের লেফাফা আর এসে পৌঁছল না।

    প্রথমটা ক্ষোভ এবং উষ্মা যতই হোক, শেষ পর্যন্ত সান্ত্বনাই দিলাম মনকে। এ ভালই হল। হাকিমির ‘মোহগর্তে’ না ফেলে ভগবান আমাকে একেবারে লালদীঘির মাঠে এনে ছেড়ে দিলেন। সামান্য ‘দু বিঘার’ পরিবর্তে লিখে দিলেন বিশাল সেক্রেটারিয়েটের ‘বিশ্ব- নিখিল’। আবার শুরু হল অভিযান। জীনের প্যান্ট আর তসরেটের কোটের গায়ে ঘন- ঘন ডাইংক্লিনিং-এর নম্বর পড়তে লাগল।

    এমন সময়ে একদিন খবর পাওয়া গেল, বাংলা সরকারের জনৈক মন্ত্রী গুটিকয়েক লোভনীয় চাকরির মেওয়া নিয়ে অপেক্ষা করছেন চট্টগ্রামের কোন টিলার উপর। আমার মত ‘হীরের টুকরো’র দেখা পেলে একটা বড় গোছের মেওয়া যে সঙ্গে সঙ্গে হাতে তুলে দেবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। একটা লম্বা-চওড়া সুপারিশপত্রও সংগ্রহ করা গেল। যিনি দিলেন শুনলাম তিনি মন্ত্রীবরের বিশেষ বন্ধু এবং সে বন্ধুত্ব প্রধানত গ্লাসিক্। অতএব চাকরি সম্বন্ধে একরকম নিশ্চিন্ত হয়েই ছুটলাম চট্টগ্রাম।

    সুদৃশ্য বাংলো। সুবিন্যস্ত পরিবেশ। বিচিত্র-বেশী প্রার্থীর ভিড়। কিন্তু মন্ত্রী-সাহেবের দেখা নেই। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করবার পর আবিষ্কার করা গেল যে তিনি বাংলোসংলগ্ন গোলাপ-বাগিচায় প্রাতভ্রমণ ব্যপদেশে একটি সুরম্য কাচের পাত্রে অর্ধ ফুটন্ত গোলাপের বুকের ভিতর থেকে শিশির সঞ্চয়নে ব্যস্ত আছেন। সেই দিকে চেয়ে মনে হল চৌষট্টি- হাজারি মসনদে বসে এই সব অক্লান্ত-কর্মী মন্ত্রীদের কী কঠোর পরিশ্রমই না করতে হয়!

    আরো এক ঘণ্টা কেটে গেল। শেষটায় একরকম মরিয়া হয়েই সেই গোলাপকুঞ্জে অনধিকার প্রবেশ করে মন্ত্রী-বাহাদুরকে কুর্নিশ জানালাম। তিনি সুমাচিত্রিত মদিরাক্ষি বিস্তৃত করে আমার দিকে তাকালেন এবং স-সুপারিশ আবেদনপত্র গ্রহণ করলেন। একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় আমি তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করলাম। মন্ত্রীবর জবাব দিলেন না। মৃদু হেসে আবার শিশির-সংগ্রহেই মনোনিবেশ করলেন।

    তৃতীয় ঘণ্টা যখন শেষ হল, মন্ত্রীবরের সেক্রেটারির শরণ নিলাম। আবেদনপত্র সম্বন্ধে প্রশ্ন করতেই গম্ভীরভাবে ইংরাজী ভাষায় জানালেন, ডাকে জবাব যাবে।

    চব্বিশ বছর সাত মাস কেটে গেছে। সে ডাক এখনো আসেনি। হয়তো আরো সময় লাগবে।

    চাকরি দিন আর না দিন, অযাচিত এবং জ্ঞানগর্ভ উপদেশ দানে কেউ কার্পণ্য করেন না। রেজিস্ট্রেশন বিভাগের বড়কর্তা বেশ খাতির করে বসালেন। দেশের বেকার সমস্যা, মেয়ের বিবাহে পণপ্রথা, প্রমোশন সম্বন্ধে গভর্নমেন্টের অবিচার ইত্যাদি বড় বড় বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা করে অবশেষে বললেন, এক কাজ করুন। চাকরি করে আর কি হবে? তার চেয়ে চিনাবাদামের চাষ করুন না কেন? নিজে হাতে লাঙল না ধরেই তো বাঙালীর এই দুর্দশা। আর দেখুন তো ওদের দেশ। লয়েড জর্জের বাপ জুতো সেলাই করতো। ফোর্ড ছিল মিস্ত্রী। অথচ—

    শিক্ষা বিভাগের এক সহকারী অধিকর্তাও একদিন অত্যন্ত ব্যথিত হলেন, যখন শুনলেন যে, আমি একটা সামান্য মাস্টারির জন্যে উমেদার। বললেন, ইয়ংম্যান, মুষড়ে পড়লে চলবে কেন? পল্লীগ্রামে চলে যান। ঘরে ঘরে শিক্ষা বিস্তার করুন। পড়েছেন তো শরৎ চাটুজ্যের পল্লীসমাজ?—বিশ্বেশ্বরী বলছেন, আলো জ্বেলে দে রে রমেশ, আলো জ্বেলে দে।

    এখন আমাদের যুবকদের শুধু আলো জ্বালাতে হবে।

    আবগারী থেকে পশু-চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য থেকে মৎস্যচাষ—কোন দপ্তরই বাদ দিই না! জুতোর সোল বদল হল তিনবার। তসরেটের নীল কোট হয়ে গেল পাঁশুটে। দুটো অঞ্চল তখনো মাড়াইনি—জেল আর পুলিশ। কেন জানি না, এদের সম্বন্ধে কেমন একটা আতঙ্ক ছিল। কিন্তু মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করেন যে মহা জাদুকর, তিনি বোধ হয় মনে মনে হেসেছিলেন, যেদিন হঠাৎ আমন্ত্রণ জানালেন খোদ কারাবিভাগের শ্বেতাঙ্গ ইন্সপেক্টার জেনারেল এক হোমরা চোমরা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আই. এম. এস.। ভয়ে ভয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। বিনা ভূমিকায় বললেন, তোমার কেসটা দেখলাম। ভেরী স্যাড। যাক। আমি তোমাকে নিতে প্রস্তুত আছি। এই হল চাকরি, এই তার ভবিষ্যৎ বলে চাকরির এমন এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিলেন, যেন ওটা চাকরি নয়, তাঁর বয়স্থা অনূঢ়া কন্যা; আমাকে যোগ্যতম পাত্র মনে করে গছিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন। সধন্যবাদ সম্মতি জানিয়ে চলে আসছি; ডেকে ফিরিয়ে বললেন, তোমাকে বড় কাহিল দেখাচ্ছে। You should get a healthy station. দার্জিলিং যাও। কি বল?

    প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম হল। আমার মত আনাড়ি রংরুটের কোন একটা সেন্ট্রাল জেলে কয়েক বছর শিক্ষানবিশি করবার কথা। দার্জিলিং-এর মত ছোট জায়গা আমার প্ৰাপ্য নয়।

    এক ক্ষান্ত-বর্ষণ শারদ-সন্ধ্যায় শুরু হল অভিযান। চললাম মেঘমায়ার দেশে। যাহোক একটা আশ্রয় জুটল। ক্ষুদ্র হোক, বৃহৎ হোক, একটা অবলম্বন। অবসান হল উদ্বেগময় অনিশ্চয়ের। এসব কথা যে সেদিন মনে হয়নি, তা নয়। কিন্তু সমস্ত ছাপিয়ে মনের মধ্যে জেগে উঠল কেমন একটা ভয়। অপরিচিত ভবিষ্যৎ। ঝাঁপ তো দিলাম। কে জানে কি আছে তার রহস্যময় অন্ধকার গর্ভে?

  • দুই

    দুই

    জি. বি. এস.-এর নাটকে যেমন প্রিফেস্, সরকারী চাকরীর তেমনি প্রোবেশন। মূল বস্তুর পুরোপুরি রসগ্রহণ করতে হলে উভয়ই অবশ্য লঙ্ঘনীয়। কিন্তু লঙ্ঘন-পথ কিঞ্চিৎ কণ্টকময়। সকলের কথা জানি না। প্রোবেশনার জীবনের ইতিহাস বিচিত্র হওয়াই স্বাভাবিক। নিজের সম্বন্ধে এইটুকু শুধু বলতে পারি, এই পথটা পার হতে গিয়ে কণ্টকের আস্বাদ যা পেয়েছি, সেটা মিশ্ররস—আঘাতের সঙ্গে মেশানো কৌতুক, খোঁচার সঙ্গে পরিহাসের প্রলেপ।

    গিরীনদা বলেছিলেন, চাকরি-গ্রন্থের প্রথম পাঠ হল—সেলাম। ঐ বস্তুটি ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় এবং ঠিকমত যদি ঠুকতে না পার, সারা জীবনটা কপাল ঠুকেই কাটাতে হবে। বহুদর্শী বান্ধবের এই মূল্যবান উপদেশ আমি অবহেলা করিনি। শুনলাম, মনিব আমার একাধিক। তার জন্যে দুশ্চিন্তা কিসের? One cannot please every body – এটা হচ্ছে সেই দেশের দর্শন, যেখানে দেবতা নেই। আমাদের দেশে দেবতার সংখ্যা তেত্রিশ কোটি। তাদের সবাইকে খুশী রাখা সম্ভব নয়, দুজন মনিবকে প্লীজ করা এমন কি আর শক্ত?

    ছোট মনিবের সঙ্গেই প্রথম সাক্ষাৎ। তিনি পূর্বাহ্ণেই জানতে পেরেছিলেন তাঁর এই নবীন অনুকর্মীটির ঝুলির মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোটাকয়েক তুচ্ছ ডিগ্রী ছাড়া মূল্যবান কিছু নেই। অর্থাৎ, চাকরির বাজারে যেটা আসল সম্পদ — experience, সেখানে সে একেবারেই নিঃস্ব। তিনি আবার শুধু এই ধনেই ধনী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব অনেকটা বয়স্ক লোকের চোখে খেলনার মত। ছেলেরা নাড়াচাড়া করে করুক। দেখে কিঞ্চিৎ সস্নেহ কৌতুকের উদ্রেক হতে পারে, এই পর্যন্ত। কিন্তু কাজের জগতে ওগুলো মূল্যহীন এবং অনাবশ্যক।

    তাঁর প্রথম প্রশ্ন হল, আমি কাজকর্ম কতদূর শিখেছি, “এ” ক্লাস কয়েদীর সঙ্গে “বি” ক্লাসের তফাৎ বুঝি কিনা, স্টকবুক, রিলিজ ডায়েরি বা তেইশ নম্বর রিটার্ন সম্বন্ধে জ্ঞান কতখানি, ইত্যাদি। সব ক’টি প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তর শুনে তিনি হতাশভাবে আরাম কেদারায় এলিয়ে পড়লেন এবং তাঁর স্বদেশী ভাষায় আক্ষেপ জানালেন, “আপনারে লইয়া আমি কী করুম?”

    ভদ্রলোকের জন্য সত্যিই বড় দুঃখ হল। মনে মনে সমবেদনা জানিয়ে চলে আসছিলাম। তিনি হঠাৎ সোজা হয়ে বসে মুখখানা বিকৃত করে বললেন, উঃ, ঘাড়ের ব্যথাটা বড্ড কাবু করলে দেখছি। হ্যাঁ, দেখুন একটা ক্যাজুয়েল ছুটির দরখাস্ত লিখে দিন তো। একদিন—হ্যাঁ, একদিন হলেই চলবে। এই ঘাড়ের ব্যথাটার জন্য।

    একটু থৈমে মুচকি হেসে বললেন, আপনারা সব বিদ্বান লোক। দেখি কি রকম লেখেন।

    লিখলাম দরখাস্ত। বুঝলাম জীবনের আসল পরীক্ষা এই শুরু হল। পরীক্ষা অনেক দিয়েছি, সারা জীবন রাত জেগে আর ঝুড়ি ঝুড়ি কেতাব গলাধঃকরণ করে “সেনেট হল” কিংবা “দ্বারভাঙ্গার” পাঁচতলায় গিয়ে উদ্‌গিরণ করেছি। সে-সব আজ ধুয়েমুছে নির্মূল হয়ে গেল। তার খবর আর কেউ কোনোদিন জানতে চাইবে না।

    জেলসাহেব আমার লেখা কাগজখানায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেই চোখ কপালে তুললেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে ফেটে পড়লেন তাঁর নির্জলা নিজস্ব ভাষায়—এডা কী ল্যাখলেন? এ কি আপনার ইস্কুলের দরখাস্ত? অ্যাঁ! রেফারেন্স কই? অফিসিয়েল করেপণ্ডেস্। প্রথমেই চাই রেফারেন্স। ওড়াও কি আপনি শেখেন নাই? ন্যান্‌, ল্যাখ্যেন-

    আমি কাগজ কলম নিয়ে তৈরি হলাম। মনিব ডিকটেশন দিলেন।

    Honoured Sir,

    With reference to the pain on my neck dated, দাঁড়ান (ক্যালেণ্ডার দেখে বললেন) dated the 20th instant, I have the honour to state —ব্যাস, এইবার ল্যাখ্যেন, একদিনের ছুটি চাই। শ্যাষে লাগাবেন I have the honour to be Sir, your most obedient servant বোঝলেন?

    সরকারের অশেষ কৃপা। শুধু চাকরিই দেননি, তার সঙ্গে দিয়েছিলেন একখানি বাসা। শুধু রাজকন্যা নয়, তার সঙ্গে অর্ধেক রাজত্ব। ছোট্ট একখানি বাংলো। পেছন দিকে পাথরের পাঁচিল-ঘেরা। পাইন বনের ভিতর দিয়ে এঁকে-বেঁকে উঠে গেছে পীচঢালা পথ; মিশেছে গিয়ে ভিক্টোরিয়া রোডের সঙ্গে। সামনেও নেমে গেছে সর্পিল রাস্তা। হারিয়ে গেছে গভীর উপত্যকার অদৃশ্য গর্ভে। বাড়ির ঠিক গায়ে একফালি জমি; যার মালিকানাস্বত্ব আমার, কিন্তু দখলী-স্বত্ব ভোগ করছিল পাড়ার যত ছোট ছোট পাহাড়ী ছেলেমেয়ের দল। প্রতিদিন এমন একটি জৈব কর্ম ওরা ওখানে অসঙ্কোচে করে যেত, যেটা ওদের কাছে অবশ্যকরণীয় হলেও, তার ফলটা আমার চক্ষু এবং নাসিকার পক্ষে আরামদায়ক ছিল না।

    শিক্ষানবিশির ফাঁকে ফাঁকে আমার প্রচুর অবসর। তাকে ব্যবহার করবার মত কাজ বা অকাজ কোনোটাই চোখে পড়ে না। তাই অগত্যা ঐ জমিটা নিয়েই পড়া গেল। উদ্দেশ্য—ফুলের চাষ। কাস্তে কোদাল, খুরপী-শাবলের সশস্ত্র আক্রমণে জমির চেহারা তো বদলে গেলই, আমার চেহারাতেও কিঞ্চিৎ পরিবর্তন দেখা দিল।

    সেদিন বিকালবেলা। বিপুল উদ্যমে কাজে লেগে গেছি। হঠাৎ পেছনে বিকট আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম। মনে হল যেন একটা ফাটা কাঁসার থালায় কে লোহার মুশল নিয়ে আঘাত করল। ফিরে চাইতেই চোখে পড়ল অনতিদূরে দুটি পর্বত-দুহিতা—প্রৌঢ় আর তার পাশে তন্বঙ্গী তরুণী। ভাবছি, এই বিচিত্র শব্দ কি এদের কারো কণ্ঠ থেকেই—কান জুড়িয়ে গেল জলতরঙ্গ বাজনার মধুর মূর্ছনায়। তরুণীটি সম্ভবত আমার হতভম্ব ভাব লক্ষ্য করে কলস্বরে হেসে উঠলেন। আমি বিমূঢ় বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।…হাসি এত সুন্দর! মানুষ এমন করে হাসে, তা তো কখনো শুনিনি! কিংবা হয়তো এ মানুষ নয়, কোন মধুকণ্ঠী কিন্নরবালা সহস্রশীর্ষ হিমালয়ের নিভৃত অন্তরাল থেকে মেঘের ভেলায় ভেসে এসে দাঁড়াল আমার বাগানের পাশটিতে।

    শিউরে উঠলাম। ভগ্ন কাংস্যখণ্ডে ঘা পড়ল। প্রৌঢ়ার শ্রীমুখ থেকে বাণী নির্গত হল। কিন্তু একবর্ণও বোধগম্য হল না। তরুণীটি যেন অপ্রতিভ হয়ে ভাঙা ভাঙা হিন্দীতে বললেন, ইনি বড়ী আম্মা, আমি কাঞ্ছী।

    ও-ও, ইনিই তাহলে স্বনামধন্য বড়ী আম্মা! আমাদের সহকর্মী ডাক্তার থাপার জ্যেষ্ঠা মহিষী। এসে অবধি ডাক্তারের ছেলেমেয়েদের কাছে অনর্গল শুনেছি এঁর কাহিনী। কদিন ইনি ছিলেন না। কার্সিয়ং-এর কাছে কোন্ পাহাড়ী গ্রামে গিয়েছিলেন, তাঁর ভাইঝিকে নিয়ে আসতে। এই কাঞ্ছীই তাহলে সেই ভাইঝি

    বড়ী আম্মাকে যথারীতি অভিবাদন জানালাম। তাঁর কণ্ঠ-গিরি আবার কী একটা উদ্‌গিরণ করল। মেয়েটি বুঝিয়ে দিল, বড়ী আম্মা বলছেন, এত কষ্ট করে এই বাগান কার জন্যে করছ বাবুজী? ফুল ফুটলে খোঁপায় পরবার লোকটি তো দেখছিনে। তিনি কবে আসবেন? –

    কণ্ঠ যতই ভয়াবহ হোক, সুরটি অন্তরঙ্গ। বললাম, তা তো জানিনে।

    —জানে-না কি রকম?

    —কারুর খোঁপার দেখা তো পাইনি আজও। কেমন করে জানবো?

    —ও-ও, বলে নেপথ্যে কাঞ্ছীর সঙ্গে মাথা নেড়ে কি বাক্য-বিনিময় হল। তারপর আবার বললেন, আমরা তাহলে সন্ধান করি?

    বললাম, আপনি গুরুজন। করতে পারেন বৈকি। কিন্তু যিনি আসবেন, তাঁকে গোড়াতেই বলে দেবেন, এখানে খোঁপায় গুঁজবার মত ফুল পেতে পারেন, কিন্তু মুখে গুঁজবার মত অন্নের বড় অভাব। ওটার ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে।

    আমার প্রস্তাব শুনে কিংবা আমার অভিনব হিন্দীর বহর দেখে এবার কাঞ্ছীর হাসির বাঁধন খুলে ছড়িয়ে পড়ল, সুরময় স্বচ্ছন্দ ধারায়। তার সঙ্গে হঠাৎ যোগ দিলেন বড়ী আম্মা। প্রচণ্ড ল্যাণ্ডস্লিপের বিপুল চাপে হারিয়ে গেল পাহাড়ী ঝরণার কলধ্বনি।

    ডাক্তার থাপা আমার প্রতিবেশী। দেখা হয় রোজ। গুড মর্নিং বিনিময় হয়। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা হয় না। নির্বিরোধ ভালমানুষ। প্রায়-অদৃশ্য চোখ-দুটিতে কেমন একটা নির্লিপ্ত দৃষ্টি। একদিন একটু জ্বরভাব হতেই ডেকে পাঠালাম। এলেন। বাঁ হাত গলার সঙ্গে ঝুলিয়ে বাঁধা

    —ও কি? হাতে কি হল ডাক্তার?

    ডাক্তার ঠোঁট উল্টে ডান হাতে একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গী করে বললেন, দ্যাট ওল্ড ট্রাবল

    তাঁর ক্ষুদ্র চোখদুটোর ভিতর থেকে প্রচ্ছন্ন কৌতুক উঁকি দিতে লাগল। বুঝলাম, ব্যাপারটা ডাক্তারের দাম্পত্য-জীবন ঘটিত। এত কাছে এই পাশের বাড়িতে বসে সে সম্বন্ধে অজ্ঞতা রক্ষা করা যে কারো পক্ষেই সম্ভব নয়, একথা ডাক্তারের অগোচর ছিল না।

    ডাক্তার থাপা দ্বিপত্নীক। বিবাহদ্বয়ের ব্যবধান পনেরো বছর। শোনা যায়, এই দীর্ঘকাল ঘর করবার পরেও সে ঘর যখন একটি শিশু-মুখ দর্শনে বঞ্চিত রয়ে গেল, বড়ী আম্মা স্বামীকে আদেশ করলেন, বিবাহ কর! নিরীহ ডাক্তার সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। হয়তো বা কপালকুণ্ডলার মত একবার অস্ফুটে উচ্চারণ করেছিল, বি-বা-হ! কিন্তু সে শুধু একটিবার। দ্বিরুক্তির দুঃসাহস হয়নি নিশ্চয়ই। এমনি করে এলেন কাঞ্ছী আম্মার কোন্ দূর সম্পর্কের বোন; উনিই আনলেন জুটিয়ে। বছর না ঘুরতেই ডাক্তারের সংসারে শুরু হল পুত্র-কন্যার প্রসেশন। কিন্তু কাঞ্ছী আম্মার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শুধু জন্মদান। বাকী সবটাই বড়ী আম্মা তুলে নিলেন তাঁর নিজের হাতে। তাঁর বিশাল সংসারে, কড়া ডিসিপ্লিন এবং সকলের ওপরেই তাঁর সমদৃষ্টি। ডাক্তারের সঙ্গে পুত্রকন্যার পার্থক্য শুধু বয়সের। শাসনপদ্ধতির যে তারতম্য, সেও কেবলমাত্র বয়সের অনুপাতে। ছোটদের বেলায় চড়চাপড়, বড়দের বেলায় হকি-স্টীক কিংবা চ্যালা কাঠ।

    সংক্ষেপে এই হল ডাক্তার থাপার স্লিং-বদ্ধ বাম হস্তের ইতিহাস।

    ডাক্তার আমাকে কোনরকম পরীক্ষা না করেই বললেন, টেক এ কাপ অফ টী। আমি ডাক্তার বোসকে খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি।

    আমি আপত্তি করলাম সামান্য ব্যাপারে আবার ডাক্তার বোসকে ডাকাডাকি কেন? তুমিই দাও না যা হোক একটা ওষুধ পাঠিয়ে।

    ডাক্তার হেসে বললেন, আমি তো চিকিৎসা করি না, চাকরি করি।

    আমি তাকিয়ে আছি দেখে, আর একটু পরিষ্কার করে বললেন, জেলডাক্তারি করছি এক নাগাড়ে এই পঁচিশ বছর। বুঝতেই পার—

    সেদিন বুঝিনি। বুঝেছিলাম ক’দিন পরে। সে-কথাটা এখানেই বলে রাখি।

    শীতের দার্জিলিং। বেলা চারটে বেজে গেছে। অফিসের দোতলায় বসে একটা কি রিটার্ন করবার চেষ্টা করছি। ঘরের কোণে চিমনি জ্বলছে। অর্থাৎ সরকারী বরাদ্দমত কাঠ পোড়াতে হয়, তাই পুড়ছে। কিন্তু তার ফলাফল সম্বন্ধে কেউ উৎসুক নয়। প্রত্যেকের টেবিলের পাশেই একটা করে লোহার তোলা উনুন। তার মধ্যে জ্বলছে কাঠকয়লা। দু-আঙুলকাটা দস্তানা পরে একটু লিখছি আর হাতটা সেঁকে নিচ্ছি। একটা বাঁশির টানা সুর কানে এল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে উঠল তার প্রতিধ্বনি—তীক্ষ্ণ কর্কশ হুইসিলের ঘন ঘন আর্তরব। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই জেলগেটের পেটা ঘণ্টাটাকে কে প্রাণপণে পিটতে শুরু করে দিল। ব্যাপার কি অনুমান করবার আগেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল এক সিপাই। বুট্ ঠুকে সেলাম করে বলল, পাগলী হো গিয়া।

    —পাগলী হো গিয়া! কে পাগল হল?

    —নেহি, নেহি, কৈ নেহি; পাগলী ঘণ্টী, এলারাম্।

    এবার বুঝলাম, এটা হচ্ছে জেলের এলার্ম (alarm)। ছুটলাম ভিতরে। লাঠি আর বন্দুক নিয়ে দু’দল সিপাইও দেখলাম ছুটে আসছে ডবল মার্চ করে। রক্তচক্ষু, পাকানো- গোঁফ হাবিলদার খড়্গবাহাদুর সুনোয়ার ভাঙা মোটা গলায় “কম্যাণ্ড” দিচ্ছে পাহাড় ফাটিয়ে। কয়েদীগুলো প্রাণভয়ে এবং প্রাণপণে ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে লম্বা লম্বা ব্যারাকগুলোর মধ্যে। যারা ছুটতে পারছে না কিংবা পিছনে আছে, তাদের পিঠে পড়ছে -বেটনের ঘা। জমাদার নোট বুক আর পেন্সিল নিয়ে ছুটোছুটি করছে ‘গুনতি’ মেলাবার জন্য। দেখতে দেখতে জেলের ভিতরকার রাস্তাগুলো সব ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু হাসপাতালের সামনে পড়ে আছে রিয়াজুদ্দিন মেট, যার মুখে হিন্দী বাৎ শুনে মনে করেছিলাম, ওর দেশ বোধ হয় ছাপরা কিংবা মজঃফরপুর। এখন শুনলাম, অকথ্য এবং অশ্রাব্য বরিশালীয়া ভাষায় ও কার মুণ্ডুপাত করছে, আর মাঝে মাঝে মাটিতে থুতু ফেলছে; তার সঙ্গে রক্ত। কয়েক গজ দূরে উত্তেজিতভাবে দাঁড়িয়ে এক ভুটিয়া। ছ’ ফুট লম্বা, পরিধিও বোধ হয় চার পাঁচ ফুটের কম নয়। দুজন ওয়ার্ডার তাকে দু’দিক থেকে ধরে আছে, আর কথা বলতে গেলেই বেটন। এমন সময় জেলর সাহেব তাঁর বিপুল দেহ নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌঁছলেন এবং দু-একটা কথা শুনবার পরেই তাঁর হাতের লাঠিখানা ভেঙে ফেললেন ভুটিয়ার পিঠের ওপর। তারপর ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে হুকুম দিলেন, ডিগ্রিমে লে যাও।

    ভুটিয়াকে cell-এ নিয়ে যাওয়া হল।

    ঘটনাটা যা শুনলাম, সত্যিই “পাগলী” হবার মত।

    ডাক্তার থাপা পনের বছর জেলে চাকরি করার পর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আবিষ্কার করেছিলেন, মানুষের যত রকম ব্যাধি আছে তাদের দুটো দলে ভাগ করা চলে—বুখার আর পেটগড়বড়। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, বসন্ত, নিউমোনিয়া—এসব হল বুখার। আর কলেরা, ডিসেন্ট্রি, ডাইরিয়া, কোলাইটিস্—এগুলো হচ্ছে পেটগড়বড়। রোগ শ্রেণীভুক্ত হবার পর চিকিৎসাও সরল হয়ে গেল। অনাবশ্যক জটিলতা না বাড়িয়ে এই দু’ দল রোগের জন্যে তিনি দুটিমাত্র মিক্চার ঠিক করে দিলেন। কুইনাইন আর কার্মিনেটিভ একটা সাদা দাওয়াই আর একটা লাল দাওয়াই।

    ডাক্তার থাপাকে কোনো কম্পাউণ্ডার দেওয়া হয়নি। নিজস্বহিন্দীভাষী বরিশালীয়া মেট রিয়াজুদ্দিনই ছিল তাঁর হাসপাতালের পিওন, চাপরাসী, নার্স এবং কম্পাউণ্ডার। তার উপরে ডাক্তারের নির্দেশ ছিল, রুগীদের রোগের ফিরিস্তি শোনবার দরকার নেই, স্রেফ্ দেখতে হবে সে কোন্ দলে পড়ে—বুখার না পেট-গড়বড়। যদি বুখার হয়, সাদা দাওয়াই আর পেটগড়বড় হলে লাল।

    হাসপাতালে ডাক্তারের আবির্ভাব সকালে মাত্র একটি ঘণ্টা এবং তখন তাঁর একমাত্র কাজ সংবাদপত্র পাঠ। বাকী সব রিয়াজুদ্দিন। দিনে দু’বার করে তার ওষুধ বিতরণ। সকাল ন’টা আর বিকাল চারটা। রুগীরা জড়ো হলেই যুদ্ধশিবিরে সেনাপতির মত তার হুঙ্কার শোনা যায়—বুখারওয়ালা ইধার বৈঠো, পেটগড়বড় উধার যাও।

    শিক্ষাপ্রাপ্ত সৈন্যদলের মত লোকগুলোও সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট লাইনে আলাদা হয়ে যায়। রিয়াজুদ্দিন মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাঁক দেয়—মুখ তোলো এবং তারপরেই শেষ কমাণ্ড, হাঁ করো। রুগীরা আকাশের দিকে হাঁ করে বসে থাকে আর দুটো প্রকাণ্ড বোতল থেকে খানিকটা করে তরল পদার্থ ঘটাৎ ঘটাৎ করে তাদের মুখগহ্বরে ঢেলে দেওয়া হয়। তারা নিঃশব্দে, বোধহয় খুশী হয়েই চলে যায়।

    বছরের পর বছর ধরে রিয়াজুদ্দিন মেট এমনি করেই তার প্রভুর নির্দেশ বিশ্বস্তভাবে পালন করে আসছে, হয়তো আরো কত বছর পালন করত। কিন্তু, কি ছিল বিধাতার মনে। হঠাৎ একদিন বোতল বদল হল। বুখারের দল সেদিন বেজায় খুশী। কুইনাইন-গোলার বদলে পেয়ে গেল মিষ্টি কার্মিনেটিভ। কিন্তু অদৃষ্ট মন্দ ছিল পেটগড়বড় দলের। তারা জানাল প্রতিবাদ। তাদের মধ্যে ছিল এক ভুটিয়া। সে তার নিজস্ব ভাষায় মেটকে দিল গালাগালি। মেট কথা না বুঝলেও সুরটা বুঝল, এবং সে গালি সুদসুদ্ধ ফিরিয়ে দিল তার পেটেণ্ট বরিশালীয়া হিন্দীতে। তারপর যে সরোষ সম্ভাষণ ও প্রতিসম্ভাষণ শুরু হল, সে দৃশ্যের আর একটিমাত্র দৃষ্টান্ত আছে পৃথিবীর ইতিহাসে—টাওয়ার অব্ ব্যাবেলের মাথার উপর। ভুটিয়া স্বল্পবাক্ জাতি। মুখের চেয়ে হাতের ব্যবহার তাদের কাছে বেশী প্রশস্ত। অতএব বাষট্টি পাউণ্ড ওজনের এক চপেটাঘাত এবং মেটপুঙ্গবের ঘূর্ণমান অবস্থায় পতন। লোকজন ছুটে এসে দেখল, এই পতনকার্যে মেট-সাহেবের চার-চারটি দন্ত তার অনুগমন করেছে। তার বিকট বিলাপে আকৃষ্ট হয়ে যে ওয়ার্ডারটি দৃশ্যপটে আবির্ভূত হল সে দিশাহারা হয়ে এবং আর কোনো রাস্তা না দেখে বাজিয়ে দিল হুইসিল। সঙ্গে সঙ্গে “পাগলী”।

  • তিন

    তিন

    আমাদের মোক্ষদা-মাসীকে নিশিতে পেয়েছিল; আমাকে পেল হাসিতে। মাসীকে দেখেছি, নিশির ডাকে ঘুরছেন ফিরছেন, কিন্তু চেতনা নিদ্রাচ্ছন্ন। আমিও তেমনি লিখছি, পড়ছি, কাজ করছি, কিন্তু সমস্ত মনটা মোহাচ্ছন্ন। সে শুধু উন্মুখ হয়ে আছে একটি অলক্ষ্য ‘সুরের পানে, যে সুরের তুলনা নেই, কোনো যন্ত্রী যাকে রূপ দিতে পারেনি, পারবে না, যে-সুর শুধু মধুর নয়, মাদকতাময়। মাঝে মাঝে ওবাড়ির কোন্ মুক্ত দ্বারপথে ভেসে আসে তার একটুখানি রেশ। কিংবা হয়তো ওটা আমার মধুর বিভ্রম।

    আত্মবিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি। এ আমার কী হল? তবে কি কাঞ্ছীকে আমি মনে মনে—? পাগল! কাঞ্ছী কে? একটা পাহাড়ী গাঁয়ের মেয়ে। শিক্ষা নেই, সভ্যতার আলোকে বেড়ে ওঠেনি, সংস্কৃতির ছাপ লাগেনি ওর দেহ-মনে। কাঞ্ছী রূপসী নয়। যৌবনের যে মোহন স্পর্শ সব নারীকেই একটি সুষমা দান করে, সেটুকু ছাড়া আকর্ষণ করবার মত নিজস্ব কিছু নেই ওর দেহে। মুখখানি অনিন্দ্য নয়। দেখবার মত সুন্দর শুধু দুটি রক্তাভ কপোল। কিন্তু সেও তো পাহাড়ী তরুণীর সাধারণ সম্পদ। সুগৌর গণ্ডের প্রস্ফুট লালিমা দার্জিলিং-এর পথে ঘাটে অহরহ দেখতে পাচ্ছি। তবে? না; বিশ্লেষণ করে তো কিছু পেলাম না। কিন্তু হায়! এমন হাসি কে কবে হেসেছিল?

    বাগানে কাজ করছিলাম। কখন তন্ময় হয়ে ডুবে গেছি কোন্ দূরশ্রুত হাসির ফোয়ারায়—

    —অনুমান করছি, আপনিই মিস্টার চৌধুরী।

    চমকে উঠলাম, পেছনে একেবারে পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে শ্বেতাঙ্গী মহিলা, মিসেস রয়, আমার বড় মনিব মিস্টার হ্যারল্ড রয়ের সহধর্মিণী।

    বিনীতভাবে জানালাম, তাঁর অনুমান সত্য।

    এঃ তুমি দেখছি একেবারে ছেলেমানুষ। আমার স্বামীর মুখে প্রায়ই শুনি তোমার কথা। মাঝে মাঝে এসো না আমার বাড়ি?

    দেশীয় খ্রীস্টানের বিদেশিনী স্ত্রী—এই মহিলাটির সম্বন্ধে মনে মনে একটা বিরূপ ভাবই ছিল। দেখলাম, ভুল করেছি। তাঁর সস্নেহ অনুরোধে সানন্দে সম্মতি দিলাম। মহিলাটি সত্যিই খুশী হলেন। স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, তোমার বুঝি খুব ফুলের শখ? ঐ রোগটা আমারও ছিল একদিন। আজকাল প্রায় কাটিয়ে উঠেছি। কি ফুল লাগাচ্ছ?

    বললাম, গোটা কয়েক ফ্লকস্ আর ডায়াস্থাসের চারা যোগাড় করেছি।

    —আমার কাছে হলিহক্‌স্ আছে। পাঠিয়ে দেবো। ঐ পাঁচিলের ধারে ধারে দিও। চমৎকার ব্যাকগ্রাউণ্ড হবে।

    পরদিন। বিকালের দিকে গেলাম মিসেস রয়ের বাড়ি। মিস্টার ছিলেন না, শুনলাম কিছুক্ষণ আগে মফঃস্বলে গেছেন। নির্জন বাড়িতে মিসেস একা সমাদর করে বসালেন, যেন কতকালের আপনার জন আমি। সুগন্ধি দার্জিলিং চা আর নিজে হাতে তৈরি কেক খেতে দিলেন। পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, আর দু’খানা খাও, আমার জিম বড্ড ভালবাসত…

    একটু থেমে মৃদু সহজ কণ্ঠেই বললেন তাকে হারিয়েছি আজ দশ বছর। তুমি আর সে বোধহয় একবয়সীই হবে। বেঁচে থাকলে অ্যাদ্দিনে তোমার মত হ’ত। তারও বড্ড ঝোঁক ছিল পড়াশুনোয়। ভগবান দিলেন না…

    কণ্ঠস্বরটা কেমন উদাস হয়ে এল শেষের দিকে।

    এ দুঃসংবাদ আগেই শুনেছিলাম। ঐ জিমই ওঁদের একমাত্র সন্তান।

    মিসেস রয় আগ্রহ করে তাঁর লাইব্রেরী দেখালেন। মূল্যবান সংগ্রহ। বললেন, একদিন খুব ঝোঁক ছিল। আর ভালো লাগে না। এসব বই যদি তোমার পছন্দ হয়, যখন খুশী এসে পড়বে। য’খানা খুশী নিয়ে যেও। কোনো সঙ্কোচ করবে না।

    ছাড়তে চান না। ঘণ্টা কয়েক পরে যখন বিদায় চাইলাম, বললেন, আবার এসো। তুমি এলে; সন্ধ্যাটা বেশ কাটল।

    আমার মনিব মিস্টার হ্যারল্ড রয় বিলাতফেরত ব্যারিস্টার। আসলে তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেট। জেলের এই খবরদারি তাঁর বোঝার উপর শাকের আঁটি—ক্ষীণ অ্যালাউন্সের সূত্র দিয়ে বাঁধা। এই অ্যালাউন্সের পরিমাণ সম্বন্ধে তিনি সর্বদা সচেতন। তাঁর মোট বেতনের অনুপাতে জেল বিভাগ তাঁকে যতটুকু দেয়, মোট সময়ের ততটা অংশই তিনি আমাদের জন্যে ব্যয় করেন। কাগজপত্রে যেখানে যেখানে তাঁর সই দরকার, তার পাশে একটা × কাটা চিহ্ন দিয়ে রাখতে হয়। এই তাঁর নির্দেশ। তিনি ঝড়ের মত আসেন এবং মোটা কলম দিয়ে কতগুলো সই-এর ঝড় তুলে দিয়ে ঝড়ের মত বেরিয়ে যান। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাগজগুলো সরিয়ে নেন। একটু দেরি হলেই প্রশ্ন করেন, হাতে বাত ধরেছে কিনা, আর একটু তাড়াতাড়ি হলেই জিজ্ঞেস করেন, is there anything to hide? আমার সৌভাগ্য, এই কাগজ টানা কাজটা আমার ভাগে পড়েনি। তাহলে আমার প্রবেশনার জীবনের একদিনেই অবসান হত।

    মিস্টার রয় আফিসে যতক্ষণ থাকেন, একেবারে পুরোদস্তুর সাহেব। কারুর সম্বন্ধে অনাবশ্যক কৌতূহল নেই। আফিস-সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া কারো সঙ্গে বাক্যালাপও করেন না। আমি রোজই তাঁর খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকি। কালেভদ্রে দু-একটা দরকারী কথা ছাড়া আমার দিকে কোনো মনোযোগ দেননি কোনদিন।

    সেদিন হঠাৎ সই করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন, তোমার প্রভিডেণ্ড ফাণ্ড আছে?

    বললাম, না।

    পরদিন অফিসে ঢুকেই দু’খানা কাগজ আমার হাতে দিয়ে বললেন, এখনি ফিল আপ্ করে দাও।

    কাগজটা দেখলাম প্রভিডেণ্ড ফাণ্ডে টাকা জমাবার দরখাস্তের ফর্ম্। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র রোজগারের একটি পয়সাও জমাবার জন্যে অবশিষ্ট থাকে না। ভাগীদার অনেক এবং আমার উপর তাঁদের মনোভাব যাই হোক, আমার অর্থের প্রতি তাঁরা কখনও বিরূপ। নন্। ইতস্তত করছি দেখে, মিস্টার তাড়া দিলেন, কুইক্ কুইক্। ওতে আমারও একটা সই দরকার হবে।

    সবিনয়ে বললাম, আপনি আমার জন্যে যে কষ্ট স্বীকার করেছেন তার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু প্রভিডেণ্ড ফাণ্ডে টাকা রাখবার মত সঙ্গতি আমার নেই।

    —কেন?

    একটু ইতস্তত করে বললাম, আমার এই সামান্য আয়ের উপর দু’একটা আত্মীয় পরিবারকে নির্ভর করতে হয়।

    —তাদের বঞ্চিত করতে তো তোমায় বলিনি।

    —কিন্তু তাদের আর এই ফাণ্ডের দাবি মিটিয়ে বাকী যা থাকবে তাতে আমার খাওয়া চলে না স্যার।

    —যদি না চলে খাবে না—অম্লান বদনে উত্তর দিলেন মিস্টার রয়, fill it in, quick!

    ভেবে দেখলাম, প্রবেশনার মানুষ আমি। আর বেশীদূর অগ্রসর হওয়া সমীচীন হবে না। ফরমের ঘরগুলো পূরণ করে তাঁর হাতে দিলাম।

    প্রভিডেণ্ড ফাণ্ডের নিয়ম অনুসারে মাসিক বেতনের প্রতি টাকায় এক আনা থেকে দশ পয়সা পর্যন্ত জমানো চলে। সে টাকা মাইনের বিল থেকে কেটে দিতে হয়। বলা বাহুল্য, আমি এক আনা হারেই কাটবার ব্যবস্থা করেছিলাম। উনি সেই অঙ্কটা বদলে দশ পয়সা হারে যা হয়, তাই বসিয়ে নিলেন।

    আমি অনুনয় করে বললাম, একেবারে মরে যাবো স্যার।

    —নেভার মাইণ্ড, বলে সই করেই উঠে পড়লেন। দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, My dear friend, আজ তুমি আমাকে অভিশাপ দিচ্ছ নিশ্চয়ই। কিন্তু I can assure you, এমন একদিন আসবে যেদিন তুমি আমাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করবে; সেটা অবিশ্যি আমি শুনতে পাবো না। কেন না আমি তার অনেক আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছি।

    কয়েকদিন পরের ঘটনা। মিস্টার রয় যথারীতি সই করছেন। হঠাৎ একটা কাগজের দিকে তাঁর নজর পড়ল। ট্রেজারী থেকে টাকা তুলবার কটিনজেন্ট বিল।

    জেলের অধিবাসীদের ধর্মপ্রাণ করে তুলবার জন্যে সরকারী প্রচেষ্টার অন্ত নেই। সে উদ্দেশ্যে নিযুক্ত আছেন বিভিন্ন ধর্মের উপদেষ্টা—পাদরি পণ্ডিত এবং মৌলবী-সাহেবের দল। সপ্তাহান্তে একবার এসে নরকবাসী পাপাত্মাদের একসঙ্গে জড়ো করেন তাঁরা। উদ্ধারের মন্ত্র প্রচার করেন। অর্থাৎ কয়েদী বেচারারা ঐ একটি দিন কাজকর্ম ছেড়ে কিছুক্ষণ একত্রে বসে একটু খোশগল্প করবার সুযোগ পায়। এই উপদেষ্টা অবৈতনিক, কিন্তু একটা যাতায়াত ভাতা ভোগ করেন—সপ্তাহে আড়াই টাকা কিংবা ঐ রকম কিছু। সেইটাই বিল করে ট্রেজারীতে পাঠানো হচ্ছে ক্যাশ করবার উদ্দেশ্যে। অঙ্কের পরিমাণ মবলক সাড়ে বারো টাকা।

    ব্যাপারটা মনিবকে বুঝিয়ে দিলাম। মিস্টার রয় কলম তুলে বললেন, কিন্তু আমি যে দেখেছি ফি রবিবার ঐ পণ্ডিত আর পাদরি লাফাতে লাফাতে আসে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে। ওদের আবার গাড়িভাড়া কিসের?

    আমি বললাম, ওরা কি করে আসে সেটা আমাদের দেখবার কথা নয়। সরকার যখন ওদের রাহাখরচ মঞ্জুর করেছেন, ওটা ওদের প্রাপ্য।

    মিস্টার রয় হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, কে বললে ওটা ওদের প্রাপ্য? সরকারী অর্থের যাতে অযথা খরচ না হয়, সেটা দেখাই আমার কর্তব্য।

    তারপর একটু ব্যঙ্গের সুরে বললেন, তোমার দেখছি ভয়ানক দরদ ওদের ওপর বখরা আছে বুঝি কিছু?

    ঝাঁ করে উঠল মাথার ভিতরটা। কিছুদিন থেকে চাকরির মায়া ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে আসছিল। একটা দমকা হাওয়ায় আজ সেটা একেবারে ছিন্ন হয়ে গেল। মুহূর্তে মনস্থির করে ফেললাম। রূঢ় জবাব মুখে এসে গিয়েছিল। কোনো রকমে নিজেকে সংযত করে ফিরে এলাম নিজের টেবিলে। একখানা কাগজ টেনে নিয়ে তাড়াতাড়ি কয়েক লাইন লিখে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দিলাম। কাগজখানা ওঁর সামনে রেখে বললাম, কাল সকালে ছেড়ে দিলেই কৃতজ্ঞ হবো। দেড়টার মেল ধরতে চাই।

    মনিব কাগজখানা পড়ে পকেটে পুরলেন এবং তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন। বাকী কাগজ আর সই হল না।

    .

    কয়েকখানা চিঠির উত্তর দেবার ছিল। সন্ধ্যাবেলা বসবার ঘরে বসে তারই দু-একটা সেরে রাখছিলাম। দরজায় করাঘাত। খুলে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারি না। অত বড় মনিব সশরীরে আমার দরজায়। অভ্যর্থনা করতে ভুলে গেলাম। উনি সেজন্য অপেক্ষা করলেন না। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন। আমি একখানা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললাম, বসুন স্যার। তিনি ফিরেও দেখলেন না। ঘরের চারদিক ঘুরে দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। একখানা ছবি দেখিয়ে বাঙলা ভাষায় প্রশ্ন করলেন, ইনি কে?

    এই প্রথম বাঙলা শুনলাম মিস্টার রয়ের মুখে।

    বললাম, আমার বাবা।

    —বেঁচে আছেন?

    —না।

    —রক্ষা পেয়েছেন, বলে কটমট করে তাকালেন আমার দিকে। আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, তোমার বয়স কত?

    বয়স বললাম।

    —আমার একটা ছেলে ছিল। ঠিক তোমার বয়সী। বেঁচে নেই। … ভগবানকে ধন্যবাদ দিই সেজন্য। …কেন বুঝতে পারছ?

    আমি উত্তর দিলাম না।

    —বেঁচে থাকলে সে হয়তো আজ তোমারই মত বেয়াদব তৈরি হত। বাপের বয়সী অফিস-মাস্টারের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারত Letter of resignation!—বলে আমার সেই ইস্তফাপত্র কুটিকুটি করে ছিঁড়ে টুকরোগুলো আমার গায়ের উপর ছুঁড়ে ফেলে ঝড়ের মত বেরিয়ে গেলেন।

  • চার

    চার

    নিছক ধনাধিকারই ঐশ্বর্য নয়। ঐশ্বর্যের পরিচয় তার বহিঃপ্রকাশ। এক সিন্দুক কোহিনূর আর এক ডজন ময়ূর-সিংহাসন নিয়ে যদি আপনি হিমালয়ের কোনো নিভৃত গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন, পৃথিবীর ধনাঢ্যদের তালিকায় আপনার নাম অনুক্ত থেকে যাবে। কিন্তু রাতারাতি কালোবাজারের কৃপালাভ করে লেক-টেরাসে বাড়ি তুলুন চারতলা, আর সেই সঙ্গে কিনুন দু’খানা বুইক আর একটা রেসের ঘোড়া, আপনার রূপ, বয়স এবং ব্যাঙ্কব্যালান্স যতই বিরুদ্ধ সাক্ষ্য দিক, অনূঢ়া কন্যার জননীকুল এবং ইনকম ট্যাক্সের ফেউদের হাত থেকে আপনি একটি দিনও স্বস্তি পাবেন না। এমনি করে আপনার বাড়ি, গাড়ি, আপনার চালচলন, আসবাবপত্র, পোশাকপরিচ্ছদ এবং সকলের উপরে আপনার সালাঙ্কারা অর্ধাঙ্গিনী,—অভাবে, সুসজ্জিতা বান্ধবীদল—আপনার জয়ঢাক স্কন্ধে সমাজের বুকের উপর সরবে বিচরণ করছেন বলেই আপনি বড়লোক; রাম, শ্যাম, যদুর থেকে আপনি স্বতন্ত্র এবং উচ্চতর জীব।

    ঐশ্বর্যের বাহন-সংখ্যা অগণিত। কিন্তু তার মধ্যে যে জন্তুটা আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি শোরগোল তুলছে, তার নাম মোটরগাড়ি। বেপরোয়া গতির নেশায় সে মাতাল হয়ে ছুটছে, তীব্র কর্কশ কণ্ঠে চরণ-সর্বস্ব পথচারীকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে—তফাত যাও। সামনাসামনি যদি এসেছ, মৃত্যু অনিবার্য; আশেপাশেও যদি পড়ে যাও, কদম-লাঞ্ছনা থেকে নিস্তার নেই। এই মোটরগাড়িই হচ্ছে আপনার ও আমার মধ্যে উদ্ধত চাইনিজ ওয়াল।

    দার্জিলিং-এ ঐশ্বর্যের অভাব নেই, অভাব শুধু তার এই শিঙওয়ালা বাহনটির। সেই একটিমাত্র কারণেই ধনী আর নির্ধনের মধ্যে ব্যবধান এখানে দুর্লঙ্ঘ্য নয়। অবজারভেটার হিলের চারদিকে বারকয়েক চক্কর দিয়ে ম্যালের যে বেঞ্চিটাতে এসে রোজ আমি বিশ্রাম করি, তারই অপর প্রান্ত অসঙ্কোচে অধিকার করেন এমন সব জাঁদরেল ব্যক্তি যাঁদের সঙ্গে এক-আসনে দূরে থাক, এক পাড়ায় অবস্থান অন্যত্র ধৃষ্টতা বলে গণ্য হবে আমা হেন ব্যক্তির পক্ষে। সেদিনও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। ওখানে আসন গ্রহণ করলেন বিশাল এক জবরজঙ্গ—বহুমূল্য রাইডিং ব্রীচেজ, তার উপর ততোধিক মূল্যবান কোট, চেস্টার মাফলার দস্তানার স্তূপ। সেখান থেকে যে আবেশময় সৌরভ বিকীর্ণ হচ্ছিল, তার কৌলীন্য সাগরপারের। এ হেন ব্যক্তির গোটা দেহটা দূরে থাক, টিকিটির সাক্ষাত্ত স্বপ্নাতীত, কলকাতা, বোম্বাই কিংবা নয়াদিল্লীর কোনো পাবলিক পার্কের বেঞ্চিতে। এতবড় অঘটন যে ঘটিত হল তার কারণ, এই রূপসী নগরীর ছায়াঘেরা পিচঢালা পরিচ্ছন্ন রাজপথ কলুষিত করবার জন্যে তাঁর আটখানা মোটরের একখানাও আমদানি করা সম্ভব হয়নি।

    আগন্তুক চোখের একটা কোণ দিয়ে বারকয়েক আমার দিকে তাকালেন, তারপর রত্নখচিত রৌপ্যাধারে মহার্ঘ্য সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বিদেশী ভাষায় প্রশ্ন করলেন, মাপ করবেন, আপনি এখানে রোজই আসেন বুঝি?

    —প্রায়ই আসি।

    —কোথায় থাকা হয়, জানতে পারি কি?

    —জেলে।

    চমকে উঠলেন ভদ্রলোক। নিজের অজ্ঞাতেই বোধ হয় একটুখানি সরে গিয়ে সন্দিগ্ধভাবে তাকাতে লাগলেন আমার দিকে। আমি আশ্বাস দিলাম, ভয় নেই। গেটভেঙে কিংবা পাঁচিল ডিঙিয়ে আসিনি। হাতে ছোরাটোরাও নেই, এই দেখুন—

    খটাস্ করে শব্দ হল। একজন পুলিসের সিপাই যাচ্ছিল সামনে দিয়ে। সম্ভবত আমার সরকারী পরিচয়টা জানে। বুক ঠুকে সেলাম দিয়ে গেল পুলিসী কায়দায়। ভদ্রলোক সেটা লক্ষ্য করলেন এবং একগাল হেসে বললেন, আপনি আচ্ছা লোক তো? আমি কি সেই কথা—কি মুশকিল—বেশ যা হোক—।

    তাঁর অবস্থাটা উপভোগ করা গেল। এবার তিনি বেশ খানিকটা কাছে সরে এসে বললেন, দেখুন, একটা কথা বলবো?

    —বলুন।

    আমার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বললেন, অনেক দেশ ঘুরেছি। অনেক অদ্ভুত জিনিস চোখে দেখেছি। এমন কত গোপন রহস্যময় নিষিদ্ধ জায়গায় যাবার সুযোগ হয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসা ভাগ্যের কথা। কিন্তু আশ্চর্য, একটা জিনিস কখনো দেখিনি। সে হচ্ছে জেল। ঐ কুড়ি ফুট উঁচু পাঁচিলের আড়ালে কী আছে, বড্ড দেখতে ইচ্ছা করে; দেখাবেন একবার?

    বললাম, সে আর শক্ত কি? আপনি ইচ্ছে করলেই হবে। আমার সাহায্য অনাবশ্যক।

    —কি রকম?

    —অতি সোজা ব্যাপার। এই যে বেঞ্চিটায় আপনি বসে আছেন, এরই উপর উঠে দাঁড়িয়ে দু-চারটা হুঙ্কার দিন, ইংরেজ নিপাত যাও। ডাউন উইথ ইম্পিরিয়ালিজম্। পুলিস কাছেই ঘুরছে। বাকীটুকুর ভার ওরাই নেবে।

    তিনি জিভ কেটে বললেন, ও সর্বনাশ, তাই কখনো পারি? ডাউন উইথ গ্যানড্‌হিজম বরং বলতে পারি একশবার, আর বলেও থাকি দরকার মত।

    পরিচয় পাওয়া গেল, উনি হচ্ছেন কোন্ দেশীয় রাজ্যের মহামান্য কুমারবাহাদুর। কয়েক লাখ টাকা বৃত্তি পান স্টেট তহবিল থেকে। গোটাকয়েক তোপও বোধ হয় হুঙ্কার ছাড়ে, যখন আসেন কলকাতা কিংবা নয়াদিল্লিতে।

    পরদিনই তিনি আমার দীন কুটীরে পদার্পণ করলেন। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলাম এবং আমার একমাত্র কম্বাইণ্ড হ্যাণ্ড, একাধারে ঠাকুর-চাকর-বয়-বেয়ারা-মশালচি—”কেটা”র নাম ধরে হাঁকডাক শুরু করে দিলাম। কুমারবাহাদুর প্রস্তাব করলেন, ঘুরে এসে বসা যাবে এবং আপনার কেটার শ্রীহস্তে চা-পান করা যাবে। আগে চলুন, আসল মিশনটা সেরে আসি।

    ছোট জেল। ঢুকেই প্রথমে নিয়ে গেলাম সেলগুলোর দিকে। সাত হাত লম্বা ও পাঁচ হাত চওড়া ঘর। একটিমাত্র গরাদ-দেওয়া লোহার দরজা। পেছনের দেয়ালে মাথার অনেকখানি উপরে ছোট্ট একটুখানি জানালার মত—যার পরিকল্পনা হয়েছিল সম্ভবত আলো-বাতাসকে ব্যঙ্গ করবার জন্যে। ঘরের সামনে দু-ধারে পাঁচিল-ঘেরা একফালি বারান্দা। তারপর আবার একটা কাঠের দরজা। সেলে যে রইল, তার মধ্যে আর এই প্রাণিজগতের মধ্যে ঐ একটিমাত্র সেতু। ওখানে যখন কপাট পড়ে, এ পৃথিবী তার কাছে জনমানবহীন।

    হরেক রকম বন্দীর আস্তানা এই সেল্ বা “ডিগ্রী”—পাগল, কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত, কৃত- অপরাধ স্বীকার করেছে যারা, কারা-আইনের কোন মারাত্মক ধারা অমান্য করে শাস্তি পেয়েছে যারা নির্জন কারাবাস। প্রথম সেলটিতে থাকে একটি ছোকরা খুনী আসামী। যতীন তার নাম। স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে পুলিসের কাছে। কুমারবাহাদুর তীক্ষ্ণ উৎসুক দৃষ্টিতে দেখছিলেন তার দিকে। সামান্য একটা ভূমিকা দেবার উদ্দেশ্যে শুরু করলাম, দিস্ পুওর ফেলো—

    যতীন বাধা দিয়ে কুমারবাহাদুরকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, কে আপনি? ও-ও জেল দেখতে এসেছেন বুঝি? দেখুন, দেখুন। বেশ ভালো করে দেখবেন স্যার। চিড়িয়াখানা দেখেছেন তো কলকাতায়? জঙ্গল থেকে জন্তু-জানোয়ার ধরে এনে খাঁচায় পুরে কত আমোদ পাই আমরা। তার চেয়ে অনেক বেশী আমোদ পাবেন এখানে। নিজের জাতকে দেখবেন জন্তুর মত খাঁচায় বন্ধ। শুধু চোখের দেখা কেন? আপনার লাঠিটা দিয়ে খোঁচা মেরেও দেখতে পারেন, কী আওয়াজ বেরোয় আমাদের গলা থেকে—ঠিক যেমন চিড়িয়াখানার সিম্পাঞ্জি কিংবা হনুমানটাকে খুঁচিয়ে দেখে ছেলেগুলো!

    এই তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের সুর হঠাৎ রুক্ষ কঠিন হয়ে উঠল যখন সে তাকাল আমার দিকে। বললে, ডেপুটীবাবু, আমাদের খাঁচায় ভরেছেন তাতে দুঃখ নেই। পায়ে ডাণ্ডা বেড়ি আর হাতে হাতকড়া দিয়ে ঝুলিয়ে রাখুন কড়িকাঠের সঙ্গে, সেটাও সইতে পারবো। কিন্তু দোহাই আপনার, পুওর ফেলো বলে লোকের কাছে সস্তা দরদ দেখিয়ে জুতোটা নতুন করে মারবেন না।

    প্রভুভক্ত জমাদার ঝাঁকিয়ে উঠে কী একটা বলতে যাচ্ছিল তার কয়েদী-সায়েস্তা- করার ভঙ্গীতে। হাত তুলে থামিয়ে দিলাম। অনুচ্চ কিন্তু তীব্রতর স্বরে বলল যতীন— মানুষকে শুধু জানোয়ার বানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তার দুর্দশাকে তুলে ধরছেন বন্ধুদের কাছে, তাদের কৌতুক আর আমোদের খোরাক যোগাবার জন্যে। কী নিষ্ঠুর আপনি!

    শেষের দিকে গলাটা কেমন কোমল শোনাল। কোঠরগত তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।

    কুমারবাহাদুরের দিকে তাকালাম। তিনি যেন স্বপ্নের ঘোর থেকে জেগে উঠলেন। হঠাৎ এগিয়ে গেলেন যতীনের সেলের সামনে। গরাদের ফাঁক দিয়ে ওর হাত দুখানা জড়িয়ে ধরে পরিষ্কার বাঙলায় বললেন, আমাদের মাপ করো, ভাই। আমরা বড্ড ভুল করেছি—বলে হাত ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে সোজা ছুটলেন গেটের দিকে। আমার জন্যে অপেক্ষা পর্যন্ত করলেন না।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    সকৌতুক অনুভব করছিলাম, চাকরির অহিফেন এরই মধ্যে মগজে তার বিষক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। ছ’মাস আগেও এ অবস্থা ছিল কল্পনার অতীত। ভেবে হাসি পায়, বড়বাবু- সর্বস্ব কেরানীকুলকে কত না অবজ্ঞার চোখে দেখেছি। আর আজ আমার কি অবস্থা? বাক্যে ও চিন্তায় যাঁরা প্রায় সবটুকু অধিকার করে বসেছেন, তারা বড়বাবু না হলেও, বড়সাহেব বা ছোটসাহেব। বন্ধুবান্ধবদের মজলিশে ক’দিন আগেও যেখানে বিচরণ করতেন শ’, রবীন্দ্রনাথ, হ্যারল্ড লাস্কি কিংবা ইসাডোরা ডানকান, আজকাল সেখানে স্বচ্ছন্দে আসন লাভ করেছে জেল কোড, ফাণ্ডামেন্টাল রুলস্, আই-জি অথবা একাউণ্টেণ্ট জেনারেল। মনে মনে লজ্জিত হলাম।

    কিন্তু এ লজ্জাবোধ কাটিয়ে উঠতেও আমার বেশী দিন লাগেনি, যখন দেখলাম, এই মানসিক রূপান্তর শুধু আমার মত ক্ষুদ্র চাকরিজীবীর পরিণাম নয়, বৃহৎ চাকরেদেরও ঐ একই পরমাগতি। তফাৎ যেটুকু, সেটা মাত্রাগত, প্রকারগত নয়; –কাইণ্ড নয়, ডিগ্রী। আমি যেখানে আই-জি কিংবা তাঁর পি-এ-কে নিয়ে আসর জমাচ্ছি, এঁরা সেখানে সার করেছেন, চী, পলিটিক্যাল কিংবা ফাইন্যান্স সেক্রেটারি। সেক্রেটারি-মহলও তেমনি মশগুল হয়ে আছেন কোনো এইচ-এম কিংবা স্বয়ং এইচ-ঈ-কে নিয়ে।

    যাক্, এসব গেল পরবর্তী কালের কথা। সেদিন কিন্তু দার্জিলিং-এর শৈলবাসে আমার সেই ছোট্ট বাংলোখানির বারান্দায় বসে বিস্তীর্ণ উপত্যকার ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ ঐশ্বর্যের দিকে তাকিয়ে নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলাম বারংবার। সভয়ে উপলব্ধি করেছিলাম, চাকরিটা যেন একটা মহাকায় পাইথন, অসহায় হরিণশিশুর মত একবার যখন তার মুখগহ্বরে এসে পড়েছি, আর রক্ষে নেই। ধীরে ধীরে সে সবটাই গ্রাস করে ফেলবে।

    শুধু কি তাই? এতদিনের চিহ্নিত পথ থেকেই যে স্খলিত হয়ে পড়েছি তা নয়, একটিমাত্র চঞ্চল ঝরণা আমার এই পাহাড়ী জীবনের ঊষর দিনগুলো মধুসঞ্চিত করে রেখেছিল, তাকেও হারিয়ে ফেলেছি। বিস্মিত হলাম এই ভেবে যে, আজ কদিন ধরে কাঞ্চী যে আসেনি, সেকথা তো কই একবারও মনে হয়নি? অথচ কটা দিন আগেও সমস্ত দেহ- মন উৎকর্ণ হয়ে থাকত, তার ঐ মোহিনী হাসির স্পর্শটুকুর লোভে।

    কয়েকখানা বই সঙ্গে এনেছিলাম। তারই একটা টেনে নিয়ে বসলাম গিয়ে ভিতরের বারান্দায়। ডিসেম্বরের মধ্যাহ্ন। আকাশে রৌদ্র ঝলমল করছে, প্রাণপণে চেষ্টা করছে শীতের তীব্রতাকে সহনীয় করবার। কিন্তু মনে হচ্ছে সবটাই তার ব্যর্থ প্রয়াস; যেমন ব্যর্থ হচ্ছে আমার এই বই-এর পাতায় মনোনিবেশের চেষ্টা।

    বাইরের দরজায় কড়া নড়ে উঠল। হাঁক দিলাম, কে? কোনো জবাব নেই। কড়াটা শুধু আরো জোরে সাড়া দিল দ্বিতীয়বার। পাশের ঘরে কেটার নাসিকাধ্বনি যে পর্দায় গিয়ে পৌঁচেছে, রীতিমত বলপ্রয়োগ ছাড়া তার নিদ্রাভঙ্গের কোন রকম ভরসা নেই। অতএব নিতান্ত অনিচ্ছায় উঠতে হল।

    —একি, তুমি!

    কাঞ্ছীকে যেন নতুন রূপে দেখলাম। কালো ভেলভেটের ঘাগরার উপর গাঢ় চকোলেট রঙ-এর সার্জের ঊর্ধ্বাবরণ, যাকে ওরা বলে চোলা। লম্বা বেণী ঝুলছে পিঠের উপর। রক্তিম গণ্ডে, ওষ্ঠে, চঞ্চল চোখ দুটিতে কৌতুকোজ্জ্বল চাপা হাসি। একটা কিছু উপলক্ষ্য পেলেই উপচে ঝরে পড়বে। হাতে এক ঝুরি কমলালেবু। ভিতরে এসে ঝুড়িটা রেখে বললে, এই নাও। বড়ী আম্মা পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের বাগানের নেবু।

    আমি সেই নধরকান্তি ফলগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। কাঞ্ছী মাথা দুলিয়ে বলল, উঁহু। যা খুঁজছ তা পাবে না। আমি নিজে হাতে গাছ থেকে পেড়ে এনেছি। কটা কাঁটা ফুটেছে, জানো? তিনটা। বড়ী আম্মা বকছিল, ডাল ভাঙছিস্ কেন? বললাম, কি করবো : তোমার বাবুজীর যে আবার বোঁটা আর পাতা না থাকলে নেবু পছন্দ হয় না!

    কথাটা সত্যি। এ আমার এক অদ্ভুত ছেলেমানুষি খেয়াল। কমলার সঙ্গে যে বোঁটা আর পাতা লেগে থাকে, দার্জিলিং-এ এসেই তো প্রথম দেখলাম।

    বললাম, কে বলল তোমাকে বোঁটা ছাড়া নেবু পছন্দ হয় না?

    —আমি জানি।

    —কি করে জানলে?

    লম্বা বেণীটায় একটা দোলা দিয়ে বলল, বলবো না।

    কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললাম, বেশ : চাই না তোমার নেবুর ঝুড়ি; ফিরিয়ে নিয়ে যাও।

    —হুঁ। ফিরিয়ে নেবো বৈকি? বড়ী আম্মার চ্যালা কাঠ কি জিনিস জানো না তো? এই দ্যাখ—বলে বাঁ হাতের উপর থেকে জামাটা সরিয়ে দেখাল একটা লম্বা কালশিরে দাগ। বললাম, বেশ হয়েছে। সারাদিন দুষ্টুমি করবে; তার শাস্তি নেই?

    —তাহলে তো তুমিও বাদ যাও না।

    -কেন, আমি আবার কি করলাম?

    —নেবু ফিরিয়ে নিয়ে যাও বললে কেন?

    এর আর উত্তর নেই। মুহূর্তকাল অপেক্ষা করে ফেটে গড়িয়ে পড়ল তার হাসি। পাষাণের উপর আছড়ে ভেঙে পড়ল একরাশ বেলোয়ারী কাঁচের বাসন। আমি যেন সম্বিত হারিয়ে ফেললাম। আমার এই অদ্ভুত ভাবান্তর ও বোধ হয় বুঝতে পারলো না। হঠাৎ হাসি থামিয়ে আস্তে আস্তে কাছে সরে এসে ভয়ে ভয়ে বলল, তুমি রাগ করলে বাবুজী?

    তৎক্ষণাৎ উত্তর না পেয়ে অপরাধীর মত কুণ্ঠিত মৃদু কণ্ঠে বলল, সত্যি, এ রোগ আমার কিছুতে গেল না। কত যে বকুনি খাই—

    ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছি। বললাম, সে জ্ঞান যদি থাকে তবে হাস কেন পাগলের মত?

    —বা-রে, আমি কি ইচ্ছে করে হাসি? হাসি পেলে আমি কি করবো?

    —আচ্ছা; এবার যখন হাসি পাবে, সোজা ছুটে যেও বড়ী আম্মার কাছে। এক ঘা চ্যালা কাঠ পিঠে পড়লেই হাসি পালিয়ে যাবে বাপ্ বাপ্ করে।

    —ঈস্ : তাই বুঝি? তাতে আরো বেশী করে হাসি পায়।

    সে জানি। উনিই তো আদর দিয়ে মাথাটা খেয়েছেন। দাঁড়াও; আজই বলে আসছি গিয়ে—

    —যাও না? বুড়ী কি বলবে আমার জানা আছে।

    —কি বলবেন?

    —বলবে, আদর দিয়ে ওর মাথা তো আমি খাইনি; খেয়েছে আর একজন।

    —সে আবার কে?

    —আমি কি জানি—বলে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল আমার দিকে পিছন ফিরে। দীর্ঘ বেণীটায় আবার একটা ঝাঁকানি দিয়ে চঞ্চল চরণে ঘরের দিকে চলে গেল। ঝুড়িটা আমার ভাঁড়ার ঘরে রেখে ফিরে আস্তে আস্তে বলল, শুধু মাথা চিবিয়ে খেয়ে তো পেট ভরবে না, ফল কটাও খেও। সবগুলোই যেন কেটাকে দান করে বসো না। যা ভুলো মন তোমার; হয়তো একটাও শেষ পর্যন্ত মুখে উঠবে না।

    খুব খানিকটা উৎসাহ দেখিয়ে বললাম, কে বললে মুখে উঠবে না, কাল এসে দেখো তুমি, ঝুড়ি একেবারে গড়ের মাঠ। … বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা, তোমার সামনেই শুরু করছি।

    উঠবার উপক্রম করতেই কলকণ্ঠে থামিয়ে দিল কাঞ্ছী—হয়েছে হয়েছে। আর উঠতে হবে না। খুব বুঝেছি।

    একবার এদিক-ওদিক কি খুঁজলে। তারপর ছুটে গেল রান্নাঘরে এবং সেখান থেকে ভাঁড়ারে। একটা ডিশ নিয়ে এসে তিন-চারটে লেবু ছাড়িয়ে ডিশখানা আমার হাতে দিয়ে বলল, খাও।

    কয়েকটা কোয়া তুলে নিয়ে বললাম, বাঃ, আমি বুঝি একা খাবো?

    —আবার কে খাবে?

    —কেন, তুমি?

    কাঞ্ছী জবাব দিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে মাটি খুঁটতে লাগল। একটি সলজ্জ মৃদু হাসি ভেসে উঠল আনত মুখের উপর। কয়েকটা কোয়া ওর হাতের মধ্যে গুঁজে দিয়ে বললাম, দেখি কার আগে ফুরোয়।

    কাঞ্ছী কিন্তু ফলগুলো মুখে তুলল না। তেমনি দাঁড়িয়ে রইল।

    —কী হল? বলে ওর দিকে যখন চোখ তুললাম, দেখলাম, দুটি স্নিগ্ধ সলজ্জ চক্ষু আমার অলক্ষ্যে একদৃষ্টে আমার মুখের পানে চেয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই, সহসা এক ঝলক রক্ত এসে পড়ল তার মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে এস্তা হরিণীর মত ছুটে বেরিয়ে গেল।

    পাশের বাড়ি থেকে বড়ী আম্মার কাংস্য কণ্ঠ ভেসে আসছে। তর্জন-গর্জনে কলহের সুর। কিন্তু প্রতিপক্ষের কোন সাড়া নেই। থাকবার কথাও নয়। বড়ী আম্মার গবর্নমেন্টে অপোজিশন পার্টির বালাই নেই। একেবারে পুরোপুরি ডিকটেটরশিপ। দাম্পত্য কলহকে পণ্ডিতেরা বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু যে দম্পতির উত্তমার্ধে শোভা পাচ্ছেন বড়ী আম্মার মত ব্যক্তি, আর অধমার্ধের অস্তিত্ব একেবারেই নৈর্ব্যক্তিক সেখানে কলহের রূপ বিপরীত, অর্থাৎ লঘুরম্ভে বহুক্রিয়া। এমন একাধিক দৃশ্যের দর্শক আমি নিজেই, যার সূচনায় ছিল একখানা দাড়ি কামাবার ব্লেড কিংবা শার্টের বোতাম, কিন্তু উপসংহারে দেখা দিয়েছে ব্যাণ্ডেজ এবং টিংচার আইডিন। সামান্য পিন্ প্রিসের বিনিময়ে খুন্তি কিংবা ডালের কাঁটা ডাক্তার থাপার দাম্পত্য-জীবনে বিরল প্রাপ্য নয়।

    এই বৃদ্ধ নিরীহ ডাক্তারটির উপর আমার কেমন একটা সহজাত সহানুভূতি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ প্রথম মনে হল ‘আহা বেচারা’ বলে যতটা করুণা তাকে দেখিয়েছি, ঠিক ততখানি বোধহয় ওর প্রাপ্য নয়। তুচ্ছ হোক, বড় হোক, কোন একটি নারী-হৃদয়ের অন্তস্তলে আমি বিচরণ করি, আমাকে আশ্রয় করে তার সুখ-দুঃখ বিরোধ ও শান্তি, আমাকে ঘিরে তার উৎকণ্ঠার অন্ত নেই—এই সত্য যে পুরুষ উপলব্ধি করেছে তার জীবনে, তার চেয়ে বড় সম্পদের অধিকারী কে? মনে হয় ডাক্তার সেই ভাগ্যবান পুরুষ- কুলের অন্যতম। তাই একজনের কাংস্য কণ্ঠের বিষ তাকে স্পর্শ করে না। কেননা সে জানে, অন্তরালে আছে সুধার ভাণ্ডার। তাই সমস্ত বিরোধ বিক্ষোভের মধ্যেও সে নিরুদ্বিগ্ন ও নির্বিকার। ব্যাণ্ডেজের বেদনা বহন করেও ভেসে থাকে একটি কৌতুকহাসি তার অদৃশ্য প্রায় চোখদুটির অন্তরালে।

    ডাক্তারের এই নতুন রূপ আজই আমার কাছে বিশেষভাবে প্রতিভাত হল কেন? তবে কি ঐ অমৃতময় অনুভূতি আজ আমার অন্তরেও তার সোনার কাঠি বুলিয়ে গেল? আমিও কি

    —আসামী আয়া, হুজুর!

    চমকে উঠলাম। অদূরে দাঁড়িয়ে নিখুঁত সামরিক বেশধারী গুর্খা ওয়ার্ডার। সশব্দ সেলাম ঠুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেল আসামী আয়া, হুজুর। অভ্যর্থনার প্রয়োজন এবং সেটা আমাকে গিয়ে করতে হবে এখনই।

    .

    কারা এই আসামী? আইন এবং আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে অপরের ধনপ্রাণ নিয়ে গেণ্ডুয়া খেলে যে ভাগ্যবানের দল তারা নয়। সমাজের বুকের উপর বসে মিষ্টি হাসির প্রলেপ দিয়ে শানায় যারা বিষাক্ত ছুরিকা, তারাও নয়। তাদের দেখা ক্বচিৎ পাবেন জেলের দরজায়। এখানে দলে দলে আসে তারাই আইনের খপ্পর থেকে টেনে তুলবার যাদের কেউ নেই। ভুটিয়া বস্তীর মাহাদুর তার দৈনিক পারিবারিক খাদ্য পচাই মদ তৈরি করেছে : নিরে ঘরে বসে। জানে না তার অপরাধ কোথায়। সিঁধেল চোর বংশী তিনখানা থালা চুরি করেছে সর্দার বাহাদুর লেডেনল’র বাংলো থেকে, বিক্রী করে কিনেছে সের পাঁচেক চাল আর একটিন সিগারেট। জেলঘুঘু ভক্তা পকেট-কর্তন ব্যবসায়ে সুবিধা হচ্ছে না দেখে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে পুলিসের কাছে, জেলে গিয়ে একটু গায়ে জোর করে নেবার উদ্দেশ্যে।

    এরাই আমার আসামী। কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া পরে সার বেঁধে আসে যায়। এদেরই নাম ধাম বিবরণ, পিঠের তিল আর নাকের কাটা দাগ লিখে রাখি আমি চৌদ্দ-কলম-ওয়ালা চিত্রগুপ্তের খাতায়। তারপর খালাসের দিন যখন আসে, বাপের নাম আর হাঁটুর চিহ্ন মিলিয়ে ছেড়ে দিই জেল-গেটের বাইরে। এই হতভাগ্যদের উপলক্ষ্য করে রাষ্ট্রের কি বিপুল আয়োজন! এদের জন্য গলদঘর্ম হচ্ছে সুবিশাল পুলিস-বাহিনী, উদয়াস্ত কলম চালাচ্ছেন টাই-বাঁধা হাকিম আর তাঁর বিস্তীর্ণ এজলাসে গলা ফাটাচ্ছেন কালো কোট-পরা উকীল, আর ময়লা চাপকানধারী মোক্তারের দল, এবং ডাণ্ডাহস্তে ধাবিত হচ্ছেন অতিব্যস্ত জেলর সাহেব মৌলবী মোবারক আলি আর আমরা তাঁর অনুচরবৃন্দ।

    তবু এরাই আমার লক্ষ্মী। এরা আসে বলেই আমার ঘরে আসে অন্ন। এরা ছিল বলেই আমি আছি। নইলে আজ কোথায় থাকতাম আমি, আর কোথায় থাকত আমার রাজকন্যা আর অর্ধেক রাজত্ব?

  • ছয়

    ছয়

    অফিস বলতে সচরাচর বুঝি এমন একটা অন্ধকার বন্দিশালা, যার গহ্বরে কলম চলে দশটা থেকে পাঁচটা। সে কলম যারা চালায়, বহু আকাঙ্ক্ষিত দিবা-নিদ্রার সুযোগ তাদের বিরল, অর্থাৎ সপ্তাহান্তে একটি দিন, রবিবারের মধুর মধ্যাহ্নে। জ্যোতিষশাস্ত্রে আমার অধিকার নেই। আমার রাশিচক্রের কোন্ তুঙ্গে কোন্ গ্রহ বা উপগ্রহ অবস্থান করছেন, সে সম্বন্ধেও আমি নিতান্ত অজ্ঞ। তবে সন্দেহ হয়, আমার মর্মস্থানে যিনি অধিষ্ঠিত তাঁর নাম চন্দ্রদেব। তাঁরই দৃষ্টি-প্রসাদে এমন এক স্বর্গে এসে কলম ধরেছি, যেখানে দিবানিদ্রার দৈনন্দিন অবসর। শুধু এই কারণেই চাকরি-জগতে আমরা সার্বকালিক ঈর্ষার পাত্র।

    কিন্তু হায়, গোলাপও নিষ্কণ্টক নয়! তাই অন্য দশজন চাকুরেবাবু যখন সূর্যঠাকুরকে অগ্রাহ্য করে ধীরেসুস্থে শয্যাত্যাগ করেন এবং ধূমায়মান চায়ের পেয়ালায় মিলিয়ে দেন নিদ্রাজড়িত প্রথম চুম্বন, কিংবা বাজারের থলিহস্তে দেখেশুনে কলাটা-মুলোটা, মাছের মুড়োটা সংগ্রহ করে গৃহিণীর মুখে ফুটিয়ে তোলেন খুশির ঝলক, আমরা তখন ধড়াচূড়া এঁটে কলম চালাই, লম্বা লম্বা হাই তুলি আর সশব্দে চালনা করি কয়েদীদলন শাসনতন্ত্র তারপর বারোটা-একটায় আসে মধ্যাহ্ন-বিরাম। অতঃপর আহারান্তে নিদ্রাসুখ। নিদ্রান্তে একটা বৈকালিক দ্বিরাগমন আছে বটে, কিন্তু তার মধ্যে নেই আফিসদুরস্ত তৎপরতা। সেখানে জেলখানার সঙ্গে বৈঠকখানার গলাগলি। রিটার্ন রেজিস্টারের কুইনাইন পিলের উপর তাম্বুল-সিগারেট-খোসগল্পের সুগারকোটিং

    বৈকালিক আফিস শুধু আফিস নয়, জেলবাবুদের সান্ধ্য-ক্লাব।

    মার্চ মাস যায় যায়। মহাশীত অফিসিয়ালি অবসর গ্রহণ করেছেন কিন্তু সশরীরে বিদায় গ্রহণ করেন নি। সরকারী কাগজ-পত্র থেকে অপসরণ করে ভর করেছেন নিরীহ গৃহস্থের স্কন্ধে। সঙ্গে রয়েছেন প্রচণ্ড পবন। এঁদের সমবেত আক্রমণ রোধ করতে না পেরে সূর্যদেব আশ্রয় নিয়েছেন মেঘের আড়ালে। ঘরে ঘরে ত্রাহি ত্রাহি ডাক পড়ে গেছে। মধ্যাহ্ন-ভোজন কোনরকমে সমাধা করে ডবল লেপের উপর ভুটিয়া কম্বল চাপিয়ে নিদ্রাদেবীর কোমল ক্রোড়ে সবে আশ্রয় নেবার আয়োজন করছি, দুয়ারে ভগ্নদূতের আবির্ভাব।

    —”টেলিফু আয়া, হুজুর!”

    পড়ে রইল কোমল শয্যার উষ্ণ আলিঙ্গন। টেলিফুকের এক ফুৎকারে উড়ে গেল আসন্ন নিদ্রার মধুর আমেজ।

    .

    —”হ্যালো?”

    মোটা, ভারী, এবং শ্বেত কণ্ঠে উত্তর এল—ডেপুটি কমিশনার কথা বলছি।

    —গুড মর্নিং স্যার। আই মিন্—

    —লুক হিয়ার। তোমাদের ‘সেল’-এ জায়গা আছে তো? যদি না থাকে, একটা সেল খালি করে ফেল, আর স্পেশাল গার্ড রেডি রাখো।

    —এখনি করছি স্যার।

    —আধ ঘণ্টার মধ্যেই একজন আসামী যাবে। লোকটা পাগল, Dangerous Luna- tic. বেশী গোলমাল করলে fetters লাগাতে পার। আলাদা রাখবে। See that he does not communicate with anybody.

    সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলাম। খানিকটা কৌতূহলও হল, স্বয়ং বড়কর্তা যার জন্যে এতখানি ব্যস্ত, না জানি সে কী ভয়ঙ্কর জীব!

    আধ ঘণ্টার মধ্যেই এসে গেল লোকটা। কোমরে দড়ি, হাতে হাতকড়া। দু-পাশে বন্দুকধারী পুলিস। এই দারুণ শীতে একটা ছেঁড়া পাজামা ছাড়া দ্বিতীয় বস্তু নেই তার দেহে। অনাবৃত পিঠে, বাহুতে, ঘাড়ে এবং প্রায় সমস্ত শরীরে ফুটে উঠেছে মোটা মোটা আঘাতের দাগ। কোনো কোনোটা কেটে গিয়ে রক্ত জমে রয়েছে। কপালের নিচের দিকটা ফুলে উঠে একটা চোখ একেবারে ঢেকে গেছে; উপরের ঠোঁট উঁচু হয়ে নাকের সঙ্গে একাকার।

    দুজন পুলিস কোমরের দড়িটা খুলে টানতে টানতে লোকটাকে আমার টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। বাকি চোখটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে। এ কী রকম ডেঞ্জারাস লুন্যাটিক বললাম, হাতকড়ি খোল দেও।

    পুলিস দুজন ইতস্তত করতে লাগল। ওদের ইনচার্জ এগিয়ে এসে বলল, ভারী পাগল আছে, হুজুর।

    —জানি। হাতকড়াটা খুলে নাও।

    হাতকড়া খোলা হতেই ‘পাগলটা’ ধপাস্ করে বসে পড়ল মেঝের উপর। একবার এদিক-ওদিক চেয়ে শুষ্ক কণ্ঠে বলল, জল। জল আসতেই বাটিটা কেড়ে নিয়ে এক নিশ্বাসে শেষ করেই গড়িয়ে পড়ল সেইখানে। সমস্ত শরীরটা কেঁপে কুঁচকে যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। অফিসে যে কয়েদীটা কাজ করে, ছুটে গিয়ে দুটো কম্বল এনে আপাদমস্তক চাপা দিয়ে দিল। গায়ে হাত দিয়ে বলল, ঈস্, গা পুড়ে যাচ্ছে, স্যার।

    হাসপাতালে না পাঠিয়ে সেলেই পাঠাতে হল আসামীটাকে। ডেপুটি কমিশনারের হুকুম। কোনো অবস্থাতেই তার অন্যথা হতে পারে না।

    .

    অনেক কাজ জমে ছিল; বাড়ি ফিরতে কিছুটা রাত হল। ওভারকোট ছাড়তে যাচ্ছি। কেটা বলল, একজন বাবু এসে বসে আছেন বাইরের ঘরে। মন প্রসন্ন হল না। এই দুর্দান্ত শীতে কোনো রকমে দক্ষিণ হস্তের ব্যাপার চুকিয়ে ফেলে ডবল লেপ আর ভুটিয়া কম্বলের দিকেই সমস্ত দেহমন উন্মুখ হয়ে ছিল। অতিথির আগমন উৎপীড়ন বলেই মনে হল।

    বসবার ঘরে ঢুকতেই একটি কাপড়-চোপড়ের বাণ্ডিল কোনরকমে উঠে দাঁড়াল এবং সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। মুখের যেটুকু দৃশ্যমান তার থেকে তার জাতি, ধর্ম বা দেশ সম্বন্ধে কোনো আভাস পাওয়া গেল না। বয়স ছাব্বিশ না ছাপ্পান্ন, সেটাও ধারণার অতীত রয়ে গেল।

    বাংলা ভাষায় বললেন, একেবারে জমে গেছি, মশাই। বোধহয় ফ্রিজিং পয়েন্ট পার হয়ে গেছে। একটু চা খাওয়াতে পারেন?

    কেটাকে চায়ের হুকুম করে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম। আগন্তুক বললেন, কি উদ্দেশ্যে এসেছি, জানতে চাইছেন তো? সে এক দুঃসাহসিক অভিযান। জানা-জানি হলে চাকরি নিয়েও টানাটানি পড়বে। তবু আসতে হল। গৃহিণী একেবারে নাছোড়বান্দা! সে যাকগে। ধনরাজ কেমন আছে, বলুন তো?

    —কে ধনরাজ?

    —ধনরাজ তামাং। সিংটন টি এস্টেট থেকে যাকে পাগল বলে চালান দিয়েছে। আপনি দেখেননি নাকি এখনো?

    —আপনার পরিচয় জানতে পারি কি?

    —এই দেখুন! আসল কথাটাই বলা হয়নি। ঠিকই ধরেছেন। খবরটা চাইবার আগে জানানো দরকার আমি লোকটা কে? পুলিসের সি-আই-ডিও তো হতে পারি। আসলে কিন্তু পুলিস নই, ডাক্তার। ঐ চা-বাগানে চাকরি করছি আজ বাইশ বছর সাত মাস। নাম নিবারণ মজুমদার। বিশ্বাস না হয়, এই নিন—বলে তিনি তাঁর পর্বতপ্রমাণ বস্ত্রস্তূপের কোন এক অজ্ঞাত স্থান থেকে বুক পরীক্ষার যন্ত্রটা বের করে গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।

    অত্যন্ত বিরল হলেও সংসারে এমন একদল লোক চোখে পড়ে, অপরিচয় বা স্বল্প পরিচয় যাদের অন্তরঙ্গতার পথরোধ করে না। পরকে আপন করতে তাদের প্রয়োজন শুধু ক্ষণিকের দৃষ্টিবিনিময়। এই ডাক্তারবাবুটি যে সেই শ্রেণীর, সহজেই বোঝা গেল। তাই সম্পর্কটাও এক মুহূর্তে সহজ হয়ে গেল। গাম্ভীর্যের মুখোশ পরে বললাম, সামান্য একটা রবারের নল দেখিয়ে কাজ হাসিল করবেন, অতখানি কাঁচা ঠাওরাবেন না। জানেন তো, জেলের লোক আমরা।

    ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন, জানি বৈকি! জানি বলেই তো এত রাত্রে চড়াও হয়েছি। খোঁজখবর না নিয়েই কি আর জেলের গণ্ডীর মধ্যে পা বাড়িয়েছি মনে করেন? আর কিছু না থাক, প্রাণের ভয়টা তো আছে।

    হঠাৎ গলা নামিয়ে আর একটু কাছে সরে এসে বললেন, তারপর, খবর কি বল তো ভাই? আছে, না হয়ে গ্যাছে?

    বললাম, যা দেখলাম, আজ না হলেও কাল নাগাদ হয়ে যাবে বোধহয়।

    ডাক্তার চুপ করে গেলেন। তাঁর মর্কট-মার্কা টুপি আর ভালুক-মার্কা গলাবন্ধের আড়ালে মুখের চেহারাটা চোখে পড়ল না; কিন্তু একটা গভীর নিশ্বাস কানে এল। কেটা চা দিয়ে গিয়েছিল। পেয়ালাটা টেনে নিয়ে তাতেই মন দিলেন।

    অনেকক্ষণ নিঃশব্দে কেটে গেল। চায়ের পাত্রও একসময়ে নিঃশেষ হয়ে গেল। হঠাৎ তাঁর স্বর শুনে চমকে উঠলাম। এ যেন আর কেউ। যেন বহুদূরের কোন্ এক দুর্নিরীক্ষ্য বস্তুর দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বললেন, এমনি আর একদিনের কথা মনে পড়ছে। ধনরাজ তখনো সর্দার হয়নি। সামান্য কুলী। এই নর্টনসাহেব ছিল ছোট ম্যানেজার। মজলিশি ছোকরা। ভাল বেহালা বাজাতে পারত। একটা মস্তবড় পিয়ানো ছিল ওর ড্রয়িংরুমে ঢুকে ঠিক ডান দিকে। গানবাজনা উপলক্ষ্য করে সাহেব-সুবোর হৈ চৈ প্রায়ই লেগে থাকতো ওর বাংলোয়। সেদিনকার আয়োজনটা ছিল একটু বড় রকমের। আশেপাশের বাগান থেকে একদল সাহেবমেম তো ছিলই, তা ছাড়া দার্জিলিং থেকে ডেপুটি কমিশনার এবং পুলিসসাহেবও উপস্থিত ছিলেন। পানভোজনের দেদার বন্দোবস্ত। গোটা কয়েক বাছা বাছা পাহাড়ী মেয়েও মোতায়েন ছিল সাহেবলোগদের ফুর্তি জমবার জন্যে। রাত তখন দশটা। নরক গুলজার। এমন সময় দেখা গেল—সর্বনাশ! মদ ফুরিয়ে গেছে। বিশ্বাসী, পরিশ্রমী এবং বেজায় চটপটে বলে সুনাম ছিল ধনরাজের। বেচারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। টেনে তুলে নিয়ে এল এক খানসামা। যেতে পনের, আসতে পনের—তিরিশ মাইল পথ ঘোড়া ছুটিয়ে সদর থেকে মদ আনতে হবে। সময় দেওয়া হল দু ঘণ্টা। ধনরাজ ছুটল। অন্ধকার রাত, পথ জঙ্গলে ঘেরা। ক্রমাগত চড়াই আর উৎরাই। ফিরে যখন এল রাত একটা বেজে পঁয়ত্রিশ। সমস্ত শরীরে ঘামের জোয়ার খেলে যাচ্ছে। ঘোড়ার মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ফেনা। ম্যানেজার বেরিয়ে এল টলতে টলতে। চোখে লালপানির ছোপ। জড়িত কণ্ঠে গর্জে উঠল, দেরি কাঁহে হুয়া, উল্লুক?

    ধনরাজের কথা বলবার মত অবস্থা নয়। তবু অতি কষ্টে জানাল, রাস্তায় বাঘ বেরিয়েছিল। খানিকটা ঘুরে আসতে হয়েছে।

    সাহেব হুঙ্কার দিলেন, চাপরাসী!

    চাপরাসী ছুটে এল—হজৌর।

    মেরা চাবুক।

    চাবুক এল এবং টুকরো টুকরো হয়ে গেল ধনরাজের পিঠে। একজন কুলী ধরাধরি করে ওর অজ্ঞান দেহটাকে আমার হাসপাতালে যখন নিয়ে এল, তখনো ওর মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে।

    ডাক্তার থামলেন। বোধহয় দৃশ্যটা তাঁর চোখের উপর ভেসে উঠেছিল! একটু পরে আবার শুরু করলেন—মনে করেছিলাম, মরে যাবে। মরাই বোধ হয় উচিত ছিল। কিন্তু কুলী-মজুরের প্রাণ কি এত সহজে বেরোয়? ক’দিন যেতেই দিব্যি সেরে উঠলো।

    আমি বললাম, বেঁচে না উঠলে সাহেবের লাথি আর চাবুক পড়বে কাদের পিঠে?

    ডাক্তার হেসে বললেন, ঠিক বলেছ। তাছাড়া বেঁচে উঠবার অন্য প্রয়োজনও ছিল। সেই কথা বলছি।

    মাসখানেক পরে হঠাৎ একদিন নর্টনের বাংলো থেকে খবর এল সাহেবের অসুখ। গিয়ে দেখি অবস্থা জটিল। গোটা দুয়েক স্টুলের পরেই পাল্স নেই, চোখ বসে গেছে ইঞ্চি দেড়েক, গলার স্বর ভাঙা। বেপ্যানটা সরিয়ে নেবার জন্যে মেথরটাকে ডাকলাম! সাড়া নেই। তারপর একে একে বয়, বেয়ারা, চাপরাসী, মশালচি, বাবুর্চি—সবগুলোর নাম ধরে ডাকাডাকি করলাম। কোনটাকেই পাওয়া গেল না। বাইরে এসে দেখি, বাড়ি একেবারে ফাঁকা। দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটা লোক—ধনরাজ তামাং।

    —কিরে? তুই এখানে কি করছিস?

    ধনরাজের মুখ শুকনো—সাহেবের নাকি বড্ড অসুখ, ডাক্তারবাবু?

    —হ্যাঁ, বড্ড খারাপ অসুখ—কলেরা। তুই চলে যা।

    ও চলে গেল। তবে নিজের বাড়ি নয়, সাহেবের শোবার ঘরে। নিজ হাতে সাফ করল কলেরার ময়লা! আর সেবা যা করল সাহেবের বিবি কিংবা মাও বোধ হয় পারত না তার সিকিভাগ!

    নর্টন বেঁচে উঠল। ধনরাজ বখশিশ পেল দু-খানা দশ টাকার নোট। সাহেব অত্যাচারী হতে পারে, অকৃতজ্ঞ নয়। বছর খানেকের মধ্যে ওর প্রমোশনও হয়ে গেল—কুলী থেকে কুলীর সর্দার। সেই দিনই দেখা করতে এল। হাতে একটা ছোট ভেড়ার বাচ্চা।

    —ওটা কি রে?

    ধনরাজ একগাল হেসে বলল, খুকুদিদি খেলা করবে।

    —কি আপদ! ওটাকে পুষবে কে?

    ধনরাজ শুনল না। ‘খুকুদিদিও’ দেখলাম ঐ লোভনীয় খেলার বস্তুটি ছাড়তে রাজী নয়। মেয়েটাকে কোলে পিঠে করে ঐ একরকম মানুষ করেছিল। বললাম, সর্দার হলি; এবার একটা বিয়ে-টিয়ে কর।

    ধনরাজ লজ্জিত হাসি হেসে বলল, মেয়ে কোথায়?

    -কেন, এত মেয়ে রয়েছে বস্তিতে?—বলে, দু’চারটা সুশ্রী মেয়ের উল্লেখ করলাম। ওর চোখ ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, ওদের নাম মুখে এনো না বাবু। ওগুলোকে ছুঁলে নাইতে হয়। কোথায় ওরা রাত কাটায়, সে তো আমি নিজের চোখে দেখেছি—বলে ম্যানেজারের বাড়িটার দিকে ইঙ্গিত করল। কথাটা যে সত্যি সে আমিও জানি, সকলেই জানে। কিন্তু বস্তি-জীবনের অন্যান্য অসংখ্য উপসর্গের মত এটাও ওরা সবাই মেনে নিয়েছে। এই তুচ্ছ কারণে বস্তির কোনো মেয়েরই বিয়ে আটকে থাকে না। এমনি ধারা ঘৃণার ছাপও দেখা যায় না কোনো কুলী যুবকের চোখে-মুখে।

    .

    ডাক্তারবাবুর সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছিল। কেটাকে ডেকে কেসটা আনতে বলে দিলাম। কেটা এলে উনি তার খাঁটি স্বদেশী ভাষায় বললেন, এই ব্যাটা কী চা করেছিস? ও-সব দুধের সরবত তোর বাবুকে দিস। আমি হলাম তোদের দেশের লোক। আমার জন্যে বেশ করে এক কাপ—বুঝলি তো?

    কেটা মুচকি হেসে ঘাড় নেড়ে জানাল, সে বুঝেছে।

    আমি গম্ভীরভাবে বললাম, আপনার কাছে মাথা ঘোরার ওষুধ আছে তো?

    ডাক্তার একটু ব্যস্ত হলেন, কেন? মাথা ঘুরছে নাকি তোমার?

    গাম্ভীর্য বজায় রেখেই বললাম, না, এখন ঘুরছে না। তবে আপনার চা-এর রূপ দেখে ঘুরবে তো। তাই, আগে থাকতেই ব্যবস্থা করে রাখছি।

    উনি হেসে উঠলেন—আগে থাকো না, ভায়া, বছরখানেক এই ভুতুড়ে শীতের দেশে! তারপর দেখবো, কার চা দেখে কার মাথা ঘোরে!

    আমি সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বললাম, থাক। সে-সব পরের কথা পরে হবে। আপনি শুরু করুন।

    ডাক্তারবাবু সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, খুকুটার বিয়ে স্থির হল। সপরিবারে দেশে যাবার আয়োজন করছি। ধনরাজ ধরল, সেও যাবে। গিন্নী তো হাতে স্বর্গ পেলেন। জান তো, আমাদের মত চাকরিজীবীদের দেশই হল আসল বিদেশ। আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিকুটুম যাঁরা আছেন, তাঁদের সস্নেহ মূর্তি স্মরণ করলে প্রাণে আর জল থাকে না। ধনরাজের মত কাজের লোক আর সত্যিকার আপনার লোক পেয়ে আমারও বল বেড়ে গেল। সাহেবকে বলে ওর ছুটি করিয়ে নিলাম।

    বিয়ের কাজকর্ম মিটে যাবার পরেও দু-দিন আমাকে আটকে থাকতে হল। মা ওকে ছাড়তে চান না। আসবার সময় যখন প্রণাম করল, মা ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘তোর মাকে আমার হিংসে হচ্ছে ধনরাজ। তোর মত ছেলে পেটে ধরেছিল, সে মাগীর তপস্যার জোর আছে।’ আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম। আমার মা মানে—অত্যন্ত সেকেলে গোঁড়া ব্রাহ্মণ বিধবা। আর ধনরাজ তামাং একটা অস্পৃশ্য, অনাচারী পাহাড়ী কুলী।

    সপরিবারে ফিরছি। পোড়াদ’ স্টেশনে গাড়ি বদল করে দার্জিলিং মেল ধরবার জন্যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিরক্তির একশেষ। প্ল্যাটফরমে পায়চারি করে করে সময় আর কাটে না। ওদিকে দোকানগুলোর সামনে কী একটা জটলা হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে। নেহাত কিছু করবার নেই বলে দেখতে গেলাম। একটু ভিতরের দিকে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল, একটি মেয়ে উপুড় হয়ে এক নেপালীর পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, আর লোকটা অকথ্য ভাষায় তাকে গালাগালি করছে। তার আস্ফালন কানে এল—পা ছেড়ে দে বলছি, হারামজাদী; আমি কখনো তোকে ঘরে নিতে পারবো না।

    মেয়েটি কাতরভাবে বলল, আমি তা হলে কোথায় যাবো?

    নেপালীটা মুখ ভেংচে তার বলবার ভঙ্গীটা নকল করে বলল, কোথায় যাবো? কেন, যাদের ঘরে একরাত একদিন কাটিয়ে এলি, তোর সেই—বলে একটা অশ্লীল ইঙ্গিত করল। বেশ একটা হাসির রোল পড়ে গেল ভিড়ের মধ্যে।

    ব্যাপারটা মোটামুটি ধারণা করতে অসুবিধা হয়নি। একজন ভদ্রগোছের লোককে জিজ্ঞাসা করে গোটা ঘটনাটাই জানা গেল।

    ঐ নেপালী পোড়াদ’ স্টেশনে একটা ছোটখাট চায়ের স্টলের মালিক আর মেয়েটি তার বৌ। মেয়েটার বয়স অল্প এবং দেখতে সুশ্রী। এ অবস্থায় ঐ অঞ্চলে যা সচরাচর ঘটে থাকে, তাই ঘটল। অর্থাৎ পাশের কোন্ গ্রাম থেকে মুসলমান গুণ্ডার দল রাতারাতি হানা দিল দোকানে। মালিক পুরুষমানুষ। কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে পালাল। মেয়েটাকে নিয়ে গেল মুখ বেঁধে। তারপর একটা রাত আর একটা দিন কোথায় কি অবস্থায় ওর কেটেছিল, সে বীভৎস ইতিহাস খুলে বলবার দরকার নেই। রাত্রির অন্ধকারে কেমন করে ও ছাড়া পেল, কেউ জানে না। বোধ হয় নেহাত দৈহিক কারণে ও-পক্ষের কড়া পাহারা কিছুটা শিথিল হয়ে থাকবে। সেই সুযোগে কোনরকমে অর্থাৎ একমাত্র মনের জোরেই ঐ দেহটাকে টেনে নিয়ে ও ছুটে এসেছে নিজের ঘরে। জানে না, সে ঘর ওর ভেঙে গেছে চিরদিনের তরে।

    ডাক্তারবাবুর মৃদু কণ্ঠ আস্তে আস্তে মিলিয়ে এল। দু-মিনিট ছেদ পড়ল তাঁর গল্পে। তারপর আবার শুরু করলেন-

    আমাদের দেশের বড় বড় লোকেরা মেয়েদের নাম দিয়েছেন, ঘরণী, গৃহিণী। যাঁরা একটু কবিগোছের, তাঁরা আবার দ’ডিগ্রী এগিয়ে বলেন, গৃহলক্ষ্মী, গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবী —এমনি কত কি! এ শুধু মনভোলানো মিছে কথা। গৃহ সেই-ই গড়ে তোলে জীবন দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে; কিন্তু গৃহ তার নয়। গৃহের দেবতা পুরুষ। তাই সে তার প্রিয়তমা গৃহলক্ষ্মীকে কাল গুণ্ডার হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রাণরক্ষা করেছিল, আজ ভাগ্যের হাতে ফেলে দিয়ে ধর্মরক্ষা করল।

    ভিড়ের ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম।…

    —মাপ করবেন ডাক্তারবাবু; বাধা দিয়ে বললাম আমি, আপনার সব কথা মেনে নিচ্ছি; তবু বলবো, আমি কিন্তু আপনার মত নিঃশব্দে বেরিয়ে আসতে পারতাম না।

    —কি করতে?

    —পা থেকে জুতো খুলে ঐ জানোয়ারটার মুখে মারতাম। পারি না পারি, চেষ্টা অন্তত করতাম একবার।

    —কী লাভ হত? জুতোটাই তোমার জখম হত। আরেক জোড়া আবার কিনতে হত পয়সা খরচ করে।

    আমি একথার জবাব খুঁজে পেলাম না। উনি একটুখানি অপেক্ষা করে বললেন, অনেক দিনের কথা। তখনো এ চুলগুলো বারো আনা পাকতে বাকি। কিন্তু একথাটা বুঝতে বাকি ছিল না যে, সেই নেপালী ছোকরার চেয়েও অনেক বড় বড় জানোয়ার তোমাদের সভ্য-সমাজে অবাধে বিচরণ করে বেড়ায়। তাদের পিঠ আমাদের জুতোর নাগালের বাইরে। ঐ একটা তুচ্ছ চা-ওয়ালাকে মেরে আর কতখানি ক্ষোভ মিটত? তবে, হ্যাঁ! ড্রামাটিক কিছু হতে পারতো হয়তো। তার জন্য চিন্তা নেই। এখন যে দৃশ্যে তোমায় নিয়ে যাচ্ছি, সেটা আরও বেশী ড্রামাটিক।

    স্টেশন-মাস্টারের অফিসে এসে একটা সুসংবাদ পাওয়া গেল, গাড়ি ঘণ্টা দুই লেট! মেয়েদের ওয়েটিংরুমে উঁকি মেরে দেখলাম, সকন্যা গৃহিণী নিশ্চিন্ত মনে ঘুমুচ্ছেন। সময় কাটাবার এই সহজ আর সনাতন রাস্তাটা খোলা থাকতে আমি যে কেন এতক্ষণ এদিক- ওদিক ঘুরে মরছি তার কোনো সঙ্গত কারণ খুঁজে পেলাম না। কম্বল বগলে করে একটা নিরালা গোছের জায়গার সন্ধান করছি এমন সময় মূর্তিমান বিঘ্নের মত ধনরাজ এসে হাজির।

    —কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

    প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। ও খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, যদি রাগ না কর তো একটা কথা বলি।

    —কি বলবি, বল না? রাগ করবো কেন?

    —শুয়োরটা তো পালিয়েছে। ওর বাপের ভাগ্যি, আমি একটু পেছিয়ে পড়েছিলাম। দুটো মিনিট আগে আসতে পারলে এক পাটি দাঁত ওর উপড়ে দিয়ে আসতাম!

    চোখ দুটো জ্বলে উঠল ধনরাজের। আমি বললাম, থাক। সে বাহাদুরি না দেখিয়ে ভালই করেছ। ওর দাঁত আমাদের কোনো কাজে লাগত না। এখনকার মতলবটা কি শুনি?

    -সে তো তুমি বুঝতেই পারছ।

    —তা কিছুটা পারছি। কিন্তু ওকে নিয়ে রাখবি কোথায়?

    —ঘরেই রাখবো। আর কোথায় রাখবো?

    আমি অপলক চোখে চাইলাম ওর দিকে। ও একটু হেসে বলল, ঘরের বৌকে লোকে আর কোথায় রাখে?

    —সব ঘটনা শুনেছিস?

    —শুনেছি।

    এর পরে আমার মুখে আর কথা সরল না। জানি, অন্যের পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা ওদের সমাজে বাধে না। কিন্তু তাই বলে ঐ মেয়ে? ওর সমস্ত ইতিহাস জেনেশুনে? মনে হল, বাধা দেওয়াই আমার কর্তব্য। পথে-ঘাটে এই সব হঠকারিতার জন্যে ওকে একটা কড়া ধমক দেওয়া দরকার। কিন্তু তোমায় সত্যি বলছি ডেপুটিবাবু, ওর চোখের দিকে চেয়ে সুর আমার আপনিই নরম হয়ে এল। না, ঝোঁকের মাথায় বাহাদুরি দেখাবার কোনো লক্ষণ তো সেখানে নেই। এ তো ছেলেখেলা নয়। আমি যা কখনো পারবো না, আমি তো তুচ্ছ, অনেক বড় বড় আদর্শবাদী মহাপ্রাণ যুবক যেখানে পেছিয়ে আসবে, এই কুলীটার কাছে সেটা এতই সহজ!

    অনাবশ্যক জেনেও বললাম, ভালো করে ভেবে দেখেছিস?

    — দেখেছি!

    —ও রাজী হবে?

    —তা জানিনে। জিজ্ঞেস করেছিলাম। কথা বলে না, খালি কাঁদতে লাগল।

    —ও, তাই বুঝি আমার ডাক পড়েছে? কিন্তু আমার বখশিশ?

    ধনরাজ খপ্ করে আমার পায়ের ধূলো মাথায় দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াল এক পাশে। মুখে সলজ্জ তার হাসি।

    ঘুমের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে ঐ হতভাগাটার সঙ্গ নিলাম। দোকানের সামনে থেকে উঠে গিয়ে একটা গাছের নীচে মেয়েটা বসে ছিল। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ধনরাজ বলল, ডাক্তারবাবু এসেছেন।

    সে মুখ তুলে একবার আমার দিকে তাকাল। মুখখানি ভারী মিষ্টি। চোখ দুটো এমন অসহায়, একবার দেখেই কেমন মায়া হল মেয়েটার ওপর। ওদের পাহাড়ী ভাষায় বললাম, তোমার সব কথা শুনেছি। তোমার বাপ আছে কিনা জানি না। আমাকে তুমি তোমার বাপের মতই বিশ্বাস করতে পার। ধনরাজকে দেখিয়ে বললাম, ওকে আমি এতটুকু থেকে জানি; ছেলের মতই জানি। ও যে-কথা তোমায় বলেছে, সেটা তুমি নিজেই ভেবে দেখ। আমি জোর করবো না। কিন্তু এটা জোর দিয়েই বলবো, ওকে বিয়ে করে কোনো মেয়েই কোনদিন দুঃখ পাবে না।

    মেয়েটা একবার কি ভাবল। তারপর আমার পায়ের উপর পড়ে বলল, তুমিই আমার বাপ, বাবুজী।

    আর কিছু বলতে পারল না। যেটুকু বাকি ছিল, জানিয়ে দিল ওর চোখের জল।

    একটা ছোটখাট নাটক করে ফেললাম, কি বল; অবিশ্যি নাটকের আসল হিরো ব্যাটা ধনরাজ। আমি সাইড অ্যাকটর মাত্র—বলে ডাক্তারবাবু হা-হা করে খানিকটা কাষ্ঠ হাসি হাসলেন। আমি তাঁর হাসিতে যোগ না দিয়ে গাম্ভীর্যের সঙ্গেই বললাম, আপনার ‘রোল’টা যে কী, নাটকের শেষ পর্যন্ত না গেলে বুঝতে পারছিনে। অতএব ‘নেক্সট্ সীন প্লীজ’-

    ডাক্তারবাবু হাসিমুখে বললেন, আচ্ছা, তাহলে শোনো—

    বৌটাকে সুস্থ করে তুলতে লেগে গেল মাসখানেক। বলা বাহুল্য, এ সময়টা ও আমার বাড়িতেই রইল। আমি হাসপাতালে পাঠাতে চেয়েছিলাম। গিন্নী রাজি হলেন না। সমস্ত ভার তুলে নিলেন নিজের হাতে। তবু একবার বোঝাতে চেষ্টা করলুম, হাসপাতালে তো বেশ ভালো ব্যবস্থাই আছে। এ ঝঞ্ঝাট বাড়িতে রাখতে চাইছ কেন?

    গৃহিণী সংক্ষেপে বললেন, সে কথা তোমরা বুঝবে না। ‘তোমরা’ কথাটার ওপর বেশ একটু জোর দিয়েই বললেন। জানি না কি তাঁর বক্তব্য। আমার কাছে ওটা হেঁয়ালিই রয়ে গেল। হয়তো—

    আমি বাধা দিলাম। এর মধ্যে তো কোনো হেঁয়ালি নেই ডাক্তারবাবু। মেয়েদের এ যে কত বড় লাঞ্ছনা, সে শুধু মেয়েরাই বুঝতে পারে। আমরা বুঝি বুদ্ধি দিয়ে, কিন্তু ওরা বোঝে ওদের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে।

    তোমার কথা আমি মেনে নিতাম ভাই, বললেন ডাক্তারবাবু, যদি বুঝতাম মেয়েদের এই চরম লাঞ্ছনা আসে শুধু পুরুষদেরই কাছ থেকে। কিন্তু তা তো নয়। একথা কি শোননি—কত মেয়েমানুষ এই নরকদৃশ্য শুধু যে পাশে দাঁড়িয়ে উপভোগ করে, তা নয়, নিজে মেয়ে হয়েও আর একটা মেয়ের উপর লেলিয়ে দেয় নিজের স্বামী কিংবা তার সঙ্গী অন্য কোনো জানোয়ার।

    বললাম, শুনেছি। সব্যসাচীর কথাটা মনে পড়ছে, গরুর মাংস কসাইখানা থেকে গরুই বয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু তবু বলবো, ওরাই সব নয় যে। কল্যাণী ঐ লাঞ্ছিতা পাহাড়ী মেয়েটার সেবার ভার নিজের হাতে তুলে নিয়ে ওর দুঃখের বোঝাটা একটুখানি হালকা করতে চেয়েছিলেন, তিনিও ওদের জাত। যাক্, তারপর বলুন—

    ডাক্তারবাবু শুরু করলেন—ধনরাজ তার বস্তির বাসা ছেড়ে দিয়ে বৌ নিয়ে উঠে গেল পাহাড়তলীর ঐ দিকটায়, চা-বাগানের আওতার বাইরে। বছরখানেক পরে ওদের একটি মেয়ে হল। মেয়ে তো নয়, যেন একরাশ টগর ফুল। ধনরাজ তার নাম রাখল লখিয়া। একটা রাতের প্রলয় বৌটার দেহে যে ভাঙন ধরিয়ে দিয়েছিল, সারা জীবনে সেটা জোড়া লাগবার নয়। প্রসবের ধকল কাটিয়ে ওঠা কঠিন হল।

    এই প্রসঙ্গে একটা জিনিস তোমায় না বলে পারছিনে, ডেপুটিবাবু। আমি ডাক্তার। অনেক সুদক্ষ নার্স নিজের চোখে দেখেছি। আন্তরিক সেবা যে কি বস্তু, তাও দেখবার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু পুরুষমানুষ যে এমনি মায়ের মত নিজের সমস্ত সত্তা ডুবিয়ে দিনের পর দিন রাতের পর রাত সামনে রুগী নিয়ে থাকতে পারে, ঐ ধনরাজটাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। বৌটা যে আরো বছর দুই বেঁচে গেল, সে শুধু ঐ সেবার জোরে, তার জীবনীশক্তির জোরে নয়।

    দু’বছরের একটা শিশু নিয়ে ধনরাজ বিব্রত হয়ে পড়ল। আমরা বললাম, বিয়ে কর। মেয়েটাকে তো বাঁচাতে হবে।

    ধনরাজ হেসে বলল, ঐ হুকুমটা কোরো না বাবু। তার জিনিস কি আর কারো হাতে তুলে দিতে পারি?

    একটা দূর-সম্পর্কের বুড়ী পিসী কোত্থেকে জুটিয়ে নিয়ে এল। সে শুধু দুটো রেঁধে দিত আর মেয়েটাকে আগলে রাখত যতক্ষণ ও কাজ থেকে না ফেরে। মেয়েকে মানুষ করবার সমস্ত ভার নিল ওর নিজের হাতে। যা কিছু রোজগার, সব যায় ঐ মেয়ের পেছনে। সে মিশনারী ইস্কুলে পড়ে। তার রাশি রাশি জামা-কাপড়, খেলনা, পুতুল, প্রসাধনের ঘটা।

    কুলী বস্তীতে সবাই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ধনরাজ হেসে উড়িয়ে দেয়। হেড-ক্লার্কবাবু বললেন একদিন, ধনরাজের কাণ্ডটা দেখেছেন মশাই! মেয়েটাকে তো ধিঙ্গী করে তুলল। এবার বিয়ে দেবে কেমন করে? ঐ মেমসাহেব তো আর সত্যিই কোনো কুলী-কামিনের ঘর করতে পারবে না?

    ব্যাপারটা সত্যিই ভাববার মত। মেয়েটাও দেখতে দেখতে বেড়ে উঠল। নাম লখিয়া। দেখতে সে লক্ষ্মী-প্রতিমাকে হার মানায়।

    ধনরাজকে ডেকে বললাম, লখিয়ার বিয়ের কতদূর কি করলি?

    ও করুণভাবে বলল, তুমি তো সবই জানো বাবু। হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিত হতে পারি এমন একটা ছেলেও তো দেখছি না এ অঞ্চলে।

    —তাহলে কী করতে চাস? মেয়ে বড় হয়ে উঠছে। জায়গা ভাল নয়।

    ধনরাজ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সে কি আর জানিনে? কত সাবধানে যে রাখতে হয় মেয়েটাকে!

    তারপর একটু কাছে সরে এসে চাপা গলায় বলল, শ’পাঁচেক টাকা জমিয়েছি। সব তো ওরই। শহরে গেলে একটা লেখাপড়া-জানা ভাল ছেলে কি জুটবে না আমার লখিয়ার জন্যে?

    দেখলাম প্রস্তাবটা মন্দ নয়। একটা মোটামুটি আলোচনা করে আপাতত স্থির হল, ও মাসখানেকের ছুটির ব্যবস্থা করে লখিয়াকে নিয়ে দার্জিলিং যাবে। ওর এক মাসতুতো ভাই পুলিশে কাজ করে। সেখানে উঠে একটা ভালগোছের নেপালী ছেলের চেষ্টা করা হবে।

    এরই দিনকয়েক পরে বিকালের দিকে ম্যানেজার নর্টনসাহেব আমাকে আর হেডক্লার্কবাবুকে সঙ্গে করে বেরিয়েছিলেন পাহাড়তলীর ঐ দিকটা ঘুরে দেখবার জন্যে। ঐ অঞ্চলের খানিকটা জমি সংগ্রহ করে বাগানগুলো বাড়িয়ে তোলার একটা প্ল্যান ছিল। ফিরবার পথে একটা ছোট বাড়ির সামনে দেখলাম একটি পনেরো-ষোলো বছরের মেয়ে ছাগলকে পাতা খাওয়াচ্ছে।

    তার রূপ, তার স্বাস্থ্য, তার সাজপোশাক এবং সব মিলিয়ে বেশ একটা মার্জিত সপ্রতিভ ভাব—ও অঞ্চলে এমন বেমানান যে কারো চোখ না পড়ে পারে না। সাহেব খানিকক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, মেয়েটি কে ডাক্তার?

    আমি জবাব দেবার আগেই হেডক্লার্কবাবু বললেন, ধনরাজ তামাং-এর মেয়ে।

    সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন, You mean our Dhanraj?

    বললাম—হ্যাঁ, আমাদের ধনরাজই বটে।

    দিন দুই পরে সাহেব হুকুম দিলেন, ধনরাজকে বস্তিতে উঠে আসতে হবে। তাঁর কুলী-সর্দারকে তিনি বাইরে থাকতে দিতে পারেন না। ধনরাজ রাজী হল না। সাহেব গম্ভীর হয়ে গেলেন। কয়েকদিন পর ধনরাজ ছুটির দরখাস্ত করল। সেটা সরাসরি না-মঞ্জুর হয়ে গেল।

    এরই ঠিক পরের রবিবার। আবার এক পার্টির ব্যবস্থা হল সাহেবের বাংলোয়। নাচ, গান, খানাপিনার বিরাট আয়োজন। বিশেষ অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রিত হলেন নবাগত শ্বেতাঙ্গ পুলিশসাহেব। ধনরাজকে পাঠান হল মদের সন্ধানে। এমন অসময়ে হুকুম এল যে, ফিরতে বেজে গেল রাত বারোটা। বোতলগুলো কোনো রকমে সাহেবের কুঠীতে পৌঁছে দিয়ে সে ছুটল নিজের বাড়ি। গিয়ে দেখল, পিসী কপাল চাপড়াচ্ছে। লখিয়া নেই। বার বার প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে এইটুকু শুধু সংগ্রহ করা গেল যে, কতগুলো চাপরাশ – পরা যণ্ডামতন লোক মেয়েটাকে মুখে কাপড় দিয়ে নিয়ে চলে গেছে। ধনরাজ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল সাহেবের বাঙলোয়। বেয়ারা-চাপরাশির বেড়া ডিঙিয়ে একেবারে সোজা হানা দিল নর্টনের বেডরুমে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ধনরাজ তখন সত্যি পাগল হয়ে গেছে। প্রাণপণে কীল, চড় আর লাথি মারছে দরজায় আর চিৎকার করছে, দরজা খোলো, খোলো দরজা!

    নটন বেরিয়ে এলেন।

    —লখিয়া কোথায়? গর্জে উঠল ধনরাজ। লালপানির কল্যাণে তখন সাহেবের তুরীয় অবস্থা। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন লখিয়াকো হাম্ সাদি কর লিয়া। I am your son-in- law; হাঃ হাঃ হাঃ-

    চোপরাও উল্লুক—বলে ধনরাজ ঝাঁপিয়ে পড়ল তার মনিবের ঘাড়ে এবং উদ্যত নাকের উপর বসিয়ে দিল তার পাহাড়ী হাতের ঘুষি।

    মিস্টার নর্টন ভূতলে আশ্রয় নিলেন। শ্বেতাঙ্গের পবিত্র রক্তে কালো-আদমির দেশ ধন্য হল। পুলিশের বড়কর্তা স্বয়ং উপস্থিত তাঁর দলবল নিয়ে। লুণ্ঠিত দ্রব্যের তিনিও একজন অংশীদার। কাজেই পরের দৃশ্যটা অনুমান করতে কষ্ট হবে না। অনুমান কেন? খানিকটা নমুনা তো নিজের চোখেই দেখেছ আজ।

    ডাক্তারবাবু সিগারেট ধরালেন। ঘড়ি দেখে বললেন, ঈস্, অনেক রাত করে ফেলেছি। যাও। এবার তুমি খাওগে; আমি উঠি।

    আমি হঠাৎ অসংলগ্নভাবে প্রশ্ন করলাম, মেয়েটার কি হল ডাক্তারবাবু?

    —তুমিও যেমন। সে খবর রাখে কে? শুনেছিলাম তার নাকি ঘন ঘন ফিট হচ্ছে।

    —আচ্ছা, ওকে কি উদ্ধার করা যায় না?

    ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়িয়ে আমার দু’কাঁধের উপর দুটো হাত রেখে হেসে বললেন, তুমি সত্যিই ছেলেমানুষ

    উনি যাবার জন্যে পা বাড়াতেই আমার যেন হঠাৎ জ্ঞান ফিরে এল। বাধা দিয়ে বললাম, একি? এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছেন? না-না। যা-হোক্ দুটো মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ুন। ভোরে উঠিয়ে দেবো।

    ডাক্তার আমার একটা হাত ধরে বললেন, সে হবার যো নেই, ভাই। ঘোড়া অপেক্ষা করছে। এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। ভোরবেলা বাগানে হাজির হওয়া চাই-ই।

    চমকে উঠলাম, বলেন কি? এই দারুণ শীতে, এই গভীর রাত্রে—

    ডাক্তারের মুখে ম্লান হাসি দেখা দিল, কি করবো, ভাই। চাকরি।

    বারান্দায় বেরিয়ে এসে আবার একটা খাপছাড়া প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা ডাক্তারবাবু, ধনরাজকে আসামী করে ওরা মামলা করলে না কেন; ম্যানেজারকে জখম করেছে; মস্ত বড় চার্জ।

    ডাক্তার হেসে বললেন, প্রশ্নটা কিন্তু তোমার মত বুদ্ধিমানের ছেলের যোগ্য হল না, ডেপুটিবাবু। মোকদ্দমা চলতে পারে। কিন্তু ধনরাজকে আদালতে দাঁড় করালে লখিয়া তো আর চাপা থাকে না। তার চেয়ে সহজ, নিরাপদ এবং মোক্ষম পন্থা হল ওকে বেমালুম পাগল বানিয়ে দেওয়া।

    আমি তর্ক তুললাম, সেটাই কি সহজ পন্থা হল? একটা ভাল মানুষকে পাগল বানাতে হবে, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট তো চাই?

    ডাক্তার হো হো করে হেসে উঠলেন। আর কোনো জবাব দিলেন না।

    দেখতে দেখতে সেই চলন্ত কাপড়-চোপড়ের বাণ্ডিল পাহাড়ের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি নিঃশব্দে সেই দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কে এই লোকটা? অখ্যাত, অজ্ঞাত, ক্ষ্যাপাটে ধরনের চা-বাগানের ডাক্তার। কিন্তু কেমন করে জানি না, আমার মত শিক্ষাভিমানীর মনের কোণে কোথায় একটা দাগ রেখে গেল।

    তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

    ধনরাজ-কাহিনীর বাকি অংশটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। গায়ের দাগ মিলিয়ে যেতে তার লাগল প্রায় মাস দুই। সেই সময়ের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ সিভিল সার্জেন বার কয়েক জেল পরিদর্শন করলেন। তারপর একদিন কোর্ট থেকে অর্ডার এল–সিভিল সার্জেনের অভিমত গ্রহণ করে ধনরাজ তামাংকে উন্মাদ সাব্যস্ত করা হল। অবিলম্বে তাকে প্রয়োজনীয় দলিলপত্রসহ রাঁচী মেন্টাল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হউক। দলিলের মধ্যে একটা দেখলাম পুলিশের রিপোর্ট। পাহাড়ী দারোগা লিখেছেন, তদন্তে জানা গেল ধনরাজ নিয়মিত গঞ্জিকা সেবী। তার পিতৃকুলে একাধিক ব্যক্তির মস্তিষ্ক-বিকৃতির ইতিহাস বিদ্যমান।

    অতঃপর হাকিমের আদেশমত আমিই একদিন তাকে পুলিশের হাতে সঁপে দিলাম। দুর্দান্ত পাগল বলে জেল কোডের নির্দেশ অনুসারে গাড়ির একটা গোটা কামরা রিজার্ভ করে দিলাম দার্জিলিং থেকে রাঁচী রোড্‌।

    পুলিসের লোকেরা যখন ওকে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধল, ও একটি কথাও বলল না। শুধু মনে হল, ওর অবসন্ন চোখ দুটিতে ফুটে উঠেছে একটা নিষ্ফল প্রশ্ন—আমার লখিয়া কোথায় রইল?

    হয়তো এ সবই আমার কল্পনা কিংবা চোখের বিভ্রম।

  • সাত

    সাত

    গোজাতির সেবা যদি পুণ্যসঞ্চয়ের পরম-পন্থা বলে স্বীকৃত হয়ে থাকে জেল প্রাঙ্গণ অবশ্যই একটি পুণ্য-ক্ষেত্র। ছোট বড় সব জেলেই একটি করে ডেয়ারী বা গোশালা আছে এবং সেখানকার যারা অধিবাসী তাদের সেবার উপকরণ সাধু গুরু মোহান্তের ঈর্ষার উদ্রেক করবে। তাদের বাসের জন্যে সুদৃশ্য ইমারত, পানভোজনের জন্যে অনায়াসলব্ধ মহার্ঘ্য খানা এবং দলন-মর্দনের জন্যে বিনা মাইনের অনুগত ভৃত্য। মাঠে মাঠে চড়ে বেড়াবার দৈন্য কিংবা মাটির ঘাস খুঁটে খাবার উঙ্কুবৃত্তি—তাদের কোনোদিন স্পর্শ করে না। তারা বংশ-গৌরবে কুলীন এবং মেদ-বাহুল্যে অভিজাত। গিরীনদা মিথ্যা বলেননি, অক্ষয় পুণ্যের অধিকারী যারা, তারাই পরজন্মে জেলের গরু হয়ে জন্মায়।

    ইংরেজের তৎকালীন রাষ্ট্রবিধানে যেমন ডায়ার্কি, ডেয়ারি বিধানেও তেমনি দ্বৈত- শাসনের ব্যবস্থা। গোধনের সুরক্ষা এবং খাদ্য নির্ধারণের দায়িত্ব নিয়ে রয়েছেন পশুপালন বিভাগ, আর কারাবিভাগের হাতে রয়েছে দুগ্ধ-ভাণ্ড। একদিকে পশু-ডাক্তার আর একদিকে জেল-ডাক্তার। প্রথম ব্যক্তিটি নিষ্কাম-ধর্মে দীক্ষিত। তার অধিকার শুধু কর্মণ্যেব। দ্বিতীয়টি কর্মাতীত মহাপুরুষ। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধু ফলেষু। যাদের নিয়ে দার্শনিক ভেদাভেদ, তারা ষেঠের বাছা ষষ্ঠীর দাস হয়ে তৈলচিক্কণ দেহে পরম সুখে বেঁচেবর্তে থেকেই তাদের কর্তব্য শেষ করেন। চতুর্থ পক্ষ, অর্থাৎ আমরা, সকৌতুকে লক্ষ্য করি—গোধনের নধর দেহ যেমন শুক্লপক্ষের শশিকলার মত দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি লাভ করতে থাকে, তার দুধের অঙ্ক তেমনি কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্রের মত ক্রমশ বিলীয়মান। অধিকাংশ জেল-ডায়ারির এই হল সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

    বলা বাহুল্য, আমাদের ক্ষেত্রেও এই সাধারণ রীতির বিশেষ ব্যতিক্রম ঘটেনি।

    একদিন কাগজপত্র সই করতে করতে দুগ্ধাঙ্কের এই তথ্যটি বড়সাহেবের নজরে পড়ে গেল। ডেয়ারির হিসাব-রক্ষার দায়িত্ব ডাক্তারের। অতএব ডাক্তার থাপার ডাক পড়ল। সাহেব প্রশ্ন করলেন, ডক্টর, তোমার দুধ কমে যাচ্ছে কেন দিন দিন?

    ডাক্তার শুষ্ক কণ্ঠে উত্তর করল, I don’t know.

    —You don’t know! তাহলে জানবে কে?

    ডাক্তার নিরুত্তর। মিস্টার রয় গলা চড়িয়ে বললেন, বল। দুধের খবর তুমি না জানলে জানবে কে?

    ডাক্তার একবার আমার মুখের দিকে, একবার জেলরসাহেবের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল এবং কোনো তরফ থেকে কোন ভরসা না পেয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বললে, The cows might know, Sir.

    মিস্টার রয় হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। বোধ হয় সন্দেহ হল; ডাক্তার বিদ্রূপ করছে। পরক্ষণেই তার নিতান্ত অসহায় দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে কি মনে হল জানি না, তিনি সহসা উচ্চহাস্য করে উঠলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে হাসি থামিয়ে বললেন, All right, you may go.

    আমি প্রবেশনার। অতএব দুগ্ধ-হ্রাসের রহস্য উদ্ঘাটন করবার ভার পড়ল আমার উপর। আমি যথারীতি তদন্ত শুরু করলাম। দু’চার দিনেই বুঝতে পারা গেল, একজন দেশোয়ালী জমাদারের একটি বৃহৎ লোটা এই ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত। গেট-কীপারকে চেপে ধরলাম, তুম কেয়া করতা হ্যায় জী? লোটা তো সচল পদার্থ নয় যে নিজে নিজে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যাবে! এ রকম চলতে থাকলে তোমার নকরি অচল হয়ে যাবে, বলে দিচ্ছি।

    সে আশ্বাস দিল, সব ঠিক হো জায়গা।

    পরদিন লোটা অন্তর্ধান করল। দুধের অঙ্ক বেড়ে গেল এক লাফে কয়েক ধাপ। মনিব খুশী হলেন।

    ক’দিন না যেতেই আবার যে-কে-সেই। গেট-কীপারকে ডেকে বললাম, তোমার আর রক্ষা নেই। প্যাক আপ প্লিজ। লোটা কম্বল বেঁধে-ছেদে তৈরী হও।

    সে জানাল, দুধ যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ‘লোটাসে নেহি’।

    —নাই বা হল লোটাসে? হাঁড়ি কিংবা ঘড়াসে যাচ্ছে বলে তোমার দায়িত্ব কমে যাবে? তুমি তল্লাসি করছ না ঠিকমত।

    এ কথার উত্তর না দিয়ে সে বলল, ভোরবেলা একবার মেহেরবানি করে যদি আসেন, সব নিজের চোখেই দেখতে পাবেন।

    তাই হল। গেলাম ভোরবেলায়। ডেয়ারিতে তখন দোহনপর্ব শুরু হয়েছে। গেট- কীপারের পরামর্শমত আমরা লুকিয়ে রইলাম পাশেই এক পাঁচিলের আড়ালে। সেই বিশালকায় জমাদারসাহেব চেয়ার জুড়ে বসে আছেন, আর তাঁকে ঘিরে শোভা পাচ্ছে তাঁর অনুগত কয়েদীর দল। কী একটা হাসির কথা হচ্ছিল। সবটা শোনা গেল না। শেষটুকু শুনলাম,—তিন দিনের ছোকরা। লাগতে আসে আমার সঙ্গে। ঠেকাক দেখি, কেমন বাহাদুর?

    বুঝলাম ‘ছোকরাটি’ এই অধম। জমাদারসাহেবের আস্ফালন যে নেহাত শূন্যগর্ভ নয়, পরক্ষণেই বোঝা গেল। একজন কয়েদী একটা বালতি করে খানিকটা দুধ তাঁর হাতে এনে দিল এবং তিনি কালবিলম্ব না করে সেটা ঢঢক্ করে ঢেলে দিলেন গলার মধ্যে। সের তিনেক আন্দাজ খাঁটি কাঁচা দুধ! পাত্রটি নিঃশেষ করে স্ফীত উদরে হাত বুলাতে বুলাতে একটা রাজোচিত উদ্‌গার তুললেন এবং তারপরেই যেন ভূত দেখে চমকে উঠলেন।

    পরের দৃশ্য নিতান্ত করুণ। যে ‘ছোকরাকে’ তিনি দু’মিনিট আগে একেবারে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন তারই পদপ্রান্তে লুটিয়ে পড়ল তাঁর দুগ্ধপুষ্ট নধর দেহ।

    গেট-কীপারের অসহায় অবস্থাটা উপলব্ধি করা গেল। লোটা নয়, হাঁড়ি নয়, দুগ্ধ- বহনের এমন পাত্রও আছে, যেখানে তার তল্লাসি সত্যিই অচল।

    সরকারী চাকরির সুখ-সুবিধা বহুবিধ। তার ফিরিস্তি দিতে গিয়ে নিজ ক্যাম্পের বিরাগভাজন এবং অপর ক্যাম্পের ঈর্ষাভাজন হতে চাইনে। তার মধ্য থেকে একটি জিনিস শুধু উল্লেখ করবো, যেটা আমার কাছে সবচেয়ে লোভনীয়, তার নাম ছুটি। ছুটি -তারই বা রকম কত! তার ব্যাখ্যা বিন্যাস বিবরণ এবং টিকাটিপ্পনীর অসংখ্য জটিল ধারা জুড়ে আছে Fundamental Rules-এর একটি মস্ত বড় দুর্বোধ্য অধ্যায়।

    প্রথম ধরুন ক্যাজুয়েল লিঙ্। বছর পড়তেই পনের দিন। একসঙ্গে নিন, কিংবা একটু একটু করে ভোগ করুন; কিন্তু যা কিছু করবেন, ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে। তারপরেই সব পচে গেল। প্রিভিলেজ লিভ্ বা যাকে বলে হক্ ছুটি পচনশীল পদার্থ নয়। বছর ঘুরে এলেই এক মাস দু’দিন জমা হল আপনার অ্যাকাউন্টে, বাড়তে থাকল ভাগ্যবান ব্যক্তির ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্সের মত। তারপর সুযোগমত নিয়ে নিন পুরো চার মাস। সবটাই পাবেন পুরো তলবে। পরিশ্রম নেই, কিন্তু পারিশ্রমিক অক্ষুণ্ণ রইল। স্বচ্ছন্দে বেড়িয়ে আসুন সেতুবন্ধ রামেশ্বর কিংবা ডেরা ইসমাইল খাঁ। সাগর ডিঙিয়ে ‘হোম্’-এ যেতে চান? তাহলে তো সোনায় সোহাগা। ঐ চার মাসটা এক লাফে আট মাস হয়ে যাবে। স্বর্গসুখ আর কাকে বলে?

    তিন নম্বর—মেডিকেল লিঙ্, অসুখের দরুন ছুটি। ঘাবড়াবেন না। অসুখের দরকার করে না, দরকার শুধু একখানা ডাক্তারী সার্টিফিকেট। সেটুকু সংগ্রহ করতে যে অক্ষম, সরকারী চাকরির সে যোগ্য নয়।

    তালিকা আর বাড়াতে চাই না। সবচেয়ে যেটা সেরা ছুটি তার উল্লেখ নেই কোন আইনের গ্রন্থে। তার নাম French leave. যখন খুশি, যতবার খুশি, একটু ঘুরে আসি স্যার বলে, বেরিয়ে পড়ুন। এ ছুটির কোনো হিসাব নেই, আছে একটিমাত্র শর্ত—বকে প্রসন্ন রাখতে হবে।

    সে দুর্লভ সৌভাগ্য আমি অর্জন করতে পারিনি। আমার একমাত্র পথ—দরখাস্ত এবং তার ফলাফলের জন্যে অধীর প্রতীক্ষা। বহুকষ্টে বহু বিড়ম্বনার পর শেষ মুহূর্তে পনের দিন ক্যাজুয়েল ছুটি লাভ করা গেল। আর একটি দিন দেরি হলেই তার পচনক্রিয়া শুরু হয়ে যেত।

    কাশ্মীর নয়, চিদাম্বরম্ নয়, সেই পুরাতন কলকাতার বহু পুরাতন বন্ধু-সমাজেই কাটিয়ে এলাম দুটো সপ্তাহ। ফিরে দেখি আমার দরজায় যে তালাটি ঝুলছে তার একমাত্র যোগ্য স্থান হতে পারতো কোনো রাজবাটীর সিংহদ্বার। এই অতি-সতর্কতার কারণ ছিল। শুনলাম, ঠিক আগের রাতেই আমার একমাত্র কাণ্ডারী শ্রীমান রামবাহাদুর ওরফে কেটা হঠাৎ অন্তর্ধান করেছেন এবং তাঁর সহযাত্রী হয়েছে আমার একমাত্র সম্পত্তি—একটি শূন্যগর্ভ স্টীল ট্রাঙ্ক আর কয়েকটা ঘটি-বাটি। যে-সিপাইটির উপর আমার কুঠী-তদারকের ভার ছিল, সে তার স্বদেশী ভাষায় বিস্তর আপসোস জানাল। আপসোস আমারও হল। কিন্তু সেটা আমার অপহৃত সম্পত্তির জন্যে নয়, অপহরণের পরিশ্রম যে ভোগ করল, তার জন্যে।

    সিপাইটি জানতে চাইল, দোকান থেকে চা আনতে হবে কিনা। বললাম, না, থাক দোস্বা নকর একটা সন্ধান করবার প্রস্তাব জানাল। তাও আপাতত না-মঞ্জুর করে দিলাম।

    Smiles সাহেবের Self Help নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আমার পড়া ছিল; এবং বাংলায় স্বাবলম্বন সম্বন্ধে অনেক রচনাও একদিন মুখস্থ করেছি। এতকাল পরে সে-সব বহুমূল্য উপদেশ কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করবার সুযোগ উপস্থিত। দুশ্চিন্তার কারণ ছিল না। নগদ পাঁচ টাকা ব্যয় করে একখানা সচিত্র রন্ধনশিক্ষা এখানে আসবার আগেই সংগ্রহ করেছিলাম।

    অবিলম্বে চা-এর প্রয়োজন, এবং তার প্রথম পর্ব স্টোভ ধরানো। আধ বোতল স্পিরিট সহযোগে, আধ ঘণ্টা পাম্প চালিয়ে সেটা কোন রকমে সমাধা হল। অতঃপর কী করণীয় সে-সম্বন্ধে সদ্য জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে ‘চা প্রস্তুত প্রণালী’ অধ্যায়টা সবে খুলে বসেছি, এমন সময় দরজায় কাঞ্ছীর আবির্ভাব।

    একটি অতুলনীয় কৌতুক-হাসির অভিনন্দন মনে মনে আশা করছিলাম, হঠাৎ শিউরে উঠলাম, তার মুখের দিকে চেয়ে। এ কী হয়েছে কাঞ্ছীর? দুদিন আগেও যে মুখ ছিল কলহাস্যমুখর, আনন্দোচ্ছল, সহসা কার নির্মম অভিশাপে সে যেন নিষ্প্রাণ পাথর হয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে গভীর বিষাদের মৌন ছায়া। এ কটা দিনেই যেন তার বয়স বেড়ে গেছে কয়েক বছর। এগিয়ে গিয়ে বললাম, কি হয়েছে কাঞ্চী?

    সে আমার ব্যাকুল প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। হাতে ছিল খাবারের থালা। ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে সেটা সামনে টুলের উপর রেখে মৃদুস্বরে বলল, বড়ী আম্মা পাঠিয়ে দিলেন। তারপর স্টোভটা নিভিয়ে দিয়ে, যেতে যেতে বলল, চা নিয়ে আসছি।

    যত দূর দৃষ্টি যায়, আমার বিস্মিত চোখ তাকে অনুসরণ করল। কিন্তু সে একবারও ফিরে চাইল না।

    চা নিয়ে এল ডাক্তারের বছর দশেকের মেয়ে রুমী। টী-পট্‌টা টুলের উপর রেখে বলল, চা কিন্তু আজ আমি করেছি বাবুজী। দেখ দুধ চিনি আর বিয়ে।

    —কাঞ্ছী এল না, রুমী?

    —তাকে যে বড়ী আম্মা নাইতে পাঠিয়ে দিলেন।

    —নাইতে? এত সকাল সকাল?

    —ও—ও। তুমি জানো না বুঝি! বড় বড় চোখ করে বলল রুমী, কাঞ্ছীর যে আজ

    —কাঞ্ছীর বিয়ে! যন্ত্রচালিত পুতুলের মত আবৃত্তি করলাম আমি।

    বিয়েতে কারা কারা এসেছে, আর কারা আসেনি, ক’খানা গয়না হল তার, কে কোন্ জিনিসটা দিলে, এমনি আরো কত কি। তার কতক আমার কানে গেল, কতক গেল না। জানালার বাইরে সদ্য-মেঘমুক্ত রৌদ্রোজ্জ্বল প্রভাতের দিকে তাকালাম। দেখলাম তার মরণাহত পাণ্ডুর রূপ। অনাগত জীবনের দীর্ঘপথের দিকে তাকালাম। দেখলাম সবটাই রুক্ষ ও ঊষর, কোথাও নেই একবিন্দু শ্যামলিমা।

    সম্বিৎ ফিরে এল রুমীর ধমকে—তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না বাবুজী, আমি আর কতক্ষণ বসে থাকবো?

    বললাম, তুই এখন যা, রুমী। এসব থালা-টালা পরে এসে নিয়ে যাস্।

    –বাঃ, তুমি না খেলে আমি যাই কি করে?

    -কেন?

    —কাঞ্ছী বকবে যে?

    —না, না। বকবে না। তুই যা।

    —হ্যাঁ, তুমি তো খুব জানো! এখুনি বললে—বকবে।

    —কি বললে?

    —বললে, রুমী খাবার আমি রেখে এসেছি। তুই এক পেয়ালা চা করে বাবুজীকে দিয়ে আয়। তিন চামচে চিনি দিস্ কিন্তু, বাবুজী চিনি বেশী খায়। আর, দিয়েই যেন চলে আসিস নে। সামনে বসে খাওয়াবি। কিচ্ছু যেন ফেলে না রাখে। তাহলে কিন্তু ভীষণ বকবো তোকে।

    এই কাঞ্ছীই আজ চলে যাচ্ছে চিরদিনের তরে। একটি মাত্র রাত্রির ব্যবধান। তারপরে আর তাকে দেখতে পাবো না।

    এই তো সেদিনের কথা। একটা মাসও হয়নি। এইখানে বসে একথা ওকথার পরও হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করেছিল, বাবুজী, বউ আসবে কবে?

    হেসে বলেছিলাম, বৌ বলে যে একজনকে আসতেই হবে, এ রকম চুক্তি তো কারো সঙ্গে করিনি।

    —ওমা! তুমি চিরকাল এমনি একলাটি থাকবে? তোমাকে দেখবে কে?

    -কেন? যার গরজ সেই দেখবে।

    কাঞ্ছীর হাস্যোজ্জ্বল মুখের উপর হঠাৎ ঘনিয়ে এল বেদনার ছায়া। কণ্ঠে বেজে উঠল অপূর্ব করুণ সুর। ঐ জানালার বাইরে চেয়ে ধীরে ধীরে বলেছিল, সে কপাল তো সে করে আসেনি! আজ হোক, কাল হোক, যেতে তাকে একদিন হবেই।

    সেই দিনটা যে এত কাছে ঘনিয়ে এসেছিল, সেও জানতো না, আমিও বুঝতে পারিনি।

    রুমীর দ্বিতীয় ধমক খেয়ে খাবারের থালায় হাত দিতে হল। এই কটি তুচ্ছ খাদ্যবস্তু। একে উপলক্ষ করেও কী না পেয়েছি এই পাহাড়ী মেয়েটির হাত থেকে! শুধু আজ নয়, আমার এই কেটা যন্ত্রটি তো বিকল হয়েই আছে। কতদিন দেখেছি, সে খবরটা যখন আমার কানে এল তার আগেই ওবাড়ি থেকে এসে গেছে খাবারের থালা। খাবারটা বরাবরই আসে বড়ী আম্মার নামে। কিন্তু আমি তার মধ্যে আর একখানা শুভ্ৰ কল্যাণহস্তের স্পর্শ পাই। আজই তার শেষ। সে স্পর্শ এ জীবনে আর কোনদিন পাবো না।

    ঘণ্টাখানেক পরেই বড়ী আম্মা এলেন নিমন্ত্রণ করতে। বললেন, মেয়েটার মা নেই, বাপ নেই, এক আমি ছাড়া আপনার বলতে কেউ নেই। সম্বন্ধটা হঠাৎ জুটে গেল। ছেলেটা মোটামুটি ভাল। অথচ দিতে-থুতে হবে না কিছুই। তাই আর সাত-পাঁচ না ভেবে দিলাম বিদায় করে। তোমাকে ও বড্ড ভালবাসে। তুমি দাঁড়িয়ে থেকে আশীর্বাদ করলে কাঞ্ছী আমার সুখী হবে! একটু কষ্ট করে আসতে হবে বাবুজী। আসবে তো?

    আমি সাগ্রহে বললাম, যাব বৈকি, বড়ী আম্মা। নিশ্চয়ই যাবো।

    কথা দিলাম। কিন্তু বড়ী আম্মা চলে যেতে না যেতেই কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল মনের ভিতরটা। কর্তব্যবোধ আঁকড়ে ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সব ব্যর্থ হল। কেবলি মনে হতে লাগল যাবার উপায় নেই। পালাতে হবে। যেখানে হোক, পালাতে হবে। ছুটি ফুরাতে তখনো একদিন বাকী। হঠাৎ মনে পড়ল, এক বাল্য-বন্ধু থাকেন কার্সিয়াং-এ, পি ডবলিউ ডি-র কর্ণধার। তাঁর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।

    ডাক্তার থাপার নামে একটা চিঠি লিখে গেলাম, বড়ী আম্মাকে সশ্রদ্ধ নমস্কার জানিয়ে বলবেন, অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে হঠাৎ আমাকে কার্সিয়াং যেতে হচ্ছে। কাঞ্ছীর বিয়ে দেখা হল না। ভারী দুঃখ রইল। ওকে সর্বান্তঃকরণে আশীর্বাদ করছি—ইত্যাদি।

    পরদিন ফিরবার পালা। ওখানে ভালো লাগল না। সকাল সকালই বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনে এসে দেখলাম গাড়ির তখনো অনেক দেরি। খানিকক্ষণ প্লাটফরমে পায়চারি করা গেল। সময় কাটতে চায় না। মানুষের ভিড় অসহ্য। ওয়েটিং রুমটায় উঁকি মেরে দেখলাম, একেবারে ফাঁকা। এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। যখন- তখন চায়ে আমার রুচি নেই। সেদিন কি হল জানি না, পর পর দু-কাপ কখন গলায় চলে গেল, জানতেই পারলুম না। তৃতীয় কাপের জন্যে বয়টাকে ডাকব কিনা ভাবছি, হঠাৎ নজর পড়ল বাইরের দিকে। চমকে উঠলাম। বিস্ময়ে আনন্দে, না বেদনায়, বুঝতে পারিনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাঞ্ছী। আনত ম্লান মুখ। পরনে নববধূর বেশ। পেছনে দাঁড়িয়ে তার বর। সোজা হয়ে বসে ওদের অভ্যর্থনা করলাম। সহাস্যে, সহজভাবেই বললাম, এসো। ছেলেটি মিলিটারী কায়দায় এক সেলাম করল, তারপর সবিনয়ে অনুমতি নিয়ে বাইরে চলে গেল। কাঞ্ছী ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়াল আমার কাছটিতে।

    কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কেটে গেল। আমি তার ডান হাতখানি আমার হাতের মধ্যে টেনে নিয়ে বললাম, তোমার বিয়েতে থাকতে পারলুম না। সেজন্য দুঃখ করো না, কাঞ্ছী। তুমি তো সবই জানো। পার তো আমাকে ক্ষমা কোরো।

    কাঞ্ছী তড়িতাহতের মত দু-হাতে আমার হাতখানি জড়িয়ে ধরে বলল, সেকি কথা, বাবুজী? তুমি ক্ষমা চাইছ আমার কাছে! আমারই যে তোমার কাছে অপরাধের অন্ত নেই! তার অপরাধ কোথায় জানি না, তবু প্রতিবাদ করলাম না। আরো কিছুক্ষণ পরে সে সহজ মৃদুকণ্ঠে বলল, আজই ফিরছ?

    বললাম, হ্যাঁ।

    একটু অপেক্ষা করে আবার বলল, ছুটি তো তোমার পাওনা আছে। আরো কিছুদিন বরং বাড়ি থেকে এসো।

    জিজ্ঞাসা করলাম, কেন?

    —কেন? হতাশভাবে জবাব দিল কাঞ্ছী, সে কথাও কি বলে দিতে হবে? কে আছে তোমার ওখানে? কে দেখবে? তেষ্টা পেলে এক গ্লাস জল চেয়ে খেতে যে জানে না, তার কষ্টের কি শেষ আছে? কতদিন না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বে, সে তো আমি চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি। না, ছুটি তোমাকে নিতেই হবে। তা না হলে ভীষণ রাগ করব আমি।

    হেসে বললাম, বেশ, না হয় নিলাম। কিন্তু ছুটির তো শেষ আছে। তারপর?

    —তারপর যখন ফিরবে, বিয়ে-থা’ সেরে একেবারে বৌ নিয়ে এসো।

    তার উদ্বেগ-আকুল চোখ দুটির দিকে চেয়ে বললাম, তাহলেই তুমি সুখী হবে, কাঞ্ছী? –হবো না? তুমি ভাল আছ, সুখে আছ; তোমার কোনো কষ্ট নেই—দূর থেকে এইটুকু যদি শুনতে পাই, সেই তো আমার পরম সুখ।

    আরো বোধ হয় কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু গলাটা ধরে এলো। রক্তাভ গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অবাধ্য অশ্রু।

    যাবার সময় হয়ে গিয়েছিল। ওড়নার প্রান্তে অশ্রুরেখা মুছে ফেলে সে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। মাটিতে হাঁটু রেখে উপুড় হয়ে আমার পায়ের উপর মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। বাধা দিলাম না। নত হয়ে ডান হাতখানা তার পিঠের উপর রেখে মনে মনে বোধ হয় আশীর্বাদ করলাম। সমস্ত দেহটা তার থরথর করে কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই বাঁধভাঙা বন্যার মত উপচে পড়ল কান্না। সে অশ্রুধারার উত্তপ্ত গোপন স্পর্শ অক্ষয় হয়ে রইল শুধু আমারই কাছে। এ পৃথিবীতে আমার এই তুচ্ছ পা দুটোই রইল তার একমাত্র নীরব সাক্ষী।

    কাঞ্ছীকে এতদিন শুধু হাসতেই দেখেছি। উচ্ছ্বসিত রজতধারার মত হাসি; সংসারে যার তুলনা নেই। আজ বিদায়ের দিনে দেখলাম তার কান্না। হৃদয়-নিংড়ানো দুর্বার কান্না তারও কোনো তুলনা নেই।

  • আট

    আট

    ১৭৫৭ থেকে ১৯৩০। পুরো দুটো শতাব্দীও নয়। ইতিহাসের অনন্ত প্রবাহে একটি ছোট্ট বিলীয়মান বুদ্বুদ। কিন্তু কী প্রচণ্ড তার আলোড়ন! কী সুদূরপ্রসারী গভীর আবর্ত সে রচনা করে গেল এই সুপ্রাচীন জাতির বহুমুখী জীবনধারায়!

    এই হতভাগ্য দেশের বুকের উপর বিদেশী বিজেতার পদাঘাত তো এই নতুন নয়। ঠিক এরই আগে সাতশ বছর ধরে আস্ফালন করে গেছে পাঠান, মোগল, তুর্কী—কত সুলতান মামুদ, চেঙ্গিস খাঁ, আলাউদ্দিন খিলজি, ঔরংজেবের দল। রস্তস্রোতে ভেসে গেছে নদী, গিরি, জনপদ। কলুষিত হয়েছে দেবমন্দির; লাঞ্ছিত হয়েছে নারী। কিন্তু ভারতের অন্তরাত্মা ধরা দেয়নি। সেই সাতশ বছরের ইতিহাস যেন একটা কালরাত্রির দুঃস্বপ্ন; যেন জলস্রোতের উপর চলন্ত মেঘের ছায়া!

    কিন্তু ইংরেজ শুধু দিগ্বিজয়ী নয়। রাজ্য জয় আর ধন লুণ্ঠন করেই সে ক্ষান্ত হল না। সে কেড়ে নিতে চাইল মনুষ্যত্ব। তার বিষবৃক্ষের বিষাক্ত শিকড় ধীরে ধীরে প্রবেশ করল এই উর্বর দেশের অস্থি-মজ্জায়। বিষক্রিয়ায় মুহ্যমান হয়ে গেল একটা সুবিশাল জাতির সমস্ত চেতনা। মোহগত মূঢ়ের মত সে তার সমস্ত ধ্যান-ধারণা, তার কর্মৈষণা, তার প্রতিভা নিয়োজিত করল বিদেশী সাম্রাজ্যের পরিচর্যায়।

    এমনি করে কাটল বছরের পর বছর। তারপর একদিন শতাব্দীর মোহনিদ্রা থেকে জেগে উঠল একদল মুষ্টিমেয় লোক। সভয়ে দেখল তারা, বিরাটকায় শ্বেতাঙ্গ অক্টোপাস লোহার বাঁধনে জড়িয়ে ধরেছে সমস্ত জাতির কণ্ঠ। প্রাণ যায় যায়। মুক্তি-কামনায় প্রথমে- শুরু হল আবেদন-নিবেদন। তারপর তর্জন-গর্জন। কিন্তু বন্ধন শিথিল হল না। যন্ত্রণার তাড়নায় এখানে-সেখানে দু’চারটা অর্বাচীনের দল ছটফট করে উঠল। দেখা দিল ১৮৫৭, তারপর ১৯০৫। কিন্তু সাম্রাজ্যের স্টীমরোলার শুঁড়িয়ে দিয়ে গেল যেখানে যত ছিল উদ্ধত শির।

    কিছুদিন গেল। ১৯২১ সালের বসন্ত কাল। সহসা একদিন ভারতের পশ্চিম প্রান্ত থেকে বেরিয়ে এল এক অর্ধনগ্ন ফকির,—ক্ষীণ দেহ, পরনে কটিবাস, মুখে রহস্যময় হাসি। ব্রিটিশ-সিংহকে আহ্বান করে বলল, হে পশুরাজ, আমরা নিরস্ত্র। কিন্তু তোমার দংষ্ট্রাঘাতকে ভয় করি না। তোমার ঐ বিজয়রথের চাকায় এতদিন আমরাই তেল যুগিয়ে এসেছি। আজ থেকে আর যোগাবো না। আমার দেশের বুকের পাঁজর গুঁড়িয়ে দিয়ে আমরাই তো তাকে টেনে নিয়ে বেড়িয়েছি। সে দড়িও ছেড়ে দিলাম। তোমার সঙ্গে আমার বিরোধ নেই; তোমার সঙ্গে আমার অসহযোগ।

    বৈরাগীর ক্ষীণ কণ্ঠে এত শক্তি ছিল কে জানত? আসমুদ্রহিমাচল কেঁপে উঠল। দেড়শ বছরের শাসন-প্রতিভা দিয়ে গড়ে তোলা যে কীর্তিস্তম্ভ, তার মূলে দেখা দিল ফাটলের রেখা। কিন্তু সে শুধু ক্ষণিকের তরে। ঝড় থেমে গেল, পড়ে রইল শুধু তার অবসাদ। রাজশক্তির জয়রথ চলল আবার ঘর্ঘর শব্দে চারদিক মুখরিত করে। যারা দড়ি ছেড়েছিল, আবার এসে এসে ধরল। দু-চার জন শুধু ছিটকে পড়ে রইল এখানে ওখানে, তলিয়ে গেল বিস্মৃতির অতলে।

    দশটি বছর না যেতেই আবার কোথা থেকে ফিরে এলো সেই শীর্ণকায় ফকির। দেহ ক্ষীণতর, কিন্তু ললাটে বজ্রের দৃঢ়তা। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হল, হে যন্ত্ররাজ বিভূতি, আমাদের জীবনের স্বচ্ছন্দ ধারা রুদ্ধ করে গড়ে তুলেছ যে পর্বতপ্রমাণ যন্ত্র তার বাধানিষেধের জঞ্জাল আমরা মানবো না।

    সেই কণ্ঠ দিকে দিকে প্রতিধ্বনিত হল—আমরা মানবো না। বেরিয়ে এল হাজার হাজার নিপীড়িতের দল, জীবনের নানা ক্ষেত্র, সমাজের নানা স্তর থেকে। সবারই কণ্ঠে এক সুর—আমরা মানবো না।

    ব্রিটিশ-সিংহের দণ্ডদীপ্ত ললাটে জেগে উঠল চিন্তা-রেখা। এ কী করে সম্ভব হল? যারা ছিল চিরকালের most obedient servant তাদের মুখে disobedience-এর ধ্বনি! কিন্তু ভাবনার সময় নেই। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল সাম্রাজ্য-শক্তি। আমরা ইংরেজ। আমাদের রাজ্যে সূর্যাস্ত নেই। চালাও রিপ্রেশন। যন্ত্ররাজ বিভূতি চালিয়ে দিল তার পেষণ-যন্ত্র। যারা পিষে মরল, তারা তো গেলই। যাঁরা বেঁচে রইল, বাঁধা পড়ল দেশব্যাপী লোহার খাঁচায়।

    তারই একটা ক্ষুদ্র খাঁচা আগলে বসে আছি আমরা ক’টি যন্ত্ররাজের অনুচর, এই দুর্ভেদ্য পাহাড়-ঘেরা হিমালয়ের জঙ্গলে। কিন্তু পাথরের বর্ম ভেদ করে বহির্জগতের তুমুল কোলাহল এখনো এখানে এসে পৌঁছায়নি। ইংরেজের স্নেহপুষ্ট, কৃপাভাজন এই পাহাড়ী জাত। চা, সিগারেট আর মদ—এই তিনদফা মহানেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে আছে। দু-একটা যদি বা মাথা তুলেছিল চাকরি বা খেতাবের মর্ফিয়া খেয়ে, আবার অচেতন হয়ে গেছে।

    সুতরাং বেশ আছি আমরা। আমাদের এই খাঁচায় তাদেরই বাসা, যারা খায় দায়, শেখানো কায়দায় হাত-পা নাড়ে এবং নিরুপদ্রবে নিদ্রা যায়। অনাবশ্যক ডানার ঝাপটায় মনিবের শান্তিভঙ্গ করে না। ভগবানকে ডাকছি, হে ঠাকুর, আমাদের এই মহাশাস্তি অটুট থাক। চোর, ডাকাত আর গাঁটকাটা নিয়ে মহাসুখে কেটে যাক দিনগুলো। কিন্তু আমার এই প্রার্থনায় মোবারক আলির যোগ নেই। হাতটা তার নিসপিস করছে। দু-চারটা বেয়াড়া স্বদেশী সায়েস্তা করবার সুযোগ যদি না জুটল, তবে বৃথাই তার এ জেলর-জন্ম।

    শেষ পর্যন্ত মোবারক আলির মনোবাঞ্ছাই পূর্ণ হল। কলকাতার কোন জেল থেকে হঠাৎ একদিন পাঠিয়ে দিল গুটিকয়েক নামজাদা “স্বদেশী” আর “স্বদেশিনী”। সেখানকার বাতাস নাকি এমন গরম করে তুলেছিলেন এঁরা, যে এই শীতল নির্বাসনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কর্তৃপক্ষের গত্যন্তর ছিল না।

    স্বদেশিনী যাঁরা এলেন তাঁর মধ্যে একজন ছিলেন শ্রীমতী তাপসী দাস। আমদানী কেতাবে তাঁর নামধাম যেখানে লেখা হল, জেলর সাহেব ‘দাস’ কেটে ‘দাসী’ বসিয়ে দিলেন। জেলে যারা নবাগত, হাসপাতালের রুগীদের মত তারাও একখানা করে টিকেট পায়, যার উপরের দিকটায় থাকে নাম আর অন্যান্য বিবরণ এবং সেগুলো সংগ্রহ করা হয় আমদানী কেতাব থেকে। শ্রীমতী দাসের হাতে যথাসময়ে এই ‘দাসী’ মার্কা টিকেট গিয়ে পৌঁছল। সঙ্গে সঙ্গে জেনানা ফাটকে আগ্নেয়গিরির আবির্ভাব। পরদিন স-পরিষদ সুপারের দর্শন মাত্রেই শুরু হল উদ্‌গিরণ। যে বস্তু উৎক্ষিপ্ত হল, তার মধ্যে যত না আগুন, তার অনেক বেশী কদম। আমরা নিঃশব্দে মাথা পেতে নিলাম। এক ফাঁকে মিস্টার রয় মোবারক আলির দিকে চেয়ে জানতে চাইলেন, ব্যাপারটা কি?

    জেলর সাহেব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ব্যাপার কিছুই নয়, স্যার। একখানা ওয়ারেন্টে কিছু গ্রামারের ভুল ছিল। কারে করে দিয়েছি।

    —গ্রামারের ভুল কি রকম?

    জেলর সাহেব আমার দিকে একটা বজ্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, বি. এ., এম. এ., পাশ না করলেও ছেলেবেলায় বাঙলা ব্যাকরণটা তো ভাল করেই পড়েছিলাম। যতদূর জানি, ‘দাস’ শব্দটা পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গে হয় দাসী”। “স্বদেশী” করতে গেলে লিঙ্গ-প্রকরণ বাতিল হয়ে যায়, একথা তো জানা ছিল না।

    সুপার-সাহেব অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। বন্দিনীদের মধ্যে দু-একজন যাঁরা একটু বয়স্কা, নিঃশব্দে চলে গেলেন। মিস্ দাস দিলেন হাঙ্গার-স্ট্রাইকের নোটিশ।

    শেষ পর্যন্ত সরকার পক্ষেরই পরাজয় হল। অত বড় একজন অভিজ্ঞ জেলরের ব্যাকরণ-নিষ্ঠার মর্যাদা রক্ষা হল না। শ্রীমতী আবার ‘দাসী’ থেকে ‘দাস’-এ রূপান্তর লাভ করলেন।

    রেলযাত্রীর মত জেলযাত্রীদেরও তিনটি শ্রেণী—প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়। কিন্তু রেলের কামরা যেমন যাত্রী নিজেই বেছে নেয়, জেলের কামরা স্থির করে দেন দণ্ডদাতা বিচারক। “স্বদেশী” মহিলাদের ছিল প্রথম শ্রেণীর টিকেট। কারণ—কতকটা সামাজিক, কতকটা রাজনৈতিক এবং বেশীর ভাগ বোধ হয় রোমান্টিক। কেননা, টিকেটদাতা হাকিম পুরুষজাতীয়। এদের শ্রেণীটাই শুধু প্রথম নয়, দণ্ডটাও ছিল অশ্রম। অতএব ভোজ্য এবং ভোগ্যবস্তুর অকৃপণ সমাবেশ। কিন্তু উপকরণই তো ভোগের একমাত্র উপাদান নয়। তাকে উপভোগ্য করে তুলতে হলে চাই মানুষের হাত। সে মানুষের অভাব নেই জেলখানায়। মুষ্টিমেয় প্রথম শ্রেণীর জন্যে গতর খাটাবে অপরিমেয় তৃতীয় শ্রেণী—এই ধারাই তো চলে আসছে সমাজে, রাষ্ট্রে, সেই অ্যারিস্টটলের “সিটি স্টেট” থেকে আরম্ভ করে অতি আধুনিক “পিউপিল্স ডেমোক্রেসি” পর্যন্ত। জেলতন্ত্রেই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? তাই প্রথম শ্রেণীর কয়েদীর পরিচর্যা করে ধন্য হয় তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী। ‘সার্ভেন্ট’ বললে পাছে এরা বা এদের শুভানুধ্যায়ীরা কুপিত হন, তাই কেতাবে এদের নাম অ্যাটেন্‌ড্যানট। জেল পরিভাষায় বলে ‘ফালতু’।

    একটি অল্পবয়সী পাহাড়ী মেয়ে “স্বদেশিনীদের” ফালতুর কাজ করত। হঠাৎ একদিন শ্রীমতী ব্যানার্জি এবং শ্রীমতী লাহা জিদ ধরলেন, ও মেয়ে চলবে না।

    বললাম, কেন?

    —কারণ দেখানোটা আমরা প্রয়োজন মনে করি না।

    আমি সবিনয়ে বললাম, সে তো অবশ্যই। আপনারা বলছেন, সেই যথেষ্ট। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, ও কি কাজকর্ম ঠিকমত করছে না?

    মিস্ লাহা একটা দৃপ্তভঙ্গী করে বললেন, আমরা যা বলেছি, তার বেশী আর কিছু বলতে চাইনে।

    এর পরে আর কথা নেই। পরিচারিকার পরিবর্তন হল।

    পরদিন বিকালবেলা স্বদেশী ওয়ার্ডের চিঠিগুলো ডাকস্থ হবার আগে পড়ে দেখছিলাম, জেলের ভাষায় যাকে বলে সেন্সর। তখন চাকরি কাঁচা, মনটাও পাকেনি। এই পরের চিঠি-পড়া ব্যাপারটাকে কেমন যেন অশোভন এবং অশিষ্ট বলে মনে হত। “স্বদেশী” মহিলাদের যেদিন থেকে আবির্ভাব হল এবং তাদের বাঁকা ছাঁদের দীর্ঘ পত্র হাতে আসতে লাগল, তখন বুঝলাম, সঙ্কোচটা আমার তরফে যতই হোক, ও তরফে তার একান্ত অভাব। সুতরাং আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে উঠতে বেশীদিন লাগেনি।

    মিসেস চ্যাটার্জির লেখা মোটা চিঠিখানা খুললাম। তাঁর কোনো বান্ধবীকে লেখা ঠাসবুনানী পাঁচ পাতা। কৌতূহল হল প্রথমেই ঐ পাহাড়ী মেয়েটার উল্লেখ দেখে মুখবন্ধের পর মিসেস চ্যাটার্জি লিখছেন, কাল আমরা একটা মস্ত বড় কাজ করে ফেলেছি। একটি নেপালী মেয়ে-কয়েদী আমাদের কাজ-টাজগুলো করে দিত। মেয়েটি ভারী লক্ষ্মী, শান্ত এবং বিশ্বাসী। কাজেকর্মেও চটপটে। হঠাৎ আমাদের কানে এল, ও জেল খাটছে কোনো সুস্পষ্ট কারণে স্বামীকে বিষ খাইয়ে মেরেছিল বলে। এ হেন স্ত্রীলোকের ঘৃণ্য সান্নিধ্য আমাদের মত সুসভ্যা এবং সুনীতিপরায়ণা মহিলাদের অবশ্য বর্জনীয়। অতএব আমরা জিদ ধরলাম, ওকে তাড়াতে হবে। কর্তৃপক্ষ প্রথমে রাজী না হলেও পরে বাধ্য হলেন। তাকে যখন চলে যেতে বলা হল তার নিজের ওয়ার্ডে, মেয়েটার চোখদুটো ছলছল করছিল। কিন্তু সে-সব তুচ্ছ সেন্টিমেন্টকে প্রশ্রয় দিলে আমাদের মর্যাদা থাকে না। এবার যে এসেছে, সে করেছিল কাপড় চুরি। অতএব আমরা নিরাপদ।

    সমস্ত রাত ধরে আমি ঐ মেয়েটার কথা ভেবেছি। স্বামীকে ও বিষ খাইয়ে মেরেছে। আর, আমি কি করেছি? আমার অন্তর, আমার কণ্ঠ, আমার প্রতিদিনের আচরণ থেকে যে বিষ ঝরে পড়েছে, সে কী আমার স্বামী এবং তার পরিজনদের জর্জর করে তোলেনি? একদিনে মেরে ফেলাটাই মারা, আর তিলে তিলে পলে পলে মারাটা কি মারা নয়? মেয়েটা কি আমার চেয়েও বেশী অপরাধী?

    আমি একা নই। আমার মত আধুনিকার দল, যারা আজ ঘর ছেড়েছে, কিংবা ঘরে থেকেও ঘরের বাঁধন স্বীকার করছে না, সবারই ঐ এক ইতিহাস। আমরা সব বিষকন্যার দল। স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, মর্যাদা আর নারী-প্রগতির ফণা তুলে আমরা আমাদের ঘর- সংসার, স্বামী-পুত্র-কন্যা, শাশুড়ী-ননদ, দেবর-ভাসুর সবারই দেহে নির্বিচারে বিষ ঢেলে বেড়াচ্ছি। তাই, সংসারও আমাদের কাছে বিষময়। ঘর আমাদের ধরে রাখতে পারলো না।

    আমার মাকে মনে পড়ছে। বাবা ছিলেন সামান্য কেরানী; মানুষ হিসেবেও অতি সামান্য। অফিস থেকে যখন ফিরতেন, তার আগে থেকেই মা আমাদের সাবধান করে দিতেন, যেন গোলমাল চেঁচামেচি না করি। বারান্দায় এসে দাঁড়ালে মা নিজে হাতে তাঁর জুতোর ফিতে খুলে দিতেন। জামাটা চাদরটা হাত থেকে নিয়ে বাড়ির কাপড় এনে দিতেন। তারপরে সযত্নে ঠাঁই করে নিকানো মেঝে আবার নিজে হাতে নিকিয়ে কত পরিপাটি করে দুখানা রুটি আর একটু তরকারি তাঁর সামনে ধরে দিয়ে পাখা নিয়ে বসতেন। আমাদের সেখানে আসবার হুকুম ছিল না। তবু যদি বাবা আমাদের জন্যে পাতে কিছু রেখে দিতে চাইতেন, মা ভয়ানক রাগ করতেন। বলতেন, ওর থেকে আবার ফেলে রাখছ? না, সে আমি কিছুতেই শুনবো না। এত খাটুনির পর এইটুকু না খেলে শরীর ঢেঁকে?

    বড় হয়ে যখন নারী-প্রগতির আস্বাদ পেলাম, মার এই দাসীবৃত্তি দেখে মনে মনে লজ্জিত হয়েছি। কিন্তু আমার চেয়ে কে বেশী জানে, মা দাসী ছিলেন না? মর্যাদা আর অধিকার নিয়ে বাবার সঙ্গে কোনোদিন লড়াই করেননি। তবু ছোট্ট সংসারের তিনিই ছিলেন সর্বময়ী কর্ত্রী।

    অভাবের সংসার। তার উপর বাবা ছিলেন রুক্ষ মেজাজের লোক। মাঝে মাঝে তাঁর মুখ থেকে অনেক রূঢ় কথা শুনতে হত মার্কে। কিন্তু একটারও জবাব দেননি কোনোদিন। হেসে বলতেন, পুরুষ মানুষকে কতো সইতে হয়; আমরা একটা শক্ত কথাও সইতে পারবো না? কখনো বলতেন, রাগ হলে দুটো কথা আমাকে শোনাবেন, না ঐ পাড়ার লোককে শোনাতে যাবেন?

    সেই মায়ের মেয়ে আমি। আমার এবং আমার মত আর দুজন আধুনিকার স্বামী যখন কর্মক্লান্ত দেহে অফিস থেকে ফেরেন, আমরা থাকি ড্রইংরুমে, শয়নকক্ষে কিংবা বাইরে কোথাও। হঠাৎ সেলাই কিংবা বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সামনে এসে দাঁড়ালে পাছে খাটো হতে হয়, তাই আসি না। দেখাতে চাই, আমাদেরও আছে একটা স্বতন্ত্র জগৎ। তোমাদের চেয়ে আমরা কিছুমাত্র ছোট নই। কিন্তু পুরুষ চিরকালই পুরুষ। আধুনিকার স্বামী হলেও সে সেই সনাতন স্বামী। স্ত্রীর কাছে সে চায় সেবা, যত্ন, আর তার চেয়েও বেশী, আনুগত্য। যখন বঞ্চিত হয়, তার সমস্ত অন্তর বিষিয়ে যায়। সভ্যতার মোলায়েম আবরণ ভেদ করে মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ে তার ঝাঁজ। কিন্তু আমরা সই না কিছুই, মেনে নিই না কাউকে। রুখে দাঁড়াই মর্যাদার সঙ্গীন উদ্যত করে। তখন চলতে থাকে আঘাত আর প্রত্যাঘাত, বক্রোক্তি ব্যঙ্গোক্তি, আর কটূক্তির কবির লড়াই। সভ্য নরনারী যে ছুরি চালায়, তার অবস্থান হাতে নয়, জিহ্বাগ্রে। কিন্তু তীক্ষ্ণতায় যে-কোন কসাই-এর ছুরিকেও সে হার মানায়।

    আর এক ধরনের দম্পতি আছে, আমাদের এই অতি-আধুনিক ঈঙ্গ-বঙ্গ সমাজে, যারা ছুরি চালায় না। কিন্তু হানাহানি নেই বলেই যে তাদের প্রাণে ‘প্রেম করে কানাকানি’, সে ভুল করে বোসো না। সেখানে স্বামী ব্যক্তিটির একমাত্র আশ্রয়—অভিনয়। তার মুখে বিলিতি মুখোশ, রসনায় সস্তাদরের বিলিতি মধুর প্রলেপ। “দাঁতের আগে মিষ্টি হাসি টানি” ভদ্রতার বাণী দিয়ে তিনি ঢেকে রাখেন তাঁর পুরুষ-হৃদয়ের ক্রোধানল। যে স্ত্রীর কাছে তাঁর দৈনিক বরাদ্দ অবহেলা, অনাদর আর ঔদাসীন্য, যার কঠিন মুখের দিকে চাইলে মাথায় খুন চেপে যায়, তাকে তিনি কাঁধে হাত দিয়ে আদর করেন, উপহার দেন নিত্যি নতুন জুয়েলারি। তার রূপের জৌলুস, কিংবা প্রসাধনের পালিস সম্বন্ধে দুটো গিল্টি-করা স্তুতিবাদ উচ্চারণ করে ক্লাবে গিয়ে হাঁফ ছাড়েন। আমাদের ভ্যানিটি-বোধ হয়তো তৃপ্তি লাভ করে। কিন্তু অন্তর? অন্তর থেকে যায় উপবাসী।

    তোমাদের চোখে আজ আমি মস্ত বড় দেশনেত্রী। আমার বক্তৃতায় আগুন ছোটে। করতালির দাপটে কেঁপে ওঠে দিমণ্ডল। কিন্তু, সভার শেষে ঘরে ফিরে আমার ভক্তের দল যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, সেটা কি জানো? সেটা হচ্ছে আমার রূপ, আমার দাঁড়াবার, চলবার, কিংবা বক্তৃতার ভঙ্গী। আমার পারিবারিক ইতিহাস যাদের জানা আছে, তারা যে ভাষা প্রয়োগ করে তোমাকে বলবো না। কেননা তুমি আমার বাল্যবন্ধু হলেও গৃহস্থবধূ।

    এই আমার মর্যাদা! —যার লোভে ঘরের বাঁধন ছিঁড়ে দেশের কাজে নেমেছিলাম।

    আজ এই গভীর রাত্রে এই নগাধিরাজ হিমালয়ের পদপ্রান্তে বসে তোমার সেদিনকার কথাটাই অকপটে স্বীকার করছি। নারীর যদি কোনো গৌরব থাকে, সে তার প্রেম। সে অমৃতলোক থেকে বরণ করেছি স্বেচ্ছানির্বাসন। যে-তরুশাখায় নীড় বেঁধেছিলাম, নিজ- হাতে তারই মূলে করেছি নির্মম আঘাত।…

    এমনিধারা আরো অনেকখানি আবেগ উচ্ছ্বাস পার হয়ে শেষটায় এসে পৌঁছানো গেল দীর্ঘ চিঠির উপসংহারে। মিসেস চ্যাটার্জি বলছেন :

    স্বামীগতপ্রাণা বলে একদিন তোমাকে কত না অবজ্ঞার চোখে দেখেছি। আমার সে ধৃষ্টতা আজ তুমি ক্ষমা করো, মিনতি। তোমার একটি মাত্র মেয়ে। আশীর্বাদ করি, সে যেন তোমার মত হয়। তার এই দেশবন্দিতা মাসীমার মত তাকে যেন দেশের কাজের নেশায় না পায়। বড় হলে নিজেরা দেখেশুনে ভাল ঘর বর দেখে মেয়েকে পাত্রস্থ করো। নিজের ঘরে গিয়ে নিজেকে যেন সে নির্বিচারে বিলিয়ে দিতে পারে তারই হাতে, যার সঙ্গে তার জীবন একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেল।

    একজন অতি-আধুনিকা, অত্যুচ্চ রাজনৈতিক খ্যাতিসম্পন্না বিদুষী মহিলার মুখে এহেন সেকেলে তত্ত্ব তোমার কানে আজ অদ্ভুত শোনাবে জানি। তবু বলবো, নারী-জীবনে সুখ যদি কোথাও থাকে, এই তার একমাত্র রাজপথ। এ পথ থেকে যে সরে দাঁড়াল, আশ্ৰয় করল উদ্ধত শির আর উদ্যত তর্জনী, সে আর যাই পেয়ে থাক, পাবে না সুখ—পাবে না সম্মান।…

    চিঠিটা শেষ করে মনে হল স্বপ্ন দেখছিলাম। এ কোন্ মিসেস্ চ্যাটার্জি? ইনিই কি সেই নীহারিকা চ্যাটার্জি, যাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতার প্রচণ্ড ঝটিকায় ভেঙে গেছে কত সাজানো সংসার? পুঁথির বোঝা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে তরুণীর দল, ঘরকন্নার জোয়াল ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে এসেছে বহু-সন্তানবতী প্রৌঢ়া, খদ্দরের বোঝা কাঁধে নিয়ে ফেরি করেছে রাস্তায় রাস্তায়, পিকেটিং করেছে মদগাঁজার দোকানে, তারপর ভিড় করেছে জেলের দরজায়? আজ তার কণ্ঠে এ কী সুর? কে জানে কোন্‌টা তাঁর আসল রূপ?

    তারপর বাইশ বছর চলে গেছে। নারী-প্রগতির আলোক আজ পৌঁছে গেছে সাধারণ বাঙালীর ঘরে ঘরে। নারীকণ্ঠের সোরগোলে আকাশ বাতাস মুখরিত। কিন্তু তারা যা চেয়েছিল, তা পেয়েছে কি? পেয়েছে সুখ? পেয়েছে সম্মান? না, আজও তারা নীহারিকা চ্যাটার্জির মত বিনিদ্র রাত্রির নিভৃত অন্ধকারে দুঃখের কাহিনী লিখে যাচ্ছে, পাতার পর পাতা কোনো পতিগতপ্রাণা সেকেলে বান্ধবীর উদ্দেশে?

  • নয়

    নয়

    দুর্জয়লিঙ্গের দেশে ঋতুরাজের ভূমিকা নিয়েছেন মহাশীত। সারা বছর তাঁরই অখণ্ড প্রতাপ। মাঝখানে কিছুকাল বিপুল সমারোহে আসর জমিয়ে রাখেন বর্ষা। ঋতুচক্রের বাকী শিল্পী যাঁরা, উইংসের পাশ থেকে একবার করে উঁকি দিয়ে চলে যান। এই সার্জ, ফ্লানেল এবং উলের টুপির বর্ম ভেদ করে তাদের ক্ষণিক আবির্ভাব শুধু বুঝতে পারি, যখন দেখি ম্যাল, বার্চহীল এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনের বেঞ্চিগুলো হঠাৎ ভরে উঠেছে রূপের জলুসে, বেশভূষার বৈভবে এবং হাসি-গল্পের ঝঙ্কারে। দোকানে দোকানে সদ্য সজ্জিত পণ্যসম্ভার; হোটেলে হোটেলে সুপ্তোত্থিত প্রাণ-চাঞ্চল্য। দার্জিলিং নাকি বাঙলা দেশের স্বাস্থ্যনিবাস। কিন্তু স্বাস্থ্য সঞ্চয়ের প্রয়োজন যাদের সবচেয়ে বেশি, তাদের দেখা নেই এর ত্রিসীমানার কোনখানে। এখানে ভিড় করে তারাই, স্বাস্থ্যের ভাণ্ডার যাদের ভরে আছে কানায় কানায়।

    কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের মত দার্জিলিংও জেগে ওঠে বছরে দু-বার। ঘরে-বাইরে উৎসবের সাড়া লাগে, পানভোজন, বিলাস-ব্যসন, পার্টি-জলসার ধুম পড়ে যায়। তারপর কুম্ভকর্ণ আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এই ক্ষণিক আনন্দের ঝলক দু-দিনের তরে আমাদের মনেও রং ধরিয়ে দেয়। দু-দিনের তবে আমরাও অনুভব করি জীবনের স্পর্শ, নিজেকে হারিয়ে ফেলি ইটালিয়ান চেস্টার এবং ফার-কোটের জঙ্গলে, উপভোগ করি অহেতুক হাসি, ‘অমিত উচ্ছ্বাস এবং অর্থহারা ভাবে ভরা ভাষা’।

    বৈকালিক আফিস সংক্ষেপে সমাধা করে সেদিন তাই সকাল সকাল বাড়ি ফিরছিলাম। ‘সিজন’ শুরু হয়ে গেছে। দার্জিলিংয়ের পথে-ঘাটে নয়নভুলানো আকর্ষণ। বাড়ি গিয়ে কোনরকমে এক পেয়ালা চা। অতঃপর বেরিয়ে পড়া।

    সুপারের বাড়ির ধার দিয়ে পথ। গেটের সামনে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন মিসেস রয়। চিন্তাক্লিষ্ট মলিন মুখ। চোখে উদাস দৃষ্টি। আমাকে দেখতে পেয়ে একটু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, এই যে, চৌধুরী। তোমাকে অনেক দিন দেখিনি। ভাল আছ?

    —আজ্ঞে, ভালই আমি। আপনাকে কি রকম শুকনো দেখাচ্ছে। অসুখ-টসুক করেনি তো?

    —নাঃ। আমি তো ভালই আছি। এসো না? মিস্টার রয় রয়েছেন। তাছাড়া আমাদের ক’জন অতিথিও এসেছে ক’দিন হল।

    মিস্টার রয়ের সঙ্গলাভ, কিংবা তাঁর অতিথিবৃন্দের সাহচর্য, কোনোটার জন্যেই আগ্রহ ছিল না। কিন্তু মিসেস রয় যখন ডাকছেন যেতেই হল। সোজা ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেলেন। মিস্টার রয় সরবে অভ্যর্থনা জানালেন এবং আগন্তুকদের সঙ্গে যথারীতি পরিচয় করিয়ে দিলেন। একজন নিঁখুত সাহেবী বেশধারী ভদ্রলোক, দুটি সযত্ন-সজ্জিতা মহিলা। মিস্টার রয়ের ভাই নিকোলাস রয়, ভ্রাতৃবধূ অচলা, ভগিনী মার্গারেট। এছাড়া ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক লুঙ্গিপরা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ—আমাদের রুটিওয়ালা গুঞ্জা হোসেন। তার সঙ্গেই কথা হচ্ছিল। টেবিলের উপর কাগজে মোড়া একখানা পাঁউরুটি লক্ষ্য করলাম।

    মিস্টার রয় আমার দিকে ফিরে বললেন, তুমি রুটি নাও কোত্থেকে, চৌধুরী?

    আমি উত্তর দেবার আগেই গুঞ্জা হোসেন বলল, আজ্ঞে, ও সাহেবের রুটি আমার দোকান থেকেই যায়। ঐ আটখানা করেই নেন। জিজ্ঞেস করুন।

    রয় বললেন, কিন্তু আমার বেলায় তোমার কিছু সুবিধে করে দেওয়া উচিত। ভেবে দ্যাখ, আমি এখানকার সিনিয়র হাকিম, তার মানে ডি-সি না থাকলেই আমি ডি-সি। তাছাড়া আমি জেলখানার বড় সাহেব, সিভিল কোর্টের সাব-জজ এবং ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার। বিপদে আপদে, মামলা-মোকদ্দমায় আমাকে ছাড়া তোমার গতি নেই।

    গুঞ্জা হোসেন হাত জোড় করে বলল, আচ্ছা হুজুর, অত করে যখন বলছেন আপনি ঐ ন’খানা করেই নেবেন।

    বলেই চলে যাচ্ছিল। মিস্টার রয় বললেন, দাঁড়াও। আর একটা কথা আছে। টাকায় ন’খানা হলে একখানা রুটির দাম কত পড়বে?

    রুটিওয়ালা প্রশ্নটার তাৎপর্য বুঝতে না পেরে বলল, আজ্ঞে, আপনি তো আর খুচরা দরে কিনছেন না?

    —তবু?

    গুঞ্জা হোসেন মনে মনে হিসেব করে বলল, তা সাত পয়সাই পড়বে।

    রয় খুশী হয়ে বললেন, সাত পয়সা! বেশ। সেই হিসাবে ন’খানা রুটির দাম পড়ছে তেষট্টি পয়সা। তুমি নিচ্ছ এক টাকা, অর্থাৎ চৌষট্টি পয়সা। তার মানে, প্রতি টাকায় তুমি এক পয়সা করে বেশি নিচ্ছ। ঠিক কি না?

    মার্গারেট মস্ত বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, উঃ, মাথা ধরে গেল বাপু তোমার হিসেবের জ্বালায়। সত্যি বলছি, হ্যারল্ড, ম্যাজিস্ট্রেট না হয়ে তুমি যদি মুদীর দোকান দিতে অনেক বেশি উন্নতি করতে পারতে।

    রয় ভগিনীর কথায় কান দিলেন না। রুটিওয়ালাকে যে প্রশ্ন করেছিলেন, তারই উপর আর একবার জোর দিয়ে বললেন, ঠিক বলেছি কিনা, বল? প্রতি টাকায় একটা করে পয়সা আমার পাওনা হচ্ছে।

    রুটিওয়ালার মুখ দেখে মনে হল, সে চটেছে। গম্ভীর হয়ে বলল, বেশ। ঐ একটা করে পয়সা আপনাকে আমি ঘুরিয়ে দেবো।

    রয় হেসে বললেন, না-না। ঘুরিয়ে দিতে হবে না। ওটা আমার হিসেবে জমতে থাকবে। সাত টাকার রুটি যেদিন কেনা হবে, একখানা রুটি আমি বেশি পাবো। এমনি করে প্রতি সাত টাকায় একটা করে ফালতু রুটি। ব্যাস! এবার বুঝলে তো?

    গুঞ্জা হোসেন কি বুঝল, সেই জানে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেল এবং এমনভাবে বেরিয়ে গেল, যেন মস্ত বড় একটা বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

    সে চলে যেতেই মিস্টার রয় চেঁচিয়ে উঠলেন, ঐ যাঃ! রুটিটা তো নিয়ে গেল না।

    চাপরাসীর ডাক পড়ল এবং মিনিট কয়েক পরে সে রুটিওয়ালাকে আবার পাকড়াও করে নিয়ে এল।

    রয় বললেন, তোমার রুটি যে ফেলে গেছ, মিঞা সাহেব

    —আজ্ঞে, ওটা হুজুরের স্যাম্পুল।

    -বেশ; তাহলে ওর দামটাও ঐ হিসেবের মধ্যে রইল। মানে, ঐ সাত পয়সা হিসেবে।

    গুঞ্জা হোসেন একগাল হেসে বলল, স্যাম্পুলের তো দাম নেই হুজুর।

    মিস্টার রয়ের মুখে খুশির আমেজ ফুটে উঠল। রুটিটার দিকে চেয়ে কি খানিকটা ভাবলেন। তারপর বললেন, এর থেকে একটা গল্প মনে পড়ছে।

    ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনবে, না বেড়াতে যাবে?

    নিকোলাস বললেন, দুটোই করবো। আমরা ডুডুও খাবো, টামুকও খাবো। আপনার আপত্তি আছে মিস্টার চৌধুরী?

    বললাম, কিছুমাত্র না। ডুডু এবং টামুকের পরেও যদি কিছু থাকে, তাতেও আমার আপত্তি নেই।

    —তোমার ইচ্ছাটা কি, অচলা? ভ্রাতৃবধূর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন মিস্টার রয়।

    অচলা মৃদুকণ্ঠে বললেন, গল্প পেলে বেড়ানোটা বাদ দিতেও রাজী আছি আমি।

    —আমি বাপু তাতে রাজী নই, সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন মার্গারেট, যা বলবে চটপট বলে ফেল। আবার একঝুড়ি অঙ্ক ঢোকাবে না তো গল্পের মধ্যে?

    রয় মৃদু হেসে বললেন, না, অঙ্ক নয়, তার বদলে এবার পাবে একঝুড়ি আম; আর তার সঙ্গে অনেকখানি Fun ।

    Fun-এর গন্ধ পেয়ে আমরা সবাই আগ্রহ দৃষ্টি ফেললাম বক্তার মুখের উপর। অচলা চেয়ারটা টেনে আর একটু এগিয়ে বসলেন। মিস্টার রয় শুরু করলেন—

    তখন সবে নতুন চাকরি; সেটেলমেন্ট ট্রেনিংয়ে যেতে হল দ্বারভাঙায়। মাঠের মধ্যে ক্যাম্প। কতগুলোতে অফিস, কতগুলোতে থাকবার ব্যবস্থা। একদিন বিকেলবেলা নিজের ক্যাম্পে বিশ্রাম করছি। মহারাজার এক ম্যানেজার এলেন দেখা করতে। পেছনে লোকের মাথায় একটা ঝুড়ি। বললাম, ওটা কি ব্যাপার?

    ভদ্রলোক বিনয়ের সঙ্গে বললেন, বিশেষ কিছুই নয়। মহারাজাধিরাজ পাঠিয়ে দিলেন। ওঁর বাগানের গোটাকয়েক ল্যাংড়া।

    গম্ভীরভাবে বললাম, বাইরে নিয়ে যেতে বলুন। ওসব অভ্যাস আমার নেই।

    ম্যানেজার অবাক হয়ে বললেন, কিসের অভ্যাস-

    —এই ঘুষ নেবার কথা বলছি।

    ভদ্রলোক মনে মনে চটলেন, বোঝা গেল। বললেন, আজ্ঞে ঘুষ দেবার অভ্যাস আমাদেরও নেই। আপনি ভুল করছেন। এটা ঘুষ নয়। এটা হচ্ছে রাজবংশের প্রাচীন প্রথা। রাজপুরুষদের সঙ্গে দেখা করতে এলে খালিহাতে আসতে নেই; মহারাজাধিরাজের মর্যাদায় বাধে।

    ভদ্রভাবেই বললাম, Excuse me ম্যানেজারবাবু, যেমন করেই বলুন, আসলে এ-ও একরকম ঘুষ। ইংরেজীতে যাকে বলে illigal gratification. মহারাজাধিরাজকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলবেন, তাঁর এই উপহার আমি গ্রহণ করতে অক্ষম।

    ম্যানেজার বোধ হয় অতটা আশা করেননি। খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তার মানে, এই আম ক’টা আপনি নেবেন না?

    —না।

    -সেটা মহারাজের পক্ষে কত বড় অপমান তা বুঝতে পারছেন?

    এবার একটু ঘাবড়ে গেলাম। ঐসব mediaeval যুগের রাজ-রাজড়াদের মর্যাদাবোধটা যেমন অত্যন্ত উঁচু, তেমনি বেজায় ঠুনকো। কখন কিসে যে সেটা ভেঙে পড়ে, কিছুই বুঝবার উপায় নেই।

    নিকোলাস বললেন, Excuse me, Harold, ওঁরা না-হয় mediaeval যুগের লোক। কিন্তু একজন আধুনিক যুগের পদস্থ সরকারী ব্যক্তির নীতি-বোধটাও তো কম ঠুনকো নয়। একঝুড়ি আমের ভার সইতে পারলো না?

    মিস্টার রয়ের মুখে মৃদু হাসি দেখা দিল। বললেন, একটা ভুল করছ। যে-ব্যক্তির কথা শুনছ, তিনি মোটেই আধুনিক ছিলেন না। সত্যি সত্যি আধুনিক যারা (আমাদের দুজনের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে নিলেন) তাদের নীতিবোধ যে কিছুতেই টোল খায় না, সেকথা বিলক্ষণ জানি। আমের ঝুড়ি সেখানে বাইরে অপেক্ষা করে না, সুড়সুড় করে সোজা ভিতরে চলে যায়।

    —তাতে অন্যায়টা কি, শুনি? আচ্ছা, হলে কি করতেন মিস্টার চৌধুরী? Honestly বলবেন কিন্তু।

    আমি চোখের ইঙ্গিতে boss-কে দেখিয়ে বললাম, Honestly বলবার মত সাহস পাচ্ছি কই?

    মিলিত কণ্ঠের হাসির রোল উঠল।

    মার্গারেট বললেন, তারপর আমের ঝুড়ির কি গতি হল?

    রয় বললেন, হ্যাঁ। তারপর ম্যানেজারকে বললাম, দেখুন ম্যানেজারবাবু, মহারাজাধিরাজের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়, তেমন কিছু আমি করতে চাইনে। অথচ সরকারী কর্মচারী হিসেবে আমগুলো গ্রহণ করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার চেয়ে আসুন একটা রফা করা যাক। আম আমি নেবোও না ফেরতও দেবো না। Neither accept, nor reject. ইতিমধ্যে আমার Head office-এ সব ব্যাপারটা লিখে দিচ্ছি। গভর্নমেন্টের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আম এখানেই থাক।

    ম্যানেজার একটু হেসে বললেন, তাই হোক

    তার মুখের ভাব দেখে মনে হল, আমার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্বন্ধে তাঁর সন্দেহ জেগেছে।

    নিকোলাস মৃদুকণ্ঠে ফোড়ন দিলেন, কিন্তু আমাদের কিছুমাত্র সন্দেহ নেই।

    —আমিও তোমার সঙ্গে একমত, যোগ করলেন মার্গারেট, তারপর হেড অফিসে চিঠি লেখা হল বুঝি?

    রয় বললেন, হ্যাঁ। চিঠি চলে গেল। দিন দশেক পরে একটা তাগিদও দেওয়া হল। এদিকে আমের অবস্থা বুঝতেই পারছ। ক্যাম্পে টেকা দায় হল। কিন্তু ঝুড়িটা সরাতেও পারি না। ম্যানেজারকে কথা দিয়েছি, Neither accept, nor reject. His Highness the মহারাজার মর্যাদা at stake! এমন সময় উত্তর এল। গভর্নমেন্ট বললেন, সরকারী কর্মচারীর পক্ষে কোন রকম উপহার গ্রহণ নিষিদ্ধ। তবে এই রকম ক্ষেত্রে, অর্থাৎ মানী লোকের মান-মর্যাদা যেখানে জড়িত, সেখানে দু-একটাকা মূল্যের কোন জিনিস গ্রহণ করতে বাধা নেই।

    ম্যানেজারকে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার ঐ আমের দাম কত? তিনি বললেন, দাম আবার কী! আগেই তো বলেছি, ওটা আমাদের বাগানের আম।

    —তা হোক, তবু ওর একটা বাজার-দর তো আছে।

    ম্যানেজার নাকে কাপড় দিয়ে বললেন, বাজার-দর? বর্তমানে দু আনা; মানে, ঐ ঝুড়িটার দাম।

    আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, বেশ! তাহলে মহারাজাধিরাজকে নমস্কার জানিয়ে বলবেন, তাঁর উপহার আমি সানন্দে গ্রহণ করছি।

    .

    ওঁদের চায়ের পাট আমি আসবার আগেই শেষ হয়েছিল। এবার বেড়াবার পালা। তারই উদ্যোগ করছিলেন। এমন সময় মিসেস রয় এসে বললেন, চৌধুরী, তুমি যেন চলে যেয়ো না। তোমার চা নিয়ে আসছি। মিস্টার রয় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বেশ, তাহলে তুমি বসো। আমরা একটু ঘুরে আসছি। কি বল? ডোরা রইলেন।

    আমি সবিনয়ে সম্মতি দিলাম।

    মিসেস রয় নিজের হাতে খাবারদাবার নিয়ে ঢুকলেন। সঙ্গে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে তাঁর দাড়িওয়ালা বয়। বললেন, আজ কিন্তু আমার কেকের ভাণ্ডার শূন্য। কি দিয়ে চা খাবে বল তো?

    বললাম, আপনি যা দেবেন, তাই দিয়েই খাবো।

    —তাহলে দেখছি শুধু চা-ই আছে তোমার কপালে। আবার যেদিন কেক্ করবো, খেয়ে যেয়ো দু’খানা। খবর দিলে আসবে তো?

    বললাম, নিশ্চয় আসবো। খবর দেবার দরকার হবে না।

    মিসেস রয় খাবারের ডিশগুলো এগিয়ে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। চীজ, বিস্কুট, প্যাস্ত্রী এবং নানা রকমের ফল। প্রচুর আয়োজন। তবু উনি বার বার আপসোস করতে লাগলেন এই বলে যে, কোনটাই ওঁর নিজের হাতের নয়। সেজন্য অবশ্য আমার কোন আপসোস ছিল না। সুখাদ্যের সদ্ব্যবহারে কোনদিন আমার কোন ত্রুটি বা অবহেলা দেখা দিয়েছে, এরকম অভিযোগ আমার ঘোর শত্রুর কাছেও শোনা যায়নি। মিসেস রয় নিঃশব্দে চেয়ে চেয়ে আমার খাওয়া দেখছিলেন। একটি অপূর্ব স্নেহদীপ্ত তৃপ্তি তাঁর চোখে ফুটে উঠল।

    কিছুক্ষণ পরে বললেন, তুমি আজকাল আস না কেন, বল দিকিনি? আমি বিদেশী মানুষ, তাই বুঝি পর মনে কর?

    আমি একটা মস্তবড় মত্তমানের শেষ টুকরো কোন রকমে গলাধঃকরণ করে বললাম, কিছুদিন আগে হলেও আপনার কথায় আমি প্রতিবাদ করতাম না। একজন শ্বেতাঙ্গী মহিলাকে পর মনে না করা সত্যিই আমার পক্ষে কঠিন ছিল। কিন্তু আজ এ কথা বলতে আমার কিছুমাত্র কুণ্ঠা নেই, আপনাকে দেখবার পর থেকে বুঝেছি, মানুষের পরিচয় তার দেশ বা চামড়ায় লেখা থাকে না।

    আমার এই উচ্ছ্বাসের উত্তরে মিসেস রায় হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, তোমার পুরো নামটা কী, চৌধুরী?

    —মলয়, মলয় চৌধুরী।

    —আচ্ছা, সত্যি করে বল তো মলয়, এইমাত্র যা বললে, সেটা কি তোমার একটা সাধারণ মত, না ঐ কথাটাই তুমি একান্ত মনে বিশ্বাস কর?

    দৃঢ়ভাবে বললাম, এ আমার অকপট বিশ্বাস, মিসেস রয়।

    উনি আর কোনো কথা কইলেন না। একটুখানি অপেক্ষা করে বললাম, আমার ধৃষ্টতা মাপ করবেন। আপনাকে দেখলে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। অথচ আপনার সঙ্গে তাঁর তফাত এত যে লোকে আমাকে পাগল বললে আশ্চর্য হবো না। তিনি দেখতে সুন্দর নন; বেশভূষা তাঁর কিছু নেই। লেখাপড়া একেবারেই জানেন না। দূর পল্লীগ্রামে কাটিয়ে দিলেন সারা জীবন। আদব-কায়দার পালিশ তাঁর দেহে বা মনে কোথাও লাগেনি। তবু মনে হয় আপনার সঙ্গে কোথাও তাঁর একটা গভীর ঐক্য আছে।

    মিসেস রয়ের মুখে মৃদু হাসি মিলিয়ে গেল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তিনি উদাস কণ্ঠে বললেন, মলয়, তোমার সঙ্গে আমার দেখা এই সেদিন। ঘনিষ্ঠতা যেটুকু, তাও সময়ের দিক থেকে সামান্য। তবু তুমি যে পরিচয় আমার দিলে, এই সাতাশ বছর যাদের নিয়ে ঘর করলাম, তারা কি তার একটা কণাও দেখতে পেল না?

    চমকে উঠলাম। প্রগল্ভ মূর্খের মত এই বিদেশিনী মহিলার অন্তরের কোন্ গোপন তারে হঠাৎ আঘাত দিয়ে ফেলেছি! সাবধান হয়ে গেলাম। প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দেবার জন্যে বললাম, আমার জন্যে আজ আপনার বেড়ানো বন্ধ হল-

    মিসেস অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, না-না, তুমি বোসো। কি বলছিলে? বেড়াতে যাওয়া? আমার তো বেড়াতে যাবার কথা ছিল না।

    কুণ্ঠিত হয়ে বললাম, আমি ভাবছিলাম, ওঁরা বেরিয়ে গেলেন, আপনিও যেতেন নিশ্চয়। সারা বিকেলটা একা-একা বাড়ি বসে কাটাবেন?

    —একা! উদাস কণ্ঠে বললেন মিসেস রয়, তুমি জান না, মলয়, আমি চিরদিনই একা। I have been alone all my life!

    একটু হেসে আবার বললেন, তুমি আমার সন্তানের মত। সব কথা হয়তো তোমাকে বলা উচিত নয়। তাছাড়া তুমি ছেলেমানুষ; সব কথা বুঝবেও না। আজ নিঃসংশয়ে বুঝতে পারছি, আমি ভুল করেছিলাম। This marriage was a mistake!

    শিউরে উঠলাম। নিতান্ত সহজ কণ্ঠে এ কী কঠিন কথা উচ্চারণ করলেন মিসেস রয়? সাতাশ বছর বিবাহিত জীবন কাটাবার পর এ কী ভয়ঙ্কর আবিষ্কার! এ কথার মর্ম ভেদ করবার মত না ছিল আমার বয়স, না ছিল বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা। কিন্তু এটুকু নিঃসন্দেহে বুঝেছিলাম, এইমাত্র যা শুনলাম, সেটা একজন অভিমানিনী ক্ষুব্ধা রমণীর ক্ষণিক উচ্ছ্বাস নয়, একটি শান্ত স্থিতধী প্রৌঢ়া মহিলার অন্তরের নিগূঢ় উপলব্ধি।

    আমি নিরুত্তর রইলাম।

    মিসেস তেমনি অবিচলিত কণ্ঠে বললেন, আমাকে ভুল বুঝো না, চৌধুরী। আমার স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আমার নেই। আমাদের দাম্পত্য-জীবনে যে সুখ, যে মাধুৰ্য পেয়েছি, খুব কম মেয়ের ভাগ্যেই তা জুটে থাকে। কিন্তু তবু আমি বিদেশী। মা, ভাই, বোন, ভ্রাতৃবধূ নিয়ে যে সংসার, সেখানে আমার স্থান হলো না।

    বিনিদ্র শয্যায় অনেক রাত পর্যন্ত মিসেস ডোরা রয়ের বেদনাহত কণ্ঠস্বর আমার মনের মধ্যে গুঞ্জরণ করে বেড়াতে লাগল। এই শ্বেতাঙ্গিনী মহিলার বিচিত্র জীবন-কাহিনী আমার জানা নেই। যে-বিবাহ আজ তাঁর কাছে একটা মারাত্মক ভুলমাত্র, তার ইতিহাস ও আমার অজ্ঞাত। এইটুকু শুধু কল্পনা করতে পারি, সাতাশ বছর আগে এই ডোরা রয় ছিলেন সুন্দরী তরুণী। দেহে যৌবনসম্ভার, নয়নে তড়িৎ-চমক, অন্তরে উদার আবেগ। জীবনের সেই মহাসন্ধিক্ষণে একদিন সুঠাম-দেহ, মেধাবী যুবক হ্যারল্ড রয়ের সঙ্গে ওঁর প্রথম দৃষ্টিবিনিময়। ঠিক কোনখানে জানি না। হয়তো লন্ডনের কোন নৃত্যগীতমুখর ভোজসভায়, হাইড পার্কের কোন নিভৃত লতাকুঞ্জে, কিংবা স্কটল্যান্ডের সাগরচুম্বিত পর্বতছায়ায়। সেদিন দুজনেরই চোখে ছিল যৌবনের ঘোর, যার মায়ায় মিলিয়ে গেল দেশ, জাতি এবং সমাজের দুস্তর ব্যবধান। ধীরে ধীরে আভাসে প্রকাশে, ভাষা ও ইঙ্গিতে পরিচয় হল অন্তরের সঙ্গে অন্তরের। অশ্রু-হাসিসিঞ্চিত বিরহ মিলনের চিরন্তন পথে সঞ্চারিত হল অনুরাগ। তার পর একদিন বন্ধুসমাজকে সচকিত করে “merrily rang the bells, and they were wed.”

    ডোরাকে সেদিন অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছিল। জন্মভূমি, স্বজাতি, সমাজ, চিরপরিচিত পরিবেশ। কিন্তু কারো কথাই সে ভাবেনি, পিছনপানে তাকিয়েও দেখেনি একবার। পরম বিশ্বাসে একটিমাত্র মানুষের হাত ধরে সে বেরিয়ে পড়েছিল ঊর্মিমুখর সাগরের পথে, এক অজানা দেশের উদ্দেশে।

    সেদিক থেকে মিসেস ডোরা রয় বঞ্চিত হননি। দীর্ঘ দাম্পত্য-জীবনে প্রেমের বন্ধন তাঁদের কোনোদিন শিথিল হয়নি, একথা তাঁরই অকপট স্বীকারোক্তি। তবে কিসের এ দীর্ঘশ্বাস? জানি না। নারীহৃদয়ের লীলাবৈচিত্র্যের সন্ধান আমি পাইনি। কোন মহিলা- রচিত একখানা উপন্যাসের একটি উক্তি মনে পড়ছে। “যতক্ষণ নরনারীর হৃদয়ের মধ্যে সত্যকার প্রেমের যোগ থাকে, ততক্ষণই বিবাহ সার্থক ও সত্য। যে মুহূর্তে প্রেমের মৃত্যু, সেই মুহূর্তেই উদ্বাহ-বন্ধন উদ্বন্ধন হইয়া উঠে—” —বলেছেন জনৈক নারী। এ কথার প্রতিধ্বনি শুনেছি কত শত কণ্ঠে, যে-কণ্ঠ একদিন পেয়েছিল মালার স্পর্শ, তারপর হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখতে পেল, তার ফুলগুলি গেছে, রয়েছে ডোর’। সেই ডোরটাকে সারাজীবন বয়ে নিয়ে বেড়াবার ব্যর্থতা আর বিড়ম্বনা, সে তো অহরহ দেখতে পাচ্ছি। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, বিবাহ কি শুধু প্রেম? শুধু প্রেম নিয়ে তৃপ্ত হয়েছে কোন নারী তার বিবাহিত জীবনে? ডোরা রয় হননি। তিনি স্বামীপ্রেম পেয়েছিলেন, পাননি স্বামীগৃহ। পেয়েছিলেন হৃদয়লক্ষ্মীর গর্ব, পাননি গৃহলক্ষ্মীর গৌরব। স্বামীর বন্ধুজনের শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন, পাননি তাঁর আত্মজনের বিশ্বাস। স্বামীর কাছে তিনি চিরন্তন প্রিয়সখী, গৃহিণী নন, সচিবও নন। তাই সমস্ত জীবন ধরে এত পেয়েও তাঁর অন্তরের ক্ষুধা মিটল না। অবশেষে একদিন সেই বুভুক্ষা-শীর্ণ অন্তরের রিক্ত রূপ তিনি তুলে ধরলেন বিদেশী বিধর্মী এক অনভিজ্ঞ অর্বাচীনের কাছে, ব্যক্ত করলেন তাঁর জীবনের যেটা সবচেয়ে গোপন আর সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য—This marriage was a mistake.

    গভীর রাত পর্যন্ত ভাবতে চেষ্টা করলুম, কেন এমন হল? ডোরা রয়ের এই ব্যর্থতার জন্যে দায়ী কে? তাঁর স্বামী—হ্যারল্ড রয়? তাই বা কেমন করে বলি? তিনি তো তাঁর সমস্ত উন্মুক্ত হৃদয় উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁর এই বিদেশিনী পত্নীর কোমল করপুটে। সেখানে তো কোন কার্পণ্য নেই। সেখানে তো কোন ফাঁকি ছিল না। তবে?

    আজ মনে হচ্ছে, একটা দিক চোখে পড়েনি হ্যারল্ড রয়ের। তাঁর মনে হয়নি—দয়িতের হৃদয়পদ্ম যত বড় কাম্য বস্তুই হোক, সারাজীবন তাকেই শুধু আঁকড়ে ধরে ভাবলোকে বিচরণ করবার সৌভাগ্য কোন নারীই কামনা করে না। সে চায় জীবনের যজ্ঞশালায় অমৃত বিতরণের আমন্ত্রণ। সে ভার যে পেল না, সংসারের রৌদ্রতাপে ললাটে ফুটল না স্বেদবিন্দু, অঞ্চল রইল ধূলি-মুক্ত, প্রিয়-মুখ-মিলনের স্মৃতিভাণ্ডার তার যত বড়ই হোক, মিসেস ডোরা রয়ের মত একদিন তাকে নিঃশ্বাস ফেলে বলতে হবে, আমি নিতান্তই একা!

  • দশ

    দশ

    সংসার চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে চিরন্তন অসহযোগ। যা চাই তা পাই না; আর যা চাই না বলে তারস্বরে চীৎকার করি, পাওয়ার মধ্যে তারই বোঝা স্তূপাকার হয়ে ওঠে। এ অতি মামুলী কথা, যার প্রত্যক্ষ উপলব্ধি থেকে রক্ষা পেয়েছে, এমন নরনারীর সাক্ষাৎ মিলবে না কোন দেশে এবং কোন যুগে। এই পুরাতন তত্ত্বের অধুনাতন দৃষ্টান্ত আমরা দুজন— বিখ্যাত জেলর, মৌলবী মোবারক আলি, আর তাঁর অখ্যাত ডেপুটি, বাবু মলয় চৌধুরী।

    খানিকটা আগেই বলেছি, স্বদেশীদের কাছে নিজের পরিচয়টা একটু বিশদভাবে দেবার জন্যে মোবারক আলি অনেকদিন থেকে ছটফট করছিলেন। সে বিষয়ে এখানকার ক্ষেত্র অতি সঙ্কীর্ণ। কারণ, প্রথমত সংখ্যায় এঁরা নগণ্য। দ্বিতীয়ত, গোড়াতেই তাঁর ব্যাকরণ- নিষ্ঠার অমর্যাদা আলি-সাহেবের অভিমানকে এতখানি আঘাত দিয়েছে যে, ওঁদের সংস্রব থেকে নিজেকে তিনি একেবারে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

    এদিকে সমতল ভূমি থেকে নানা সূত্রে নানা রুচিকর খবর প্রতিদিন তাঁর কাছে ভেসে আসছিল। একদিন শুনলাম, কোন্ একটা বড় জেলে এক হাজার ‘স্বদেশীওয়ালা’ তাঁদের সদ্য-লব্ধ দু-হাজার নতুন কম্বল একত্র জড়ো করে খাণ্ডবদাহনের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার একজোড়া করে নতুন কম্বল দাবি করে মাঠের মধ্যে সত্যাগ্রহ করে পড়ে আছেন। স্যাটানিক গভর্নমেন্টের কম্বলগুলোও যে শয়তান, এ-তত্ত্ব অস্বীকার করি না এবং শয়তানকে যে আগুনে পুড়িয়ে মারতে হয়, এ-যুক্তিও অকাট্য। অতএব বহ্ন্যুৎসবের অর্থ বুঝি। কিন্তু আর একজোড়া ‘শয়তান’ দাবি করে আবার সত্যাগ্রহ কেন?

    —কেন আবার? গর্জে উঠলেন মোবারক আলি, পিঠ চুলকোচ্ছে, বুঝতে পারছেন না? ওষুধ চাই।

    আবার একদিন শোনা গেল, আর একটা কোন স্পেশাল, না সেন্ট্রাল জেলে ভাত- ডালের হোলি চলছে। অন্য উদরে প্রবেশ না করে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে কারাকর্মীদের মাথায় এবং শূন্য থালার সামনে বসে সারিবন্দী রাজবন্দীরা গর্জন করছেন, ম্যায় ভুখা হুঁ!

    এর ক’দিন পরেই কোত্থেকে এল এক উড়ো খবর—সেখানে নাকি ‘স্বদেশীবাবুরা সন্ধ্যাবেলায় ব্যারাকে না ঢুকে, চড়েন গাছে এবং গভীর রাত পর্যন্ত আবৃত্তি করেন শিবরামের মহাসঙ্গীত।’ মোবারক বললেন, ‘গুলি খেয়ে গাছের ওপর থেকে পাখি পড়তে দেখেছি। মানুষ কি করে পড়ে, দেখতে ইচ্ছা করে।’ অর্থাৎ ওখানে উপস্থিত থাকলে দৃশ্যটা তিনি স্বহস্তে উপভোগ করতেন।

    এই জাতীয় খবর আমাদের স্বায়ুতন্ত্রীর উপর যে আঘাত করত, তার প্রতিক্রিয়া উভয়ের বেলায় ছিল বিপরীত। আমি প্রার্থনা করতাম, এই সব ‘স্বদেশী’-পীঠস্থান থেকে আমাকে রক্ষা করো ভগবান। মোবারকের প্রার্থনা ছিল—হে খোদাতাল্লা, বেশি নয়, শত পাঁচেক বেয়াড়া স্বদেশী আমার হাতে এনে দাও। একবার পরখ করে দেখি, তারা কী রকম চীজ!

    নিছক নৈর্ব্যক্তিক প্রার্থনায় নির্ভর না করে তিনি শেষ পর্যন্ত কালি-কলমের আশ্রয় নিলেন। লিখিত আবেদনে জানালেন উপরওয়ালার দরবারে, এই সঙ্কটকালে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি ইংরেজ সরকারের সাম্রাজ্য রক্ষায় নিয়োগ করতে উৎসুক। অতএব তাঁকে কোন বৃহৎ রাজনৈতিক জেলে স্থানান্তরিত করা হোক।

    কিন্তু কর্তৃপক্ষের রসজ্ঞান আছে। তাঁর সরব এবং আমার নীরব—কোন প্ৰাৰ্থনাই পূর্ণ হল না। মোবারক রয়ে গেলেন পাহাড়ের দেশে চোর ডাকাত আগলে; আমার ডাক পড়ল এক নির্জলা ‘স্বদেশী’ ছাউনিতে সত্যাগ্রহী দমনের মহান ব্রত স্কন্ধে নেবার জন্যে।

    .

    দুর্গম জঙ্গলে ঘেরা ডজন খানেক ভাঙা বাড়ি। এককালে ছিল গোলাবারুদের কারখানা। প্রহরে প্রহরে বেয়নেট দেখাত টহলদার প্রহরী, অজ্ঞ পথচারীর প্লীহা কাঁপিয়ে হুঙ্কার দিত—হুকুমদার! কালক্রমে প্রহরী বদল হল। বেলুচ্ রেজিমেন্ট যেখানে ছিল সেখানে দেখা দিল ফেরুপাল। তারাও প্রহর ঘোষণা করে। ‘হুকুমদার’ বলে না, বলে হুক্কা হুয়া।

    এক যুগ পরে আজ আবার এল পট-পরিবর্তনের পালা। কোদাল, কুড়ুল, আর শাবলের ঘায়ে ভিটেছাড়া হয়ে গেল শিবরামের দল। নতুন দৃশ্যে যারা অবতীর্ণ, সরকারের চোখে তারাও একজাতীয় জীবন্ত গোলাবারুদ। তাই নতুন করে আবার শুরু হয়েছে সশস্ত্র প্রহরীর টহল-গর্জন; হুঁশিয়ারির সরঞ্জাম এবার ব্যাপকতর।

    এই কারখানা থেকে একদিন যে বুলেট বেরিয়েছিল, তাদের খ্যাতি ছিল আন্তর্জাতিক রক্ত-পিছল পথে তারাই করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উদ্বোধন। আজ যেসব বুলেট জড়ো হল এই ভাঙা ঘরের বুকে তাদের পথ রক্তহীন। কে জানে হয়তো এদের হাতে এই পথ বেয়েই আসবে একদিন এই সাম্রাজ্যের উপসংহার।

    জঙ্গলের পাশে মাঠ। সেখানে তৈরি হল সারি সারি চালাঘর। শালের খুঁটি খড়ের ছাউনি আর চাটাইয়ের বেড়া। পাঁচিল ছাড়া জেল হয় কেমন করে? কারাগার বলতে প্রথমেই বুঝি কারাপ্রচীর। সে থিওরী বাতিল হয়ে গেল। একটা সূক্ষ্ম কাঁটাতারের বেষ্টনী কোনরকমে আব্রু রক্ষা করে বাঁচিয়ে দিল জেলের মান, মসলিনের ওড়না যেমন করে লজ্জা নিবারণ করে রাজপুত রমণীর। কাস্তেধারী পথচারী কৃষকের দল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আর হাসে। যারা তরুণ, ঠাট্টা করে বলে, এ জেল, না বাবুদের বাগান-বাড়ি? একটু প্রাচীন যারা, সম্ভ্রমের সঙ্গে উত্তর দেয়, এখানে কারা থাকবে জানিস? স্বদেশীবাবুরা। গান্ধী-রাজার লোক। এ তো চোর-ডাকাত নয়, যে পালাবে?

    সেটা আমরাও বুঝি। তবু চিন্তিত হলেন অভিজ্ঞ এবং দক্ষ জেলর মহেশ তালুকদার কিন্তু শ্বেতাঙ্গ ইনস্পেক্টর জেনারেল তাঁর আশঙ্কাকে আমল দিলেন না। বললেন দু-চার- দশটা যদি পালায়, টেক নো নোটিশ। তার বেশি হলে একটা রিপোর্ট পাঠিয়ে দিও আমার অফিসে। তবে rest assured jailor. সে রিপোর্ট তোমাকে দিতে হবে না। এরা পালাবার জন্যে আসেনি।

    তার ঘেরা শেষ হতেই শুরু হল বন্যাপ্রবাহ। বড় বড় মোটরযান ভর্তি—আসছে তো আসছেই। যুবক, বৃদ্ধ, প্রৌঢ় ও কিশোর। উচ্ছল হাসি আর প্রদীপ্ত উৎসাহ। আকাশে- বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে বন্দে মাতরম্, মহাত্মা গান্ধীজীকি জয়।

    —আজ কত এল?

    —তিনশ পঁচিশ।

    —মোটে? আমাদের এসেছে চারশ সাতান্ন।

    পাশাপাশি দু’জেলের কর্মীদের দিনান্তে দেখা হলে আলাপের বিষয় ঐ একটি। পাকা বাড়িতে থাকেন নেতা এবং উপ-নেতার দল, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী। আর তৃতীয় শ্রেণীর জন্যে খড়ের চালা। তাদের আর শেষ নেই। পাঁচশ, ছশ, আটশ, হাজার, বারোশ। আর যে জায়গা নেই। কে শোনে সেই কথা? বন্যার জল ফেঁপে ফুলে উঠছে প্রতিদিন। ‘এ- যৌবন-জলতরঙ্গ রুধিবে কে?”

    কাঁটাতারের গেট। তার সামনেই টালির ঘরে অফিস বসেছে। কাজ চলেছে সকাল থেকে রাত বারোটা। লড়াইফেরতা সুপার, ক্যাপ্টেন ব্যানার্জি। প্রবীণ এবং সুদক্ষ জেলর মহেশ তালুকদার। চারজন তাঁর ডেপুটি। তারপর আছে কেরানীকুল এবং সিপাই-সান্ত্রীর বিশাল বাহিনী। টেবিলে টেবিলে ওয়ারেন্টের হিমালয়, আর ফাইলের পিরামিড। নানা আকারের আর নানা প্রকারের খাতার উপর কলম চলছে অবিরাম। তার সঙ্গে চলছে হাসি, পরিহাস, চা-সিগারেট আর মাঝে মাঝে অফিস-পলিটিক্সের রুচিকর ফোড়ন

    —ও বাবা! এ যে সবারই দেখছি rigorous imprisonment, সশ্রম কারাদণ্ড। কি শ্রমটা করছেন এঁরা—অনেকটা আপন মনেই বললে সুধাংশু। আমদানী বইয়ে ওয়ারেন্ট নকল করা তার কাজ।

    ডেপুটি জেলর হৃদয়বাবু চা খাচ্ছিলেন। বললেন, কেন, শ্রমটা কম হচ্ছে কোথায়? তোমাদের ঘানিটানা পাথরভাঙা এসব করছে না বটে; কিন্তু ওদের লাইনে ওরা খাটছে সারাদিন।

    —যথা?

    —যথা, ভোরে উঠেই—মিলিটারি কায়দায় বললেন হৃদয়বাবু—

    বাঁয়া ডাহ্‌ইনা,
    বাঁয়া ডাহ্ইনা,
    ঘুম্‌ যাও।
    বাঁয় ডাহ্ইনা,
    বাঁয়া ডাহ্ইনা,
    ঠ্যর্ যাও।

    সকলেরই হাতের কাজ বন্ধ হয়ে গেল। যতীশদা বললেন এধার থেকে, ক্ষেপে গেলেন নাকি হৃদয়বাবু? ওসব কি বলছেন?

    হৃদয়বাবু গম্ভীরভাবে বললেন, বুঝতে পারছেন না? প্যারেড; স্বদেশী প্যারেড! আপনারা যাকে বলেন—

    Left Right, Left Right
    About turn!
    Left Right, Left Right
    Halt!

    হাসির রোল উঠল ঘর জুড়ে। যতীশদা কলকাতা থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জার। ভোরবেলার খবর রাখেন না। সন্দেহের সুরে বললেন, এসব সত্যিই করে নাকি ওরা, না বানিয়ে বলছেন আপনি?

    হৃদয়বাবু চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, আপনি ভাগ্যবান লোক, দাদা। রোজ বৌদির হাতে লেহ্য পেয় খেয়ে দশটা-পাঁচটা করছেন। একদিন মশার কামড় খান না আমাদের সঙ্গে এই জঙ্গলে? নিজেই দেখতে পাবেন, বানিয়ে বলছি কিনা। যতীশদা একটা কি বলতে যাচ্ছিলেন, সুধাংশু বাধা দিয়ে বললে, সে থাকগে। আপনি বলুন। এর পরের পর্বটা কি?

    হৃদয়বাবু সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, এর পরেই শুরু হল ক্লাস। নিম্ন প্রাইমারি থেকে এম. এ. পর্যন্ত যত রকমের ক্লাস আছে, সব। কতক ঘরে, কতক মাঠে, কতক বা গাছতলায়। এত বড় রেসিডেন্সিয়াল ইউনিভার্সিটি পৃথিবীতে আর কোথাও পাবে না।

    —কটা অবধি ক্লাস চলে?

    —ঘড়ি ধরে এগারোটা। তারপর স্নান এবং আহার পর্ব। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম। দুটো থেকে শুরু হবে বক্তৃতা, আলোচনা, ডিবেট, আর তার মধ্যে (গলা খাটো করে বললেন হৃদয়বাবু) কোন কোন ঘরে সিক্রেট মিটিং কিংবা ক্লোজ-ডোর মন্ত্রণাসভা। এই জেলে বসেই ভবিষ্যৎ প্রোগ্রাম তৈরি হচ্ছে, জেনে রেখো।

    -তারপর?

    —তারপর বিকেলবেলায় খেলাধূলা। দাঁতকপাটি, হাডু-ডু-ডু, দাড়ি-বাঁধা, চোর-চোর। সন্ধ্যার পরে আমোদ-প্রমোদ। ক্যারিকেচার, ম্যাজিক, সাঁওতাল নাচ আরো কত কি! কোনো ঘরে আবার গানের মজলিশও বসে। তার সঙ্গে জলের ড্রাম বা বালতির সংগত।

    নিতাই বক্সী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, বেশ আছে কিন্তু লোকগুলো। জেল খেটে দেশোদ্ধার হল, এদিকে ফুর্তির সীমা নেই। আর আমাদের অবস্থা দ্যাখ। কোন্ সকালে এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি। বারোটা বেজে গেল। কখন যে ফিরবো, কে জানে? আর ফিরেও তো সেই লোহাকাটাদের হোটেলের শুকনো ভাত! থালায় ঢাললে ঝন্‌ঝন্ করে ওঠে, যেন পাথরের টুকরো।

    ছোকরামত কে একজন বলল, তার চেয়ে চলুন না, দাদা, গান্ধীজী কি জয় বলে বেরিয়ে পড়া যাক্। লোহাকাটাদের লোহার টুকরোর বদলে দিব্যি দু’বেলা গরম গরম–

    —চলিয়ে হুজুর—জমাদার তমেশ্বরনাথ মিশির সেলাম দিয়ে আমন্ত্রণ জানাল। ব্যাপার নতুন কিছু নয়। প্রায় দৈনন্দিন ঘটনা। রন্ধন-যজ্ঞ সবেমাত্র সমাপ্ত হয়েছে। এবার ভোজন-যজ্ঞের উপক্রমণিকা, অর্থাৎ পরিবেশন,—জেলের ভাষায় যাকে বলে ফিডিং প্যারেড়।

    নিতাই বকসীর টিফিন ক্যারিয়ারে হোটেলের শুষ্ক অন্ন শুষ্কতর হতে লাগল। টুপিটা তুলে নিয়ে ছুটতে হল অপরের সদ্য-পক্ব অন্ন-বিতরণ-উৎসবে খবরদারি করবার জন্যে। তিনি একা নন। আমরাও সঙ্গ নিলাম, সমব্যথার ব্যথী। ডেপুটি জেলর বাহিনীর এটা হচ্ছে দৈনন্দিন অভিযান। ফল যা হবে সেটাও আমাদের মুখস্থ। বণ্টন ব্যাপারে যথাসম্ভব হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও অন্তত পঞ্চাশজনের ভাত কম পড়বে, যদিও চাল যেটা দেওয়া হয়েছে বরাদ্দমত তার হিসাব নির্ভুল এবং রান্নার ব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধানে কোনো ত্রুটি নেই। তারপর হবে একটা নিষ্ফল এনকোয়ারি অর্থাৎ স্বদেশী ক্যাম্পের পাণ্ডাদের সঙ্গে খানিকটা নিরর্থক বাগবিতণ্ডা।

    জমাদার বলবে, হামি খোদ দেখেছি, এই পাঁচঠো বাবু দোবার করে ভাত লিয়েছে। স্বদেশীরা গর্জে উঠবেন, মিথ্যা কথা। আমরা ঘোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত ওঁদের কোনো মতে ঠাণ্ডা করে আমাদের রিপোর্ট দিতে হবে—রন্ধনশালার সাধারণ কয়েদীদের অনবধানতাবশত তেইশ সের দশ ছটাক চালের ভাত পুড়ে গিয়ে মনুষ্য-খাদ্যের অযোগ্য হয়ে গেছে। অতএব ঐ পরিমাণ চাউল অতিরিক্ত ইসু করা হউক! অতঃপর বড়সাহেবের হুকুম হবে, তথাস্তু এবং নতুন করে কয়লা পড়বে বয়লারে।

    এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে প্রতিদিন। স্বদেশী নেতারা বলছেন, আমাদের হাতে কিচেন ছেড়ে দিন। সেখানকার সাধারণ কয়েদীদের চালাব আমরা। রসদ হিসাব করে বুঝে নেবো। বাকি দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু কর্তৃপক্ষ রাজী নন। সরকারের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করে এ ব্যবস্থা চলে কেমন করে? কিচেন আমাদেরই চালাতে হবে। জেল-ম্যানেজমেন্ট সরকারের দায়িত্ব। তোমরা কয়েদী। কয়েদীর হাতে কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া যায় না।

    মাসখানেক পরে একদিন সকালবেলা রসদ-গুদামের ধার দিয়ে যাচ্ছিলাম। বারান্দায় বসে স্টোর ক্লার্ক সুরেশবাবু হিসাব কষছেন। টেবিলের ওপাশে আরেকখানা চেয়ারে বসে আছেন ও-তরফের একজন ছোট নেতা, বিমল মজুমদার। তাঁর হাতে খাতা পেন্সিল। সুরেশবাবুর হাঁক শোনা গেল—হলুদ ৩৭ সের বারো ছটাক হচ্ছে, বিমলবাবু। আপনার কত হল?

    —আজ্ঞে, আমার হচ্ছে তেরো ছটাক।

    —বেশ। ঐ এক ছটাক আপনাকে বক্‌শিশ দেওয়া গেল।

    দুজনেই হেসে উঠলেন। যে-সব সাধারণ কয়েদীরা মাল ওজন করছিল, তাদের মুখেও দেখলাম খুশির ঝলক। সমস্ত রসদ কষে, মাল ওজন করে বিমলবাবু কিচেনে নিয়ে গেলেন, কয়েদীর মাথায় চড়িয়ে। শুনলাম, উনিই নাকি এ মাসের মত মেস কমিটির সেক্রেটারি। রন্ধনশালার তদারক করছেন আর একজন। তিনি কিচেন কমিটি। রান্নার চেহারাও দেখলাম বদলে গেছে। জেলের আইনে প্রত্যেক কয়েদীর প্রাপ্য হচ্ছে চার ছটাক সব্‌জি। এক গাড়ি তরকারী আসে রোজ। আলু, বেগুন, কুমড়ো, পালংশাক, মুলো, বাঁধাকপি আরও কত কি। এই হরেক রকমের জিনিস একসঙ্গে মিলিয়ে একটা উপাদেয় রসায়ন তৈরি হত এতকাল। আজ সেই একই উপকরণযোগে তরকারী হচ্ছে দুটো—আলু আর বাঁধাকপির ডালনা, বাকি সব দিয়ে একটা চচ্চড়ি মত। ডাল আর জলের অসহযোগ আমরা কোনোদিন ঘোচাতে পারিনি। এবারে দেখলাম, তারা বেমালুম মিলে গেছে এবং তার মধ্য থেকে উঁকি দিচ্ছে মাছের মাথার ভগ্নাংশ। একমাত্র ভাজা ছাড়া মৎস্যখণ্ডের যে আর কোনো সদ্‌গতি করা যেতে পারে, রন্ধন কর্তৃপক্ষের সেটা ছিল কল্পনার বাইরে। সেই মৎস্যকেই দেখলাম, কালিয়া-রূপে শোভা পাচ্ছে কয়েদীর থালায়।

    ‘কিচেন কমিটি’ হেসে বললেন, কি দেখছেন ডেপুটিবাবু; বিধাতা আমাদের রসনা দিয়েছেন দুটো কাজের জন্য—বক্তৃতা আর সুখাদ্যের রসগ্রহণ। প্রথমটা যখন আপনারা গায়ের জোরে বন্ধ করলেন, সে লোকসান তো দ্বিতীয়টা দিয়েই পুষিয়ে নিতে হবে।

    আমি বললুম, শুধু পুষিয়ে নেওয়া? বলুন, সুদসুদ্ধ আদায় করে নেওয়া।

    ‘মেস কমিটি’ হেসে উঠলেন।

    ফিরবার পথে ভাবতে ভাবতে এলাম, কার হুকুমে হল এসব? কেউ জানলো না, তবু হয়ে গেল রাতারাতি কর্তৃত্ব হস্তান্তর। আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, কতকটা যেন স্বভাবের নিয়মে, আপনি আপনি। কর্তৃপক্ষ দেখেও চোখ বুজে রইলেন, মনে মনে বোধ হয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সব চেয়ে খুশী হলাম আমরা, অর্থাৎ নিতাই বকসীর দল। পঁচা আদমিকা ভাত ঘট্ গিয়া—এই ভয়াবহ রিপোর্ট নিয়ে আর আসে না তমেশ্বর মিশির। এনকোয়ারির দায় থেকে মুক্তি পেয়েছি।

    দিন যায়, মাস যায়, বছরও যায় যায়। জোয়ারের বেগ শেষ হল। দেখা দিয়েছে ভাটার টান। যারা মাঝ-দরিয়ায় তরী ভাসিয়েছিল, ঝড়ঝঞ্ঝার ভ্রুকুটিকে গ্রাহ্য করেনি, তাদের মন আজ ঘরমুখী, তীরের আশ্রয়ের জন্য ব্যাকুল। দেশমাতৃকার দীপ্ত মূর্তি অনেকের চোখেই ঝাপসা হয়ে এসেছে, উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আপন আপন গৃহের রূপ। দেহ ক্লান্ত, মন অবসন্ন, মেজাজ রুক্ষ। প্যারেড, ডিবেট আর ক্যারিকেচার আপনা হতেই বন্ধ হয়ে গেছে। তার জায়গায় এসেছে অসহিষ্ণু বাগযুদ্ধ আর অহেতুক দলাদলি। বাইরের খবর কী? জেলের এই কদন্ন আর কম্বলশয্যা আর কতকাল কপালে আছে? মহাত্মাজী কী বলছেন? কম্প্রোমাইজের কতদূর হল? এই সব প্রশ্ন ঘুরেফিরে গুঞ্জন করছে সবারই মনে মনে।

    আফিস চলছে মন্দাক্রান্তা ছন্দে। যেখানে রাত বারোটায় নিঃশ্বাস পড়ত না, সেখানে বেলা বারোটায় নাক ডাকে। আগমনীর পালা অনেক দিন শেষ হয়েছে; এখন চলেছে বিসর্জনের পর্ব। রোজই একদল বেরিয়ে যাচ্ছে জেলের মেয়াদ শেষ করে। বন্ধুরা গেট পর্যন্ত এসে বিদায় দিয়ে যায়। মুরুব্বিরা ভিড় করেন আফিস পর্যন্ত। তারপর পাথেয় নিয়ে চলতে থাকে দর-কষাকষি। খোরাকী দু-দিন হবে, না তিন দিন : নৌকাভাড়া তিন টাকা হবে, না সাড়ে তিন। জেলর মহেশ তালুকদার খাঁটি ব্যুরোক্র্যাট—ইস্পাতের ফ্রেমের উপর কাদার গাঁথুনি। বিনয়ে-সৌজন্যে গদগদ। সাড়ে তিন ঘণ্টা অসীম ধৈর্য নিয়ে বক্তৃতা শুনে যাবেন, কিন্তু টাকার অঙ্ক তিন থেকে সাড়ে তিন হবে না।

    ওদিকে স্বদেশী পাণ্ডারাও ইস্পাতের জাত। মাঝে মাঝে যখন সঙ্ঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন ডাক পড়ে আমার। জেলর সাহেবের অনুগ্রহে আমি হচ্ছি তাঁর ভৌগোলিক উপদেষ্টা।

    —এই যে মলয়, তুমি তো অনেক কাল কাটিয়েছ ওদেশে। বল তো কুমিল্লা থেকে বদরখালি নৌকাভাড়া কত?

    কুমিল্লার সঙ্গে আমার পরিচয় ভূগোলের পাতায়; আর বদরখালির নাম এই প্রথম শুনলাম। তবু বিশেষজ্ঞের গাম্ভীর্য নিয়ে বলতে হয়, বদরখালির কোন্ পাড়ায় বাড়ি আপনার?

    খালাসোদ্যত আসামীটি বললেন, দক্ষিণপাড়ায়।

    -নৌকো তো ওদিকে সস্তা। কত চাইছেন আপনি?

    ভদ্রলোক উত্তর দেবার আগেই, তালুকদার-সাহেব বললেন, উনি তো চার টাকা হেঁকে বসে আছেন। আমার মনে হয়, আড়াই টাকার বেশী লাগবে না।

    আমি রায় দিলাম, টাকা তিনেকের মত পড়বে।

    যেন সকল সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমনিভাবে বললেন মহেশবাবু, ব্যাস; মিটে গেল। মলয়ের যে সব জানা কিনা?

    পাণ্ডারা মনে মনে উত্তপ্ত হলেও বাইরে কিছুই বললেন না। খালাসীটি ছেলেমানুষ। মেজাজ ঠিক রাখতে পারল না। উষ্মার সঙ্গে বলে উঠল, আচ্ছা, স্বরাজ হলে আমাদের হাতেই ক্ষমতা আসবে। তখন দেখবো, কি করে আপনাদের চাকরি থাকে।

    তালুকদার মশায় হেসে উঠলেন, বলেন কি? চাকরি থাকবে না? বরঞ্চ মাইনে বেড়ে, যাবে আমাদের। আজ বিদেশী সরকারের পয়সা বাঁচাচ্ছি; তখন বাঁচাবো আপনাদের। –

    কিন্তু আমি জানি, তালুকদার-সাহেব কড়াকড়ি যতই করুন, শেষ পর্যন্ত হার হত তাঁরই—অন্তত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, ঠিক যেমন করে হারতেন আমাদের আঠারো নম্বর মেসের ম্যানেজার হরিদাসবাবু।

    গল্পটা যখন মনে পড়ল, বলেই ফেলি।

    অনেক দিন আগেকার কথা। ইস্কুলে পড়ি। থাকতাম এক মেসে। নতুন ঠাকুর বহাল হল—মহাদেব মিশ্র। অতবড় করিতকর্মা লোক সারাজীবনে দ্বিতীয়টি আর দেখলাম না। কামিনীবাবুর আফিস ঠিক সাড়ে আটটায়। আটটা বাজতে পনের মিনিট হতেই খাবার ঘর থেকে হুঙ্কার এল–ঠাকুর ভাত নিয়ে এসো। মাছ সবে কোটা হচ্ছে তখন। কামিনীবাবুর সঙ্গে তার যোগাযোগ শুধু লোলুপ দৃষ্টি আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে তার জন্য বরাদ্দ ছিল দু’পয়সার দই, অর্থাৎ মধুপর্কের এক বাটি। হঠাৎ সেদিন দইয়ের বদলে হাতা হস্তে মহাদেবের প্রবেশ। কামিনীবাবু অবাক। ওটা আবার কি?

    —আজ্ঞে রামরস।

    —রামরস মানে?

    মহাদেব হাতা উপুড় করে দিল কামিনীবাবুর পাতে। দস্তুরমতো মাঝের ঝোল। সঙ্গে একটুকরো মাছ। কামিনীবাবুর চোখে আনন্দাশ্রু : সে কি, এরই মধ্যে হয়ে গেল?

    —করে ফেললাম একহাতা।

    হাঁড়ি নয় কড়া নয়, হাতায় করে রান্না মাছের ঝোল! কামিনীবাবুর কপাল ফিরে গেল সেই দিন থেকে।

    দু-দিন না যেতেই মহাদেব গোটা মেসটাকে জয় করে ফেলল। মহাদেব ছাড়া আর কোন বাবুরই চলে না। আস্তে আস্তে বাজারের ভারও এসে গেল তার হাতে। লেখাপড়া সে জানত না। কাগজ-কলমের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। হিসাব সব মুখে মুখে। রোজ সকালে ম্যানেজার হরিদাসবাবু দু-খানা দশ টাকার নোট তার হাতে ধরে দিতেন। সন্ধ্যাবেলা সে খরচ লিখিয়ে হিসাব মিটিয়ে যেত। হরিদাসবাবু খাতা খুলে বললেন বল, মাছ?

    —মাছ—আট টাকা এগারোআনা।

    হরিদাসবাবু লিখলেন—সাত টাকা বারোআনা।

    -পটল?

    মহাদেব বলল, পটল—দু টাকা পনেরোআনা।

    হরিদাসবাবু লিখলেন—দু টাকা চারআনা।

    এমনি করে মহাদেব যা বলত, প্রতি দফায় বেশ কিছু ডিসকাউণ্ট বাদ দিয়ে ম্যানেজার বসাতেন তাঁর খাতায়। লেখা শেষ হলে মহাদেব জিজ্ঞেস করত, কত হল বাবু? হরিদাসবাবু খাতার অঙ্ক যোগ করে বলতেন,—সতেরো টাকা ছ’আনা দু পয়সা।

    —কত ফেরত দিতে হবে?

    —দু টাকা ন’আনা দু পয়সা।

    মহাদেব বিনা বাক্যব্যয়ে দু টাকা ন’আনা দু পয়সা ফেলে দিয়ে চলে যেত। হরিদাস তাকিয়ে থাকতেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগত তাঁর হাঁ বন্ধ হতে। যতই কাটুন, সব যেত জলের উপর দিয়ে। দুধে হাত পড়ত না কোনদিন।

    গল্পটা একদিন জেলর সাহেবকে শোনালাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর হেসে বললেন, তোমার ঐ হরিদাসের সঙ্গে আমার আসল জায়গাতেই তফাত।

    —যেমন?

    —তিনি জিতবার চেষ্টা করে ঠকতেন। আমি জিতবার চেষ্টা করি না।

    আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম। মহেশবাবু আর একটু পরিষ্কার করে বললেন, বুড়ো হয়ে গেলাম। জীবনে নিজের রোজগার থেকে দুটো পয়সা কোনো সৎকাজে কারো হাতে তুলে দিয়েছি বলে তো মনে পড়ে না। দৈবক্রমে গৌরীসেনের এত বড় সিন্দুকটা যখন হাতে পড়েছে, তার থেকে দু-চারটা পয়সা যদি ঐ বাপ-তাড়ানো মা-খেদানো ছেলেগুলোর ভোগে লাগে তো লাগুক না, আমার তো কোন লোকসান নেই।

  • এগারো

    এগারো

    স্বপ্ন দেখছিলাম। দার্জিলিং-এ আমার সেই বাংলো। বাইরের ঘরে ক্যাম্পচেয়ারে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। বেলা গড়িয়ে গেছে। জানলায় দাঁড়িয়ে ডেকে যাচ্ছে কাঞ্ছী, বাবুজি বাবুজি। ঘুম কিছুতেই ভাঙছে না। কাঞ্ছীর হাসির ফোয়ারা” খুলে গেল, ছড়িয়ে পড়ল স্বপ্নময় মধুর ঝঙ্কার। …

    ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। বিছানার পাশে বিশ্রী কর্কশ সুরে বেজে চলেছে অ্যালার্ম ঘড়িটা। রাত দুটো বেজে পনের। রাউণ্ডে যেতে হবে। নিতান্ত যে ক্রীতদাস তারও আছে গভীর রাত্রির বিশ্রামের অবকাশ। আমার নেই। সেই কথাটাই জানিয়ে দিল ঘড়িটা।

    ফাল্গুনের শেষ। শীত চলে গেছে। রাত্রিশেষের কোমল দেহে লেগে আছে তার বিদায়ের স্পর্শ। কী মধুময় এই নিশীথ রাত্রির শয্যার আলিঙ্গন! ‘ক্লান্তি টানে অঙ্গ মম।’ কিন্তু তার চেয়েও প্রবলতর টান মহেশ তালুকদারের ডিউটি রোস্টারের চতুর্থ লাইন—”বৃহস্পতিবার লেট্‌ রাউণ্ড—ডেপুটি জেলর বাবু মলয় চৌধুরী।” কোনোরকমে শরীরটাকে টানতে টানতে বেরিয়ে পড়লাম, শেক্সপিয়র যাকে বলেছেন—crawling like a snail। আজ বুঝলাম, এই অনবদ্য বিশেষণটির এর চেয়ে যথাযথ প্রয়োগ আর হতে পারে না। কোনো রাউণ্ডগামী জেলর কিংবা তার ডেপুটির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি মহাকবির। যদি হত, বেচারা ইস্কুলের ছেলেগুলোর মাথায় এত বড় অপবাদের বোঝা চাপিয়ে যেতেন না।

    রাউণ্ডে চলেছি। কিসের উদ্দেশ্যে আমার এই নৈশ অভিযান? কর্তব্যপরায়ণতা, সতর্কতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি বড় বড় কথা খুঁটা দিয়ে যতই কেননা একে উঁচুতে তুলে ধরি, নিজের কাছে একথা লুকানো নেই যে, আমার আসল উদ্দেশ্য—শিকার সন্ধান। চাকরির উচ্চ মঞ্চে আরোহণের যতগুলো সোপান আছে, এও তার মধ্যে একটি। এই শিকার- সংখ্যাই হচ্ছে আমার কৃতিত্বের মাপকাঠি। গিয়ে যদি দেখি, আমার শিকারের দল, অর্থাৎ নিশাচর প্রহরীকুল সজাগ ও সতর্ক, তাদের মাথার পাগড়ি মাথার উপরেই আছে, চাদরত্ব প্রাপ্ত হয়ে দেহ আবৃত করেনি; তাদের পায়ের জুতো পায়েই শোভা পাচ্ছে, উপাধানে রূপান্তর লাভ করেনি, আমার সমস্ত পরিক্রমা ব্যর্থ হবে। আমার রিপোর্ট হবে একটি লাইন—Found everything in order. বলা বাহুল্য, এই সরল এবং সুরহীন রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের কর্ণে সুধা বর্ষণ করবে না, অর্জন করবে কুঞ্চিত নাসিকার অবজ্ঞা— লোকটা কি ওয়ার্থলেস! অর্থাৎ অন্যের গলদ আবিষ্কারের অক্ষমতাই হচ্ছে আমার নিজের গলদের বড় প্ৰমাণ।

    কিন্তু অদৃষ্ট যদি প্রসন্ন হয়, আমার রিপোর্টের পাতা ভরে উঠবে বিচিত্র শিকার- কাহিনীর সরল বর্ণনায়। কারো হাতে লাঠি নেই, কারুর জামায় নেই বোতাম, কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে গেছে দু’মিনিট অবিরাম টহল দিতে দিতে, কেউ বা নিজের সীমানা ছেড়ে দিয়ে গল্পের থলেটা খুলে ধরেছে সদ্য-মুলুক-প্রত্যাগত কোনো ভাইয়ার কাছে। এছাড়া থাকবে দুটো একটা sleeping while on duty—নৈশ প্রহরীর সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ—ঘুম।

    ঘুম! তারই বা কত বিচিত্র রূপ! এতদিন জানা ছিল মুদ্রিত চক্ষুই নিদ্রাদেবীর আসন। খাট নাই, পালঙ্ নাই, খোকার চোখে বস। কিন্তু খোকার সে চোখ যদি চেয়ে থাকে, ঘুমপাড়ানী মাসী পিসি তো সেখানে বসতে পারেন না। এই কথাই তো শুনে এসেছি মা-ঠাকুরমার কাছে। রাউণ্ডে বেরিয়ে ধরা পড়ল, ছেলেমানুষ পেয়ে কী প্রতারণাই না . তাঁরা করে গেছেন। ঐ যে সিপাইটি লাঠি ঠুকে ঠুকে টহল দিচ্ছে, পা ফেলছে ঠিক সমান তালে, চোখ খোলা, দৃষ্টি শূন্যে নিবদ্ধ, কাছে এগিয়ে যান, শুনতে পাবেন ওর নাকের ডাক। পথ আগলে দাঁড়ান, ও সোজা এসে পড়বে আপনার ঘাড়ের উপর। মাথার উপর থেকে টুপিটা তুলে নিন, ও জানতে পারবে না। ও জেগে নেই। গভীর ঘুমে বিভোর।

    ঐ পাঁচিলের ধারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে শিবনেত্র প্রহরী, লাঠিটা ধরে আছে নিখুঁত অ্যাটেনশনের ভঙ্গীতে, আমাকেই যেন সম্মান দেখাবার জন্যে, দেহ নিস্পন্দ, মাথাটি পর্যন্ত দুলছে না,—ওরও সমস্ত চেতনা নিদ্রাচ্ছন্ন।

    এরা হঠযোগী নয়, চলন্নিদ্রাসন বা অন্য কোনো উৎকট আসনও অভ্যাস করেনি বিষ্টু ঘোষের আখড়ায়। কিন্তু এর পেছনে আছে দীর্ঘ দিনের সাধনা আর তার মূলে নিতান্ত প্রাণের দায়। সমস্ত জীবনে ‘একটি সম্পূর্ণ রাত্রিও যাদের কাটে না শয্যার আশ্রয়ে, নিদ্রাবশীকরণের এই দুরূহ প্রক্রিয়া তাদের বাধ্য হয়েই শিখতে হয়। এই বিদ্যার জোরেই এরা ধূলি নিক্ষেপ করে আমাদের হুঁশিয়ার চোখে এবং আমাদের মারাত্মক লেখনীর কবল থেকে মুক্তি পায়। মুক্তি পায় না তারা, এই জাতীয় ভ্রাম্যমাণ এবং দণ্ডায়মান নিদ্রা যাদের আয়ত্ত হয়নি, নিদ্রা যাদের কাছে শয়নসাপেক্ষ, অর্থাৎ কোনো যৌগিক বা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় না নিয়ে যারা সোজা সটান আশ্রয় করে ভূমিতল। কিন্তু ধূলি-নিক্ষেপের হাত থেকে সেখানেও যে আমাদের চক্ষুযুগল পুরোপুরি মুক্ত নয়, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমাদের সহকর্মী মহীতোষদা।

    ভালোমানুষ বলে মহীতোষবাবুর অখ্যাতি ছিল। সেটা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল যখন পুরো তিন মাসের মধ্যেও তাঁর রাউণ্ডের জালে কোনো শিকার ধরা পড়ল না। মহীতোষ রাউণ্ডের সংখ্যা ও সময় বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু তাঁর কপাল ফিরলো না। তারপর একদিন তাঁর নজরে পড়ল, রাউণ্ডে বেরিয়ে প্রতিবারই একটা-না-একটা পোস্ট তিনি খালি দেখতে পান। অনুপস্থিত সিপাহীর অবস্থান সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে তার প্রতিবেশী ওয়ার্ডার এমন একটা জায়গার নাম করে, যেখানকার ডাক জৈবিক প্রয়োজনে অলঙ্ঘনীয়। একদিন তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। পনেরো মিনিট, কুড়ি মিনিট, আধ ঘণ্টা যায়। প্রতিবেশী সিপাহী কেমন অস্বস্তি বোধ করছে, কিন্তু তার বন্ধুর দেখা নেই। মহীতোষদা একটা গাছের গোড়ায় বেশ স্থায়ীভাবে বসলেন। ক্রমে প্রহরী বদলের ঘণ্টা পড়ল এবং কিছুক্ষণ পরে একদল নতুন সিপাহীও এসে গেল। পুরানো দলকে এবার ফিরে যেতে হবে। কিন্তু যার জন্যে তিনি অপেক্ষা করে আছেন, তার অগস্ত্য যাত্রার অবসান হল না।

    তারপর সেই বিশেষ স্থানটিও খুঁজে দেখা গেল। কেউ নেই। মহীতোষবাবু নিরাশ হয়ে অগত্যা ফিরে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছেন, হঠাৎ গাছের উপর থেকে ঝুপ্ করে তাঁর মাথায় একটা কি পড়ল। এ কি? খাকী টুপি এল কোত্থেকে! প্রথমটা মনে হল ভৌতিক ব্যাপার। কিন্তু গভীর রাতে গাছের ডাল থেকে নিরীহ ভদ্রলোকের মাথায় টুপি বর্ষণ করে মজা দেখবার মত রসজ্ঞান ভূতেরও আছে কিনা সন্দেহ হল মহীতোষবাবুর। সন্দেহভঞ্জনে দেরি হল না। নিরুদ্দেশ সিপাহীর সন্ধান পাওয়া গেল। অর্থাৎ দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তিনি ‘উচ্চ বৃক্ষচূড়ে বাঁধি নীড়’ নির্বিঘ্নে এবং সুস্থদেহে নিদ্রা-সুখ উপভোগ করছেন। শিরচ্যুত টুপিটা অসময়ে বিশ্বাসঘাতকতা না করলে সে নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটাবার আশু সম্ভাবনা ছিল না।

    মহীতোষবাবু অতঃপর আবিষ্কার করলেন, ব্যাপারটা আকস্মিক নয়। তিনটি বৃহৎ শাখার প্রশস্ত সঙ্গমস্থলে কম্বল বিছানো এবং সেটা নিয়মিত নিদ্রার স্থায়ী ব্যবস্থা। কারো ব্যক্তিগত বন্দোবস্ত নয়, রীতিমত যৌথ কারবার। লভ্যাংশ সমান ভাগে বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ প্রত্যেকটি সিপাহী পালা-ক্রমে এই নিদ্রাসুখ ভোগ করেন এবং তার শূন্য পোস্টের উপর যখন রাউণ্ড অফিসারের নজর পড়ে, পার্শ্ববর্তী বন্ধুরা কৈফিয়ত দেয়—call of nature, Sir.

    জেল কর্তৃপক্ষের সৌভাগ্য, সকলেই মহীতোষবাবু নয়। পাহারাওয়ালার মধ্যে যেমন একদল থাকে বুনো ওল, রাউণ্ডওয়ালাদের মধ্যে তেমনি আছে দু-চারটা বাঘা তেঁতুল। তার সব চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আমাদের ‘গগন ডিপ্‌টি’। ভদ্রলোক পদে কেরানী, কিন্তু পরিচ্ছদে ডেপুটি জেলর। নাম গগন হালদার, সিস্টীরা বলে গগন ডিপটি। যদিও কেরানী হিসাবে ‘রাউণ্ড’ তাঁর অবশ্য করণীয় নয়, তাঁর অস্থাধিক উদ্যম ও উৎসাহ লক্ষ্য করে কোনো সুরসিক জেলর রাউণ্ডের তালিকায় গগনবাবুর নামটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। সেই অবধি তাঁর দাপটে সিপাহী-কুল কম্পমান। টহল দিতে দিতে দু-মিনিট যদি কারো পা দুটো থেমে যায়, লাঠিখানা জড়িয়ে ধরে চোখ দুটো যদি জড়িয়ে আসে তন্দ্রায়, অন্য বাবুদের কাছে কান্নাকাটি চলে, রেহাই পাওয়া যায়। কিন্তু গগন ডিপ্‌টির কাছে নিস্তার নেই। তাই তাঁর রাউণ্ডের পালা যেদিন পড়ে, সিপাহী মহলে হুঁশিয়ারির অন্ত নেই। সবাই সেদিন পুরোদস্তুর ভালো ছেলে। Everything in order। বলা বাহুল্য সেটা গগনবাবুর কাম্য হতে পারে না। তাঁর কলমের খোঁচায় দু-চারটা যদি ধরাশায়ী না হল, তাঁর ডেপুটিত্ব বজায় থাকে কেমন করে! কিন্তু এদিন দুর্ভাগ্য, সিপাহীরা ষড়যন্ত্র করেছে, তাঁকে সে সুযোগ দেবে না।

    একদিন এক অভিনব কৌশল এল তাঁর মাথায়। গগনবাবু জানেন, আমাদেরও অজানা নেই, রাউণ্ড শেষ হলেই প্রহরীদের মধ্যে জাগে আরামের লোভ। যাক্ ফাঁড়া কাটল—বলে সবাই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কেউ কেউ হয়তো বুট খুলে একটু আরাম করে বসে, কেউ বা খানিক গড়িয়ে নেয় কোনো গাছের নীচে কিংবা বারান্দার কোণে। সেই দুর্বল ক্ষণের সুযোগ নিলেন গগনবাবু। একটা পরিক্রমা শেষ করে আধ ঘণ্টা লুকিয়ে রইলেন অফিসে। তারপর আবার শুরু হল তাঁর দিগ্বিজয়। এবার জাল ভরে গেল মূল্যবান শিকারে। গোটা-চারেক শিপিং, ছ’সাতটা সিটিং অ্যাণ্ড ডোজিং, তাছাড়া ডজনখানেক টুপিহীন মাথা আর বেল্টহীন কোমর। শাস্তির হিড়িক পড়ে গেল পরদিন সকালের অফিসে। গগন ডিপ্‌টির কৃতিত্বে ম্লান হয়ে গেল সত্যিকার ডিটির দল।

    সেবার মাঘ মাসের মাঝামাঝি। পদ্মার তীরে খোলা মাঠের মধ্যে জেল। তার উপর বাঙলার শীত। হাড়ের ভিতর থেকে কাঁপুনি উঠে ছড়িয়ে পড়ে দেহের প্রতি অঙ্গে। রাত সাড়ে তিনটা। চারদিক কুয়াশায় আচ্ছন্ন। তার কণাগুলো ঝরে পড়ছে বৃষ্টিধারার মত, আর বিঁধে যাচ্ছে অস্থি-মজ্জায়। সর্বাঙ্গে কাপড় জড়িয়ে চোখ দুটো কোনো রকমে খুলে রেখে এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে কাঁপছে সিপাইয়ের দল। এই ভয়ঙ্কর নিশীথে, দীর্ঘ প্রাচীরের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে কে ও? আপাদমস্তক কম্বলে ঢাকা, যেন কুয়াশার সাগরে একটি ভাসমান ভেলা। সাত নম্বরের কোণ পার হতেই হাঁক দিল সতর্ক প্রহরী, আসামী ভাগতা হ্যায়। সেই ভয়াবহ বার্তা তীরের ফলার মত বিঁধল গিয়ে সকলের কানে বেজে উঠল হুইস্ এবং সঙ্গে সঙ্গে গেট-সেন্ট্রি বাজিয়ে দিল অ্যালার্ম। আশেপাশে যারা ছিল ছুটে এল লাঠি হাতে, বেগতিক দেখে ‘কম্বল’ ধাবমান হল। কিন্তু সিপাইরা ঘিরে ফেলল চারিদিক থেকে। কী যে সে বলল, কারো কানে গেল না। লাঠি চলল বেপরোয়া।

    মিনিট কয়েকের মধ্যে কর্তারা যখন এসে পৌঁছলেন, ‘কম্বল’কে তার আগেই ধরাধরি করে তোলা হয়েছে হাসপাতালের বারান্দায়। চোখ মুখ ফুলে উঠেছে। চিনতে কষ্ট হয়। আর্তনাদ শুনে বোঝা গেল। কম্বলধারী পলাতক আসামী নয়, স্বনামধন্য রাউগুবিশারদ গগন ডিপ্‌টি।

    পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। কি বলছিলাম? আমি রাউণ্ডে চলেছি। রাত দুটো বেজে পঁচিশ। খানিকটা পথ চলবার পর একবার চারদিক যখন তাকিয়ে দেখলাম, নিঃশব্দে ঝরে পড়ে গেল মুহূর্ত-পূর্বের পুঞ্জীভূত গ্লানি আর বিরক্তির বোঝা। এ কোন্ পৃথিবী? এর দিকে দিকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরে উঠেছে বাসন্তী জ্যোৎস্নার রজত প্লাবন; নিস্তব্ধ রাত্রির সর্বদেহে সঞ্চার করেছে ‘শোভা, সম্ভ্রম ও শুভ্রতা’। দিনের আলোয় যা কিছু ছিল তুচ্ছ ও রূপহীন, জ্যোৎস্নার মায়াস্পর্শে তাকেই দেখছি সুন্দর ও মহিমাময়। ঐ চুন-বালি-খসা ভাঙা বাড়িটা যেন রূপকথার রাজপুরী। ঐ কাঁটা ঝোপটা যেন মায়াকানন। হঠাৎ কোথা থেকে ভেসে এল বাঁশির সুর। ক্লান্ত করুণ বেহাগের ব্যাকুলতা। কে ও? হৃদয়মথিত আকুল কান্না গলিত ধারায় লুটিয়ে পড়েছে ফাল্গুনী নিশীথিনীর বুকের উপর!

    গেট পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। ১২৭ ঠিক হ্যায়, হুজুর, তালা জালা সব ঠিক হ্যায়— বুট ঠুকে স-সেলাম রিপোর্ট জানাল ‘দো-সে তিন্কা’ সতর্ক প্রহরী। অর্থাৎ দুই এবং তিন নম্বর ওয়ার্ড মিলে আসামীর সংখ্যা ১২৭; এবং তারা সবাই উপস্থিত—এই কথা জানিয়ে দিল ভারপ্রাপ্ত ওয়ার্ডার। তাকিয়ে দেখলাম, ১২৭-এর একও নেই দুটো ব্যারাকের কোনো কোণে। চাটাইয়ের বেড়া আর বাখারির জানালা কবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে! কয়েদীরা সব ছড়িয়ে আছে মাঠের এখানে-ওখানে, মিশে গেছে অন্য সব ওয়ার্ডের বন্দীদের দলে। তবে তালাগুলো সব বন্ধ আছে ঠিকই এবং তার শক্তি পরীক্ষাও চলছে যথারীতি। দু-ঘণ্টা অন্তর নতুন প্রহরী এসে শূন্য ঘরের তালা টেনে জানালা ঠুকে রিপোর্ট দিচ্ছে—সব ঠিক হ্যায়, হুজুর।

    আরো এগিয়ে গেলাম। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নিদ্রিত মানুষ। মাঝে মাঝে ঠকাস্ ঠকাস্ বুটের শব্দ। সবার উপর গড়িয়ে পড়ছে অবিশ্রান্ত বাঁশির সুর। বারো নম্বরের কোণে মেহগিনি গাছের তলায় একটি ছোট বাঁধানো চত্বর। তারই উপর বসে যে ব্যক্তিটি এই সুরের জাল বুনে চলেছেন, তাঁর কাছে আমার আগমন অজ্ঞাত রয়ে গেল। আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর কখন এক সময়ে তাঁর পাশটিতে বসে পড়েছি এবং কখন সে সুর থেমে গেছে, কিছুই বুঝতে পারিনি। চমকে উঠলাম তাঁর কণ্ঠস্বরে—কি খবর ডেপুটিবাবু; বে-আইনী হচ্ছে, না?

    মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলাম, তা একটু হচ্ছে বৈকি।

    —বাঁশিটা কেড়ে নেবেন তো?

    —নেওয়াই তো উচিত। কিন্তু নিতে পারছি কৈ?

    —কেন?

    —কেড়ে নেবার জোরটাই যে আপনি কেড়ে নিলেন। বড্ড কবিত্ব হয়ে গেল; কি বলেন?

    —তা একটু হল। কিন্তু যা বললেন, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলবো এ পথে আসা আপনার ঠিক হয়নি। আপনি মিসফিট্।

    আমি বললাম, ঠিক ঐ কথাটা আমিও আপনার সম্বন্ধে বলতে পারি, অনিমেষবাবু।

    এ রাস্তা আপনার নয়।

    —কেন?

    —আপনি শিল্পী, আপনি রসস্রষ্টা। আপনার পথ সুন্দরের পথ, বিরোধের পথ নয়। রাজনীতির বন্ধুর পথে আপনি ক্রমাগত হোঁচট খাবেন, অভীষ্ট সীমায় কখনো পৌঁছতে পারবেন না।

    অনিমেষ চুপ করে রইলেন। আমি একটু থেমে আবার বললাম, আপনি হয়তো বলবেন, “আমাদের পথে সঙ্ঘর্ষ নেই। মহাত্মাজী শান্তিকামী। তিনি বলেছেন, ইংরেজের সঙ্গে আমাদের বিরোধ নেই, তার নীতির সঙ্গে আমাদের অসহযোগ।” কিন্তু ওটা শুধু কথার মার-প্যাচ। আসল ও দুটোর মধ্যে কোনো তফাত নেই।

    অনিমেষ এবারও প্রতিবাদ করলেন না। তেমনি নীরবে বসে রইলেন।

    আমি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, আপনি এদের এই অহিংস অসহযোগ বিশ্বাস করেন? নিঃসঙ্কোচে উত্তর এল—না।

    —এদের এই খদ্দর ফিলজফি?

    —তাও করি না।

    —হিন্দু-মোস্‌লেম ইউনিটি?

    —না; সে বস্তুতেও আমার বিশ্বাস নেই।

    আমি হেসে ফেললাম, তাহলে দেখছি, আপনার মত বিশ্বস্ত এবং অকপট সৈনিক এদের আর নেই।

    অনিমেষ গাম্ভীর্য রক্ষা করেই বললেন, কারো মতবাদ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, মলয়বাবু। আমার কাছে মানুষের থিওরির চেয়ে অনেক বড় সেই মানুষটি। সেখানে আমার বিশ্বাস অন্ধ এবং অটল। সে-জায়গায় যদি কোনোদিন ভাঙন ধরে, সেইদিন এ রাস্তা ছেড়ে দেবো।

    ঠিক দু-বছর পরের কথা। মহাত্মাজী তার আগেই ‘হিমালয়ান ব্লাণ্ডার’ ঘোষণা করে সম্মুখ সমর থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। যারা তাঁর এবং তাঁর অধিনায়কদের আহ্বানে স্যর আশুতোষের গোলামখানায় পদাঘাত করে বেরিয়ে পড়েছিল তাদের কানে আবার নতুন মন্ত্র বর্ষিত হচ্ছে—ছাত্রানাম্ অধ্যয়নং তপঃ। কিন্তু সে তপস্যা নতুন করে শুরু করবার পথ কোথায়, সে সম্বন্ধে নেতৃবৃন্দ নীরব। যারা ঘাটেও নহে, পারেও নহে, সেই ঘোর সন্ধ্যাবেলায় তাদের ডেকে নেবার কেউ নেই।

    এমনি সময়ে একদিন ডালহৌসি স্কোয়ারের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল অনিমেষের সঙ্গে। আমি তাঁকে চিনতে পারিনি। চিনবার কথাও নয়। তিনিই আমাকে ডেকে থামালেন। পরনে একটি জীর্ণ খদ্দরের পাঞ্জাবি, জুতো-জোড়া তালির কল্যাণে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। গায়ের উজ্জ্বল রং তামাটে। বয়স বেড়ে গেছে অন্তত দশ বছর।

    বললাম, কী করছেন আজকাল? কলেজে ভর্তি হননি?

    —কই আর হলাম? মা মারা গেলেন। দুটো বড় বড় বোন গলার উপর, আর একটা ছোট ভাই। চাকরি খুঁজছি।

    —চাকরি যখন করতে চান, বি.এ.-টা পাশ করলে সুবিধা হত না?

    অনিমেষ হেসে বললেন, পাশ করতে চাইলেই তো আর করা যায় না। তাছাড়া পাশ করেই বা আর কি লাভ হত? স্বদেশী মামলায় জেল খেটেছি শুনে সবাই দরজা দেখিয়ে দেয়। গভর্নমেন্ট অফিসে তো বটেই, মার্চেণ্ট অফিসগুলো পর্যন্ত। আপনার খোঁজে আছে নাকি কিছু? পনের কুড়ি—যা দেয়, তাতেই রাজী আছি।

    —আচ্ছা, চেষ্টা করবো।

    ঠিকানা লিখে দিয়ে অনিমেষ আবার জনারণ্যে মিলিয়ে গেল। আমি কিছুক্ষণ সেইদিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    এই অনিমেষ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র, তাঁর বিধবা মায়ের এবং দু-তিনটি নিঃসহায় ভাইবোনের একমাত্র ভরসাস্থল। মার একান্ত কামনা ছিল, ছেলে বিদ্বান হবে, মানুষ হবে, সংসারের দুঃখ ঘোচাবে। এই আশা নিয়েই তিনি তাঁর শেষ সম্বল ছেলের কল্যাণে নিঃশেষ করেছিলেন। তারপর কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল। ছেলে কলেজ ছেড়ে আশ্রয় নিল জেলে, আর মায়ের আশ্রয় হল শয্যা। সে আশ্রয় তাঁর ঘুচল না। তারপর একদিন সংসার থেকে তিনি বিদায় নিলেন, সম্ভবত বিনা চিকিৎসায়। রেখে গেলেন দুটি নিরাশ্রয়া অনূঢ়া কন্যা আর একটি সহায়বিহীন শিশুপুত্র। একটি ভদ্র শিক্ষামার্জিত সুখী পরিবার বন্যার জলে ভেসে চলে গেল।

    অনিমেষ একটা দুটো নয়। এমনি হাজার হাজার অনিমেষ এবং তাদের মুখাপেক্ষী আরো কয়েক হাজার নর-নারী শিশু এইভাবেই সেদিন তলিয়ে গেছে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙলার ঘরে ঘরে। কে তার জন্যে দায়ী? যাঁরা রাজনীতির উচ্চ মঞ্চে বিচরণ করেন, তাঁরা হয়তো বলবেন, এরা সব স্বাধীনতার বলি। বৃহৎ সাফল্যের স্রোতের মুখে এই সামান্য ক্ষতি তৃণের মতই ভেসে গিয়ে থাকে সকল দেশে, ইতিহাসের সকল অধ্যায়ে। স্বাধনীতাকামী পরপদানত দেশের এইটাই একমাত্র পরিণাম। অস্বীকার করি না। দেশের বৃহত্তর কল্যাণের গভীর তাৎপর্য মনে মনে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনিমেষের অনাহারক্লিষ্ট শীর্ণ মুখখানা এবং তাকে ঘিরে তিনটি অ-দৃষ্ট, অপরিচিত ও অসহায় কিশোর-কিশোরীর ম্লান মুখ বারংবার চোখের উপর ভেসে উঠতে লাগল।

    একটা কথা জিজ্ঞেস করা হল না। অনিমেষের সেই অন্ধ বিশ্বাস কি আজও অটুট আছে? একটা ক্ষুদ্র ফাটলও কি দেখা দেয়নি কোনোখানে?

  • বারো

    বারো

    অফিসে এসে দেখলাম, ব্যস্ততা দেখাবার মত উপকরণ টেবিলে বিশেষ কিছু সঞ্চিত নেই। অগত্যা ডাকের ফাইলটা টেনে নিয়ে উলটে-পালটে দেখছিলাম। তাও এক সময়ে শেষ হয়ে গেল। তখন সব শেষের চিঠিখানার দিকে চোখ রেখে চুপ করে বসে ছিলাম।

    গুনগুন করে কীর্তন ভাঁজতে ভাঁজতে হৃদয়বাবুর প্রবেশ। হেলমেটটা ব্র্যাকেটে ঝুলিয়ে দিয়ে আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালেন এবং বেশ খানিকটা ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বিষয়টা যেন অত্যন্ত জটিল বলে মনে হচ্ছে, মলয়বাবু! কী ওটা, Differential Calculus, না Law of Relativity?

    আমিও গম্ভীরভাবে জবাব দিলাম, তার চেয়ে জটিল।

    —যথা?

    —নোটিশ পাওয়া গেল, মহম্মদ পর্বতের কাছে যাবেন না; পর্বতমহাশয় অভিযান করছেন মহম্মদের দরবারে।

    —অর্থাৎ?

    —অর্থাৎ ফিঙ্গার-প্রিন্ট কেসের আসামী ভূপেশ সেনের বিচার হবে জেলে! এস. ডি. ও. লিখেছেন কোর্টের আয়োজন করতে।

    হৃদয়দা বললে, এর মধ্যে জটিলতাটা দেখলেন কোথায়?

    বললাম, বিষয়টা তলিয়ে দেখুন। বিচারপ্রার্থী বন্দী প্রকাশ্য বিচারশালায় দাঁড়াবার অধিকার পেল না—

    —বিচারক নেমে এলেন তাঁর বিচার করতে জেলখানায়, কেমন? যোগ করলেন হৃদয়বাবু।

    আমি বললাম, তাই তো দাঁড়াচ্ছে।

    —কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন, এর মধ্যে একটা জিনিস রয়েছে, যার নাম administrative necessity.

    —সেইখানেই তো আমার আপত্তি। শাসনতান্ত্রিক প্রয়োজন যখন বিচারের আদর্শকে ডিঙিয়ে যায়, তখন আর যাই হোক, কোর্টের মর্যাদা রক্ষা পায় না। শাসনদণ্ডের কাছে মাথা নোয়ালো ন্যায়দণ্ড; এর চেয়ে মারাত্মক আর কি হতে পারে?

    —আপনি বড্ড বেশী তলিয়ে গেছেন মলয়বাবু।

    —না হৃদয়দা, আমি একেবারে সারফেস থেকে দেখছি। সবাই জানে, আসামী যতক্ষণ বিচারাধীন আইনের চোখে সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। ব্রিটিশ ল’-এর এই হচ্ছে গোড়াকার কথা। তার দোষমুক্তি প্রমাণের ভার তার নিজের ওপরে নয়, অভিযোক্তাকেই প্রমাণ করতে হবে যে সে অপরাধী। অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেকে সমর্থন করবার তার যে মৌলিক অধিকার সেটা হবে নিরঙ্কুশ এবং তার জন্যে তাকে দিতে হবে পরিপূর্ণ সুযোগ আর অবাধ সুবিধা। এই জেলের মধ্যে তার কোটা সম্ভব, বলুন?

    হৃদয়দা প্রতিবাদ করলেন না। অনুকূল শ্রোতা পেয়ে আমার উৎসাহ বেড়ে গেল এবং তারই ঝোঁকে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে ফেললাম। শেষটায় বললাম, ইংরেজ পৃথিবীকে অনেক কিছু দিয়েছে—অনুপম সাহিত্য, সুগভীর দর্শন এবং মহাশক্তিশালী জড়বিজ্ঞান। কিন্তু আমার মনে হয়, তার সব অবদানকে ছাড়িয়ে গেছে একটা জিনিস, যাকে বলা যেতে পারে Rule of law. ব্যক্তির চেয়ে বড় বিধান এবং তারই কাছে নির্বিচারে মাথা নোয়াবে প্রাইম মিনিস্টার থেকে টম্, ডিক্, হ্যারি,—এটা হল British Jurisprudence-এর প্রথম কথা। অন্য দেশে যান। বেশী দূরে নয়, ইংলিশ চ্যানেল পার হলেই দেখবেন, অত বড় Revolution-এর জন্মভূমি যে ফ্রান্স, সেখানেও আইনের চোখে সব মানুষ সমান নয়। সেখানে রাজপুরুষদের জন্যে বিশেষ আইন, তাদের বিচারের জন্যে স্বতন্ত্র বিচারশালা। একজন সাধারণ ইংরেজের চোখে সেটা শুধু বিসদৃশ নয়, অন্যায়। সাম্রাজ্যের স্বার্থে সেই ইংরেজকে আজ কোথায় টেনে নামিয়েছে!

    বক্তৃতার নেশায় লক্ষ্য করিনি যে হৃদয়বাবুর পদযুগল ইতিমধ্যে কখন টেবিলের তলা থেকে উপরে প্রমোশন লাভ করেছে। দেহের ভঙ্গী অর্ধশয়ন, চক্ষু মুদ্রিত এবং হস্তে অর্ধদগ্ধ সিগারেট।

    —ঘুমুলেন নাকি, হৃদয়দা?

    —ঘুমুতে আর দিলেন কই?

    —একদম ঝিম্ ধরে গেলেন যে! সাড়া-শব্দ দিন।

    হৃদয়বাবু টেবিলের উপর থেকে পা নামিয়ে এবার সোজা হয়ে বসলেন। তারপর গম্ভীরমুখে বললেন, আপনার আলোচ্য বিষয় সম্বন্ধে আমার জ্ঞান এত গভীর যে, কোনো রকম মন্তব্য করে বাচালতা প্রকাশ করবো না। আপনার বক্তৃতা শুনে অন্য একটা কথা মনে হল। তাই শুধু বলবো। সেটা আমার একটা থিওরি। শুনে আবার হাসবেন না তো? বললাম, যদি হাসি, বলতে হবে আপনার থিওরি সার্থক। পৃথিবীতে বেশীর ভাগ থিওরিই তো কেবল চোখের জলের সৃষ্টি করে গেছে।

    হৃদয়বাবু এবার চারিদিকটা দেখে নিয়ে চাপা গলায় বললেন, আজ হোক, কাল হোক, ইংরেজকে একদিন জাল গুটিয়ে সরে পড়তেই হবে। সেদিন যদি বেঁচে থাকি, পেনসন তো পাবো না নিশ্চয়ই; অথচ পেটের সংস্থান তো করতে হবে। তাই ঠিক করেছি একখানা ইস্কুল-পাঠ্য ইতিহাস লিখবো। তাতে একটা অধ্যায় থাকবে—ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। কি কারণ? উত্তর—ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন। ইংরেজের সঙ্গে সত্যিকার বিশ্বাসঘাতকতা যদি কেউ করে থাকে, তা সে নিজের ভাষা। থিওরিটা মনঃপূত হল না, কি বলেন?

    আমতা আমতা করে বললাম, কেমন যেন বোধগম্য হচ্ছে না।

    হৃদয়বাবু এবার নড়েচড়ে বসে বললেন, ভেবে দেখুন তো একবার, ১৮৫৭ সালের পর ওদের রাজত্বের ভিত যখন পাকাপোক্ত হয়ে বসল, কত আশা করে এই ভাষাকে ওরা নিয়ে এসেছিল সেই সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর ওপার থেকে। উদ্দেশ্য কি? একমাত্র সাম্রাজ্য বিস্তার। ভেবেছিল, এর কয়েকটা ডোজ পেটে পড়লেই নেটিভের প্রাণে রাজভক্তির বাণ ডেকে যাবে। বশংবদ কেরানী সরবরাহের অভাব হবে না কোনোদিন। সেদিকে ওরা ভুল করেনি। কিন্তু কি জানি, কোথায় ছিল একটুখানি হিসেবের গোল। তাই ইংরেজি ইস্কুলের কারখানা থেকে কাতারে কাতারে কেরানী যেমন তৈরী হল, তার সঙ্গে বেরোল আর একরকম জীব, আপনাদের ইকনমিকসের ভাষায় যাকে বলে by-product, অর্থাৎ কয়লার খনি থেকে যেমন বেরিয়ে আসে দু-চারখানা কমল হীরে। এদের চেহারা একেবারে আলাদা। ডোজ-মাপা বিদ্যার বরাদ্দটুকু পান করেই তারা ক্ষান্ত হল না, নিঃশেষে শুষে নিল পশ্চিম দিগন্তের বিপুল জ্ঞান-ভাণ্ডার; এবং তারই জেরে মোক্ষম আঘাত দিল সাম্রাজ্যের বুকের উপর। এদের চিনতে পারছেন নিশ্চয়ই। এরাই হচ্ছে আপনাদের গোখলে, গান্ধী, সুভাষ, প্যাটেল, চিত্তরঞ্জন, জওহরলালের দল—কেরানী ফ্যাক্টরির মারাত্মক by-product; ইংরেজি পণ্ডিতের গুরুমারা চেলা। টোল বা মক্তব থেকে এদের জন্ম হত না কোনোদিন।

    —শুধু কি এরাই? বলে চললেন হৃদয়বাবু, আমার মনে হচ্ছে ফ্যাক্টরি থেকে আসল মাল আর বেরোচ্ছে না। আজকাল যা কিছু আসছে সবই ঐ by-product, তফাত শুধু প্যাকিং মোড়কটার। কোনোটা খদ্দর কোনোটা আবার খাকী—

    বলে তিনি চোখের কোণ দিয়ে আমার দিকে একটু বিশেষভাবে তাকালেন। তারপর বললেন, আপনি আপসোস করছিলেন না?—সেই ইংরেজ আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে! আপসোস আমারও হয়। তবে সেটা অন্য কারণে—কী ওরা চাইল, আর কী ঘটল! লোকে শিব গড়তে বাঁদর গড়ে। ওরা বাঁদর গড়তে শিব গড়ে ফেলল। বানাতে গেল আরো গোটাকয়েক হৃদয় সামন্ত, কপালদোষে সেগুলো হয়ে গেল মলয় চৌধুরী। হৃদয়দা নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে উঠলেন। খোদা বক্‌স, মোয়াজ্জেম হোসেন আরও কে কে তখন ঘরে ঢুকছে।

    —কী খবর হৃদয়দা, বড্ড ফুর্তি যে আজ?

    —আরে ভাই, বল কেন? এত কষ্ট করে একখানা নতুন গান লিখলাম, তা মলয়বাবুর মোটেই পছন্দ হল না। মুখখানা কি রকম তোলো হাঁড়ি করে বসে আছেন, দ্যাখ।

    মোয়াজ্জেম হোসেন বললেন, কি গান লিখলেন, আমরা একটু শুনতে পাইনে? হৃদয়বাবু চাপা গলায় কীর্তনের সুরে গাইলেন,

    প্রভাতে উঠিয়া
    হুঁকা হাতে নিয়া
    কানু কহিলেন, রাই গো,
    তোমার মালসাতে কি আগুন আছে?

    একটা হাসির রোল উঠিল।

     

    কোর্ট বসল সুপারের ঘরে।

    হাকিম সদ্য আমদানী ব্রিটিশ সিভিলিয়ান। বেশভূষায় চেষ্টাকৃত তাচ্ছিল্যের লক্ষণ সুস্পষ্ট। পাইপ সংযোগে দুর্বোধ্য ভাষাকে অধিকতর দুর্বোধ্য করবার যে মনিব-সুলভ প্রচেষ্টা, তাতে এখনো পুরোপুরি দক্ষ হয়ে ওঠেননি। আসামী ভূপেশ সেন স্বদেশী মামলায় জেল খাটছে, কিন্তু পুলিশের বিশ্বাস, ওটা তার একটা গৌরবময় আবরণ। আসলে সে অন্ধকারের জীব। অতএব কর্তৃপক্ষের হুকুম এল, তার আঙুলের ছাপ দিতে হবে পুলিশের খাতায়। ভূপেশ করল যথারীতি অস্বীকার। তারই জের এই মামলা

    হাকিম তাঁর নবলব্ধ বাঙলায় প্রশ্ন করলেন, টুমি টিপ্ ডিটে অস্বীকার আছো?

    ভূপেশ দু-বগলে হাত পুরে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

    ম্যাজিস্ট্রেট সুর চড়িয়ে বললেন, জবাব ডাও।

    ভূপেশ নিরুত্তর। কোর্ট-ইনস্পেক্টর অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিলেন। সেদিকে ফিরে সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, Is your accused deaf and dumb, Inspector?

    — I am examining him, Your Honour. ব্যস্ত হয়ে জবাব দিলেন ইনস্পেক্টর। তারপর ভূপেশের দিকে ফিরে বললেন, কি মশাই, হাকিম কি বলছেন, শুনতে পাচ্ছেন না?

    ভূপেশ জবাব দিল ইংরাজীতে, পাচ্ছি। আপনার সাহেবকে বুঝিয়ে দিন, ভদ্রলোকের কাছ থেকে জবাব পেতে হলে প্রশ্নের ভাষাও ভদ্র হওয়া দরকার।

    —হোয়াট! রুখে উঠলেন সাহেব। কিন্তু এবার প্রশ্ন করলেন ইংরেজিতে, আমি জানতে চাই তুমি টিপ্ দেবে কিনা?

    ভূপেশ জবাব দিল, না।

    —না ডিলে কঠোর শাস্তি পেটে হবে।

    ভূপেশ হেসে বলল, বৃথা আস্ফালন না করে, সেটা চটপট দিয়ে ফেললেই তো পার এমনি করে চলল কিছুক্ষণ বাদানুবাদ—একে আই. সি. এস এস. ডি. ও, তায় নবাগত। কালা আদমীর ঔদ্ধত্য সহ্য করবার কথা নয়, অভ্যাসও হয়নি। তিনি যে কোর্টে, একথা সম্ভবত মনে রইল না। হঠাৎ হুকুম দিয়ে বসলেন, Take his finger-impression by force.

    ইনস্পেক্টর ইতস্তত করতে লাগলেন। জোর করে টিপ্ নেওয়া যদি চলত, তাহলে আর এত মামলা-মোকদ্দমার প্রয়োজন ছিল কী?

    সাহেবের ধৈর্যের বাঁধ একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। বিকট চীৎকার করে উঠলেন, পাকড়ো উসকো। দুজন কনস্টেবল এগিয়ে এসে ভূপেশকে ধরতেই সে এক ঝাপটায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হুঙ্কার দিল—বন্দেমাতরম্।

    —শাট্ আপ্‌, ইউ স্কাউড্রেল! গর্জে উঠলেন এস. ডি. ও।

    উত্তরে এল পালটা গর্জন—মহাত্মা গান্ধীজী কী জয়!

    জেলের ভিতর থেকে শত কণ্ঠে উঠল তার প্রতিধ্বনি—মহাত্মা গান্ধীজী কী জয়!

    সাহেবের লাল মুখ থেকে মনে হল রক্ত ফেটে পড়বে, আর চোখ থেকে ঠিকরে পড়বে আগুন। নীচের ঠোঁট সজোরে কামড়ে ধরে একবার তাকালেন ভূপেশের দিকে। মুহূর্তে সে দৃষ্টি নেমে এল টেবিলের উপর। সেখানে পড়েছিল তাঁর হান্টার। হঠাৎ সেটা তুলে নিয়ে সপাং করে বসিয়ে দিলেন আসামীর উদ্ধত কপালে। ভূপেশ ঘুরে পড়ে গেল এবং দু’হাতে কপাল চেপে ধরে সমস্ত শক্তি দিয়ে বলে উঠল, মহাত্মা গান্ধীজী কী জয়

    পঁচিশ হাত দূরে জেল-গেট। খবর পৌঁছতে লাগল পঁচিশ সেকেণ্ড। তারপর শুরু হল তাণ্ডব। গেট রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ল গেট-কীপারের পক্ষে। উপায়ান্তর না দেখে সে বাজিয়ে দিল পাগলা ঘণ্টা। ফতুয়া গায়ে চটি পায়ে ছুটে এলেন জেলর সাহেব। আর তার পিছনে ততোধিক বিচিত্র বেশে আমরা, তাঁর অনুচরবৃন্দ। রাইফেলধারী স্কোয়াড গেট পার হয়ে থেমে গেল। সমস্ত রাস্তা জুড়ে লাইন করে বসে আছে বন্দীর দল। ‘বন্দে মাতরম্’ থেমে গেছে; কিন্তু সবারই মুখে উৎকণ্ঠা, চোখে উত্তেজনা। নেতৃস্থানীয় কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রথম লাইনে, গেটের ঠিক সামনেটায়। তাদেরই একজনকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করলেন তালুকদার সাহেব, ব্যাপার কি বরেনবাবু?

    ক্ষীণকায় বরেনবাবু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ব্যাপার তো দেখতেই পাচ্ছেন। গুলি চালান, রাস্তা সাফ হয়ে যাবে। একটাকে তো ওদিকে সাবাড় করে এলেন।

    —কাকে আবার সাবাড় করলাম? বলছেন কি আপনি!

    বরেনবাবু শ্লেষের সঙ্গে বললেন, আকাশ থেকে পড়লেন যেন মনে হচ্ছে। ভূপেশ সেন খতম—সে সুসংবাদ কি জানা নেই আপনার?

    —ভূপেশ সেন খতম! সত্যিই আকাশ থেকে পড়লেন তালুকদার। ফোর্স ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন এবং গেটের বাইরে আসতেই, ডিমিস্ করবার হুকুম দিলেন। সবাই মিলে ছুটে গেলাম অফিসে। কোর্টের চিহ্নমাত্র দেখা গেল না। হাকিম, পেস্কার, ইনস্পেক্টর, সিপাহী সব যেন ভোজবাজির মত উড়ে গেছে। মেঝের উপর চিত হয়ে পড়ে আছে আসামী ভূপেশ সেন। কপালের ক্ষত থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে দু-চারজন জেলের লোক। ডাক্তার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল তুলো আর ওষুধ নিয়ে। পিছনে স্ট্রেচার হাতে দুজন সাধারণ কয়েদী।

    ঘটনা যা ঘটবার ঘটে গেল। আমাদের কাজ হল রিপোর্ট দেওয়া। সে রিপোর্টের ভাষা কতটা জোরালো হলে জেলের তরফ থেকে উপযুক্ত প্রতিবাদ জানানো হবে, অথচ শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের ক্রোধের উদ্রেক হবে না, এইটাই হল বিবেচনার বিষয়। প্রথম দিকটার উপর জোর দিলেন স্বল্পাভিজ্ঞ সুপার, যুদ্ধ-প্রত্যাগত উষ্ণরক্ত ক্যাপ্টেন, মর্যাদা সম্বন্ধে যিনি অতিমাত্রায় আত্মসচেতন; আর দ্বিতীয় বিষয়টা বিশেষভাবে আঁকড়ে রইলেন বহুদর্শী, শীতল-শোণিত প্রৌঢ় জেলর, প্রেস্টিজের ফাঁকা বুলি যাঁর কাছে একেবারেই অর্থহীন। এই দুই বিরুদ্ধ শক্তির সমন্বয়ে রিপোর্টের মুসাবিদা যখন ধীর গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, এমন সময় সাইকেল মারফত সুপারের নামে জরুরী চিঠি এসে উপস্থিত। এস. ডি. ও সাহেব লিখছেন, একটা বেয়াড়া এবং বিপজ্জনক আসামীকে দমন করবার জন্যে কোর্টের মধ্যেই কিঞ্চিৎ বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়েছিল। জেলসুপারের আফিসে বসে এই অপ্রিয় কর্তব্য পালন করতে হয়েছে বলে তিনি ক্ষমা চাইছেন এবং আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ করছেন।

    ক্যাপ্টেন ব্যানার্জি চিঠিখানা তালুকদার সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন, লোকটা একেবারে কাঁচা। ইটনের গন্ধ এখনো মুখ থেকে যায়নি, দেখছি। নিজের মৃত্যুবাণ পাঠিয়ে দিয়েছে নিজের হাতে,—বলে হো হো করে হেসে উঠলেন।

    ব্যানার্জির উল্লসিত হবার কারণ ছিল। এই ক’দিন আগেই ক্লাবের পানশালায় তাঁর মিলিটারী কৌলীন্যের প্রতি অমার্জনীয় তাচ্ছিল্য দেখিয়েছে এই অর্বাচীন এবং উন্নাসিক সিভিলিয়ান। সেই আক্রোশের জ্বালা মেটাবার সুযোগ উপস্থিত।

    চিঠিখানা পকেটস্থ করে বিজয়ীর আনন্দ নিয়ে তিনি ছুটলেন এই ছোট হাকিমের উপরওয়ালা বড় হাকিম অর্থাৎ স্বয়ং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দরবারে। সে তক্তে যিনি অধিষ্ঠিত, তিনি বিলাতী সিভিলিয়ান। কিন্তু তফাত অনেক। তাঁর মুখে ইটন বা অক্সফোর্ডের গন্ধ একেবারে লুপ্ত হয়ে গেছে, উগ্র হয়ে উঠেছে খাঁটি এবং পুরোদস্তুর ‘ভারতীয়’ গন্ধ। তাঁর তাম্রাভ দেহ-চর্মে এবং কেশ-বিরল-মস্তকে দেশী সূর্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। চিঠিখানা তিনি নিঃশব্দে পাঠ করলেন এবং ধীরভাবে পকেটে পুরলেন। তারপর ঘটনা সম্বন্ধে একটা মোটামুটি আভাস গ্রহণ করে বিনয় ও সৌজন্যে বিগলিত হয়ে বললেন, আপনি যে এতটা কষ্ট স্বীকার করেছেন, এজন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, ক্যাপ্টেন ব্যানার্জি। এসব অপ্রিয় ব্যাপারে আপনাকে আর বিব্রত হতে হবে না। বাকী যেটুকু আমার হাতে ছেড়ে দিন। যা কিছু করবার, আমিই করবো, বলেই উঠে দাঁড়িয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন ব্যানার্জির দিকে। ইঙ্গিতটা বুঝতে কষ্ট হল না। সুপার-সাহেব কলের পুতুলের মত সেই প্রসারিত হাতখানায় কোনো রকমে একটা দোলা দিয়ে নিঃশব্দে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

    ‘মৃত্যুবাণের’ পরিণাম যে এই দাঁড়াবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি ক্যাপ্টেন ব্যানার্জি।

    প্রতিশ্রুত ‘অ্যাকশনে’ বিলম্ব হল না। যথারীতি একোয়ারী কমিটি নিযুক্ত হল। মেম্বর দুজন—ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং এবং তাঁর সঙ্গে রইলেন কারাবিভাগের বড়কর্তা, ততোধিক ঝানু এবং পক্বকেশ শ্বেতাঙ্গ আই. এম. এস্.। যথাসময়ে তাঁরা দর্শন দিলেন আবার এই সুপারের ঘরে।

    প্রথম আলোচনার বিষয় হল মেডিক্যাল সাক্ষ্য। রিপোর্ট রয়েছে দু-খানা। প্রথমটা দিয়েছেন ক্যাম্‌বেল-ফেরত এস্. এ. এস্। দ্বিতীয়টা, লড়াই-ফেরত আই. এম. এস। একজন নগণ্য জেলডাক্তার; আর একজন মহামান্য সিভিল সার্জন। তাঁদের মতের পার্থক্যও পদানুরূপ। আমাদের ডাক্তার লিখেছেন, ক্ষতের পরিমাণ তিন ইঞ্চি লম্বা এবং এক ইঞ্চি গভীর। সম্ভবত লাঠি বা ঐজাতীয় কোনো কঠিন বস্তু দ্বারা আঘাতের ফলে তার উৎপত্তি। সিভিল সার্জনের মতে, আঘাতের পরিধি এক ইঞ্চি দীর্ঘ, এক-চতুর্থাংশ ইঞ্চি প্রস্থ; উৎপত্তির কারণ—কোনো কঠিন বস্তুর উপর আকস্মিক পতন।

    জেলডাক্তারকে তলব করা হল। ম্যাজিস্ট্রেট-সাহেব দুখানা রিপোর্টই তাঁর হাতে দিয়ে বললেন, এ সম্বন্ধে আপনার কিছু বলবার আছে?

    ডাক্তার বললেন, নো স্যার।

    ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন, রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে আপনি ক্ষত পরীক্ষা করেছিলেন ২৪ তারিখে, আর সিভিল সার্জন করেছেন ২৫ তারিখে। একদিনের ব্যবধানে কোনো আঘাতের এতখানি উন্নতি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন? ডাক্তার জানালেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছুই বলবার নেই। ইনস্পেক্টর-জেনারেল বললেন, আপনার রিপোর্ট থেকে এই সিদ্ধান্ত আমাদের করতে হচ্ছে যে, হয় আপনার সাধারণ জ্ঞানের অভাব, নয়তো আপনি সরকার-বিরোধী কোনো প্রভাবের অধীনে পরিচালিত হয়েছিলেন।

    ডাক্তার বললেন, সে সম্বন্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই।

    আমাদের অফিসে দুজন কেরানী ছিল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। সুপারের আদেশে তাদের একটা জবানবন্দী নেওয়া হয়েছিল এবং সে-কাজটা পড়েছিল আমার উপর। অত্যন্ত জোরের সঙ্গে তারা প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করেছিল। সুতরাং বিবৃতির ভাষাটাও ছিল * অনুরূপ জোরালো। তার একটা নকল কমিটির কাছে পেশ করা হয়েছিল। সুতরাং কেরানীদ্বয়ের ডাক পড়ল। ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্ন করলেন, আপনারা কদ্দূর লেখাপড়া করেছেন? একজন বলল, সে ম্যাট্রিক পাশ করে আই. এ. পর্যন্ত পড়েছে, আর একজন জানাল সে আই. এস. সি পাশ করেছে।

    —তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, এ বিবৃতি আপনাদের নয়?

    —আজ্ঞে, ওটা আমাদেরই স্টেটমেণ্ট।

    ম্যাজিস্ট্রেট বিস্ময়ের সুরে বললেন, এরকম ইংরেজি আপনারা বলতে বা লিখতে পারেন?

    তারা জানাল, আমরা বাংলায় বলেছি; ডেপুটি জেলর মলয়বাবু সেটা ইংরেজিতে তর্জমা করে লিখেছেন।

    ম্যাজিস্ট্রেট আশ্বস্ত হয়ে বললেন, ও-ও, তাই বলুন। মলয়বাবু ঠিকমত তর্জমা করলেন কিনা, সেটা অবশ্যই আপনাদের জানবার কথা নয়।

    কেরানীদ্বয় নিরুত্তর।

    সকলের শেষে এলেন কোর্ট-ইনস্পেক্টর। আসামীর আকৃতি এবং প্রকৃতি সম্বন্ধে একটা ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে বললেন, কেস সম্পর্কে হাকিমের সঙ্গে আসামীর দু-চারটে কথা- কাটাকাটি হচ্ছিল। হঠাৎ লোকটা আস্তিন গুটিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এস. ডি. ও. সাহেবের উপর। আমরা তখনো এগিয়ে যেতে পারিনি। হাকিম উঠে দাঁড়িয়ে দু-হাত দিয়ে এমনি করে ঠেকাতে গেলেন। তাঁর হাতে লেগে আসামী ছিটকে পড়ল ঐ ধারে। ওখানে ছিল একটা টেবিল। বোধ হচ্ছে ঐ টেবিলটাই হবে। ওরই কোণে লেগে একটুখানি কেটে গেল কপালের এই ডান দিকটায়।

    কমিটির মেম্বারদ্বয় পরস্পরের দিকে তাকালেন। উভয়ের মুখেই ফুটে উঠল একটা নিশ্চিন্ত তৃপ্তির ভাব। মনে হল, এতক্ষণ তাঁরা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন। ইনস্পেক্টর তাঁদের আলোকের সন্ধান দিয়ে রক্ষা করলেন।

    কমিটির রায় আপাতত মুলতুবি রইল। কিন্তু তাঁদের আসন্ন সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে আমাদের কারুরই কোনো সন্দেহ রইল না!

    সাহেবরা চলে গেলে ইনস্পেক্টরও যাবার আয়োজন করছিলেন। জেলরসাহেব ডেকে বললেন, এত তাড়া কিসের? আসুন না, একটু চা খাওয়া যাক। ছোকরাদের মধ্যে কে একজন বলল, হ্যাঁ, বড্ড পরিশ্রম গেল আপনার। গলাটা একটু ভিজিয়ে নিন, স্যার।

    সুধাংশু বলে উঠল, সত্যি একখানা সীন যা দেখলাম; তার মধ্যে আবার সবচেয়ে সেরা পার্ট আপনার। বিবেকটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন, দাদা?

    কে একজন বলল, দাদার ওসব বিবেক-টিবেকের বালাই নেই।

    জেলর সাহেব বিরক্তি প্রকাশ করলেন। একটু ধমকের সুরে বললেন, আহা, থাম নারে বাপু।

    ইনস্পেক্টর কিন্তু বিরক্তির লক্ষণ দেখালেন না। চায়ে চুমুক দিয়ে হাসি মুখেই বললেন, বলতে দিন। ছেলেছোকরাদের কথা গায়ে মাখলে চলে না। একটু থেমে চায়ের কাপে আরো গোটাকয়েক চুমুক দিয়ে বললেন, বিবেকের কথা কে বলছিলে, ভাই? তুমি? ‘তুমি’ বলছি বলে মনে কিছু করো না যেন।

    —না, না। মনে করবো কেন? আপনি স্বচ্ছন্দে বলুন।

    ইনস্পেক্টর সিগারেট ধরিয়ে দু-একটা টান দিয়ে বললেন, সত্য-নিষ্ঠা, মহানুভবতা— ইত্যাদি বড় বড় বুলি তোমাদের বয়সে আমরাও অনেক ঝেড়েছি। তারপর দেখলাম ওগুলো ঐ স্বদেশীওয়ালাদের খদ্দরের ঝোলাতেই মানায় ভাল। যারা কাজের লোক, অর্থাৎ সংসারে যাদের উপার্জন করে খেতে হয় এবং দশজনকে খাওয়াতে হয়, তাদের ওসব বালাই থাকলে সত্যিই চলে না। চাকরি যখন করতে হবে, তখন একমাত্র লক্ষ্য হবে উন্নতি, অর্থাৎ মনিবকে খুশী রাখা। গোটা দুই মিছে কথা বলে যদি সে কাজটা হাসিল করা যায়, দোষের তো কিছুই দেখি না।

    ‘সুধাংশু বলল, এ একেবারে খাঁটি কথা বলেছেন দাদা। আপনার উন্নতি মারে কে? প্রমোশন বলুন, খেতাব বলুন সব আপনার হাতের মধ্যে।

    এসব কথার কোনো জবাব না দিয়ে ইনস্পেক্টর বললেন, তোমাদেরও বলি, এ পথে যখন এসেছ, এই পথ ধরেই চল। দু’নৌকায় পা দিও না। হঠাৎ একদিন কোথায় তলিয়ে যাবে টেরও পাবে না। ঐ বিবেকের বোঝা সেদিন কোন কাজেই লাগবে না।

    হৃদয়বাবুকে খুঁজে পাওয়া গেল, জেলের পাশে একটা খেজুর গাছের ঝোপ ছিল, তারই এক কোণে।

    —এখানে বসে কি করছেন, দাদা?

    —ভাবছি।

    —কি ভাবছেন?

    —ভাবছি, আমার ইতিহাসখানা এবার আরম্ভ করা দরকার।

    —এত শীগগির?

    —শীগির কোথায় দেখছেন? ওদের তো হয়ে এল। ঘুণে ধরা বাড়ি ভেঙে পড়তে আর দেরি নেই।

    ভেঙে পড়বে! ঐ ইনস্পেক্টরের মত লোহার পিলার ওদের কত আছে তার খবর রাখেন?

    —যতই থাক, তবু আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, দিন ওদের ঘনিয়ে এসেছে। ভীরুর রাজত্ব বেশিদিন টেকে না মলয়বাবু।

    —ভীরু!

    হৃদয়বাবু সোজা হয়ে বসে বললেন, ভীরু নয়? তেরো বছর আগেকার কথা স্মরণ করুন। ১৯১৯ সাল। নিরীহ চাষাভূষা, অসহায় নারী আর অবোধ শিশুর রক্তে ভেসে গেল জালিয়ানওয়ালাবাগ। আমরা যেমন করে ইঁদুর মারি, ঘরের নর্দমা বন্ধ করে ঠেঙিয়ে ওরা তার চেয়েও অনায়াসে গুলি করে মারল মানুষ। গুলি করতে যাদের পারলো না, তাদের পিঠে ভাঙল চাবুক। লজপত রায়কে ধরে বুকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল প্রকাশ্য রাজপথে এমনি দিনের বেলায়। তারপরে এল এমনিধারা এক কমিশন। মনে আছে কি বলেছিল জেনারেল ডায়ার? বুক টান করে বলেছিল, হাঁ আমি মেরেছি এবং বেশ করেছি। আরো মারতাম যদি গুলি ফুরিয়ে না যেত

    তাঁর পেছনে এসে দাঁড়াল মাইকেল ওডায়ার। বললেন, Dyer is right. তারই প্রতিধ্বনি উঠল পার্লামেন্টে, উঠল ওদের প্রেসে এবং অসংখ্য সভা-সমিতির প্রকাশ্য অধিবেশনে। ভেবে দেখুন একবার বুকের পাটা! আমাদের রাজ্য; আমরা যেমন করে পারি শায়েস্তা করবো। এই তো পুরুষের মত কথা। আর আজ? সামান্য একটা লাঠির খোঁচা মুছে ফেলবার জন্যে কী রকম হিমশিম খেয়ে গেল এতগুলো জাঁদরেল আই. সি. এস. আর আই. এম-এস. এর গোষ্ঠী। ইনস্পেক্টরকে শিখণ্ডি খাড়া করে লুকিয়ে রইল জঘন্য মিথ্যার ধামা মাথায় দিয়ে। কি জন্যে, না গোটাকয়েক নিরীহ কাগজওয়ালার বাক্যবাণের ভয়ে।

    হৃদয়বাবুর কণ্ঠে এই ঝাঁজ এবং তাঁর সদাপরিহাসদীপ্ত মুখে এইরকম তীব্র ঘৃণার কুঞ্চন কোনোদিন দেখিনি। নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম। উনি তেমনি তিক্ত কণ্ঠে বললেন, জানেন মশাই, ইংল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী একদিন দম্ভভরে এদেরই নাম দিয়েছিলেন স্টীল ফ্রেম। সে স্টীলের আর জোর নেই। তার আগাগোড়া মরচে ধরে গেছে। অত বড় জাতটার গোটা মেরুদণ্ডটাই বেঁকে গেছে। রাজদণ্ড বইবার শক্তি আর নেই।

    —তাই তো বলছিলাম, এবার আমার বই শুরু না করবার আর কারণ দেখি না। হ্যাঁ, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।

    —কি কাজ, বলুন।

    হৃদয়দা অনুনয়ের সুরে বললেন, আপনার জানাশুনা হোমরা-চোমরা ব্যক্তি দু-চারজন নিশ্চয়ই আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরতলায়। একটু তদ্বির-টদ্বির করবেন ভাই, বইখানা যেন আমার উতরে যায়।

  • তেরো

    তেরো

    বৈষ্ণব তীর্থযাত্রীর চরম লক্ষ্য যেমন শ্রীবৃন্দাবন, আমাদের অর্থাৎ কারাসেবক-যাত্রীর পরম তীর্থ তেমনি সেন্ট্রাল জেল। ডিস্ট্রিক্ট আর স্পেশাল জেলগুলো যেন ওয়েসাইড স্টেশন। সেন্ট্রাল হল টার্মিনাস। এখানে এলে মনে হবে, হ্যাঁ, এইবার এসে পড়েছি। আমার প্রথম মনিব মোবারক আলি তাঁর ক্ষুদ্র পার্বত্য রাজ্যটির দিকে তাকাতেন আর বলতেন, আরে ছ্যা, এ আবার একটা জেল! চাকরি করা গেছে বটে সেই অমুক সেন্ট্রাল জেলে। কর্নেল ম্যাকফারসন্ সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট, গণপতি সান্যাল জেলর। সে সব দিন— ইত্যাদি। বলতে বলতে চোখ দুটো তাঁর সজল হয়ে উঠত। মুখের উপর দীপ্ত আলো ফুটিয়ে তুলত সেই কটি গৌরবময় দিন, আলি-সাহেবের জীবনে যারা এনেছিল ‘পরম লগন’। কোনো দুর্বল মুহূর্তে একদিন তিনি আমার কাছে ব্যক্ত করেছিলেন তাঁর জীবনের চরম আকাঙ্ক্ষা। রাজত্ব নয়, মন্ত্রিত্ব নয়, জমিদারি-জায়গীরদারিও নয়, কোনো একটি সেন্ট্রাল জেলে জেলরের উচ্চাসন। কিন্তু হায়! এ আশা তাঁর জীবনে পূর্ণ হয়নি। থাক সে কথা।

    ‘স্বদেশী স্পেশ্যাল’ থেকে সেন্ট্রালে যেদিন প্রথম এলাম, মনে হল দীনেশ পণ্ডিতের গ্রাম্য পাঠশালা থেকে আর একবার শহরের মিশনারী ইস্কুলে পড়তে এসেছি। এলোপাথাড়ী হট্টগোলের এলাকা শেষ হল। ঢুকলাম এসে সুশৃঙ্খল এবং সুসংবদ্ধ নিয়মের রাজ্যসীমায়। দু-ধারে সুবিন্যস্ত পুকুর, বাগান, ফুলের কেয়ারী। এখানকার যারা অধিবাসী, তাদের পোশাক অভিন্ন। জাঙ্গিয়া কুর্তা, কোমরে গামছা, মাথায় টুপি। তারা ‘ফাইলে’ চলে, ফাইলে বসে, ফাইলে খায় এবং ফাইলে করে ঘুমোয়। এদের দৈনন্দিন জীবন কতগুলো প্যারেডের সমাহার—ল্যাট্রিন প্যারেড, বেদিং প্যারেড, ফীডিং প্যারেড, ওয়াশিং প্যারেড, আরো কত কি প্যারেড। সুদক্ষ সেনানায়কের মত এই প্যারেডগুলো চালনা করে যেসব কয়েদীপ্রধান, তাদের নাম মেট। তাদের পরনে কুর্তার বদলে কোট, কোমরে চাপরাশ, পায়ে স্যাণ্ডাল। এই মেট-গোষ্ঠীই হচ্ছে কারা-শাসনের স্টীল-ফ্রেম, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে বৃহৎ বৃহৎ জেলের ডিসিপ্লিন। আহারে, বিহারে, কর্মে এবং দুষ্কর্মে সাধারণ কয়েদীর জীবনযাত্রা এই মেট-রাজতন্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা মেটের ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে, মেটের ডাকে জাগে।

    সেন্ট্রাল জেলের রাষ্ট্রতন্ত্রে সুপারের যে Sovereignty বা পূর্ণাধিপত্য, সেটা হচ্ছে de jure। ডি ফ্যাকটো অধীশ্বর যিনি, তাঁর নাম চীফ হেড ওয়ার্ডার বা বড় জমাদার। মেট রাজতন্ত্রের তিনিই কর্ণধার এবং তাঁরই হাতে আসল শাসনদণ্ড। সুপারের হাতে যে শাসন, সেটা হচ্ছে Rule of Law, আর চীফের হাতে যে শাসন তার নাম Rule of Awe —প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয়টা যে অনেক বেশী কার্যকরী, সে বিষয়ে অভিজ্ঞ মুরুব্বিমহলে দ্বিমত নেই। লাঠির মাহাত্ম্য কতখানি জীবন্ত, এইখানে এসেই প্রথম প্রত্যক্ষ করলাম, এবং সেই সঙ্গে উপলব্ধি করলাম, বঙ্কিমচন্দ্র যে লাঠি প্রশস্তি গেয়ে গেছেন, এ যুগেও তার মধ্যে কিছুমাত্র অত্যুক্তি পাওয়া যাবে না।

    কারারাজ্যের প্রধান বিভাগ দুটি—General Department বা সাধারণ বিভাগ আর Manufactory Department বা উৎপাদন বিভাগ। প্রথমটির উপর ন্যস্ত রয়েছে তার শাসকমণ্ডলীর পরিবহন এবং শাসিত বাহিনীর পরিচালন, তাদের খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ডিসিপ্লিন। দ্বিতীয়টিতে জড়িত রয়েছে শিল্প, বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থান সেন্ট্রাল জেলগুলো শুধু জেল নয়, ছোটখাটো শিল্পকেন্দ্র, নানা শিল্পের মিলনক্ষেত্র— ঘানি, তাঁত, সতরঞ্চি, দরজি-শালা, বাঁশ, বেত, কাঠ এবং লোহালক্করের জড়াজড়ি। এখানে টাটানগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে আমেদাবাদ, বৌবাজারের সঙ্গে খিদিরপুর। এ ছাড়া জেলপ্রাচীরকে বেষ্টন করে রয়েছে তার বিস্তৃত সবজি-ক্ষেত।

    সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ফোরম্যান পরিতোষবাবু খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিলেন। গর্বের সঙ্গে বললেন, সব তাঁর নিজের হাতে গড়া। কিন্তু কী লাভ ভূতের বেগার খেটে? ডেপুটি সুপার হবার পথ খোলা নেই কোনো কালা আদমির। ওটা শ্বেতচর্মের বিশেষ অধিকার, মগজের বর্ণ তার যাই হোক। সর্ ওয়ার্কশপে পুরোদমে কাজ চলেছে। শুধু একটা দেখলাম বন্ধ। পরিতোষবাবু বললেন, এটা হচ্ছে পেতল-কাঁসার কারখানা। ক’দিন আগেও এখানে দাঁড়ালে মাথা ধরে যেত এর ঠনাঠন্ শব্দে।

    জিজ্ঞেস করলাম, কী তৈরী হত এখানে?

    পরিতোষবাবু বললেন, বেশির ভাগ ঘণ্টা—ছোট বড় নানারকমের গঙ্। জেলে জেলে যে-সব ঘণ্টা দেখেন, সব আমাদের তৈরি। শুধু জেল কেন, ইস্কুল, কলেজ, থানা, কাছারি, চার্চ এবং আরো কত জায়গা থেকে অর্ডার পাই আমরা। আপনার কলেজে যে ঘণ্টাটা বাজত, হয়তো সেটা আমরাই পাঠিয়েছিলাম একদিন।

    —তা হবে। বোধ হয় সেই ঘণ্টার টানেই এখানে এসে পড়েছি।

    পরিতোষবাবু হেসে উঠলেন। বললাম, কাজ বন্ধ কেন? অর্ডার নেই বুঝি?

    —অর্ডার আছে বৈকি। কিন্তু যোগেন নেই।

    —যোগেন কে?

    —যোগেন ছিল এখানকার Instructor। জেলে যাকে বলে ইসপিনদার। সে ব্যাটা খালাস হয়েছে এই মাসখানেক। ওরকম পাকা কারিগর আর পাচ্ছিনে। তাই তো হাঁদাটাকে বললাম, অর্ডারগুলো ফেরত দাও, আর একটা সার্কুলার করে দাও যে, ঘণ্টা আমরা আর দিতে পারবো না। ও কি বলে, জানেন? বললে Why? Let Jogen come. শুনুন কথা! যোগেন আসুক! আরে, যোগেন যদি আর চুরি না করে, তার যদি জেল না হয়, আমরা জোর করে ধরে আনবো তাকে?

    এই ‘হাঁদা’ ব্যক্তিটি যে শ্বেতচর্ম ডেপুটি সুপার সে কথা বুঝতে অসুবিধা হল না। আরো কিছুদিন গেল। পেটা ঘণ্টার অর্ডার জমে উঠল। দু-চারটা তাগিদও আসতে শুরু করল। ডেপুটি সুপার বিব্রত বোধ করলেন। যোগেনের দোস্ত ছিল মহীউদ্দিন। তাঁতে কাজ করে। তাকে ডেকে পাঠানো হল। সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, যোগেনের কি হল? সে আসছে না যে?

    মহীউদ্দিন বলল, সে হামি বাহার না গেলে কেমন কোরে বোলবো হুজুর?

    —টোমার আর কটোডিন বাকী আছে?

    —একুশ রোজ, সাব্

    -টিকেট লেয়াও।

    মহীউদ্দিনের টিকেট আনা হল। ডেপুটি সুপার উৎকৃষ্ট কাজের পুরস্কারস্বরূপ তার কুড়ি দিন special remission বা বিশেষ ধরনের জেল মকুফ সুপারিশ করলেন। সুপারের মঞ্জুরি এসে গেল আধ ঘণ্টার মধ্যে। মহীউদ্দিন পরদিনই খালাস হয়ে গেল।

    দিনসাতেক পরে যোগেন এসে সেলাম করে দাঁড়াল সাহেবের অফিসে। পকেটকাটার অপরাধে আড়াই বছর জেল। এইবার নিয়ে আটবার হল তার শুভাগমন। সাহেব দেরাজ থেকে পেটাঘণ্টার অর্ডারগুলো বের করে তার হাতে দিয়ে বললেন, টুমি বহুৎ বড়মা আছে, যোগেন কর্মকার। এথা দেরি কাঁহে হুয়া?

    যোগেন জবাব দিল না; মুচকি হাসল শুধু একবার।

    পরদিন সকাল থেকেই ঘণ্টাওয়ালাদের ঠনাঠন্ শব্দে যথারীতি মাথাধরা শুরু হল পরিতোষবাবুর।

    যোগেন দুটো একটা নয়। বছরের পর বছর ধরে শত শত যোগেন এমনি ঘুরে ঘুরে আসে, ধরা দেয় এই লৌহ-তোরণের বাহু-বন্ধনে, সূর্যের চারিদিকে যেমন করে ঘোরে গ্রহ আর উপগ্রহের দল। কী প্রচণ্ড আকর্ষণ! সারা জীবনেও এ পরিক্রমার বিরাম নেই। পাঁচবার, দশবার তো হামেশাই আসছে, যাচ্ছে; বিয়াল্লিশ বার জেল খেটেছে, এমন এক মহাপুরুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম এই সেন্ট্রাল জেলের হাসপাতালে। প্রথম যেদিন আসে, তার বয়স ছিল দশ। চুরাশী বছর বয়সে এইখানেই পড়ল তার শেষ নিঃশ্বাস।

    এদের অনেককেই দেখলাম। ভদ্র, বুদ্ধিমান, চটপটে, কাজের লোক এবং এমন সব কারিগরি বিদ্যায় পারদর্শী, যার কোনো একটি অবলম্বন করে স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রার অভাব হবে না জেলের বাইরে কোনো জায়গায়। কিন্তু সে পথে এরা যায় না। জেলের ডাক এদের কাছে দুর্নিবার

    রোজই এদের কেউ না কেউ খালাস পাচ্ছে। মাতব্বর গোছের একজনকে একদিন পাকড়াও করা গেল। অফিস থেকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে বললাম, কেউ কোথাও নেই, একটা সত্য কথা বলবি?

    মহেশ দাঁতে জিভ কেটে আমার পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে বললে, বি কেলাসই হই আর যাই হই, হুজুরের কাছে কি মিথ্যে বলতে পারি?

    —জেলে আসিস কেন?

    মহেশ অসঙ্কোচে জবাব দিল, ইচ্ছে করে কি আর আসি বাবু? দশবার পকেট মারতে গেলে হঠাৎ ধরাও পড়তে হয় দু-একবার। হাত-সাফাই-এর কাজ। সবগুলো কি আর উতরে যায়?

    —পকেট মারিস কেন?

    -শোনো কথা! পকেট না মারলে খাবো কি?

    —কেন? দেশে কত লোক তাঁতের কাজ করে খাচ্ছে। তোর মত একটা পাকা তাঁতীর কাজ জুটবে না?

    মহেশ হেসে বললো, আপনি ভুলে যাচ্ছেন, হুজুর, পুরানো চোর আমি। আমার মত লোককে কাজ দেবে কে? আপনি বলবেন, ব্যবসা কর। কিন্তু ব্যবসার গোড়ার কথা হল বিশ্বাস। পুরানো চোরকে বিশ্বাস করে কেউ? পুঁজি নেই; ধারে মাল পাবো না; তৈরী জিনিস বিক্রী করতে গেলে লোকে বলবে চোরাই মাল। ধরে নিয়ে যাবে থানায়। তারপর ঘুরে ফিরে আবার সেই জেল।

    বললাম, কোনো Mil-এ গিয়ে চাকরি কর।

    —চাকরি দেবে কেন? চাকরি দূরের কথা, ভদ্দরলোকের পাড়ায় একটু আশ্রয় পাবারও উপায় নেই আমাদের। গেরস্তের রাত্তিরে ঘুম হবে না। ভলান্টিয়াররা পালা করে পাহারা দেবে। পুলিশ এসে ঘণ্টায় ঘণ্টায় দরজায় ধাক্কা মারবে, সারা রাত হাঁকডাক – করবে বাড়ি আছি কিনা দেখবার জন্যে। তারপর যদি কাছাকাছি কোথাও একটা চুরি- ডাকাতি কিছু হল, প্রথম দড়ি পড়বে আমারই হাতে।

    আমি রেগে উঠলাম, দড়ি পড়লেই হল? মগের মুলুক নাকি? প্রমাণ করতে হবে তো?

    —প্রমাণ! বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল মহেশের মুখে, প্রমাণ কতো চান! পাড়ার দশজন ভদ্দরলোক নিজের পকেট থেকে গাড়িভাড়া দিয়ে কোর্টে গিয়ে সাক্ষি দেবেন। হলপ করে বলবেন, এই লোকটাকে সিঁদ কাটতে দেখেছি। কেউ বলবেন, একে দেখেছি বাকস্ মাথায় ছুটতে। সাপের সঙ্গে এক ঘরে বাস করা যায় হুজুর, কিন্তু দাগী চোরের সঙ্গে এক পাড়ায় থাকা যায় না।

    একথার উত্তর খুঁজে পেলাম না। অন্য প্রশ্ন পাড়লাম। বললাম, তাই বলে জীবনভোর এই জেলের কষ্ট—

    মহেশ বাধা দিয়ে বলল, কষ্টটা আপনি কোথায় দেখলেন স্যার? খাসা দোতলা বাড়ি, তিনবেলা ভরপেট খাবার, ধবধবে জামাকাপড়, শীতের দিনে তিনটা করে কম্বল, অসুখ করলে তোফা হাসপাতালে। দু’পাউণ্ড ওজন কমলে মাছ, মাংস, দুধ ঘি’র দেদার ব্যবস্থা। এরকম আরাম আছে নাকি জেলের বাইরে?

    অবাক হয়ে গেলাম। বোকার মত প্রশ্ন করলাম, বলিস কি? জেলে তোদের কষ্ট হয় না?

    —একটুও না। একটা কষ্ট শুধু ছিল। সেও সেই প্রথম প্রথম। আজকাল তাও নেই।

    —কি সেটা?

    —হুজুর অপরাধ নেবেন না?

    —না। তুই বল্।

    —সে হচ্ছে নেশা। যতদিন গলার ফোকরটা তৈরি হয়নি, বড্ড কষ্ট গেছে। এখন আর ভাবনা নেই।

    ফোকরের কাহিনী যা শুনলাম—বিস্ময়কর এবং ভয়াবহ। একটা সীসার বল গলার ভিতর একপাশে রেখে, দিনের পর দিন তিল তিল করে তৈরি হয় এক গহ্বর। যন্ত্রণা তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে ভবযন্ত্রণা থেকে একেবারে মুক্তি পাবার সম্ভাবনা। এমনি করে বল গলায় আটকে দু-চারজন যে শেষ হয়ে যায়নি, তা নয়। মহেশের চোখের উপরেই একজন গেল সেবার। ফোকরের ঘা যখন শুকিয়ে যায়, বলটা ফেলে দিয়ে তার মধ্যে ওরা লুকিয়ে রাখে সিকি, আধুলি, গিনি, আংটি কিংবা সোনার চেন। এই গচ্ছিত সম্পত্তির বিনিময়ে আসে তামাক, বিড়ি, গাঁজা, চরস, কোকেন, আফিম, আরো কত কি নেশার উপকরণ। সে উপকরণ যারা যোগায়, আইনের কেতাবে তাদের কর্তব্য নির্দিষ্ট আছে এই সব নিষিদ্ধ-বস্তুর প্রবেশ রোধ করা। বলা বাহুল্য, তাদের কর্তব্য হানির দোষ শুধরে যায় উপযুক্ত কাঞ্চন-মূল্যে এবং সে ভার বহন করে ঐ ফোকরগচ্ছিত ধনের একটা মোটা অংশ।

    মহেশ আমার কৌতূহল বুঝতে পেরে তার ফোকর থেকে উগরে বের করল একটা গিনি। তারপর সেটাকে আবার স্বস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে আরো অনেক সুখ-দুঃখের কথা বলে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

    কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সারা জীবন জেলে কাটিয়ে দিচ্ছিস, বৌ- ছেলেমেয়ের জন্যেও মনটা একবার কাঁদে না? ইচ্ছে হয় না, অন্য দশজনের মত তাদের নিয়ে ঘরসংসার করতে?

    মহেশ বলেছিল, বৌ-ছেলে থাকলে তো মন কাঁদবে! ওসব ঝঞ্ঝাট আমাদের প্রায় কারুরই নেই।

    বিস্মিত হয়ে বলেছিলাম, সে কি! এত যে মেয়েছেলে আসে তোদের সঙ্গে দেখা করতে? দরখাস্তে লেখে অমুক আমার স্বামী, অমুক আমার স্বামীর ভাই!

    মহেশ হেসে ফেলল—স্বামী-টামী না বললে আপনারা দেখা করতে দেবেন কেন? আসলে বৌ নয় কোনোটাই।

    একটু থেমে অনেকটা যেন আপন মনে বলেছিল, না-ই বা হল বৌ, এরাই আমাদের অসময়ের বন্ধু। রোগে-শোকে, আপদে-বিপদে এরা না টানলে আমাদের উপায় ছিল না। সেবার বসন্ত হল ঐ রামদিন কাহারের। কী সেবাটাই না করলে বিলি! লুকিয়ে রাখল নিজের ঘরে, কর্পোরেশনের লোক পাছে টের পেয়ে নিয়ে যায় হাসপাতালে। ওরই জন্যে ‘রামদিন বেঁচে গেল। তারপর পড়ল ও নিজে। রামদিনটা হাসপাতালে খবর দিয়ে এল। অ্যাম্বুলেন্স দেখে কী কান্না বিলির! কাঁদে আর বলে, আর বাঁচবো না, মহেশদা। নেহাত পরমায়ুর জোর ছিল মেয়েটার। প্রাণে মরল না, কিন্তু চোখ দুটো গেল। এখন রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে। মেয়েগুলো সত্যই বড় ভালো হুজুর।

    মহেশ চলে গেলে মনে পড়ল, কবে কোথায় যেন পড়েছি—বাইরে থেকে মানুষের ভালো করতে যাবার মত বিড়ম্বনা আর নেই। অথচ, এই বিড়ম্বনাই আমরা কোমর বেঁধে করে যাচ্ছি। এই ‘বি’ ক্লাস জেলঘুঘু পুরাতন পাপীদের উদ্ধার করবার জন্যে একদল লোকের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। যে সব পণ্ডিত ব্যক্তি crime-এর জীবাণু নিয়ে মাথা ঘামান এবং সে পোকাগুলোর আসল বাসস্থান রক্তের মধ্যে না মাথার খুলিতে, এই মহাতথ্য সম্বন্ধে গবেষণা করেন, তাঁদের কথা বলছিনে। Crime-এর জন্মস্থান যে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া—এই পুরানো ধুয়া তুলে Heredity vs. Environment-এর সনাতন ঝগড়া আমদানি করে যাঁরা মাসিকপত্রে পাঠকের কান ঝালাপালা করেন, তাঁদের প্রসঙ্গও আলোচনা করছিনে। আমি বলছিলাম তাঁদের কথা, যাঁরা ক্ষেপে উঠেছেন জেল রিফর্মের ধ্বজা নিয়ে। আহা! বড্ড কষ্ট কয়েদীগুলোর! কম্বলের জামাটা গায়ে ফোটে; দাও ওর নীচে একটা সুতী লাইনিং। কম্বল শয্যার উপর বিছিয়ে দাও একখানা করে চাদর। মাছের টুকরোটা বাড়িয়ে দাও। ধনের বরাদ্দটা হাস্যকর—এক ছটাকের ১২৮ ভাগের এক ভাগ। ঐ হোমিওপ্যাথিক ডোজটা ডবল কর। বেচারীরা বিড়ি খেতে পায় না? ডিগ্রেসফুল! এক বাণ্ডিল বিড়ি বরাদ্দ হোক প্রত্যেকের জন্যে, কিংবা দাও একটা করে হুঁকো-কলকে। বড্ড একঘেয়ে জীবন ওদের। মাঝে মাঝে ঝাড় একটা করে ম্যাজিক ল্যান্টার্নের লেকচার। একটা করে রেডিও সেট বসিয়ে দাও ওদের ব্যারাকের মাথায় গান-বাজনা? অবশ্যই চাই। ম্যান্ ডাজ নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন! সন্ধ্যার পর কীর্তন করুক সবাই মিলে। মাঝে মাঝে জারি গান আর কবির লড়াই। অর্থাৎ জেলকে যেন কেউ জেল বলে বুঝতে না পারে। আহারে-বিহারে যতটা পার আরাম দাও। আহা, কী ভীষণ কষ্ট বেচারাদের!

    হতভাগ্য কয়েদীর দুঃখে এই সহৃদয় রিফর্মারদের কোমল হৃদয় অহরহ বিগলিত হচ্ছে। কিন্তু বন্দীর হৃদয়ের খবর এরা পাননি কোনদিন। এঁদের একজনকে লক্ষ্য করেই বলেছিল মহেশ—সবচেয়ে অসহ্য আপনাদের ঐ ভিজিটার-বাবুরা। এমন চোখে চাইবে, যেন আমরা সব কেষ্টর জীব। একবার এক বুড়ো এসে ধরল আমাকে—শুনলাম, তিনি নাকি একজন রায়বাহাদুর—কেমন আছ? কি খাও? কি অসুবিধা তোমাদের? এমনি সব ন্যাকামি! গা জ্বলে গেল। বললাম, বাবু, জেলের মধ্যে কি খাই সে খবর না নিয়ে জেলের বাইরে গিয়ে কি খাব, তাই নিয়ে একটু মাথা ঘামান। তাতেই অনেক বেশি উপকার হবে আমাদের। কথাটা বোধ হয় ভাল লাগল না রায়বাহাদুরের। হন্ হন্ করে চলে গেল। এরকম কত দেখলাম। ওদের দরদ উথলে ওঠে যতক্ষণ জেল খাটছি। বাইরে গিয়ে যখন ফ্যাফ্যা করে বেড়াই, কেউ পৌঁছেও না। দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, আর সবাই মিলে ফন্দী আঁটে কি করে এই জেল-ঘুঘুটাকে জেলে পুরে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।

    যোগেন মহেশ অ্যাণ্ড কোম্পানির অনেকগুলো মুখ আজ ভিড় করে আসছে মনের কোণে। কেউ বেশ জ্বলজ্বলে; কেউ বা ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেছে স্মৃতির অন্তরালে। এদেরই একজনের হাতে তৈরি আমার এই বেতের চেয়ারখানা। সংসারে যে-কটি আমার প্রিয়বস্তু আছে, তার মধ্যে এর স্থান ছোট নয়। এতকাল পরে আজও কোনো কোনো দিন নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় এই চেয়ারখানা নিয়ে যখন আমার বাগানের কোণটিতে গিয়ে বসি, চোখের উপর ভেসে ওঠে কালো ছিপছিপে মজবুত গড়নের এক জোয়ান ছোকরা, হাসিহাসি মুখে বসন্তের দাগ, মাথায় ঢেউখেলানো বাবরি। নাম জিজ্ঞেস করলে বলত, রহিম শেখ, বেত-কামানের ওস্তাগর। অর্থাৎ তার পদমর্যাদা সম্বন্ধে সে নিজেও যেমন সচেতন ছিল অপরকেও তেমনি সজাগ করে রাখত।

    রহিম গাঁজা, বিড়ি, চরস এসব স্পর্শ করত না। তার চেয়েও বড় নেশা এবং ঐ একটিমাত্র নেশা ছিল তার চুল। কেশ-প্রসাধনের জন্যে তেলের প্রয়োজন। সেটা নানা উপায়ে তাকে সংগ্রহ করতে হয়। সে তেলের কতক যেত তার মাথায়, আর বেশীর ভাগ যেত জমাদারের পায়ে। তা না হলে কাঁচির মুখে কোনদিন উড়ে যেত তার শখের বাবরি। বলাবাহুল্য, তৈল-সংগ্রহের জন্যে তার ফোকর-ব্যাঙ্কের উপর যে চাপ পড়ত গাঁজা- চরসের ধাক্কার চেয়ে সেটা বেশী বই কম ছিল না।

    বি-ক্লাস বন্দীদের একটা সাধারণ ব্যাধি আছে, যাকে ওরা বলে ছোকরা রোগ- নিপীড়িত যৌন-জীবনের কুৎসিত বিকৃতি। জেল-ক্রাইমের একটা বড় অংশের মূলে রয়েছে এই ছোকরা রোগ, যার জন্যে দায়ী বোধ হয় ওদের স্ত্রী-সঙ্গ-বর্জিত দীর্ঘ কারাবাস এবং সেখানকার কলুষিত আবহাওয়া। এরই তাড়নায় কত কুটিল ষড়যন্ত্র, কত জঘন্য জিঘাংসা, কত আঘাত প্রতিঘাতের বীভৎস লীলা প্রতিদিন ঘটে যাচ্ছে ঐ লম্বা ব্যারাকগুলোর গহ্বরে, সে ইতিহাস কোনোদিন লেখা হবে না।

    হাসপাতাল থেকে রহিম শেখের জন্যে দৈনিক বরাদ্দ ছিল আধসের দুধ। কিন্তু রহিম তার বাহক মাত্র। যে-ভাগ্যবান্ সে দুধ উদরস্ত করত, তার বয়স ছিল সতেরো; দেহের রং মোটামুটি ফরসা এবং স্বাস্থ্য নিটোল। একে নিয়েই একদিন ঘনিয়ে উঠল মেঘ, এবং তার শেষ পরিণতি হল ছোরা বর্ষণ—রহিম আর পটলার মধ্যে প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার খেলা। আঘাতের মাত্রার বেশীর ভাগ পড়েছিল রহিমের ভাগে। তাই শাস্তির বেলায় সুপার তার পাওনাটা একটু কমিয়ে দিলেন। রহিমের ধারণা, সেটা সম্ভব হয়েছিল শুধু আমারই সানুগ্রহ হস্তক্ষেপের ফলে।

    খালাস হবার কিছুদিন পর ও আমার সঙ্গে দেখা করতে এল আমার বাড়িতে। আমি তারই হাতের তৈরি আমার এই প্রিয় চেয়ারখানায় বসে কি একটা করছিলাম। রহিম খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, চেয়ারখানা তাড়াতাড়ি নামিয়ে দিলাম। জিনিসটা পছন্দসই হল না। আচ্ছা, তার জন্যে কি? এবার এসে আর একটা করে দিচ্ছি—একেবারে নতুন ডিজাইন। যতদিন বসবেন রহিমকে মনে পড়বে।

    আমি বললাম, থাক, চেয়ারের দরকার নেই আমার। তোকে আর আসতে হবে না। কটা দিন অপেক্ষা কর। একটা ভাল কাজ জোটাতে পারবো বলে মনে হচ্ছে তোর জন্যে।

    রহিম ব্যস্ত হয়ে বলল, না না, ওসব আপনি কখনো করতে যাবেন না।

    তার আপত্তির বহর দেখে হেসে ফেললাম, কেন রে? কাজের কথা শুনে ভয় পাচ্ছিস কেন?

    রহিম সোজাসুজি বলল, দরকার নেই আপনার কাজ খুঁজে। ওতে আমার তো কোনো উপকার হবেই না, বরং আপনি ফ্যাসাদে পড়ে যাবেন।

    অবাক হয়ে বললাম, আমি ফ্যাসাদে পড়বো কেন?

    রহিম বারান্দার কোণে চেপে বসে বলল, তবে শুনুন একটা গল্প বলি।

    সেবার খালাস পেলাম—জেল থেকে। সাহেব চার টাকা বকশিশ দিলেন। সেই সঙ্গে দিলেন দু’দিনের খোরাকি বারো আনা আর শেয়ালদহ পর্যন্ত একখানা রেলের পাশ। মাথায় কি বখেয়াল এল। কোলকাতায় না ফিরে, মনে করলাম, ঐখানেই একটা কাজকর্ম জুটিয়ে নিয়ে থেকে যাবো। বেতের কাজ তো আগেই জানতাম। এবার একটা পাকা ওস্তাগরের হাতে পড়ে ছুতোর মিস্ত্রির কাজটাও বেশ ভালোরকম রপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সারাদিন কাজ খুঁজে বেড়াই, আর রাত্রিবেলা পড়ে থাকি ইস্টিশনে। দেখতে দেখতে টাকা কটা ফুরিয়ে গেল।

    সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি। প্ল্যাটফরমে ঘুরে বেড়াচ্ছি। একেবারে গা ঘেঁষে এক মাড়োয়ারী বাবু চলে গেল। পকেটে একতাড়া নোট। হাতটা নিশপিশ করে উঠল। লোকটা এমন হাঁদা, নোটগুলো হাতিয়ে নিতে লাগত ঠিক এক সেকেণ্ড। কিন্তু সামলে নিলাম নিজেকে, কপালে দুঃখ থাকলে যা হয়। ভোরের দিকে, তখনো ঘুম ভাঙেনি, পিঠে এক জুতোর ঠোক্কর। চোখ মেলে দেখি পুলিশের হাবিলদার। বললাম, মারছেন কেন খালি খালি?

    —তবে রে শালা—বলে চুল ধরে টেনে তুলল। তারপর থানায়। ১০৯ ধারায় চালান দিয়ে দিল। সেদিন ছিল রবিবার। ওয়ারেন্ট সই করাতে হবে এস-ডি-ও সাহেবের বাসায় আমাকে নিয়ে চলল বেঁধে। শুনলাম হাকিমটা নাকি ‘পাগলা’। আসামী না দেখে ওয়ারেন্ট সই করে না।

    বাড়ির সামনে টেনিস খেলবার মাঠ। তারই একপাশে বেতের চেয়ারে বসে একজন মেয়েছেলে উল বুনছিলেন। ভাবে বুঝলাম, এস. ডি. ও সাহেবের পরিবার। অল্প বয়স; মুখ দেখলেই বোঝা যায় প্রাণে দয়ামায়া আছে। পাশে একখানা ছোট টেবিল। পুলিশ দুজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে খৈনি টিপছিল। সেই ফাঁকে একটু এগিয়ে গিয়ে সেলাম করে বললাম, মেমসাহেব, আপনার ঐ টেবিলটা পালিশ করা দরকার। মেহেরবানি করে যদি কাজটা আমাকে দেন। দু’দিন খেতে পাইনি।

    প্রথমে উনি খানিকটা চমকে উঠলেন। পুলিশ দুটোও রা-রা করে ছুটে এল। তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে উনি এগিয়ে এসে বললেন, পালিশের কাজ জান তুমি?

    —জানি, মেমসাহেব।

    দেশী হাকিমের পরিবারেরা মেমসাহেব বললে খুশী হন, এটা আমার জানা ছিল।

    উনি বললেন, তুমি চুরি করেছ?

    —না, হুজুর। চারদিন হল জেল থেকে বেরিয়েছি। কাজ খুঁজছিলাম। ইস্টিশন থেকে খালি খালি ধরে এনেছে।

    মেমসাহেব ভিতরে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরে সাহেবকে সঙ্গে করে ফিরে এলেন। তিনি এসে আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তারপর কোথায় কোথায় ফোন করে শেষটায় পুলিশদের হুকুম করলেন, আসামী ছেড়ে দাও।

    প্রায় দশ-বারো দিন ধরে ওদের সব ফার্নিচার পালিশ করে দিলাম। মালমশলা কেনবার টাকা আমারই হাতে ধরে দিলেন। আমিই সব কিনে নিয়ে এলাম। হিসাব দিতে গেলাম; নিলেন না। কাজ দেখে মেমসাহেব ভারী খুশী। এ ক’দিন খেতে তো দিলেনই তার উপর বকশিশ দিলেন দশ টাকা।

    এদিকে সাহেব আমার জন্যে কাজ খুঁজছিলেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কি কাজ জানো?

    —সব রকম বেতের কাজ জানি হুজুর। মেমসাহেব যে চেয়ারটায় বসে আছেন, ওটা জেলে বসে আমিই তৈরি করেছিলাম।

    —বটে!

    ওখানকার কাজ শেষ হলে উনি আমাকে একটা চিঠি দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন শহরের বাইরে কোন্ এক জমিদার এক ইস্কুল খুলেছিলে, সেখানে। বড়লোকের খেয়াল। ভদ্দরলোকের ছেলেদের ধরে হাতের কাজ শেখানো হচ্ছে—তাঁত, কাঠের কাজ, ছুরি কাঁচি তৈরি, বেতের কাজ এইসব।

    আমি হলাম বেতের মাস্টার। মাইনে কুড়ি টাকা। এস. ডি. ও. সাহেব বলে দিয়েছিলেন তুমি যে জেল খেটেছ, একথা কাউকে বোলো না। আমি মনে মনে হাসলাম। দাগী চোরের গায়ে জেলের গন্ধ লেগে থাকে,—একথা ওঁর জানা ছিল না। ছোকরা হাকিম কিনা।

    মাসখানেকের মধ্যেই পুলিশের চেষ্টায় সব জানাজানি হয়ে গেল। ছাত্ররা বলে বসল, আমরা জেলখাটা চোরের কাছে কাজ শিখবো না। বুঝলাম, আমার চাকরি এবার খতম। মানে মানে সরে পড়ব ভাবছি, এমন সময় জমিদারের মেয়ের গলা থেকে হার চুরি গেল পুকুরঘাটে। পুলিশ এসে ধরল আমাকে। পিঠেও বেশ কিছু পড়ল, সে তো বুঝতেই পারছেন। জমিদার মামলা চালাতে দিলেন না। আমাকে ডেকে নিয়ে এক মাসের মাইনে বেশী দিয়ে চোখ-পাকিয়ে বললেন, জুতো দেখতে পাচ্ছিস?

    আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, পাচ্ছি।

    —খবরদার! আমার জমিদারির ত্রিসীমানায় কোনোদিন পা দিয়েছিস তো পিঠের চামড়া তুলে নেবো, বুঝলি?

    এবারেও ঘাড় নেড়ে বললাম, বুঝেছি।

    জমিদারবাবু হাঁক দিলেন, দারোয়ান!

    দারোয়ান এসে আমার কান ধরে হিড়হিড় করে নিয়ে চলল। যাবার সময় কানে এল বাবু বলছেন, যেমন জুটেছে একটা পাগল এস. ডি. ও.! ইস্কুলের মাস্টার চাই, পাঠালো এক দাগী চোর!

    কাজকর্ম করে খাবার শখ অ্যাদ্দিনে মিটে গিয়েছিল। এবার নিজের পথ ধরলাম। ইস্টিশনে জুটে গেল একটা কেস্। পকেট ভারী করে চলে এলাম। কোলকাতায়। কিছুদিন পরেই আবার সেই “পুরানা জেল”।

    আমি বললাম, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলি, কি বলিস?

    —সে কথা আর বলতে, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল রহিম, বাইরে যে-কদিন থাকি, মনে হয় পরের বাড়ি আছি। নিজের বাড়িঘর বলতে যা কিছু আমাদের ঐ জেল। জেলকে লোকে ঠাট্টা করে বলে শ্রীঘর। কথাটা কিন্তু একেবারে খাঁটি, স্যার।

    —বেশ, তা যেন হল। কিন্তু আমার কি ফ্যাসাদ হবে বলছিলি যে?

    রহিম অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ঐ দেখুন, আসল কথাটাই ভুলে গেছি। কোলকাতায় আসবার ক’দিন পরেই পটলার সঙ্গে দেখা চিৎপুরে। তার কাছে শুনলাম, এস. ডি. ও. সাহেবের চাকরি নিয়ে টানাটানি। একটা দাগী চোরকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে বাড়িতে জায়গা দিয়েছেন, ইস্কুলে চাকরি করে দিয়েছেন—সাহেব কালেকটার নাকি বেজায় খাপ্‌পা। উনি আর এস. ডি. ও. নেই। সাধারণ হাকিম করে কোথায় বদলি করে দিয়েছেন। তাই তো বলছিলাম স্যার, পুরনো চোরের ভেজাল অনেক। আপনি কখনো এসব ঝঞ্ঝাটে জড়াতে যাবেন না। একটা বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?

    .

    রহিম চলে গেল। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার কথাগুলো মনের মধ্যে নড়েচড়ে বেড়াতে লাগল। অনেক কথার মধ্যে একবার সে বলেছিল, আমরা দাগী। আমাদের এ দাগ কি কোনো কালেও মিটবে না?

    উত্তর দিতে পারিনি। হয়তো এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, দাগী ওরা নয়, দাগ পড়েছে আমাদের চোখে, দাগ পড়েছে আমাদের মনে—যে চোখ দিয়ে ওদের দেখি, যে মন দিয়ে ওদের বিচার করি, সেইখানে। আমরা ভদ্র মানুষ, সভ্য মানুষ, সৎ মানুষ। কোনোদিন ভুলি না, এই লোকটা একদিন জেলের ঘানি টেনেছিল। সমাজের যে স্তরে যে স্থানটুকু সে ছেড়ে গিয়েছিল সেখানে ফিরে এসে দাঁড়াবার সুযোগ তাকে আমরা দিতে পারি না কিছুতেই। একবার যে গেল, সে চিরকালের তরেই গেল। যে ছাপ পড়ল তার কপালে, আমাদের চোখে সে কোনোদিন মুছবে না।

    মনে পড়ে গেল অনেকদিন আগেকার ঘটনা। তখন কলেজে পড়ি। একটা কি সাহিত্য- সভাটভা উপলক্ষ করে প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্রের সান্নিধ্যলাভ করবার সুযোগ জুটে গেল। ঘণ্টাকয়েক ছিলাম তাঁর কাছে; তাঁর সৃষ্ট পতিতা চরিত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে কী একটা মন্তব্য করেছিলাম। তিনি হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। গড়গড়ার নলটা মুখ থেকে নেমে এল হাতে। তীক্ষ্ণ চোখ দুটো কেমন উদাস হয়ে উঠল। সহসা যেন কত দূরে চলে গেলেন। কোথাকার কোন্ অলক্ষ্য বস্তুর দিকে চেয়ে মৃদুকণ্ঠে বললেন, পতিতা! হ্যাঁ; ওদের নিয়ে অনেক কথাই উঠেছে, যদিও আমি সেটা ঠিক বুঝতে পারিনে। আমি যে ওদের অনেকের কথাই জানি। নিজে চোখে দেখেছি, এমন জিনিস ওদের মধ্যে আছে, যা বড় বড় সমাজে নেই। ত্যাগ বল, ধর্ম বল, দয়া, মায়া, প্রেম—মনুষ্যত্ব বলতে যা বুঝি, ওদের মধ্যেও অভাব নেই।

    একটু থেমে করুণার্দ্র কণ্ঠে বলেছিলেন, তা ছাড়া, কোনো মানুষ নিছক কালো, তার মধ্যে কোনো redeeming feature নেই, একথা ভাবতে আমার কষ্ট হয়। ও আমি পারি না।

    বাইরে সন্ধ্যার ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। কেউ কোথাও নেই। একটি ছোট্ট বারান্দায় তাঁর সামনে পাশাপাশি বসে আমরা দুটি তরুণ ছাত্র। আমাদের দিকে না চেয়ে, অনেকটা যেন আত্মগত ভাবে, থেমে থেমে এই ক’টা কথা তিনি বলে গিয়েছিলেন। আজ এতকাল পরে ঐ হতভাগা দাগী চোর রহিম শেখের দিকে চেয়ে মানব-দরদী কথাশিল্পীর সেই বেদনাসিক্ত কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ভাবছি, এরাও কি নিছক কালো? এদের মধ্যেও কি কোনো redeeming. feature নেই?

    শতাব্দীর ওপার থেকে টমাস হার্ডির মানসকন্যা টেস্-এর কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি। একটি রাত্রির মুহূর্তের দুর্বলতা তার জীবনে নিয়ে এসেছিল লজ্জা; কলঙ্ক আর অভিশাপ। সে দাগ যখন সারাজীবনেও মুছে ফেলা গেল না, তার আর্ত কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হল এক কঠিন প্রশ্ন—The recuperative power of Nature is denied to maidenhood alone? নিরন্তর ভাঙাগড়াই তো প্রকৃতির লীলা। ছিন্ন শাখার মূল থেকে দেখা দেয় নবপত্রোদ্‌গম অতবড় পুত্রশোক, তারও ক্ষত একদিন মিলিয়ে যায় মায়ের বুকে। অশ্রুধারা শুকিয়ে যায়, ফিরে আসে হাসির ঝলক। কিন্তু মুহূর্তের তরে খণ্ডিত হল যে কুমারীর কৌমারধর্ম, তার কালিমা রেখা কি কোনোদিন মুছবার নয়? প্রকৃতির অপরাজেয় সঞ্জীবনীশক্তি এইখানেই শুধু ব্যর্থ হবে?

    টেস্ তার প্রশ্নের জবাব পেয়েছে কিনা জানি না। কিন্তু রহিমের প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। লৌহ যবনিকার অন্তরালে শত শত রহিমের চোখে ফুটে আছে ঐ একটি নির্বাক প্রশ্ন—আমাদের এ দাগ কি কোনোদিন মুছবে না?

    প্রাণপূর্ণ দরদ নিয়ে যদি আসেন কোনো টমাস হার্ডি কিংবা শরৎ চাটুজ্জে, হয়তো এর জবাব একদিন মিলবে।

    .

    পনেরো বছর পরের কথা। ইতিমধ্যে গোটাসাতেক জেল ঘুরে আবার এসেছি কলকাতায়। আগের বছর বড় মেয়ে বিনুর বিয়ে দিয়েছি। জামাই-ষষ্ঠীর তত্ত্ব করতে হবে, সেই সব আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত গৃহিণীর বিশেষ ফরমাস—এক ঝুড়ি ল্যাংড়া আম দেওয়া চাই-ই। দুপুরে রোদ মাথায় করে বড়বাজার পোস্তায় গিয়েছিলাম আম কিনতে। ভীষণ ভিড়। অনেক দোকান ঘুরে বহু দরদস্তুর করে এক জায়গায় পছন্দ করে দাম দিতে যাচ্ছি—সর্বনাশ! মনিব্যাগ কৈ? এ পকেট ও পকেট বৃথাই হাতড়ে দেখলাম বার বার। আম ঐ পর্যন্ত রইল। ফিরবো যে তার ট্রামভাড়াটাও নেই। হ্যারিসন রোডের ফুটপাথ ধরে পূবদিকে পা চালিয়ে দিলাম।

    —সেলাম, হুজুর।

    চমকে উঠলাম। গলাটা চেনা-চেনা। তাকিয়ে দেখি, বেঁটে কালো কাঁচা-পাকা দাঁড়িওয়ালা একটা লোক। মাথায় ঢেউখেলানো বাবরি।

    —কে, রহিম?

    —হ্যাঁ, হুজুর। গরিবকে ভোলেননি, দেখছি।

    —কেমন আছিস, রহিম?

    —ভালোই আমি আপনার দোয়ায়।

    একটু তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে চেয়ে রহিম বলল, আপনাকে কেমন যেন শুকনো দেখাচ্ছে, স্যর। শরীর ভালো আছে তো?

    গোটা পঁচিশেক টাকা ছিল ব্যাগেতে। বড্ড মুষড়ে পড়েছিলাম। চেষ্টা করেও নিস্তেজ ভাবটা চাপা দিতে পারলাম না। বললাম, ভালোই আছি। তবে —

    রহিম সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল। আমি একটু হাসবার মত মুখ করে বললাম, মনিব্যাগটা চুরি গেল।

    রহিম ব্যস্ত হয়ে বলল, এখন চুরি গেল? কোথায়?

    বললাম, ঐ আমপট্টিতে, এই আধ ঘণ্টাটাক হবে। সে যাক্, তারপর তুই আছিস কোথায়? কাজটাজ কিছু

    রহিম সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, আপনি দাঁড়ান বাবু, আমি এখুনি আসছি বলে ছুটে বেরিয়ে গেল।

    আমি সেইখানেই অপেক্ষা করে রইলাম। পনেরো মিনিট, কুড়ি মিনিট, আধ ঘণ্টা যায়। হঠাৎ মনে হল, এ কি করছি? একটা পুরোনো চোর কি বলে গেল, আর তার কথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি—একজন পদস্থ সরকারী অফিসার! পা বাড়াতে যাচ্ছি, রহিম ছুটতে ছুটতে এসে হাজির। ফতুয়ার পকেট থেকে দুটো মনিব্যাগ বের করে বলল, দেখুন কোটা আপনার?

    আমি নিজের ব্যাগটা তুলে নিলাম।

    রহিম বলল, খুলে দেখুন সব ঠিক আছে কিনা। দেখলাম, সব যেমন ছিল ঠিক তেমনি আছে। আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। বললাম, কোথায় পেলি? রহিম হেসে জবাব দিল, সে অনেক কথা, হুজুর। সব আপনি বুঝবেন না। ছোকরাটা নতুন। আপনাকে তো চেনে না। তবে ভারী বিশ্বাসী। সরায়নি কিছুই, গোটাটাই জমা দিয়েছে। সর্দারের কাছে গিয়ে আপনার কথা বলতেই তাড়াতাড়ি বের করে দিল। সর্দার এখন ভারি ব্যস্ত, নৈলে নিজেই আসত। বলে দিল, বাবা যেন আমাদের কসুর মাপ করেন।

    আমি একখানা দশটাকার নোট তুলে নিয়ে রহিমের হাতে দিতে গেলাম। সে দাঁতে জিভ কেটে জোড়হাত করে দু-পা পিছনে সরে গেল। তারপর আমার পায়ে হাত ছুঁইয়ে বলল, কসুর আর বাড়াবেন না হুজুর।

    আমি আর পীড়াপীড়ি করতে পারলাম না। রহিম বলল, আম কিনতে এসেছিলেন এদ্দুর?

    —হ্যাঁ, বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে দিতে হবে। ঝুড়িখানেক ল্যাংড়া আম; সবাই বললে পোস্তাতে সুবিধা হবে।

    রহিম বলল, এখানে আম কেনা কি আপনার কাজ? চলুন আমি কিনে দিচ্ছি।

    আমার উৎসাহ কমে গিয়েছিল। বললাম, থাক। ওদিক থেকেই না হয় নেবো।

    রহিম বলল, আপনাকে বাজারে ঢুকতে হবে না। কষ্ট করে এই মোড়টায় এসে একটু দাঁড়ান। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি।—বলে আমার সম্মতির অপেক্ষা না করেই সে চলে গেল।

    মিনিট দশেকের মধ্যেই কুলীর মাথায় দু-ঝুড়ি ল্যাংড়া আম নিয়ে সে ফিরে এল এবং একটা ঘোড়ার গাড়ির ছাদে চাপিয়ে দিয়ে গাড়োয়ানকে বলল, বাবুকে পৌঁছে দিয়ে আয়। আমি আমের দাম জানতে চাইলাম। রহিম আবার হাতজোড় করল। বিরক্তির সুরে বললাম, না না, সে কি হয়? খালি খালি এতগুলো টাকা তুই দিতে যাবি কেন? আর আমিই বা নেবো কেন?

    রহিম সঙ্কুচিত হয়ে বলল, আপনাকে দিইনি হুজুর। আমার বিনু-মাকে দিলাম। সেই কবে দেখেছি! আপনার চাকর নিয়ে আসত গেটের সামনে। দু-বছরের মেয়ে; যেন বেহেস্তের পরী। সেই আমাদের ছোট্ট বিনু-মা আজ বড় হয়েছে। সাদী হয়েছে। গরিব রহিম আর কিই বা দিতে পারে? দুটো আম দিলাম আমার মাকে

    গলাটা আটকে গেল। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।

    আমের দাম আর দিতে পারলাম না।

    বাড়ি পৌঁছে গাড়ির ভাড়া দিতে গেলাম। গাড়োয়ান সেলাম করে বলল, ভাড়া পেয়ে গেছি, বড়বাবু।

    —সে কি! কে দিলে ভাড়া?

    —কেন, রহিম!

    —না, না, সে হবে না। ও টাকা ফিরিয়ে দিও। ভাড়া তোমাকে নিতেই হবে!

    গাড়োয়ান ভয়ে ভয়ে বলল, বলেন কি বাবু? ঐ রহিমকে আপনি চেনেন না? আস্ত পুঁতে ফেলবে আমাকে।