Author: তাহের আলমাহদী

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    চৌদ্দ
    শুনেছি, প্রাণিবিজ্ঞান মতে চিংড়িমাছ মাছ নয়। আমাদের মত অবৈজ্ঞানিক মৎস্যভোজীর পক্ষে ব্যাপারটা চমকপ্রদ সন্দেহ নেই। কিন্তু এর চেয়েও চমকে যাবার কারণ ঘটল, যেদিন শুনলাম, ভূতনাথ দারোগা দারোগা নয়। এ শুধু খবর নয়, এ একটা আবিষ্কার। রাম শ্যাম যদু থেকে আরম্ভ করে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ পর্যন্ত একটা গোটা মহকুমার মুখে যিনি এক ডাকে ‘ভূতনাথ দারোগা’, ভাবিনি সেই স্বনামধন্য পুরুষ একজন তুচ্ছ ডি. এস. পি. মাত্র। সরকারী পরিচয় যে আসল মানুষটির ধার দিয়েও যায় না, তারই আর একটা দৃষ্টান্ত পাওয়া গেল।

    ভূতনাথের দাপটে বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খায়। অর্থাৎ গোরুচোর ফাজলা শেখ আর বাঘশিকারী দুর্দান্ত জমিদার কালু চৌধুরী একই হাত-কড়া পরে, একই দড়ি কোমরে বেঁধে একসঙ্গে কোর্টে আসে যায়। লঘু-গুরু ভেদ নেই ভূতনাথ দারোগার কাছে। তাঁর শুভদৃষ্টি একবার যার উপরে পড়েছে, অর্থ এবং মুরুব্বীর জোর তার যতই থাক, জেলের ঘানির সাতপাক তাকে ঘুরতেই হবে। যত বড় বেয়াড়া, খুঁতখুঁতে কিংবা উদারপন্থী হাকিম আসুন, ভূতনাথের আসামীকে বেকসুর খালাস দেবার মত কোনো ফাঁক পেয়েছেন বলে শোনা যায়নি।

    —খালাস অমনি দিলেই হল? ভূতনাথ বুক ফুলিয়ে বলেন তাঁর ভক্তমহলে, ফৌজদারী মামলা হচ্ছে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা সড়ক। আইন-কানুনের গলিঘুঁজির বালাই নেই, স্রেফ্ ঘটনা সাজিয়ে যাও। Conviction মারে কে? কিন্তু ঘটনা মানে কি? হঠাৎ প্রশ্ন করে বসেন কোনো জুনিয়রকে লক্ষ্য করে; লক্ষ্যটি নেহাত উপলক্ষ। উত্তর দেন উনি নিজেই—ঘটনা মানে যদি বুঝে থাক—যেটা ঘটে, সুবল মিত্তিরের ডিক্সনারি ঘাড়ে করে ইস্কুলমাস্টারি করে খাওগে। পুলিশের চাকরি তোমার চলবে না। যা ঘটে নয়, ঘটনা মানে তোমার সুবিধের জন্যে যা ঘটা দরকার। এই যেমন ধর, বাঘাডাঙ্গার সতীশ কুণ্ডু হঠাৎ টাকার গরমে তেতে উঠেছে। তোমার এলাকায় বাস করে তোমারই সামনে ঘাড় উঁচু করে চলে। জব্দ করতে চাও? ফেলে দাও কোনো খুনী মামলায়।

    কোনো ছোকরা প্রবেশনার জিজ্ঞেস করে, কিন্তু স্যর, কাছাকাছি কোথাও খুন তো একটা হওয়া চাই!

    —কে বললে খুন হওয়া চাই? খুনের কোনো দরকার নেই; দরকার শুধু একটা লাস। দেশে এত লোক মরছে, আর একটা মড়া যোগাড় করতে পারবে না? আর কোথাও না পাও, হাসপাতালগুলো আছে কি করতে?

    প্রবেশনারটি নাছোড়বান্দা। আবার প্রশ্ন করে, মড়া না হয় একটা জোটানো গেল। কিন্তু সেটা যে কলেরায় মরেনি, খুনের লাস, সেকথা প্রমাণ হবে কি করে?

    ভূতনাথ তৎক্ষণাৎ জবাব দেন, কেন? ডাক্তার বলে একরকম প্রাণী আছে শোননি কোনোদিন? ওরাই প্রমাণ করবে। ভগবান ওদের হাতে স্প্রীং লাগিয়ে দিয়েছেন; যেদিকে ঘোরাতে চাও ঘুরবে। তবে তার জন্য চাই কিছু তেল।

    দু-একজন সিনিয়র গোছের অফিসার মাথা নেড়ে বললেন, ঐ যা বললেন, স্যর। ঐ তেলটাই হল আসল। ঐটি সংগ্রহ করাই একটু মুশকিল।

    —কিছু মুশকিল নেই, সঙ্গে সঙ্গে বলেন ভূতনাথ, তেল আপনিই জুটে যায়। খোঁজ নিয়ে দ্যাখ, সতীশ কুণ্ডুর একটা বিপক্ষ দল আছে নিশ্চয়ই, আর তার কর্ণধার হচ্ছেন জগৎ পাল কিংবা নিরঞ্জন সাহা। ওদের কাউকে শুধু ইঙ্গিতে জানতে দাও, তোমার মতলবটা কি। তেলের পিপে মাথায় নিয়ে ছুটে আসবে। যত খুশী ঢাল। ডাক্তার যদি একটু নজর দেন, আদালতে গিয়ে দেখবে কলেরার পচা মড়ার পেট থেকে বেরিয়েছে বন্দুকের গুলি কিংবা তার বুকে রয়েছে মারাত্মক ছোরার জখম।

    এর পরে আর কোনো প্রশ্নেরই অবকাশ থাকে না। তবু স্থূলবুদ্ধি অর্বাচীন পুলিশ- মহলেও থাকে দু-একজন। তাদেরই কেউ একজন বলে বসে, আচ্ছা স্যর, লাস না হয় পেলাম, আর সেটা যে খুন তারও ডাক্তারি প্রমাণ পাওয়া গেল; কিন্তু খুনের সঙ্গে সতীশ কুণ্ডুকে জড়াবার মত সাক্ষী কোথায়?

    ভূতনাথ সিগারেটের সঙ্গে উচ্চাঙ্গের হাসি মিশিয়ে বলেন, সাক্ষী তো আকাশ থেকে পড়ে না বাপু, মাঠেও গজায় না। ও জিনিসটা কষ্ট করে তৈরী করতে হয়; আর তার জন্যে চাই মাথায় কিঞ্চিৎ মগজ আর বুকে খানিকটা সাহস।

    বলা বাহুল্য, ভূতনাথের ভাণ্ডারে এ দুটি পদার্থের কোনোটারই অভাব নেই। এদের জোরে সাক্ষী তৈরী আর আসামীর স্বীকারোক্তি আদায়, দুটোই তাঁর কাছে জলভাত। প্রথমে তোয়াজ তোষণ, তারপর শাসন গর্জন,–এইসব প্রচলিত পদ্ধতি তো আছেই, এ ছাড়া আছে তাঁর কয়েকটা নিজস্ব পেটেন্ট কবিরাজি মুষ্টিযোগ।

    —সাক্ষী কথা শুনছে না?

    সহকারী বলেন, না, স্যর।

    —কি বলে?

    —কিছুই বলে না।

    —তোমাদের যা করবার, করেছ?

    —সবই তো করলাম।

    ভূতনাথ গম্ভীরভাবে ব্যবস্থা করে দিলেন, বৃহৎ যষ্টিমধুচূর্ণ এক পুরিয়া। পুরিয়া যথারীতি সেবন করানো হল। অর্থাৎ একটি মধুবর্ষী বৃহৎ যষ্টি সাক্ষীর পৃষ্ঠদেশে চূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু সে নির্বিকার। ভূতনাথের কাছে রিপোর্ট এল।

    —কি, সোজা হল না?

    সহকারী হতাশভাবে মাথা নাড়লেন।

    —দাও ডোজ তিনেক গুম্ফোৎপাটন রসায়ন। যত নষ্টের মূল ব্যাটাচ্ছেলের ঐ কাইজারী গোঁফ।

    একজন কুস্তীগীর হিন্দুস্থানী সিপাহীকে এই মহৎ কার্যে নিয়োগ করা হল। মিনিট পাঁচেক পরেই খবর এল, সাক্ষী তৈরী।

    শুধু সাক্ষী-বাগানো নয়, কনফেশন আদায় করতে ঐ একই ব্যবস্থা। কিন্তু দু-একটা দুর্ধর্ষ আসামী কখনো ক্বচিৎ দেখা যায়, যাদের বেলায় গুস্ফোৎপাটন রসায়ন কিংবা শ্মশ্রুছেদন বটিকা হয়তো ‘তেমন কার্যকরী হয় না। এরকম ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োগ করেন তাঁর শেষ এবং মোক্ষম আবিষ্কার—মহানিমজ্জনী সুধা, চপেটাঘাত সহ সেব্য। শীতকালের গভীর রাতই হচ্ছে এই মহৌষধি প্রয়োগের প্রশস্ত সময়। তার উপর স্থানটা যদি পানাপুকুর হয়, ফল অব্যর্থ।

    ভূতনাথ ঘোষালের সঙ্গে পরিচয় ছিল না, দেখা হয়ে গেল কার্যসূত্রে। অফিসে বসে কাজ করছি। ভারী জুতোর শব্দে মুখ তুললাম। যে ভদ্রলোক আমার টেবিলের ওপাশে চেয়ারখানা দখল করলেন, তাঁর দৈর্ঘ ছ’ফুট এবং পরিধি তিন ফুটের কম নয়। আমি জিজ্ঞাসু চোখে চাইতেই পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসারটি পরিচয় দিলেন—সদর ডি. এস. পি.। ভদ্রলোক টুপিটা খুলতেই মাথাজোড়া বিশাল টাক চক্‌চক্ করে উঠল আমি সসম্ভ্রমে নমস্কার জানিয়ে বললাম, ও আপনিই মিস্টার ঘোষাল? ভারী আনন্দ হল।

    —আনন্দ হল! ছাদ-ফাটানো হাসি হাসলেন ভূতনাথ; আমাকে দেখে কারো আনন্দ হয় এই প্রথম শুনলাম মশাই আপনার কাছে। অ্যাদ্দিন তো জানতাম, এ রূপ দেখলে লোকে আঁতকে ওঠে।—বলে পকেট থেকে একটা আধপোড়া মোটা সিগার বের করে ধরিয়ে কড়া ধোঁয়া ছাড়লেন।

    ভূতনাথ অত্যুক্তি করেন নি। প্রকাণ্ড একটা খাঁড়ার মত নাক, তার নীচে জমকালো পাকানো গোঁফ, সুগোল রক্তাভ চোখ, পানের রস আর সিগারের ধোঁয়ায় জারিত মোটা মোটা ঠোঁট, গোটাকয়েক গজদন্ত এবং তার তলায় একখানা চওড়া চোয়াল। এ হেন আকৃতি আনন্দদায়ক তো নয়ই, ঘোর আতঙ্কদায়ক। কিন্তু আপনাকে দেখে ভারী আতঙ্ক হল—একথা তো বলা যায় না কোনো সদ্যপরিচিত আগন্তুককে।

    সিগারটায় আরো গোটাকয়েক টান দিয়ে সহকারীকে বললেন, কই তোমার কাগজপত্তর বের কর।

    সহকারী একখানা কাগজ আমার সামনে রাখলেন—একজন হাজতি আসামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার আবেদন। কাগজটায় চোখ বুলিয়ে দেখছিলাম। ভূতনাথ মাথা দুলিয়ে বললেন, আছে মশাই, আছে। ম্যাজিস্ট্রেটের সই না নিয়ে আসিনি। সে-সব চলত আগেকার দিনে। যখন খুশি দেখা করেছি আসামীর সঙ্গে, দরকার মত বের করে নিয়ে গেছি থানায়, আর পৌঁছে দিয়ে গেছি, যখন সুবিধা। পারমিশন তো দূরের কথা, একটা রসিদ-টসিদও চাননি জেলর-বাবুরা। সেসব দিন আর নেই। আপনারা হলেন নব্যতন্ত্রের অফিসার। আমরাও তাই আট-ঘাট বেঁধেই কাজ করি। কই, আপনার মেট গেল কোথায়? একবার হুকুম করুন, নিয়ে আসুক বদমাশটাকে। এখানকার কাজ সেরে আবার কোর্টে যেতে হবে একবার।

    বলে, চেয়ারের উপর বিশাল দেহটা যতখানি সম্ভব এলিয়ে দিয়ে লম্বা হাই তুলে হাতে তুড়ি দিলেন।

    আসামীকে আনানো হল। মাথায় ব্যাণ্ডেজ সর্বাঙ্গে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন। দেড়মাস হাসপাতালে থাকবার পর কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়েছে, কদিন হল। মেট এবং আর একজন কয়েদীর কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে এসে বসে পড়ল। ভূতনাথ তার মুখের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বললেন, তুমিই বদরউদ্দীন মুন্সী?

    —হ্যাঁ হুজুর। চিনতে পারছেন না?

    —চিনবো কেমন করে বল? তোমার কীর্তিকলাপ অবিশ্যি জানতে বাকী নেই। কিন্তু চাক্ষুষ দেখা তো হয়নি কোনোদিন।

    —হয়েছে বৈকি। দেখা আমাদের হয়েছে, বড়বাবু। একবার নয়, দু’বার।

    —দু’বার! বল কি? আমার তো মনে হচ্ছে না। কোথায় দেখলাম তোমাকে?

    প্রথম দেখা আমাদের ছত্রিশ সালে কুড়ুলগঞ্জে ভুবন সার গদীতে। ডাকাতি করে পালাচ্ছিলাম। একেবারে পড়ে গেলাম হুজুরের পিস্তলের মুখে। গুলিও আপনি ছুঁড়েছিলেন। মাথা তাক করেই ছুঁড়েছিলেন। কিন্তু মাথাটা নিতে পারেননি, নিলেন এই কানের পাশ থেকে এক টুকরো মাংস। ভারী আপসোস হল; কানের জন্যে নয়, হুজুরের জন্যে। এমন পাকা হাতের গুলিটা ফসকে গেল।

    ভূতনাথ হো হো করে হেসে উঠলেন, ফসকে গিয়ে ভালোই হয়েছিল বলতে হবে। তা না হলে আজ আমাদের দেখা হত কেমন করে? খোদা যা করেন ভালোর জন্যেই করেন, কি বল?

    ভূতনাথের সুর হালকা। কিন্তু মুন্সী জবাব দিল গম্ভীর গাঢ় সুরে, আলবত। খোদা যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।

    ঘরের হাওয়া যেন হঠাৎ বদলে গেল এবং মিনিট কয়েক কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর ভূতনাথ আবার পূর্বসূত্রে ফিরে গিয়ে বললেন, আচ্ছা, এ তো গেল একবার। আর কোথায় দেখা হল তোমার সঙ্গে?

    —ওরই ঠিক একবছর পরে সোনাডাঙ্গার রমেশ ডাক্তারের বাড়িতে। নোটিশ দিয়ে ডাকাতি। একদল পুলিশ নিয়ে আপনি একেবারে রেডি হয়ে গিয়েছিলেন। মতলব ছিল বদর মুন্সীকে ঝাঁকসুদ্ধ ডাঙায় তোলা। কিন্তু দু’চারখানা ল্যাজা চালাতেই ফোর্স আপনার পালিয়ে গেল। হুজুর আশ্রয় নিলেন ডাক্তারের খিড়কির পুকুরে কচুরিপানার তলায়। আমার দলের লোকগুলো জানত, আপনিও সরে পড়েছেন। আমি কিন্তু জলের ওপর হুজুরের ঐ গোঁফজোড়া ভাসতে দেখেছিলাম। হাতে ল্যাজাও ছিল। কাজে লাগাইনি।

    একটু থেমে খানিকটা যেন শ্লেষজড়িত সুরে বলল মুন্সী, তাহলেই দেখুন, হুজুর, খোদা যা করেন, ভালোর জন্যেই করেন।

    ভূতনাথবাবুর মুখ দেখে মনে হল, তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন। মুন্সীও সেটা লক্ষ্য করল এবং চোখে মুখে সামান্য একটু হাসি ফুটিয়ে বলল, যাক ওসব পুরনো কথা। বাজে বকে খালি খালি আপনার সময় নষ্ট করবো না। এবার হুকুম করুন, গরিবকে হঠাৎ তলব করেছেন কেন?

    ভূতনাথ চেয়ারে হেলান দিয়ে সিগার টানছিলেন। কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ার আড়ালে তাঁর মুখখানায় মনে হল আষাঢ়ের মেঘ থমথম করছে। আরও কিছুক্ষণ কালো ধোঁয়ার কড়া গন্ধ ছড়িয়ে, সোজা হয়ে বসে বললেন, দ্যাখ বদরুদ্দিন, দেখা আমাদের হোক আর নাই হোক, দুজনকে যে আমরা ভালোভাবেই চিনি সেকথা তুমিও জান, আমিও জানি। কথার মারপ্যাচ আর বুদ্ধির লড়াই দেখিয়ে লাভ নেই। তোমাকে যা বলবো একেবারে খোলাখুলিভাবেই বলবো। তোমার কাছ থেকেই সেই জিনিসটাই আশা করি।

    —মারপ্যাচ আমার মধ্যেও নেই, হুজুর। খুনীই হোক, আর ডাকাতই হোক, বদর মুন্সীর দিল্ সাদা। একথা তার দুশমনরাও অস্বীকার করবে না।

    —আমিও সে কথা বিশ্বাস করি, মুন্সী; আর সেই বিশ্বাস আছে বলেই তোমার কাছ থেকে কিছু সাহায্য চাইতে এসেছি।

    মুন্সী বিস্ময়ের সুরে বলল, সাহায্য! আমার কাছে?

    —হ্যাঁ, তোমারই কাছে। আজ চৌদ্দো বছর ধরে পুলিশ তোমাকে ধরবার চেষ্টা করছে; পারেনি। শুধু পুলিশ নয়, বেসরকারী লোকেরাও কম চেষ্টা করেনি। তোমার দলের পেছনে তাড়া করতে গিয়ে আজ পর্যন্ত তিনজন লোক প্রাণ হারিয়েছে, জখমও হয়েছে অনেক। কদমতলীর মাঠে তিনশ’ লোকে ঘেরাও করেও শেষ পর্যন্ত তোমাকে আটকাতে পারেনি। সেই বদর মুন্সী কিনা ধরা পড়ল জনকতক কোঁচা-ঝোলানো বরযাত্রীর হাতে, তার একটা ঘুষির মুখে যাদের গুঁড়িয়ে ছাতু হয়ে যাবার কথা! তোমাকে এখানে না দেখলে কথাটা বোধ হয় আমিও বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু এমনিই হয়ে থাকে। এই দুনিয়ার নিয়ম। মহাভারতে আছে, অত বড় সে সব্যসাচী অর্জুন তিনিও একদিন তাঁর গাণ্ডীবখানা তুলতে পর্যন্ত পারেননি।

    বদর মুন্সীর ভারী গলায় উত্তর এল, জানি।

    —তাহলেই দ্যাখ, সব নিয়তির খেলা। যা কিছু লম্ফঝম্প, সব দু’দিনের। হঠাৎ একদিন এমনি করে তার শেষ হয়।

    একটু থেমে ভূতনাথবাবু তেমনি ধীরে ধীরে বললেন, তুমি সেরে উঠেছ, সুখের কথা একরকম পুনর্জন্মই বলা চলে। ধরে যে তোমার প্রাণ ছিল সেদিন তাই তো কেউ বুঝতে পারেনি।

    মুন্সী রুদ্ধকণ্ঠে বলল, ছিল না হুজুর। প্রাণ ফিরে পেয়েছি জেলর সাহেবের দয়ায়। উনি আমার বাপ, আমার জন্মদাতা—-বলে সে মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে।

    ভূতনাথ বললেন, সে সবই আমরা শুনেছি। কিন্তু যে-জীবন তুমি ওঁদের দয়ায় ফিরে পেলে, তার বাকী কটা দিনও বোধ হয় ওঁদের আশ্রয়েই কাটিয়ে দিতে হবে—শুনতে ভালো না লাগলেও, এ সত্যি কথাটা জেনে রাখা ভালো।

    মুন্সী হেসে বলল, সেটাও কি আপনি আমাকে মনে করিয়ে দেবেন বড়বাবু? এই জেলের মাটিতেই যে একদিন আমার শেষ ঘুম আসবে, সেকথা আমি জানি। তার জন্যে তৈরিও হয়ে আছি।

    ভূতনাথ উদাস কণ্ঠে বললেন, এই যখন পরিণাম, আর সে সম্বন্ধে তোমার মনে যখন কোনো মিথ্যা আশা নেই, তখন আর মায়া কিসের? যাদের সঙ্গে হাতে হাত ধরে একদিন এই পথে পা বাড়িয়েছিলে, তাদের পেছনে ফেলে এলে চলবে কেন? তাদেরও ডাক। সবাই এসে নিজের ভাগ বুঝে নিক।

    মুন্সীর সন্দিগ্ধ দৃষ্টি পড়ল ভূতনাথের মুখের উপর। আস্তে আস্তে তার ঠোঁটের কোণে দেখা দিল আগেকার সেই শ্লেষ-কুঞ্চিত হাসি। বলল, এই সাহায্যই কি আমার কাছে চাইতে এসেছেন, হুজুর?

    —শুধু চাইতে আসিনি মুন্সী, সাগ্রহে বললেন ভূতনাথ, সে সাহায্য পাব বলেই ভরসা করি।

    —তাহলে বুঝবো, বদর মুন্সীকে আপনি চিনতে ভুল করেছেন বড়বাবু। আপনার এতখানি দামী সময় অনর্থক নষ্ট হল দেখে আমার আপসোস হচ্ছে।

    ভূতনাথের রূপ হঠাৎ বদলে গেল। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, তার মানে, তুমি দলের কারো নাম করবে না?

    উত্তরে মুন্সী শুধু হাসল একটুখানি। তারপর উঠবার উদ্যোগ করে বলল, হুকুম হলে এবার উঠতে পারি, বড়বাবু। আপনার কাজের ক্ষতি হচ্ছে। সে লোকসান আর বাড়াতে চাই না।….সেলাম, হুজুর।

    ভূতনাথ তীব্র শ্লেষের সুরে বললেন, ভূতনাথ দারোগার মুষ্টিযোগগুলো আজও একেবারে অকেজো হয়ে যায়নি, একথা বোধ হয় মুন্সী-সাহেবের স্মরণ আছে!

    —নিশ্চয়ই আছে। তবে মুষ্টিযোগের ফল কি সকলের বেলায় সমান হয়, বড়বাবু? বলে, আর একবার সেলাম করে উঠে দাঁড়াল।

    মুন্সী চলে যাবার পরেও খানিকক্ষণ ভূতনাথবাবুর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। তাঁর মেঘাচ্ছন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে সহকারীটি বললেন, আমি আগেই বলেছি স্যর, ভাল কথার পাত্তর ও নয়। রীতিমত ওষুধ চাই। সেই ব্যবস্থাই আমাদের এবার করতে হবে। আপনার ‘নিমজ্জনী সুধা’ কয়েক ডোজ পড়লেই বাপ বাপ করে পথে আসবে বাছাধন

    ভূতনাথ কটমট করে তাকালেন তাঁর সহকারীর দিকে, অতো সোজা মনে কোরো না। যে লোকটা কনফেশন করে, অথচ আর কাউকে জড়ায় না, সে বড় কঠিন চীজ।

    আমি বললাম, আপনার কথায় যদ্দূর বুঝলাম, লোকটা মহাপুরুষ। কিন্তু ধরা পড়ল কেমন করে?

    —একেবারে মহাপুরুষের মত, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন ভূতনাথ, ধরা পড়ল, মার খেল ঠায় দাঁড়িয়ে, আর ঐ রকম মার; তারপর করে বসল এক কনফেশন। শুধু ডাকাতি নয়, তার সঙ্গে মার্ডার এবং রেপ। আগাগোড়া সমস্ত ব্যাপারটাই যাকে বলে রহস্যময়। যাই হোক, আপনি ঠিকই বলেছেন, লোকটা মহাপুরুষ। কাজেই বেশ একটু কড়া নজর রাখতে হবে। ডানায় যখন একবার জোর পেয়েছে, হঠাৎ কোনদিন বনের পাখি বনে চলে যাবে, টেরও পাবেন না।

    সে বিষয়ে জেলের তরফ থেকে হুঁশিয়ারী এবং কড়াকড়ির ত্রুটি ছিল না। ভূতনাথের উপদেশে সেই ব্যবস্থা আর একটু দৃঢ়তর হল।

    এই ঘটনার পর মাসখানেক চলে গেছে। মুন্সীকে বিশেষভাবে মনে করবার মত নতুন কিছু ঘটেনি। তারপর একদিন বিকালের দিকে সেল-ব্লকের মেট এসে জানাল, মুন্সী আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

    —কেন?

    —সে কথা হুজুরের দরবারে নিজেই নিবেদন করতে চায়।

    আমার মেটটি কিঞ্চিৎ লেখাপড়া জানে এবং সাধুভাষার উপর তার গভীর অনুরাগ।

    বললাম, আচ্ছা ‘লিয়ে’ এসো।

    মুন্সী এসে বসল আমার পায়ের কাছটিতে। আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম। সে কিছু বলল না, এদিক ওদিক চেয়ে ইতস্তত করতে লাগল। তার উদ্দেশ্য বোঝা গেল। জন দুই কর্মী কার্যসূত্রে আমার অফিসে অপেক্ষা করছিল। তাদের তাড়াতাড়ি বিদায় দিয়ে বললাম, বল এবার।

    মুন্সী আমার পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে বলল, বদর মুন্সীর মনের কথা এমন করে কেউ কোনোদিন বোঝেনি হুজুর। আজ আবার এলাম এক নতুন আরজি নিয়ে।

    —কি তোমার আরজি?

    মুন্সী খানিকটা কি ভাবল। তারপর নিজের দু’খানা হাতের দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বলল, গোস্তাকি মাপ করবেন, বড়বাবু। টাকাকড়ি সোনাদানা লোকে যতখানি চায় যতখানি পেলে মনে করে সে বড়লোক, তার চেয়েও অনেক বেশি এই দুটো হাত দিয়েই তো লুটেছি জীবনভোর। কিন্তু কেড়ে যেমন নিয়েছি, উড়িয়েও দিয়েছি তেমনি। পড়ে নেই কিছুই। যাদের কলজের ভেতর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলাম তাদের নিঃশ্বাসেই সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। আজ তাই মন আমার একেবারে হালকা। একটুখানি বোঝা শুধু রয়ে গেছে; উঠতে বসতে বুক চেপে ধরে। সেইটেই আজ হুজুরের পায়ের উপর ফেলে দিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত হতে চাই।

    কথাটা স্পষ্ট বুঝতে না পেরে আমি নিঃশব্দে অপেক্ষা করে রইলাম।

    মুন্সী আরো একটু কাছে সরে এসে হাতজোড় করে বলল, বলতে সাহস হয় না। কিন্তু না বলেও আমার উপায় নেই। হাজার পাঁচেক টাকা আমার লুকনো আছে এক জায়গায় সেটা আমি হুজুরের হাতে দিয়ে যেতে চাই।

    সবিস্ময়ে বললাম, আমার হাতে! আমি সে টাকা নিয়ে কি করবো?

    —বিলিয়ে দেবেন, যেখানে খুশি। ইচ্ছা হয় কোনো ভাল কাজে খরচ করবেন। তবু মরবার সময় এইটুকু জেনে যেতে পারবো, বদরুদ্দিন ডাকাতের গোটা জীবনটাই বিফলে যায়নি। অনেক দয়াই তো হুজুর করেছেন এই খুনীটাকে। তার শেষ আব্দারটুকু পায়ে ঠেলবেন না।

    সহসা উত্তর দিতে পারলাম না। তার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, তার গুপ্তধনের ভার গ্রহণ আমার পক্ষে আইনসঙ্গত নয়, নৈতিক দিক দিয়েও অসঙ্গত। এই জাতীয় অবাঞ্ছনীয় প্রস্তাব তার পক্ষে অন্যায় স্পর্ধা বলে মনে হল। কিন্তু কি দেখেছিলাম জানি না, সেই পরস্বাপহারী নরহত্তার মুখের উপর, কি শুনেছিলাম তার বেদনার্ত ব্যাকুল কণ্ঠে, রূঢ় উত্তর আমার মুখে এসেও আটকে গেল। সোজা জবাবটা এড়িয়ে গিয়ে বললাম, নিজের লোক কি তোমার কেউ নেই যে অতগুলো টাকা বিলিয়ে দিতে চাইছ?

    মুন্সী একটু হেসে বলল, নিজের লোক? নিজের লোকের অভাব কি, বড়বাবু? সবাই আছে। তিন-তিনটা বিবি, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনী, তাদের আবার ছেলেমেয়ে। না আছে কে? আপনি বলবেন, কেউ তো আসে না একটু খোঁজখবর নিতে? তবু তারা আছে। আরো কিছু টাকা আমার রয়ে গেছে, এ খবরটা জানাজানি হলেই আণ্ডাবাচ্ছা নিয়ে ধন্না দেবে আপনার ঐ জেলের মাঠে। এমন মড়াকান্না কাঁদবে হয়তো আমার চোখেই জল এসে পড়বে। এই বুড়ো বয়সে অতোটা দরদ তো সইতে পারবো না। আপনার লোক মাথা খুঁড়ে মরবে তাও চোখের ওপর দেখতে চাই না। কাজেই আমার এ টাকার কথা তারা কোনোদিন জানবে না।

    -বেশ, তাদের না হয় না দিলে। কিন্তু টাকার দরকার তোমার নিজেরও তো কম নয়। অত বড় মামলা তোমার মাথার ওপর।

    মুন্সীর মুখে হাসি ফুটে উঠল : আস্তে আস্তে বলল, মামলার হাত থেকে বাঁচবার চেষ্টাই যদি করবো, তাহলে আজ এখানে আসবার কি দরকার ছিল, বড়বাবু?

    তা বটে। ভূতনাথবাবুর কথা মনে পড়ল। মুন্সীর এই ধরা-পড়া এবং স্বীকারোক্তির মধ্যে কী একটা রহস্য আছে। সে রহস্য উদ্ঘাটনের কৌতূহল যতই থাক, সে সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন করা আমার পক্ষে সমীচীন হবে না বলে চুপ করে রইলাম। মুন্সী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, আরজি আমার মঞ্জুর হল তো হুজুর?

    বললাম, তোমার মনের কথা আমি বুঝতে পারছি, মুন্সী। তেমনি তুমিও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, এ বিষয়ে তোমাকে সাহায্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবু একটা কথা জানতে চাই। বল তো, তোমার ইচ্ছাটা কি? কাকে তুমি দিয়ে যেতে চাও তোমার এই শেষ সম্বল? কিভাবে, কার হাতে দিলে তুমি শান্তি পাও?

    মুন্সী তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না। একদৃষ্টে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল শূন্য দেওয়ালের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বলল, আপনি আমার বাপ, আমার জীবনদাতা। আপনার কাছে লুকোবার আমার কিছুই নেই। এ সংসারে একটা মানুষ আছে, যার হাতে এই সামান্য টাকাটা তুলে দিতে পারলে আমার মনের বোঝা নেমে যায়। আমি মহানন্দে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে হাসতে হাসতে চলে যেতে পারি। কিন্তু একথাও জানি সে আমার টাকা পা দিয়েও ছোঁবে না। যে চরম সর্বনাশ আমি তার করেছি, দুনিয়ার সমস্ত টাকা ঢেলে দিলেও তার কোনোদিন পূরণ হবে না।

    টেবিলের উপর টেলিফোন ঝঙ্কার দিয়ে উঠল।

    —হ্যালো!

    কোর্ট থেকে খবর দিচ্ছে, জজসাহেব একটা জটিল মামলার এইমাত্র চার্জ বোঝানো শেষ করেছেন, জুরী মহোদয়গণ দরজা বন্ধ করলেন। কখন খুলবেন, নিশ্চয় করে বলা যায় না। অতএব আসামীদের ফিরতে অনেক রাত হবার সম্ভাবনা।

    সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। জানালা দিয়ে দেখা গেল দূরে আকাশের গায়ে অস্তমান সূর্যের বর্ণচ্ছটা, সেই দিকে চেয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল মুন্সী। আমিও উঠলাম। লক-আপ-পর্বের আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে হবে। যেতে যেতে বললাম, আবার কবে আসছ?

    আর্দ্র কণ্ঠে উত্তর এল, যেদিন আবার হুকুম পাবো।

    কয়েকদিন পরে তেমনি সময়ে সেই জায়গাটিতে বসেই শুনলাম তার অসমাপ্ত আত্মকাহিনী, নরঘাতক দস্যুর বিচিত্র জীবনের এক অপূর্ব অধ্যায়। বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সেদিন বিপুল ঘনঘটা। আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঘন ঘন বিদ্যুৎস্ফুরণ। মনে হচ্ছিল, প্রলয় আসন্ন। সেইদিকে চেয়ে অনেকক্ষণ তন্ময় হয়ে বসে রইল মুন্সী। তারপর ধীরে ধীরে অনুচ্চ গম্ভীর কণ্ঠে বলে গেল তার শত দুষ্কর্মের বিবরণ

    আজ এতদিন পরে আমার কণ্ঠে তার পুনরুক্তি করতে গিয়ে মনে হচ্ছে এর চেয়ে হাস্যকর ব্যর্থতা আর হতে পারে না। তবু এইটুকু আমার সান্ত্বনা—নিজের ভাষা ও ভাষ্য দিয়ে তাকে আমি বিকৃত করিনি, ব্যাহত করিনি তার স্বচ্ছন্দ সারল্য। এ কাহিনীর কথা মুন্সীর, সুরও তারই। আমি অক্ষম লিপিকার মাত্র।

    মুন্সীর কাহিনী শুরু হল :-

    কালীগঞ্জের সীতানাথ দত্তের বাড়িতে ডাকাতি করবো—এটা আমাদের অনেক দিনের ইচ্ছা। লোকটা টাকার কুমির, কিন্তু ভয়ানক ধড়িবাজ। টাকাপয়সা গয়নাগাঁটি বাড়িতে বিশেষ কিছুই রাখে না, সব থাকে ব্যাঙ্কে। মস্ত বড় কারবার। চারখানা গোরুর গাড়ি। সবগুলো নিজের কাজেই খাটছে দিনরাত। তার একখানার গারোয়ান করে ঢুকিয়ে দিলাম আমাদের দলের এক ছোকরাকে। সেই একদিন খবর নিয়ে এল, দত্তমশায়ের মেয়ের বিয়ে। ঐ একটিই মেয়ে। জামাই আসছে বড় ঘর থেকে। বিয়েতে মস্ত ধুমধাম হবে। বড়লোক কুটুম্ব আসবে অনেক। বিয়ের রাতে হানা দিতে পারলে নগদে গয়নাতে হাজার পঞ্চাশের বুঝ যে পাওয়া যাবে, তাতে আর সন্দেহ নেই। তবে দত্তমহাশয়ের দুটো বন্দুক আছে, হিন্দুস্থানী দারোয়ান আছে। বাড়িতে লোকজনও থাকবে কম নয়। কাজেই আয়োজনটা বড় রকমের হওয়া দরকার। সেদিক থেকে অসুবিধা কিছু নেই। দল ঠিক করে ফেললাম। তা ছাড়া—

    এ পর্যন্ত বলে মুন্সী হঠাৎ থেমে গেল। মনে হল ভাবছে, যেটা মুখে এসেছিল, তাকে মুখের বাইরে আনা ঠিক হবে কিনা। একবার আমার দিকে তাকাল এবং পরক্ষণেই যেন সব সঙ্কোচের বাধা ঠেলে দিয়ে বলল, নাঃ, লজ্জা করলে তো চলবে না। এ পাপমুখে সবই যখন কবুল করেছি হুজুরের কাছে, এটাও লুকোবো না।

    হুজুর জানেন এক একটা ডাকাতিতে কত বড় বড় গেরস্তকে আমরা পথের ফকির করে ছেড়ে দিই। দশজনে বলাবলি করে, লোকটার কি সর্বনাশ হয়ে গেল! বাইরে থেকে ঐটুকু দেখা যায়, কিন্তু আসল সর্বনাশ যে কদ্দূর গিয়ে পৌঁছায় তার খবর আপনারা রাখেন না। লোকের ধনপ্রাণ কেড়ে নিয়েই আমরা ক্ষান্ত হই না, কেড়ে আনি মান, আর তার চেয়েও বড় জিনিস—মেয়েদের ইজ্জত। বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে, আর বৌ-ঝিদের ধর্ম নষ্ট হয়নি এ রকম ঘটনা আমি অন্তত একটাও জানি না। শিকারীর দলে যেমন কতগুলো লোক থাকে, যারা বনবাদাড় ভেঙে পিটিয়ে হৈ-হল্লা করে শিকার ধরবার সুবিধে করে দেয়, আমরাও তেমনি একদল গুণ্ডা নিয়ে যাই, যাদের কাজ হল মারধোর, খুন-জখম আর চেঁচামেচি। এদের নজর রূপোর দিকে যতটা থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি থাকে রূপের দিকে। আমরাও তাই চাই। এগুলোকে দিয়ে আমাদের ডবল লাভ। গোটাকয়েক মেয়েমানুষের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে আসল কাজ হাসিল করে নিই; আর ভাগ-বাঁটোয়ারার বেলায় যা হোক কিছু দিলেই চলে যায়। দেখতে ভাল বলে দত্তবাড়ির মেয়েদের নামডাক ছিল। তার ওপর এই বিয়ে উপলক্ষে শহর থেকে যারা আসবে, তারা তো আর এক কাঠি সরেশ। কাজেই গুণ্ডা আসতে লাগল দলে দলে। ওরই মধ্যে থেকে বেছে বেছে একদল জোয়ান ছোকরা ঠিক করে ফেললাম।

    শীতের রাত। বারোটার মধ্যেই বিয়ের গোলমাল মিটে গেল। যারা খেতে এসেছিল, সব চলে গেল। বরযাত্রী আর দূরের কুটুম্বরাও সব শুয়ে পড়েছে। এমনি সময়ে আমরা মার মার শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বাড়িটা ঘিরে ফেলা হল প্রথম চোটেই। খোট্টা দারোয়ানগুলোর কোনো পাত্তাই পাওয়া গেল না। বরযাত্রীদের ঘর বাইরে থেকে বন্ধ করে ঢুকে পরলাম বাড়ির মধ্যে। মেয়েমহলে কান্নাকাটির ধুম পড়ে গেল। বাছা বাছা লোক নিয়ে উঠলাম গিয়ে দোতলায়। বাহাদুর লোক বটে সীতানাথ দত্ত। যেন কিছুই হয়নি, এমনি ভাবে বেরিয়ে এসে বলল, তোমাদের সর্দার কে? মুখে রং-টং মাখা ছিল। এগিয়ে গেলাম। দত্তমশাই বলল এই নাও চাবি। ঐ ঘরে সিন্দুকে টাকা আছে। গয়নাও বেশ কিছু আছে। নিয়ে যাও। কাপড়-চোপড় আছে, তাও নিতে পার। মেয়েদের গায়ে যে সব গয়না আছে, তাও খুলে দেবার ব্যবস্থা করছি। কিন্তু একটা কথা দিতে হবে।

    —কি কথা?

    —যদি হিন্দু হও, নারায়ণের দিব্যি, যদি মোছলমান হও, আল্লার দিব্যি, মেয়েদের গায়ে যেন হাত দেয় না কেউ।—বলে এগিয়ে এসে এই হাত দুটো জড়িয়ে ধরে দত্তমশাই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। ধরা গলায় বলল, ডাকাতের সর্দার হলেও তুমি মানুষ। আমারই দেশের মানুষ। তোমার ঘরেও মা-বোন বৌ-ঝি আছে। এইটুকু শুধু তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি।

    ডাকাতি অনেক করেছি, বড়বাবু। কান্নাকাটিও কম শুনিনি। ও সব আমাদের গা-সহা হয়ে গেছে। কিন্তু দত্তমশায়ের চোখের জলে মনের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। কথা দিলাম। বললাম, গয়নাগাঁটি খুলে দিয়ে মেয়েদের সব একটা ঘরে চলে যেতে বলুন। ওঁদের কোনো বিপদ নেই।

    দত্তমশাই চলে গেল। আমি আমার দলবল জড়ো করে হুকুম দিলাম, টাকাকড়ি জিনিসপত্তর যা পাও লুঠ কর। কিন্তু সাবধান, জেনানা হারাম।

    কাজ শেষ হতে আধ ঘণ্টার বেশী লাগল না। সবাইকে নিচে যাবার হুকুম দিয়ে ভাবলাম, তেতলাটা একবার নিজের চোখে দেখে আসি। সীতানাথ দত্ত ঘড়েল লোক। কিছু আবার লুকিয়ে-টুকিয়ে রাখেনি তো ওখানে?

    তেতলায় একখানা ঘর। অন্ধকার। দরজা বন্ধ। জানালা দিয়ে টর্চ ফেলতেই আলো পড়ল একটি মেয়ের মুখের উপর। চমকে উঠলাম। এ কে? কোত্থেকে এল ও? একেবারে অবিকল সেই। সেই নাক, সেই চোখ, তেমনি জোড়া ভুরুর উপর ছোট্ট একখানি কপাল। আমার কত আদরের নুরু। পরীর মত মেয়ে। আমার ছেলেবেলার দোস্ত ছিল মতীশ; কলেজে পড়ত তখন। সাধ করে নাম দিয়েছিল নূরজাহান। আট বছর আগে এমনি দামী বেনারসী পরিয়ে গা-ভরা জড়োয়া গয়নায় সাজিয়ে মাকে আমার পরের ঘরে পাঠিয়েছিলাম। আর ফিরে আসেনি।

    মেয়েটা চীৎকার করে কাকে জড়িয়ে ধরল। টর্চ নিবিয়ে দিলাম। বেশ করে রগড়ে নিলাম চোখ দুটো। এ আমার কী হঙ্ক? কি ভাবছি ছাই-ভষ্ম? কে ঐ মেয়েটা? সীতানাথ দত্তের মেয়ে? ওরই হয়তো বিয়ে হল খানিকক্ষণ আগে। আবার টর্চ জ্বাললাম। ভারী ভারী গয়নার উপর জড়োয়ার পাথরগুলো ঝলমল করে উঠল। হাজার দশেক টাকার মাল। ভাগ্যিস ওপরে এসেছিলাম। দত্তটা এক নম্বর জোচ্চোর। ধমক দিয়ে বললাম, খুলে দাও গয়না। কে যেন মুখ চেপে ধরল। স্বর ফুটল না। নুরুর মুখখানা ভেসে উঠল চোখের ওপর। সেই আট বছর আগে শেষবারের মত দেখা বিয়ের সাজ-পরা নূরজাহান। ঠোঁট দুটো যেন কেঁপে উঠল একবার। কি বলতে চায় সে? এ গয়না আমার নেওয়া হবে না— এই কথাই যেন শুনতে পেলাম তার মুখে!

    ফিরে এলাম। সোজা নীচে নেমে গেট পার হয়ে, ছুটলাম মাঠের দিকে। দলের লোকগুলো ঐখানেই কোথাও অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। মনে হল, কে যেন আমার ঘাড় ধরে ঠেলে নিয়ে চলেছে। খানিকক্ষণ ছুটবার পর হঠাৎ থমকে গেলাম। এ কী করছি! মাথাটা কি সত্যিই খারাপ হয়ে গেল? এরকম তো কোনোদিন হয়নি। সীতানাথ দত্তের দুটো মিষ্টি কথা শুনে বদরুদ্দিন ডাকাতের মন ভিজে গেল? কথার খেলাপ করে বসলাম নিজের দলের সঙ্গে! যে লোভ দেখিয়ে নিয়ে এলাম ঐ ছোঁড়াগুলোকে, তার ধারেও তারা ঘেঁষতে পেল না, আর সেটা আমারই জন্যে! এলাম ডাকাতি করতে, ফিরে যাচ্ছি দশ হাজার টাকার গয়না ফেলে রেখে! ভীমরতি আর কাকে বলে?

    মাথাটায় বেশ কয়েকবার ঝাঁকানি দিয়ে মনে হল যেন নেশার ঘোর কেটে গেছে। ঢুকলাম আবার দত্তবাড়ির ফটকে। সোজা তেতলায় উঠে গেলাম। ঘর খোলা। টর্চ জ্বেলে যা দেখলাম—

    হঠাৎ আবার থেমে গেল মুন্সী। দুটো বড় বড় চোখ শূন্য, বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ঐ ফাঁকা দেয়ালটার দিকে। ঐখানেই যেন ফুটে উঠেছে সেদিনের দেখা কোনো বীভৎস দৃশ্য। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি আবার সহজ হয়ে এল। দেয়াল থেকে চোখ নামিয়ে আমার দিকে চেয়ে বলল, যা দেখলাম আমার কাছে নতুন কিছু নয়, বড়বাবু। সারা জীবন কত দেখেছি। খুন আর বলাৎকার—এই তো আমার পেশা। এই হাতে কত লোকের গলা টিপে মেরেছি, ছোরা বসিয়েছি বুকে, ল্যাজার এক ঘায়ে খতম করেছি, রামদার এক কোপে নাবিয়ে দিয়েছি ধড় থেকে মুণ্ডু। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটেছে। এতটুকু বুক কাঁপেনি। মাথাও ঘোরেনি একবার। মেয়েমানুষের সর্বনাশ? তাও কম করিনি। কত মেয়ে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে, তবু রেহাই পায়নি। কত বড় বড় ঘরের ঝি বৌ এই পায়ের উপর মাথা খুঁড়ে বলেছে, তুমি আমার ধর্মের বাপ, আমি তোমার মেয়ে। হাসি পেয়েছে সে-সব মড়াকান্নার বহর দেখে। কিন্তু আজ আমার এ কী হল? ঘরে ঢুকে যা দেখলাম, মাথাটা ঘুরে গেল। দেয়াল ধরে সামলে নিলাম। দেখলাম দেয়ালের গা ঘেঁষে পড়ে আছে একটি জোয়ান ছেলে। রাজাবাদশার মত রূপ; পরনে বরের পোশাক। বুকের বাঁ দিকটায় বিঁধে রয়েছে একখানা ছোরা। সবটাই বসে গেছে বেরিয়ে আছে শুধু বাঁট। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বাসরঘর আর তার মাঝখান জুড়ে ভেলভেটের জাজিম। রক্তে-ভেজা বিছানার একপাশে অসাড় হয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে মেয়েটা, আর আমারই একটা জানোয়ার—। চুল ধরে টেনে তুললাম শুয়োরটাকে। মুখটা তার ঠুকে দিলাম দেয়ালের গায়ে। নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত ছুটল। চারপাঁচটা দাঁত ভেঙে বেরিয়ে গেল। আর দু-এক ঘা খেলেই সাবাড় হয়ে যেত শালা। কিন্তু ছেড়ে দিলাম। ছুঁচো মেরে হাতে গন্ধ করে কী লাভ? লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বারান্দায়।

    ছেলেটির নাড়ী ধরলাম। নাকে হাত দিয়ে দেখলাম। নেই। তারপর এগিয়ে গেলাম তার দিকে। মেয়ে তো নয়, যেন একরাশ কাঞ্চন ফুল। কে বলে নুরু নয়? এই তো আমার নূরজাহান। এত রূপ কি মানুষের হয়? বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছে সীতানাথ দত্তের ঘরে। আমারই মেয়ে সে। আজ বিয়ের রাত না পোহাতে আমারই হাত দিয়ে এল তার সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে চরম সর্বনাশ!…

    .

    কিছুক্ষণ থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষণ-মুখর বিষণ্ণ সন্ধ্যা। ঘনায়মান অন্ধকারে মুন্সীকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। উঠে গিয়ে আলোটা জ্বেলে দিলাম। চমকে উঠলাম। বদর মুন্সীর চোখে জল! না, ভুল করিনি। দুটি রোগপাণ্ডুর গণ্ডের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে নির্বাক অশ্রুধারা। বললাম, থাক মুন্সী, এসব কথা বলে আর কি হবে? এতে আজ কারোরই কোনো লাভ নেই। মুন্সী তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল, না. হুজুর, মেহেরবানি করে আর একটু শুনুন। লাভ থাক আর নাই থাক, সব কথা আজ আমাকে বলতেই হবে। আপনাকে ছাড়া আর কাকেই বা বলবো?

    আমি সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারের উপর পা তুলে গুছিয়ে বসলাম। মুন্সী শুরু করল।

    ঘরের কোণে একটা সোরাই ছিল। কয়েকবার চোখে মুখে জলের ছিটে দিতে ও চোখ মেলে তাকাল। অনেক বছর আগে আমার নুরুও এমন করে চাইত। কিন্তু কত তফাত! এদিক ওদিক চেয়ে হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়তেই চেঁচিয়ে উঠে সঙ্গে সঙ্গে আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। ছুটে বেরিয়ে গেলাম। ডাক্তার! একজন ডাক্তার চাই। ভুলে গেলাম আমি কে, কোথায় যাচ্ছি, ডাক্তার ডাকবার আমার কি অধিকার। শুধু মনে হল ডাক্তার ডাকতে হবে। কিন্তু সে সুযোগ আর হল না। সিঁড়ির মুখেই আটকা পড়ে গেলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, মেয়েটি আমার কেউ নয়। আমি তাদের বাড়ি এসেছি ডাকাতি করতে। আমারই জন্যে আজ একফোঁটা কচি মেয়ে দুনিয়ার সব কিছু হারিয়ে সংসারের বাইরে চলে গেল।

    ভূতনাথবাবু মিথ্যা বলেননি, হুজুর, যারা আমাকে ঘিরে ধরেছিল ইচ্ছে করলে তাদের সবগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু হাত আমার উঠল না। কেবলই মনে হতে লাগল, এই শেষ। বদর মুন্সীর কবর খোঁড়া হচ্ছে। গিয়ে শুধু ঘুমিয়ে পড়া। লাঠি, সড়কি, লোহার ডাণ্ডা—অনেক কিছুই চারদিক থেকে এসে পড়ছিল আমার মাথায়, পিঠে, ঘাড়ে। যতক্ষণ পেরেছি দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর কখন পড়ে গেলাম। আর কিছু মনে নেই।

    জ্ঞান যখন হল, চোখ মেলে প্রথমেই দেখলাম পাশে দাঁড়িয়ে লাল পাগড়ি। একজন মাথায়-রুমাল-বাঁধা দেশী মেমসাহেব ছুটে এল। বুঝলাম, নার্স। কাছে এসে আমার নাড়ী দেখল, তারপর একটা শিশি থেকে খানিকটা ওষুধ গেলাসে ঢেলে আস্তে আস্তে খাইয়ে দিল। কিছুক্ষণ পরে একটু যেন বল পেলাম। অতি কষ্টে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কোথায়?

    —এটা সরকারী হাসপাতাল। ডাক্তারবাবুকে ডেকে দেবো?

    হাত নেড়ে বললাম, চাই না। হাকিম—হাকিম চাই একজন।

    একজন পুলিশের দারোগা এলেন। আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাকিম কেন?

    -একরার করবো।

    ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এলেন। তখনো আমার জ্ঞান ছিল, কিন্তু কষ্ট হচ্ছিল খুব। একরারী আসামীর জবানবন্দী—কত ঝঞ্ঝাট, সে তো আপনি জানেন। লিখবার আগে তাকে সাবধান করে দিতে হবে, সময় দিতে হবে ভেবে দেখবার। হাকিমদের কত কি সব নিয়ম আছে। আমি বললাম, ওসব আইনকানুন চটপট সেরে ফেলুন হুজুর। সময় বেশী দিলে এ জীবনে আর সময় হবে না।

    বলবার কথা সামান্য। কোনোরকমে থেমে থেমে বলে গেলাম। সবটুকু বোধ হয় বলতে পারিনি। তার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম। তারপর কখন কি করে ওরা আমাকে হুজুরের আশ্রয়ে নিয়ে এল, কিছুই জানি না। সরকারী হাসপাতালের কর্তারা বোধ হয় মনে করেছিলেন, মড়াটা আর তাদের ওপর চাপে কেন? ফেলে দাও জেলের ঘাড়ে। কিন্তু তারা জানত না, এখানে আমার বাবা আছেন। তাঁরই দয়ায় আমার মরা ধড়ে প্রাণ ফিরে এল।

    .

    মুন্সীর কাহিনী শেষ হল। আমি তার শেষ প্রসঙ্গের জবাব দিলাম। বললাম, এর মধ্যে আমার দয়া তো কোথাও কিছু নেই, মুন্সী। যেটুকু কর্তব্য, তাই শুধু করেছি। বরং কৃতিত্ব যদি কিছু থাকে সেটা ডাক্তারের। সে যাক। একটা কথা শুধু বুঝতে পারছিনে। অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করেছে, এটা নতুন নয়, অদ্ভুত কিছুও নয়। কিন্তু যে-অপরাধ সে করেনি, তারই বোঝা স্বেচ্ছায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে হাকিম ডেকে হলপ করে বলছে, এটা আমি করেছি—এরকম তো কখনো শুনিনি। এর মধ্যে বাহাদুরি থাকতে পারে, কিন্তু একে সৎসাহস বলে না। ডাকাতি তুমি করেছ। তার সমস্ত দায়িত্ব তোমার। কিন্তু ঐ মেয়েটি আর তার স্বামীর উপর যে জঘন্য অত্যাচার ঘটল সেদিন, তার দায়িত্ব তো তোমার নয়। সাধ করে দুটো মারাত্মক মিথ্যা অপরাধে নিজেকে জড়িয়ে ফাঁসির দড়ির সামনে গলা বাড়িয়ে দেবার সার্থকতা কোথায়, আমি দেখতে পাইনে।

    মুন্সী বিনীত কণ্ঠে বলল, হুজুর জ্ঞানী লোক, আমি মুখ্যু ডাকাত। হুজুরের সঙ্গে তর্ক করা আমার গোস্তাকি। তর্ক আমি করছিনে। কিন্তু একথাও অস্বীকার করতে পারিনে, মেয়েটার কপালে যা কিছু ঘটল, তার সবটুকুর মূলেই তো আমি। ঐ জন্তুটাকে আমিই তো জুটিয়েছিলাম। যে জন্যে জুটিয়েছিলাম, ঠিক তাই সে করেছে। চুক্তির বাইরে সে যায়নি। কথার খেলাপ যদি কেউ করে থাকে, সে আমি। সীতানাথ দত্তের কথায় ভুলে যে হুকুম আমি জারী করেছিলাম, সে অন্যায় হুকুম। ঐ গুণ্ডাটা যদি সে মানা না মেনে থাকে, তার জন্যে তাকে দোষ দিই কেমন করে?

    বুঝলাম, মন তার যে পথ ধরে ছুটে চলেছে, আমার ন্যায়-অন্যায়ের শুষ্ক লজিক সেখানে অচল। হয়তো ওর কথাই ঠিক। আর একথাও সত্যি যে, দৈবক্রমে ঐ মেয়েটার মুখে যদি ওর নুরুর মুখের আদল সেদিন চোখে না পড়ত, আজ আমার কাছে বসে বদর মুন্সীর এ কাহিনী শোনাবার কোনো উপলক্ষ ঘটত না। এ সংসারে ঐ নুরুই ছিল তার একমাত্র বন্ধন। সে বন্ধন একদিন অকালে ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। যে ক্ষত রেখে গিয়েছিল ঐ দানবপ্রকৃতি দস্যুর বুকের কোণে, সেটা হয়তো চিরদিন তার অগোচরে থেকে যেত। হয়তো চিরদিনই এমনি কত শত সীতানাথ দত্তের মেয়ে তার লোভ আর লালসার আগুনে আহুতি দিয়ে যেত তাদের অনিন্দ্য রূপ, অমূল্য বস্ত্রালঙ্কার, আর অত্যাজ্য সতীধর্ম। কিন্তু তা হল না। বদর মুন্সীর বিচিত্র জীবন-নাট্যে দেখা দিল এক প্রলয়-রাত্রি। আট বছরের ওপার থেকে নববধূ বেশে ফিরে এল তার নূরজাহান। ফিরে এল, কিন্তু বদর মুন্সী তাকে ফিরে পেল না। তার নিজের হাত দিয়েই এল নির্দয় আঘাত। নির্মূল হয়ে গেল ঐ মেয়েটার স্বামী, সম্ভ্রম, তার নারী-জীবনের সমস্ত শোভা ও সম্পদ। নতুন করে মৃত্যু হল নূরজাহানের। আট বছরের পুরানো ক্ষত-মুখ থেকে আজ শুরু হয়েছে রক্তক্ষরণ। নিজেকে নিঃশেষ না করে এ বেদনার উপশম নেই।

    সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ক্ষান্তবর্ষণ আকাশে মেঘাড়ম্বর স্তব্ধপ্রায়’। বদর মুন্সীর সেলের লৌহতোরণ অনেকক্ষণ আগে থেকেই তার জন্যে অপেক্ষা করছে। তার নিশ্চয়ই মনে নেই; আমিও মনে করিয়ে দিইনি। জমাদার কয়েকবার নিঃশব্দে পায়চারি করে গেছে জানালার সুমুখ দিয়ে। এক দুর্দান্ত ডাকাতের জন্যে তাদের উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। তবু উঠব উঠব করেও যেন উঠতে পারছিনে।

    মুন্সী আরো কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাটিয়ে ধীরে ধীরে বলল, হুজুর ফাঁসির দড়ির কথা বলছিলেন। ও জিনিসটাকে আর ভয় নেই। ফাঁসিতে যাওয়াই আজ সবচেয়ে ভালো যাওয়া। এক নিমিষে সব শেষ। কিন্তু এই তিলে তিলে মরা, এ মরণ তো আর সহ্য হয় না! না, এ আমার আপসোস নয়। জীবনে যা কিছু করেছি, যত পাপ, যত অন্যায়, তার জন্যে আমার দুঃখ নেই। মৌলবী-সাহেবরা যাই বলুন, তার জন্যে তওবা করবারও কোনো চাড় নেই আমার মনে। বুকের ভেতরটা শুধু জ্বলতে থাকে, যখন ঐ মেয়েটার মুখ মনে পড়ে। রাতে ঘুম নেই, দিনে স্বস্তি নেই। সমস্ত শরীরে শুধু জ্বালা। হতভাগীর যা হবার, তা তো হল। তারপর? সারাটা জীবন কেমন করে কাটবে ওর? যে শ্বশুরঘর ও দেখতেও পেল না, সেখানে জায়গা হবে না। বাপের বাড়ির আশ্রয় তাও হয়তো ছাড়তে হবে। আজ না হলেও কাল। বিয়ের রাতে বিধর্মী ডাকাত এসে যার সর্বনাশ করে গেল, হিন্দুর ঘরে সে মেয়েকে কি চোখে দেখেন আপনারা, সে তো আমি জানি। ঐ রকম সব মেয়ের যা গতি, ওকেও কি সেই পথে যেতে হবে? সন্ধ্যার পর সেজেগুজে দাঁড়াতে হবে ঐ বাজারের গলিতে? ওখানে যারা থাকে, তাদের কতজনকে তো আমি জানি। এই রাস্তা ধরেই তারা একদিন ভেসে এসেছিল। ঐ ফুলের মত মেয়ে, কোনো দোষ যে করেনি, দুনিয়ার কোনো পাপের ছোঁয়াচ যার গায়ে লাগেনি, তাকেও গিয়ে পচে মরতে হবে ঐ দোজকের পাঁকের মধ্যে? আমার সর্বস্ব দিয়েও কি তাকে বাঁচাবার উপায় নেই?

    এই নিষ্ফল প্রশ্নমালার আমি কি উত্তর দেবো? আমি শুধু নির্বাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম অগ্নিগোলকের মত তার দুটো চোখের পানে। সর্বাঙ্গে অনুভব করলাম তার দাহ। প্রশ্নবাণ নিরস্ত হল। কিন্তু তার উত্তেজিত ভগ্নকণ্ঠের দুঃসহ বেদনা সমস্ত ঘরময় অনুরণিত হয়ে ফিরতে লাগল।

    মেয়েটার যে বিভীষিকাময় ভবিষ্যৎ আজ ওর কল্পনায় ভেসে উঠেছে, একদিন যে সে বাস্তবের রূঢ় রূপ ধরে দেখা দেবে না, কেমন করে বলি? কিন্তু সে পরিণাম যদি সত্যি দেখা দেয়, মুন্সী তাকে রোধ করবে কি দিয়ে? কি কাজে লাগবে ওর সযত্ন-সঞ্চিত গুপ্তধন?

    একথাটা আমি যেমন করে বুঝেছি, এই বহুদর্শী অভিজ্ঞ দস্যু তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়ে তার চেয়ে কম বোঝেনি। কিন্তু মানুষের জীবনে বুদ্ধির স্থান কতটুকু? কটা প্রশ্নের জবাব সে দিতে পেরেছে আজ পর্যন্ত? কটা সমস্যার সমাধান? Rational animal বলে মানবজাতির পরিচয় আছে দর্শনের পাতায়। শুনতে পাই, এইটাই নাকি তার বৈশিষ্ট্য। সমগ্র জীব-জগতে মানুষ যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে, তার মূলেও শুনি তার ঐ Rationalism. সেজন্যে গর্ববোধ করতে চান করুন। কিন্তু একথা অস্বীকার করি কেমন করে যে, আমার মধ্যে যতটুকু Rational তার অনেক বেশি animal?

    জ্ঞানগর্বী মানুষ এই সহজ সত্যটা মেনে নিতে লজ্জাবোধ করে। বুদ্ধিজীবী বলে তার অহঙ্কারের অন্ত নেই। ন্যায়শাস্ত্রের ধরাবাঁধা ফরমুলা দিয়ে সে বাঁধতে চায় তার দৈনন্দিন কর্মধারা। কিন্তু যখন ঝড় ওঠে কোথায় থাকে তার Logical Syllogism? শতছিন্ন হয়ে যায় তার হিসাবনিকাশের জটিল সূত্র। সেদিন যে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, সে তার মস্তিষ্ক নয়, হৃদয়; হেড নয়, হার্ট—যার রহস্যময় ভাষার কোনো আভিধানিক অর্থ নেই, কোনো থিওরির কাঠামোতেও যাকে বাঁধা যায় না।

    মুন্সীর জীবনে ঝড় উঠেছিল। তাই যে প্রশ্ন নির্গত হল তার বিক্ষত বক্ষ আলোড়িত করে, সেও এমনি অর্থহীন। নির্বিকার নিঃশব্দে আমি শুধু তার শ্রোতাই রয়ে গেলাম। তার ব্যাকুল দৃষ্টি তখনো আমার মুখের উপর নিবদ্ধ, সাগ্রহ উত্তর-প্রতীক্ষায় উন্মুখ। আমি দেয়াল-ঘড়িটার দিকে তাকালাম। রাত আটটা বেজে পনেরো। চোখ নামিয়ে তার দিকে ফিরে বললাম, জমাদার দাঁড়িয়ে আছে। তোমাকে এবার বন্ধ হতে হবে, মুন্সী।

    .

    দিনকয়েক পরে ভূতনাথবাবু আবার এসে উপস্থিত। তেমনি হঠাৎ এবং হন্তদন্ত।

    —কি ব্যাপার?

    —মুন্সীটাকে একবার আনতে পাঠান তো?

    —নতুন করে বাজিয়ে দেখবার মত পেলেন নাকি কিছু?

    —একটা দাঁতভাঙা গুণ্ডা ধরা পড়েছে। সন্দেহ হচ্ছে ওরই দলের লোক। দেখি কিছু বলে কিনা। ব্যাটাকে একটু একলা পেলে সুবিধে হয়।

    —বেশ তো, তাই হবে।

    পাশের ঘরে ঘণ্টাখানেক ধস্তাধস্তি করে ভূতনাথবাবু যখন বেরিয়ে এলেন, তাঁর মুখ দেখে আশান্বিত হওয়া গেল না।

    —সুবিধা হল দাদা?

    উনি মুখ বিকৃত করে বললেন, কিছু না, কিছু না। Very hard nut মশাই। আমার দাঁত ভাঙল, দাঁত ভাঙাটার কোনো হদিস পাওয়া গেল না।

    দাঁতভাঙা লোকটা জেলে এসে গেল তার পরদিন। মুন্সীকে এক সময় ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, এ কি সেই?

    মুন্সী খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হুজুরের কাছে লুকোবো না। কিন্তু আর কাউকে তো একথা বলতে পারি না।

    মাসখানেকের মধ্যেই মামলা শুরু হয়ে গেল। পুলিশের তৎপরতার ত্রুটি ছিল না। বদরুদ্দিন মুন্সীর সহ-আসামী বলে একদল লোককে গ্রেপ্তার করে চালান দেওয়া হল। তাদের দেখে ওর হাসি আর ধরে না—এরা ছিল নাকি আমার সঙ্গে? কি জানি? ছিল হয়তো আগের জন্মে। এ জন্মে তো কোনোটাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

    আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে মুন্সী কোনো উকিল দেয়নি। খুনী আসামী বলে সরকারী ব্যয়ে উকিল নিযুক্ত হল। স্থানীয় বারের একজন উদীয়মান ক্রিমিন্যাল ল’ইয়ার। তিনি এসে পরামর্শ দিলেন কনফেশনটা retract কর। বল, পুলিশের ভয়ে কি বলেছি, মনে নেই। মারের চোটে মাথা ঠিক ছিল না। এ মামলার কিছুই জানি না আমি। ব্যস। বাকীটা রইল আমার হাতে। নির্ঘাত খালাস করে দেবো।

    মুন্সী হেসে বলল, ভয় নেই, বাবু। কনফেশন করলেও মামলাটা যাতে অনেকদিন চলে, সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি। ফী আপনার মারা যাবে না।

    মামলার প্রথম দিন পাঁচটার সময় কোর্ট যখন উঠতে যাবেন, মুন্সী জোড়হাত করে বলল, ধর্মাবতার, আপনার এজলাসে আমাকে যে বসবার অনুমতি দিয়েছেন, তার জন্যে খোদা আপনার মঙ্গল করুন। আর একটা বেয়াদপি মাপ করবেন। বসে বসে আর ঐ একঘেয়ে বক্তৃতা শুনতে শুনতে বড্ড ঘুম পেয়ে যায়। যদি ঘুমিয়ে পড়ি, কসুর নেবেন না।

    হাকিম প্রবীণ ব্যক্তি। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলেন তার প্রধান আসামীর দিকে। যে-মামলাকে বলা যেতে পারে তার ফাঁসি-মঞ্চের প্রবেশ দ্বার, তার কথা শুনতে গিয়ে ঘুম পেয়ে যায়, এরকম ঘুম বোধ হয় তাঁর দীর্ঘ জীবনে আর কখনো দেখেননি।

    এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন বেলা এগারোটার সময় ভূতনাথবাবুর আবির্ভাব।

    —সর্বনাশ হয়ে গেল, মশাই।

    —কী হল?

    —মুন্সীকে একবার কোর্টে পাঠাতে হবে।

    —কোর্টে যায়নি সে?

    —না। এই দেখুন না?

    মুন্সীর ওয়ারেন্টখানা দেখালেন। জেল-ডাক্তার লিখে দিয়েছেন তার উপর—unfit to attend Court.

    বললাম, অসুস্থ হয়ে পড়লে আর কোর্টে যায় কেমন করে, বলুন?

    —অসুস্থ মোটেই নয়। আপনি নিজে একবার খবর নিয়ে দেখুন। নিশ্চয়ই এটা কালকের ঘটনার জের।

    ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলেন ভূতনাথবাবু :

    মোকদ্দমার উদ্বোধনী বক্তৃতার পর দু’দিন হল সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে! মুন্সী তো প্রথম থেকেই মামলা সম্বন্ধে উদাসীন। যতক্ষণ আদালতের কাজ চলে, কাঠগড়ায় রেলিং- এ হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। কাল যে সব সাক্ষীর জবানবন্দী নেওয়া হল, তাদের মধ্যে একজন ছিল সীতানাথ দত্তের মেয়ে। তাকে যখন নিয়ে আসা হল তখনো ওর যথারীতি নাক ডাকছিল। দু-চারটা প্রশ্ন করবার পর কখন হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। ডকের দিকে তাকিয়েই লাফিয়ে উঠল মুন্সী। জবানবন্দীর মাঝখানেই কোর্টের দিকে চেয়ে জোড় হাত করে বলল, গোস্তাকি মাফ করবেন, ধর্মাবতার। আমার একরারনামাটা একবার পড়ে দেখুন। আমি তো কবুল করেছি। সরকার পক্ষের যা কিছু চার্জ, এক কথায় মেনে নিয়েছি সব। তবে আর একে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া কেন? রেহাই দিন ওকে। আমি আবার বলছি, ঐ মেয়েটার চরম সর্বনাশের জন্যে দায়ী আমি। ওর স্বামীকে খুন করেছি আমি, ওদের সর্বস্ব লুট করেছি আমি। আর বলাৎকার? হ্যাঁ, আমি—আমি উঃ—বলে হঠাৎ বুক চেপে ধরে বসে পড়ল। ওদিকে মেয়েটাও অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল সাক্ষীর কাঠগড়ায়।

    আদালত বন্ধ হয়ে গেল। মুন্সীকে তারপর ধরাধরি করে কয়েদীর গাড়িতে করে পাঠানো হল জেলখানায়। মেয়েটাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। তার জ্ঞান ফিরে আসতে লেগে গেল দু’ ঘণ্টা।

    ভূতনাথবাবু বললেন, মেয়েটার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। তবু ডাক্তারের মত করিয়ে কোনো রকমে স্ট্রেচারে করে কোর্টে নিয়ে এসেছি। যেমন করে হোক, তার এভিডেন্সটা আজকার মধ্যে শেষ করতে হবে। এদিকে আসল আসামীই গরহাজির। ওর absence-এ তো trial চলতে পারে না। যেমন করে হোক ওটাকে নিয়ে যেতেই হবে। সবাই অপেক্ষা করছে। কোর্ট বসে আছেন। ট্যাক্‌সি আমার সঙ্গেই আছে। বলেন তো অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থাও করতে পারি।

    ডাক্তারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, মুন্সীর আবার কি হল?

    ডাক্তার চিন্তান্বিত মুখে মাথা নেড়ে বললেন, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কাল কোর্ট থেকে ফিরে অবধি খাচ্ছে না, কথা বলছে না। সটান চোখ বুজে পড়ে আছে।

    ভূতনাথ গর্জে উঠলেন, বদমাইশি, স্রেফ বদমাইশি, বুঝতে পাচ্ছেন না? মামলাটাকে মাটি করতে চায় শালা। ও জানে, মেয়েটা আজ ফিরে গেলে আর তাকে পাওয়া যাবে না। আমি বললাম, ওর কনফেশনের পরেও কি মেয়েটির evidence একান্তই দরকার?

    দরকার বৈকি! কনফেশনের support-এ যদি অন্য evidence না থাকে, ওর মূল্য কতটুকু? এখানে যদি বা সাজা হয়, হাইকোর্টে গিয়ে টিকবে না।

    ডাক্তারকে বললাম, কোনো রকমে পাঠানো যাবে না?

    —পাল্‌সের যা অবস্থা, ভরসা করি না, স্যর।

    ভূতনাথবাবুকে নিরাশ হয়েই ফিরতে হল।

    সেইদিন সন্ধ্যাবেলা। জেলের ভিতরকার জনবহুল রাস্তাগুলো শূন্য প্রায়। কয়েদীরা সব চলে গেছে যে-যার ওয়ার্ডে। রন্ধনশালার অহোরাত্র “মচ্ছব” আগলে থাকে যারা, তারাও তাদের কালিঝুলি-মাখা জাঙ্গিয়া কুর্তা ছেড়ে হাতা-খুন্তি আর ডাল-মন্থনের ডাণ্ডা সামলে ক্ষিপ্রহস্তে তৈরি হচ্ছে। জমাদারের দল “গিতি” মেলাতে ব্যস্ত। ডেপুটি-বাবুরা নিজ নিজ এলাকায় টহল দিচ্ছেন। লক্‌আপ্ পর্বের সুশৃঙ্খল সমাপ্তির জন্যে সকলের মনেই উৎকণ্ঠা। আমিও চলেছি সদলবলে। প্রাচীর পরিক্রমা শেষ করে পুকুরধারে এসে পৌঁছেছি, এমন সময় এক ভগ্নদূত এসে “রিপোর্ট” দিল, টোটাল নেহি মিলতা হ্যায়। অজ্ঞাতসারেই কপালটা ঘেমে উঠল। জেলের চাপরাস যার স্কন্ধে, তার কাছে এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর নেই। রুক্ষ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম হতভাগ্য দুর্মুখের দিকে। সে অকুণ্ঠ বিনয়ের সঙ্গে জানাল, একঠো কমতি হুয়া।

    লক্-আপ্ ইয়ার্ডে এসে দেখলাম, কারো মুখে সাড়া নেই। সমস্ত ওয়ার্ডগুলো দুবার করে গোনা হয়ে গেছে। ফল এক; অর্থাৎ ‘একঠো কমতি হুয়া’। হিসাবমত হবে ১৩৪৩, হচ্ছে ১৩৪২। সকলেই নিঃশব্দে অপেক্ষমাণ—এবার কি হুকুম হবে। হুকুম হল—Count again. ব্যারাকে ব্যারাকে আবার সাড়া পড়ে গেল। দু’লাইন করে বসল কয়েদীরা। এবার শুধু জমাদার নয়, ডেপুটিবাবুরাও যোগ দিলেন গণনায়। দু, চার, ছয়, আট।…একে একে সবাই আবার ফিরে এল লক্-আপ্ ইয়ার্ডে। মুখ অন্ধকার।

    এবার বাকী রইল শুধু একটিমাত্র পথ—চরম এবং শেষ পন্থা, পাগলা ঘণ্টি। একটা টানা হুইসিল। তারপরেই শুরু হবে সর্বব্যাপী তাণ্ডব। লাঠি আর বন্দুক কাঁধে অহেতুক উল্লম্ফন, গোটা পঞ্চাশেক মশাল জ্বেলে সম্ভব এবং অসম্ভব স্থানে নিষ্ফল অনুসন্ধান, প্রাচীর বেষ্টন করে পুলিশবাহিনীর ব্যর্থ আস্ফালন। অতঃপর দীর্ঘ লঙ্কাকাণ্ডের সমাপ্তি। শুষ্ক মুখে নতশিরে ভগ্ন-দূতের পুনঃপ্রবেশ।

    —কি বাৰ্তা?

    —একঠো কমতি হ্যায়।

    বড় জমাদারের দিকে ফিরে বললাম, সবই তো হল। আর কি? এবার শিঙ্গে ফুঁকে দাও-

    —মিল গিয়া মিল গিয়া—ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল এক ওয়ার্ডার।

    —কোথায়, কাঁহা মিল গিয়া? একসঙ্গে আঠারোটা প্রশ্ন।

    –ঐ গাছপর—

    গাছপর! সদলবলে এবং সবিক্রমে ছুটলাম সেই দিকে।

    হাসপাতালের পিছনে কম্পাউণ্ড পাঁচিলের ধার ঘেঁষে একটা অনেককালের অশ্বত্থ গাছ। তারই ডালপালার ঝোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে আছে দু’খানা পা। এগিয়ে গিয়ে সমস্ত দেহটাই দেখা গেল। ধুতি পাকিয়ে তৈরি হয়েছে লম্বা দড়ি। তার একটা দিক ডালে বাঁধা, বাকি দিকটায় ফাঁস দিয়ে গলায় জড়ানো।

    মিনিট কয়েকের মধ্যেই ঝুলন্ত দেহটাকে নামিয়ে আনা হল। ডাক্তার এসে নাড়ি ধরে মুখ বিকৃত করলেন। জিভ বেরিয়ে এসেছে। চোখ দুটো ঠিকরে পড়ছে। বীভৎস্য দৃশ্য। তবু প্রথম দৃষ্টিতেই চিনতে পারলাম। জমাদারের দিকে তাকিয়ে বললাম, ঘণ্টি।…

    সেন্ট্রাল টাওয়ারের উপর থেকে ‘তিন ঘণ্টি’ জানিয়ে দিল, সব ঠিক হ্যায়।

  • পনেরো

    পনেরো

    রবিবার। বিকেল চারটা বেজে পঁয়ত্রিশ। সদলবলে ফাইল দেখছি। লাল-ফিতে-বাঁধা কাগজের ফাইল নয়; আইনের শিকলে বাঁধা মানুষের ফাইল। কিন্তু মানুষের প্রাথমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সজ্জন-সমাজ তাকে বর্জন করেছে, তার মানবতার দাবিকে করেছে প্রত্যাখ্যান। সংসারের সহজ এবং প্রকাশ্য পথ থেকে স্খলিত হয়ে তারা এসেছে দলে দলে, অন্ধকার পিচ্ছিল পথ ধরে। ললাটে মুদ্রিত অপরাধীর পঙ্ক-তিলক। সেই সব মানুষের ফাইল দেখছি।

    একপাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ লাইনটা একবার দেখে নিলাম। পরনে জাঙ্গিয়া কুর্তা, কোমরে বাঁধা গামছা, মাথায় টুপি, বাঁ হাতে টিকিট, ডান হাতটা ঝুলে আছে দেহের পাশ দিয়ে। বুকের উপর আঁটা অ্যালুমিনিয়ামের চাকতি। সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ইণ্ডিয়ান পিনাল কোডের এক-একটি জীবন্ত ধারা। ৩৭৯, তার পাশে ৩০২, তারই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৪২০ কিংবা ৩৯৫—খুনী, তস্কর, নারীমেধভুক, দস্যু, প্রতারক, পকেট-কর্তকের বিচিত্র সমাবেশ। কিন্তু আমার চোখে সে বৈচিত্র্য অর্থহীন। ‘এখানে আসিলে সকলেই সমান।’ আমার কাছে রামের সঙ্গে শ্যামের যে তফাত সে শুধু নম্বরের। রাম ৭৫৭, শ্যাম ১১০৪। তাদের অপরাধের বিবরণ আমি জানি না; জানি না তাদের প্রাক-কারাজীবনের কোন ইতিবৃত্ত। একথা আমার জানা নেই, রাম বলে যে লোকটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে, সে তার প্রতিবেশীর হাঁড়ি থেকে চুরি করেছিল একবাটি পান্তা ভাত, আর তার পাশে যে শ্যাম, সে তার প্রতিবেশীর আট বছরের মেয়ের বুকে ছুরি বসিয়ে ছিনিয়ে নিয়েছে দেড়ভরি ওজনের সোনার হার। আমার কাছে তাদের একমাত্র পরিচয়—কয়েদী। এইটুকু মাত্র জেনেই আমি তাদের ‘রিফর্ম’ করবার ভার নিয়েছি।

    আমার কয়েদীবাহিনীর মনের খবর আমি রাখি না। তাই সবার উপরে আমার সমদৃষ্টি, সকলের প্রতি আমার সম আচরণ। একটা মানুষের সঙ্গে আর একটা মানুষের যে দুস্তর ব্যবধান, আমাদের শাস্ত্র একথা মানে। তার মতে রাম ও শ্যাম এক ও অভিন্ন। আহারে, বিহারে, কর্মে, অবসরে, শাসন ও শৃঙ্খলার একই সূত্রে গাঁথা। মুড়ি এবং মিছরি একই পাত্রে রেখে একই ডিসিপ্লিনের পেষণ-যন্ত্রে আমি তাদের গুঁড়িয়ে চলেছি। যে বস্তু তৈরি হচ্ছে, তার স্বাদ, গন্ধ, অথবা বর্ণ সম্বন্ধে আমি নির্বিকার।

    বর্তমানে আমি যে কার্যে রত, তার নাম সাপ্তাহিক ‘ফাইল’ পরিদর্শন। জানতে এসেছি কার কি অভিযোগ, কার কি নিবেদন; যদিও জানি, সত্যিকার অভিযোগ যদি কিছু থাকে, আমার কাছে তা অনুক্তই থেকে যাবে। কেননা, যাদের সম্বন্ধে অভিযোগ, আমারই পেছনে চলেছে তাদের দীর্ঘ প্রসেশন।

    —নালিশ আছে বাবু—

    প্রসেশন থেমে গেল।

    —কি নালিশ?

    বক্তা বোধ হয় সত্তরের গণ্ডি পার হয়ে গেছে। ঝুঁকে, কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে কোনো রকমে ফাইলের শৃঙ্খলা রক্ষা করছে। টিকিটখানা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, দ্যাখ তো বাবু, বয়স কত লিখেছে? তার পাশে যে কয়েদীটি দাঁড়িয়ে, দেখে মনে হয়, প্রায় একই বয়সী, তার টিকিটখানাও টেনে নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলল, আর এটাও দ্যাখ।

    কণ্ঠে উত্তেজনার আভাস।

    বললাম, ব্যাপার কি, বল দিকিনি?

    —বলছি। বয়সটা আগে দ্যাখ।

    সঙ্গে সঙ্গে অধীর প্রশ্ন—কি লেখা আছে?

    এসব বেয়াদপি অসহ্য হল চীফ জমাদারের। খেঁকিয়ে উঠে কি একটা বলতে যাচ্ছিল। ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললাম বুড়োর দিকে তাকিয়ে, তোমার বয়স তো দেখছি ৭২ আর ওর ৬৫।

    —তাহলে তো ‘আইটার বাবু’* ঠিকই বলেছে। কিন্তু এ তোমাদের কি রকম বিচার বাবু? আমার ছেলের চেয়ে আমি মোটে সাত বছরের বড়?

    [* কথাটি “রাইটার” (Writer) অর্থাৎ যে সব লেখাপড়া-জানা কয়েদী এদের চিঠিপত্র দরখাস্ত ইত্যাদি লিখিবার জন্য নিযুক্ত।]

    —এ লোকটি তোমার ছেলে?

    —আমার ছেলে না তো পাড়ার লোকের ছেলে?

    এবার উত্তেজনা চাপা রইল না। পাশের লোকের বিনীত কণ্ঠ বলল, হাঁ, হুজুর, উনি আমার বাপ। বয়স হয়েছে কিনা; মেজাজটা তাই একটু—

    —তুই থাম—গর্জে উঠল বুড়ো। জেল খাটতে এসেছি বলে, যাকে জন্ম দিলাম, তাকে ছেলে বলতে পারব না?

    নরম সুরে বললাম, না, না। কে বললে, পারবে না? ওটা আমাদেরই ভুল হয়েছে। ডাক্তারের দিকে তাকালাম। বেচারার বিশেষ দোষ নেই। বয়স নির্ধারণের ডাক্তারি প্রক্রিয়া কি আছে, জানি না। তবে এরা যে পিতাপুত্র, কেবলমাত্র চোখে দেখে একথা বলতে হলে রীতিমত দিব্যজ্ঞান থাকা দরকার। টিকিট দু-খানা ডাক্তারের হাতে দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, তিনি চাপা গলায় বলছেন, তুমি যে এই কচি খোকাটির বাপ, আগে বললেই পারতে।

    বৃদ্ধের সুর চড়া—আমি আবার কি বলবো? তোমার আক্কেল নেই?

    ‘নালিশের’ বিষয়বস্তু বেশির ভাগই চিঠি। সাধারণ কয়েদী চিঠি লিখতে পারে দু-মাস অন্তর একখানা। বাইরে থেকে যে চিঠি আসে তাদের নামে, তারও একটার থেকে আর একটার ব্যবধান—দু-মাস। ডেপুটিবাবুরা টিকিট দেখে তারিখ গুনে গুনে চিঠি মঞ্জুর করে চলেছেন।

    —একটা পিটিশান চাই, হুজুর, আবেদন জানাল এক ছোকরা। নাম পানাউল্লা।

    -তোর আবার কিসের পিটিশান?

    আশপাশে ছোকরা-মত যারা দাঁড়িয়ে ছিল সবারই মুখে দেখলাম চাপা হাসি। পানাউল্লা একটু ইতস্তত করে বলল, চাচা লিখেছে, বৌ নাকি নিকা বসতে চায়।

    আমি কিছু বলার আগেই জবাব দিলেন আমার ডেপুটি খালেক সাহেব, নিকা বসবে না তো কি করবে? তুমি মেহেরবানি করে সাত বছর জেলে পচবে, আর কচি বৌটা তোমার পথ চেয়ে বসে থাকবে, না?

    পানাউল্লা কিছুমাত্র দমে গেল না। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, নিকা বসতে চায়, বসুক। কিন্তু ঐ গয়জদ্দি ছাড়া কি মানুষ নেই দেশে? আমি যদ্দিন ছিলাম, তখন তো ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেখিনি। নেড়িকুত্তার মত ন্যাজ গুটিয়ে বেড়াত। আজ আমি নেই বলে—

    তার চোখ দুটো জ্বলে উঠল হিংস্র পশুর চোখের মত। বুঝলাম, পানাউল্লাকে যে বস্তু বিচলিত করেছে, সেটা আসন্ন পত্নী-বিচ্ছেদের আশঙ্কা নয়, তার চেয়েও গভীর এবং জটিলতর। দরখাস্ত মঞ্জুর করতে হল। তবু একবার জিজ্ঞেস করলাম, পিটিশান করে এ- নিকা তুই ঠেকাবি কি করে?

    —নিকা ঠেকাতে চাই না, বলল পানাউল্লা, বছির দারোগাকে খালি জানিয়ে দেবো, পানাউল্লা সারা জীবন জেলে থাকবে না। ছাড়া একদিন সে পাবেই।

    এর পর যেসব পিটিশনের আবেদন পেলাম, তার মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই। বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র না খেয়ে মরছে, শত্রুপক্ষীয় লোকেরা অত্যাচার করছে, জমিদার খাজনার দাবিতে বাড়িঘর নিলামে চড়িয়েছে, প্রতিকার চাই। এই একই ক্লান্তিকর কাহিনী শুনে আসছি বছরের পর বছর, যেদিন থেকে এই চাপরাস কাঁধে নিয়েছিলাম। প্রথম জীবনে মনটা উত্তেজিত হয়ে উঠত। নির্বিচারে দরখাস্ত মঞ্জুর করতাম; গরম গরম নোট লিখতাম তার উল্টো পিঠে, জাগাতে চেষ্টা করতাম নিষ্প্রাণ কর্তৃপক্ষের নিদ্রাগত কর্তব্যবোধ। মনকে বোঝাতে চাইতাম, প্রতিকার একটা হবেই, যদিও কী সেই প্রতিকার, তার সঠিক চেহারাটা নিজের কাছেও কোনদিন স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। আজ আর এই দুঃখের কাহিনী মনকে স্পর্শ করে না। তবু যন্ত্রের মত দরখাস্ত মঞ্জুর করি। কিন্তু তার ফলাফল সম্বন্ধে আর কোন মিথ্যা ধারণা পোষণ করি না।

    বড় বড় মামলার সুদীর্ঘ শুনানির পর সুবিজ্ঞ বিচারক যখন অপরাধীকে সাত, আট, দশ কিংবা বিশ বছরের জন্যে জেলে পাঠিয়ে দেন, আমরা অর্থাৎ সৎ, শিষ্ট এবং ভদ্র ব্যক্তিরা নিশ্চিন্ত হই, জজসাহেব আত্মপ্রসাদ লাভ করেন, খবরের কাগজের সম্পাদকীয় স্তম্ভে তাঁর ন্যায়বিচারের গুণকীর্তন ধ্বনিত হয়। কিন্তু একথা বোধ হয় তিনি জানেন না, আমরাও ভেবে দেখিনি—এই কঠোর দণ্ডটা ভোগ করে কে? লোকটা জেলে গেল ঠিকই। এই জেলে যাওয়ার মধ্যে যে দুঃখ আছে, লজ্জা আছে, সাংসারিক ক্ষয়-ক্ষতি আছে এবং তার চেয়েও বেশি আছে অসম্মান ও অপযশ তাকে আমি ছোট করে দেখছি না। স্বাধীনতা- হীনতা এবং প্রিয়জন-বিচ্ছেদের যে বেদনা সদ্য-কারাগতের দৈনন্দিন জীবন ভারাতুর করে তোলে, তার সম্বন্ধেও আমি সচেতন। কিন্তু শুধু এই কারণে যতখানি আহা-উহু আমরা বন্দীর উদ্দেশে নিক্ষেপ করে থাকি, ঠিক ততখানি বোধ হয় তার প্রাপ্য নয়। নিজের চোখেই দেখেছি, যত দিন যায়, মহাকালের হস্তস্পর্শে মিলিয়ে আসে তার মনের ক্ষত, জুড়িয়ে আসে লজ্জা আর অপমানের গ্লানি, স্তিমিত হয়ে আসে প্রিয়-বিচ্ছেদের তীব্রতা। দুঃসহ দিন সহনীয় হয়ে আসে। অনভ্যস্ত জীবনের অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং অস্বাচ্ছন্দ্যের তীক্ষ্ণ ধারগুলো আর খচখচ করে বেঁধে না। ধীরে ধীরে এই বন্দী-জীবনের সঙ্গবহুল নতুন পরিবেশের মধ্যে গড়ে ওঠে এক নতুন সমাজ; স্বধর্মী, সহকর্মী, সহযাত্রীদের জড়িয়ে নিত্য-নবজাত অলক্ষ্য আকর্ষণ। সঙ্গী থেকে বন্ধু, বান্ধব থেকে আত্মজন।

    আরো দিন যায়। ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে গৃহের স্মৃতি, শিথিল হয়ে আসে বহির্জগতের আকর্ষণ। তারপর একদিন আসে, যখন জেলের এই কঠোর রূপটা তার চোখে বদলে যায়। এই সংকীর্ণ জগতের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনধারার মধ্যে সে নিজেকে ডুবিয়ে দেয়। কদাচিৎ মনে পড়ে, এ তার গৃহ নয়, কারাবাস।

    কিন্তু তাই বলে বিচারালয় থেকে যে দণ্ড সে বহন করে এনেছিল, সেটা কি নিষ্ফল হবে? না। শুধু তার লক্ষ্যস্থল বদলে যায়। সে দণ্ড ভোগ করে কতগুলো নারী ও শিশু, দণ্ডিত আসামীর উপর একদিন যারা ছিল একান্ত-নির্ভর এবং যাদের পথের প্রান্তে বসিয়ে রেখে সে এই জেলের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। সে-দরজা পার হতে না হতেই নিজের জন্যে পেল সে অন্নবস্ত্রের নিশ্চয়তা, পেল নতুন সমাজ, নতুন বন্ধন, আর তার কারাদণ্ডের সমস্ত কঠোরতা রয়ে গেল তার পরিত্যক্ত প্রিয়জনের জন্যে। জেলে যে আসে সে তার শেষ সম্বল নিঃশেষ করেই আসে।

    জানি, এর ব্যতিক্রম আছে। সুযোগ ও সুবিধা বুঝে মাঝে মাঝে কারাবরণের ব্যবসা করেন যাঁরা, তাঁরা আলাদা জীব। তাঁদের কথা আমি তুলছি না। তাদের কথাও বলছি না, যারা আমার আপনার এবং অন্য দশজন রাম-শ্যাম-যদুর বহু-দুঃখার্জিত সঞ্চয়টুকু বন্ধুবেশে আহরণ করে, ব্যাঙ্ক কিংবা লিমিটেড কোম্পানির নামে সাততলা এমারত গড়ে লালদীঘির কোণে; তারপর হঠাৎ একদিন সেই ভবনশীর্ষে একটি লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, কখনো কখনো বা ছিটকে এসে পড়ে আমার এই অতিথিশালায়। স্ত্রীর বেনামীতে রেখে আসে লেক অঞ্চলে বিশাল প্রাসাদ, সেই সঙ্গে মোটা অঙ্কের পাশ-বই, আর নিজের জন্যে সংগ্রহ করে আনে একখানা উচ্চশ্রেণীর প্রবেশপত্র। সেই সব ভাগ্যবান্ ‘ডিভিশন্ বাবু’ আমার লক্ষ্য নয়। জেলের অরণ্যে তারা মুষ্টিমেয় অতিবিরল বকুল কিংবা কৃষ্ণচূড়া।

    আমি বলছিলাম, সেই সব শ্যাওড়া কচু, ঘেঁটু আর বনতুলসীর কথা, সংখ্যায় যারা শতকরা আটানব্বই। প্রতিদিন দলে দলে এসে তারা ভিড় করছে আমার এই তৃতীয় ডিভিশনের লঙ্গরখানায়। এখানে আসবার আগে থানা থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা লড়েছে কোমর বেঁধে, উকিলের ঘরে পাঠিয়েছে বাক্স-প্যাঁটরা, ঘটি-বাটি আর স্ত্রীর হাতের শেষ অলংকার, মহাজনের গদিতে তুলে দিয়েছে ক্ষুধার্ত পরিবারের একমাত্র সম্বল— দু-চারবিঘা ধানের জমি, জমিদারের কবলে নিক্ষেপ করেছে বাপ-পিতামহের ভিটা মাটি, আর বৃদ্ধা মাতা, যুবতী স্ত্রী এবং শিশুসন্তানের জন্যে রেখে এসেছে কলঙ্ক, অনশন আর লাঞ্ছনা।

    কোর্ট যে শাস্তি দেন আইনের ভাষায় তার নাম rigorous imprisonment, তার imprisonment অংশটাই শুধু পড়ে আমার কয়েদীর ভাগে, আর rigour বহন করবার জন্যে রইল তার বর্জিত আশ্রিত দল।

    প্রতি রবিবার ভোর না হতেই সেই সব পিছনে ফেলে-আসা নারী ও শিশুর ভিড় জমে ওঠে আমার এই জেল-গেটের সামনেকার মাঠে। আমি আমার দোতলার বারান্দায় বসে তাদের দেখতে পাই। অসহায়, উদ্‌ভ্রান্ত দৃষ্টি; মুখে নেই গৃহস্থের শ্যামল শ্রী। একদল ছন্নছাড়া যাযাবর। বিকেল চারটা বাজতেই শুরু হয় মোলাকাত। ছিন্নবসনা স্ত্রী এসে দাঁড়ায় ইন্টারভিউ জানালায় লোহার গরাদে-দেওয়া বেষ্টনীর বাইরে। তাকে ঘিরে দাঁড়ায় একদল ছোট ছোট উলঙ্গ কঙ্কাল। কোটরগত চোখের জলে অনশনক্ষীণ কণ্ঠ মিলিয়ে কয়েদী- স্বামীর কাছে বলে যায় তার একটানা দুর্দশার কাহিনী—ছোট ছেলেটা গেল একদিনের জ্বরে; না পেল ওষুধ না জুটল পথ্য; সেয়ানা মেয়েটাকে ধরে নিয়ে গেছে আজগর মুন্সীর ভাইপো; বড়ছেলেটা মাসখানেক হল উধাও; বাকীগুলো আগোপণ্ড; বুড়ী এখনো মরেনি; জমিদারের পাইক দু-বেলা শাসিয়ে যাচ্ছে মাস গেলেই ভিটে ছেড়ে দিতে হবে।

    আমি আর কি করবো? জানলার এ-ধার থেকে উদাস কণ্ঠে জবাব দেয় স্বামী। দেহে তার পরিচ্ছন্ন জেলের পোশাক। সর্বাঙ্গে স্বাস্থ্যের জলুস, মুখে দার্শনিক গাম্ভীর্য।

    এমনি করে বছর কেটে যায়। মাঝে মাঝে এসে ঐখানে দাঁড়িয়ে ঐ একই কাহিনী শুনিয়ে যায় স্ত্রী। তারপর আর আসে না তার হাড়সর্বস্ব ছেলের পাল নিয়ে। কে জানে, তার কি হল? বেঁচে আছে কিনা, সে খবর দিয়েই বা কার কি প্রয়োজন?

    দণ্ডদাতা দণ্ড দিয়েই খালাস। তাঁর কি এসে যায় কোথায় গিয়ে পড়ল তার উদ্যত মুষল, নির্মূল হয়ে গেল কোন্ সাজানো সংসার, নিস্তব্ধ হয়ে গেল কার কোলাহলমুখর গৃহ-প্রাঙ্গণ?

    দিন যায়। দীর্ঘ দণ্ডকাল শেষ হয়। যে লৌহতোরণের প্রসারিত বাহু দণ্ডিত বন্দীকে নিঃশব্দে গ্রহণ করেছিল, সে-ই তাকে সশব্দে বর্জন করে। তার বুক কেঁপে ওঠে। পাদুটো আড়ষ্ট হয়ে যায়। কোথায় এলাম? এ কোন্ দেশ? ঐ যে অবিশ্রান্ত জলস্রোতের মত বয়ে চলেছে জনপ্রবাহ, কোনোদিকে তাকিয়ে দেখবার অবসর নেই, কিসের টানে কোথায় চলেছে তারা? এক পাশে দাঁড়িয়ে বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টি মেলে সে চেয়ে থাকে ঐ মোহাবিষ্ট জনতার দিকে। দশ বারো পনেরো বছর এ বস্তু সে দেখেনি। সে ভুলে গেছে জীবন-যুদ্ধের তাড়না। ভুলে গেছে, এই যে অগণিত মানুষ উদয়াস্ত কাজ করে যাচ্ছে, এদের চোখের সামনে রয়েছে আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, সমৃদ্ধি, সম্মান আর স্বাচ্ছন্দ্য চাই; শুধু নিজের জন্যে নয়, প্রিয়জনের জন্যে। সেই আশায় মোহ তাদের অন্ধবেগে চালিয়ে নিয়ে চলেছে। প্রতিদিন নতুন করে যুগিয়ে যাচ্ছে কর্মপ্রেরণা। অক্ষুণ্ণ রেখেছে সতত-ক্ষীয়মাণ প্রাণ-শক্তি। এই মোহাবেশের উন্মাদনা সে পায়নি তার দশ বছরের বন্দীজীবনে; অনুভব করেনি আত্মজনের জন্যে আত্মপীড়নের আনন্দ। অন্নবস্ত্র-আশ্রয়ের ভাবনা তাকে ভাবতে হয়নি। সে-সব দিয়েছেন সদাশয় সরকার, আর সেই সঙ্গে দিয়েছেন প্রিয়জনের দায় এবং দুশ্চিন্তা থেকে পূর্ণমুক্তি। তাকে কাজ করতে হয়েছে, কিন্তু কাজ করে খেতে হয়নি। সে তো কাজ নয়, শুধু হস্ত-পদ-সঞ্চালন। তার মধ্যে না ছিল প্ৰাণ, না ছিল প্রেরণা। জেলের কারখানায় সে ছিল একটা সজীব যন্ত্র—যে যন্ত্র সে চালাত, তারই একটা বৃহৎ অংশ।

    এই চলমান জনস্রোতের পাশে দাঁড়িয়ে দশ বছরের কুয়াশার আবরণ ভেদ করে সে দৃষ্টি পাঠাল পেছনের দিকে একদা যেখানে ছিল তার গৃহ। প্রাণপূর্ণ স্নেহনীড়। মনে পড়ল সব; মনে পড়ল সবাইকে। কিন্তু বুকের ভিতরটা টনটন করে উঠল না। মমত্ববোধ চলে গেছে, অসাড় হয়ে গেছে দায়িত্বের অনুভূতি। বুকে হাত দিয়ে দেখল। হাতে ঠেকল একটা শুষ্ক নিরেট মরুভূমি। শ্রদ্ধা, প্রীতি, ভালবাসার কোনো ক্ষীণ ফল্গুধারাও বইছে না তার অস্তস্তলে।

    পাশে এসে দাঁড়াল এক সদ্য-আহরিত কারাবন্ধু। তিন মাস জেল খেটে আজ খালাস পেয়েছে একই সঙ্গে। বলল, এখানে দাঁড়িয়ে যে? বাড়ি যাবে না?

    —বাড়ি! শ্লেষবিকৃত কণ্ঠে এল উত্তর। ঠোটের উপর ফুটে উঠল এক অদ্ভুত ব্যঙ্গ- হাসির কুঞ্চন-রেখা।

    —নাও, বিড়ি খাও, এগিয়ে এসে হাত বাড়াল নতুন বন্ধু।

    সেদিকে না তাকিয়েই বিড়িটা সে হাত পেতে নিল, ধরাল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে ঔদাস্যভরে ধোঁয়া ছাড়ল কয়েকবার, তারপর পা চালিয়ে দিল যেদিকে দু-চোখ যায়, মিশে গেল জনারণ্যের অন্তরালে।

    ফাইলের পরেই কেস টেবল (case table), সেন্ট্রাল টাওয়ারের নীচে খোলা প্রাঙ্গণে আমার বৈকালিক অফিসের এক টুকরো। এই টেবিলে বসেই প্রতি সন্ধ্যায় আমি কেস লিখি কয়েদীর টিকিটে। হরেক রকমের কেস। কারো কম্বলের ভাঁজে পাওয়া গেছে দু-খানা তামাকপাতা আর এক ডিবা চুন; কারো “খাটনি” অর্থাৎ দৈনিক task পুরো হয়নি, এক মণ ছোলা ভেঙে ডাল করবার কথা, ভেঙেছে ছত্রিশ সের বারো ছটাক; কেউ “চৌকা” থেকে লুকিয়ে এনেছে পেঁয়াজ আর তিনটা লঙ্কা; কিংবা গামছার বিনিময়ে হাসপাতালের মেট-সাহেবের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে আধসের দুধ আর এক ছটাক চিনি।

    এইসব এবং এর চেয়েও গুরুতর কেসের তদন্ত করি, রিপোর্ট লিখি টিকিটের পাতায়, এবং পরদিন সকালবেলা আলামত-সহ অপরাধীদের হাজির করে দিই সুপারের দরবারে। আর একদফা শুনানির পর তিনি বিচার শেষ করেন। কাউকে দেন ডাণ্ডাবেড়ি, কাউকে হাতকড়া, কাউকে বা পরতে হয় চটের কাপড় কিংবা সেলে বসে খেতে হয় চালের গুঁড়োর মণ্ড, আইনের ভাষায় যার নাম penal diet ।

    “ফেকু গোয়ালা”—–দরাজ গলায় হাঁক দিল বড় জমাদার। একটা লোকের হাত ধরে নিয়ে এল “আমদানীর” মেট। আমার টেবিলের সামনে দাঁড় করাতেই গর্জে উঠল জমাদারের দ্বিতীয় হুকুম—সেলাম করো।

    দেখলাম, চোখ দুটো তার জবাফুলের মত লাল, ফুলেও উঠেছে অনেকখানি, আর জল ঝরছে অবিরাম।

    —ও কি! চোখে কি হল?

    —চুন লাগায়া আউর কেয়া? জবাব দিল জমাদার।

    —কিরে, চুন লাগিয়েছিস চোখে?

    —নেহি, হুজুর।

    -চোখ লাল হল কি করে?

    -বেমার হুয়া —বলে মুচকে হাসল।

    দুজন সহকর্মী সাক্ষী বলে গেল, দেয়াল থেকে চুনবালি নিয়ে ও ঘষে দিয়েছে চোখের মধ্যে, নিজের চোখে দেখেছে তারা। বলছে হাসপাতাল যাবো।

    টিকিট উলটে দেখলাম, কয়েকমাস আগে খানিকটা সাবান না সাজিমাটি খেয়ে, আমাশা বাধিয়ে আর একবার পনেরো দিন পড়ে ছিল হাসপাতালে। ধমক দিয়ে বললাম, চোখে চুন দিয়েছিস কেন?

    —বারো সের গহুঁ পিষণে নেহি সত্তা।

    —নেহি সতা! আব্দার পেয়েছ?

    টিকিটের পাতা খুলে দেখলাম ডাক্তারের নোট রয়েছে—হেল্থ—গুড, লেবার হার্ড। জেলকোডের বিধানে এ হেন ব্যক্তির গম-পেষণের দৈনিক বরাদ্দ বারো সের। অতএব রিপোর্ট করতে হল। কিন্তু চোখে চুন দেওয়া তার একেবারে ব্যর্থ হল না। আপাতত কিছুদিন হাসপাতালে আশ্রয় মিলবে। ফিরে এসে হাজির হবে বড় সাহেবের কাছে।

    সকলের শেষে যাকে আনা হল, একটি সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে। মুখের দিকে তাকালে চোখ ফিরিয়ে নিতে সময় লাগে। গৌরবর্ণ দীর্ঘদেহ আর অনিন্দ্য মুখশ্রী বলে নয়, সে মুখের প্রতি রেখায়, কপালে, ওষ্ঠে, চিবুকের বন্ধনীতে একটা সুস্পষ্ট আভিজাত্যের ছাপ, জেলখানায় সেটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এ কোত্থেকে এল? ঝগড়াঝাঁটি করে, কিংবা খুন-জখম করেও কখনো কখনো এসে থাকে দু-চারটি বড়ঘরের ছেলে কিন্তু এর অপরাধ দেখছি চুরি। ৩৭৯ ধারায় ছ মাস জেল।

    একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। চমক ভাঙল জমাদারের গর্জনে—এক নম্বর হারামী, হুজুর। ফাইল পর কভি নেহি আয়গা।

    জিজ্ঞেস করলাম, কেন, ফাইলে আসনি কেন?

    —ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, স্যর।

    কথাটা বিশ্বাস হল না। মনে হল, আসল কারণ ঘুম নয়। বোধ হয় সবার সঙ্গে পংক্তিভুক্ত হয়ে দাঁড়াবার লজ্জাটা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারে নি।

    তোমার নাম কি?

    —পরিমল ঘোষ।

    —বাবার নাম?

    —ঐ টিকিটেই লেখা আছে, স্যর।

    রুক্ষ স্বরে বললাম, জানি। তবু তোমার কাছ থেকেই শুনতে চাই।

    ছেলেটা এক মিনিট ভাবল, তারপর বলল, বিজয়গোপাল ঘোষ।

    এ কোন্ বিজয়গোপাল? এক নামের কত লোকই তো দেখা যায়। কিংবা একি আমাদের সেই বিজয়ের ছেলে? জমাদারকে বললাম, উসকো অফিসমে লে যানা।

    অফিসে এসে সহকর্মীদের কাছ থেকে যে সব তথ্য পেলাম, আমার সন্দেহ সমর্থিত হল। বিজয় আমার বন্ধু এবং সহপাঠী। এম. এ. আর ল পাশ করে প্রথমটা যেমনি হয় আলিপুর কোর্টে হাঁটাহাঁটি। তারপর হঠাৎ সরকারী চাকরি নিয়ে চলে গেল মফঃস্বলে। সেই থেকে ছাড়াছাড়ি। কার মুখে শুনেছিলাম কোন্ এক বিশাল বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করবার পর সে নাকি হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তার আত্মীয়-বন্ধু-মহলের সংস্রব থেকে। সত্যি মিথ্যা জানি না। আমিও কোনোদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবার চেষ্টা করিনি। ভুলেই গিয়েছিলাম একরকম। কে জানত এতকাল পরে এভাবে তাকে স্মরণ করতে হবে?

    আমার কলেজের একটা গ্রুপ ফটো বাসা থেকে আনিয়ে পরিমলের হাতে দিয়ে বললাম, দ্যাখ তো কাউকে চেন কিনা? সে চমকে উঠল, এ কি! এ ছবি আপনি কোথায় পেলেন? এর মধ্যে আমার বাবা আছেন।

    বললাম, তোমার বাবার ঠিক পাশের লোকটিকে চিনতে পারছ?

    —না তো।

    —ভালো করে দ্যাখ।

    বুদ্ধিমান ছেলে। আর একবার দেখে সলজ্জ হাসির সঙ্গে বলল, আপনি?

    বললাম, এখানে যেমন দেখছ, ঠিক এমনি একই সঙ্গে পাশাপাশি আমরা কাটিয়েছি আমাদের কলেজ-হস্টেলের ছটা বছর। বিজয় আর ঐ আমি বন্ধু এবং সহপাঠী। বাইরের সম্পর্ক এইটুকু। কিন্তু যে সম্পর্ক চোখে দেখা যায় না, সেটা শুধু আমরাই জানতাম। সেই বিজয়ের ছেলে তুমি! আজ এইখানে—

    ওর দিকে নজর পড়তেই কথাটা আর শেষ করা হল না। দাঁত দিয়ে ঠোট চেপে ধরে উদ্‌গত অশ্রু রোধ করবার সে কি আপ্রাণ চেষ্টা! কিন্তু একটিবার মাত্র আমার চোখের দিকে চেয়ে সে চেষ্টা তার ব্যর্থ হয়ে গেল। দু’চোখের কোল ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়ল জলধারা।

    আত্মীয়স্বজন যদি কেউ জেলে এসে পড়ে, সংশ্লিষ্ট জেলকর্মীকে সেটা কর্তৃপক্ষের গোচরে আনতে হবে—এটা জেল কোডের বিধান। আত্মীয়টিকে তখন অন্যত্র চালান দেবার ব্যবস্থা করতে হয়। পরিমল আমার আত্মীয় নয়, স্বজন বলতে যা বোঝায়, তাও নয়। তবু অনেক ভেবে ঐ আইনের আশ্রয় নিলাম। যাবার সময় সে বলল, এ ভালোই হল। আমিও ভাবছিলাম বলবো, আমাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিন।

    হঠাৎ যেন ধাক্কা খেলাম। সেও আমাকে ছেড়ে যাবার জন্য ব্যস্ত! বললাম, কেন, তুমি যেতে চাইছিলে কেন?

    পরিমল উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। আমিও জবাবের জন্য পীড়াপীড়ি করলাম না। শুধু বললাম, যেখানেই থাক, একটা কথা আমার মনে রেখো। জেলের আইন-কানুনগুলো মেনে চলবার চেষ্টা কোরো। অনেক অনর্থক অসুবিধার হাত এড়াতে পারবে।

    মাস চার-পাঁচ কেটে গেল। তারপর একদিন সকালের ডাকে একটা মোটা খামের চিঠি পেলাম। অচেনা হাতের লেখা। শেষ পাতায় সকলের শেষে নাম রয়েছে— হতভাগ্য পরিমল। সে যে আমাকে চিঠি লিখবে ভাবতে পারিনি। আমাকে এড়িয়ে চলতেই সে চেয়েছিল, আর সেটাই তো তার পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু সংসারের কটা ঘটনাই বা স্বভাবের নিয়মে ঘটে?

    চিঠিখানা আজ আমার হাতে নেই। সমস্ত যত্ন অগ্রাহ্য করে কোনো একটা বদলির হিড়িকে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। চিঠি নেই। তার প্রতি ছত্রের প্রতিটি কথা আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। কিন্তু তাকে বাইরে এনে রূপ দিতে পারি, এমন দিব্য শক্তি বিধাতা আমাকে দেননি। ফটোগ্রাফ যেমন চিত্র নয়, যে চিঠিটা এখানে তুলে দিলাম, সেটাও তেমনি পরিমলের চিঠি নয়। তার অবয়বটা হয়তো রইল, রইল না তার প্রাণস্পন্দন। কতদিন হয়ে গেল, তবু সেই হারিয়ে-যাওয়া চিঠির অবলুপ্ত অক্ষরের বুকের ভিতর থেকে আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি—

    কাকাবাবু,

    আপনার শেষ উপদেশ আমি এতদিন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। কিন্তু আর পারলাম না। এই জেলে আসবার পর এই চিঠিই আইন-ভঙ্গের প্রথম অপরাধ। সে অপরাধ কেন করেছি, কেন প্রকাশ্য রাস্তায় না গিয়ে গোপন পথের আশ্রয় নিলাম, এ চিঠিটা শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝতে পারবেন।

    আমার এই চিঠি পেয়ে আপনি বিরক্ত হবেন কিনা জানি না, বিস্মিত হবেন নিশ্চয়। যার চোখের সামনে থেকে পালিয়ে আসবার জন্যে একদিন অস্থির হয়ে উঠেছিলাম, আজ তাকেই আবার এ দীর্ঘ কাহিনী শোনাতে যাবো, একথা কি আমিও কোনদিন ভাবতে পেরেছিলাম? কিন্তু কি করবো? যাকে ভালবাসি তাকে আঘাত দেওয়াই বোধ হয় আমার কপালের লিখন। তাই পালিয়ে এসেও থাকতে পারলুম না। আমার হাত থেকে এখনো যে আপনার অনেক দুঃখ পাওনা আছে। এখনো যে আমার বলা হয়নি, কি করে কোন্ ঘোর দুর্যোগের দিনে এই নরকের পথে প্রথম পা বাড়িয়েছিলাম, এতবড় সর্বনাশ কেমন করে হল, অতবড় বাপের কঠিন আদর্শ কেন আমাকে রক্ষা করতে পারেনি।

    একথা জানি, সে কাহিনী যে শুনবে, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে। আমি ক্রিমিনাল। সংসারে আমার জন্যে দয়া নেই, ক্ষমা নেই, নেই কারো মনে এতটুকু সংবেদন। কিন্তু আপনাকে তো অন্য সবার সঙ্গে এক করে দেখতে পারি না। এখানে বসেই আমি যে আপনার বুকের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছি।

    যে জিনিস ওখানে সঞ্চিত হয়ে আছে এ হতভাগার জন্যে, একমাত্র বাবা ছাড়া আর কারো কাছেই তা পাইনি। তাই তো লিখতে বসে আজ আপনা হতেই এ মুখ থেকে বেরিয়ে এল—কাকাবাবু। আপনাকে কাকাবাবু বলে ডাকবার মত স্পর্ধা আমার হবে, এক মুহূর্ত আগেও ভাবতে পারিনি।

    আমার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে আমার বাবার কথা। আপনাকে সেদিন বলতে গিয়েও বলতে পারিনি। বাবা নেই। প্রায় আট মাস হল, তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর এই অকালমৃত্যু যত বড় মর্মান্তিক হোক, একদিন হয়তো সইতে পারবো। কিন্তু যেভাবে, যে নিদারুণ দুঃখ-দুর্দশা-লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে তিনি তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, এতবড় পাষণ্ড হয়েও এক নিমেষের তরে ভুলতে পারছি না। সে-কথা আমার কারো কাছেই বলবার উপায় নেই। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার মায়ের কথা—এমন কথা, যা উচ্চারণ করাও সন্তানের পক্ষে অপরাধ। সে শুধু রইল আমার বুকের মধ্যে। যতদিন বাঁচবো, সে বোঝা আমাকে একাই বয়ে বেড়াতে হবে।

    সেই ভয়ঙ্কর দিনটা আজও চোখের উপর ভাসছে। বাবা হাওড়ায় বদলি হয়ে এসেছেন। শিবপুরে একটা বাড়িতে আমরা থাকি। কিছুদিন আগে থেকেই তিনি “ব্লাড প্রেসার’-এ ভুগছিলেন। দারুণ সাংসারিক অশান্তি তাঁর উপর বিষের মত কাজ করছিল। মাঝে মাঝে এত বাড়াবাড়ি হত যে একনাগাড়ে পাঁচ-সাত দিন মাথা তুলতে পারতেন না। ছুটি নিলে সংসার চলে না। এই অবস্থাতেই তাঁকে কাজ করতে হত। সেদিনও কোর্টে বেরোবার আয়োজন করছিলেন। মা এসে বললেন, টাকার কদ্দূর হল? মাঝে আর তিনটি দিন বাকী। জিনিসটা দেখেশুনে কিনতে হবে তো।

    বাবা জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে বললেন, অতো টাকা তো যোগাড় করতে পারছিনে। ধারও মিলছে না কোনোখানে।

    মা অবাক হয়ে বললেন, অতো টাকা মানে? অন্তত শ’পাঁচেক টাকা না হলে একটা চলনসই জড়োয়া নেকলেস হয় কি?

    একটু থেমে বললেন, পাঁচটা নয়, সাতটা নয়, ঐ একটা মায়ের পেটের বোন। তার প্রথম মেয়ের বিয়ে। না গিয়ে এড়ানো যাবে না। তা তোমার হাতে যখন পড়েছি, বল তো খালি হাতেই যাবো।

    বাবা টুপিটা তুলে নিয়ে ধীরে শান্ত কণ্ঠে বললেন, আর তো কোনো উপায় দেখছিনে। আপাতত সংসার খরচের টাকা থেকে শ’খানেক দিয়ে যাহোক একটা—

    “শ’খানেক!” মা একেবারে রুখে উঠলেন, “বলতে একটু বাধলো না? তোমার না হয় মান-ইজ্জতের বালাই নেই, কিন্তু একশ টাকার একটা জিনিস হাতে করে গেলে আমার বাবার মুখখানা কোথায় থাকে ভেবে দেখেছ?”

    আমি পাশের ঘরে স্কুলে যাবার আগে বই গোছাচ্ছিলাম। বাবার হঠাৎ নজর পড়তেই গম্ভীর গলায় বললেন, খোকা তুমি নিচে যাও। আমি তাঁর চোখের দিকে চেয়ে চমকে উঠলাম। এ কী চেহারা হয়েছে বাবার? বুঝলাম এই মুহূর্তে তাঁর শুয়ে পড়া দরকার। কিন্তু তাঁর কথার অবাধ্য কোনোদিনই হইনি। তাই কোনো কথা না বলে বই খাতা নিয়ে নিচে নেমে গেলাম। আমার পেছনে বাবাও নামতে লাগলেন। মার গলা শোনা গেল, টাকার বাবস্থা না করেই চলে যাচ্ছ যে?

    বাবা নিম্নস্বরে কি একটা বললেন। মার উত্তেজিত উত্তর নিচে থেকেই শুনতে পেলাম। রেগে গেলে মার জ্ঞান থাকত না, কি বলছেন আর কাকে বলছেন। যা বললেন, তার সবটা আমার কানে গেল না, যেটুকু গেল তাও বলবার মত নয়। সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ সিঁড়িতে একটা শব্দ শুনে ছুটে এলাম। দেখলাম বাবা পড়ে আছেন। কপালের একটা ধার কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। জ্ঞান নেই। চাপরাসী আর ঠাকুর- চাকরে মিলে ধরাধরি করে তাঁকে কোনো রকমে উপরে নিয়ে গেল। আমি ছুটলাম ডাক্তার ডাকতে। ঘন্টা দুই চেষ্টার পর জ্ঞান ফিরে এল। কিন্তু সমস্ত বাঁ অঙ্গটা অচল। তখনো বুঝিনি মুহূর্তমধ্যে কত বড় সর্বনাশ আমাদের ঘটে গেল। বাবা চিরদিনের তরে শয্যায় আশ্রয় নিলেন।

    মাসের প্রথম তারিখে সমস্ত মাইনেটা বাবা মার হাতে ধরে দিতেন। কিন্তু সেটা ছিল চৌদ্দ পনেরো দিনের খরচ। বাকি মাসটা যেভাবে চলত, আপনি অনুমান করুন। সামান্য পুঁজি যা ছিল, আগেই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই সম্ভব হল না। বাবা প্রথমে কিছুদিন ছুটি পেলেন। তারপর নামমাত্র পেনসন দিয়ে সরকার তাঁকে একেবারেই ছুটি দিয়ে দিলেন। পেটের দায়ে তাঁকে তখন কত কি করতে হত। কখনো খবরের কাগজে প্রবন্ধ, কখনো আইনের বই-এর নোট লেখা। শুয়ে শুয়ে লিখতে পারতেন না। ডিকটেট করতেন, আমি ইস্কুলের ছুটির পর দু-ঘণ্টা করে রোজ লিখে দিতাম। তারপর যেতে হত প্রেসে। যা আসত, অতি সামান্যই।

    সে কী জীবন! গল্প শুনেছি, শিব বিষপান করে নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন। দেবাদিদেবকে চোখে দেখা যায় না। আমি দেখেছি আমার বাবাকে। শিবের চেয়েও শান্ত; সর্বংসহা বসুমতীর চেয়েও সহিষ্ণু। এত বিষ, এত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর অপমান! উত্তরে একটা কথাও তাঁর মুখ থেকে কোনোদিন বার হতে শুনিনি। আমি অস্থির হয়ে উঠতাম। বাবা আমার মন বুঝতে পারতেন। কাছে ডেকে গায়ে হাত বুলিয়ে বলতেন, খোকা, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শেখা হল সইতে শেখা। একথা কোনোদিন ভুলো না।

    এই নিরবচ্ছিন্ন রোগশয্যায় আমিই ছিলাম তাঁর একমাত্র সঙ্গী। মাঝে মাঝে দু-একজন পুরনো সহকর্মী দেখা করতে আসতেন। মামুলী সান্ত্বনা দিয়ে চলে যেতেন। তার কোনোটাই বাবাকে স্পর্শ করত না। দূর ছাত্রজীবনের একটিমাত্র বন্ধু তাঁর সমস্ত অন্তর জুড়ে ছিলেন। কতদিন কতভাবে তিনি তাঁর কথা আমায় শুনিয়েছেন। তখন কি জানি, একদিন এমনিভাবে আমি তাঁর দেখা পাবো? সেই দেখা পেলাম, কিন্তু সময়ে পেলাম না কেন? যদি পেতাম, বাবাকে বোধ হয় এমন করে হারাতে হত না; আর আমিও আজ এই পাঁকের মধ্যে ছট্‌ফট করতাম না।

    এই সময়ে আমাদের সংসারে একটি নতুন মানুষের আবির্ভাব হল। মার কোন্ দূর সম্পর্কের দাদা। আমাদের মণীশ-মামা। শুনেছি মার যখন বিয়ে হয়নি, দাদামশাই তাঁর এই আত্মীয়টিকে একদিন তাঁর মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন : এতকাল পরে এই নিখুঁত সাহেবিপোশাক পরা ভদ্রলোক তাঁর একটা নতুন-কেনা টু-সীটার অস্টিন চড়ে যখন-তখন আমাদের বাড়ি চড়াও করে অতিশয় অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। তারপর একদিন এঁকে উপলক্ষ করেই দেখা দিল জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। সেই কথা বলেই এ চিঠি শেষ করবো।

    সেবার আমি ম্যাট্রিক দেবো। ইস্কুলে ভালো ছেলে ছিলাম। বাবার একান্ত ইচ্ছা প্রথম দশজনের মধ্যে যেন দাঁড়াতে পারি। পাছে তাঁকে দুঃখ দিতে হয়, তাই পড়াশুনোয় কোনোদিন অবহেলা করিনি। সেদিনও নিজের ঘরে বসে জিওমেট্রি মুখস্থ করছিলাম। রাত প্রায় এগারোটা। পাশের ঘরে বাবা। শরীরটা আবার কদিন থেকে খারাপ যাচ্ছে। গোবিন্দ তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। অনেক দিনের পুরনো এই চাকরটি তখনো আমাদের ছেড়ে যায়নি। রান্নাবান্না থেকে বাবার দেখাশোনা সবই ওর হাতে। বাড়ির সামনে মোটর থামবার পরিচিত শব্দ শোনা গেল। গোবিন্দ উঠে গেল দরজা খুলতে। তারপরেই দেখলাম মণীশ-মামা উপরে উঠছেন। বারান্দা পেরিয়ে সোজা বাবার ঘরে ঢুকলেন এবং সাবধানে একটা চেয়ারে বসে বললেন, বিজয়বাবু, ঘুমুলেন নাকি?

    বাবার বোধ হয় তন্দ্রা এসেছিল। একটু চমকে উঠে বললেন, কে?

    —আমি মণীশ।

    -ও, কি বলুন?

    মামা একটু কেশে নিয়ে বললেন, বলছিলাম, সুরমার শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছে না। একটা কোথাও চেঞ্জে-টেঞ্জে যাওয়া দরকার।

    বাবা শান্তভাবেই বললেন, কোনো অসুখ করেছে কি?

    —না, অসুখ তেমন কিছু নয়। এই বাড়ির আবহাওয়াটা তেমন সহ্য হচ্ছে না।

    —কিন্তু চেঞ্জে পাঠাবার মত টাকা তো আমার নেই।

    —টাকার জন্যে আপনাকে ভাবতে হবে না। ওটা আমিই ম্যানেজ করবো। সুরমার ইচ্ছা পরিমলও সঙ্গে যায়। ওর পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই বেরিয়ে পড়তে চাই। একটা বাড়ি- টাড়ি তাহলে এখন থেকেই দেখতে হয়।

    বাবা একটুখানি চুপ করে থেকে বললেন, আপনারা স্বচ্ছন্দে যেতে পারেন। পরিমলের যাওয়া হবে না।

    —কেন হবে না, জানতে পারি কি? প্রশ্ন করলেন মা। কখন এসে দরজার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, দেখতে পাইনি। বাবাও বোধ হয় টের পাননি। সেদিকে একবার তাকিয়ে বাবা বললেন, সে আলোচনা করে লাভ নেই। ওকে আমি যেতে দিতে পারি না।

    মা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, চব্বিশ ঘণ্টা রুগী ঘেঁটে ঘেঁটে ওর অবস্থাটা কি হয়েছে দেখতে পাচ্ছ? আমার চোখের সামনে আমার ছেলেটাকে তুমি মেরে ফেলতে চাও?

    বাবা আস্তে আস্তে বললেন, মণীশবাবু আমাকে মাপ করবেন, রাত বোধ হয় অনেক হল। এবার একটু ঘুমোতে চাই।

    মণীশ-মামা কিছু বলবার আগেই মা চেঁচিয়ে উঠলেন, ও সব ভড়ং রেখে দাও। আমার ছেলে আমি যেখানে খুশি নিয়ে যাবো। দেখি তুমি কেমন করে বাধা দাও।

    মণীশবাবু বললেন, আমার মনে হয়, আপনি অন্যায় করছেন, বিজয়বাবু। ছেলেটা ক’দিন একটু ঘুরে আসবে এতে আপত্তির কারণ কি থাকতে পারে?

    বাবা মিনিট কয়েক চুপ করে থেকে বললেন, আমার স্ত্রী-পুত্রকে চেঞ্জে পাঠাবার মত সঙ্গতি যদি থাকতো, অবশ্যই পাঠাতাম। তা যখন নেই, অন্যের অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে চাই না। কিন্তু যেখানে আমার জোর খাটবে না, সেখানে বাধা দিতে গেলে লাঞ্ছনা ভোগই সার হবে। তাই আপত্তিটা শুধু পরিমলের বেলাতেই জানিয়ে রাখছি।

    মামা সিগারেট ধরালেন। মার তিক্ত স্বর শুনতে পেলাম, অন্যের অনুগ্রহ! বলতে একটু চক্ষুলজ্জা হল না তোমার? এই অনুগ্রহ না পেলে কোথায় থাকত তোমার স্ত্রী-পুত্র, আর কোথায় থাকতে তুমি নিজে? তোমার বুঝি ধারণা, তোমার ঐ গোটাকয়েক পেনশনের টাকা আর ঐ নোট-ফোট লিখে যা ভিক্ষে জোটে, তাই দিয়েই এই সংসারটা চলছে? এ অনুগ্রহ যে করতে চাইছে, সে আজ নতুন করছে না, অনেকদিন আগে থেকেই করে আসছে। তা না হলে আজ সবাইকেই পথে দাঁড়াতে হত।

    মণীশ-মামা বললেন, আহা! এসব তুমি কি বলছ সুরমা? অনুগ্রহ আবার কোথায় দেখলে? এ তো আমার কর্তব্য। একেবারে ছেলেমানুষ। রেগে গেলে আর—

    বাবার গম্ভীর কণ্ঠে ডুবে গেল তাঁর নাকী-সুর—কই, এসব কথা তো আমার জানা ছিল না। জানি, আমি আজ নিতান্ত দুঃস্থ এবং অক্ষম। কিন্তু অন্যের দয়ায় বেঁচে আছি, আমার একমাত্র সন্তান হাত পেতে পরের অন্ন গ্রহণ করছে, একথা তো আমি ভাবতেই পারি না।

    শেষের দিকে তাঁর সুরটা এমন করুণ শোনাল যে, আমার চোখে জল এসে পড়ল। ইচ্ছে হল, ছুটে গিয়ে বলি, না বাবা, আমরা এখনো পরের কাছে হাত পাতিনি। ও সব মিথ্যে কথা। কিন্তু যাওয়া হল না। জানতাম বাবা রাগ করবেন। একটুখানি থেমে উনি তেমনি ধীরে ধীরে বললেন, যা হয়ে গেছে, তা তো আর ফেরানো যাবে না। তবে এ অন্যায়ের এইখানেই শেষ। কাল ভোর থেকেই সব ব্যবস্থা বদলে যাবে।

    বাঁ হাত অচল। শুধু ডান হাতটা কপালে ঠেকিয়ে বাবা বললেন, মণীশবাবু, আমার এবং আমার পরিবারের জন্যে আপনি যা করেছেন, তার জন্যে অশেষ ধন্যবাদ। কিন্তু আর নয়। আপনার অনুগ্রহের দান থেকে আমাদের মুক্তি দিন।

    বাবাকে ভালো করেই চিনি। কাল থেকে যে ব্যবস্থা তিনি করতে চাইছেন, সেটা যতো কঠোরই হোক, তবু যে তার নড়চড় হবে না, সেটাও আমার জানা ছিল। এমনিতেই তাঁর খাবার বরাদ্দ এত সাধারণ যে, তার নীচে আর এক ধাপ নামতে গেলে, সেটা হবে অনাহার। অথচ সেই রাস্তাই যে তিনি ধরবেন, তাতে আর সন্দেহ নেই। সে তো আত্মহত্যার সামিল। সেই ভীষণ পরিণাম থেকে তাঁকে বাঁচাবার কি কোন পথ নেই? আমি তাঁর একমাত্র সন্তান, একমাত্র বংশধর। যতই ছোট হই, অক্ষম হই, আমি কি শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকবো? পীড়িত, অভাবগ্রস্ত পিতার মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেবার ক্ষমতা ও আমার নেই? এই তো, আমার বয়সী কত ছেলে পথে-ঘাটে কতরকম কাজ করে খাচ্ছে। আমি ভদ্রঘরে জন্মেছি বলেই তা পারবো না?

    গভীর রাত পর্যন্ত নানা রকমের উদ্ভট কল্পনা মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ জেগে উঠে দেখি পাঁচটা বেজে গেছে। খাতা থেকে একটা কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে লিখলাম, বাবা, ভেবে দেখলাম সংসারের আয় বাড়াবার জন্যে আমার কিছু রোজগার করা দরকার। সেই চেষ্টাতেই চললাম। আমার জন্যে ভেবো না। আশীর্বাদ করো যেন সফল হয়ে ফিরে আসতে পারি।

    বাবার ঘরে যেতে সাহস হল না। পাছে তিনি জেগে ওঠেন, কিংবা তাঁর মুখের দিকে চোখ পড়লে আমার সকল সঙ্কল্প ভেঙে যায়, তাই পড়ার টেবিলে চিঠিটা চাপা দিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়লাম।

    এর পরে যে জীবন শুরু হল, তার বর্ণনা দিতে গেলে এ চিঠি শেষ হবে না। সে চেষ্টা করবো না। ঘরের বাইরে এসে পৃথিবীকে দেখলাম এক নতুন রূপে। দেখলাম, নরক বলে কোনো আলাদা দেশ নেই। এই সংসারটাই একটা প্রকাণ্ড নরক। দেখলাম, মানুষ কত নীচ, কত কঠোর, কত নির্মম! দয়া নেই, প্রীতি নেই, একবিন্দু সহানুভূতি নেই। আছে শুধু সন্দেহ, পীড়ন আর বঞ্চনা। ভিক্ষা চাইলে হয়তো সহজেই পেতাম, কিন্তু যার কাছেই বলেছি, আমাকে একটা কাজ দাও, আমি খেটে খেতে চাই, সবারই চোখে দেখেছি অবিশ্বাস, শুনেছি কারো নীরব কারো-বা সরব মন্তব্য—কোনো মতলব আছে ছোকরার

    দু-দিন পেটে পড়ল শুধু কলের জল। অনেক ঘুরে অনেকের দুয়ারে ঢুঁ মেরে এক দোকানে জুটল খাতা লেখার কাজ। খোরাক আর পনেরো টাকা। হাতে স্বর্গ পেলাম। মাস গেলেই প্রথম মাইনের টাকাটা মনিঅর্ডার করে পাঠালাম বাবার কাছে। লিখলাম, এই টাকাটা দিয়ে ফল আনিয়ে নিও। আমার জন্যে কিছু ভেবো না। আমি ভাল আছি। সুবিধা হলেই গিয়ে তোমাকে দেখে আসবো!

    কিছুদিন পরে মালিকের বাক্স থেকে পঞ্চাশ টাকা চুরি গেল। সন্দেহ পড়ল আমার উপর। বিশ্বাস যখন গেল তারপরে আর সেখানে থাকা চলে না। বেরিয়ে পড়লাম। এবার জুটল এক চায়ের দোকানে বয়-এর কাজ। টেবিলে টেবিলে খাবার যোগানো। কাটল কিছুকাল। একদিন একখানা প্লেট ধুতে গিয়ে হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল। কদর্য ভাষায় বাপ তুলে গালাগালি। আবার পথ। সেখান থেকে মোটরের কারখানা। সে চাকরি টিকল না। মাতাল মিস্ত্রিটার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে হত। তার কুৎসিত ঘনিষ্ঠতা সহ্য হল না। এর পরে জুটলাম গিয়ে এক দেশী মদের দোকানে। কাজ, মদ বিক্রি। মাইনে তিরিশ টাকা। বেশ কিছুকাল কাটিয়ে দিলাম।

    কতবার কতভাবে পাঁকের স্পর্শে এসেছি। কিন্তু পাঁক গায়ে লাগতে দিইনি। কিছু টাকা হাতে করতে পারলেই বাবার কাছে ফিরে যাবো, এই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। কারো পরামর্শ, কারো কোনো প্রলোভন সে লক্ষ্য থেকে আমাকে নড়াতে পারেনি। এতদিন পরে এই মদের দোকানের বারান্দায় এমন একটি লোকের সাক্ষাৎ পেলাম একদিন, যার কাছে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলুম না। জানি না, কি যাদু ছিল তার চোখে, তার কথায়, তার হাতের স্পর্শে। স্রোতের মুখে তৃণের মত আমি তার ইচ্ছার তোড়ে ভেসে চলে গেলাম।

    দোকান বন্ধ হবার পর বারান্দায় একটা বেঞ্চিতে চুপ করে বসে ছিলাম। সে এসে বসল পাশটিতে। যেন কতদিনের বন্ধু, এমনিভাবে হাত ধরে বলল, তোমায় তো এখানে মানাচ্ছে না, ভাই। তুমি এ রাস্তায় কেমন করে এলে?

    অনেকদিন পরে মানুষের কণ্ঠে যেন একটু দরদের আভাস পেলাম। সে আমার চেয়ে বোধ হয় বছর-পাঁচেক বড় হবে। কিন্তু তার পাশে নিজেকে মনে হল শিশু। একটা ভালো হোটেলে নিয়ে গিয়ে সে প্রচুর খাওয়ালে। তারপর ট্যাকসি করে নিয়ে গেল বেড়াতে। একদিন, দু-দিন, তিনদিন। তারপর এক নিভৃত সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে বসে তাকে খুলে বললাম আমার জীবনের বিচিত্র কাহিনী। সে নিঃশব্দে শুনল সব কথা। তারপর সস্নেহে বলল, তুমি ঠিক করেছ ভাই। এ ছাড়া আর পথ ছিল না। কিন্তু এই মাতালের দোকানে মদ বেচে তো বাবার দুঃখ ঘোচাতে পারবে না। তার চেয়ে আমার সঙ্গে চল। আমি তোমার পথ বাতলে দেবো।

    তার সঙ্গ নিলাম।

    সে রাতটা আমার চোখের উপর ভাসছে। অত্যন্ত সরু গলি। অন্ধকার পথ, দু-পাশে নোংরা জঞ্জাল। টর্চের আলোয় কোনো রকমে এগিয়ে যাচ্ছি। একটা পোড়ো মতন বাড়ি। সেটা ছাড়িয়ে ভেতরের দিকে আর একটা প্রকাণ্ড জীর্ণ কোঠা। সামনের দিকটা ভেঙে পড়েছে। ভাঙা স্তূপের পাশ দিয়ে একফালি পথ। অতিকষ্টে পার হয়ে ডানদিকে পেলাম একটা সিঁড়ি। যেমন স্যাঁতসেঁতে, তেমনি অন্ধকার। উঠছি তো উঠছিই। তার যেন আর শেষ নেই। সে আমার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। অনেক হোঁচট খেয়ে, অনেক মোড় ঘুরে শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছলাম একটা হল-মতন ঘরে। একঘর লোক। বিশ্রী ভাষায় আলাপ করছে, আর মাঝে মাঝে হাসছে বিকট কদর্য হাসি। এ কোথায় নিয়ে এলে? ভয়ে ভয়ে বললাম তাকে। সে উত্তর দিল না। হাত ধরে নিয়ে গেল পাশের একটা ঘরে। মোমবাতির আলোয় দেখলাম, একটা লোক খাটিয়ায় শুয়ে বিড়ি টানছে। বয়েস হয়েছে; কিন্তু দেখতে গুণ্ডার মত।

    আমার বন্ধু বলল, এনেছি ওস্তাদ।

    —এনেছো? বেশ, এদিকে নিয়ে এসো।

    তেমনি হাত ধরেই সে আমাকে আরো খানিকটা এগিয়ে নিয়ে গেল। লোকটা উঠে এসে আমার মুখের কাছে মুখ এনে অনেকক্ষণ কি দেখল। তারপর বলল, বাঃ, খাসা মাল এনেছিস রে। ঠিক আছে, ও পারবে।

    ধেনো মদের উগ্র গন্ধে গা পাক দিয়ে উঠল। পিছন ফিরে বন্ধুকে আর দেখতে পেলাম না। আর কোনোদিন দেখতে পাইনি।

    পরদিন সকালেই বুঝলাম, কোথায় এসেছি। পকেটমারদের প্রধান ট্রেনিং সেন্টার। বন্ধুটি একজন পাকা আড়াকাঠি। আমি নতুন রংরুট। আমাকে নজরবন্দী করে রাখা হল। কিছুক্ষণ পরেই ওস্তাদ ডেকে পাঠালে। কাঁধের উপর হাত রেখে বলল, ভয় কিসের? তোমার মত কত ছেলে আছে আমাদের দলে। সক্কলের সঙ্গে আলাপ-সালাপ করো। খাও-দাও ফুর্তি করো। আর মন দিয়ে কাজ শেখো, ভাল করে শিখতে পারলে এরকম লাইন আর নেই। রাতারাতি বড়লোক। আচ্ছা, সব চাইতে কাকে বেশী ভালবাস বল তো?

    বললাম বাবাকে।

    —বেশ। বল দিকিনি, ‘বাবার নাম নিয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, দল ছেড়ে কোনো দিন যাবো না; দলের কোনো কথা কারো কাছে প্রকাশ করবো না। বল—

    প্রতিজ্ঞা করলাম। এমনি করে আমার দীক্ষা হল।

    মাসখানেক ট্রেনিং দিয়েই ওরা আমাকে রাস্তায় পাঠাতে শুরু করল। পালানোর উপায় নেই, পেছনে ভিড়ের মধ্যে ওদের গার্ড। বেগতিক দেখলে ছোরা চালাতে দ্বিধা করবে না। হাতেখড়ি শুরু হল। সারাদিনে কিছু কেস দিতেই হবে। তা না হলে নানারকম নির্যাতন। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেটা আমাকে বেশী সইতে হয়নি। দক্ষ এবং বিশ্বস্ত কর্মী বলে অল্পদিনেই আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। যা পেতাম, সব জমা দিতে হত সর্দারের কাছে। আমার প্রাপ্য ছিল খোরাক আর সামান্য কিছু হাতখরচ।

    গহর বলে একটা লোক ছিল আমাদের দলে। আমাকে সত্যিই ভালবাসত। একদিন আড়ালে নিয়ে বলল, তুমি কি বোকা! যা পাও সবই দিয়ে দিচ্ছ! কিছু কিছু সরাতে হয়। তা নৈলে তোমার রইল কি? আমরা সবাই কি করছি দেখতে পাও না?

    সেকথা আমি জানতাম। তার বিপদটা কম ছিল না। একদিন একটু ঝুঁকি নিলাম। এক ভাটিয়া ভদ্রলোক বাসে উঠতে যাবে। ভীষণ ভীড়। মনিব্যাগটা সরিয়ে নিয়ে আমিও সরে পড়লাম। নিরাপদ জায়গায় এসে ব্যাগ খুলে দেখলাম, দুখানা হাজার টাকার নোট। ব্যস্, আর নয়। এবার ফিরতে হবে।

    কতকাল পরে বাড়ি ফিরছি। রাত প্রায় দশটা। কড়া নাড়তে গিয়ে বুক কাঁপছে। মনে হল অনেক দূরে চলে গেছি, অনেক নীচে নেমে গেছি। এ বাড়ি আমার নয়। মাথা উঁচু করে এখানে ঢুকবার অধিকার আমার চলে গেছে। তারপর ঢুকে কি দেখবো কে জানে? এমন সময় হঠাৎ দরজা খুলে গেল। সামনেই গোবিন্দ। আমাকে দেখেই হাউ-হাউ’ করে কেঁদে উঠল—অ্যাদ্দিন কোথায় ছিলে দাদাবাবু? এ কি চেহারা হয়েছে তোমার? তার মুখ চেপে ধরে বললাম, চুপ চুপ! বাবা কেমন আছেন?

    গোবিন্দ চোখ মুছতে মুছতে বলল, আর কেমন! তুমি যাবার পর থেকেই একেবারে ভেঙে পড়েছেন। আর মাথা তুলতে পারেন না। বুকের অবস্থাও খুব খারাপ। কোন্দিন প্রাণটা বেরিয়ে যায়।

    —মা কোথায়?

    গোবিন্দ সেকথার জবাব দিল না। বাইরে যেতে যেতে বলল, তুমি ওপরে যাও, আমি চট করে একটা সোডা নিয়ে আসছি।

    বাবার ঘরে ঢুকে শিউরে উঠলাম। চোখ বুজে পড়ে আছেন—বাবা নন, বাবার কঙ্কাল। পায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলেন, কে?

    —আমি, বাবা।

    —খোকা? অ্যাদ্দিনে এলি? বড্ড ভুল করেছিলি বাবা। আয় কাছে আয়।

    কাছে যেতেই ডান হাতটা কোনো রকমে তুলে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি তাঁর বুকের উপর মাথা রেখে চোখের জল আর রাখতে পারলুম না। অনেকক্ষণ সেইভাবে পড়ে রইলাম। চোখের জলের ভিতর দিয়ে আমার মনের সব তাপ সব পাপ যেন গলে বেরিয়ে গেল। হালকা হয়ে গেল বুকটা। তিনি আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, তুই বড় হবি, মানুষ হবি, এই তো আমার একমাত্র সাধ। কিন্তু এ তুই কী করলি, খোকা? দশ-বিশ টাকায় আমাদের কি উপকার হবে বল? আর তার জন্যে তুই এমন করে নিজেকে ক্ষয় করে চলেছিস্? তোর সবগুলো মনিঅর্ডার আমি তুলে রেখে দিয়েছি। কচি ছেলের এত কষ্টের রোজগার আমি পেটের দায়ে খরচ করবো!

    আমি উঠে বসে বললাম, এবার অনেক টাকা এনেছি, বাবা। সকাল হলেই সবচেয়ে বড় ডাক্তার ডেকে আনবো। তোমাকে শীগির শীগির সেরে উঠতে হবে। তারপর চল, আমরা একটা চেঞ্জে গিয়ে থাকি।

    মনিব্যাগটা খুলে নোট দু’খানা বের করলাম।

    সেদিকে একবার তাকিয়েই বাবার মুখটা হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল। রুক্ষ স্বরে বললেন, একি! এত টাকা তুই কোথায় পেলি?

    আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    —কে দিয়েছে বল? আমার কাছে লুকোসনে। বল, কে দিয়েছে?

    অতখানি বিচলিত হতে বাবাকে কখনো দেখিনি। ভয়ে ভয়ে বললাম, কেউ দেয়নি; আমি পেয়েছি।

    —কি করে, কোত্থেকে পেয়েছিস?

    আমি নিরুত্তর।

    বাবা চেঁচিয়ে উঠলেন, চুরি করেছিস?

    এ প্রশ্নের কোনো জবাব আমার মুখে এল না।

    বাবা একেবারে ভেঙে পড়লেন।চোর! আমার ছেলে চোর! হা ভগবান, এও আমাকে দেখতে হল!….

    দুর্বল দেহ থরথর করে কাঁপছে। চোখ দুটো মনে হল যেন ঠিকরে বেরিয়ে পড়বে। অদম্য উত্তেজনায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে চান। কী সর্বনাশ! আমি তাড়াতাড়ি ধরে শুইয়ে দিয়ে শীর্ণ মুখখানা দু’-হাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম, বাবা তুমি চুপ কর, ঠাণ্ডা হও। এ টাকা আমি ফিরিয়ে দেবো, ফেলে দেবো। তোমায় ছুঁয়ে বলছি, একাজ আর করবো না। তুমি স্থির হও।

    আর বলতে হল না। তিনি তৎক্ষণাৎ স্থির হয়ে গেলেন। চিরদিনের মত স্থির। আমি কি ছাই তখনো বুঝতে পেরেছি? যখন বুঝলাম, মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল। সেই নিস্পন্দ দেহের উপর লুটিয়ে পড়লাম।

    শেষকৃত্য যখন শেষ হল, তখনো সূর্যোদয় হয়নি। সকলের অলক্ষ্যে শ্মশান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সেই মনিব্যাগটা পকেটেই ছিল। সোজা থানায় গিয়ে সেটা জমা দিয়ে বললাম, আশা করি, মালিককে দেখলে চিনতে পারবো।

    ভাটিয়া ভদ্রলোক থানায় ডায়রি করিয়ে রেখেছিলেন। তাঁকে ডেকে পাঠানো হল। চিনলাম। তিনিও তাঁর ব্যাগ এবং নোট সনাক্ত করলেন।

    আমার বিরুদ্ধে পুলিশ কেস দায়ের হল। কোমরে দড়ি এবং হাতে হাতকড়া পরিয়ে জেলে নিয়ে গেল।

    হাকিমের বোধ হয় দয়া হয়েছিল আমাকে দেখে। প্রথম অপরাধ বলে একটা বণ্ড নিয়ে ছেড়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু ছাড়া পেয়ে কোথায় যাবো আমি? কার জন্যেই বা যাবো? বললাম, এটা আমার প্রথম অপরাধ নয়। এ অপরাধ অনেকবার করেছি; ধরা পড়িনি। পুলিশ আমাকে সমর্থন করল। তাদের খাতায় আমার নাম ছিল। ম্যাজিস্ট্রেট বাধ্য হয়েই ছ’মাসের জেল দিয়ে দিলেন।

    ছ’মাস শেষ হয়ে এসেছে। খালাসের আর তিন দিন বাকি। কিন্তু যা চেয়েছিলাম, তা পেলাম কই? কোথায় আমার শাস্তি? কোথায় আমার প্রায়শ্চিত্ত? আমি তো শুধু চোর নই, অমি পিতৃহন্তা। সে মহাপাপের দণ্ডভোগ তো আমার শেষ হয় নি। কোনে দিন হবে কিনা, তাও জানি না। যদি হয়, সেই দিন আপনার কাছে ফিরে যাবো।

    —হতভাগ্য পরিমল

    সে আর ফিরে আসে নি।

  • ষোলো

    ষোলো

    দায়রা-বিচারে কাশিম ফকিরের ফাঁসির হুকুম হয়ে গেল।

    সুযোগ্য জজসাহেব বয়সে নবীন নন কিন্তু জজিয়তির আসনে নবারূঢ়। পেছনে রয়েছে মুন্সেফ আর সবজজগিরির সুদীর্ঘ সোপান। ছিলেন ডিক্রি-ডিসমিসের মালিক। জীবন কাটিয়েছেন পাট্টা কবুলিয়ত আর জীর্ণ তমসুকের ধুলো ঘেঁটে। মানুষ যা-কিছু ঘেঁটেছেন, সব ঐ দলিলের মত ঘুণে ধরা-জাল, জোচ্চুরি, ঘুষ আর মিথ্যা সাক্ষ্যের গোপন বিষে ন্যূব্জ-দেহ। সেই সব মানুষ দেখেছেন জজসাহেব। দেখেননি তাজা মানুষ, উচ্ছল প্রাণরসে ভরা মেঠো গেঁয়ো আর বুনো মানুষ, জীবন-মৃত্যু যাদের পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন।

    খুনীর সঙ্গে জজসাহেবের এই প্রথম পরিচয়, মৃত্যুদণ্ডে এই প্রথম হাতেখড়ি।

    সে দণ্ডকে রূপ দিতে গিয়ে শুভ্রকেশ বিচারকের সুদৃঢ় লেখনী হয়তো একবার কেঁপে উঠেছিল। সে কম্পন অনুরণিত হল তাঁর আবেগজড়িত কণ্ঠস্বরে, বিচরমঞ্চের উচ্চাসন থেকে যখন তিনি ঘোষণা করলেন তাঁর ন্যায়নিবদ্ধ কঠোর আদেশ :

    …the said Kasim Fakir be hanged by the neck till he be dead… দণ্ডদাতা বিচলিত হলেন, গ্রহীতা রইল নির্বিকার। পরম ঔদাসীন্যে গ্রহণ করল চরম আদেশ। রায় যখন শেষ হল, কাঠগড়ার উপর দাঁড়িয়ে একবার চারিদিকটায় চোখ বুলিয়ে নিল। মনে হল কাকে যেন খুঁজছে তার ব্যাকুল দৃষ্টি। তারপর ধীরে ধীরে নেমে এল রেলিং-ঘেরা কাঠের মঞ্চ থেকে। পুলিশের লোকেরা এসে ফিরে দাঁড়াল। চোখেই পড়ল না। ফিরেও দেখল না অপেক্ষমাণ স্তব্ধ জনতার বিস্মিত দৃষ্টি। নিঃশব্দে এগিয়ে চলল আদালতের বাইরে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে কালো ঘেরাটোপ-ঘেরা কয়েদীর গাড়ি।

    দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন উকিলবাবু। মক্কেলের প্রাণরক্ষার জন্যে প্রাণপণ করেও ফল পাননি। বোধ হয় ইচ্ছা ছিল, গোটাকয়েক দার্শনিক সান্ত্বনা দিয়ে পুরিয়ে দেবেন সেই ব্যর্থতার শূন্য স্থান। কিন্তু মক্কেলের মুখের দিকে চেয়ে তাঁর মুখেও আর কথা জোগাল না। কোনোরকমে ব্যক্ত করলেন নেহাত যেটুকু কাজের কথা—এখানে একটা সই কর তো ফকির। সাতদিনের মধ্যেই হাইকোর্টে আপীল দায়ের করতে হবে।

    একটু থেমে অনেকটা যেন আপন মনে বললেন, দেখা যাক আর একবার চেষ্টা করে।

    ফকির দাঁড়াল। মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত বিকৃত হাসির কুঞ্চন। শুষ্ক কণ্ঠে বলল, কী লাভ বাবু? এখানেও তো কম চেষ্টা করেননি।

    .

    ফকিরের সঙ্গে আমার দেখা আসাম সীমান্তের কোনো ডিস্ট্রিক্ট জেলে। দেশ ছিল তার ময়মনসিংহ, ইংরেজ-শাসিত বাংলার সবচেয়ে বড় জিলা। বিশাল ভূখণ্ড। শুধু আয়তনে নয়, তার বৈশিষ্ট্য রয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে। দক্ষিণ আর পূবদিক জুড়ে বিস্তীর্ণ সমতলভূমি—ব্রহ্মপুত্র যমুনার অকৃপণ করুণায় শস্যসম্ভারে ঐশ্বর্যময়। রুদ্র বৈশাখের খরতাপে তার মাঠে মাঠে ফাটল ধরে। আষাঢ়ের শেষে সেখানে নেমে আসে বর্ষার প্লাবন। ফেঁপে ফুলে কূল ছাপিয়ে ছুটে আসে দুর্বার-যৌবনা নদী। শ্রাবণে সেই মাঠের বুকে দশ হাত গভীর জলের উপর দিয়ে পাল তুলে যায় সওদাগরী পানসি, ভেসে বেড়ায় অসংখ্য জেলে-ডিঙ্গি। জল শুধু জল। কিন্তু দেখে দেখে চিত্ত বিকল হয় না। তার রূপে নেই বন্ধ্যার রুক্ষতা। তার উপর বিছানো থাকে সুস্পষ্ট শ্যামল আমন ধানের আস্তরণ। বন্যার সঙ্গে তাদের রেষারেষি। জল যদি বাড়ে চার আঙুল ধানের গাছ উঠবে আধ হাত। রুদ্র প্রকৃতির সঙ্গে করুণাময়ী প্রকৃতির দ্বন্দ্ব জয়পরাজয় নির্ভর করে মানুষের ভাগ্যের উপর।

    কার্তিকের শেষে এই বিপুল জলরাশি কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায় ভোজবাজির মত। দীর্ঘ ধানগাছ লুটিয়ে পড়ে। মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকে সোনার শিষ। তার নিচে যে কোমল মাটি, তার মধ্যেও স্বর্ণ-রেণু, কৃষকের ভাষায় যার নাম পলি। তারই স্পর্শে মেতে ওঠে রবিশস্যের খন্দ, লক্লক্ করে মটরের ডগা, হলুদের নেশা লাগে সর্ষে ক্ষেতে, গুজি তিলের অতসীফুল মনে ধরিয়ে দেয় বৈরাগ্যের ছাপ।

    আল বাঁধা নেই, জলসেচ নেই, কাদাঘাঁটা নেই, একটি একটি করে ক্ষীণপ্রাণ ধানের চারা পুঁতে রুগ্ন শিশুকে তিল তিল করে মানুষ করবার দুরূহ সাধনা নেই, জল জল করে চাতকচক্ষে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবার বিড়ম্বনা নেই। মাটিতে কয়েকটা আঁচড় কেটে যেমন-তেমন করে বীজ ছড়িয়ে দিয়ে গান গেয়ে মাছ ধরে আর দাঙ্গা করে দিন কাটায় ময়মনসিহের চাষী। বাকি যা কিছু, সব দেয় নদী, দেয় ব্রহ্মপুত্র আর তার কল্যাণী কন্যা যমুনা। তাই এদেশের নাম নদী-মাতৃক দেশ।

    এরা যে পাট জন্মায় তার খ্যাতি আছে ডাণ্ডী আর নিউইয়র্কের বাজারে। এদের বিরুই চালের মিষ্টি স্বাদ আজও লেগে আছে আমাদের মত বিদেশী অন্নভোজীর রসনায়। জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রাকৃতিক ঔদার্য এদের দেহে দিয়েছে স্বাস্থ্যের দৃঢ়তা, মনে এনেছে নির্ভীক সারল্য। প্রাণ দেওয়া-নেওয়া এদের বিলাস। ধন এবং নারী-লুণ্ঠন এদের ব্যসন। এদের পরিভাষায় ‘abduction’ কথাটার প্রতিশব্দ “বউটানা”, অর্থাৎ পরের বৌকে প্রকাশ্যে বাহুবলে টেনে এনে বশ করার নাম নারীহরণ, গোপনে চুরি করে অরক্ষিতা কুমারী কিংবা বিধবার উপর বলপ্রয়োগ নয়। প্রথমটায় আছে হিংস্র পৌরুষ, দ্বিতীয়টায় কামুকের ইতর কাপুরুষতা।.

    ময়মনসিংহ গীতিকবিতার দেশ। তারও মূলে আছে প্রকৃতির অজস্র বদান্যতা। বাংলার রত্নভাণ্ডারে বিক্রমপুর দিয়েছে মনীষা, বরিশাল দিয়েছে স্বদেশপ্রেম, আর ময়মনসিংহ দিয়েছে পল্লীকাব্য। এর পথে-ঘাটে, নদীর চরে, আমের বনে, নিরক্ষর কৃষকের গোবর-নিকানো আঙিনায় এখনো ভেসে বেড়ায় নদের ঠাকুর আর মহুয়া বেদেনীর বিরহ-মিলন, লীলাকঙ্কের প্রেমগুঞ্জন, কবি চন্দ্রাবতীর মৌন আত্মত্যাগ।

    এই গেল দক্ষিণের রূপ। উত্তরের চেহারা একদম আলাদা। সেখানে নেই দক্ষিণের এই প্রাকৃতিক দাক্ষিণ্য। রুক্ষ বন্ধুর বনভূমি, মাঝে মাঝে অনুচ্চ পাহাড়-শ্রেণী। কৃপণা বসুমতী প্রসন্ন সহাস মুখে বরদান করেন না। বহু খোঁড়াখুঁড়ি করে তবে শস্যকণার সাক্ষাৎ মেলে। এই বিস্তৃত অঞ্চলের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে মধুপুরের গড়। এককালে ছিল ভবানী পাঠকের কর্মক্ষেত্র, আজ পুলিশ-ভীত দস্যু-তস্কর এবং ফেরারী আসামীর লীলাভূমি। এরই কোনোখানে জনহীন জঙ্গলে-ঘেরা এক টিলার ধারে ছিল কাশিম ফকিরের আখড়া। পাশাপাশি দু’খানা খড়ের চালা, একটি ভাঙা দরগা, তার চারদিকে ঘিরে ভাঙ্ আর ধুতুরার বন। সম্পত্তির মধ্যে ছিল নাতনীর বয়সী একটি রূপসী স্ত্রী, গোটাকয়েক গোরুছাগল, একপাল মুরগী আর একটি ময়না।

    ফকির পঞ্চাশোর্ধ্ব। তার উপরে তার যৌবনের ইতিহাস চিহ্নিত আছে পুলিশের খাতায়। তার এই বনংব্রজেং অর্থহীন নয়। কিন্তু একটি উদ্ভিন্ন-যৌবনা চঞ্চলা নারী কোন্ দুঃখে কিংবা কিসের মোহে সংসারের যা-কিছু আকর্ষণ সব ত্যাগ করে বরণ করেছিল এই নির্জন বনবাস, বেছে নিয়েছিল এক অশক্ত বৃদ্ধের নিরানন্দ সঙ্গ, সে-রহস্য জানেন শুধু তার সৃষ্টিকর্তা।

    বৃদ্ধ ফকির দরগার পাশে বসে মালা জপ করে। মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডাকে, কুটী, ও-ও কুটী। কুটীবিবি তখন বন্যা হরিণীর মত চঞ্চল চরণে আপন মনে ঘুরে বেড়ায় উদ্‌গত শৃঙ্গ, সতেজ ছাগশিশুর সঙ্গে “পৈট্” খেলে—তার মাথা ধরে ঠেলে ক্ষেপিয়ে দেয় আর সে যখন সামনের পা দুটো তুলে শিঙ উঁচিয়ে লাফিয়ে আসে, হাততালি দেয় আর খিলখিল করে হাসে। কখনো মুরগীর পেছনে তাড়া করে বেড়ায়, সুর নকল করে ঝগড়া বাধায় কোকিলের সঙ্গে, কিংবা পোষা ময়নার গলা ধরে ভাব জমায়।

    মাঝে মাঝে ফকির সফরে বেরোয়। আলখাল্লা পরে ঝুলি কাঁধে ফেলে একমুখ দাড়ি আর একমাথা পাকা চুল নিয়ে আঁকাবাঁকা লাঠিটা হতে করে যখন বনপথে অদৃশ্য হয়ে যায়, কুটী সেদিকে চেয়ে মুখ টিপে টিপে হাসে। কি ভাবে, কে জানে? ফকিরের ফিরতে মাস কেটে যায়। হাটে হাটে কেরামতি দেখিয়ে বেড়ায়, তাবিজ কবচ দেয়, জলপড়া খাওয়ায়, ঝাড়ফুঁক করে আর সন্ধ্যার অন্ধকারে কোনো একটা আড়াল বেছে নিয়ে নোট ডবলের খেলা দেখায়। দু-টাকা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চার টাকা দেয়, পাঁচ টাকাকেও দশ টাকা করে। তার বেশি যদি কেউ দেয়, ফিরিয়ে দিয়ে বলে আখড়ায় যেও। দরগার সিন্নি লাগবে এক টাকা সওয়া পাঁচ আনা। একা যেও; লোকজন থাকলে হবে না।

    তারপর একদিন ফকির ফিরে আসে। ঝোলাভর্তি টাকা সিকি আর বৌ-এর জন্য টুকিটাকি। কুটীর খুশী আর ধরে না।

    দু-চার দিন পরেই আসতে শুরু করে নোট ডবলের মক্কেলের দল। ছোটখাট পার্টিকে আমল দেয় না ফকির। কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেয়। তিন চার পাঁচ শো নিয়ে যারা আসে তাদের বলে, বসো। রাত এক প্রহরের পর সিন্নি হবে।

    প্রহর কেটে যায়। মক্কেলের ডাক পরে দরগার পাশে। ফকির সমাধিস্থ। ক্ষিপ্রগতিতে ঘুরছে তার হাতের তসবী। রাত বাড়তে থাকে। টিলার পেছনে প্রহর জানায় শেয়ালের পাল। নিস্তব্ধ বনালয়ে মাঝে মাঝে শোনা যায় বন্য জন্তুর ডাক। হঠাৎ এক সময়ে কাশিম চোখ মেলে চায়। তসবী কপালে ঠেকিয়ে গাঢ় স্বরে বলে, খোদা মেহেরবান্। দাও, টাকা দাও।

    ভক্ত নোটের তাড়া তুলে দেয় ফকিরের হাতে। রুদ্ধশ্বাসে কম্পিত বক্ষে অপেক্ষা করে, কখন সে তাড়া ডবল হয়ে ফিরে আসবে।

    —এই নাও সিন্নি।

    ভক্ত হাত বাড়িয়ে নেয় দু-খানা বাতাসা, একটু ফল আর এক গেলাস সুস্বাদু শরবত। সমস্ত দিনের ক্লান্তি ও দীর্ঘ অনশনের পর ভারী ভাল লাগে। কিন্তু এ কী! সমস্ত চেতনা যেন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। সর্বাঙ্গ এলিয়ে পড়ছে কেন? চোখ যে আর খুলে রাখা যায় না। ঘুম আসছে। অপার অনন্ত ঘুম। সে ঘুম যেন আর ভাঙবে না।

    সে-ঘুম সত্যিই আর ভাঙে না। ঘণ্টাখানেক পরে মাথার দিকটায় স্বামী আর পায়ের দিকটায় স্ত্রী, ভক্তকে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায়, টিলার পেছনে ঘন জঙ্গলের মধ্যে সেখানে কাটা আছে সুন্দর কবর। অজ্ঞান ভক্তকে তারই মধ্যে ফেলে দিয়ে ফকির কপালের ঘাম মোছে, কুটী হেসে ওঠে কলকণ্ঠে। বনপ্রান্তে ওঠে তার প্রতিধ্বনি। তারপর নিপুণভাবে মাটিচাপা দিয়ে, ঘাসের চাপড়া লাগিয়ে সমস্ত চিহ্ন বিলুপ্ত করে স্বামী-স্ত্রী নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতে যায়, এবং পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়েও পড়ে। সকালে উঠে নোটগুলো হাঁড়ি-বন্ধ করে পুঁতে রাখে মাটির তলায়। তারপর বেশ করে জল দেয় ভাঙ্ আর ধুতরা গাছের জঙ্গলে।

    এমনি করে বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে মহাসুখে ছিল ফকির দম্পতি। মাঝে মাঝে হতভাগ্য মক্কেলের কোন আত্মীয়-স্বজন যদি আসত তার খোঁজে, ফকির একেবারে আকাশ থেকে পড়ত। সে যে সেইদিনই ডবল নোট ট্যাকে গুঁজে চলে গেল। কি বল, বিবিজান, তাই না? বিবিজান ঘর ঝাঁট দেওয়ার ফাঁকে কিংবা রান্না করতে করতে মুখ টিপে হাসে। বলে, সে তো সেই ক–বে চলে গেছে। ফকির ব্যস্ত হয়ে পড়ে, খোঁজ খোঁজ ভালো করে খোঁজ। বড্ড ডাকাতের উৎপাত এ দিকটায়। অতগুলো টাকা নিয়ে, ঈস্‌…।

    তারপর একদিন এল এক নতুন মক্কেল। বাইশ-তেইশ বছরের জোয়ান ছোকরা। দেহ তো নয়, যেন নিপুণ ভাস্করের হাতে গড়া কালো পাথরের মূর্তি। মাথায় ঢেউ-খেলানো বাবরি চুল। সরু কোমরে আঁট করে বাঁধা লাল চারখানার গামছা। হাতে তেলে-পাকানো বাঁশের লাঠি। চঞ্চল চোখ দুটো দিয়ে উপচে পড়ছে স্বাস্থ্য আর খুশির ঝিলিক। এদিক- ওদিক চেয়ে খুঁজতে খুঁজতে আসছিল ফকিরের আস্তানা। আঙিনার পাশে প্রথমেই চোখাচোখি হয়ে গেল কুটীর সঙ্গে। থমকে দাঁড়াল ছেলেটি। মুখে ফুটে উঠল স-কৌতূহল বিস্ময়ের চিহ্ন। তারপর সেটা মিলিয়ে গেল কৌতুক হাসির কুঞ্চনে। সে হাসির নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি জেগে উঠল কুটী-বিবির অনিন্দ্য ঠোট দু-খানির কোণে। সে শুধু পলকের তরে। তারপর সদা-চঞ্চল চাহনির উপর নেমে এল কালো একজোড়া আঁখিপল্লব। আনত দীপ্ত মুখের উপর দেখা দিল আরক্তিম ছায়া। কিসের ছায়া কে জানে?

    ফকির দাওয়ায় বসে তামাক টানছিল, মক্কেল এগিয়ে গিয়ে একটা নোটের বাণ্ডিল তার সামনে ফেলে দিয়ে বলল, পাঁচশ টাকা আছে। গুনে নাও। আর এই নাও তোমার সিন্নির খরচা, এক টাকা সোওয়া পাঁচ আনা, বলে ট্যাক থেকে খুচরো পয়সাগুলো ছুঁড়ে দিল মেঝের উপর। ফকির কথা বলল না। ইঙ্গিতে বসতে বলে হুঁকোটা তুলে দিল শাঁসালো মক্কেলের হাতে। তারপর সিন্নির পয়সা কুড়িয়ে নিয়ে বলল, নোট রেখে দাও। ও-সব কি দিনের বেলায় হয়? জিরোও, তামাক খাও। সিন্নি হবে সেই রাত এক প্রহর বাদে।

    বহুকাল পর সেদিন চিরুনি পড়ল কুটীবিবির মাথায়। জটপাকানো অবাধ্য চুলের বোঝা কোনোরকমে বশে এনে খোঁপায় পরল একটি নাম-না-জানা বনফুল। তারপর বেশ করে গা ধুয়ে এল আধ মাইল দূরে এক ঝরণা থেকে। বাড়ি এসে পরল একখানা আসমানী রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি। গত ঈদের সময় ফকির এনে দিয়েছিল কোন্ হাট থেকে। দু-বার মাত্র পরেছে কাপড়খানা। ফকির বলেছে চমৎকার মানায় তাকে।

    -কই, কোথায় গেলে? মিঞাসাকে কিছু খেতে দাও। কদ্দূর থেকে আসছে বেচারা। বেলা কি আর আছে?

    —এখানে পাঠিয়ে দাও। খাবার দিয়েছি, রান্নাঘর থেকে সাড়া দিল কুটী।

    কুটী বেরিয়ে এল। হাতে একবাটি দুধ আর একসাজি মুড়ি। একবার চেয়ে দেখল তার অতিথির মুগ্ধদৃষ্টির পানে। একখানা মাদুর বিছিয়ে দিল দাওয়ার উপর। সযত্নে আঁচল দিয়ে মুছে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বসো না?

    হোসেনের যেন জ্ঞান ফিরে এল এতক্ষণে। বলল, তুমিও থাক নাকি এই জঙ্গলে? কুটী অবাক–বাঃ, কোথায় থাকবো তবে?

    —কী করে এলে এখানে?

    কুটী কৃত্রিম কোপ দেখিয়ে বলল, আহা! জানেন না যেন? আমি তো ফরিরসাহেবের বিবি।

    —ঐ ফকিরের বিবি তুমি—বলে হো হো করে হেসে গড়িয়ে গেল ছোকরা।

    বিবি বিরক্ত হল, হাসছ যে?

    —না না, ও কিছু না। এই টাকাটা তুলে রাখো। আমি ফাঁকা থেকে ঘুরে আসি একটু। উঃ কী জঙ্গল! দম আটকে আসছে—বলে দুধটা এক চুমুকে শেষ করে আর মুড়ির সাজিটা কোঁচড়ে ঢেলে চিবোতে চিবোতে বেরিয়ে গেল।

    কুটী নিজ হাতে জবাই করল তাদের সবচেয়ে যেটা সেরা মুরগী। যত্ন করে রাঁধল তার “ছালুন”, আর চমৎকার লাল বিরুই চালের ভাত। ঘন করে জ্বাল দিল নিজের হাতে দোওয়া কালো গোরুর দুধ। সামনে বসে খাওয়াল অতিথিকে। খানিকটা দুধ রেখে উঠে যাচ্ছিল হোসেন, কুটী অনুনয় করে বলল, আমার মাথার দিব্যি, ওটুকুন খেয়ে ফেল।

    তারপর একটু মুখ টিপে হেসে তরল কণ্ঠে বলল, একে তো জঙ্গলে এসে মিঞাসাহেবের মনটা পালাই পালাই করছে, তারপর দুটো পেটভরে খেতে না পেলে বাড়ি গিয়ে একঝুড়ি নিন্দে হবে তো আমার?

    হোসেন সে প্রশ্নের জবাব দিল না। মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, খু-ব খেলাম। এত যত্ন করে সামনে থেকে কেউ কোনদিন খাওয়ায়নি।

    কেরোসিনের ঢিবরির মৃদু আলোকে কুটীবিবির মুখখানা স্পষ্ট দেখা গেল না। বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল যে নিঃশ্বাস, তাও সে চেপে গেল।

    খাবার পর হোসেন মিঞা বারান্দায় বসে গল্প করছিল ফকিরের সঙ্গে। পাশের চালাটায় নিজে হাতে পরিপাটি করে বিছানা পেতে মশারি খাটিয়ে দিয়ে কুটী এসে বলল, এবার কিন্তু শুয়ে পড়তে হবে। সেই কোন্ দেশ থেকে কত মেহনত করে আসা। এখন কি গল্প করার সময়?

    হোসেন চলে গেলে ফকিরের পাশে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত কি ভাবল কুটীবিবি। তারপর দৃঢ় চাপা গলায় বলল, এর বেলা ওসব চলবে না বলে দিলাম।

    ফকির লক্ষ্য করছিল সবই। অন্ধকারে চোখ দুটো হিংস্র শ্বাপদের মত জ্বলে উঠল। ব্যঙ্গ করে বলল, বড্ড দরদ দেখছি। এরই মধ্যে এত জমে গেলি?

    —মজেছি বেশ করেছি—রুক্ষ কণ্ঠে জবাব দিল কুটী, কিন্তু এর যদি কিছু করতে যাস, তোরই একদিন কি আমার একদিন। মনে থাকে যেন।

    ফকির নিজেকে সামলে নিল। আঁচল ধরে টেনে বসাল বৌকে। কণ্ঠে আদর ঢেলে বলল, তোর কথা আমি কোনোদিন ঠেলেছি, না ঠেলতে পারি কুটী? তোকে ক্ষ্যাপাচ্ছিলাম একটু।

    বৌয়ের সুন্দর মুখখানা তুলে ধরে বলল, বাঃ, আজকে তোকে যা দেখাচ্ছে কুটী!

    এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৃপ্তভঙ্গীতে কুটী উঠে চলে গেল। যতদূর দেখা যায়, পেছন থেকে একজোড়া হিংস্র জ্বলন্ত চোখ তার চলন্ত দেহের উপর আছড়ে আছড়ে পড়তে লাগল।

    গভীর নিষুতি রাত। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ এইমাত্র হেলে পড়েছে দূরে বনের আড়ালে। জীব-জগৎ নিষুপ্ত। জেগে আছে শুধু গহন বন। তার অদ্ভুত রহস্যময় ভাষা শোনা যায় নিস্তব্ধ রাত্রির কানে কানে। ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল কাশিম ফকির। আলগোছে বাঁশের ঝাঁপ খুলে নিঃশব্দে তার ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল। বিছানার এক প্রান্তে নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমিয়ে আছে তার রূপসী স্ত্রী। গাছের আড়াল থেকে বেড়ার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক ম্লান জ্যোৎস্না এসে পড়েছে তার সুপ্ত সুন্দর মুখের উপর। সে মুখে যেন ফুটে উঠেছে কোন্ সদ্যলব্ধ পরম তৃপ্তির আভাস। স্বপ্নাবৃত উন্নত বুকখানা উঠছে, নামছে নিঃশ্বাসের তালে তালে। নিঃশব্দে চেয়ে রইল ফকির। তার কুৎসিত শীর্ণ পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁতে উঠল ঘর্ষণের শব্দ। কোটরগত চোখ থেকে ঠিকরে পড়ল জ্বালা। শিরাবহুল হাতের শক্ত কাঠির মত আঙুলগুলো দংশনোদ্যত বৃশ্চিকের মত এগিয়ে গেল নিদ্রিতার গলার কাছে। একটিবার টিপে ধরলেই শেষ হয়ে যাবে ঐ বুকভরা নিঃশ্বাসের ভাণ্ডার। তাই যাক্—অস্ফুট গর্জন শোনা গেল ফকিরের ভাঙা গলায়, তাই যাক! দুনিয়া থেকে সরে যাক শয়তানী।….

    নিজের স্বর শুনে চমকে উঠল ফকির। হাত গুটিয়ে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল।

    পাশের ঘরে নতুন বিছানার আর নতুন অনুভূতির উত্তেজনায় হোসেনের ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছিল বারে বারে। ফকিরের হাত তার গায়ে ঠেকতেই ধড়মড় করে উঠে বসল।

    —কে?

    —আমি, ফিসফিস করে উত্তর এল। সময় হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে বেরিয়ে এস। দরজার পাশে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। তার কাছে নিয়ে মক্কেলকে বসিয়ে দিলে মাদুরের উপর। গায়ে মাথায় খানিকটা মন্ত্রপড়া জল ছিটিয়ে দিয়ে বলল, নোট দাও।

    —নোট তো বিবির কাছে।

    —বিবির কাছে! সেখানে কি করে গেল?

    —আমি রাখতে দিয়েছি।

    আরেকবার জ্বলে উঠল ফকিরের হিংস্র চোখ দুটো।

    —বেশ, এই নাও সিন্নি। খোদার নাম নিয়ে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেল—ভক্তের হাতে তুলে দিল শরবতের গেলাস।

    একরাশ কড়া ভাঙ্, আর তার সঙ্গে মেশানো ধুতরার বিষ। অত বড় বলিষ্ঠ ছোকরা আধ ঘণ্টার মধ্যে অসাড় হয়ে গেল। ফকিেেরর জীর্ণ দেহে কোথা থেকে এল অসুরের শক্তি। আলখাল্লা খুলে ফেলে দিয়ে দোহাই আল্লা বলে পা ধরে টেনে নিয়ে চলল হোসেনের নিশ্চল দেহ। বারে বারে বসে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়ে কোনোরকমে পৌঁছল গিয়ে টিলার পেছনে। কবর খোঁড়াই ছিল। ঠেলে ফেলতেই গলা থেকে বেরোল অস্ফুট গোঙানির শব্দ। পাগলের মত কোদাল চালাল ফকির। কবর ভরে গেল। গোঙানির আওয়াজ স্তব্ধ হল চিরদিনের তরে। কাশিমের কাজ যখন শেষ হল রাত্রির শেষ প্রহর তখন বিদায়োন্মুখ

    কুটীর ঘুম ভাঙল ভোরবেলা কি এক দুঃস্বপ্ন দেখে। তাড়াতাড়ি চোখ রগড়ে বাইরে এসে প্রথমেই ছুটে গেল পাশের ঘরে। এ কি! ঘর যে খালি! ফকির পড়ে ছিল বারান্দায়; ঘুমিয়ে কিংবা ঘুমের ভান করে। ডাকতেই খেঁকিয়ে উঠল, ডাকাডাকি করছিস কেন ভোরবেলা?

    —ওকে তো দেখছি না! ব্যাকুল কণ্ঠে বলল কুটী।

    —চলে গেছে হয়তো।

    —চলে গেছে! আমাকে না বলে?

    ফকির আর জবাব দিল না। কুটী উদ্ভ্রান্তভাবে এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ নজরে পড়ল শরবতের শূন্য গেলাস। একবার নাকের কাছে ধরতেই সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। এ গন্ধ তো তার অচেনা নয়। ছুটে গেল টিলার ধারে। যেটুকু সন্দেহ তখনো লেগে ছিল মনের কোণে নিঃশেষে উড়ে গেল।

    উন্মত্ত আবেগে ছুটে এসে ফকিরের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল কুটীবিবি। পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে এল কান্না। সে কান্নার যেন আর শেষ নেই। ফকির তাকিয়ে রইল সপচক্ষু মেলে, যেমন করে তাকিয়ে থাকে ব্যাধ, তারই হাতে শরবিদ্ধ যন্ত্রণা-বিহ্বল হরিণীর দিকে।

    হঠাৎ কি মনে করে উঠে বসল কুটী। আয়ত চোখের তারায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। পাতলা ঠোট দুটির উপর ফুটে উঠল ক্রূর হাসির বাঁকা রেখা। ঢলঢলে মুখখানা যেন এক নিমেষে কঠিন পাথর হয়ে গেল। চঞ্চলা হরিণী মরে গেল। তার থেকে জন্ম নিল এক ক্রুদ্ধা সৰ্পিণী।

    কাশিম বিস্ময়-ভীত দৃষ্টি মেলে চেয়ে দেখল এ রূপান্তর। কিন্তু কণ্ঠ তার নির্বাক। কুটীবিবি সোজা হয়ে দাঁড়াল। কোমরের চারদিকে শক্ত করে জড়িয়ে নিল লুটিয়ে পড়া আঁচল। তারপর স্বামীর মুখের উপর তর্জনী তুলে রুদ্ধশ্বাসে বলল, শোধ নেবো, এর শোধ নেবো আমি।

    কাশিমের বিস্ময়ের ঘোর কাটবার আগেই সে ঝড়ের বেগে ছুটে বেরিয়ে গেল।

    ফকির ছুটল—কোথায় যাস কুটী? ফের, শোন?

    কেউ সাড়া দিল না। মুহূর্তে বনের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল তড়িৎগতি তনুদেহ। বন ছাড়িয়ে মাঠ। মাঠের শেষে আবার বন। গ্রীষ্মের চষা ক্ষেত। মাটি তো নয়, যেন পাথর। কোমল পা দু-খানা রক্তে ভরে উঠল। ফিরেও দেখল না কুটী। ভূক্ষেপ করল না বিস্মিত পথিকের হতবাক কৌতূহল। মাঝে মাঝে শুধু শোনা গেল ক্লান্ত কণ্ঠের ব্যাকুল প্রশ্ন,–কোনো পথচারীকে চমকে দিয়ে—বলতে পার, থানা আর কদ্দূর?

    চৈত্রের আকাশ থেকে আগুন ঠিকরে পড়ছে। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যায়। সুগৌল মুখখানায় ফেটে পড়ছে রক্তের আভা। ঘামে ভিজে গেছে সর্বাঙ্গের বসন। কুটীর দাঁড়াবার অবসর নেই। চলছে তো চলছেই।

    বাইশ মাইল পথ পার হয়ে থানার মাঠে এসে যখন পৌঁছল, মনে হল তার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। বারান্দায় উঠতে পারল না। অস্ফুট কণ্ঠে একবার শুধু বলল, পানি। বলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

    ডাক্তারের সাহায্যে জ্ঞান ফিরে এল, চোখ মেলেই চেঁচিয়ে উঠল কুটী—খুন, খুন হয়েছে রাউজানের জঙ্গলে। শীগরির চল তোমরা।

    চলবার শক্তি ছিল না। সেই রাত্রেই ডুলি চড়ে পুলিশের সঙ্গে ফিরে এল আখড়ায়। কবর খুঁড়ে বের করা হল হোসেনের মৃতদেহ। মনে হল যেন জোয়ান ছেলেটা এইমাত্র ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। একবার ডাকলেই উঠে পড়বে। কুটী চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকের উপর। পরম স্নেহে আঁচল দিয়ে মুখের উপর থেকে মুছে নিল মাটির দাগ। ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, ওগো, একজন ডাক্তার ডাক তোমরা। ও মরেনি। একটু ওষুধ দিলেই বেঁচে উঠবে।

    পাশের কবরগুলোও খোঁড়া হল। পাওয়া গেল একটা গলিত শব আর দশটা কঙ্কাল।

    কথা হচ্ছিল কাশিম ফকিরের উকিল সুজিৎ রায়ের বৈঠকখানায়। ভদ্রলোকের বৃত্তি ওকালতি কিন্তু প্রকৃতি সাহিত্যিক। প্রথমটা তার উপজীবিকা, দ্বিতীয়টা উপসর্গ। মফঃস্ব শহরে মাঝে মাঝে কোনো সাহিত্যিক-যশঃপ্রার্থী স্থানীয় লেখকের ক্লান্তিকর প্রবন্ধ কিংবা নিদ্রাকর্ষক কবিতা পাঠ উপলক্ষ করে সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থের বৈঠকখানায় যে সব চা- জলযোগের বৈঠক বসে, এই উকিলবাবুটি তারই একজন অকৃত্রিম সভ্য। ওরই একটা কি অধিবেশনে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সে-পরিচয় ক্রমশ গাঢ়তর হয়ে বন্ধুত্বের কোঠায় প্রমোশন লাভ করবার আয়োজন করছে, সেই সময়ের কথা। মক্কেলের জন্যে মৃত্যুদণ্ড আর নিজের জন্যে পরাজয় পকেটস্থ করে বাড়ি ফিরেই তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। দেখলাম, উকিল হলেও ঘটনাটা তাঁর বুদ্ধির কোঠা পার হয়ে অন্তরের দরজায় করাঘাত করে ফেলেছে। কোনোরকম ভূমিকা না করেই তিনি কাশিম ফকিরের দীর্ঘ কাহিনী একটানা শুনিয়ে গেলেন। অর্থাৎ, আমি উপলক্ষ মাত্র, কথাগুলো শোনালেন তিনি নিজেকেই।

    আমি জেলের লোক। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ইতিহাস আমার মনের পাতায় দাগ কাটে না। আমি দেখলাম ওর গদ্যময় বাস্তব দিকটা। বললাম, ফকির সাহেবের কল্যাণে আপনার খাটুনি যেটা হয়েছে, সেটা না হয় ছেড়ে দিলাম; খরচ-পত্তর বাবদ উকিলবাবুর পকেটের উপরেও তো চাপ কম পড়েনি। উনি বললেন, ঠিক উল্টো। বরং পারিশ্রমিক বলে পকেটে যেটা এসেছে, তার পরিমাণ, উকিলবাবু সচরাচর যা পেয়ে থাকেন, তার চেয়ে বেশী বই কম নয়।

    বিস্মিত হলাম, বলেন কি? কোন্ সূত্রে এল? ফকিরের এতবড় বান্ধবটি কে?

    —কেন, ওর বৌ কুটীবিবি?

    আমি এমন চোখে তাকিয়ে রইলাম, সাধুভাষায় যাকে বলে বিস্মিত-বিস্ফারিত লোচন।

    সুজিতবাবু আরো পরিষ্কার করে বললেন, খরচ-পত্তর তো দিয়েছেই, পাঁচবার দেখা করেছে আমার সঙ্গে।

    কৌতূহল দমন করা গেল না। প্রশ্ন করলাম, স্বামী মহাত্মার সঙ্গে দেখা করতে চায়নি?

    —না। একদিন তুলেছিলাম সে কথা। মুখ বেঁকিয়ে বলল, ও মুখপোড়াকে দেখে আমার কি হবে? কিন্তু এ কথা সে অনেকবার বলেছে আমাকে, টাকা যা লাগে দেবে! উকিলবাবু, তুমি খালি দেখো, গলাটা যেন ওর বেঁচে যায়।

    কিন্তু গলা বাঁচাতে পারলুম না, নিঃশ্বাস ফেলে বললেন সুজিৎবাবু।

    উকিলবাবু যখন ছেড়ে দিলেন, তখন রাত এগারোটা। সমস্ত রাস্তাটা ফকির-দম্পতির কীর্তিকাহিনীই মন আচ্ছন্ন করে রইল। একবার ভালো করে দেখতে ইচ্ছা হল লোকটাকে। বাড়ি না ফিরে সোজা জেলের মধ্যে গিয়ে হাজির হলাম।

    প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত আসামীর নির্জন কক্ষ—জেলের ভাষায় যাকে বলে ফাঁসি ডিগ্রি বা কণ্ডেড্ সেল। লোহার গরাদে-দেওয়া রুদ্ধ দরজা। তার ঠিক সামনেই জ্বলছে একটা তীব্র লণ্ঠনের আলো। তারই পাশে লাঠিহাতে দাঁড়িয়ে আছে সতর্ক প্রহরী। এই একটি মাত্র কয়েদীর জন্যেই সে বিশেষভাবে নিয়োজিত। তার শ্যেনচক্ষুর প্রখর অবরোধ থেকে একটি সেকেণ্ডের তরেও মুক্তি নেই হতভাগ্য বন্দীর। ডিউটি-অন্তে ও যখন চলে যাবে, ওর জায়গায় আসবে আর একজন। সে গেলে আর একজন। যতদিন না একেবারে মুক্তি হয় ঐ বন্দীর—এই প্রহরীপরিক্রমার বিরাম নেই। এইটাই আইনের বিধান। জানি না, এ বিধান কার রচনা। যারই হোক, ঐ একচক্ষু প্রহরীর মত তিনিও বোধহয় দাঁড়িয়েছিলেন একমাত্র রাষ্ট্রশাসনের বেদীর উপর। ঐ সিপাহীর মত তাঁরও হাতে ছিল সমাজ-স্বার্থের লণ্ঠন। যার জন্য তাঁর বিধান রচিত হল, সেই মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে চেয়ে তিনি তাঁর আইনের একটি ধারাও সংযোগ করেননি। একথা তাঁর মনে হয়নি মৃত্যুদণ্ড যত বড়ই নিষ্ঠুর হোক, এই হুঁশিয়ারির দণ্ড তার চেয়েও নির্মম। ফাঁসিমঞ্চের যে অদৃশ্য ছায়া ঐ লোকটাকে অনুক্ষণ অনুসরণ করছে, দিনরাত্রির কোনো না কোনো ক্ষণে তাকে হয়তো ও ভুলে থাকতে পারে, কিন্তু মুহূর্তের তরেও ভুলতে পারে না এই সদাজাগ্রত প্রখর দৃষ্টির অনুসরণ। সে যে অষ্টপ্রহর নজরবন্দী, তার আহারনিদ্রা শয়ন উপবেশন, তার কর্মলেশহীন দিনরাত্রির ক্লান্তি ও বিশ্রাম, সবারই উপর চেপে রয়েছে এই যে নিরবচ্ছিন্ন সতর্কতার নিশ্ছিদ্র আবরণ, সে কি প্রতি নিমেষেই তার কণ্ঠরোধ করছে না? যে-দুটি দৈনন্দিন জৈব ক্রিয়া দেহী মাত্রেরই অবশ্য-করণীয় অথচ মানুষমাত্রেরই গোপনীয়, তার জন্যেও কি এতটুকু অন্তরালের প্রয়োজন নেই ফাঁসির আসামীর?

    শুনেছি, সম্ভাব্য আত্মহত্যার দুর্গতি থেকে রক্ষা করবার জন্যেই মৃত্যু-দণ্ডিতের উপর এই সতর্কতার অভিযান। কিন্তু তার দৈহিক হত্যাটাই বড় হল? আর, এই যে পলে পলে তিলে তিলে আত্মহত্যা করছে তার আত্মা, শ্বাসরুদ্ধ হচ্ছে তার লাঞ্ছিত মনুষ্যত্ব, সে কথাটা কি ভেবে দেখেছিলেন আইন-স্রষ্টা বিজ্ঞের দল?

    আর একটু এগিয়ে সামনেটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বালিশশূন্য কম্বল-শয্যার উপর পাশ ফিরে শুয়ে আছে আমার বন্দী Condemned Prisoner কাশিম আলী ফকির। ঘুমুচ্ছে, না জেগে আছে, কে জানে? সে যে আছে, এইটুকুই আমার প্রয়োজন। এইটুকু দেখে এবং আমার বিশ্বস্ত কর্মীর মুখে শুনেই আমি নিশ্চিন্ত। তার মনের খবর আমি রাখি না। রাখবার কথাও নয়। তবু কেন জানি না, কেমন আচ্ছন্নভাবে তাকিয়ে রইলাম ঐ সাড়ে চার ফুট লম্বা শীর্ণকায় লোকটার দিকে। ওর একমাথা চুল, একমুখ দাড়ি, মুদ্রিত চোখের কোণে গভীর বলি-রেখা, শীর্ণ দেহের উপর ঢোলা পোশাক এবং বিশেষ করে ওর ঐ পড়ে থাকবার নিশ্চিন্ত ভঙ্গী—সমস্ত ব্যাপারটা যেন মনে হল হাস্যকর—ইংরেজিতে যাকে বলে funny. এই লোকটা খুন করেছিল? একটা নয়, দুটো নয়, বারোটা খুন!

    ফকির আপীল করেনি। তবু আইনের বিধানে মৃত্যুদণ্ডে মহামান্য হাইকোর্টের সম্মতি প্রয়োজন। ক’দিনের মধ্যেই সে সম্মতি এসে গেল—Death sentence confirmed. এর পর রইল প্রাণভিক্ষার পালা। প্রথমে ছোটলাট; সেখানে ব্যর্থ হলে বড়লাট; তিনিও যদি বিরূপ হন, মহামহিম ভারত-সম্রাট। Mercy petition-এর খসড়াও তৈরি হল-

    যত্নে রচিত বহু হৃদয়দ্রাবী বিশেষণের একত্র সমাবেশ। কিন্তু ফকির সে আবেদনে টিপসই দিতে রাজী হল না। প্রাণভিক্ষা চায় না সে। অতএব অনাবশ্যক বিলম্ব না করে ফাঁসির দিন স্থির হয়ে গেল। আসামীর কাছে সেটা প্রকাশ করবার নিয়ম নেই।

    —কাউকে দেখতে ইচ্ছা করে? সরকারীভাবে প্রশ্ন করা হল ফকিরকে।

    একমুহূর্ত কি ভাবল। তারপর মাথা নেড়ে জানাল—না।

    তিন তিনেক পরে বিকাল-বেলা সেলব্লকের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছি, ফকির বসে ছিল তার ‘ডিগ্রির’ দরজার ঠিক পেছনে, মুখ দেখে মনে হল কি যেন বলতে চায়। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলবে?

    ফকির একটু ইতস্তত করে বলল, এখানে মেয়েছেলে আসতে পারে, বাবু?

    -কেন পারবে না? কাউকে দেখতে চাও?

    —আমার বিবিকে একবার দেখতে চাই। নাম কুটীবিবি; মধুপুর থানার রাউজান গ্রামে বাড়ি।

    সরকারী চিঠি গেল কুটীবিবির নামে। তার নকল পাঠানো হল থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসারের কাছে। বেসরকারী খবর পাঠালাম সুজিৎবাবুর বৈঠকখানায়। তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন এবং দিনসাতেক খোঁজাখুঁজি করে শুষ্কমুখে এসে বললেন, পাওয়া গেল না মলয়বাবু। রায়ের দিনও কোর্টে এসেছিল। কিন্তু হাকিম উঠে যাবার পর বাইরে এসে দেখতে পাইনি।

    থানা থেকেও খবর এল, উক্ত ঠিকানায় কুটীবিবি নামক কোন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেল না।

    নির্দিষ্ট দিন এসে গেল। রাত চারটা বাজতেই আসামীকে ডেকে তোলা হল। বড় জমাদার তার সেলের সামনে গিয়ে গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, বেরিয়ে এসো ফকির। গোসল সেরে নিয়ে আল্লার নাম কর।

    কাশিম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, যেন কিছুই বুঝতে পারেনি। সেলের দরজা খোলা হল। ফকির জমাদারের মুখের দিকে বিস্মিত দৃষ্টি মেলে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যেতে হবে?

    এর উত্তরটা বোধ হয় আটকে গেল তেত্রিশ বছরের অভিজ্ঞ কর্মচারী বহুদর্শী চি হেডওয়ার্ডার গজানন্দ সিং-এর মুখে। গোসল বা আল্লার নাম করতে ফকির কোনো উৎসাহ দেখাল না। সেলব্লকের মেট এবং পাহারাওয়ালা এগিয়ে গিয়ে তাকে বাইরে নিয়ে এল। মাথায় কয়েক মগ জল ঢেলে পরিয়ে দিল এক সুট নতুন তৈরি জাঙ্গিয়া কুর্তা। মেট মুসলমান। ফকিরকে পাশে নিয়ে সেই নমাজ পড়ল। ফকির অনুসরণ করল যন্ত্রচালিতের মত।

    শেষ ব্যবস্থা তদারক করবার জন্যে সেল-ইয়ার্ডে যখন হাজির হলাম, ঠিক তখনই ফকিরের নমাজ শেষ হয়েছে। এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, সে এল না বাবু?

    একমুহূর্ত ভেবে নিলাম। তারপর বললাম, এসেছিল ফকির। কিন্তু তোমার খবর শুনে কেঁদে কেঁদে অফিসের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গেল। ডাক্তার বললেন, এ অবস্থায় ওকে দেখা করতে দেওয়া ঠিক হবে না। ওষুধ-পত্তর দিয়ে সুস্থ করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। ফকির সর্বাঙ্গ দিয়ে শুনে গেল আমার কথার প্রতিটি অক্ষর। তারপর আকাশের দিয়ে চেয়ে অস্ফুটকণ্ঠে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আল্লাহ্। মনে হল এই নিঃশ্বাসের সঙ্গেই যেন বেরিয়ে গেল তার নিভৃত অন্তরের বহুদিন রুদ্ধ কোন বেদনার বোঝা! রাত্রিশেষের ক্ষীণালোকেও স্পষ্ট দেখলাম, মলিন মুখখানা তার এক নিমেষে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শীর্ণ কোটরগত চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা নীরব অশ্রু।

    অন্তর্যামী জানেন, ফকিরকে যা বলেছিলাম, তার সমস্তটাই আমার রচনা। কিন্তু ঐটুকু মিথ্যার মূল্যে যে পরম-বস্তু সেদিন পেলাম, তার সঙ্গে বিনিময় করতে পারি সমস্ত জীবনব্যাপী সত্য-ভাষণের বিপুল গৌরব। শুধু কি পেলাম? যে অমৃত তুলে দিলাম এই মৃত্যুপথযাত্রীর হৃদয়পাত্রে, তার মরণজয়ী মাধুর্য আমার জীবনেও অক্ষয় হয়ে রইল।

    ফাঁসি-যন্ত্রের চারদিকে কর্মব্যস্ততা চঞ্চল হয়ে উঠল। সুপার-সাহেব এলেন। তাঁর সঙ্গে এলেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট। সরকারী ইউনিফর্মে সজ্জিত জেলর এবং সহকারী দল সার বেঁধে এসে দাঁড়ালেন একদিকে। আর একদিকে দাঁড়াল সশস্ত্র রিজার্ভ ফোর্স। চারদিক নিস্তব্ধ। অতবড় জেলের তেরশ চৌদ্দশ লোক যেন রুদ্ধশ্বাসে চেয়ে আছে প্রত্যাসন্ন কোন্ মহাসংঘটনের প্রতীক্ষায়। অতগুলো ব্যারাক, যেন প্রেতপুরী। কোথাও নেই একবিন্দু প্ৰাণচিহ্ন।

    সুপারের নিঃশব্দ ইঙ্গিতে আসামীকে নিয়ে আসা হল। মাথায় চোখঢাকা টুপি। হাতদুটো পেছনদিকে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা। দু-দিক থেকে দুজন সিপাই আস্তে আস্তে তাকে ধরে তুলল ফাঁসি-মঞ্চের উপর। মাথার ঠিক ওপরটাতে একটা লোহার আড়ের সঙ্গে ঝুলছে মোটা ম্যানিলা দড়ির তৈরি ফাঁস। পায়ের নীচে লোহার তক্তা। তার তলায় নাতি- গভীর গর্ত। জল্লাদ তৈরি হয়ে আছে হুকুমের অপেক্ষায়।

    সুপারের হাতে ওয়ারেন্ট। গম্ভীরকণ্ঠে পড়ে গেলেন জজের আদেশ। তার বাংলা তরজমা করে শোনালেন রিলিজ দপ্তরের ডেপুটি জেলর। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল রিজার্ভ চীফ্ হেডওয়ার্ডারের অনুচ্চ গম্ভীর কমাণ্ড—Present Arms; নিখুঁত নৈপুণ্যে উদ্যত হল রাইফেলযুক্ত বেয়নেট। চিরবিদায়োন্মুখ বন্দীর উদ্দেশে বন্দিশালার সশস্ত্রবাহিনী জানাল তাদের শেষ সামরিক সম্মান।

    রাইফেলের বাঁটের উপর তাদের হাতের শব্দ তখনো মিলিয়ে যায়নি, হঠাৎ চারদিক সচকিত করে স্তব্ধ জেল প্রাঙ্গণের বুক চিরে ফেটে পড়ল এক তীক্ষ্ণ আর্তস্বর—’ছেড়ে দাও, তোমাদের পায়ে পড়ি, আমাকে ছেড়ে দাও।’ ফাঁসিমঞ্চের উপর থেকে ছুটে পালাতে চাইল ফাঁসির আসামী। দুজন জোয়ান সিপাই তাকে ধরে রাখতে পারে না। জল্লাদ থমকে দাঁড়াল। সুপারের কপালে দেখা দিল কুঞ্চন-রেখা। তাঁর ইঙ্গিতে আরও দুজন সিপাই ছুটে গিয়ে জোর করে তুলে ধরল আসামীর ভেঙে-পড়া কম্পিত দেহ। ক্ষিপ্রহস্তে হ্যাংগম্যান গলায় পড়িয়ে দিল ফার্স এবং মুহূর্তমধ্যে টেনে দিল লোহার হাতল। পায়ের তলা থেকে লোহার পাতখানা নিচে পড়ে গেল। তারই সঙ্গে চোখের নিমেষে গহ্বরের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল কাশিম ফকিরের শীর্ণ দেহ। একটা শক্ত মোটা দড়ি শুধু ঝুলে রইল আমাদের চোখের সামনে। একটুখানি কেঁপে উঠল একবার কি দু-বার। তারপর সব স্থির।

    .

    সকলের মুখেই ঐ এক কথা। এ কী করে বসল লোকটা? গোড়াতে না করল আপীল, না পাঠাল একটা mercy petition, ভেঙে পড়ল শেষকালে একেবারে ফাঁসিকাঠের উপর! ড্রামাটিক কাণ্ড বটে!

    ঐ ফাঁসি নিয়েই সেদিন জমে উঠল গল্পের আসর। সিনিয়র অফিসারেরা তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে লাগলেন। বীরেনবাবু বললেন, ফাঁসি তো কতই দেখলাম। টেররিস্টদের কথা বলছিনে। তাঁদের ব্যাপারই আলাদা। তাছাড়া যাদের দেখেছি, সবাইকেই প্রায় ধরে আনতে হয়েছে সেল থেকে gallows অবধি। একটা মুসলমান ছোকরা কিন্তু ভারী বাহাদুরি দেখিয়েছিল সেবার আলীপুর জেলে। আলি মহম্মদ না কি ছিল তার নাম। ঠিক মনে নেই। বড়লোকের ছেলে। বিয়েও করেছিল বনেদী ঘরে। বৌ নাকি ছিল পরমাসুন্দরী। এক মাস না যেতেই দিল তাকে খতম করে।

    —খতম করে! কেন?

    —কেন আবার? চরিত্রে সন্দেহ। কাঁচা বয়সে যা হয়ে থাকে। যেমন উন্মত্ত প্রেম, তেমনি পলক না ফেলতেই সন্দেহ। অবশ্য ভুল বুঝতেও তার দেরি হয়নি। তখন ছোরাহাতে একেবারে থানায় গিয়ে হাজির। নিজে সে মামলা লড়তে চায়নি। কিন্তু বাড়ির লোক শুনবে কেন? চেষ্টার ত্রুটি হল না। বড় বড় উকিল-ব্যারিস্টার, তদ্বির, সুপারিশ, ধরপাকড়, কান্নাকাটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গলা বাঁচল না।

    তার ফাঁসির দিনটা বেশ মনে আছে। সেল থেকে বেরিয়ে এল গটগট করে। বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল gallows-এর ওপর। বড়সাহেব ওয়ারেন্ট পড়ছিলেন! মাঝখানেই বলে উঠল, ওসব রাখো সাহেব। ওয়ারেন্ট তো আগেই শুনেছি। তোমার হ্যাংগম্যানকে ডাক, ফাঁসটা লাগিয়ে দিক—I am ready.

    …তারপর একটু থেমে ধীরে ধীরে আপন মনে বলে গেল—এই দুনিয়াতেই কসুর করেছিলাম; এই দুনিয়া থেকেই তার সাজা নিয়ে যাচ্ছি। আমার কোনো আপসোস নেই। আজ ম্যয় বহুৎ খুশ হ্যায়, বহুৎ খুশ হ্যায়।

    রাধিকাবাবু প্রবীণ লোক। জুনিয়র বাবুরা চেপে ধরল, আপনি দু-চারটা বলুন, দাদা। আপনার নিশ্চয়ই অনেক ফাঁসি দেখা আছে।

    তিনি বললেন, অনেক না হলেও তা দেখেছি বৈকি দু-চারটে। তবে মনে করে রাখবার মত তাজ্জব কিছু ঘটতে দেখিনি। সবগুলোই মামুলি ব্যাপার। সেল থেকে ধরে এনে ঝুলিয়ে দেওয়া। একটা শুধু পেয়েছিলাম, ওরই মধ্যে একটু বিশেষ ধরনের। লোকটার নামও মনে আছে। নিতাই ভটচাজ্। ভয়ঙ্কর মামলাবাজ। পরের পেছনে কাঠি দেওয়াই ছিল তার কাজ। সারাজীবন কত লোকের সর্বনাশ করে শেষটায় নিজেই পড়ে গেল এক মারাত্মক খুনী মামলায়। জমির দখল নিয়ে হাঙ্গামা। ওপক্ষে জোড়া খুন। নাশ গুম্ হয়ে গেল, কিন্তু তার রক্তমাখা কাপড় আর কি সব পাওয়া গেল ভটচাজের ঘরে। দায়রা জজ ছিল এক সাহেব। ফাঁসির order দিয়ে বসল। আপীল লিখেছিল ও নিজেই। অনেক পাকা ব্যারিস্টারের কলম থেকে ওরকম draft বেরোয় কিনা সন্দেহ। কিন্তু কাজ হল না। লোয়ার কোর্টের রায়ই বহাল রইল শেষ পর্যন্ত। গোটা আষ্টেক অগোপণ্ড ছেলেমেয়ে নিয়ে বৌটা প্রায়ই দেখা করতে আসত। অবস্থা এককালে বেশ সচ্ছল ছিল। মরবার আগে তাদের সর্বস্বান্ত করে পথে বসিয়ে গেল।

    লোকটা কিন্তু বারবার বলে এসেছে, সে এ মামলার কিছু জানে না, একেবারে নির্দোষ, শত্রুপক্ষের লোকেরা আক্রোশবশত ফাঁসিয়ে দিয়েছে। সত্যি মিথ্যা জানি না। এরকম তো সবাই বলে থাকে। কিন্তু ফাঁসিকাঠের ওপর দাঁড়িয়ে শেষ মুহূর্তেও যখন ঐ একই কথা সে বলে গেল, সবটাই মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবার মত জোর পেলাম না। ….

    রাধিকাবাবু চুপ করলেন। সেই শেষ দৃশ্যটা বোধ হয় তাঁর চোখের ওপর ভেসে উঠেছিল। একটুখানি থেমে আবার শুরু করলেন—আসামী gallows-এর উপর দাঁড়িয়ে। ওয়ারেন্ট পড়া শেষ হয়েছে। হ্যাংগম্যানটাও রেডি। সাহেবের ইঙ্গিতের শুধু অপেক্ষা। সবাই আমরা ঐদিকেই তাকিয়ে আছি। নিঃশ্বাস পড়ছে কি পড়ছে না। হঠাৎ চমকে উঠলাম নিতাই-এর গলা শুনে। স্পষ্ট জোরালো গলা, না আছে একটু কাঁপুনি, না আছে জড়তা, তোমরা শোনো, বিশ্বাস করো, খুন আমি করিনি। খুন করছ তোমরা। একটা নিতান্ত নিরপরাধ লোককে জোর করে ঝুলিয়ে দিচ্ছ ফাঁসিকাঠে।….

    এইটুকু বলেই তার সুর হঠাৎ কেমন নরম হয়ে গেল। যেন প্রার্থনা করছে, এমনিভাবে আস্তে আস্তে বলল, অন্যায় করে, অবিচার করে যারা আমায় বাঁচতে দিল না, কেড়ে নিল আমার অসহায় স্ত্রী-পুত্রের মুখের অন্ন, হে ভগবান! তুমি তাদের বিচার করো।

    মজলিসটা বসেছিল ডেপুটিবাবুদের অফিসে। কোণের দিকে নিঃশব্দে বসেছিলেন আমাদের তরুণ সহকর্মী সিতাংশু। ভদ্রলোক একটু ভাবগম্ভীর। সকলের মধ্যে থেকেও কেমন স্বতন্ত্র। সেজন্যে পরিচিত মহলে তাঁর নিন্দা-প্রশংসা দুটোরই কিঞ্চিৎ আতিশয্য ছিল। আজকের ভোরের অনুষ্ঠানে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন, সেটা আমি লক্ষ্য করেছি। আমাদের গল্পের আসরে তিনি উপস্থিত থেকেও যোগ দেননি। হঠাৎ কি মনে হল, ওঁর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনি বুঝি কোন ফাসি দেখেননি, সিতাংশুবাবু?

    উনি একটু চমকে উঠলেন; বোধ হয় বাধা পেলেন কোনো নিজস্ব চিন্তাসূত্রে। তারপর আবেগের সঙ্গে বিনীত কণ্ঠে বললেন, দেখেছি স্যার, একটিমাত্র ফাঁসি দেখেছি। কিন্তু সে ফাঁসি নয়, শহীদ-বেদীমূলে দেশপ্রাণ ভক্তের জীবনবলি। এ প্রসঙ্গে তাঁর কথা উল্লেখ করে তাঁর আত্মার অসম্মান করতে চাই না।

    সিতাংশুর এই ভাবাবেগ আমি উপলব্ধি করছি। ‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান, তাদের জয়গানেও আমি কারো চেয়ে পশ্চাৎপদ নই। সিতাংশুর মত তাদের দু-একজনকে দেখবার সৌভাগ্য আমারও হয়েছে। দেখেছি, মহৎ উদ্দেশ্যে যে-মৃত্যুবরণ তার মধ্যে এক প্রচণ্ড মোহ আছে। সে মোহ যখন মনকে আচ্ছন্ন করে, মৃত্যুর বিভীষিকাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। মরণের রূপ তখন ভয়ঙ্কর নয়; মরণ সেখানে শ্যাম-সমান। ফাঁসি-মঞ্চের ঐ লোহার পাতখানার উপর দাঁড়িয়েও তাই তাদের চোখে ভেসে ওঠে গভীর আত্মতৃপ্তি, কণ্ঠে জেগে ওঠে সতেজ গর্ববোধ। তারা জানে, তাদের জন্যে সঞ্চিত রইল দেশমাতৃকার অজস্র আশীর্বাদ আর দেশবাসীর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। ভাণ্ডার তাদের পূর্ণ। তাই উন্নত শিরে, সস্মিত মুখে তারা স্বচ্ছন্দে চলে যায়, কণ্ঠে পরে ম্যানিলা রজ্জুর বরমাল্য। এ তো মৃত্যু নয়, এ আত্মদান, মহত্তর জীবনের মধ্যে পুনরাবির্ভাব। এ মৃত্যু শুধু তার দেশের গৌরব নয়, তার নিজের কাছেও এক মহামূল্য অন্তিম সম্পদ।

    কিন্তু সে সম্পদের একটি কণাও যারা পেল না, মৃত্যু যাদের দিয়ে গেল শুধু ক্ষতি, মরণপথে একমাত্র পাথেয় যাদের লজ্জা, গ্লানি আর অভিশাপ, আইনের কাছে, সমাজের কাছে, স্বজন বান্ধব সকলের কাছে যারা কুড়িয়ে গেল খালি নিন্দার পসরা, সেই সব নিঃসম্বল সংসার-পরিত্যক্ত হতভাগ্য নরহস্তার দল মৃত্যুকে গ্রহণ করবে কিসের জোরে? কী অবলম্বন করে তারা পা বাড়াবে মরণ-সাগরের সীমাহীন অন্ধকারে? তাই মৃত্যু শুধু একটিমাত্র রূপে দেখা দেয় তাদের চোখে, সে রূপ বিভীষিকার রূপ। সে রূপ দেখে ফাঁসি-যন্ত্রের উপর কেউ আর্তনাদ করে, কেউ দাঁড়িয়ে থাকে বজ্রাহত মৃতদেহের মতো, কেউ ভেঙে দুমড়ে আছড়ে পড়ে, কেউবা অর্থহীন প্রলাপের আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখতে চায় গ্রাসোদ্যত মরণের করাল ছায়া।

    মৃত্যু-ছায়া যে কি বস্তু, সে তো আমি স্বচক্ষে দেখেছি। আজ তোমার ফাঁসি—এই সরল ছোট্ট একটি মাত্র বাক্য কেমন করে একটা দৃঢ়কায় সুস্থ মানুষের মুখের উপর থেকে সমস্ত রক্ত মুহূর্তে শুষে নেয়, সে বীভৎস দৃশ্যও আমার চোখে পড়েছে। মৃত্যু আসন্ন, এ কথা তো তার অজ্ঞাত ছিল না। এই দিনটির জন্যেই সে তৈরী হয়েছে বহুদিন ধরে। তবু আসন্ন আর আগতের মধ্যে দুস্তর ব্যবদান। নিশ্চিত হলেও মরণ এতদিন ছিল তার মানশ্চক্ষে। আজ সে সশরীরে উপস্থিত। আজ রুদ্রের অবির্ভাব। তারই নিঃশ্বাসে একটা জীবন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরে যায়। রক্তমাংসের গড়া জ্যান্ত ধড়ের উপর দেখা দেয় চর্মাবৃত কঙ্কালের মুখ। এ দৃশ্য দেখবার সুযোগ কজনের ভাগ্যে জোটে? সিতাংশুর জুটেছিল, কিন্তু সে দেখল না।

    সিতাংশুর সঙ্গে আমার বিরোধ নেই। পুণ্যাত্মা শহীদদের জন্যে রইল আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। কিন্তু এই পাপাত্মা খুনীদের জন্যে রইল কি? কিছু না। সেখানে আমি রিক্তহস্ত। আমার কাছে, সংসারের মানুষের কাছে কোনো দাবী তাদের নেই। তবু কখনো ক্বচিৎ কোনো সঙ্গিহীন নিরালা সন্ধ্যায়, মন যখন গুটিয়ে আসে একান্ত আপনার মধ্যে, চোখ বুজলে আমি সেই মরণাহত, রক্ত-লেশহীন, ভীতি-পাণ্ডুর শীর্ণ মুখগুলো দেখতে পাই। ভয় নয়, ঘৃণা নয়, কী এক অব্যক্ত মমতায় সমস্ত অন্তর ভরে ওঠে।

    ।। প্ৰথম পৰ্ব সমাপ্ত।।

  • এক

    এক

    এক
    কাঁচা আর পাকার মধ্যে যে ব্যবধান সেটা কালগত। কাল পূর্ণ হলেই কাঁচা লঙ্কায় পাক ধরে, কাঁচা মাথা পাকা চুলে ভরে যায়। সংসারে একটি বস্তু আছে যার বেলায় এ নিয়ম চলে না। তার নাম চাকরি। সেখানেও কাঁচা পাকে; কিন্তু কালধর্মে নয়, তৈলধর্মে। সরকারী, আধা-সরকারী কিংবা সওদাগরী অফিসে গিয়ে দেখুন, পক্ক-কেশ সিনিয়র যখন কাঁচা রাস্তায় হোঁচট খাচ্ছেন, তৈল-সম্পদে বলীয়ান কোনো ভাগ্যবান জুনিয়ার তখন অনায়াসে পাড়ি দিয়েছেন কনফার্মেশনের পাকা সড়ক। গিরীনদা বলতেন, চাকরি হচ্ছে পাশার ঘুঁটি। পাকবে কি পচবে, নির্ভর করছে তোমার চালের উপর

    মূল্যবান কথা। চাল অবশ্যই চাই। কিন্তু তার সঙ্গে চাই প্রচুর তেল।

    আমার সহকর্মী রামজীবনবাবু তৈল-প্রয়োগে অপটু ছিলেন; অক্ষক্রীড়াতেও দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। তাই কালপ্রভাবে তাঁর গুম্ফদেশে শ্বেতবর্ণের আভা দেখা দিল কিন্তু চাকরির কৃষ্ণত্ব ঘুচল না। সেজন্য রামজীবনের নিজের কোনো ক্ষোভ ছিল না। কোনো অভিযোগও কোনোদিন করতে শুনিনি কর্তৃপক্ষের নামে।

    —’ওরা কি করবে?’ কর্তাদের পক্ষ টেনেই বরং বলতেন রামজীবন : ‘জায়গা কোথায়? যক্ষের মতো যাঁরা ঘাঁটি আগলে বসে আছেন, তাঁরা দয়া করে সরবেন, তবে তো, জেল-সার্ভিসে পেনশন্ অতি বিরল ঘটনা। পঞ্চত্বপ্রাপ্তির দুর্ঘটনা বরং শুনতে পাবে দু-একটা; পঞ্চান্নপ্রাপ্তির কোনো বালাই নেই, অন্তত পঁয়ষট্টি পেরোবার আগে। কালে- ভদ্রে দু-একটা পোস্ট যদি বা পাওয়া গেল, আগে বাবাজীবন, তবে তো রামজীবন।

    বললাম, বাবাজীবনটি কে?

    —বাবাজীবন কি একটি যে তোমায় বলবো, কে? শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে এখনও ওঁদের ক’জন বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছেন।—বলে ইঙ্গিতে পাশের ঘর দেখিয়ে দিলেন।

    পাশের ঘরটি জেলর সাহেবের। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, তিনি চোখ বুজে বৈকালিক অফিসের দৈনন্দিন তন্দ্রাসুখ উপভোগ করছেন। চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে তাঁর খাস মেট কলিমদ্দি গাজী নিত্যকার বরাদ্দ মতো তাঁর কেশবিরল উত্তমাঙ্গে অঙ্গুলি চালনা করছে। টেবিলের তলায় বসে হারাধন পাহারা নিপুণ হাতে পদসেবায় নিযুক্ত। জেলর সাহেবের মুখের দিকে তাকালাম। বার্ধক্যের বলিরেখাগুলো যেন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল। তার সঙ্গে স্পষ্টতর ভাবে নজরে পড়ল ওঁর গিলে করা ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি, বহু যত্নে কোঁচানো দামী শান্তিপুরী ধুতি, আর আরশির মতো পালিশওয়ালা আধুনিক ডিজাইনের নিউকাট্। বাবাজীবনই বটে!

    রামবাবুর দিকে ফিরে বললাম, আপনার নামকরণের তারিফ না করে পারছিনে। রামজীবন একটু সন্দিগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, নামকরণের আসল মানেটা ধরতে পারছো তো?

    এবার আমারও সন্দেহ হল, কথাটার হয়তো কোনো গূঢ় তাৎপর্য আছে, যা আমার জানা নেই।

    বললাম, আসল মানেটা কি রকম?

    রামজীবন হেসে ফেললেন, এঃ, তুমি দেখছি একেবারে আনাড়ি! ঐ যে সিংহাসনটা ওঁরা দখল করে আছেন, ওটা এক পুরুষের নয়। বেশির ভাগই পৈতৃক, কারও কারও বা শ্বাশুরিক। ওঁরা ভাগ্যবান পুরুষ। তোমার মতো রাত জেগে একগাদা পরীক্ষাও পাস করতে হয়নি, আমার মতো অফিসে অফিসে ধর্না দিয়ে চাপরাসীর গলাধাক্কা খেতেও হয়নি। Application নেই, Interview নেই, Testimonial সংগ্রহের জন্যে হাঁটাহাঁটি নেই, চাকরি এল সোজা, সরল সংক্ষিপ্ত পথ ধরে অর্থাৎ Give him a chair and a table.

    সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম, সেটা আবার কি পদার্থ? রামজীবন কি একটা ফাইল ঘাঁটছিলেন। বন্ধ করে সিগারেট ধরালেন। তারপর পা তুলে গুছিয়ে বসে বললেন, নাঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না! শোনো তাহলে। একেবারে গোড়া থেকেই বলি। মিডলটন সাহেবের নাম শুনেছ তো?

    —আই. জি. ছিলেন এককালে?

    —আই. জি. ছিলেন মানে? আই. জি. তো এখনও আছে, পরেও থাকবে। কিন্তু এ একেবারে আলাদা চীজ। ডাকসাইটে ইনস্পেক্টর জেনারেল, লেপ্টনান্ট কর্নেল মিডলটন। খাস সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল। কথা বললে মনে হবে মেঘ ডাকছে। ভেতরে ভেতরে আবার তেমনি আত্মভোলা আশুতোষ। যতবড় অপরাধই কর, একবার গিয়ে পড়তে পারলেই হল। প্রথমটা গঁ গঁ করে উঠবে। তারপরেই জল। সেবার অক্ষয় পাঠকের চাকরি গেল। রসদ-গুদামের ইনচার্জ। সব মাল ঘাটতি। দু চার দশ সের নয়, কয়েক মণ! স্পেশাল অডিট বসল। কড়া রিপোর্ট। পুলিসে দেবার মতো কেস। শেষ পর্যন্ত হাত-কড়া আর পড়ল না; যা কিছু গেল চাকরির উপর দিয়ে। অক্ষয়বাবু দেখলাম কিছুমাত্র ঘাবড়ায়নি। ডিমিসাল অর্ডারটা পকেটে করে চলে গেল কলকাতায়। তখনকার দিনে রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনের দিকে যারা বসতো তাদের পর্দানশিন জেনানা করে রাখা হয়নি! পুলিশ-পাঁচিলের আড়ালে বসে ইজ্জত রক্ষা করতে তাঁদের বোধহয় ইজ্জতে বাধত। শুধু মহাজন নয়, অভাজনরাও বিনা বাধায় যেতে পারত দক্ষিণের বারান্দায়। বেলা তখন দুটো-আড়াইটে হবে। আই. জি. প্রিজনসের অফিসের সামনে তুমুল গণ্ডগোল। সাহেব কাজ-টাজ ফেলে বেরিয়ে এসে দেখেন প্রলয় কাণ্ড। সকলের সামনে দাঁড়িয়ে অক্ষয় পাঠক। পেছনে ঘোমটা মাথায় একটি মহিলা, আর তার পেছনে লাইন ধরে বারোটা ছেলেমেয়ে। এমনি কাউমাউ জুড়ে দিয়েছে কার কথা কে শোনে! মিডলটন্‌ বলে উঠলেন, Who are you? কে টুমি?

    —আই অ্যাম অক্ষয় পাঠক স্যার।

    —ড্যাম! এটা কৌন্ প্রসেশন আছে?

    অক্ষয় অত্যন্ত সহজ ভাবে জানাল, প্রসেশন নয়, সাহেব। এটি তোমার বৌমা আর এগুলো তারই কাচ্চা-বাচ্চা।

    —গুড গড। চোখ কপালে তুললেন মিডলটন। তারপর সামলে নিয়ে বললেন, এখানে কি চাই?

    —চাই আর কি সাহেব? চাকরি যখন নিয়েছ, এগুলোও নাও। এই রাবণের গুষ্টি আমি খাওয়াবো কী দিয়ে?

    পরে শুনেছিলাম গোষ্ঠীবর্গ সবটা অক্ষয়ের নয়। সাতটি ওর নিজের আর বাকীগুলো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে ধার।

    বললাম, আমি মনে করেছিলাম, রাস্তা থেকে। যাক্, তারপর প্রসেশনের কি গতি হল?

    রামজীবন হেসে বললেন, সে তো বুঝতেই পাচ্ছ। পার্সনাল অ্যাসিস্টান্ট ছিলেন রায়সাহেব বিধু ঘোষ। জরুরী তলব পেয়ে ছুটে এলেন। আসা মাত্র, ঐ বারান্দায় দাঁড়িয়ে অর্ডার দিলেন মিডলটন, পাঠককে কাজে বহাল করে নাও, রায়সাহেব।

    পি. এ. অবাক, বলেন কি স্যর! অর্ডার বেরিয়ে গ্যাছে, তাছাড়া চার্জ অত্যন্ত সিরিয়াস!

    সাহেব বললেন, But don’t you think this is more serious! — বলে আঙুল তুললেন পাঁচটি ছেলে আর সাতটি মেয়ের দিকে। অক্ষয়বাবুর উপর একটি অগ্নিদৃষ্টি ছেড়ে বললেন, বাচ্চাডের কী খাইটে ডিয়াছ?

    অক্ষয় নিরুত্তর।

    —স্কাউড্রেল! বলে দু-পা এগিয়ে গেলেন মিডলটন। পকেট থেকে বেরোল মনিব্যাগ। “বৌমার” হাতে দু-খানা দশটাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, উহাডের সণ্ডেস খাইটে ডেবেন। তারপর আবার সেই অগ্নিদৃষ্টি পাঠকের মুখের উপর এবং সেই সঙ্গে এক মেঘগর্জন—আর চুরি করিও না। যাও।

    অক্ষয়বাবুর প্রসেশন্ চলে গেল। খানিকক্ষণ সেই দিকে চেয়ে রইলেন মিডলটন। তারপর অনেকটা যেন অনুনয়ের সুরে বললেন পি. এ.-কে, Give him a cheap station, Rai Saheb!

    গজেনবাবু মাধ্যাহ্নিক ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন। টুপিটা নেবার জন্যে অফিসে ঢুকে বললেন, খুব তো জমিয়েছেন দুজনে। খবর জানেন তো?

    বললাম, কি খবর?

    —আই. জি.-র ইনস্পেকশন সাতাশ তারিখে। সাহেবের কাছে ডি. ও. এসে গেছে। গজেনবাবু বেরিয়ে যেতেই অপ্রসন্নমুখে বললাম, এ আবার এক উৎপাত শুরু হল। রামবাবু হেসে বললেন, যা বলেছ! এখন ঐ উৎপাতটাই আছে, সে উত্তাপ আর নেই।

    —উত্তাপ কি রকম?

    —উত্তাপ নয়? আই. জি. আসছেন। কী থ্রীল্ ছিল এই ছোট্ট কথাটার মধ্যে। সেসব তোমরা ধারণাই করতে পারবে না। সকালের ডাক খুলে দেখা গেল টুর প্রোগ্রাম। ব্যাস্! মুহূর্ত-মধ্যে যেন ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠল গোটা জেলখানা—বড় সাহেব থেকে আরম্ভ করে মেথর-দফাদার গয়জদ্দি ওস্তাগর! লেগে গেল সাফাই-এর ধুম। চালাও ঝাড়ু, ঢালো ফিনাইল, রাস্তায় নর্দমায়, ঘরে বারান্দায় যেখানে সেখানে লাগিয়ে যাও চুনের প্লাস্টার। মিডলটন সাহেবের ইনস্পেকশন! তার প্রথম ও শেষ কথা হল—সাফাই। কাজকর্ম কদ্দূর কি করেছ তোমরা, সে খবরে তাঁর দরকার নেই। কয়েদীরা খেতে পাচ্ছে, কি পাচ্ছে না, ও-সব নিয়েও মাথাব্যথা নেই। রসদ-গুদামের কোণে, লাইন দেওয়া বস্তার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখবেন কটা আরসোলা বসে আছে; অফিসের আলমারি আর বই-এর র‍্যাকের পেছনে লাঠি চালিয়ে দেখবেন, কোথায় লুকিয়ে আছে টিকটিকি আর কুনোব্যাঙ। এ সব মারাত্মক জানোয়ারের হাত থেকে তবু পার আছে, কিন্তু মাকড়সার দেখা পেলে আর রক্ষে নেই। আগাগোড়া সব ব্যাড়! জেলরবাবুরা হপ্তাখানেক আগে থেকেই গোটা কয়েক C. D. Gang বানিয়ে ফেলতেন। কয়েদীরা আর সব কাজ-কর্ম বন্ধ রেখে বাঁশের ঝাঁটা বেঁধে দলে দলে মাকড়সা তাড়িয়ে বেড়াত।

    প্রশ্ন করলাম, C. D. Gang-টা কি জিনিস?

    —Cobwebs Destroying Gang, আমরা সংক্ষেপে বলতাম, C. D. Gang. মোটা রেমিশন বখশিশ পেত এদের চার্জে থাকত যে-সব মেট পাহারা। সত্যি, মাকড়সা জাতটা ভারি নেমকহারাম। আজ সন্ধ্যাবেলা বেটাদের জালটাল ছিঁড়ে, গোষ্ঠীসুদ্ধ বেমালুম উচ্ছেদ করে নিশ্চিন্ত হয়ে আছ; সাল সকালে গিয়ে দ্যাখ, বেশ একটি সূক্ষ্ম জাল টাঙিয়ে নতুন করে সংসার পেতে বসেছে। কাজেই C. D. Gang-এর কাজ চলত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। আই. জি. ওধারটা রাউণ্ড দিচ্ছেন, C. D.-রা ঝাড়ুবাঁধা বাঁশ ঘাড়ে করে ছুটছে ওধারে।

    রামজীবনবাবুর মতো অতগুলো না হোক, অপেক্ষাকৃত হাল আমলের দু-চারটা ইনস্পেকশন আমিও দেখেছিলাম। এ মহাপর্বের প্রথম অধ্যায় ছিল জেলর এবং ডেপুটি বাবুদের সোর্ড-স্যালুট। আই. জি. এসে সামনে দাঁড়াতেই, ইস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ফেলে যাওয়া খানকয়েক মরচে-ধরা তরোয়াল নিয়ে বাবুরা যে কসরত দেখাতেন, যাত্রার দলের চেয়ে সেটা কম, উপভোগ্য ছিল না। এই আস্ফালন আমাকেও একদিন দেখাতে হয়েছে; কিন্তু তার কৌশলটা কোনোদিন আয়ত্ত করতে পারিনি। কেবলই আশঙ্কা হত, ‘প্ৰেজেণ্ট আর্মস্’ দেখাতে গিয়ে আমার নাসিকার কিঞ্চিৎ অংশও বুঝি উপরওয়ালাদের প্রেজেন্ট দিতে হয়! অদৃষ্টের জোর ছিল। নাসিকা অক্ষত আছে। সেই মধ্যযুগের তরোয়াল খেলা আজও চলেছে। বিভিন্ন জেলের প্যারেড গ্রাউণ্ডে বৎসরান্তে যখন তার হাস্যকর অভিনয় দেখি এবং হুঙ্কার শুনি, মনে মনে কৌতুক বোধ করে থাকি, কিন্তু কর্তৃপক্ষের রসবোধের তারিফ করতে পারি না। যাক্ সে কথা।

    রামজীবনবাবুকে প্রশ্ন করলাম, আপনার মিডলটনকে অসি-যুদ্ধ দেখাতে হত না?

    —নিশ্চয় হত। তবে আমরা যেটা দেখাতাম, সেটা তোমাদের কালের ছেলেখেলা নয়, একেবারে খাঁটি এবং নিখুঁত সোর্ড-স্যালুট। পুরো সাতদিন ধরে মহড়া দিতে দিতে প্রাণ বেরিয়ে যেত। ভুলচুক হলে রক্ষা নেই। সার্ভিস রেকর্ডে কালো কালো দাগ!

    —আপনার কপালে জুটেছে নাকি দু-চারটি?

    —জোটেনি আবার, আরে, আমি তো কোন্ ছার! বড় বড় মহারথীরাও বাদ যাননি। এই যেমন ধর রায়সাহেব গণপতি সান্যাল। অত বড় বাঘা জেলর। নাম শুনলে এখনও আমাদের বুক ঢিব্‌টিব্ করে। তাঁর কাণ্ডটা শোনো। রাজসাহী সেন্ট্রাল জেলে এসেছেন মিডলটন। বড় একখানা সোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছেন রায়সাহেব। পেছনে আমরা চারজন ডেপুটি আর রিজার্ভ চীফ্ বলবন্ত সিং। আই. জি.-র গাড়ি এসে থামতেই হুঙ্কার দিলেন—স্লোপ্ আর্মস্! খড়্গ উদ্যত হল। মিডলটন্ নেমে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে গলা ফাটিয়ে কমাণ্ড দিলেন জেলর সাহেব—প্রেজেন্ট আর্মস্! হাত টান করে নামিয়ে দিলাম তরোয়াল। ব্যাস্, আর সাড়াশব্দ নেই। দু মিনিট তিন মিনিট যায়। হাত টাটিয়ে উঠল আমাদের। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি থম্‌থম্ করছে রায়সাহেবের মুখ।

    বয়স হয়েছে। একে নার্ভাসনেস্, তার ওপর বুকের ভেতর প্যালপিটেশনের ধাক্কা। পরের বুলিটা আর মনে আসছে না কিছুতেই। সুপার চঞ্চল হয়ে উঠছেন। আই. জি-র মুখ অমাবস্যা। ব্যাপার গুরুতর দেখে, গলা ছাড়ল বলবন্ত সিং। কোনরকমে মুখ-রক্ষা হল, আর সেই সঙ্গে আমাদেরও প্রাণরক্ষা। কিন্তু রায়সাহেবের প্রাণ নিয়ে টানাটানি। অতবড় সেন্ট্রাল জেল থেকে বদলি হলেন যশোর ডিস্ট্রিক্ট জেলে।

    রামজীবন সিগারেট ধরালেন। বললাম, চেয়ার টেবিলের গল্পটা তো শোনা হল না।

    দেশলাই-এর কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, এইবার শোন। ধর, ইনস্পেক্‌শন ভালয় ভালয় উৎরে গেছে। মাকড়সা ট্রেচারি করেনি। সি. ডি-দের কাজ নিখুঁত। মিডলটন খুশি হয়েছেন। খোস-মেজাজে বেরিয়ে এসেছেন গেট পার হয়ে। সুপার সাহেবের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করে মোটরে উঠতে যাবেন, পাশ থেকে স্যালুট দিল একটি ছোকরা। পরনে লম্বা বাকী প্যান্ট, তার ওপরে মিলিটারী প্যাটার্ন হাফশার্ট। দুটোর কোনোটাই নিজস্ব নয়, সম্ভবত পৈতৃক সম্পত্তি। শ্রীমানের সঙ্গে তার ছোটভাইকেও একসঙ্গে উদরস্ত করতে পারে। মিডলটনের মুখে কৌতুক হাসি ফুটে উঠল। জেলর সাহেবের দিকে তাকাতেই, বিনীত কণ্ঠে বললেন, My son sir, কিংবা, My son-in-law, Sir.

    — I see, is he going to school?

    —না, সাহেব। ইস্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছি। ইংরেজি চমৎকার শিখেছে। Very eager to serve under you. দয়া করে পায়ে স্থান দিলে গরীব বেঁচে যায়। অনেকগুলো কাচ্চা- বাচ্চা।

    সাহেব তাঁর বেতের লাঠিটা দিয়ে শ্রীমানের পেটে একটা খোঁচা মারলেন, বোধহয় বিদ্যার পরিমাণটা পরখ করবার জন্যে। তারপর বললেন, All right. Give him a chair and a table.

    এক কথায় চাকরি হয়ে গেল। অর্থাৎ মাইনের সঙ্গে দেখা নেই। অফিসের একপাশে একটি চেয়ার ও একখানি টেবিলের ব্যবস্থা হল বাবাজীবনের জন্যে। বৎসরান্তে আবার এলেন আই. জি.। এবার গেটের বাইরে নয়, ভেতরেই হাজির করা হল শ্রীমানকে। পরনে নিজের সুট। পুত্র বা জামাতার অসামান্য কৃতিত্বের লম্বা ফিরিস্তি দিলেন জেলর সাহেব। পূর্ব বন্দোবস্ত মতো সুপারও যোগ করলেন দু-চার লাইন। পেটের উপর আবার সেই লাঠির খোঁচা। Admission Register লিখতে পার? প্রশ্ন করলেন মিডলটন।

    —ইয়েস, স্যার।

    —পয়লা অক্টোবর তিন মাস জেল হলে তার খালাস পড়বে কোন্ তারিখে? নির্ভুল উত্তর পাওয়া গেল। গাড়িতে উঠতে উঠতে সুপারের দিকে ফিরে আদেশ করলেন আই. জি.—’একটা রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবেন ওর কাজ সম্বন্ধে। জায়গা খালি হলে বিবেচনা করে দেখবো।’ যথাসময়ে রিপোর্ট চলে গেল। পাঁচ সাত মাস কিংবা এক বছর পরে অর্ডার এল, ‘বাবু অমুক চন্দ্র অমুককে অত তারিখ হইতে অস্থায়ী অ্যাসিস্টান্ট জেলর পদে নিযুক্ত করা হইল।’ মুরুব্বীর জোর রয়েছে। অস্থায়ী স্থায়ী হতে দেরি হল না। তারপর পৈতৃক বা শ্বাশুরিক আসনের দিকে টপাটপ্ এগিয়ে চললেন শ্রীমান। এমনি করেই চলছে। এক বাবাজীবন এগিয়ে যান, তো আর এক বাবাজীবন এসে তার শূন্য আসন দখল করেন। তাহলেই বোঝ, রামজীবনকে অপেক্ষা করতেই হবে।

    ইংরেজ কবি কাব্যলক্ষ্মীকে বলেছেন, Jealous mistress। আমি কবি নই, ইংরেজও নই। আমার কাছে সত্যিকার জেলাস মিস্ট্রেস্ যদি কেউ থাকেন, তিনি নিদ্রাদেবী। অত্যন্ত কড়া মনিব। নিজের প্রাপ্য কড়ায় গণ্ডায় আদায় করেন এবং তাঁর উপর অনধিকার হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করেন না। আপনার বাৎসরিক পরীক্ষা আসন্ন। চোখের সামনে রাশি রাশি সর্যের ফুল শোভা পাচ্ছে। আর কোনো পথ না দেখে এগারোটার ঘুমকে জোর করে টেনে নিয়ে গেলেন একটায়। মনে করলেন, খুব লাভ হল। কিন্তু, হায়, পরদিন যখন ঘুম ভাঙল, সেই সঙ্গে ভুলও ভাঙল আপনার। দেখলেন, ঘড়ির কাঁটা সাড়ে সাতটা ছাড়িয়ে আটটার দিকে ধাবমান। অর্থাৎ ভবী ভুলবার নয়। রাত্রির অবহেলার শোধ নিয়েছে রাত্রিশেষে।

    আমার বাৎসরিক পরীক্ষা নেই; আছে সাপ্তাহিক নাইট-রাউণ্ড বা নৈশ চক্কর। তার ধান্ধায় বেরিয়েছিলাম রাত দুটোয়। জেলাস মিস্ট্রেস্ তাঁর দাবি ছাড়লেন না। মুক্তি দিলেন পরদিন বেলা আটটায়। ধরাচূড়া এঁটে হন্তদন্ত হয়ে অফিসে যখন পৌঁছলাম, জেলের চাকা তখন পুরোদমে চলছে। জেলর সাহেবের ঘরের সামনে দিয়ে পথ। শ্যেনদৃষ্টির কবলে পড়তেই কলকণ্ঠে বিপুল অভ্যর্থনা – Good morning, মলয়বাবু। এই যে আসুন; আসতে আজ্ঞা হোক্‌।

    গিরীনদা বলেছিলেন, চাকরি জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজন হল একখানা মুখোশ। নিজের আসল মুখখানা কাউকে দেখিও না। অন্তত উপরওয়ালাকে তো নয়ই। তখন হেসেছিলাম। পরে বুঝেছি, এর চেয়ে মূল্যবান উপদেশ আর হতে পারে না। তাই জেলর সাহেবের আন্তরিক অভ্যর্থনায় পিত্ত যখন জ্বলে উঠল, একখানা মোলায়েম মুখোশ পরে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি একটুকরো কাগজ আর এক গোছা চাবি এগিয়ে দিয়ে বললেন, রামজীবনবাবু আসবেন না। এই নিন তাঁর চিঠি আর চাবি।

    —কী হল রামবাবুর?

    জেলরবাবু বিরক্তির সুরে বললেন, কি জানি মশায়; ডাইরিয়া না ডায়াবেটিস, কি একটা লেখা আছে ঐ চিরকুটে। আসলে এটা হচ্ছে মেণ্টাল শক। …আমি অপেক্ষা করে আছি দেখে মাথা নেড়ে বললেন, শোনেননি বুঝি? এবারেও হল না। সিউড়িতে চান্স পাচ্ছে ক্ষেত্তরদার ছেলে বংশী।

    একটু চিন্তার ভান করে বললাম, রামজীবনবাবু মনে হচ্ছে ওঁর সিনিয়র!

    —সিনিয়র হলে কি হবে? ‘কিন্তু’ আছে এর মধ্যে।

    একটু থেমে আমার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে চেয়ে বললেন, দেখুন মশাই, আমি সিধে মানুষ। সোজা কথায় বুঝি চাকরি করতে এসে ওসব মহত্ত্ব-টহত্ত্ব দেখালে চলে না। এখানে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। কি বলেন?

    সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলাম, সে তো নিশ্চয়ই।

    —তবে? বাগান থেকে কয়েদী পালাল। সিপাই মরবে, মরুক। আমার আপনার কি এসে গেল? সিপাইকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের ফ্যাসাদ ডেকে আনবার দরকার কি? যাক্, ওসব যার কথা সেই বুঝুক। আপনি দেখুন খালাস-টালাস কি আছে। চটপট নিয়ে আসুন। সাহেব আসবার সময় হল।

    সেই দিনই সন্ধ্যেয় অফিস শেষ করে গেলাম রামজীবনবাবুর বাড়ি। ঢুকেই সামনের ঘরটায় থাকেন। দেখলাম খাটের উপর বসে পা-দুটো ডুবিয়ে দিয়েছেন একবালতি জলের মধ্যে। পাশে দাঁড়িয়ে রামবৌদি মাথার উপর পাখার বাতাস করে চলেছেন। রামবৌদি কথাটা বোধহয় দ্ব্যর্থ-বোধক। রামদার স্ত্রী, তার সঙ্গে রয়েছে তাঁর শ্রীঅঙ্গের ইঙ্গিত।

    —কি করছেন, দাদা?

    —এই যে, এসো ভাই। মাথাটা ছাড়ছে না। একটা ফুটবাথ নিচ্ছি।

    —সেই সঙ্গে আবার মাথায় হাওয়া?

    —হ্যাঁ, একাধারে ডবল অ্যাক্‌শন্।

    মহিলাটি দেখলাম গলদঘর্ম হয়ে পড়েছেন। বললাম, পাখাটা আমাকে দিন তো বৌদি। আপনি বরং একটু চা-টা-এর যোগাড় দেখুন।

    রামবৌদি পাখা নামিয়ে রেখে আঁচলে মুখ মুছে বললেন, থাক্, আপনাকে আর হাওয়া করতে হবে না। আর দরকারও নেই। চায়ের সঙ্গে কি খাবেন বলুন তো? আপনার তো আবার মিষ্টি-টিষ্টি চলবে না। কাঁচালঙ্কা কিন্তু আমার ঘরে নেই।

    রামবৌদি বাঁকুড়ার মেয়ে। আমার দেশ পদ্মার ওপার। খাদ্য সম্বন্ধে আমাদের এই মধুর বিরোধ নতুন নয়। বললাম, তা জানি! কাঁচালঙ্কার মর্যাদা বুঝতে আপনার অনেক দেরি। কড়াই-এর ডাল আর পোস্ত-চচ্চড়ি আছে তো? অগত্যা তাই নিয়ে আসুন।

    রামজীবনদা হেসে বললেন, ওসব থাক্। ডবল অমলেট করে নিয়ে এসো দু-ডিশ। বৌদি কৃত্রিম রোষ দেখিয়ে বললেন, দু-ডিশ বৈকি। জ্বরের মধ্যে ডিম ভাজা! ওসব আমার দ্বারা হবে না বাপু।

    আমি বাধা দিয়ে বললাম, আপনি ভুল বুঝলেন, দাদা ওটা আমার মুখ চেয়েই বলেছেন। উনি জানেন, একখানা এলে হজমের ব্যাঘাত ঘটবে।

    বৌদি হেসে চলে গেলেন।

    বালতির ভিতর থেকে পা তুলে নিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে খাটের উপর গুটিয়ে বসলেন রামজীবনবাবু। ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করলেন, তারপর আফিসের খবর কি, বল তো?

    মোটামুটি খবর দিলাম, এবং সেই সঙ্গে যোগ করলাম জেলর সাহেবের জ্ঞানগর্ভ উপদেশ। রামজীবনের মুখের হাসিটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। নিঃশব্দে চেয়ে রইলেন জানালার বাইরে। ঘরের সামনে একফালি সরু রাস্তা। তারপরেই খাল। বর্ষার তাড়নায় ফেঁপে ফুলে ভরে উঠেছে। কূল ছাপিয়ে এল বলে। কোথাও সোজা, কোথাও পাক খেয়ে ছুটে চলেছে তীব্র স্রোত। ওপার থেকে দুর্বার বেগে ধেয়ে এল বৃষ্টি। চক্ষের নিমেষে খাল পার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এপারের বাড়িগুলোর উপর। চারিদিকের অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠল। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, জানালাটা বন্ধ করে দিই?

    —না থাক্—অনুচ্চ গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন রামজীবন। জল-ঝড়ের দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বললেন, একটা কথা তোমায় বলবো। এতদিন বলি বলি করেও বলা হয়নি। দেখছিলাম, সে রাতটার সঙ্গে আজকের রাতের আশ্চর্য মিল। এমনি বর্ষাকাল। খালের জল ঘাট ছাপিয়ে উঠেছে। এমনি দুর্যোগ। তুমি যেখানে বসে আছ তার ঠিক পেছনে ঐ মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে বৌটার কি কান্না! পাশে সেই কয়েদীটা ছবির মতো দাঁড়িয়ে। কোলে মাসকয়েকের একটি ঘুমন্ত বাচ্চা। আমি এই খাটের উপর ঠিক এমনি করে বসে। ভেবে চলেছি কী করবো, কী আমার কর্তব্য! তোমার বৌদি গেছেন বাপের বাড়ি। ছেলে- পিলেরাও গেছে সেই সঙ্গে। নির্জন বাড়িতে আমি একা। একটু পরামর্শ করবো, সে উপায়ও নেই। অথচ স্থির একটা কিছু করতেই হবে। দেরি করবার সময় নেই।

    বৌদি নিজে আসেননি। মেয়ের হাতে পাঠিয়ে দিলেন চা এবং ডিমভাজা। দাদাকে বঞ্চিত করেন নি। কিন্তু উনি তখন অন্য লোক। অমলেটের দিকে নজর পড়ল না। ডবল বালিশের উপর পাশ-বালিশ, তার উপর মাথা রেখে ধীরে ধীরে বলে গেলেন সেই বর্ষারাতের অনুক্ত কাহিনী।

    এই জেলেরই দু-বছর আগেকার ঘটনা। আমি তখন আসিনি। জেলরও ছিলেন অন্য লোক। শ্যালিকার বিয়ে উপলক্ষে দিন সাতেকের ক্যাজুয়াল ছুটি নিয়ে গিয়েছিলেন কোলকাতায় না বর্ধমানে। অ্যাকটিনি করছিলেন রামজীবনবাবু। মাইল দেড়েক দূরে জেলের বাগান। তার তদ্বির-তদারকের ভার জেলরের উপর। বৈকালিক ডিউটির একটি বড় অংশ প্রায়ই সেখানে কাটাতে হয়। তার জন্যে অ্যালাউন্স বরাদ্দ আছে মাসিক পাঁচ টাকা। যুদ্ধের বাজারে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ছ’টাকা চার আনা। অ্যালাউন্সের লোভে না হোক, কর্তব্যের খাতিরে রামজীবনও বাগান দেখতে যান। আঠারো কুড়ি জন কয়েদী রোজ সেখানে সকালে বিকালে কোদাল চালায়। তাদের চার্জে আছে একজন বেটনধারী সিপাই। সে একাধারে সান্ত্রী এবং কৃষি-বিদ্যা-বিশারদ। চাষবাসের খেদমত এবং কয়েদীবাহিনীর খবরদারি—এ দুটোরই ভার তার উপর।

    সাতদিনের জেলর রামজীবন গেছেন বাগান-পরিদর্শনে। নতুন লোক। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন সব খুঁটিনাটি। সিপাই সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। সন্ধ্যা হয় হয়। কয়েদীদের ফিরবার সময় হয়ে গেছে। মেট তাদের এ-ক্ষেত ও-ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করে জোড়ায় জোড়ায় বসিয়েছেন এনে পুকুরপাড়ে। গুনতি হল—দু, চার, ছয়, আট…। এ কি! একটা যে কম! দ্যাখ তো কোটা আসেনি—হুকুম করল পাহারাকে। পাহারা খাতার সঙ্গে নাম মিলিয়ে বললে, মেনাজদ্দিটা আসেনি। হাঁক-ডাক চলল মেনাজদ্দির নাম ধরে। কোনো সাড়া নেই। এখানে সেখানে খুঁজে দেখা হল। ফল একই। মেট ছুটে গেল, সিপাইকে খবর দিতে। রামজীবন তখন বাগানের ফটক পার হয়ে রিকশায় উঠতে যাচ্ছেন। সিপাই দাঁড়িয়ে ছিল পাশে, রিকশা চলতে উদ্যত হলেই খটাস্ করে বুট ঠুকে লাগিয়ে দেবে স্যালুট। এমন সময় এল সেই ভয়াবহ রিপোর্ট—মেনাজদ্দি নেই। মাথার ভিতরটা ঝিম্ ধরে গেল রামজীবনের। সেই সঙ্গে মনে হল হৃৎপিণ্ডের কলকব্জাগুলো আর চলছে না। কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন স্থাণুর মতো খেয়াল নেই, হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এল সিপাই-এর চিৎকার শুনে—’জেলমে যাতা হ্যায় হুজুর।’ চমকে উঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। জলদি যাও। অ্যালার্ম দিতে বল এক্ষুনি।’ হঠাৎ মনে পড়ল বাকী কয়েদীগুলোর কথা। তাড়াতাড়ি বাগানে ফিরে গিয়ে তাদের চার্জ নিলেন। সিপাই ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে পথের বাঁকে। এ তো যে- সে দৌড় নয়, মরণ-দৌড়; কয়েদীটা একা যায়নি, তার সঙ্গে নিয়ে গেছে এই দরিদ্র লোকটার বাকী জীবনের রুটি। দেড় মাইল পথ পার হতে লাগল দশ মিনিট। সঙ্গে সঙ্গে জেল-গেটে বেজে উঠল অ্যালার্ম। রণ-রঙ্গে ধেয়ে এল লাঠি আর বন্দুকধারীর দল। তার সঙ্গে যোগ দিল পুলিশবাহিনী। বাগান আর তার আশ-পাশ জুড়ে শুরু হল প্রলয় নৃত্য। পলাতক কয়েদীর জন্য জান দিল কুমড়ো, কচু, ঝিঙে, পটল, আর মান দিল চারদিকের কতকগুলো কুটীরবাসী গৃহস্থ পরিবার। মেয়েদের আব্রু রক্ষার অজুহাত অগ্রাহ্য করে তাদের রান্না আর শোবার ঘরে, আঁস্তাকুড় আর শৌচাগারে চলল খানিক বেপরোয়া পুলিশী সন্ধান। কিন্তু মেনাজদ্দির খোঁজ মিলল না।

    অ্যালার্ম শেষ হতেই সুপার এলেন। শুরু হল এনকোয়ারী পর্ব। গতানুগতিক রীতি অনুসারে তিনি যখন বাগানী সিপাইকে সাসপেণ্ড করবার হুকুম দিতে যাবেন, রামজীবন আপত্তি জানিয়ে বসলেন। দৃঢ়ভাবে বললেন, এ পলায়নের সমস্ত দায়িত্ব তাঁর। সিপাই জেলরকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল, কয়েদীর দিকে অখণ্ড মনোযোগ দেবার সুযোগ পায়নি। তারই সদ্ব্যবহার করেছে মেনাজদ্দি। বলা বাহুল্য, সুপার এ যুক্তি মেনে নিলেন না। আইন বলছে, কয়েদীর হেফাজত যার উপর ন্যস্ত, তার গতিবিধির জন্য দায়ী হবে সেই ওয়ার্ডার। জেলরের ইনস্পেকশন্ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এবং শুধু সেই কারণে সিপাইকে তার আইন-নির্দিষ্ট দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া যায় না। সুপার মন্তব্য করলেন, তাঁর মতে রামজীবনের এই অহেতুক উদারতা দুর্বলতার নামান্তর মাত্র। এই রকম মনোভাব জেলর পদাধিকারী দায়িত্বশীল অফিসারের পক্ষে মারাত্মক, এবং সিপাইবাহিনীর মধ্যে ডিসিপ্লিন রক্ষার অনুকূল নয়।

    উপরওয়ালার কাছ থেকে সরব তিরস্কার এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে নীরব উপহাস সম্বল করে রামজীবন যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন অনেক রাত। আরও অনেক রাত পর্যন্ত এই বিছানায় পড়ে ঐ কথাগুলোই তাঁর মনের মধ্যে তোলপাড় করে বেড়াতে লাগল। সত্যিই কি তাই? আইনের দৃষ্টি ছাড়া মানুষের চোখে কি আর কোন দৃষ্টি নেই? ন্যায়-অন্যায়ের একমাত্র মানদণ্ড ঐ জেলকোড কিংবা পিনালকোড? আমার মন কেউ নয়? আমার যে আইন-না-পড়া সহজ বিচারবুদ্ধি, তার কি কিছুই বলবার নেই?

    জেলগেটে একটার ঘণ্টা শুনতে পেলেন রামজীবন। তারপর কখন এক সময় ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে এল তাঁর উত্তপ্ত স্নায়ুজাল। স্বপ্নের মধ্যে মনে হল কে তাঁকে ডাকছে, মৃদু কোমল কণ্ঠে—বাবা। গলাটা যেন তার বড় মেয়ে কল্যাণীর মতো। সাড়া দিতে যাবেন, হঠাৎ মনে পড়ল, তারা তো এখানে নেই। আবার সেই কুণ্ঠা-জড়িত কণ্ঠ। ধড়মড় করে উঠে বসলেন রামজীবন, কে?

    —আমরা,-বাবা, দরজার বাইরে থেকে জবাব এল।

    –কে তোমরা?

    —দরজাটা খুলুন না? ভীরু কণ্ঠের কাতর অনুরোধ

    রামজীবন জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালেন। দরজার ওপাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ, পাশে একটি স্ত্রীলোক। তার দু-হাতে কাপড় জড়ানো একটা পোঁটলার মতো। তার ভিতর থেকে শিশুর কান্না শোনা গেল। চেপে বৃষ্টি এল এক পশলা। রামজীবন দরজা খুলতেই ওরা তাড়াতাড়ি দাঁড়াল এসে ঘরের মধ্যে। হ্যারিকেন উস্কে দিতে দেখা গেল লোকটার গায়ে কয়েদীর পোশাক। ভিজে সর্বাঙ্গে লেপটে গেছে। মেয়েটির পরনে যে শাড়ি তার থেকেও জল ঝরছে। রামজীবন রূঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, কে তোমরা? কি চাই এত রাত্রে?

    লোকটা জোড়হাত করে বলল, আমি মেনাজদ্দি। বাগান থেকে পালিয়েছি আজ সন্ধ্যাবেলা-

    রামজীবন যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মেয়েটি বলল, ও ধরা দেবে, বাবা। ওকে জেলখানায় ফিরিয়ে নাও।

    —ধরা দেবে? তা এখানে কেন? থানায় যেতে বল।

    পোঁটলাসুদ্ধ বাচ্চাটা মেনাজদ্দির হাতে দিয়ে বৌটি বসে পড়ে রামবাবুর পা জড়িয়ে ধরল।

    কান্নার সুরে বলল, ওরা যে খুন করে ফেলবে বাবা!

    খুন না হলেও অভ্যর্থনার মাত্রাটা যে তার কাছ ঘেঁষে যাবে, একথা রামবাবুর অজানা ছিল না। জেলগেটে পাঠালেও বিশেষ তারতম্য হবে না, তাও তিনি জানতেন।

    মেনাজদ্দির দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললেন, পালিয়েছিলি কেন?

    উত্তর দিল তার বৌ—সব কসুর আমার, বাপজান। আমি খবর দিয়েছিলাম, বাচ্চাটা জ্বরে বেহুঁশ। ডাকলে সাড়া দেয় না। বড় ভয় হল। সোনার মার কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লাম—শেষকালে একবার দেখতে পেল না ছেলেটাকে! আমার জ্ঞান ছিল না, বাবা। খবর পেয়েই ও যে পালিয়ে আসবে, বুঝতে পারিনি।

    রামজীবন নিঃশব্দে চেয়ে রইলেন। কি বলবেন ভেবে পেলেন না। বৌটি একটু থেমে আবার বলল, পায়ে তোমার জুতো আছে। সাজা যা দেবার তুমি নিজে দাও। জেল খাটিয়ে নাও যতদিন ইচ্ছা। দোহাই তোমার, থানায় পাঠিও না এই রোগা মানুষটাকে।

    মিনতি-সজল চোখ দুটি তুলে ধরল রামজীবনের দিকে। মুখখানা একেবারে কচি। দারিদ্র্য এবং দুশ্চিন্তায় শীর্ণ স্নান। বোধহয় কল্যাণীর বয়সীই হবে মেয়েটা। দেখতে আরও ছোট দেখায়। ওর মুখের দিকে চেয়ে রামজীবনের হঠাৎ মনে এল একটা নিতান্ত অবান্তর কথা—মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। এবার পাত্রস্থ করতে হবে। তারপর সে চলে যাবে পরের বাড়ি। কত দূরে কে জানে? কতদিন পরে পরে দেখতে পাবেন, তাও অনিশ্চিত।

    মেনাজদ্দির দিকে চেয়ে তিক্তস্বরে বললেন, ব্যাটা, চুরি করেই যদি খাবি, বিয়ে করতে গিয়েছিলি কিসের জন্যে? না না, আমি কিছু করতে পারবো না। এসব পুলিসের ব্যাপার। থানায় খবর দিতে হবে।

    বৌটার কান্না উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। আর কিছু বোধহয় বলতে সাহস করল না। শুধু নত হয়ে আরও জোরে চেপে ধরল রামজীবনের পা দুটো। গভীর রাত্রির অন্ধকারে তারই উপর ঝরে পড়তে লাগল তার বাধাহীন চোখের জল। মেনাজদ্দি বৌকে দেখিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ও আসবার পরে আর চুরি করিনি, বড়বাবু

    —চুরি করিসনি! জেল হল খালি খালি, কেমন? ঝাঁঝিয়ে উঠলেন রামজীবন।

    মেয়েটি মুখ তুলে বললে, সত্যি কথা, বাবা। এবার ও চুরি করেনি। যে রাতে চুরি হল রায়বাবুদের বাড়ি, সেদিন জ্বরে ওর হুঁশ ছিল না। সমস্ত রাত পাখা করে ভোরবেলা একটু ঘুমের মতন দেখে আমিও কাত হয়েছিলাম। পুলিস এসে টেনে তুলল। দারোগা সাহেবকে কত করে বললাম, শুনল না। জ্বরো মানুষটাকে বেঁধে নিয়ে গেল মারতে মারতে। তারপর শুনলাম এক বছর জেল হয়ে গেছে।……আঁচলে চোখ মুছে বলল, এবার ভেবেছিলাম, এ দেশে আর নয়। খালাস হলেই আমরা ফুপার কাছে চলে যাবো। মস্ত বড় গেরস্ত। দু-বেলা তার জমিতে কিষাণ খাটলেও আমাদের তিনটি পেট স্বচ্ছন্দে চলে যায়। …খোদার মরজি।

    দীর্ঘশ্বাস ফেলে রামজীবনের পায়ে হাত রাখল মেনাজদ্দির বৌ। কিছুক্ষণ মাটির দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ মাথা তুলে প্রশ্ন করল, এবারে আবার কদ্দিন সাজা হবে? বা-বা।

    রামজীবন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। প্রশ্নটা তাঁর কানে গেলেও মনে পৌঁছাল না। বললেন, কোথায় থাকে তোমার ফুপা?

    –সে অনেক দূরে। ভাটিতে। দু-দিন দু-রাত লাগে নৌকায়।

    —নৌকাভাড়া কত?

    —তা তো জানি না, বাবা।

    মেনাজদ্দি বলল, চার-পাঁচ টাকা লাগে কেরায়া নৌকায়।

    রামজীবন দু-হাত পেছনে জড়ো করে ঘরময় পায়চারি করলেন কয়েকবার। পাশের ঘরে গেলেন। আবার ফিরে এলেন। একবার উঠে বসলেন খাটের উপর। তারপর নেমে দাঁড়ালেন লোকটার মুখোমুখি। হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, সেখানে গেলে পুলিসের হাত এড়াতে পারবি? খুঁজে ধরে আনবে না?

    মেনাজদ্দির মুখে মৃদু হাসি খেলে গেল। বলল, ভাটিতে? পুলিশের বাবার সাধ্যি কি কাউকে খুঁজে বার করে বড়বাবু। চারদিকে খালি বড় বড় গাঙ্। এ-পার ও-পার নজর পড়ে না! তিরিশ-চল্লিশ কোশ দূরে থানা। কে কার খবর রাখে? ভাটি বড় জবর দেশ।

    রামজীবন আবার পাশের ঘরে ফিরে গেলেন। নিয়ে এলেন নিজের ধুতি, কল্যাণীর একখানা শাড়ী আর ছোট ছেলের গোটা-দুই পুরানো জামা। ধুতিটা মেনাজদ্দির হাতে দিয়ে বললেন, পরে নে এটা। আর ঐ জাঙ্গিয়া-টাঙ্গিয়াগুলো ফেলে দিয়ে আয় খালের জলে।

    কয়েদীটা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল; যেন বুঝতে পারেনি জেলরবাবু কি বলছেন। রামজীবন ধমকে উঠলেন, হাঁ করে দেখছিস কি? কথা কানে যাচ্ছে না?

    কম্পিত হাতে কাপড়টা নিয়ে সে বাইরে চলে গেল। বাকি জামা-কাপড় এবং সেই সঙ্গে একখানা দশ টাকার নোট মেয়েটার হাতে দিয়ে বললেন, ঐ পুলের ধারেই কেরায়া নৌকার ঘাট। দু-এক টাকা বেশী দিলে এখনি রওনা হতে পারবে। ফুপার কাছে চলে যাও। এখানে এসেছিলে, এ কথা যেন কোনোদিন কেউ জানতে না পারে।

    ততক্ষণে মেনাজদ্দি ফিরে এসেছিল। তার দিকে কট্‌ট্ চোখে তাকিয়ে বললেন, বুঝলি তো? সে শুধু শুধু ঘাড় নাড়ল কলের পুতুলের মতো। বৌটি মাথা লুটিয়ে দিল রামজীবনের পায়ের কাছে। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, দোয়া কর, বাপজান। ভালোয় ভালোয় গিয়ে যেন পৌঁছাতে পারি।

    মেনাজদ্দি কি একটা বলতে যাচ্ছিল। রামজীবন আবার ধমক লাগালেন। হ্যারিকেনের মৃদু আলোকে দেখা গেল কয়েদীর চোখদুটো ছলছল করছে।

    বৃষ্টি থেমে গেছে। সমস্ত আকাশময় তার পুনরাগমনের আয়োজন। রামজীবন খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বিদ্যুতের আলোয় মনে হল বউটা ঐ দূর থেকে ফিরে তাকাল। তারপর আর কিছু দেখা গেল না। দরজা বন্ধ করে খাটের উপর স্থির হয়ে বসলেন রামজীবন। কিন্তু মনের ভিতরে চললো অস্থির দ্বন্দ্বের আলোড়ন—দায়িত্বশীল সরকারী কর্মচারী আমি। এ কি করে বসলাম! আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ; সরকারের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা! ছুটে গিয়ে আবার দরজা খুললেন। চিৎকার করে ডাকতে গেলেন, মেনাজদ্দি! ডাকা হল না। চোখের উপর ভেসে উঠলো একটি কচি মেয়ের অশ্রুসজল মুখ। কোলে তার রুগ্‌ণ শিশু। পাশে দাঁড়িয়ে একটা হতভাগ্য কয়েদী। ছেলের অসুখের খবর পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল জেলের বাগান থেকে। তারপর গভীর রাতে বউয়ের হাত ধরে ফিরে এসেছে তারই কাছে ধরা দেবার জন্যে।

    বাকী রাতটুকু আর ঘুম এল না। কখনও বিছানায়, কখনও ঘরের ভিতর ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দিলেন রামজীবন। সকাল সকাল গিয়ে কাজের মধ্যে ডুবে যেতে চেষ্টা করলেন; সে চেষ্টা সফল হল না। থেকে থেকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তে লাগলেন। সহকারী বিজনবাবু বললেন, আপনার কি অসুখ করেছে, স্যার?

    —না, ঠিক অসুখ নয়। শরীরটা তেমন ভাল বোধ হচ্ছে না।

    বিজনবাবু হেসে বললেন, আমাকে দু-দিন ছুটি দিন। বউদিকে নিয়ে আসি গিয়ে। অন্যদিন হলে এর একটা সরস ও সস্নেহ উত্তর দিতেন রামজীবন। আজ শুধু মৃদু হেসে চুপ করে রইলেন। বিজনবাবু বুঝলেন escape-এর ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি ভদ্রলোক। তাই একরকম জোর করেই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।

    আজ সকাল থেকে বৃষ্টি নেই। চারদিকে বর্ষণ-মুক্ত বর্ষার পরিপূর্ণ যৌবনশ্রী। রামজীবন খালের ধারে একটা ক্যাম্প-চেয়ারে পড়েছিলেন। অপরাহ্ণের রৌদ্রমুক্ত আকাশ গাঢ় নীল। এক ঝাঁক চিল উড়ে যাচ্ছিল। সেইদিকে তাকিয়ে মনে হল, আর একটু উঠলেই ওদের ক্লান্ত ডানায় নীল জড়িয়ে যাবে।

    হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন বিজনবাবু।

    —কি খবর?

    —খুব ভাল খবর, স্যার। মেনাজদ্দিটা ধরা পড়েছে। এইমাত্র দিয়ে গেল পুলিস। ধোলাই-এর চোটে ডবল হয়ে গেছে বেটা। চিনতেই পারছিলাম না। অনেক ডাকাডাকি করতে চোখ পিট-পিট করে তাকাল একবার। হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়ে এলাম। বাঁচবে কিনা কে জানে!

    রামজীবন আস্তে আস্তে বললেন, কোথায় ধরা পড়লো?

    —মাইল তিরিশেক দূরে নদীর মধ্যে কোথায়। ঘোড়েল তো কম নয়। বউছেলে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল নৌকো করে। পড়বি তো পড় একেবারে জলপুলিশের মুখে। কাপড়চোপড় বদলে ফেলেছিল; পায়ের কড়াটা খালি খুলতে পারে নি। তাতেই ধরা পড়লো।

    একটু থেমে আবার বললেন বিজনবাবু, পুরোনো চোর; পালাবি, না হয় নিজেই পালা। আবার বউটাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে। ঐ মেয়েমানুষ দেখেই নৌকো থামিয়েছিল পুলিশ।

    রামজীবন তাঁর সহকর্মীর এই সরস কাহিনীতে যোগদান করবার চেষ্টা করলেন। মৃদু হেসে বললেন, বউ-ছেলেও বুঝি ধরে এনেছে ঐ সঙ্গে?

    —আপনিও যেমন—মুখে একটা শব্দ করে বলে উঠলেন বিজনবাবু, বাচ্চাটা পথেই গেছে। মেয়েটাকেও কোথায় সরিয়ে ফেলেছে শুনলাম। ওরা বলছিল, পুরানো চোরের বউ হ’লে কি হয়, দেখতে নাকি খাসা। এরকম তৈরী শিকার হাতছাড়া করবে, অত বোকা ওদের মনে করছেন কেন?

    রামজীবনের কাহিনী যখন শেষ হল বেশ রাত হয়েছে।

    কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কেটে গেল। তারপর বললাম, আপনার চাকরিটা যে এখনও টিকে আছে দাদা, এটা যেন বিশ্বাস করতে পারছি না।

    উনি হেসে বললেন, টিকে আছে শুধু তোমার জন্যে।

    —আমার জন্যে!

    —হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে একদিন দেখা হবে বলে।

    —তা মন্দ নয়। কিন্তু আমার সঙ্গে তো দেখা হল অনেক পরে। তখন যারা ছিল তারা কিছুই জানতে পারেনি?

    —না। তবে পুলিশ চেষ্টার ত্রুটি করেনি। কিন্তু ঐ বি ক্লাসের মুখ থেকে রক্ত বেরিয়েছিল অনেক, কথা বেরোয়নি একটাও।

    বললাম, তাহলে আপনার জীবনের এই গোপন কাহিনীর আমিই কি একমাত্র শ্রোতা।

    —না; আর একজন আছেন।

    –কে সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটি জানতে পারি?

    –তোমার বৌদি।

    সবিস্ময়ে বললাম, বৌদি! বৌদি জানেন সব?

    —হ্যাঁ।

    —কি বললেন শুনে?

    —কিছুই বলেননি। পরে একদিন ঐ প্রসঙ্গ তুলে আপসোস করছিলাম, বড্ড ভুল করেছি। সেদিন ওসব ছেলেমানুষি না করে কয়েদীটাকে যদি পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দিতাম কিংবা কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যেতাম জেলগেটে, এতদিন প্রোমোশনও পড়ে থাকত না, চাই কি সদ্য সদ্য পুরস্কার হয়তো জুটে যেত একটা। শুনে তোমার বৌদি গম্ভীর হয়ে বললেন, “হ্যাঁ; তবে সে পুরস্কার তুমি ভোগ করতে পারতে না।” বলেছিলাম, “কেন?” “ওটা আমার শ্রাদ্ধেই খরচ হয়ে যেত।” “তার মানে?” উনি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, “এ রকম কাণ্ডের পর গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া আমার অন্য কোনো পথ থাকত কি?”

    আমার মুখে আর কোনো কথা যোগাল না। শুধু বললাম, আপনি ভাগ্যবান দাদা। উঠতে যাচ্ছি, কোথা থেকে ছুটে এলেন বৌদি—একি, উঠছেন যে?

    —বাঃ, বাড়ি যেতে হবে না! রাত কত হল খবর রাখেন?

    —আমি খবর খুবই রাখি। আপনাদের যেন হঠাৎ খেয়াল হল মনে হচ্ছে

    কাছে এসে স্বর নামিয়ে বললেন, বর্ষা রাত দেখে খিচুড়ি করছিলাম।

    আমি জবাব দেবার আগেই দাদা সাগ্রহে বলে উঠলেন, খিচুড়ি করেছ নাকি? বৌদির উত্তরে কৃত্রিম রোষ—হ্যাঁ। কিন্তু সে খবরে তোমার কি দরকার? তোমার বার্লি তৈরি হচ্ছে। পাঁচ মিনিট সবুর কর।

    রামজীবনবাবু ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, আমাকে কি আজও বার্লি খেতে হবে? —জ্বরো মানুষ আর কি খেয়ে থাকে?

    দাদা আমতা-আমতা করে বললেন, জ্বরটা যেন নেই বলেই মনে হচ্ছে। মাথাটা তো একদম ছেড়ে গেছে। দ্যাখ তো মলয়, হাতখানা।—বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে।

    রামবৌদির মুখে কৌতুকহাসি ফুটে উঠলো-

    আমি বললাম, তা ঠিকই করেছেন। হাত দেখার কাজটা যোগ্য লোকের হাতেই দিয়েছেন দাদা। আপনার খিচুড়ি পথ্যের ব্যবস্থা আমার মতো ডাক্তার ছাড়া আর কেউ দেবে না, বলে নীরব অনুনয়ের দৃষ্টিতে বৌদির দিকে তাকালাম। উনি হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

  • দুই

    দুই

    –কেমন লাগছে আমাদের দেশ?

    বললাম, মন্দ কি। পাহাড় আছে, সমুদ্রও আছে….

    —কিন্তু বাড়াবাড়ি নেই কোনোটারই, যোগ করলেন কবিরাজ মশাই। চারদিকের মাঠঘাট গাছপালার সঙ্গে ওরাও বেশ মিশে আছে। এ জিনিস কিন্তু আপনার দার্জিলিং মুশৌরীতে নেই, পুরী ওয়ালটেয়ারেও পাবেন না। এটা পাবেন শুধু এইখানে, এই চাটগাঁয়, আপনারা যাকে বলেন মঘের দেশ,—বলে একটা বিচিত্র গড়ন নস্যের ডিবা থেকে দুটি ভীম-টিপ উদ্ধত নাসারন্ধ্রে চালান করলেন। আমার চোখের উপর ভেসে উঠল একটি অতি পরিচিত দৃশ্য—আমাদের ম্যাগাজিন সেন্ট্রী গজাধর সিং রাইফেলের নলে গুলি ভরছে।

    রক্তিমাভ চোখদুটি আমার মুখের উপর তুলে হঠাৎ যেম ধমকে উঠলেন কবিরাজ, আরে মশাই, এই মঘের দেশেরই একদল ছেলেমেয়ে একদিন বাঘের মতো লড়াই করেছিল আপনাদের ইংরেজ প্রভুর সঙ্গে। কংগ্রেসীবাবুদের নিরামিষ চরকাযুদ্ধ নয়, রীতিমত গোলা-বারুদ-বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ। প্রাণ দিয়েছিল, নিয়েও ছিল। তাদের পেছনে ছিল এই চাটগাঁর ইস্কুলের এক নগণ্য অঙ্কের মাস্টার। প্রতিশোধ নেবার পালা যখন এল, ইংরেজ তাকে ভোলেনি। যথারীতি ধরে নিয়ে ঝুলিয়ে দিল আপনার ঐ জেলখানায়।

    কবিরাজমশায়ের উত্তপ্ত কণ্ঠ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন বাইরে অন্ধকারের দিকে। কিছুক্ষণ পরে আবার শুনতে পেলাম তাঁর মৃদু গম্ভীর সুর—যেন কতদূর থেকে ভেসে এল কথাগুলো—চাটগাঁর ‘সূর্য’ অস্ত গেল। সঙ্গে যারা ছিল তারা আজ পচে মরছে দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে কোন্ আন্দামানের অন্ধকূপে। কে জানে, কবে তারা ফিরবে? একেবারেই ফিরবে কিনা, তাই বা কে বলতে পারে?

    কয়েকটি নির্বাক মুহূর্ত কেটে যাবার পর অনেকটা যেন আপন মনে বললেন কবিরাজমশাই, তবু বলবো, জেলে গিয়ে ওরা বেঁচে গেছে। দাঁড়িয়ে দেখতে হয়নি তাদের ঐ একটি দিনের দুঃসাহসের কত বড় মূল্য দিয়েছে তাদের দেশ। জালিয়ানওয়ালাবাগ নিয়ে আপনারা হৈ-চৈ করে থাকেন। কিন্তু খবর রাখেন না, এই চাটগাঁর প্রতি গ্রামে, প্ৰতি শহরে দিনের পর দিন কী পৈশাচিক অত্যাচার চলিয়েছিল একদল জানোয়ার। ডায়ার ওডায়ার নয়, বিদেশী গোরা পল্টন নয়, আমার আপনার জাতভাই তারা। একটা ভদ্র গৃহস্থও রক্ষা পায়নি সে পশুগুলোর হাত থেকে। ছেলেগুলোর গেছে বুকের পাঁজর মেয়েদের গেছে নারী-ধর্ম। আপনারা তো অনেক দেশের ইতিহাস পড়েছেন মশাই,— হঠাৎ দীপ্ত প্রশ্ন করলেন আমার দিকে চেয়ে, দেখেছেন এর তুলনা? স্বাধীনতার দণ্ড আছে জানি, কিন্তু এতখানি বীভৎস দণ্ড পেয়েছে কোনো দেশ, পৃথিবীর কোনো জাত?

    সর্বনাশ! কাকে কি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসলেন কবিরাজমশাই? আমি জেলের লোক। ব্রিটিশ রাজত্বে লীগ সরকারের চাকরি করি। নিছক সন্ধ্যা যাপনের উদ্দেশ্য নিয়ে খোশগল্পের লোভে পা দিয়েছিলাম প্রতিবেশীর বৈঠকখানায়। এমন কামানের মুখে পড়তে হবে জানলে কখনও আসি? ওঁর তীক্ষ্ণ চোখদুটো তখনও আমার মুখের উপর উদ্যত। সেই দিকে একবার চেয়ে কাষ্ঠ হাসি হেসে বললাম, তারপর, এখানে মাছ-টাছ কি রকম পাওয়া যায় কবরেজমশাই?

    —মাছ! চমকে উঠলেন ভদ্রলোক। আস্তে আস্তে তাঁর দৃষ্টি সহজ হয়ে এল। মুখে ভরে উঠল প্রসন্ন সরল হাসি। রাইফেলের নলে আর একবার বারুদ চালিয়ে বললেন, মাছ? হ্যাঁ, তা পাবেন বইকি! সব রকমই পাবেন। তা ছাড়া রয়েছে চাটগাঁর নিজস্ব বস্তু—শুঁটকি আর লইট্টা। রাঁধতে পারলে অতি উপাদেয় খাদ্য।

    বললাম, ঐখানেই তো মুশকিল।

    —কেন?

    —আজ্ঞে, রাঁধতে হলে তাকে ঘরে আনতে হবে তো?

    —অসুবিধা কিসের?

    —অপরাধ না নেন তো বলি।

    —সেকি! অপরাধ নেব কেন! বলুন না?

    —আপনাদের পাঁচজনের কাছে সুখ্যাতি শুনে একটু লোভ হল। গেলাম একদিন শুটকির বাজারে। আধসেরটাক মাল বেশ প্যাক করে নিয়ে যখন বাড়ি ঢুকলাম রাত দশটা বেজে গেছে। গৃহিণী ঘুমিয়ে পড়েছেন। মতলব ছিল, সেই ফাঁকে ডাক্তারবাবুতে আর আমাতে বাইরের ঘরে স্টোভ জ্বেলে—

    জিনিসটা নামাতে-না-নামাতেই নাকে কাপড় দিয়ে উনি এসে উপস্থিত। হাত দিয়ে পোঁটলাটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, আধমাইল দূরে ফেলে দিয়ে বেশ করে সাবান মেখে চান করে এসো লালদীঘি থেকে। মাথা চুলকে বললাম, তুমি এখনও ঘুমোওনি? উনি যেতে যেতে বললেন, মড়া বেঁচে ওঠে ঐ গন্ধে, আর আমার তো শুধু ঘুম!

    কবিরাজমশাই হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা, এ তো গেল শুঁটকি। আর একটার কী খবর?

    —আর একটা মানে লইট্টা? সে ইতিহাস আরও করুণ। চাকরটা একদিন পাতায় করে নিয়ে এসেছিল খানিকটা। দেখেই সে কি বমি! খবর পেয়ে ছুটে এলাম অফিস থেকে। একটু সুস্থ হয়ে বললেন, লোকটাকে আজ‍ই তাড়িয়ে দাও। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? ভীষণ রেগে উঠলেন উনি, কেন আবার! কোত্থেকে একদলা গয়ের তুলে এনে বলছে কিনা মাছ! আমি যেন আর মাছ চিনি না?

    কবিরাজমশাই সস্নেহে বললেন, এই ব্যাপার! আচ্ছা দাঁড়ান। আপনার মুশকিল আসান করে দিচ্ছি,—বলে অন্দরের দিকে ফিরে হাঁক দিলেন, মিনু, মিনু আছিস?

    নেপথ্যে উত্তর এল, যাই বাবা।

    মিনিট দুয়েকের মধ্যে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল একটি গৌরী তরুণী। স্বাস্থ্যে এবং বুদ্ধিতে উজ্জ্বল। কবিরাজ বললেন, মিনু, তোমার কাকাবাবুকে প্রণাম কর। আমাদের বিশেষ বন্ধু। জ্ঞানবাবুর জায়গায় এসেছেন –

    —জানি, বলে মিনু এগিয়ে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। হাসিমুখে বলল, কাকীমার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। জানো বাবা, কাকাবাবু একজন সাহিত্যিক। খুব ভাল লেখেন।

    কবিরাজ বিস্ময় প্রকাশ করলেন, তাই নাকি! কই, সেকথা তো এতক্ষণ বলেননি মশাই? আপনি দেখছি একটি বর্ণচোরা আম!

    বললাম, কিন্তু বড্ড টক।

    —টক না মিষ্টি বুঝতে দিলেন কই? সন্ধ্যা থেকে আমিই তো কেবল আবোলতাবোল বকে মরছি, আর একজন জলজ্যান্ত লেখক চুপ করে বসে আছেন!

    বললাম, লেখকরা তো আর বকে না, লেখে।

    —আর বাজে লোককে বলতে দিয়ে লেখার রসদ যোগাড় করেন, কি বলেন? বলে হাসতে লাগলেন কবিরাজমশাই।

    মিনু বললে, তোমার সামনে কারও মুখ খোলবার উপায় আছে? কি বকতেই পারে!

    —তা যা বলেছিস। ওঃ, হ্যাঁ, তোকে যে জন্যে ডেকেছিলাম, কাকীমার সঙ্গে শুধু ভাব করলে হবে না, ওঁকে আমাদের মাছটাছগুলো রাঁধতে শিখিয়ে দাও। তার আগে, মানে কালই, কাকাবাবুকে নেমন্তন্ন করে খাইয়ে দাও তো তোমার দু-একখানা রান্না। জানেন মলয়বাবু, আমার এই মায়ের হাতের শুঁটকির ঝোল আর লইট্টার বড়া একদিন যদি খান, আপনি জীবনে ভুলতে পারবেন না।

    —হ্যাঁ, তোমার তো সবই বাড়াবাড়ি,—বলে মিনু ভিতরে চলে গেল। বলে গেল, আপনি উঠবেন না কাকাবাবু, আমি চা নিয়ে আসছি।

    মিনু চলে গেলে কবিরাজমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে কদিন হল আপনার?

    —মাসখানেক হল।

    –দেখুন মজা। পাশাপাশি বাড়িতে থাকি। এদ্দিনে আমাদের পরিচয় সবে শুরু হল। তাও, আপনি দয়া করে এলেন বলে। আর ওদের, মানে মিনু আর কাকীমার অবস্থা দেখুন—বলে ভদ্রলোক আবার তাঁর সেই অট্টহাসির ঝড় তুললেন।

    কবিরাজমশাই মিথ্যা বলেননি। আলাপচর্যায় স্ত্রীজাতি চিরকালই অগ্রণী। তার কারণ এ নয় যে সামাজিক সৌজন্যে কিংবা হৃদয়ের ঔদার্যে তাঁরা পুরুষের চেয়ে অগ্রসর। তার কারণ এই যে, বাক্য জিনিসটার গতি পুরুষের বেলায় অন্তর্মুখী আর নারীর বেলায় বহির্মুখী। কথা আমরা হজম করি, ওঁরা বমন করেন। সেই জন্য সংসারে স্ত্রী বক্তা আর পুরুষ শ্রোতা। নারীজাতি দুটি ক্ষেত্রে অমিতব্যয়ী—অর্থ এবং বাক্য, অবশ্য প্রথমটা যেখানে নিজের অর্জিত নয়।

    এই কলকাতা শহরেই দেখতে পাবেন, বোস আর বাঁড়ুজ্জে পঁচিশ বছর ধরে পাশাপাশি বাড়িতে বাস করছেন। কিন্তু একে অন্যের সঙ্গে পরিচয় করেননি। প্রতি সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে আটহাতি ধুতির উপর ফতুয়া চড়িয়ে পরস্পর-সংলগ্ন রোয়াকে বসে স্টীলের কাপে চা পান করতে করতে তাঁরা পরস্পরকে নয়নবাণে বিদ্ধ করেন, কিন্তু বাক্য-সূত্রে স্পর্শ করেন না। ছাদের উপরে যান, সেখানকার দৃশ্য অন্যরূপ। সেখানে বোসজায়া এবং বাঁড়ুজ্জে-গৃহিণী মাধ্যাহ্নিক আহারান্তে কিংবা বৈকালিক প্রসাধনের পর নিজের আলিসার পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড়ি আচার দোক্তা এবং সাংসারিক সুখ-দুঃখের বিনিময় করে থাকেন।

    রেলে করে যাচ্ছেন কোনো দূরের পথে। আপনি এবং আপনার সহযাত্রী চব্বিশ ঘণ্টা পাশাপাশি বসে নিঃশব্দে কাটিয়ে দিলেন। অপাচ্য রেলওয়ে-উপন্যাস চিবিয়ে, ঘুমিয়ে, হাই তুলে রুক্ষ মাঠের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শন করে সময় আর কাটে না। আলাপ করবার ইচ্ছা আছে, কিন্তু বরফ ভাঙতে এগিয়ে এলেন না কেউ। ঠিক পাশে, জেনানা কামরায় চলেছেন আপনাদের ‘সংসারদ্বয়’। তাঁরা কিন্তু প্রথম দৃষ্টিতেই জমে গেছেন, যেন কতকালের চেনা। দুটো স্টেশন পার হতে না হতেই উভয়েই প্রমোশন পেয়েছেন দিদি থেকে ভাই, এবং ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’র কোঠায়। দুজনেই বলছেন, শুনছেন না কেউ। মিলিত কলকণ্ঠের ঝঙ্কারে ডুবে গেছে রেলগাড়ির হুঙ্কার। জংশন স্টেশনে গাড়ি থামলে আপনি নেমে গিয়ে হেঁকে বললেন, সব গুছিয়ে-টুছিয়ে নাও। আর দুটো স্টেশন বাকি। উত্তর পেলেন না। শুনতে পেলেন, ‘উনি’ হেসে বলছেন ‘তিনি’-কে, দেখলে তো ভাই, কি রকম ব্যস্তবাগীশ মানুষ নিয়ে ঘর করতে হয় আমাকে। দুটো স্টেশন পরে নামতে হবে; এখন থেকেই তাড়া দেওয়া শুরু হল।

    তিনি বললেন, আমার উনি আবার এর চেয়েও এককাঠি সরেস। সেবার হল কি জানো ভাই?…

    .

    মিনু চা নিয়ে এল। সঙ্গে কিঞ্চিৎ ‘ইত্যাদি’। বললাম, শুধু চা-ই বরং দাও আজ। বাকী সব আরেক দিন এসে খাবো। অসময়ে কিছু আমার আবার—

    —বেশ তো, বাধা দিয়ে বললেন কবিরাজমশাই, আপনার যা ইচ্ছা করে তাই খান। আমাদের শাস্ত্রে বলে খাওয়া নিয়ে জোর করতে নেই। আচ্ছা দাঁড়ান। একেবারে খালি চা-টা খাওয়া ঠিক হবে না। একটা নতুন উপকরণ দিচ্ছি।

    আলমারি খুলে মারবেল আকারের দুটি গোলাকৃতি কালো পদার্থ আমার ডিসের উপর রাখলেন।

    মিনু বলল, কি জিনিস চিনতে পাচ্ছেন তো?

    একটু লক্ষ্য করে বললাম, কালোজাম বলে মনে হচ্ছে। বহরমপুরে বলে ছানাবড়া। তবে সেগুলো এর চেয়ে বড় বড়।

    দুজনের উচ্ছ্বসিত হাসি।

    একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, তবে কি নারকেলের নাড়ু?

    কবিরাজমশাই বললেন, নাঃ, আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না। এটা হচ্ছে চ্যবনপ্রাশ, বলবীর্য কান্তিবর্ধক, শ্লেষ্মানিবারক।—বলে একটা সংস্কৃত শ্লোক আউড়ে দিলেন।

    মিনু বলল, আমার খাবার তো আপনার পছন্দ হল না। এবার খান চ্যবনপ্রাশ দিয়ে চা।

    বললাম, তা মন্দ নয়। চায়ের সঙ্গে চ্যবনপ্রাশ; বেশ অনুপ্রাস আছে কিন্তু।

    কিছুদিন পরের ঘটনা। কবিরাজমশায়ের বৈঠকখানায় সন্ধ্যাযাপন ইতিমধ্যে প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মজলিসি লোক। জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতার অন্ত নেই। তেমন অপূর্ব তার রসঘন পরিবেশ। সেটা বোধহয় মাঘমাস। জমাট শীত। সন্ধ্যা থেকে গল্পের আসর যেটা বসেছিল সেটাও কম জমাট নয়। ফাঁকে ফাঁকে চলেছে চ্যবন প্রাশ এবং অন্যান্য উপকরণ-যোগে গরম চা। দ্বিতীয়পর্ব শেষ হবার পর আবার জল চড়বে কিনা জানতে এসেছিল মিনু। একজন পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকলেন, সামনে একটা চেয়ার দখল করে কবিরাজমশায়ের দিকে চেয়ে বললেন, মাপ করবেন। অসময়ে বিরক্ত করলাম। আপনার চাকরটিকে একবার ডেকে পাঠান তো।

    কবিরাজমশায়ের বিস্মিত প্রশ্ন—চাকর! মানে বিপিন? তার আবার কি হল?

    —দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে।

    আমার পক্ষে আর বসে থাকা সমীচীন নয়। বললাম, আমি তাহলে উঠি আজকার মতো।

    কবিরাজমশাই বললেন, বসুন না একটু।

    দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে অপ্রসন্ন মুখে বললেন, ওয়ারেন্ট-টোয়ারেন্ট আছে নাকি? যে দিনকাল পড়েছে, কাউকে বিশ্বাস নেই মশাই।

    —একবার ডাকুন না; বলছি সব।

    কবিরাজ অন্দরের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বললেন, বিপিনকে একবার এদিকে পাঠিয়ে দে তো মিনু।

    ভেতর থেকে জবাব এল, বিপিন বাড়ি নেই, বাবা।

    কোথায় গেল?

    —তার মার অসুখ। বিকালের গাড়িতে বাড়ি চলে গেছে।

    —ও, তাই সন্ধ্যা থেকে দেখছি না হতভাগাকে।

    দারোগাবাবু মৃদু হেসে একটু বিদ্রূপের সুরে বললেন, ভারি আশ্চর্য তো, চাকর ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল, আর আপনি সে খবরটা রাখেন না।

    কবিরাজমশাই স্পষ্টত বিরক্ত হলেন। বললেন, এতে আশ্চর্য কি দেখলেন? চাকর- বাকরের খবর মেয়েরাই রাখে।

    —যাক্। আমাদের খবর কিন্তু অন্য রকম। আপনার বাড়িটা একটু সার্চ করতে চাই। এই নিন ওয়ারেন্ট।

    কবিরাজের মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল। শুষ্ক কণ্ঠে বললেন, বেশ, করুন।

    দারোগাবাবু আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে চাইলেন, আপনি—

    পরিচয় দিলাম। উনি আগ্রহের সঙ্গে বললেন, আপনি যখন উপস্থিত আছেন স্যার, witness হিসাবে আমাদের সঙ্গে একটু থাকলে ভালো হয়।

    নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও রাজী হতে হল’।

    ভিতরে ঢুকতেই জানালা দিয়ে নজর পড়ল বাইরে চারদিক ঘিরে লালপাগড়ির ঘন লাইন। একতলাটা তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। তারপর আমরা সদলবলে উপরে উঠে গেলাম। খান তিনেক ঘর। প্রথমটায় থাকেন কবিরাজমশাই। পরেরখানা তাঁর ছেলের। বর্তমানে খালি। মালিক বীরভূমের কোন গ্রামে অন্তরীণ। দুটোতেই দস্তুরমতো পুলিশী তল্লাসী শেষ হল। তৃতীয় ঘরের সামনে যেতেই উনি বললেন, এখানে আমার মেয়ে থাকে। এটাও দেখতে চান?

    সকুণ্ঠ উত্তর এল দারোগাবাবুর, আজ্ঞে এলাম যখন—

    —বেশ। মিনু একটু বাইরে এসো মা। ওঁরা তোমার ঘর সার্চ করবেন। মিনু দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, কেন বাবা?

    —বিপিনটা লুকিয়ে আছে কি না, দেখতে চান।

    মিনু সেইখানে দাঁড়িয়েই বলল, যা খুশী চাইলেই তো আমরা দিতে পারি না বাবা। ওঁদের না হয় লজ্জা-সরমের বালাই নেই, আমাদের তো মান-সম্ভ্রম বলে একটা কিছু আছে। কি বলেন কাকাবাবু?

    বলা বাহুল্য, “কাকাবাবুর” পক্ষে এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই নিরুত্তর রইলাম। উত্তর দিলেন পুলিশ অফিসার। বললেন, লজ্জা-সরম আমরাও একদম খুইয়ে বসিনি, মিস্ সেন। কিন্তু লজ্জা করে ঠকার চেয়ে একটু নির্লজ্জ হয়ে যদি জেতা যায়, সেইটাই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়?

    —তার মানে?

    —মানে, আপনাকে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াতে হবে।

    —যদি না সরি?

    —আমাদের বাধ্য হয়ে সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে, বুঝতেই পারছেন।

    —বেশ, তাই করুন।

    সহজ কণ্ঠ। কোথাও নেই এতটুকু উত্তাপের আভাস। দারোগার দিকে তাকালাম, এবং তার দৃষ্টি অনুসরণ করে চোখ ফেরালাম মিনুর মুখের উপর। শিউরে উঠলাম। মনে হল, একে আমি কোনোদিন দেখিনি। এ মেয়ে নয়, প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা। কোমল নারীদেহ নয়, তার প্রতি অঙ্গ থেকে ঠিকরে পড়ছে ইস্পাতের দীপ্তি এবং দৃঢ়তা। মুহূর্তকাল সেই দিকে চেয়ে নিজের অজ্ঞাতসারে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল ক’টি ভীতিবিহ্বল শব্দ…না-না..

    পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলাম। এগিয়ে এসে সহজ ভাবেই বললাম, এটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না মিনু। ওঁরা বাড়ি সার্চ করতে এসেছেন। সঙ্গে ওয়ারেন্ট আছে। তোমার পক্ষে বাধা না দেওয়াই উচিত।

    —নিশ্চয়ই, সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন জানালেন কবিরাজমশাই, তুই সরে আয় মা। করুক ওঁদের যা খুশি।

    মনে হল মিনুর চোখেও স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে এসেছে। একবার আমার একবার ওর বাবার মুখের দিকে চেয়ে দরজা ছেড়ে চলে গেল।

    দারোগাবাবু সদলবলে ঘরে ঢুকে প্রথমে কোণগুলো দেখলেন। আলনা এবং আলমারির পেছনে উঁকি মারলেন। তারপর খাটের নীচে একবার তাকিয়ে দুজন কনস্টেবলকে হুকুম করলেন, উস্‌মে কোন্ চীজ্‌ হ্যায়, নিকালো!

    ওরা নীচে গিয়ে একটা কম্বলে জড়ানো বাণ্ডিল টেনে এনে ঘরের মাঝখানে বসিয়ে দিল। কম্বলটা খুলে পড়তেই কবিরাজমশাই চমকে চেঁচিয়ে উঠলেন, এ কি! বিপিন!

    পরদিন যথারীতি হাজতি আসামী-রূপে বিপিন আমার আতিথ্য গ্রহণ করল। ওয়ারেন্ট পড়ে দেখলাম, নাম রয়েছে সঞ্জয় চ্যাটার্জী ওরফে বিপিন দাস। চার্জ—আগ্নেয়াস্ত্র সহ ডাকাতি। ঘটনাস্থল—উত্তর ভারতের কোনো বড় শহর। কাল বৎসরাতীত। পুলিশের কোনো কর্তাব্যক্তির মুখে শুনলাম, একটি বিশিষ্ট ধ্বংসধর্মী রাজনৈতিক দলের ইনি অন্যতম পাণ্ডা। একাধিক খুন এবং ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। পুলিশ যথারীতি পশ্চাদ্ধাবন করেও বহুদিন একে কবলস্থ করতে পারেনি। হঠাৎ হয়তো শোনা গেল, বৌবাজারের কালু দপ্তরী লেনের মোড়ে ছলিমদ্দি নামে যে দর্জিটি চমৎকার ট্রাউজার কাটে, উনিই হচ্ছেন স্বনামধন্য সঞ্জয় চ্যাটার্জি। পরদিনই দেখা গেল, দোকান বন্ধ, মালিক রাতারাতি উধাও। আবার কিছুদিন পরে খবর দিলে কোনো গুপ্তচর, কুমিল্লার ফৌজদারী আদালতের বটগাছতলায় যে জ্যোতিষী ঠাকুর মামলাকারীদের হস্তরেখা পরীক্ষা করে জয়-পরাজয় নির্ণয় করেন, এবং সোয়া পাঁচ আনার মাদুলি ধারণের ব্যবস্থা দিয়ে বেশ দু-পয়সা পকেটস্থ করে থাকেন, তিনিই হচ্ছেন সঞ্জয়ের নবতম সংস্করণ। ঊর্ধ্বতন মহলে কথাটা পৌঁছবার আগেই জ্যোতিষীর অন্তর্ধান। এমনি একটা কোনো সূত্রে শেষটায় রিপোর্ট পেলেন চিটাগং ডি. আই. জি. যে, এই বহু-বাঞ্ছিত ব্যক্তিটি কিছুদিন হল, কবিরাজ সদানন্দ সেনের বাড়িতে ভৃত্যরূপে অবস্থান করছেন। এ চাকরির গোপন সুপারিশ এসেছে কবিরাজের ইন্টার্নী পুত্রের কাছ থেকে, এবং মঞ্জুর করেছেন তাঁর তরুণী কন্যা।

    পুলিশ-প্রধানটি বললেন, শিকার এবারেও ফসকে যেত মশাই, আটকে গেছে নেহাত সরকারের কপালগুণে। সেজন্য অবিশ্যি আমাদের বাহাদুরি কিছু নেই। সংসারে এমন শেকল আছে, যা পুলিশের শেকলের চেয়েও শক্ত। তাতেই শেষটায় জড়িয়ে পড়ল সঞ্জয় চাটুজ্জে। শ্রীমতী মিনু সেনের কাছে সেজন্যে আমরা অনেকখানি ঋণী।

    বললাম, কিন্তু আমি যেন শুনলাম, মেয়েটাকে অ্যারেস্ট করছেন আপনারা!

    —আমার দারোগাবাবুদের তাই ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আইনই তো সব নয়। পুলিস হলেও কৃতজ্ঞতা জিনিসটা আমাদের অভিধানেও আছে। তাই ওদের বললাম, মিনু সেনকে দেবার যদি কিছু থাকে সেটা হাতকড়া নয়, ফুলের তোড়া। তাই নিয়ে হাতজোড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে এসো।

    একটু বাঁকা দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বললেন, কেউ সাহস করছে না এগোতে। কাজটা আমাদের হয়ে আপনিই করুন না। আপনার তো বেশ যাতায়াত আছে শুনতে পাই। শ্রীমতীও নাকি আপনার খুব ভক্ত!… Congratulations! বলে আমার ডান হাতে গোটাকয়েক ঝাঁকানি দিয়ে পুলিশ-প্রধান নিষ্ক্রান্ত হলেন।

    সরকারের খাতায় যে পরিচয়ই থাক, জেলের মধ্যে বিপিন দাস একেবারে নির্ভেজাল বিপিন দাস। সেই চাকরদের মতো হাঁটু পর্যন্ত তুলে কোমরে গুঁজে কাপড় পরা। খালি গা, গলায় তুলসীর মালা। চোখে সদা-শঙ্কিত দৃষ্টি। জোড়হাত করেই আছে, জেলর সাহেব থেকে মেট সাহেব পর্যন্ত সবার কাছে। বড় জমাদার মজিদ খাঁ তো হেসেই খুন। এ কী রকম স্বদেশী আসামী! পুলিসের তো খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই! এ নাকি আবার ডাকাতি করে, বোমা ছোঁড়ে, পিস্তল চালায়! যত সব—

    তবু পুলিসের রিপোর্ট মতো সেল-ব্লকেই রাখতে হয়েছে বিপিনকে। সেখানে সে সিপাই-জমাদারদের ফাই-ফরমাস খাটে, ইয়ার্ড ঝাঁট দেয়, ঘরে ঘরে জল তোলে, ছোটখাট ‘স্বদেশী’ বাবু বা অন্যান্য ‘ডিভিশন’ বাবু যাঁরা আছেন, তাঁদের কাপড় কাচে, জুতো ব্রুশ করে, বিছানা ঝেড়ে মশারি খাটিয়ে দেয়। বুট পট্টি পাগড়ী খুলে সিপাই বাবাজীরা যখন তাদের দ্বিপ্রাহরিক আয়াস উপভোগ করেন, বিপিন তার সঙ্গে যোগ করে নিপুণ হাতের পদসেবা কিংবা দলাই-মলাই। আয়াস থেকে আসে আরাম, এবং তার থেকে নিদ্রা।

    কথাটা আমার কানে গেল, এবং সিপাই-বাহিনীর এই সুখনিদ্রা আমার অনিদ্রার কারণ হয়ে দাঁড়াল। বিপিন সম্বন্ধে তাঁরা যতখানি নিশ্চিন্ত হতে লাগলেন, আমার দুশ্চিন্তা বেড়ে উঠল ততখানি। আমি যে জানি, দেখে এবং ঠকে শিখেছি, এই শ্রেণীর মহাজনদের এটাই সনাতন-পন্থা। এমনি করে যাদের বশে ওঁদের ওঠা-বসার কথা, তাদেরই একদিন বশ করে কোথা দিয়ে ওঁরা নিঃশব্দে সরে পড়েন, কেউ জানতে পারে না। এর বেলায় যদি তেমন কিছু ঘটে, অর্থাৎ সঞ্জয় চ্যাটার্জি যদি অকস্মাৎ প্রাচীর লঙ্ঘন করেন, আমার চাকরিটিও যে তার সহগামী হবে, তাতে আর সন্দেহ নেই। এতদিনের এবং এত কষ্টের অর্জিত ধন হাতছাড়া হলে, সরকারের হাতে আমারও ছাড়া নেই। অতএব সেই কর্তাব্যক্তিটির শরণ নিলাম। বললাম, এ বোঝা তো আমারও নয় আপনারও নয়। কতদিন আর আমার ঘাড়ে চাপিয়ে রাখবেন? পাঠিয়ে দিন না যাদের জিনিস তাদের কাছে— সেই কোন্ হরিদ্বার না কানপুর। একটু ঘুমিয়ে বাঁচি।

    উনি চিন্তান্বিত মুখে বললেন, ঘুম আমারও চলে গেছে, মিস্টার চৌধুরী। খবর পেয়েছি, গোপন পথে চিঠি-চলাচল শুরু হয়ে গেছে।

    চমকে উঠলাম, বলেন কি?

    —হ্যাঁ, তবে এখনও মনে হচ্ছে একতরফা। শ্রীমান লেখক আর শ্রীমতী পাঠিকা। উল্টো স্রোত যখন বইবে, অর্থাৎ শ্রীমতী যখন লেখিকার রোল নেবেন তখনই ভাবনার কথা। তার আগে যেমন করে হোক্, পাপ বিদায় করতেই হবে। আমার তরফে চেষ্টার ত্রুটি নেই, এটুকু জেনে রাখুন।

    বিরক্তির বোঝা নিয়ে ফিরলাম এবং অফিসে এসেই ডেকে পাঠালাম বিপিন দাসকে। সেই গবেটমার্কা চাকরের মুখোশ পরে জোড়হাত করে দাঁড়াল এসে আমার অফিসের জানালায়। জমাদারকে সরিয়ে দিয়ে বললাম, আপনাকে বুদ্ধিমান লোক বলে জানতাম, কিন্তু এসব কি হচ্ছে সঞ্জয়বাবু?

    এমনি ধারা সোজাসুজি চ্যালেঞ্জ ও বোধহয় আশা করেনি। তাই প্রথমটা একটু ইতস্তত করল। সে শুধু কয়েক সেকেণ্ড। পরক্ষণেই মুখের উপর যখন দৃষ্টি ফেললাম, বিপিন দাস মিলিয়ে গেছে, ফুটে উঠেছে সঞ্জয় চ্যাটার্জি। মাথাটা একপাশে একটু হেলিয়ে মৃদু হাসির সঙ্গে বলল, আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না জেলরবাবু।

    —বুঝতে ঠিকই পারছেন। এ শুধু না বোঝার ভান। নিজে ডুবেছেন, ডুবুন। ঐ মেয়েটাকে ডোবাচ্ছেন কেন? আপনার পথ আর ওর পথ তো এক নয়।

    জবাব এল স্থির গম্ভীর কণ্ঠে, এর উত্তর আজ আপনাকে দিতে চাই না, মিস্টার চৌধুরী। যাবার দিন দিয়ে যাবো। আজ শুধু এইটুকু বলবো, আপনি নিশ্চিন্ত হোন। আপনাকে বিব্রত বা বিপন্ন করবার মতো কোনো কিছুই আমি করিনি এবং করবো না।

    কোনো কোনো মানুষের কথার মধ্যে যাদু থাকে, গল্পে পড়েছি। কারও কারও বলবার এমন একটা ভঙ্গি আছে, যা শ্রোতাকে মোহগ্রস্ত করে, এটাও ছিল শোনা কথা। আজ দুটোকেই প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করলাম। সেদিন ঘটনার পর থেকে মিনুর উপর মনটা অপ্রসন্ন হয়ে ছিল, হঠাৎ কেমন মায়া হল মেয়েটার উপর।

    কবিরাজমশাইয়ের বৈঠকখানায় আমাদের সান্ধ্যআসর সেদিন আপনিই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে আসর যে আবার কোনোদিন খুলবে এ আশাও অবশ্য ছিল না। মেয়েমহলের সম্পর্কটাও অনুরূপ হবে, এটাই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়েছিলাম। তাই সেদিন সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফিরে যখন দেখলাম আমার রান্নাঘরের বারান্দায় মিনু আর তার কাকীমা বেশ আগের মতোই জমিয়ে বসেছেন, বিস্মিত না হয়ে পারিনি। কিন্তু তার মধ্যে অণুমাত্র পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেল না। আমি বাড়ি ঢুকতেই কলকণ্ঠে বলে উঠল, কই, আপনাকে তো আজকাল আর দেখতে পাই না কাকাবাবু!

    ঠিক সহজ ভাবে উত্তর দিতে পারলাম না। আমতা আমতা করে বললাম, বড্ড কাজ পড়েছে কদিন হল।

    —হ্যাঁ! সন্ধ্যার পরে আবার কাজ কিসের আপনার?

    এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বসবার ঘরে চলে গেলাম। মিনু উঠে এল আমার পেছনে পেছনে। কাছে এসে বলল, বাবা বড্ড মুষড়ে পড়েছেন। আপনি এমনি করে যাওয়া বন্ধ করলে তো চলবে না।

    একটুখানি চিন্তা করে বললাম, তুমি আমার ওপর রাগ করোনি মিনু?

    —ওমা, রাগ করবো কেন?

    —একটু ঘুণাক্ষরেও যদি জানতে পেতাম, তা হলে—

    —তাহলে কী? আমাকে সরে যেতে বলতেন না, এই তো? কিন্তু আপনি জানেন না কাকাবাবু, সেদিন আমাকে, আর শুধু আমাকে নয়, পুলিশ যাকে ধরতে এসেছিল, তাকে আপনি কতখানি রক্ষা করেছেন।

    —রক্ষা করেছি! আমি?

    —হ্যাঁ, আপনি। আমার কি ছাই মাথার ঠিক ছিল? আপনি না বললে আমি দরজা ছেড়ে কিছুতেই যেতাম না। আর ঐ পুলিশের লোকটাও ঠিক তাই চাইছিল।

    —বল কি!

    —হ্যাঁ। ওর ঐ সাপের মতো চোখদুটোর দিকে একবার তাকিয়ে তা আমি বুঝেছিলাম।

    —কিন্তু তুমি ভুল করনি তো?

    —না কাকাবাবু, ওখানটায় কোনো মেয়েই কোনদিন ভুল করে না।

    আমি চুপ করে সেদিনকার দৃশ্যটার উপর মনে মনে চোখ বুলিয়ে গেলাম। মিনু বলল, ওরা যখন আমার গায়ে হাত দিত, একবার ভেবে দেখুন কি করতেন আপনি, কি করতেন বাবা, আর কি করতো সে, যাকে ধরবার জন্যে ওদের এত তোড়জোড়! তখনও সে খাটের নীচে কম্বল মুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকত, এটা নিশ্চয়ই আশা করতে পারেন না। কিন্তু তারপর? মাগো! ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। দারোগার কোমরে পিস্তল ছিল। এতবড় সুযোগ সে নষ্ট করত না।

    মিনু চোখ বুজল। তার সমস্ত শরীরটা কেঁপে উঠল কয়েকবার। একবার ভাবলাম বলি, যে পরিণাম কল্পনা করে তুমি এমন করে শিউরে উঠছ, সেটা তো ওঁর জীবনের আকস্মিক ঘটনা নয়, যে-কোনো মুহূর্তেই আসতে পারে।

    কিন্তু সেই বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে এই রূঢ় সত্যটা মুখ থেকে বেরোল না।

    .

    দিন কয়েক পরেই খবর এল বিপিন দাসকে কানপুরে চালান দেবার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে। দিনক্ষণও স্থির হয়ে গেল। যাবার আগের দিন আমার একজন অফিসার এসে বললেন, বিপিন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

    —বেশ তো, আসতে বলুন।

    অফিসারটি একটু ইতস্তত করে বললেন, একা আসতে চাইছে। বলা যায় না হয়তো কনফেশন করার মতলব। অত বড় Inter-Provincial case-এর আসামী, একটু বাজিয়ে দেখবেন স্যার। যদি কিছু বের করা যায়, মোটা রিওয়ার্ডের সম্ভাবনা রইল।’

    হেসে বললাম, “তাই যদি হয়, আপনি বঞ্চিত হবেন না, সতীশবাবু।’

    ভদ্রলোক চলে গেলেন। ওঁর চোখের ভিতর খুশি আর লোভ একসঙ্গে জ্বল-জ্বল করে উঠল।

    বিপিন আমার টেবিলের উপর একখানা খামে-আঁটা চিঠি রেখে বলল, আপনার সেদিনকার প্রশ্নের উত্তর।

    শিরোনামটায় চোখ বুলিয়ে বললাম, কি রকম! প্রশ্ন করলাম আমি, আর উত্তর পাবে শ্রীমতী মিনতি সেন?

    —চিঠিটা ওরই। কিন্তু দেবার আগে আপনি একবার পড়ে দেখবেন। আসামীদের চিঠি সেন্সর করতে হয় তো, আমার বেলায় সে কাজটা না হয় আপনি নিজেই করলো মিস্টার চৌধুরী, বলে হাসতে লাগল।

    চিঠিখানা পকেটস্থ করলাম।

    অনেকদিন পরে আবার হানা দিলাম কবিরাজমশায়ের বৈঠকখানায়। নতুন চাকর বহাল হয়েছে। বলল, কাকে চাই?’

    —যাকে হোক ডেকে দাও।

    —বাবু তো বাড়ি নেই।

    —দিদিমণি আছে তো, তাকেই ডাকো।

    লোকটা আমার সর্বাঙ্গে চোখ বুলোতে লাগল—সাধুভাষায় যাকে বলে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ। এমন সময় ঘরে ঢুকল মিনু।

    —ওমা কাকাবাবু, কখন এলেন? বসুন, চা নিয়ে আসছি।

    —চা পরে হবে। তোমার একটা চিঠি আছে।

    —আমার চিঠি! কে দিলে?

    —পড়লে বুঝতে পারবে।

    বন্ধ খামখানা তার হাতে দিলাম। লেখাটার উপর চোখ পড়তেই কে যেন একরাশ সিঁদুর মাখিয়ে দিল গৌরবর্ণ মুখের উপর। আমার দিকে চোখ না তুলেই তাড়াতাড়ি ভিতরে চলে গেল।

    চা এল চাকরের হাতে। একটু একটু করে দশমিনিট ধরে কাপটা শেষ করলাম। উঠতে যাবো, এমন সময়ে সে এল। সদ্যধোয়া চোখমুখ লক্ষ্য করলাম। তার উপর একটি চেষ্টাকৃত ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলে চিঠিখানি আমায় দিয়ে বলল, আপনি পড়েছেন?

    বললাম, পরের চিঠি; অনুমতি না পেলে পড়ি কি করে?”

    ~অনুমতি তো লেখকই দিয়ে গেছেন। শুধু অনুমতি নয়, অনুরোধ। আপনি পড়ুন। আমি আসছি।—

    বলে বেরিয়ে গেল। চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলাম—

    মিনু,

    সেদিন তুমি জানতে চেয়েছিলে, আমাদের দীক্ষার মন্ত্র কি? আজ সে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। আমাদের একটিমাত্র মন্ত্র। তার প্রথম এবং শেষ হল—দেশ। ব্যক্তি আমাদের কাছে মিথ্যা, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ অর্থহীন। বন্ধন নেই, আকর্ষণ নেই। পেছন ফিরে তাকানো আমাদের গুরুতর নিষেধ। তবু যে আজ যাবার আগে নিজের কথা শোনাতে বসেছি, তার কারণ জানতে হলে চিঠিটা তোমাকে শেষ করতে হবে।

    মাকে হারিয়েছিলাম যখন আমার বয়স সাত! ভাইবোন কেউ ছিল না। পরের বাড়িতে অনাদরে মানুষ। সংসারের যে একটা কোমল দিক আছে, যেখানে মানুষ ভালবাসে, ভালবাসা পায় তার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। কৈশোর থেকে আমি বিপ্লবী। যে জীবন বেছে নিয়েছি, তার একটি মাত্র রূপ। সে রূপ কর্তব্যে কঠোর, প্রতিজ্ঞায় নির্মম। স্নেহ প্রীতি দয়া মায়া আমাদের বিদ্রূপের বস্তু। নারী আমাদের কাছে দুর্বলতার প্রতীক। তাকে এড়িয়ে চলতে হবে; এই হল আমাদের creed।

    আমাদের জীবনের বেশীর ভাগ কেটেছে পাহাড়ে জঙ্গলে, উন্মুক্ত আকাশ-তলে। শুধু কাজ আর কাজ। দিনরাতগুলো ভারী প্রোগ্রাম দিয়ে ঠাসা। ইঁটের মতো নিশ্ছিদ্র নিরেট। পথে-বিপথে, গৃহ-জীবনের ছায়ায় যখন এসেছি, মেয়েদের কাছে পেয়েছি প্রাণপূৰ্ণ আতিথ্য এবং সাগ্রহ আশ্রয়! পেয়েছি স্নেহ, প্রীতি, শ্রদ্ধা। যাবার সময় দেখেছি কারও ম্লানমুখ, কারও বা চোখের জল। কিন্তু মনের ওপর ছাপ পড়েনি কোনোদিন। সঞ্চয় করিনি কিছুই। যা পেয়েছি দিনান্তে, নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে চলে গেছি। এই ছিল আমার জীবনের ধারা। সে-ধারা বদলে গেল, যেদিন এলাম তোমাদের বাড়ি। তোমার দেখা যখন পেলাম, কি মনে হল জানো? মনে হল, আমার মধ্যে কোথায় একটা অভাব ছিল, এতদিনে সেটা পূর্ণ হল। যা পেলাম, তারই জন্যে যেন অপেক্ষা করেছি সারা-জীবন। সে যেন এক পরম সম্পদ, যে আজ মিটিয়ে দিল আমার সকল দৈন্য, ভরে দিল আমার সকল শূন্যতা।

    তবু ভাবছি, এ দেখা যদি আমাদের না হত! আমি যে বিপ্লবী। আমার পথ চিরন্তন ধ্বংসের পথ। সে পথে শুধু রক্ত, শুধু হিংসা, শুধু মৃত্যু। সেখানে তো অমৃতের স্থান নেই। তোলার এ মহাদান সেখানে ব্যর্থ হয়ে গেল, যেমন করে ব্যর্থ হয় মরুভূমির বুকে বৃষ্টিধারা। হৃদয়-পাত্র উজাড় করে যা দিলে তাকে গ্রহণ করবো আমি কি দিয়ে? অঞ্জলিভরে যা নিলাম, তাকে রাখি এমন পাত্র কোথায়?

    তোমায় তো বলেছি, মিনু, নেবো বললেই কি সব জিনিস নেওয়া যায়? তার জন্যে সাধনা চাই। সে সাধনা আমি কোনোদিন করিনি। তাই, যে-কথা বারংবার বলেছি, যাবার আগে আর একবার বলে যাই—তুমি যা অকাতরে দিয়েছ তাকে গ্রহণ করবার অধিকার আমার নেই, তার মর্যাদা দেবার যোগ্যতা আমি অর্জন করিনি। যা আমার প্রাপ্য নয়, অনায়াসে পেয়েছি বলেই, তার উপর লোভ করা চলে না। এইখানেই তার শেষ হোক, এই কামনা জানিয়ে গেলাম।

    কাল আমি যাচ্ছি।

    ইতি—সঞ্জয়

    পুনশ্চ—চিঠিখানা তোমার হাতে দেবার আগে মিস্টার চৌধুরীকে পড়ে দেখতে অনুরোধ করেছিলাম। সম্ভবত সেটা তিনি করবেন না। তোমার পড়া হলে তাঁকে দিও।

    —স।

    চিঠি শেষ হল। মিনুর তখনও দেখা নেই। অগত্যা আর একবার পড়লাম। ততক্ষণেও সে এল না। পাশের ঘরটা ওর পড়বার ঘর। সেখান থেকে যেন একটা চাপা কান্নার সুর কানে এল। কে কাঁদে? মাঝখানে ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলাম। আমার ঠিক সামনে টেবিলের উপর মাথা রেখে লুটিয়ে পড়ে আছে একটি মেয়ে। একরাশ এলোচুল ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে, ঢেকে গেছে সমস্ত টেবিলখানা। রুদ্ধ কান্নার দুর্বার উচ্ছ্বাসে দুলে-দুলে উঠছে তার দেহ। চিঠিখানা ফিরিয়ে দেওয়া হল না। যেমন নিঃশব্দে এসেছিলাম, তেমনি নিঃশব্দে বেরিয়ে চলে এলাম।

  • তিন

    তিন

    দেড়গজি ফদটার উপর আর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ‘বুঝিয়া পাইলাম’ বলে সই করে দিলাম। তিনদিন ধরে অবিরাম চলেছে এই চার্জ আদান-প্রদান-পর্ব। দাতা—প্রাজ্ঞ এবং সিনিয়র জেলর রায়সাহেব বনমালী সরকার। গ্রহীতা—তাঁর এই অজ্ঞ এবং অ্যাকটিনি জুনিয়র, বাবু মলয় চৌধুরী। শুরু থেকেই উনি আমাকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, ‘বেশ করে দেখে শুনে মিলিয়ে নেবেন, মশাই। এর পরে যেন বলে বসবেন না, এটা পাইনি আর ওটা পাইনি!’ অতএব এই তিনদিন ধরে দেখছি শুনছি এবং মেলাচ্ছি। ঘানিঘরের কয়েদী থেকে রসদ-গুদামের বস্তা, ডেহরির ষাঁড় থেকে পোলট্রির আণ্ডা। আলাদা ইনচার্জ আছেন প্রতি বিভাগে। নিজ নিজ এলাকাভুক্ত সবকিছুর জন্য তাঁরা দায়ী। কিন্তু তার দ্বারা এই বিশাল কারা-সম্পত্তির উপর জেলরের যে সর্বময় দায়িত্ব, তার খণ্ডন হয় না। সুতরাং ওজন কর পেঁয়াজ আর পাঁচফোড়ন, গুনে নাও রসুইখানার খুন্তি আর গোসলখানার মগ।

    ফর্দের একটা নকল পকেটস্থ করতে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন রায়সাহেব—’ওঃ হো! আসল বস্তুটাই তো আপনাকে বোঝানো হয়নি।’ -বলে হাঁক দিলেন, ‘রতিকান্ত!’ অফিসের পেছনদিকে একটা ছোট্ট ঘর থেকে বেরিয়ে এল এক কৃষ্ণমূর্তি। ছায়ামূর্তি বললেই চলে। হাড়ের ফ্রেমের ওপর চামড়ার খোলসটা জড়াবার আগে মাঝখানে যে একটা মাংসের প্লাস্টার দিয়ে নেওয়া দরকার, সে কথা বোধ হয় ভুলে গিয়েছিলেন ওর বিধাতাপুরুষ। সে অভাব পূরণ করেছে পিঠের উপর একটা মস্ত বড় কুঁজ। ঝুঁকে পড়া দেহটাকে আরও খানিক নুইয়ে ডবল প্রণাম ঠুকল রতিকান্ত। তারপর যুক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল হুকুমের অপেক্ষায়। রায়সাহের বললেন, এটি আপনার খাস্ বয়, বেয়ারা, বাহন একাধারে সব। টেবিল ঝাড়বে, ফাইল গোছাবে, এটা ওটা এগিয়ে দেবে। কাজের লোক, তবে কাজটা মাঝে মাঝে একটু বেশী করে ফেলে। যে চিঠিটা ডাকে দেওয়া দরকার, সেটা তাকে তুলে রাখে, আর কালো কালির দোয়াতে ঢেলে দেয় লাল কালি।

    প্রশংসা শুনে রতিকান্তর মুখের ওপর একটি সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল। বললাম, তোমার নামটি তো বেশ।

    হাসি আকর্ণ বিস্তৃত হল। বিগলিত কণ্ঠে বলল রতিকান্ত, ‘আজ্ঞে, ওটা আমার গুরুদেবের দেওয়া। আগে নাম ছিল ভজহরি।

    গুরুদেবের রসজ্ঞানের তারিফ করে বললাম, বেশ, বেশ, তারপর জেল হল কিসের জন্যে।

    —৩৭৯, আর কি! উত্তর করলেন রায়সাহেব। রতিকান্তের মাথাটা নুইয়ে পড়ল মাটির দিকে।

    প্রশ্ন করলাম, কী চুরি করেছিলে?

    মৃদু কণ্ঠের কুণ্ঠিত উত্তর—গরু।

    জেলের অধিবাসী যারা, তাদেরও একটা সমাজ আছে। তার বিভিন্ন স্তর। স্তরভেদের মাপকাঠি হল ক্রাইম অর্থাৎ কৃত অপরাধের জাতি এবং গুরুত্ব। কুলীন-পাড়ায় থাকেন খুন, তহবিল তছরূপ, Criminal breach of trust কিংবা ‘স্বদেশী’ ডাকাতি। চুরির স্তর তার অনেক নীচে। সবার নীচে সবার শেষে সবহারাদের মাঝে যার বাস তার নাম গরুচোর। শুধু হরিজন নয়, অভাজন। চোর হলেও এরা চোর জাতির কলঙ্ক। স্বজাতির আসরেও হুঁকাবন্ধ। এই জন্যে জেলে এসে এরা সহজে মুখ খোলে না। আমার এক সহকর্মী ছিলেন। কয়েদী খালাস দেবার সময় নাম ধাম বিবরণ ইত্যাদি মেলাবার পর তিনি সবাইকে একটি প্রশ্ন করতেন—’কী চুরি?’ যাদের অপরাধ চুরি নয় তারা সগর্বে উত্তর দিত, খুন, ডাকাতি, কিংবা নারীহরণ। যারা চুরি সেকশনে দণ্ডিত, তারাও বলত টাকা চুরি, কাঁঠাল চুরি কিংবা অন্য কিছু। একবার এমনি এক ৩৭৯ কিছুই বলতে চায় না। জেলর সাহেব নাছোড়বান্দা। টেবিল চাপড়ে গর্জে উঠলেন, কী চুরি?

    —আজ্ঞে, গরুর বিষয়ে।

    রতিকান্তকে দেখলাম একটি বিরল ব্যতিক্রম। জেলে ঢুকবার কয়েক দিনের মধ্যেই তার কৃতিত্বটুকু বন্ধু-সমাজে প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। বলেছিল, যাই বল ভাই, তোমাদের ঐ টাকাকড়ি বাক্স প্যাট্রার চেয়ে আমার এই চার-পা-ওয়ালা মাল পাচার করা অনেক সোজা। তাছাড়া ঝামেলাও কত কম! সিঁদ কাটা নেই, তালাভাঙা নেই; গেরস্তের ঘরে ঢুকে প্রাণটি হাতে করে ইষ্টনাম জপ করা নেই। সোজা গোয়ালে গিয়ে দড়িটা খোল, তারপর হাঁটা দাও। রাতটা কোনো রকমে কাবার হলে আর তোমাকে পায় কে? ধরা পড়ার কথা বলছ? ওসব কপালের লেখা। শাস্তরে বলেছে, দশদিন চোরের, একদিন গেরস্তের।

    এহেন অকপট স্বীকারোক্তির পর গাঁজা, বিড়ি কিংবা ‘দশ পঁচিশে’র গোপন আড্ডায় রতিকান্তের ঠাঁই পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। সে গল্প শুনলাম রায়সাহেবের মুখে। এক রবিবার উনি ফাইল দেখছেন। একজন মাতব্বর গোছের কয়েদী সেলাম জানালো, ‘নালিশ আছে হুজুর।’

    —কি নালিশ?

    —আমাকে ১৩ নম্বর থেকে আর কোথাও সরিয়ে দেবার হুকুম দিন।

    —কেন?

    —বড্ড চোর-ছাঁচড়ের আড্ডা, বলে আড়চোখে তাকাল রতিকান্তের দিকে। রায়সাহেব তার টিকেট লক্ষ্য করলেন, ৩৮১ ধারা। বললেন, তুমি কী করেছিলে?

    —আজ্ঞে, মনিব মাইনে দেয়নি বলে ঘড়ি নিয়ে চলে গিয়েছিলাম।

    —ও-ও, সেটা বুঝি চুরি নয়?

    —চুরি হতে পার স্যার, কিন্তু গরু-চুরি নয়।

    জেলর সাহেব এই ঘড়ি নিয়ে প্রস্থানকারীর নালিশ মঞ্জুর করেন নি। যদিও বুঝেছিলেন তার নালিশটা নেহাত লঘু নয়, এবং তার পেছনে রয়েছে ‘জনমতের’ সমর্থন। কয়েকদিন পরেই সেটা স্পষ্ট হল, এবং রতিকান্ত নালিশ জানাল, তাকে অন্য জেলে চালান দেওয়া হোক। বেচারার বেগতিক অবস্থা বিবেচনা করে রায়সাহেব তাকে জেলরের খাস্ ফালতুর ছাপ দিয়ে নিয়ে এলেন নিজের অফিসে এবং রাতে শোবার ব্যবস্থা করে দিলেন ‘সেল’ ব্লকে।

    চার্জ নেবার তিন-চার দিন পর। বিকেলবেলা অফিসের টেবিলে বসে কাজ করছি, পায়ের উপর ঠাণ্ডা একটা কি ঠেকতেই ভয়ে লাফিয়ে উঠলাম। সাপটাপ নয় তো? টেবিলের নীচে থেকে সাড়া এল, আমি রতিকান্ত, হুজুর।

    —ওখানে কি করছিস হতভাগা?

    —আজ্ঞে একটু পদসেবা। সে-হুজুরের করতে হত কিনা রোজই—

    থাক, এ-হুজুরের করতে হবে না। দয়া করে বেরিয়ে এসো।

    রতিকান্ত বিস্মিত হল। এ বিস্ময় লক্ষ্য করেছি আমার সহকর্মী মহলেও—শুধু বিস্ময় নয়, স্থানবিশেষে বিদ্রূপ, নব্যতন্ত্রের ‘লোক দেখানো উদারতা’র উপর কটাক্ষ। বৈকালিক অফিস ঠিক অফিস নয় জেলবাবুদের। দেহে নেই ইউনিফর্মের নাগপাশ, মনে নেই ব্যস্ততার বোঝা। অর্ধনিমীলিত নেত্রে আরাম-কেদারায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে বিশ্বস্ত কয়েদীর হাতে নিপুণ চরণদলন কিংবা পক্ককেশ উত্তোলন—তখনকার দিনে এই ছিল সিনিয়র অফিসারদের নিত্য বরাদ্দ। আমরা সে রসে বঞ্চিত হয়ে গেলাম। হায়রে কবে কেটে গেছে পদসেবার কাল!

    কিছুদিন আগে রতিকান্তের অর্ধমেয়াদ শেষ হয়েছে। মাঝে মাঝে দেখি টিকেটখানা হাতে করে আমার সামনে বিনা কারণে ঘুরে যায়। একদিন বললাম, কিরে রতিকান্ত কিছু বলবি?

    মাথা নীচু করে দু-চারবার ঢোক গিলে বহু সঙ্কোচে জানাল, বড় ডিটি-বাবুকে টিকিট দেখিয়েছিলাম। বললেন, ‘মেট’-এর হক হয়েছে।

    কয়েদীজীবনে ‘মেট’ পদলাভ বহু আকাঙ্ক্ষিত সৌভাগ্য। বললাম, মেট হতে চাস? জবাব দিল না। শীর্ণ মুখখানা শুধু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    –তোর এই চেহারা। কয়েদীরা তোকে মানবে কেন?

    —মানবে না কেন? হঠাৎ উত্তেজনায় একটা শকারাদি শব্দ উচ্চারণ করতে যাচ্ছিল, দাঁতে জিব কেটে থেমে গেল।

    রতিকান্তকে মেট-পদে প্রমোশন দেওয়া গেল। ডেপুটি জেলর বিনয়বাবু বললেন, আপনার রতিকান্তের কুঁজ বোধহয় আর রইল না, স্যার।

    —কি রকম?

    —মেট হবার পর সে রীতিমত বুক টান করে হাঁটবার চেষ্টা করছে।

    সেটা আমিও লক্ষ্য করেছিলাম। দেখলাম, বেল্টা খালি কোমরে ঢলঢল করে বলে গামছা জড়িয়ে তার ওপর বেল্ট্ এঁটেছে। নিত্য পালিশের ফলে চক্‌চক্ করছে তার পিতলের চাপরাস।

    জেলের বাইরে যেসব কয়েদী কাজ করে, তাদের প্রত্যেকটা গ্যাঙ্ বা দফার জন্যে অন্তত একজন ‘মেট’ চাই। বাইরে যাবার অধিকার সকলের নেই। যেতে পারে শুধু তারাই, যাদের বাকী দণ্ডকাল একবছর অথবা তার কম! বড় বড় জেলে যেখানে স্বল্প- মেয়াদী লোকের সংখ্যা বেশী নয়, বাইরে যাবার যোগ্য মেট মাঝে মাঝে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে। একদিন দেখা গেল জেলরের ‘কুঠিতে যে সব কয়েদী বাগানে এবং ‘জলভরি’র কাজ করে তাদের মেট নেই। সবগুলো মেট-এর টিকেট পরীক্ষা করে বড় জমাদার এসে জানাল, বাইরে যাবার হক্ আছে শুধু একজনের।

    জিজ্ঞাসা করলাম, কে সে?

    —আকা রোতিকান্ত।

    রতিকান্তের দিকে তাকালাম। অফিসের কোণে বসে সে আমার স্যাম্রাউন বেল্টে পালিশ লাগাচ্ছিল। একটিবার চোখ তুলেই হঠাৎ দ্বিগুণ বেগে বুরুশ চালনা শুরু করল। বললাম, কিরে, পারবি?

    উঠে দাঁড়িয়ে জোড়হাত করে বলল, হুজুরের দয়া।

    ‘মেট’-এর চেহারা দেখে গৃহিণী তো হেসেই খুন। বললেন, এ ঘিয়ে-ভাজা কুঁজো দিয়ে কাজ চলবে না বাপু।

    আমি বললাম, ‘রসে-ভেজা যদ্দিন না পাচ্ছ, ঘিয়ে ভাজা দিয়েই চালিয়ে নাও।

    —কী যে বল! ঐ কুঁজ নিয়ে পাহারা দেবে কি গো! সব কয়েদী পালিয়ে যাবে। বললাম, সে ভয় নেই। পালাতে গেলেই কুঁজে আটকে যাবে।

    আমার একটা নিজস্ব ফুলের বাগান ছিল। তার ভার পরেছিল ব্যক্তিগত ভাবে মেটের উপর। আগে যে ছিল, সে নিজে হাতে সব কাজ করত। তাই শুনে রতিকান্তও লেগে গেল কোদাল শাবল খুরপি নিয়ে। একদিন দেখলাম, তার কোদাল চালানোর কসরত দেখে বাগানের পাশে ভিড় জমে গেছে। সিপাই বেটন দেখিয়ে থামাতে পারছে না। জটলার আড়ালে তার দু-একটি কয়েদী পাছে নিঃশব্দে মিলিয়ে যায়, এই ভয়েই সে সন্ত্রস্ত। বেগতিক দেখে বাগান পরিচর্যার দায় থেকে রতিকান্তকে রেহাই দিতে হল। গৃহিণীকে ডেকে বললাম, ওর আর বাগানে গিয়ে দরকার নেই, বাড়ির ভেতরেই করুক যাহোক কিছু।

    —হ্যাঁ, করবার তো ওর কতই আছে! শ্লেষের সঙ্গে বললেন গিন্নী, বারান্দায় বসে রাস্তার লোক গুনুক না। অনেক উপকার হবে।

    বারান্দাতেই আশ্রয় নিল রতিকান্ত, এবং সেই সুযোগে আমার সাত বছরের কন্যা মঞ্জু ওকে দখল করে বসল। মায়ের সংসারে অকেজো হলেও মেয়ের সংসারের কাজে- অকাজে তার আর ফুরসত রইল না।

    মাসখানেক বাদে যোগ্য মেট জুটে যেতেই রতিকান্তকে আসতে হল আবার সেই অফিস-ফালতুর কাজে। কিন্তু যে গিয়েছিল সে আর ফিরে এল না। অফিসের সেই ছোট্ট কোণটি তার হারিয়ে গেছে। আগের মতো সেইখানে এসেই সে বসল, নিজেকে বাঁধতে চাইল পুরানো দিনের সব কিছুর সঙ্গে। কিন্তু কোথায়, কি করে যেন ছিঁড়ে গেছে একটা তার; কিংবা মনের মধ্যে দেখা দিয়েছে কোনো বাঁধনের সূত্র। তাই কথায় কথায় তার ত্রুটি, পদে পদে তার ভুল। টেবিলের একটা দিক ঝাড়া হয় তো, আর একদিকে ধুলো লেগে থাকে। কুঁজোয় জল ভরা হয় না। সন্ধ্যাবেলা ধুনো দেবার কথা মনে করিয়ে দিতে হয়। একদিন বলল, শরীরটা ভাল ঠেকছে না, বাবা। একটু হাসপাতালে যেতে চাই। টিকিটে লিখে দিলাম হাসপাতালে যাবার নির্দেশ। দু-দিন পরে ফিরে এসে বলল, ভালো লাগল না। ডাক্তারকে বলে একটু দুধের ব্যবস্থা করে দিলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সেটাও সে নিয়মিত আনতে ভুলে যায়। কদিন পরে দেখি সাপ্তাহিক ফাইলে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁ-হাতে টিকেট। ডান-হাত ঝুলছে দেহের পাশ দিয়ে।

    —কি চাই?

    —একখানা চিঠি দিন, হুজুর। মেয়েটার খবর পাচ্ছি না অনেক দিন।

    রতিকান্তের ঘরসংসারের বালাই নেই, এইটাই জানা ছিল। এই প্রথম শুনলাম তার একটি মেয়ে আছে। সাত আট বছরের। মামাদের কাছে থাকে। টিকিটের পাতা উল্টে দেখলাম, চিঠিপত্রের আদান বা প্রদান, কোনোটারই কোনো চিহ্ন নেই। জিজ্ঞেস করলাম, মেয়ের খবর দেয় না তারা?

    —কেই দেয়?

    —তুই নিসনি কেন এতদিন?

    কোনো উত্তর নেই। লিখে দিলাম চিঠি লিখবার অনুমতি।

    ছ-মাস এবং তার বেশী সাজা নিয়ে যারা জেলে আসে, মাসে মাসে তারা খানিকটা করে মাপ পায়, যার নাম ‘রেমিশন’। ওরা বলে ‘মার্কা’। মার্কার পরিমাণ নির্ভর করে প্রার্থীর কাজ এবং চালচলনের উপর। এর জন্য আবেদন-নিবেদনের অন্ত নেই। সকলেই চায় যতটা বেশী মার্কা পেয়ে খালাসের দিনটা যতখানি এগিয়ে আনা যায়। রতিকান্ত খোদ জেলরের আফিস-মেট। মার্কা লাভের সুযোগ এবং সুবিধা, তার সব চেয়ে বেশী। এজন্য কয়েদী মহলে সে সার্বজনীন ঈর্ষার পাত্র। কিন্তু এ সুবিধার সৎ বা অসৎ ব্যবহার সে কোনোদিন করেনি। সপ্তাহান্তে প্যারেড দেখতে গিয়ে মার্কার আবেদন শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে, রতিকান্ত সেখানে অনুপস্থিত।

    সেদিন অফিসে গিয়ে বসতেই টেবিলের উপর চোখ পড়ল, রতিকান্তের টিকেট। বললাম, এটা এখানে কেন? যথারীতি নিরুত্তর।

    —কি চাই বল না?

    —কটা দিন বকশিশ্ দেবেন, হুজুর!

    বিস্মিত দৃষ্টিতে চাইলাম ওর দিকে। অনেকটা যেন কৈফিয়তের সুরে বলল রতিকান্ত, মেয়েটাকে দেখবার জন্য মনটা বড় ছটফট করছে।

    পুরো ‘মার্কা’ পেয়ে দিন পনেরো পরে রতিকান্তের খালাসের দিন স্থির হয়ে গেল। একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি, তুমুল কাণ্ড। মঞ্জুর দোলখাওয়া মেমসাহেবটি নিরুদ্দেশ! মেয়ে কেঁদে বাড়ি মাথায় করছে আর তার মা যে-ভাবে পা ফেলে বেড়াচ্ছেন, বাড়িটা যে-কোন মুহূর্তে আমাদের মাথায় পড়তে পারে। শুনে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। সুন্দর পুতুলটি। একটা স্প্রিং-লাগানো ছোট্ট চেয়ারে ফুটফুটে একটি মেম বসে। চাবি ঘোরালেই সবসুদ্ধ দোল খেতে থাকবেন; আর তার সঙ্গে দুলিয়ে দেবেন শিশু-দর্শকের সমস্ত হৃদয়। মঞ্জুর শোকটা যেন কত তীব্র, অনুভব করতে চেষ্টা করলাম। বাড়িতে একদল কয়েদী। স্বাভাবিক নিয়মে চুরির সন্দেহ তাদের উপরেই পড়বে। বড় জমাদার যথারীতি সবাইকে কিঞ্চিৎ পুরস্কার দিলেন। কিন্তু মেমসাহেব উদ্ধার হল না। মঞ্জুর মা বললেন, এ নিশ্চয় সেই কুঁজোটার কাণ্ড!

    আমি মৃদু প্রতিবাদ জানালাম, তা কেমন করে সম্ভব? সে তো ছিল সেই কতদিন আগে!

    —হ্যাঁ। সেই তখনই সরিয়ে ফেলেছে। মেয়ের কি খেয়াল ছিল নাকি অ্যাদ্দিন? আজ হঠাৎ খোঁজ পড়েছে, আর নাকে-কান্না শুরু হয়েছে।—বলে গৃহিণী এক মোক্ষম ধমক লাগালেন মেয়েকে! ফলে নাকে-কান্নার পর্দা চড়ে গেল এবং তার মধ্যেই শোনা গেল তার প্রতিবাদ, কখোনো না। কুঁজো মেট খুব ভালো। সে কখনো আমার মেমসাহেব নেয়নি।

    অগত্যা সন্দেহজনক দুজন কয়েদী এবং সেই সঙ্গে বর্তমান মেটটিকেও দল থেকে সরিয়ে অন্য কাজে দেওয়া হল।

    নির্ধারিত দিনে সকাল আটটায় রতিকান্ত খালাস হয়ে গেল। তাকে দেওয়া হল একদিনের খোরাকি ছ’আনা, তার গন্তব্য স্টেশনের একখানা রেলের পাস, আর ভালো কাজ দেখানোর বক্‌শিশ্ দু’টাকা। যাবার সময় ভিড়ের মধ্যে নজরে পড়ল তার সেই পেটেন্ট প্রণাম, হাতে কাপড়-চোপড়ের একটা ছোট পুঁটলি।

    বেলা তখন নটা। অফিসের পুরো মরসুম। নিঃশ্বাস ফেলবার অবসর নেই। গেটের বাইরে কিসের একটা গোলমাল শোনা গেল! আমার নতুন মেটটা এসে জানাল, রতিকান্তকে ধরে এনেছে সিপাইরা।

    —কেন!

    —চোরাই মাল পাওয়া গেছে ওর পুঁটলির মধ্যে।

    অফিস থেকে বেরিয়ে দেখলাম, জেলফটকের সামনে ভিড় জমে গেছে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে কুঁজো রতিকান্ত। একজন পালোয়ান সিপাই শক্ত করে ধরে রয়েছে তার একটা হাত। আমাকে দেখে একবার মুখ তুলে তাকাল। চোখে পড়ল, কপালের পাশে খানিকটা জায়গা ফুলে উঠেছে। গালের উপর কালশিরের দাগ। পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের বড় জমাদার। ডান হাতে বেটন, বাঁহাতে একটা পুতুল। বীরদর্পে এগিয়ে এসে বিজয়-উল্লাসে জানাল, উসকো গাঁটরিসে নিকালা—খোকী বাবাকা মেসার্।

    পুরোপুরি ব্যাপারটা শোনা গেল সেই পালোয়ান সিপাইয়ের কাছে। গেট থেকে বেরিয়ে রতিকান্ত যখন রাস্তার দিকে না গিয়ে আমার বাগানের দিকে যাচ্ছিল, তখনই তার কেমন সন্দেহ হয় এবং লুকিয়ে তার অনুসরণ করতে থাকে। তারপর বাগানের ধারে একটা গাছের গোড়ার মাটি সরিয়ে এ জিনিস বের করে যেমনি পুঁটুলির মধ্যে ভরা, সিপাই ছুটে গিয়ে হাতে হাতে ধরে ফেলেছে।

    আমার সহকর্মী বিনয়বাবু মন্তব্য করলেন, ‘আমি আগেই বলেছি স্যার, ব্যাটার ঐ কুঁজ হচ্ছে আসলে একটা শয়তানির বস্তা। ওকে ভালোরকম শায়েস্তা করা দরকার।’ সে বিষয়ে কারও ভিন্ন মত আছে বলে মনে হল না। অপেক্ষা শুধু আমার হুকুমের। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা গেল। সামনের লোকজন ঠেলে বেরিয়ে এল আমার কন্যা মঞ্জু। বড় বড় চোখ করে একবার তাকিয়ে দেখল সবদিকটা। তারপর ছুটে গিয়ে বড় জমাদারের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল তার মেমসাহেব। রতিকান্তের হাতের মধ্যে সেটা গুঁজে দিয়ে বলল, টুনিকে দিও। বলো, মঞ্জু দিয়েছে। অ্যাঁ?

    উত্তরের অপেক্ষা না করে, আর কোনো দিকে না চেয়ে ছুটে মিলিয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে।

    রতিকান্তের মুখে এতক্ষণ কোনো বিকার ছিল না। চোখ দুটোও ছিল শুষ্ক। এবার তার কুৎসিত শুকনো তোবড়ানো গাল দুটোও কুঁচকে কেঁপে উঠল। তারই সঙ্গে দু-চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে এল জলের ধারা।

  • চার

    চার

    পুলিশ আর জেল সমগোত্র হলেও সমধর্মী নয়। লক্ষ্য হয়তো এক, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন। এঁরা ঘাঁটেন কাঁচামাল, আমাদের গুদামে থাকে তৈরী raw materials জিনিস! ওঁদের ভাগে আমাদের finished products। পুলিসের কাজ হচ্ছে মাল সংগ্রহ করা, নানা জায়গা থেকে নানা রকম মাল। তাকে ঝেড়ে পিটিয়ে চালান করেন কোর্ট নামক ফ্যাকটরিতে। তারপর সেই বকযন্ত্রে শোধন করে finishing ছাপ দিয়ে গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে আসেন জেলের দরজায়। আমরা মাল খালাস করি, সাজিয়ে গুছিয়ে ঘরে তুলি, কাজে লাগাবার চেষ্টা করি। তারপর পুরানো হয়ে গেলে ফেলে দিই রাস্তায়।

    সেখানে কতগুলো পচে, কতগুলো হারিয়ে যায়, কতগুলো আবার ঘুরে ফিরে পুলিসের গাড়ি চড়ে ফিরে আসে আমাদের গুদামে। পুলিসের সঙ্গে এই হল আমাদের সম্পর্ক। ওদের যেখানে সারা, আমাদের সেখানে শুরু।

    এমনি করে একদিন একটা বড় রকম পুলিস-অভিযানের জের টানবার জন্যে আমার বদলি হল এক মস্ত বড় সেন্ট্রাল জেলে। দাঙ্গা হয়ে গেছে তিরিশখানা গ্রাম জুড়ে। পাইকারি ভাবে চলেছে খুন, জখম, লুণ্ঠন, আগুন আর নারীমেধ যজ্ঞ। সব শেষ হবার পর যথারীতি পুলিসের আগমন। গোটাকয়েক অনাবশ্যক গুলিবর্ষণ। তারপর ভরে গেল জেলখানা। গিয়ে দেখলাম, “লআপ টোটাল” কয়েকশ’ থেকে একলাফে ছাড়িয়ে গেছে দু-হাজার। রীতিমত রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন। সকালে যাই, বাড়ি ফিরি বেলা দেড়টায়। আবার বিকালে যাই, ফিরে আসি রাত দশটায়। বাকি রাত যেটুকু, তারও ফাঁকে ফাঁকে বাড়ির দরজায় এসে হুঙ্কার দেয় গেট-ফালতু, ‘এক লরি আসামী আয়া হুজুর।’ কিংবা হয়তো রিপোর্ট দেয় কোনো জমাদার, ‘বারো নম্বরমে একঠো মর্ গিয়া।

    অতিরিক্ত অফিস বসেছে কাপড়ের গুদামে। কম্বলের গাঁট হটিয়ে পড়েছে চেয়ার টেবিল। একটা ছোট কামরায় ঠাসাঠাসি আমরা তিনজন অফিসার। মাঝখানে জাঁকিয়ে বসেন আমাদের সিনিয়র ফৈজুদ্দিন সাহেব। দু-পাশে আমরা দুজন জুনিয়র। কাগজপত্রের স্তূপ যা-কিছু আমাদের দিকে; দাদার সামনে ফাঁকা। উনি হস্তদন্ত হয়ে ফিরে আসেন। দু-চারটে হাঁক-ডাক দিয়ে লাঠিখানা নিয়ে ঢুকে পড়েন জেলের মধ্যে। কয়েক ঘণ্টা পরে ব্যস্ত হয়ে ফেরেন। ‘কোথায় গিয়েছিলেন দাদা?’ ‘একজিকিউটিভ করে এলাম খানিকটা। তোমাদের মতো কলম হাতে করে আড্ডা দিলে কি আর জেল চলে?”

    দু-চারদিনেই জানা গেল দাদার ‘একজিকিউটিভ’-এর এলাকা হল রসদগুদাম কিংবা হাসপাতাল। কর্মতালিকা চা এবং সিগারেট যোগে খোসগল্প কিংবা টাটকা সিরাপের সরবত পান। তখন আমরাও মাঝে মাঝে ‘একজিকিউটিভ্’ শুরু করলাম এবং দাদার সামনে কিছু কিছু ফাইল জমতে শুরু হল। একদিন এমনি একটা ফাইল খুলে আমার দিকে চেয়ে বললেন, এ কি! লুনাটিক ফাইল আমার টেবিলে কেন? পাগল-টাগল সব তুমি। বললাম, আমি পাগল! তা আপত্তি নেই? প্রতিভাবান ব্যক্তি মাত্রেই পাগল।

    রসিকতাটা মাঠে মারা গেল। উনি খানিকক্ষণ শূন্য চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, আহা, তোমাকে পাগল বলবো কেন? বলছিলাম, পাগলের ফাইল তুমি ডিল করবে। ওটা জুনিয়ারের কাজ।—বলে আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন বাণ্ডিলটা।

    প্রতি জেলকেই একদল পাগল পুষতে হয়। তাদের ক্রিয়া-কলাপ যেমন বিচিত্র, আইন কানুনের মারপ্যাচগুলোও তেমনি জটিল। পাগলের আবার শ্রেণীভেদ আছে। যে-কোনো জেলের সেল্ ব্লকে গেলে দেখতে পাবেন, ছোট ছোট কতকগুলো সাইন-বোর্ড ঝুলছে—Non-criminal lunatic। অর্থাৎ যাকে crime বলে, সে-রকম কোনো অপরাধ তারা করেনি। করেছিল শুধু পাগলামি, এবং সেইটাই তাদের জেলে আসবার কারণ। আমি কোনোদিন ভেবে পাইনি, এই কারণটা কি আমার আপনার সবার বেলাতেই প্রযোজ্য নয়? সংসারে Non-criminal lunatic নয় কে? তবে বলতে পারেন, সবাইকে তো আর জেলে জায়গা দেওয়া যায় না। তাই পুলিস যেখান সেখান থেকে দু-চারটা স্যামপল সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দেয় জেলখানায়। সেখানে একবার যারা ঢোকে, তাদের নিস্তার নেই। এই সেল্-এ বসে বসেই একদিন বদ্ধ পাগল হয়ে তারা রাঁচীর রাস্তা ধরে।

    আর একরকম পাগল আছে। তাদের নাম criminal lunatic। অর্থাৎ শুধু lunatic নয়, তার সঙ্গে আবার criminal। পাগলামি ছাড়াও তাদের নামে আছে একটা কোনো আইন-ভঙ্গের অভিযোগ, ঝুলে আছে Penal Code-এর কোনো ধারা। এদের আবার দুটো দল। কেউ আগে পাগল পরে criminal, কেউবা আগে criminal পরে পাগল। ফৈজুদ্দিন সাহেব বললেন, কেসটা আমি মোটামুটি দেখেছি। খুন করেছিল মেয়েটা। দ্যাখ তো, কোন্ সেকশনে কমিট্ করেছে। ৪৭১ না ৪৬৬?

    ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললাম, ওটা কী বলছেন দাদা? Greek?

    —আহা বুঝতে পারছ না! পাগল খুনী না খুনী পাগল?

    হতাশ সুরে বললাম, নাঃ; গ্রীক নয়, হিব্রু।

    দাদা কাজের লোক, ঠাট্টা তামাশা পছন্দ করেন না। গম্ভীর ভাবে বললেন, কাজকর্ম তো আর শিখতে আসনি? খালি ফাঁকি আর ফক্কড়ি। পড় পড়, ভাল করে পড়ে দ্যাখ। বলে উনি লাঠিখানা নিয়ে যথারীতি একজিকিউটিভ করতে বেরিয়ে পড়লেন।

    ফাইল খুলে প্রথমেই নজরে পড়ল, আসামীর নাম। মল্লিকা গাঙ্গুলী। বেশ নামটি তো? মনে মনে পড়লাম কয়েকবার। চেহারাটা কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম। দীর্ঘাঙ্গী তরুণী। মাথায় বিপর্যস্ত কেশভার; চোখে উদ্‌ভ্রান্ত দৃষ্টি; মুখখানা দিনশেষের মল্লিকা ফুলের মতো শুভ্র-মলিন। খুন করেছিল কেন? হয়তো খুলতে পারেনি জীবনের কোনো জটিল গ্রন্থি, মেটাতে পারেনি অন্তরের কোনো গভীর দ্বন্দ্ব। মনটা উদাস হয়ে উঠল। কোন্ এক অ-দৃষ্টা অপরিচিতা রহস্যময়ী নারীর বিধ্বস্ত জীবনের সঙ্গে কেমন একটা একাত্মতা অনুভব করলাম।

    তথ্য যেটুকু পেলাম অতিশয় সংক্ষিপ্ত এবং অতিমাত্রায় সরল। তার মধ্যে ফৈজুদ্দিন সাহেবের প্রশ্নের উত্তর হয়তো ছিল, কিন্তু উত্তর পায়নি বৃদ্ধা পৃথিবীর সেই চিরন্তন জিজ্ঞাসা—মানুষ খুন করে কেন? কী সেই দুয়ে প্রবৃত্তি যার তাড়নায় তার বুকে জাগে নর-রক্ততৃষ্ণা, চোখের পলকে অসাড় হয়ে যায় তার অনন্ত কালের মানবধর্ম—দয়া, মায়া, স্নেহ, প্রেম; হাজার বছরের সংস্কৃতি দিয়ে গড়া যে সভ্য মানুষ, তাকে এক নিমেষে করে তোলে নখী দন্তী শৃঙ্গী?

    আইন যে-টুকু দেখে, যে-টুকু দেখে তার বিচার করে সে শুধু তার বাইরের রূপ, তার কাজ, তার হাত-পায়ের অভিব্যক্তি,—তুমি এই করেছ, এই করনি। এই করা এবং না- করার অন্তরালে তার যে চিররহস্যাবৃত অন্তর্লোক, সেখানে বিচারকের দৃষ্টি পৌঁছায় না।

    নথিপত্র থেকে পাওয়া গেল, মল্লিকা খুন করেছিল। তারপর পুলিশের হাতে যখন গিয়ে পৌঁছল, তখন সে আর প্রকৃতিস্থ নয়। বিকৃত মস্তিষ্কের বিচার চলে না। অভিযোগের মর্ম সে বুঝবে না। তার বিরুদ্ধে নিজেকে সমর্থন করবার যে মনন-শক্তি, সেটাও তার নেই। সিভিল-সার্জেনের মতে she is not fit to stand her trial। তাই মামলার শুনানি স্থগিত রেখেছেন জজসাহেব। এই বিকৃতি যদি কোনোদিন কেটে যায়, ফিরে আসে তার মানসিক সাম্য, সেদিন আবার তাকে গিয়ে দাঁড়াতে হবে বিচারশালায়, গ্রহণ করতে হবে তার প্রাপ্য দণ্ড। তাকে সুস্থ, স্বাভাবিক করে তুলবার জন্যে যা কিছু প্রয়োজন, সে দায়িত্বও সরকারের। তাই জজসাহেব মামলা স্থগিত রেখেই তাঁর কর্তব্য শেষ করেননি, সেই সঙ্গে আদেশ দিয়েছেন তার উপযুক্ত চিকিৎসার। মল্লিকার গন্তব্যস্থল রাঁচী উন্মাদাশ্রম। সেখানে যতদিন তার স্থান নির্দিষ্ট না হয়, তাকে জেলে থাকতে হবে। রাঁচীর পথে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে তাই এই কারাবাস।

    গত ছ-মাস ধরে মল্লিকার দিন কেটেছে কলকাতার কোনো বড় জেলে, জেনানাফাটকের একটা ছোট নির্জন কামরায়। সেখানকার যা কিছু সবারই উপরে ছিল তার নীরব ঔদাসীন্য। কাউকে সে কোনো প্রশ্ন করেনি, কারও কোনো প্রশ্নের জবাবও দেয়নি। সঙ্গিনীদের কাউকে সে চিনত না। তাদের বিরাগ এবং অনুরাগ উভয় ক্ষেত্রেই ছিল সে সমজ্ঞান। তারপর একদিন একটি নতুন মেয়ে ভরতি হল। কোলে তার দু-তিন মাসের শিশু। তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে মা গিয়েছিল নাইতে কিংবা খেতে। ফিরে এসে দেখে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে তার মুখের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাগলী। সর্বনাশ! মেয়েটির চিৎকার শুনে ছুটে এল সবাই। শিশুটিকে যখন কেড়ে নিল ওর কোল থেকে, মল্লিকা শুধু তাকিয়ে রইল নিষ্পলক চোখে, তারপর নিঃশব্দে উঠে গেল তার সেই ছোট্ট সেলটিতে। মা নালিশ জানাল জেলর সাহেবের কাছে। কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হলেন। মল্লিকার জন্যে নিযুক্ত হল স্পেশাল গার্ড—তার সেল-এর দরজা বন্ধ রইল উদয়াস্ত। তাতেও নিশ্চিন্ত হতে না পেরে শেষটায় তাকে সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলেন আমাদের জেলে। এখানে মেয়েদের ওয়ার্ডে বাচ্ছা ছেলে নেই।

    কদিনের মধ্যেই সে এসে গেল। ঘোড়ার গাড়ির দরজা খুলে যখন নামানো হল জেল গেটের সামনে, একবার তাকিয়ে দেখলাম, চারদিকে যারা ছিল, সব যেন পাথর হয়ে গেছে। দেখলাম, আমাদের কল্পনা কত দীন, কত ভীরু! আসল বস্তুর কাছে ঘেঁষতেও সে ভয় পায়। আর দেখলাম, বিধাতার হাতের অনির্বচনীয় সৃষ্টি যে রূপ, মানুষের হাতের অনাদর অবহেলা তাকে কী দুর্গতির মধ্যেই না নিয়ে যেতে পারে! ছেলেবেলায় দেখেছি, আমাদের দেশের বাড়ির বৈঠকখানার সামনে ছিল একটা ডালিম গাছ। ফাল্গুনে তার সর্বাঙ্গে ছেয়ে যেত বর্ণোজ্জ্বল ফুলের মালা। বৈশাশে শাখা পল্লব নুয়ে দিত রসপুষ্ট ফলের ভার। একবার কোথা থেকে একঝাঁক ভীমরুল এসে তার ডালে বাসা বাঁধল। আমাদের একজন অতি-বিজ্ঞ অভিভাবক ভীমরুল তাড়াবার জন্য একদিন সেই ফলে ফুলে ভরা ডালিম গাছে আগুন ধরিয়ে দিলেন। মনে আছে, ইস্কুল থেকে ফিরে সেই পোড়া ডালগুলোর দিকে চেয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। দেশ ছেড়ে আসবার পরেও অনেক দিন যখন-তখন তার কথা মনে পড়ত। তারপর ভুলে গিয়েছিলাম। আজ এতকাল পরে মল্লিকা গাঙ্গুলীর দিকে চোখ পড়তেই সেই দগ্ধ-পল্লব, ভ্ৰষ্টশ্রী ডালিমগাছটি আমার চোখের উপর ভেসে উঠল।

    আমাদের মেয়ে-ওয়ার্ডার মানদা বিশ্বাস মল্লিকার বাহু ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে এল আমার অফিসে। একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বললাম, বসুন। সে বসল না। দীর্ঘায়ত নীলাভ চোখদুটো তুলে একবার শুধু তাকালে আমার দিকে। বিস্মিত হলাম! এ তো উন্মাদের উদ্‌ভ্রান্ত দৃষ্টি নয়। শান্ত সমাহিত দুটি চোখ। তার অন্তরালে যেন লুকিয়ে আছে কতকালের পাথরচাপা কান্না। সে পাথর যদি সরে যায়, বেরিয়ে আসে অবরুদ্ধ অশ্রুধারা, হয়তো বিশ্বসংসার ভেসে যাবে।

    মানদা তার জামা কাপড় গয়না-গাঁটির নাম বলে যাচ্ছিল, ওয়ারেন্টে যে তালিকা আছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে নেবার জন্যে। বাধা দিয়ে বললাম, ‘ও সব থাক, তুমি ওকে নিয়ে যাও।’

    পরের সপ্তাহে Noon Duty-র ভার পড়ল আমার ভাগে। এখানে একটু বলে রাখা দরকার, নুন-ডিউটি নয়, মাধ্যাহ্নিক বিশ্রাম। তার স্থান গৃহ নয়, অফিস—এইটুকু শুধু তফাত, কিন্তু অফিস হলেও গৃহসুলভ আরাম-ব্যবস্থার ত্রুটি নেই। ‘আমদানি সেরেস্তার’ লম্বা টেবিলখানা তক্তাপোশে রূপান্তর লাভ করবে। তার উপর রচিত হবে তাকিয়া এবং সতরঞ্চি সহযোগে পরিপাটি শয্যা। গরমের দিনে মাথার উপর ঘূর্ণমান পাখা। শীতের দিনে সদ্য গাঁটভাঙা কম্বল। ফাঁকা অফিস। চারিদিক নিঝুম। নির্বাধ নিদ্রার মনোরম পরিবেশ। কালেভদ্রে কোনো-কোনো দিন দু-একটা টেলিফোন্-ঝঙ্কার কিংবা কোর্ট- পুলিসের হুঙ্কার–আসামী আয়া হুজুর।’ এ সব উৎপাত থাকলেও আমাদের দাদারা এই নুন-ডিউটি নামক বস্তুটিকে মোটামুটি পছন্দ করতেন। কারণ—প্রথমত তিনখানা ঘর আর তার তিনগুণ বাচ্চা-কাচ্চাওয়ালা সরকারী কুঠি দিবানিদ্রার প্রশস্ত স্থান নয়। দ্বিতীয়ত স্বামীদের দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা কোনো স্ত্রীই প্রসন্ন চোখে দেখেন না। তাঁরা মনে করেন, ওটা গৃহিণী জাতির একচেটে অধিকার। দুপুর বেলা একটু গড়িয়ে নেবার প্রয়োজন যদি কারও থাকে সে তো ওঁদেরই, সংসারের চাকায় যাঁরা ঘুরপাক খাচ্ছেন উদয়াস্ত। অফিস-নামক আড্ডাখানায় যারা কাজের নামে ঝিমোয় কিংবা আসর জমায় খোসগল্পের, বাড়িতে এসে তারা নাক ডাকবে, এ অন্যায় সইবে কে?

    আমি তখনও ‘দাদা’ পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি। সঙ্গিনীহীন শয্যায় অভ্যস্ত হতে কিছুটা বিলম্ব ছিল। Noon Duty সপ্তাহটা উৎপীড়ন বলে মনে হত। সেদিনও তাই অপ্রসন্ন মনে সতরঞ্চি-শয্যায় এপাশ-ওপাশ করছিলাম। জেলগেটের ভেতরদিকের ফটকে তুমুল গণ্ডগোল। পুরুষের সঙ্গে নারী-কণ্ঠের মিশ্রণ। গিয়ে দেখি খণ্ড-প্রলয়ের সূচনা। একদিকে বিপুল গুম্ফ গেটকীপার, আর এক দিকে অনলচক্ষু ফিমেল ওয়ার্ডার। কী ব্যাপার? গেটকীপার জবাব দিল না। অঙ্গুলি নির্দেশ করল মানদা বিশ্বাসের উদরের দিকে। চাদরের সযত্ন-আবরণ ভেদ করে সেখানকার বিপুল স্ফীতি অন্ধ ব্যক্তিরও নজরে পড়তে বাধ্য। বিস্মিত হলাম। মানদা চিরকুমারী এবং উত্তর-চল্লিশ। তবু বলা যায় না, এ হেন নারীর জীবনেও অকাল বসন্তের আবির্ভাব ঘটতে পারে। কিন্তু তার এই ফলাফল রাতারাতি দেখা দেবে কেমন করে? সুতরাং গেট-কীপার যদি এ ঘটনার কোনো অনৈসর্গিক কারণ সন্দেহ করে ফিমেল-ওয়ার্ডারকে চ্যালেঞ্জ করে থাকে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। মানদা দমবার পাত্রী নয়। নারীজাতির চিরন্তন প্রিভিলেজের উপর দাঁড়িয়ে সেও গেট-কীপারকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। নারীদেহে “তল্লাসী” করবার কী অধিকার আছে পুরুষের? অতএব দূরে রহ।

    আমি উভয় সঙ্কটে পড়লাম। শেষ পর্যন্ত গেট-কীপারকে কিঞ্চিৎ তিরস্কার করে মানদাকে অনুরোধ করলাম, যদি সম্ভব হয়, সে যেন আমার অফিসে গিয়ে তার দেহভার মুক্ত করে। আপাতত সেখানে কোনো পুরুষ উপস্থিত নেই। সে স্বীকৃত হল, এবং কিছুক্ষণ পরে অফিসে ফিরে দেখলাম, টেবিলের উপর সাজানো রয়েছে একজোড়া শাড়ি, তার পাশে সায়া ব্লাউজ, একশিশি সুগন্ধ তেল, স্নো পাউডার এবং চুল বাঁধবার সরঞ্জাম। জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই তার স্বাভাবিক রুক্ষকণ্ঠে বলল মানদা, এগুলো তো আর আপনারা দেবেন না। তাই, কপালের ভোগ আমাকেই ভুগতে হয়। এর কোটা না হলে মেয়েমানুষের চলে, বলুন?

    মেয়েমানুষ ফিমেল ওয়ার্ডে আজ নতুন আসেনি। কিন্তু এতদিন তো এ দুর্ভোগ মানদাকে ভুগতে হয়নি। আজ যে-জন্য হল সেটাও বুঝলাম। তবু প্রশ্ন করলাম, কিন্তু মেয়ে তো তোমার ওখানে গুটি পনেরো। আর—

    –ও আমার কপাল! একগাল হেসে বলল মানদা, এসব বুঝি ঐ হতচ্ছাড়ীগুলোর জন্যে? ওরা মাখবে স্নো পাউডার।

    হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, আচ্ছা স্যার, মল্লিকাকে জেলে পাঠিয়েছে যে হাকিম, আমাকে একবার নিয়ে যেতে পারেন তার কাছে?

    কেন?

    —তাকে একবার বলে আসতাম পাগলা গারদে ও যাবে না, যাবে তুমি। আর বলতাম, ওর বাড়ির লোকগুলোকে ধরে এনে ফাঁসি দাও একটা একটা করে। মেয়েটা যে এখনও বেঁচে, আছে সে শুধু যীশুর কৃপায়

    মানদা যুক্তকর কপালে ঠেকিয়ে বুকের উপর ক্রুস আঁকল।

    বললাম, তুমি শুনেছ ওর সব কথা?

    —কি করে শুনবো? ও তো কথা বলে না। কিন্তু ওর মুখের দিকে চেয়েই আমি সব বুঝে নিয়েছি। ক’টা দিন সময় দিন আমাকে। একটু সুস্থ করে তুলি, তারপর সব জানতে পারবো। যদি পারেন স্যার, ডাক্তারবাবুকে বলে ওর একটু দুধ-টুধের ব্যবস্থা করে দেবেন। বললাম, করবো। আর এই কাপড়-চোপড়গুলো এইখানেই থাক। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার কাছে।

    দিন পাঁচ-ছয় পরে জেনেনা-ওয়ার্ডে যেতে হয়েছিল কোনো কাজে। মানদা বলল, মল্লিকাকে দেখবেন না?

    —চল।

    সেলব্লকের চত্বরে একটা গাছের নীচে বাঁধানো বেদির উপর বসে আছে মল্লিকা। অপরাহ্ণের ম্লান রৌদ্র এসে পড়েছে তার পায়ের কাছটিতে। দেখে চেনাই যায় না। রুক্ষ জট পাকানো চুল বহু-যত্নে বশে এসেছে। দুটি সুদৃশ্য দীর্ঘ বেণী ঝুলছে পিঠের উপর। পরনে পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড়। মুখে সামান্য প্রসাধনের চিহ্ন। কপালে একটি সিন্দুরের টিপ। কালিঢালা দুটি চোখের কোলে সদ্যলব্ধ স্বাস্থ্যের আভাস। শীর্ণ কপালে সে-দিন যে মালিন্য দেখেছিলাম, অনেকখানি মিলিয়ে গেছে, ফুটে উঠেছে লাবণ্যের আভা। সেদিনের মতই নিঃশব্দে একবার চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে। তেমনি শান্ত দৃষ্টি। মানদা এগিয়ে গিয়ে চিবুকে হাত দিয়ে ওর মুখখানা আমার দিকে তুলে ধরে বলল, এই মেয়ে খুন করেছিল, আপনি বিশ্বাস করেন ডেপুটিবাবু? দু’তিনটি মেয়ে-কয়েদী কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। তাদের একজনকে বলল মানদা, যা তো সরলা, দিদিমণির দুধ আর ফলের ডিশটা নিয়ে আয়।

    সরলা ছুটল। মানদা আমার দিকে ফিরে বলল, দু-একখানা বই-টই দিতে পারেন?

    — বই!

    —হ্যাঁ, বাচ্চাদের ছবির বই। দেখছেন না, ও এখন কচিছেলের বাড়া। সব কিছু করে দিতে হয়।

    —বই পড়তে পারবে বলে মনে কর?

    —এক-আধটু যদি পাতা ওলটায়।

    ফিরে আসতে আসতে বললাম, কথা টথা বলে কিছু?

    একেবারেই না, মাথা নেড়ে বলল মানদা—ওর নিজের কথা জিজ্ঞেস করে দেখি, তাতে শুধু ওর কষ্ট বাড়ে। সেরে উঠুক। আস্তে আস্তে সব জানা যাবে।

    জানা গেল কদিন পরেই। সকালের অফিস। নিঃশ্বাস ফেলবার অবসর নেই। বড় সাহেব “সেলাম” জানালেন। গিয়ে দেখি, তাঁর টেবিলের পাশে একটি অপরিচিত সুদর্শন যুবক। তাঁকে দেখিয়ে বললেন, সাহেব, ইনি কলকাতা থেকে এসেছেন। মল্লিকা গাঙ্গুলীর সঙ্গে দেখা করতে চান। এই মেয়েটিই কি সেদিন এল প্রেসিডেন্সি থেকে।

    বললাম, হ্যাঁ স্যার।

    —তাহলে দেখাটা তোমার অফিসে বসিয়েই করিয়ে দাও। কি বল, চৌধুরী?

    –সেইটাই ভাল হবে।

    ভদ্রলোক আমার সঙ্গে আসতে আসতে উদ্বিগ্ন প্রশ্ন করলেন, ও কেমন আছে, স্যার? বললাম, আগের চেয়ে অনেকটা ভালো। উনি কে হন আপনার?

    —আমার স্ত্রী।

    মেয়েটিকে নিয়ে আসবার জন্যে মানদাকে খবর পাঠিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পরে সে এল, কিন্তু একা। বললাম, কই, মল্লিকা কই?

    —সে এল না বাবু।

    —কেন?

    —তা কেমন করে বলবো? অপ্রসন্নকণ্ঠে জবাব দিল মানদা।

    —তার স্বামী এসেছেন দেখা করতে, বলেছিলে?

    —বলেছি বইকি। একেবারে কাঠ হয়ে বসে রইল। কিছুতেই আনা গেল না।—বলে কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল ভদ্রলোকের দিকে। ইনিই যে মল্লিকার স্বামী, তার বুঝতে বাকি ছিল না।

    ভদ্রলোক ক্ষীণকণ্ঠে অনেকটা যেন আপনমনে বললেন, তাহলে সেই রকমই আছে, দেখছি।

    বললাম, ওখানেও দেখা করত না?

    —প্রথম দিকটা করত। খুব boisterous ছিল তখন। চেঁচাত, কাঁদত, হাসত, আবোল- তাবোল বকত, কিন্তু দেখা করতে আপত্তি করত না।

    —আপনি বরাবর কলকাতাতেই আছেন?

    —আজ্ঞে না, আমি থাকি এলাহাবাদ। সেখান থেকে মাসে মাসে এসে দেখে গেছি। মাঝে-মাঝে একটু যেন চিনতেও পারত। তারপর হঠাৎ একেবারে গুম হয়ে গেল। কথা বলে না; ডাকলে আসে না।

    একটু থেমে বললেন, এবার অনেকদিন আসতে পারিনি। কাল ওখানে গিয়ে শুনলাম ওকে এই জেলে পাঠানো হয়েছে। বাড়ি না গিয়ে সোজা স্টেশনে এসে গাড়ি ধরলাম। কি জানি কেন মনে হল, এবার বোধ হয় দেখা হবে। কথা না বলুক, শুধু একবার দেখা।

    গলাটা ধরে এল ভদ্রলোকের। রুমাল বের করে চেপে ধরলেন চোখের উপর। বৃথা সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা না করে আমি চুপ করেই রইলাম। কয়েক মিনিট পরে উনি বললেন, এবার তাহলে আমি আসি, স্যার।

    বললাম, কোথায় উঠেছেন আপনি? –

    —উঠিনি কোথাও। স্টেশন থেকে সোজা চলে এসেছি।

    —এখন কোথায় যেতে চান? আপনার ফিরবার গাড়ি তো সেই রাত দশটায়।

    —হ্যাঁ। এ সময়টা ওয়েটিং রুমেই কাটিয়ে দেব ভাবছি।

    —তার মানে হরিবাসর?

    মতীশবাবুর মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বললেন, তা হোক। একটা দিন তো।

    উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

    —আজ্ঞে, এগিয়ে দিতে হবে না। গেটটা শুধু পার করে দিন।

    গেট পার হয়েও ওঁকে অনুকরণ করছি দেখে মতীশবাবু হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন, এবার আমি যেতে পারব, স্যার। আপনি আর কষ্ট করবেন না।

    —চলুন না।

    একটা ছোট একতলা বাড়ির সামনে এসে বারান্দার সিঁড়ি দেখিয়ে বললাম, এই দিকে-

    উনি একটু অবাক হয়ে বললেন, এটা—

    —হ্যাঁ, এটাই আমার প্রাসাদ। পৈতৃক নয়, সরকারী। তবে আপনার ওয়েটিং রুমের চেয়ে নেহাত খারাপ হবে না।

    মতীশ ইতস্তত করে বললেন, কিন্তু—

    —আমার অসুবিধা হবে, এই বলবেন তো? তা আর কি করবো?

    উপস্থিত মতো অনাড়ম্বর মধ্যাহ্ন-ভোজন শেষ করে দুজনে এসে বাইরে বারান্দায় দু-খানি ক্যাম্প-চেয়ার দখল করলাম। সামনে খানিকটা দূরে সু-উচ্চ জেলের পাঁচিল। সেদিকে কিছক্ষণ চেয়ে থেকে মতীশবাবু আস্তে আস্তে বললেন, ঐ পাঁচিলের ওপারটাতেই বুঝি-ওদের ওয়ার্ড?

    বললাম, হ্যাঁ। খানিকটা গিয়েই।

    —মজা দেখুন! একদিন যে আমাকে সব দিয়েছিল, আজ সে চোখের দেখাটাও দিল না। অথচ এর জন্য আমরা কেউ দায়ী নই। সেও না, আমিও না।

    আমার কনিষ্ঠ শ্রীমান এসে জানিয়ে গেল, মা বলছে কাকাবাবুর বিছানা দেওয়া হয়েছে।

    বললাম, মতীশবাবু, এবার আপনাকে একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। এটা কিন্তু আমার অনুরোধ নয়, আপনার বৌদিদির আদেশ এবং তার ওপরে আপীল চলে না।

    মতীশবাবু হেসে বললেন, বেশ তো। আর আপনি?

    —আমিও উঠছি। আদেশটা আমার ওপরেও প্রযোজ্য।

    .

    জেলের পাশেই এক মাইল চওড়া ঘোড়দৌড়ের মাঠ। তারই মাঝখানে একটি সবুজ কোমল গলফ্-চত্বরের উপর গিয়ে বসলাম দুজনে। সূর্য তখন অস্ত গেছে। বৈশাখ মাস। শুক্ল পক্ষ। সামনের ঐ সুপারি, নারিকেল বাঁশবনে ঘেরা গ্রামের কোল ঘেঁষে চাঁদ উঠবে একটু পরেই। সেই নরম আবির্ভাবের পূর্বাভাস ফুটে উঠেছে তরুশ্রেণীর মাথার উপর। ঐদিকে চেয়ে নিঃশব্দে বসে ছিলেন মতীশবাবু। তারপর একসময়ে বলে উঠলেন, খাঁটি কলকাতার জীব আমরা। এতখানি খোলা-মেলা আমাদের ধাতে সয় না।

    —এসব দেশে আসেননি কোনোদিন?

    —এসেছিলাম একবার বছর দুয়েক আগে। ঐ নারকেল সুপারির ঘন লাইনের দিকে চেয়ে সেই দিনটার কথাই ভাবছিলাম।

    —বেড়াতে এসেছিলেন?

    —হ্যাঁ; তা প্রথমটা একরকম বেড়াতেই।

    —শেষটায়?

    শেষটায় যা ঘটল, আজও তার জের টানছি। হয়তো সারাজীবন টেনেও শেষ হবে না।

    —সে তো দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ভেবে পাচ্ছি না, যোগাযোগটা আপনাদের ঘটল কেমন করে?

    —সে বিচিত্র উপন্যাস শুনতে গেলে আপনার ধৈর্য থাকবে না দাদা।

    —একবার পরীক্ষা করে দেখতে আপত্তি আছে কিছু?

    —আপত্তি! মৃদু হাসির শব্দ তুলে বললেন মতীশ, এই কটি ঘণ্টা যে পরিচয় আপনার পেলাম, তারপরে আর ও জিনিসটা থাকতে পারে না। কিন্তু সে একঘেয়ে দুঃখের কাহিনী—

    বাধা দিয়ে বললাম, দুঃখ জিনিসটা ফেলনা নয়, মতীশবাবু। তাকেও সম্পদ করে তোলা যায়, যদি মনের মতো কাউকে ভাগ দিতে পারেন।

    মতীশের মৃদু হাসি মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে মাটির দিকে চেয়ে থেকে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, বেশ, তাহলে শুনুন।

    মতীশ গাঙ্গুলীর কাহিনী শুরু হল—

    .

    কলেজের বন্ধুদের মধ্যে সব চেয়ে যার সঙ্গে ভাব হয়েছিল এবং কলেজ ছাড়বার পরেও তাতে ফাটল ধরেনি, তার নাম হীরালাল। বাড়ি চিল বাঙাল দেশের কোনোখানে, .ঠিক জানতাম না। হঠাৎ একদিন পড়বার ঘরে এসে বলল, আমার বিয়ে! তোমাকে যেতে

    হবে আমাদের দেশে।

    বললাম, সর্বনাশ!

    —সর্বনাশ কেন?

    —আরে আমরা হলাম নির্ভেজাল কলকাতার লোক। শেয়ালদ’র স্টেশনে গাড়ি চড়া আমাদের শাস্ত্রে নিষেধ।

    হীরালাল শুনতে চায় না। বুঝিয়ে বললাম, কোলকাতার বাইরেও যে বাংলা দেশ আছে, আমাদের কাছে তার অস্তিত্ব শুধু ভূগোলের পাতায়। আমার মা, বোন, বৌদিরা কেউ ভূগোল পড়েননি। পড়লেও ভুলে গেছেন।

    কিন্তু হীরালাল একেবারে নাছোড়বান্দা। বাঙালে গোঁ যাকে বলে। সরাসরি বাবার কাছে গিয়ে আবেদন পেশ করল এবং একরকম জোর করেই সেটা মঞ্জুর করিয়ে নিয়ে এল। মা অসন্তুষ্ট হলেন। বিধবা বোন মঞ্জরী রুষ্ট হয়ে রইল। যাবার দিন বিছানাপত্তর সুটকেস ইত্যাদি গুছিয়ে দিয়ে গম্ভীর ভাবে বলল, ‘দেখো দাদা, বন্ধুর দেশের কোনো বিদ্যেধরী যেন ঘাড়ে চেপে না বসেন।

    হেসে বললাম, চাপলে মন্দ কি? ও দেশের মেয়েগুলো সত্যিই সুন্দর। তোদের মতো ঢেসি নয়।

    মুখে আগুন!—বলে আমার ভগিনী এমন মুখ করলেন, যেটা শুধু ঐ বস্তুটিযোগেই হতে পারে।

    আমাদের বংশে আমিই প্রথম শেয়ালদ’র স্টেশনে গাড়ি চাপলাম। যশোরে পৌঁছে আমার জিনিসপত্রগুলো খুলে দেখা গেল, এই কটা দিন কাটাবার মতো আবশ্যক কোনো জিনিসই বাদ দেয়নি আমার ভগিনী। মায় মুখসুদ্ধির মশলা, দাঁত খোঁচাবার নিমের খড়কে এবং গায়ে মাখবার সর্ষের তেল। হীরালালের বৌদি এসে গম্ভীরভাবে বললেন, দুটো জিনিস কিন্তু আনতে ভুলে গেছেন ঠাকুরপো।

    বললাম, কি জিনিস?

    —চাট্টে চাল আর একটু নুন!

    গাম্ভীর্য বজায় রেখেই বললাম, চিন্তিত হবেন না! ওগুলো পার্শেলেও এসে পড়তে পারে।

    সকলের সম্মিলিত হাসি।

    যশোর থেকে মাইল পনেরো দূর কী একটা গ্রামে কনের বাড়ি। সকাল সকাল খাওয়া- দাওয়া সেরে দু-খানা বড় নৌকো করে রওনা দিল বর আর বরযাত্রীর দল। বর্ষাকাল। ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে, পাটক্ষেত পাশে ফেলে কচুরিপানা ঠেলে ঠেলে, খাল বিল মাঠ পেরিয়ে নৌকো চলল। দু’ধারে আম-কাঁঠাল-নারকেল-সুপারির বন। বাঁশ-ঝোপ নুয়ে পড়েছে জলের উপর। সন্ধ্যার মুখে গিয়ে পৌঁছলাম ওদের ঘাটে। সেখান থেকে হাঁটাপথে এক মাইল। গোটা তিনেক হারিকেন লণ্ঠন নিয়ে অপেক্ষা করছেন কনেপক্ষ। বরযাত্রীদলে গুঞ্জন উঠল—বরের জন্যে পালকি আসেনি, এ কি রকম ব্যবস্থা? হীরালালের বাবা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে চাপাগলায় বললেন, এ তোমাদের ভারি অন্যায়। পালকি আসবে কোত্থেকে তা বোঝ না? মেয়েটার মা নেই, বাপ নেই। গরীব ভগ্নিপতি বামুনপণ্ডিত মানুষ, কোনো রকমে নমো নমো করে পার করছে শালীটিকে!

    একটু থেমে আবার বললেন, গাড়ি-পালকি দেখে তো আর বিয়ে দিচ্ছি না। দেখেছি শুধু মেয়েটিকে। মায়ের আমার সাক্ষাৎ কমলার মতো রূপ। ভালোয় ভালোয় দু-হাত এক হোক। ঘরের বৌ ঘরে নিয়ে যাই। গাড়ি পালকি ওখানে গিয়ে চড়বে যত খুশি। কি বলব বাবা, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে এটুকু হেঁটে যেতে? —বলে বৃদ্ধ আমার পিঠে হাত রাখলেন। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না না। আমার বেশ ভাল লাগছে কাকাবাবু।’

    চারদিকে জঙ্গলে ঘেরা দু-তিনখানা খড়ের ঘর। তারই একটিতে বর এবং বরযাত্রীদের বসবার ব্যবস্থা। পরিপাটি করে গোবর নিকানো মাটির মেঝে। তার উপর ফরাস। বরের জন্যে একখানা পাড়ের সুতো দিয়ে তৈরী আসন। ঝালর দেওয়া তাকিয়া। আসনে একটি চমৎকার হরিণ, তাকিয়ার গায়ে সুদৃশ্য গোলাপ। সুরুচি এবং সূক্ষ্মশিল্পের পরিচয়। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। কনেপক্ষের একটি ভদ্রলোক লক্ষ্য করে বললেন, এ সবই মেয়ের হাতের কাজ। বললাম, ভারি সুন্দর তো? হীরালালের মুখে খুশি এবং গর্বের ঝলক খেলে গেল।

    নটায় লগ্ন। বরের ডাক পড়ল বিবাহ-সভায়। ওর একটু বাইরে যাওয়া দরকার। বাড়ির গায়ে পুরানো পুকুর। সরু পায়ে-চলার পথ। দু-ধারে জঙ্গল। হ্যারিকেন নিয়ে একজন লোক চলল পথ দেখিয়ে। ওখানেই বসুন, আর ওদিকে যাবেন না—বললে পেছন থেকে। হীরালাল লাজুক মানুষ, তায় নতুন বর। আর একটু এগিয়ে গেল পুকুরপাড়ের দিকে। তারপরেই এক চিৎকার। লোকটি ছুটে গিয়ে দেখল, পায়ের একটা আঙুল থেকে রক্ত ঝরছে। লোকজন ভেঙে পড়ল লাঠিসোটা মশাল নিয়ে। খানিক খোঁজাখুঁজির পর ধরা পড়ল সাপ। সাক্ষাৎ যম। ওদেশে বলে খৈয়ে গোর্খা। হীরালালকে তার আগেই ধরাধরি করে আনা হয়েছিল বৈঠকখানায়। ওঝা এসে ঝাড়ফুঁক শুরু করল। ডাক্তার একজন এলেন ব্যাগ হাতে করে। কিন্তু হীরালাল আর চোখ খুলল না, কথাও বলল না- ঘণ্টাখানেক পরে তার ফর্সা দেহ নীল হয়ে গেল। মুখ দিয়ে উঠল গাঁজলা। আরও কিছুক্ষণ পরে ও-অঞ্চলের সব চেয়ে বড় ওঝা এসে ওর চুল ধরে আলগোছে টান দিলেন। একটা গোছা উঠে এল হাতের মুঠোয়। ওঝার মুখ কালো হয়ে গেল। বিড়-বিড় করে বললেন, আর আশা নেই।

    ভিতরে-বাইরে কান্নার রোল পড়ে গেছে। কনের ভগ্নিপতি হায় হায় করে বেড়াচ্ছেন; আর নিশ্চল পাথর হয়ে বসে আছেন বরের বাপ। মাঝখানে একবার কাকে যেন বললেন, দ্যাখ তো পালকি পাওয়া যায় কিনা ঘাট পর্যন্ত। টাকা যা চায়, দেবো। তোমাদের বড্ড শখ ছিল..। এমন সময় কে এসে জানাল কনে অজ্ঞান হয়ে গেছে। সে-কথা শুনে কারও কোনো চাঞ্চল্য দেখা দিল না। যে-যেমন ছিল, বসে রইল মৃতদেহের চারদিকে। আমি ছিলাম এক কোণে। একটি কিশোরী মেয়ে এসে বলল, আপনি একবার ভেতরে আসুন। কোথায়, কেন, কে ডাকছে, কোনো কথা জিজ্ঞেস না করে যন্ত্রচালিতের মতো চললাম ওর পেছনে। উঠোনে বিয়ের সমস্ত আয়োজন তেমনি সাজানো। তার পাশ দিয়ে নিয়ে গেল একটা ঘরে। বারান্দা পার হয়ে দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালাম। পরনে লাল চেলি। কপাল এবং কপাল জুড়ে শ্বেত-চন্দনের আলপনা। হাতে গলায় সামান্য দু-একখানা অলঙ্কার। একটা নতুন পাটির উপর যে-মেয়েটি চোখ বুজে শুয়ে আছে মনে হল সে মেয়ে নয়, কোনো সুদক্ষ শিল্পীর হাতে-গড়া প্রতিমা।

    একদল মেয়েমানুষ চারদিকে ভিড় করে কলরব করছিল। আমাকে দেখে সব সরে গেল। আধঘোমটা-পরা একটি মহিলা এগিয়ে এসে ধরা গলায় বললেন, দেখুন তো ভাই, এটারও বোধ হয় হয়ে গেল। চোখ খুলছে না, সাড়াও দিচ্ছে না।

    অনুমান করলাম, উনিই কনের দিদি। গায়ের চাদরটা খুলে রেখে এগিয়ে গেলাম। বললাম, জল নিয়ে আসুন এক বালতি। আর জানলার কাছ থেকে সবাই সরে যান আপনারা। মুহূর্ত-মধ্যে ঘর ফাঁকা হয়ে গেল। অনেকক্ষণ চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেবার পর চোখের পাপড়ি দুটো কেঁপে উঠল দু-একবার। তারপর আস্তে আস্তে খুলে গেল। বেরিয়ে পড়ল দুটি অপূর্ব নীল তারা। নীলোৎপল কথাটা কাব্যে পড়েছি। আজ স্বচক্ষে দেখলাম। প্রথমটা যেন ও কিছুই বুঝতে পারলো না। হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। বুকের উপর ক্ষিপ্রহস্তে টেনে নিল স্খলিত আঁচলখানা। ধড়ফড় করে উঠে বসে গোড়ালি পর্যন্ত নামিয়ে দিল পরনের শাড়ি। আমি তাড়াতাড়ি কাঁধের পাশটা ধরে শুইয়ে দিয়ে বললাম, না, না, উঠবেন না। শুয়ে থাকুন। ওর দিদির দিকে চেয়ে বললাম, একটু দুধ নিয়ে আসুন, গরম দুধ। মেয়েটি পাশ ফিরে চোখ বুজল। হ্যারিকেনের মৃদু আলোকে দেখলাম চোখ দুটোর কোল গড়িয়ে পড়ছে জলের ফোঁটা।

    উঠোনের একধারে একটা ছোটখাটো বৈঠক বসেছে। গ্রাম্য-প্রধানের দল। সকলেই বয়সে প্রবীণ। সেখান দিয়ে যখন বৈঠকখানায় ফিরে যাচ্ছি, একজন প্রশ্ন করলেন, জ্ঞান ফিরল, বাবা? মাথা নেড়ে বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —না ফিরলেই ছিল ভালো, বলে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। আরেকজন বললেন, যে গেল, সে তো গেলই। এবার যে রইল তার একটা ব্যবস্থা তো করতে হয়। তুমি দাঁড়িয়ে কেন বাবা? বসো। ওরে, কে আছিস? একটা টুল-ঠুল নিয়ে আয় তো।

    আমি সেই শতরঞ্চির একধারে বসে পড়ে বললাম, না, না, টুল দরকার নেই। আমি এইখানেই বসছি।

    —আহা, ধুলোর মধ্যে বসলে! দাঁড়াও, একটু ঝেড়ে দিচ্ছি। কলকাতার ছেলে। এসেছ আমাদের এই অজ পাড়াগাঁয়ে। তারপর এতবড় সর্বনাশ হয়ে গেল। তোমার বড্ড কষ্ট হল, বাবা।—ভদ্রলোক তাঁর কাঁধের গামছা দিয়ে ধুলো ঝাড়তে লাগলেন। এদিকে একজন তামাক টানছিলেন। হুঁকোটা অন্য হাতে চালান করে আগের প্রস্তাবের জের টেনে বললেন, ব্যবস্থা আর কি? বিয়ে তো দিতেই হবে রাতের মধ্যে। তা না হলে সমাজে পতিত হবেন যাদব বাবাজী। আর মেয়েটাকেও থাকতে হবে আজীবন আইবুড়ো।

    যাদববাবু কনের ভগ্নীপতি। হাতজোড় করে বললেন, আপনারা পাঁচজন আছেন। গরীবকে যেমন করে হোক উদ্ধার করুন। এখন আর ভালমন্দ বাছবিচারের সময় নেই

    আগের ভদ্রলোকটি বললেন, হুঁ, মুশকিলের কথা। ছেলে-ছোকরাগুলো বেশীর ভাগ বিদেশে। হাতের কাছে কাউকে তো দেখছি না। এক বিপিন চাটুজ্জে মশাই আছেন। বয়স হয়েছে বটে, সংসারও তিনটে, তবে কুলীন সন্তানের পক্ষে সেটা বেশী কিছু না। তাছাড়া অবস্থা ভালো। উনি যদি রাজী হন, মেয়েটা যাই হোক, খাওয়া-পরার কষ্ট পাবে না।’

    যাদব বললেন, উনি রাজী হবেন কি?

    —তা হবেন, বললেন একটি দন্তহীন ভদ্রলোক। শালীটি তো তোমার ডানাকাটা পরী হে। তবে নগদ কিছু দিতে হবে।

    —তা দেবো। তবে জানেন তো আমার অবস্থা। আপনারা দয়া করে একটু বলেকয়ে দেখুন। আমিও হাতে পায়ে ধরি গিয়ে। যতটা অনুগ্রহ করেন।

    —আমাদের যতদূর সাধ্য, আমরা নিশ্চয়ই করবো, বললেন আগেকার সেই ভদ্রলোকটি, —মেয়ে নয়, বোন নয়, শালী। তবু তুমি যা করেছ বাবাজী, ক’জনে করে আজকাল?

    —সে কথা একশোবার। সে আমরা সবাই বলাবলি করেছি। বললেন মুরুব্বিগোছের আরেকজন।

    —তাহলে আর দেরি নয়। চল, সবাই মিলে চেপে ধরি গিয়ে চাটুজ্জেকে। রাত তো আর বেশি বাকি নেই।

    .

    কয়েক মিনিট ছেদ পড়ল মতীশের গল্পে। জ্যোৎস্নালোকে তার মুখের দিকে চেয়ে মনে হল, একটু যেন ইতস্তত করছেন ভদ্রলোক। বললাম, আপনার সঙ্কোচের কোনো কারণ নেই, মতীশবাবু। বয়সে আমি হয়তো চার-পাঁচ বছরের বড়। আমাদের পরিচয়ের পরিমাণটাও চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশী নয়। তবু এই জেলের সর্দারটিকে বন্ধু বলেই মনে করতে পারেন।

    —সে কথা কেন বলছেন দাদা! আহত সুরে বললেন মতীশবাবু। আগেই তো বলেছি, একান্ত আপনার জন না হলে কাউকে এসব কথা বলা যায়? সেজন্য নয়। সে রাতটা যেন চোখের উপর দেখতে পাচ্ছি। এমনি জ্যোৎস্না উঠেছিল সেদিন। বর্ষারাত হলেও আকাশ ছিল এমনি নির্মেঘ। যাক্ ….। ওঁরা ওঠবার আয়োজন করতেই কেমন ওলটপালট হয়ে গেল আমার বুকের ভেতরটা। হ্যাঁ, বাড়ির কথা মনে পড়েছিল বৈকি! বাবার কঠিন মুখ, মায়ের চোখের জল, ছোট বোনের বিষমাখা শ্লেষ, এবং তার চেয়েও ভয়ঙ্কর আমাদের হাতীবাগান বাগবাজার আর কালীঘাটের রুদ্রমূর্তি! সবই দেখতে পাচ্ছিলাম চোখের উপর। কিন্তু সে সব কিছু ছাপিয়ে উঠেছিল একখানি কুণ্ঠাজড়িত মুখ আর দুটি অসহায় চোখের নীল তারা। মনে হয়েছিল এ অপূর্ব সম্পদ যেন আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল বিধাতার হাতে। তা যদি না হবে, এদেশে আমি আসবো কেন, হীরালাল এমন করে মরবে কেন, আর এত লোক থাকতে আমারই বা ডাক পড়বে কেন তার মূর্ছিতা কনের চোখে জল ছিটাবার জন্যে?

    যাদববাবু ঘর থেকে একটা চাদর নিয়ে ফিরে আসতেই উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, অনুমতি করেন তো, আমার একটা কথা বলবার ছিল।

    উনি আগ্রহের সঙ্গে বললেন, বলুন!

    —আমাকে যদি অযোগ্য মনে না করেন, আর আপনার শ্যালিকার যদি আপত্তি না থাকে, ওঁকে তাহলে—আমরা নৈকষ্য কুলীন। পদবী গঙ্গোপাধ্যায়।

    যাদববাবু আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন, এতখানি সৌভাগ্য কি আমার সইবে ভাই?

    চারিদিকে সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। একজন বললেন, কলকাতার ছেলে তো। প্রাণ আছে, দয়াধর্ম আছে। আর একজন বলে উঠলেন, ভগবান ওকে পাঠিয়েছেন, যাদব। উনি নররূপী দেবতা। এমনিধারা সব মন্তব্য। কথাটা হীরালালের বাবার কানে গেল। আমাকে ডেকে পাঠালেন। অপরাধীর মতো কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম! এগিয়ে এসে হঠাৎ আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করছি বাবা, তুমি সুখী হও। আমার মাকে কোনোদিন অনাদর কোরো না।

    এতক্ষণে তাঁর চোখে জল দেখা দিল।

    এপাশে আমার বন্ধুর মৃতদেহ পালকি চড়ে গেল নদীর ঘাটে। ওপাশে আমি গিয়ে বসলাম বরের আসনে। একদিকে হরিধ্বনি, আরেকদিকে হুলুধ্বনি। প্রতিটি মন্ত্র স্পষ্ট করে এবং শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করে মল্লিকাকে গ্রহণ করলাম।

    .

    মতীশের মৃদুকণ্ঠ হঠাৎ বন্ধ হল।

    বললাম, তারপর?

    —তারপর-এর তো আর শেষ নেই দাদা। এ তো কেবল শুরু। কিন্তু এবার আমাকে ট্রেন ধরতে হবে।

    —ট্রেন ধরবে কাল বেলা একটায়।

    মতীশ চুপ করে রইল।

    বললাম, বন্ধু বলে যখন স্বীকার করেছ ভায়া, বুকখানা একটু হালকা করে যাও। এখনও অনেক দিন বেঁচে থাকতে হবে।

    ডান হাতখানা রাখলাম ওর পিঠের উপর! মতীশ বসে ছিল দু-হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে। জ্যোৎস্নালোকে দেখলাম তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।

    ধীরে ধীরে বারংবার বিরাম নিয়ে মতীশ বলে গেল তার স্বল্পজীবী বিবাহিত জীবনের সুদীর্ঘ কাহিনী। মাত্র দুটি বছরের ইতিহাস। কিন্তু তার প্রতিটি দিন বেদনায় ম্লান, প্রতিটি রাত্রি দুঃখে নিবিড়। নিঃশব্দে শুনে গেলাম। যখন শেষ হল, চাঁদ অস্ত গেছে। রাত কত জানি না। অন্ধকার মাঠে চার-পাঁচটা আলো ছুটোছুটি করছে। মতীশ বলল, অতগুলো আলো নিয়ে ঘুরছে কারা?’

    বললাম, সিপাইরা আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছে। তোমার বৌদি হয়তো পুলিসেও খবর দিয়ে থাকবেন। আর বসে থাকা নিরাপদ নয়।

    মতীশের শ্রোতা সেদিন যে-মন নিয়ে প্রায় সমস্ত রাত ধরে তার কাহিনী শুনেছিল, আমার শ্রোতাদের কাছে সে মনোযোগ আশা করবো, এতটা বুদ্ধিভ্রংশ আমার ঘটেনি। তাই যে-কথা আপনার কাছে তুচ্ছ, কিন্তু তার কাছে অমূল্য, সে সব রইল অনুক্ত। বর্ণ মাধুর্যের সমস্ত রস রইল আমার কাছে। যেটুকু দিলাম, সেটা শুধু রেখাচিত্র, আপনারা যাকে বলেন স্কেচ্

    সকালের গাড়িতে বৌ নিয়ে মতীশ এসে উঠল তাদের আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাড়িতে। দরজা খোলাই ছিল। সিঁড়ির মুখেই মঞ্জরীর সঙ্গে দেখা।

    —এ কে, দাদা?

    —তোর বৌদি।

    —মানে?

    —’বৌদি’ কথাটার মানে বুঝিস না, তোকে তো এতটা মুখ্যু বলে জানতাম না। মল্লিকার দিকে ফিরে বলল, আমার ছোট বোন মঞ্জরী।

    মল্লিকা কুণ্ঠিত হাসি-মুখে এক পা এগিয়ে গেল ননদের দিকে। সে একটা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে সরে গেল ঝড়ের মতো। মতীশ বৌ নিয়ে উপরে উঠে গেল। মার ঘরের সামনে গিয়ে ডাকল, মা!

    —কে, মতীশ এলি?

    ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। পরনে পট্টবাস। এইমাত্র আহ্নিক সেরে উঠেছেন।

    —তোমার বৌ নিয়ে এলাম মা, কাষ্ঠহাসি হেসে বললে মতীশ। মল্লিকা নত হয়ে প্রণাম করতে গেল, সুহাসিনী চৌকাঠের ওপার থেকেই শুষ্ককণ্ঠে বললেন, থাক, বাছা।

    বলে, খানিকটা সরে গেলেন ভিতরের দিকে। ছেলের মুখের দিকে চেয়ে বললেন, ব্যাপার কি মতীশ?

    —ব্যাপার তো দেখতেই পাচ্ছ। বিয়ে করেছি। আর যা জানতে চাও, আস্তে আস্তে বলছি। তার আগে—

    কথাটা শেষ না হতেই মা বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। কয়েক মিনিট পরেই কানে এল তার বাবার ক্রুদ্ধস্বর—অ্যাঁ? বল কি! বিয়ে হয়ে গেছে! আচ্ছা, ডেকে দাও তো হতভাগাটাকে।

    ডাকতে হল না। মতীশ নিজেই গেল বাপের ঘরে। সঙ্গে সঙ্গেই উনি রুক্ষকণ্ঠে গর্জে উঠলেন, এসব কি শুনছি?

    —যা শুনছেন, সত্যি।

    —আমাদের অনুমতি না নিয়েই বিয়ে করেছ? খবরটা পর্যন্ত দেবার প্রয়োজন বোধ করনি?

    —খবর দেবার সময় ছিল না। অনুমতি নেবারও উপায় ছিল না। সব কথা শুনলেই বুঝতে পারবেন।

    —শুনতে চাই না তোমার সব কথা, খেঁকিয়ে উঠলেন বিশ্বনাথবাবু, যা শুনেছি তাই যথেষ্ট। এবার তাহলে আমার কথা শোনো। অতখানি স্বাধীন যখন মনে করছ নিজেকে, তখন যাকে এনেছ, তার ভারও নিজের কাঁধেই নিতে হবে। আমি তোমার এ বিয়ে স্বীকার করি না।

    মতীশ মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মনে হল সেখানেও রয়েছে এই কথারই সমর্থন ‘বেশ’ বলে বেরিয়ে এল বাবার কাছ থেকে। মায়ের ঘরের বাইরে বারান্দার এক কোণে লজ্জা আর অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে তার সদ্য-পরিণীতা স্ত্রী। গাঙ্গুলী-বাড়ির প্রথম পুত্রবধূ। কিন্তু গাঙ্গুলী-বাড়ি তাকে স্বীকার করল না।

    সুটকেসটা তুলে নিয়ে মতীশ বলল, চল মল্লিকা।

    মল্লিকা চোখ তুলে একবার চেয়ে দেখল স্বামীর মুখের দিকে। তারপর নিঃশব্দে তার অনুসরণ করল।

    সিঁড়ির সামনেই থামতে হল। ছোট ভাই জিতেশ উপরে উঠছে। ধুতিটা লুঙ্গির মতো করে পরা। গায়ে হাতকাটা গেঞ্জি। হাতে টুথপেস্টের টিউব আর ব্রাশ। এই সবে ঘুম ভেঙেছে কিছুক্ষণ হল। দাদার সঙ্গে বয়সের তফাত বেশি নয়। লেখাপড়ায় অনেক তফাৎ! ফাস্ট ইয়ারেই কেটে গেল বছর দুই, অর্থাৎ নামটা আছে কলেজের খাতায়, মানুষটা থাকে ক্রিকেট ফিল্ডে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন, কোথায় যাচ্ছ সুটকেস নিয়ে?

    —যাচ্ছি যেখানে খুশি। তুই সর্।

    —আহা, তুমি না হয় গেলে, নতুন বৌকে নিয়ে যাচ্ছ কোথায়?

    —তা দিয়ে তোর কাজ কি?

    —তার মানে একটা হোটেল-টোটেলে গিয়ে উঠবার মতলব। তোমার তো বাপু বন্ধু- বান্ধব কেউ কোথাও নেই। জানো খালি বাড়ি আর দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিং।

    মল্লিকা ছিল দাদার পেছনে। তার সামনে এগিয়ে বলল, দাঁড়াও বৌদি, পেন্নামটা সেরে নিই। আমার এই দাদাটিকে তুমি এখনও চিনতে পারনি। বি-কম্ পাস করলে কি হয়, বুদ্ধি-শুদ্ধি বেজায় কম। বুককিপিং ছাড়া আর কিছু বোঝে না। এসো।

    বলে মল্লিকার পিঠে হাত দিয়ে একরকম জোর করেই নিয়ে চলল মার ঘরের দিকে। দরজার সামনে গিয়ে বলল, আচ্ছা মা। আমি তো তোমাদের কুপুত্তুর। মুখ্যু মানুষ। ফেল করি আর ব্যাট্ পিটিয়ে বেড়াই। আমার কথার কোনো দামই নেই। তবু মাঝে মাঝে দু’একটা না বলেও তো পারি না! নতুন বৌ যদি হোটেলে গিয়ে ওঠে, গাঙ্গুলীবাড়ির মুখ উজ্জল হবে কি?

    তোকে সর্দারি করতে কে বলেছে জিতু? রুক্ষকণ্ঠে সাড়া দিলেন সুহাসিনী।

    —না, তা কেউ বলেনি। তবু গায়ে পড়েই বলতে হয়। যা হয়ে গেছে, একদিন যা মেনে নিতে হবে, তাকে গোড়া থেকে স্বীকার করে নেওয়াই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? বাবাকে এই সোজা কথাটা বুঝিয়ে বলতে পারলে না? চল বৌদি—

    উত্তরের অপেক্ষা না করেই জিতেশ তার বৌদিকে নিয়ে গেল মতীশের ঘরে। বলল, এই তোমার ঘর। বই-এর জঙ্গল বললেও পার। তাই বলে পড়বার মতো কিছু পাবে না। সব বুক-কিপিং, ব্যাঙ্কিং আর কি সব ছাই-ভস্ম। তারই মধ্যে ডুবে আছে। খিদে পেল কিনা তাও অন্য লোককে বলে দিতে হয়। দ্যাখ, এবার তুমি যদি পার এই ঘরের আর সেই সঙ্গে মানুষটার ভোল ফেরাতে। মাঝে মাঝে তার এই মুখ্যু ছোট ভাইটারও একটু খোঁজখবর নিও। নেবে তো?

    জিতেশের হাসি-মুখের দিকে চেয়ে মল্লিকাও হাসতে চেষ্টা করল। তার সঙ্গে দু-চোখ ভরা জল। জিতেশ সেদিকে একবার চোখ তুলে কথা ঘুরিয়ে নিলে, আচ্ছা তাহলে তুমি এখন চানটান সেরে নাও। এই পাশেই বাথরুম। আমি একটু চায়ের চেষ্টা দেখিগে।

    স্বর নামিয়ে বলল, ওটা আবার ছোড়দির ডিপার্টমেন্ট। বড্ড মুখঝামটা দেয় একটু দেরি করে উঠি বলে। আচ্ছা কদিন যাক্ না, তারপর অসময়ে চা-টার দরকার হলে তোমার কাছেই আসবো, কি বল?

    আঁচলে চোখ মুছে মৃদু কণ্ঠে বলল মল্লিকা, তাই এসো ভাই।

    বিকাল না হতেই নানা রঙের এবং নানা আকারের গাড়ি এসে জমতে শুরু হল গাঙ্গুলীবাড়ির গেটের সামনে। কয়েকজন আরোহী, বেশির ভাগই আরোহিণী। একে একে তাঁরা জমায়েত হলেন দোতলার হলঘরে। নিজেদের মধ্যে চলল ঘণ্টাখানেক প্রাথমিক আলোচনা। তারপর মতীশের ডাক পড়ল। সে তার চিলে কোঠার ঘরে বসে কি একটা পড়ছিল। জিতেশ এসে দরজায় হাঁক দিল আদালতের পেয়াদার ভঙ্গিতে, এক নম্বর আসামী হাজির?

    —কি ব্যাপার?

    –তোমাকে তলব করেছেন ওঁরা, মানে The Honourable Full Bench.

    –কে কে আছেন রে?

    —বললাম তো ফুল বেঞ্চ। নাম চাও? কাগজ পেন্সিল নাও। শ্যামবাজার থেকে এসেছেন ছোট পিসিমা আর তাঁর দুই মেয়ে গীতা আর রীতা। ভবানীপুর থেকে বড়দি আর তাঁর চার রত্ন, নাম ভুলে গেছি। চোরবাগান থেকে মেজো কাকীমা আর পটলডাঙা থেকে ছোড়দির শাশুড়ী। তার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর ছোট জা কল্যাণী দেবী। আরও কারা কারা আছেন, বল তো আবার গিয়ে মুখস্থ করে আসি।

    —থাক্ আর মুখস্থ করতে হবে না।

    মতীশ এসে দাঁড়াল কাঠগড়ায় মাসী-পিসিদের কাছে তার হঠকারিতার কৈফিয়ত দেবার জন্যে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চলল জবানবন্দী। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে জেরা। মতীশ জানিয়ে দিল সমস্ত ঘটনা এবং দুর্ঘটনার আদ্যন্ত বিবরণ। বলল না শুধু সেইটুকু যা তার

    একান্ত আপনার ধন, পৃথিবীতে আর কারও যাতে প্রয়োজন নেই। মূর্ছিতা মল্লিকার পাশে সেই কটি বিরল মুহূর্ত, যারা তার সঙ্কীর্ণ জীবনধারায় এক নিমেষে নিয়ে এসেছিল বন্যার আলোড়ন।

    বিচারকমণ্ডলী রায়দান শুরু করলেন। পিসিমা বললেন, সব তো বুঝলাম বাবা। কিন্তু একথা তোমারও বোঝা উচিত ছিল, ঐ মেয়ে আমাদের দেশের নয়, সমাজের নয়, ও কখনও আপনার হবে না। তাছাড়া বাঙাল দেশের পাড়াগাঁ থেকে কত কুশিক্ষা, কত রোগের বীজ বয়ে নিয়ে এসেছে, কে জানে? ও কি আমাদের ঘরের যুগ্যি?

    মঞ্জরীর শাশুড়ী ঠাণ মৃদুকণ্ঠে বললেন, বিয়ের আসনে বসতে গিয়ে যার বর অপঘাতে মারা যায়, সেই দুর্লক্ষণা কন্যা ঘরে আনে কেউ? শিক্ষিত ছেলে হয়ে এ তুমি কী কাজ করলে বাবাজী?

    কাকীমা তিক্ত-কণ্ঠে বললেন, বাহাদুরি দেখাবার আর জায়গা পেলে না তুমি? হতই বা বুড়োর সঙ্গে বিয়ে, তাতে আমাদের কি? পাড়াগাঁয়ে গরীব লোকের মধ্যে ঐ রকম তো হয়। এই তো আমাদের চাকরটা সেদিন বিয়ে করে এল। কনের বয়স শুনলাম বারো, আর এ মিনসে তো ঘাটের মড়া বললেই চলে। ওরা আমাদের কে, যে ছেলের ‘কর্তব্য- জ্ঞান’ উথলে উঠল?

    —কর্তব্য-জ্ঞান না ছাই! ফেটে পড়লেন বড়দিদি। চাঁদপানা মুখ দেখে বাবু আমাদের মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। কি খাইয়ে বশ করেছিল কে জানে? পাড়াগাঁয়ে মেয়েমানুষগুলো কত রকম তুকতাক জানে শুনেছি।

    —আমি সেটা আগেই বলেছিলাম দিদি, যোগ করলেন মঞ্জরী, বলুক তো দাদা, সাবধান করে দিইনি যাবার সময়?

    সকলের শেষে মন্তব্য করলেন গৃহকর্ত্রী—ছেলের দোষ দিয়ে কি হবে বল। ছেলেমানুষ, ভুলচুক হয়েই থাকে। বুড়ো হয়ে উনি কি করলেন! পই-পই করে বারণ করলাম, যেতে দিও না। একে বাঙাল দেশ, তায় পাড়াগাঁ। শুনলেন আমার কথা? আহা, বন্ধুর বিয়ে, যেতে চাইছে যাক্। এখন বোঝো…..

    এবার ডাক পড়বার পালা দু-নম্বর আসামীর। কারও কারও মতে প্রধান আসামী। মতীশ ছুটি পেয়ে ঘর থেকে বেরোতে যাবে, হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল তরুণীর দল। রীতা গম্ভীর মুখে বলল, ডেকে কি হবে মা? দেড় ঘণ্টা সাধ্যসাধনার পর দেড়খানা কথা শুনলাম। তাও উর্দু না তেলেগু, বোঝা গেল না।

    নবীনাদের দল খিলখিল করে হেসে উঠল। বড়দির মেয়ে চামেলী লরেটোতে জুনিয়ার কেম্ব্রিজ পড়ে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, বৌ-এর সঙ্গে একজন Interpreter আনা তোমার উচিত ছিল, বড় মামা। ওর ঐ অভিনব ভাষা তুমি Follow করতে পার?’

    মতীশ যেতে যেতে বলল, তা পারি বৈকি! তোর ঐ অভিনব ফিরিঙ্গী বাংলার চেয়ে অন্তত বেশী পারি।

    চামেলীর লম্বা মুখখানা আরও লম্বা হয়ে গেল।

    মঞ্জরীর জা কল্যাণী বলল, কিন্তু যাই বলুন, মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী। এরকম রূপ আমার জানাশোনার মধ্যে আমি দেখিনি।

    —ছাই রূপ! ভ্রূকুটি করল মঞ্জুরী, ঘোড়ার মতো মুখ। চোখদুটো যেন আফিম খেয়ে ঢুলছে। না জানে চুল বাঁধতে, না জানে কাপড় পরতে। সকালে এসে যখন দাঁড়াল, কপালে তেল চক্‌চক্‌ করছে। তার ওপর এত বড় একটা সিঁদুরের ফোঁটা। ম্যাগো!

    রীতা বলল, এখনও দেখে এলাম, মুখটা কেমন তেলা-তেলা। টয়লেটের বালাই নেই।

    কল্যাণী বলল, সেই কথাই তো বলছিলাম। আমরা এই যে ক’জন রয়েছি এখানে, কারও বেলায় টয়লেটের কোনো ত্রুটি হয়েছে কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু ওসব না ঘষেও যা দেখাচ্ছে, কেউ দাঁড়াতে পারবে কাছাকাছি?

    কল্যাণীর এই স্পষ্ট উক্তি মহিলারা কেউ প্রসন্ন মনে নিতে পারল না। অল্পবিস্তর প্রসাধনের চিহ্ন প্রবীণা নবীনা সকলের মুখেই সুস্পষ্ট। তার বিধবা শাশুড়ী ঠাকুরুণটিও সেদিকে কার্পণ্য করেননি। রীতা আবার একটা কী বলতে যাচ্ছিল, থেমে গেল দরজার দিকে চেয়ে। ঘরে ঢুকল ক্রিকেটের পোশাক পরা জিতেশ আর তার পেছনে গাঙ্গুলী- বাড়ির নববধূ। সকলের বিস্মিত দৃষ্টি পড়ল তার আনত মুখের উপর। জিতেশ বলল, এসো বৌদি। এখানে যারা বসে আছেন, ফাজিল মেয়েগুলো ছাড়া, সবাই তোমার গুরুজন। সকলের পায়ে কপাল ঠুকতে গেলে কপালে আইওডেক্‌স্ ঘষতে হবে। তার চেয়ে বরং একটা পাইকারী পেন্নাম লাগিয়ে দাও।

    বড়দি রুষ্টকণ্ঠে বললেন, তোকে এসব ব্যাপারে কে ডেকেছে শুনি? ফাজিল ছেলে কোথাকার!

    —আহা, ডাকেনি বলেই তো আসতে হল বড়দি। গাঙ্গুলী-বাড়ির মান-সম্মান নিয়ে তোমরা তো অনেক মাথা ঘামাচ্ছ দেখছি, নতুন বৌয়ের কাছে কি মানটা তোমাদের রইল, তাই খালি বুঝলাম না।

    —আচ্ছা তুমি এবার যাও তো জিতু, বলে কল্যাণী এসে নতুন বৌয়ের হাত ধরল—এসো ভাই, আমি পরিচয় করে দিচ্ছি।

    .

    দিদির সংসারে সমস্ত কাজ ছিল মল্লিকার হাতে। রান্না-বান্না, বাসন বাজা, ঘর নিকানো, এমন কি গরুর সেবা পর্যন্ত। এখানে তার কোনো কাজ নেই, দু-দিনেই সে হাঁপিয়ে উঠল। এদের রান্নার জন্যে আছে ঠাকুর, ঘরের কাজের জন্যে ঝি চাকর। সকালে বিকালে চায়ের পাঠ, তাও মঞ্জুরীর হাতে। একদিন সাহস করে এগিয়ে গিয়েছিল, আমায় একটু দেখিয়ে দাও না ঠাকুরঝি। মঞ্জরী ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিল, রক্ষে কর ভাই, তোমাদের সোনার অঙ্গে এসব কঠিন কাজ সইবে না। তারপর আর যায়নি। নিজের ঘরখানা ঝেড়ে গুছিয়ে সময় আর কাটতে চায় না। বাকী সময়টা একটু-আধটু ‘পড়াশুনা করতে চেষ্টা করে। বইতে মন বসে না। চোখের উপর ভেসে ওঠে তার সেই ফেলে আসা দিদির বাড়ির দিনগুলো। নিরলস কর্মময় দিন। ভোর থেকে শুরু, অনেক রাতে শেষ। একটা ঘুমের কোল থেকে উঠে আর একটা ঘুমের কোলে নেতিয়ে পড়া। তার মধ্যে নেই আলস্যের অবসর। মল্লিকার দু-চোখ ছাপিয়ে ওঠে জলের ধারা। বইয়ের অক্ষর ঝাপসা হয়ে যায়।

    এমনি একদিন সকাল বেলায় বই হাতে করে বসেছিল মল্লিকা। নীচে কি একটা সোরগোল শুনে তার তন্দ্রা ভেঙে গেল। গিয়ে শুনল, ঠাকুর আসেনি। সমস্ত মনটা তার খুশীতে নেচে উঠল। মঞ্জরী অপ্রসন্ন মুখে ঘোরাফেরা করছে, কুণ্ঠিত অনুনয়ের সুরে বলল, আজকের রান্নাটা আমি করি ঠাকুরঝি। তুমি আঁশ-কোশের মধ্যে নাই বা এলে।

    —পারবে তুমি? ঘাড় বেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল মঞ্জরী।

    –মোটামুটি পারবো। ওখানকার রান্না তো বরাবর আমিই করেছি।

    —ও আমার কপাল! গালে হাত দিয়ে বলল মঞ্জরী, এ কি তোমার সেই পাড়াগেঁয়ে পুঁইডাটার চচ্চড়ি, না, লাওয়ের ঘণ্ট! কি কি হবে শোনো। রুই মাছের ফ্রাই, চিংড়ির কালিয়া, বাবার জন্যে মাংসের স্টু, জিতুর জন্যে ডিমের কোপ্তা। পারবে এসব?

    মল্লিকা হতাশ সুরে বলল, ও সব তো আমি জানি না ভাই। ঠাকুর রোজ যা রাঁধে, ঝাল ঝোল শুক্‌তো ডালনা, সেগুলো একরকম নামিয়ে দিতে পারবো, আশা করি।

    —বেশ রাঁধো। তবে গাদাখানেক ঝাল দিও না যেন। তোমাদের দেশে তো কাঁচালঙ্কা ছাড়া আর কোন মশলা নেই।

    খেতে বসে কর্তা প্রশ্ন করলেন, এসব কে রেঁধেছে মঞ্জু?

    —তোমাদের নতুন বৌ, বাবা।

    বিশ্বনাথবাবু সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল পাতে কিছুই পড়ে নেই। দু-একখানা রান্না বরং পুনশ্চরূপে দেখা দিল। উনি কোনো আপত্তি করলেন না। জিতেশ সকাল সকাল কলেজ চলে গিয়েছিল। একটার সময় ফিরে খেয়েদেয়ে উপরে এল পেটে হাত বুলোতে বুলোতে।

    —বৌদি?

    —কি ঠাকুরপো?

    —হাত দাও।

    —সে কি!

    —আহা হাত বাড়াও, হ্যাণ্ডশেক্ করবো।

    মল্লিকা হেসে ফেলল, কেন, হ্যাণ্ডশেকের দরকার পড়ল কিসে?

    চারদিকে চেয়ে গলা খাটো করে বলল জিতেশ, বুঝতে পারছ না! তোমাদের ঐ উড়ে মহারাজের পাঁচন আর ছোড়দির অরিষ্ট খেয়ে খেয়ে পেটে কড়া পড়ে গিয়েছিল। অ্যাদ্দিন পরে দুটো ভাত খেলাম।

    আর একটু কাছে সরে এসে বলল, কিন্তু নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মেরে বসলে বৌঠাকরুণ।

    — কেন?

    —বাবা-মার মধ্যে পরামর্শ হচ্ছিল, ঠাকুর রেখে আর দরকার নেই। আড়ি পেতে শুনে এলাম। তোমার চাকরি পার্মানেন্ট হয়ে গেল।

    —সে তো আমার সৌভাগ্য ঠাকুরপো। এ ভার যদি সত্যিই ওঁরা দেন, আমি বেঁচে গেলাম।

    দিনগুলো যেমন করেই কাটুক মল্লিকার, রাতগুলো কাটে মধুর স্বপ্নের মতো। স্বামীর নিবিড় সান্নিধ্যে তার বুক দুরদুর করে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়, চোখে আসে জল। ভাবে, এত সুখ তার সইবে কি? অনেক রাত পর্যন্ত মতীশকে কাটাতে হয় তার উপরের চিলেকোঠার ঘরে। বাবা-মার ঘরের দরজা বন্ধ হলে, তারপর সে নীচে নেমে আসে। সেদিন একটা কি জটিল জিনিস পড়বার ছিল! আরও রাত হল ঘরে ফিরতে। মল্লিকা তখনও জেগে বসে আছে। মতীশ এসে শুয়ে পড়ল তার কোলের উপর। তার লম্বা লম্বা চুলগুলোর মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে বলল মল্লিকা, তুমি বড্ড গম্ভীর হয়ে গেছ আগের চেয়ে। হাস না, কথা বল না। দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছ।

    মতীশ তার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, কোন্ মুখে হাসব মল্লি? কি সুখেই না আমরা রেখেছি তোমায়!

    —ওসব কথা বললে আমি কিন্তু সত্যিই রাগ করবো। কেন, আমার কষ্ট কিসের? তুমি কাছে আছো, এই তো আমার পরম সুখ। তাছাড়া ঠাকুরপো রয়েছে। ওর জন্যে সাধ্য কি দু-দণ্ড মন খারাপ করে থাকি?

    —হ্যাঁ ঐ ছেলেটা আছে বলেই এখানে আমরা আছি। নাহলে তোমাকে নিয়ে কবে চলে যেতাম। তোমাকে এতদিন বলা হয়নি মল্লি, আমি চাকরি খুঁজছি। কলকাতায় নয়, বাইরে।

    —বাইরে! চমকে উঠল মল্লিকা, বাইরে কেন?

    তোমাকে নিয়ে একদিন ঘর বাঁধবো বলে। তখন আর তোমার কোনো দুঃখ থাকবে না।

    মল্লিকার বুকের স্পন্দন থেমে গেল যেন। নীচু হয়ে লজ্জারক্ত ডান কপালখানি রাখল স্বামীর কপালের উপর। মৃদু গুঞ্জনের সুরে বলল, এখানে আমার কোনো দুঃখ নেই।

    মাসখানেকের মধ্যেই মতীশের চাকরি জুটে গেল। এলাহাবাদে কোনো একটা ব্যাঙ্কে অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট্। বাবা বললেন, ‘চাকরি করবার কি দরকার পড়ল তোমার? এম. এ.-টা পাশ করলে হত না?’

    —এম. এ. প্রাইভেটে দেবো, স্থির করেছি।

    মা বললেন, দেশ ছেড়ে এতদূরে যাচ্ছিস কেন? এক বছর পরে উনি রিটায়ার করলে ওঁর অফিসেই তো ঢুকতে পারতিস। সায়েব কথা দিয়ে রেখেছে, উনি বলছিলেন।

    —কারও কথার উপর নির্ভর করে হাতের জিনিস ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে কি? মা আর উত্তর দিলেন না।

    সে রাত্রে মল্লিকার চোখে ঘুম এল না। স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে এতদিনের সংযমের বাঁধ বুঝি ভেসে গেল। অনেকক্ষণ কান্নার পর বুকটা যখন একটু হালকা হয়েছে, ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, এ চাকরি তুমি ছেড়ে দাও, লক্ষ্মীটি। তোমাকে ছেড়ে আমি একটা দিন ও থাকতে পারবো না।

    ওর মুখখানা দু-হাতে ধরে নিজের মুখের কাছে এনে সান্ত্বনার সুরে বলল মতীশ, এরকম ভেঙে পড়লে তো চলবে না, মল্লি। তুমি একটু শক্ত না হলে আমি জোর পাব কোথায়?

    বাকী রাত ধরে চলল ওদের স্বপ্নের জাল বোনা, দু-জনে মিলে নীড় বাঁধবার স্বপ্ন। স্টেশনে তুলে দিতে গেল জিতেশ। গাড়ি ছাড়বার মিনিট কয়েক আগে বলল, ও- মাসেই আসছো তো?

    মতীশ হেসে বলল, কেন, তুই তো রইলি।

    —তা বৈকি, আমি উইকেট আগলাবো, না তোমার বৌ আগলাবো?

    —এখন তো দুটোই আগলাতে থাক্, বলে উঠে পড়ল গাড়িতে।

    দাদা চলে যাবার পর থেকে জিতেশ রোজ একবার করে উপরে মল্লিকার খোঁজ নিয়ে যায়। ‘বৌদি’ বলে হাঁক দেয়, খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে, বোনার পশম আর পড়বার বই যোগায়, ফাইফরমাস খাটে। একদিন দুপুর বেলা ঘর থেকে বেরোতেই দেখে দরজার পাশ থেকে দ্রুত বেগে সরে গেল মঞ্জরী। পালাবার ধরনটা ভালো লাগল না জিতেশের। কিন্তু এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যও করল না। দিনকয়েক পরে বিকালের দিকে একদিন রান্নাঘরে চা করছিল মল্লিকা, মঞ্জরী এসে বলল, অসময়ে চা কেন?

    —ঠাকুরপো খাবে।

    —কোথায় সে?

    —আমার ঘরে বসে আছে।

    —চা তো সে বরাবরই নীচে এসেই খায়। আজ তোমার ঘরে কেন?

    —তা তো জানি না। চাইল খেতে। করে নিয়ে যাচ্ছি এক কাপ।

    পেয়ালা হাতে চলে যাচ্ছিল মল্লিকা। মঞ্জরী ডাকল, শোনো-

    মল্লিকা ফিরে দাঁড়াল। মঞ্জরীর কণ্ঠ থেকে উপচে উঠল বিষ, একটাকে খেয়ে পেট ভরেনি, ঐ কচিটাকেও চিবিয়ে খেতে শুরু করেছ!

    —তার মানে? শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইল মল্লিকা

    —এই সোজা কথাটার মানে বোঝ না, এতটা কচিখুকী তো তুমি নও বৌ! মল্লিকার চোখের তারায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। ভ্রূ-যুগলে দেখা দিল ঘৃণার কুঞ্চন। সংযত এবং দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ছি! এত নোংরা মন তোমার ঠাকুরঝি?

    উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুতপায়ে উঠে গেল উপরে। মঞ্জরী চেয়ে রইল জ্বলন্ত চোখ মেলে। তার মধ্যে যতখানি ক্রোধ, তার অনেক বেশি বিস্ময়।

    জিতেশের চা খাওয়া হয়ে গেলে মল্লিকা সহজ ভাবেই বলল, আমার ঘরে আর তুমি এসো না ঠাকুরপো।

    জিতেশ বিস্ময়ে বলে উঠল, কেন?

    –সে কথা আমাকে জিজ্ঞেস করো না ভাই। আমি বলতে পারবো না।

    —তোমাকে বলতে হবে না বৌদি, আমি বুঝেছি।

    সেই দিন দু-খানা চিঠি গেল মতীশের কাছে। জিতেশ লিখল, তোমার বৌকে তুমি নিয়ে যাও দাদা। আমাকে শিগিরই দিল্লী যেতে হচ্ছে।

    মল্লিকা লিখল, ওগো তুমি একবার এসো। আমি আর থাকতে পারছি না।

    এলাহাবাদে গিয়ে দুপুরে চাকরি, আর সকালে-বিকালে বাড়ি খোঁজা—এই ছিল মতীশের রুটিন! শুধু বাড়ি নয়, সেই সঙ্গে একটা টিউশান্। শ’দেড়েক টাকার ভেলায় চড়ে সংসার-সমুদ্রে অবতরণের সাহস করা যায় না। মল্লিকাকে সকল রকম দুঃখ এবং দৈন্য থেকে রক্ষা করতে হবে। দিদির বাড়িতে সে অভাবের মধ্যে মানুষ হয়নি। তার চিহ্ন রয়েছে তার দেহের অটুট স্বাস্থ্যে এবং অপরূপ লাবণ্যে। মল্লিকাদের সেই ছোট্ট গ্রামখানির সঙ্গে মতীশের পরিচয় স্বল্পক্ষণের। তবু যে সামান্য কটি মানুষ তার দেখবার সুযোগ হয়েছিল, তাদের দেহে বস্ত্রের স্বল্পতা যতই থাক, পুষ্টির দীনতা চোখে পড়েনি। একদল উলঙ্গ এবং অর্ধোলঙ্গ ছেলেমেয়ে তাকে ঘিরে ধরেছিল, ‘কলকাতার বাবু’ নামক আজব জীবটিকে দেখবার জন্যে। তাদের চালচলনে চাকচিক্য ছিল না, কিন্তু সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি সরল নিরাভরণ স্নিগ্ধতা। প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ করে এটা বোঝা গিয়েছিল, ওদেশের ক্ষেতে আছে ধান, খালবিলে পুকুরে আছে মাছ, গরুর বাঁটে দুধ এবং আম কাঁঠাল বাতাবী নারিকেলের বনে অজস্র ফল। যশোর জেলার কোন্ দূর দুর্গম পল্লী প্রান্তে এই জঙ্গলে ঘেরা গ্রামখানি তার শ্যামলশ্রী নিয়ে মতীশের মনের একটা কোণ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

    একথা সে অন্তর দিয়ে অনুভব করে, এই গ্রামের কোলেই একদিন কুঁড়ি হয়ে দেখা দিয়েছিল তার মল্লিকা। এরই আকাশতলে, এরই বাতাসের ছোঁয়া লেগে দিনের পর দিন তিলে তিলে মেলে ধরেছিল তার রূপমাধুরীর সমগ্র দল। সেখান থেকে উপড়ে এনে এই মমতাহীন রুক্ষতার মধ্যে কি দিয়ে তাকে বাঁচাবে এই তার একমাত্র চিন্তা।

    মল্লিকার চিঠির উত্তর দিল মতীশ, আর ক’টা দিন কষ্ট করে থাকো মল্লি। আমাদের ঘর যে বাঁধা হয়নি। জিতেশকে লিখলো, তোর দিল্লী লাহোর এখন শিকেয় তুলে রাখ। যতদিন না আমি যাচ্ছি, বৌদিকে ফেলে কোথাও গেলে আর রক্ষা রাখবো না।

    আরও মাসখানেক চেষ্টার পর একটা ছোট বাসা পাওয়া গেল এবং সেই সঙ্গে জুটল একটা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হিসাব লেখার কাজ—সন্ধ্যাবেলা দু-ঘণ্টা। মতীশের মনে হল তার মতো ভাগ্যবান কেউ নেই। সাতদিনের ছুটি নিয়ে এল কলকাতায়। এসেই শুনল, পিসিমার মেয়ে গীতার বিয়ে। মা বললেন, ওঁর প্রথম কাজ। অনেক ঘটা হবে। বার বার করে বলে গেছেন, নতুন বৌকে যেতেই হবে। না গেলে ভালো দেখায় না। অগত্যা মতীশকে রাজী হতেই হল।

    সেইদিনেই বিকাল বেলা শাশুড়ীর ঘরে ডাক পড়ল মল্লিকার। গিয়ে দেখে নিক্তি আর মোটা খাতা নিয়ে বসে রয়েছে গাঙ্গুলীবাড়ির পুরানো সেকরা মতিলাল। সামনে কয়েকখানা গহনা। সুহাসিনী দেবী বললেন, তাহলে ঐ কথাই রইল, মতি। ব্রেসলেট আর ওপর- হাতের মাপটা নিয়ে নাও। চুড়ির মাপ আর নিতে হবে না। একটা চুড়ি খুলে নিলেই হবে। জিনিস কিন্তু আমার সোমবারের মধ্যেই চাই। মল্লিকার দিকে ফিরে বললেন, তোমার একটা চুড়ি খুলে দাও বৌমা।

    মল্লিকা চুড়ি খুলে রাখল শাশুড়ীর সামনে। সেকরা উঠে এসে তার বাহুর উপর এক জড়োয়া আর্মলেট রেখে বলল, এটাই ঠিক হচ্ছে মা? খাসা মানিয়েছে দেখুন। তারপর নিজের জায়গায় ফিরে যেতে যেতে বলল, সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রীর মতো বৌ আপনার। সাজান না কত সাজাবেন।

    সন্ধ্যাবেলা বড়বাজার থেকে বেনারসীর বোঝা মাথায় নিয়ে এল কপ্পুরলাল। দোতলার হলঘরে একশ’ পাওয়ারের আলো জ্বেলে মা আর মেয়েতে মিলে ঘণ্টাখানেক চলল বাছাবাছি। তারপর মল্লিকাকে ডেকে পাঠানো হল। দোকানী একটিবার তার দিকে চেয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল, রঙ পছন্দ আর দরকার হোবে না, মা। বহুমাকে সব রঙ মানিয়ে যাবে। এই নিন, বলে মল্লিকার দিকে এগিয়ে দিল চার-পাঁচখানা দামী জমকালো শাড়ি। রাত এগারোটায় মল্লিকা যখন শুতে এল, মতীশ বলল, অনেক কাপড় গয়না পেলে নাকি শুনলাম?

    —হিংসা হচ্ছে বুঝি তোমার! মুখ টিপে হাসল মল্লিকা।

    মতীশ সে হাসিতে যোগ দিল না, কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল। মল্লিকা এগিয়ে এসে ডানহাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, আহা রাগ করছ কেন? তোমাকেও কিছু ভাগ দেবো। এবার খুশি তো?

    ম্লান হাসি হেসে বলল মতীশ, খুশি হবারই তো কথা। কিন্তু তুমি তো জানো না মল্লি, এ গয়না কাপড় তোমার জন্যে আসেনি, এসেছে গাঙ্গুলীবাড়ির মানরক্ষার জন্যে।

    মল্লিকার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। স্বামীর আর একটু কাছে সরে এসে বলল, এ বিয়েতে যেতে কেমন যেন ভয় করছে আমার। তার চেয়ে চল না, আমরা আগেই চলে যাই। বাবা-মাকে বুঝিয়ে বললে ওঁরা নিশ্চয়ই জোর করবেন না।

    —বুঝিয়ে বলেছি। ওঁরা শুনবেন না। কিন্তু না—হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল মতীশ, বিয়েতে তোমাকে যেতেই হবে, ওদের অস্ত্র দিয়েই ওদের আমরা মারবো। ঐ বেনারসী আর জড়োয়ার অস্ত্র। ঐগুলো পরে, রানীর মতো মাথা উঁচু করে একবার তুমি গিয়ে দাঁড়াও ঐ হিংসুটে কুচক্রী ছোটলোকগুলোর মধ্যে। ওরা চেয়ে দেখুক; দেখে জ্বলে পুড়ে মরুক। ওদের সেই জ্বালা আমি একবার নিজের চোখে দেখতে চাই।

    স্বামীর পাশে বসে মল্লিকা তার বুকের উপর আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। এই শান্ত-শিষ্ট নিরীহ মানুষটির বুকের মধ্যে এতখানি আগুন লুকিয়ে ছিল, স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি কোনোদিন।

    নতুন বৌকে সাজাবার ভার নিল মঞ্জরী। একদিন এসব আর্টে নাকি তার জুড়ি ছিল না। আজ কপাল পুড়েছে বলেই সাধ-আহ্লাদ তো আর নিঃশেষ হয়ে যায় নি। প্রসাধন পর্বের প্রথম অঙ্ক হল স্নানঘর। সেখান থেকেই শুরু। নিপুণ হাতে সাবান লেপনের পর মুখে কপালে যখন শুরু হল শুষ্ক তোয়ালের নির্মম ঘর্ষণ, মল্লিকা আর মুখ না খুলে পারল না—আর কত ঘষবে ঠাকুরঝি! একপরতা চামড়াই বুঝি উঠে গেল এতক্ষণে।

    মঞ্জরী জবাব দিল তার স্বভাবমধুর কণ্ঠে, অঢেল আছে কিনা, তাই এত দেমাক, এত হেলা-ফেলা। দ্যাখ্ চোখ খুলে, কি ময়লাটা উঠছে! এক-চোখো বিধাতার কি কাণ্ডজ্ঞান আছে? উলুবনে মুক্তো ছড়িয়ে দিয়েছে। এত রূপ, তার একটু যত্ন নেই! একগাদা তেলকালি মেখে ভূত সেজে বসে আছে। পড়তিস সেরকম লোকের হাতে—

    পরিহাস-তরল কণ্ঠে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল মল্লিকা, থেমে গেল ননদের দিকে চেয়ে। হঠাৎ যেন নিশ্চল হয়ে গেছে মঞ্জরী। তার নির্নিমেষ চোখটি তারই সিক্ত দেহের উপর নিবদ্ধ। কিন্তু সেখানে তারা থেমে নেই, ভেদ করে চলে গেছে হয়তো কোনো স্মৃতি- মুখর অতীত দিনের আলোয় যার খবর মল্লিকা জানে না।

    গয়না পরাতে গিয়ে বিরক্তি ফুটে উঠল মঞ্জরীর মুখে। এই রকম নেকলেস কি আজকাল কেউ পরে? মার যেমন পছন্দ! আর এই বুঝি ব্রেসলেট! দূর! বলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। নিজের গয়নার বাক্‌স খুলে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর তাকাল নিজের দিকে। বোধহয় মনে পড়ল সেই মঞ্জরীকে যার সর্বদেহে একদিন এরা ছিল প্রাণময় জ্যোতি। আজকের মঞ্জরীর কাছে এগুলো শুধু নিষ্প্রাণ স্বর্ণপিণ্ড। তাড়াতাড়ি কয়েকখানা অলঙ্কার বেছে নিয়ে ফিরে এল মল্লিকার কাছে। নিপুণ হাতে চলল অঙ্গসজ্জা। এক-একটা স্তর পার হয়, আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারদিক থেকে দেখে মৃৎশিল্পী যেমন করে দেখে তার হাতের গড়া দেবীমূর্তি।

    দীর্ঘ প্রসাধন পর্ব যখন শেষ হল, কাছে এসে বৌ-এর রক্তাভ কপোলের উপর আলগোছে একটি ছোট্ট চুম্বন রেখে বলল, দাদার হয়ে একটিনি করলাম একটুখানি— বলেই হঠাৎ বেরিয়ে গেল ঝড়ের মতো। মল্লিকা বিস্ময়-বিমূঢ় চোখে চেয়ে রইল তার এই দুর্বোধ্য, দুর্মুখ ননদটির দিকে।

    জিতেশ বাড়ি নেই। ক’দিন হল তার ক্রিকেট টিম্‌ নিয়ে খেলতে গেছে দিল্লী। বাড়িতে আর চারটি প্রাণী। একখানা গাড়িতেই চললেন সবাই। যাবার আগে গোপন ষড়যন্ত্র হল মতীশ আর মল্লিকায়, শেষ পর্যন্ত ওদের থাকা চলবে না। ঘণ্টা দুয়েক পরেই মল্লিকার ভীষণ মাথা ধরবে কিংবা গা-বমি করবে, এবং মঞ্জরীর প্রস্তাবে মতীশের উপর ভার পড়বে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার। ওরা ট্যাক্‌স করে ঘুরবে। দেখবে আলোকোজ্জ্বল কলকাতার বিচিত্র রূপ। তারপর বাড়ি ফিরবে অনেক রাতে। আর দু-দিন পরেই তো চলে যাচ্ছে এ শহর ছেড়ে, কবে ফিরবে কে জানে? মল্লিকা উৎসাহিত হয়ে উঠল, বেশ হবে কিন্তু। সত্যি, কলকাতার কত গল্প শুনেছি ছেলেবেলা থেকে, একদিনও ভালো করে দেখা হল না।

    মতীশ ভার নিয়েছে, সে ক্ষোভ তার মিটিয়ে দেবে এক রাতেই। এসব ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কিনা, সে বিষয়ে ওদের সন্দেহ কম ছিল না। পিসিমা যদি ছাড়তে না চার্ন, মা যদি বেঁকে বসেন, মঞ্জরী যদি সাহায্য না করে—এর সবগুলো সম্ভাবনাই ছিল। কিন্তু একটা আকস্মিক ঘটনায় ওদের পথ সুগম হয়ে গেল।

    তিনতলার একটি সুসজ্জিত প্রশস্ত কক্ষে নিমন্ত্রিতা মেয়েরা জড় হয়েছেন। অত্যুজ্জ্বল তড়িতালোকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জ্বলছে রূপ আর বেশভূষার চমক। কনেও আছে তাদের মধ্যে। বরপক্ষের একটি বর্ষীয়সী মহিলা ঘরে ঢুকলেন, কই আমাদের বৌ কই, মা-লক্ষ্মী কই গো? একবার চারদিকটা চোখ বুলিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলেন মল্লিকার কাছে, এই বুঝি? বাঃ, মেয়ে সুন্দর শুনেছি। এত সুন্দর, এ যে স্বয়ং মা-দুগ্‌গা গো। মুখখানা দ্যাখ, একেবারে ঠাকুর-দেবতার মুখ…..

    মল্লিকা বিব্রত হয়ে পড়ল। লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না। তবু বুঝতে পারছে চারদিক থেকে সবগুলি চোখই তার উপর উদ্যত এবং তাদের কোনোটাই প্ৰসন্ন নয়। এমন সময় কে একজন তাকে রক্ষা করল।

    —এই যে কনে, এই দিকে আসুন ঠাকুরমা, বলে কাণ্ডজ্ঞানহীনা বৃদ্ধার হাত ধরে নিয়ে গেল আসল কনের কাছে। তিনি স্পষ্টত নিরাশ হলেন।

    খবরটা যখন কনের মায়ের কানে পৌঁছল, তিনি হলেন ক্ষিপ্ত। কী দরকার ছিল মাঝখানে জাঁকিয়ে বসবার? রূপ না হয় আছে, তাই বলে এতখানি দেমাক কিসের? এসেছো তো বাপু কোন্ হাড়ফুটোর ঘর থেকে। বাসন মেজে মেজে হাতে কড়া পড়ে গেছে।—ইত্যাদি মধুর বাক্যের গুঞ্জরণ উঠল ঘরে ঘরে এবং তার সবটুকুই এসে পৌঁছল মল্লিকার কানে। সুতরাং মাথাটা তার সত্যিই ধরল এবং চলে যাবার প্রস্তাবে একবাক্যে সম্মতি দিলেন স্নেহময়ী অভিভাবিকার দল।

    প্রকাণ্ড একখানা নতুন ক্রাইসলার গাড়ি। গম্ভীর হর্ন বাজাতে বাজাতে ছুটে চলেছে চৌরঙ্গীর বুকের উপর দিয়ে। স্বামীর বাহুবন্ধনে ধরা দিয়ে পিছনের সিটে যখন ডুবে গেল মল্লিকা, তার মনে হতে লাগল সেই একটি মাত্র কথা, এত সুখ তার সইবে তো? মতীশের জীবনেও কোনোদিন আসেনি এমনিধারা উচ্ছল মুহূর্ত। তার মনে জেগেছে উৎসবের জোয়ার। এ যেন তারই বিবাহরাত্রি। রূপৈশ্বর্য-মণ্ডিতা যে অগ্নিশিখার উত্তপ্ত স্পর্শ জড়িয়ে আছে তার অঙ্গে সে যেন তার সদ্যলব্ধা নববধূ। মল্লিকা যেন আজই প্রথম এসেছে তার জীবনে। তাকে সে আরও একান্ত, আরও নিবিড় করে পেতে চায়। হঠাৎ একসময়ে দু-খানা মুখের ব্যবধান যখন অতন্ত সংকীর্ণ হয়ে এল, মল্লিকা আস্তে ঢেলে দিল স্বামীকে, ফিফিস্ করে বলল, দেখছে যে লোকটা!

    —ওর পেছনে দুটো চোখ আছে নাকি? তেমনি চুপি চুপি বলল মতীশ।

    —বাঃ, বুঝতে পারে তো!

    কিন্তু এসব কোন যুক্তিই টিকল না। ব্যবধান ঘুচে গেল। তার জন্যে ও তরফেও যে কোনো সত্যিকার আপত্তি ছিল মনে হল না।

    ঘণ্টাতিনেক ঘুরে আমহার্স্ট স্ট্রীটে যখন এসে পৌঁছল, তার আগেই বেশ জোরে জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ওদের বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করানো হল। মতীশ নেমে পড়ল। মল্লিকাও নামতে যাচ্ছিল, বাধা দিয়ে বলল মতীশ, দাঁড়াও দরজা খুলুক আগে, ভিজে ঢোল হয়ে যাবে যে!

    —তা হোক, আমি নামবো; কোণের দিকে সরে আসতে আসতে বলল মল্লিকা। ততক্ষণে গাড়ির দরজা বন্ধ করে এগিয়ে গেছে মতীশ। ফুটপাথ পার হয়ে কড়া নাড়তে যাবে হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ চীৎকার শুনে পেছনে ফিরে দেখে, গাড়ি চলতে শুরু করেছে।

    ‘রোখো, রোখো, এই ড্রাইভার! এই ট্যাক্সি! চোর! চোর! পাকড়ো।’ উন্মাদের মতো চীৎকার করতে করতে ছুটল মতীশ। তার আগেই তার মুখের উপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বিদ্যুৎবেগে মিলিয়ে গেছে ট্যাক্সি। রাস্তায় জনমানব নেই। দোকানপাট বন্ধ। শুধু সাক্ষীগোপালের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে ল্যাম্প পোস্টগুলো।

    মতীশ বাড়ি ফিরল না। মুষলধারে বৃষ্টি মাথায় করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালো সারারাত। তারপর হঠাৎ খেয়াল হতে ভোরবেলা গেল থানায় খবর দিতে। গাড়ির নম্বর জানা নেই। কি গাড়ি তাও মনে করতে পারলে না! পাঞ্জাবী ড্রাইভার, এইটুকু তথ্য শুধু জানতে পারলেন থানা অফিসার।

    পরদিন বেলা আটটার সময় একখানা রিকসা করে সে যখন বাড়ি ফিরল, তখন আর চলবার শক্তি নেই। টলতে টলতে বসে পড়ল উঠানের পাশে। মা ছুটে এলেন, কোথায় ছিলি সারারাত! এ কি চেহারা হয়েছে ছেলের! বৌমা কই?

    কি জবাব দেবে মতীশ? হাঁটুর মধ্যে মাথা রেখে একবার শুধু বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে মা। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

    কর্তার এক বন্ধু ছিলেন পুলিশের উচ্চ মহলে। ট্যাক্সি করে ছুটলেন তাঁর কাছে। থানায় থানায় সাড়া পড়ে গেল। শহর এবং শহরতলিতে শুরু হল সন্ধান। টেলিগ্রাম ছড়িয়ে পড়ল এক স্টেশন থেকে আর এক স্টেশনে। দেখতে দেখতে দুদিন কেটে গেল, প্রত্যাশিত খবর এসে পৌঁছল না।

    তৃতীয় দিন ঝি আসছিল কাজে, চারদিক তখনো ফরসা হয়নি। বাইরের রোয়াকে ঝুঁকে পড়ে কি একটা দেখছে দুজন উড়ে মিস্ত্রি, হাতে তাদের রাস্তায় জল দেবার হোজ- পাইপ

    —কী গা? হেঁকে বলল ঝি।

    এগিয়ে গিয়ে একপলক দেখেই চেঁচিয়ে উঠল কালীদাসী—ওমা, এ যে আমাদের বৌদিদিমণি!

    ধরাধরি করে ওর নিজের ঘরে তোলা হল বৌকে। নিরাভরণ দেহ। আবরণও নেই বললেই চলে! একটা নোংরা ধূতি কোনো রকমে জড়ানো। মতীশ আছড়ে পড়ল সংজ্ঞাহীনার বুকের উপর। চিৎকার করে ডাকল, মল্লি, মল্লিকা! কেউ সাড়া দিল না।

    খবর পেয়ে ডাক্তার এলেন। মোটামুটি পরীক্ষা করে ক্ষিপ্রহস্তে লিখলেন প্রেসক্রিপশন। সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভয় নেই, ভাল হয়ে যাবে। তারপর কর্তার ঘরে গিয়ে বললেন, Physical injury যেটা হয়েছে, তার জন্যে ভাবি না। কিন্তু nerve-এর shock কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। Treatment তো আছেই, তার চেয়েও বেশী দরকার long and patient nurse — দরদ এবং সেবা। দু-দিন একদিন নয়, বোধহয় কয়েক মাস।

    ঘরভর্তি লোক। সবাই নিস্পন্দ। নিঃশব্দে চেয়ে আছে ডাক্তারের মুখের দিকে। হঠাৎ পিছন থেকে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল মঞ্জরী। দৃঢ়কণ্ঠে বলল, সেজন্য ভাববেন না ডাক্তার কাকা। আমাদের তো কোনো কাজ নেই! ও ভার আমি নিলাম।

    —তুমি কি পারবে, মা? সন্দেহের সুরে বললেন বৃদ্ধ ডাক্তার।

    —কেন পারবো না?

    —ওটা আনাড়ি হাতের কাজ নয়। নার্সিং-এর জন্যে প্রাণ চাই নিশ্চয়ই, কিন্তু তার সঙ্গে চাই ট্রেনিং।

    কর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির হল বৌকে আপাতত কোনো নার্সিং হোমে পাঠানো হবে। সেখানে তার ভার নিয়ে থাকবে দুজন সুদক্ষ নার্স! অবিলম্বে তার ব্যবস্থা করবার জন্যে ডাক্তার ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়লেন।

    প্রথম যেদিন জ্ঞান হল মল্লিকার, চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল চারদিকে। বোধহয় মনে করতে চেষ্টা করল সব কথা। তারপর ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আমি কোথায়? মতীশ কাছেই ছিল, ওর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলল, তুমি আমার কাছে আছ, মল্লি।

    —তুমি! না-না, ভীতকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল মল্লিকা, সরে যাও। আমায় ছুঁয়ো না, আমায় ছুঁতে নেই-

    —সে কি কথা মল্লি! ওকে জড়িয়ে ধরে বলল মতীশ, আমি, আমি! আমার কাছে রয়েছ তুমি।

    —ওগো তোমার পায়ে পড়ি, আমায় ছেড়ে দাও। আমি অশুচি, অস্পৃশ্য। আমার যে সর্বনাশ হয়ে গেছে।

    চিৎকার শুনে ছুটে এল সিনিয়র নার্স মিস্ সরকার। বিরক্তির সুরে বলল, করছেন কি! ছেড়ে দিন ওকে।

    মতীশ অপরাধীর মতো উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ উত্তেজনার পর ক্লান্ত, অসাড় হয়ে চোখ বুজল মল্লিকা। নার্স তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে পাল্সে হাত রাখল।

    মতীশের উপর কড়া হুকুমজারি হল, ডাক্তারের অনুমতি যতদিন না মেলে মল্লিকার ঘরে তার প্রবেশ নিষেধ। তবু বিকেল হলে নার্সিং হোমের অফিসে গিয়ে ধর্না দেয়, মিস্ সরকারের সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছে আজ। উত্তর প্রায় একই—একটু ভালো কিংবা আগের মতোই। এমন সময় এলাহাবাদ থেকে চিঠি এল—আর ছুটি দেওয়া হবে না। অবিলম্বে জয়েন না করলে তারা অন্য লোক দেখে নেবে। উত্তরে তৎক্ষণাৎ ইস্তফা পত্র লিখে ফেলল মতীশ। তারপর কি ভেবে আস্তে আস্তে ছিঁড়ে ফেলে দিল। মনে পড়ল মল্লিকার সেই কথাগুলো—চল আমরা বিয়ের আগেই চলে যাই। বাবা-মাকে বুঝিয়ে বল, ওঁরা নিশ্চয়ই জোর করবেন না। ওকে নিয়ে ঘর বাঁধবার স্বপ্ন এখনও তো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

    মঞ্জরী রোজ একবার করে যায় নার্সিং হোমে। সেদিন ওকে একটু সুস্থ দেখে বলল, দাদাকে তাড়িয়ে দিয়েছিস কেন রে? পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেচারা।

    মল্লিকার মুখখানা করুণ হয়ে উঠল। বলল, ওকে তুমি দেখো, ভাই।

    —আমি দেখবো, মানে? তুই কি বাড়ি-টাড়ি যাবি না নাকি? কদ্দিন আর এই হাসপাতালে শুয়ে থাকতে চাস শুনি?

    —বাড়ি যাবার পথ তো আমার আর নেই ঠাকুরঝি।

    —সে আবার কী কথা!

    মল্লিকা একটু চুপ করে থেকে বলল, যা হারিয়েছি, তার চেয়ে বড় মেয়েমানুষের আর কী আছে ভাই? সে-কথা উনি না বুঝতে পারেন, মেয়ে হয়ে তুমি তো বোঝো। এই দেহটা কি আর তার পায়ে রাখা যায়, না এ দিয়ে তার সেবা চলে?

    মঞ্জরী উষ্ণকণ্ঠে বলল, দ্যাখ্ বৌ, তোর এই সব পণ্ডিতি-বুলি শুনলে আমার গা জ্বালা করে। দেহের কথা বলছিস? কিন্তু একে বাঁচাবার কোনো উপায় তো তোর হাতে ছিল না?

    —তা ছিল না। কিন্তু তাই বলে যা ঘটল তার ফলটা তুমি অস্বীকার করবে কেমন করে? ভূমিকম্পে যখন বাড়ি ভেঙে পড়ে, তার উপরেও বাড়ির কোনো হাত নেই! তবু সেই ভেঙে পড়াটা সত্যি। তার ফলভোগও ঐ বাড়িকেই করতে হয়।

    মঞ্জরী অসহিষ্ণু হয়ে উঠল, কি জানি ভাই, তোমার ওসব বড় বড় তত্ত্বকথা আমার মাথায় ঢোকে না। আমি মুখ্যু মানুষ, সহজ বুদ্ধিতে বুঝি, পাপ পুণ্য শুচি অশুচি—এসব বোধ হল মনের। দেহের সঙ্গে তার কিসের সম্পর্ক? দেহে যদি দাগ লেগেও থাকে, মনকে তা স্পর্শ করবে কেন? সেই জানোয়ারটাকে তো তুই ভালবেসে আত্মদান করিসনি!

    —না ভাই, তা করিনি। তবু দেহের দাগ মনের গায়েও লাগে। শরীরটা যখন বাসের অযোগ্য হয়ে গেল, মন দাঁড়াবে কিসের ওপর? দেহই না মনের আধার?

    মঞ্জরীর দৃষ্টি ছিল জানালার বাইরে। সেই দিকে চেয়েই মৃদু কণ্ঠে বলল, তোর কথার ঠিক জবাব আমি দিতে পারবো না বৌ! সে বিদ্যা আমার নেই! আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, তোর কপালে যা ঘটেছে সেটা যদি আমার হত, আমি তাকে স্রেফ একটা দুঃস্বপ্নের মতো ঝেড়ে ফেলে দিতাম। একদিন এক পশুর হাতে পড়েছিলাম বলে তার দাঁতের বিষ আর নখের আঁচড়টাই আমার জীবনে সত্য হয়ে থাকবে, আর মিথ্যে হয়ে যাবে আমার চিরদিনের দেবতার অমৃত-স্পর্শ, একথা আমি কিছুতেই মানতে পারি না।

    মল্লিকার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় বৌ, তুই বড় স্বার্থপর। খালি নিজেকে নিয়েই আছিস। নিজের শুচি, নিজের ধর্ম। আর একজনের দিকে দ্যাখ্, আর একজনের কথাও ভাবতে চেষ্টা কর।

    ক্ষণেকের বিরতির পর মল্লিকা বলল, ঐখানেই তো আমার সব দুঃখ ঠাকুরঝি। উনি যদি আমাকে ত্যাগ করে চলে যেতেন, মুখ ফিরিয়ে নিতেন আমার এই অভিশপ্ত দেহটার দিক থেকে, আমি বেঁচে যেতাম ভাই। সংসারে সব মেয়ে সারাজীবন নিতে চায় স্বামীর ভালবাসা, আমি সমস্ত অন্তর দিয়ে চাইছি আমার স্বামীর ঘৃণা। কী করলে তা পাওয়া যায় বলতে পারো?

    মঞ্জরী কোন উত্তর না দিয়ে রাগ করে চলে গেল। বাড়ি পৌঁছেই ঝড়ের মতো ঢুকল দাদার ঘরে। তিক্ত কণ্ঠে বলল, পরী দেখে ভুলেছিলে, এবার বোঝো! বুনো পাখি ঘরে এনে রাখলেই কি পোষ মানে, না কোনোদিন আপনার হয়!

    সেই রাত্রেই মতীশ এলাহাবাদ চলে গেল।

    নার্সের সঙ্গে রুগীর যে সম্পর্ক, সেটা যে কখন ওরা নিঃশব্দে পার হয়ে এসেছে, মিস্ সরকার বা মল্লিকা কেউ তা টের পায় নি। আজ ওদের সত্যিকার সম্পর্কটা কি, ওরা জানে না। শুধু জানে, ওরা দাঁড়িয়েছে একে অন্যের অন্তরের মুখোমুখি, এবং তার মাঝখানে কোনো অন্তরাল নেই।

    সেদিন মঞ্জরী চলে যাবার পর বহুক্ষণ তেমনি অসাড় হয়ে পড়ে রইল মল্লিকা, ডুবে গেল তার অন্তহীন চিন্তার গহন অতলে। মিস্ সরকার কখন এসে তার শয্যার একটা কোণ দখল করেছে জানতেও পারেনি। জানতে পারল, তার ডান হাতখানা যখন পড়ল এসে ওর হাতের ওপর। চমকে উঠে বলল, ওমা! তুমি এখন এলে?

    মিস্ সরকার সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, মঞ্জরী দেবী ঠিকই বলেন, দুঃখের হাত থেকে বাঁচতে হলে অনেক কিছু ভুলতে হয়।

    —ভুলতে যে পারি না ভাই।

    —আমি কেমন করে ভুললাম? — তুমি!

    —হ্যাঁ, এই আমি।

    মল্লিকা পাশ ফিরে হাতখানা নার্সের কোলের উপর রেখে বলল, তুমিও কি আমারই মতো—

    মিস্ সরকার হেসে বলল, হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে মিল অনেক—একটু-আধটু অমিলও আছে। আমি যাদের কবলে পড়েছিলাম, তাদের মাথায় পাগড়ি ছিল না, তবে মুখে ছিল চাপদাড়ি। প্রয়োজন ফুরোবার পর তাঁরা যখন দয়া করে আমাকে মুক্তি দিয়ে গেলেন, তোমার মতো এমনি একটা নার্সিং হোম আমার কপালে জোটেনি, জুটেছিল শুধু একটা গাছতলা। সেখান থেকে নিজের অসাড় দেহটাকে নিজেই টেনে-হিঁচড়ে যখন ঘরে নিয়ে গেলাম, তখন জুটল গলাধাক্কা।

    —বল কি! চমকে উঠল মল্লিকা।

    —হ্যাঁ। অবিশ্যি গলায় হাত দিয়ে ধাক্কাটা কেউ মারেনি। কিন্তু যা পেলাম তার মানে ঐ দাঁড়ায়। তারপর রইল শুধু পথ। এলাম কলকাতায়। কি করে সেকথা আর জিজ্ঞেস কোরো না। বারকয়েক হাত-বদল হবার পর শেষটায় যখন বেরিয়ে এলাম, একেবারে রীতিমতো পাসকরা নার্স। আজ কে বলবে এই রমা সরকারই হচ্ছে নোয়াখালির এক প্রসিদ্ধ গ্রামের স্বনামধন্য মিত্রবংশের আদরের মেয়ে অতসী।

    —নামটাও বদলে ফেলেছ?

    —মানুষটাই যখন রইল না, তুচ্ছ নামটা রেখে কি লাভ হত মল্লিকা?

    মল্লিকা নিজের মনে কি ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, কিন্তু একটা কথা দিদি, অনেক কিছু পেয়েছ বুঝলাম। ঘর বাঁধতে তো পারনি!

    —ঠিকই বলেছ। কিন্তু তার কারণ, তুমি যা ভাবছ তা নয়। তার কারণ, ঘর থেকে বাইরে নেবার অনেক সঙ্গী জুটলেও, ঘর বাঁধবার সঙ্গী আজ পর্যন্ত একটাও আসেনি। -তেমন সঙ্গী যদি পাও, তোমার দিক থেকে মনে-প্রাণে পারবে তার ঘর করতে? -কেন পারবো না?

    মল্লিকা করুণ কণ্ঠে বলল, কিন্তু আমি যে পারছি না, ভাই। আমার দেবতার মতো স্বামী। তার মুখের দিকে চাইলে আমার বুক ফেটে যায়। তবু তো পারি না তার ডাকে সাড়া দিতে? মল্লিকার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। নিজের আঁচলে সস্নেহে মুছিয়ে দিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল মিস্ সরকার, আমি সব জানি বোন। কিন্তু তোমার ঐ পুঁথির বুলি তোমাকে ভুলে যেতে হবে। তুমি অনেক পড়েছ, অনেক শিখেছ। সে সব শুধু বোঝা। জীবনের মাঝখান থেকে যখন টান আসে, ওগুলো কোনো কাজেই লাগে না। ওসব ঝেড়ে ফেলে তখন সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়।

    মল্লিকা বলল, না দিদি, তুমি ভুল করছ। লেখা-পড়া যাকে বলে, আমি তা কোনোদিন শিখিনি। পাড়াগাঁয়ে ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের ঘরে মানুষ। একটু বাংলা একটু সংস্কৃত। সে-সব আমার মনেও নেই। জীবনে যদি কিছু পেয়ে থাকি, পুঁথির কাছ থেকে পাইনি, পেয়েছি মানুষের কাছ থেকে। আমার ভেতরে যা-কিছু দেখছ, সব ঐ একটিমাত্র মানুষের দান।

    —কে তিনি?

    —আমার কৈশোর-গুরু আমার দিদির স্বামী।

    ঝি এসে জানাল ডাক্তারবাবু মিস্ সরকারকে ডেকে পাঠিয়েছেন। নার্স যেতে যেতে বলল, এবার উঠে মুখ হাত ধুয়ে নাও। তোমার খাবারটা এখানেই দিতে বলি।

    মল্লিকা যেন শুনতেই পেল না কথাগুলো, তার দু-কান ভরে বাজতে লাগল যাদব তর্করত্নের স্নেহ-গভীর উদার কণ্ঠস্বর। মনে পড়ল, কি একটা প্রসঙ্গে একদিন তিনি বলেছিলেন, এই যে মানব-দেহ আমরা ধারণ করেছি, একে তুচ্ছ কোরো না মল্লিকা। দেহ হচ্ছে দেবতার মন্দির। একে শুচি, শুদ্ধ পবিত্র রাখলেই তার মধ্যে দেবপ্রতিষ্ঠা সম্ভব। তুমি মেয়ে হয়ে জন্মেছ। আজ হোক, কাল হোক একদিন তোমাকে পতিবরণ করতে হবে। স্বামী হয়ে যিনি আসবেন, তোমার এ দেহ-মন যেন তাঁর পায়ে শুদ্ধভাবে সমর্পণ করতে পার, যেমন করে আমরা নিবেদন করি দেবতার পায়ে পূজার ফুল। মনে রেখো মল্লিকা, নিখুঁত নিষ্কলঙ্ক ফুলই দেবভোগ্য। যে-ফুল আঁস্তাকুড়ে পড়েছে, যাকে কেউ পায়ে মাড়িয়ে গেছে, সে কখনও দেবতার পূজায় লাগে না।

    কথাগুলো মল্লিকার অন্তস্তলে গাঁথা হয়ে গেছে। কে জানত একদিন তার নিজের জীবনেই দেখা দেবে তার মূল্য-পরীক্ষার প্রয়োজন? কিন্তু প্রয়োজন যখন সত্যিই দেখা দিল, ঘর বাঁধতে না বাঁধতেই যখন ডাক পড়ল সে ঘর ভাঙবার, সহসা দমকা বাতাসে নিবে গেল তার যৌবনারতির সদ্য-সাজানো দীপমালা, তখন সব কিছু ফেলে সমস্ত শক্তি দিয়ে একেই সে আঁকড়ে ধরল, এই আ-কৈশোর-বন্দিত নির্মম কঠিন আদর্শ। মনে মনে বলল মল্লিকা, প্রথম জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে যাকে সত্য বলে জেনেছি, তার মর্যাদা যেন কোনোক্রমে ক্ষুণ্ণ না হয়। তার জন্যে যতবড় মূল্য দিতে হয় দেবো। এই উচ্ছিষ্ট দেহ ত্যাগ করতে হয় করবো, তবু একে দিয়ে আমার দেবতার পূজা অসম্ভব।

    দেখতে দেখতে প্রায় দু-মাস কেটে গেল। অনেকখানি সেরে উঠেছে মল্লিকা। নার্সিংহোমের এই সস্নেহ আশ্রয় থেকে বিদায়ের দিন দ্রুত এগিয়ে আসছে। ছোট্ট খাটখানির উপর শুয়ে সেই কথাই বোধ হয় ভাবছিল। ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ। অন্যদিনে এতক্ষণে সে উঠে পড়ে। আজ যেন কোনো তাগিদ নেই। জানালা দিয়ে নিঃশব্দে চেয়ে ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের পানে। মিস্ সরকার হঠাৎ ঘরে ঢুকে বলল, ওমা তুমি এখনও শুয়ে?

    —উঠতে ইচ্ছা করছে না ভাই।

    নার্স মুখ টিপে হাসলো, কেন?

    –কেমন যেন জোর পাচ্ছি না কদিন থেকে। মাথা তুললেই গা পাক দেয়।

    মিস্ সরকার টেবিলটা গোছাতে গোছাতে বলল, তাই তো দেবে। তুমি খেতে পার আর না পার, আমাদের যে এবার পেটভরে সন্দেশ খাবার পালা।

    একটু থেমে মল্লিকার সন্দিগ্ধ চোখের দিকে চেয়ে বলল, বুঝতে পারছ না? নোটিস টের পাওনি?

    চোখ নামিয়ে নিল মল্লিকা। কোথা থেকে এক ঝলক রক্ত এসে পড়ল তার শীর্ণ পাণ্ডুর মুখের উপর। কিন্তু সে শুধু মুহূর্তকাল। পরক্ষণেই সভয়ে দেখল নার্স, সে-মুখে একফোঁটা রক্ত নেই। যেন একখানা সাদা কাগজ। দু-চোখে ভরে উঠেছে কিসের এক গভীর আতঙ্কের ছায়া। চমকে উঠল মিস্ সরকার। ছুটে এগিয়ে গিয়ে বসল ওর বিছানার পাশটিতে। সহসা তার বুকের উপর ভেঙে পড়ল মল্লিকা, চেঁচিয়ে উঠল আর্তকণ্ঠে, এ আমায় কী শোনালে দিদি! তুমি ঠিক জানো, যে আসছে সে আমার গর্বের ধন না কলঙ্কের কালি? নার্সের মুখে এ প্রশ্নের উত্তর যোগাল না। ওকে শুধু বুকে জড়িয়ে ধরে সর্বাঙ্গে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

    মঞ্জরী এল পরদিন বিকালে। মিস্ সরকারের মুখে খবর পেয়ে ছুটতে ছুটতে ঢুকল এ-ঘরে। চৌকাঠের ওপর থেকেই কলকণ্ঠের চিৎকার—কিগো পণ্ডিতমশাই, তোমার লেকচারের ঝুড়ি এবার শিকেয় উঠলো তো? বাড়ি যাবে না? এমন অনাছিষ্টি কথা ভগবান কখনো সইতে পারেন? ঘাড় ধরে নেবার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন পেয়াদা। কেমন জব্দ!

    কাছে এসে বসতে শুষ্ক কণ্ঠে বলল মল্লিকা, বড্ড ভয় হচ্ছে ঠাকুরঝি।

    —আ মর্! ভয় কিসের! ছেলে যেন ওরই হচ্ছে, আর কারও কোনোদিন হয়নি!

    –না ভাই, সে কথা নয়—

    —থাক্, তোমার কোনো কথাই বলে কাজ নেই।

    হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, সত্যি, ঠাট্টার কথা নয় বৌ। এবার তুমি আর একা নও। পেটে রয়েছে আমাদের ঘরের ছেলে, গাঙ্গুলী-বাড়ির প্রথম বংশধর। তার মান-মর্যাদা আছে, কল্যাণ-অকল্যাণ আছে। এই নার্সিংহোমে পড়ে থাকা আর চলে না। বাবাকে বলছি গিয়ে। ডাক্তারকে উনি বুঝিয়ে বলুন!

    সে রাতটা মল্লিকার কাটল প্রায় বিনিদ্র শয্যায়। তাকে নিয়ে এ কী কৌতুক বিধাতার! এতদিন যে সমস্যা ছিল, সেইটাই কি যথেষ্ট নয়? তার ওপর এ আবার কী পরীক্ষা! ‘গাঙ্গুলী-বাড়ির প্রথম বংশধর!’ মঞ্জরীর মুখে একথা শুনবার পরেও তার সমস্ত বুকখানা কই আনন্দে, গৌরবে ভরে উঠল না তো? অন্তরের অন্তস্তল থেকে কুৎসিত সাপের মতো মাথা তুলে উঠল এক বিষাক্ত সন্দেহ। দুলে উঠল তার সমস্ত অস্তিত্ব।

    ভোরের হাওয়ায় কখন চোখ বুজে এসেছিল। যখন ঘুম ভাঙল ঘর ভরে গেছে সকাল বেলার কোমল রোদে। তাড়াতাড়ি চোখে জল দিয়ে এসে দেখে জুনিয়ার নার্স মীরা তার খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকে চেয়ে বলল মল্লিকা, একটু কাগজ কলম দিতে পার ভাই?

    —চিঠি লিখবেন বুঝি? মুখ টিপে হাসল অল্পবয়সী মেয়েটি।

    মল্লিকা মাথা নাড়ল।

    —বড় কাগজ চাই তো?

    —হ্যাঁ, বড় কাগজই দিও।

    অনেকদিন পরে দিদির কাছে তার এই দীর্ঘ চিঠি। প্রথম খানিকটা অনুযোগ, অভিমান—আপদ বিদায় করে নিশ্চিন্ত হয়েছ তোমরা। একবার জানতেও চাও না, সেটা মরেছে, না বেঁচে আছে। ইত্যাদি। তারপর লিখল—বড্ড ভয় হয়েছিল দিদি। পাড়াগেঁয়ে মুখ্যু মেয়ে। কি চোখে দেখবেন এঁরা। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে দেখছি, আমার জন্যেই যেন সবাই পথ চেয়ে বসেছিলেন। যেমন দেওর, তেমনি ননদ। আর তেমন ভগ্নীপতিটি। তার কথা আর নাই বললাম।

    সকলের শেষে রইল তার চরম সর্বনাশের কথা। সেই দুর্যোগের রাত, নার্সিং হোম. স্বামী ননদ, মিস্ সরকার এবং এই সমস্যা-জড়িত সন্তানের আবির্ভাব। সব অকপটে এবং সবিস্তারে জানিয়ে লিখল—দিদিভাই, এবার তোমরা বলে দাও আমি কোন্ পথে যাবো! জামাইবাবুর প্রতিটি উপদেশ আমার কাছে অলঙ্ঘ্য গুরু-মন্ত্র। এতদিন তারই আলোতে পথ চলেছি। হঠাৎ ঝড় উঠল। আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আজ এসেছে নতুন নির্দেশের প্রয়োজন। এত বড় প্রয়োজন আমার জীবনে আর কোনোদিন দেখা দেয়নি।

    উত্তর এল সাত-আট দিন পরে। দিদির কয়েক লাইন, তার সঙ্গে জামাইবাবুর কয়েক পাতা। কুশল প্রশ্নাদির পর লিখেছেন তর্করত্ন—মানুষের জীবনে ঝড় আসে, আবার কেটে যায়। যে-ক্ষতি সে রেখে যায়, তার চিহ্নও একদিন মিলিয়ে আসে। ঝড় ক্ষণিকের, কিন্তু সূর্যালোক শাশ্বত। ঝড়ের কথা মনে রেখো না, সূর্যকে অর্থাৎ ধ্রুবকে আশ্রয় কর।

    তারপর লিখেছেন, ‘তুমি মা হতে চলেছ। এইখানেই তোমার সব প্রশ্ন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আমাদের শাস্ত্র বলেছেন নারীর পরিপূর্ণ রূপ হচ্ছে মাতৃরূপ। অন্যত্র সে খণ্ডিতা, অসম্পূর্ণা। সন্তানের মধ্যে সে পুনর্জন্ম লাভ করে। তার সমস্ত সত্তা বিলীন হয়ে যায় ঐ ক্ষুদ্র একটি শিশুর সত্তায়। সে তখন ঐ শিশু-দেবতার সেবাদাসী। সেই তার একমাত্র পরিচয়। নিজস্ব বলে তখন আর তার কিছুই থাকে না! তোমার আর কোনো সমস্যা নেই।

    চিঠির উপসংহারটি বারে বারে পড়ল মল্লিকা—তোমার বিবাহের সঙ্গে সঙ্গেই আমার গুরু-গিরির পালা শেষ হয়ে গেছে ভাই। এখন তোমার গুরু এবং পথ-নির্দেশক তোমার স্বামী, আমার পরম স্নেহাস্পদ মতীশভায়া। তিনি যা বলেন সেইটাই তোমার মন্ত্র। তিনি যেখানে নিয়ে যাবেন, সেইটাই তোমার তীর্থ।

    চিঠিখানা বুকে চেপে ধরে চোখ বুজে রইল অনেকক্ষণ। মনে মনে উচ্চারণ করল—তবে তাই হোক। আমি আর ভাবতে পারি না।

    মঞ্জরীর চিঠি পেয়ে মতীশ আবার এল কলকাতায়। ভয়ে ভয়ে ঢুকল মল্লিকার ঘরে। দূরত্ব রেখে বসল একটা টুলের উপর। মল্লিকার মনে আবার জেগে উঠল সেই ভয়ঙ্কর প্রশ্ন, যার উত্তর সে জানতে চেয়েছিল মিস্ সরকারের কাছে। কিন্তু স্বামীর উদার সরল স্নেহস্নিগ্ধ চোখদুটির দিকে একবার মাত্র চেয়ে প্রশ্নটি তার মনের মধ্যেই রয়ে গেল। নিজের দেহে প্রথম মাতৃত্বের সূচনা স্মরণ করে তার সদ্য-রোগমুক্ত মুখের উপর ফুটে উঠল একটি লাজসুন্দর মৃদু হাসি। দুর্নিবার আকর্ষণে এগিয়ে গেল মতীশ। মল্লিকার একটি হাত নিজের দু-খানা হাতের মধ্যে নিয়ে মৃদুস্বরে বলল, আমি সব শুনেছি মল্লি। ডাক্তারের সঙ্গেও কথা হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই তোমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবো।

    বাড়ির কথা শুনেই বুকের ভিতরটা চমকে উঠল মল্লিকার। ভীত কণ্ঠে বলল, কিন্তু-

    —আর কোনো ‘কিন্তু’ নেই, বাধা দিয়ে বলল মতীশ। সব ‘কিন্তু’ সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিজেকে তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও দেখি।

    কথাগুলো মল্লিকার কানে এল সুধা বর্ষণের মতো। সেই সঙ্গে মনের মধ্যে জেগে উঠল তার গুরুর ক’টি ছত্র। আর কোনো কথাই তার মুখে এল না। শুধু ক্লান্ত হাতখানি এলিয়ে পড়ল স্বামীর কোলের উপর।

    এর ক’দিন পরেই গাঙ্গুলী-বাড়ির মাথার উপর আবার হল বজ্রপাত। সুহাসিনী দেবী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলেন, হঠাৎ পড়ে গেলেন মাথা ঘুরে। প্রেসারের খেলা। আগেও দু-একবার ভেলকি দেখিয়ে গেছে। ডাক্তারের বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও সাবধান হননি সুহাসিনী, এবার তার ফল ফলল। ছেলেরা বাড়ি নেই, কর্তা অফিসে, মঞ্জরী গিয়েছিল তার রুগ্‌ণা শাশুড়ীকে দেখতে। ঝি আর চাকরে মিলে সংজ্ঞালুপ্ত দেহটাকে কোনো রকমে দিয়ে গেল ঘরে। ডাক্তার এসে যা করবার করলেন। কিন্তু স্বামী এবং ছেলেমেয়েরা ফিরবার আগেই উনি পৌঁছে গেলেন ওদের নাগালের বাইরে।

    দিল্লী লাহোর ক্রিকেট পিটিয়ে ঘুরছিল জিতেশ। খবর পেয়েই এসে পড়ল। দেখল এবং শুনল সব। তারপর সোজা গিয়ে হানা দিল মল্লিকার নার্সিং হোমে।

    —বৌদি! দরজার বাইরে থেকেই সেই দরাজ গলার ডাক। ধড়মড় করে উঠে বসল মল্লিকা।

    —তুমি এখনও বিছানায় পড়ে আছ? বিনা ভূমিকায় কঠোর প্রশ্ন।

    —না ভাই, এই তো উঠে বসেছি।

    —তারপর, যাচ্ছ কখন?

    –কোথায়?

    —কোথায় মানে? তোমার মতলবটা কি খুলে বল দিকিনি বৌদি! মা তো দিব্যি পাড়ি দিলেন। এদিকে ছোড়দির সমন এসে গেছে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে। শাশুড়ি বুড়ী নাকি যায়-যায়। আমাদের কি শেষটায় গুষ্টিসুদ্ধ বেঘোরে মারতে চাও? বেশ কর যা খুশী। আমার কি? মুখ্যু মানুষ, ব্যাট্ ঘাড়ে করে বেরিয়ে পড়বো একদিকে। কিন্তু ঐ বুড়ো মানুষটাকেই বা দেখে কে, আর তোমার ঐ নাবালক বি.কম্.-টিকেই বা কে সামলায়? মল্লিকা নিবিষ্ট মনে ভাবছিল। দু-মিনিট অপেক্ষা করে আবার হুঙ্কার দিল জিতেশ, ভাবছ কি? উঠবে না ঘাড়ে তুলবো?

    —বাব্বা, ছেলে একেবারে ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছেন!

    —ঘোড়ায় নয়, মোটরে! তুমি ভুলে যাচ্ছ, এটা তোমার যশোর নয়, সুসভ্য কলকাতা শহর। বৌরা এখানে ঘোড়ায় চড়ে শ্বশুরবাড়ি যায় না, মোটরে চড়ে যায়।

    —যাও বাপু, নিয়ে এসো তোমার মোটর।

    —বাঃ, একেই তো বলে লক্ষ্মী মেয়ে। নাও, চটপট গুছিয়ে নাও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।

    বলে গাড়ি আনতে বেরিয়ে গেল।

    নিজের হাতে সংসার তুলে নিল মল্লিকা। ঠাকুর রয়েছে। সে শুধু নামমাত্র। বেশীর ভাগ রান্নাগুলোই তাকে করতে হয়। যেদিন না পারে, কর্তা এটা হয়নি, ওটা হয়নি বলে অনুযোগ করেন, আধপেটা খেয়ে চলে যান অফিসে। খাবার সময় সামনে গিয়ে বসতে হয়। শ্বশুর গম্ভীর মানুষ। কথাবার্তা বড় একটা বলেন না। কিন্তু মল্লিকা বুঝতে পারে তাঁর মনের কথা। একদিন বলেও ফেললেন, জানো বৌমা, আমি ছিলাম মায়ের একমাত্র ছেলে। মা কাছে এসে না বসলে একদিনও খাওয়া হত না। বুড়ো বয়সে আবার বুঝি সেই অভ্যাস ফিরে এল!

    জিতেশ আসে তার ক্রিকেট বন্ধুদের দলবল নিয়ে। যখন তখন ‘বৌদি’ বলে হাঁক দেয়। অসময়ে চায়ের ফরমাস করে। আর মাঝে মাঝে আসে রমা সরকার। মল্লিকা তাকে বসায় নিয়ে তার শোবার ঘরের কোণটিতে। আটকে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রমা হয় তো বলে, এবার উঠি, মল্লিকা বাধা দেয়।

    —ডিউটি রয়েছে যে, বোঝাতে চায় নার্স।

    —থাক্‌গে ডিউটি। ও ছাই চাকরি তুমি ছেড়ে দাও।

    —সর্বনাশ! চাকরি ছাড়লে খাবো কি? তোমার ছেলে হলে যদি আয়ার চাকরিটা দাও, তখন না হয় ছেড়ে দেওয়া যাবে নার্সিংহোম। কিন্তু তার তো এখনও কয়েক মাস দেরি। মল্লিকা সে কথার জবাব দেয় না। অনেকটা যেন আপন মনে বলে, ঘর নেই, বাঁধন নেই, শুধু ভেসে ভেসে বেড়ানো। এই কী মেয়েমানুষের জীবন?

    —কি করবো ভাই! পানসি সাজিয়ে এলো না তো কোনো রাজপুত্তুর! ভেসে না বেড়িয়ে যাবো কোথায়?

    —ও সব বাজে কথা। আসলে ঘরের দিকে মন নেই তোমার।

    —হয়তো তাই। এমন অবাধ খোলামাঠে চরতে পেলে সংসারের জোয়াল কে ঘাড়ে তুলতে চায়, বল?

    মল্লিকার হঠাৎ মনে হল কথাটা পরিহাসের সুরে বললেও কেমন একটা করুণ রেশ রয়েছে শেষের দিকে। তার ছোঁয়া ওর মনেও লাগল, এবং তার ছায়া পড়ল ওর মুখের উপর। সেদিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে রমা বলল, তবে শোনো, একটা গল্প বলি। গল্পটা আমার পিসতুতো দাদার কাছে শোনা। উনি ছিলেন মস্ত বড় এক রাজার ছেলের প্রাইভেট সেক্রেটারি। শুধু রাজার ছেলে নয়, তার ওপরে আবার নামজাদা সিনেমা আর্টিস্ট। তার পর যা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সিনেমা আর তার আশপাশের যেসব ‘এবং’ থাকে, তাতেই আস্তে আস্তে তাঁকে গ্রাস করে ফেলল। রাজকুমার আর ঘরে আসেন না। রাজা তখনও বেঁচে। রেগে-মেগে ছেলেকে করলেন ত্যাজ্যপুত্তুর, তার বৌরানীকে যোগাতে লাগলেন নিত্য নতুন শাড়ি জুয়েলারী, বই আর গান-বাজনার সরঞ্জাম। একটু নড়তে গেলেই চারদিক থেকে ছুটে আসে চারজন দাসী। এমনি তার খাতির।

    হঠাৎ একদিন কি খেয়াল হল বৌরানীর, বেলা ন’টার সময়ে বেড়াতে গেলেন প্রাইভেট সেক্রেটারির বাড়ি। একশ’ টাকার চাকুরে। আমার বৌদিটি তখন কোমরে আঁচল বেঁধে মাছ ভাজছে তার সেই রান্নাঘর নামক খুপরির মধ্যে। ময়লা কাপড়ে হলুদের ছাপ। সর্বাঙ্গে ঘাম আর কালিঝুলি। আমার দাদা ছুটে এলেন তাঁর হাতল-ভাঙা চেয়ার ঘাড়ে করে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে বৌরানী সোজা হয়ে গিয়ে উঠলেন ঐ রান্নাঘরের দরজায়। বৌদি শশব্যস্তে বেরিয়ে এসে বলল, এখানে আপনার কষ্ট হবে! ও-ঘরে চলুন। তা হোক। এইখানেই বসি। আপনি রান্না করুন’—বলে নিজেই একটা পিঁড়ি টেনে নিলেন। মাছ ভাজা চলল। ঘরময় ধোঁয়া। বৌরানী বার বার চোখ মুছছেন। বৌদি আবার বলল, বড্ড কষ্ট হচ্ছে আপনার। সেকথা বোধহয় ওঁর কানে গেল না। সেই কালিমাখা ঝুলেভরা অন্ধকার খোপটার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে বললেন, ‘এরকম একটা রান্নাঘরও যদি পেতাম…’

    —যাক; এবার আমি চলি, বলে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল মিস্ সরকার

    মঞ্জরী গেছে শ্বশুরবাড়ি। সাত-আট দিন পরে কখনও কখনও এসে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। মল্লিকা দু-দিন জোর করে ধরে রাখে। তার প্রিয় রান্নাগুলো রেঁধে খাওয়ায়। মঞ্জরী বলে, তোর মতলব তো ভাল নয়, বৌ! ঐ জঙ্গল-টঙ্গল খাইয়ে একেবারে বাঙাল বানিয়ে ফেলতে চাস? – বলে আরও খানিকটা মেখে নেয় কুমড়োর ডাঁটা দিয়ে মটর ডাল কিংবা ধনেপাতা দিয়ে লাউ-এর ঘণ্ট।

    সমস্ত দিন খেটে সবার মন যুগিয়ে অনেক রাতে যখন শুতে যায় মল্লিকা, নিঃসঙ্গ শয্যার দিকে চেয়ে মনটা তার হু-হু করে ওঠে। বিছানায় না গিয়ে কোনো কোনো দিন কাগজ কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসে। নানা খুঁটিনাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখে, তারপর আর রাখতে পারে না নিজেকে —ওগো, আমার এই সুখের দিনে তুমি কাছে নেই, এ যে আমি আর সইতে পারছি না।

    মতীশ লেখে, মল্লি, এতদিন তুমি ছিলে শুধু আমার। বড় ছোট করে সংকীর্ণ করে পেয়েছিলাম তোমাকে। আজ তুমি সবার মধ্যে ছড়িয়ে গেছ। তোমাকে নতুন করে, বড় করে পেলাম। আমার এ আনন্দ রাখবার জায়গা নেই। তোমার থেকে দূরে থেকেও আমি তোমাকে জড়িয়ে আছি। আমি তোমার কাছে যাবো না। তুমি আসবে আমার কাছে। নতুন করে ঘর বাঁধবো আমরা। সেই দিনটির প্রতীক্ষায় দিন গুনছি।

    .

    দেখতে দেখতে মাস এগিয়ে চলল। মল্লিকাকে আবার যেতে হল নার্সিং হোমে। তারপর একদিন হঠাৎ শুরু হল যমযন্ত্রণা, যার হাত থেকে কোনো মায়েরই নিস্তার নেই। সমস্ত রাত যমে-মানুষে টানাটানির পর ভোরের দিকে তার কোলে এল কোলজোড়া খোকা শ্বশুর এসে গিনি দিয়ে মুখ দেখলেন। মঞ্জরী আর জিতেশ এসে হৈ-হল্লা করল কিছুক্ষণ সাত-আট দিন পরে এল মতীশ। মল্লিকা রাগ করে বলল, অ্যাদ্দিন পরে বুঝি মনে পড়ল? মতীশ সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, ঈস্, বড্ড ছোট!

    খিলখিল করে হেসে উঠল মল্লিকা,—ওমা, ছোট হবে না তো পেট থেকে পড়েই ছুটবে নাকি?

    মতীশ নিরাশ সুরে বলল, নিয়ে যাবার মতো বড়-সড় হতে যে এখনও অনেক দেরি!

    মল্লিকা বাঁকা চোখে তাকাল স্বামীর মুখের দিকে, বাবুর বুঝি আর সবুর সইছে না?

    দিনকয়েক পরে সকাল বেলা বাচ্চাকে তেল মাখাচ্ছিল ঝি, মল্লিকা পাশে বসে স্নিগ্ধ চোখ মেলে চেয়েছিল সেই দিকে। ঝি বলে উঠল, হ্যাঁগা, ছেলে তোমার কারও মুখই পায়নি—না বাপের, না মার!

    বুকের ভেতরটা ধ্বক্ করে উঠল মল্লিকার। এ কথার অর্থ কী? ঝুঁকে পড়ে বেশ করে দেখতে লাগল ছেলেকে। সত্যিই তো, এ কার মুখ!

    কি রকম রাঙা হয়েছে দ্যাখ, আবার বলল ঝি, বড় হলে কালো হবে। মায়ের তো ধার দিয়েও যায়নি, বাপের রঙও পাবে না।

    মল্লিকার মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল। বুকে যেন আটকে গেল নিঃশ্বাস। চোখ বুজে শুয়ে পড়ল সেইখানেই।

    কি হল গো! বলে ঝি তাড়াতাড়ি ছেলে ফেলে উঠে গেল। ক্ষিপ্র হাতে লেগে গেল মায়ের পরিচর্যায়। খানিকক্ষণ বুকে পিঠে মালিস করবার পর একটু সুস্থ বোধ করল মল্লিকা। উঠে বসে ঝিকে বলল ছেলেকে তার কোলে তুলে দিতে। ঝি বলতে লাগল, আহা হোক না কালো, নাই বা হল বাপ-মায়ের মতো। বেঁচে থাক্। ব্যাটাছেলের চেহারায় কি আসে যায়? নাও একটু দুধ দাও। বাছার আমার গলা শুকিয়ে গেছে।

    মল্লিকা দু’চোখের তীব্র দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে রইল তার সদ্যোজাত শিশুর দিকে। তবে কি-

    পরদিন ছেলে দেখতে এলেন পিসিমা। সঙ্গে বড়দি। একথা সেকথার পর বললেন ভাইঝিকে, দ্যাখ্ ললিতা, কি রকম গাট্টাগোট্টা দেখতে হয়েছে খোকা। একেবারে পাঞ্জাবী গড়ন।—বলে একটু বিশেষভাবে চোখ টিপলেন। বড়দি বললেন, সেটা আমি এসেই লক্ষ্য করেছি পিসিমা। তাছাড়া মাথাটা কেমন গোল দেখেছ, আর কত বড়? আমাদের বাড়িতে এরকমটা কারও নেই।

    —কি জানি বাবা! বংশের প্রথম ছেলে বংশের ধারা পাবে, এই তো সবাই আশা করে। তা এ যে একেবারে গোত্তরছাড়া,—বলতে বলতে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে উঠে পড়লেন পিসিমা। তাহলে আসি বৌ—বলে বড়দিও তাঁর অনুগমন করলেন। তাঁর বাঁকা ঠোটের হাসিটি মল্লিকার দৃষ্টি এড়াল না।

    তাঁরা চলে যাবার পর বহুক্ষণ বজ্রাহতের মতো বসে রইল মল্লিকা। সন্ধ্যা এল। আস্তে আস্তে গভীর হল রাত। সবাই শুয়ে পড়ল। ঘুম এল না শুধু ওর চোখে। হ্যারিকেন তুলে বারে বারে দেখতে লাগল ঘুমন্ত ছেলের মুখের পানে। যত দেখে ততই দৃঢ় হল মন, হ্যাঁ, ওদের কথাই ঠিক। এ ছেলের সঙ্গে তার নাড়ীর যোগ আছে, আত্মার যোগ নেই। এ গাঙ্গুলী-বংশের কেউ নয়। তার নামহীন গোত্রহীন অবাঞ্ছিত সন্তান। ভেঙে দিতে এসেছে তার এত দুঃখের গড়া নীড়, এত সুখের সাজানো সংসার। যে-রাতটাকে সে ভুলতে চেয়েছিল, মুছে ফেলতে চেয়েছিল তার জীবন থেকে, তারই কলঙ্ককাহিনী সর্বাঙ্গে লিখে নিয়ে এল এই মাংসপিণ্ড। এরই মধ্যে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে সেই অভিশপ্ত রাত, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে তার নারী-জীবনের চরমতম গ্লানি!

    বিদ্যুৎ-স্ফুরণ হল মল্লিকার দু-চোখের নীল তারায়। কানদুটো থেকে ছুটে এল আগুনের হল্কা। মাথার শিরগুলো মনে হল ফেটে বেরিয়ে যাবে। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে মাথা পেতে দিল স্নানঘরে কলের তলায়। কিন্তু দেহের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বলছে যে অনলজ্বালা, সাধ্য কি জল তাকে ঠাণ্ডা করে!

    একরাশি ভিজে-চুল নিয়ে আবার ফিরে এল খাটের পাশে। শিশু কাঁদছে। হ্যারিকেনটা একবার তুলে ধরল মল্লিকা। ইস্। কী কুৎসিত সে বিকৃত মুখ! কী কুশ্ৰী কৰ্কশ গলা!

    দু-হাতে কান ঢেকে ছুটে গেল ঘরের কোণে। মাথাটা লুটিয়ে দিল টেবিলের উপর। কিন্তু সে কান্নার হাত থেকে তবুও তার মুক্তি নেই। কেঁদে ককিয়ে যাচ্ছে ছেলে। হয়তো এখনই দম বন্ধ হয়ে যাবে। তাই যাক্, চিৎকার করে উঠল মল্লিকা, সরে যাক্ ঐ অভিশাপ, আমার জীবন থেকে মুছে যাক্ ঐ পাপচিহ্ন!

    দৃপ্ত ভঙ্গীতে উঠে দাঁড়াল মল্লিকা। তার মুখের প্রতি রেখায় ফুটে উঠল এক পাশব জিঘাংসা। তীব্র আরক্ত চক্ষু মেলে মোহাচ্ছন্নের মতো এগিয়ে গেল ঐ জড়পিণ্ডটার দিকে। আস্তে আস্তে অজ্ঞাতসারে বেরিয়ে এল তার দীর্ঘ তীক্ষ্ণ আঙুলগুলো; যেন একদল হিংস্র বৃশ্চিক।

    তারপর কি যে হল জানে না মল্লিকা। হঠাৎ খেয়াল হল কান্না থেমে গেছে। ঐ ক্ষুদ্র দেহটা আর ছটফট করছে না! পড়ে আছে নিস্পন্দ নিশ্চল ক্ষুদ্র একখণ্ড পাথরের মতো। বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল মল্লিকার। কী হল, কাঁদছে না কেন খোকা? ছুটে গিয়ে নিয়ে এল হ্যারিকেন। উঁচু করে ধরলো বাচ্চার মুখের উপর। রক্তে ভিজে গেছে শুভ্র সুন্দর শয্যা। এত রক্ত কেন! বিকৃত প্রেতকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—এত রক্ত কেন! ওগো, তোমরা ওঠো। দিদি, ডাক্তারবাবু, মীরা শীগগির এসো—

    গভীর রাত্রির বুক চিরে ফেটে পড়ল নারী-কণ্ঠের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। নার্সের দল ছুটে এল। উপর থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন ডাক্তার। মল্লিকা হেসে উঠল পৈশাচিক

    —হাসি—হাঃ-হাঃ-হাঃ, খুন, খুন করেছি আমি! এই দ্যাখ।

    হা-হা-হা-হা…সে হাসির আর শেষ নেই।

    .

    পরদিন একটার গাড়িতে মতীশের যাওয়া হল না। গৃহিণী বললেন, সমস্ত রাত বকিয়ে মেরেছ ছেলেটাকে, এখন একটু ঘুমোতে দাও।

    কাছে এগিয়ে এসে অনুনয়ের সুরে বললেন, হ্যাঁগো, ভেতরে নিয়ে একবারটি দেখা করিয়ে দিতে পার না?

    বললাম, ফিমেল ওয়ার্ড যে।

    —হলই বা ফিমেল ওয়ার্ড। কোন্ রাজকন্যারা আছেন সেখানে শুনি? তোমাকে দেখে যদি অ্যাদ্দিন অজ্ঞান না হয়ে থাকেন, ওকে দেখে কেউ মূর্ছা যাবে না।

    —আমাকে দেখে কেউ অজ্ঞান হয়নি, বুঝলে কি করে?

    —ইস, এত সস্তা নয়, উল্টোটা হয়েছে কিনা, তাই বল! না সত্যি, একটা ব্যবস্থা কর। পাগল হোক আর যাই হোক, মেয়েমানুষ তো? চোখের ওপর দেখলে হয়তো মনে পড়বে।

    —ডাক্তাররা সে ভরসা দেন না।

    —হ্যাঁঃ, তোমাদের ডাক্তাররা তো সব জানে!

    বিকেলবেলা মতীশকে বললাম, চল তোমাকে আমাদের রাজত্বটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিই।

    ওর বিশেষ উৎসাহ দেখা গেল না। আপত্তিও করল না। ম্লান হাসি হেসে বলল, চলুন।

    দু-চারটা ওয়ার্ড ঘুরে জেনানা ফটকের গেটে গিয়ে কড়া নাড়লাম। মানদা এসে দরজা খুলে সেলাম জানাল। ভেতরে ঢুকলাম। মতীশ ইতস্তত করছিল। সাইনবোর্ডটার দিকে চেয়ে মনে হল তার পা দুটো যেন সরছে না। বললাম, দাঁড়িয়ে কেন? এসো!

    মেয়েদের সাধারণ ব্যারাক ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম সেল-ব্লকের দিকে। মানদা দরজা খুলতেই দেখলাম সামনেকার ঘাসে ঢাকা ছোট্ট চত্বরটি আলো করে বসে আছে মল্লিকা। অপর্যাপ্ত কালো চুল ছড়িয়ে পড়েছে পিঠের উপর। একটি মেয়ে-কয়েদী তারই পরিচর্যায় ব্যস্ত।

    মতীশের বাহু ধরে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ডাকলাম, মল্লিকা!

    ও চোখ তুলে চাইল, ওর সেই আশ্চর্য চোখে

    —দ্যাখ তো কে এসেছে? মতীশকে এগিয়ে দিলাম সামনের দিকে। মল্লিকার দৃষ্টি পড়ল তার মুখের উপর। তেমনি শান্ত, নিস্তরঙ্গ, ভাবলেশহীন। তার কোথাও নেই ক্ষীণতম পরিচয়ের আভাস। উদ্‌গত অশ্রু কোনো রকমে সংবরণ করে মতীশ বলল, আমি–আমি এসেছি মল্লি! চিনতে পারছ না?

    মল্লিকা সাড়া দিল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে যেন ক্লান্ত হয়ে চোখ নামিয়ে নিল।

    —মল্লি! গাঢ়স্বরে ডাকল মতীশ, একবার চেয়ে দ্যাখ। আমি!

    আবার চোখ তুলল মল্লিকা। মনে হল একটু যেন ভাবান্তর দেখা দিল সেই অর্থহীন নিষ্পলক চোখের তারায়। একটু যেন সরে গেল বিস্মৃতির ঘন আবরণ। সেদিকে চেয়ে মতীশের চোখেও ফিরে এল তার বহুদিনলুপ্ত আশার রশ্মি। আগ্রহাকুল স্বরে বলল, চিনতে পারছ?

    উত্তর এল না। ধীরে ধীরে সেই ভাষাহীন মুখের উপর ফুটে উঠল একটা ক্ষীণ বেদনার চিহ্ন। কোনো দূরানুভূত যন্ত্রণা। ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠল তার রেখা। যেন দুঃসহ আবেগে মুক্তি চাইছে কতদিনের কোনো অবরুদ্ধ অশ্রুর ভাণ্ডার। সহসা দু-হাতে মুখ ঢেকে সে ছুটে চলে গেল ঐ সেলগুলোর দিকে। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল তড়িৎ-শিখার ঝলকে।

    কতক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, হঠাৎ চোখে পড়ল মল্লিকার সেল থেকে বেরিয়ে এসে হাত নেড়ে কি বলছে মানদা। বুঝলাম আমাদের চলে যাবার ইঙ্গিত। সঙ্গে সঙ্গেই আবার সে ব্যস্ত হয়ে ফিরে গেল ঘরের মধ্যে।

    মতীশের দিকে তাকালাম। সাড়া নেই, সম্বিৎ নেই; চেয়ে আছে কিন্তু সে যেন পাথরের চোখ। কাঁধের উপর হাত রাখতেই চমকে উঠল। মৃদুকণ্ঠে বললাম চল, আমরা যাই।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    সংসারে আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিটি কে? এ প্রশ্নের একটি মাত্র উত্তর—আমি। আমার সঙ্গে আমার Love at first sight. প্রথম দর্শনেই আমি আমার প্রেমে পড়েছি। শেষ দর্শনেও সে প্রেম অটুট থাকবে। আমার রূপের উপর আপনি যতই বিরূপ হোন না কেন, আমার চোখে সে অতুলনীয়। এই ধরুন আমার প্রতিবেশিনী সু-দেবী। শুনতে পাই উনি যখন বাঁ-ফুটপাথ ধরে চলেন, পাড়ার ছোকরার দল উঠে যায় ডান ফুটপাথে। তবু দিনের মধ্যে কতবার উনি নিজেকে দেখেছেন ওঁর ঔ ড্রেসিং-টেবিলের বড় আয়নাটায়। সামনে থেকে, পাশ থেকে, পেছন থেকে ঘাড় ফিরিয়ে ঐখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে সাজাচ্ছেন নানা আভরণে, গোছাচ্ছেন নানা প্রসাধনে। তবু আশ মেটে না। অন্যের বিকর্ষণ যতই হোক, নিজের উপর ওঁর আকর্ষণ অফুরন্ত।

    এই জন্যেই সংসারে আয়না জিনিসটার এত কদর। নানা আকারে নানা প্রকারে সকল যুগে সকল মানুষের ঘরে তার আনাগোনা। ধনীর প্রমোদ কক্ষ থেকে গরীবের মাটির দেওয়াল। সন্ন্যাসীর গৈরিক ঝোলা থেকে আধুনিকার ঝুলন্ত হ্যাণ্ডব্যাগ! শুধু মরজগৎ নয়, অমরলোকেও যার বিপুল চাহিদা। দেবার্চনার উপকরণে দর্পণ অপরিহার্য। এমন যে সার্বজনীন প্রিয় বস্তু, ঘটনাচক্রে সেও যে কত বড় অপ্রিয় রূপ নিয়ে দেখা দিতে পারে, নিজের চোখেই একদিন দেখলাম। সেই কথাটা রলবো বলেই এতখানি গৌরচন্দ্রিকা।

    তখন আমি ডিস্ট্রিক্ট জেলে। জেলর ছিলেন স্বনামধন্য গণপতি সান্যাল। বড় বড় “সেন্ট্রাল” সমুদ্রে কৃতিত্ব দেখাবার পর শেষ জীবনে কোনো কারণে তিনি একটা ছোট “ডিস্ট্রিক্ট” নদীতে এসে হাল ধরেছেন। আমি তাঁর একমাত্র ডেপুটি। ঝড়-ঝাপটা যা কিছু আমার উপর দিয়েই যায়। উনি আড়ালে বসে সিগার টানেন আর উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বলেন, আপনার এই টয় (Toy) জেলের রকম-সকম আমার ঠিক ধাতস্থ হচ্ছে না। ওসব আপনিই চালান মশাই।

    ‘সুপার’ ছিলেন এক তরুণ আই. এম্. এস্.। আমাদের একঘণ্টার মালিক। রোজ ওই সময়টুকু কোনো রকমে কাটিয়ে সাহেবকে বিদায় দিয়েই সান্যালমশাই প্রস্থান করতেন তাঁর কুঠিতে। খুলে বসতেন হয়তো কোনও লোমহর্ষক রেলওয়ে উপন্যাস। চাকরিতে থেকেও নিরুদ্বেগ অবসরযাপন। বেশ চলছে দিন।

    এমন সময় দেশী ম্যাজিস্ট্রেট বদলি হয়ে তাঁর জায়গায় এলেন এক বিলাতি সাহেব। লড়াই-ফেরতা মেজর। আসল নামটা মনে নেই। সবাই বলত ‘অ্যালুমিনিয়ম’ সাহেব। মেসোপটেমিয়া না বাগদাদের কোন ফ্রন্টে তাঁর মাথা ভেদ করে নাকি চলে গিয়েছিল মেশিনগানের গুলি। মিলিটারী হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন ধন্বন্তরি। ছোট্ট একটা অ্যালুমিনিয়মের চাকতি দিয়ে বন্ধ করলেন মাথার ফুটো। কিন্তু বাইরে ফাঁক জোড়া লাগলেও ভিতরে কোথায় একটা স্ক্রু আলগা রয়ে গেল। তার ফলেই বোধহয় মিলিটারীতে তাঁর অন্ন উঠল। মেজর থেকে হলেন ম্যাজিস্ট্রেট। তা হোন্। কিন্তু ঢিলে স্ক্রুর প্রতাপে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম!

    জেল কোডে বিধান আছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সপ্তাহে একবার করে ডিস্ট্রিক্ট জেল পরিদর্শন করবেন। এ হেন আইনের আবদার মেনে চলবার মতো ভালোমানুষ ম্যাজিস্ট্রেট চিরদিনই দুষ্প্রাপ্য। সপ্তাহে দূরে যাক, বছরে একটিবার জেলের দরজায় পদধূলি দেননি, এরকম কালেক্টরও বিরল নন। কিন্তু অ্যালুমিনিয়ম সাহেব মসনদে বসেই প্রথম নজর দিলেন জেলের দিকে, এবং বিপুল উৎসাহে শুরু করলেন তাঁর সাপ্তাহিক পরিদর্শন—সময় নেই, অসময় নেই। বেলা আড়াইটায় অফিস থেকে ফিরে সবে দু-মগ জল মাথায় ঢেলেছি, কিংবা আহারান্তে নিদ্রাকর্ষণের মহৌষধি খবরের কাগজটা সবে তুলে ধরেছি চোখের উপর, ব্যাস, জেল-গেটে বেজে উঠল ডবল ঘণ্টা। দু-মিনিটের মধ্যে ছুটে এল গেট- ফালতু—কালেক্ট্র সাব্ আ গিয়া! অর্থাৎ ছোটো আবার ধড়াচূড়া এঁটে। শুধু আমিই নই, জেলর সাহেবেরও রেহাই নেই।

    এমনি একটা শীতকালের সকালবেলা। দুটো ঘণ্টা শুনে ছুটে গেলাম। সান্যালমশাই একটু আগে এসে গেছেন। শার্টের উপর খাকী সার্জের মিলিটারী কোট। কোটটি ওঁর প্রথম যৌবনের সঙ্গী, চাকরি-জীবনের সমবয়সী। মালিকের দৈহিক শ্রীবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি বেচারা। হাত, ঝুল এবং ঘের—সব দিকেই পিছিয়ে পড়েছে অনেকখানি। তবু আজও তার কপালে পেনশন জোটেনি। মনিব যতদিন চাকরিতে আছেন, জুটবে বলেও মনে হয় না। শার্টের অবস্থাও’ প্রায় তাই। গলার বোতাম বশ মানেনি। ফলে গলগ্রন্থির গ্রন্থি কণ্ঠা থেকে নেমে এসেছে ইঞ্চি তিনেক। তার উপর কয়েকদিন ক্ষৌর-কার্যের অভাবে গণ্ডদেশ কদমফুল।

    সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট কয়েক মিনিট কৌতুক-দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, Have you got a mirror? সান্যালমশাই যেমন করে তাকালেন বোঝা গেল, কথাটা ওঁর ঠিক বোধগম্য হয়নি। তখন প্রশ্নটার পুনরুক্তি হল আমাদের দিকে চেয়ে। তাৎপর্য বুঝতে পেরে আমি না-শোনার ভান করে একটু আড়ালে সরে গেলাম।

    কথা হচ্ছিল, দু গেটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। ডাইনে বাঁয়ে অফিস। তার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে কৌতূহলী কেরানীকুল। তাদের দিকে নজর গেল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের বাংলা ভাষায় বললেন, আয়না আছে? আসরফ হোসেন ছুটে গিয়ে তার টেবিলের দেরাজ থেকে নিয়ে এল একটা হাত-আরশি। ম্যাজিস্ট্রেট সেটা এগিয়ে ধরলেন জেলর সাহেবের মুখের উপর। কৌতুককণ্ঠে বললেন, Have a look please!

    জেলর সাহেবের ভারী মুখখানা আরও ভারী হয়ে উঠল। যেন রক্ত ফেটে পড়ছে গৌরবর্ণ গণ্ডদেশ থেকে। মিনিটখানেক অপেক্ষা করে সাহেব এবার আদেশের সুরে বললেন, Take it. একটুখানি ইতস্তত করলেন গণপতিবাবু। তারপর হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করলেন আরশি! পাশেই দাঁড়িয়েছিল গেট-কীপার, ওর হাতে সেটা গছিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলেন পাশের কামরায়। চারদিকে সিপাইশাস্ত্রী, কয়েদীদের মুখের চাপা হাসি নীরব হলেও অস্পষ্ট রইল না।

    আমাকে একাই কালেক্টর সাহেবের অনুসরণ করতে হল। ঠিক অনুসরণ নয়, পশ্চাদ্ধাবন। অর্থাৎ তাঁর কাছে যেটা হাঁটা, আমার পক্ষে সেটা ছোটা। যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, পদস্থ লোকদের যদি জেলে পাঠানো হয়, কোথায় থাকেন তারা? আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই বক্তব্যটা আর একটু পরিষ্কার করে বললেন, এই যেমন, ধর, রায়বাহাদুর, খানবাহাদুর, এই সব মেকদারের লোক।

    বললাম, ওঁদের সেলেই (Cell) রাখা হবে। সাধারণ কায়েদীদের ব্যারাকে তো আর-

    —Cell-এ! ঠিক বলেছ। That will be the proper place for these blocks. চল তো দেখে আসি জায়গাটা।

    পাশাপাশি বারোটা সেল। অর্থাৎ সাত হাত লম্বা পাঁচ হাত চওড়া ঘর। সামনে পাঁচিল-ঘেরা সরু একফালি ইয়ার্ড। কামরাগুলো বেশীর ভাগই খালি। দু’চারটিতে লোক রয়েছে। ওদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বললেন সাহেব, এরা কারা?

    —এরা কেউ পাগল, কেউ কুষ্ঠরোগী, কোনো কোনোটা মারাত্মক গুণ্ডা।

    —তাই নাকি! খুশিতে নেচে উঠল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের ছোট ছোট চোখ দুটো—চমৎকার Company হবে! ঠিক আছে।

    একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করলাম, আসবার কথা আছে নাকি ওঁদের কারও?

    —যে কোনও দিন। And the whole lot of them! অবিশ্যি ওঁরা যদি বুদ্ধিমান হন, তাহলে হয়তো আনতে হবে না।

    কৌতূহল দুর্নিবার। তবু এ বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করা সমীচীন হবে কিনা ভাবছি, উনি আবার হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, দেখলাম, দাঙ্গা বন্ধ করতে হলে এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

    কাছেই ছিল একটা বটগাছের বাঁধানো বেদি। চলতে চলতে তার উপর বসে পড়লেন সাহেব। সিপাইরা ছুটে এলো ধুলো ঝেড়ে জায়গাটা বসবার মতো করে দেবার জন্যে। হাত দিয়ে নিরস্ত করলেন। সেইখানে বসেই শুনলাম তাঁর দাঙ্গা নিবারণের অভিনব ‘পথের’ বর্ণনা।

    ঊনচল্লিশ-চল্লিশ সালের কাহিনী। পূর্ব-বাংলার বুকের উপর দিয়ে তাল ঠুকে চলেছে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব। পাশের জেলায় তার শ্মশানলীলা শেষ হতে না হতে এখানেও শুরু হবার সম্ভাবনা দেখা দিল। শহর ও গ্রামাঞ্চল থেকে ঘন ঘন যে-সব জিগির ধ্বনিত হতে লাগল, তাঁর আক্ষরিক অর্থ ঈশ্বরের মহিমাজ্ঞাপক হলেও ভাবার্থ কল্পনা করে আমাদের প্রাণে আর জল রইল না। বড় বড় ইংরেজ রাজপুরুষদের মুখে উদ্বেগ এবং অন্তরে উল্লাস। কিন্তু ‘অ্যালুমিনিয়ম’ মানুষটি ছিলেন অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। বলে বসলেন, না, দাঙ্গা হতে দেবো না আমার এলাকায়।

    জাত-ভাইরা অবাক। ক্ষ্যাপা নাকি লোকটা! উপদেশ নির্দেশের অভাব হল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ ক্ষ্যাপামির কাছেই সবাইকে হার মানতে হল। অ্যালুমিনিয়ম ছুটলেন এ গ্ৰাম থেকে ও-গ্রামে, এ শহর থেকে ও-শহরে। এখানে ওখানে বসালেন পুলিশ পিকেট। জায়গা বুঝে মার্চ করালেন গুর্খা রেজিমেণ্ট। তারপর একদিন জরুরী তলব পেয়ে তাঁর খাস কামরায় জড় হলেন জেলার সবকটি রায়বাহাদুর এবং খানবাহাদুর। সাহেব ‘খান’দের দিলেন ডানদিকের আসন, ‘রায়’দের বসালেন বাঁদিকে। নিজে মাঝখানে বসে কোনও রকম ভূমিকা না করেই বললেন, লুক হিয়ার মাই ডিয়ার বাহাদুরস্, সোলজার মানুষ আমি। বক্তৃতা দিতে শিখিনি। ও-জিনিস আমার কাছে আশা করবেন না। একটা মাত্র কাজের কথা শোনাবার জন্যে আপনাদের কষ্ট দিয়েছি। সেটা হচ্ছে এই—আমি দাঙ্গা হতে দেবো না। আমার ডিস্ট্রিক্টের কোথাও একটা সামান্য ঘটনাও যদি ঘটে, পুলিসের প্রথম কাজ হবে আপনাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা। চোর-ডাকাতদের কি করে জেলে নিয়ে যায়, আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন। আপনাদেরও ঠিক তেমনি করে অর্থাৎ কোমরে দড়ি এবং হাতে হাতকড়া পরে সার বেঁধে পায়ে হেঁটে যেতে হবে জেলখানায়। আমার এস্. ডি. ও.-দের নির্দেশ দেওয়া আছে, জামিনের আবেদন সরাসরি নামঞ্জুর হবে।

    অত্যন্ত ঠাণ্ডা মেজাজে, ইংরেজিতে যাকে বলে matter of fact ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে গেলেন কালেক্টার সাহেব। তাঁর মহামান্য অতিথিরা মনে মনে স্বীকার করলেন লোকটার আর যাই দোষ থাক্, কপটতার অপবাদ তাকে দেওয়া চলে না। কল্পনানেত্রে নিজেদের অবস্থা দর্শন করে প্রবীণ শ্রোতাদের চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল। সেদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে উপসংহার করলেন অ্যালুমিনিয়ম, আমি জানি, মন্ত্রিসভার অনেকে আপনাদের বন্ধু। সুতরাং শেষ পর্যন্ত জেলে আপনারা থাকবেন না, হয়তো আমাকেই সেখানে পাঠাবার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু তার আগে আপনাদের ঐ জেলযাত্রার প্রসেশনটা আমরা সবাই মিলে উপভোগ করে নেবো। সেটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। গুড্‌বাই!

    রাউণ্ড শেষ করে সদলবলে যখন গেটের দিকে ফিরছি তিন নম্বর ওয়ার্ডে একজন ভদ্রবেশী কয়েদী এগিয়ে এসে ইংরেজিতে বলল, ‘নালিশ আছে, ইওর অনার।’

    ইংরেজী শুনে কৌতূহল হল সাহেবের। দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, কে তুমি?

    —আজ্ঞে আমি আপনার ফৌজদারী কোর্টের একজন মোক্তার।

    —গুড গুড্‌! What brings you here?

    মোক্তারবাবু নিজস্ব ইংরেজীতে তাঁর দুরবস্থার যে বর্ণনা দিলেন, তাকে সংক্ষেপ করলে এই রকম দাঁড়ায়—দুজন মক্কেল-সমেত একখানা রিক্শা চড়ে জরুরী মামলার তাড়ায় তিনি কোর্টে যাচ্ছিলেন। রাস্তার মোড়ে ট্র্যাফিক পুলিস পাকড়াও করে বসল। নরম হলে হয়তো ছেড়ে দিত। কিন্তু মোক্তারি কায়দায় আর্গুমেন্ট করতে গিয়ে যেতে হল থানায়, সেখান থেকে আদালতে। বিচারক ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট। ইদানীং দ্রুত ডিপোজালের জোরে প্রথম শ্রেণীতে প্রমোশন পাবার চেষ্টায় ছিলেন। আসামী ডকে উঠতে না উঠতেই রায় দিয়ে ফেললেন, দু-টাকা জরিমানা অনাদায়ে দু-দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড।

    এসব মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের রেওয়াজ নেই। সেটাই সাধারণ রীতি। কিন্তু বর্তমান আসামীটি অসাধারণ, অর্থাৎ মোক্তার। সুতরাং আইনের ধারা উপধারা উল্লেখ করে সওয়াল শুরু করলেন। নজির-টজির দেখিয়ে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করলেন, মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টে এরকম কোনও বিধান নেই যে তিনজন মানুষ এক রিক্শায় যেতে পারবে না। অত নম্বর বাই-লতে শুধু বলা আছে যে, চার মণের বেশী ওজন কারও রিক্শাতে বইতে দেওয়া হবে না। সুতরাং এ ক্ষেত্রে সরকার পক্ষকে প্রমাণ করতে হবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওজন চার মণের অতিরিক্ত। উপযুক্ত দাঁড়িপাল্লা ছাড়া সে প্রমাণ সম্ভব নয়। অতএব—

    এই পর্যন্ত শোনবার পর অনারারি হাকিম জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে করলেন পাঁচ টাকা আর তার বদলে জেলের মেয়াদ হল সাতদিন। সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী মামলার আসামী এসে ডক অধিকার করল।

    মক্কেলরা ওঁর অংশের জরিমানাটাও দিতে যাচ্ছিলেন, মোক্তারবাবু বাধা দিলেন এবং ডক থেকে নেমে সঙ্গের পুলিসকে বললেন, আমি জেলে যেতে চাই।

    কালেক্টর সাহেব ধীরভাবে শেষ পর্যন্ত শুনে বললেন, আপনার বীরত্বের প্রশংসা করি। But what can I do for you? আমাকে কি করতে হবে বলুন?

    মোক্তারবাবু বললেন, আইনত আপনার কিছুই করবার নেই। Summary trial. এ সব কেস্-এ আপীলও চলে না। কিন্তু আপনি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। আপনার ফৌজদারি কোর্টে, বিশেষ করে অনারারি বেঞ্চে বিচারের নামে যে-সব জিনিস চলে, তারই একটা নমুনা আপনাকে দিলাম। এ-সম্বন্ধে আপনার ধারণা থাকা দরকার।

    ধন্যবাদ জানিয়ে কালেক্টর সাহেব বিদায় নিলেন এবং অফিসে এসে আমার কাছ থেকে মোক্তারটির নাম বিবরণ সব সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেন।

    সেইদিন বিকালেই মোক্তারবাবুর ‘ফাইন-মেমো’ এসে গেল—জরিমানা আদায় হওয়ায় খালাসের হুকুম। উনি তো অবাক! কে দিল জরিমানা?

    দিন দুই পরে রাস্তায় দেখা, ডেকে থামিয়ে বললেন, ব্যাপারটা শুনেছেন মশাই? আমার সেই হাকিমের বোধ হয় চাকরি গেল।

    বললাম, চাকরি গেল মানে? চাকরি থাকলে তো যাবে! উনি তো শুনলাম অনারারি।

    —ওই অনারারি চাকরির জন্যেই প্রাণ দিয়ে থাকে ওরা। কিন্তু সেটাও আর থাকছে না।

    –কেন?

    —সেদিন আপনার ওখান থেকে বেরিয়েই ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব সোজা একেবারে ওর কোর্টে গিয়ে হাজির। একখানা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললেন, ‘নবীন মোক্তারের জরিমানা। আমার হাকিমের অবস্থা একবার ভেবে দেখুন। টাকা নেয় কেমন করে? না নিয়ে উপায় নেই। অনুনয় করে বললেন, টাকাটা আমাকে দিতে দিন স্যার। সাহেব নাছোড়বান্দা—তুমি কেন দেবে? এটা আমার দণ্ড।

    —আপনার দণ্ড কেন, স্যার? মাথা চুলকে বলল হাকিম।

    —তোমার মতো ম্যাজিস্ট্রেটের উপরওয়ালা হয়েছি বলে।

    আয়নাঘটিত ব্যাপারের পরদিন জেলর সাহেব অফিসে এলেন না। এল একটা স্লিপ, তাঁর আরদালি মারফত। এক লাইন লেখা— সময় করে একবার দেখা করবেন।’ যেতেই হাতে দিলেন একখানা ছুটির দরখাস্ত। বললেন, আপাতত চার মাসই রইল। তবে এটা শেষ নয়, প্রথম কিস্তি।

    আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম ওঁর মুখের দিকে। মাথা নেড়ে আস্তে আস্তে বললেন, আর ফিরতে চাই না মলয়বাবু

    তখনও ওঁর চাকরি শেষ হতে বছর দুই বাকি। আর্থিক অবস্থা অকালে অবসর নেবার পক্ষে অনুকূল নয়। হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় যা করতে যাচ্ছেন, তার থেকে তাঁকে নিরস্ত করাই আমার কর্তব্য। কিন্তু তখনও কানে বাজছিল তাঁর শেষ কথাটার রেশ—আর ফিরতে চাই না মলয়বাবু। এমন একটা সুর ছিল তার মধ্যে, যার পরে কোনও কথাই আমার মুখে যোগাল না। দরখাস্তখানা হাতে করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    কয়েক মিনিট পরে উনি আবার বললেন, চাকরি অনেক দিল হল। কথায় কথায় লালমুখের ড্যাম্ ফুল শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। সব নিঃশব্দে সয়ে গেছি। ওদেরই রাজত্ব, না সয়ে উপায় কি বলুন! কিন্তু বুড়ো বয়সে সবার সামনে এই বাঁদরনাচটা আর সহ্য হল না ভাই—

    দরজার দিকে চেয়ে থেমে থেমে কথাগুলো বলে গেলেন সান্যালমশাই। চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তাঁর দৃষ্টি দরজা পার হয়ে চলে গেছে বত্রিশ বছর আগে, যেদিন প্রথম তাঁর অঙ্গে উঠেছিল এই দাসত্বের আচ্ছাদন। সুখে দুঃখে এতগুলো দিন কেটে গেছে। জীবনে রঙীন মুহূর্ত যে একেবারে আসেনি তা নয়। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে ওঁর ঘৃণাকুঞ্চিত চোখের সামনে ভেসে উঠল যে-জীবনের ছবি, তার আগাগোড়া ছেয়ে আছে ‘শুধু দিনযাপনের, শুধু প্রাণধারণের গ্লানি।’

    জেলর সাহেবের বাড়ির গেট পেরোতেই ছুটতে ছুটতে এল ওঁর সাত বছরের ছেলে পিন্টু। ফিফিস্ করে বলল, কাকাবাবু, মা আপনাকে ডাকছে।

    সান্যাল-গৃহিণী কোনোদিন আমার সামনে বের হননি। হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে গেলে ঘোমটাটা টেনে দিয়েছেন কপালের নীচে। আজ আমাকে তাঁর কিসের প্রয়োজন বুঝতে কষ্ট হল না। পিন্টুর সঙ্গে খিড়কি দিয়ে ঢুকলাম। দরজার মুখেই উনি দাঁড়িয়ে। বারো থেকে পাঁচ বছরের তিন-চারটি ছেলেমেয়ে এসে ঘিরে দাঁড়াল। সবারই মুখে উদ্বেগের চিহ্ন। ছোট হলেও তারা বুঝতে পেরেছে একটা কিছু আসন্ন, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনও পারিবারিক অকল্যাণ। কোনও রকম ভূমিকা না করেই উনি অনুনয়ের কণ্ঠে বললেন, আপনি ওঁকে একটু বুঝিয়ে বলুন ঠাকুরপো। একটা মাথা গুঁজবার জায়গা পর্যন্ত করেননি। কোথায় গিয়ে উঠবো এতবড় সংসার নিয়ে? ছেলেগুলো কেউ মানুষ হল না। তিনটে মেয়ে পার হতে বাকী। জানেন তো সব।

    জানি সবই। তার সঙ্গে একথাও জানি, ছোট বড় সব মানুষের জীবনে এমন এক একটা ক্ষণ আসে যার অদৃশ্য বাহু তাকে তার চিরাভ্যস্ত ‘জানা’ এবং ‘বোঝার’ সরল রাস্তা থেকে একটানে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সমস্ত হিসাব-নিকাশের আওতার বাইরে। তেমনি একটা প্রলয় মুহূর্ত আজ দেখা দিয়েছে তাঁর স্বামীর জীবনে এবং তারই দুর্বার প্লাবনে ভেসে চলেছেন প্রবীণ প্রাজ্ঞ এবং পাকা জেলর রায়সাহেব গণপতি সান্যাল। কেউ তাঁকে আটকাতে পারবে না।

    যে বুঝবে না তাকে বুঝিয়ে বলবার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সান্যাল-গৃহিণীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।

    .

    রায়বাহাদুর এবং খানবাহাদুরদের বন্ধন-ভয় দেখিয়েই আ মিনিয়ম সাহেব নিশ্চিন্ত ছিলেন না। ক’দিনের মধ্যেই দাঙ্গার এক চমৎকার প্রতিষেধক আবিষ্কার করে ফেললেন। তার নাম একজিবিশন, অর্থাৎ কৃষি-শিল্প প্রদর্শনী। কিন্তু আসর জমল যাদের নিয়ে তারা শিল্পীও নয় কৃষকও নয়, তারা কলকাতার বড় বড় দোকানদার। দলে দলে এসে বসল জমকালো স্টল সাজিয়ে। সেই সঙ্গে এল ম্যাজিক, সার্কাস, নাগরদোলা আর বাঈনাচ। ঘটা করে হল দ্বারোদ্ঘাটন। ম্যাজিস্ট্রেট কাঁচি দিয়ে ফিতে কাটলেন। তার আগে বক্তৃতা দিলেন পরিষ্কার বাংলায়। বললেন, এটা শুধু জিনিসপত্তর আর আমোদ-আহ্লাদের একজিবিশন নয়, এটা প্রেমের এবং ঐক্যের একজিবিশন। একজিবিশন কথাটার মানে হল—দেখানো। পাশাপাশি জেলাগুলোকে আপনারা দেখিয়ে দিন, তারা যখন একে অন্যের গলায় ছুরি বসাচ্ছে, আমরা তখন গলাগলি ধরে আনন্দ করছি।

    গেট-দর্শনীর উল্লেখ করে বললেন, ‘আমরা অনেক রকম কর দিয়ে থাকি—আয়কর, পথকর, জলকর। তার ওপোর এই যৎসামান্য ‘বিপিন কর’—দু’আনা, বলে একজিবিশন কমিটির সেক্রেটারি বিপিন করকে দেখিয়ে দিলেন। চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেল।

    সম্প্রদায় বিশেষের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা কিন্তু বেঁকে রইলেন মুখ গোমড়া করে। রাজনীতি ও ধর্মনীতি—উভয় মঞ্চ থেকে শোনা গেল তাঁদের আর্তনাদ। প্রথম দল একজিবিশন. নামক অনাবশ্যক বিলাসের মুণ্ডুপাত করে দরিদ্র জনসাধারণের জন্য বিপুল অশ্রুমোচন করলেন। দ্বিতীয় দল শ্মশ্রু আন্দোলন করে হুঙ্কার দিলেন গান-বাজনা, বাঈনাচ সব হারাম হ্যায়।

    কিন্তু প্রদর্শনী বয়কট করলেও তার দর্শিকাদের প্রতি অতিশয় অগ্রাহ্য দেখাতে শুরু করলেন তাঁদের স্বর্ণচন্দ্র যুবক দল। মহিলা গেটের সামনেটায় নানারূপ অঙ্গভঙ্গীর একজিবিশন দেখিয়ে তাঁরা তাঁদের চিরন্তন ঐতিহ্যের পরিচয় দিতে লাগলেন। বিপিন করের কমিটি মৃদু প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিনিময়ে লাভ করলেন ইষ্টকখণ্ড। তারপর হঠাৎ একদিন অবতীর্ণ হলেন এক ট্রাক লালপাগড়ি সহ স্বয়ং জেলা-শাসক। দর্শনমাত্র রোমান্স-সন্ধানী বীরবৃন্দ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলেন। যাঁরা পিছিয়ে পড়লেন, তাঁদের পৃষ্ঠদেশে পড়ল কিঞ্চিৎ মৃদু যষ্ঠি, এবং আশ্রয় জুটল সরকারী হাসপাতালে। আরেক দলের হাতে পড়ল লৌহবলয় এবং তাঁরা স্থানলাভ করলেন আমার লৌহতোরণের অন্তরালে।

    তারপর যা হয়ে থাকে, রণক্ষেত্রে দেখা দিলেন কাগজওয়ালার দল। আইন বাঁচিয়ে দিনকয়েক গলাবাজি দেখালেন পুলিসী-জুলুমের প্রতিবাদে। আসর বিশেষ জমল না। শেষ দৃশ্যে দেখা গেল, যে-সব বীরপুরুষেরা মহিলা গেটের পাশে জটলা করতেন, তাঁরা এবং তাঁদের বন্ধুরা যথারীতি দু’আনা ‘বিপিন কর’ দক্ষিণা দিলো বড় গেটে ভিড় করছেন।

    বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছিলাম এই মৃদু যষ্টির গোটকয়েক মৃদু তরঙ্গ নাকি ভেসে গিয়ে লেগেছিল মন্ত্রিসভার মসনদে। কর্তাব্যক্তিদের তলব পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট গেলেন কলকাতায়। সেখানে কি জাতীয় উপদেশ তাঁর মাথায় বর্ষিত হয়েছিল জানা যায়নি, তবে তার সবগুলোই যে ঐ অ্যালুমিনিয়ম চাকতির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, তার প্রমাণ পেতে দেরি হল না। রাজধানী থেকে ফিরবার দিনকয়েক পরেই, তাঁর নির্দেশে ব্যাপকতর যষ্ঠি-চালনার পুনরাবৃত্তি হল জজকোর্টের প্রাঙ্গণে।

    এবারকার লক্ষ্য ছিলেন জনৈক নারীহরণকারী মহাপুরুষের একদল ভক্ত। ঘটনা সামান্য। সেসন-কোর্টে যখন তাঁর বিচার চলছিল, অভিনন্দন জানাতে গিয়ে ভক্তবৃন্দ কিঞ্চিৎ বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন। ফলে জজসাহেব ম্যাজিস্ট্রেটের শরণ নিতে বাধ্য হন।

    পর পর দু-বার এমনি উপযুক্ত এবং সময়োচিত ঔষধ প্রয়োগের ফলে দাঙ্গাবিকার প্রশমিত হল। আমি এবং আমার মতো হাজার হাজার নিরীহ প্রাণী এই ভেবে নিশ্চিন্ত হলাম যে আরও কিছুকাল দুনিয়ার দানাপানি কপালে আছে, হঠাৎ ছোরার মুখে পৈতৃক প্রাণটা বোধহয় দিতে হল না।

    আজ ভাবছি, এমনি দু’-একটা পাগলা ‘অ্যালুমিনিয়ম’ যদি সেদিন জুটত পদ্মা, মেঘনা, রূপসা, কর্ণফুলীর তীরে, হয়তো বদলে যেত এই হতভাগ্য দেশের ইতিহাস; অন্তত মুছে যেত একটা কালিমা-লিপ্ত দীর্ঘ অধ্যায়, যার প্রতি ছত্রে জড়িয়ে আছে হত্যা-লুণ্ঠন, দাবানল আর নারী-নিগ্রহের দুরপনেয় কলঙ্ক।

    .

    মাঝখানে সামান্য কিছুদিন বিরতির পর ম্যাজিস্ট্রেট যথারীতি আবার তাঁর সাপ্তাহিক জেল পরিক্রমা শুরু করলেন। সেদিনটা ছিল রবিবার। রাউণ্ড শেষ করে সুপারের অফিসে বসে মন্তব্য লিখছিলেন পরিদর্শকের খাতায়। চাপরাসী একখানা কার্ড রেখে গেল। লেখা শেষ করে সাহেব আগন্তুককে ডেকে পাঠালেন। ঘরে ঢুকে গুড মর্নিং জানাল একটি গোবেচারী গোছের ছেলে। মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল, চোখে সন্ত্রস্ত দৃষ্টি।

    —Are you coming from the Air? কার্ডখানা হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সাহেব।

    ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। সাহেব কার্ডের উল্টো পিঠটা তুলে ধরলেন তার সামনে। বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে AIR. লজ্জিত মৃদু হাসি ফুটে উঠল ছেলেটির মুখে। বলল, আমি অল ইণ্ডিয়া রেডিওতে চাকরি করি।

    —I see. তারপর? কি মনে করে? আমি গাইতেও জানি না, বক্তৃতা করতেও শিখিনি। আমাদের এই চৌধুরীকে বরং ধরে নিয়ে যেতে পার। He writes stories —বলে কৌতুক-দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে।

    ছেলেটি এসব প্রসঙ্গের জবাব দিল না। একখানা হাতে-লেখা দরখাস্ত এগিয়ে দিয়ে বলল, বড্ড বিপদে পড়ে এসেছি, স্যার। আপনি রক্ষা না করলে আমার আর উপায় নেই।

    সাহেব দু-চার লাইন পড়ে কাগজখানা আমার হাতে দিয়ে বললেন, পড়, কি লেখা আছে। শুনতে শুনতে (এক ফাঁকে লক্ষ্য করলাম) ওঁর মুখের পেশীগুলো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠল, ঘনিয়ে এল গাম্ভীর্যের ছায়া।

    বিষয়টি বিস্ময়কর হলেও তখনকার দিনে বিচিত্র নয়। ছেলেটির নাম শশাঙ্ক সেন। চিটাগং কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করে অল ইণ্ডিয়া রেডিওর কোনও স্টেশনে একটা চাকরি সংগ্রহ করে। খুব কপালজোের বলতে হবে। কেননা প্রথমে আর্মারি রেইড, তারপর আসানুল্লা হত্যা, এত বড় দুটো প্রলয় কাণ্ডের পর চট্টগ্রামবাসী সেন, রায়, বাঁড়ুজ্জেদের সরকারী চাকরি লাভ আর আকাশের চাঁদ পকেটস্থ করা ছিল একই বস্তু। কিন্তু কপাল তাকে খানিকদূর এগিয়ে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারল না। চাকরি পাকা হবার পালা যখন এল, সরকারী নিয়মে দরকার একটি পুলিশ রিপোর্ট। স্টেশন ডিরেক্টর চিটাগং ডি. আই. জি.’র শরণ নিলেন। উত্তরে এমন একটি শেল গিয়ে পড়ল তাঁর টেবিলে, যার একঘায়ে চাকরি পাকা হওয়া তো দূরের কথা, একেবারে ভূমিসাৎ।

    স্টেশন ডিরেক্টর মশাই লোক ভাল ছিলেন। খতম-নোটিসের সঙ্গে পুলিসের চিঠিটাও শশাঙ্কর হাতে দিলেন। সে দেখল, যে-সব ভয়ানক ব্যাপারে তাকে জড়িত করা আছে, তার কোনোটার সঙ্গেই এ-জন্মে অন্তত তার যোগাযোগ ঘটেনি। যে-সব ভয়ঙ্কর ব্যক্তির উল্লেখ আছে তার অপকর্মের সঙ্গী বলে, তাদেরও সে বহু চেষ্টা করে মনে করতে পারল না। সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ল শুধু চারটি প্রাণী-বিধবা মা, একটি বয়স্কা বোন আর গোটাদুই অপোগণ্ড ভাই, তার এই ক্ষীণ চাকরি-সূত্রটি আশ্রয় করে যারা ঝুলে আছে বিরাট অনশনের গহ্বরের মুখে।

    শশাঙ্কর চোখের দিকে চেয়ে ডিরেক্টর সাহেব নোটিশটা আপাতত ফিরিয়ে নিলেন এবং ক’দিনের ছুটি দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দিলেন দেশে। বললেন, ওদের গিয়ে ধরো। দ্যাখ একবার চেষ্টা করে।

    মনিবের উপদেশমত দিনসাতেক ধরে শশাঙ্ক শেষ চেষ্টা করে দেখল। পুলিসের বড় সাহেবের অফিসে ধর্ণা দিল কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারল না। অ্যাডিশনাল সাহেবের চাপরাসীর চাপদাড়ি দেখেই ফিরে এল, সাহেবের শ্রীমুখ দর্শন হল না। কিন্তু আসল হর্তাকর্তা এবং বিধাতা যিনি, অর্থাৎ এক নম্বর ডি. আই. ও., তিনি ওকে বঞ্চিত করলেন না। খাতির করে কাছে বসিয়ে স্নিগ্ধ-কণ্ঠে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ইংরেজ তাড়াবো, আবার তার চাকরিও করবো—এ দুটো তো একসঙ্গে হয় না শশাঙ্কবাবু। তার চেয়ে আপনার বোমাধারী বন্ধুদের স্মরণ করুন। তাঁরাই একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। বলে উচ্চহাস্য করে উঠলেন।

    এমনি যখন অবস্থা, তখন এক উকিল-বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সব দেখে এবং শুনে তিনি পরামর্শ দিলেন, এক কাজ কর। কপাল ঠুকে চলে যাও পাগলা ‘অ্যালুমিনিয়মে’র কাছে। অঘটন ঘটাতে যদি কেউ পারে, ঐ লোকটাই পারবে। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলে হয় লাঠি নয় রুটি, দুটোর একটা জুটবেই।

    সব কথা গুছিয়ে বলা শশাঙ্কের পক্ষে সম্ভব হবে না মনে করে উকিল-বন্ধু তার হয়ে এই দরখাস্তটা লিখে দিয়েছেন।

    .

    সাহেব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা মন দিয়ে শুনলেন এবং পুলিস সাহেবের সই করা রিপোর্টটাও দেখলেন। তারপর শাণিত দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন শশাঙ্কর দিকে। দু-চারটি ভাল-পোশাক-পরা ইংরেজি কথা হয়তো মনের মধ্যে সাজিয়ে রেখেছিল বেচারা, কিন্তু ঐ চোখের সামনে তারা আর বেরোতে সাহস পেল না। আমিও ভেবে পেলাম না, এ দৃষ্টির অর্থ কি! ছেলেটার হয়ে একটু ওকালতি করবো কিনা ভাবছি, হঠাৎ ঐ পুলিস-রিপোর্ট-খানা পকেটস্থ করে একলাফে উঠে পড়লেন ভদ্রলোক এবং ছুটে বেরিয়ে গেলেন গেটের দিকে। গেট খোলার দেরি সয় না। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই তাঁর গাড়িখানা একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। শশাঙ্কর এত সাধের দরখাস্ত পড়ে রইল টেবিলের উপর।

    জানি যার বিরুদ্ধে এত বড় এবং এই জাতীয় গুরুতর অভিযোগ, ইংরেজ সরকারের দয়া বা অনুগ্রহ তার প্রত্যাশা করা অনুচিত। তবু তার উকিল বন্ধুটির মতো আমার মনেও কেমন একটা ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, অ্যালুমিনিয়ম সাহেব হয়তো পুলিশের চশমা দিয়েই সবটা দেখবেন না।

    ছেলেটিকে আমার অফিসে নিয়ে গিয়ে বসালাম। কিন্তু সান্ত্বনা দেবার মতো -কোনও কথাই খুঁজে পেলাম না। শুধু বোঝাবার চেষ্টা করলাম, সে একা নয়, হাজার হাজার শশাঙ্ক সেন ছেয়ে আছে এ দেশের ঘরে ঘরে।

    সে কোনও কথাই বলল না। অনেকক্ষণ নিঃশব্দে কাটিয়ে বলল, ওরা যা লিখেছে তার একটা কথাও যদি সত্যি হত স্যার, আমার কোনও ক্ষোভ ছিল না। কিন্তু সবটাই যে মিথ্যা। অথচ—

    টেলিফোন বেজে উঠল জেল-গেটে। গেট-কীপার ছুটে এসে জানাল, কালেক্টর সাব সেলাম দিয়া।

    —ছেলেটি কি চলে গেছে? ব্যস্তভাবে প্রশ্ন করলেন সাহেব।

    —এখনও যায়নি স্যার।

    —ওকে আজকেই চলে যেতে বল। He must report to his Director at once. জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, কোনও চিঠিপত্র দেবেন কিনা। তার আগেই রিসিভারটা নামিয়ে রাখার আওয়াজ শোনা গেল।

    সেইদিন সন্ধ্যাবেলা লালদীঘির বেঞ্চিতে দেখা হয়ে গেল পুরাতন বন্ধু দুর্গাদাসবাবুর সঙ্গে। ডি. আই. বি. আফিসের হেডক্লার্ক দুর্গাদাস দত্ত। বললেন, অ্যালুমিনিয়মের কাণ্ড শুনেছেন?

    —শুনিনি তো?

    “কাণ্ডের” বর্ণনা দিলেন দুর্গাদাসবাবু।

    অতিরিক্ত কাজের ভিড় সামলাতে না পেরে রবিবার সকালেও ওঁরা আফিস করছিলেন। এক নম্বর ডি. আই. ও. আলি সাহেবও উপস্থিত। ভাঙা গলায় কাকে ধমকাচ্ছিলেন। হঠাৎ সব চুপ। কি ব্যাপার! তাকিয়ে দেখেন, সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং কালেক্টর। আলি সাহেবের টেবিলে একটা কাগজ রেখে বললেন, এটা তোমরা পাঠিয়েছিলে?

    —ইয়েস স্যার।

    —Let me see his papers, শশাঙ্ক সেনের ফাইল বের কর। বলে, বসে পড়লেন সামনের একটা চেয়ারে।

    সে-যুগের চাটগাঁয় বাস করে টিকটিকির কবলে পড়েনি, বিশেষ সম্প্রদায় বাদ দিলে, এ রকম ছেলে কিংবা মেয়ে বোধহয় একটিও ছিল না। বয়স তার যাই হোক—পনের কিংবা পঁয়ত্রিশ। কিন্তু নিয়ম-মাফিক ফাইল থাকত শুধু রুই কাতলাদের বেলায়। তারই মধ্যে লেখা হত তাদের ঠিকুজী কোষ্ঠী, রোজনামচা। চুনো-পুঁটিদের আবার ফাইল কোথায়? তাদের ইতিবৃত্ত লুকিয়ে থাকত এ. এস. আই. বা ওয়াচারদের পকেটবুকে। এমনি একটা কিছুর উপর ভিত্তি করেই হয়তো রচিত হয়েছিল শশাঙ্ক সেনের রিপোর্ট।

    পাগলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সে-কথা বলা যায় না। অতএব শুরু হল ফাইল-সন্ধান, যাকে বলা যেতে পারে বন্যহংসীর অনুসরণ। প্রথমে এ টেবিল ও টেবিলে একটু আধটু খোঁজাখুঁজি, তারপর আলমারির তাক। কিন্তু সাহেবের ওঠাবার নাম নেই। তখন রেকর্ড- রুমে ছাদ-সমান উঁচু র‍্যাকের উপর মই লাগিয়ে স্বয়ং ইনস্পেক্টর তাঁর তিনজন সহকারী নিয়ে পুরনো কাগজের গাদা হাতড়ে চললেন। ম্যাজিস্ট্রেট অপেক্ষা করে আছেন। ধৈর্য পরীক্ষায় ওদের কাছে হার মানবেন না, এই যেন তাঁর পণ। কিন্তু সব জিনিসের একটা শেষ আছে। একটা বাণ্ডিল দু’-তিনবার করে দেখেও সন্ধান-কার্য একসময়ে শেষ হল। সর্বাঙ্গে ধুলোর প্লাস্টার লাগিয়ে শুষ্কমুখে আলি সাহেব এসে দাঁড়ালেন ম্যাজিস্ট্রেটের টেবিলের পাশে। সাহেব একবার চোখ তুলে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত ইনস্পেক্টর। ধুলো ঘাঁটাই সার হল। তবে আমি এটা আগেই জানতাম। যা নেই বা কোনোদিন ছিল না, তা পাওয়া যায় না!

    পুলিস রিপোর্টটা চেয়ে নিয়ে সেইখানে বসেই একটা মোটা কলম দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লিখলেন তার উল্টোপিঠে—’শশাঙ্ক সেনের কাগজপত্র সব দেখলাম। তার বিরুদ্ধে আপত্তিকর কিছুই পাওয়া গেল না। এখানে যে অভিযোগ করা হয়েছে সব ভিত্তিহীন। পুলিসের তরফ থেকে তার কলফার্মেশন সম্পর্কে কোনও বাধা নেই। স্টেশন – ডিরেক্টর এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত করেন জানালে বাধিত হবো।’

    লেখা শেষ করে সেইখানে বসেই সেটা নিজে হাতে খামে ভরলেন, গালা আর মোমবাতি চেয়ে নিয়ে শীলমোহর করলেন তার উপর, এবং স্টেশন-ডিরেক্টরের ঠিকানা লিখে বাইরে গিয়ে ফেলে দিলেন ডাকবাক্সে।

    .

    সাত-আট দিন পরে আবার জেল ভিজিটের পালা। গেটে ঢুকেই বললেন, সেই ছেলেটি কনফার্মড হয়ে গেছে শুনেছ? ওদের ডিরেক্টরের চিঠি পেলাম কাল। বললাম, আমিও ওর চিঠি পেয়েছি। ও আসছে দু-চার দিনের মধ্যে।

    —কেন?

    —ঠিক জানি না। বোধহয় উপকারটা পেল, তার জন্যে নিজে এসে একবার—

    –না, না। লিখে দাও খরচ-পত্তর করে আসতে হবে না মিছিমিছি।

    —একটা কথা জিজ্ঞেস করবো…

    সাহেব সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন, বললাম, ওর সম্বন্ধে আপনি যা লিখেছেন, আমি জানি। কিন্তু প্রথম লাইনটা বুঝতে পারিনি। শুনলাম, ওর ফাইল-টাইল কিছু পাওয়া যায় নি। অথচ—

    —লিখেছি সব পাওয়া গেছে, এই তো? তার কারণ বুঝলে না! যদি লিখতাম কাগজ পাওয়া গেল না, বাড়ি পৌঁছবার আগেই ঐ ইনস্পেক্টর লাফাতে লাফাতে ছুটত আমার পেছনে, দাঁত বের করে বলত, ফাইল পেয়েছি স্যার। এক শীট কাগজে গোটাকয়েক আঁচড় কাটতে কত সময় লাগে! দশ মিনিট? তারও কম। সে সুযোগ ওদের আমি দিতে চাইনি। একটু মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল। তাছাড়া উপায় ছিল না। এর পরে আবার কিছু একটা বানিয়ে ফেলবে, সে পথ বন্ধ করে দিলাম।—বলে ছেলেমানুষের মতো হো হো করে হেসে উঠলেন।

  • ছয়

    ছয়

    হাঙ্গারস্ট্রাইক? হ্যাঁ, তা দেখছি বইকি। দুটো চারটে নয়, দশ বিশটাও নয়, দুশো চারশো। ইংরেজ রাজত্বে দেখেছি সত্যাগ্রহী কংগ্রেস, কংগ্রেস-রাজত্বে দেখলাম সত্যাগ্রহী কমরেডস্। জাত একই, তফাত শুধু বর্ণে। ওঁরা ছিলেন সাদা, এঁরা লাল। উভয় ক্ষেত্রেই অনশন একটা পলিটিক্যাল মহাস্ত্র। লক্ষ্যস্থল সরকার নামক নিরাকার পদার্থ, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। জেলটা শুধু উপলক্ষ। তবু যেহেতু সে দৃশ্যমান, তাকে ধরা যায় এবং সে ধরে রাখে, প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ যখন বাধে তার সঙ্গেই বাধে। তাকে ঘিরেই চলতে থাকে আঘাত আর প্রতিঘাতের পালা।

    হাঙ্গারস্ট্রাইক প্রথমেই যাকে স্ট্রাইক করে সেটা হল জেলের আইন। ‘খাবো না’ বলে মুখভার করলে মায়ের কিংবা প্রিয়ার কাছে সেটা হয়তো অভিমান, কিন্তু জেলের কাছে অপরাধ। জেলকোডের পরিভাষায় তাঁর নাম major offence. অপরাধ মাত্রেরই দণ্ড আছে। আগেকার আমলে যাঁদের দেখেছি, তাঁরা সেকথা জানতেন এবং নিজেরা দণ্ডপাণি না হয়েই দণ্ড গ্রহণ করতেন। তাঁরা বলতেন, বিরোধটা পেয়াদার সঙ্গে নয়, পেয়াদার পেছনে অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে যে তাকে চালাচ্ছে তার সঙ্গে। জেল আর তাদের মধ্যে একটা অলিখিত এবং অব্যক্ত বোঝাপড়া ছিল, অনেকটা যাকে বলে mutual understanding. আমি জোর করে মুখ বন্ধ করে থাকবো, তুমি আমাকে জোর করে খাওয়াবে। ব্যাস, ঐ পর্যন্তই। ঠোকাঠুকি আছে, মন-কষাকষি নেই।

    হালআমলে অর্থাৎ ঊনপঞ্চাশী হাঙ্গারস্ট্রাইকের নীতি দেখলাম অন্য রকম। পেয়াদাটাকে যখন হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে, তখন ওর ওপরেই নাও এক হাত। ও যেমন তোমার পোলিটারিয়েট নাকের মধ্যে রবারের নল চালিয়ে দুধ ঢালছে, তুমি ওর বুর্জোয়া কানের মধ্যে বস্তি-নিঃসৃত বাক্য-সুধা বর্ষণ কর! সুযোগ পেলে তোমার হাতুড়ি ও কাস্তে মার্কা বদ্ধমুষ্টি চালিয়ে ওর ঐ পুঁজিবাদী নাকটাকে উড়িয়ে দিতে পার। ঢিল খেয়ে ও যদি পাটকেলটা ছোঁড়ে, তোমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। প্রপাগাণ্ডার ডাণ্ডা চালিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করবার উত্তম সুযোগ। উনপঞ্চাশ সালের কমরেডি হাঙ্গার স্ট্রাইকের প্রধান তত্ত্ব ছিল এই প্রচার।

    মোটামুটি ভাবে হাঙ্গারস্ট্রাইক মাত্রেই একটা শব্দহীন লাউড-স্পীকার। জনগণের কানের পর্দাকে প্রবল বেগে আঘাত করবার মতো এত সহজ আর এমন অব্যর্থ অস্ত্র আর কিছুই নেই। আপনার বক্তৃতা যখন শ্রোতা পায় না, বিবৃতি পায় না পাঠক, কিংবা স্লোগান-মুখর শোভাযাত্রা যখন দর্শক-অভাবে শোভাহীন, তখন আপনার নেতৃত্বরক্ষার একমাত্র পথ,—জেলে গিয়ে হাঙ্গারস্ট্রাইক। দ্রুত বিস্মরণশীল জনতা অন্তত কিছুদিন আপনাকে স্মরণে রাখবে।

    কিন্তু অনশন যেখানে নিছক রাজনৈতিক, তার মধ্যে উত্তেজনা যতই থাক রস নেই বিশেষ করে জেলবাবুদের কাছে ওগুলো একেবারে বিস্বাদ এবং বিবর্ণ। তার উদ্দেশ্য থেকে বিধেয়, সবটুকু আমাদের কণ্ঠস্থ। ও-পক্ষের ধরন-ধারণ এবং এ-পক্ষের বচন করণ, সব বিধিবদ্ধ, গতানুগতিক। যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের ওটা একটা আনুষঙ্গিক উৎপাত মাত্র।

    হাঙ্গারস্ট্রাইকের মধ্যে চমক আছে, আছে বৈচিত্রের রং, এবং সেটা দেখা দেয় তখনই যখন ও অস্ত্রটা পড়ে গিয়ে তাদের হাতে, যাদের আমরা বলি সাধারণ কয়েদী। বলা বাহুল্য এটা তাদের নিজস্ব হাতিয়ার নয়। তাদের অস্ত্রশালায় এর স্থান ছিল না কোনোদিন। তারা জানত, লড়াই-এর একমাত্র পথ—শত্রুর উপর লাফিয়ে পড়, উদ্যত হাতিয়ার দিয়ে আঘাত কর তার দেহে। কিন্তু শুধু শুয়ে থেকে আর পড়ে থেকেও যে লড়াই চলে—এমন লড়াই, যার কাছে প্রতিপক্ষের সমস্ত অস্ত্র অকেজো হয়ে যায়, সেটা তারা প্রথম দেখল ‘স্বদেশীবাবু’দের শিবিরে। সেখান থেকেই তাদের দীক্ষা। তারপর স্থানে-অস্থানে এই অপূর্ব অস্ত্র তারা প্রয়োগ করেছে এবং এখনও করছে, কখনও ব্যক্তিগত, কখনও দলগত প্রয়োজনে। তার কাহিনী বিচিত্র।

    সাতচল্লিশ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা যখন এল, কোনও একটা সেন্ট্রাল জেলের দীর্ঘমেয়াদী কয়েদীরা বলে বসল, আমরা মুক্তি চাই। যুক্তিটা কি? জানতে চাইলেন কর্তৃপক্ষ। উত্তর অত্যন্ত সরল—অপরাধ যা করেছিলাম সে সেই ব্রিটিশ-রাজত্বে। এতদিন তো তার ফল-ভোগ করলাম। আর কেন? পরাধীন যুগের দণ্ড যদি স্বাধীন যুগেও কায়েম রাখবে, তবে এ স্বাধীনতার মূল্য কি? বলে তারা হুঙ্কার ছাড়ল—এ আজাদি ঝুটা হ্যায়।

    সরকার নামক যে একটি নৈর্ব্যক্তিক গোষ্ঠী আছে, সকল দেশে এবং সকল যুগেই তার রসবোধ বড় কম। ‘রিলিজ’-এর বদলে তাঁরা মঞ্জুর করলেন কিঞ্চিৎ ‘রেমিশন’। অর্থাৎ দণ্ডের শেষ না করে, করলেন হ্রাস। পরদিন থেকেই ব্যারাকে ব্যারাকে শুরু হল হাঙ্গার- স্ট্রাইক পর্ব। সারি সারি শুয়ে পড়ল দশ, বারো, বিশ কিংবা পঁচিশ বছরের দল, যাদের বুকের উপর ঝুলছে খুন, রাহাজানি, দাঙ্গা আর নারী-ধর্ষণের চাকতি। স্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা বিস্ময়ের চেয়ে বিরক্ত বোধ করলেন বেশি, তার সঙ্গে বোধহয় কিঞ্চিৎ কৌতুক, এই ভেবে, যে একদা যাঁদের হাতে এঁরা দীক্ষা নিয়েছিলেন আজ তাঁদেরই এঁরা কিঞ্চিৎ শিক্ষা দিতে উদ্যত।

    একদিন গেল, দু-দিন গেল, তিনদিনের দিন রঙ্গমঞ্চে দেখা দিল একদল ডাক্তার আর সেই বড় বড় রবারের নল আর বালতি বালতি দুধ, বার্লি, ডিম, কমলালেবু, গ্লুকোজ, আর কি সব ওষুধপত্তর। ফানেল-ভর্তি সেই সব রসায়ন নলযোগে চলে গেল নাসিকা টানেলের মধ্যে। রসনা তৃপ্তি না হোক, উদরপূর্তির তরল ব্যবস্থা। ‘স্বদেশী’ হাঙ্গারস্ট্রাইকের চিকিৎসা-পদ্ধতিও ছিল ঠিক একই রকম। তফাত এই যে, তাঁরা ঐ নলটাকে যথারীতি অস্বীকার করে মাথা-নাড়া দিতেন, আর সরকার পক্ষ থেকে মাথাটা যথারীতি চেপে ধরা হত। কিন্তু তাঁদের এই মন্ত্রশিষ্যেরা এই অনাবশ্যক আবরণটা অতিক্রম করে গেল। মাথা নাড়া আর মাথা ধরার প্রয়োজন রইল না। বরং আরও দু-চারদিন যেতেই দেখা গেল ঐ বালতি আর রবারের নলটির উপর অনশনকারীর আকর্ষণ ক্রমশ দুর্বার হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট সময়ে তারা দেখা না দিলে সারি সারি চোখগুলো তৃষিত প্রতীক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।

    কর্তৃস্থানীয় জনৈক জবরদস্ত উপরওয়ালা একদিন এই দৃশ্য লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “ডাক্তার না এনে তোমাদের আনা উচিত ছিল গোটাকয়েক হান্টার। তাহলে এ দুর্ভোগ আর একদিনও ভুগতে হত না।’ তাঁর পরামর্শ অবশ্য গৃহীত হয়নি। তবু দুর্ভোগ বেশীদিন ভুগতে হল না। আপনা হতেই একদিন দেখা গেল খাদ্যের রূপান্তর ঘটেছে—তরল থেকে কঠিন স্তরে এবং প্রবেশপথ নাসিকা নয়, মুখবিবর।

    “দায়মলি”দের* এই দলবদ্ধ অনশনের উদ্দেশ্য যাই হোক, ধরনটা ছিল রাজনৈতিক। অনেকটা সেই স্বদেশীবাবুদের পুরানো রাস্তা। কিন্তু করণ সিং-এর হাঙ্গারস্ট্রাইক একেবারে তার নিজস্ব। উদ্দেশ্যই যে শুধু অভিনব তাই নয়, ধরনটাও নতুন। কতগুলো দুঃসাহসিক ডাকাতির সঙ্গে জড়িত একটা গ্যাঙ কেস্-এ আরও কয়েকজনের সঙ্গে করণ সিং-এর জেল হল দশ বছর। দলবল থেকে আলাদা করে তাকে পাঠানো হল এক সেন্ট্রাল জেলে। গৌরবর্ণ দেহ, বাঁশির মতো নাক, রুক্ষ আয়ত চোখ। খাবারের থালার দিকে তাকিয়েই ঝাঁঝিয়ে উঠল, লে যাও। নেহি খায় গা।

    [* খুন এবং খুন-সহ ডাকাতির অপরাধে যাদের বিশ এবং পঁচিশ বছর জেল হয়, সিপাই-মহলের চলিত ভাষায় তাদের বলে দায়মলি।]

    —কেন, খাবে না কেন? জানতে চাইল রন্ধনশালার মেট।

    —ইয়ে গোশত্ হালাল হ্যায়।

    —তবে কী গোশত্ খাবে তুমি?

    উত্তরে সে যা জানাল, তার মানে—জবাই-করা জানোয়ারের মাংস যা বাজারে পাওয়া যায়, তার কাছে শুধু অখাদ্য নয়, অস্পৃশ্য। কোনো দেবস্থানে বলিদত্ত যে পশু তারই মাংস চাই, আর তার সঙ্গে চাপাটি। এই তার দৈনন্দিন খাদ্য। বাজে জিনিস তার রুচবে না। কর্তৃপক্ষ জানালেন, সেটা সম্ভব নয়। বেশ, তাহলে খাদ্যগ্রহণও সম্ভব নয় করণ সিং-এর পক্ষে।

    চলল হাঙ্গার স্ট্রাইক এবং তার সঙ্গে সঙ্গে এবেলা ওবেলা নেজাল ফিডিং। বুঝিয়ে সুঝিয়ে হার মানল জেলের লোক। সুপার এসে যথারীতি ওয়ার্নিং দিলেন। তারপর একটি একটি করে প্রত্যাহার করা হল কারাজীবনের যা কিছু সুবিধা সুযোগ। কেটে নেওয়া হল তার যা কিছু ছিল অর্জিত রেমিশন, বন্ধ হল ভবিষ্যৎ অর্জনের অধিকার। তারপর এল চরম পন্থা। অর্থাৎ আইনভঙ্গের মামলা দায়ের হল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। হাকিম এলেন। কোর্ট বসল সুপারের ঘরে। আসামীর ওঠবার শক্তি নেই। স্ট্রেচারে করে আনা হল হাকিমের কাছে। তুমি দোষী না নির্দোষ—প্রশ্ন করলেন কোর্ট।

    আসামী নিরুত্তর! অনেক করে আবার বোঝালেন হাকিম। জেলকোডের নির্ধারিত খাদ্য বর্জন করা গুরুতর অপরাধ। তার জন্য দণ্ড বেড়ে যাবে। করণ সিং মুদ্রিত-চক্ষু, নির্বিকার। ছ’মাস জেল দিয়ে চলে গেলেন হাকিম।

    এমনি করে কেটে গেল কয়েক মাস। কেটে গেল বছর। খবর পেয়ে পাঞ্জাবের কোন্ দূর গ্রাম থেকে এল তার বাপ। ক্ষীণদৃষ্টি, ভগ্নদেহ। বয়স পার হয়ে গেছে সত্তরের কোঠা। জেল-ডাক্তার তার কম্পিত শীর্ণ হাতে তুলে দিলেন একটা কমলালেবু। ছেলের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে আস্তে আস্তে বলল বৃদ্ধ, খেয়ে নে। আমি আর কদ্দিন? আর তোকে বলতে আসবো না।

    করণ সিং-এর চোখ খুলে গেল। রক্তাভ ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। রুক্ষ-কণ্ঠে বলল, বিরক্ত কোরো না। বাড়ি ফিরে যাও।

    —তুই আমার জোয়ান ছেলে না খেয়ে জান দিবি জেলখালায়, আমি বাড়ি ফিরবো কোন্ মুখে? তোর মা থাকলে কি এমন করে ফেরাতে পারতিস তাকে?

    ছেলের বুকের উপর ভেঙে পড়ল বিপত্নীক বৃদ্ধ। চারদিকে যারা দাঁড়িয়ে ছিল জেলরক্ষী আর জেলবন্দী, সবারই চোখ সজল হয়ে উঠল। কিন্তু করণ সিং-এর নিমীলিত চোখের কোণে একবিন্দু জলরেখা দেখা দিল না।

    ক্ষিতীশ রুদ্র জেলে এসেছিল কোন্ এক দাঙ্গা কেস্-এর আসামী হয়ে। তারপর চার বছর জেল হয়ে গেল। বছরখানেক কেটে যাবার পর হঠাৎ একদিন তার মনে হল একটু চা না হলে জীবন দুর্বহ। তৃতীয় শ্রেণীর বন্দীদের খাদ্যতালিকায় চা অনুপস্থিত। সেকথা তাকে জানানো হল। উত্তরে বলল ক্ষিতীশ, তা জানি। কিন্তু আমি চা চাইছি on medical ground, অর্থাৎ ওজন কমে গেলে কিংবা শরীর খারাপ হলে যেমন দুধ মাখন কিংবা অতিরিক্ত মাছমাংসের বরাদ্দ করেন মেডিক্যাল অফিসার, তেমনি ক্ষিতীশ রুদ্রের দাবি হল সামান্য এক কাপ চা।

    কিন্তু চায়ের অভাবে শরীর তো তোমার খারাপ হয়নি? প্রশ্ন করলেন ডাক্তার। ক্ষিতীশ নিঃশব্দে চলে গেল।

    মাসখানেক পরে আবার এল টিকিট নিয়ে। চোখের কোণে কালি পড়েছে, বেরিয়ে এসেছে কণ্ঠার হাড়। ওজন কমে গেছে আট পাউণ্ড। মুখে জয়োল্লাসের মৃদু হাসি। ডাক্তারও হাসলেন, টিকেটখানা চেয়ে নিয়ে কি খানিকটা লিখলেন তার পিঠে। পরদিন সকালে চা-এর বদলে এল এক চার্জ। স্বাস্থ্যের প্রতি ইচ্ছাকৃত অবহেলার অপরাধে সুপারের সামনে হাজির হল ক্ষিতীশ রুদ্র। ব্যাপার শুনে সুপার একটা ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু ক্ষিতীশ তার দাবি ছাড়ল না। সেদিন বিকালেই রিপোর্ট দিল বড় জমাদার, ক্ষিতীশ খানা ছোড় দিয়া।’

    কয়েদী-মহলে কিঞ্চিৎ কৌতুকের উদ্রেক হল। করণ সিং-এর আচরণে সমর্থন না থাক, সম্ভ্রম বোধের অভাব ছিল না। কিন্তু ক্ষিতীশ রুদ্রের ব্যাপার নিয়ে চলল লঘু আলোচনা। লোকে দেশের জন্যে প্রাণ দেয়, প্রিয়ার জন্যে জান দেয়; সেটা নতুন নয়, আশ্চর্যও নয়। কিন্তু তুচ্ছ এক পেয়ালা চা-এর জন্যে পৈতৃক প্রাণটা বিলিয়ে দিচ্ছে, এত বড় শহীদ এই প্রথম দেখা গেল। ক্ষীতিশের ভ্রূক্ষেপ নেই। মাসকয়েক কেটে গেল ডিম দুধ আর কমলার রস নাসাধঃকরণ করে।

    ইতিমধ্যে তার মায়ের কাছ থেকে এল এক চিঠি। এই অহেতুক আত্মহত্যার পথ থেকে নিরস্ত হবার জন্যে নানারকম উপদেশ দিয়ে শেষের দিকে লিখেছেন, ‘মনে রেখো তুমি যেখানে আছ, সেখানে লোকে আরাম করতে যায় না, যায় কৃত অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে। সেকথা ভুলে গিয়ে যারা জেলে গিয়েও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আবদার করে, তারা জানে না যে সেটা বাহাদুরি নয়, নির্লজ্জ কাঙালপনা। তোমার আচরণে তুমি লজ্জিত হবে, তোমার মা হয়ে এইটুকু শুধু তোমার কাছে আশা করি!’

    এ চিঠি পাবার পরেও ক্ষিতীশের অনশন অব্যাহত রইল, কিন্তু অবস্থার ঘটল দ্রুত অবনতি। কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হলেন। মায়ের কাছে জরুরী তার গেল—তাঁর ছেলের অবস্থা গুরুতর। ইচ্ছা করলে তিনি এসে দেখে যেতে পারেন। তিনি এলেন না। লিখে পাঠালেন : আমি গিয়ে কি করবো! যে-ছেলের কাছে মা-এর চেয়ে চা-এর দাবি বড় তাকে আমার বলবার কিছু নেই।

    চিঠিখানা পড়িয়ে শোনানো হল ক্ষিতীশকে। সেদিন বিকালেই আবার খবর নিয়ে এল বড় জমাদার : ‘ক্ষতিশ অন্‌শন্ তোড় দিয়া।

    না, আমরণ অনশনের চরম পরিণাম দেখবার দুর্ভাগ্য আমার ঘটেনি। দেখেছি তাদের বৈচিত্র্যময় পরিণতি। কোনোটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, কোনোটা আংশিক। কোনোটা আপাত-জয়লাভের গৌরব না পেলেও আসন্ন জয়ের পথ খুলে দিয়ে গেছে। কোনোটা আবার শেষ হয়েছে গিয়ে কোনও অপ্রীতিকর সীমানায়, রেখে গেছে শুধু তিক্ত স্মৃতি। যবনিকা যেখানেই পড়ুক এবং যে-ভাবেই পড়ুক, সব চেয়ে খুশী হয়েছি আমরা, অর্থাৎ জেলের লোক। নাকের বদলে মুখের বিবরে এক পেয়ালা ডাবের জল বা কমলার রস ঢেলে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আফিসে ফিরে গেছি। মুক্তি পেয়েছি দৈনন্দিন রিপোর্ট পাঠাবার দুরূহ কর্তব্য থেকে। সতত-দুশ্চিন্তার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে ডাক্তারবাবুরা।

    দীর্ঘ অনশন শেষে কেউ দীর্ঘদিনের জন্যে পঙ্গু হয়ে গেছে, কেউ বা চিরকালের তরে সার করেছে পাকযন্ত্রের বৈকল্য, কারও আবার সারাজীবনের সঙ্গী হয়েছে দুরারোগ্য বাতব্যাধি। অনশন ভঙ্গের অনুরোধ জানাতে গিয়ে কিংবা অবধারিত মৃত্যুর কবল থেকে মানুষকে বাঁচাবার যে প্রাথমিক দায়িত্ব, তাই পালন করতে গিয়ে অভিনন্দন যা লাভ করেছি তাও কৌতুকময়। কেউ দিয়েছেন নীরব ঔদাসীন্য, কারও কাছে লাভ করেছি অকথ্য কটূক্তি এবং ইচ্ছাকৃত অপমান, কারও হাত থেকে পেয়েছি আকস্মিক আক্রমণ। মনে পড়ে একবার কোনও এক রাজনৈতিক দলে কয়েকজন পাণ্ডা কী একটা দাবি জানিয়ে হাঙ্গারস্ট্রাইক শুরু করলেন। বন্ধুরা পালা করে উদয়াস্ত তাঁদের ঘিরে বসে আছেন। ডাক্তার কাছে গেলে তেড়ে আসেন। অন্য কোনও জেল-অফিসার দেখামাত্র একেবারে মারমুখী। এদিকে ওঁদের নাসিকা-ভোজন একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু বন্ধুরা বাধা না দিয়ে ছাড়বেন না। সুতরাং আমাদের একমাত্র পন্থা হল শুভাকাঙ্ক্ষীদের কবল থেকে ওঁদের নিঃশব্দে হরণ করে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

    আর কালবিলম্ব না করে দলবল নিয়ে হানা দেওয়া গেল। কয়েকজন কুস্তিগির সিপাইকে নির্দেশ দেওয়া হল—যাঁরা আক্রমণ করবেন তাঁদের প্রতিরোধ করবার প্রয়োজন নেই, শুধু বাহুবিস্তার করে সস্নেহে আলিঙ্গন করলেই চলবে। ওয়ার্ডের কাছাকাছি যেতেই শুরু হল তর্জন-গর্জন। সে সব অগ্রাহ্য করে স্ট্রেচারগুলো চলে গেল ভেতরে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একতলার দরজার ঠিক বাইরেটায়। হঠাৎ পাশের অন্য একটা ব্যারাকের দোতলা থেকে চিৎকার করে উঠল একজন সাধারণ কয়েদী, সরে যান, স্যার।’ হুঁশিয়ারিটা কার উদ্দেশ্যে না জেনেই খানিকটা পিছিয়ে গেলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ইঞ্চিতিনেক দূরে সশব্দে ভেঙে পড়ল একটা মাটিভর্তি মস্ত বড় পাতাবাহারের টব। ওটা যে উপরের বারান্দা থেকে আমারই শিরোদেশ লক্ষ্য করে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, সেটুকু বুঝতে দেরি হল না। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝলাম যে সরে যেতে আর এক সেকেণ্ড দেরি হলে আপনাদের আজ এমন জরাসন্ধের কবলে পড়তে হত না।

    হাঙ্গারস্ট্রাইক কেন হয়, কোথায় তার মনস্তাত্ত্বিক- পটভূমি—সে-সব তত্ত্ব উদ্ঘাটন করবার মতো সন্ধানী আলো আমার চোখে নেই। দীর্ঘকাল ধরে সাদা চোখে যা দেখলাম, তাতে এই কথাই মনে হয়েছে—সব হাঙ্গার স্ট্রাইকের অন্তরালে একটা সাধারণ সূক্ষ্ম অনুভূতি লুকিয়ে আছে। তার নাম অভিমান। বিচিত্র তার রূপ, বিভিন্ন তার লক্ষ্য। সে অভিমান কখনও রাষ্ট্র বা সমাজ-ব্যবস্থার উপর, কখনও নিজের উপর, কখনও কোনো আত্মজনের উপর, আবার কখনও বা অস্পষ্ট অনির্দেশ্য কোনও আদর্শের উপর। বাড়িতে মা অথবা স্ত্রীর উপর রাগ করে না খেয়ে থাকা আর জেলে সরকার বা তার কোনও প্রতিনিধির উপর রাগ করে না খেয়ে থাকা—তলিয়ে দেখলে এ দুটো একই বস্তু। জাত একই, তফাত শুধু রূপের। এ দুয়ের পেছনে যে ভাবাবেগ তার “কাইণ্ড” এক, তফাত শুধু “ডিগ্রির”।

    সব মানুষের মনের মধ্যেই অভিমান আছে। কিন্তু কারাজীবনের আলো-বাতাসে ছড়িয়ে আছে তার পুষ্টির উপাদান। একজন আধুনিক কারাতত্ত্ববিদ বলেছেন, ‘পৃথিবীতে ক্রিমিনালই হচ্ছে সব চেয়ে বুদ্ধিমান জাত।’ ‘ক্রাইম’-এর পেছনে বুদ্ধির প্রয়োজন, সন্দেহ নেই। কিন্তু ক্রাইম করবার পর জেলে যখন সে আসে, তার বুদ্ধি-প্রয়োগের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়ে। যত দিন যায়, তার মাথার দিকটায় ভাঁটা পড়তে থাকে, জোয়ার দেখা যায় বুকের দিকে। দৈনন্দিন জীবনের যে শক্তি তাকে চালিত করে, তার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তি যতখানি, তার চেয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকে হৃদয়বৃত্তি। যুক্তির চেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে ভাবালুতা। বৃহৎ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন, ঐ পাষাণ বেষ্টনী ঘেরা ক্ষুদ্র পৃথিবীর মধ্যে বসে বসে তার কেবলই মনে হতে থাকে এ দুনিয়ায় তার কেউ নেই, সংসারে সবার কাছে, সব কিছু থেকে সে বঞ্চিত, সকলের দ্বারা সে বর্জিত। তাই সবার বিরুদ্ধে তার দুরন্ত ক্ষোভ, সকলের উপর তার দুর্জয় অভিমান। কয়েদী জাতটা বুদ্ধিমান, একথা হয়তো সত্য। কিন্তু তার চেয়ে স্পষ্টতর সত্য—তারা অত্যন্ত অভিমানী এবং অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর।

    হাঙ্গারস্ট্রাইক অনেক ঘটেছে আমার জীবনে। পিছনের দিকে তাকিয়ে সেইসব অভিমান-ক্ষুব্ধ শীর্ণ মুখগুলো আজ দেখতে পাচ্ছি। সারি সারি শুয়ে আছে হাসপাতালের লোহার খাটে। কেউ বা একান্ত নিঃসঙ্গ—পড়ে আছে কোনও নির্জন সেল-এর সংকীর্ণ অন্ধকারে। কোনোটা ঝাপসা হয়ে গেছে, কোনোটা বা আজও স্পষ্ট।

    তারই মধ্যে একখানা বিবর্ণ মুখ যেন জ্বল্ করছে চোখের উপর। মনে পড়ছে প্রথম যেদিন সে এল। কালো ঘেরাটোপঢাকা কয়েদী-গাড়ি থেকে নেমে এসে দাঁড়াল আউটার আর ইনার গেটের মাঝখানে। লম্বায় প্রায় ছ’ফুট, প্রশস্ত বুক, ঈষৎ সোনালী রং-এর কোঁকড়ানো চুল নেমে এসেছে কাঁধের উপর। তার উপরে বিশাল পাগড়ি। আধময়লা জোব্বার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে উজ্জ্বল দেহশ্রী। নামটাও জমকালো সৈয়দ আফজল খাঁ। পাঠান না আফগান ঠিক জানি না। উত্তর পশ্চিম সীমান্তের কোনও প্রান্তে তার দেশ। ওয়ারেন্ট খুলে দেখলাম, ৩৯৬ আই. পি. সি.। ডাকাতির সঙ্গে নরহত্যা। শুনলাম, তিন-চারটা মারাত্মক মামলার সঙ্গে সে জড়িত। তাই কোর্টে যাওয়া-আসার পথে প্রিজনভ্যানের মধ্যেও তার হাতে পড়ল হাতকড়া। একদিন এই নিয়ে লেগে গেল পুলিশের সঙ্গে। হাবিলদার বলল, হাতকড়া খুলে দিলে কোন্ দিন তুমি লাফিয়ে পড়ে ছুট্‌ দাও, কে জানে? —যদি দিই, আটকাতে পারবে? বলে এক দুই তিন ঝটকায় ভেঙে ফেলল হাতকড়া। লাফিয়েও পড়ল না, ছুটও দিল না। শুধু দেখিয়ে দিল, সে সবই পারে। তারপর থেকে কোর্টের পথে তার ডাইনে বাঁয়ে লেগে থাকত দুজন করে রাইফেলধারী গুর্খা।

    যেমন বিশাল বপু, তেমনি বিপুল তার দক্ষিণ-হস্তের ব্যাপার। কিন্তু আফজল খাঁর দীর্ঘ হাজতবাসের মধ্যে ওদিকটা নিয়ে মাথা আমাদের ঘামাতে হয়নি। শহরের প্রান্তে ওদের মস্ত বড় ঘাঁটি। সেখান থেকে ওর বন্ধুরা নিয়মিত যোগান দিত ডেকচি-ভর্তি খাসী বা ভেড়ার মাংস, মোটা মোটা ঘৃত-জর্জর চাপাটি আর সেই সঙ্গে আঙুর-আনার-কাজু- মনাক্কার প্যাকেট। বিচারাধীন আসামীর বাইরে থেকে খাদ্য-প্রাপ্তি আইনসিদ্ধ। জেল হবার সঙ্গে সঙ্গেই সে অধিকার চলে যায়। তখন সে পুরোপুরি জেলের পোষ্য। সুতরাং সাত বছর মেয়াদ নিয়ে যেদিন কোর্ট থেকে ফিরে এল আফজল খাঁ, উভয় দিকেই সমস্যা দেখা দিল।

    তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী-খাদ্য তিন প্রকার—বেঙ্গল ডায়েট (দুবেলা ভাত), বিহার ডায়েট (একবেলা ভাত, একবেলা রুটি), আর পাঞ্জাব ডায়েট (দুবেলাই রুটি)।

    প্রথামত ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, কোন্ ডায়েট নেবে তুমি?

    আফজল খাঁ গম্ভীর ভাবে বলল, আফগান ডায়েট।

    ডাক্তারের কোডে এ হেন বস্তুর উল্লেখ নেই। সুতরাং বিকল্প ব্যবস্থা হল—পাঞ্জাব ডায়েট্। ডাক্তারের বোধ হয় মনে হয়েছিল, এই পেশোয়ারী পাহাড়টিকে আর যেখানেই হোক্ অন্নভোজী এলাকায় ফেলা যায় না। আফজল নালিশ জানাতে এল আমার কাছে। সোজাসুজি মন্তব্য করল, আপকা জেলমে ইন্‌সাব্ নেহি হ্যায়।

    বিরক্ত হয়ে বললাম, কেন, কি অবিচারটা দেখলে তুমি?

    —আপ্‌কা বেঙ্গল ডায়েট হ্যায়, বিহার ডায়েট্ হ্যায়, পাঞ্জাব ডায়েট্ ভি হ্যায়, আফগান ডায়েট্ কেঁও নেই হোগা?

    সঙ্গত প্রশ্ন। জিজ্ঞাসা করলাম, আফগান ডায়েট্ কি পদার্থ খাঁ সাহেব?

    —লিখ্‌ লিজিয়ে, বলে একটা দৈনিক খাদ্যতালিকার ফিরিস্তি দিয়ে গেল আফজল খাঁ। “সেরভর দুম্বারা গোশত্‌” বিকল্পে খাসীর মাংস থেকে শুরু করে আটা মাখন দুধ মশলা পেস্তা বাদাম ফলমূল এবং সকলের শেষে এক প্যাকেট সিগারেট যোগ করে যখন থামল, হিসাব কষে দেখলাম, তার দাম কম করে ধরলেও ছ’টাকা বারো আনা। একজন সাধারণ কয়েদীর রোজকার বরাদ্দ শুধু বারো আনা কিংবা তার চেয়েও কম। সুতরাং আফজল খাঁর দাবিপূরণ যে আমাদের শক্তির বাইরে একথা স্পষ্ট করেই জানাতে হল। সেও ঠিক তেমনি স্পষ্ট করেই জানিয়ে গেল যে, এ ছাড়া এবং এর চেয়ে কম কোনও খাদ্য সে গ্রহণ করবে না।

    শুরু হল হাঙ্গারস্ট্রাইক।

    সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। আমার হাসপাতাল পরিক্রমার পালা। অন্য সব ওয়ার্ড থেকে দূরে এক কোণের দিকে আফজল খাঁর ছোট ঘরটিতে গিয়ে দেখলাম, তার নাসিকা- ভোজনের আয়োজন চলছে। একটা বেশ বড় বালতি ভরা দুধ। ডিম কমলালেবু ইত্যাদির পরিমাণটা রীতিমত রাজসিক। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাঙ্গারস্ট্রাইকের রুগী আপনার কজন?

    —আজ্ঞে একজন, বলে ডাক্তার একটু হাসলেন। কৌতূহল হল। দাঁড়িয়ে গেলাম খানিকক্ষণ। ‘ফিড’ শুরু হল। একটা বড় জগে করে ফানেলের মধ্যে মিশ্র রসায়ন ঢালা হচ্ছে, আর দুটো নল বেয়ে সেটা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে উন্নত নাসারন্ধ্রে। এক একটা জগ শেষ হয়, আর চেঁচিয়ে ওঠে আফজল, আউর দেও। জগ ভরতে যেটুকু দেরি তার মধ্যে আবার হুঙ্কার দেয়, আউর দেও। এমন করে গোটা বালতিটা নিঃশেষ হয়ে গেল।

    আফজল খাঁর অনশন যে একটা ক্ষণস্থায়ী খেয়াল, সে বিষয়ে আমাদের মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। আমার অফিসারদের মতে, যে-লোক সারাজীবন ধরে শুধু মণ মণ মাংস চিবিয়ে এসেছে, সে নাক দিয়ে দুধ গিলে কতদিন থাকবে? পেটের ক্ষিদে না হয় মিটল, দাঁতের ক্ষিধে মেটাবে কি দিয়ে? কিন্তু দেখলাম, আমরা ভুল করেছি। মাস কেটে গেল। আস্তে আস্তে শয্যার সঙ্গে মিশে গেল সেই বিশাল দেহ কিন্তু মন রইল অটল। পুরোপুরি আফগান ডায়েট না হলেও, স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে, তার কাছাকাছি খাদ্য-তালিকা মঞ্জুর করা অসম্ভব হবে না, এ রকম একটা আভাস তাকে দেওয়া হয়েছিল। কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

    একদিন কী একটা প্রয়োজনে বিকালে একবার যেতে হয়েছিল জেলখানায়। হাসপাতালে যখন পৌঁছলাম, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আফজল খাঁকে দেখে যাবার ইচ্ছা হল। একটা কম পাওয়ারের বাতি জ্বলছে তার ছোট ঘরটিতে। সেই মৃদু আলোয় তার রক্তহীন মাংসবিরল দীর্ঘ দেহটার দিকে চেয়ে শিউরে উঠলাম। ধীরে ধীরে খাটের পাশে যে চেয়ারখানা ছিল তার উপর গিয়ে বসলাম। একবার শুধু সে তার নিষ্প্রভ চোখদুটি মেলে আমার দিকে তাকাল। তারপর পড়ে রইল তেমনি নিস্পন্দ নিথর মৃতদেহের মতো। মনটা কেমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। মৃদুকণ্ঠে ডাকলাম, খাঁ সাহেব!

    —সাব্!

    —এমনি করে জান দিয়ে কী লাভ?

    —এ জান রেখেই বা লাভ কি? ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিল আফজল!

    চমকে উঠলাম। তবে কি আত্মহত্যার পিছনে আর কোনও নিগূঢ় কারণ আছে? আফগান ডায়েটটা শুধু অভিনয়? বললাম, এ কথা কেন বলছ? সাতটা বছর কতটুকু সময়? দেখতে দেখতে চলে যাবে। জোয়ান বয়স তোমার। নতুন করে ঘর বাঁধবে। গোটা জীবনটাই তো সামনে পড়ে আছে।

    ক্ষীণ আলোকে মনে হল তার বিবর্ণ ওষ্ঠের কোণে যেন জেগে উঠল একটুখানি মৃদু হাসির আভাস। তেমনি ধীরে ধীরে বলল, ঘর আমার ভেঙে গেছে বাবুসাব!

    —তোমার বাপ মা আছে?

    —যখন দেশ ছেড়েছি, তখন ছিল। তারপর কি হয়েছে, জানি না।

    —জেনানা?

    —না সাহেব, সাদি হয়নি আমার।

    —যাকে চেয়েছিলে তাকে পাওনি বুঝি?

    আফজল খাঁ এ প্রশ্নের উত্তর দিল না। শোনা গেল মৃদু দীর্ঘনিঃশ্বাসের ক্ষীণ শব্দ। তারপর উদাস কণ্ঠে বলল, সে সব ব্যাপার ঢুকে-বুকে শেষ হয়ে গেছে। আজ নতুন করে সে কথা তুলে কোনও লাভ নেই।

    বললাম, সংসারে কিছুই কোনোদিন চুকে যায় না আফজল খাঁ। ভাঙাগড়াই হচ্ছে দুনিয়ার নিয়ম। যাক্ রাত হল, এবার আমি উঠি।

    আফজল খাঁ শীর্ণ হাতখানা কপালে ঠেকিয়ে সেলাম করল। আর কোনও কথা বলল না।

    দিনতিনেক পরে সন্ধ্যেবেলা আমার বাংলো সংলগ্ন বাগানে একটা বাঁধানো চত্বরের উপর বসে ছিলাম। কিছুক্ষণ আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বর্ষণ-সিক্ত গাছপালার উপর সন্ধ্যার করুণ ম্লানিমা। সেদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, চারদিকে যা কিছু দেখছি, সব যেন কোনও প্রচ্ছন্ন বেদনার অদৃশ্য সূত্র দিয়ে গাঁথা। আলো নেই, আশা নেই; সংসারের আসল রূপ এমনি অশ্রুসজল।

    টেলিফোন বেজে উঠল। আশ্চর্য ব্যাপার! জেলর জানাচ্ছেন আফজল খাঁ আমার দর্শন প্রার্থী। ‘আজই?’ ‘হ্যাঁ।’

    সেই ছোট্ট ঘরখানায় স্তিমিত আলোয় বসে অনেকক্ষণ ধরে শুনে গেলাম আফজল খাঁর ক্ষীণ কণ্ঠের গুঞ্জরণ। বিশেষ কোনও ভূমিকা দিয়ে শুরু হয়নি তার কথা। আমার অনুচরদের যখন ঘর থেকে সরিয়ে দিলাম সে বলল, আপ্ জেহল্কা বড়া সাহেব, ম্যায় আপ্‌কা কয়েদী—

    বাধা দিয়ে বললাম, আজকের সন্ধ্যাটা অন্তত সে ব্যবধান আমাদের না-ই বা রইল খাঁ সাহেব।

    এর পরেই আর কিছু না বলে সে সোজা চলে গেল তার কাহিনীতে।

    সৈয়দ বংশের ছেলে। ঘরে খাবার-পরবার অভাব নেই। আফজল ছেলেবেলা থেকেই একটু খেয়ালী এবং বেপরোয়া। রূপ এবং স্বাস্থ্য—এর কোনোটাতেই খোদা তার বেলায় কার্পণ্য করেননি। তাছাড়া তার রাইফেলের নিশানা ছিল নির্ভুল এবং শিকারের নেশা দুর্নিবার। রুক্ষ, কঙ্করময় তাদের দেশ। কোথাও নেই একবিন্দু শ্যামলিমা। তবু অদ্ভুত মায়া ছিল তার সেই দেশের ওপর। বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে তার ভারি ভাল লাগত। এমনি এক উদ্দেশ্যবিহীন পথচলার ফাঁকে খেজুরবনের ছায়ায় তার সঙ্গে দেখা। মাথায় জলের ঘড়া। ফিরছিল দূরের কোনও ঝরনা থেকে। আওরত; কিন্তু রক্ত-মাংসের নয়। বাস্ত্রাই গোলাপের কোমল পাপড়ি দিয়ে তৈরি তার দেহ। আর মুখখানা? আফজলের মনে হল, সেটাও ঠিক মুখ নয়, একটি সদ্য-স্ফুট শিশিরধোয়া রক্তগোলাপ। প্রথম দিন কোনও কথা হয়নি। হয়েছিল শুধু ক্ষণিকের দৃষ্টিবিনিময়। চোখের ভিতর থেকে এক ঝলক বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিয়ে ঘাঘরা দুলিয়ে সে উঠে গেল চড়াই পথ বেয়ে। আফজলও ফিরে এল, কিন্তু সে শুধু তার দেহ। তার সবটুকু দিল্ সে রেখে এল ঐ ঢালু পাহাড়ের বাঁকে।

    তারপর আবার দেখা হল। তারপর আবার এবং তারপরে বারংবার। পরিচয় হল। আস্তে আস্তে হল প্রাণ দেয়া-নেয়া। আসমানী—(নামটা আমার দেওয়া নয় বাবু সাব বলেছিল আফজল, ওর বাপ-মা-ই রেখে গিয়েছিল। তা না হলে ঐ নামেই ডাকতাম আমি। সে তো দুনিয়ার নয়, আসমানের)—আসমানী কুমারী নয়, এক বৃদ্ধ রু সর্দারের বিবি। সমস্ত দিন তার সেবা করে তার রূঢ় গঞ্জনা সয়ে সয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল একটু আলোর জন্যে, একটু হাওয়ার জন্যে। খোদা মেহেরবান্। তার জীবনের সেই আলো আর হাওয়া নিয়ে এল আফজল। ওর প্রশস্ত বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কোমল কণ্ঠে বীণার মৃদুতান তুলে এই ভাষায় সে কথা বলত। ঊষর উদাস মাঠের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে শুনে যেত আফজল, শুধু কান দিয়ে নয়, সমস্ত অন্তর দিয়ে।

    একদিন কি খেয়াল হল আফজলের। বলে উঠল, ‘চল, তোমার সর্দারকে দেখবো।

    –কেন, সর্দারনীকে দেখে বুঝি আশ মিটছে না? চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল আসমানী।

    –এইটুকুতে কি আশ মেটে আসমান? গাঢ় স্বরে বলল আফজল। সবটুকু না পেলে দিল্ ভরে না, শুধু হাহাকার করে বুকের ভেতরটা।

    কাছে টেনে নিয়ে আসমানীর মাথাটা সে চেপে ধরল বুকের উপর, যার ভিতরে তোলপাড় করছে তাজা রক্তের ঢেউ। আস্তে আস্তে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শুষ্ক স্বরে বলল আসমানী, কিন্তু আমার যে হাত পা বাঁধা আফজল। এর বেশী তো আমার দেবার কিছু নেই।

    টস্ করে মুক্তাধারার মতো ঝরে পড়ল চোখের জল। আতর-মাখা রুমাল দিয়ে মুছিয়ে দিল আফজল। হাত বুলিয়ে দিল আনার ফুলের মতো কোমল পেলব দুটি রক্তাভ গণ্ডে।

    একদিন সত্যিসত্যিই সর্দারকে দেখতে গেল আফজল। বারান্দায় খাটিয়ার উপর পড়ে আছে একটা বিপুল মাংসপিণ্ড। যেমন কুৎসিত, তেমনি অসভ্য লোকটা। ওকে দেখেই রুখে উঠল, কে তুমি? কি চাই? তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ও, তুমিই আমার সুন্দরী বিবির রোশনাই দেখে মেতে উঠেছ। সুবিধা হবে না, মিঞা সাহেব। এক দিন স্রেফ পুড়ে মরবে। তার চেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। বেঘোরে প্রাণটা দিয়ে লাভ কি?

    আফজলের কানে এর একটা কথাও যায়নি। সে দাঁড়িয়েছিল আচ্ছন্নের মতো। এরই সঙ্গে ঘর করে আসমানী! ঐ কদাকার দেহটার পরিচর্যা করবার জন্যেই কি খোদা তাকে আসমান করে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন?

    ফিরবার পথে আসমানীর সঙ্গে দেখা। কি একটা বলতে গেল আফজল, কিন্তু গলায় তার স্বর ফুটল না। আসমানীর মুখে ম্লান হাসি। বলল, দেখলে আমার ঘর?

    —এ ঘর ভেঙে তোমায় বেরিয়ে আসতে হবে আসমানী, চল আমরা কোথাও পালিয়ে যাই। চলে যাই কোনও দূর দেশে। কেউ জানবে না, কেউ আমাদের খোঁজ পাবে না।

    –তোমায় তো বলেছি আফজল, সে উপায় আমার নেই। ঐ বুড়ো যদ্দিন বেঁচে থাকবে, এখান থেকে আমার নড়বার পথ বন্ধ।

    —কেন?

    —আমার বাবা যে আমাকে ঋণের দায়ে বাঁধা দিয়ে গেছে ঐ সুদখোর লোকটার কাছে। যতদিন ও ছেড়ে না দেয়, ওর সংসারে থেকেই সে ধার আমাকে শুধতে হবে।

    এ সমস্যার হঠাৎ কোনও সমাধান আফজলের চোখে পড়ল না। কিন্তু তার বুকের মধ্যে বিঁধে রইল আসমানীর সেই অসহায় করুণ মুখখানা। সমস্ত চেতনার মধ্যে জেগে রইল শুধু একটি কথা—যেমন করেই হোক আসমানীকে বাঁচাতে হবে।

    কিছুদিন কেটে গেল। পর পর ক’দিন নির্দিষ্ট গোপন স্থানে আসমানীর দেখা পাওয়া গেল না। দুশ্চিন্তা হল আফজলের। অসুখবিসুখ করেনি তো? পরদিন আবার গিয়ে উঠল সেই সর্দারের বাড়ি। আসমানীর কোনও সাড়া নেই। ওকে দেখেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল বুড়ো সর্দার, আবার এসেছিস শয়তান?

    —কেন মুখ খারাপ করছ খালি খালি? ঝাঁঝিয়ে উঠল আফজল,—আসমানী কোথায়?

    —ওঃ, বড্ড দরদ দেখছি, বিকৃত কণ্ঠে বলল সর্দার। তারপর গর্জে উঠল! আসমানী কোথায় তা জেনে তোর কি হবে রে কুত্তা?

    —খবরদার! গাল দিও না বলছি, রুখে উঠল আফজল।

    —তবে রে হারামীকা বাচ্চা!

    খাটিয়ার পাশে ছিল নাগরা। তারই একপাটি তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল আফজলের দিকে। জুতোটা সজোরে গিয়ে লাগল ঠিক তার মুখের উপর। আফগান রক্ত টগবগ করে উঠল। এক মুহূর্ত কি ভাবল আফজল খাঁ। তার পর ছুটে গেল বাইরে। দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করানো ছিল তার গুলি-ভরা রাইফেল। তুলে নিয়েই টেনে দিল ট্রিগার। অব্যর্থ সন্ধান।

    কিছুক্ষণ যেন সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছিল আফজল। তারপর দেখল, খাটিয়ার উপর পড়ে আছে সর্দারের রক্তাক্ত অসাড় দেহ। তার উপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে আসমানী। তার বুকের বসন ভিজিয়ে দিয়ে বয়ে চলেছে রক্তের ধারা।

    হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। তীরোজ্জ্বল কালো চোখের তারা থেকে ঠিকরে পড়ল অগ্নিশিখা! তীরের মতো ছুটে এল তীক্ষ্ণ স্বর—নির্লজ্জ, কাপুরুষ! মনে করেছ, আমার স্বামীকে খুন করলেই আমি তোমার হাতে ধরা দেবো। এই ছিল তোমার মতলব, না?

    শান্ত অনুনয়ের সুরে বলল আফজল, বিশ্বাস কর আসমানী। কোনও মতলব নিয়ে আমি আসিনি। আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমাকে চাই। কিন্তু তার জন্য তোমার স্বামীকে খুন করবো, না-না। শুধু অপমান সইতে না পেরে রাগের মাথায় –

    —বেরিয়ে যাও, ক্রুদ্ধা নাগিনীর মতো গর্জে উঠল আসমানী, বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। খুনী, ডাকু, শয়তান…

    সেইদিন কাউকে কিছু না বলে দেশ ছেড়ে হিন্দুস্থানের পথে বেরিয়ে পড়ল আফজল খাঁ।

    আফজল ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ দম নিয়ে আস্তে আস্তে বলল, ‘আসল কথা কি জানো সাহেব, নিজের মনটাকে বুঝতে পারেনি আসমানী। ঐ বুড়ো জানোয়ারটাকে সে যে কতখানি ভালবেসেছিল সেটা প্রথম জানতে পারল তখন, যখন তার বুকের পাশ দিয়ে বিঁধে গেছে আমার রাইফেলের গুলি।

    শহরের উপকণ্ঠে ওদের যে-দলটা ছিল, জেল হবার পরেও তারা মাঝে মাঝে দেখা করতে আসত আফজল খাঁর সঙ্গে। ইদানীং আর আসেনি। হয়তো তারা উঠে গেছে অন্য কোথাও। কিংবা হয়তো দেখা করার প্রয়োজন আর নেই। আফজল খাঁর ঘরে সেই সন্ধ্যাটি যেদিন কাটিয়ে এলাম তার ক’দিন পরেই একজন দর্শনপ্রার্থী এসে উপস্থিত হাঙ্গারস্ট্রাইক যারা করে বাইরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নিষিদ্ধ। সুতরাং মোলাকাতের আবেদন সরাসরি অগ্রাহ্য হবার কথা। তবু লোকটাকে ডেকে পাঠালাম। চেহারা এবং পোশাক দেখে মনে হল সে পাঠান। বলল, আফজল ওর ছেলেবেলার দোস্ত, দূর সম্পর্কের আত্মীয়তাও আছে কিছু, পাশাপাশি গ্রামে বাড়ি। জেলের মধ্যে না খেয়ে আছে, এই খবর পেঁয়ে দেশ থেকে ছুটে এসেছে ওকে একবার দেখবার জন্যে। এবার ‘হুজুর মেহেরবানি’ করে—তার বক্তৃতা শেষ হবার আগেই তার চোখের দিকে চেয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, আসমানীকে চেনো?

    লোকটার মুখে পড়ল বিস্ময়ের ছায়া। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বলল, চিনি। কিন্তু হুজুর তাকে—

    —কোথায় আছে সে?

    —আছে আমাদের দেশেই। আগের মরদটা খুন হবার পর নিকা করেছে তারই এক চাচাতো ভাইকে।

    আমাকে নীরব দেখে যোগ করল, সেই শয়তানীটার জন্যেই তো দোস্তকে দেশ ছাড়তে হল। একদিন খুব ভাব ছিল দুজনের। তারপর কি যে হল ওরাই জানে, হঠাৎ রটিয়ে দিল, তার বুড়ো সর্দারকে নাকি খুন করেছে আফজল।

    লোকটা কিছু কিছু উর্দু জানে। আর একটু কাছে ডেকে নিয়ে বললাম, দ্যাখ খাঁ সাহেব, তোমার দোস্তের অবস্থা ভালো নয়। বাঁচবার আশা নেই বললেই চলে। কিন্তু জেলের মধ্যে যারা খানা ছেড়ে দেয়, বাইরের লোকের সঙ্গে তাদের দেখা করবার হুকুম নেই। তোমার বেলায় সে হুকুম আমি দিতে পারি—

    খাঁ সাহেব কৃতজ্ঞতায় গলে গিয়ে বলে উঠল, হুজুর কা মেহেরবানি।

    বললাম, কিন্তু সে মেহেরবানি আমি দেখাতে পারি শুধু এক শর্তে।

    শর্তের বর্ণনা দিলাম! শুনে মুখ চুন হয়ে গেল পাঠান সর্দারের। মাথা নেড়ে বলল, একথা আমি বানিয়ে বলব কেমন করে? এর কোনোটাই যে সত্যি নয়।

    গম্ভীরভাবে বললাম, বেশ, না বলতে পারো বলো না। তোমার দোস্তের সঙ্গে এ জীবনে আর দেখা হল না।

    কিছুক্ষণ আপনমনে কি ভাবল পাঠান। তারপর বলল, আমি রাজী।

    আমি নিজেই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। হাসপাতালের সেই ঘরটিতে। ঘরে ঢুকবার আগে আর একবার স্মরণ করিয়ে দিলাম সেই শর্তের কথা-দেখো খাঁ সাহেব, জবান দিয়েছ। কথার খেলাপ যেন না হয়।

    —কভ্‌ভি নেহি—দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর করল পাঠান।

    ভাষাহীন দুটি ঘোলাটে চোখ দিয়ে দোস্তের মুখের দিকে চেয়ে রইল আফজল। যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। পাঠানের চোখদুটো ছলছল করে উঠল। কান্নাবিকৃত কণ্ঠে বলল, নিজের হাতে কেন জান দিচ্ছিস, দোস্ত? এই দেখবো বলেই অতদূর থেকে ছুটে এলাম? কি জবাব দেবো তোর মার কাছে? সে বুড়ী যে—

    গলায় একটা কাশির শব্দ তুলে আর একবার জানিয়ে দিলাম আমার শর্ত। চকিতে আমার দিকে একবার চেয়ে নিয়ে আবার সে চোখ ফেরালো দোস্তের মুখের উপর। বলল, তোর আসমানী যে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে গেল, আফজল।

    —কি বললি? যেন কবরের ভিতর থেকে উঠে এল ভগ্নস্বর। নিষ্প্রভ চোখের তারায় ফিরে এল এক ঝলক প্রাণের জ্যোতি; মরণাহত মুখে একবিন্দু রক্তের আভাস। আর একটু কাছে সরে গিয়ে বলল পাঠান সর্দার, তুই তো চলে এলি, দোস্ত, আর আসমানী আজও তোর পথ চেয়ে বসে আছে। নিকে করবার জন্যে কত সাধাসাধি। খানদানি ঘরের কত জোয়ান ছেলে। ফিরেও দেখল না। তার মুখে শুধু ঐ এক কথা—সে ফিরে আসুক আর নাই আসুক, তার জন্যেই আমাকে অপেক্ষা করতে হবে।

    আফজলের চোখ ছাপিয়ে শীর্ণ গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুধারা। বুকের অন্তস্তল থেকে বেরিয়ে এল গভীর নিঃশ্বাস। শীর্ণ হাতখানা বাড়িয়ে বাল্যবন্ধুর একটা হাত ধরে বলল, সেই এলি, আর কদিন আগে এলি না কেন দোস্ত? বড্ড দেরি হয়ে গেছে ভাই, বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

    এবার এগিয়ে এসে বললাম আমি, কে বললে দেরি হয়ে গেছে? আমি বলছি তুমি বেঁচে উঠবে। আবার দেশে ফিরে যাবে। যাকে চাও, তাকে নিয়েই ঘর বাঁধবে।

    —হ্যাঁ সাহেব, সেই দোয়া কর। আমি বেঁচে উঠতে চাই,—তীব্র আগ্রহের সুরে বলল আফজল;-আমার তো মরলে চলবে না। দাও তোমাদের কি খাবার আছে!

    সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবার পর আফজল খাঁকে যখন হাজির করা হল হাঙ্গার স্ট্রাইকের মতো মারাত্মক অপরাধের দণ্ড গ্রহণ করবার জন্যে, সে হঠাৎ ছুটে এসে আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, তোমার হাতে যা কিছু শাস্তি আছে সাহেব, সব মাথা পেতে নেবো। ডাণ্ডা বেড়ি, খাড়া হাতকড়া, ডিগ্রি বন্ধ, যা তোমার ইচ্ছে। শুধু যে-কটা রোজ মাপ পেয়েছি, সাত বছরের সাজা থেকে সেটুকু যেন কেড়ে নিও না। যত তাড়াতাড়ি পার, আমাকে যেতে দাও। তুমি তো সবই জানো।

  • সাত

    সাত

    —এই নিন।

    —কী দিচ্ছেন?

    —আপনার কিঞ্চিৎ নতুন খোরাক, বলে ও-পাশের টেবিল থেকে হাত বাড়িয়ে ধরলেন আমার সহকর্মী বিশ্বনাথবাবু। ভাঁজকরা কাগজখানা টেনে নিলাম। আজ সন্ধ্যায় যারা কোর্ট থেকে নতুন ভরতি হল, তাদেরই একজনের জেল-ওয়ারেন্ট। খলে দেখা গেল, চুরির অপরাধে তিনমাস সশ্রম কারাদণ্ড, এবং সঙ্গে পনেরো বেত। ৩৮১ ধারার কেস। অর্থাৎ চোরটি বাইরের লোক নয়, বাড়ির চাকর।

    —হুইপিং দেখেছেন আপনি? প্রশ্ন করলেন বিশ্বনাথবাবু।

    —বললাম, বেতমারা তো? তা দেখেছি বইকি। গ্রামের পাঠশালায় পড়েছিলাম তিন বছর।

    —না, না; সে বেত নয়, জেলখানার বেত।

    —আজ্ঞে না; সে সৌভাগ্য এখনও হয়নি।

    —এইবার হবে। দেখবেন সে কি কাণ্ড। আর ‘দেখবেন’ বলছি কেন, দেখাবেন। মানে আপনারই কাজ ওটা। সব ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে।

    পরদিন সকালেই কয়েদীটির দেখা পেলাম ‘কেস্-টেবিলে’। ১৭/১৮ বছরের জোয়ান ছোকরা। মাথায় একরাশ কোঁকড়া চুল। তার মাঝখানে দিয়ে চলে গেছে লম্বা টেরি। নাকটা বাঁশীর মতো। তার নীচে সূক্ষ্ম গোঁফের রেখা।

    —আপীল করবে? প্রশ্ন করলাম যথারীতি।

    বিনা-দ্বিধায় উত্তর এল, না।

    সুতরাং জেল-কোডের বিধানমতে এক পক্ষ পরে বেত্রদণ্ডের দিন স্থির করে ফেললাম। সকাল থেকেই শুরু হল আয়োজন। জেলের মাঝামাঝি একটি অনেক কালের নিমগাছ। তার নীচে খানিকটা খোলা জায়গা। চলতি নাম—নিমতলা। সেই ছায়া-ঢাকা সিমেন্ট- বাঁধানো চত্বরে রোজ জমাদারের দরবার বসে। তার চারদিক ঘিরে বড় বড় কয়েদীব্যারাক। বধ্যভূমির পক্ষে আদর্শ স্থান। সেইখানেই খাটানো হল সেই বিচিত্র যন্ত্র, জেলকোর্ডে যার নাম whipping triangle, সিপাই-কোর্ডে বলে ‘টিকটিকি’। এই নামকরণের তাৎপর্য এবং ইতিহাস আমার জানা নেই! এমন একটা ভয়াবহ বস্তুর সঙ্গে এই ক্ষুদ্র নিরীহ প্রাণীর নামটা যে কেন যুক্ত হল, সে গবেষণার জন্যে যোগ্যতর ব্যক্তির প্রয়োজন।

    কাঠ এবং লোহা দিয়ে তৈরী ন’ ফুট লম্বা একটি ত্রিকোণ ফ্রেম। দেখতে খানিকটা ব্ল্যাকবোর্ডের স্ট্যাণ্ডের মতো। তার সঙ্গে লাগানো উপরে দুটো লোহার কড়া আর নীচে দুটো বেড়ি। খানিক দূরে এনামেলের গামলা-ভর্তি ডাক্তারি রসায়ন। তার পাশে সারি সারি দু’খানা বেত— লম্বায় হাত-তিনেক, ব্যাস আধ ইঞ্চি। এক দিকে কাপড়ে জড়ানো বাঁট, ধরবার সুবিধার জন্যে।

    —দু-খানা কি হবে? জিজ্ঞাসা করলাম সামনের কয়েদীটিকে।

    —বলা যায় না, একটা যদি ভেঙে যায়, উত্তর করল জমাদার।

    সদলবলে সুপার এসে গেলেন। আসামীকে হাজির করা হল তাঁর সামনে। প্রশ্ন করলাম, কি নাম?

    —মধুসূদন হালদার।

    —কদ্দিনের সাজা?

    —তিন মাস।

    —আর?

    —পনেরো বেত, থেমে থেমে বলল মধুসূদন। ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকালো অদূরে দাঁড়ানো ‘টিকটিকি’ এবং তার পাশে শুইয়ে-রাখা বেত দু-খানার দিকে। দুজন মেট তাকে টেনে নিয়ে উপুড় করে ধরল পেছন-দিকে-হেলানো সেই ত্রিকোণফ্রেমের উপর। হাত এবং পা দুটো ছড়িয়ে ঢুকিয়ে দিল সেই কড়া আর বেড়ির মধ্যে। তারপর শক্ত করে এঁটে দিল স্ক্রু। কোমরের উপর দিয়ে জড়িয়ে বেঁধে দিল চামড়ার বেল্ট। আগাগোড়া সমস্ত শরীরটা গাঁথা হয়ে গেল টিকটিকির সঙ্গে। খোলা রইল শুধু দুটি অঙ্গ—ঘাড় আর মাথা। বিবস্ত্র দেহ। শুধু কোমরের নীচে জড়িয়ে দেওয়া হল সেই গামলার জলে ভেজানো এক টুকরো পাতলা ন্যাকড়া।

    এবার বীর বিক্রমে এগিয়ে এল বেত্র-জল্লাদ। ছ’ফুট লম্বা পেশোয়ারী। প্রস্থটাও দৈর্ঘ্যের সমানুপাত। নারীধর্ষণ মামলায় পাঁচ বছর সশ্রম দণ্ড নিয়ে সে এসেছিল জেলখানায়। কিন্তু অন্য সব কয়েদীর মতো বাঁধা-ধরা খাটনি বা task এই উষ্ণ মেজাজ বেয়াড়া চেহারার লোকটার ঘাড়ে চাপানো হয়নি। দরজি কিংবা কাঠ-কামান বা ঐ জাতীয় একটা কিছু যথারীতি ওই টিকিটেও লেখা আছে। সেটা কাগজ-কলমের ব্যাপার। কার্যক্ষেত্রে জুম্মা খাঁ গোড়া থেকেই বড় সাহেবের ছত্রধর আর বড় জমাদারের বডিগার্ড। এই দুইটি তার বৃত্তি। তার উপর মাঝে মাঝে এই বেত্রদানের পবিত্র কর্তব্য। এতগুলো কঠিন দায়িত্বপালনের উপযোগী দৈহিক সামর্থ্য বজায় রাখতে হলে কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত রসদের প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে উদাসীন নন। তাই হাসপাতাল থেকে এক পোয়া মাংস এবং এক ছটাক মাখন তার দৈনিক বরাদ্দ।

    একখানা বেত তুলে নিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে যখন সে ঠিক জায়গাটিতে গিয়ে দাঁড়াল, তার উল্লাস-দীপ্ত মুখের দিকে একবার চেয়েই স্পষ্ট বোঝা গেল, মূল্যবান সরকারী খাদ্যের সার্থকতা প্রমাণ করতে সে চেষ্টার ত্রুটি করবে না।

    —এক! আকাশ ফাটিয়ে হুঙ্কার দিল বড় জমাদার। মুক্ত বাতাসে সন্-সন্ করে উঠল জুম্মা খাঁর বেত। তার মাথার উপরে একটা দ্রুত চক্কর দিয়ে বিদ্যুৎবেগে পড়ল গিয়ে মধুসূদনের কোমরের নীচে।

    —আঁ—আঁ—আঁ…সঙ্গে সঙ্গে এক বীভৎস আর্তনাদ।

    মানুষের কণ্ঠে নয়, কোনো কোনো আহত জানোয়ারের কণ্ঠ থেকে শোনা যায় সেই নারকীয় শব্দ। হঠাৎ চোখে পড়ল সেই হলদে রং-এর ন্যাকড়ার মাঝখানটা বসে গেছে মাংসের ভিতর। তার উপর ভেসে উঠেছে লাল রং-এর ছোপ।

    —দুই! গর্জে উঠল জমাদার সাহেব! সপাং করে উঠল বেত এবং তার সঙ্গে আবার সেই জানোয়ারের মৃত্যু-নিনাদ। বেতের সংখ্যা যেমন এগিয়ে চলল, ধীরে ধীরে নেমে এল গোঙানির পরদা। সাত-আট ঘা যখন পড়েছে তখন আর শব্দ নেই। নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম, বাঁচা গেল! এই চিৎকারটা যেন আর সহ্য হচ্ছিল না।

    এবার তাকিয়ে দেখলাম ঘাড় সমেত মাথাটা ঝুলে পড়েছে ডান দিকে। হাত দুটো টান করে ঝুলিয়ে বাঁধা। হঠাৎ চোখের উপর ভেসে উঠল ক্রুশবিদ্ধ যিশুখৃষ্টের সেই পরিচিত ছবি। কয়েদীটা ভাগ্যবান বলতে হবে।

    ডাক্তার যিনি উপস্থিত ছিলেন, তাঁর চাকরি বেশী দিনের নয়। লক্ষ্য করছিলাম, তাঁর মুখের উপর ফুটে উঠেছে উদ্বেগের ছায়া। দু-একবার ইতস্তত করে সুপারের কাছে গিয়ে কী বললেন। প্রবীণ লেফট্‌নান্ট্ কর্নেল হেসে উঠলেন, আই. এম. এস.-সুলভ উচ্চাঙ্গের হাসি। বললেন ‘Oh, No No, কিচ্ছু হয়নি। He is just creating a scene.’

    —বি ক্লাস ঘুঘু তো, যোগ করলেন জেলর সাহেব।

    কী ভাবছিলাম জানি না, হঠাৎ কানে এল জমাদারের শেষ গর্জন—’পন্দরো।’ দেখলাম বড় সাহেবের প্রসেশন ফিরে চলেছে। জুম্মা খাঁর হাতে বেত নেই, তার জায়গায় সেই সুবিশাল ছত্র। ডাক্তার টিকটিকির কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করছেন, হাত-পায়ের বেড়ি আর বেল্ট খুলে দেয়ার জন্যে। মেট দুটো সেদিকে বিশেষ ভ্রূক্ষেপ না করে ধীরে-সুস্থে কাজ করে যাচ্ছে। স্ট্রেচার পাশেই ছিল। তার উপরে নামানো হল মধুসূদনের অসাড় উলঙ্গ দেহ। ডাক্তার পাসে হাত দিলেন এবং স্ট্রেচার-বাহকদের তাড়া দিয়ে নিয়ে চললেন হাসপাতালের দিকে।

    আফিসে ফিরবার পথে আমার মনে পড়ল ছেলেবেলার একটা ছোট্ট ঘটনা। আমার বয়স তখন বারো-তেরো। আমাদের গ্রামে জেলেপাড়ার দুধরাজ মাঝির বউকে ভূতে পেয়েছিল। অকারণে হাসত, চেঁচাত, গান করত, আবার পা ছড়িয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদতে বসত। গ্রামেরই মেয়ে, কিছুদিন আগে বিয়ে হয়েছে। যখন কুমারী ছিল, পূজাপার্বণে আমাদের বাড়ি তাকে আসতে দেখেছি অনেকবার। ডুরে কাপড়-পরা শ্যামবর্ণ সুশ্রী মেয়েটি। বয়সে আমার কিছু ছোটই হবে। মনে আছে, একটা কি কাজ উপলক্ষে জেলেপাড়ার মেয়েদের খাওয়ানো হয়েছিল। আমার উপর ছিল পান পরিবেশেনের ভার। সবাইকে একটা করে দিয়ে কী মনে করে ওর হাতে দুটো পান দিয়ে ফেলেছিলাম। ও আমার মুখের দিকে চেয়ে ফিক্ করে হেসে ফেলল। পাশে ছিল এক বুড়ি, ওর দিদিমা কিংবা ঠাকুরমা। ব্যাপারটা তার চোখ এড়ায়নি। ওকে এক ধমক দিয়ে বলেছিল, হাসছিস কেন হতভাগী? ছোটবাবুর তোকে মনে ধরেছে। পেন্নাম কর শিগগির। বলামাত্র আমার পায়ের ওপর ঢিপ্ করে মাথা ঠেকিয়ে সে আরক্ত মুখে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল।

    সেই মেয়েকে ভূতে পেয়েছে শুনে কৌতূহল হল, কষ্টও হল। দেখতে গেলাম।

    উঠোনের মাঝখানে পিঁড়ির উপর আসনপাতা। পাশে একটা জলের ঘড়া, আরও কিসব জিনিসপত্র। এক বিকটাকৃতি ভূতের ওঝা বিচিত্র সাজে ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পড়ছে, আর একটা প্রকাণ্ড ঝাঁটা দিয়ে ঘা দিচ্ছে আসনের উপর। কিছুক্ষণ পরে বৌটার ডাক পড়ল। দুজন লোক তাকে ধরে নিয়ে দাঁড় করালো সেই আসনের সামনে। ওঝা হঠাৎ রুখে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দিল খানিকক্ষণ, এবং তারপরই নির্মমভাবে ঝাঁটা চালাল তার পিঠের উপর। দু’চার ঘা লাগাতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মেয়েটির কি কান্না! আমি আর সইতে পারলাম না। সামনে ছুটে গিয়ে বললাম, এসব হচ্ছে কি? মেয়েছেলের গায়ে হাত তুলছ, পুলিসে দেব তোমাকে।

    আমার কাণ্ড দেখে সভাসুদ্ধ সবাই হেসে আকুল। মেয়েটির বাপ ওখানেই ছিল। উঠে এসে আমার হাত ধরে বলল, তুমি এদিকে এসো ছোটবাবু। ও ঝাঁটা তো ময়নার গায়ে পড়ছে না, পড়ছে সেইটার পিঠে, যে ওর ওপর ভর করেছে। এবার সে নিশ্চয়ই পালাবে।

    চুরির অপরাধে মধুসূদনের উপর বেত্রাঘাতের আদেশ দিয়েছিলেন যে হাকিম, ময়নার বাপের মতো তাঁরও বোধহয় বিশ্বাস, বেত আসামীর দেহে পড়বে না। ঐ দেহের মধ্যে বাসা বেঁধেছে যে ক্রাইমের পোকা, পড়বে তারই উপর। ওতেই তারা মরবে। সুধন্য মাঝি যেমন আশা করেছিল, ভূত পালিয়ে তার ময়না আবার সহজ, স্বাভাবিক হয়ে উঠবে তার ছোট্ট সংসারের মধ্যে, ফিরে পাবে কল্যাণী বধূর সুস্থ দেহমন, মধুসূদনের হাকিমও ঠিক সেই ভরসাই করেছিলেন। অপরাধের জীবাণু ধ্বংস হলেই অপরাধী তার স্বাভাবিক সমাজ জীবনে ফিরে আসবে; নতুন করে গড়ে উঠবে তার নাগরিক নীতিবোধ। এই বিশ্বাস ছিল বলেই কিশোরী কন্যার রক্তাক্ত দেহ দেখে সুধন্য বিচলিত হয়নি; হাকিমও তাঁর কিশোর আসামীর বেত-জর্জর দেহের চিত্র অবিচল চিত্তে গ্রহণ করেছেন। আমি বিশ্বাসী। তাই ওঝার ঝাঁটাকে যেমন মেনে নিতে পারিনি, জুম্মা খাঁর বেতকেও তেমনি স্বীকার করতে পারলাম না।

    এর কিছুদিন আগেই ক্রাইম এবং তার শাস্তি সম্বন্ধে একখানা বই পড়েছিলাম। গ্রন্থকার অপরাধ-শাস্ত্রে সুপণ্ডিত। লিখেছেন, ক্রাইম নাম বস্তুটিকে আমাদের পিতামহেরা যে চোখে দেখতেন, আমাদের দৃষ্টি তার চাইতে অনেক উদার। তখনকার দিনে অপরাধী যে দণ্ড পেত, তার মূলে ছিল প্রতিশোধ। Tooth for a tooth and eye for an eye.—এই ছিল তাদের দর্শন। তুমি আমার দাঁত নিয়েছ, আমিও তোমার দাঁত নেবো, চোখের বদল নেবো চোখ। যে হাত দিয়ে তুমি পরধন হরণ করেছ, সে হাত তোমার কেটে নিলাম—চুরি অপরাধে এই ছিল রাজদত্ত শাস্তি। কারও দেহে তুমি আঘাত করেছ, কেড়ে নিয়েছ কারও প্রাণ, বিনিময়ে তোমারও মাংস ছিঁড়ে খাবে হিংস্র কুক্কুর, তোমার প্রাণ দিতে হবে ঘাতকের হাতে কিংবা শূলের উপর।

    প্রাচীন শাস্তি-প্রণালীর ধারা বহু নৃশংস দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে তারপর বলেছেন ভদ্রলোক, দণ্ডনীতির চণ্ডমূর্তি আজকার মানুষের কাছে বীভৎস বর্বরতা। শাস্তি আজ আর retribu- tive নয়, reformative. আধুনিক মানুষের কাছে ক্রাইম একটা ব্যাধি মাত্র। সেই ব্যাধিকে বিনাশ করে অপরাধীকে নিরাময় করে তোল। তার জন্যে যতটুকু কঠোরতা দরকার, তার বেশি যেন তাকে সইতে না হয়। তার সমাজ-বিরোধী আচরণকে সমাজকল্যাণের দিকে মোড় ফেরাতে হলে যে ন্যূনতম অবরোধ বা সামান্যতম বল-প্রয়োগের প্রয়োজন, সেইটুকুই হল শাস্তি। দণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য অপরাধীকে সমাজ-জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

    সেদিন মধুসূদনের বেত্র-চিকিৎসা স্বচক্ষে উপভোগ করবার পর বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীর এইসব জ্ঞানগর্ভ তত্ত্ব হজম করা আমার পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। ইচ্ছা হল, তাঁকে ডেকে এনে বলি, বর্তমান দণ্ড-প্রণালীর স্তবগান করবার আগে একবার আমাদের বেত্রপাণি জুম্মা খাঁকে দেখে যান। দেখিয়ে দিয়ে যান, পিতামহের যুগ থেকে কোথায় কতটুকু আমরা উদার এবং অগ্রসর। তারা যদি অপরাধী নামক জীবটাকে উলঙ্গ করে বন্য পশুর মুখে ফেলে আমোদ পেয়ে থাকেন, আমরাও সেই হতভাগ্য প্রাণীটাকে বিবস্ত্র করে নর-পশুর কবলে ফেলে তার চেয়ে কম আনন্দ পাই না। সেখানে তার মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে সিংহ কিংবা কুকুরের দাঁত, এখানে সেই মাংস তুলে নিচ্ছে জুম্মা খাঁর বেত! তাঁরা গলায় কোপ মেরে নামিয়ে দিয়েছেন, আমরা গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিচ্ছি। তফাৎ কোথায়? তফাৎ শুধু এই—তারা যেটা করেছেন, সহজ সরল পথে বিনা দ্বিধায় করে গেছেন, আমরা সেই একই জিনিস করছি, কিন্তু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বড় বড় তত্ত্বকথার আড়াল দিয়ে। তাঁরা বেতটাকে বেত ছাড়া আর কোনো রূপে দেখেননি এবং মেরেছেন মারবার জন্যেই; আমরা মারছি আর বলছি, এ বেত নয়, বেতরূপী কল্যাণ।

    ঝাঁটা খেয়ে ময়নার ঘাড় থেকে ভূত বিদায় নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি। কেননা ক’দিনের মধ্যে সে নিজেই বিদায় নিয়ে চলে গেল। সেইদিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার পর তুলে নিয়ে যে শয্যায় তাকে শুইয়ে দেওয়া হল, সে শয্যা থেকে সে আর ওঠেনি। মধুসূদন কিন্তু হাসপাতালের বেড ছেড়ে একদিন বেরিয়ে এল এবং তার ক’দিন পরেই দেখলাম, সে জেলের বাইরে দু’নম্বর, “জলভরি দফায়” ভর্তি হয়ে বাবুদের বাসায় জল টানছে।

    নামে “জলভরি” হলেও এসব “দফা” বা কয়েদীগোষ্ঠীর কর্মক্ষেত্র শুধু জল ভরাতেই সীমাবদ্ধ থাকত না। গৃহিণীদের খাস এলাকায় অর্থাৎ রান্না, ভাঁড়ার এবং কলতলাতেও ছিল তাদের স্বচ্ছন্দ গতিবিধি। আস্তে আস্তে কি করে জানি না, একদিন সে আমার বাড়িতে এসে পড়ল। জেলর সাহেব বললেন, মধুসূদনের ইতিহাস যেটুকু জানলাম ঐ ছাড়া ওকে Bachelor’s den—আর কোথাও রাখতে ভরসা পাই না।

    আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম। উনি পরিষ্কার করে বললেন, ওর কেস্টা জান তো? হার চুরি। তোমার বাড়িতে সে বালাই নেই।

    বললাম, একবার হার নিয়েছে বলে, ঘড়ি বা কলম সে কখনও নেবে না, এমন কিছু গ্যারান্টি আছে কি?

    —তা আছে, অন্তত ওর বেলায়। যদ্দূর শুনেছি, ওর নজরটা ঠিক হারের দিকে ছিল না, ছিল হার যারা পরে, এমন একজনের দিকে। তোমার তো সে গুড়ে বালি। অতএব শ্রীমধুসূদন তোমার সহায় হউন।

    সকালে ইক্‌মিক্ কুকারে চাল ডাল আর একটা কিছু সেদ্ধ-টেদ্ধ চাপিয়ে আপিসে চলে যেতাম। বারোটায় ফিরে নামিয়ে নিয়ে কোনো রকমে গলাধঃকরণ—এই ছিল আমার জীবনযাত্রা। সেদিন এই পর্ব যখন শুরু করতে যাচ্ছি, মধুসূদন বলল, আপনি যান বাবু, ওসব আমি করে রাখবো।

    বললাম, তুমি পারবে?

    মধু ঘাড় নাড়ল।

    অফিস থেকে যখন ফিরলাম, মধুসূদন তার আগেই ভিতরে চলে গেছে। স্নান সেরে খেতে গিয়ে দেখি, কুকার নেই। তার জায়গায় পরিপাটি করে আসন পাতা। পাশে জলের গ্লাস, সামনেই ঢাকা দেওয়া ভাতের থালা, চারদিকে বাটি করে সাজানো দু’তিনটা তরকারী। ইক্‌মিকের বোঁটকা গন্ধ নেই। সুপাচ্য সুস্বাদু খাদ্য।

    দুপুরের পর ও আসতেই বললাম, এত সব কাণ্ড করতে গেলে কেন তুমি? ঐ কুকারেই আমার চলে যেত।

    মধু সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, খাবার মতো হয়েছিল বাবু?

    —খাবার মতো মানে! চমৎকার রেঁধেছ তুমি। দ্যাখ না, কিচ্ছু পাতে পড়ে নেই। অতঃপর ইক্‌মিক্ শিকেয় উঠলেন। তার জায়গায় পাকাপাকি বহাল হল মধুসূদন হালদার। খাওয়াটা শুধু উদরপূর্তি নয়। বাড়তি যেটুকু, সেটা যে আপনার জন ছাড়া অন্য কারও কাছেও পাওয়া যায়, এই প্রথম তার পরিচয় পেলাম। একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, এতসব রান্না তুই কোথায় শিখলি মধু? আর এরকম যত্নআত্তি?

    মধু লজ্জিত হল—যত্নআত্তি আর কোথায় করছি বাবু? রান্না যেটুকু জানি গিন্নীমার কাছে শেখা। বড় ভালবাসতেন আমাকে।

    হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, আর সেই গিন্নী-মার হারটা তুই চুরি করে বসলি?

    মধু যেন একটু আহত হল। মাথা নীচু করে বলল, হারটা গিন্নীমার নয়, তার মেয়ের। আর চুরিও আমি করিনি বাবু।

    —তবে?

    —সে অনেক কথা। এক দিন সব বলব আপনাকে।

    .

    সে “এক দিন” আসতে দেরি হল না। কিন্তু কথা যেটুকু বলা হল সে “অনেক” নয়, সামান্যই। অনেক হয়তো রয়ে গেল তার না-বলা কথা।

    বাপ মারা যাওয়ার পর সংসার চলে না। গুটিতিনেক ভাইবোন নিয়ে মা বিব্রত হয়ে পড়লেন। মামার সঙ্গে মধুসূদন কলকাতায় এল চাকরির খোঁজে। উঠল এসে মামার কাছেই হাওড়ার এক বস্তিতে। মাস খানেকের মধ্যেই এই কাজটা জুটে গেল। ছোট্ট পরিবার। বাবু ঠিক দশটায় ডালভাত খেয়ে ট্রামে করে বেরিয়ে যান কলকাতার কোন্ অফিসে। তার পরই ইস্কুলে যায় দিদিমণি—চোদ্দ-পনরো বছরের মেয়ে, ঝর্ণা। মাইল দেড়েক পথ। মধুকেই পৌঁছে দিতে হয়; আবার নিয়ে আসতে হয় সেই চারটের সময়। বাড়িতে থাকেন গিন্নীমা আর বছর চারেকের ছেলে পল্টু। ঠিকা ঝি আছে; বাসন মাজে, ঘর মোছে, বাটনা বাটে। বাকী সব কাজ মধুর। গিন্নী বারোমেসে হার্টের রুগী। সকালে কোনও রকমে ডাল-ভাত ফুটিয়ে তার সঙ্গে দু’খানা ভাজা কিংবা একটু আলুসেদ্ধ দিয়ে স্বামী আর মেয়েকে রওনা করে দেন। আর পেরে ওঠেন না। মাছ এবং অন্য দু-একটা বিশেষ পদ রাঁধতে হয় মধুকে। তিনি কাছে বসে দেখিয়ে দেন। বাবুর ফিরতে রাত হয়। ঝর্ণা চারটেয় ফিরে জলখাবারের বদলে ভাত খায়। উপকরণের অভাব ঘটলে মুখ ভার হয়ে ওঠে। মাকে কিছু বলে না। মধুর সঙ্গে কথা বন্ধ হয়ে যায়। ওর নিজের কোনো কাজ করতে এলে বলে, এটা আমিই করে নিতে পারবো। তোমাকে আর দয়া করে আসতে হবে না।

    মধু মুখ টিপে হাসে, বলে, কাল কিরকম কাটলেট করবো দেখো। দেখি ক’খানা খেতে পার।

    —চাই না, ঠোঁট উলটে জবাব দেয় ঝর্ণা।

    পরদিন দু’খানার জায়গায় চারখানা কাটলেট পড়ে তার পাতে। সবটা চেঁচে-মুছে খেতে খেতে বলে মধুকে শুনিয়ে শুনিয়ে, কী কাটলেটই না হয়েছে। খালি ঘি-মসলার শ্রাদ্ধ!

    মধু মুচকি হেসে তার কাজে চলে যায়।

    একদিন ইস্কুলের ছুটির পর বেরিয়ে আসতেই রোজকার মতো বইগুলো যখন ওর হাত থেকে নিয়ে নিল মধু, ঝর্ণা বলল, চল মধু, একটু গঙ্গার ধারে বেড়িয়ে আসি।

    —আমার যে অনেক কাজ পড়ে আছে দিদিমণি।

    ঝর্ণা ঝাঁঝিয়ে উঠল, আমি কিছু বললেই অমনি কাজের ওজর। বেশ, যেতে হবে না তোকে। আমি একাই যাব— বল হাঁটতে শুরু করল গঙ্গার দিকে। মধুকে অনুসরণ করতে দেখে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বাঃ, তোকে আবার কে আসতে বলেছে?

    মধু সেকথার জবাব না দিয়ে বলল, থামলে কেন? চল না কোথায় যেতে হবে। ফিরতে দেরি হলে আবার মা বকবেন।

    —ইস্! কারও বকুনি-টকুনির ধার ধারি না আমি। আমার বেড়াতে ইচ্ছে হয়েছে, আমি বেড়াবো।

    তেলকল ঘাটে জেটির উপর গিয়ে বসল দুজনে। কূলে কূলে ভরে উঠেছে ভাদ্র মাসের গঙ্গা। মাঝখান দিয়ে একখানা স্টীমার চলে গেল। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে আস্তে আস্তে বলল ঝর্ণা, একটা গল্প বল না, মধু।

    —আমি কি লেখাপড়া জানি যে গল্প বলব?

    —লেখাপড়ার গল্প নয়, তোর দেশের গল্প, ছেলেবেলাকার গল্প।

    নাছোড়বান্দা মেয়ে। অগত্যা বলতে হল মধুকে। ওর সেই মাছচুরির গল্প।

    গ্রাম থেকে ক্রোশ তিনেক দূরে সরকারী বাঁধ। পাহারাওলা ঘুমে বিভোর। মধু আর তার পাড়ার আর একটি ছেলে বংশী মস্ত বড় একটা কাৎলা কাঁধে করে যখন ফিরে আসছে, তখন অনেক রাত। এমন আঁধার যে নিজের হাত পা চোখে পড়ে না। বংশী আগে, পিছনে মধু। হঠাৎ ‘উঃ মাগো’ বলে একটা চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল ছেলেটা। মধু তাকিয়ে দেখে ফণা উঁচিয়ে সাক্ষাৎ যম। কী তার গর্জন! মাথার উপরে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে একটা মস্ত বড় মণি। তারই আলোতে দেখা গেল, বংশীর বুড়ো আঙুল থেকে রক্ত পড়ছে। মাছ রইল পড়ে। কোনও রকমে তাকে কাঁধে তুলে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল মধু। খানিকটা গিয়েই সাঁওতালদের পাড়া। ওর চিৎকার শুনে বেরিয়ে এল একদল মেয়েপুরুষ। খবর গেল গুণীনের কাছে। সাক্ষাৎ দেবতা বললেও চলে। ঝাড়া আরম্ভ হল। রাত যখন প্রায় কাবার, চেঁচিয়ে উঠলেন গুণীনঠাকুর—যে যেখানে আছিস সরে যা। সে আসছে!

    সব ফাঁকা হয়ে গেল। রইলেন কেবল তিনি, আর পড়ে রইল বংশী। আরও কিছুক্ষণ ঝাড়-ফুঁক করবার পর শোনা গেল সেই হিস্হিস্ শব্দ। অতদূরে বসেও আমাদের গা ছমছম করে উঠল। গুণীন মন্তর পড়ছে আর ডাকছে ‘আয় বেটা, আয়।’ আসতে কি আর চায়? কিন্তু না এসেও উপায় নেই। মন্তরের জোরে টেনে আনল। সেই কাটা জায়গায় মুখ দিয়ে নিজের বিষ নিজেই তুলে নিল। তারপর কোথা দিয়ে যে চলে গেল কেউ জানতেও পারল না। গুণীনের ডাকে আমরা সব ফিরে এসে দেখি, বংশী উঠে বসেছে।

    গল্প যখন শেষ হল, মধুর হঠাৎ খেয়াল হল ঝর্ণা কখন সরে এসে একেবারে তার গা ঘেঁষে বসেছে। বড় বড় চোখ তুলে বলল, সত্যি?

    —একেবারে নিজের চোখে দেখা, বললে মধুসূদন।

    ওরা যখন বাড়ি ফিরল, সন্ধ্যা হয় হয়। দরজা খুললেন গিন্নিমা—কোথায় ছিলি তোরা? সেই চারটা থেকে ঘর-বার করছি।

    ঝর্ণা এগিয়ে গিয়ে মার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, একটু গঙ্গার ধারটা ঘুরে এলাম, মা। তুমি রাগ করেছ?

    —না, রাগ করবো কেন? রেগে উঠলেন মা; সেই কোন্ সকালে দু’টো ভাতেভাত খেয়ে মেয়ে আমার সারা শহর টহল দিয়ে বেড়াচ্ছেন, আসুন উনি বাড়ি। তোমাকে রীতিমত শাসন করা দরকার।

    মধুকে বললেন, আর কোনোদিন ওকে গঙ্গার ধারে-টারে নিয়ে যাসনে, বুঝলি? বাবু ওসব পছন্দ করেন না।

    সপ্তাহ না কাটতেই আবার একদিন ইস্কুল থেকেই মাথা ধরল ঝর্ণার। গঙ্গার হাওয়া না লাগালেই নয়। মধুরও বিশেষ আপত্তি দেখা গেল না। আজ আর জেটিতে নয়, দূরে একটা নির্জন জায়গা দেখে ঘাসের উপর বসল পাশাপাশি। আজও গল্প বলতে হল মধুকে। যাত্রার দলের সঙ্গে পালিয়ে যাবার কাহিনী। সেই দেশ-বিদেশে গান গেয়ে বেড়ানো। প্রথমেই কি আর গাইয়েদের দলে ঢুকতে পেরেছিল? কতদিন শুধু তামাক সেজে অধিকারীর গা হাত পা টেপে, রান্না করে তারপর। গল্প যতক্ষণ চলল, মধুর কাঁধের উপর মাথা রেখে চুপ করে রইল ঝর্ণা।

    তারপর আবেশ-জড়ানো সুরে বলল, সত্যিই বড্ড মাথা ধরেছিল আজ। তোর গল্প শুনে একদম ছেড়ে গেছে। বড্ড ভালো লাগছে মধু।

    মধুর কানে হল মধু-সঞ্চার; সর্বদেহে খেলে গেল বিদ্যুৎ-শিহরণ।

    .

    দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন বাবু। মাথা নিচু করে দুজনে এসে দাঁড়াল সেইখানে। খুকী ওপরে যাও—গম্ভীর কণ্ঠে বললেন তিনি। তারপর মধুসূদনের কান ধরে টেনে নিলেন ভিতরের দিকে। চোখ পাকিয়ে বললেন, আর কোনোদিন ওকে নিয়ে কোথাও গেছ যদি শুনতে পাই, চাবুক মারতে মারতে বের করে দেবো। মনে থাকে যেন।…

    কিন্তু মনে থাকল না। এর পরে একদিন ক্লাস পালিয়ে বেরিয়ে এল ঝর্ণা। ট্রামে চড়ে ওরা চলে গেল বোটানিক্যাল গার্ডেন। গাছের ছায়ায়, ঝোপের আড়ালে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে বসল এসে পদ্মপুকুরের ধারে। কেউ কোথাও নেই। শুধু দূরে কোনও গাছের উপর থেকে ভেসে আসছিল অচেনা পাখির ডাক। মধু তন্ময় হয়ে বলছিল তার জীবনের আর একটা কোনও দুঃসাহসের কাহিনী। তার হাঁটুর উপর চিবুক রেখে ঘাসের বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিয়েছিল ঝর্ণা।

    সেইদিন রাত সাড়ে সাতটায় বাড়ি ঢুকতেই মধুসূদনের জবাব হয়ে গেল। তার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে যাবার হুকুম। বাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নামছিল, কানে এল গিন্নীমার গলা, ছেলেটাকে যে তাড়িয়ে দিলে, ওর দোষটা কি শুনি? মেয়ে যে তোমার ধিঙ্গিপনা করে বেড়াচ্ছেন, সেটা দেখতে পাও না?

    দেখতে আমি সবই পাই, গিন্নী—গম্ভীর ভাবে জবাব দিলেন বাবু : কিন্তু মেয়েকে তো আর এভাবে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাকে যায়, তাকে দিলাম। মেয়ের ব্যবস্থাও করছি।

    টিনের সুটকেসটা হাতে করে মধু গেল গিন্নীমার সঙ্গে দেখা করতে। তিনি রান্না করছিলেন। বললেন, খেয়ে-দেয়ে রাতটা থেকে কাল সকালে যাস্।

    মধুর কণ্ঠা পর্যন্ত ঠেলে উঠল কান্না। কোনও রকমে সামলে নিয়ে বলল, না, মা, আমার খিদে নেই। আমি যাই।

    তিনি আর কিছু বললেন না। তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নিলেন মধুর দিক থেকে।

    রাত কাটল ফুটপাথে। সকালে উঠে একবার ভাবল, মামার কাছে যায়। কিন্তু চাকরি গেল কি করে—এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে সে? দেশে ফিরে যাওয়া আরও অসম্ভব। তাছাড়া টাকাও নেই। মাইনে যেটা পাওনা ছিল, আগেই নিয়ে নিয়েছে। আসবার সময় পেয়েছে শুধু কয়েকআনা পয়সা। তারই খানিকটা খরচ করে চায়ের দোকানে কিছু খেয়ে নিল। তারপর পার্কে শুয়ে লম্বা ঘুম দিয়ে কেটে গেল বেলা। তিনটা বাজতেই সে উঠে বসল। তারপর কিসের এক অলক্ষ্য টান তাকে নিয়ে গেল সেই পুরনো রাস্তায়। ইস্কুলের গেটটা নজরে পড়তেই নিজের অজ্ঞাতেই চমকে উঠল মধু। পা দুটো দাঁড়িয়ে গেল। একটু পরেই ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল ঝর্ণা। ইস্কুল তখনও ছুটি হয়নি। সোজা এগিয়ে এসে বলল, তুই এসেছিস, মধু? ইস্ বড্ড মুখ শুকিয়ে গেছে! খাসনি বুঝি কিছু?

    মধু হাসবার মতো মুখ করে বলল, খেয়েছি বইকি।

    ত্রস্ত দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল ঝর্ণা, ঝিটা এখনই এসে পড়বে। এপাশে আয়। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ইস্কুলের পিছনদিকে। মধু চলল তার সঙ্গে। একটা বাড়ির আড়ালে চারদিকটা দেখে নিল ঝর্ণা। তারপর গলা থেকে হারছড়া খুলে ওর হাতে গুঁজে দিয়ে মুঠোটা বন্ধ করে দিল। বলল, এটা রাখ? বিক্রী করে চালিয়ে নে যদ্দিন কাজ-টাজ না জোটে। টাকা ফুরিয়ে গেলে আবার আসিস, বুঝলি?

    মধু আপত্তি জানাল, ওরা যে তোমাকে বকবে, দিদিমণি। না না, এ হার তুমি—

    —আচ্ছা সে আমি বুঝবো, বাধা দিয়ে বলল ঝর্ণা—তুই এখন যা—বলে সে মিলিয়ে গেল মেয়েদের দলের মধ্যে। ইস্কুলে তখন ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেছে।

    মধু দেখল, মামার কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনও পথ নেই। এটা সে বুঝেছিল, সে না খেয়ে প্রাণ দিতে পারে, কিন্তু ঝর্ণার হার বিক্রী করতে পারে না।

    সে-রাত্রে মামার বাসায় শুয়ে এই কথা ভাবতে ভাবতে অনেক রাত পর্যন্ত তার চোখে ঘুম এল না। যখন এল সে শুধু সুখ-স্বপ্নে-ভরা। তারই মধ্যে কানে এল কে যেন বাইরে থেকে দরজা ঠেলছে। তার মামা উঠে খুলে দিয়েই কাঠ হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে পুলিস।

    জেল হাজতে আর যেতে হল না। মামার চেষ্টায় জামিন হয়ে গেল থানা থেকেই। কিছুদিন পরেই মামলা উঠল কোর্টে। আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন ঘুম ধরে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা ডাক কানে যেতেই চমকে উঠল মধু। ওদিকে চেয়ে আর চোখ ফেরাতে পারল না। সাক্ষীর মঞ্চে উঠে এল ঝর্ণা। চোখদুটো ফুলো-ফুলো। সমস্ত মুখখানা বিষণ্ণ, অন্ধকার! আরও বেশী চমকে উঠল যখন শুনল, কোর্টবাবুর প্রশ্নের উত্তরে বলে যাচ্ছে ঝর্ণা—হ্যাঁ, ঐ আসামী আমার গলা থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে এই হার, অমুক দিন বেলা চারটার সময় যখন ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। তার আগের দিন বাজারের পয়সা চুরি করার জন্যে বাবা ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, সন্ধ্যাবেলা এসে ও আমাদের সবাইকে শাসিয়ে গিয়েছিল।…

    তারপরে এল এক ঝি। মধু তাকে কোনোদিন দেখেনি। থেমে থেমে বলল, হ্যাঁ, আমি ছিলাম দিদিমণির ঠিক পেছনে। হার ছিনিয়ে নিয়ে ঐ লোকটা যখন পালাচ্ছে, আমি চোর চোর বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কোথায় যে ও মিশে গেল, দেখতে পাইনি।

    হাকিম রায় দিলেন। তিন মাস জেল, তার সঙ্গে পনেরো বেত।

    তিন মাস দেখতে দেখতে কেটে গেল।

    খালাসের আগের দিন মধুকে ডেকে বললাম, চাকরিই যখন করবি, আমার এখানেই থেকে যা না? মাইনে ওখানে যা পেতিস, তাই নিস।

    মধু খুশি হয়ে বলল, আমিও সেই কথা বলবো, ভাবছিলাম। আপনার কাছেই থাকবো আমি। দুটো দিন শুধু ছুটি দিন। বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসি। মাকে অনেকদিন দেখিনি। ভাইবোনগুলোকে দেখতে ইচ্ছা করে।

    বললাম, বেশ, তাই, বরং ঘুরে আয়।

    দু-দিন নয়, তিনদিনের দিন সন্ধ্যবেলা ঘুরে এল। আমার বাড়িতে নয়, জেলগেটে; কোমরে দড়ি-বাঁধা হাজতি আসামীদের সঙ্গে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল।

    পরদিন দুপুর বেলা নির্জন অফিসে মধুকে ডাকিয়ে নিয়ে এলাম। এবার যে কাহিনী শুনলাম, সেটা ওর নিজের কথাতেই বলি—

    অনেক দিন পরে বাড়ি ফিরছি, সবাই ছুটে আসবে, তা না, আমাকে দেখেই মা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। ভাইবোনগুলোও, মনে হল যেন ভয় পেয়েছে। খবর শুনেই পাড়ার লোকজন আসতে লাগল একে একে। আমার এক পিসিমা বললেন, হ্যাঁরে মধু, পনেরো ঘা বেত তুই সইতে পারলি?

    আরেকজন, আমার সম্পর্কে কাকা হন, বললেন, জেলে শুনেছি গরুর বদলে মানুষ দিয়ে ঘানি টানায়। তেল কম হলে চাবুক মারে। সত্যি নাকি রে? ঘানি টেনেছিস তুই? কে একজন ছোকরা বলে উঠল ভিড়ের ভেতর থেকে, জেলখানায় নাকি হাতা মেপে ভাত দেয়। মেধোটার চেহারা দেখে তা তো মনে হচ্ছে না।

    ও, তা জানিস না বুঝি?’—বললেন আমার এক জ্ঞাতিদাদা, ওখানেও চুরি চলে। সিপাইদের পা টিপে দিলে দু-এক হাতা ভাত বেশি দেয়।

    খেয়ে-দেয়ে যখন শুতে গেছি, মা এসে বসল মাথার কাছে। বলল, হ্যাঁরে মধু, তোর বাপ-দাদারা গরীব ছিল সবাই, কিন্তু প্রাণ গেলেও চুরি করেনি। তুই শেষটায় বংশের নাম ডোবালি! বাবা?

    আমি বললাম, তোমার পা ছুঁয়ে বলছি, মা। চুরি আমি করিনি।

    মা চুপ করে রইল। বিশ্বাস করল না আমার কথা। তারপর আস্তে আস্তে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, খুব লেগেছিল, নারে?

    আপনাকে সত্যি বলছি, বাবু, বেতের জ্বালা যে কী জিনিস এইবার তা টের পেলাম। বেত যখন মেরেছিল, সে যন্ত্রণা এর কাছে কিছু না। ভোর হবার আগেই কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হাওড়াস্টেশনে নেমেই দেখা হয়ে গেল ছেদীরামের সঙ্গে জেলে থাকতে আলাপ। বড্ড ভালবাসত আমাকে। তাকে সব বলেছিলাম। এবারকার কথাও বললাম। শুনে সে হেসে উঠল। তারপর বলল তার সেই ভাঙা-ভাঙা বাংলায়, তুই মরদ না আছিস, মধু। যে মাইয়া তোকে চাবুক দিল, জেল খাটাল, জান থেকে বড় যে ইজ্জত তাই চলে গেল, তার ইজ্জত তুই কেড়ে লে। দিল্ ঠাণ্ডা হোবে।

    কথাটা আমার মনে লাগল। বেত আর জেলের জ্বালা আর একবার জ্বলে উঠল বুকের মধ্যে। ঠিক বলেছে ছেদীরাম। আমার মুখে মিথ্যা দুর্নামের চুনকালি লেপে দিয়ে ঐ মেয়েটা ঘরের আড়ালে বসে মনের সুখে ঘর-সংসার করবে, সে হবে না। ওকেও টেনে আনবো পথের ধুলোয়। চাকরকে মেরে মেয়েকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন আমার মনিব, সেটা হতে দেবো না। চাকরের মুখের কালি তাঁর মেয়ের মুখেও লাগবে। দেখি তারপর কোথায় থাকে তার মান-ইজ্জত।

    ছেদীরাম আমার সঙ্গী হল। কথা রইল, ভেতরে ঢুকবো আমি একাই। ঐটুকু একা মেয়েকে সামলাতে আর কারও দরকার হবে না। ও থাকবে বাড়ির বাইরে। কাজ সেরে যখন বেরিয়ে আসবো, কোনোদিক থেকে বাধা এলে ছোরা চালাবে। খানিকটা দূরে একটা বটগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকবে ট্যাসি, সে ব্যবস্থাও ছেদীরামের

    রাত তখন সাড়ে নটা। ছোট্ট গলি। লোকজন চলা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকদিন পর মনিব-বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লাম। খানিক পরে খুলে গেল কপাট। ঢুকেই দেখি সামনে দাঁড়িয়ে ঝর্ণা। কিন্তু এ কী চেহারা! মনে হল যেন অনেক দিন অসুখে ভুগে উঠল। আমাকে দেখে প্রথমটা কেমন থতমত খেয়ে গেল। তারপর এগিয়ে এসে বলল, মধু? এদ্দিন পরে বুঝি মনে পড়ল! মনে মনে তোকে কত ডেকেছি, জানিস? আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। মুখ বেঁধে ফেলবার জন্যে যে ন্যাকড়াটা হাতে নিয়েছিলাম, আস্তে আস্তে সেটা পকেটে পুরে ফেললাম! গলাটা পরিষ্কার করে বললাম, মা কই, দিদিমণি?

    মা?—ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ঝর্ণা, মা তো নেই। দু’মাস হল চলে গেছে।

    —পলটু?

    –পলটুকে মাসীমা এসে নিয়ে গেছেন। আমাকে বাবা যেতে দিলেন না। ইস্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছেন। একটুও বেরোতে দেন না। জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন একটা দোজবরে বুড়োর সঙ্গে—

    ছুটে এসে আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, আমাকে তুই নিয়ে চল, মধু। এখানে থাকলে আমি মরে যাবো।…

    বাইরে কাশির শব্দ শোনা গেল। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল ঝর্ণার।—ঐ বাবা ফিরলেন ক্লাব থেকে—বলেই তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।

    বাবু বাড়ি ঢুকলেন। প্রথমে আমাকে চিনতে পারলেন না। কাছে এসেই চেঁচিয়ে উঠলেন, ও, জেলে গিয়ে আর বেত খেয়েও তোর লজ্জা হয়নি হারামজাদা? আবার এসেছিস আমার সর্বনাশ করতে?

    বললাম, কী বকছেন পাগলের মতো! সর্বনাশ আমি করেছি, না আপনি করেছেন আমার সর্বনাশ?

    —তবে রে! একটা চাকরের এত তেজ! বলে ছুটে এসে দিলেন গলাধাক্কা। পড়তে পড়তে সামলে নিলাম। ঠিক সেই সময় খোলা দরজা দিয়ে ছুটে এল ছোরা, বিঁধে গেল বাবুর বাঁহাতের উপরদিকে।

    চেঁচামেচি শুনে এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে লোকজন এসে পড়ল। ছেদীরামের চিহ্ন নেই। আমি ছুটতে শুরু করলাম। কিন্তু বেশীদূর যাবার আগেই সবাই ধরে ফেলল। তারপর এই—

    গায়ের জখমগুলো দেখিয়ে দিল মধুসূদন।

    ওয়ারেন্ট খুলে দেখলাম, চার্জ গুরুতর—নারীহরণ এবং নরহত্যার চেষ্টা। ৩৬৬/৫১১, তার সঙ্গে ৩০৭।

  • আট

    আট

    পূর্বদিকে বর্মা, পশ্চিমে চট্টগ্রাম, মাঝখানে যে পর্বতসঙ্কুল ভূখণ্ড, তার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। সাহেবরা বলতেন চিটাগাঙ্ হিল ট্রাক। বাংলা দেশ। কিন্তু বাংলার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক, দৈহিক নয়, আত্মিকও নয়। বাংলার শ্যামলিমা আছে, নেই তার উন্মুক্ত বিস্তার। কোনও অবারিত মাঠের প্রান্তে নুইয়ে পড়ে না চুম্বনাকুল গগনললাট। কোনও আদিগন্ত নদীর বুকে নেমে আসে না স্খলিতাঞ্চলা সন্ধ্যা। বুকভরা মধু বধূ হয়তো আছে। কিন্তু কোনও স্তব্ধ অতলদীঘি কালো জলে পড়ে না তাদের অলক্তরঞ্জিত চরণচিহ্ন।

    এদেশেও জেল আছে, কিন্তু তার কৌলীন্য নেই। সে শুধু আকারে ছোট নয়, জাতেও ছোট। সুতরাং আমার চৌহদ্দির বাইরে কর্মসূত্রের টান যখন নেই, তখন আর কোনও সূত্র ধরে এই পাণ্ডব-বর্জিত দেশে কোনোদিন আমার পদধূলি পড়বে, এরকম সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু এ বিশাল বিশ্বের কোন্ কোণে কখন যে কার জন্যে বিধাতাপুরুষ দুটি অন্নের ব্যবস্থা করে রেখে দেন সে শুধু তিনিই বলতে পারেন। যা ছিল স্বপ্নের অগোচর, তাই একদিন বাস্তব ঘটনার রূপ নিয়ে দেখা দিল। সেমেন্টের তাঁবু ঘাড়ে করে আমার এক আত্মীয় টোল ফেলে ফিরছিলেন এই দেশের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হঠাৎ রোগশয্যায় পড়ে আমাকে স্মরণ করলেন। তার সঙ্গে যুক্ত হল তাঁর স্ত্রীর সাশ্রু অনুনয়। অতএব আমিও একদিন বাক্স-বিছানা ঘাড়ে করে মগের মুলুকে পাড়ি দিলাম।

    পার্বত্য চট্টগ্রাম। গিয়ে দেখলাম, শুধু পার্বত্য নয়, আরণ্য চট্টগ্রাম। যেদিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, দুর্ভেদ্য পাহাড় আর দুর্গম জঙ্গল। তারই বুক চিরে চলে গেছে শীর্ণ জলরেখা। তার নাম নদী। একটা বিশাল গাছের গুঁড়ির বুকের উপর থেকে কাঠ খুঁড়ে খুঁড়ে তৈরী হয়েছে খোন্দল। তার নাম নৌকা। তারই মধ্যে বসে যেতে হল দিনের পর দিন। হঠাৎ একদিন অসময়ে নৌকা থেমে গেল। সামনে এপার ওপার জোড়া বাঁধ। মাঝিদের কলরব শুনে কৌতূহল হল। লক্ষ্য করে দেখি, বাঁধ নয়, গজেন্দ্রগমনে নদী পার হচ্ছেন পাহাড়ী পাইথন। আর এক দিন। সবে সন্ধ্যা হয়েছে তখন। গলুই-এর উপর বসে নিশ্চিন্ত মনে বেসুরো গান ধরেছি, মাঝির চাপা ধমক শুনে থেমে গেলাম। দশহাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে জলপানরত চিতাবাঘ। শুধু আধি নয়, পথের বাঁকে লুকিয়ে আছে ব্যাধি। এমন জ্বর, যার কবল থেকে কাকেরও নিস্তার নেই। তারপর আছে মাছির ঝাঁক। ভীমরুলের চেয়েও বিষাক্ত। একবার ধরলে শুধু যন্ত্রণা নয়, সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দেবে ক্ষত

    রাঙামাটি শহর থেকে দিনতিনেকের পথ। একখানি বসতিবিরল পাহাড়ী গ্রাম; বনের ফাঁকে ফাঁকে দু-একখানা চালাঘর। জঙ্গল-মুক্ত ঢালু পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ক্ষেত। সেখানে “ঝুম্” চাষ করে মেয়ে-পুরুষের মিলিত দল। লাঙল গরুর বালাই নেই। অদ্ভুত হাতিয়ার দিয়ে মাটি খুঁড়ে কিংবা আঁচড় কেটে একই সঙ্গে পুঁতে বা ছড়িয়ে দেয় ধান মকাই আর নানারকম সবজির বীজ। যেমন যেমন তৈরী হয়, কেটে ঘরে তোলে ফসলের বোঝা।

    আমার আত্মীয়টির আস্তানা ছিল গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে। আধমরা হয়ে আমি যখন গিয়ে পৌঁছলাম, তিনি তখন মরে সবে বেঁচে উঠেছেন। করবার বিশেষ কিছুই ছিল না। আমার এই সশরীরে উপস্থিতি, এইটুকু দিয়েই যেন তাঁকে কৃতার্থ করে দিলাম। বললাম, একটা কিছু টনিক-ঠনিক খেয়ে চট্‌পট্ সেরে ওঠো।

    উনি হেসে বললেন, তুমি কাছে বসে আছ, এইটাই আমার সব চেয়ে বড় টনিক। আর কিছু চাই না।

    সারাদিন তাঁর টনিক যুগিয়ে বিকেল বেলা রোদ যখন পড়ে আসে, পাহাড়ী পথ ধরে নিরুদ্দেশযাত্রায় বেরিয়ে পড়ি। সেদিন অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিলাম। কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে খেয়াল হয়নি। সঙ্গে ছিল সেট্লমেণ্ট অফিসের এক চাপরাসী। অনুস্বার-কণ্টকিত কি একটা নাম, আজ আর মনে নেই। যেখানে গিয়ে পড়েছিলাম ওরই কাছাকাছি তার বাড়ি। দ্বিতীয়বার কোনও চিতাবাঘের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে এরকম ইচ্ছা ছিল না। তাই হাঁটার বেগটা বেশ একটু বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি চৌদ্দ-পনেরো বছরের পাহাড়ী মেয়ে নেমে আসছে সামনের ঐ পায়ে-চলা ঢালু পথ বেয়ে। তার পিঠে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নামছে একটা জরাজীর্ণ বৃদ্ধা, বোধহয় দৃষ্টিও নেই। আমরা পথ ছেড়ে দিয়ে বনের ধার ঘেঁষে দাঁড়ালাম। তারা অতি সন্তর্পণে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কিশোরী মেয়েটি একটিবার শুধু আমার দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল। দুটি কৌতূহল-ভরা কালো হরিণ-চোখ। সুশ্রী মুখখানি ঘিরে কেমন একটা বিষণ্ণ ম্লানিমা। আমারও কৌতূহল হল। আর একটু উঠে গিয়ে রাস্তার বাঁকে দাঁড়ালাম।

    ওরা নেমে গিয়ে যেখানে থামল, তার ঠিক সামনেই একটি পল্লব-ঘন বটের চারা। গোড়ায় বাঁধানো মাটির বেদি, যত্ন করে নিকানো। সঙ্গিনীকে ঘাসের উপর বসিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল কিশোরী। আঁচলের বাঁধন খুলে বের করল দুটি ছোট ছোট মোমবাতি আর একটা দেশলাই। বাতি দুটো জ্বেলে পাশাপাশি বসিয়ে দিল বেদির উপর। তারপর একটুখানি পিছনে সরে এসে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল, জানি না কার উদ্দেশে। অস্পষ্ট জড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধা কি বলে উঠল তার পাহাড়ী ভাষায়। বোধহয় কোনও প্রশ্ন। কিন্তু কিশোরীর কাছ থেকে কোনও জবাব এল না। তারপর যেমন এসেছিল তেমনি করে আবার ওরা ফিরে চলল সন্ধ্যার ছায়া-ঢাকা চড়াই পথ ধরে। যাবার সময় আর একটা চকিত দৃষ্টি দিয়ে গেল আমার বিস্মিত মুখের উপর।

    আমরাও চলতে শুরু করলাম। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ নিঃশ্বাসের শব্দে পেছন ফিরে তাকালাম, ঠিক ওর মায়ের মতো দেখতে হয়েছে মেয়েটা’–স্নিগ্ধ কণ্ঠে যেন আপনমনে বলে উঠল চাপরাসী।

    —তুমি চেনো নাকি ওদের?

    —চিনি বইকি। ওই তো ওদের ঘর। মংখিয়ার মা আর মেয়ে।

    মংখিয়া! চমকে উঠলাম। নামটা যেন তড়িৎশিখার মতো জ্বলে উঠল আমার স্মৃতির অন্ধকারে। প্রশ্ন করলাম, কোন্ মংখিয়া? মংখিয়া জং?

    —হ্যাঁ বাবু। আপনি জানলেন কি করে?

    আমি জবাব দিলাম না। দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের কৃষ্ণাবরণ ভেদ করে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল একখানা মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের মুখ। তার উপর দুটি ভাসাভাসা অসহায় চোখ। মংখিয়া জং।

    .

    মংখিয়ার সঙ্গে দেখা আমার চিটাগাং জেলে। চৌদ্দ বছর—হ্যাঁ, তা হল বইকি। এই গাঁয়ের কথাই সে বলেছিল। পাহাড় কেটে কেটে অতি যত্নে তৈরী ছোট ছোট ক্ষেত। তার পাশ দিয়ে উঠে যে চড়াই পথ সেইখানে তার বাড়ি। ছোট সংসার। বিধবা মা, সতেরো বছরের বৌ আর তার কোলে একটি বছর খানেকের মেয়ে। ভোর হতেই সে বেরিয়ে যেত “ঝুম-এ। দু-তিনখানা গ্রাম ছাড়িয়ে দূর-পাহাড়ের কোলে। প্রায় একবেলার পথ। বেশীর ভাগ দিনই একা। ঘরের কাজ সেরে মেয়েকে শাশুড়ীর কাছে গছিয়ে কোনও কোনও দিন সিকিও তার সঙ্গ নেয়। সেদিনটা সে আসতে পারেনি। মংখিয়া একটা গোটা ভুট্টাক্ষেতের জঙ্গল সাফ করে ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিল খানিকক্ষণ। হাতে ছিল একটি নধর কচি ভুট্টার মোচা। ছাড়িয়ে মুখে তুলতে যাবে, পাহড়ের বাঁকের আড়াল থেকে ভেসে এল সুরের ঝঙ্কার। এ সুর তার চেনা। শুধু চেনা নয়, এর সঙ্গে ছিল তার প্রাণের টান। এতক্ষণ বুঝতে পারেনি, সকাল থেকে সকল কাজের মধ্যে এরই পানে পড়ে ছিল তার কান, এরই জন্যে মন ছিল তার উন্মুখ।

    জনহীন বনভূমি। তার উপর লুটিয়ে পড়ছে গানের ঢেউ। কখনও কাছে, কখনও মিলিয়ে যাচ্ছে দূর পাহাড়ের গায়ে। বেলা বেড়ে চলেছে। গাছের মাথায় ঝলমল করছে রোদ। ঘরে ফিরবার সময় হল। সে খেয়াল নেই মংখিয়ার। আবেশে বুজে আসছে চোখ দুটো। হঠাৎ মনে হল গান তো আর শোনা যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল মংখিয়া। পাহাড়ের বাঁক ঘুরে এগিয়ে গেল। দু-তিনখানা ভুট্টাক্ষেত পার হয়ে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল একটি ঝোপের আড়ালে।

    —ওখানে লুকিয়ে কি হচ্ছে, শুনি?

    ধরা পড়ে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠল মংখিয়া। তার সঙ্গে মিলিত হল কলহাস্যের কোমল ঝঙ্কার।

    —সিম্‌কি আসেনি কেন? প্রশ্ন করল নারীকণ্ঠ।

    —এসেছে বইকি। ঐ তো রয়েছে ওখানে—মংখিয়ার মুখে রহস্যের হাসি।

    —ইস্! তাহলে আর এত সাহস হত না।

    –কেন, ভয় কিসের?

    —থাক্, আর বাহাদুরি দেখিয়ে কাজ নেই। এবার বাড়ি যাও। বেলা হয়েছে।

    —বাড়িই তো যাচ্ছিলাম। এমন সময়—

    —-কী হল এমন সময়? মাথাটা বাঁদিকে হেলিয়ে মোহিনী ভঙ্গীতে তাকাল মেয়েটি।

    —কিছু না। এই নাও

    মংখিয়া হাত বাড়িয়ে ভুট্টাটা এগিয়ে ধরল।

    মেয়েটি হাত বাড়াল না, এগিয়েও গেল না। সেখানে দাঁড়িয়েই বলল, কি ওটা?

    —বাঃ! গান শোনালে বক্‌শিশ নেবে না?

    —চাই না অমন বক্‌শিশ—সমস্ত দেহে একটা দোলা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।

    —না, সত্যি। তোমার জন্যে নিয়ে এলাম।

    —ছুঁড়ে দাও ওখান থেকে।

    —হাত থেকে নেবে না বুঝি?

    —বাঃ! কেউ দেখে ফেলে যদি?

    —কেউ নেই এখানে।

    দ্যাখ, দেখছে—বলে আঙুল তুলে ধরল গাছের দিকে। একটা কাঠবেড়ালী ল্যাজ নাড়ছিল, আর মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল বিজ্ঞের মতো।

    দুজনেই হেসে উঠল। মংখিয়া আর একটু কাছে এসে ভুট্টার মোচা তুলে দিল মেয়েটির হাতে।

    —দাঁড়াও, আমি একা খাব বুঝি? বলে মোচাটা ভেঙে অর্ধেকটা সে ফিরিয়ে দিল মংখিয়ার হাতে। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা মিলিত হাসির উচ্ছ্বাস। কিন্তু উঠতে না উঠতেই সে যেন ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। মেয়েটির হাত থেকে খসে পড়ে গেল ভুট্টার ভগ্নাংশ। দুজনের মিলিত ভীত দৃষ্টি ঝোপের আড়ালে গিয়ে স্থির হয়ে গেল। দৃপ্ত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সিম্‌কি। ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। দিদির একান্ত কাছটিতে এসে তার চোখের উপর চোখ রেখে ফিফিস্ করে বলল, ছুঁয়ে দিলি! কণ্ঠে অপরিসীম বিস্ময়, তার সঙ্গে অভিমান-ক্ষুব্ধ অনুযোগ। দিদির কাছ থেকে কোনও সাড়া এল না। মাথাটা শুধু নুয়ে পড়ল বুকের উপর। দাঁড়িয়ে রইল নিষ্প্রাণ পুতুলের মতো।

    এবার স্বামীর দিকে ফিরে তাকাল সিম্‌কি। নির্বাক চাহনি। কিন্তু তার ভিতর থেকে নির্গত হল যে অগ্নিময়ী ভাষা, মংখিয়ার কাছে সেটা কিছুমাত্র অস্পষ্ট নয়। হঠাৎ দেহময় দীপ্ত তরঙ্গ তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দৃঢ়হস্তে কোমরে জড়িয়ে নিল আঁচলখানা। তারপর ছুটে বেরিয়ে গেল ঝড়ের মতো।

    সিমকি শোন্—এতক্ষণে স্বর ফুটল দিদির কণ্ঠে। কিন্তু শোনবার জন্যে সিম্‌কি আর তখন দাঁড়িয়ে নেই।—কী হবে! শুষ্ককণ্ঠে বলল মংখিয়ার দিকে ফিরে। চোখে সন্ত্রস্ত দৃষ্টি। মংখিয়া নিরুত্তর। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কি ভাবল। তারপর হাতে একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গী করে ধীরে ধীরে রওনা হল বাড়ির পথে।

    প্রাচীনপন্থী হিন্দু-সমাজে যেমন ভাদ্রবৌ, মংখিয়াদের পাহাড়ী সমাজে তেমনি বৌ-এর বড় বোন। স্পর্শ করা শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, মহাপাপ। হিন্দুসমাজে তার ক্ষমা আছে। কিঞ্চিৎ কাঞ্চনমূল্যে প্রায়শ্চিত্তের বিধানও বোধ হয় আছে কোনও রকম। কিন্তু মংখিয়ার সমাজ এখানে ক্ষমা-লেশহীন, নির্মম। এইজাতীয় অপরাধের প্রাথমিক বিচার করবেন গ্রামের মোড়ল। তিনি যদি তুষ্ট না হন, কিংবা তার বিচারের পরে যদি গ্রাম্যসমাজ রুষ্ট থেকে যায়, তখন অপরাধীর তলব পড়বে মহাপরাক্রান্ত মাজার দরবারে। মাজা—ইংরেজরা বলতেন বোমঙ্ চীফ (Bohomong Chief)। তিনিই ছিলেন চিটাগ হিল ট্র্যাকসের দালাই লামা। সমস্ত প্রজাকুলের দণ্ড-মুণ্ডের মালিক। বিস্তৃত তাঁর এক্তিয়ার। ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিনীতি সংক্রান্ত অপরাধ শুধু নয়, খুন, জখম, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি গুরুতর ক্রাইমও ছিল তাঁর অলিখিত এলাকার অন্তর্গত। দু-দিন তিনদিনের পথ বলে ব্রিটিশ সরকারের থানা পুলিস এসব ঘটনার সন্ধান পেত না, পেলেও অনেক সময় চুপ করে থাকত।

    বাড়ির কাছে আসতেই মংখিয়ার কানে গেল তার শিশুকন্যার কান্না। ছুটে এসে দেখল কেঁদে কেঁদে নীল হয়ে গেছে মেয়েটা। কেউ কোথাও নেই। মা তথাগত শিষ্যা। সংসারে থেকেও নেই। গ্রামোপান্তের ক্যাঙ্ থেকে এখনও তার ফিরবার সময় হয়নি। কিন্তু সিম্‌কি? এতক্ষণে বোধহয় মোড়লের বাড়ি গিয়ে দশঋনা করে লাগাচ্ছে তার নামে। মেয়েটা বাঁচল কি মরল, সে প্রশ্ন আজ তার কাছে অতি তুচ্ছ। অস্নাত, অভুক্ত, পরিশ্রান্ত মংখিয়ার মাথার ভিতরটায় অগ্নিবৃষ্টি হতে লাগল।

    তার অনুমান যে মিথ্যা নয়, জানা গেল একটু পরেই। বাড়ির বাইরে থেকে হাঁক দিল কর্কশ কণ্ঠ—মংখিয়া আছিস? মোড়লের চাকর। কিন্তু নিজেকে সে ছোটখাটো মোড়ল বলেই জানে, জাহিরও করে সেই রকম! একটা কড়া জবাব এসে গিয়েছিল মংখিয়ার মুখে, সামলে নিয়ে বেরিয়ে এল। খাড়া তলব। অমান্য করলে রক্ষা নেই। বিলম্ব করলেও বিপদ অনিবার্য।

    বারান্দায় বসে তামাক টানছিল মোড়ল। তার সামনে উঠানে দাঁড়িয়ে সিম্‌কি। কোমর জড়িয়ে তেমনি শক্ত করে বাঁধা আঁচলের বেড়। ফুলোফুলো চোখ দুটিতে সদ্য-ক্ষান্ত বর্ষণের চিহ্ন। উন্নত বুকে অদম্য উত্তেজনার স্পন্দন। মংখিয়া এসে যখন দাঁড়াল ও পাশটিতে, একবার মাত্র সেদিকে তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল অন্য দিকে।

    —বৌ যা বলছে, সত্যি? প্রশ্ন করল মোড়ল।

    —হ্যাঁ, আমি ছুঁয়েছি ওর দিদিকে।

    হুঁকো থেকে মুখ তুলে বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মোড়ল। তারপর বলল, বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে, বলিস কি! ও হল তোর বড় শালী, গুরুজন। ওর পেছনে ঘুরে মরছিস কেন? ছুঁয়েই বা দিলি কোন্ আক্কেলে? এত বড় পাপ তো আর নেই!

    মংখিয়া নিরুত্তর, কয়েক মিনিট থেমে আবার বলল মোড়ল, তাছাড়া ও মেয়েটা মে একনম্বর নচ্ছার, সে তো আর কারও জানতে বাকি নেই। তা না হলে ওর মরদটাই বা ওকে ছেড়ে চলে যাবে কেন?

    এবার উত্তর দিল মংখিয়া, ছেড়ে যায়নি, রাঙামাটি গেছে চাকরি করতে।

    —চাকরি করতে, না আমার কপালে আগুন দিতে! অবরুদ্ধ কণ্ঠে গর্জে উঠল সিম্‌কি।

    হাত দিয়ে তাকে থামাবার ইঙ্গিত করে মোড়ল বলল, যাক, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এবার শুদ্ধ হতে হলে মাথা মুড়োতে হবে, ক্যাঙে বাতি দিতে হবে বারো গণ্ডা, তারপর সমাজ-খাওয়ানো আছে। সেও অনেক টাকার ব্যাপার।

    সিম্‌কির দিকে ফিরে বলল, তুমি ঘরে যাও, বৌ। মাগীটাকে শায়েস্তা করবার ব্যবস্থা আমি করছি। মাথা মুড়ে, লোহা পুড়িয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে—

    না—দৃঢ় গম্ভীর কণ্ঠে বাধা দিল মংখিয়া। ওর কোন দোষ নেই, দোষ আমার। ওর গায়ে যদি কেউ হাত তোলে, আমি তাকে ছেড়ে দেবো না।

    বটে! বিস্মিত ক্রুদ্ধ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল মোড়ল। তারপর নিজেকে সংযত করে বলল, বেশ। গায়ের জোরটা তাহলে মাজার কাছে গিয়েই দেখিয়ো।

    পরদিন থেকে আবার যথারীতি কাজে লেগে গেল মংখিয়া। ভোরে উঠেই বেরিয়ে পড়ে কাস্তে নিয়ে। নিজের ক্ষেতে যেদিন কাজ থাকে না, জন খাটে অন্যের জমিতে। বেলা গড়িয়ে গেলে বাড়ি ফিরে আসে। নিঃশব্দে দুটো খেয়ে নিয়ে আবার কোথায় চলে যায়। মার সঙ্গে যোগাযোগ কোনোকালেই নেই। মেয়েটাকে আদর করত মাঝে মাঝে, তাও ছেড়ে দিয়েছে। বৌ-এর সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ। রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে অনেক রাতে যখন ঘরে ফেরে, তার আগেই মেয়ে কোলে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সিম্‌কি। ঘরের কোণে ঢাকা দেওয়া ভাত দুটো খেয়ে নিজের নির্দিষ্ট জায়গাটিতে শুয়ে সেও কখন ঘুমিয়ে পড়ে। যখন ঘুম ভাঙে, বৌ বিছানায় নেই।

    এমনি একটা রৌদ্রদগ্ধ দিন। মধ্যাহ্ন গড়িয়ে পড়েছে অপরাহ্ণের কোলে। মাঠের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিল মংখিয়া। ক্লান্ত এবং তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুধার্ত। বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছে দুজন বিদেশী, কোমরে তকমা আঁটা। মানুষ নয়, যমদূত। মাজার পাইক। এক নিমেষেই চেনা গেল তাদের আকৃতি-প্রকৃতি এবং সংবর্ধনার বহর দেখে কোনোরকমে দুটো ভাত মুখে দিয়ে নেবার সময় চেয়েছিল মংখিয়া, ওরা তো হেসেই খুন। সকাল থেকে বসে বসে এই যে এতখানি সময় নষ্ট হল তাদের, সেটা একবার ভাবল না লোকটা? তারপর আবার ভাত খাবার সময় চাইছে!

    ঘরে ঢোকা হল না, দোরগোড়া থেকেই বেরিয়ে পড়তে হল। কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে মোড়ল, আর তার খানিকটা পেছনে গাছের আড়ালে পাওয়া গেল সিকির শাড়ির আভাস। মংখিয়ার চোখ দুটো দপ্ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু সে জ্বালা সে লুকিয়ে রাখল নিজের কাছেই। একটিবার তাকিয়েই ফিরিয়ে নিল চোখ দুটো।

    মহাপ্রতাপান্বিত মাজার দরবার। তার চারদিক ঘিরে রয়েছে মধ্যযুগের নির্মম কঠোরতা। রাজকীয় জাঁকজমকের মাঝখানে বিচার আসনে বসে এজলাস করছেন বো চীফ। দুয়ে তাঁর আইনকানুন, দুর্লঙ্ঘ্য তাঁর বিধিনিষেধ। সে-সব যে ভঙ্গ করে, অমোঘ দণ্ডের হাত থেকে তার নিস্তার নেই। দণ্ড মানেই দৈহিক নিপীড়ন। অপরাধ ভেদে তার অমানুষিক বৈচিত্র্য। শুনেছি কত হতভাগ্য আসামী ঘর থেকে দরবারে এসেছে, আর ঘরে ফিরে যায়নি।

    মংখিয়ার অদৃষ্ট প্রসন্ন ছিল, আর দেহটাও ছিল পাথরের তৈরি। সেটাকে টেনে নিয়ে কোনো রকমে একদিন সে ঘরে গিয়ে পৌঁছল। কেমন করে আর কিসের জোরে, সে রহস্য সে নিজেও ভেদ করতে পারেনি।

    তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ক্যাঙ থেকে ফিরে বারান্দার উপর একটা অসাড় দেহ পড়ে থাকতে দেখে মা চমকে উঠেছিলেন। শুধু গোঙানি শুনে বুঝেছিলেন তার ছেলে ফিরে এসেছে মাজার দরবার থেকে। খানিকটা সুস্থ হবার পর ছেলেকে এদিকে ওদিকে তাকাতে দেখে বলেছিলেন, বৌ বাড়ি নেই। মোড়লের ওখানে গেছে বোধহয়। দাঁড়া, ডেকে নিয়ে আসি।

    না—শ্রান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল মংখিয়া। সে স্বর শুনে মা-ও আর যেতে সাহস করেননি। পরদিন ছেলের পিঠে তেল মালিশ করতে করতে অনেকটা যেন কৈফিয়তের সুরে বললেন মা, ছেলেমানুষ। ঝোঁকের মাথায় বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। এখন ভয়ে আসছে না।

    মংখিয়ার কাছ থেকে ভাল-মন্দ কোনও জবাব পাওয়া গেল না। একটু থেমে সুর চড়িয়ে বললেন মা, তাই বলে ঘরের বৌ পরের বাড়ি পড়ে থাকবে নাকি। বাড়ি আনতে হবে না? মংখিয়া এবারেও নিরুত্তর।

    তার পরদিন। রাত শেষ না হতেই মা চলে গেছেন মন্দিরে। মংখিয়াও কাটারি হাতে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ল মাঠের পথে। খানিক দূর গিয়ে কি মনে করে আবার ফিরে এল। কিন্তু বাড়ি ঢুকল না। তেমনি মন্থর পায়ে এগিয়ে চলল মোড়লের বাড়ির দিকে। মোড়ল নেই। পুরো ঝুমের সময়, সেই রাত থেকে বেরিয়ে গেছে পাহাড়ে। তার বৌ আর দুটো ছেলেও গেছে খানিক পরে। কোথাও কারও সাড়াশব্দ নেই। মংখিয়া এগিয়ে চলল।

    ভিতরদিকের উঠানে ঘরের কোলে ছায়ায় বসে মেয়েকে স্তন দিচ্ছিল সিম্‌কি। নিঃশব্দ চরণে সামনে এসে দাঁড়াল মংখিয়া। সিম্‌কির দৃষ্টি ছিল মেয়ের মুখে। প্রথমটা কিছু জানতে পারেনি। হঠাৎ ছায়া দেখে চমকে উঠল। চকিত চোখে স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে কি দেখল সেই জানে। পালাতে গিয়েও পালাল না। যেমন বসে ছিল তেমনি রইল। শুধু অনাবৃত বুকের উপর আলগোছে টেনে দিল স্খলিত আঁচলখানা। মংখিয়া দাঁড়িয়ে আছে ছবির মতো। নিজের স্বপ্নাবৃত দেহের উপর সেই একাগ্র দৃষ্টি অনুভব করে সিকির ভীরু চোখে ফুটে উঠল লাজরক্ত মৃদু হাসি। স্নিগ্ধ তিরস্কারের সুরে বলল, অসভ্য কোথাকার তারপর মেয়ের মুখ থেকে স্তনাগ্র সরিয়ে নিয়ে বলল, আর খেতে হবে না। ঐ দ্যাখ্ কে এসেছে। মেয়ে হাসল। দন্তহীন অন্তরঙ্গ হাসি। মংখিয়া নত হয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। একটিবার তার কোমল কচি গাল দুটো ধরে আদর করল। তারপর তাকে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে, দু-পা এগিয়ে এসে বৌ-এর গলায় বসিয়ে দিল কাটারির ঘা।

    মাথাটা যখন ছিটকে পড়ল মাটিতে, সেই শেষ স্নিগ্ধ হাসিটি বোধহয় তখনও তার চোখের কোণে মিলিয়ে যায়নি।

    .

    সংক্ষেপে এই হল মংখিয়া জং-এর খুনের ইতিহাস। শুনেছিলাম তার মুখ থেকে চিটাগাং জেলের বারো নম্বর সেল-এর সামনে বসে। গুছিয়ে সাজিয়ে বলা আত্ম-কাহিনী নয়, প্রশ্নের জাল ফেলে সংগ্রহ করা তথ্য। দোভাষী ছিল আমার অফিস-রাইটার (writer) গুণধর চাক্‌মা।

    বক্তার ভাষাকে ভাষান্তরে পৌঁছে দেওয়াই হল দোভাষীর কাজ। সে শুধু কাঠামো, তার মধ্যে সমূর্ত প্রাণের স্পন্দন কেউ আশা করে না। গুণধরের মুখ থেকে যে-কাহিনী সেদিন শুনেছিলাম, সেটা ভাষান্তর নয়, রূপান্তর—অন্তরের রং দিয়ে আঁকা। সেই ভাঙা- ভাঙা ইংরেজি বাক্যের মধ্যে ব্যাকরণ-নিষ্ঠার পরিচয় ছিল না, কিন্তু প্রচুর পরিমাণে ছিল দরদী প্রাণের সনিষ্ঠ প্রকাশ। সে যেন অন্যের কথা নয়, দোভাষীর নিজেরই অনুতাপবিদ্ধ অন্তরের বেদনাময় রূপ।

    বেশ মনে আছে, শুনতে শুনতে কখন তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বাধা দিল একটা অতিপরিচিত ‘খটাস’ শব্দ। অর্থাৎ বড় জমাদার সবুট-সেলাম ঠুকে নিবেদন করলেন, ফাঁসিকা খানা আয়া, হুজুর। তার পেছনে কালিমাখা ‘চৌকাওয়ালার’ হাতে ঢাকা-দেওয়া অ্যালুমিনিয়মের থালা। খানা উদ্‌ঘাটিত হল। দেখলাম, শুধু খানা নয়, এই মৃত্যুপথযাত্রীর অন্নের থালার সঙ্গে জড়ানো জেলরক্ষীদের নীরব হৃদয়স্পর্শ।

    ভাতের পরিমাণটা বোধহয় দু-’ডাবু’, অর্থাৎ সাধারণ কয়েদীর যে বরাদ্দ তার ডবল। সেই অনুপাতে ডাল তরকারি। সেদিনটা ছিল মৎস্যদিবস, অর্থাৎ সাপ্তাহিক fish day। ভাতের স্তূপের উপর তার যে ভর্জিত খণ্ডটি লক্ষ্য করলাম তার আয়তনও চারজনের বরাদ্দের চেয়ে ছোট নয়। ফাঁসি-আসামীর জন্যে এই যে বিশেষ ব্যবস্থা, এর পেছনে জেল কোডের অনুশাসন নেই, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বা অনুমোদন কিছুই নেই। এর মধ্যে যদি কোনও কোড় থাকে, তার রচয়িতা জেলখানার বহু-নিন্দিত সিপাই-জমাদার।

    খানা পরিবেশিত হল। সেই সঙ্গে জমাদারের পকেট থেকে বেরোল এক-বাণ্ডিল বিড়ি। এ বস্তুটিও খানার অঙ্গ। Condemned prisoner অর্থাৎ ফাঁসির জন্যে অপেক্ষমাণ বন্দীর সরকার-প্রদত্ত special privilege। অন্য কয়েদীরা এ দক্ষিণা থেকে বঞ্চিত।

    ত্রি-সন্ধ্যা এই ফাঁসি-যাত্রীর খাদ্য-পরীক্ষা ছিল আমার আইনবদ্ধ কার্যতালিকার অঙ্গ। ঠিক পরীক্ষা নয়, নিরীক্ষা। কি উদ্দেশ্যে এ আইন রচিত হয়েছিল, আমি জানি না। বোধহয়, যে হত্যাকাণ্ড সরকারের নিজস্ব অধিকার, তার উপর আর কেউ অবৈধ হস্তক্ষেপ না করে, তার জন্যে এই হুঁশিয়ারি।

    .

    মংখিয়ার কাহিনীর বাকী অংশটা সংক্ষিপ্ত। সরকারী নথিপত্র থেকেই পাওয়া গেল তার বিবরণ। মাজাকে অগ্রাহ্য করে রক্তমাখা কাটারি হাতে সে সোজা গিয়ে উঠল ব্রিটিশ-সরকারের থানায়। শান্ত সহজ কণ্ঠে জানাল, এ দা দিয়ে বৌকে খুন করে এলাম। তোমাদের যা করবার কর।

    বিচারের সময় নিম্ন বা উচ্চ আদালতে এর বেশি আর বিশেষ কিছুই সে বলেনি। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও ব্যবস্থা তার ছিল না। সরকারী খরচে একজন তরুণ উকিল তার হয়ে লড়েছিলেন। তিনি বারংবার প্রশ্ন করেছিলেন মংখিয়াকে—এ কথা সত্যি নয় যে তোমার স্ত্রী ঐ মোড়লের উপপত্নী ছিল এবং ওর সঙ্গেই সে বসবাস করত?

    —না।

    —এ কথা কি সত্য নয় যে ঐ মোড়লের উপপত্নী থাকাকালীন অবস্থায় পাশের বাড়ির আর একজন লোকের সঙ্গে তার গোপন প্রণয় ছিল?

    –মিথ্যা কথা।

    —এবং সেই কারণে ঐ মোড়লই তাকে খুন করে তোমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে?

    —না, খুন আমি করেছি।

    খুনী মামলার বিচার-স্থল দায়রা আদালত এবং তার জন্যে রয়েছে বিচার-বিভাগের লোক, যাকে বলা হয় সেসন জজ। চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টসের ব্যবস্থা অন্যরকম। সেখানকার দায়রা বিচারের ভার ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের হাতে। তিনিও নিজে থেকে কতকগুলো প্রশ্ন করেছিলেন খুনের রহস্য ভেদ করবার জন্যে। জানতে চেয়েছিলেন, কেন খুন করেছ? বৌ-এর বিরুদ্ধে কী তোমার অভিযোগ? কখন, কী অবস্থায়, কোন্ আক্রোশে নিজের বৌ-এর ঘাড়ে দিলে দা-এর কোপ?

    এসব কথার দু’চারটা জবাব দিয়েছিল মংখিয়া। ঠিক কি বলেছিল, তার পরে আর তার মনে নেই।

    আপীলের জন্যে মংখিয়ার কোনও আগ্রহ ছিল না। গুণধর চাকমা একরকম জোর করেই তাকে রাজী করেছিল। তারপর আমার কাছে এসে বলল, আপীলটা স্যার আপনাকে লিখতে হবে।

    আমি অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু আমি তো উকিল নই।

    গুণধর বললে, সেই জন্যেই তো বলছি। এখানে উকিলের বুদ্ধি চলবে না।

    —তবে কার বুদ্ধি চলবে শুনি?

    —বুদ্ধি নয়, চাই শুধু একটুখানি হার্ট-

    গুণধরের অনুরোধে কিনা জানি না, আপীল আমিই লিখেছিলাম। আপীল নয়, আবেদন। তার মধ্যে আইন ছিল না। সরকারের পক্ষের সাক্ষীদের কোথায় কোথায় অসঙ্গতি, কোথায় অত্যুক্তি, সে সব দেখিয়ে যুক্তি-জাল বিস্তারের চেষ্টাও ছিল না। শুধু ছিল খানিকটা উচ্ছ্বাস। স্ত্রীর কাছে কী পেয়েছিল মংখিয়া? প্রেম নয়, প্রীতি নয়, অণুমাত্র আনুগত্য নয়, শুধু লাঞ্ছনা, ঔদ্ধত্য আর আনুষঙ্গিক নির্যাতন। কোনও একটা মানুষের অন্তরের সমস্ত কোমলতা নিংড়ে ফেলে দিয়ে তাকে নির্মম কঠোর ক্ষিপ্ত করে তুলবার পক্ষে সেগুলো কি যথেষ্ট নয়? সে যদি সভ্য সমাজের লোক হত, হয়ত ঐ স্ত্রীকে সে বর্জন করত, ভেঙে দিত বিবাহবন্ধন, কিংবা হয়তো অন্তরে সঞ্চিত বিদ্বেষ লুকিয়ে রেখে তার সঙ্গেই অভিনয় করে যেত সারাজীবন। কিন্তু মংখিয়া সভ্য মানুষ নয়, পাহাড়ে জঙ্গলে স্বচ্ছন্দে বেড়ে-ওঠা প্রকৃতির হাতের মানুষ। সভ্যতার কপটতা তাকে স্পর্শ করেনি। আত্ম- সংযমের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা সে শেখেনি। তাই তার বুকের ভেতরকার সমস্ত জিঘাংসা প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে এল ধ্বংসের নগ্ন মূর্তি নিয়ে। শিক্ষা-সংস্কৃতির মুখোশ পরে আমি আপনি যেখানে শানিয়ে শানিয়ে শুধু বাক্যবাণ প্রয়োগ করতাম, অরণ্যচারী বর্বর মানুষ মংখিয়া সেখানে বসিয়া দিল মৃত্যুর আঘাত

    তারপরে লিখেছিলাম, সভ্য মানুষের তৈরি যে আইন সুবিজ্ঞ বিচারক তাই দিয়ে বিচার করেছেন বুনো মানুষের আচরণ। মংখিয়া যে-খুন করেছে, যে-মন নিয়ে খুন করেছে, তাকে দেখতে হবে মংখিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে, তারই দৃষ্টি দিয়ে, শিক্ষা-মার্জিত সামাজিক মানুষের দৃষ্টি দিয়ে নয়। অনুভব করতে হবে তার সেই দুর্জয় অভিমান, যার তাড়নায় সে নিজের হাতে বিসর্জন দিয়ে এল তার সদ্য-বিকশিত-যৌবনা স্বর্ণপ্রতিমা, তার একমাত্র শিশু-সন্তানের জননী।

    সিকি মরল, কিন্তু শেষ হল না। তার মৃত্যুদাহের সমস্ত দুঃসহ জ্বালা সে দিয়ে গেল এই নারীহত্তার দেহমনে। তার কাছে কোথায় লাগে মৃত্যুদণ্ড! ফাঁসি তো তার শাস্তি নয়, শাস্তি।

    উপসংহারে লিখেছিলাম মংখিয়ার নিজের না হোক, যারা রয়ে গেল তার উপর একান্ত-নির্ভর—একটি নিষ্পাপ বৃদ্ধা, আর একটি নিরপরাধ শিশু,—তাদের মুখ চেয়ে এই হতভাগ্য বন্দী শুধু বেঁচে থাকবার করুণাটুকু কামনা করে।

    .

    ক’দিনের মধ্যেই আপীলের ফল বেরিয়ে গেল। অপ্রত্যাশিত কিছু নয়, এই রকম আবেদনের যেটা যথাযথ উত্তর। অর্থাৎ Appeal summarily dismissed — সরাসরি না-মঞ্জুর। তার কয়েকদিন পরেই কমিশনার সাহেব এলেন জেল পরিদর্শনে। এটা সেটা দেখবার পর ঢুকলেন ফাঁসি-ডিগ্রির চত্বরে। মংখিয়ার সেল্-এর সামনে দাঁড়িয়ে জেলর সাহেবকে প্রশ্ন করলেন, who wrote his appeal?

    —ডেপুটি জেলর মলয় চৌধুরী।

    —তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?

    ছুটতে ছুটতে এলেন জেলর সাহেব। বললেন, যাও, তোমার ডাক পড়েছে। তখন বলিনি যে ঐসব পাগলামো কোরো না? এ কি তোমার বাংলা মাসিকের প্রবন্ধ যে আবোলতাবোল যা খুশি লিখলেই হয়ে গেল! এবার বোঝো!

    সুপারের অফিসে অপেক্ষা করছিলেন কমিশনার। প্রবীণ শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ান। কাছে যেতেই সাগ্রহে বলে উঠলেন, আপনি লিখেছিলেন আপীল? I congratulate you—বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু আপনার সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি। স্ত্রীর আচরণ যতই উত্তেজক হোক, হঠাৎ রুখে গিয়ে ঝোঁকের মাথায় খুন করেনি মংখিয়া। It was a planned affair. ভেবেচিন্তে খুনের উদ্দেশ্য নিয়েই সে গিয়েছিল মোড়লের বাড়ি।

    আমি প্রতিবাদ করলাম না। সাহেব একটু অপেক্ষা করে আবার বললেন, তার চেয়ে বড় কথা,—বাই দি বাই, আপনি ম্যাডোনার ছবি দেখেছেন?

    বললাম, দেখেছি।

    ভাবগম্ভীর সুরে বললেন কমিশনার, আমার বিশ্বাস ওর চেয়ে সুন্দর, ওর চেয়ে পবিত্র সৃষ্টি সংসারে আর কিছু নেই। আপনার কি মনে হয়?

    বললাম, আমার ধারণাও তাই।

    সাহেব বললেন, মংখিয়ার চোখের সামনে ছিল সেই জীবন্ত ম্যাডোনা—A young mother suckling her little baby. যে-কোন একটা নারীমূর্তি নয়, তারই সুন্দরী তরুণী স্ত্রী, আর তার কোলে শুয়ে স্তন-পান করছিল যে শিশু সেও তারই প্রথম সন্তান। Can you imagine a purer sight। But it could not soften his mind—এতটুকু দাগ পড়ল না তার মনের ওপর। What a hardened criminal! আপনি বলেছেন সে করুণার পাত্র। Absurd! He deserves no mercy, মৃত্যুই তার উপযুক্ত দণ্ড!

    কমিশনার সাহেবের যুক্তি খণ্ডন করবার মতো কোনো তথ্য আমার হাতে ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত চুপ করেই ছিলাম। হয়তো ওঁর কথাই ঠিক। এই খুনী লোকটাকে আমি যা দেখাতে চেয়েছি, সেটা সে নয়। মানুষের অন্তরের কাছে তার কোনও দাবি নেই। তবু পরদিন সকালবেলা আবার যখন গিয়ে দাঁড়ালাম তার সেল-এর সামনে, আর সে চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে,—তার বিশাল দেহের সঙ্গে অত্যন্ত বেমানান, ভীরু ভাবলেশ- বর্জিত ছোট ছোট দুটি চোখ,—আমার কেবলই মনে হতে লাগল, কোথায় যেন একটা ভুল রয়ে গেছে।

    ফাঁসির দিন ধার্য হল। তার কদিন আগে যথারীতি জিজ্ঞাসা করা হল আসামীকে, কাউকে দেখতে চাও?

    মংখিয়া বলল, অনেক দ্বিধা সঙ্কোচের পর, আমার মাকে যদি একবার—। সরকারী ব্যবস্থায় পাঁচ-ছ’-দিনের মধ্যেই তার মাকে নিয়ে আসা হল। সেই শীর্ণকায়া পার্বত্যরমণীর দিকে একবার তাকিয়েই বুঝলাম বার্ধক্য তাঁর দেহকে নুইয়ে দিলেও মনকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁকে দেখে একথা মনে হল না যে, তাঁর একমাত্র উপযুক্ত পুত্র এবং সংসারের একমাত্র অবলম্বন আজ মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্মরণ করেছে। জেল-গেট থেকে দুর্বল কিন্তু অবিচল পদক্ষেপে সেল-চত্বরে গিয়ে দাঁড়ালেন।

    ফাঁসি-ডিগ্রির লৌহকপাট খুলে দেওয়া হল। ফাঁসির আসামী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেই দিকে। কাছে গিয়ে বললাম, বাইরে এসো। তোমার মা এসেছেন।

    অতি সন্তর্পণে সিঁড়ি বেয়ে উঠানে নেমে এল মংখিয়া। নত হয়ে হাত দুটো বাড়িয়ে ধরতে গেল তার মায়ের পা দুটো। চোখের নিমেষে দু-হাত ছিটকে পিছিয়ে গেলেন মা। হাত নেড়ে নিষেধের সুরে কি যেন বলে উঠলেন ক্রুদ্ধ তীক্ষ্ণ পাহাড়ী ভাষায়। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল দোভাষী চাকমার গম্ভীর কণ্ঠ—Don’t touch me; you are a sinner.

    পরমুহূর্তেই কেমন কোমল হয়ে গেল বৃদ্ধার জড়িত স্বর। ডান হাতখানা উপরে তুলে বিড়বিড় করে বললেন, তথাগত তোমার মঙ্গল করুন।

    মংখিয়া মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল সদ্য-তিরস্কৃত শিশুর মতো। দু-চোখের কোণ বেয়ে নেমে এল জলধারা। চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। মানুষ—জীবন্ত নয়, চিত্রার্পিত। তাদের সচকিত করে আবার শোনা গেল বৃদ্ধার সুস্পষ্ট তীক্ষ্ণ স্বর—কী চাও তুমি আমার কাছে?

    মংখিয়া চোখ তুলে তাকাল। ভগ্নকণ্ঠে বলল, চাইবার আমার কারও কাছেই কিছু নেই, মা। সেজন্য তোমায় ডাকিনি। একটা কথা শুধু বলে যাবো, তাই তোমায় কষ্ট দিয়েছি। মা অপেক্ষা করে রইলেন। ক্ষণিক বিরতির পর আবার শুরু করল মংখিয়া, আমি যখন আর থাকবো না, আমাদের বাড়ির সামনে যে জমিটুকু আছে, যেখানে সে দাঁড়িয়ে থাকত, ঝুম্ থেকে ফিরতে যেদিন দেরি হত আমার, সেইখানে, ঠিক্ সেই জায়গাটিতে একটা বটের চারা লাগিয়ে দিও। দেখো জল দিতে যেন ভুল না হয়। তারপর গাছ যেদিন পাতা মেলতে শুরু করবে, একটু মাটি দিয়ে গোড়াটা বাঁধিয়ে দিও। রোজ সন্ধ্যাবেলা তার নাম করে একটা করে বাতি জ্বেলে দিও সেই বেদির ওপর। মেয়েটা যদি বাঁচে, একটু বড় হলে তারই হাতে ছেড়ে দিও এ কাজের ভার। বোলো, এটা তার বাবার শেষ ইচ্ছা। মা, (চমকে উঠলাম তার সেই ডাক শুনে) এইটুকু, শুধু এই কাজটুকু আমার জন্যে তোমরা পারবে না?

    কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল মংখিয়ার। চোখ দুটো দু-হাতে চেপে ধরে ছুটে চলে গেল তার নির্দিষ্ট সেল্-এর মধ্যে

    আরও কিছুক্ষণ তেমনি নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন তার মা। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ালেন ফিরে যাবার পথে। হঠাৎ মনে হল পা দুটো তার কেঁপে উঠল। শুধু পা নয় সমস্ত শরীর। গুণধর চাকমা ছুটে এল। তার সঙ্গে একজন ওয়ার্ডার। তাদের প্রসারিত হাতের উপর লুটিয়ে পড়ল তপঃক্ষীণা বৃদ্ধার সংজ্ঞাহীন শীর্ণ দেহ।

    ।। দ্বিতীয় পৰ্ব সমাপ্ত।।

  • এক

    এক

    সংসারে ‘শেষ’ বলে যে একটা কথা আছে, সে শুধু কথার কথা। আসলে শেষ হয় না কিছুই। বীজের মধ্যে যেমন নবাঙ্কুর, শেষের মধ্যে তেমন নবারম্ভ। জীবনটাকে নাটক বলতে চান, বলুন। আমার আপত্তি শুধু এক জায়গায়—সে নাটকে ‘মূর্ছা ও পতন’ যতই থাক, যবনিকা-পতন নেই। তার অগণিত দৃশ্য জুড়ে কেবল অন্তহীন ‘প্রবেশ’ ও ‘প্রস্থান’। এই আমাকে দিয়েই দেখুন। জেলখানার লোক আমি। কারা-রক্ষা এবং কয়েদী-শাসন আমার একমাত্র পবিত্র ধর্ম। একদিন কী দুর্মতি হল! শাসনদণ্ড সরিয়ে রেখে তুলে নিলাম লেখন-দণ্ড। তারপর যেদিন ভুল ভাঙল, দেখলাম, আগাগোড়া সবটাই আমার লোকসানের পালা। না পেলাম লেখকের খ্যাতি, না জুটল শাসকের খেতাব। শুধু কি তাই? সরকারী আপিসের সতীর্থেরা হুঁকো বন্ধ করলেন, সাহিত্য-বাসরের স্বজাতিরা জাতে তুললেন না। বাঁয়ে ভ্রুকুটি, ডাইনে নাসিকা-কুঞ্চন। হাড়ে হাড়ে বুঝলাম, সরকারী চাকরির তকমা বুকে ঝুলিয়ে লক্ষ্মীর উপাসনায় বাধা নেই, কিন্তু সরস্বতীর কমলবনে প্রবেশ নিষেধ।

    গিরীনদা বলতেন, বক আর কচ্ছপে কোনদিন মিল হয় না। জোর করে মেলাতে গেলে যা দাঁড়ায়, সুকুমার রায় তার নাম দিয়েছেন বকচ্ছপ। সে এক আজব জীব, নাইদার বার্ড নর বীস্ট। কোনো দলেই তার জায়গা নেই।

    তাই মনে মনে স্থির করেছিলাম, এইখানেই শেষ হোক। আমার এই তামসলোকের অন্তরাল থেকে যে দু-চারটি বর্ণহীন ছবি নিতান্ত খেয়ালের বশে একদিন তুলে ধরেছিলাম মুক্ত দুনিয়ার মানুষের কাছে, তার উপর নেমে আসুক সমাপ্তির যবনিকা। যে পথটা ধরেছিলাম, সেটা আমার নেশাও নয়, পেশাও নয়, ক্ষণিকের খেয়াল মাত্র। তার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। ফলও পেয়েছি হাতে হাতে। অতএব রইল আমার লেখনী। ব্যাটনের জয় হোক।

    কিন্তু হল না। আবার আমাকে আসতে হল। আবার এসে খুলতে হল লৌহকপাটের নিষিদ্ধ অর্গল। কেন? তা আমি জানি না। নিজেকে বারংবার প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর পাইনি। এইটুকু শুধু জানি, যে কথা প্রথমেই বলেছি—অবসান বলে কোনো শব্দ নেই বিধাতার অভিধানে।

    প্রত্যক্ষ কারণ না থাক, একটা কিছু আছে, যাকে উপলক্ষ্য করে এই পুনশ্চের আবির্ভাব। আপাতদৃষ্টিতে সেটা একখানা চিঠি। ‘চিঠি’ বললে তাকে বাড়িয়ে বলা হবে। খাতা থেকে ছিঁড়ে-নেওয়া এক টুকরো কাগজে কয়েকটি মাত্র লাইন। তার মধ্যে—

    যাক; সে কাহিনী যথাস্থানে বলব। আপাতত আরো খানিকটা পিছনে সরে গিয়ে গুরুদাসবাবুর প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করা যাক

    গুরুদাস সমাদ্দার ছিলেন কোর্ট-ইন্সপেক্টর। অর্থাৎ পদে পুলিস, পেশায় মোক্তার। কোমরে রিভলবার বেঁধে ঘোড়া বা জীপ ছুটিয়ে ডাকাত ধরবার ব্যর্থ চেষ্টা কিংবা ডজনখানেক কাঁদুনে গ্যাস ইষ্টকবর্ষী জনতার উপর লাফিয়ে পড়া—এই সব বড় বড় পুলিসী ব্যাপার তাঁর কার্য-তালিকার বাইরে। তাঁর একমাত্র বড়াইয়ের ক্ষেত্র ফৌজদারী কোর্ট এবং হাতিয়ার ইণ্ডিয়ান পিনাল কোড়। আসল উকিল-মোক্তারদের সঙ্গে কোর্টবাবুদের তফাত শুধু পোশাকের। তাঁদের সাদা পেন্টুলন, কালো কোট, আর ওঁর ছিল খাকী টিউনিকের উপর স্যাম-ব্রাউন বেল্ট, তার উপর ক্রাউন-মার্কা হেলমেট। এই জাঁদরেল পরিচ্ছেদে সজ্জিত হয়ে পালিশ-উঠে-যাওয়া নড়বড়ে টেবিলের উপর বিপুল মুষ্ট্যাঘাত করে যখন হুঙ্কার ছাড়তেন—ইওর অনার, কে বলবে ল কলেজ দূরে থাক, একটা সাধারণ কলেজের চৌকাঠও কোনোদিন লঙ্ঘন করে নি সমাদ্দার সাহেব। সাবেকী আমলের এনট্রান্স-ফেল। ভগ্নীপতি ছিলেন দারোগা। তাঁরই তদবিরের জোরে এল. সি. অর্থাৎ লিখিয়ে-কনেস্টবল রূপে প্রথম প্রবেশ। তারপর ক্রমে ক্রমে জমাদার এবং ছোট ও বড় দারোগার সিঁড়িগুলো অতিক্রম করে কাঁচাপাকা গোঁফ এবং মাথাজোড়া টাক নিয়ে কোর্টবাবুর গদি। সংক্ষেপে এই হল সমাদ্দার সাহেবের চাকরি-জীবনের ইতিবৃত্ত।

    কোর্ট-পুলিসের দপ্তরে বড় থেকে ছোট সকলেই ইন্সপেক্টরবাবুর মতো হাফ-পুলিস। পোশাক আছে, প্রতাপ নেই। হাবিলদার বা সিপাই যে কজন থাকে তাদের ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে, রিজার্ভ লাইনের ধাক্কা কিংবা কোতোয়ালি থানার ধকল সইতে পারে নি বলেই ওইখানটা ওদের শেষ পরিণতি। একজন সুরসিক হাকিমকে একবার বলতে শুনেছিলাম, কোর্ট-পুলিসের ক্যাম্প হল পুলিস-ফোর্সের পিঁজরাপোল। কথাটার মধ্যে অতি-ভাষণ হয়তো কিছু আছে, কিন্তু সত্যের অপলাপ নেই।

    কোর্টবাবুর এই ক্ষুদ্র বাহিনীই হচ্ছে জেল আর পুলিসের ভিতরকার সূক্ষ্ম হাইফেন। নটা বাজবার আগেই কোনোরকমে একটা উর্দি চড়িয়ে হাবিলদার আর তার জনকতক অনুচর জোড়া কয়েক হাতকড়া এবং একটা মোটা দড়ি হাতে নিতান্ত ঢিলেঢালা মেজাজে পান চিবোতে চিবোতে উঠবে গিয়ে জেল-অফিসের বারান্দায়। কেউ কেউ আবার সেইখানেই একটু গড়িয়ে নেয়। মাঝে মাঝে রাইটারদের* তাগিদ দেয়, লাট সাহেবদের খানা হল? লাট সাহেব মানে ঐদিন যারা কোর্টে যাবে সেই সব হাজতী আসামী। হাজতের মেট যথাসময়ে তাদের হাজির করবে জেল ডেপুটিবাবুর সেরেস্তায়। নাম ডাকা হবে ওয়ারেন্ট ধরে ধরে। তারপর একটা হাতকড়ায় দুজন দুজন করে গেঁথে এবং কোমরে দড়ি জড়িয়ে হাবিলদার সাহেব সদলবলে যাত্রা করবেন কাছারির উদ্দেশে।

    [*Writer অর্থাৎ লেখাপড়া-জানা কয়েদী, যারা আপিসের কাজে সাহায্য করে।]

    এই বিচিত্র প্রসেশন যখন রাস্তা দিয়ে চলে, কৌতূহলী পথিক পাশ কাটিয়ে যাবার সময় একটু মুচকি হেসে মন্তব্য করে তার সঙ্গীর কানে কানে, কতগুলো চোর যাচ্ছে দেখেছ? ‘চোরে’রা সে-সব বড় একটা গায়ে মাখে না। গল্প করতে করতে এগিয়ে যায়। বড় জোর গায়ের চাদর দিয়ে মাথাটা ঢেকে নেয়, চেনা লোকের চোখ এড়াবার জন্যে।

    কোর্ট-হাজতের খবরদারি এবং দরকারমত সেখান থেকে আসামীদের নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন কোর্টের কাঠগড়ায় তোলা—সে-সবও ওদের কাজ-এই হাবিলদার আর তার দলবল। তারপর দিনের শেষে ওরাই আবার দড়ি-বাঁধা প্রসেশন নিয়ে জেলখানার পথ ধরে। শোভাযাত্রা এক হলেও; যাত্রীরা সব এক নয়। সকালবেলা যারা এই পথ ধরে গিয়েছিল, তাদের কারও কারও ভাগ্যে জুটেছে মুক্তি, তার জায়গা পূরণ করেছে নতুন মুখ।

    এ দৃশ্য অনেক দিন আমার নজরে পড়েছে এবং প্রতিবারই নিজের মনকে প্রশ্ন করেছি, চোর ডাকাত খুনী বদমাশ পকেটমারদের এই যে বিচিত্র মিছিল, এদের চেয়ে শান্তিপ্রিয় জীব আমাদের সভ্য এবং ভদ্রসমাজে আছে কি? ইচ্ছা করলেই যে-কোনো মুহূর্তে গুরুদাসবাবুর পিঁজরাপোলের ওই কৃষ্ণের জীবকটিকে ধূলিসাৎ করে ওরা মুক্ত বিহঙ্গের মতো উধাও হয়ে যেতে পারে। যায় না কেন, তার কারণ বোধ হয় ওই নিরীহ মানুষ কটার উপর এদের এক ধরনের অদ্ভুত অনুকম্পা। এই ‘চোর’-গুলোর হাতেই যে তাদের প্রহরী-বাহিনীর অন্নের থালা।

    সেইদিনকার কথাই বলি। সাতটা বেজে গেছে। জেলখানার নৈশ আপিস সরগরম। ডেপুটি জেলার রতনবাবুর হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে—নাম কেয়া? বাপকা নাম? কাঁহা ঘর? চীজ বাতাও—। নবাগত আসামী এবং কয়েদীদের নাম-ধাম মিলিয়ে নিচ্ছেন ওয়ারেন্টের সঙ্গে এবং তারই উপর লিখে নিচ্ছেন ওদের চীজ অর্থাৎ কাপড়-চোপড় জিনিসপত্রের তালিকা। পাশের ঘরে বসে আমি ক্যাশবুক চেক করছি। টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে হেডক্লার্ক এগিয়ে ধরছেন ভাউচার এবং অন্যান্য কাগজপত্র। ‘সুপার’-এর রবারস্ট্যাম্প যেখানে যেখানে আছে, তার নীচে ছোট্ট করে লিখে দিচ্ছি একটা করে এম. সি. মলয় চৌধুরীর সংক্ষিপ্তসার। কাল সকালবেলা সই করবার সময় ওই ধোবী-মার্কটুকু না দেখলে আমার মেজর আই. এম. এস. মনিব ওই মোটা খাতাটা ছুঁড়ে মারবেন হেডক্লার্কের মুখের উপর। হাজার দেড়েক টাকার বিনিময়ে এই জেলখানায় কর্তৃত্ব গ্রহণ করেই তিনি আমাদের কৃতার্থ করেছেন। তার উপরে আবার দায়িত্ব? অসম্ভব। সে বোঝা বইবে এই তিনশো টাকার জেলার। তারই নিদর্শন ঐ এম. সি.। ওই দুটো তুচ্ছ অক্ষরের খুঁটির উপর ভর করেই তিনি অন্ধবেগে চালিয়ে যাবেন তাঁর মূল্যবান স্বাক্ষরের এঞ্জিন। ওইটুকু দেখতে পেলেই তিনি নিশ্চিন্ত। জানবার, বুঝবার, ভাববার তাঁর কিছুমাত্র প্রয়োজন নেই।

    গুড ঈভনিং, মিস্টার চৌধুরী।

    গুড্‌ ঈভনিং। আসুন, আসুন। এত রাত্তিরে, কী ব্যাপার?

    গুরুদাসবাবু চেয়ারটা টেনে নিয়ে তার উপর গা এলিয়ে দিয়ে মুখে একটা শব্দ করে বললেন, পুলিসের আবার রাত্তির! আসামী নিয়ে এলাম।

    আসামী নিয়ে! আসামীরা আজকাল ইন্সপেক্টরের কাঁধে চড়ে আসে নাকি!

    ইন্সপেক্টর তো ছার! তেমন তেমন আসামী আই. জি. পুলিসের ঘাড়েও চড়ে!

    উত্তরে একটা কী বলতে যাচ্ছিলাম, দরজার দিকে নজর পড়তে থেমে গেলাম। হাবিলদারের সঙ্গে যাকে ঢুকতে দেখলাম, তিনি আসামী নন–আসামিনী। চলবার ভঙ্গিটা বেশ সপ্রতিভ। বেশভূষা সাধারণ। কিন্তু তার মধ্যে রুচির পরিচয় আছে। স্ত্রী-জাতির বয়স নির্ধারণে আমি চিরদিন ভুল করে থাকি। তবে এই মেয়েটির তারুণ্য সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই। সমাদ্দার বসেছিলেন দরজার দিকে পিছন করে। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন এবং বিরক্তির সুরে বললেন তাঁর হাবিলদারকে লক্ষ্য করে, এখানে আনতে কে বলল তোমাকে? ও ঘরে নিয়ে যাও।

    ওরা সরে যাবার পর সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাইলাম সমাদ্দারের দিকে। উনি জবাব দিলেন—একরারী আসামী। থানা থেকে পাঠিয়েছিল কনফেশন রেকর্ড করবার জন্যে। করে ফেললেই ঢুকে যেত। কিন্তু আমার এস. ডি. ও সাহেব এক ফ্যাকড়া তুললেন। কোথায় নাকি কী গোলমাল আছে! যে অপরাধ ও নিজের ঘাড়ে নিতে চাইছে আসলে সেটা ও করেছে কিনা সন্দেহ। আমার ওপর হুকুম হল, নিজে সঙ্গে করে রেখে আসুন জেলখানায়। আরও খানিকটা ভাবতে দিন। আপনাকেও বলতে বলেছেন সাবধানে- টাবধানে রাখতে, কেউ আবার বিগড়ে না দেয়!

    গলা খাটো করে চোখে অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত যোগ করলেন গুরুদাসবাবু, আসল ব্যাপার তো বুঝতেই পারছেন। সেই চিরন্তন রূপের খেলা। কিন্তু বাইরে যারা ভোলায় ভেতরে তারা ফাঁসায়—এ জ্ঞান তো এখনও হয় নি। হাকিম হলেও বয়স অল্প।

    কেসটা কী? —খুট-টুন নাকি? মাঝখানে প্রশ্ন করে বসলাম।

    খুন না হলেও তার চেয়ে এককাঠি সরেস। ব্ল্যাকমেলিং। রূপের ফাঁদ পেতে রূপো ধরার ফন্দি।

    ভালো ব্যবসা। কিন্তু কনফেস্ করছে কেন?

    কী জানি মশাই! জড়িয়ে-টড়িয়ে পড়েছে হয়তো কারও সঙ্গে। যাক, আপনি কাজ করুন। আমি উঠি। হাকিম না ছাড়লে কাল সকালেই আবার ছুটতে হবে তো। চাকরি মন্দ হয় নি, কী বলেন? মুখে বিরক্তির ভাব দেখিয়ে খুশী মনেই প্রস্থান করলেন সমাদ্দার

    সাহেব।

    মিনিট কয়েক পরেই সেই হাবলিদার এসে জানাল, মেয়েটি আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আনতে বলে দিলাম। স্বচ্ছন্দ লঘু পায়ে এগিয়ে এসে, বাধা দেবার আগেই পায়ের ধুলো নিয়ে হাসিমুখে বলল, আপনি এখানে কবে এলেন?

    তুমি চেন নাকি আমাকে? বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞাসা করলাম।

    বাঃ, চিনি না? সে চেহারা নেই। তবু ঘরে ঢুকেই আমি চিনতে পেরেছি।

    একটু থেমে আবার বলল, আপনার নিশ্চয়ই মনে নেই আমার কথা! কেমন করে থাকবে? কত বছর হয়ে গেল!— কেমন একটা উদাস সুর লাগল ওর শেষের কথাটায়। মুখের উপর ঘনিয়ে এল কোন দূরাগত অতীত দিনের ছায়া। আমি তখন প্রাণপণে হাতড়ে চলেছি মনের মধ্যে, কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না—কবে কোথায় যেন দেখেছি, ওই টানা ভ্রূর তলায় ভাসা-ভাসা চঞ্চল দুটি চোখ, বাঁ দিকের গালে ছোট্ট সুন্দর একটি তিল, পাতলা ঠোঁটের নীচে অপরূপ চিবুকের রেখা।

    কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল মেয়েটি। হয়তো বুঝতে চাইল, আমি চিনতে পেরেছি কি না। তারপর বলল, তখন আপনি কুমিল্লায়। সভাপতি হয়ে গিয়েছিলেন মণিমেলার বার্ষিক উৎসবে। একটা মেয়ে কপালে চন্দন আর গলায় বেলফুলের গোড়ে দিয়ে বরণ করেছিল, মনে পড়ে? তারপর আপনার পাশটিতে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছিল—”বন্দী বীর”। খুব সুখ্যাতি করেছিলেন আপনি!

    ও–ও, তুমি সেই অপর্ণা।

    নামটা এখনও মনে আছে আপনার! বিস্ময়ে আনন্দে উচ্ছল কণ্ঠে বলে উঠল মেয়েটি। অথচ মানুষটিকে ভুলে গেছি। তাই হয়। নাম ঠিকই থাকে, মানুষ বদলে যায়। … কী করব, বলো? কোথায় সেই রোগা ছিপছিপে দশ-এগারো বছরের ফ্রকপরা মেয়ে, আর কোথায়—

    পূর্ণাঙ্গ-যৌবনা অপর্ণার দিকে চেয়ে কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলাম। সুন্দর মুখখানা নেমে এল নীচের দিকে এবং তার উপর ছুটে এল একঝলক রক্তের আভা। প্রসঙ্গটার মোড় ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, এবার সবটাই মনে পড়েছে। সভার মাঝখানে হঠাৎ ঝড় এসে পড়ায় খুব বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন। সভাপতির ভাষণটা আর দিতে হয় নি।

    কিন্তু ভাষণের বদলে একদল শ্রোতাকে গাড়ি করে পৌঁছে দিতে হয়েছিল। বলে খিলখিল করে হেসে উঠল অপর্ণা।

    তাতে বরং লাভই হয়েছিল সভাপতির। চা আর গরম গরম পাঁপরভাজা খাইয়েছিলেন তোমার মা।

    ইশ! মার কথায় বুঝি রাজী হয়েছিলেন আপনি? কত সাধাসাধি! কিছুতেই খাবেন না। তারপরে বলে বসলেন, অপর্ণা যদি করে দেয়, তবে খেতে পারি। আমি তো ভয়ে মরি। চা করতে কি শিখেছি তখন! দুধ আর চিনি দুটোই বেশি দিয়ে ফেলেছিলাম। আপনি কিন্তু বলেছিলেন, খুব সুন্দর হয়েছে।

    বলেছিলাম নাকি?

    আরও কী কী বলেছিলেন, সব আমার মনে আছে। কাছে ডেকে আমার পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, বড় হয়ে কী হতে চাও? আমি সঙ্গে সঙ্গে জোর গলায় জবাব দিয়েছিলাম, ডাক্তার। আপনি আমার মুখের দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, ডাক্তার কেন, তুমি হবে রাজরানী। হেসে উঠেছিলাম, রাজরানী! হ্যাঁ, এমনই একটা ছোট রাজ্যের রানী—বলে আমাদের সেই সাজানো ঘরখানা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন কিন্তু আপনার কথার ঠিক মানেটা ধরতে পারি নি। তবু ভারি মিষ্টি লেগেছিল, ছোটদের জন্য লেখা আপনার সেই গল্পগুলোর মতো। আমার চেয়েও খুশী হয়েছিল মা। আস্তে আস্তে কেমন ধরা-ধরা গলায় বলেছিল, সেই আশীর্বাদ করুন। আমি যেন দেখে যেতে পারি। বড় হয়ে বুঝলাম, আমার মনের কথাই বলেছিলেন সেদিন। বোধ হয় সব মেয়ের মনের কথা। একটি ছোট্ট রাজ্য, একান্তভাবে আমার, আমি তার রানী। এর চেয়ে বড় সাধ আর কী আছে মেয়েদের জীবনে! কিন্তু কই, আপনার সে আশীর্বাদ তো ফলল না!

    অপর্ণার মৃদুকণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল। ভিজে উঠল চোখের পাতা। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে মৃদু হাসি টেনে এনে বলল, আপনার কাজের ক্ষতি হল, এবার আমি যাই। কাল সকালে একবার আসতে পারব?

    বললাম, সকালে আমি বড্ড ব্যস্ত থাকি।

    তা হলে বিকালে?

    কাল তো তোমার কোর্টে যাবার দিন।

    তা হোক, তবু আপনার কাছে আসতেই হবে একবার। আমার যে অনেক কথা বলবার আছে।

    একটুখানি অপেক্ষা করল। তারপর বোধ হয় আমার থেকে কোন সাড়া না পেয়ে তরল কণ্ঠে বলল, আচ্ছা সত্যি বলুন তো, দশ বছর আগে সেই যে আমাকে দেখেছিলেন, তারপরে কেমন করে কোন্ পথ ধরে এখানে এসে দাঁড়ালাম, সে-সব কথা জানতে আপনার একটু ইচ্ছে হচ্ছে না?

    তোমার বাবা কি ওখানেই আছেন?

    জানি না।

    মা?

    মা নেই।

    দেখে মনে হচ্ছে, তুমি খুব ক্লান্ত। এখন যাও, যা হোক কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ো গে।

    আমার কথার জবাব না দিলে আমি কখনো যাব না। ছেলেমানুষের মতো মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে অভিমানের সুরে বলল অপর্ণা।

    হাসবার চেষ্টা করে বললাম, কী জবাব দেব, বলো? এটা তো বুঝতেই পারছি, এখানে যখন এসে পড়েছ, যে পথ দিয়ে এসেছ, সেটা সরল নয়, সুখেরও নয়। তার বেশী জেনে আর কী লাভ?

    উত্তরে একটা কী বলতে যাচ্ছিল অপর্ণা, পিছনে বুটের আওয়াজ শুনে থেমে গেল। সশব্দে ঘরে ঢুকল চীফ হেডওয়ার্ডার। বুট এবং সেলাম ঠুকে রিপোর্ট দাখিল করল—বাষাট্ আদমি কাছারিসে আয়া। একষাট্ বন্ধ হো গিয়া। আউর—। রিপোর্ট অসমাপ্ত রেখে তাকাল অপর্ণার দিকে। বললাম, ওকেও নিয়ে যাও। জমাদারনীকে একবার-

    জমাদারনী হাজির হ্যায়, হুজুর

    সিনিয়র ফিমেল ওয়ার্ডার পিছনেই ছিল। এগিয়ে এসে সেলাম করল। জিজ্ঞাসা করলাম, খাবারদাবার আছে তো?

    আছে, বাবা। এক ফাইল ভাত, দুটো কম্বল, থালা বাটি সব ঠিক আছে।

    অপর্ণার দিকে তাকালাম। ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল এবং আর কোন কথা না বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল জমাদারনীর সঙ্গে।

    .

    সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত দশ বছর পিছনে ফেলে-আসা একটি কালবৈশাখী সন্ধ্যা আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল। মণিমেলার উৎসব। প্রধান উদ্যোক্তা একদল কিশোর-কিশোরী। নিমন্ত্রণপত্রে সময় রয়েছে চারটে। সওয়া চারটেয় গিয়ে দেখি, সভামণ্ডপের সাজ-সজ্জা সবে শুরু হয়েছে। সভাপতির মঞ্চের চারদিকে রঙিন কাগজের শিকল জড়ানো তখনও শেষ হয় নি। অগত্যা কাছাকাছি এক ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় আশ্রয় নিলাম। ছেলেমেয়েদের অবাধ্যতা এবং সেই সঙ্গে জিনিসপত্রের দুর্মূল্যতা সম্বন্ধে গবেষণা চলতে লাগল। ঘণ্টাখানেক পরে ডাক পড়ল। যথারীতি মালাদান এবং বরণ ইত্যাদির পর কার্যসূচীর প্রথম দফা ঘোষণা করতে যাচ্ছি, একটি পাণ্ডা-স্থানীয় ছেলে কানে কানে জানিয়ে দিল, উদ্বোধন-সঙ্গীত গাইবে যে মেয়েটি, হঠাৎ সর্দি লেগে তার গলাটা বসে গেছে, আধঘণ্টা সময় নিয়েছেন ডাক্তার। বিকল্প হিসাবে আর কাউকে পাওয়া যাবে কিনা, প্রস্তাব করতেই ছেলেটি হেসে বলল, তা কী করে হয়, স্যার? এক মাস ধরে কত আশা করে রিহার্সাল দিচ্ছে নমিতা!

    অতএব নিরুপায়। গায়িকার গলা বসে গিয়ে সভাকেও একেবারে বসিয়ে দিয়ে গেল। আধ ঘণ্টা পরে নমিতার গলার সুরের আলো যেমন জ্বলে উঠেছে, বিদ্যুতের আলো গেল নিবে। শুরু হল হট্টগোল। তার মধ্যে নিঃশব্দে বসে আছি। সেই ছেলেটি এসে বার বার বিনয় প্রকাশ করতে লাগল, আপনার বড় কষ্ট হল, স্যার। আর পাঁচ মিনিট। হঠাৎ পাশ থেকে কলকণ্ঠে বলে উঠল একটি কিশোরী, তাতে আর কী হয়েছে! সেবার তো এর চেয়েও কষ্টে পড়েছিলেন বর্ধমানে।

    খবরটা জানা ছিল না। জানতে চাইলাম, কোন্ বার?

    কেন, আপনার গল্পেই তো আছে! পাঁচটায় সভা, গিয়ে দেখেন কেউ নেই, সব লোক গেছে সার্কাস দেখতে। প্রথম শো ভাঙবার পর নটার সময় শুরু হল ফাংশান। তারপর—বেশ লিখেছেন কিন্তু—’সারারাত আর কোন খাবার না জুটলেও একটা জিনিস প্রাণভরে খেয়েছিলাম। সেটা হচ্ছে মশার কামড়।’

    চপল কণ্ঠের মিষ্টি হাসির রোল ভরে দিল অন্ধকার সভামঞ্চ। মনে পড়ল, উত্তর পুরুষের জবানিতে এইরকম একটা গল্প লিখেছিলাম বটে কোন এক ছেলেদের মাসিক পত্রে। কিন্তু গল্প যে শুধু গল্প, সেটা আর যেখানেই হোক, এই বয়সের ছেলেমেয়েদের বোঝাতে যাওয়া বিড়ম্বনা। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, কোথায় যেন পড়েছিলাম, একজন খ্যাতনামা আধুনিক সাহিত্যিকের কথা। বলছেন, নিজেকে নায়ক করে প্রেমের গল্প লেখার বিপদ অনেক। বন্ধুরা একবর্ণও বিশ্বাস করে না, কিন্তু গৃহিণী সবটাই বিশ্বাস করে বসেন।

    এ বিষয়ে আমার নিজের অভিজ্ঞতাও কম করুণ নয়। সাম্প্রতিক ঘটনা। প্রৌঢ় বয়সে যৌবনের স্মৃতি মন্থন করতে গিয়ে একটি চঞ্চলা পাহাড়ী কিশোরীকে আশ্রয় করে কিঞ্চিৎ রোমান্স সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। বন্ধুরা অনেক অনেক সরস মন্তব্য করেছেন। সহাস্যে উপভোগ করেছি। হঠাৎ একদিন আমার কলেজ-গামী পুত্রের জনৈক সহপাঠী এসে সাগ্রহ প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা জ্যাঠামশাই, কার্শিয়াং স্টেশনে সেই যে চলে গেল, তারপর কাঞ্ছির সঙ্গে আর আপনার দেখা হয় নি?’

    তাই বলছিলাম, উত্তম পুরুষের বিপদ সর্বত্র। যাক সে কথা।

    যথাসময়ে অর্থাৎ বিজ্ঞাপিত সময়ের ঘণ্টা দুই পরে সভার কাজ শুরু হল। দেড়-হাত লম্বা ঠাসবুনানি প্রোগ্রাম। মাঝামাঝি পৌঁছবার আগেই চারদিক আঁধার করে এল ঝড়। সঙ্গে সঙ্গে আর-এক দফা আলো নেভার পালা। উঠব কি উঠব না স্থির করবার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বৃষ্টি।

    আমার আসন ছিল একটা বারান্দায়। তার সামনে খোলা উঠোনে শামিয়ানা টাঙিয়ে শ্রোতাদের বসবার জায়গা। কড়কড় শব্দে কোথায় বাজ পড়ল। তার সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঝলসানো বিদ্যুৎচমক। সেই আলোতে দেখলাম, সভার চিহ্নমাত্র নেই। কয়েকটি ছেলেমেয়ে, ওদের ভাষায় মণি-ভাইবোন শুধু বসে আছে আমার চারদিক ঘিরে। বাজ পড়ার শব্দে একেবারে গা ঘেঁষে এগিয়ে এল। এরাই বোধ হয় সভার উদ্যোক্তা। তাই সভাপতিকে ফেলে পালাতে পারে নি, কিংবা দূরের বাসিন্দা বলে পালানো সম্ভব হয় নি।. সেই ছেলেটিকে লক্ষ্য করলাম। তার দায়িত্বই তো সবচেয়ে বেশী। কী একটা বলতে এসেছিল, এমন সময় শোনা গেল একটি কিশোরী কণ্ঠের আবদার—একটা গল্প বলুন না? চারদিক থেকে সমবেত সমর্থনে আমার ক্ষীণ আপত্তি তলিয়ে গেল। শুধু সমর্থন নয়, তার সঙ্গে সংশোধন—বেশ বড় গল্প কিন্তু, আর বেশ মজার।

    অতএব শুরু হল গল্প। অন্ধকারে শ্রোতৃবৃন্দের মুখ দেখা গেল না, কিন্তু আমার মুখের উপর অনুভব করলাম তাদের উজ্জ্বল চোখের নীরব স্পর্শ।

    গল্প যখন শেষ হল, ঝড় পড়ে গেছে, কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হয় নি। আমার সঙ্গে একটা ঘোড়ার গাড়ি ছিল। ভুলেই গিয়েছিলাম এতক্ষণ। এবার গাড়োয়ানের তাগিদে সজাগ হয়ে উঠলাম। সেই ছেলেটি, বোধ হয় ‘মধ্যমণি’, সবিনয়ে প্রস্তাব করল আমার পাড়ার কাছাকাছি থাকে এমনি গুটিকয়েক ছেলেমেয়েকে পৌঁছে দেবার ভার আমাকে বহন করতে হবে। না করে উপায় কী! কিন্তু গাড়োয়ান বেঁকে বসল এবং ডবল বসশিশ কবুল না করা পর্যন্ত সোজা হল না।

    দুর্গা বলে রওনা দেওয়া গেল। তখন খেয়াল হয় নি, গাড়ি তো গাড়োয়ান একা চালায় না। আরও দুটি প্রাণী আছে তার সহচর। তাদের সঙ্গে কোন বন্দোবস্ত হয় নি। ফলে খানিকক্ষণ চলবার পর তারা হঠাৎ নিশ্চল হয়ে গেল; খবরের কাগজের ভাষায় যার নাম ‘অবস্থান ধর্মঘট’। শাসন এবং তোষণের মিলিত প্রয়োগ নিষ্ফল হবার পর বকশিশের মাত্রাটা আর এক টাকা বাড়িয়ে দিলাম। চালকের মুখ থেকে সে কথা শোনামাত্র তার বাহনযুগল আবার সচল হলেন। তাদের এই প্রভুভক্তিটা এমন অর্থপূর্ণ যে আমার কিশোর সহযাত্রীদের কলহাস্যে অন্ধকার নির্জন পথ মুখর হয়ে উঠল।

    সবাইকে পৌঁছে দেবার পর শেষ বাড়িটা অপর্ণাদের। ওর মা বাইরে এসে আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। তার পরের কথা আগেই কিছু বলা হয়েছে।

    ওর বাবা ছিলেন ওখানকার জজ কোর্টের উকিল। পসার এবং প্রতিষ্ঠা প্রথম শ্রেণীর। ভদ্রলোক বাড়ি ছিলেন না। আমাদেরই মতো কোথাও বোধ হয় আটকা পড়ে গিয়েছিলেন। মহিলাটির স্বাস্থ্য, বেশ-বাস, দুচারখানি দামী অলঙ্কার, যে ঘরটিতে বসেছিলাম তার সাজ- সজ্জা এবং বিশেষভাবে লক্ষণীয় তাঁর মুখের সেই পরিতৃপ্ত হাসিটুকু – এসব থেকে এক মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, পরিবারটি শুধু সম্পন্ন নয়, সুখী। অপর্ণা ওঁদের একমাত্র সন্তান। মায়ের মত সেও একদিন এমনি একটা সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্য ভরা সংসারের রাজ্যভার হাতে তুলে নেবে, সেইটাই সহজ এবং স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল। ডাক্তারের মত পরের ঘরের স্বাস্থ্য নিয়ে স্বাস্থ্যক্ষয় নয়, তার হাতে থাকবে নিজের ঘরের স্বাস্থ্য ও শ্রী ফুটিয়ে তোলার পবিত্র ভার। তাই বোধ হয় আমার মুখ থেকেই আপনিই বেরিয়ে গিয়েছিল, ডাক্তার নয়, তুমি হবে রাজরানী। তার মা খুশী হয়েছিলেন। সে নিজেও কম খুশী হয় নি। কিন্তু আমাদের সেদিনকার সেই সমবেত শুভকামনা সফল হয় নি। রাজ্যপাট পায় নি অপর্ণা। পেলেও কেড়ে নিয়ে গেছে কোন্ অলক্ষ্য অদৃষ্টের অভিশাপ! হারিয়ে গেছে রানীর সিংহাসন। ছন্নছাড়া রিক্ত বেশে আজ সে আমার রাজ্যে প্রবেশ প্রার্থিনী।

    জেলখানার লোক আমি। এই পাষাণপুরীর পাঁচিলের মধ্যে কাটিয়ে দিলাম সারাজীবন। এক জেল থেকে আর এক জেলে ঘুরেছি, আর দেখেছি মসিকলঙ্কিত মানুষের মিছিল—জীবনের রাজপথ যাদের ডাক দেয় নি, কিংবা ডাক দিয়েও সাড়া পায় নি; রিপুর তাড়না, অথবা ভাগ্যের প্রতারণা যাদের টেনে নামিয়ে নিয়ে গেছে এমন এক আঁধার সর্পিল পিচ্ছিল পথে যার শেষ প্রান্ত এই লৌহতোরণ। সে পথে চলতে গিয়ে কারও গায়ে লেগেছে পাঁক, কারও পায়ে ফুটেছে কাঁটা, নর্দমার বিষ-বাষ্পে কারও বা বিষিয়ে গেছে নিঃশ্বাস। সমাজ ও সভ্যতার লৌহ-পেষণ তাদের দেহ থেকে নিংড়ে নিয়েছে স্নেহ প্রীতি দয়া মায়া ঘৃণা লাঞ্ছনা আর শাসনের সাঁড়াশি চালিয়ে বুকের ভিতর থেকে উপড়ে নিয়েছে মানবতার শেষ অঙ্কুর। সেই বিবর্তনের গভীর চিহ্ন আমি দেখেছি ওদের মুখের প্রতিটি রেখায়। কিন্তু আমার অন্তরে আজ আর তার ছাপ পড়ে না। তার পিছনে যে ইতিহাস, তার জন্যেও জাগে না কোন কৌতূহল। অভ্যাসের বশে সেই কথাটাই জানিয়ে দিয়েছি অপর্ণার প্রশ্নের উত্তরে। মনে মনে বলেছি, যে পথ দিয়ে তুমি এসেছ, তার.সাধারণ চেহারাটা আমার চেনা। বিশেষ যেটুকু, তা দিয়ে আমার প্রয়োজন নেই। সে কাহিনী তোমার শুনতে চাই না।

    কিন্তু এইটাই কি আমার অন্তরের কথা? গভীর রাত্রির অন্ধকারে নিজের মনের সঙ্গে যখন মুখোমুখি হবার অবসর হল, পরম বিস্ময়ে দেখলাম, ওই মেয়েটার ক্লান্ত ম্লান চোখ দুটো কোথায় যেন একটু দাগ রেখে গেছে শুষ্ক-কঠিন অন্তস্তলের কোণে। দশ বছর আগে যে সুস্থ সুন্দর পরিবেশে তাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেই ছবিটা আজ চোখের উপর থেকে কিছুতেই নড়তে চাইছে না।

    পরদিন সকালেই আবার এলেন গুরুদাসবাবু। সঙ্গে নিয়ে এলেন অপর্ণাকে কোর্টে হাজির করবার ওয়ারেন্ট। আমদানী সেরেস্তার ডেপুটিবাবু যথারীতি তার ব্যবস্থা করলেন। অর্থাৎ যথাসময়ে সে চলে গেল কোর্টে। সঙ্গে গেল আমাদের একজন ফালতু ফিমেল ওয়ার্ডার। নারী-আসামীকে জেল থেকে কোর্টে পাঠাতে হলে পুরুষ-পুলিসের সঙ্গে নারী-পাহারার বিধান দিয়েছেন জেলকোড। সে শুধু প্রহরিণী নয়, সঙ্গিনী। কিন্তু ওই আসামী যখন প্রথম আসে জেলখানায় এবং তার আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে থানার ‘লক-আপ্’-এ কিংবা কোর্ট-হাজতের কোণে, তখন তার সঙ্গদান এবং নিরাপত্তার সবটুকু ভার নেয় পুরুষ কনেস্টবল।

    এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, কোন জেলের ফিমেল ওয়ার্ডে একটি সদ্য-আমদানী মুখরা মেয়ের পাল্লায় পড়েছিলাম। কাহিনী যা শুনিয়েছিল, এমন কিছু নতুন নয়। বাংলা কাগজ খুললে ওই-জাতীয় ঘটনা রোজ না হলেও প্রায়ই চোখে পড়ে থাকে। ভোরবেলা ঘুম থেকে জাগিয়ে গ্রামের বাড়িতেই ওকে গ্রেপ্তার করা হয়, কী এক বাসন চুরির মামলায়। দশ- বারো মাইল দূরে থানা। জনবিরল মাঠের মধ্য দিয়ে পথ, মাঝে মাঝে জঙ্গল। বাউরীদের ঘরের কুমারী মেয়ে। বয়স পনেরে-ষোলো। কোনোদিন গ্রামের বাইরে যায় নি। ওর বাপ বা ভাই একজন কেউ সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিসের জমাদার সে প্রার্থনা মঞ্জুর করেন নি। ওই জমাদার এবং তার একটি সিপাইয়ের হেফাজতে পড়ন্ত বেলায় যখন সে থানায় গিয়ে পৌঁছল, তখন তার কৌমার্য আর অক্ষত নেই।

    তারপর কোর্ট-হাজত। চারদিকে লালসাদীপ্ত শতচক্ষুর অভিনন্দন। একটি নিতান্ত জৈব প্রয়োজনের তাগিদ তীব্রভাবে অনুভব করলেও, মুখ ফুটে বলতে পারে এমন একখানা মুখও তার চোখে পড়ে নি। কোর্ট থেকে হাঁটিয়ে যখন তাকে জেলের দিকে নিয়ে যাওয়া হল তার আগেই সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অন্ধকারের সুযোগ পেয়ে সেই বিশেষ প্রয়োজনটি তাকে মাঠের মধ্যেই সেরে নিতে হয়েছিল। সঙ্গের পুলিসটিকে একটু সরে যেতে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু চুরির আসামীকে অরক্ষিত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া যায় কেমন করে? তাই সরে যাওয়া দুরে থাক, একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পুরুষ রক্ষী তাঁর পৌরুষ-ধর্ম পালন করেছিলেন। বাকী রাস্তাটুকু আরও যে-সব ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। কুমারী-জীবনের চরম অভিজ্ঞতা লাভ করবার পর সেগুলো সামান্য উপরি-পাওনা।

    যেদিন জেলে এল, ওর সামনেই আর একটা মেয়ে-আসামী তখন কোর্টে যাবার আয়োজন করছিল। জেলখানার ফালতু জমাদারনী অপেক্ষা করছে তাকে নিয়ে যাবার জন্যে। এই ব্যবস্থার উল্লেখ করে একদিন মেয়েটি আমাকে বলেছিল, আহা, এমনি একটা মেয়েছেলে যদি সেদিন আমার সঙ্গে থাকত, তাহলে বোধ হয় ওরা আমার-

    কথাটা তার মুখে বেধে গিয়েছিল। বাকীটুকু আর বলতে পারে নি।

    আমি বলেছিলাম, এ ব্যবস্থা তো আমরা করিনি। এটা বরাবরকার সরকারী নিয়ম।

    এর পরেই জিজ্ঞসা করেছিল মেয়েটি, ওখানে কি সরকার নেই বাবু?

    সে প্রশ্নের জবাব সেদিনও দিতে পারি নি, আজও পারি নি।

    .

    সেদিন সন্ধ্যা হবার আগেই ফিরে এল অপর্ণা। এবার সে দস্তুরমত confessing accused বা একরারী আসামী। ওয়ারেন্টের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—To be kept segregated. সবার থেকে আলাদা রাখার নির্দেশ। যে স্বীকারোক্তি সে করে এসেছে হাকিমের কাছে হলপ করে, অন্য কারও প্রভাবে পড়ে পাছে সেটা প্রত্যাহার করে বসে, তাই এই হুঁশিয়ারির ব্যবস্থা। আইনমত একটি নির্জন সেল-এ তাকে বন্ধ করা হল। বেঁচে গেল অপর্ণা। সহবন্দিনীদের সরব ও নীরব কৌতূহল তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

    পরদিন ছিল রবিবার। কিন্তু জেলখানার অফিসে রবিবার বলে কোন বস্তু নেই। আসতে হবেই। তবে খানিকটা বেলা করে ঢিলেঢালা বেশে ধীরে সুস্থে আসেন বাবুরা। মনে মনে একটা ছুটির মেজাজ আনতে চেষ্টা করেন। দুধের সাধ মেটাতে চান ঘোল দিয়ে। আমার বেলায় সেদিন রুটিন বদল হল। সকাল সকাল হাজিরা দিলাম এবং গিয়েই ডেকে পাঠালাম অপর্ণাকে।

    কাছে এসে যখন দাঁড়াল, মুখে শুধু এক ঝলক টেনে-আনা নিষ্প্রভ হাসি। ক্লান্তির মধ্যেও উচ্ছলতা দেখেছিলাম সেই প্রথম রাতটিতে, তার জায়গায় কেমন এক গভীর অবসাদ। আমার টেবিলের পাশে একটা টুল ছিল। তার উপর বসতে বলে ফিমেল ওয়ার্ডারটিকে বিদায় করে দিলাম। অপর্ণা কয়েক মিনিট নিঃশব্দে বসে রইল। তারপর হঠাৎ মনে পড়েছে, এমনি ভাবে আঁচলের খুঁট থেকে খুলে ফেলল এক টুকরো হলদে রঙের কাগজ। আমার সামনে রেখে বলল, এটা জমা দিতে ভুল হয়ে গেছে সেদিন। আপনার কাছে দিলে হবে তো?

    পড়ে দেখলাম কোর্ট-পুলিসের রসিদ। পাঁচশো টাকার প্রাপ্তি-স্বীকার। টাকার অঙ্কটা দেখে বিস্ময় লাগল। বললাম, এটা কী ব্যাপার?.

    তা তো দু-এক কথায় বোঝানো যাবে না। বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। চকিত দৃষ্টি মেলে আমার মুখের দিকে তাকাল অপর্ণা। বোধ হয় বুঝতে চেষ্টা করল—যা বলেছি সেটা নিছক পরিহাস, না সত্য! আমি হালকা সুরেই বললাম, কী করব বলো, তোমাদের সেই সভার সভাপতিগিরি করতে গিয়ে যে মারাত্মক ভুল করেছিলাম, তার শাস্তি না নিয়ে যাই কোথায়? তা নইলে জেলের মানুষ আমি, এসব দিকে মন দেবার সময় নেই, প্রবৃত্তিও নেই। তোমার মত মক্কেল তো আমার দুটো-চারটে নয় যে বসে বসে তাদের লম্বা কাহিনী শুনব!

    অপর্ণার মুখখানা, কেমন করুণ হয়ে উঠল। আঘাত পেল কি? কিংবা হয়তো ভিতরকার কোনও অবরুদ্ধ উচ্ছ্বাস ঠেকিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে। আবহাওয়াটাকে হালকা করে দেবার উদ্দেশ্যে ছদ্ম আপসোসের সুরে বললাম, কী কুক্ষণেই সেদিন জেল থেকে বেরিয়েছিলাম!

    নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে ম্লান হেসে বলল অপর্ণা, কিন্তু আপনার সেই কুক্ষণ আমার কাছে যে কী ক্ষণ নিয়ে এসেছিল, তা তো আপনি জানেন না! কতদিন ভেবেছি, আপনি আবার আসবেন। মাকে কত বিরক্ত করেছি, উনি আর আসছেন না কেন? মা বলত, তুই কি পাগল হয়েছিস্! কিন্তু আমি জানি, মুখে যাই বলুক, মাও আশা করত আপনি আসবেন। কতদিন অপেক্ষা করে যখন আর এলেন না, বারীনদাকে বলে-কয়ে তার সঙ্গে ভয়ে ভয়ে একদিন উঠলাম গিয়ে আপনার জেলখানার গেটে। শুনলাম আপনি বদলি হয়ে গেছেন। কী যে মনে হয়েছিল সেদিন! সত্যিই আর দেখা হল না!

    মনে মনে বললাম, এ দেখা না হলেই বোধ হয় ভালো হত। অপর্ণা আমার মুখের দিকে চেয়ে বোধ হয় অনুমান করল আমার মনের কথা। তারপর আবদারের সুরে বলল, আচ্ছা সত্যি বলুন তো, আমার কথা একদিনও আপনার মনে হয় নি?

    উত্তর পাবার আগেই হেসে ফেলল, শুনুন কথা! আমার মতো কত ভক্ত আছে আপনার! কত সভায় কত মেয়ে মালা আর চন্দন দিয়ে বরণ করেছে আপনাকে। সবাইকে মনে রাখা কি সম্ভব? তবু—

    কথাটা তার শেষ হল না, আমি অন্য কথা তুললাম, তোমাদের বাড়ির খবর কী বলো? কী হয়েছিল তোমার মার?

    ধরা গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে সহজ সুরেই বলল, মা মারা যায় নি। তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল।

    চমকে উঠলাম : বল কী!

    চলতি কথায় যাকে খুন বলে তা কেউ করে নি। এক কোপে মারা নয়, মাসের পর মাস ধরে তিল তিল করে মারা। তার চেয়ে গলা টিপে কিংবা গুলি করে একদিন শেষ করে দিলেই অনেক ভালো হত। যেতেই যখন হল, তখন এত দিন ধরে এত দুঃখ পেয়ে যাবার কী দরকার ছিল?

    এর পরে আর কোন প্রশ্ন করা যায় না। ওর মায়ের মুখের সেই পরিতৃপ্ত ভাবটি চোখের উপর ভেসে উঠল। মনে মনে আমিও সেদিন তৃপ্তি পেয়েছিলাম এই ভেবে, এতদিনে একটি সুস্থমনা সুখী পরিবারের দেখা পেলাম, সংসারে যা অত্যন্ত বিরল। তবে কি সবটাই আমার ভুল?

    অপর্ণার কথাতেই যেন তার উত্তর পাওয়া গেল; আপনি যখন আমাদের দেখেছিলেন, তখনকার কথা নয়। তখনও আমরা বড়লোক হই নি। কিন্তু বড় সুখ ছিল সংসারে। তার বছর দুই পরে বাবার ওকালতির পসার হঠাৎ বেড়ে গেল। অনেক টাকা পেলাম আমরা, কিন্তু বাবাকে আর পেলাম না। দিনকে দিন তাঁর নতুন রূপ। রাত করে ফেরেন। প্রায়ই তখন জ্ঞান থাকে না। মাকে দেখলেই অকথ্য গালাগালি, মাঝে মাঝে মারধোর। কোনোদিন একেবারেই ফেরেন না। যেখানে রাত কাটে, মেয়ে হয়ে সে কথা আর কেমন করে বলি! পাড়ায় কান পাতা যায় না। ইস্কুল ছেড়ে দিলাম। চেনা-শোনা কাউকে দূর থেকে আসতে দেখলেই জানলা বন্ধ করি। মার মুখে একটি কথা নেই। খাওয়া গেল, ঘুম গেল। তারপর আর চেনা যায় না। ডাক্তার দেখানো দরকার। কে দেখায়? তারপর আমিই গেলাম একদিন ডাক্তার নন্দীর কাছে। বাবার বন্ধু। সবই জানতেন উনি। ডাকতেই এলেন। দেখে- শুনে ওষুধ একটা লিখে দিলেন। কিন্তু যাবার সময় আমাকে ডেকে বলে গেলেন, “ওতে বিশেষ কাজ হবে না, বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়া দরকার। দেখি তোমার বাবাকে বলে।’ কী বলেছিলেন তিনিই জানেন। বাবা ভীষণ রাগারাগি শুরু করলেন কদিন। মা বকতে লাগল আমাকে। কিন্তু বেশী দিন আর বকুনি খেতে হল না। মাসখানেকের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।

    অপর্ণার মৃদুকণ্ঠ হঠাৎ কখন থেমে গেছে টের পাই নি। অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। …একটি বর্ষণমুখর রাত। রাস্তার ধারে একখানি প্রশস্ত ঘর। আসবাবের বাহুল্য নেই। যে কখানা আছে বেশ পরিপাটি করে সাজানো। একখানা গোল টেবিলের এপাশে বসে আছি। ও-পাশটিতে পর্যন্ত ঘোমটা টানা। সুদৃশ্য ঝালর-পরানো সোফার উপর একটি সুরূপা মহিলা। কপালের উপর বাঁকা ভ্রূ দুটির মাঝখানে একটি উজ্জ্বল সিঁদুরের টিপ। স্বাস্থ্য এবং আনন্দে ঝলমল করছে মুখখানা। ডান পাশে আমার কৌচের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটি দশ-বারো বছরের ছিপছিপে মেয়ে। কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।….

    অপর্ণার কথা কানে যেতেই মিলিয়ে গেল ছবিখানা। চমক ভাঙতেই ওর দিকে তাকালাম। আঁচলে চোখ মুছে ও আবার শুরু করল, মরবার দুদিন আগে দুপুরবেলা শিয়রে বসে হাওয়া করছিলাম। ইশারায় আমাকে কাছে এসে বসতে বলল। আমার একটা হাত বুকের উপর টেনে নিয়ে মুখের দিকে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। আমি আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিলাম। একটু শান্ত হলে আস্তে আস্তে বলল, আমি তো চললাম, মা। তোর যে কী হবে এই ভেবেই শুধু যেতে আমার মন সরছে না। কিন্তু ভগবানের ডাক তো এড়াবার উপায় নেই।

    আমি প্রাণপণে বলতে চেষ্টা করলাম, মাগো তোমার পায়ে পড়ি, তুমি চুপ করো। কিন্তু গলা দিয়ে আমার স্বর ফুটল না। ওই কটা কথা বলেই মা হাঁপিয়ে পড়েছিল। একটু দম নিয়ে আবার বলল, আমার গয়নাগুলো সব তোর। ওতে আর কারো অধিকার নেই। ওইটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করিস। পারবি কিনা ভগবানই জানেন।

    তারপর একটা নিঃশ্বাস পড়ল। আর কিছুই বলতে পারে নি মা। তখন থেকেই কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

    তখন তুমি কত বড়? অপর্ণা একটু থামতেই ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করলাম।

    সেই বছরই আঠারোয় পা দিয়েছি। শেষের দিকটায় মার যখন খুব বাড়াবাড়ি, সারাক্ষণ প্রায় তার কাছেই কেটে যেত। এবার একেবারে ছুটি পেয়ে গেলাম। করবার কিছুই রইল না। মার ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। পড়াশুনা তো আগেই ছেড়েছি। ঠাকুর চাকর দুই-ই পুরনো। সংসার তারাই দেখে। খাবার দিয়ে যখন ডেকে পাঠায়, খেয়ে এসে আবার ঢুকে পড়ি নিজের কোটরে। পারতপক্ষে বাবার সামনে বেরোই না। তাঁর রুটিন সেই আগের মতোই চলছে। সকালে মক্কেল, খেয়েদেয়ে কাছারি, ফিরে এসে কাপড়-চোপড় ছেড়ে চা খেয়ে বেরিয়ে পড়া। তারপর কখন ফেরেন জানি না। মাঝে মাঝে শুনতে পাই, এটা-সেটা নিয়ে খিটখিট করছেন। ডালে নুন পড়ে নি, টাই কোথায় গেল, কলতলার সাবান নেই কেন? একদিন কোর্টে যাবার আগে ডেকে পাঠালেন। রুক্ষ মেজাজে বললেন, কী কর সারাদিন? জামা-কাপড়গুলোও একটু গুছিয়ে রাখতে পার না?

    নিঃশব্দে চলে আসছিলাম, আবার ডেকে ফেরালেন। একটু নরম সুরে বললেন, মা- বাপ কি লোকের চিরদিন থাকে? চুপ করে শুয়ে-বসে না থেকে একটু-আধটু কাজকর্ম করলেই বরং ভুলে থাকা যায়। ইস্কুলে যাবি আবার?

    বললাম, না। বলেই চলে এলাম নিজের ঘরে।

    মাঝে মাঝে পাড়ার গিন্নীরা কেউ কেউ এসে হা-হুতাশ করতেন, বড় বড় উপদেশ দিতেন। চুপ করে শুনে যেতাম আর ভাবতাম, কখন উঠবেন এঁরা! সমবয়সী মেয়েরাও আসত। কাউকে কাউকে মন্দ লাগত না। কিন্তু বেশীক্ষণ থাকলে মনটা পালাই পালাই করত। এমন সময় আর এক উৎপাত শুরু হল। মাসের মধ্যে তিন-চার দিন সেজেগুজে দাঁড়াতে হত গিয়ে বসবার ঘরে। ভাবী শ্বশুর-ভাসুরের দল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, কী পড়ি, কী কী রান্না জানি, গান গাইতে পারি কিনা! যা খুশি জবাব দিতাম। তারপর কী হত জানি না! আভাসে আন্দাজে বুঝতাম, আমাকে বোধ হয় পছন্দ করেছেন; কিন্তু আমার সঙ্গে আর যা যা চাই, সেই ফদটা পছন্দ হয় নি। সেদিকে ক্রমেই মুশকিল দেখা দিল। টের পাচ্ছিলাম, আমাদের অবস্থায় ভাটার টান শুরু হয়ে গেছে। বাবার বৈঠকখানায় মক্কেলের ভিড় তেমন জমছে না।

    এমন সময়ে এল বারীনদা। তাকে আপনি দেখেছেন। মনে নেই নিশ্চয়ই। ও ছিল আমাদের মণিমেলার সর্দার, যাকে বলে মধ্যমণি।

    আমি বললাম, মনে আছে বইকি। সেদিনকার সভায় ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করছিল যে চশমা পরা ছেলেটি সেই তো? ফরসামত গাট্টা-গোট্টা চেহারা?

    অপর্ণা হেসে ফেলল : ঠিক ধরেছেন। আপনার দেখছি কিছুই ভুল হয় না। খালি আমাকে চিনতে পারেন নি।

    প্রতিবাদ করলাম, কে বলল চিনতে পারি নি? নামটা তো ভুল হয় নি। ওইটাই আসল পরিচয়। নাম বাদ দিয়ে মানুষের আর থাকে কী? যাক, এবার ‘বারীনদা’ কোন্ ভূমিকা নিয়ে এলেন, সেই কথা বলো।

    বারীনদাকে তুচ্ছ করবেন না। আমার কাহিনীর অনেকখানি জায়গা সে জুড়ে আছে। কিন্তু আপনি যা ভাবছেন, তা নয়।

    ওর সলজ্জ হাসিটির দিকে চেয়ে বললাম, কই, আমি তো কিছুই ভাবি নি।

    তাই বই কি! আমি আপনার মুখ দেখেই বুঝেছি। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল, সত্যিই তা নয়। বারীনদার সঙ্গে অনেক মিশেছি। আপনি যখন দেখেছেন, তখন তো বটেই, তার পরেও চার-পাঁচ বছর। শুধু আমি নই, আমার মতো আরও তিন-চারটি মেয়ে। কিন্তু নিতান্ত কাজের কথা ছাড়া আর কোন কথা ওর মুখে কেউ শোনে নি। এমন কিছু ওর চোখে কোনোদিন দেখা যায় নি, যেটা বিশেষ করে মেয়েদের চোখে পড়ে। একটি পনেরো-ষোলো বছরের মেয়ে আর একটি ওই বয়সী ছেলে বারীনদার কাছে একেবারে এক। শেষ পর্যন্ত দেখেছি, সংসারে মেয়ে বলে যে একটা জাত আছে সেটা যেন ও কোনোদিন টের পায় নি। সে কথা এখন থাক। যা বলছিলাম।

    বারীনদা এল আমার সঙ্গে দেখা করতে। ওর মাকে আমি মাসিমা বলতাম। বড্ড ভালবাসতেন আমাকে। তাঁর কাছেই সব কথা শুনেছিল। মা যখন মারা যায়, তার বছর দুই আগে থেকেই ও কলকাতা চলে গেছে। কালেভদ্রে আসত কুমিল্লায়। কী করত জানি না! জিজ্ঞেস করলে খালি হাসত, বলত না কিছুই। যারা ওর ওপরে খুশী নয় তারা বলত, কিছু করে না, আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। যাই করুক, মাসীমাকে মাসে মাসে টাকা পাঠাত, যদিও টাকার দরকার তাঁর ছিল না বললেই হয়।

    বারীনদা এল দুপুরবেলা। বাবা কাছারিতে। দুজনে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলাম। চা আর খাবার করে খাওলাম। বললাম, জান বারীনদা, মা চলে যাবার পর এই প্রথম ঢুকলাম রান্নাঘরে। তুমি এলে, তাই।

    চায়ের খালি কাপটা নামিয়ে রেখে ও গম্ভীর হয়ে বলল, পড়া ছেড়ে দিয়ে ভালো করিস নি পরী। আমি বলি, আবার তুই ভর্তি হয়ে যা।

    পরী আমার ডাকনাম। একটুখানি ভেবে বললাম, পড়তে আমারও ইচ্ছে করে বারীনদা। কিন্তু এখানকার স্কুলে আর হয় না।

    বেশ তো, কলকাতায় গিয়ে পড়।

    খরচ?

    মেসোমশাই দেবেন না?

    খুব সম্ভব, না। না দিলেও সে ব্যবস্থা আমি করতে পারব।

    তুই কী করে করবি?

    মার গয়না আছে কী করতে?

    উঁহু, সেটা ঠিক হবে না।

    ওগুলো দিয়ে তবে হবে কী?

    বারীনদা ভাবতে লাগল। আমি বললাম, খরচটা আসল সমস্যা নয়। সমস্যা হল, থাকব কোথায়?

    কেন, হস্টেলে?

    না বারীনদা, মানুষ দেখলেই আমি কেমন হাঁপিয়ে উঠি। হস্টেলে আমার থাকা হবে না। তার চেয়ে এক কাজ করো না কেন? ছোট দেখে একটা বাসা নাও। তুমি থাকবে, আমিও থাকব। মাসীমাও গিয়ে থাকতে পারেন মাঝে মাঝে। খানতিনেক ঘর হলেই আমাদের চলে যাবে।

    দূর, তাই কখনও হয়!

    কেন হবে না?

    বারীনদা যেন আরও গম্ভীর হয়ে গেল। খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর বলল, দ্যাখ্ পরী, আমাদের দুজনকে আমরা এত বেশী জানি যে সেদিক থেকে ভাববার কিছু নেই। তবু লোকের কথা একটু ভাবতে হয়।

    তুমিও যেমন! কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিয়ে বললাম আমি, লোকের কথায় আমাদের কী এসে যায়?

    আচ্ছা, ভেবে দেখি। বলে উঠে পড়ল বারীনদা। দোর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললাম, ফিরছ কবে?

    হপ্তাখানেক আছি। এর মধ্যে আর একদিন আসব।

    বারীনদা এল না। চার-পাঁচ দিন পরে গেলাম ওর মায়ের কাছে। শুনলাম, আমার সঙ্গে দেখা হবার পরের দিনই টেলিগ্রাফ পেয়ে চলে গেছে কলকাতায়। মাসীমা দুঃখ করতে লাগলেন, ছেলে সংসারী হল না, কী যে করে তাও বলে না! এদিকে তিনি আর কদিন?

    সেই দিন রাত্রে কী মনে করে মার ঘরে গিয়ে সিন্দুকটা খুললাম। দেয়ালে-গাঁথা লোহার সিন্দুক। দুটো মাত্র তাক। উপরের তাকে একটা ক্যাশবাক্সে মার গয়না থাকত আর নীচের তাকে থাকত বাবার কী সব দলিলপত্তর। খুলেই দেখলাম, নীচেটা সব খালি। বুকটা কেঁপে উঠল। তাড়াতাড়ি ক্যাশবাক্সে চাবি লাগাতে গিয়ে দেখি, গা-তালাটা খোলা। ডালা তুলেই মাথা ঘুরে গেল। সেইখানেই বসে পড়লাম। অনেক গয়না ছিল মার। সবটাই প্রায় গেছে, পড়ে আছে মাত্র চার-পাঁচখানা। দু-চোখ থেকে জল ফেটে বেরিয়ে এল। আমারই দোষ। সিন্দুকের একটা চাবি যে বাবার কাছে ছিল সেটা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। মারও তো খেয়াল হয় নি। অথচ এই গয়না নিয়ে শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না।

    বাবা বাড়ি নেই। ফিরতে রাত হবে। তা হোক, যত দেরিই হোক, আমাকে জেগে থাকতেই হবে। ঠাকুর ভাত দিয়ে ডাকতে এল। ফিরিয়ে দিলাম। তখন কি আমার খাবার মতো অবস্থা? বাবা যখন ফিরলেন, রাত প্রায় বারোটা। শোবার ঘরেই ওঁর রাতের খাবার চাপা দেওয়া থাকত। ঢুকতেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনি অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, এ কী! এখনও শুতে যাস নি?

    সে কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, আপনি গয়না নিয়েছেন? মার সিন্দুক থেকে?

    চড়া সুরে জবাব এল, সে কৈফিয়ত কি তোমার কাছে দিতে হবে?

    ও গয়না তো আপনার নয়।

    বাবা কী যেন ভাবলেন। তারপরে একেবারে অন্য সুরে বললেন, ও-সব সেকেলে সোনার পিণ্ডি দিয়ে তো তোমাকে পার করা যাবে না। স্যাকরাকে দিয়েছি, ভেঙে হালফ্যাশানের নতুন গয়না গড়ে আসবে।

    কথাটা যে নির্জলা মিথ্যা, বলবার ধরন দেখেই বুঝলাম। বললাম, আমাকে একবার জানালেন না কেন? নতুন গয়নার কোন দরকার ছিল না।

    বাবা চটে উঠলেন : বড্ড জ্যাঠা হয়েছ তুমি। যাও শুতে যাও।

    বড় অসহায় মনে হল নিজেকে। বারীনদাও নেই যে তার পরামর্শ নেব। এ সব তো আর কাউকে বলা যায় না। যে কখানা ছিল, আপাতত সরিয়ে রাখলাম একটা কাঠের আলমারিতে, যার মধ্যে মার কাপড় থাকত। তার চাবিটা আমার কাছেই ছিল।

    সেই সময়টা বার বার করে আপনার কথা মনে হত। ভাবতাম আপনি থাকলে নিশ্চয়ই এ বিপদে আমাকে সাহায্য করতেন। সারাদিন কাটল ছট্‌ফট্ করে। কত সব আজগুবী প্ল্যান আসত মাথায়। তখন ওখানকার জজসাহেব ছিলেন বাঙালী। তাঁর কাছে গিয়ে যদি কেঁদে পড়ি, তিনি কি এর একটা বিহিত করবেন না? আবার ভাবতাম, কি করবেন তিনি? বাপ যার শত্রু, কে বাঁচাবে তাকে?

    একদিন সকালে উঠে দেখলাম, বাবার বিছানাপত্তর বাঁধা হচ্ছে। কোলকাতা যাবেন। রওনা হবার মিনিট কয়েক আগে আমাকে ডেকে বললেন, চার-পাঁচ দিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। সাবধানে থেকো। রাধার মাকে বলেছি, কটা রাত শোবে তোমার ঘরে।

    রাধার মা আমাদের পুরনো ঝি। মা মারা যাওয়ার পর ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। চার-পাঁচ দিনের জায়গায় সাত-আট দিন কেটে গেল। তারপর ফিরলেন বাবা। রাত তখন আটটা কি সাড়ে আটটা। আমি নিজের ঘরেই ছিলাম। চাকর এসে বলল, বাবু ডাকছেন। বাবার ঘরে গিয়ে দেখলাম, উনি বসে আছেন চেয়ারে, আর ওদিকে জানলার ধারে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে একটা মহিলা। আমার সাড়া পেয়ে মুখ ফেরালেন। ব্লাউজের গলাটা অনেকখানি খোলা। তার উপর ঝলমল করছে জড়োয়া নেকলেস। দেখেই চিনলাম। সারা দেহে যেন আগুন জ্বলে উঠল। বাবা বললেন, পরী, তোমার মাকে প্ৰণাম করো।

    আমার মা! সংসারে মা কি লোকের দুবার হয়? বিষিয়ে উঠল সমস্ত অন্তর। কোন উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে এলাম। পেছন থেকে শুনলাম, বলছেন আমার নতুন মা, “মেয়েটা তো বড্ড অসভ্য দেখছি। তুমি বলেছিলে ছেলেমানুষ। এ যে দেখছি হাতি।”

    বাবার কথা শোনা গেল না। শোনবার প্রবৃত্তিও ছিল না।

    এর পর যে দিন শুরু হল, বলতে গেলে মহাভারতকেও ছাড়িয়ে যাবে। সে-সব থাক। যেটুকু না বললে নয়, তাই শুধু—

    এক বাণ্ডিল ইনটারভিউ পিটিশন নিয়ে ঢুকলেন কিরণ হালদার, আমদানী-সেরেস্তার দু নম্বর ‘কেরানী। হঠাৎ খেয়াল হল আজ রবিবার। কয়েদীদের মোলাকাতের দিন। এসব দরখাস্ত এসেছে তাদেরই আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে। গেটের বাইরে তারা অপেক্ষা করছে। আপাতত আমার কাজ হল ওই কাগজগুলোর উপর একটা করে ‘এম. সি.’ লিখে দেওয়া। সেটা হয়ে গেলেই সংশ্লিষ্ট কয়েদীদের নামের তালিকা তৈরি করবেন কিরণবাবু। তাই দেখে বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে খুঁজে খুঁজে লোকগুলোকে কুড়িয়ে এনে অফিসের সামনে বসিয়ে দেবে লাল ব্যাজওয়ালা রাইটারের দল। তারপর তাদের জেল-টিকেট পরীক্ষা করে দেখবেন ডেপুটি জেলর এবং আইনানুসারে যারা মোলাকাতের হকদার, তারাই শুধু দাঁড়াবে গিয়ে ইন্টারভিউ রুমের ‘খাঁচা’র পাশে।

    গেটের পাশে ছোট্ট একখানা ঘর। মাঝখানে সূক্ষ্ম জালের বেড়া। তার ভিতরের দিকে দাঁড়াবে কয়েদীর লাইন, পাশাপাশি তিন চার জন, আর বাইরের দিকে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াবে তাদের স্ত্রী পুত্র ভাই বোন, মা মাসী, শ্যালক ভাগনের দল। দু প্রস্থ মিহি জালের ফাঁক দিয়ে চেনা মুখখানা দেখবার জন্যে দু তরফের কী ব্যর্থ প্রয়াস। যেটুকু দেখা গেল ঠিক চেনা গেল না। যাদের চোখের জোর কম, তাদের সার হল শুধু চোখের জল। তবু চলতে থাকে উঁকিঝুঁকি। তারপর শুরু হবে কথাবার্তা, অর্থাৎ বেপরোয়া কোরাস চিৎকার। একটি অল্পবয়সী বউ কী বলতে এসেছে তার সদ্য-জেলে-আসা স্বামীকে। বলা হল না। বললেও যাকে বলা সে শুনতে পেল না তার ভীরু কণ্ঠ। কেমন করে শুনবে? তারই ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বাজখাঁই হুঙ্কার ছাড়ছে কোন্ গ্রামের মোড়ল, জানিয়ে দিচ্ছে তার একদা প্রতিবেশী অধুনা জেলখাটা বন্ধুটিকে : “তোমার বাড়ি ঘর সব নিলাম হয়ে গেছে। ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে নিয়ে গেছে আব্বাস সরদারের ছেলেগুলো। কী করবে বলো?”

    উত্তর শোনা গেল না। ওদিকে কোণের দিকে কোনো রকমে একটু জায়গা পেয়েছে একটি তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলে। পাড়ার কার সঙ্গে এসেছিল কয়েদী বারাকে জানাতে—তিনমাস মাইনে দিতে পারে নি বলে ইস্কুলের খাতা থেকে নাম কেটে দিয়েছেন হেডমাস্টার।

    তার অশ্রুভেজা কথাগুলো ডুবিয়ে দিয়ে ঠিক পাশ থেকে ফেটে পড়ল একটা মোটা ভাঙা গলা—”মজাসে রহ ভাইয়া। ইধার সব ঠিক হ্যায়।” স্বনামধন্য গ্যাঙ-সরদার। ডাকাতি মামলায় বেরিয়ে গেছে আইনের ফাঁক দিয়ে। কিন্তু জনকয়েক অনুচরকে বাঁচাতে পারে নি। তাদেরই একজনকে আশ্বাস দিয়ে গেল : ওদিকে সব ঠিক, মজাসে রহ

    কয়েদী আর তাদের আত্মীয় বন্ধু –এই দুই দলের মাঝখানে ঘড়ি ধরে বসে আছেন ডেপুটি জেলর। তাঁরই নির্দেশে একজন সিপাই পাঁচ-সাত-দশ মিনিট পর পর বাইরের দিক থেকে সরিয়ে দিচ্ছে এক-এক দল দর্শনার্থী। নতুন দল এসে দখল করছে তাদের শূন্য স্থান। যারা চলে যাচ্ছে, তাদের অনেকেরই চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। তার সবটাই কি প্রিয়জন-মিলনের আনন্দাশ্রু? হয়তো তা নয়, আরও কিছু আছে। যাকে দেখতে এলাম, ভালো করে দেখা হল না, শোনা গেল না তার গলার স্বর, শোনানো গেল না আমার যা বলবার কথা।

    তবু হয়ে গেল ইন্টারভিউ। রবার স্ট্যাম্পের ছাপ পড়ল কয়েদীদের টিকিটে। আবার দেখা হবে সেই দুমাস পরে যদি পরিষ্কার থাকে টিকিটের পাতা, অর্থাৎ কারা-অপরাধের কোনও শাস্তির আঁচড় না লাগে তার গায়ে।

    কিরণবাবু বিদায় নেবার পর অপর্ণার দিকে যখন তাকাবার ফুরসত হল, সেও দেওয়াল-ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, দশটা বাজে। আজকের মতো উঠি। আপনারও কাজের সময়, আমারও আজ কাপড় কাচার ফাইল। আসবার সময়েই মনে করে দিয়েছেন জমাদারনী।

    আমিও সায় দিলাম : বেশ তাই এসো। আমার কাজ না হয় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা যেত, কিন্তু ওই কাপড় কাচা, মানে জেলের রুটিন ঠেকানো যাবে না।

    আর একটু পরিষ্কার করে বললাম, তুমি হয়তো ভাবছ, আমি ময়লা কাপড় পরে থাকব, তাতে সরকারের কী আসে যায়? কিন্তু না, ওটা একটা অপরাধ, যাকে বলে জেল অফেন্স, তার আবার শাস্তি আছে নানা রকম।

    আমাকে শাস্তি দিতে পারবেন আপনি? কৌতুকভরা সুরে জিজ্ঞাসা করল অপর্ণা।

    কেন পারব না?

    একদিন পরীক্ষা করে দেখতে হবে। —বলে হাসতে হাসতে উঠে পড়ল।

    পরের সপ্তাহে তিনবারে, অর্থাৎ পুরো তিনটে সিটিং দিয়ে অপর্ণা তার কাহিনী শেষ করল। জেলখানার অফিস। মাঝে মাঝে খাতাপত্র-ফাইল হাতে বাবুদের আনাগোনা, যখন তখন সিপাই-সান্ত্রীদের বুটের ঠকাস। তারই মধ্যে বসে একটি মেয়ে বলে যাচ্ছে তার ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের দীর্ঘ ইতিহাস। সে কাহিনী সবাইকে বলবার মত নয়। তার মধ্যে দুঃখ আছে, লজ্জা আছে, আর আছে তার তরুণ হৃদয়ের কত সাধ ও স্বপ্ন। স্থানকাল ও পরিবেশ কোনোটাই তার প্রকাশের অনুকূল নয়। তাই হয়তো সব কথা সে বলতে পারে নি। যেটুকু বলেছিল, দীর্ঘদিনের ব্যবধানে তার অনেকখানি আজ হারিয়ে গেছে আমার মন থেকে। তা ছাড়া যে ভাষায়, অন্তরের যে উত্তাপ দিয়ে সে একটার পর একটা ঘটনা * তুলে ধরেছিল আমার চোখের উপর, তার যথার্থ রূপায়ণ আমার এ লেখনীর পক্ষে ব্যর্থ প্রয়াস। তবু যে লিখছি, তার কারণ সেই চিঠি। সে কথা আসবে আরও অনেক পরে

    অপর্ণার নতুন মা এসেই সংসারের ভার নিলেন, এবং তাঁর প্রথম কাজ হল অনেক কালের ঠাকুরকে জবাব দেওয়া। তিনটে লোকের সংসার, তার মধ্যে দুটো মেয়েছেলে। ঠাকুর-ঝিয়ে কী হবে? নিজেই এগিয়ে গেলেন উনুনের ধারে। অপর্ণাকে যেতে হল তাঁর সাহায্যে। এটা তোলা, ওটা নামানো, হাতের কাছে এগিয়ে দেওয়া, যখন যা দরকার। না গেলে চলবে কেন? দু দিন না যেতেই চাকা উল্টে গেল। তখন ওই সাহায্যটাই পড়ল গিয়ে গৃহিণীর হাতে আর অপর্ণার হাতে উঠল হাতা বেড়ি ডেকচি আর কড়া। মা থাকতে এবং তার পরেও মাঝে মাঝে দু-একবার শখ করে ছাড়া রান্নাঘরে সে কখনও যায় নি। দরকার হয় নি, অভ্যাসও ছিল না। তাই আজ পদে পদে তার ত্রুটি, এবং তার নগদ পাওনাও হাতে হাতে : কী করেছ এতদিন! সামান্য দুটো ভাত ফোটাতেও শেখায় নি তোমার মা? বিয়ে দিলে তো তিন ছেলের মা হতে! খেতে বসে ফেটে পড়েন কোন কোন দিন, এটা কি রেঁধেছ; ডালনা, না গোরুর জাবনা?

    মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করত অপর্ণা। কিন্তু সে শুধু মনে মনে। এ কথা সে জানত, একটা কিছু বলতে গেলেই অনেক কিছু বলতে হয় এবং তার পরে তার খেই থাকে না। হাতিয়ার দিয়ে যে লড়াই তার শেষ আছে, কিন্তু কথার লড়াই একবার শুরু হলে আর থামতে জানে না। সেইটাই সে প্রাণপণে এড়িয়ে চলতে চায়। মাকে দেখেছে, কথা যত তিক্ত যত রূঢ়ই হোক, উত্তরে কোনোদিন মুখ না-খোলা, এই যেন ছিল তাঁর পণ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে পণ তাঁর অটুট ছিল। কিন্তু সবাই কী সব পারে, না এড়াতে চাইলেই সব এড়ানো যায়?

    একদিন সন্ধ্যার আগে নিজের ঘরে বসে চুল বাঁধছিল অপর্ণা। নতুন মা এসে বললেন, আলমারির চাবিটা একটু দাও তো।

    কোন্ আলামরি?

    ওই যে, ও-ঘরে যেটা আছে।

    অপর্ণা বুঝল, একে একে সবটাই দখল হয়ে গেছে, এবারকার লক্ষ্য তার মায়ের কাপড়ের আলমারি, যার মধ্যে সেদিন সে সরিয়ে রেখেছে লুটের হাত থেকে বাঁচানো সেই চার-পাঁচখানা অলঙ্কার। ওটুকু যেমন করে হোক রক্ষা করতেই হবে।

    নতুন মা অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন: কী ভাবছ এত?

    ওতে তো সংসারের কোন জিনিস নেই।

    তবে কী আছে?

    আছে মার খানকয়েক কাপড় আর সামান্য দু-একটা গয়না

    সেইগুলোই দেখতে চাই।

    অপর্ণা একটু ভেবে নিয়ে বলল, থাক না। ও দিয়ে আর কী দরকার আমাদের?

    তোমার দরকার না থাক, আমার থাকতে পারে।

    মাথার ভিতরটা জ্বলে উঠল অপর্ণার। নিজেকে যথাসাধ্য সংযত রেখে সহজ সুরেই বলল, ওগুলো মা আমাকে দিয়ে গেছে।

    এবার রুখে উঠলেন নতুন মা : তোমাকে দিয়ে গেছেন মানে! কী অধিকার ছিল তার দিয়ে যাবার? এ সংসারে যা কিছু সব এখন আমার। এইটুকু বোঝবার বয়স তোমার হয় নি তা নয়।

    অপর্ণা চুল বাঁধতে লাগল। কোনো জবাব দিল না। তিনি বীরদর্পে এগিয়ে এসে বললেন, চাবি দেবে কিনা জানতে চাই।

    অপর্ণা তেমনিই নিরুত্তর। নতুন মা গর্জে উঠলেন : এত সাহস তোমার! আচ্ছা আসুক ও, দেখি কোথায় থাকে তোমার তেজ। ঘাড় ধরে যদি না—

    বলতে বলতে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন।

    কিছুক্ষণ পরেই অপর্ণার কানে গেল নতুন মা’র উত্তেজিত কণ্ঠস্বর এবং সঙ্গে সঙ্গে চাপা কান্নার আওয়াজ। বুঝল বাবা অফিস থেকে ফিরেছেন। মিনিট কয়েক যেতেই তিনি এলেন তার ঘরে। বিরক্তির সুরে বললেন, গয়না কাপড় নিয়ে কী ঝঞ্ঝাট বাধিয়েছিস তোর মা’র সঙ্গে? চাবি চেয়েছিল, দিয়ে দিলেই তো পারতিস!

    কোন উত্তর না পেয়ে আর একটু এগিয়ে এসে নরম গলায় বললেন, আহা, তোকে যা দেবার সে আমি দেব। ওই তোর সম্বল, আর কিছুই পাবি না—এ কথা মনে করিস কেন? মা নেই, আমি তো রয়েছি।

    অপর্ণার চোখে জল এসে গেল। বাবার নজরে পড়তেই বলে উঠলেন, এই দেখো, কাঁদবার কী হল! বলেছি তো, আমি যখন রয়েছি, গয়না-টয়না যা তোর চাই—

    কিছু চাই না আমি—অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল অপর্ণা: যা পরে আছি, সব খুলে দিচ্ছি, নিয়ে যাও। কিন্তু ওইটুকু আমার মার হাতের শেষ চিহ্ন। ও আমি কিছুতেই দেবো না। উচ্ছ্বসিত কান্নার বেগ আর রোধ করতে পারল না। তার বাবা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন বিহ্বলের মতো। তার পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন।

    অপর্ণা বলেছিল, এর পর কী রকম ছট্‌ফট্ করে যে আমার দিনরাতগুলো কাটত, আপনাকে বোঝাতে পারব না! আমি জানতাম, বাবার এ যাওয়া শুধু দুদিনের জন্যে। ওদিকের তাড়নায় আবার তাঁকে আসতে হবে। এ তো শুধু গয়না-কাপড়ের লোভ নয়, তার চেয়েও অনেক বেশী অনেক গভীর। মাকে শেষ করেই এদের আশ মেটেনি, তার সমস্ত চিহ্ন এরা মুছে ফেলতে চায়। আমাকে এরা দাসীর মতো খাটিয়ে নিচ্ছে, উঠতে বসতে লাঞ্ছনার শেষ নেই। তাও হয়তো সয়ে যেত। কিন্তু আমার মায়ের সেই চরম মৃত্যু সইব কেমন করে? কেমন করে দেখব, দু দিন আগে যেসব ছিল, সবখানে ছিল, জুড়ে ছিল এই বাড়ির প্রতিটি কোণ, প্রতিটি খাট-পালঙ আসবাবপত্তর, আজ সে কোনখানে নেই! এ যে আবার তাকে নতুন করে হারানো। তারপর এ বাড়িতে আমি থাকব কেমন করে? তাই স্থির করলাম, আমাকে যেতে হবে। কোথায় যাব, কার কাছে গিয়ে দাঁড়াব, জানি না। এইটুকু শুধু জানি, আমাকে যেতেই হবে। যত বিপদ, যত দুঃখই আসুক, না গিয়ে আমার উপায় নেই।

    `স্বীকার করতে বাধা নেই, কারণ যতই বড় হোক, অপর্ণার এই চলে যাবার সংকল্প হঠাৎ যেন ধাক্কা দিয়েছিল মনের মধ্যে। ওই বয়য়ের একটি সাধারণ গৃহস্থ ঘরের কুমারী মেয়ের মুখে এই ধরনের উক্তি আমাদের অভ্যাসে বাধে। তার মূলে হয়তো বহু যুগের সংস্কার, কিংবা আরও কিছু। ঠিক কী যে মনে হয়েছিল, বলতে পারব না। কেমন একটা অস্বস্তির মতো। বোধ হয় সেই মনোভাব থেকেই প্রশ্ন করেছিলাম, তোমার বাবা যে পাত্র দেখছিলেন তোমার জন্যে, তার কী হল?

    অপর্ণা হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে বলল, আপনার মনের কথা বুঝতে পেরেছি। তারই কোন একটি যদি জুটে যেত আমার কপালে, আপনি নিশ্চিন্ত হতেন। আমিও কী হতাম না? কোন্ মেয়ে চায় নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়াতে? কিন্তু সে রাস্তা আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার নতুন মা আসবার পর ও নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য শোনা যায় নি। যাওয়া ছাড়া আমার আর কোন পথ ছিল না।

    কিন্তু দিন কয়েক পর একদিন গভীর রাত্রে সত্যি সত্যিই যখন বেরিয়ে পড়লাম, পা দুটো আর চলতে চায় না। বুকের মধ্যে সে কী কাঁপুনি। একবার মনে হল ফিরে যাই। যে ঘর ছেড়ে এলাম, তার মধ্যে যত কষ্ট যত লাঞ্ছনাই থাক, তবু তো নিশ্চিত আশ্রয়। যে পথে চলেছি, সেখানে যে শুধু অজানা অনিশ্চয়। বুক চেপে ধরে আড়ষ্ট পা দুটোকে আবার চালিয়ে দিলাম। মাথা নেড়ে বললাম, না, যে ঘর ছেড়েছি সেখানে আর ফিরে যাওয়া যায় না। যেতে আমাকে হবেই।

    বাবা গিয়েছিলেন চাঁদপুর না নোয়াখালি, একটা কী মামলায়। আমার নতুন মাও সকাল সকাল দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছিলেন। সেই হল আমার সুযোগ। সঙ্গে সামান্য কটা টাকা, দু-চারখানা জামাকাপড় আর সেই কখানা গয়না। কেবলই ভয় হচ্ছিল, কেউ যদি চিনে ফেলে! মেয়েদের গাড়িতে উঠি নি। বড্ড ফাঁকা। ভিড়ের মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে চলে এলাম কলকাতায়।

    অনেক ঘোরাঘুরির পর বারীনদার নতুন বাসায় যখন পৌঁছলাম, সে অবাক হল নিশ্চয়ই। কিন্তু চোখে মুখে তার কোন আভাস পাওয়া গেল না। ওর স্বভাবই ছিল অমনি। সামান্য একটু হেসে জিজ্ঞেস করল, কার সঙ্গে এলি?

    কার সঙ্গে আবার? একলা!

    ঠিকানা পেলি বুঝি মা’র কাছ থেকে?

    তা ছাড়া আর কোথায় পাব? তুমি তো একটা চিঠি দিয়েও খোঁজ নিলে না!

    এ অনুযোগের কোন উত্তর দিল না বারীনদা। দু মিনিট কী ভাবল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, ওখানকার সব কথাই শুনেছি। তারপর থেকেই বাড়ি খুঁজছিলাম। এই কদিন হল পেয়েছি। ভাবছিলাম এবার একবার যাবো। তার চেয়ে এই ভালই হয়েছে। কিন্তু —

    আবার কিন্তু কিসের?

    ভাবছি, সত্যিই ভালো হল কিনা! কেমন উদাস সুরে বলল বারীনদা। তারপর তাড়াতাড়ি বলে উঠল, চল, তোর ঘর দেখিয়ে দি। চান-টান কর, ভাত আসবে কিন্তু হোটেল থেকে।

    কাল থেকে আর আসবে না। গম্ভীরভাবে বললাম আমি। বারীনদা হঠাৎ বুঝতে না পেরে একটু অবাক হয়ে তাকাল। বললাম, বাঃ, এত কষ্ট করে দু বেলা হাত পুড়িয়ে রান্না শিখলাম কি হোটেলের ভাত খাবার জন্যে?

    ও! হেসে উঠল বারীনদা। মনে হল, খুশীই হয়েছে প্রস্তাব শুনে। পুরুষমাত্রেই বোধ হয় হয়ে থাকে।

    বাগবাজারের একটা গলির মধ্যে একতলায় তিনখানা ঘর নিয়ে বাসা। বাকী অংশে থাকে বাড়িওয়ালা। সেদিকটা একেবারে আলাদা। বারীনের ঘরখানা বড়। তার পরেরটা তালাবন্ধ। ওর কী সব জিনিসপত্র থাকে। কোণের দিকের ছোট ঘরখানা অপর্ণার। এইখানেই শুরু হল তার নতুন জীবন।

    দু-তিন দিন পরে দুপুর বেলা ঘরের মেঝেয় মাদুর বিছিয়ে শুয়ে ছিল অপর্ণা, বারীন বাইরে থেকে বলল, পরী আছিস?

    না, উড়ে গেছি! এসো না!

    কয়েকখানা বই নিয়ে এলাম তোর জন্যে। নতুন বছর না পড়লে তো ইস্কুলে ভর্তি হওয়া যাবে না। তদ্দিন বসে না থেকে একটু-আধটু পড়াশুনা কর।

    পড়াবে কে?

    যেখানটা না বুঝবি, আমিই না হয় চেষ্টা করে দেখবো।

    চেষ্টাটা করবে কখন? সারাদিনই তো খালি বাইরে আর বাইরে। আচ্ছা বারীনদা, মাসীমাকে নিয়ে এলে হয় না?

    বড্ড একলা লাগছে, না?

    না, তা কেন? উনি এলে বেশ হয়। গঙ্গাস্নানটান করতে পারেন।

    বারীন আগের কথার জের টেনেই বলল, বেশী দিন আর একলা লাগবে না। ভাবছি তোকেও আমাদের কাজে লাগিয়ে দেবো।

    কী কাজ তোমাদের?

    যখন দেবো, তখনই দেখতে পাবি।

    সকালের দিকে নানা দেশের লোক আসত বারীনের ঘরে। বেশীর ভাগই ওর বয়সী ছেলে। পাজামা ধুতি কোট প্যান্ট—বিচিত্র পোশাকে ভরে যেত ঘর। দরজা বন্ধ করে কী সব কথাবার্তা হত নানা ভাষায়। অপর্ণা সে সময়টা থাকত প্রায়ই রান্নাঘরের দিকে। ওদের টুকরো টুকরো কথা কানে যেত। যাবার আসবার পথে হঠাৎ কেউ হয়তো সামনে পড়ে যেত এবং সঙ্গে সঙ্গে সসম্ভ্রমে সরে দাঁড়াত। বেশ মজা লাগত অপর্ণার। একদিন এমনি একটা দলকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে আসছিল বারীন, অপর্ণা হাসিমুখে তাকিয়েছিল সেই দিকটায়। বারীনের মুখে চিন্তার রেখা। হয়তো যে আলোচনা শেষ হয়েছে, তারই জের চলছিল মনের মধ্যে। কাছে এসে অপর্ণার দিকে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়াল। ম্লান হেসে বলল, কী দেখছিস?

    দেখছিলাম এত জাতের মানুষও আছে কোলকাতায়!

    বারীন তেমনি হেসে উত্তর দিল, এত জাত কোথায় দেখলি? ওরা সব একজাত।

    একজাত মানে?

    মানেটা না হয় আর একদিন শুনিস।

    না, এখখুনি বলতে হবে।—মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল অপর্ণা।

    বলার মতো নতুন কিছু নয়। সেই পুরনো কথা। দুনিয়ায় জাত আছে দুটো, হ্যাস্‌ আর হ্যাভ্-নস্। যাদের আছে, আর যাদের নেই। তুই আমি আর এরা সব সেই নেই–এর জাত।

    অপর্ণার মনে পড়ল, এই ধরনের কথা আগেও বলত বারীন। বলত, সব মানুষ সমান। দেশের ধল-দৌলত জমি-জমা কল-কারখানায় সক্কলের সামনে অধিকার। সমিতির ছেলেমেয়েরা চুপ করে শুনত আর আড়ালে বলত বারীনদা কমিউনিস্ট। কমিউনিস্ট কাকে বলে অপর্ণা জানত না (এখনও জানে না), এইটুকু শুধু বুঝত, যারা খেটে খায় অথচ অনেক খেটেও খেতে পায় না, তাদের উপর ওর গভীর টান, আর যাদের আমরা বলি বড়লোক, তাদের উপর ও খুশী নয়।

    সেই দিন বিকেলের দিকে নিজের ঘরে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল অপর্ণা। রাস্তার মোড়ে ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ নজর পড়তেই ছুটতে ছুটতে এল বারীনের ঘরে: সর্বনাশ হয়েছে বারীনদা!

    কী হল?

    বাবা আসছেন। দেখে মনে হল রাস্তার নম্বর খুঁজছেন।

    বারীন মুহূর্তকাল কী ভাবল! তারপর ওর মুখের উপর গভীর দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বলল, আমার দিকে নয়, নিজের মনের দিকে বেশ করে চেয়ে দেখ পরী, তারপর বল, থাকবি, না ফিরে যাবি!

    তুমি ক্ষেপেছ! ফিরে যদি যাব, তা হলে এলাম কেন? তবে তুমি যদি তাড়িয়ে দাও বাকীটুকু আর বলতে পারল না। বড় বড় জলের ফোঁটা বেরিয়ে এল চোখ ছাপিয়ে।

    বারীন হেসে ফেলল : পাগল কোথাকার! যা তোর ঘরে যা। আমি ওঁকে এখান থেকে বিদায় করে দেবো।

    যদি খুঁজে দেখতে চান?

    বারীনের মুখে পড়ল চিন্তার ছায়া। বিড়বিড় করে বলল, অসম্ভব নয়….আচ্ছা….বাইরে তোর কাপড়-জামা জুতো-টুতো যা কিছু সব নিয়ে আয়।

    কি হবে?

    নিয়ে আয়, তারপর বলছি।

    দরজার উলটো দিকে ও-দিকের দেওয়ালে ছিল একটা কাঠের কপাট-দেওয়া দেওয়াল-আলমারি। বেশ খানিকটা উঁচু; গভীরও অনেকখানি। তালাটা খুলে ফেলল বারীন। জিনিসপত্র যা ছিল সব সরিয়ে ফেলল। ঘুণে ধরা দুটো তাক একটু টানতেই খুলে এল। ততক্ষণে বাইরে কে কড়া নাড়ছে। অপর্ণাও এসে গেছে তার জামা-কাপড় নিয়ে। বারীন খোলা আলমারিটা দেখিয়ে বলল, ঢুকে পড়।

    ওমা! ওর মধ্যে বন্ধ করবে নাকি?

    তা না হলে আর ঢুকতে বলছি কিসের জন্যে?

    দম আটকে মরি যদি?

    সে তখন দেখা যাবে! আর দেরী করিস না। ওদিকে শুনছিস তো কড়ানাড়ার শব্দ?

    অপর্ণা জামা-কাপড় নিয়ে ভয়ে ভয়ে সেই আলমারির গর্তে ঢুকতেই বারীন আস্তে আস্তে পাল্লা দুটো বন্ধ করে দিল। ছোট তালাটা সরিয়ে একটা বড় তালা লাগিয়ে দিল, যাতে করে কপাট দুখানা এঁটে না বসে।

    অপর্ণার বাবা এসে বসলেন সামনের বারান্দায়। কোন রকম ভূমিকা না করেই বললেন, পরী কোথায়?

    পরী!

    হ্যাঁ! পরীকে চিনতে পারছ না? শ্লেষতিক্ত উত্তর।

    আজ্ঞে, তা পারছি বইকি। কিন্তু পরী কোথায় তা আমি কেমন করে জানব?

    তুমি বলতে চাও, সে এখানে আসে নি?

    কী আশ্চর্য! এখানে এলে আমি তাকে লুকিয়ে রাখব?

    তা তুমি পার। সমস্ত বাড়ি সার্চ করব।

    বেশ তো, করুন না? পরী কি বাড়ি থেকে না বলে চলে গেছে?

    হ্যাঁ, চলো। কখানা ঘর তোমার বাসায়?

    এই তো তিনখানা।

    সব ঘরগুলো দেখলেন ভদ্রলোক। রান্নাঘর, কলতলা, বাথরুম। কয়লা রাখার ছোট্ট খুপরিটাও বাদ দিলেন না। অপর্ণার ঘরে গিয়ে বললেন, এখানে কে থাকে?

    আমার এক বন্ধু।

    একটা মেয়েদের চিরুনি পড়ে ছিল তাকের উপর। সেটা তুলে নিয়ে বললেন, এটা কার?

    আজ্ঞে তারই। বড় চুল রাখে বলে—

    ও-ও! বলে চিরুনিটা রেখে দিয়ে বেরিয়ে এলেন।

    ফিরে এসে বারান্দার সেই চেয়ারটায় যখন বসলেন, আলমারির ফাঁক দিয়ে যতটা দেখা যায়, অপর্ণার মনে হল অনেকখানি মুষড়ে পড়েছেন বাবা। বারীন দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক পাশেই। তার দিকে চেয়ে যখন বললেন, এক গ্লাস জল খাওয়াতে পার? গলাটা বড্ড ক্লান্ত শোনাল। জলের গ্লাসটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে খানিকটা যেন দম দিয়ে বললেন, কী করি বল তো বারীন? বড্ড আশা করে এসেছিলাম—তোমার এখানে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। দেখেছি তো, সেই ছোট থেকে তোমার ওপর বেজায় টান। বারীনদা বলতে অজ্ঞান। কোথায় গেল মেয়েটা!

    অপর্ণার বুকের ভিতরটা একবার নড়ে উঠল। কিন্তু সে শুধু ওই একটি বার। পরক্ষণেই মনে পড়ল তার মায়ের জীবনের শেষ দিনগুলো। স্পষ্ট অনুভব করল, মুখের পেশীগুলো যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। বারীনের গলা শোনা গেল : মামাবাড়ি যায় নি তো?

    সেখানে যাবে কার কাছে! সব মরে-হেজে গেছে। ছোটমামাটা এখানেই থাকে, বেলেঘাটায়। তাকে বোধ হয় ওর মনেও নেই। তবু কথাটা যখন তুললে, ঘুরে যাই একবার।

    উঠতে গিয়ে বারীনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—আচ্ছা তুমি কি বল, পুলিসে একবার–

    অপর্ণা চমকে উঠল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে কান খাড়া করে রইল উত্তরের অপেক্ষায়। বারীন যেন অনেক ভেবেচিন্তে মাথা নেড়ে বলল, সেটা কি ভালো হবে?

    বাবা সায় দিলেন। আমিও তাই ভাবছিলাম। কেলেঙ্কারি তাতে বাড়বে ছাড়া কমবে না। আর বসে কী হবে? উঠি। তুমি কিছু মনে কোরো না বারীন।

    না, না, আমি কী মনে করব? ভাবছি ভয়ানক কিছু একটা না ঘটলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে, পরী তো সে রকম মেয়ে নয়!

    অপর্ণার মনে হল, তার বাবা যেন হঠাৎ রুক্ষ চোখ তুলে বারীনকে একবার দেখে নিলেন। তারপর ছাতাটি তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন।

    অপর্ণা ভেবেছিল, আলমারি খোলবার পর দুজনে মিলে খুব এক চোট হেসে নেবে। প্রাণভরে উপভোগ করবে এই প্রহসন-নাটকের সবটুকু রস। কিন্তু এ কী হল! দুজনে যেন চোখ তুলতেই পারল না দুজনের দিকে। বারীনের মুখে যে কুঞ্চনরেখা দেখা দিল, সেটা হাসি নয়, হাসির প্রয়াস। আড়চোখে একবার তাকিয়েই মাথা নিছু করে নিজের ঘরে চলে গেল অপর্ণা।

    তাকের উপর রাখা ছোট আরশিটায় নজর পড়তেই চমকে উঠল, কেমন যেন থম্‌থম্ করছে চোখ-মুখ, সবটা জুড়ে ফেটে পড়ছে রক্ত।

    সেই দিন রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর গয়নার পুঁটুলিটা হাতে করে বারীনের ঘরে গিয়ে বলল, এটা রাখো।

    কী ওটা?

    দেখোই না।

    বারীন একবার উঁকি দিয়েই বুঝতে পারল এবং কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, দেখে আর কী করব বল? গয়না পরবার ভাগ্যই যদি হবে, তবে কলিকালে না এসে জন্ম নিতাম রামায়ণের কালে। কেউ একজন এসে কেয়ূর-কুণ্ডল-কণ্ঠাভরণে সাজিয়ে দিত। ধনুকে টঙ্কার দিয়ে চলে যেতাম যুদ্ধে।

    তার জন্যে আপসোস কিসের? খোঁজ করলে ‘কেউ একজন’ তো এ কালেও পাওয়া যায়। কেয়ূর-কুণ্ডল নাই বা হল, এ যুগের যা সাজ—

    এই যেমন ময়লা ধুতির উপর ছেঁড়া শার্ট, তার নীচের পকেটে দুখানা শুকনো রুটি আর বুক-পকেটে একটা দু-টাকা দামের ফাউন্টেন পেল, কী বলিস?

    শুধু কী তাই?

    তা ছাড়া আর কী? এই সাজে সাজিয়ে তো আমাদের গৃহলক্ষ্মীরা বীর পুরুষদের যুদ্ধে পাঠাচ্ছেন প্রতিদিন বেলা দশটায়।

    অপর্ণার দৃষ্টি হঠাৎ উদাস হয়ে এল। ধীরে ধীরে বলল, যারা পাঠাচ্ছে আর যাদের পাঠাচ্ছে তারা হয়তো এতেই সুখী। তুমি তার কী বুঝবে!

    হুঁ। সে সুখের চেহারাটা যদি দেখতিস একবার? কেমন একটা করুণ ছায়া পড়ল বারীনের মুখের উপর

    অপর্ণা বলল, সুখ জিনিসটা কি বাইরে থেকে দেখলেই চেনা যায় বারীনদা? থাকগে ও-সব বাজে কথা। ধরো তাড়াতাড়ি। ঘুম পেয়েছ, শুতে যাবো।

    কী হবে ও দিয়ে?

    বাঃ, সব প্ল্যান ভুলে গেলে। খাওয়াটা না হয় তোমার হোটেলেই চলছে, আর সব খরচপত্তর? তারপর ইস্কুলে ভর্তি হলে তো এককাঁড়ি টাকা লাগবে মাসে মাসে।

    আচ্ছা সে যখন লাগবে তখন দেখা যাবে।

    এখন রেখে দিতে ক্ষতি কি?

    বারীন যেন মুহূর্তমধ্যে বদলে গেল। খানিকক্ষণ কী ভাবল। তার পর শুষ্ক মুখে আস্তে আস্তে বলল, ক্ষতি হতে কতক্ষণ! আমার যে প্রতি মুহূর্তেই টাকার দরকার।

    অপর্ণা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এবার মেঝের উপর বসে পড়ে অন্তরঙ্গ সুরে বলল, বারীনদা, তোমার সব কথা আমাকে বলবে না?

    কোন্ সব কথা? মৃদু হেসে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল বারীন।

    এক নম্বর হল, কিসের জন্যে তোমার টাকার দরকার?

    কিসের জন্যে? প্রশ্নটা যে নেহাত বোকার মত হল পরী। এ দরকারের কী আর শেষ আছে? যাদের অনেক আছে তাদেরই নেই, আর আমার তো একেবারে হ্যাভ-নস্‌।

    ও-সব যা-তা বলে বুঝিয়ে দিলে আমি শুনব না। তোমাকে বলতেই হবে তুমি কী কর, কোথায় যাও, কোত্থেকে তোমার টাকা আসে, আর সে সব যায় কোথায়!

    বাপ রে, তুই যে রীতিমত আমার গার্জেন হয়ে উঠলি!

    ঠাট্টা রাখো। না বললে আমি উঠবই না এখান থেকে।

    বলব রে বলব। এত ব্যস্ত কিসের? শুধু বলা কেন, তোকে বোধ হয় টানতেও হবে আমাদের দলে। কিন্তু

    আবার গাম্ভীর্যের ছায়া পড়ল বারীনের মুখের উপর। অপর্ণা অপেক্ষা করে রইল। ওর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল বারীন, কিন্তু সব কথা শুনে যখন মনে হবে, বারীনদা যা করে সে সব ভালো কাজ নয়, দেখে দেখে যখন ঘৃণা হবে আমার ওপর

    ঘৃণা! বলেই বিস্ময়ে বেদনায় নির্বাক হয়ে রইল অপর্ণা। তারপর বলল, তোমার সঙ্গে আমার মতের মিল না হতে পারে, কিন্তু তাই বলে ঘৃণা করব তোমাকে! আমি! এত বড় কথাটা তুমি মুখ ফুটে বলতে পারলে বারীনদা?

    বলতে বলতে গলাটা তার করুণ হয়ে উঠল। বারীন কিছুক্ষণ চেয়ে রইল তার মুখের পানে। তারপর তেমনি মৃদু হেসে বলল, আচ্ছা, আর বলব না। হল তো? যা এখন শুতে যা। রাত হয়েছে।

    ডান হাতখানা দিয়ে মৃদু আঘাত করল ওর পিঠের উপর। অপর্ণা আর কিছু বলতে পারল না। চোখ মুছতে মুছতে উঠে চলে গেল।

    পরদিন ঘুম ভাঙতে বেলা হল। তার আগেই যথারীতি বেরিয়ে গেছে বারীন। মুখ ধুয়ে কাপড় ছেড়ে রান্নাঘরে যাবার আগে একটু পড়াশুনা নিয়ে বসেছিল অপর্ণা। বাইরের দরজায় কড়া নড়ে উঠল। ঠিকা ঝি বাসন মাজছিল। উঠে গিয়ে খুলে দিতেই ভিতরে ঢুকল বারীনের পাঞ্জাবী বন্ধু শরণ সিং। অপর্ণা তাকে দেখেছে কয়েকবার। কিন্তু কথাবার্তা হয় নি। কী বলবে, কোন্ ভাষায় বলবে, তাই ভাবছিল। ওকে ইতস্তত করতে দেখে নিজেই এগিয়ে এল শরণ এবং পরিষ্কার বাংলায় বলল, এই সুটকেস আর এই টাকাটা বারীনকে দেবেন। বলবেন, দু-জোড়া দুল ছাড়া আর কিছু বিক্রি হয় নি।

    অপর্ণা সুটকেস আর খামটা ওর হাত থেকে নিয়ে বলল, আপনি একটু বসুন না। বারীনদা এখনি আসবে।

    না। আমাকে এই সাড়ে নটার ট্রেনে বাইরে যেতে হচ্ছে। দশ-বারো দিন পরে ফিরছি। তারপর এসে দেখা করব।

    চাবি সঙ্গেই ছিল। নিজের ঘরে গিয়ে অপর্ণা খুলে ফেলল সুটকেসটা। একরাশ জড়োয়া গয়না ঝলমল করে উঠল। নেকলেস, আর্মলেট, টায়রা, ব্রেসলেট। একটা একটা করে তুলে ধরল জানলার সামনে। এত সুন্দর আর এরকম দামী জিনিস সে কোনদিন দেখে নি। বাক্সটার কোণের দিকে কাগজে জড়ানো এক বাণ্ডিল কার্ড। তার উপরে ইংরাজীতে লেখা—ইস্ট ইণ্ডিয়া জুয়েলারী এম্পোরিয়ম; নীচে রাস্তার নাম, নম্বর।

    বারীন ফিরল এগারোটার পর। বাক্স আর টাকা বুঝিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল অপর্ণা, গয়নার দোকান আছে বুঝি তোমাদের?

    গয়নার দোকান কি রে! রীতিমত জুয়েলারি এম্পোরিয়ম। জিনিস দেখলি তো?

    দেখলাম।

    কেমন লাগল?

    খুব সুন্দর।

    নিবি নাকি দু-একখানা?

    রক্ষে করো বাপু।

    রক্ষে করব? আচ্ছা করলাম। কিন্তু সবাইকে রক্ষে করলে আমাদের চলে না। কাউকে না কাউকে না মেরে উপায় নেই।

    তার মানে?

    বারীন উত্তর না দিয়ে হাসতে লাগল। অপর্ণার কৌতূহল বেড়ে গেল। তাড়া দিয়ে উঠল, কী, খালি হাসছ? বলো না কী বলছিলে?

    ধরতে পারিস নি তো? ও সব নকল। সোনাটা কেমিক্যাল, আর পাথরগুলো মেকী।

    অ্যাঁ, তাই নাকি!

    কিন্তু তোর মতো অনেকেই বলে, খুব সুন্দর। তারপরে আর তাদের রক্ষা করি কি করে!

    এই সব জোচ্চুরি ব্যবসা তোমাদের? দোকানে যেদিন পুলিস পড়বে তখন দেখো মজা।

    দোকান কোথায়?

    কেন, ওই যে কী একটা ঠিকানা দেখলাম!

    তা একটা আছে বটে, তবে আসল দোকান হল এই সুটকেস।

    তা হলে ওই কার্ডগুলোও ভুয়ো?

    ভুয়ো বলি কেমন করে! একে ক্লাইভ স্ট্রীট, তার ওপর ফার্মের নামটাও জমকালো। বড় বড় খদ্দের ঘায়েল হয়ে যায়।

    কিন্তু এ-সব কি ভালো হচ্ছে বারীনদা? বিপদে পড়তে কতক্ষণ!

    বিপদ কোথায় নেই পরী? তোরা যাকে সৎপথ বা ন্যায়ের পথ বলিস, সেখানেও পদে পদে বিপদ। তা ছাড়া সে সব পথ তো আমাদের মত মানুষের জন্যে খোলা নেই।

    খোলা নেই বলছ কেন? চাকরি-বাকরি কিংবা কোন একটা ব্যবসা-ট্যবসা করে কত লোক করে খাচ্ছে!

    তা খাচ্ছে। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশী লোক খাচ্ছে না। তার কারণ, যাকে আমরা বলি জীবন-সংগ্রাম সেখানে তোর ওই হাতিয়ারগুলো আর কাজে লাগছে না।

    কেন?

    সে ‘কেন’র ঠিক উত্তর আমার জানা নেই। তার চেয়ে চোখের ওপর যা দেখছি তাই বলতে পারি।

    কি দেখছ চোখের ওপর? বলে গুছিয়ে বসল অপর্ণা।

    বারীন বলল, একটু চোখ খুললে তুইও দেখতে পাবি, আমরা যে দেশে বাস করছি, সেটা হচ্ছে মস্ত বড় একটা তিনতলা ফ্ল্যাট-বাড়ি, যার একতলার সঙ্গে আর একতলার বিরোধ। একেবারে ওপরে যারা থাকে, তাদের অস্ত্র হল ধনবল; আর একদম নীচের তলায় যাদের বাস, তাদের সম্বল হচ্ছে বাহুবল। দুনিয়ায় টিঁকে থাকতে হলে এই দুটোই হল আসল অস্ত্র। মাঝখানে আছি আমরা। আমাদের ওর কোনোটাই নেই। থাকবার মধ্যে আছে মাথায় কিঞ্চিৎ মগজ, যাকে একদিন গর্ব করে বলতাম, বুদ্ধিবল। এতকাল তাই ভাঙিয়ে খেয়েছি। কলম আর গলার জোর দেখিয়েছি ইস্কুলে আর আদালতে; চোখ বুজে করে গেছি ডাক্তারি, মোক্তারি, মাস্টারি আর কেরানীগিরি, আর সে-সব যাদের জোটে নি, তারা করেছে—ওই, তুই যা বলছিলি, ছোটখাটো দোকানদারি। এখন তার কোনোটাতে জায়গা নেই। তাই ওই সোজা সরল প্রকাশ্য পথ ছেড়ে বুদ্ধিকে এবার নামাতে হয়েছে এই সব আঁকাবাঁকা গোপন পথে। বলে বাক্সটা দেখিয়ে দিল।

    অপর্ণা নীরবে শুনে যাচ্ছিল। নীরব হয়েই রইল।

    বারীন আবার বলল, লড়াই মাত্রেই তিন হাতিয়ার—ছল, বল আর কৌশল। বল যাদের নেই, তাদের সম্বল ওই বাকি দুটো—ছল আর কৌশল। এখানে যা দেখছিস, সে হচ্ছে তারই একটা নমুনা।

    কিন্তু এ দিয়ে আর কতদিন চলে? এতক্ষণে সাড়া দিল অপর্ণা : ধরা একদিন পড়তেই হবে।

    তা হয়তো হবে। তবু যতদিন চালানো যায়। তবে আমাদের তরফে সবচেয়ে বড় ভরসার কথা হচ্ছে এই, বলবান মাত্রেই কোনো একটা বিশেষ জায়গায় দুর্বল। অত বড় যে হাতী, তার চোখ দেখেছিস তো? তেমনি ওপরতলায় যারা থাকে, তাদের বড় বড় লোহার সিন্দুকগুলো নিরেট হলেও ঠিক নিশ্ছিদ্র নয়। খুঁজলে দেখা যাবে, কোথাও একটা দুর্বল ফাঁক রয়ে গেছে, সেখানে খোঁচা দিলে কিছু বেরিয়ে আসবে। সেইটুকু আমরা কুড়িয়ে নিই।

    কিছুই বুঝলাম না তোমার কথা!

    আচ্ছা এই যেমন ধর, স্বামী লাখপতি ব্যবসাদার। পয়সা কুড়িয়ে কুড়িয়ে গড়ে তুলেছে টাকার পাহাড়। ভয়ানক হুঁশিয়ার, কোন দিক দিয়ে কিছু বেরিয়ে না যায়। এদিকে স্ত্রীটিরও নেশা হল, চারটির জায়গায় পাঁচটি নেকলেশ, তিন সেটের ওপর আর এক সেট জড়োয়া ব্রেসলেট। নেশামাত্রেই গোপন পথ ধরে চলে। সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ল শরণ সিং। যোগাতে লাগল নেশার উপকরণ—এই চমৎকার জড়োয়ার জোচ্চুরি।

    কিন্তু সবার কাছেই কি আর জোচ্চুরি চলে? সন্দেহ প্রকাশ করল অপর্ণা, ওরা তো আমার মতো বোকা নয় যে ঠকবে!

    সকলে না হলেও, অনেকেই তোর মতে ঠকে। বোকা বলতে যা বোঝায়, এ ঠিক তা নয়। কবিরা বলেন, স্ত্রীজাতির নাকি একটা তৃতীয় নয়ন আছে। হয়তো আছে। তবে এই গয়নার বেলায় তার তিনটে নয়নই অন্ধ। তাই এক টুকরো কাঁচের মধ্যে তাঁরা দেখতে পান চুনি-পান্নার ঝিলিক। ফলে আমাদের পকেটেও কিছু এসে যায়। একটা মুশকিল আছে।

    কি মুশকিল?

    ঢোকা বড় শক্ত। মহলটা দুর্ভেদ্য। শরণ সিং বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না।

    অপর্ণা কী একটা বলতে যাচ্ছিল, বাইরের দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল। বারীন বেরিয়ে গেল খুলে দিতে। অপর্ণাও উঠে পড়ে বলল, ইস, অনেক বেলা হয়ে গেছে! এখন আবার যেন আড্ডা দিতে বোসো না, চান করে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। ও বেলা বেরোতে হবে, মনে আছে তো?

    খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বেলা পড়তেই ওরা বেরিয়ে পড়ল। এর আগেও দু-তিন দিন বারীনের সঙ্গে বেরিয়েছে অপর্ণা। কিন্তু সে শুধু বেড়ানো, ঘুরে ঘুরে শহর দেখা। আজকের উদ্দেশ্য অন্যরকম। শ্যামবাজারের কাছাকাছি খাল পার হয়ে যে অঞ্চলে গিয়ে পড়ল তার নাম উল্টাডাঙ্গা। খোয়া-ওঠা ধুলোয় ভরা রাস্তা। দুধারে চওড়া খোলা ড্রেন। তার মধ্যে আলকাতরার মতো পাঁক। পাঁক বললে তাকে গৌরব দেওয়া হয়। বহুকাল থেকে সঞ্চিত বহু রকম কদর্য জিনিসের মিশ্রণে একটা আধা-তরল রাসায়নিক পদার্থ।

    কোথায় নিয়ে এলে? নাকে আঁচল দিয়ে বিরক্তির সুরে বলল অপর্ণা।

    বারীন হাসল তার সেই বাঁকা হাসি : আজব দেশ নয়। সেদিন যে-চৌরঙ্গী দেখে দিশেহারা হয়েছিলে–সেও যে শহর, এটাও সেই শহর। দুটোরই নাম কোলকাতা।

    ময়লাগুলো সাফ করে না কেন?

    মাঝে মাঝে করে বইকি। খানিকটা তুলে সাজিয়ে রাখে রাস্তার ধারে। তারপর সবাই মিলে পায়ে পায়ে সেগুলো নিয়ে তোলে রান্না আর খাবার ঘরে, সেখান থেকে—

    চুপ করো তুমি—ধমকে উঠল অপর্ণা। বারীন এবার গলা ছেড়ে হেসে উঠল। ততক্ষণে তারা বড় রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়েছে গলির মধ্যে। এখানে ওখানে আবর্জনার স্তূপ। দু-ধারে মাটির ঘর, উপরে খাপরা কিংবা টিনের ছাউনি। জাঁতার শব্দ কানে আসছে। কোন কোন বারান্দায় বসে ডাল ঝাড়ছে পশ্চিমী মেয়েরা। তারই ধূলোয় অন্ধকার হয়ে গেছে গলিপথ। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। লোকগুলোর পরনে ঝুল-কালি-মাখা কাপড় অপর্ণার হঠাৎ মনে পড়ল, এই রকম কাপড় দেখেছিল ওদের বাসায় যায় যে ডালওয়ালা তার গায়ে। কী সুন্দর সোনামুগের ডাল! কিন্তু যে ন্যাকড়াটায় বেঁধে নিয়ে যায়, তার রঙও এই রকম। এইখানেই বোধ হয় থাকে সে লোকটা। বারীন বলল, এই হচ্চে উল্টোডাঙার ডালপট্টি।

    এবার তারা পড়ল গিয়ে আর একটা গলির মুখে। ওরই মধ্যে একটু যেন পরিষ্কার ঘর-দোর। বাসিন্দারা প্রায় সকলেই মেয়েছেলে। সায়া-সেমিজ-ব্লাউজ-জ্যাকেটের বালাই নেই। বসন বলতে একখানা করে শাড়ি। সেটা অঙ্গাবরণ হলেও সর্বাঙ্গের আব্রুরক্ষার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সেদিকে তাদের বিশেষ আগ্রহ আছে বলেও মনে হল না। অপর্ণা বুঝল, এরা সব যাকে বলে, নিম্নশ্রেণীর স্ত্রীলোক। ফিসফিস করে বলল, এটা বোধ হয় ঝি-পাড়া!

    বলে দ্যাখ না? জবাব দিল বারীন : দল বেঁধে তেড়ে আসবে। বড় বড় ধানকলে কাজ করে এরা। ঝি নয়, মজুর, মানে মজুরনী। তা ছাড়া সন্ধ্যার পরে অন্য ব্যবসা আছে।

    সেটা আবার কী?

    বারীন উত্তর দিল না, অন্য কথা পাড়ল। লজ্জায় মরে গেল অপর্ণা। আড়ালে জিভ কেটে মনে মনে বলল, ছি ছি, কী ভাবল বারীনদা!

    একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া গলিতে পড়তেই কানে এল তুমুল কোলাহল। নারী- পুরুষের মিলিত কণ্ঠ। তার ভাষাটা এমন স্তরের যে বারীনের সঙ্গে পাশাপাশি চলা বা তার মুখের দিকে তাকানো কঠিন হয়ে উঠল। কলহের উপলক্ষ্যটা এবার চোখে পড়ল, সামনেই একটা জলের কল। তখনও জল আসে নি। কিন্তু এরই মধ্যে নানা আকারের এবং নানা প্রকারের ভাণ্ড এসে জড়ো হয়েছে তার চারদিকে। তাদের মালিকরাও সশরীরে উপস্থিত এবং সকলেই ওই কল-সংলগ্ন জমিটুকুর প্রথম অধিকারের জন্য তৎপর। বিরোধের বিষয়টাও তাই। জনৈক বঙ্গরমণীর মাটির কলসী হটিয়ে দিয়ে কলের গায়ে বালতি বসিয়েছিল এক গামছা-সর্বস্ব বিহারী পুরুষ। বোধ হয় মনে করেছিল, যেহেতু তার গায়ের জোর বেশী, অতএব অধিকারটা বড়। কিন্তু মুখের জোর বলে যে একটা মারাত্মক অস্ত্র আছে, এবং সত্যি-সত্যি আক্রমণ না করে কেবলমাত্র আস্ফালন দেখিয়েও যে যুদ্ধ জয় করা যায়—এই কঠিন সত্যটা তার জানা ছিল না। এইবার জানল এবং অত বড় দেহটা নিয়েও একটা তীক্ষ্ণ রসনার তোড়ে শেষ পর্যন্ত হটে আসতে হল। বালতিটা কয়েক ইঞ্চি সরিয়ে দিয়ে তবে রক্ষা।

    হঠাৎ কলের মুখ থেকে প্রথমে শোঁ শোঁ আওয়াজ, তার পরেই পট্পট্ শব্দে খানিকটা জল ছিটকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে হাঁড়ি কলসি ঘড়া বালতির দঙ্গলে এমন একটা জড়াজড়ি ঠেলাঠেলি এবং হুটোপাটি শুরু হল, যেটা অপর্ণার চোখে নতুন হলেও বস্তিবাসীদের জীবনে অতি সনাতন দৈনন্দিন ঘটনা! হঠাৎ নজরে পড়ল, এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খানিকটা দূরে বালতি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি দশ-বারো বছরের ছেলে। দেখলেই বোঝা যায় সে তার খালি গা এবং ছেঁড়া হাফপ্যান্ট নিয়েও এদের সবার থেকে আলাদা। বারীন এগিয়ে গেল তার দিকে। চোখাচোখি হতেই ছেলেটির মুখে ফুটে উঠল একটুখানি সলজ্জ হাসি।

    ইস্কুলে যাও নি হারু?

    গিয়েছিলাম। ইতিহাসের স্যার আসেন নি, এক ঘণ্টা আগেই ছুটি হয়ে গেল।

    এখন জল নেবে কেমন করে? আর একটু পরে এলে হত না?

    দিদি বলল একটুও জল নেই।

    আচ্ছা তুমি বাড়ি গিয়ে খবর দাও, আমি নিয়ে আসছি।

    না না। আপনি নেবেন কেন?

    বারীন ওর হাত থেকে বালতিটা নিয়ে বলল, বোকা ছেলে! তোমাকে যে এক ঘণ্টা এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

    হারু ছুটতে ছুটতে চলে গেল। বা রীন বালতি নিয়ে এগিয়ে যেতেই যারা একেবারে কল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঠেলাঠেলি করছিল, সকলেই একটুখানি সরে গিয়ে পথ করে দিল। বারীন একজনকে বলল, কিছু মনে কোরো না ভাই, আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে।

    বালতিটা কলের নীচে বসিয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা, তোমরা এমনি ধাক্কা-ধাক্কি না করে যদি একটা লাইন করে দাঁড়াও, তা হলে সকলেরই সুবিধে হয়।

    একজন বলে উঠল, তা তো হয়, কিন্তু শোনে কে? আরও দু-চারজনের কাছ থেকেও ওই কথারই একটা অস্পষ্ট সমর্থন শোনা গেল। বারীন আর কথা বাড়াল না।

    কল থেকে খানিকটা এগিয়ে ডান দিকে আর-একটা গলি। দু-ধারে তেমনই খাপরা বা টিনের চালা। তার কোলে খোলা নর্দমা। এখানে সেখানে জড়ো হয়ে আছে আবর্জনার পাহাড়। বাড়ি-ঘর এবং লোকজনের চেহারা দেখলে মনে হয়, গৃহস্থ-বস্তি। বাঙালী, হিন্দুস্থানী, উড়িয়া নানা জাতের সংমিশ্রণ। খানিকক্ষণ চলবার পর একটা বাড়ির সামনে আসতেই একটি মধ্যবয়সী মহিলা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন ছি ছি, এ কী কাণ্ড বলো দেখি! তুমি কেন এত কষ্ট করে জল টানতে গেলে বাবা?

    বারীন হেসে বলল, যা কুরুক্ষেত্র চলছে কলের গোড়ায়, হারুর সাধ্যি কি ঢোকে তার মধ্যে?

    মহিলাটি আর একটা কী বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ অপর্ণার দিকে নজর পড়তেই বললেন, এটি কে বাবা?

    আমার বোন।

    তোমার নিজের বোন?

    নিজের বইকি। মাসীমার মেয়ে।

    বাঃ, খাসা মেয়েটি তো। দাঁড়িয়ে কেন মা? এসো ভেতরে এসো। আর আসবেই বা কোথায়?—বলেই একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।

    নর্দমার উপরে একফালি তক্তা দিয়ে পারাপারের ব্যবস্থা। বারীনের হাত ধরে ধীরে ধীরে উঠে এল অপর্ণা। এক টুকরো বারান্দা, তার কোলে দুখানা ছোট ছোট ঘর। ভিতরটা রীতিমত অন্ধকার, তারই একখানার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা মোটা ভাঙা গলা : কে কথা বলছে?

    আজ্ঞে আমি বারীন?

    কখন এলে বাবা?

    এই আসছি।

    আমার জিনিসটা এনেছ?

    বারীন জবাব দিল না। আস্তে আস্তে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকল। মহিলাটি হাত নেড়ে কী একটা ইশারা করলেন। তারপর অপর্ণাকে নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে। মেঝের উপর ছেঁড়া একটা মাদুর পাতা। তার এক ধারে একরাশ দেশলাইয়ের কাঠি, পাশে কতকগুলো খালি খোল। দেখেই বোঝা যায়, কে একজন এখানে বসে কাজ করছিল, এইমাত্র উঠে গেছে। মহিলাটি এদিক ওদিক চেয়ে বললেন, কই, রেখা কোথায় গেলি?

    পেছনের দরজায় একটা চটের পরদা। ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, অপর্ণারই বয়সী একটি মেয়ে কাপড় বদলাচ্ছে। সাড়া দিল, এই যে যাচ্ছি। এবং সঙ্গে সঙ্গে পরদা সরিয়ে ঘরে এসে ঢুকল! পরনে একখানা কালোপেড়ে কোরা শাড়ি। মহিলাটি বললেন, আবার সেই ছেঁড়া কাপড়টা জড়িয়ে ছিলি! এত করে বললাম, ওটা পরিস না, ওতে গেরস্তের অকল্যাণ হয়। কেন, এই তো খাসা কাপড় এনে দিয়েছে বারীন।

    রেখা মায়ের কথায় কান না দিয়ে অপর্ণার দিকে চেয়ে হাসিমুখে বলল, বসুন ভাই। আমরা কাজ করতে করতে গল্প করি। এই আপদগুলো আধ ঘণ্টার মধ্যে বিদায় করতে হবে—বলেই বসে পড়ে ক্ষিপ্রহাতে খোলের মধ্যে কাঠি পুরতে লেগে গেল। তারই ফাঁকে চোখ তুলে বলল, আপনাকে কিন্তু অনেকক্ষণ থাকতে হবে, তাড়াতাড়ি চলে গেলে চলবে না।

    অপর্ণা বলল, বেশ তো। কিন্তু আমিই বা চুপ করে বসে থাকব কেন? দিন না গোটাকতক বাক্স। দেখি, পারি কিনা!

    তা হলে তো ভালই হয়। গুনে গুনে ষাটটা করে কাঠি পুরবেন। কম-বেশি হলে হিসেব মিলবে না কিন্তু।

    হেসে ফেলল দুজনে। মিনিট খানেক পরে রেখা জিজ্ঞাসা করল, আপনি বুঝি কোলকাতাতেই থাকেন?

    না, এই মাসখানেক হল এসেছি।

    মায়ের সঙ্গে?

    আমার মা নেই।

    দু মিনিট ছেদ পড়ল কথায়। তারপর আবার প্রশ্ন করল রেখা, এখানে আসবার আগে আপনার দাদা আমাদের কথা কিছু বলেন নি?

    অপর্ণা মাথা নাড়ল; এবং এই না-বলার জন্যে মনে মনে ভারি রাগ হল বারীনের ওপর। রেখা বলল, বলবার আছেই বা কী? তা ছাড়া আমরাই তো শুধু নই, এ রকম কতো বাড়ি আছে, যেখানে ওঁকে যেতে হয়, কতো লোককে দেখতে হয়। এই পাড়াতেই, ধরুন না, তিন-চার ঘর—

    পাশের ঘর থেকে একটা হুঙ্কার এসে বাকী কথাগুলো ডুবিয়ে দিয়ে গেল। শুধু হুঙ্কার নয়, তার সঙ্গে কদর্য গালাগালি। লক্ষ্যটা যে রেখার মা, সেটুকু অপর্ণারও বুঝতে অসুবিধা হল না। রেখার মুখখানা কঠিন হয়ে উঠল। হাতের কাজ থামিয়ে ওখান থেকেই গলা চড়িয়ে ভর্ৎসনার সুরে বলে উঠল, বাবা!

    সঙ্গে সঙ্গে ও-পক্ষের সুর নেমে গেল। অনেকটা যেন অনুযোগের ভঙ্গিতে বললেন ভদ্রলোক, অন্যায়টা কি বলেছি শুনি? তোমাদের সব হবে, আর আমার এক-ফোঁটা আফিম জুটবে না! আমি তো তোমাদের সংসার থেকে চাইছি না, বারীনের কাছে চাইছি, তাতে তোমাদের জ্বলুনি কিসের!

    জ্বলুনি কি সাধে! তিক্তস্বরে বললেন রেখার মা, তোমার এক দিনের নেশায় যে পয়সা যায়, সেটা যে ভরগুষ্ঠীর দু দিনের খোরাক সে খবর রাখ? বারীন আর কত দেবে? তুমি কি কিছুই বুঝবে না?

    শেষের দিকে গলাটা ভারী হয়ে উঠল। উত্তরে ভদ্রলোক বিড়বিড় করে কী বললেন, ঠিক বোঝা গেল না। রেখা মাথা নীচু করে হাত চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনের দিকে তাকাতেই চোখ দুটো যেন দপ্ করে জ্বলে উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে অপর্ণার চোখে পড়ল, রাস্তার ওপারে দাওয়ায় বসে একজন মাঝবয়সী পশ্চিমা লোক একজোড়া কোটরগত ক্ষুধার্ত চোখ মেলে এই দিকে তাকিয়ে আছে। রেখা উঠে গিয়ে দড়াম্ করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আবার এসে বসল তার নিজের জায়গায়। অনেকটা যেন নিজের মনে বলল, এক মিনিট দোরটা খুলে রাখবার উপায় নেই!

    অপর্ণা বলল, আপনারা কদ্দিন আছেন এ পাড়ায়?

    তা হল বছর দুই। বাবা বিছানা নিলেন, তার পরেই চলে আসতে হল এই নরকে।

    কী অসুখ ওঁর?

    প্যারালিসিস। পা দুটো অচল হয়ে গেছে।

    কাঠি ভরা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। অপর্ণার হঠাৎ খেয়াল হল, এসে অবধি বারীনের কোনো সাড়া পায় নি। বলল, বারীনদাকে দেখছি না তো! গেল কোথায়?

    আমাদের কাজেই গেছেন। মৃদু হেসে জবাব দিল রেখা, তৈরী ঠোঙাগুলো পৌঁছে দিয়ে নতুন কাগজ আনতে গেছেন। এসেই আবার এই বাক্সগুলো নিয়ে যাবেন ম্যাচ-ফ্যাক্টরীতে। আরও কিছু খোরাক আসবে আমার। যাবার সময় একবার উঁকি মেরে দেখে গেছেন, কদ্দূর হল!

    তাই নাকি? কই সাড়া পেলাম না তো?

    সাড়া দিলে তো পাবেন? নেহাত দরকার না হলে উনি তো কথা বলেন না! একটু ম্লান হাসি ভেসে উঠল রেখার আনত মুখের উপর। অপর্ণা বুঝতে পারল; ব্যথিত হল;

    কিন্তু বিস্মিত হল না। বারীনকে আর কেউ না চিনুক তার তো চিনতে বাকি নেই। সে আসে যায়, কাজ দেয়, কাজ নেয়, একটি দুঃস্থ পরিবারের অন্নবস্ত্র যোগায়। তার ফাঁকে কখন কার গোপনমনে কিসের মেঘ জমে উঠল সে খবর সে রাখে না। হয়তো রাখবার ক্ষমতাই দেন নি তার বিধাতাপুরুষ।

    খানিকক্ষণ পরে রেখা আবার একটা খাপছাড়া প্রশ্ন করে বসল, আচ্ছা বলুন তো ভাই, আমি কি দেখতে খুব বিচ্ছিরি?

    এ কথার কোন উত্তর নেই। অসামান্য রূপসী না হলেও রেখা সুন্দরী, এবং নিজের সম্বন্ধে সে সচেতন ছিল না—এ কথা মনে করবার কারণ নেই। উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই সে বলে উঠল, এই দেখুন, কী সব বাজে বকছি পাগলের মতো! আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, মেয়েটা কী বেহায়া! নিজের অবস্থা ভুলে যাই, মনে থাকে না, আমরা কত গরিব, শুধু গরিব নয় গলগ্রহ!

    অপর্ণা কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। অসংলগ্ন ভাবে শুধু বলে ফেলল, আপনি ওকে ভুল বুঝেছেন। ও একটা আস্ত পাগল।

    পাগল না ভাই, পাথর! যাক গে, ওই যে উনি এসে পড়েছেন।

    বারীন এসেই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, তোমার হল রেখা?

    রেখা কোন কথা না বলে দেশলাইয়ের বাক্সগুলো তুলে দিল ওর হাতে। চকিতে একবার ওর মুখের দিকে চেয়ে বলল, ঠোঙার কাগজ আনেন নি?

    না, ওদিকটায় এখনো যাই নি। এবার আসবার সময় নিয়ে আসব। পরী, তোরা বসে গল্প কর, আমি আধ ঘণ্টার মধ্যেই আসছি।

    .

    সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরবার পথে বারীনের পাশে চলতে চলতে অপর্ণা জিজ্ঞাসা করল, এ রকম মক্কেল তোমার আর কত আছে বারীনদা?

    মক্কেল কী রে?

    ওই হল। মক্কেলরা দেয়, এরা না হয় নেয়। তবে কেউ কেউ আবার দেয়ও—অনেক কিছু দেয়। অনেক সময় নিজের যা কিছু আছে সব। কিন্তু সে সব তুমি দেখেও দেখতে পাও না।

    বারীন হেসে বলল, তোর কথাগুলো ঠিক বাংলা নভেলের মতো। খুব পড়েছিস বুঝি?

    পড়েছি বইকি—উষ্মার সঙ্গে বলল অপর্ণা, তবে কি জান, মানুষকে দুটো খেতে- পরতে দিলেই যারা মনে করে সব হল, তার আর কোন দুঃখ, কোন অভাব থাকতে পারে না, তারাই তোমার মতো সব-কিছু নাটক নভেল বলে উড়িয়ে দিতে চায়। আসলে সেটা জীবনকে এড়িয়ে চলা কিংবা তাকে ছোট করে দেখা। ..

    হয়তো তাই। তবে ওই খাওয়া-পরার অভাবটা এত বড় যে, ওর কাছে অন্য কিছু চোখেই পড়ে না। তুই যে-সব দুঃখের কথা বলছিস সে-সব উৎপাত যে নেই তা বলছি না, কিন্তু সে বিলাস তাদেরই মানায়, ওই খাওয়া-পরার প্রয়োজন যাদের মিটে গেছে।

    তুমি ভুল করছ বারীনদা। ওগুলো মোটেই বিলাস নয়। সব মানুষের জীবনেই আসে। যারা খেতে পাচ্ছে তাদেরই শুধু নয়, যারা পাচ্ছে না তাদেরও। তার চাক্ষুষ প্রমাণ তো এইমাত্র দেখে এলাম।

    বারীন কোন উত্তর দিল না। বোধ হয় এড়িয়ে গেল কথাটা। বুদ্ধিমান এবং চক্ষুষ্মান হয়েও এই একটি জায়গায় সে অন্ধ। বুদ্ধি দিয়ে হয়তো বোঝে, হৃদয় দিয়ে বোঝে না। কথা বলতে বলতে তারা সেই পুলের কাছে এসে পড়েছিল। সেদিকে নজর পড়তে বারীন বলে উঠল, ওই যাঃ, বুড়ীর বাড়ি তো ফেলে এলাম!

    কোন্ বুড়ী?

    আছে এক পৈতে-কাটা বুড়ী। গেল সপ্তাহের পৈতেগুলোও পড়ে আছে। চল, একবার ঘুরে যাই।

    —বলে আবার সেই পথেই ফিরে চলল বারীন। অপর্ণা চলতে চলতে বলল, তোমার টেবিলের ওপর কাগজের ঠোঙায় কতকগুলো পৈতে পড়ে আছে দেখছিলাম, ওইগুলো বুঝি?

    হ্যাঁ, ওইগুলোই। আজও বোধ হয় আর এক ঠোঙা চাপবে।

    বেশ মিহি আর মাজা সুতোর পৈতে। দেখে কিন্তু হাতে-কাটা বলে মনে হয় না।

    তা হলে কী হবে, বিক্রি হয় না। কলের তৈরী পবিত্র জাপানী পৈতে না হলে তো আজকালকার সদ্-ব্রাহ্মণদের মন ওঠে না। কোনদিন শুনব, নারায়ণ-পূজোর তুলসী আসছে জার্মানী থেকে!

    অপর্ণা হেসে ফেলল, এত সব উদ্ভট কথাও যোগায় তোমার মাথায়!

    একতলা পাকা বাড়ি। দেওয়ালে চুন-বালি খসে পড়ছে। সামনের বারান্দায় কম্বলের আসনে বসে চোখে নিকেলের চশমা লাগিয়ে একজন বর্ষীয়সী বিধবা তকলি কাটছিলেন। পরনে পরিচ্ছন্ন সাদা থান। বারান্দাটি ধবধব করছে পরিষ্কার। বেশ একটি শুচিশুদ্ধ পরিবেশ। শীর্ণ মুখখানা ম্লান, কিন্তু কেমন একটা মমতা-মাখানো। একবার তাকালেই মাথা নুয়ে আসে। ওদের দেখেই ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়লেন। অপর্ণা এগিয়ে গিয়ে প্ৰণাম করল। মহিলাটি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বারীনের দিকে তাকালেন এবং পরিচয় পেয়ে সস্নেহে ওর চিবুক স্পর্শ করে আঙুল চুম্বন করলেন। বললেন, বড্ড ভালো দিনে এসেছ তোমরা। কালীঘাটে গিয়েছিলাম। মায়ের প্রসাদ রয়েছে ঘরে। এসো, ভেতরে এসো।

    সামনেই একখানা মাঝারি আকারের ঘর। ওরা জুতো খুলে রেখে ভিতরে গিয়ে বসল। পাথরের রেকাবিতে করে সামান্য ফলমূল আর একটু সন্দেশ ওদের সামনে ধরে দিয়ে অপর্ণাকে উদ্দেশ করে বললেন, হাতে জল দিয়ে প্রসাদটুকু খেয়ে নাও মা। বারীন কিন্তু তোমার কথা একদিনও বলে নি। ও আমার ভারী চাপা ছেলে।

    বারীন প্রতিবাদ করল না, নিঃশব্দে হাসতে লাগল।

    ও কি এখানেই থাকে? — প্রশ্ন করলেন মহিলাটি।

    বারীন বলল, না, এই কিছু দিন হল এসেছে।

    অপর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, আবার যেদিন আসবে, ওকে নিয়ে এসো। এক বেলা থাকবে আমার কাছে। বড্ড ফাঁকা লাগে একা একা।

    শেষের দিকে কেমন কোমল এবং করুণ শোনাল কথাগুলো। বারীন বলল, বেশ তো, আর একদিন নিয়ে আসব। আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা রাখবেন। আজ কিন্তু আর বসর না মাসীমা। হ্যাঁ, আপনার পৈতে এবার একটাও পড়ে নেই। বেশ ভালো দাম পেয়েছি। বলে পকেট থেকে দুখানা এক টাকার নোট বের করে রাখল ওঁর পায়ের কাছে। উনি মনে মনে কী সব হিসাব করে মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু এতটা তো হতে পারে না! কত করে বিক্রি করেছ?

    বারীন যে রীতিমত বিপদে পড়েছে, তার মুখ দেখেই অপর্ণার বুঝতে বাকী রইল না। কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকারে উনি বোধ হয় টের পেলেন না। সেই সুযোগ নিল বারীন। আমতা আমতা করে বলল, যাকে বেচতে দিয়েছিলাম সে ওই দু টাকাই তো দিয়ে গেল। হিসেব- পত্তর এখনও হয় নি। আজ কিছু দেবেন নাকি?

    মাসীমা আর কিছু বললেন না। উঠে গিয়ে তাকের উপর রাখা একটি ছোট্ট বাক্সের ভিতর থেকে কাগজে জড়ানো একটা প্যাকেট বের করে এনে ওর হাতে দিলেন। তার পর আগের জায়গায় বসে পড়ে বললেন, তোমাকে তো অনেকবার বলেছি বাবা, তুমি যা করছ, আমার পেটের ছেলের চেয়েও বেশী। যেদিন আর পারব না সেদিন তো মাসীমার বোঝা তোমাকেই টানতে হবে। সেটা যতদিন ঠেকিয়ে রাখা যায়। এ থেকে যা আসে, ঠিক তাই আমাকে দিও। তাতেই আমার স্বচ্ছন্দে চলে যাবে।—এই বলে নোট দুখানা তুলে নিয়ে আঁচলে বাঁধলেন।

    বাইরে থেকে কে বলে উঠল, বারীনবাবু, এসেছেন নাকি?

    মাসীমার মুখখানা হঠাৎ অপ্রসন্ন হয়ে উঠল। চাপা গলায় বললেন, ওকে আর কিছু দিও না বাবা। সোজাসুজি ভিক্ষে চাইতে যার মানে বাধে, অথচ ধার বলে হাত পাততে লজ্জা করে না, তাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। তোমার টাকা কি ও কোনোদিন ফিরিয়ে দেবে মনে কর?

    বারীন হাসতে হাসতে বলল, ভরসা খুবই কম।

    তবে?

    ততক্ষণে ভদ্রলোক বারান্দায় উঠে এসে ঘরের মধ্যে মুখ বাড়িয়েছেন। বারীন এগিয়ে গিয়ে বলল, কী খবর আপনার?

    খুব ভালো খবর ব্রাদার। ম্যাঙ্গো সাহেব ডেকে পাঠিয়েছিল সেদিন। বললে—বসাক, আমি খুব দুঃখিত। হেডক্লার্কের কথা শুনে হঠাৎ তোমাকে ছাড়িয়ে দিলাম। এইবার বুঝতে পারছি কত বড় ভুল করেছিলাম। এখন তো আমার হাতে কিছু নেই। তবে রেস্ট অ্যাসিওর্ড, কোন সেকশনে জায়গা হলেই তোমাকে নিয়ে নেবো। আরে বাবা, এইবার পথে এসো। জানতুম ডাকতেই হবে। এই শর্মা না হলে সুইনবার্ন কোম্পানির একটি দিন ও চলবে না। হেঁ-হেঁ—

    বারীন বলল, আমি বলছিলাম, যদ্দিন ওটা না হয়, অন্য দিকেও চেষ্টা করলে ক্ষতি কি!

    আরে না না। ওখানেই হবে। আর শুধু একটা মাস। হ্যাঁ, আসল কথাই তো বলা হয় নি। আজ আবার সামান্য কিছু দিতে হবে ব্রাদার। ছোট ছেলেটা জ্বরে ভুগছে, গিন্নীর কাপড় নেই, ঘর থেকে বেরুতে পারে না। আসছে মাসেই আপনার সব টাকা শোধ করে দেবো। এই চাকরিটা হতে যা দেরি।

    আজ তো কিছু নেই। তিন-চার দিন পরে আবার আসব, তখন—

    তিন-চার দিন! আচ্ছা কাল সকালে যদি আপনার বাসায় যাই একবার?

    বারীন একটু ভেবে নিয়ে বলল, আজ্ঞে না, কাল পেরে উঠব না।

    ভদ্রলোক যখন বারীনের সঙ্গে কথা বলছিল, অপর্ণা যতবার বাইরের দিকে তাকিয়েছে, প্রতিবারই চোখে পড়েছে একজোড়া কুৎসিত চোখের চুরি-করা চাউনি। এক সময় সেটা বোধ হয় মাসীমারও নজরে পড়ে গেল। উনি তখন ওর বাড়িঘরের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। কথার মাঝখানে হঠাৎ বলে উঠলেন, চলো, আমরা রান্নাঘরে গিয়ে বসি।

    ফেরবার পথে এই পাঁচ মিনিটের দেখা বিধবা মহিলাটি অপর্ণার সমস্ত মন জুড়ে রইলেন। চলতে চলতে এক ফাঁকে প্রশ্ন করল, ওঁর বোধ হয় কেউ নেই?

    বারীন বলল, আছে বইকি। ছেলে আছে এবং সে যে উপযুক্ত নয়—সে কথাও কেউ বলবে না।

    অপর্ণা বিস্ময়ের সুরে বলল, কী করে লোকটা?

    মস্ত লোক। ক্যালকাটা পুলিসের দারোগা। অ্যাদ্দিনে হয়তো ইনস্পেক্টার হয়ে গেছে, কিংবা হবো হবো করছে।

    মাকে দেখে না?

    সে তো দেখতেই চায়, উনি দেখা দিতে চান না।

    দোহাই তোমার, হেঁয়ালি ছেড়ে সোজা ভাষায় একটা কথা বলো দিকিন!

    বারীন হেসে ফেলল, ঘটনাগুলো কি সোজা রাস্তায় ঘটে যে সোজা ভাষায় বলব? এই ওঁদের বেলাতেই দেখ। দারোগা মানুষ। থানার ওপরে মস্ত বড় সরকারী বাসা। মা বউ নিয়ে সচ্ছল সংসার। একদিন দরজার আড়াল থেকে মায়ের নজর পড়ল, একটা লোক ছেলের পা জড়িয়ে ধরে কী সব বলছে, কিন্তু ছেলে মোটেই আমল দিচ্ছে না। তার পর বেরোল একটা নোটের বাণ্ডিল। চলে গেল প্যান্টের পকেটে। সঙ্গে সঙ্গে জল হয়ে গেলেন দারোগাবাবু। বাইরে আসতেই চেপে ধরলেন মা : “কিসের টাকা তোর পকেটে?” ছেলের উত্তর ঠিক জানা নেই। আমতা আমতা করে হয়তো বলে থাকবে কিছু। হুকুম হল : “ফিরিয়ে দাও টাকা।” লোকটা ততক্ষণে চলে গেছে। তা ছাড়া ফিরিয়ে দিতে গেলে ব্যাপারটা হয়তো অন্য দিক দিয়ে জটিল হয়ে দাঁড়াবে। কে শোনে সে কথা? প্রতিজ্ঞা করে বসলেন, “যে ছেলে ঘুষ খায়, তার মা নই আমি, তার বাড়িতে জলগ্রহণ করব না।” দারোগার মেজাজ তো! উত্তরে হয়তো কড়া কিছু বলে থাকবে। তার সঙ্গে আবার একটু ফোড়ন মিশিয়েছিলেন রউমা! ব্যস, এক কাপড়ে উঠলেন এসে ওই স্বামীর ভিটেয়। তার পর অনেকবার এসেছে ছেলে-বউ। পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু মায়ের পণ ভাঙাতে পারে নি।

    অপর্ণা একমনে শুনছিল। এবার প্রশ্ন করল, তুমি ওঁর দেখা পেলে কেমন করে?

    ওই পাড়ায় আমার অন্য মক্কেল আছে তো! তাদের খোঁজে এসে। খাসা নামটা দিয়েছিস, মক্কেলই বটে।

    ওই পৈতে ছাড়া কি ওঁর আর কোন সম্বল নেই?

    ছিল। খান-দুই ঘর ভাড়া দিয়েছিলেন। কিছু কিছু আসত। এখন আর আসে না। ভাড়াটের অবস্থা তো দেখলি।

    ওই ওঁর ভাড়াটে! ওই জোচ্চরটা!

    আহা, গালাগালি দিচ্ছিস কেন? জোচ্চুরি আবার করল কোথায়?

    জোচ্চুরি নয়! ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা নেই, ইচ্ছেও নেই, তবু বলে ধার!

    ওটা জোচ্চুরি নয়, চক্ষুলজ্জা। কী করবে বল? জাতটার নাম যে মধ্যবিত্ত—যাদের আদ্য মধ্য কোন বিত্তই নেই, অথচ ভদ্রতার খোলসটা ছাড়া চলে না। বিত্ত একেবারে নেই, তাই বা বলি কেমন করে? আছে এক ঝুড়ি অভিমান আর খানিকটা ফাঁকা মর্যাদাবোধ, তাই হাতটা সোজাসুজি না বাড়িয়ে একটু ঘুরপথে বের করে, যাকে বলে দেনার আড়াল দিয়ে দান গ্রহণ। সেটা তো শুধু ওর দোষ নয়, ওর জাতের ধর্ম। লোকটা যে ভদ্দরলোক। তাই তো তোকে বলছিলাম সেদিন, এই মাঝের তলায় যারা থাকে, তাদের মতো দুঃখী আর নেই।

    বারীন যখন যা কিছু বলে তারই মধ্যে থাকে একটা প্রচ্ছন্ন পরিহাসের সুর। এটা তার চিরদিনের স্বভাব। কিন্তু এই শেষের কথাটা কেমন যেন গম্ভীর শোনাল তার কণ্ঠে। মনে হল, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও ফেলল না। অপর্ণা একবার তার মুখের দিকে তাকাল। অস্পষ্ট আলোয় বিশেষ কিছু দেখা গেল না। বাকী পথটুকু দুজনে নীরবে পার হয়ে এল।

    পর পর তিন-চার দিন বারীনকে খুব ব্যস্ত দেখা গেল। সকালে বেরিয়ে যাচ্ছে, ফিরছে অনেক বেলায়। স্নানাহার এবং খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর আবার একদফা ঘুরে এসে দরজা বন্ধ করে রাত দশটা এগোরাটা পর্যন্ত চলে ওদের গোপন আসর। তারই ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুদের আনাগোনা। সবারই মুখে গাম্ভীর্যের ছায়া। একটা কিছু ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে, যার জন্যে সবাই উদ্বিগ্ন। অপর্ণার সঙ্গে দেখাশোনা যদি বা হয়, কথাবার্তা বিশেষ কিছুই হয় না।

    সেদিন সকালে খানিকটা পড়াশুনা সেরে বারীনের ঘরের সুমুখ দিয়ে যেতে গিয়ে দেখল, সে চুপ করে শুয়ে আছে। অপর্ণা ঘরে ঢুকে বলল, ওমা, আমি মনে করেছি তুমি বেরিয়ে গেছ! এ রকম অসময়ে শুয়ে যে? শরীর ভালো তো?

    বারীন এতগুলো প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে উঠে বসল এবং অপর্ণার দিকে একদৃষ্টে কয়েক মিনিট চেয়ে থেকে বলল, তোকে একটা কাজ করতে হবে পরী।

    কী কাজ? উদ্বেগের সুরে জিজ্ঞাসা করল অপর্ণা।

    মনে আছে, একদিন বলেছিলাম তোকেও আমাদের দলে আসতে হবে? সেদিনটা এতকাল ঠেকিয়ে ঠেকিয়েই এসেছি, আর বোধ হয় ঠেকানো গেল না।

    কী হয়েছে, আমাকে খুলে বলো বারীনদা! —বলে অপর্ণা বসে পড়ল ওর তক্তপোশের এক পাশে।

    বারীন একটু যেন ইতস্তত করে কুণ্ঠার সুরে বলল, অনেকগুলো পরিবারের ভার পড়েছে ঘাড়ের ওপর, এদিকে টানবার ক্ষমতা নেই। খবর পেলাম প্রায়-বাড়িতেই হাঁড়ি চড়ছে না। তার ওপর আর এক বিপদ। হাজার দুয়েক টাকার মাল ছিল আবদুলের কাছে, তারও কোনো খবর নেই। যদি ধরা পড়ে থাকে, তা হলেই সৰ্বনাশ!

    অপর্ণা চমকে উঠল, আস্তে আস্তে বলল, কী মাল?

    কোকেন।

    অ্যা! একটা ভীতি-বিহ্বল অস্ফুট শব্দ শোনা গেল অপর্ণার মুখে। আর কোন কথা বলতে পারল না।

    বারীন বলল, সে যাক গে। তোকে যা বলছিলাম, সেই বাক্সটা তো দেখেছিস, নিয়ে বেরোবি একবার?

    অপর্ণার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। তাড়াতাড়ি বলে ফেলল, না না, ও-সব পারব না। তার চেয়ে আমার গয়নাগুলো নিয়ে যাও। ওই দিয়ে যা হয় করো। তোমার ওই বাক্স নিয়ে ঘোরা আমাকে দিয়ে হবে না।

    তোর ওই জিনিস কখানার কথাও আমি ভেবেছি। কিন্তু এ সময়ে ওটা আমরা হাতছাড়া করতে পারি না। ওর দরকার হয়তো পরে আসছে। আবদুল যদি ধরা পড়ে থাকে, ছাড়াতে হবে তো? তার মানে অনেক টাকার ব্যাপার।

    একটু অপেক্ষা করে আবার বলল বারীন, তোকে আমি বলতাম না পরী। আমি নিজেই বেরোতাম সুটকেসটা নিয়ে। কিন্তু আমাকে আজ সারাদিন ওই আবদুলের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। কখন কী খবর আসে! তা ছাড়া তুই যা ভাবছিস, তেমন কিছু অন্যায় তো আমরা করছি না। লোক ঠকাতে হবে তা ঠিক, কিন্তু ভেবে দেখেছিস ঠকছে কারা? যাদের অনেক আছে, অঢেল আছে। আর কাদের জন্য ঠকাচ্ছি? যাদের কিছুই নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে ছট্‌ফট্ করছে, তাদের দুটো মুড়ি কি করে জুটবে সেইটাই ভাববার কথা, না কোন রাজার নন্দিনী পাঁচ টাকার জিনিস পঁচিশ টাকায় কিনে একটু ঠকলেন, তাই নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে! এর মধ্যে দোষটা কোথায় দেখলি?

    অপর্ণা অনুনয়ের সুরে বলল, আমাকে ভুল বুঝো না বারীনদা। দোষ-গুণ বা ন্যায়- অন্যায়ের কথা আমি তুলি নি। ওসব আমি কী জানি? তুমি বলছ, এই আমার যথেষ্ট—সেই এতটুকু যখন ছিলাম, তখন থেকে এই কথাই তো জেনে এসেছি। তোমার সেই পরীকে আজ ভুলে গেলে?

    স্বরটা কেমন বদলে গেল। শেষের দিকে রয়ে গেল বোধ হয় একটু অভিমানের রেশ। বারীন জবাব দিল না, হয়তো এটা প্রশ্ন নয় বলেই। ওর মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে আবার বলল অপর্ণা, আমি ভাবছিলাম, কী বলতে কী বলব! কেউ যদি ধরে ফেলে? এমন কিছু জিজ্ঞেস করে, যা আমি জানি না? কী মুশকিল হবে তা হলে! না লক্ষ্মীটি, ওসব তুমি আর কাউকে দাও।

    বারীন হেসে ফেলল, আচ্ছা ভীতু দেখছি! ধরবে আবার কে? আমরা তো আর জোর করে চাপাতে যাচ্ছি না। যার খুশি কিনবে, না হয় কিনবে না। ওর পিঠের উপর হাত বুলিয়ে বলল, কিচ্ছু ভয় নেই। যা বলতে হবে না-হবে, সব আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। বালিগঞ্জের দিকে বরং না গেলি। হঠাৎ-বড়লোক বাঙালী মহিলারা একটু বেশি সেয়ানা। তা ছাড়া নজরও ছোট। দু’শো টাকার জিনিস কিনতে হলে দু-টাকা থেকে দর করতে শুরু করবে। তার চেয়ে বড়বাজারে যা। মাড়োয়ারী-গিন্নীদের পটানো অনেকখানি সোজা।

    কিন্তু আমি যে কোনো দিকই চিনি না।—নিরুপায় ভাবে বলল অপর্ণা।

    চেনাবার ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছি। অমল যাবে তোর সঙ্গে।

    বারীনকে যাই বলুক, ওর নির্দেশে একটু বিশেষ রকম সাজগোজ করে অমলের সঙ্গে যখন বেরিয়ে পড়ল অপর্ণা, যে কথাটা তার মনের মধ্যে তোলপাড় করে ফিরতে লাগল তা হচ্ছে ওই ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব। একজন তার সরল মনের বিশ্বাস এগিয়ে দিচ্ছে তোমার কাছে, তুমি জেনেশুনে তার ওপরে ছুরি চালাচ্ছ। এ শুধু অন্যায় নয়, পাপ। সে লোকটা অনেক টাকার মালিক বলেই তোমার সব দোষ কেটে গেল, সব অন্যায় ঢেকে গেল—এ কথা কেমন করে মানবে সে? যা অন্যায় তা সব ক্ষেত্রে, সকলের বেলাতেই অন্যায়। পাত্র-বদল হলেই তার রূপ বদলায় না। গুরুত্বের হয়তো কিছু তারতম্য ঘটে, কিন্তু দোষ দোষই থেকে যায়।

    অমল চলেছিল আগে আগে। তার হাতে সেই সুটকেস। সেই দিকে চেয়ে অপর্ণা একবার থমকে দাঁড়াল, তীব্র ইচ্ছা হল ফিরে যায়। মুখ থেকে বেরিয়ে গেল : শুনুন! অমল ফিরে তাকাল। কাছে এসে বলল, একটা রিকশা ডাকব? লজ্জিত হল অপর্ণা; না না, রিকশা কী হবে? চলুন। সেই মুহূর্তে চোখের উপর ভেসে উঠল, আজই সকালে দেখা বারীনের সেই চিন্তাকুল মুখ, কপালের ওপর স্পষ্ট হয়ে ওঠা উদ্বেগের রেখা; থেমে থেমে বলছে : অনেকগুলো পরিবারের ভার পড়েছে ঘাড়ের ওপর…খবর পেলাম প্রায়-বাড়িতে হাঁড়ি চড়ছে না।

    ফিরে যাওয়া হল না। ততক্ষণে ট্রাম-লাইনে এসে গেছে। একটা স্টপেজের কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল অমলকে, এরপর আবার হ্যারিসন রোডে অন্য ট্রামে উঠতে হবে, তাই না?

    অমল বলল, হ্যাঁ।

    গেট-ওয়ালা চারতলা বাড়ি। বাইরে দাঁড়িয়ে দারোয়ান খইনি টিপছে আর কার সঙ্গে গল্প করছে। পিঠের ওপর ঝুলছে চামড়ার ফিতেয় বাঁধা বন্দুক। খানিকটা দূর থেকে অমল বলল, ওখানে একবার দেখলে হয়, বেশ বড়লোক বলে মনে হচ্ছে।

    অপর্ণার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল—এইবার শুরু হবে তার পরীক্ষা। কিন্তু বাইরে কোন দুর্বলতা প্রকাশ পেতে দিল না। সহজভাবেই বলল, বেশ তো, বাক্সটা দিন তা হলে। ঘুরে আসি একবার—বলেই কোনো দিকে না তাকিয়ে গম্ভীরভাবে ভিতরে ঢুকে পড়ল। দারোয়ান এল ছুটতে ছুটতে! অপর্ণা তার সদ্যলব্ধ হিন্দী ভাষায় জানাল, সে জুয়েলারী এম্পোরিয়মের প্রতিনিধি, খোদ ‘মালিকিনী’র সঙ্গে ভেট করতে চায়। গয়নার ‘ফরমাশ আছে।

    দারোয়ান একজন চাকরকে ডেকে হাত পা নেড়ে কী সব নির্দেশ দিল। চাকর ওকে সসম্ভ্রমে নিয়ে গেল তেতলায় এবং ঝিয়ের জিম্মায় রেখে সরে পড়ল। ঝিয়ের প্রশ্নের উত্তরে ওই একই কথা জানাল অপর্ণা, এবং তাকে অনুসরণ করে অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে অন্দর-মহলে গিয়ে পৌঁছল।

    সেটা বোধ হয় গৃহিণীর বিশ্রামকক্ষ। মাঝখানে অনেকটা জায়গা মূল্যবান পুরু কার্পেটে ঢাকা। দু-তিনটা বিশাল তাকিয়া গড়াগড়ি যাচ্ছে। তারই একটার গায়ে ততোধিক বিশাল দেহ এলিয়ে দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন মারোয়াড়-মহিষী। একজন দাসী পদসেবায় নিযুক্ত। আর একজন দাঁড়িয়ে আছে শিয়রের কাছে, বোধ হয় হঠাৎ কোন হুকুমের প্রতীক্ষায়! পা দুটো টেনে নিয়ে ওরই মধ্যে একটু সোজা হয়ে বসবার চেষ্টা করলেন এবং অপর্ণাকেও বসবার ইঙ্গিত করলেন। তারপর জানতে চাইলেন ওর আসবার উদ্দেশ্য। দু-চার কথায় তারই একটু আভাস দিয়ে অপর্ণা সুটকেসটা খুলে ধরল। গিন্নী সেদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মাথার কাছে দাঁড়ানো ঝিটাকে কী বললেন, এবং সে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুটি তরুণী এক রকম ছুটতে ছুটতে এসে বসে পড়ল সেই কার্পেটের উপর। চেহারা এবং বেশভূষা দেখে অপর্ণা অনুমান করল এরা এ-বাড়ির বউ। এসেই একজন তুলে নিল একটা নেকলেস, আর একজন আর্মলেট। দুজনেরই চোখে-মুখে ফুটে উঠল খুশির ঝলক। তার পর গিন্নীর সঙ্গে চলল তাদের কথাবার্তা, যার প্রায় সবটুকুই অপর্ণার কাছে একেবারে দুর্বোধ্য। গিন্নী গয়না দুখানা ওদের হাত থেকে নিয়ে নেড়েচেড়ে, আলোর দিকে ধরে গম্ভীরভাবে পরখ করতে লাগলেন। তারই ফাঁকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে জেনে নিলেন, দোকানটা কোথায় এবং সেখানে গেলে আরও জিনিস দেখতে পাওয়া যাবে কিনা। দোকানের উল্লেখে অপর্ণা একবার চমকে উঠল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কার্ডগুলো দেখিয়ে জবাব দিল, ওঁদের কষ্ট করে যাবার দূকার কী, যে যে জিনিস চাই, বলে দিলে সে নিজেই আর একদিন নিয়ে আসতে পারে।

    আরও কিছুক্ষণ কী সব আলোচনা হল বউদের সঙ্গে। কথাগুলো না বুঝলেও মোটামুটি ধরতে পারল অপর্ণা, গিন্নীর ইচ্ছা জিনিসগুলো সরকার মশাইকে দিয়ে যাচাই করে দেখা। কিন্তু বউ দুটির ধারণা, এ ব্যাপারে সরকার যদি নাক গলায়, তারপর কর্তাদের কান এড়ানো যাবে না এবং তার ফলে শেষ পর্যন্ত হয়তো সবটাই ফেঁসে যাবে। মহিলাটি তা সত্ত্বেও জিদ করতে লাগলেন এবং ঝিকে দিয়ে সরকারকেই বোধ হয় ডেকে পাঠালেন। বউরা ক্ষুণ্ণ-মনে উঠে চলে গেল।

    মাড়োয়াড়-গৃহিণী এবার অপর্ণার দিকে নজর দিলেন। জানতে চাইলেন কোথায় দেশ, কে কে আছে তার, বিয়ে হয়েছে কিনা? তার পর যোগ করলেন, তার বয়সী একটি মেয়ের পক্ষে এতগুলো দামী গয়না নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ক্যানভাসিং করতে বেরুনো একেবারেই ঠিক হয় নি। এই কলকাতা শহরে রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে আছে গুণ্ডা আর বদমাশ বিপদ ঘটতে কতক্ষণ!

    অপর্ণা ওঁর ভাষাটি বুঝল না। কিন্তু একটি অনাত্মীয়া বিদেশিনী মহিলার এই আন্তরিক উৎকণ্ঠার সুর তার অন্তর স্পর্শ করল। জবাব দেবার মতো বিশেষ কিছুই ছিল না। মাথা নিচু করে শুনে গেল। একবার শুধু বলল, সে একা আসে নি, সঙ্গে লোক আছে এবং সে বাইরে অপেক্ষা করছে।

    মিনিট দশেকের মধ্যেই সরকার-জাতীয় একটি মারোয়াড়ী ভদ্রলোক ব্যস্তভাবে এসে পড়লেন এবং মনিবপত্নীর সঙ্গে দু-চারটে কথা বলে গয়না দুখানা নিয়ে চলে গেলেন। অপর্ণার বুক ঢিপ্ টিপ্ করতে লাগল। গিন্নী আবার গল্প জুড়ে দিলেন তার সঙ্গে। আধ ঘণ্টা পরে সরকার এসে বললেন, বিলকুল ঝুটা ও রুক্ষভাবে তাকালেন অপর্ণার দিকে। মনিব-জায়াকে বোঝালেন, এই রকম একদল লোক ব্যবসার নাম করে লোক ঠকিয়ে বেড়ায়, মোটা মাইনে দিয়ে মেয়েছেলে ক্যানভাসার রাখে, যাতে করে অন্দর-মহলে জাল ফেলবার সুবিধা হয়। একে পুলিসে দিলেই গোটা দলটা ধরা পড়বে এবং এই মুহূর্তে সেইটাই ওদের একমাত্র কর্তব্য।

    অপর্ণা প্রতিবাদ করতে চাইল। কিন্তু মনে হল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গিন্নী সরকারের প্রস্তাবে সায় দিলেন না। বললেন, ওর দোষ কী? ছেলেমানুষ, দোকান থেকে যা দিয়েছে, তুলে নিয়ে এসেছে।

    গয়না দুটো ফিরিয়ে দিয়ে অপর্ণার দিকে তাকিয়ে সস্নেহে বললেন, তুমি এবার এসো বাছা। এসব জিনিস এখানে চলবে না।

    নতুন করে আর কোথাও ভাগ্য পরীক্ষার উৎসাহ অপর্ণার চলে গিয়েছিল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে মনে স্থির করে ফেলল, সোজা বাসায় ফিরে বাক্সটা বারীনদার সামনে ফেলে দিয়ে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেবে—এসব কাজ আমাকে দিয়ে হবে না, আর এ পথও তোমাকে ছাড়তে হবে। কিন্তু রাস্তায় বেরুতেই অমল যখন তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সাগ্রহে প্রশ্ন করল, নিলে কিছু ওরা? তখন শুধু মাথা নেড়ে জবাব দেওয়া ছাড়া আর কিছুই বলা হল না।

    এই ছেলেটি বারীনের দলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। অপর্ণার বয়সীই হবে বোধ হয়। ভারি লাজুক। কখনও ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। এবারেও তেমনি মাটির দিকে চেয়ে চিন্তিত মুখে বলল, একেবারে খালিহাতে ফিরে গেলে…বারীনদা বার বার করে বলে দিয়েছেন, কিছু টাকা অন্তত…তারপর যেন হঠাৎ আবিষ্কার করেছে এমনভাবে মাথা তুলে বলল, আমরা বোধ হয় ভুল করেছি। মারোয়াড়ী-পাড়ায় এসব জিনিসের আদর নেই। ওদের গয়না মানে তো ভারী ভারী সোনার তাল। তার চেয়ে এক কাজ করলে হয়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে একটা বাড়ি দেখে এলাম। মস্ত বড় মোটর দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা বোধ হয় পারসী। বেশ সৌখিন বলে মনে হল। ওখানে হয়তো কিছু সুবিধে হতে পারে

    বেশ, তাই চলুন—শুষ্ক স্বরে বলল অপর্ণা।

    রেলিং-ঘেরা কম্পাউণ্ডওয়ালা আধুনিক গড়নের বাড়ি। গেটে ঢুকেই লাল কাঁকর- ছড়ানো রাস্তা। দু’ধারে ফুল এবং পাম গাছের টব। লোকজন কেউ নেই। কার্পেটমোড়া সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে উপরে উঠে গেল অপর্ণা। হলের সামনে পড়তেই একজন উর্দিপরা চাপরাসী বেরিয়ে এসে হিন্দীতে জিজ্ঞাসা করল, কাকে চাই? অপর্ণা জানতে চাইল, অন্দরমহলে যাবার রাস্তা কোন্ দিকে? চাপরাসী উত্তর দেবার আগেই পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নিখুঁত সাহেবী পোশাক-পরা একটি মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। খানিকক্ষণ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে, তারপর নমস্কার করে ইংরেজীতে বললেন, ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে আসুন।

    অপর্ণার ইংরেজী-বিদ্যার দৌড় বেশী নয়। তারই সাহায্যে সে কোনোমতে জানাল, আমি একটা জুয়েলারি ফার্ম থেকে আসছি। মেয়েদের সঙ্গে দেখা করে দু-একটা নমুনা দেখাতে চাই।

    জুয়েলারি!–বলে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক : বেশ তো, আমাকে দেখাতে আপত্তি আছে কিছু?

    না, আপত্তি আর কি!

    বারান্দা পার হয়ে একটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘর। সেখানে নিয়ে গিয়ে একটা সোফা দেখিয়ে অপর্ণাকে বসতে বললেন ভদ্রলোক, এবং নিজেও বসলেন তার পাশের কৌচটিতে। এস্কিউজ মী।—বলে সুটকেসটা ওর হাত থেকে নিয়ে রাখলেন একটা সুদৃশ্য টিপয়ের উপর। তারপর ভাঙা-ভাঙা বাংলায় বললেন, আপনাকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে, একটু চা আনতে বলি?

    না না, আমি চা খাই না কুণ্ঠা-জড়ানো লজ্জার সুরে বলল অপর্ণা।

    তা হলে একটু কোল্ড ড্রিঙ্ক?

    কিচ্ছু দরকার নেই।

    দরকার আছে বইকি! —বলে একটা কী নাম ধরে হাঁক দিলেন এবং চাকর গোছের একজন লোক আসতেই দুটো আইসক্রীমের অর্ডার দিলেন। অপর্ণার দিকে ফিরে বললেন, কোন্ ফার্ম থেকে আসছেন আপনি?

    অপর্ণা সুটকেস খুলে একখানা কার্ড বের করে দিল ওঁর হাতে। উনি তার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, কিছু মনে করবেন না, এদের সঙ্গে আপনার টার্মস্ কি রকম? মানে কতটা মাইনে-টাইনে দেয়?

    অপর্ণা মহা সমস্যায় পড়ল। একবার ভাবল, বলে দেয়—এটা আমাদের নিজেদের ফার্ম, কাজেই মাইনের কথা ওঠে না। তার পরেই মনে হল, এই রকম একটা সম্ভ্রান্ত জুয়েলারি দোকানের যারা মালিক, তাদের বাড়ির কোন মেয়ের পক্ষে ফেরি করতে আসাটা শুধু অস্বাভাবিক নয়, অশোভন। অথচ উত্তর একটা দিতেই হবে। তাই কোনোরকমে বলে ফেলল, আপাতত একশো টাকা করে দিচ্ছে।

    একশো টাকা! কপাল কুঞ্চিত করে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন ভদ্রলোক, আই শুড সে, মিস—, আপনার নামটা জানতে পারি?

    অপর্ণা চ্যাটার্জি।

    আই মাস্ট সে মিস চ্যাটার্জি, ওরা আপনাকে ভয়ানক ঠকাচ্ছে। সার্টেনলি ইউ ডিসার্ভ মাচ মোর। অন্য যে কোন জায়গায় আপনি এর চেয়ে বেশী রোজগার করতে পারেন। এই ধরুন, আমার আপিসে! আপনার মতো এই রকম একজন স্মার্ট প্রাইভেট সেক্রেটারির জন্যে আমি অনায়াসে দুশো টাকা দিতে পারি। কাজ বিশেষ কিছুই নয়, আমার যেসব ভিজিটর আসেন, বেশীর ভাগই বড় বড় ব্যবসায়ী, তাঁদের রিসিভ করা, আর আমার পার্সোনাল ডায়রী রাখা। মানে এনগেজমেন্টগুলো লিখে রেখে ঠিক সময়ে মনে করিয়ে দেওয়া।

    তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আর একবার অপর্ণার দিকে চেয়ে আবার বললেন ভদ্রলোক, আপনি যাই বলুন মিস চ্যাটার্জি, এ কাজ আপনার নয়। সুটকেস হাতে করে দোরে দোরে গয়না ফেরি করে বেড়ানো আপনাকে একেবারেই মানায় না। বলুন, রাজী আছেন আমার প্রস্তাবে?

    এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবের আকর্ষণে না হলেও, এর আকস্মিক নূতনত্বে খানিকটা অভিভূত হয়ে পড়েছিল অপর্ণা, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না। ভদ্রলোক কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে বললেন, ঠিক এই মুহূর্তেই আপনার জবাব চাইছি না। আপনি ভেবে দেখুন। দরকার হলে আপনার অভিভাবকদের সঙ্গেও পরামর্শ করে দেখতে পারেন। কাল পরশু যখন হোক জানিয়ে দেবেন। এই নিন আমার কার্ড।

    ওর দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে কার্ডখানা এগিয়ে ধরলেন ভদ্রলোক। অপর্ণার নাকে গেল একটা পরিচিত গন্ধ, অনেক রাতে কোন কোন দিন দরজা খুলে দিতে গিয়ে যেটা পাওয়া যেত তার বাবার মুখ থেকে। সমস্ত শরীরটা ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়ে উঠল। কার্ডখানা নিতে গিয়ে হঠাৎ নজর পড়ল ওঁর চোখের দিকে। আপনার অজ্ঞাতে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল অপর্ণার। আর কোন কথা না বলে উঠে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে ট্রের উপরে আইসক্রীমের গ্লাস সাজিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল সেই বেয়ারাটা। ভদ্রলোক নিজেকে খানিকটা সরিয়ে নিয়ে বললেন, নিন, গলাটা একটু ভিজিয়ে নিন। যা গরম!

    অপর্ণা আর ‘না’ বলল না। নিঃশব্দে গ্লাসটা তুলে নিয়ে চুমুক লাগাল। সেই মুহূর্তে যে কোন একটা পানীয়ের সত্যিই দরকার ছিল তার। বুকের মধ্যে যে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল খানিকটা যেন শান্ত হল। গেলাসটা নিঃশেষ হবার পর ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, কবে নাগাদ আপনার জবাব আশা করতে পারি?

    অপর্ণা রুমালে মুখটা মুছে নিয়ে বলল, মাপ করবেন। চাকরির আমার দরকার নেই। এবার আমাকে উঠতে হবে।

    উঠতে হবে কী বলছেন! ওই সুটকেসে কী আছে, তাই তো এখনো দেখা হয় নি!

    দেখাবার মতো উৎসাহ তার একেবারেই ছিল না। কিন্তু না দেখিয়ে চলে যাওয়াও মুশকিল। তাই নিতান্ত অনিচ্ছাভরে বাক্সটা খুলে ডালাটা তুলে ধরল। ভদ্রলোক যেন চিৎকার করে উঠলেন, বাঃ!

    একটা নেকলেস তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এর দাম কত?

    চারশো টাকা।

    নেকলেসটা চোখের সামনে রেখে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বললেন, টু টেল ইউ দি টুথ, মিস চ্যাটার্জি, নেকলেস পরাবার মতো নিজের লোক আমার কেউ নেই। তবে উপযুক্ত পাত্র পেলে এ রকম একটা জিনিস প্রেজেন্ট দেওয়ার চেয়ে বড় আনন্দ আর কী আছে! তাই বলছিলাম—

    একটু থেমে গভীর দৃষ্টিতে অপর্ণার মুখের দিকে আর-একবার তাকিয়ে বললেন, আসুন না, দেখি কী রকম মানায় আপনার গলায়!

    দু-হাতে হারটা ধরে উঠে দাঁড়াতেই খানিকটা ছিটকে পিছিয়ে গেল অপর্ণা, দু-চোখে আগুন ছড়িয়ে দৃপ্ত-কণ্ঠে বলল, রেখে দিন ওখানে!

    ভদ্রলোক প্রথমটা হঠাৎ থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, না না, রেখে দেব কেন? এটা আমি নিলাম। আপনি বসুন, আমি চেকবইটা নিয়ে আসছি।

    ভদ্রলোক বাইরে যেতেই অপর্ণা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে চলল সিঁড়ির দিকে। কয়েকটা ধাপ নামতেই পেছনে শুনতে পেল : এ কী! চলে যাচ্ছেন যে? চেকটা নিয়ে যান!

    অপর্ণা আর দাঁড়াল না, ফিরেও তাকাল না। রাস্তায় পড়তেই এগিয়ে এল অমল। ওর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল, ভয়ে ভয়ে বলল, কী হয়েছে?

    কিছু না, বাড়ি চলুন-

    একটা গাড়ি ডাকব?

    ডাকুন।

    ট্যাক্সি থেকে নেমে দরজার কড়া নাড়তেই খুলে দিল ঝি। অপর্ণা ঝড়ের মতো ঢুকল বারীনের ঘরে। উত্তেজিত স্বরে ডাকল, বারীনদা!

    বারীন নেই, তার জায়গায় বসে রয়েছে শরণ সিং। ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে বলল, কী হয়েছে বহিন?

    এই সস্নেহ সম্বোধনে অপর্ণার চোখে জল এসে পড়ল। কোন উত্তর না দিয়ে বাক্সটা মাটিতে ফেলে ছুটে গিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। দুর্জয় ক্ষোভ আর অভিমানে ভরে উঠল সমস্ত মন। ওই বারীনদা আর তার বন্ধুরাই তো তাকে ঠেলে দিয়েছে অপমান আর অমর্যাদার মুখে! ওরা সব জানত, এ শুধু না-জানার ভান।

    আস্তে আস্তে যখন ভাঁটা দেখা দিল উত্তেজনায়, তখন আবার লজ্জিত হল। এ রকম একটা নাটক না করলেই হত। ছি ছি, কী ভাবছে শরণ সিং, কী ভাবল অমল! বারীনদাই বা গেল কোথায়? চোখ মুখ ভালো করে মুছে বাইরে এসে দেখল, শরণ গালে হাত দিয়ে বসে আছে বারীনের ঘরের সামনে। বলল, ওদিকের সব খবর কী শরণদা?

    খবর ভালো নয়। ওর দিকে না চেয়ে তেমনই শুষ্ক কণ্ঠে বলল শরণ সিং। অপর্ণার বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল। কী সেই অমঙ্গল সংবাদ, মুখ ফুটে জিজ্ঞাসা করতে পারল না। শরণ নিজেই জানিয়ে দিল, আবদুল ধরা পড়েছে। বারীন গেছে তার জামিনের ব্যবস্থা করতে। আমি তোমার জন্যেই বসে ছিলাম। কিন্তু অমলের কাছে যা শুনলাম, এদিকে বোধ হয় কোনো সুবিধে হয় নি। আমি তা হলে উঠি। বারীন আবার আশা করে বসে আছে। খবরটা একবার—

    এক মিনিট দাঁড়ান, আমি আসছি। ঘরে এসেই অপর্ণা বাক্স খুলে বের করল সেই গয়নার পুঁটলি। তারই থেকে দুটো জিনিস তুলে নিয়ে শরণের কাছে গিয়ে বলল, আজকের কাজ বোধ হয় এতেই হয়ে যাবে। যদি না কুলোয় কাউকে পাঠিয়ে দেবেন।

    শরণ হতভম্বের মতো খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, এসব কী করছ তুমি? এ তো আমি নিতে পারি না!

    কী মুশকিল, বারীনদার সঙ্গে কথা হয়েছে যে!

    কথা হয়েছে?

    হ্যাঁ।

    ঠিক তো?

    বাঃ, তবে কি মিছে কথা বলছি! আপনি এবার আসুন, আর দেরি করবেন না।

    বারীন যখন ফিরল, রাত এগারোটা বেজে গেছে! জামা খুলতে খুলতে বলল, তুই খেয়ে নিয়েছিস তো?

    অপর্ণা হেসে মাথা নাড়তেই বিরক্ত হয়ে উঠল, এ তোর ভারি অন্যায়। কতদিন বলেছি না, নটা বাজলেই আমার ভাতটা ঢাকা দিয়ে রেখে খেয়ে নিবি?

    আচ্ছা, এখন থেকে তাই না হয় করা যাবে। তুমি এবার চট্ করে হাত মুখ ধুয়ে এসো তো। শুধু বকুনি খেলে পেট ভরবে না। বড্ড খিদে পেয়েছে।

    আমারও।—বলে হেসে ফেলল বারীন। তার সঙ্গে যোগ দিল অপর্ণা।

    রান্নাঘরে পাশাপাশি খেতে বসে অপর্ণা জিজ্ঞাসা করল, তারপর? কদ্দূর কী করে এলে বলো।

    বারীন ভাত মাখছিল। হাত দুটো থামিয়ে হঠাৎ যেন নিশ্চল হয়ে গেল।

    কী হল আবার! সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল অপর্ণা।

    কিছু না। ভাবছিলাম, মাসীমার ওই শেষ সম্বলটুকু হাত করতে না পেরে তোর নতুন মা নিশ্চয়ই ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন!

    তুমি এখানে বসেই শুনতে পেয়েছিলে বুঝি? —কৌতুকের সুরে বলল অপর্ণা।

    না, তা ঠিক পাই নি, তবে এখন বুঝলাম। ওঁর নাগালের বাইরে এসেও কিছু বাঁচানো গেল না।

    বারীনের সেই স্বাভাবিক হালকা সুর; কিন্তু তার মধ্যে একটু যেন প্রচ্ছন্ন বেদনার আভাস, অপর্ণার মনেও যার স্পর্শ লাগল। তাই একটা কোন সহজ পরিহাসের দোলা দিয়ে বিষয়টাকে উড়িয়ে দেবার ইচ্ছা থাকলেও তা সম্ভব হল না। ক্ষণকাল নীরব থেকে বলল, আমার কী মনে হচ্ছে জান?

    কী মনে হচ্ছে?

    মা যেখানে আছে, সেখান থেকে যদি আমাদের দেখতে পায়, জানতে পায় আমাদের সব কথা, তা হলে নিশ্চয়ই খুব খুশী হয়েছে। আমার চেয়েও খুশী।

    বারীন কোন উত্তর দিল না। বিস্মিত মুগ্ধ দৃষ্টিতে ক্ষণকাল শুধু তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। তারপর আবার ভাত মাখতে শুরু করল।

    পরদিন সকাল হতেই বারীন বাইরে যাবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল। কাজের অন্ত নেই। আবদুল এখনও পুলিসহাজতে। এবার গিয়ে উকিল-মোক্তার লাগিয়ে তার জামিনের বন্দোবস্ত করতে হবে। হাতে হাতে মোটা রকম নগদ ব্যবস্থা না পেলে পুলিস-কোর্টের উকিল কখনও মাথা তোলেন না। কাল রাতেই অপর্ণা এবং স্যাকরা মিলে তার সুরাহা করে দিয়েছে। বেরুতে যাবে এমন সময় শরণ সিং এসে উপস্থিত। দোরগোড়া থেকেই বলল, কোথায় যাচ্ছ?

    বারীন চোখের ইঙ্গিতেই গন্তব্যস্থানটা বুঝিয়ে দিল। শরণ জুতো খুলতে খুলতে বলল, যা করবার আমিই করব। তোমার গিয়ে কাজ নেই।

    কেন?-–কপাল কুঞ্চিত করে বিস্ময়ের সুরে প্রশ্ন করল বারীন।

    কেন আবার! আবদুলের জন্যে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে।

    কী বলছ তুমি?

    ঠিকই বলছি। তোমার যাওয়া তো হবেই না, এ বাড়িটাও আমাদের এখনই ছেড়ে দিতে হবে।

    কী ব্যাপার বলো তো? হঠাৎ খেপে গেলে নাকি?

    হ্যাঁ, খেপে যাবার কারণ হলেই খেপতে হয়। ঘরে চলো, বলছি।

    বারীনের ঘরে তিনজনে মিলে বসল ওদের পরামর্শসভা। শরণ সিং আগের কথার সূত্র ধরেই জানাল, সে খবর পেয়েছে, ওদের এই কোকেন ব্যবসায়ের উপর পুলিসের নজর পড়েছে। শুধু নজর দিয়েই তারা ক্ষান্ত হয় নি, কাজের দিক দিয়েও বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে! নানা কারণে এ বাড়িটা আর এক মুহূর্তও নিরাপদ নয়।

    এক অজানা আশঙ্কায় অপর্ণার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। শুষ্ক মুখে বলল, ভাগ্যিস তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলে শরণদা। আর দু মিনিট দেরি হলেই ও বেরিয়ে পড়ত। কিন্তু এত শীগগির বাড়ি পাওয়া যাবে কোথায়?

    সে ব্যবস্থা আমি করে এসেছি। আমাদের পাড়ায় এই রকম একটা ছোট বাড়ি খালি আছে। গেলেই পাওয়া যাবে।

    বাড়ির প্রসঙ্গে বারীন এতক্ষণ কোন কথা বলে নি, এবার মৃদু হেসে বলল, দু মাসের ভাড়া বাকি আছে, তা জান তো?

    শরণ বলল, তোমার হাতে যে টাকা আছে, তার থেকে দিয়ে দাও।

    আর ওই লোকটা জেলে পচতে থাক! শ্লেষ-তীব্র-কণ্ঠে বলল বারীন, তোমার বন্ধুপ্রীতি দেখে মুগ্ধ হলাম শরণ সিং!

    শরণ কিছুমাত্র দমে না গিয়ে বলল, বন্ধুর আসল পরিচয়টা যদি জানতে, তা হলে মার ও কথা বলতে না। পরীর সামনে বলতে চাই নি এতক্ষণ, কিন্তু তুমি আমাকে বাধ্য করলে।

    আসল পরিচয় মানে?

    মানে, আবদুল বিট্রে করেছে। আমাদের সব খবর এখন পুলিসের খাতায়।

    শরণ সিংয়ের উত্তেজিত গম্ভীর কণ্ঠ হঠাৎ থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অপর্ণার গলা থেকে বেরিয়ে এল একটা ভীতিবিহ্বল ক্ষীণ শব্দ। পর-মুহূর্তে মনে হল, সকলেই যেন নিশ্চল পাথর হয়ে গেছে।

    মিনিট কয়েক পরে শরণই শুরু করল, তোমার নামে ওয়ারেন্ট বেরিয়ে গেছে। আমাদের এই বাড়ির নম্বরটা ও জানে না, তাই পুলিস এখনও এসে পড়ে নি। কিন্তু বেশীক্ষণ আর দেরি হবে না।

    বারীনের আনত মুখখানা থমথম করতে লাগল কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে তার মনোরাজ্যের কোনও খবর পাওয়া গেল না। অপর্ণা ছুটে গিয়ে নিয়ে এল ওর শেষ পুঁজি। শরণের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, বাড়ি-ভাড়াটা যত তাড়াতাড়ি পার মিটিয়ে দিয়ে এসো। আমি দশ মিনিটের মধ্যে সব গুছিয়ে নিচ্ছি।

    ও সব রেখে দে পরী। মৃদুগম্ভীর সুরে বলল বারীন, বাড়িভাড়া না দিলেও চলবে। শরণ, একটা গাড়ি ডেকে আনো।

    অপর্ণা বলল, ছি-ছি, সেটা ভারি অন্যায় হবে।

    বারীনের মুখে ফুটে উঠল সেই বক্র হাসি। বলল, তা একটু হবে। তবে তার জন্যে চিন্তার কারণ নেই। পঞ্চাশ টাকা গেলে ওরা টেরও পাবে না। তোদের কবিদের ভাষায়, এটা হচ্ছে সাগরের কাছে গোষ্পদ।

    একটা ঘোড়ার গাড়িতে টুকিটাকি খুচরো জিনিস সব ধরানো গেল না, শুধু বাক্স বিছানা বাসনপত্র কোনও রকমে তুলে নিয়ে চারদিকের খড়খড়ি বন্ধ করে ওরা বেরিয়ে পড়ল ভবানীপুরের দিকে।

    বাড়িওয়ালার একটি মেয়ে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসত অপর্ণার কাছে। বেশ মেয়েটি। তার বাবা-মাও যে খারাপ লোক, এ রকম কোনও পরিচয় তাঁরা দেন নি। তাঁদের ন্যায্য পাওনাটুকু শোধ না করে এই যে পালিয়ে যাওয়া, এর পেছনে অর্থনীতিক যুক্তি যদি কিছু থেকেও থাকে, অপর্ণার সাধারণ নীতিবোধ তাকে কোনোমতেই মেনে নিতে পারল না। কেবলই মনে হতে লাগল, এ শুধু অন্যায় নয়, অপরাধ। দীর্ঘ পথ সেই অপরাধের লজ্জাটাই তাকে নানা দিক থেকে বিধতে লাগল। অথচ বলবার বা করবার তার কিছুই নেই। এই যে মানুষটি তার পাশে নিঃশব্দে বসে আছে, মুখে যাই বলুক, তার মনের কোনও কোণে এজন্যে এতটুকু বিকার দেখা দিয়েছে কি? তার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখবার চেষ্টা করল অপর্ণা। কিন্তু বদ্ধ গাড়ির অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করা গেল না। এই মুহূর্তে একটি কথাই শুধু মনে হল, সংসারের এক পরম বিস্ময় এই বারীন মানুষের জন্যে তার দরদের অন্ত নেই, আবার সেই মানুষের উপরেই সে যেমনি কঠোর তেমনি নির্মম।

    আবদুলের ব্যাপারে অনেকখানি মুষড়ে পড়লেও বারীন শরণ সিংয়ের মতো শেষ পর্যন্ত সায় দিতে পারল না। নিজে রইল নেপথ্যে, কিন্তু তদ্বিরের কোনও ত্রুটি হতে দিল না। পুলিসের কাছে জামিন না-মঞ্জুর হবার পর কোর্টের শরণ নেওয়া হল। সেখানে জন দুই উকিল মিলে দীর্ঘ বাক্যজল বিস্তার করলেন, কিন্তু তাতে করে হাজতের দরিয়া থেকে মক্কেলকে টেনে তুলতে পারলেন না। এদিকে পুলিসের জাল ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগল, এবং কয়েক দিনের মধ্যে এমন দু-চারজন তার মধ্যে জড়িয়ে গেল, যারা রুই-কাতলা না হলেও ঠিক চুনোপুঁটির দলে পড়ে না। জালের মুখটা যে এবার বারীনের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে, সেটা তার কাছেও অস্পষ্ট রইল না। সুতরাং নতুন বাসায় গা-ঢাকা দিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় দেখা গেল না।

    গা-ঢাকা দেবার অন্য প্রয়োজনও ছিল। কালো-বাজারের সুড়ঙ্গ পথে কোকেন নামক পরম নেশার বস্তু পাচার করে যে অর্থাগম হত, বারীনের বাজেটে আয়ের ঘরে সেইটাই ছিল প্রধান অঙ্ক। সেই দরজাটা যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন যে-সব পরিবারের অন্ন যোগাবার ভার সে হাতে নিয়েছিল, তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াবার আর মুখ রইল না। দৈবাৎ পাছে কারও সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, এই ভয়ে রাস্তায় বেরুবার পথও তাকে ত্যাগ করতে হল।

    কিন্তু ঘরের কোণে লুকিয়ে থেকে কতদিন চলে? বিশেষ করে বারীনের মতো যাদের জীবিকার পথ সহজ নয়, সরলও নয়। দু-তিন দিন পরে এক সকালবেলা অপর্ণা কলতলায় মুখ ধুচ্ছিল, বারীন কাছে গিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি একটু চা কর দিকিন, এখুনি বেরুতে হবে।

    বেরুতে হবে? —বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল অপর্ণা।

    বারীন হেসে বলল, ভয় নেই, পুলিসের আরও অনেক কাজ আছে। সব ফেলে কেবল বারীন বোসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে তাদের চলে না।

    ও-সব বাজে কথা রাখো। পরের বোঝা বইতে গিয়ে লাভ তো হল নিজের বিপদ টেনে আনা। এখনও শখ মেটে নি? না, বেরুনো হবে না তোমার।

    খুব তো জ্যাঠাইমার মতো রায় দিয়ে বসলি! পরের বোঝা না হয় না বইলাম, নিজেদের বোঝাটাও তো চালিয়ে নিতে হবে!

    এর পরে অপর্ণার মুখে আর কথা যোগাল না। সংসারের অবস্থা সত্যিই অচল হয়ে উঠেছিল। তবু একবার শেষ চেষ্টা করে বলল, বেশ, বেরুতেই যদি হয়, এখন না গিয়ে সন্ধ্যার পরে যেয়ো।

    তাতে কোনও কাজ হবে না। দে, চা-টা দে; আর দেরি করিস নে।

    খাবার সময় ফিরবে বলেছিল। সারাটা দিন কেটে গেল। দারুণ উৎকণ্ঠায় ঘর-বার করে অপর্ণা অস্থির হয়ে পড়ল। অথচ করবার কিছু নেই। শরণ সিংয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়বে কিনা ভাবছে, এমন সময় ফিরল বারীন। রাত নটা বেজে গেছে।

    কোথায় ছিলে সারাদিন?

    দরজা খুলেই ঝাঁজিয়ে উঠল অপর্ণা। নিতান্ত সহজ এবং নিরুত্তাপ সুরে জবাব এল, বলছি। তার আগে খেতে দিবি চল্।

    খেতে বসে ওই সম্বন্ধে দু-একটা প্রশ্নোত্তর ছাড়া আর কোনও কথা হল না। অপর্ণা আগাগোড়া গম্ভীর হয়ে রইল। সেদিকে দু-একবার আড়চোখে চেয়ে বারীনও মুখ বুজে হাত চালিয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়া মিটে গেলে হেঁসেলের পাট সেরে নিজের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল অপর্ণা, বারীন এসে দাঁড়াল ঠিক দরজার সামনে।

    সরো, ঘুম পেয়েছে।—নীরস গম্ভীর সুর অপর্ণার।

    পেলে কী হয়, ঘুম হবে না।

    কেন?

    রাগের সঙ্গে ঘুমের চিরকালের বিরোধ।

    রাগের কথা এল কিসে?

    আমিও তো তাই বলি—রাগের কথা এল কিসে? চল ছাতে যাই। হাওয়া লাগলে মাথা ঠাণ্ডা হবে।

    বারীন তার ডান হাতখানা রাখল ওর কাঁধের উপর। অপর্ণা আর আপত্তি করল না। যেতে যেতে বলল, মাথা আমার ঠাণ্ডাই আছে।

    ওদের এই গলিটা সদর-রাস্তা থেকে অনেকখানি দূরে। বড় শহরের যে দুটি বৃহৎ অবদান—চোখ-ধাঁধানো আলো আর কান-ফাটানো কোলাহল, এ পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পারে না। সমস্ত পাড়াটা এরই মধ্যে নিঝুম হয়ে গেছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত। আদিগন্ত কালো পর্দার উপর এক-আকাশ তারা। চারিদিকের ওই উঁচুনীচু অসংখ্য বাড়ি, দিনের আলোয় যাদের দেখে মনে হয় একটা শ্রীহীন শৃঙ্খলাহীন ইট-কাঠের জঙ্গল, চন্দ্রহীন রাত্রির এই আধ-আলো আধ-অন্ধকারে কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে। ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল অপর্ণা। আকাশ বলে যে এক পরম বিস্ময় আছে পৃথিবীতে, সে কথা আজ হঠাৎ মনে পড়ল। খেয়াল ছিল না, হাতখানেক দূরে একই রেলিঙের পাশে আর-একজন মানুষ তারই মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ চমকে উঠল, যখন কানে গেল তার মৃদু কণ্ঠ : আমাদের সেই ছেলেবেলার কথা তোর মনে আছে পরী?

    অন্তরের একটা একান্ত কোমল স্থানে যেন হাত পড়ল অপর্ণার। মানুষ তার জীবনের সব-কিছু ভুলে যেতে পারে, ভুলতে পারে না কৈশোরের সাধ আর প্রথম যৌবনের স্বপ্ন। তাদের বিগত দিনের মধ্যে এই দুটি বস্তুই যে জড়িয়ে আছে, শুধু জড়িয়ে নয়, সিঞ্চিত হয়ে আছে আনন্দ-বেদনার মধুর রসে, সে কথা কি জানে না বারীনদা! অন্য দিন হলে হয়তো সে বলে উঠত, মনে নেই আবার! কিন্তু আজ তার বুক ভরে গেল অভিমানে। অন্তরের উচ্ছ্বাস চেপে রেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, কী জানি বাপু, ও-সব আর ভাববার সময় নেই।

    ভাবতে বলছি না। অনেক যত্ন করে তোকে আমরা নাচ-গান শিখিয়েছিলাম, সে-সব ভুলে যাস নি তো?

    কেন? এই বুড়োবয়সে আবার তার পরীক্ষা দিতে হবে নাকি?

    যদি বলি, হ্যাঁ!

    রক্ষে করো। স্টেজে ওঠবার দিন চলে গেছে।

    স্টেজে না হয় না উঠলি, ঘরে বসে মাস্টারি করতে পারবি তো?

    অপর্ণা হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে উঠল : তা মন্দ বলনি। দাও না জুটিয়ে দু-একটা টিউশানি। বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছি, তবু দু-চার পয়সা রোজগার হয়।

    টিউশানি করে আর কত রোজগার হবে। গলা ভাঙবে, পেট ভরবে না। আমি যে মাস্টারির কথা বলছি সেটা একটু অন্য রকম।

    অন্যরকম! যথা?

    যথাটা এখন নয়, ক্রমশ প্রকাশ্য।

    পরের সপ্তাহটা বারীন প্রায় বাইরে বাইরেই কাটিয়ে দিল। তার পর একদিন সন্ধ্যাবেলা অপর্ণাকে নিয়ে তুলল চিৎপুর অঞ্চলে কোনও গলির মধ্যে একটা পুরনো বাড়ির দোতলায়। বেশ বড়গোছের ঘর। আধময়লা ফরাশের উপর কয়েকটা তাকিয়া। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে নানারকম বাদ্যযন্ত্র। অ্যাশট্রের উপর পোড়া সিগারেটের টুকরো, মাঝখানে একটা লম্বা-নলওয়ালা গড়গড়া। দেখেই মনে হবে, গানের আসর চলছিল, এই কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে, শিল্পীরা হয়তো পাশেই কোথাও বিশ্রাম করছে। অপর্ণা চারদিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, এ আবার কোথায় নিয়ে এলে?

    কেন, দেখে বুঝতে পারছিস না কী হয় এখানে?

    তা তো পারছি। কিন্তু কাদের বাড়ি এটা? তারা সব গেলই বা কোথায়?

    সে খবরে আমাদের দরকার নেই। যাদের নিয়ে দরকার তারা এখনই এসে পড়বে। তার আগে কী করতে হবে মোটামুটি শুনে রাহ্

    বলো।—ফরাসের একধারে বসে পড়ল অপর্ণা। বারীন তার মুখোমুখি বসে বলল, একটা বড় রকমের জলসার আয়োজন করেছি। চ্যারিটি শো। তাতে নামছেন—মানে তোদের ভাষায়, অংশগ্রহণ করছেন দুটি মেয়ে। তোর কাজ হল খানকয়েক বাজার-চলতি গান আর গোটা দুই নাচ ওদের শিখিয়ে দেওয়া। ভয় নেই, একেবারে আনাড়ী নয়। কাঠামোটা বোধ হয় তৈরী আছে, দরকার শুধু খড়-জড়ানো থেকে রঙ-ধরানো।

    অর্থাৎ কিছুই নয়! বেশ, তা না হয় হল। কিন্তু এই চ্যারিটি শো-টা কাদের জন্যে, জানতে পারি?

    বারীন নিজের বুকে একটা আঙুল রেখে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম—ইস্কুলের বইতে পড়েছিলে মনে নেই?

    অপর্ণা হেসে উঠল। বারীন সে হাসিতে যোগ না দিয়ে উঠে পড়ল। খানিকটা গিয়ে আবার ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, হ্যাঁ যাদের আনতে যাচ্ছি, তাদের সামনে আমরা কিন্তু পরী আর বারীনদা নই।

    তবে?

    আমি মিস্টার বোস, আর তুমি আমার পরমশ্রদ্ধেয়া সঙ্গীত-শিক্ষয়িত্রী মিস চ্যাটার্জি।

    মিনিট পনেরো পরেই ফিরে এল বারীন। সঙ্গে দুটি মেয়ে। বয়স বোধ হয় অপর্ণার চেয়ে সামান্য কিছু বেশী। দেহে যৌবনের লাবণ্য নেই, আছে তাকে ধরে রাখবার ব্যর্থ প্রয়াসের চিহ্ন। হাবভাব এবং সাজপোশাকে শালীনতার অভাব। চোখে মুখে অহেতুক চাপল্যের কেমন একটা কৃত্রিম চাপা হাসি ফুটিয়ে তুলে তারা যখন কাছে এসে বসল, অপর্ণার দৃষ্টি অপ্রসন্ন হয়ে উঠল। বারীন আড়চোখে একবার সেদিকটায় দেখে নিয়ে বিনীত কণ্ঠে বলল, আপনার ছাত্রীদের পৌঁছে দিলাম মিস চ্যাটার্জি। নতুন করে আমার আর কিছু বলবার সময় নেই। একটু কষ্ট করে গড়ে-পিটে নিতে হবে, শোটা যাতে · ভালোয় ভালোয় উতরে যায়। আচ্ছা, আপনি তা হলে কাজ শুরু করুন। আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঘুরে আসছি।

    অপর্ণা ততক্ষণে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। হঠাৎ এই ‘আপনি’ এবং ‘মিস চ্যাটার্জি’ হয়ে উঠবার কারণটাও খুব অস্পষ্ট নেই। ওই সম্মানটুকু না দেখালে এই মেয়ে দুটো বোধ হয় প্রথম থেকেই তাকে নিজেদের স্তরে টেনে নামাত। এখনও যে বিশেষ দূরত্ব ছিল তা নয়। একজন মুখ টিপে হেসে বলল, আপনি বুঝি আমাদের মাস্টারনী!

    অপর্ণা মনে মনে উত্তপ্ত হয়ে উঠল, কিন্তু কথায় বা ব্যবহারে কোনও তাপ প্রকাশ না করে প্রশ্নটা শুনতে পায় নি এমন ভাবে বলল, আপনারা কে কোন্টা করবেন?

    উত্তরের বদলে ছাত্রী দুটি একজন আর-একজনের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। এবারে আর ওর পক্ষে বিরক্তি প্রকাশ না-করা সম্ভব হল না। একটু রুক্ষ স্বরেই বলল, এতে হাসবার কী আছে? গান আর নাচ, কার কোন্টায় অভ্যাস আছে, জানতে চাইছি।

    এবারও একজন হাসতে শুরু করেছিল। আর-একজন তাকে একটা ধমক দিয়ে ছদ্ম গাম্ভীর্যের সুরে বলল, চুপ কর্ পোড়ারমুখী, উনি চটে গেছেন, দেখছিস না? তার পর অপর্ণার দিকে চেয়ে বলল, অভ্যাস আমাদের সবই আছে, সবই রাখতে হয়। কিন্তু তা দিয়ে কদ্দূর কী কাজ হবে, সেটা আপনিই ঠিক করে দিন।

    এর পর আর কথা না বাড়িয়ে দুজনেরই একটা মোটামুটি পরীক্ষা নিয়ে অপর্ণাকে স্থির করতে হল কে গান করবে আর কে নাচ দেখাবে। বুঝতে পারল, শেখাবার আগে যেটা শিখেছে তাই ভোলানোই হল আসল কাজ। ঘণ্টাখানেক পরে যখন হারমোনিয়াম বন্ধ করল অপর্ণা, একটি মেয়ে তার ডিবে থেকে একখিলি পান বের করে এগিয়ে ধরে বলল, একটা পান খান দিদি।

    পান খাই না আমি।

    আর-একজন বলল, সেটা আপনার দাঁত দেখেই ধরা যায়। আচ্ছা, ওই বাবুটি আপনার কে হয়?

    কেন বলুন তো?

    তা হলে ঠিক ধরেছি।—বলে আর-এক দফা হাসির রোল তুলে সখীর গায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল।

    ফাঁকা ট্রামে বাড়ি ফিরবার পথে অপর্ণা প্রায় সমস্ত রাস্তাটা গম্ভীর হয়ে রইল। বারীন কয়েকবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে এক ফাকে জিজ্ঞাসা করল, কেমন দেখলি? হবে?

    অপর্ণা উষ্মার সঙ্গে জবাব দিল, জানি না। আমি ও-সব পারব না।

    বারীনের মুখে মৃদু হাসি দেখা দিল। বলল, একেবারে কাঁচা বুঝি? কোনও রকমে দাঁড় করানো যাবে না?

    অপর্ণা সে কথার উত্তর না দিয়ে কঠিন সুরে বলল, ওই দুটো জংলী কোত্থেকে জোটালে বলো দিকিন! সভ্যতা দূরে থাক, ভদ্রভাবে কথা বলতেও শেখে নি!

    বারীন তেমনি মৃদু হেসেই বলল, ও, এই কথা! তা কী করবি বল? যেখানে ওরা থাকে, সেটা সভ্যতা বা ভদ্রতা শেখবার জায়গা নয়।

    কোথায় থাকে ওরা? কী করে?

    থাকে একটা বিশেষ পল্লীতে। কী করে, অর্থাৎ ওদের জাত-ব্যবসার চলতি নামটা শুনলে তুই শক্‌ পাবি। তাই সাধু ভাষায় বলছি, ওরা হচ্ছে পতিতা।

    কী বললে! চমকে উঠল অপর্ণা।

    বারীন অনেকটা যেন অসহায় কণ্ঠে বলল, উপায় কী বল? ভদ্রঘরের মেয়ে পাই কোথায়? তাই ওদের দিয়েই কাজ চালাতে হয়, জংলীকেই ঘষে-মেজে ভদ্র বানাতে হয়। তা না হলে উপরতলার দর্শকদের রুচিবোধে আটকে যাবে। ভেতরে ভেতরে যে সম্পর্কই থাক, বাইরে নাক সেঁটকাবে, সস্ত্রীক বা সকন্যা আসতে চাইবে না। আমাদের টিকিট বিক্রি হবে না। তাছাড়া অশাস্ত্রীয় কাজ কিছু করি নি। মনু বলে গেছেন, স্ত্রীরত্নং দুষ্কৃলাদপি।

    রত্নই বটে! কিন্তু তুমি ওদের পেলে কেমন করে?

    ভয় নেই। সরাসরি যোগাযোগ করবার দরকার হয় নি, মাঝখানে দালাল আছে। এই রে, লোকটা যে একখানা হ্যাণ্ডবিল চেয়েছিল! নামকরণটা মনের মতো না হলে বিগড়ে যেতে পারে। দ্যাখ তো, তোর পছন্দ হয় কিনা, মানে ঠিক আর্টিস্টিক হল কিনা নাম দুটো!

    নামও বুঝি বানাতে হয়েছে?

    পাঞ্জাবির পকেট থেকে এক বাণ্ডিল কাগজ বের করে একখানা বিজ্ঞাপন অপর্ণার হাতে দিয়ে বলল, নিশ্চয়ই। ওদের আসল নাম হয়তো মিছরিবালা আর বেদানাসুন্দরী। তা হলেই হয়েছে আর কী! নাম শুনে গেট থেকেই সব লোক পালিয়ে যাবে।

    অপর্ণা ততক্ষণে হ্যাণ্ডবিল পড়তে শুরু করেছে। কয়েক লাইন পরেই রয়েছে আর্টিস্টদের নাম এবং পরিচয়। চোখে পড়তেই স্থান-কাল-পাত্র ভুলে গিয়ে সরবে হেসে উঠল।

    হাসছিস যে?–প্রশ্ন করল বারীন।

    হাসব না! এ কী কাণ্ড করেছ? নৃত্য প্রদর্শন করবে থার্ড ইয়ারের ছাত্রী লিপিকা মজুমদার, এবং সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করবেন নবনীতা ঘোষ, বি.এ.। সর্বনাশ! শুধু কবিত্বভরা নাম নয়, তার সঙ্গে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী!

    তার মানে, একাধারে ত্র্যহস্পর্শযোগ। একে তরুণী, উঁচুমহলের বাসিন্দা, তার ওপর উচ্চশিক্ষিতা। এর পরেও যদি পঁচিশ টাকার সব টিকিটগুলো উড়ে না যায়, তা হলে বুঝব, আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার।

    কিন্তু আসল জায়গায় যে গোল রয়ে গেল!

    আসল জায়গা আবার কোটা?

    ওই নৃত্য এবং গীত। প্রথমটায় তাল কাটবে, আর শেষেরটায় সুর।

    তা কাটুক। তার আগে আমাদের টিকিটগুলো কাটলেই হল।

    কিন্তু মোটা টাকার টিকিট কেটে হল-এ গিয়ে যখন দেখবেন তোমার দর্শকেরা যে গানের সুর নেই আর নাচের তাল নেই, ভঙ্গি নেই, তখন দলসুদ্ধ খেপে গিয়ে তোমাদের মাথা কাটতে চাইবেন না তো?

    তুই ভুলে যাচ্ছিস পরী, যে মহলটার উপর আমাদের প্রধান ভরসা, অর্থাৎ যারা পয়সা দেয় এবং দিতে পারে, তারা ও-সব বাজে জিনিস নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা গান শোনে না, দেখে। কী গাইছে তা তারা বোঝে না, বুঝতে চায়ও না। কে গাইছে, সেইখানেই তাদের আগ্রহ। নাচের বেলাতেও তাই। এটা মণিপুরী, না উদয়শঙ্করী—সে-সব সূক্ষ্ম- বিচারে তাদের দরকার নেই, খানিকটা হাত-পা-ছোঁড়া থাকলেই যথেষ্ট। তার ওপরে যেটা আসল প্রয়োজন সে হচ্ছে নর্তকীটির বয়স, রূপ আর পরিচয়।

    দর্শক-মনস্তত্ত্বের এই অভিনব বিশ্লেষণ কৌতুক-মেশানো আগ্রহ নিয়ে শুনে যাচ্ছিল অপর্ণা। বারীন বলে চলল, একটা পয়সাওয়ালা পাড়া আছে এই কোলকাতায়, শিক্ষিতা মেয়ে সম্বন্ধে যাদের দুর্বলতা একটু বেশী। কলেজে পড়া বাঙালী মেয়ে নাচছে, এই খবর পেলেই তারা ছুটে আসবে। সামনের লাইনে বসে মস্ত বড় হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে। তাল, মান, লয় রইল কি না রইল, জানতে চাইবে না।

    কিন্তু অন্য পাড়ার লোকও তো আসতে পারে, বেতাল লাফঝাঁপ আর বেসুরো চিৎকার দিয়ে যাদের ভোলানো যায় না?

    মুশকিল তো এইখানে। অনেকটা যেন নৈরাশ্যের সুরে বলল বারীন, ওই সব নিয়ে মাথা ঘামায় এ রকম একটা বেরসিক সমাজও আছে। তারা হচ্ছে ওই দু-টাকা চার-টাকার দল। পয়সার বেলায় ঢনঢন, এদিকে দাবি করবে ষোলো আনা, আর সেটা না মিটলেই গণ্ডগোল। আমি ইচ্ছা করেই ওই সব ক্লাসের বেশী টিকিট রাখি নি। কিন্তু যারা আসবে তাদের নিয়েই ভাবনা। কী আর করবি বল? ক’দিন একটু খেটেখুটে চলনসই-মতো কিছু একটা দাঁড় করাতেই হবে।

    সুতরাং অপর্ণাকে খাটতে হল। ক’দিন নয়, বেশ কিছুদিন; এবং একটু-আধটু নয়, অনেকখানি। কিন্তু তার ছাত্রীদের বিদ্যাবুদ্ধি বা স্বভাবচরিত্রের দিক থেকে যতখানি বাধা বা অসুবিধা সে আশঙ্কা করেছিল, ক্রমশ দেখা গেল তার অনেকটাই অমূলক। বেশ সহজ এবং সুশৃঙ্খল ভাবে কাজ এগিয়ে গেল। অবাধ্যতা দূরে থাক, শ্রদ্ধাই বরং পাওয়া গেল ওদের কাছে। সেই সঙ্গে একটা সরল আন্তরিকতা।

    দিন চারেক তালিম দেবার পর একদিন যেমন কাজ সেরে উঠে দাঁড়িয়েছে অপর্ণা, মেয়ে দুটি হঠাৎ ওর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বসল। সে বাধা দিয়ে বলল, এ কী করছেন! ওদের একজন বলল, বয়সে ছোট হলেও আপনি আমাদের গুরুজন। আর একজন বলল, এখন থেকে কিন্তু ওই ‘আপনি-টাপনি’ বলতে পারবেন না। আমরা তো আপনার ছাত্রী।

    পরদিন দেখা গেল অপর্ণা কিছু বলবার আগে ওরাই এগিয়ে আসছে বিনীত আগ্রহ নিয়ে। জানতে চাইছে, এখানটা কেমন হবে, ওখানটায় কী করবে? ‘দিদি’ বলছে না, বলছে ‘দিদিমণি’।

    নির্দিষ্ট দিনে একটা নামকরা থিয়েটার হল ভাড়া নিয়ে শুরু হল জলসা। দেখা গেল বারীনের হিসাবে ভুল হয় নি, অনুমানও মিথ্যা হয় নি। সামনেকার সারিগুলো ভরে গেছে দামী স্যুট সিল্ক বা আদ্দির পাঞ্জাবি এবং জমকালো শাড়ি-গয়নায়। তার মধ্যে একটা বড় অংশে শোভা পাচ্ছে নানা রঙের পাগড়ি এবং টুপির বাহার। গান এবং বাজনায় যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কজন ছিলেন খ্যাতনামা শিল্পী। কিন্তু সবাইকে ম্লান করে দিল ওই লিপিকা মজুমদার আর নবনীতা ঘোষ। তাদেরই উপরে সমস্ত হলের সহর্ষ দৃষ্টি, আগমন-নির্গমনে বিপুল হাততালির অভ্যর্থনা।

    স্টেজের পেছনে নানা কাজের ফাঁকে যখনই তাকিয়েছে অপর্ণা, বারীনের চোখে দেখেছে অর্থপূর্ণ হাসি, অর্থাৎ দেখলি তো? অপর্ণা কিন্তু বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারে নি। সে তো জানে তার এই মহাবিদূষী ছাত্রী দুটির বিদ্যার দৌড় কতখানি। মারাত্মক ভুল দেখে উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে সে ঘেমে উঠেছে, কিন্তু দর্শকদের চোখে কোনও ভাবান্তর লক্ষ্য করে নি। সব একেবারে তন্ময়। অথচ অতবড় সেতারী আফসার খাঁর মালকোষ আলাপ থেমে গেছে অন্তরায়, শ্রোতাদের গোলমাল ভেদ করে এগোতে পারে নি।

    কিন্তু এর চেয়েও কত বড় বিস্ময় যে তার জন্যে অপেক্ষা করেছিল, ভাবতেও পারে নি। সেটা হল জলসা শেষ হবার পর। পিছনে একটা ছোট ঘরে বসে সে বিশ্রাম করছিল। আর অপেক্ষা করছিল, ওদিকের কাজ মিটিয়ে বারীন কখন ছাড়া পাবে। এমন সময় তার ছাত্রীরা এসে বসল তার পায়ের কাছে। ওদের মধ্যে যে বড় এবং একটু-আধটু লেখাপড়া জানে, সে বলল, কেমন দিদিমণি?

    বেশ ভালই হয়েছে।—উত্তর দিল অপর্ণা।

    ভালো হলেই ভালো। এত কষ্ট করে শেখালেন আমাদের।

    আমার আর কী কষ্ট! তার চেয়ে অনেক বেশী খাটতে হয়েছে তোমাদের।

    মেয়েটি একবার তাকাল তার সঙ্গিনীর মুখের দিকে! চোখের ইশারায় কী কথা হল দুজনের। তারপর আঁচলের আড়াল থেকে একটা কাগজে মোড়া বাণ্ডিল অপর্ণার পায়ের কাছে রেখে দুজনে একসঙ্গে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। অপর্ণা ব্যস্ত হয়ে উঠল, এ-সব আবার কী!

    ও কিছু না, সামান্য একখানা কাপড়। কুণ্ঠিত মৃদু কণ্ঠে বলল মেয়েটি, আর কীই বা দিতে পারি আমরা!

    কাপড়ই বা তোমরা দেবে কেন? না না, ও আমি নিতে পারব না।

    কথাটা নিজের কানেই বড় রূঢ় শোনাল অপর্ণার। ওদের অপ্রস্তুত ভাব লক্ষ্য করে একটু নরম সুরে বলল, তোমাদের কাছ থেকে উপহার পাবার মতো কিছুই তো আমি করি নি।

    উপহার! কপালে হাত রেখে বিস্ময়ের সুরে বলল মেয়েটি, হ্যায় কপাল, তোমাকে উপহার দেবো আমরা? জান না, আমরা কোথাকার মেয়ে।

    ‘কোথাকার মেয়ে’ এই সামান্য ছোট্ট কথাটার মধ্যে এমন একটা কুণ্ঠাময় বেদনার সুর ছিল, যা অপর্ণাকে স্পর্শ না করে পারল না। এতদিন পরে এই বোধ হয় প্রথম পূর্ণ দৃষ্টি মেলে সে ওই পতিতা মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল। সে আরও কুণ্ঠিত হয়ে উঠল এবং মুখ নীচু করে থেমে থেমে বলল, তোমার সঙ্গে আর তো আমাদের দেখা হবে না। তাই ভাবলাম, দুজনে মিলে একখানা কাপড় দিই দিদিমণিকে। কোনোদিন যদি পরো, হয়তো আমাদের কথাটা একবার মনে পড়বে

    বলতে বলতে চোখ দুটো হঠাৎ ছলছল করে উঠল মেয়েটির। ঠিক পাশেই মাটির দিকে চেয়ে বসে ছিল তার সঙ্গিনী। ক্ষণিকের তরে মুখখানা তুলে আবার নামিয়ে নিল। গুছিয়ে কথা বলতে শেখে নি। সখীর কথায় জানিয়ে দিল তার নীরব সমর্থন। দুজনের দিকে আর-একবার চেয়ে দেখল অপর্ণা। তারপর কাপড়খানা তুলে নিল কোলের উপর। কী একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাইরে থেকে সাড়া দিয়ে ঢুকল বারীন। মেয়ে দুটিকে লক্ষ্য করে বলল, ও তোমরা এখানে? দুলালবাবু খোঁজ করছিলেন। তোমাদের টাকাকড়ি সব মিটিয়ে দিয়েছি।

    নেপথ্যে দুলালবাবুর হাঁকডাকও শোনা গেল। মেয়ে দুটি বারীনকে ছোট্ট একটা নমস্কার করে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

    দু সপ্তাহ অতিরিক্ত পরিশ্রমের পর সকালের দিকে নিজের ঘরে তক্তপোশের উপর একটু গড়িয়ে নিচ্ছিল অপর্ণা, দরজার বাইরে বারীনের সাড়া পাওয়া গেল : পরী, ঘুমোচ্ছিস নাকি?

    নিশ্চয়ই। আজ সারাদিন ঘুমোব। তুমি আবার কোথায় চললে এই সাতসকালে? বারীন সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ঘরে ঢুকল, এবং একটা সাদা খাম ওর বিছানার এক পাশে রেখে বলল, এটা তুলে রাখ্

    কী ওটা? বলে উঠে বসল অপর্ণা, এবং বারীনের মুখে মৃদু হাসি ছাড়া আর কোন উত্তর না পেয়ে মাথা দুলিয়ে বলল, বুঝেছি, মাস্টারনীর ফী-টা একেবারে হাতে হাতে মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে

    ভুল করলি। ফী তো আমার দেবার কথা নয়, পাবার কথা।

    কিসের জন্যে, শুনি?

    কেন, মাস্টারনীর মাস্টার বলে!

    অপর্ণা হেসে উঠল, বটে! তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, ঠিকই বলেছ তুমি। ফী কেন, কিছুই আমার দেওয়া হয় নি। হয়তো এ জীবনে কোনোদিনই হবে না।

    কথাটা হালকা সুরে শুরু করলেও, শেষদিকটা ঠিক হালকা রইল না। বারীন যেন সেটা লক্ষ্য করে নি এমনই ভাবে বলল, সে সব দেনা-পাওনার হিসেব-নিকেশ এখন না করলেও চলবে। আসলে এটা তোরও নয়, আমারও নয়। মাসীমার যে জিনিস কখানা আমরা খুইয়েছি, এ তারই খানিকটা ক্ষতিপূরণ। মনে করেছিলাম সবটাই পুরিয়ে রাখা যাবে, কিন্তু ওদিকে আবার অনেকগুলো মুখ হাঁ করে বসে আছে।—বলে পকেটে হাত দিয়ে আর একখানা খাম স্পর্শ করল।

    অপর্ণা মৃদু আপত্তির সুরে বলল, আমি বলছিলাম, এটাও এখন থাক। পরে আবার সুযোগমত—

    বারীন তাড়া দিয়ে বলে উঠল, যা বলছি তাই শুনবি, না খালি বকবক করবি কাজের সময়?

    আঃ, বকছ কেন? শুনছি তো!

    তা হলে ওটা বাক্সে তুলে রাখ। আমি চলি। এ বেলা আর ফিরতে পারব না।

    কোন্ দিকে যাচ্ছ?

    হাওড়ার দিকে?

    উল্টোডাঙ্গায় যাবে না?

    কেন, যাবি নাকি তুই?

    হ্যাঁ, পৈতে-কাটা মাসীমাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করে।

    তিনি তো নেই।

    নেই?

    না, দিন দশেক আগে মারা গেছেন।

    অপর্ণার মুখে খানিকক্ষণ কোনও কথা সরল না। তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছিল?

    হয়েছিল একটু জ্বরের মতন। আসল অসুখ তো বুঝতেই পারছিস। বাড়িভাড়া বন্ধ। তারপর পৈতের দাম বলে দু-চার আনা যা নিতেন, তাও অনেকদিন দেওয়া হয় নি। যেতেই পারি নি ওদিকটায়।

    ছেলে বা বউ কেউ আসে নি শেষ সময়ে?

    বউয়ের কথা জানি না, তবে ছেলে প্রায়ই আসত। মরবার আগের দিনও নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল নিজের বাসায়। উনি যান নি, ওদের দেওয়া কোনও জিনিসও নেন নি।

    অপর্ণা আর কোন প্রশ্ন করল না। বুকের ভিতর থেকে শুধু একটা গভীর নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। এই মহিলাটি তার কেউ নন। জীবনে মাত্র একটিবার কয়েক মিনিটের জন্যে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তাঁর সেই ছোট্ট শুচি ঘরখানিতে বসে সামান্য দু-চারটি মামুলী কথা তবু মনে হল, তাঁর এই শোচনীয় মৃত্যু এমন একটা শূন্য রেখে গেল ওর অন্তরের মাঝখানে, যা হয়তো কোনোদিন পূর্ণ হবে না।

    বারীন চলে যাচ্ছিল, অপর্ণা জিজ্ঞাসা করল, রেখাদের খবর কী?

    নতুন খবর কিছু নেই। দেশলাই-কারখানাটা শুনছি উঠব-উঠব করছে। তা হলেই মুশকিল হবে। কাল আর হয়ে উঠবে না, পরশু ভাবছি ঘুরে আসব এদিকটায়, তখন যাস্!

    কিন্তু সে পরশু আর এল না। তার আগে এল এক অভাবনীয় বিপর্যয়।

    তখনও ভোর হয়নি। হঠাৎ একটা তীব্র আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল অপর্ণার। কানে এল বারান্দায় অনেক লোকের পায়ের শব্দ। তাড়াতাড়ি দরজা খুলতেই সামনে পড়ল পুলিস। উঠোনেও লাল পাগড়ির ভিড়। খানিকক্ষণ লাগল আচ্ছন্ন ভাবটা কাটিয়ে উঠতে। তারপর বারীনের ঘরের সামনে গিয়ে দেখল, বিছানাপত্র বাক্স-প্যাঁটরা তছনছ করে চলছে তালাশি। একজন অফিসার জন-দুই সিপাই নিয়ে এগিয়ে এলেন তার ঘরের দিকে। জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে কে থাকে?

    অপর্ণা বলল, আমি

    কী নাম আপনার?

    অপর্ণা।

    পুরো নাম বলুন।

    অপর্ণা চ্যাটার্জি।

    বারীন বোস আপনার কে হয়?

    দাদা হন।

    অফিসারটি একটু হেসে বললেন, ঠিক বোঝা গেল না। উনি হলেন বোস, আর আপনি চ্যাটার্জি—

    অপর্ণা একটু ইতস্তত করে বলল, আপন দাদা নন। এক জায়গায় বাড়ি, ছেলেবেলা থেকে দাদা বলে ডাকি।

    আর কিছু নয় তো? —বাঁকা চোখে তাকিয়ে যেন আপনমনে বললেন ভদ্রলোক।

    কী বলছেন?

    না, কিছু বলছি না। এ বাক্স কি আপনার?

    হ্যাঁ।

    সার্চ করব?

    করুন।

    বেশ স্পষ্ট করেই বোঝা গেল, সেই কোকেন-ঘটিত ব্যাপারটা এ তরফ ভুলে থাকতে চাইলেও, পুলিসের তরফ একদিনের তরেও ভোলে নি। আরও দেখা গেল, বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এলে বাড়িওয়ালাকে ফাঁকি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু গোয়েন্দা বিভাগের হাত এড়ানো যায় না। এতদিন পরে যেমন করেই হোক ওরা নতুন ঠিকানা খুঁজে বের করেছে, এবং দ্বিতীয়বার পালাবার সুযোগ দেয় নি। কোকেনের গোপন ব্যবসা ছাড়া আরও গোটাকয়েক চার্জও উদ্যত হয়েছিল বারীন বোসের নামে। তার মধ্যে একটা হল—এই সদ্য-সম্পন্ন চ্যারিটি শো। যে প্রতিষ্ঠানের নামে এর লাইসেন্স চাওয়া হয়েছিল, তার কোনও অস্তিত্বই নাকি খুঁজে পাওয়া যায় নি।

    তল্লাশি চলল অনেকক্ষণ। কোকেন পাওয়া গেল না। সে রকম কোনও আশা নিয়ে বোধ হয় ওঁরা আসেন নি। দু-একখানা চিঠিপত্র যা পাওয়া গেল তারই সূত্র ধরে আবদুলের সঙ্গে বারীন বোসকেও জড়ানো যাবে, আপাতত এই আশাতেই সেগুলো হস্তগত করলেন। অপর্ণার কাছে যে খামখানা ছিল, তাও চলে গেল পুলিসের ঝোলায়। বারীন তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন, কিন্তু ভারপ্রাপ্ত পুলিস-অফিসার বেশ মোলায়েম করে বুঝিয়ে দিলেন, টাকাটা ওদের উপার্জিত এবং সৎপথে উপার্জিত, সে কথা প্রমাণ হলে তৎক্ষণাৎ ফেরত দেওয়া হবে। সার্চলিস্ট অর্থাৎ তল্লাশি-লব্ধ জিনিসের ফর্দে অন্যান্য সব কিছুর সঙ্গে টাকাটারও উল্লেখ রইল এবং তার জন্যে একটা রসিদও কেটে দিলেন ইনস্পেক্টর সাহেব।

    প্রথমে আসামী বারীন বোসের সঙ্গে অপর্ণাকে থানায় নিয়ে যাবার প্রস্তাব উঠেছিল। তার বিবৃতি নেবার পর শেষ পর্যন্ত অত দূর আর ওঁরা অগ্রসর হলেন না। যাবার আগে মিনিট দুয়েকের জন্য বারীন এল ওর ঘরে। স্বাভাবিক সুরেই বলল, চললাম পরী, মনে হচ্ছে বেশ কিছুদিনের জন্যে। তুই আর কদ্দিন থাকবি এখানে? তার চেয়ে কুমিল্লায় ফিরে যা। আমি বরং তোর বাবাকে একখানা চিঠি লিখে দেবো।

    অপর্ণা চমকে উঠল : না, না। তাঁকে কিছু লিখতে যেয়ো না তুমি।

    তুই তা হলে কী করবি? কী করে চলবে?

    সেই ভাবনাটাই বড় হল? আর এদিকে যে তোমার—। বলতে বলতে অপর্ণার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। বারীনকে আর সময় দেওয়া হল না, পরমুহূর্তে চোর-ডাকাতের মতো হাতকড়া পরিয়ে তাকে যখন ওরা ধরে নিয়ে গেল, অপর্ণাও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, ছুটে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল বিছানার ওপর। চোখের জল আর বাধা মানল না।

    কিছুক্ষণ পরেই এল শরণ সিং, যেমন রোজ একবার করে আসে। সব শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল বারান্দার কোণে। অপর্ণাও যেন বলবার মতো কোনও কথা খুঁজে পেল না। শুধু একবার জানতে চাইল, তাদের তরফ থেকে করবার মতো কিছুই কি নেই? শরণ হতাশ সুরে বলল, কিছুই নেই। তবু একবার যেতে হবে উকিলের কাছে। তার আগে, দাঁড়াও, বাজারটা করে আনি।

    না না, বাজার-টাজারে আজ দরকার নেই। একার জন্যে আর রাঁধতে চাই না। খাবার ইচ্ছেও নেই একেবারে।

    একা কেন, আমি যে আজ তোমার এখানেই দুটো খাব বলে এসেছিলাম।

    সত্যি?

    হ্যাঁ। এখান থেকেই সোজা কোর্টে যেতাম—এই বলে একটু এগিয়ে গেল গেটের দিকে। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি কিছু ভেবো না পরী বহিন। বারীন যদ্দিন না আসে, তোমার শরণদা তো রইল।

    ঠিক এই সুরে কোনোদিন কথা বলে নি শরণ সিং। বারীনের একান্ত অনুগত ও অন্তরঙ্গ এই মিষ্টস্বভাবী পাঞ্জাবী যুবকটির কাছে অপর্ণার কোনো সঙ্কোচ ছিল না। ‘পরী বহিন’-এর উত্তরে সেও ডেকেছে ‘শরণদা’, এটা ওটা আনতে দিয়েছে, যখন-তখন ফাই- ফরমাশ খাটিয়েছে। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবে নি, এরই উপরে কোনোদিন নির্ভর করতে হবে। তাই আজ যখন এ অনাত্মীয় বিদেশী মানুষটি অত্যন্ত সহজে কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে জানাল—তোমার কোনও ভাবনা নেই, আমি তো রইলাম, অপর্ণা বিস্মিত হল যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশী হল অভিভূত। কোন কথা না বলে সে শুধু তাকিয়ে রইল শরণদার মুখের পাণে। শরণ একটু এগিয়ে এসে বলল, আমরা গরিব মানুষ। সামান্য একটু কারবার আছে কোলকাতায়। কোনো রকমে দিন চলে। আমাদের যদি এক বেলা জোটে, তোমারও জুটবে। তারপরে যদি দেখি, আর চলছে না, তোমাকে নিয়ে যাব আমার দেশে। কত খুশী হবে আমার বুড়ো বাপ আর আমার মা। একটা মেয়ে নেই বলে ওদের ভারি আপসোস, সে দুঃখ আর থাকবে না।

    হঠাৎ হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, যাই চট্ করে বাজারটা করে আনি। নটা বেজে গেছে। থলেটা কোথায় পরীবহিন?

    শুনতে শুনতে অপর্ণা কেমন তন্ময় হয়ে গিয়েছিল। নামটা কানে যেতেই যেন জ্ঞান ফিরে এল। রান্নাঘর থেকে তাড়াতাড়ি বাজারের থলেটা নিয়ে এসে তুলে দিল ওর হাতে।

    .

    দিন কয়েক ঘোরাঘুরি করে উকিলের কাছ থেকে যেটুকু ভরসা পাওয়া গেল, তারই জোরে অনেকখানি এগিয়ে গেল শরণ সিং। তারপর এমন একটা জায়গায় এসে থেমে যেতে হল, যেখানে তার ক্ষুদ্র সঙ্গতির পক্ষে আর তল পাওয়া সম্ভব নয়। এদিকে অপর্ণার বাক্সে যে সোনাটুকু ছিল, আগেই গেছে। দু-গাছা সরু চুড়ি ছাড়া গায়েও কিছু নেই। সেই শেষ সম্বল যখন সে খুলে দিতে গেল, শরণের কাছ থেকে এল প্রবল বাধা। সোজাসুজি বলে বসল, মেয়েছেলে হয়ে তুমি গায়ের গয়না খুলে দেবে, আর মরদ হয়ে তাই আমি হাত পেতে নেব, সেটা আমাকে দিয়ে হবে না পরী বহিন।

    অপর্ণা শুষ্ক কণ্ঠে বলল, কিন্তু তা ছাড়া আর উপায় কী?

    উপায় একটা হবেই। দাঁড়াও, একবার বারীনের সঙ্গে দেখা করে আসি। সে নিশ্চয়ই একটা কিছু বাতলে দিতে পারবে।

    আমাকেও নিয়ে চলুন না।

    তুমি যাবে?

    কত দিন হয়ে গেল! একবার দেখতে ইচ্ছে করে কেমন আছে!

    সেখানে তুমি নাই বা গেলে বহিন। নীচু ক্লাসের আসামী, তাদের সঙ্গে যারা দেখা করতে যায়, জেলখানার চোখে তারাও ওই নীচু ক্লাস। ভিখিরীর মতো দাঁড় করিয়ে দেয় ভিড়ের মধ্যে। তার ভেতরে তোমাকে নিয়ে যেতে চাই না। আমি একাই ঘুরে আসি।

    নীচু ক্লাসের আসামী! কথাটা কানে যেতেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল অপর্ণার। তারপর ভাবল, অস্বীকার বা অভিযোগ করবার সত্যিই কিছু নেই। আইনের চোখে বারীন নিশ্চয়ই আসামী, সমাজের চোখেও অপরাধী। আর উঁচু ক্লাসের লোকও সে নয়। কিন্তু সেইটুকুই কি সব? কার জন্যে কিসের জন্যে সে অপরাধী? গায়ে একটা নিজের-হাতে- কাচা টুইলের শার্ট, আর দু-বেলা দু-মুঠো ডাল-ভাত, এর বেশী তো সে নিজের জন্যে রাখে নি, কোনোদিন কামনাও করে নি। কিন্তু আদালতের কাছে সে প্রশ্ন অবান্তর। সূক্ষ্মদর্শী বিচারক শুধু জানতে চাইবেন, কী করেছে সে? কেন করেছে, সে কথা তাঁর নথিপত্রের কোনও জায়গায় স্থান পাবে না।

    বিকালের দিকে এক সময়ে ওদিককার সব খবর জানিয়ে যাবে, এই কথাই বলে গিয়েছিল শরণ সিং। কিন্তু রাত আটটা বেজে যাবার পরেও তার দেখা নেই। বড়ই ভাবনায় পড়ল অপর্ণা! এদিকে কালুর মাও এসে গেল তার ছেলেকে নিয়ে। বরাবরকার পুরনো ঝি। আগে ছিল ঠিকে, দু-বেলা শুধু বাসন মেজে ঘর নিকিয়ে যেত। বারীন চলে যাবার পর অপর্ণা যখন একা পড়ল, ছেলেকে নিয়ে এখানেই শোয় কালুর মা। ব্যবস্থাটা শরণ সিংয়ের। দু-তরফেরই সুবিধে। বস্তির বাসা তুলে দিয়ে ঝি পেয়েছে ভদ্র আশ্রয়, আর অপর্ণা পেয়েছে খানিকটা নিরাপদ সঙ্গ, আর সেই সঙ্গে একটি মনের মতো বন্ধু—ওই কালু। পাঁচ-ছ বছরের ছেলে, আগে আগে ওকে নিয়েই কাজে বেরুত কালুর মা। আজকাল প্রায়ই রেখে যায় দিদিমণির কাছে। সেও বাঁচে ওই দস্যি ছেলের হাত থেকে, অপর্ণাও বাঁচে একজন কথা বলার সঙ্গী পেয়ে। সে কথার না আছে শেষ, না আছে বিষয়বস্তুর অভাব। উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অপর্ণা। কিন্তু ও যখন ঘুমিয়ে পড়ে, কিংবা মায়ের সঙ্গে বাইরে যায়, নতুন নতুন প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজন আর থাকে না, তখনকার ক্লান্তি বোধ হয় আরও বেশী।

    শরণ যখন এল, রাত প্রায় সাড়ে নটা। অপর্ণা ছুটে বেরিয়ে এল বারান্দায় : আপনার এত দেরি যে? আমি সেই বিকেল থেকে ঘর-বার করছি! ভালো আছে তো বারীনদা? ভালো আছে বইকি। ও হচ্ছে সেই জাতের মানুষ যারা কোনো অবস্থাতেই খারাপ থাকে না।

    খুব রোগা হয়ে গেছে, না?

    না তো। আগের মতোই যেন দেখলাম।

    অপর্ণা ক্ষণকাল মৌন থেকে বলল, আপনি যে এত রাত করলেন? কোথাও কোনও বিভ্রাট ঘটে নি তো?

    না, একটু গঙ্গার ঘাটে বসেছিলাম।

    গঙ্গার ঘাটে!

    হ্যাঁ, আমার একটা বিশেষ ঘাট আছে। মানে সেই ঘাট নয়, ধারে-কাছে বড়-একটা কেউ আসে না। যখন কোনো ভাবনায় পড়ি, যার কূলকিনারা পাওয়া যায় না, তখন ওইখানটায় গিয়ে বসি।

    কথাটা এমনভাবে বলল শরণ, এতখানি উদ্বেগের মধ্যেও হেসে ফেলল অপর্ণা। বলল, তা বেশ। কিন্তু ফল কী হল? নদীর কূলে বসে ভাবনার কূল পেলেন কিছু?

    নাঃ, পেলাম না বলেই এলাম তোমার কাছে।

    আমার কাছে!

    হ্যাঁ, কারণ তার মধ্যে তুমিও আছ, আমিও আছি। তবে তোমার জায়গাটাই বড়। ভূমিকার পরের অংশ শোনবার জন্যে অপর্ণা অপেক্ষা করে রইল। শরণ একবার তার মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, বারীনের কাছে পথ জানতে গিয়েছিলাম, তার যতটুকু দেখিয়ে দেবার সে দিয়েছে। বাকিটুকু তোমার হাতে। সেখানে সে জোর করতে চায় না। বার বার করে বলেছে, পরীর মনে যদি এতটুকু দ্বিধা থাকে, সে যেন না এগোয়।

    কিছুই অনুমান করতে না পেরে অজ্ঞাত আশঙ্কায় অপর্ণার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কী বলতে চায় শরণদা? এসব কিসের ইঙ্গিত? নিজেকে আর চেপে রাখতে না পেরে সোজাসুজি বলে ফেলল : আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না শরণদা যা বলবার খুলে বলুন।

    নিশ্চয়ই। খুলে বলবার জন্যেই তো তৈরী হচ্ছিলাম এতক্ষণ। তার আগে আবার বলছি, এ শুধু একটা প্রস্তাব। নেওয়া না-নেওয়া নির্ভর করছে তোমার ওপর।

    ভূমিকা যত বড়ই হোক, আসল কথাটা সামান্য। মিনিট কয়েকের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। শেষ হবার পরেও অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অপর্ণা। তার পর মৃদু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, আপনারা আমাকে মাপ করবেন শরণদা, এ আমি পারব না।

    আমি জানতাম পরী বহিন। বারীনকেও সেটা আগেই বলে এসেছি।

    অপর্ণা অধীর হয়ে উঠল : বারীনদার কথা ছেড়ে দিন। মেয়েদের জীবনের কতগুলো দিক আছে, যেখানে সে চিরদিন অন্ধ। কিন্তু আপনিও কি আমাকে—

    না, না। আমি তোমাকে কিছুই বলব না। তুমি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছ, আমরা আজ সত্যিই নিরুপায়। চারদিক থেকে বিপদ ঘনিয়ে আসছে। পালাবার রাস্তা নেই। ওইটুকুই ছিল একটু সরু পথের মতো। কিন্তু তোমার মন যদি সায় না দেয়, সেখানে তোমাকে কিছুতেই টেনে নামাব না। একটা কথা শুধু আমার মনে হয়েছিল, বলবো?

    বলুন।

    শুনেছি দেশে যখন ছিলে, তোমরা মাঝে মাঝে থিয়েটার করতে। সেখানে তোমাকে অনেক কিছু সাজতে হত, আউড়ে যেতে হত মুখস্থ-করা পার্ট। তার সবটাই মুখের কথা, মনের কথা নয়। সবটুকুই ছিল অভিনয়। এইমাত্র তোমাকে যা বললাম সেও ঠিক তাই। তফাত শুধু এই যে, এখানে স্টেজে দাঁড়াতে হবে না।

    আপনি ভুলে যাচ্ছেন শরণদা, থিয়েটার করতে গিয়ে যা করেছি, অভিনয় বলে জেনে-শুনেই করেছি; যাদের সামনে করেছি, তারাও জানত এটা অভিনয়। তার মধ্যে না ছিল কারও স্বার্থ, না ছিল কারও ভালোমন্দ, লাভক্ষতির তাগিদ। আপনারা যা করতে বলছেন, সেখানে কি তাই? আমার পক্ষে সেটা অভিনয় হতে পারে, কিন্তু আর-একজনের কাছে? সে তো একে সত্যি বলেই নেবে। আমি তাকে ঠকাব, আর ঠকাতে গিয়ে ছোট হয়ে যাব। নিজের কাছে হারিয়ে আসব আমার যা-কিছু আছে সব—আমার মান-সম্ভ্রম, মর্যাদা। তার পরে মেয়েমানুষের আর রইল কী? না শরণদা, আর যা করতে বলেন করব, কিন্তু একজন পুরুষের কাছে নিজেকে পণ্যের মতো তুলে ধরতে পারব না, কোনোমতেই না।

    বলতে বলতে মনের মধ্যে সঞ্চিত উত্তেজনার আবেগ তাকে ঠেলে দাঁড় করিয়ে দিল। হঠাৎ মনে হল, ঘরের ভিতরটা বড় তেতে উঠেছে। তাড়াতাড়ি সে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল একটু হাওয়ার প্রত্যাশায়। শরণ সিং মিনিট কয়েক বসে রইল নিস্পন্দের মতো। তারপর এক সময়ে নিঃসাড়ে বেরিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল ঝিয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, দরজাটা বন্ধ করে দাও, কালুর মা।

    অনেকক্ষণ পরে কী একটা বলতে গিয়ে অপর্ণার হঠাৎ খেয়াল হল, শরণ চলে গেছে। ঘরে গিয়ে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল সে শুধু পড়ে থাকা আর বিনিদ্র রাত্রির প্রহর গোনা। ঘুমের কোনো সম্ভাবনাই রেখে যায় নি শরণ সিং। অন্তরের উত্তাপ যখন একটুখানি শান্ত হয়ে এসেছে, ওদের দিকটাও মনের সামনে খুলে দেখল অপর্ণা। ওরা দুজনেই যে তার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী, সে কথা তার চেয়ে কে বেশী জানে? ঘোর বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে তা থেকে রক্ষা পাবার কোনও পথ যখন চোখে পড়ে নি, তখনই বহু দ্বিধা-সঙ্কোচের সঙ্গে এই প্রস্তাব তারা পাঠিয়ে দিয়েছে তার কাছে। সে বিপদ ওদের একার নয়, তার নিজেরও। আজ যদি বারীনকে দীর্ঘদিনের জন্য জেলে যেতে হয়, সংসারে এতটুকু আশ্রয় পাবার মতো স্থানও তার অবশিষ্ট নেই। শরণ সিং শেষ পর্যন্ত তাকে দেশে নিয়ে যাবার ভরসা দিয়েছে। তার মধ্যে তার উদার মনের পরিচয় যাই থাক, সেটা সম্ভব নয়, শোভনও নয়। ঘটনাচক্রে তার সমস্ত ভবিষ্যৎ আজ বারীনের শুভাশুভের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু কি তাই? এই স্বার্থের যোগ আর প্রয়োজনের তাগিদ ছাড়া আর কিছুই নেই? নিজের অন্তরকে জিজ্ঞাসা করল অপর্ণা। উত্তরও এল সঙ্গে সঙ্গে। আর কোনও কারণে নয়, বারীনদা বলেই। সে জন্যে, প্রয়োজন হলে সে সব দিতে পারে, দিতে পারে নিজেকেও

    পরক্ষণেই মনে হল, এ তো সে দেওয়া নয়। নিজেকে দেওয়ার মধ্যে গৌরব আছে, তার চেয়ে বেশী আছে তৃপ্তির আনন্দ। তার বুকের মধ্যে কোথায় সে অনুভূতি। যে পথ দিয়ে ওরা তাকে নিয়ে যেতে চাইছে, সেখানে পা বাড়ানো দূরে থাক, তার কথা ভাবতে গিয়েই মন যে ভেঙে পড়ছে, ভরে উঠছে লজ্জায়, ঘৃণায়, গ্লানিতে। ছিঃ ছিঃ, এ যে তার নারীজীবনের অপমান! এর পরে সে নিজের কাছে মুখ দেখাবে কেমন করে?

    কখনও তন্দ্রায়, কখনও অতন্দ্র জাগরণে সমস্ত রাত কাটিয়ে ভোরে উঠেই অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে এল অপর্ণা। অনেকখানি জুড়িয়ে গেল স্নায়ুর তাপ, মনে ফিরে এল প্রশান্তি। তার সবচেয়ে প্রিয় গ্রন্থ ছিল ‘গীতবিতান’। তাই খুলে বসল। গান সে শুধু গাইত না, পড়ত। আজ কিন্তু কবিগুরু তার মন টেনে নিতে পারলেন না। সেখানে ভরা শুধু অবসাদ শুধু ক্লান্তি। তাকেই বোধ হয় সে প্রশান্তি বলে ভুল করেছিল।

    একটু পরেই পিওন এসে দিয়ে গেল একটা খামের চিঠি। উপরে টাইপ করা শরণ সিংয়ের নাম। পাঠিয়েছেন ওদের উকিল। তাঁর নাম-ঠিকানাও ছিল লেপাফার বাঁ দিকটায়। মামলার খবর মনে করে সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলল অপর্ণা। তিনশো টাকার মতো একটা হিসাব দিয়ে উকিলবাবু জানিয়েছেন, তিন-চার দিনের মধ্যে দেনাটা মিটিয়ে না দিলে তাঁর পক্ষে এ মোকদ্দমা হাতে রাখা সম্ভব হবে না। আরও লিখেছেন, আগামী তারিখেই বারীনের পক্ষে একজন সিনিয়র উকিল নিযুক্ত করতে হবে। তার জন্যে আরও শ’দুই টাকার প্রয়োজন। সবচেয়ে দরকারী খবর, মামলার অবস্থা আসামীর পক্ষে অনুকূল। খরচপত্র চালিয়ে যেতে পারলে ছাড়া পাবার প্রচুর সম্ভাবনা।

    চিঠিখানা দুবার পড়ল অপর্ণা, বিশেষ করে ওই শেষদিকের আশ্বাস। তারপর তাকাল তার ক্ষয়ে-যাওয়া চুড়ি দু-গাছার পানে। গয়না বলতে ওইটুকুই তার অবশিষ্ট সম্বল, খুব বেশী করে ধরলেও যার দাম পঞ্চাশ-ষাট টাকার উপরে নয়।

    ঘণ্টাখানেক পরে বাজার করবার তাগিদ নিয়ে যথারীতি হাজির হল শরণ সিং। কোনও কথা না বলে অপর্ণা চিঠিখানা তার হাতে তুলে দিল। শরণের চোখে মুখে বিশেষ কোন আগ্রহ বা কৌতূহলের চিহ্ন দেখা গেল না। মনে হল ভিতরে কী আছে, সেটা তার আগে থেকেই জানা। ধীরে-সুস্থে পড়ে হাসল একটু ম্লান হাসি। তারপর খামখানা পকেটে পুরে বলল, থলেটা দাও।

    অকস্মাৎ যেন কোন্ ধ্যান থেকে জেগে উঠল অপর্ণা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শরণের মুখের দিকে আয়ত চোখ মেলে বলল, আমি রাজী আছি শরণদা। আপনি ওদিকের সব ব্যবস্থা করুন।

    কিসের! ও-ও! না বহিন, যে-কাজের পেছনে তোমার মনের সাড়া নেই, তার মধ্যে তোমাকে আমি যেতে দেব না। তাতে বারীনের অদৃষ্টে যাই থাক।

    না না, আপনি আর বাধা দেবেন না শরণদা। নিয়ে চলুন কোথায় যেতে হবে। যা বলবেন আমি সব করব, সব পারব।

    বলেই এগিয়ে এসে শরণের হাত দুটো জড়িয়ে ধরল। ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ল চোখের জল।

    শরণ সিং নির্বাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সে অশ্রুআপ্লুত চোখদুটির দিকে। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে ওর পিঠের ওপর হাত রেখে বলল, বেশ, তাই হবে বহিন।

    লালদীঘির পূবদিকে বাগানের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মোটর গাড়ির দীর্ঘ লাইন। নানা রঙের এবং নানা আকারের; কিন্তু সবগুলোই বাড়ির গাড়ি। কোনোটাতে ড্রাইভার আছে, কোনোটাতে নেই—মালিক নিজেই চালক। অপর্ণাকে সঙ্গে করে তারই একধারে ফুটপাথের উপর এসে দাঁড়াল শরণ সিং। তখনও পাঁচটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। চুপিচুপি বলল, চলো আর একটু এগিয়ে যাই। বেশ করে চিনে রাখতে হবে, এর মধ্যে কোন্খানা আমাদের কাজে লাগবে। অপর্ণা নিঃশব্দে অনুসরণ করল। গাড়ির সারির পেছনে ছোট ছোট দলে ড্রাইভারদের জটলা। ক্ষুধার্ত দৃষ্টি মেলে অনেকেই তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। অপর্ণার দৃষ্টি এড়াল না, কিন্তু মনে হল যেন অস্বস্তি বোধ করবার মতো মনের জোরটুকুও হারিয়ে গেছে।

    পাঁচটা বাজবার পরেই দামী-স্যুটপরা মালিকের দল আসতে শুরু করলেন। একবার তাকালেই বোঝা যায়, পদে ও অর্থে তাঁরা সব উপরতলার বাসিন্দা। চার অঙ্কের সরকারী কর্মচারী কিংবা রোজগারের দিক দিয়ে তার চেয়েও উঁচু স্তরের—অর্থাৎ বণিকমণ্ডলীর ছোট-বড় তারকার দল। একখানা দুখানা করে গাড়িগুলো সগর্জন ধোঁয়াকুণ্ডলী পেছনে রেখে দ্রুতবেগে ছুটে চলে গেল। একটি বিশেষ ব্যক্তির দিকে নজর দিল শরণ সিং। সুদর্শন যুবক। বেশভূষায় নিখুঁত এবং মার্জিত রুচি। একটু ব্যস্তভাবে এগিয়ে গিয়ে দখল করলেন একখানি ড্রাইভারহীন টু-সীটার। গাড়িতে ওঠবার আগে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন, যখন চোখ পড়ল অপর্ণার দিকে। বুকের ভেতরটা নড়ে উঠল অপর্ণার। চোখ নামিয়ে নিয়ে আবার একবার না তুলে পারল না। তখনও তাকিয়ে আছে পুরু চশমার পেছনে দুটি চোখ। তার মধ্যে কৌতূহল যতখানি, তার চেয়ে বেশী ছিল বিস্ময়। আর যে কী ছিল জানে না অপর্ণা। কিন্তু ভালো লেগেছিল একখানি বুদ্ধিদীপ্ত সুন্দর মুখের সেই শান্ত উজ্জ্বল দৃষ্টি। শুধু চোখের ভালোলাগা নয়, অন্তরের কোন্ অলক্ষ্য কোণেও বোধ হয় লেগেছিল তার মৃদু স্পর্শ, জেগেছিল ভীরু শিহরণ। ক্ষণেকের তরে কোথায় যেন চলে গিয়েছিল অপর্ণা। সংবিৎ ফিরে এল শরণের ডাকে। একটা ছোট্ট নোটবুকে কী যেন টুকে নিয়ে সে বলছিল, চলো বাড়ি যাই।

    দিন তিনেক পর ইংরাজী মাসের পয়লা তারিখ, যখন পকেটের ওজন বেড়ে যায় এ পাড়ায় ছোট-বড় সকলেরই। এই দিনটির কথা আগেই বলে গিয়েছিল শরণ। আজ সকালে বাজার পৌঁছে দেবার সময় স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেল : চারটার সময় তৈরি থেকো। অপর্ণা মাথা নেড়ে জানিয়েছিল, আচ্ছা।

    পাঁচটার আগেই আবার এসে দাঁড়াল সেই মোটর-লাইনের সামনে। সেই টু-সীটারখানা আজও ছিল প্রায় একই জায়গায়। মালিককে দূর থেকে আসতে দেখে চুপিচুপি বলল শরণ সিং, যা যা বলতে হবে, সব মনে আছে তো? অপর্ণা এবারেও মাথা নাড়ল কলের পুতুলের মতো। সঙ্গে সঙ্গে শরণ মিলিয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে।

    কোন দিকে না চেয়ে একটু জোরে জোরে পা চালিয়ে সেই ভদ্রলোক গাড়ির কাছে এসে পড়লেন। দরজা খুলে ডান দিকে তাকাতেই চোখ পড়ল, ঠিক পাশেই কেমন কুণ্ঠিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপর্ণা। যেন কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

    মাপ করবেন, আপনি কাউকে খুঁজছেন কি? —গম্ভীর মৃদু কণ্ঠের সহজ প্রশ্ন। অপর্ণার বুকটা আবার কেঁপে উঠল সেদিনের মতো। তখনই মনে পড়ল শরণ সিংয়ের হুঁশিয়ারি—সব মনে আছে তো? একটু কাষ্ঠ-হাসির চেষ্টা করে বলল, না, মানে, আমি এসেছিলাম আমার এক আত্মীয়ের কাছে, ওই আপিসে। এসে দেখলাম তিনি নেই—

    তার পর?

    ওঁর সঙ্গেই ফিরব বলে বেশী পয়সা নিয়ে বেরোই নি! তাই—

    ও-ও। কোথায় যাবেন আপনি?

    সে অনেক দূর। বেহালা।

    বেশ তো, আমি পৌঁছে দিচ্ছি। অবিশ্যি আপনার যদি কোনও আপত্তি না থাকে।

    না, আপত্তি আর কী? কিন্তু অতটা পথ খালি-খালি আপনাকে —

    তাতে আর কী হয়েছে! ঠিক খালি-খালি নয়, আমার পথও ওই দিকে। একটু শুধু এগিয়ে যেতে হবে! আসুন।—

    দরজাটা খুলে ধরলেন ভদ্রলোক। অপর্ণা সসঙ্কোচে উঠে বসল পাশের সীটে।

    হাইকোর্ট ছাড়িয়ে মাঠের পথ ধরতেই গাড়ির বেগ বেড়ে গেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে অপর্ণার মনের গহনে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, তার বেগ আরও অনেক বেশী। যে পথে তাকে নামতে হয়েছে, যে কাজের ভার মাথায় নিয়ে আজকের এই অভিযান, তার ভিতরকার শঙ্কা, লজ্জা ও চাঞ্চল্য তো ছিলই, তার উপরে ছিল এই গতির নেশা, একজন অজানা পুরুষের এই মোহ-সঞ্চারী সান্নিধ্য, যার আস্বাদ এই প্রথম এল তার কুমারীজীবনে। তার একান্ত পাশটিতে বসে যে ব্যক্তিটি উদ্দামবেগে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন, এবং মাঝে মাঝে বিস্ময় ও আনন্দ-ভরা সুন্দর চোখ দুটি বুলিয়ে নিচ্ছেন তার মুখের উপরে, কয়েক মুহূর্ত পূর্বেও তিনি ছিলেন তার কল্পনাজগতের বাইরে। এখনও তাঁর কোনও পরিচয় সে জানে না। তবু এ কথা সে নিজের কাছে লুকোবে কেমন করে, তার বুকের রক্তে ঢেউ তুলেছে ওই দৃষ্টিস্পর্শ এবং তারই সঙ্গে মেশানো তাঁর মৃদু নিঃশ্বাসের দোলা। চঞ্চল বাতাসে দু-চারটি চূর্ণ কুন্তল, অবাধ্য আঁচলের একটা কোণ উড়ে গিয়ে পড়েছে তাঁর কাঁধের উপর। মোড় ঘোরাতে গিয়ে ওই নিপুণ বলিষ্ঠ হাতখানি কখন একবার ছুঁয়ে যাচ্ছে তার আড়ষ্ট বাহুপাশ। অন্তরগহনে জাগিয়ে তুলছে মধুর শিহরণ। দুলে উঠছে বুকের রক্তস্রোত।

    এমন সময় গাড়ির গতি একটু মন্থর হয়ে এল। হাওয়ার শব্দ কমে গেল। হঠাৎ কানে এল—আচ্ছা আপনি কখনো কুমিল্লায় ছিলেন?

    চমকে উঠল অপর্ণা। কোনও কিছু ভাববার আগেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল : হ্যাঁ, কেন বলুন তো?

    ভদ্রলোক হাসিমুখে বললেন, তা হলে ঠিক ধরেছি। আপনাকে আমি চিনি। মানে আগে দেখেছি।

    আমাকে!

    হ্যাঁ, কিন্তু আপনি তা জানেন না।

    গাড়ির বেগ আরো খানিকটা সংযত করে বললেন, আমার বাবা ছিলেন ওখানকার সাব-জজ। বছর তিনেক আগে বেড়াতে গিয়েছিলাম কদিনের জন্যে। নববর্ষ উপলক্ষ্যে এ. ডি.-এম. এর বাড়িতে যে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল, সেখানে আপনার গান শুনেছিলাম। আজও কানে লেগে আছে। আর আপনার সেই আরতি-নৃত্য! এখনও যেন চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি। আপনার নামটিও আমার মনে আছে। অপর্ণা দেবী—কেমন তাই না? তার পরেও আপনার খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছি—

    গাড়িটা একটু রাখুন

    সহজ অনুরোধের সুরেই বলতে চেয়েছিল অপর্ণা। তার মধ্যে একটি কেমন ভয় ও ব্যস্ততার উত্তেজনা ফুটে উঠল। ভদ্রলোক বিস্মিত হলেন। বললেন, কেন?

    আমি নেমে যাবো।

    সে কি! এখানে কোথায় নামবেন এই মাঠের মধ্যে?

    তা হোক, আমাকে নামিয়ে দিন। দু-চোখে কাতর অনুনয়।

    গাড়ির গতি অনেকখানি কমিয়ে দিলেন ভদ্রলোক, কিন্তু একেবারে থামালেন না। অনুতপ্ত কণ্ঠে বললেন, আমাকে আপনি ভুল বুঝেছেন, অপর্ণা দেবী। অনেক দিন আপনার কথা মনে হয়েছে। আজ দৈবক্রমে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ায় সত্যিই ভারি আনন্দ পেলাম। তাই হয়তো ঝোঁকের মাথায় এমন কিছু বলে ফেলেছি, যা আমার বলা উচিত ছিল না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, যা বলেছি সবটুকু নেহাত সরল মনে না-ভেবে বলা। এর মধ্যে কোনও মতলব বা অভিসন্ধি আমার নেই।

    না না, সে কথা আমি বলি নি। সেজন্যে নয়—

    তবে?

    সে আপনি বুঝবেন না; আমিও বোঝাতে পারব না—প্রায় অবরূদ্ধকণ্ঠে বলল অপর্ণা, দয়া করে এইখানেই আমাকে নেমে যেতে দিন।

    কিন্তু আপনি যে বললেন, বেহালায় আপনার বাসা?

    মিথ্যে বলেছি।

    মিথ্যে বলেছেন!

    হ্যাঁ। কিন্তু কেন, তা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। —বলতে বলতে চোখ দুটো জলে ভরে গেল।

    এ কী, আপনি কাঁদছেন!

    ওঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি আঁচলে চোখ মুছে ফেলল অপর্ণা। গাড়ি তখন মাঠ পার হয়ে সবে বসতি অঞ্চলে মোড় নিয়েছে। সেইখানে একটা রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড় করাতেই নেমে পড়ছিল অপর্ণা, ভদ্রলোক অনুনয়ের সুরে বললেন, আমি এখনও বলছি অপর্ণা দেবী, আপনি নেমে যাবেন না। কী হয়েছে, আমাকে খুলে বলুন। আমার যদি কিছু করবার থাকে আমি নিশ্চয়ই করব। এইটুকু বিশ্বাস রাখুন আমার ওপর। আমার কাছ থেকে আপনার কোনাও বিপদ বা অসম্মানের ভয় নেই।

    আগ্রহাকুল দৃষ্টিতে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে রইলেন তিনি। কিন্তু অপর্ণা কোনও কথাই বলতে পারল না। শুধু যে অশ্রু সে এতক্ষণ কোনোরকমে ধরে রেখেছিল চোখের কোণে, তাই এবার অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়তে লাগল।

    ভদ্রলোক আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে আর একখানা গাড়ি এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। তার ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ল শরণ সিং আর তারই বয়সী আর-একটি লোক। অপর্ণা তাড়াতাড়ি নেমে পড়ে রূদ্ধশ্বাসে বলল, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলুন শরণদা।

    কাজ হল? —চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল শরণ সিং। অপর্ণা যেন বুঝতে পারে নি এমনি বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

    টাকা পেয়েছ?—ব্যগ্রকণ্ঠে সোজাসুজি জানতে চাইল শরণ।

    না না, ও আমি পারব না, কিছুতেই না। আমাকে নিয়ে চলুন শীগগির!

    টাকা! কিসের টাকা? –এগিয়ে এসে বললেন ভদ্রলোক : আপনারা কে, জানতে পারি?

    সেটা স্যর, আপনার না জানলেও চলবে। ব্যঙ্গের সুরে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল শরণের সঙ্গীটি। তবে কিসের টাকা, সেটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধি আপনার থাকা উচিত ছিল। মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করতে গেলে ট্যাঁক থেকে কিঞ্চিৎ—

    ওকে থামতে বলুন শরণদা। চিৎকার করে বলতে গেল অপর্ণা, কিন্তু সামান্য একটু ক্ষীণ স্বর শুধু বেরোল তার গলা থেকে

    ও, এই ব্যাপার! অনেকটা যেন আপন মনে বললেন ভদ্রলোক : এইজন্য দলবল জুটিয়ে পেছু নিয়েছিলে! আর আমি কী ভেবে কার জন্যে—ইশ! বলে সামনেকার লম্বা চুলগুলোর মধ্যে আঙুল চালিয়ে দিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন ভদ্রলোক। পরমুহূর্তেই যেন একটা রূঢ় ঝাঁকানি দিয়ে টেনে তুললেন নিজেকে। অপর্ণার সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন, টাকা চাই তোমার? আগে বল নি কেন? তার জন্যে আমার এতদিনের স্বপ্ন ভেঙে দেবার কী দরকার ছিল?

    এটা প্রশ্ন নয়। হলেও অপর্ণার কাছে তার উত্তর ছিল না। তার জন্যে তিনি অপেক্ষাও করলেন না। অস্ফুটকণ্ঠে বললেন তিনি, সেই তুমি! আজ এত নেমে গেছ! ছি!

    হঠাৎ প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করলেন একটা নোটের তাড়া। ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, এই নাও টাকা! আরও চাই?

    প্যাকেটটা সজোরে বুকের উপর গিয়ে পড়তেই একটা ক্ষীণ শব্দ করে চোখ তুলল অপর্ণা। ঠিক সামনে কয়েক হাত দূরে তারই দিকে তাকিয়ে আছে দুটি জ্বলন্ত চোখ, তার ভিতর থেকে ঠিকরে পড়ছে শুধু জ্বালাময়ী ঘৃণা। সে দৃষ্টি অসহ্য হল অপর্ণার! আপনার অজ্ঞাতে দু-হাতে চেপে ধরল চোখ দুটো। বুকের উপরটা তখনও জ্বলে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ভিতরে সমস্ত অস্থিমজ্জা পুড়িয়ে দিচ্ছিল যে যন্ত্রণা, তার কাছে বাইরেকার এই জ্বালা অতি তুচ্ছ।

    একদল লোক—সম্ভবত সিনেমা কিংবা চিড়িয়াখানা-ফেরত, ––কলরব করে চলেছিল ওই পথ দিয়ে। তামাশার গন্ধ পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। একজন হিন্দীতে জানতে চাইল, ব্যাপার কী?

    কুছ নেহি ভাইয়া। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল শরণ সিং : আপলোক যাইয়ে।

    কিন্তু ‘যাইয়ে’ বললেই এ রকম একটা লোভনীয় দৃশ্যের মজা ছেড়ে চলে যাবার মতো বেরসিক লোক তারা মোটেই নয়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন দিয়ে ওদের দুজনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। তাদের কৌতূহলের প্রধান কেন্দ্র ওই ‘জেনানা’। কে সে? এ হেন জায়গায় কী সূত্রে তার আবির্ভাব? শরণের বন্ধুটি, বোধ হয় তাদের হাত থেকে সহজে মুক্তি পাবার আশায় বলে ফেলল, বিশেষ কিছুই নয় ভাই। বাবুটি ওকে নিয়ে ফুর্তি করতে বেরিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সুবিধে হয় নি।

    কৌন বাবু? বলে গর্জে উঠল পাঁচ-সাত জন। একজন ঘুষি বাগিয়ে গেল ভদ্রলোকের দিকে। তিনি তখন গাড়িতে উঠবার আয়োজন করছিলেন। দু-তিন জন দাঁড়াল গিয়ে গাড়ির সামনে। আর-একজন কুৎসিত ভাষায় গালাগালি দিয়ে উঠতেই তিনি প্রতিবাদ করলেন, চোপ রও। সঙ্গে সঙ্গে ঘুষিটা পড়ল গিয়ে তাঁর মুখের উপর। অপর্ণা চিৎকার করে উঠল। শরণ এবং তার বন্ধু এগিয়ে গেল ঠেকাতে। জটলার এক ফাঁকে দেখা গেল, কাঁচভাঙা চশমাটা ঝুলে পড়েছে ওঁর গালের উপর, আর নাকের ভিতর থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। সমস্ত পৃথিবীটা হঠাৎ দুলে উঠল অপর্ণার চোখের উপর। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে দুটো হাত বাড়িয়ে দিল, যেন কোনও আশ্রয়ের খোঁজে। তার পরে কী হল, আর মনে নেই।

    অপর্ণার যখন জ্ঞান ফিরল চারদিকটা অন্ধকার। তারই মধ্যে আবছায়ার মতো কে যেন শিয়রে বসে আস্তে আস্তে হাওয়া করছে। জিজ্ঞাসা করল, কে?

    আমি, দিদিমণি।

    কালুর মা? আমি কোথায়?

    তোমার নিজের বিছানায় শুয়ে আছ দিদিমণি। আলো জ্বালব?

    জ্বালো। শরণদা কোথায় গেল?

    বলতে বলতেই শরণ এসে ঘরে ঢুকল। উৎকণ্ঠার সুরে বলল, এখন কেমন আছ পরী বহিন?

    ভালো আছি। আপনি এখনও বাড়ি যান নি?

    বাড়ি! সে এক সময়ে গেলেই হবে। রাত বেশি হয় নি। যাও তো কালুর মা, দিদিমণির দুধটা এবার নিয়ে এসো। বেশ গরম আছে তো—

    দেখি, যদি না থাকে দুখানা কাগজ জ্বেলে চট্ করে তাতিয়ে নিয়ে আসছি। বলতে বলতে কালুর মা তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেল।

    এখন আবার দুধ কেন? অনুযোগের সুরে বলল অপর্ণা।

    একটু খেতে হবে বইকি। বলে তাকের উপর থেকে নামিয়ে নিয়ে এল একটা কাগজে- মোড়া শিশি।

    ওটা কী?

    কিছু না, একটু ওষুধ। দুধের সঙ্গে খেতে বলে গেছেন ডাক্তারবাবু।

    ছি ছি, এ সব কি ছেলেমানুষি বলুন তো? এই সামান্য ব্যাপারে আবার ডাক্তার ডাকতে গেলেন কেন? কী হয়েছে আমার?

    শরণ এ অভিযোগের কোনও উত্তর দিল না। মৃদু হেসে শিশির মোড়কটা খুলে ফেলল। অপর্ণা দু-এক মিনিট কী ভাবল। তারপর বলল, ওঁর কী হল শরণদা? খবর পেয়েছেন কিছু?

    কার? ও হ্যাঁ, উনি তখনই বাড়ি চলে গেছেন। গোলমাল দেখে পুলিস এসে পড়েছিল। পরিচয় পেয়ে তারাই ওঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।

    একটু থেমে, বোধ হয় ওর উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে লক্ষ্য করে বলল, বেশী কিছু লাগে নি। দু-এক দিনেই ভালো হয়ে যাবেন।

    সে টাকাটা?

    তোমার বালিশের নীচে আছে।

    শরণদা!

    কী বহিন?

    আমাকে একবার তাঁর কাছে নিয়ে যেতে পারেন?

    তাঁর কাছে!

    হ্যাঁ, এই নোটের তাড়াটা আমি ফিরিয়ে দিয়ে আসবো।

    শরণ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। গভীর দৃষ্টিতে একবার ওর মুখের দিকে চেয়ে চোখ ফেরালো জানলার বাইরে। খানিকক্ষণ পরে স্নেহার্দ্র কন্ঠে বলল, পরী, তোমার শরীর মন কোনোটাই আজ ঠিক নেই। এই অবস্থায় ঝোঁকের উপর কিছু করতে যেয়ো না। রাতটা কেটে যাক। সকালে উঠে মন সুস্থ হলে ভেবে-চিন্তে যা ভালো বুঝবে তাই কোরো। কেউ বাধা দেবে না।

    কালুর মা দুধ নিয়ে এল। তার হাত থেকে প্যানটা নিয়ে পেয়ালায় ঢেলে কয়েক ফোঁটা ওষুধ মিশিয়ে শরণই ধরে দিল ওর সামনে। তারপর বলল, দুধটা খেয়ে নিয়ে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো। ওইটাই এখন তোমার সবচেয়ে বেশী দরকার।

    অপর্ণা নতমুখে পেয়ালায় চামচে নাড়তে নাড়তে বলল, আপনি যা ভাবছেন তা নয়, মন আমার ঠিক আছে। শুধু ঠিক নয়, স্থির করেও ফেলেছি।

    কিন্তু অপর্ণা বোধ হয় তখনও জানে না, ‘স্থির’ কথাটা আর যেখানেই চলুক মন নামক যে বিচিত্র বস্তু বাস করে মানুষের বুকের মধ্যে, তার বেলায় খাটে না। এই মুহূর্তে সে যা স্থির করে, পর-মুহূর্তেই তার সেই সংকল্প যে কোথায় ভেসে যায় সে রহস্য আজও ভেদ করা যায় নি, হয়তো কোনোদিনই যাবে না।

    শরণ চলে যাবার পর কালুর মাকেও শুতে পাঠিয়ে দিয়ে বালিশের তলা থেকে নোটের বাণ্ডিলটা বের করল অপর্ণা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল লোহার তার-দিয়ে গাঁথা সেই কাগজগুলোর দিকে। ধীরে ধীরে অনেকদূর চলে গেল তার দৃষ্টি, যেখানে লোহার- গরাদে-ঘেরা জেল-হাজতের অন্ধকারে একদল চোর-ডাকাতের মধ্যে পড়ে আছে বারীনদা, দিন গুনছে হয়তো তারই মুখ চেয়ে—কবে কেমন করে আসবে তার মুক্তি! এই তো সেই মুক্তির দূত! এই পাঁচশো টাকার বিনিময়ে আবার তারা ফিরে পাবে সেই পুরনো দিন। তারপর নতুন করে শুরু হবে তাদের নবজীবনের যাত্রা। এই পথ দিয়ে নয়, এই কুটিল পঙ্কিল গোপন গলিপথ থেকে প্রকাশ্য সরল রাজপথে ফিরিয়ে আনতে হবে বারীনদাকে। সেখানে যা জোটে তাতেই স্বচ্ছন্দে মিটে যাবে তাদের সামান্য প্রয়োজন। যে সংকল্প নিয়ে সে ঘর ছেড়েছিল, এইবার এতদিনে দেখা দিয়েছে তাকে পরিপূর্ণ রূপ দেবার শুভক্ষণ। বড় হবে, মানুষ হবে অপর্ণা। তারপর হয়তো একদিন পূর্ণ হবে যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তার মায়ের মনে, যে আশীর্বাদ সেদিন করেছিলেন জেলর সাহেব, যে ভীরু আশা সে নিভৃত মনের কোণে লুকিয়ে রেখেছে আকৈশোর-

    অকস্মাৎ কিসের রূঢ় আঘাতে ছিন্ন হয়ে গেল কল্পনার তার। এ কী ভাবছে সে! যে কাগজগুলোকে আশ্রয় করে মূঢ়ের মতো এই স্বপ্নের জাল বুনে চলেছে অপর্ণা, তারই আর-একটা রূপ ফুটে উঠল তার চোখের উপর। সেখানে এর পাতায় পাতায় জড়িয়ে গেছে এক দিকে হীন প্রতারণার কালি, আর এক দিকে সুতীব্র ঘৃণার বিষ। শুধু প্রতারণা নয়, নিজেকে হেয়, হীন, বিকৃত করে তুলে ধরা এমন একজনের কাছে, যার চোখে সেই একদিন এনেছিল স্বপ্নের ঘোর, ছায়া ফেলেছিল মনের পাতায়। সে পরমবার্তা কোনোদিন জানতে পারে নি অপর্ণা। আজ যখন জানল, তার পর-মুহূর্তেই দেখল, সে ছায়া মিলিয়ে গেছে। নারী-জীবনের এই সহসা-লব্ধ প্রথম সম্পদ আজ নিজের দোষেই হারিয়ে এল। তার জায়গায় নিয়ে এল দুঃসহ ঘৃণা আর দুস্তর লাঞ্ছনা।

    এই কথা মনে হতেই নোটগুলোর স্পর্শে হাত দুখানা যেন জ্বালা করে উঠল। যেখানে ছিল সেইখানেই আবার লুকিয়ে ফেলল প্যাকেটটা। তারপর বিছানার উপর বসে মনে মনে শপথ গ্রহণ করল—যা হারিয়ে এলাম, সে পরম বস্তু আর ফিরে পাব না জানি, তবু যেমন করে হোক, ফিরিয়ে দিতে হবে এই অবজ্ঞালাঞ্ছিত ভিক্ষার দান। কোনও মায়া, কোনও স্বার্থ, রঙিন ভবিষ্যতের কোনও মোহ কখনও যেন সে-পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

    বিরুদ্ধমুখী ভাবনার দোলায় দোল খেতে খেতে কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিল, শেষ পর্যন্ত জানতে পারে নি। ভোরের দিকে দেখা দিল এক অদ্ভুত স্বপ্ন। কোন্ এক পাহাড়ী দেশে বেড়াতে গেছে সে আর বারীনদা। চলতে চলতে সামনে পড়ল এক বিরাট গহ্বর। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল তারই মধ্যে। বারীন হাত বাড়িয়ে দিল কিন্তু সে-হাত সে ধরতে পারল না, তলিয়ে গেল অন্তহীন অন্ধকারে। কেউ কোথাও নেই, শুধু উপর থেকে ভেসে আসছে বারীনের ব্যাকুল ডাক—পরী! পরী! সাড়া দিতে গেল, কিন্তু গলায় স্বর ফুটল না।

    সেই মুহূর্তে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে থেকে শোনা গেল শরণ সিংয়ের গলা : পরী বহিন! ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে। জানলার বাইরে ঝলমল করছে রোদ। ইশ, এত বেলা হয়ে গেছে! ভারি লজ্জিত হল অপর্ণা। তাড়াতাড়ি সাড়া দিয়ে বলল, যাই শরণদা।

    আজ বেশ ভালো বোধ করছ তো? —বাইরে থেকেই জিজ্ঞাসা করল শরণ।

    হ্যাঁ গো, হ্যাঁ। আপনার দেখছি বেজায় ভাবনা হয়েছে আমাকে নিয়ে! বলে দরজা খুলে দিল।

    ভাবনা হবে না! কাল তো রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আজ এত বেলা পর্যন্ত ওঠ নি দেখে—

    ভাবলেন বুঝি মরে গেলাম!

    ছি:, ওসব কথা কখনও বলতে আছে? বলে সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকাল ওর সদ্য-ঘুম- ভাঙা প্রফুল্ল মুখের পানে। বলল, এবার চোখে মুখে জল দিয়ে একটু চা খেয়ে নাও। আজ আর রান্নার দিকে গিয়ে কাজ নেই। কালুর মা ওদিকের কাজ সেরে এখনই আসছে। ওই দুটো চাল ফুটিয়ে দেবে। বাজার-টাজার সব করে রেখে গেলাম।

    আপনি এখন যাচ্ছেন কোথায়?

    বাবা আসছে নটার গাড়িতে। স্টেশনে আমাকে না দেখলে বুড়ো ওইখানেই বসে পড়বে। এবেলা আর আসা হয়ে উঠবে না। বিকেলে আসব। তারপর যেতে হবে উকিলের বাড়ি।

    উকিলের উল্লেখে গতরাত্রির চিন্তাস্রোত আবার নতুন করে ফিরে এল। বিশেষ করে সেই শপথের কথা। মনে হল, শরণ সিংহের বাবা অসছেন, সকালে সে থাকতে পারল না, যেতে পারল না উকিলের কাছে—এটা যেন বিধাতার ইঙ্গিত। এমনি করে তিনিই যেন ঘটিয়ে দিলেন তার সংকল্পসিদ্ধির সুযোগ। সকালেই তাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

    নোটের প্যাকেটটা আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে নিয়ে লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করে করে কোনো একটা থানায় গিয়ে পৌঁছল অপর্ণা। থানা-অফিসারের কাছে কালকের ঘটনার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে বলল, টাকাগুলো সেই ভদ্রলোককে ফিরিয়ে দিতে চাই। তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ওকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করলেন, তাঁর নাম-ঠিকানা বলতে পারেন?

    না।

    তা হলে তাঁকে খুঁজে পাব কোথায়?

    গাড়ির নম্বর আছে; তাঁর নিজের মোটর। তা থেকে খোঁজ পাওয়া যাবে না?

    তা হয়তো যায়। কিন্তু তার আগে আপনার আসল উদ্দেশ্যটা কী, খুলে বলুন তো?

    সেকথা আপনাকে আগেই বলেছি। এই টাকাগুলো তাঁর হাতে ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনও উদ্দেশ্য নেই।

    কিন্তু আপনি নিজে যে পুলিস কেসে জড়িয়ে পড়বেন, তা বুঝতে পারছেন?

    পারছি, তবু এ ছাড়া উপায় নেই।

    আপনার বয়স অল্প। দেখে বুঝতে পারছি, ভদ্রঘরের মেয়ে। সাধ করে এসব কেলেঙ্কারি মাথায় তুলে নিচ্ছেন কেন?

    তার উত্তর আমি দিতে পারব না। দিলেও হয়তো আপনি মানতে চাইবেন না। আমি যা করতে যাচ্ছি, তার সব ফলাফল জেনে-শুনে তার জন্যে তৈরী হয়েই করছি। আপনি শুধু আমাকে একটু সাহায্য করুন। হয় ওঁকে এখানে ডেকে পাঠান, নয়তো আমাকেই পাঠিয়ে দিন তাঁর কাছে।

    দাঁড়ান দাঁড়ান, একটু ভাবতে দিন। মহা ফ্যাসাদে ফেললেন দেখছি! হয় তিনি এখানে আসবেন, না হয় আপনি সেখানে যাবেন—এই তো? আচ্ছা বসুন আপনি।

    অফিসারটি উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে টেলিফোনে কী সব আলোচনা করলেন, বোধ হয় কোনও উপরওয়ালার সঙ্গে। তারপর ফিরে এসে বললেন, আপনি যা চাইছেন তার কোনোটাই আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আপাতত আপনাকে কনফেসিং অ্যাকিউজ্‌ড্—মানে একরারী আসামী হিসেবে কোর্টে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সেখানে হাকিমের কাছে আপনার সব কথা খুলে বলবেন।

    তারপর?

    তারপর আপনার নামে মামলা দায়ের হবে। যে ভদ্রলোককে আপনি ঠকিয়েছেন, কোর্ট থেকে সমন যাবে তাঁর কাছে। ওখানেই তাঁকে দেখতে পাবেন।

    কোর্টে নেবার পর এস. ডি ও.-র সামনে যখন ওকে হাজির করা হল, তিনি ওকে ভেবে দেখবার সময় দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন নিজের খাস কামরায়। অনেকক্ষণ পরে নিজেই এলেন সেখানে। বারংবার জানতে চাইলেন, তার এই স্বীকারোক্তির পেছনে পুলিস বা. অন্য কারও কোনও জুলুম বা প্ররোচনা আছে কিনা। অপর্ণা জানাল, না।

    এমনও তো হতে পারে—প্রশ্ন করলেন হাকিম, আমার কাছে এই যা বলছেন, তেমন কোনও ঘটনাই ঘটে নি, এ সব কিছুই করেন নি আপনি, শুধু কারও ভয়ে, কারও ওপর কৃতজ্ঞতা দেখাতে কিংবা কাউকে বাঁচাতে গিয়ে এই মিথ্যা অপবাদ আপনি নিজে ঘাড়ে তুলে নিচ্ছেন?

    অপর্ণা তেমনি দৃঢ়স্বরে জানাল, না।

    তবু হাকিমের সন্দেহ দূর হল না। তাই কোর্ট-ইনস্পেক্টরকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁরই হেফাজতে ওঁকে পাঠিয়ে দিলেন জেলখানায়। চাপা গলায় ইংরেজিতে তাঁকে কী সব নির্দেশ দিয়ে অপর্ণার দিকে ফিরে বললেন, জেলে পাঠাচ্ছি বলে মনে করবেন না, আপনি কোন অপরাধ করেছেন। কী বলছেন, কেন বলছেন, যা বলতে যাচ্ছেন সে সব সত্যি না মিথ্যা, কী লাভ বলে, ক্ষতিই বা কতখানি—নির্জনে বসে সব আর-একবার তলিয়ে ভেবে দেখুন। তারই সুযোগ দিলাম। ওখানে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ। কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না।

    দীর্ঘ কাহিনী শেষ করে যেন একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল অপর্ণা। তারপর মুখে একটু মৃদু হাসি টেনে এনে আমার দিকে চেয়ে বলল, জেলের নাম শুনে বুকটা একবার কেঁপে উঠেছিল বইকি। তখন তো জানি না, কত বড় সৌভাগ্য আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে!

    হেসে ফেললাম : সৌভাগ্য!

    সৌভাগ্য নয়? কতকাল পরে আপনাকে দেখলাম। এ যে কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবি নি।

    মোকদ্দমার প্রথম তারিখে হাকিমের এজলাসে অপর্ণার ডাক পড়ল না। কোর্ট-হাজতে কয়েক ঘণ্টা বসে থেকে সন্ধ্যাবেলা ফিরে এল জেলখানায়। আবার তারিখ পড়ল পনেরো দিন পরে। এদিন আর ফিরে এল না। তার বদলে এল একটা স্লিপ। সমাদ্দার সাহেব লিখেছেন, হাজতী আসামী অপর্ণা চ্যাটার্জির নামে কোর্টে যে পাঁচশো টাকার ক্যাশ ডিপোজিট আছে, তার রসিদখানা দয়া করে লোক-মারফত পাঠিয়ে দেবেন। অপর্ণা ওঁর আঁচল থেকে খুলে সেই হলদে কাগজখানা আমারই কাছে রাখতে দিয়েছিল। পাঠিয়ে দিলাম।

    দিন চারেক পরে সমাদ্দার সাহেব আবার এলেন কী কাজে। বললেন, তাজ্জব ব্যাপার মশাই! ছাব্বিশ বছর চাকরি হল, তার মধ্যে এরকমটা কখনও দেখি নি, শুনিও নি কোনোদিন। আপনি তো শুনি গল্প-টল্প লিখে থাকেন। শুনে রাখুন। চমৎকার প্লট। হয়তো একদিন কাজে লাগবে।

    প্লটের লোভে না হলেও কৌতূহলের বশে উৎকর্ণ হলাম। সমাদ্দার সাহেব তাঁর তাজ্জব কাহিনীর একটা সরস বর্ণনা দিয়ে শেষের দিকে যোগ করলেন, আসামীকে জিজ্ঞেস করলাম—এই কি সেই বাবু যাকে ব্ল্যাকমেল করে টাকা নিয়েছিলে? স্পষ্ট ভাষায় উত্তর এল—হ্যাঁ। তার পর স্টেটমেন্টে যা কিছু বলেছে, আমার প্রশ্নের জবাবে একে একে কনফার্ম করল। ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই স্রেফ অস্বীকার। সোজা বলে দিল, ‘আমি ওকে চিনি না, কখনও দেখিও নি। যে ঘটনা শুনলাম, সে রকম কোনো উপন্যাস আমার জীবনে ঘটে নি।’ আসামী রুখে উঠল। ডকে দাঁড়িয়ে সে কী চিৎকার : ‘মিথ্যা কথা বলছেন উনি। এ টাকা ওঁর। আমি ঠকিয়ে নিয়েছিলাম। সাক্ষী কিছুতেই স্বীকার করল না। হাকিম আর কী করবেন, প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিলেন মেয়েটিকে, সেই সঙ্গে টাকা ফেরত দেবার অর্ডার।

    তারপর?

    তারপর আর কী, টাকার প্যাকেটটা আনিয়ে তুলে দিলাম ওর হাতে। চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন।

    ***

    এ কাহিনী যেদিন শুনেছিলাম, তারপর সাত-আট বছর চলে গেছে। অপর্ণার কথা ঝাপসা হতে হতে কখন মিলিয়ে গেছে মনের কোণে। মনের আর দোষ কী? প্রতিদিন নতুন নতুন অপর্ণার ছায়া পড়ছে তার দপর্ণের গায়ে। একজনকে বেশীক্ষণ ধরে রাখতে গেলে তার চলে না। কিংবা দর্পণ না বলে বলতে পারেন, স্লেট। এই মুহূর্তে যা লেখা হয়, পর-মুহূর্তে মুছে যায়। তার পর ক্রমাগত চলতে থাকে ওই লেখা, আছে মুছে ফেলার পালা। তাই তো করে চলেছি জীবনভোর। জানি না, এর শেষ কোথায়

    একদিন সকালের ডাকে অন্য সব চিঠিপত্রের সঙ্গে এল একটা খাম। অচেনা হাতের লেখা। সর্বাঙ্গে পোস্ট-অফিসের ছাপ। নামটা আমারই, ঠিকানাটা সাত বছরের পুরনো। তার উপরে লাল কালির কলম চালিয়ে কোনও পরিচিত বন্ধু কী মনে করে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার বর্তমান ঠিকানায়। খাম খুলতেই বেরিয়ে এল সেই চিঠি, যার উল্লেখ করেছি এই দীর্ঘ আখ্যায়িকার সূচনায়। রুল-টানা খাতা থেকে ছিঁড়ে-নেওয়া একটু কাগজ। তার উপরে কয়েকটা মেয়েলী হাতের লাইন।

    শ্রীচরণকমলেষু,

    আপনার আশ্রয় ছেড়ে যেদিন চলে এলাম, তার পর এই আমার প্রথম চিঠি। জানি না, আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। এতদিন পর যে আবদার নিয়ে এলাম আপনার কাছে, পৌঁছে দিতে পেরেছি কিনা, তাও আমার অজানাই থেকে যাবে। এইটুকু শুধু জানি, সারাজীবন পথ চেয়ে থাকলেও এ চিঠির কোনও উত্তর আমার আসবে না, কোনোদিন পাব না আপনার হাতের একটু চিহ্ন, স্নেহমণ্ডিত দুটি লাইন, তার নীচে একটি অম্লান স্বাক্ষর। সে পথ আমাকে নিজের হাতেই বন্ধ করতে হল। আমি কোথায় আছি, সে কথা আপনাকে জানাবার উপায় নেই। কেন? সে জবাবটাও মুখ ফুটে বলতে পারব না।

    জীবনে দুটিবার মাত্র আপনার সঙ্গে দেখা। যা পেয়েছি অন্তরভরে আছে। আমি আর কী দিতে পারি! আপনার পায়ের তলায় রইল আমার ঠিকানাহীন চিঠি।

    আমার মামলার ফল সেদিন না হলেও, তার কদিন পরে নিশ্চয় জানতে পেরেছিলেন। একবার মনে হয়েছিল, আপনার কাছেই ফিরে যাই। দাঁড়াবার মতো একটা জায়গা, বাকী জীবনটা কাটিয়ে দেবার মতো একটা কোনও আশ্রয় হয়তো আপনি জুটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু কোন্ মুখে যাব? আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের কানে যখন শুনলাম—তিনি আমাকে চেনেন না, কোনোদিন দেখেন নি, যা বলেছি সব মিথ্যা, সেই লজ্জার বোঝা মাথায় নিয়ে কী বলে কেমন করে দাঁড়াব আপনার চোখের সামনে! তাই যাওয়া হল না। এত কাণ্ডের পর শরণদার কাছে গিয়েও উঠতে পারি নি। ওরা যা চেয়েছিল তা যখন দিতে পারলুম না, কথা দিয়েও তা রাখা গেল না, তখন আর ওকে বিব্রত করি কিসের জোরে? তার পর কোথায়, কেমন করে আমার দিন কেটেছে, সে কথা আমার বলবার নয়।

    এক দিন নয়, দু দিন নয়, কতগুলো বছর! মন যখনই ভেঙে পড়তে চেয়েছে, এই বলে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছি, তিনি তো দিয়েছিলেন—আমার অজ্ঞাতে আমারই জন্যে অঞ্জলি ভরে রেখেছিলেন। আমি হাত পাততে পারি নি। তাই পেলাম না। কিন্তু একেবারে যে পাই নি তা নয়। অমৃতের বদলে পেয়েছি বিষ। তবু তো পেয়েছি। আমার জীবনে অক্ষয় হয়ে থাক সেই ঘৃণার দান। এই কথা ভেবেই, বহু দুঃখে বহু অভাবে পড়েও সেই বাণ্ডিলের একখানা নোটও আমি নষ্ট করি নি। আজও সব তেমনই তোলা আছে।

    তার পর মনে হল, ওটা সান্ত্বনা নয়, প্রতারণা। নিজের মনকে মিথ্যা দিয়ে ঠকানো। ঘৃণা নিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকা যায় না।

    একদিন যখন নিতান্ত অসহ্য হল, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলুম না। লজ্জার মাথা খেয়ে অনেক খুঁজে খুঁজে গেলাম তাঁর বাড়ি। কিন্তু এবারেও আমার হার হল। দেখা পর্যন্ত করলেন না। দরজা থেকে ফিরে এলাম।

    যাক সে কথা। যা বলতে বসেছি, তাই এবার বলি।

    সেদিন আপনার ‘লৌহকপাট’ পড়লাম। ছদ্মনামে লিখলে কী হয়, আমার কাছে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারেন নি। ওই হাত, ওই মন, ওই দরদ, ওর সবটাই যে আমার চেনা। এতটুকু থেকে যার স্বাদ পেয়েছি, তা কি কখনও ভোলা যায়? যে প্রাণ একদিন ধরা দিয়েছিল শ্যামল বাংলার কিশোর মনের কাছে, তারই স্পর্শ পেয়ে অমর হয়ে রইল জেলখানার মানুষ। ওইখানে গিয়েই তো আপনাকে আবার নতুন করে পেলাম। যা কাউকে বলবার নয়, এ বিড়ম্বিত জীবনের সেই তুচ্ছ কাহিনী নামিয়ে দিয়ে এলাম আপনার পায়ের কাছে। আশা আছে, যত তুচ্ছই হোক, আপনার স্নেহবর্ষী লেখনীর মুখে সে একদিন রূপ নেবে। শুধু আশা নয়, এটা আমার শেষ আবেদন।

    আপনি হাসছেন? না, অমর হবার সাধ নেই। শুধু একটি বারের জন্য চোখের সামনে দাঁড়াতে চাই। সেদিন দেখে এলাম তাঁর লাইব্রেরি, পরিজনহীন শূন্য গৃহের যে কোণটিতে বসে তাঁর অবসর কাটে। আপনার লেখা কোনদিন নিশ্চয়ই তাঁর হাতে পড়বে। যদি পড়ে, হয়তো একবার চোখ মেলে দেখবেন সেই লজ্জাহীনা অপর্ণাকে, একদিন যার দিক থেকে কঠোর ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারপর শত অনুনয়েও যাকে চোখের দেখা পর্যন্ত দেন নি। সেদিন হয়তো ক্ষণেকের তরেও মনে হবে, যতখানি হেয় বলে তার মুখদর্শন করেন নি, ঠিক ততখানি হেয় বোধ হয় সে নয়।

    শতকোটি প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি।

    আপনার স্নেহের অপর্ণা।

  • দুই

    দুই

    নাম গোলাম মামুদ। চাকরি করেন লীগ সরকারের জেলখানায়। অথচ দাড়ি নেই, লুঙ্গি নেই, পরেন শান্তিপুরী ধুতি। তার পেছনে কাছা, সামনে কোঁচার বাহার। ফল যা হবার তাই হল। স্বজাতি মহলে চাঁই-এর দল চঞ্চল হয়ে উঠলেন। শোনা গেল, এ হেন অনাচার কর্তৃপক্ষের নজরে না এনে তাঁরা কিছুতেই ঠাণ্ডা হবেন না। তাঁর নিজের অফিসেও স্বজাতির দলটাই তখন প্রবল। বলতে গেলে আমিই কেবল বিজাতীয়। তবু তাঁদের চেয়ে আমার উপরেই টানটা যেন বেশী পড়ল জেলর সাহেবের। আমি তাঁর জেলখানার অন্যতম অনুচর, কিন্তু বৈঠকখানার অদ্বিতীয় সহচর। একদিন সেখানে বসেই চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে বলে ফেললাম, কাজটা ভালো হচ্ছে না, দাদা।

    উনি তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে গড়গড়া টানছিলেন। হঠাৎ না বুঝতে পারার সুরে বললেন, কোন্ কাজটা?

    তাঁর সযত্ন-রচিত কোঁচাটা দেখিয়ে দিলাম।

    মামুদ সাহেব হাসলেন, এ দিকে দেখছি তোমারও নজর পড়েছে। যাকে বলে, কোঁচায় সর্পভ্রম। কিন্তু যা ভাবছ তা নয়। এর পেছনে একটা মজার ইতিহাস আছে।

    —কি রকম? মজার গন্ধে একটু এগিয়ে বসলাম।

    —তবে শোন, বলে নলটায় গোটা কয়েক ঘন ঘন টান দিয়ে শুরু করলেন—’বছর পাঁচেক আগেকার কথা। সিউড়ি থেকে বদলি হয়ে এলাম খুলনায়। চার্জ নেবার কদিন পর সন্ধ্যাবেলা বসে বসে ওয়ারেন্ট চেক করছি। হাকিমের নামটায় নজর পড়তেই থেমে গেলাম। এস. বি. সেন। আমাদের সুনীল নয়তো? একসঙ্গে বি. এ. পাশ করেছি। তার কিছুদিন পরেই ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে কোথায় চলে গেল। অনেকদিন দেখা নেই। ও-এস.-কে ফোন করে জেনে নিলাম, হ্যাঁ, সুনীলই বটে। বাসার ঠিকানাটাও সংগ্রহ করে ফেললাম।

    ‘এই যা দেখছ, এইটাই আমার চিরকালের পেটেণ্ট চেহারা। আজন্ম ডিসপেটিক। ভোরে উঠে এক চক্কর না ঘুরে এলে খিদে হয় না।’ পরদিন সকালেই বেড়িয়ে ফেরবার মুখে সুনীলের বাড়িতে গিয়ে হানা দিলাম। চাকর এসে বলল, বাবু এখনও ওঠেন নি। বাড়িতে মেয়ে-ছেলে নেই। ওর শোবার ঘরের দরজায় ধাক্কা দেওয়া গেল। ভেতর থেকে বিরক্তির সুরে সাড়া এল, কে? জবাব দিলাম না। মিনিট দুই অপেক্ষা করে একবার কড়া নেড়ে দিলাম। দরজা খুলে গেল। সুনীল অসময়ে ঘুমভাঙা রুক্ষ চোখ দুটো একবার আমার দাড়ি থেকে লুঙ্গি পর্যন্ত বুলিয়ে নিয়ে চড়া গলায় বলল, কাল না তোমাকে বলে দিলাম, আণ্ডা আমার চাই না? আবার এসেছ বিরক্ত করতে! আমি কাঁদো-কাঁদো গলায় বললাম, না এসে উপায় কী হুজুর? আপনারা পাঁচজনে দুটো আণ্ডা না নিলে আমার পেট চলে কী করে?

    ‘আরে, এ যে মামুদ’ —বলেই কোমরের কাপড় সামলাতে সামলাতে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।

    ‘বাসায় ফিরে প্রথমেই গিয়ে দাঁড়ালাম আমার শোবার ঘরে বড় আরশিটার সামনে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম নিজেকে। তারপর কী মনে হল, বৈঠকখানায় এসেই নাপিত ডেকে পাঠালাম। চেহারাটা খোদার দেওয়া। ওটা তো আর ছাড়া যায় না। ছাড়লাম আমার অনেকদিনের পুরনো সাথী—দাড়ি আর লুঙ্গি।’

    আমি বললাম, ‘কিন্তু দাদা, ওরা আপনাকে অত সহজে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো এবার ঐ পাঁচ বছরের অবহেলার শোধ নিয়ে বসবে।’

    —দেখা যাক, বলে নলটা আবার তুলে নিলেন মামুদ সাহেব।

    যে সময়ের কথা বলছি, তার কিছুদিন পরেই নোয়াখালির রঙ্গমঞ্চে দেখা দিয়েছিল সেই বীভৎস নাট্যলীলা। এটা ছিল তারই মহড়ার যুগ। সুতরাং জাতির বৈশিষ্ট্যের ধ্বজাধারী একদল বীরপুরুষ আচকান আর পায়জামা চড়িয়ে হঠাৎ একদিন হানা দিলেন মামুদ সাহেবের বৈঠকখানায়। ভুল উর্দুর সঙ্গে খাঁটি স্বদেশী খিস্তি মিলিয়ে তাঁর ধুতি আর শ্মশ্রুহীন মুখের বিরুদ্ধে ঘোষণা করলেন জেহাদ। মামুদ দমবার পাত্র নন। নির্ভুল উর্দুতে মোলায়েম সুরে সে জবাব দিলেন, তার মানে হচ্ছে, ওটা তাঁর ব্যক্তিগত রুচির এলাকা, এবং সে জায়গায় অন্যের নির্দেশ বা উপদেশ তিনি অনধিকারচর্চা বলে মনে করেন।

    এর মাসখানেক পরেই এল ওঁদের ঈদ্ পর্ব। স্থানে অস্থানে কোরবানির ধুম পড়ে গেল। মামুদের রন্ধনশালায় মাংস জিনিসটা নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু তার জাত সম্বন্ধে বাছ- বিচার ছিল। মুরগী এবং খাসী ছাড়া আর কোন জন্তু সেখানে ঢুকবার অধিকার পায় নি। ব্যাপারটা তাঁর স্বজাতি-মহলে তোলপাড় তুলেছিল। হঠাৎ কথা নেই, বার্তা নেই, ঈদের দিন সকালবেলা খান বাহাদুরের কুঠি থেকে কুলির মাথায় বিশাল এক ঝুড়ি এসে হাজির। বিশ-পঁচিশ সের গোস্ত—জেলর সাহেব এবং তাঁর স্বধর্মী সহকর্মীদের জন্যে কিঞ্চিৎ উপহার!

    মামুদের আরদালি ছিল ইয়াসিন সেখ। সেই বৃহৎ মাংসখণ্ডগুলোর দিকে একবার তাকিয়েই তাড়াতাড়ি কুলিটাকে সরিয়ে দেবার আয়োজন করছিল। মামুদ বাধা দিলেন। ঐ ইয়াসিনকে পাঠিয়ে জেলের বাগান থেকে আনিয়ে নিলেন দুজন কোদালধারী কয়েদী। বাড়ির পেছনে খানিকটা পোড়ো জায়গা পড়ে ছিল। তারই এক কোণে খোঁড়া হল একটা ছোটখাটো কবর। মাংসের টুকরোগুলো সযত্নে মাটি চাপা দেবার পর, কুলির সঙ্গে যে মৌলভী গোছের লোকটি এসেছিলেন, তাঁর দিকে ফিরে বিশুদ্ধ উর্দু ভাষায় বিনীত কণ্ঠে বললেন মামুদ, খান বাহাদুর সাহেবকে আমার হাজার হাজার আদাব জানাবেন। তাঁর উপহার পেয়ে আমি ভারী খুশী হয়েছি।

    এই আদাবের উত্তর কখন কী ভাবে পাঠিয়েছিলেন খান বাহাদুর, সেটা জানবার আমার অবকাশ হল না। তার আগেই এসে গেল বদলির হুকুম।

    মাস ছয়েক পরে আদালত থেকে কী একটা মামলায় সাক্ষীর সমন পেয়ে আবার যেতে হয়েছিল সেই পুরাতন কর্মস্থলে। শুনলাম, মামুদ সাহেব তখনো টিঁকে আছেন। কোর্টের কাজ সেরে গেলাম দেখা করতে। খবর পেয়েই ছুটে এলেন বৈঠকখানায়। পরনে শান্তিপুরী ধুতি নয়, হাওড়া হাটের লুঙ্গি; আর চিবুকের তলায় কিঞ্চিৎ নুর। বাঁ হাতটায় একটা ব্যাণ্ডেজ।

    বোধ হয় একটু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। উনি ম্লান হেসে বললেন, তোমার কথাই ঠিক হল, মলয়। এরা শোধ নিয়েছে, ভালো করেই নিয়েছে।…সেবার মান রাখতে গিয়ে পোশাক ছেড়েছিলাম। এবার চাকরি রাখতে গিয়ে মান ছাড়লাম।

    শেষের দিকে গলাটা কেমন উদাস হয়ে এল। আমি সে প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে বললাম, হাতে কী হল?

    —হাতে? ও-ও, সেও এক মজার ব্যাপার। বলছি, বোসো।

    মামুদ সাহেব ভিতর থেকে একবার ঘুরে এলেন। তার আগেই এল ঘরের তৈরী সন্দেশ আর চা। মিনিট কয়েক যেতে না যেতেই জমে উঠল আমাদের সেই পুরোনো দিনের আড্ডা। তারই ফাঁকে শুনতে পেলাম ওঁর ব্যাণ্ডেজ-বাধা হাতের কাহিনী!

    তিন-চার দিন আগের ঘটনা। তখনও ঠিক ভোর হয়নি। জেলর সাহেবের ঘুম পাতলা হয়ে এসেছে। হঠাৎ কানে গেল একটানা বাঁশির সুর। এ সর্বনেশে বাঁশি তার চেনা। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। দু-তিন মিনিট না যেতেই জেল-গেটে উঠল পেটা ঘণ্টার আর্তনাদ। জেল-অ্যালার্ম! চলতি কথায় যাকে বলে পাগলা ঘণ্টি। হাতের কাছে যা পেলেন, তাই জড়িয়ে নিয়ে ছুটলেন মামুদ। ততক্ষণে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে লাঠি পার্টি আর তার সামনে রাইফেলধারী স্কোয়াড। হুকুম পেলেই ডবল মার্চ করে ঢুকে পড়বে জেলখানায়।

    সদলবলে অকুস্থলে গিয়ে দেখলেন মামুদ, যা আশঙ্কা করেছিলেন, ঘটেছে ঠিক তাই। তেরো নম্বরের জানালার শিক ভেঙে উধাও হয়েছে এক ছোকরা কয়েদী। জেলর সাহেবের নাকের উপর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার মরচে-ধরা ক্ষয়ে-যাওয়া ভাঙা ডগা মুহূর্তমধ্যে সারা জেল জুড়ে শুরু হল তাণ্ডব। তন্নতন্ন করে খোঁজা হল প্রতিটি বাড়ির কোণ, পাঁচিলের ধার, গাছের ডাল আর নর্দমার তলা। কিন্তু পলাতকের সন্ধান পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল পাঁচিলের গায়ে দাঁড় করানো একটা বাঁশ আর তার পাশে একটা ছেঁড়া কুর্তা।

    ছেলেটার নজর আছে, বললেন মামুদ সাহেব। এতদিন থাকল আমার হোটেলে। যাবার সময় বখশিশ দিয়ে গেল গায়ের একটা ছেঁড়া জামা

    পাগলা-ঘণ্টি শেষ হবার আগেই এসে পড়লেন জেল-সুপার। পরীক্ষা করলেন ভাঙা শিক আর ছেঁড়া কুর্তা। তারপর চারটে সিপাইকে সাপেণ্ড করে উঠলেন গিয়ে গাড়িতে

    চারটে সিপাই! সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন মামুদ সাহেবের প্রতিবেশী এক উকিলবাবু। মিনিট দশেক আগে এসে আমার পাশে একটা চেয়ার দখল করেছিলেন।

    মামুদ বললেন, সেইটাই সাধারণ নিয়ম। একটা ‘এসকেপ’ মানেই চারজনের গর্দান।

    —তারা সব কারা? জানতে চাইলেন উকিলবাবু।

    —এই ধরুন, এক নম্বর—বাবুটি যে-ওয়ার্ড থেকে চম্পট দিলেন, তার ওয়ার্ডার-ইন- চার্জ। দু নম্বর—যেখান দিয়ে তিনি পাঁচিল লঙ্ঘন করলেন, সেই অঞ্চলের ওয়াল-গার্ড। তিন নম্বর হল জানালা-ঠোকাই।

    —সেটি আবার কে?—কৌতুককণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন উকিল ভদ্রলোক।

    মামুদ হেসে বললেন, জানালা-ঠোকাই চেনেন না! বড় মুশকিলে ফেললেন দেখছি। পরিচয়টা একটু জানিয়ে দাও তো, মলয়। আমি ততক্ষণে মৌতাতটা সেরে নিই। তোমরা তো এ রসে বঞ্চিতই রয়ে গেলে।

    গড়গড়ার নলটা মুখে তুললেন জেলর সাহেব। সদ্য-সাজা অম্বুরী তামাকের মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে উঠল। বললাম, একেবারে বঞ্চিত হই নি দাদা। ঘ্রাণেন কিঞ্চিৎ পাচ্ছি বৈকি। তবে সেটা হয়তো ঠিক অর্ধ-ভোজন নয়।

    উকিলবাবুর দিকে ফিরে বললাম, আপনার তো জেলের পাশেই বাড়ি। রোজ দুটো আড়াইটার সময় সারা জেলে একটা শব্দ ওঠে ঠন ঠন ঠন ঠন, ঠক ঠক। কখনও লক্ষ্য করেন নি?

    —হ্যাঁ, হ্যাঁ; মাঝে মাঝে শুনতে পাই বটে। বাড়িতে আমরা বলাবলিও করেছি। কেউ বলতে পারে নি ওটা কী।

    —ওটা হচ্ছে লোহার ডাণ্ডা দিয়ে জানালা-দরজার শিক ঠোকার শব্দ। একজন সিনিয়র ওয়ার্ডারের ওপর ঐ দরকারী কাজটার ভার পড়ে। তারই নাম জানালা-ঠোকাই। সন্ধ্যাবেলা ‘লক-আপ’-এর ঠিক আগে তাকে রিপোর্ট দিতে হয় জেলর সাহেবের কাছে, জানালা দরজা সব পরখ করে দেখলাম, ‘সব ঠিক হ্যায়’। এই রকম আর একজন আছে, ঠিক সন্ধ্যার আগে টহল দিয়ে ফেরে সারা জেলখানা। দেখে বেড়ায়, কোথাও পড়ে আছে কিনা বাঁশ, দড়ি কিংবা ঐ ধরনের কোনো মারাত্মক জিনিস। তাকেও রিপোর্ট দিতে হয় লকআপ টেবিলে, তামাম জেলখানা ঘুম্-ঘামকে দেখা। বাঁশ রশি সব বন্ধ হ্যায়।

    ঐ হল চার নম্বর, যোগ করলেন মামুদ সাহেব।

    সুপার চলে যেতেই শুধু বড় জমারদারকে সঙ্গে নিয়ে জেলের ভিতরটা চুপি চুপি ঘুরে দেখছিলেন জেলর সাহেব। কয়েদীরা তখনও বন্ধ। ফিমেল ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে পথ। হঠাৎ কানে এল কলকণ্ঠের হাসির ঝঙ্কার। কী ব্যাপার? একটু দাঁড়িয়ে গেলেন মামুদ সাহেব। শুনলেন, বলে উঠল কে একটি মেয়ে, কী মুশকিল! কতক্ষণ আর আটকে রাখবে?

    —চুপ কর না, ধমকে উঠলেন আরেকজন। কী রকম মজাটা হল, মাইরি! সাহেব থেকে সিপাই সক্কলের মুখ চুন।

    —যা বলেছিস ভাই, উচ্ছলিত কণ্ঠ শোনা গেল আর-একটি মেয়ের। ওঃ, যা আনন্দ হচ্ছে! বাহাদুর বটে ছোকরা। একবার দেখতে ইচ্ছে করে, সত্যি।

    এর পর যে মন্তব্য শোনা গেল, তার মধ্যে কিঞ্চিৎ আদি রসের আধিক্য। মামুদ লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দিলেন। কিন্তু ওদের ঐ অহেতুক উল্লাসের নিগূঢ় সত্যটি তাঁর মনের মধ্যে লেগে রইল। যে ছেলেটা পালিয়ে গেছে সে এদের কেউ নয়। তার কোনও পরিচয় এরা জানে না। কখনও দেখে নি, নামও শোনে নি কোনোদিন। পালিয়ে গেছে বলেই আজ সে ওদের আপনার জন। তাদের সঙ্গে এদের একাত্মতা। যে শৃঙ্খলে এরা বাঁধা পড়ে রইল, তারই বন্ধন সে ছিঁড়ে চলে গেছে, অগ্রাহ্য করে গেছে এই পাষাণ- প্রাচীরের অবরোধ, এই সিপাই-শাস্ত্রী-লাঠি-বন্দুকের ভ্রুকুটি। ওদের মনেও লেগেছে সেই মুক্তির বাতাস। সমস্ত জেলের আজ আনন্দের দিন।

    গোটা দুয়েকের সময় আবার অ্যালার্ম বেজে উঠল।

    —আবার!

    মামুদ সাহেব বললেন, কী করা যাবে বল? কপালে দুঃখ থাকলে কেউ খণ্ডাতে পারে না। এবারকার ঘটনাস্থল জেনানা ফাটক। গিয়ে দেখলাম, জনচারেক পড়ে আছে দাঁত লেগে; একদল হাত-পা ছুঁড়ছে, মানে হিস্টিরিয়া; আর বাকীগুলো পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে। ডাক্তার বেচারা যে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কার নাকে দিচ্ছে স্মেলিং সল্ট, কারও মাথায় ঢালছে জলের বালতি। ব্যাপার যা শুনলাম, রীতিমতো ভৌতিক কাণ্ড।

    শীতের দিন। খোলা উঠানে বসে মেয়েরা তাদের দুপুরের বিশ্রামটুকু সেরে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ একজনের নজর পড়ল কম্পাউণ্ড পাঁচিলের ওধারে একটা ছোট ব্যারাকের ছাদের উপর। সারি সারি মাটির গামলা উপুড় করে বসানো।

    গামলা কেন? প্রশ্ন করলেন উকিলবাবু।

    দেখছেন না? কোন্ শায়েস্তা খাঁর আমলের বাড়ি। তখন ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল ছাদ ফুটো করে। সেখান দিয়ে আবার বৃষ্টি আসবে তো? তাই ঐ গামলার ঢাকনা। মেয়েটার মনে হল ওরই ভেতর একটা বড় গামলা বেশ তালে তালে নাচছে।

    তোমরা হাসছ, কিন্তু ওর হার্ট বেচারি তখন ফেল করে-করে। বেশ করে চোখ রগড়ে আরেকবার দেখল। নাঃ, ভুল নয়। দু-চার মিনিট বিশ্রাম নিয়ে গামলা-সুন্দরী আবার নৃত্য শুরু করলেন! সবাই জানে, ওটা হচ্ছে কলেরা ওয়ার্ড, আর ওর ঠিক পাশেই হচ্ছে ফাঁসিমঞ্চ, যাকে বলে gallows। কিছুদিন আগেই সেখানে একজনকে ঝোলানো হয়েছে। ব্যাস্ আর যায় কোথায়! মেয়েটির জিব গেল টাকরায় আটকে, চোখ উঠল কপালে আর গলা থেকে বেরিয়ে এল একটা গোঁ গোঁ গোছের বিকট আওয়াজ। তার হাতের ইশারা লক্ষ্য করে আরও দু-চারজন যারা তাকিয়েছিল ঐ দিকে, তারাও এক দফা নাচ দেখে নিল। তারপরে যে কাণ্ড হল, সেটা তোমরা কল্পনা করে নাও, আমি ঠিক বোঝাতে পারব না। আমার ফিমেল ওয়ার্ডার ডিউটির নাম করে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিলেন। হাঁউমাউ শুনে যখন ঘুম ভাঙল, দেখলেন, situation out of control। তাঁর হাতে তখন একটিমাত্র অস্ত্ৰ—ঐ বাঁশি। তাই প্রাণপণে ফুঁকে দিলেন।

    এবার বিশাল বাহিনী নিয়ে হানা দিলাম কলেরা ওয়ার্ডের ফটকে। খালি বাড়ি পড়ে আছে। ছাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এতগুলো লোকের ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল! নৃত্যদর্শনের সৌভাগ্য হল না। ভৌতিক-দুনিয়ার যাঁরা বাসিন্দা, তাঁদের স্বভাব-চরিত্র ঠিক জানা নেই। তাঁরা ভয় দেখান শুনেছি। হয়তো জায়গা বিশেষে ভয় পেয়েও থাকেন। বিশেষ করে জেলখানার পাগলা ঘণ্টিকে কেয়ার করে না এরকম পাগলাভূত পাওয়া দুষ্কর। রিট্রিট করব কিনা ভাবছি, হঠাৎ যেন মনে হল, গামলাটা একটু নড়ছে। সবাই রৈ রৈ করে উঠল; কিন্তু উপরে উঠে ব্যাপারটা পরখ করবার হুকুম যখন দিলাম, সব চুপচাপ। তবে দু-একজন সাহসী মানুষ জেল ফোর্সেও থাকে। তাবই একজন একটা ম‍ই লাগিয়ে উপরে উঠে গেল, এবং অনেকখানি দূর থেকে গামলা তাক করে ছুঁড়ে মারল লাটি। গামলাটা ভেঙে যেতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল খালি গা, জাঙ্গিয়া-পরা লিলিকে এক ছোকরা। আমাদের দিকে চেয়েই কেঁদে উঠল ভেউ ভেউ করে।

    পুরীর সমুদ্র দেখেছ? তার চেয়েও মহা বিক্রমে গর্জে উঠল আমার ফোর্স।

    মইটাকে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করলাম আর হাবিলদারকে বললাম রিজার্ভ ফোর্স ফিরিয়ে নিতে। নিতান্ত অনিচ্ছায় তারা মার্চ করে চলে গেল। আরদালি, বডিগার্ড, গোছের দু-চারজন যারা রইল, তাদের বিশেষ মারমুখী বলে মনে হল না। এইবার মই লাগিয়ে বললাম ছেলেটাকে নেমে আসতে। সে কি আসতে চায়? ছাদের উপর দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল হাত জোড় করে। জিজ্ঞাসা করলাম, পালিয়েছিলি কেন?

    —মেট মারত রোজ।

    —কেন?

    আর কথা বলে না। দু-চারটা ধমক দিতেই বলল, খারাপ কাজ করতে চেয়েছিল, আমি দিই নি।

    অসম্ভব নয়। ছেলেটি দেখতে সুশ্রী। বললাম, এখানে এসে জুটলি কী করে?

    সেও এক তাজ্জব কাহিনী। শেষ রাতে শিক ভেঙে তো বেরোল। রান্নাঘরের পাশ থেকে একটা বাঁশও যোগাড় হল। কিন্তু নানা রকম কসরত করেও পাঁচিলে ওঠার সুবিধে হল না। এদিকে ভোর হয়ে আসছে। হঠাৎ কারও নজরে পড়লে পাঁউরুটি বানিয়ে দেবে। তাই ফরসা হবার আগেই কোনও রকমে গা-ঢাকা দিয়ে পাইপ বেয়ে উঠল কলেরা ওয়ার্ডের মাথায় আর আশ্রয় নিল গামলার নীচে। তারপর সাত-আট ঘণ্টা বসে থেকে কোমরে আর পায়ে যখন খিল ধরে গেছে, তখন ওই গামলা মাথায় দিয়েই মাঝে মাঝে উঠে একটু লেফট রাইট করবার চেষ্টা করছিল।

    জেনানা ফাটক থেকে একজন যে সেদিকে চোখ দিয়ে বসে আছে, ও কেমন করে জানবে?

    অনেক করে ভরসা-টরসা দেবার পর নামতে রাজি হল ছোকরা। মাটিতে পা দিতে যাবে, এমন সময় চোখের পলকে কোত্থেকে ছুটে এল চার-পাঁচজন বীরপুরুষ। একটা নিরীহ ছাগলছানার ওপর লাফিয়ে পড়ল একপাল নেকড়ে। ও ব্যাটাও ওস্তাদ কম নয়। বেটনের বেড়াজাল এড়িয়ে কেমন করে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল এসে আমার পায়ের ওপর। বাঁ হাতটা বোধ হয় একটু বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ তার ওপর সপাং করে উঠল বেটনের ঘা।

    জেলর সাহেব আবার গড়গড়ার আশ্রয় নিলেন। বলবার মতো কিছু ছিল না। আমরা- শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম। কয়েক মিনিট পর অনেকটা যেন কৈফিয়তের সুরে বললেন মামুদ, সকালে যাদের সাসপেণ্ড করা হয়েছে ঐ সিপাইটা তাদেরই একজনের ছেলে। ছোকরা মানুষ। নিজেকে ঠিক সামলাতে পারে নি।

    বললাম, তা বুঝলাম। কিন্তু আপনার যে সামলে উঠতে বেশ কিছুদিন লাগবে।

    —না হে। এমন কিছু নয়। ডাক্তারদের কাণ্ড তো? কেরামতি দেখাবার কোনও একটা সুযোগ পেলেই হল। অফিসে যেতে পারতাম, কিন্তু ঐ হতভাগাটা শুনছি ঘুরঘুর করছে বাড়ির চারদিকে। মতলব মোটেই ভালো নয়।

    বলেন কী? রাগে বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন উকিলবাবু। মামূদ সাহেবও চড়া গলায় বললেন, তাই দেখুন না! লাঠি ঠুকে নুলো বানিয়ে দিলি। তাতে আশ মিটল না, এবার কপাল ঠুকে খোঁড়া না বানিয়ে ছাড়বে না।

    তারপর একটু হেসে স্বর নামিয়ে বললেন, তাই কটা দিন একটু গা-ঢাকা দিয়ে আছি।

  • তিন

    তিন

    বছরটা ঠিক মনে নেই। ইংরাজি চুয়াল্লিশ কিংবা পঁয়তাল্লিশ সাল। দেশ জুড়ে চলেছে মন্বন্তর। দক্ষিণ বাংলার যে অঞ্চলে আমর আস্তানা, একদিন সে অন্ন জুগিয়েছে সারা বাংলার ঘরে ঘরে। সরকারী নথিপত্রে তার নাম ছিল Granary of Bengal। সেদিন এক গ্রেন শস্য নেই তার ভাণ্ডারে। মাঠভরা পাকা ধান। তারই পাশে দাঁড়িয়ে বিহুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে চাষীর দল। অজন্মা নয়, তাদের ‘সোনার ক্ষেত শুষিছে মানুষ প্রেত!’ তার একহাতে দাঁড়িপাল্লা আর এক হাতে বন্দুক। তাই একদিকে চলেছিল অন্নের ছড়াছড়ি, আর এক দিকে নিরন্নের হাহাকার।

    দেশের লক্ষ্মী যখন ছেড়ে যায়, জেলখানার তখন বাড়-বাড়ন্ত। যে জেলটা আমি তখন আগলে আছি, তার স্থায়ী পোষ্য ছিল পাঁচ-ছশো। গোটা কয়েক ধাপ ডিঙিয়ে সংখ্যাটা হঠাৎ হাজারের কোঠা ছাড়িয়ে গেল। ওদিকটায় যেমন জোয়ারের জোর, ভাঁড়ারে তেমনি ভাঁটার টান। সেই নিত্যবর্ধমান গহ্বর কেমন করে পূর্ণ করি, এই ভাবনায় আমার ঘুম নেই।

    একদিন সন্ধ্যাবেলা অফিসে বসে বসে সেই কথাই ভাবছিলাম। পাঁচ-সেরী চাবির গোছা হাতে ঝুলিয়ে কুণ্ঠিত ভাবে এসে দাঁড়ালেন আমার স্টোর-কীপার, বিরাজ মুন্সী; জেল পরিভাষায় যার নাম—গুদামী বাবু। কারা-ভাণ্ডারের অন্নপূর্ণা, সুতরাং সহকর্মীদের চিরন্তন ঈর্ষার পাত্র, কিন্তু ঘটনাচক্রে সেদিন তাঁর অবস্থাটা ঠিক অভাবগ্রস্ত বৃহৎ পরিবারের গৃহিণীর মতো। অপ্রসন্ন মুখে ‘বাড়ন্ত’ ছাড়া আর কোনও বার্তা নেই। দর্শনমাত্রেই কর্তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে ওঠে। আমি যখন জিজ্ঞাসু চোখে মুন্সীর দিকে তাকালাম, সেখানেও তেমনি ফুটে উঠল সেই বিরক্তির রূক্ষতা।

    বিরাজবাবু বিনা ভূমিকায় নিস্পৃহ কণ্ঠে রিপোর্ট দিলেন, আর পঁচিশ বস্তা আছে, স্যর।

    পঁচিশ বস্তা! অর্থাৎ দিন তিনেকের সংস্থান। খবরটা আমার অজানা নয়, অপ্রত্যাশিতও বলা যায় না। তবু রূঢ় কণ্ঠ চাপা রইল না–মোটে পঁচিশ বস্তা! এই না সেদিন দুশ বস্তা যোগাড় করলাম কত কাণ্ড করে! এরই মধ্যে উড়ে গেল!

    মুন্সীর মুখে মৃদু হাসি দেখা দিল। অনাবশ্যক মনে করে আমার প্রশ্নের জবাব আর দিলেন না।

    চাল-সংগ্রহের প্রাথমিক প্রয়োজন—একখানা সরকারী পারমিট। তখন সিভিল-সাপ্লাই নামক স্বনামধন্য সংস্থা জন্মলাভ করলেও ডালপালা বিস্তার করে চারিদিকটা জাঁকিয়ে বসে নি। পারমিট বস্তুটির ভার ছিল একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে। সেই রাত্রেই তাঁর দ্বারস্থ হলাম। বৈঠকখানা ঘরে অফিস। হিসাবপত্র দেখেশুনে বললেন আপনার এই রাক্ষুসে খাঁই মেটাবার মতো মাল আমার হাতে নেই, মশাই। আপনি সাহেবের কাছে যান।

    সাহেব, অর্থাৎ কালেক্টর ছিলেন একজন জবরদস্ত শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ন। সন্ধ্যার পরে দ্রব্যগুণে তিনি এমন এক ঊর্ধ্বরাজ্যে বিচরণ করতেন যেখানে আমার মতো সামান্য ব্যক্তি কিংবা চালডালের মতো তুচ্ছ বস্তুর প্রবেশ একরকম অসম্ভব। তবু নিতান্ত নিরুপায় হয়েই তাঁর দরজায় ধরণা দিলাম, এবং বহু সাধ্যসাধনার পর দর্শনলাভও করা গেল। তথ্যাদি সহ আমার দাবী পেশ করে ব্যাপারটা যে অত্যন্ত জরুরি এবং সরকারের প্রাথমিক দায়িত্বের অন্তর্গত, সে বিষয়ে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা যোগ করে দিলাম। সাহেব অত্যন্ত ধীরভাবে আমার বক্তব্য শেষ পর্যন্ত শুনে গেলেন এবং ততোধিক ধীরভাবে প্রশ্ন করলেন জেলে একটা আর্মারি আছে না?

    প্রশ্নটা ধাক্কা খাবার মতো হলেও জবাব দিলাম, আছে।

    —কত বন্দুক হবে?

    —একশো।

    —এস. পি.-কে বলে দিচ্ছি, আর একশো ওদের স্টক্ থেকে ধার নিন। আপনার কয়েদী বললেন, এক হাজার? তাহলে রাইফেল পিছু পাঁচজন করে পড়ছে। কতক্ষণ লাগবে মনে করেন? পাঁচ মিনিট! না হয়, বড়জোর দশ মিনিট! কী বলেন?

    বলা বাহুল্য, অঙ্কটা নির্ভুল হলেও প্রশ্নটার জবাব দিতে পারলাম না। কালেক্টর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, পারবেন না? বেশ; তাহলে এক কাজ করুন! দুটো গেট একসঙ্গে খুলে দিন। তারপর এক-একটা জানোয়ার ধরে এনে (অঙ্গবিশেষের নাম করে বললেন, তার উপর) কষে গোটাকয়েক লাথি মেরে ঘাড় ধরে বের করে দিন।….. আর তাও যদি না পারেন, চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে যান।

    আপাতত সেটাই একমাত্র পন্থা বুঝতে পেরে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালাম। দরজা পার হয়ে বারান্দায় পড়েছি, এমন সময় আবার ডেকে ফেরালেন কালেক্টর। বললেন, কত চাল চাই আপনার?

    —যত দিতে পারেন। আমার দৈনিক প্রয়োজন সাড়ে বাইশ মণ।

    বিড়বিড় করে গোটা কয়েক টমি-সুলভ শপথ উচ্চারণ করে কলিং বেলটা ঠুকে দিলেন। চাপরাসী ছুটে আসতেই হুকুম হল, হ্যারিকৃষ্টোবাবু। মিনিট তিনেকের মধ্যে চাপরাসীর পেছনে হ্যারিকৃষ্টো অর্থাৎ আমাদের হরেকৃষ্ণ হালদার এসে উপস্থিত। নিচেই কোথাও অপেক্ষা করছিলেন, মনে হল। এই দুর্দান্ত শীতে একটা টুইলের শার্ট এবং তার উপর একখানা সাধারণ আলোয়ান ছাড়া আর কোনও আচ্ছাদন নেই! শহরের সবচেয়ে বড় আড়তদার। টাকা যে কত, লোকে বলে, সে হিসাব ওর নিজের জানা নেই! হয়তো তার গরমে আর শীতবস্ত্রের প্রয়োজন হয় নি। আমার দিকে ক্রুদ্ধ ভ্রুকুটি চালিয়ে কোমর দু-ভাঁজ করে সেলাম ঠুকলেন সাহেবের সামনে। সাহেব কড়া সুরে হুকুম করলেন, জেলের জন্যে দুশো মণ চাল চাই।

    —কবে, হুজুর?

    —আজ রাতের মধ্যে।

    —এত চাল তো হাতে নেই, স্যর।

    –হোয়াট!-–সাহেবের রক্তচক্ষু বিস্তৃত হল।

    হরেকৃষ্ণ মাথা চুলকে বললেন, আজ্ঞে আমার রিটার্নটা যদি দেখেন হুজুর, তাহলে—

    —হ্যারিকৃষ্টোবাবু!’ গর্জে উঠলেন কালেক্টর। সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের উপর বিপুল বজ্রমুষ্টি।

    হরেকৃষ্ণ আর মুখ খুললেন না; হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সাহেব কিঞ্চিৎ সুর নামিয়ে বললেন, লুক্ হিয়ার, হ্যারিকৃষ্টোবাবু, তোমার সঙ্গে বেশি কথা বলার সময় আমার নেই। এক ঘণ্টার মধ্যে মাল ডেলিভারি না দিলে আমি তোমার সমস্ত স্টক সীজ করব।

    —আজ্ঞে, হুজুর যখন আদেশ করছেন, যেমন করে হোক দিতেই হবে যোগাড় করে। তবে-

    —ব্যস্।

    হরেকৃষ্ণবাবুর সঙ্গে এক গাড়িতেই ফিরলাম। পথে আসতে আসতে বললেন, দেখলেন ব্যাটার চোট? মদ খেলে আর কাণ্ডাকাণ্ডজ্ঞান থাকে না। আরে ভালো করে বললেই তো হয়। আমি কি বলেছি, দেবো না? বিশেষ করে যখন গবর্মেন্টের দরকার….। আমার কোনও সাড়া না পেয়ে এবার ব্যঙ্গের সুরে বললেন, স্টক্ সীজ করবেন! হুঁঃ সীজ অমনি করলেই হল! আমার হাতেও কলকাঠি আছে, মশাই। একটিবার ঘুরিয়ে দিলে আপনার জেলখানায় চাঁদের হাট বসে যাবে।…

    বলে টেনে টেনে হাসতে লাগলেন। আমি তার মাঝখানেই বলে ফেললাম, চালটা তাহলে কখন দিচ্ছেন, হরেকৃষ্ণবাবু?

    —দাঁড়ান, আর একটু রাত হোক। রাস্তায় লোকচলাচল বন্ধ হোক। তা না হলে রক্ষা আছে? আর আপনিই বা মিছিমিছি কষ্ট করবেন কেন? বাসায় চলে যান। একজন কেরানী-টেরানী কাউকে পাঠিয়ে দেবেন। ওজন করে মাল বুঝে নিয়ে যাবে।

    বললাম, আবার কাকে পাঠাব? এতটা যখন এসেই পড়েছি, চলুন নিজেই নিয়ে যাই।

    মনে মনে বললাম, তোমাকে এখনও বুঝতে বাকী আছে, হ্যারিকৃষ্ট? এক মিনিট কাছছাড়া হলে এমন ডুব মারবে যে, আমার কেরানী কেন, তাদের সমস্ত পিতৃকুল এসেও তোমার টিকিটি খুঁজে পাবে না।

    জেল-গেটে মাল পৌঁছে দিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম রাত প্রায় একটা। ফটকের সামনে মনে হল একটা কাপড়ের পুঁটলি পড়ে আছে। আমার সাড়া পেয়ে ছিটকে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল পায়ের উপর। কাছেই যে সেন্ট্রি টহল দিচ্ছিল, রা-রা করে ছুটে এল। হাত তুলে থামিয়ে দিলাম। এদিকে পায়ের উপর যে পড়ল, তার আর নড়াচড়ার নাম নেই।

    অনেক টানাটানির পর যখন মাথা তুলল, মুখটা দেখে মনে হল চেনা-চেনা। চোদ্দ- পনেরো বছরের একটা কলঙ্কসার দেহ। পরনে ছেঁড়া প্যান্ট। তার উপর জড়ানো একখানি জীর্ণ চাদর। বললাম, কে তুই?

    —আমি ফটিক।

    —ফটিক কে রে?

    —আপনার জেলে ছিলাম। ছ’মাস মেয়াদ খেটে বেরিয়েছি আজ সাত দিন।

    –এখানে এসেছিস কী করতে?

    —তিনদিন কিছু খাই নি হুজুর। আমাকে আবার জেলে ভর্তি করে নিন। যা কাজ দেবেন, সব করব!—বলে মাথাটা আবার ঘষতে লাগল আমার জুতোর উপর।

    সেন্ট্রি হেসে উঠল এবং তারপরেই একটা মোক্ষম ধমক দিয়ে টেনে তুলল হাত ধরে।

    বললাম, জেলে ভর্তি করব কি রে! এটা কি হোটেল যে যাকেতাকে ঢোকালেই হল!

    —আপনি সব পারেন, হুজুর, রুদ্ধ কণ্ঠে বলল ফটিক। ক্ষীণ আলোতেও দেখা গেল, তার দু-চোখের কোল বেয়ে বয়ে চলেছে জলের ধারা।

    প্রশ্ন করলাম, কে আছে তোর? এ কদিন কোথায় ছিলি?

    উত্তরে যা বলল, তার থেকে মোটামুটি ইতিহাসটা পাওয়া গেল।

    শহর থেকে মাইল দশ-বারো দূরে কী একটা গ্রামে ওদের বাড়ি। অবস্থা একেবারে খারাপ ছিল না। খেয়ে-পড়ে কোনোরকমে চলে যেত। জেল থেকে বেরিয়ে গিয়ে দেখে খাঁ খাঁ করছে বাড়ি। বাপ মা দুজনেই মারা গেছে খেতে না পেয়ে। একটা বয়স্থা বোন ছিল, সেও নেই। সবাই বলল, মকবুল চৌধুরীর ছেলের সঙ্গে কোথায় নাকি চলে গেছে। বছর দশেকের ছোট ভাই ছিল একটা। তার খোঁজ কেউ জানে না। গ্রামে কোনও কাজ নেই। কাজ দেবার মতো লোকও নেই। শহরে ফিরে এসেও কিছু জোটাতে পারে নি।

    বললাম, সরকারী লঙ্গরখানায় যাস নি কেন?

    —গিয়েছিলাম হুজুর। দু-দিন যাবার পর একটা পুলিশ চিনে ফেলল। রটিয়ে দিল এটা জেলখাটা দাগী চোর। তারপর আর তারা খেতে দেয় না। বাবুরা তাড়া করে, বলে, শালা পকেট মারতে এসেছে। একদিন খুব মেরেছিল। এই দেখুন, বলে কাঁদতে লাগল। দেখলাম, গোটা হাতটা ফুলে আছে।

    পকেটে মনিব্যাগ ছিল। গোটা দুই টাকা বের করে ফটিকের হাতে দিতে গেলাম। হাত বাড়াল না। মাথা নেড়ে বলল, টাকা চাই না, বাবু। আমাকে জেলে ভর্তি করে দিন। আপনি হুকুম করলেই হবে। আপনার পায়ে পড়ি–আরেকবার পা জড়িয়ে ধরবার উপক্রম করতেই আটকে দিল আমার সেন্ট্রি।

    অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, জেলে ভর্তি করবার ক্ষমতা আমার নেই। কোর্ট থেকে ওয়ারেন্ট নিয়ে যারা আসে, তারাই শুধু ঢুকতে পারে জেলখানায়। এ-সব আইন- কানুনের কথা সে কানে তুলতেও চাইল না। বললাম, আজ এই টাকা দুটো নিয়ে যা। কিছু কিনে-টিনে খেয়ে নে। কাল আবার আসিস। যাহোক একটা ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু ফটিক নাছোড়বান্দা। যেমন করে হোক, জেলেই তাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। তা না হলে নড়বে না। অগত্যা বাকী রাতটুকুর জন্যে আমার বাইরের বারান্দায় তার থাকবার ব্যবস্থা করে দিলাম। সেন্ট্রি আপত্তি করতে লাগল। এই সব চোর-চোট্টার উপর দয়া দেখাতে গিয়ে অনেকের অনেক বিপদ ঘটেছে, তার কয়েকটা পুরনো নজিরও দাখিল করল। একটা কড়া নজর রাখবার নির্দেশ দিয়ে কোনও রকমে তাকে নিরস্ত করলাম।

    পরদিন সকাল বেলা ও. সি.-র নামে একটা চিঠি দিয়ে একজন সিপাই-এর জিম্মায় ফটিককে পাঠিয়ে দিলাম কোতোয়ালি থানায়।

    বিকেলে আফিসে যেতে হয়েছিল কী একটা দরকারী কাজে। টেলিফোন বেজে উঠল। পুলিশ সাহেবের গলা—কী কাণ্ড বলুন তো?, একেবারে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! খোদ কত্তার পকেটে হাত! তাও তাঁরই এক পুরনো মক্কেল! ভাগ্যিস, হাতে হাতে ধরে ফেলেছিলেন! যে-রকম দিনকাল পড়েছে মশাই, রাত-বিরেতে না বেরোনোই ভালো।

    বললাম, আজই পাঠাচ্ছেন তো?

    —বাপরে। আপনি দেখছি, বেজায় রেগে আছেন ব্যাটার ওপর। বাগে পেলে এক হাত না দিয়ে ছাড়বেন না? কিন্তু দেখছেন তো ক্রাইমের ঠেলা। বড় বড় রুই-কাতলা ধরে কূল পাচ্ছি না; আর ওটা তো একটা চুনোপুঁটি, ছিঁচকে চোর। ও-সব যদি ধরতে শুরু করি জায়গা দেবেন কোথায়? খাওয়াবেন কী…হ্যাঁ, আপনার চিঠি ও. সি. আমাকে পাঠিয়েছিল। আমি কিন্তু ব্যাটাকে ছেড়ে দিতে বলে দিয়েছি।

    —ছেড়ে দিয়েছেন! হঠাৎ বেরিয়ে গেল আমার মুখ থেকে।

    —হ্যাঁ; তবে একেবারে খালি হাতে যায় নি। দাওয়াই যা পড়েছে, বাছাধনকে এ জীবনে আর কারও পকেটে হাত দিতে হবে না। এ বিষয়ে আমার ও. সি.-টির বেশ হাতযশ আছে—বলে হেসে উঠলেন পুলিশ-প্রধান।

  • চার

    চার

    “যতই বলুন, one cannot go against Nature. রক্তমাংসের ধর্মটাও ধর্ম।” বলতে বলতে অফিসের পরদা ঠেলে বেশ খানিকটা উত্তেজিত ভঙ্গীতে ঢুকে পড়লেন ডাক্তার সাহেব। একটা নারী-ঘটিত মামলার রায় পড়ছিলাম। বন্ধ করে বললাম, কী হল আবার? কার কথা বলছেন?

    —ঐ যে আপনার নিত্যানন্দ না কী নাম! দিন, দেশলাই দিন।

    দেশলাইটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, নিত্যানন্দ নয়, সদানন্দ; ব্রহ্মচারী সদানন্দ। এই দেখুন, কত বড় জাজমেন্ট।

    —আপনি দেখুন। ও-সব আমার অনেক দেখা আছে।

    একটা চেয়ার টেনে বসে গোটা তিনেক কাঠি পুড়িয়ে সিগারেট ধরালেন ডাক্তার সাহেব। লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে খানিকটা ঠাণ্ডা হয়ে নিয়ে বললেন, আসল ব্যাপারটা কী বলুন তো?

    —ব্যাপার রীতিমত জটিল। সারাজীবন ব্রহ্মচর্য করে, বুড়ো বয়সে একটা ঝিয়ের সঙ্গে-

    —এর মধ্যে ‘জটিল’ কী দেখলেন। আমি তো দেখছি simple biological case । সেই কথাই বলছিলাম। সাধু-সন্ন্যাসীরা বলেন, নারী নরকের দ্বার। বেশ, মানলাম। কিন্তু আপনার দেহে রক্ত-মাংস যতক্ষণ আছে, ঐ দ্বারটি এড়াবার উপায় আছে কি? ব্রহ্মচর্যই করুন, আর গেরুয়াই ধরুন, ঘুরেফিরে ঐখানে এসেই হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে। সাপুড়েদের দেখেছেন তো? যতই সাবধান হোক, একদিন ঐ সাপের হাতেই প্রাণ দিতে হয়। তেমনি বড় বড় শিকারীর শেষ গতি হল বাঘের পেট।

    —উপমাটা যে উলটো হল ডাক্তার সাহেব! সাপুড়ে আর শিকারীদের কারবারই হল ঐ নাগিনী-বাঘিনী নিয়ে। কিন্তু এঁরা যে স্ত্রী-জাতির ছায়াও মাড়ান না।

    —আরে মশাই, ছায়া মাড়ান না বলেই কায়ার ঠেলা সামলাতে পারেন না। যাকে আমি কামনা করি, তাকে যখন হাতের কাছে পাই, তার জন্যে লোভ বলুন, হঠাৎ বাসনা বলুন, হঠাৎ উগ্র হবার সুযোগ পায় না। কিন্তু সে যখন বেড়ায় আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে কোনও বাঁধ, হোক না সে আমার নিজের হাতে তৈরী, তখন আমাকে আর মোহ-মুদ্‌গর মেরে ঠেকানো যায় না; তখনই আসে ঐ বাঁধ- ভাঙার উন্মাদনা, যার চেয়ে মারাত্মক জিনিস আর কিছু নেই।

    আমি মৃদু হেসে বললাম, আছে।

    —কী বলুন।

    —ডাক্তার যখন ছুরি ফেলে ফিলজফি ধরে।

    —ওঃ হো! ঠিক কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। চারটে অপারেশন আছে। দুটো তার মধ্যে বেশ গোলমেলে। পালাই।— বলে লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন ডাক্তার সাহেব।

    বললাম, কী রকম দেখলেন বলুন।

    —কী রকম আবার? তিন দিন হয়ে গেল। ঐ তো শরীর। একদম নেতিয়ে পড়েছে। কাল সকাল থেকেই নাকে নল চালিয়ে দুধ ঢালতে হবে। তাই বলে এলাম ডাক্তারকে।

    —বলেন কী! তা হলে আমার কাজটা তো আজই সেরে নেওয়া দরকার।

    —আপনার আবার কী কাজ?

    —একটা হুমকি দিতে হবে, “অবিলম্বে হাঙ্গার স্ট্রাইক প্রত্যাহার না করিলে তোমাকে ফৌজদারী সোপর্দ করা হইবেক।”

    —হুমকি দিতে হয় দিন, কিন্তু যা চীজ দেখলাম, বিশেষ কাজ হইবেক বলে তো মনে হয় না।

    তবু ঐ হুমকি অর্থাৎ আইনানুসারে যথারীতি ওয়ার্নিং দেবার জন্যে সদলবলে হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ঠিকই বলেছেন ডাক্তার সাহেব। ব্রহ্মচারীর ক্ষীণ দেহ ক্ষীণতর হয়ে বিছানার সঙ্গে মিশে গেছে। দিন তিনেক আগে নারী-ধর্ষণ মামলায় পাঁচ বছরের মেয়াদ নিয়ে তিনি আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। তারপর থেকে আর জলগ্রহণ করেন নি। অর্থাৎ জল ছাড়া আর কিছু গ্রহণ করেন নি। কিসের জন্যে তাঁর এই কঠোর অনশন, বার বার প্রশ্ন করেও জানা যায় নি। এইটুকু জানিয়েছেন, এটা তাঁর হাঙ্গার স্ট্রাইক বা প্রায়োপবেশন নয়, কারও বিরুদ্ধে তাঁর কোন ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। তবু আর একবার ঐ একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। উনি ম্লান হেসে বললেন, জবাব তো আমি আগেই দিয়েছি স্যার। কারণটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।

    —কিন্তু আপনি যাকে ব্যক্তি বলছেন, জেলে ঢোকবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গত হয়েছেন। এখানে ব্যক্তিগত বলে আপনার কিছু নেই।

    ব্রহ্মচারী চুপ করে রইলেন। আমি আর একটু পরিষ্কার করে বললাম, আপনার দেহ মন দুই-ই এখন সরকারের দখলে। তবে মন জিনিসটা চোখে দেখা যায় না, ধরাছোঁয়া যায় না; ওর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করবার অস্ত্র আমাদের হাতে নেই। কিন্তু আপনার ঐ দেহটা সরকারী সম্পত্তি। যেমন করেই হোক ওকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদের।

    ব্রহ্মচারী হাসলেন। নিজেকে দেখিয়ে কৌতুকের সুরে বললেন, কিন্তু এমন কিছু মূল্যবান সম্পত্তি নয় যে সে দায় পালন না করলে সরকারের বিশেষ ক্ষতি হবার সম্ভাবনা।

    —আপনি ভুল করলেন ব্রহ্মচারী মশাই। মানুষ দয়া বলে যাকে জানে, তাকে দায় বলেই পালন করে, লাভ-ক্ষতির হিসেব খতিয়ে দেখে না। সরকারের বেলাতেও সেই একই কথা।

    সদানন্দ নিঃশব্দে চোখ বুজলেন। মুখে ফুটে উঠল গাম্ভীর্যের ছায়া। তার মধ্যে কয়েকটা বোধ হয় সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বের রেখা। বৃথা অপেক্ষা না করে আমার আইন-প্ৰদত্ত অধিকার—অর্থাৎ চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশ দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করবার আদেশ জারি করতে যাচ্ছিলাম, এমন সময়ে উনি চোখ খুললেন এবং অনেকখানি দ্বিধা ও সঙ্কোচের সুরে বললেন, আত্মহত্যা করা বা জেলের আইল-শৃঙ্খলা অমান্য করে আপনাকে বিব্রত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার এই উপবাসের মূলে আর কিছু নেই, ছিল শুধু একটু চিত্তশুদ্ধির চেষ্টা। কিন্তু তা সফল হয় নি। তাই আর অনাবশ্যক ঝঞ্ঝাট বাড়াতে চাই না। একটা নিবেদন শুধু আছে আপনার কাছে। অনুমতি করেন তো বলি।

    —বলুন না?

    —চিরদিন—হ্যাঁ, চিরদিনই বলা যেতে পারে, গুরুগৃহ ত্যাগ করবার পর থেকেই আমি স্বপাক-ভোজী। অবশ্য ভোজের ব্যাপারটা এমন কিছু গুরুতর নয়। দু-মুঠো আতপ চাল, তার সঙ্গে দুটো ঝিঙে-কাঁচকলা ফুটিয়ে নেওয়া। আধ ঘণ্টার মামলা। সাধারণ কয়েদী হিসেবে যে কাজ আমাকে দেবেন, তার কোনও রকম ক্ষতি না করে

    ব্রহ্মচারীর বক্তব্য শেষ হবার আগেই পাশে দাঁড়িয়ে আমার আইন-অভিজ্ঞ জেলর তাঁর কর্তব্য পালন করলেন। আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন জেল কোডের অমোঘ নির্দেশ—No prisoner is allowed to cook for himself। জেলখানায় স্বপাক নিষিদ্ধ। খানিকটা চাপা গলায় এবং দৃশ্যত আমার উদ্দেশে বললেও যাতে ব্রহ্মচারীর শ্রুতিপথ এড়িয়ে না যায়, সে বিষয়ে নিশ্চয়ই সজাগ ছিলেন জেলরবাবু। তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। সদানন্দ তাঁর অসমাপ্ত নিবেদন আর শেষ করলেন না। আমি যে মৌন হয়ে রইলাম তাকে সম্মতি মনে না করে জেলরবারু সমর্থন বলেই গ্রহণ করলেন। অপ্রিয় উত্তরটা আমাকে আর মুখ ফুটে দিতে হল না।

    হাসপাতালের হাতা পেরিয়ে সবে সাধারণ এলাকায় ঢুকতে যাচ্ছি, আমার এসকর্ট- বাহিনীর বেড়া ডিঙিয়ে কোত্থেকে একটা লোক বিদ্যুৎবেগে ছুটে এসে সজোরে পা জড়িয়ে ধরল। অতি কষ্টে সিপাইদের হাত থেকে তাঁকে বাঁচানো গেল বটে, কিন্তু তারপরও সে পা ছাড়বার নাম করে না। ধমক দিতেই কেঁদে ফেলল। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে কথা যেটুকু বেরুল, তার থেকে বুঝলাম ব্রহ্মচারী তার গুরুদেব, তিনি মানুষ নন শাপভ্রষ্ট দেবতা, এবং এই মামলাটা একেবারেই মিথ্যা! আসল বক্তব্যটা ছিল শেষের দিকে। উনি যখন এই জেলখানার অন্ন কিছুতেই গ্রহণ করবেন না, এবং স্বপাকও সম্ভব নয়, তখন এই সামান্য রন্ধন-কার্যটি যদি দয়া করে ওর হাতে ছেড়ে দিই গুরুর প্রাণরক্ষা হয়, শিষ্যও নিজেকে কৃতার্থ মনে করে।

    বললাম, কিন্তু উনি তো নিজের হাতে ছাড়া কারও হাতে খাবেন না।

    শিষ্যটি সবিনয়ে নিবেদন করল, সেইটাই তাঁর সাধারণ নিয়ম বটে, কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে কোনও কোনও শিষ্যের হাতে অন্ন গ্রহণ করতে আপত্তি করেন না। জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি বুঝি সেই বিশেষ শিষ্যদের একজন?

    বিনীত কণ্ঠে উত্তর এল, গুরুদেব আমাকে কৃপা করেন।

    —কী কেস্-এ এসেছ তুমি?

    —মারপিট।

    —জমি নিয়ে?

    —আজ্ঞে না, জমির আইল নিয়ে।

    —কী নাম?

    –সহদেব ঘোষ।

    —গোয়ালা?

    —হুজুর।

    —তোমার সঙ্গে আর কজন আছে?

    —আজ্ঞে তিনজন—ছেলে, জামাই আর সম্বন্ধী।

    —কিন্তু উনি তো ব্রাহ্মণ! গোয়ালার হাতে খাবেন কি?

    —তা খাবেন। ওঁর জাতবিচার নেই। যাকে স্নেহ করেন, বিশ্বাস করেন, সে মুচি হলেও খান। তা না হলে ব্রাহ্মণের হাতেও জলস্পর্শ করেন না।

    —আচ্ছা তোমার কথা আমার মনে রইল। ভেবে দেখব।

    সহদেব ঘোষ আমার পা দুটো আবার চেপে ধরল। যে কোনও সমস্যাই হোক তার মীমাংসা মুলতুবী রাখা ওদের স্বভাবের বাইরে। আইলের স্বত্ত্ব যেমন তৎক্ষণাৎ লাঠির জোরে সাব্যস্ত করে নিয়েছিল, থানা-আদালতের মুখ চেয়ে বসে থাকে নি, এখানেও তেমনি জেলের আইন-কানুন বা কর্তৃপক্ষের বিচার-বিবেচনার ভরসায় না থেকে গুরুসেবার অধিকারটা নিছক পা চেপে ধরার জোরেই আদায় করে নেবার ব্যবস্থা করল।

    .

    শাসনতন্ত্রের বিধানমাত্রেই অনম্য। শাসক তাকে প্রয়োগ করেন, কিন্তু নিজের খুশিমত ভাঙতে পারেন না, নোয়াতে পারেন না। কারা-শাসনের ভার যাঁর হাতে, তাঁর বেলায় এ কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কেননা, এখানে যাদের নিয়ে তাঁর কারবার, আইন পালনের চেয়ে লঙ্ঘনের দিকেই তাদের ঝোঁক বেশী। হয়তো সেই একই কারণে এখানকার যারা বাসিন্দা, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত কড়া আইনের শক্ত শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা। তাদের অশন, বসন, চলন, কথন, কর্ম, অবসর, সবখানি জুড়ে জেল কোডের বিস্তৃত অধিকার। খাদ্যবস্তুর পরিমাণ যেমন বাঁধা, তার নাম এবং সংখ্যাও তেমনি নির্দিষ্ট বস্ত্রের বেলাতেও তাই। আকার প্রকার সংখ্যা, সব বিধিবদ্ধ। তেঁতুলের বদলে আমড়া, কিংবা ধনের বদলে পাঁচফোড়ন যেমন অচল, জাঙিয়ার বদলে পায়জামা অথবা কুর্তার বদলে হাফশার্টও তেমনিই না-মঞ্জুর।

    একটা পুরনো ঘটনা মনে পড়ল। এই সেদিন পর্যন্ত নারীকয়েদীরা যে শাড়ি পরত, তার জমিতে থাকত নীল রঙের ডোরা। উনিশশো বত্রিশ সনে সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স করে যাঁরা জেলে এলেন তার মধ্যে কয়েকজন হিন্দু বিধবা ডোরা-কাটা শাড়ি পরতে অস্বীকার করে বসলেন। কোনও এক জেলের শ্বেতাঙ্গ সুপার ক্ষেপে উঠলেন, তোমরা আইন অমান্য করে জেলে এসেছ, জেলে এসেও আইন অমান্য করবে তা চলবে না! তাঁকে যখন বোঝানো হল, এদের আসল উদ্দেশ্য আইন লঙ্ঘন নয়, শাস্ত্র-পালন, তিনি জেল-কোডের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, কিন্তু আমার শাস্ত্রে যখন সাদা থানের ব্যবস্থা নেই, তখন ওই নীলস্ট্রাইপওয়ালা শাড়িই পরতে হবে। মহিলারা বললেন, না। হুকুম হল, জোর করে পরিয়ে দাও।

    শুরু হল সংঘর্ষ। কারা-বিভাগের শ্বেতচর্ম বড়কর্তাও সুপারের পক্ষ নিলেন—আইন অমান্য’ চলবে না। মন্ত্রিসভার তখনও জন্ম হয় নি; একজিকিউটিভ কাউন্সিলের যুগ। জেলের চার্জ ছিল জনৈক দেশীয় মেম্বারের হাতে। বিধবাদের শ্বেত বস্ত্র দাবির মধ্যে সিভিল-ডিসওবিডিয়েন্সের গন্ধটা তিনি ঠিক ধরতে পারলেন না। কিন্তু জেল-কোডের ধারা যে খাঁড়া উঁচিয়ে আছে, তাকে ঠেকান কি করে? একজিকিউটিভ অর্ডার চলবে না; আইন বদলাতে হল। অর্থাৎ সেই ধারাটির সঙ্গে যুক্ত হল একটি অ্যামেগুমেন্ট—হিন্দু বিধবাদের শাড়িতে স্ট্রাইপ থাকবে না।

    অত দূর না গিয়েও সংঘর্ষ বাঁচাবার অন্য একটা পথ তখনও ছিল, এখনও আছে। কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা—অনেক ক্ষেত্রেই তার শরণ নিতেন। সেবার ইচ্ছে করেই নেন নি। সেটা হচ্ছে জেলকোডের ছিয়ানব্বই ধারা। বয়লারের মাথায় যেমন একটা করে সেফটি ভালভ থাকে, যার কাজ হল অতিরিক্ত বাষ্পের চাপ বের করে দিয়ে ইঞ্জিন সচল রাখা, তেমনি ওই ধারাটিই হচ্ছে কারাতন্ত্রের সেফটি ভালভ – সময় বিশেষ অতিরিক্ত আইনের চাপকে কিঞ্চিৎ হালকা করে দেবার যন্ত্র। বয়লারের ভালব বোধ হয় স্বয়ংক্রিয়। কিন্তু ছিয়ানব্বই ধারাকে চালু করতে হলে একটি বিশেষ ব্যক্তির আনুকূল্য প্রয়োজন। তাঁর নাম মেডিক্যাল অফিসার। তিনি যদি মনে করেন জেলের কোনও বিধি বা আদেশ ক্ষেত্র বিশেষে কয়েদীর দেহ কিংবা মনের পক্ষে হানিকর, তালিকা-মাফিক খাদ্য বা বস্ত্র কারও দৈহিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিকূল, তা হলে ওই বিশেষ ক্ষেত্রে সুপার তাঁর উপর-মহলের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনটিকে শিথিল করবার ব্যবস্থা করতে পারেন।

    বছর কয়েক আগেকার একটা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি। তখন জেলের আইনে ধূপপান সম্বন্ধে ভীষণ কড়াকড়ি। প্রথম শ্রেণীর কয়েদী (যাঁরা কালে-ভদ্রে আসেন) এবং হাজতী আসামী ছাড়া আর কারও কাছে বিড়ি সিগারেট কিংবা এক টুকরো তামাকপাতাও ছিল মারাত্মক নিষিদ্ধ বস্তু, জেল-কোডে যাকে বলে Prohibited article, সেই সময়ে কোনও নামজাদা সেন্ট্রাল জেলের মেডিক্যাল অফিসার একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর কায়েদীর টিকিটে দৈনিক দু-প্যাকেট সিগারেট সুপারিশ করে বসলেন। সুপার মানতে চাইলেন না। জেলের যা বরাদ্দ, তার উপরে কারও বেলায় কিছু বাড়তি খাদ্য—যথা মাছ, মাংস, মাখন, ডিম, দুধ, দই কিংবা ফলমূল, এ সবের ব্যবস্থা ওঁরা দিয়ে থাকেন। সেটা নতুনও নয় অপ্রত্যাশিতও নয়। কিন্তু এ যে নেশা। জেলের আইনে যাকে বলা হয়েছে নিষিদ্ধ বস্তু। সিগারেট যদি চলে মদ গাঁজা চণ্ডু চরসেই বা বাধা কোথায়? তাঁর মতে এটা ছিয়ানব্বই ধারার অপপ্রয়োগ।

    মেডিক্যাল অফিসার বললেন, নেশার ব্যবস্থা কি সাধ করে করেছি! করেছি প্রাণের দায়ে।

    —কী রকম?

    —তবে শুনুন। দিন সাতেক হল এসেছে লোকটা। এসেই এ অসুখ, সে অসুখ। আমার দুজন ডাক্তার হিমসিম খেয়ে গেল। রোগটা যে কী, ধরতেই পারল না। আমি গিয়ে দেখি রুগী ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে। চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল। কী ব্যাপার? জিজ্ঞেস করতেই গরম মেজাজে শুরু করল লম্বা ফিরিস্তি। আমাদের শাস্ত্রে যে-সব বড় বড় রোগের বর্ণনা আছে, তার কোনোটার সঙ্গেই মেলে না। হঠাৎ আমার হাতের দিকে নজর পড়তেই থেমে গেল! মুখে কথা নেই, কিন্তু চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। হাতে কী ছিল বুঝতেই পারছেন। সিগারেটের টিন। একটা চান্স নেওয়া গেল। ওই থেকে একটা বের করে এগিয়ে ধরলাম। পাগলের মতো ছুটে এসে কেড়ে নিল আমার হাত থেকে। ধরাতে দেরি সয় না। তারপর সে কী টান! আর-একটা দিলাম। দু-মিনিটে শেষ। চোখের সামনে চেহারা বদলে গেল। রীতিমত সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন লাগছে? “খুব ভালো, স্যার! কোনও অসুখ নেই আমার।” জিজ্ঞেস করলাম, ক’প্যাকেট চলত রোজ? একগাল হেসে বলল, “আজ্ঞে, দেড় টিন। কোনোদিন পুরো দুটোও লেগে যেত।”….তা হলেই বুঝুন।

    সুপার হেসে উঠলেন। ডাক্তার সাহেব ভয়ে ভয়ে বললেন, খুব বেঁচে গেছি মশাই। ওই বস্তুটি দিতে আর একদিন দেরি হলেই ও নির্ঘাত খুন করত! হয় নিজেকে, নয়তো আর কাউকে। তার মধ্যে আমারই সম্ভাবনা ছিল প্রথম নম্বর।

    ছিয়ানব্বই ধারার আরও একটা বিচিত্র প্রয়োগ মনে পড়ে গেল। সে সম্বন্ধে দু-চার কথা বলেই এ অবান্তর প্রসঙ্গ শেষ করব।

    চীফ প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্ট থেকে তিন মাসের জেল নিয়ে এল এক খোঁড়া পকেটমার। ফিরিঙ্গিপাড়ায় মাঝে মাঝে দেখেছি, টুপি উপুড় করে ভিক্ষা চাইছে পথচারীদের কাছে। জেলে যখন এল, পরনে তালি-মারা ট্রাউজার, ছেঁড়া শার্ট আর ময়লা হ্যাট। গায়ের রঙ তামাটে। নামটা বোধ হয় ডেভিস কিংবা ডেভিডসন। কথা বলে ইংরেজীতে, তবে তার সঙ্গে গ্রামারের সম্পর্ক অতি ক্ষীণ। তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী। কিন্তু সকালবেলা লপসির থালা সামনে দিতেই ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মেটকে হুকুম করল, “নেটিভকা খানা নেহি খায়গা। ব্রেড-বাটার আউর টী লেয়াও।” মেট লোকটার কিঞ্চিৎ রসজ্ঞান ছিল। সাড়ম্বরে সেলাম ঠুকে বলল, বিলেতে অর্ডার গেছে সাহেব। আসতে দেরি হবে, ততক্ষণে লপসিটা খেয়ে লাও।

    এর পর সাহেবের মেজাজ ঠিক্ থাকবার কথা নয়। হিন্দী এবং ইংরেজী মিশিয়ে মেটের চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে দিল। শ্বেতাঙ্গ জেলরের কাছে নালিশ জানাল মেট। শুনানি মুলতুবী রেখে তিনি আসামীকে নিয়ে গেলেন সুপারের অফিসে। তার ঘণ্টাখানেক পরে দ্বিতীয় শ্রেণীর দাবি জানিয়ে ডেভিডসনের দরখাস্ত চলে গেল চীফ প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। তার সঙ্গে রইল জেল-সুপারের সুপারিশ। আবেদনের উত্তরসাপেক্ষে ওর জায়গা হল ইউরোপীয়ান ওয়ার্ডে, এবং শ্বেতাঙ্গ কয়েদীদের কিচেন থেকে তৃতীয় শ্রেণীর বাবুর্চি-কয়েদীরা পৌঁছে দিল বহুমূল্য বিলাতী খানা। পরদিন সরাসরি না-মঞ্জুর হয়ে ফিরে এল দরখাস্ত। মোটা লাল পেন্সিল দিয়ে গোটা অক্ষরে লিখেছেন সিভিলিয়ান সি. পি. এম. — He is a beggar and can’t get Division II. ডিভিশন টু।

    দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠতে হলে কয়েদীর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা এবং সেই সঙ্গে জীবনযাত্রার মান সাধারণ স্তরের উপরে থাকা চাই। ম্যাজিস্ট্রেটের অর্ডার অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। কিন্তু ঐ লাল পেন্সিলের লেখা দেখে জেলর সাহেবের লাল চোখ আরও লাল হয়ে উঠল। জেল-কোড বগলে করে ছুটলেন সুপার-বাহাদুরের কামরায়। শুধু সুপার নন, তিনিই আবার মেডিক্যাল অফিসার। লড়াই-ফেরতা দেশী আর. এম. এস.। ইংরেজ- সহকারের অনুরোধকে আদেশ বলে ধরতে শিখেছেন। সুতরাং ছিয়ানব্বই ধারা প্রয়োগ করে ডেভিডসনের পদোন্নতি বজায় রাখা হল।

    এই পকেটমার সাহেবটির পিতৃ-পরিচয় আমরা পাই নি। যতদূর অনুমান হয় খঞ্জ পুত্রটিকে ঐ নাম ছাড়া আর কিছুই তিনি দিয়ে যেতে পারেন নি। কিন্তু সেটা যে কত বড় সম্পত্তি, হয়তো তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। ঐ নামের দৌলতে জেলে এসেও গদিআঁটা লোহার খাটে শুয়ে সরকারী কোট-পেণ্টলুন পরে এবং চেয়ার-টেবিলে চপ-কাটলেট চিবিয়ে তিনটি মাস মহা আরামে কাটিয়ে গেল ভিখারী ডেভিডসন।

    সেদিন ডেপুটি এবং কেরানী বাবুদের সান্ধ্য-আফিসে ঐ নামমাহাত্ম্যই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াল। সিতাংশুবাবু আপসোস করলেন, বড্ড ভুল করেছি, দাদা। নামটাকে যদি গোড়া থেকেই চ্যাটার্জির বদলে চ্যাটারটন করে দেওয়া যেত, এতদিনে আর কিছু না হোক একটি পুলিস সার্জেন্ট অন্তত হতে পারতাম।

    হৃদয়দা ওয়ারেন্ট চেক্ করছিলেন। চোখ না তুলেই বললেন, আমার মনে হয় নামের চেয়ে পোশাক-মাহাত্ম্যটা আরও বড়।

    —পোশাক-মাহাত্ম্য?

    —হ্যাঁ, আর তার প্রমাণ আমিও একবার হাতে হাতে পেয়েছিলাম।

    —আপনি! একসঙ্গে পাঁচজনের কণ্ঠ।

    হৃদয়দা ওয়ারেন্ট বন্ধ করে চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বললেন, তখন কলেজে পড়ি। চুঁচড়ো থেকে প্রায়ই খেলতে আসতাম গড়ের মাঠে। সাড়ে সাতটায় একটা গাড়ি ছিল, তাতে করে ফিরে যেতাম। একদিন একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। প্ল্যাটফর্মে ঢুকে দেখি, গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। লাফিয়ে উঠে পড়লাম, সামনে যে কামরা পেলাম তাতে। থার্ড ক্লাস, কিন্তু একেবারে ফাঁকা। কারণ বুঝতে দেরি হল না। ওটা সাধারণত থার্ড নয়, ইউরোপিয়ান থার্ড। আমার পরনে ছিল ধুতি আর পাঞ্জাবি। গাড়িতে যে-কটি দেশী সাহেব-মেম ছিলেন, তাঁরা কেউ নাক সেঁটকালেন, কেউ চোখ কপালে তুললেন, কেউবা মুখ ফিরিয়ে বসলেন। একটি জামরঙের মেমসাহেব বেশ তেজ দেখাতে শুরু করলেন। শিভালরির সুযোগ পেয়ে এক ছোকরা মতন সাহেব এগিয়ে এসে একেবারে আমার নাকের ওপর ঘুষি বাগিয়ে হিন্দী ভাষায় কৈফিয়ৎ তলব করে বসল : “এ গাড়িতে কেন উঠেছ? জান না, এটা রিজার্ভড ফর্ ইউরোপীয়ানস্?” বললাম, তাই নাকি? আচ্ছা এক মিনিট সবুর করো। সঙ্গে যে পোঁটলাটা ছিল তাই নিয়ে ঢুকে পড়লাম বাথ-রুমে। ধুতি-পাঞ্জাবির ওপরেই চড়িয়ে দিলাম কাদা-মাখা হাফপ্যান্ট। স্যাণ্ডেল খুলে পরে নিলাম ফুটবলের বুট। বাড়ি থেকে স্টেশনে আসতে হত সাইকেলে। রোদ লাগে বলে দাদার একটা ফেলে-দেওয়া ছেঁড়া হ্যাট মাথায় দিয়ে আসতাম। সেটাও চিল পোঁটলার মধ্যে। পরে নিলাম। তারপর গ্যাটগ্যাট্ করে বেরিয়ে এসে একেবারে সেই মেমসাহেবর সামনে গিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, হ্যালো, হা-ডু-ডু!

    আমাদের সম্মিলিত হাসির পর্দাটা বোধ হয় একটু বেশী চড়ে গিয়েছিল। লাল-মুখ জেলর যাবার পথে একবার উঁকি মেরে দেখে গেলেন।

    যাক। আসল প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূর এসে পড়েছি। বলতে গিয়েছিলাম, সহদেব ঘোষ যখন তার দুটো হাতের জোরেই গুরুদেবের পাচক-সমস্যার সমাধান না করে ছাড়ল না, তখন বাকি যেটুকু, অর্থাৎ আতপ চাল, ঘি-কাঁচকলা এবং বৈকালিক দুধ আর ফলমূলাদির ব্যবস্থা, ঐ ছিয়ানব্বই ধারার আওতায় বসে আমি আর ডাক্তার সাহেব মিলে করে ফেললাম।

    সদানন্দ চল্লিশোর্ধ্ব। ঘন ঘন উপবাস এবং (ডাক্তার সাহেবের মতে) ব্রহ্মচর্যরূপ বায়োলজিক্যাল কারণে শরীর একেবারে শুষ্কং কাষ্ঠং। ডাল ভাঙা, গম পেশা, কোদাল চালানো কিংবা তাঁত বোনা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই তাঁকে কয়েদী-রাইটার (vonvict writer) বানিয়ে দেওয়া হল। জেলের যারা বাসিন্দা, অন্যান্য দিকে তাদের বিদ্যা-বুদ্ধি যতই থাক, আক্ষরিক বিদ্যায় বড়ই খাটো। তাদের চিঠিপত্র এবং হরেক রকম দরখাস্ত লিখে দেবার জন্যে ওদের মধ্যে থেকেই মুন্সী বেছে নিতে হয়। ব্রহ্মচারীর ওপর পড়ল সেই মুন্সীগিরির ভার।

    কার হালের বলদ কেড়ে নিয়ে গেছে বাদীপক্ষের লোক, মেয়েদের ইজ্জত বাঁচানো দায় হয়েছে পাড়ার কোন্ গুণ্ডার হাত থেকে, খাজনার দায়ে কার বাস্তুভিটা নিলামে চড়েছে—এমনি ধারা যত অভিযোগ আসে আমার কাছে, প্রত্যেককে একখানা করে দরখাস্ত মঞ্জুরি করি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বরাবর। সে সব দরদ দিয়ে, তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে লিখে দেন ব্রহ্মচারী। আর একটা জিনিস তাঁকে লিখতে হয়, জেল-আপীল। সাজা হবার পর উকিল মোক্তার লাগিয়ে ঊর্ধ্বতন আদালতে আপীল দায়ের করবার সামর্থ্য বা সুবিধা যাদের নেই তারা বিনা খরচায় আপীল করে জেল থেকে। রায়ের নকল পায় বিনা ফী-তে। সমস্ত নথিপত্র তন্ন তন্ন করে মন দিয়ে পড়েন ব্রহ্মচারী। তারপর আপীলকারীর বক্তব্য শুনে নিয়ে বহু যত্ন এবং পরিশ্রম দিয়ে তৈরী হয় তাঁর মুসাবিদা।

    একদিন জেলা-জজ এলেন জেল পরিদর্শনে। কথা-প্রসঙ্গে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার স্টাফে কি কোনও উকিল আছে?

    —উকিল!

    —হ্যাঁ; মানে ওকালতি পাস, কিংবা আগে প্র্যাকটিস করত?

    —কেন বলুন তো?

    —জেল থেকে যে-সব আপীল যায়, সেগুলি লেখে কে?

    —জেল স্টাফের কেউ নয়, লেখে একজন সাধারণ কয়েদী।

    –কয়েদী! বিস্মিত হলেন জজ-সাহেব।

    বললাম, হ্যাঁ; এবং তার ব্যবসা ছিল কথকথা আর গুরুগিরি, ওকালতি নয়। আপনি ই পাঠিয়েছেন তাকে।

    —কী নাম বলুন তো?

    —ব্রহ্মচারী সদানন্দ।

    —ও-ও, সেই লোকটা? আপীল যা লেখে মশাই, পাকা উকিলও পেরে উঠবে না। অথচ মজা দেখুন, নিজের কেস্-এ সে কোনও ডিফেন্স দেয় নি।

    —আপনার রায়ে পড়লাম সে কথা।

    —আরও তাজ্জব ব্যাপার শুনুন, যা রায়ে লিখি নি। ওকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, তুমি দোষী না নির্দোষ, জোড় হাত করে বলল, প্রশ্নটা কি নিরর্থক নয়, ধর্মাবতার? জানতে চাইলাম, নিরর্থক কেন? জবাব দিল, যদি বলি দোষী, সে কথার উপর নির্ভর করেই তো আপনি আমাকে শাস্তি দিতে পারেন না, সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হবে। আর যদি বলি আমি নির্দোষ, তাহলেও আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন না। সেখানেও ওই সাক্ষ্য-প্রমাণ। তবে আর এই অনাবশ্যক প্রশ্নের সার্থকতা কোথায়?

    বললাম, এ লোক যে পাকা উকিলের মতো আপীল লিখবে, তাতে আর আশ্চর্য কি?

    —কিন্তু ওকালতি-জ্ঞানটা ও নিজের কাজে লাগাতে চাইল না, এইটাই আশ্চর্য।

    —শুনেছি, অনেক বড় বড় শিষ্য আছে ওর। তারাও তো একজন উকিল লাগাতে পারত।

    —সে চেষ্টা তারা কম করে নি। কিন্তু আসামী ওকালতনামায় সই না করলে উকিল দাঁড়াবে কেমন করে? উকিল না দিক, নিজেও তো লড়তে পারত। সে দিক দিয়েও যায় নি। বাদীপক্ষের যা কিছু বক্তব্য সব আগাগোড়া শুনে গেছে, একটি কথাও বলে নি। অনেক মামলা করেছি মশাই, এ রকমটা দেখি নি।

    এই পর্যন্ত এসে জজ-সাব কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, আপনাকে বলতে বাধা নেই, লোকটা সত্যিই দোষী কিনা, সে সম্বন্ধে মনে মনে আমি নিঃসন্দেহ হতে পারি নি। কোথাও কোনও রহস্য আছে নিশ্চয়, যা আড়ালেই রয়ে গেল। জুরির মনের কথাও বোধ হয় তাই। কিন্তু আমাদের রাস্তা একেবারে বাঁধা। এভিডেন্সের বাইরে এক চুল নড়বার উপায় নেই। সেখানে এমন কোনও খুঁত পাওয়া যায় নি, যার ওপর দাঁড়িয়ে জুরির পক্ষে দোষী ছাড়া অন্য ভাডিক্ট্‌ দেওয়া চলে। আর ওঁদের সঙ্গে আমারও একমত না হবার কারণ ছিল না।…..যাক, এবার উঠি কোর্টের সময় হল।

    জুরি হবার সৌভাগ্য আমার কোনোদিন হয়নি। তবু রায় পড়ে আমারও ওই কথাই মনে হয়েছিল। কোথাও কোনও রহস্য রয়ে গেল, যা ভেদ করা যায় নি।

    বাদীপক্ষের কাহিনী সরল ও সংক্ষিপ্ত। একটি কুড়ি-বাইশ বছরের মেয়ে একদিন সকালের দিকে কেঁদে পড়ল গিয়ে নবদ্বীপ থানার বড় দারোগার কাছে। তিনি জানতে চাইলেন, কী হয়েছে? মেয়েটি বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে, আর কিছুই বলতে চায় না। তারপর এল এক মোক্ষম পুলিসী ধমক, যার উত্তর বলে উঠল, আমার ধম্মোনাশ করেছে কথক- ঠাকুর।

    —কোন্ কথক-ঠাকুর? জানতে চাইলেন বড়বাবু।

    —ওই মাঝের পাড়ার ব্রেহ্মচারী।

    দারোগা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মেয়েটার মুখের দিকে। তারপর বললেন, কোথায় করল তোমার ধম্মোনাশ?

    —ওর বাড়িতে।

    —তুমি সেখানে কী করছিলে?

    —বাসন মাজতে গিয়েছিলাম।

    —কী নাম তোমার?

    —ময়না।

    —ঠিকে-ঝি, না দিন-রাতের?

    —ঝি নই আমি!

    —ঝি নও, তবে বাসন মাজতে গিয়েছিলে কেন?

    উত্তর দিতে গিয়ে একটু বোধ হয় ইতস্তত করেছিল মেয়েটি। তারপর আর-এক ধমক খেয়ে খুলে বলল ঘটনার বিবরণ।

    ব্রহ্মচারীর বরাবরকার ঝি পাঁচীর মা ওদেরই পাড়ার লোক। আগের দিন সন্ধ্যে থেকে জ্বরে পড়েছিল; সকালে আর কাজে বেরোতে পারে নি। অন্য সব বাড়ি, যেখানে সে কাজ করত, তাদের জন্যে বিশেষ ভাবনা ছিল না। তারা একরকম করে চালিয়ে নেবে। কিন্তু কথক-ঠাকুর একা মানুষ। সেই সকালে বেরিয়ে যায়, দেড়টা দুটোর আগে ফিরতে পারে না। তারপর নিজে হাতে দুটো চাল ফুটিয়ে খায়। বাসন দু-খানা মাজা না পেলে বড্ড কষ্ট হবে বেচারার। ময়নার মা শুনে বললেন, তার জন্যে কী? ময়না গিয়ে মেজে দিয়ে আসুক না। একলা মানুষের ভারী তো বাসন! কথক-ঠাকুরের বাড়ি চিনত ময়না। দরজা খোলাই ছিল। রান্নাঘর থেকে বাসন তুলে নিয়ে কুয়োতলায় বসে যতক্ষণ কাজ করছিল কারও কোনও সাড়া পাওয়া যায় নি। তারপর যখন হাত ধুয়ে চলে আসবে, ঠাকুর এসে দাঁড়াল তার সামনে। বলল, আমার শোবার ঘরটা একটু গুছিয়ে দিয়ে যাও না! ঠাকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় হল ময়নার। বলল, না, আমি যাই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। পা বাড়াতেই ওর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঠাকুর। বাঁ হাতে জাপটে ধরে ডান হাতে মুখ চেপে ধরল। তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেল ঘরের মধ্যে। মুখ ছেড়ে দিতেই চেঁচাতে যাচ্ছিল ময়না, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর ফুটল না। ঠাকুরের হাতে ঝকঝক করছে মস্ত বড় কাটারি। সেটা রেখেই দরজায় খিল তুলে দিল।

    দারোগা জিজ্ঞেস করলেন, তারপর?

    ময়না জবাব দিল না। বসে রইল মাটির দিকে মুখ করে।

    —কোথায় সে ঠাকুর?

    —কাপড়-গামছা নিয়ে চলে গেল গঙ্গার দিকে। আমিও অমনি ছুটে এলাম থানায়।

    –গঙ্গার দিকে! লাফিয়ে উঠলেন দারোগাবাবু। টুপিটা মাথায় চড়িয়ে একজন সিপাই নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সহকারীকে বলে গেলেন, মেয়েটাকে আটকে রেখো।

    ঘাটে পৌঁছেই নিরাশ হলেন বড়বাবু। একবুক জলে দাঁড়িয়ে সরবে গঙ্গার স্তব আবৃত্তি করছেন ব্রহ্মচারী। টুপীটা খুলে অসহিষ্ণু হাতে চুলগুলো ধরে একবার টানলেন। একটা কুৎসিত গালাগালি উচ্চারণ করলেন মেয়েটার উদ্দেশে, খবরটা আর একটু আগে দিতে পারল না। তারপর জল থেকে উঠতেই আসামীকে গ্রেপ্তার করলেন।

    থানায় আসবার পর ব্রহ্মচারীকে যখন জানানো হল, তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, তিনি চকিত দৃষ্টিতে একবার তাকালেন মেয়েটির দিকে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন নিস্পন্দের মতো, তারপর বললেন, কোথায় যেতে হবে?

    —কোর্টে। তার আগে থানার লক-আপ-এ।

    —চলুন।

    প্রত্যক্ষদর্শী এ-জাতীয় মামলায় বড় একটা সাক্ষী থাকে না, এ ক্ষেত্রেও ছিল না। কিন্তু পরোক্ষ সাক্ষ্যের অভাব হয় নি। অভিযোগকারিণীর সমর্থনে তার দেহ-পরীক্ষার ডাক্তারি রিপোর্ট তো ছিলই, তা ছাড়া মাতব্বর-গোছের দু-তিনজন পাড়ার লোক হলপ করে বলেছিলেন, মেয়েটা যখন কাঁদতে কাঁদতে থানার দিকে যাচ্ছিল, তখনই তার মুখ থেকে তাঁরা সংগ্রহ করেছেন তার লাঞ্ছনার কাহিনী, আর তার সঙ্গে আসামীর নাম এবং পরিচয়। সঙ্গে সঙ্গে আসামীর সন্ধানও তাঁরা করেছিলেন, কিন্তু তাকে পাওয়া যায় নি। আর একজনের সাক্ষ্যে জানা গেল, স্নান করে ফেরবার পথে তিনি দেখতে পেলেন, কথক- ঠাকুর হন্হন্ করে ছুটে চলেছে গঙ্গার দিকে। অনেক দিনের জানা-শোনা, কিন্তু বার বার প্রশ্ন করেও তার গন্তব্যস্থান বা ব্যস্ত হবার কারণ সম্বন্ধে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। হনহন করে গঙ্গায় ছুটে যাবার প্রয়োজন বিশ্লেষণ করে বুঝিয়েছিলেন সরকারী উকিল। তার উল্লেখ না করলেও চলবে।

    এই কটি তথ্যের উপর নির্ভর করে আসামী দোষী সাব্যস্ত করা যায় কি না—বিচক্ষণ বিচারক সে প্রশ্ন এড়িয়ে যান নি। ময়নার মতো মেয়ের জীবননাট্যে ঐ মুহূর্তে অন্য কোনও নায়কের আবির্ভাব অসম্ভব ছিল না। কিন্তু তেমন যদি কেউ এসে থাকে – প্রেমিক বা অত্যাচারী, যে বেশেই হোক,—তাকে নেপথ্যে সরিয়ে রেখে এই নিরীহ লোকটার বিরুদ্ধে এত বড় মিথ্যা অভিযোগ আনবার কোনও যুক্তি খুঁজে পান নি। অন্যান্য সাক্ষীদের অবিশ্বাস করবারও কোনো হেতু ছিল না। তা ছাড়া, অভিযোগের উত্তরে অভিযুক্তের নির্বাক ঔদাসীন্য— তার মধ্যে রহস্য যতই থাক–জজ বা জুরিদের মনে অনুকূল আবহাওয়ার সৃষ্টি করে নি।

    কিন্তু কী সেই রহস্য, বিচারক যা ভেদ করতে পারেন নি, জুরিরা যার সন্ধান পান নি, তার সম্বন্ধে কৌতূহল আমার যতই থাক, সেটা মেটাবার পথে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা এই চেয়ার। আমার ও আমার বন্দীর মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সে দূরত্ব ঘোচাতে পারি এমন কোনো মন্ত্র আমার জানা নেই। সে যখন আমার সামনে আসে, তার চারদিকে জড়িয়ে থাকে কয়েদীর খোলস। ভেতরে যে মানুষ, তাকে আমি পাই না। আমি যখন তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই, সেও আমার নাগাল পায় না। যদি বা কেউ হাত বাড়ায়, সে হাতে ঠেকে শাসকের লৌহবর্ম।

    আমার সাহিত্যিক বন্ধুদের বলতে শুনেছি, আমি তো প্লটের রাজা! অপরাধী মানুষের অন্তর্লোকে যেমন ‘সাইকলজি’র ছড়াছড়ি, তার বহির্জীবনেও তেমনিই গড়াগড়ি যাচ্ছে ‘ড্রামাটিক সিচুয়েশন’। ট্যাপ করলেই রসের স্রোত। ধরে নিয়ে শুধু পরিবেশন করা। আমি প্রতিবাদ করি না, মনে মনে শুধু হাসি। স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে কবিরা নাকি বলেছেন, তাদের বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। কিন্তু এই কয়েদী-জাতটার শুধু বুক নয়, মাথা ফাটিয়ে দিলেও যে মুখ ফোটে মা–সে কথা যদি জানতেন আমার বন্ধুগণ!

    সহদেব ঘোষের গায়ে যে খোলসটা ছিল সেটা মাঝে মাঝে হঠাৎ খুলে পড়ত। ক্ষণেকের তরে বোধ হয় ভুলে যেত, সে জেলখানার লোক। এমনই একটা অসতর্ক মূহুর্তে একদিন চেপে ধরলাম : সেদিন যে বলেছিলে মিথ্যা মামলায় জেল খাটছেন তোমার গুরু, তার প্রমাণ দাও। হেসে ফেলল ঘোষের পো। সামনের দুটো দাঁত ভাঙা। বছর কয়েক আগে একটা মরা তালগাছ বাঁচাতে গিয়ে ওই ছুটিকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল। সে জন্য কোনো ক্ষোভ নেই সহদেবের মনে। গাছের মূল্য থাক বা না থাক, সেটা যে ওর পৈতৃক সম্পত্তি। সেই ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল গভীর বিস্ময় : প্ৰমাণ! প্রমাণ আমি কোথায় পাব হুজুর?

    তবে এতগুলো সাক্ষীর কথা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিচ্ছ কিসের জোরে?

    জোর আমার কিছুই নেই ধর্মাবতার, মিথ্যাবাদীও কাউকে বলতে চাই না। আমার চোখ যা দেখে, মন যা বলে, তাই আমি জানি। আদালতে দাঁড়িয়ে কোন্ সাক্ষী কী বলল আর না-বলল, তা দিয়ে আমার কিসের দরকার?

    যে ব্যাপারে, মানে যে ঘটনায় জড়িয়ে ওঁর সাজা হল, তার সম্বন্ধে তুমি কিছু জান?

    সহদেব দাঁতে জিব কেটে বলল, না হুজুর।

    আমি হেসে ফেললাম : কিছু না জেনেই, অতবড় একজন জজ বিচার করে যা স্থির করলেন, সেটা বলতে চাও ভুল?

    আমার উচ্চাঙ্গের হাসি দেখে সহদেব যে কিছুমাত্র অপ্রতিভ হয়েছে, তার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজে থেকে হাত জোড় করে বলল, হুজুর, মুখ্যু মানুষ আমি, তায় জাতে গয়লা। গরিবের কথায় অপরাধ নেবেন না। আমার গুরুকে আমি দেখেছি সেই জোয়ান বয়স থেকে। আর জজ সাহেব তাঁকে দেখেছেন সবে দুটো দিন। তাও নিজের চোখ দিয়ে নয়, অন্য লোকের চোখ দিয়ে। তবু তাঁরই কথা আমাকে মেনে নিতে হবে, আর আমি যা দেখলাম, যা পেলাম – সব ভুয়ো?

    শিষ্যের মুখে এ-হেন যুক্তি শোনবার পর গুরুর মামলা-ঘটিত রহস্য- মোচনের সব আশায় জলাঞ্জলি দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ রইল না।

    মাস কয়েক পরে একদিন অসময়ে যেতে হয়েছিল জেলখানায়। বৈশাখের মাঝামাঝি। বেলা প্রায় দেড়টা। কিছুক্ষণ হল ভোজন- পর্ব সমাধা হয়েছে; এখন চলছে মাধ্যাহ্নিক বিরামের পালা। ওয়ার্কশপগুলো খালি। বড় বড় ব্যারাকে আরাম করছে কয়েদীরা। বেশীর ভাগই হাত-পা ছড়িয়ে গড়িয়ে নিচ্ছে খানিকক্ষণ। কোথাও কোথাও গোল হয়ে বসেছে দশ-পঁচিশের আসর। কারও বা ঝোলার ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়েছে লুকিয়ে-রাখা ময়লা তাসের প্যাকেট একটা গোপন কোণ বেছে নিয়ে শুরু হয়েছে বিন্তি বা টোয়েনটি- নাইনের জুয়ো।

    কান রয়েছে বাইরে, ইয়ার্ডের পানে, কোন্ দিকে শোনা যায় টহলদার সিপাহীর ভারী বুটের আওয়াজ। রুদ্র আকাশের অগ্নিবর্ষণ মাথায় নিয়ে টহল আর দিচ্ছে কে? পাগড়িটা খুলে বারান্দার কোণে কিংবা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গেছে একটুখানি, কিংবা সুযোগ বুঝে বসেও নিচ্ছে কয়েক মিনিট। দুঃসাহস যাদের বেশী, তারা এরই মধ্যে দেয়ালে কিংবা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে পা দুটো। জানে না কখন নেমে এসেছে অবাধ্য চোখের পাতা। কতক্ষণ আর? হঠাৎ কখন কানের কাছে ফেটে পড়বে শ্লেষতিক্ত ব্যাঘ্রগর্জন : শো গিয়া! চোখ খুলেই দেখতে পাবে জমাদারের রক্তচক্ষু। ধড়মড়িয়ে উঠে বেল্‌ট্‌ আঁটতে আঁটতে বলবে, নেহি হুজুর, জরাসে আঁখ লাগ গিয়া। জমাদারের দয়া হলে এইখানেই শেষ। নয়তো ডিউটি-অন্তে যেতে হবে ওয়ার্ডার-গার্ডের ডেপুটিবাবুর কাছে। একদফা শুনানির পর অর্ডার-বুকে লেখা হবে রিপোর্ট : ডোজিং হোয়াইল অন ডিউটি। শাস্তির ডোজটা নির্ভর করবে দুটো জিনিসের উপর, দণ্ডিতের ম্যানার এবং দণ্ডদাতার মূড।

    বিশেষ একটি জায়গা আছে জেলখানায়, রৌদ্রদগ্ধ মধ্যাহ্নও যেখানে বিরামহীন কর্মমুখর। সেটি হচ্ছে এই বিরাট গোষ্ঠীর অন্নসত্রের যজ্ঞশালা। ভোর চারটেয় তার আরম্ভ, বেলা চারটেয় আহুতি। পূর্ণাহুতি নয়, সাময়িক বিরতি মাত্র। রাবণের চিতার মতো অগ্নি সেখানে অনির্বাণ; কখনও ধিকিধিকি, কখনও দাউদাউ। মোটা লোহার পাত দিয়ে তৈরী একটি অতিকায় বাক্স, যার পোশাকী নাম কুকিং-রেঞ্জ, কয়েদীরা বলে—বাইলট। ( কথাটা বোধ হয় বয়লারের কারা-সংস্করণ )। তার ডালার উপর সারি সারি গর্ত, ভেতরে জ্বলছে মোটা মোটা কাঁচা কয়লার চাঁই, ওপরে বসানো একটা করে প্রকাণ্ড পিপে-আকারের লোহার ডেক, যার ব্যাস চব্বিশ ইঞ্চি, দৈর্ঘ্য তিন ফুট। তার অর্ধেক অংশ ডুবে গেছে আগুনের মধ্যে, বাকী অর্ধেক জেগে আছে রেঞ্জের ওপর। এক-একটা ডেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ সের করে চাল কিংবা ডাল অথবা মন দুই করে তরকারি চাপিয়ে দিয়ে দু দিক থেকে খুস্তিনামধারী পাঁচ হাত লম্বা লোহার ডাণ্ডা চালায় যে সব কয়েদী, তাদের বর্ণ বা পরিধির সঙ্গে ওই ডেক- গুলোর বিশেষ তফাত নেই। তাদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন ছুটি ব্যক্তি—কানায় লাগানো রাক্ষুসে কড়ার ভিতর দিয়ে প্রকাণ্ড বাঁশ চালিয়ে দিয়ে ৰাইলটের ছ পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যারা কাঁধে করে টেনে তোলে ফুটন্ত ভাত-ভর্তি ডেকগুলো, তারপর জলে- ভেজা সিমেন্টের মেঝের উপর দিয়ে বয়ে নিয়ে ঢেলে দেয় মাড়- নিকাশের অতিকায় ছাঁকুনির মুখে। যাকে-তাকে দিয়ে এ কাজ চলে না। এর পেছনে চাই এক দিকে যেমন অমিত গায়ের জোর, আর এক দিকে তেমনই যত্নায়ত্ত কৌশল, এবং সকলের ওপরে অবিচল সতর্কতা। কোনো একটার অভাব হলে যে বিপর্যয় ঘটে, তার নিদর্শন আমি নিজের চোখেই দেখেছি। একটা, তো এই সেদিনের ঘটনা। হঠাৎ পা পিছলে ডেক উলটে দিয়ে সেই যে পড়ল লোকটা, আর উঠল না। সহবন্দীরা স্ট্রেচারে করে ঝলসানো দেহটাকে পৌঁছে দিয়ে এল হাসপাতালে। তার পর ফিরে এল ঘাম মুছতে মুছতে। শুধু কি ঘাম? তার সঙ্গে বোধ হয় খানিকটা চোখের জল। সে কথা এখন থাক।

    সেদিন অসময়ে টেলিফোন এল জেলরবাবুর কাছ থেকে, ওই মানিক-জোড়ের এক মানিক হঠাৎ কী কারণে বিগড়ে গিয়ে বাঁশ ফেলে শুয়ে পড়েছে গুদামের বারান্দায়। জরুরী অবস্থায় কাজ চালাবার মতো দু-একজন যারা ছিল, সময় বুঝে কারও ঘাড়ে চেপেছে বাত, কারও বা হাঁটুতে নেমেছে রস। এদিকে চার ডেক ভাত ক্ৰমাগত খুস্তির ঘায়ে লেই হবার উপক্রম। খুন্তি থামলেই তলা থেকে উঠছে পোড়া গন্ধ। খবর পেয়ে জেলর এসে লোকটাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, জানতে চেয়েছিলেন কী তার অভিযোগ। উত্তরে প্রথমে কিছুই বলতে চায় নি, অনেক পীড়াপীড়ির পর জানিয়েছে, ‘বড়া সাব কো বোলেগা’। শাসন এবং তোষণ সমভাবে ব্যর্থ হবার পর, অন্য কোনো অশক্ত বা অনিচ্ছুক লোকের ঘাড়ে ডেক চাপানো বিপজ্জনক মে করে, গত্যন্তর না দেখে তিনি আমাকে স্মরণ করেছেন।

    রন্ধন-মহলের বারান্দায় আসামীকে আমার সামনে হাজির করতেই নিখুঁত মিলিটারী কায়দায় সেলাম করে বলল, নালিশ হ্যয় হুজুর। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, না। ওই ডেক যতক্ষণ না নামছে, ততক্ষণ কোনো নালিশ নেই। একটু যেন থমকে গেল লোকটা। চোখ দেখে বুঝলাম, এ উত্তর সে আশা করে নি। মিনিটখানেক নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল আমার দিকে চেয়ে। তার পর সঙ্গীকে ইশারা করে ঘরের কোণ থেকে তুলে নিল বাঁশ। পর পর সব ডেকগুলো যখন নামানো হয়ে গেল, ডাকিয়ে এনে বললাম, বলো, কী তোমার নালিশ! গম্ভীর তাচ্ছিল্যের সুরে উত্তর এল : কুছ নেহি। —বলেই চলে গেল সামনে থেকে। জেলখানার বড় সাহেব আমি। একটা সাধারণ কয়েদীর এই উদ্ধত আচরণে অপরাধ নেবার কথা। নেওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু ওই ছ-ফুট-লম্বা শিশুটার মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে হেসে ফেললাম। ভেল-খাটা মানুষের সেই চিরন্তন অভিমান। এর পরের স্তরগুলোও আমার মুখস্থ। বিনা কারণে মেজাজ দেখানো, কাজ না করা, এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো হাঙ্গার-স্ট্রাইক। এই গ্রন্থেরই দ্বিতীয় পর্বে এ নিয়ে একটা গবেষণামূলক লেকচার দিয়েছি। পুনরুক্তি দিয়ে নতুন করে আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। পদোচিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললাম, কী নাম তোমার?

    গুলাব সিং।

    মিথ্যা কথা বলছে হুজুর। —সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানাল রন্ধনশালার মেট : ওর আসল নাম নসরুল্লা।

    সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতেই মাথা নেড়ে বলল, জী, ওভি মেরা নাম হ্যয়।

    আমার অনুচরদের মুখে কিঞ্চিৎ চাপা হাসি দেখা দিল। জেলরবাবু বললেন, একই সঙ্গে গুলাব সিং আর নসরুল্লা! কোন্‌ জাত তুমি?

    উত্তরে যা শুনলাম, সে এক বিচিত্র ইতিহাস। গুলাব সিং আসলে শিখ। বাড়ি ছিল পাঞ্জাবের কোন্ গ্রামে। ওর বয়স যখন তিন বছর, বাপ চলে গেল ফৌজে, আর ফিরল না। থাকবার মধ্যে ছিল শুধু মা। বছরখানেকের মধ্যে সেও চোখ বুজল। চার বছরের শিশুর আশ্রয় জুটল এক প্রতিবেশী মুসলমান-পরিবারে। সেইখানেই সে মানুষ, এবং তাদেরই দেওয়া নাম ওই নসরুল্লা। আঠারো বছরে পড়তেই ফৌজে নাম লিখিয়ে বর্মা ফ্রন্টে চলে গেল গুলাব সিং। লড়াই মিটে যাবার পর ঘরে ফিরে দেখল, তার আশ্রয়দাতাও ওপারে পাড়ি দিয়েছেন। সংসারে আর কোনো বন্ধন রইল না। দিন কয়েক এখানে ওখানে টহল দিয়ে রোজগারের খোঁজে চলে এল বাংলা মুলুক। নকরিও জুটে গেল হুগলির এক চটকলে। কিছুদিন পরে পাশের বস্তির একটি মেয়ের সঙ্গে হল মন-জানাজানি, তাকে নিয়েই ঘর বাঁধল নসরুল্লা। কিন্তু সে ঘর তার টিকল না। শয়তানের নজর পড়ল ওর সুন্দরী বিবির উপর; আর সেও গোপনে সাড়া দিয়ে বসল। সন্দেহের জ্বালা বুকে নিয়ে ছটফট করে দিন যায় নসরুল্লার। একদিন অসময়ে কাজ পালিয়ে ঘরে ফিরে যা দেখল, তার পর আর মাথা ঠিক রাখা সম্ভব হল না। পাশেই ছিল একটা নেপালী পরিবার। ছুটে গিয়ে তাদের ঘর থেকে নিয়ে এল ভোজালি। আমরা রুদ্ধনিশ্বাসে অপেক্ষা করে রইলাম। তার পর চমকে উঠলাম।

    এই পর্যন্ত এসে হঠাৎ থেমে গেল নসরুল্লা। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, দূরে একটা গাছের দিকে।

    দুনোকো কাট।—সহজ শান্ত সুরে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল নসরুল্লা।

    চমকে উঠেছিলাম; ‘কাট দিয়া’ শুনে নয় (আমার রাজ্যে ওটা নতুন নয়, অসাধারণ বস্তুও নয়), যে ভাবে, যে নিরুত্তাপ ঔদাসীন্যে কথাটা আউড়ে গেল, তাই দেখে। ভোজালির মুখে যেন উড়ে গেল দুটো হাঁস কিংবা মুরগির গলা।

    হাকিমের কাছে সব কম্বুরই কবুল করেছিল গুলাব সিং। চরম দণ্ডের জন্যে জন্যে তৈরীও ছিল মনে মনে। কিন্তু কোর্টের কী মরজি হল! দশ বছর জেল দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন জেলখানায়। মাসখানেকের মধ্যেই ছোট জেল থেকে চালান হয়ে এল বড় জেলে। ফৌজী চেহারা দেখে বড় জমাদার লাগিয়ে দিল চৌকায়। তার পর থেকে ওই ডেক বয়ে বয়ে কড়া পড়ে গেছে কাঁধের ওপর। তার জন্যে তার কোনো ক্ষোভ নেই। নালিশ যা ছিল, তাও আর জানাতে চায় না।

    বললাম, কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে জেলের যে নালিশ, তার বিচার এখনও হয় নি।

    উসকো বাস্তে হাম হাজির হয়, সাব।—অ্যাটেনশন হয়ে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল নসরুল্লা।

    কতদিন ফৌজে ছিলে তুমি?

    পাঁচ বরষ।

    আজ এখানে যে কসুর তুমি করেছ, সে ঘটনা যদি ঘটত তোমার পল্টনের কুক-শেড়ে, বলতে পার কী হত সেই বাবুর্চীর?

    কোর্ট মার্শাল।

    তার পর?

    গোলি।—বলে বুকের উপর আঙুল রাখল গুলাব সিং।

    আর কিছু আমি বলতে চাই না। মনে রাখতে চেষ্টা কোরো- যেখানে আছ, এও তোমার সেই ফৌজ।

    নসরুল্লা জবাব দিল না। তার সেই মিলিটারী স্যালুট ঠুকে নিঃশব্দে জানিয়ে দিল, সে কথা ভুলবে না।

    গুলাব সিং মুখ ফুটে না বললেও তার নালিশের আসল বিষয়ট। জানতে চেষ্টা করলাম। গোপন সূত্র থেকে কয়েকদিন পরেই সমস্ত ব্যাপারটা পাওয়া গেল।

    ডেক-তোলা পল্টনের সৈন্য-সংখ্যা ছিল তিন। বাকী দুজনের নিয়মিত ডিউটি-বদল হতো। এ-বেলা যার খাটনি, ও-বেলা তার মাপ। কিন্তু নসরুল্লা ছিল কমন ফ্যাক্টর। ও-পাশে যেই থাকুক, এ- পাশের বাঁশ পড়বে তারই কাঁধে। তার কারণ, মেট নামক ব্যক্তিটিকে খুশী করবার যে সব আর্ট, সেগুলো সে আয়ত্ত করতে পারে নি কিংবা ইচ্ছা করেই করে নি। এ সব দিকে খেয়ালও বিশেষ ছিল না। হঠাৎ সে দিন কী মনে করে আপত্তি জানিয়ে বলে বসল : সব কাম বাইনাম্বারসে হোনা চাইয়ে। মেট এবং তার দলবল পল্টনিয়া বলে ওকে প্রায়ই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। বাইনাম্বার শুনে তারই মাত্রা গেল বেড়ে। মেজাজ চড়ে গেল নসরুল্লার। বাঁশ ফেলে দিয়ে বেরিয়ে গেল চৌকা থেকে। বাকী দুজন যারা ছিল, তার মধ্যে একটি মেটের ইঙ্গিতে ‘পেটমে দরদ হ্যয়’ বলে চলে গেল হাসপাতাল। একজন দিয়ে তো আর ডেক টানা চলে না। দেখা দিল, যাকে বলে, গুরুতর পরিস্থিতি। একটা বাইনাম্বার থেকে এক হাজার লোকের অনশনের উপক্রম।

    রন্ধনশালার দিকে যথোচিত নজর দিলেন কর্তৃপক্ষ। মেটকে যেতে হল ‘চক্কর’-পাহারায়; অর্থাৎ তার মেটগিরির এলাকা মানুষের ওপর থেকে সরে গেল দেয়ালের ওপর। নির্জন পাঁচিলের একটা নির্দিষ্ট অংশে উদয়াস্ত টহল দেওয়া—ওইখান দিয়ে কেউ না পালায়। তার দুষ্টচক্রে আর যারা ছিল, তাদের কেউ গেল ডাল ভাঙতে, কারও হাতে উঠল তাঁতের মাকু কিংবা বাগানের কোদাল। ডেকের লোক বাড়িয়ে দিয়ে নিয়মমত ‘সুস্থি’ বা বিশ্রামের ব্যবস্থা হল নসরুল্লার। দিন চারেক পরে চৌকা-মহলে রাউণ্ডে গিয়ে দেখি, বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে আছে গুলাব সিং, ঠিক সামনেই টগবগ করে ভাত ফুটছে, কখন তৈরি হবে তারই অপেক্ষায়। জিজ্ঞাসা করলাম, কী খবর, গুলাব সিং? এবার বাইনাম্বারসে কাজ হচ্ছে তো? সলজ্জ হাসির একটা ঝিলিক বিদ্যুৎচমকের মতো খেলে গেল তার মুখের ওপর। পরক্ষণেই গম্ভীর মিলিটারী কণ্ঠে সশ্রদ্ধ জবাব : জী সাব।

    সেদিন গুলাব সিংয়ের মামলা মিটে যাবার পর সদলবলে আপিসের দিকে ফিরছিলাম। ‘রাইটার’দের গুমটির কাছে আসতেই কানে গেল একটি পাঠরত উদাত্ত গভীর সুর-

    ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণ-
    স্তমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্।
    বেত্তাসি বেদ্যঞ্চ পরঞ্চ ধাম
    ত্বয়া ততং বিশ্বমনস্তরূপ।।

    ভগবদ্গীতার সেই বহুশ্রুত অমর শ্লোক। কিন্তু এই পরিবেশে এমন করে কোনোদিন শুনি নি। আপনা হতেই যেন যতি পড়ল আমাদের সমবেত গতিচ্ছন্দে। গীতা চণ্ডী কিংবা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ আবৃত্তিই ছিল ব্রহ্মচারীর অবসরযাপনের সঙ্গী। এ খবর আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু সে আবৃত্তি যে এত মধুর, এমন স্বচ্ছন্দ-সুরময়, তার আবেদন যে এত অনায়াসে অন্তরকে স্পর্শ করে, সেটুকু জানবার সুযোগ হয় নি। মিনিট কয়েক নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার পর হঠাৎ খেয়াল হল, আমার পদমর্যাদা এবং অনুচরবৃন্দ-সহ এই মাঝপথে থেমে গিয়ে গীতাপাঠ-শ্রবণ—এ দুয়ের মধ্যে কোথায় যেন একটা অসঙ্গতি রয়ে গেছে। অতএব ক্যারাভান সচল হল। ‘সেল’-ব্লক পেছনে ফেলে এক নম্বর বাগানের পাশ দিয়ে বড় সড়কে গিয়ে পড়লাম। গুমটি অদৃশ্য হয়ে গেল। স্তব্ধ মধ্যাহ্নের রৌদ্রক্লান্ত গাছপালার ভিতর দিয়ে তখনও ভেসে আসছিল বহুযত্নে অধীত সু-উচ্চারিত দেবভাষার সুললিত ছন্দ—

    অনন্তবীর্যামিতবিক্রমত্তং
    সর্বং সমাপ্লোষি ততোঽসি সর্বঃ।

    বিশ্বরূপদর্শন যোগের এই শ্লোক কটি আমিও একদিন নিষ্ঠা এবং স্বত্নের সঙ্গে পাঠ করেছি। কিন্তু সে শুধু পাঠ এবং তার সঙ্গে কিঞ্চিৎ অর্থবোধ। শব্দ ও অর্থের বন্ধন অতিক্রম করে পঠিত বস্তু যে সমূর্ত ও সপ্রাণ হয়ে উঠতে পারে, সে দৃশ্য আজ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলাম।

    “হে অনন্তবীর্য, তুমি অমিতবিক্রমশালী। তুমি সমগ্র বিশ্বে ব্যাপ্ত হইয়া আছ, অতএব তুমি সর্বস্বরূপ। তুমি ভিন্ন অন্য কিছুরই স্বতন্ত্র সত্তা নাই।”

    প্রথম দিকে ব্রহ্মচারীর গীতার আসরে শ্রোতার সংখ্যা ছিল সামান্য। তার প্রিয় শিষ্য সহদেব ঘোষ এবং তারই দু-একটি বন্ধু। ক্রমশ পাঠচক্র বিস্তৃত হল, এবং কয়েক সপ্তাহ যেতেই দেখা গেল, রবিবারের মধ্যাহ্ন-সমাবেশে শ্রোতার দল রাইটারদের গুমটি ঘর ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সামনেকার আঙিনায়-বেলগাছের ছায়ায় ঠাসাঠাসি ভিড়। তারা এসেছে বিভিন্ন ইয়ার্ড থেকে, এবং এই বে- আইনী ব্যাপারে—জেলকোডে যার নাম ‘ব্রেকিং ফাইল’ – স্থানীয় আইন-রক্ষকদের বিশেষ কোনো কড়াকড়ি নেই। ভিড়টা শুধু কয়েদীর নয়, কোণের দিকে সাদা পোশাকে বসে গেছে কোনো তিলকধারী দেশোয়ালী সিপাই কিংবা পঞ্চাশোর্ধ্ব জমাদার। ব্যাপারটা সরকারীভাবে আমার গোচরে আনলেন সরকার-নিযুক্ত অবৈতনিক ধর্ম-শিক্ষক, সাপ্তাহিক আড়াই টাকা রাহাখরচের বিনিময়ে যিনি আমার পাপমগ্ন পোষ্যদের কানে কিঞ্চিৎ ধর্মোপদেশ দান করে থাকেন। কয়েদীমহলে ধর্মের প্রতি ঔদাসীন্য যে ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, সে জন্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি কিঞ্চিৎ উষ্মার সঙ্গে বললেন, জঘন্য অপরাধ করে যে লোকটা জেল খাটতে এল, সে যদি ধর্মশিক্ষক হয়ে দাঁড়ায়—। কথাটা সম্পূর্ণ হল না; বাকিটুকু মুখে একটা শব্দ করে হাতের ইঙ্গিতে দেখিয়ে দিলেন। পণ্ডিত মশায়ের ক্রোধ সঞ্চারের কারণ ছিল। লোকসংখ্যা তাঁর ক্লাসে বরাবরই কম। সম্প্রতি সেটা দু-তিনজনে এসে ঠেকেছিল। বিষয়টা যে গুরুতর সবিনয়ে স্বীকার করে যথারীতি প্রতিকারের আশ্বাস দিলাম। কিন্তু তিনি বিশেষ আশ্বস্ত হলেন বলে মনে হল না। পরের সপ্তাহে তিনি এলেন না, তার বদলে এল তাঁর ছুটির দরখাস্ত।

    ব্রহ্মচারীকে ডেকে পাঠিয়ে বললাম, শুনেছি জেলে আসবার আগে আপনি কথকতা করতেন?

    উত্তর এল সলজ্জ হাসির সঙ্গে, জীবিকার জন্যে লোকে অনেক কিছু করে। আমিও করতাম। তবে ওটা কথকতা নয়, কথা বেচা।

    বললাম, এখানে অবশ্যি সে সুবিধে নেই। কিছুদিন বিনামূল্যে চালাতে আপত্তি কী?

    আমার ওপর আপনার অশেষ অনুগ্রহ। কিন্তু এ দায়িত্ব নেওয়া কি আমার পক্ষে উচিত হবে?

    অনুচিত মনে করছেন কেন?

    আমিও ওদের মতো কয়েদী। ওরা আমার কাছে আসবে কি?

    গীতাপাঠ শুনতে তো আসে, দেখছি।

    ব্রহ্মচারী যুক্তকর কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ওই পবিত্র গ্রন্থের ওপর যাদের শ্রদ্ধা আছে তারাই বোধ হয় আসে। পাঠটা এখানে নিতান্তই গৌণ।

    বললাম, আমিও ঠিক তাই চাই, ব্রহ্মচারী। ধর্মের ওপর যদি কারও অন্তরের টান থাকে, তারাই এসে বসুক আমাদের এই রবিবারের ধর্মসভায়। যাদের নেই, কিংবা বক্তব্যের চেয়ে বক্তার নাম-ধামের দিকে যাদের নজর বেশী, তাদের টেনে এনে কী লাভ? আমার বিশ্বাস, জোর করে অনেক কিছু করা যায়; কিন্তু মানুষকে ধার্মিক বানানো যায় না।

    ব্রহ্মচারী এ প্রসঙ্গের কোনো উত্তর দিলেন না। জোড়হাত করে বললেন, আমাকে কী আদেশ করছেন?

    যা করতে বলছি, ঠিক ‘আদেশে’র কোঠায় পড়ে না, বরং অনুরোধ বলতে পারেন। নতুন কিছু নয়। যা করছিলেন, ওইটাই একটু ব্যাপকভাবে করতে হবে। অর্থাৎ রবিবারের আসরটা গুমটি-ঘরের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যেতে হবে পাঁচ নম্বরের বারান্দায়। আর বক্তব্য বিষয়? সেটা আর আপনাকে কী বলব? সকলের না হলেও অনেকের যা মাথায় ঢোকে এবং মনটাও একটু ছুঁয়ে যায়, এমনি ধারা কিছু একটা বেছে নিলেই হল।

    আমার তরফে চেষ্টার কোনো ত্রুটি হবে না। বলে নমস্কার করে প্রস্থান করলেন ব্রহ্মচারী।

    একটা রবিবার পেরিয়ে যাবার দু-তিন দিন পর মাতব্বরগোছের কয়েকজন কয়েদী জেলরবাবুর আপিসে এসে জানালেন, তাঁরা আমার দর্শন প্রার্থী। প্রার্থনা মঞ্জুর হল। ওঁদের মধ্যে সবচেয়ে যিনি বিজ্ঞ, মুখপাত্ররূপে নিবেদন করলেন : বাইরে থেকে যে পণ্ডিতজী এসে থাকেন, তাঁকে আর কষ্ট দেবার প্রয়োজন নেই; এখন থেকে তাদের সাপ্তাহিক ধর্মোপদেশের ভারটা ব্রহ্মচারীর উপরেই ছেড়ে দেওয়া হোক। তাঁকে সমর্থন করলেন ডেপুটেশনের দ্বিতীয় মেম্বর, আমাদের গোশালার মেট : হ্যাঁ, হুজুর, ওই ব্যবস্থাই পাকা করে দিন। আহা! পাগলা ঠাকুরের গল্প যা শুনলাম, কেউ আর শুকনো চোখে উঠে যেতে পারে নি।

    পাগলা ঠাকুরের গল্প!

    পরমহংসদেবের কথা বলছে, স্যর। —সস্নেহ হাসির সঙ্গে বললেন মুখপাত্র : তাঁরই লীলা-প্রসঙ্গ আলোচনা করছিলেন ব্রহ্মচারী।

    হংস-টংস জানি না বাপু।—একটু বিরক্তির সুরে মন্তব্য করলেন মেট, সোজাসুজি বুঝি আমাদের পাগলা ঠাকুর। বিছানার তলায় কোথায় দুটো পয়সা পড়ে আছে; তার জন্যে সারারাত ঘুম নেই; এক হাতে টাকা আর এক হাতে মাটি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছ—টাকা মাটি, মাটি টাকা, তারপর সবসুদ্ধ গঙ্গার জলে ছুঁড়ে ফেলে তবে নিশ্চিন্দি। এ কি যে-সে পাগল!

    অথচ সেই টাকার জন্যে কী না হচ্ছে দুনিয়ায়! — দার্শনিক গাম্ভীর্যের সঙ্গে যোগ করলেন তৃতীয় ব্যক্তি, আমাদের দরজিশালায় পাহারা। টুপির চারদিকে লাল ফিতার বর্ডার দেখে বুঝলাম তিনি একটি দায়মলি, অর্থাৎ খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন দণ্ড নিয়ে এসেছেন জেলখানায়। মেটের তখন রীতিমত ভাব এসে গেছে। সেই আবেগের সুরেই বলে চললেন, অনেকটা আপন মনে : মাঘ মাসের কনকনে শীত। কোঁচার খুঁট ছাড়া দ্বিতীয় বস্তুর নেই। রানীমা নিজে হাতে একখানা দামী শাল দিয়ে গেলেন। গায়ে দিয়ে কোথায় বাঁচবে, না, হাঁপ ধরে গেল ঠাকুরের। টান মেরে ফেলে দিয়ে প্রাণটা জুড়োয়।… কী সুন্দর করে বললে আমাদের বেহ্মচারী : মা যাকে দু হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে আছেন, শাল দিয়ে সে করবে কী? মাঘের শীত তার গায়ে লাগলে তো?

    জেলখানার জনমত যাই হোক, একজন কয়েদীকে সরকারীভাবে তাদের ধর্মশিক্ষক নিযুক্ত করা যায় না। সে এক্তিয়ারও আমার নেই। রিলিজিয়স্ টীচারদের নিয়োগকর্তা ডিভিশনাল কমিশনার। সে নিয়োগ ঘোষণা করে সরকারী গেজেট। ব্রহ্মচারীর পক্ষে এ-হেন পদলাভ কোনোমতেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু সপ্তাহান্তে পদহীন শিক্ষকের বেসরকারী আসন প্রায় স্থায়িভাবেই তার দখলে এসে গেল। দেখলাম, পণ্ডিতজী লোকটি সত্যই পণ্ডিত। ধন এবং মান দুটো যেখানে ধরে রাখা সম্ভব নয়, বুদ্ধিমানের মতো অর্ধং ত্যজতি সূত্র গ্রহণ করে প্রথমটা অর্থাৎ মাসিক দশ টাকার মায়া ত্যাগ করলেন। ছুটি ফুরিয়ে যাবার পরেও প্রতি রবিবারে তাঁর ‘কাজের চাপ’ কিংবা ‘শারীরিক অসুস্থতা’ নিয়মিতভাবে দেখা দিতে লাগল, এবং আমার গোশালার মেট ও তার বন্ধুদের পাগলা ঠাকুরের গল্প শোনায় কোনো বাধা রইল না।

    .

    অনেক দিন আগে একটি ভ্রমণকারী ইংরেজ-দম্পতি আমার জেল দেখতে এসেছিলেন। কথায় কথায় স্ত্রী প্রশ্ন করলেন, যারা জেল খাটে, ডু দে আর্ন এনিথিং? বললাম, না। স্বামীটি সুরসিক। সহাস্যে প্রতিবাদ করলেন, হোয়াই, দে আর্ন দেয়ার ফ্রীডম! ঠিকই বলেছিলেন ভদ্রলোক। আমার এই পান্থশালায় অনির্দিষ্ট বাস নিষিদ্ধ। নির্ধারিত কাল শেষ হলে সবাইকেই যেতে হয়। একটি করে দিন যায়, আর সেই মুক্তির দিনটি এক ধাপ করে এগিয়ে আসে। জেলখাটা মানেই মুক্তি-অর্জনের সাধনা। সে দিন কারও দ্রুত আসে, কারও বা বিলম্বে। ডোরাকাটা জাঙিয়া কুর্তা এঁটে কোমরে গামছা জড়িয়ে দিনের পর দিন যাকে দেখে এসেছি মাকু চালাতে কিংবা লোহা পিটতে, হঠাৎ একদিন সকালবেলা আপিসে গিয়ে দেখলাম, সদ্য-কাচা ধুতি আর পাটভাঙা শার্ট পরে সে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার টেবিলের ও পাশটিতে। খালাস-দপ্তরের ডেপুটিবাবু ওয়ারেন্ট থেকে উচ্চকণ্ঠে মিলিয়ে নিলেন তার নাম-ধাম-বিবরণ। তার পর তার প্রসারিত হাতের ওপর গুনে দিলেন খোরাকির পয়সা আর সেই সঙ্গে একখানা রেলের পাস। সেলাম করো। – শেষ হুঙ্কার দিলেন বড় জমাদার। শেষবারের মতো পালিত হল তাঁর অমোঘ আদেশ। কেউ আবার সেলামের ঠিক ভঙ্গিটি এড়িয়ে গিয়ে মৃদু হেসে হাত দুখানা তুলল একবার কপালের কাছাকাছি। বোধ হয় জানাতে চাইল, এতদিন যে সম্পর্ক ছিল আমাদের মধ্যে—শাসক আর শাসিতের সম্পর্ক—আজ তার অবসান; তাই রেখে যাচ্ছে একটি সসঙ্কোচ নমস্কার বিদায়-বেলার শ্রদ্ধা ও প্রীতির নিদর্শন।

    এমনই ভাবেই একদিন দেখা হয়ে গেল সহদেব ঘোষের সঙ্গে। অ্যাটেনশন নয়, নত হয়ে জোড় হাত করে দাঁড়িয়ে ছিল আমার টেবিলের ও-পাশে খালাসী-কয়েদীর নির্দিষ্ট জায়গায়। বড় জমাদারের হুকুম শুনে না ঠুকল সেলাম, না জানাল নমস্কার; কেঁদে উঠল হাউ হাউ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল পা দুটো, যেমন করে ধরেছিল আর-একদিন, আদায় করেছিল গুরুসেবার অধিকার। সেদিনের অভিজ্ঞতার পর, আজ আর বাধা দেবার চেষ্ট। করলাম না। খানিকক্ষণ পরে ও নিজেই উঠে বসল এবং চোখ মুছে বলল, আমার গুরুকে দেখবেন। আমার তো আর থাকবার উপায় নেই। ছেলেটা রইল; ওই দুটো ভাত ফুটিয়ে দেবে।

    বললাম, বেশ; তাই হবে।

    আর-একটা ভিক্ষা চাইছি যাবার সময়। জানি, না বললেও আপনি করবেন। তবু মন মানে না। আপনার কলমে যতখানি আছে, মাপ দিয়ে গুরুকে আমার তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবেন।

    কিন্তু আমার কলমের দাক্ষিণ্য পুরোপুরি বর্ষণ করবার আগেই হঠাৎ একদিন হুকুম এল : স্ট্রাইক দি টেন্ট। শুরু হল প্যাকিং। ওখানকার মেয়াদ আমার শেষ হল। কিন্তু ব্রহ্মচারীর মেয়াদ তখনও বছর তিনেক বাকী। চার্জ দেবার আগের দিন সমস্ত কয়েদীর স্পেশাল ফাইলের হুকুম দিলেন জেলরবাবু। শেষবারের মতো শুনতে হবে বাকী রইল কার কী নালিশ, অপূর্ণ রইল কার কোন্ আবেদন। শুনলাম, এবং যা শুনলাম, তার কতক মিটিয়ে আর বেশীর ভাগ মেটাবার বৃথা আশ্বাস দিয়ে আপিসে ফিরে এসেই ব্রহ্মচারীকে ডেকে পাঠালাম। সঙ্গের সিপাইটিকে ইঙ্গিতে সরিয়ে দিয়ে বললাম, কই, তুমি তো কিছুই চাইলে না ব্রহ্মচারী? কুণ্ঠানত চোখ দুটো হঠাৎ একবার চমকে উঠে তাকাল আমার দিকে। তার কারণ বোধ হয় যাবার দিনে আমার এই প্রথম ‘তুমি’ সম্বোধন। আমার মুখে ‘আপনি’ শুনতেই সে অভ্যস্ত। এই কথাটির মধ্যে যে দূরত্ব আছে, তার জন্যে সদানন্দের মনে মনে একটা গোপন দুঃখ ছিল, যা কোনো- দিন মুখ ফুটে না বললেও আমি টের পেয়েছি। তবু আমার রাজ্যে সে একক, সকলের চেয়ে স্বতন্ত্র, এই সুস্পষ্ট সত্যকে স্বীকৃতি দেবার জন্যেই বোধ হয় আমার মুখ থেকে আপনা হতেই ‘আপনি’ বেরিয়ে যেত। চলে যাবার ক্ষণে তেমনি আপনা হতেই আজ ‘তুমি’ বেরিয়ে গেল।

    ব্রহ্মচারীর শীর্ণ মুখের উপর ফুটে উঠল একটি জোরকরে-টেনে- আনা ম্লান হাসি। আমার প্রশ্নের সরাসরি জবাব পেলাম না। তার বদলে এল একটি সনিশ্বাস স্বগতোক্তি; না চাইতেই যা পেয়েছি, সে শুধু আমার অন্তর্যামীই জানেন।

    হয়তো তাই। দার্শনিক মানুষ; কী দেখেছে, কী পেয়েছে, সে-ই জানে আর জানেন তার অন্তর্যামী। আমার অ-দার্শনিক সাদা চোখে তা পড়বার কথা নয়। আমি জানি, ওর জন্যে যা করব ভেবেছিলাম, তা করতে পারি নি। ভেবেছিলাম, আরও কিছুদিন গেলে বাকী মেয়াদটা মকুব করবার সুপারিশ জানিয়ে একটা প্রস্তাব পাঠাব সরকারের কাছে। কোন্ ভরসায় এবং কোন্ যুক্তিবলে এ ইচ্ছা আমি মনে মনে পোষণ করেছিলাম, সেটা একটু বিশদভাবে বলা প্রয়োজন।

    বিচারককে যে রাস্তায় চলতে হয়, তার পরিসর অতি সংকীৰ্ণ, চারদিকে প্রসিডিওর-কোড এবং এভিডেন্স-অ্যাক্টের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেখানে হৃদয়বৃত্তির প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু সরকার নামক যে সর্বশক্তিমান যন্ত্র মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে, তার পথ অনেক প্রশস্ত। সেটাও আইনের প্লাস্টার দিয়ে গাঁথা কংক্রীট রোড, কিন্তু তার মাঝে মাঝে আছে নরম মাটির ফাঁক কিংবা কোমল ঘাসের আস্তরণ। আদালতের প্রধান লক্ষ্য অপরাধী নয়, তার অপরাধ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, সে লঘু না গুরু, যে ব্যক্তিটি সে প্রশ্ন অবান্তর; বিচার্য বিষয় তার কৃতকর্মের লঘুত্ব বা গুরুত্ব। বিচারককে অন্ধ বলা হয়। আসলে তিনি অন্ধ নন, একচক্ষু। রেল-কোম্পানির একমুখী লণ্ঠনের মতো তাঁর দৃষ্টি ও শুধু একটি দিকে প্রসারিত-উপস্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পর্ক কী এবং কতখানি, সাক্ষ্যপ্রমাণের আলোয় তারই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। সে সম্পর্ক সাব্যস্ত হল কি না এবং কতটা সাব্যস্ত হল, এইটুকু দেখেই তিনি নিশ্চিন্ত। পিছনে দাঁড়িয়ে যে বিচিত্র মন, যে দুয়ে প্রেরণা, যে আবাস্থিক জটিলতা ওই লোকটিকে টেনে নিয়ে গেছে ওই বিশেষ অপরাধের আওতার মধ্যে, বিচারশালার একদর্শী লণ্ঠনের সন্ধানী আলো সেখানে পৌঁছয় না।

    কিন্তু সরকারের হাতে যে লণ্ঠন, সেটা চতুর্মুখ অপরাধের বে চিত্র আদালতে উদ্ঘাটিত হল, তারই মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার আলো ছড়িয়ে আছে ওই অপরাধী মানুষটার পেছনে সামনে, ডাইনে বাঁয়ে। সে কোথায় ছিল, কোথায় এসেছে, কেন এল এবং ভবিষ্যতে কোথায় যাবে, সব দিকে দৃষ্টি রেখে রাষ্ট্রকে চলতে হয়। বিচারক দণ্ড দিয়েই ক্ষান্ত; পরের অংশ অর্থাৎ দণ্ডিতের বোঝা পড়ল গিয়ে শাসকের ঘাড়ে। সে ভার বইতে গিয়ে তাকে তাকিয়ে দেখতে হয় কাঠগড়া এবং কারাপ্রাচীরের বাইরে, খুঁজতে হয় অপরাধ নামক ওই বিশেষ কার্যটির অন্তরালে লুকিয়ে আছে কোন্ রহস্যময় গোপন শক্তি, কোন্ সামাজিক পারিবারিক কিংবা পারিপার্শ্বিক ব্যাধির তাড়না! সেইখানেই শেষ নয়। সেই সঙ্গে দেখতে হয় তাদেরও, অপরাধী লোকটার চারদিকে যারা ছড়িয়ে আছে কিংবা একদিন জড়িয়ে ছিল।

    তা ছাড়া, যাকে আমরা ক্রিমিন্যাল বলি, তার সবখানিই তো ক্রিমিন্যাল নয়। জেলের মধ্যে তার যে পরিচয়, তার বাইরেও তার একটা সত্তা আছে, যেখানে সে বৃহত্তর সমাজের জীব, মানুষের দরবারে একাধারে দাতা এবং প্রার্থী। সমাজকে সে কিছু দিতে চায়, কিছু আবার পেতেও চায় তার হাত থেকে। সেই আদানপ্রদানের জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে দীর্ঘ অবরোধে যখন তার জীবন কাটে, সেটা শুধু তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ক্ষতি নয়, সামাজিক অপচয়

    এই সব দিকে তাকিয়ে এবং এই কথা মনে রেখে আদালত যে দণ্ডবিধান করেন, রাষ্ট্র তাকে অনড় ও অব্যয় বলে মেনে নিতে পারে না। মানবগোষ্ঠীর সর্বব্যাপী স্বার্থের দিকে চেয়ে আইনপ্রদত্ত অবরোধ বা কারাবন্ধনের কবল থেকে কোনো কোনো বন্দীকে ফিরিয়ে আনতে হয় তার ফেলে-যাওয়া বৃহত্তর জীবনের মধ্যে; প্রয়োগ করতে হয় দণ্ডিতের দণ্ড হ্রাস করবার বিশেষ ক্ষমতা। আইনের দাবি অলঙ্ঘ্য হলেও চূড়ান্ত নয়। তার কারণ, আইনের চেয়েও মানুষ বড়।

    এই সূত্রে সুধীন ব্যানার্জি নামে একটি ছোকরা কয়েদীর কথা এসে পড়ল। সেটুকু শেষ করেই আসল প্রসঙ্গে ফিরে আসব।

    ঘন ঘন খানাতল্লাশ জেল-ডিসিপ্লিনের একটি প্রধান অঙ্গ। এমন অনেক জিনিস আছে, যেগুলো জেলের বাইরে নিতান্ত নির্দোষ, কিন্তু পাঁচিল পার হয়ে ভিতরে এলেই মারাত্মক। আপনার পকেটে একখানা ছুরি বা হাতে এক টুকরা দড়ি দেখলে আমি বিচলিত হব না। কিন্তু ওই দুটি তুচ্ছ বস্তু যখন বেরিয়ে আসে আমার কয়েদীর কম্বলের ভাঁজ কিংবা স্যাণ্ডালের সুকতলার তলা থেকে, তখন আর আমি নির্বিকার থাকতে পারি না। নস্যের মতো নিরীহ দ্রব্য সংসারে আর কী আছে? মানুষের সমাজে সবচেয়ে যারা নির্বিরোধ, যাদের আমরা বলি ব্রাহ্মণপণ্ডিত, তাদেরই ওটা নিত্যসহচর। পাত্রাধার তৈল কিংবা তৈলাধার পাত্র এই জাতীয় সূক্ষ্ম নৈয়ায়িক তর্কের সহজ মীমাংসার জন্যেই নস্যের প্রয়োজন, এই কথাই তো জানা ছিল। জেলখানায় এসে দেখলাম, নস্ত্য নামক মহাবস্তুর আর-এক মূর্তি, বড় বড় পণ্ডিতের কল্পনায় যা কোনোদিন আসে নি। এক দল ভারী-মেয়াদী দুর্দান্ত কয়েদী চালান হয়ে যাচ্ছিল এক জেল থেকে আর-এক জেলে। লোহার জালে ঘেরা সুরক্ষিত প্রিজন ভ্যান। চল্লিশ মাইল বেগে ছুটে চলেছে ফাঁকা মাঠের মধ্য দিয়ে। দু পাশে দুটি রাইফেলধারী সিপাই। হঠাৎ এক কয়েদীর দেহের কোন গুপ্ত স্থান থেকে বেরিয়ে এল একটি সুদৃশ্য নস্যের ডিবা এবং তারই সুগন্ধিচূর্ণে আচ্ছন্ন হয়ে গেল দু জোড়া সতর্ক চক্ষু। চোখের পলকে একখানা ক্ষিপ্র হাত তাদেরই একজনের পকেট থেকে তুলে নিল চাবির গোছা। দরজা খুলতে লাগল কয়েক সেকেণ্ড। সিপাইদের হল্লা শুনে ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছিল। খানিকটা গুঁড়ো চোখে পড়তেই পায়ের চাপ পড়ল ব্রেকের উপর। মিনিট কয়েক পরে তাকাবার মতো অবস্থা যখন ফিরে পেলেন সিপাইজীরা, দেখলেন, প্রিজন ভ্যান শূন্য এবং ফাঁকা মাঠের এখানে ওখানে দু-চারজন নিরীহ গোপালক ছাড়া জনমানবের চিহ্ন নেই।

    যথাসময়ে সার্চ বা তল্লাশি নামক অস্ত্রটি যদি সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা হত, ওই ডিবাটি এত বড় একটা বিপর্যয় ঘটাতে পারত না। সুতরাং জেলকর্মীদের কর্মসূচির একটা বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে ওই সার্চ। যখন-তখন ছোট-বড় দল নিয়ে এখানে-ওখানে হানা দিয়ে তারা খুঁজে বেড়ায়, জেল কোডের ভাষায় যার নাম prohibited article বা নিষিদ্ধ বস্তু। ওই বিশাল গ্রন্থের একটা গোটা পাতা জুড়ে রয়েছে তার দীর্ঘ তালিকা। অস্ত্রশস্ত্র, দড়ি, বাঁশ, টাকাকড়ি, হরেক রকম নেশার উপকরণ—এ সব তো বটেই, তা ছাড়াও ওই দলে পড়ে বই খাতা চিঠিপত্র কিংবা অন্য কোনো জিনিস, তার পেছনে যদি না থাকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা অনুমোদন।

    এমনি এক সার্চ-পার্টি একদিন সুধীন ব্যানার্জির কম্বলের তলা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এল খান দুই চিঠি, যার উপরে না ছিল জেল- অফিসের রবারস্ট্যাম্প, না পাওয়া গেল সুপারের স্বাক্ষর। মাল- সমেত আসামীকে আমার দরবারে হাজির করা হল। তার সঙ্গে লিখিত অভিযোগ—ফাউণ্ড ইন পজেশন অফ, আঅথরাইজড লেটারস্। হুখানা চিঠিই ওর চিঠির উত্তরে লেখা; এসেছে ওর মায়ের কাছ থেকে, এবং কারা-প্রবাসী পুত্রের জন্য মায়ের যে স্বাভাবিক ব্যাকুলতা — তার বেশী অর্থাৎ জেলের তরফ থেকে আপত্তি করবার মতো কিছুই নেই তার কোনোখানে। কাগজ দুখানা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী করে এল এগুলো? কাকে দিয়ে আনলে?

    অনুনয়ের সুরে উত্তর এল : অন্যায় করেছি সার্। এবারটির মতো মাপ করুন।

    আমার কথার জবাব দাও।

    সুধীন ক্ষণেকের তরে আমার মুখের দিকে চেয়ে চোখ নামিয়ে বলল, এনেছে একজন সিপাই; কিন্তু তার কোনো দোষ নেই। আমিই তাকে আনতে বলেছিলাম।

    তোমার চিঠিও বুঝি সে-ই নিয়ে গিয়েছিল?

    মাথা নেড়ে জানাল, হ্যাঁ।

    বললাম, জেল থেকে চিঠি পাঠাবার নিয়ম কী, জান?

    জানি, আপিসে দিতে হয়।

    তা না করে, গোপনে লোক দিয়ে পাঠালে কেন? কী ছিল চিঠিতে?

    সুধীন নিরুত্তর। একটু জোর দিয়ে বললাম, বলো।

    উত্তর এল মৃদু ভীরু কণ্ঠে, তার সঙ্গে জড়ানো অনেকখানি সঙ্কোচ ও লজ্জা : মা বড্ড কান্নাকাটি করছিল আসবার সময়। আর কোনোদিন করব না, সার্।

    চোখের কোণ বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছিল। তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল।

    আমার প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর পেলাম না। কিন্তু এটুকু বোঝা গেল, সে চিঠিতে যা ছিল সেটা বিশেষ কিছু না হলেও এমন কিছু, যা শুধু মায়ের কাছেই বলা যায়, সরকারী সেন্সরের স্কুল দৃষ্টির সামনে তুলে ধরা যায় না; অন্তত একটি পনেরো বছরের ছেলের পক্ষে তা অত্যন্ত কঠিন।

    টিকিট উলটে দেখলাম, ৩০২ ধারার কেস। খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন, অর্থাৎ কুড়ি বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন সেসন জজ। আপীলও না-মঞ্জুর হয়ে গেছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘খুন করেছিলে?’ অভ্যাসের বশে এ-জাতীয় প্রশ্ন অনেককেই করে থাকি। উত্তরে ‘না’ শুনে শুনে কানও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রেও তার পুনরুক্তির জন্য প্রস্তুত ছিলাম। তাই বিস্মিত হলাম যখন কানে এল একটি মৃদু কিন্তু দৃঢ় এবং সুস্পষ্ট উত্তর : ‘হ্যাঁ’।

    মুখ থেকে আপনিই বেরিয়ে গেল, কাকে খুন করেছ?

    দাদাকে।

    দাদাকে! নিজের দাদা?

    হ্যাঁ, সৎভাই।

    কেন?

    সুধীন উত্তর দিল না। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল, ঠিক পাশটিতে দাঁড়িয়ে ছিল যে গার্ড, তার মুখের দিকে। সরিয়ে দিয়ে ওকে কাছে ডেকে নিলাম। হাতের ইঙ্গিতে লোকটিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়াল আমার চেয়ারের হাতলের পাশে। কয়েক মিনিট তাকিয়ে রইল মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল : আমার মায়ের অপমান সইতে পারি নি, সার্। শান্ত হবার সময় দিলাম। দ্বিতীয় প্রশ্নের আর প্রয়োজন হল না। দ্বিধাহীন সহজ সুরে সুধীন বলে গেল তার খুনের ইতিহাস। তা থেকে যে তথ্যটুকু সংগ্রহ করা গেল, তাকে মোটামুটি রূপ দেবার চেষ্টা করছি।

    সুধীনের মা ওর বাবার দ্বিতীয় পক্ষ। প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর বৃদ্ধবয়সে আবার যখন টোপর পরলেন ভদ্রলোক, তাঁর বড় ছেলের বয়স তখন বাইশ পেরিয়ে গেছে। অর্থাৎ নববধূর চেয়ে তিন-চার বছরের বড়। তা ছাড়া আরও চারটি ছেলে-মেয়ে। সবগুলোই নতুন মাকে বাইরে মেনে নিলেও মনে মনে সয়ে নিল না। বিশেষ করে তাঁর লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো রূপ শুধু ওদের নয়, আত্মীয়স্বজন সকলেরই চক্ষুশূল হয়ে উঠল। এক বছর পরেই সুধীন এল তাঁর কোলে, এবং তার বছর দুই পরে কর্তা হঠাৎ ওপারে যাত্রা করলেন। উইল একটা রেখে গিয়েছিলেন, এবং তার মধ্যে মা ও ছেলের স্বচ্ছলভাবে চলার মতো ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু প্রথম পক্ষের তরফ থেকে সেটাকে ভুয়ো প্রমাণ করবার জন্যে আদালতে মামলা দায়ের হল। তারপর যা হয়ে থাকে। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত এবং সেখান থেকে উচ্চতর আদালত ঘুরে এসে বছর বারো পরে লড়াই যখন থামল, তার আগেই মামলার আসল লক্ষ্য, অর্থাৎ উইল-বর্ণিত বিষয়-আশয় তৃতীয় পক্ষের হাতে চলে গেছে এবং তার সঙ্গে গেছে বনেদী পরিবারের লোহার সিন্দুকের সঞ্চয়—নগদ টাকাকড়ি এবং সোনা-দানা।

    সুধীনের মামার বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না। ধন জন দুয়েরই অভাব। বিপদের দিনে অসহায় বিধবাকে সাহায্য করবার জন্যে এগিয়ে এসেছিলেন একটি উকিল—ওর মায়ের দূর-সম্পর্কের কোন জ্ঞাতি-ভাই। যে-হেতু সে ব্যক্তিটি বয়সে যুবক, ওঁদের দুজনকে যুক্ত করে নিত্য নতুন মুখরোচক কাহিনী পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সে সবগুলোর রচনা এবং প্রচারের প্রধান অংশে ছিল সুধীনের বৈমাত্রেয় ভ্ৰাতা। সাহায্যকারী তার ইয়ার-বন্ধুর দল। মামলায় হেরে যাবার পর ওই অস্ত্রটাকেই তারা সমস্ত শক্তি এবং উৎসাহ দিয়ে নির্লজ্জভাবে কাজে লাগাতে লাগল। একদিন সন্ধ্যার পর কী একটা দরকারী কাজে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তার উকিল-মামা। কথা হচ্ছিল ভিতরের মহলে একটা বারান্দায়। এমন সময় হঠাৎ সেখানে হানা দিল বিনাতা-পুত্র এবং তার দলবল। সুধীন ছিল তার পড়বার ঘরে। হৈ-হল্লা শুনে ছুটে এসে দেখল, দাদার দুটি বন্ধু তার মামাকে দু দিক থেকে ধরে আছে, আর সবাই মিলে কুৎসিত চিৎকার করে যা বলতে চাইছে, তার অর্থ—এই মাত্র একটা অতি জঘন্য কাণ্ড তারা হাতে হাতে ধরে ফেলেছে। ও-তরফের সঙ্গে যুক্ত দু-একজন প্রতিবেশীও এসে পড়েছিলেন। তাঁদের একজনের মন্তব্য শোনা গেল : দুটোকেই থানায় নিয়ে যাও। দঙ্গলের ভেতর থেকে মহাকলরবে উঠল তার সমর্থন। সেই কদর্য দৃশ্যের একান্তে ঢু হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে নিঃশব্দে বসে আছেন তার মা। মনে হচ্ছিল যেন একখানা শ্বেতপাথরের গড়া মূর্তি। প্রবীণ প্রতিবেশীর প্রস্তাব শুনে নিশ্চল দেহটা যেন একবার নড়ে উঠল। সুধীনের দাদা তখন এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে মায়ের ঠিক সামনে। হাত-পা নেড়ে চিৎকার করে বলছে, কী হল? গায়ে হাত দিতে হবে, না, নিজেই উঠবে? মায়ের কোনো সাড়া নেই। মাথাটা আরও নুয়ে পড়েছে মাটির দিকে। জ্ঞান আছে কি না বোঝবার উপায় নেই। কে একজন বলে উঠল, হাত ধরে টেনে তোল। যত সব নষ্টামি। সেই মতলবেই বোধহয় আরও খানিকটা এগিয়ে আসছিল ওর দাদা। কিন্তু হাত বাড়াতে না-বাড়াতেই গর্জে উঠল রিভলভার। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, সব অন্ধকারে একাকার হয়ে গেছে। কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যাবার পর চেতনারাজ্যে আবার যখন আলো জ্বলে উঠল, চোখ খুলে দেখল সুধীন, বারান্দার উপর পড়ে আছে একটা নিশ্চল দেহ। কপালের একটা ধার থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। সেইদিকে ভীতিবিহ্বল তীব্র দৃষ্টি মেলে তেমনই মূর্তির মতো চেয়ে আছেন তার মা। কানে গেল একটা ফিসফিস আওয়াজ : ‘এ কী করলি খোকা?’ আঙিনায় জনমানবের চিহ্নমাত্র নেই।

    সকলের অলক্ষ্যে কখন যে সে নিঃশব্দে সরে গিয়েছিল, মায়ের ঘরের আলমারির ভিতর থেকে তুলে এনেছিল গুলিভরা রিভলভার, কিছুই আর মনে তার পড়ে না।

    আপনি বলুন তো সার্, অন্যায় করেছি আমি?—উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল সুধীন। খানিকটা বোধ হয় তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ যেন ধাক্কা খেয়ে আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। চেয়ে দেখলাম, সরল নিষ্পাপ দুটি কিশোর-চোখ সাগ্রহ প্রশ্ন তুলে তাকিয়ে আছে আমার মুখের পানে। নরহস্তা জানতে চাইছে, সে অন্যায় করেছে কি না! তবু সহজ উত্তরটা আমার জিভে এসে আটকে গেল।

    হ্যাঁ, একটা অন্যায় আমি করেছি।—এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল সুধীন, কিন্তু সে শুধু মার কথায়। আমার মাকে তো আপনি দেখেন নি, সার্! দেখলে বুঝতেন, তাঁর চোখের দিকে একবার তাকালে কিছুতেই ‘না’ বলা যায় না।

    জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, কী সে অন্যায়? তার আগেই জবাব পাওয়া গেল-কোর্টে দাঁড়িয়ে কতকগুলো মিথ্যা বলে এলাম। ইচ্ছে করে, মারব বলেই মেরেছি—এ কথা কিছুতেই বলতে দিলে না মা। বলতে হল, উকিলদের বানানো কথা – রিভলভার নিয়ে এসেছিলাম, লোকগুলোকে ভয় দেখাতে। দাদা ছুটে এসে হাত চেপে ধরল, কেড়ে নিতে চাইল রিভলভার। আমি ছাড়তে চাই নি। ধস্তাধস্তির সময় কখন গুলি ছুটে গেছে, আমি জানি না। যখন বলি, হাকিম আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একবার ইচ্ছে হল বলে দিই—এ সব মিথ্যা কথা; দাদাকে খুন করেছি আমি। বলতেও যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, মার সেই চোখ দুটো, আর বলতে পারলুম না। কিন্তু জজসাহেব বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন, সব বানিয়ে বলছি। তাই এত চেষ্টা করেও মা আমাকে ছাড়িয়ে নিতে পারল না।

    মিনিট কয়েক বিরতির পর আবার শুনতে পেলাম, সুধীন বলছে—তার জন্যে আমার মনে কোনো কষ্ট নেই সার্। খুন করেছি, তার শাস্তি তো পেতেই হবে। কিন্তু যখন মনে পড়ে, কুড়ি বছর পরে ফিরে গিয়ে মাকে আর দেখতে পাব না, মাথাটা একদম খারাপ হয়ে যায়।

    শুষ্ক সান্ত্বনার সুরে বললাম, কেন, দেখতে পাবে না কেন?

    মা কিছুতেই বাঁচবে না অতদিন।

    চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এবার আর মুছে ফেলবার চেষ্টা করল না। কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর বললাম, মাকে লিখে দাও, মাঝে মাঝে এসে তোমাকে দেখে যাবেন।

    তা হয় না সার্। বড্ড সেকেলে বনেদী ঘর আমাদের। জেলখানায় মা আসতে পারে না। না আসাই ভালো। আমার এই পোশাক মা সইতে পারবে না।

    খুনের অপরাধে এই ষোলো বছরের ছেলেটাকে যাবজ্জীবন দণ্ড নিয়ে বিচক্ষণ বিচারক তাঁর আইন-প্রদত্ত কর্তব্য পালন করেছিলেন তার উপরে ছিল মহামান্য হাইকোর্টের সমর্থন। বিচারে নিশ্চয়ই কোনো খুঁত ছিল না। তবু সেদিন মনে হয়েছিল, এইটাই কি শেষ কথা? এর পরে আর কিছু নেই? সুধীন ব্যানার্জি খুনী। সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে, দুনিয়ার মানুষের কাছে এই কি তার একমাত্র পরিচয়? তার বাইরে সে আর কিছু নয়? কোনোদিন কিছু ছিল না, কোনোদিন কিছু হতেও পারবে না?

    মনে হয়েছিল, যে যাই বলুক, আইনের এই সূক্ষ্ম চোখটাই সব নয়। মানুষকে দেখবার চেনবার আরও অনেক চোখ আছে। অনেক দিক থেকে দৃষ্টি ফেললে তবে তার পূর্ণ রূপ ধরা পড়ে। মানব-সমাজের পক্ষ থেকে সে দৃষ্টিপাতের দায়িত্ব সরকারের। হয়তো এই রকম একটা মনোভাব থেকেই একদিন সুধীনকে ডেকে বলেছিলাম, মাকে লিখে দাও লাটসাহেবের কাছে দরখাস্ত করতে।

    কিসের জন্যে সার্?

    তোমার খালাসের জন্যে।

    সুধীন হাসল; একটুখানি ম্লান হাসি। তারপর বললে, আপনি ভাবছেন, এ-সব কথা তাকে মনে করিয়ে দিতে হয়? কোনো দিকে কোনো চেষ্টাই বাকী রাখে নি মা। লাট সাহেবের কাছেও পিটিশন করতে চেয়েছিল। কিন্তু উকিল-মামা বড় বড় উকিলদের সঙ্গে পরামর্শ করে এসে বললেন, এখনও তার সময় হয় নি। আরও কিছুদিন না গেলে কোনো ফল হবে না।

    হয়তো সেই কিছুদিন অপেক্ষা করেই আবেদন পাঠিয়েছিলেন উকিলবাবুরা, এবং যথাসময়ে তার ফলও দেখা দিয়েছিল। কারাবাসের আড়াই বছর পূর্ণ হলে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪০১ ধারা প্রয়োগ করে বাকী অংশটা মকুব করবার আদেশ দিয়েছিলেন প্রাদেশিক সরকার। আদেশ দেবার আগে যথারীতি তার চরিত্র এবং চালচলন সম্বন্ধে একটা রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছিলেন, এবং আমরা যে তার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিলাম সে কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।

    .

    সুধীন ব্যানার্জির সঙ্গে ব্রহ্মচারীর কোথাও কোনো মিল নেই। অমিলের অংশটাই বরং অতিমাত্রায় ব্যাপক এবং গভীর। প্ৰথম জন হত্যা করেছিল মানুষ, দ্বিতীয় জন মনুষ্যত্ব। নরঘাতক একদিন ক্ষমা পেলেও পেতে পারে, কিন্তু নারীধর্ষকের মার্জনা নেই। সুধীনের তরফ থেকে মানবতার দুয়ারে আবেদন করবার অবসর ছিল। সংবেদনশীল মানবসমাজের পক্ষে সরকার সে আবেদন গ্রহণও করেছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মচারীর বেলায় সে অবকাশ কোথায়? সংসারের কাছে রোষ এবং ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই তার প্রাপ্য নেই। তবু যে সরকারী দাক্ষিণ্য লাভের জন্য সুপারিশ পাঠাবার কথা আমার মনে হয়েছিল, তার কারণ আমিও স্পষ্ট করে জানি না। হয়তো মনে করেছিলাম, জঘন্য অপরাধে দণ্ডিত এই সদানন্দের মধ্যে আর-একটা যে মানুষ আছে, যার পরিচয় আমি পেয়েছি, পেয়েছে আমার জেলখানার লোক, তাকে যদি দীর্ঘকাল ধরে এই পাঁচিলের আড়ালে পঙ্গু করে ফেলে রাখা হয়, তাতে কারও কোনো লাভ নেই। তার চেয়েও বড় কারণ, কোন্ যুক্তিবলে জানি না, আমার মনের কোণে একটা বিশ্বাস ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, ব্রহ্মচারী নির্দোষ। অপরাধের দণ্ড সে ভোগ করেছে, সেটা সে করে নি, করতে পারে না। সেদিন বিদায়-মুহূর্তে ব্রহ্মচারীর সেই স্বগত উক্তির উত্তরে আমার এই যুক্তিহীন বিশ্বাসটাই বাইরে বেরিয়ে এল। বললাম, কী পেয়েছ, তা তুমিই জান। আমি তো জানি, কিছুই দিই নি, দিতে পারি নি। যা হয়তো পারতাম, মনে মনে যা ভেবে রেখেছিলাম, সেটুকুও শেষ পর্যন্ত করে উঠতে পারি নি। চক্রান্তের জালে জড়িয়ে একটা নির্দোষ মানুষ জেলে পচতে থাকল, আর—

    হঠাৎ কেমন যেন বিচলিত হয়ে পড়ল ব্রহ্মচারী। চকিতে একবার আমার দিকে চেয়ে কথাটা শেষ করবার আগেই বলে উঠল, নির্দোষ! না না; নির্দোষ আমি নই।

    নির্দোষ নও!—যন্ত্রচালিতের মতো আবৃত্তি করে গেলাম। ব্রহ্মচারী সে প্রশ্নের আর জবাব দিল না; মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল।

    জীবনে অনেক কারণে অনেক আঘাত পেয়েছি। কিন্তু সেই দিন যা পেয়েছিলাম, আজও বোধ হয় কাটিয়ে উঠতে পারি নি।

    .

    জেলখানার লোক আমি। আমার সঙ্গে আমার বন্দীদের সম্পর্ক, যতক্ষণ তারা থাকে আমার পাঁচিলের মধ্যে। বাইরে এলে তাদের আলাদা রূপ। সেখানে তারা আমার কেউ নয়, আমিও তাদের কেউ নই। সুতরাং ব্রহ্মচারী-উপাখ্যান এইখানেই শেষ হবে, এইটাই ছিল সঙ্গত এবং স্বাভাবিক। কিন্তু হল না। বছর তিনেক পরে, আমার মনের কোণ থেকে যখন সে নিঃশেষে মিলিয়ে গেছে, হঠাৎ আমার গৃহকোণে তার দেখা পেলাম। শুধু দেখা নয়, তার সঙ্গে পেলাম তার প্রমাণিত অপরাধ এবং তারও পূর্বেকার সুদীর্ঘ কাহিনী। এই কথাগুলো শোনাবার জন্যেই খালাস হবার কদিন পরেই আমার নতুন কর্মস্থলে তার আকস্মিক আবির্ভাব। কুশল-প্রশ্নাদির পর বলল, জেলে থাকতেই বলতে পারতাম; অনেক দিন বলবার আকাঙ্ক্ষাও যে না হয়েছে তা নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিরস্ত করেছি।

    বললাম, কেন?

    একটু ইতস্তত করে উত্তর দিল ব্রহ্মচারী, আপনার দয়ার ওপর নতুন করে আর-এক দফা অত্যাচার করতে মন সায় দেয় নি।

    কথাটা এক রকম করে বুঝলাম। পাছে আমার মনে হয়, সত্য কাহিনী বলবার ছলে এ শুধু নিজের অপরাধ ঢেকে রেখে সুবিধা বা অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা, তাই নিজের সম্বন্ধে সে আগাগোড়া মৌন থেকে গেছে। আজ আর সে আমার কয়েদী নয়। তাকে দেবার মতো অনুগ্রহ বা নিগ্রহ কোনোটাই আমার হাতে নেই। তাই বলবার যে বাধা ছিল, তাও চলে গেছে।

    কিন্তু সে কাহিনীর পুনরুক্তি করতে গিয়ে আমি যে মস্ত বড় বাধায় এসে ঠেকলাম! সেটা হচ্ছে তার ভাষা। সুনির্বাচিত সংস্কৃত শব্দের পরিমিত প্রয়োগ ব্রহ্মচারীর প্রতিটি বাক্যকে যে মার্জিত এবং মধুর রূপ দান করে থাকে, তার সামান্য অংশ আয়ত্ত করতেই আমার জীবন কেটে যাবে। তা হলে তো আর এ কাহিনী বলা চলে না। তাই নিরুপায় হয়ে এবং আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমার এই জেলের তৈরী অন্ত্যজ ভাষাতেই শুরু করে দিলাম।

    .

    যে বংশে ব্রহ্মচারীর জন্ম, গুরুগিরি এবং পৌরোহিত্যই তাদের কৌলিক পেশা। তার বাবা হৃষীকেশ ‘আচার্য পর্যন্ত এই কুলধারা অব্যাহত ছিল। যজন, যাজন, অধ্যাপনা – এই ত্রিবিধ বৃত্তির অন্তত দ্বিতীয়টি তিনি সযত্নে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু পুত্রদের আমলে এসে কোনোটাই আর বজায় রইল না। প্রথম পুত্র মোক্তারি পাস করে শহরে গিয়ে পসার জমিয়ে বসল। দ্বিতীয়টিও শহরের কোনো বড় রাস্তার মোড়ে সাজিয়ে বসল মনিহারী দোকান। তৃতীয় এবং কনিষ্ঠ এই সদানন্দ তখন গ্রামের ইস্কুলে উপর-দিকের ছাত্র। হেডমাস্টার মুক্তকণ্ঠে তার ইংরেজী-জ্ঞানের প্রশংসা করেন। তাই শুনে গোপনে নিশ্বাস ফেলেন হৃষীকেশ। ছেলেদের সম্বন্ধে বাবার মনের এই অনুক্ত ক্ষোভটুকু সদানন্দের কাছে লুকনো ছিল না। নিজের অবর্তমানে গৃহদেবতা নারায়ণ-শিলার ভবিষ্যৎ ভেবে তিনি যে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাঁর মুখের দিকে চেয়ে এটাও সে এক রকম করে বুঝতে পেরেছিল। হঠাৎ একদিন দেখা গেল তার অ্যালজেব্রা এবং গ্রামারের আড়ালে একখানা নতুন বইয়ের আমদানি হয়েছে। তার নাম নিত্যপূজা-পদ্ধতি। একটা ছুটির দিনের দুপুরবেলা সদ্য নিদ্রা- ভঙ্গের পর বড় বউঠাকুরানী যাচ্ছিলেন তার ঘরের পাশ দিয়ে। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। বন্ধ দরজার আড়াল থেকে ভেসে আসছিল অনুচ্চ কণ্ঠের গুঞ্জরণ-–খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্ৰ-বদনং লম্বোদরং প্রস্যন্দন-মদগন্ধ-লুব্ধ-মধুপব্যালোল গণ্ডস্থলং…। বামাকণ্ঠের হাসির শব্দে থেমে গেল গণেশের ধ্যান। দরজার এ পাশ থেকেই পরিহাসতরল কণ্ঠে বললেন বউদিদি, সাবাস! তুমিই দেখছি বংশের ধারা বজায় রাখবে ঠাকুরপো। যাই, নাপিত ডেকে পাঠাই। সামনের চুলটা কদমছটি করে পেছনে বেশ মোটা একটা – কী যেন বলে?

    গড়িয়ে পড়ল হাসির ফোয়ারা। সদানন্দের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। কিন্তু বউঠাকুরানীর অপেক্ষায় না থেকে সে নিজেই নাপিত ডেকে পাঠাল; এবং চুল ছাঁটবার পর পিছন দিকের পুষ্ট শিখাটি কারও নজর এড়াল না। তার পরদিন সকাল সকাল পড়া শেষ করে স্নান সেরে ওই বইখানাকে নিয়েই ঢুকল গিয়ে ঠাকুর- ঘরে। দৈনন্দিন রুটিনমতো হৃষীকেশ নদীতে স্নান সেরে কমণ্ডলু হাতে গঙ্গাস্তব পাঠ করতে করতে ফিরছিলেন। বাড়ি ঢুকেই কানে গেল ঘণ্টার শব্দ। ঠাকুরঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। নিষ্পলক চক্ষে দেখতে লাগলেন কিশোর পূজারীর সেই অপটু হাতের দেব-পূজার প্রয়াস।

    সন্দানন্দের চোখে পড়ল, বৃদ্ধ পিতার বহু-উপবাস-ক্লিষ্ট শীর্ণ মুখখানা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কী যেন বলতে গিয়ে নিজেকে সংবরণ করলেন হৃষীকেশ। তারপর সহজ সুরে বললেন, আজ ইস্কুল নেই তোর?

    —পূজোটা সেরে নিয়েই যাব। লজ্জিত মৃদু সুরে উত্তর করল সদানন্দ, মুদ্রাটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না, একটু দেখিয়ে দেবেন?

    সেইদিন থেকে কুলবিগ্রহের নিত্যপূজার ভার নিল বালক সদানন্দ। দাদাদের তর্জন, বউদিদের পরিহাস, সহপাঠীদের বিদ্রুপ তাকে নিরস্ত করতে পারল না। প্রথম দিকে ত্রুটি- বিচ্যুতি যেটুকু ছিল, পিতার সাহায্যে দু-দিনেই কাটিয়ে উঠল। একটু একটু করে অন্যান্য পূজা-প্রণালীও যত্ন করে শেখালেন হৃষীকেশ। ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ হল না, কিন্তু পড়াশুনায় আগের মতো অখণ্ড মনোযোগ বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াল।

    হৃষীকেশকেও অনেক অনুযোগ শুনতে হল ছেলেদের কাছে। স্বর্গতা জননীর উল্লেখ করে বললেন মোক্তারবাবু, মা বেঁচে থাকলে কি তাঁর কোলের ছেলেটার ভবিষ্যৎ এমন করে নষ্ট করতে পারতেন আপনি?

    হৃষীকেশ প্রথমটা চমকে উঠলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, নষ্ট কাকে বলছ? ছেলের মেজাজ ফেটে পড়ল : পুরুতগিরি করতে গিয়ে লেখাপড়া যে গোল্লায় গেল, দেখতে পাচ্ছেন না?

    হৃষীকেশ ধীরভাবেই বললেন, ওর দাদারা যদি লেখাপড়া করেও গোল্লায় গিয়ে থাকে, ও না হয় না করেই যাবে।

    বছর দুই পরে সদানন্দের ইস্কুলের পড়া শেষ হল। পাস করে গেল ভালোভাবেই। জলপানির আশা করেছিলেন হেডমাস্টার। তা আর হল না। কিছুদিন আগে ব্যাধি আর বার্ধক্যের চাপে প্রায় অচল হয়ে পড়েছিলেন হৃষীকেশ। যজমান-বাড়ির ক্রিয়াকর্মে প্রায়ই গিয়ে উঠতে পারতেন না। সে দায়টাও এসে পড়েছিল সদানন্দের ঘাড়ে।

    পরীক্ষার ফল বের হবার কয়েকদিন পরে তার ভবিষ্যতের ভাবনা যখন নতুন করে দেখা দিয়েছে সমস্ত পরিবারের মনে, এমনি সময়ে একদিন পাশের গ্রামের কোনও এক পুরাতন যজমানের বৃষোৎসর্গের অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফিরেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। দীর্ঘ চেষ্টায় জ্ঞান ফিরল, কিন্তু সে শুধু ক্ষণেকের জন্যে। মনে হল, শেষবারের মতো কাকে যেন খুঁজছেন চারপাশে। ছেলেমেয়েরা কাছেই ছিল। ছুটে এসে ঝুঁকে পড়ল। একে একে সবার দিকে চেয়ে চোখ দুটো স্থির হয়ে দাঁড়াল কণিষ্ঠ পুত্রের মুখের ওপর ঠোঁট দুখানা নড়ে উঠল কয়েকবার, কিন্তু স্বর ফুটল না। চোখের কোণ বেয়ে বেরিয়ে এল কয়েক ফোঁটা জল। আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, রুদ্ধবাক মৃত্যু-পথযাত্রীর সেই দুটি আকুল চক্ষের শেষ আবেদন সদানন্দের কাছে আস্পষ্ট রইল না। কানের কাছে মুখ নিয়ে অশ্রুজড়িত কণ্ঠে চিৎকার করে বলল, বাবা, আপনার সব কাজ আমি মাথায় তুলে নিলাম। আপনি নিশ্চিন্ত মনে ভগবানের নাম করুন।

    ক্ষণেকের তরে, মনে হল সেই যন্ত্রণা-বিকৃত রেখাকীর্ণ মুখের উপর ফুটে উঠল প্রশান্তির চিহ্ন। আশ্বাসময় গভীর তৃপ্তিতে চোখ দুটো বুজে এল, আর খুলল না।

    শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে যাবার পর যথারীতি শহরে গিয়ে কলেজে ভরতি হবার তাগিদ যখন এল, সদানন্দ প্রস্তুত হয়েই ছিল, জবাব দিতে দেরী হল না—তা কী করে হয়? ঠাকুরপূজো কে করবে? তা ছাড়া এত সব যজমান শিষ্য—

    —চুলোয় যাকগে যজমান শিষ্য। রুখে উঠলেন বড়দাদা, সারাজীবন চালকলা বেঁধে চলবে তোর? নিজের ভবিষ্যতের কথাটাও একবার ভাবছিস না?

    সদানন্দ হেসে ফেলল : ভাবছি বৈকি। কিন্তু ভবিষ্যতের চেয়েও বড় ভবিতব্য। তাকে কেউ খণ্ডাতে পারে না।

    বড়দাদা আর সইতে পারলেন না, উঠে চলে গেলেন। বউদিদি বললেন, তার মানে পড়াশুনা আর করবে না?

    —করব, তবে কলেজে নয়।

    —কলেজে নয় তো কোন্‌খানে?

    —জায়গাটা তোমাদের পছন্দ হবে না।

    —তবু বলো না একবার শুনি?

    —টোলে।

    বউদিদি হেসে উঠলেন : এইবার তা হলে ষোলো কলা পূর্ণ হল।

    হৃষীকেশের এক সতীর্থ এবং বন্ধু ছিলেন সিলেটের কোন্ গ্রামে। মহা-মহোপাধ্যায় পণ্ডিত এবং টোলের অধ্যাপক। মাঝে মাঝে ওঁদের পত্র-বিনিময় হত। ঠিকানাটা বাড়িতেই ছিল। পিতৃবিয়োগের দুঃসংবাদ জানিয়ে তাঁরই আশ্রয় প্রার্থনা করে চিঠি লিখল সদানন্দ। সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল। দুঃখ প্রকাশ এবং যথারীতি সান্ত্বনা দিয়ে শেষের দিকে লিখলেন অধ্যাপক—‘ছাত্রাভাবে আমার চতুষ্পাঠী কিছুদিন হইল বন্ধ করিয়া দিতে হইয়াছে। উদরান্নের জন্য অন্য বৃত্তি গ্রহণ করিয়াছি। নিয়মিত অধ্যাপনার ব্যবস্থা নাই। তবু তোমার শিক্ষার ভার গ্রহণ করিলাম। তুমি তো আমার ছাত্র হিসাবে আসিবে না, পুত্র হিসাবে আসিবে। যত শীঘ্র সম্ভব চলিয়া আসিও।’

    শুভলগ্ন দেখে একদিন সিলেটের পথে পা বাড়াল সদানন্দ। সঙ্গে রইল সামান্য পরিধেয় এবং তারই সঙ্গে সযত্নে জড়ানো গৃহদেবতা শালগ্রামশিলা। কয়েকজন শিষ্য এবং যজমান তার ভরণ-পোষণের ভার সমেত লেখাপড়া এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা করে দেবার প্রস্তাব করেছিলেন, সদানন্দ গ্রহণ করে নি। বিনীত কণ্ঠে জানিয়েছিল, আপনাদের দেবার মতো প্রাণ আছে, সামর্থ্যও আছে। কিন্তু আমার যে নেবার মতো যোগ্যতা নেই। সেইটুকু অর্জন করবার জন্যেই এটা আমার তীর্থযাত্রা। দুটো বছর সময় চাইছি। ফিরে আপনাদের কাজেই লাগব।

    সন্ধ্যার দিকে অধ্যাপকের ঘাটে এসে নৌকা ভিড়ল। সেই দিনটি তার সমস্ত প্রীতি, মাধুর্য, বিস্ময় ও শঙ্কার শিহরণ নিয়ে আজও অম্লান হয়ে আছে সদানন্দের বুকের মধ্যে। হয়তো চিরদিন থাকবে।

    এগিয়ে এসে সস্নেহ সমাদরে এই বিনয়-নম্র প্রিয়দর্শন ছেলেটিকে গ্রহণ করলেন সস্ত্রীক অধ্যাপক। দুজনকে প্রণাম করে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল দরজার সামনে। হঠাৎ শিউরে উঠল সদানন্দ, এবং সঙ্গে সঙ্গে নেমে এল চোখের পাতা। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনদিকে তাকিয়ে অধ্যাপক-গৃহিণীর স্নিগ্ধ হাসিটিও অকস্মাৎ নিবে গেল। তার সঙ্গে বেরিয়ে এল একটি গভীর নিঃশ্বাস।

    ভয়ে ভয়ে আর-একবার চোখ তুলল সদানন্দ। চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। মুখের বাঁ দিক জুড়ে বিস্তৃত দাহচিহ্ন। কুঁচকে যাওয়া চামড়ার পাশ দিয়ে কয়েকটা দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। তার উপরে স্থির হয়ে আছে একটি বিকৃত বিকল চোখ।

    বাঁ দিকটা যেমন বীভৎস, মুখের ডান অংশটা তেমনই নিটোল সুন্দর। তার চেয়েও আশ্চর্য তার অপরূপ দেহশ্রী। একরাশ কালো কোঁকড়ানো চুলের আড়ালে নাতি প্রশস্ত কপাল। তার উপরে সযত্নে-রচিত কাঁচপোকার টিপ। গ্রীবার বাঁকটি অনবদ্য। সুগঠিত উন্নত বুক, সুঠাম পেলব বাহু। ক্ষীণ কোমর এবং যৌবনপুষ্ট নিম্নাঙ্গের চারদিক বেষ্টন করে বুকের উপর দিয়ে কাঁধের আড়ালে নেমে গেছে যে সাধারণ শাড়িখানা, সে শুধু অঙ্গাবরণ নয়, অঙ্গশোভা—এমন একটি বিশেষ ভঙ্গিতে জড়ানো, যাতে করে দেহকে আড়াল করেছে যতখানি, তার চেয়ে বেশী করেছে প্রকাশ।

    কন্যার এই অপূর্ব অঙ্গবিন্যাস ও তপ্তকাঞ্চনবর্ণের দিকে চেয়ে বোধ হয় মহাদেবীর ধ্যান মনে পড়েছিল ন্যায়রত্নের। তাই তার নাম দিয়েছিলেন চণ্ডী। সদানন্দের চোখে সে ধরা দিল আর-এক রূপে। অপরাহ্ণের পড়ন্ত আলোয় ওই দ্বারলগ্না নারীমূর্তির দিকে তাকিয়ে বিচিত্র রোমাঞ্চে কেঁপে উঠল তার ভীরু হৃদয়। বিস্ময়, বেদনা এবং ভয়ের সঙ্গে জড়ানো আর একটা অনাস্বাদিত অনুভূতি, যাকে সে চেনে না। তার জাগ্রত যৌবনের দুয়ারে এই প্রথম নারীর পদক্ষেপ। কিন্তু পূজারীর শ্রদ্ধাপ্লুত পুলকে মন ভরে উঠল কই?

    ওই নারীদেহ এবং দাঁড়িয়ে থাকবার প্রগল্ভ ভঙ্গি, বিশেষ করে ডান দিকের ওই মোহন চক্ষুটির নির্লজ্জ চটুল হাসি সদানন্দের গোপন অন্তর্লোকে কোন্ এক সুপ্ত প্রবৃত্তির ঘুম ভাঙিয়া দিল! কী কদর্য তার রূপ! নিজের অশুচি অন্তরের দিকে চেয়ে মনে মনে শিউরে উঠল। চোখ বুজে ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করতে চেষ্টা করল। কিন্তু তাঁর দ্বার জুড়ে রইল ওই কদাননা, শোভনতনু, মোহিনী রমণী।

    অপুত্রক-গৃহে পুত্রের স্থান পেল সদানন্দ। নিজের বাড়িতে তার ডাকনাম ছিল সদা। এখানে হল আনন্দ, আর চণ্ডীর মুখে আনন্দদা, কখনও বা আরও সংক্ষেপে নন্দদা। আবেগে, উচ্ছ্বাসে, সোহাগে জড়ানো সে ডাক যখন কানে যায়, সমস্ত দেহমূল যেন নড়ে ওঠে। শান্ত, গম্ভীর, সংযমশীল ব্যাকরণের ছাত্র সদানন্দ কিসের যেন উন্মাদনা অনুভব করে তার বুকের মধ্যে। এড়িয়ে চলতে চায়। গুরুনির্দিষ্ট নীরস পাঠের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে চায় একাগ্র মন। তার পর হঠাৎ এক সময়ে অনুভব করে, কখন সে মন মোহাচ্ছন্ন হয়ে গেছে দুখানি সুকোমল চঞ্চল হাতের স্পর্শ-সুখের স্মৃতি-নেশায়, অজ্ঞাতসারে কামনা করছে সেই নিষিদ্ধ পঙ্কিল সুখের পুনরাবৃত্তি।

    সে কামনা অপূর্ণ থাকে না। নির্জন ঘরে কখনও ঝড়ের মতো এসে পড়ে উদ্বেলিত প্রাণরসে-ভরা একটি যৌবন-মত্ত দেহ। পিঠের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে যায় অর্থহীন প্রলাপ। তারপর হঠাৎ সামনে এসে মুগ্ধবোধ বন্ধ করে দিয়ে তেমনই ঝড়ের মতো ছুটে যায়।

    কোনও কোনও দিন চুপিচুপি এসে বসে পড়ে একান্ত কাছটিতে। গলা জড়িয়ে ধরে আশ্চর্য করুণ কণ্ঠে বলে, আমাকে তুমি দু চক্ষে দেখতে পার না, তাই না নন্দদা?

    সদানন্দের শিরায় শিরায় উদ্দাম হয়ে ওঠে রক্তস্রোত, বন্যার বেগে ভেঙে যেতে চায় সংযমের বাঁধ। ইচ্ছা হয়, নিবিড় পেষণে লুঠে নেয় ওই উত্তপ্ত উদ্ধত বুকের সুধার ভাণ্ডার। হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে আসে। খানিকটা সরে গিয়ে বলে, বিরক্ত কোরো না, পড়তে দাও।

    —না, দেবো না পড়তে কোঁকড়ানো খোলা চুলে ছন্দময় দোলা দিয়ে বলে ওঠে মোহিনী। ব্যবধানটুকু আবার ঘুচে যায়। বলে, আচ্ছা নন্দদা, এই সব অং বং পড়তে গেলে কেন তুমি? সুধার বর কেমন তিনটে পাস দিয়েছে। মস্ত বড় চাকরি পাবে এবার।

    –কে সুধা?

    —ও হরি! সুধাকে চেন না? ওই বোসেদের মেয়ে। কত ঘটা করে বিয়ে হল, তুমি আসবার ঠিক সাত দিন আগে। চাকরি পেলেই ওরা বাসা করবে, বলছিল সুধা।

    বেশ, এবার একটু ওদিকে যাও দিকিন। জ্যাঠাইমা ডাকছেন।

    চণ্ডীর কানে বোধ হয় সে কথা পৌঁছল না। কেমন উদাস কোমল হয়ে গেল কণ্ঠস্বর। আপন মনে বলে চলল, সুধা আর আমি একসঙ্গে তিন বছর পড়েছি শিবু পণ্ডিতের পাঠশালায়। সবাই বলত, চণ্ডীর কাছে সুধা দাঁড়াতেই পারে না। রূপেও না, গুণেও না। তারপর এই দশা হল। বাবা বললেন, এ মুখ নিয়ে আর পাঠশালায় যেতে হবে না। কারও বাড়ি গিয়ে একটু বসি, তাও পছন্দ করেন না। লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে হয়। একলা একলা কি ভালো লাগে সব সময়? বলো নন্দদা, লাগে?

    সদানন্দ উত্তর দিল না। এ দুর্ঘটনার ইতিহাস সে আগেই শুনেছিল। মামার বাড়িতে স্টোভ জ্বালতে গিয়ে হঠাৎ কী করে আগুন লেগেছিল মুখের বাঁ দিকটায়, তারপর কেমন করে ওই অত রূপ চিরদিনের তরে হারিয়ে ‘প্রাণটুকু শুধু ফিরে পেল হতভাগী’,—সব কথাই শুনিয়েছিলেন অধ্যাপক-গৃহিণী। কিন্তু নিজের মুখে সে কিছুই বলে নি। জীবনের এত বড় একটা বিপর্যয় তাকে যে কোথাও স্পর্শ করেছে তারও কোনও আভাস পায় নি সদানন্দ। উদ্দাম কলহাস্যমুখর চিত্তচঞ্চলার কণ্ঠে আজকার এ সুর একেবারে নতুন।

    পরক্ষণেই আবার ফিরে এল সেই উচ্ছল কণ্ঠ : জানো নন্দদা, সুধার ছোড়দা ওই অশোকটা কী পাজী! বলে কি শুনবে?—’অনেক রাত্তিরে একবার আসিস চণ্ডী। দরজা ভেজানো থাকবে!’ কী অসভ্য!

    সদানন্দের মনে হল, এই গোপন অভিসারের সমস্ত কলুষ-রস উপচে পড়ছে ওই মেয়েটার চোখ-মুখের প্রতিটি রেখায়। সেই নেশার মত্ততা ফুটে উঠেছে তার প্রতিটি অঙ্গে। হঠাৎ ছুটে এসে তার গায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে চিবুকে হাত দিয়ে বলল, মুখ গোমড়া করে রইলে যে বড়? হিংসে হচ্ছে বুঝি? সত্যি, ব্যাটাছেলেগুলো ভা—রি হিংসুটে! তবু অমন করে থাকবে? বেশ, চললাম আমি অশোকের কাছে। বলেই লুটিয়ে পড়া আঁচল কুড়িয়ে নিয়ে হাসির লহর তুলে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে চলে গেল।

    নারীর সঙ্গে নদীর এবং যৌবনের সঙ্গে জোয়ারের মিল আছে—এটা কাব্যের কথা কবিরা বলেন, নদীর যেমন রূপ বদলায়, গতি বদলায়, তেমনি ক্ষণে ক্ষণে নব রূপ আর নতুন পথ নেয় নারী। তার হৃদয়স্রোত বেশীদিন এক খাতে বয় না। সদানন্দ কাব্যচর্চা করে না, নীরস ব্যাকরণের ছাত্র। তবু গুরুগৃহে মাস কয়েক কেটে যাবার পর এই রকম একটা অনুভূতি তার মধ্যে জেগে উঠল। মনে পড়ল তাদের গ্রামের নদীতে একবার বান ডেকেছিল। কোথা থেকে এর উদ্দাম জলোচ্ছ্বাস নির্লজ্জের মতো দু-তীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেঙে দিয়েছিল কঠিন মাটির বন্ধন, ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল গৃহস্থের সম্ভ্রম ও আশ্রয়। তার পর দেখা গেল, সে প্রচণ্ড গতিবেগ আর নেই, পড়ে আছে শুধু একটা নিস্তেজ জলধারা। কিন্তু নদীর গতি কোনোদিন শেষ হয় না, শুধু তার দিক বদলে যায়। তাদের গ্রাম ছেড়ে নবগঙ্গাও চলে গেল দূরান্তরে। আর-এক গ্রামের বুক চিরে বয়ে চলল তার বিপুল স্রোত।

    বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে অধ্যাপকের কয়েক বিঘা জমি ছিল। মাঝে মাঝে যখন তিনি শিষ্য-পরিক্রমায় বেরোতেন চাষবাস তদারক করবার ভার পড়ত সদানন্দের উপর। একদিন দুপুর-রোদে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে দেখল, চণ্ডী বসে বসে কী একটা সেলাই করছে। কিছদিন আগেও এমনি মাঠ থেকে ফিরে এলে সে পাখা নিয়ে ছুটে আসত, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাওয়া করতে শুরু করত। ঘাম ঝরে গেলে কোনোদিন টেনে খুলে দিত গায়ের জামা। বাধা-নিষেধ, সঙ্কোচ-আপত্তি সব উড়ে যেত তার উচ্ছ্বসিত হাসির তোড়ে। আজ তার ওঠবার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। একবার শুধু চোখ তুলে দেখে সেই সেলাই নিয়েই ব্যস্ত হয়ে রইল। নিজের ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এক গেলাস খাবার জল চাইল সদানন্দ। মৃদুকণ্ঠে সাড়া দিয়ে এবার উঠে দাঁড়াল চণ্ডী। জল গড়িয়ে নিয়ে গেলাসটা রাখল একটা টুলের ওপর। খাওয়া হলে তুলে নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

    সেই অপত্রিয়মাণ দেহের দিকে চেয়ে সদানন্দের মনে পড়ল তার গ্রামের নদী নবগঙ্গার কথা। তার মতো এই নারীও একদিন উত্তাল তরঙ্গ তুলে এসেছিল তার জীবনে, আশৈশব- গড়ে-তোলা কঠোর সংযমের বাঁধের উপর হানা দিয়ে তার অস্তিত্বের মূল ধরে নাড়া দিয়েছিল। আর একটু হলেই হয়তো সব ভেঙে পড়ত। কিন্তু তার আগেই সে সরে গেছে। পড়ে আছে শুধু ওই নির্জীব নিস্তরঙ্গ রূপধারা, এই মাত্র যে চলে গেল তার সম্মুখ দিয়ে। কিন্তু স্রোত সরে গেলেও মরে যায় নি। অনুকূল হাওয়ায় এখনও সেখানে উদ্দাম জোয়ারের আলোড়ন দেখা দেয়। আর-এক কূলে গিয়ে আছড়ে পড়ে তার ঢেউ।

    কুলনাশিনীর এই নতুন অভিমান সদানন্দের কাছে গোপন ছিল না, বোধ হয় গোপন রাখতে সে চায়ও নি। চরম উপেক্ষায় নিতান্ত অবহেলাভরে নিজেকে সে সরিয়ে নিয়ে গেছে এই নীরস শুদ্ধাচারীর নিরুত্তাপ সংস্রব থেকে। সব দেখে, সব জেনেও একটি কথাও বলে নি সদানন্দ। সে যেন শুধু নিস্পৃহ দর্শকমাত্র, তার বেশী আর কিছু নয়। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, এই যে সে নির্বাক ঔদাসীন্যে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে আছে, এটা সংযম নয়—কাপুরুষতা, ক্ষমা নয়—অক্ষমতা। এগিয়ে গিয়ে পথ রোধ করাই পৌরুষের লক্ষণ। কেউ নেমে যেতে চাইলেই তাকে পাপের পথে ছেড়ে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া, ও তো শুধু ‘কেউ’ নয়। ওর সঙ্গে সম্পর্ক যদি নাও থাকে, যাঁরা তাকে স্নেহ এবং আশ্রয় দিয়ে আপনজনের অধিকার দিয়েছেন, সেই পরিবারের মান-সম্ভ্রম কুল-মর্যাদার দিকে চেয়ে তাঁদের এই বিপথগামিনী কন্যাকে রক্ষা করতে হবে।

    এই সব যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে সদানন্দ। কিন্তু এই কর্তব্যবোধের অঙ্কুশ তাকে সাময়িকভাবে সজাগ করে তুললেও কাজের পথে এগিয়ে যেতে পারে নি। মনের গহনে চোখ পড়তেই সন্দেহ জেগেছে, এর সবটাই হয়তো আত্মপ্রবঞ্চনা। যে-বস্তু তাকে চালনা করছে সে কি নিছক শুভাকাঙ্ক্ষী আশ্রয়দাতার প্রতি কর্তব্যবোধ, না তার সঙ্গে জড়ানো কোনও কামনাবিদ্ধ প্রবৃত্তির তাড়না? যে ধরা দিতে এসেছিল, যাকে অনায়াসে লাভ করা যেত নিজেই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। আজ যদি সে অন্য কারও হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে থাকে, আমার অন্তরে এ যন্ত্রণা কেন? এরই নাম কি ঈর্ষার জ্বালা? একেই কি বলে পরাজয়ের গ্লানি? কিংবা আমি স্বেচ্ছায় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি, এ কথা সত্য নয়। অক্ষম বলে তাকে ধরে রাখতে পারি নি। আমি হেরে গেছি, আর জয়ী হয়েছে ওই অশোক। আমার অত্যুচ্চ আদর্শের ধ্বজা আঁকড়ে ধরে অমি ছট্‌ফট্ করে মরছি, আর আমার এই অশক্ত মুষ্টির বন্ধন থেকে আমার কামনার ধন কেড়ে নিয়ে ভোগ করছে এমন একজন, রূপে গুণে বিদ্যায় চরিত্র-গৌরবে মহত্তর জীবনের মাপকাঠিতে যে আমার চেয়ে সর্বাংশে নিকৃষ্ট।

    দুর্বল মুহূর্তে এই সব কথা মনে হত সদানন্দের। কোনও কোনও দিন সমস্ত রাত এপাশ ওপাশ করে কেটে যেত। কখনও উঠে গিয়ে কত রাত্রির চঞ্চল প্রহর পায়চারি করে কাটিয়ে দিত বাড়ির সামনেকার মাঠটায়।

    এমনি এক বিনিদ্র রাত্রে সেই মাঠের ধারে একটা গাছের গোড়ায় বসে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, এই যে আজ সে দেশ ছেড়ে আত্মীয়-পরিজন সকলের একান্ত ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে চলে এসেছে, বরণ করে নিয়েছে এই অধ্যয়ন-কঠোর নিরানন্দ জীবনের দীনতা, তার একমাত্র উদ্দেশ্য স্বর্গত পিতার শেষ অভিলাষ পূর্ণ করে তাঁর আধ্যাত্মিক আদর্শকে রূপ দান করা। একটা চটুল-প্রকৃতি দুশ্চরিত্রা নারীর সঙ্গে নিজের পবিত্র, মহৎ-লক্ষ্য জীবনকে জড়িয়ে ফেলে আত্মহত্যা করতে সে আসে নি। সে নারী যে আজ তাকে স্বেচ্ছায় মুক্তি দিয়ে গেছে, এটা নিতান্তই বিধাতার আশীর্বাদ। সে একান্ত ভাগ্যবান। স্বর্গত পিতার পুণ্যবলই তাকে শেষ মুহূর্তে রক্ষা করেছে।

    স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে পিতার উদ্দেশে প্রণাম জানাল সদানন্দ। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। খণ্ড খণ্ড মেঘে ছেয়ে আছে শুক্লপক্ষের স্বচ্ছ আকাশ। তারই একখানার আড়াল থেকে হঠাৎ যেন ডুব-সাঁতার দিয়ে বেরিয়ে এল দ্বাদশীর চাঁদ। দিকে দিকে ছড়িয়ে গেল জ্যোৎস্নার প্লাবন। হেসে উঠল সিক্ত-পত্ৰ গাছপালার দল। পাতার আড়ালে এখানে ওখানে শোনা গেল দু-চারটি হঠাৎ জেগে ওঠা কাকের ডাক। আলো দেখে মনে করেছিল, ভোর হয়ে গেছে। ঘুম ভাঙতেই আবার নেতিয়ে পড়ল ঘুমের কোলে। বিশ্বপ্রকৃতির এই স্থির প্রসন্ন মূর্তির দিকে চেয়ে সদানন্দের সমস্ত অন্তর নির্মল আনন্দে ভরে উঠল। ইষ্টদেবতাকে প্রণাম জানিয়ে হৃষ্টমনে পা বাড়াল ঘরের দিকে।

    কয়েক পা গিয়েই থমকে দাঁড়াল। এত রাত্রে কার ছায়া পড়ল ওই হিজল গাছের ধারে? শুধু ছায়া নয়, তার পেছনে কায়াও আছে, যার প্রতিটি রেখা ওর চেনা। একটিবার তাকিয়েই গভীর ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু ফিরে যেতে পারল না। মুহূর্ত-পূর্বেকার সমস্ত সংকল্প ভাসিয়ে দিয়ে বুকের মধ্যে জ্বলে উঠল দুর্নিবার জ্বালা। কঠোর স্বরে বলল, দাঁড়াও। কায়া ধীরে ধীরে কাছে এসে দাঁড়াল, যেন কিছুই হয় নি এমনিভাবে অত্যন্ত সহজ সুরে বলল, কী বলছ?

    —কোথায় গিয়েছিলে?

    —তুমি বুঝি পাহারা দিচ্ছিলে বসে বসে? বলে হেসে উঠল চাপা হাসি।

    —চুপ করো। হাসতে লজ্জা করে না?

    —না, করে না। দীপ্ত-কণ্ঠে বলে উঠল চণ্ডী।

    —এত অধঃপাতে গেছ!

    —যদি গিয়ে থাকি, তোমার কী, তুমি সে কথা বলবার কে?

    ডান চোখের ভিতর থেকে ঠিকরে এল অগ্নিশিখা। জ্যোৎস্নালোকে স্পষ্ট দেখতে পেল সদানন্দ। কিন্তু বলবার মত আর কোনও কথা খুঁজে পেল না। তার জন্যে অপেক্ষাও করল না নির্লজ্জ অভিসারিণী। দৃপ্তভঙ্গিতে দ্রুত পায়ে চলে গেল। তার পরেই শোনা গেল খিড়কির কপাট বন্ধ করবার শব্দ।

    কম্বল-শয্যায় ফিরে গিয়ে আত্মস্থ হবার চেষ্টা করল সদানন্দ। ঠিকই বলেছে চণ্ডী—তুমি সে কথা বলবার কে? সত্যিই কেউ নয়। এ শুধু চণ্ডীর কথা নয়, কিছুক্ষণ আগে সে নিজেও তো মনে মনে এই সঙ্কল্পই গ্রহণ করেছে, এই পথেই চালিত করতে চেয়েছে তার ভবিষ্যৎ জীবনধারা। ওই মেয়েটা তার কেউ নয়। ওর শুভাশুভের সঙ্গে তার কোনও যোগ নেই। ওই পাপস্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাই তার সাধনা। সুষ্পষ্ট ভাষায় সেই একই কথা ও জানিয়ে দিয়ে গেল। সহজ এবং সুগম করে দিয়ে গেল, তার অভীষ্টসিদ্ধির পথ। তবে কিসের এ ক্ষোভ? কেন মনে হচ্ছে এটা তার অপমান, এটা তার পরাজয়? বুকের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত মুচড়ে উঠছে কিসের বেদনায়? কে যেন বলছে তার কানে কানে, যে ছিল একান্তভাবে তোমার, মনের গোপন গহনে একদিন মোহ- সঞ্চার করেছিল যার মোহনস্পর্শ, আজ সে তোমার কেউ নয়। তোমার জীবন থেকে সে হারিয়ে গেছে, আর তারই জন্যে তোমার অন্তর-জোড়া এই হাহাকার।

    না, না। তীব্র প্রতিবাদের আঘাতে সমস্ত সত্তাকে সচেতন করে উঠে বসল সদানন্দ। এই দৌর্বল্যতাকে জয় করতেই হবে। ছিঁড়ে ফেলতে হবে এই মোহপাশ। সমূলে উপড়ে দিতে হবে আবাল্যশুদ্ধ অন্তরের এক কোণে দেখা দিয়েছে যে পাপের অঙ্কুর। সেই সন্ধ্যা থেকে যে কলুষ চিন্তা তাকে অবিরাম অনুসরণ করে চলেছে, চোখ বুজলে পাছে আবার : তার কবলে গিয়ে পড়তে হয়, তাই বাকী রাতটুকু জেগে কাটিয়ে দেবে এই হল তার সিদ্ধান্ত। শুধু জেগে থাকা নয়, নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়া কোনও ধর্মগ্রন্থের পবিত্র পরিবেশের মধ্যে।

    কম্বল গুটিয়ে রেখে রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বেলে গীতা খুলে বসল সদানন্দ। দ্বিতীয় অধ্যায়, সাংখ্যযোগ। মোহাবিষ্ট অর্জুনের প্রতি শ্রীভগবানের উদাত্ত বাণী : ক্লৈব্যং মা গমঃ পার্থ,–হে পার্থ, কাপুরুষতাকে আশ্রয় কোরো না। ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং তত্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ—ওঠো, হৃদয়ের এই তুচ্ছ দুর্বলতা ত্যাগ করো।

    গোবর-নিকানো আঙিনার কোণে উত্তর ভিটাতে একখানা লম্বা ধরনের ঘর। খড়ের ছাউনি, মূলবাঁশের বেড়া, মাটির দাওয়া। পূর্বে-পশ্চিমে ছোট বড় দুটি কামরা। তাদের মাঝখানেও ওই ছ্যাঁচা বাঁশের দেওয়াল। ছোটটিতে থাকে সদানন্দ, বড়টি অধ্যাপকের। তারই পাশে আড়াআড়িভাবে আর একখানা পুবদুয়ারী চালাঘর। সেখানে থাকেন সকন্যা গৃহিণী। দু-দিন হল শিষ্যবাড়ি গেছেন অধ্যাপক। এখনও ফিরতে পারেন নি। নিজের ঘরে খোলা দরজার দিকে মুখ করে গভীর রাত্রির গীতাধ্যয়ন প্রথমে নীরবেই শুরু করেছিল সদানন্দ। তারপর কখন সেই পাঠ ক্রমশ মৃদু থেকে কিঞ্চিৎ উচ্চতর গ্রামে এসে গেছে, বোধ হয় বুঝতে পারে নি। হঠাৎ দরজায় কার সাড়া পেয়ে চোখ তুলতেই কণ্ঠ থেমে গেল। রুক্ষ দৃষ্টি মেলে বিস্ময় মেশানো বিরক্তির সুরে বলল, তুমি এখানে?

    —ভয় নেই। মুখ টিপে হেসে জবাব দিল চণ্ডী, কেউ দেখে ফেলবে না। মা অঘোরে ঘুমুচ্ছে।

    —ঘরে যাও, আমার কাজ আছে।

    সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কোথায় গিয়েছিলাম, জানতে চেয়েছিলে। তাই বলতে এলাম।

    —কোনও দরকার নেই—বইয়ের দিকে চোখ রেখেই বলল সদানন্দ।

    —রাগ করেছ বুঝি?

    সদানন্দ এ কথার কোনও জবাব দিল না। চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঠিক তার সামনেটায় মেঝের উপর বসে পড়ল চণ্ডী। কিছুক্ষণ নীরবে চেয়ে থেকে যখন কথা বলল, তার সেই চপল সুর কোথায় মিলিয়ে গেছে, তার জায়গায় ফুটে উঠেছে গভীর করুণ রেশ। বলল, আমার দিকে একবার চেয়ে দেখো।

    সদানন্দ ক্ষণেকের তরে চোখ তুলেই আবার নামিয়ে নিল। বোধহয় সে দৃষ্টি সইতে পারল না। সেই সুরেই বলল চণ্ডী, আমি কুৎসিত। আমার মুখের দিকে চাইলে লোকে আঁতকে ওঠে। তাই বলে আমার এই রক্তমাংসের শরীরটাও কি মিথ্যা হয়ে গেছে? আমার কোনও সাধ নেই, লোভ নেই? সংসারে মেয়েমানুষ যা চায় তার কোনোটাই আমার জন্যে নয়?

    সদানন্দের কাছে এ প্রশ্নের কোনও জবাব ছিল না। থাকলেও বোধ হয় দিতে পারত না। ক্ষণকাল অপেক্ষা করে আবার বলল চণ্ডী, আমার বয়সী যে সব মেয়ে, আমরা যারা একসঙ্গে বড় হয়েছি, একে একে তারা সবাই চলে গেল—ঘর পেল, বর পেল। আমি কী পেলাম? আমি কী পাব? কী নিয়ে কাটাব আমার সারা জীবন? কেউ ভেবে দেখেছে সে কথা? কেউ না। তাই আমার পথ আমি নিজেই বেছে নিলাম। অশোক আমার মুখের দিকে চায় না, চাইতে ভয় পায়। আমার মনের খবরও সে জানে না। সে চেয়েছিল আমার এই দেহ! আমি দিয়েছি। কেন দেবো না? আর কেউ তো তাও কোনোদিন চায় নি।

    লজ্জাহীনা প্রগলভার দিকে ঘৃণারক্ত রূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সদানন্দ। শুধু ঘৃণা নয়, তার মধ্যে অপরিসীম বিস্ময়। পাপের এ কী অসঙ্কোচ স্বীকারোক্তি! বলতে ইচ্ছা হল : এ পথ ধরবার আগে, এই কলঙ্কের কথা মুখ ফুটে উচ্চারণ করবার আগে ওই পুকুর কি একবার চোখে পড়ে নি কলঙ্কিনী? বলতে ইচ্ছা হল, কিন্তু বলা গেল না কিছুই। দীর্ঘদিনের বাক্-সংযম রসনার গতি রুদ্ধ করে দিল। কিন্তু অন্তরের সমস্ত ঘৃণা এবং রোষ বেরিয়ে এল দুটি জ্বলন্ত চোখের ভিতর দিয়ে। সেই দিকে চেয়ে চণ্ডীর মনেও বোধহয় লাগল তার উত্তপ্ত স্পর্শ। উত্তেজিত দীপ্তকণ্ঠে বলল, কী দেখছ অমন করে? তুমি বলতে চাও, আমি নষ্ট হয়ে গেছি? হ্যাঁ, হয়েছি। কিন্তু তার জন্যে দায়ী কে?

    সে কথা কেমন করে বলবে সদানন্দ? তাকে কিছুই বলতে হল না। চণ্ডীর নিজের মুখ থেকেই এল তার প্রশ্নের উত্তর, দায়ী তুমি।

    —আমি!

    –হ্যাঁ, তুমি!

    এই আকস্মিক আক্রমণে সদানন্দের স্নায়ুকেন্দ্র যেন হঠাৎ বিকল হয়ে গেল। সেই বিমূঢ় মূর্তির দিকে চেয়ে বোধ হয় কিঞ্চিৎ দয়ার উদ্রেক হল নির্দয়ার। অনেকটা যেন সস্নেহ সমবেদনার সুরে বলল, সত্যি তোমার জন্যে দুঃখ হয়, নন্দদা। লোভ আছে, কিন্তু ভোগ করবার ক্ষমতা নেই, সাহস নেই। যার উপরে লোভ, তাকে আঁকড়ে ধরতে পার না! সেদিকে হাত বাড়াতেও ভয়। সেই না-পারাটাকে ফলাও করে বল—সংযম। আরও কী যেন একটা গালভরা নাম আছে তোমাদের শাস্ত্রে? ব্রহ্মচর্য না?—বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল।

    সেই হাসির তীক্ষ্ণ ফলাগুলো কেটে কেটে বসে গেল সদানন্দের সমস্ত দেহের পরতে পরতে। ওই মধুবর্ষী রসনায় এত বিষ, কেমন করে জানবে সে? কিন্তু যতই বিষাক্ত হোক, ওই অভিযোগের প্রতিটি বর্ণ সতেজ ও প্রাঞ্জল। মিথ্যা বলে প্রতিবাদ করবার সাধ্য নেই, হীন বলে উপেক্ষা করবার শক্তি নেই। তাই বলে সয়ে নেওয়াও যায় না। নিষ্ফল ক্ষোভ এবং অক্ষম লজ্জায় মাথাটা আরও নুয়ে পড়ল বুকের ওপর।

    সামনের দিকে আর একটু কাছে সরে এল চণ্ডী। আবেগভরা কণ্ঠে আবদার ঢেলে বলল, তুমি রাগ করলে! বাঃ, একটু ঠাট্টাও বুঝি করতে নেই? আচ্ছা যা বলেছি, সব ফিরিয়ে নিলাম। এবার হল তো? শোনো। একবার চেয়ে দ্যাখ না?…বেশ, এ পোড়া মুখ দেখতে না চাও, দেখো না। নিজের মনের দিকে চেয়ে বুকে হাত দিয়ে বলো তো—চণ্ডী তোমার কেউ নয়, কোনোদিন কেউ ছিল না! এই চোখেই কি দেখেছ তাকে এতদিন?…বিশ্বাস করো নন্দদা, যতই নেমে গিয়ে থাকি, আজও তোমারই আছি। তুমি আমাকে টেনে তোলো। একটিবার, শুধু একটিবার মুখ ফুটে বলো

    পায়ের উপর আচমকা স্পর্শে চমকে উঠল সদানন্দ। পদ্মকোরকের মতো দুখানা হাত, নবনীর মতো কটি আঙুল, কবিরা যার নাম দিয়েছেন চম্পকাঙ্গুলি, একদিন যার মদির স্পর্শ নেশা ছড়িয়ে দিয়েছে সমস্ত চেতনায়, এই মুহূর্তে হঠাৎ মনে হল, কতগুলো কুৎসিত বিষধর সাপ জড়িয়ে ধরেছে তার পায়ের পাতা। দু-হাত পেছনে ছিটকে গিয়ে চিৎকার করে উঠল : ছুঁয়ো না, সরে যাও।

    বিস্ময়বিহ্বল করুণ কণ্ঠে বলল চণ্ডী, সরে যাব! এ কথা তুমি বলতে পারলে নন্দদা? —দুশ্চরিত্র স্ত্রীলোকের ছায়া মাড়ালেও পাপ। যাও, বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে। সমস্ত দেহটাকে একটা রূঢ় ঝাঁকানি দিয়ে ভয়াল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল চণ্ডী। যেন একখণ্ড জ্বলন্ত ইস্পাত। ডান দিকের চোখটা জ্বলে উঠল। তর্জনী তুলে বলল, দুশ্চরিত্র! বেশ, আমিও দেখে নেবো কোথায় থাকে তোমার চরিত্রের অহঙ্কার! যে পাঁকে আমি ডুবেছি, তোমাকেও সেখানে নামতে হবে। তা যদি না পারি—

    বাকী কথাগুলো অসমাপ্ত রেখেই বিদ্যুৎ-চমকের মতো মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।

    .

    চণ্ডীকে সে ভালোবাসে, একদিন নিজের মনকে এই কথাই বোঝাতে চেয়েছিল সদানন্দ। আজ মনে হল, সে শুধু ভাবের ঘরে চুরি। ভালোবাসা নয় : রূপজ মোহ, নারী- মেধের দুর্বার আকর্ষণ। সেই কলুষ স্পর্শ দিনের পর দিন তার দেহে-মনে যে ঝড় তুলেছিল তাকে শত চেষ্টাতেও শান্ত করতে পারে নি। মাঝে মাঝে আশঙ্কা হত, আজই হয়তো ঘটে যাবে তার শুদ্ধাচারী-জীবনের সেই চরম পতন, যার দাগ কোনোদিন মোছে না। বহু কষ্টে সে পতন রোধ করে গেছে, তারপর ঘটনা-স্রোত গেল অন্য পথে। সেই সঙ্গে সে আশঙ্কাও দূরে চলে গেছে, ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাসের জোর। চণ্ডীর সেই গভীর রাত্রির স্পর্ধিত প্রতিজ্ঞা—তোমাকেও নেমে আসতে হবে সেই পাঁকের মধ্যে—আজ আর তাকে বিচলিত করল না। কিন্তু পতনের ভয় না থাকলেও ওই মেয়েটা তার জীবনের মধ্যে এমন ভাবে জড়িয়ে গেছে, এইখানে বসে তার গ্রন্থিমোচন কেমন করে সম্ভব? ওকে আশ্রয় করে যে বিপর্যয় ঘটে গেল তার অন্তর্লোকে, তারপর আর যাই হোক, বিদ্যার্থীর শান্ত সাধনার পথ খোলা থাকে না। অর্থাৎ গুরুগৃহবাস এইখানেই শেষ, এবার চলে যাবার পালা। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ঘর ছেড়েছিল, এখানে আর তার সিদ্ধির সম্ভাবনা রইল না।

    মুগ্ধবোধ খুলে রেখে এই সব কথাই ভাবছিল সদানন্দ। অধ্যাপক ফিরে আসবার পর বিদায়ের প্রস্তাবটা কী ভাবে উপস্থিত করলে তাদের সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হবে না, অথচ ফললাভের পথ সুগম হবে, সেটাও ছিল চিন্তার বিষয়। এমন সময় এল তাঁর চিঠি। অন্যান্য কথার পর জানিয়েছেন, কোনো এক শিষ্যের বিশেষ অনুরোধে পক্ষকাল ভাগবতপাঠের ভার গ্রহণ করতে হয়েছে। মঙ্গলময়ের ইচ্ছা হলে ওই শুভ কাজ শেষ করেই তিনি গৃহযাত্রা করবেন। চাষবাস এবং স্থানীয় যজমানদের ক্রিয়াকর্মের দায়িত্ব সদানন্দের উপর অর্পণ করে তিনি নিশ্চিন্ত আছেন। ইত্যাদি।

    দিনের বেশির ভাগ যতদূর সম্ভব বাড়ির বাইরেই কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করে সদানন্দ। বাকী সময়টা থাকে নিজের ঘরে। দু-বেলা খাবার সময় দেখা হয় অধ্যাপক-পত্নীর সঙ্গে। দু-চারটি সাংসারিক কথাবার্তাও হয়। চণ্ডী থাকে নেপথ্যে। দৈবাৎ একদিন সামনে পড়তেই চোখাচোখি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল দুজনেই। সদানন্দের মনে হল, কেমন যেন রক্তহীন পাণ্ডুর দেখাল মুখখানা। পরক্ষণেই নিজের মনকে সরিয়ে নিয়ে এল অন্য কোনও কাজের মধ্যে।

    একদিন সন্ধ্যার পর অধ্যাপক-গৃহিণী তার ছোট ঘরটিতে দেখা দিলেন। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে একখানা জলচৌকি এগিয়ে দিল সদানন্দ। তিনি সেটি গ্রহণ করে বললেন, বোসো বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

    সদানন্দ তার কম্বলের আসনে বসে অপেক্ষা করে রইল। তিনি ক্ষণকাল চুপ করে থেকে বললেন, কদিন থেকেই বলব মনে করছি। আজ-কাল করে হয়ে ওঠে নি। এদিকে ওঁরও ফেরবার সময় হল। তার আগেই সব ঠিকঠাক করে ফেলা দরকার। আর তো দেরি করা চলে না।

    —কার কথা বলছেন? কিসের দেরি? বিস্ময়ের সুরে প্রশ্ন করল সদানন্দ।

    —দেরি বইকি বাবা। দু মাস পেরিয়ে তিন মাসে পড়ল। চোখমুখের চেহারা যা হয়েছে! বেরুতে দেওয়া যায় না। এর পরে জানাজানি হয়ে পড়বে। এই মাসের মধ্যেই একটা ভালো দিন দেখে দু-হাত এক করবার ব্যবস্থা করে ফেলতে চাই।

    একটা কালো পরদা যেন উঠে গেল সদানন্দের চোখের উপর থেকে। বেরিয়ে পড়ল কুৎসিত দৃশ্যপট। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত অন্তরাত্মা বিষিয়ে উঠল। বুকের ভিতরটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল। হঠাৎ কোনও উত্তর দেবার মতো অবস্থা রইল না।

    গুরুপত্নী মুহূর্তকাল অপেক্ষা করে বললেন, দেশের বাড়ি থেকে কাউকে আনাতে চাও? আমি বলছিলাম, ‘ভাইদের সঙ্গে যখন তেমন যোগাযোগ নেই, আর আমরাই যখন তোমার বাপ-মা, তখন—

    তিক্ত কণ্ঠে বাধা দিল সদানন্দ : ও, সেই জন্যেই বুঝি ওই মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিতে চান?

    —ও মা! সে কি কথা! গলায় ঝুলিয়ে দেবো কেন? তুমি তো নিজেই ওকে পায়ে ঠাঁই দিয়েছ বাবা।

    —পায়ে ঠাঁই দিয়েছি! আমি?

    —তা-না হলে কি ওই অতবড় আইবুড়ো মেয়েকে এতটা মেলামেশা করতে দিই, না সব জেনে-শুনেও নিশ্চিন্দি হয়ে বসে থাকি?

    —সব জেনে-শুনে! অনেকটা যেন আপন মনে আবৃত্তি করে গেল সদানন্দ। তার পর সুর চড়িয়ে বলল, কী জানেন আপনি? কতটুকু জানেন? আপনার ধারণা, ওর এই অবস্থার জন্যে দায়ী আমি?

    —তুমি একা কেন দায়ী হবে বাবা? সন্তানের দায়িত্ব মায়েরও কম নয়।

    —কী বলছেন আপনি! চিৎকার করে উঠে দাঁড়াল সদানন্দ : এ সব ভুল, সব মিথ্যা। আমি এর কিছুই জানি না।

    —জান না! বিস্ময়াহত শুষ্ক ক্ষীণ স্বরে বললেন চণ্ডীর মা, ও যে বললে—

    —ও বলেছে এই কথা? মিথ্যাবাদী! শয়তানী! গর্জে উঠেই হঠাৎ থেমে গেল সদানন্দ। মনে পড়ল সেই গভীর রাত্রির দম্ভোক্তি : ‘দেখে নেবো কোথায় থাকে তোমার অহঙ্কার। এই ভাবে শোধ নিল শেষকালে!

    গুরুপত্নী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন : এ তুমি কী বললে সদানন্দ? তোমাকে যে আমরা ছেলের চেয়েও আপনার বলে জেনেছি।

    ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকল চণ্ডী। মাকে ধরে টেনে তুলে বলল, কী করছ এখানে বসে? চলে এসো।

    মেয়েকে দেখেই আরও ভেঙে পড়লেন তিনি : এ তুই কী করলি সর্বনাশী! তোকে নিয়ে কোথায় যাব আমি?

    —তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। যেতে হয় তো আমি একাই যাব। বলে আর কোনও কথা বলবার আগেই মাকে এক রকম টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল।

    গুরুগৃহে সেই রাতটাই সদানন্দের শেষ রাত। কয়েকখানা পাঠ্যগ্রন্থ সম্বল করে নিশীথ- রাত্রির অন্ধকারে চিরদিনের মতো যখন বেরিয়ে এল, তখন এ কথা তার মনে হয় নি, সকলের অলক্ষ্যে এই যে পালিয়ে যাওয়া—এ শুধু কাপুরুষতা নয়, নিজের উপরে আরোপিত অপরাধের নীরব স্বীকৃতি। যে মিথ্যা কলঙ্কের ভয়ে সে গৃহত্যাগ করছে, সেটাই সকলের চোখে সত্য হয়ে উঠবে। এ-সব কথা সেদিন বিচার করে দেখবার অবসর হয় নি। শুধু মনে হয়েছিল, যে পরিকল্পিত জঘন্য অভিযোগ, যে হীন ষড়যন্ত্র অক্টোপাসের মতো অষ্টবাহু বিস্তার করে তাকে জড়িয়ে ধরেছে, তার কবল থেকে নিজেকে বাঁচাবার একমাত্র পথ দূরে চলে যাওয়া। তাই গিয়েছিল। তার পর যখন পূর্ণ দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকাবার অবসর হল, দেখতে পেল দূরে গিয়েও বাঁচতে পারে নি। সর্বাঙ্গে জড়িয়ে গেছে দলিতা নাগিনীর প্রতিহিংসার বিষ। অন্যের চোখে না পড়লেও নিজের চোখকে এড়াবে কেমন করে?

    যে কারণে ওখান থেকে চলে আসা, ঠিক সেই কারণেই বাড়ি ফিরে যাওয়া চলে না। দুর্নাম এবং কলঙ্কের বিষদাঁত নিয়ে অক্টোপাস সেখানেও ধাওয়া করবে।

    সেই দিন থেকেই শুরু হল সদানন্দের নিরুদ্দেশ ভ্রমণের দীর্ঘ সূচী। সে এক বিচিত্র জীবন! কখনও অনাহার কখনও ভিক্ষা। কোথাও সাদর আহ্বান, কোথাও বা রূঢ় প্রত্যাখ্যান। এমনি ভাবে কেটে গেল কতদিন। তার পর আশ্রয় জুটল নবদ্বীপে এক পুঁথি- পাগল পণ্ডিতের জীর্ণ বৈঠকখানায়। কাজ, তাঁর চেয়েও জীর্ণ পুঁথির পাঠোদ্ধার, তার অনুলিপি-লেখন এবং তারই ফাঁকে ফাঁকে কখনও মুগ্ধবোধ কখনও ভট্টিকাব্য কখনও-বা রঘুবংশ! সেই বৈঠকখানার অন্ধকার কোণ থেকেই একদিন বেরিয়ে এল নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত শ্রীসদানন্দ আচার্য কাব্য-ব্যাকরণ-স্মৃতিতীর্থ।

    ব্রহ্মচারী সদানন্দ আচার্যের বৃত্তি ছিল ত্রিবিধ—যাজনিক ক্রিয়া, শিক্ষাদান এবং কথকতা। ক্রমে ওই তৃতীয়টিই প্রধান হয়ে দাঁড়াল। ওদিকেই দেখা দিল শক্তির বিকাশ। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল খ্যাতি। অর্থ হল, প্রতিষ্ঠা হল। কর্মজীবনে পুরুষ যা কামনা করে, যা পেলে নিজেকে মনে করে কৃতী এবং সফলকাম, সবই পেল সদানন্দ। সাধারণ জনের প্রীতি ও সম্মান, পণ্ডিতজনের স্বীকৃতি। তবু এই কর্মময় জীবনের কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে গেল। গৃহ? হ্যাঁ, গৃহ-বন্ধনের রঙিন আকর্ষণ নির্জন অবসরে দেখা দিত বইকি ব্রহ্মচারীর গোপন মনে। সে বন্ধনের মূল যে জায়গায়, যাকে আশ্রয় করে পুরুষ গৃহ-রচনা করে গৃহী হয়, সেখানটার কথা ভাবতে গেলেই তার চোখের উপর ভেসে উঠত একটি কুৎসিত কিন্তু অনিন্দ্য-তনু অতৃপ্ত-যৌবনার উগ্রমূর্তি। ওই একটি নারীই এসেছিল সদানন্দের জীবনে, দিয়েছিল তার উত্তপ্ত দেহ-মনের নিবিড় স্পর্শ। কিন্তু তার মধ্যে মধু নেই, গন্ধ নেই, নেই দীপশিখার স্নিগ্ধতা। নারী যে কল্যাণদাত্রী, আরও যে কত রূপ আছে তার—প্রেমময় সুধাময়, সে কথা সে পেয়েছে কাব্যের মধ্যে, অন্তরের মধ্যে নয়। গৃহিণী গৃহমুচ্যতে—মহাকবির এই বাণী রইল শুধু তার জ্ঞান এবং প্রচারের মধ্যে, জীবনের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠল না।

    এমন করে অজ্ঞাতে কখন গড়িয়ে গেল বেলা। হঠাৎ চমক ভেঙে দেখতে পেল ব্রহ্মচারী, তার জীবনের আঙিনায় নেমে এসেছে অপরাহ্ণের ছায়া।

    .

    রাস-পূর্ণিমার উৎসব চলেছে নবদ্বীপে। কত যাত্রী এসেছে দেশদেশান্তর থেকে। রাস্তার দু-ধারে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে দেখছে দীর্ঘ শোভাযাত্রা, ভিড় করেছে মেলায়, মন্দিরে, স্নানের ঘাটে। পোড়ামাতলার মোড়ে বিস্তৃত শামিয়ানার নীচে সভার আয়োজন করেছেন উৎসবের উদ্যোক্তারা। কথকতা করবেন ব্রহ্মচারী সদানন্দ। তিলধারণের স্থান নেই কোনোখানে। সব স্তরের সব বয়সের নরনারী। মিশ্র কোলাহলে ভরে উঠেছে সভাঙ্গন। মঞ্চের উপর শীর্ণকায় দীর্ঘাঙ্গ ব্রহ্মচারীর গৈরিক আভাস দেখা যেতেই সব স্তব্ধ হয়ে গেল। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ঘিরে রয়েছেন তাঁর চারপাশে। ধীরে ধীরে আসন গ্রহণ করে স্মিত মুখে বিশিষ্ট দর্শকদের দিকে ফিরে জানতে চাইলেন কোন্ কাহিনী শুনতে চান তাঁরা।

    প্রভুর যা অভিরুচি—বিনীত কণ্ঠে উত্তর দিলেন জনৈক প্রবীণ শিষ্য। কয়েক মুহূর্ত বিশাল জনতার দিকে তাকিয়ে রইল সদানন্দ। তারপর শুরু হল কচ ও দেবযানীর অমর উপাখ্যান। অশ্রান্ত গতিতে এগিয়ে চলল অধ্যায়ের পর অধ্যায়। মহাভারতের মৌলিক বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত রবীন্দ্রকাব্যের মাধুর্য ও কল্পনা, এবং তার মধ্যে জড়িত রইল ব্রহ্মচারীর নিজস্ব ভাষা, ভঙ্গি আর কণ্ঠের লালিত্য।

    দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ। দৈত্যগুরুর দ্বারে ভিক্ষাপ্রার্থী। যে সঞ্জীবনী বিদ্যা দেবতার অনায়ত্ত, দেবলোকের হিতার্থে তাই তাকে অর্জন করতে হবে। সেই দুর্জয় আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এসেছেন শুক্রাচার্যের কাছে। সমস্ত দৈত্যকুল তাঁর প্রতিকূল। দৈত্যগুরু তাঁর প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, দেবতনয়কে শিষ্যরূপে গ্রহণ করতে তিনি অনিচ্ছুক ও অসমর্থ। কিন্তু কচকে নিরস্ত করা গেল না। সমস্ত বিপদ-বাধা বরণ করে কঠোর তপস্যায় গুরুর অনুগ্রহ লাভের জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। শুক্রাচার্যের স্নেহধন্যা তরুণী কন্যা দেবযানী। শুধু কন্যা নয়, প্রিয়শিষ্যা এবং আচার্যের দুর্লভ বিদ্যার অধিকারিণী। এই দৃঢ়কাম তরুণ দেবপুত্রের অপূর্ব ক্লান্তি, বিনয়-নম্র সুমিষ্ট আচরণ এবং অনমনীয় অধ্যবসায় তাঁর নারীহৃদয়কে স্পর্শ করল। অবাঞ্ছিত বিদেশীর উপর পড়ল তার প্রসন্ন দৃষ্টির স্নিগ্ধ আলোক। কন্যার অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে কচকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করলেন শুক্রাচার্য। শুরু হল বিদ্যার্থীর কঠোর জীবন। সহস্র-বৎসরব্যাপী দুস্তর সাধনা। নিরলস কর্মে এবং সুদুর্লভ অবসরে দেবযানী রইল তাঁর পাশে, প্রীতিময়ী প্রবাসসঙ্গিনী। পাঠগৃহে প্রাসাদের অলিন্দে, নির্জন বনছায়ায়, নিরালা নদীতীরে ছায়ার মতো দিল তাঁকে সঙ্গ এবং সাহচর্য।

    অকস্মাৎ একদিন রাত্রির অন্ধকারে নিভৃত শয্যায় কচের দৃষ্টি পড়ল তাঁর গোপন অন্তরের পানে। কেউ জানে না, কখন কোন্ অসতর্ক মুহূর্তে তারই উপরে অঙ্কিত হয়ে গেছে এক রূপময়ী দৈত্যবালার মোহিনী মূর্তি। নিমেষের তরে বিস্ময়ে পুলকে বেদনায় ভরে গেল তাঁর তরুণ মন। পরমুহূর্তেই ফিরে এল সেই কঠোর প্রতিজ্ঞা—যে ব্রত গ্রহণ করেছি, যে উদ্দেশ্য নিয়ে বরণ করেছি এই শত্রুপুরীর লাঞ্ছনা, তার পরিপূর্ণ সাফল্যই আমার একমাত্র লক্ষ্য। তার পূর্বে নিজের সুখ দুঃখ শুভাশুভ কিছুই জানি না। কর্তব্যের কাছে হৃদয়বৃত্তির স্থান নেই।

    এমনই করে কেটে গেল সহস্র বৎসর। গুরু প্রীত হলেন। দান করলেন বহুবাঞ্ছিত সঞ্জীবনী বিদ্যা। উদ্দেশ্য সিদ্ধির পর যাত্রার আয়োজন করলেন কচ। আচার্যকে প্রণাম করে বিদায় নিতে গেলেন দেবযানীর কাছে। কিন্তু সে-বিদায় কি এত সহজ? সেখানে যে রয়েছে সেই চিরন্তনী নারী, মাতৃরূপে প্রিয়ারূপে কন্যারূপে অনন্তকাল যে পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে বহির্মুখী পুরুষের, স্নেহ দিয়ে প্রেম দিয়ে বাঁধতে চেয়েছে প্রিয়জনে, অশ্রু দিয়ে গাঁথা মায়াডোর জড়িয়ে দিয়েছে তার হাতে; কোমল বাহু প্রসারিত করে বলেছে, ‘যেতে নাহি দিব’। কিন্তু নির্মম পুরুষ সে ব্যাকুল ডাক কোনদিন শোনে নি। যে শুনেছে, তাকেও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে বৃহত্তর জীবনের প্রবল বাহু। পথপ্রান্তে ফেলে দিয়ে গেছে উপেক্ষিত স্নেহপাশ

    এখানেও তারই পুনরাবৃত্তি হল। সেই বিদায়ের ক্ষণে দেবতার কাছে প্রেম নিবেদন করল দৈত্যকন্যা দেবযানী। যথারীতি ব্যর্থ হল তার আবেদন। নারী সব সইতে পারে। সংসারে এমন কোনও দুঃখ নেই, আঘাত নেই, যা সে যুগ যুগ ধরে বুক পেতে গ্রহণ করে নি। কিন্তু একটা জিনিস সে সইতে পারে না—প্রেমের প্রত্যাখ্যান। সে আঘাত যখন আসে, কেউ ভেঙে পড়ে, কেউ জ্বলে ওঠে নাগিনীর মতো। দেবযানি জ্বলে উঠল। হৃদয় ভরে অমৃতের ভাণ্ডার সঞ্চয় করে রেখেছিল যার জন্য, তারই উপরে ঢেলে দিল অভিশাপের বিষ—যে বিদ্যার অভিমানে প্রেমকে অবহেলা করছ, সে বিদ্যা তোমার ব্যর্থ হবে, সে শুধু ভার হয়ে থাকবে তোমার জীবনে।”শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ।”

    সভাভঙ্গের পর জনতার ভিড় হাল্কা হয়ে গেছে। অনুরাগী বন্ধু এবং শিষ্যদের কাছে বিদায় নিয়ে গৃহে ফিরছিল সদানন্দ। একাই চলেছিল গলিপথ দিয়ে। এগিয়ে দিতে চেয়েছিল কেউ কেউ। কাউকে সঙ্গে নেয় নি। মনের মধ্যে কেমন একটা একা থাকবার তাগিদ অনুভব করছিল। আনমনে পথ চলতে চলতে ভাবছিল, এইমাত্র যে কাহিনী সে শুনিয়ে এল; তার একটা ক্ষীণ সুর কোথায় যেন জড়িয়ে আছে তার নিজের জীবনের মধ্যে, কোথায় যেন একটুখানি মিল। শুধু কচের কথাই সে বলেনি, বলে এসেছে নিজের কথা। আর তার সঙ্গে—

    রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সদানন্দ। ঠিক তার সামনে মুখোমুখি যে দাঁড়িয়ে আছে, সে কি সত্য, না শুধু চোখের বিভ্রম? এতদিন পরে আপনার অজ্ঞাতে স্মৃতির কোঠায় যার ছায়া পড়েছিল, সে কায়া হয়ে দেখা দিল কেমন করে! অথবা এ শুধু তার বিভ্রান্ত কল্পনা!

    দু-হাতে চোখ রগড়ে আর-একবার তাকিয়ে দেখল ব্রহ্মচারী। না, ভ্রান্তি নয়, সত্যই সে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের বাঁ দিকটা আঁচলে ঢাকা। ডানদিকের যেটুকু প্রকাশ, তার মধ্যে ভুল করবার অবকাশ নেই। কিন্তু এ কি সে, না তার মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে আছে কোনও প্রেত? কোথায় গেল চোখের সেই বিদ্যুৎঝলক, ওই কালো চোখের তারা থেকে যা ঠিকরে পড়ত একদিন? অপরাঙ্গে দৃষ্টি পড়তেই শিউরে উঠল সদানন্দ। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হল না, এই দেহই একদিন তরঙ্গ তুলেছিল তার রক্তধারায়।

    —কেমন আছ? নিস্পৃহ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল চণ্ডী। সে বাণীর ঝঙ্কার নয়, কেমন একটা ভাঙা-ভাঙা ধার-ক্ষয়ে যাওয়া সুর।

    —ভালো। তুমি?

    —আমি? হাসির কুঞ্চনে আরও কুৎসিত দেখাল মুখখানা : যেমন দেখছ। বাসা কোথায়?

    —মাঝের পাড়ায়।

    —যাব একদিন। বলেই এগিয়ে গেল রাস্তার ধার ঘেঁষে।

    একবার ইচ্ছা হল ব্রহ্মচারীর, ডেকে ফিরিয়ে বলে, না, আমার বাড়িতে এসো না তুমি। কোনও তরফেই তার আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু বলা হল না।

    তিন-চার দিন পরে প্রাতঃসন্ধ্যা সেরে বারান্দায় বেরোতেই একটা অপরিচিত লোক উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। শরীর ও পোশাক দুই-ই অপরিচ্ছন্ন। কৃত্রিম হাসির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল দুপাটি কদর্য দাঁত।

    —আপনার কাছে এলাম।

    —কে আপনি?

    —আমাকে আপনি ঠিক চিনবেন না। তবে আমার ইয়ে—মানে, ঘরের মানুষটি আপনার অনেক দিনের চেনা। একটু থেমে ব্রহ্মচারীর সন্দেহ-কুঞ্চিত ক্রূর দিকে চেয়ে যোগ করল, চণ্ডীর কথা বলছি।

    —চণ্ডী আপনার স্ত্রী?

    —না না! জিব কেটে মাথা নাড়ল লোকটা : হাজার হলেও বামুনের মেয়ে। শুধু বামুন কেন, গুরুবংশের মেয়ে। তবে হ্যাঁ, একসঙ্গেই যখন আছি আজ কুড়ি বাইশ বছর, তখন বুঝতেই তো পারছেন, জ্ঞানী লোক আপনি। বলে আবার হেসে উঠল সেই কুৎসিত হাসি।

    —আমার কাছে আপনার কী দরকার? রূঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল সদানন্দ। দরকার সামান্যই। মা মেয়ে দুজনকেই পুষতে হয়। যা দিনকাল, দেখুন না, কার বোঝা কে বয়!

    —আর কিছু বলবার আছে আপনার?

    —না, আর কিছু না। শুধু গোটা পঞ্চাশেক টাকা হলেই আপাতত-

    —মাপ করবেন। আপনি এবার আসতে পারেন।

    —আসব বইকি। তবে টাকাটা দিয়ে দিলে পারতেন ঠাকুরমশাই। আপনার ভালোর জন্যেই বলছি।

    ব্রহ্মচারী ঘরে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছিল, ফিরে দাঁড়িয়ে রুক্ষদৃষ্টি মেলে জানতে চাইল : তার মানে?

    —মানে, আপনার সঙ্গে ওর আসল সম্পর্কটা তা হলে গোপনই থেকে যেত।

    —কী বলতে চান আপনি?

    —আজ্ঞে, সেটা আমার চেয়ে আপনিই ভালো জানেন। এখানে অবিশ্যি এখনও কেউ জানে না। কিন্তু জানতে কতক্ষণ? ভেবে দেখুন, তারপরে —

    —জানেন, আপনাকে আমি পুলিসে দিতে পারি?

    –পুলিস! বিকট শব্দ করে হেসে উঠল লোকটা : তাতে আপনার বিশেষ সুবিধে হবে না, পণ্ডিতমশাই। তাছাড়া করালী কুণ্ডু কারও চোখরাঙানোকে পরোয়া করে না। যাক, এবার তা হলে আসি। পেন্নাম।

    হনহন করে বেরিয়ে যাচ্ছিল করালী। ব্রহ্মচারী ডেকে ফেরাল, শোনো। চণ্ডী পাঠিয়েছে টাকার জন্যে?

    —না, তা ঠিক নয়। আমতা আমতা করে বলল লোকটা, তবে টাকার দরকার তারই। অসুখে পড়ে আছে। কদিন কাজে বেরোতে পারে নি। আমিও বেকার বসে আছি। সেয়ানা মেয়েটাকে

    কথা শেষ করবার আগেই ঘরের মধ্যে চলে গেল ব্রহ্মচারী। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসে পাঁচখানা নোট ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, আর কোনোদিন এসো না।

    —না না, আর আসতে হবে না। নোটগুলো কুড়িয়ে নিয়ে কোঁচার খুঁটে বাঁধতে বাঁধতে বলল করালী, এতেই কাজ হবে।

    কিন্তু পাঁচ-সাত দিন না যেতেই আবার এসে দাঁড়াল সেইখানটিতে। গড়গড় করে বলে গেল একঝুড়ি কথা, যার সারমর্ম—মা-মেয়ের কাপড় নেই, ঘরের বার হতে পারে না। গোটা দশেক ইত্যাদি। দশটা টাকা দিয়ে বিদায় করল ব্রহ্মচারী। তার কদিন পরেই এল মোটা অঙ্কের তাগিদ। ছ মাস থেকে বাড়িভাড়া বাকি। চণ্ডীকে অপমান করে গেছে বাড়িওয়ালা। বিশ্রী ইঙ্গিত করেছে বয়স্থা মেয়েটাকে জড়িয়ে। ভয়ানক কান্নাকাটি করছে ওরা। সন্ধ্যার মধ্যেই যেমন করে হোক বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।

    “সত্যিই তো, ওদেরই বা দোষ দিই কেমন করে”–হতে পা নেড়ে বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বলল করালী, “আজ না হয় সব গেছে, আসলে তো অত বড় একজন নামকরা পণ্ডিতের মেয়ে! সেই কথা বিবেচনা করে আমিও মশাই ফেলে আসতে পারলুম না। ওদের ওখানে গিয়েই জড়িয়ে পড়লাম। সেই যে চেপে ধরল, আর ছাড়বার নামটি নেই। কী করি, বলুন? ঘাড়ে যখন এসে চাপল একটা মেয়েছেলেকে তো আর রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমারও তখন বিশেষ কোনেও ঝঞ্ঝাট নেই। বউ মারা যাবার পর আর সংসার করি নি। আপনার আর্শীবাদে অবস্থাও মন্দ ছিল না। তিনখানা বাড়ি ঢাকা শহরে। ভাড়া যা আসত—তিনটে তো মোটে প্রাণী–হেসে-খেলে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হিন্দুস্থান পাকিস্তান হতেই সর্বনাশ ঘটল। তারপরেও অনেকদিন পড়েছিলাম। ওই মেয়েটা সেয়ানা হয়ে উঠতেই চলে আসতে বাধ্য হলাম। সে যাক গে। এবার কোনোক্রমে দায় উদ্ধার করে দিন। আর আসব না আপনার কাছে।

    ব্রহ্মচারী কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কানে গেল, বলছে করালী, দায়টা তো আসলে আপনারই—

    —কী বললে? গর্জে উঠল সদানন্দ।

    —আজ্ঞে মানে

    —মনে করেছ কতগুলো মিথ্যা কুৎসার ভয় দেখিয়ে বরাবর এমনই টাকা আদায় করে যাবে, না?

    —আজ্ঞে না, ভয় দেখাব কেন? আমি বলছিলাম-

    —যাও! মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে দরজার দিকে আঙুল তুলে ধরল সদানন্দ।

    —কী বলছেন?

    বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।

    করালী উঠে দাঁড়িয়ে রক্তচক্ষু মেলে বলল, এই কি আপনার শেষ কথা!

    —হ্যাঁ, শেষ কথা। আর কোনোদিন যেন তোমাকে এখানে দেখতে না পাই।

    —আচ্ছা! লম্বা চুলগুলোয় একটা উদ্ধত ঝাঁকানি দিয়ে বেরিয়ে গেল করালী। দিন তিনেক পরেই এল আবার বাইরে যাবার নিমন্ত্রণ। বর্ধমান অঞ্চলে পর পর গোটাকয়েক ধর্মসভায় ভাগবত-পাঠ শেষ করে কথকতার বায়না নিয়ে যেতে হল মুর্শিদাবাদ। সেখান থেকে মালদা হয়ে নবদ্বীপ ফিরতে মাস পেরিয়ে গেল।

    ফিরে আসবার কয়েকদিন পর। অন্ধকার রাত। দশটা বেজে গেছে। বিশ্রামের আয়োজন করছিল ব্রহ্মচারী। দরজার কড়া নড়ে উঠল। একটু বিরক্তির সঙ্গে খুলে দিয়ে হ্যারিকেনের আলোটা উঁচু করে ধরতেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল—তুমি!

    —খুব অবাক হয়ে গেছ, না? দরজা পার হয়ে ভিতরের দিকে পা বাড়াল চণ্ডী।

    —তুমি বোধহয় জান না, এ বাড়িতে আমি একা থাকি।

    —তার মানে, কেউ দেখে ফেললে দুর্নাম দেবে, এই তো?

    —মিথ্যা দুর্নামের ভয় আমি করি না।

    —একদিন কিন্তু করেছিলে। সে যাক। আজ নিশ্চিন্ত থাকতে পার। এ রূপ দেখে সে ভুল কেউ করবে না। বড়জোর ভাববে, ভিক্ষা চাইতে এসেছে কোনও রাস্তার ভিখিরী। আর সত্যিই তাই। একটা ভিক্ষে চাইতে এসেছি তোমার কাছে। বলে সে বসে পড়তে যাচ্ছিল উঠানের এক পাশে।

    ব্রহ্মচারী বাধা দিয়ে বলল, বারান্দায় উঠে বোসো। দাঁড়াও। বাড়াল একটা কিছু এনে পেতে দেবার জন্যে।

    —বলে ঘরের দিকে পা

    —থাক, আর কিছু লাগবে না। এই মেঝেতেই বসছি। একটুখানি দাঁড়িয়ে থাকতেই পা ধরে যায়।

    —সলজ্জ মৃদু হাসির সঙ্গে বলল চণ্ডী।

    ব্রহ্মচারীর একবার ইচ্ছা হল, জিজ্ঞাসা করে শরীর এরকম হল কী করে? কী অসুখ করেছিল? তখনই মনে হল করালীর মুখে সেদিন সামান্য যেটুকু জেনেছে তার পরে এ প্রশ্ন নিরর্থক। চণ্ডীই আবার কথা পাড়ল। যেন কতদূর থেকে ভেসে এল তার স্বর—তুমি তো চলে এলে। মাসখানেকের মধ্যে মাও সরে পড়ল। সেই যে বিছানা নিয়েছিল, আর উঠল না। আমার অবস্থা তখনও বাবার নজরে পড়ে নি। মা বলে যেতে পারে নি, হয়তো ইচ্ছা করেই বলে যায় নি। ওই লোকটা এসেছিল বাবাকে পৌঁছে দিতে। তারপর আর নড়তে চায় না। লোকের কাছে বলে বেড়ায়, গুরুকে এই অবস্থায় ফেলে যায় কেমন করে। কিন্তু তার আসল টানটা যে কোথায় আমি প্রথম দিনই টের পেয়েছিলাম। তারই সুযোগ নিলাম। দুর্গা বলে ঝুলে পড়লাম ওই করালীর কাঁধে। তখনও ও সবকিছু জানে না। যখন জানল, লাথি মেরে দূর করে দিতে পারত। কিন্তু দেয় নি। বরং অনেক কিছু করেছে আমার জন্যে, যা আপনার লোকেরা কেউ কোনোদিন করত না।

    —জ্যাঠামশাই কোথায় আছেন। চণ্ডী একটু থামতেই প্রশ্ন করল ব্রহ্মচারী।

    —কী করে জানব? বাড়ি ছাড়বার পর আর খবর পাই নি। এতদিন কি আর বেঁচে আছেন? থাকলেও কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কোনোদিনই জানতে পারবো না।

    কয়েক মুহূর্তের জন্যে গলাটা একটু ধরে এল। একটুখানি ছেদ পড়ল কথার মাঝখানে তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার শুরু করল : যাক্ যা বলতে এসেছিলাম, শোনো। বুঝতেই পারছ, তুমি হঠাৎ চলে আসবার পর আমাকে জড়িয়ে অনেক কথাই রটেছিল তোমার নামে। করালীর কানেও গিয়েছিল নিশ্চয়ই। নবদ্বীপে এসে আমার আগে ও ই জানতে পারে, তুমি এখানে আছ। মাঝে মাঝে বলতেও শুনেছি তোমার কথা। কিন্তু যে এখানে আসা-যাওয়া করে, ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি। হঠাৎ একদিন শুনলাম, আমার নাম করে টাকার জন্যে উৎপাত করছে তোমার ওপর। ছিঃ ছিঃ, কী লজ্জা বল তো?

    সদানন্দ প্রতিবাদ করল : না না, উৎপাত করবে কেন? তা ছাড়া টাকা তোমার হয়ে চায় নি।

    —আমার হয়ে না চা’ক, টাকার দরকার যে আমার জন্যই, সে কথা নিশ্চয়ই বলেছে। তা হলে আর বাকী রইল কী?

    —যেখানে থেকেই হোক, সে দরকারটা যদি আমি জেনে থাকি, সেটা কি তোমার এতই লজ্জার কথা?

    হয়তো একটু মৃদু অভিমান প্রচ্ছন্ন ছিল সদানন্দের এই প্রশ্নের অন্তরালে। চণ্ডীর কাছে কি ধরা পড়ে নি? পড়লেও সে জানতে দিল না। স্থির সহজ সুরেই বলল, ঠিকই বলেছ। কারও কাছে হাত পাততেই আজ আর আমার লজ্জা করা চলে না।

    কারও কাছে! আহত হল সদানন্দ। কিন্তু কী বলবার আছে? যে দূরে ছিল, সে যদি দূরেই থাকতে চায়, একজনকে সবার থেকে আলাদা করে না দেখতে চায়, নালিশ জানাবে সে কার কাছে? তবু চুপ করে থাকতে পারল না। একটু ক্ষোভের সঙ্গেই বলল, আমার কথাটা তুমি বোধ হয় বুঝতে পার নি।

    —বুঝে কি লাভ বলো? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল চণ্ডী : টাকা তুমি দিতে পার, দেবার ইচ্ছাও হয়তো আছে, কিন্তু নেবারও তো একটা অধিকার চাই। তা যদি থাকত, করালীর আগে আমি নিজেই আসতাম তোমার কাছে। সে যাক গে। আমার আসল কথাটাই যে এখনও বলা হয় নি। তোমাকে কিন্তু শুনতে হবে নন্দদা। বলো, শুনবে?

    —আমি তো বুঝতে পারছি না, কী বলবে তুমি! সাধ্যমত হলে নিশ্চয়ই শুনব। চণ্ডী ক্ষণকাল নীরব থেকে বলল, তোমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।

    —চলে যেতে হবে! কেন? অতিমাত্রায় বিস্মিত হল সদানন্দ।

    —কারণটা যদি না বলি? না হয় মেনেই নিলে আমার একটা অনুরোধ।

    ব্রহ্মচারী নিরুত্তর। মুখ ফুটে দূরে থাক, মনে মনেও বলতে পারল না, বেশ, তাই নিলাম, মেনে নিলাম তোমার কথা।

    চণ্ডী কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, যদি জিজ্ঞেস কর, আমি যা বলব, কোনও প্রশ্ন না তুলে চোখ বুজে মেনে নেবার মতো কী পরিচয় আমি তোমাকে দিয়েছি, আমার কোনও উত্তর নেই। না যদি শোনো, তা হলেও আশ্চর্য হব না। শুধু ভেবে দেখতে বলব, বড় রকম কারণ না থাকলে এত রাত্রে এই অনুরোধ নিয়ে তোমার কাছে ছুটে আসতাম না।

    সদানন্দ তখনও নির্বাক। কী সে বড় কারণ, এত কথার পর জানতে চাওয়াও যেমন সহজ নয়, না জেনে এই অনুরোধ রক্ষা করাও তেমনই কঠিন। চণ্ডী অনুনয়ের সুরে বলল, যত শীগগির পার তুমি কোথাও চলে যাও নন্দদা। ভগবান তোমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, যেখানে যাবে, লোকে তোমাকে মাথায় তুলে নেবে। নাম বল, অর্থ বল, কোনো দিকেই কোনও ক্ষতি হবে না।

    —লাভ-ক্ষতিটাই একমাত্র জিনিস নয়,—শুষ্ক গম্ভীর সুরে বলল সদানন্দ, তার চেয়েও অনেক বড় জিনিস আছে মানুষের জীবনে। আমার যা কিছু সব এইখানে। নবদ্বীপের কাছে আমি অনেকভাবে ঋণী। হঠাৎ তাকে ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

    —সম্ভব নয়? ক্ষীণ নৈরাশ্যের সুরে যেন আবৃত্তি করে গেল চণ্ডী। নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তা হলে আর কী করতে পারি আমি?

    সদানন্দ একটু ইতস্তত করে বলল, কেন চলে যেতে বলছ জানাতে বাধা আছে কি? তোমার যদি কোনও সুবিধা হয়, তা হলে বরং—

    চণ্ডীর মুখে ফুটে উঠল এক মর্মান্তিক হাসি। বাধা দিয়ে বলল, আমার সুবিধা? আর একদিন যে কাউকে কিছু না বলে গভীর রাত্রে চলে গিয়েছিলে, সেও কি আমার সুবিধার জন্যে?

    —না, তার মধ্যে নিজের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বলতে পার, পালিয়ে গিয়েছিলাম। অপবাদ, তা সে যত বড় মিথ্যাই হোক, সাহস করে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি নি।

    —কিন্তু আজ আবার যদি আসে তার চেয়েও বড় কলঙ্কের অপবাদ, তার চেয়েও মিথ্যা, জঘন্য, কুৎসিত?

    ব্রহ্মচারী হাসল; নিরুদ্বেগ প্রশান্ত হাসি। অত্যন্ত সহজ সুরে বলল, তা হলেও আজ আর পালাবার প্রয়োজন নেই। মিথ্যার ভয় আমার ঘুচে গেছে।

    —তুমি বুঝতে পারছ না নন্দদা,—আর্তকণ্ঠে বলে উঠল চণ্ডী, ওই করালীকে তুমি চেন না। ও মানুষ নয়, সাপ; সাপের চেয়েও নিষ্ঠুর। কখন কোন্ পথে, কী ভাবে যে ছোবল মারবে, স্বপ্নেও ভাবতে পার না।

    —সেই জন্যেই কি তুমি আমাকে চলে যেতে বলছ?

    -–একে তুমি তুচ্ছ করে দেখো না, নন্দদা। তা ছাড়া—

    -–তা ছাড়া কী, বলো?

    —বুঝতে পারছি, আমিই বোধহয় ওর অস্ত্র। আমাকে দিয়েই হয়তো শোধ তুলবে তোমার ওপর। নিজে থেকে তোমার অনেক অনিষ্ট করেছি। এতদিন পরে আবার আমার হাত দিয়েই আসবে তোমার চরম ক্ষতি? না নন্দদা, তোমার পায়ে পড়ি, আমার এই শেষ কথাটা রাখো। নবদ্বীপ ছেড়ে চলে যাও তুমি। দেরি করলে হয়তো সর্বনাশ হয়ে যাবে।

    উঠানে নেমে ব্রহ্মচারীর পা দুটো চেপে ধরল। বেদনার্ত চোখ তুলে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। আজ আর সরে গেল না সদানন্দ, পা দুটোও ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল না। কিছুক্ষণ নির্লিপ্ত দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল, রাত অনেক হল। এবার তুমি বাড়ি যাও।

    —যাচ্ছি, তার আগে তুমি কথা দাও—

    —কথা দিতে পারি না। তবে তোমার কথা আমি ভেবে দেখবো।

    চণ্ডী আর কোনও কথা বলল না। পা ছেড়ে দিয়ে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে নির্জন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

    সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত সদানন্দের বিনিদ্র চোখের উপর জেগে রইল দুঃখে দৈন্যে লাঞ্ছনায় ভেঙে-পড়া একটা কুরূপা নারীমূর্তি, কানে আসতে লাগল তার উৎকণ্ঠায়-ভরা ব্যাকুল আবেদন। অন্তরের তলদেশ থেকে ভেসে এল একটি তিরস্কারের সুর—একদিন যাকে সব দিতে পারতে, আজ তার এই সামান্য কথাটা রাখতে পারলে না! এ ভিক্ষা তো সে নিজের জন্যে চায় নি, চেয়েছে তোমারই জন্যে, তোমারই মঙ্গল কামনায়।

    সে স্বর ডুবিয়ে দিয়ে জেগে উঠল ক্ষুব্ধ উত্তর—কিন্তু কেমন করে ভুলি, এই নারীই একদিন চরম অভিশাপ নিয়ে এসেছিল আমার জীবনে! কে সে? তার সঙ্গে কী আমার সম্পর্ক, যে তারই কথায় ছেড়ে যেতে হবে বহু যত্নে, বহু সাধনায় গড়ে তোলা এই যশখ্যাতি, অর্থ, সম্মান, এই বহুবিস্তৃত সামাজিক প্রতিষ্ঠা? এ তো ঠুনকো জিনিস নয় যে, এই মিথ্যা অপবাদের ঘায়ে ভেঙে পড়বে?

    তবু ভেঙে পড়ল। কদিন পরে এল সেই দুর্জয় আঘাত। এল ওই চণ্ডীর দিক থেকে, তারই মেয়ের রূপ ধরে। করালী কুণ্ডুর নিপুণ হাতে সাজানো রঙ্গমঞ্চে প্রধান ভূমিকা নিল ওই ময়না। অত্যন্ত অতর্কিতে তারই হাত থেকে ছুটে এল ব্রহ্মচারীর মৃত্যুবাণ। অমোঘ সে অস্ত্র এবং তারই হাতে মরল ব্রহ্মচারী—কলঙ্কময় অপঘাত মৃত্যু। এত বড় প্রতিষ্ঠা এবং এতদিনের সুনাম তাকে বাঁচাতে পারল না। অতবড় গর্ব ও গৌরবের ধন যে নবদ্বীপ, সেও তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল না।

    আমার সরকারী বাসভবনের এক কোণে লিখবার ঘরে বসে ব্রহ্মচারী যখন তার কাহিনী শুরু করে তখনও বেলা আছে। তারপর কখন সেই বেলাটুকু ফুরিয়ে গিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে, রাত্রি এসেছে, কিছুই বুঝতে পারি নি।

    চাকর এসে আলোর সুইচটা টিপে দিতেই হঠাৎ খেয়াল হল, ব্রহ্মচারীর মৃদুকণ্ঠ কখন থেমে গেছে, এবং তার পরেও অনেকক্ষণ আমরা দুজনে অন্ধকারে মুখোমুখি বসে আছি, আলো জ্বালবার কথাটাও মনে হয়নি। এবার নড়েচড়ে বসে ডাকলাম, ব্রহ্মচারী! ক্ষীণ অস্পষ্ট কণ্ঠে সাড়া দিয়ে সদানন্দ মুখ তুলে তাকাল। বললাম, আমার সেদিনের কথাটা তোমার মনে আছে?

    ব্রহ্মচারী জবাব দিল না; জিজ্ঞাসা করল না, কোন্ দিনের কথা জানতে চাইছি আমি। তার মুখের উপর ফুটে উঠল একটি পরিম্লান করুণ হাসি, যার অর্থ—প্রশ্নটা কি নিরর্থক নয়? হয়তো আমার কণ্ঠেও সেই বিশেষ দিনটির কোনও স্মৃতি জেগে উঠে থাকবে জেলখানার আফিসে শেষবারের মতো যেদিন ওর সঙ্গে আমার দেখা। বললাম, একটা নির্দোষ মানুষ জেলে পচতে লাগল, এই ভেবে অনেকখানি ক্ষোভ ছিল আমার মনে। তারই খানিকটা প্রকাশ করতে গিয়েছিলাম। তুমি বাধা দিয়ে বলেছিলে, আমি তো নির্দোষ নই। শুনে বড় কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন।

    —জানি, স্যর্—মাথা নত করে বলল ব্রহ্মচারী, তবু যা সত্য, না বলে আমার উপায় ছিল না।

    অতিমাত্রায় বিস্মিত হয়ে বললাম, কোনটা সত্য? কী বলতে চাও তুমি? এ কাহিনী যদি মিথ্যা না হয় –

    —কাহিনী আমার মিথ্যা নয়। শেষটুকু শুধু বাকী আছে। তাই বলেই আজকের মতো বিদায় নেবো।

    আমি অপেক্ষা করে রইলাম। ব্রহ্মচারী কয়েক মুহূর্ত কি ভেবে নিয়ে ধীরে ধীরে শুরু করল : সাধারণভাবে বলতে গেলে নির্দোষ কথাটার অর্থ—সে দোষ করে নি। আইনের চোখেও তাই। অপরাধ মানে কোনও অপরাধমুলক কাজ। কিন্তু মনুষ্যত্বের দরবারে এইটাই কি দোষ-বিচারের মাপকাঠি? দোষ বলুন, অপরাধ বলুন, তার জন্ম আমার মনের মধ্যে। তাই যদি হয়, যে মুহূর্তে সে জন্মাল, তখন থেকেই কি আমি অপরাধী নই? অপরাধটা আমার কাজের মধ্যে দেখা দেয় নি বলেই সে নেই, দোষের কাজ করি নি বলেই আমি নির্দোষ, –তা কেমন করে বলি?

    বললাম, তত্ত্ব হিসাবে কথাটা মন্দ লাগছে না, যদিও বেশ জটিল। ও-সব রেখে বরং আসল ব্যাপারটা খুলে বলো।

    —তাই বলব। শুধু একটা দিনের কথা। আমার জীবনের সেই মহাপরীক্ষার দিন।

    প্রাতঃস্নান আমার চিরদিনের অভ্যাস। সেদিন একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি কাপড়-গামছা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছি, উঠোনের কোণে নজর পড়তেই চমকে উঠলাম। কুয়োতলায় বাসন মাজছিল একটি মেয়ে। কখনও দেখি নি, তবু তার দেহের প্রতিটি রেখা যেন আমার চিরজীবনের চেনা। মুখ থেকে আপনা হতেই বেরিয়ে গেল—কে তুমি

    —আমার নাম ময়না।

    —কার মেয়ে তুমি?

    —আমার মায়ের নাম চণ্ডী দেবী।

    খুঁটিয়ে দেখতে গেলে মায়ের সঙ্গে মেয়ের মিল বেশী নয়, সে রঙ পায় নি, গড়ন কিছুটা পেলেও, সে রূপ পায় নি। তবু সব মিলিয়ে কী ছিল তার দেহে বলতে পারব না। হঠাৎ যেন বহু বছর পিছনে ফিরে গেলাম। বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো আমার সমস্ত চেতনার মধ্যে জ্বলে উঠল এমনই একটা মুহূর্ত—যেদিন প্রথম দেখেছিলাম ওর মাকে। সেদিনের কথা আপনাকে আগেই বলেছি। নারীদেহের যে তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম সেই প্রথম দিন, যে প্রবৃত্তির তাড়না, তারই তাণ্ডবে মেতে উঠল আমার বার্ধক্যের শীতল রক্ত। তারই জ্বালা বোধহয় ফুটে উঠেছিল আমার চোখের মধ্যে। সেদিকে একবার তাকিয়েই অস্ফুট চিৎকার করে সরে গিয়েছিল মেয়েটা।

    নিজেকে কোনোমতে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল করালী। আমাকে দেখেই হেসে উঠল তার সেই পৈশাচিক হাসি—”কি গো ব্রহ্মচারী, নির্জন বাড়িতে কোন্ ধর্ম-চর্চা হচ্ছিল ওই মেয়েটাকে নিয়ে?” চিৎকার করে বলতে গিয়েছিলাম, চুপ করো। পারি নি; জোর পাই নি মনের মধ্যে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে আমার মুখের উপর তর্জনী তুলে গর্জে উঠেছিল লোকটা—বলো, টাকা দেবে কি না? সমস্ত শক্তি দিয়ে বলেছিলাম, না। তারপর কোনেও দিকে না চেয়ে ছুটে চলে গিয়েছিলাম গঙ্গার ঘাটে।

    ব্রহ্মচারীর উত্তেজিত কণ্ঠ আবার নীরব হল। কয়েক মিনিট বিরতির পর শুনতে পেলাম তার নিরুত্তাপ ধীর স্বর : তার পরের ঘটনা তো আপনি জানেন। জল থেকে উঠতেই আমাকে গ্রেপ্তার করলেন থানা অফিসার। প্রতিবাদ করি নি। ওদের সেই ভয়ঙ্কর অভিযোগও অস্বীকার করতে পারি নি।

    —কেন? সে অভিযোগ তো সত্য নয়?

    —না, তা নয়। যে অপরাধে জড়িত হলাম, যে অপরাধ আমার সাব্যস্ত হল আদালতের বিচারে, তা আমি করি নি —

    —তবে?

    —তবু, নিজের অন্তরের দিকে চেয়ে কেমন করে বলি আমি নির্দোষ?

  • পাঁচ

    পাঁচ

    সোমবার সাপ্তাহিক জেল-টহলের দীর্ঘ প্রোগ্রাম ঘাড়ে নিয়ে সদলবলে শুরু করেছি পরিক্রমা। এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ড ঘুরছি, আর শুনে চলেছি কয়েদী বাহিনীর হরেক রকম অভিযোগ। কার পৈতৃক সম্পত্তি জোর করে দখল করেছে কোন্ দুর্দান্ত জোতদার, প্রতিকার চাই; কে ছ মাস ধরে বাড়ির খবর পায় নি, জানতে চায় কেমন আছে রুগ্না স্ত্রী আর অসহায় অপোগণ্ডের দল; কে হাসপতালে যেতে চেয়েছিল কাল পেটের ব্যথার ‘দাওয়াই’ খেতে, মেট নিয়ে যায়নি, বলেছে আগে দেখা কোনখানে তোর দরদ, তারপর বোঝা যাবে….

    ছোকরা-ব্যারাক শেষ করে ফিমেল ওয়ার্ড অর্থাৎ জেনানা ফাটকের গেটের সামনে গিয়ে প্রসেশন থেমে গেল। কপাটের গায়ে ঝুলছে একটা সরু দড়ি। টানতেই ভিতরে বেজে উঠল মিষ্টি ঘণ্টার আওয়াজ। মিনিটখানেক পরেই দরজা খুলে সেলাম জানাল ফিমেল ওয়ার্ডার। সিপাই বাহিনী রইল বাইরে। উপর মহলের অফিসারদের নিয়ে ঢুকে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে মেট্রনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠের হুঙ্কার : এস্কাট্ আটেনশন্।

    কোনও কালে হয়তো কোনও গ্রাম্য পাঠশালায় মাসকয়েক শ্লেট হাতে যাতায়াত করেছিল গিরিবালা মেট্রন। Squad Attention! এতবড় একটা কটমট ইংরেজি কমাণ্ড তার মুখে আসবার কথা নয়। জেলের তরফ থেকে তাতে কোনও লোকসান হয় নি। কাজ ঠিকই চলে যায়। মানে না বুঝলেও ঐ অভিনব পেটেণ্ট বুলি কানে যাওয়া মাত্র সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে মেয়ে-কয়েদীর দল। আজও তারা একই সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। তারপর ‘নালিশ’ জানাবার পালা। একটি প্রৌঢ়া কয়েদী এগিয়ে দিল একখানা পোস্টকার্ডের চিঠি। বললাম, কী চাই তোমার?

    পড়ে দেখুন বাবা। বড্ড কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার। পরের বাড়িতে ফেলে এসেছি। দেখবার কেউ নেই। আপনি মা-বাপ। দয়া করে হুকুম দিলে কাছে এনে রাখতে পারি। আমার যে খাবার মায়েপোয়ে ভাগ করে খাবো।

    বললাম, তোমাকে তো আগেই বলেছি, সাত-আট বছরের ছেলে জেলখানায় রাখবার আইন নেই; ছ বছর পর্যন্ত যাদের বয়স, তারাই শুধু থাকতে পারে মায়ের সঙ্গে।

    মেয়েটি আর কিছু বলল না। দাঁড়িয়ে রইল মাথা নীচু করে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম দু চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা।

    নিঃশব্দে এগিয়ে গেলাম। লাইনের শেষে অনেকটা যেন তাচ্ছিল্যভরে দাঁড়িয়ে আছে একটি তরুণী। রূপ আছে, কিন্তু সে শুধু আকৃতিগত, অর্থাৎ তার একমাত্র সাক্ষ্য ওর ঐ অবয়ব। রূপের ভিতরে যে প্রাণ থাকে, তার কোনও চিহ্ন নেই। যে লাবণ্য, যে মাধুর্য যৌবনের অত্যাজ্য সহচর তাদেরও খুঁজে পাওয়া শক্ত। রূঢ় কঠিন মুখের উপর দুটি রুক্ষ ক্লান্ত চোখ। দেখে হঠাৎ মনে হবে, দয়া মায়া স্নেহ, প্রীতি ভালবাসা দিয়ে গড়া সংসারের যে একটা কোমল দিক আছে, তার দেখা সে পায়নি; পেলেও তার সবটুকু স্নিগ্ধতা কে যেন ওর ভিতর থেকে নিংড়ে নিয়ে গেছে। যেন একটি পালিশহীন পাথরের মূর্তি। কৌতূহলহীন শূন্য দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

    “কাল এসেছে সেসন্স্ কোর্ট থেকে”—বললেন আমার ‘আমদানী সেরেস্তার’ ডেপুটিবাবু।

    জিজ্ঞাসা করলাম, কী তোমার নাম?

    মামুলী প্রশ্ন; নবাগত সবাইকে যা করে থাকি। নিতান্ত অবহেলাভরে হাতের টিকিটখানা বাড়িয়ে ধরে বলল, পড়ে দেখুন না? শুধু নাম কেন, আরো অনেক কিছু পাবেন।

    আবার অফিসার মহলে একটা চাপা চাঞ্চল্য দেখা দিল। একজন সাধারণ কয়েদীর মুখ থেকে এই জাতীয় উদ্ধত উত্তরে তাঁরা অভ্যস্ত নন। ডিসিপ্লিন রক্ষার তাগিদে আমারও কিছু একটা ‘অ্যাকশন’ নেবার প্রয়োজন ছিল। সেখানে ত্রুটি রয়ে গেল। আর কিছু না বলে টিকিটখানাই শুধু তুলে নিলাম ওর হাত থেকে। চোখ বুলিয়ে দেখলাম নাম—জ্ঞানদা মল্লিক। ঘরে আগুন দেবার অপরাধে চার বছরের জেল দিয়েছেন সেন্সস্ জজ। অজ্ঞাতসারে আর-একবার চোখ পড়ল ওর মুখের দিকে। হঠাৎ মনে হল, নিজের হাতে যে আগুন সে জ্বেলেছে, তার চেয়েও হয়তো কোনও প্রচণ্ড আগুন অদৃশ্য হয়ে ছিল তার বুকের মধ্যে, যার খবর কেউ পায় নি, জজসাহেব বোধহয় জানতে চাননি, কিংবা পারেন নি।

    টিকেটখানা ফিরিয়ে দিতেই একটা বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল ওর পাতলা ঠোঁটের কোণে। তার সঙ্গে শ্লেষ মিশিয়ে বলল, আর কিছু জানতে চাইলেন না? কেন আগুন দিয়েছিলাম? কাকে পুড়িয়ে মেরেছি?

    এহেন অদ্ভুত প্রশ্নের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। তবু বিস্ময়ের ভাব চেপে রেখে বললাম, বলতে চাও সে সব?

    —আপত্তি কী? কতবার তো বললাম। বলে বলে মুখস্থ হয়ে গেছে। প্রথমে পাড়ার পাঁচজন ভদ্দরলোক, তারপর পুলিসের দারোগা, উকিলবাবুরা, ছোট হাকিম, আর শেষটায় জজসাহেব। সবাইকে বলেছি। একবার নয়, দুবার নয়, অনেকবার। চান তো আপনাকেও শোনাতে পারি।

    বললাম, আমি শুনতে চাই না। তুমি কী ছিলে বা কী করেছ, তা দিয়ে আমার দরকার নেই। তোমাকেও তাই বলি, সে সব কথা ভুলে যাবার চেষ্টা করো।

    জ্ঞানদার ওষ্ঠের কোণে সেই কুঞ্চন-রেখাটা মনে হল আর নেই। চোখের তারায় একটু বিস্ময় কিংবা ঐ-জাতীয় কিছু লক্ষ্য করলাম। আমার এ উত্তর হয়তো সে প্রত্যাশা করে নি।

    কয়েকদিন পরেই জজসাহেবের রায়ের নকল এসে গেল। অন্য সকলের মতো জ্ঞানদাকেও প্রশ্ন করা হয়েছিল—আপীল করবে কিনা। আঙুল দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি ছাড়া আর কেনও জবাব পাওয়া যায় নি। তবু যদি কদিন পরে আবার মত বদলায়, এই ভেবে আমার ডেপুটি জেলর নথিপত্রগুলো আনিয়ে নেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তার ভিতর থেকে কাহিনী যা পাওয়া গেল অনেকটা মামুলী ধরনের

    বছর পনেরো বয়সে বিয়ে হয়েছিল জ্ঞানদার। বাপ মারা গেছেন তার অনেক আগে। বিধবা মায়ের কী একটা দুর্নাম ছিল। প্রতিবেশীদের আনুকূল্যে সেই খবরটা পল্লবিত হয়ে যখন তার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পৌঁছল, তারপর আর সেখানে তার ডাক পড়ে নি। স্বামী দেবতাটি কদিন পরেই আর-একজনের কপালে সিঁদুর দিয়ে নির্বিবাদে ঘর-সংসার শুরু করেছেন, এ খবর যথাসময়ে পাওয়া গিয়েছিল। তারপরেও অপেক্ষা করে ছিল জ্ঞানদা। কিন্তু তার আসন্ন যৌবন অপেক্ষা করল না, এবং সেদিকে চেয়ে আশেপাশের মাংস-ভুক পুতঙ্গের দলে চাঞ্চল্য দেখা দিল। সামান্য দু-চার বিঘা ধানের জমি এবং অন্যান্য সম্বল যা ছিল, বরপক্ষের দাবি মেটাতেই তার প্রায় সবটাই উড়ে গিয়েছিল। যেটুকু পড়েছিল তা দিয়ে দুটি মানুষের পেট চলে না।

    এক মুদীর দোকান থেকে ধারে জিনিস আসত। তার পাওনার পরিমাণ বেড়ে বেড়ে এমন একটা অঙ্কে গিয়ে দাঁড়াল, যা শোধ দেওয়া ওদের পক্ষে কোনও কালেই সম্ভব নয়। সেজন্য মেয়ের ভাবনার অন্ত ছিল না, কিন্তু মাকে বিশেষ চিন্তিত বলে মনে হত না। কারণটা জ্ঞানদা তখনও বুঝতে পারে নি। বুঝল সেইদিন, যেদিন মুদীপুত্রের তরফ থেকে তার দেহের দুয়ারে এল সেই ঋণ পরিশোধের দাবি। প্রথমটা ফণা তুলে উঠেছিল, কিন্তু মিইয়ে যেতেও দেরি হয় নি, যখন দেখল, সে দাবির পেছনে রয়েছে মায়ের সমর্থন। শুধু সমর্থন নয়, প্রশ্রয়। জ্ঞানদারা উচ্চবর্ণ, মুদী নিচু জাত। তার পক্ষে ভদ্রপল্লীতে আনাগোনা করা নিরাপদ ছিল না। সুতরাং জ্ঞানদাকেই যেতে হত নৈশ অভিসারে। লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে একটা বাগানবাড়ির নির্জন ঘরে মুদীটি বসে থাকত মিলনের অপেক্ষায়।

    লোকটা মুদী হলেও হৃদয়টা উদার বলতে হবে। নারী-মাংসের স্বাদ একা একা উপভোগ করে কিছুদিন পরেই অতৃপ্তি দেখা দিল। জুটিয়ে ফেলল দু-চারটি বন্ধুবেশী ভাগীদার। কিন্তু জ্ঞানদা এমন বেঁকে বসল যে, বহু চেষ্টা করেও তাকে বন্ধুদের আসরে টেনে নামানো গেল না। মুদী দমবার পাত্র নয়। শুরু হল পীড়ন ও লাঞ্ছনা। ক্রমে সংসার অচল হয়ে দাঁড়াল, মা চঞ্চল হয়ে উঠলেন, কিন্তু জ্ঞানদা রইল অটল। চরম দিন এল এক শীতের রাতে। তার দু’দিন আগে থেকেই চলেছে উপবাস, তার সঙ্গে মায়ের অকথ্য গঞ্জনা। শেষ পর্যন্ত রাজী হল জ্ঞানদা। খবর পাঠাল সেই মুদীর ছেলের কাছে, “রাত বারোটা নাগাদ বাগানবাড়িতে যাচ্ছি। দয়া করে আজকের রাতটা একাই থেকো। কাল থেকে তোমার বন্ধুরাও থাকবে।”

    মুদী তাতেই খুশী। স্ফূর্তির মাত্রাটা বোধ হয় একটু বেশি হয়ে পড়েছিল। তার পরেই বেহুঁশ ঘুম। রাত তিনটের সময় সুযোগ বুঝে পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে পড়ল জ্ঞানদা। আঁচলের তলায় লুকিয়ে এনেছিল এক বোতল কেরোসিন, আর একরাশ ছেঁড়া ন্যাকড়া প্রণয়ীর পকেট থেকে সন্তর্পণে তুলে নিলে দেশলাই। তারপর নিঃশব্দে বাইরে এসে দরজায় শিকল তুলে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দিল জ্বলন্ত কাপড়ের টুকরো।

    দাউ দাউ করে সেগুলো যখন জ্বলে উঠল, জ্ঞানদার মনে হল, এই আগুনটাই বোধহয় এতকাল চাপা ছিল তার সারা বুক জুড়ে। আজ সেটা বাইরে বেরিয়ে আসতেই নিবে গেল তার অন্তরের জ্বালা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তৃপ্ত চক্ষু মেলে দৃশ্যটা সে উপভোগ করল। আরও হয়তো করত, কিন্তু তার পরেই এল মরণাহতের অন্তিম চীৎকার–কে আছ বাঁচাও! হঠাৎ কোথা থেকে তার সমস্ত দেহ জুড়ে বিদ্যুৎ-প্রবাহের মতো ছুটে এল একরাশ ভয়। দুহাতে কান চেপে ধরে ছুটে চলল জ্ঞানদা। নিজের ঘরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর।

    দিনের পর দিন নানা রকম অভিযোগ আসতে লাগল জ্ঞানদার নামে। কাউকে মানে না। কাজকর্ম তার খুশিমত করে, বেশির ভাগই করে না। বলতে গেলে শুনিয়ে দেয় কড়া কথা। মেট্রনকে যখন তখন অপমান করে বসে। সহবন্দিনীরা বোঝাতে এলে নিঃশব্দে চলে যায় সেখান থেকে, নয়তো ঝাঁকিয়ে ওঠে—নিজের চরকায় তেল দাও গে। ‘রিপোর্ট’ লেগেই থাকে। বিচারের জন্যে আমার সামনে যখন হাজির করেন জেলর সাহেব, কোনও প্রশ্নেরই জবাব দেয় না, পীড়াপীড়ি করলে বিরক্তির সুরে বলে ওঠে, আমি আবার কি বলব, ওদের কাছেই তো শুনলেন সব।

    একদিন বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আর পাঁচজন যেমন চলছে, তেমনি করে চলবার চেষ্টা করো। যারা ভালোভাবে থাকে, নিয়মমতো কাজকর্ম করে, মেয়াদ শেষ হবার অনেক আগেই তারা বেরিয়ে যায়।

    কথার মাঝখানেই এল অসহিষ্ণু জবাব—উঃ, আর কত বক্তৃতা করবেন! ওসব রেখে শাস্তি-টাস্তি যা দেবার দিয়ে দিন। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।

    এর পরেই আর-একটা কী গুরুতর অপরাধে বেশ কিছুদিনের জন্যে তাকে সেল্-এ বন্ধ করতে হল, আমাদের শাস্ত্রে যাকে বলে solitary confinement ।

    পরের সপ্তাহে অন্য সব মেয়েদের ‘ফাইল’-পরিদর্শন শেষ করে জ্ঞানদার ছোট্ট নির্জন ঘরটির সামনে গিয়ে যখন থামলাম, জেলের নিয়মমতো তৎক্ষণাৎ তার উঠে দাঁড়াবার কথা। সে ধার দিয়েও গেল না! যেমন ছিল তেমনি বসে রইল দেওয়ালে হেলান দিয়ে। একবার তুলেই নামিয়ে নিল রুক্ষ চোখ দুটো, কপালে দেখা দিল বিরক্তির কুঞ্চন। মিনিট খানেক অপেক্ষা করে বললাম, তুমি লেখাপড়া জান?

    –কেন, তা দিয়ে আপনার কী দরকার?

    —জানতে চাইছিলাম, বই-টই পড়বে?

    সোজা মুখের দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, ঠাট্টা করছেন নাকি?

    —হচ্ছে কী জ্ঞানদা? ধমকে উঠল মেট্রন।

    কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বলল, হবে আবার কী? এদিকে তো শুনি “রিপোর্ট” হলে বই পড়তে দেওয়া হয় না, তাই নাকি আইন। দেখছিও তাই। তাহলে এ কথা জিজ্ঞেস করার মানে কী?

    কথাটা মিথ্যা নয়। জেল-লাইব্রেরী কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বই পেতে পারে তারাই যাদের স্বভাব ও চালচলন নির্দোষ। কারা-অপরাধে যারা শাস্তিভোগ করছে, বই পড়বার সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত।

    জ্ঞানদার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, আমি জানতে চাইছি, তুমি পড়তে চাও কিনা! বই দেওয়া হবে কি না হবে, সেটা আমি বুঝবো!

    —বেশ, দিতে পারেন, নিতান্ত উদাসীন সুরে বলল জ্ঞানদা।

    —কী বই পড়বে?

    —কী বই আবার! গল্প-টল্প থাকলে দেবেন পাঠিয়ে। আপনাদের ঐ ধৰ্ম্মের কথা আর পঞ্চাশ গণ্ডা উপদেশ আমার ভালো লাগে না।

    সেটা ছিল লীগ সরকারের আমল। অলিখিত আইন অনুসারে জেল-লাইব্রেরীর বই নির্বাচনেও ‘রেশিও’ মেনে চলতে হত। ফিফটি-ফিটি। গল্পের বই বলতে যা পড়েছিল আলমারির কোণে, তার মধ্যে বেশির ভাগই ‘ছোলতান ছায়েবের কেরামতি’ কিংবা ‘লায়লা বিবির কেচ্ছা’। সে-সব ও পড়বে না। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম একখণ্ড শ্রীম- কথিত কথামৃত। কী মনে হল ঐখানাই দিলাম পাঠিয়ে।

    সপ্তাহান্তে আবার যখন গেলাম ওদের ওয়ার্ডে, আমি কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই কলকণ্ঠে বলে উঠল জ্ঞানদা, খু-ব বই পাঠিয়েছিলেন যা হোক! ঐ বুঝি আপনার গল্পের বই? সেদিনই তো বললাম, ও-সব ধর্ম্মের বুলি আমার সহ্য হয় না। ও ছাই আমি খুলিও নি। ঐ পড়ে আছে, নিয়ে যেতে পারেন। দিতে চান তো একটা নবেল-টবেল দেবেন। ঐ ‘ছোট জমাদারনী’ যা পড়ে।

    ‘ছোট জমাদারনী’ আমার জুনিয়ার ফিমেল ওয়ার্ডার। তার বয়স তিরিশের নিচে। মেয়ে-স্কুলে ক্লাস সেভেন না এইট পর্যন্ত পড়েছিল বোধ হয়। ডিউটিতে যখন আসে, স্কার্টের তলায় লুকিয়ে আনে, হয় কোনও লোমহর্ষণ ডিটেকটিভ উপন্যাস, নয়তো কোনও আধুনিক লেখকের চিত্তহরণ প্রেমের গল্প। নাম শুনলেই রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। ‘প্রণয়- কণ্টক’, ‘পরিণয়-জ্বালা’ কিংবা ‘সচিত্র যৌবন ফোয়ারা’। প্রাণমাতানো প্রচ্ছদপট। একটি হাবাগোবা গোবর গণেশ উদ্ভ্রান্ত প্রেমিকের পাশে স্বল্পবসনা চটুলনয়না সুন্দরী যুবতী! সেই সব বই পড়ে ছোট জমাদারনী। জেল লাইব্রেরি তার কদর বোঝে না। তাই অগত্যা কথামৃতের পক্ষেই ওকালতি শুরু করলাম। বললাম, নাম দেখেই ভয় পাচ্ছ কেন? ওটাও গল্পের বই। অনেক মজার মজার কথা আছে। পড়েই দেখো না একবার!

    জ্ঞানদা আর কথা বাড়াল না। ভাব দেখে মনে হল, আমার ওকালতির সবটুকুই বোধ হয় মাঠে মারা গেল।

    পরের সপ্তাহে কী কারণে রাউণ্ডে যাওয়া হল না। দিন পনেরো পরে আবার যখন দেখা হল ওর সঙ্গে, মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে নিতে ভুলে গেলাম। কোনও সোনার কাঠির মায়াস্পর্শে যেন রাতারাতি বদলে গেছে জ্ঞানদা। সে উগ্রতা নেই, তার জায়গায় এসেছে একটি কোমল শ্রী। সে লজ্জাহীন প্রগল্ভতা নেই, দু-চোখভরা লাজনম্র মধুর সঙ্কোচ। জড়সড় হয়ে দাঁড়াল আমার বিস্ময়-মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে। দু-গণ্ডে ছড়িয়ে গেল এক ঝলক রক্তিমাভা। মৃদু হেসে স্নিগ্ধকণ্ঠে বলল, দরজাটা একটু খুলতে বলুন না?

    মোটা মোটা গরাদে-দেওয়া ভারী দরজাটা খুলে দেওয়া হল। সঙ্গে সঙ্গে তড়িৎবেগে এগিয়ে এসে আমার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল মেট্রন আর ফিমেল ওয়ার্ডার। মেয়েমানুষ হলেও খুনী তো! কী জানি কী করে বসে!

    মাথা নত করে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল জ্ঞানদা। গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করল আমার পায়ের কাছটিতে। অস্ফুট মৃদু কণ্ঠে যেন আপনমনে বলল, ‘আজ ভারী ভালো লাগছে মনটা’! কপালের উপর থেকে রুক্ষ চুলগুলো সরিয়ে আমার মুখের দিকে আয়ত চোখ মেলে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, এসব কি সত্যি? এমনি ছিলেন ঠাকুর? এমনি আত্মভোলা সরল সদাশিব! এমন সুন্দর কথা সত্যিই বলে গেছেন তিনি?’

    এগুলো হয়তো প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলেও উত্তর সে চেয়েছিল তার নিজেরই মনের কাছে। আমি উপলক্ষ মাত্র। তাই চুপ করেই রইলাম। আমার পরিষদ-দলেও কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। আরও কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কেটে যাবার পর বললাম, বইটা তাহলে ভালো লেগেছে তোমার?

    এ কথার আর উত্তর এল না, শুধু চোখ দুটো বুজে এল, মুখের উপর ছড়িয়ে পড়ল একটি তৃপ্তিময় মৃদু হাসি। কয়েক মুহূর্ত তেমনি তন্ময় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে ফিরে গেল তার সেলের মধ্যে।

    কয়েকদিন পরে আবার এক রিপোর্ট এল জ্ঞানদা মল্লিকের নামে। গিরিবালাকে ডেকে পাঠিয়ে জানতে চাইলাম, কী ব্যাপার? বলল, পনেরো দিন পেরিয়ে গেছে বলে কেরানীবাবু বইটা ফেরত চেয়েছিলেন। হুকুম শোনা দূরে থাক উল্টে দশ কথা শুনিয়ে দিয়ে বলেছে, ইচ্ছে হয় রিপোর্ট করুন গে। আমার যা বলবার আমি বড় সাহেবের কাছেই বলব।

    গিরিবালা বেচারীর জন্যে দুঃখ হল। এ রকম চীজ বোধ হয় একটিও জোটে নি তার এতবড় মেট্রন-জন্মে! অথচ কী করা যায়! বললাম, না দিতে চায় থাক না! ওকে ঘাঁটিয়ে কী লাভ? কেরানীবাবুকে ডেকে আমিই বরং বলে দেবো।

    বলা বাহুল্য, এই উলটো বিচার মেট্রনের মনঃপূত হল না। তার গম্ভীর মুখ এবং দ্রুত প্রস্থানের ভঙ্গি দেখেই তা বোঝা গেল।

    জ্ঞানদার তরফেও অভিযোগ ছিল। পরের সপ্তাহে দেখা হল ওর সেলের দরজায়। যেতেই বলে উঠল, আপনার ঐ কেরানীবাবুটিকে একটু ধমকে দেবেন তো! যখন তখন বলে পাঠায় ঐটুকু বই শেষে করতে কদিন লাগে? শুনুন কথা! এ বই যে কোনোদিন শেষ হয় না, সে কথা ওকে বোঝাই কেমন করে?

    ঐ জেলের মেয়াদ আমার শেষ হয়ে এসেছিল। আবার কোথায় গিয়ে ছাউনি ফেলতে হবে, সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছিলাম। হঠাৎ এল সেই অমোঘ আদেশ। শেষবারের মতো যখন ঢুকলাম জেনানা ফাটকের গেটে, তার অনেক আগেই জ্ঞানদার সেলের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল! কিন্তু সেই নিরালা ছোট্ট কুঠরির মায়া ছাড়তে চায় নি। মেট্রনকে বলে কয়ে ইচ্ছা করেই বেছে নিয়েছিল নির্জন-বাস। আমাকে দেখে বেরিয়ে এসে প্রণাম করল সেইদিনকার মতো। শুধু মাটিতে মাথা ঠেকানো নয়, কম্পমান কোমল হাতে তুলে নিল পায়ের ধুলো। উঠে দাঁড়াতেই নজরে পড়ল থমথম করছে মুখ, চোখ দুটো ফুলো-ফুলো। তার কোণে শুকিয়ে আছে জলের রেখা, বোধহয় মুছতে ভুলে গেছে। হঠাৎ বলে উঠল অশ্রুরুদ্ধ করুণ কণ্ঠে, এবার যে ওরা আমার কথামৃত কেড়ে নিয়ে যাবে!

    সঙ্গে সঙ্গে ঝরঝর করে ঝরে পড়ল চোখের জল। যদ্দূর সম্ভব সহজ সুরেই বললাম, নিলেই বা! তার জায়গায় দুখানা নতুন বই পেয়ে যাচ্ছ তুমি। সেগুলো তোমার। কোনোদিন কেউ ফেরত চাইবে না।

    —সত্যি! সিক্ত চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল জ্ঞানদার। তারপর বলল, অনেক দয়া করেছেন, অনেক স্নেহ পেয়েছি আপনার কাছে। শেষবারের মতো আর একটা জিনিস চাইব।…দেবেন তো?

    —কি জিনিস বলো?

    —ওদের একটু সরে যেতে বলুন।

    হাতের ইশারায় অনুচরদের সরিয়ে দিলাম। জ্ঞানদা এগিয়ে এল আমার একান্ত কাছটিতে। ফিসফিস করে বলল, একখানা ঠাকুরের ছবি।

    তখনকার জেলের আইনে কয়েদীর পক্ষে কোনও ছবি বা ফোটোগ্রাফ রাখা নিষিদ্ধ আইন রক্ষার ভার কাঁধে নিয়ে নিজের হাতে তা লঙ্ঘন করি কেমন করে? কিন্তু এদিকে যে দুটি সজল চোখ আমার পানে চেয়ে অধীর প্রতীক্ষায় উন্মুখ, তাদের সে কথা বোঝানো যায় না। তার প্রয়োজনও হল না। হঠাৎ কখন আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, দেবো। পরদিন জ্ঞানদার কোনও এক কল্পিত আত্মীয়ের তরফ থেকে দু-খণ্ড কথামৃত ওর নামে জমা দেওয়া হল। তার মধ্যে লুকানো রইল একখানা ঠাকুরের ছবি।

    জ্ঞানদার কাহিনী এইখানেই শেষ হল। এর পরের অংশটুকু আমার। আমারই এক লজ্জার কাহিনী!

    সেই দিন থেকে বছরের পর বছর এক জেল থেকে আরেক জেলে ঘুরেছি। মাঠে, মন্দিরে, গৃহস্থের পূজার ঘরে যখনই যেখানে চোখে পড়েছে ঠাকুরের কোন ছবি, তার পাশটিতে ফুটে উঠত একখানা অশ্রুলাঞ্ছিত নারীর মুখ। লজ্জায়, অপরাধে, ক্ষোভে, অনুশোচনায় ছট্‌ফট্ করে বেড়াতাম। এ আমার কী হল! পরমহংসের পাশে পাপীয়সী! কাকে বলি আমার এ অধঃপতনের ইতিহাস?

    তারপর অকস্মাৎ একদিন মনে হল, নিজের পাশে ঐ স্থানটি ঠাকুরই ওকে দিয়েছেন। এই হতভাগিনী মেয়েটা, সংসারে কারও কাছে যে আশ্রয় পায়নি, তিনি তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। তাঁরই ‘কথামৃতের’ সঞ্জীবনী ধারায় ও নতুন করে বেঁচে উঠল। দৈবক্রমে সে অমৃত আমিই এনে ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আমি তার বাহক। এ তো আমার লজ্জা নয়, এ আমার গৌরব!

    ।। তৃতীয় পৰ্ব সমাপ্ত।।

  • এক

    এক

    সাধারণ ভাবে দেখতে গেলে, লেখক ও পাঠকের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটা দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক। প্রথম জন দেয়, দ্বিতীয় জন নেয়। একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, সম্পর্কটা পারস্পরিক, যাকে বলে মিউচুয়্যাল। পাঠকও দেয়, অনেক সময় অকাতরে, এবং লেখক সে দান অজ্ঞাতসারে গ্রহণ করে।

    নিতান্ত দৈবক্রমে সহসা যেদিন লেখকের ভূমিকায় নেমে পড়েছিলাম, তারপর থেকে বুঝেছি, অদৃশ্য হাত থেকে পাওয়া সেই অজানা দানের দাম অনেক।

    জানি, সকলে এ-মত মানতে চাইবে না; বলবেন, লেখক যেখানে স্রষ্টা, তার সৃষ্টিই তো তার মন ভরে দেয়। পাঠকের কাছ থেকে কি এল আর না এল, সে বিষয়ে সে উদাসীন।

    কথাটা আংশিক সত্য। নিজের সৃষ্টির মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। কিন্তু তার গভীরতা থাকলেও স্থায়িত্ব বড় কম। খোলা পাত্রে রাখা কর্পূরের মতো দুদিনেই উবে যায়, যদি তার উপরে একটি আচ্ছাদন না থাকে। সেই আচ্ছাদন হল পাঠকের স্বীকৃতি।

    যে-আনন্দ শুধু আমার, যেখানে আপনার অংশ নেই, তার মধ্যে তৃপ্তি কোথায়? একা আমি যা পেলাম সেটা নিছক ভোগ, অন্যের সঙ্গে ভাগ করে যা পেলাম, সেটা উপভোগ।

    অনেক সময় দেখা গেছে, আমার কাছে আমার সৃষ্টির কোনো মূল্য নেই, কিন্তু আপনার কাছে আছে। আমি কিছুই পেলাম না, আপনি তাকে গ্রহণ করলেন, সেখানে সেই গ্রহণই আমার পরম পাওয়া।

    বিখ্যাত স্কটিশ লেখক এ জে ক্রোনিন যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘হ্যাটাস্ ক্যাসল’ লিখতে শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স তেত্রিশ। ডাক্তার মানুষ; লেখার নেশা কোনোকালে ছিল না। সাহিত্যিক হবার দুরাশা কোনোদিন পোষণ করেন নি। দীর্ঘ রোগভোগের পর স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে হাইল্যাণ্ডসে ঘুরছিলেন। হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে অগত্যা একদিন কালি-কলমের শরণ নিলেন। একখানা উপন্যাস। একটু একটু করে এগুতে লাগলেন। মাঝামাঝি পৌঁছে মনে হল, কিছুই হয় নি, আগাগোড়া সবটাই পণ্ডশ্রম। পাণ্ডুলিপিখানা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ডাস্টবিন-এ। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। তার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লেন। এক চাষী প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা। ডাক্তারকে সে ভালবাসত। অসুস্থ শরীরে জলে ভিজছেন দেখে অনুযোগ দিতে লাগল। ক্রোনিন হয়তো বলতে চান নি; কিন্তু কথায় কথায় ভারাক্রান্ত মনের ব্যর্থতার ক্ষোভ আপনা থেকেই বেরিয়ে এল। উপন্যাসের কাহিনীর একটা মোটামুটি খসড়াও জানিয়ে দিলেন সেই সঙ্গে।

    চাষীর সাহিত্যজ্ঞান সামান্য। কিন্তু অত দিন ধরে যত্ন করে গড়ে তোলা একটা জিনিস নিজের হাতে নষ্ট করার মধ্যে যে বেদনা আছে, সেটা তার মনে লাগল। হয়তো সান্ত্বনাচ্ছলেই বলেছিল, বেশ তো হচ্ছিল লেখাটা। ফেলে দিলেন কেন?

    বেশ হচ্ছিল। একজন অজ্ঞ কৃষকের এই সামান্য স্বীকৃতি যেন এক আশ্চর্য মন নিয়ে এল ক্রোনিনের প্রাণে। তখনই বাড়ি ফিরে এলেন, ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করলেন জলে- ভেজা কাগজগুলো, উনুনের ধারে শুকিয়ে নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করলেন লেখা। বই যখন বেরোল, রাতারাতি বেস্ট-সেলার।

    অকস্মাৎ জীবনের মোড় ফিরে এল। স্টেথস্কোপ ছেড়ে বরাবরের জন্যে লেখনী আশ্ৰয় করলেন এ. জে. ক্রোনিন। সারা পৃথিবীর এক বিপুল পাঠকসমাজ তাঁকে তার ডিস্পেনসারির অজ্ঞাত কোণ থেকে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিল সাহিত্যের আম-দরবারে।

    লেখকের ভাগ্যবিবর্তনে পাঠকের দান অপরিসীম।

    শোনা যায়, এর ঠিক উল্টোটা ঘটেছিল হতভাগ্য তরুণ কবি কীটস-এর জীবনে। উত্তরকালে যাঁর সম্বন্ধে প্রসিদ্ধ সমালোচকেরা রায় দিয়েছিলেন, বেঁচে থাকলে এ কবি শেক্সপীয়রকে ছাড়িয়ে যেত, ছাব্বিশ বছর বয়সে ক্ষয়রোগে হল তাঁর জীবনাবসান। দায়িত্বহীন সমালোচকের তীক্ষ্ণ আঘাত ছাড়া সাধারণ পাঠকের কাছ থেকে কিছুই তিনি পেয়ে যান নি। যদি পেতেন, আমার মনে হয়, যে জীবন ও ধরণীকে তিনি অমন প্রগাঢ়ভাবে ভালবেসেছিলেন তার দ্বার থেকে হয়তো তাঁকে অত শীঘ্র বিদায় নিতে হত না।

    কিন্তু সব দেশেই একদল ব্যর্থ লেখক ও উন্নাসিক সমালোচক ‘সাধারণ পাঠক’কে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে থাকেন। ‘জনপ্রিয়’ শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে তার মধ্যে বেশ খানিকটা শ্লেষ না মিশিয়ে ছাড়েন না। তাঁদের মতে যে-বস্তু অনেকে পড়ে তার মধ্যে বস্তু নেই। কে জানে, ‘অনেকে’র উপর এই অবজ্ঞার অন্তরালে কিঞ্চিৎ ‘টক আঙুর’- ক্ষোভ লুকিয়ে আছে কি না!

    তাঁরা যাই বলুন, এ-কথা না মেনে উপায় নেই, বৃহৎ পাঠকগোষ্ঠীর সাগ্রহ দৃষ্টি যিনি লাভ করেছেন, সে লেখক পরম ভাগ্যবান। যিনি শুধু কৌতূহল জাগাতে পেরেছেন, তিনিও মন্দভাগ্য নন। যিনি তাও পারেন নি, চারদিক থেকে পেয়েছেন শুধু ঔদাসীন্য, তাঁর মতো দুর্ভাগা আর নেই।

    আজ থেকে দশ বছর আগে নিছক খেয়ালের বশে যেদিন ‘লেখনী ধারণ করেছিলাম—কথাটা বোধহয় ঠিক হল না, লেখনীকে চালনা করেছিলাম তার স্বধর্ম থেকে পরধর্মে, ‘ড্রাফট, নোটিং আর সিগনেচার’-এর বাঁধা পথ থেকে অজানা পথে, ‘সাহিত্য’ নামক অজ্ঞাত ও নিষিদ্ধ রাজ্যের সীমানায়—সেদিন আমার মনশ্চক্ষে অনাগত পাঠকের যে-রূপটি ভেসে উঠেছিল, সেটা উদাসীনের রূপ, ইংরেজিতে যাকে বলে কোল্ড। তোষ নয়, রোষও নয়, নির্বিকার তাচ্ছিল্য। তার বেশি আর কোনো প্রত্যাশা আমার ছিল না। কেমন করে থাকবে? লেখক তো রাতারাতি জন্মায় না। তার পিছনে দীর্ঘদিনের সাধনা চাই, চাই অবিশ্রান্ত অনুশীলন। সেখানে একটি বৃহৎ শূন্য ছাড়া আর কোনো মূলধন যার নেই, পাঠক মহারাজের দৃষ্টিপ্রসাদ দূরে থাক, দৃষ্টিপাতের সৌভাগ্যই বা আশা করবে সে কোন্ অধিকারে?

    তাছাড়া, কী তার বিষয়বস্তু। রাজ-রাজড়ার গৌরব-কাহিনী, অভিজাত সমাজ বা সুখী সংসারের মধুর আলেখ্য, কিংবা বিশ্বনাথ কবিরাজ যাকে বলেছেন ‘ধীরোদাত্ত সুমহান’ মানব-গোষ্ঠীর কীর্তিগাথা অথবা আধুনিক মতে ‘মেহনতী মানুষের জীবনযন্ত্রণা’–এর কোনোটাকে অবলম্বন করে মহৎ সাহিত্য রচনার আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে সে আসে নি। সে সুযোগ ও সামর্থ্য তার থাকলে তো? লোকচক্ষুর অন্তরালে যে মসিলিপ্ত সঙ্কীর্ণ জীবনধারা যুগ যুগ ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছে, মানবতার প্রাথমিক স্বীকৃতি পর্যন্ত যেখানে গিয়ে পৌঁছয় নি, তারই ভিতর থকে কয়েকটি খণ্ডচিত্র আহরণ করে লৌহতোরণের একটা পাল্লা খুলে বাইরের পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছিল। তার মধ্যে না ছিল চোখ- ধাঁধানো বর্ণ-সম্ভার, না ছিল তাক-লাগানো শিল্প-শৈলী। অত্যন্ত সাধারণ সুরে বলা কতগুলো অবাঞ্ছিত মানুষের কলঙ্কের কথা। সংসারে কার তাতে কী প্রয়োজন? কোন্ কল্যাণ সে বয়ে আনবে সৎ ও সভ্য সমাজের দ্বারে? কে শুনবে সে কাহিনী? এই প্রশ্নটাই মনের মধ্যে মুখর হয়ে উঠেছিল।

    দীর্ঘ আট বছর পরে কী পেলাম আর ন্যায়ত কী আমার পাওনা ছিল, মনে-মনে তার সালতামামির খসড়া করতে গিয়ে বারবার শুধু একটি কথাই মনে হচ্ছে—সংসারে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে কী দুস্তর ব্যবধান! পাওয়া যে আমার প্রাপ্যকে এমন করে ছাড়িয়ে যাবে, কে ভেবেছিল? যা পেয়েছি, তার মধ্যে কতটা প্রশস্তি আর কতটা দোষারোপ, সে প্রশ্ন আমার কাছে অবান্তর। কারা খুশী হয়ে জিন্দাবাদ দিয়ে গেছে, আর কারা রুষ্ট হয়ে নিন্দাবাদ শুনিয়ে গেল, তার হিসাবও অর্থহীন। সাড়া যে মিলেছে, সেইটাই তো সবচেয়ে বড় পুরস্কার। দীর্ঘদিন ধরে আমি যা দেখেছি, তার কথা যেমন করেই বলে থাকি না কেন, সে বলা একেবারে ব্যর্থ হয় নি, সাধারণ মানুষের সংবেদনশীল হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি, তার চেয়ে বড় গৌরব আর কী থাকতে পারে? আজ মুক্তকণ্ঠে কৃতজ্ঞ অন্তরে এই কথাটি বলে যেতে চাই।

    এ শুধু আমার ঋণস্বীকারের তাগিদ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছুটা জবাবদিহির দায়। আমার ‘পাঠক-পাঠিকা’ নামক কঠোর মনিবের কাছে জবাবদিহি।

    কথাটা আর একটু খুলে বলা প্রয়োজন।

    যে-সব খ্যাতনামা ব্যক্তি লেখকদের কাছ থেকে ভুরি ভুরি বই উপহার পেয়ে থাকেন এবং প্রত্যুপহারস্বরূপ দরাজহস্তে প্রশংসা-পত্র বিতরণ করেন, আমি তাঁদের কৃপা-লাভে বঞ্চিত রয়ে গেছি। সুতরাং প্রসিদ্ধ মাসিক বা সাপ্তাহিকের পাতায় ক্ষুদ্র অক্ষরে মুদ্রিত বৃহৎ বৃহৎ ‘অভিমত’ শোভিত বিজ্ঞাপন আমার ভাগ্যে জোটে নি। আমার যারা পাঠক, তাদের বেশির ভাগই খ্যাতি-প্রতিষ্ঠাহীন সামান্য মানুষ। বই তাদের অর্থমূল্যে সংগ্রহ করতে হয়, কাজেই না পড়ে ছাড়ে না। পড়ে, বন্ধুদের পড়ায় এবং ভাল-লাগা ও মন্দ- লাগা দুটোকেই প্রচণ্ডভাবে প্রকাশ করে। সাধারণত সে প্রকাশ-স্থল—ক্লাব, হস্টেল, কলেজের করিডোর, পাড়ার লাইব্রেরি, রেলের কামরা কিংবা মেস বা পারিবারিক খাবার ঘর। যাদের উৎসাহ কিঞ্চিৎ প্রবল, তারা আর একটু এগিয়ে যায়, অর্থাৎ কালি-কলমের আশ্রয় নেয়। না, সাময়িক পত্রে প্রবন্ধ বা পত্রাঘাতের উদ্দেশ্যে নয়। সেখানে প্রথম বাধা—তারা সম্পাদকের প্রিয়পাত্র বা পরিচিত নয়, দ্বিতীয় এবং দুর্জয় বাধা, রচনাটা যার সম্বন্ধে সে-লোকটা কোনো কাগজ-গোষ্ঠীর বশ্যতা স্বীকার করে নি, সুতরাং আনুকূল্য বা অনুগ্রহও পায় নি। তখন এই সব উৎসাহী পাঠক-পাঠিকার সামনে একমাত্র খোলা পথ—তাদের মনের কথাটি সরাসরি লেখকের কাছে তুলে ধরা। একখানা চিঠি। তার মধ্যে নিন্দা প্রশংসা অনুকূল বা প্রতিকূল আলোচনা যতটা থাকে, তার বেশি থাকে প্রশ্ন—’এটা কেন হল, ওটা কেন হল না। অমুকের উপর কি আপনি অবিচার করেন নি? তমুক কি আর ফিরে আসবে না? ওর সঙ্গে তার মিলন ঘটালে কী দোষ হত? যাই বলুন, নায়িকা চরিত্রের প্রথম দিকটার সঙ্গে শেষ দিকের সঙ্গতি-রক্ষা হয় নি, আপনি কী বলেন?’ ইত্যাদি।

    মাঝে মাঝে সেই বিচিত্র প্রশ্নে ভরা চিঠির ঝাঁপি যখন খুলে বসি, ভারি কৌতুক লাগে, তার সঙ্গে বিস্ময়। ভেবে চিন্তে, গুছিয়ে, সাজিয়ে বলার যে মুন্সিয়ানা, তা কোথাও নেই। কতগুলো সরল নিরাভরণ আড়ম্বরহীন অন্তরঙ্গ ঘরোয়া উক্তি। কিন্তু তার প্রতিটি ছত্রে যে আন্তরিকতা ও সহজ রসানুভূতির স্পর্শ জড়িয়ে আছে তার একটা কণাও কি পাওয়া যায় নামজাদা সাময়িক পত্রের ভাড়াটে সমালোচকের গাল চিবিয়ে বলা ধোঁয়াটে কিংবা জটিল মুরুব্বিয়ানার মধ্যে?

    পুরনো চিঠির তাড়ার ভিতর থেকে কত অশ্ৰুত কণ্ঠ কানে আসছে। কোনোটা কোমল, কোনোটা কঠোর। কারও সুরে অভিভূতের উচ্ছ্বাস, কারও কণ্ঠে বিচারকের তীক্ষ্ণতা। কিন্তু এক জায়গায় সকলেই এক। সকলেরই কিছু জিজ্ঞাসা আছে।

    একটি প্রশ্ন দেখছি অনেকের। বারংবার এসেছে, নানা আকারে এবং নানাজনের কাছ থেকে—’জেলখানার লোক হয়ে জেলের দরজা খুলে ধরলেন কোন্ সাহসে?’ ‘দরদ প্রীতি ও সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়ে যাদের দেখেছেন এবং দেখিয়েছেন, তাদের কঠোর শৃঙ্খলার নিগড়ে বেঁধে রাখাই তো ছিল আপনার সরকারী কর্তব্য। এ দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখলেন কেমন করে?’ ‘আপনার সহকর্মী, অনুকর্মী এবং উপরমহল—কে কী ভাবে নিলেন আপনার সাহিত্যকর্ম?’ ‘যে সব রূঢ় এবং স্পষ্ট কথা লিখে গেছেন, তার জন্যে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল কি?’

    এই জাতীয় প্রশ্ন যাঁরা করেছেন, বুঝতে পারি তাঁরা অনেকেই আমার জন্যে উদ্বেগ বোধ করেছিলেন। কেউ কেউ হয়তো সরকারী অফিসের লোক, সুতরাং ভুক্তভোগী। এঁদের কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে কিঞ্চিৎ বিব্রত বোধ করছি। সকলেই জানেন, সরকারী দপ্তরখানার সব অংশটা প্রকাশ্য নয়। আজ যদিও তার আওতা থেকে দূরে সরে এসেছি। তবু যা গোপন, তাকে লোকচক্ষুর অন্তরালেই রাখতে চাই। তার দ্বারা হয়তো অনেক মুখরোচক তথ্যের স্বাদ থেকে পাঠককে বঞ্চিত করছি। কি করি, নিরুপায়।

    কারাপ্রাচীরের অন্তরালে যে অলক্ষ্য জীবনস্রোত, আমার আগেও তার কিছু-কিছু অন্তরঙ্গ পরিচয় বাংলা সাহিত্যে রূপলাভ করেছে। তার মধ্যে অনবদ্য শিল্পসৃষ্টির অভাব নেই। যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন রাজনৈতিক বন্দী। কারাশাসনের সঙ্গে জড়িত আমিই বোধহয় প্রথম, যার মাথায় এই অদ্ভুত খেয়াল চেপেছিল। দুঃসাহসের কাজ সন্দেহ নেই এবং দুঃসাহস মাত্রেরই ফলভোগ করতে হয়, আমাকেও হয়েছে। তার অপ্রিয় অংশটা যথাসম্ভব বাদ দিয়ে সেইটুকু শুধু বলি, যার মধ্যে জিজ্ঞাসিত প্রসঙ্গের সঙ্গে হয়তো কিঞ্চিৎ কৌতুকরসের সন্ধান পাওয়া যাবে।

    .

    সকালের ‘ডাক’ এসে পৌঁছল। একরাশ বাদামী রঙের লম্বা লেফাফা ‘অল ইণ্ডিয়া গভর্ণমেন্ট সার্ভিস’। তার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে একখানি হাল্কা সবুজ চৌকো খাম, তার উপরে সুঠাম হস্তাক্ষর। রাবীন্দ্রিক ধাঁচের সঙ্গে মেয়েলি ঢংয়ের সংমিশ্রণ। মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। পাঠিকার চিঠি। এর আগে কয়েকখানা মাত্র পেয়েছি। মোহ তখনও কাটে নি। খুলতেই যেন ধাক্কা খেয়ে স্বপ্নের জাল কেটে গেল। নিতান্ত অ-নারীসুলভ রূঢ় ভাষায় লিখেছেন জনৈক কলেজের ছাত্র—”লৌহকপাট পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখনি সন্দেহ ছিল, একজন জেল-কর্মচারীর কলম থেকে এমন সুন্দর সরস লেখা বেরোয় কি করে? পরে জেনেছি, আপনি একটি পাকা তস্কর, আর এক নম্বর জালিয়াৎ। এ বইয়ের একবর্ণও আপনার লেখা নয়। একজন রাজনৈতিক বন্দীর ডায়েরি থেকে হুবহু টুকে নিয়ে নিজের নামে ছেপে দিয়েছেন। আমাদের বাংলার প্রফেসর মিস্—বলেছেন ক্লাসে। তাঁর ভাই জেলে চাকরি করেন, তাঁর নিজের মুখ থেকে শোনা। এ-কথা আপনি অস্বীকার করতে চান?”

    না, চাই না। কারণ অস্বীকার করে লাভ নেই। একে অধ্যাপিকার উক্তি, তার উপর তাঁর ভাইয়ের সাক্ষ্য, তিনি আবার জেলের লোক—একজন কলেজের ছাত্রের পক্ষে ডবল বেদবাক্য। আমার প্রতিবাদ সেখানে দাঁড়াবে কিসের জোরে?

    ঠিক এরই প্রতিধ্বনি শোনা গেল আমার এক পরম শুভানুধ্যায়ী প্রাক্তন মনিবের কাছে। পিঠের উপর প্রচণ্ড চপেটাঘাত করে বললেন, সাবাস! যেখানে যাই, শুধু তোমারই নাম, সেই সঙ্গে পয়সাও বেশ আসছে শুনলাম। তা (এবার গলা খাটো করলেন ভূতপূর্ব মনিব) ব্যাপারটা কি বল দিকিন? রাতারাতি লেখক হয়ে পড়লে কেমন করে? এসব মাল পেলে কোথায়?

    এখানেও অস্বীকার করা বৃথা। তাঁর চোখেমুখে রহস্যময় খুশির হাসি ফুটিয়ে তুলে বললাম, পেয়েছি এক জায়গায়।

    “তাই বল”, ভীষণ ‘খুশি’ হলেন ভদ্রলোক। পরক্ষণেই তাঁর সারামুখে ঘনিয়ে এল নৈরাশ্যের কালো ছায়া। নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “কি জানো? সবই হচ্ছে এই কপাল। তা না হলে আমি তো বলতে গেলে সারাজীবন ঐ স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চেই কাটিয়ে এলাম। রাত জেগে একগাদা ডেটিন্যু আর স্টেট্‌প্রিজারের খাতা সেন্সর করে মাথা ধরাই সার হল। আগাগোড়া সবটাই রাজনীতির কচকচি। অমন মিষ্টি গল্প কি একটাও থাকতে নেই।”

    একদিন শুনলাম, ‘লৌহকপাট’-এর আর একজন গ্রন্থকার আবিষ্কৃত হয়েছেন। ডেটিন্যু বা পলিটিক্যাল প্রিজনার নয়, আমারই জনৈক প্রীতিভাজন সহকর্মী ও বন্ধু। এক সময়ে এখানে ওখানে দু-চারটে গল্প, প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ছবি আঁকেন, চমৎকার বক্তৃতা করতে পারেন। তার ফলে ডিপার্টমেন্টের নীচের মহলে কিছুসংখ্যক ভক্ত লাভ করেছেন। তাদেরই একজন ছুটি নিয়ে গাঁটের পয়সায় রেল-ভাড়া দিয়ে তাঁর কর্মস্থলে গিয়ে এ রকম ‘যুগান্তকারী গ্রন্থরচনা’র জন্যে উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন জানিয়ে এসেছে। বন্ধুটি রসিক ব্যক্তি। ‘হাঁ’ ‘না’ কিছুই না বলে মধুর হাসি দিয়ে ভক্তকে আপ্যায়িত করেছেন। তারপর আমার সঙ্গে যখন দেখা হল, ব্যাপারটার সরস বর্ণনা দিয়ে যোগ করলেন, “ছদ্মনামের বিপদটা দেখলেন তো? কার নৈবেদ্য কে পায়!”

    ছদ্মনাম নিয়ে একদিন কিন্তু সত্যিই এক ‘বিপদ’ ঘটবার উপক্রম হল। আমার অফিসের এক কর্মীর সঙ্গে বন্ধুর আর এক ভক্তের তুমুল বিরোধ বেধে গেল। এ পক্ষের হাতে অকাট্য প্রমাণ—ছাপাখানা থেকে বাণ্ডিল বাণ্ডিল ‘প্রুফ’ আসতে দেখেছে তার ‘সাহেবে’র নামে। ও-পক্ষ তা শুনবে কেন? তার ‘হিরো’ যে নিজে মুখে স্বীকার করেছেন, তিনিই গ্রন্থকার। মৌন যে সম্মতির লক্ষণ, তার এমন নিদারুণ দৃষ্টান্ত বোধহয় আর কখনও দেখা যায় না। বচসা যখন হাতাহাতির পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, আশেপাশের লোকজন এসে ছাড়িয়ে দিল।

    আমার চেয়ে কিছু সিনিয়র একজন ‘দাদা’-স্থানীয় সহকর্মী একদিন লোক-মারফৎ একটি প্রস্তাব পাঠালেন, যাকে রীতিমত লোভনীয় বলা চলে। বইয়ের দৌলতে আমি যে এরই মধ্যে ‘লাল’ হয়ে গেছি, এই ‘খবরটা’ তখন বিভিন্ন জেলের অফিসপাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ‘দাদা’ নিশ্চয় তার দ্বারা উদ্বুদ্ধ এবং কিঞ্চিৎ প্রলুব্ধ হয়ে থাকবেন। বলে পাঠালেন আমি যা জানি এবং লিখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি চাঞ্চল্যকর মালমসলা তাঁর ভাণ্ডারে সঞ্চিত আছে। ইচ্ছা করলেই তিনি যে কোনো সময়ে সেগুলো লিখে ছাপিয়ে ফেলতে পারেন এবং সে জিনিস হাতে পেলে আমার এই সব জোলো কাহিনীর দিকে কেউ ফিরেও তাকাবে না। সেই জন্যেই সে ‘ইচ্ছা’ সংবরণ করছেন। অনুজ-স্থানীয় বন্ধুর কোনো অনিষ্ট হয় এটা তিনি চান না। মালগুলো তিনি আমাকে দিয়ে দিতে পারেন, অবশ্য কিঞ্চিৎ বাণিজ্যের বিনিময়ে। টারস্‌ আমারই অনুকূল—ফিটি ফিটি।

    ভাবছি, সেদিন যদি সেই সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতাম, ‘দাদা’র দাক্ষিণ্যে আজ আমি কোথায়!

    আর একজন বন্ধুও সত্যিকার বন্ধুর কাজ করেছিলেন। একটা সাধারণ খাম খুলতেই বেরিয়ে পড়ল একখানা পাঁচ টাকার নোট, সেই সঙ্গে বিরাট চিঠি। তার সারমর্ম—আমার মতো একজন প্রতিভাবান লেখককে লাভ করে সমস্ত কারাবিভাগ গৌরবান্বিত, এবং তার সহকর্মী হবার সৌভাগ্যে তিনিও গর্বিত। দুঃখের বিষয়, এখনও আমার লেখার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে নি। বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও স্থানীয় কোন দোকানে আমার ব‍ই পাওয়া যায় নি। সেই জন্য পাঁচটি টাকা পাঠালেন। বাকী প্রাপ্যের বিল-সমেত দু-খণ্ড পুস্তক যেন অবিলম্বে তাঁর নামে পার্সেল করা হয়।

    আমি টাকা পাঁচটি মণিঅর্ডারে ফেরৎ দিয়ে সবিনয়ে জানালাম, আমার কোনো বইয়ের দোকান নেই, সুতরাং টাকা গ্রহণে অক্ষম। বই দুখানা তাঁর কাছে উপহারস্বরূপ পাঠাবার জন্যে কোলকাতায় প্রকাশককে নির্দেশ দেওয়া হল।

    পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, যে শহরে তিনি থাকতেন সেখানকার সবগুলো বইয়ের দোকানেই এ বই বিক্রি হচ্ছিল। স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিও একাধিক কপি সংগ্রহ করেছিল।

    পরের খবর। বই উপহার পেয়ে বন্ধু যত্ন করে পড়েছিলেন এবং কতকগুলো বিশেষ বিশেষ জায়গা লাল পেন্সিলে চিহ্নিত করে সোজা গিয়ে হাজির হয়েছিলেন এমন এক বৃহৎ ব্যক্তির দরবারে, যাঁর হাতে আমাদের জীবনমরণের কলকাঠি। তাঁকে পরিষ্কার করে বুঝিয়েছিলেন, জেলখানার উচ্চপদে অধিষ্ঠিত থেকেও এই দায়িত্বজ্ঞানহীন লেখক যেখানে সেখানে যথেচ্ছভাবে প্রচলিত কারা-ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছে; বন্দীদের জন্যে যে-সব সংস্কারমূলক বিধি-বিধান ও সুযোগ-সুবিধার প্রবর্তন করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তার উপর বক্র কটাক্ষ করেছে; বিশ্বস্ত কর্মী এবং সরকার নিযুক্ত সম্মানিত জেল ভিজিটরদের সম্বন্ধে মানহানিকর মন্তব্য করেছে; এবং চোর ডাকাত গুণ্ডা বদমাসদের উপর সস্তা দরদের ভান করে জেল-ডিসিপ্লিনের কোমর ভেঙে দিয়েছে—ইত্যাদি।

    কোনো ব্যক্তিগত কারণে (সুতরাং অপ্রকাশ্য) বৃহৎ ব্যক্তিটি আমার উপরে আগেই রুষ্ট হয়ে ছিলেন। লালরেখাঙ্কিত লাইনগুলো সেখানে কিঞ্চিৎ ইন্ধনের কাজ করে থাকবে। বন্ধু তাঁর কাছ থেকে কী আশ্বাস নিয়ে ফিরেছিলেন, প্রকাশ পায় নি। তবে যে-রকম ব্যস্ততার সঙ্গে ছুটে এসে আমার আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত দিয়ে সবিস্তারে সমবেদনা জানিয়েছিলেন, তার থেকে অনুমান করি, তাঁর দৌত্য একেবারে ব্যর্থ হয় নি।

    প্রতিদিন নানা সূত্র থেকে নানা রকম ভয়াবহ খবর কানে আসতে লাগল। বোঝা গেল, আমার মাথার উপরে খড়্গ শাণিত হচ্ছে। কখন কি ভাবে এসে পড়ে তার জন্যে অপেক্ষা করে রইলাম। যখন সত্যি সত্যি এল, তার আকার ও ওজন দেখে আমার বন্ধু ও তার দলবল তো বটেই, আমিও হতাশ হলাম। ‘টার্ম’ পুরো হবার আগেই আমাকে বড় জেল থেকে মফঃস্বলের ছোট জেলে বদলি করলেন কর্তৃপক্ষ। হয়তো এটাকেই তাঁরা ‘শাস্তি’ বলে ধরে নিয়েছিলেন। পদ বা পকেটে হাত না পড়লেও, বৃহৎ দায়িত্ব থেকে ক্ষুদ্র দায়িত্বে অবতরণ। কিন্তু চাকরির দিক থেকে যেটা ‘শাপ’, অন্য দিকে আমি তাকে ‘বর’ বলেই গ্রহণ করলাম। যে দুষ্কার্য ওঁরা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, অপেক্ষাকৃত নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশে তারই খানিকটা বেশি সুযোগ পাওয়া গেল।

    পরে শুনেছিলাম, তোড়জোড় যেভাবে শুরু হয়েছিল, এত সহজে আমার নিষ্কৃতি পাবার কথা নয়। একজন ব্রিটিশ আমলের শীতলমস্তিষ্ক ঝানু সিভিলিয়ান ক্রুদ্ধ মালিককে কিঞ্চিৎ বাস্তব জ্ঞান দান করাতে ব্যাপারটা আর বেশীদূর গড়ায় নি। কোন্ আইনের কোন্ ধারায় ফেলে বইটাকে বাজেয়াপ্ত এবং তার লেখককে শায়েস্তা করা যায়, এই নিয়ে যখন গবেষণা চলছে, তখন ঐ ভদ্রলোক নাকি বলেছিলেন, ‘তা হয়তো যায়। ও বেচারী আর কী করতে পারে? জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে লড়বে না। তবে আর একটা দিক ভাববার আছে। বইখানা যে রকম পপুলার হয়ে গেছে, ড্রাসটিক কিছু করলে প্রেস আমাদের পেছনে লাগতে পারে।

    এর পরে বৃহৎ ব্যক্তিটি আর অগ্রসর হন নি। হয়তো প্রেস নামক গোলমেলে জিনিসটাকে ঘাঁটাতে যাওয়া সমীচীন মনে করেন নি, চক্ষুশূল লোকটাকে চোখের উপর থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েই বোধহয় আপাতত মনের ঝাল মিটিয়েছিলেন।

    আর একজন কর্তাব্যক্তির সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করেই বর্তমান প্রসঙ্গে দাঁড়ি টানতে চাই। তিনি যে দরের এবং যে স্তরের লোক, স্বাভাবিক রাস্তায় অর্থাৎ যাকে বলে নরম্যাল কোর্স-এ তাঁকে আমাদের পাবার কথা নয়। কি করে পেলাম, সেই ক্ষুদ্র ইতিহাসটুকু বলা দরকার।

    শোনা যায়, তাঁকে নিয়ে ততটা না হলেও, তাঁর পাণ্ডিত্য নিয়ে মহাকরণের উচ্চমহল বড় বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন। পাণ্ডিত্য অনেকেরই থাকে, কিন্তু সরকারী ফাইলের যেখানে সেখানে তার উগ্র প্রকাশ মন্ত্রী ও বিভাগীয় প্রধানদের ভাবিয়ে তুলেছিল।

    মফঃস্বলে পাঠিয়েও মহাসমস্যা। যেখানে যে পদে যান, দু-দিন যেতে না যেতেই নীচের মহলে গণ্ডগোল দেখা দেয়। কোথায় নাকি কোনো একজন কেরানীর গাফিলতি উপলক্ষ করে সমস্ত কেরানীকুলকে ডেকে এনে উপদেশচ্ছলে এমন সব বাক্য প্রয়োগ করেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত তারা দল বেধে তেড়ে এসেছিল। ‘পাবলিক’-হামলা তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোনো এক জায়গায় একদল ধর্মঘটী মজুরের জমায়েত কার্ল মার্কস, কেইট্স্ এবং হ্যারল্ড ল্যাস্কির মতামত উদ্ধৃত করে এমন জ্ঞানগর্ভ দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন যে কুলীগুলো সেই ভয়েই, শুধু কাজ ছেড়ে নয়, ডেরা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, এবং মালিকপক্ষ এ হেন বিদ্বান ব্যক্তির হাত থেকে রক্ষা পাবার আবেদন নিয়ে তখনই মোটর নিয়ে ছুটলেন কলকাতায়।

    এমনি করে নানা বিভাগে ঘুরবার পর ভদ্রলোক যখন সরকারের কাছে একটি দুঃসাধ্য ‘প্রব্লেম’ হয়ে উঠলেন তখন কোনো সুরসিক উপরওয়ালার হঠাৎ মাথায় এল—লোকটাকে “জেলে পাঠিয়ে” দিলে কেমন হয়। যে কথা সেই কাজ। এক সপ্তাহ না যেতেই তিনি অপ্রত্যাশিত ভাবে জেলের ঘাড়ে এসে চাপলেন।

    এই যে ব্যবস্থা হল, তার মধ্যে সরকারের কৌতুক বোধ যেমন আছে, কূটনীতিও কম নেই। কারাবিভাগ এমন একটি রাজ্য, যেখানে আর যাই হোক ‘পাবলিক’ নামক কোনো বস্তুর মুখোমুখি হতে হবে না। বক্তৃতার পক্ষেও জেল অতি আদর্শ স্থান। শ্রোতারা ঘুমিয়ে পড়তে পারে, কিন্তু পালিয়ে যেতে পারবে না।

    মহাকরণ কর্তৃপক্ষ এতদিনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলেন।

    কিন্তু সরকারী শাস্ত্রে এক্সপিরিয়েন্স বলে একটা বহু-ব্যবহৃত শব্দ আছে, চাকরির বেলায় বিদ্যা ও পাণ্ডিত্যের চেয়ে যাকে বেশী দাম দেওয়া হয়। আমাদের এই কর্তাব্যক্তিটি অন্য অনেক জায়গায় ঘুরলেও জেলের মুখ দেখেন নি। সুতরাং নতুন তক্তে বসাবার আগে তাঁর জন্যেও কয়েক সপ্তাহ-ব্যাপী একটা শিক্ষানবিসির ব্যবস্থা করতে হল। উদ্দেশ্য—সেখানকার কাজকর্ম, রীতিনীতি এবং লোকলস্কর সম্বন্ধে মোটামুটি জ্ঞানলাভের সুযোগ দেওয়া।

    ব্যবস্থাটা নতুন নয়। ইংরেজ আমলেও দেখেছি। তার আকার যেমন ব্যাপক, প্রকারও ছিল তেমনি সুষ্ঠু। জাঁদরেল জাঁদরেল সব মেজর, কর্ণেল জেলের হাল ধরবার আগে সোজা গিয়ে ঢুকতেন সামান্য একজন ডেপুটি জেলরের ক্ষুদ্র সেরেস্তায়। তার পাশে টুল পেতে বসে প্রথম পাঠ নিতেন তার অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে।

    এই সূত্রে আমাদের স্বনামধন্য খালেকদার কথা মনে পড়ল। কিঞ্চিৎ মোড়ফের হলেও বলে ফেলা যাক।

    প্রথম জীবনে অনেকের মতো আমিও একদিন তাঁর সাকরেদি করেছি। কিছু জানতে চাইলেই তিনি গম্ভীর ভাবে একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক উক্তির পুনরাবৃত্তি করতেন—রিড, অ্যাণ্ড ইউ উইল নো। বলে পনেরো কুড়ি বছর আগেকার বিশাল বিশাল সার্কুলার ফাইল পড়তে দিতেন। মই চড়ে ছাদসংলগ্ন র‍্যাকের উপর থেকে আধ ইঞ্চি পুরু ধুলোর স্তর ভেদ করে আমাদেরই সেগুলো পেড়ে আনতে হত। এই জাতীয় কাজের জন্যে দু-তিন জন কয়েদী মোতায়েন ছিল। দাদা তাদের সাহায্য নিতে দিতেন না। বলতেন, এটাও ট্রেনিং-এর অঙ্গ। মই এবং ধুলোর ভয় করলে কাজ শেখা যায় না।

    একবার একজন সদ্য লড়াই-ফেরত আই. এম. এস. মেজরকে (যিনি দু-দিন পর ওঁর ‘বস’ হয়ে বসবেন) খালেকদা ঐ একই আদেশ দিয়ে বসলেন। ভদ্রলোক পাঞ্জাবী, ছ’ফুটের উপর লম্বা; প্রস্থটাও সেই অনুপাতে। উঠে গিয়ে চেরা বাঁশের তৈরি নড়বড়ে মইটাকে ধরে ঝাঁকানি দিতেই তার গোটা কয়েক ধাপ খুলে গেল। মৃদু হেসে দাদার দিকে চেয়ে বললেন, এখুনি যে খুনের দায়ে পড়তে, বাবু।

    একটা রোগা মতন ছোকরা কয়েদী ছিল খালেকদার খাস বেয়ারা। অগত্যা তাকে দিয়েই বইগুলো নামিয়ে আনা হল। সাহেব একটা খণ্ড তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ পাতা উল্টে বললেন, সব তো দেখছি মান্ধাতার আমলের ব্যাপার। কোন্ কাজে লাগবে এগুলো?

    খালেকদা দমবার পাত্র নন। বিজ্ঞের মতো মুখ নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, ‘এই যে বাড়িটা দেখছ সাহেব, যখন তৈরি হয়, এর তলায় একটা ভিত গড়তে হয়েছিল। এখন সেটা মাটির নীচে চাপা পড়ে গেছে, আমাদের কোনো কাজে লাগছে না। আসলে কিন্তু তারই ওপর সব দাঁড়িয়ে আছে। ঐগুলো হচ্ছে সেই ভিত।’

    উনি তখন অ্যাডমিশান ব্র্যাঞ্চ, অর্থাৎ ‘আমদানী সেরেস্তা’র ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি জেলার। সাহেব এসেছিলেন দেখতে কি করে কয়েদী ভর্তি করা হয়, কি কি রেজিস্টার আছে তার জন্যে, কি সব তথ্য লেখা হয় সেখানে, কোন্টার পর কি করণীয় ইত্যাদি। খালেকদা জেল কোড়-এর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়টি খুলে প্রথমেই তার শিরোনামা নিয়ে পড়লেন—অ্যাডমিশান অফ প্রিজনার্স; শুরু করলেন প্রিজনার্স্ জন্মের আগের পর্ব থেকে, অর্থাৎ প্রিজ বস্তুটি কী, কী তার প্রয়োজন, কোথায় তার সার্থকতা। যে-ভাষায় বলছিলেন সেটা ইংরেজি নিশ্চয়ই, তবে কিংস ইংলিশ-এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ওঁর নিজস্ব সৃষ্টি। আমরা বলতাম “খালেকদা’জ পেটেণ্ট ইংলিশ”। আমাদের মতো অন্তরঙ্গ সহচর ছাড়া বাইরের লোকের পক্ষে বোধগম্য হবার কথা নয়। মেজর সাহেব কিছুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে তাকিয়ে থেকে বললেন, এক্সকিউজ মি, আই ডোন্ট ফলো গ্রীক। বেটার স্পীক্ ইন্ বেঙ্গলি। হামি কুছ কুছ্ বাংলা বুঝে।

    যাক, যা বলছিলাম। সরকারী আদেশে আমাদের এই জ্ঞানী ব্যক্তিটিও জেল-সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ‘ট্রেনিং’ নিতে প্রথমেই আমার অফিসে পদার্পণ করলেন এবং গেট্ পেরিয়েই জেলখানার প্রবীণ অধ্যক্ষ থেকে গোটা স্টাফকে ট্রেন-আপ করতে শুরু করলেন। আমরা এতকাল ধরে যা কিছু করেছি, যে-পথে চলেছি, সব ভুল, সজোরে ও সবিস্তারে সেই কথাই প্রমাণ করে দিলেন। শেষের দিকে যোগ করলেন, আমাদের মধ্যে যেসব দুর্নীতি, অনাচার ও অযোগ্যতা বাসা বেঁধে আছে, সেগুলো দূর করতেই সরকার তাঁকে বিশেষ ভাবে নিয়োজিত করেছেন। (নিয়োগের আসল কারণটা যে আগেই ভিতরে ভিতরে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল, সে কথা বোধহয় তাঁর জানা ছিল না।) আমার প্রায়-সাদা হয়ে-যাওয়া চুলগুলোর দিকে লক্ষ্য রেখে এবং কত বছর জেলে আছি জেনে নিয়ে মন্তব্য করলেন, গভর্মেণ্টও হয়েছে তেমনি, এক্সপিরিয়েন্স আর একসপিরিয়েন্স! ওটা যেন একটা ফেটিস্ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার তো মনে হয়, অনেক দিন একই জিনিস নিয়ে পড়ে থাকা একটা ড্র-ব্যাক, আপনাদের সব ড্রাইভ চলে গেছে, ইনিশিয়েটিভ নেই, শুধু গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে চলেছেন। আমাকে কিছু নিউ ব্লাড আমদানি করতে হবে দেখছি। চলুন, ভেতরটা একবার দেখে আসি।

    তাঁর আগমন সংবাদ জেলের ভিতরে পৌঁছে গিয়েছিল। শীতকাল। প্রচুর মরসুমী ফুল ফুটে আছে এখানে ওখানে। একজন মাতব্বর গোছের হাজতী আসামী কতকগুলো বড় বড় গাঁদা তুলে বিশাল এক মালা গেঁথে রেখেছে। আমরা সদলবলে হাজত-ওয়ার্ডের বারান্দায় উঠতেই সে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে এগিয়ে এল। উনি থমকে দাঁড়িয়ে রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, কতদিনের জেল তোমার?

    —আজ্ঞে জেল নয়, আমি আণ্ডারট্রায়াল।

    —কী কেস্-এ এসেছ?

    —ডাকাতি কেস্।

    —আমি ডাকাতের হাতের মালা নিই না।

    মুহূর্তের জন্যে লোকটা যেন একটু ক্ষুণ্ণ হল। তারপরেই বেশ সপ্রতিভ হাসি হেসে বলল, ভুল করলেন হুজুর। আমি যে ডাকাত সেটা এখনো প্রমাণ হয় নি। বলে মালাটা হাতে জড়াতে জড়াতে গম্ভীর ভাবে নিজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। উনি আর এগোলেন না। একটা দৃপ্ত ভঙ্গি করে ফিরে এলেন। বাইরে এসে বললেন, লোকটা তো ভারি পাজী দেখছি! আমার মুখের ওপর জবাব করে! এই সব বদমাসগুলোকে কড়া শাসনে রাখা দরকার। হ্যাড আই বিন ইউ, আমি ওটাকে এখনই সেল্-এ পাঠিয়ে দিতাম।

    ইঙ্গিতটা স্পষ্ট হলেও আমি যখন সেটা না বোঝার ভান করে নিশ্চেষ্ট রইলাম, তিনি কিঞ্চিৎ শ্লেষের সুরে যোগ করলেন, আমার মনে হয় সনেস্ জিনিসটা সাহিত্যে হয়তো চলে, কিন্তু অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর পক্ষে মারাত্মক। কী বলেন?

    বুঝলাম, আমার ‘অপকর্মে’র খবরটা আগেই ওঁর কানে পৌঁছে গেছে এবং তাতে করে আর যাই হোক, আমার সম্বন্ধে তাঁর মনোভাবটা অনুকূল হয়নি! কয়েকদিন পরে সেটা আরও স্পষ্ট হল। ট্রেনিং পর্ব (কাগজে কলমে তাঁর, কিন্তু আসলে আমার) যেদিন শেষ হল, চলে যাবার মুখে ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, ভালো অফিসার বলে আপনার সুনাম আছে শুনেছি, এ-কদিনে আমার ইম্প্রেশানও নট্‌ ব্যাড; কিন্তু এসব কী করছেন?

    বক্তব্যটা হঠাৎ ধরতে না পেরে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখের দিকে তাকাতেই যোগ করলেন, এ-রকম একটা বদনেশা জোটালেন কোত্থেকে! না না; ওসব ছাড়ুন। সেণ্টিমেণ্টাল সিনেমার গল্প না লিখে কাজকর্মের দিকে মন দিন।

    একটু মজা করবার লোভ হল। আনন্দে বিগলিত হয়ে বললাম, আমার লেখা আপনি পড়েছেন স্যার?

    —আমি! এমন ভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন এর চেয়ে মানহানিকর অভিযোগ আর হতে পারে না। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমার সময়ের দাম আছে।

    রীতিমত ক্রুদ্ধ হয়েছেন দেখে আর এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। ছদ্ম নৈরাশ্যের সুরে বললাম, আমি ভেবেছিলাম পড়ে থাকবেন হয়তো। তা নাহলে সিনেমার গল্প লিখি জানলেন কেমন করে?

    —কেন? আপনার কী একটা বই নাকি ছবি হয়েছে শুনলাম! একেবারে হিট পিকচার!

    কথা নয়, একরাশ শ্লেষ ও অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিলেন আমার মুখের উপর। তার ফলে আমার ভিতরে আরও খানিকটা কৌতুক রস উথলে উঠল। মাথা নীচু করে ঘাড় চুলকে সবিনয়ে নিবেদন করলাম, তার থেকে যদি বলেন, আমি সিনেমার গল্প লিখি, তাহলে কিন্তু, স্যার, সেক্সপীয়র, টলস্টয়, ডিকেন্স, রবীন্দ্রনাথ, ডস্টয়ভস্কি এবং নানা দেশের সব বড় বড় নোবেল প্রাইজ উইনার্সও সকলেই আমার দলে পড়বেন।

    আমার দিকে একটা জ্বলন্ত ভ্রূকুটি নিক্ষেপ করে ভদ্রলোক গট্ গট্ করে বেরিয়ে গেলেন। চোখের দৃষ্টি এবং গমনভঙ্গি দুই-ই এত সুস্পষ্ট যে তার অর্থ বুঝতে কিছুমাত্র অসুবিধা হয় নি। এও বুঝেছিলাম, সেইখানেই শেষ নয়, জের অনেকদূর চলবে। তাই চলেছিল। শুনছি নাকি, আমার বেরিয়ে আসবার পরেও চলছে। আমার এই বিদঘুটে নামটা কিংবা সেই ‘সেণ্টিমেণ্টাল সিনেমার গল্প’ যখনই তাঁর নজরে পড়ে, বিশেষ করে জেল-লাইব্রেরির বইয়ের তালিকার কোনো কোণে—আশেপাশের সকলকে ইষ্টনাম জপতে হয়। এগুলো যেন প্রাণী বিশেষের কাছে লাল ন্যাকড়া বা রেড র‍্যাগ।

    আর একটা মজার ঘটনা কানে এসেছে। বড় বড় জেলের কয়েদীরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে বাইরে থেকে ফিল্ম আনিয়ে জেলে বসে সিনেমা দেখতে পায়। কোনো জেল নাকি সুঃসাহসভরে সেই রেড-রাগ-চিহ্নিত ছবিখানা (যাকে তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন হিট পিকচার) আনাবার ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। শেষ মুহূর্তে খবর পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং শুনেছি, এ বিষয়ে যারা উদ্যোক্তা তাদেরও একহাত নিতে ছাড়েন নি।

    প্রশ্নকর্তাদের কাছে আমার সশ্রদ্ধ নিবেদন, এসব যা বলছি, তাকে যেন তাঁরা খেদোক্তি বলে মনে না করেন। আমার সামান্য সাহিত্যকর্মের উপর মুষ্টিমেয়র এই রোষদৃষ্টি আমি সানন্দে উপভোগ করেছি। এঁদের বাইরে যাঁরা, লেখার জগতে এসে যাঁদের পেলাম, তাঁদের কথা বলছি না, কর্মী হিসাবে যাঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্নস্তর, বহুজনের কাছে যে সস্নেহ প্রসন্ন দৃষ্টিলাভ করেছি, তার কথাই মনে রয়ে গেছে। এক দিক দিয়ে ক্ষোভের কারণ যদি কিছু ঘটেও থাকে, আরেক দিকের প্রাপ্তি তার সবটুকু ধুয়ে মুছে দিয়ে গেছে। মানুষের জীবন তো একটা নিস্তরঙ্গ জলধারা নয়। সে নদীর স্রোতের মতো গতিময়। ক্ষণেকের তরে কোনো আবিলতা যদি আসেও, গতি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যে মানুষ জীবন্ত, তার পথ একটানা মসৃণ নয়, উত্থান-পতনে বন্ধুর। তার একদিকে যেমন অভিঘাত, আরেক দিকে তেমনি অভিনন্দন।

    জেল-পরিধির বাইরেও একটা বিরাট সরকারী মহল আছে। সেখানে কি প্রতিক্রিয়া হল, সেটাও অনেকে জানতে চেয়েছেন। সে সম্বন্ধে বিশেষ করে বলবার মতো কিছু দেখছি না। এইটুকু শুধু বলতে পারি, সেখানকার দু-একজন হোমরা-চোমরা প্রথম প্রথম আমাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, তাকে ঠিক প্রসন্ন দৃষ্টি বলা চলে না। বড় শহরের ভিড়ের মধ্যে হয়তো আমার উপর তাঁদের নজর পড়ত না। কিন্তু থাকি মফঃস্বলে, তার উপর সাহিত্য করি। এখানে ওখানে সভা সমিতিতে ডাক পড়ে। সভাপতিত্ব কিংবা প্ৰধান অতিথির প্রাধান্যও মাঝে মাঝে জুটে যায়। তার আগে এজাতীয় সম্মানে একচ্ছত্র অধিকার ছিল সরকারী বড় কর্তাদের। স্বাধীনতার পরে সাধারণের চোখে তাঁদের সে জমক নেই। তা ছাড়া ইতিমধ্যে জনজীবনের আনাচে-কানাচে সংস্কৃতি নামক একটি নতুন বস্তুর আবির্ভাব ঘটেছে, প্রাদুর্ভাব বলাই উচিত। তাকে বাদ দিয়ে কোনো জমায়েত জমে না। তারই সূত্র ধরে সভামণ্ডপের উচ্চমঞ্চে রাজপুরুষের বদলে টান পড়ছে সাহিত্যিকের। সাহিত্যিক যেখানে বাইরে থেকে আমদানি, তাকে উপেক্ষা করা চলে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গোল বাধল—সে যে তাঁদেরই একজন। সুতরাং সরকারী কর্তৃমহলে সে প্রথমে চাপা কটাক্ষ, ক্রমশ প্রকাশ্য ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের বিষয় হয়ে দাঁড়াল।

    প্রথমটা একটু ক্ষুব্ধ হলেও পরে বুঝলাম এইটাই স্বাভাবিক। আমার অপরাধ তো একটি নয়। অফিসার্স্ ক্লাবে চাঁদা দিই, কিন্তু ধরণা দিই না, কর্তাব্যক্তিরা যখন স-পারিষদ আসর জাঁকিয়ে বসে রাজা-উজির বধ করেন, মাথা নাড়ার দলে আমাকে পাওয়া যায় না, সন্ধ্যার পর তাস না পিটে ‘অন্ধকার মাঠে ঘুরে বেড়াই কিংবা ঘরের কোণে বসে লিখি।’ সবটাই বাড়াবাড়ি। সুতরাং ক্লাবে লাইব্রেরির বাৎসরিক ‘পারচেজ’- এর সময় কয়েকজন তরুণ মেম্বার যখন ‘লৌহকপাট’-এর নাম করে বসল, প্রবীণ সিনিয়ারদের কাছ থেকে এল এক দুর্জয় ধমক—কী আছে ঐ জেলের কেচ্ছায়? ও আবার একটা বই নাকি! নবীন সভ্যরা কিন্তু অত সহজে হঠতে চাইল না। বেশির ভাগই সদ্য বেরিয়েছে কলেজ থেকে, চাকরির অহিফেনে ধাতস্থ হয়ে ওঠে নি। তখন রফা হল—বিনা পয়সায় পেলে আপত্তি নেই। কেউ কেউ অভিযোগ করলেন, লেখক যখন ক্লাবের মেম্বার, তারই উচিত ছিল দু-এক খণ্ড বই লাইব্রেরিকে প্রেজেন্ট করা।

    কদিন পরে ক্লাবে যেতেই কর্তৃস্থানীয় এক ব্যক্তি সেই ঔচিত্যের কথাটা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। বললেন, এই যে! আপনাকে তো আজকাল দেখাই যায় না। হ্যাঁ শুনুন, আপনার নাকি একখানা কি বই আছে?

    আমি মাথা নাড়লাম, আছে।

    —ছাপানো বই?

    কথাটা ঠিক ধরতে পারলাম না। বই তো ছাপানোই হয়ে থাকে। তিনি কি মনে করেছেন হাতে লেখা তালপাতার পুঁথি? জিজ্ঞাসা করব ভাবছিলাম, তার আগে অর্থটা তিনিই পরিষ্কার করে দিলেন, ‘মানে, বইটা কি পাবলিড্ হয়েছে?’

    —আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —আপনি নিজেই বুঝি পাবলিশার?

    —আজ্ঞে না।

    —তবে?

    পাবলিশারের নাম করলাম।

    —ও, তাই নাকি! বেশ, বেশ। তা কই, এখানে তো দেখছি না আপনার বই! আমাদের লাইব্রেরিতে দু-একখানা দেবেন তো? মানে যাকে বলে প্রেজেন্টেশান।

    প্রশ্ন ও প্রস্তাবের ধরনে আমার মাথায় হয়তো কিঞ্চিৎ দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়ে থাকবে। সবিনয়ে উত্তর দিলাম, দেখুন, দু-রকমের লেখক বই প্রেজেন্ট করে থাকেন। এক, যাঁরা অনুগ্রাহক, মনে মনে বলেন, আমার বই পড়ে তোমরা কৃতার্থ হও। দুই, যাঁরা অনুগ্রহপ্রার্থী, তাঁরা বলেন—আমার বই পড়ে আমাকে কৃতার্থ কর। আমি এর কোনো দলেই পড়ি না। অতএব মাপ করবেন।