Author: তাহের আলমাহদী

  • এগার

    এগার

    মালতীর দিনগুলি মন্দ কাটছিল না। রঞ্জিত আসার পরই মালতীর মনে হল ওর কী যেন হারিয়ে গিয়েছিল জীবন থেকে, কী যেন নেই, সংসারে কী না থাকলে ফাঁকা ফাঁকা মনে হয় এমন এক জিনিস রঞ্জিত ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে মালতীর জীবনে ফিরে এসেছে।

    শীতকাল বলে বেলা তাড়াতাড়ি পড়ে যায়। শীতকাল বলে জলে বাঁশ পচা গন্ধটা তেমন তীক্ষ্ণ মনে হচ্ছে না। আর শীতকাল বলেই গ্রামের সকলে সকাল সকাল জল নিতে চলে আসে কুয়োতে।

    চাকের কুয়ো লম্বা। গলা পর্যন্ত দাঁড়ালে দেখা যায়। কুয়োতলা পার হলে বাঁশঝাড়। ঈশম শক্ত বাঁশ খুঁজছে। রঞ্জিত একটা করে কোপ মেরে আলগা করে দিচ্ছে আর ঈশম সেই বাঁশ টেনে বের করে কঞ্চিগুলি ছেঁটে দিচ্ছিল। যারা জল নিতে এসেছিল ওরা বেশিক্ষণ কুয়োতলায় অপেক্ষা করল না। বড়বৌর সেই নিখোঁজ ভাইটি ফিরে এসেছে। সরু গোঁফ, বড় চোখ আর বিদেশ বিভুঁয়ে থাকে বলেই হয়তো শরীরে এক ধরনের শ্যামল লাবণ্য। মালকোঁচা মেরে ধুতি পরেছে, চুল কোঁকড়ানো, মাথার মাঝখানে সিঁথি—লম্বা মানুষ রঞ্জিতকে এখন আর দেখলে চেনাই যায় না, বাপ-মা মরা সেই বালক এত বড় হয়ে এখন মশাই হয়ে গেছে।

    যারাই জল নিতে এসেছিল তারা সকলেই প্রায় বালতি ফেলছে কুয়োর ভিতর এবং জল তুলে আনার সময় রঞ্জিতকে দেখছে। সুদর্শন এই যুবকটিকে সকলেই একনজরে চিনতে পেরেছিল, কতদিন আগের কথা যেন, কেউ কেউ ডেকে ওর সঙ্গে কথা বলল, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, সে যাদের দিদি বলে ডাকত, পাড়াপড়শী যারা এক সময় ওকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েছিল, মা-মরা ছেলে বলে যারা ওকে সামান্য ভালোমন্দ হলে ডেকে খাওয়াত তারা জল তুলে নিচে নেমে গেল এবং ওর সঙ্গে কথা বলে ঘরে ফিরে গেল।

    মালতী এল সকলের শেষে। ওর কাঁখে কলসী, পরনে তাঁতের শাড়ী। মালতী যে বিধবা, এ-শাড়ি পরলে মনে হয় না। মনে হয় কুমারী মালতী শখ করে এখন জল তুলতে এসেছে। মনে হয় মালতী এই মানুষের সামনে সাদা থান পরতে লজ্জা পায়। সে এসেই সোজা কুয়োতলায় কলসী রেখে যেখানে রঞ্জিত বাঁশ কাটছিল সেখানে গিয়ে দাঁড়াল—এত বাঁশ! এত বাঁশ দিয়া কি হইব?

    রঞ্জিত বলল, জলে ভিজিয়ে রাখব। লাঠি হবে, পাকা বাঁশের লাঠি।

    সোনা আশেপাশে ছোটাছুটি করছে। সে এই নতুন মানুষটিকে কখনও ছাড়ছে না। মানুষটি তাকে কত দেশ-বিদেশের সব অদ্ভুত গল্প বলছে। অদ্ভুত সব ম্যাজিকের কথা বলছে।

    সোনা বলল, পিসি, রঞ্জিত মামা রাইতের ব্যালা ম্যাজিক দেখায়।

    মালতী আর একটু নেমে গেল। যেখানে ঈশম বাঁশের গুঁড়িতে দা রেখে কাটা বাঁশ ঝাড় থেকে টেনে নামাচ্ছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল এবং বলল, তর মামার কথা আর কইস না!

    রঞ্জিত মালতীর দিকে তাকাল না। সে বাঁশের কঞ্চি কেটে সাফ করছে কারণ মালতীর কোনও রহস্যজনক কথা শুনলেই শুধু সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে। সেদিন মালতী রাগে অথবা ক্ষোভে কিংবা হয়তো উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। চোখ মুখ লাল, চোখ ভিজা ভিজা, যেন মালতীর সব সতীত্ব রঞ্জিত কেড়ে নিয়েছে। প্রায় মালতী কেঁদে ফেলেছিল। রঞ্জিতের সেই কথা মনে হয় আর মনে হয়—মালতী তোমার সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে না। মালতী তুমি দিদিকে আর কিছু বলনি তো!

    রঞ্জিত এবার মালতীর দিকে সহজভাবে তাকাল। বলল, মামার কথা বলতে নেই কেন?

    রঞ্জিত এমনভাবে তাকাল, যেন মালতীরও সেই দৃশ্যটা মনে পড়ুক এমন এক ইচ্ছা। সুতরাং মালতী আর দেরি করল না। সে জল ভরে চলে গেল। চলে গেলেই শেষ হয়ে যায় না। যেতে যেতে বড়বৌদির সঙ্গে গল্প করল। বড়বৌ এবং ধনবৌ ঢেঁকিতে ঠাকুর-ভোগের জন্য ধান ভানছে। ভানা ধান ঢেঁকির মাথার কাছে বসে শশীবালা ঝাড়ছিলেন। পাগল ঠাকুর আজ কোনওদিকে বের হয়ে যাননি। তিনি উঠোনে আপন মনে পায়চারি করছেন। মালতী উঠোনে এসেও বাঁশের কোপ শুনতে পেল। এই বাঁশ দিয়ে কী হবে, বাঁশ দিয়ে লাঠি হবে! তার তোড়জোড় হচ্ছে। মানুষটার শরীর হাত পা মুখ, সারাক্ষণ কেন জানি বুকের ভিতর নড়েচড়ে বেড়ায়। এমন মানুষটাকে দেখার জন্য ছলছুতো করে কেবল এ-বাড়িতে চলে আসা। কী আর কাজ মালতীর, নরেন দাস এখন আর বাড়িতে নেই। অমূল্য মাথায় ডুরে শাড়ি নিয়ে বাবুর হাটে গেছে নরেন দাসের সঙ্গে। এখন বাড়িতে শুধু শোভা, আবু, মালতী। আভারানী আছে, কিন্তু এত নিরীহ যে মনেই হয় না একটা মানুষ বাড়িতে আছে। আভারানীকে রঞ্জিত বৌদি বলে ডাকে। রাতের বেলায়, যখন শীত বলে সকলে তাড়াতড়ি শুয়ে পড়ে, যখন বৈঠকখানায় শচীন্দ্রনাথ লালটু পলটুকে পড়াতে বসেন তখন রঞ্জিত নিজের ঘরে বসে সামান্য আলোতে কি সব বড় বড় বই পড়ে। কত পড়ে মানুষটা! মানুষটা এখন কম কথা বলে, বেশি কথা বললে মালতীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসে, যেন অজ্ঞ লোকের কথা শুনে হাসছে। তখন অভিমানে মুখটা লাল হয়ে ওঠে মালতীর। মানুষটা তখন অপরাধীর মতো চোখ করে তাকায়। তাকালেই কিছু দৃশ্য, ভয়ে মানুষটা নিরুদ্দেশে চলে গেল।

    মালতী একদিন বলেছিল, এত ডর পুরুষ মাইনসের ভালো না।

    —আমার আবার ডর কিসের?

    —ডর না! মুখে কইলেই কি সব কওয়ন যায়!

    —আমার কিন্তু মনে হয়েছিল তুমি দিদিকে সত্যি বলে দেবে।

    —আর কিছু মনে হয় নাই ত!

    —আবার কি মনে হবে!

    —ক্যান, মালতীর নামে কত কথা মনে হইতে পারে।

    —আমার আর কিছু মনে হয়নি মালতী। আমি তারপর অনেক দূরে চলে গেছলাম। আসাম চলে যাই। সেখান থেকে ফিরে আসি দু’বছর পর। কলকাতায় লাহিড়ীমশাইয়ের সঙ্গে দেখা। তিনিই আমাকে প্রায় টেনে তুলেছেন। বলতে বলতে থেমে যেত রঞ্জিত। স্বপ্ন দেখতে শিখে গেলাম। এ-সব এখন খুব তুচ্ছ মনে হয়। বোধ হয় বেশি বলা হয়ে গেল। তার গোপন জীবনের কথা বুঝি ফাঁস হয়ে গেল। সে সহসা থেমে আর কিছু বলতে চাইত না। নিজের কথা ভুলে গিয়ে বলত, তুমি কেমন আছ। তোমার সব খবরই আমি রাখতাম। তুমি যে এখানে চলে এসেছ তাও। কিন্তু তারপর?

    —তারপর আবার কি! যেন বলার ইচ্ছা, তারপর খা আছে সে তো দেখতেই পাচ্ছ। এই নিয়ে আছি।

    —সামুকে আর দেখি না কেন?

    —সামু ঢাকা গ্যাছে। লীগ লীগ কইরা দ্যাশটারে জ্বালাইয়া দিল।

    —সামু তবে পার্টি করে!

    —পার্টি না ছাই। মালতীকে খুব হিংস্র দেখাচ্ছিল। মালতী বলল, লাঠি ত বানাইতেছ মেলা। কিন্তু লাঠিতে মাথা ভাঙতে পার কয়টা?

    —লাঠি তো মালতী মাথা ভাঙার জন্য নয়, মাথা রক্ষা করার জন্য। আমি ভেবেছি, এখানেই মূল আখড়া করব। তারপর আরও তিনটে ছোট ছোট আখড়া খুলব। একটা বামন্দিতে, একটা সম্মান্দিতে আর একটা বারদীতে। তারপর সেখানে থেকে যারা শিখে ফেলবে তারা আবার তিনটে করে নতুন আখাড়া খুলবে। গ্রামে গ্রামে আখড়া খুলে আমাদের প্রত্যেককে লাঠি খেলা, ছোরা খেলা সব শিখে নিতে হবে। নিজের মাথা রক্ষা করার জন্য এসব করছি। অন্যের মাথা ভাঙার জন্য নয়।

    মালতী কেমন লজ্জা পেল বলে। তারপর বলল, তুমি আমারে দুই চারটে কৌশল শিখাইয়া দ্যাও। আমারে লাঠি খেলা শিখাইলে তোমার আবার জাত যাইব না ত?

    —জাত যাবে কেন?

    —আমি মেয়েমানুষ। অবলা জীব।

    —অবলা জীবদেরই বেশি শিখতে হবে। আরম্ভ হোক, সব গোছগাছ করে নি। খেলা জমে উঠুক।

    —খেলা শিখাইবে কে?

    —আমি।

    —তুমি আবার এইসব শিখলা কবে?

    —এক ফাঁকে শিখে ফেলেছি।

    —তুমি কত না কিছু জান! কত কিছু না করতে পার!

    —আমি কিছুই করতে পারিনি মালতী। কত কিছু করার আছে আমাদের। তুমি সব জানলে অবাক হয়ে যাবে।

    —আমারে দলে নাও না।

    —দল পেলে কোনখানে?

    —এই যে তুমি লাঠিখেলার দল করতাছ।

    দল কথাটা বলতেই রঞ্জিত কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। দল বলা উচিত নয়। কারণ সে এখানে গোপনে কিছুদিন বসবাস করতে এসেছে। সে বলল, না, কোন দল করছি না মালতী। আমার দল করার কি আছে।

    —ক্যান, বৌদি যে কইল তুমি দ্যাশের কাজ কইরা বেড়াও।

    —তা হলে দিদি তোমাকে সব বলেছে। বলে সামান্য সময় চুপ করে থাকল রঞ্জিত। সকালবেলার রোদ ওদের পিঠে পড়ছিল। ওরা দীনবন্ধুর বড় ঘরটার পিছনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। লালটু পলটু সোনা সকলেই ওকে ঘিরে আছে। ওরা মালতী পিসিকে দেখছে। মামা, মালতী পিসির মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে, মালতী পিসি মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।

    মালতী কিছু বলতে যাচ্ছিল। দেখল এইসব ছোট ছোট ছেলেদের সামনে বলা ঠিক না। মালতী আর কথা না বলে চলে গেল।

    খুব গোপনে কাজ করছিল রঞ্জিত। সে লাঠি খেলা ভিতর বাড়ির উঠোনে, জ্যোৎস্নায় অথবা মৃদু হারিকেনের আলোতে শেখাবার চেষ্টা করছে। যেন কেউ না জানে। কেবল বড়বৌ, ধনবৌ পাগলা ঠাকুর সাক্ষী থাকত। সোনা, লালটু, পলটু ঘুমিয়ে পড়লে উঠোনে লাঠি খেলা আরম্ভ হতো। কিন্তু একদিন রাতে সোনা পাশে খুঁজতে গিয়ে দেখল মা নেই। মা কোথায়! সে ঘুম থেকে উঠে বসল। দরজা খোলা। উঠোনে লাঠির ঠকাঠক শব্দ পাচ্ছে। জ্যোৎস্না রাত। আবছা আলোতে সে বুঝতে পারল, মা উঠোনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছেন। সে নেমে দরজা পার হয়ে মায়ের কাছে চলে গেল। আট দশজন গ্রামের জোয়ান লোক রঞ্জিত মামার কাছে লাঠি খেলা শিখছে। অন্য পাশে কারা যেন—বুঝি মালতী পিসি, বুঝি কিরণী দিদি এবং ননী, শোভা, আবু। ওরা কাঠের ছোরা নিয়ে খেলছিল, খেলা শিখছিল। মা এবং জেঠিমা পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল আর বোধহয় পাহারা দিচ্ছিল। এদিকে কেউ আসছে কিনা লক্ষ রাখছে। লাঠির ঠকাঠক শব্দ উঠছে। শির, বহেরা কটি এমন সব শব্দ। ছোট মামা কেমন মন্ত্রের মতো তালে তালে বলে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে ছোট মামা লাঠি ঘুরাতে ঘুরাতে এত বেগে এদিকে ধেয়ে আসছেন যে টের পাওয়া যাচ্ছে না ছোট মামার হাতে লাঠি আছে, কেবল বনবন শব্দ। তিনি ঘুরে ঘুরে, কখনও ডান পা তুলে, কখনও বাঁ পা তুলে, যেন মানুষটা এই লাঠির ভিতর বেঁচে থাকার রহস্য খুঁজে পেয়েছে, মানুষটা লাঠিটাকে নিজের ডান হাত বাঁ হাত করে ফেলছে, যেমন খুশি লাঠি চালাচ্ছে। সোনা মাঝে মাঝে লাঠির ভিতর ছোট মামার মুখটা হারিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেল।

    সোনাও খুব উত্তেজনা বোধ করছিল ভিতরে ভিতরে। সামান্য কাকজ্যোৎস্না। কামরাঙা গাছের ওপাশে তেমনি বিস্তৃত মাঠ নিঃসঙ্গ জ্যোৎস্নায় শুয়ে আছে। পাগল জ্যাঠামশাই দাওয়ায় বসে হাত কচলাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে ক্ষেপে গিয়ে সেই এক উচ্চারণ। সংসারে যেন আপদ লেগেই আছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ছোট মামা মাঝে মাঝে ছুটে যাচ্ছিলেন মালতী পিসির দিকে। মালতী পিসি কাঠের ছোরা নামাতে গিয়ে কোথায় ভুল করছে শুধরে দিচ্ছেন। দাওয়ার পাশে সব বড় বড় লাঠি দাঁড় করানো। তেল মাখানো বলে লাঠিগুলি এই সামান্য জ্যোৎস্নায়ও চকচক করছে। কেউ লাঠি ঘুরাতে ঘুরাতে পরিশ্রান্ত হলে, লাঠিটা দাওয়ার পাশে রেখে উঠোনের উপর দু’পা ছড়িয়ে বসে যাচ্ছে। ছোট মামা হাতকাটা গেঞ্জি গায়ে অনবরত দৃষ্টি রাখছেন সকলের উপর। সোনা আর কাফিলা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ছুটে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

    ধনবৌ বলল, তুমি সোনা!

    —আমার ভয় করতাছে।

    ঘরের অন্ধকারে সোনা একা থাকতে ভয় পাচ্ছিল। সে ফের বলল, মা এইটা কি হইতাছে?

    —লাঠিখেলা।

    রঞ্জিত দেখতে পেল সোনা ঘুম থেকে উঠে এসেছে। সে সোনাকে কাছে ডেকে বলল, তুই খেলা শিখবি?

    —শিখমু। খুব আগ্রহের সঙ্গে কথাটা বলল সোনা।

    —কিন্তু অনেক সাধনা করতে হয়।

    সোনা সাধনা কথাটার অর্থ জানে না। সোনা বলল, মা সাধনা মানে কি মা?

    রঞ্জিত বলল, ধনদি কি বলবে। আমার কাছে আয়। সাধনা মানে হচ্ছে তুমি যা করবে, একাগ্রচিত্তে করবে। কেউ তোমার এই ইচ্ছার কথা জানবে না।

    —আমি কমু না।

    —হ্যাঁ বলতে নেই। যদি না বল, তবে তোমাকে শেখাতে পারি।

    —দ্যাখবেন, আমি কমু না

    রঞ্জিত জানত এইসব কথার কোনও অর্থ হয় না। এইসব বালকদের রঞ্জিত দলে নিয়ে নিল। বলে দিতে পারে, নাও পারে, তবু ওদের একাগ্রচিত্ত করার জন্য মাঝে মাঝে রঞ্জিত নানাভাবে বক্তৃতা করত। সুতরাং সোনা, লালটু, পলটু এই দলে ক্রমে ভিড়ে গেল। ওরা খেলার চেয়ে ফাইমরমাস খাটায় বেশি উৎসাহ বোধ করত। রাত ঘন হলে কোনওদিন সোনা ঘুমিয়ে পড়ত। ওর খেলার কথা মনে থাকত না। ভোর হলে মামাকে বলত, আমি তোমার লগে কথা কমু না।

    —কেন কি হল?

    —তুমি কাইল আমারে খেলাতে লও নাই।

    —তুমি তো ঘুমিয়ে পড়েছিলে।

    .

    সোনা মাঝে মাঝে মামার মতো অথবা বড় জেঠিমার মতো কথা বলতে চেষ্টা করত। মামা যেন তার অন্য গ্রহের মানুষ। স্পষ্ট এবং ধীর গলায় কথা বলে। মালতীরও ইচ্ছা হত রঞ্জিতের মতো কথা বলতে। বড়বৌদি এবং এই রঞ্জিতের কথা এত মিষ্টি যে, মনের ভিতর কেবল গুনগুন করে বাজে। ওদের কথা এতটুকু কর্কশ নয়। মালতীর মনে হত ওর কথা কর্কশ। সে সেজন্য যতটা পারে রঞ্জিতের সঙ্গে কম কথা বলে। রঞ্জিত আজকাল কাজের কথা ব্যতিরেকে অন্য কথা বলতেই চায় না। সে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার সময় বলত, তোমার খুব একাগ্রতার অভাব মালতী। তুমি খুব যেন অন্যমনস্ক, খেলার সময় অন্যমনস্ক হলে মাথায় মুখে কোনদিন লেগে যাবে।

    মালতী তখন উত্তর দিত না। কি উত্তর দেবে! এই খেলা যেন নিত্য তার সঙ্গলাভের জন্য। যেন এই মানুষ এসে গেছে তার, এখন আর ভয় কিসের! রঞ্জিতের সব কথা সেজন্য সে চুপচাপ শুনে যেত কেবল। কোনও কোনদিনও মালতীকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য সে এই অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করত। তখন আরও গা জ্বলে যেত মালতীর। এসব গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষা যেমন কর্কশ তেমন শ্ৰীহীন! রঞ্জিত এমন ভাষায় কথা বললে, তার কাছে আর কিছু চাইবার থাকে না। মালতী বিরক্ত হয়ে বলত, তোমার আর ঢং করতে হবে না রঞ্জিত। ইচ্ছা করলে আমিও তোমার মতো কথা বলতে পারি। তুমি যা ভাল করে বলতে পার না, তা বলো না। বড় খারাপ লাগে। তোমার সঙ্গে আমি ছেলেবয়স থেকে বড় হয়েছি।

    রঞ্জিত কেমন অবাক হল ওর কথা শুনে। তোমাকে মালতী আর গ্রাম্য বলে ধরাই যায় না।

    মালতী বলল, তবু যার যা তার তা। আমার মুখে তোমার ভাষা মানাইব ক্যান। তুমিও যা ভাল কইরা কইতে পার না, তা কইতে যাইয় না। বড় খারাপ লাগে শুনতে।

    .

    সোনা বলল, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তুমি ডাকলা না ক্যান?

    —ঠিক আছে, আজ রাতে তোমাকে ডেকে তুলব। কিন্তু শর্ত আছে।

    —শর্ত! শর্ত কথাটাই শোনেনি সোনা। সে বলে, ছোটমামা শর্ত কি! –তুমি সোনা শুধু মাঠ দেখেছ।

    —মাঠ দেখেছি।

    —ফুল দেখেছ।

    —ফুল দেখেছি। সোনা মামার মতো কথা বলতে চেষ্টা করল।

    —আর সোনালী বালির চর দেখেছ।

    —চর দেখেছি। তরমুজ দেখেছি।

    —কিন্তু শর্ত দ্যাখো নি।

    —না।

    শর্ত বড় এক দৈত্য। এই দৈত্য কাঁধে চাপলে মানুষ অমানুষ হয়ে যায়। আবার অমানুষ মানুষ হয়ে যায়।

    —তোমার দৈত্যটা কি কয় ছোটমামা?

    —আমার দৈত্যটা অমানুষকে মানুষ হতে কয়।

    —দৈত্যটা আমারে আইনা দ্যাও না।

    —বড় হও। বড় হলে এনে দেব। রঞ্জিত এই বলে সোনাকে কাঁধে তুলে ঘোরাতে থাকল। বড় উঠোনে লাঠি খেলা হয়, ছোরা খেলা হয়। চারধারে বড় বড় টিন-কাঠের ঘর। পালবাড়ির উঠোন থেকে কিছু দেখা যায় না ভিতরে। রাত হলেই উঠোনটা মানুষে ভরে যাবে।

    .

    আতা বেড়ার ওপাশ থেকে একটা চোখ অপলকে দেখছে রঞ্জিতকে। রঞ্জিতের পেশীবহুল শরীর দেখে চোখটা তাজ্জব বনে যাচ্ছে। রঞ্জিতের খালি গা। রঞ্জিত সোনাকে কাঁধে নিয়ে ঘোরাচ্ছে। কখনও সোনাকে দুহাত ধরে ঘোরাচ্ছে। সোনা খুব আনন্দ পাচ্ছিল। ওর মাথা ঘুরছিল। কিছুক্ষণ ঘুরিয়েই সে সোনাকে মাটির ওপর ছেড়ে দিচ্ছে, সোনা টলছিল, দু’হাত বাড়িয়ে আবার আবার করছিল। শচীন্দ্রনাথ উঠোন পার হয়ে যাবার সময় দেখলেন, রঞ্জিত সোনাকে নিয়ে উঠোনে খেলা করছে। শচীন্দ্রনাথ কিছু বললেন না। সকালবেলা পড়ার সময়। কিন্তু সোনার পরীক্ষা হয়ে গেছে। সে পরীক্ষায় খুব ভালো করেছে। সোনার স্মৃতিশক্তি প্রখর। এই সকালে উঠোনের ওপর মামা ভাগ্নেকে নিয়ে এমন মত্ত দেখে মনে মনে খুশি হলেন তিনি। শীতকালে ওদের মামাবাড়ি যাবার কথা। ধনবৌ ওদের পরীক্ষা হয়ে গেলেই বাপের বাড়ি যায়। শীতের সময় খুব কুয়াশা হয় মাঠে। কলাই গাছে কলাই শুঁটি। আর মাঠে মাঠে সর্ষের ফুল হলুদগোলা রঙের মতো।

    শীতের দিনেই হত খাবার, রকমারি খাবার। পিঠে-পায়েস তখন বাড়ি বাড়ি। তখন বড় বড় লোকদের বাড়িতে বাস্তুপূজা। ভেড়া বলি, তিলা কদমা আর তিলের অম্বল। নানা রকমের খাবার। তখন বাজারে গেলেই বড় পাবদা মাছ—কি সোনালী রং আর কি বড় বড়! কালিবাউশ, বড় বাগদা চিংড়ি আর দুধ। শীত এলেই অঞ্চলের গাভীরা তাদের সঞ্চিত দুধ সব ঢেলে দেয়। তখন অভাবটাও পল্লীতে পল্লীতে জাঁকিয়ে বসে থাকে না। তখন সংসারে সংসারে আনন্দ উৎসব। সব দিনমজুর তখন কাজ পায় গেরস্থবাড়িতে। জিনিসপত্রের দাম সস্তা হয়ে যায়। আর শীতকাল এলেই লালটু পলটু গ্রামের সব ছেলেদের সঙ্গে মাঠে নেমে গিয়ে গোল্লাছুট খেলে। শুধু মাঠ, ধান কেটে নেওয়া হয়েছে বলে নরম মাটির শুকনো নাড়া, পা পড়লেই খড়খড় শব্দ। তখন যত পারো ছোটো। ছুটে ছুটে পড়ে যাও মাটিতে—কিন্তু শরীরের কোথাও এতটুকু আঘাত লাগবে না।

    শচীন্দ্রনাথ আতা বেড়ার পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখলেন, মালতী দাঁড়িয়ে আছে। কাফিলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কি যেন করছে। শচীন্দ্রনাথ বললেন, তুই এখানে?

    —আঠা নিমু। বলে কাফিলা গাছ থেকে আঠা তুলে নেবার মতো অভিনয় করল। বস্তুত মালতী এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একজন মানুষকে ওপাশে বেড়ার ফাঁকে চুপি চুপি দেখছিল। কেউ এলেই খুঁটে খুঁটে যেন গাছ থেকে আঠা নিচ্ছে এমনভাব চোখেমুখে। সে এই করে প্রাণভরে রঞ্জিতকে দেখছিল। ভোরে উঠেই মালতীর হাতে যা কাজ ছিল, যেমন উঠোন ঝাঁট দেওয়া আর বাসন ঘাটে নিয়ে যাওয়া, তারপর হাঁসগুলি ছেড়ে দেওয়া—এইসব কাজ করে দেখল আর কিছু করণীয় নেই। আভারানী রান্নাঘরে চিঁড়ার ধান ভিজিয়ে রাখছে। চুপি চুপি সে ঠাকুরবাড়ি চলে এল। মালতী আতা বেড়ার পাশে একটু সময় অপেক্ষা করল। প্রথম উঁকি দিতে সাহস পায়নি। একটা কিছু অছিলা দরকার। বেড়ার সঙ্গে কাফিলা গাছ। গাছ থেকে একটু একটু আঠা ঝরছে। সে একটা পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কেউ দেখতে পেলে বুঝবে মালতী আঠা নিচ্ছে গাছ থেকে। সে আতা বেড়ার ফাঁকে উঁকি দিল। মরিয়া হয়ে সে উঁকি দিয়ে রঞ্জিতকে দেখতে থাকল। অপমানকর ঘটনা ঘটে যেতে পারে এই নিয়ে, কলঙ্ক পর্যন্ত রটে যেতে পারে এই নিয়ে, সে তাও ভুলে গেল। নরেন দাস বাড়িতে নেই, অমূল্য বাবুর হাটে শাড়ি বিক্রি করতে গেছে, তাঁত এখন ক’দিনের জন্য বন্ধ। সুতরাং মালতীর প্রায় ছুটির দিন এগুলি। সে এইসব দিনে খেলে, বেড়িয়ে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে তেঁতুলের আচার মুখে স্বাদ নিতে নিতে বেশ সময় কাটিয়ে দিতে পারবে। তার পর পুরীপূজার মেলা। সে এবার রঞ্জিতকে নিয়ে পুরীপূজার মেলায় চলে যাবে। তারপর সেই মেলার প্রাঙ্গণে সারকাসের হাতি, সিংহ, বাঘ, মাঠে ঘোড়দৌড় এবং মন্দিরের এক পাশে ডোমেদের শুয়োর বলি এসব দেখে, জিলিপি রসগোল্লা মুখে পুরে সারা মাঠ ছুটে বেড়িয়ে—কী যে এক আনন্দ, কী যে এক সুখ বসত করে মনের ভিতর—বুঝি সুখের জন্য এই মানুষ রঞ্জিত এখন তার জীবনের সব কিছু। সে মরিয়া হয়ে বেড়ার ফাঁকে একটা চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল।

    বিকেলের দিকে যখন বেলা একেবারেই পড়ে এল, যখন বৈঠকখানার উঠোনে আলো মরে গেছে, সোনা, লালটু,পলটু যখন একটা করে বাঁশের লাঠি তুলে নিয়ে পুবের ঘরে সাজিয়ে রেখে দিচ্ছিল—তখনই গলা পাওয়া গেল। পুকুরপাড় থেকে ডেকে ডেকে উঠে আসছে কে!

    বৈঠকখানার উঠোনে এসে ডাকল, রঞ্জিত নাকি আইছে?

    শচীন্দ্রনাথ সামুকে দেখে সামান্য বিস্মিত হলেন। কিছুদিন আগে জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে শচীন্দ্রনাথ সামুকে গালমন্দ করেছিলেন। কথা কাটাকাটি হয়েছে। সেই সামু ফের এ বাড়িতে উঠে এসেছে বলেই বোধ হয় তিনি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। তিনি স্বাভাবিক থাকার জন্য অন্য কথা টেনে আনলেন। বললেন, তর মায় নাকি বিছানা থাইকা আর উঠতেই পারে না।

    —পারে না কর্তা।

    —তারিণী কবিরাজের কাছে একবার যা।

    —গিয়া কি হইব কর্তা। বোধ হয় শীতটা আর পার হইব না।

    —তবু একবার গিয়া দ্যাখ। যদি তাইন একবার তর মায়েরে দেইখা যান। আমার চিঠি নিয়া যা। সামু বলল, দ্যান চিঠি। পাঠাই। দ্যাখি কি হয়।

    —দ্যাখি কি হয় না! তুমি পাঠাইবা। পিসিরে অচিকিৎসায় মারবা সে হইতে দিমু না।

    সামুর মুখে সামান্য প্রসন্ন হাসির রেখা ভেসে উঠল। নাকের নিচে ছাঁটা গোঁফ এবং থুতনিতে অতি সামান্য নুর—খুব লক্ষ করলে বোঝা যায় থুতনির নিচে সেই নুরটাকে যেন সামু গোপনে লালন করছে। এক সময় সামুর মুখে বড় বড় দাড়ি দেখে শচীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—তরে দেখলে সামু, পিসার কথা মনে হয়। শচীন্দ্রনাথ সামুর বাবার কথা মনে করিয়ে দিয়ে সামুকে মহান করে তুলছিলেন যেন। তারপর কতদিন গেছে, মালতীকে ইচ্ছা করেই গালে বড় দাড়ি দেখিয়ে যেন প্রতিশোধ তুলতে চেয়েছিল। তারপর একসময় মনে হয়েছে, প্রতিশোধ কোথাও কারও জন্য অপেক্ষা করে থাকে না, সময় এলে সব জলের মতো মনে হয়, হাস্যকর মনে হয়। নিজের ছেলেমানুষীর কথা ভেবে লজ্জায় মুখ ঢেকে দিতে ইচ্ছা যায়। সুতরাং এখন সামু আবার ভদ্রগোছের যেন। বিশেষ করে শিক্ষিত, মার্জিত রুচির পুরুষ। যেন এখন সামু রঞ্জিত একরকম। সামুর পরনে তফন, ডোরাকাটা। ধানগাছের মতো রং তফনের। আর গায়ে হাল্কা গেঞ্জি, পুরুহাতা শার্ট। সে এবার শচীন্দ্রনাথের দিকে না তাকিয়েই বলল, শোনলাম রঞ্জিত ফিরা আইছে?

    —হ, আইছে। এতদিন কলিকাতায় আছিল, আবার ফিরা আইছে।

    সামু আর শচীন্দ্রনাথের জন্য অপেক্ষা করল না। ডাকল, কৈ ঠাকুর, কৈ গ্যালা। একবার এদিকে বাইর হও। দেখি চেহারাটা। তুমি আমারে চিনতে পার কিনা দেখি।

    রঞ্জিত বৈঠকখানার উঠোনে এসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল—তুই সামু না?

    —তাহলে দেখছি ভুইলা যাও নাই।

    —ভুলব কেন!

    —কি জানি বাবা, তুমি কোনখানে চইলা গেলা। কোন চিঠিপত্র নাই। বড় বৌঠাইরেনের লগে দেখা হইলে কইছি, রঞ্জিতের চিঠি পাইলেন নি! একেবারে নিরুদ্দেশে গ্যালা। কোন চিঠিপত্র নাই।

    রঞ্জিত বলল, ভিতরে এসে বোস।

    —সাঁজ বেলাতে ঘরে বইসা থাকবা? চল না মাঠের দিকে যাই।

    এটা মন্দ কথা নয়। মাঠের দিকে বলতে—সেই সোনালী বালির নদীর চর। সেই নদী, এক আবহমানকালের নদী। কথায় কথায় রঞ্জিত সামুকে অনেক কথাই বলল, অনেক দিনের অনেক কথা। এক ফাঁকে মালতীর কথাও।

    জ্যোৎস্না উঠে গেলে, পরিচ্ছন্ন আকাশ। ওরা আলের ওপর দিয়ে হাঁটছিল। এই সব যব গম খেত পার হলেই নদীর চর। নদী সাপের মতো বিস্তৃতি নিয়ে এই চর, মাঠ এবং গাঁয়ের মাঝে শুয়ে আছে। তরমুজের লতা খুব ছোট বলে এবং বাতাস দিচ্ছিল বলে অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় দূর থেকে একপাল খরগোশের মতো মনে হচ্ছে। ওরা যেন নিরন্তর সেই বালির চরে ছুটে বেড়াচ্ছিল। নদীর জল নেমে গেছে। কি আর জল—সেই এক রকমের, মনে হয় পার হয় গরু, পার হয় গাড়ি। ওরা নদীর জলে কাপড় হাঁটু পর্যন্ত তুলে নেমে গেল। স্ফটিক জল। নিচে নুড়ি পাথর, মাথার ওপর আকাশ। সাদা জ্যোৎস্না। নদী পার হলে গ্রাম, কিছু ঘন বন, আর পুবে হেঁটে গেলে এক বাঁশের সাঁকো পাওয়া যায়। সেই সাঁকোর ওপর মালতীকে নিয়ে একদিন সামু এবং রঞ্জিত চলে গিয়েছিল। নদীর জল মাঠ ভেঙে চুকৈর ফল, টকটক মিষ্টি মিষ্টি ফল, আনতে ওরা চলে গিয়েছিল। তারপর ওরা ফেরার পথে বড় মাঠ পার হতে গিয়ে পথ হারিয়ে সারাক্ষণ মাঠময়, গ্রামময় ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরলে নরেন দাস ধমক দিয়েছিল। ওরা বাড়িতে ঢুকলেই মালতীকে কাজ দিয়ে তাঁতঘরে পাঠিয়ে দিত।

    তখন সামু বলেছিল, ঠাকুর একটা বুদ্ধি দ্যাও।

    রঞ্জিত বলেছিল, নরেন দাস মাছ খেতে ভালোবাসে।

    —কি মাছ?

    —ইচা মাছ।

    সেবার ভাদ্র কি আশ্বিন মাস ছিল। ঠিক এখন মনে পড়ছে না ওদের। বর্ষার জল নেমে যেতে আরম্ভ করেছে। জলের নিচে সব জলজ ঘাস পচতে শুরু করেছে। দুর্গন্ধ জলে। জলের মাছ বড় বিল, নদী অথবা সমুদ্রে পালাতে পারলে যেন বাঁচে। খাল ধরে মাছগুলি নেমে যবে। ঠিক জায়গা মতো জলের নিচে চাই পেতে রাখতে পারলে মাছে চাই ভরে যাবে। চিংড়ি মাছে ভরে যাবে। বড় বড় গলদা চিংড়ি। কিন্তু বড় কষ্ট। বিশেষ করে সাপখোপের ভয়, জোঁক এবং জলজ কীট-পতঙ্গের ভয়। ওরা সব তুচ্ছ করে গায়ে রসুন গোটার তেল মেখে মাছ ধরার জন্য সাঁতরাতে থাকল। পচা জল সাঁতরে খালের বড় বট গাছটার নিচে চাই পেতে সেই বটগাছের ডালে সারারাত পাহারা দিয়ে পরদিন প্রায় দুই ঝুড়ি গলদা চিংড়ি নরেন দাসের উঠোনে এনে ফেলতেই চকিতে যেন বলে উঠেছিল, আরে, তরা করছসটা কি! সেই যে উভয়ে চকিত চোখে দেখেছিল, নরেন দাসের কী যে লোভ! নরেন দাস, বিষয়ী মানুষ নরেন দাস, লোভে আঁকুপাঁকু করছিল—আর কোনওদিন কখনও ছোট মেয়ে মালতীরে ধরে রাখেনি। মালতী প্রায় সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে এই অঞ্চলের সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছে।

    এই মালতীর জন্য ওরা কত দুঃসাহসিক কাজ করে বেড়াত! সেই মালতী এখন কত বড় হয়েছে। রঞ্জিত হাঁটছিল আর ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে এক সময় বলে ফেলল, মালতী বড় সুন্দর হয়েছে, কতদিন পর দেখা। মালতী এখন কি লম্বা হয়েছে!

    সামু এবার মুখ তুলে তাকাল। বলল অরে নিয়া বড় ভয় আমার। একদিন রাইতে দেখি অমূল্যরে নিয়া আনধাইরে হাঁস খুঁজতে মাঠে বাইর হইছে।

    রঞ্জিত বোধ হয় কিছুই শুনছিল না। মালতীকে সে প্রথম দিন দেখে চমকে গিয়েছিল। ওর মুখ থেকে যেন ফসকে বের হয়ে গেছিল—কি সুন্দর তুমি! কিন্তু বলতে পারেনি। কোথায় যেন ওর মনে এক অহঙ্কার আছে, আত্মত্যাগের অহঙ্কার। তবু মনের ভিতর ভালো লাগার আবেগ সময়ে অসময়ে খেলা করে বেড়াচ্ছিল। সামুর সঙ্গে দেখা হতেই মনে হল, এই মানুষ একমাত্র মানুষ যাকে তার ভালো লাগার কথাটুকু বললে কোনও ক্ষতির কারণ হবে না। সে জলের কিনারে হেঁটে যাবার সময় মালতীর কথা বলছিল। নির্মল জলের মতো মালতী পবিত্র হয়ে আছে এমন সব বলার ইচ্ছা। জলে জ্যোৎস্না চিকচিক করছে। জলের শব্দে ছোট ছোট মাছেরা ছুটে আসছে পায়ের কাছে। দাঁড়িয়ে গেলে সেই সব কুঁচো মাছ পায়ে ঠোকর মারছিল। দু’জনই প্রায় সময় সময় একেবারে চুপ মেরে যাচ্ছে আবার কথা উঠলে নানারকমের কথা, কথায় কথায় রঞ্জিত বলল, তুই নাকি লীগের পাণ্ডা হয়েছিস!

    সামু এ-কথার কোনও জবাব দিল না। কারণ কথাটার ভিতর বোধ হয় রঞ্জিতের অবজ্ঞা আছে। সে যেন ঠিক এখন শচীন্দ্রনাথের মতো কথা বলছে। শচীন্দ্রনাথ অথবা অন্যান্য হিন্দু মাতব্বর ব্যক্তিরা ওর দল সম্পর্কে যেমন উন্নাসিকতা রক্ষা করে থাকেন ঠিক তেমনি যেন রঞ্জিত ওর পার্টি সম্পর্কে অবজ্ঞা দেখাতে চাইল। সুতরাং সামু অন্য কথায় চলে আসার জন্য বলল, চল উপরে উইঠা যাই। চরে বইসা হাওয়া খাই।

    রঞ্জিত চরে উঠে এগিয়ে গেল। তারপর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলল, কি রে জবাব পেলাম না যে। –ও কথা, বাদ দ্যাও ঠাকুর।

    কেন বাদ দেব। আরও কি বলতে যাচ্ছিল। সহসা যেন সামু বলে ফেলল, ওটা আমার ধর্মের কথা। বলেই হাত ধরে রঞ্জিতকে টেনে বসাল। ছুঁইয়া দিলাম। সান করতে হইব না ত! রঞ্জিত এমন কথায় হা হা করে হেসে উঠল। কিন্তু হাসতে হাসতেই কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল রঞ্জিত। সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সামু এবার ধীরে ধীরে বলল,কতদিন আছ ঠাকুর? বলে দূরে নদীর জল দেখতে থাকল।

    —ঠিক নেই। যতদিন পারি থাকব! বলার ইচ্ছা যেন, আত্মগোপন করে আছি। যদি ধরিয়ে না দিস তবে বোধ হয় এবার এখানে অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যেতে পারব।

    সামু এবার ওর দিকে মুখ ফেরাল। এখন সে আর এই বালিয়াড়ি দেখছে না। নদী দেখছে না। এবং এত যে রহস্যময় গ্রাম মাঠ ফসল পড়ে আছে তাও দেখছে না। সে শুধু রঞ্জিতের মুখ দেখছে। সে রঞ্জিতের মুখে সেই ছায়া দেখছে—বোধ হয় আত্মত্যাগের অহংকার এই মানুষের মুখে, অন্য মানুষের ধর্মে কর্মে একেবারেই বিশ্বাস নেই। সে মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, আমার মাইয়াটারে তোমারে আইনা দ্যাখামু ঠাকুর। মাইয়াটা এখন ঠিক মালতীর ছোট বয়সের মত হইছে। কেবল ছুটে ছুটে বেড়ায় গোপাটে। মাইয়াটারে দ্যাখলে, আমার তোমার কথা মনে হয়। তুমি আমারে ঠাকুর অবিশ্বাস কইর না, অবহেলা কইর না। বলে কেমন মুখ ব্যাজার করে ফেলল সামু।

    —মালতী বলল, তুই ঢাকায় থাকিস, সেখানে পার্টি করছিস!

    —মালতী বড় অবজ্ঞা করে ঠাকুর। মালতী আমার লগে আর প্রাণ খুইলা কথা কয় না।

    —বুঝি অবিশ্বাস করছে?

    —জানি না ঠাকুর। বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা জানি না।

    ঠিক তখনই জ্যোৎস্নার ভিতর মনে হচ্ছিল এক মানুষ, পাগল মানুষ হেঁটে নদী পার হচ্ছেন। ওপারে গ্রামের ভিতর লণ্ঠন জ্বলছিল, জলে সেই লণ্ঠনের অলো ভাসছে। পাগল মানুষ, মণীন্দ্রনাথ নদী পার হচ্ছিলেন বলে জলে সামান্য ঢেউ উঠছে। আলোর রেখাগুলি ছত্রখান হয়ে গেল।

  • বার

    বার

    ফেলু দাওয়ায় বসে গরজাচ্ছিল। বাঁ হাতে এখন আর একেবারেই শক্তি পাচ্ছে না। হাতটার দিকে তাকালেই ভয়ঙ্কর এক আক্রোশ বুক বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে—তুমি ঠাকুর, পাগল ঠাকুর, তোমার পাগলামি ভাইঙ্গা দিমু।

    হাতটা ওর বাঁ হাত। কব্জিতে জোর নেই। কালো পোড়া বিশীর্ণ রঙ ধরে আছে কব্জির চামড়াতে। দু’পাশের মাংস ফুলে ফেঁপে আছে, যেন কব্জির দু’পাশে মাংস বেড়ে একটা মোটা গিঁট হয়ে যাচ্ছে। কালো তার বাঁধা। কালো তারে মন্ত্র পড়া সাদা এক কড়ি ঝুলছে। কড়ির গলায় ফুটো করে হাতে বাঁধা সুতো নিয়ে ফেলু কেবল গজরাচ্ছিল। কিছু কাক উড়ছিল উঠোনে, কিছু শালিখ পড়ছিল মাচানে আর বিবি গেছে পশ্চিম পাড়াতে এক শিশি তেল ধার করতে। ফেলু আছে মাছ পাহারায়।

    উঠোনের ওপর শীতের রোদ কাফিলা গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে নিচে এসে নামছে। এই সামান্য রোদেই ফেলু মাচানে মাছ ছড়িয়ে বসে আছে তারপর আরও সামনে খানা-ডোবা এবং জমি, জমিতে কোনও ফসল হয় না। ছোট্ট একখণ্ড জমি ফেলুর। বাড়ির উত্তরে এই জমি, বাঁশ গাছের ছায়া জমিটাকে বড় অনুর্বর করে রেখেছে।

    ওর গলায় কালো তার বাঁধা। গলায় চৌকো রুপোর চাকতি। সব সময় পালোয়ানের মতো চেহারা করে রাখার সখ ফেলুর। ফেলুর যৌবন নেই, কিন্তু এখনও শক্ত ঘাড় গলা দেখলে, ঘাড় গলা হাত দেখলে, তাজ্জব বনে যেতে হয়! মানুষটার মুখ ফসলহীন মাঠের মতো। রুক্ষ, দাবদাহে যেন সবসময় পুড়ে যাচ্ছে। একচোখে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে। চোখের ভিতর মণি আছে, মণির ভিতর সব সময় নৃশংস এক ভাব। সুখী পায়রা আকাশে উড়তে দেখলেই ধরে ফেলার সখ, দুই পাখা ছিঁড়ে দেবার সখ। এবং ঠ্যাং খোঁড়া করে দিতে পারলে গাজীর গীতের বায়ানদারের মতো চান্দের লাখান মুখখান এমন সব বলতে থাকে।

    ফেলু বড় হা-ডু-ডু খেলোয়াড় ছিল। তখন তার দুই হাতের ওপর শত্রু পক্ষের কী আক্রোশ! ঐ হাত যেভাবে পারো ভেঙে দাও। থাবা মারলে ফেলু, সকলে বাঘের মতো ভয় পায়।

    চত্বরে খেলা হচ্ছে। গোপালদি বাবুদের দল খেলছে—দশ টাকা আগাম আরও দশ ফেলুর ঐ বাঘের মতো থাবা মচকে দিতে পারলে কিন্তু হায়,কে কার থাবা মচকায়! ফেলু ছুটছে। একবার এ-মাথায় আবার ও-মাথায়। সে খুব দ্রুত ছুটতে ভালোবাসে। দাগের উপর পড়েই সে লাফ দেয়, যেন সে লাফ দিয়ে আসমান ছুঁতে চায়। ঐ ওর কায়দা। শক্ত হাত-পা পেশীতে সূর্যের আলো ঝলমল করত। কালো খাটো প্যান্ট, কালো গেঞ্জি আর রুপোর তাগা গলায়, যেমন লম্বা ফেলু, তেমন কুৎসিত মুখ শরীর-মনে হয় তখন ফেলু জয় মা বলে অথবা আল্লা আল্লা বলে—হা মা ঈশ্বরী বলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। দুই পায়ে কাইচি চালাও–ফেলু যে ফেলু সে পর্যন্ত পাহাড়ের মতো মুখ থুবরে পড়বে। তখন ফেলুর কোমরে বসে উল্টোভাবে এমন এক মোচড় দিতে হবে যেন বাঘের থাবা বেড়ালের হয়ে যায়। বাবুদের বায়নার মুখে ছাই দিয়ে যে ফেলু সেই ফেলু। খেলার শেষে টেরটি পাওয়া যায় না, ফেলুর কোথাও শরীর জখম হয়েছে।

    সেই ফেলু বসে বসে এখন নিজের হাত দেখছে। কাক তাড়াচ্ছিল এবং ভাঙা হাতের দিকে তাকিয়ে বড়ঠাকুরকে গাল পাড়ছিল—পাগলামির আর জায়গা পাও না ঠাকুর, তোমার পীরগিরি ভাইঙ্গা দিমু। তারপর সে হুঁস করল। একটা কাক ফের এসে ঘরের চালে বসেছে। কাকটা সেই থেকে জ্বালাতন করছে। কাক একটা নয়, অনেক। ধরে ফেলেছে, সে ব্যারামি নাচারি মানুষ। সে ক্রমে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। গিঁটে গিঁটে ব্যাদনা। হাতির শুঁড় ওর সব শক্তি নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু ফেলুর জ্বলন্ত দুই চোখ, বিশেষ করে পোকায় খাওয়া চোখটা এখন বড় বেশি ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল। কাকটা বোধ হয় সেই চোখটা দেখতে পায়নি। সে চোখটা দেখাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। কাকটা উড়ে এসে উঠোনে বসল। চোখটা দেখতে পায়নি। সে এবার তেড়ে গেল। তুমি আমারে পাগল ঠাকুর পাইছ। বলেই সে ডান হাতটা উঁচু করতে গিয়ে দেখল, হাতটা পুরোপুরি নিরাময় হয়নি। বাঁ হাতটা পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। ডান হাতটা নিরাময় হচ্ছে না। বিবি গেছে এক শিশি তেল ধার করতে আর সে ঘরের মাগের মতো বসে আছে মাছ পাহারায়।

    বিবির ওপর রাগটা বাড়ছিল। পাটকাঠি নিয়ে হাতে কত আর কাক-শালিখ তাড়ানো যায়। কাক-শালিখ, মাছের লোভে বাজপাখি পর্যন্ত উড়ে আসতে পারে। বাজপাখির কথা মনে আসতেই গৌর সরকারের কথা মনে এসে গেল। হাজিসাহেবের পাঁচনের খোঁচা, সময়ে অসময়ে সেই সন্দেহের পোকা কুরে কুরে খেলে, হাজিসাহেবে পাঁচনের খোঁচা মারেন মইজলা বিবিরে, আর প্রতাপ চন্দের নাভিতে তেল মাখানোর অভ্যাস, অভ্যাসটার কথা মনে আসতেই ফেলু ভাবল—ওরা কাক চিল নয়, ওরা বাজপাখি নয়, ওরা লাল নদীর ঈগল। বড় মাছ বাদে ওরা খায়না।

    সব জমি জিরাত ওদের। সুদিনে দুর্দিনে কামলা খাটলে পয়সা। ফেলুকে গৌর সরকার বড় ভয় পায়। সে ফেলুকে ভয় পায় গতর দেখে নয়, এমন গতরের কামলা ওর ঘরে কত বাঁধা আছে। ভয়, ফেলু নাকি যৌবনে অথবা সেদিনও রাতে-বিরেতে কোথায় চলে যেত। দরকার পড়লে সে দশটা টাকার বিনিময়ে দশটা মাথা এনে দিতে পারে—সেই ফেলু কি তাজ্জব, একটা কাক তাড়াতে পারছে না। ফেলু রাগে হতাশায় লুঙ্গিটা ডান হাতে ঝাড়তে থাকল বার বার।

    রোদে মাছ শুকানো হচ্ছে। ছোট্ট একটা উঠোন নিয়ে ফেলুর ঘর। একটা পেয়ারা গাছ। নতুন বিবি পুরনো হয়ে গেছে। সাত আট সাল হল সে বিবিকে ধরে এনেছে। বয়স আর কত বিবির, দেড় কুড়ি হবে, কি দু-এক বছর বেশি হতে পারে। কাঁচা যৌবনের ঢল বিবির বড় বেশি। পাড়াময় রসিকতা কত—বিবিটা আলতাফ সাহেবের। কি করে, কে কখন আলতাফ সাহেবের কাটা মাথা পাট খেতে আবিষ্কার করেছিল কেউ জানে না। তারপর বছর পার হয়নি, ফেলু আলতাফ সাহেবের খুবসুরত বিবিকে ঘরে এনে তুলেছে। কেউ রা-টি করেনি। ফেলু বড় দাঙ্গাবাজ মানুষ। ভয়ে বিস্ময়ে কেউ ওকে ঘাঁটাতে সাহস পায় না। সেই ফেলু এখন এক কাক, সামান্য কাকের সঙ্গে পেরে উঠছে না।

    মাছ রোদে শুকাচ্ছে। এক ফাঁকে একটা কাক এসে মাছ নিয়ে উড়াল দিল। ক্ষোভে হতাশায় ফেলু কাকটাকে তেড়ে গেল। কোমর থেকে লুঙ্গিটা খুলে গেছে, সে প্রায় উলঙ্গ হয়ে কাকটার পিছনে ছুটতে গিয়ে দেখল, প্রায় সব কাকগুলো ওর মাছের মাচানে বসে মাছ খাচ্ছে। রাগে দুঃখে সে ছেঁড়া তফনটা তুলে আর হাঁটতে পারল না। প্রায় হামাগুড়ি দেবার মতো হেঁটে গিয়ে দেখল, কাক যে সামান্য কাক, সেও বুঝে ফেলেছে ফেলুর আর তাগদ নেই। সে মরা মাছগুলির দিকে নিজের পোকায় খাওয়া চোখটা খুলে দাঁড়িয়ে থাকল। সে নড়তে পারছে না। নড়লে বাকি কয়টা মাছও আর থাকবে না। ওর ডান হাত সম্বল, বিবির ওপর সংসার। মাছের এ-অবস্থা দেখলে বিবি তাকে কুপিয়ে কাটবে। সে মাচানের পাশে বসে মাছগুলিকে ফের ছড়িয়ে রাখল। পুঁটি মাছ, চেলা মাছ। ইতস্তত ছড়িয়ে রাখলে বিবি এসে ধরতে পারবে না, কাকে এসে মাছ নিয়ে গেছে। সামু ফের ঢাকা গেছে, ফিরছে না। সামুর মার কাছ থেকে এক কাঠা ধান এনেছে ধার করে, সেও কী দিয়ে শোধ হবে, কবে, কীভাবে কাজ করতে পারলে শোধ হবে সে বুঝে উঠতে পারছে না। একমাত্র যুবতী বিবি আন্নু সব দেখেশুনে করছে।

    আন্নুর ওপর এ সময় তার কেমন মায়া হতে থাকল। সে লুঙ্গিটা তুলে এবার পরল। আন্নু বেগম, বড় মনোরম নাম। কিন্তু আন্নুটার শরীরে এত বেশি তেজ—প্রায় যেন সরকারদের তেজী ঘোড়া-লম্বা মাঠ পেলেই কেবল দৌড়াতে চায়। বড় মাঠে ফেলু এখন আর ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে পারে না। কোমরে টান ধরে। সমানে ছুটতে গেলে বড় অবশ অবশ লাগে শরীরটা। আন্নু ক্ষেপে গিয়ে বলে,মরদ আমার! ঠেলে ফেলে দেয় পিঠ থেকে, মাটিতে থুবড়ে পড়ে মুখ হাঁ করে ফেলে ফেলু। তখনই একটা সন্দেহের কোড়া পাখি ফেলুকে কুরে কুরে খায়। সে অতি কষ্টে যেন নদীর চর পার হতে হতে ডাকছে আন্নু, আৰু রে, পাগল ঠাকুর আমারে কানা কইরা দিছে।

    ছোট গ্রাম। কয়েক ঘর মুসলমান পরিবার। হাজিসাহেবের বাড়িতে চারটা চার-দুয়ারী নতুন টিনের ঘর আছে। কিছু গাইগরু আছে, বড় দুটো মেলার গরু আছে। তারপর সামুদের কিছু জমি, নয়াপাড়ার মাঠে ওদের কিছু জমি আছে। সম্বৎসর সামুদের ঐ ফসলে চলে যায়। ভাল দু’কানি পাটের জমি থাকলে আর কী লাগে! সামুর মিঞাজানেরা বড় গেরস্থ। সুতরাং অভাবে অনটনে ধান, খৈ, মুড়ি সবই চলে আসে। তারপর আর যারা আছে প্রায় সবাই আল্লার বান্দা। গতরের ওপর নির্ভর। আবেদালির জমি নেই। মনজুর অধিকাংশ জমি ভাগচাষ করে। ঈশম ত শালা! বলে ফেলু একটা খিস্তি করল। পঙ্গু বিবি ঈশমের। সামুদের আতাবেড়া পার হলে হজিসাহেবের গোলাবাড়ি এবং পরে একটা বেতঝোপ আর আতাফলের একটা বড় গাছ, গাছের নিচে ভাঙা কুঁড়েঘর—কোন আদ্যিকাল থেকে বিবিটা সেখানে পড়ে গোঙাচ্ছে। কি কঠিন ব্যাধি! বিবিটাকে সে কোনওদিন ভালোবাসতে পারেনি! ওর একমাত্র সম্বল এক তরমুজ খেত।.. সেই খেতে বসে থাকে মানুষটা। এখন শীতের দিন, এইসব দিন পার হলে গ্রীষ্মের দিন আসবে। তখন যেন ঈশম সওদাগরের মতো। ঠাকুরবাড়ির বান্দা ঈশম তরমুজ বিক্রি করবে, আর সব টাকা তুলে দেবে ছোট ঠাকুরের হাতে। ওর গর্ব সে জমি থেকে ছোট ঠাকুরের হতে কত টাকা তুলে দিতে পারল।

    গ্রামের পর গ্রাম অথবা বিস্তীর্ণ মাঠ। মুসলমান গ্রামগুলিতে হাহাকার যেন বেশি। কোনও কোনও গ্রামে হাজিসহেবের মতো ধনী আছেন, তাদের সুখ অন্য ধরনের। ওরা, ওদের ছেলেরা উজানে যায়, পাটের ব্যবসা করে কেউ। মসজিদে ইন্দারা বানিয়ে ওরা সিন্নি ছড়ায়। এইসব দেখে অজ্ঞ ফেলুর বড় ইচ্ছা বড় একটা নাও বানায়। সেই নাও নিয়ে পাটের ব্যবসা করার সখ। পাটের দালাল অথবা ফড়ে হতে পারলে বড় সুখের। যা করে হাজিসাহেব হজ করে আসলেন পৰ্যন্ত।

    আর হিন্দু গ্রামগুলির দিকে তাকাও—পুবের বাড়ির নরেন দাস—তার জমি আছে, তাঁতের ব্যবসা আছে। দীনবন্ধুর দুই তাঁত দুই বউ। সুখে আছে লোকটা। আর ঠাকুরবাড়ির মানুষেরা শোনা যায় তল্লাটের বিদ্বান বুদ্ধিমান মানুষ। বড় ঠাকুর পাগল মানুষ। মেজ ঠাকুর, সেজ ঠাকুর দু’দশ ক্রোশ হেঁটে গেলে মুড়াপাড়ার জমিদারদের কাছারিবাড়ির নায়েব গোমস্তা। জমিদারদের বড় বিশ্বাসভাজন লোক। ওদের সচ্ছল সংসার। তারপর পালবাড়ি-জমি আছে ওদের, মিলের কাজ আছে। তারপর মাঝিরা—ওদের বড় বড় গরু। ইচ্ছা করলে ওরা প্রায় মেলায় গরু দৌড়ে বাজি জিতে আসতে পারে। ক্বচিৎ দু’ একবার নয়াপাড়ার মিঞাজানেরা বাজিতে জিতে গেলে—সে যেন মাঝিদেরই বদান্যতা। বারবার কাপ মেডেল নিলে মইনসে কয় কি! ওরা মেলার গরু মাঠে নিয়ে যায়নি বলে মিঞাজানেরা দৌড়ে বাজি জিতে গেল।

    শেষে পড়বে কবিরাজ বাড়ি। নীল রঙের ডাক-বাক্স লাল রঙের ঘোড়া আছে বাড়িতে। প্রতাপ মাঝি ধনী লোক, বিশ্বাসপাড়ার মাঠে, ফাউসার মাঠে এবং সুলতানসাদির মাঠে সব সেরা জমিগুলি ওর। শেষে আর দ্যাখো গোঁর সরকার—শালীর সনে পীরিত যার, যে ছন ছাইতে গেলে জলপান করতে দেয় না, েমানুষ সুদে এবং লালসায় বড় হচ্ছে-অপরের সুখ দুঃখের বোধগম্যি কম—কেবল টাকা টাকা, টাকা পেলে সে নিজের কলিজা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারে। ফেলু ভাবতে ভাবতে দাঁত শক্ত করে ফেলল—তোমা-গ মশাইরা জবাই করতে পারলে শান্তি। সে চিৎকার করে উঠল, ঠাকুর, পাগল তুমি! তোমার পাগলামি—সে আর বলতে পারল না, কাকগুলি ওকে অন্যমনস্ক দেখে ফের নেমে এসেছে। সে হুস হুস করতে থাকল। ভারি দুর্দশা তার। বিবিটা এখনও ফিরছে না, কি করছে এতক্ষণ! হাজিসাহেবের ছোট ছেলে কি আন্নুর পেটে হাঁটু রাখতে চায়। সে চিৎকার করে উঠল, হালার কাওয়া আমারে ডরায় না। হালার বিবি আমারে ডরায় না। সে বিবিকে খুন করবে বলে পাগলের মতো হেসে উঠল। সে হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, পোড়া হাত কি ভাল হইব আল্লা! সে বাঁ-হাতটা কোনও রকমে ডান হাতে চোখের সামনে তুলে আনল। দেখল কব্জির চামড়া কুঁচকে গেছে। ফোলা কব্জি, কব্জিতে কানাকড়ি বাঁধা কালো তার ঝুলছে। মনে হয় এই ফেলু ঈশমের বিবির মতো পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। সে উঠোন থেকেই পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকল, আন্নু রে, আন্নু।

    তখন আবেদালির বিবি জালালি যাচ্ছে বাড়ির নিচ দিয়ে। বাঁশ ঝাড়ের নিচে শীর্ণ জালালিকে দেখে মনে হল বিলে নেমে যাচ্ছে জালালি। এখন গরিব গরবাদের শালুক তুলবার সময়! আশ্বিন-কার্তিকে সামনের সব মাঠ আর অঘ্রান-পৌষে বিলেন জমিতে কট করে ধানের ছড়া শামুকের মুখে কেটে কোঁচড় ভরা যায়। এখন মাঠে কিছু নেই। ফাঁকা মাঠ। যব গমের ফলন হয়নি। এখন শুধু বিলে নেমে যাওয়া শালুকের জন্য। জালালি শালুক তুলতে বিলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। জালালিকে দেখে বলল, ভাবি, আন্নুরে দ্যাখছেন নি?

    জালালি গামছাটা সঙ্গে রেখেছে। মাথায় ওর একটা পাতিল ছিল। পাতিলটার জন্য মুখ দেখা যাচ্ছে না। পাতিলটা মাথায় ছিল বলেই হয়তো ফেলুর কথা ওর কানে যায়নি। অথবা গেলেও অস্পষ্ট। সুতরাং জালালি পাতিলটা মাথা থেকে নামিয়ে এনে বলল, কি কও মিঞা? আমারে কিছু কও নাকি!

    —আর কি কমু গ! বলে ফেলু যে ফেলু, সে পর্যন্ত গাইগরুর মতো মুখে নির্বোধের হাসি নিয়ে তাকাল।

    —কিছু কইতে চাও?

    —আন্নু গেছে এক শিশি তেল আনতে। আইতাছে না।

    জালালি বলল, আইব নে। বলে জালালি দাঁড়াল না। সে ফের পাতিলটা মাথায় নিয়ে মাঠে নেমে গেল। বড় মাঠ সামনে। বাঁ পাশে সোনালী বালির নদী, নদীর চর। চর পার হয়ে সোজা উত্তরমুখো হাটলে সেই বিল। ফাওসার বিল। বিলে একবার ঈশমকে কানাওলায় ধরেছিল—এত বড় বিল এ-পরগণাতে কেন, এ-জেলাতে বুঝি আর নেই। একবার বিলের জলে কুমীর ভেসে এসেছিল, বড় এক অজগর সাপ ভেসে উঠেছিল। তারপর এই বিলের নানা রকমের কাছিমের গল্প, গজার মাছের গল্প, এবং রাতে সপ্তডিঙা মধুকরের গল্প কিংবদন্তীর মতো এ-অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। সেই বিলে জালালি যাচ্ছে শালুক তুলতে। শুধু জালালি নয়, অনেকে, এমন প্রায় হাজার হবে। ওরা শালুক তুলে আনবে। ওরা ভোরে শালুক তুলতে বের হয়ে যাচ্ছে। ফেলু উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

    আবেদালি এ সময়ে দেশে চলে আসবে। বর্ষা, শরৎ, হেমন্তে সে গয়না নৌকার মাঝি। শীত, গ্রীষ্ম আর বসন্তে সে হিন্দু পাড়ায় কামলা খাটবে। এই তো গ্রাম—গ্রামে মাত্র সামু মাতব্বর মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারছে। যত সামু মাতব্বর মানুষ হয়ে যাচ্ছে, যত হিন্দু যুবকেরা সম্মান দিয়ে কথা বলছে, তত ফেলু সামুর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। সে যেন সামুর বান্দা হয়ে যাচ্ছে ক্রমে।

    যেন এক মানুষ মিলে গেছে সমাজে, মাত্র এক মানুষ, যে এইসব ভদ্র হিন্দু পরিবারের মানুষদের চেয়ে কোনও অংশে কম যায় না। সামু ঢাকা থেকে এলেই ফেলুর ঘুরঘুর করা বেড়ে যায়। সে ওর ভাঙা হাত সম্পর্কে নালিশ দেবার সময় ক্ষোভে-দুঃখে ভেঙে পড়ে। ভিতরে ভিতরে এইসব হিন্দু সুখী পরিবারের বিরুদ্ধে তার আক্রোশ ভয়ঙ্করভাবে পীড়ন করলে সামু যেন মোল্লা-মৌলবীর মতো কিছুটা আসানের কথা শোনাতে পারে। সামুর লীগ পার্টি—জিন্দাবাদ—আমাদের জন্য একটা দেশ চাই। এই দেশে আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটা জায়গা চাই। তারপরে যে কথা শুনলে ফেলুর ঘুম চলে আসে—একদিন এ-দেশটা দুঃখী মানুষের হয়ে যাবে। ফেলু দুঃখী মানুষ ভাবতে সে প্রায় তার গোটা স্বজাতিকে ভেবে ফেলেছিল। তার জন্য কতরকমের জেহাদ—ধর্মযুদ্ধ চাই। তার জন্য কতরকমের বিপ্লব চাই, সামু বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ত। আমাদের জন্য দেশ, এই দেশ মাটি ফসল সব আমাদের জন্য হবে। আমাদের সুখের জন্য হবে। অধিকাংশ মানুষ যখন আমরাই এই দেশে বসবাস করছি, তখন এই দেশ আমাদের।

    সামু যখন বইয়ের ভাষায় টেনে টেনে কথা বলতে থাকে, তখন মনে হয়, ফেলুর সব ফেলে ঐ এক মানুষের পিছনে থেকে জাতির সেবা করলে কাজটা মোল্লা-মৌলবীর চেয়ে কম ধর্মীয় হবে না। কিন্তু হাত ভেঙে কী হয়ে গেল সে! কাকগুলি মাছের লোভে মাথার ওপর উড়ছে। সে হুস্ করল। বলল, হালার কাওয়া, আমার নাম ফেলু শেখ। সে মাথার উপরে ডান হাতে পাটকাঠিটা ঘোরাতে থাকল।

    আর তখনই বাছুরটা হাম্বা করে ডাকল। হাড় বের করা বাছুরটার মুখ দিয়ে ঠাণ্ডায় লাল পড়ছে। বাছুরটার ঠাণ্ডা লেগেছে, শীতে বাছুরটা ফুলে ঢাক হয়ে আছে। রোদে নিয়ে গেলে ফুলে থাকা ভাবটা গরমে কমে যাবে। তা’ছাড়া হাতে একটা কাজ পাওয়া গেল। এত বেলায়ও যখন আন্নু ফিরে এল না, বাছুরটা ক্ষুধায় হাম্বা করছে—ওকে নিয়ে তবে মাঠে নেবে যেতে হয়। খোঁটাতে বেঁধে দিলে কিছু ঘাসপাতা খেতে পাবে। ঘাসপাতা খেলে শক্ত হবে বাছুরটা।

    আন্নু আসছে না। কী করা যায়? সে তাড়াতাড়ি ডান হাতে মাছগুলি তুলে ফেলল। ঘরের ভিতর মাছ রেখে ঝাঁপ বন্ধ করে দিল। সে বাছুর নিয়ে গোপাটে নেমে গেল। খোঁটা পুঁতে দিলে দেখল কাতারে কাতারে লোক বিলে শালুক তুলতে যাচ্ছে। সব মুসলমান বিবি, বেওয়া। ওরা এ-অঞ্চলের সব মুসলমান গ্রাম থেকে নেমে যাচ্ছে। আর এই তো সামনে বিশাল বিলেন মাঠ। হাইজাদির সরকাররা পুকুরপাড়ে বাস্তুপূজা করছে। ভেড়া বলি হচ্ছে। ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে।

    বাস্তুপূজার জন্য ঠাকুরবাড়ির ছোট ঠাকুর বের হয়ে পড়েছেন। তিনি হিন্দু গ্রামে উঠে সব হিন্দু গেরস্থবাড়িতে বাস্তুপূজার তিল-তুলসী দেবেন। বাস্তুপূজায় ঢাক বাজছে। পূজা-পার্বণে ঘুরে বেড়াবেন, মন্ত্র পড়বেন। ঈশম আজ তাঁর সঙ্গে যাবে না। সে কাল যাবে। চাল কলা এবং তৈজসপত্র সব বোচকা বেঁধে আনবে।

    সংরকারদের বাস্তুপূজায় কত মেয়ে-বউ এসেছে নতুন শাড়ি পরে কপালে সিঁদুরের টিপ, হাতে সোনার গহনা, পরনে গরদের শাড়ি আর ওদের কেমন মিষ্টি চেহারা—কী সুন্দর মুখ। একেবারে য্যান হেমন্তে সোনালী বালির নদীর চর। পূজা হচ্ছে, পার্বণ হচ্ছে। কুটুমের মতো ঠাকুরবাড়ির বড়বৌ, ধনবৌ পুকুরপাড়ে নেমে এল। জমির বুকে ছোট কলাগাছ, নিচে ছোট ঘট। ঘটের ওপর নারকেল আর চারধারে সব নৈবেদ্য—যেন ভোজ্যদ্রবের অভাব নেই। তিলা কদমা শীতের যত খাদ্যদ্রব্য সব ওদের আয়ত্তে।

    আর কী জ্বালা, জ্বালা নিবারণ হয় না জলে, জালালি জলের দিকে নেমে যাবার জন্য মাঠের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আর কী জ্বালা, বাছুরটা কিছুতেই ঘাসে মুখ দিচ্ছে না। শীতের ঘাস—শিশিরে ভিজে আছে ঘাস। যতক্ষণ রোদ ভালোভাবে না উঠবে, যতক্ষণ হিম ঘাস থেকে ভালোভাবে না মরে যাবে ততক্ষণ বাছুরটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে, ঘাসে মুখ দেবে না। সে রাগে দুঃখে বাছুরটা ঘাস খাচ্ছে না বলে পেটে লাথি বসিয়ে দিল। বাছুরটা দু’হাঁটু মুড়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। কারণ ওর মনে হচ্ছিল বাছুরটা তাড়াতাড়ি ঘাস ক’টা না খেয়ে ফেললে, এক ফাঁকে হাজিসাহেবের খোদাই ষাঁড়টা অথবা গৌর সরকারের দামড়া গরুটা এসে চেটে পুটে এই তাজা ঘাস খেয়ে ফেলবে। এই ঘাস সে যেন মাঠে নেমে আবিষ্কার করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি বাছুরটা ঘাস খেয়ে ফেললে আর কেউ এসে ভাগ বসাতে পারবে না। কিন্তু বলিহারি যাই হালার মাগী আন্নু ভাগে এক বাছুর এনেছে! এমন এক মরা বাছুর যার কপালে সুখ নাই, গায়ে বল নাই, আছে কেবল মল-মূত্র ছড়ানো ছিটানো অথবা ধ্যাবড়ানো। আন্নুর কথা মনে হতেই সে সব ফেলে গাঁয়ের দিকে উঠে যাবে ভাবল। এক শিশি তেল ধার করতে এত দেরি!

    দূরে ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। ওর কানে বড় বেঢপ লাগছে শব্দটা। জালালিকে দেখা যাচ্ছে। অনাহারে জালালি কাতর! এখন ফাওসার বিলে নেমে যাবার জন্য প্রতাপ চন্দের ঘাট পার হচ্ছে। সে, সামনে যেসব জমি আছে, শ্যাওড়া গাছের বন আছে তা অতিক্রম করে বেনেদের পুকুরপাড় ধরে হাঁটছে। সেই এক বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঠের সব জমি প্রতাপ চন্দের। সেই সব জমি পার হলে ফওসার খাল। খালের পাড়ে পাড়ে যত জমি পড়বে- পাটের, আখের, এমনকি করলার জমি, সব গৌর সরকারের। তারপর যত জমি, সব হাজিসাহেবের। হাজিসাহেবের তিন বিবি, ছোট বিবির বয়স আর কত—এই এক কুড়ি চার-পাঁচ হবে। হাজিসাহেব ঈদের দিনে তিন বিবি মসজিদে নিয়ে যাবার সময় চারদিকে নজর রাখেন। সতর্ক নজর। কেউ নজর দিয়ে গিলে ফেলল কিনা দেখেন। অন্তরালে কিছু দেখা যায় কিনা, হেই হেডা কি হইছে। নজরে লালসা ক্যান, বলে হয়তো একটা পাঁচনের খোঁচা মারেন মাইজলা বিবিরে। খোঁচা দিয়ে কন, বিবিরে, অঃ সোনার বিবি, পথ দেইখা হাঁট। তখন কেবল কেন জানি মনে হয় ফেলুর, পাঁচনটা কেড়ে নিয়ে এক বাড়ি হালার হালা, হাজির মাথায়। ভাবতে ভাবতে এসব, ফেলুর মাথায় খুন চড়ে যায়, ফেলু স্থির থাকতে পারে না—কেবল কি সব মনে হয়। ফেলু, যে ফেলু কোন মাতব্বর নয়, জলে-জঙ্গলে যে ফেলু মানুষ হয়েছে, যে ফুেলকে উজান থেকে হাজিসাহেব ধরে এনেছিল—উজানি নৌকাতে ধান কাটা সারা হলে, ফেলু হাজিসাহেবের পেটে পিঠে পায়ে রসুন গোটার তেল গরম করে মেখে দিত, সেই ফেলুর কেন জানি বড় সাধ মাঝে মাঝে হাজিসাহেবের মাইজলা বিবিরে একবার বোরখার অন্তরালে উঁকি দিয়া দ্যাখে।

    সে গোপাটে দাঁড়িয়ে ছিল। বড় সেই অশ্বত্থ গাছটির নিচে বিচিত্র সব মটকিলা গাছের ঝোপ, পাতাবাহারের জঙ্গল। শীতকাল বলে জঙ্গলের ভিতরটা শুকনো খটখটে। ভিতরে ঢুকে গোসাপের মতো ঝোপের আড়ালে সন্তর্পণে পড়ে থাকলে হয়তো মাইজলা বিবিরে দেখা যাবে—কারণ, ও-পাশটায় হাজিসাহেবের অন্দরের পুকুর। ঝোপের ভিতর থেকে উঁকি দেবার আগে চারপাশটা সে দেখে নিল। বাঁদিকে আবেদালির ঘর, কেউ এখন ঘরে নেই। আমগাছটার নিচে ভাঙা ঘর এখন খালি। উত্তর-দুয়ারী ঘরে সেই কবে জোটন বাস করত, এখন জোটন নেই বলে বর্ষায় বৃষ্টিতে ঝড়ে ঘরটা একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিছু ঝোপজঙ্গল, বেতগাছ আবেদালির বাড়িটাকে সব সময় অন্ধকার করে রাখে। কোনও রকমেই শীতের সূর্য আবেদালির উঠোনে নামতে চায় না।

    আর এইসব ঘর উঠোন এবং ঝোপ-জঙ্গল পার হলেই—হাজিসাহেবের আতাবেড়ার ওপাশে তিন বিবির গলা, কাচের চুড়ির মতো জলতরঙ্গ বাজিয়ে চলেছে। কি হাসে! হাসতে হাসতে মনে হয় হালার দুনিয়া গিলা ফ্যালবে। সিঁথিতে বড় লম্বা টান ধানখেতের সাদা আলের মতো। আর ডুরে শাড়ি হাঁটুর নিচে বেশিদূর নামতে চায় না। ঝোপের ভিতর থেকে ফেলু মরিয়া হয়ে এবার উঁকি দিল। হাত পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে, ডান হাতটা কোনওরকমে কাজে লাগছে এখনও, কবে এই হাতটা পঙ্গু হয়ে যাবে—সে প্রায় একটা মরা সাপের মতো ঝোপের ভিতর পড়ে থাকল। ঝোপের পাশ দিয়ে ঘাটের পথ। হাজিসাহেবের অন্দরের পুকুরের পানি কি কালো। পানি দেখলেই বিবি-বৌদের পেটে জ্বালা ধরে। তলপেটটা শিরশির করতে থাকে। কালো পানির টানে চুপি চুপি সময়ে-অসময়ে মাইজলা বিবি ঘাটে নেমে আসে। এলেই খপ করে হাত ধরে ফেলবে, ধরে ঝোপের ভিতর টেনে-ফেলু আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে কচ্ছপের মতো এবার গলাটা তুলে ধরল। সে মরা সাপের মতো বেশি সময় শিকারের আশায় ঝোপের ভিতর পড়ে থাকতে পারছে না।

    যখন মন খুশিতে উজান বয় না তখন ডাকে আন্নু। আর যখন মন উজানি নদীর মতো মাতাল তখন ডাকে, আন্নু বেগম। পেট পুরে খেতে পারলে ডাকে বেগমসাহেবা। ফেলু বেগমাসাহেবার জন্য পাগল, আর পাগল এই মাইজলা বিবির সুরমাটানা চোখের জন্য। ঘাট থেকে তাড়িয়ে দেবার পর এই অশ্বত্থের ঝোপ ওর মতো নিরালম্ব মানুষের সামান্য আশ্রয়। সে ঝোপের ভিতর একটা মরা গো-সাপের মতো সেই থেকে পড়ে আছে—মাইজলা বিবি এ-পথে এখনও ঘাটে এসে নামছে না।

  • তের

    তের

    এখন শীতের দিন। জমি থেকে সব ফসল উঠে গেল বলে মাঠ ফাঁকা। কেবল নরেন দাস অথবা মাঝি-বাড়ির শ্রীশচন্দ্র, প্রতাপ চন্দ কামলা দিয়ে নিচু জমিতে তামাকের চাষ করছে। আর সব উর্বরা জমি থাকলে সেখানে পেঁয়াজ, রসুন এবং চীনাবাদামের গাছ দেখা যাচ্ছে। এই পথে কেউ বড় এখন আসবে না। এলেও ঝোপের ভিতর যে একটা মানুষ শিকারী বেড়ালের মতো ওৎ পেতে আছে টের পাবে না। জালালির শরীরটা এখন মাঠের শেষে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পুবের বাড়ির মালতী গরু নিয়ে এসেছে গোপাটে। সে গোপাটে গরুর খোঁটা পুঁতে চলে যাচ্ছে।

    সরকারদের ঘাট পাড়ে তেমনি ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। মাঠে মাঠে বাস্তুপূজার নিশান উড়ছে। ঠাকুরবাড়ি, পালবাড়ি এবং বিশ্বাসপাড়া যেদিকে তাকানো যাচ্ছিল সব দিকে সেই ঢোলের বাজনা আর মেষ অথবা মোষের আর্তনাদ। মোষ বলির সময় হলে সরকারদের পঞ্চাশজন ঢাকি একসঙ্গে ছররা ছোটাবে। সে একবার একটু কাৎ হয়ে গলাটা কচ্ছপের মতো যেন বাড়িয়ে দিল। মনে হল মাইজলা বিবির মুখ শরীর ঝোপের অন্য পাশে–ঠিক ঘাটের মধ্যে নেমে আসছে। ভেসে উঠেও উঠল না। মরীচিকার মতো ঝিলিমিলি করছে শুধু। আহা, ভেতরটা কেমন করছিল ফেলুর।

    তখন হাইজাদির সরকারেরা করজোড়ে নতুন গামছা গলায় দাঁড়িয়ে আছে। মোষের ধড় এবং মুণ্ডু নিতে যারা শীতলক্ষ্যার পার থেকে এসেছিল, তারা ঘাটের অন্য পাড়ে দাঁড়িয়ে। মাঠে মাঠে উৎসব আর ঝোপের ভিতর ফেলু। সে মাইজলা বিবির মরীচিকা দেখার জন্য ঝোপের ভিতর কচ্ছপের মতো গা তুলে রাখল।

    মালতী গোপাটে গরুর খোঁটা পুঁতে তাড়াতাড়ি শোভা আবুকে নিয়ে ঠাকুরবাড়ির ঘাটে স্নান করতে চলে গেল। বাস্তুপূজা বলে সকাল সকাল আভারানী স্নান করেছে। মাঠে অমূল্য কলাগাছ পুঁতে এসেছে। এবং দুর্বাঘাস চেঁচে চারদিকটা পরিচ্ছন্ন করে শুকনো আমের ডাল বেলপাতা সব পেড়ে এনে বারকোষে রেখে দিয়েছে। গোটা তিনেক জমি পার হলে ঠাকুরবাড়ির ভিটা জমি। সেখানে বড়বৌ ধনবৌ সকাল সকাল স্নান করে চলে এসেছে। সোনা, ঠাকুরঘর থেকে কাঁসি নিয়ে ছুটছে। সোনা কাঁসিটা জোরে জোরে বাজাচ্ছিল। পুকুরের জলে কচুরীপানা কলমিলতা এবং শীতের সময় বলে গাছে কোনও ফল নেই, ফুল বলতে কিছু শীতের ফুল ঝুমকোলতা, শ্বেতজবা, রাঙাজবা। বাস্তুপূজায় রাঙাজবা দিতে নেই। শ্বেতজবা কে ভোর না হতেই গাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। বড়বৌ সাজিতে সামান্য ফুল সংগ্রহ করতে পেরেছেন। খুঁজেপেতে কিছু শ্বেতজবা, কিছু পলাশ ফুল আর টগর। গাঁদা ফুল কিছু আছে। শীতের জন্য শ্বেতজবা তেমন ফোর্টে না ভালো, ফুলগুলি কুঁকড়ে আছে—অসময়ের ফুল বড় হতে চায় না।

    তখন জালালি সমস্ত গরিবদুঃখী মানুষের সঙ্গে সেই বড় বিলে, প্রকাণ্ড বিলে—এ-পাড়ে দাঁড়ালে যার ও-পাড় দেখা যায় না, যে বিলে ভিন্ন ভিন্ন সব কিংবদন্তী রয়েছে, বিলের চারপাশে নলখাগড়ার বন, মাঝে মাঝে উঁচু ডাঙা, আবার দু’দশ একর নিয়ে গভীর জল, কালোজল বড় গভীর—যেখানে মানুষ যেতে, নৌকা বাইতে ভয়, তেমন বিলে নেমে যাচ্ছে জালালি। জলের ভিতর কি এক দৈত্য থাকে বুঝি, কিংবদন্তীর দৈত্য। ওর পেট পিঠ জ্যোৎস্না রাতে ময়ূরপঙ্খী নৌকার মতো। নৌকা যেন এক জলে ভাসে, জলে ভেসে নৌকা যায়, ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়। তারপর মানুষের সাড়া পেলে টুপ করে জলের নিচে ডুবে যায়—হায়, মানুষের অগম্য বুদ্ধি। অজ্ঞ মানুষের বিশ্বাস, অলৌকিক ঘটনার মতো ঘটনা নেই। দুপুর রাতে চরাচরে যখন মানুষ জেগে থাকে না, যখন সারা বিলটা পাঁচ-দশ ক্রোশ জুড়ে জলের ভিতর ডুবে থাকে, যখন জ্যোৎস্নায় ফসলের মাঠ ভরে থাকে তখন জলে এক ময়ূরপঙ্খী নাও ভাসে—ভিতরে রাজকন্যা এক, চাঁদবেনের পুত্রবধূ হবে হয়তো, বেহুলা লখীন্দরের পাঁচালি মানুষের প্রাণে বিহ্বলতা জাগায়।

    নৌকা বিলের জলে ভেসে উঠলে আলোতে আলোময়। যেন মাঝ বিলে আগুন ধরে গেছে। তেমন বিলে নেমে যাবার আগে জালালি জলটা প্রথম মাথায় দিল, পরে মুখে জল দিল, তারপর গোসাপের মতো জলে ভেসে গেল। শীত কনকন করছে—কিন্তু পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, জ্বালা নিবারণ হয় না জলে। কবে আবেদালি গেছে, মাস পার হয়ে যাবে প্রায়, ঘুরে এল না এখনও। এলেও দু’চার হপ্তা পেট পুরে খাওয়া। তারপর ফের উপোস। জালালি জলে ভাসতে থাকল। ফুৎ করে জল মুখে নিয়ে হাওয়ার ভিতর জল ছুঁড়ে দিতে থাকল।

    সব মানুষ সাঁতার কেটে যেখানে শাপলা-শালুকের পাতা ভেসে আছে সেদিকটায় চলে যেতে থাকল ক্রমশ। বড় শালুকের জন্য সকলের লোভ বেশি। এ-জলে কি আছে কি নেই,কেউ বড় জানে না। বরং কী নেই, কী থাকতে না পারে এই বিস্ময়। সেই এক সালে হাজার হাজার মানুষ পুরীপূজার মেলা থেকে ফিরে আসার সময় দেখেছিল—বিলের ঠিক মাঝখানে কালো রঙের এক মঠ ভেসে উঠেছে। ভেসে উঠতে উঠতে কিছু ওপরে উঠে থেমে গেল। তারপর ফের নিচে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রায় স্বপ্নের মতো ব্যাপারটা। যারা দেখেছে, তারা মন্ত্রের মতো বিশ্বাস করেছে, যারা দেখেনি তারা আজগুবি গল্প মনে করেছে। আর যাদের অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস আছে তারা, খবরটাকে নিয়ে নতুন কিংবদন্তী সৃষ্টি করেছে। মনে হয় বুঝি ঈশা খাঁ সোনাই বিবিকে নিয়ে এ-বিলে লুকিয়ে রয়েছে। সেই জাহাজের মতো হালের দাঁড় কালো রঙের মঠের মতো জলের ওপর ভেসে ওঠে মাঝে মাঝে। শুধু একটু দেখিয়েই যেন ডুব দেয়। যেন বলে, দ্যাখো, দ্যাখো আমি এখনও বুড়ো বয়সে সোনাইরে নিয়ে বড় সুখে আছি বিলের ভিতর। তোমরা আমার অনিষ্ট করলে, আমিও তোমাদের অনিষ্ট করব। সেই ভয়ে ভরা ভাদরে সোজা বিলের মাঝ বরাবর কেউ নৌকা ছাড়ে না। এ-বিল বড় ভয়ঙ্কর। বিলের তল নেই, জলের নিচে মাটি নেই। শুধু যেন অন্ধকার আর প্রাচীন সব লতাগুল্ম নিয়ে চুপচাপ জলের ভিতর ডুবে আছে। ভয়ে এ-বিলে কেউ নৌকায় বাদাম দেয় না। বড় নিভৃতে যেতে হয়, যেন ঈশা খাঁর কালঘুম ভেঙে না যায়।

    অঞ্চলের মানুষেরা এ-বিলকে দানবের মতো ভয় পায়। ঈশম যে ঈশম, সে পর্যন্ত এ বিলের পাড়ে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। কি এক জীনপরী পিছু লেগে ওকে রাতের বেলায় অজ্ঞান করে দিয়েছিল। সেই বিলে গরিবদুঃখী মানুষেরা পেটের জ্বালা নিবারণের জন্য জলে নেমে গেল।

    পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, জ্বালা মরে না জলে। জলের ভিতর ভেসে ছিল জালালি, যেন নেমে গেলেই পেটের জ্বালা নিবারণ হবে। কিন্তু হায়, জলের ভিতর কাদার ভিতর কোথাও শালুকের নাম গন্ধ নেই। রোজ রোজ তুলে নিয়ে গেলে কি আর থাকে! কিছু মরা শাপলা পাতা সামনের জলে উল্টে আছে। শীতের দিনে শাপলা ফুল আর ফোটে না। শাপলা ফুলে কালো কালো ফল হয়েছে। সে দুটো ফল সাঁতরাতে সাঁতরাতে সংগ্রহ করে ফেলল। এবং জলের ভিতরই জালালি ভাসতে ভাসতে খেতে থাকল। ভিতরে এক ধরনের কালো কালো বীচি, এক ধরনের সোঁদা সোঁদা গন্ধ, স্বাদ বলতে মরি মরি কিছু না, খেতে হয় বলে খাওয়া। পেটের ভেতর জ্বালা থাকলে কী খেতে না সখ যায়। লাল আলুর মতো সেদ্ধ করে খেতে হয় শালুকের ভেতরটা। একটু নুন দিয়ে, কোনও কোনও সময় তেঁতুলের অল্প গোলা ফেলে দিলে প্রায় অমৃতের মতো স্বাদ। লোভে সাঁতার দিতে থাকল জালালি। সামনে দুটো শালুক পাতা জলের ভিতর ডুবে আছে। লতা দুটো ধরার জন্য সে জলের ভিতর ডুব দিল। জলের নিচে নেমে গেল। অনেক নিচে, লতা ধরে ধরে আলগোছে তা ধরে ধরে—জোরে টান দিলে লতাটা ছিঁড়ে যাবে, লতা ছিঁড়ে গেলে সব গেল, জাদুর ঘরে নেমে যাবার সিঁড়িটা তুলে নেবার মতো হবে। সুতরাং খুব সন্তর্পণে জলে ডুবে যাবার জন্য, অন্ধকার মাটিতে হাতড়ে বেড়ানোর জন্য, ডুবুরির মতো বুড়বুড়ি তুলে প্রায় হারিয়ে গেল। জলের নিচে বড় ভয়। ভয়ে চোখ খুলছে না জালালি। চোখ খুললেই মনে হয় কোন জাদুকরের দেশে সে পৌঁছে গেছে। জলের নিচে জলজ ঘাসেরা তাকে নেচে নেচে ভয় দেখায়। নীল অথবা সবুজ মনে হতে হতে একটা কালো কুৎসিত অন্ধকার চারপাশ ঢেকে ফেলে। সে এক শ্বাসে জলের নিচে ডুবে নিমেষে জল কেটে আবার ওপরে ভেসে উঠল। তারপর কত দীর্ঘকাল পর যেন আকাশ মাটি এবং সূর্য দেখতে পেয়েছে এমন নিশ্চিন্তে শ্বাস নেবার সময় মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে—সোনার চেয়েও দামী একটা বড় শালুক ওর হাতে।

    পাতিলটা ঢেউ খেয়ে একটু দূরে সরে গেছে। সে পাতিলটাক টেনে এনে শালুকের শেকড়গুলি প্রথম কামড়ে ছিঁড়ে দেখল শালুকটা যত বড় ভেবেছিল—ঠিক তত বড় নয়। শালুকটা বোধ হয় রক্ত শাপলার। পেতি শাপলার সালুক বেশ মিষ্টি। সাদা শাপলার শালুকে কষ বেশি। রক্ত শাপলার শালুকে অল্প তিতাভাব থাকে। তবু শালুকটাকে পরিচ্ছন্ন করে খুব যত্নের সঙ্গে পাতিলের ভিতর রেখে পাড়ের দিকে তাকাল। কেউ আর পাড়ে দাঁড়িয়ে নেই। যে যার মতো শালুকের খোঁজে জলে ভেসে দূরে চলে যাচ্ছে। আবেদালি আসে না, কতকাল আসে না, সেই কবে গয়না নৌকার মাঝি হয়ে চলে গেল—আর আসে না। জব্বর আসে না। সে বাবুর হাটে তাঁতের কাজ নিয়ে চলে গেছে। জোটন এসেছিল একটা মুরগি নিয়ে আবেদালিকে খাওয়াবে বলে, মুরগিটা উড়াল দিয়ে সেই যে হাজিসাহেবের বাড়িতে চলে গেল, আর এল না। হাজিসাহেবের ছোট বিবি কোতল করে ফেলল মুরগির গলাটা।

    বিলের জলে দুঃখী মানুষেরা শালুকের খোঁজে ভেসে বেড়াচ্ছিল। চারপাশের গ্রাম থেকে দুঃখী মানুষেরা হেঁটে এসে নেমে গেল জলে। বেলাবেলিতে সকলে জল ছেড়ে উঠে যাবে। এই শীতের শেষে আর যখন শালুক থাকবে না, যখন জলের ওপর আর কোনও শালুক পাতা ভাসবে না অথবা এই বিলের জল শান্ত নিরিবিলি, তখন ঝোপেজঙ্গলে অথবা জলের ওপর বালিহাঁস ভাসবে। নানা রকমের পাখি, লাল-নীল পালকের পাখি, জলপিপি এবং ভিন্ন ভিন্ন সব বক ছোট বড় চকাচকিতে প্রায় বিলটা ছেয়ে যাবে। তখন মুড়াপাড়ার জমিদারবাবুর ছেলেরা হাতিতে চড়ে আসবেন, তাঁবু ফেলবেন বিলের ধারে এবং ভোরে অথবা জ্যোৎস্নায় পাখি শিকার করে তাঁবুতে পাখির মাংস, ওরা শীতের শেষে মাসাধিক কাল পাখির মাংসে বন মহোৎসব চালাবে।

    গ্রীষ্মকালটাই জালালির বড় দুঃসময়। প্রায় মাটিতে পেট দিয়ে পড়ে থাকতে হয়। বর্ষা এলে ধানের জমিতে, পাটের জমিতে আবেদালির কাজের অন্ত থাকে না। বর্ষা শেষ হলে জল কমতে থাকলে, শাপলা ফুল ফুটতে থাকলে মাটির নিচে অন্নের মতো প্রিয় এই শালুক, দুঃখী মানুষদের, নিরন্ন মানুষদের একমাত্র সম্বল এই শালুক, বর্ষা এলেই মাটির ভিতর জন্ম নিতে থাকে। এই জলা জমি আর মাটির অন্তরে শালুক আপনার প্রিয় ধন—যেন ফেলতে নেই, অবজ্ঞা করতে নেই। বসে থাকলে পাপ, ভেসে বেড়ালে পুণ্য। জালালি পাতিলটার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে বেড়াতে থাকল। ডুব দিলে তখন অন্য কেউ হাত বাড়িয়ে পাতিল থেকে শালুক তুলে নিতে পারে।

    সামনে শুধু জল, প্রায় অনন্ত জলরাশি। শালুকের লোভে সে খুব দূরে চলে এসেছে। বোধ হয় এর পর আর শালুক নেই। ডান দিকে পদ্মফুলের বন। বাঁ দিকে স্ফটিক জল। সামনের জলে কি যেন সব ভেসে বেড়াচ্ছে। কি হবে আর–বড় গজার মাছ হবে হয়তো। বড়-বড় মাছ, থামের মতো লম্বা গজার মাছ। কালো কুচকুচে, মাথায় মুখে লাল সিঁদুর গোলা রঙ, গায়ে অজগর সাপের মতো চক্র। ওর ভয় লাগছিল। তবু মনে হয়, ভয়ে হোক বিস্ময়ে হোক কেউ এতদূর আসেনি। কেউ আসেনি বলেই বোধ হয় কিছু ইতস্তত শালুক এখনও পড়ে আছে। সে ভয় থেকে রেহাই পাবার জন্য চোখ বুজে জলের নিচে ডুব দিল। কিন্তু জলের নিচে চোখ খুলতেই মনে হল—বড় একটা গজার মাছ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। লেজ নাড়ছে। স্থির। গজার মাছটা জালালিকে দেখছে। জলের নিচে আজব একটা জীব, বোধ হয় মনুষ্যকুলের কেউ হবে—প্রায় ব্যাঙের মতো নিচে নেমে আসছে। প্রাচীন সব জলজ ঘাস এবং লতার ভিতর মাছটা মুখ বার করে রেখেছে। জালালি চোখ খুলতেই শুধু মাছটার মুখ দেখতে পাচ্ছে। কালো ভয়ঙ্কর মুখ একবার হাঁ করছে, আবার জল গিলে মুখ বন্ধ করছে। জালালিকে মাছটা এতটুকু ভয় পাচ্ছে না। বরং জালালিকেই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।

    হায়, পেটের জ্বালা, বড় জ্বালা, জ্বালা সহে না প্রাণে। ভয়ে বিস্ময়ে জালালি জলের নিচে এতটকু হয়ে আছে। তবু লোভ সামলাতে পারল না জালালি। আর একটু নিচে গেলেই মাটিতে হাত লেগে যাবে এবং শালুকটা আয়ত্তে চলে আসবে। দমে আসছিল না। সে তাড়াতাড়ি শ্বাস নেবার জন্য জল কেটে ভেসে উঠল। দম নিল, একটু সময় ভেসে থেকে বিশ্রাম নিল। ফের ডুবে জলের নিচে চলে যেতে থাকলে দেখতে পেল, সবুজ এক দেশ, নীল জলের গালিচা পাতা। অন্ধকার, ক্রমে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছে। তারপরই লতার গোড়ায় ঠিক মাটিতে যেখানে শাপলা পাতার লতা এসে থেমে গেছে সেখানে হাতটা ঠেকে গেল। অন্ধকারেও টের পাচ্ছিল জালালি, মাছটা মুখ হাঁ করে এগিয়ে আসছে। অতিকায় মাছ। তবু একটা মাছ, সে যত অতিকায় হোক, বড় হোক, সে মাছ। একটা মাছ, সামান্য মাছ, তুমি মাছ যত বড়ই হও—আমি মনুষ্যকুলে জন্মে তোমাকে ভয় পাব! বোধ হয় সে এমন কিছু ভাবতে ভাবতে শালুকের গোড়া চেপে ধরল। তারপর সে দেখল মাছটা সবুজ রঙের ঘাসের ভিতর মুখটা নাড়ছে। খুব সন্তর্পণে নাড়ছে আর জালালিকে দেখছে। শালুকটা হাতে পেয়ে জালালির সাহস বেড়ে গেল। সে ভ্রূক্ষেপ করল না। সে আর একটু এগিয়ে গেল। মাছটা এবার পিছু হটে যাচ্ছে। সে এবার আর দেরি করল না। যখন মাছটা ভয় পেয়ে যাচ্ছে তখন আর ডুবে থেকে কি হবে। সে ভোঁস করে জল কেটে শুশুকের মতো পিঠ ভাসিয়ে দিল।

    সেই কবে একবার জালালি জলের নিচে হাঁস চুরি করে গলা টিপে ধরেছিল, কবে একবার মালতীর পুরুষ হাঁসটাকে ঝড়ের রাতে পুড়িয়ে নরম মাংস এবং ঠ্যাঙ চিবিয়ে আল্লার দুনিয়া বড় সুখের ভেবে বড় একটা ঢেকুর তুলেছিল—এখন শুধু তার কথা মনে আসছে। সেই মৃত হাঁসটার মতো মাছ, মাছটার চোখ সারাক্ষণ জলের নিচে স্থির হয়ে ছিল। যেন এক বড় অজগর সাপ ওকে গিলতে আসছে এমন মনে হল। কিন্তু সাপ হলে সব জায়গাটা এতক্ষণে প্লাবনের মতো তোলপাড় হতে আরম্ভ করত। এত স্থির থাকত না। সে এটাকে মনের ভয় ভাবল। জলের নিচে চোখ খুললেই মনে হয় সব বিচিত্ৰ গাছগাছালি যেন প্রাণ পেয়ে তার দিকে ধেয়ে আসছে। সে সহজে সেজন্য চোখ খুলতে চায় না।

    সবুজ রঙের কদম ফুলের মতো ঘাসের অন্ধকারে জালালি বুঝতে পারেনি কী তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে বেশ সুখে একটার পর একটা ডুব দিয়ে গভীর জলের ভিতর চলে যেতে থাকল। ঠিক ডুবুরীর মতো জলের নিচে ডুবে যাচ্ছে, জলের ওপর ভেসে উঠছে। তেমন অসংখ্য মানুষ এখন পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে, জলের ভিতরে তারা ডুবে যাচ্ছে, জলের ওপর ভেসে উঠছে। কখনও শালুক পাচ্ছে, কখনও পাচ্ছে না। আর ঠিক কখন পাবে কেউ বলতে পারছে না। সব শাপলালতার গোড়ায় শালুক থাকে না। ফলে শালুক তোলার দলটা বিলের জলে ছড়িয়ে পড়ছিল। সুর্য ওপরে উঠে গেছে। দুরে চোখ মেলে তাকালে, শুধু গভীর জল—শান্ত এবং কালো। সেখানে এক শীতল ঠাণ্ডা ঘর রয়েছে যেন। ওপার দেখা যাচ্ছে না। অনন্ত জলরাশি কত প্রাচীনকাল থেকে ভিন্ন ভিন্ন কিংবদন্তী নিয়ে বিলের ভিতর ভেসে বেড়াচ্ছে। শীতের সময় জলের রঙটা আরও কালো হয়ে ওঠে। শীতের সময় চারপাশের নলখাগড়ার ঝোপ থেকে পাখিরা অন্যত্র উড়ে যায় এবং ঝোপের ভিতর যেখানে জল থেকে জমি ভেসে উঠেছে সেখানে বিষাক্ত সাপেরা গর্তের ভিতরে মরার মতো শীতের ঠাণ্ডায় পড়ে থাকে। গ্রীষ্মের জন্য, বর্ষার জন্য ওদের প্রতীক্ষা। বর্ষা পড়লেই অথবা বসন্তকালে যখন সূর্য মাথার উপর কিরণ দেয় তখন বিষাক্ত সাপ সব মাঠ থেকে জলে নেমে যায়। জলের ওপর ভেসে বেড়ায়। দূরের গজারী বন থেকে তখন কিছু ময়াল সাপ পর্যন্ত এই বিলের জলে নেমে আসে। জালালি জলের ভিতর দেখছিল লাল চোখ দুটো ওর দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকছে। কিছুই স্পষ্ট নয়। কারণ অন্ধকার বড় প্রকট জলের গভীরে। নীল অথবা সবুজ রঙের ঝোপের ভিতর যদি আরও দুটো শালুক খুঁজে পাওয়া যায়—প্রলোভনে জালালি একটা পাতিহাঁস হয়ে গেল আর জলের ভিতর ডুবে-ডুবে লাল চোখ দুটোকে মরণ খেলা দেখাতে থাকল।

    .

    তখনও ফেলু ঝোপের ভিতর শুয়ে আছে। নেমে আসছে, আসছে না। এলেই খপ করে ধরে ঝোপের ভিতর টেনে নেবে। কামরাঙা গাছের ছায়ায় বিবির শরীর দেখা যাচ্ছে, যাচ্ছে না। এদিকে রোদ মাথার ওপর উঠে এল। অথচ বিবির মুখ দেখা গেল না, অঙ্গ দেখা গেল না। মাঠের ভিতর বাস্তুপূজার ঢাক-ঢোলের বাজনা কখন থেমে গেছে। পুকুরপাড়ে বড়বৌ। সোনা মাঠের ওপর দাঁড়িয়ে কথা নেই বার্তা নেই কাঁসি বাজাচ্ছে—ট্যাং ট্যাং। পূজা পার্বণ শেষ। এখন সব তিল তুলসী, বারকোষ, নৈবেদ্য এবং তিলা কদমা আর অন্যান্য ভোজ্যদ্রব্য বাড়ি নিয়ে যাওয়া। বড় সাদা পাথরে পায়েস—ধনবৌ সাদা পাথরে পায়েস নিয়ে যাচ্ছে। ফল ফুল, নতুন গামছা, ঘট আর নারকেল নিয়ে যাচ্ছে রঞ্জিত। মাঠের ভিতরই প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। গ্রামের যুবা পুরুষেরা, বৃদ্ধ, বৃদ্ধারা প্রসাদ নিয়ে চলে যাচ্ছে। তারপর হ্যাজাকের আলো জ্বলবে রাতে। সরকাররা পুকুরের পাড়ে চার পাঁচটা হ্যাজাক জ্বালাবে। পথের ওপর ডে-লাইট জ্বলবে। তখন মাঠে মাঠে আরও সব হ্যাজাকের আলো, আলোতে এই মাঠ এবং গ্রাম সকল একসময়, মাত্র এক রাত্রির জন্য ডুবে থাকবে আর ভেড়ার মাংস এবং আতপ চাউলের সুগন্ধ মাঠময় কী যে গন্ধ ছড়াবে! ফেলুর জিভে জল এসে গেল। রঞ্জিত এখন অন্য জমিতে মালতীকে দেখছে। মালতী বড় ব্যস্ত। সে কিছু লোককে বসিয়ে খিচুড়ি পায়েস খাওয়াচ্ছে। শীতের রোদে বেশ আমেজ ছিল। উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়ায় বেশ শীত-শীত ভাব। সকলে পেট পুরে খেয়ে রোদের ভিতর ঘাসের ওপর যেন প্রায় গড়গাড়ি দিচ্ছে।

    আর সোনা তখন কাঁসি ফেলে গোপাট ধরে ছুটছে। ফতিমা গোপাটে ছাগল দিতে এসে ইশারাতে সোনাকে ডাকল। যেন ফতিমা শীতের ঠাণ্ডায় একটা কচ্ছপ আবিষ্কার করে ফেলেছে। কচ্ছপটাকে ধরার জন্য সে সোনাকে ডাকছে। এখন শীতকাল। শীতের জন্য কচ্ছপেরা বেশিক্ষণ জলে থাকতে পারে না। পাড়ে উঠে রোদ পোহায়। অথবা জমির ভিতর কচ্ছপেরা লুকিয়ে থাকে। লাঙ্গলের ফালে মাটির ভিতর থেকে কচ্ছপ উঠে আসতে পারে। কিন্তু ফতিমা সোনাকে সে-সবের কিছুই দেখাল না। অশ্বত্থ গাছটার নিচে সোনাকে টেনে নিয়ে গেল। ঝোপের ভিতর কি আছে দ্যাখেন। বলে ফতিমা চুপি দিল। বুঝি মানুষ হবে, পাগল ঠাকুর হবে। ফতিমা অন্তত তাই ভেবেছিল। সোনাবাবুর পাগল জ্যাঠামশাই যিনি রাত-বিরাতে, কোনওদিন খুব ভোরবেলা উঠে মাঠ পার হয়ে সোনালী বালির নদী পার হয়ে নিরুদ্দেশে চলে যান, সেই মানুষই হয়তো আজ বেশি দূর না গিয়ে এই অশ্বত্থের নিচে মটকিলা ঝোপের ভিতর শুয়ে শুয়ে পাখির সঙ্গে গল্প করছেন। ছোট মেয়ে ফতিমা, সামুর একমাত্র মেয়ে ফতিমা জানে না—এই মানুষ পাগল মানুষ নন, এ অন্য মানুষ—ফেলু শেখ। ফেলু শেখ এখনও চুপচাপ সেই পরাণের চেয়ে প্রিয়, মরণে যার স্মৃতি ভোলা দায়—সেই এক পরমাশ্চর্য যুবতীকে খপ করে ঝোপের ভিতর টেনে নেবার জন্য আত্মগোপন করে আছে।

    সোনা ঝোপের ভিতর উঁকি দিয়ে ডাকল, জ্যাঠামশয়। কারণ যখন সব দেখা যাচ্ছে না তখন পাগল মানুষ ব্যতীত আর কে হবেন। এই অঞ্চলে তিনিই তো একমাত্র মানুষ যাঁর কাছে এই মাঠ, গাছগাছালি এবং পরবের দিনে উৎসব সব সমান।

    ফেলু এত নিবিষ্ট যে কতক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছে খেয়াল নেই। কার যেন গলা, কে যেন ঝোপে উঁকি দিয়ে পিছনে ডাকছে। হাত পিঠ মুখ ফেলুর দেখা যাচ্ছে না। ঘন ঝোপের বাইরে শুধু পা দুটো দৃশ্যমান, এই পা দেখে ধনকর্তার ছোট পোলা টের পেয়েছে মানুষ আছে ঝোপের ভিতর। ওরা এখন হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকছে। আগে সোনা পিছনে ফতিমা। সে তাড়াতাড়ি ধড়ফড় করে উঠে বসল। ঝোপ থেকে পাগলের মতো ছুটে বের হয়ে যাবে ভাবল, কিন্তু তাড়াতাড়ি করলে ধরা পড়ে যাবে, সে কি যেন হাতড়াতে থাকল। তার কি যেন হারিয়ে গেছে।

    সোনা এবং ফতিমা বুঝতেই পারেনি, এমন একটা নীরস মানুষ ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে। সোনা বলল, আপনে!

    ফেলুর কি হারিয়ে গেছে এমন চোখমুখ। সে বলল, ঝোপের ভিতর শিকড়-বাকড় খুঁজতাছি।

    —কি হইব?

    —হাতটা জোড়া লাগব।

    সোনা বলল, পাইলেন নি?

    —না রে কর্তা, পাইলাম না। কৈ যে সব লুকাইয়া থাকে, বলে ফেলু ফতিমার দিকে কটমট করে তাকাল। ঝোপের ভিতর ফতিমা এবং সোনা। ফেলু সোনাবাবুকে কিছু বলল না। শুধু ফতিমার দিকে তাকিয়ে মনে-মনে গজরাতে থাকল, সামু মাইয়াটারে বড় আসকারা দ্যায়। মাইয়াটারে ইংরাজি শিখায়। এত অধর্ম ভাল নয় মনে হল ফেলুর। আর সঙ্গে সঙ্গে পাগল ঠাকুরের মুখ ভেসে ওঠে, মুখ ভেসে উঠলেই ভিতরের সেই অধম্মটা জেগে ওঠে। হাতের দিকে তাকালে ক্ষোভের সীমা থাকে না। ফেলুর প্রতিপত্তি কমে যাচ্ছে। সেই যে বিবি আন্নু সে পর্যন্ত তেলের নাম করে হাজিসাহেবের ছোট বিবির কাছে চলে গেল। ছোট বিবির কাছে গেল কি ছোট সাহেবের কাছে গেল কে জানে! এখনও সে ফিরছে না। ফেলু তাই ভাবল একটু তাড়াতাড়ি করা যাক। বিবির কথা মনে হতেই সে পা চালিয়ে হাঁটল। তাড়াতাড়ি করতে গেলে বড় বাগের ভিতর দিয়ে সোজা উঠে যেতে হয়। পথ নেই, শুধু বাঁশের জঙ্গল। কিছু বেতগাছ এবং চারপাশটা অন্ধকার। দিনের বেলায় হেঁটে যেতে গা ছমছম করে। পাশেই গ্রামের কবরখানা। ফেলু হন হন করে হাঁটছিল। বাঁ হাতে একেবারে শক্তি নেই। কব্জিতে মন্ত্রপড়া কড়ি ঝুলছে। যদি বিবি এখনও সং করে বেড়ায় সে বিবির পেটে এক লাথি মারবে। তার শরীর এবং দাঁত শক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর তক্ষুনি দেখল বিবি তার বাগের অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসছে। কিন্তু হাতটা—পঙ্গু হাত নিয়ে কিছু করতে পারল না। বাগের অন্ধকার থেকে বের হতেই সে মুখের উপরে ভয়ঙ্কর চিৎকার করে উঠল, তুই আন্নু!

    আন্নু দাঁড়াল না। এমন মানুষটাকে সে আর ভয় পায় না। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বলল, তুমি মানুষটা ক্যামনতর! কইলাম হুস করতে কাওয়া আর তুমি বাগের ভিতর ঘোরতাছ!

    —তুই এহানে ঝোপে-জঙ্গলে কি করতাছস?

    —সঙের লাইগ্যা তোমারে খোঁজতাছি।

    —আঃ। বিবিটাও ইতর কথা কইতে শিখা গ্যাছে। কারে লাথি মারে ফ্যালু! নিজের পেটে লাথি মারে! ফেলু রাগে দুঃখে নিজের পেটে একটা লাথি মারতে চাইল। বিবিটা পর্যন্ত ধরে ফেলেছে ফেলু পঙ্গু হয়ে গেছে। সুতরাং কে কার পেটে এখন লাথি মারে। আন্নু পরম কুলীন এক যুবতী কন্যার মতো বাগের ভিতরে ডুব দিয়ে জল খাচ্ছে, একাদশীর বাপও টের পাচ্ছে না। ফেলু কেমন কাতর গলায় বলল, তুই মনে করস আমি কিছু বুঝি না! হালার কাওয়া।

    —আর তুই মনে করস আমি-অ কিছু বুঝি না। ফেলুর মুখের ওপর ঝামটা মারল আন্নু।

    —তুই যুবতী মাইয়া, তর বোঝনের না আছে কি ক’। বলে ফেলু কথা আর বাড়াল না। একটু দূরে কাঁঠাল গাছে সোনা, ফতিমা নিচে। কাঁঠাল পাতা অথবা ডাল ভেঙে দিচ্ছে ফতিমার ছাগলটাকে। গোলমাল বাধালে অথবা চিৎকার চেঁচামেচি করলে এখানে ওরা ছুটে আসতে পারে। ছুটে এলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে। সে অশ্বত্থের ঝোপে আত্মগোপন করেছিল, গাছে তখন কাক উড়ছিল না, মেলায় গরু যাচ্ছে, গলায় ঘণ্টা বাজছিল আর ঘাসের ভিতর পড়ে থেকে মাইজলা বিবির সনে সঙ—সব টের পাবে যুবতী মেয়ে আন্নু। সে চুপচাপ অন্নুর শরীরের আঁশটে গন্ধটা এবারের মতো হজম করে গেল। সে পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকল, গোসল কইরা বাড়ি ঢুকবি। না হয়, তর একদিন কি আমার একদিন। আর এই হজম করার যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়ল পাগল-ঠাকুরের ওপর, সে এক হাতিতে চড়ে ওর দুই হাত ভেঙে এখন মাঠে ময়দানে পাখি ওড়াচ্ছে, এবং বাতাসে ফুঁ দিয়ে চলে যাচ্ছে। সেই মানুষকে বাগে পেলে পীর না বানিয়ে ছাড়ছে না। রাগ এবং বিদ্বেষ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বিবি আন্নু এই ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর এতক্ষণ তেল আনার নাম করে, ওকে মাছ পাহারায় রেখে এসে কী করছিল সব যেন জানা।

    কিন্তু অসহায় ফেলু দু’হাত ওপরে তুলতে গিয়ে দেখল, সে নাচারি, বেরামি মানুষ। এমন জবরদস্ত বিবির সঙ্গে সে বুঝি ইহজীবনে লড়তে পারবে না। লড়তে পারলে বোধ হয় এই অন্ধকার বাগের ভিতর এখন এক প্রলয়ঙ্কর খণ্ডযুদ্ধ বেধে যেত। অগত্যা ভালো মানুষের মতো আন্নুর পিছনে পিছনে, যেন সে এবং আন্নু, মেমান বাড়ি থেকে বাগের ভিতর দিয়ে ফিরছে—কোনও তঞ্চকতা নেই, পরস্পর তেমনভাবে হাঁটছে, মাঠে তখনও ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। মালতী প্রসাদ বিতরণ করছে মাঠে। কাগজের লাল নীল পতাকা উড়ছে বাতাসে। মাঠের ভিতর সাদা ধবধবে গরদ পরে মালতী, নিষ্ঠাবতী, ধর্মাধর্ম যার একমাত্র সম্বল, যে সকলের মতো হাঁস পুষে বড় করছে, পুরুষ হাঁসটার জন্য যার মমতা আর বর্ষায় যে চুপচাপ নিঃশব্দে বৃষ্টিতে ভেজে সারারাত ধরে, সেই মালতী, বিধবা মালতী এখন বাস্তুপূজার পায়েস খাওয়াচ্ছে সকল মানুষকে।

    গাছের ডালে সোনাবাবু। ফতিমা দুষ্টু প্রজাপতির মতো চারা কাঁঠাল গাছটার চারপাশে ঘুরছে এবং লাফাচ্ছে। ছাগলটার জন্য সে ডালপাতা সংগ্রহ করছে। সোনা ছাগলটার জন্য ডাল ভেঙে দিচ্ছিল গাছের। কাঁঠাল পাতা খাবার জন্য ছাগলটা, ছোট্ট এক বাচ্চা ছাগল দু’পায়ে ভর করে লাফ, দিচ্ছিল। সোনা ছাগলটার পাতা খাবার আনন্দে, গাছের সব কচিকাঁচা ডালপাতা ভেঙে ছাগলটার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছাগলটার পাশে এখন পাতার ডাঁই। সোনা লাফ দিয়ে গাছ থেকে নেমে পড়ল। পড়তেই কানের কাছে মুখ এনে ফতিমা ফিসফিস করে বলল, যাইবেন সোনাবাবু?

    —কোনখানে?

    —বকুল ফল আনতে যাইবেন?

    — কতদূর?

    —বেশি দূর না। বলে, আঙুল তুলে দেখাল—ঐ যে দ্যাখছেন না হাসান পীরের দরগা। দরগার ডাইনে ট্যাবার পুস্কনি, আমরা যামু পুস্কনির পাড়ে।

    —ছোটকাকা বকব।

    —যামু আর আমু।

    সোনা চারিদিকে তাকাল। পূজা-পার্বণের দিনে কারো কোনও লক্ষ নেই। লালটু, পলটু ছোটকাকার সঙ্গে চরু রান্নার জন্য গেছে। ছোটমামা গেছে সরকারদের বাস্তুপূজাতে। শোভা, আবু, কিরণী বাস্তুপূজার প্রসাদ খেয়ে বেড়াচ্ছে। পূজা-পার্বণের দিনে কে কোথায় যায়—কে কার খবর রাখে! পাগল জ্যাঠামশাই ভোরে কোনদিকে বের হয়ে গেছেন, কেউ টের করতে পারেনি। সোনা মনে মনে ভাবল, বেশি দেরি হলে সকলে ভাববে, সোনা গেছে জ্যাঠামশাইর লগে। সুতরাং সোনা বোঁ বোঁ শব্দ করতে থাকল মুখে। তারপর ওরা মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকল। বড় মাঠ, উত্তরে গেলে হাসান পীরের দরগা। দরগার পাশ দিয়ে সাইকেলে গোপাল ডাক্তার নেমে আসছে। গোপাল ডাক্তার ওদের দেখে ফেলবে ভয়ে ওরা দালানবাড়ির খালের ভিতর নেমে গেল। দু’জনে চুপচাপ মাথা গুঁজে উবু হয়ে বসে থাকল। এত বড় মাঠের ভিতর সোনা এবং ফতিমাকে একা একা ঘুরতে দেখলে আশঙ্কার কথা। তুমি সোনা, সেদিনের সোনা, একা একা এত বড় বিশাল বিলেন মাঠে নেমে এসেছ—কি সাহস তোমাদের! চল চল বাড়ি চল। অথবা কিছু তিরস্কার। কিংবা বাড়িতে খবরটা পৌঁছে দিলে ছুটবে ঈশম, তার প্রিয় তরমুজ খেত ফেলে ছুটবে। আর মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে অথবা বিলেন মাঠে নেমে গিয়ে ডাকবে, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন! অঃ সোনাবাবু।

    কবে একবার সোনা একা-একা তরমুজ খেতে নেমে গিয়েছিল—কবে, সেই কতকাল আগে সোনা প্রথম গ্রামের বাইরে বের হয়ে দক্ষিণের মাঠে—সোনালী বালির নদীর চরে তরমুজ খেতের ভিতর হারিয়ে গিয়েছিল সঠিক মনে নেই, কিন্তু সেই তরমুজ খেত, মালিনী মাছ এবং বড় মিঞার দুই বিবি—দুর্গাঠাকুরের মতো মুখ, নাকে নথ দুলছিল, কি এক রোমাঞ্চ যেন জীবনে, সোনা এখন সেই এক রোমাঞ্চকর লোভে ছুটছে। ফতিমা কাপড়টা গামছার মতো করে প্যাঁচ দিয়ে পরেছে। শরীরে ফতিমার জামা নেই। কোনও ফ্রক নেই। খালি গা। নাকে নথ দুলছে ফতিমার। কানে পেতলের মাকড়ি। নাকের বাঁশিতে সোনার নাকচাবি। চাবির মুখটা চ্যাপ্টা চাঁদের মতো। কথা নেই বার্তা নেই সোনা ফতিমার নাকটা চ্যাপ্টা করে ধরে নাকের ভিতর সেই চ্যাপ্টা চাঁদ কি করে বাঁশিতে আটকে আছে দেখল। ফতিমার খুব লাগছিল নাকে। কিন্তু সোনাবাবু, ছোট্ট সোনাবাবু…শরীরে যার চন্দনের গন্ধ লেগে থাকে আর মাথায় কি সুমধুর গন্ধ! সোনাবাবু তার নাক উল্টে বাঁশিতে এখন চ্যাপ্টা চাঁদের মুখ উঁকি দিয়ে দেখছে

    ফতিমার শরীর শিরশির করে আনন্দে কাঁপছিল। সে বলল, সোনাবাবু চলেন। গোপাল ডাক্তার গ্যাছে গিয়া। দূরে মাঠের আলে গোপাল ডাক্তারের ঘণ্টি বাজছে। আর প্রান্তরে যখন শস্য নেই, যখন মাঠ ফাঁকা, শুধু মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঝোপ-জঙ্গল দাঁড়িয়ে আছে তখন ছুটে যাওয়া ভালো। ওরা ছোটার সময়ই দেখল, ট্যাবার পুকুরের নিচে যে মাঠ আছে সেখানে পাগল জ্যাঠামশাই। তিনি হনহন করে বিলের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। সোনা আর মুহূর্ত দেরি করল না। সে যেন জ্যাঠামশাইকে মাঠের ওপর আবিষ্কার করে ফেলেছে তেমন গলায় ডাকল, কিন্তু মানুষটা হনহন করে হেঁটে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। ঢাক ঢোল বাজছে তো বাজছেই। বাস্তুপুজোর মোষ বলির রক্ত খাঁড়াতে লাগছে তো লাগছেই। আর সোনা, ফতিমা মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে তো ছুটছেই। ওরা ছুটছিল আর ডাকছিল। ওরা ঢিবির ওপর উঠে ডাকল, জ্যাঠামশয়! কে কার কথা শোনে! জ্যাঠামশাই পুকুরটার পাড়ে পাড়ে যে বন আছে তার ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

    সংসারে কত কিছু ঘটে, কত কিছু ঘটে না। ফসল ফলে না সব সময় মাঠে। এখন কোথাও রুক্ষ মাঠ, কোথাও জমিতে তামাকের পাতা দেখা যাচ্ছে। পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বাঁধাকপি উঁচু জমিতে পুকুর থেকে জল তুলে পেঁয়াজ আলু-বাঁধাকপির চাষ করছে বড় গেরস্থ প্রতাপ চন্দ। আলে আলে দুই বালক-বালিকা ছুটছে। ঢিবি থেকে নেমে মাঝিদের বড় জমি পার হয়ে ছুটছে। অকালের ফল বকুল ফল বনের ভিতর। ওরা বকুল ফলের অন্বেষণে ছুটে যাচ্ছে। ফতিমা ফল কুড়াবে, সঙ্গে সোনাবাবু আছে, ভরদুপুরের রোদ রয়েছে, আর শীতে সূর্য মাথার ওপর বলে ওদের এতটুকু শীত করছে না। খালি গায়ে খালি পায়ে ছুটছে। যেন দুটো খরগোশ তাড়া খেয়ে বনের দিকে পালাচ্ছে।

    সহসা মনে হল সোনার, ওরা বড় বেশি দূরে চলে এসেছে। এতবড় বন সামনে! সোনা ভয়ে এতটুকু হয়ে গেল! ওরা আর বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    জায়গাট বড় নির্জন, পুকুরটা প্রাচীন। মজা দিঘির মতো দাম এবং কচুরিপানায় ঠাসা। পাড়ে পাড়ে কত বিচিত্র গাছগাছালি গভীর বনের সৃষ্টি করেছে। ছোট বড় লতার ঝোপ-পায়ে হাঁটা সামান্য পথ। পথে শুকনো ঘাসপাতা। মাটিতে মরা ডাল, পাখির পালক। বোধ হয় মাথার ওপরে প্রাচীন এক অর্জুনের ডালে পাখিদের রাতের আস্তানা। তার নিচে কত যুগ ধরে, মাছের এবং মানুষের হাড়, গরু-বাছুরের হাড়। পাশেই এক জরদ্‌গবের মতো কড়ুই গাছ। গাছটার ভিতর কত বিচিত্র খোঁদল, ডালপালা নিয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে সব মৃত গাছের ডাল, ডালে ডালে হাজার হবে শকুন সার সার বসে রয়েছে। ওরা গাছটার নিচে যেতে সাহস পেল না। কিন্তু এইটুকু পথ পার হতে না পারলে ওরা অকালের ফল বকুল ফল খুঁজে পাবে না। বকুল গাছটা বড় নয়, ছোট। ঝোপজঙ্গলে গাছটাকে খুঁজে বের করা কঠিন। গাছটার খোঁজখবর ফতিমাকে জোটন দিয়ে গেছে। আবেদালির দিদি জোটন আবেদালির জন্য একটা মুরগি এনেছিল, মুরগিটা উড়াল দিয়ে চলে গেল হাজিসাহেবের আতাবেড়াতে। আতাবেড়ার পাশে ছোটবিবির সঙ্গে দেখা, জোটনকে ছোটবিবি বলল, মুরগিটা মাঠের দিকে নেমে গেছে। মাঠে নামলেই মনে হল জোটনের, দূরে কি একটা কেবল ছুটছে। বুঝি কুকুর হবে। বেড়াল হতে পারে। মাঠের ওপর দিয়ে অকারণে ছুটে পালাচ্ছে। মাঠে নামতেই হাজিসাহেবের ছোট বেটার সঙ্গে জোটনের দেখা।—ঐ যায়, যায়। দেখা যায়। সব শলাপরামর্শ যেন ঠিক ছিল। ছোট বেটা জোটনকে অকারণ সেই মাঠের দিকে হাত তুলে মুরগির খোঁজে যেতে বলে দিল।

    জোটন মুরগিটা চুরি করে এনেছিল আবেদালিকে খাওয়াবে বলে। জোটনের ধারণা এখন সেই মুরগি ফাঁক বুঝে তার গ্রামের দিকে পালাচ্ছে। পোষা মুরগি, বড় সোহাগের মুরগি মৌলবীসাহেবের। আদরের মুরগি মাঠের উপর দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। সে কি ভেবে তাড়াতাড়ি মুরগি ধরার জন্য ছুটতে থাকল। যদি এ মুরগি চলে যায় যদি টের পায় মৌলবীসাব, মুরগি যাবার পথে জোটন চুরি করে নিয়ে গেছে তবে আর রক্ষে থাকবে না। সেই মুরগি যখন দূর থেকে অস্পষ্ট, মনে হচ্ছে কি একটা ট্যাবার পুকুর পাড়ে বনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, তখন জোটনও না ছুটে পারল না। এত সখ করে, এত কুরশিস করে মুরগিটা ধরে এনেছিল আবেদালিকে খাওয়াবে বলে, এখন হায় সেই মুরগির চৈতন্য উদয়। কি হবে! কি হবে! সুতরাং ছোটা ভালো। মুরগি ধরার জন্য জোটন কাপড় হাঁটুর ওপর তুলে ছুটতে থাকল। ছুটতে ছুটতে ট্যাবার পুকুরের পাড়ে, ভিতরের জঙ্গলে। কিন্তু শেষে আর পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। মুরগিটা যদি গাছের ডালে চুপচাপ বসে থাকে, উঁকি দিয়ে দেখতে থাকল।

    তখন মুরগির গলা টিপে ধরেছে ছোটবিবি। হাজিসাহেবের ছোটবিবি মুরগি হালাল করে হাতের ভিতর শক্ত করে ধরে রেখেছে। ছেড়ে দিলেই ক্যা-ক্যা করে ডেকে উঠবে। তখন বনে বনে জোটন খুঁজছিল, হায়, মুরগি, তুই কোথায় গেলি! ঝোপে-জঙ্গলে জোটন মুরগি খুঁজতে এসে কপাল থাবড়াতে থাকল। তখন মনে হল ঝুঁটিতে লাল রঙ মুরগির, ঝোপের ভিতর লাল রঙের কি যেন দেখা যায়। সে লোভে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বনের ভিতর ঢুকে পড়ল। কিন্তু হায় ঢুকে দেখল, গাছের ডালে লাল বকুল ফল। অকালে বকুল ধরেছে গাছটাতে। পাকা ফল দু’চারটে নিচে পড়ে আছে। একটা বিড়াল কি নেড়ি কুকুর এই বাগের ভিতর ঢুকে গেল। আবছা অস্পষ্ট শীতের রোদে দূর থেকে বিড়াল কুকুর না অন্য কোনও জীব ধরা যাচ্ছিল না। জোটন ভেবেছিল, ওর মুরগি পালাচ্ছে। নাকের বদলে নরুন পাবার মতো জোটন মুরগির বদলে বকুল ফল তুলে নিল। সেই ফল এনে সে ফতিমার হাতে দিয়েছে, আর বলেছে সেই আশ্চর্য বকুল ফলের গাছটা বনের ভিতর লুকিয়ে আছে।

    গাছটার অনুসন্ধানে এসে সোনার ভয় ধরে গেল। সে বলল, আমার ডর করতাছে ফতিমা।

    —ডর কিসের। আইয়েন আপনে। বলে ফতিমা সোনার হাত ধরে কড়ুই গাছটার দিকে তাকাল। বড় বড় শকুন, ওরা নিবিষ্ট মনে বসে আছে। কড়ুই গাছটার দিকে তাকালেই সোনার ভয়টা বাড়ছে। ওরা শকুনের রাজা গৃধিনীকে দেখতে পেল, মগডালে বসে রাজার মতো তাবৎ পৃথিবীর কোথায় কোন মৃত জীব পড়ে আছে বাতাস শুঁকে টের পাবার চেষ্টা করছে। অন্য শকুনগুলি ঠোঁট গুঁজে বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো ঘাড় নিচু করে ওদের একবার দেখে নিল—ছোট ছোট কাঠের পুতুলের মতো মনুষ্যকূলের দুই জীব নিচে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু শকুনের রাজা সবসময় জেগে। সে ক্ষুধার জন্য শিকারের খবর দেবে। সে-ই একমাত্র উঁচু মুখে আকাশের অন্য প্রান্তে কী উড়ে যাচ্ছে, কারা উড়ে যাচ্ছে, কত হবে…আর যদি মৃত জীবের গন্ধ ভেসে আসে, সে প্রথম দু’পাখা বাতাসে ছড়িয়ে দেবে, তারপর উড়তে থাকবে আকাশে—প্রায় তখন মনে হয় নির্বাণ লাভের মতো এইসব বড় বড় পাখি কোন এক অদৃশ্য জগতের সন্ধানে উড়ে যাচ্ছে।

    কিন্তু রাজা শকুনটা ওড়ার বদলে কেবল উঁকি দিয়ে ওদের দেখছে। ফতিমা, যে ফতিমা, একা গোপাটে ছাগল নিয়ে আসে, যে মাথায় করে সানকিতে নাস্তা নিয়ে যায় জমিতে, যার ভয়ডর একেবারে কম—পাটখেত বড় হলে অথবা নির্জন মাঠের ভিতরে যখন বড় বড় পাটগাছগুলি ফতিমার মাথা পার হয়ে উঁচুতে উঠে যায়, যখন সামনের আলপথ সিঁথির মতো, দু’ধারে পাটগাছ ঘন বনের সৃষ্টি করে রাখে, তেমন পথে কতবার ফতিমা একা একা চলে এসেছে ছাগলটার দড়ি ধরে—সেই ফতিমা পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেল। রাজা শকুনটা নিচের দিকে উঁকি দিলে সে লাফ দিয়ে ছুটতে চাইল সোনাবাবুর হাত ধরে।

    যেন এই গাছটা গল্পের সেই সদর দেউড়ি—গাছটা রাক্ষস খোক্কসের মতো সদর দেউড়িতে পাহারা দিচ্ছে। সদর দেউড়ি পার হতে পারলেই ফুল-ফল রাজকন্যা মিলে যাবে। ফতিমা সাহসে ভর করে ফুল-ফলের জন্য এবং সেই অত্যাশ্চর্য জগতের জন্য সোনাবাবুকে ঠেলে ঠুলে পাখির পালক, মাছের হাড়, মানুষের হাড়, পাখিদের মলমূত্র অতিক্রম করে বনের ভিতর ঢুকে গেল। ভিতরে বিচিত্র বর্ণের ছোট ছোট পাখি উড়ে বেড়াচ্ছিল। পাখিরা ডাকছিল। প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা গিরগিটি ক্লপ ক্লপ শব্দ করে ডাল থেকে পাতায় উঠে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকল। জায়গাটা বড় নির্জন, নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে সোনার। কোথাও কোনও মানুষের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দূরে কে যেন কেবল কাঠ কেটে চলেছে—তার শব্দ ভেসে আসছিল। কান পাতলে ঢাক-ঢোলের শব্দ শোনা যায়। ওরা এমন একটা জায়গায় চলে এসে এই প্রথম পরস্পর অসহায় চোখ তুলে তাকাল।

    ফতিমা বলল, সোনাবাবু, আপনেরে ছুইয়া দিছি। বাড়ি গেলে সান করতে হইব।

    সোনা মা’র ভয়ে বলল, তুই ছুইলি ক্যান।

    —আমি ছুইলাম, না আপনে ছুইলেন। বাঁশিতে নাকচাবিটা আপনে দ্যাখলেন না!

    —মায় শুনলে আমারে মারব। সোনার চোখের ওপর সেই দৃশ্যটা এতক্ষণে ভেসে উঠল। সেই বর্ষার মতো। সেই ফতিমার আঁচলে প্রজাপতি বেঁধে দিয়েছিল বলে মা ওকে খুব মেরেছিল। ফতিমার কথায় সোনার যথার্থই ভয় ধরে গেল। বলল, তুই কইস না। আমি তরে ছুইয়া দিছি মায়েরে কইস না।

    —আমি কইতে যামু ক্যান!

    —কইলে ঠিক মায় আমারে মারব।

    —কোনদিন কমু না।

    —তিন সত্য!

    —তিন সত্য।

    সোনা যেন এবার একটু নিশ্চিন্ত হল। ফতিমা না বললে, এ-কথা কেউ আর জানতে পারবে না।

    চারিদিকে বড় বড় গাছ। অপরিচিত গাছ। ঝোপ-জঙ্গল লতায়-পাতায় প্রায় কোথাও কোথাও নিবিড় অরণ্য সৃষ্টি করে ফেলেছে। ওরা সেই অরণ্যের ভিতর বকুল গাছটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যেন ওরা বলতে চাইছে, বৃক্ষ, তুমি এতদিন কার ছিলে?

    বৃক্ষ উত্তর দিল, রাক্ষসের

    —এখন কার?

    —এখন তোমাদের।

    —তবে তুমি আমাদের ফল দাও। বকুল ফল।

    ওরা পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এগুতে পারছে না। চারপাশটায় যেন জঙ্গলের শেষ নেই। কতদূর হেঁটে যাওয়া যেন এই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে! শুকনো ঘাসপাতা পায়ের নিচে। কত দীর্ঘদিনের মানুষ-বিবর্জিত জায়গা। ওরা হামাগুড়ি দিয়ে অথবা সন্তর্পণে-কাঁটাগাছ পার হবার জন্য ছোট ছোট লাফ দিচ্ছিল। আর মনে মনে সেই গল্পের মতো বলা, বৃক্ষ তুমি কার ছিলে?

    —রাজার ছিলাম।

    —এখন কার?

    —এখন তোমার?

    —তবে ফল দাও। বকুল ফল!

    বৃক্ষ কখনও রাজার, কখনও রাক্ষসের। বৃক্ষ, অঃ বৃক্ষ! ওরা বৃক্ষ বৃক্ষ বলে চেঁচাতে থাকল। কোথায় গেলে তুমি বৃক্ষ! ওরা বনের ভিতর হেঁকে ডেকে বেড়াতে থাকল। ওরা কেবল গাছটার অন্বেষণে আছে। মগডালে বসে শকুনেরা চিৎকার করছিল, বনের বিচিত্র সব শব্দ উঠছে। ঘস ঘস—ডালে ডালে পাখিদের কলরব ছিল আর ছিল দুই বালক-বালিকা। ওরা ভয়ে ভয়ে বকুল গাছটার উদ্দেশে হাঁটছে।

    আর ঠিক তখন মনে হল বনের ভিতর কে বা কারা হুঁম হুঁম শব্দ করে ক্রমশ ওদের দিকে এগিয়ে আসছে, ঠাকুরমার কাছে শোনা গল্পের সেই ভূত-প্রেত অথবা ডাকিনী-যোগিনীর মতো। ফতিমা ফিফিস্ করে বলল, সোনাবাবু ঐ শোনেন।

    সোনা একটা মরা গাছের গুঁড়িতে বসেছিল। ও আর হাঁটতে পারছিল না। পায়ে লাগছিল। পায়ে কাঁটা ফুটেছে। ওর মনে হল এখন এইসব ফেলে খোলা মাঠের ভিতর নেমে যেতে পারলে বড়দা মেজদা ট্যারা হয়ে যাবে। আমারে একটা দে, সোনা বড় ভাল পোলা, দে দে, একটা দে, বলে বড়দা মেজদা ওর চারপাশে ঘুর ঘুর করবে। ফতিমাও বড় শখ করে এই বনের ভিতর পালিয়ে এসেছে ফল নেবে বলে, কিন্তু বনের ভিতর সেই হুম্ হুম্ শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

    বনের ভিতর ওরা চুপচাপ বসেছিল। ওদের ভিতর আতঙ্ক–এবারে কিছু একটা হয়ে যাবে। ওরা পালাতে গিয়ে ঘন গাছপালার ভিতর ক্রমে আরও হারিয়ে যাচ্ছিল। বনটা যে ভিতরে ভিতরে এত বড় ওদের জানা ফ্লি না। বনের ভিতর ঢুকে গেলেই গাছটা সদর দেউড়ির সেপাইর মতো সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে, এবং ওদের অঞ্জলিতে বকুল ফল ভরে দেবে এমন একটা ধারণা ছিল, কিন্তু হায়! এখন ওরা এত ভিতরে ঢুকে গেছে যে, কোনদিকে গেলে মাঠ এবং পরিচিত পথ মিলে যাবে বুঝতে পারছে না। ফতিমার মুখ-চোখ শুকনো দেখাচ্ছে। বনময় সেই শব্দ কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে এইসব জঙ্গলের ভিতর কে বা কারা সহসা সহসা অট্টহাস্য করছিল। ঠাকুরমার গল্পের মতো যেন কে বা কারা বলছে হাঁউ-মাঁউ-কাউ, মানুষের গন্ধ পাঁউ। ওরা ভয়ে, মৃত্যুভয়ে চোখ বন্ধ করে সামনের ঘাস, শুকনো পাতা, জঙ্গল যা কিছু সামনে পড়ছে সব মাড়িয়ে ছুটছে। অথচ সামনের খোলা মাঠ এখনও দেখা যাচ্ছে না। ওরা শুকনো ডাল, পাখির পালক, গাছ এবং মানুষের হাড় অতিক্রম করে কেবল ছুটতে থাকল। কিন্তু সামনে আর পথ নেই, ফের পিছনের দিকে ছোটা। অথচ সেই এক অট্টহাসি পিছনে ছুটে আসছে তো আসছেই। ডালপালা ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে ওদের ধরার জন্য ছুটে আসছে। সূর্যের অমিত তেজের মতো বনের ভিতর সেই এক অট্টহাসি গাছপালা ভেঙে দুম-দাম শব্দ করে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে।

    তখন মাঠের ভিতর হুম্-হুম্-হুম্ শব্দ। রাজ-রাজেশ্বর কি জয়! জয়-যজ্ঞেশ্বর কি জয়—কারা যেন মাঠ ভেঙে এমন বলতে বলতে চলে যাচ্ছে। সোনা ভয়ে গাছপাতার ভিতর লুকিয়ে পড়ল। ফতিমাও জঙ্গলের ভিতর মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল। আর মুখ তুলতেই দেখল, ঝোপের ভিতর থেকে খোলা মাঠ দেখা যাচ্ছে। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটা দল খোলা মাঠের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। ষোলজন লোক বাঁশের ভিতর কাটা মোষটা ঝুলিয়ে নিয়েছে। চার-পা বাঁধা কাটা মোষটা মরা গরু-বাছুরের মতো ঝুলছে। ঠিক পেটের মাঝখানে বসানো কাটা মোষের মাথাটা। দড়ি দিয়ে মাথাটাকে পেটের ওপর বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথাটা চোখ খুলে রেখেছে, কান ঝুলিয়ে রেখেছে। এবং শস্যবিহীন মাঠ দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। লোকগুলি জয় যজ্ঞেশ্বর কি জয়, রাজ-রাজেশ্বর কি জয় বলতে বলতে নেমে যাচ্ছে। ওরা ঝোপের ভিতর প্রায় যেন শ্বাস বন্ধ করে পড়ে আছে। ভয়ঙ্কর দৃশ্য এখন শুধু চোখের উপর ভাসছে। গলা এত শুকনো যে, ওরা ডাকতে পর্যন্ত পারল না। বলতে পারল না, আমরা ঝোপের ভিতর আটকা পড়েছি। কোনদিকে রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে আমরা মরে যাব

    লোকগুলি কাটা মোষ নিয়ে চলে যাচ্ছে। পিছনে যারা আসছে, তাদের মাথায় চাল, ডাল। একটা মোষের মাংস খাবার মতো মানুষের জন্য চাল-ডাল-তেল। ওরা শীতলক্ষ্যার পাড় থেকে এসেছে। পূজার প্রসাদ মোষের মাংস ফেলতে নেই তাই এইসব মানুষ এসেছে শীতলক্ষ্যার পাড় থেকে এই কাটা মোষ নিয়ে যেতে। ওরা মোষটা নিয়ে যেন পাল্কি কাঁধে বেহারা যায়—হুঁ-হোম-না, যেন বরের সঙ্গে বধূ যায়—হুঁ-হোম-না, যেন মোষের পেটে কাটা মাথা যায়—হুঁ-হোম-না! বড় কুৎসিত এই দৃশ্য। মুণ্ডবিহীন মোষ পেটে মাথা নিয়ে দুলতে দুলতে যাচ্ছে। বনের ভিতর তখন ডালপালা ভেঙে বেড়াচ্ছে কে? অট্টহাস্য, অট্টহাস্য! মগডালে শকুনের আর্তনাদ, ঝিঁঝিপোকার ডাক এবং সেই দ্রুত ডালপালা ভাঙার শব্দ—ওরা ভয়ে এবার চোখ বুজে ফেলল, কারণ বনের ভিতর পথ করে সেই অট্টহাস্য ওদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ওদের দুজনকে শক্ত দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরেছে। মাটি থেকে টেনে উপরে তুলে নিচ্ছে। যেন দুই পুতুল। সোনা রুপোর পুতুল। দৈত্যটা দুই কাঁধে দুই সোনা রুপোর পুতুল ফেলে বনের বাইরে বের হয়ে এল। তখন দুই পুতুল প্রাণ পেয়ে ঝলমল করে উঠেছে। দৈত্যটা বুঝি এত আনন্দ আর দু’হাতে সামলাতে পারছিল না। চিৎকার করে উঠল, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    তখনও মাঠে ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। বাস্তুপূজা শেষ হলেই পুরীপুজোর মেলা। মেলায় দোকানপত্র যাচ্ছে গোপাট ধরে। বাঁশ কাঁধে মানুষ যাচ্ছে। ত্রিপল মাথায় মানুষ যাচ্ছে। সোনালী বালির নদীর জলে এখন কত সওদাগর নৌকা ভাসাল। বাদাম তুলে খাঁড়ি ধরে ব্রহ্মপুত্রে পড়বে। তারপর ফের বাঁক নিলে সেই প্রকাণ্ড বিল—পাঁচ ক্রোশের মতো বিল রয়েছে। খালের জল বিলে পড়েছে। বিল পার হলেই মেলার প্রাঙ্গণ! বড় কাঠের পুল পার হলে যজ্ঞেশ্বরের মন্দির। মন্দিরের পাশে সারকাসের তাঁবু পড়েছে।

    সেই বিলের কথা মনে পড়ছিল পাগল ঠাকুরের। তিনি সোনা এবং ফতিমাকে মাঠে এনে ছেড়ে দিলেন। সোনার সব ভয় উবে গেছে। ফতিমা পর্যন্ত এখন হি-হি করে হাসছে। ওরা বাড়ি ফেরার জন্য দৌড়াতে লাগল। বেলা পড়ে আসছে, শীতের বেলা। সামসুদ্দিন ঢাকা গেছে। আজ ঢাকা থেকে ফেরার কথা। ফতিমা দ্রুত ছুটতে থাকল। ঢাকা থেকে বা’জান কাঁচের চুড়ি কিনে আনবে। ফিরে ফতিমাকে বাড়ি না দেখলে খুব রাগ করবে বাজান। কানের দুল আনবে। মা’র জন্য ডুরে শাড়ি আনবে। বা’জান সময়-অসময় নেই সেই শহরে চলে যায়। দু’চার দিন পর ফের ফিরে আসে! সেই ঢাকা শহরে বড় হলে ফতিমা যাবে! যেতে যেতে তেমন গল্পও করল ফতিমা

    সোনা বলল, আমি-অ যামু। বাবায় কইছে বড় হইলে আমারে লইয়া যাইব।

    —বা’জী কইছে আমারে সদর ঘাটের কামান দেখাইব।

    —বাবায় কইছে আমারেও সদর ঘাটের কামান দেখাইব। রমনার মাঠ দেখাইব। বুড়িগঙ্গার জলে সান করাইব।

    —বা’জী কইছে লিখা-পড়া শিখলে মোটরে চড়াইব!

    —বাবায় কইছে ফাস্ট হইলে রেলগাড়ি কইরা ঢাকায় নিয়া যাইব।

    —রেলগাড়ি ছোট। ছোট গাড়িতে সোনাবাবু যাইব!

    —মোটরগাড়ি রেলগাড়ির ছোট।

    —হ কইছে? ফতিমা সোনার মুখের সামনে গিয়ে মুখ বাঁকাল।

    —কিছু জানস না ছেরি, দিমু এক থাপ্পর।

    —দ্যান ত দ্যাখি। থাপ্পর দিবেন! আপনের মায়রে কইয়া মাইর খাওয়ামু না তবে! কমু, সোনাবাবু।

    আমারে ছুইয়া দিছে।

    —আমি যে তরে ছুইয়া দিছি, তুই কইয়া দিবি!

    —তবে মোটরগাড়ি ছোট এডা কন ক্যান!

    —আর কমু না।

    ফতিমা আর দেরি করল না। এই বাবুটির উপর বিজয়নী হয়ে উল্লাসে ছুটছে। মাথার চুল উড়ছে। কোমর থেকে ডুরে শাড়ি খুলে পড়ছে। ছুটতে ছুটতে কোনওরকমে প্যাঁচ দিচ্ছে কোমরে। কোনওরকমে কাপড় সামলে মল বাজিয়ে ছুটছিল। পায়ে মল, রুপোর মলের ভিতর ছোট লোহার দানা। ফতিমা ছুটছিল আর পায়ের মল বাজছিল ঝম ঝম। ছুটতে ছুটতে দু’বার ফিরে তাকাল পিছনে। এতটুকু নড়ছে না, সেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্ষোভে দুঃখে ভেঙে পড়ছে সোনাবাবু। ফতিমা বিজয়িনীর মতো ঘুরে ফিরে লাফ দিল, হাঁটল, দু’পা এগিয়ে ফের লাফ দিল। ফের ঘুরে ফিরে চরকিবাজির মতো মাঠের ওপর ঘুরছে। যেন এক চঞ্চল খরগোশ কচি ঘাস থেকে এক কামড় খাচ্ছে, দু’কামড় নষ্ট করছে। ফতিমা মাঠের উপর দিয়ে চঞ্চল খরগোশের মতো ছুটছিল। কিন্তু মনে মনে সোনা, যে সোনার শরীরে সব সময় চন্দনের গন্ধ লেগে থাকে, যে সোনাবাবুর মুখ ঘাসের মতো নরম, কচি কলাপাতার মতো যে লাজুক, তেমন মানুষকে মাঠে একা ফেলে যেতে কেমন কষ্ট হচ্ছিল ফতিমার। ফতিমা এবার দাঁড়াল। পিছন ফিরে ডাকল, আইয়েন, আমি খাড়াইছি।

    সোনা রাগে এবং ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল, না, আমি যামু না।

    ফতিমাও গলা ছেড়ে বলল, আপনে না আইলে, আমি-ও যামু না।

    দু’জন দু’জমির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকল। সোনা কিছুতেই নড়ছে না।

    ফতিমা ছুটে সোনার নাগালে চলে গেল। চলেন।

    —না, আমি যামু না।

    —চলেন। না হয় আপনের রেলগাড়িটাই বড়। তারপর ফতিমা আরও কি যেন বলতে চেয়েছিল। বলতে পারল না। অথবা মনের ভিতর হয়তো এমন কথা উঁকি মারতে পারে—মেলায় গেলে আমরা রেলগাড়িতে যাব। বড় গাড়ি না হলে আমরা দু’জনে যাব কি করে! অথচ ফতিমা কথাটা প্রকাশের ভাষা ঠিক খুঁজে পেল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল কিছু সময়। তারপর সোনার হাত ধরে বলল, আমারে একটা কারতিক পূজার ছিরাঘট দিবেন?

    —দিমু।

    —আইয়েন, ইবারে মাঠের ওপর দিয়া ছুটি। ওরা হাত ধরে শীতের রোদে কিছুক্ষণ ছুটে দেখল, পুকুরপাড়ে মালতী। ওরা তাড়াতাড়ি হাত ছেড়ে দিল। হাত ছেড়ে দিয়ে দু’জন দু’দিকে ছুটতে থাকল।

    সেই যে ঢাক বাজছিল, ঢোল বাজছিল আর থামছে না। পঞ্চাশটা ঢাকি অনবরত ঘাড় কাৎ করে বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই। সরকারদের বাস্তুপূজা অঞ্চলে বিখ্যাত। লোকজনের সীমা সংখ্যা নেই। আত্মীয় কুটুম্ব, গ্রামের নিবাসিগণ, কিছু গরিব প্রজা আর সব মাতব্বর ব্যক্তি লাঠি হাতে ঘোরাফেরা করছিল। পুকুরপাড়ে হাজার মানুষ হবে, দূর দূর গ্রাম থেকে ওরা এসেছে। ধোপা নাপিত নমঃশূদ্র। ওরা পাত পেতে খিচুড়ি খাচ্ছে। আর মাঠের উপর দিয়ে মোষ যাচ্ছে, সেই যেন পাল্কি কাঁধে বেহারা যায়। ওরা মুসলমান গ্রামগুলির পাশ দিয়ে যাবার সময় শিব ঠাকুর কি জয়, রাজ রাজেশ্বর, যজ্ঞেশ্বর কি জয়, এইসব বলছিল। পেটে মাথা নিয়ে মোষ চলেছে। মাঠের ওপর, ঘাসের ওপর বিন্দু বিন্দু রক্ত পড়ছে—ধর্ম আমাদের সনাতন, এত কচি মোষ তল্লাটে বলি হয়না। এত বড় খাঁড়া তল্লাটে আর কার আছে। আর এই ধর্মের মতো পূতঃপবিত্র কী আছে—জয় রাজ রাজেশ্বর, যজ্ঞেশ্বর কি জয়। বিলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মানুষগুলি কাটা মোষ বাঁশে ঝুলিয়ে জয়ধ্বনি করছিল। বিলের গরিব দুঃখী মানুষগুলি যারা শালুক তুলতে এসে জলের ভেতর সাদা হয়ে যাচ্ছে—হাত পা ঠাণ্ডা—এবং শীতে শিথিল হয়ে যাচ্ছে, যারা মাঝে মাঝে পাড়ে বসে রোদ পোহাচ্ছিল, তারা পাড়ের উপর দেখল বিন্দু বিন্দু এক ঝাঁক পাখির মতো মানুষগুলি কাঁধে মোষ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার কাটা মোষের পেটে মাথাটা হড়কে নিচে পড়ে গেল। এত খাড়া ছিল বিলের পাড় যে পড়বি তো পড় একেবারে সেই গরিব দুঃখীদের পায়ের কাছে। সহসা এমন কাণ্ড! ধড়বিহীন মুণ্ড ওদের পায়ের কাছে পড়ে আছে।

    মোষের কাটা মুণ্ড দেখে ওরা তোবা তোবা বলে উঠল। এক কোপে কাটা মুণ্ড ওরা দেখে কেমন গুনাহ করে ফেলল। এত বড় বিলে ওরা দুঃখী মানুষ সব শালুক তুলতে এসে এমন কুৎসিত দৃশ্য দেখে ফেলে চোখে কানে কেমন আঙুল দিল অথবা বুঝি ভয়, এই যে বিল দেখছ, বড় বিল, বিলে কত না কিংবদন্তী, কত না সাপখোপ, অজগর আর কত না জলজ ‘ঘাস জলের ভিতর। লতাপাতা কীট-পতঙ্গ বড় বড় জোঁক নাকে কানে ঢুকে গেলে কে কাকে রক্ষা করে। সুতরাং ওরা মুণ্ডটার দিকে আর তাকাল না। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, এবারে ঘরে ফিরতে হয়।

    শীতকাল বলে উত্তরের হাওয়া ক্রমশ প্রবল হচ্ছে। আকাশ বড় পরিচ্ছন্ন। মনে হয় এবার পৃথিবী উজাড় করে সব ঠাণ্ডা এই মাটির উপর, এই বিলের উপর নেমে আসবে। এতক্ষণ বিলের জলে সহস্র পাতিল ভেসেছিল, এখন একটিমাত্র পাতিল জলে ভাসছে। জলে একা এক পাতিল ভাসলে বড় ভয়। সেই পাতিলের মানুষটা কোথায় গেল! দ্যাখো দ্যাখো পাতিলের মানুষটা কোথায় গেল!

    সূর্য তেমনি অস্ত যাচ্ছিল। শালুক ফুল ফোটে না আর। দূরে সব পদ্মপাতা, পদ্মপাতার পাশে ছোট এক পাতিল একা একা জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষটা কোথায় গেল! পাতিলের মানুষটা! জলের মানুষ সব পাড়ে উঠে এসেছে। যে যার শালুকের পাতিল মাথায় পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে—একটা পাতিল বিলের জলে উত্তরে হাওয়ায় ভেসে ভেসে গভীর জলে চলে যাচ্ছে।

    কে তখন হাঁকল, দ্যাখো, বিলের জলে পাতিল ভাইস্যা যায়।

    কে তখন ফের হাঁকল, দ্যাখো পানির তলে মানুষ ডুইবা যায়।

    কিন্তু এক ত্রিকালজ্ঞ বৃদ্ধা, মুখে জরার চিহ্ন, ক্লিষ্ট চেহারা, সে জোর গলায় হাঁকরাতে থাকল, বিল আবার একটা মানুষ কাইরা নিল। সেই বৃদ্ধা নিয়তির মতো দাঁড়িয়ে যেন বলতে চাইল, এটা হবেই। সালের পর সাল বিল ক্ষুধা নিয়ে জেগে থাকে। ফাঁক পেলেই গিলে খায়। কিন্তু মানুষটা কে? কে ডুবে গেল জলে!

  • পনের

    পনের

    জালালি লাল চোখ দুটোর সঙ্গে জলের ভিতর তামাশা করছিল। সেই চোখ দুটো এগোচ্ছে পিছোচ্ছে। জলের নিচে ডুব দিলে ঘন নীল অথবা সবুজ রঙ চারদিকে প্রেতের মতো ভেসে বেড়ায়। নিচে সূর্যের আলো যতটুকু পৌঁছায় ততটুকু আবছা দেখা যায়। কিন্তু গভীর জলের ভিতর জালালি আদৌ বুঝতে পারেনি, বড় রাক্ষুসে গজার মাছটা ওকে মরণ কামড় দেবার তালে আছে। ফাঁক পেলেই এসে খুবলে মাংস তুলে নেবে। কারণ মাছটা তার আস্তানায় জালালির উপদ্রব আদৌ সহ্য করতে পারছে না।

    জালালি জলের ভেতর ডুবে দেখল, মাটি খুব মসৃণ। কোনও মাছের আস্তানা হলেই–বড় মাছ হতে হয়, রুই কাতলা অথবা কালিবাউস, বড় প্রকাণ্ড হতে হবে, হলেই নিচে, গভীর জলের নিচে বৃত্তাকার সমতল আবাস। চারপাশের ঘন ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর মাছের এই নিঃসঙ্গ নিবাস। নিবাসের আশেপাশে যত জালালি শালুকের জন্য ঘুরঘুর করছিল তত মাছটা ক্ষেপে যাচ্ছিল। তত মাছটার লেজ কাঁপছে জলের নিচে। তত এগুচ্ছে পিছোচ্ছে। ভয় পাচ্ছে মানুষ দেখে, অথবা ভয় পাচ্ছে না, ঘোড়ার মতো কদমে পাখনা নাড়াচ্ছে। মাছটার শরীরে বড় বড় চক্র। অজগর সাপের গা যেন। বড় একটা কালো রঙের থাম যেন। শরীরে তার মানুষের চেয়ে কত অধিক শক্তি, সেই শক্তি নিয়ে দুর্বল জালালির বুক থেকে খুবলে মাংস তুলে নেবার জন্য জোরে এসে ধাক্কা মারল। জালালির মাথাটা নিচের দিকে ছিল তখন। জলের নিচে শালুক, মাটিতে শালুক—জালালি দু-ঠ্যাং ফাঁক করে প্রায় ব্যাঙের মতো ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছিল। ঠিক নিচে নেমে যাবার মুখে মাছটা এসে বুকে ধাক্কা মারল।

    জালালির এবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। জলের ভিতর মাছটা অতিকায় পশুর মতো দাপাচ্ছে। ফলে জলে ঘূর্ণি উঠছিল। জলের ভিতর মাছটা ঘাস লতাপাতাগুলি উল্টে পাল্টে ক্ষীণকায় জালালি ক সাপটে ধরল। শেষবারের মতো সে ঘাস-লতাপাতা ফুঁড়ে ওপরে ভেসে ওঠার দুবার চেষ্টা করতে গিয়ে একটা ঢেকুর তুলল। একটা বড় শ্বাস নিতে গিয়ে জল গিলে ফেলল অনেকটা। ফের উঠতে গিয়ে যখন আর পারছিল না, তখন জলের ভিতরই শ্বাস নেবার চেষ্টা করতে গিয়ে মনে হল রাজ্যর সব জল পেটে ঢুকে যাচ্ছে। যত অন্ধকারের ভিতর শালুকের লতা এবং সেইসব পদ্মপাতার শক্ত লতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছিল এবং প্রাণের যাতনায় ছটফট করছে তত লাল চোখ দুটো বড় হতে হতে এক সময় আগুনের গোলা হয়ে গেল, তারপর ফস করে নিভে যাওয়ার মতো, জলের সঙ্গে জল মিশে গেলে যেমন হয় ঠিক তেমনি আগুনের গোলা দুটো জলের সঙ্গে মিশে একটা কুসুমের মতো রঙ নিয়ে খানিকক্ষণ জেগে থাকল। তারপর জালালির প্রাণটুকু ফুটকরি তুলে জলের উপর ভেসে উঠলে কুসুমের রঙটাও আর থাকল না। ঘোলা জলটা ক্রমে থিতিয়ে আসতে থাকল। জলজ জঙ্গল, লতাপাতা ঝোপ-ঘাস সব জলের নিচে চুপ হয়ে আছে। আর নড়ছে না। লতাপাতার ভিতর একটা মানুষ আটকা পড়ল। আজব জীব মনে হচ্ছে এখন জালালিকে। ঘাড় গলায় লতাপাতা পেঁচিয়ে আছে। পায়ের নিচে এবং বুকের চারপাশে অজস্র কদম ফুলের মতো জলজ ঘাস লেপ্টে আছে। জালালি উপুড় হয়ে আছে। পা দুটো উপরের দিকে মাথাটা নিচের দিকে হেলানো। একটা ছোট মাছ রূপালী ঝিলিক তুলে জালালির নাকে মুখে এবং স্তনে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।

    গজার মাছটা নড়ছিল না। সে দূরে লেজ খাড়া করে একদৃষ্টে ঘটনাটা দেখছে। যখন দেখল আজব জীবটা লতাপাতায় আটকে গিয়ে আর নড়তে পারছে না তখন নিজের আস্তানার চারপাশে বিজয়ীর মতো পাক খেল। তারপর দ্রুত পাখনা ভাসিয়ে তীরের মতো দক্ষিণের দিকে ছুটতে থাকল। সকলকে যেন খবর দিতে হয়-দ্যাখো এসে আমার আস্তানায় একটা আজব জীবকে আমি ধরে ফেলেছি।

    মাছটা এত বড় আর কপালে মনে হয় সিঁদুর দেওয়া—মাছটা কত প্রাচীনকালের কে জানে! মাছটার গায়ে কত মানুষের আজন্মকাল থেকে কোঁচ অথবা একহলার শিকারচিহ্ন। মাছটার ডান ঠোঁটে দুটো বোয়ালের বঁড়শি নোলকের মতো দুলছে। মাছটার গায়ে কোচের ছোট ছোট কালি। খুঁজলে, একটা দুটো নয়, অনেক কটা যেন মাংসের ভিতর থেকে বের করা যাবে। সেই মাছটা এবার আনন্দে এবং উত্তেজনায় বিলের ভিতর জল ফুঁড়ে আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠল। তারপর সেই পাড়ের লোক, যারা পাতিল একা ভেসে যায় বলে হায় হায় করছিল, তারা দেখল বিলের জলে এমন একটা মাছ নয়, যেন হাজার লক্ষ মাছ সেই প্রাচীন বিলের জল ফুঁড়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে, নেমে আসছে। ভয়ে এবং বিস্ময়ে মানুষগুলি দেখল অনন্ত জলরাশির ভিতর বড় বড় রাক্ষুসে সব গজার মাছ কুমিরের মতো জলের উপর ভেসে উঠেছে। ওরা যেন সন্তর্পণে সকলকে সাবধান করে দিল—বাপুরা দ্যাখো, আমাদের তামাশা দ্যাখো। আমরা জলের জীব, তাবৎ সুখ আমাদের জলে।

    সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। বিলের জলে সূর্যের লাল রঙ। আকাশে লাল রঙ। মানুষগুলির মুখে আগুনের মতো উজ্জ্বল এক রঙ। গরিব দুঃখী মানুষেরা অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শীত। উত্তুরে হাওয়ায় সব শীত এসে এই বিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। জলে ডুবে ডুবে ওদের হাত পা সাদা হয়ে গেছে। ওরা একসঙ্গে সেই হাজার রাক্ষুসে গজার মাছের ডুব দেওয়া এবং কখনও কখনও জল ফুঁড়ে বাতাসের দিকে উঠে যাওয়া দেখছে। এমন হয়। সেই প্রাচীন বৃদ্ধা যার শরীরে প্রায় কোনও বাস ছিল না, যে আগুন জ্বালাবার জন্য ঘাসপাতা সংগ্রহ করছে এবং যে আগুন জ্বালাতে না পারলে, গামছার মতো জ্যালজ্যালে শাড়িটা শুকিয়ে নিতে না পারলে প্রচণ্ড শীতে এই বিলের পাড়েই মরে পড়ে থাকবে; সে ঘাসপাতায় আগুন জ্বেলে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলছে—কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না, শুধু চোখমুখ দেখলে ধরা যাচ্ছে—যেন বলার ইচ্ছা, হে তোমরা বাপুরা মনুষ্যজাতিগণ দ্যাখো, মাছের খেলা দ্যাখো। আনন্দের দিনে একসঙ্গে ওরা কেমন ঘোরাফেরা করছে দ্যাখো। তোমরা খবর রাখ না মনুষ্যগণ, নোয়া নামক এক নবি জলে নৌকা ভাসিয়েছিলেন। সেই মহাপ্লাবনের দিন স্মরণ কর। এমন সব কথাই বুঝি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে চাইছিল বৃদ্ধা কিন্তু এসব বলবার অর্থ কি! জালালি, যার স্বামী আবেদালি, যে গয়না নৌকার মাঝি, যার বিবি এখন জলের নিচে দুই ফেরাস্তার আলোর জন্য প্রতীক্ষা করছে, তার আর মহাপ্লাবনের খবর নিয়ে কী হবে! সুতরাং বৃদ্ধার দিকে কেউ আর তাকাল না। সকলে শীতের ভিতর শুধু আগুনটুকুর জন্য লোভী হয়ে উঠল। সকলে জালালি জলে ডুবে যাওয়ার ঘটনাটা পর্যন্ত ভুলে গেল সহসা। ওরা নিজেদের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিলের পাড় থেকে ঘাসপাতা এনে শুকনো সব ঘাসপাতা খড়কুটো এবং ঝোপজঙ্গল থেকে ডালপালা এই অগ্নিকুণ্ডে সকলে নিক্ষেপ করতে থাকল। বিলের ভিতর ক্রমে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। পাড়ে আগুন মাথার ওপর উঠে গিয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে দিতে চাইছে। কী লেলিহান জিহ্বা! সেই আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপ পেয়ে মনে হল সেই সহস্র মাছ বিলের দিকে চলে যাচ্ছে।

    পাড়ে দাঁড়িয়ে তখন বিশাল মানুষ পাগলঠাকুর। তিনি আগুন দেখে শীত নিবারণের জন্য ছুটে গেলেন না। তিনি হাত কচলে শুধু বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। কারণ বিলে মানুষ ডুবে গেল। দুই পদ্মকলির নিচে মানুষ ডুবে গেল। জলে ডুবে শালুক তুলতে গিয়ে মানুষটা আর উঠল না।

    শীতের জন্য পাড়ের মানুষেরা আগুনের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিলের সেই পাতিলটা নড়ছে না। বাতাস পড়ে গেছে। দূরে পদ্মপাতার ভিতর পাতিলটা ভাসতে ভাসতে আটকে গেল। বিলের জলে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল বলে ক্রমে জলটা রক্তবর্ণ, ফিকে রক্তিম আভা, ক্রমশ ফিকে হতে হতে একেবারে নীল হয়ে গেল। নীল থেকে সবুজ এবং পরে কালো জল। এখন এই অনন্ত জলরাশি মনে হচ্ছে স্থির। জলে কোনও ফুটকরি ভাসছে না। শীতের ভয়ে মাছগুলি পর্যন্ত নড়তে সাহস পাচ্ছে না। পাগলঠাকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ফের উচ্চারণ করলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    মোষের কাটা মুণ্ড তেমনি বিলে পড়ে থাকল! মানুষগুলি যারা কাটা মোষ নিয়ে শীতলক্ষ্যার পাড়ে যাবে তাদের কাছে বুঝি মাথাটা আদৌ লোভনীয় নয়। মাথাটা এখানে ওখানে ফেলে দিতেই হয়। মোষের সব মাংস খাওয়া যায় না। তবু নিতে হয়। প্রসাদ ফেলতে নেই। মাথা নিলে চালডালের পরিমাণটা বাড়ে। সুতরাং এই বিলের ভিতর কাটা মুণ্ড মোষের আগুনের উত্তাপে কান দুটো খাড়া করে দিল। আহা, সেই কখন শীতের ভোরে অবলা কচি মোষটাকে স্নান করানো হয়েছিল, তেল-সিঁদুর মাথায় দিয়ে কচি ঘাস খেতে দিয়েছিল। গলায় করবী ফুলের মালা। পায়ে রক্তজবার মালা ঠিক নূপুরের মতো। যেন ধর্মক্ষেত্রে কচি মোষের বাচ্চাটা এবার মরণ নাচন নাচবে।

    অবলা মোষের এই বাচ্চা শীতের সকালে স্নান করে হাড়িকাঠের পাশে শুয়েছিল। শীতে নড়তে পারছিল না। রাজার মতো তার আপ্যায়ন। ছোট কচিকাচা ছেলেরা নূতন জামা-কাপড় পরে, কী সুন্দর ফুটফুটে মেয়েরা নূতন ফ্রক পরে কচি ঘাস রেখে গেছে সামনে। সারা সকালটায় ওর কত সোহাগ ছিল। বুড়ো বামুনঠাকুরের মাথায় বড় টিকি, টিকিতে রক্তজবা বেঁধে সেই যে এক সের ঘি নিয়ে বসে গেল, আর কিছুতেই ওঠে না। ঘাড়ে গলায় ঘি মেখে মোষের, চবর চবর সে পান চিবুচ্ছিল। ঘাড়ে-গলায় ঘি মেখে মাংসের ভিতরটা নরম করে দিচ্ছিল। যেন খাঁড়া আটকে না যায়। কি প্রাণান্তকর চেষ্টা সফল বলির জন্য। কিন্তু হলে কী হয়, মোষের প্রাণবায়ু গলায় আটকে আছে। সব খেতে বিস্বাদ ঢাকঢোলের বাজনায়, ধূপধুনোর গন্ধে, চন্দনের গন্ধে, ফুল-বেলপাতার গন্ধে এবং ভয়ঙ্কর শীতে মোষটা বড় নির্জীব ছিল সারাদিন। এখন একটু আগুনের তাপ এসে গায়ে লাগতেই কাটা মুণ্ড কান খাড়া করে দিল। পাগলঠাকুর এইসব দেখে, না হেসে এবং না বলে পারলেন না—গ্যাৎচোরেৎশালা।

    তখন গ্রামে গ্রামে খবর রটে গেল—এ সালেও বিলের জলে মানুষ ডুবেছে। এমন কোনও সাল নেই, বছর যায় না, মানুষ ডুবে না মরে এই জলে। কিংবদন্তীর পাঁচালিকে রক্ষা করে আসছে যেন। সুতরাং সর্বত্র খবর—ফাওসার বিলে, যে বিল বিশাল, যে বিলের তল খুঁজে পাওয়া যায় না, মানুষ যে বিলে পড়লে পথ হারিয়ে ফেলে, তেমন বিলে এ সালে আবেদালির বিবি জালালি ডুবে মরল। টোডারবাগের আবেদালি গয়না নৌকা চালাতে সেই যে বর্ষার দিনে নেমে গেছে আর উঠে আসে নি। জব্বর বাবুর হাটে গেছে। সুতরাং মানুষজন পাঠাতে হয়, না হলে বিল থেকে লাশ তোলা যাবে না। কোথায় কোন জলে ডুবে আছে অথবা কিংবদন্তীর রাক্ষসটা জালালিকে নিয়ে কোথায় ডুব দিয়েছে কে জানে!

    বিলের মানুষগুলি আগুন নিভে গেলে যে যার গাঁয়ের দিকে রওনা হল। এখন জ্যোৎস্না নামবে বিলের উপর। সমস্ত বিলটা জ্যোৎস্নায় সারা রাত ডুবে থাকবে, পাতিলটা ভেসে যেতে যেতে এক সময় অদৃশ্য হয়ে যাবে। হাওয়া উঠলে সেই পাহাড়ের মতো কালো বস্তুটা বিলের ভিতর থেকে ফের ভেসে উঠতে পারে। কি বস্তু, কোন জীব, কোথায় এর নিবাস—দৈত্যদানো অথবা অন্য কিছু বোঝা ভার। কেউ কেউ জীবটাকে দেখেছে, এমন একটা প্রচলিত ধারণা আছে অঞ্চলের মানুষদের। বিলের পাড় ধরে হাঁটলেই কথাটা মনে হয়। এত বড় বিল এবং কালো জল দেখে অবিশ্বাস করা যায় না যেন। প্রাচীন বিল—কথিত আছে, নবাব ঈশা খাঁ এই বিলে সোনাই বিবিকে নিয়ে ময়ূরপঙ্খী নৌকায় কত রাতের পর রাত কলাগাছিয়ার দুর্গের দিকে মুখ করে বসে থাকতেন। চাঁদ রায়, কেদার রায় কলাগাছিয়ার দুর্গ তছনছ করে দিয়েছে। সোনাইকে উদ্ধারের জন্য জলে জলে সপ্তডিঙা যায়—সোনাইকে উদ্ধারের জন্য সাতশো মকরমুখী জাহাজ পাল তুলে দিয়েছে! জলে বৃদ্ধ ঈশা খাঁর মুখে লম্বা সাদা দাড়ি ফকির দরবেশের মতো মাথায় তাঁর সোনার ঝালর, কোমরে অসি আর পিছনে কালো রঙের বোরখার ভিতর প্রতিমার মতো সোনাই, সোনাই বিবি—স্থির অপলক দৃষ্টি সামনে। ওরা বিলের ভিতর আত্মগোপন করে ছিল। এই আত্মগোপনের ছবি কিংবদন্তীর পাঁচালির মতো বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। ফলে তামাক খেতে খেতে ফেলু ভাবল, জালালি এখন কিংবদন্তীর দেশে যেফৎ খেতে চলে গেছে। এবার ঈশা খাঁ, সোনাই বিবি, সেই পাহাড়ের মতো দানোটা এবং বিলের হাজার হাজার রাক্ষুসে গজার মাছ ফেরাস্তার অলৌকিক আলোতে জলের নিচে পথ দেখিয়ে নবাববাড়ির অন্দরে নিয়ে যাচ্ছে জালালিকে।

    কেবল পাগল ঠাকুরই এখন একা দাঁড়িয়ে। প্রথমে পাতিলটা যে জায়গায় ছিল আর যে জায়গায় জালালি ডুব দিয়েছিল, সেই জায়গাটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। ডান দিকে কাঁশবন পার হয়ে কিছুটা জলের ভিতর নেমে যেতে হয়। দুটো বড় পদ্মের কলি জল ফুঁড়ে ফুটে উঠেছে এবং ঠিক তার পাশেই জালালি শেষবারের মতো ডুব দিয়ে আর উঠতে পারেনি। পাতিলটা ভেসে ভেসে দূরে সরে গেল বলে আর দেখা গেল না। জ্যোৎস্নায় অদৃশ্য সব। ঠিক পায়ের নিচে শুধু সেই কাটা মুণ্ড। কাটা মুণ্ড পাগল ঠাকুরের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে চায় যেন। রক্তবীজের বংশ। যেখানে এক ফোঁটা রক্ত সেখানে সেই রক্তবীজ দৈত্য—হাজার হাজার, লাখে লাখে। রক্তবীজ অসুরের মতো এই মোষের মুণ্ডটা প্রাণ পেয়ে যাচ্ছে। পাগল ঠাকুর বিস্ময়ে দেখছিলেন, দেখতে দেখতে মনে হল মোষের মুণ্ডটা প্রশ্ন করছে, ঠাকুর তুমি কী দেখছ?

    পাগল ঠাকুর বললেন, আমি বিলের জ্যোৎস্না দেখছি।

    —ঠাকুর তুমি জ্যোৎস্না ছাড়া আর কি দেখতে পাচ্ছ?

    —তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।

    —আমি কে?

    —তুমি এক অবলা জীব মোষ।

    —মোষের বুঝি ঠাকুর প্রাণ থাকে না?

    —থাকে।

    —তবে তোমরা আমাকে অযথা হত্যা করলে কেন?

    —তোমাকে হত্যা করা হয়নি, দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।

    —দেবতা সে কে?

    —দেবতা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। আলো দিচ্ছেন, ফুল ফোটাচ্ছেন, সংসারের যাবতীয় পাপ মুছে পুণ্য ঘরে তুলে আনছেন।

    —আর কিছু করছে না?

    —আরও অনেক কিছু করছেন। জীবের পালন, সৃষ্টি, স্থিতি, লয় সব তাঁরই হাতে।

    —তবে আমি নিমিত্ত মাত্র! ভোগের নিমিত্ত!

    —নিমিত্ত মাত্র। ভোগের নিমিত্ত

    মোষটা এবার হেসে উঠল।

    পাগল ঠাকুর বললেন, তুমি হাসছ কেন?

    —ঠাকুর, তোমার কথা শুনে।

    পাগল ঠাকুরকে এবার খুব বিমর্ষ দেখাল। তিনি মোষটার দিকে তাকাতে পারছেন না। তাকালেই ফের হেসে উঠবে। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেন। দুই পদ্মকলির নিচে জালালি ডুবে আছে দেখতে থাকলেন। সামনে শুধু জলরাশি। হাওয়ার জন্য এখন জলে ঢেউ উঠছে। জলের শব্দ ভেসে আসছিল তীরে। দূর থেকে ঢাক-ঢোলের শব্দ তেমনি ভেসে আসছে। কেমন গুমগুম শব্দের মতো মনে হচ্ছে। যেন ঝড় আসছে। অথবা মনে হয় হাজার বছর ধরে সেই রাক্ষস ছুটে আসছে। রাজপুত্রের হাতে পাখি পাখির ডানা ছিঁড়ে ফেলছে রাজপুত্র। পড়ি-মরি করে সেই হাজার লক্ষ রাক্ষসের দলটা রাজপুরীর দিকে ছুটে আসছে। কান পাতলে মনে হয় সেই রাক্ষসেরা অনন্ত কালের গর্ভে পাখির রক্তপানের লোভে ছুটছে। পাখি রাজপুত্রের হাতে। খুশিমতো ডানা পা এবং মুণ্ড ছিঁড়ে দিলেই শেষ। কিন্তু হায়, রাজপুত্র পাথরের, পাখি পাথরের! সুখী রাজপুত্র রাতের বেলায় পাখি হাতে স্বপ্ন দেখতে দেখতে পাথর হয়ে গেছে।

    মোষটা বলল, কী ঠাকুর, তাকাচ্ছো না কেন?

    পাগল ঠাকুর জবাব দিলেন না।

    —ঠাকুর, তুমি সামান্য কাটা মুণ্ডের হাসি সহ্য করতে পার না, আর আমি কী করে খাঁড়ার ঘা সহ্য করেছি বল!

    পাগল ঠাকুর বললেন, দ্যাখো তোমাকে বাপু আমি কিছু বলছি না! তুমি আমার পিছনে লাগবে না।

    —ঠিক আছে। তবে আমি উড়াল দিলাম। বলে মুণ্ডটা দু’পাশে পলকে দুটো ডানা গজিয়ে নিল, তারপর বিলের ওপর উড়তে থাকল।

    —আরে কর কি, কর কি! পাগল ঠাকুর কাটা মুণ্ড ধরতে গেলেন।

    —কেন আমাকে তোমার ভগবানের চেয়ে খারাপ দেখাচ্ছে এখন! বাদুড়ের মতো দেখাচ্ছে না! অতিকায় বাদুড়ের মতো! বলে মোষের মাথাটা পাগল ঠাকুরের সামনে পেণ্ডুলামের মতো দুলতে দুলতে বলল, কেমন লাগে দেখতে! বাদুড়ের মতো লাগছে না! লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে এমন সব বাদুড় ছিল। এখন আর তারা নেই। একদল আরও বড় সরীসৃপ এসে ওদের খেয়ে ফেলল। কিন্তু তারা তোমাদের মতো আর যাই করুক, ধর্মের নামে ভণ্ডামি করেনি। ঈশ্বরের নামে সব অপকর্ম চালায়নি।

    কাটা মুণ্ডটার কাণ্ডকারখানা দেখে পাগল ঠাকুর বড় বেশি বিরক্ত হলেন। বড্ড জ্বালাতন করছে মুণ্ডটা, ভালো মানুষ পেলে যা হয়। তিনি পাড় ধরে হাঁটতে থাকলেন—কিন্তু আশ্চর্য, সব সময় সেই মোষের মুণ্ডটা দুটো বড়ো পাখা নিয়ে ওর চোখের সামনে ঠিক পেণ্ডুলামের মতো ঝুলছে তো ঝুলছেই কেউ যেন অদৃশ্য এক সুতো দিয়ে মোষের মুণ্ডটাকে আকাশ থেকে ছেড়ে দিয়েছে। পাগল ঠাকুর হাঁটছেন, মোষের মুণ্ডটা ক্রমশ পিছনে সরে যাচ্ছে। পাগল ঠাকুর পিছনে হাঁটছেন, মোষের মুণ্ডটা এবার এগুচ্ছে। এ তো বিষম জ্বালাতন হল! তিনি এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য থেকে মুক্ত হবার জন্য ছুটতে থাকলেন। একবার সামনে, একবার পিছনে। যেন একা একা মাঠে গোল্লাছুট খেলছেন। একবার উত্তরে, একবার দক্ষিণে। পশ্চিমে পুবে যেদিকে গেছেন, মোষের মুণ্ডটা ওঁর চোখের উপর একটা অতিকায় বাদুড় হয়ে ঝুলছে। কখনও মুণ্ডটা হাসছে, কখনও কাঁদছে। কখনও বলছে, শালা মনুষ্যজাতির মতো ইতর জাতি দেখিনি বাপু। খুশিমতো ঈশ্বরের নামে আমাকে দু’টুকরো করে বিলের পাশে ফেলে চলে গেল।

    পাগল ঠাকুর যে পাগল ঠাকুর, তাঁর পর্যন্ত ভয় ধরে গেল। তিনি সব ভুলে মাঠময় ছুটে বেড়াতে থাকলেন। এবং সেই এক চিৎকার অতিকায় বাদুড়কে উদ্দেশ করে, গ্যাৎচোরেৎশালা! সামসুদ্দিন ঢাকা থেকে ফিরেই শুনল, জালালি ডুবে গেছে জলে। গ্রামের কেউ একবার খোঁজ করতে যায়নি পর্যন্ত। সে তাড়াতাড়ি দলবল নিয়ে মাঠে বের হয়ে পড়ল। দু’জন লোককে দু’জায়গায় পাঠিয়ে দিল। একজন আবেদালি এবং অন্যজন জব্বরকে খবর দিতে চলে গেল। সে তার দলবল নিয়ে বিলের পাড়ে পৌঁছাতে বেশ রাত করে ফেলল। ওরা পাড়ে পৌঁছেই দেখল, জ্যোৎস্নার ভিতর মাঠময় কে যেন ছুটে বেড়াচ্ছে। দেখলে মনে হবে ঘটনাটা আধিভৌতিক। মনে হবে কোনও জিনপরী, ঈশ্বরের ভয়ে পাগলের মতো ছুটে পালাচ্ছে। সামসুদ্দিন পর্যন্ত হকচকিয়ে গেল। দলের লোকেরা বলল, ভাই সামু, চলি রে। কার কপালে কি আছে কওয়ন যায় না।

    সামু এবার চিৎকার করে উঠল, মাঠের ভিতর কে জাগে কও!

    উত্তরে এক পরিচিত শব্দ, গ্যাৎচোরেৎশালা। মাঠের ভিতর মনুষ্য জাগে। সকলের প্রাণে এবার জল এসে গেল। পাগল ঠাকুর সাদা জ্যোৎস্নায় এই মাঠের ভিতর ছুটাছুটি করছেন। ভূত প্রেত, দৈত্য-দানোর ভয় ওদের আর থাকল না। সামু চিৎকার করে প্রতিধ্বনি তুলল, বড়কর্তা, আমি সামু! আবেদালির বিবি জালালি জলে ডুইবা গ্যাছে! তারে আমরা তুলতে আইছি।

    সুতরাং কিংবদন্তীর ভয়টা ওদের মুহূর্তে উবে গেল। ওরা এবার অলস অথবা মন্থর পায়ে জলের কাছে নেমে গেল। যারা বিলে শামুক তুলতে এসেছিল তাদের দু’একজন সঙ্গে আছে। সামসুদ্দিন তদের একজনকে নিয়ে বিলের ধারে ধারে ঘুরতে থাকল। কোথায় শেষবার ওরা জালালিকে দেখেছে এবং তখন বেলা ক’টা তার একটা আন্দাজ করতে চাইল সামু। হাসিমদের বড় নৌকাটা জলের নিচ থেকে তুলে আনার জন্য কয়েকজন লোক চলে গেছে। নৌকা এলেই জলের ভিতর অন্বেষণে নেমে যাবে। জালালির কাপড় জলে ভেসে থাকতে পারে, ফুলে ফেঁপে জালালি জলের ওপর ভেসে উঠতে পারে।

    কিন্তু নৌকা ভাসিয়ে মনজুর যখন এল, যখন জয়নাল গলুইতে লগি বাইছে এবং নৌকার ওপর প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন লোক, জ্যোৎস্না রাতে বিলের জলে ঢেউ উঠছে—পদ্মপাতার উপর কোনও গাঙফড়িঙের শব্দ, রাতনিশুতি হচ্ছে অথবা জালালির কোনও হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন মনে হল দূরে কি ভেসে যায়! ওরা বিলের ভিতর ঢুকে দেখল সেই পাতিল, পাতিলে কিছু শালুক, শালুকের ওপর চাঁদের আলো মায়াময়। গোটা আট-দশ শালুক সারাদিনে ডুবে ডুবে জালালি সংগ্রহ করেছিল। শালুকের ভিতর একটা বড় ঝিনুক। বড় ঝিনুক জলের তলায় মিলে গেলে স্বপ্ন দেখা—ঝিনুকে যদি মুক্তো থাকে, বোধ হয় জালালি জলের নিচে স্বপ্ন দেখেছিল, বেগম হবার স্বপ্ন। সামসুদ্দিন নুয়ে পাতিলটা পাটাতনে তোলার সময় কাতর গলায় হাঁকল, চাচি, তর রাজ্যে এখন কারা জাগে!

    জল থেকে কোনও উত্তর উঠে এল না। সে এবার চারদিকে তাকাল। বিলের পাড়ে একের পর এক ছোট ছোট গ্রাম। গরিব-দুঃখীদের নিবাস। গ্রামে যারা মোল্লা-মৌলবী মানুষ, হাটে তাদের সুতোর অথবা পাটের কারবার আছে। আর আছে হিন্দু মহাজন। এবং হক সাহেবের ঋণসালিশী বোর্ড! মানুষগুলি আত্মরক্ষার কৌশল ধীরে ধীরে জেনে ফেলছে। সে অন্যান্য সকলকে লক্ষ করে বলল, তবে দ্যাখছি পাওয়া গ্যাল না।

    কেউ কোনও শব্দ করল না। করলেই সামু ওদের জলের নিচে ডুব দিতে বলবে। এই শীতে জলে নামলে হিমে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ওরা কেমন ইতস্তত করতে থাকলে সামু বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, আপনারা নৌকায় থাকেন, জলে ডুব দিয়া আমিই খুঁজি। বলে, দলের মানুষেরা যেখানে শেষবার জালালিকে দেখেছে বলেছে, সামু গামছাটা পরে সেখানে ডুব দিল।

    বিলে এত মানুষজন দেখেই বুঝি মোষের মুণ্ডটা চোখের উপর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাগল ঠাকুর সামান্য সময় পেলেন ভাববার। তিনি ভাবলেন, এমন কেন হল! সামান্য এক অবলা জীবের এত রোষ! তিনি তাড়াতাড়ি সেই রোষ থেকে রক্ষা পাবার জন্য সামুদের নৌকার দিকে হাঁটতে থাকলেন। নৌকাটা জলের উপর এক জায়গায় থেমে আছে। এবং একজন মানুষ একা জলে সাঁতার কাটছে। জলে ডুব দিচ্ছে। ভয়-ভীতির তোয়াক্কা করছে না! এতগুলো মানুষ নৌকার উপর দাঁড়িয়ে তামাসা দেখছে। আর একটা মানুষ দামের ভিতর শীতের রাতে আটকে পড়বে? কে এমন অবিবেচক মানুষ! পাগল ঠাকুর প্রায় জলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। জালালি যেখানে ডুবেছে তার চেয়ে অনেক দূরে ওরা খোঁজাখুঁজি করছে। সামুর এই অনর্থক পরিশ্রমের জন্য পাগল ঠাকুর রুষ্ট হচ্ছিলেন। তাছাড়া একা একা মাঠে হাঁটলে ফের মোষের কবলে পড়ে যাবেন ভেবে পাড়ে দাঁড়িয়ে তালি বাজালেন। যেন তোমরা আমায় নৌকায় তুলে নাও এমন বলার ইচ্ছা।

    মনজুর পাটাতনে দাঁড়িয়ে হাঁকল, তালি বাজায় কোন্ মাইনষে?

    উত্তর নেই। কেবল কে অনবরত বিলের পাড়ে তালি বাজাচ্ছেন। ওর বুঝতে আদৌ কষ্ট হল না, ঠাকুরবাড়ির পাগল ঠাকুর তালি বাজাচ্ছেন। নৌকায় ওঠার জন্য তালি বাজাচ্ছেন। মনজুর এবার চিৎকার করে বলল, যাইতাছি কর্তা, খাড়ান।

    নৌকা পাড়ের কাছে গেলে কোথায় পাগল ঠাকুরনৌকায় উঠে আসবেন—তা না, জলে ঝাঁপ দিয়ে সেই দুই পদ্মকলির দিকে ছুটে যেতে থাকলেন। পাগল মানুষের শীত গ্রীষ্ম সব সমান। মানুষটা বুঝি পুরোপুরি ক্ষেপে গেছে। তিনি সকলকে পিছনে ফেলে দুই পদ্মকলির উদ্দেশে একটা বড় সাদা রাজহাঁসের বেগে চলে যেতে থাকলেন। দশাসই মানুষ, তল্লাটে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। যেমন লম্বা তেমনি অসীম শক্তির ধারক মানুষটি। সকল কিংবদন্তীর দৈত্যদানোকে কলা দেখিয়ে দুই পদ্মকলির ভেতরে ডুবে গেলেন। দাম, লতাপাতা, পদ্মের লতা ছিঁড়ে ফুঁড়ে জালালির জীর্ণ লাশটাকে টেনে বের করে ফেললেন। তারপর চুল ধরে জলের ওপর ভেসে সাঁতরাতে থাকলেন। তীরের বেগে সাঁতার কাটছেন। মানুষগুলি ভয়ে বিস্ময়ে রা করতে পারছে না। ঠিক এক পীর, দরগার পীর পাগল মানুষ যেন। সকলকে বিস্মিত করে শরীরটা কাঁধে ফেলে জল ভেঙে উপরে উঠে গেলেন তিনি। কোনওদিকে তাকালেন না। কাঁধে মৃতদেহ, সামনে ফসলবিহীন মাঠ, আকাশে কিছু নক্ষত্র জ্বলছিল, আর দূরে তেমনি ঢাকের বাদ্যি বাজছে। পাগল ঠাকুরের সহসা মনে হল তিনি জালালিকে নিয়ে হাঁটছেন না। যেন সেই ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ, দুর্গের মাথায় কবুতর উড়ছে এবং র‍্যামপার্টে ব্যাণ্ড বাজছিল! এখন ঢাকের বাদ্যি শুনে সেসব মনে করতে পারছেন। কাঁধে তাঁর জালালি নয়, যুবতী পলিন। পলিনকে নিয়ে হাঁটছেন। এটা ফসলবিহীন মাঠ নয়, এটা যেন সেই র‍্যামপার্ট। পাশে দুর্গ। একদল ইংরেজ সৈন্যের কুচকাওয়াজের শব্দ, ওরা পিছন থেকে পলিনকে কেড়ে নেবার জন্য ছুটে আসছে। পাগল ঠাকুর এই ভেবে ছুটতে থাকলেন।

    ওরা দেখল মাঠের ওপর দিয়ে তিনি ছুটে যাচ্ছেন। পাগল মানুষ তিনি, কোনদিকে চলে যাবেন জালালিকে নিয়ে কে জানে! তা ছাড়া তিনি বিধর্মী মানুষ। সেই মানুষের কাঁধে মৃত জালালি। ওরা ছুটতে থাকল। মৃত জালালিকে নিয়ে অন্য কোনও মাঠে অথবা নদীর ওপারে চলে গেলে ইসলামের গুনাগার হতে তবে আর বাকি থাকবে না। এখন জালালিকে ধর্মমতে আবেদালি পর্যন্ত দেখতে পাবে না। আর কিনা এই পাগল মানুষ বিধর্মী মানুষ সব পিছনে ফেলে মাঠ ধরে ছুটছেন। ওরা তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে মাঠের মাঝখানে পাগল ঠাকুরকে ঘিরে ফেলল। ধীরে ধীরে ওরা পাগল ঠাকুরের নিকটবর্তী হতে থাকল। ওরা বুঝতে দিচ্ছে না জালালিকে কাঁধ থেকে তুলে নেবার জন্য ওরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। ওদের এই কৌশল ধরে ফেলতে পারলে তিনি ফের ছুটবেন। যেমন এক হেমন্তের বিকেলে মুড়াপাড়ার হাতি নিয়ে মাঠে ঘাটে বের হয়ে পড়েছিলেন।

    ওরা ওকে ঘিরে ফেলে চারদিকে সতর্ক নজর রাখল। সামু কাছে গিয়ে বলল, চাচিরে দ্যান।

    অদ্ভুত ব্যাপার। একেবারে ভালোমানুষ তিনি। খুব ধীরে ধীরে, যেন রু অসুস্থ মানুষকে কাঁধ থেকে নামাচ্ছেন। ধীরে ধীরে তিনি জালালিকে শুইয়ে দিলেন। শুইয়ে দেবার সময় গলগল করে ভিতর থেকে জল উগলে দিল জালালি। শরীরটা সাদা ফ্যাকাসে। চোখের মণি দুটো স্থির। অপলক তাকিয়ে সকলকে দেখছে। ডুরে শাড়িটা আলগা হয়ে গেছে। সামু কাপড়টা খুলে জলটা চিপে ফেলে দিল। তারপর শাড়িটা দিয়ে লাশটা ঢেকে দিল। তারপর জালালির সঙ্গে কার কি সম্পর্ক, কে এই লাশ বহন করে নেবার অধিকারী—যারা পুত্রবৎ তারাই শুধু লাশ বহন করে নিয়ে যেতে পারবে এইসব ভেবে সে চার-পাঁচজন মানুষকে লাশটা বেঁধে ফেলতে বলল। একটা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে যেমন কাটা মোষ নিয়ে মানুষেরা গিয়েছিল, জয় যজ্ঞেশ্বর কি জয় বলে জয়ধ্বনি করছিল, তেমনি ওরা আল্লা রহমানে রহিম বলে চলে যাচ্ছিল মাঠ ধরে!

    আবেদালির বিবি শালুক তুলতে এসে জলে ডুবে মরে গেল। কিংবদন্তীর দেশে জালালি শহীদ হয়ে গেল। এই নিয়ে ফের একটা সাল উত্তেজনা থাকবে—যেমন রসো এবং বুড়ি সেই কোন এক সালে জলে ডুবে মরেছিল, কেউ টের পায়নি, হেমন্তের কোন অপরাহ্ণে কঙ্কাল আবিষ্কার করে বিস্মিত হয়েছে অঞ্চলের মানুষেরা। তারপর সব গালগল্প। অশিক্ষিত অথবা অর্ধশিক্ষিত মানুষেরা যখন রাত হয়, যখন কেউ জেগে থাকে না, তখন অঞ্চলের এইসব খালবিল, শ্মশানের অথবা কবরখানার অলৌকিক ঘটনা নিয়ে তারা ডুবে থাকে। ভূত-প্রেতের বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে ভালোবাসে।

    ওরা যত এগুচ্ছিল ততই ঢাক এবং ঢোলের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সারারাত ঢাক ঢোল বাজবে। হ্যাজাকের আলো এখন মাঠময় আর মাঝে মাঝে বাজি পুড়ছে। হাউই উড়ছে আকাশে। মালতীর চোখে ঘুম আসছিল না। পার্বণের খাওয়া চালকলা, তিলাকদমা ফুলেফলে ভরা। তারপর খিচুড়ি পায়েস। বড়বৌ আলাদা ডেকে আবার পায়েস খেতে দিয়েছিল মালতীকে।

    মালতী লেপ কাঁথার ভিতর শুয়ে জানালা দিয়ে মাঠের জ্যোৎস্না দেখছিল। বাস্তুপূজার দিনে জ্যোৎস্না বড় রহস্যময়। ঠিক যেন কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্ণিমা। বাজি, আতসবাজি আর নাড়ু মোয়া। খেতে খেতে আকণ্ঠ। এই জ্যোৎস্নায় বিলের জলে জালালি ডুবে আছে। কথাটা ভাবতেই মালতীর কেমন দম বন্ধ ভাব হচ্ছে। সে উঠে বসল। ওরা এখনও আসেনি। এলে গোপাটে ওদের কথাবার্তা থেকে টের পাওয়া যেত জালালিকে খুঁজে পাওয়া গেছে কিনা!

    মালতী অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারল না। লেপ-কাঁথা গায়ে জড়িয়ে কেমন চুপচাপ উদাস ভঙ্গিতে জানালার কাছে বসে থাকল। সারাদিন শরীরে খুবই ধকল গেছে। নৈবেদ্য সাজাবার জন্য পেতলের হাঁড়ি মেজে সাফসোফ করেছে। নরেন দাসের নানারকম বাতিক। এই বাস্তুপূজা জমির জন্য, ফসলের জন্য। প্রাণের চেয়ে মূল্যবান ফসল। সুতরাং কোথাও ত্রুটি থাকলে রক্ষা নেই। বিষয়ী মানুষ নরেন দাস অমূল্যকে পর্যন্ত ছুটি দিয়েছে এই দিনে। মালতী সেই কোন ভোর থেকে দুধের বাসন, পেতলের হাঁড়ি মেজে সাফসোফ করেছে। তারপর সারাদিন মাঠ আর বাড়ি। বাস্তুপূজা মাঠে হয়। মাঠে সব টেনে নিয়ে যেতে হয়েছে। আবার মাঠ থেকে টেনে বাড়িতে তুলতে হয়েছে। প্রায় এক হাতে সব কাজ, শোভা আবু সামান্য সাহায্য করেছে। অমূল্য দুপুর পর্যন্ত ছিল, তারপর সে বাড়ি চলে গেছে। ফলে মালতী সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্বাস ফেলার সময় পায়নি। তাড়াতাড়ি সেজন্য হাত পা ধুয়ে শুয়ে পড়েছে ঘুমোবে বলে। কিন্তু হায় কপাল, ঘুম আসে না চোখে। কিসের আশায় কি যেন কেবল বুকে বাজে। মনে হয় এই জ্যোৎস্না রাতে চুপচাপ মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে। পাশে এক ভালোবাসার মানুষ থাকবে শুধু। ওর প্রিয় সেই স্বার্থপর দৈত্যটির কথা মনে হল।

    দৈত্যটি তার সারাদিন মাঠে মাঠে প্রসাদ খেয়ে বেড়িয়েছে—একবার মালতীর পূজা দেখতে এল না। সে, সরকারদের বাস্তুপূজা দেখতে ওর জমির পাশ দিয়ে চলে গেল অথচ ওর এমন নিয়মনিষ্ঠার পূজা দেখে গেল না। ভিতরে ভিতরে ক্ষোভে মরে যাচ্ছিল। যেন মানুষটার ওপর রাগ করেই সে সারাদিন ক্রমান্বয়ে কাজ করেছে। এই ক্ষোভের জ্বালা ভয়ঙ্কর। সে ভিতরে বড় কষ্ট পাচ্ছিল। মানুষটার বড় বেশি গরিমা মনে মনে। দেশের কাজ করে বেড়ায় বলে অহঙ্কারে পা পড়ে না।

    জ্যোৎস্নায় মাঠ এখন ভেসে যাচ্ছে। গাছগাছালি সব সাদা হয়ে গেছে। এতটুকু অন্ধকার নেই কোথাও। এমন জ্যোৎস্না যেন কতকাল ওঠেনি। এমন জ্যোৎস্নায় ঘুম আসে না চোখে।

    মালতীর প্রথম মনে হয়েছিল বেশি খাওয়ার জন্য ভিতরটা হাঁসফাস করছে এবং ঘুম আসছে না চোখে। ক্ষোভে অভিমানে ঘুম আসছে না, অথবা মানুষটাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছা হচ্ছে। ফলে জ্বালা ভিতরে, বুকের ভিতর কী এক ভীষণ জ্বালা। মাঝে মাঝে বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠছে। বুঝি সে এল। চুপিচুপি ওর জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। কিন্তু না, কেউ এল না। কেউ আসবে না। শুধু একা জেগে বসে থাকা। মালতী ফের শুয়ে পড়ল। জ্যোৎস্নায় মাঠ আদিগন্ত ভেসে যাচ্ছে। ওর মুখে জ্যোৎস্নার লাবণ্য ছড়িয়ে পড়ছে। সে নিজের ঘাড় গলা ছুঁয়ে দেখল। কি মসৃণ ত্বক, কী মনোরম এই শরীর। সে ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়ছে। সে রঞ্জিতকে ভুলে থাকার জন্য স্বামীর স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল। স্বামীর সঙ্গে সহবাসের দৃশ্য ভাববার চেষ্টা করল—যদি মনের ভিতর তার অস্থির ভাবটা কাটে। কিন্তু সেই পুরানো দৃশ্য, একঘেয়ে দৃশ্য নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। পুরানো সহবাসের দৃশ্য কোনও আর উত্তেজনার জন্ম দেয় না। সে মনে মনে ভাবল, না কোথাও আর জ্যোৎস্না নেই। সে লেপটা গোটা মাথায় মুখে ছড়িয়ে দিয়ে ভিতরটা অন্ধকার করে দিল। এখন শুধু মালতীর চারপাশে অন্ধকার। সব স্বপ্ন শহরের দাঙ্গা শেষ করে দিয়েছে। নূতন করে স্বপ্ন দেখলে পাপ। মালতী এই পাপের ভয়ে লেপের নিচে মুখ লুকিয়ে ফেলল, অন্ধকারে নিজে নিজে পাপ করে বেড়ালে কে আর টের পাবে! স্বামীর মুখ যখন কিছুতেই মনে আসছে না, পুরানো সহবাসের ছবি যখন চোখের উপর ক্যালেণ্ডারের পাতার মতো নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে তখন অন্ধকারে সরু সুন্দর আঙুলের স্পর্শ শরীরে রোমাঞ্চ এনে দিচ্ছে। আঙুলগুলো শরীরের ভিতর নানারকম পাপ কাজ করে বেড়াচ্ছে, শরীরে আবেশ এনে দিচ্ছিল। সতী সাবিত্রীর মতো পুণ্যবতী না হয়ে মনে মনে অন্ধকারের ভিতর রঞ্জিত নামক এক যুবকের স্মৃতিভারে আপন শরীরের ভিতর পাপকে অন্বেষণ করে বেড়াল—গোপনে এই পাপকার্য বড় ভালো লাগে। প্রাণের চেয়েও আপন মনে হয়। আহত সাপ মরে যাবার আগে শরীর যেমন গুটিয়ে আনে আবার সবটা ছেড়ে দেয় এবং এক সময় সোজা লম্বা হয়ে পড়ে থাকে, তেমনি মালতী শরীর ক্রমে গুটিয়ে আনছে এবং সহসা শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল। তুলে দিচ্ছিল। তার এখন অসহায় আর্তনাদ এই শরীরের ভিতরে। কী যেন নেই পৃথিবীতে, কী যেন তার হারিয়ে গেছে। সারা শরীরে এখন তার ভালোবাসার অনুসন্ধান চলছে শুধু। কত আপন আর কত প্রিয় অনুসন্ধান। হায়, মানুষের অন্তরে এই ভালোবাসার ইচ্ছা কী করে হয়, কোন অন্ধকার থেকে সে উঁকি মারে, কখন সে সব পাপ-পুণ্য বিসর্জন দিয়ে মরমিয়া সন্ন্যাসিনীর মতো পাগল-পারা হয় কেউ বলতে পারে না। মালতী ঘন ঘন শ্বাস ফেলছিল। বুঝি সেই এক বাউল শরীরে নৃত্য-গীত বাজায়, আমারে বাজাও তুমি রসের অঙ্গুলি দিয়া। তারপর কোড়াপাখির ডাকের মতো শব্দ—ডুব্‌ ডুব। মালতী একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেল। কিন্তু এ-কি! গোপাটে কারা এখন ছোটাছুটি করছে! কে যেন আকাশফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ছে! মালতীর গলা চিনতে কষ্ট হল না। জব্বর কাঁদছে। ওর মা শালুক তুলতে গিয়ে ডুবে মরেছে। জব্বর এমনভাবে কবে কাঁদতে শিখল! ঠিক শিশুর মতো আকাশ বিদীর্ণ করে কেঁদে উঠছে—মা মা। মালতী ছুটে সাদা জ্যোৎস্নায় নেমে গেল। বাঁশে ঝুলিয়ে লাশটা নিয়ে সামু গোপাট ধরে এবার বুঝি উঠে আসবে।

  • ষোল

    ষোল

    গোপাটের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা প্রায় সকলেই জেগে গেল। তা ছাড়া সন্ধ্যার পর থেকে পাড়ার বৌ-ঝিরা কুয়োতলায় অথবা পুকুরপাড়ে, কখনও আতাবেড়ার ফাঁকে উঁকিঝুঁকি মেরেছে—এই বুঝি এল! সামসুদ্দিন যখন তার দলবল নিয়ে গেছে তখন লাশ তুলে আনতে কতক্ষণ! কিন্তু যারা বয়সে প্রাচীন, যারা বিলের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখে, তাদের কাছে এটা সামুর পণ্ডশ্রম। ওরা বৈঠকখানায় অথবা উঠোনে এবং গোয়ালের পাশে বসে তামাক খাচ্ছিল। আর বিলের সব অলৌকিক গল্পের ফোয়ারা ছোটাচ্ছিল। প্রতিবেশীদের ছোট ছোট শিশুরা, নাবালকেরা সেইসব প্রাচীন পুরুষদের পাশে বসে দলে দলে গল্প শুনছিল।

    ঈশম সোনাকে সেই কিংবদন্তীর গল্প শোনাচ্ছিল।

    হেমন্তের এক বিকেলে সোনাবাবু জন্মালেন। ঈশম তরমুজ খেতে তরমুজের লতা পাহারা দিচ্ছিল। তখন সোনালী বালির নদীর চরে কাশফুল ফুটে থাকার কথা। ধান কাটা হয়ে গেছে তখন। সোনাবাহু ম্যাউ ম্যাউ করে বেড়ালের মতো অসুজ ঘরে কাঁদছেন। সোনা ঈশমের কাছে সেই ম্যাউ ম্যাউ কান্নার কথা শুনে বলল, যান! আপনে মিছা কথা কন।

    —না গ কর্তা, মিছা কথা কই না। যেন তার বলার ইচ্ছা, সংসারে এমনটা হয় কত! মাথায় পাগড়ি বাইন্দা রওনা দিলাম, ধনকর্তারে খবর দিতে। তারপর বোঝালেন নি কর্তা, রাইত, কি ঘুটঘুইটা আনধাইর। মনে হইল বামুন্দির মাঠের বড় শিমুল গাছটা, মাথায় একটা চেরাগ জ্বালাইয়া আমার দিকে হাঁইটা আইত্যাছে। কি ডর, কি ডর! বিলের পানিতে মনে হইল কে য্যান আমরে ডুবাইয়া মারতে চায়।

    —মারতে চায়! সোনা প্রায় চোখ কপালে তুলে কথাটা বলল।

    —হ। কি কমু কর্তা। বিলের লক্ষ্মীরে ত আমরা দেখি নাই কোনদিন। রূপবতী কন্যা–সোনার নাও পবনের বৈঠাতে পানি থ্যাইক্যা ফুস কইরা ভাইসা ওঠে। আনধাইর রাইতে ভাসে না, রাইত ফর্সা হইলে ভাসে। চান্দের আলো থাকলে ভাসে। পূর্ণিমার দিনে সেই নাও দেখলে তাজ্জব। কী সাদা কী সাদা! সেই জলে ডুইবা গ্যালে আর ভাসে না জলে, বলে গান ধরে দিল ঈশম।

    সোনার এই গল্প কেন জানি ভালো লাগছিল না। বিলের অলৌকিক গল্প শুনে ওর ভয় ধরে যাচ্ছে। সেই জলে ডুইবা গেলে আর ভাসে না জলে। এখন কেন জানি বার বার মার কথা মনে আসছিল সোনার। মা বিকেলে বকাবকি করেছেন, তুমি কোনখানে যাও সোনা, কোনখানে থাক ঠিক থাকে না। কোনদিন তুমি জলে ডুইবা মরবা।

    সোনার মনে হল মা ঠিকই বলেছেন। বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর সখ বড় বেশি ওর। কবে থেকে এমন অভ্যাস গড়ে উঠেছে সোনা নিজেও জানে না। ছোট মানুষের যা হয় সোনার তাই হল। ভয় ধরে গেল প্রাণে। কোনওদিন সে না বলে না কয়ে মাঠে নেমে যাবে—তারপর সেই বিল, প্রকাণ্ড বিলে নেমে যাবার নেশা, কোনদিন সে জলে ডুবে মরে থাকবে কেউ টের পাবে না। সেজন্য সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, না আর না। আর কোনদিন সে বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াবে না। সে একা অথবা পাগল জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে কোথাও চলে যাবে না। গেলে সেই যে গল্প অথবা কিংবদন্তীর পাঁচালি-জলে ডুইবা গ্যালে আর ভাসে না জলে—সেই জলে অথবা ডাঙায় যেখানেই হোক সে আর একা যাবে না। মা সারাদিন চিন্তা করেন। মার চোখে ভয়ের চিহ্ন দেখে এখন সে কেমন অতি কর্তব্যপরায়ণ অথবা যেন সদা সত্য কথা বলিবে, যেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের গল্প—মায়ের জন্য ঝড় জলের ভিতর অবলীলাক্রমে দামোদর নদী পার হয়ে যাচ্ছেন-সোনা এবার ভাবল, সে মায়ের অবাধ্য কোনও দিন হবে না। সেও মায়ের জন্য সব করবে। কেন জানি তার মার কথা মনে হলেই ঈশ্বরচন্দ্রের কথা মনে হয়। সে কেমন যেন মনে মনে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো আদর্শবাদী সত্যবাদী হতে চাইল। ঈশ্বরচন্দ্রের মতো সেও মায়ের জন্য সব করবে। মার যা অপছন্দ তা করবে না, যা পছন্দ তা করবে। ঈশম গান করছে তেমনি, ডুইবা গ্যালে আর ভাসে না জলে।

    এখন বড়ঘরে ঠাকুর্দা কাশছেন। ওরা এই উঠোনের পাশে বসে সব শুনতে পেল।

    ঈশম একসময় গান থামিয়ে বলল, বোঝলেন নি কর্তা, সাঁজ লাগলেই রাজকন্যা বিলের পানিতে সূর্য হাতে ডুব দ্যায়।

    —আর ভাসে না জলে?

    —ভাসে। সারা রাইত পানির তলে দুই হাত সূর্যেরে লইয়া সাঁতার কাটে। কাটতে কাটতে নদী ধ‍ইরা সাগরে যায়। সাগরে সাগরে মহাসাগরে। ভোর হইতে না হইতে পুবের আকাশে ভাইস্যা ওঠে। আসমানে সূর্যটারে টানাইয়া দ্যান রাজকন্যা। তারপর পলকে তিনি অন্তর্ধান করেন।

    —কোনখানে তিনি অন্তর্ধান করেন?

    —বিলের পানিতে।

    —আপনে দ্যাখছেন।

    —আমি দ্যাখমু কি গ কর্তা। আপনের মায়রে জিগাইয়েন। পাগল কর্তারে জিগাইতে পারেন। সোনা ভাবল, হয়তো হবে। এত বড় যখন বিল আর সোনার নাও পবনের বৈঠা যখন রাজকন্যার জিম্মায়, তখন তার নদী ধরে সাগরে পড়তে কতক্ষণ! সাগরে সাগরে কতদূর চলে যায় রাজকন্যা। এখন রাজকন্যা তবে কোন সাগরে আছে—দক্ষিণের না উত্তরের? ওর প্রশ্ন করার ইচ্ছা, কোন সাগরের নিচে এখন রাজকন্যা সাঁতার কাটছে? সূর্য হাতে রাজকন্যা নীল জলের ভিতর সোনালী মাছের মতো মুখে রুপোলী সূর্য নিয়ে কোন জলের নিচে সাঁতার কাটছে? এসবও জানার ইচ্ছা। ঈশম তখন বলছিল, সকাল হইলে রাজকন্যা পুব সাগরে ভাইস্যা ওঠে। সুর্যটারে আসমানে টানাইয়া দ্যায়। তারপর রাজকন্যা টুপ কইরা পানির নিচে ডুইবা যায়। সোনা যেন এবার কতদিন পর এই সূর্য ঠাকুরের চালাকিটা ধরে ফেলেছে।

    ওর বার বার এক প্রশ্ন ছিল, সূর্য তুমি যাও কোথা? বাবা বলেছেন, সে বড় হলে রহস্য জানতে পারবে। এখন কিন্তু তার কাছে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল। সূর্য যায় মামার বাড়ি। বিলের নিচে মামা-মামিদের ঘরে যায়।

    সোনা চুপচাপ বসেছিল। ঈশম গোয়ালে কি কাজের জন্য উঠে গেল। ঈশম চলে গেলে উঠোনের উপর একা ওর ভয় করতে থাকল। সে তাড়াতাড়ি ছুটে বড় ঘরে উঠে গেল। ঘরে ঠাকুমা আছেন, ঠাকুরদা তক্তপোশের উপর কাঁথা বালিশ চারদিকে রেখে বসে আছেন। বড় বড় বালিশ দিয়ে ঠাকুরদাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। বালিশগুলি ওঁর অবলম্বনের মতো কাজ করছিল। মাথার কাছে পিলসুজে বাতি জ্বলছে। রেড়ির তেলের প্রদীপ। নীলচে রঙ এই আলোর। মুখে-চোখে বিদ্যুতের মতো আলোটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে। ঠাকুমা সন্ধ্যাহ্নিকের জন্য ঠাকুরঘরে চলে যাবেন এবার। যতক্ষণ ঠাকুমা ঘরে ছিলেন, সোনা পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করেছে। ঘুরঘুর করার সময়ই ঈশ্বরচন্দ্রের কথা ফের মনে হল। দামোদর নদীর কথা মনে হল। সে আবার ভাবল, মায়ের জন্য সব করবে। আর ঘুরেফিরে সেই কথা মনে হল—বিলে রাজকন্যা, মাঠে ফতিমা। ফতিমা ওকে ছুঁয়ে দিয়েছে। সে স্নান করেনি। এসব শুনলে মা রাগ করবেন। মার কঠিন মুখের কথা ভাবতেই ওর প্রায় কান্না পেতে থাকল। মা আজ গরদের শাড়ি পরেছেন, পূজা-পার্বণের দিনে মা সারাদিন গরদ পরে থাকেন। মাকে তখন ভালো মানুষের ঝি মনে হয়। মাকে জলের মতো নির্মল মনে হয়, সাদা শাপলা ফুলের মতা পবিত্র মনে হয়। সুতরাং সেই পবিত্র এবং নির্মল জলের পাশে অশুচি শরীর নিয়ে থাকলে পাপ। সোনা এখন কি করবে ভাবতে পারছিল না। বলবে, ফতিমা আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছে। না কিছুই বলবে না—চুপচাপ থেকে যাবে, সে কিছুই স্থির করতে পারছে না। ওর ভিতর থেকে ভয়ে ভয়ে কেমন শীত উঠে আসছিল, সে দাঁড়াল না। এক দৌড়ে পশ্চিমের ঘরে ঢুকে গেল। কী শীত, কী শীত! কী ঠাণ্ডা, এই ঠাণ্ডায় স্নান করা বড় কষ্ট! সোনা গায়ের চাদরটা আরও ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। তারপর মায়ের পাশে বসে পড়ল। ওর স্নান করবার কথা মনে থাকল না। এখন কেবল বিলের সেই রাজকন্যার কথা মনে আসছে। রাজকন্যার মুখে রুপোলী সূর্য। সূর্য মুখে রাজকন্যা একটা মাছের মতো জলের নিচে সাঁতার কাটছে।

    উৎসবের দিনে এই ছুটাছুটি সোনাকে খুব ক্লান্ত করেছিল। সে রাতে খেল না পর্যন্ত। তক্তপোশে উঠে সকলের অলক্ষ্যে শুয়ে পড়ল। ওর আজ পড়া নেই। উৎসবের জন্য ছুটি। আজ উঠোনে লাঠিখেলা ছোরাখেলা বন্ধ। লালটু পলটু সেই যে ছোটকাকার সঙ্গে পূজার চরু রান্না করতে গেছে, ফেরেনি। সারা বিকেল সে একা ছিল। বড় জেঠিমা এখনও রান্নাঘরে, রাত্রে আজ কোনও রান্নার কাজ নেই। ঠাকুরদা সামান্য ফল সেদ্ধ খাবেন। ঠাকুরমা গরম দুধ খাবেন। তাঁদের সেই কাজটুকু করতে পারলে মা-জেঠিমার ছুটি। মা এখন ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। সে এখন একা এই ঘরে। হারিকেনের আলোটা নিবু নিবু টিনের চাল, চালে কুয়াশা জমেছে। ফোঁটা ফোঁটা জল জমে নিচে পড়ছে। টুপ টাপ শব্দ হচ্ছিল। কান পেতে রয়েছে সোনা। যেন কে বা কারা উপরের কাঠের পাটাতনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সোনা মাকে ডাকতে পারত। তার ভয়ের কথা বলতে পারত। অন্যদিন কোনও ভয় থাকে না, আজ ভয়ের কথা বললে মা বিরক্ত হবেন। সে মাকে ডাকতে সাহস পেল না।

    একটা মানুষ জলে ডুবে মরে গেছে আর কাটা মুণ্ড পেটে নিয়ে মোষ যায় মাঠে, দৃশ্যটা মনে পড়তেই সে লেপ দিয়ে মাথা ঢেকে দিল। মনে হল তার শরীরটা অশুচি। সে ফতিমাকে ছুঁয়ে স্নান করেনি। শরীর অশুচি থাকলে অপদেবতা ঘাড়ে চাপতে সময় নেয় না। সে নিজেকে অশরীরী আত্মাদের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য লেপ দিয়ে শরীর মুখ ঢেকে দিল। ছোট মানুষ, মনে কত রকমের ভয়, ওর বার-বারই মনে হচ্ছিল ফাঁক পেলেই সেই বিলের অপদেবতাও লেপের ভিতর ঢুকে যাবে। ওকে সুড়সুড়ি দেবে। ওকে হাসিয়ে মেরে ফেলবে অথবা ওর নাকে-মুখে কল্পিত এক ঘ্রাণ দেবে মেখে। মেখে দিলেই সে দাসানুদাস–সেই অপদেবতা তাকে বিলের জলে হেঁটে যেতে বলবে। অপদেবতার পিছনে-পিছনে সে জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে গেলেই ডুবে যাবে। ওর ভিতরে-ভিতরে বড় কষ্ট হচ্ছিল। মা-বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে। সে ক্রমে লেপের নিচে গুটিয়ে আসছে। কারা যেন এখন ঘরটার চারপশে ফিসফিস করে কথা বলছে। সোনা মনে মনে দেবতাদের নাম স্মরণ করছে। তখন ঘরের আলোটা ক’বার দপদপ করে নিভে গেল। ঘর অন্ধকার। সোনা এবার লেপ থেকে মুখ বার করতেই দেখল জানালায় সাদা জ্যোৎস্না এবং সেখানে যেন কার মুখ। বুঝি জালালি উঁকি দিয়ে সোনাকে দেখছে। সোনা এবার ভয়ে চিৎকার করে উঠল। কাটা মোষের গলা নিয়ে জালালি ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

    চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে ধনবৌ ছুটে এসেছে। সোনা থরথর করে কাঁপছিল। জানালায় আঙুল তুলে কি যেন দেখাতে চাইছে। ধনবৌ দেখল, জানালায় এখন শুধু জ্যোৎস্না খেলা করে বেড়াচ্ছে।

    ধনবৌ বলল, চিৎকার দিলি ক্যান!

    সে বলল, মানুষ।

    —মানুষ কই থাইকা আইব! শুইয়া পড়।

    সোনা এবার ভয়ে কেঁদে ফেলল–মা, আমারে ফতিমা ছুঁইয়া দিছে।

    —আবার সেই মাইয়াটার লগে তুমি গেছ!

    সোনা নিজের দোষ ঢেকে বলল মা, আমি অরে ছুঁই নাই।

    ধনবৌ সোনাকে কিছু আর বলল না। সে ঠাকুরঘরের দিকে হাঁটতে থাকল। পরনে গরদের শাড়ি, ফুল-বেলপাতার গন্ধ, চন্দনের গন্ধ শরীরে। মাকে পবিত্র ফুলকুমারী মনে হচ্ছে সোনার। সে মায়ের পিছনে আল্‌ল্গা হয়ে হাঁটছে। অন্ধকার ছিল না। জ্যোৎস্নায় মাঠ-ঘাট ভেসে যাচ্ছে। ঈশম বোধ হয় এতক্ষণে তরমুজ-খেতে পৌঁছে গেছে। রঞ্জিতও বৈঠকখানা ঘরে বসে কি লিখছিল মনোযোগ দিয়ে—সে ক্রমাগত লিখে যাচ্ছে। আর ধনবৌ উঠোন পার হয়ে যাচ্ছে। সোনা প্রথম ভেবেছিল মার যা রাগ—তিনি নিশ্চয়ই ওকে পুকুরে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে হিমের মতো জল, জলে ডুব দিতে বলবেন। সে ভয়ে ঠক্‌ঠক্‌ করে কাঁপছিল।

    মা ঠিক শেফালি গাছটার নিচে এসে বললেন, সোনা তুমি দাঁড়াও।

    সোনা দাঁড়াল।

    মা পুকুরের দিকে নেমে গেলেন না। ঠাকুরঘরের দরজা খুলে তামার পাত্র থেকে তুলসীপাতা নিলেন, সামান্য চরণামৃত নিলেন। জলটা সোনার শরীরে এবং নিজের মাথায় ছড়িয়ে দিয়ে হাঁ করতে বললেন সোনাকে। হাঁ করলে তুলসী-পাতাটা সোনার মুখে আল্গা করে ছেড়ে দিয়ে বললেন, খাও! এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে হল সোনার, শরীর থেকে তার সমস্ত ভয় মন্ত্রের মতো উবে গেছে। সে মাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, মা আমি আর একা মাঠে যামু না।

    ধনবৌ সোনার কথার জবাব দিল না। তামার পাত্র থেকে গণ্ডুষ করে জল নিল এবং দ্রুত ছুটে গেল ঘরে। ঘরের ভিতর, বিছানায় তক্তপোশে জলটা ছিটিয়ে দেবার সময়ই শুনল, গোপাটে হৈ-চৈ। জব্বর কাঁদছে।

    বড়বৌ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে এল। রঞ্জিতও সব ফেলে নেমে এল উঠোনে। ধনবৌ দরজায় শেকল তুলে দিল। এক সঙ্গে ওরা পুকুরপাড়ের দিকে হেঁটে গেল। সোনা পিছনে। সেও সন্তর্পণে ওদের পিছু পিছু পুকুরপাড়ে নেমে গেল।

    দীনবন্ধু আর ওর দুই বৌ সুখী দুঃখী এসে দাঁড়াল বুকলতলায়। প্রতাপ চন্দ এসে দাঁড়াল চিলাকোঠার পাশে। ওর তিন স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততি অনেক। ওরা ছাদের উপর দঁড়িয়ে জালালিকে দেখার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকল। শ্রীশ চন্দ, অবিনাশ কবিরাজ এবং গৌর সরকারের ছেলে-মেয়ে বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়েছিল—দলটা আসছে। কেমন ভৌতিক মনে হচ্ছে সব। জলে ডোবা মানুষ উঠে আসছে। জোৎস্না পর্যন্ত কেমন মরা-মরা, সাদা ফ্যাকাসে। এমন কি এখন হাওয়ায় একটা কলাপাতা নড়লে পর্যন্ত টের পাওয়া যায়। চুপচাপ। নিঃশব্দ। আকাশে এতটুকু মেঘ নেই। সাদা মেঘ থাকলে, হাওয়া থাকলে এবং ঝোপ জঙ্গলে কোন কীট-পতঙ্গ শব্দ করলে বোধহয় ব্যাপারটা এত বেশি ভৌতিক মনে হতো না। এমন কি ঢাকঢোলের বাজনা থেমে গেছে! ভয়ঙ্কর সাদা জ্যোৎস্নায় ওরা দেখল গোপাট ধরে মানুষগুলি উঠে আসছে। সোনা এবার মাকে জড়িয়ে ধরল, কারণ সেই মুখটা, কাটা মোষের মুণ্ড পেটে নিয়ে যেন ফের উঁকি দেবে।

    ধনবৌ সোনাকে তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিল।

    লাশটা বাঁশে বাঁধা। লাশটা ঝুলে-ঝুলে উঠে আসছে। রঞ্জিতও ভাবল একবার ডেকে সামসুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু মাঠের দিকে তাকাতেই মনে হল এখনও উৎসবের ছবি জেগে আছে। একটু পরে অর্থাৎ শেষ রাতের দিকে সরকারদের পুকুরপাড়ে বাজি পোড়ানো হবে। রঞ্জিত ডাকতে সঙ্কোচ বোধ করল।

    আর সোনার মনে হল দুপুরের ছবি যায়। কাটা মোষ পেটে মাথা নিয়ে যায়। সব স্পষ্ট নয়, তবু মনে হয় জালালির মাথাটা নিচের দিকে ঝুলে আছে। চুলগুলি শণের মতো খাড়া হয়ে আছে। সোনা ভয়ে এবার মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু মার কোনও সাড়া-শব্দ পাচ্ছে না। তিনি এই দৃশ্য দেখে কেমন শক্ত হয়ে গেছেন।

    সাধারণত এমনি হয় মানুষের। শোকের ছবি দেখলে কষ্ট নামক একটা বোধ সংক্রামিত হতে থাকে ভিতরে। মনে হয় একদিন না একদিন সকলকে সব কিছু ছেড়ে যেতে হবে। ভুবনময় সাদা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে। বড়বৌ অর্জুন গাছটার নিচে। জালালির লাশ নিয়ে ওরা মাঠ পার হয়ে চলে গেল।

    তারপরই ওরা সকলে দেখল, সেই মানুষ, কিংবদন্তীর মানুষ গোপাট ধরে রাজার মতো উঠে আসছেন।

    সাদা জ্যোৎস্নায় পাগল ঠাকুরকে সন্ন্যাসীর মতো দেখাচ্ছে।।

    সোনা দেখল, জ্যাঠামশাই এখন কোনও দিকে তাকাচ্ছেন না। সোজা গোপাট ধরে হেঁটে আসছেন। সামনে এসে পড়তেই বড় জেঠিমা ছুটে গোপাটে নেমে গেলেন। রঞ্জিতও নেমে গেল। জ্যাঠামশাইকে দেখে সোনার সব ভয় উবে গেল। সে ছুটে গিয়ে গোপাটে নেমে ডাকল, জ্যাঠামশাই।

    বড়বৌ, পথ আগলে আর মানুষটাকে বেশি দূরে যেতে দিল না। সে পাগল মানুষের হাতে হাত রাখল। হাত রাখলে এই মানুষ একেবারে সরল বালক বনে যান। তাঁর খালি গা, হাত-পা ঠাণ্ডা, শীতে মানুষটা আরও সাদা হয়ে গেছে। কাপড় ভিজা। মানুষটার সর্দিকাশি পর্যন্ত হয় না। আর বড়বৌ পারছে না। মানুষটার দিন-দুপুর নেই, কখন কোথায় চলে যান, কখন আসেন ঠিক থাকে না। এত বড় উৎসবের দিনে মানুষটকে সে আহার করাতে পারেনি। আলাদা করে সব রেখে দিয়েছে—যদি মানুষটা রাতে আসে, যদি মানুষটা ভোরের দিকে ফিরে আসে—সেই আশায় বড়বৌ শ্বেতপাথরের বাটিতে সব কিছু ভাগে ভাগে আলাদা করে রেখেছে।

    পাগল ঠাকুর বেশিক্ষণ শক্ত হয়ে থাকতে পারলেন না। বড়বৌর চোখে সেই এক বিষণ্ণতা। সাদা জ্যোৎস্নায় সেই বিষণ্ণতা যেন আরও তির্যক্। মানুষটা এবার চুপচাপ বড়বৌর হাত ধরে ঘরের দিকে উঠে যেতে থাকলেন। চারদিকে একবার চোখ মেলে তাকালেন, কেন যে বের হয়েছিলেন মনে করতে পারছেন না। কিসের উদ্দেশে এই বের হওয়া। কার স্মৃতির জন্য এমন উতলা হওয়া। কারা ওঁর জীবনের সোনার হরিণটি বেঁধে রেখেছে। কোথায় এমন হেমলক গাছ আছে—যার নিচে এক সোনার হরিণ বাঁধা—কল্পিত সেই সোনার হরিণটি কোন মাঠে—পাগল ঠাকুর ভাবতে-ভাবতে বিচলিত বোধ করলেন। কে সে? যুবতী পলিন কি চাঁদের বুড়ির মতো? অপলক কি তার চোখ! সে কি কোনও ঝরনার পাশে খরগোশের ঘরে বাস করছে! অথবা প্রতিদিন ঝরনার জলে স্নান, যুবতী পলিন হায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে…দুর্গের মাথায় জালালি কবুতর এবং সামনে কত জাহাজ। জহাজে করে যুবতী এসেছিল এ-দেশে বাপের কাছে। সে জাহাজঘাটায় বাপের সঙ্গে তাকে রিসিভ করতে গেছিল। কিছু কিছু স্মৃতি ফের মনে পড়ছে। স্পষ্ট নয়, ভাসা-ভাসা। যুবতীর মুখে কি অপরূপ লাবণ্য, নীল চোখ। আর ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে প্রতিদিন দুর্গের র‍্যামপার্টে বসত। এসব মনে এলেই কেমন উদাস হয়ে যান। তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা মাথার ভিতর। আবার স্মৃতিভ্রষ্ট। যুবতীর চোখ মুখ এবং শরীরের লাবণ্য কেবল পাগল প্রায় মাঠে মাঠে ঘুরিয়ে মারছে তাঁকে। তিনি কিছুতেই সেই নীল চোখ, লাবণ্যভরা মুখ স্মরণ করতে পারলেন না। প্রিয়জনের মুখ এবং স্মৃতি স্মরণ করতে না পারলে যা হয়—রাগে দুঃখে বেদনায় এবং হতাশায় ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠেন। ফলে সেই আক্রোশের চিৎকার, গ্যাৎচোরে শালা।

    রঞ্জিতও দেখল মাঠে সে একা। দূরে ইতস্তত এখনও মাঠের ভেতর হ্যাজাকের আলো জ্বলছে। মাঠ, বিশাল বিলেন মাঠ, মাঠে আলো—বিশ্বাস পাড়াতে হ্যাজাকের আলো, সরকারদের পুকুরপাড়ে হ্যাজাকের আলো এবং দু-একজন মানুষ এখনও প্রসাদ পাবার লোভে মাঠ পার হয়ে চলে যাচ্ছে। রঞ্জিত একা-একা কিছুক্ষণ ঠাণ্ডার ভিতর পায়চারি করল। ওকে খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। বোধহয় মনের ভেতর আখড়ার কাজকর্মগুলি সম্পর্কে সে সমস্যা-পীড়িত। সে সকলের অলক্ষ্যে, প্রায় গোপনে কাজটা চালাচ্ছে—সমিতির এই নির্দেশ। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে ওর লাঠিখেলা, ছোরাখেলার আখড়া সম্পর্কে সামসুদ্দিন এবং তার দলবল ভালোভাবেই জেনে গেছে। ওরা অর্থাৎ এই সব হিন্দুরা নিজেদের সাহসী এবং শক্তিশালী করে তুলছে। আত্মরক্ষার নিমিত্ত এইসব হচ্ছে। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। হিন্দুরা জনসংখ্যায় কম। ওরা কম-বেশি সব মধ্যবিত্ত। এবং নিচু জাতি যারা, যেমন নমশূদ্র সম্প্রদায়—তাদের ভিতর এই লাঠিখেলা, ছোরাখেলার হুজুগ এসে গেছে। এইসব কারণে পরস্পর নির্ভরতা ক্রমশ কমে আসছিল। ভিন্ন দুই জাতি, ফলে ক্রমশ দুই দিকে ধাবিত হচ্ছে। বোধহয় সমিতির কাছে দীর্ঘ এক চিঠিতে এইসব ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিল রঞ্জিত। এবং এই মৃত্যু, জালালির জলে ডুবে মরা প্রায় জীবন-সংগ্রামের জন্য বলা যায়। শালুক তুলতে গিয়ে জালালি পদ্মপাতায় আটকে মরে গেল। বোধহয় রঞ্জিতকে মানুষে-মানুষে এই প্রকট আর্থিক বৈষম্যও পীড়িত করছিল। সে সমিতিকে এইসব লিখেও জানাবে ভাবল।

    ঠিক তখনই মনে হল নরেন দাসের জমিতে সাদা কাপড়ে কে এক মানুষ দাঁড়িয়ে তাকে দূর থেকে দেখছে। রঞ্জিত বুঝল মালতী মাঠে নেমে এসেছে। সে সবার সঙ্গে ফিরে যায়নি। সে ক্রমে সন্তর্পণে এদিকে এগিয়ে আসছে। নিঃসঙ্গ এই মালতীর জন্য ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। সে নিজেকে অর্জুন গাছটার পাশে অদৃশ্য করে রাখল। কিন্তু হায়, কে কাকে লুকায়, কে কাকে অদৃশ্য করে! মালতীর চোখ বড় প্রখর এবং বুকের ভিতর যে সুখ পাখিটা ডাকছিল, দূরে জ্যোৎস্নায় রঞ্জিতকে দেখে সেই সুখপাখি ফের কলরব করতে থাকল। ধিকধিক করে বুকের ভিতরটা জ্বলছে। এমন দিনে কার না ইচ্ছা হয় সামনের দিগন্ত প্রসারিত মাঠে অদৃশ্য হতে! যখন জ্যোৎস্নায় সমস্ত জগৎ সংসার ডুবে আছে, কার না ইচ্ছা করে অগাধ সলিলে ডুবে মরতে

    আর কার না ইচ্ছা করে এমন সুপুরুষ দেখলে ভালোবাসতে। বড়বৌ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। টেবিলের ওপর হারিকেন জ্বলছে। পাগল মানুষ এখন প্রায় নগ্ন। বড়বৌ ভিজা কাপড় শরীর থেকে খুলে ফেলল। শ্বেতপাথরের মতো শক্ত অবয়ব। বুকের পেশি এত প্রবল যে মনে হয় একটা বড় হাতি অনায়াসে বুকের ওপর তুলে নাচাতে পারেন। পেটে চর্বি নেই। পাতলা মাংসের ওপর সাদা চামড়া—ঠিক যেন নদীরেখার মতো কোমল লোমশ বুকের পেশি থেকে একটা রেখা নাভি বরাবর নিচে নেমে এক আদিম অরণ্য সৃষ্টি করেছে। বড়বৌ সাদা তোয়ালে দিয়ে শরীরের সব বিন্দু-বিন্দু জলকণা খুব যত্নের সঙ্গে শুষে নিল। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ ঠিক যেন একটা বড় কাঠের পুতুল। কল লাগানো কাঠের পুতুল। এতটুকু নড়ছে না। এতটুকু অন্যমনস্ক হচ্ছে না—কেবল বড়বৌর সেই বড় বড় চোখ, ভালোবাসার চোখ অপলক দেখছেন। হাত তুলে দিতে বললে হাত তুলে দিচ্ছেন। বসতে বললে বসে পড়ছেন।

    উৎসবের দিন। বড়বৌ সব খাদ্যবস্তু ভিন্ন ভিন্ন থালাতে সাজিয়ে রেখেছে। তিনি কিছু খাবেন, কিছু খাবেন না। আবার হয়তো সবটাই খেয়ে ফেলতে পারেন। তারপর আরও খাবার জন্য বড়বৌর হাতটা কামড়ে ধরতে পারেন। দিতে না পারলে সাপ্টে তুলে নেবেন পাঁজাকোলে। এবং ছুটতে থাকবেন মাঠ-ময়দানে। অথবা এই খাটের ওপর নিরন্তর মানুষটা বড়বৌকে ফেলে রেখে, কখনও উলঙ্গ করে দেন, কখনও এক সুন্দর যুবতীর মুখের ঘ্রাণ নেবার মতো মুখে মুখ দিয়ে পড়ে থাকেন—কখন যে কি করবেন কেউ বলতে পারে না। সবই প্রায় তাঁর অত্যাচারের শামিল এবং এই অত্যাচারের আশায় বড়বৌ সারা দিনমান অপেক্ষা করে। দিনের শেষে তিনি ফিরে না এলে জানালায় বড়বৌ দূরের মাঠ দেখে। সেই মাঠ দেখতে দেখতে কত রাত শেষ হয়ে যায় তবু পাগল ঠাকুর ফিরে আসেন না। হয়তো তিনি কোনও গাছের নিচে শুয়ে নীল আকাশের গায়ে নক্ষত্র গুণছেন। তখন তাঁর মুখে কত সব কবিতা উচ্চারণ। ভালোবাসার কবিতা শুয়ে শুয়ে নক্ষত্র দেখতে দেখতে উচ্চারণ করেন। কবিতার সেই পক্তি সব বড়বৌকে এক নীল চোখ এবং সোনালী চুলের কথা বার বার মনে করিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুর ঠাকুরের উদ্দেশে আবেগে বলার ইচ্ছা, আপনি কেন মানুষটাকে পাগল করে দিলেন বাবা! আপনার ধর্মাধর্ম মানুষটার চেয়ে বড় কেন ভাবলেন। কেন আপনি ওঁকে কলকাতা থেকে তার করে নিয়ে এলেন। জোর করে তাঁকে বিয়ে দিলেন। ঘরে একজন ম্লেচ্ছ বৌ থাকলে, এর চেয়ে কী বড় ক্ষতি হতো আপনার চোখে জল এসে গেল বড়বৌর। কাপড় পরবার সময় চোখের জলটা আচ্ছন্ন করে দিল সব কিছু। মণীন্দ্রনাথকে বড় ঝাপসা দেখাচ্ছে এখন। পাট-ভাঙা কাপড় পরাবার সময় বড়বৌ কিছুক্ষণ বুকের ভিতর মুখ লুকিয়ে রাখল। কাঠের পুতুলটা এতটুকু নড়ছে না। যদি তাঁর সামান্য অত্যাচার আরম্ভ হয়, যদি তিনি দু’হাতে জোরজার করে বড়বৌকে উলঙ্গ করে দেন—কিন্তু পাগলঠাকুর আজ এতটুকু উত্তেজিত হলেন না। তিনি যেন এখন সন্ন্যাসীর মতো ফলদানের নিমিত্ত প্রতীক্ষা করছেন। হাতে বুঝি দণ্ডি দিলে তাই হতো।

    উৎসবের দিন বলে তসরের জামা গায়ে দেওয়া হল। কোঁকড়ানো চুলে চিরুনী দেওয়া হল। ঠিক যেন বরের সাজে পাগল মানুষ এখন দাঁড়িয়ে আছেন। এমন দৃশ্য বড়বৌ দেখে আবেগে গলে পড়ল।—এমন সুপুরুষ হয় না গো, বলতে বলতে সে প্রায় কেঁদে ফেলল। হাত ধরে এনে বড়বৌ পাগল মানুষটাকে আসনে বসাল। তারপর এক-এক করে উৎসবের ফুল-ফল বাতাসা, তিলাকদমা, পায়েস এবং খিচুড়ি—কত রকমারি খাবার থালার পাশে; বড়বৌ মাঝে-মাঝে এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু আজ পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথের কোনও খাবার স্পৃহা দেখা গেল না। তিনি সব নেড়েচেড়ে উঠে পড়লেন। তারপর নরম বিছানাতে সুন্দর এক রাজপুত্র যেমন শুয়ে থাকে, রুপোর কাঠি সোনার কাঠি যেমন পায়ে মাথায় দিয়ে শুয়ে থাকে, ঠিক তেমনি শুয়ে থাকলেন মণীন্দ্রনাথ। এতটুকু পাট ভাঙেনি কাপড়ের গোড়ালি পযন্ত টানা কাপড়, কোঁচা সোজা পায়ের কাছে নেমে এসেছে। দু’হাত আড়াআড়ি করে বুকের ওপর রাখা। তিনি বুকের ওপর হাত রেখে ঘরের কড়িকাঠ গুণছেন। স্থির অপলক দৃষ্টি। পাশে বড়বৌ। বসে আছে তো আছেই। চোখে ঘুম আসছে না। বার বার দু’গালে চুম খাচ্ছে। জামার নিচে বুকের ভিতর নরম হাতের আঙুল ক্লিবিল করে বেড়াচ্ছিল—যদি মানুষটা সোনা রুপোর কাঠির স্পর্শে মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠে। না মানুষটা আজ কিছুতেই জাগছে না। এমন উৎসবের দিন বিফলে গেল! সে মানুষটার রোমশ বুক থেকে হাত তুলে নিল এবার। কোনও উত্তেজনা নেই দেখে লেপ গায়ে দিয়ে কাঠের পুতুল বুকে নিয়ে শুয়ে থাকল সারা রাত। কাঠের পুতুলটা ঘুমায় না—কিন্তু কালঘুম বড়বৌর—কখন দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে, কখন মণীন্দ্রনাথ ধীরে-ধীরে রাজপুত্রের খোলস ছেড়ে হাঁটু কাপড়ে বের হয়ে যান, বড়বৌ টের পায় না। কালঘুম বড়বৌর সব কিছু হরণ করে নিয়েছে।

    .

    তাবুদের ভিতর ততক্ষণে জালালিকে রাখা হয়ে গেছে। মালতী সেই অর্জুন গাছটার উদ্দেশে পা টিপে টিপে হাঁটছে। আর তখন, ফেলু পাড়ে দাঁড়িয়ে জালালির কবর ঠিক মতো খোঁড়া হল কিনা দেখছে।

    বিলে তখন গজার মাছটা আপন আস্তানায় ফিরে এসেছে এবং সন্তর্পণে পদ্মলতার ভিতর আজব জীবটাকে দেখতে না পেয়ে বিস্ময়ে লেজ নাড়ছে। কে চুরি করে নিয়ে গেল—কোথায় কোন জলে আজব জীবটা ভেসে বেড়াচ্ছে! অনুসন্ধানের জন্য গজার মাছটা জলের ওপর পাখনা ভাসিয়ে সাঁতার কাটতে থাকল।

    তাবুদের ভিতর জালালির মুখটা সাদা কাপড়ে ঢাকা। নতুন কাপড়ের কফিন দিয়েছেন হাজিসাহেব। হজিসাহেবের তিন বিবি উষ্ণ জলে গোসল করিয়েছে। সব কাজ-কর্ম ওরাই দেখেশুনে করছে। চুলে বেণী বেঁধে দিয়েছে, আতর দিয়েছে, চন্দনের গন্ধ দিয়েছে—এখন আর কে বলবে সামান্য গয়না নৌকার মাঝি আবেদালির বিবি জালালি!

    তাবুদে জালালি, মসজিদে ইমাম। আল্লার কাছে জালালির জন্য দোয়া চাইছে সবে। তিন সারিতে গ্রামের সব পুরুষ মসজিদের ভিতর দাঁড়িয়ে কান স্পর্শ করে—হে আল্লা, এমন বিরাট বিশ্বময় তোমার অপার মহিমা—আমরা সামান্য মানুষ, আমাদের আর কি করণীয় আছে, বিশ্বময় সৌরজগতের অপার লীলা তুমি ছড়িয়ে দিয়েছ, হে আল্লা, যে ঘাস মাঠ ফসল এবং পাখিদের সব কলরব শুনছি, তোমার করুণার কথা কে না জানে—তুমি সকলকে আশ্রয় দাও, তুমি আমাদের এই দুঃখী জালালিকে তোমার অপার মহিমার আশ্রয়ে তুলে নাও—ওরা বোধ হয় ওদের দোয়া ভিক্ষার ভিতর এমন কিছুই বলতে চাইছিল।

    জ্যোৎস্না রাত, ঢাক-ঢোল বাজছে, ইতস্তত হ্যাজাকের আলো মাঠে ঘাটে এবং তাবুদের ভিতর জালালি মুখ ফিরে শুয়ে আছে। সামসুদ্দিন ইমামের কাজ করছিল। মসজিদের পাশে আতাফলের গাছ, গাছে রাজ্যের সব পাখির নিবাস, অসময়ে এত লোক দেখে ওরা সকলেই জেগে গেল, কলরব করতে থাকল এবং কিছু আতাফলের পাতা প্রায় ফুলের মতো তাবুদের ওপর ঝরে পড়তে থাকল।

    তারপর সকলে মিলে লা ইলাহা ইল্লাল্লা মোহম্মদ রসুলাল্লা—তাবুদ কাঁধে নিয়ে মানুষগুলি মাঠে যাবার সময় আল্লা এক, মহম্মদ তার রসুল, এইসব বলছে। তখনও সরকারদের পুকুরপাড়ে ঢাক বাজছে ঢোল বাজছে। তখনও মাঠময় জ্যোৎস্না। ওরা লণ্ঠন হাতে, কেউ কুপি হাতে, বোরখা পরে বিবিরা—যাদের নামার কথা নয় কবরে তারা পর্যন্ত দুঃখী মানুষ জালালির জন্য বটগাছের নিচে নেমে এসেছে। গাঁয়ের পুরুষেরা চারপাশে দাঁড়াল। হাজিসাহেব অসুস্থ, তিনি আসতে পারেননি। অন্যান্য প্রায় সকলে কবরের চারপাশটায় দাঁড়িয়ে আছে। তাবুদ থেকে জালালিকে বের করা হল। একপাশে সামু, জব্বর অন্য পাশে। ওরা নিচে নেমে গেল। ফেলু ডান হাত দিয়ে কাটা বাঁশগুলি সামু কবর থেকে উঠে এলেই সাজিয়ে দেবে। উত্তরের দিকে মাথা এবং দক্ষিণের দিকে পা রেখে জালালিকে শুইয়ে দেওয়া হল। মুখটা ঘুরিয়ে দিল পশ্চিমে—মক্কা মদিনা দেখুক জালালি—এই করে ওরা উপরে উঠে এলে ফেলু এক হাতে কাটা বাঁশগুলি কবরের ওপরে বিছিয়ে দিল, কিছু ইস্তাহার বিছিয়ে দিল—তাতে লেখা আছে, মুসলিম লীগ—জিন্দাবাদ যেন কবরে সাক্ষ্য হিসাবে ওরা ওদের শপথপত্র রেখে দিল। এই শপথপত্র কবরে মাটি ঝুরঝুর করে পড়ে না যাবার জন্য এবং গরিব মুসলমানদের বেঁচে থাকবার উত্তরাধিকারের দৌলতকে কেউ যেন অস্বীকার করতে না পারে; অথবা যেন সামুর বলার ইচ্ছা—চাচি, আমরা এই ফসল এবং মাঠ আমাদের জাতভাইদের দিয়ে যাব, আমরা এমন সব সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছি। ধর্ম আমাদের সকলের ওপরে—রসুল আমাদের মহম্মদ, আল্লা এক—তাঁর কোন শরিক নাই।

    সকলেই একটু একটু করে কবরে মাটি দিল। তারপর সব মাটি কবরের ওপর তুলে দেওয়া হল। চেপে মাটি দিল, মাটির ওপর গোসলের বাকি জল ঢেলে দিল জব্বর। তিনটা জীয়ল গাছ পুঁতে, ওরা পেছনের দিকে তাকাল না, ওরা গ্রামের দিকে উঠে যেতে থাকল। ঠিক ওরা সকলে আড়াই পা গিয়েছে, তক্ষুনি এক অলৌকিক আলো কবরের ভিতরে ঢুকে গেল। ফতিমা বাপের পাশে হাঁটছিল। বাপ তাকে ফেরাস্তার গল্প বলছে। সেই যেন এক কিংবদন্তীর গল্প—বেহেস্তের এক সিঁড়ি পড়ে গেল, আলোর সিঁড়ি। কবরের ভিতর অলৌকিক আলোর প্রভায় জালালি জেগে গেল।

    দুই ফেরাস্তা প্রশ্ন করল, তুমি কে?

    জালালি বলল, আমি জামিলা খাতুন।

    —তোমার ধর্ম কি?

    —ধর্ম ইসলাম।

    —আল্লা কে?

    —আল্লা এক, তাঁর কোন শরিক নেই।

    —রসুলের নাম?

    —হজরত মহম্মদ।

    —এঁকে চেন? বলেই দুই ফেরাস্তা আলো ফেলল মুখে।—কে তিনি?

    হজরত মহম্মদ। জালালি ফের ঘুমের ভিতর যেন ঢলে পড়ল।

    জালালিকে দুই ফেরাস্তা কোলে তুলে নিলেন। অলৌকিক আলোয় জালালির শরীর লীন হয়ে গেল। ঠিক যেন এক কিংবদন্তীর সূর্য—যায় যায়, বিলের জলে ডুবে যায়। বিল থেকে নদীতে, নদী থেকে সাগরে, মহাসাগরে—শেষে এক সময় রাজকন্যা টুপ করে জলে ভেসে উঠে দুই ডানা মেলে দেয় আকাশে, পুবের আকাশে সূর্য লটকে দিয়ে আবার সাগরের জলে ডুবে অদৃশ্য হয়ে যায়।

    তখন সোনা মায়ের পাশে শুয়ে একটা ঘোড়ার স্বপ্ন দেখল। একটা ঘোড়ার দুটো মুখ। ঘোড়াটা অন্ধ। সারকাসের তাঁবু থেকে ঘোড়াটাকে ক্লাউন টেনে বের করে এনেছে। তারপর ফাঁকা মাঠে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিল। অন্ধ ঘোড়া এখন একবার পুবে আবার পশ্চিমে ছুটছে। ঘোড়ার পিঠে এক হতভাগ্য মানুষ—সে একবার পুবে আবার পশ্চিমে ডিগবাজি খাচ্ছে। প্রায় সারকাসের খেলার মতো। দর্শক মাত্র দুজন। সোনা এবং ফতিমা। সোনা এবং ফতিমা এমন মজার খেলা দেখে হাততালি দিতে থাকল। পিছনে পাগল জ্যাঠামশাই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ওদের, মাঠে সারকাসের খেলা যেন দেখাতে এনেছেন।

    জ্যোৎস্না মরে আসছে, ভোর হতে দেরি নেই। গ্রামের সবাই জালালিকে কবর দিয়ে উঠে যাচ্ছে। বাগের পথে ফেলু দাঁড়াল। সারা মাঠময় কুয়াশার জন্য দৃষ্টি এগুচ্ছে না। ক্রমশ কুয়াশা চরাচর এত আচ্ছন্ন করে দিল যে ফেলু প্রায় নিজেকেই দেখতে পাচ্ছিল না। ভোর রাতের ঠাণ্ডা—হাত পা সব বরফ হয়ে যাচ্ছে। আন্নু সবার আগে উঠে গেছে, ঘুমের বাতিক বড় বেশি বিবির। মনজুর উঠে গেল, হাজি সাহেবের বড় বিবি উঠে গেল। জব্বরকে সামু ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সামুর বিবি পেছনে পেছনে উঠে আসছে। বোরখা দেখে চেনা যাচ্ছিল সব—কার বিবি, বিবির কি রকমফের, শুধু সেই বোরখাটার চোখে সাদা গুটি সুতার কাজ। জ্যোৎস্নায় সহসা দেখে ফেললে প্রায় ভূত বলে বিভ্রম হতে পারে। সেই বোরখার নিচে যুবতী মাইজলা বিবি। তোর সনে পীরিত আমার ওলো সই ললিতে, ফেলু মনে মনে মরিয়া হয়ে উঠল। আবার সেই বুকের ভিতর আঁকুপাঁকু শব্দটা হচ্ছে। কাজটা খুব নিমেষে করে ফেলতে হবে। যেন অন্য মানুষ টের না পায়। কুয়াশা এত ঘন যে এক হাত সামনের মানুষটাকে স্পষ্ট দেখা যায় না। অস্পষ্ট কুয়াশার ভিতর, সেই বোরখাটা চিনে ঠিক মতো ধরতে না পারলে ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে যাবে। সে শীতে হি হি করে কাঁপছিল। মাত্র একটা হাত তার সম্বল। জবরদস্ত বিবিকে কাবু করতে কতক্ষণ সময় নেবে। ভাববার সময়ই মনে হল কুয়াশার পর্দার ওপর মাইজলা বিবি ভেসে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে খপ করে সাপটে ধরল এক হাতে। ওর ভিতরে প্রায় যেন এখন অযুত হস্তীর বল। সে মুখে ডান হাতটা চেপে ঠেলতে ঠেলতে ঝোপের ভিতর ফেলে বাঘের মতো হঙ্কার দিল, রা করবি না বিবি। আমি তর পরাণের ফেলু।

  • সতের

    সতের

    সবার শেষে ঈশমও গ্রামে উঠে যাচ্ছে। উঠে যাবার পথে মনে হল, ঝোপের ভিতর এক প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড। প্রায় সাপে বাঘে ধস্তাধস্তি হচ্ছে যেন। বোধ হয় মড়ার গন্ধ পেয়ে হাসান পীরের দরগা থেকে শেয়াল উঠে এসেছে। গোসাপও হতে পারে। প্রায় কুমীরের মতো বড় বড় গোসাপ নদীর চরে সে কতদিন ঘুরতে দেখেছে। এখন এই ঝোপের ভিতর কামড়াকামড়ি করছে। ঈশম ভয়ে দ্রুত গ্রামের দিকে ছুটে গেল।

    ভোরের স্বপ্ন, যেমন তাজা তেমনি মিষ্টি। আর বোধ হয় প্রথম স্বপ্ন দেখতে শিখল সে। স্বপ্ন দেখার পরই ঘুম ভেঙে গেল। সে শুনতে পেল বড় ঘরে ঠাকুরদা ঈশ্বরের স্তোত্র পাঠ করছেন। বড়: জ্যেঠিমা, ছোট কাকা এই শীতের ভোরে ঠাকুরদাকে উঠোনের ওপর এনে দাঁড় করিয়েছেন।

    বৃদ্ধ দীর্ঘদিন পর বায়না ধরেছেন—তিনি আজ সূর্যোদয় দেখবেন। তিনি সেই কবে অন্ধ হয়ে গেছেন—দীর্ঘদিন ঘরের বার হননি, তিনি ঘরে বসেই প্রতিদিন ভোর রাতের দিকে ঈশ্বরের স্তোত্র পাঠ করেন—হে ঈশ্বর, তোমার করুণা ফুলে ফলে, ফসলের মাঠে, তুমি করুণাময়।

    বৃদ্ধের কথা না রাখলে অনর্থ ঘটবে। সুতরাং ওরা বৃদ্ধের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। ঠিক কামরাঙা গাছটার নিচে দাঁড়ালে পুবের আকাশ স্পষ্ট। সূর্য উঠবে। পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। পাখিরা উড়ে যাচ্ছিল। মসজিদে আজান দিচ্ছে সামসুদ্দিন। মোরগেরা ডাকছে। বড়বৌ পূজার ফুল তুলতে চলে গেছে। বৃদ্ধ মানুষটি সূর্যোদয় দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। কতকাল যেন—কত দীর্ঘকাল যেন সূর্যোদয় দেখেননি, কতকাল তিনি যেন এমন পাখির কলবর শুনতে পাননি। কামরাঙা গাছটার নিচে তিনি সোনা, লালটু, পলটুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। সূর্য উঠলেই বলতে হবে—সূর্যোদয় হচ্ছে। তিনি এই যে সূর্য, আলোর দেবতা, ঈশ্বরের অংশ, ঈশ্বর জনে জনে ফুলে ফুলে বিরাজমান—সর্বত্র তিনি, তিনি এক এবং বহু, তিনি সীমাসংখ্যার অতীত, মহাবিশ্বের তিনিই সব—তাঁর সেই আলোর দূতকে স্বাগত জানাবেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার সুর্যোদয়ের কথা তাঁকে আর বলতে হল না। তিনি নিজেই যেন টের পাচ্ছেন সূর্য আকাশে উঠে আসছে। কুয়াশার জল কামরাঙা গাছ থেকে টুপটাপ ঝরছিল। লাল নীল পাখির পালক উড়ছিল। ফ্লানেলের জামা গায়ে খড়ম পায়ে বৃদ্ধ মানুষটি সূর্য উঠতেই দু’হাত তুলে প্রণাম করলেন। মহাবিশ্বে আমরা সামান্য মানুষ। তুমি মানুষের জরাজীর্ণ জীবনকে আলোকিত কর। রোগ শোক সব হরণ করে নাও।

    সূর্যোদয়ে এত রহস্য আছে সোনার জানা ছিল না। সেও ঠাকুরদার দেখাদেখি সূর্যকে প্রণাম করল এবং ঠাকুবদার সঙ্গে গলা মিলিয়ে সূর্যস্তব পাঠ করল।

    শচীন্দ্রনাথের অন্য কিছু কাজ ছিল। মাঠে ঈশমকে নিয়ে নেমে যেতে হবে। গৌর সরকার সীমানা ভেঙে দিচ্ছে জমির। এসব দেখার জন্য, আর বোধ হয় ঘটনাটা মামলাবাজ গৌর সরকারকে একটু সমঝে দেবার জন্য তিনি দ্রুত মাঠে নেমে যাবেন স্থির করেছিলেন। উত্তেজনায় রাতে শচীন্দ্রনাথের ঘুম হয়নি, কারণ মাটির মতো ভালোবাসার সামগ্রী আর কি আছে!

    সূর্য আকাশে উঠে গেছে। মনে হল বৃদ্ধের এখন আর কোনও অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। সূর্যের উত্তাপে শরীরের ভিতর প্রাণের আবেগ—সেই যৌবনের মতো অথবা শৈশবের মতো মনে হয়, তিনি এখন একা একা, কেউ কিছু বলে না দিলেও কোথায় কোনদিকে গেলে গোপাট পড়বে, কোনদিকে গেলে পুকুরপাড়ের প্রিয় অর্জুন গাছটা পড়বে এবং নদী আর কতদূর, কতটা মাঠ এগুতে পারলে সোনালী বালির নদীর চর, চরে এখন তরমুজের লতা কত বড়, কত সবুজ সব লতাপাতা তিনি চোখ বুজে বলে দিতে পারেন। তিনি যেন বলতে চাইলেন, শচি, তুমি মাঠে নাইমা যাইতে চাও–যাও, আমার জন্য তোমার কোন চিন্তার কারণ নাই। আমি একলা মানুষ। সংসারে এই তো হয়—স্ত্রী-পুত্র এত, তবু নিজেকে কেবল একা মনে হয়। তিনি শচীন্দ্রনাথকে শুধু বলেছিলেন, সে যেন মাঠে যাবার আগে তাঁর চাঁদির বাঁধানো লাঠিটা দিয়ে যায়। কতকাল আগে, তখন প্রৌঢ় মহেন্দ্রনাথের কি দাপট! তিনি চাঁদির বাঁধানো লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে গ্রাম মাঠ পার হয়ে চলে গেছেন। সেই মানুষ কতকাল ঘরের বার হননি। প্ৰায় অথব এখন তিনি। কিন্তু কথা আছে এ-সালে তিনি দেহরক্ষা করবেন। কুষ্ঠী ঠিকুজি এবং রাশিফল এমনই সব বলছে। শীতকালে বুড়ো মানুষের মৃত্যুভয় অসীম। কার্তিকের টান, বড় টান। কার্তিকের টান বানের জলের মতো। গ্রাম মাঠ সাফ করে বুড়ো মানুষদের নিয়ে যায়। ঠিক সেই সময়ে একদিন তাঁর সন্তান ভূপেন্দ্রনাথ বলেছিল, বাবা, এবারে চন্দ্রায়ণটা কইরা ফেলি।

    তিনি পুত্রের ইচ্ছার কথা ধরতে পেরেছিলেন। বয়স হয়েছে। কার্তিকের টানে বড় কষ্ট পাচ্ছিলেন। দ্বাদশ ব্রাহ্মণ ভোজন এবং চন্দ্রায়ণ করালে পাপ খণ্ডন হবে। পাপ খণ্ডন হলেই এই সংসার থেকে মুক্তি। তখন বায়ুতে পঞ্চভূত হয়ে আত্মাটা মিশে যাবে। তিনি ভূপেন্দ্রনাথের কথায় রুষ্ট হয়েছিলেন।—আমার ত যাওয়নের সময় হয় নাই। হইলে টের পামু। তোমাগ ঘণ্টা বাজাইতে হইব না।

    আর শীতের মাঝামাঝিতে মনে হল মহেন্দ্রনাথ আবার তাজা হয়ে যাচ্ছেন। এবং কানে যেন ভালো শুনতে পাচ্ছেন। শরীরের জড়তা ক্রমশ উবে যাচ্ছে। এখন তিনি বিছানাতে ওঠা বসা করতে পারেন। হাঁটা চলা করতে পারেন। আর মনে হল তিনি ফের শতবর্ষ বাঁচার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।

    তিনি এবার তাঁর তিন নাতিকে উদ্দেশ করে-বড় কচিকাঁচা বয়স ওদের, তাঁর সন্তানেরা সবই শেষ বয়সের, প্রথম দিকে কোনও সন্তানাদি হবে না বলেই ঠিক ছিল, তিন নাতিকে উদ্দেশ করে কিছু বলতে গিয়ে এমন সব ছবি মনে পড়ে গেল তাঁর। তিনি বললেন, আমার মাঠে নাইমা যাইতে ইচ্ছা হয়। তোমরা আমারে মাঠে নিয়া যাইবা?

    এই কথায় তিন নাতিকে বড় উৎফুল্ল দেখাল। ওরা ঠাকুরদার এমন একটা অভিপ্রায় জেনে আনন্দে উৎফুল্ল। এখনও সূর্য উপরে উঠে আসেনি।

    পলটুর হাত ধরে মহেন্দ্রনাথ গোপাটে যাচ্ছেন। লালটু আগে আগে হাঁটছে। সোনা পিছনে পিছনে হাঁটছে। ঠাকুরদার হাতে চাঁদি বাঁধানো লাঠি। লাঠির মুখটা সোনাব্যাঙের মাথা যেন। চোখ বোজা, কান খাড়া, কোনও-কোনও সময় মনে হয় শজারুর মুখের মতো লাঠির মাথাটা হাঁ করা। মহেন্দ্রনাথ লাঠিটা ডান হাতে ভালো করে ধরলেন। তিনি যেন এখন সব কিছু দেখতে পাচ্ছেন, সেই প্রৌঢ় বয়সের মতো। কোথাও একটা শ্বেতজবা ফুটে আছে। তিনি বললেন,দ্যাখ ত পলটু, মনে হয় গাছে একটা জবা ফুল ফুইটা আছে।

    লালটু বলল, আছে।

    লালটু পলটু সোনা অবাক। হ্যাঁ, গাছে মাত্র একটা শ্বেতজবা ফুটে আছে।

    সোনা বলল, ঠাকুরদা স্থলপদ্ম গাছটায় ফুল হইছে।

    —অসময়ে ফুল। বলে তিনি পুকুরপাড় ধরে নেমে যাবার সময় বললেন, তরা আমারে তেঁতুল গাছটার নিচে নিয়া আইলি!

    ওরা ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অন্ধ মানুষকে যেমন সবাই ধরাধরি করে পথ পার করে দেয় তেমনি এই তিন নাবালক মহেন্দ্রনাথকে মাঠের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পুকুরপাড় ধরে হাঁটার সময় তিনি প্রায় এক-এক করে সব গাছের নাম বলে যাচ্ছিলেন। কখনও কদবেল গাছ অথবা কখনও জামরুল গাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছেন, বলে দিতে পারছেন। যেতে যেতে সহসা তিনি থেমে পড়লেন। বললেন, জলে একটা বোয়াল মাছ ভাইসা আছে।

    ওরা দেখল, হ্যাঁ, পুকুরের জলে বড় একটা বোয়াল মাছ ভেসে দাম খাচ্ছে। সোনা বলল, দ্যাখি আপনের চোখ দুইটা। বাবায় আইলে কইয়া দিমু, আপনে মিছা কথা কন। চক্ষে দ্যাখতে পান ঠিক। মহেন্দ্রনাথ সোনার কথা শুনে হাসলেন। তিনি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে মাছের গন্ধ পাচ্ছিলেন, এবার লাঠি ঠুকে ঠুকে জায়গাটাকে চেনার জন্য বললেন, তরা বড় জামগাছটার নিচে নিয়া আইছস্!

    তিনজন ওরা এবার একসঙ্গে হেসে উঠল। বলল, ঠাকুরদা কইতে পারল না।

    মহেন্দ্রনাথ আরও সামান্য সময় চিন্তা করলেন। কতদিন পর ঘর থেকে বের হয়েছেন, সূর্যোদয় দেখবেন বলে। আর নিজের এই বাসভূমি যা তিনি তিলেতিলে অর্জন করেছেন, যে ভালোবাসা তাঁকে এখনও ঈশ্বরের সংসারে ডুবে যেতে দেয় না, সেই জগৎ এত অপরিচিত হয়ে গেল! তিনি এমন ভুল বলে ফেললেন! প্রায় শতবর্ষের অভিজ্ঞতা এই মাটি এবং মানুষ সম্পর্কে—তিনি এই তিন নাবালকের কাছে কিছুতেই হার স্বীকার করতে চাইলেন না। তিনি স্মৃতির ভিতর ডুবে মণিমাণিক্য অনুসন্ধানের মতো কোথায় কোন গাছের পরে কি গাছ ছিল, কখন কোন গাছ ছিল, কখন কোন গাছ তিনি কেটে ফেলেছেন—সব মনে-মনে অনুসন্ধান করে বেড়ালেন। তেঁতুল গাছটার পর জামরুল গাছের পাতার গন্ধ আসছিল নাকে, তারপর মনে হল রোদ মাথায় মুখে—তবে বড় জামগাছটা হবে ঠিক। কিন্তু নাতিরা তাঁর যেভাবে হেসে উড়িয়ে দিল তাতে তিনি বড় মুষড়ে পড়েছেন। নাকে বড়-বড় শ্বাস টানলেন—যদি নিঃশ্বাসে কোনও অন্য কোন পরিচিত গন্ধ ভেসে আসে। যদি তাঁর জল মাটির জন্য ভালোবাসা তাঁকে ফের অন্তর্যামী করে তোলে।

    এবার মহেন্দ্রনাথ বললেন, খেজুর গাছের নিচে আইছি।

    নাবালক তিন নাতি আরও জোরে হেসে উঠল। ঠাকুরদাকে নিয়ে এবার তারা খেলায় মেতে গেল। ‘সেই যেন চোর-চোর খেলা। ঠাকুরদা অন্ধ। অন্ধ বলেই ওরা ধরে নিল ঠাকুরদার চোখ বাঁধা। ওরা ঠাকুরদার চারপাশে চোর-চোর খেলছিল অথবা চোর চোর বলে চিৎকার করছিল—ঠাকুরদা ওদের ছুঁতে পারছেন না। ওরা ঠাকুরদাকে নিয়ে শক্ত খেলায় মেতেছে। ওরা এবার ঠাকুরদাকে সামনের মাঠে নিয়ে যাবে এবং যেতে যেতে বলবে, আপনি কোথায়? ঠাকুরদা বলবেন, আমি খামার বাড়িতে। তারপর ওরা যতদূর হেঁটে যাবে, উত্তরে, দক্ষিণে যেদিকে চোখ যায়—ফের এক প্রশ্ন, আমরা কোথায়? তিনি যেন বলবেন, আমরা ভিটা জমির ওপর। খেলার মতো ঘটনাটা হয়ে গেল। এমন খেলা বুঝি হয় না। ওরা প্রশ্ন করছিল আর বিজ্ঞের মতো ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে উত্তরের প্রত্যাশা করছিল। সোনা কেবল হরিণ শিশুর মতো ঠাকুরদার চারপাশে লাফাচ্ছে। ঠাকুরদা ঠিক বলতে পারলেই আবার টেনে নিয়ে যাওয়া রথের মতো—ওরা এক পুরনো রথ যেন ভালোবাসার পথ ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

    জরাজীর্ণ রথটি পথের ওপর অতিকায় এক বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছিল। হাতে লাঠি, গায়ে শাল, মাথায় লাল টুপি এবং হাতে শীতের দস্তানা। তিনি গরম মোজা পায়ে দিয়েছেন, পায়ে সাদা কেডস জুতো—তিনি হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলেন, তাঁর প্রিয় নাবালকেরা কোথায় তাঁকে টেনে নিয়ে এসেছে। তিনি একবার ভাবলেন ডেকে বলবেন, দ্যাখ বৌমারা, তোমার পোলারা আমারে কই লইয়া যইতাছে। কিন্তু বলতে পারলেন না। কেমন যেন পুকুরপাড়ে নেমে এসে তিনি মজা পেয়ে গেছেন। তিনি চুপচাপ লাঠিটা ঝোপে-জঙ্গলে ঠুকে ঠুকে এগুতে থাকলেন। এক সময় মনে হল লাঠিতে শক্ত একটা কিছু ঠেকছে। এতক্ষণে মনে হল তিনি বড় জামগাছটা কেটে একটা অর্জুন গাছ লাগিয়েছিলেন। ওঁর মুখ চোখ এবার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল—তোমরা আমারে অর্জুন গাছটার নিচে নিয়া আইছ।

    ঠাকুরদা এবার ঠিক বলে ফেলেছেন। সোনা মনে মনে চাইছিল, ঠাকুরদা ঠিক-ঠিক বলে ফেলুক। কারণ তিনি যে ভাবে নিরালম্ব মানুষের মতো এই পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং বড়দা মেজদা যে-ভাবে ঠাকুরদাকে হেনস্থা করছে—তাতে ওঁর কষ্টটা কেবল বাড়ছিল। যেই সঠিক বলে ফেলেছেন, যেই তিনি বুঝতে পেরেছেন ওঁকে অন্য পথে পুকুরের পাড়ে নিয়ে আসা হয়েছে এবং মুখে নাবালকের মতোই যখন আর গর্বের অন্ত নেই, তখন সোনা আনন্দে একটা লাফ না দিয়ে থাকতে পারল না; যেন উত্তরটা মহেন্দ্রনাথ দেয়নি, উত্তরটা সোনা দিয়েছে।

    ওরা মহেন্দ্রনাথকে আরও টেনে নামাতে চাইলে তিনি বললেন, আমি আর যামু না। আমারে তোমরা ঝোপে-জঙ্গলে নিয়া যাইতে চাও! বান্দরের মতো নাচাইতে চাও! আমি নাচমু না। বলে তিনি অর্জুন গাছটার নিচে বসে পড়লেন। দুর্বাঘাস ছিল কিছু, রোদ এসে পড়েছে কখন। ঘাসে কোনও শিশিরবিন্দু ছিল না। বসে পড়ে তিনি চারধারে কি খুঁজতে থাকলেন।

    সোনা বলল, কি খোঁজেন।

    —আমারে।

    সোনা বুঝতে পারল না কথাটা।

    —আমারে খুঁজি। আমারে তোমরা এইখান রাইখা দিয়। তারপর তিনি কি ভেবে চুপ করে গেলেন। হয়তো তাঁর এই তিন নাতি ওঁর এই প্রিয় স্থানটুকুর খবর রাখে না। তিনি মাটির ওপর ফের ভালোবাসার হাত রাখলেন। সব ছেলেদেরই বলে রেখেছেন, তাঁর এই ভালোবাসার মাটিতে তাঁকে যেন দাহ করা হয়। তিনি নিজেই স্থানটি নির্বাচন করে রাখার সময় স্মারক হিসাবে অর্জুন গাছ লাগিয়েছেন।

    সূর্যের আলো গাছের মাথায় পড়ায় বেশ উষ্ণ মনে হচ্ছিল চারিদিকটা। মাঠে মেলার গরু নেমে যাচ্ছে। কিছু গাছের ছায়া ইতস্তত পাড়ে-পাড়ে। বুড়ো মানুষ মহেন্দ্রনাথ পা ছড়িয়ে নাতিদের নিয়ে অর্জুন গাছের নিচে বসে রয়েছেন। দেখলে মনে হয় চোখ বুজে কিছু ভাবছেন। বোধ হয় স্মৃতিতে তাঁর একমাত্র পাগল ছেলের জন্য কষ্ট। তিনি পলটুর মাথায় হাত রেখে বললেন, পড়াশুনা কইর। বাবারে কষ্ট দিয় না।

    মাঠে আবেদালির বিবির কবরটা দেখা যাচ্ছে। কবরের পাশে তিনটে জিয়ল গাছ পোঁতা। একটা মোরগ কবরটার ওপর এক পায়ে দাঁড়িয়ে শীতের সূর্যকে দেখছে। আর এই জলালিকে নিয়ে পাগল ঠাকুর গত রাতে ফিরে এসেছেন। মণীন্দ্রনাথ, বড় ছেলে তাঁর, পাগল ছেলে, সে এখন কোথায় কে জানে!

    পলটু কোনও উত্তর করল না। বাপ সম্পর্কে পলটুর একটা অসম্ভব রকমের অবজ্ঞা আছে। সে বাপের সঙ্গে কোথাও যায় না। বরং সোনার সঙ্গে ভাব বেশি। পলটু অন্য কথায় এল। সে বলল, চলেন, ঠাকুরদা, আমরা গোপাটে নাইমা যাই।

    মহেন্দ্রনাথ পলটুর কথা শুনেও শুনলেন না। তিনি এখন অন্য কথা ভাবছিলেন। জালালি জলে ডুবে মরেছে। কবরে একটা মোরগ উত্তর-দক্ষিণ ঘুরছে। আর সূর্যের উত্তাপ সমানভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছিল। গতকাল পার্বণের দিন গেছে। পূজার শেষে বলির বাজনা যেন থামছে না। আর অঞ্চলের বয়সী মানুষটি এখন তাঁর প্রিয় মাটিটুকুর উপর বসে আছেন। এখানেই তিনি চিরকালের মতো মহানিদ্রায় মগ্ন হবেন। এখানেই তাঁর দেহ সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসবে—চোখের উপর তিনি দৃশ্যটা ঝুলতে দেখলেন। ছেলেরা চারপাশে ঘিরে থাকবে, গ্রামের পর গ্রাম থেকে লোক জড়ো হবে—অঞ্চলের মানুষেরা হরিসংকীর্তন করবে, চন্দনের কাঠ পুড়বে, ঘৃত-দধি দুগ্ধ ঢেলে দেওয়া হবে, তার ভিতরে তিনি যজ্ঞের হবির মতো জ্বলতে থাকবেন। এবং তাঁর পাগল ছেলে তখন অর্জুন গাছটায় হেলান দিয়ে জ্বলন্ত মানুষটাকে দেখতে দেখতে দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠবে। সহসা এই পাগুল পুত্রের মুখ তাঁকে কেমন বিষণ্ণ করে দিল। পাগল পুত্র চিতার আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন নালিশ–বাবা, আপনি আমার সর্বনাশ করেছেন। আপনি আমার সব ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছেন। আপনার ধর্মবোধ আমার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি এক পাগল, আমার চিন্তাশক্তি নাই, আমার পাগল চিন্তার সমভাগী হতে কেউ চায় না—কেবল যেন মনে হয় মাথার ভিতর এক স্বপ্ন নিরালম্ব মানুষের মতো পাক খাচ্ছে, কেবল কে যেন সেই স্বপ্নের ভিতর চলে যেতে থাকে। আপনি সেই মানুষ, আত্মার কাছাকাছি আমার যে যুবতী ছিল, যুবতীর নাম পলিন, উঁচু লম্বা এবং নীল চোখ তার, তাকে আপনি দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। সমুদ্র আমি দেখিনি বাবা, কিন্তু বসন্তের আকাশ দেখেছি, আকাশের নিচে সোনালী বালির নদীর জল, জলে তার মুখ ভাসে। আকাশের কোনও বড় নক্ষত্র অন্ধকারে জলে প্রতিবিম্ব ফেললে মনে হয়, সেই মেয়ে কত দূরদেশ থেকে ডাকছে, মণি, যাবে না? উইলো ঝোপের পাশে বসে আমরা দুজনে সান্তাক্লজের গল্প করব। তুমি যাবে না? আর দেখছি শীতের মাঠে ঘাসে ঘাসে কত শিশিরবিন্দু। শিশিরবিন্দুর মতো সেই পবিত্র মুখ আপনি কেড়ে নিয়েছেন বাবা। নালিশ দিতে দিতে চিতার আগুনের দিকে তাকিয়ে বিদ্বান বুদ্ধিমান পাগল ছেলে হাউহাউ করে কাঁদছে।

    মহেন্দ্রনাথ লাঠিটা এবার আরও জোরে চেপে ধরলেন। মনের ভিতর কতকাল থেকে অনুশোচনা। মৃত্যুর জন্য যত প্রস্তুত হচ্ছেন ততই পাগল ছেলের জন্য অনুশোচনা বাড়ছে। তত তিনি নিজেকে অসহায় ভাবছেন। তাঁর কেন জানি মনে হয়, আর দেরি করে লাভ নেই। তাড়াতাড়ি চন্দ্রায়ণটা করে ফেলতে হয়। দ্বাদশ ব্রাহ্মণভোজনের ব্যবস্থা করতে হয়। ব্রাহ্মণ খাইয়ে প্রায়শ্চিত্তটা সেরে ফেললেই—সংসার থেকে চিরদিনের জন্য নির্বাসনের দলিলটা মিলে যাবে। ঈশ্বরে সমর্পিত প্রাণ আর সাংসারিক দুঃখবোধে পীড়িত না হলেই যেন ভালো হয়। তিনি পলটুকে বললেন, আমারে ঘরে নিয়া যা। বলে তিনি পলটুর কাঁধে ঘরে ফেরার জন্য হাত রাখলেন।

    বস্তুত তিনি নিজের সংসারে ফিরতে চাইলেন। ওরাই যেন তাঁকে তাঁর নির্দিষ্ট ঘরটিতে পৌঁছে দেবে। যে-ঘর থেকে একদা সূর্যোদয় দেখবেন বলে বের হয়েছিলেন, ঠিক সেই ঘরে। অন্ধকার ঘর, বায়ুশূন্য এবং মাঝে মাঝে ঝিল্লির ডাক শোনা যায়—কেম নিঃশব্দ এবং নির্জন, পাশে কেউ নেই। সব শূন্য। একটা শূন্যের মতো বায়ুশূন্য ঘরে ফের ফিরে যাওয়া। তিনি চোখ বুজলে তেমন একটা আলোহীন বায়ুহীন ঘরের দৃশ্য দেখতে পান।

    কিন্তু দুষ্ট বালকদের মতলব বোঝা দায়। ওরা ওদের ঠাকুরদাকে নিয়ে বেশ রঙ্গ-তামাশা আরম্ভ করে দিল। ওরা ওদের প্রিয় ঠাকুরদাকে ধরে নিয়ে যেতে থাকল। গোপাট পার হয়ে অশ্বত্থ গাছের নিচটাতে এসে দাঁড়াল তারা। ওরা মহেন্দ্রনাথকে গাছতলায় ছেড়ে দিয়ে বলল, এবারে কন ত কোনখানে আইছেন?

    বৃদ্ধ তাদের খুব অনুনয়-বিনয় করতে থাকলেন—কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন ওদের হাতে যখন পড়েছেন, তখন তাঁর হেনস্থার শেষ নেই। ওরা ওঁকে নিয়ে খেলায় মেতে গেছে। ওরা ওঁকে ঝোপে-জঙ্গলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। তিনি প্রায় করজোড়ে বললেন ওদের, সোনাভাই, ধনভাই, বড়ভাই, তোমরা বড় লক্ষ্মী পোলা। তোমরা আমারে ঘরে নিয়া যাও।

    সোনা বলল, ঠাকুরদা, ডর নাই। টোডারবাগের বটগাছটার নিচে আইছি। লালটু বলল, আমরা আপনের লগে মাঠ পলান্তি খেলুম। বলেই ওরা মহেন্দ্রনাথকে গাছের নিচে ধীরে ধীরে বসিয়ে দিল। যেন মহেন্দ্রনাথ ওদের সমবয়সী বন্ধু। তারপর ওরা ছুটে ছুটে বেড়ালো—চিৎকার করে সবাইকে যেন বলতে চাইল—রাজা হুই গাছের নিচে বইসা আছে। রাজারে ছুঁইয়া দিলেই জিত! মহেন্দ্ৰনাথ এমন খেলায় ঘরের কথা ভুলে গেলেন। গাছের ডালে পাখি, পাখিরা সব কলরব করছে। কোথাও দূরে গরু-বাছুরের ডাক, অনেক দূরে কে যেন কাঠ কাটছে। আর অনেক দূর দিয়ে কে যেন হেঁটে চলে যায়। বুঝি সেই পাগল ছেলে। আর মনে হল তাঁর, চারপাশে প্রকৃতির কোলে সেই এক শৈশব ঘুরে ফিরে আসে। তিনি লাঠি কোলে রেখে বসে আছেন। স্থির। প্রায় বুদ্ধমূর্তির মতো চোখ বুজে তিনি বসে আছেন। দূরে সোনালী বালির নদীর জলে নৌকা ভাসে, পাল তোলা নৌকার খুঁটিতে নীল রঙের পাখি—তিনি বসে বসে সেই শৈশবকে যেন দেখতে পাচ্ছেন, শৈশব ঘুরে ফিরে চলে আসে, সেই এক নাও নদী ধরে যায়, পাশে সেই এক লাল নীল পাখি উড়ে উড়ে আসে। তাঁর চারপাশে শৈশব এখন খেলা করে বেড়াচ্ছে। তিনি পুরানো শৈশবের প্রতীক। ওরা এখন গান গাইছে মাঠে, লুকোচুরির গান। গ্রামের অন্য সব বালক বলিকা এই খেলায় ভিড়ে গেছে। সুভাষ, কিরণী, কালাপাহাড় এমনকি টোডারবাগ থেকে ছোট্ট ফতিমা পর্যন্ত নেমে এসেছে।

    মহেন্দ্রনাথের চোখে এখন আর পাগলপুত্রের মুখ ভাসছে না। কারণ,সংসারে সুখ সব সময় থাকে না। সংসারে দুঃখও সব সময় ভাসে না। শুধু এক দূরের শৈশব বারবার এই প্রকৃতির কোলে ঘুরে ফিরে চলে আসে। তিনি মনে মনে নিজের সেই হরানো শৈশবকে ফিরে পাবার জন্য গুনগুন করে লুকোচুরি গান গাইতে থাকলেন। শৈশব বুঝি মাথার উপরের বটবৃক্ষ অত বড় ছিল না। তবু তিনি তাঁর শৈশবের সাঙ্গোপাঙ্গদের গাছের নিচে দেখতে পেলেন। ওর খেলা করে বেড়াচ্ছে। এবং তিনি যে গান গাইছিলেন, সেই গান সমস্বরে ওরা গেয়ে চলেছে। কিন্তু সময় বড় সামান্য। কত আর সময় হবে—তাঁর মনে হল সহসা, ওরা কেউ বেঁচে নেই, ওরা এই বটবৃক্ষের নিচে কী করে আর ফিরে আসবে। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। ভিতর থেকে কে যেন কেবল বলছে, তারা কেউ বেঁচে নেই, একা তুমি পুরী পাহারা দিচ্ছ। যেন এতদিনে ধরতে পারলেন এই গাছপালা পাখির ভিতর তিনি আর কেউ নন। তিনি পরিত্যক্ত মানুষ সবুজ বনে মৃত বৃক্ষের মতো তিনি জায়গা দখল করে আছেন। অথবা জীর্ণ মঠের মতো, মঠ থেকে সন্ন্যাসী পুণ্য করতে তীর্থে বের হয়ে গেছেন। তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। একা একা সবার অলক্ষ্যে তিনি নদীর দিকে পাগলের মতো নেমে যেতে থাকলেন।

    সোনা-ই প্রথমে চিৎকার করে উঠল, ঠাকুরদা গাছতলাতে নাই।

    ওরা সকলে এত মশগুল ছিল খেলাতে, ঝোপে-জঙ্গলে ওরা এত বেশি ছুটছিল যে, টেরই পায়নি কখন বুড়ো মানুষটা নদীর দিকে নেমে গেছেন। ওরা সবাই এবার গ্রামের দিকে চিৎকার করে বলতে বলতে উঠে আসছে—ঠাকুরদা হারাইয়া গেছে। গাছতলাতে নাই, কোনখানে নাই।

    .

    ঈশম চরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল। চারদিকে তরমুজের লতা। হলুদ রঙের ফুল। বড় বড় লতার ফঁকে ফাঁকে উটপাখির ডিমের মতো তরমুজ। যেন এক অতিকায় উটপাখি এই বালির চরে ডিম পেড়ে রেখে গেছে। কালো কুচকুচে রঙ। এবার শীত যেতে-না-যেতেই তরমুজে ছেয়ে গেল। মেলায় এবার অনেক তরমুজ যাবে। ছোটঠাকুর ব্যাপারীর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। তিনি আল নিয়ে মামলা করবেন ভেবে বাড়ি থেকে নেমে এসেছিলেন। পথে ব্যাপারীর সঙ্গে দেখা। তিনি জমিতে চলে এলেন। এসে তাজ্জব বনে গেলেন। ঈশম ওকে একবারও বলেনি, ফলন এত ভালো হয়েছে। ক’দিনের ভিতর জমিটার চেহারা পাল্টে গেছে। মেলায় যাবে তরমুজ। কাল পরশু থেকে এই পথে অথবা চরের পাশ দিয়ে বড় বড় ঘোড়া উঠে যাবে। মেলায় ঘোড়দৌড় হবে। সোনালী বালির নদীতে পাল তুলে নৌকা যেতে আরম্ভ করেছে। এ মাসটাই নৌকা চলবে। তারপর জল কমে গেলে পারাপার করতে হাঁটু জল থাকে। ঈশম জমি থেকে এক দুই করে তরমুজ সংগ্রহ করছে।

    ঈশম ছুটে যাচ্ছে। পাতার ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখছে। তারপর টোকা মারছে। ডাঁসা তরমুজ খেতে স্বাদের হয়। সে টোকা দিয়ে বুঝতে পারে কোন তরমুজ জমি থেকে তুলে নেবার সময় হয়েছে। এক-একটা তরমুজ বিশ-ত্রিশ সের ওজনের। সে একসঙ্গে দুটো তুলে আনতে পারছে না। এমন কি কোনও কোনও তরমুজ সে বুকের কাছে তুলে প্রায় যেন পাঁজাকোলে নিয়ে আসছে। সে ছইয়ের পাশে এক-দুই করে তরমুজ জড়ো করার সময়ই দেখল, এদিকে একটা মানুষ টলতে টলতে নেমে আসছে। কত লোকই আসে! সে ভলো করে লক্ষ করেনি। নিবিষ্ট মনে সে শুধু তরমুজ জড়ো করছে। তার যেন হাতে সময় নেই। সময় চলে যাচ্ছে। সে দূরে দেখল বাতাসে তরমুজের পাতা ফাঁক হয়ে যাচ্ছে, ফাঁক হয়ে গেলেই বড় একটা তরমুজের পিঠ সে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল। বাতাস আর নেই। কাছে গিয়ে দেখল বড় বড় পাতা তরমুজটাকে ঢেকে দিয়েছে। সে চারিদিকে চোখ মেলে খুঁজতে থাকল। পাতার ভিতর পড়ে থাকলে টের পাওয়া যায় না। তরমুজ ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। সে আর একবার বাতাসের জন্য অপেক্ষা করল। বাতাস উঠলেই পাতার ফাঁকে তরমুজটা সে দেখে ফেলবে—এই ভেবে চোখ তুলতেই দেখল, মানুষটা দু’বার আছাড় খেয়েছে, দু’বার উঠে দাঁড়িয়েছে। টলছে। কে এই মানুষ! শীতের রোদে পাগলের মতো নদীর দিকে নেমে আসছে। সে ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝল, আরে এ যে সেই মানুষ, সে ছুটতে থাকল। নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এত সাহস হল কী করে, চোখে দেখতে পায় না, তাজ্জব। মানুষটা লাঠি ঘুরিয়ে যেন তার যৌবনকাল, যেন বাতাসের সঙ্গে মানুষটা লড়ছে, লাঠি ঘোরাচ্ছে, দ্যাখো, আমি মহেন্দ্রনাথ এখনও কতদূর হেঁটে যেতে পারি, দ্যাখো, আমি মহেন্দ্ৰনাথ কতকাল এই মাটিতে বসবাস করছি, এখন কিনা আমার পোলারা কয় চন্দ্রায়ণ করেন বাবা। কি সাহস! মানুষটা লাঠি ঘুরিয়ে হাঁটতে গিয়ে বার বার মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন। আর একটু হলেই গড়িয়ে গিয়ে নদীর জলে পড়বেন। ঈশম ছুটতে ছুটতে গিয়ে ধরে ফেলল। তারপর পাঁজাকোলে তুলে নিতেই দেখল, হাত পা ছিঁড়ে গেছে। রক্ত পড়ছে। এমন কেন করছেন তিনি! এখন যেন ঠিক একটা পতুলের মতো মুখ—মানুষটার, সেই জবরদস্ত চেহারা নেই। একেবারে ছোট মানুষ হয়ে গেছেন। ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদছেন।

    —আপনের কি হইছে কর্তা! কোনদিকে যাইবেন ঠিক করছেন।

    —আমারে তুই কই লইয়া যাইতাছস?

    —বাড়ি যাইবেন।

    –বাড়ি! বৃদ্ধ এবার চোখ বুজে ফেললেন। তিনি এটা কী করতে যাচ্ছিলেন! তিনি তাঁর বড় ছেলের মতো নিরুদ্দেশে হাঁটছিলেন কেন! মনের ভিতর কিসের এই অনুতাপ। নিজের ছেলেমানুষীর জন্য কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।-আমারে নামাইয়া দে।

    —শরীর কি হইছে দ্যাখছেন?

    —কি হইছে?

    ঈশম ইচ্ছা করেই চুপ করে থাকল। শরীরে রক্ত নেই বোঝা যাচ্ছে। কোনও কোনও জায়গা কেটে গেছে অথচ রক্তপাত হচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি পুকুরপাড়ে উঠলেই সকলে ছুটে এল। সেই বৃদ্ধ মানুষ, আলখাল্লা পরা মানুষ, অঞ্চলের সর্বশেষ মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেছিল। তিনি সকলকে অন্তত এমনই বললেন।

  • আঠার

    আঠার

    এ-ভাবেই শেষে মেলার দিন এসে গেল। ঘোড়া উঠে আসতে আরম্ভ করল এক দুই করে। গোপাট ঘরে বড় বড় ঘোড়া চলে যাচ্ছে। মাসাধিককাল মেলা। শনিবারে ঘৌড়দৌড় হবে। গলায় ঘণ্টা বাজলে মানুষেরা মাঠে নেমে ঘোড়া দেখে, কার ঘোড়া যায়। নয়াপাড়ার ঘোড়া কি বিশ্বাসপাড়ার ঘোড়া! মাঠে ঘোড়ার মুখ ভাসলেই মানুষগুলি ঘোড়া যায় বলে চিৎকার করতে থাকে।

    মেলায় যাবে সকলে। রঞ্জিত যাবে, মালতী যাবে। আবু, শোভা যাবে। ছোট ঠাকুর যাবেন। তরমুজ যাবে নৌকায়। এখন নৌকায় তরমুজ বোঝাই হচ্ছে। যাবে না শুধু সোনা। লালটু পলটু পর্যন্ত জামা পরে ঠিক হয়ে আছে, সূর্য উঠলেই ওরা হাঁটতে শুরু করবে। সোনা যাবে না, কারণ সোনার এতদূর হেঁটে যেতে কষ্ট হবে। এতদূর হেঁটে যেতে পারবে না।

    সোনা বারান্দায় বসে আছে। সে সব কিছু দেখছে এবং মনে মনে অভিমানে ভেঙে পড়ছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। ছোটকাকা না বললে সে মেলাতে যেতে পারবে না। বাড়ির কেউ সাহস করে কাকাকে বলতে পারছে না। সোনা মাকে সকাল থেকে বায়না করছে, আমি যামু, তুমি ছোট কাকাকে কও, আমি যামু। মা পর্যন্ত সাহস পায়নি বলতে। ধনবৌ গতকাল একবার বলেছিল, সোনা যদি মেলায় যায়। ছোটকাকা ধনবৌকে মেলার ভিড়ের কথা বলেছিল, এতদূর সে যেতে পারবে না হেঁটে, এসব বলেছিল। আর ধনবৌ বলতে সাহস পায়নি।

    সোনা থামে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সব কিছু দেখছে, এবং লালটু পলটু পাটভাঙা প্যান্ট জামা পরে ছুটোছুটি করছে, দেখতে পেয়ে ভ্যাক করে কেঁদে দিল। যত সকলের সময় হয়ে যাচ্ছে মাঠে নেমে যাবার, তত সে ভেঙে পড়ল। কারণ শেষ পর্যন্ত আশা ছিল ছোটকাকা তাকে কাঁদতে দেখে মেলায় যেতে বলবে।

    ঈশম আসছিল তরমুজ মাথায় করে। সে এত বড় একটা তরমুজ আবিষ্কার করে অবাক। প্ৰায় এক মণের চেয়ে বেশি ওজন। সে তরমুজটা নৌকায় তুলে দেয়নি। বাড়িতে নিয়ে এসেছে। সবাইকে কেটে কেটে খেতে বলবে। আর কাটলেই ভিতরে লাল রঙ, কালো বীচি, বসন্তকালে এই তরমুজের রস শরবতের মতো। সে উঠোনে উঠেই ডাকল, সোনাবাবু কই গ। দাওটা আনেন।

    রঞ্জিত ছিল উঠোনে দাঁড়িয়ে। শোবা আবু এসেছে উঠোনে। মালতী এসেছে। যারা মেলায় যাবে তারা সবাই উঠোনে ভিড় করছে। গাঁয়ের নিচে পথ, পথ ধরে মানুষেরা সার বেঁধে মেলায় যেতে আরম্ভ করছে। সবাই মেলায় যাবে, যাবে না শুধু সোনা। সে ঈশমের ডাক শুনতে পেয়েছে। কিন্তু উঠোনে নেমে গেল না। থামে হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শুধু।

    রঞ্জিতকে বলল ঈশম, দ্যান, কাইটা সকলেরে দ্যান।

    ঈশম বড় দুটো কলাপাতা কেটে আনল। প্রথম তরমুজ, ঠাকুরের জন্য কিছুটা আলাদা করে রাখা হয়েছে। বাকিটা রঞ্জিত কেটে সবাইকে দিল। দেবার সময় ঈশম বলল, সোনাবাবু কৈ? তাইনরে

    দ্যাখতাছি না।

    লালটু বলল, সোনা কানতাছে।

    —কান্দে ক্যান!

    –মেলায় যাইব বইলা।

    —আপনেরা যাইবেন, সোনাবাবু যাইব না?

    —ছোটকাকায় না করছে।

    —না করলেই হইব। বলে সে ভিতরে ঢুকে ডাকল, সোনাবাবু কই! কেডা কইছে আপনে মেলায় যাইবেন না! আমি আপনেরে মেলায় লইয়া যামু। কার সাধ্য আছে না করে দ্যাখি।

    ছোটকাকা বললেন, এতদূর হাঁইটা যাইতে পারব না। কে অরে কোলে নিয়া হাঁটব?

    —আমি হাঁটমু। চলেন কর্তা।

    যেন সহসা আকাশের সব মেঘ কেটে গেল। সোনার কি যেন হারিয়ে গিয়েছিল, সহসা মিলে গেছে। সে মাকে বলল, মা আমারে ছোটকাকায় যাইতে কইছে। ঈশম দাদা আমারে লইয়া যাইব। সোনা ছুটে ছুটে সকলকে বলতে থাকে। ঠাকুমাকে বলল, ঠাকুরদাকে বলল, আমি মেলাতে যামু। ঈশম দাদা আমারে লইয়া যাইবে। মেলায় যাবার নামে সে প্রায় আত্মহারা হয়ে গেল। এ যেন এক জীবন, মেলা, বানি, নদীনালা সব মিলে মানুষের প্রাণে এক বন্যা বয়ে আনে। রহস্যটা এতদিনে সোনা জানতে পারবে। মেলাতে কি রহস্য, কারা জাগে মেলাতে, ঘোড়দৌড় হলে বাজি জেতার জন্য সবাই আকুল হয় কেন—এসব মনে হচ্ছিল সোনার। সোনা ঈশমের হাত ধরে সবার আগে আগে মাঠে নেমে গেল। কিছু হেঁটে কিছু কাঁধে চড়ে এবং যখনই সোনা আর হাঁটতে পারছিল না, ঈশম কাঁধে তুলে নিচ্ছে। বেশিদূর যেতে না যেতেই বালিয়াপাড়া পার হলে নদীর পাড়ে সোনা জলছত্র দেখল। তারপর গাছের নিচে, সারি সারি হিজল গাছের নিচে সোনা বিন্নির খৈ এবং লাল বাতাসা দেখল। দু’পয়সার বিন্নির খৈ, এক পয়সার বাতাসা কিনে দিল ঈশম। ছোটকাকা থাকলে কিছুতেই খেতে পারত না, খেতে দিত না। কেউ কেউ আগে উঠে গেছে। সোনা দু’পকেটে বিন্নির খৈ রেখেছে, ঠোঙাতে বাতাসা। সে হাঁটছিল আর বিন্নির খৈ খাচ্ছিল। খেতে খেতেই দেখল বড় মাঠে তাঁবু পড়েছে। তাঁবুর মাথায় পতাকা উড়ছে। যজ্ঞেশ্বরের মন্দির দেখা যাচ্ছে। অশ্বত্থ গাছ ফুঁড়ে মন্দিরের ত্রিশূল আকাশের দিকে উঠে গেছে। আর সারি সারি ঘোড়া দরগার জমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেউ তালপাতার বাঁশি বাজাচ্ছে। নদীতে কত নৌকা লেগে রয়েছে। ওদের একটা নৌকা আসবে। তরমুজের নৌকা। নদীনালা ঘুরে আসতে সময় লেগে যাবে।

    রঞ্জিতের একটা দল আসবে নারায়ণগঞ্জ থেকে। এই মেলাতে দলটা ছোরা খেলা, লাঠি খেলা দেখাবে। ভুজঙ্গ, গোপাল দুদিন আগে মেলায় চলে গেছে। তাঁবু ফেলতে হবে। ছোট ছোট, এই তের চোদ্দ বছরের মেয়েরা আসবে, সাদা ফ্রক গায়ে, কালো প্যান্ট পরে এবং পায়ে কেডস জুতো। কথা ছিল, বাবুদের কাছারি বাড়িতে ওরা থাকবে। সমিতির নির্দেশে এইসব হচ্ছে। রঞ্জিত এমনভাবে চলাফেরা করছে, দলটার সঙ্গে তার যেন কোনও সম্পর্ক নেই। বরং ভুজঙ্গই সব করছিল।

    মালতী ঠিক যজ্ঞেশ্বরের মন্দিরে উঠে যাবার মুখেই দেখল, জব্বর ইস্তাহার বিলি করছে মেলাতে। সে মালতী দিদিকে দেখে এক গাল হেসে দিল।–দিদি, আপনে আইছেন। মালতী দেখল, ওর পাশে অপরিচিত দু’চারজন মুসলমান পুরুষ, মালতী ভয়ে হাসতে পারল না। একবার ইচ্ছা হল জানতে, মেলায় সামু এসেছে কিনা, কিন্তু জব্বরের দু’পাশের লোকগুলি এমনভাবে তাকাচ্ছিল যে, সে কিছুতেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নদী থেকে স্নান করে আসতে হবে। কিছু ফুল বেলপাতা তিল তুলসী লাগবে—মালতী সোজা মন্দিরে উঠে গেল।

    আর তখনই একটা বাচ্চা ছেলে, ছেলের বয়স আর কত হবে, মেলায় হারিয়ে গিয়েছে। হাতে তার একটা ছোট্ট ছাগশিশু। দিদি গেছে স্নান করতে নদীর ঘাটে। ওকে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে—দিদি আসবে, এলেই মন্দিরে উঠে যাবে।

    সংসারে তখন জ্বালা যন্ত্রণার কথা উঠেছে। ভিতরে এক মন আছে মানুষের, পাগলের মতো সেই মন নদী দেখলে কেবল উথালপাথাল করে। মেলায় এমন কত সুন্দরী হিন্দু মেয়েদের ভিড়। স্নান করে উঠে এলে, ভিজে কাপড়ে উঠে এলে, কী যে দেখায়, যুবতী মেয়ের সর্ব অঙ্গে কালসাপ যেন, কেবল দেখলেই ছোবল মারতে ইচ্ছা যায়। স্থির থাকা যায় না।

    গোপালদির বাবুদের ছেলেরা গোটা মেলাতে ভলান্টিয়ার দিয়েছে।—ওহে মানব জাতির সন্তানেরা, মিলেমিশে থাক, কুকাজ করলে ধরে বেঁধে নিয়ে যাব। জলছত্র দিয়েছে। কেউ হারিয়ে গেলে তার সন্ধান দিচ্ছে। ব্যজ পরা বাবুদের ছেলেরা কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে দিকে দিকে খবর নিয়ে যাবার সময়ই শুনল, কে কার স্তন টিপে দিয়েছে। যুবককে ধরে ফেলেছে। লুঙ্গি পরা, গলায় গামছা বাঁধা, বগলে পাচনের লাঠি, মাতব্বর মানুষের মতো মেলা দেখতে এসেছিল। লোভে, যখন ভিড়, স্নানের ঘাটে ভিড়, তখন পরিচিত মেয়ের স্তনে হাত দিলে সব গোপন করে রাখবে—কিন্তু হিন্দু নারী, সে তার মানসম্মানের জন্য বোকার মতো হাউহাউ করে কেঁদে দিল। বাবুদের এক ছেলে দেখে ফেলেছে। কড়া নজর সবদিকে। মুঠিতে ধরে পাছায় এক ধাঁই করে লাথি মারল। সঙ্গে সঙ্গে মেলায় খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কিছু বলতে সাহস করছে না। দরগার ঘোড়াগুলি ঘাস খাচ্ছে। বিকেল হলে মাঠে নেমে যাবে। কত বড় প্রশস্ত মাঠ। দুরে দূরে সব লাল নীল নিশান উড়ছে। দুটো একটা ঘোড়া, বোধ হয় মুড়াপাড়ার সুরেশবাবুর ঘোড়াটা এখন ধু ধু মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সাদা রঙের ঘোড়া তীরবেগে ছুটে আসছিল।

    আর তীরবেগে ছুটে যাচ্ছিল জব্বর। সে দেখল তার স্বজাতিকে টেনে বেঁধে নিয়ে কাছারি বাড়িতে তোলা হচ্ছে। কেউ একবার মুখ ফুটে কিছু বলছে না। তার স্বজাতিরা মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। সে প্রায় যেন যোজন দূরে লাফ মেরে যেতে পারে, তেমনি লাফ দিয়ে ছুটে গেল এবং ভিড়ের ভিতর পড়ে হুংকার দিয়ে উঠল, কই লইয়া যান অরে।

    কে একজন বলল, কাছারি বাড়ি।।

    —হ্যায় কি করছে!

    —স্তন টিপা দিছে।

    —দিছে ত কি হইছে। বলেই সে ভিড় ঠেলে আরও এগিয়ে গেল। ওর দলটাও এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা সেই যুবকের নাগাল পেল না। একদল ব্যাজ পরা লোক আনোয়ারকে কাছারি বাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। পাছায় লাথি, কিল চড় ঘুষি, হায় আনোয়ার, তোমার মনে যে কি ইচ্ছা, এমন সুন্দর স্তনে, ফোটা পদ্মফুলের মতো স্তনে তুমি নাকি জলের অতলে স্বপ্ন দেখছিলে–যেন এক রূপালী মাছ ভাইস্যা যায়। তুমি খপ করে ধরতে গেছিলে!

    ক্রমে সূর্য নেমে যাচ্ছিল। বড় তাঁবুতে ফরাস পাতা। সেখানে বাবুদের মেয়েরা বসবে। সুন্দর সুন্দর অলঙ্কার গায়ে। দেবীর মতো মুখ। ঝলমল চোখে ঘোড়দৌড় দেখবে। অথবা নদীতে যে হাজার নৌকা ভেসে রয়েছে—সেই সব নৌকা থেকে দাসদাসী উঠে এলে মেলাময় আনন্দ, দরগা থেকে তখন এক দুই করে ঘোড়া ঠিক এই তাঁবুর নিচে প্রথম নেমে আসবে, বাবুদের প্রথম সেলাম দিয়ে কদম দিতে দিতে মাঠে নেমে যাবে—যেন আমরা এসেছি দুর দেশ থেকে, বাজি জিতে আমরা চলে যাব, আপনারা মেহেরবান লোক, আপনাদের এই মাঠে ঘোড়া ছোটাব। বাজি জিতব। বলে ঘোড়াটার খেলা দেখাতে শুরু করেছিল। এক দুই করে ঘোড়া তার পা তুলে বাবুদের ছোট ছোট মেয়েদের নাচ দেখাচ্ছিল।

    তখন মেলাতে দুটো দল। কাছারি বাড়িতে হিন্দু যুবকেরা উঠে গেছে। নিচে মুসলমান যুবকেরা। পুলিশ এসেছে। ওরা বাবুদের সপক্ষে কথা বলছিল। আইন আছে। বিচার আছে। থানায় চালান দেওয়া হবে।

    কিন্তু কে কার কথা শোনে! কাছারি বাড়ি ভেঙে আনোয়ারকে ওরা কেড়ে নিতে গেলে বাবুদের বন্দুক গর্জে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া নাচছিল দুরে, সেই ঘোড়া ভয় পেয়ে ছুটতে থাকল। যে যেদিকে পারছে ছুটতে থাকল। ঈশম তরমুজ বিক্রি করছিল। সোনা লালটু পলটু সার্কাসের তাঁবুতে বাঘ সিংহের খেলা দেখছে। ব্যাগপাইপ বাজছিল, বাঘটা থাবা চাটছে। উঁচু রিঙে একটি ফুটফুটে মেয়ে খেলা দেখাচ্ছে, তখন সেই বন্দুকের গর্জনে সারা মেলাটায় কিরকম যেন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল।

    দুটো লাশ পড়ে গেছে। ক্রমে অন্ধকার মশালের আলো দেখা যেতে লাগল। কাছারি বাড়িতে বাবুদের মেয়েরা উঠে গেছে। দরগা থেকে সব ঘোড়া এক এক করে নেমে আসছে। সহিসের হাতে মশাল। মেলাময় মশাল জ্বলছে। মাঝে মাঝে আল্লা হো আকবর ধ্বনি উঠছিল। কাছারি বাড়িতে হিন্দুরা প্রাণ রক্ষার্থে চিৎকার করছে, বন্দে মাতরম্।

    কে কোথায় ছিটকে পড়ছে বোঝা যাচ্ছে না। সোনা, লালটু, পলটুকে তাঁবুর ভিতর বসিয়ে দিয়ে ঈশম চলে এসেছিল। সার্কাস ভেঙে গেলে ওরা ঈশমের কাছে চলে আসবে এমন ঠিক ছিল। ঈশম মেলাতে দাঙ্গা বাঁধতেই সার্কাসের তাঁবুর দিকে ছুটে যাচ্ছে। অন্ধকার হয়ে গেছে। লোকজন যে যেদিকে পারছে ছুটছে। সেই ছোট্ট ছাগশিশু এবং বাচ্চাটা কারা চেপ্টে দিয়ে চলে গেছে। দিদির আশায় সে দাঁড়িয়েছিল, দিদি এলেই মন্দিরে উঠে যাবে। যখন ঘটনাটা ঘটে দুপুর হবে, আর এই দুপুর থেকেই গুঞ্জন। ক্রমে ক্রমে জব্বর এলে সেই গুঞ্জন বাড়তে থাকে—সবাই ভেবেছিল, মেলাতে বান্নিতে এমন হামেশাই ঘটে। মাতব্বর মানুষেরা এসে সব মিটমাট করে দেয়, কিন্তু তাজ্জব এই জব্বর—সে সকলকে বলছিল, আপনেগ ইজ্জত নাই। আপনেরা গরু ঘোড়া আর কতদিন হইয়া থাকবেন। ঠিক সামুর গলার স্বরে সে চিৎকার করছিল। এত মানুষজন দেখে ওর কেমন জুস এসে গেছিল ভিতরে। সে এবার নিজেকে, সে যে কত বড়, এবং ইচ্ছা করলে কি না করতে পারে, বলে আনোয়ারকে কেড়ে নেবার জন্য কাছারি বাড়িতে উঠে যাবার সময় দেখল বন্দুক গর্জে উঠছে। সে এতটা আশাই করতে পারেনি। পর পর দুটো লাশ ওর সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল। আগুন জ্বলতে কতক্ষণ। এবার যেন সকলে মশালে আগুন জ্বালিয়ে ছুটে আসবে এবং সব তছনছ করে কাছে পিঠে যার যা কিছু অমূল্য মনে হবে ফেলে মাঠের ভিতর দৌড়াতে থাকবে।

    ঈশমও সাকার্সের তাঁবুর দিকে ছুটছে। হায় গেল, সব গেল! সে চিৎকার করে ডাকছে। সোনাবাবু! তাঁবুর সামনে এসে দেখল, তাঁবু আর নেই। সব তছনছ করে দিয়েছে। তাঁবুর একটা দিকে আগুন জ্বলছে বাঘ সিংহ ঝলসে যাচ্ছে। কাছে কোথাও কোনও লোকজন নেই। যেন নিমেষে সব লুঠপাট করে তুলে নিয়ে গেছে কারা

    ঈশম কি করবে স্থির করতে পারছে না। সে বড় মুখ করে সোনাবাবুকে নিয়ে এসেছে। হায়, কি হবে! সে আকুল হতে থাকল। আর পাগলের মতো কাছারি বাড়ির দিকে উঠে যাবে ভাবল। কিন্তু কাছে গিয়ে মনে হল—বাবুরা যে-ভাবে রুখে আছে ওর পরনে লুঙ্গি, সে কিছুতেই আর সে দিকে যেতে সাহস পেল না। তারপর মনে হল তিন নাবালক এদিকে ছুটে আসতে পারে না। কারণ ওরা পথ হারিয়ে ঠিক যেখানে সে তরমুজ বিক্রি করছিল সেদিকেই ছুটে যাবে। সে আর দাঁড়াল না। গোটা মেলাটা ক্ষেপে গেছে। চারপাশে আগুন। এই আগুন যেন কতকাল থেকে মাটির ভিতর এতদিন আত্মগোপন করেছিল। কত দিনের অপমান এইসব মানুষ হজম করে এখন বদলা নিচ্ছে। সে কী করবে ভেবে পেল না। আগুনের ভিতর দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকল, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন গ। লালটুবাবু। আমি গাঁয়ে ফিরমু কি কইরা। মুখ দ্যাখামু কি কইরা! সে পাগলের মতো আগুনের ভিতর কেবল ডাকতে লাগল। সে ডাকতে ডাকতে ছুটছিল। চারধারে কাচ ভাঙা, কাচের চুড়ি ভেঙে পথটা লাল নীল সবুজ মিহিদানার মতো পথ, পথে ছুটতে গিয়ে ওর হাতপা কেটে যাচ্ছে। ওর হুঁশ ছিল না। ওরা হয়তো গাছের নিচে ওর জন্য দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু হায়, এসে দেখল সেখানে কেউ নেই। শুধু বড় বড় তরমুজ চারদিকে কারা ছড়িয়ে দিয়ে মাঠের অন্ধকারে মিশে গেছে। তরমুজে সব চাপ চাপ রক্ত। ওর শরীর শিউরে উঠল। পাগলের মতো হেঁকে উঠল, কেডা আমার মানুষ কাইড়া নিছ কও! বলে সেও উন্মত্ত মেলাতে কাদের হত্যা করার জন্য ছুটে গেল। সে ফাঁকা মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে উন্মত্তপ্রায় চিৎকার করে ডাকতে থাকল, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন। রা করেন। কোন্ আনধাইরে লুকাইয়া আছেন কন, আমি ঈশম। আমি, সোনাবাবু বাড়ি নিয়া যামু। আপনেরে বাড়ি নিয়া না যাইতে পারলে আমার জাত মান কুল সব যাইব।

    ঘোড়াগুলি দ্রুতবেগে ছুটছে। যেসব ঘোড়া দরগায় ছিল তারা প্রায় সকলে জব্বরের হয়ে যেন লড়ছে। এটা যে কী করে হয়ে গেল—দোকানপাট লুঠ, মনিহারি দোকান, কাপড়ের দোকান এবং কামার কুমোরেরা এসেছে হাঁড়ি-কলসী, দা-বঁটি নিয়ে—সে সবও লুঠপাট হচ্ছিল। সার্কাসের তাঁবু থেকে দু-তিনটে মেয়ে উধাও হয়ে গেল। এবং মানুষেরা নদীর পাড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সামনের বড় বড় সব তরমুজের নৌকা, হাঁড়ি পাতিলের নৌকা, আর কিছুই টের পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু জলের ভিতর হাহাকারের শব্দ। কেউ কোনওদিকে তাকাচ্ছে না। যে যার প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে। ঘোড়ার পায়ের নিচে অথবা আগুনের ভিতর কার কখন প্রাণ যায় বোঝা দায়। সড়কি, বর্শা, সুপুরির শলা হাজার হাজার দু’দলের ভিতর কোথা থেকে সহসা আমদানি হয়ে গেল। যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। দীঘির দু’পাড়ে দু’দল অন্ধকারে প্রতীক্ষা করছে। রাত বাড়লেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

    রঞ্জিত বিকেলের দিকেই প্রথম আঁচ পেয়েছিল। সে তার দলবল নিয়ে কাছারি বাড়িতে উঠে গেল। এখন সোনা লালটু পলটু আর মালতীকে খুঁজে বের করতে হবে। মেলাতে এলে মালতী অধিক সময় মন্দিরে কাটায়। সে ওদের কাছারি বাড়ি তুলে দিয়ে প্রথম মালতীর খোঁজে চলে গেল। মালতী ঠিক যেখানে বড় একটা মঠ আছে, মঠের দরজায় যেখানে ভিড়, ভিড়ের ভিতর মালতী পূজা দেখার জন্য প্রায় যেন হামাগুড়ি দিচ্ছে। রঞ্জিত আঁচল ধরে ফেলল। বলল, শোভা আবু কোথায়?

    —ওরা মন্দিরে আছে।

    —ওদের নিয়ে চলে এস।

    মালতী ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে।

    রঞ্জিত বলল, দেরি করো না। আমি সার্কাসের তাঁবুতে যাচ্ছি। ঈশমকে খবর দিতে হবে। অনেক কাজ। মেলায় গণ্ডগোল হতে পারে।

    রঞ্জিত হনহন করে হাঁটছে। দিঘির এ-পাড়ে রকমারি কাচের চুড়ির দোকান। তারপর ফুল ফলের দোকান। তারপর বিন্নির খৈ। মিষ্টির দোকান কত! তেলেভাজার দোকানগুলি পার হয়ে এলেই ফাঁকা মাঠ। মাঠে এখন তাঁবুর ভিতর গোপালদির বাবুরা বসে আছে। এই মাঠ পার হলে সাকার্সের তাঁবু, দুটো ছোট বড় সার্কাস। রঞ্জিত টিকিট কিনে দিয়েছে। ঈশম ওদের বসিয়ে দিয়ে বের হয়ে এলে কথা ছিল—সার্কাস দেখা শেষ হলে যেখানে ঈশম তরমুজ বিক্রি করবে সেখানে সবাই চলে যাবে। রঞ্জিত দেরি করতে পারল না। এখানে সে ছদ্মবেশী মানুষ। তার পরিচয়ের জন্য লোক হাঁটাহাঁটি করতে শুরু করেছে। সে যতটা পারল দ্রুত সার্কাসের তাঁবুতে ঢুকে যাবার জন্য হাঁটতে থাকল। জিলিপির দোকান থেকে তখনও একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এমন কুৎসিত আকার নেবে মেলাটা অন্তত জিলিপি ভাজার মনোরম গন্ধ থেকে তা টের পাওয়া যায়নি। কেবল রঞ্জিত এবং অন্য কেউ বুঝি ভেবেছিল—সময়টা দুঃসময়। মেলা ছেড়ে এখন যা . যার মতো ফেরা দরকার।

    মেলাতে শচীন্দ্রনাথের আসার কথা ছিল। তিনি এলে এই জব্বরকে কব্জা করতে পারতেন। শচীন্দ্রনাথকে জব্বর ভয় পায়। কারণ আবেদালির সুখে-দুঃখে শচীন্দ্রনাথ আত্মীয়ের মতো। রঞ্জিত হাঁটতে হাঁটতে এসব ভাবল। সে সার্কাসের তাঁবুতে আসতেই দেখল, সার্কাস ভেঙে গেছে। গণ্ডগোলের আঁচটা ওরাও টের পেয়েছে। সব খেলা না দেখিয়ে, বাঘের খাঁচায় বাঘ, সিংহের খাঁচায় সিংহ পুরে দিল। রঞ্জিত গেটের সামেন ওদের তিনজনকে দেখে বলল, তোমাদের আর ওদিকে যেতে হবে না। আগে তোমাদের কাছারি বাড়ি দিয়ে আসি। রঞ্জিত ভেবেছিল, ওদের কাছারি বাড়ি তুলে দিয়ে ঈশমকে খবর দেবে এবং ঈশমকে সব তরমুজ নৌকায় তুলে দিতে বলবে। কাছারি বাড়ি পর্যন্ত রঞ্জিত যেতে পারল না। সূর্য অস্ত যাচ্ছে তখন—বন্দুকের গর্জন, এবং হল্লা। মানুষজন নিহত হচ্ছে।

    রঞ্জিত তাড়াতাড়ি একটু পিছনের দিকে হেঁটে গেল। ওর মনে পড়ে গেল মালতীকে সে বলে এসেছে, সার্কাসের তাঁবুর গেটে সে থাকবে। তাড়াতাড়ি সে তাঁবুর গেটে এসে দাঁড়াতেই দেখল, পেছনের দিকটায় কে তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে এই বালকদের নিয়ে কী করবে! মালতী এখনও আসছে না, অথবা মালতী কী ওদের না দেখে ফের মন্দিরে চলে গেছে। এখন তো হাতে প্রাণ—কখন প্রাণ যায়, আর মালতীর মতো সুন্দরী যুবতী—সে এবার কেমন আকুল হয়ে ওদের নিয়ে সোজা মন্দিরের দিকে ছুটে গেল। সোনা ঠিক কিছুই বুঝতে পারছে না। সহসা কেন এমন হল! যেন পঙ্গপালের মতো সব মানুষ নদীর দিকে ছুটে যাচ্ছে। সে দেখল আবু একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সোনা বলল, মামা ঐ দ্যাখেন আবু।

    রঞ্জিত বলল, তোর পিসি কোথায়?

    আবু কাঁদছিল শুধু। বুঝল আবু এই মেলাতে হারিয়ে গেছে। এখন আর মালতীকে খোঁজা অর্থহীন। ওর বুকটা কেঁপে উঠল। ওদের কোনও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে না দিতে পারলে সে স্বস্তি পাচ্ছে না। কিন্তু কীভাবে কাছারি বাড়ির দিকে উঠে যাওয়া যায়। সে পিছনের দিকে তাকাতেই দেখল—আগুন জ্বলছে। একমাত্র নদীর দিকেই নেমে যাওয়া যেতে পারে। নৌকা আছে। তরমুজের নৌকা। সে ওদের নিয়ে ছুটতে থাকল। অন্ধকার হয়ে গেছে। মানুষজন সব আর চেনা যাচ্ছিল না। মাঝে মাঝে দূরের আগুন সহসা হল্কা ছাড়লে কিছু কিছু মুখ দেখা যাচ্ছে। নির্বিচারে হিন্দু-মুসলমান—এদিকটাতে মিলেমিশে আছে। সবাই প্রাণের দায়ে নিরাপদ স্থানের জন্য ছুটছিল।

    রঞ্জিত দেখল নৌকাটা কে আলগা করে দিয়েছে। একটু দূরে ভেসে রয়েছে। সে জলে ঝাঁপ দিল। এবং মাঝ নদী থেকে নৌকা আনার জন্য সাঁতরাতে থাকলে দেখল, জলের ওপর কি সব ভেসে রয়েছে। সে বুঝতে পারল সেই ভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা জলে ভেসে রয়েছে। আগুন থেকে এবং হত্যা থেকে প্রাণ রক্ষার্থে ডুবে ডুবে নদী পার হচ্ছে। সে দেখল কিছু কিছু নৌকা তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে। সে আর দেরি করল না। নৌকায় উঠে গেল। এবং মনে হল তার কিছু আবছা মতো মানুষের আভাস সেই নৌকায়

    রঞ্জিত চিৎকার করে উঠল, তোমরা কে?

    কোনও শব্দ ভেসে আসছে না।

    —কে তোমরা?

    এবার বুঝি গলা চিনতে পেরে মালতী কেঁদে ফেলল, আমি মালতী।

    —তুমি! পাশে কে?

    —শোভা, আবুরে পাইতেছি না।

    এখন আর কথা বলার সময় নয়। নৌকাটা তীরের দিকে টেনে নিয়ে যাবার সময় বলল, আবুকে পাওয়া গেছে। আর সোনা লালটু সবাই পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর একটু থেমে বলল, বৈঠা দেখছি না, লগি নেই—কোথায় গেল সব!

    মালতী কোনও জবাব দিল না। তার এখন আর কোনও ভয় নেই। সে প্রাণপণে রঞ্জিতকে সাহায্য করার জন্য হাতে জল টানছিল। নৌকা পাড়ে এলে রঞ্জিত অন্ধকারে দেখল সেই মশালের আগুন এদিকেই ছুটে আসছে। সর্বনাশ, ওরা টের পেয়েছে আত্মরক্ষার্থে নদীর জলে মানুষ ভেসে পার হয়ে যাচ্ছে ওপারে। সে এ-মুহূর্তে কি করবে ভাবতে পারল না। মনে হচ্ছে নিশ্চিত হত্যা—নির্বিচারে হত্যা। সে সোনার চোখ দেখল। সোনা কিছুই বুঝতে পারছে না যেন। এমন একটা হাসিখুশির মেলা, মেলাতে কত পাখি উড়ে এসেছে, কত রঙ-বেরঙের ঘোড়া, তালপাতার বাঁশি, তিলাকদমা, বাতাসা, কী সুন্দর সব লাল-নীল নিশান উড়ছিল-এখন সেসবের কিছু নেই—কী করে তছনছ হয়ে গেল—শুধু চারদিকে আগুন জ্বলছে। মাঠে সেই সব অশ্বারোহী পুরুষ–কদম দিচ্ছে। হাতে মশাল। মশালের আলোতে মৃত্যুর কাছাকাছি যে মানুষ তাদের মুখ দেখার বাসনা। সবাই উঠে এলে রঞ্জিত জোরে নৌকাটা নদীতে ঠেলে দিল। তারপর প্রাণপণে সবাই জল টানতে থাকল হাতে। তরমুজের নৌকা, রঞ্জিত এক দুই করে সব তরমুজ জলে ফেলে পাড়ের দিকে ভাসিয়ে দিতে থাকল। অন্ধকারে এইসব তরমুজ জলে ভেসেছিল। জলে ভেসে ভেসে মানুষের মাথার মতো কত শত মানুষ জলে মুখ ডুবিয়ে পৈশাচিক উল্লাস থেকে আত্মরক্ষা করছে। আর ঠিক মাঝ নদীতে এসেই মনে হল সেই মশাল হাতে দলটা মাঠ শেষ করে নদীর কাছাকাছি এসে যাচ্ছে। ওরা যদি দেখতে পায়, বর্শা ছুঁড়ে দিতে পারে। অথবা জল সাঁতরে চলে আসতে পারে। সে সবাইকে এবার নৌকা থেকে জলে নামিয়ে দিল। তারপর নৌকাটা জলে কাৎ করে রাখল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে—খালি একটা নৌকা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। বরং কাছেপিঠে যেসব তরমুজ ভেসে যাচ্ছে অন্ধকারে ওরা সেইসব তরমুজ মানুষের মাথা ভেবে যে যার বল্লম অথবা শলা ছুঁড়ে দিলেই হাত খালি হয়ে যাবে, তখন আর নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না, মাঠে উঠে যাবে। ওরা নৌকার ওপাশে শরীর লুকিয়ে জলের ভিতর মাছ হয়ে থাকবে এবং সন্তর্পণে নৌকাটাকে টেনে ওপারে নিতে পারলেই যেন ভয়ডর কেটে যাবে। ওরা নৌকাটাকে গুণ টানার মতো নিয়ে যাবে তারপর।

    মালতী একপাশে। মাঝে সোনা লালটু পলটু এবং আবু শোভা–শেষ মাথায় রঞ্জিত। শুধু সবার হাতদুটো নৌকার কাঠে। আর গোটা শরীর মুখ নৌকার ছায়ায় আড়াল করা। যেন এই নৌকায় কিছু মানুষজন ছিল, এখন ওরা নদীর জলে ডুবে গেছে। খালি নৌকা কাটা মাথা নিয়ে যায়। দু-চারটে তরমুজ গলুইর ওপর ইতস্তত ছড়নো। অন্ধকারে এমন একটা দৃশ্য তৈরি করে রাখল রঞ্জিত।

    কখন কী যেন হয়ে যায় মানুষের ভিতর। যারা ঘোড়ায় চড়ে এই হত্যাকাণ্ডে মেতে গেছে, রঞ্জিত জানে—ওরা, ঘরে বিবি বেটা রেখে এসেছে। বাজি জিতে গেলে পালা-পার্বণের মতো উৎসব লেগে যাবে। গ্রামে গ্রামে সেই বাজি জেতার মেডেল গলায় ঝুলিয়ে মানুষের কাছে দোয়া ভিক্ষা করবে। এখন দেখলে কে বলবে—এরাই সেইসব মানুষ। অন্ধকারের ফাঁক থেকে সে দেখল, ওদের হাতে সুপারির শলা, যেন এক হত্যার খেলায় মেতে গেছে। ওরা সুপারির শলা, বল্লম সেইসব তরমুজের বুকে সড়কির মতো গেঁথে দিতে থাকল আর উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। ওরা কাফের হত্যা করছিল।

    আর তখন এক মানুষ নদীর পাড়ে পাড়ে যায়। অন্ধকারে সে মানুষটা ডাকছে, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন গ।

    অন্ধকার থেকে সাড়শব্দ আসছে না।

    দূরে তখন নৌকা ভাসিয়েছে রঞ্জিত। ওরা পাড়ে উঠে এবার ছুটতে থাকবে।

    মানুষটা ডাকছিল, আমি কারে লইয়া ঘরে ফিরমু। মানুষটা এ-পারে ডাকছে। ও-পারের মাঠে তখন ছুটতে গিয়ে আছাড় খেল সোনা। দূর থেকে, অনেক দূর থেকে কে যেন তাকে ডাকছে। সোনা ডাকল,

    মামা! আমারে কে ডাকে!

    রঞ্জিত অন্ধকার মাঠে ওকে কোলে তুলে নিল। বলল, কথা বলো না। ছোটো। সে ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, সামনে হিন্দুগ্রাম পড়বে। সেখানে রাত কাটাতে হবে। অন্ধকারে মালতীকে নিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছে না। সারারাত না হেঁটে সামনের গ্রামে সে আশ্রয় নেবে ভাবল।

    মানুষটার ডাক ক্রমে কেমন ক্ষীণ হতে হতে এক সময় বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। সোনাবাবু আছেন? আমি ঈশম। আমি কারে লইয়া বাড়ি যাই কন!

    সোনার বার বার মনে হচ্ছিল, ওকে কে নদীর ওপারে ডাকছে! কে যেন এই নদীর পাড়ে পাড়ে ওকে অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে সেই গলার স্বর সে কিছুতেই চিনতে পারছে না। সে ভয়ে পড়ি মরি করে ছুটতে থাকল। ভয়, নিশিটিশি হতে পারে। তাকে নিশিতে ডাকছে।

  • উনিশ

    উনিশ

    মেলার দাঙ্গা মেলাতেই শেষ হয়ে গেল। ঈশম বাড়ি ফিরে এসেছিল সকলের শেষে। শীর্ণ চেহারা, দুর্বল। দেখলে মনে হবে, শরীর থেকে প্রাণপাখি উড়ে গেছে। সে সেই যে ডাকছিল, মাঠে মাঠে নদীর পাড়ে, ডাক আর থামেনি। কেমন চোখ ঘোলা—যেন সে কোনও নাবালককে হত্যা করে ফিরছে। কে যেন বলল, ঈশমকে দেখে এসেছে বিলের পাড়ে বসে বিড়বিড় করে কি বকছে। শচীন্দ্রনাথ আর দেরি করেন নি। মেলার দাঙ্গা এদিকে ছড়ায়নি। রাতে রাতে শেষ হয়ে গেছে। রূপগঞ্জ থেকে একদল পুলিশ নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চে একদল আর্ম পুলিশ এসে শেষপর্যন্ত দাঙ্গা আয়ত্তে এনেছে। মাতব্বর মানুষেরা আবার সবাইকে মিলেমিশে থাকতে বলে ভাবল—যাক, এবারের মতো ফয়সালা হয়ে গেল। সামু খবর পেয়ে ঢাকা থেকে ছুটে এসেছে। বিলের পাড়ে যাবার সময় সামুর সঙ্গে শচীন্দ্রনাথের দেখা – সামু বলল কর্তা কৈ যান?

    —যামু ফাওসার বিলে।

    —এই সকাল সকাল!

    —ঈশমটা ত ফিরে নাই। দাঙ্গাতে ঈশম বুঝি গ্যাল মনে হইল। এখন শুনতাছি ঈশম বিলের পাড়ে দুই দিন ধইরা বইসা আছে।

    শচীন্দ্রনথ ঈশমকে প্রায় বিলের পাড় থেকে ধরে এনেছিলেন। চোখমুখ দেখলে আর বিশ্বাসই করা যায় না এই সেই ঈশম। সোনা লালটু পলটু ঈশমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওদের দেখে ওর কেমন শরীর কাঁপছিল। সে হাসতে পারল না। সে যেন বিশ্বাস করতে পারল না—ওরা ফিরে আসতে পারে। সে নাবালকদের মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, বাবু আপনেরা বাইচ্যা আছেন। বাবু গ, বলে তার ভিতর থেকে কেমন কান্নার আবেগ উঠে আসছিল।

    শচীন্দ্রনাথ ধমক দিলেন।—এই, ওঠ। যা, এখন সান কইরা খা। তারপর ঘুমাইবি। তরমুজ খেতে আজ আর নাইমা যাইতে হইব না। তোমরাও যাও। অরে একটু বিশ্রাম নিতে দ্যাও, বলে সোনা লালটু পলটুকে বৈঠকখানার ঘর থেকে নেমে যেতে বললেন। ওরা নেমে না গেলে ঈশম সারাদিন ওদের সামনে বসে থাকবে এবং পাগলের মতো হাউমাউ করে আবেগে সুখের কান্না কাঁদতে থাকবে।

    মেলা থেকে মালতীও ফিরে এসে কেমন ভয়ে দিন কাটাতে থাকল। রাত হলে সে ঘরের বার হতো না। কুপি জ্বেলে বসে থাকত। রাত হলে শোভা আবুকে বুকে নিয়ে কেবল দুঃস্বপ্ন দেখত। এক একদিন বলার ইচ্ছা হতো, ঠাকুর, আর পারি না। রাইতে ঘুম নাই চোখে, মনে হয় কারা য্যান রাইতে বাড়ির উঠোনে ফিসফিস কইরা কথা কয়। তোমারে ঠাকুর বুঝাইতে পারি না, পরাণে কি জ্বালা। সেই যেন জালালির মতো, জ্বালা সহে না প্রাণে! জ্বালা মরে না জলে। ঠাণ্ডা হাত! উষ্ণ স্পর্শের জন্য মালতীকে কাতর দেখাচ্ছে। অথবা যেন বলার ইচ্ছা, ঠাকুর, আমারে নিয়া, যেদিকে দুই চক্ষু যায়, চইলা যাও। কিন্তু সকাল হলে, যখন টোডারবাগের মাঠে মোরগেরা ডাকে, সূর্য গাবগাছটার ফাঁকে উঁকি মারে তখন কিছু আর মনে থাকে না। তখন মনটা পাগল পাগল লাগে, কোনও ফাঁক-ফিকির খোঁজা, কী করে মানুষটারে দ্যাখা যায়।

    একদিন সে রঞ্জিতকে বলল, আমারে একটা চাকু দিবা ঠাকুর?

    —চাকু দিয়ে কী করবে?

    —আমারে দাও না। কাঠের চাকু দিয়া আর খেলতে ইসছা হয় না।

    —হাত তোমার এখনও ঠিক হয়নি মালতী। ঠিক হলে এনে দেব।

    মালতীর বলার ইচ্ছা হতো, আমার হাত ঠিক নাই কে কয়! তুমি আমারে আইনা দ্যাও, দ্যাখ একবার কি খেলাটা খেলি। বঝি মরণ খেলার সখ। অমূল্যর বড় বেশি বাড় বাড়ছে। রঞ্জিত আসার পর থেকেই অমূল্য কেমন মরিয়া। সে ফাঁক-ফিকিরে আছে, মালতীকে পেলেই সাপটে ধরবে, ঝোপে জঙ্গলে অথবা কবি-গান হলে, যাত্রা গান হলে, যখন কেউ বাড়ি থাকবে না, তখন সাপটে ধরবে। মালতী বাড়ি পাহারা দেবার জন্য শুয়ে থাকে, থাকতে থাকতে দরজায় শব্দ, কে তুমি! আরে কথা কও না ক্যান, দরজা খুইলা চইলা আস, একবার চাঁদের লাখান মুখখানা, বলেই ভিতরে ভিতরে মরণ খেলার জন্য মালতী প্রস্তুত হতে থাকে। তখনই মনে হয় যেন জব্বর দাঁড়িয়ে আছে গাছতলাতে, ইস্তাহার বিলি করছে। বলছে, মালতী দিদি আইলেন। ওর পাশের মানুষগুলি দাঁত বের করে মালতীকে দেখছে। ঠিক এমন একটা ছবি ভাসলেই, ওর বায়না রঞ্জিতের কাছে, ঠাকুর দ্যাও না, বড় একটা চাকু, দিবা আমারে, সূর্য ডুবলে আমার বুকে জল থাকে না।

    দাঙ্গার পর থেকে এই লাঠিখেলা ছোরাখেলা রাতের আঁধারে। অথবা অন্য কোথাও ডে-লাইট জ্বেলে। এবং বড় দালানবাড়ির মাঠকোঠা পার হলে যে নির্জন জায়গা গ্রামের, সেখানে সবাই জমা হতো। এখন আর রঞ্জিত এসব দেখে বেড়ায় না। সে দূরে চলে যায়, কোথায় যায়, কেন যায়, কেউ জানেনা। কবিরাজ এবং গোপাল দেখাশোনা করছে। ফাল্গুন-চৈত্র গেল। বোশেখ মাস বড় গরম। গরমে জ্যোৎস্না উঠলে ডে-লাইট জ্বালা হতো না। অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় খেলা হতো। মুখগুলি তখন ভলো করে যেন চেনা যেত না। মালতী শোভা আবুকে সঙ্গে নিয়ে ঠাকুরবাড়ি চলে আসত। ধনবৌ, বড়বৌ থাকত। পালবাড়ি থেকে সুভাষের মা আসত। হারান পালের বৌ আসত। চন্দদের বড় বড় দুই মেয়ে মতি গগনি আসত। ধীরে ধীরে খেলা জমে উঠলে, সোনাদের নতুন মাস্টারমশাই শশীভূষণ সকলের হাতে ভিজা ছোলা গুড় দিতেন। এই দেশে কোথায় কবে গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে! তিনি ইতিহাসের ছাত্র। যখন স্বাধীনতা আসে, এমন গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। বেধে গেলে এইসব লাঠিখেলা আপন প্রাণ রক্ষার্থে কাজে আসে।

    কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে, দুর্ভিক্ষ হচ্ছে। ঠিক এ-অঞ্চলে বাস করলে টের পাওয়া যায় না। অভাবে অনটনে মানুষ চলে আসছিল, শশীভূষণ এই দলের বুঝি। তিনি চাকুরি নিয়ে চলে এলেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সোনা শশীভূষণের পায়ের কাছে বসে ইতিহাসের গল্প শুনত, ট্রয় যুদ্ধ, ট্রয়ের সেই কাঠের ঘোড়া। শহরের দরজায় কাঠের ঘোড়াটা কারা রেখে গেল। কত বড় ঘোড়া! নগরীর শিশুরা সেই কাঠের ঘোড়ার চারপাশে ঘুরে ঘুরে গান গাইছিল। সেই কাঠের ঘোড়া সমুদ্রের বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে আছে—কী বড় আর উঁচু। এবং ভিতরে হাজার হাজার সৈন্য। সেই ট্রয়ের নগরী এবং সমুদ্রের বালিয়াড়ির কথা মনে হলেই সোনার মনে হয় রাজার এক দেশ আছে। বাবার কাছে সে গল্প শুনেছে। মুড়াপাড়ার বাবুদের বাড়ি নদীর পাড়ে। প্রাসাদের মতো অট্টালিকা। নদীর চরে কাশফুল এবং বড় চর পার হলে পিলখানার মাঠ। মাঠে সব সময় হাতিটা বাঁধা থাকে। বাবুদের মেয়ে অমলা কমলা। কমলা ওর বয়সী মেয়ে। ওরা কলকাতায় থাকে। পূজার সময় ওরা আসে। কেন জানি সোনার ট্রয় নগরীর কাঠের ঘোড়ার কথা মনে হলে নদীর চরে হাতিটার কথা মনে হয়। অমলা কমলার কথা মনে হয়। আর মনে হয় সেই অট্টালিকার মতো প্রাসাদের কথা। বড়দা মেজদা পুজা এলেই যায়। সে যেতে পারে না। মেলা থেকে এসে এবার কেন জানি তার মনে হল, দাদাদের মতো সেও এবার মুড়াপাড়া যেতে পারবে। বাবুদের হাতি, শীতলক্ষ্যা নদী, পিলখানার মাঠ এবং নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই স্টিমারটা দেখতে পাবে। কী আলো, কী আলো! সারা নদী উথালপাথাল করে আলোটা গ্রামের দু’পাশের মাঠে, ঘাসে ঘাসে, নদীর চরে, কাশবনে কিছুক্ষণের জন্য স্থির উজ্জ্বল হয়ে থাকে। সোনা মেলা থেকে এসেই কেন জানি ভাবল সে বড় হয়ে গেছে। সে এবার মুড়াপাড়া দুর্গাপূজা দেখতে যেতে পারবে।

    এই শশীভূষণ ভোর হলে তক্তপোশে বসে থাকতেন। দুলে দুলে কী সব বই পড়তেন। সোনা চেয়ারে বসে পা দোলাত এবং মনোযোগ দিলে ওর পড়া শিখতে বেশি সময় লাগত না। তারপর এদেশে বর্ষকাল এলে নৌকায় করে স্কুল। মাস্টারমশাই কাঠের পাটাতনের মাঝখানে বসে থাকতেন। ঈশম লগি বাইত। ওরা তিন ভাই, গ্রামের আরও চার পাঁচজন ছেলে একসঙ্গে মাস্টারমশাইকে নিয়ে বিদ্যালয়ে চলে যেত।

    বর্ষা এলেই কত শালুক ফুল ফুটে থাকে চারদিকে। তখন এসব অঞ্চলে আর হাতি ঘোড়া উঠে আসতে পারে না। কেবল জল আর জল। ধানের জমি, পাটের জমি। জলে জলে দেশটা ডুবে থাকে। মাছ, ছোট বড় রুপোলী মাছ জলের নিচে। স্ফটিক জল। ধানখেতে পাটখেতে কত রাজ্যের সব পোকামাকড়। ছোট বড় নীল সবুজ রঙের কাঁচপোকার মতো আবার হলুদ রঙ কোনও পোকার! সূর্য উঠলে এই সব পোকামাকড় পাতার নিচে লুকিয়ে থাকে। সোনা নৌকায় উঠলেই কৌটোয় যত সোনাপোকা ধরে আনে। একবার সে একটা আশ্চর্য রকমের পোকা পেয়েছিল—সোনালী রঙের কাঁচপোকা। টিপ দেবার মতো। পোকাটাকে পোকা বলে চেনাই যায় না। মুক্তো বিন্দুর মতো মাঝখানে উজ্জ্বল। চারদিকে তার সোনালী রঙ। কালো একটা বর্ডার দেওয়া, হাত-পা বলে কিছু নেই। সত্যি কপালে টিপ দেবার জন্য যেন এই কাঁচপোকা। সে ফতিমার জন্য কাঁচপোকা কৌটোর ভিতর রেখে দিয়েছিল। কবে ফতিমা আসবে! এখন আর দেখা হয় না। বর্ষা এলে এ-গ্রামে হুট করে চলে আসতে পারে না ফতিমা। সে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে গোপনে কাঁচপোকা ওর স্যুটকেসে তুলে রাখল। বর্ষা শেষ হলে সে ফতিমাকে কপালে টিপের মতো পরিয়ে দেবে।

    সোনা এইসবের ভিতর বড় হতে হতে একদিন দেখল, মেজ জ্যাঠ্যামশাই নৌকা পাঠিয়েছেন। মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে। ছোটকাকা বললেন, সোনা, তুমি যাইবা দুগ্‌গা ঠাকুর দ্যাখতে! কান্দাকাটি কইর না কিন্তু। সোনা এবার দূরদেশে যাবে। আকাশে বাতাসে পূজার বাজনা বেজে উঠল। মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে। অলিমদ্দি বড় একটা মাছ তুলে আনল। সোনা, লালটু, পলটু মাছটাকে টেনে রান্নাঘরে তুলছে। কত বড় মাছ। ওরা তিনজনে নড়াতে পারছে না। বড়বৌ, ধনবৌ মাছটা দেখে তাজ্জব। ঢাইন মাছ! পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ এত বড় মাছটা দেখে উঠোনের ওপর নাচতে থাকলেন।

    সোনা বলল, আমি মুড়াপাড়া যামু দাদা।

    –কে কইছে তুমি যাইবা?

    —কাকায় কইছে।

    লালটু ভেবেছিল মা হয়তো বলেছেন। মা বললে এ সংসারে কিছু হয় না। মার কিছু বলার কোনও অধিকার নেই। ছোটকাকা যখন বলেছে, তখন যথার্থই যাবে সোনা। কেউ বাধা দিতে পারবে না। লালটু কেমন বিরক্ত হয়ে বলল, ভ্যাক্ কইরা কাইন্দা দিলে হইব না, আমি বাড়ি যামু—বলে লালটু সোনাকে মুখ ভেংচে দিল। এই অভ্যাস লালটু পলটুর। সোনাকে ওরা সহ্য করতে পারে না। বাড়িতে সোনা সবার ছোট বলে ওর আদর বেশি। এতদিন সে মুড়াপাড়া যেতে পারে নি—এটা একটা সান্ত্বনা ছিল। সেই সোনা ওদের সঙ্গে যাচ্ছে। রাগ হয় না!

    সোনাও ছেড়ে দেবার পাত্র না। সে দুগ্‌গা ঠাকুর দেখতে যাবে। ওর প্রাণে কি যে আনন্দ। মন প্রসন্ন দাদারা খারাপ বলে সে খারাপ হবে কেন! সে দূরদেশে যাবে। সে কতদূর! একদিন লেগে যাবে যেতে। কত নদী বন মাঠ পড়বে যেতে। সে লালটুকে মন প্রফুল্ল থাকলে দাদা বলে ডাকে। পলটুকে বড় দাদা সে এখন মোটামুটি স্কুলের ভালো ছাত্র। সে এখন দূরের মাঠে একা নেমে যেতে পারে। যব খেতে লকোচুরি খেলেতে আজ-কাল আর ভয় পায় না।

    ধনবৌ সোনার মুখ দেখতে থাকল। বড় করে কাজল টেনে দিয়েছে চোখে। সুন্দর মুখ। যত লাবণ্য চোখে। বয়সের অনুপাতে লম্বা বেশি। একটু মাংস থাকলে শরীরে এ-লাবণ্য সবুজ দ্বীপের মতো। সোনার চোখ বড়। কাজল দিলে সে চোখ আরও বড় দেখায়। কপালের একপাশে কড়ে আঙুলে ধনবৌ লম্বা করে কাজল টেনে দিল। বাঁ পা থেকে সামান্য ধুলো নিয়ে সোনার মাথায় দিল এবং সামান্য থুতু ছিটিয়ে দিল শরীরে। তারপর সোনাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। চুমু খেল কপালে। সোনার কেমন সুড়সুড়ি লাগছিল—কাতুকুতুর মতো। সোনা খিলখিল করে হাসছিল।

    সোনা একেবারে পুরোপুরি পাগল মানুষের মুখ পেয়েছে। শরীরের গড়ন দেখলে বোঝা যায়, তেমনি লাবণ্যময় শরীর তার, বয়সকালে উঁচু লম্বা হবে খুব। ধনবৌ সোনাকে কোলে নিয়ে আদর করতে চাইল। কিন্তু সোনার সংকোচ হচ্ছে। সে লজ্জা পাচ্ছিল। বলল, আমার লজ্জা করে। আমি কোলে উঠমু না মা।

    দূরদেশে যাবে ছেলে। সাত আটদিন ধনবৌ এই ছেলে বুকে নিয়ে শুতে পারবে না। বুকটা কেমন টনটন করছিল। বলল, লও তোমারে নৌকায় দিয়া আসি। এই বলে জোরজার করে কোলে তুলে নিতে চাইল।

    সোনা কিছুতেই উঠল না।

    ধনবৌ বলল, আমার যে ইচ্ছা করে তোমারে একটু কেলে লই। বলে ফের ছেলেকে দু’হাত বাড়িয়ে তুলে নিতে গেল।

    —ধ্যাৎ, তুমি কি যে কর না মা! আমারে তুমি কোলে নিবা ক্যান! আমি বড় হই নাই।

    —অ—মারে! আমার সোনা বড় হইছে। বড়দি শুইনা যান, কি কয় সোনা। সোনা নাকি বড় হইছে। কোলে উঠতে লজ্জা।

    নৌকা ঘাটে বাঁধা। ওরা তিনজনে যাবে মুড়াপাড়া। দুগ্‌গা ঠাকুর দেখতে যাবে। গ্রামের পুজো প্রতাপ চন্দ করে। কতকালের এক মামলা আছে। কেউ সে বাড়ি ঠাকুর দেখতে যেতে পারে না। ছোট বালকদের মন মানবে কেন! পুজোর সময় হলেই ভূপেন্দ্রনাথ নৌকা পাঠিয়ে দেন।

    সুতরাং সোনা লালটু পলটু যাচ্ছে মুড়াপাড়া। ঈশম নিয়ে যাচ্ছে। এ-ক’দিন অলিমদ্দি বাড়ির কাজ করবে। ঈশমেরও যেন ক’দিন ছুটি। সে এই দলবল নিয়ে হৈচৈ করে ফিরে আসবে। সে সকলের আগে নৌকায় উঠে বসে আছে। ভাল লগি নিয়েছে। বৈঠা নিয়েছে। অন্যের লগি বৈঠা ওর পছন্দ নয়। পালের দড়িদড়া ঠিক আছে কিনা দেখে নিচ্ছে। খুঁটিনাটি কাজ। দূরদেশে যাবে। একদিন লেগে যাবে। সে সবকিছু, এমন কি হুঁকো-কলকে ঠিক করে নিল। দশ ক্রোশের মতো পথ! এখন এই সকালে রওনা হলে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। ঘুরে ফিরে যেতে হবে। নদীতে এবং বিলে বাতাস পেলে, স্রোতের মুখে তুলে দিতে পারলে তবে সকাল সকাল যেতে পারবে।

    সোনা ঠাকুর্দাকে প্রণাম করল। বলল, দাদু আমরা মুড়াপাড়া পূজা দ্যাখতে যাইতাছি।

    বুড়ো মানুষটি খুঁজেপেতে চিবুক ধরে বলল, তাই বুঝি!

    লালটু বলল, দাদু দশরায় আপনের লাইগা কি কিনমু?

    বুড়ো মানুষটা কোনও উত্তর দেবার আগেই পলটু ঠাট্টা করে বলল, ঝুমঝুমি বাঁশি কিনমু।

    -–দ্যাখছ, দ্যাখ বড়বৌ—কি কয় তোমার পোলা! আমাকে ঝুমঝুমি বাঁশি কিনা দিব কয়।

    —ঠিকই বলেছে। আপনি ছেলেমানুষের মতো কাঁদেন। আপনাকে কেউ খেতে দেয় না কন!

    —আমি কই বুঝি!

    —কন না!

    —আমার কিছু মনে থাকে না বড়বৌ।

    পলটু নৌকায় উঠে দেখল, পাগল মানুষ গলুইতে বসে আছে চুপচাপ। সে কখনও বাবা বলে ডাকে না। এই মানুষ বড় অপরিচিত তার কাছে। এই মানুষের পাগলামি কেমন বিরক্তিকর। সে যত বড় হচ্ছে, এক পাগল মানুষ তার বাবা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। বাবাকে এড়িয়ে চলার একটা স্বভাব গড়ে উঠেছে পলটুর ভিতর। কিছুটা যেন শাসনের ভঙ্গি। এই মানুষের কোনও অসম্মান ওকে পীড়া দেয়। নানাভাবে সেসব অসম্মান থেকে মানুষটাকে রক্ষা করার বাসনা। কিন্তু সে আর কী মানুষ যে,–এই পাগল মানুষকে ধরে বেঁধে রাখবে।

    নৌকার গলুইয়ে চুপচাপ বসে আছেন তিনি। পাটাতনের ওপর পদ্মাসন করে বসে আছেন। পলটু নৌকায় উঠেই বলল, আপনে নামেন। কই যাইবেন আপনে?

    পাগল ঠাকুর পলটুর কথার কোনও জবাব দিলেন না। ছেলেমানুষের মতো ফিফিক্ করে হাসলেন। পলটু এবার রেগে গিয়ে বলল, আপনে নামেন। নামেন কইতাছি। মণীন্দ্রনাথ এতটুকু নড়লেন না। কথা বললেন না। বরং কাপড়টা বেশ যত্ন নিয়ে পাট করে পরলেন। পোশাকে কোনও অশালীন কিছু আছে, এই ভেবে কাপড়টা বেশ গুটিয়ে পরলেন। হাতকাটা শার্ট গায়ে। শার্টটা টেনেটুনে দিলেন। মাথার চুল হাতেই পাট করতে থাকলেন। দ্যাখো, এই চুল আমার, এই বসনভূষণ আমার—এবার আমি তোমাদের সঙ্গে যেতে পারি। বলে ধ্যানী পুরুষের মতো ফের পদ্মাসনে বসে পড়লে পলটু হাত ধরে টানতে আরম্ভ করল, নামেন আপনে। মা। মা–আ। সে চিৎকার করতে থাকল। যেন বড়বৌ এলেই সব ফয়সালা হয়ে যাবে। কিন্তু বড়বৌর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।

    ঈশম কিছু বলছিল না। সে বেশ মজা পাচ্ছে। সে চুপচাপ ছইয়ের ওপাশে বসে আছে। কিছু দেখতে পাচ্ছে না মতো বসে বেতের ঝোপে বোলতার চাক খুঁজছে।

    পলটু বলল, নামেন এখন। নৌকা ছাইড়া দিব।

    কে কার কথা শোনে! এমন শরৎকালের সকাল, ঠাণ্ডা হাওয়া ধানখেত থেকে ভেসে আসছে, কোড়ার ডাক ভেসে আসছিল। নদীতে নৌকায় পাল দেখা যাচ্ছে। পাল তুলে নদীতে গ্রামোফোন বাজাতে বাজাতে কারা যেন যায়। সোনালী বালির নদী থেকে সব বড় বড় মাছ ধান খেতে শ্যাওলা খেতে উঠে আসছে। কত শস্যক্ষেত্র দু’পাশে অথবা স্ফটিক জল—কারণ পাট কাটা হলে গ্রাম মাঠ দ্বীপের মতো। চারপাশে যেন দীঘির জল টলটল করছে। বিশাল জলরাশি নিয়ে এইসব বাড়ি জমি এবং নদী ভেসে রয়েছে। মণীন্দ্রনাথের কতদিন থেকে কোথাও যাবার বাসনা। বর্ষা এলেই তিনি বন্দী রাজপুত্রের মতো শুধু অর্জুন গাছটার নিচে বসে থাকেন। মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে শুনেই ওঁর দুরদেশে যাবার ইচ্ছা হল। সবার আগে যা কিছু পরনে ছিল, তাই নিয়ে তিনি নৌকায় উঠে বসে আছেন। চুল কি সুন্দরভাবে পাট করেছেন। ভদ্র মানুষের মতো চুপচাপ। একেবারে সেই এক সরল বালক যেন। পলটু যত এসব দেখছিল তত ক্ষেপে যাচ্ছিল। সে এবার ভয় দেখাবার জন্য বলল, ডাকমু ছোট কাকারে?

    মণীন্দ্রনাথ খুব অপরাধী চোখে পলটুর দিকে তাকালেন। যেন বলার ইচ্ছা—বাছা, আর ডেকো না, আমি তোমাদের পাশে চুপচাপ বসে থাকব। মণীন্দ্রনাথের বড় অবলা জীবের মতো চোখ। চোখে এক অসামান্য অসহায় দুঃখ ভেসে বেড়াচ্ছে—আমি যে এক পাগল মানুষ। কতকাল ধরে হাঁটছি। তবু সেই দুর্গের মতো প্রাসাদে পৌঁছাতে পারছি না। তিনি তাঁর জাতককে এমন কিছু বুঝি বলতে চাইছেন।

    লালটু পলটু উঠে এল। ছোট কাকা ঘাটে এসেই বললেন, ভিতরে কে বইসা আছে রে?

    সঙ্গে সঙ্গে মণীন্দ্রনাথ ছই-এর ভিতর থেকে গলা বাড়িয়ে দিলেন। হামাগুড়ি দিয়ে যেন কত বাধ্যের ছেলে, বের হয়ে পাটাতনে দাঁড়ালেন। ধনবৌ বড়বৌ এসেছে ঘাটে। নৌকা ছেড়ে দিলে ওরা চলে যাবে। তখন মণীন্দ্রনাথ পাড়ে উঠে আসছেন। চোখমুখে কি ভয়ঙ্কর উদাসীনতা। নৌকার গলুইয়ে জল দিয়ে ঈশম ঘাট থেকে দড়ি ছেড়ে দিলে পাগল মানুষ ছুটে যেতে চাইলেন। বড়বৌ এখন ঘাটে। সুতরাং কোনও ভয় নেই। সে যেমন দু’হাত ছড়িয়ে অন্যান্যবার আগলে রাখে এবারেও আগলে রাখল। বলল, এস, বাড়ি এস। বড়বৌর সেই এক বিষণ্ণ মুখ! কত আর বয়েস এই বড়বৌর। ত্রিশ হতে পারে, তেত্রিশ হতে পারে। বড়বৌর বয়স মুখ দেখে ধরা যায় না। বড়বৌর দিকে তাকিয়ে পাগল মানুষ আর নড়লেন না। সোনা ছইয়ের ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখল, বড় জেঠিমা জ্যাঠামশাইকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। সোনার বড় কষ্ট হতে লাগল। সে এবার গলা ছেড়ে হাঁকল, জ্যাঠামশয়।

    মণীন্দ্ৰনাথ কেমন দু’হাত ওপরে তুলে দিলেন। আশীর্বাদ করার মতো ভঙ্গিতে দু’হাত ওপরে তুলে দাঁড়িয়ে থাকলেন। সোনা এবার চিৎকার করে বলল, দশরা থাইকা কি আনমু?

    পার তো আমার জন্য কপিলা গাইর দুধ এনো—যেন এমন বলার ইচ্ছা। আর যদি পার, শীতলক্ষ্যার চরে এখন যেসব কাশফুল ফুটে থাকবে, বাতাসে তা আমার নামে উড়িয়ে দিও। সেই এক মেয়ে, পলিন যার নাম, পার তো তার নামে কিছু কাশফুল জলে ভাসিয়ে দিও।

    সোনা দেখল জ্যাঠামশাই কিছুই বলছেন না! জেঠিমা চুপচাপ। ক্রমে নৌকা ভেসে যেতে থাকল। ক্রমে ধানখেত পার হলে, সোনালী বালির নদী। নদীতে নৌকা নেমে গেলে আর কিছু দেখা গেল না। সোনাও এবার ছইয়ের ভিতর চুপচাপ বসে থাকলে ঈশম বলল, কি দ্যাখছেন সোনাবাবু?

    বিলের জলে নৌকা ছেড়ে দিয়েছিল ঈশম। সোনাকে এমন চুপচাপ দেখে কথা না বলে পারছিল না।

    সোনা অপলক শুধু দেখছিল। এমন অসীম জলরাশি, পারাপারহীন জলরাশি—কত দূর চলে গেছে—বুঝি আর এই নাও এবং মাঝি বিল পার হবে না—জল শুধু জল। সোনা বিস্ময়ে হতবাক। সোনা কিছু বলল না। এই বিলে আবেদালির বৌ ডুবে মরেছে। এই বিলের জলে এক ময়ূরপঙ্খী নাও আছে—সোনার নাও, পবনের বৈঠা। সোনার বলতে ইচ্ছা ঈশমকে—এই যে জল, জলের নিচে যে নাও, সোনার নাও পবনের বৈঠা—পারেন না আপনে সেই নাও তুলে আনতে। আমি, আপনে আর পাগল জ্যাঠামশাই সেই নাও নিয়ে বিল পার হয়ে চলে যাব। যেন এমন নাও মিলে গেলেই ওরা সেই র‍্যামপার্টে চলে যেতে পারবে। চোখ নীল, সোনালী চুল মেয়ের—আহা, বড় ডুব দিতে ইচ্ছা করছিল বিলের জলে। ডুব দিয়ে ময়ূরপঙ্খী নৌকাটা তুলে আনতে ইচ্ছা হচ্ছিল সোনার।

    .

    ভোরবেলা উঠে মালতী যেমন অন্যদিন সে তার হাঁস কবুতর খোঁয়াড় অথবা টঙ থেকে ছেড়ে দেয়, যেমন সে অন্য কাজগুলি করে চুপচাপ কিছুক্ষণ উঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে তেমনি সে আজও দাঁড়িয়ে থাকল। হাঁসগুলি জলে ভেসে দূরে চলে যাচ্ছে। রাতে ভাল ঘুম হয়নি মালতীর। কারা যেন সারারাত অন্ধকারে বাড়িটার ঝোপে জঙ্গলে ঘোরাফেরা করেছে। দাঙ্গার পর থেকেই মালতীর প্রাণে অহেতুক ভয়! নরেন দাসের বৌ বলেছে, তর যত কথা! কে তরে আর নিতে আইব।

    সুতরাং সকালবেলা রাতের সেই ফিসফাস শব্দের কথা কাউকে সে বলতে পারল না। ভয়ে সে যথার্থই রাতে দরজা খুলে বের হয়নি। দু-একবার ওঠার অভ্যাস রাতে। সে সব চেপেচুপে সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে।—কে কে! এমন কি সে রাতে দু-তিনবার কে কে বলে চিৎকার করে উঠেছিল। –কারা কথা কয় গাছের নিচে। সে একবার ঝাঁপ তুলে দেখবার চেষ্টা করেছে। কখনও মনে হয়েছে—সেই দাঙ্গা,দাঙ্গার আগুন চোখের ওপর জ্বলছে। সে এসব দেখলেই আঁতকে উঠত—তারপর মনে হতো, না, স্বপ্ন! জব্বরকে মালতী দু’দিন উত্তরের ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। নরেন দাস তেড়ে গেছে, তুমি এখানে ক্যান মিঞা! তারপর বলত, তর বাপ আইলে, না কইছি তা…। জব্বর হাসত। হাসতে হাসতে দাড়িতে হাত বুলাত। বড় দাড়ি-গোঁফ, চেনা যায় না—জব্বর এখন মাতব্বর মানুষ যেন। সে ওর মায়ের মৃত্যুর পর এদিকে অনেকদিন ছিল না। কোথায় কোন গঞ্জে সে এখন তাঁত কিনে ব্যবসা করার চেষ্টা করছে। আবেদালির সঙ্গে ওর কোনও সেম্পর্ক নেই। আবেদালি আবার নিকা করে ভাঙা ঘরে শণ দিয়েছে। বিবির জন্য আতাবেড়া দিয়েছে। আবেদালির হাঙ্গা করা বৌ মল বাজিয়ে এখন ঘরের ভিতর শুয়ে-বসে থাকে। আবেদালিকে জব্বর আর পরোয়া করে না। এমন কি সেদিন বাপ-বেটাতে বচসা। লাঠালাঠি। আবেদালি বলেছিল, হারে পুত, তুই জননীর গায়ে হাত দ্যাস। সেই জব্বর এখন এদিকে এলে আর বাপের কাছে ওঠে না। সে ফেলু শেখের বাড়ি এসে ওঠে। এবং যে ক’দিন থাকে, ফেলুর বিবিকে আতর কিনে এনে দেয়। সুগন্ধ তেল কিনে আনে হাট থেকে এবং বড় ইলিশ কিনে এনে দু’চার রোজ প্রায় যেন জব্বর এক নবাব- পয়সার ওপর উড়ে বসে বেড়ায়। ফেলুর বিবি তো জব্বর এলেই উল্লাসে আর বাঁচে না। ফেলু সব বোঝে। সেই এক উক্তি তার—হালার কাওয়া! ভয়ডর নাই। তারপর কব্জিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ডান হাতটাতে সামান্য নিরাময়ের চিহ্ন ফুটে উঠছে। বাঁ হাতের কব্জি তেমনি ফুলে ফেঁপে আছে। কালো রং। কুমিরের চামড়ার মতো খসখসে! মরা চামড়া উঠছে কেবল। কালো তারে সাদা কড়ি এবং আলকাতরার মতো চ্যাটচ্যাটে তেল মাখতে মাখতে হাতটা আর হাত নেই। জব্বর এলে বিবি তার নাচে গায়, ফুরফুরে বাতাসে উড়ে বেড়ায় আর কী সব সলা-পরামর্শ—ফেলু তখন ছেঁড়া মাদুরে জামগাছটার নিচে শুয়ে থাকে। নিদেন যখন চক্ষে আর সয় না, বাগি বাছুরটা নিয়ে মাঠে নেমে আসে। তারপর রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার—হালার কাওয়া, আমারে ডরায় না! সেই বিবি পর্যন্ত কিছুদিন হল জব্বরের সঙ্গে কথা কয় না, কী এমন ঘটনা— ওর জানার ইচ্ছা ছিল, কী এমন ঘটনা ওদের দু’জনকে মাঠের মতো বোবা বানিয়ে রেখেছে। সে আসে না, সে না এলে ফেলুর এখন আহার জোটা দায়।

    কোনও কোনও দিন জব্বর সোজা উঠোনে উঠে আসত। তারপর মালতীকে ডেকে বলত, দিদি আছেন?

    মালতী বাইরে এলে জব্বর বলতো, আপনের শ্বশুরবাড়ি যাইতে ইচ্ছা হয়না? আপনে শ্বশুরবাড়ি আর যাইবেন না?

    —না রে, কই যামু! কে আর আছে আমার! কি আর আছে আমার!

    —কি যে কন দিদি, কি নাই আপনের?

    মালতীর চোখে তখন জ্বালা ধরে যেত। মলতীর চেয়ে ছোট এই জব্বর। কিছু ছোট হবে। কত ছোট হতে পারে—সকালের হাওয় মুখে লাগবার সময় এমন ভাবল। আর দেখল এক কদর্য মুখ, চোখে এখন জব্বরের কী যেন লালসা। সে বুঝি ঘুরঘুর করতে ভালাবাসছে। সময় অসময় নাই সে লোক নিয়ে উঠোনের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। এইসব দেখলেই মালতীর ভয়টা বাড়ে। তখন যেন বলার ইচ্ছা, তোমার ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিমু। অথবা সেই মানুষটার কাছে চলে যেতে ইচ্ছা হয়–ঠাকুর, দিবা আমারে একটা বড় চাকু, আইনা দিবা!

    জব্বরের কথা মনে আসতেই মালতীর শরীর কেমন শক্ত হয়ে গেল। সে আর দাঁড়াল না। হেঁটে হেঁটে দীনবন্ধুর ডেফল গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল। সে একটু আড়াল দেওয়া জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সে মানুষটাকে খুঁজছে। না, নেই মানুষটা। সে দুটো লেবুপাতা ছিঁড়ল, যেন সে এখন এখানে লেবু পাতা তুলতে এসেছে। মানুষটার বদলে সে শশীভূষণকে বৈঠকখানা ঘরে দেখতে পেল। তিনি গোছগাছ করছেন—স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, তিনি দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু সে গেল কোথায়? এ সময়ে মানুষটা জানালায় বসে থাকে। টেবিলের ওপর গাদা বই। কেবল বইয়ের ভিতর মানুষটা ডুবে থাকে। সে গেল কোথায়! মালতী আর অপেক্ষা করল না। কাঁখে জলের কলসী থাকলে এত ভয়ের কারণ থাকে না। একটা অছিলা থাকে। তবু যখন ভাবতে ভাবতে ঠাকুরবাড়ির উঠোনে উঠে এসেছে তখন আর ফেরা যায় না। সে ভিতর বাড়িতে ঢুকলে দেখতে পেল, ঘাট থেকে বড়বৌ ধনবৌ উঠে আসছে। মালতী এ-বাড়ির সকলকেই দেখতে পেল। কেবল রঞ্জিত নেই। রঞ্জিতকে কিছু বলা দরকার। একমাত্র মানুষ এই সংসারে যাকে সব বলা যায়। সে সোনাকে অনুসন্ধান করল। সে থাকলে তাকে বলা যেত, সোনা, তোমার মামা গ্যছে কোনখানে? কিন্তু সোনা, লালটু পলটু কেউ নেই।

    বড়বৌ মালতীকে দেখেই কি যেন টের পেল! বলল, তোর মুখ এমন কালো কেন রে? কিছু হয়েছে! কেউ কিছু বলেছে?

    —কি হবে আবার!

    —চোখ দেখলে মনে হয় সারা রাত না ঘুমিয়ে আছিস।

    মালতী এবার লজ্জা পেল। সে বলতে পারত, অনেক কিছু—না ঘুমিয়ে সে থাকবে কেন, সে তো বিধবা মানুষ, তার আর কার জন্য রাত জেগে থাকা। সুতরাং সে যা-ও ভেবেছিল, রঞ্জিত কই বৌদি, অরে দ্যাখতাছি না, সে তাও বলতে পারল না।

    মালতী উঠোন পার হয়ে এল। ঠাকুরঘরের পাশে সেই শেফালি গাছটা। সে গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। ফুলে ফুলে গাছের চারপাশটা সাদা হয়ে আছে। খুব ভোরে যারা ফুল তুলে নেবার নিয়ে গেছে। এর পরও ফুল ফুটেছে এবং ফুল ঝরে পড়েছে। মালতী কি ভেবে কোঁচড়ে ফুল তুলতে বসে পড়ে। কিছু কাজ ছিল না হাতে অথবা এও হতে পারে, কী করে এই উঠোনে কোন অছিলায় দেরি করা যায়—যদি রঞ্জিত কোথাও গিয়ে থাকে, তবে এক্ষুনি চলে আসবে। ফুল তুলতে তুলতে সে হয়তো চলে আসবে। সে রঞ্জিতের জন্য গাছের নিচে ফুল তোলার অভিনয় করছে। মালতীর খোঁপা খুলে গিয়েছিল—খালি গা মালতীর—সাদা থানে মালতীকে এই সকালে সন্ন্যাসিনীর মতো দেখাচ্ছে। কি পুষ্ট তার বাহু। এমন পুষ্ট বাহু আর শরীর নিয়ে সে কী করবে! রঞ্জিতের কাছে সে বুঝি এমন একটা প্রশ্ন করতেই এসেছে—আমি কী করি! আমি কী যে করি! তখনই উঠোনে পায়ের শব্দ। বুঝি রঞ্জিত। সে চোখ তুলে দেখল ছোটকর্তা। পিছনে অলিমদ্দি। অলিমদ্দিকে নিয়ে তিনি বোধ হয় যজমান বাড়ি যাচ্ছেন। পূজা-পার্বণের সময় এটা। দুর্গাপূজার সময়—সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, দশমীর পর ফাঁকা ফাঁকা ভাবটা পূর্ণিমাতে এসে ভরে যায়। কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা—রাতে কোজাগরী জ্যোৎস্না। কি সাদা! কত ইচ্ছা তখন মালতীর। নদীর চরে সাদা জ্যোৎস্নায় তরমুজ খেতে চুপচাপ রঞ্জিতকে পাশে নিয়ে বসে থাকে। অঞ্জলিতে দু’হাত তুলে বলে, আমি বড় দুঃখিনী। তুমি আমারে নদীর পাড়ে নিয়ে যাও—অথবা যেন বলার ইচ্ছা, জলে নাও ভাসাওরে। মালতীর কেবল রঞ্জিতকে নিয়ে সাদা জ্যোৎস্নায় সোনালী বালির নদীর জলে নিভৃতে সাঁতার কাটতে ইচ্ছা হয়। জলে নাও ভাসাতে ইচ্ছা হয়।

    সে রঞ্জিতের প্রতীক্ষাতে বসে থাকল। সে এল না। দু’বার বড়বৌদি এদিকে এসেছিল, দুবারই বলবে ভেবেছিল, বৌদি রঞ্জিতকে দ্যাখতাছি না। কিন্তু বলা হয়নি। সঙ্কোচে সে বলতে পারেনি। বৌদি বৌদি, মনের ভিতর আকুতি তার, বৌদি বৌদি, আমি ফুল নিতে আসি নাই বৌদি, আমি…

    বড়বৌ বলল, কিছু বলবি আমাকে!

    —বৌদি, রঞ্জিতকে দ্যাখতাছি না।

    —ও ঢাকা গেছে।

    —ঢাকা গ্যাল। কেমন বিস্ময়ের সঙ্গে বলল,

    —হ্যাঁ, গেল। সন্ধ্যায় দেখি ওর এক বন্ধু এসে হাজির। বাউল মানুষ। এ বাড়িতে তো মানুষের শেষ নাই। বৈরাগী বাউল লেগেই আছে। খাবেদাবে, শোবে, রাত কাটাবে। ভোর হলে যেদিকে চোখ যাবে সেদিকে নেমে যাবে। ভাবলাম সেই বুঝি। ওমা, রাতে দেখি, কি সব ফিসফিস করে কথা। আমাকে বলল, দিদি ঢাকা যাচ্ছি, কবে ফিরব ঠিক নেই, ফিরব কিনা আর, তাও বলতে পারি না। এক নিঃশ্বাসে বলে গেল বড়বৌ।

    মালতী আর বড়বৌর সামনে দাঁড়াতে পারল না। সে বুঝি ধরা পড়ে যাবে। সে ছুটে বের হয়ে গেল। তুমি এমন মানুষ রঞ্জিত! সে যেন আর পারছে না! কোথাও ছুটে গিয়ে বুঝি ঝাঁপ দেবার ইচ্ছা। সে তেঁতুল গাছটা পার হয়ে গেল এবং বড় যে গাছটা পুকুরপাড়ে ছায়া ছায়া ভাব সৃষ্টি করে রেখেছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে সে হাউহাউ করে বুঝি প্রাণ খুলে কাঁদতে পারবে। কেউ টের পাবে না। সে ফুলগুলি এবার জলে ফেলে দিল। এবং দাঁড়িয়ে দেখল ফুলগুলি জলে ভেসে ভেসে কত দূরে যায়! রাতের অন্ধকারে ফিসফিস করে কারা যেন কথা বলে! আমি কই যাই ঠাকুর! মালতী সহসা চিৎকার করে উঠতে চাইল। কিন্তু পারল না। অভিমানে চোখ ফেটে শুধু জল নেমে আসছে তার।

  • বিশ

    বিশ

    ঈশম সহসা হেঁকে উঠল, কর্তারা ঠিক হইয়া বসেন! নৌকাটা খাল থেকে ঠেলে শীতলক্ষ্যার জলে ফেলে দেবার সময় এমন হেঁকে উঠল।—স্রোতের মুখে পইড়া গ্যালেন। পানিতে পইড়া গ্যালে আর উঠান যাইব না। সামনে বড় নদী, শীতলক্ষ্যা নাম তার।

    এত বড় নদীর নাম শুনে সোনা ছইয়ের ভিতরে ঢুকে বসে থাকল। লালটু পলটু ছইয়ের ওপর বসে ছিল এতক্ষণ। বড় নদীতে পড়ে গেছে শুনেই লাফিয়ে পাটাতনে নামল। দেখল—বড় নদী তার দুই তীর নিয়ে জেগে রয়েছে। স্রোতের মুখে নৌকা পড়তেই বেগে ছুটতে থাকল। সারা পথ বড় কম সময়ে পার হয়ে এসেছে। পালে বাতাস ছিল। উজানে নৌকা বাইতে হয়নি। আর কি আশ্চর্য নদীতে পড়তেই ঢাক-ঢোলের বাজনা। পূজার বাজনা বাজছে। দুই পাড়ে গাছ-পালা-পাখি এবং গাছ-পালা-পাখির ভিতর সোনা বড় অট্টালিকা আবিষ্কার করে কেমন মুহ্যমান হয়ে গেল। সারি সারি অট্টালিকা। এত বড় যেন সেই বিল জুড়ে অথবা সোনালী বালির নদীর চর জুড়ে—গ্রাম মাঠ জুড়ে—শেষ নেই বুঝি অট্টালিকার। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। সে আর ছইয়ের নিচে বসে থাকতে পারল না। হামাগুড়ি দিয়ে বের হতেই দেখল জলে সেইসব ঐশ্বর্যমণ্ডিত প্রাসাদের প্রতিবিম্ব ভাসছে। যেন জলের নিচে আর এক নগরী। সে তার গ্রাম ছেড়ে বেশিদূর গেলে মেলা পর্যন্ত গেছে। কোথাও সে এমন প্রাসাদ দেখেনি—সে এবার উঠে দাঁড়াল। নৌকার মুখ এবার পাড়ের দিকে ঘুরছে। সামনে স্টীমার ঘাট, ঘাটের পাশে বুঝি নৌকা লাগবে। পাড়ে পাম গাছ। সড়ক ধরে পাম গাছের সারি অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। সড়কের ডাইনে নদীর চর এবং কাশফুল। উত্তরের দিকে পিলখানার মাঠ, মাঠ পার হলে বাজার এবং আনন্দময়ী কালীবাড়ি। ঘাটে রামসুন্দর এসেছিল ওদের নিতে–সে পাড়ে উঠে যাবার সময় সব বলল।

    নদী থেকে যত কাছে মনে হয়েছিল, যেন নদীর পাড়েই এই সব অট্টালিকা—নদীর পাড়ে নেমে মনে হল সোনার, তত কাছে নয়। ঠিক সড়কের পাশে পাশে হাঁটু সমান পাঁচিল। পাঁচিলের মাথায় লোহার রেলিঙ। ছোট-বড় গম্বুজ! কোথাও সেই গম্বুজে লাল-নীল পাথরের পরী উড়ছে। দু’পাশে সারি-সারি ঝাউগাছ। গাছের ফাঁক দিয়ে দীঘিটা চোখে পড়ছে। দু’পাড়ে বিচিত্র বর্ণের সব পাতাবাহারের গাছ, ফুলের গাছ, কত রকমারী সব ফুল ফুটে আছে, যেন ঠিক কুঞ্জবনের মতো। সাদা পদ্মফুল দিঘিতে—দু’পাড় বাঁধানো এবং ঝরনার জল যেন পড়ছে তেমন কোথাও শব্দ শুনে সোনা চোখ তুলে তাকাল। দেখল পাশে ছোট একফালি জমি। কি সব কচি ঘাস, লোহার জাল দিয়ে বেড়া। ভিতরে কিছু হরিণ খেলা করে বেড়াচ্ছে।

    লালটু-পলটু এই হরিণ অথবা চিতাবাঘের গল্প তাকে বলেছে। সে মনে-মনে একটা বিস্ময়ের জগৎ আগে থেকে তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু কাছে, এত কাছে এমন সব হরিণশিশু দেখে সোনা হতবাক। রামসুন্দর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। লালটু-পলটু পিছনে আসছে। সে ছুটে ছুটে এতটা এসেছিল। তারপর গেলেই বুঝি সেই চিতাবাঘ এবং ময়ূর। ময়ূরের পালক সে যাবার সময় নিয়ে যাবে ভাবল। তখনই মনে হল ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠছে। নুড়ি বিছানো রাস্তা। সাদা কোমল আর মসৃণ। সে দুটো-একটা নুড়ি তাড়াতাড়ি পকেটে পুরে ফেলল। তারপর মুখ তুলতেই দেখল, খুব সুন্দর এক যুবা এই অপরাহ্ণে ঘোড়ায় কদম দিতে দিতে ফিরছেন। পিছনে ফুটফুটে একটি মেয়ে। গায়ে সাদা ফ্রক। জরির কাজ ফ্ৰকে। ঘাড় পর্যন্ত মসৃণ চুল। সোনার মতো ছোট এক মেয়ে—যেন সেই রেলিঙ থেকে একটা বচ্চা পরী উড়ে এসে সেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছে। সোনাকে পলকে দেখা দিয়েই সহসা উড়ে গেল। সদর খুলে গেছে ততক্ষণে। ঘোড়ার পিঠে সেই যুবা দিঘির পাড়ে বাচ্চা পরী নিয়ে উধাও হয়ে গেল। সোনা কেমন হতবাকের মতো তাকিয়ে থাকল শুধু।

    তার মনে হল ছোট্ট এক পরী ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে চলে গেছে। যেদিকে ঘোড়া গেছে, সোনা সেদিকে ছুটতে থাকল। ছুটতে ছুটতে সেই সদর দরজা। লোহার বড় গেট, ভিতরে একটা মানুষের গায়ে বিচিত্র পোশাক। হাতে বন্দুক কোমরে অসি। মাথায় নীল রঙের পাগড়ি। দরজা বন্ধ বলে সোনা ঢুকতে পারছে না ভিতরে। ঘোড়াটা এত বড় বাড়ির ভিতর কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল! সোনার কেমন ভয় ভয় করছে। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল, রামসুন্দর, লালটু পলটু আসছে।

    সোনা ছোট্ট এক প্রাণপাখির মতো অট্টালিকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। যেন সে এক রাজার দেশে চলে এসেছে। রাজবাড়ি। এই সদরে মানুষ-জন বেশি ঢুকছে না। দীঘির দক্ষিণ পাড় দিয়ে মানুষ-জন যাচ্ছে। এ-ফটক অন্দরমহলের। সোনা নিরিবিলি এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দেখে রামসুন্দর তাড়াতাড়ি হেঁটে গেল।

    মহলের এই ফটকে সবাই ঢুকতে পারে না। কেবল আপনজনেরা ঢুকতে পারে। অথবা কিছু আমলা যারা এই পরিবারে দীর্ঘকাল ধরে আশ্রিত। বিশেষ করে ভূপেন্দ্রনাথ, যার সততার তুলনা নেই, পারিবারিক সুখ-দুঃখে যে মানুষ প্রায় ঈশ্বরের শামিল। সোনা ঘোড়াটার পিছু-পিছু ছুটে ভেতরে ঢুকতে চাইলে মল্ল মানুষের মতো দুই বীরযোদ্ধা ফটক বন্ধ করে ছোট এক প্রাণপাখিকে ভিতরে ঢুকতে মানা করে দিল। সোনা প্রথম গরাদের ফাঁকে মুখ ঢুকিয়ে দিল। সে ভিতরটা দেখার চেষ্টা করছে। অনেক দূর থেকে যেন কী এক সুর ভেসে আসছে। কে গান গাইছে যেন। সামনে সারি-সারি থাম, কারুকাজ করা কাঠের রেলিঙ। মাথার ওপর ঝাড়লণ্ঠন। সে প্রায় ফড়িঙের মতো উড়ে উড়ে ভিতরে চলে যেতে চাইছে।

    তখন কোথাও এক নর্তকী নাচছিল। ঘুঙুরের শব্দ কানে আসছে। তখন কোথাও ঢাকের বাদ্যি বাজছিল। ছাদের ওপর সারি-সারি পাথরের পরী উড়ছে। ওরা বাতাসে শরীরের সব বসনভূষণ আলগা করে ওড়াচ্ছে। অথবা পা তুলে হাত তুলে নাচছিল। চারপাশে সব মসৃণ ঘাসের চত্বর। কোমল ঘাসে ঘাসে পোষা সব বুলবুল পাখি। ছোট-ছোট কেয়ারী করা গাছ। গাছে-গাছে ফুল ফুটে আছে। দক্ষিণ থেকে এ-সময় কিছু পাখি উড়ে এসেছিল। সে-সব পাখি কলরব করছে। সে ফটকে মুখ রাখতেই দেখল—লাল অথবা হলুদ রঙের পোশাক পরে, ছোট-ছোট মেয়েরা লুকোচুরি খেলছে, তখনই রামসুন্দর হাঁকল, ফটক খুলতে হয়। ভূইঞা কর্তার পরিজন আইছে। সঙ্গে-সঙ্গে ক্যাচ-ক্যাঁচ শব্দ তুলে লোহার ফটক খুলে গেল। সোনাকে সেই মল্ল মানুষরা আদাব দিল! লালটু পলটু কি গম্ভীর! চাপল্য ওদের বিন্দুমাত্র নেই।

    ওরা শেষে একটা জলের ফোয়ারা পেল। সোনা যত দেখে,তত চোখ বড় হয়ে যায়। সেই মানুষ দু’জন বন্দুক ফেলে সোনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে চাইলে, সোনা রামসুন্দরের পেছনে চলে গেল। কিছুতেই ওরা সোনাকে কাঁধে তুলে নিতে পারল না। ভূইঞা কর্তার পরিজন এই সোনা, ছোট্ট সোনা। জাদুকর-এর পালিত পুত্রের মতো মুখ চোখ। ওরা সোনাকে কাঁধে তুলে ভূপেন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে যেতে চাইল। যেন নিয়ে গেলেই ইনাম মিলে যাবে তাদের—কিন্তু সোনা হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। কেমন একটা ভয়-ভয় ভাব। বেশি জোরজার করলে হয়তো সে কেঁদেই ফেলবে।

    সোনা হেঁটে যেন এ-বাড়ি শেষ করতে পারছে না। সে যে এখন কোথায় আছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। মাথার ওপর বড় বড় ছাদ। ছাদে ঝাড়লণ্ঠন দুলছে। লম্বা বারান্দা, জালালি কবুতর খিলানের মাথায়, জাফরি কাটা রেলিঙের পর্দা—কত দাসদাসীর কণ্ঠ—এসব যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। রামসুন্দর হাত ধরে মহলার পর মহলা পার করে নিয়ে যাচ্ছে। আহা, এ-সময় পাগল জ্যাঠামশাই থাকলে সোনার এতটুকু ভয়ডর থাকত না। দেওয়াল বড় বড় তৈলচিত্র পূর্বপুরুষদের। তারপরই নাটমন্দির। এখানে এসেই সে আবার আকাশ দেখতে পেল। ওর যেন এতক্ষণে প্রাণে জল এসেছে।

    ভূপেন্দ্রনাথ কাছারি বাড়িতে বসে ছিলেন। পূজার যাবতীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের হিসাবপত্র নিচ্ছিলেন। তখন কানে গেল—ওরা এসে গেছে। মোটা পুরু গদীতে বসে ছিলেন তিনি। সাদা ধবধবে চাদর বিছানো। মোটা তাকিয়া। মানুষ-জন কিছু প্রজাবৃন্দ নিচে বসে রয়েছে। তিনি সব ফেলে ছুটে গেলেন। কারণ এবার কথা আছে সোনা আসবে পূজা দেখতে। শেষ পর্যন্ত শচী ওকে পাঠাল কিনা কে জানে! সকাল থেকেই মনটা উন্মনা হয়ে আছে। রামসুন্দরকে ঘাটে বসিয়ে রেখেছেন দুপুর থেকে। কখন আসবে, কখন আসবে এমন একটা অস্থির ভাব। তিনি সব ফেলে ছুটে গেলে দেখলেন নাটমন্দিরে সোনা দেবী প্রণাম করছে। পরনে নীল রঙের প্যান্ট। পায়ে সাদা রবারের জুতো, সিল্কের হাফশার্ট গায়ে। শুকনো মুখ। সেই কখন বের হয়েছে। ভূপেন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি গিয়ে সোনাকে বুকে তুলে নিলেন। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে—কত কিছু চেয়ে নেবার ইচ্ছা এই বালকের জন্য। কিন্তু আশ্চর্য, কিছু বলতে পারলেন না। বড় বড় চোখে দেবী এদের দিকে তাকিয়ে আছেন। হাতে তাঁর বরাভয়। মা-মা বলে চিৎকার করে উঠলেন ভূপেন্দ্রনাথ। সোনা সহসা এই চিৎকারে কেঁপে উঠল। ভূপেন্দ্রনাথের চোখে জল।

    দেবীর প্রতি অচলা ভক্তি। যেন পূজা নয়, প্রাণের ভিতর এক বিশ্বাসের পাখি নিয়ত খেলা করে বেড়ায়। সোনাকে বুকে নিয়ে ভূপেন্দ্রনাথ দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে। দেবীর অপার মহিমা, মহিমা না হলে এই সব সামান্য মানুষ বাঁচে কী করে, খায় কী করে, প্রাচুর্য আসে কী ভাবে! এই যে সোনা এসেছে, সেও যেন দেবীর মহিমা। নির্বিঘ্নে এসে গেছে এবং এই দেশে মা এসেছেন। শরৎকাল, কাশফুল ফুটেছে, ঝাড়লণ্ঠনে বাতি জ্বলবে। চরের ওপর দিয়ে হাতি যাবে। ঘণ্টা বাজবে হাতির গলায়। হাতিটাকে শ্বেতচন্দনে, রক্তচন্দনে সাজানো হবে। সবই দেবী এলে হয়। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে ভূপেন্দ্রনাথ—এই সব নাবালকের জন্য মঙ্গল কামনা করলেন। দেবীর বড়-বড় চোখ। নাকে লম্বা নোলক, হাতের শঙ্খ-পদ্ম-গদা সব মিলে যেন কোথাও এক বরাভয়। আনন্দময়ীর বাড়ির পাশের জমিতে নামাজ পড়বে মুসলমান চাষাভুষা মানুষেরা। ওটা মসজিদ নয়। ভাঙা প্রাচীন কোন দুর্গ, ঈশা খাঁর হতে পারে, চাঁদ রায়, কেদার রায় করতে পারে, এখন সেই ভাঙা দুর্গে নামাজ পড়ার জন্য লোক ক্ষেপানো হচ্ছে। আজ সকালে এমন খবরই কাছারি বাড়িতে দিতে এসেছিল—মুসলমানরা বিশেষ করে বাজারের মৌলবীসাব, যার দুটো বড় সুতার কারবার আছে, যে মানুষের নদীর চরে একশো বিঘা ধানের জমি, খাসে রয়েছে হাজার বিঘা, সেই মানুষ বাবুদের পিছনে লেগেছে। বোধ হয় এই দেবী, দেবীর মহিমাতে সব উবে যাবে। কার সাধ্য আছে দেবীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়! যেন হাতের শাণিত তরবারি এখন সেই মহিষাসুরকেই বধে উদ্যত। ভূপেন্দ্রনাথের মনে বোধ হয় এমন একটা ছবি ভেসে উঠেছিল। সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকার, মা-মা। তোর এত মহিমা! তোর এত মহিমার কথা তিনি উচ্চারণ করেন নি। কেবল সোনা, জ্যাঠামশাইর চোখে জল দেখে ভাবল, মানুষটা তাদের কাছে পেয়ে কাঁদছে। মা-মা বলে কাঁদছে।

    সোনা এতটা পথ বাড়ির ভিতর হেঁটে এসেছে, অথচ সেই ছোট্ট মেয়ে কমলাকে সে কোথাও দেখতে পেল না। কোথায় আছে এখন কমলা! সে ভেবেছিল, ভেতরে ঢুকে গেলেই কমলাকে দেখতে পাবে। কিন্তু না সে নেই। সে খেতে বসে পর্যন্ত সন্তর্পণে চারদিকে তাকাচ্ছিল। কত বালক-বালিকা ছুটোছুটি করছে। কেবল সেই মেয়ে যে ঘোড়ায় চড়া শেখে, তাকে দেখতে পাচ্ছে না। ছোট্ট মেয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে গেলে বড় আশ্চর্য দেখায়। সোনা যতক্ষণ এই ভিতর বাড়িতে ছিল কমলাকে দেখার আগ্রহে চারদিকে যেন কী কেবল খুঁজতে থাকল।

    .

    শচীন্দ্রনাথ সকাল থেকে খুব ব্যস্ত ছিলেন। ছেলেরা সব পূজা দেখতে চলে গেছে। দুপুরে মনজুর এসেছিল সালিশি মানতে। মনজুর এবং হাজিসাহেবের ভিতর বিরোধ ক্রমে ঘনিয়ে আসছে। হাজিসাহবের বড় ছেলে, মনজুরের যে সামান্য জমি আছে সেখানে গত গ্রীষ্মে কোদাল মেরে আল নামিয়ে দিয়েছে। বর্ষায় যখন পাট কাটা হয়, কিছু পাট জোর-জবরদস্তি করে কেটে নিয়ে গেছে মনজুর একা। হাজিসাহেবের তিন ছেলে। হাজিসাহেবের বড় সংসার। পাটের এবং আখের বড় চাষ। অথচ সামান্য জমির প্রলোভনে একটা খুনোখুনি হয়ে যেতে পারে। সুতরাং সারা বিকেল শচীন্দ্রনাথ হাজিসাহেবের বাড়িতে বসে একটা ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ফয়সালা হলেই চলে যাবেন। উঠোনের জলচৌকিতে তিনি বসে ছিলেন। পানতামুক আসছিল। শচীন্দ্রনাথ কিছুই খাচ্ছেন না। এখন আসতে পারে ইসমতালি, প্রতাপচন্দ। বড় মিঞা আসতে পারে। তবু শচীন্দ্রনাথই সব। তিনি এক সময় হাজিসাহেবের মেজ ছেলের খোঁজ করলেন।

    —আমির কৈ গ্যাছে?

    —আমির নাও নিয়া গ্যাছে বড় মিঞারে আনতে।

    বড় মিঞা ঘাট থেকে উঠে এসে শচীন্দ্রনাথকে আদাব দিল। বলল, কর্তা ভাল আছেন?

    —আছি একরকম। তা তোমার এত দেরি?

    —কইবেন না, একটা বড় নাও নদীর চরে কেডা বাইন্দা রাখছে।

    —নাও কার জান না?

    কার বোঝা দায় কর্তা। দুই মাঝি। আর আছে বড় একখানা বৈঠা, পাল আছে। নাওডারে দ্যাখতে গ্যাছিলাম।

    —মাঝিরা কি কয়?

    —কিছু কয় না। কই যাইব, কোনখান থাইকা আসছে কিছু কয় না।

    —কিছুই কয় না?

    —না। রাইতের বেলা আপনের গান শোনা যায় কেবল।

    —কি গান!

    —মনে হয় গুণাই বিবির গান। চরে সারা রাইত ঝম-ঝম শব্দ হয়।

    —গ্যাছ একবার রাইতে?

    —কর্তা, ডর লাগে। রাতের বেলা গান শুনতে গ্যাছিলাম। যত যাই তত দ্যাখি নাও জলে-জলে ভাইসা যায়। দিনের বেলাতে গ্যালাম, দ্যাখি দুই মাঝি আছে। বোবা কালা। কথা কয় ইশারায়।

    —কার নাও, কি জন্য আইছে জানতে পারলা না?

    —না কর্তা।

    —আশ্চর্য!

    —হ কর্তা। বড় আশ্চর্য!

    মনজুর আসতেই অন্য কথা পাড়লেন শচীন্দ্রনাথ। হাজিসাহেব মাদুরে বসে—প্রায় নামাজের ভঙ্গিতে, হাতে লাঠি, লাঠির মুখে চাঁদের বুড়ি—বুড়ো হাজিসাহেব সালিশি মেনে নিলেন। কথা থাকল, যে পাট কাটা হয়েছে, সব ওরা ফিরিয়ে দেবে। এবং জল নেমে গেলে কথা থাকল জমির আল সকলে মিলে ঠিক করে দেবে।

    শচীন্দ্রনাথ এবার মনজুরকে বললেন, হা রে মনজুর নদীর চরে নাকি বড় নাও ভাইসা আইছে?

    —আইছে শুনছি।

    —চরের কোনখানে?

    –সে অনেক দূর কর্তা।

    অনেক দূর বলতে যথার্থই অনেক দূর। নদী-নালার দেশ। বর্ষাকালে এইসব গ্রাম অন্ধকারে দ্বীপের মতো জেগে থাকে। তারপর জল। শুধু জল। নদী-নালা তখন দু’পাড়ের সঙ্গে মিশে যায়। বড় বড় বাগান, ফলের এবং আনারসের। আর অরণ্য কোথাও জলে নাক ভাসিয়ে জেগে থাকে। দক্ষিণে শুধু গজারির বন। বনে বাঘ থাকে। ইচ্ছা করলে সেই নাও নিমেষে গজারি বনে পালিয়ে যেতে পারে। ইচ্ছা করলে এই নাও জলে জলে নিমেষে উধাও হয়ে যেতে পারে। টের পাবার জো নেই। প্রায় যেন এক লুকোচুরি খেলা। খালে বিলে, বিলের দু’পাশে বড় গজারির অরণ্য—দশ-বিশ ক্রোশ জুড়ে অরণ্য। সে সব অরণ্যে এখন এ-সময় ভিন্ন ভিন্ন দুর্ঘটনা খুবই স্বাভাবিক।

    ঘাটের ওঠার আগে শচীন্দ্রনাথ বললেন, অলিমদ্দি, ল একবার ঘুইরা যাই।

    —কই যাইবেন?

    —নদীর চরে। বড় নাও আইছে। অসময়ে বড় নাও।

    অলিমদ্দি লগি মেরে মাঠে এসে পড়ল। এসব মাঠে জল কম। কম জল বলে অলিমদ্দি কিছুটা পথ নৌকা বাইল। নদীর জলে পড়তেই সে বৈঠা বের করে পাল তুলে দিল, তারপর চারদিকে চোখ মেলে বলল, কই গ কর্তা, নাও ত দ্যাখতাছি না।

    —চরে নাও নাই!

    —কই আছে! থাকলে দ্যাখা যাইত না!

    শচীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়ালেন। পাটাতনে দাঁড়িয়ে দেখলেন যথার্থই চরে কোনও নৌকা নেই। বড় নৌকা দূরে থাকুক; হাটে গঞ্জে যাবার কোষা নৌকা পর্যন্ত তিনি দেখতে পেলেন না। তিনি বিস্ময়ে বললেন, আশ্চর্য!

    ঘরে ঘরে এখন লণ্ঠন জ্বলছে। আশ্বিন মাস বলে রাতের দিকে শীত পড়ার কথা। কিন্তু গরমই কাটছে না। ঠিক ভাদ্র মাসের মতো ভ্যাপসা গরমে শচীন্দ্রনাথের শরীর ঘামছিল। অলিমদ্দি এসে গোয়ালঘরে ধোঁয়া দিচ্ছে। গরুর ঘরে একটা বড় লম্বা মশারি টাঙানো। ধোঁয়া উঠে এলে অলিমদ্দি মশারি ফেলে দিল। তখন শচীন্দ্রনাথ বড় ঘরে ঢুকে বললেন, বাবা নদীর চরে শুনছি একটা বড় নাও ভাইসা আইছে—

    —কার নাও!

    —তা কইতে পারমু না।

    —দ্যাখ দ্যাখ, কার নাও। লক্ষ্মীর নাও হইতে পারে, আবার অলক্ষ্মীর নাও হইতে পারে! দ্যাখ, একবার খোঁজখবর কইরা।

    –সকাল হলে ভাবচি বড় মিঞার নাও, হাজিদের নাও আর চন্দদের নাও নিয়া বাইর হমু—কোনখানে নাওটা অদৃশ্য হইয়া থাকে দ্যাখতে হইব।

    কারণ বর্ষাকাল এলেই ডাকাতির উপদ্রব বাড়ে। সতরাং এই এক বড় নৌকা ভেসে এসেছে, এবং দিনের বেলা কোথায় অদৃশ্য হয় কেউ জানে না, রাত নিঝুম হলে সকলে ভয়ে ভয়ে থাকে। রাত হলে এইসব গ্রাম জলে জঙ্গলে একেবারে নিঝুম পুরীর মতো। কারণ গ্রামের বাড়ি সব দূরে দূরে। শুধু নরেন দাসের বাড়ি, ঠাকুরবাড়ি এবং দীনবন্ধুর বাড়ি সংলগ্ন। তারপর পালবাড়ি। হারান পালের দুই ছেলে, ভিন্নমুখী দুই ঘর একউঠোনে করে নিয়েছে। রাত হলে সব কেমন নিঝুম হয়ে আসে। মালতীর আর তখন ঘুম আসে না। রঞ্জিত এতদিন ছিল বলে ভয়ডর কম ছিল। রঞ্জিত চলে গেল ওর আর কী থাকল! যা হবার হবে। সে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বে ভাবল।

    আশ্বিনের এই রাতে এমন গরম যে দরজা বন্ধ করলে হাঁসফাঁস লাগে। এখনও নরেন দাস জেগে আছে। তাঁতঘরে কি যে করছে নরেন দাস! আভারানী বাসন মাজতে ঘাটে গেছে। আবু গেছে হারিকেন নিয়ে। সে পাড়ে হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে। দরজা খোলা রেখে একটু হাওয়া খাওয়ার জন্য পাটি পেতে মালতী শুয়ে পড়ল। গরমে গরমে শরীর যেন পচে গেছে। এই গরম, রাতের অন্ধকার সব মিলে মালতীকে নানারকম হতাশায় পীড়িত করছে। কিছুই নেই আর। হায়, জীবন থেকে তার সব চলে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। গরমের জন্য সায়া সেজিম শরীর থেকে আলগা করে দিতে দিতে এমন সব ভাবল। মানুষটা এখন কোথায় আছে, কী কাজ এমন সে করে বেড়ায়, যার জন্য নানা স্থানে তাকে ছদ্মবেশে পালিয়ে বেড়াতে হয়। ছদ্মনামটা তার কেউ জানে না। ওর একটা ছবি সে দেখেছে, ছবিতে রঞ্জিতকে চেনাই যায় না। লম্বা দাড়ি, মাথায় পাগড়ি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা—যেন এক প্রৌঢ় সন্ন্যাসী। মালতী এই ছদ্মবেশ কিছুতেই বিশ্বাস করেনি। একদিন, তখন লাঠিখেলা ছোরাখেলা হয়ে গেছে। যে যার মতো যার-যার বাড়ি চলে গেছে। মালতীকে জ্যোৎস্নায় সহসা পিছন থেকে কে এসে আঁচল টেনে ধরল—দেখল সেই সন্ন্যাসী। রুদ্র মূর্তি, মালতী ভয়ে মূর্ছা যাবার মতো। রঞ্জিত তখন বলল, আমি রঞ্জিত মালতী, চিনতে পারছ না। মালতী কাপড়টা বুকের কাছে টেনে রাখার সময়, সেই দৃশ্য মনে করে কেমন উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সেদিনই কেবল রঞ্জিত একবার মাত্র ওকে দুহাতে জাপ্টে ধরে ভয় ভাঙিয়েছিল, আমি রঞ্জিত, তুমি চিনতে পারছ না! মালতী এখন ভাবছে সে বোকা। ভালো করে মূর্ছা গেলে মানুষটা নিশ্চয়ই পাঁজাকোলে তুলে নিত। ঘরে দিয়ে আসত। সে খিলখিল করে হেসে উঠে তখন দু’হাতে জড়িয়ে ধরে সহসা অবাক করে দিতে পারত। আর মানুষটা নিজেকে বুঝি তখন কিছুতেই সামলে রাখতে পারত না। মনে হতেই ভিতরটা ওর উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠল। এবার সে সায়া সেমিজ পুরোপুরি আলগা করে ঘাটের দিকে তাকাল। অন্ধকারের জন্য ঘাটের কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাবগাছটার নিচে জল উঠে এসেছে। সেখানে জলে মাছ নড়লে যেমন শব্দ হয় প্রথমে তেমন একটা শব্দ পেল। অমূল্য থাকলে এ-সময় বড়শিতে মাছ আটকেছে ভেবে ছুটে যেত। কিন্তু মালতী জানে-নরেন দাস কোনও বড়শি জলে ফেলেনি। একা মানুষ বলে সারাদিন খাটা-খাটনি গেছে। এখনও রাত জেগে তাঁতঘরে সূতা ভিজাচ্ছে মাড়ে। কাল ফিরবে অমূল্য। কাজের চাপ তখন কমবে।

    শোভা সকাল সকাল শুয়ে পড়েছে। শরীর ভাল নেই। জ্বর-জ্বর হয়েছে। আবু এসে ঘরে ঢুকলেই দরজা বন্ধ করে দেবে ভাবল মালতী। ঘাটে হারিকেন তেমনি জ্বলছে। আবুকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু আলোটা সহসা নিভে গেলে শুনতে পেল ঘাটে বাসন পড়ার শব্দ। মালতী ভাবল, ঘাট বুঝি পিছল ছিল, উঠে আসার সময় বৌদি পা ঠিক রাখতে পারেনি, পড়ে গেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁতঘরে ঢুকে কারা যেন ধস্তধস্তি শুরু করে দিয়েছে। মালতী এবার উঠে বসল। এ সময়ে চোর ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রব বাড়ে। সে ডাকল, দাদারে তর ঘরে লড়ালড়ি ক্যান! কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার—না কোনও শব্দ, না কোনও চিৎকার। ফের সব নিঝুম। সে তাড়াতাড়ি সায়া-সেমিজ ঠিক করে উঠে বসল। আলো জ্বালাবে এই ভেবে হারিকেনটা টেনে আনার জন্য উঠে দাঁড়াতেই দুই ছায়ামূর্তি অন্ধকারে সাপ্টে ধরে মুখে কাপড় ঠেসে দিল। এই ঘরে এখন ধস্তাধস্তি। শোভা জেগে গেল। অন্ধকারে শুধু ফোঁস ফোঁস শব্দ। কিল লাথি এবং মহাপ্রলয়ের মতো ঘটনা। সে ভয়ে ডাকতে থাকল পিসি-পিসি। তারপর আর কারও কোনও সাড়া নেই। কারা যেন ভূতের মতো এই গৃহ থেকে যুবতী মেয়ে তুলে বর্ষার জলে ভেসে গেল।

    সোনা খেয়ে উঠে নাটমন্দিরের সিঁড়িতে নেমে এল। লালটু পলটু এখন জমিদারবাবুর ছেলেদের সঙ্গে ভিড়ে গেছে। সোনা এ-বাড়ির কাউকে চেনে না। সেই আকাশ আবার মাথার ওপর। সে যেন অনেকক্ষণ কোঠা বাড়ির ভিতর দিয়ে হেঁটে এসে আকাশটাকে দেখে ফেলল। সব কিছুই নতুন। অপরিচিত মুখ। জ্যাঠামশাই আগে আগে হেঁটে যাচ্ছেন। সে প্রায় সব সময় জ্যাঠামশাইর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। সে একটা সাদা হাফ শার্ট গায়ে দিয়েছে। নীল রঙের প্যান্ট। চুল ছোট করে ছাঁটা। চোখ বড় বলে অপরিচিত মানুষজনেরা ওকে ঘিরে ধরেছে। ওর নাম কি, জিজ্ঞাসা করছে। জ্যাঠামশাই তখন সামান্য হাসছেন। নাম বলতে বলছেন। এবং সে যে চন্দ্রনাথ ভৌমিকের ছোট ছেলে, বিকেলের ভিতরেই সেটা ছড়িয়ে পড়ল। নাটমন্দিরের পুরোহিত মশাই সোনাকে দুটো সন্দেশ দিল খেতে। সে সন্দেশ দুটো খেল না। জ্যাঠামশাইকে দিয়ে দিল রেখে দিতে। সে জ্যাঠামশাইকে ফেলে খুব একটা দূরে যেতে সাহস পাচ্ছে না। লালটু পলটু ওকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। দীঘির পাড়ে ব্যাডমিন্টন খেলা হবে,সোনা যায়নি। বস্তুত সোনা যেতে সাহস পায়নি। ঈশম এলে সে যেন যেতে পারত। ঈশম এখন নদীতে আছে। এ ক’দিন সে নদীতে থাকবে। ছইয়ের ভিতর সে শুয়ে বসে অথবা মাছ ধরে, বেলে মাছ এবং পুঁটি মাছ ধরে কাটিয়ে দেবে। নিজের নৌকায় রান্না করবে, এবং খাবে।

    মাঝে মাঝে সোনার আর যা মনে হচ্ছিল, সে এক মেয়ের কথা, যে মেয়ে বাপের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে অন্দরে ঢুকে গেল। সোনার সেই জগতে মাঝে মাঝে চলে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল। ছোট ছোট মেয়েরা, ছেলেরা লুকোচুরি খেলছে জরির টুপি পরে, সিল্কের ফ্রক গায়ে দিয়ে। সোনার ইচ্ছা হল সেই বড় উঠোনটাতে চলে যেতে। যেখান সে ফুল ফুটে থাকার মতো মেয়েদের ফুটে থাকতে দেখে এসেছে। সে জানত, ওরা এত বড় যে, তাকে তারা খেলায় নেবে না। সে একপাশে শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে। সে খেলবে না। খেলা দেখবে! ওর মুখে দুঃখী রাজকুমারের ছবি ভেসে উঠবে। তখন হয়তো কোনও ছোট্ট মেয়ে ওর হাত ধরে বলবে, এস, আমাদের সঙ্গে খেলবে! আমরা লুকোচুরি খেলব! সেই জগৎটাতে যাবার বড় প্রলোভন হচ্ছিল সোনার। পরী কী হুরী হবে কে জানে, ছোট্ট এক মেয়ে তার চোখের উপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে গেল—এখন আর সোনার অন্য কথা মনে আসছে না। কাছারিবাড়িতে বসে শুধু সেই ছোট্ট মেয়ের মুখ মনে ভাসছে। তখন জ্যাঠামশাই ডাকলেন, সোনা আয়!

    কোথায় যাবে! সোনা এখন ঠিক বুঝতে পারছে না। জ্যাঠামশাই একটা শার্ট গায়ে দিলেন। ধুতি পাট করে পরলেন। তারপর ওরা যেদিকে খেতে গিয়েছিল, সেদিকে না গিয়ে একটু বাঁ দিক ঘেঁষে বারান্দার নিচে যে কেয়ারি করা ফুলের বাগান আছে তার ভিতর ঢুকে গেলেন। যেন এই মহলাতে ঢুকতে হলে তুমি প্রথমে কিছু ফুল ফল দেখে নাও–তেমনি দৃশ্য এই ঢোকার মুখে। নানা রকমের গাছ এবং ফুল ও ফল। এ-রাস্তাটা যে বাড়ির ভিতরই আছে অনুমান করতে পারেনি। আর এ-কী বাড়ি রে বাবা, যেন সেই কী বলে না, শেষ নেই তার, সোনা একপথে এসে এখন আবার অন্য পথে নেমে যাচ্ছে। তার বাড়ি সেই অজ পাড়াগাঁয়ে। সেখানে মাত্র প্রতাপ চন্দ্রের বাড়িতে দালান, অন্য বাড়ি সব টিনকাঠের। ওদের বাড়ির দেয়াল এবং মেঝে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। দক্ষিণের ঘর, পুবের ঘর, সব ঘরের একটা নাম আছে। এখানে কোনও নাম নেই। এখানে সব হলঘরের মতো ঘর। জ্যাঠামশাই যেতে যেতে সব ঘরগুলির নাম বলে যাচ্ছেন। দেয়ালে বড় বড় তৈলচিত্র। সে-সব তৈলচিত্র কার, কোন সালে মারা গেছে, কার জন্ম কোন মাসে, বাবুদের হাতি কবে কেনা হয়েছে, যেতে যেতে জ্যাঠামশাই হাতি কেনার গল্প করতে থাকলেন। তারপর একটা সিঁড়ি। দোতলায় উঠে গেছে। কার্পেট পাতা। সোনা এ-সবের কী নাম কিছু জানে না। জ্যাঠামশায় সোনাকে সব বলে যাচ্ছেন। কী সুন্দর আর নরম কার্পেট। সোনার খালি-পা ছিল। সে খুব আস্তে আস্তে, বুঝি দ্রুত হেঁটে গেলে কার্পেটে পা লাগবে—সে তেমনভাবে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল। দু’পাশে সব রেলিঙ্। কেবল মেয়েরা এখানে গিজগিজ করছে। ভূপেন্দ্ৰনাথ এমন মানুষ যে তাঁর কাছে অন্দর সদর সমান। সে একটা পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, বৌঠাইরেন, আমি আইছি। সোনা পাশে চুপচাপ পলাতক বালকের মতো দাঁড়িয়ে থেকে এই ভিতর বাড়ির ঐশ্বর্য এবং বৈভব দেখতে দেখতে কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। ওর মনে হল এখানে মানুষ থাকে না, দেব-দেবীরা থাকে। সে-যতটা পারল জ্যাঠামশাইর জামা-কাপড়ের ভিতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল।

    সোনা কান পেতে থাকল। কে সাড়া দিচ্ছে, কোনদিকের দরজা খুলছে, সেই মেয়েটা কোথায়? এসব ভাবনার সময়ই মনে হল পর্দা নড়ছে। পর্দার ওপাশে পায়ের শব্দ শোনা গেল। ভূপেন্দ্রনাথের সবুর সইছে না। সে পর্দার এপাশ থেকে বলে উঠল, বৌঠাইরেন, সোনা আইছে।

    বৌঠানের পাশে রাঙা চেলি পরে ছোট্ট এক মেয়ে-কেবল সেই থেকে ঘুরঘুর করছে। শালিক না চড়ুই কি পাখির যেন ছানা তার চাই। সে পুতুলের ঘর সাজাবে! পূজোর দিন বলেই রাঙা চেলি পরেছে। পায়ে আলতা। কপালে টিপ লাল রঙের। চুল বব-ছাঁট। চোখে লম্বা কাজল। হাতে হাতির দাঁতের কারুকাজ করা বালা। কমলা, পুজোর দিনে কত রকমের গয়না পরেছে। সেও ঠাকুমার পায়ে পায়ে বের হয়ে এল।

    ভূপেন্দ্রনাথ ফের বললেন, সোনা আইছে বৌঠাইরেন।

    বৌঠান চারদিকে তাকালেন। কোথায় সেই ছেলে! সোনা জ্যাঠামশাইর পিছনে এমন লেগে আছে যে সহসা দেখা যায় না। কমলা বলল, দাদু সোনা কোথায়?

    ভূপেন্দ্রনাথ জোর করে সোনাকে পেছন থেকে টেনে আনল, এই হইল সোনা!

    কমলা বলল, দেখি সোনা তোমার মুখ। কেমন পাকা পাকা কথা কমলার! সেই মেয়ে! সোনা লজ্জায় আরও আড়ষ্ট হয়ে গেল।

    বৌঠান সোনাকে অপলক দেখল। ভূপেন মিথ্যা বলেনি। দেখেই বোঝা যায় এই সোনা ভূপেন্দ্রনাথের বড় আদরের। চন্দ্রনাথের ছোট ছেলে সোনা। চন্দ্রনাথ বিকালে এ-বাড়ির কাছারিবাড়িতে রোজ আসে। ভোরের দিকে কোনও কেনও দিন দেখা করে যায়। পুজোর সময় কাজের চাপ বলে বোধ হয় ভোরে দেখা করে যেতে পারেনি। এবার শচীন্দ্রনাথ সোনাকে আসতে দিয়েছে, ভূপেন্দ্রনাথের প্রাণে বড় আনন্দ। পূজোর ক’টা দিন তিনি খুবই ব্যস্ত থাকবেন, তবু আপন রক্তের এই তিন বালকের উপস্থিতি তাঁকে বড় মহিমময় করে রাখছে। ভূপেনের মুখ দেখলে এ-সব যেন টের পাওয়া যায়। বাড়ি থেকে ফিরে এলেই সে বৌঠাকুরানীকে বলত, বোঝলেন বৌঠাইরেন, সোনা যে কী হাসে না, কী বড় চোখ না, কী সুন্দর হইছে পোলাটা—আপনেরে আর কি কমু! বড় হইলে আপনেরে আইনা দ্যাখামু। সেই সোনা এ বাড়ি আসতেই এখানে টেনে নিয়ে এসেছেন, দ্যাখেন, আনছি। দ্যাখেন, মুখখানা একবার দ্যাখেন বৌঠাইরেন।

    বৌঠাকুরানী সোনার মুখ দেখতে দেখতে শুধু ভাবলেন, ভূপেনের কথায় কোনও অতিশয়োক্তি ছিল না—পোলার মুখ ত রাজার মতো হইছে। কুষ্ঠি করাইছ নি!

    —কুষ্ঠি সূর্যকান্তরে দিছি করতে। বলে সে সোনাকে বলল, প্রণাম কর। জ্যাঠিমা হন।

    সোনা উবু হয়ে প্রণাম করলে দু’হাতে তুলে ধরলেন এবং চিবুক ধরে আদর করার সময়, হাতে একটা চকচকে রুপোর টাকা দিলেন। হাতে ওর রুপোর টাকা সে নেবে কি নেবে না ভাবছিল। জ্যাঠামশাইর দিকে সে তাকাল। তিনি চোখের ইশারায় সোনাকে অনুমতি দিয়েছেন। সোনাকে এই প্রথম দেখলেন বড় বৌঠাকুরানী। এই সোনা, এত বড় বৈভবের ভিতর প্রথম ঢুকেছে। সোনাকে তিনি বুঝি রুপোর টাকা দিয়ে বরণ করে নিলেন। হাতে টাকা, এমন টাকা-পয়সা কত আঁচলে বাঁধা থাকে, এ-যেন আশ্চর্য যোগাযোগ, কথা ছিল টাকাটা দিয়ে ময়নার বাচ্চা কিনে দেবেন কমলাকে। তখনই কিনা সোনা দরজায় দাঁড়িয়ে—তিনি টাকা দিয়ে সোনাকে আশীর্বাদ করলেন।

    কমল মনে মনে ফুঁসছিল। ভূপেন্দ্রনাথ ওর সম্পর্কে দাদু হন। ভূঁইঞা-দাদু সে ডাকে। দাদু কোনও কথা বলছেন না। কমল যে এ-বাড়ির মেজবাবুর মেয়ে, ওরা যে দু-বোন ঠাকুরমার কাছে শরৎকাল এলেই চলে আসে, মেজবাবু আসেন এসব বলছে না। মেজবাবু সরকারি অফিসে বড় চাকুরি করেন। বিদেশে তার প্রবাসজীবন দীর্ঘদিন কেটেছে। তার মা মাঝে মাঝে দেশের গল্প করেন। সে দেশটাতে একটা নদী আছে, নাম টেমস নদী, সে দেশটাতে একটা গ্রাম আছে, তার নাম লুজান। একটা গীর্জা আছে সকলে ওকে সেন্ট পলের গীর্জা বলে, দুপাশে গাছ আছে, ওরা নাকি উইলো গাছ, দুপাশে জমি আছে, শোনা যায় সন্ধ্যা হলে স্কাইলার্ক ফুল ফুটে থাকে। অমলা কমলা সে-সব গল্প শোনার সময় তন্ময় হয়ে যায়! আর সামনে এই বালক সোনা নাম, তাকে সেইসব দেশের গল্প না বলতে পারলে, এতবড় নদী পার হয়ে আসা, এত বড় বাড়িতে বসবাস করা বৃথা, এবং ছুটতে না পারলে, সে যে কমল, মা তার বিদেশিনী, এ সব যেন বোঝানো যাচ্ছে না। দাদু মাকে বাবাকে ভালোবাসে না। বাবার জন্য দাদু আলাদা বাড়ি করে দিয়েছে। বুঝি মাকে নিয়ে এমন সান্ত পরিবারে ঢোকা বারণ। না, এসব সোনাকে বলা যাবে না। দিদি এখন থেকে ওকে সব শেখাচ্ছে। দিদি বলে দিয়েছে, সবকিছু সবাইকে বলতে নেই। আমি তোমাকে সোনা সব কিন্তু বলব না। আমাকে ঠাকুমা শালিকের বাচ্চা এনে দেবে। আমি পুতুল খেলব। তোমার মুখ দেখলে কেবল আমার পুতুল খেলতে ইচ্ছা হয়।

    সোনা হাতের টাকাটা পকেটে রাখল। তখন কমল আর সহ্য করতে পারল না। সোনা এবং ভূঁইঞা-দাদু চলে যাচ্ছে। সোনা ঠাকুমাকে তার ভালো নাম বলেছে। ভাল নাম ওর অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক। কি নাম রে বাবা। কত বড় নাম! তার মামাদের যেমন অদ্ভুত সব নাম—জন, ক্যামবেল, মার্টিন, বিশপ—কী সব নাম মামাদের! সে মনেই রাখতে পারে না। সোনার নামটাও প্রায় তাই! সে আর সহ্য করতে পারছে না। বলেই ফেলল, সোনা আমাকে কী বলে ডাকবে?

    বোধ হয় ভূপেন্দ্রনাথ কমলের কথা শুনতে পাননি। বৌঠাকুরানী এবং ভূপেন্দ্রনাথ কিছু পারিবারিক কথাবার্তা বলছিলেন। ওদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় কে একজন অনেকদিন পর পূজা দেখতে এসেছেন। দেখাশোনার জন্য যেন আলাদা লোক দেওয়া হয়, এ-সব কথা বলছিলেন। তখন সোনা কেন জানি কমলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। আমি তোমাকে আবার কি ডাকব। কমল ডাকব। পুচকে মেয়ে, বুঝি এমন বলার ইচ্ছা সোনার।

    —দাদু, আমাকে সোনা কমল পিসি ডাকবে না? বলে সোনার দিকে গরবিনীর চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকল।

    এতক্ষণে সোনার মনে হল কমলের চোখ ঠিক কালো নয়। ঠিক নীল নয়। ঘন নীল অথবা কালো রঙের সঙ্গে হলুদ মিশালে এক রঙ–কি যে রঙ চোখে বোঝা দায়। তারপর মনে হল বেথুন ফলের মতো রঙ। বেথুন ফল পাকলে খোসা ছাড়িয়ে নিলে এমন রঙ হয়। সোনা দেখল, কমল ওর দিকে টগবগ করে তাকাচ্ছে। গাল ফুলিয়ে রেখেছে। সোনা ছড়া কাটতে চাইল, গাল ফুলা গোবিন্দের মা চালতা তলা যাইও না। কিন্তু এই বাড়ি, এতবড় বাড়ির বৈভব ওকে এখনও ভীতু করে রেখেছে। সে কিছু বলতে পারল না।

    এ-সময় ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, তোমারে, সোনা কমল-পিসি ডাকবে। কি ক’ন বৌঠাইরেন। কমল সোনার বড় হইব না?

    —তা তোমার হইব। আটদশ মাসের বড় হইব।

    সোনা যেন একটু মিইয়ে গেল। বৌঠাকুরানী ভূপেন্দ্রনাথকে বললেন, মায়রে ছাইড়া থাকতে পারব ত?

    —পারব।

    —না পারলে ভিতর বাড়িতে পাঠাইয়া দিও।

    —দিমু।

    বস্তুত এই পরিবারে ভূপেন্দ্রনাথ যথার্থ আত্মীয়ের মত। এই তিন বালক, আত্মীয়ের সামিল। লালটু পলটুর সমবয়সী বৌঠাকুরানীর দুই বড় নাতি, ওর বড় ছেলে অজিতচন্দ্রের ছেলে এবং ছেলের ছোট শ্যালক নবীন। লালটু পলটু এলে কাছারিবাড়ির লনে অথবা দীঘির পাড়ে খেলা—ব্যাডমিন্টন খেলা। বাবুদের আরও সব আমলা কর্মচারীর ছেলেরা সমবয়সী না হলেও—একসঙ্গে পূজার কটা দিন খুব হৈচৈ—যেন প্রাণে আর ঐশ্বর্য ধরে না। সারাদিন পূজার বাজনা। কেবল বাদ্য বাজে। ঢাক ঢোল বাজে। কাঁসি বাজে। আর অষ্টমীর দিনে বাবুদের বাড়ি পাঁঠা বলি। শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাড়ে তখন কী জাঁকজমক। নবমীতে মোষ বলি, হাড়কাঠে তখন পাঁঠা, মোষ, মোষের বলিদান। ভোর থেকে কমল বৃন্দাবনীর সঙ্গে ফুলের বাগানে ঠিক মৌমাছি হয়ে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। কলকাতার কমল গাঁয়ে এসে পূজার এ-কটা দিন ফুরফুরে পাখি হয়ে যায়।

    সেই কমল সোনার হাত ধরে সারা প্রাসাদ ঘুরে ঘুরে বেড়াল। হা-হা করে হাসল। হাসবার সময় সে বড় হলঘরে তার এই হাসির প্রতিধ্বনি কেমন শোনাল কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। হাত ধরে সে ছুটল। বড় বড় খিলান আর টানা লম্বা বারান্দা। ছোটার সময় সে পকেট ধরে রেখেছিল। পকেটে টাকাটা আছে। ছুটতে ছুটতে ওরা অন্দরের দিকটায় এসে গেল। কেমন নিঝুম, বাড়ির পিছনে বড় বড় গাছ সব। সারি সারি সুপারি ফলের বাগান। কমল হাত ধরে এবার ফিরে আসার সময় বলল, সোনা, ঐ দ্যাখ আমার দিদি দাঁড়িয়ে আছে। যাবি?

    সোনা ঘাড় কাত করল। সে এখনও কমল অথবা কমল-পিসি কিছুই বলছে না। কেবল কমলের হাত ধরে সে হাঁটছে।

    বারান্দায় রেলিঙে সেই মেয়ে। সোনা নাম বলে দিতে পারে। মেয়ের নাম অমলা। রেলিঙে ঝুঁকে সেই মেয়ে এখন ওকে দেখছে। লম্বা ফ্রক হাঁটুর নিচে। ঘাড়ের কাছে চুল। একেবারে সোনালী রঙ চুলের। আর কাছে যেতেই দেখল চোখ একেবারে নীল।

    কমল বলল, সোনা!

    দিদি যেন ওর ঘুম থেকে উঠেছে এমনভাবে তাকাল। অমলা হাই তুলে বলল,–কি নাম তোমার?

    এই মেয়ে কথা বলছে, কী যে ভালো লাগছিল। সে এইসব বালিকার মতো কথা বলতে চাইল, আমার নাম শ্রীঅতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক।

    —আমাকে তুমি কি বলে ডাকবে? অমলা বলল।

    কমল বলল, সোনা, তোর পিসি হয়। অমলা পিসি।

    আর ডল পুতুলের মতো এই মেয়ে কমলা। ডাকে সবাই কমল বলে। সোনা খুব ধীরে ধীরে ওদের মতো কথা বলল, তুমি আমার কমল-পিসি। তুমি আমার অমলা-পিসি।

    কমলা খুব যেন খুশি। অমলা আবার রেলিঙে ঝুঁকে কি যেন দেখছে।

    সোনা বলল, কমল, তুমি ঘোড়ায় চড়তে পার?

    কমল বলল, হ্যাঁ রে, তুই আমার নাম ধরে ডাকছিস। আমি দাদুকে কিন্তু বলে দেব।

    সোনাকে কেমন বিমর্ষ দেখাল। সে বলল, আমি জ্যাঠামশয়ের কাছে যামু। সে রাগ করলে কমল অন্য কথায় এল। বলল, আমি ঘোড়ায় চড়তে পারি। সোনাকে কাছে এনে বলল, যামু কিরে, যাব বলবি

    সে তবু যেন খুশি হয় না। অথবা ওর যেন এখন বলার ইচ্ছা, আমার এক পাগল জ্যাঠামশাই আছে। কিন্তু সে তা না বলে বলল, ছাদে বড় বড় পুতুল। কেবল উইড়া যায়।

    কমল বলল, নদীর পাড়ে কাশবনে ফুল ফুটলে ওরা স্থির থাকতে পারে না। বাকিটুকু বলল না। বাকিটুকু অমলাদি ওকে বলেছে। কাশ ফুল ফুটলে বসন-ভূষণ ঠিক থাকে না। সব ফেলে কেবল নদীর চরে উড়ে যেতে চায়।

    পরীদের কথা শুনেই অমলা কেমন ফের ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো সোনাকে দেখল। সে যেন এই প্রথম দেখছে। সে সোনার চুলের ভিতর হাত রাখল এবার। সব ভুলে গেছে মতো বলল, কাদের ছেলে রে!

    —অমা, তুমি জান না! এই না বললাম তোমাকে! আমাদের চন্দ্রনাথ দাদুর ছেলে!

    —ও মাঃ, তাই বুঝি। তবে তো আমাদের জিনিস—এমন এক মুখ করে সে সোনাকে বুকের কাছে সাপ্টে ধরতে চাইল। সোনা একটু সরে দাঁড়াল। মেয়ের শরীরে কি যেন গন্ধ—মিষ্টি, বাগানে বেল ফুল ফুটলে সে এমন একটা গন্ধ পেত। মেয়ের চোখ এত নীল যে আকাশকে হার মানায়। সোনার একবার ইচ্ছা করছিল চোখ দুটো ছুঁয়ে দেখতে। বিষণ্ন গোলাপের পাপড়ি ঝরে গেলে যেমন কাতর দেখায় এই চোখ এখন তেমন কাতর দেখাচ্ছিল। কেবল হাই তুলছে অমলা। তুমি সোনা এস, বলে সহসা সোনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে চাইল।

    সোনা বলল, আমি জ্যাঠামশাইয়ের কাছে যামু।

    —কি রে, দিদিকে ভয় পাস কেন?

    অমলা বলল, এই শোনো। বলে কেমন ঝলমল করে উঠল খুশিতে। সোনার এমন মুখ, হাসিখুশি মুখ, ঝলমল আকাশের মতো মুখ দেখতে বড় ভালো লাগল।—এস, আমার সঙ্গে এস। এস না, ভয় কি! কমলের মতো আমি তোমার পিসি। আমাকে তুমি অমলা-পিসি ডাকবে। এস না।

    কমল বলল, আয় না। ভয় কি!

    ওরা সিঁড়ি ধরে নামবার সময় ছোটবৌরানী বলল, কার ছেলে রে!

    —সোনা, চন্দ্রনাথ দাদুর ছেলে।

    বৌঝিরা বলল, ওমা, এ কেরে?

    কমল গর্বের সঙ্গে যেন পরিচয় দিল, জান না! চন্দ্রনাথ দাদুর ছেলে।

    —এ ছেলে কথা বলে না! মা, একি ছেলে রে! অমলা হাসতে থাকল।

    সোনা বলল, আমি জ্যাঠামশয়ের কাছে যামু।

    কমলা যেন সোনার চেয়ে কত বড় এমন চোখে মুখে কথা বলল, না লক্ষ্মী, তুমি এস। দিদি তুই সোনাকে ভয় দেখাস কেন রে!

    অমলা বলল, ভয় কোথায় দেখালাম! সোনা, এস।

    লোকজনের ভিড় ঠেলে ওরা ঠাকুমার ঘরে ঢুকে গেল। এ-ঘরটাও সেই বড় হলঘরের মতো। বড় বড় খাট পড়েছে। বারান্দায় ময়না পাখি। যাবার সময় অমলা পাখির খাঁচাটাকে ঘুরিয়ে দিয়ে গেল। কমল কি যেন কথা বলল পাখিটার সঙ্গে। বলল, এর নাম সোনা। পাখিটা দাঁড় থেকে নেমে ডাকল, কমল, কমল, নাম বল। সোনা সোনা নাম বল। পাখির গলায় সোনা তার নাম শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল। সোনাকে দেখে পাখিটা তখন খাঁচার ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে।

    বড় এই ঘরটাতে ঢুকেই অমলা লাফ দিয়ে খাটে উঠে গেল। সে আলমারির ওপর থেকে বড় একটা চামড়ার স্যুটকেস টেনে নামাল। কি যেন ওরা দেবে সোনাকে। কমল ওর বাক্স খুলে ফেলল। ওরা কে আগে কি দেখবে সেজন্য স্যুটকেশ থেকে সব টেনে নামাল। অমলার বয়স আর কত, এই এগারো বারো, কমলের বয়স কত এই নয় দশ–কে জানে কার সঠিক বয়স—তবু দু’জনের ভিতর সোনাকে খুশি করার জন্য প্রতিযোগিতা, এই দ্যাখো সোনা বলে, পুঁতির মালা, ঝিনুক এবং ছোট ছোট নুড়ি পাথর বাক্স খুলে দেখাল। কমল বলল, তুমি কী নেবে সোনা!

    সোনা বলল আমি কিছু নিমু না।

    অমলা বলল, এই দ্যাখো কী সুন্দর ছবি, ছবি নেবে?

    —না, আমি কিছ নিমু না

    অমলা বলল, এই দ্যাখো কী সুন্দর ময়ূরের পালক, পালকের কলম দিয়ে তুমি লিখতে পারবে।

    —আমি জ্যাঠামশাইর কাছে যামু কমল।

    —ও মা! দিদি, দ্যাখ সোনা আমাকে কমল ডাকছে। পিসি ডাকছে না।

    অমলা হাসল। পুচকে মেয়ের কি বড় হবার সাধ। সে এবাব বলল, বাইস্কোপের বাক্স নেবে সোনা! এখন যেন অমলা কমলা যে যার তূণ থেকে শেষ অস্ত্র বের করছে। অমলা বলল, চোখ রাখো, কী সুন্দর ছবি দেখা যাচ্ছে! দ্যাখো কী সুন্দর একটা মেয়ে ডালিম গাছের নিচে, খোঁপায় ফুল গোঁজা। তারপর অমলা আর একটা ছবি লাগিয়ে বলল, দু’জন সিপাই, মাথায় ফৌজি টুপি। পাশে দুটো বাঁদর। গলায় গলায় ভাব। পা তুলে সোনাকে দেখে নাচছে।

    সোনা এবার ফিক্ করে হেসে দিল। বাঁদর নাচছে দু’পাশে। সে এবার সাহস পাচ্ছে যেন।

    অমলা বলল, এই দ্যাখো। অমলা ছবিটা প্যাল্টে দিতেই সোনা দেখল, একটা ঝরনা। একটা প্রজাপতি। এবং ঝোপের ভিতর মস্ত এক বাঘ। সোনা চোখ বড় বড় করে বলল, অমলা, একটা বাঘ।

    —এই রে! তুমি আমাকেও নাম ধরে ডাকছ। বলেই খুশিতে গালে গাল লেপ্টে দিল সোনার।

    সোনাকে নিয়ে অমলা কমলা একসময় ছাদে উঠে এল। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে শীতলক্ষ্যার বুকে নেমে আসছে। ডায়নামোর শব্দ ভেসে আসছে। চারদিকে আলোতে আলোময়। মনে হয় যেন এখানে এসে সব পৃথিবীটা খুশিতে ঝলমল করে ফুটে উঠেছে। কতদূর পর্যন্ত আলো, আলোতে আলোময় এই মাটি এবং গাছ ফুল পাখি। কি উঁচু ছাদ! সে ছাদের ওপর ছুটে বেড়াল। কার্নিসের কাচে ঝুঁকে দাঁড়াল। নিচে দীঘির জল। জলে আলোর প্রতিবিম্ব ভাসছে। দূরে শীতলক্ষ্যা নদী এবং পাশে চর, তারপর পিলখানার মাঠ। মাঠে হতিটা বাঁধা থাকে। ছাদে দাঁড়িয়ে সে, সব দেখার চেষ্টা করল। অমলা কমলার সঙ্গে সেই থেকে তার ভাব হয়ে গেছে, সে বাড়িময় ছুটে বেড়িয়েছে। অমলা কমলার শরীরে কি যেন মৃদু সৌরভ, এই সৌরভ মনের ভিতর এক আশ্চার্য রং খুলে ধরছিল। অমলা কমলা ওর দু’পাশে দাঁড়িয়ে কোথায় কী আছে, কোনদিকে গেলে মঠ পড়বে, মঠের সিঁড়িতে সাদা পাথরের ষাঁড়, গলায় তার মোতি ফুলের মালা, আরও কি সব খবর দিচ্ছিল। এখন সে ছাদে উঠে এসেছে, ছাদের দুপাশে দুই মেয়ে তাকে কেবল বড় হতে বলছে। সে মাকে ফেলে অনেকদূর চলে এসেছে। সে যেন ক্রমে বড় হয়ে যাচ্ছে। ওর ভয় ভয় ভাবটা থাকছে না। যেমন মেলায় বিন্নির খৈ খেতে খেতে অথবা ঘোড়দৌড়ের মাঠে কালু শেখের ঘোড়া দেখতে দেখতে সে পৃথিবীর যাবতীয় মাধুর্য শুষে নিত, ঠিক তেমনি এই ছাদে আজ গ্রহ-নক্ষত্ৰ দেখতে দেখতে আকাশের মাধুর্য শুষে নেবার সময় তার মায়ের মুখ মনে পড়ে গেল। এই দুই মেয়ের ভালোবাসা তাকে আর ছোটাতে পারল না। ছাদের এক কোণে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। বড় কাতর দোখাচ্ছে তাকে। অমলা কমলা আদর করতে চাইলে সে প্রায় কেঁদে ফেলল। এত দূরদেশে এসে মায়ের জন্য মন খারাপ, ভিতরটা তার কেমন ছটফট করছে।

  • একুশ

    একুশ

    ক্রমে রাত বাড়ছে। কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে প্রকৃতি। গাছের একটা পাতা পর্যন্ত হাওয়ায় নড়ছে না। ক্রমে এই গ্রাম আরও অন্ধকারে ডুবতে থাকল। বুঝি চরাচরে কেউ জেগে নেই। ভেসে ভেসে সেই নৌকা কোথায় যে যায়, কোথায় যে থাকে কেউ জানে না। চরের বুকে রাতের গভীরে সেই নৌকা এসে হাজির। বড় দুই কোষা নাও। কোষা নাওএর মাঝিরা বাঁধাছাদা একটা জীবকে নৌকায় তুলে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    মহেন্দ্ৰনাথ তখন ডাকলেন, শচী, শচীরে।

    কোনও সাড়াশব্দ নেই। তিনি ডাকলেন, অলিমদ্দি, অ অলিমদ্দি!

    কেউ সাড়া দিচ্ছে না। পুবের বাড়িতে হায় হায় রব। তোমরা ওঠ সকলে। কে কোথায় আছ! দীনবন্ধুর বৌ চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে। দীনবন্ধু উঠোনে নেমে চিৎকার করে উঠল। সকলে আপনেরা জাগেন। সর্বনাশ হইয়া গ্যাছে। শচীন্দ্রনাথ জেগেই মাথার কাছ থেকে একটা বর্শা তুলে নিলেন হাতে। অলিমদ্দি বলল, কর্তা, আমি একটা সুপারির শলা নিলাম।

    ভুজঙ্গ এল, কবিরাজ এল, কালাপাহাড়, চন্দদের দুই বেটা এবং গৌর সরকার সদলবলে মুহূর্তে এসে হাজির।—কি হইছে!

    —কি আর হইব! তোমার আমার মান-সম্মান গ্যাছে।

    সবাই অন্ধকারে বের হয়ে পড়ল। মেঘলা আকাশ। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। নয়াপাড়াতে খবর দেওয়া হল। টোডারবাগ থেকে ছুটে এল মনজুর, আবেদালি আর হাজিসাহেবের তিন বেটা। বলল, কোনদিকে যাওয়ন যায়।

    শচীন্দ্রনাথ বললেন, চরের দিকে লও। রাইতে যদি সেই নাও জলে জলে ভাইসা যায়!

    জয়,জয় মা মঙ্গলচণ্ডীর জয়। মা গো, তর ছাওয়াল পাওয়াল—তুই যারে রাখস মা তারে কে মারে! মা গো, তুই অবলা জীবের প্রাণ, তর কাছে মা জিম্মায় থাকল দুঃখিনী মালতী।

    শচীন্দ্রনাথ নৌকায় উঠে বললেন, জব্বর কইরে! সে গাঁয়ে আইছিল, সে নাই ক্যান?

    এবার আবেদালি হা হা করে কেঁদে উঠল, কর্তা গ, আমার জানমান আর নাই। পোলার কসুর আমি কি দিয়া শোধ দিমু। সকলে থ।

    একদল থানায় গেল। সবিরুদ্দিনসাবকে খবর দিতে হয়।

    শচীন্দ্রনাথ তখন বললেন, জব্বরের কাম। তোমরা নৌকা ভাসাও জলে।

    জলে নাও ভাসাও রে, কিংবদন্তীর নাও ভাসাও। সোনার নাও পবনের বৈঠা। নাও রে—জলে নাও ভাসাও। মানুষগুলি রাতের অন্ধকারে জয় জয়মালা, গন্ধেশ্বরী, ওমা তুই পটেশ্বরী, তর দেশে জলে স্থলে দুঃখ মা, আখেরে বনিবনা হবে কি হবে না কে জানে। শচীন্দ্রনাথ চিৎকার করে উঠলেন, তিনদিকে চইলা যাও। একদল ফাওসার বিলে বিলে যাও। অন্যদল সোনালী বালির নদীর চরে। যারা পশ্চিমে যাবা সঙ্গে নিবা পালের নাও। পশ্চিমা বাতাসে পাল তুইলা দিবা।

    নৌকা এখন না ছাড়লে নাগাল পাওয়া দায়। শচীন্দ্রনাথ বললেন, আর আমি যাই, সঙ্গে নরেন দাস যাউক—সেই যেখানে চরে আলো জ্বলে সেইখানে। ওরা এবার সকলে নৌকায় উঠে বৈঠা মাথার ওপর তুলে চিৎকার করে উঠল, মাগো, তর এমন সুজলা সুফলা দ্যাশ, মাগো তুই ক্যান আবার জ্বইলা উঠলি। সংসারে বনিবনা হয় না—একি কাণ্ড মা সিদ্ধেশ্বরী। তুই মা ওর মুখ রক্ষা কর দিকি ইবারে।

    —আর কে যাইবা জলে জলে? গজারির বনে বনে অন্ধকার, আলো জ্বলে না, জোনাকি জ্বলে না। নিশুতি রাতে সাপে বাঘে বনিবনা হয় না। সেই বনের দিকে বড় নাও নিয়ে শচীন্দ্রনাথ ভেসে পড়লেন। এতক্ষণ গ্রামের ভিতর ভীষণ চিৎকার চেঁচামেচি ছিল। বাড়ি থেকে বাড়িতে, গ্রাম থেকে গ্রামে নৌকার পর নৌকা ছুটে এসেছে। টেবার দুই ভাই ছুটে এসেছে। মেয়ে মহলে গুঞ্জন। চোখে মুখে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের ছাপ—কি হল দেশটাতে! এমন দেশ উচ্ছন্নে যায়—হায়, আর সর্বনাশ হতে কি বাকি! সকলে চুপচাপ এখন জেগে বসে আছে। কেউ সে রাতে আর ঘুম যেতে পারল না।

    শচীন্দ্রনাথ, বড় মিঞা, মনজুর এবং নরেন দাস নিচের দিকের পাটাতনে। উপরের দিকের পাটাতনে অলিমদ্দি, গৌর সরকার, প্রতাপ চন্দের দুই ছেলে। সকলের হাতে বৈঠা। আর উপরে আকাশ। মেঘলা আকাশ ক্রমে কেমন পাতলা হয়ে আসছে। থেকে থেকে হাওয়া উঠছে। সবগুলি দাঁড় এক সঙ্গে উঠছে নামছে। দ্রুতবেগে প্রায় ঘণ্টায় দশ বিশ ক্রোশ তারা পাড়ি জমাতে পারে এখন। হালে মনজুর শক্ত হয়ে বসে থাকল। এই অসম্মান এখন যেন শুধু নরেন দাসের নয়—একটা জাতির, মনজুর মুখচোখ রাঙা করে হাঁকল—জব্বইরা, তুই মুখে চুনকালি মাখাইলি!

    সেই বড় নৌকার সন্ধানে ওরা চরের মুখে এসে থামল। কোথায় নৌকা। কোনও চিহ্ন নেই নৌকার চারদিকে শুধু জল, চুপচাপ ওরা জলের ওপর দাঁড় তুলে বসে থাকল। না নেই, কোথাও নেই। আদিগন্ত জলের ভিতর ইতস্তত মাছের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। ধানখেতে দুটো একটা বালিহাঁসের শব্দ। শচীন্দ্ৰনাথ তখন বললেন, নাও ইবারে দক্ষিণে ভাসাও।

    সামনে গজারি গাছের বন। মাথার উপর গজারি গাছের অন্ধকার। নিচে জল, কোথাও বুক জল, কোথাও হাঁটু জল আর কোথাও ঝোপ জঙ্গল জলের নিচে অরণ্য সৃষ্টি করে রেখেছে। নৌকা গাছের ফাঁকে ফাঁকে জলের ভিতর ঢুকলে, ওরা প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। জলের ভিতর জোনাকিরা জ্বলছে। কত হাজার লক্ষ, যেন এক আলো অন্ধকার জগৎ। এমন আলো অন্ধকারে ওরা কিছুই দেখতে পেল না। নরেন দাস বলল, আনধাইরে আর কারে খোঁজবেন?

    কিছু পাখি ডাকল। চুপচাপ সকলে যেন আড়িপাতার মতো ভাব। এদিকটাতে কোনও গ্রাম নেই, অনেক দূরে নৌকা বাইলে সুন্দরপুর গ্রাম। ওরা যত বনজঙ্গলের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে তত ক্ৰমে সব শব্দ মরে আসছে। পাতার খসখস শব্দ হচ্ছে না। নিচে জল বলে, পাতা খসে পড়লে শব্দ হচ্ছে না। এত বড় গভীর বনে আগাছা নেই, বেতের ঝোপঝাড় চারদিকে ছড়ানো, মাথার উপর হাজার রকমের লতা দুলছে। ভয়াবহ অন্ধকার, যদি কোনও আলো জ্বলতে দেখা যায়, যদি অন্য কোনও নৌকার শব্দ কানে ভেসে আসে। কারণ, দ্রুত পালাবার মতো পথ এখানে নেই। বরং রাত কাটিয়ে দেবার জন্য এই গজারি গাছের বন। আঁধারে আঁধারে এই বন পার হলে মেঘনা নদী। নদীতে পাল তুলে দিলে ঠিক যেন আত্মীয়স্বজন যায়। অথবা নদীতে কার নৌকা ভেসে যায়, কেবা তার খোঁজ রাখে। এই গজারির বনে ওরা তন্ন তন্ন করে মালতীকে খোঁজার চেষ্টা করল। ওরা খুব আস্তে কথা বলছিল। দুটো একটা গজারি গাছের পাতা ঝরে পড়ছে। জলে জলে সেই পাতা ভেসে ভেসে অন্ধকার নদীতে নেমে যাচ্ছে। ওরা সেই পাতা অথবা পাখ-পাখালির ডাকের ভিতর নিজেদের আত্মগোপন করে রাখল। ওরা এভাবে বনের ভিতর বড় নৌকার সন্ধানে থাকল।

    না নৌকা, না সেই গুনাইবিবির গান। এমন হারমাদ মানুষ কী করে মালতীর মতো এক জবরদস্ত যুবতীকে হাফিজ করে দিল!

    শচীন্দ্রনাথ কেমন বিপর্যস্ত গলায় বললেন, নাও নদীতে ভাসাইয়া দ্যাও। বড় নাও মনে লয় নদীর জলে ভাইস্যা গ্যাছে।

    .

    —জব্বর, যুবতী কি কয়!

    —কিছু কয় না মিঞা।

    —কিছু না কইলে পার পাইব ক্যামনে?

    —ইট্টু সবুর করেন মিঞা

    —সকাল হইতে আর যে দেরি নাই জব্বর।

    জব্বর এবার পাটাতনে উঠে দাঁড়াল। নৌকা এবার গজারি বন পার হয়ে নদীতে পড়েছে। মেঘনা নদী উত্তাল। ক্রমে নদীর সব বড় বড় বাউড় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। নৌকা চালাবার নির্দিষ্ট কোনও পথ নেই। শুধু জলে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এবং ধরে আনা যুবতীকে বশ করা। হিন্দু রমণী—সুন্দরী যুবতী মাইয়া মালতীরে বশ করে শহরে নিয়ে যাওয়া। সবুর সয় না পরাণে—হেন কাজ কে করে! সবুর না সইলে জোর জবরদস্তিতে হেনস্থা করবেন মিঞাসাব। কিন্তু ছইয়ের ভিতর যায় কার সাধ্য। মালতী এখন সাপ বাঘের মতো। ভিতরে গেলেই ছুটে কামড়াতে আসছে। কখনও হিক্কা উঠছিল। কখনও পাগলের মতো চিৎকার করছিল, আর ভয়ে দু’কসে থুতু জমছে। গলা কাঠ। হাত-পা বাঁধা মালতীর। হাত-পা আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধা। তবু এই যুবতী ছইয়ের ভিতর ঢেউএ গড়াগড়ি খাচ্ছে। কখনও চুপচাপ পড়ে থাকছে। চার মাঝি, মিঞাসাব তার দুই শাগরেদ আর জব্বর। জব্বর মাঝে মাঝে ঢুকে যাচ্ছে ছইয়ের ভিতর। বশ করার কথাবার্তা বলছে। আখেরে এই মহাজন মানুষ মালতীকে ঘরের বিবি করে ফেলবে। দুই চারদিন নৌকায় নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, গায়ে পায়ে হাওয়া বাতাস লাগানো, তারপর ঘরে ফিরে যাওয়া। এমন বর্ষার দেশে দেরি আর সয় না, মন আর মানে না। উথাল-পাথাল কইরা মন নদীর চরে ছুইটা যায় কেবল। আর এমন শরীর নিয়ে জ্বলে পুড়ে খাক কে কবে হয়! জব্বর এখন পয়সার লোভে মাতালের মতো রংদার বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে কানের কাছে—মালতী দিদি, উঠেন, কথা কন, জলপানি খান। আসমান দ্যাখেন, কত বড় নদীতে নাইমা আইছি দ্যাখেন। গতরে দিদি আগুন জ্বালাইয়া বইসা আছেন, ইবারে আগুনে পানি দ্যান। বলতে বলতে দড়াদড়ি খুলে দিচ্ছে। খুলে দিলেই যুবতী মাইয়া ভালো মাইনসের ঝি বইনা যাইব! আশায় আশায় জব্বরের এখন চক্ষু চড়কগাছ।

    গলুইর দিকে তিনজন লোক। ডোরাকাটা লুঙ্গি পরনে, কালো গেঞ্জি গায়ে। পয়সার লোভে জব্বর মালতীকে করিম শেখের নৌকায় তুলে আনল, কারণ জব্বরের দুটো তাঁত না হলে চলছে না। করিম শেখ মেলায় বিধবা মালতীকে দেখেছে। মেলাতে মালতীর রূপ দেখে সে তাজ্জব বনে গেছে। এখন তো এই সময়–মেলাতে দাঙ্গা হয়ে গেছে। দাঙ্গার সময় মেলাতে করিম শেখ দলবল নিয়ে সারা মেলা ছুটে বেড়িয়েছে, মালতী কোথায়! কোথাও সে মালতীকে খুঁজে পায়নি, সেই থেকে নেশার মতো জব্বর নারাণগঞ্জের গদিতে সূতা আনতে গেলেই বলত, কিরে জব্বইরা তর দিদি কী কয়?

    —কেবল আপনের কথা কয়। পয়সা খসানোর তালে ছিল জব্বর।

    —আমার কথা ক্যান কয় রে! আমারে চিনে।

    —চিনব না আপানেরে! কয়, মালতী দিদি কয়, হা রে জব্বইরা মেলাতে যে তর লগে সুন্দর মত মানুষ দ্যাখলাম, মানুষটা কেডারে-

    —তুই কি কইলি?

    —কইলাম খুব মেহেরবান মানুষ। জবরদস্ত আদমি। নাম করিম। নারানগঞ্জ শহরে তারে চিনে না এমন কেডা আছে!

    —এত বড় কইরা দিলি আমারে!

    —দিমু না! আপনে কত বড় মানুষ, কন!

    —আর কি কইলি?

    —কইলাম সোনার মানুষ।

    —শুইনা কি কয়?

    —কয় সোনার মানুষের বুঝি সখ থাকে না।

    —তুই কি কইলি?

    —কইলাম সখ থাকে না কি কন! সখ সুখ সব থাকে।

    তারপরই একরাতে গদিতে বসে করিম বলল, রাইতে আঁখিতে ঘুম থাকে না রে, জব্বর! য্যান এক স্বপ্নের হুঁরী উইড়া উইড়া আসে।

    —হুঁরী! কেমন চোখ বড় বড় করে দিল জব্বর। শুধু হুঁরী বললে যে অসম্মান করা হয় মালতীকে। হুঁরী পরী বশ মানে। মালতী দিদি আমার আসমানের তারা। আসমানের তারা খসাইতে ম্যাও লাগে। এই বলে জব্বর একটা বড় অঙ্কের টাকার আভাস দিতে চাইল।

    —কত ম্যাও লাগে?

    জব্বর প্রথম চারখানা তাঁত কিনতে কত টাকা লাগতে পারে ভেবে নিল। তারপর বলল, হাজার টাকা।

    —হাজার টাকায় হুঁরী পরী আসমানের তারা সব এক লগে কিনন যায় মিঞা।

    —একটা কিনতে কম লাগে তবে! বুঝি ফসকে গেল সব, সে ঢোক গিলে বলল, কম লাগে তবে —লাগে না?

    —তবে লাগুক। দ্যান যা মনে লয়।

    জব্বর শেষ পর্যন্ত দর-দাম করে পাঁচশত টাকা নিল। বাকি খরচপত্র করিম সব করবে কথা থাকল। নৌকা, মাঝি, এবং রাত-বিরাতের ফূর্তি সব করিম শেখের খরচ। প্রথম ভেবেছিল করিম নৌকায় নিজে থাকবে না, কিন্তু কেন জানি ওর অবিশ্বাস জন্মে গেল, হারমাদ জব্বর, কোনদিকে শেষে নাও ভাসাবে কে জানে—তবে তার আসমানের তারাও যাবে, নগদ টাকাও যাবে। শেষপর্যন্ত সে নৌকায় পর্যন্ত উঠে এল।

    জব্বর টাকার লোভে, দুই তাঁত করে তাঁতি হবার লোভে সময়ে অসময়ে গ্রামে চলে আসত। খরচ করত দু’হাতে, ফেলুকে নিয়ে সলাপরামর্শ করত, আর যাদের সে এ-অঞ্চল দেখাতে এনেছিল—কত বড় অঞ্চল দ্যাখেন মিঞারা, এই অঞ্চলে আমার মালতী দিদি বাড়ে দিনে দিনে, তারে লইয়া যান সাগরের জলে। মালতীকে দূর থেকে দেখাবার সময় যাদের সে এমন বলত, তারা সবাই করিম শেখের লোক। দিনক্ষণ দেখে, সময় বুঝে যখন রঞ্জিত গ্রামে নেই, যখন আনধাইর রাইত এবং যখন কেউ বলে না দিলে বোঝা দায়—কার নৌকা, কেবা এল নদীর চরে, তখনই কাজটা হাসিল করতে সময় লাগবে না। সামসুদ্দিনও এখানে নেই। সে ঢাকা গেছে। সুতরাং এ-সময়েই কামটা হাসিল কইরা ফ্যালতে হয়, এমন পরামর্শ দিল ফেলু। ফেলু বিনিময়ে দুই কুড়ি দশ টাকা পেল। বিবি আন্নু তার ডুরে শাড়ি পেল। কথা ছিল, ফেলুর বিবি সঙ্গে যাবে—কিন্তু শেষপর্যন্ত ফেলু রাজি হয়নি। তার সাহস হয়নি। ধরা পড়ার ভয়ে ফেলু এতটুকু হয়ে গেছিল।

    এখন সূর্য উঠছে। মৃদুমন্দ বাতাস পালে খেলছে। ভোরের সূর্য নদীর বুক থেকে প্রায় ভেসে ওঠার মতো। মেঘনা নদীর প্রবল ঘূর্ণির ভিতর নৌকা পড়ে না যায়—মাঝিরা খুব সন্তর্পণে বৈঠা চালাচ্ছে। হাল ধরে আছে। ছইয়ের দু’দিকে কাঠের দরজা। ভিতরটা ঘরের মতো। ঠিক যেন এক পাসি নাও। ভিতরে কথাবার্তা হলে গলুই থেকে বোঝা দায়। ছইয়ের ভিতর মালতী ফোপাচ্ছে। জব্বর উবু হয়ে বসে আছে পাশে—এবং ঠিক সেই আগের মতো রংদার বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। ফেলুর বিবি নৌকায় থাকলে এখন সুবিধা হতো। দু’কুড়ি দশ টাকা দিতে রাজি, তবু বিবিটাকে ফেলু আসতে দেয়নি। যদি বশ না মানাতে পারে, বনের বাঘ খাঁচায় ঢুকে যদি হালুম-হালুম করতে থাকে কেবল—তাহলে কী যে হবে না! জব্বরের মুখ ভয়ে শুকিয়ে আসছে। সুতরাং জব্বর মরিয়া হয়ে পায়ের কাছে এসে বসে বলল, দিদি ওঠেন। দুধ গরম কইরা দেই, দুধ খান। বল পাইবেন গায়ে গতরে

    কে কার কথা শোনে! মালতী একা পাটাতনে ঝোড়ো কাকের মতো। চোখে-মুখে কলঙ্কের ছাপ। চোখের নিচে এক রাতে কী ভয়ঙ্কর কুৎসিত কালো দাগের চিহ্ন। হাতে-পায়ে এখন দড়ি-দড়া নেই। দরজার ফাঁকে সকালের আলো ওর পায়ের কাছে এসে পড়েছে।

    জব্বর ডাকল, মালতী দিদি, ওঠেন। মুখ ধুইয়া নাস্তা করেন।

    মালতী ঘাড় গুঁজে বসে থাকল, যেন ফের বিরক্ত করলে গলা কামড়ে দেবে। জব্বর ভয়ে ছইয়ের ভেতর থেকে বের হয়ে এল। তেজ এখনও মরেনি। মুখ-চোখ মালতীর পাগলের মতো লাগছে।

    —কি কয়? করিম শেখ পাটাতনে বসে হুঁকা টানছিল।

    —কয় বুড়া মাইনসের জান, সামলাইতে পারব ত!

    —কি যে কও! বয়স কত আমার! এই দুই কুড়ি মোতাবেক।

    —তা যখন পারেন, তখন সব ঠিক হইয়া যাইব।

    হুঁকা টানতে টানতেই বলল করিম, তুমি যে কইলা, তোমার দিদি আমার কথা কয়, এহনে ত দ্যাখছি, দিদি তোমার পাগলের মতো বইসা আছে।

    —আরে না মিঞা! বনের বাঘ খাঁচায় উঠাইলে তা ইট্টু এমন করে! বশ মানাতে সময় লাগে।

    —বশ না মানাইতে পারলে নদী-নালায় আর কয় রাইত ঘুরবা? কবে গদি ছাইড়া বাহির হইছি। বড় বিবি কয়, কই যান মিঞা?

    —কি কইলেন?

    —কইলাম মৎস্য শিকারে যাই! নদী-নালার দ্যাশ, পানিতে ভ্যাইসা গ্যাছে। যদি মেঘনার পানিতে ঢাইন মাছ পাই। একটু থেমে কলকের আগুন জলে ফেলে দিলেই ফস করে আগুনটা নিভে গেল। তারপর বলল, মাছ ত বঁড়শিতে আটকাইছে, এহনে মৎস্য ডাঙ্গায় তুলতে পারতেছ না—এডা ক্যামন কথা!

    —ডাঙ্গায় তুইলা ফ্যাললে আর থাকলটা কি কন? দুই চারডা লম্ফঝম্ফ। তারপর খতম। পাঁজ দোয়ারে আপনের মিষ্টি কথা ভাইসা বেড়াইব। বনের বাঘ বশ মানলে মিঞা তখন আবার ক্যান জানি সখ যায়—শিকারে গ্যালে হয়। ভাল লাগে না, পানিতে স্বাদ-সোয়াদ থাকে না। মনটা তখন আপনের আবার মৎস্য শিকারে যাইতে চায় না মিঞা? বলে জব্বর বলল, তামাক সাজি।

    —সাজ। তামুক খাইয়া সুখ পাইলাম না।

    এই খাল-বিলের দেশে করিম শেখ মুখটা ভোঁতা করে বসে থাকল। নৌকা কোনও গঞ্জের পাশ দিয়ে যাচ্ছে না। খাদ্যদ্রব্য যা ছিল সব শেষ। ঘুরে-ফিরে—যতদিন না মালতীর প্রাণে বিশ্বাস জাগে ততদিন এই খালে-বিলে এবং নদীর মোহনাতে ঘুরে বেড়াতে হবে। এখন শুধু ভালো ব্যবহার, জবরদস্তির কাজ নয়। একমাত্র সরল অকপট ব্যবহারই মালতীকে আপনার করে নিতে পারবে। এই ভেবে করিম শেখ বলল, মনের ভিতর এক পঙ্খী বাস করে জব্বর।

    —তা করে মিঞা।

    —পঙ্খীটা উড়াল দিতে চায় মিঞা। কী যে চায় পঙ্খী। পঙ্খী রে তুমি কী চাও? নতুন বিবির জন্য কেমন উদাস হইয়া যায়! পানির স্রোতে বিড়াল ভাসে—অ মন তুমি এক মাঝি। মনে পড়ে জব্বর, জবরদস্ত বিবি হালিমা—তারে বশ মানাইতে কয়দিন লাগছিল। তোমার মনে থাকনের কথা না রে, কী যে ভাবি। কেমন ছাড়া ছাড়া কথা মনের কোণে জেগে উঠছে করিমের। এখন যে সে কত উদার মোতাবেক মানুষ। সরল ব্যবহারের চিহ্ন ওর মুখে। দেখলে মনেই হবে না—করিমের ভিতরের মানুষটা বড় কুটিল, সর্পিল স্রোতের মতো। মুখে মনে এক ছবি এখন করিমের। যা খুশি মনে লয় কর, গঞ্জের ঘাট থাইকা কিনা লও। মেঘনার ইলিশ। তারপর জলে জলে ভাইসা যাও। আর পাটাতনে বইসা ইলিশ মাছের ঝোল, গরম ভাত এবং নদীর জলে ময়ূরপঙ্খী নাও ভাসাও। বড় লোভ আমার, যেন এমন বলার ইচ্ছা করিম শেখের। হিদুর মেয়ে, যৌবন যার বিফলে যায় এমন যুবতী মাইয়ারে লইয়া ঘর করতে সখ যায়—অ যুবতী, পরাণে তর কি কষ্ট, তুই ক্যামন কইরা এই যৌবনে কাইন্দা কাইন্দা মরস, তরে লইয়া যামু সাগরের জলে, ভাবতে ভাবতে করিম শেখ ফুরুৎ ফুরুৎ করে দু’বার ধোঁয়া ছেড়ে দিল আকাশে। তারপর হুঁকোটা জব্বরকে দিয়ে বলল, টান মিঞা, পরাণ ভইরা সুখটান দ্যাও! বলে, কেমন হামাগুড়ি দিয়ে চৌকাঠ পার হতে চাইলে জব্বর খপ করে দু ঠ্যাং জড়িয়ে ধরল, আরে মিঞাসাব, করতাছেন কি!

    —কি, করতাছি কি!

    —সাপ লইয়া খেলা করতে চান?

    —সাপের বিষদাঁত ভাইঙা দিতে চাই।

    —খুব সোজা মনে হইছে?

    —তা মনে হইছে।

    —সুতা বিচাকিনার মতো মনে হইছে?

    —হইছে।

    —মিঞা এত সোজা না!

    —সোজা কি না দ্যাখি। বলে সে হামাগুড়ি দিয়ে দরজা অতিক্রম করে ছইয়ের ভিতর ঢুকে গেল। এবং লেজ গুটিয়ে শেয়াল যেমন তার গর্তের ভিতর নিরিবিলি বসতে চায়, সে তেমনভাবে একটু তফাতে নিরিবিলি বসল। মালতীকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঘাড় গুঁজে বসে আছে মালতী। নৌকায় তুলে আনতে জোর জবরদস্তি করতে হয়েছিল বলে শরীরের নানা জায়গায় ক্ষত এবং রক্তের দাগ। অথবা কেউ যেন শরীরের সর্বত্র আঁচড়ে খামছে দিয়েছে। সে যেন ভালোবাসা দিচ্ছে তেমনভাবে হাত রাখতে গিয়ে দেখল, গলুইর মাঝি এদিকে তাকাচ্ছে। সে পাল্লাটা এবার ঠেলে ভেজিয়ে দিল। লালসায় এখন মানুষটার জিভ চক্‌চক্‌ করছে। পদ্মফুলের মতো তাজা, গোলাপের মতো কোমল এবং স্নিগ্ধ অথবা লাবণ্যময় শরীরে যেন যৌবন কেবল নদীর উজানে যায়। করিম শেখ উত্তপ্ত লোহার উপর হাত রেখে দ্রুত সরিয়ে নেবার মতো বার দুই ছুঁতে চেষ্টা করল, বার দুই কপালে হাত রেখে ভালোবাসা দিতে চাইল। মালতী এখন কেমন ভালোমানুষের ঝি হয়ে গেছে। করিমকে কিছু বলছে না। এবার সাহস পেয়ে করিম একেবারে রাজা-বাদশার মতো হাঁকল চরে নাও বান্দ মিঞারা। ইলিশের ঝোলে ভাত খাইয়া লও তারপরই পাটাতনে যুবতী মালতীর সঙ্গে করিম শেখ এক খেলায় মেতে যাবে এমন চোখ মুখ নিয়ে ছইয়ের বাইরে এসে নদীর চরে তাকাতেই কাশবনের ভিতর বড় এক কুমির ভেসে উঠতে দেখল বুঝি। কুমিরটা ভিতরে ভিতরে এত বড় হাঁ খুলে রেখেছে ভাবতেই করিমের মুখে রক্ত এসে গেল।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

    চরে নাও বেঁধে ইলিশ মাছের ঝোল, ভাত। গ্রাম অনেক দূরে। নদীর দক্ষিণ পাড়ে। কাশবন পার হলে আস্তানাসাবের কবরখানা। কতদূরে এখন এইসব জমি এবং মাঠ চলে গেছে। সামনে হোগলার বন। জল ক্রমে কমতে কমতে ডাঙার দিকে উঠে গেছে! সূর্য ক্রমে মাথার উপর উঠে আসছে। ওরা পাটাতনে বসে খেল। মালতী কিছু খেল না। চুপচাপ মালতী নদীর জল দেখছে। ওরা তখন সবাই অন্যমনস্ক। করিম নামাজ পড়ছে।

    মালতী আর ফিরতে পারছে না। কোথায় ফিরবে! ওকে হারমাদ মানুষেরা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। সে রঞ্জিত অথবা অন্য কোনও মুখ এ-সময় মনে করতে পারছে না। মাথার ভিতর কী জ্বালা যন্ত্রণা! থেকে থেকে অসহায় আর্তনাদ। সে হায়, কী করবে এখন? কোথায় যাচ্ছে, তার কী ইচ্ছা, সে কে, কেন এমন করে চুপচাপ বসে আছে? কিছু কি তার করণীয় নেই? এত বড় নদী, নদীর জল—এই অতল জলে ঠাঁই হবে না জননী, বলে, সবাই যখন ঝোল ভাত খেতে ব্যস্ত, করিম যখন নিবিষ্ট মনে নামাজ পড়ছে তখন মালতী জলে ঝাঁপ দিল। জয় মা জাহ্নবী, জননী মা তুই, তোর বুকে ভেসে গেলাম। কোথায় কি করে স্রোতের মুখে পড়তেই নিমিষে দূরে গিয়ে ভেসে উঠল মালতী। মাঝিরা সকলে নাস্তা ফেলে হৈ হৈ করে উঠল। জব্বর প্রমাদ গুনে তাড়াতাড়ি জলে লাফ দিয়ে পড়ল। মাঝিরা দড়ি খুলতে গিয়ে দেখল, গিঁট লেগে গেছে, ওরা তাড়াতাড়ি দড়ি খুলতে পারল না। মালতী স্রোতের মুখে অনেকদূর চলে গেছে। মালতী কখনও ডুবে যাচ্ছে, কখনও ভেসে উঠছে। করিম পাটাতনে দাঁড়িয়ে হাঁকল, সেই এক হাঁক এ-অঞ্চলের, কে ডুইবা যায়! করিম নৌকা স্রোতের মুখে ছেড়ে দিলে মালতী চরের বুকে হোগলার জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ল।

    নৌকাটা স্রোতের মুখে কচ্ছপের মতো ভেসে যাচ্ছিল। সামনে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু জলের ঘূর্ণি। ডানদিকে চর, চরের বুকে ধানক্ষেত। সকলে ভাবল, জলের নিচে বুঝি মালতী ডুবে গেছে। কিন্তু বর্ষায় মালতী সোনালী বালির চর পার হয়ে যেত, ঘূর্ণিতে মালতী ডুবে ডুবে বালিমাটি তুলে আনত নদীর বুক থেকে। সেই মালতী জলে ডুবে যাবে জব্বর বিশ্বাস করতে পারল না। সে নৌকায় উঠে চারদিকে তাকাল। পাশে শরবন। শরের গোড়া ফাঁক করে যেমন মাছ নদীর জলে সাঁতার কাটে তেমন এক মানুষ যেন এক শরবনে সাঁতার কাটছে।

    জব্বর চিৎকার করে উঠল, ঐ যায় দ্যাখেন!

    মাঝিরা বলল, মাছ মিঞা, মানুষ না।

    করিম বলল, হাঁ মাছ বড় মাছ। মাছের পিছনে এখন ছোটা ভাল না। করিম বরং সতর্ক দৃষ্টি রাখছে মাঝনদীতে। কারণ ভয় করিমের—একবার এই নদী পার হয়ে গেলে জেল হাজত করিমের। ঘরে তুলে না নিতে পারলে, নদীর জলে, শরবনে, যেখানে থাকুক, মাথায় মালতীর লগির বাড়ি, তখন জলের তলায় ডুবে যাবে মালতী! খাল-বিল-নদীর জলে কে কবে ভেসে যায় কে জানে! বর্ষার জল, এমন জলে যুবতী নারী ডুবে মরলে আত্মহত্যার শামিল হবে। করিম বলল, কইরে মিঞা, যুবতী মাইয়া কই?

    জব্বর কিন্তু সেই শরবনের দিকে তাকিয়ে আছে। বন ক্রমে ডাঙার দিকে উঠে গেছে। সেখানে এতবড় নাও ভাসালে চড়ায় নাও আটকে যাবে। এবং সেখানে শুধু কাদা-জল, কি করবে জব্বর! এই অসময়ে আল্লার বান্দা কে এমন আছে ধইরা আনে যুবতী মাইয়ারে—জব্বর রাগে দুঃখে এখন চুল ছিঁড়তে থাকল। এবং যেদিকে শরবন কাঁপছে অথবা নড়ছে সেদিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। আর সহসা দেখতে পেল, শরবন পার হয়ে মালতী অন্ধের মতো কবরখানার দিকে উঠে যাচ্ছে। করিম পাগলের মতো হা হা করে হাসতে থাকল। পথ হারাইছে যুবতী মাইয়া, যুবতীর সন্ধানে চল। সে এবার লাফ দিয়ে পড়ল জলে। জব্বর দেখাদেখি লাফ দিয়ে জলে নেমে গেল। করিমের শাকরেদ পর্যন্ত লোভে লালসায় জল সাঁতরাতে থাকল। যতদূর চোখ যায় শুধু জল, মনুষ্যহীন এই বনে-জঙ্গলে একটা শশকের পিছনে একদল নেকড়ে যেন দ্রুতবেগে ছুটছে। সামনে সেই ডাঙা। আস্তানাসাবের দরগা আর চারিদিকে গভীর জল। দূরে কতদূরে গেলে যেন লক্ষ যোজন দূরে মানুষের বসতি। এই ডাঙায় আটকা পড়লে নির্ঘাত মালতী পাগল হয়ে যাবে। অথবা ঝোপ-জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে যদি কোনওরকমে পাঁচ সাত মাইল নদীর উজানে ভেসে গিয়ে লোকালয়ে উঠতে পারে, তবে জব্বর তোমার জেল হাজত। তোমার দুই তাঁতের বোনাবুনি শেষ! লোভ লালসা শেষ! যত দ্রুত পালাচ্ছে মালতী তত দ্রুত ছুটছে জব্বর, করিম, ওর শাকরেদ। শরবনের ভিতর দিয়ে ছুটছে। শরীর কেটে রক্ত পড়ছে। ওদের এখন অমানুষের মতো দেখাচ্ছিল। ভূতের মতো অথবা প্রেতের মতো যেন শ্মশানভূমিতে নৃত্য করে বেড়াচ্ছে।

    মানুষের সাক্ষাৎ এ-অঞ্চলে চোখে পড়বে না। দু’দশ ক্রোশের ভিতর প্রায় লোকালয়বিহীন এই অরণ্য, বন জঙ্গল এবং পরবে দরগায় মোমবাতি জ্বালানো হয়, পরব বাদে মানুষ এ-পথে কেউ কখনও আসে না। এই অরণ্যের ভিতর যেন মৃত এক জগৎ-সংসার চুপচাপ প্রকৃতির খেলা দেখে চলেছে। আর আসে দশ-বিশ ক্রোশ দূর থেকে মানুষ, মৃত মানুষ। ইন্তেকালে মানুষ এসে এই কবরখানায়, অরণ্যের ভিতর আশ্রয় নেয়। এবং দরগার কবরে কবরে ইন্তেকালের সময় শোনা যায়-আল্লা এক, মহম্মদ তার একমাত্র রসুল।

    এখন সুর্য আকাশে পশ্চিমের দিকে হেলে পড়তে শুরু করেছে। ওরা তিনজন হোগলা বনে ঢুকেই কেমন দিশেহারা হয়ে গেল। কারণ, কোনও শব্দ পাচ্ছে না। জলে কাদায় মানুষ ছুটলে একরকমের ছপছপ শব্দ হয়, সেসব শব্দ চুপচাপ কেমন মরে গেছে। ওরা সেই শব্দ শুনে এতক্ষণ ছুটছিল। বাতাসে শরবন কেঁপে যাচ্ছে। ঝোপে-জঙ্গলে কত সব কীট-পতঙ্গ এবং পোকামাকড়। বর্ষার জন্য সাপের ভয়। এই অঞ্চলে বিষধর সাপ, মাঠে এবং নদীর চরে গ্রীষ্মের দিনে যারা ঘুরে বেড়াত তারা জলের জন্য সব উঁচু জমিতে উঠে যাবে। অথবা ঝোপে-জঙ্গলে ঘাসের মাথায় জড়াজড়ি করে পড়ে থাকবে। আর জলজ ঘাস, জোঁক এবং এক ধরনের ফড়িংয়ের ভয় আর—প্রায় যেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই—এই এক যুবতী এখন ওদের সবাইকে বনের ভিতর কাদায় জলে ঘুরিয়ে মারছে। যত ঘুরে মরছে তত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে জব্বর এবং পাগলের মতো চিৎকার করছে করিম, অশ্লীল সব কটুক্তি। দড়িদড়া খুলে না দিলেই হতো। এখন কি করা! হায়! এখন পদ্মফুলের মতো যে মালতী সে এখন কোথায়! এখন প্রায় ফাঁসির আসামীর মতো মুখ নিয়ে খোঁজাখুঁজি। ছুঁতে পারল না, ভালো করে সাপ্টে ধরতে পারল না, সাপ্টে ধরে সোহাগে কচুপাতার মতো নরম চুলে হাত ঢুকিয়ে, হায়! সে কিছুই করতে পারল না। সব বিফলে গেল, ভাবতেই করিম নিজের মূর্তি ধারণ করল এবার। একেবারে জানোয়ারের মতো মুখ! বলল, হালা, তুমি আমারে গরু ঘোড়া পাইছ। বলেই সে এক লাথি মারল জব্বরের পাছাতে। সঙ্গে সঙ্গে জব্বর ভয়ে ভয়ে বলল, আসেন মিঞা। মনে হয় উত্তরের ঝোপে জলে কাদায় মানুষ হাঁইটা যায়! আসেন।

    না আর না! জব্বর মনে মনে কসম খেল। পেলেই সাপ্টে ধরবে। ইজ্জতের মাথা খাবে। করিম ভাবল, না আর না। আর সোহাগ দেবে না। পেলেই জানোয়ারের মতো লাফিয়ে পড়বে ঘাড়ে। টানা- হ্যাঁচড়া, টানতে টানতে ঝোপের ভিতর ফেলে, ভাবতেই করিমের চোখমুখ নেশাখোরের মতো দেখাচ্ছে। যা হয় হবে, একবার মাটির ভিতর আবাদের চারা তুলে দিতে পারলে জমি তার, কার হিম্মত আর বলে, জমি তোমার না মিঞা, জমি আমার। সে এবং জব্বর শাকরেদ নাদির হন্যে হয়ে ছুটছিল। এবং ছুটতে ছুটতে মনে হল সন্ধ্যায় মালতী ডাঙায় উঠে গেছে। ওরা ডাঙায় উঠে কবরখানার ঝোপ- জঙ্গলে ওৎ পেতে থাকল। মালতী একা একা অরণ্যের ভিতর পথের খোঁজে ঘুরে বেড়ালে খপ করে ধরে ফেলবে।

    মালতী অভুক্ত। সারাক্ষণ শরবনের ভিতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে অবসন্ন। সে এই অরণ্যের ভিতর ঢুকে দেখল দর দর করে রক্ত পড়ছে। গোটা শরীর কেটে গেছে। গায়ে শাড়ি নেই। সেমিজ ছিঁড়ে খুঁড়ে গেছে। কোথায় কোন্ জঙ্গলের লতায় পাতায় বেতঝোপের ভিতর ওর কাপড় এখন নিশানের মতো উড়ছে কে জানে। ওর হুঁশ ছিল না। সেমিজের একটা দিক ফালা ফালা। সে টলতে টলতে নির্জন বনভূমিতে ঢুকে আহত হরিণ যেমন তার শরীর ঝোপের ভিতর টেনে নেয়, সন্তর্পণে চুপচাপ পড়ে থাকে, মালতী তেমনি নিজেকে ঝোপের ভিতর অদৃশ্য করে দিল। উপরে হাল্কা জ্যোৎস্না। সামান্য সময় এই জ্যোৎস্না আকাশে থাকবে। তারপর ক্রমে কেমন ক্ষীণ এক শব্দ উঠে আসছে মনে হল; নদীর জলে শব্দ। পাড়ে ঢেউ ভাঙায় শব্দ। সহসা ঝোপে-জঙ্গলে কোন অতর্কিত শব্দ শুনলে সে আঁতকে উঠছে। ক্রমে সে নিস্তেজ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল সে মরে যাচ্ছে। দূরে দূরে সে হরিণীর দ্রুত ছুটে যাওয়ার শব্দ পেল। দূরে দূরে আকাশে এক ভেলার মতো রঞ্জিতের মুখ, মুখের ছবি, দুই চোখ রঞ্জিতের ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে। মালতী ক্রমে এ-ভাবে সংজ্ঞা হারাচ্ছে বুঝতে পারছিল। আর ঠিক তক্ষুনি দেখল ওর পায়ের কাছে তিন যমদূতের মতো অপদেবতা দাঁড়িয়ে আছে। ওকে তারা নিতে এসেছে। এবার যথার্থই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ভয়ে। কিছু খচমচ শব্দ, হরিণীর দ্রুত পালানোর শব্দ এবং জলে ঢেউ ওঠার শব্দ—সারারাত সংজ্ঞাহীন মালতীর কোমল শরীরে পাশবিকতার সাক্ষ্য রেখে মালতীকে মৃত ভেবে কবরভূমিতে ফেলে অন্ধকারে ওরা সরে পড়ল সকাল হতে না হতেই। শেয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খাবে যুবতীকে। কেউ টের পাবে না, বনের ভিতর এক যুবতী মাইয়া মইরা পইড়া আছে।

  • বাইশ

    বাইশ

    সোনা সারারাত ঘুমের ভিতর স্বপ্ন দেখল, সেই এক বড় সমুদ্র যেন, বালিয়াড়িতে কারা একটা বড় কাঠের ঘোড়া টানতে টানতে নিয়ে এল। কি উঁচু আর লম্বা ঘোড়া! মানুষগুলি চলে গেলেই সে দেখতে পেল, ঘোড়াটা কাঠের নয়, ঘোড়াটা তাজা ঘোড়া—ওর দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাচ্ছে। সে একা ছিল না, কমলা অমলা যেন সঙ্গে আছে। ঘোড়াটা ওর কাছে এসে ঠিক পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল—যেমন মুড়াপাড়ার হাতিটাকে সেলাম দিতে বললে অথবা হেঁট-হেঁট বললে হাঁটু ভেঙে শুয়ে পড়ে তেমনি ঘোড়াটা এসে ওর সামনে এসে দু পা তুলে খাড়া হয়ে গেল। সে, কমলা এবং অমলা পিঠে চড়তেই ঘোড়াটা ছুটতে থাকল। ঠিক বালিয়াড়ির শেষে সমুদ্রের প্রায় হাঁটু জলে নেমেই ঘোড়াটা আবার কেমন কাঠের হয়ে গেল—নড়ছে না! সে, অমলা কমলা নামতে পারছে না। ক্রমে ঘোড়াটা উঁচু হতে হতে একেবারে আকাশ সমান হয়ে গেল। মেঘ ফুঁড়ে এত উঁচুতে উঠে গেছে যে, নিচের কিছুই ওরা দেখতে পাচ্ছে না। সে মুঠো মুঠো মেঘ ছিঁড়ে খেতে থাকল, কি মিষ্টি আর সুস্বাদু। ঠিক মেলাতে সে যেমন আঁশ-আঁশ চিনির তৈরি তুলোর বল ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেত, সে ঘোড়ার পিঠে উঠে তেমনি সেই মেঘ ছিঁড়ে, মোয়ার মতো হাতে নিয়ে গোল গোল করে অমলা কমলাকে দিতে থাকল। আর তখন নিচের দিকে তাকাতেই মনে হল, কারা যেন সেই হাজার লক্ষ হবে, পিলপিল করে ঘোড়ার পা বেয়ে উঠে আসছে। ঠিক যেন ওদের স্বর্গে ওঠার সিঁড়ি মিলে গেছে। সে এখন কী করবে ভেবে পেল না। হাতের কাছে আকাশ চিরে মাথা গলিয়ে দিতে পারবে, এবং দেব-দেবীদের রাজত্বে কার্তিক গণেশ অথবা শিবঠাকুর কীভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, দেখতে পাবে। কিন্তু কী আশ্চর্য, যেই না এমন ভাবা, ঘোড়াটা আবার ছোট হতে হতে একটা ছোট খেলনা হয়ে গেল! সে, কমলা অমলা এখন সেই খেলনার ঘোড়া বুকে নিয়ে সমুদ্রের বালিয়াড়িতে উঠে আসছে এবং উঠে আসার মুখেই মনে হল, জ্যাঠামশাই আশ্বিনের কুকুর নিয়ে হেঁটে হেঁটে নদীর পাড়ে চলে যাচ্ছেন। সহসা জ্যাঠামশাই বিরক্তিতে চিৎকার করে উঠলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। সঙ্গে সঙ্গে সোনার সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে গেল। ওর মাথার কাছে, ঠিক জানালায় শরতের সূর্য সোনালী জলের রঙ যেন, ওর পায়ের নিচে সূর্যের আলো। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল।

    প্রথম সে বুঝতে পারল না কোথায় সে আছে। ওর মনে হচ্ছিল সে বাড়িতে আছে। এবং বিছানায় শুয়ে স্বপ্ন দেখছে। এখন মনে হল, এটা কাছারিবাড়ি। এটা মেজ-জ্যাঠামশাইর বিছানা। সে মেজ-জ্যাঠামশাইর পাশে শুয়ে ঘুমিয়েছে। সে এবার ভালো করে চোখ মুছল। অমলা কমলার কথা মনে হল। ওরা এখন কোথায়? তারপর রোদ উঠলে সে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। জ্যাঠামশাই কোথায়? এত বড় কাছারিবাড়িতে কেউ নেই। সকলেই যেন নদীর পাড়ে চলে গেছে। দরজা পার হলে বারান্দা। বারান্দার পর সবুজ মাঠ। আর দীঘির দক্ষিণ পাড়ে বড় মঠ। সোনা গতকাল মঠ দেখতে পায়নি। সোনা বস্তুত রাত হলে এদিকটায় এসেছে। অমলা কমলা ওকে জ্যাঠামশাইর কাছে দিয়ে গেছে। বাড়ির উত্তরে থাকলে বোঝাই যায় না দিঘির পাড়ে এত বড় এক মঠ আছে। শুধু ছাদের উপর যখন সে দাঁড়িয়েছিল, অমলা কমলা বলেছে, মঠের সিঁড়িতে একটা শ্বেতপাথরের ষাঁড় আছে। ষাঁড়ের গলায় মোতি ফুলের মালা। আর সেই ছাদের অন্ধকারটা এখন যেন ওর কাছে এক রহস্যময় জগৎ। ঘুম থেকে উঠেই পূজার বাজনা কানে আসছিল। অর্জুন নায়েব নদী থেকে স্নান করে ফিরছে। রামসুন্দর কাঁধে লাঠি নিয়ে কোথাও যাবে বোধহয়। লালটু পলটু এখন কোথায়? এ-বাড়িতে এসে মেজদাকে সে দেখতেই পাচ্ছে না। ওরা কোথায় আজ শিকারে যাবে। সকাল সকাল হয়তো নদীর চরে শিকারের জন্য বের হয়ে গেছে। আর তখনই মনে হল মাঠ পার হলে দীঘি, দীঘির ওপারে এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সে যেন চিনতে পারছে মানুষটাকে, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না। অস্পষ্ট লম্বা এবং স্থির, প্রায় যেন সমুদ্রের বালিয়াড়িতে ট্রয় নগরীর কাঠের ঘোড়া, শহরের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। সোনা দাঁড়াল না। ঠিক স্বপ্নের মতো, যেন স্বপ্নটা হুবহু মিলে যাচ্ছে। সে পাগলের মতো ছুটতে থাকল। অর্জুন নায়েব বলল, সোনা, কোন্‌খানে যাইতাছ? তোমার জ্যাঠামশাই নদীতে স্নান করতে গ্যাছে। কে কার কথা শোনে এখন। সে মাঠ পার হয়ে, হরিণেরা যেখানে থাকে, তাদের নিবাস পার হয়ে, ময়ূরের ঘর ডাইনে ফেলে, ফুল-ফলের গাছ পার হয়ে এক ছায়াস্নিগ্ধ ঝাউ গাছের নিচে এসে দাঁড়াল। আবার ঘাড় তুলে দেখল। ঠিক মিলে যাচ্ছে কি না। কারণ, সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। এদিকটায় বিচিত্র সব দেশী-বিদেশী ফুলের গাছ, ঝোপ-জঙ্গলের মতো জায়গা, সে গাছের ডালপাতা ফাঁকা করে দেখল সব ঠিকই আছে। দীঘির পাড় থেকে যা স্পষ্ট দেখতে পায়নি, এখানে এসে স্পষ্ট হয়ে গেল। সে আবেগে ছুটতে ছুটতে ডাকল, জ্যাঠামশয়! বড় জ্যাঠামশয়! আমি সোনা, জ্যাঠামশয়, জ্যাঠামশয়। কি আকুল আবেগ! সে পড়ি-মরি করে ছুটছে। তার সেই আপন মানুষ মিলে গেছে! সে দেখল কুকুরটা পর্যন্ত সোনাকে দেখে আনন্দে লেজ নাড়ছে। জ্যাঠামশাই কিছুতেই তাকাচ্ছেন না। হাতে-পায়ে ধানপাতার কাটা দাগ। জলে জলে হাত পা সাদা হয়ে গেছে। কখনও ঘুরে ঘুরে, কখনও জলে জলে কুকুর নিয়ে তিনি একলাই বের হয়ে পড়েছেন।

    সোনা কাছে যেতেই কুকুরটা ডেকে উঠল, ঘেউ। এই সেই কুকুর, কবে থেকে বাড়ি উঠে এসেছে, বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, বড় অবহেলাতে এই কুকুর সংসারে বড় হচ্ছে। যা-কিছু উচ্ছিষ্ট থাকে, এই কুকুর খায়। বাড়িতে যে কুকুরটা থাকে বোঝাই যায় না। কেউ আদর করে না, কিন্তু এখন এই আশ্বিনের কুকুর সোনার কাছে কত মূল্যবান। তার কত নিজের জিনিস এসে গেছে। সে আর এখন কাকে ভয় পায়! সে, যেমন ট্রয় নগরীর বালকেরা কাঠের ঘোড়া টানতে টানতে শহরের ভিতর টেনে নিয়ে গিয়েছিল, তেমনি সে এই মানুষটাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। এত দূরে এসেই পাগল মানুষের কেমন যেন লজ্জা এসে গেছে প্রাণে। তিনি যেতে চাইছেন না ভিতরে। কারণ, এত বড় বাড়ি দেখে বুঝি তাঁর সেই দুর্গের কথা মনে পড়ে গেছে। একবার তিনি একটা কালো রঙের টাই পরেছিলেন। পলিনের উক্তি, তুমি কালো রঙের টাই পরবে না মণি, তুমি সাদা অথবা কমলা রঙের টাই পরবে, কালো রঙ দেখলে তোমার মতো মানুষকে কেমন নিষ্ঠুর মনে হয়। অথবা যেন এই যে তার বসন-ভূষণ এমন প্রাসাদের মতো বাড়িতে তা মানায় না। তিনি চারিদিকে তাকাতে থাকলেন। গায়ে জলের লাল মতো শ্যাওলা, যেন মানুষ নন তিনি, এক জলের দেবতা, নানারকম শ্যাওলা এবং গাছ লতাপাতা জলের, শরীরে গজিয়ে উঠেছে। সোনা টানতে টানতে নিয়ে যাবার সময় দিঘির সিঁড়িতে জ্যাঠামশাইকে বসাল। সে অঞ্জলিতে জল তুলে এনে শরীর থেকে শ্যাওলা, লতাপাতা পরিষ্কার করে দিতে থাকল। পাগল মানুষ যেন এই সিঁড়িতে পাথরের এক মূর্তি, বসে বসে আকাশ দেখছেন। চোখে না দেখলে বোঝাই যায় না মানুষটার ভিতর প্রাণ আছে।

    দীঘির অন্য পাড়ে কমলা বৃন্দাবনীর সঙ্গে পূজার ফুল তুলছে। ফুল তুলতে তুলতে দেখল, সিঁড়িতে সোনা কি যেন করছে। সোনা লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙছে আবার উঠে যাচ্ছে। সিঁড়ির শানে এক মানুষ, সোনা মানুষটার শরীরে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। পাশে এক কুকুর। সে সোনার সঙ্গে ঘাটে বার বার নামছে আবার সোনার সঙ্গে সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। কী এত কাজ করছে নিবিষ্ট মনে সোনা! কমল ছুটতে থাকল, সে সেইসব হরিণ অথবা ময়ূরের ঘর পার হয়ে সবুজ গালিচা ঘাসের পাতার ওপর দিয়ে ছুটল। তারপর ঘাটের সিঁড়িতে এসে দেখল, সোনা হাঁটু গেড়ে মানুষটার শরীর থেকে কি সব বেছে দিচ্ছে। সে দেখল, সোনা শ্যাওলা বেছে দিচ্ছে। শাপলা-শালুকের পাতা বেছে দিচ্ছে। মাানুষটা কে! কমলা যে এসে পাশে দাঁড়িয়ে আছে, উঁকি দিয়ে দেখছে, আশ্চর্য চোখে কুকুর এবং এই পাথরের মতো মানুষকে দেখছে—সোনা তা দেখেও কোনও কথা বলছে না। কমল বাধ্য হয়ে বলল, কে রে সোনা?

    —আমার জ্যাঠামশয়।

    —তোর জ্যাঠামশয়?

    —আমার বড় জ্যাঠামশাই।

    —কথা বলে না?

    —না।

    —বোবা?

    —না।

    —তবে কথা বলে না কেন?

    —কথা বলে—শুধু বলে গ্যাৎচোরেৎশালা।

    —আর কিছু বলে না?

    —না।

    —এ মা, একি কথা রে! শুধু গ্যাৎচোরেৎশালা বলে!

    সোনা আর উত্তর করল না। সোনা নিবিষ্ট মনে হাত পা থেকে শেষ শাপলা-শালুকের পাতা, দাম এবং জলজ ঘাস তুলে বলল, ওঠেন জ্যাঠামশয়।

    কমল বলল, জলে ভিজে গেছে কেন?

    সোনা বলতে পারত সাঁতার কেটে জ্যাঠামশাই এসেছেন। ওরা ওঁকে নিয়ে আসেনি। তিনি কুকুর নিয়ে চলে এসেছেন।

    —তোর জ্যাঠামশাই পাগল।

    সোনা রেগে গেল। বলল, হ হ, কইছে! পাগল কে কইছে!

    —তবে কথা বলে না কেন?

    সোনার কেন জানি ভীষণ রাগ হচ্ছিল। জ্যাঠামশাইকে পাগল বললে সে স্থির থাকতে পারে না। সে যেন তাড়াতাড়ি কমলের কাছ থেকে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে দূরে সরে যেতে চাইল। তখন কমল বলল, আসুন দাদু। আমি সোনার পিসি হই। সোনা, আমি তোর পিসি হই না রে?

    এবার যেন সোনা খুব খুশি। বলল, আমার কমল-পিসি জ্যাঠামশয়।

    মণীন্দ্রনাথ কমলকে দেখলেন। চোখ নীল কেন এ মেয়ের! সে হাঁটু গেড়ে বসল। যেন কোনও দৈত্য এখন হাঁটু গেড়ে বসে পুতুলের মতো ছোট্ট এক মেয়েকে দু’হাতে তুলে চোখের কাছে নিয়ে এল। বলতে চাইল, তুমি কে মেয়ে! তোমাকে যেন চিনি!

    এমন যে ডাঁহাবাজ মেয়ে তার চোখ পর্যন্ত আতঙ্কে এতটুকু হয়ে গেল। সোনা ভিতরে ভিতরে মজা পাচ্ছিল। সে প্রথম কিছু বলল না, কিন্তু দেখল কমল কেঁদে দেবে, সে বলল, ভয় নাই কমল। বলে সে জ্যাঠামশাইর দিকে তাকাল। আর তক্ষুনি সেই মানুষ, যেন মন্ত্রের মতো চোখ সোনার, চোখে রাগ, এতটুকু ছেলের এমন চোখ দেখে মণীন্দ্রনাথ কমলাকে নামিয়ে দিলেন। হয়তো কমল ছুটে পালাত, কিন্তু সোনা কি নিৰ্ভীক, এখন কমল নিজেকে খুব ছোট ভাবল সোনার কাছে। সোনা এতটুক ভয় পাচ্ছে না, সে টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এতবড় মানুষ সোনার একান্ত বশংবদ, সোনার ভয়-ডর নেই, কমলরেও ভয়-ডর থাকল না। সে বাঁ হাতটা ধরল, সোনা ডান হাত ধরেছে। কুকুরটা আগে আগে যাচ্ছে।

    ট্রয়ের ঘোড়া নিয়ে নাটমন্দিরের সামনে ঢুকতেই প্রায় একটা শোরগোল পড়ে গেল। সেই মানুষ এসেছেন আবার এই দেশে। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ হাবাগোবা মুখ নিয়ে নাটমন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্গাঠাকুর দেখতে থাকলেন। আর বাড়ির আমলা কর্মচারী, বালক-বালিকা এমনকী মেজবাবু এসে গেলেন। তিনি ভূপেন্দ্রনাথকে ডাকতে পাঠিয়েছেন।—বল গিয়ে ভুঁইঞা কাকাকে, ওঁর বড়দা এসেছেন। শান্তশিষ্ট বালকের মতো মানুষটা এখন দাঁড়িয়ে দুর্গাঠাকুর দেখছেন। উপরে ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে। তিনি ঘুরে-ফিরে সব দেখতে থাকলেন।

    সোনা বলল, দুগগাঠাকুররে নম করেন।

    মণীন্দ্রনাথ একেবারে সটান হয়ে শুয়ে পড়লেন। কেউ যেন ওঁকে আর এখন তুলতে পারবে না। দু’হাত সামনে সোজা। সবাই হাসাহাসি করছে। সোনার এসব ভাল লাগছে না। সে এখন পারলে এখান থেকেও নিয়ে সরে পড়তে চায়। মেজবাবু অর্থাৎ অমলা কমলার বাবা ধমক দিলেন। সামনে কেউ দাঁড়িয়েছিল বোধহয়, কর্মচারী কেউ হবে—মেজবাবু সকলকে চেনেন না—এই পূজার সময়ে দূর দেশের সব কাছারিবাড়ি থেকে নায়েব গোমস্তারা চলে আসে, সঙ্গে পূজা-পার্বণের জন্য আখ, কলা, দুধ, মাছ যে অঞ্চলে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, পূজার সময় সব নিয়ে হাজির হয়। ওদের একজনকে বললেন, ভুঁইঞাকাকা এখনও. আসছেন না কেন দেখ তো?

    পাগল মানুষ তেমনি সোজা সটান। প্রণিপাতের মতো শরীর শক্ত। সোনা দেখল, জ্যাঠামশাই সোজা হয়ে আছেন। সোনা বুঝতে পারল না, বললে তিনি উঠবেন না। সে এবার নুয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, উঠেন জ্যাঠামশয়। আর নম করতে হইব না। বলে হাত ধরতেই তিনি উঠে পড়লেন। ভিজা কাপড়ে সব কাদা-মাটি লেগে আছে।

    ভূপেন্দ্রনাথ এসে তাজ্জব। মণীন্দ্রনাথ ভূপেন্দ্রনাথকে দেখেই সোনার দিকে তাকালেন। কি হবে সোনা! দেখছ মানুষটা আমার দিকে কিভাবে তাকাচ্ছে! সোনার দিকে তাকিয়েই মণীন্দ্রনাথ বিষণ্ণ হয়ে গেলেন। যেন তাঁর মনেই ছিল না এখানে ভূপেন্দ্রনাথ থাকে। এখানে এলে তাঁকে ভূপেন্দ্রনাথের পাল্লায় পড়তে হবে। তিনি এবার হাঁটতে চাইলেন। ভূপেন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি হাত ধরে ফেললেন। কোথায় কোনদিকে আবার চলে যাবেন, ভূপেন্দ্রনাথ হাত ধরে রাখলেন। তিনি এবার সকলকে চলে যেতে বললেন। ভিড় করতে বারণ করে দিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন না কি করে এই মানুষ এত দূরে চলে এসেছেন! বোধ হয় সাঁতার কেটে চলে এসেছেন। কী যে পারেন না এই মানুষ, তা ভাবতে-ভাবতে নিজের ভিতর কেমন বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। দুর্গাঠাকুরের দিকে মুখ তুলে তাকালেন, মা, মাগো, বলার ইচ্ছা। দুর্গাঠাকুরের বড় বড় চোখ দুই ভাইকে দেখতে দেখতে বুঝি হাসছিল। তিনি তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরে পড়তে চাইলেন, কারণ তিনি জানতেন, নাটমন্দিরের দোতলায় জাফরি কাটা অন্দরে এখন শতেক চোখ পর্দার আড়াল থেকে নিশ্চয়ই ওঁকে দেখছে—এমন সুপুরুষ মানুষকে দেখে নিশ্চয়ই ওরা হা-হুতাশ করছে। কি চেহারা তাঁর! গৌরবর্ণ। লম্বা এবং শিশুর মতো সরল। নাবিক যেমন সমুদ্রে পথ হারিয়ে বিষণ্ণতায় ভোগে, এখন এই মানুষের চোখে তেমনি এক বিষণ্ণতা। ভূপেন্দ্রনাথের এসব ভেবে কেন জানি চোখে জল এসে গেল।

    .

    জোটন সকাল থেকেই মুখ গোমড়া করে বসে আছে। আশমানে চাঁদ দেখছে। নীল আকাশ দেখলেই টের পায় জোটন, শরৎকাল এসে গেছে। এখন দুর্গাপূজার সময়। এই দরগায় বসেও তা টের পাওয়া যায়। দরগা তো নয় য্যান বিশাল বনের ভিতর বনবাসী জোটন। দু’সাল থেকে, কি আরও বেশি হবে—সে বাপের ভিটাতে যেতে পারছে না। ফকিরসাব নিয়ে যাচ্ছে না। শরৎকাল এলেই আকাশে চাঁদ বড় হয়ে দেখা দেয়। সারারাত এই বনের ভিতর জ্যোৎস্না ছড়ায়। আকাশের দিকে তাকালেই মনের ভিতর কেমন করে। প্রতাপ চন্দ্রের বাড়িতে দুগ্‌গা ঠাকুর, ঠাকুরের মুখ-চোখ এবং নাকে নথ সব সে মনে করতে পারছে। মনে হলেই ভিতরটা কেমন করে। কতবার ফকিরসাবকে বলেছে, দ্যাশে লইয়া যাইবেন? মানুষটা তখন রা করেন না। দিন দিন ফকিরসাবের শরীর ভেঙ্গে আসছে। আর বুঝি সে বাপের ভিটাতে ফিরে যেতে পারবে না। মানুষটার কাছে দরগার এক কোণে ছোট ছইয়ের মতো নিবাসের যেন তুলনা নেই। ছইয়ের ভিতর বসে ফকিরসাব কেবল হুঁকা খান আর কি সব বয়াৎ বলেন, যা জোটন আদৌ বোঝে না। বাংলা করে দিলে জোটন কেবল হাসে।

    —ফ্যাক-ফ্যাক কইরা হাসেন ক্যান?

    —হাসলাম কই আবার।

    —আপনে হাসলেন না?

    —ঠিক আছে। হাসি পাইলে আর হাসুম না। বিমর্ষ মুখ নিয়ে সে বসে থাকল।

    ফকিরসাব বললেন, মন খারাপ ক্যান?

    জোটন উত্তর করছে না।

    —কি কথা কন না ক্যান?

    —কি কমু কন?

    —যা মনে লয়।

    —মনে লয় দ্যাশে যাই।

    —দ্যাশে গিয়া থাকবেন কই? আপনের ভাইজান ত আবার সাদি করছে। নতুন মানুষ আপনেরে চিনতে পারব?

    —চিনতে পারব না ক্যান? গ্যালে ঠিকই চিনতে পারব।

    —বড় দূর যে! এতদূর নাও বাইয়া যাইতে পারমু?

    —নাও জলে জলে মাঠে পড়লে না হয় আমি লগি ধরমু।

    —মাইনসে দ্যাখলে কি কইব? বলেই ফকিরসাব আবার শরীরে অস্বস্তি বোধ করলেন। পেটের ভেতরটা মোচড়াচ্ছে।

    শরৎকাল বলে ঝোপ-জঙ্গলে এখন কীট-পতঙ্গ বাড়ছে। শরৎকাল বলে জলে এখন পচা গন্ধ উঠতে থাকবে। কারণ, নদী-নালা, ঝোপ-জঙ্গল থেকে জল নামতে থাকলেই ঘাস শ্যাওলা দাম সব পচে যাবে। দরগার চারপাশে শুধু হোগলার বন। বনের ফাঁকে কোনও পথ নেই এখন।

    দরগায় আসতে হলে নৌকা ঠেলে নিয়ে আসতে হয়। দরগার পুবে বড় নদী মেঘনা, মেঘনার পাড়ে-পাড়ে এই বন নিশুতি রাতে নির্জন অরণ্যের মতো চুপচাপ। এমন কি কোনও কীট-পতঙ্গের ডাকও ভয়াবহ লাগে! চারপাশে বড় বড় রসুন গোটার গাছ, অশ্বত্থ গাছ আর নিচে তার হাজার বছর ধরে অঞ্চলের কবরখানা। কোথাও ভাঙা মসজিদ, ভাঙা কুয়ো, বেদি। জীর্ণ অন্ধকূপের মতো সব ছোট-ছোট ইঁটের কোঠা, কোনও কোনওটা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। আর লতাপাতা, গাছ-গাছালি এত ঘন যে, দু’পা যেতে লতাপাতায় জড়িয়ে যেতে হয়। একটা সরু পায়ে-হাঁটা পথ গ্রীষ্মের দিনে দেখা দেয়। বর্ষাকালে কেউ আর বনের ভিতর ঢুকতে চায় না। জলের কিনারে কবর দিয়ে চলে যায়। মানুষের ইন্তেকালের সময় কিছু মানুষজন চোখে পড়বে, দু’ ক্রোশ পথ হাঁটলে ক’ঘর বসতি আছে। পারতপক্ষে এদিকে কেউ মাড়ায় না। দরগায় এক ফকিরসাব আছেন, দুঃসময়ে শুধু দোয়াভিক্ষার জন্য সাবের কাছে চলে আসে মানুষ। জমিতে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলে ফকিরসাব ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে নিচে নেমে মালা-তাবিজ যখন যা দরকার প্রয়োজন মতো দিয়ে আসেন। মানুষেরা কেউ বনের ভিতর এক অলৌকিক ভয়ের জন্য ঢুকতে চায় না। পাশে একটা লম্বা খাল আছে। মৃত অজগর সাপের মতো খালটা নিশিদিন শুয়ে থাকে। বর্ষাকাল এলে এই খাল জেগে ওঠে, কিছু উজানি নৌকা পথ সংক্ষিপ্ত করার জন্য এই খালে উঠে আসে। খাল দিয়ে যায় আল্লা অথবা ঈশ্বরের নাম নিতে নিতে। কোনওরকমে এই কবরখানা ভয়ে ভয়ে পার হয়ে যায়।

    মানুষ মরলে ফকিরসাবের পরবের মতো উৎসব। ফকিরসাব তখন দু’গণ্ডা মতো পয়সা পান। পান খান। আর মালা-তাবিজ গলায় ঝুলিয়ে আল্লা এক রহমানে রহিম বলতে-বলতে সেই মৃত মানুষটার চারপাশে ঘুরতে থাকেন। কখনও বনের ভিতর লুকিয়ে নানা রকমের খেলা খেলতে ভালোবাসেন অর্থাৎ কবরখানায় মৃত মানুষ এলেই ফকিরসাবের কেরামতি বেড়ে যায়। কালো আলখাল্লাতে পা পর্যন্ত ঢেকে, গলায় লাল নীল হলুদরঙের রসুন গোটার মতো বড় বড় পাথর ঝুলিয়ে, চোখে কালো সূর্যা টেনে এবং মাথায় ফেটি বেঁধে মনে হয় তখন এক পীর এসে গেছেন। সাদা কোঁকড়ানো চুল তাঁর। ঊর্ধ্বমুখী বাহু তাঁর। চাপ দাড়িতে রসুন গোটার তেল চপ চপ করছে। যারা কবর দিতে এল তারা দেখতে পায় এক মুশকিলাসানের লম্ফ হাতে নিয়ে বনের ভিতর কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। লোকগুলি ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। বনের ভিতর থেকে মুশকিলাসানের লম্ফ নিয়ে সহসা উদয়। মনে হবে তখন তিনি যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছেন। তারপর যার যা খুশি—দু’গণ্ডা পয়সা এবং যার ইন্তেকাল হল তার কিছু জিনিসপত্র মিলে গেলে এই মানুষের অন্নসংস্থান। জোটন তখন ছইয়ের ভিতর বসে মানুষটার এই কেরামতি দেখে ফিকফিক করে হাসে। দিনেরবেলাতেও কালো আলখাল্লার নানা জায়গায় তালি মারতে মারতে জোটন মানুষটার নাচন কোদন দেখে। তখন দেখলে কে বলবে এই মানুষ নিরীহ জীব, কে বলবে অকপট সরল মানুষ, প্রকৃতপক্ষে ভীতু লোক। অথচ অন্নসংস্থানের জন্য কবরে মানুষ এলেই এই মানুষ অন্য মানুষ হয়ে যান। পীর বনে যাবার লোভে মানুষটা সকলের চোখে ভিন্ন ভিন্ন অলৌকিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া দেখাতে ভালোবাসেন। এই অলৌকিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার জন্য ফকিরসাব দিন-রাত উপায় উদ্ভাবন করেন। আর ইন্তেকালের সময় মানুষের চোখে নিজের খেলা দেখান। রাতে বেল-গাছের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকেন।

    সুতরাং কোথায় যে দুর্গোৎসবের জন্য জোটনের প্রাণে দুঃখ জেগে থাকে, বোঝার উপায় থাকে না ফকিরসাবের। সম্বৎসর এই দরগায় ছইয়ের ভিতর তিনি শুয়ে থাকেন। সময়ে অসময়ে তিনি রসুন গোটা কোঁচড়ে সংগ্রহ করে আনেন। মাচানের নিচে স্তূপীকৃত রসুন গোটা। বড় বড় পিপের মতো হাঁড়িতে সব ভিজানো থাকে। ছেঁচা রসুন গোটা জলে পচলে একরকমের ঘন তেল, সেই তেলে ছইয়ের ভিতর তার আলো জ্বলে, মুশকিলাসানের লম্ফ জ্বলে এবং কিছু তেল পাতিলে পাতিলে গাছের মাথায় বসিয়ে রাখেন। সময়ে অসময়ে ইন্তেকালের সময় যারা আসে, তাদের অলৌকিক কিছু দেখাবার জন গাছের মাথায় আগুন জ্বেলে বসে থাকেন। আরও কি সব কাণ্ড তাঁর। দরগায় নতুন তখন। তাঁর কী যে তখন হাসি পেত। একটা হাড় রেখেছেন। কিছু জড়িবুটি রেখেছেন। মাঠে দাঁড়িয়ে মানুষ হাঁক পাড়লে — হেই কে আছে, আমি এক নাচারি ব্যারামি মানুষ, তখনই ফকিরসাব যেন অন্য মানুষ হয়ে যান। পীর হবার জন্য তিনি তাঁর সেই মুখস্থ বয়াৎ বলতে বলতে জড়িবুটি নিয়ে মাঠে নেমে যান। পয়সা চাই সোয়া পাঁচ আনা। দরগার থানে শিন্নি দেবার জন্য এই পয়সা। সেই ফকিরসাব কী করে বুঝবেন, জোটন, যার নিবাস ছিল হিন্দু পল্লীর পাশে, পরবে পার্বণে চিড়া কুটে দিত, ধান ভেনে দিত, কেন সে ব্যাজার মুখে কাঠ কুড়াতে বনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে।

    সূর্য উঠবে উঠবে করছে। গাছপালা এত ঘন যে, সূর্য উঠলেও দেখা যায় না। সূর্যের আলো গাছের ডালপালায় পড়ছে। বড় সন্নিবিষ্ট এই গাছপালা বৃক্ষ। জোটন দু’হাতে বন-ঝোপ লতা-পাতা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। সে অনেকগুলি কবর পার হয়ে খালের পাড়ে নেমে এল। তারপরই সব হোগলার বন। এখন আশ্বিন-কার্তিক মাস বলে জলের কচ্ছপ পাড়ে উঠে আসবে। ডিম পাড়বে। এ-অঞ্চলে গ্রাম মাঠ নেই, ধানের খেত নেই, হিন্দু পল্লী নেই যে জমিতে নেমে শামুকের খোলে কট করে ধানের ছড়া কাটবে, ডিম নিয়ে ঠাকুরবাড়ি উঠে যাবে। ডিমের বদলে পানগুয়া চেয়ে নেবে। এখানে শুধু এই নির্জনে গাছপালা বৃক্ষ। জোটনের জোরে জোরে ফকিরসাবকে শুনিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল। ফকিরসাব আর নৌকা বাইতে পারেন না। ফকিরসাব ক্রমে লবেজান হয়ে যাচ্ছেন। ফকিরসাব একটা কোড়া পাখি ধরার জন্য বিলের জলে আঁতর পেতে রেখেছিলেন। কোড়া পাখির কলিজা খেলে গায়ে বল ফিরে আসতে পারে। ফিরে এলেই জোটন বাপের ভিটাতে বেড়াতে যাবে ভাবতেই মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। আর মন প্রসন্ন হতেই দেখল, দুটো সাদা পা যেন। হোগলার জঙ্গলে দুটো সাদা পা, কী সুন্দর আর যেন দুর্গাঠাকুরের পা। ওর বুকটা কেঁপে উঠল। পায়ের ওপর সূর্যের আলো চিকচিক করছে। একটা ফড়িং কোত্থেকে উড়ে এসে বার বার পায়ের ওপর বসছে। উপরে গাছপাতা নড়লে ছায়া পড়ছে পায়ে। ফড়িংটা ভয় পেয়ে তখন উড়ে যাচ্ছে। এই রোদ এবং পাতার ছায়াতে মনে হচ্ছিল, পায়ে মল বাজলে যেমন শব্দ দ্রুত বনের ভিতর হারিয়ে যায়, তেমনি এক শব্দ বুকের ভিতর বাজতে বাজতে কোন্ অতলে ডুবে যাচ্ছে জোটন। জোটন দেখল পা-দুটো এখন যথার্থই দুর্গাঠাকুরের হয়ে গেছে। সেই যেন গৌরী, শিবের জন্য বনবাসে এসে হোগলা বনে লুকিয়ে আছে। অথবা চৈত্র মাসে নীলের উপোসে গৌরী নাচে, নাচের মুদ্রা পায়ে যেন খেলে বেড়াচ্ছিল। জোটন বড় বড় চোখে এসব দেখছে, এখন কী করবে স্থির করতে পারছে না। সে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছে না। এক যুবতী কন্যার পা দেখা যাচ্ছে। শুধু পা-দুটো বাকি শরীর হোগলার জঙ্গলে। খুনটুন হবে হয়তো। কিন্তু এই দরগায়, পীরের থানে কার সাহস আছে খুন করে। জোটন কাঁপতে কাঁপতে দু’হাতে হোগলার বন ফাঁক করে দিতেই দেখল, নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জন দিলে, দশ-হাত দুগ্‌গাঠাকুর যেমন চিৎ হয়ে থাকে, তেমনি মালতী হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। যেন অসুরনাশিনী মা জননী, তুই, অ-মালতী, তুই চিৎপাত হইয়া পইড়া আছস! চুল খাড়া কইরা চোখ ঊর্ধ্বমুখী কইরা পইড়া আছস! তরে নিয়া আইছে কে! সে প্রায় মায়ের মতো শিয়রে বসে মাথাটা কোলে তুলে নিল। বুকে মুখে এবং শরীরের যেখানে যা-কিছু পুষ্ট সব হাতড়ে দেখল, না প্রাণ আছে। শুধু হুঁশ নেই। নাভির নিচটা কারা সারারাত খাবলে খুবলে খেয়ে গেছে। মৃতপ্রায় ভেবে মালতীকে কারা ফেলে চলে গেছে। শরীরের কোথাও কোথাও দাঁতের চিহ্ন। রক্তের দাগ, সে আর দাঁড়াল না। যেন এক অশ্ব ছুটে যায়, বনের ভিতর দিয়ে জোটন ছুটতে থাকল। আর ডাকতে থাকল, ফকিরসাব, অ ফকিরসাব, দ্যাখেন আইসা পীরের থানে কি হইছে। তাড়াতাড়ি করেন ফকিরসাব। হোগলা বনে কারা দুগ্‌গাঠাকুর বিসর্জন দিয়া গ্যাছে। যেমন দু’লাফে সে ছুটে এসেছিল ফকিরসাবকে খবর দিতে, তেমনি দু’লাফে সে তার ছইয়ের ভিতর থেকে একটা ডুরে শাড়ি বের করে বলল, আপনে আমার পিছনে আসেন।

    জোটন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ফকিরসাবকে বলল, কী দ্যাখা যায়?

    —দুই পা দ্যাখা যায়।

    —কার পায়ের মতো?

    —দুগ্‌গাঠাকুরের পা য্যান!

    —তাহলে আপনে খাড়ন। লে জোটন নিজে প্রথম হোগলার জঙ্গলে ঢুকে শাড়িটা দিয়ে মালতীকে ঢেকে দিল। তারপর বন ফাঁক করে ইশারায় ডাকল, আপনে মাথার দিকটা ধরেন। আমি পা ধরি।

    এমন জবরদস্ত লাশ টানতে উভয়ের বড় কষ্ট হচ্ছিল। ওরা একটু গিয়েই গাছের ছায়ায় ঘাসের উপর শুইয়ে রাখছে। আবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ফকিরসাব বললেন, বিবি, আপনের দুগ্‌গাঠাকুর দরগাতে আইসা গেল। দ্যাশে গিয়া আর কাম কি!

    জোটন হাঁপাচ্ছিল। সে উত্তর দিতে পারল না। ওর হাত এখন রক্তে অথবা পিচ্ছিল এক পদার্থে চ্যাট চ্যাট করছে। পাতা দিয়ে ঘাস দিয়ে সে সব মুছে আবার টেনে নেবার জন্য তুলে ধরছে। মাঝে মাঝে মালতীর শাড়ি লতায়-পাতায় আটকে সরে যাচ্ছে। এমন পুষ্ট শরীর যে সামান্য বাতাস লাগতেই শাড়ি পিছলে পড়ে যায়। জোটন ফকিরসাবের দিকে তাকাল। বলল, না না, এইটা ভাল না, আপনার চোখ গাছপালার দিকে দ্যান! এদিকে না।

    ফকিরসাব বলল, আমি ফকির মানুষ আমার চোখে দোষের কিছু থাকে না।

    জোটন বলল, আপনে পুরুষমানুষ। চক্ষু আপনের এখন গাছপালা পাখি দ্যাখুক।

    —আপনের যখন তাই ইচ্ছা…বলে ফকিরসাব চোখ বুজে থাকলে জোটন বলল, কি কইলাম আপনে কি করলেন!

    —কি কইলেন?

    —গাছপালা পাখি দ্যাখতে কইলাম।

    —তাই দ্যাখতাছি।

    —চোখ বুইজা বুঝি দ্যাখা যায়?

    —খুইলা রাখলে যা দ্যাখি, বুইজা রাখলে বেশি দ্যাখি।

    —তা’হলে খুইলা রাখেন।

    এবার জোটন ডেকে উঠল, মালতী অ মালতী, দ্যাখ কই আইছস। আল্লার বান্দার কাছে আইছস। চোখ মেইলা তাকা একবার। মালতী, মালতী! হুঁশ নেই। সুতরাং জোটন তাড়াতাড়ি কিছু জল এনে চোখমুখে ছিটিয়ে দিল। হুঁশ কিছুতেই ফিরছে না। এখানে রোদ নেই, গাছপালা এত নিবিড় যে সামান্য শিশির পর্যন্ত ঘাসের উপর পড়তে পারে না। আর একটু যেতে পারলেই ওদের ছই। মাচানে ফেলে পিঠে পায়ে কোমরে গরম জলের সেঁক দিতে পারলে শরীরের ব্যথা মরে আসবে। তারপর সেই বিশল্যকরণীর মতো ফুলের রস মিশিয়ে মালতীর যেখানে যা-কিছু ক্ষত আছে এবং যেখানে যা-কিছু রক্তপাত ধুয়েমুছে রসুনগোটার তেলে ফুলের রস লাগাতে পারলে মালতী ফের চোখ মেলে তাকাবে।

    ফকিরসাবের কিন্তু কিছুতেই এতটুকু ব্যস্তভাব নেই। হচ্ছে হবে ভাব। কেমন নিরিবিলি এই কবরখানায় দুর্গাঠাকুর আইসা গেল ভাব। সাতে নাই পাঁচে নাই, ফকিরসাবের তাড়াহুড়ো নাই। তিনি মালতীকে মাচানে ফেলে রেখে হুঁকোটা খুঁজতে থাকলেন।

    —এখন আপনের হুঁকা খাওয়নের সময়!

    —পানিটা গরম করেন ইত্যবসরে হুঁকা খাই। হুঁকা খাইলে মাথাটা সাফ থাকে।

    হুঁকা খাইলে মাথাটা সাফ থাকে এটা ফকিরসাবের কথার কথা। মনের কথা নয়। হয়তো এমনই মানুষটা। শত বিপদেও মানুষটার মাথা গরম হয় না। বেশ রয়ে-বসে বুঝেসুঝে হাঁকল, কৈ গ, পানি আপনের গরম হইল?

    তৈজসপত্র বলতে জোটনের চারটা পাতিল, একটা পিতলের বদনা এবং সামান্য এক ভাঙা আশি। চারটে জালা আছে রসুন গোটা ভেজানোর জন্য। নাহলে তাড়াতাড়ি এক জালা পানি এনে দিতে পারত ফকিরসাবকে। বদনা করে পানি আনছে জোটন। বর্ষার পানি বেশি দূরে নয়। ছইয়ের নিচে জল। উনুনে জল গরম হলে জোটন বলল, এদিকে আর আইসেন না।

    —ক্যান? ফকিরসাব হুঁকা খেতে খেতে বলল।

    —ক্যান আবার খুইলা কইতে হইব!

    —দুগ্‌গাঠাকুরকে আপনে তবে খালি কইরা একলাই দ্যাখবেন?

    জোটন কান দিল না। মানুষটার এই স্বভাব। সব জানবে, বুঝবে এবং এত বড় ইমানদার মানুষ, তবু মানুষটা ক্যান, কি হইব দ্যাখলে—আমি ত ফকির মানুষ, আমার কাছে সব সমান এমন বলবে।

    জোটন সমস্ত শরীর ভালো করে গরম জলে ধুইয়ে দিল। জোটন সব ধুয়েমুছে মালতীকে আবার সেই বিধবা মালতী করে দিতে চাইল। সংসারে সব চাইলেই হয় না! কেন জানি বার বার মালতীর জন্য সুন্দর এক যুবা পুরুষের মুখ মনে পড়ছিল জোটনের। কবে থেকে মালতীর শরীর খোদার মাশুল তুলছে না—বড় কষ্ট এই শরীরের। ঈষদুষ্ণ জলে গা ধোয়াবার সময় জোটন মনে মনে নানারকমের কথা বলছিল। কি পুষ্ট শরীর! জোটন হাত দিয়ে মালতীর কোমর থাবড়ে দিচ্ছে। উপুড় করে মালতীর কোমরে জল ঢেলে দিচ্ছে। ডানদিকে বসে ধীরে ধীরে জল উপর থেকে ঢেলে থাবড়ে থাবড়ে মাজাতে যে সারারাত অমানুষের হাড়হালুম গেছে তা ঝেড়ে দিচ্ছে জোটন।

    এ-ভাবে মনে হল মালতীর, কারা যেন তাকে একটা বড় জলাশয়ে ভাসিয়ে রেখেছে। শরীরে কে কি যেন মেখে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল, নরম হাত, ভালোবাসার হাত—কিন্তু তাকাতে সাহস পাচ্ছে না। যেন তাকালেই সেইসব নরপিশাচের মুখ ভেসে উঠবে। সে তবু পালাবার জন্য ধড়ফড় করে উঠে বসলে জোটন চিৎকার করে উঠল, ফকিরসাব আসেন। দ্যাখেন আইসা, মালতীর হুঁশ ফিরা আইছে।

    মালতী চোখ খুলে দেখল জুটি ওকে ধরে বসে আছে। কি বলতে গিয়ে চোখমুখ কাতর দেখাল মালতীর। সে বলতে পারল না। সে মাচানে যেন কতকাল পর দীর্ঘ এক মরুভূমি পার হয়ে এক মরূদ্যানে উঠে এসেছে। মালতী ফের সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল।

    জোটন এবার ফকিরসাবকে বলল, প্যাটটা পইড়া আছে।

    —কি দিবেন খাইতে?

    —ইট্টু দুধ নিয়া আসেন। গরম কইরা দেই! যদি খায়।

    ফকিরসাব দেরি করলেন না। হুঁকা খাবার পর নানারকমের প্রশ্ন এসে দেখা দিয়েছে। প্রথমত এই যুবতীকে কারা ফেলে দিয়ে গেল! কখন এবং ওরা কতজন ছিল। নানারকমের সন্দেহ দেখা দিতে থাকল। মালতী তার ঘরে ফিরে যাবে কিনা, থানা-পুলিস এবং অনেক ঝামেলা এর পিছনে রয়েছে। তিনি ফকির মানুষ। এখানে কতদিন আছেন। এমন ঘটনা এখানে কোনওদিন ঘটেনি। তবে একবার এক সাধু এসেছিল, ভৈরবী সঙ্গে ছিল। এই দরগায় ক’রাত ওস্তাদের ভোজ খেয়ে বেশ যখন সরগরম, তখন সেই ভৈরবী তিলকচাঁদের সঙ্গে ভিড়ে গেল। ছিল ভৈরবী, হয়ে গেল পদ্মদীঘির ছোটবাবুর বহুরানী। তারপর সাধুবাবাজী বড় একটা রসুনগোটার মগডালে উঠে গলা দিল। ছোটবাবু মাথার উপর ছিলেন বলে সে-যাত্রা ফকিরসাব থানা-পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন—কিন্তু এখন, এবারে! ফকিরসাব ঘাবড়ে গেলেন। তবু তিনি মুখ ফুটে কিছু বললেন না। জল ভেঙে বাগের ওপাশে ওঁর দুই ছাগলের দুধ দুয়ে আনার জন্য নেমে গেলেন। জল ভেঙে ওপাড়ে গিয়ে উঠলেন।

    জোটন মালতীর মাথা কোলে নিয়ে বসে থাকল। বনের ভিতর ডাহুক পাখি ডাকছে। নিচে সেই জল এবং শরবন। যতদূর চোখ যায় সে দেখল বাতাসে শরবন কাঁপছে। শরৎকালের রোদ পাখ-পাখালির মতো উড়ে এসে দরগায় এখন নেচে খেলে বেড়াচ্ছে। সামান্য হাওয়া ছিল জলে। কতরকমের লাল নীল ফড়িং উড়ছে। কতরকমের বিচিত্র কীট-পতঙ্গের শব্দ কানে আসছে আর কতকাল আগে ইন্তেকাল হয়েছিল তার বড় সন্তানের—এই কবর ভূমিতেই এখন সে সন্তান পাথর হয়ে আছে। যেন মাটি খুঁড়লেই সেই সন্তান বের হয়ে আসবে। জোটন সব ভুলে মালতীকে মায়ের স্নেহে চোখেমুখে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। চুলে বিলি কেটে দিতে থাকল। সন্তানস্নেহে জোটনের চোখ ফেটে জল আসছিল।

  • তেইশ

    তেইশ

    মণীন্দ্রনাথ এত বড় রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে ঢুকেই মোটামুটি স্বাভাবিক মানুষ হয়ে গেলেন। তিনি এখন সোনাকে সঙ্গে নিয়ে কাছারিবাড়ির উঠোনে পায়চারি করছেন। ভূপেন্দ্রনাথ ট্রাঙ্ক থেকে তাঁর ধুতি বের করে দিয়েছেন, পাঞ্জাবি খুলে নিজেই পরিয়ে দিয়েছেন। লম্বা মানুষ এবং বলিষ্ঠ বলে জামা-কাপড় সবই খাটো খাটো দেখাচ্ছে। রামপ্রসাদ দেখাশোনার ভার নিয়েছে—কোথায় কোনদিকে একা একা চলে যান দেখার জন্য রামপ্রসাদ থাকল। অনর্থক এই দেখাশোনার ভার রামপ্রসাদের ওপর। মণীন্দ্রনাথ কেবল কথা বলছেন না এই যা। নতুবা দেখে মনে হবে তিনি ফের তাঁর প্রবাস-জীবন থেকে ফিরে এসেছেন। এই মনোরম জগতে সোনার হাত ধরে কেবল তাঁর ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছা।

    উৎসবের বাড়ি। মানুষজন ভ ত্মীয়কুটুম কেবল আসছে। নদীর ঘাটে নাও এখন লেগে আছে। ঢাক-ঢোলের শব্দ নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে। জ্যাঠামশাইর হাত ধরে টানতে টানতে সোনা নাটমন্দির পার হয়ে এল। সে মনে মনে কাকে যেন খুঁজছে। কমল কোথায়! এত বড় বাড়ির ভিতর থেকে কমলকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। সে জ্যাঠামশাইকে ময়ূর দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট এক চিড়িয়াখানা বাবুদের। ছোট দুটো বাঘ আছে, হরিণ আছে, ময়ূর আছে আর কচ্ছপ আছে। জ্যাঠামশাইকে সে বাঘ দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। কমল সঙ্গে থাকলে বড় ভালো হত। কমল ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। সারাটাক্ষণ সে কমলকে কাছে পেতে চায়।

    কমলের জন্য সে চারদিকে তাকাতে থাকল। বারান্দা পার হয়ে গেল। বড় বড় হলঘর পার হয়ে গেল। পরিচিত অপরিচিত মানুষজনের ভিতর দিয়ে সে চলে যাচ্ছে। জ্যাঠামশাই ওকে কেবল অনুসরণ করছেন মাত্র। মাথার উপরে সেই ঝাড়লণ্ঠন। একটা চড়ুই পাখি ধুতরো ফুলের মতো কাচের জারে ফরফর করে উড়ছে। দশটা বাজতে দেরি নেই। বড়দা মেজদা যে কোথায় থাকে! ওরা বড়বাবুর মেজ ছেলের সঙ্গে কোথায় এখন বন্দুক দিয়ে বিলের জলে হাঁস মারতে গেছে। সে কমলকে আর যেন কোথাও খুঁজে পেল না। সে জ্যাঠামশাইকে টানতে টানতে দীঘির পাড়ে নিয়ে এল। জ্যাঠামশাইকে বলতে চাইল—আমরা এক নতুন জায়গায় চলে এসেছি। এখানে বড় নদী শীতলক্ষ্যা, চরে কাশবন, দীঘির পাড়ে চিতাবাঘ, হরিণ, ময়ূর, দূরে পিলখানার মাঠ, ঝাউগাছ, নদীর পাড়ে পামগাছের বন এবং দূরে চলে গেলে বাবুদের অন্য অনেক শরিক এবং তাঁদের দুর্গাপূজা–জ্যাঠামশাই এই যে দ্যাখছেন, এটা ময়ূর। দ্যাখেন দ্যাখেন। সে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে ময়ূরের খাঁচার পাশে বসে পড়বে ভাবতেই দেখতে পেল, দীঘির পাড় ধরে চন্দ্রনাথ হনহন করে ফিরছেন। সোনা সে তার বাবাকে দেখে জ্যাঠামশাইর পিছনে লুকিয়ে থাকল। চন্দ্রনাথ মহালের আদায়পত্রের জন্য বের হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে দু’দিন এদিকে আসতে পারেননি। আজই তিনি নৌকায় মহাল থেকে ফিরে এসেছেন। সোনা, জ্যাঠামশাইকে বাইরে নিয়ে এসেছে সব দেখাবে বলে। সোনা যেন কত অভিজ্ঞ প্রবীণ এবং জ্যাঠামশাই তার হাত ধরে হাঁটছেন এমন ভাব। দূরে পিলখানার মাঠ পার হলে আনন্দময়ীর কালীবাড়ি, বাজার-হাট এবং রাতে সেই অদ্ভুত শব্দ—ডায়নামো চলছে। তার ইচ্ছা ছিল সব দেখিয়ে যে-ঘরটায় ডায়নামো আছে, সেদিকে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাবাকে দেখেই সে ভয় পেয়ে গেল।

    মহাল থেকে ফিরেই চন্দ্রনাথ শুনেছেন, সোনা এবার পূজা দেখতে এসেছে। চন্দ্রনাথ নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলেন। সোনার মুখ দেখার জন্য কেমন ব্যাকুল হয়ে আছেন। দীঘির পাড়ে এসে দেখলেন, বড়দা মণীন্দ্রনাথ। ময়ূরের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মণীন্দ্রনাথকে দেখে চন্দ্রনাথ প্রথমে খুবই হতবাক। এই পাগল মানুষ একা এখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর তিনি এলেনই বা কার সঙ্গে! মেজদা বলে পাঠিয়েছেন কেবল সোনা এসেছে। সুতরাং মণীন্দ্রনাথকে দেখতে পাবে আশাই করেননি। চন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি দাদার দিকে হেঁটে গেলেন। কাছে যেতেই দেখলেন পিছনে সোনা বড়দার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে।

    —তুমি, সোনা, এখানে?

    —জ্যাঠামশায়কে ময়ূর দেখাইতে নিয়া আইছি।

    —লালটু পলটু কই?

    —ওরা পাখি মারতে গ্যাছে।

    পূজার ছুটিতে বাবুদের ছেলেরা শহর থেকে চলে আসে। ওরা বন্দুক নিয়ে পাখি শিকারের খেলায় মেতে ওঠে। চন্দ্রনাথ সোনাকে দেখেই কেমন আকুল হতে থাকলেন। সোনা তার মায়ের মুখ পেয়েছে, না বড়দার মুখ পেয়েছে বুঝতে পারছে না। এইসময় যেন সেই মা অর্থাৎ দূরের এক গ্রামে, বড় বড় চোখে ধনবৌ নিত্যদিন শ্রম করে চলেছে সংসারের জন্য। দূরবর্তী গ্রামে কোমল এবং সুন্দর এক জননীর মুখ ভেসে উঠলে চন্দ্রনাথ সোনাকে বুকে নিয়ে আদর করতে চাইলেন। বললেন, আয় তরে কোলে লই।

    সোনা জ্যাঠামশাইকে আরও জোরে সাপ্টে ধরল। সে কোলে উঠতে চাইল না। কারণ সোনার কাছে এই পাগল মানুষ, চন্দ্রনাথের চেয়ে কাছের মানুষ। সে তার বাবাকে কদাচিৎ দেখতে পায়। বাবা সাধারণত তিন-চার মাস অন্তর বাড়ি যান। অধিকাংশ সময় রাতের বেলা। অধিক রাতে। সোনা টের পায় না। ভোর হলে সে দেখতে পায় বিছানাতে মা নেই। বাবা তাকে বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। সোনা প্রথমে অবাক চোখে তাকায়, তারপর চোখ বড় করে দিলে সে বুঝতে পারে, তার বাবা প্রবাস থেকে ফিরেছেন, আখ, আনারস, যে-দিনের যা তিনি নিয়ে এসেছেন। সোনা তখন চুপচাপ ভালো ছেলের মতো শুয়ে থাকলে, বাবা তাকে কতরকমের কথা বলেন, এবার উঠতে হয়, উঠে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে হয়! লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে—এমন সব একের পর এত পুণ্যশ্লোকের মতো কথা, কিছু সংস্কৃত উচ্চারণ, ধর্মাধর্মের কথা, সূর্যস্তব আরও কি যেন তিনি এই ছেলে অথবা এই যে সংসার, গাছ ফুল মাটি এবং গোপাটে অশ্বত্থগাছ, তারপর দূরে দূরে সোনালী বালির নদী, নদীর চর, সব মিলে বুঝি তার বাবা জন্মভূমি সম্পর্কে, জননী সম্পর্কে এবং গুরুজনদের সম্পর্কে আচার ব্যবহার শেখাতে গাছপালা পাখিদের ভিতর টেনে নিয়ে যান—সোনার মনে হয় বাবার হাতে আলাদিনের প্রদীপ আছে, তার যা খুশি বাবা তাকে এনে দিতে পারেন। ফলে তার কাছে চন্দ্রনাথ সব সময়ই জাদুর দেশের মানুষ।

    চন্দ্রনাথ কেবল সোনার সঙ্গে কথা বলছেন, মণীন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা বলছেন না, এ-কারণে মণীন্দ্রনাথ বুঝি মনে মনে রেগে যাচ্ছেন। চন্দ্রনাথ বুঝতে পেরে বললেন, আপনের শরীর কেমন? বড়বৌদির শরীর? এসব বলা নিরর্থক। তবু কুশল প্রশ্ন না করলে, এত বড় মানুষটা যে এখনও আছেন, এই সংসারে আছেন, যেন না থাকলেই বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগবে, মানুষটাকে শুধু সম্মান দেখানো— মানুষটা আছেন বলেই যেন সব আছে! চন্দ্রনাথ এবার সোনাকে বললেন, জ্যাঠামশাইরে ধইরা ভিতর বাড়ি লইয়া যাও। কোন্‌দিকে আবার ছুটব তখন তুমি ধইরা রাখতে পারবা না। তারপর চন্দ্রনাথ হাঁটু গেড়ে পাগল মানুষের পায়ে মাথা ঠেকালেন।

    সোনা জ্যাঠামশাইর হাত ধরে কাছারিবাড়ির দিকে হাঁটছিল। চন্দ্রনাথ যেতে যেতে বললেন, তুমি যে পূজা দ্যাখতে আইলা, তোমার মার কষ্ট হইব না?

    সোনা বলল, মায় তো আমারে কইল আইতে।

    চন্দ্রনাথ ছেলের মাথায় হাত রাখলেন, রাইতের ব্যালা কিন্তু কাইন্দ না।

    সোনা চুপ করে থাকল। জ্যাঠামশাই ওর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি এখন বাড়ির ভিতরে যেতে চাইছেন না। অথচ চন্দ্রনাথের ইচ্ছা—এই গাছপালা রোদ্দুরের ভিতর সোনা না ঘুরে এখন কাছারিবাড়িতে চলে যাক। রোদ উঠেছে। এই রোদে ঘুরে বেড়ালে সোনা অসুস্থ হতে পারে! আর এই রোদে যার মুখ দেখলে কেবল ধনবৌর কথা মনে হয়, প্রবাসে তিনি কতদিন ধরে যে একা, এই পূজার সময়ে চলে যেতে পারলে বড় মনোরম, সোনার মুখ দেখে চন্দ্রনাথ বাড়ি যাবার জন্য ভিতরে ভিতরে আকুল হয়ে উঠেছেন। এখন বর্ষাকাল বলে আর যখন তখন বাড়ি যাওয়া হয়ে উঠছে না। গেলেই নৌকা করে যেতে হয়। শীতে অথবা হেমন্তে মহালে বার হচ্ছেন, মহালে বের হবার নামে তিনদিনের কাজ একদিনে সেরে বাড়ি চলে যান, দু’রাত বাড়িতে থেকে কাছারিবাড়ি ফিরে আসেন, মহালে আদায়পত্রের নামে লুকিয়ে চুরিয়ে চলে যাওয়া। কোনও ছুটিছাটার বালাই নেই, বাবুদের মর্জি, যাও, দু’দিন ছুটি! আবার হয়তো ছ’মাসে কোনও সময়ই করে উঠতে পারেন না চন্দ্রনাথ। ভূপেন্দ্রনাথ ছোটভাইর মুখ দেখে ধরতে পারেন সব, তিনি বাবুদের বলে-কয়ে ছুটি করে দেন। এছাড়া মহালের নাম করে চন্দ্রনাথ যখন বাড়ি চলে আসেন তখন প্রায়ই খুব রাত হয়ে যায়, নিশুতি রাত। বেলায় বেলায় মহালের কাজ সেরে বাড়িমুখো হাঁটতে থাকেন। দশ ক্রোস পথ হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন চন্দ্ৰনাথ। নিশুতি রাতে কড়া নাড়লে ধনবৌ টের পায়, মানুষটা আর থাকতে পারছে না, চলে এসেছে। ধনবৌ নিজেও কত রাত না ঘুমিয়ে থেকেছে, কারণ ধনবৌ বলতে পারে না চন্দ্রনাথ কবে আসবে। দরজায় কড়া নাড়লেই বুকটা আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। খুব চুপি চুপি যেন সোনা টের না পায়, টের পেলেই উঠে বসবে, ঘুমাবে না, সারারাত বাবা ওর জন্য কি এনেছে এবং লালটু ওর তক্তপোশ থেকে উঠে এসে বাবার সঙ্গে শুতে চাইবে। ফলে ধনবৌ প্রায় লুকিয়ে দরজা খুলে দেয়। আহা, চন্দ্রনাথ দীঘির পাড় ধরে হাঁটার সময় ভাবলেন, ধনবৌ নিশ্চয়ই রাতে ঘাটে বাসন মাজতে মাজতে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। দূরের অন্ধকারে লগির শব্দ শুনলেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষটা বুঝি নৌকা করে নদীর চরে উঠে আসছে। ধনবৌ নিজেও বুঝি আর অপেক্ষা করতে পারছে না। রাতে জানালায় মুখ রেখে জেগে বসে থাকছে। দরজার কড়া বুঝি এক্ষুনি নড়ে উঠবে, চুপি চুপি দরজা খুলেই দেখতে পাবে তার স্বামী চন্দ্রনাথ, শক্তসমর্থ মানুষ, মোটা গোঁফ এবং ভাটা ভাটা চোখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। স্বামী তার পালিয়ে সহবাস করতে চলে এসেছে। ধনবৌ হাত-পা ধোবার জল এবং গামছা হাতে দিয়ে শুধু জিজ্ঞাসা করে, চন্দ্রনাথ কী খাবেন। চন্দ্ৰনাথ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলেন না। শুধু লণ্ঠনের আলো মুখের কাছে নিয়ে যান। ধনবৌর মুখ দেখতে দেখতে কী যেন তিনি বলতে চান। বলতে পারেন না। ধনবৌ তখন সব বুঝতে পেরে মিষ্টি মিষ্টি হাসে।

    কি সব ভাবছেন তিনি। চন্দ্রনাথ এবার মণীন্দ্রনাথকে বললেন, সময় মত স্নান করবেন। সময় মত খাইবেন। ছুটাছুটি করলে বাবুরা কিন্তু রাগ করব।

    মণীন্দ্রনাথ আর দাঁড়ালেন না। সোনার হাত ছেড়ে হাঁটতে লাগলেন। সোনা বলল, বাবা, যাই? বলে সে আর বাবার আদেশের অপেক্ষা করল না। সে জ্যাঠামশাইকে ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল।

    সোনা যেতে যেতে বলল, জ্যাঠামশয়, আমি কিন্তু আপনের লগে সান করমু, আপনের লগে খামু। সোনা আরও বলতে চাইল, এই যে দেখছেন, দীঘি পার হলে বাঘ আছে, বাঘের বাচ্চা আছে। সেই চিড়িয়াখানাতে নিয়ে যাবার ইচ্ছা এখন সোনার। সে টানতে টানতে বাঘের খাঁচার সামনে নিয়ে দাঁড় করাল। চিতাবাঘ্রে দুটো বাচ্চা, চুকচুক করে দুধ খাচ্ছে। কান খাড়া করে যেন বাঘদুটো সোনা এবং মণীন্দ্রনাথকে দেখতে থাকল। ডানদিকে হেঁটে গেলে ছোট্ট এক জলাশয়, পাড়ে পাড়ে লোহার রেলিঙ, জলাশয়ে কুমীর। শীতলক্ষ্যার জলে কুমীরের ছা ভেসে এসেছিল। গোলা করে মাছের জন্য ডালপালাএবং জলের ভিতর পচা এক শ্যাওলাভূমি তৈয়ার করে রাখলে এই কুমীর মাছ খেতে ঢুকে আটকা পড়ে গেল গোলাতে। সেই থেকে ছোট্ট কুমীরের জন্য এই জলাশয়। লালটু পলটু বাঘ, হরিণ, ময়ুরের গল্প করেছে, কিন্তু কুমীরের গল্প করেনি। কাল এসেই ওরা কুমীর দেখে এসেছে। সোনা তখন অমলা কমলার সঙ্গে ছাদে উঠে নক্ষত্র দেখছিল—রাতে শুতে গেলে কাছারিবাড়িতে এই গল্প। চিড়িয়াখানাতে এবার একটা কুমীর এসেছে। সে জ্যাঠামশাইকে, যেন জ্যাঠামশাই এক নাবালক, সোনা বড় মানুষ, সে যাচ্ছে আর কথা বলছে, বাঘে কি খায়, ময়ূরে কখন পেখম ধরে, হরিণেরা কি খেতে ভালোবাসে, বাবুদের এইসব হরিণ কোত্থেকে ধরে এনেছে—বিজ্ঞের মতো যা সে এতদিন শুনেছে—এক এক করে বলে যাচ্ছিল।

    বাঘের খাঁচার পাশে মণীন্দ্রনাথ সহসা দাঁড়িয়ে গেলেন। এবং গরাদ ধরে নাড়তে থাকলেন। সোনা তাড়াতাড়ি ভয় দেখাল মণীন্দ্রনাথকে, জ্যাঠামশয়, বাঘে কিন্তু মানুষ খায়। দুষ্টামি করলে কিন্তু বাঘে লাফ দিব। মণীন্দ্রনাথ সোনার কথা শুনে হা-হা করে হাসতে থাকলেন। তারপর ছাদের দিকে তাকিয়ে সহসা চুপ মেরে গেলেন। সোনা এতদূর থেকেও চিনতে পারল, ছাদে উঠে অমলা রোদে চুল শুকাচ্ছে।

    মণীন্দ্রনাথ এবার সোনাকে কাঁধে তুলে নিতে চাইলেন। সোনা জ্যাঠামশাইর কাঁধে উঠল না। বলল, আসেন দ্যাখি কে আগে যায়। বলে সোনা ছুটতে থাকলে দেখল পাগল মানুষ ছুটছেন না। ছাদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। অমলার চুল সোনালী রঙের। চোখ নীল। অমলাকে দেখে জ্যাঠামশাই কেমন স্থির হয়ে গেলেন! আর আশ্চর্য এই মানুষ যথার্থই সেই থেকে ভালো হয়ে গেলেন যেন। সোনাকে তেল মাখিয়ে দিলেন গায়ে, স্নান করিয়ে দিলেন। একসঙ্গে খেতে বসলেন। সোনার মাছ বেছে দিলেন, এবং বিকেলে হাত ধরে নদীর পাড়ে বেড়াতে গেলেন।

    আর তখনই সোনা দেখল একটা ল্যান্ডো গাড়ি আসছে। দুই সাদা ঘোড়া। অমলা কমলা হাওয়া খেতে বের হয়েছে। ওরা সোনাকে দেখে বলল, যাবে সোনা?

    —জ্যাঠামশাইরে নিলে যামু।

    ওরা গাড়ি থামাতে বলল। জ্যাঠামশাইকে তুলে নিল সোনা। অমলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর জ্যাঠামশাইর দিকে চেয়ে বলল, আমার বড় জ্যাঠামশয়। কলিকাতায় চাকরি করত।

    ওরা সাদা সিল্কের ফ্রক গায়ে দিয়েছে, পায়ে সাদা মোজা, কেডস্। মণীন্দ্রনাথেব সিল্কের পাঞ্জাবি আর পাট করা ধুতি, সাদা জুতো। সোনার সোনালী রঙের সিল্ক, সাদা হাফ প্যান্ট! পায়ে রবারের জুতো। দুই সাদা ঘোড়া নদীর পাড় ধরে ওদের এখন হাওয়া খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে। সোনা ঘাটে দেখল, নৌকায় ঈশম বসে মাছ ধরছে। সে চিৎকার করে উঠল, ইশমদাদা যাইবেন? হাওয়া খাইতে যাইবেন?

    সোনার কাছে ছোট বড় ভেদ থাকল না। যেন এই গাড়িতে উঠে ইচ্ছা করলে সকলেই হাওয়া খেতে যেতে পারে। সে তার জ্যাঠামশাইর দিকে তাকিয়ে বলল, যাইবেন পিলখানার মাঠে? হাতি দ্যাখামু আপনেরে। কমলা তুমি যাবে?

    অমলা বলল, আমিও যাব। কমল, তুই, আমি সোনা। সে এখন পাগল মানুষটাকে দেখল, দেখতে দেখতে বলল, আপনি যাবেন? কিন্তু কোনও কথা বলল না বলে জোরে অমলা বলল, আপনি যাবেন হাতি দেখতে? আমরা কাল ল্যাণ্ডোতে হাতি দেখতে যাব। নদীর চরে নেমে যাব। যাবেন?

    এত করেও অমলা মণীন্দ্রনাথকে কথা বলাতে পারল না। এমন কি তিনি আজ গ্যাৎচোরেৎশালাও বললেন না। কেবল মাঠ, নদী এবং কাশফুল দেখতে দেখতে ফিরে ফিরে অমলাকে দেখলেন। অমলা উল্টে ওর মায়ের চেহারা পেয়েছে। মণীন্দ্রনাথ অমলার দিকে তাকিয়ে শিশুর মতো অভিমান করে বসে আছেন যেন।

    আশ্বিনের সূর্য নদীর ওপারে নেমে যাচ্ছে। গাড়িটা এগুচ্ছে! ঘোড়ার পায়ের শব্দ। ঠক ঠক। বেশ তালে তালে, ঘোড়াদুটো যাচ্ছে, সোনা যেন কোথায় কবে একবার এমন দুটো সাদা ঘোড়াকে গাড়ি টেনে নিতে দেখেছে। খুব বরফ পড়েছে, গাছে গাছে পাতা ঝরে গেছে, চারদিকে বরফের পাহাড়। মাঝে সিঁথির মতো পথ। কে যেন এমন করে তাকে কোথাকার রাজা-রানীর গল্প করেছিল। সোনা এবং মণীন্দ্রনাথ একদিকে, অমলা কমলা একদিকে। নানারকমের পাখি নদী পার হয়ে যাচ্ছে। ওপারের মানুষ প্রায় দেখা যাচ্ছে না বললেই হয়। জল নদীর নিচে নেমে যাচ্ছে ক্রমে। লাল ইঁটের বাড়ি ওপারে প্রায় ছবির মতো মনে হচ্ছিল সোনার। সে কতরকমের কথা বলতে চাইছে। তার মনে হল, সেই আলো জ্বালার মানুষটা, আর কিছুক্ষণ পরই, যেই না সূর্য অস্ত যাবে, মানুষটা লম্বা পোশাক পরে আলো জ্বালবে। মানুষটাকে সোনার বড় ভালো লাগে, মেজ জ্যাঠামশাইকে মানুষটা যমের মতো ভয় পায়। কেবল দেখা হলেই আদাব দেয়। ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর পিঠের ছেঁড়া জামার ভিতর থেকে শীর্ণ শরীরটা কত রুগ্‌ণ ধরা যায়। মানুষটা সন্ধ্যা হলেই সেই কলটা চালিয়ে দেয়। ভটভট শব্দ হতে আরম্ভ করলেই ম্যাজিকের মতো সারা বাড়িতে লাল নীল আলো জ্বলতে থাকে।

    লোকটা সোনাকে বলেছে, সে আজ আলো জ্বালার সময় সেই ম্যাজিক কলটা তাকে দেখাবে! ওর নাম ইব্রাহিম। সোনাকে সকালে উঠেই একবার আদাব দিয়েছে। সোনা দেখেছে বাড়ির নিয়মকানুন আলাদা। সকাল হলেই ফরাসের যত চাকর তারা সোনাকে আদাব দিয়েছে। তোষাখানার চাকরেরা আদাব দিয়েছে। এ বড় আশ্চর্য সংসার। জ্যাঠামশাইকে দেখে মানুষগুলি দূর থেকে আদাব দিতে দিতে চলে যাচ্ছে। ইব্রাহিম নুয়ে গেছে কতকটা। আদাবের সময় আর তাকে নুইতে হয় না। যাত্রা গানে সোনা একবার আওরঙজেবের পালা দেখেছিল। সোনার কাছে প্রায় সেই বাদশার শামিল। সাদা দাড়ি নাভি পর্যন্ত নেমে গেছে। লোকটার হাতে এত বড় বাড়ি, এবং তার অন্ধকার, লোকটাকেও সোনার মনে হয় মহাভারতের দেশের মানুষ! অমিত তেজ এই মানুষের। হাতে তার জাদুর কাঠি, যন্ত্রে ছোঁয়ালেই ফুসমন্তরে কথা বলে ওঠে। আলো জ্বলে ওঠে। ও মাঝে মাঝে চিৎকার করে। বলে দিলাম ফুস মন্তর কথা কবে যন্তর।

    সে গাড়িতে বসে দেখল বেলা পড়ে আসছে। ফিরতে দেরি হলে ইব্রাহিম তার জন্য অপেক্ষা না করে যদি সেই জাদুর ঘরে গিয়ে বসে থাকে। সোনা কমলকে দ্রুত গাড়ি চালাবার কথা বলল।

    কমল বলল, গাড়ি তো চলছেই।

    —আমরা ফিরে যাব কমল। সোনা যতটা পারছে কমলের মতো কথা বলতে চাইছে। খুব বেশি কঠিন না বলা। একটু বইয়ের ভাষায় কথা বলতে হয় এই যা। তবু উচ্চারণ ঠিক থাকে না বলে, অমলা কমলা ঠোঁট টিপে হাসে। সে ভাবল এবার থেকে বড় জেঠিমার কথাগুলি মনে রাখার চেষ্টা করবে। সোনা বলতে পারত, ফিরে না গেলে আলো জ্বলবে না। কারণ ইব্রাহিম বলেছে আমি গেলেই সে আলো জ্বালাবে।

    কমল বলল, তোকে আমরা ছাদে নিয়ে যাব। সেখান থেকে ভালো দেখতে পাবি।

    অমলা বলল, আমরা ছাদে আজকে লুকোচুরি খেলব। তুই আসবি সোনা?

    অমলা সোনাকে দেখছিল। অমলা সোনার চোখ মুখ দেখে, কি সুন্দর চোখ, এবং কি মিষ্টি করে কথা বলে, আর এই বালক যেন সেই মায়ের মুখে বাইবেল বর্ণিত বালক, সাদা পোশাকে সোনাকে প্ৰায় মাঝে মাঝে তেমনই দেখাচ্ছে। সোনা এতটুকু আনন্দ পেলেই উৎসাহে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে ঘোড়ার ছুটে যাওয়া দেখছে। ওরা গাড়ি থামিয়ে নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল। এদিকটা গঞ্জের মতো জায়গা। সারি সারি লোক যাচ্ছে। অমলা কমলাকে দেখে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে যাচ্ছে।

    তারপরে ক্রমে গাড়িটা এসে এক মাঠে পড়ল। মণীন্দ্রনাথ চুপচাপ বসে এতক্ষণ নদীর দু’তীর দেখছিলেন, এখন মাঠ দেখছেন। আর ফিরে ফিরে অমলাকে দেখছেন। যেন তার পলিন, শৈশবের পলিন—কি যে চেহারা তার! ধীর স্থির মণীন্দ্রনাথ অমলাকে আদর করার জন্যে মাথায় হাত রাখলে অমলা ভয় পেতে থাকল। সোনা বলল, ভয় নাই অমলা। আমার জ্যাঠামশয় কাউকে কিছু বলে না। অনিষ্ট করে না। আর আশ্চর্য, এমন বলতেই মানুষটা ঠিকঠাক হয়ে বসলেন। ওরা সবাই যেন তীর্থযাত্রায় বের হয়েছে এমন মুখ মণীন্দ্রনাথের। অমলা গল্প করতে থাকল কবে সেই শিশু বয়সে ল্যান্ডোতে তারা এই মাঠে এসে পড়তেই ভীষণ কুয়াশা নেমে এসেছিল। ইব্রাহিম তখন ল্যাণ্ডো চালাত। দুই ঘোড়াকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। গাড়ি থেকে নেমে অমলা কমলা ছুটাছুটি করছিল মাঠে! কিন্তু সহসা কুয়াশা নামলে ইব্রহিম ঘোড়া দুটোকে খুঁজে পেল না। শীতের দিন ছিল। ইব্রাহিম দুই কাঁধে দুই মেয়ে নিয়ে ফেরার সময় দেখেছিল, এক বৃদ্ধ রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধের হাতে লাঠি। মেজবাবুর ফ্রুট শুনবে বলে দেশ থেকে বের হয়েছে। অমলার বাবা সুন্দর ক্ল্যারিওনেট বাজান। তিনি দেশে এসেছেন, তিনি রাতে ফ্রুট বাজাবেন। কিন্তু কুয়াশায় সেই মানুষ রাস্তা হারিয়ে ফেললে ইব্রাহিম হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল। আর আশ্চর্য, সেই মানুষ এক বড় ক্লারিওনেট বাজিয়ে। সে তার চেয়ে বড় ওস্তাদ মেজবাবু জেনে এখানে চলে এসেছিল। কিন্তু পরে জানা যায়, মেজবাবু তার নিচের ঘরে সেই মানুষকে আটকে রেখেছিলেন। এবং ওস্তাদ স্বীকার করে সব সুর তান লয়—যা কিছু ফুটের রহস্য জেনে নিয়েছিলেন। সেই ওস্তাদ মানুষ এত ভাল ফ্রুট বাজায় যে, সে বাজাতে আরম্ভ করলে অকালে কাশের বনে ফুল ফুটতে থাকে, পাখি উড়তে থাকে মাথার উপর। মানুষটা সব কিছু উজাড় করে দিল মেজবাবুকে। নিজের বলতে কিছু আর রাখল না। এসেছিল কিছু নিতে, কিন্তু এসে দেখল, বড় কাঁচা হাত মেজবাবুর। এত বড় বাড়ির সম্মানিত ব্যক্তি তার কাছে হেরে যাবে, ভাবতেই সে কষ্ট পেয়েছিল বড়। নিচের ঘরে সারা রাত দিন তখন মেজবাবু মানুষটার কাছে পড়ে থাকতেন। তালিম নিতেন। নাওয়া-খাওয়ার সময় ছিল না। আর কি বিস্ময়ের ব্যাপার, সেই মানুষ সব দিয়ে থুয়ে নদীর জলে নেমে গিয়েছিল। মানুষটার আর কোনও সম্বল ছিল না। সে দুঃখী মানুষ ছিল, সে হাটে বাজারে গঞ্জে ফ্রুট বাজাত, বড়বাবুর মেজছেলে তাও নিয়ে নিল। তার আর অহঙ্কারের কিছু ছিল না। যেন সে তার স্বর হারিয়ে ফেলেছে, সুর হারিয়ে ফেলেছে। সে একা একা নদীর পাড় ধরে চলে যেতে চাইলে মেজবাবু বললেন, বুড়ো বয়সে আর কোথায় যাবে? থেকে যাও। কে আর তোমার ফ্রুট শুনবে! তুমি তো বলেছ, যা তুমি আমায় দিয়েছ, হাটে বাজারে আর তুমি তা বাজাবে না। তুমি পয়সা পাবে কোথায় তবে? খাবে কি?

    খালেক মিঞা প্রথম জবাব দিতে পারেনি। পরে বলেছে, যে আজ্ঞে হুজুর। হুজুরের ল্যাণ্ডোতে সে সেই যে এসে বসল আর নড়ল না। চোখে দেখে না ভালো, তবে গাড়িতে চড়ে বসলে খালেক মিঞা একাই একশ। খালেক এখন বাতাসের আগে ল্যাণ্ডো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

    নদীর ওপারে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। কাশফুলের মাথায় ক্রমে জ্যোৎস্না উঠবে এবার। নদীতে যেসব নৌকা আছে তার লণ্ঠন এবার এক দুই করে জ্বলবে। নদীর পাড়ে এসেই ল্যাণ্ডোটা বাঁক নিল। সূর্যাস্ত হচ্ছে বলে এখন একটা লাল রঙের আভা নদীর দু’পাড়ে গ্রামে মাঠে। ল্যাণ্ডোর মানুষগুলোর মুখে পর্যন্ত সেই লাল রঙ। সূর্যাস্ত হলেই অন্ধকার, তারপর মাথার উপর নীল আকাশ। শরতের আকাশে জ্যোৎস্না উঠলে বুঝি ঝাউগাছটার নিচে ল্যাণ্ডোটা এসে দাঁড়াবে। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ তখন ল্যাণ্ডো থেকে নেমে যাবেন।

    ঝাউগাছটার নিচে পৌঁছাতে ওদের অন্ধকার হয়ে গেল। ঘোড়াগুলি এখন কদম দিচ্ছে। এখন আর দ্রুত ছুটছে না ঘোড়া। কারণ ওরা প্রাসাদের কাছে কালীবাড়ির মাঠটায় এসে গেছে।

    মণীন্দ্রনাথ নেমে গেলে অমলা বলল, তোর মনে থাকবে তো সোনা।

    সোনা ঘাড় কাত করে মনে থাকবে এমন সম্মতি জানাল। ছাদের ওপর যখন জ্যোৎস্না উঠবে, সে কমলা অমলার সঙ্গে লুকোচুরি খেলবে। ঢাকের বাদ্য বাজবে, ঢোলের বাদ্য বাজবে, আর ওরা লুকোচুরি খেলবে, ছাদে অথবা রান্নাবাড়ি পার হলে অন্দরের যেসব দাসী বাঁদীদের ঘর আছে তার আশেপাশে। কিন্তু কালীবাড়ির মাঠে আসতেই সোনার কি মনে পড়ে গেল। সে বলল, আমি নামব অমলা।

    এখানে নামবি কেন? অমলাকে অধীর দেখাল।

    সোনা বলতে পারত, সেই যে জাদুর মেশিনটা আছে যা ঘোরালে তারে তারে বিদ্যুৎ খেলে যায়, আলো জ্বলে ওঠে, ঘরে নীল লাল রঙের আলো জ্বালা হয়, এবং পূজার দিন বলে ছোট ছোট গাছে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে টুনি ফুলের মতো আলোর মালা খেলা করতে থাকে—তার এখন সেই জাদুর মেশিনটার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো চাই। ইব্রাহিম বলেছে সে সেই মেশিনটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, হাতে তার জাদুর কাঠি ছোঁয়ালেই শব্দ হয় নানারকমের—কি বিচিত্র শব্দ যেন, নদীর জলে বৈঠা পড়ছে অথবা কাঠে বাড়ি মারছে খটখট—না শব্দটা ঠিক এমন নয়, শব্দটা ভটভট এই এক ধরনের শব্দ, আর ইব্রাহিম বড় বড় চোখে তার লম্বা জোব্বার ভিতর থেকে কত রকমারি জাদুর কাঠি বের করে দেখাবে বলেছে। সোনা সেই আশায় লাফিয়ে নেমে পড়ল ল্যাণ্ডো থেকে।

    কোথায় ইব্রাহিম এখন! সে চারদিকে খুঁজতে থাকল। জাদুর মেশিনটা যে-ঘরে থাকে, সে সেখানে গেল হাঁটতে হাঁটতে। ল্যাণ্ডোটা এখন সদরে ঢুকে যাচ্ছে। কোথাও যেন সে ঘোড়ার ডাক শুনতে পেল। এবং কিছু বালক-বালিকা—ওরাও এসেছে দেখবে বলে, কারণ পুজার ক’টা দিন এই প্রাসাদ যেন গ্রামের ছেলে-বুড়োদের কাছে আশ্চর্য এক মায়াপুরী, এই পূজার ক’টা দিন প্রাসাদের দালান-কোঠা, নীল রঙের মাঠ, হ্রদের মতো বড় দীঘি এবং বিচিত্র বর্ণের ফুলের গাছ সব মিলে এক মায়াকানন। দূর থেকে মানুষেরা হেঁটে হেঁটে চলে আসে। সোনা যেতে যেতে সেইসব মানুষদের দেখতে পেল নদীর পাড়ে বসে আছে। অথচ ডানদিকে সেই গোল ঘরটা লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। আশ্চর্য ইব্রাহিমকে সে দেখতে পাচ্ছে না। ইব্রাহিম বলেছে, তাকে আলো জ্বালানো দেখাবে। এই আলো জ্বালানো সোনার কাছে প্রায় এক অলৌকিক ঘটনার মতো। সে আর দেরি করতে পারল না। সে ছুটে গিয়ে জালে মুখ রাখতেই দেখল, ইব্রাহিম যন্ত্রটার ওপর ঝুঁকে কি করছে!

    সে ডাকল, ইব্রাহিম।

    ইব্রাহিম কোনও উত্তর করল না। সূর্য অস্ত গেছে বলে এবং সন্ধ্যা নামছে বলে ঘরের ভিতরটা সামান্য অন্ধকার। ইব্রাহিমের মুখ অস্পষ্ট। ওর মুখে ঘাম। সে যেন যন্ত্রটাকে বশ মানাতে পারছে না। গোয়ার্তুমি করছে সেই জাদুর মেশিনটা। যত গোয়ার্তুমি করছে তত সে টেনে টেনে কি সব খুলে ফেলছে, চারপাশে ঘুরে ঘুরে টেনে টেনে কি পরীক্ষা করছে, আর সে পাগলের মতো চোখ মুখ করে রেখেছে অথবা উদ্‌বিগ্ন চোখমুখ, এত যে বালক-বালিকা চারপাশে, সবাই ওর কৌশল দেখতে এসেছে, ইব্রাহিম মিস্ত্রী, নামডাক এত যে এই মানুষ প্রায় মরা হাতি লাখ টাকার মতো, সেই মানুষ এখন বিনা নোটিশে এমন ঘাবড়ে গেছে যে সোনা পর্যন্ত আর ডাকতে পারল না, ইব্রাহিম, তুমি আমায় আসতে বলেছিলে। কি করে এমন একটা জগৎটাকে নিমেষে জাদুর দেশের শামিল করে দাও দেখাবে বলেছিলে, এখন তুমি কিছু করছ না। তোমাকে ডাকলে সাড়া দিচ্ছ না।

    সোনার এবার ভয় ভয় করতে থাকল। সে একা যাবে কি করে! ইব্রাহিম বলেছিল, আলো জ্বালা হলে, সে তাকে কাছারিবাড়ি পৌঁছে দেবে। এখন সেই ইব্রাহিম একেবারে মোল্লা মৌলবী হয়ে গেল। অথব ফকির দরবেশ। কোনও কথা বলছে না। সে যে বিড় বিড় করে কোরাণশরিফ পাঠ করছে। সোনা কিছুতেই বলতে পারল না, অ ইব্রাহিম, আমারে তুমি তবে আইতে কইছিলা ক্যান! এখন আমি যামু কি কইরা!

    যদি সেই হেমন্তের হাতিটা ফিরে আসত এখন। ওরা গেছে ল্যাণ্ডোতে আর বড়দা মেজদা গেছে বাবুদের সঙ্গে। হাতিতে চড়ে ওরা হাওয়া খেতে গেছে। হাতিটার গলায় ঘণ্টা বাজলেই সে টের পেত হাতিটা ফিরছে। না কোথাও কেউ ফিরছে না। শুধু অপরিচিত বালক-বালিকা এবং মানুষজন যাদের সে চেনে না, যারা প্রতিমা দেখতে আসে একমেটে, দু’মেটে হলে, তারাই আবার এই আলো জ্বালা দেখতে এসেছে। বাবুরা থাকেন শহরে। পূজায় এলে এই বাড়ির কলের একটা মেশিন ঘুরতে থাকে। তখন এই বাড়িঘর নিয়ে প্রাসাদের আলো নিয়ে এবং রকমারি সব পাথরের মূর্তি নিয়ে এই গ্রামটা শীতলক্ষ্যার জলে শহর বনে যায়। সোনাও এসেছে এই শহরে। সে যা কিছু দেখছে তাতেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে।

    অন্ধকারটা ক্রমে ভারী হচ্ছে। গাছপালা ঘন বলে আকাশে যে সামান্য জ্যোৎস্না, তা এই ঘরে অথবা ঘাসের বুকে গাছের ডালপালা এবং পাতা ভেদ করে নামতে পারছে না। সবাই বলছে, কি হইল ইব্রাহিম, তোমার পাগলি কথা কয় না ক্যান!

    —কইব কইব। না কইয়া যাইব কই!

    সোনা বলল, ইব্রাহিম, তুমি আইতে কইছিলা।

    ইব্রাহিম যেন এতক্ষণে টের পেয়েছে সোনাবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। সে বলল, কর্তা, পাগলির যে কি হইল!

    —কি হইছে?

    —কথা কইছে না।

    আর তখনই সোনা দেখল, মেজ জ্যাঠামশাই এদিকে ছুটে আসছেন। সঙ্গে অন্দরের চাকর নকুল। চোখে মুখে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তার ছাপ। এখানে যে সোনা একা এবং অপরিচিত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তিনি তা পর্যন্ত লক্ষ করছেন না। তিনি নিজে এবার ভিতরে ঢুকে টর্চ মেরে কি দেখলেন। ইব্রাহিমকে সরে যেতে বললেন, তারপর কি দেখে বললেন, এটা এখানে কেন!

    সোনার মনে হল ডাক দেয়, আমি জ্যাঠামশয় এখানে!

    কিন্তু সোনা মেজ জ্যাঠামশাইকে মস্ত বড় মানুষ ভাবতেই সে ডাকতে সাহস পেল না। যেমন তিনি এসেছিলেন, তেমনি চলে গেলেন। সোনা বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকল। এখন আর অন্ধকার নেই। এত বড় আকাশ মাথার উপর আর ছোট্ট এক ফালি চাঁদ এবং হাজার নক্ষত্রকে ব্যঙ্গ করছে এই মায়াকানন, প্রাসাদ। চারপাশে আলোর মালা। চারপাশে বড় বড় ম্যাগনোলিয়া ফুলের গাছ, তার বিচিত্র বর্ণের পাতা এবং ছোট ছোট কীট-পতঙ্গের শব্দে সোনাকে কেমন মুহ্যমান করে দিল। সে একা একা হেঁটে যাচ্ছে। তার ভয়ডর কিছু থাকল না। এত আলো চারপাশে, এত গাছগাছালির ভিতর অজস্র আলো, দূরে কারা এখন ছুটোছুটি করছে এবং পূজার বাজনা বাজছে নিয়ত—সোানার ভয়ড়র একেবারে উবে গেল। ওর মনে একটা অতীব স্বপ্নের দেশ, দেশটার নাম কেবল সে এক মেয়ের মুখের সঙ্গে তুলনা করে মিল খুঁজে পায়—সে মেয়ে অমলা। তার অমলা পিসি। অমলা তাকে আজ ছাদে যেতে বলেছে। তুই সোনা ছাদে আসবি, আসবি কিন্তু। আমি তোর জন্য অপেক্ষা করব। সোনা ল্যাণ্ডোর সেই সুন্দর মুখ মনে করতে পারল. এবং কলকাতার মেয়ে অমলা। কলকাতা খুব বড় শহর, ট্রামগাড়ি, হাওড়ার পুল কি সব অত্যাশ্চর্য সামগ্রী নিয়ে বসবাস করছে কলকাতা। অমলা সেখানে থাকে, সেখানে বড় হয়েছে। আশ্চর্য রকমের নীল চোখ! এবং আলোর মতো মুখে নিয়ত কথার ফুলঝুরি-সোনা এই আলোর রাজ্যে হাঁটতে হাঁটতে কেমন সরল এক মায়ার টানে ছুটতে থাকল।

    সোনা দীঘির পাড়ে পাড়ে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে সোনা কাছারিবাড়ি ঢুকে গেল। কত লোকজন কত আমলা কামলা চারপাশে। সে সব ফেলে ছুটছে। এত জোরে ছুটতে দেখলে জ্যাঠামশাই বকবে, সে চারদিকে একবার দেখে নিল। না, মেজ জ্যাঠামশাই কাছে কোথাও নেই। পূজামণ্ডপে নানা রকমের প্রদীপ, জ্বালানো হচ্ছে। দেবীর মূর্তিতে গর্জন লাগানো হয়েছে। এবং ঝিলমিল রঙের সব গর্জন এখন চাকচিক্যময় হয়ে গেছে। সোনা এই প্রতিমার সামনে ধরা পড়ে যাবে, তুমি এক আশ্চর্য মায়ার টানে ছুটে যাচ্ছ সোনা–আমি সব টের পাচ্ছি। সোনা সেজন্য মণ্ডপে দেবীর মুখের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে ডানদিকের বারান্দায় উঠতে সোনা দেখল একটা ইজিচেয়ারে বড় জ্যাঠামশাই শুয়ে আছেন। মুখ বুজে পড়ে আছেন। গায়ে একটা সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়ে দামী জুতো, পূজোর সময়ে এই পোশাক মেজ জ্যাঠামশাইর—যা কিছু ভাল পোশাক পাগল জ্যাঠামশাইকে পরতে দিয়েছেন, অথবা নিজে হাতে পরিয়ে দিয়ে এখানে বসিয়ে রেখেছেন। পায়ের নিচে রামসুন্দর, একটু দূরে বসে তামাক কাটছে। রাশি রাশি তামাক কাটা হচ্ছে। রাশি রাশি রাব ঢেলে এক সুগন্ধ তামাকের সৃষ্টি এবং পাশে পাগল জ্যাঠামশাই—সোনা আজ এখানে এসেও মুহূর্ত দেরি করল না। তার হাতে সময় নেই। ওর দেরি হয়ে গেছে। সেই কখন থেকে ছাদের ওপর অমলা ওর জন্য অপেক্ষা করছে। অমলা, অমলা-পিসি। কলকাতার অমলা। কত বড় শহর কলকাতা। মেমরিয়েল হল, রূপালী রঙের বেড়া এবং দু’পাশে সব সুরম্য অট্টালিকা। সুদূর সেই কলকাতার মতো অমলার শরীরে এক দূরের রহস্য নিমজ্জিত। সোনার বয়স আর কত! তবু এই টান সোনাকে কেমন পাগলের মতো ছুটিয়ে মারছে। সে পাগল জ্যাঠামশাইর কাছ থেকে পালাবার জন্য ডানদিকের বারান্দায় উঠে এল না। সে বড় থামের পাশে নিজেকে প্রথম লুকিয়ে ফেলল। তারপর আবার ছুটে সিঁড়ি ভাঙতে থাকল।

    সিঁড়ি ভাঙার সময়ই সে ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেল। দীঘির ওপারে মঠ। মঠে কেউ এখন বড় ঘণ্টায় শেকল টেনে ঘণ্টা বাজাচ্ছে। সকালে সোনা ভেবেছিল সন্ধ্যায় জ্যোৎস্না উঠলে সে এবং পাগল জ্যাঠামশাই সেই মঠে চলে যাবে। সে পাগল জ্যাঠামশাইকে সিঁড়িতে বসিয়ে রাখবে। যেখানে পাথরের বৃষ রয়েছে তার ডান দিকে সে দাঁড়াবে। শ্বেত পাথরের বাঁধানো মেঝে। মেঝের উপর দাঁড়ালে সে শেকলটা হাতে নাগাল পায়। সে এক দুই করে ঘণ্টা বাজাবে আর জ্যাঠামশাই সেই ঘণ্টাধ্বনি এক-দুই করে গুনবেন। নিচে এসে বলবে—কত বার? জ্যাঠামশাই বলবেন, দশ বার। একমাত্র সে-ই যেন এভাবে ক্রমে মানুষটাকে নানা কাজের ভিতর অথবা জ্যাঠামশাই যা ভালোবাসেন, তার ভিতর নিয়ে যেতে যেতে এক সময় নিরাময় করে তুলবে। কিন্তু এই ঘণ্টাধ্বনি শুনে সোনা কেমন থমকে গেল। যেন পাগল জ্যাঠামশাই বলছেন, সোনা যাবি না, মঠের সিঁড়িতে ঘণ্টা বাজাবি না? আমি এক দুই করে গুনব। গুনতে গুনতে একশ ঠিক ক্রমান্বয়ে বলে যাব। সব ঠিক-ঠিক ক্রমান্বয়ে বলে গেলে দেখবি সোনা আমি একদিন ভাল হয়ে যাব।

    সিঁড়িতেই সে থমকে দাঁড়াল। সে ওপরে যাবে, না নিচে নেমে পাগল জ্যাঠ্যামশাইকে নিয়ে মঠের সিঁড়িতে গিয়ে বসে থাকবে। এমন একটা দোমনা ভাব ভিতরে তার কাজ করছে। বরং ওর এখন ঐ মঠেই চলে যেতে বেশি ইচ্ছে। সে এত উঁচু মঠ কোথাও দেখেনি। হাজার হবে টিয়াপাখি, নীল রঙের। পাখিরা সব মঠের ভিতর বাসা বানিয়ে নিয়েছে। জ্যোৎস্না রাত হলে পাখিরা চক্রাকারে মঠের চারপাশে ওড়ে। মঠটার কথা মনে হলেই এমন সব পাখিদের কথা মনে হয়। পাখিদের কথা মনে হলেই ওর গুলতিটার কথা মনে হয়। মেলা থেকে রঞ্জিতমামা তাকে একটা গুলতি কিনে দিয়েছিল। সে সেই গুলতি দিয়ে কাক, শালিক, টিয়াপাখি এবং কাঠবিড়ালি যা পেত সামনে, মারার চেষ্টা করত। কিন্তু সে এদের সঙ্গে পারত না। জামরুল গাছটার নিচে ছোট খোঁদল, খোঁদলে সেই কাঠবিড়ালি, সকাল হলেই গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ত। সোনা পড়া ফেলে ছুটত জীবটার পিছনে। ছোট্ট জীব এ-গাছ থেকে ও-গাছে লাফিয়ে পড়ত। সোনালী রোদে সে কটকট করে ডাকত। সোনা গুলতি মারলে বিড়ালটা হাতজোড় করে রাখত। কিন্তু সোনা কর্ণপাত না করলে তখন খেলা আরম্ভ হয়ে যেত। সোনার মনে হতো এই সে এক জীব, ছোট্ট জীব! জীবের কি বড়াই। একেবারে ভয় পায় না। গাছের পাতায় পাতায় যেন উড়ে বেড়ায়। শুধু এই জীব কেন, যা-কিছু সুন্দর এবং সজীব, এই যেমন রোদ, মাটি, শরতের বৃষ্টি, সব কিছুরই পিছনে তাড়া করতে সে ভালোবাসে। অমলা তার কাছে খুব এক দূরের রহস্য বয়ে এনেছে। সে সেজন্য নড়তে পারছে না। কার কাছে যাবে? পাগল জ্যাঠামশাই, বড় মঠ এবং জ্যোৎস্না রাতের মাঠ না অমলা, কমলা। সে অন্ধকারে কিছু স্থির না করতে পেরে সিঁড়ির মুখে যেমন চপচাপ দাঁড়িয়েছিল তেমনি দাঁড়িয়ে থাকল।

    একজন পাইক বরকন্দাজের মতো মানুষ ওর পাশ কাটিয়ে গেল। ওকে দেখতে পায়নি। দেখতে পেলেই বলত, কে? অন্ধকারে কে জাগে! তাকে তাড়া করত। আর অন্ধকার থেকে আলোয় এলেই, আরে, এ যে সোনাবাবু! আপনে এখানে কি করতাছেন? আশ্চর্য, সোনা এইসব মানুষদের দেখে–কি লম্বা আর উঁচু। সব সময় করজোড়ে থাকে। ওকে দেখলে পর্যন্ত করজোড়ে কথা বলে। ওর ইচ্ছা হল সিপাইটাকে একটু ভয় পাইয়ে দেয়। এবং সে মুখ বাড়াতেই দেখল সামনে অমলা কমলা এবং অন্য সব ছোট ছোট মেয়ে অথবা ছেলে। দাসীবাদীদের ঘর পার হয়ে সব কোথায় যাবে বলে হৈ-হৈ করে নেবে যাচ্ছে।

    সে এবারেও নড়ল না।

    কমলার মনে হল কেউ যেন থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, কে রে তুই?

    সোনা আলোতে এসে বলল, আমি।

    –তোকে খুঁজতে যাচ্ছি। সেই কখন থেকে আমরা তোর জন্য বসে আছি।

    ওরা ফের উপরে উঠে যাবে মনে হল। কিন্তু দোতলার সিঁড়িতে উঠেই ওরা ছাদে গেল না। ওরা একটা ফাঁকা মতো জায়গায় চলে গেল। এখান থেকে রান্নাবাড়ির কোলাহল পাওয়া যায়। মাছ ভাজার গন্ধ আসছে। ওরা একটা ঝুলন্ত বারান্দায় এসে গেল। এখন ওরা যে যার দলে দলে ভাগ হয়ে যাবে। তারপর ছড়িয়ে পড়বে রান্নাবাড়ির চারপাশে।

    সুতরাং ওরা অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ল। অথবা বলা যায় লুকিয়ে পড়ল। অমলা সোনাকে নিজের দলে রেখেছে। সে ভেবেছিল সোনাকে নিয়ে কোথাও সে লুকিয়ে পড়বে। কিন্তু সোনা যে কোথায় সহসা অদৃশ্য হয়ে গেল। সে একটা চিলেকোঠায় উঠে গেল। এখানে তাকে কেউ খুঁজে পাবে না।

    আর সোনার এখন যেন এ-বাড়ির সব চেনা হয়ে গেছে। কোনদিকে তোষাখানা, কোনদিকে বালাখানা, কোথায় ঠাকুরবাড়ি, কোথায় সেই বৌরানীর মহল, এবং মহলের পর মহল পার হতে কত সময় লেগে যায় সে সব জানে! ওরা আর বেশিদূর যাবে না, গেলে সে বাদ যাবে।

    সোনা কিন্তু কিছুদূর এসেই কেমন ভয় পেয়ে গেল। এদিকটা একেবারে ফাঁকা ফাঁকা। ভাঙা পাঁচিল নিচে। পাঁচিলের ওপাশে সেই বড় বনটা। সোনা বেশি দূরে যাবে না। বড় বড় দুটো আলোর ডুম জ্বলছে বলে এবং দাসী বাঁদীদের কি নিয়ে বচসা হচ্ছে বলে ভয়টা তেমন জোরালো হচ্ছে না। তবু সে এমন একটা জায়গা চাইছে, যেখানে সে পালালে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। সে তেমন একটা জায়গা না পেয়ে কেমন হতাশায় ডুবে যাচ্ছিল আর তখন দেখল অমলা ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। যেন অমলা এতক্ষণ ওকেই খুঁজছে।

    অমলা বলল, আমার সঙ্গে আয় সোনা।

    অমলা সোনাকে সাহায্য করতে পারবে। সে অমলার পিছু পিছু নুয়ে নুয়ে হাঁটতে থাকল। মাথা তুলে দাঁড়ালেই ওপাশের রেলিং থেকে ওদের দেখতে পাবে।

    সোনা এবং অমলা এই করে উত্তরের বাড়ি পর্যন্ত চলে এল। বড় বড় দরজা পার হয়ে যে যার মতো লুকিয়ে পড়ছে। অমলা ফিফিস্ করে এদিকে আয়, এদিকে আয় করছে। একটা অন্ধকার মতো লম্বা বারান্দায় ওরা এসে পড়ল। এখান থেকে অতিথিশালার দিকে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে। সিঁড়িটা ঘুরে ঘুরে নিচে নেমে গেছে। কাঠের সিঁড়ি। সোনা এবং অমলা ঘুরে ঘুরে নামছে। ওরা নামতে নামতে যেন একটা নির্জন জায়গায় চলে এল। নীল রঙের অল্প আলো। সোঁদা সোঁদা পাঁচিলের গন্ধ। সামনে একটা পরিত্যক্ত ঘর। হাট করে একটা পাট খোলা। কিছু ইঁদুর-এর শব্দ। উপরে একটা গাছ। কী গাছ এই আলোতে চেনা যায় না। দুটো-একটা বাদুড়ের মতো জীব ওদের শব্দ পেয়ে উড়ে গেল। ওরা দরজা অতিক্রম করে পাঁচিলটার পাশে একটা কিছু ধ্বংসস্তূপের মতো দেখতে পেল। এককালে বোধহয় এখানে একটা কুয়ো ছিল। কুয়োটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখানে এসেই অমলা বলল, চুপ করে দাঁড়া। এখানে আমাদের খুঁজতে কেউ সাহস পাবে না। আমরা রান্নাবাড়ির পেছনটাতে চলে এসেছি।

    সোনা ভয়ে জবাব দিল না।

    —কি রে, একেবারে চুপ করে আছিস কেন? কথা বল।

    —আমার বড় ভয় লাগছে।

    ভয় কি রে! এখানে আমি বৃন্দাবনীর সঙ্গে রোজ আসি। সকালে ফুল তুলতে আসি। তারপরই ওদের মনে হল কেউ যেন কাঠের সিঁড়িটা ধরে নিচে নেমে আসছে। অমলা কোনও কথা আর বলল না। সে একেবারে চুপ হয়ে গেল। সোনা একেবারে অমলার পাশাপাশি সংলগ্ন হয়ে আছে। যেন সে এখন বলির পাঁঠা। অমলা যা-যা বলবে সোনা তাই তাই করবে। সোনাকে অমলা দুটো সন্দেশ দিল খেতে। তারপর যখন দেখল সিঁড়ি থেকে শব্দটা আর উঠে আসছে না, কেউ বোধহয় সিঁড়ি দিয়ে নেমে রান্নাবাড়ির দিকে চলে গেছে, তখন অমলা বলল, তুই কমলার সঙ্গে ভাব করবি না, কেমন?

    আবার শব্দ হচ্ছে কাঠের সিঁড়িতে। বোধহয় কমলা তার দলবল নিয়ে ওদের খুঁজতে আসছে। মলিনা, আলো, মধু কিংবা আরও কেউ কেউ হবে। যে-ই হোক, এদিকে আসতে ওরা সাহস পাবে না। মাথার উপর একটা লম্বা ডাল। পাঁচিলের ওপাশ থেকে ডালটা এপাশে ঢুকে গেছে। আর তারই নিচে সেই ভুতুড়ে ঘরটা। ঘরটার অন্ধকারে অমলা সোনাকে জড়িয়ে ধরেছে। বলছে, ভয় কি রে! এই দ্যাখ, দ্যাখ না সোনা। বলে অমলা সোনার হাত নিয়ে কেমন খেলা করতে থাকল।

    সোনা আবার বলল, এখানে না অমলা। আমার এসব ভালো লাগে না। সোনা বার বার অমলার মতো কথা বলতে চায়, ওর অমলার মতো কথা বলতে ভালো লাগে।

    তখন কমলার দলবলটা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে। সোনা বলল, কমলা আমাকে বাইস্কোপের বাক্‌স দেবে বলেছে।

    অমলা বলল, আমি তোকে রোজ একটা স্থলপদ্ম এনে দেব। বৃন্দাবনী বাবার জন্যে গোলাপের তোড়া বানাবে। তোকে আমি ফুলের তোড়া দেব। বলে আর সোনাকে কথা বলতে দিল না। ওর চুলে অমলা হাত দিয়ে আদর করতে থাকল। মাথাটা এনে নাকের কাছে রাখল। একেবারে রেশমের মতো নরম চুল। সোনা কেমন ভীতু সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে। কলকাতার মেয়ে অমলা কত কিছু জানে! এই বয়সে সোনা আর কী করতে পারে! অমলা ওকে নিয়ে কী করতে চায়! তুই কী সুন্দর সোনা! তোর চোখ কি বড়! তোকে আমি কলকাতা নিয়ে যাব। কত বড় শহর দেখবি। কত বড় চিড়িয়াখানা জাদুঘর।

    সোনা বলল, বইয়ে আছে জাদুঘরে বড় একটা তিমি মাছের কঙ্কাল আছে।

    —তুই গেলে দেখতে পাবি, কত বড় কঙ্কাল

    সোনা বলল, আমার ভয় লাগে।

    অমলা বলল, একটু নিচে। তুই কীরে! ভয় পাস কেন এত।

    সোনা বলল, ঈশম একটা বড় মাছ ধরছিল।

    অমলা যেন আর পারছে না। সোনার কাছে কী চাইছে। সোনার হাতটা কোন অতলে যেন নিয়ে যাচ্ছে। সোনার যেন কিছু জ্ঞানগম্যি নেই। যেন সে কিছু জানে না। অমলা কেমন বিড়বিড় করে বকছে,

    সোনা কত বড় মাছ রে?

    —খুব বড়।

    —দে, তবে হাত দে।

    সোনা বলল, না।

    —তবে তোকে চুমু খাই

    —না।

    —কেন কি হবে?

    —গালে থুতু লাগবে।

    —মুছে ফেলবি। তুই কি বোকা রে।

    আবার সেই কথা সোনার মুখে। ওর ভয়, এটা যে কী, কোন ওষধিতে গড়া, একবার খেলে আর খেতে নেই, ধরা পড়ে গেলে ভয়, তাছাড়া এ বড় এক পাপ কাজ। সোনা নিজের কাছে নিজেই কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে। অথচ একটা ইচ্ছা-ইচ্ছা ভাব, রহস্য নিয়ে জেগে আছে কলকাতার মেয়ে, সে এক দূরের রহস্য, যা সে এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কেবল নদীর জলে শাপলা ফুলের মতো ফুটে থাকার স্বভাব তার, সে যেন জলের উপর ভেসে আছে, লজ্জা ভয় সঙ্কোচ ওকে ক্রমে জলের উপর ভাসিয়ে রাখছে, ওর হাত নিয়ে সেই অতলে ছেড়ে দিলেই সে জলের ভিতর ডুবে যাবে। পাপের ভিতর হারিয়ে যাবে।

    সে বলল, না অমলা। না, না।

    অমলা বলল, লক্ষ্মী সোনা। দে হাত দে। তুই আবার বাঙাল কথা বলিস কেন?

    সোনা কেমন গুটিয়ে আসছে। সে যেন পৃথিবীতে একটা বিশুদ্ধভাব নিয়ে বেঁচে ছিল এতদিন, অমলা তাকে সেখান থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। ওর এখন ছুটে যেতে ইচ্ছা করছে। অথচ অমলার প্রীতিপূর্ণ চোখ, সোনালী চুল, চোখের নীল রঙ, আর শরীরে যেন উজ্জ্বল সোনালী বাতি জ্বলছে নিয়ত—এমন এক শরীর ছেড়ে ওর যেতে ইচ্ছা করছে না। সারাক্ষণ সে অমলার পাশে পাশে হাঁটতে ভালোবাসে, কিন্তু এখন অমলা যা ওকে করতে বলছে—তা, কেন জানি ওর কাছে একটা পাপ কাজ বলে মনে হচ্ছে।

    অমলা সোনাকে আর সময় দিল না। সোনার মুখটা টেনে টুক করে একটা চুমু খেল। তারপর বলল, ভালো লাগছে না?

    সোনা বুঝল কি বুঝল না টের পেল না। ভাঙা দরজাটা বাতাসে সরে গেছে। নীলচে আলোতে সোনার মুখ অস্পষ্ট। অমলা সেই মুখ দেখে বলল, কী রে, চুপ করে আছিস কেন? ভালো লাগছে না?

    ভালো লাগছে না বললে অমলা রাগ করবে। অমলা ওকে আর ভালোবাসবে না। সন্দেশ দেবে না, ফুল-ফল দেবে না। সে বলল না কিছু। ঘাড় কাৎ করে সুবোধ বালকের মতো সম্মতি জানাল।

    আর কথা নেই অমলার। যেন এবারে পাসপোর্ট মিলে গেছে। সে তাকে নিয়ে যা ইচ্ছে করছে। সোনারও কেমন ভালো লেগে যাচ্ছে। সেই হাত নিয়ে খেলা, নতুন খেলা, জীবনের এক অদ্ভুত রহস্যময় খেলা, আরম্ভ হয়ে গেল।

    অমলা প্যান্টের দড়ি বাঁধার সময় বলল, কী রে তোর ভালো লাগেনি?

    সোনা ফিক করে হেসে দিল।

    —হাসলি যে?

    সোনা কিছু না বলে বাইরে এসে দাঁড়াল। কিছু না বুঝেই সোনা বোকার মতো হাসল। এবং বাইরে আসতে আবার সেই হাসি।

    —কি রে, তোর কি হয়েছে সোনা? এত হাসছিস কেন?

    সোনা জোরে জোরে হাসতে থাকল। এটা কী একটা হয়ে গেল। অমলা-পিসি তাকে এটা শেখাল। বেশ একটা খেলা, তার জীবনে এসে গেল। এখন আর অমলাকে নিয়ে ছাদের উপর অথবা একটা নীল রঙের মাঠে কেবল ছুটতে ইচ্ছা করছে। এখন আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে না। কী সুন্দর লাগছে অমলাকে, অমলা নিত্যনতুন বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। কিন্তু মায়ের মুখ মনে পড়তেই সে কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। তার মনে হল সে একটা পাপ কাজ করে ফেলেছে। তার আর কিছু ভালো লাগছে না। একা, নির্জন এই ভাঙা পাঁচিলে সে বড্ড একা একা। পাশের এই অমলাকে এখন আর সে যেন চিনতে পারছে না। সে তারপরই যথার্থই ছুটতে থাকল।

    অমলা বলল, সোনা ছুটে যাস না। পড়ে যাবি সিঁড়ি থেকে। অমলাও দু’লাফে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যেতে থাকল। সোনা এখন যেভাবে ছুটছে, পড়ে গেলে মরে যাবে! সে সোনার চেয়েও দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে সোনাকে সাপটে ধরল।—সোনা, এই সোনা, তোর কী হয়েছে? এভাবে ছুটছিস কেন? অন্ধকারে পড়ে গেলে মরে যাবি।

    সোনা অমলাকে দু’হাতে ঠেলে ফেলে দিল। অন্য সময় হলে অমলা কেঁদে ফেলত, কিন্তু এখন সোনার চোখ দেখে ভয়ে সে কিছু বলতে পারছে না। সে কাছে এসে বলল, তোকে একটা ভালো গল্পের বই দেব। আমার সঙ্গে আয়।

    সোনা চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। অমলা তাকে বার বার ডাকল—সে উত্তর করল না। ঢাকের বাদ্যি বাজছে মণ্ডপে। সে একটা বড় হলঘর পার হয়ে যাচ্ছে। কতরকমের ছবি ঘরটাতে। কতরকমের বাঘের অথবা হরিণের চামড়া। ঢাল তলোয়ার সাজানো এই হলঘরটাতে এলেই সোনা মনে মনে রাজপুত্র হয়ে যায়। অথচ মাথায় সোনার মুকুট, পায়ে নূপুর, কালো রঙের ঘোড়া এবং কোমরে রূপালী রঙের বেল্ট আর লম্বা তরবারি। এই হলঘরে এলেই সোনার এক রাক্ষসের দেশ থেকে বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধারের ইচ্ছা জাগে! আজ ওর সেই ইচ্ছাটা জাগছে না। হলঘর পর্যন্ত পিছু পিছু অমলা এসেছে। তারপর আর আসতে সাহস পায়নি। দরজার মুখে সে দাঁড়িয়ে সোনার চলে যাওয়া দেখছে।

    দরজা পার হতেই সে একবার পিছন ফিরে তাকাল। অমলা এখনও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক বন্দিনী রাজকন্যার মতো মুখ করে রেখেছে। রাজপুত্র সোনা। কিন্তু এখন সে কী করবে! কোথায় যাবে! ওর মনে হচ্ছিল সবাই ওর এই পাপ কাজের কথা জেনে ফেলেছে। পাগল জ্যাঠামশাইর পাশে বসলেই তিনি যেন সোনার শরীরের গন্ধ শুঁকে বলে দেবেন, তুমি সোনা বড় তরমুজের মাঠ দেখে ফেলেছ। রহস্য তোমার অন্তহীন। তুমি সোনা, আমার পাশে বসবে না। সোনার এখন কেবল কান্না পাচ্ছে।

    থামের আড়ালে এসে থামতেই সোনা দেখল, পাগল জ্যাঠামশাই ইজিচেয়ারে শুয়ে নেই। সব পরিচিত, অপরিচিত লোক গিজগিজ করছে মণ্ডপের সামনে। ওর সেখানে যেতে ইচ্ছা হল না। ওর কেবল কেন জানি মায়ের মুখ বার বার মনে পড়ছে। ঠিক পাগল জ্যাঠামশায়ের মতো মা-ও ওর হাতের গন্ধ শুঁকলেই টের পেয়ে যাবে। সে একটা পাপ কাজ করে ফেলেছে টের পেয়ে যাবে। এখন কি করলে যে সব পাপ তার ধুয়ে মুছে যাবে—সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। মা বলেছে, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সব বলে দিলে পাপ খণ্ডন হয়ে যায়। সে জলের কাছে তার যা-কিছু পাপ সব বলে দেবে এবং ক্ষমা চেয়ে নেবে।

    সে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জল এবং জলের দেবতাকে বলবে, হে জলের দেবতা, আর তখনই সে দেখল কাছারিবাড়ি এসে গেছে। রামসুন্দর বসে রয়েছে একটা গোল টেবিলে। চারপাশে কাঠের চেয়ার। বাবুদের ছেলেরা গোল হয়ে বসেছে। রামসুন্দর সুন্দর গল্প বলতে পারে। একটু দূরে পাগল জ্যাঠামশাই বসে আছেন। মাথার উপর আকাশ, আর মৃদু জ্যোৎস্নার আলোতে সে ভাবল, কাল ভোরে সে পাগল জ্যাঠামশাইকে নিয়ে নদীর পাড়ে চলে যাবে। মা যেমন দুঃস্বপ্ন দেখলে সকাল সকাল সোনালী বালির নদীতে চলে যান, জলের কাছে দুঃস্বপ্নের হুবহু বলে দেন, বলে দিলেই সব দোষ খণ্ডন হয়ে যায়, তেমনি সে বলে দেবে। দিলেই তার যত দোষ খণ্ডন হয়ে যাবে।

    এমন মহাপাপ করে সোনার কিছুই ভালো লাগছিল না। এমন কি এখন যে রামসুন্দর গল্প বলছে তাও শোনার আগ্রহ নেই। সে কাছারিবাড়ির ভিতরে ঢুকে মেজ জ্যাঠামশাইর বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং সারাদিনের ক্লান্তিতে তার ঘুম এসে গেল।

    সে ঘুমের ভিতর একটা কুঠিবাড়ির স্বপ্ন দেখল। সামনে বিস্তীর্ণ এক মাঠ। মাঠে কোনও শস্য ফলে না। নুড়ি বিছানো পথ, পাশে খোয়াই। খোয়াই ধরে জল নেমে আসছে। সাদা, নীল, হলুদ রঙের পাথর। জল নির্মল বলে পাথরগুলির রঙ জলের উপর নানা রঙ নিয়ে ভেসে থাকছে। আর কুঠিবাড়ির পিছনেই একটা পাহাড়। তার ছায়া সমস্ত কুঠিবাড়িটাকে শান্ত স্নিগ্ধ করে রেখেছে।

    সোনা সকালের রোদে বের হয়ে পড়েছে। সে কার হাত ধরে যেন নিয়ত ছুটছে। সে তার মুখ দেখতে পাচ্ছেন। পিছনের বেণী কেবল ঝুলতে দেখছে। লাল রিবন বাঁধা চুলে রূপালী রঙের ফ্রক গায়ে মেয়েটা তাকে নিয়ে সেই খোয়াইর দিকে ছুটে চলেছে।

    খোয়াইর পাড়ে এসে সোনা ভয় পেয়ে গেল। মনে হল তার, এমন গভীর জল এবং স্রোত পার হয়ে সে ও-পাড়ে উঠে যেতে পারবে না। মেয়েটা বলছে, কি রে, ভয় কি! আয়! আয় না, দেখ আমি, কেমন তোকে পার করে দিচ্ছি।

    আলগা হাতে সোনাকে যেন মেয়েটা খোয়াইর ওপারে নিয়ে যাবে বলে হাত বাড়াল। খোয়াইর জল পার হবার সময় পায়ের কাছে ছোট ছোট মাছ চারপাশে খেলা করে বেড়াচ্ছিল। ঠাণ্ডা জল। এমন জল এই সুন্দর সকালকে যেন মহিমময় করে রাখছে। সোনা আর কিছুতেই ওপাড়ে উঠে যেতে চাইছে না।

    —কি রে, খুব ভালো লেগে গেছে! আর উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না! সোনা মেয়েটার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। ওর দিকে কেবল পিছন ফিরে থাকছে। সোনাকে কেবল পিছন ফিরে কথা বলছে। সোনা বলল, খুব ভালো লাগছে।

    এত ভালো লাগছে যে সোনার কেবল জলের মাছ হয়ে যাবার ইচ্ছা হচ্ছে। আর কি অবাক, যেই না তার ইচ্ছা জলের মাছ হয়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গেই যে জলের মাছ হয়ে গেল। মেয়েটা হাসল ওর দিকে তাকিয়ে, কি রে, তুই জলের মাছ হয়ে গেলি? বলতে বলতে মেয়েটাও জলের নিচে টুপ করে ডুব দিল। আর কী আশ্চর্য! সে এবং মেয়েটা দু’জনই হলুদ এবং নীল রঙের চাঁদা মাছ হয়ে খোয়াইর হাঁটুজলে সাঁতার কাটতে থাকল। তারপর দু’জন এক ভয়ঙ্কর স্রোতের মুখে এসে আটকে গেল। উজানে উঠে যাবার জন্য নীল রঙের মাছটা লাফ দিতেই পাড়ে এসে পড়ল। এবার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সোনা শ্বাস ফেলতে পারছে না। সে পাড়ে লাফ-ঝাঁপ দিচ্ছে। শ্বাসকষ্ট প্রায় মৃত্যুকষ্টের শামিল। সোনা ঘুমের ভিতর স্বপ্নে হাঁসফাস করছিল এবং এক সময় ঘুম ভেঙে গেল তার। সে ঘেমে গেছে! আর সে দেখল কে যেন তাকে পাঁজাকোলে রান্নাবাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। সে চোখ তুলে দেখল পাগল জ্যাঠামশাই নিয়ে যাচ্ছেন। এতক্ষণে মনে হল সোনার, সে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

    সে বলল, জ্যাঠামশয়, মাছ দ্যাখলে কি হয়?

    পাগল মানুষ বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। এখন সোনা মুখ দেখে বুঝতে পেরেছে তিনি যেন বলতে চেয়েছেন, রাজা হয়। স্বপ্নে মাছ দেখলে রাজা হয়।

    পরদিন সকালে সোনা সূর্য উঠতে না উঠতেই জ্যাঠামশাইকে টানতে টানতে শীতলক্ষ্যার পাড়ে নিয়ে গেল। সামনে ছোট চর, পাড়ে কাশবন। বাঁদিকে মঠতলায় স্টিমার ঘাট। দশটায় স্টিমার আসার কথা। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসে।

    সকাল বলে এবং আশ্বিনের মাস বলে ঘাসে ঘাসে শিশির। জ্যাঠামশাই, সোনা এবং প্রিয় আশ্বিনের কুকুর নদীর পাড়ে হাঁটছে। এরা তিনজনে চরে নামতেই দেখতে পেল সেই হাতিটা, হেমন্তের হাতি। এখন আশ্বিনের শেষাশেষি চরের ওপর দিয়ে কোথায় চলে যাচ্ছে। ওর ইচ্ছা হল জোরে চিৎকার করে ডাকে, জসীম। আমাবে জ্যাঠামশয়রে নিয়া যাও। আমি মার কাছে যামু গিয়া। আমার এখানে ভাল লাগে না। কিন্তু বলতে পারল না। ভয়ে সে বলতে পারল না। যদি আবার জ্যাঠামশাই হাতিতে চড়ে নিরুদ্দেশে চলে যান।

    অথচ গত রাত্রের ঘটনা মনে হতেই সে তার মায়ের কাছে ফিরে যেতেও সাহস পাচ্ছে না। এখন কেবল মনে হচ্ছে খালেক মিঞার মতো সে পথ হারিয়ে ফেলেছে। এই কুয়াশা পার হলেই এক জগৎ, সেখানে নিয়ে যাবার জন্য অমলা তার সুন্দর চোখ নিয়ে অপলক প্রতীক্ষা করছে। সোনা জ্যাঠামশাইর হাত ধরে নদীর ঘাটে দাঁড়াল। অথচ পাপের কথা কিছু বলতে পারছে না। কী বলবে! সামনের জলে কিছু কাশফুল ভেসে যাচ্ছে। এই ফুল দেখতে দেখতে সে তার মহাপাপের কথা ভুলে গেল। ওর কেবল মনে হচ্ছে এতদিনে সেই দূরের রহস্যটা সে যেন কিছু কিছু ধরতে পারছে। এখন ওর চারপাশের ফুল-ফল, পাখি, দু’পাশে নদীর চর, নদীর জলরাশি এবং এই যে হাতি চলে যাচ্ছে নদীর পাড়ে-পাড়ে, জ্যাঠামশাই পিছনে তার সূর্য-ওঠা দেখাচ্ছেন, কুকুরটা সকালের রোদে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর স্টিমার ঘাটে যাত্রীরা বসে আছে, কিছু কিছু ঘাসের নৌকা, খড়ের নৌকা মাঝনদীতে…সবাই যেন গান গায় তখন, কোন্‌খানে ভাসাইলা নাও, দুই কূলের নাই কিনারা, য্যান এই নাও ভাসাইয়া দিছে সোনা, অমলা অথবা কমলা অথবা ফতিমারে নিয়া সোনাবাবু মাঝগাঙের মাঝি হইয়া গ্যাছে।

    সোনা এই নদীকে সাক্ষী রেখে কোনও পাপের কথা বলতে পারল না। সে সোজা উঠে এল ফের জ্যাঠামশাইর হাত ধরে। সকালের রোদ সোনার মুখে পড়েছে। যেন মুখটা সূর্যের আলোতে জ্বলছিল।

    পাগল মানুষ সোনার মুখ দেখে কি যেন ধরতে পারছেন। তিনি আশীর্বাদের মতো সোনার মাথায় হাত রাখলেন।…তোমার ভিতর বীজের উন্মেষ হচ্ছে সোনা। এই হতে হতে কিছু সময় পার হলে তুমি কিশোর হয়ে যাবে! তখন দেখবে রহস্যটা যা এখন ছুঁতে পারছ না, তা ধরতে পারবে। আরও বড় হলে, দুই কূলের নাই কিনারা, তুমি জলের ভিতর ডুবে যাবে। না ডুবতে পারলে পাড়ে-পাড়ে তার সন্ধানে থাকবে। তারপর খুঁজে না পেলে আমার মতো পাগল হয়ে যাবে।

  • চব্বিশ

    চব্বিশ

    অন্দরের দিকে যেতে সারাদিন আর সোনার ইচ্ছা হচ্ছিল না। গাছের পাতার মতো নিরিবিলি এক লজ্জা অথবা সংকোচ ওকে ঘিরে ধরেছে। সুতরাং সে সারাদিন কাছারিবাড়ির বারান্দায় বসেছিল। এবং চারপাশে যে মাঠ আছে, সেখানে সে ঘোরাফেরা করছে। সে কিছুতেই অমলা কমলার সঙ্গে দেখা করেনি।

    আজ নবমী। সুতরাং মোষ বলি হবে। সকাল থেকেই এই উৎসবের বাড়ি অন্যরকম চেহারা নিচ্ছে। লালটু পলটু কাছে কোথাও নেই। ওরা বাবুদের বাড়ি-বাড়ি দুর্গাঠাকুর দেখে বেড়াচ্ছে। নদীর পাড়ে সড়ক। নদীর পাড়ে প্রাচীন মঠ। মঠের পাশ দিয়ে পুরানো বাড়ির দিকে একটা পথ গেছে, সেই পথে সোনা গতকাল পাগল জ্যাঠামশাইর হাত ধরে গিয়েছিল পুরানো বাড়িতে। সঙ্গে রামসুন্দর ছিল। সুতরাং এমন একটা নিরিবিলি পথ দুপাশে বাবুদের ইটের দালান-কোঠা, এবং দীঘির কালো জল তার কাছে আতঙ্কের মনে হয়নি। দীঘির পাড়ে বড় অশ্বত্থ গাছ, গাছের নিচে আশ্রম। আশ্রমের পাশ দিয়ে পথটা কতদূরে গেছে সোনা জানে না। কেবল ওর মনে হয়েছিল, এই পথ ধরে গেলেই সেই বুলতার দীঘি, এবং দীঘির দু’পাড় দেখা যায় না। বড় বড় মাছ, মাছের কপালে সিঁদুরের ফোঁটা। নদীর সঙ্গে যোগাযোগ দীঘির জলের, কালো জল, জলে অজস্র রূপালী মাছ, এবং একটা জলটুঙি আছে দীঘির মাঝখানে। মাঝে অতল জলের ভিতর বড় একটা দ্বীপ। সোনার এসব কোনও বড় দীঘি দেখলেই মনে হয়। আর মনে হয় বার-বার অমলার মুখ, এবং এটা যে কী একটা হয়ে গেল! সে পাগল জ্যাঠামশাইর সঙ্গে আর তেমন বেশি কথা বলতে পারছে না। কেবল চুপচাপ দীঘির পাড়ে কোনো অশ্বত্থের ছায়ায় বসে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে। কেবল ভাবছে অমলা তাকে রূপালী মাছের খেলা, জলের নিচে খেলা, কী-যে এক খেলায় সুন্দর এক রাজপুত্র বানিয়ে তাকে নদীর পাড়ে ছেড়ে দিয়েছে।

    সোনা সেই পুরানো বাড়ি-বাড়ি বলতে আর কিছু নেই, শুধু ইট-কাঠ, ভাঙা দালান এবং চুন-বালি খসা নাটমিন্দর। মন্দিরে পূজা হয় দেবোত্তর সম্পত্তি থেকে। এই বাড়িতেই বাবুদের প্রথম জমিদারী আরম্ভ হয়েছিল। কি যেন নাম সেই পূর্ব পুরুষের! সোনা এখন আর তা মনে করতে পারছে না। রামসুন্দর যেতে যেতে অন্য এক হাতির গল্প করছিল, হাতি, নদী পার হতে গিয়ে শেকলে পরশমণির স্পর্শ, এবং হাতি বাবুদের নসিব বদলে দিয়ে গেছে। এমন সব কিংবদন্তী রামসুন্দর কী সুন্দরভাবে গাছের ছায়ায় বসে বলতে ভালোবাসে। আর সে কাছারিবাড়ির একটা টুলে নিরিবিলি বসে দেখতে পাচ্ছে, মাঠের ভিতর নবমীর মোষটা ঘাস খাচ্ছে। মোষটা বলি হবে বলে সব ছেলেমেয়েরা ঘুরে ফিরে অথবা একটু দূরে বসে মোষটার খাওয়া দেখছে। একটু বাদে রামসুন্দর মোষটাকে স্নান করাতে নিয়ে যাবে। সোনা, একবার মোষের মাথা নিয়ে এক কাটা মোষ যায়, সে মাঠে কাটা মোষের মাথা দেখে ধড় দেখে বনের ভিতর পথ হারিয়ে ফেলেছিল। সে জ্যান্ত মোষ কোনওদিন দেখেনি। ওর মোষটার কাছে যেতে কষ্ট হচ্ছে। একবার ভেবেছিল মোষটার কাছে গিয়ে বসে থাকবে এবং ঘাস খাওয়া দেখবে। কিন্তু বলি হবে বলে ওর ভিতরে ভিতরে মোষটার জন্য কষ্ট হচ্ছিল। কাছে যেতে তার খারাপ লাগছে। মোষটার পিঠে একটা শালিক পাখি বসে আছে. পিঠে শালিক পাখি দেখেই সোনার কেন জানি মোষটাকে দুটো ঘাস ছিঁড়ে দিতে ইচ্ছা হল। মোষটা জানে না কিছুক্ষণ পরই সে মরে যাবে।

    সোনার খবর নিতে অমলা দুদু’বার বৃন্দাবনীকে পাঠিয়েছে। দু’বারই সোনা কাছারিবাড়ির কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। সে সাড়া দেয়নি। বৃন্দাবনী তারপর হতাশ হয়ে চলে গেছে। সোনা শুনেছে এই বৃন্দাবনীই ওদের বড় করে তুলছে। মানুষ করে তুলছে। অমলা কমলার মা খুব সুন্দর। এবং চুপচাপ কলকাতায় নির্জন ঘরে একা বসে থাকেন। বড় একটা জানালা আছে। জানালায় দুর্গের র‍্যামপার্ট দেখা যায়। মেয়েদের জন্মের পর তিনি আর সেই ঘর থেকে বের হন না। রবিবারে শুধু গীর্জায় যান। কমলার বাবার চোখমুখ দেখলেও সোনার কেন জানি কষ্ট হয়। কেমন বিষণ্ণ আর উচ্ছ্বাস। সেজন্য সোনা অমলা অথবা কমলার সঙ্গে যতটা সহজে ভাবে সে আর ভাব করবে না, কথা বলবে না, তত ভিতরে ভিতরে সে নিজেই যেন কেমন দুর্বল হয়ে যায়। তবু সেই ঘটনাটা মনে হলেই ওর কেমন ভয় করে। অমলা নিজেও কমলার সঙ্গে কাছারিবাড়ি চলে এসেছে। এই, তোরা সোনাকে দেখেছিস। সোনা কোথায় সোনাকে দেখছি না! রামসুন্দরকে তখন জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল, মইষডার কাছে বইসা আছিল সোনাবাবু।

    ওরা মাঠে নেমে গেল। যেখানে মোষটা ঘাস খাচ্ছে সেখানে একদঙ্গল ছেলেপিলে। ওরা মোষটার চারপাশে বসে রয়েছে। অমলা সোনাকে সেখানে দেখতে পেল না।

    সোনাকে ওরা দেখতে পাবে না, কারণ সোনা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। চুপি চুপি অমলাকে দেখছে। সে অমলাকে ডাকতে পারছে না। সেই ঘটনার পর থেকেই সোনা কেমন নদীর পাড়ের সোনা হয়ে গেছে। সে যতটা পারল, কমলা অমলার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছে। অথবা পালিয়ে পালিয়ে এ-কটা দিন কাটিয়ে দিতে পারলেই ফের নৌকায় দেশে ফিরে যাওয়া। ওর আর ভালো লাগছে না। মায়ের জন্য ওর খুব কষ্ট হচ্ছে, সে জানে না মায়ের কাছে কবে কীভাবে যাবে, কবে তাকে সকলে সেই ছোট্ট নদীটির পাশে পৌঁছে দেবে।

    মেজ জ্যাঠামশাইকে সে কাছেই পায় না। তিনি কোথায় কখন চলে যান সোনা টের পায় না। মাঝে মাঝে স্নানের অথবা আহারের আগে তিনি বাক্স থেকে জামাপ্যান্ট বের করে দেন। সোনা যেন তাড়াতাড়ি লালটু পলটুর সঙ্গে স্নান আহার শেষ করে নেয়। কারণ, উৎসবের বাড়ি, কে কার দেখাশুনা করে! শুধু পাত পেতে বসে পড়া।

    অন্যদিন সকালবেলা সোনা, অন্দরে ঘি আর সুগন্ধ আতপ চালের ভাত মেখে ডাল দিয়ে অথবা কচু-কুমড়ো সেদ্ধ, বাবুদের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেতে বসে যায়। কাল সকালবেলা সে পুরোন বাড়ি চলে গিয়েছিল না হলে খেতে গেলেই দেখা হয়ে যেত অমলার সঙ্গে। আজ কোথাও যেতে পারেনি বলে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে খেতে ডাকবে কেউ-না-কেউ। বৃন্দাবনী এসেছিল, অমলা কমলা খুঁজে গেছে। তার ভাত নিয়ে ছোট বৌরানী বসে রয়েছে। সোনা এ-বাড়িতে এসে ছোট বৌরানীরও বড় প্রিয় হয়ে গেছে। সেই সোনাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। দু’দিন থেকে সে অন্দরে ছোটদের সঙ্গে বাল্য-ভোগ খেতে আসছে না। বৌরানী সোনার খোঁজে বার বার কাছারিবাড়ি লোক পাঠিয়েছে।

    ভূপেন্দ্রনাথ পূজামণ্ডপ থেকে নেমে আসার সময় এক ঠোঙা সন্দেশ এনেছিলেন। সেই খেয়ে সোনা নবমী পূজা দেখবে বলে সকাল সকাল পাগল জ্যাঠামশাইর সঙ্গে নদী থেকে স্নান করে এসেছে। পূজার নূতন জামা-প্যান্ট পরেছে। মোষ বলি হবে। ছোট শিং বলেই সোনার মনে হল মোষটার বয়স কম। কম বয়েসের এই মোষ এখনও ঘাস খাচ্ছে। ঘাস খেলে ঘস ঘস শব্দ হয়। সোনা শব্দটা শুনতে শুনতে চারপাশে তাকাল। আর কী সমারোহ—কী কচি-মোষ! ঘাস, ফুল ফল খেতে দিচ্ছে মোষটাকে। সেই এক রক্তজবার মালা, এখন মালা পরে মোষটা যেন ঘাসের ভিতর রাজার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ক্রমে যত কচি কাঁচা বালক সেই সকাল থেকে যারা জড়ো হচ্ছিল চারপাশে তারা এখন মোষটার নীল রঙের চোখ দেখছে। বলির সময় চোখদুটো লাল-রঙের হয়ে যাবে। সোনা হাঁটতে হাঁটতে মোষটাকে পিছনে ফেলে কাছারিবাড়ির সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল। লম্বা ঘর পার হয়ে নাটমন্দিরের চত্বরে ঢুকে গেলে দেখল, কি লম্বা আর চকচকে দুটো খঙ্গ নিয়ে বসে রয়েছে রামসুন্দর। কিছু ছাগশিশু, অথবা পাঁঠা বলি হবে। মোষ বলি হবে। রামসুন্দর বসে আছে তো আছেই। দোতলার বারান্দায় কে যেন সব চিকগুলি ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। মোষ বলির সময় পাঁঠাবলির সময় সব বৌরানী, আর পরিজন যত আছে, চিকের ভিতর মুখ রেখে নৃশংস ঘটনা দেখতে দেখতে হা-মা দেবী কল্যাণী, তুমি কল্যাণব্রতী, সুন্দরী, মহাকালের আদ্যাশক্তি বলে করজোড়ে প্রণাম করবে। ভূলুণ্ঠিত হবে।

    নবমী পূজার প্রসাদ এইসব াঠার মাংস। মহাপ্রসাদ। পূজা শেষ হলেই এইসব আস্ত পাঁঠা গণ্ডায় গণ্ডায় রান্নাবাড়িতে চলে যাবে। বড় বড় টাগারি ধোয়া মোছা হচ্ছে। ছাল ছাড়াবার জন্য নকুল তিনজন মানুষকে নিয়ে রান্নাবাড়ির বারান্দায় দড়ি ঝুলিয়ে রাখছে। যেন বলি শেষ হলে আর কিছু পড়ে না থাকে নিমেষে বড় বড় কড়াইয়ে এসব পাঁঠার মাংস জ্বাল হবে। মোষটাকে সেই বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে যাবে শীতলক্ষ্যার ওপারের মানুষেরা। রক্ষিত জ্যাঠামশাই কাটা-মোষ যারা নিতে এসেছে তাদের সঙ্গে পাওনা গণ্ডা নিয়ে রফা করছেন।

    সোনা রামসুন্দরের পাশে চুপচাপ বসল। রামসুন্দর রামদা ধার দিচ্ছে। দুটো রামদা। উল্টে পাল্টে রামসুন্দর কি নিবিষ্ট মনে ধার দিয়ে চলেছে। সেই যে সোনা একবার সোনালী বালির নদীর চরে প্রথম তরমুজ খেতে হারিয়ে গিয়েছিল—ঈশম ছইয়ের ভিতর তামাক টানছে, সে নদীর জল থেকে একটা মালিনী মাছ ধরে এনে তরমুজের পাতায় রেখেছিল, এবং মাছটা এক সময় মরে যাবে ভাবতেই সে যেভাবে দ্রুত ছুটে গিয়ে বালির ভিতর গর্ত করে জল রেখে মাছটা ছেড়ে ভেবেছিল এবার আর ভয় নেই, মাছটা বেঁচে যাবে, এবং গর্তের পাড়ে বসে নিবিষ্টমনে প্রতীক্ষায় ছিল মাছটা বেঁচে যাচ্ছে কি না—ঠিক তেমনি যেন রামসুন্দরের নিবিষ্ট মনে প্রতীক্ষা রামদায় ধার উঠছে কি না! সে দু’বার ঘষেই হাতের আঙুলে জিভ থেকে একটু থুতু লাগিয়ে ধার পরীক্ষা করছে। এত বড় একটা জীবের গলা এক কোপে কাটা প্রায় যেন বিলের গভীর জলে ডুব দেওয়া। ভেসে উঠতে পারবে কিনা কেউ বলতে পারে না।

    ঠিক দশটায় বলি। হাঁকডাক চারপাশে। কেউ যেন চুপচাপ বসে নেই। দু’বার ওকে অতিক্রম করে মেজ জ্যাঠামশাই লম্বা বারান্দা পার হয়ে গেলেন, দু’বার রামসুন্দর ধার দিতে দিতে চোখ তুলে লক্ষ করেছে ছোট একটা মানুষ এইসব দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছে। বড়দা, মেজদা, বাবুদের ছেলেরা সবাই ছুটে ছুটে কোথাও যাচ্ছে। ওকে কতবার যাবার সময় দেখছে—অথচ কেউ কথা বলছে না। নবমীর পূজা শেষ হলেই যেন আবার সবাই সবাইকে চিনতে পারার কথা ভাববে। সেজন্য সোনাও চুপচাপ আছে। ওর খুব খিদে লাগছে। কাউকে বলতে পারছে না। সকালে সে ভাত খায়নি। সকালে ওর ফ্যানা ভাত খাবার অভ্যাস। কষ্টটা প্রায় সেইদিনের মতো—যেদিন সে ফতিমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল বলে মা ভাত খেতে দেয়নি। সোনা চুপচাপ রামদা দুটো দেখছে। কি চকচক করছে। সোনার একবার রামদা দুটোতে হাত দিতে ইচ্ছা হল। কিন্তু রামসুন্দর দা দুটো পাশাপাশি সাজিয়ে রেখেছে। একটা পাঁঠা কাটার, একটা মোষ কাটার! সে দা দু’টোকে অপলক দেখছে। রামসুন্দরের এমন চোখ মুখ সে কোনওদিন দেখেনি। ওর কেমন ভয় ভয় করতে লাগল।

    বলি হবে দশটায়। ঠিক ঘড়ি ধরে দশটায়। সবাই যেন এখন ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব জোরে জোরে মন্ত্র পাঠ হচ্ছে মণ্ডপে। তন্ত্রধার দ্রুত মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন। দশটা ঢাক বাজলে দশটা ব্যাগপাইপ বাজবে। ঢোল বাজবে দশটা। সব দশটা করে। পাঁঠাও দশটা, শুধু মোষ একটা। মোষটা বলি হবে—কী আতঙ্ক তার! সোনা ভয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মোষ বলির কথা মনে হলেই বুকটা কেঁপে উঠছে। ঠিক সেই ঠাণ্ডা ঘরটার মতো। যেমন সে লুকোচুরি খেলার রাতে কোনও এক প্রাচীন ঠাণ্ডা ঘরে শ্যাওলার ভিতর—একটা কাক কা কা করে ডাকছিল—রাত্রে কাক ডাকা ভালো না, অমঙ্গল হয়, সারাক্ষণ অমলা যে ওকে নিয়ে কী করছিল…! এখন রামসুন্দর দায়ে ধার উঠে গেছে বলে নিশ্চিন্তে গোঁফে তা দিচ্ছে।

    এই রামসুন্দর আজ মোষ বলি দেবে। সকাল থেকেই সে অন্য মানুষ। সকাল সকাল সে নদী থেকে স্নান করে এসেছে। টিকিতে জবাফুল বেঁধেছে। ঘরে বসে সে গাঁজা খেয়েছে। সে এখন একটা আসনে পদ্মাসন করে বসে আছে। রামদা দুটো সামনে। ডাকলেই সে মণ্ডপের দিকে দুই দা দুই কাঁধে নিয়ে ছুটে যাবে। সিঁদুরের ফোঁটা চক্ষুর মতো এঁকে দেবে দায়ের মাথায়। তারপর আর কার সাধ্য আছে ওর সামনে যায়!

    সোনাকে এমন চুপচাপ পাশে বসে থাকতে দেখে বিরক্তিতে কেমন বলে উঠল, সোনাকর্তা এহনে যান। আমি দেবীর আরাধনা করতাছি। তারপর আর কোনও কথা নয়। একেবারে গুম মেরে বসে আছে।

    তা চুপচাপ বসে থাকবে! এতবড় একটা জীবকে সে এক কোপে দু’খান করবে সোজা কথা! কি বড় আর মোটা গর্দান মোষের। কালো কুচকুচে সবল মোষ। দশটা বিশটা মানুষের যে মোষ সামলানো দায় সেই মোস এক কোপে কাটতে চায়। মোষ যারা ধরবে তারা এক এক করে এসে পড়ল, গোল হয়ে বসল এবং গাঁজা খেল। ওরা উৎকট চিৎকার করে উঠল দু’হাত তুলে। সোনা তেমনি উবু হয়ে বসে আছে। সে নড়ছে না। সে কেমন এইসব মানুষজন দেখে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। দেয়ালে সেই সব সড়কি, বল্লম, নানারকমের লম্বা ফলা এবং তরবারি সাজানো এবং এই ঘরটাতেই রামসুন্দর দিনমান পড়ে থাকে বুঝি। হাতে তার নানারকমের শিকারের ছবি। বাঘ ভাল্লুকের ছবি এঁকে রেখেছে সে সারা শরীরে। সে যতবার ভাওয়ালের গজারি বনে বাবুদের সঙ্গে বাঘ শিকারে গেছে ততবার সে হাতে, বুকে পিঠে অথবা কব্জিতে উল্কি পরে এসেছে নারানগঞ্জ থেকে। সে ক’টা বাঘ শিকার করেছে, ক’টা হরিণ এবং অজগর ওর শরীর দেখলেই তা টের পাওয়া যাবে। সোনা মাঝে মাঝে রামসুন্দর পাশে বসে থাকলে উঁকি দিয়ে গুনত—এক, দুই, তিন। তারপর বলত, আপনে তিনটা বাঘ মারছেন। রামসুন্দর হাসত। তারপর সে তার হাত তুলে বগল দেখাত।— দ্যাখেন, এখানে একটা বাঘ আছে। বাঘটারে বগলের নিচে লুকাইয়া রাখছি।

    সোনা বলত, ক্যান লুকাইয়া রাখছেন?

    —বাঘটার লগে আমার খুব ভাব-ভালবাসা আছিল।

    —ভাব-ভালবাসা কি?

    —আপনের বিয়া হইলে টের পাইবেন।

    সোনা বলত, যান! সে ঠেলে ফেলে দিত রামসুন্দরকে। তারপর বলত, আমাকে একটা হরিণের বাচ্চা আইনা দিবেন?

    সোনার ধারণা বনে গেলেই হরিণের বাচ্চা ধরা যায়। এই যে চিড়িয়াখানা বাবুদের এবং চিড়িয়াখানায় বাঘ, কুমীর এবং জোড়া হরিণের খাঁচা, সবই এই মানুষের জন্য। যেন এই মানুষ যাবতীয় বন্য জন্তু এনে পোষ মানাচ্ছে।

    সে বলত, বনে গেলে ধইরা আনবেন ত?

    —রাখবেন কোনখানে?

    —বাড়ি নিয়া যামু।

    —খাওয়াইবেন কি?

    —ঘাস খাওয়ামু।

    —ঘাস খাইতে চায় না। বন থাইকা ধইরা আনলে গোসা কইরা থাকে।

    —গোসা করব ক্যান?

    —জঙ্গলের জীব যে জঙ্গলে যাইতে চায়।

    —অমলা কমলার হরিণ আছে। অরা গোসা করে না ক্যান?

    —সুন্দর মুখ, কি সুন্দর চক্ষু অগ কন? রঙখানা কি? অরা কথা বললে আপনের গোসা থাকে? কথা কইলে খেলা করতে ইসছা হয় না, ভালবাসতে ইসছা হয় না?

    —যান। আপনে কেবল মন্দ কথা কন।

    সেই মানুষটা এখন গুম মেরে আছে। কথা বলছে না। এমনকি এদিকে বড় এখন কেউ আসতেও যেন সাহস পাচ্ছে না, কপালে বড় রক্তচন্দনের ফোঁটা দিয়ে বসে রয়েছে, কাউকে সে ভ্রূক্ষেপ করছে না। এমনকি অমলার বাবা মেজবাবু একবার এসেছিলেন এদিকটাতে, তিনি রামসুন্দরকে এমন অবস্থায় পা ছড়িয়ে বসে থাকতে দেখে পালিয়েছেন। কারণ ওর চোখ জ্বাফুলের মতো লাল। সকাল থেকে পাশের ঘরটায় ঢুকে কি খাচ্ছে পালিয়ে পালিয়ে—একটা উৎকট গন্ধ এবং ঝাঁজ। সোনা দু’বার ঘরটায় ঢুকে পালিয়ে এসেছে। সে এখন মণ্ডপের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁ-দিকে ঝাড়-লণ্ঠনে একটা জালালি কবুতর সেই কখন থেকে ডাকছে। সে ঝাড়-লণ্ঠনে নিজের মুখ দেখার চেষ্টা করল। বাতাসে ছোট কাচের নকশি কাটা পাথরগুলি দুলছে। ঠিক প্রজাপতির মতো নকশি কাটা কাচগুলি ঘুরে ঘুরে দুলছে। কেমন রিনরিন শব্দ হচ্ছে। সেই শব্দে চকিতে মুখ তুলতেই দেখল, মণ্ডপে দেবী ওর দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছেন। সে সরে দাঁড়াল। মনে হল চোখ ঘুরিয়ে ওকে দেখছেন দেবী। সে কেমন ভয়ে ভয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। বলল, ঠিক অমলা কমলার মতো বলা, ভয় পেলে সে বইয়ের ভাষায় কথা বলতে চায় অথবা বড় জেঠিমা যেমন বলেন, তেমন ভাবে সে বলল, মা দুগ্‌গা, আমার জ্যাঠামশাইকে ভাল করে দাও।

    গর্জনে দেবীর মুখ চকচক করছে। ধূপের ধোঁয়ায় যেন মুখ, নাকের নোলক কাঁপছে। হাতের ত্রিশূল দেবী আরও শক্ত করে চেপে ধরেছেন। মেজ-জ্যাঠামশাই একটা গরদের কাপড় পরে সারাক্ষণ চণ্ডী পাঠ করছেন। পুরোহিত ফুল-বেলপাতা চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন। রাশি রাশি ভোগের নৈবেদ্য এবং ফলমূলের গন্ধ। এখন বলির সময়। ঢাক বাজছে দশটা। মোষটাকে কারা আনতে গেছে মাঠে। দেবীর চোখ যেন ক্রমে লাল হয়ে যাচ্ছে। যে যার মতো বলি দেখার জন্য জায়গা করে নিচ্ছে। সোনা সেই দেয়ালে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর নড়তে পারছে না।

    তখন সেই মানুষটা সহজে দু’কোপে দুটো বাচ্চা পাঁঠা কেটে ফেলল। সে চোখ বুজে ফেলছে। চোখ খুলতেই দেখল ধড়টা এবং পাগুলো তিড়িং তিড়িং করে লাফাচ্ছে। সে বলল, মা, আমি আর পাপ কাজ করব না।

    সে একটা থামের আড়ালে আছে। দোতলার চিক ফেলা। বাবুদের পরিজনেরা, দাসদাসী সবাই সেই চিকের আড়ালে। ওরা বলি দেখার জন্য চলে এসেছে। অথচ কী যে করবে সোনা, ভয়ে সে নড়তে পারছে না, সারাক্ষণ দেবী তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন।—তুমি কী করেছ সোনা, এটা কী করেছ, এমন বলছে। দেবীর রক্তচক্ষু। এই তবে দেবী মহিমা!

    সে বলল, আমি কিছু করিনি মা। তেমনি বাতাস বইছে। নকশি কাঁথার মতো ছোট ছোট বরফি কাচ আবার আগের মতো বাতাসে দুলছে। রিনরিন করে বাজছে। জালালি কবুতরটা চুপচাপ একটা ধুতুরা ফুলের মতো কাচের গেলাসে বসে পাঁঠা বলি দেখছে। জায়গা নেই। পাখিটা বেশ জায়গা মতো বসে গেছে। সারা মণ্ডপে এবং নিচে, চারপাশের বারান্দায় সর্বত্র লোক। আর দোতলার চিক ফেলা। অমলা কমলা এই ভিড়ের ভিতর পাঁঠা বলি দেখছে না, সোনাকে খুঁজছে। কোথায় যে গেল!

    এখন কেউ তাকে দেখতে পাবে না। তাকে তার সামনের মানুষজন ঢেকে ফেলেছে। দুগ্‌গা ঠাকুর ওকে দেখতে পাচ্ছেন না। সে চুপি চুপি মাথা নিচু করে ভেগে পড়ার জন্য কিছু মানুষ ঠেলে সিঁড়ির মুখে আসতেই কে তার হাত খপ করে ধরে ফেলল। আর সেই মানুষটা তাকে কাঁধে তুলে দাঁড়িয়ে থাকল।

    আর মোষটাকে তখন কারা টেনে টেনে আনছে। ধূপধুনোর গন্ধে কেমন নেশা ধরে গেছে। দুগ্‌গা ঠাকুরের মুখ দেখা যাচ্ছে না। ধোঁয়ায় একেবারে সব অস্পষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু মোষটা সব দেখে ফেলেছে। নাকে বড় নোলক দুলছে দুগ্‌গা ঠাকুরের। আর কী অপার মহিমা দু’ চোখে। মোষটা এবার আরাধনা করছে এমন মুখ তুলে তাকাল। তখনই ঠেলেঠুলে বিশ-বাইশজন লোক মোষটাকে হাড়কাঠে ফেলে দিল। পায়ে দড়ি বাঁধা। গলাটা টেনে জিভ বের করে চারটা মানুষ পায়ের দড়িতে হ্যাঁচকা মারতে সবল জীবটা হুড়হুড় করে নিচে গাইগরুর মতো পড়ে গেল।

    জিভ থেকে লালা বের করছে। গঁ গঁ শব্দ করছে। এবারে ঘাড়টা চেপে দিতেই শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল। কেউ মোষের আর্তনাদ শুনতে পেল না। ঢাক এত জোরে বাজছে আর চারদিকে দালান কোঠা বলে এমন গমগম শব্দ যে, এই বাড়িঘর প্রাসাদ, প্রবল প্রতাপান্বিত মোষ আর সোনা দুলছে। সেই রিনরিন শব্দ বাতাসে জলতরঙ্গের মতো কাচের বরফি কাটা নকশাতে। সেই দুগ্‌গা ঠাকুরের মুখ ঝলমল করছে আর কেবল রক্তপাত হচ্ছে সামনে। পশু বলি হচ্ছে, মেজ জ্যাঠামশাই পশুর মুণ্ড নিয়ে মণ্ডপে সাজিয়ে রাখছেন। মাথায় ঘিয়ের ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হচ্ছে। সব শেষে মোষ বলি। বাদ্যি যারা বাজাচ্ছে, তারা নেচে নেচে বাজাচ্ছে। হাত তুলে সকলে জয়ধ্বনি করছে, দুগ্‌গা ঠাকুর কি জয়! শ্রীশ্রী, চণ্ডীমাতা কি জয়! মা অন্নপূর্ণা কি জয়! আদ্যাশক্তি মাহামায়া কি জয়! অসুরবিনাশিনী, মধুকৈটবনাশিনী কি জয়! মা অন্নপূর্ণা কি জয়! রামসুন্দর সেই খাঁড়াটা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। প্রতিমার মুখ কাঁপছে। যেন সে এখন মহিষমর্দিনী, এবং এই মহিষের রক্তপানে খড়্গা হাতে নিজেই নেচে বেড়াবে।

    মোষটাকে যারা ঠেলেঠুলে হাড়িকাঠে ফেলে দিয়েছিল তারা সবাই মোষটার পিঠে চেপে বসেছে। তাঁবুর খোঁটা পোঁতার মতো চারজন লোক চারপাশে দড়ি টেনে রেখেছে। মানুষগুলির চাপে ঘাড়টা লম্বা হয়ে যাচ্ছে মোষের। কালো চামড়া নীল নীল হয়ে যাচ্ছে অথবা ফেটে যাচ্ছে মনে হয়। ক্রমান্বয়ে ঘি মাখানো হচ্ছে গর্দানে। সোনা উঁকি দিয়ে আছে। ওকে কে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখন দেখার সময় নেই। সে চিকের আড়ালে আছে। এ-পাশে দাঁড়ালে চিক চোখে পড়ে না। সে এখন অপলকে একবার দেবীর মুখ দেখছে আর রামসুন্দর যে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে খঙ্গ হাতে এবং এসেই দেবীর শ্রীচরণে ভূপাতিত হয়ে—মাগো, তুই মা অন্নপূর্ণা, তোর কী করুণা মা, বলে হাউহাউ করে কাঁদছে রামসুন্দর, এসব দেখে সে কাঠ হয়ে যাচ্ছে! এই যে খড়কুটো দিয়ে তৈরি মাটির প্রতিমা, চিমটি কাটলে রঙ এবং মাটি উঠে আসবে, এখন তার কী মাহাত্ম্য, করজোড়ে বাবুরা সব দাঁড়িয়ে আছেন। আর পুরোহিত ঘণ্টা বাজাতেই, ফুল-বেলপাতা দিতেই রামসুন্দর মোষটার সামনে দাঁড়াল। এখন মোষটা লেজ গুটিয়ে নিচ্ছে। একটা লোক চুলের বেণীর মতো লেজটাকে দুমড়ে ধরে আছে। লেজটা সেজন্য কাঁপছে।

    তখন রামসুন্দর মা মা বলে চিৎকার করে উঠল, মা তোর এত লীলা, মা মা, বলতে বলতে খ উপরে তুলল না বেশি। হাতখানেক উপর থেকে কোপ বসিয়ে দিল। খড়্গা সোনার চোখের সামনে দুলে উঠেই অদৃশ্য হয়ে গেল—কি যে হয়ে যাচ্ছে মুণ্ড ছিটকে পড়েছে, ধড়টা গড়িয়ে পড়ছে। কলসী থেকে জল পড়ার মতো মোষের ঘাড়টা এখন রক্ত ওগলাচ্ছে। মেজ জ্যাঠামশাই সেই মুণ্ডটা মাথায়া তুলে নিলেন। তিনি যে কত শক্ত মানুষ, দেবীর সামনে তিনি যে কী মহাপাশে আবদ্ধ, এখন যেন সোনা তা টের পাচ্ছে। তিনি মাথায় মুণ্ড নিয়ে হাঁটতে থাকলেন। সোনা বস্তুত রামসুন্দর উপরে খড়্গা তুলতেই চোখ বুজে ফেলেছিল। সে চোখ খুলতেই দেখল জ্যাঠামশাই মোষের মুণ্ড নিয়ে মণ্ডপে যাচ্ছেন। সেই মানুষটা সোনাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে এখন মোষের রক্ত ধরার জন্য খুরি নিয়ে হাড়িকাঠের নিচে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রক্ত নিয়ে সকলের কপালে ফোঁটা টেনে দিচ্ছে। মা ঈশ্বরী করুণাময়ী! চিমটি কাটলে তোর মা রঙ মাটি উঠে আসবে, খড় বেরিয়ে পড়বে, তুই মা দেখালি বটে খেলা! সেই পাগল মানুষ এখন এইসব মানুষের উন্মত্ত অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছেন। সোনা ভিড়ের ভিতর জ্যাঠামশাইকে দেখতে পাচ্ছে না। যারা রক্ত কাড়াকাড়ি করে নিয়ে যাচ্ছে কচুপাতায় অথবা কলাপাতায়, যারা খুরি আনতে ভুলে গেছে তাদের থেকে সোনা সরে দাঁড়াল। ওরা কেমন পাগলের মতো হাতে পায়ে রক্ত লাগিয়ে ছুটোছুটি করছে। সে ভয়ে সিঁড়ির মুখে যেখানে পথটা অন্দরের দিকে চলে গেছে, তার একপাশে একটা থাম, সে থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। এইসব দেখতে দেখতে ওর যে খুব খিদে পেয়েছে ভুলে গেল। নিজেকে বড় একা এবং অসহায় লাগছে। মার কথা মনে হল। কতদিন সে মার পাশে শুচ্ছে না। মার পাশে না শুলে তার ঘুম আসে না। মায়ের শরীরে একটা পা তুলে না দিলে, মাকে পাশবালিশের মতো ব্যবহার না করলে সোনার ঘুম আসে না। ভিতরে ভিতরে সে এখন মায়ের জন্য কষ্ট পাচ্ছে।

    মার জন্য না ক্ষুধার জন্য বোঝা যাচ্ছে না—কারণ সোনা এখন থামের আড়ালে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সকাল থেকে সে প্রায় কিছুই খায়নি, চোখ-মুখ কি শুকনো দেখাচ্ছে, সে চারপাশে এত লোক দেখছে, অথচ কিছু বলতে পারছে না। সে আজ মেজ জ্যাঠামশাইকে কিছু বলতে ভয় পাচ্ছে। বড়দা মেজদা ওকে আমল দিচ্ছে না। মোষ বলি হলেই ওরা আবার বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেছে। এখন রান্নাবাড়িতে দশটা পাঁঠার মাংস রান্না হচ্ছে। মহাপ্রসাদ হলেই পাত পড়বে বড় উঠোনে। সকলে খেতে বসবে, তখন সোনাও দুটো খাবে—সে থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে চুপি চুপি রান্নাবাড়ি থেকে কখন খাবারের ডাক আসে সেই আশায় দাঁড়িয়ে আছে। এবং তখন কেন জানি মায়ের কথা মনে হলেই চোখ ফেটে জল আসছে সোনার।

    সিঁড়িতে তখন দ্রুত নেমে আসছে মনে হল কেউ। সে পিছনে ফিরে দেখল অমলা কমলা। ওরা বলল, সোনা, তুই ফোঁটা দিসনি?

    সোনা বলল, না।

    —আয়, ফোঁটা দিবি। বলে অমলা কোথা থেকে একটা খুরি নিয়ে এল। জমানো রক্ত। সেই রক্ত থেকে সোনার কপালে ফোঁটা দিয়ে দিল। বলল, এদিনে ফোঁটা না দিলে তুই বড় হবি কী করে? তোর পুণ্য হবে কী করে?

    কিন্তু সোনা কিছু জবাব দিচ্ছে না। সে অন্ধকার মতো একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সে কেবল ওদের দেখছে। সেই এক জরির কাজ করা ফ্রক গায়ে। হাতে ছোট্ট দামি ঘড়ি এবং বালা, সরু আঙুলে হীরের আংটি! ববকাট চুলে সাদা রিবন বাঁধা। গায়ে পদ্মফুলের মতো সুবাস।

    সেই আবছা অস্পষ্ট জায়গাটিতেও অমলা ধরতে পারল, সোনা কাঁদছিল। সে বলল, কি রে, তোকে আমরা সেই সকাল থেকে খুঁজছি। তুই ছিলি কোথায়?

    সোনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

    কমলা বলল, চল, ছোট কাকিমা তোকে ডাকছে।

    সোনা বলল, মোষ বলি আমি কোনকালে দেখিনি।

    অমলা বলল, সোনা তুই দাঁড়িয়ে কাঁদছিলি?

    —যা, আমি কাঁদব কেন।

    —তুই ঠিক কেঁদেছিস! আমি সব দেখেছি।

    সোনা ধরা পড়ে গেছে ভাবতেই বলল, ফোঁটা দিলে আমার কোন পাপ থাকবে না?

    —না। বলেই অমলা সোনার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, এদিকে আয়। সে সোনাকে একটু ভিতরের দিকে নিয়ে গেল। বলল, কি রে, কাউকে বলিস নি ত?

    —না।

    —তুই আমাকে পিসি বলতে পারিস না! আমি তো তোর চেয়ে কত বড়।

    —পিসি ডাকতে আমার লজ্জা লাগে অমলা।

    —তবু তুই আমাকে পিসি ডাকবি। মান্য করবি, কেমন!

    সোনা জবাব দিল না।

    —আজ আসবি সন্ধ্যার পর ছাদে।

    —ধ্যেৎ। বলেই সে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

    আর সেই নাটমন্দিরে এখন কাটা মোষ পড়ে। মণ্ডপে দশটা পাঁঠার মাথা, মাঝখানে মোষের মাথা। মাথায় প্রদীপ, প্রদীপ জ্বলতে জ্বলতে কোনটা নিভে গেছে। সবক’টা মাথার চোখ এখন দেবীর দিকে তাকিয়ে আছে। এখন ভিড়টা নেই। একটু রক্ত হাড়িকাঠে পড়ে নেই। ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে। সোনা সোজা দীঘির পাড়ে চলে এল। রোদ উঠেছে খুব। শরতের বৃষ্টি সকালে হয়ে গেছে। সবকিছু তাজা, ঘাস ফুল পাখি সব। তবু কেন জানি সোনার কিছু ভালো লাগছে না। সে তখন দেখল পাগল জ্যাঠামশাই ময়ূরের ঘরটাতে বসে রয়েছেন। উত্তরের আকাশে একটা কালো মেঘ। সেই মেঘ দেখে ময়ূর পেখম মেলেছে। পাগল জ্যাঠমশাই সেই ময়ূরের পেখম দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে গেছেন।

    সোনা ডাকল, জ্যাঠামশায়!

    মণীন্দ্রনাথ যেন ধরা পড়ে গেছেন এমনভাবে তাকালেন। কেমন অপরাধী মুখ। সোনা সেসব লক্ষ করল না। শুধু চুপি চুপি বলল, চলেন, বড়ি যাই গিয়া। ওর যে ভালো লাগছে না আর, এমন কথা বলল না।

    কিন্তু মণীন্দ্রনাথ যেন ধরতে পেরেছেন সোনা কিছু খায়নি এখনও পর্যন্ত। ওর ক্ষুধায় চোখ মুখ কোথায় ঢুকে গেছে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন তিনি। এবং সোনাকে নিয়ে সোজা রন্নাবাড়িতে ঢুকে কোনওদিকে আর তাকালেন না। দুটো কলাপাতা নিজেই নিয়ে এলেন। মাটির গ্লাসে জল রাখলেন। তারপর বারান্দা পার হয়ে ঠাকুরকে হাত তুলে ইশারা করলেন।

    নকুল বুঝতে পারছে, এই পাগল মানুষ তাঁর নাবালক ভাইপোটিকে খেতে দিতে বলছেন। মহাপ্রসাদ এখনও নামেনি। বড় উঠোনে লম্বা পাত পড়ছে। সেখানে সে উঠে যেতে বলতে পারত। কিন্তু তিনি যখন এসেছেন তখন কার সাধ্য না দেয়। নকুল নিজেই ওকে ভাত বেড়ে দিল। পাগল মানুষ নিবিষ্ট মনে ভাত মেখে সোনাকে বড় বড় গ্রাসে খাওয়াতে লাগলেন। জল খেতে দিচ্ছেন। নুন মেখে দিচ্ছেন। যেমনটি করলে সোনার খেতে ভালো লাগবে তেমনটি করছেন।

    অথচ সোনা খেতে পারল না। কারণ আসার সময় সে মণ্ডপের সামনে কাটা মোষটাকে পড়ে থাকতে দেখেছে। এমন কুৎসিত দৃশ্য আর এই পাঁঠার মাংস—ওর কেমন ভিতর থেকে ওক উঠে আসছিল।

    জ্যাঠামশাই খেয়ে এলে সে ওঁর সঙ্গে ঘুমাতে পারল না। সে দেখল পাগল জ্যাঠামসাই চুপচাপ একটা ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন বারান্দায়। আশ্বিনের কুকুরটার জন্য তিনি আলাদা খাবার এনেছেন ঠোঙা করে। পেটভরে খেয়ে কুকুরটা পায়ের কাছে ঘুমাচ্ছে। তিনি ঘুমাননি। মেজ জ্যাঠামশাই সারাদিন পর দুটো খেয়ে শুতে-না-শুতেই নাক ডাকাচ্ছেন। সে বুঝল এ-ই সময় বের হয়ে যাওয়ার। সে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে এখন পিলখানার দিকে চলে যাবে। এ-ই সময়। হাতিটার কাছে গিয়ে একটু বসা যাবে। সেখানে গেলে বুঝি এই যে ভয়, এক ভয়, কাটা মোষ পড়ে আছে, কাটা মোষের ভয়ে সে যেন হাতিটার কাছে চলে যাচ্ছে অথবা এখন দেখে মনে হবে সে তার পাগল জ্যাঠামশাইকে হাতি দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। হাতি দেখিয়ে, ঘাস ফুল পাখি দেখিয়ে সে তার পাগল জ্যাঠামশাইকে নিরাময় করে তুলবে।

    বাগানের ভিতর দিয়ে ওরা হাঁটতে থাকল। সামনে শীতলক্ষ্যা নদী। নদীর পাড়ে ওরা হাঁটবে। মাথার উপর নির্মল আকাশ। দু’পাশে পাম গাছ আর নদীর পাড়ে পাড়ে কত মানুষ। ওরা প্রায় পালিয়ে হাতি দেখতে চলে যাচ্ছে। কেউ দেখছে না এমনভাবে চুপি চুপি সোনা জ্যাঠামশাইর হাত ধরে চলে যাচ্ছে। কেবল কাছারিবাড়ি পার হলে যাত্রা পার্টির অধিকারী মানুষটি দেখে ফেলল। সে রামায়ণ পাঠ করছিল, চশমার কাচ ঘসে বাগানের ভিতর দিয়ে কারা যাচ্ছে লক্ষ করতেই বুঝল সেই পাগল মানুষ তাঁর নাবালক ভাইপোর হাত ধরে কোথায় যাচ্ছেন। এই মানুষকে দেখলেই কেন জানি রাজা হরিশচন্দ্রের কথা মনে হয় অধিকারী মানুষটির। গাছপালার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আবছা আবছা মুখ, হাত পা এবং কুকুরের ছায়া চোখে পড়ছে। সে যেন সারা জীবন পালাগানে এমন একজন উদাস মানুষের ভাব ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে—যিনি কেবল সামনের দিকে হাঁটেন, কোনওদিকে তাকান না। সে পারেনি। মানুষটাকে দেখেই ওর কেন জানি বড় একটা নিঃশ্বাস উঠে এল।

    সোনা কিন্তু জ্যাঠামশাইর সঙ্গে বের হতে পেরেই যাবতীয় দুঃখ ভুলে গেল। সে আগের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। সে বার বার জ্যাঠামশাইকে সাবধান করে দিচ্ছে, যেন হাতির সঙ্গে জ্যাঠামশাই কোন দুষ্টুমি না করে। করলেই সে তার বাবাকে না হয় মেজ জ্যাঠামশাইকে বলে দেবে এমন ভয় দেখাতে লাগল।

    ওরা কালীবাড়ি যাবার পথে এসে পড়ল। বাজারের ভিতর দিয়ে কালীবাড়ি যাবার একটা রাস্তা আছে। কিন্তু পিলখানায় যেতে হলে অতদূরে যেতে হবে না। ডানদিকের উমেশবাবুর মঠ, মঠের উত্তরে সুপুরির বাগিচা। বাগিচা পার হলেই একটা আমবাগান। বাগানের ভিতর হাতিটা বাঁধা থাকে। কিন্তু সে এখন কোথায় জায়গাটা আবিষ্কার করতে পারছে না। সে রাস্তার উপর দাঁড়িয়েই ঘণ্টার শব্দ পেল। এবং মনে হল বাগানের ভিতর ঢুকে গেলেই সে হাতিটাকে আবিষ্কার করে ফেলবে। কিন্তু কোনদিকে যে হাতিটা আছে! তারপরই মনে হল সকালে পিলখানায় থাকে, দুপুর হলে জসীম হাতিটাকে নদীতে স্নান করাতে নিয়ে যায়, তারপর বনের ভিতর কিছুক্ষণ বেঁধে রাখে। খাবার দেওয়া হয়। কলাগাছ আর যত মাদারের ডাল। দশমীর দিনে হাতি থাকবে না। সকাল হলেই জসীম বাবুদের বাড়ি বাড়ি হাতি নিয়ে যাবে। চালচিড়া মুড়ি মোয়া সন্দেশ হাতির জন্য চেয়ে নেবে। খুব সকাল সকাল সে হাতিটার কপালে চন্দনের তিলক পরাবে। শোলার রঙ-বেরঙের লাল নীল অথবা জরির চাঁদমালা বেঁধে দেবে মাথায়। কমলা বলেছে ওরা কাল হাতির পিঠে চড়ে দশহরা দেখতে যাবে। অমলা বলছে, সোনা, তুই আমাদের সঙ্গে যাবি। সোনা কিছু বলেনি। সে এখন হাতিটা কোনদিকে, কোন্ বনের ভিতর এবং মাঠের পাশ দিয়ে যাবে, না সোজা দৌড়াবে বুঝতে পারল না। কেবল কুকুরটা সোজা বনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে এবং ঘেউঘেউ করছে। সে বুঝল হাতিটাকে দেখে ফেলেছে তার আশ্বিনের কুকুর।

    তাড়াতাড়ি ওরা কুকুরটাকে অনুসরণ করে ভিতরে ঢুকে গেল। বনের ভিতর ঢুকে সোনা দেখল হাতিটা দুলছে, সামনে পিছনে দুলছে। এই বন গাছপালা পাখি নিয়ে তার হাতি বেশ আছে। হাতির পায়ে শেকল। সে বেশিদূর এগোতে পিছোতে পারছে না। সোনা, জ্যাঠামশাইর পাশে—যেন ওরা দুই মুগ্ধ বালক হাতিটাকে নিবিষ্ট মনে দেখছে। তখনই হাতিটা হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। এবং সোনাকে, পাগল জ্যাঠামশাইকে চিনতে পেরে সেলাম দিল!

    আর আশ্বিনের কুকুরটাও হিজ মাস্টার্স ভয়েসের মতো ওদের পাশে বসে ঘেউঘেউ করে উঠল। যেন বলতে চাইল, আমাকে চিনতে পারছ না, আমি আশ্বিনের কুকুর। সোনাদের বাড়িতে আমি থাকি। তোমার সঙ্গে একবার নদী পার হয়েছিলাম, মনে নেই!

    সোনা এবার হাতি না দেখে জ্যাঠামশাইর মুখ দেখল। শিশুর মতো হাতির দিকে তাকিয়ে হাসছেন তিনি। এই হাসি দেখে সহসা কেন জানি মনে হল, জ্যাঠামশাই ভালো হয়ে যাবেন। চোখে মুখে সরল অনাবিল হাসি। সে মায়ের কথা, অমলা কমলার কথা অথবা ফতিমার কথা ভুলে আনন্দে জ্যাঠামশাইর পিঠে দু’হাতে গলা জড়িয়ে দুলতে থাকল। সোনা বলল, জ্যাঠামশয় বলেন ত, এক। পাগল মানুষ বললেন, এক। বলেন, দুই। তিনি বললেন, দুই। হাতিটা তখন শুঁড় দোলাচ্ছে। গলায় তার ঘণ্টা বাজছিল। জ্যাঠামশাই এক-দুই-তিন করে ক্রমান্বয়ে ঠিক ঠিক গুনে যাচ্ছেন। সোনা পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথের সঙ্গে এক দুই তিন অথবা একে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ, তিনে নেত্র—যেন দুই নাবালক বনের ভিতর জীবনের নামতা পাঠ নূতন করে ফের আরম্ভ করেছে—সোনা সুর করে পড়ে যাচ্ছে, জ্যাঠামশাই ঠিক ঠিক অবিকল উচ্চারণ করে নামতা পড়ছেন।

    সোনা হঠাৎ এই নির্জন বনের ভিতর আনন্দে দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠল, বাবা, মা, মেজদা, বড়দা, ছোটকাকা, জেঠিমা, আমার জ্যাঠামশয় ভাল হইয়া গ্যাছে। এই বলতে বলতে সে বনের ভিতর ছুটে ছুটে ঘুরে বেড়াতে থাকল। কুকুরটাও ছুটে বেড়াচ্ছে। হাতির গলায় ঘণ্টা বাজছে। পাগল মানুষ চুপচাপ বসে কেবল গুনে যাচ্ছেন—এক দুই তিন, চার, পাঁচ, ছয় সাত, আট, নয়।

  • পঁচিশ

    পঁচিশ

    সেই যে মালতী শুয়ে থাকল আর উঠল না। দিন তিনেক বাদে কিছুটা যেন হুঁশ ফিরেছে। চোখ মেলে তাকিয়েছে। কি যেন বলতে গিয়ে ঠোঁট কেঁপে উঠছে। বলতে পারছে না। আঁচল দিয়ে মালতী নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে। যত জোটন মুখ থেকে আঁচল টেনে কথা বলাতে চেয়েছে, তত মালতী মুখের আঁচল তুলে দিয়ে কেমন শক্ত হয়ে পড়ে থাকছে।

    মালতীর হুঁশ ফিরলে এই যে জোটন—যার যৌবন নেই শরীরে, যে পীরের দরগায় এসে গেছে এবং যার স্বভাব ছিল পান-সুপারি অথবা সামান্য খুদকুড়ার জন্য মালতীর বাড়ি ধান ভেনে দেওয়া, চিঁড়ে কুটে দেওয়া, সেই জোটনকে দেখে প্রথম মালতীর যেন হাতে আকাশ পাবার মতো অবস্থা। তার উপর কি মনে হতেই মালতী সব ভবিতব্য ভেবে শক্ত হয়ে গেল। এবং এখন মনে হচ্ছে জোটন ওর বড় শত্রু। বনবাদাড়ে সে কোথায় যে পড়ে ছিল মনে করতে পারছে না। কীভাবে এখানে এল তাও মনে করতে পারছে না, কেবল মনে পড়ছে সে হোগলার বনে ঢুকে লুকিয়ে ছিল। তারপর তিন জীব, মনুষ্যকুলের যেন তারা কেউ নয়, তাদের দেখে সে সংজ্ঞা হারিয়েছিল। তারপর এখানে এবং এটা জোটনের কাজ। সে আস্তানাসাবের দরগায় এখন। তাকে ওরা বনবাদাড়ে ফেলে চলে গেছে। এই জোটন ওর এত বড় শত্রুতা কেন করল! বনবাদাড়ে পড়ে থেকে এক সময় মরে গেলে অন্তত এ পোড়ামুখ আর দেখাতে হতো না কাউকে। সে জোটনের কথায় সেজন্য কোন উত্তর দিচ্ছে না।

    ফকিরসাব দুধ এনে গাছতলায় বসে আছেন। এই দুধটুকু এখন গরম করে খেতে হবে। মালতীকে স্নান করতে হবে। মালতী হিন্দু বিধবা যুবতী। ভিজা কাপড়ে দুধটুকু গরম করে খেতে হবে। এই মাচান এবং ছই সব কিছুতেই এক অপবিত্র ভাব, মালতী জেগে গেলেই টের পাবে। জোটন ডাকল, ওঠ মালতী, তারপর সে বলতে চাইল, যেন উঠে স্নান করে আসে মালতী। কাঠ, নতুন সরা, দুধ সব ঠিক আছে, যেন গরম করে মালতী দুধটুকু খেয়ে নেয়। দুধটুকু গরম করে দিতে জোটন সাহস পাচ্ছিল না। কারণ হিন্দু বিধবার আচার-নিয়ম অনেক। জোটন সব ঠিক করে রেখেছে। কাঠ, উনুন, নতুন পাতিল সব। যেন বলার ইচ্ছা, এই যে মেয়ে তুমি এতকাল যৌবন বাইন্দা রাখছ, স্বপ্ন দ্যাখছ, সোয়ামির মুখ দেইখা মামদোবাজি খেলা খেলছ—আর এখন কিনা কিছু জান না। অর্থাৎ যেন বলার ইচ্ছা—কি আছে আর, যা হইবার হইছে। এডা ত আর হাড়ি-পাতিল না। এডা তো সোনার অঙ্গ। ছুঁইয়া দিলে জাত যায় না। কার জাত! তোমার না মানুষের? জোটন নানাভাবে মালতীকে বুঝ-প্রবোধ দিচ্ছিল।—ওঠ মালতী, উইঠা খা। দুধ গরম কইরা খা।

    মালতী উঠল না। শক্ত হয়ে পড়ে থাকল।

    জোটন ফকিরসাবকে বলল, কি করন যায়?

    —কি করতে কন?

    —নরেন দাসরে একটা খবর দিতে হয়।

    —তবে দ্যান।

    —আমি দিমু কি কইরা? আমি একলা যাইতে পারি! জোটন ক্ষোভের গলায় বলল।

    —এই যে কইলেন, পানিতে নাও ভাসাইলে আপনে লগি বাইবেন। দুগ্‌গা ঠাকুর দ্যাখতে যাইবেন কইলেন।

    —তামাশা রাখেন। কি করবেন কন!

    —আমি কি কমু?

    —যা মনে লয় করেন। বলে জোটন বিরক্ত মুখে ছইয়ের নিচে ঢুকে বলল, ওঠ মালতী। লক্ষ্মী, আমার সোনা। দুধ গরম কইরা খা। তারপরে ল তরে দিয়া আসি।

    মালতী এবার বিস্ময়ের চোখে তাকাল।

    —তরে দিয়া আমু।

    মালতী ধড়ফড় করে উঠে বসল।

    —আমি আর ফকিরসাব তর লগে যামু।

    মালতী দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে থাকল। এ-পোড়ামুখ নিয়ে সে যাবে কী করে! সে ভিতরে ভিতরে হাহাকারে ডুবে যাচ্ছিল। না, না, আমি কোথায় যাব! কার কাছে যাব! আমি যেদিকে দু’চোখ যায় চলে যাব জোটন। আমি জলে ডুবে মরে যাব।

    —কি হইছে তর? কিছু হয় নাই।

    এই প্রথম কথা বলল মালতী।—আমি কই যামু?

    ফকিরসাব এবার গাছতলা থেকে এলেন।—যাইবেন না তো খাইবেন কি? আমি ফকির মানুষ গাছপাতা খাইয়া বাঁচি, আপনেরে কোন্‌খান থাইকা দুধ ঘি আইনা খাওয়ামু?

    মালতী এই মানুষের মুখ দেখে ভয়ে ফের বিবর্ণ হয়ে গেল। পাকা দাড়ি থেকে এখন জল টপটপ করে পড়ছে। ভিজা গামছা পরে বসে আছেন। হাতে গলায় বড় বড় পাথরের মালা। রসুন গোটার তেলে কাজল, সেই কাজলে সুর্মা টেনেছেন ফকিরসাব। জোটন ছইয়ের ভিতর বসে হাসছিল। ফকিরসাব তেড়ে আসার মতো মাচানের কাছে উঠে এলেন। বললেন, ওঠেন কইতাছি। ওঠেন। সান করেন, দুধ গরম কইরা খান। বুড়া মানুষ আমি, পানি ভাইঙা সাঁতার কাইটা দুধ লইয়া আইছি। তাইন এখন খাইবেন না?

    মালতী নড়ল না।

    ফকিরসাব এবার চোখ গরম করে চোখ লাল করে ভয় দেখালেন মালতীকে।—খাইবেন না আপনে! আপনের চোদ্দ গুষ্ঠি খাইব। বলে, ফকিরসাব আস্ত একটা কাঠ এনে বললেন, ওঠেন। আমি কিন্তু পাগল মানুষ। এহনে সান কইরা দুধ গরম কইরা না খাইলে আগুন লাগাইয়া দিমু।

    জোটন ফকিরসাবের কথায় সায় দিল।—আ ল ওঠ তুই। পাগল ক্ষেইপা গেলে রক্ষা নাই। তুই না খাইলে সব ফিরা পাবি। পাইলে আমি তরে খাইতে কইতাম না। ওঠ।

    ফকিরসাব বললেন, কার অঙ্গ! অঙ্গ আপনের, সোনার অঙ্গে কালি লাগলে ধুইয়া ফেলান। সোনার অঙ্গে কালি কতক্ষণ লাইগা থাকে! ঠাইরেন, গাঙ্গের পানিতে কত কিছু ভাইসা যায়, কিন্তু ঠাইরেন, মা জননীর কি কিছু হয়? যেন ফকিরসাবের বলার ইচ্ছা, মাগো জননী, নদীতে এঁটো থাকে না, বরফে এঁটো থাকে না। মাগো জননী, আপনেরা নিজের জলে নিজে ধুয়ে যান।

    তবু মালতী উঠল না। ছইয়ের নিচে নেমে এল না! মাথা গুঁজে এক কোনায় বসে থাকল। জোটন ফকিরসাবকে বলল, কি করবেন। চোখ মুখ কই গ্যাছে গিয়া। ক’দিন না খাইয়া আছে কে জানে। কিছু ত কয় না।

    ফকিরসাব বললেন, যাই একবার। পানি ভাইঙ্গা যাই। বড় মিঞার কোষা নাওটা আনতে পারি কি না দ্যাখি! তারপর চলেন আল্লার নামে তরী ভাসাই।

    এক ক্রোশ পথ সাঁতার কাটলে ডাঙায় হাঁটলে সেই দুই-চার ঘর বসতি। পথে যেতে যেতে একবার বমি করলেন ফকিরসাব। এই বর্ষা এলে বড় অনটন ফকিরসাবের। দুই ছাগল, তার দুধ আর শাপলা শালুক। এখন জল সাঁতরে মুশকিলাসান নিয়ে যেতে পারেন না, যা কিছু পান ইন্তেকালের সময়। শাপলা শালুক খেয়ে পেট কেমন ভার হয়ে আছে।

    কোষা নৌকা নিয়ে আসতে আসতে বেলা হয়ে গেল। ফরিকসাব কিছু খেলেন না। জোটন এক বদনা পানি ঢক ঢক করে খেল। দুধটুকু সঙ্গে নিল। সরা এবং কাঠ সব তুলে নিল পাটাতনে। একটা মাটির উনুন পর্যন্ত। সব ঠিক করে ফকিরসাব বললেন, ঠাইরেন, মা জননী, ওঠেন আইসা। ছাগল দুটোকে এনে মাচানের নিচে বেঁধে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

    এবার কিন্তু জোটন মালতীকে তুলতে গিয়ে দেখল, উঠতে পারছে না মালতী। কোমরে ভীষণ ব্যথা। রসুন গোটার তেল এক শিশি নিল সঙ্গে। মালতীকে বলে দিল এটা যেন বাড়িতে মালিশ করে। জোটন মালতীকে শক্ত করে ধরল। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে। কি চেহারা হয়ে গেছে! চোখমুখে কালি পড়ে গেছে। সোনার অঙ্গে কে আগুন ধরিয়ে চলে গেল! জোটন ভয়ে এখন মালতীর দিকে তাকাতে পারছে না। যেন আত্মহত্যার কথা ভেবে এই মেয়ে এখন বসে আছে। সুযোগ সুবিধা পেলেই আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে।

    ভিতরে ভিতরে কষ্ট ফকিরসাবের। ফকির মানুষ বলেই অসুখ বিসুখ থাকতে নেই। জোটন এসে একদিনও মানুষটাকে অসুস্থ দেখেনি। এই সকালে পেটে এমন গণ্ডগোল—কিন্তু কারে বলা যায়? ভিতরে ভিতরে অস্বস্তি হচ্ছে, কি যে এই পেটের ভিতর হচ্ছে জ্বালা মতো এক ভাব, তিনি যেমন অন্য সময়ে লতাপাতার রস খান, তেমনি বনের ভিতর ঢুকে দু’হাতে পাতা কচলে মুখের ভিতর কিছু রস ফেলে দিলেন। এই রস খেলেই শরীরের সব যন্ত্রণা মরে আসবে। ধীরে ধীরে নিরাময় হবেন তিনি।

    ফকিরসাব জোটনকে বললেন, আপনে দুধডা না হয় অন্য কিছু মুখে দিয়া লইতে পারতেন। আমার খিদা নাই।

    জোটন বলল, কি কইরা খাই কন। মালতী খাইল না। আমি খাই কি কইরা!

    ফকিরসাব এবার খোলামেলা জায়গায় মালতীকে ভালো করে দেখলেন। সত্যি ওকে ভালো দেখাচ্ছে না। ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে দিলেন, যেন জোটন ওকে ধরে বসে থাকে। লক্ষণ ভালো না! কী যে হবে! কী যে করা! এখন এই যুবতীর মাথা ঠিক নেই। পাগল পাগল চেহারা। যুবতী নারী সতী হলে যা হয়। নদীর পাড়ে ফকিরসাব বালক বয়সে এক নারীর সতী হবার গল্প শুনেছিলেন। গল্পের সেই চোখ-মুখের চেহারা এই মালতীর চোখে মুখে। সারাক্ষণ বসে বসে কেবল আত্মহননের কথা ভাবছে।

    জোটন মালতীকে কোষা নৌকার মাঝখানে বসাল। ফকিরসাব মুশকিলাসানের লম্ফ নিলেন সঙ্গে। যখন বের হয়েছেন, দু’চারদিন কি দু’চার হপ্তাও হতে পারে। গাঁয়ে গাঁয়ে লম্ফ নিয়ে ঘোরা যাবে। কোষা নৌকা আনতে গিয়ে বলেছেন ফকিরসাব, যেমন বলে থাকেন, যামু একবার বিবিরে লইয়া, নদী-নালায় কয় রাইত ভাইসা থাকমু, তেমন এবারেও বললেন, লম্ফ নিয়া যাইতেছি পেটে টান পড়ছে বিবির। আর কি য্যান কয়, বিবি কয় বাপের বাড়ি দুগ্‌গা ঠাকুর দ্যাখতে যাইব। তা একবার দ্যাখাইয়া আনি। ফকিরসাব ইচ্ছা করেই মালতীর কোনও খবর কাউকে বলেননি। এমন খবর পেলে লোকজন ছুটে আসত দরগায়। তবে এই দরগাতেই থানা পুলিস আরম্ভ হয়ে যাবে। অথবা নাও হতে পারে। কারণ এখন জাত মান কুল নিয়ে কথা। মালতীর মুখে চোখে সেই জাত মান কুলের কলঙ্ক লেপ্টে আছে অথবা সে এক কলঙ্কিনী যেন—কী যে হয়, কী যে হয়, কী যেন তার কেবল জলে ভেসে যায়। রঞ্জিত, ছোট ঠাকুর, নরেন দাস এবং গ্রামের সকলে ওর চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। এই মেয়ে বনবাসে যাবে। এই মেয়ের জাত মান নেই। কলঙ্কিনী। এমন সব কথা মনে আসছিল মালতীর।

    সহসা ফকিরসাব দেখলেন পাটাতনে মালতী অঝোরে কাঁদছে। এটা ভালো। কেঁদেকেটে আকুল হলে মনের সব গ্লানি মরে আসবে। আবার ধরণী সুজলা সুফলা মনে হবে।

    মালতী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। যেন মনে মনে রঞ্জিতকে উদ্দেশ করে বলা, ঠাকুর, আমার সব হরণ কইরা নিছে। তোমারে কি দিমু ঠাকুর।

    সারারাত শকুনের মতো তাকে নিয়ে কারা যেন কাড়াকাড়ি করেছিল। বোধহয় আকাঙ্ক্ষা সব জলের মতো মরে যাচ্ছিল। কেবল পিচ্ছিল রক্তাক্ত শরীরে কারা যেন সারারাত নৃত্য করে গেছে ভূতের মতো। তিন অমানুষ নরকে ডুব দেবার লোভে পশুর মতো হামলে পড়েছিল—আর সেই অসংখ্য কালো সরীসৃপ সারারাত ওর শরীরের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছিল। যার শেষ নেই, শেষ হবে না। আঁচড়ে কামড়ে, খাবলে খুবলে কোথা থেকে কোথায় যে টানতে টানতে নিয়ে গেল, মালতী এখন কিছুতেই তা মনে করতে পারছে না। কেবল মনে পড়ছে তারা সেই কবরভূমির অন্ধকারে মাংসের লোভে—কোনও শেয়াল যেমন মৃত মানুষের গন্ধে কবরে ঢুকে যায়—ওরা তেমনি পারলে ওর শরীরের ভিতর সদলবলে প্রবেশ করতে চেয়েছিল। মালতী এখন কষ্ট পাচ্ছে। হাত দিতে পারছে না। বসতে পারছে না মালতী। ফুলে ফেঁপে আছে. আর বেহুঁশ শরীরের উপর সেই সব দৃশ্য ভাবতেই গলা থেকে ওক উঠে এল।

    ফকিরসাব দেখলেন মালতী ওক দিচ্ছে।

    জোটন বলল, না খাইলে বমি হইব না, কন!

    মালতী কেবল ওক দিচ্ছে। এখন আর অঝোরে কাঁদছে না। ধানখেতের ভিতর ফকিরসাব লগি মারছেন। লগি মারতে মারতে মাঠের ভিতর নেমে এলেন। সূর্য ক্রমে মাথার উপর উঠে আসছে। গায়ের জোব্বা খুলে নিয়েছেন। কেবল এক নেংটি পরনে ফকিরসাবের। গলায় এবং হাতের কব্জিতে, কনুইতে সেইসব পাথরের মালা তাবিজের শব্দ। এবং মনে হয় যেন এক প্রাচীন পুরুষ, তপোবনে মহর্ষি কণ্বদেব, শকুন্তলাকে নিয়ে রাজার কাছে যাচ্ছেন। যেকোনও ভাবে গ্রামে তাকে পৌঁছে দিতে হবে। ভিতরে ভিতরে হাঁসফাঁস করছেন, কিন্তু কাউকে কিছুতেই বুঝতে দিচ্ছেন না। বেহুশের মতো লগি মারছেন কেবল।

    জোটন বলল, মালতী ইট্টু দুধ খা। মালতী, না খাইলে ত তুই মইরা যাইবি

    মালতী কিছু বলল না। ওক দিতে দিতে পাটাতনে শুয়ে পড়ল।

    এত দূরের পথ লগি মেরে এ বয়সে যে আর পার হওয়া যায় না, মাঠে নেমে যেন তিনি তা ধরতে পারছেন। সোজা পথে পাড়ি দিলেও রাত অনেক হয়ে যাবে। জল নেমে যাচ্ছে। ভাদ্র মাসের শেষ থেকেই জল নামতে শুরু করে। সোজা পথে যাওয়া যাবে না। মাঝে মধ্যে ডাঙা ভেসে আছে। মেঘনাতে পড়ে বাদাম দিলে পথ ঘুরতে হবে বেশি। তিনি বরং সনকান্দার পাশ দিয়ে নৌকা বাইবেন। গড়িপরদির মঠ পার হয়ে নদীতে পড়তে পারলে আর কষ্ট হবে না। জলে উজানি স্রোত মিলে যেতে পারে। তবু ভিতরে ভিতরে কষ্ট। জ্বালা। পাতার রসে পেটের জ্বালা মরছে না। কেমন গলা এবং বুক শুকিয়ে উঠছে।

    জোটন বুঝতে পারছিল মানুষটার কষ্ট হচ্ছে। সে তামুক সাজল। মানুষটা তামুক টানলে আবার গতরে শক্তি পাবে। সে ফকিরসাবকে তামাক খেতে দিয়ে নিজেই লগি বাইতে থাকল।

    জোটন বলল, মালতী ত দুধ খাইল না। আপনে খান। খাইলে বল পাইবেন। এত দূরের পথ না হইলে যাইবেন কি কইরা!

    —না গ বিবি, তা হয় না। বলে ঢক ঢক করে বর্ষার জল তুলে এক গলা খেয়ে ফেললেন।

    এই ফকিরসাব এবং জোটন মালতীর জন্য প্রাপণাত করে যাচ্ছে। দরগায় কোন্ অমানুষ ফেলে রেখে গেল মালতীকে, মালতী কিছুই বলছে না, কিছু বললে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন ভেসে উঠলে মালতী মাথা ঠিক রাখতে পারছে না। দরগায় এমন একটা কাণ্ড, ফকিরসাব মনে মনে নিজেকে অপরাধী ভাবলেন। তিনি তো রাতে কবরভূমিতে লম্ফ জ্বেলে ঘোরাফেরা করেন, দূরের মানুষেরা কবরভূমিতে সেই আলখাল্লা পরা মানুষের হাতে মুশকিলাসান দেখলে ভয়ে পালায়, আর কোথাকার কোন্ বেজন্মা মানুষ দরগা অপবিত্র করে রেখে গেছে। সব দায় যেন এখন ফকিরসাব আর জোটনের। মানুষ না মরলে, ইন্তেকাল না হলে ফকিরসাবের দাম বাড়ে না। দিনে দিনে তার অন্নাভাব বাড়ছে। দুধটুকু পাটাতনে রেখেছে জোটন। এত পীড়াপীড়িতেও দুধটুকু খাচ্ছে না মালতী। কি দামী আর মহার্ঘ বস্তু এই দুধটুকু। একটু দুধ উপচে পড়লে রাগে হাত-পা কাঁপছে ফকিরসাবের।

    প্রথম ফকিরসাব ঘাট চিনতে ভুল করলেন। অনেকদিন তিনি এ অঞ্চলে আসেননি। নবমীর চাঁদ ডুবে গেছে। নিঝুম মনে হচ্ছে। আঁধারে ধানখেতের ভিতর সেই এক কোড়াপাখির ডাক। দূর থেকে—প্রতাপ চন্দের দুর্গোৎসবের ডে-লাইট চোখে পড়ছিল। এখন নাও সোনালী বালির চরে। চর থেকে ফকিরসাব আলো লক্ষ করে এগোচ্ছেন। চোখ-মুখ ঘোলা। হাত পা শিথিল হয়ে আসছে। অন্ধকারে হড়হড় করে বমি উঠে এসেছে। সবার অলক্ষ্যে তিনি বমি করে মুখ ধুলেন। যেন জলে কুলকুচা করছেন এমন শব্দ অন্ধকারে। গাছের ফড়িং ধানের ফড়িং অন্ধকারে উড়ে এসে পড়ছে। প্রতাপ চন্দের ঘাট পার হয়ে এসে নরেন দাসের ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে ফকিরসাব বললেন, আপনেরা নামেন।

    মালতী সেই পাটাতনে শুয়েছিল আর ওঠেনি। কোথায় এই নৌকা ভেসে যাচ্ছে, কিসের উদ্দেশ্যে ফকিরসাব নৌকা বাইছেন, জোটন হাল ধরেছে, সে যেন বুঝতে পারছে না। ঘাটে এসে নৌকা ভিড়লেই ওর সংবিৎ ফিরে এল। আরে, এই ত সেই ঘাট! সে এখানে হাঁস ছেড়ে সকালবেলা বসে থাকত। মাথার উপর একটা কদম ফুলের গাছ। গাছে কি অজস্র ফুল ফুটে থাকে বর্ষায়। অথচ এই দু’তিনদিনে তার কাছে এরা সবাই যেন অপরিচিত, সে একটা নতুন দেশে এসে গেছে।

    এমন আঁধারে সহসা খবর দেওয়ার একটা বিড়ম্বনা আছে। আজ কতদিন মালতী নিখোঁজ কে জানে। সহসা নেমে নরেন দাসকে ডাকলে সে হাউমাউ করে চিৎকার চেঁচামেচি করতে পারে। মালতীকে দেখলে পাড়ার লোক জড়ো করে ফকিরসাবকেই বেঁধে রাখতে পারে। তুমি তারে পাইলা কোন্‌খানে? আরে মিঞা, মনে মনে তোমার এই খোয়াব আছিল। শেষে উপকার করতে এসে দায়ে অদায়ে ফেঁসে যাওয়া। সুতরাং কাজটা নির্বিঘ্নে করার জন্য গা মুছে ফেললেন ফকিরসাব। মুশকিলাসানের লম্ফ থেকে—যা তিনি অন্য সময় হলে করতেন অর্থাৎ মুখে চোখে তেল কালি মেখে বীভৎস করে ভোলা—এসময়ে তিনি সেই সাজে সাজতে চাইলেন। যেন তিনি এই গ্রামে মালতীকে নিয়ে আসেননি, মুশকিলাসানের লম্ফ নিয়ে এসেছেন। বাড়ি বাড়ি উঠে যাবার মতো আলখাল্লা গায়ে দিয়ে সারা মুখে কালি লেপ্টে দিতেই চোখ দুটো বড় বড় আর লাল দেখাতে থাকল। তিনি এখন যথার্থ আর এ দুনিয়ার মানুষ নন। মালা তাবিজের ভিতর, কালো শতচ্ছিন্ন আলখাল্লার ভিতর, এখন এক হারমাদ মানুষ। হাতের মশালে ইচ্ছা করলে যেন এই গাছপালা, পাখি সব ভস্ম করে দিতে পারেন। অথবা তিনি যেন সেই মানুষ দুরে দূরে হেঁটে যান, হাতে মশাল, কিসের উদ্দেশ্যে তিনি যেন ক্রমাগত হেঁটে যাচ্ছেন। আশমানকে আলো দিচ্ছেন, দু’লাফে ইচ্ছা করলে সমুদ্রে চলে যেতে পারেন। প্রায় এখন এক অলৌকিক মানুষের মতোই টলতে টলতে হাতে লম্ফ নিয়ে দাসের বাড়ির দিকে উঠে যেতে থাকলেন। এখন তাঁকে মনে হয় এক মানুষ, সেই যেন চাঁদবেনের পুত্রবধূ অথবা ঈশা খাঁর সোনাইবিবির মতো এক কিংবদন্তীর মানুষ! নিশুতি রাতে এমন কে গৃহস্থ আছে যার বুক এই মানুষের হাঁকে না কেঁপে ওঠে। তিনি তখন যথার্থই আর মানুষ থাকেন না। রসুলের মতো যেন আকাশ মাটি এবং মাঠের অন্ধকার ভেদ করে উঠে আসেন। কিন্তু ফকিরসাব ভিতরে ভিতরে শক্তি পাচ্ছেন না। চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন। তবু রাতের আঁধারে সকলকে ভয় দেখাবার নিমিত্ত (হাতে পায়ে শক্তি নেই, পেটে যন্ত্রণা হচ্ছে) তিনি কিছুই পরোয়া না করে প্রায় মাটি ফুঁড়ে ওঠার মতো হেঁকে উঠলেন—মুশকিলা সা…ন আসান করে। মনে হল তাঁর যত জোরে হেঁকে ওঠার কথা ছিল, তিনি যেন গলা থেকে তত জোরে হাঁক দিতে পারলেন না। আরও জোরে, এ তল্লাটের সব মানুষের বুক কাঁপিয়ে হাঁক দিতে হয়—আমি এক মানুষ, যার নিবাস আস্তানাসাবের দরগাতে, যার কাম কাজ ইন্তেকালের সময় মোমবাতি জ্বালানো আর গাছের মগডালে আলো জ্বালিয়ে অলৌকিক এক জীবনের ভিতর ঘুরে বেড়ানো। মা জননীরা, জন্ম-মৃত্যুর মতো এই বেঁচে থাকাও অলৌকিক এক ঘটনা আর ঈশ্বরের মতো সুখদুঃখের জীবনে মুশকিলাসান আসান করে মা জননীরা বলে তিনি প্রায় যৌবনকালের মতো বুক চিতিয়ে হাঁটতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। কিছুটা গিয়েই তিনি কেমন হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। লম্ফটা তিনি কিছুতেই লাঠির ডগা থেকে নামাচ্ছেন না। ওঁর হাঁটু দুর্বল হলে লাঠি আর লম্ফতে তিনি শক্তি খোঁজেন। তিনি হামাগুড়ি দিতে পারতেন, দিলে ভালো হতো—ওঁর বমিটা বুঝি তবে হড়হড় করে আবার উঠে আসত না। কিন্তু বমিটা হড়হড় করে উঠে এলেই বিবি তাঁর দেখে ফেলবে, ফকির মানুষের আবার ব্যামো কি—তিনি তাড়াতাড়ি আলোটা মাথার উপর তুলে নিয়ে নিচে যে অন্ধকার মিলে গেল সেই অন্ধকারে বমিটা সেরে ফের এগুতে থাকলেন। জল আর শাপলা উঠে আসছে পেট থেকে। আশ্বিনের টানে পচা জল নামছে নদীতে, সেই জলের গন্ধ পর্যন্ত উঠে এল ওকের সঙ্গে।

    নরেন দাস দরজা খুলে দেখতে পেল উঠোনের উপর ফকিরসাব। হাতে সেই মুশকিলাসান। উঁচু লম্বা মানুষ। মাথায় পাগড়ি। সাদা চুল, সাদা দাড়ি, মুখ কালো, চোখ লাল। আলোটা গনগন করে মুখের কাছে জ্বলছে। কেমন চোখ ঊর্ধ্বনেত্র। স্থির। বিড়বিড় করে মন্ত্র উচ্চারণের মতো গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য নানারকমের বয়াৎ। লাল নীল হলুদ রঙের পাথর গলাতে ঝুলছে। সেসব পাথর চক্‌চক্‌ করছে। শোভা, আবু দরজার বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। পিসি নিখোঁজ হবার পর থেকে রাতে কোনও শব্দ হলেই ওরা জেগে যায়। নরেন দাসের চোখে ঘুম নেই। কারা যেন বাড়িটার চারপাশে ফিসফিস করে কথা বলে বেড়াচ্ছে।

    নরেন দাস কাছে গেলে একটা কাঠিতে সামান্য কাজল তুলে টিপ দিল কপালে। দাস একটা পয়সা ফেলে দিল লম্ফের ভিতর। মাটির লম্ফ। ছোট ছোট মুখ লম্ফের। এক মুখে আলো, অন্য মুখে কাজল, এবং আর একটা মুখে পয়সা ফেলার ফোকর। নরেন দাস ফোঁটা নেবার জন্য আভারানীকে ডাকল, শোভা আবুকে ডাকল। ওরা ফোঁটা নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলে খপ করে অন্ধকারের ভিতরে হাতটা চেপে ধরলেন ফকিরসাব–দাস, আপনের বইনের খোঁজ আছে।

    —আমার বইনের খোঁজ!

    —আছে। মা লক্ষ্মীকে আমি দরগার মাটিতে পাইছি।

    —কি কন আপনে! অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে চিৎকার করে উঠতে চাইল দাস।

    —হ, পাইছি. মায় আমার বনদেবীর মত আর্তনাদ কইরা ছুটছিল। চিৎকার-বাঁচান বাঁচান। কেডা আছেন আমারে বাঁচান।

    —আপনে বাঁচাইলেন!

    —বাঁচাইলাম। বলেই আকাশ ফুঁড়ে দিতে চাইলেন যেন হাঁক,—পীর মানুষ দরবেশ মানুষ আমি, এই দ্যাখেন ফুস মন্তরে হাজির মা জননী, আমার সামনে হাজির। জননীরে কেউ অসতী করতে পারে নাই—ফকিরসাব মালতীর জন্যে মিথ্যে কথা বললেন। তারপরই সঙ্গে সঙ্গে ওক উঠে এল। লম্ফ উপরে তুলে দিলেন। নিচে ছায়া ছায়া অন্ধকার। নরেন দাস একটু দূরে দাঁড়িয়ে যেন তামাশা দেখছে। সামনে মালতী নেই। কেউ নেই। সাধু সন্ত পীরের সামনে যেন দানের প্রতীক্ষায় দাস দাঁড়িয়ে আছে এমন একটা ভাব মুখে। পীর সাহেব মুখটা আলখাল্লার ভিতর লুকিয়ে ওক দিয়ে কিসব বার করছেন, টক দুর্গন্ধে সামনে যাওয়া যাচ্ছে না।

    এসব দেখে নরেন দাস কেমন হাবা গোবা মানুষ হয়ে গেল। ফকিরসাবের অনেক হিম্মতের গল্প সে শুনেছে। এবার সে এই হিম্মত দেখে বুঝি আশ্চর্য বনে যাবে। যা অবিশ্বাস্য, এই মানুষ বলছে মালতীকে পাওয়া গেছে। সে কেমন বিহ্বলভাবে আবুর মাকে ডাকছে, শুনছ আবুর মা, মালতীরে পাওয়া গেছে। ফকিরসাবের সামনে আছে। তুমি আমি দ্যাখতে পাইতাছি না।

    নরেন দাসের চোখমুখ দেখে ফকিরসাব বুঝতে পারলেন ওর হাঁকডাকে কাজ হচ্ছে। রহস্যজনক ভাবে ওরা ফকিরসাবকে দেখছে। যেন মানুষটা এখন এইমাত্র আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। উঠোনের উপর দাঁড়িয়ে ওদের ডেকে তুলে বলছেন—এই নাও মালতীরে। দিয়া গেলাম। লম্ফটা এত বেশি জ্বলছে যে মুহূর্তে এই বাড়িময় আগুন ধরে যেতে পারে, সবদিকে আলোতে আলোময়। কেবল পুবের দিকে ঠিক কুলগাছের নিচটা অন্ধকারে ডুবে আছে। ফকিরসাব পিছন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কুলগাছের নিচে অন্ধকারে মালতীকে ধরে জোটন দাঁড়িয়ে আছে।

    ফকিরসাব পাওয়া গেছে কথাটাকে বিশ্বাস করানোর জন্য লা ইলাহা ইল্লাল্লার মতো অথবা বিসমিল্লা রহমানে রহিমের মতো বলতে থাকলেন, দাস মায় আমার বনদেবীর মত ছুইটা যায়, কি ত্বরিতে ছুইটা যায়! তখন নদীর জলে স্রোত থাকে না, তখন পাখি বনে কূজন করে না, ময়নামতির হাটে তখন দোকানি লম্ফ জ্বালে না–মায় আমার দাস, ছুইটা গ্যালে গ্রাম মাঠ গাছপালা পাখি সব হায় হায় করতাছিল। দাস, আমি তাইনরে তুইলা আনলাম।

    মালতী কুলগাছের অন্ধকার থেকে সব শুনছে। জোটনের ফকিরসাব, মেলাতে বান্নিতে যে মানুষ গাজির গিদের বায়ানদারের মতো হেঁটে বেড়ায়, যে মানুষ পীর দরবেশ বনে যাবার জন্য মেলাময় ঘোড়দৌড়ের বাজিতে ছুটে বেড়ায়, সেই মানুষ অভাগী মালতীর জন্য মিছা কথা কয়।

    আভারানী ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বলল, ফকিরসাব, তাইন কোনখানে? সামনে কিছু দ্যাখতে পাই না ফকিরসাব।

    —আছে। যদি দোষ না নেন, হাজির করি।

    নরেন দাস বলল, মিছা কথা কইবেন না ফকিরসাব। বিশ্বাস হয় না।

    —হয়। বলে ফকিরসাব ডাকলেন, মায় কইগ আমার! বেলতলা কুলতলায় মায় আমার যেইখানে থাকেন একবার আবির্ভূতা হন মা। বলে লম্ফের সলতে উসকে দিতেই পেটে আবার কামড়। তলপেট শক্ত হয়ে আসছে। ক্রমে কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন ফকিরসাব। কিছুতেই আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। মনে হচ্ছে তাবৎ সংসারের ধর্মাধর্ম এই মুহূর্তে পেটের ভিতর বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবু কোনও রকমে চোখ তুলে তাকালেন। হাসলেন জোরে। হাত-পা ছুঁড়ে বললেন, আসেন আসেন–‘মা জননী, আসেন। আসমানে থাকেন বাতাসে থাকেন নাইমা আসেন। প্রায় যেন ভোজবাজির খেলা দেখাচ্ছেন ফকিরসাব। এই গভীর রাতে কেউ যখন জেগে নেই তখন ফকিরসাব ভোজবাজির মতো নরেন দাসের উঠোনে খেলা দেখিয়ে দিলেন। প্রতিবেশীরা যে যার ঘরে। দীনবন্ধুর বৌ এবং দীনবন্ধু, ওর দুই ছোট-বড় বৌ টের পেয়েছে, ফকিরসাব মুশকিলাসানের লম্ফ নিয়ে এসেছেন। তখন দেবীর মতো মালতী উঠোনের অন্ধকারে হাজির। আলোটা ঘুরিয়ে দিতেই আভারানী এবং নরেন দাস দেখল, ক্লান্ত মালতী, চোখ বুজে আসছে মালতীর, যেন পড়ে যাবে মাটিতে—ওরা ছুটে গিয়ে ধরে ফেলতেই ফকিরসাব ফুঁ দিয়ে আলো নিভিয়ে দিলেন। সুড়ুৎ করে টপকে কুলগাছ পার হয়ে চলে এলেন ঘাটে। জোটন সঙ্গে সঙ্গে গাবতলা পার হয়ে ঘাটে চলে এল। ফকিরসাব কোনওরকমে বললেন, জলদি নাও ভাসান পানিতে। দেরি করবেন না।

    অন্ধকার পাটাতনে মলমূত্রে কাপড় ভেসে যাচ্ছিল। ফকিরসাব কিছু বললেন না জোটনকে। পেট সাফ হয়ে নেমে যাচ্ছে। তারপর কেবল শুধু মল, মূত্রের দেখা নেই। জোটন দুর্গন্ধে বসতে পারছে না। নদীর মুখে নৌকা ছেড়ে দিতে পারলে ভাটি পাওয়া যাবে। ফকিরসাব সেই ভাটিতে নৌকা ছেড়ে দিতে বললেন। আর কিছু বলতে পারছেন না। ওলাওঠাতে এখন প্রাণ সাবাড়ের সময়। স্রোতের মুখে নাও ছেড়ে বসে থাকতে পারলে ভাটি পাওয়া যাবে। শেষরাতের দিকে আলিপুরা গ্রাম পাওয়া যাবে। বাকি ক্রোশের মতো পথ নিশ্চয়ই জোটন রাত শেষ হতে-না-হতে দরগায় টেনে নিয়ে যেতে পারবে। স্রোতে এসে নৌকা পড়তেই ফকিরসাব কিছু কথা বললেন জোটনকে লক্ষ করে—বিবি, আমার প্রাণপাত হইতাছে। আমারে আপনে রাইত থাকতে দরগাতে তুইলা দিয়েন। সকাল হইলে হাউমাউ কইরা কাইন্দেন না। আলিপুরায় খবর দিবেন, ফকিরসাবের রাইতে ইন্তেকাল হইল। যদি কয়, রাত কয়টায়?

    জোটন বুঝতে পারছে না কেন এমন বলছেন তিনি। পাটাতনে এখন মানুষটা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে। হাত দিতেই বুঝল, আলখাল্লা, জোব্বা সব ভেসে যাচ্ছে। জোটনের ভিতরটা হায় হায় করে উঠল। সে বুক থাবড়ে বলল, রাইত কটায় কমু?

    —রাইত দুই প্রহর শেষ না হইতে।

    —তখন ত আপনে দাসের বাড়িতে আছিলেন।

    —আপনের এত কথায় কাম কি বিবি। বলেই মানুষটার কথা বুঝি একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।

    জোটন হাউহাউ করে কাঁদতে চাইলে হাত তুলে ইশারায় ডাকলেন কাছে। জোটন মাথা কোলে নিয়ে বসে থাকল। নাও জলের টানে দ্রুত নেমে যাচ্ছে। শুধু হালটা কোনওরকমে এক হাতে ধরে আছে জোটন। অন্য হাতে ধীরে ধীরে জামা-কাপড় ছাড়িয়ে দিচ্ছে। ধুয়ে-পাখলে দিচ্ছে। খালি গায়ে মানুষটা লম্বা এই পাটাতনে হাত দুটো বুকে তুলে অপলক অন্ধকারে কি যেন দেখছেন। কাছে গেলে বললেন, কাইন্দেন না। ভাল না লাগলে দরগায় যাইবেন না। বলতে বলতে ফকিরসাবের গলা বসে আসছে।

    অন্ধকারে নদীর জল ধূসর। গ্রামে মাঠে জোনাকি জ্বলছে। জোটনের কেন জানি মানুষটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হল। আকাশে কত নক্ষত্র জ্বলছে। অন্ধকারে কত সব নক্ষত্র যেন তাকিয়ে তাকিয়ে ফকিরসাবের ইন্তেকাল দেখছে। এতকাল থেকে এই মানুষ, এক মানুষ—দিন নাই রাইত নাই, মাঠে মাঠে বনে বনে অথবা অনাহারে দিন কাটিয়েছেন, কবে শোনা যায় কোন এক হত্যার দায়ে এই মানুষ তাঁর ঘর ছেড়েছিলেন। বিটি-বেটাদের ছেড়ে, জমি-বাড়ি গোলা এবং পুকুরের পাড়ে পাড়ে অর্জুনগাছ, ধানের গোলাতে পাখি উড়ে বেড়াত, সেই মানুষ খুনের দায় এড়াতে বরিশালের ভোলা অঞ্চল থেকে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিলেন। তারপর দীর্ঘদিন সংগোপনে এখানে সেখানে বসবাসের পর—আস্তানাসাবের দরগাতে এক রাতের রাতযাপন। দূর থেকে মানুষেরা এসেছিল কবর দিতে। কবরের কিছু মোমবাতি তিনি তুলে এনে এই বনের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে কখন রাজাবাদশার মতো, মনে মনে এক ইচ্ছা পূরণের পালা। দিন যায় রাত যায়, বনের পাখপাখালি এবং গাছপালা বৃদ্ধ মানুষটার কাছে ক্রমে দোসর হয়ে যায়। তিনি একটা কুঁড়েঘর বানিয়ে ফেললেন। রবিশালের কোথায় নিবাস ছিল মনে থাকল না। তিনি একটা মাটির লম্ফ সংগ্রহ করলেন। কিছু হাদিস এবং ধর্মাধর্মের ছোট বড় কথা কী করে যেন গড়গড় করে বলে ফেলতে পারলেন। তারপরে মানুষটা আর খুনী মানুষ থাকলেন না। ফকির মানুষ বনে গেলেন।

    এই মানুষের এখন ইন্তেকাল হচ্ছে। জোটন বলল, আপনের ডর নাই। ফকিরসাব আপনে মানুষ আছিলেন না, পীর আছিলেন। এই বলতেই কেমন সাহস এসে গেল তার প্রাণে। এই মানুষকে রাতে রাতে দরগায় হাজির করতে হবে। ঠিক যেখানে বড় নিমগাছটা আছে, উঁচু মতো ভিটা জমি, তার উপর শুইয়ে রাখতে হবে। যারা আউশ ধান কাটতে এদিকে আসবে নৌকা নিয়ে তারা দেখবে জোটন গাছের নিচে এক মরা মানুষ নিয়ে জেগে আছে। কে এই মানুষ!—এই মানুষ ফকিরসাবের। রাইতের বেলা ইন্তেকাল হইল। রাইতে মানুষটা নিজের ভিতর ডুব দিলেন। এই বয়স পর্যন্ত মানুষটার কোন রোগ-শোক জরা ছিল না। শেষ বয়সের এই জরাকে প্রশ্রয় দিতে নেই। কিছুই যেন হয়নি, জোটন তাঁকে ধুয়ে পাখলে একেবারে নতুন মানুষ করে ফেলল। শরীরে কোন মল-মূত্রের গন্ধ থাকতে দিল না। ওলাওঠাতে প্রাণ গেছে বুঝতে দিল না। এইবেলা জোটনের কসম, আপনে পীর বইনা গ্যালেন ফকিরসাব!

  • ছাব্বিশ

    ছাব্বিশ

    বিকেলের রোদ এখন জানালায়। বৃন্দাবনী সব দরজা খুলে দিচ্ছে। এই ঘরে আয়নার সামনে অমলা কমলা এখন সাজবে। বারান্দায় অমলা কমলা দাঁড়িয়ে আছে। দূরে শীতলক্ষ্যার পাড়। পাড়ে পাড়ে কাটা মোষ নিয়ে যাচ্ছে যারা, অমলা কমলা তাদের দেখছিল।

    বৃন্দাবনী ডাকল, বড় ঠাকুরানী, আসুন।

    ওরা দেখল বৃন্দাবনী বড় আলমারি খুলছে। ওদের ফ্রক বের করছে। এখন সে ওদের চুল বেঁধে দেবে। বেলা পড়ে আসছে। অন্দরে ল্যাণ্ডো লেগে রয়েছে। ওরা বিকালে অন্যান্য বাবুদের বাড়ি ঠাকুর দেখতে যাবে। সঙ্গে যাবে রামসুন্দর। আর বৃন্দাবনী ডাকলেই ওদের যেন এক খেলা আরম্ভ হয়ে যায়। মার্বেল পাথরের মেঝে—খুব একটা জোরে ছোটা যায় না। অথচ এই দুই মেয়ে কি সুন্দর মসৃণ মেঝের উপর ছুটতে পারে। বৃন্দাবনী ডাকলেই—ওরা ছুটে পালাবে, কারণ সে ওদের চুল এত আঁট করে বেঁধে দেয় যে মাথায় বড় লাগে।

    সুতরাং বৃন্দাবনী আর ডাকল না। ডাকলেই ওরা পালাবে। সে পা টিপে টিপে কাছে গিয়ে ধরে ফেলবে ভাবল। কিন্তু তার আগেই দুষ্টু মেয়েরা টের পেয়ে গেছে। ওরা সেই খেলায় মেতে গেল—ঠিক যেন ওরা ছোট্ট দুই পরী হয়ে যায়—ওরা মেঝের উপর সন্তর্পণে পা টিপে টিপে হাতের অদ্ভুত ব্যালেন্স রেখে ছুটতে থাকে—ঠিক ব্যালেরিনা যেন। হাত তুলে নদীর পাড়ে অথবা অদ্ভুত কায়দায় ওরা যেন ক্ষণে ক্ষণে মসৃণ বরফে পা তুলে তুলে নাচে। তখন বৃন্দাবনীর রাগ হয়। সে কেন ওদের ছুটে ধরতে পারবে! তখন সে অভিমান করে দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বলে না। মুখ দেখলে ওরা টের পায় সে রাগ করেছে। তখন ওরা আর দেরি করে না। এসে ধরা দেয়। কারণ এই বৃন্দাবনীর কাছেই ওরা শিশুবয়স থেকে বড় হয়ে উঠেছে।

    অমলা বলল, আমি আজ চুল বাঁধব না পিসি

    বৃন্দাবনী কাজের ফাঁকে চোখ তুলে তাকাল। কিছু বলল না।

    অমলার ইচ্ছা ওর চুল ফাঁপানো থাকুক। ঘাড় পর্যন্ত বব করা চুল। চুলটা পিঠের নিচে নামলেই কেটে ফেলা ঠিক নয় বলার ইচ্ছে। এখন তোমাদের বয়স হচ্ছে মেয়ে। এই বয়সে চুল আর একটু বড় হতে দাও। আমি বেশ এঁটে বেণী বেঁধে দি। তবে চুলের গোড়া শক্ত হবে। মাথা থেকে, বড় হলে ঝুরঝুর করে চুল উঠে যাবে না।

    অথচ ওদের মুখ ববকাটা চুলে বড় সুন্দর দেখায়। তাজা গোলাপের মতো। কতবার ভেবেছে মাথা ন্যাড়া করে দেবে, ন্যাড়া করে দেবে শুনলেই ওরা পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে। বৃন্দাবনীর তখন কষ্ট হয়।। মেজবাবুকে আর চুল কাটা নিয়ে পীড়াপীড়ি করে না।

    মেজবাবুকে বৃন্দাবনী যেমন ছোট থেকে বড় করে তুলেছে, যে যত্ন এবং সেবা ছিল প্রাণে—সেই যত্নে এই দুই মেয়ে বৃন্দাবনীর হাতে ক্রমে মানুষ হচ্ছে। ওরা ফের ছুটতে চাইলে বৃন্দাবনী ধমক দিল। রাগ করতে চাইল। দুমদাম আলমারির দরজা বন্ধ করে দিতে চাইল। মেয়েরা আসছে না। যে যার মতো সারা ঘরে ফের ছুটে বেড়াচ্ছে।

    কলকাতার বাড়িতে হলে বৃন্দাবনী জোর ধমক দিতে পারত। কিন্তু এখানে সে কিছু করতে পারে না। কলকাতার বাড়িতে সে-ই সব। সে না থাকলে এই দুই মেয়ে মায়ের মতো ব্যবহারে কিঞ্চিৎ ভিন্নধর্মী হতো। কি সুন্দর বাংলা বলে ওরা। পূজা-আর্চায় অগাধ ভক্তি। পূজা এলেই ওরা কবে দেশের বাড়িতে যাবে এই বলে মেজবাবুকে পাগল করে দেয়। সন্ধিপূজার সময় বাড়ির সব মেয়ের মতো করজোড়ে চিকের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। মোষ বলি হলে রক্তের ফোঁটা কপালে, ফোঁটা দিলেই শরীরের সব পাপ মুছে যায়, শুধু তখন পবিত্র এক ভাব থাকে শরীরে। বৃন্দাবনী যেন ওদের মুখ দেখলেই টের পায়। মেজবাবুর স্ত্রী এসব পছন্দ করেন না, করেন কি করেন না সেও তিনি ভালো করে জানেন না, তবু প্রতিবারে ওঁদের পূজা দেখতে আসা নিয়ে একটা মনোমালিন্য এবং ক্রমে তা প্রকট হতে হতে কখন জানি ওঁরা দুজনেই পরস্পর দূরের মানুষ হয়ে যান। বৃন্দাবনী টের পায়—মেজবাবু ওদের নিয়ে স্টিমার ঘাটে নামলেই একেবারে সরল বালক, যেন কতদিন পর ফিরে আসা, কতদিন পর মুক্তি, নদীর পাড়ে নেমেই জন্মভূমিকে তিনি গড় হয়ে প্রণাম করেন, মেয়েদের বলেন, এই তোমার দেশ, বাংলাদেশ, এই তোমাদের পিতৃভূমি, তারপর চুপচাপ হাঁটেন। গাড়িতে উঠে তিনি বাড়ি যান না। চারপাশে নদীর জল, মাঠের ঘাস এবং সারি সারি পামগাছের ছায়ায় নিজের বাল্যকাল স্মরণ করে কেমন অভিভূত হয়ে যান। এই পথে তিনি কৈশোরে কতদিন ঘোড়ায় চড়ে নদীর পাড়ে পাড়ে কতদূর চলে গেছেন।

    বৃন্দাবনী দেখেছে, এই নিয়ে কোনও বচসা হয় না, মেজবাবু কলকাতা থেকে রওনা হবার আগে ক’দিন সকালে মহাভারত পাঠ করেন শুধু। সন্ধ্যায় ক্লাবে যান না। মেজবৌরানী তখন গীর্জায় যান। ফাদার আসেন বাড়িতে। দক্ষিণের দিকে যে দোতলা সাদা পাথরের হলঘর আছে সেখানে ফাদারের পায়ের নিচে তিনি বসে থাকেন।

    এবার অমলা দেখেছে, বাবা পূজার আগের ক’দিন মার ঘরের দিকে যাননি। মার মুখ ভীষণ বিষণ্ণ এবং ক্লান্ত। রাতে বাবা নিজের ঘরে শুয়ে থাকেন। দুপুর রাতে সহসা বাবা ফ্রুট বাজান। কেন যে এমন হচ্ছে দু’জনের ভিতর—ওরা ত কিছুই অনুমান করতে পারত না। সকাল হলেই দু’বোন চুপ-চাপ স্কুলে চলে যায়। স্কুল থেকে এসে আর সারা বাড়িতে ছুটতে সাহস পায় না। মার মুখ বিষণ্ণ প্রতিমার মতো হয়ে গেছে। মা ক্রমে পাথর হয়ে যাচ্ছেন। এ-দেশে মা যেন বাবার সঙ্গে কিসের খোঁজে সমুদ্র পার হয়ে চলে এসেছিলেন। চোখ দেখলে মনে হয় তিনি তা পাননি। অথবা কখনও কখনও মনে হয় কোথাও তিনি কিছু ফেলে চলে গেছিলেন, এদেশে ফিরে আসায় তা আবার তাঁর মনে হয়েছে। তিনি সারাক্ষণ মাঠের দিকের বড় জানালাটায় দাঁড়িয়ে থাকেন। মাঠ পার হলে সেই দুর্গ, দুর্গের মাথায় হাজার হাজার জালালি কবুতর উড়ছে। মা সেসব দেখতে দেখতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যান। কী যেন খোঁজেন সব সময়।

    এই যখন দৈনন্দিন সংসারের হিসাব, তখন বৃন্দাবনী দুই মেয়েকে বাংলাদেশের মাটির কথা শোনায়। শরৎকালে শেফালি ফুল ফোটে, স্থলপদ্ম গাছ শিশিরে ভিজে যায়, আকাশ নির্মল থাকে, রোদে সোনালী রঙ ধরে—এই এক দেশ, নাম তার বাংলাদেশ, এদেশের মেয়ে তুমি। এমন দেশে যখন সকালে সোনালী রোদ মাঠে, যখন আকাশে গগনভেরি পাখি উড়তে থাকে, মাঠে মাঠে ধান, নদী থেকে জল নেমে যাচ্ছে, দু’পাড়ে চর জেগে উঠেছে, বাবলা অথবা পিটকিলা গাছে ছেঁড়া ঘুড়ি এবং নদীতে নৌকা, তালের অথবা আনারসের, তখনই বুঝবে শরৎকাল এ-দেশে এসে গেল। তুমি অমলা এমন এক দেশে নীল চোখ নিয়ে জন্মালে। সোনালী রঙের চুল তোমার। তুমি যদি কোনওদিন কোনও হেমন্তের মাঠ ধরে ছুটতে থাক তবে তুমি এক লক্ষ্মীপ্রতিমা হয়ে যাবে। এমন মেয়েরা দুষ্টুমি করে না। এস তোমার চুল বেঁধে দি।

    বৃন্দাবনী ওদের এবার নিখুঁতভাবে সাজিয়ে দিল। ওরা যতক্ষণ সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে না গেল ততক্ষণ সে তাকিয়ে থাকল। ওরা ঘুরে ঠাকুমার ঘর হয়ে গেল কাকিমাদের ঘরে, দেখা করে গেল। মেজবাবু এই সংসারে ম্লেচ্ছ মেয়ে বিয়ে করার জন্য নানারকমের অবহেলা পাচ্ছেন—এই বলে হয়তো এই দুই মেয়ে যারা উত্তরাধিকার-সূত্রে সম্পত্তির একটা বড় অংশ দখল করে আছে অথচ কিছুই হয়তো শেষপর্যন্ত পাবে না—এমন আশংকা থাকায়, কিছু করুণা কিছু ভালোবাসা এই মেয়েদের প্রতি কম-বেশি সকলের। ওরা এমন তাজা আর স্নিগ্ধ, এত বেশি অকারণ হাসে, আর এমন অমায়িক—মনে হয় কেবল দুই জাপানী কল দেওয়া পুতুল, কেবল হাত-পা তুলে ঘুরছে-ঘুরছে-ঘুরছে। সুতরাং তারা নিচে নেমে গেলেই, কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকে অন্দর

    ওরা ক্রমে নামছে, আর চারিদিকে তাকাচ্ছে। সোনাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। একবার দুপুরের দিকে সিঁড়ির মুখে সোনাকে পেয়েছিল, কিন্তু কপালে রক্তের ফোঁটা দিতে-না-দিতেই ছুটে পালিয়েছে সে যে গেল কোথায়!

    নিচে নেমে দেখল খালেক মিঞা গাড়িতে বসে নেই। মাহুত জসীম এসেছে গাড়ি নিয়ে। পিছনে রামসুন্দর তকমা এঁটে দাঁড়িয়ে আছে।

    অমলা খালেককে না দেখে বিস্মিত হল। বলল, তুমি জসীম!

    —হ্যাঁ, মা ঠাইরেন। আমি।

    —খালেক কোথায়?

    —অর অসুখ মা-ঠাইরেন।

    —কি হয়েছে?

    —জ্বর, কাশি।

    সকালের রামসুন্দর আর এই রামসুন্দরকে চেনাই যায় না। এ-দিনের জন্য সে কারও বান্দা নয়। কেবল দেবীর বান্দা। কিন্তু যেই শুনেছে বড় খুকুরানী আর ছোট খুকুরানী পুজো দেখতে, অন্য বাবুদের নাটমন্দিরে যাবে, কুলীন পাড়ার ঠাকুর দেখতে যাবে—সে তখনই উর্দি পরে দৌড়েছে। এখন দেখলে মনে হবে রামসুন্দরকে সে দেবীর বান্দা আর বান্দা এই দুই মেয়ের।

    রামসুন্দর নাগরা জুতো পরেছে, সাদা উর্দি পরেছে, কোমরে পেতলের বেল্ট। বেল্টের পাতে এই পরিবারের প্রতীকচিহ্ন। ওর মাথায় নীল রঙের পাগড়ি, জরির কাজ করা পাগড়ি দেখতে বুলবুল পাখির বাসার মতো। ভিতরটা উঁচু হয়ে টুপির মতো উঠে গেছে। সোনা এখন দেখলে বলত, রামসুন্দর তুমি কোন্ দেশের রাজা?

    অমলা কমলা এসব কিছুই দেখল না। খুব গম্ভীর মুখে গাড়িতে উঠে গেল। বাড়ির দাসী বাঁদী অথবা ভৃত্যদের সামনে অথবা বের হবার মুখে কোনও চাঞ্চল্য প্রকাশ পায়, সে ভয়ে দুই বোনই একেবারে চুপচাপ পাশাপাশি বসে আবার চারদিকে কাকে যেন খুঁজল। সোনা যে কোথায়! অথবা এ অবেলায় সে কি ঘুমোচ্ছে! অমলার বলতে পর্যন্ত সাহস হল না ল্যাণ্ডো কাছারিবাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে যাও। এখানে এলেই কিছু আইনকানুনে পড়ে যেতে হয়। যেখানে সেখানে একা একা গেলে ঠাকুমা রাগ করেন। যে বাবা ওদের এত ভালোবাসেন তিনি পর্যন্ত অন্দরের বাইরে বের হতে দেখলে বলেন তোমরা এখানে কেন। ভিতরে যাও। অথচ কলকাতার বাড়িতে ওরা একেবারে স্বাধীন। মালীদের ছেলেরা ওদের হয়ে কতরকমের কাজ করে দেয়। পুতুলের ঘর বানিয়ে দেয়। এবং ওরা বাড়িময়, সেও তো বড় বাড়ি, বড় প্রাসাদের মতো বাড়ি ছুটে শেষ করা যায় না, তেমন এক বাড়িতে ওরা মানুষ হচ্ছে বলে এখানে এইসব নিয়ম মাঝে মাঝে ওদের খুব দুঃখী রাজকুমারী করে রাখে। অমলার বড় ইচ্ছা হচ্ছিল সোনাকে নিয়ে পূজা দেখতে যায়। দু’বোনের মাঝে সোনা বসে থাকবে—কী যে ভালো লাগছে না, সোনার শরীরে চন্দনের গন্ধ লেগে থাকে, এমন একটা গন্ধ যে সে পায় কোথায়? অথবা কেন যে মনে হয়েছে, গত রাতে দাতাকর্ণের পালা হয়েছে, বৃষকেতুর সেই উজ্জ্বল মুখ, টানা টানা লম্বা চোখ, ছোট মানুষ এবং কী অসীম পিতৃভক্তি, সোনা যেন ওর কাছে সারাক্ষণ বৃষকেতু হয়ে আছে। গত রাতে অমলা চিকের আড়াল থেকে দেখেছে, সোনা তার পাগল জ্যাঠামশাই-র পাশে বসে ছিল আসরে। যাত্রা দেখতে দেখতে সে পাগল জ্যাঠামশাইর হাঁটুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

    কী আশ্চর্য সেই মানুষ পাগল ঠাকুর! সারাক্ষণ শক্তভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে বসেছিলেন। হাত- পা নড়লেই সোনার ঘুম ভেঙে যাবে। আর অমলা দেখছিল, ওদের পিসিরা অথবা কাকিমারা—সবাই ফাঁকে ফাঁকে চুরি করে পাগল মানুষটাকে দেখতে দেখতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। ঝাড়লণ্ঠনে তখন নানারকমের লাল নীল আলো জ্বলছিল।

    গাড়িটা ক্রমে গাছের ছায়ায় নুড়ি বিছানো পথে বের হয়ে যাচ্ছে। ঘোড়ার পায়ে ক্লপ ক্লপ শব্দ হচ্ছে। দীঘির নিরিবিলি জলে কিছু পদ্মফুল ফুটে আছে। আর শরতের বিকেল মরে যাচ্ছে। নীল আকাশ, গাছের ফাঁকে ফাঁকে অজস্র মানুষ দেখা যাচ্ছে নদীর পাড়ে। সবাই ঠাকুর দেখতে বের হয়ে পড়েছে।

    অমলা কেমন বিরক্ত গলায় বলল, সোনাটা যে কি না!

    —কেন কি হয়েছে?

    —ওকে দেখছি না কোথাও।

    অমলা দীঘির এ-পাড় থেকে ও-পাড়ের কাছারিবাড়ি লক্ষ রাখছে। মঠের সিঁড়িতে সে যদি একা বসে থাকে, অথবা ময়ূরের কিংবা হরিণের ঘরগুলি পার হয়ে সে যদি কুমীরের খাদে উঁকি দেয়। না কোথাও গাছের ফাঁকে অথবা পাতার অজস্র বিন্দু বিন্দু জাফরিকাটা খোপের ভিতর সে সোনাকে আবিষ্কার করতে পারল না। তখন কমলা বলল, সোনা আর আমাদের কাছে আসবে না।

    এমন কথায় অমলার বুকটা কেঁপে উঠল।—আসবে না কেন রে?

    —ও রাগ করেছে।

    —আমরা তো ওকে কিছু বলিনি।

    —রাগ না করলে এমন হয়! আমাদের দেখলেই পালায়।

    অমলার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর সেরে গেল। সোনা আবার কমলাকে বলে দেয়নি তো!

    এখন গাড়িটা নদীর পাড়ে এসে পড়েছে। দুই সাদা ঘোড়া গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তেমনি ক্লপ ক্লপ শব্দ ঘোড়ার পায়ে। তেমনি সূর্য অস্ত যাচ্ছে শীতলক্ষ্যার পাড়ে, তেমনি মানুষজন, গাড়ি দেখলেই দু’পাশে দাঁড়িয়ে এই প্রতিমার মতো দুই বালিকাকে গড় করছে! রাস্তা একেবারে ফাঁকা। ঘোড়া দুটো নিঃশব্দে দুলে দুলে কদম দিচ্ছে।

    অমলা বলল, সোনাকে কোথাও দেখলেই এবারে সাপ্টে ধরব, বুঝলি। জোর করে ধরে আনব দেখি ও যায় কোথায়!

    কমলা বলল, তুই ওর হাত দুটো ধরবি, আমি পা দুটো। চ্যাঙদোলা করে ছাদে তুলে নিয়ে যাব। সিঁড়ির দরজা বন্ধ করে দিলে সোনা কি করে দেখব!

    অমলা ভাবল সোনাকে রাগালে চলবে না, ওকে তোয়াজ করে রাখতে হবে। সে যে কী করে ফেলল সোনাকে নিয়ে! সে এমনটা কমলাকে নিয়ে কতবার করেছে। কিন্তু সোনাকে নিয়ে। সে যেন আলাদা রোমাঞ্চ। আলাদা স্বাদ। ওর ভয়, সোনাকে কমলা না আবার লোভ দেখিয়ে হাত করে ফেলে। সে বলল, ওকে চ্যাঙদোলা করে ছাদে তুলে আনব না। সোনা খুব ভালো ছেলে। ওকে আমি ভালোবাসব।

    কমলা দিদির দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও তবে ভালোবাসব।

    অমলা এমন কথায় কি যেন দুঃখ পেল ভিতরে।—তোর এটা স্বভাব কমলা। আমার যা ভালো- লাগবে সেটা তোর চাই।

    —আমার না তোর?

    অমলা আর কথা বলল না। পিছনে রামসুন্দর দাঁড়িয়ে আছে। সে প্রায় একটা কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সামনে শীতলক্ষ্যার চর। চরে মনে হল সেই পাগল মানুষ একা একা হেঁটে কোথায় চলে যাচ্ছেন।

    কমলা বলল ঐ দ্যাখ দিদি, সোনার পাগল জ্যাঠামশাই।

    অমলা পিছন ফিরে দেখল সেই বালক, সঙ্গে সেই আশ্বিনের কুকুর। নদীর চর পার হয়ে ওরা কোথাও যাচ্ছে।

    কমলা বলল, পিছনে সোনা না!

    অমলা বলল, রামসুন্দর, পিছনে কে সোনা না?

    রামসুন্দর বলল, আজ্ঞে তাই মনে হয়।

    —জসীম, গাড়ি চালাও। জোরে চালাও। বলে অমলা ফ্রক টেনে ঠিক-ঠাক হয়ে বসল।

    প্রাচীন মঠ নদীর পাড়ে। মঠের ত্রিশূলে একটা পাখি বসে আছে। সোনা এবং তার পাগল জ্যাঠামশাই মঠ পর্যন্ত উঠে আসতে না আসতেই ওরা মঠের আগে উঠে যাবে। স্টিমার ঘাট পার হয়ে যাবে। এবং সোনা আর তার জ্যাঠামশাইকে ধরে ফেলবে। সোনাকে সঙ্গে নেবে, ওর পাগল জ্যাঠামশাই সঙ্গে থাকবে। ওরা চারজন, ঠিক চারজন কেন, রামসুন্দর জসীম আর আশ্বিনের কুকুর মিলে সাতজন, এই সাতজন মিলে বাড়ি বাড়ি দুগ্‌গা ঠাকুর দেখে বেড়াবে। সব শেষে যাবে পুরানো বাড়ি, সে বাড়ির ঠাকুর দেখা হলেই ওরা ল্যাণ্ডোতে একটা বড় মাঠে নেমে যাবে। আশ্বিনের শেষাশেষি হিম পড়বে সাঁজ নামলেই। সাদা জ্যোৎস্না থাকবে। ওরা সকাল সকাল না ফিরে একটু রাত করে ফিরবে। সঙ্গে রামমুন্দর আছে—ভয় কি! সে উর্দি পরে একেবারে বীরবেশে ল্যাণ্ডোর পিছনে কাঠের পুতুলের মতো সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে।

    আর তখন সোনাও দেখতে পেল, নদীর পাড়ে দুই ঘোড়া কদম দিচ্ছে। গাড়ির পিছনে যাত্রাপার্টির মানুষের মতো কে একজন সোজা দাঁড়িয়ে আছে. দূর থেকে সোনা, রামসুন্দর যে এমন একটা রাজার বেশে দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারে ভাবতে পারল না। অমলা কমলা হাত তুলে ওকে ইশারায় ডাকছে।

    সোনা তাড়াতাড়ি জ্যাঠামশাই-র হাত টেনে ধরল। সোনাকে দেখেই নদীর পাড়ে ওরা ল্যাণ্ডো থামিয়ে দিয়েছে। যেন সোনাকে তুলে নেবার জন্য ওরা দাঁড়িয়ে আছে। সে আর ওদিকে হাঁটল না। আবার সে পিলখানার মঠের দিকে উঠে যাবে। সে জ্যাঠামশাই-র হাত ধরে ঠিক উল্টোমুখে হাঁটতে থাকল।

    অমলা বলল, রাম, তুমি যাবে। সোনাকে নিয়ে আসবে।

    কমলা বলল, দেখলি, কেমন সোনা আমাদের দেখেই পালাচ্ছে।

    রামসুন্দর গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল। সে সারি সারি পামগাছের আড়ালে আড়ালে এসে সোজা চরে নেমে গেল। এখানে বাবুরা নদীর পাড় বাঁধিয়ে দিয়েছেন। সে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে কাশবনের দিকে ছুটতে থাকল।

    সোনা দেখল, সেই রাজার বেশে মানুষটা চরের ওপর দিয়ে ওদের দিকে ছুটে আসছে। কাশবনের আড়াল পড়ায় ওদের আর দেখা যাচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি জ্যাঠামশাইকে নিয়ে সেই কাশের বনে কোথাও লুকিয়ে পড়বে ভাবল। অমলা কমলা ওকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য পাঠিয়েছে মানুষটাকে। কিন্তু সে পালাতে গিয়েই দেখল কুকুরটা লেজ নাড়ছে, আর ঘেউঘেউ করছে। কুকুরটা রামসুন্দরকে তেড়ে যাচ্ছে।

    সোনা আর পালাতে পারল না। সে তাড়াতাড়ি চরের উপর দিয়ে ছুটতে থাকল। সে কাছারিবাড়িতে উঠে গিয়ে মেজ জ্যাঠামশাই-র পাশে গদিতে বসে থাকবে চুপচাপ। সে কিছুতেই অমলা কমলার সঙ্গে আর কোথাও যাবে না, লুকোচুরি খেলবে না।

    তখন বেশ মজা পাচ্ছিল আশ্বিনের কুকুর। পাগল জ্যাঠামশাই একা একা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তালের আনারসের নৌকা যাচ্ছে। হাঁড়ি-পাতিলের নৌকা পাল তুলে যাচ্ছে। নৌকা যাচ্ছে উজানে। কেউ কেউ গুণ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পাগল মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছেন। সোনাকে নিয়ে চরের ভিতর এখন ছুটোছুটি আরম্ভ হয়ে গেছে, অমলা কমলা পর্যন্ত নেমে এসেছে—তিনদিক থেকে তিনজন ধীরে ধীরে সাঁড়াশি আক্রমণ করে সোনাকে ছেঁকে তুলবে, তারপর ল্যাণ্ডোতে নিয়ে উধাও হবে—সেসব তিনি খেয়াল করছেন না। তিনি যেন এখন নদীতে যেসব পালের নৌকা যাচ্ছে তা এক দুই করে গুনছেন।

    মজা পেয়েছে আশ্বিনের কুকুর। সূর্যাস্তের সময় এ-একটা আশ্চর্য খেলা। সে পাড়ে দাঁড়িয়ে ঘেউঘেউ করছে। এদিক ওদিক ছুটছে সোনা, ছুটে পালাবার চেষ্টা করছে। সোনার সঙ্গে সেও ছোটাছুটি করছে।

    রামসুন্দর বলল, আপনেরা ক্যান নাইমা আইলেন!

    অমলা বলল, এই সোনা, শোন। অমলা রামসুন্দর কি বলছে শুনছে না।

    সোনা বলল, আমি যামু না।

    —আমরা দুগ্‌গা ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি।

    —যাও। আমি যামু না। সে তিনদিকে তিনজনের ভিতর আটকা পড়েছে। ওর আর পালাবার উপায় নেই।

    রামসুন্দর বলল, আপনে না গ্যালে ওনারা কষ্ট পাইব।

    —আমি যামু না। সে কেমন একগুঁয়ে জেদি বালকের মতো একই কথা বার বার বলে চলল। তখন অমলা ছুটে এসে খপ করে সোনাকে জড়িয়ে ধরল।—কোথায় যাবি?

    আর আশ্চর্য, সোনা এতটুকু নড়তে পারল না। কি কোমল সুগন্ধ শরীর, কি আশ্চর্য রঙের চোখ মুখ, সব নিয়ে অমলা সোনাকে নদীর চরে জড়িয়ে ধরেছে। এমনভাবে জড়িয়ে ধরলে কেউ বুঝি কখনও কোথাও আর ছুটে যেতে পারে না।

    —চল্, আমাদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবি। ফেরার পথে বড় মাঠে নেমে যাব। সাদা জ্যোৎস্না থাকবে। তোকে তখন একরকমের পাখি দেখাব। কোমল পাখিগুলি উড়ে উড়ে ডাকে। কি সাদা রঙ পাখিগুলির! তুই দেখলে আর নড়তে পারবি না।

    সোনা বলল, কিন্তু তুমি আমারে…! বলেই সে অমলার মুখ দেখে কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখে কী মিনতি মেয়ের, কী করুণ মুখ-চোখ করে রেখেছে অমলা। সোনা যথার্থই আর কিছু বলতে পারল না। সে জ্যাঠামশাইকে ডাকল, চলেন আমরা ঠাকুর দেইখা আসি। ল্যাণ্ডোতে যামু আর আমু।

    পাগল জ্যাঠামশাই এবার মুখ ফেরালেন। সোনা মেজবাবুর মেয়েদের সঙ্গে উঠে যাচ্ছে। তিনি তাড়াতাড়ি নৌকা গোনা বন্ধ করে দিলেন যেন। তিনি সোনাকে ধরার জন্য উঠে যেতে লাগলেন।

    অমলা বলল, তোর জ্যাঠামশাইকে সঙ্গে নিবি?

    সোনা পিছন ফিরে দেখল, জ্যাঠামশাই সুবোধ বালকের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সে বলল, যাইবেন?

    কোনও জবাব না দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন তিনি।

    কমলা বলল, তুই আমার পাশে বসবি।

    অমলা বলল, যা সে কি করে হবে! বাকিটুকু বলতে না দিয়ে সোনা বলে ফেলল, আমি জ্যাঠামশাই-র পাশে বসমু।

    কমলা বলল, বস কিরে? বসব বলবি।

    —বসব। সোনা কথাটা শেষ করতেই জসীম দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।

    সোনা বলল, কি জসীম, আমার জ্যাঠামশয়রে চিন না!

    —আপনের মায় ক্যামন আছে?

    সোনা তো জানে না মা তার কেমন আছে! এ ক’দিনেই মনে হয়েছে দীর্ঘদিন সে মাকে ছেড়ে চলে এসেছে। এবং মাঝে মাঝে ওর কেন জানি মনে হয় বাড়ি গিয়ে সে আর মাকে দেখতে পাবে না। সে গেলেই দেখবে, জেঠিমা চুপচাপ ঘাট পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর কেউ নেই। কেন জানি এটা তার বার বার অমলার সঙ্গে পাপ কাজে লিপ্ত হবার পর থেকে মনে হয়েছে। সে কিছু জবাব দিতে পারল না। সে জোর করে বলতে পারল না, ভালো আছে—আমরা কবে যাব, এমন বলতে পারছে না মেজ জ্যাঠামশাইকে। বার বার মেজদা বড়দা ওকে শাসিয়েছে ভ্যাক করে কেঁদে দিলে চলবে না। বাড়ি যামু আমি, বললে চলবে না। যখন নৌকা ছাড়বে ঘাট থেকে তখন তুমি যেতে পারবে। সে বার বার কেন জানি আজ ঈশমের নৌকায় উঠে যাবে ভাবল। সেই নৌকায় গিয়ে বসে থাকলে ওর মনে হয়, সে তার গ্রাম মাঠের কাছাকাছি আছে।

    জসীম সোনার কোনও সাড়া না পেয়ে বলল, মার জন্য মনটা আপনের ক্যামন করতাছে বুঝি?

    জসীম ঠিক বলেছে। মার জন্য মনটা আশ্চর্য রকমের ভারী হয়ে আছে।

    জসীম ফের বলল, আবার যামু আপনেগ দ্যাশে। শীতকাল চইলা আইলেই হাতি নিয়া চইলা যামু। আপনের মার হাতে পিঠাপায়েস খাইয়া আমু।

    সোনা এসব কিছুই শুনছে না। সে ঘোড়ার দিকে মুখ করে বসে আছে। দুই ঘোড়া, সাদা রঙের ঘোড়া পায়ে ক্লপ ক্লপ শব্দ, পিছনে রাজার বেশে রামসুন্দর, মাথার উপর কত সবুজ গাছপালা পাখি এবং নিরন্তর এই ঘোড়া যেন তাকে নিয়ে কোন্ দূরদেশে চলে যেতে চাইছে। সে দেখল, অমলা অপলক ওকে চুরি করে দেখছে। সে লজ্জা পেয়ে কী ভেবে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর কী যেন আশ্চর্য মজা জীবনে এসে যাচ্ছে টের পেয়ে মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। অমলার দিকে তাকিয়ে শেষে ফিক করে হেসে ফেলল।

    অমলাও হাসল।—আমার পাশে বসবি?

    সোনা জ্যাঠামশাই-র মুখ দেখল। মুখে যেন তাঁর সায় নেই। সে বলল, না।

    অমলা বলল, কাল দশমী। বাবা বিকেলে ফ্রুট বাজাবেন। তুই আমি আমাদের ব্যালকনিতে বসে বাবার ফ্রুট বাজনা শুনব।

    সোনা এখন নির্মল আকাশ দেখছে। সে শুনতে পাচ্ছে না কিছু।

    অমলা ফের বলল, বাবা ফ্রুট বাজাবেন। কত লোক, হাজার হাজার মানুষ আসবে নদীর পাড়ে। বাবার ফ্রুট বাজনা শুনতে আসবে। আমাদের ব্যালকনিতে তুই আমি আর কমলা। কী আসবি ত?

    সোনা বলল, পিসি, পুরানবাড়ি কতদূর!

    কমলা বলল, এ কিরে দিদি, সোনা তোকে পিসি ডাকছে।

    অমলা কেমন গুম মেরে গেল। সে বলল, অনেক দূর।

    অমলার অভিমান টের পেয়ে সোনা বলল, আমি বিকালে যাব।

    কমলা বলল, বিকাল নারে, ওটা হবে বিকেল।

    —আমি জানি।

    —বলতে পারিস না কেন?

    —মনে থাকে না।

    —তুই আমাদের সঙ্গে কলকাতা গেলে কথা বলবি কি করে?

    সোনা চুপ করে থাকলে কমলা ফের বলল, তুই এভাবে বললে, তোকে সবাই বাঙাল বলবে। কলকাতার কথা মনে হলেই কোন রাজার দেশের কথা মনে হয়। কত বড় বড় সব প্রাসাদের মতো হাজার হাজার বাড়ি, গাড়ি, ঘোড়া, দুর্গ, র‍্যামপার্ট, জাদুঘর, হাওড়া ব্রীজ, এসব ভাবতে ভাবতে সে একটা গোটা সাম্রাজ্যের কথা ভেবে ফেলে। রাজা পৃথ্বীরাজের কথা মনে হয়। রাজা জয়চন্দ্রের কথা মনে হয়। স্বয়ম্বর সভার কথা মনে হয়। সে যে কোন বন-উপবনে তার ঘোড়া লুকিয়ে রেখেছে। রাজকন্যা দেউড়িতে এসে মূর্তিতে মাল্যদান করলেই ঘোড়ার পিঠে তুলে সে দ্রুত ছুটবে আর কেন জানি দৃশ্যটাতে একটা সাদা ঘোড়া, ঘোড়ার পিঠে সে এবং তার পিছনে অমলা বসে রয়েছে। সে যেন অমলাকে নিয়ে নদী বন মাঠ পার হয়ে জ্যাঠামশাই-র নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজতে যাচ্ছে। সোনা এবার পাশের মানুষটির দিকে মুখ তুলে তাকাল। তিনি চুপচাপ নিরীহ শান্ত মানুষের মতো বসে আছেন।

    সোনা বলল, অমলা, তুমি ঘোড়ায় চড়তে জান না?

    কমলা বলল, এই ত বেশ কথা বলতে পারিস্।

    সোনা বলল, আমার জ্যেঠিমা কলকাতার ভাষায় কথা বলে।

    —তাহলে তুই এতদিন বলিসনি কেন?

    —আমার লজ্জা লাগে।

    কমলা বলল, দিদি খুব ভালো ঘোড়ায় চড়া শিখেছে; ঘিরিদরপুরের মাঠে সকাল হলেই ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে যায় দিদি।

    সোনা চুপচাপ। বাড়ি বাড়ি ঠাকুর দেখে ফের মাঠের পাশ দিয়ে বড় মাঠে নেমে যাওয়া। মাঠময় সাদা জ্যোৎস্না, পাশে নদীর চর, কাশ ফুল। অস্পষ্ট নদীর জল, আকাশে অজস্র নক্ষত্র। তার প্রতিবিম্ব নদীর জলে। ঘোড়া সেই সাদা জ্যোৎস্নায় ছুটছে। ওদের গলায় ঘণ্টা বাজছিল। আশ্বিনের কুকুর সেই ঘণ্টার শব্দে নেচে নেচে পিছনে আসছে। ওরা মাঠের ভিতর নেমে যেতেই ওপারের বাঁশবন থেকে কিছু পাখি উড়ে আসছে মনে হল। ওরা গাড়িতে বসে রয়েছে। বড় বড় পাখি সাদা জ্যোৎস্নায় উড়ে উড়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আর কক্ কক্ করে ডাকছে। কেমন ভয়াবহ মনে হল। অজস্র পাখি এই রাতে যেন বিশ্ব চরাচরে উড়ে উড়ে কিসের নিমিত্ত শোক জ্ঞাপন করছে।

    তখনই মনে হল নদীর চরে একটা ঘূর্ণি ঝড় উঠেছে। রাশি রাশি কাশফুল হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। পাখিগুলি বনের ভিতর হারিয়ে গেল। পাখিদের আর কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু কাশফুলের রেণু, অজস্র রেণু প্রায় তুষারপাতের মতো ওদের ওপর এখন ঝরে পড়ছে।

    কমলা বলল, সোনা, চোখ বন্ধ কর। কাশফুলের রেণু চোখে পড়লে অন্ধ হয়ে যাবি।

    সোনা চোখ বুজে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে, সবাই চোখ বুজে বসে থাকল। যতক্ষণ তুষারপাতের মতো এই কাশের রেণু পড়া বন্ধ না হচ্ছে ততক্ষণ ওরা চোখ বুজে থাকবে। অমলা না বললে গাড়ি ঘুরবে না বাড়ির দিকে। অমলা সোনাকে একটা আশ্চর্য ছবি দেখাতে এনেছে। সে জ্যোৎস্নায় তার ঘড়ি দেখল। স্টিমার আসার সময় হয়ে গেছে। স্টিমারের আলো এই মাঠে যখন পড়বে, ডানদিকে অথবা বাঁদিকে আলোটা যখন পাশের ডাঙা, নদীর চর খুঁজবে তখন মাঠে পাখিগুলির শরীরেও আলো পড়বে। অদ্ভুত মায়াবিনী এক রহস্যময় দৃশ্য ফুটে ওঠে তখন। উজ্জ্বল আলোর ভিতর পাখিদের চোখ, নীলাভ চোখ, সাদা ডানা এবং হলুদ রঙের পা যেন গভীর নীলজলে অজস্র মাছের মতো, একটা ঘূর্ণিস্রোতে মাছগুলি ঘুরে ঘুরে নেমে আসছে—অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আবার ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে। কী এক নেশায় পেয়ে যায়। দাঁড়িয়ে কেবল দেখতে ইচ্ছা হয়—প্রায় ছায়াছবির মতো ঘটনাটা। সোনাকে সে সেই দৃশ্য দেখাতে এনেছে। স্টিমারের আলো দূর থেকে দেখলেই পাখিগুলি জঙ্গলের ওপরে চক্রাকারে উড়তে থাকে।

    অমলা চোখ বুজেই বলল, সোনা, তোকে আমরা আজ কত খুঁজেছি।

    সোনা কিছু বলল না। সে এবার চোখ খুলে তাকাল। আর দেখল সকলেই কেমন সাদা হয়ে গেছে। সে কাউকে চিনতে পারছে না। ওরা যেন সবাই গল্পের দেশের মানুষ হয়ে গেছে। অথবা সেই যে, সে একটা ছবির বই দেখেছিল—ইংরেজি ভাষায় ছোটদের গল্পের বই, কেবল পাইন গাছ, গাছে গাছে বরফ পড়েছে, এক বৃদ্ধ সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, ছোট এক বালক দাঁড়িয়ে আছে হাত ধরে, ওদের পোশাকের ওপর, মাথায় বরফের কুচি পড়ে সাদা হয়ে গেছে—সে যেন তেমনি। সে একা কেন হবে, সকলে। জ্যাঠামশাই চোখ খুলছেন না, সোনা বললেই চোখ খুলবেন—তিনি সেই বুড়ো মানুষ হয়ে গেছেন। এতক্ষণ শুধু ঘোড়া দুটোই সাদা ছিল, এখন ঘোড়া, গাড়ি, রামসুন্দর, জসীম সকলে তার সেই গল্পের দেশের মানুষ। আশ্বিনের কুকুর পর্যন্ত সাদা হয়ে গেল।

    তখনই সোনা দেখল এক আশ্চর্য আলো চারপাশের আকাশ, নদী, নদীর চর, কাশবন এবং মাঠের সব গাছপালা আলোকিত করে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সোনা চিৎকার করে উঠল, ঐ আলো ইস্টিমারের আলো।

    সকলে চোখ মেলে সেই আলো দেখল। ওদের গাড়িতে এসে আলো পড়েছে। বলা যায় হাজার ডে-লাইট যেন জ্বেলে দেওয়া হয়েছে সর্বত্র, সেই আলোতে আবার বন থেকে পাখিরা উড়ে এসেছে। ওরা সাদা হয়ে গেছে, মাঠে সাদা জ্যোৎস্না, সাদা পাখি এবং নীলাভ চোখ, সোনা আপলক দেখছে, দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যাচ্ছে। পাগল মানুষ নিজেকে দেখছেন। সে কি সহসা পলিনের দেশে চলে এসেছে! এত কাশফুল তুষারপাতের মতো, চারপাশে সাদা–আর নীলাভ চোখ পাখিদের। জ্যাঠামশাই সেই পাখিদের ধরার জন্য কেমন লাফ দিয়ে নামতে চাইলেন। জসীম বুঝতে পেরে বলল, এবারে গাড়ি ফিরাতে হয় খুকুরানী।

    রামসুন্দর বলল, তাই হয়।

    কিন্তু অমলা কিছু বলছে না। ঘূর্ণিঝড় এসে ওদের এমন একটা গল্পের দেশের মানুষ করে দিয়ে যাবে সে নিজেও তা ভাবতে পারেনি। সে বলল, সোনা কী দেখছিস?

    —পাখি দেখছি।

    —আলো দেখছিস না?

    —দেখছি।

    —আর কি দেখছিস?

    সোনা বলল, ইস্টিমার।

    কিন্তু অমলা পাগল মানুষকে কিছু বলছে না বলে কেমন ক্ষেপে যাচ্ছেন তিনি। তিনি কী বলতে যাচ্ছিলেন, তখনই মনে হল কী যেন একটা অতিকায় জীব উঠে আসছে চর থেকে। প্রথমে ওরা কিছুই বুঝতে পারেনি, একটা সাদা রঙের জীব, প্রায় হাতির মতো উঁচু লম্বা, এই মাঠের দিকে উঠে আসছে। সোনা এবং সবাই হতবাক হয়ে দেখছে। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, ওটা কী জসীম! ওটা কী উঠে আসছে! আলোটা এতক্ষণে সরে গেছে। কিন্তু সকলের আগে পাগল মানুষ চিনতে পেরেই লাফ দিয়ে নেমেছেন—সেই হাতি, কাশফুলে সাদা হয়ে গেছে—সেই অজস্র বন কাশের। ফুলে ফুলে হাতিটা পর্যন্ত সাদা হয়ে গেছে। এবং শেকল ছিঁড়ে সে ছুটে পালাচ্ছে। অথবা জসীম ওর কাছে যায়নি বলে সে জসীমের জন্য এই মাঠে চলে এসেছে।

    সোনা তাড়াতাড়ি নেমে জ্যাঠামশাইর হাত চেপে ধরল। সে এ-ভাবে ধরলে তিনি কোথাও যেতে পারেন না। অথচ চোখে কী মিনতি তাঁর। তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও। হাতিতে চড়ে আমি আবার কোথাও চলে যাব।

    সোনা পাগল মানুষের হাত ছাড়ল না। জসীম বলল, আমি চলি রে, ভাই। সেই রামসুন্দরকে বলল, আবার লক্ষ্মী আমার খেইপা গেছে। বলে সে লাফ দিয়ে নামল এবং হাতিটা যেদিকে ছুটে যাচ্ছে ক্রমে সে চিৎকার করতে করতে সেদিকে ছুটে গেল। আর ওরা দেখল জসীমের ডাক শুনেই হাতিটা কেমন সাদা জ্যোৎস্নায় পলকে থেমে গেছে, থেমে দাঁড়িয়ে আছে আর দুলে দুলে শুঁড় নাড়ছে।

    সোনা বলল, জ্যাঠামশাই, আমি বড় হলে আপনাকে নিয়ে কলকাতা চলে যাব। আপনি এখন গাড়িতে ওঠেন।

    এই শুনে মণীন্দ্রনাথও একেবারে শান্ত হয়ে গেলেন। চুপচাপ হাতিটা দেখতে দেখতে মগজের ভিতর নিরন্তর যে ছবি পোরা আছে তা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠতে দেখলেন—যেন সেই নদীর জলে ময়ূরপঙ্খী ভাসে, দুর্গের গম্বুজে পাখি ওড়ে এবং হুগলী নদীর দু-পাড়ে চটকলের সাইরেন—আর তখন ইডেনের নীল রঙের প্যাগোডার নিচে পলিন তাকে পাশে নিয়ে বসে থাকে। হাতে হাত রেখে বলে—তুমি অনেক বড় হবে মণি। বাবা তোমার কাজে খুব খুশি। বাবাকে বলে তোমার বিলেত যাবার ব্যবস্থা করব। একবার ঘুরে এলেই তুমি কত বড় হয়ে যাবে, আরও বড় কাজ পাবে। কার্ডিফে আমাদের বাড়ি আছে। ক্যাসেলের গা ঘেঁষে ছোট্ট ব্রীজ, তারপর রাউদ ইঞ্জিনিয়ারিং ডক এবং দূরে এক পাহাড়ের মাথায় লাইট হাউস। গ্রীষ্মের বিকেলে তুমি আমি লাইট হাউসের নিচে বসে থাকব। সমুদ্র দেখব। আমরা জাহাজে যাব, জাহাজে ফিরে আসব, মাই প্রিন্স। শুধু তুমি রাজি হলেই হয়ে যাবে।

    এবং ঠিক তক্ষুনি অমলা এসে সোনার পাশে বসেছে। ওর শরীর থেকে কাশফুলের রেণু তুলে দিতে দিতে ওকে জড়িয়ে ধরেছে। কানে কানে কি বলছে। এই মেয়ের মুখ দেখলেই পলিনের অনুভূতি পাগল মানুষের মাথায় ফিরে ফিরে আসে—যেন, তাঁর সামনে ছোট পলিন, তিনি যে এখন কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না—কারণ পলিন ওকে সন্ত মানুষের মতো হতে বলছে। পলিন সে রাতে অধীর আগ্রহে পিয়ানো বাজাচ্ছিল। উজ্জ্বল সাদা রঙের সিল্কের গাউন পরেছিল পলিন। ওর চাঁপা ফুলের মতো নরম আঙুল কী দ্রুত চলছে! অধীর উন্মত্ত এক ইচ্ছা—সে রাতে পলিন সারারাত ঘুমোতে পারেনি, আমাকে বাড়ি যেতে হবে পলিন। বাবা টেলিগ্রাম করেছেন। বাবা বড় অসুস্থ। এ যাত্রায় তোমার সঙ্গে আমার বুঝি যাওয়া হল না। তারপর কী, তারপর আর ভাবা যাচ্ছে না—আবার সব ঘোলা ঘোলা অস্পষ্ট। পাগল মানুষ কিছুতেই আর বাকিটা মনে করতে পারলেন না।

    অমলা এবার আরও কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলল, কাউকে বলিসনি তো?

    সোনা কেমন বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। জসীম হাতি নিয়ে পিছনে ফিরছে। রামসুন্দর বাড়ির দিকে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে দিয়েছে। ওরা হাতি নিয়ে ঘোড়া নিয়ে মিছিল করে রাজার মতো ফিরছে।

    —তুই না সোনা, কিছু বুঝিস না।

    তখনই পাগল মানুষ এক রহস্যময় কবিতা আবৃত্তি করতে থাকলেন—

    Still still we hear her tender taken breath And to
    live ever or else swoon to death, death, death,
    death-

    বার বার পুনরাবৃত্তি—ডেথ, এবং ঘোড়ার পায়ের শব্দ ক্লপ ক্লপ। হাতিটা সকলের পিছনে আসছে। আশ্বিনের কুকুর সকলের আগে যাচ্ছে। মাঝখানে দুই সাদা ঘোড়া, গাড়ি, প্রাসাদে যেন রাজা ফিরছেন। নিজেকে আজ সোনার উপকথার নায়কের মতো মনে হচ্ছে।

  • সাতাশ

    সাতাশ

    সকাল থেকেই বিসর্জনের বাজনা বাজছে। দেবীর চোখে মুখে বিষণ্ণতা। তিনি আবার হিমালয়ে যাচ্ছেন। আগমনী গান যে যার গাইবার এতদিন গেয়েছে। এবারের মতো আর গাইবার কিছু নেই।

    এইদিন সব কিছুতেই একটা বেদনার ছাপ। এত যে রোদ ঝিলিমিলি আকাশ, এত যে উজ্জ্বল দিন, কোথাও মালিন্য নেই—তবু কী যেন সকলের হারিয়ে যাচ্ছে। এই মণ্ডপের সামনে সকলেই এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। বড় হুজুর সকাল থেকেই নাটমন্দিরে একটা বাঘের চামড়ার উপর বসে আছেন। পরিধানে রক্তাম্বর। কপালে রক্ত চন্দনের তিলক। এই দিনে–মা ভুবনময়ী, ভুবনমোহিনী, হে মা জগদীশ্বরী, তুই একবার নয়ন ভরে তাকা মা, হেন্ন প্রার্থনা এই মানুষের।

    মেজবাবু এবারেও প্রতিবারের মতো ফ্রুট বাজাবেন। নগেন ঢালি এসেছিল ঢোল নিয়ে। সে গতকাল হাটে বাজারে গঞ্জে ঢোল পিটিয়ে চলে এসেছে।

    গ্রাম গ্রামান্তরে এই খবর রটে গেলে চাষী বৌ’র মুখের রঙ বদলে যায়। সকাল সকাল খেয়ে নিতে হবে। শীতলক্ষ্যার তীরে গাঁ। জমিদারবাবুদের সব দালানকোঠা নদীর পাড়ে পাড়ে। আঁচলে একটা চৌ-আনি বেঁধে, পানে ঠোঁট রাঙা করে মাথায় ঘোমটা টেনে দশরায় যাবে, যাবার আগে দীঘির পাড়ে বসে মেজবাবুর ফ্রুট বাজনা শুনবে। সকাল সকাল বের না হতে পারলে জায়গা পাওয়া যাবে না। নদীর পাড়ে পাড়ে যেসব গাছ আছে, সেসব গাছের নিচে রাত থাকতেই লোক এসে জমতে শুরু করেছে। চাষী মানুষেরা অথবা বৌ-রা সামিয়ানার নিচে যেতে পারবে না। কাছ থেকে দেখবে মেজবাবুকে এমন শখ এইসব চাষী বৌয়ের। কিন্তু সিপাইগুলি এমন করে, লাঠি নিয়ে তাড়া করে, কার সাধ্য ওরা সামিয়ানার নিচে গিয়ে বসে। কতবার চাষী বৌ ভেবেছে লুকিয়ে চুরিয়ে সে চলে যাবে সামিয়ানার নিচে, কাছ থেকে দেখবে মেজবাবুকে, ফ্রুট বাজনা শুনবে—কিন্তু তার মানুষ বড় ভীরু, সে কিছুতেই তার বৌকে ভিতরে ঢুকতে দেবে না। একটা ঝাউগাছের নিচে বসে ওরা বাবুর ফ্রুট বাজনা শুনবে। যতক্ষণ না নদীর জলে, সব গ্রামের প্রতিমা বিসর্জন হবে, ততক্ষণ মেজবাবু ক্রমান্বয়ে ফ্রুট বাজিয়ে যাবেন। একের পর এক সুর, সবই তখন বড় করুণ মনে হয়, নিরিবিলি এক জগৎ সংসারে কী যে কেবল বাজে, প্রাণের ভিতর কী যে বাজে—ফুট শুনতে শুনতে তারা অন্য গ্রহের মানুষ হয়ে যায়।

    সকাল থেকেই জায়গা নেবার জন্য দূর গ্রামান্তর থেকে লোকজন আসতে আরম্ভ করেছে। আমলা কর্মচারীদের কাজের বিরাম নেই। মঞ্চ করা হয়েছে। দীঘির পাড়ে এক মঞ্চ, রোশনচৌকি যেন বাজাবে সেখানে। সে মঞ্চে তিনি শীতলক্ষ্যার ও-পারে সূর্য ঢলে পড়লেই উঠে যাবেন। কলকাতা থেকে তাঁর আরও দু’জন শিষ্য এসেছে। ওরা বাজাবে। এখন খালেক কোথায়! খালেক পীড়িত। কাছারিবাড়ি পার হলে এক অশ্বশালা আছে, কিছু ঘোড়া আছে, সাদা রঙের, কালো রঙের ঘোড়া সেখানে। আস্তাবলের এক পাশে খালেকের ছোট ঘর। আলো নেই, বাতাস আসে না। সূর্য দেখা যায় না। খালেক সেই ঘরে শীর্ণকায় মানুষের মতো অনাহারী দুঃখী এবং চোখেমুখে ক্লিষ্ট এক ভাব। খালেক মিঞা শরীর শক্ত করে পড়ে আছে। খালেক আজই সূর্যাস্তের সময় মারা যাবে। সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। হাত পা স্থবির। পাষাণের মতো ভারী লাগছে সব। দশমীর দিন সেও ফ্রুট বাজায়। সেও মেজবাবুর পাশে বসে থাকে। আজ সে তার আঙুলগুলি এইদিনে নেড়ে নেড়ে দেখতে চাইছে—পারছে না। ভারী ভারী—পাষাণের মতো ভারী। ইব্রাহিম একবার দেখে এসেছে। ভূপেন্দ্রনাথ দু’বার দেখে এসেছেন। ওষুধ বা পথ্য সে কিছুই খাচ্ছে না। সে টের পেয়ে গেছে সূর্যাস্তের সময় ফ্লুট বাজালেই সে এক অদ্ভুত সুরলহরীর ভিতর ডুবে যেতে যেতে পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখ ভুলে যাবে। সে মরে যাবে। তবু সে এই দুঃসময়ে এটা তার দুঃসময় কী সুসময়, সে মনে মনে এটা সুসময় জানে, সে যেন কার পদতলে বসে সারাজীবন ফ্লুট বাজাবে, তার জন্য তৈরি হচ্ছে।

    যখন একটা মানুষ মরে যাবে বলে চিৎপাত হয়ে অশ্বশালার পাশে পড়ে আছে তখন একজন মানুষ, আদ্যিকালের এক তালপাতার পুঁথি সামনে রেখে পড়ে চলেছেন—জয়ং দেহি, যশো দেহি। এই মানুষ মহালয়ার চণ্ডীপাঠ করেন না। বিসর্জনের দিন চণ্ডীপাঠ। এমন উল্টো ব্যাপার ভূ-ভারতে কবে কে দেখেছে। তিনি পদ্মাসন করে বসেছেন। বাঘছালের উপর বসে। সামনে দেবীপ্রতিমা। বিসর্জনের বাজনা বাজছে। তিনি উচ্চৈঃস্বরে বললেন, হে জগদম্বে, হে মা ঈশ্বরী, বলে সুর ধরে যেন বলে চললেন, অপরাধ ক্ষমা করতে আজ্ঞা হয় মা। তুই আজ চলে যাবি, অ মা উমা, এই বুঝি তোর ইচ্ছা ছিল, বলে শিশুর মতো করজোড়ে তিনি কাঁদতে থাকলেন। এবং কাঁদতে কাঁদতে তিনি মহিষাসুর বধে চলে এলেন। দেবীর গা থেকে কী তেজ বের হচ্ছে! শরীরে কাঁটা দিয়েছে। কি গ মা, তুই ভয় পেলি, তিনি পাঠ করতে করতে মাঝে মাঝে এইসব স্বগতোক্তি করছেন।—হে মা, তুমি এখন মধু পান কর। থেমে তিনি বললেন, মধু পান নিমিত্ত শরীরে অপার শক্তি সঞ্চয় করেছ—যা দেবী সর্বভূতেষু, দেবী তোমার নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে হাজার দেবসৈন্য সৃষ্টি হচ্ছে, তারা যে সব মুহূর্তে বিনাশ হয়ে গেল মা। মহিষাসুর নিমেষে সব ধ্বংস সাধন করছে। মা, তোর বুঝি এই কপালে ছিল, মায়াপাশে আবদ্ধ করতে পারলি না! বলে তিনি যেসব ভক্ত পাশে বসে চণ্ডীর ব্যাখ্যা শুনছিল, তাদের ব্যাখ্যা করার সময় দেখলেন, এক বালক নাটমন্দিরের পশ্চিমের বারান্দায় বড় একটা থামের আড়ালে ঈশমের গল্পের মতো মনোযোগ দিয়ে চণ্ডীপাঠ শুনছে। সেই এক কিংবদন্তী, গর্জে গর্জে কে গর্জন করছে. দেবীর গর্জন, না অসুরের!

    এই বৃহৎ সংসারে তিনিই সব। অমলার ঠাকুরদা প্রভাবশালী মানুষ। একমাত্র দেবীর সামনে এসে তিনি শিশু বনে যান। শিশুর মতো কাঁদেন। কেবল ক্ষমাভিক্ষার মতো মুখ। সেই মুখে, চণ্ডীপাঠের সময় গর্জে গর্জে এমন শব্দ উচ্চারণে সোনা হেসে ফেলেছিল। তক্ষুনি চিৎকার। যেন গোটা বাড়িটা কাঁপছে। সকলে ছুটে এসেছে।—কে হাসে! সোনা পালিয়ে যাবে ভেবেছিল! কিন্তু চক্ষু রক্তবর্ণ, নাসিকা ঈগল পাখি প্রায়, কপালে রক্তচন্দনের ফোঁটা এবং কাপালিক সদৃশ মুখ—ক্ষণে ক্ষণে মুখের কী পরিবর্তন—সোনা আর নড়তে পারেনি। বললেন, অঃ তুই। দেবীমহিমা শুনতে ভালো লাগছে!

    সোনা ঘাড় কাৎ করে দিল।

    —তবে দাঁড়া!

    সোনা একটা থামের মতো দাঁড়িয়ে থাকল।

    অনেকক্ষণ পরে হুঁশ হল কমলা ওকে পিছন থেকে চুপি চুপি ডাকছে।—সোনা, এখানে কী করছিস!

    সে বলতে পারল না চণ্ডীপাঠ শুনছে। ঋষি পুরুষেরা নানারকম কিংবদন্তী লিখে গেছে তালপাতার পুঁথিতে, এখন সে সবই দেবীমহিমা হয়ে গেছে। ওর কাছে প্রায় সবটাই ঈশমের সেই যে এক সূর্য আছে না, জলের নিচে এক রূপালী মাছ আছে, মাছটা সূর্য মুখে অথবা সেই মাছটা কী জালালি? যে কেবল বিল পার হয়ে নদী পার হয়ে সাগরে চলে যায় সূর্য মূখে। সকাল হলেই পুবের আকাশে সূর্যটাকে লটকে ডুব দেয় ফের। সাগরে সাগরে মহাসাগরে ঘোরাফেরা তার।

    সে বলতে পারত, ঋষি পুরুষেরা কিংবদন্তী লিখে গেছে তালপাতার পুঁথিতে। আমি তাই শুনছি। বলতে পারত, আমাদের ঈশম ওর চেয়ে অনেক বেশি ভালো কিংবদন্তী জানে। সে ভাবল, বড় হলে তালপাতার পুঁথিতে সেও তা লিখে রাখবে। সুতরাং সে চণ্ডীপাঠ শুনছে, না কিংবদন্তী শুনছে পুরাকালের, এখন এই মেয়ে কমলাকে তা প্রকাশ করতে পারল না।

    সোনা কিছু বলছে না দেখে ফের কমলা বলল, পাঁচটায় হাতি আসবে। হাতিতে আমরা দশরা দেখতে যাব। তুই আমাদের সঙ্গে যাবি।

    সোনা বস্তুত এখন জ্যাঠামশাই-র সেই কালরাত্রি, মহারাত্রি বলা যেতে পারে—জালালিকে তুলে আনছেন বিলের পাড় থেকে এমন একটা দৃশ্য দখতে পাচ্ছে। জ্যোৎস্না রাত, শীতে পাগল জ্যাঠামশাই-র মুখ সাদা ফ্যাকাসে—ঠিক জ্যোৎস্নার মতো রঙ, এখন সোনার এসব মনে হওয়ায় সে কমলার কথা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।

    —এই শুনছিস আমি কি বলছি?

    —কী?

    —আমাদের সঙ্গে হাতির পিঠে দশরা দেখতে যাবি?

    —যাব।

    —একটু সকাল সকাল ভিতরে চলে আসবি। আমরা তোকে সাজিয়ে দেব। পাউডার মেখে দেব। সোনা হাঁটতে থাকল।

    —কি রে, মনে থাকবে ত?

    সে ঘাড় কাৎ করে বলল, মনে থাকবে তার। তারপর বলল, আর কে কে যাবে?

    —আমি, দিদি, সোনাদি, রমা, বাচ্চু।

    —আর কেউ যাবে না?

    —আর কে যাবে জানি না। তুই কিন্তু আগে আগে চলে আসবি। মুখে তোর পাউডার মেখে দেব। সোনা তার এই বয়স পর্যন্ত মুখে পাউডার মাখেনি। সে বেটাছেলে। বেটাছেলে পাউডার মাখে না, বাড়িতে এমন একটা নিয়ম আছে। মা জ্যেঠিমা কদাচিৎ মুখে পাউডার মাখেন। সে পাউডার মাখতে প্রায় দেখেইনি বললে চলে। দূর দেশের আত্মীয়-বাড়িতে যেতে হলে হেজলিন স্নো মেখেছে, শতীকালে মা তার মুখে স্নো মাখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই গরমের সময় সে পাউডার মাখবে এবং ওর মুখ আরও সুন্দর দেখাবে ভাবতেই লজ্জায় গুটিয়ে গেল।

    সে বলল, জ্যাঠামশয় যাবে না?

    —না।

    —জ্যাঠামশয় না গেলে আমিও যাব না।

    —তুই কি রে, সোনা! যারা ছোট তারাই যাবে। বড়রা হেঁটে যাবে। ঠাকুমা তোকে নিয়ে যেতে বলেছে। এই বলে যেমন দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নেমে এসেছিল তেমনি দ্রুত উপরে উঠে গেল। সিঁড়ির মুখে অমলা দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, কি রে, পেলি সোনাকে?

    —হ্যাঁ।

    —কী বলল?

    —বলল, যাবে।

    —বলেছিস তা সকাল সকাল আসতে। পাউডার মেখে দেব মুখে, বলেছিস?

    —সব বলেছি। তুই না দিদি…, কি বলতে গিয়ে থেমে গেল। বাবা এদিকে আসছেন। বাবা দশমীর দিন ধুতি-চাদর পরে একেবারে বাংলাদেশের মানুষ হয়ে যান। তারপর কলকাতায় যাবার দিন এলেই ‘একেবারে সহেবসুবো মানুষ। তখন তিনি বাংলাতে পর্যন্ত কথা বলেন না। তখন বাবাকে বরং বেশি পরিচিত মানুষ মনে হয় ওদের। ওরা বাবার সঙ্গে সহজেই তখন কথা বলতে পারে।

    কিন্তু এখন ওরা পালাবার পথ খুঁজছিল। এই অসময়ে ওরা নাটমন্দিরের কাছে চলে এসেছে—এটা ঠিক না। দেখলেই বাবা ধমক দেবেন। সুতরাং ওরা যতবারই সোনাকে কাছারিবাড়ির দিকে খুঁজতে গেছে, খুব সন্তর্পণে গেছে। এমনকি অন্দরের দাসী-বাঁদীদের চোখও যেন না পড়ে। প্রায় লুকোচুরি খেলার মতো চলে যাওয়া, তারপর সোনাকে না পেলে বিমর্ষ হয়ে ফিরে আসা।

    বাবা এখন করিডর পার হয়ে যাচ্ছেন, ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেবেন। বাবার ঘরটা বাবা না থাকলে সবসময় তালা দেওয়া থাকে। বড় বড় আলমারি—কত বই সব এবং কাচের জানালা দরজায় নানা-রকমের কারুকাজ। বাবার ঘরে পুরানো আমলের লম্বা আবলুস কাঠের খাট এবং পালঙ্ক বলা চলে, কতকাল থেকে পালঙ্ক খালি। বাবা এলে এই পালঙ্কে না শুয়ে ছোট একটা তক্তপোশে শুয়ে থাকেন। ডানদিকের ঘরটাতে বিলিয়ার্ড টেবিল। অবসর সময় বাবা একাই টেবিলে লাল-নীল রঙের বল নিয়ে খেলা করেন। আর দেওয়ালে বাবার কোর্টের ছবি। গভর্নরের সঙ্গে বাবার ভোজ খাওয়ার ছবি। বিলাতে লিঙ্কন হলে পড়ার সময়কার ছবি। মায়ের সঙ্গে তোলা ফোটো—বোধহয় জায়গাটা ওয়েলসের কোনও একটা গ্রামের। মামাবাড়িতে যাবার সময় বড় একটা ক্যাসল পড়ে। একটা ক্যাসলের ছবিও এ-ঘরে রয়েছে। ছাত্রাবস্থায় বাবার সেই সতেজ মুখ দেখার জন্য দুই বোন চুরি করে এই ঘরে ঢুকে যায়। বাবার কাছে ধরা পড়লে দু’বোন ছুটে পালায়। সোনা বলেছিল, বাবার ঘরটা দেখবে। অমলা বলেছিল, দেখাবে। কিন্তু কী করে দেখানো যায়! সোনার বুদ্ধি নেই মোটেই। কেবল কথা বললেই হাসে। চুপি চুপি দেখে চলে যাবে তেমন সে নয়। এটা কি, এটা কেন, এই লাল-নীল রঙের বল দিয়ে কী হয়! আমি দুটো বল নেব। অথবা সে ওসব দেখতে দেখতে এমন অন্যমনস্ক হয়ে যাবে যে, ধরা না পড়ে যাবে না। সোনা এমন ছেলে যে, ওকে নিয়ে কিছু করা যায় না। পালানো যায় না। সে বোকার মতো বার বার ধরা পড়ে যায়।

    সোনা তখন ভূপেন্দ্রনাথকে বলল, জ্যাঠামশয়, দশরাতে যামু। কমলা আমারে নিয়া যাইব। হাতিতে চইড়া যামু কইছে।

    দশমীর দিন এই হাতি আসে বিকেলে। জসীম জরির পোশাক পরে। মাথায় তার জরির টুপি। বাড়ির বালক এবং বালিকারা সকলে মিলে দশরা দেখতে যায়। হাতির শুঁড়ে শ্বেতচন্দনে ফুল-ফল আঁকা থাকে। কপালে কানপাতা এবং শরীরে নানারকমের কলকা আঁকা অথবা ধানের ছড়া এবং লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। গলায় কদম ফুলের মালা। যেই না মেজবাবুর ফ্রুট বাজনা আরম্ভ হবে, হাতিটা নিয়ে জসীম রওনা হবে পিলখানার মাঠ থেকে। তারপর সোজা অন্দরমহলের দরজায়। সেখানে হাতিটা দাঁড়িয়ে থাকবে। কপালে চাঁদমালা তার। তখন বাড়ির বৌরানীরা সোহাগ মেগে নেবে প্রতিমার। প্রতিমার পায়ে সিঁদুর ঢেলে নিজের নিজের কৌটায় পুরে রাখবে। সম্বৎসর এই সিঁদুর কপালে দেবে আর মেজবৌরানীর জন্যেও সিঁদুর আসে সোনার কৌটায়। সেটা মেজবাবু কলকাতা যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে যান। মেজবৌরানী কপালে সিঁদুর দেন না। লম্বা গাউন পরেন। গীর্জায় যান। তবু এক ইচ্ছা এই পরিবারের—বিশেষ করে বৌঠাকুরানীর অর্থাৎ মেজবাবুর মার মন আদৌ মানে না। তিনি সব বৌদের জন্য যেমন কৌটায় দেবীর পা থেকে সিঁদুর কুড়িয়ে রাখেন তেমনি মেজবৌরানীর জন্যও সিঁদুর কুড়িয়ে নেন। মেজবাবুকে দেবার সময় অনুরোধ করবেন একবার অন্তত সিঁদুরটা যেন কপালে ছোঁয়ায় বৌ! মেজবাবু তখন সামান্য হাসেন। তারপর যার জন্য দেবীর পা থেকে সিঁদুর সঞ্চয় করা—সে এই হাতি। সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী এই পরিবারের। দশমীর দিনে কপালে নিজ হাতে বৌঠাকুরানী সিঁদুর পরিয়ে দেন। চাঁদমালা পরিয়ে দেন। তারপরই বাজনা বাজে। ঢাকের বাজনা, বিসর্জনের বাজনা। পরিবারের সব বালক-বালিকা সেজেগুজে হাতিতে চড়ে বসে। প্রতিমা নিরঞ্জনের লোকেরা, জয় জগীদশ্বরী, জয় মা জগদম্বা আর জয় বাড়ির বড় হুজুরের—এইসব জয় দিতে দিতে প্রতিমা বের করে নিয়ে যায়। এইসব জয়ের ভিতর শোনা যায় মেজবাবু মঞ্চের উপর বসে ফ্রুট বাজাচ্ছেন। দক্ষিণের দরজা দিয়ে প্রতিমা যায়, উত্তরের দরজা দিয়ে হাতি যায়। আর মাঝখানে বড় চত্বর। তারপর দীঘি। দীঘির পাড়ে রোশনচৌকির মতো মঞ্চ, ক্রমান্বয়ে, এক সুরে বেজে চলেছে। নদীতে এক দুই করে প্রতিমা নামছে। ক্রমে সন্ধ্যা নামছে নদীর চরে কাশফুলের মাথায়। দশমীর চাঁদ আকাশে। আর ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। নৌকায় সারি সারি দেবী প্রতিমা, বিসর্জনের বাজনা, হৈচৈ আলো-আঁধারির খেলা। হাউই পুড়ছে আলো ফুটছে কত রকমের। থেকে থেকে মেজবাবুর ফ্রুট বাজনা। করুণ এক সুর এই বিশ্বচরাচরে অপার মহিমা নিয়ে বিরাজ করছে। মেজবাবু বুঝি এই সুরের ভিতর ফ্রুট বাজাতে বাজাতে স্ত্রীর ভালোবাসার জন্য কাঁদেন।

    আজ আবার সেইদিন এসে গেছে। নিত্যকার মতো ভূপেন্দ্রনাথ সকাল সকাল স্নান করে এসেছেন নদী থেকে। নিত্যকার মতো ময়ূরের ঘর, বাঘের খাঁচা এবং হরিণেরা যে যেখানে থাকে সেসব জায়গায় ভূপেন্দ্রনাথ ঘোরাঘুরি করছেন। সাফসোফ ঠিকমতো হয়েছে কি না, এসব যদিও ওঁর দেখার কথা নয়—তবু এতগুলি জীব এই প্রাসাদে প্রতিপালিত, প্রতি মানুষের মতো তাদের সুখ-দুঃখ বুঝে ভূপেন্দ্ৰনাথ নিজে দেখেশুনে সব বিধিমতো ব্যবস্থা করে থাকেন। তাছাড়া আজ দেবী চলে যাচ্ছেন হিমালয়ে। কি এক বেদনা সবসময় সকাল থেকে প্রতিবারের মতো ওকে বিষণ্ণ করে রাখছে। তারপর নিত্যকার মতো মঠের সিঁড়ি ভেঙে ভিতরে ঢুকে শিবের মাথায় জল, বৃষের পায়ে জল এবং শেকল টেনে এক দুই করে শতবার ঘণ্টাধ্বনি।

    খালেকের অসুখ। কুলীনপাড়া থেকে ডাক্তার এসে দেখে গেছে। আর এখন যারা বিদায় চাইছে, যেমন পুরোহিত এবং অন্য অনেকে, তারা এখন সবাই কাছারিবাড়িতে ভূপেন্দ্রনাথের অপেক্ষায় বসে আছে। তাছাড়া গত সন্ধ্যায় যারা কাটা মোষ নিয়ে গিয়েছিল তারা আসবে নতুন কাপড়ের জন্য। যে- সব প্রজাদের জমি বিলি করার সময় ঠিক ছিল মায়ের পুজায় পাঁঠা অথবা মোষ এবং দুধ-কলা, আনাজ যার যা কিছু ফসলের বিনিময়ে দেবার কথা—তারা তা দিয়েছে কি না, না দিলে তাদের ডেকে পাঠানো, এসব কাজও ভূপেন্দ্রনাথের জন্য পড়ে থাকে। আর এমন সব কাজের ভিতরে ভূপেন্দ্রনাথের দুপুর গড়িয়ে গেল। কিছুই আর তাঁর ভালো লাগছে না। বিষাদ-বিষণ্ণ প্রতিমার সামনে তিনি চুপচাপ অনেকক্ষণ একা একা দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বড়বৌ এবং ধনবৌর জন্য দেবীর পা থেকে সিঁদুর তুলে নিয়েছেন। আবার সেই নির্জনতা এই বাড়িকে গ্রাস করবে। এ ক’দিন কী ব্যস্ততা! কী সমারোহ! গোটা প্রাসাদ সারাদিন গমগম করেছে। আজ কারো কোনও ব্যস্ততা নেই। দীঘির চারপাশে সকলে জমা হচ্ছে।

    বিকেলেই জসীম হাতিটার পিঠে পিলখানার মাঠে চেপে বসল। তখন গরদের কাপড় পরছেন মেজবাবু। গরদের সিল্ক। হাতে হীরের আংটি। কালো রঙের পাম্পশু জুতো। মেজবাবু তাঁর ঘর থেকে বের হচ্ছেন। তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন। আগে পিছনে পরিবারের আমলা কর্মচারী। আতরের গন্ধ সকলের গায়ে। সবার আগে ভূপেন্দ্রনাথ, পরে রক্ষিতমশাই এবং সকলের শেষে বাবুর খাস খানসামা হরিপদ। যেন একটা মিছিল নেমে যাচ্ছে দক্ষিণের দরজায়। ওরা নেমে এল নাটমন্দিরে। এখানে মেজবাবু গড় হলেন। দেবীর পায়ের বেলপাতা অঞ্জলির মতো করে হাতে তুলে নিলেন। ওরা বড় বড় থামের ওপাশে এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেলে সোনার মনে হল, দেবী এখন ওর দিকে তাকিয়ে নেই। দেবী তাকিয়ে আছেন ওদের দিকে। চোখমুখ কাঁপছে। ঘামের মতো মুখটা চকচক করছে। সে আরও কাছে এল। দুর্গাঠাকুরের চোখে জল পড়ছে কি না দেখার জন্য একেবারে মণ্ডপের ভিতর ঢুকে গেল।

    সে প্রথম সিংহটাকে একবার ছুঁয়ে দেখল। দীঘির পাড়ে সকলে এখন যে যার জায়গা নিচ্ছে বলে কেউ আর মণ্ডপে নেই। এই সময়, সুসময়ও বলা চলে, একবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা দেবীকে, অসুর অথবা সেই বাচ্চা ইঁদুরটাকে। গণেশের পায়ের কাছে যে একটা কাঁটালতায় বসে আছে। সে সিংহের মুখে প্রথম হাতটা ভরে দিল। অসুরের বুক থেকে যে রক্ত এ ক’দিন গড়িয়ে পড়েছে সেটা হাত দিয়ে দেখল—কেমন শুকনো হয়ে গেছে রক্তটা। এবং সিংহটা খাবলা খাবলা মাংস তুলে নিয়েছে। ওর কেন জানি এই অসুরের জন্য মায়া হল। সে অসুরের মাথায় হাত দিয়ে কোঁকড়ানো চুলে আদর করার মতো দাঁড়িয়ে থাকল। এবার মজা দেখাচ্ছি। সিংহটার চোখে সে একটা চিমটি কেটে দিল। কিছু রং উঠে এল নখে। দেবীর মহিমায় সিংহটা সোনাকে ভয় পাচ্ছে না। সে এবার উঁকি দিয়ে দেবীর চোখ দেখল, জল পড়ছে। তা তোমার এত কষ্ট যখন থেকে গেলেই হয়। দেবীর সঙ্গে কথা বলতে চাইল মনে মনে। ওর ভয় ছিল, কাছে গেলেই দেবী রাগ করবে। কিন্তু কী ভালোবাসার চোখ। সে বলল, তা তোমার এমন জীব কেন বাহন মা। আমি ওকে সুড়সুড়ি দেব নাকে। এই বলে সে ছোট একটা কাঠি যেই না নাকের কাছে নিয়ে গেছে অমনি এক শব্দ হ্যাচ্চো। কেউ নেই আশেপাশে—অথচ হ্যাঁচ্চো দিল কে। সিংহটা সত্যি তবে হাঁচি দিল! সে থতমত খেয়ে ছুটে পালাতে গিয়ে দেখল পাগল জ্যাঠামশাই মণ্ডপের সিঁড়িতে। তিনি হাঁচি দিয়েছেন। পাগল মানুষের ঠাণ্ডা লাগে না। সোনা এই প্রথম জ্যাঠামশায়ের ঠাণ্ডা লাগায় ভাবল তিনি তবে ভালো হয়ে যাচ্ছেন। সে জ্যাঠামশাই-র হাত ধরে বলল, আমি হাতিতে চড়ে দশরা দেখতে যাব।

    দীঘির পাড়ে তখন মেজবাবু ফ্রুট বাজাচ্ছেন। সোনার মনে হল ওর দেরি হয়ে গেছে। সে পাগল জ্যাঠামশাইকে ফেলে কাছারিবাড়িতে ছুটে গেল। জামা-প্যান্ট বদলে নিতে হবে তাড়াতাড়ি।

    যারা প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য নাটমন্দিরে এসেছে তারা সবাই গামছা বেঁধেছে কোমরে। ওরা ঠাকুর কাঁধে নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। রামসুন্দর যাচ্ছে মাথায় ঘট নিয়ে। ঠাকুর নদীর চরে নামানো হবে। সেখানে আরতি হবে, ধূপধুনো জ্বলবে। বড়দা, মেজদা ঠাকুরের সঙ্গে নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। সে যেতে পারছে না। ওর জন্য অমলা কমলা বসে রয়েছে। সে যাবে হাতিতে।

    ভুপেন্দ্রনাথ সোনাকে জামা-প্যান্ট পরিয়ে দিল। মাথা আঁচড়ে দিল। সোনা আর দাঁড়াতে পারছে না। সে কোনওরকমে ছুটতে পারলে বাঁচে। সবাই সব নিয়ে চলে যাচ্ছে। ওর জন্য কেউ কিছু রেখে যাচ্ছে না।

    এখন রোদ নেমে গেছে। সেইসব হাজার হাজার লোক নদীর পাড়ে বসে পামগাছ অথবা ঝাউগাছের ছায়ায় নিবিষ্ট মনে ফ্রুট বাজনা শুনছে। হাজার হাজার মানুষ, মানুষের মাথা গুনে বলা কঠিন কত মানুষ—এসেই যে যার মতো জায়গা করে মেজবাবুর ফ্রুট বাজনা শুনতে বসে যাচ্ছে।

    অশ্বশালার পাশে এক মানুষ আছে—তার বুঝি ইন্তেকাল হবে এবার। সেও এক মনে, দু’হাত বুকের ওপর রেখে সেই সুরের ভিতর ডুবে যাচ্ছে। সে চিৎপাত হয়ে, গঞ্জে শহরে যেমন ফ্রুট বাজাত; তেমনি বুকের উপর দু’হাত নাড়ছে। সেও বুঝি শেষবারের মতো মেজবাবুর সঙ্গে মনে মনে ফুট বাজাচ্ছে। এমন আশ্বিনের বিকেলে এই পৃথিবীর বুকে সে ফ্রুট না বাজালে আর কে বাজাবে! সে দু’হাত অনেক কষ্টে উপরে তুলে রাখল। যথার্থই সে আজ ফ্রুট বাজাচ্ছে। তারপর হাত দুটো ওর ক্রমে অসাড় হয়ে যাচ্ছে। বুকের উপর হাত, চোখ বোজা—মানুষটার দুনিয়াতে কেউ নেই, আছে শুধু দুই ঘোড়া, এক ল্যাণ্ডো আর এক ফুট। সে চুরি করে মেজবাবু না থাকলে নিশুতি রাতে নদীর চরে একা বসে ফুট বাজাত। সে নানারকম সুরের ভিতর তন্ময় হয়ে থাকত। তেমনি আজও সে তন্ময় হয়ে যাচ্ছে। দীঘির পাড়, শীতলক্ষ্যার চর, নদী মাঠ সব যেন এই সুরের ভিতর হাহাকার করছে। সে মেজবাবুর ফ্রুট বাজনা শুনতে শুনতে চোখ বুজে, এক আল্লা, তার কোন শরিক নেই…শরিক নেই…নেই…সে আর শ্বাস নিতে পারছে না। অসহ্য এক যন্ত্রণা ভিতরে। সে হাত দুটো আর উপরে রাখতে পারল না। অবশ হয়ে আসছে সব। এক আশ্বিনের বিকেলে ক্রমে এভাবে সে মরে যাচ্ছে। কেউ খেয়াল করছে না।

    তখনই সোনা ছুটছিল। হাতিটা অন্দরে এসে গেছে। জসীম হাতির পিঠে বসে প্রতীক্ষা করছে নিশ্চয়। সবাই ওর জন্য হাতির পিঠে নদীর পাড়ে এখনও নেমে যেতে পারছে না। হাতি বুঝি ওকে ডাকছে! ফ্রুট বাজছে। দীঘির পাড়ে হাজার মানুষ। বিচিত্র বর্ণের মেলা। ইব্রাহিম কলের ঘরটাতে বসে আছে। সময় হলেই আলো জ্বেলে দেবে।

    সোনা তার পাগল জ্যাঠামশাইকে খুঁজতে গিয়ে দেরি করে ফেলেছে। যেন তার পাগল জ্যাঠামশাই, সে যা বলবে তাই শুনবেন। জ্যাঠামশাই দশরাতে চলে যাবেন একা একা। সে জ্যাঠামশাই-র সঙ্গে দশরাতে মেলা দেখবে। হাতির পিঠে বসে থাকবে না! ফেরার সময় দু’জন হেঁটে হেঁটে লাড্‌ডু খেতে খেতে ফিরে আসবে।

    কিন্তু জ্যাঠামশাই না দীঘির ঘাটে, না সেই সব মানুষের ভিতর। এদিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। হাতিটা অন্দরে দাঁড়িয়ে এখন শুঁড় নাড়ছে। কান দোলাচ্ছে। অমলা কমলা বিরক্ত হচ্ছে। জসীমকে হাতি ছাড়তে বারণ করে দিচ্ছে বুঝি। সে প্রাণপণে কাছারিবাড়ির মাঠ পার হয়ে এল! দারোয়ানদের ঘর অতিক্রম করে সেই নাটমন্দিরের উঠোন। সে এখানে এসে শ্বাস নিল! দেখল পকেটের পয়সাগুলি পড়ে গেল কি না ছুটতে গিয়ে। সে চোদ্দটা তামার চক্‌চকে পয়সা পেয়েছে। দশরা দেখার জন্য বৌরানীরা বাড়ির সব বালক-বালিকাদের মতো ওর হাতে একটা করে তামার পয়সা দিয়েছে। সে বলেছে, সে একা নয়। ওরা দু’জন। সে এবং তার পাগল জ্যাঠামশাই। সে পাগল জ্যাঠামশাই-র জন্য একটা একটা পয়সা গুনে ভিন্ন পকেটে রেখে দিয়েছে। মেলা দেখা হলেই জ্যাঠামশাইর পকেটে পয়সাগুলি দিয়ে দেবে। কিন্তু সে কোথাও জ্যাঠামশাইকে পেল না। ওঁকে খুঁজতে গিয়ে ওর এত দেরি হয়ে গেল। সে সিঁড়ি ভেঙে ছুটছে। ওর বড় দেরি হয়ে গেল। সে লম্বা বারান্দা পার হয়ে গেল। রান্নাবাড়ির পথে গেলে সে তাড়াতাড়ি দরজায় ঢুকে যেতে পারবে। ওরা ওর মুখে পাউডার মেখে দেবে—সে পাগল জ্যাঠামশাই-র ওপর মনে মনে ভীষণ রাগ করছে। মুখে ওর পাউডার মাখা হল না। ক্ষোভে ওর এখন কান্না পাচ্ছে। সবাই এখন নিশ্চয় উত্তরের দরজাতে আছে। সে অমলা কমলাকে তাদের ঘরে গিয়ে পাবে না ভাবল। সে পড়ি মরি করে জোরে জোরে ছুটতে থাকল। আর পৌঁছেই দেখল, কেউ নেই। না হাতি, না অমলা কমলা। বাড়ির সব আলো জ্বলে উঠছে। সবাই ওকে ফেলে বুঝি চলে গেল। সে একা পড়ে গেল। সে যে এখন কি করবে! তবু একবার অমলাদের ঘরে খোঁজ নিতে হবে। দাসীবাঁদী কেউ নেই যে বলবে, ওরা গেল কোথায়! সে দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল। বাড়ি ফাঁকা মনে হল। দু-একটি অপরিচিত মুখ। কেউ ওকে দেখে কথা বলছে না। সে ভয় পাচ্ছে। কোনওরকমে অমলাদের ঘরটাতে যেতে পারলেই আর তার দুঃখ থাকবে না। অমলা কমলা ওকে ফেলে হাতিতে চড়ে মেলা দেখতে যেতে পারে না। এমন সময়ই সে দেখল প্রাসাদের সব আলো নিভে গেছে। এত যে ঝাড়লণ্ঠন, এত যে বৈভব সব কেমন নিমেষে অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। দীঘির পাড়ে ফ্রুট বাজছে না। সেই ময়না পাখিটা তখনও অন্ধকারে ডাকছে, সোনা তুমি কোথায় যাও। কেউ নেই সোনা। আঁধার আঁধার।

    এমন অন্ধকার সোনা জীবনেও দেখেনি। এক হাত দূরের কিছু দেখা যায় না। কেবল ছায়া ছায়া ভাব। ছায়ার মতো মানুষেরা ছুটাছুটি করছে। ওর পাশ দিয়ে একটা লোক ছুটে বের হয়ে গেল। প্রায় অদৃশ্যলোকে সে যেন এসে পৌঁছে গেছে। সে ভয়ে ভয়ে ডাকল, অমলা!

    তখন একটা শক্ত হাত অন্ধকার থেকে বের হয়ে এল। এবং ওর হাত চেপে ধরল—কাকে ডাকছ?

    —অমলাকে।

    —তুমি কে?

    —আমি সোনা।

    —কোথায় যাবে?

    —অমলার কাছে। ওরা আমাকে নিয়ে দশরাতে যাবে বলেছে। আমার মুখে কমলা পাউডার মেখে দেবে বলেছে।

    —ওদের ঘরে তুমি যেতে পারবে না। বারণ। কেউ ঢুকতে পারবে না। সোনা বলল, না, আমি যাব।

    —না। সেই শক্ত হাত কার সোনা টের পাচ্ছে না। তবু সে যে স্ত্রীলোক সেটা সোনা বুঝতে পারল। সে বৃন্দাবনী হতে পারে। সোনা ভয়ে বিমূঢ়। রেলিঙে এসে দাঁড়াল। যদি কেউ ওকে এখন কাছারিবাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে। মনে হল সিঁড়ির মুখে লণ্ঠন। সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল মেজবাবু উঠে আসছেন। সামনে ওঁর খাস খানসামা হরিপদ। সে ফের এখান থেকে ছুটে পালাতে চাইল। মেজবাবুকে ঘরে ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে। শোকচ্ছন্ন মুখ। সোনা অবাক। এই সেই মানুষ যাকে সে কিছুক্ষণ আগে দেখে এসেছে মঞ্চে নিবিষ্ট মনে ফ্রুট বাজাচ্ছেন। এখন তিনি মূর্ছিত এক প্রাণ। সোনার ভিতরটা হাহাকার করে উঠল। অমলা কমলার কিছু হয়নি তো! ওদের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। মনে হচ্ছে ভিতরে অমলা কমলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

    হাতিটা একা অন্ধকার প্রাসাদ থেকে ফিরে গেল। কেউ দশরাতে যেতে পারল না। কোনও দুঃসংবাদ এ বাড়িতে এসেছে। কী সেই দুঃসংবাদ কেউ যেন বলতে পারছে না। পরিবারের দু-একজন ব্যাপারটা জেনেছে। এবং ভূপেন্দ্রনাথ তাদের অন্যতম। সে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে। অন্ধকার প্রাসাদে সব বিসর্জন হয়ে গেছে, এখন এক নির্জন মাঠের ভিতর দিয়ে শুধু হেঁটে যাওয়া।

    সোনা জেদী বালকের মতো বলল, অমলার কাছে যাব।

    বৃন্দাবনী বলল, না। না।

    সুতরাং সোনা বাইরের দিকে চলে এসে ওদের জানালার দিকে মুখ করে মাঠে বসে থাকল। আলো জ্বললেই ওরা জানালা থেকে সোনাকে দেখতে পাবে। দেখতে পাবে সে হাঁটু মুড়ে সিড়ির উপর ওদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বসে আছে। কী যেন এক টান তার এই দুই মেয়ের জন্য, সোনা মনে মনে ভাবছে, ওদের কিছু হয়েছে, সে সবটা না জেনে কিছুতেই এখান থেকে নড়বে না ভাবল।

    তখনও হাতিটা যায়। অন্ধকারে গাছগাছালির ভিতর দিয়ে হাতিটা যায়। ইব্রাহিম কলঘরে একটা টর্চ নিয়ে বসে আছে। কোথায় যে কি হল! সে আলোর ঘর অন্ধকার করে বসে থাকল। শুধু ঢাকের বাজনা ভেসে আসছে। হাতিটা এখন নদীর পাড়ে নীরবে হেঁটে চলে যাচ্ছে।

    আর কোথাও বোধহয় প্রতিমা বিসর্জন হচ্ছিল। পাগল জ্যাঠামশাই কোথায় আছে কে জানে! সোনা কারও জন্য জীবনে কিছু কিনতে পারল না। দু’পকেটে ওর চক্‌চকে তামার পয়সা। উপরে জানালা বন্ধ। তখন নদীতে শেষ প্রতিমা বিসর্জন। নদীতে যে আলো, ধূপধুনো, ঢাকের বাদ্যি ছিল এবার তাও নিভে গেল। কোথাও আর কিছু জ্বলছে না। শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। উপরে আকাশ, নির্মল আকাশে সেই অন্তহীন হাজার হাজার নক্ষত্র। নক্ষত্রের আলোতে সে যেন পৃথিবীর যাবতীয় শুভবোধকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। জানালা খুলে গেলেই সে ওদের জন্য কিছু করতে পারে। সে ওদের মুখ দেখার জন্য ঘাসের ভিতর বসে আছে। দু’হাঁটুর ভিতর মাথা গুঁজে বসে আছে।

    বিসর্জনের পর ভূপেন্দ্রনাথের হুঁশ হল। সোনা কোথায়! ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। সকলের ফের অন্ধকারে ছুটোছুটি। রামসুন্দর আবিষ্কার করল সোনা মেজবাবুর দালান বাড়ির নিচে শুয়ে আছে। সোনা সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছে!

    সকালে অন্দর থেকে একটা চিঠি পেল সোনা-আমরা ভোর রাতের স্টিমারে চলে যাচ্ছি সোনা। তোর সঙ্গে আমাদের আর দেখা হল না।

    কাছারিবাড়ির সিঁড়িতে সে সারাটা সকাল একা চুপচাপ বসে থাকল। তার কিছু আজ ভালো লাগছে না। তার মনে হল নদীর চরে কাশের বনে বনে কেবল কে যেন আজ চুরি করে বুকের ভেতর ফুট বাজাচ্ছে।

  • আটাশ

    আটাশ

    এবার ওদের ফেরার পালা। ঈশম সকাল সকাল দুটো রান্না করে খেয়ে নিয়েছে। সে খুব সকালে গোটা নৌকার পাটাতন ধুয়েছে। গলুইতে জল জমে ছিল, সব ফেলে দিয়ে একেবারে নৌকা হালকা করে রেখেছে। পাল যেখান যা সামান্য ছেঁড়া ছিল গতকাল সারাটা দিন সেখানে সযত্নে সুঁচ-সূতা দিয়ে মেরামত করে নিয়েছে। কোনও কারণেই যেন নৌকা চালাতে কষ্ট না হয়। গুণ টানার দড়ি ঠিকঠাক করে সে বসে থাকলে দেখল, মেজকর্তা আসছেন সকলের আগে। মাঝে সোনা লালটু পলটু, পাগল কর্তা, আশ্বিনের কুকুর পিছনে।

    এখন স্টিমার ঘাটে খুব ভিড়। যে যার মতো পূজার দিনগুলি গ্রামে কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। এই গ্রাম প্রায় শহরের শামিল। এখানে হাইস্কুল আছে। পোস্ট অফিস আছে। বাজার-হাট, আনন্দময়ীর কালীবাড়ি আর বড় বড় জমিদারদের প্রাসাদ মিলে এক জাঁকজমক এই পূজার ক’টা দিন—তারপর ফের বাবুদের কেউ ঢাকা চলে যান, কলকাতায় যান, গ্রাম থেকে একে একে সবাই চলে গেলে—পুরী খাঁ খাঁ করে।

    ভূপেন্দ্রনাথের এমনই মনে হচ্ছিল। ওরা চলে যাচ্ছে। সকাল সকাল ওরা সেদ্ধভাত খেয়ে নিয়েছে। ভূপেন্দ্রনাথ পাড়ে দাঁড়িয়ে ওদের বিদায় দিলেন। যতক্ষণ নৌকাটা শীতলক্ষ্যার বুকে দেখা গেল ততক্ষণ তিনি পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ওঁর আর কেন জানি এসময় কাছারিবাড়িতে ফিরতে ইচ্ছা হল না। তিনি হেঁটে হেঁটে কালীবাড়ির দিকে চলে এলেন। ভাবলেন, চুপচাপ তিনি কালীবাড়ির বারান্দায় গিয়ে মাকে দর্শন করবেন! পুরোহিত কালু চক্রবর্তী মাঝে মাঝে এসে নানারকম কুশল সংবাদ নিলে হুঁ হাঁ করবেন। আর বারান্দায় বসে সেই ভাঙা প্রাচীর শ্যাওলাধরা দুর্গের মতো বাড়িটাতে কোনও মন্দিরের সাদৃশ্য খুঁজে পান কি না দেখবেন। কী সাহস মৌলবীসাবের যে, এখানে হাজার লক্ষ মানুষ নিয়ে এসে নামাজ পড়তে চায়? কোরবানী দিতে চায়। এসব করলেই এ অঞ্চলে আগুন জ্বলে উঠবে! তিনি বললেন, মা, তুমি শক্তিদায়িনী। তুমি শক্তি দিও মা। তিনি মনে মনে যেন কোনও ধর্মযুদ্ধের স্বপ্ন দেখছেন। যেন এই মা, আনন্দময়ী, শক্তিদায়িনী মা হাজার হাজার দেবসৈন্য তৈরি করবে শরীর থেকে। এবং অসুর নিধনে উদ্যত হবে। যুগে যুগে মা তুমি মুণ্ডমালাধারিণী।

    তারপর ভূপেন্দ্রনাথ মনে মনে হাসলেন। অবজ্ঞায় ওঁর মুখ কুঁচকে উঠল। থানার দারোগা, পুলিশসাহেব সদরের, মায় ম্যাজিস্ট্রেট সব বাবুদের হাতে। একটা তার করে দিলেই স্টিমার বোঝাই করে সৈন্যসামন্ত হাজির হবে। তিনি অবহেলায় মুখ কুঁচকে রাখলেন। ভিতরে ভিতরে তিনি এত বেশি উত্তেজিত যে, হাঁটতে হাঁটতে তিনি নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলছেন। তিনি যেন একটা রণক্ষেত্রের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।

    তখন ঈশম হালে বসে সোনাকে বলল, কি গ কর্তা, মুখ কালা ক্যান?

    সোনা মুখ ফিরিয়ে রাখল। যেন ঈশম ওর মুখ দেখতে না পায়।

    —আর কি, এইবারে নাও ঘাটে লাগাইয়া দিমু। আপনের মায় ঠিক ঘাটে খাড়াইয়া থাকব। গেলেই আপনারে কোলে তুইলা নিব।

    পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ নৌকার গলুইয়ে বসে আছেন। রোদ মাথার উপর। ঈশম বার বার অনুরোধ করছে ছইয়ের ভিতর বসতে—তিনি বসেননি। একেবারে অচঞ্চল পুরুষ। পদ্মাসন করে বসে আছেন। রোদে মুখ লাল হয়ে গেছে। সোনার এখন এসব ভালো লাগছে না। সে বাড়ি যাচ্ছে! অমলা কমলা এখন কত দূরে। সে বাড়ি গিয়ে মাকে কেমন দেখবে তাও জানে না। কেমন এক পাপবোধে সেই থেকে সে আচ্ছন্ন। অমলা কমলার কান্না, অথবা সেই রাত্রি ওকে যেন আরও বেশি সচেতন করে দিয়েছে। কেউ যেন বলছে, তুমি এটা ভালো করনি সোনা। সে সেজন্য সারাক্ষণ চুপচাপ বসেছিল নৌকায়।

    বাড়ির ঘাটে নৌকার শব্দ পেয়েই ধনবৌ ছুটে এসেছিল। বড়বৌ এসেছে। সে খবর পেয়েছে পাগলমানুষ সাঁতার কেটে, কখনও গ্রামের পথে হেঁটে মুড়াপাড়া চলে গেছেন। যেদিন সোনা ফিরবে সেদিন তিনিও ফিরবেন।

    সোনা নৌকা থেকে লাফ দিয়ে নেমেই মাকে জড়িয়ে ধরল। এতক্ষণ যে মনটা ভারী ছিল, এখন তা একেবারে হালকা হয়ে গেছে।

    বড়বৌ বলল, কি সোনা, মার জন্য কাঁদিসনি ত?

    সোনা ঘাড় কাৎ করে না করল।

    —ঠিক কেঁদেছিস! তোর চোখমুখ বলছে। কি রে লালটু, সোনা কাঁদেনি?

    —না, জ্যেঠিমা।

    —তাহলে আর কি, এবার জ্যাঠামশাই-র মতো হয়ে গেলি। যেখানে খুশি চলে যাবি। কারো জন্য মায়া হবে না।

    বড়বৌ যেন এ কথায় পাগল মানুষকে সামান্য খোঁচা দিল। আর পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথও যেন সে খোঁচা ধরতে পেরে তাকালেন বড়বৌর দিকে।

    বড়বৌ বলল, এস। যেন বলতে চাইল, তুমি কোথাও চলে গেলে আমার ভারী কষ্ট হয়। ভয় হয়। আমার আর কে আছে!

    সোনা প্রায় যেন বিশ্ব জয় করে ফিরেছে। তার নূতন অভিজ্ঞতা, হরিণ, ময়ূর এবং বাইস্কোপের বাক্স, এসব তার সকলকে দেখাতে না পারলে অথবা বলতে না পারলে সে মনে মনে শান্তি পাচ্ছে না। প্রথম মালতী পিসিকে সে এসব দেখাবে ভাবল। গোপাটে ফতিমা এলে তাকে দেখাবে ভাবল।

    সোনার মনে হল ‘কত দিন পর সে এখানে ফিরে এসেছে, যেন দীর্ঘ দিন এখানে ছিল না। সবাইর সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত সে স্বস্তি পাচ্ছে না। সে প্রথমে বড়ঘরে ঢুকেই ঠাকুরমা ঠাকুরদাকে প্রণাম করল। তারপর উঠোনে নেমে এলে বড়বৌ বলল, সোনা, জামা প্যান্ট ছেড়ে খেয়ে নাও।

    সোনা এসব শুনল না। ওরা সেই কখন খেয়ে বের হয়েছে, সুতরাং খিদে পাবার কথা! ওরা হাত পা ধুয়ে এলেই বড়বৌ খেতে দেবে। কিন্তু কেউ খেতে আসছে না। সোনা দৌড়ে পুকুরপাড়ে চলে গেল। অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়াল। দক্ষিণের ঘরে আবেদালি বসে আছে। ছোটকাকা বাড়ি নেই। পালবাড়ির সুভাষের বাবা নেই। হারান পালের বাড়ি খালি। সোনা অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ করল।

    শুধু জলে এখন মালতী পিসির পাতিহাঁস সাঁতার কাটছে। সে পুকুরপাড় ধরে কয়েদবেল গাছটার নিচে চলে গেল। এখান থেকে শোভা আবুদের বাড়ি চোখে পড়ে। সে হাঁটুজলে নেমে সোজা ওদের বাড়ি উঠে দেখল নরেন দাস বাড়িতে নেই। সব কেমন খাঁ-খাঁ করছে। শোভা আবু নেই। ওদের মা নেই। এমনকী সে মালতী পিসিকেও দেখতে পেল না। কেবল মনে হল ওদের তাঁতঘরে কেউ বসে তামাক কাটছে।

    সোনার কেমন ব্যাপারটা ভুতুড়ে মনে হল। কেউ নেই। সে একা। সূর্য অস্ত গেছে। অথচ বাড়ির পর বাড়ি সে দেখছে খালি পড়ে আছে। ওর কেমন ভয় ধরে গেল। সে তাড়াতাড়ি উঠোন পার হয়ে বাড়ির দিকে ছুটবে ভাবল, আর তখন দেখল মালতী পিসি একটা পিটকিলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। একা। নির্জনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে।

    সে কাছে গেল। অন্যদিন হলে মালতী পিসি ওকে জড়িয়ে ধরত, আদর করত। কিন্তু আজ কেন যে মালতী পিসির চোখ মরা! চুল বাঁধেনি। কেমন রুক্ষ চোখ মুখ। মাঝে মাঝে থুতু ফেলছে। মাঝে মাঝে ঠিক নয়, যেন এক অশুচি ভাব সারাক্ষণ শরীরে—সব সময়ই সে থুতু ফেলে শরীর পবিত্র রাখতে চাইছে। এবং কার সঙ্গে যেন বিড়বিড় করে কথা বলছিল। সোনাকে দেখে আর কথা বলছে না। একেবারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সে যে সোনাকে চেনে এমন মনেই হচ্ছে না। সুতরাং সোনা গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল। সোনা এসেছিল ওর বাইস্কোপের বাক্স দেখাতে, আর এখন মালতী পিসির এমন চেহারা দেখে সে কথা পর্যন্ত বলতে পারল না। মালতী পিসির কী একটা অসুখ হয়েছে। অসুখ হলে মানুষের চোখ-মুখ এমন হয়। সোনা আর দাঁড়াতে পারল না। সে ছুটে এসে জ্যেঠিমাকে বলল, মালতী পিসি গাছের নিচে…সে বলে শেষ করতে পারল না। জ্যেঠিমা বললেন, ওর কাছে যাবে না। ওকে বিরক্ত করবে না।

    সে জ্যেঠিমাকে বলল, ছোটকাকা বাড়ি নাই ক্যান? শোভা, আবু নরেন দাস বাড়ি নাই। পালবাড়ির সুভাষের বাবা নাই। এসব শুনে বড়বৌ এক ফকিরের দরগায় মেলা বসেছে এমন বলেছে। গ্রাম ভেঙে মানুষজন দেখতে গেছে মেলা।

    জ্যেঠিমার কথা শুনে সোনার মনে হল এই পৃথিবীতে আবার একটা কিংবদন্তী সৃষ্টি হচ্ছে।

    এ এক অলৌকিক ক্রিয়া। কারণ, এক রাতে দুটো ঘটনা ঘটে কি করে! ঘটে না, ঘটতে পারে না। রাতের মাঝামাঝি সময় ফকিরসাবের অলৌকিক আবির্ভাব নরেন দাসের বাড়িতে। সাক্ষাৎ মা-লক্ষ্মী, অথবা জননীর মতো ফকিরসাব মালতীকে রেখে গেলেন। আর আশ্চর্য, দরগার মানুষেরা অথবা যারা ইন্তেকালে এসেছিল কবর দিতে তারা দেখছে, ফকিরসাবের বিবি, লম্ফ জ্বেলে সেই রাতে বসে আছে দরগায়। পাশে কফিনের ভিতর ফকিরসাবের মৃতদেহ। অলৌকিক ঘটনা না ঘটলে এমন হয় না। দশ ক্রোশের ফারাক—নদী-নালার দেশ। জোয়ারের জল কখন আসে যায় কেউ টের পায় না। সেই জলে জলে ফকিরসাবের বিবি দিনমানের পথ মুহূর্তে পাড়ি দিয়েছিল। মানুষের মনে তেমন একটা অবিশ্বাস গড়ে উঠতে পারেনি। গ্রাম-মাঠের জায়গা, নদী-নালার দেশ, খবর পৌঁছাতে সময় লাগল না। নরেন দাস সকলকে ফকিরসাবের অলৌকিক আবির্ভাবের কথা রটিয়ে দিয়েছিল। মধ্যরাতে, আল্লা রহমান রহিম বলে উঁচু লম্বা মানুষের আগমন এবং মৃত্যুর খবর শুনতেই নরেন দাসের মনে হয়েছিল, যোজন দূরে মাথা উঠে গেছে ফকিরসাবের, দুঃখিনী মালতীকে তিনি আলখাল্লার ভিতর থেকে ছোট একটা পুতুলের মতো বের করে দিয়ে নিমেষে হাওয়ায় লীন হয়ে গেছেন। এই ঘটনায় ফকিরসাব রাতারাতি পীর বনে গেলেন। আবার কিংবদন্তী। ধর্মের মতো, অথবা সেই তালপাতার পুঁথির মতো কেবল কিংবদন্তী। বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে নিরন্তর বিবদমান দুই সাম্রাজ্য। একপাশে সোনা। মাঠ পার হলে গোপাট, গোপাটের ওপাশে ফতিমা।

    ফতিমা এলেই সোনা সেদিন এই সন্ধ্যায় বাইস্কোপের বাক্স তাকে দিয়ে দিল।

    —কেডা দিল সোনাবাবু?

    —অমলা।

    —ক্যান দিল?

    —খুব ভালোবাসে আমারে।

    ফতিমা অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে চুপচাপ বাবুর মুখ দেখল। তারপর বলল, বাইস্কোপের বাক্স আমার লাগে না।

    সোনা বলল, ক্যান লাগে না?

    —লাগে না। আমি নিমু না।

    সোনা বলল, ক্যান নিবি না?

    ফতিমা কথা বলল না। সোনাবাবু মুড়াপাড়া থেকে ফিরে এসেছে শুনেই সে জল ভেঙে চলে এসেছে পুকুরপাড়ে। জল বেশি নেই গোপাটে। পায়ের পাতা ডুবে যায় এমন জল। ফতিমা বাবুর সঙ্গে কথা না বলে শাড়িটা একটু উপরে তুলে, জলে নেমে গেলে সোনা বলল, অমলা বলল, অমলা আমার পিসি হয়।

    ফতিমা ঘাড় কাৎ করে তাকাল এবং উঠে এসে বাইস্কোপের বাক্সটার জন্য হাত পাতল।

    সোনা দেবার আগে ফতিমাকে বাক্সের খোপে চোখ রাখতে বলল। সে ছবি পাল্টে পাল্টে দেখাচ্ছে। ফতিমা এই ছবিগুলির ভিতর আরব্য রজনীর রহস্যময় জগৎ আবিষ্কার করে কেমন বিমুঢ় হয়ে গেল। যেন এবার ওর চোখ তুলে বলার ইচ্ছা—সোনাবাবু, এতদিন কোথায় ছিলেন। তারপর ওর চোখ মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়, সে বিকেল হলেই পুকুরপাড়ে পেয়ারা গাছটার নিচে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। সেই গাছটার নিচ থেকে মাঠের এপারে এই অর্জুন গাছ স্পষ্ট! অর্জুন গাছের নিচে কেউ এসে দাঁড়ালেও স্পষ্ট। কেবল পাটগাছগুলি জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে বড় হয়ে গেলে দুটো গাছের নিচই ঢাকা পড়ে যায়। কেউ কাউকে দেখতে পায় না। তখন পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়ালে ওপারে অর্জুনের ছায়ায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না বোঝা যায় না। পাট কাটা হলে সব আবার খালি। ফতিমা বিকেলে গাছের নিচে দাঁড়লেই টের পায় সোনাবাবু কোথায়। সে বিকেলে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থেকেছে। অথচ সে বাবুর মুখ দেখতে পায়নি একবারও। কেমন একটা ক্ষোভ অভিমান এতদিন ভিতরে ভিতরে ছিল। বাইস্কোপের বাক্সটা দিতেই অভিমান ওর জল হয়ে গেল।

    ফতিমা বলল, নানী কইছে একবার যাইতে।

    সোনা বলল, বলবি নানী বলছে যেতে।

    —এটা ত বইয়ের ভাষা।

    —বইয়ের ভাষার কথা বলতে শিখবি।

    —আমার লজ্জা লাগে।

    —আমারও। বলে সে হা হা করে হেসে উঠল। অমলা-পিসি জ্যেঠিমার মতো কথা বলে।

    আমাকে বলে, সোনা যামু কিরে, যাব বলবি!

    —আপনে কি কইলেন?

    —কইলাম লজ্জা লাগে।

    —আমারও লাগে। বলেই ফতিমা নেমে গেল জলে, তারপর সারা মাঠে জল ছিটিয়ে মাঠের ওপারে উঠে পেয়ারা গাছটার নিচে হাত তুলে দিল। সোনাও হাত তুলে দিল। সিগনাল পেয়ে যে যার গাড়িতে যে যার বাড়িমুখো রওনা দিল।

    সোনা দক্ষিণের ঘরে ঢুকে দেখল, অলিমদ্দিও নেই। আবেদালি শুধু বসে রয়েছে। অলিমদ্দি এবং ছোটকাকার ফিরতে দেরি হবে। ফকিরের দরগায় গেছে ওরা। সুতরাং এতবড় বাড়িতে কোনও পুরুষমানুষ থাকবে না, রাতে চোর-ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রব, সেজন্য শচীন্দ্রনাথ আবেদালিকে রেখে গেছেন বাড়ি পাহারা দিতে। আবেদালি থাকবে, খাবে এবং বাড়ি পহারা দেবে। সোনা নিজে একটা হ্যারিকেন এনে বৈঠকখানার দাওয়ায় রেখে দিল।

    সোনা আবেদালিকে বলল, আপনে গ্যালেন না?

    —কোনখানে?

    —ফকিরসাবের দরগায়।

    —কাইল যামু।

    কারণ ঈশম যখন এসে গেছে তখন আর তার থাকবার কথা নয়। সবাই যাবে দরগাতে। সময় পেলেই চলে যাবে।

    কোথাও যাবার নাম শুনলে সোনারও যাবার ইচ্ছে হয়। মেলার কথা মনে হলেই সেই সার্কাসের কথা মনে হয়, দুই বাঘের কথা মনে হয়। সে কি ভেবে এবার হ্যারিকেনের উপর ঝুঁকে বসল। আজও পড়া থেকে ওদের ছুটি। কাল থেকে, ঠিক কাল থেকে না, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা শেষ হলে রাত-দিন জেগে পড়া। স্কুল খুললেই পরীক্ষা। সুতরাং সে একটু সময় পেয়ে আবেদালির মুখ দেখছে।

    আবেদালি কেমন নির্জীব মানুষ হয়ে গেছে। জব্বর এখনও নিখোঁজ। আবেদালির শরীর ক্রমে ভেঙে আসছে।

    জালালি মরে যাবার পর থেকে দ্বিতীয় পক্ষের বিবিটা আবেদালির অভাব অনটন বুঝতে চায় না। কেবল খাই খাই ভাব। যা রাঁধবে, নিজে একা খাবে, ওকে পেট ভরে খেতে দেবে না। সে এই বাড়িতে আজ রাতে পেট ভরে খেতে পাবে। ওর কাঁচাপাকা দাড়ির ভিতর পেট ভরে খাবার লোভী মুখটা ধরা পড়ছে। কেবল চোখ দেখলে টের পাওয়া যায়, জব্বরটা ওকে বড় ছোট করে দিয়ে গেছে। থানা-পুলিশ হতো, কিন্তু ফকিরসাবের এমন অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডের পর সবাই সব ভুলে গিয়ে দরগার মেলা নিয়ে মেতে উঠেছে।

    আর সব চেয়ে আশ্চর্য এই মালতী। যে রাতে ফিরে এল মালতী, হল্লা করে লোক জড়ো করল না নরেন দাস। চেঁচামেচিতে বোঝা যায় সব—তবু ওর যা কথা তাতে বোঝা যাচ্ছে—ফকিরসাব, আর সাধারণ মানুষ ছিলেন না। ফুসমন্তরে জ্বলে উঠেছিল এক অগ্নিশিখা—শিখার প্রচণ্ড আলোতে ঋষিগণের সহস্র মুখ যেন সারা উঠোনে ভেসে বেড়াচ্ছিল—যেন বলছেন ফকিরসাব, আমার জননীরে কেউ অসতী করে নাই নরেন দাস। তারে তুমি তুলে লও। প্রায় গোটা ব্যাপারটা নরেন দাসের কাছে সীতার বনবাসের মতো মনে হয়েছিল।

    মালতী অন্ধকারে চুপচাপ। সে কোনও কথা বলছিল না। পাষাণ প্রতিমার মতো তার শক্ত মুখ চোখ দুটো কেবল জ্বলছিল। তাকে প্রশ্ন করলে কোনও জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। সে ক্রমে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। সে ক্রমে চুপচাপ, অর্থহীন দৃষ্টি। সে বারান্দায় চিড়িয়াখানার জীবের মতো বসেছিল। পাড়া প্রতিবেশীরা তাকে দেখে যাচ্ছে এবং ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে। ফকিরসাবের মতো মানুষ হয় না। আল্লার বান্দা তিনি এমন বলাবলি করছিল।

    এভাবে একদিন গেল। দু’দিন গেল। নরেন দাস তার বোনকে কেন জানি আর জলচল করে নিতে পারল না। জাতিতে যবন, এরা মানুষ না, ওরা চুরি করে নিয়ে গেছে, সুতরাং বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, যবনে ছুঁলে ছত্রিশ। সে মালতীর জন্য ঢেঁকিঘরের বারান্দায় একটা খুপরি করে দিল। সেই খুপরিতে ঠিক একটা পাতিহাঁসের মতো মালতী এক সকালে ঢুকে গেল।

    আর আশ্চর্য, খুপরি ঘরে এমন এক সুন্দরী বিধবা একা থাকতে সাহস পেয়ে গেল। শরীরে তার আর কি আছে যা মানুষ জোর করে কেড়ে নিতে পারে! সে এতদিন সোহাগে সব লালন করছিল। এবং আকাশে নানারকম নক্ষত্রের ছবি দেখলে তার যার কথা বেশি মনে হতো, সেই রঞ্জিত, যুবক এক, তাকে না বলে চলে গেছে, সে তাকে আর কিছু দিতে পারল না। এই উচ্ছষ্ট শরীরের কথা ভাবলেই ওর মুখে থুতু উঠে আসে। সারাদিন জলে ডুবে থাকতে চায়। জলে নামলেই মনে হয় তার শরীর পবিত্র হয়ে যাচ্ছে। জলে ডুবে গেলে মনে হয়, আহা কি শান্তি মা জননী জাহ্নবীর কোলে! সে ডুবে গেল কি না,তার আঁচল অথবা চুল ভেসে থাকল কি না, কী শীতের রাত, কী গ্রীষ্মের দাবদাহে শুধু তার এমন এক প্ৰশ্ন।

    প্রতিবেশী বালকদের এটা একটা খেলা হয়ে গেল। মালতী পিসি কেবল ভোঁস ভোঁস করে একটা উদবিড়ালের মতো ডুবত ভাসত। ওরা পাড়ে দাঁড়িয়ে খেলা করত অথবা ঠাট্টা-তামাশা করত, পিসির আঁচল ভেসে আছে বলত। অথবা চুল, না না চুল না, তোমার পায়ের আঙুল দেখা যাচ্ছে, হাতের আঙুল, তোমার শাড়ি জলের ভিতর বাতাস পেয়ে পাল তুলে দিতে চেয়েছে। তোমার সব ডুবে যায়নি, তুমি কেবল কিছু-না-কিছু নিয়ে জলের উপর ভেসে আছ। এমন যখন বলত বালকেরা, তখন মালতীর কী করুণ মুখ! আমার সব তবে ডোবে না, আমার কিছু-না-কিছু ভাইসা থাকে! দ্যাখ দ্যাখ সোনা, ডুবে আছি কি না দ্যাখ।

    সোনা বলত, পিসি, তুমি ডুইবা গ্যাছ।

    তারপরই মালতী সারা ঘাটে জল ছিটিয়ে উঠে আসত। চারপাশে শুধু অপবিত্র এক ভাব। সে বালতি থেকে জল ছিটাত আর ঘরের দিকে এগিয়ে যেত। শুচিবাইগ্রস্ত মালতী এভাবে ক্রমে জলে ডুবে থাকতে থাকতে একসময় শ্রীহীন রুক্ষ, এবং পাগলপ্রায় হয়ে গেল। সারারাত অভিমানে চোখ ফেটে জল আসে। চোখে ঘুম থাকে না। সোনা যখনই এসেছে, দেখেছে মালতী পিসি জলে সাঁতার কাটছে। জল থেকে কিছুতেই উঠতে চাইছে না। মুখ বড় করুণ। শরীর থেকে কারা যেন তার প্রাণপাখি নিয়ে পালিয়েছে। নরেন দাস বকে বকে জল থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

    এভাবে শরৎকালটা কেটে গেল সোনার। শশীভূষণ পূজার ছুটি শেষ হলে চলে আসবেন। হেমন্তের দিনে পড়ার চাপ বেশি। ওকে সকালে এবং রাতে বেশিসময় শশীভূষণ নিজের কাছে পড়ার জন্য বসিয়ে রাখবে। পাগল জ্যাঠামশাই কিছুদিন হল কোথাও যাচ্ছেন না। সোনার ধারণা সে-ই জ্যাঠামশাইকে শান্ত এবং ধীর স্থির করে তুলছে। জ্যাঠামশাই সেই যে হাতি দেখতে গিয়ে ভালো হয়ে যেতে থাকলেন যেন ক্রমে তিনি সেই থেকে ভালো হয়ে যাচ্ছেন। সে মাঝে মঝে জ্যাঠামশাইকে তামাক সেজে দেয়। তামাক খান তিনি। বসে বসে আপন মনে সেই কবিতা আবৃত্তি করেন। স্নানের সময় স্নান, আহারের সময় আহার। রাতে তিনি ওদের পড়ার টেবিলের একপাশে ছোট্ট পড়ুয়ার মতো সরল বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে বসে থাকেন। যেন খুব নিবিষ্ট পড়াশোনায়। তিনি কখনও সোনার স্লেট নিয়ে পেনসিলে নানা রকমের প্রজাপতি, অথবা নদীর সাঁকো, কিংবা মাঠের ছবি আঁকেন। কাউকে তিনি আর বিব্রত করেন না। সোনা লক্ষ্মীপূজার জন্য টুনিফুল আনতে গিয়েছিল। জ্যাঠামশাই নৌকা বাইছিলেন। এবং যেখানে এই দুর্লভ টুনিফুল পাওয়া যায় ঠিক সেখানে, তিনি তাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এইসব জীবনের ভিতর সোনা দেখেছে বড় জ্যেঠিমা খুশি। তিনি সারাদিন সংসারের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন। জ্যাঠামশাই বাড়ি থাকলে, জ্যেঠিমার আর কোনও দুঃখ থাকে না। কপালে বড় গোল করে সিঁদুর, মাথায় লম্বা সিঁদুর, লাল পেড়ে কাপড়, কী ধবধবে এবং সাদা, আর শ্যামলা রঙের জ্যেঠিমাকে কখনও কখনও রামায়ণে বর্ণিত নারী চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা হয়।

    এইভাবে কার্তিক পূজার দিন এসে গেল। ফতিমা অর্জুন গাছের নিচে এসে একদিন বলে গেছে, ওর এবার দুটো শ্রীঘট চাই। শ্রীঘটের কথা সে মাকে বলেছে, জ্যেঠিমাকে বলেছে। সে ওদের প্রত্যেকের কাছ থেকে শ্রীঘট নিয়ে রাখবে। এবং কার্তিক পূজার পরদিন ফতিমা এলে দুটো নয়, এবার চারটা দেবে। যেমন অমলা কমলা ওকে নানাবিধ দ্রব্য দিয়ে খুশি রাখতে চেয়েছে, সে তেমনি এই মেয়ে—কী যে মেয়ে, পায়ে মল, নাকে নোলক, ডুরে শাড়ি পরা মেয়ে তার জন্য অপেক্ষায় থাকে—সে তাকে কিছু দিতে পারলেই মহৎ কিছু করে ফেলেছে, এমন ভাবে

    আর কার্তিক পূজার দিনই ঘটনাটা ঘটল।

    ওরা বিকেলে গেছে মাঠে। সন্ধ্যার সময় চারপাশের জমিগুলিতে আগুন জ্বালানো হয়েছে। ‘ভাল-বুড়াতে’ আগুন দিচ্ছে সবাই। সংসারের যাবতীয় পাপ মুছে, পরিবারের মানুষেরা হেমন্তের মাঠ থেকে পুণ্য তুলে আনতে গেছে। অলক্ষ্মী ফেলে লক্ষ্মী আনতে গেছে সবাই। সোনা লালটু পলটু তিনজন তিনটা ‘ভাল-বুড়াতে’ আগুন দিয়ে এখন মাঠের উপর ছুটছে। ওরা ওদের সবচেয়ে যে জমি ভালো ফসল দেয় সেখানে আগুনের দণ্ডগুলি পুঁতে দিল। তারপর চাই কার্তিক পূজার জন্য সবচেয়ে পুষ্ট ধানের ছড়া। এখন ওরা তিনজন এই হেমন্তের মাঠে সেই পুষ্ট ছড়ার জন্য জমি থেকে জমিতে ক্রমে সোনালি বালির নদীর চর পার হয়ে চলে যাবে। যে যত বড় ছড়া নেবে সে তত বেশি পুণ্য বহন করবে সংসারের জন্য। এভাবে এক প্রতিযোগিতা-সোনা একটা বড় ছড়া কেটে বলল, কি বড়, দ্যাখ দাদা! আর তখন পলটু বলল, কৈ দ্যাখি! দেখে বলল, বড় না ছাই। বলে আরও একটা বড় ছড়া দেখাল। এবং ক্রমে এভাবে ওরা ছড়ার জন্য দূরের মাঠে নেমে গেল। পছন্দ হচ্ছে না। মনে হয় এ জমি পার হয়ে গেলে বড় মিঞার জমি, জমিতে ফসল হয় সবার সেরা, অথবা কোথাও এমন জমি আছে যেখানে তাদের জন্য পুষ্ট ছড়া নিয়ে লক্ষ্মী অপেক্ষা করছেন। ওরা এখন মাঠে মাঠে মা লক্ষ্মীকে খুঁজছে।

    ওরা তিনজন এভাবে অনেকদূরে চলে এল। পুষ্ট এবং বড় ধানের ছড়া না নিতে পারলে গৌরব করা যাবে না। বড় জ্যেঠিমা বলবেন ও মা, দ্যাখ ধন, তোর ছেলে কত বড় ছড়া এনেছে! এই মাঠে পুষ্ট ধানের ছড়াটির জন্য ওরা জমি থেকে জমিতে ঘুরছে। আবছা অন্ধকার। হেমন্তের মাঠ বলে সামান্য কুয়াশা। অস্পষ্ট জ্যোৎস্না আকাশে বাতাসে। ওরা নুয়ে একটা করে ধানের ছড়া হাতে নিয়ে দেখছে আর রেখে দিচ্ছে। হাত দিয়ে মাপছে। না, বড় ছোট! প্রায় হাত লম্বা না হলে কার্তিক ঠাকুরের গলায় মালার মতো দোলানো যাবে না।

    তখন লণ্ঠন হাতে কারা যেন নদীর পাড়ে পাড়ে হেঁটে এদিকে আসছে। লণ্ঠনের আলো দেখে মনে হল ওরা অনেক দূরে চলে এসেছে। ওদের খেয়ালই ছিল না, ওরা নদীর চর ভেঙে হাইজাদির মাঠে পড়েছে। লণ্ঠনের আলো দেখে ওদের বাড়ি ফেরার কথা মনে হল।

    কাছে এলে সোনা দেখল, ফেলু যাচ্ছে। মাথায় বড় একটা ট্রাঙ্ক। ফেলু মাথায় বড় ট্রাঙ্ক নিয়ে চলে যাচ্ছে। পিছনে সামসুদ্দিন। এবং সবার পিছনে ফতিমা। ফতিমা আজ সালোয়ার পরেছে। লম্বা ফুল হাতা ফ্রক সোনালি রঙের। কাল ফতিমার আসার কথা অর্জুন গাছটার নিচে। সে ফতিমার জন্য চারটা শ্রীঘট রেখে দেবে। এ-সময়ে কোথায় যাচ্ছে ফতিমা সেজেগুজে! সে ফতিমাকে দেখেও কিছু বলতে পারল না।

    সামসুদ্দিন এত বড় মাঠে ওদের তিনজনকে দেখে কেমন একটু বিস্মিত হল। সে বলল, আপনেরা!

    —ধানের ছড়া খুঁজতে আইছি।

    সামসুদ্দিনের এতক্ষণে মনে পড়ল আজ কার্তিক পূজা। সবাই বের হয়ে পড়েছে পুষ্ট ধানের ছড়া খুঁজতে মাঠে। সে বলল, পাইছেন নি!

    ওরা যা সংগ্রহ করেছিল দেখাল।

    সামসুদ্দিন হাসল।—মা-লক্ষ্মী এত ছোট হইব ক্যান। আসেন আমার লগে।

    ওরা ফের হাঁটছিল। সোনা কিছুতেই কিছু বলছে না। সে ফতিমার পাশাপাশি হাঁটছে তবু কথা বলছে না। ফতিমাও কিছু বলছে না। সে আর বেশিক্ষণ অভিমান নিয়ে থাকতে পারল না। বলল, তুই ছিরাঘট নিবি না!

    —রাইখা দিয়েন। ঢাকা থাইকা আইলে নিমু।

    —তুই ঢাকা যাইবি?

    —আমরা সবাই ঢাকায় যামু। আমি স্কুলে পড়মু। বাড়িতে নানী একলা থাকব।

    সোনা বলল, কৈ তুই আগে কস নাই ত?

    —কমু কি! বা’জি সকালে সব কইল।

    সোনা জানে ফতিমার বাবা বাড়ি এলে সে কোথাও যায় না। সোনা আবার চুপ করে গেল। ফতিমাও কিছু বলছে না। সে বলল, সোনাবাবু আপনে আমারে চিঠি দিবেন।

    —যা! চিঠি দিমু কিরে!

    —আপনে কেমন থাকেন জানাইবেন।

    —ছোটকাকায় বকব

    ফতিমা বলল, বিকেলে আমি কানতে ছিলাম, বা’জি কইল, তুই কান্দস ক্যান? তর আবার কান্দনের কি হইল?

    —কিছু হয় নাই কান্দনের?

    তখন সামসুদ্দিন বলল, এই দ্যাখেন পুষ্ট ধানের ছড়া। সে বিলের জলে একটা গামছা পরে নেমে গেল। এতবড় ধানের ছড়া কোনখানে খুঁইজা পাইবেন না। এই বলে সে তিনজনের হাতে তিন গুচ্ছ বড় বড় ধানের ছড়া দিয়ে বলল, জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার। কি বলেন কর্তা? লক্ষ্মীরে আনতে গেলে কষ্ট লাগে। এই বলে সে গামছা দিয়ে শরীর মুছে ফেলুকে বলল, তরা হাঁটতে থাক। আমি অগ দিয়া আসি। অরা চিনা বাড়ি উইঠা যাইতে পারব না।

    সামসুদ্দিন অর্জুন গাছটা পর্যন্ত এল। পুবের বাড়ি সামনে এবং সেখানে মালতী আছে—জব্বর মালতীকে চুরি করার তালে ছিল, ফকিরসাব ওকে এখানে রেখে গেছেন—এবং জব্বর ওর দলের পাণ্ডা–সুতরাং এই অপরাধের জন্য সে কিছুটা দায়ী, ওকে দেখলে এমন মনে হয়। সামসুদ্দিন ভিতরে ভিতরে এই অসম্মানের জন্য পীড়িত। সে নিজেকে বড় অসহায় বোধ করল। সে নানাভাবে মুসলমান মানুষের ভিতর আত্মপ্রত্যয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, যা এতদিন নসিব বলে মেনে আসছিল সবাই, সে তা আঙুলে তুলে দেখিয়ে দিয়েছে—ওটা নসিব নয়। ওটা আপনাদের অসম্মান! আপনারা এতদিন তা গায়ে মাখেননি। কিন্তু জাতির আত্মপ্রত্যয় ফিরিয়ে আনতে গেলে কিছু কঠিন উক্তি তাকে সময়ে অসময়ে করতে হয়েছে। কিন্তু তার বিনিময়ে জব্বরের এমন ইতর কাজ! ভিতরে ভিতরে তার জন্য সে জ্বলে-পুড়ে খাক হচ্ছিল। সহসা গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া নানা মানুষ নানাভাবে ব্যাখ্যা করবে। সে যাচ্ছে। যেন এখানে থাকলেই ওর মালতীর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। সে কিছু বলতে পারবে না। সে মাথা নুয়ে অসম্মানের দায়ভাগ কাঁধে তুলে নেবে শুধু। মালতীর সামনে পড়ার ভয়েই বোধহয় সে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। অবশ্য সে হাজিসাবের ছোট ছেলে আকালুকে দলের পাণ্ডা করে দিয়ে গেছে। শহরে, কাজের চাপ বেড়ে গেছে। সে এখন থেকে শহরেই থাকবে।

    সামসুদ্দিন আর উঠে আসতে সাহস পেল না। নরেন দাসের বাড়িতে কোনও লম্ফ পর্যন্ত জ্বলছে না। সে একা দাঁড়িয়ে থাকল অর্জুন গাছটার নিচে। যতক্ষণ না ওরা উঠে গিয়ে বলল, আপনে যান, ততক্ষণ সে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বার বার লক্ষ রাখছে নরেন দাসের বাড়িতে লম্ফ জ্বলছে কি না। সে কেমন এখানে ভীতু মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বার বার লম্ফের আলোতে মালতীর মুখ দেখার ইচ্ছা। মালতী, তুই আমার কসুর মাপ কইরা দেইস, এমন বলার ইচ্ছা। সে আবার মাঠের দিকে হেঁটে গেলে গাছের নিচটা কেমন খালি হয়ে গেল।

    সোনা বাড়ি উঠে দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দেখল মাস্টারমশাই দাঁড়িয়ে আছেন। শশীভূষণ দেশ থেকে চলে এসেছেন। ওদের দেখেই তিনি বললেন, কী তোমরা অলক্ষ্মী ফেলে লক্ষ্মী এনেছ! দেখাও তো লক্ষ্মীরে।

    ওরা ধানের ছড়া আলোতে তুলে দেখল।

    —খুব বড় ছড়া দেখছি. কোথায় পেলে?

    সোনা তার ছড়াও দেখাল। ওরটা সবার বড় কি-না, না ছোট, সে তার মাস্টারমশাইর কাছ থেকে ছড়া দেখিয়ে তার সার্টিফিকেট চাইল।

    শশীভূষণ সোনার ইচ্ছা বুঝতে পেরে বলল, সবার বড় সোনার ছড়া। সোনা সেই-না শুনে ছুটে গেল ভিতরে। মা জ্যেঠিমা কার্তিক পূজার ঘরে নানারকম আলপনা দিয়েছেন। হ্যাজাকের আলো জ্বলছে। জলচৌকিতে কার্তিক ঠাকুর। নিচে সারি সারি শ্রীঘট। ঘটে আতপ চাল, উপরে জলপাই। সে তার ধানের ছড়া মাকে দিল। মা দু’হাতে সোনার হাত থেকে ধানের ছড়া বরণ করে নিলেন।

    কিন্তু শশীভূষণকে দেখেই সোনার বুকটা কেঁপে উঠেছিল। সে আর খুব একটা এ পূজায় উৎসাহ পেল না। মাস্টারমশাই বড় কড়া প্রকৃতির লোক। তিনি খুব সকালে উঠবেন। সবার দরজায় গিয়ে ডাকবেন, সোনা ওঠ। লালটু ওঠ। পলটু ওঠ! হাত-মুখ ধুয়ে নে। তিনি সবাইকে ঘুম থেকে তুলে মাঠে নিয়ে যাবেন। প্রাতঃকৃত্যাদি হলে, মটকিলার ডাল দেবেন। দাঁত মাজতে বলবেন। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দাঁত মাজা হলে বলবেন, উঠে এস। তার জন্য আলাদা একটা তক্তপোশ দিয়েছিলেন শচীন্দ্রনাথ। বড় তক্তপোশ। তিনি সেখানে রাজ্যের সব গাছগাছড়া জড়ো করে রেখেছেন। পেটের পীড়া, দাঁত ব্যথা, বাত এবং মাথাধরা এবং অন্যান্য যাবতীয় রোগে তিনি ওষুধ দেবেন। ওরা মুখ ধুয়ে এলেই ভিজা ছোলা দেবেন। গুনে গুনে দেবেন। এবং গুনে গুনে ফ্রিহ্যাণ্ড একসারসাইজ করাবেন। পড়া হলে স্নান। তেল মেখে দেবেন সোনার মাথায়। সকলকে নিয়ে তিনি পুকুরঘাটে সাঁতার কাটবেন। তারপর গরম ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা এবং হেঁটে স্কুলে যাওয়া। শশীভূষণ এলেই ওরা একটা নিয়মের ভিতর আবার মানুষ হবে এমন ঠিক থাকে।

    এই নিয়মের ভিতর শশীভূষণের যত রাগ লালটুর উপর। লালটুর ডনবৈঠক একশ দশ বার সোনার পঞ্চাশবার। আর পলটুর একশ কুড়িবার। পলটু ঠিক ওঠ-বোস করে কাজ সেরে নেয়। সোনাও। কিন্তু লালটু দেরি করে ওঠ-বস করবে। মাঝে মাঝে উঠতে বসতে ওর প্যান্ট হড়হড় করে নেমে আসে। শশীভূষণ তখন কান ধরে তুলে দেন। এবং চিৎকার করতে থাকেন, ধনবৌদি, ধনবৌদি।

    চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ধনবৌ ছুটে এসে দেখতে পায়, লালটু উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উঠতে বসতে ওর প্যান্ট খুলে গেছে। প্যান্টে ওর দড়ি নেই।

    —এটা কি!

    —আমি কি করমু কন! ওর প্যান্টে কিছুতেই ডোর থাকে না।

    —আচ্ছা, দেখছি। বলে তিনি পাট দিয়ে বেশ শক্ত করে সুতলি পাকিয়ে ওর প্যান্টে ডোর ভরে দিতেন। লালটু ভয়ে ভয়ে আর প্যান্ট থেকে দড়ি খুলে ফেলত না। লালটু জব্দ এই মাস্টারমশাই-র কাছে।

    সোনা শশীভূষণকে দেখলেই এসব মনে করতে পারে।

    মনে করতে পারে একটা উড়োজাহাজের কথা। সেই প্রথম এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে যাচ্ছে। ঢাকার কাছে কর্মিটোলাতে যুদ্ধের জন্য ঘাঁটি হয়েছে। মেজ-জ্যাঠামশাই বাড়ি এলে যুদ্ধের গল্প করেন। মাঠ থেকে উড়োজাহাজ দেখে সে যখন বাড়ি ফিরছিল তখন রাস্তায় দেখা।

    —এই খোকা, শোন!

    সে বিদেশী শব্দ শুনেই থমকে দাঁড়িয়েছিল।

    —ঠাকুরবাড়ি কোনদিকে?

    সে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল।

    ছোট করে চুল ছাঁটা মানুষটার। তিনি নবদ্বীপের মানুষ। এখানে তিনি হাইস্কুলে হেডমাস্টার হয়ে এসেছেন। বারদি থেকে হেঁটে এসেছেন বলে হাতে পায়ে ধুলো। সোনা বাড়িটা দেখিয়েই ছুটে হারাণ পালের বাড়ির ভিতর ঢুকে সোজা চলে এসে ছোটকাকাকে খবরটা দিয়েছিল। দিয়েই সে আবার বারবাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল—কতক্ষণে সেই মানুষ পুকুরপাড়ে উঠে আসেন।

    শশীভূষণ বাড়িতে ঢুকে বলেছিলেন, এটা তোমাদের বাড়ি?

    সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।

    —শচীন্দ্রনাথ তোমার কে হয়?

    —কাকা।

    —একবার কাকাকে ডাকো দেখি।

    ততক্ষণে শচীন্দ্রনাথ বারবাড়ির উঠোনে চলে এসেছেন। ওঁকে দেখেই শশীভূষণ নমস্কার করেছিলেন। বলেছিলেন, এলাম।

    —আসেন। শচীন্দ্রনাথ বৈঠককানায় নিয়ে ওঁকে বসিয়ে দিলেন।—এই আপনের ঘর, এই তক্তপোশ। আর এই তিন বালক।

    সোনা ততক্ষণে বুঝতে পেরেছিল, ওদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই—যাঁর আসার কথা অনেকদিন থেকে, যিনি বরিশালের কোন অঞ্চলে শিক্ষকতা করতেন সেকেণ্ড মাস্টারের, এখানে হেডমাস্টারের চাকরি পেয়ে চলে এসেছেন। শচীন্দ্রনাথই এ-ব্যাপারে বেশি স্কুলের জন্য খেটেছেন। এবং কথা ছিল হেডমাস্টারমশাই ঠাকুরবাড়িতেই থাকবেন, খাবেন। এবং এই তিন বালকের প্রতি নজর রাখবেন।

    শচীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তোমরা মাস্টারমশাইকে প্রণাম কর।

    ওরা সেদিন কে কার আগে প্রণাম করবে—ঠেলেঠুলে প্রণাম করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পায়ে।

    প্রথমেই তিনি বলেছিলেন, তোমাদের দাঁত দেখি।

    সোনা দাঁত দেখিয়েছিল।

    —ভালো করে দাঁত মাজা হয় না। বলে তিনি নিজে হাত পা ধুয়ে আসার সময় একরাশ মটকিলার ডাল কেটে আনলেন। এবং সবাইকে একটা করে দিয়ে—কীভাবে দাঁত মাজতে হয়, দাঁত নিচ থেকে উপরে মাজতে হয়, এই দাঁত মাজা আমরা আদৌ জানি না, দাঁত থেকেই সব রোগের উৎপত্তি এমন বলে তিনি নিজে দাঁত মেজে খাঁটি নমুনা দেখিয়েছিলেন।

    সোনা, লালটু, পলটু বাইরে এসে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছিল।

    সেই মাস্টারমশাই আবার এসে গেছেন। সোনা আর যখন তখন পড়া ফেলে অর্জুন গাছের নিচে ছুটে যেতে পারবে না।

    সোনা হ্যারিকেন নিয়ে হাত পা ধুতে ঘাটের দিকে চলে গেল। সে কেমন বিমর্ষ। ফতিমা নেই এবং সে অন্যমনস্ক। অন্যমনস্ক না হলে সে একা ঘাটে হ্যারিকেন নিয়ে হাত পা ধুতে আসতে পারত না। ওর ভয় করত।

    সে ঘাটে নেমে গেল। হ্যারিকেনটা তেঁতুলগাছের গোড়ায় রেখেছে। সে পা ধোওয়ার জন্য জলে নামতেই সামনে কি দেখে ভয় পেয়ে গেল. জলের উপর ঠিক মাছরাঙা পাখির মতো এক জোড়া পায়ের পাতা ভাসছে। লাল। যেন সিঁদুর গুলে পায়ের পাতায়, কেউ মা লক্ষ্মীকে জলে ভাসিয়ে গেছে। লক্ষ্মীর পায়ের মতো দু’পা জলে ভাসিয়ে নিচে কেউ ডুবে আছে। সে দেখেই লাফ দিয়ে ছুটে পালাল। হ্যারিকেন পায়ে লেগে পড়ে গেল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে দক্ষিণের ঘরে ঢুকে বলতে বলতে কেমন তোতলা বনে গেল।

    শশীভূষণ মুহূর্ত আর দেরি করলেন না। শচীন্দ্রনাথ এবং নরেন দাস ছুটে এল। শশীভূষণ জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নিচে মনে হল মাথার কাছে একটা শক্ত কিছু লাগছে। তিনি ডুব দিয়ে তুলে আনলে দেখলেন, মালতী। গলায় কলসী বেঁধে জলে ডুবে আত্মহত্যার চেষ্টা। পায়ে আলতা পরেছে। কপালে সিঁদুর আর হাতে গলায় ওর যত গয়না ছিল সব পরে সে জলের নিচে অন্তর্ধান করতে চেয়েছে।

    শচীন্দ্রনাথ নাড়ি টিপে বুঝলেন, প্রাণটা ভিতরে এখনও আছে। চোখ দুটো বোজা। মালতী অজ্ঞান হয়ে আছে, গলগল করে জল বমি করছে। ফ্যাকাসে মুখ। কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা। সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, পায়ে আলতা। চারপাশে যে এত ভিড় শচীন্দ্রনাথ তা লক্ষ করলেন না। তিনি অপলক অভাগিনী মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছেন। ওরা নুন দিয়ে ওর শরীর ধীরে ধীরে ঢেকে দিতে থাকল। মেয়েটা চোখ বুজে এখন নুনের নিচে বুঝি নিভৃতে ঘুম যাচ্ছে। সকাল হলেই জেগে উঠবে। সেই আশায় সকলে আলো জ্বালিয়ে চারপাশে বসে থাকল। সোনা সে রাতে ঘুম যেতে পারল না। শিয়রে সেও জেগে বসেছিল। বার বার রঞ্জিতমামার কথা তার মনে পড়ছে। তার কেন জানি রঞ্জিতমামার ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল।

  • ঊনত্রিশ

    ঊনত্রিশ

    উপরে হেমন্তের আকাশ। নিচে ধানের মাঠ। আর রাতের অজস্র তারার আলো এবং মানুষজনের ভিড় চারপাশে। মালতী নুনের নিচে শুয়ে আছে। যেন ঘুম যাচ্ছে। সোনা রাত বাড়লে আর জেগে থাকতে পারেনি। সে যে শতরঞ্জ পাতা আছে দক্ষিণের ঘরে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল, আশ্চর্য, দেখল, রঞ্জিতমামা একটা লাঠি হাতে ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে আছেন। ছোটকাকা মামাকে কি সব বলছেন।

    রঞ্জিত মালতীর পায়ের কাছে এসে বসল। ওর এটাচিটা সোনা এনে বড় জ্যেঠিমাকে দিয়ে দিল। মুখে ওর খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ক’রাত জেগে জেগে হেঁটে-হেঁটে এতদূর এসেছে। ক্লান্ত এবং ঘুম যাবে বলে উঠে এসেছিল। ভিড় এবং হ্যাজাকের আলো রঞ্জিতকে প্রথমে বিস্মিত করেছিল, এবং এই বিস্ময় প্রচণ্ড ওকে নাড়া দিয়েছে। ওর মনে হল নরেন দাসই এই আত্মহত্যার জন্য দায়ী।

    নরেন দাস ওকে একটা খুপরিতে রেখে দিয়েছে। অথবা সেই জব্বর। সে এখন কোথায়! ওর অবশ্য এসব কথা ভাববার বেশি সময় ছিল না। সে ডানহাতটা নুনের ভিতর থেকে বের করে আনল। নাড়ি দেখল। ভালোর দিকে। সে পায়ের পাতায় কতটুকু গরম আছে দেখার জন্য নুন সরাল। পাতায় আলতার দাগ। ভিতরটা রঞ্জিতের ভীষণ কেঁপে উঠল। মালতীর মুখ দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। সে মুখ থেকে নুন সরিয়ে দিল।

    এখন শেষ রাত। এখন সে একা পাহারায় আছে। নুন সরাতেই ওর কেন জানি মনে হল মালতী জোরে শ্বাস ফেলছে। ওর কপালে সিঁদুর, মাথায় সিঁদুর। কে বলে মালতী বিধবা। মালতীর এই সুন্দর মুখ এবং শরীর দেখে রঞ্জিত বিমূঢ়ের মতো বসে থাকল। সে কপালে হাত রাখল। চিবুক দেখল। ভাগ্যিস সে বুঝিয়ে-সুজিয়ে সকলকে ঘুমোতে পাঠাতে পেরেছে। সবাই এক সঙ্গে জেগে কী লাভ! সে মালতীকে চুরি করে ভালোবাসার চেষ্টায় আকাশের দিকে তাকাতেই মনে হল ভোর হয়ে আসছে। সে এবার মালতীকে নুন থেকে একেবারে আলগা করে দক্ষিণের ঘরে নিয়ে গেল এবং শতরঞ্জিতে শুইয়ে দিল। ডাকল, মালতী, আমি এসে গেছি। বস্তুত এই জলাজমির দেশে মাটি আর মানুষ জলের নিচে আশ্রয় খোঁজে। মালতী প্রাণ ধারণে কোনও আর উৎসাহ পাচ্ছে না। জলের নিচে তার সেই প্রিয় নিরুদ্দিষ্ট হাঁসটিকে খোঁজার জন্য বুঝি ডুব দিয়েছিল। আমি আর ভাসব না জলে, জলের নিচে ডুবে যাব, এই ছিল তার আশা।

    সকাল হলে রঞ্জিত থানা-পুলিশের ভয়ে একবার শচীন্দ্রনাথকে থানায় যেতে বলল। ছ’ ক্রোশের মতো পথ। সুতরাং কিছুটা হেঁটে থানায় যাবার জন্য তিনি প্রস্তুত হলেন।

    শচীন্দ্রনাথ থানায় চলে গেলে রঞ্জিত নরেন দাসের কাছে গেল। বলল, ওকে এ-ঘরে ফেলে রেখেছেন কেন?

    নরেন দাস টানা হাঁটছিল। মালতী এখন ক্রমে গলগ্রহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সে উত্তর করল না।

    রঞ্জিত বুঝতে পারল, নরেন দাসের ইচ্ছা নয় মালতী বড় ঘরে থাকুক। লক্ষ্মীর পট আছে, ধর্মাধর্ম আছে। নরেন দাস এখন এসবে মাথা ঘামাতে চাইছে না। রঞ্জিত আর কিছু বলতে সাহস পেল না। সে মালতীর কে! সামান্য খুপরি ঘরেই এখন থাকার আস্তানা মালতীর। তাকে আর ভিতর বাড়িতে নেওয়া যাবে না। জীবনে তার আর খোলা বাতাস, মুক্ত মাঠ, বর্ষার বৃষ্টিতে উদোম গায়ে ভেজা হবে না। সব তার হারিয়ে গেল।

    স্টিমারেও একজন মানুষ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। সে রেলিঙে দাঁড়িয়ে বিশাল মেঘনা নদী দেখতে দেখতে কেবল মালতীর কথা ভাবছে। দু’পাড়ে কত গাছ-গাছালি। স্টিমারটা যত এগুচ্ছে তত যেন কৈশোরের বালিকা গাছ-গাছালির নিচে নদীর পাড় ধরে ছুটছে। ওর চুল উড়ছে। খালি গা। কোমরে প্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরেছে। ক্রমান্বয়ে ছুটছে। দামোদরদির মঠ পিছনে। সামনে এবার উদ্ধবগঞ্জ পড়বে। কিন্তু মানুষটা কিছু দেখছে না—দেখছে শুধু নিরন্তর এক বালিকা মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। কী যেন ছুঁতে চাইছে, পারছে না। সামসুদ্দিন, মালতী নিখোঁজ হবার পর থেকেই কেমন যেন ভেঙে পড়েছিল। জব্বর তার জাতভাই, লীগের পাণ্ডা। সামান্য অর্থের লোভে সে কাজটা করেছে। একটা ফুলের মতো জীবনকে নষ্ট করে দিয়েছে। যে তার কৈশোরে সারা মাস কাল নানাভাবে ফুল ফুটিয়েছিল, সে এখন নির্জীব পাগলপ্রায়। এবং শিগগিরই যেন কি একটা দুর্ঘটনা ঘটবে—সে ভয়ে ভয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

    .

    সেদিন ফেলু তার বাছুরটা নিয়ে মাঠে নেমে যাচ্ছে। হেমন্তের সকাল। ধানের মাঠ শুধু চারপাশে। সে বাছুরটাকে ধানের মাঠে আগা ছেড়ে দিতে পারছে না। আলগা ছেড়ে দিলেই ধান খেতে অথবা কলাই খেতে মুখ দেবে। এ মাসেই দু’বার গৌর সরকারের বান্দা লোক আবদুল বাছুরটাকে খোঁয়াড়ে দিয়ে এসেছে। সে পঙ্গু বলে কেউ আর তাকে ভয় পাচ্ছে না। জীবনে সে বহু গুনাহ্ করেছে, আল্লা তার ফল হাতে নাতে দিচ্ছেন, এমন ভাবে সব মানুষ। ওর মনে হয় তখন শালা এ-দুনিয়ার হালফিলে যত মাঝি-মাল্লা আছে, সকলের রক্তে সে খোঁচা দিয়ে দেখে—কিন্তু হায়! পারে না। হাতে তার শক্তি আর নেই। কালো-কড়ি তারে বাঁধা হাত মরার মতো শরীরের এক পাশে ঝুলে থাকে। এক এক সময় মনে হয় দেবে এক কোপে শেষ করে। গলা হ্যাৎ করার মতো শরীর থেকে হাতটা বাদ দিয়ে দেবে। কিন্তু পারে না। এই মরা হাতটার জন্যে তার বড় মায়া হয়। রোদে কোলের উপর হাত নিয়ে বসে থাকলে হাতটাকে তার নিজের সন্তানের মতো লাগে।

    সে বাছুরটার দড়ি ধরে হাঁটতে থাকল। বাছুরটা কিছুতেই এগোতে চাইছে না। হাড় বের করা এই গরুর বাচ্চাটাকে সে কিছুতেই পেট ভরাতে পারে না। তার পঙ্গু হাত আর এই বাগি (ভাগে) বাছুর তাকে পাগল করে দিচ্ছে। আর দিচ্ছে আন্নু। সে তো আর ফেলু নেই, হা-ডুডু খেলোয়াড়ও নয়—বিবি তার এখন অন্য বাড়ি যায়—কারে সে কি কবে! রাতেরবেলা বিবি পাশে না থাকলে চোখে ঘুম থাকে না। বিবি তার কোথাও রঙ্গরসে ডুবে আছে। হাজিসাহেবের ছোট বেটা আকালু বাঁশবনে লুকিয়ে থাকে। সে বাছুর নিয়ে বের হলে অথবা ফসল চুরি করতে গেলে—এবং যখন সে দূরে দূরে মনের দুঃখে বনবাসে যায় তখন যুবতী তার রঙ্গরসে ডুবে থাকে!

    অথবা এখন সে যে কী করে খায়! দু’পেটের সংসার। সে কোনও কোনও দিন মনের দুঃখে নদীর পাড়ে হেঁটে বেড়ায়—বাছুরটা সঙ্গে থাকলে সে ছুটতে পারে না। সে বাছুরটা নিয়ে হাঁটে, এবং ফসলের শীষ কেটে নেয়—ঠিক জোটনের মতো। কলাই গাছ তুলে আনে রাতে। যব, গমের দিনে যব, গম। সে একা পারে না। বিবি তার মাঝে মাঝে সঙ্গে থাকে। বিবি তার জ্যোৎস্না রাতে মাঠের ভিতর চুরি করে ফসল কাটে আর সে আলে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মাঝে জমির আল থেকে হাঁক আসে, কে জাগে? শিস্ দেবার মতো জবাব আসে, আমি জাগি।

    —সঙ্গে কে জাগে?

    —মিঞাসাব জাগেন। আন্নু খুশি থাকলে সে ফেলুকে মিঞাসাব বলে। আন্নু যেন এসময় তার নিজের আন্নু। পীরিত করে কার সনে—সে কথা তার মনে থাকে না। এই আন্নুকে নিয়ে ফসল চুরি করতে বের হলে ফেলু বুঝতে পারে, বিবি তার ঘরেই আছে। কিন্তু একা মাঠে নেমে এলে তার সন্দেহটা বাড়ে। বিবি তার চুরি কইরা অন্য বাড়ি যায়। সে তখন দুঃখে এবং অক্ষমতার জন্য বাগি বাছুরটার পাছায় লাথি মারে।—হালার কাওয়া, আমারে ডরায় না। এবং চারপাশে মাঠ, মাঠের দিকে তাকালেই শুধু এক মানুষ হেঁটে হেঁটে যায়। মাথায় তার নানারকমের পাখি ওড়ে। সে তখন কর্কশ গলায় হাঁকতে থাকে, ঠাকুর, তুমি আমারে কানা কইরা দিলা।

    শুধু সে ডান হাত সম্বল করে বাছুরটাকে টানছে। বাছুরটা হিজল গাছটার নিচে এসেই শক্ত হয়ে গেল। ফেলু বাছুরটাকে টেনে এতটুকু হেলাতে পারছে না। এমন এক ছোট্ট জীবকে সে হেলাতে পারছে না! রাগটা তার ক্রমে বাড়ছে। বাছুরটা মাঠে কী দেখে ভয় পাচ্ছে! সে আবার চারপাশে তাকাল। হালার হালা, খোদাই ষাঁড়! হাজিসাহেবের খোদাই ষাঁড়টা দু’পা সামনে দু’পা পিছনের দিকে ঠেলে লেজ খাড়া করে শিঙ দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। ফেলুর বাগি বাছুরটাকে ভয় দেখাচ্ছে। অমিত তেজে সে যে ঘোরাফেরা করে—ফসল খায়, কেউ কিছু বলতে পারে না, শিঙ দিয়ে মাটি তুলে তা পরীক্ষা করছে। ধারালো শিঙ। ছুরির ফলার মতো। চক্‌চক্‌ করছে সবসময়। সে ছাড়া থাকে, ধর্মের ষাঁড় বলে কেউ কিছু বলে না। রাজা বাদশার মতো এখন শিঙে ধার দিয়ে ঘাড় গর্দান লম্বা করে দাঁড়িয়ে আছে মাঠে। ধানের মাঠে এমন এক জীব, জবরদস্ত জীব দেখলে ফেলুর প্রাণটা শুকিয়ে যায়। বাগি বাছুরটাকে দেখলেই তেড়ে আসার স্বভাব। কোনদিন বাছুরটার পেট এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে! সে তবু ফেলু বলে, (তার ভয়ডর নাই বলে মানুষ জানে) সামান্য এক জীবকে সে মনুষ্যকুলের কেউ বলে, ডরায় না। ফেলু এমন একটা ভাব দেখাবার জন্য খোদাই ষাঁড়টাকে বলল, হালার পো হালা!

    সে ধর্মের ষাঁড়কে হালার পো হালা বলল। তার কেন জানি কোরবানির চাকুটা পেলে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে জবাই করতে ইচ্ছা হয় ষাঁড়টাকে। এটা যে সে এখন কাকে ভেবে বলছে বোঝা দায়। কোন্ ষাঁড়টা বেশি বেইমান—এই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, না আকালু, কে বড় দুশমন ওর। সে বলল, হালার কাওয়া। হালার আকালু। খোপকাটা লুঙ্গি পরে দাড়িতে আতর মেখে সে যায় উঠোন পার হয়ে। ফেজটুপি মাথায়। লাল রঙের লম্বা ফেজটুপি, একটা দাঁড়কাকের মতো, তুমি মিঞা আমার বিবির গায়ে হাত দ্যাও! হালার কাওয়া। উঠানের উপর দিয়া আবার যাও কি কইরা দ্যাখি! বলেই সে ফিরে এসে উঠোনের উপর মান্দারের ডাল দিয়ে বেড়া দিয়ে দিল।—এডা পথ না মিঞা! এডা সদর রাস্তা না। কিন্তু সকাল হলেই ফেলু দেখেছিল, সব মান্দারের ডাল কারা তুলে ফেলে দিয়ে গেছে। সে তখন বিবির মুখের দিকে তাকাতে পারে না পর্যন্ত। যেন প্রশ্ন করলেই ফ্যাচ করে উঠবে—আমি কি কইরা কই, কেডা মান্দারের ডাল তুইলা ফ্যালাইছে আমি তার কি জানি!

    —হ্যালির হালি! তুই আবার না জানস কি! ফেলু তখন চিল্লাচিল্লি করতে পারত। কিন্তু কাকে বলবে! সে যে পঙ্গু হাতে বিবিকে এখন ভয় পায়। সেই কবে জব্বর সবুজ রঙের ডুরে শাড়ি কিনে দিয়ে গিয়েছিল, গন্ধ তেল দিয়েছিল—বিনিময়ে জব্বর আন্নুর কাছ থেকে কি নিয়ে গেছে কে জানে। তবু সে হাত পঙ্গু বলে সব হজম করেছে। এখন বিবির এক গামছা আর ছেঁড়া শাড়ি সম্বল। মাঠে ফসল চুরি করতে যাবার সময় সে ছেঁড়া শাড়িটা পরে যায়। আর দিনমান আতাবেড়ার আড়ালে সে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ এক খাটো গামছা সম্বল। কখনও কখনও গামছাটা ভিজে গেলে আতাবেড়ার উপর শুকাতে দেয়। তখন আন্নু একেবারে উলঙ্গ। আতাবেড়ার আড়াল। সামনে ঝোপ-জঙ্গল। উঠোনের ওপর দিয়ে গেলে টেরই পায় না আতাবেড়ার ও-পাশে ফেলুর অন্দরে বিবি তার উলঙ্গ হয়ে বসে ধান সেদ্ধ করছে, গম ভাজছে, কাওন জলে ভিজাচ্ছে। যখনকার যা অর্থাৎ যা সব ফসল চুরি করে আনছে তা দিয়ে সম্বৎসর খাবে এই ভেবে দিনমান কাজ করে যাচ্ছে বিবি।

    যতক্ষণ বিবিটা এভাবে উলঙ্গ হয়ে অন্দরে ঘোরাঘুরি করবে ততক্ষণ সে উঠোনে বসে থাকবে, গুড়ুক গুড়ুক তামাক টানবে—আর মনোহর সব দৃশ্য, আতাবেড়ার ভিতর বিবির যৌবন কচি কলাপাতার মতো। অপটু হাতের ব্যবহারে সব নষ্ট করে ফেলেছে ফেলু। বিবির চুলে তেল থাকে না। চোখে সুমা টেনে দিতে পারে না। পার্বণের দিনে বিবি ধার করে মাথায় চুলে তেল দিলে ফেলু যে ফেলু, তার পর্যন্ত আন্নুকে নিয়ে নৌকা ভাসাতে ইচ্ছা হয়।

    যতক্ষণ সে বাড়ি থাকবে, দাওয়ায় বসে থাকবে। সে পাহারায় থাকবে। কেউ এলে তুড়ি বাজাবে হাতে। দু’বার বাজালেই আন্নু টের পায়। তাড়াতাড়ি হাতের কাজ ফেলে ডুরে শাড়ি পরে বসে থাকে। সব শস্যদানা হাঁড়ি পাতিলে ঢেকে রাখে। কেউ যেন টের না পায় ওরা রাত-বিরাতে ফসল চুরি করে আনছে।

    এসব দৃশ্য দেখতে বড় মজা। সে চুরি করে আতাবেড়ার ফাঁকে আন্নুকে দ্যাখে আর মজা পায়। কখনও বিবির শরীরে জ্যালজ্যালে গামছা—প্রায় চিকের মতো। হাজিসাহেবের ঘাটের ও-পারে ঝোপের ভিতর যেমন সে ফণা তুলে বসে ছিল মাইজলা বিবিকে দেখবে বলে, সে ঘরের ভিতর তেমনি কখনও কখনও বসে থাকে। নিজের বিবির উলঙ্গ শরীর চুরি করে দেখতে ফেলু বড় মজা পায়।

    এত অভাব অনটনেও বিবিটা যে কী করে এমন লাবণ্য জিইয়ে রেখেছে শরীরে—হায়, তখন ফেলু আকালুর লম্বা শরীর, শক্ত বুক, লাল রঙের ফেজটুপি কেবল মরীচিকার মতো দেখতে পায়। খুসবু আতর মাখে দাড়িতে আকালু। আকালু বড় চালাক! সে যখন রাস্তা দিয়ে যায়, আতর মেখে যায় দাড়িতে। বিবি আতরের গন্ধ পেলেই আতাবেড়ার আড়ালে নেচে ওঠে। মানুষ তার এসে গেছে। সে টের পায় আতরের গন্ধে এক মানুষ এই রাস্তায় জানিয়ে গেল সে বাঁশবনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। বিবিটা তখন সবুজ রঙের জব্বরের দেওয়া শাড়িটা পরে যায়—কই যাও তুমি! যাই মতিউরের কাছে। চিড়ার ধান ভিজাইছে। চিড়া কুইটা দিলে দুই খোলা চিড়া দিব।

    —আর কিছু দিব না?

    —আর কি দিব?

    —ক্যান, চুমা দিব না তরে?

    বিবি বুঝতে পারে মানুষটা ওকে সন্দেহ করছে। আতরের গন্ধ সে টের পেয়ে গেছে। তা আল্লা মানুষটার শক্তি হরণ কইরা নিলা, ঘ্রাণ হরণ কইরা নিলা না ক্যান। জ্ঞান হরণ কইরা নিলা না ক্যান আন্নু কখনও কখনও ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

    ফেলু টের পায় এ-ভাবে আকালু তার বিবির ভালোবাসা হরণ করে নিচ্ছে। সে কোরবানির চাকুটার তালাশে থাকে তখন। কিন্তু কোনওদিন দুপুরের রোদে সে দেখতে পায় মাঠের উপর আকালু মাথায় লম্বা লাল রঙে ফেজটুপি পরে কালো রঙের ফিফিনে আদ্দি গায়ে, খোপকাটা লুঙ্গি কোমরে—আকালু আর একটা ধর্মের ষাঁড় হয়ে গেছে। যেন তিন ষাঁড় তিনদিক থেকে ওকে পাগল করে দিচ্ছে। এক আকালু, দুই হাজিসাহেবের খোদাই ষাঁড়, তিন পাগল ঠাকুর। সে বাছুরটাকে ফের টানতে থাকল।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

    মাঝে মাঝে ফেলু কোরবানির চাকুটা চালাঘরের এ-বাতায় ও-বাতায় লুকিয়ে রাখে। আন্নু ওর গলা কেটে সটকে পড়তে পারে। নিশিদিন ঘরের ভিতর এক অবিশ্বাস, বাতা অথবা চালের শণের ভিতর সে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে—ওটা ঠিক আছে কি-না, না আকালু বিবিকে দিয়ে ওটাও হরণ করে নিয়েছে।

    সে এ-ভাবে বাছুরটাকে টেনেও নড়াতে পারল না। ধর্মের ষাঁড়টা একইভাবে চারপায়ের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মহান জীব যেন সে। কোনওদিকে তার দৃপাত নেই। মাঝে মাঝে ষাঁড়টা তার চোখের উপর মিঞা আকালুদ্দিন হয়ে যাচ্ছে। ষাঁড়টা তার বাছুরটাকে তেড়ে আসবে বলে লেজ তুলে দিচ্ছে।

    ষাঁড়টা এবার শিঙ উঁচিয়ে এদিকে ছুটে আসতে পারে। ষাঁড়টা ছুটে এলেই বাছুরটাও ছুটবে। ছুটে বাড়ির দিকে উঠে যাবে। ফেলু দড়ি ধরে থাকলে টানতে টানতে তাকেও নিয়ে বাড়ি তুলবে। ঐ শালা যণ্ড, এক মহাজীব, জীবের চোখ লাল যেন তার সামনে অথবা দূরে যা কিছু মাঠ, যা কিছু ফসল এবং কচি কচি ঘাস সব তার ভোজনের নিমিত্ত। আর কে আছে এ মহা-পৃথিবীতে ফসলে ভাগ বসায়! সামনে দিয়ে যায়। ফেলু জোর খিস্তি করল, ও হালা বাগি বাছুর সামনা দিয়া যাইতে ডর পায়।

    বাগি বাছুরের আর দোষ কি! ফেলু নিজেও সামনে যেতে ভয় পাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি একটা ছিটকিলার ডাল ভেঙে ফেলল। এক হাতেই সে ডাল থেকে পাতা ফেলে ওটাকে একটা পাচনের মতো করে নিল। সে হাতের ওপর ডালটা ঘোরাতে থাকল। যণ্ডটা দেখুক ফেলুর কি দুর্জয় সাহস আর শক্তি। সে লাঠি ঘুরিয়ে এখন যণ্ডটাকে ভয় দেখাচ্ছে। এবং বাগি বাছুরটার কাছে সে নিজের প্রতিপত্তি কত বেশি, সে যে ফেলু, এক হাত গিয়েও সে ফেলুই আছে এমন বোঝাতে চাইছে। জীবটা কাছে এলেই থোতা মুখ ভোঁতা করে দেবে। একদিন ফেলু দেখেছে যণ্ডটা ওর বাছুরটাকে তাড়া করে আসছে। সে পঙ্গু হাতে পেরে উঠছে না। বাছুরটা ওকে টেনে নিয়ে বাড়িতে তুলেছে। যণ্ডটা তখন মহামারীর মতো তেড়ে এসে একেবারে উঠোনে উঠে গেছে। বাছুরটাকে সে চুরি করে ঘাস খাওয়াচ্ছিল। যণ্ডের প্রতাপ কত, ষণ্ডটা উঠোনে উঠে এলেই হায় হায় রব। গেল গেল। চিৎকার চেঁচামেচি। বাছুরটা ঘরে ঢুকে গেছে। বোধহয় ঢুঁ মেরে ফেলুর কুঁড়েঘর উড়িয়ে দিত। কিন্তু আন্নুর হাতে ছিল গরম ফ্যানের পাতিল। সে জীবের রোষমূর্তি দেখে ভয়ে গরম ফ্যান ছুঁড়ে দিল যণ্ডের মুখে। আর তখন জীবটা হাম্বা হাম্বা করে ডাক দিল মুখটা পুড়ে গেছে। মহাষণ্ড মাঠের ওপর দিয়ে তখন লেজ তুলে ছুটছে। সেই থেকে জীবটা তার সীমানায়, ফেলু নিজের সীমানায়। দুই জীব। পোড়া মুখ যণ্ডের। এক চোখ গলে কপালের ভিতর ঢুকে গেছে। ফেলুর বসন্তে গেছে একটা চোখ। দুই জীব এখন এক চোখে সময় পেলেই লড়ছে।

    কি যে ডর ফেলুর! তবু হাতে লাঠি থাকায় ডর কমে গেল! সে বাছুরটারে নিয়ে আবার হাঁটতে থাকল। কচি ঘাস সে খুঁজছে। দেখল মাঝিদের মাঠে আলের ওপর নরম ঘাস। সে বাছুরটাকে দড়ি ধরে বসল। চারপাশে ধান খেত। সে আলে আলে বাছুরটাকে ঘাস খাওয়াচ্ছে। ঘাস খেতে খেতে বাছুরটার ছপ্ ছপ্ শব্দ ফুৎফাৎ শব্দ। লেজ নেড়ে নেড়ে বাছুরটা নিশ্চিন্তে খাচ্ছে। এই ঘাস খাওয়া দেখতে দেখতে ফেলু কেমন আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এবং কেন জানি তার গতরাতের কথা মনে হচ্ছে বার বার। সে কাল সারারাত ভয়ে ঘুমোতে পারেনি। আন্নু সন্ধ্যার পর ঘরে ছিল না। ছেঁড়া ডুরে শাড়ি পরে বিবি তার যে কোথা গেল। সে তাকে এ-বাড়ি ও-বাড়ি খুঁজেছে। সে হাজিসাহেবের বাড়ি যেতে পারে না। গেলেই মাইজলা বিবি, ওলো সই ললিতে গানটা গায়। পাচনের গুঁতো মারতে পারেন হাজিসাহেব। সে ফিরে এসেছিল। না ও কোথাও নেই। আন্নু যখন এল তখন রাত অনেক। মাথায় তার এক বোঝা কলাই গাছ। সে গাছ চুরি করে এনেছে হাজিসাহেবের জমি থেকে। এনেছে, না দোষ ঢাকবার জন্য এক বোঝা কলাই গাছ দিয়েছে আকালু সে বুঝতে পারছে না।

    না বলে, না কয়ে গেলেই ফেলুর মনে হয় বিবি তার মসকরা করতে গেছে। অথবা আকালুর সঙ্গে বনে মাঠে পীরিত করতে গেছে। গতকাল রাতে কোথাও যাবার কথা নেই অথচ না বলে না কয়ে চলে গেল। লালসা পেটে পেটে। ফেজ টুপি মাথায় আনধাইর রাইতে দাড়িতে খুশবো মেখে আকালু নেমে গেছে। বিবি, কোন অন্ধকারে খোপকাটা লুঙ্গি পরে আকালু দাঁড়িয়ে থাকে, গন্ধ শুঁকে শুঁকে টের পায়। সে সেদিন গৌরচন্দ্রের বাড়ি গেল। ফিরতে রাত হবে কথা ছিল। সেই ফাঁকে বিবিটা বনে মাঠে নেমে গেল।

    না কী বিবি তার কাজ কারবার হয়ে গেলে, বাছুরের ঘাস নেই বলে অন্ধকারে সব কলাই তুলে এনেছে জমি থেকে। কী যে হচ্ছে! গাঁয়ের মানুষও জানে জবরদস্ত ফেলুর বিবি এখন পীরিত করছে। জবরদস্ত ফেলুর এই অবস্থা। বিবি তার পীরিত করে অন্য জনার সঙ্গে। সে ভিতরে ভিতরে আগুন। বিবি ঘাস মাথা থেকে নামাতে পারেনি। কোমর বরাবর লাথি। পা তো তার আর পঙ্গু নয়। বরং হাতের শক্তি এখন তার পায়ে এসে জমেছে। লাথি খেয়ে আন্নু সামলাতে পারেনি। উল্টে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আন্নুকে মারলেই সে দাওয়ায় বসে আগে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদত। মড়া মরেছে বাড়িতে এমন কান্না। কান্নার সঙ্গে নানারকম অশ্লীল শব্দ সুর করে গাওয়া। মাঠের ধার দিয়ে কেউ গেলেই বুঝতে পারত শালা ফেলু আবার ক্ষেপে গেছে।

    নিত্যকারের ব্যাপার বলে কেউ আসে না। আবার দ্যাখো কি পীরিত দু’জনায়।

    কিন্তু আজ সবাই যেন টের পেয়েছে আন্নু মতিহার সাদাপাতা দাঁতে মাখছে। আন্নু গতকাল মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েও কাঁদেনি। কোথায় যেন সে একটা শক্ত জায়গা পেয়েছে পা রাখবার। কাঁদলে কাটলে কটুক্তি করলে ফেলুর ডর থাকে না। আজ সে কোনও কটুক্তি করছে না। কোনদিকে আন্নু না আবার যথার্থই চলে যায়। ফেলু শুধু জানে সে তালাক না দিলে বিবি কোথাও যেতে পারবে না। আকালু চায় ফেলু তালাক দিক। তালাক দিলে কিছু পয়সা পর্যন্ত মিলে যাবে এমন লোভ দেখিয়েছে আকালু। ফেলুর মুখ দেখলে তখন মনে হয় এই যে কথায় কথায় মারধোর করা সবই দাম তোলবার জন্য। কত দাম দিবা মিঞা। কিন্তু ফেলুর অন্তর জানে সে এ-সব পারে না। আন্নু না থাকলে সে মরে যাবে।

    কিন্তু ফেলু যখন আন্নুর দাম-দর নিয়ে মাথা ঘামায়, এক চোখে মুচকি হাসে, তখন তার দাড়ির ভিতর গোটা মুখ কী যে বীভৎস—তা মিঞা বরাবর হইয়া যাউক। যুবতীর বিনিময়ে টাকা আসে। যতদিন বিবি আছে ততদিন অভাবে অনটনে টাকা ধার—আন্নু না থাকলে শালা হারামের ছাও ফেলুকে ভিটেমাটি ছাড়া করে ছাড়ত। তখন ক্ষণে ক্ষণে ইচ্ছা হয় ফেলুর, ভাঙা মরা হাতে মারে এক বাড়ি। শালা ইতরের বাচ্চার পীরিত ছুইটা যাউক। পরক্ষণেই মনে হয় ওর হাত নেই—এক হাত সম্বল। তেড়ে গেলে হারামের বাচ্চা ওর ঘাড়টা ধরে ফেলবে এবং এমন মোচড় দেবে পঙ্গু হাতে যে ফেলু একটা পাগলা কুকুরের মতো চিৎকার করতে থাকবে। সেজন্য আকালু কোথাও গেলে সে হাসি হাসি মুখে বলবে –কৈ যান ভাইসাব? মাঠে ধান কেমন হইল? কার্তিকশাল ধানের ভাত কতকাল খাই না। ধান উঠলে আনুরে পাঠাইয়া দিমু। দুই কাঠা ধান দিয়া দিবেন।

    আকালুর চোখে সর্ষে ফুল ফুটে ওঠে। ফেলুটা তক্কে তক্কে আছে কবে ধান উঠবে! সে কী বলবে ভেবে পায় না। আন্নুটা কোথায়? আতাবেড়ার ফাঁকে চোখ ঠেলে দেয়। সে কী তার দাড়ির আতরের গন্ধ পায়নি? বাধ্য হয়ে আন্নুকে দেখবার জন্য উঠোনে দাঁড়ায়। কিছু কথা বলতে হয়। সে চোখ এধার ওধার করতে করতে বলল, বিবিরে পাঠাইয়া দিয় মিঞা। দুই কাঠা ধান দিমু। গুয়া দিমু। তামাক পান যা লাগে দিয়া দিমু। তারপর আন্নুকে যে চুরি করে দেখার তালে আছে সেটা ধরা পড়লেই মিঞার মুখে থুতু দিয়ে চলে যাবার ইচ্ছা। আন্নুর কী জ্বালা এই মানুষকে নিয়ে। কিছুতেই ছেড়ে আসতে পারছে না। কী করে কোথা থেকে যে এমন একটা খুবসুরত বিবি ধরে এনেছে! কেউ জানে না বললে ঠিক হবে না, জেনেও জানে না যেন—এতদিনে এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ফেলুর বিবি আনুর। ফেলু নিয়মমাফিক তালাক না দিলে সে ঘরে তুলে নিতে পারবে না। পারে আন্নুকে নিয়ে কোনদিকে চলে যেতে, আন্নুকে নিয়ে কোন গঞ্জে চলে গেলে কেউ টের পাবে না।

    ফেলু যেন তখন টের পায় বিবি তার যথার্থই ভাগবে। শুধু ভাগবে না, যেমন সে হ্যাৎ করে মিঞাসাহেবের গলা দুফাঁক করে দিয়েছিল, তেমনি বিবি, তার গলা দুফাঁক করে ভাগবে। এবং এই-ভাবে বসে বসে সে কেবল বিবির মুখ দেখছিল। একবার বিবি কাঁদল না। শক্ত হয়ে সারাক্ষণ কুপির আলোতে মুখ নিচু করে গোঁজ হয়ে বসে থাকল। ভয়ে ফেলু রাতের প্রথম দিকে ঘুম যেতে পারল না। হোগলা বিছিয়ে সে শুয়ে চুপিচুপি বিবির মুখ দেখছে। কঠিন মুখ শক্ত চোখ বিবর্ণ। চোখ জ্বলছে। বাইরে তখন কী একটা পাখি ডাকছিল। হেমন্তের মাঠে শিশির পড়ছে। কোড়াপাখিদের ডিম ফুটে নিশ্চয়ই এতদিনে বাচ্চা হয়েছে। ফেলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই মনে হল বিবি নড়েচড়ে বসেছে। এবং তার বুঝি একটু মায়া হল। বড় জোরে সে মেরেছে। সে বলল, কই গ্যাছিলি?

    —মরতে গ্যাছিলাম।

    —মরতে কই গ্যাছিলি?

    —মাঠে।

    —ক্যান, কি কামডা মাঠে?

    — ঘাস না আনলে তর সাধের বাছুরডা খাইবে কি? সারাদিন কি খাইতে দিছস?

    মনে হয় বিবির রাগটা কমে আসছে। সে উঠে বসল।—দে, দুইডা। খাইতে দে।

    —পারমু না।

    —ক্যান পারবি না! কেডা তরে ভাত দ্যায়? বলেই সে তেড়ে যাবে ভাবল। কিন্তু সেইরকমের গোঁজ হয়ে বসে থাকা দেখে সে উঠতে সাহস পেল না। বাতার যেখানে কোরবানির চাকুটা লুকিয়ে রেখেছিল সেটা সেখানে ঠিকমতো আছে কি-না দেখল। কিন্তু চাকুটা নেই। আতঙ্ক চোখে মুখে। একটা চোখে দেখতে হয় বলে ঘাড় পুরোটা না ঘুরালে সে দেখতে পায় না। একবার মনে হল অন্য কোথাও রেখেছে। সে অযথা বিবির ওপর রাগ করছে। খুঁজে দেখলেই হবে। তাছাড়া সে বিবিকে কী সুখটা দিল! ক্ষণে ক্ষণে মায়া পড়ে যায়। ক্ষণে ক্ষণে তার অবিশ্বাস। সে মায়া পড়ে গেলে কাছে গিয়ে বসল। পিঠে হাত দিয়ে আদর করতে চাইল। সাপ্টে ধরে আদর করতে চাইল। আন্নু যেন এবার গলা কামড়ে ধরবে! সাপের মতো ফুঁসে উঠছে। মিঞা, তুমি আমারে ছুঁইবা না, তুমি ইবলিশ। তুমি না-পাক।

    —কি কইলি! আমি ইবলিশ, না-পাক মানুষ! ফেলু তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।

    ওকে যেন বিবি এতদিন পর চিনিয়ে দিচ্ছে—তুমি ইবলিশ, তুমি শয়তান। তোমার ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই।

    ফেলুর পায়ের রক্ত চড়াৎ করে মাথায় উঠে গেল। সে বুঝি কঠোর কঠিন কিছু একটা এবার করবে। সে বাইরের অন্ধকারে নেমে এল। ঘরে থাকলে এক্ষুনি হত্যাকাণ্ড ঘটবে। সে চালের বাতায় সেটা খুঁজল। না নেই। আমি, আমি ইবলিশ, না-পাক মানুষ, সে খুঁজতে খুঁজতে এমন সব বলল। নামাজ পড়ি না, আল্লার নাম মুখে আনি না, আমার গুনাহ্র শেষ নাই। তা তুই এহনে এগুলান কবি। বলেই সে লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে বিবির সামনে ধপাস করে বসে পড়ল। তারপর বাঁ-হাতটা ডান হাতে তুলে মরা সাপের মতো বিবির চোখের সামনে দোলাতে থাকল। বলল, বিবি, তর সাহসের বলিহারি যাই। এডা আমার মরা হাত, হাত তরে সাহস দিছে। তুই আমারে না-পাক কইলি! না হইলে কার হিম্মত আছে, কাইন্দা মরে কত বান্দা লোক— তুই ত মাইয়া মানুষ আন্নু! হাসুয়াডা কোনখানে রাখছস! কোরবানের চাকুড়া?

    —ক্যান, তুমি আমার গলা কাটবা?

    —দিলে দেহন যায় গলা তর কাটে কি না!

    আন্নু এবার আরও শক্ত হয়ে গেল।—এই আছিল তর মনে! বলে সে খড়ের ভিতর থেকে হাসুয়া এবং কোরবানির চাকুটা ফস করে বের করে ফেলল।—আইনা দিলাম। ইবারে চালাও দ্যাহি। করছ একখানা কাম তবে বুঝি! বলে সে দুই চোখ বিস্ফারিত করে যেন রণরঙ্গিণী, ডুরে শাড়ি খুলে ফেলে প্রায় উলঙ্গ আন্নু সামনে গলা বাড়িয়ে দিল। হিম্মত মিঞা নাই! পার না পোচাইয়া গলা কাটতে! বলেই সে ফের কেমন শক্ত হয়ে গেল। ফেলুর যা মেজাজ, এক্ষুনি সে গলা চেপে নলি কেটে দিতে পারে। এক্ষুনি সে কিছু একটা করে ফেলবে! কিন্তু আন্নু এতটুকু ভয় পাচ্ছে না। কারণ চোখ দেখে সে টের পাচ্ছে—মানুষটারে ডরে ধরেছে। সে আগের মতো দুই চোখ বিস্ফারিত করে, যেন আগুন জ্বলছে চোখে—মাঠের ভিতর স্বামী হত্যার কথা শুনে সে যেমন হা হা করে হেসে উঠেছিল পালিয়ে আসার সময়, আজ আবার তেমনি পাগলের মতো হাসতে থাকল।

    সঙ্গে সঙ্গে ফেলু তার মরা হাতের মতো নিস্তেজ হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি অস্ত্র দুটো হাতের পিছনে লুকিয়ে ফেলল। সে গোপনে অস্ত্র দুটোকে খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখল অন্ধকারে। আন্নু কঠিন চোখে দেখছে জবরদস্ত মানুষটা ক্রমে রাতের পোকা হয়ে যাচ্ছে। সে কঠিন গলায় বলল, পারলা না, মিঞা! জানে আর হেকমত নাই?

    —নাই বিবি।

    —তা হৈলে পোড়ামুখ মাইনসেরে আর দ্যাখাইয় না।

    ফেলুর মনে হল, সত্যি তার আর বাঁচার অর্থ হয় না। নিজের মুণ্ড নিজে কেটে দণ্ড দিতে পারলে অথবা দু’হাতে মুণ্ড নিয়ে নাচতে পারলে যেন বিবির কথার সঠিক জবাব দেওয়া হতো। কিন্তু অন্ধকার, ওপাশে গোয়ালে বাছুরের চোখ এবং চুরি করে ধান অথবা ফসল কেটে আনা—সবই কেমন মায়াময়—সে কিছুতেই কাটামুণ্ড নিয়ে এখন আর নাচতে পারে না। সে বিবির অলক্ষ্যে কোরবানির চাকু খড়ের গাদায় লুকিয়ে হোগলাতে শরীর টান করে দিয়েছিল। তারপর প্রায় সারারাত সে ঘুমোতে পারেনি। সে ঘুমিয়ে পড়লেই বিবি ঘরে আগুন জ্বালিয়ে ভেগে পড়বে। এক পোড়া মানুষ কুঁকড়ে থাকবে আগুনে-আগুন, হত্যার ছবি—ফেলু একেবারে পাগল বনে যেত, যদি সে না দেখত এক সময় বিবিটা আঁচল পেতে একপাশে শুয়ে আছে। সে সন্তর্পণে কাছে উঠে গেল! দেখল আন্নু যথার্থই ঘুমোচ্ছে কি-না, না ঘুমের ভান করে মটকা মেরে আছে! সে কুপির আলোতে দেখল আন্নু যথার্থই ঘুমোচ্ছে। ওর মনটা সহসা অদ্ভুত বিষণ্ণ হয়ে গেল। বিবিকে আদর করার ইচ্ছা হচ্ছে। সে মুখটা কাছে নিয়ে গিয়েও ফিরিয়ে আনল। ডর, বড় ডর। নাগিনীর মতো ডর। আদর করলেই গলা কামড়ে ধরবে। সে বিবির পাশে গামছা পেতে শুয়ে পড়েছিল। এবং সকালে আন্নুই তাকে ডেকে দিয়েছে—বাছুরডারে মাঠে দিয়া আস।

    মাঠে বাছুর নিয়ে নেমে এলে এই কাণ্ড। এক ষণ্ড চার পায়ের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল মাঠ, ধানখেত, সোনালী বালির নদীর চর উপেক্ষা করে ফেলুকে ভয় দেখাচ্ছে।

    এবং হাজিসাহেবের ছোট বেটা, যত লম্বা মানুষ না, তার চেয়ে বেশি লম্বা হবার সখ। লাল রঙের টুপি মাথায়। খোপকাটা লুঙ্গি পরে তাজা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে আছে। দাড়িতে খুশবো আতরের গন্ধ। বিবি বেমালুম গত রাতের পাছার লাথি ভুলে বাঁশবনে নেমে যাচ্ছে।

    সে এবং যণ্ড আর আকালুদ্দিন, পাগল ঠাকুর সবাই ক্রমে পরস্পর প্রতিপক্ষ হয়ে যাচ্ছে। এক মহিমামণ্ডিত মানুষ হেমন্তের সকালে সোনালী বালির নদীর চরে শুয়ে আছে। কেবল তিনিই জানেন, যণ্ডটা কত বেগে ছুটলে ফেলুর পেট এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে পারে।

    যেন ষণ্ডটা ফেলুকে দেখে, পায়ের ওপর মরণ নাচন নাচছে। এবার যণ্ডটা বুঝি ছুটবে।

  • ত্রিশ

    ত্রিশ

    তখন মালতী হাসছিল। রঞ্জিতের কথা শুনে হাসছিল। এমন প্রতিশোধ স্পৃহা থাকে হাসিতে, রঞ্জিত মালতীর মুখ না দেখলে যেন টের পেত না। কী করুণ আর অসহায় মুখ মালতীর! কী কঠিন হাসি!

    খুপরি ঘরটার ভিতর মালতী একটা পাতিহঁসের মতো বসেছিল। হেমন্তের শেষ রোদ নেমেছে ওর ঝাঁপের দরজায়। হেমন্তের শেষ বলে শীতশীত করছে। একটা পাতলা কাঁথা গায়ে মালতী ছোট কম্বলের আসনে বসে আছে। অশৌচের শরীর যেন! অবজ্ঞা চারপাশে। নরেন দাস রোদ থেকে খড় তুলে এক জায়গায় জড়ো করছে। আভারানী ধান ঝাড়ছে। শোভা আবু বাড়ি নেই।

    মালতী সহজে ঘর থেকে আজকাল বের হতে চায় না। মাঝে মাঝে বাড়ির নিচে এক গাব গাছ আছে, সেখানে গিয়ে বসে থাকে।

    রঞ্জিত এলেই ঝাঁপটা খুলে দিয়েছিল মালতী। কারণ এই ঝাঁপ থাকলে অন্ধকার থাকে চারপাশে। সে ক্রমে অন্ধকার ভালোবাসছে। চিড়িয়াখানার জীবের মতো আর বেঁচে থাকতে পারছে না। সে যে এখন কী করবে! ভিতরে তার কী যে হয়েছে! সারাক্ষণ শীতশীত ভয় ভয়। বুকটা কাঁপে। কঠিন হাসি হাসলে নরেন দাস ভয় পায়। রঞ্জিতের সঙ্গে দেখা হলেই বলে, যান, গিয়া দ্যাখেন, পাগলের মত হাসতাছে।

    এমন শুনেই রঞ্জিত এসেছিল। এলেই মালতী বিনীত বাধ্যের যুবতী হয়ে যায়। সে একটা জলচৌকি ঠেলে দেয় বাইরে। মাথা নিচু করে বসতে বলে। রঞ্জিত বসলেই যেন মালতী কেমন বল পায় শরীরে। তার একমাত্র মানুষ, যাকে কথাটা বলবে বলে সে স্থির করেছে। সে যে এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। বুঝতে পারছিল না বলেই চোখে মুখে দীনহীন চেহারা। সে কিছুতেই কথাটা বলতে পারে না। সে কেমন মানুষটার মুখ দেখতে দেখতে মুহ্যমান হয়ে যায়।

    রঞ্জিত বলল, তুমি এমন পাগলামি করলে চলবে কেন মালতী!

    —কি পাগলামি ঠাকুর?

    —মাঝে মাঝে তুমি গাব গাছতলায় ছুটে যাও। সেখানে চুপচাপ বসে থাক। কিছু খাও না।

    —কিছু খেতে ভাল লাগে না ঠাকুর।

    —ভাল না লাগলে তো চলবে না। খেতে হবে বাঁচতে হবে।

    —তোমারে ঠাকুর কইলাম একটা চাকু দিতে। তুমি কিছুতেই দিয়া গ্যালা না।

    —আবার তোমার এক কথা।

    —আমার আর কোন কথা নাই।

    —তুমি অমন করলে নরেনদা কি করবে তোমাকে নিয়ে?

    —আমারে নিয়া কারো কিছু করতে হইব না।

    —এমন বলে না, বলতে নেই। যেন অসুস্থ মালতীকে রঞ্জিত বুঝ-প্রবোধ দিচ্ছে।

    —তোমার কি মনে হয় ঠাকুর আমারে ভূতে পাইছে?

    —তুমি তো জান মালতী, এ-সব আমি মানি না।

    —তবে তুমি দাদার কথা বিশ্বাস কর ক্যান?

    —করি, কারণ তোমার মুখ দেখলে আমার ভয় হয়।

    —কি ভয়?

    —কেমন অস্বাভাবিক চোখমুখ তোমার। তুমি তো এমন ছিলে না মালতী। তুমি মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকো। তিনি তোমার সব ভাল করে দেবেন।

    —ঠাকুর, তোমার এত বিশ্বাস ভগবানে?

    —আর কি বলব তোমাকে! আমার কেবল ভয় হয় আবার তুমি কিছু করে না বস!

    —আমি মরতে চাই না ঠাকুর। বিশ্বাস কর, আমি মরতে চাই না। তুমি কাছে থাকলে আমি মরতে পর্যন্ত সাহস পাই না। তারপর সে কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, যদি চাকুটা দিতা। আমি এখন কী যে করি।

    রঞ্জিতের মাথায় এখন হেমন্তের রোদ। আর কোথাও কোনও পরিচিত পাখির ডাক। ঘরে যুবতী মেয়ে অন্ধকারে বসে আছে। সে যেন দীর্ঘদিন থেকে রঞ্জিতকে কিছু বলবে বলে ঘুম যেতে পারছে না। চোখের নিচে কালি। হাত পা শীর্ণ। মুখে ক্লান্তি। এবং চারপাশে অদ্ভুত এক নির্জনতা। অথচ বার বার সে চাকুর প্রসঙ্গে ফিরে আসছে।

    সে বলল, মালতী তুমি কপালে সিঁদুর দিয়েছিলে। পায়ে আলতা। কি যে সুন্দর লাগছিল।

    মালতী জবাব দিল না।

    —তোমার এমন সুন্দর চোখ মালতী। আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারছি না। তোমাকে আর কি বলব।

    মালতী মাথা নিচু করে রাখল। কিছু যেন ভাবছে

    রঞ্জিত বলল, আমি চলে যাব মালতী। তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে কি না জানি না। কবে দেখা হবে তাও বলতে পারি না। আমার অজ্ঞাতবাস শেষ হয়ে গেল। যাবার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করে গেলাম।

    মালতীর চোখ বড় বড় দেখাচ্ছে। সে বলল, আমি জোরে জোরে পাগলের মতো হাসি ক্যান জিগাইলা না?

    —জিজ্ঞেস করে কী হবে। কিছু করতে পারছি না। জিজ্ঞেস করে লাভ কী!

    মালতী বলল, তোমার অজ্ঞাতবাস শেষ। মালতীর বুকটা বলতে গিয়ে ধড়াস করে উঠল।

    –শেষ। পুলিশ খবর পেয়ে গেছে আমি এখন এ-অঞ্চলে আছি। আজ কী কাল পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টার হতে পারে ভেবে পালাচ্ছি।

    মালতী এনকাউন্টার শব্দটা বুঝল না। সে এখন নিজের যে এক অতীব দুঃখ আছে ভুলে যাচ্ছে। সে কেবল তার প্রিয়জনের মুখ দেখছিল। এই মানুষ তার কাছে এলে কোনও সন্দেহের কারণ থাকে না। কারণ সে এই মেয়েকে কতদিন লাঠি খেলা ছোরা খেলা শিখিয়েছে। রঞ্জিত এক মহান আদর্শে নিমজ্জিত। সামান্য এক বিধবা যুবতী তার কাছে কিছু না। বরং মালতীর কঠিন চোখমুখ সে এলেই সহজ হয়ে যায়। নরেন দাসের ধারণা এবং অন্য সকলের ধারণা মালতী রঞ্জিতকে ভয় পায়। এখন সেই যুবক ফের নিরুদ্দেশে যাবে। নিরুদ্দেশে গেলে তার আর থাকল কী! সে এখন সবই ওকে বলে দিতে পারে। অথচ কীভাবে বলবে! এমন একটা কথা, যা নরেন দাস জেনেও বেমালুন চেপে যাচ্ছে। মালতী এবার কান্না কান্না গলায় বলে ফেলল, ঠাকুর, আমি মরতে চাই না। তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে চল।

    রঞ্জিত দেখল চোখ ফেটে জল পড়ছে মালতীর।

    ক্রমে বিকেল মরে আসছে। মাঠ থেকে ধানের গন্ধ আসছিল। যেন মনে হয়, এই যে মাঠ চারদিকে, ফসল সর্বত্র এবং কলাই খেতের নীলচে রঙের ফুল এবং ধান উঠতে আরম্ভ করেছে, দূরের মাঠে ধান কাটার গান শোনা যাচ্ছিল—সবই অর্থহীন মালতীর কাছে। মালতী কী করবে এখন! অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে রঞ্জিত কী বলে।

    এতদিন রঞ্জিত তার সমিতির নির্দেশে কত বড় বড় কাজ অবহেলায় সমাধান করেছে। কুমিল্লাতে সে হাডসন সাহেবকে খুন করে পলাতক। পুলিশের লোক জানে সে আগরতলা হয়ে শিলচর এবং শিলচর থেকে আসামের কোথাও উধাও হয়েছে। নিখোঁজ। তার শৈশবের পরিচয় দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও পুলিশ সংগ্রহ করতে পারেনি। সে-ই রঞ্জিত, সে-ই সুখময় দাস, সে-ই কখনও চরণ মণ্ডল এবং সে যে নদী পার হতে গিয়ে একবার নীলের বাদ্যি বাজিয়ে ছিল গোপাল সামন্ত নামে—সে-সব পুলিশ খবর রেখেও রঞ্জিত নামে এক বালক এখানে কৈশোর কাটিয়ে পলাতক তা তারা জানে না। এ-অঞ্চলের মানুষেরা জানে রঞ্জিত দেশের কাজ করে বেড়ায়—এই পর্যন্ত। এখন মালতী তার সামনে গোঁজ হয়ে বসে রয়েছে এবং জীবনপাত করে যে আদর্শ সবই অর্থহীন। মালতীর গোঁজ হয়ে বসে থাকা সে একেবারে সহ্য করতে পারছে না। সে বড় দুর্বল বোধ করছে।

    তার সামনে কত বড় মাঠ, শস্যক্ষেত্র। সে সামান্য ফসলের জমি নিয়ে কী করবে! মালতীকে সে কোথাও পৌঁছে দিতে পারছে না। এই নিয়তি মালতীর। কিছু বলতে পারল না। মাথা নিচু করে হেঁটে হেঁটে গাছপালার ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

    মালতী যেমন খুপরি থেকে একটা হাঁসের মতো বের হয়ে এসেছিল তেমনি সে ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকে বসে থাকল। একটু পরে এল শোভা। বাঁ হাতে ওর লণ্ঠন। ডান হাতে কলাই করা থালাতে খ‍ই এবং গুড়, মালতীর রাতের আহার। খেতে দিলেই মালতী ঝাঁপ বন্ধ করে দেবে। তারপর এক অন্ধকার নিয়ে, চোখ কোটরাগত করে সে শুয়ে থাকবে। ঘুম নেই চোখে। কেবল মনে হয়, কোন মরুপ্রান্তে একটা পত্র পুষ্পহীন বৃক্ষ তাকে হাতছানি দিচ্ছে।

    রঞ্জিত হাঁটতে হাঁটতে পুকুরপাড়ে চলে এল। সেই এক অর্জুনগাছ, গাছটা ডালপালা মেলে বড় হয়ে যাচ্ছে। চারপাশে ক্রমে অন্ধকার নামছে। দক্ষিণের ঘরে শশীমাস্টার ছেলেদের পড়াচ্ছেন। সোনা খুব জোরে জোরে পড়ে। সে তার কঠিন কঠিন শব্দ রঞ্জিত বাড়ি এলেই শুনিয়ে শুনিয়ে পড়ে। সে যে কত বড় হয়ে গেছে এবং কতসব কঠিন কঠিন শব্দ জেনে ফেলেছে এই বয়সে, সে রঞ্জিতমামাকে তা জানাতে চায়। সে এত দুঃখের ভিতরও মনে মনে হাসল। সে চলে যাবে। এসব ছেড়ে যেতে ওর সব সময়ই কেমন কষ্ট হয়। দিদির কাছে সে মানুষ বলে যা-কিছু টান এই দিদির জন্য। এবং স্বামী তার পাগল বলে সব সময়ই মনের ভিতর নানারকমের চিন্তা—মানুষটা এভাবে সারাজীবন বাঁচবে আর কবিতা আবৃত্তি করবে, দিদির জীবনটা বড় দুঃখে কেটে গেল। এখানে এলে সে নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছে এমন ভাবে! সব মাঠঘাট চেনা। তাই যেন যাবার আগে সব ঘুরে ঘুরে একটু দেখে যাওয়া। পুকুরপাড় থেকেই সে দক্ষিণের ঘরের আলোটা দেখতে পেল। শশীমাস্টার দুলে দুলে পড়ান। ইতিহাস থেকে তিনি—‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী’ ছেলেদের বলার সময় কেমন মাটি এবং মানুষের নিমিত্ত তিনি উত্তাপ পান। শশীমাস্টার এই তিন ছেলেকে সন্তানের মতো স্নেহ করেন।

    সে অন্ধকার থেকে এবার উঠে এল। সংসারে আপনজন বলতে তার দিদি। আর কেউ নেই। স্বামী পাগল মানুষ। সে সোজা বাড়ি উঠে এল এবার। নিজের ঘরে ঢুকে পোশাক পাল্টাল। ওর স্যুটকেসের ভিতর যা যা থাকার কথা ঠিক আছে কি-না দেখে নিল। মহেন্দ্রনাথ নিজের ঘরে বসে আছেন। এ-সময় তিনি সামান্য গরম দুধ খান। দিদি নিশ্চয়ই মহেন্দ্রনাথের পায়ের কাছে বসে আছে।

    সে দিদিকে বলে তাড়াতাড়ি দুটো খেয়ে নিল। মহেন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকে প্রণাম করার সময় বলল, আমি আজই চলে যাচ্ছি।

    বড়বৌ আর এখন এসবে বিস্মিত হয় না। কখন কোথায় থাকবে অথবা যাবে কেউ জানতে চাইলে সে চুপচাপ থাকে। আগে বড়বৌ এ-নিয়ে সামান্য অশান্তি করত রঞ্জিতের সঙ্গে। এখন আর করে না। অসময়ে কোথাও চলে যাচ্ছে বললে বিস্মিত হয় না। বরং সে সব ঠিকঠাক করে দেয়। কথা বেশি বলে না। রঞ্জিত বুঝতে পারে দিদি তার এই চলে যাওয়া নিয়ে ভিতরে ভিতরে কষ্ট পাচ্ছে! দিদি চুপচাপ থাকলে সে টের পায়, চলে গেলে নিশ্চয় দিদি তার কাঁদবে। সে যাবার আগে যেমন প্রণাম করে থাকে, এবারেও তা করল। তারপর বিষণ্ণ মুখ দেখে যেমন বলে থাকে, কই তুমি হাসলে না? আমি যাব অথচ তুমি হাসলে না। না হাসলে যাব কি করে?

    বড়বৌ জোর করে হাসে তখন। হেসে বিদায় দেয় এই ছোট ভাইটিকে।

    —এই তো আমার দিদি। বলে সে সকলের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য প্রথমে দক্ষিণের ঘরে ঢুকে গেল। শশীমাস্টারকে বলল, চলে যাচ্ছি। সোনার মাথায় কী ঘন চুল হয়েছে, সে চুলে হাত ঢুকিয়ে আদর করল সোনাকে। বলল, যাচ্ছি আমি। তোমরা ভাল হয়ে থেক। মা’র কথা শুনবে। জ্যাঠামশাইকে দেখে রাখবে।

    শশীমাস্টার বললেন, তা’ হলে আবার বনবাসে যাচ্ছেন?

    –যেতে হচ্ছে।

    —ফিরবেন কবে?

    —বোধহয় আর এখানে ফিরতে পারব না।

    —কেন?

    —অসুবিধা আছে।

    —আপনি স্বদেশী মানুষ, আপনাদের সব জানার সৌভাগ্য আমাদের হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে আপনার মতো বনবাসে যেতে ইচ্ছা হয়। জাতির সেবা করতে ইচ্ছা হয়।

    —জাতির সেবা তো আপনি করছেন। এর চেয়ে বড় সেবা আর কী আছে?

    —কিন্তু কি জানেন, বলে শশীমাস্টার উঠে দাঁড়ালেন। দেশ স্বাধীন যে কবে হবে বুঝতে পারছি না।

    —হয়ে যাবে।

    —হবে ঠিক! তবে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছি না বলে দেরি হচ্ছে। রঞ্জিত এমন কথার কোনও জবাব দিতে পারল না।

    —আপনার কি মনে হয়?

    —কিসের ব্যাপারে বলছেন?

    —এই স্বাধীনতার ব্যাপারে।

    —সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লে সংসার চলবে কী করে?

    —তা ঠিক বলেছেন। কিন্তু লীগ যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছে, তাতে যে শেষপর্যন্ত কি হয়! রঞ্জিত এ-কথার জবাব দিতে হবে বলেই অন্য কথায় চলে এল।—এরা কিন্তু আপনার খুব ভক্ত। এরা আজকাল যত্ন নিয়ে দাঁত মাজছে।

    শশীমাস্টার বললেন, দাঁতই সব। আপনার দাঁত দেখি।

    অন্য সময় হলে রঞ্জিত কি করত বলা যায় না। কিন্তু এখন সে চলে যাচ্ছে বলে খুব সরল সহজ হয়ে গেছে। তাই সে কোনও কুণ্ঠা প্রকাশ না করে শশীমাস্টারকে দাঁত দেখাল।

    শশীমাস্টার লণ্ঠন তুলে সবক’টা দাঁত দেখলেন। যেন কুশলী ডাক্তার ওর দাঁত দেখছেন। মাড়ি টিপে টিপে দেখলেন। তারপর পলটুকে এক ঘটি জল আনতে বলে রঞ্জিতের মুখের দিকে তাকালেন।—আপনার নিচের পাটির দাঁত কিন্তু ভাল না।

    রঞ্জিত হাসতে হাসতে বলল, কি করলে ভাল হবে?

    —রোজ রাতে একটা করে হরতুকি খাবেন। বলে তিনি বাইরে গেলেন। হাত ধুলেন. তারপর ফিরে এসে বললেন, হরতুকিতে দাঁত শক্ত হয়। লিভারের কাজ ভাল হয়। সুনিদ্রা হবে। এবং পরিপাকে এত বেশি সাহায্য করবে—বলে একটু থামলেন। কি যে খুঁজে খেরোখাতাটা পেয়ে পাতা উল্টে গেলেন। ‘হ’ এই শব্দের পাতা থেকে হরতুকি কত নম্বর পাতায় আছে খুঁজে হরতুকির গুণাগুণ ব্যাখ্যা করে শোনাতে থাকলেন।

    রঞ্জিত দেখল লম্বা খাতায় নানারকম আয়ুর্বেদীয় ফুল-ফলের নাম। তাদের উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ। রঞ্জিত বলল, এদের এসব বলুন। দেশের মাটিতে যা হয় পৃথিবীর কোথাও তা পাওয়া যায় না।

    শশীমাস্টার বললেন কি লালটু-পলটু, মামা কি বলছেন! তোমার মামা তো আজ চলে যাবেন। প্রণাম কর।

    সকলে একসঙ্গে উঠে এসে কে আগে প্রণাম করবে, দুপদাপ প্রণাম সেরে কে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে সবার আগে বসবে তার প্রতিযোগিতা যেন। রঞ্জিত বলল, পরীক্ষা পাসের সময় এটা চাই। সবার আগে যেতে হবে। বারান্দায় বাড়ির পাগল মানুষ চুপচাপ বসে আছেন। সে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, জামাইবাবু আমি আজ চলে যাচ্ছি। বলে সে দু’পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। প্রণাম করার সময় বলল, আশীর্বাদ করবেন, আমি যেন ভালো কিছু করতে পারি।

    তিনি বসেছিলেন। বসে থাকলেন। কোনও উচ্চবাচ্য নেই। তাঁর চোখ অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। তবু বোঝা যায় সারাজীবন ধরে মানুষটি এক সোনার হরিণের পিছনে ছুটছেন। মানুষটার দিকে তাকালেই রঞ্জিতের চোখ ছলছল করে ওঠে।

    সে তাড়াতাড়ি এবার পশ্চিমের ঘরে ঢুকে গেল। ধনবৌকে প্রণাম করার সময় বলল, ধনদি, আজ চলে যাচ্ছি।

    ধনবৌ বলল, সাবধানে থাইক।

    তারপর সে শচীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে খুব ঘন অন্ধকারের ভিতর মাঠে নেমে গেল। শশীমাস্টার, সোনা, লালটু, পলটু হ্যারিকেন নিয়ে পুকুরপাড় পর্যন্ত এসেছিল। তারপর আর যায়নি। রঞ্জিত নিজেই বলেছে, আপনারা ফিরে যান মাস্টারমশাই। অন্ধকারে আমি ভালো দেখতে পাই। আলো থাকলে বরং চোখ ঝাপসা লাগে।

    অন্ধকার নেমে আসতেই আবার সেই মাঠ, সোনালী বালির নদী, তরমুজের জমি এবং উপরে আকাশ, চিত্র-বিচিত্র সব নক্ষত্র আর মাঠের নির্জনতা ওকে শৈশবের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। শৈশবে সে, সামসুদ্দিন আর মালতী-মালতীকে নিয়ে তারা নদীতে সাঁতার কাটত। সাঁতার কেটে ও-পাড়ে উঠে যেত। গয়না নৌকার নিচে কখনও কখনও রঞ্জিত লুকিয়ে থাকলে মালতী ভয় পেত। সে ডাকত, ঠাকুর।

    কে যেন তেমনি মনে হয় এখনও তার পিছনে ডাকছে। ঠাকুর, তুমি আমাকে কার কাছে রেখে গেলা? তুমি দেশের কাজ করে বেড়াও, আমি কি তোমার দেশ না? তোমার এই জলা-জমি অথবা মাটিতে আমি বড় হয়ে উঠি না! আমার সুখ-দুঃখ তোমার সুখ-দুঃখ না! ঠাকুর, ঠাকুর, কী কথা বলছ না কেন?

    রঞ্জিত যত দ্রুত হাঁটবে ভেবেছিল, সে তত দ্রুত হেঁটে যেতে পারছে না। কে যেন তাকে কেবল নিরন্তর বলে চলেছে, আমি কী করি ঠাকুর! মনে হল সে যেতে যেতে কোনও গাছের ছায়ায় অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে পড়ছে। যত তাড়াতাড়ি সে এ অঞ্চল ছেড়ে যাবে ভেবেছিল, কেন জানি সে তত তাড়াতাড়ি যেতে পারছে না। বস্তুত ওর পা চলছিল না। তার মাথার উপর বড় এক আকাশের মতো পবিত্রতা নিয়ে মালতী জেগে রয়েছে। সে আর এক পা বাড়াতে পারল না।

    মনে মনে সে আজ কখনও জীবনে যা ভাবেনি, যা-কিছু স্বপ্ন ছিল সব মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অন্য জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়বে ভাবল। দেশ উদ্ধারের চেয়ে কাজটা কেন জানি কিছুতেই কম মহৎ মনে হচ্ছে না।

    সে সেই অশ্বত্থ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। অন্ধকার কী ঘন! আর কী প্রাচীন মনে হয় এইসব তরুলতা। সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কিছু প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করছে। বিন্দু বিন্দু সব আলো গাঁয়ের ভিতর জ্বলছে নিভছে। রাত এখনও তেমন গভীর নয়। ভুজঙ্গ কবিরাজকে লাঠিখেলা ছোরাখেলার সব নির্দেশ, আর কোথায় আখড়া খুলতে হবে নূতন, সে গেলে কার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ রাখতে হবে সবই সে ঠিকঠাক বলেছে কি-না আর একবার এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভেবে নিল। কোথাও তখন কোনও কুকুর আর্তনাদ করছে। শেয়ালেরা ডাকছে। জালালির কবরে এক ঝোপ কাশের বন সৃষ্টি হয়েছে এতদিনে। সেই কাশের সাদাফুল এই অন্ধকারে এক ফালি জ্যোৎস্নার মতো দুলছে চোখে। বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ জীবনসংগ্রাম ছিল জালালির। মৃত্যুর পর একখণ্ড ভূমি পেয়ে সে এখন কী মনোরম হাসছে। জালালি তার নতুন এই ভূ-খণ্ডে এখন কাশফুল হয়ে বেঁচে আছে। গাছের গোড়ায় ভালোবাসার মাটি—সে তা পেয়ে ছোট্ট শিশুটির মতো হাসছে। কাশফুলের মতো পবিত্র হাসিটি মুখে লেগে আছে জালালির।

    অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মনে হল, এই একখণ্ড জমি সকলের প্রাপ্য। সবাইকে এই দিতে হবে। অভুক্ত এবং ভূমিহীন মানুষ, ভূমিহীন বলতে পায়ের নিচে মাটি নেই এমন মানুষ সে ভাবতে পারে না। তার ঘর থাকবে, চাষ-আবাদের জমি থাকবে, সে কিছু খাবে, খেতে পাবে, খেতে না পেলে মানুষের স্বাধীনতার অর্থ হয় না। মানুষের স্বাধীনতা বলতে সে এই বোঝে। তার কেন জানি এবার মনে হল, সে একখণ্ড জমি মলতীকেও দেবে।

    অথবা এই অন্ধকারে, ঘন অন্ধকারে দাঁড়ালেই সে কেমন সাহসী মানুষ হয়ে যায়। ওর মৃত্যুভয় থাকে না। রাতের পর রাত, এমন সব মাঠ-জঙ্গল, নদী-বন, যদি কোথাও পাহাড় থাকে, সিংহ-শাবকের মতো পাহাড় বেয়ে ওঠা, যেন নিরন্তর এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে অভিযান—দুঃসহ এইসব অভিযান তাকে মাঝে মাঝে বড় বেশি বাঁচার প্রেরণা দেয়। কিছু না করতে পারলেই মনে হয় সে মৃত। একঘেয়ে জীবন তখন। বাঁচার কোনও প্রেরণা থাকে না। উৎসাহ-বিহীন মানুষের মতো তাকে অধার্মিক করে ফেলে। হাডসন সাহেবকে হত্যার পর সে আবার নতুন কিছু করতে যাচ্ছে। প্রায় এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে অভিযানের মতো এই ঘটনা। অন্ধকারে নরেন দাসের বাড়ি স্পষ্ট। বিন্দু বিন্দু আলো এখনও জ্বলছে। বোধহয় নরেন দাস গোয়ালে গরু বাঁধছে এবং আভারানী ঘাট থেকে বাসন মেজে এলেই সে এগুতে পারবে। ওদের এবার শুধু শুয়ে পড়তে দেরি। মালতীকে নিয়ে ভয়ডর তাদের কমে গেছে। কারণ মালতীর শরীরে আর কোনও ঘোড়া দৌড়ায় না। মালতী রুগ্‌ণ, শীর্ণকায়, অবসন্ন এবং শরীরের ভিতর মালতীর ধর্মাধর্ম এখন ঢাকঢোল বাজাচ্ছে। মালতীকে ঘরে জায়গা দিচ্ছে না নরেন দাস। মালতী এখানে থাকলে পাগল হয়ে যাবে।

    ক্রমে রাত বাড়ছে। ভোর রাতের দিকে ঠাকুরবাড়ি পুলিশে ঘিরে ফেলবে। এমন খবরই তার কাছে আছে। সন্তোষ দারোগা নারানগঞ্জে গেছে আর্মড ফোর্সের জন্য। সামান্য একজন মানুষকে ধরবার জন্য সন্তোষ দারোগা গোপনে গোপনে সেখানে মহোৎসবের ব্যাপার করে ফেলছে। ভীষণ হাসি পেল দারোগার ভয় এত বেশি ভেবে।

    কে সেই মানুষ, সে এখন ভেবে পাচ্ছে না—যে তাকে ধরিয়ে দিচ্ছে। এখানে কার সঙ্গে শত্রুতা। কয়েক ক্রোশ দূরে থানা। যেতে আসতে সময় অনেক। জলা জায়গা বলে কেউ বড় এদিকটাতে আসতে চায় না। সে এখানে বেশ অজ্ঞাতবাসে কাটিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু চুপচাপও বসে থাকা যায় না। সমিতির কাছে সে নির্দেশ চেয়ে পাঠাল। তাদের নির্দেশমতো একের পর এক আখড়া খুলে চলেছিল গ্রামে গ্রামে। তারপর এক খবর, এক মানুষ বাউল সেজে চিঠি দিয়ে গেল—পুলিশ তার সূত্র আবিষ্কারে ব্যস্ত। তাকে পালাতে হবে।

    এবারে মনে হল নরেন দাসের বাড়ির যে বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলছিল, তা নিভে গেছে। সে গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি গায়ে দিয়েছে। ওপরে জহর কোট। কোটের নিচে হাত রেখে দেখল—না, ঠিক আছে। সে এবার সন্তর্পণে এগুতে থাকল, তার আর এখন ভয় নেই। দেখল সামনের অন্ধকারে একটা জীব ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে। সে রিভলবারটা চেপে ধরতেই মনে হল, ওটা বাড়ির আশ্বিনের কুকুর। সে চলে যাচ্ছে বলে তাকে বিদায় জানাতে এসেছে।

    রঞ্জিত বলল, বাড়ি যা। এখানে কী?

    কুকুরটা তবু পায়ে পায়ে আসতে লাগল।

    সে বলল, তুই যা বাবা। আমি এতদিনে একটা ভালো কাজ করতে যাচ্ছি।

    কিন্তু কুকুরটা পাশে পাশে হাঁটছেই।

    —কি বলছি শুনতে পাচ্ছিস না?

    কুকুরটা এবার পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

    —হ্যাঁ হয়েছে। খুব হয়েছে। এবারে যা।

    কুকুরটা যথার্থই এবার ছুটে পুকুরপাড়ে উঠে গেল। এবং অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রঞ্জিত কোনদিকে যাচ্ছে দেখল।

    রঞ্জিত মালতীর দরজার সামনে সন্তর্পণে দাঁড়াল। ঝাঁপের দরজা। টর্চ জ্বেলে সে ঝাঁপের দরজায় ফাঁক আছে কি-না দেখল। সে কোনও ফাঁক খুঁজে পেল না। সুতরাং খুব সন্তর্পণে বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকল, মালতী। মনে হল তখন ভিতরের জীবটা জেগে আছে। সামান্য ডাকেই তার সাড়া মিলেছে।

    সে উঠে বসেছে। গলার স্বর চিনতে পেরে মালতীর বুক কাঁপছিল। সে কাঁপা হাতেই ঝাঁপ খুলে দিল।

    —আমি।

    মালতী কথা বলল না।

    —এবার আমরা যাব।

    মালতী বুঝতে পারছে না—আমরা যাব বলে রঞ্জিত কী বোঝাতে চাইছে। সে মাথা নিচু করে ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

    —আমার সঙ্গে তুমি যাবে?

    —কোথায়? সহসা মালতী রঞ্জিতের মতো প্রশ্ন করল।

    —যেদিকে দু’চোখ যাবে!

    —কিন্তু আমার যে কথা ছিল ঠাকুর।

    —এখন আর কোনও কথা না মালতী। দেরি করলে আমরা ধরা পড়ে যাব।

    —কিন্তু আমার ভয় করছে। তোমাকে সবটা বলতে না পারলে—

    —রাস্তায় সবটা তোমার শুনব। তুমি তাড়াতাড়ি এস।

    মালতী এবার খুপরির ভিতর ঢুকে দুটো সাদা থান, সেমিজ এবং পাথরের থালা নিল সঙ্গে।

    —এত নিয়ে পথ হাঁটতে পারবে না।

    সে পাথরের থালা রেখে দিল।

    রঞ্জিত বলল, আমাদের রাতে গজারির বনে গিয়ে ঢুকে পড়তে হবে।

    ওরা নদীর চরে নেমে আসতেই শুনল টোডারবাগের ওপাশে কারা টর্চ জ্বালিয়ে আসছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ। রঞ্জিত বুঝতে পারল, রাতে রাতে সন্তোষ দারোগা গ্রাম ঘিরে ফেলেছে। সে মালতীকে বলল, জলে ঝাঁপিয়ে পড়।

    পুলিশের লোকগুলি টর্চ এবার নিভিয়ে দিল। ওরা চলে যাচ্ছে।

    রঞ্জিত বলল, জলে ডুবে থাক।

    ওরা জলের ভিতর যখন ডুব দিল, তখনই মনে হল কেউ টের পেয়ে গেছে। সে বলল, মালতী, সাঁতার কাটতে হবে। যত জোরে সম্ভব। বলে সাঁতার কেটে ওরা নদীর পাড়ে উঠলে দেখল টর্চের আলো এসে এ-পাড়ে পড়েছে। বুঝি রঞ্জিত ধরা পড়ে গেল। টর্চের আলোতে বুঝি ওকে খুঁজছে।

    রঞ্জিতের এমন একটা ভয়াবহ ব্যাপারে যেন ভ্রূক্ষেপ নেই। মালতীকে নিয়ে যে সামান্য অসুবিধা। সে মালতীকে বলল, বুঝতে পারছ ওরা কিছু টের পেয়েছে। ওরা আগে এসে গেল।

    মালতী কিছু বুঝতে পারছে না। সে বসে বসে এখন ওক দিচ্ছে।

    —কি হয়েছে তোমার?

    মালতী বলল, ঠাকুর, তুমি পালাও। দেরি করলে ওরা ধরে ফেলবে।

    রঞ্জিত যেমন স্বভাবসুলভ হাসে, তেমনি হাসল। সে বলল, এটা তুমি পরো। এটা আমাকে বিপদ থেকে অনেকবার রক্ষা করেছে।

    মালতী দেখল, কালো রঙের একটা বোরখা। ওরা বনের ভিতর ঢুকে পোশাক পাল্টে ফেলল। সে তার স্যুটকেস থেকে এক এক করে সব বের করল। বলল, এখানে টিপলে গুলি বের হবে। এই দ্যাখো। এটাকে বলে ট্রিগার। সে আলো জ্বেলে সব বোঝাল। এই ট্রিগার। ভাল হোল্ডিং চাই। এমিঙ খুব তীক্ষ্ণ দরকার। কিন্তু একি মালতী, ওক দিচ্ছ কেন? মালতী ওক দিতে দিতে কথা বলতে পারছে না।

    রঞ্জিত বলল, তোমার কী হয়েছে মালতী তুমি ঠিক করে বল। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

    মালতী যা এতদিন বলবে ভাবছিল, ঘৃণায় যা বলতে পারছিল না, এখন এই দুঃসময়ে রঞ্জিতকে সে তা মরিয়া হয়ে বলে ফেলল।

    —ঠাকুর, আমি মা হইছি। তিন অমানুষ আমারে জননী বানাইছে। আর কিছু বলতে পারছে না। মালতী উপর্যুপরি ওক দিচ্ছে কেবল।

    অন্ধকারে রঞ্জিত কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। মালতী পায়ের কাছে বসে ওক দিচ্ছে। ওপারে ইতস্তত টর্চের আলো। বনের ভিতর আলো ঢুকছে না। সেই আলোর কণা শুধু বৃষ্টিপাতের মতো পাতার ফাঁকে ফাঁকে সামান্য ঢুকছে। রঞ্জিত এবার হাঁটু গেড়ে বসল। মাথায় হাত রাখল মালতীর। বলল, আমাদের অনেক পথ হাঁটতে হবে মালতী। আমরা কোথায় যাব জানি না। তুমি ওঠ।

    এভাবে নদীর পাড়ে যে বন, যে বনে একবার সোনা পাগল জ্যাঠামশাইর সঙ্গে হাতিতে চড়ে মাঠ অতিক্রম করেছিল, সেই বনে মালতী এবং রঞ্জিত সারারাত সকাল হবার আশায় গাছের নিচে পাশাপাশি শুয়ে ছিল। রঞ্জিত আর একটা কথাও বলেনি। মালতী ভয়ে ঘাসের ভিতর মুখ লুকিয়ে রেখেছে। দু’জনই সারা রাত জেগে ছিল। এরপর কী কথা বলে যে আবার স্বাভাবিক হওয়া যায় রঞ্জিত ভেবে উঠতে পারছে না। কোথায় যাবে, কার কাছে নিয়ে যাবে এবং সে এমন এক মেয়ে নিয়ে এখন কী করে? গাছের শাখা-প্রশাখা বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে। শেষ রাতের জ্যোৎস্না গাছের পাতায় পাতায়। সেই যেন পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। অথবা কে যেন আবার উচ্চৈঃস্বরে পড়ে চলেছে—অ্যাট লাস্ট দি সেলফিস জায়েন্ট কেম। খুব সকালে আকাশ ফর্সা না হতে মালতীই ডেকে দিয়েছে। রঞ্জিতের চোখে ভোর রাতের দিকে ঘুম এসে গেছিল।

    রঞ্জিত ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে নিজে একটা লুঙ্গি পরল। সে তার স্যুটকেস থেকে আঠা এবং রঙিন কিছু পাট বের করে একেবারে অন্য মানুষ সেজে গেল। বোরখার নিচে বিবি, আর রঞ্জিত এক মিঞাসাব। ভাঙা ছাতি বগলে। মিঞা-বিবি মেমান বাড়ি যাচ্ছে এমনভাবে রঞ্জিত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকল।

    যেতে যেতে মালতী বলল, তুমি ঠাকুর আমাকে জোটনের কাছে রাইখা যাও

    রঞ্জিত কথা বলল না। এ অবস্থায় ওকে কোথায় আর নিয়ে যাওয়া যাবে। সে দরগার উদ্দেশে হাঁটতে থাকল। দিনমানে হাঁটলে সে মালতীকে নিয়ে জোটনের দরগায় পৌঁছাতে পারবে। মালতীকে আপাতত জোটনের কাছে রেখে সে কোথাও চলে যাবে ভাবল।

    আর সে হাঁটতে হাঁটতেই কার ওপর আক্রোশে বনের ভিতর চিৎকার করে উঠল, বন্দেমাতরম্। আক্রোশের প্রতিপক্ষ জব্বর, না সন্তোষ দারোগা, ওর চোখমুখ দেখে তা ধরা গেল না।

    ।। প্ৰথম খণ্ড সমাপ্ত।।