Author: তাহের আলমাহদী

  • দুই

    দুই

    প্রথমটা চিনতে পারিনি। একটু ঠাহর করে দেখতেই মুখ থেকে অজ্ঞাতসারে বেরিয়ে এল, আপনি!

    —ভাবছেন, এতদিন পরে খোঁজ পেলাম কি করে?

    সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললাম, আপনার কি কোনো অসুখ করেছিল?

    —অসুখ? হ্যাঁ, তা, বলতে পারেন। করেছিল নয়, বছর সাতেক ধরে চলছে।

    –বলেন কি! কী অসুখ?

    —রিটায়ারমেণ্ট; আপনারা যাকে বলেন, অবসর-গ্রহণ। বলে হেসে উঠলেন ভূতপূর্ব ভূতনাথ দারোগা। সেই আগেকার মতো পিলে চমকানো ঝড়ো হাসি, শুধু তার বেগটা পড়ে গেছে। তারপর বললেন, চেহারা জিনিসটা দাঁড়িয়ে থাকে কিসের ওপর জানেন? আপনি বলবেন ভালো স্বাস্থ্য, ভালো খাবারদাবার, যত্নআত্তি, এই সব। অন্যের বেলায় হয়তো তাই। কিন্তু পুলিসের বেলায়—পোশাক। সেই খোলসটা যেদিন ছেড়েছি সেদিন থেকে শাঁসও শুকোতে শুরু করেছে। যাক সে কথা। এটা নিশ্চয়ই আপনার কাণ্ড!

    হাতে ছিল একটা খাঁকী কাগজে মোড়া প্যাকেট। এতক্ষণ লক্ষ্য করি নি। মোড়ক খুলে ভেতরকার বস্তুটি সামনে ধরতেই আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। আমার সাহিত্যিক অপচেষ্টার এই নিদারুণ চিহ্নটি ভূতনাথ দারোগার নজরে পড়ে যাবে, স্বপ্নেও কি কোনোদিন ভেবেছিলাম? এর ভিতরে ওঁর যে রূপটি ফুটে উঠেছে, তাকে মধুর বলা চলে না। কে জানে তার কোন্ রেখায় ফৌজদারি আইনের কোন্ মারাত্মক ধারা শুঁড় তুলে দাঁড়িয়ে আছে? ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ে বলবে, দাও দশ হাজার টাকার ড্যামেজ, কিংবা মানহানির দায়ে চল শ্রীঘর।

    না, ভূতনাথবাবু সেদিক দিয়ে গেলেন না। খুশির সুরে বললেন, কদিন আগে পুলিশ ক্লাবে গিয়েছিলাম। পুরনো আমলের জনকতক অফিসার এখনও আছে। মাঝে মাঝে গিয়ে বসি তাদের কাছে। মনটা ভালো থাকে। হালআমলের ছোকরারাও খাতির যত্ন করে। তাদেরই একজন সেদিন একটা বই নিয়ে এসে বলল, ‘এর থেকে আপনার সম্বন্ধে অনেক কথা জানা গেল।’ আমার সম্বন্ধে! আমি তো অবাক। আমাকে নিয়ে আবার বই লিখল কে? ছাপিয়ে বের করবার মতো এমন কীর্তি রেখে এলাম? তবে অনেক গরম গরম স্বদেশীওয়ালাকে ঠাণ্ডা করতে হয়েছে। তারই মধ্যে কেউ বোধ হয় ঝাল ঝেড়ে থাকবে। বললাম, পড় তো শুনি। খানিকটা শুনেই বুঝলাম, আপনি। অনেকদিন এক স্টেশনে ছিলাম, একসঙ্গে উঠেছি, বসেছি। কই, এসব বিদ্যা আছে বলে তো টের পাই নি। আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই।

    ভয় কেটে গেল, কিন্তু বিস্ময় রয়ে গেল। যা লিখেছি, তাতে করে এতটা খুশী হবার কথা নয়। বললাম, আমার কিন্তু আশঙ্কা ছিল, আপনি রাগ করবেন।

    —রাগ করব! কেন?

    —আপনার সম্বন্ধে ভালো কথা তো কোনোটাই লিখি নি।

    —আপনি হাসালেন দেখছি। আমি যা, তাই তো লিখবেন। বানিয়ে বানিয়ে ভালো ভালো কথা লিখলে খুশী হতাম ভাবছেন? না। ভূতনাথ দারোগা ভূতনাথ দারোগাই থাকতে চায়। নব্যতন্ত্রের বাবুদের মতো মহাপুরুষ হতে চায় না। জানেন দেশ স্বাধীন হবার পর পুলিস অফিসার মানে এক একটি খুদে মহাত্মা। বিষ তো গেছেই, ফণা পর্যন্ত নেই। সব ঢোঁড়া সাপ। আমার সেই মুষ্টিযোগগুলো ভুলেও কেউ ব্যবহার করে না। সে গাট্স্ নেই কারও। অথচ আপনি তো জানেন, তার প্রত্যেকটা থেকে কী অব্যর্থ ফলটাই না পেয়েছি সেদিন।

    কথাটা ঠিক। সাক্ষী তৈরী করা কিংবা কনফেশান আদায় করবার যে কটি পেটেণ্ট ওষুধ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, ফলের দিক দিয়ে দেখতে গেলে স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের রীতি পদ্ধতি তার কাছেও ঘেঁষতে পারে না। প্রয়োগ দূরে থাকে, অনেক সময় নাম শুনিয়েই কার্যোদ্ধার হত। নামকরণের মধ্যেও রীতিমত প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। বৃহৎ যষ্টি-মধু-চূর্ণ; তাতে যদি কাজ না হয়, দাও ডোজ-কয়েক গুম্ফোৎপাটন রসায়ন কিংবা শ্মশ্রুছেদন বটিকা, স্থান কাল বুঝে কোথাও মহানিমজ্জনী সুধা, চপেটাঘাতসহ সেব্য।

    চোখের দিকে চেয়ে মনে হল, ভূতনাথবাবু বোধহয় তাঁর অতীত কীর্তির গৌরবময় স্মৃতির মধ্যে ডুবে গেছেন। কিছুক্ষণ পরে নিঃশ্বাস ফেলে গভীর সুরে বললেন, সারাজীবন ধরে এত যে করলাম, কী পেলাম তার বদলে! একদিন হয়তো ঐ নামগুলোও লুপ্ত হয়ে যেত। সেই পরিণাম থেকে আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন, মিস্টার চৌধুরী। প্রকৃত বন্ধুর কাজ করেছেন।

    হঠাৎ মুন্সীর কথা মনে পড়ল। বললাম, বদরুদ্দিন মুন্সীকে আপনার মনে আছে?

    —নেই আবার! ঐ একটা লোক ছাড়া ভূতনাথ ঘোষাল সারাজীবন কারও কাছে হার মানে নি। একবার নয়, বার বার। বড় আশা ছিল ব্যাটাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে পারবো। সে সুযোগ আর দিলে না। মুখের ওপর যেন থাবড়া মেরে চলে গেল। বাহাদুর বটে! মরে তো সবাই, অমন মরার মতো মরতে পারে কজন?

    একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। বহুদিনের ওপার হতে বদর মুন্সীর মরণাহত বীভৎস মুখখানা বিস্মৃতির পরদা ঠেলে চোখের উপর এসে দাঁড়িয়েছিল, ভেসে আসছিল তার সেই ভাঙা গলার আর্তনাদ—আমার সর্বস্ব দিয়েও কি তাকে বাঁচাবার উপায় নেই, হুজুর?

    ভূতনাথবাবুর কথা কানে যেতেই যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। উনি বললেন, আর একটা লোককেও আমি মরদের মতো মরতে দেখেছি। তবে তার ব্যাপারটা একেবারে আলাদা।

    —বলুন না, শুনি।

    ভূতনাথ হেসে বললেন, ও-ও, নতুন খোরাকের গন্ধ পেলেন বুঝি? কিন্তু যা ভাবছেন, তা নয়। তাকে দিয়ে আপনার বিশেষ সুবিধে হবে না। আপনারা যাকে বলেন ড্রামাটিক, তেমন কিছু সে করে নি। কোনো মহত্ত্ব-টহত্ত্ব দেখায় নি যে আপনার গল্প লেখার মশলা হবে।

    চা এসে পড়েছিল। সেদিকটা দেখিয়ে বললাম, তা না হোক, চা-এর সঙ্গে কিঞ্চিৎ স্ন্যাকস্ এর কাজ করবে তো?

    —তা করতে পারে।

    —তাহলে শুরু করুন।

    ভূতনাথবাবু পেয়ালাটা তুলে নিয়ে বললেন, বি.এ. পাস করে কলেজে ঢুকেছিলেন নিশ্চয়ই?

    —আজ্ঞে না। ওদিকটা আর মাড়াই নি।

    —বলেন কি! দুপুরে এম. এ. সকালে ল’–আমাদের কালে এইটাই তো ছিল সাধারণ রেওয়াজ।

    —আমাদেরও তাই। আমি কোনো রকমে এড়িয়ে গেছি।

    —তাই আপনার চুলগুলো এখনও কিছু কাঁচা আছে। মহামেডান্ ল-এর সাকসেশন চ্যাপ্টার মুখস্থ করতে হলে দশ বছর আগেই আমার দশা হতো!

    —কেন, খুব জটিল ব্যাপার বুঝি?

    —জটিল মানে? বাড়ির মুরগিটা পর্যন্ত ওয়ারিস, তারও একটা ভাগ আছে। একবার কোনো মিঞা চোখ বুজলে হল; সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ জন দাবিদার। তিন-চারটে বিবি, তাদের তিন ডজন ছেলেমেয়ে, বোন, ভাগনে, শালা যে যেখানে আছে। তারপর শুরু হল মামলা। দু-নম্বর দেওয়ানি তো পাঁচ নম্বর ফৌজদারি। খুন, জখম, দাঙ্গা। তার জের যে কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ বলতে পারে না। ঐ অঞ্চলের কথা বলছি, সারা জীবন যাদের মধ্যে কাটিয়ে এলাম। আপনিও তো বেশ কিছুদিন ছিলেন। অন্য দশ জায়গায়ও ঘুরতে হয়েছে। ঐরকমটা দেখেছেন কোথাও?

    স্বীকার করলাম, দেখি নি। মামলা মোকদ্দমা সব দেশের লোকেই করে। সাধারণত তাদের দৌড় ঐ আদালত পর্যন্ত। সেইখানেই শেষ ফয়সালা। কিন্তু ভূতনাথবাবুর দীর্ঘ চাকরি-জীবন এবং আমারও অনেকগুলো বছর এমন কতকগুলো মানুষের মধ্যে কাটাতে হয়েছিল যাদের অভিধানে ‘হার মানা’ বলে কোনো শব্দ নেই, প্রতিশোধ যাদের নিত্য ধৰ্ম, এবং আক্রোশ মেটাবার কোনো পন্থাকেই যারা হীন বা অন্যায় মনে করে না। সে বিষয়ে তাদের উদ্ভাবনী শক্তিও অসামান্য।

    একটা অভিনব খুনের মামলা মনে পড়ল। অতিশয় হুঁশিয়ার ব্যক্তি তোরাপ গাজী। বাড়িতে দো-নলা বন্দুক। লোক ও লাঠি ছাড়া বাইরে বেরোয় না। দারুণ গ্রীষ্মেও জানালা খুলে শোয় না। সেদিন সদর থেকে মামলা জিতে খোসমেজাজে বাড়ি ফিরে পাল্লা দুটোয় খিল আঁটতে বোধহয় ভুলে গিয়েছিল। গভীর রাত্রে বিকট চিৎকার ‘ইয়া আল্লা’! ঠিক বুকের উপর ফণা তুলেছে কালকেউটে। লাফিয়ে উঠবার আগেই বসিয়ে দিল মোক্ষম ছোবল। ‘বেলে বেলে জ্যোৎস্নায়’ চোখে পড়ল, জানালা থেকে নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে একটা লম্বা বাঁশের চোঙা। বোঝা গেল সাপ উড়ে আসে নি, ছাদ থেকেও পড়ে নি, এসেছে বাঁশের ফোঁকর আশ্রয় করে। তার মধ্যেও ইচ্ছে করে ঢোকে নি নিশ্চয়ই। অনেক কৌশল করে বহু সাবধানে চরম বিপদের ঝুঁকি নিয়ে একজন কেউ তাকে ঢুকিয়েছে। যাকে বলে সাক্ষাৎ যম নিয়ে খেলা। ভিতরকার মনোভাব হল—যে কোনো উপায়ে শত্রুতা-সাধন। শত্রুর প্রাণ নিতে গিয়ে নিজের প্রাণটা যদি যায় ক্ষতি নেই, সে জন্যে তারা ভাবে না। একে শুধু রিভেঞ্জ বা প্রতিশোধ বলে ছোট করে দেখলে ভুল হবে। এ এক উঁচুদরের জীবনদর্শন। হায়ার ফিলজফি অব্ লাইফ্, সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে যা বোঝা যায় না। মনে হয়, অবাস্তব, অসম্ভব।

    আরেকজন মামলাবাজ গ্রাম্য মাতব্বরের কথা শুনেছিলাম। অন্ধকার রাত্রে ঘরের বাইরে লোকের সাড়া পেয়ে ‘চোর চোর’ বলে লাঠি হাতে ছুটে বেরিয়েই ‘মাগো’ বলে এক লাফ এবং তারপরেই ‘বাবাগো’ বলে বসে পড়া। সঙ্গে সঙ্গে গগন-ভেদী আর্তনাদ। ‘কী হল গো’ বলে দৌড়ে এলেন গৃহিণী এবং ‘উঃ’ বলে পা ধরে বসে পড়লেন চৌকাঠের উপর। ছেলে ছিল পাশের ঘরে। বুদ্ধি করে একটা টর্চ নিয়ে বেরিয়েছিল। দেখল, বাবা- মায়ের ঘরের ঠিক সামনে সারি সারি পোঁতা আছে মোটা মোটা খেজুরের কাঁটা, ছুঁচলো মাথাটা উপরের দিকে। তারই দুটো বিঁধে আছে তার বাবার দু-পায়ের তলায় এবং ধপ্ করে বসে পড়ার ফলে গোটা তিনেক তাঁর পরনের ধুতি ভেদ করে ইঞ্চিখানেক ভিতরে ঢুকে গেছে। চৌকাঠের আশ্রয় না জুটলে মায়ের অবস্থাও অনুরূপ হত। তাঁর খোঁচাটা আপাতত শুধু পায়ের উপর দিয়ে গেছে।

    যারা এসেছিল, তারা যে নিপুণ শিল্পী, কাঁটাগুলো বসাবার মধ্যেই তার পরিচয় পাওয়া গেল। ‘চুরি’ নামক হেয় কর্মের মতলব নিয়ে তারা আসে নি, তাও বোঝা গেল। গৃহিণীর পায়ের কাঁটা খুলে দেবার পর তিনি হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, রান্নাঘরের তালাটা ভাঙা। ছেলের সাহায্যে খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে দেখলেন, বাসনপত্র যেমন ছিল তেমনি পড়ে আছে। হাঁড়িতে কিছু পান্তাভাত এবং কড়াতে কয়েক টুকরো ইলিশ মাছ ভাজা রেখেছিলেন পরদিন প্রাতরাশের জন্যে। অতিথিরা সেগুলো তাদের নৈশ ভোজনের কাজে লাগিয়েছে। কাঁটা-রোপণে সময় কম লাগেনি, অনেকটা মেহনতও হয়ে থাকবে। ক্ষুধার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। সেটা সঙ্গে সঙ্গে মেটাবার জন্যেই রান্নাঘরে ঢুকবার প্রয়োজন হয়েছিল। যাবার সময় সাড়া-শব্দটা ইচ্ছাকৃত। কর্তা-গিন্নী চোর মনে করে ব্যস্তভাবে ছুটে বেরোবে, এবং তারপরে—।

    এই ধরনের ব্যাপার আমি আর কতগুলো জানি? ভূতনাথবাবুর ভাণ্ডারে দু-চার-দশটা জড়ো হয়ে থাকবে। তারই একটা ঝাড়বার আয়োজন করলেন। চায়ের পেয়ালায় কয়েকটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে বললেন, রহমতগঞ্জের জব্বার মোল্লাকে ভোলেন নি আশা করি!

    —কানা জব্বার?

    —’কানা’ কি বলছেন! ব্যাটা ঐ এক চোখে যা দেখত, দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর সহস্র চক্ষু দিয়ে তার চেয়ে একচুল বেশি দেখতেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। সারাটা জীবন পুলিসকে নাস্তানাবুদ করে একদিন সে পটল তুলল। সেদিন জোড়া-খাসির ফিষ্টি হল আমাদের ক্লাবে। সারারাত ধরে ডজন ডজন বোতল উড়ে গেল। সকালে গেলাম কণ্ডোলেন্স জানাতে। শুনলাম, সোনাদানা টাকাকড়ি বিশেষ কিছু না থাকলেও জমিজমা অনেক রেখে গেছে। স্বনামে বেনামে গোটা চরটাই প্রায় তার।

    বললাম, হবে না? ডাকাতি তো একটা দুটো করে নি। আমার আমলেই তো—

    —ভুল করলেন, বাধা দিয়ে বললেন ভূতনাথবাবু। ওর এক ছটাকও ডাকাতির রোজগার নয়। কিছুটা পৈতৃক আর বেশির ভাগ মামলা মোকদ্দমা করে জ্ঞাতিদের কাছ থেকে বাগিয়ে নেওয়া। ডাকাতিটা ছিল শখ। তার পেছনে বরং বেশ কিছু ঢালতে হত।

    —এত সম্পত্তি থাকতে ডাকাতি করে বেড়াত!

    —করবে না? আগেকার দিনে রাজারা যে দিগ্বিজয়ে বেরোতেন, সবটাই কি লাভের লোভে কিংবা অভাবের তাড়নায়? ওটা ছিল তাঁদের ব্যসন। এদেরও তাই। খন্দটা ভালোয় ভালোয় উঠে গেছে। বড় বড় গোলা ভরা ধান, পাটের বাজার বেশ চড়া, রাখী কারবারেও মোটা রকম মুনাফা এসেছে ঘরে। অতএব চল একটু বেরোনো যাক। সঙ্গে সঙ্গে চর চলে গেল গ্রামে গ্রামে সব শাঁসালো গেরস্তের খোঁজে। খবর এসে গেল—কার সিন্দুকে কি রকম মাল আছে, কার ঘরে যুবতী বৌ-ঝি আছে, কোথায় বাধা পাবার সম্ভাবনা। তাই বুঝে দলবল জোটানো হল। রাতারাতি তেল পড়ল বন্দুকে। কাত্রা, বল্লম, ল্যাজা সড়কি শানিয়ে তোলা হল। তারপর দিনক্ষণ দেখে শুরু হল অভিযান। পুরোদস্তুর শিকার যাত্রা। তফাৎ শুধু লক্ষ্যের বেলায়। জন্তু-জানোয়ারদের বদলে মানুষ।

    যাক, যা বলছিলাম। জব্বারের সাক্ষাৎ ওয়ারিস অর্থাৎ ডিরেক্ট ডিসেণ্ডেণ্টস বেশী নয়। এক জরু, এক ছেলে। জরুটি প্রথম পক্ষ, ছেলে দ্বিতীয় পক্ষের। তার আবার দুটো বিবি আর তিন-চারটে অপোগণ্ড কাচ্চাবাচ্চা। বাড়ির সামনে খাল। তার ওপরে জব্বারের মেয়ের বাড়ি, আর একটু ওদিকে থাকে ভাগনেরা। তিন বাড়িতে ভাবসাব কোনোকালেই ছিল না। মামলা দু’এক নম্বর প্রায়ই লেগে থাকত। তাহলেও জব্বারের সামনে জামাই বা ভাগনেরা মাথা তুলতে সাহস করে নি। ছেলে, অর্থাৎ কাদের মোল্লা বাপের স্বভাব আর চালটা কিছু কিছু পেয়েছিল, বুদ্ধিটা পায় নি। গোঁয়ার, বদরাগী, নানা রকম নেশাভাঙে ওস্তাদ। খুনজখম আর মেয়েমানুষ-ঘটিত মামলায় কয়েকবার জড়িয়েও পড়েছিল। বাপের ভয়ে অন্য পক্ষ বেশীদূর এগোয় নি। দু-একটা ব্যাপারে থানা পর্যন্ত গড়ালেও কোর্টে ওঠে নি। আপনার এলাকায় তাকে আসতে হয় নি কোনোদিন। এবার অবস্থা কাহিল হয়ে উঠল। জ্ঞাতি-কুটুম্ব-পড়শীর দল জোট বেঁধে লাগল তার পেছনে। হাতে মারতে না পারলেও অন্তত ভাতে মারতে হবে। নদীর ধার ঘেঁষে এক বন্দে অনেকগুলো জমি। ফি বছর সোনা ফলে। অনেকের নজর ছিল সেদিকে। তারই স্বত্ব নিয়ে লাগল মোকদ্দমা।

    —কিন্তু ওগুলো তো ওর পৈতৃক মোকদ্দমা।

    —হলই বা। এতক্ষণ তাহলে শুনলেন কি? বাপের সম্পত্তি ছেলে পাবে—আইন কি অত সোজা? নানারকম ফ্যাকড়া বেরোল। উকিলবাবুরা মওকা পেলেন। তাঁদের হাতে পড়ে যা ছিল জলের মতো পরিষ্কার, তাই এবার তেলের মতো ঘোলাটে হয়ে দাঁড়াল। ও পক্ষের পাণ্ডা হল বোনাই। বোনাই বোঝেন তো?

    হেসে বললাম, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। কথাটার জন্মস্থান হয়তো পূব অঞ্চলে, কিন্তু পশ্চিমেও চলে। ‘চলন্তিকা’য় চড়িয়ে পরশুরাম ওকে জাতে তুলে দিয়ে গেছেন।

    —তাই নাকি! বিস্ময় প্রকাশ করলেন ভূতনাথবাবু, আমি তো শব্দটাকে নেহাৎ গেঁয়ো বলেই জানতাম, আপনারা যাকে বলেন ‘গ্রাম্য’ অর্থাৎ ভালগার। যাই হোক, বোনাই মানে তোফাজ্জল মানুষটি কিন্তু মোটেই গেঁয়ো নয়। লেখাপড়া জানে, দু-পাতা ইংরেজিও পড়েছিল। পোশাকে-আশাকে আদবকায়দায় ভদ্র, মুখে হাসিটি লেগেই আছে। কখনও উত্তেজিত হয় না। অর্থাৎ বাইরে গোবেচারা, ভিতরে ভিতরে একটি দারুণ চীজ। ফল যা হবার হল। একখানি একখানি করে জমিগুলো কাদের মোল্লার হাতফসকে ও তরফে চলে গেল। নগদ টাকাপয়সা যৎসামান্য যা ছিল, সে তো গেছে প্রথম চোটে। কাদেরের অবস্থা তখন ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো, কিন্তু বোনাই-এর গায়ে দাঁত বসাবে, সে মুরদ নেই। তোফাজ্জল সে দিক দিয়ে অত্যন্ত হুঁশিয়ার।

    জজকোর্টে একটা আপিলের মামলা চলছিল। কাদেরের খুব আশা ছিল, এটাতে তার জিত হবে। উকিলও অনেক ভরসা দিয়েছিলেন। কিন্তু রায় বেরোতেই বসে পড়ল কাছারির বারান্দায়। বসতবাড়ির ঠিক লাগোয়া আড়াই বিঘে সুপুরিবাগান বন্ধক রেখে কবে নাকি শ’খানেক টাকা ধার করেছিল জব্বার মোল্লা। সুদ সমেত মোটা টাকার ডিক্রি পেয়েছেন হালদারবাবুরা। মানে বাগানটি গেল। তোফাজ্জল এসে শ্যালকের হাত ধরে টেনে তুলল, আহা, অমন ভেঙে পড়লে চলবে কেন ভাইজান? বাড়ি চল। জজের ওপরে জজ আছে। টাকার জন্যে ভেবো না। আমি তো এখনও বেঁচে আছি।

    আসল খবর সবাই জানত। হালদারদের সঙ্গে যোগসাজশে মামলাটা দায়ের করেছে তোফাজ্জল। ধারের কাহিনী মিথ্যা, দলিলটাও জাল। কাদের এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়ল। দু-চোখ থেকে ঠিকরে পড়ল আগুনের জ্বালা। বোনাই সকলের অলক্ষ্যে মুচকি হেসে সরে গেল।

    বাড়ি ফিরতে কাদেরের রাত হল। সমস্ত পথ শুধু একটা কথাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছিল—শোধ নিতে হবে। কিন্তু কেমন করে? কত রকমের আজগুবি উপায় মনে হয়েছে। সবটাই তার সাধ্যের বাইরে।

    ছোট ছেলেটা বছর পাঁচেকের। জেগে বসে আছে, বাপ কখন আসবে। সদরে গেছে, একটা কোনো মিঠাই হাতে করে ফিরবে নিশ্চয়ই। বলেও দিয়েছিল যাবার সময় বাপজান, আমার জন্যে লজেঞ্চুস আনিস!

    সাড়া পেয়ে ছুটে আসতেই কাদের ছেলেকে ঠেলা মেরে ফেলে দিল। পড়ে গিয়ে যেমনি কেঁদে ওঠা, পিঠের উপর বসিয়ে দিল চড়। ছেলের মা এল ছাড়াতে। ফোড়ন- টোড়ন কিছু একটা কেটে থাকবে হয়তো, তাকেও তেড়ে গেল—ছুটে না পালালে ঐখানেই খুন-জখম যাহোক একটা ঘটে যেত। মা বুড়ি ঘরে শুয়ে কাতরাচ্ছিল। নানা রোগে ভুগে হাড্ডিসার চেহারা। সৎমা হলেও কাদের বুড়িকে বিশেষ হেলাফেলা করতো না। দূরে কোথাও গেলে, ফিরে এসে খোঁজ নিত, মা কেমন আছে। আজ গোঁজ হয়ে বসে রইল দাওয়ার ওপর। মা কয়েকবার ডাকতে রেগেমেগে ঘরে ঢুকে খেঁকিয়ে উঠল, ডাকাডাকি করছ কিসের জন্যে?

    মামলার ব্যাপারে মায়ের মনে উদ্বেগ ছিল। ছেলের হাবভাব থেকে ফলটা আন্দাজ করতে পারলেও সেই কথাই জিজ্ঞেস করল। কাদের কোনো জবাব না দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছন থেকে কানে গেল, মা বলছে, ‘এত লোক মরে, খোদা আমাকে একবার চোখে দেখে না।’

    অতি মামুলী আপসোস। কথাগুলোও নিতান্ত সাধারণ। বুড়ো বয়সে কখনও কোনো ক্ষোভের কারণ ঘটলে সবাই একবার আওড়ায়। মায়ের মুখ থেকে কাদের নিশ্চয়ই আরও অনেকবার শুনে থাকবে। কান দেয় নি। আজ কী মনে করে থমকে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে ফিরে গিয়ে মা-র বিছানার পাশে বসল। কোনো কথা বলল না। দুটো জ্বলন্ত চোখ শুধু অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই তোবড়ানো গাল, ছানি পড়া চোখ, আর ঠেলে-ওঠা কণ্ঠার দিকে। ছেলের সেই চাউনি দেখে বুড়ির শুকনো মুখ আরও শুকিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে বলল, অমন করে কী দেখছিস?

    কাদের জবাব দিল না। আপনমনে বিড় বিড় করে আউড়ে গেল, হ্যাঁ, আর বেশীদিন নেই। আরও কিছুক্ষণ বসে বসে কী ভাবল। তারপর মায়ের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলল, আমার একটা কথা শুনবে?

    বুড়ি আরও ভয় পেল। ছেলেকে সে চেনে। যা বলে সোজাসুজি, ভূমিকা করা তার অভ্যাস নেই। জিজ্ঞেস করল, কী কথা?

    —যা দেখছি, তোমার ডাক এসে গেছে। যেতে যখন হবেই তার আগে আমার একটা উবগার করে যাও না কেন?

    —উবগার! আমি কী উবগার করবো তোর! সে সাধ্যি যদি থাকত—

    —আছে সাধ্যি। তুমি ইচ্ছে করলেই পার।

    বুড়ি কিছুই ভেবে পেল না, ছেলের কী উপকার সে করতে পারে। কাদের উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ফিরে এসে মায়ের খানিকটা কাছ ঘেঁষে বসল। তারপর ফিস ফিস করে বলল, কাগপক্ষী কেউ জানবে না, খালি তুমি আর আমি, ব্যাস।

    বুড়ি বিরক্ত হয়ে উঠল, কী চাস, খুলে বলবি তো না কি?

    কাদের তখনও ঠিক আসল কথায় গেল না। বলল, এই যে আমরা ভরগুষ্টি পথে বসতে চলেছি, কার জন্যে তুমি তো জান!

    —জানি বইকি বাপজান, জেনে কী করবো? খোদা এর ইনসাব করবে। এসব জমিজমা পুকুর বাগান কিছুই ওদের ভোগে লাগবে না, তুই দেখে নিস।

    —খোদা কি করবে, সে ভরসায় আর বসে থাকা চলে না। আমি আর থাকতে পারছি না। হাত দিয়ে দ্যাখ, আমার সারা কলজেটা দাউ দাউ করে জ্বলে যাচ্ছে।

    মায়ের একটা হাত খপ্ করে তুলে নিয়ে চেপে ধরল বুকের উপর। তারপর নামিয়ে রেখে বলল, আমার মুখের গ্রাস ঐ শালা কেমন করে বসে বসে খায়, আমি একবার দেখে নেবো।

    বুড়ি নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল। বুঝল এ শুধু নিষ্ফল আস্ফালন, নিরুপায়ের যা একমাত্র পথ। এ করেও যদি কিছু সুখ পায় তো পাক। তোফাজ্জলের দাড়ি ওপড়ানো দুটি থাক, এক গাছা চুলে হাত দেবার, আপনারা যাকে বলেন কেশ স্পর্শ করবার মতো ক্ষমতা যে ওর নেই সে কথা সবাই জানে।

    বুড়ির বিছানা যেখানটায়, তার উল্টোদিকের দেওয়ালে একখানা ছোট সাইজের রামদা ঝোলানো ছিল। সেই দিকে হাত তুলে কাদের বেশ সহজ ভাবেই বলল, শোনো মা, ঐ যে দা-টা দেখছ, ওটা দিয়ে আমি তোমার গলায় একটা কোপ মারবো।

    মা আঁতকে উঠতেই ভরসা দিল, ভয় নেই, এমন ভাবে মারবো যে আমার চেঁচানি শুনে লোকজন যারা আসবে, তাদের কাছে যেন বলে যেতো পারো, কোপটা মেরে গেল তোফাজ্জল। মুখে না বললেও চলবে, আমি ঐ বলে চেঁচাবো, তুমি খালি মাথা নেড়ে সায় দেবে।…পারবে না?

    মা চুপ করে আছে দেখে বলল, আচ্ছা, তোমাকে কিছু বলতে হবে না। যা করবার আমিই করবো।

    বুড়ির অবস্থা কল্পনা করুন। ছেলেকে যদি না চিনত, মনে করতে পারত সে ঠাট্টা করছে। কিন্তু এটা যে ঠাট্টা নয়, ছেলের যে রকম মতিগতি, কাজটাও তার পক্ষে বিশেষ কঠিন হবে না। সবই বুঝল। কান্নাকাটি করে লাভ হবে না, পালাবে যে সে উপায়ও নেই। জবাই করবার আগে গরুগুলো যে চোখে তাকায়, তেমনি ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে তাকিয়ে রইল।

    কী একটা হয়তো বলতে গিয়েছিল, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কাদের বলল, তুমি ভাবছ, লোকে বিশ্বাস করবে কেন? তোমার ঐ তেঁতুলতলার জমিটা যে সে হাত করতে চায়, সেজন্যে কয়েকবার এসে তোমাকে ফুঁসলে -ফাঁসলে সাদা কাগজে টিপসই নেবার চেষ্টা করেছে, সে খবর কে না জানে?

    এতক্ষণে কথা সরলো বুড়ির গলায়। বোধহয় আশা হল টিপ যখন সে দেয় নি, গলাটা এ যাত্রা বাঁচতে পারে। চোখের জল মুছে ভাঙা গলায় বলল, তোর মুখ চেয়েই আমি রাজি হই নি।

    —হও নি বলেই তো সুবিধে। সবাইকে বোঝানো যাবে, সেই জন্যেই তোমার ওপরে তার আক্রোশ।

    বুড়ি এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। কপাল চাপড়ে স্বামীর উদ্দেশে ইনিয়ে বিনিয়ে কী সব নালিস জানাতে যাচ্ছিল, ছেলের দিকে নজর পড়তেই মাঝপথে থেমে গেল। কাদের মুখে কিছুই বলল না। ডান হাতের এই আঙুলটা একবার ঠোটের উপর রেখে দু-চোখে আগুন ছড়িয়ে বেরিয়ে চলে গেল।

    পরদিন রাত প্রায় আটটা। কাদের মোল্লার বিকট কান্নায় গোটা পাড়াটা কেঁপে উঠল।

    আমি বললাম, পরদিনই!

    কথাটায় হয়তো কিছু বিস্ময় প্রকাশ পেয়ে থাকবে। কিংবা অজ্ঞাতসারে কোনো আঘাত। ভূতনাথবাবু একটা আধপোড়া চুরুট ধরাচ্ছিলেন, কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে একরাশ কড়া ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, তবে কি সাতদিন ধরে প্ল্যান আঁটবে, এই বুঝি আপনি আশা করেছিলেন? অতখানি কাঁচাছেলে সে নয়। এসব কাজ ফেলে রাখলেই নানারকম বাধাবিঘ্ন এসে জোটে, এই সোজা কথাটা সে জানত। তবু যে একটা দিন দেরি করেছিল, সে শুধু বাধ্য হয়ে। এক নম্বর, এ রকম ঘটনা ঘটবার জন্যে রাতের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আর দু নম্বর, ব্যাপারটাকে পাকাপোক্ত ভাবে দাঁড় করাতে গিয়ে একটা—কী বলবো, রোমান্সের সুবিধে নিতে হয়েছিল! পুরনো রোমান্স।

    এবার সত্যিই চমকে উঠলাম। এত বড় বীভৎস কাণ্ডের মধ্যে ‘রোমান্স’!

    ভূতনাথবাবু আমার ভাবান্তর লক্ষ্য করে বললেন, এতে আর অবাক হবার কী আছে? রোমান্স কোথায় নেই বলুন! ওর কি স্থানকাল আছে, না পাত্রাপাত্রের ভেদ আছে? কেন, ঐ বইটা পড়েননি? কী নাম যেন। দাঁড়ান….বেশ নামকরা লোকের লেখা। শ্রীকান্ত। পড়েছেন নিশ্চয়ই?

    বললাম, তা পড়েছি। কিন্তু এটা তো আপনার জুরিসডিকশন নয়। ওসব বই-এর খোঁজখবর-

    —আমি পেলাম কি করে, এই বলবেন তো? কী করবো মশাই! বেকায়দায় পড়লে বাঘেও ঘাস খায়। ভূতনাথ দারোগাকেও বাংলা নভেল পড়তে হয়। আমার নতুন বৌমাটি একটি নাটক নভেলের পোকা। বদভ্যাসটি সে-ই ধরিয়েছে। প্রথমে ছিলাম চিনির বলদ। পাড়ার লাইব্রেরী থেকে তার ফরমাশ-মতো বই নিয়ে আসা আর পড়া হয়ে গেলে পৌঁছে দেওয়া। ভেতরে কী আছে, পাতা উল্টে দেখি নি। কিন্তু আমার খুদে মা-টি রীতিমতো নাছোড়বান্দা—’এই গল্পটা একটু পড়ে দেখুন না, বাবা। শুনুন, কী চমৎকার লিখেছেন ভদ্দরলোক!’ এমনি করে করে এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে দুপুরবেলা খেয়ে উঠে ওরই যে কোনো একটা টেনে নিয়ে দু-চারপাতা না ওল্টালে ঘুম আসতে চায় না। একদিন হাতে এসে গেল শ্রীকান্ত। ওর আবার অনেকগুলো পর্ব আছে। সেটা কোন্ পর্ব বলতে পারবো না, আপনার হয়তো জানা আছে। ঘটনাটা হল—কোথায় যেন নতুন রেল-লাইন বসানো হচ্ছে। মাটি-কাটা কুলী এসেছে এক দঙ্গল—নানবয়সের মেয়েপুরুষ, কাচ্চাবাচ্চাও কম নয়। কতগুলো ছাদখোলা ওয়াগন হচ্ছে তাদের আস্তানা। এক-একটার মধ্যে দু-তিনটে করে সংসার। কাছেপিঠে কোথাও মুখে দেবার মতো জল নেই, অন্য সব স্যানিটারি অ্যারেঞ্জমেন্টট্স কাগজে কলমে ছিল নিশ্চয়ই, কাজের বেলায় না-ই বা রইল। যা হয়ে থাকে। গরমের দিন। শুরু হল কলেরা। একই গাড়ির একপাশে লোক মরছে, আর তার থেকে দু-হাত দূরে একটি পেয়ার—কাঁচা বয়স নিশ্চয়ই—সারারাত ধরে চালিয়েছে উৎকট রোমান্স। নায়ক রুগীর কাছে বসে। তারই চোখের ওপর পাশাপাশি এই দুই দৃশ্য।

    বললাম, ও তো গল্প!

    —গল্প বলেই একটু রেখে ঢেকে আব্রু বাঁচিয়ে বলেছেন লেখক। আসলে যা ঘটে, সে তো আরও উৎকট। আমার নিজের পাড়াতেই দেখুন না? ভদ্রমহিলার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। স্বামীটি মরমর, ছেলেমেয়েরা যে যার মনে আছে, একটা ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের মাসতুতো না পিসতুতো ভাইকে বগলদাবা করে রাত দশটা অবধি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনও দোকানে দোকানে, কখনও নির্জন নদীর ধারে, কখনও অন্ধকার মাঠে। বাড়ি এসেও রাতদুপুর পর্যন্ত দুজনে মিলে গানবাজনা, হৈ-হুল্লোড়।

    —আপনাদের পাড়ায় ছেলে-ছোকরা নেই?

    কথাটার সুরে বোধহয় কিঞ্চিৎ উষ্মা প্রকাশ পেয়ে থাকবে। ভূতনাথবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, নাঃ, আপনি দেখছি এখনও রিয়ালিস্টিক রাইটার হতে পারেন নি! অল্পেতেই নীতিবোধ চাড়া দিয়ে ওঠে! ছেলে-ছোকরারা কী করবে? এদিকে যে আবার ভাইবোন তবে হ্যাঁ করত, মহিলাটি যদি- তরুণী হতেন। তখন ঐ ছেলেটা হত ওদের রাইভ্যাল। এখন ওকে পিটি করে। আহা বেচারা! সবাই মিলে নাম দিয়েছে ল্যাং-বোট। যাক, যে রোমান্সের কথা বলতে গিয়ে এতখানি ভণিতা, সেটা এবার শুনুন।

    কাদের মোল্লার ছোট বিবি ফতিমা খালের ওপারের মেয়ে, তোফাজ্জলের কী রকমের বোন। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুটা আশনাই ছিল। সাদিও হয়ে যেত। কোনো একটা ব্যাপারে জব্বার জামাইকে জব্দ করবার জন্যে মেয়েটাকে একদিন ছোঁ মেরে নিয়ে এসে রাতারাতি ছেলের বৌ বানিয়ে ফেলল। কিন্তু প্রথঢ় বয়সে মনে যে রঙ লাগে তা কি অত সহজে মোছে? ওদের অন্তত মোছে নি। কাদের সে কথা জানত, কিন্তু কিছু মনে করত না, বরং মাঝে মাঝে সেটা কাজে লাগাত। তোফাজ্জলের কাছ থেকে কোনো কিছু সুবিধে আদায় করতে হলে সে ভার পড়ত ঐ দু-নম্বর বিবির ওপর। তাছাড়া তার হাত দিয়ে যখন-তখন মাছটা মুরগীটা, কখনও-সখনও হঠাৎ দরকারে লুঙিটা জামাটাও আসত। ঘটনার দিন দুপুরবেলা বেরোবার নাম করে কাদের ছোট বৌকে দিয়ে বোনাই-এর একটা লুঙি আনিয়ে নিয়েছিল। ফতিমা নিশ্চয়ই খুশী হয়ে ছুটতে ছুটতে গিয়েছিল। বাঁশের সাঁকোটা পেরোতে অন্যের যদি লাগে পাঁচ মিনিট, তার হয়তো তিন মিনিটের বেশী লাগেনি। এই সুযোগে একবার কাছে আসা, দু-একটা কথা, একটুখানি হাসি। সেদিন অবিশ্যি তার কোনোটাই হয়নি। তোফাজ্জল তখন বাড়ি ছিল না। ফতিমা কাউকে কিছু না জানিয়ে বাইরের উঠোনে দড়ির ওপর থেকে লুঙিটা টেনে নিয়ে তেমনি ছুটতে ছুটতে ফিরে এসেছিল। কাদের দাঁড়িয়ে আছে, দেরি হলে বকুনি খেতে হবে।

    ভূতনাথের কাহিনীতে এইখানে হঠাৎ একটু ছেদ পড়ল।

    কারণটা বুঝতে না পেরে চোখ তুলে দেখলাম, তিনি জানালার বাইরে চেয়ে আছেন। মিনিটখানেক পরে ফিরে বললেন, আচ্ছা মিস্টার চৌধুরী, আপনি তো একজন লেখক। বলুন তো, লুঙি নিয়ে ফিরে আসতে আসতে কী ভাবছিল ফতিমা?

    আমি হেসে বললাম, লেখকরা কি হাত গুনতে জানে?

    —হাত গুনতে হবে কেন, মন গুনে বলুন।

    —আমি এখনও তত বড় লেখক হতে পারিনি।

    —আমি কিন্তু বেশ দেখতে পাচ্ছি, মৃদু এবং অনেকটা আবেশময় সুরে বললেন ভূতনাথবাবু, লুঙিটা পাড়তে গিয়ে মেয়েটার ঠোটের কোণে একটু দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠেছিল। মাথা নেড়ে মনে মনে বলেছিল, বেশ মজা হবে। বাড়ি এসে খুঁজে পাবে না, ভাববে কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। একে ডাকবে, ওকে বকবে, তারপর যখন জানতে পারবে কে সেই ‘চোর’, তখন?… পরের অবস্থাটা মনে মনে কল্পনা করে তার মুখখানা নিশ্চয়ই রাঙা হয়ে উঠেছিল। হয়তো একা একা খিল্‌ খিল্‌ করে হেসে উঠেছিল সেই নির্জন খালের ধারে। কী বলেন?

    আমি উত্তর দিলাম না। আমার চোখের সামনে যে নতুন ভূতনাথ দারোগা বসে আছেন, নিজের চোখে দেখেও যার এই রূপান্তর অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছিল, তারই মুখের পানে সবিস্ময়ে চেয়ে রইলাম।

    তিনি আমার উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। যেন নিজেকেই শোনাচ্ছেন, এমনি ভাবে অনুচ্চ সুরে বললেন, নিতান্ত সরল ছেলেমানুষ মেয়েটা। সে কেমন করে জানবে, সামান্য একটা লুঙির মধ্যে কত বড় সর্বনাশ সেদিন লুকিয়েছিল। একদিন যাকে সে মন দিয়েছিল এবং তার পরেও মন থেকে মুছে ফেলতে পারে নি, তাকে নিয়ে এই ছোট্ট লুকোচুরির রঙিন লোভটুকু সে ছাড়তে পারে নি। এ যদি পাপ হয়, তার প্রায়শ্চিত্ত সে নিজের জীবন দিয়ে করে গেছে।

    অজ্ঞাতসারে চমকে উঠলাম, কী করেছিল? আত্মহত্যা?

    —তার কথা যখন আসবে, তখন বলবো। আপাতত আসুন, কাদেরের কাছে ফিরে যাওয়া যাক।

    মরা-কান্না শুনে আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে এসে দেখল, কাদের মোল্লা মায়ের পায়ের ওপর পড়ে মাথা খুঁড়ছে। দু-দুটো বিবি তাকে ধরে রাখতে পারছে না। বুড়ির ঘাড়ের বাঁ দিকের প্রায় আদ্ধেকটা নেমে গেছে। বালিস বিছানা রক্তে লাল। রামদাটা কাৎ হয়ে পড়ে আছে শিয়রের কাছে। শোকের বেগটা একটু পড়ে এলে কাদেরের মুখ থেকে যে বয়ান বেরোল তার থেকে জানা গেল, পাশের গাঁয়ে কোন্ দোস্তের বাড়ি তার দাওয়াৎ ছিল। বাড়িতে মায়ের অসুখ, তাই খেয়ে উঠে আর দাঁড়ায় নি, জোরে পা চালিয়ে যখন ফিরবার কথা, তার আগেই ফিরে এসেছে। বাড়ি ঢুকে মায়ের কান্না আর তার সঙ্গে পুরুষমানুষের গলায় চাপা ধমকানি শুনে তাড়াতাড়ি দরজার সামনে এসে যা দেখল, বললে কেউ বিশ্বাস করবে না, তার নিজের চোখকেই সে বিশ্বাস করতে পারে নি। যতই দুশমনি থাক, তাই বলে শাশুড়ি, আর ঐ রকম বুড়ো মানুষ, অতদিন থেকে ভুগছে, তাকে কেউ খুন করতে পারে! নিজের চোখে তাই তাকে দেখতে হল। ঐখানে হাঁটু গেড়ে বসে তার মায়ের মাথার ওপর দা উঁচিয়ে ধরেছে তার বোনাই! দেখেই মাথাটা ঘুরে গেল। চেঁচাতে চেষ্টা করেছিল, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় নি। ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতেই বসিয়ে দিল কোপ। ছুটে গিয়ে দু-হাতে কোমর জাপটে ধরেছিল। রাখতে পারবে কেন? ‘শালা তো মানুষ নয়, নয়, দাঁতাল শুয়োর।’ এক ঝটকায় ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেছে।

    কে একজন জানতে চাইল, বৌ দুটো ছিল কোথায়?

    —বড়টি বলল, সে রসুইখানায় ছেলেকে ভাত খাওয়াচ্ছিল। ছোট কিছু বলল না। তার হয়ে কাঁদুনে সুরেই জবাব দিল কাদের, ও ঘাটে গিয়েছিল। ওরা দুজনে আসবার আগেই পালিয়েছে হারামজাদা।

    পাঁচ মাইল দূরে থানা। দুজন প্রতিবেশীর কাঁধে হাত দিয়ে সমস্ত পথ একটানা বিলাপ করতে করতে কাদের গিয়ে লুটিয়ে পড়ল বড়বাবুর পায়ের ওপর। এজাহার লিখে নিয়েই তিনি ঘোড়া নিয়ে ছুটলেন। লাশ চালান দিয়ে সেই রাত থেকেই শুরু হল তদন্ত। তোফাজ্জলকে বাড়ি পাওয়া গেল না। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারল না। কাদেরের বাড়ি আর খালের পুলের মধ্যে রশি চারেক ব্যবধান, সেই পথে এবং সাঁকোর বাঁশে তিন- চার জায়গায় রক্তের দাগ দেখা গেল। তোফাজ্জলের বাড়ির উঠোনেও খানিকটা খানাতল্লাশে বাড়িঘরে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না। পেছনে ছিল পুরনো খড়ের গাদা। যাবার সময় দারোগার হঠাৎ খেয়াল হতেই সেটা ভেঙে ফেলবার হুকুম দিলেন। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ল রক্ত-মাখা লুঙি।

    ভোরবেলা বাজারের পাশে একটা মেয়েমানুষের ঘর থেকে বেহুঁশ অবস্থায় তোফাজ্জলকে গ্রেপ্তার করা হল।

    ভূতনাথের দেশলাই-এর কাঠি ফুরিয়ে গিয়েছিল। চাকরকে ডেকে তার ব্যবস্থা করবার পর তিনি পকেট থেকে একটি বিশাল সিগার বের করে ধরালেন। মিনিট কয়েক নিঃশব্দে ধোঁয়া ছেড়ে আবার শুরু করলেন :-

    আমি তখন সদরে। ডি. এস. পি. ভবতোষ সেন ছুটি নিয়েছেন, তাঁর জায়গায় কাজ করছি। কয়েকটা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংস নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। এস. পি. ডেকে বললেন, ‘ও-সব থাক। আপনি এই কেসটা দেখুন।’ ও. সি-র রিপোর্ট পড়ে তাঁর বোধ হয় কোনো সন্দেহ হয়ে থাকবে। আমার কাছে অবিশ্যি কিছুই ভাঙলেন না।

    পরদিন থেকেই লেগে পড়লাম। সদর থেকে অনেকটা দূরে। প্রায় সন্ধ্যা হল থানায় পৌঁছতে। গিয়ে দেখি, কাদের বসে আছে। চোখ দুটো লাল, চুল উস্কুখুস্কু। কী ব্যাপার? কাল রাত থেকে ফতিমাকে পাওয়া যাচ্ছে না। ও-সি’র মুখ গম্ভীর। ইংরেজীতে বললেন, ‘কোনো গোলমাল আছে মনে হচ্ছে। দু-দিন চেষ্টা করেও মেয়েটাকে মিট করতে পারিনি। রোজই শুনি, অসুখ।’

    কয়েকজন সিপাই নিয়ে তখনি দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। সারারাত খোঁজাখুঁজির পর কাদেরের বাড়ি থেকে মাইল চারেক দূরে ঐ খালের মধ্যেই পাওয়া গেল। একটা বাঁশঝাড় কবে উপড়ে জলে পড়ে গিয়েছিল। ভাঁটার টানে ভেসে এসে তার সঙ্গে আটকে গেছে।

    ভূতনাথবাবু আবার জানালার বাইরে দৃষ্টি ফেরালেন। মিনিট খানেক চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললেন, কতদিন হয়ে গেল। মুখখানা এখনও স্পষ্ট মনে আছে।

    ঐ সম্বন্ধেই বোধহয় কোনো প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই ওঁর গলা শোনা গেল। বললেন—

    ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকে আমাদের দেশের চাষীদের সম্বন্ধে অনেক ভালো ভালো কথা পড়েছি। লোকগুলো কী সরল উদার! একজনের বিপদে দশজন বুক দিয়ে এসে পড়ে। এক বাড়ির উৎসব মানে গোটা গাঁয়ের উৎসব। এসব যাঁরা লিখেছেন, সম্ভবত তাঁরা শহরের লোক। গ্রাম্যজীবনের স্বাদ দূরে থাক, কাছ থেকে দেখবার সুযোগও বোধহয় হয়নি। হলে বুঝতেন, একের বিপদে অন্যেরা এসে পড়ে ঠিকই, তবে সেটা অন্য উদ্দেশ্যে। যে লোকটা পড়েছে তাকে সবাই মিলে চেপে ধরবার জন্যে, যাতে করে আর সে মাথা তুলতে না পারে। তোফাজ্জলের ব্যাপারেও তাই হল। একে তো ফেরেববাজ লোক বলে কেউ তার উপর খুশী ছিল না। কখন কার পেছনে লাগে এই ভয়েই তটস্থ! তার ওপরে নানা কাণ্ড করে হঠাৎ অবস্থাটা ফিরিয়ে ফেলবার পর অনেকের মনেই জ্বালা ধরেছিল। এই সুযোগ তারা ছাড়ল না। একগাদা সাক্ষী জুটে গেল কাদেরের পক্ষে। কেউ কেউ সেদিন তোফাজ্জলকে সন্দেহজনক ভাবে বুড়ির ঘরে ঢুকতে দেখেছে, কেউ দেখেছে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির দিকে ছুটতে। তার নিজের চাকরটা পর্যন্ত বলে বসল, মনিব যখন বাড়ি ঢোকে, তার গায়ে আর লুঙিতে রক্তের দাগ ছিল। কারণটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, ধমক খেয়ে আর সাহস করেনি।

    আমাদের ও. সি.-টিও কোনো কারণে লোকটার ওপর নারাজি হয়ে থাকবেন। এবার বাগে পেয়ে এঁটে ধরলেন। মামলাখানা যা তৈরী হল, তার মধ্যে দাঁত ফোটাবার মতো এতটুকু নরম জায়গা কোনোখানে খুঁজে পাওয়া গেল না।

    হ্যাঁ, ফতিমার মৃত্যুটা নিয়ে টানা-হেঁচড়া করতে ছাড়িনি, কিন্তু কাদেরের মুখে ঐ এক কথা—’জানি না, হুজুর। মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম ঘরে নেই। যেখানে যেখানে যেতে পারে কোথাও না পেয়ে থানায় গিয়েছিলাম খবর দিতে।’

    পাড়ার লোকের বিশ্বাস—দু-চারজন মুখ ফুটে বলেও ফেলল—তোফাজ্জলের সঙ্গে মেয়েটার যে গোপন সম্পর্ক ছিল তার থেকে অন্য ভাবে না হলেও খবরাখবর দিয়ে হয়তো কিছুটা সাহায্য করে থাকবে। পাছে সে কথা বেরিয়ে যায় সেই ভয়ে জলে ঝাঁপ দিয়েছে। একটি সদ্য-গোঁফ-ওঠা কলেজে-পড়া ছোকরা কথাটাকে একটু অ্যামে করে দিল, ভয়ে নয় স্যর, লজ্জায়, ঘেন্নায়। তোফাজ্জলকে সে সত্যিই ভালবাসত।

    ইনভেস্টিগেশন শেষ করতে লেগে গেল ছ’মাস। আমরাই তারিখে তারিখে দরখাস্ত করে সময় নিয়েছি। সাহেব এস. পি.; তার ওপরে দারুণ একরোখা মানুষ। ঐ যে একবার মাথায় ঢুকেছিল এর মধ্যে মিস্ট্রি আছে, ব্যাস, গোঁ চেপে গেল, যেমন করে হোক সেটা বের করতেই হবে। নিজেও কম চেষ্টা করেননি ভদ্রলোক। তারপর হাল ছেড়ে দিলেন।

    আসামী গোড়া থেকেই জেলহাজতে। এস. ডি. ও. জামিন দেয়নি। বড় ব্যারিস্টার লাগিয়ে প্রথমে সেশন্স, তারপর হাইকোর্ট পর্যন্ত লড়েও কাজ হয়নি। আমরা বারবার অপোজ করে গেছি। জোরালো প্রমাণ রয়েছে ওর বিরুদ্ধে। জামিন দিলেই সাক্ষী ভাগাবার চেষ্টা করবে। অত্যন্ত প্রভাবশালী লোক, সুতরাং এ ঝক্কি নেওয়া যায় না—এই ছিল সরকার পক্ষের যুক্তি। সব কোর্টই সেটা মেনে নিয়েছিলেন।

    ওর পক্ষে মামলা চালানো, উকিল ব্যারিস্টার লাগানো এবং অন্যান্য তদ্বির- তদারকের ভার ছিল বড় ভাই-এর ওপর। দু-হাত দিয়ে লুটছিল লোকটা। এমন সুযোগ কে ছাড়ে? ও-অঞ্চলের চাষী গেরস্তর হাতে নগদ টাকা-কড়ি বড় একটা থাকে না। যা ছিল গোড়াতেই শেষ হয়ে গেছে। তারপর টান পড়েছিল জমিজমায়। ওর নিজের যা ছিল, তাছাড়া এক বছরে কাদেরকে ঠকিয়ে যা কিছু হাত করেছিল, কিছু বাঁধা পড়ল, বেশীর ভাগ জলের দামে বিক্রি হয়ে গেল। হালদারদের পোয়া বারো। মামলা যখন উঠল, তখন আর বিশেষ কিছু বাকী নেই। কাদেরের খুশি আর ধরে না। এক একখানা জমি যায় আর তার ফুর্তি বাড়ে। তার বাড়ির লাগোয়া সেই তেঁতুলতলার বাগানটা যেদিন গেল, সেদিন আনন্দের চোটে একেবারে ক্ষেপে যাবার মতো অবস্থা। বৌ-এর গলায় ছিল একটা রুপোর হাঁসুলি, ভুলিয়ে ভালিয়ে কিংবা এক রকম কেড়ে নিয়েই বলতে পারেন, স্যাকরার দোকানে বাঁধা রেখে সেই টাকায় মস্ত বড় এক খাসী কিনে এনে লাগিয়ে দিল ভোজ। প্ৰায় গাঁসুদ্ধ নেমন্তন্ন!

    প্রতি তারিখে কোর্টে যাওয়ার ওর কোনো দরকার ছিল না, কিন্তু সক্কলের আগে গিয়ে হাজির হত। কাছারির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, তোফাজ্জলকে কখন নিয়ে আসবে জেল থেকে, চোরডাকাত গাঁটকাটাদের সঙ্গে একটা দড়িতে বেঁধে, একই হাতকড়ায় গেঁথে মামলা যখন চলত, সাক্ষীর জবানবন্দি বা উকিল ব্যারিস্টারের সওয়াল জবাব—এসব দিকে তার নজর ছিল না, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত আসামীর কাঠগড়ার পানে। দলের লোকের কানে কানে ফিস্ ফিস্ করে বলত, দ্যাখ্ দ্যাখ্, বোনাই আমার কত আরামে আছে জেলে গিয়ে, মুখখানা একেবারে আমসি হয়ে গেছে।

    ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, মিসফরচ্যুন নেভার কাম্‌স্‌ অ্যালোন। কপাল যখন ভাঙে, নদীর মতো এক পাড় ভাঙে না, দু-পাড়ে একসঙ্গে ভাঙন লাগে। তোফাজ্জলেরও তাই হল। একটা মাত্র ছেলে, বছর সাতেক বয়স, বাপের ভীষণ ন্যাওটা। জন্ম থেকেই রোগা, বাপ জেলে যাবার পর থেকে আরও শুকিয়ে যাচ্ছিল। তারপর পড়ল জ্বরে। যেদিন রায় হবার কথা, তার আগের রাত্রে হঠাৎ মারা গেল। কাদেরের কাছে খবর এল। সে গেল না। মনে মনে হয়তো খুশী হবার চেষ্টা করেছিল। তাও পারল না। হঠাৎ কী রকম গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। পাড়ার কেউ কেউ পরে তার বৌ-এর মুখে শুনেছিল, সে রাতটা নাকি সে ঘুমোতে পারেনি। বার বার উঠে উঠে তামাক খেয়েছিল।

    পরদিন ভোরেই সদরে রওনা দেবার কথা। বৌকে আগেই বলে রেখেছিল। রাত থাকতে উঠে ভাতে-ভাত নামিয়ে স্বামীকে ডাকতে এসে দেখে, পুব পোতার ঘরে তার মাকে যেখানে খুন করা হয়েছিল, সেইখানে দাঁড়িয়ে শূন্য মেঝের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। দেখে কী রকম ভয় পেয়েছিল বৌটা। কাছে সরে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, কী দেখছ! কাদের কোনো জবাব দেয়নি। আরও খানিকক্ষণ তেমনি ভাবে তাকিয়ে থেকে অদ্ভুত গলায় থেমে থেমে বলেছিল, মা নিশ্চয়ই সব আগে থেকে জানতে পেরেছিল। তা না হলে অমন জোর দিয়ে কইল কেমন করে—তুই দেখে নিস্ কাদের, এর কিছুই ওদের বরাতে সইবে না! তাই তো হল। শেষকালে ছেলেটাও গেল…। বলেই হঠাৎ বৌ-এর দিকে ফিরে তাড়া দিয়েছিল, ভাত দিবি চল্‌।

    কোর্টে সেদিন ভীষণ ভীড়। আমিও দলবল নিয়ে উপস্থিত। রায় সম্বন্ধে আমরা একদম নিশ্চিত ছিলাম। হাতিয়াঙ্গাদি জজ; না ঝুলিয়ে ছাড়বে না, তাও একরকম জানা কথা। চার্জ বোঝানো শেষ হতেই জুরিরা যখন ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন, হাকিমের সঙ্গে আমরাও উঠে পড়লাম। এক পেয়ালা কড়া চা-এর প্রয়োজন বোধ করছিলাম। হরিশ পাইন ছাড়া সে জিনিস কেউ দিতে পারবে না। কোর্ট-কম্পাউণ্ড ছাড়িয়ে দু-পা গেলেই তার দোকান। গেট পেরোতে গিয়ে হঠাৎ নজরে পড়ল, বটগাছের নীচে কাদের মোল্লা গালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে আছে। আশ্চর্য! উল্টোটাই বরং আশা করেছিলাম। অন্য দিন দেখেছি, খুশী মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে দেখতে পেয়েই ছুটে এসে সেলাম করেছে, মামলার হালচাল সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়েছে, আজ চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল। ব্যাপার কী? বোনাই-এর জন্যে মন-কেমন করছে? অসম্ভব, কাদের মোল্লার মন অত কাঁচা—এ অপবাদ তার পরম শত্রুও দিতে পারবে না। তবে কি ওর সন্দেহ হচ্ছে তোফাজ্জল ছাড়া পেয়ে যাবে? তেমন কোনো সম্ভাবনা যে নেই, একটা ছোট ছেলেও তা বুঝতে পারছে, আর ওর মতো ঝানু-মামলাবাজ পারবে না? তাহলে ওর কিসের চিন্তা? ভাবলাম, চা খেয়ে ফিরবার পথে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু তখন আর ওকে দেখতে পেলাম না।

    পরিষ্কার কেস্। কোথাও কোনো প্যাচ-গোঁজ নেই। জজ অবিশ্যি জুরিদের বোঝালেন, যেমন বোঝাতে হয়, ‘ফ্যাক্ট সম্বন্ধে আপনারাই মাস্টার, আপনাদের মত আমি মেনে নিতে বাধ্য, যেমন আইন সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা আপনাদের মানতে হবে।’ কিন্তু সেই ফ্যাক্ট-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে আসল জায়গাগুলোয় এমন সব প্রচ্ছন্ন কিন্তু সুগম ইঙ্গিত দিলেন, ইংরেজীতে যাকে বলে থ্র সাম ক্লিয়ার হিস্‌, যাতে করে তাঁর মত সম্বন্ধেও জুরিদের কোনো সন্দেহ না থাকে। ফলে যা আশা করা গিয়েছিল তাই হল। একেবারে ইউন্যানিমাস ভারডিক্ট—গিলটি। ৩০২ ধারার মামলা; জুরিরা একমত; চরম শাস্তি না দেবার কোনো কারণ নেই। কোনো কোনো বয়স্ক জজ এরকম ক্ষেত্রেও, দুটো একটা, আইনের ভাষায় যাকে বলে এক্সটেনুয়েটিং ফ্যাক্টর খাড়া করে ফাঁসিটা এড়াবার চেষ্টা করেন। কিন্তু হাতিয়াঙ্গাদি সে দলে পড়েন না। ভদ্রলোক একে সিভিলিয়ান, তায় বয়স অল্প, সুতরাং বুঝতেই পারছেন।

    এই পর্যন্ত এসে ভূতনাথবাবুর বাক্যস্রোত হঠাৎ মন্থর হয়ে এল। যেন কোনো দূর- নিরীক্ষ্যমাণ বস্তুর দিকে দৃষ্টি রেখে ধীরে ধীরে বললেন, সেদিনকার সেই দৃশ্যটা আজও চোখের ওপর ভাসছে। খুনী মামলার বিচার তো একটা দুটো দেখি নি, ফাঁসির হুকুমও সেদিন প্রথম শুনলাম তা নয়। কিন্তু আগে বা পরে যা দেখেছি এবং শুনেছি, সেদিনের সঙ্গে তার তুলনাই হয় না। অত বড় সেশন্স কোর্ট লোকে লোকারণ্য। কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই। সব যেন একসঙ্গে বোবা হয়ে গেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, লাল শালু ঘেরা উঁচু প্ল্যাটফর্মের পেছনে যিনি বসে আছেন তাঁর মুখের দিকে। জজসাহেব শান্ত গম্ভীর গলায় তাঁর রায় পড়ে চলেছেন।

    ফাইণ্ডিং শেষ করে একটুখানি দম নিলেন, মাথা তুলে একবার তাকালেন আসামীর দিকে, তারপর এল সেনটেন্স। কয়েকটি মাত্র কথা, যার ফলে একজন সুস্থ সবল রোগ- ব্যাধিহীন মানুষকে অকালে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। ইণ্ডিয়ান পিনাল কোডের সেই চরম শব্দ কটি তখনও পুরোপুরি উচ্চারণ করেন নি জজ সাহেব, সবে মাত্র বলেছেন, আই দেয়ারফোর অর্ডার দ্যাট দি তোফাজ্জল হোসেন বি হ্যাংড্ বাই-

    হঠাৎ সারা আদালতের মাথায় যেন বাজ পড়ল। কোন্ একটা কোণ থেকে ছুটে এল একটি মাত্র শব্দ—’না’! হাকিম থমকে থেমে গেলেন। অতগুলো লোক—প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। ভিড়ের ভিতর একটা চাঞ্চল্য দেখা দিতে সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল একটি মাত্র লোকের মুখের উপর। লোকজন ঠেলে একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মামলার ফরিয়াদী কাদের মোল্লা। জজ কিছু বলবার আগেই সেলাম করে জানাল, গোস্তাকি মাপ করবেন, হুজুর। ও হুকুম ভুল, তোফাজ্জল বেকসুর। আমার মাকে খুন করেছি আমি।

    চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম সবাই যেন হতভম্ব হয়ে গেছে। মায় হাকিম পর্যন্ত। তোফাজ্জলের দিকে চোখ পড়তেই দেখি, দু’চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, কী যেন বলতে চায়, স্বর ফুটছে না। ধীরে ধীরে আবার সাড়া জাগল। একটা চাপা গুঞ্জন উঠল—যারা জানে না, জানতে চাইছে, কে লোকটা? কেউ বলছে, হঠাৎ মাথা খারাপ হয়ে গেছে। জজ সাহেব হাত তুললেন, অর্ডার, অর্ডার। তারপর হঠাৎ আমার দিকে ফিরে কাছে যাবার ইঙ্গিত করলেন। তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতেই বললেন, “ডিটেন্‌ দ্যাট্ ম্যান্।’ বলেই পাবলিক প্রসিকিউটরকে ডেকে নিয়ে খাস কামরায় গিয়ে ঢুকলেন। বাকী রায় আর পড়া হল না। ফাঁসির হুকুম মুলতুবী রইল। বলতে পারেন শেষ ধাপে এসে আটকে গেল।…একটু চা আনতে বলুন।

    চাকরকে ডেকে চা-এর অর্ডার দিলাম। আমি যথারীতি এক কাপের কথাই বলেছিলাম, উনি সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন প্রস্তাব যোগ করলেন—দু-কাপ এবং বেশ কড়া করে।

    চা আসবার আগেই ভৃত্যের হাতে এল একখানা ভিজিটিং কার্ড। দেড় ইঞ্চি লম্বা এক ইঞ্চি চওড়া সেই বৃহৎ আপদটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছিলাম, কোনো রকমে নিজেকে সংবরণ করে রুক্ষস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম, কে? কী চায়?

    ভূতনাথ হেসে বললেন, সে কথা ও বেচারী জানবে কেমন করে? আজ এই পর্যন্ত থাক। আরেকদিন এসে

    আপনি ক্ষেপেছেন! একটু বসুন, আমি কার্ডওয়ালাকে ভাগিয়ে দিয়ে আসি। আপনার চা শেষ হবার আগেই এসে পড়বো।

    ভূতনাথবাবু আর বেশীক্ষণ বসতে চান নি। তাঁর ‘নাটক’ও শেষ অঙ্কে এসে গিয়েছিল। বাকী দৃশ্যগুলোর যে বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন, তার একটা সংক্ষিপ্তসার পরিবেশন করে আমিও এগিয়ে যেতে চাই।

    কিছুক্ষণ পরেই জজসাহেব এজলাসে ফিরে এলেন। তোফাজ্জলের মামলার আবার তারিখ পড়ল। কাদের মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হল। ওয়ারেন্টের মাথায় লাল কালি দিয়ে বড় বড় হরফে লিখে দিলেন পেশকারবাবু, ‘কনফেসিং অ্যাকিউজ্‌ড্; টু ‘বী কেপ্ট সিগ্রিগেটেড।’ একরারী আসামীকে আলাদা করে রাখাই রীতি। সব জেলেই সে ব্যবস্থা আছে। এর বেলায় সে নিয়মে যেন কোনো রকম শৈথিল্য না ঘটে, সে বিষয়ে বিশেষ নির্দেশ দিলেন জজসাহেব। ভূতনাথবাবু জেলরের সঙ্গে দেখা করে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে হুঁসিয়ার করে দিয়ে এলেন। আসামীর স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবার ভার পড়ল একজন দক্ষ ও সিনিয়র ম্যাজিস্টেটের উপর। নির্জন খাসকামরায় ডেকে নিয়ে তিনি তাকে ভেবে দেখবার যথেষ্ট সময় দিলেন, বারংবার বোঝাবার চেষ্টা করলেন, পুলিস বা শত্রুপক্ষের ভয়ে, কোনো দিক থেকে কারও প্রভাব বা প্ররোচনায়, ঝোঁকের মাথায়, কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি এই স্বীকারোক্তির প্রবৃত্তি তার মনে জেগে থাকে, সে যেন এই বিপজ্জনক কাজ থেকে নিরস্ত হয়। একরার করবার কোনো দায় তার নেই। জজের আদালতে কি বলেছে না বলেছে, আইনত সেটা মূল্যহীন, এবং এখনও যদি সেকথা প্রত্যাহার করে, সেটা কোনো অপরাধ বলে গণ্য হবে না।

    কিন্তু কাদের মোল্লা নিরস্ত হয় নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনার হুবহু বর্ণনা দিয়ে মাতৃহত্যার গুরুতর অপরাধ অকপটে স্বীকার করেছিল। শত্রুর প্রতি যে দুর্জয় আক্রোশ তাকে এই কাজে প্ররোচিত করেছিল, তাও কিছুমাত্র গোপন করে নি।

    আবার মামলা শুরু হল। একই মামলার পুনর্বিচার কথাটা বোধহয় ঠিক হল না। সাধারণ কোনো আইন-ঘটিত কারণে বিচারকার্য যেখানে অসিদ্ধ বলে প্রতিপন্ন হয়, সেইখানে রিট্রায়াল বা পুনর্বিচারের প্রয়োজন ঘটে। সেই পুরনো আসামীকে আবার নতুন করে দাঁড়াতে হয় কাঠগড়ায়। একই অভিযোগের পুনরুক্তি। আরেকবার সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হয়—তুমি দোষী না নির্দোষ। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ তাই রইল, ঘটনাও এক, বদল হল শুধু আসামীর। নাটকের প্রথম কয়েক অঙ্কে যে ছিল ফরিয়াদী, শেষ অঙ্কে তাকেই দেখা গেল আসামীর ভূমিকায়। অভিযোক্তা স্বেচ্ছা-প্রণোদিত পদক্ষেপে অভিযুক্তের আসনে গিয়ে উঠল।

    এবারও সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠবে—কেন? আসামী তো নিজে এগিয়ে এসে তার কৃত অপরাধ স্বীকার করেছে, আদালতে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছে ‘আমি দোষ করেছি ধর্মাবতার, আই প্লিড্‌ গিলটি টু দি চার্জ’, তা সত্ত্বেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে বাধা কোথায়? আছে বাধা। আপাতদৃষ্টিতে না থাকলেও আইনের দৃষ্টিতে আছে। একমাত্র আসামীর উক্তির উপর নির্ভর করে তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না—এই হল ফৌজদারী দণ্ডবিধির সুস্পষ্ট নির্দেশ।

    আইনের প্রসঙ্গে অনেকদিন আগেকার অন্য একটা ঘটনা মনে পড়ছে। মামলার দিক থেকে এর সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। অতি সাধারণ কেস্। আসামীটি তার চেয়েও সাধারণ। একটা চৌদ্দ-পনরো বছরের ছেলে। কোথায় দেখেছিলাম? সম্ভবত কৃষ্ণনগর জেল-হাজতে। নাম ছিল পটল দাস।

    সপ্তাহান্তে একদিন আমার রাউণ্ড। লাইনবন্দী লোকগুলোর সামনে দিয়ে সদলবলে জোর কদমে ঘুরে যাওয়া। বিশেষ কারও উপর নজর পড়বার কথা নয়। হঠাৎ একবার কেমন করে যেন খেয়াল হল, এই ছেলেটাকে এই বিশেষ জায়গায় অনেকদিন থেকে পুরোপুরি অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। হাত থেকে ওর হিস্ট্রি টিকেটখানা নিয়ে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, তাই বটে, প্রায় ছ’মাস ধরে আছে এখানে। অথচ কেস্টা সামান্য। খুন, ডাকাতি, ঘরে আগুন দেওয়া বা ঐজাতীয় কিছু নয়, ৩৭৯ ধারা— চুরি। জিজ্ঞাসা করলাম, কী চুরি করেছিস?

    উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। আশে-পাশে যারা দাঁড়িয়ে, তাদের মুখেও চাপা হাসি। একজন বলে উঠল, পটল চুরি, হুজুর!

    হাসি আর চাপা রইল না। পটলের মাথাটা আর একটু নুয়ে পড়ল; লজ্জায় নিশ্চয়ই, তবে তার মূলে চুরিটা যতখানি তার চেয়ে বেশি বোধ হয় চোরাই মাল। চোরেরও জাতিভেদ আছে। কে কুলীন আর কে হরিজন, নির্ভর করে অপহৃত দ্রব্যের উপর। ‘লুটি তো ভাণ্ডার’ যারা, তারা সম্ভ্রমের পাত্র, ছিঁচকের প্রাপ্য শুধু উপহাস।

    ঘটনার বিবরণও পাওয়া গেল। দিদির বাড়ি থেকে ফিরছিল। জলঙ্গীর চরের উপর দিয়ে পথ। সারি সারি পটলের ক্ষেত। বেশ ভালো ফলন হয়েছে সেবার। পাতার ফাঁকে ফাঁকে নধর কচি ফলগুলোকে উঁকি মারতে দেখে লোভ হল। বাড়ি নিয়ে ভেজে খাবার চেয়ে তুলবার আনন্দটাই বেশী। এখান থেকে কয়েকটা ছিঁড়ে নিয়ে কোঁচড়ে ভরে ফেলল। সবসুদ্ধ সেরখানেক হবে। কয়েক পা যেতেই দেখল সামনে থেকে একজন লোক আসছে। কাছাকাছি গাঁয়ের কোনো মোড়ল চাষী বা কৃষাণ হবে হয়তো। বুকের ভিতরটা ঢিপ্ টিপ্ করতে লাগল। কোনো দিকে না চেয়ে যদি গট গট্ করে এগিয়ে যেত, লোকটা হয়তো লক্ষ্যই করত না। কিন্তু পটল দাসের মনটা তখন তার কাপড়ে বাঁধা পটলগুলোর মতোই একেবারে কাঁচা। এক পা যায়, আর ভয়ে ভয়ে তাকায় সেই লোকটার মুখের পানে। গাঁয়ের মানুষ এমনিতেই একটু সন্ধিৎসু। অচেনা লোক দেখলে খোঁজখবর না নিয়ে ছাড়ে না। তার উপরে ছেলেটার হাবভাব অনেকটা সন্দেহজনক।

    দূর থেকে হেঁকে বলল, ‘এই, বাড়ি কোথায় তোর?’

    জবাব দিতে গিয়ে পটলকে বারকয়েক ঢোক গিলতে হল। তারপরেই দ্বিতীয় প্রশ্ন—’কোঁচড়ে কী?’

    এবার আর জবাব নয়, তার বদলে সোজা দৌড়। কিন্তু গ্রহ বিরূপ। একখানা জমি পেরোবার আগেই পটলের লতায় পা বেধে সজোরে ভূমিসাৎ। পটলগুলোও কোঁচড় ছেড়ে মাটিতে লুটোপুটি।

    হাতেনাতে চোর ধরার মধ্যে একটা উত্তেজনা আছে, তা সে যেরকম চুরিই হোক না কেন। একজন সামান্য গ্রাম্য কৃষক হাতের কাছে এত বড় সুযোগ পেয়েও বীরত্ব প্রকাশে বিরত হবে, আশা করা যায় না। গাঁটের পয়সা খরচ করে চোরকে কোনো দূরবর্তী থানায় নিয়ে গিয়ে পুলিশের হেফাজতে পৌঁছে দেবার ব্যাপার যদি হত হয়তো ততটা উৎসাহ দেখা যেত না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেদিকেও সুবিধা ছিল। কী তদন্ত উপলক্ষে থানার জমাদারবাবু তখনও পাশের গ্রামে উপস্থিত। পটলকে মালসমেত তাঁরই হাতে সঁপে দেওয়া হল। তাঁর সঙ্গে সে প্রথমে গেল থানায়, তারপর কাছারি হয়ে জেলখানায়। তার বিরুদ্ধে যে মোকদ্দমা দায়ের হল, তার আলামত্ বা এক্‌জিবিট হিসাবে সেই পটল কটি সযত্নে তোলা রইল কোর্টের মালখানায়। আদালতে দাখিল করবার সুযোগ আর এল না। আই. ও. অর্থাৎ তদন্তকারী অফিসার তারিখে তারিখে একই রিপোর্ট দিতে লাগলেন— কম্‌প্লেনেট নট্ ট্রেসেল্‌। ফরিয়াদী নিখোঁজ। কার ক্ষেত থেকে পটল তুলেছিল পটল দাস,

    তার পাত্তা পাওয়া গেল না। নানাভাবে চেষ্টা করেও পুলিস সেই চোরাই মালের কোনো দাবীদার খাড়া করতে পারল না। মামলার যে একমাত্র সাক্ষী, সেই গ্রামের লোকটি, তার নামও ‘পত্তা’ জমাদার সাহেবের নোটবুকের এক কোণে পেন্সিলে লেখা ছিল। তিনি নিজেই তার পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। পটল দাসের হাজতবাস বেড়ে চলল। তারিখের পর তারিখ পড়তে লাগল।

    অনেককে দুঃখ করতে শুনি, মানুষের যেটা সব চেয়ে বড় গুণ পরোপকার-প্রবৃত্তি— সংসার থেকে তার ক্রমশ বিলোপ ঘটছে। তা যদি হয়, আমার মতে সেটা শুভলক্ষণ। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে, পৃথিবীর যত জটিল সমস্যা তার বেশীর ভাগের মূলে রয়েছে পরের ভালো করবার চেষ্টা। তুমি না চাইলে কি হয়, আমি তোমার উপকার না করে ছাড়বো না—একদল মহৎ মানুষের মনে যদি এই উগ্র মহত্ত্বের প্রাদুর্ভাব না ঘটত, সাধারণ মানুষ সুখে থাকতে পারত, অন্তত আজকের তুলনায় তাদের দুঃখের ভার অনেক লঘু হয়ে যেত। সুসভ্য শ্বেতকায়ের অন্তরে যেদিন সভ্যতা-বিস্তারের মঙ্গলেচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, ‘অসভ্য ও অর্ধসভ্য’ কৃষ্ণাঙ্গের জীবনে সেটা ছিল প্রথম দুর্দিন। বহু শতাব্দী ধরে বহু রক্ত দিয়ে সেই মহোপকারের ঋণ তাদের শোধ করতে হয়েছে এবং কারও কারও এখনও হচ্ছে।

    শুভাকাঙ্ক্ষী শক্তিমানের কল্যাণ-হস্ত কখন কী ভাবে কার মাথায় এসে পড়বে, এই ভয়ে দুর্বলেরা সর্বদা তটস্থ। তাদের মনোভাব হল—কাজ নেই আমার ভালোয়, এই বেশ আছি। বলা বাহুল্য, বৃহতেরা সে কথায় কর্ণপাত করেন না। ক্ষুদ্রের সরব ও নীরব বাধা অগ্রাহ্য করে তার মঙ্গলার্থে কাজ করে যান। দুনিয়ার সর্বত্র এই রীতি। প্রবল রাষ্ট্র যখন তার হীনবল প্রতিবেশীর ‘লিবারেশন’ বা উদ্ধারের জন্যে ‘মুক্তি ফৌজ’ পাঠিয়ে দেন, সেই অজস্র অর্থ ও লোকক্ষয়ের মূলেও এই পরহিতৈষণা।

    পটল দাস ভালোই ছিল জেলখানায়। বিনা পরিশ্রমে নিয়মিত তিন বেলা দক্ষিণহস্তের নিশ্চিত ব্যবস্থা। নতুন কোঠাবাড়ির দক্ষিণ-খোলা বারান্দায় লোভনীয় কম্বলশয্যা। কলের জলে আশ মিটিয়ে স্নান, বেলা পড়লেই হাডুডুডু, মাঝে মাঝে বাড়ির বা গাঁয়ের লোকের সঙ্গে দেখাশুনো। মন কেমন করলে এখানেও সঙ্গী-সাথীর অভাব নেই। এ আরাম চিরস্থায়ী নয়, জেল হলেও বড় জোর এক মাস। তার পরে আবার তো সেই জলপড়া খড়ো ঘর, পচা পুকুর, পান্তা ভাত আর দুপুর রোদে জনখাটার কঠিন জীবনে ফিরে যেতে হবে। তার আগে যে কটা দিন পারা যায়, এই স্বাদটুকু নিয়ে যাওয়া মন্দ কী? এই বোধহয় ছিল তার মনোভাব। গোড়াতে না থাকলেও অভিজ্ঞ বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে গড়ে উঠেছিল। সুতরাং মামলার আশু ফয়সালা নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না।

    মাথাব্যথা হল। সে না চাইলেও আমি তার ভালোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। একজন অল্পবয়সী আসামী অনির্দিষ্ট কালের জন্যে হাজতে বসে পচবে, জেলখানার পুরনো চাঁইদের সঙ্গে মিশে অধঃপতনের পথ ধরবে, এটা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। দায়িত্বশীল কারা-শাসক হিসাবে আমার প্রথম কর্তব্য যত শীঘ্র সম্ভব ওর বিচারের ব্যবস্থা করা। সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হল, সামান্য এক সের পটল চুরি, তার জন্য আবার সাক্ষীসাবুদের কী দরকার? দোষ কবুল করলেই তো সব হাঙ্গামা চুকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সাজা হয়ে যাবে। কতদিন আর, বড় জোর মাসখানেক। দেখতে দেখতে কেটে যাবে।

    পটল দাসকে ডেকে এনে সেই পরামর্শ দিলাম। বললাম, এবার যেদিন কোর্টে যাবি, ডকে উঠেই হাকিমকে বলবি, আমি দোষ স্বীকার করছি।

    সে বলল, হাকিমের কাছে নেয় না, হুজুর।

    ব্যাপারটা আমার অজানা ছিল না। নির্দিষ্ট তারিখে অর্থাৎ চৌদ্দদিন অন্তর বিচারাধীন আসামীকে বিচারকের সামনে হাজির করতে হবে, এটা তার আইন প্রদত্ত অধিকার। কিন্তু বেশির ভাগ মফঃস্বল কোর্টে যে আসামীর কেস ‘তৈরী’ হয়নি, যাকে বলে রেডি ফর্ হিয়ারিং, তার দৌড় কোর্ট-হাজত বা ‘লক-আপ’ পর্যন্ত। কাঠগড়ায় তার ডাক পড়ে না। কোর্টবাবুর মর্জি না হলে হাকিমের মুখ সে দেখতে পায় না। প্রথম জীবনে অর্থাৎ যতদিন রক্ত গরম ছিল, এই নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক গরম গরম নোট পাঠিয়েছি। সরকারী কাগজ ও বেসরকারী কালি-কলমের কিঞ্চিৎ অপব্যয় ছাড়া আর কোনো ফল হয় নি।

    এবার আর লেখালেখির পথ দিয়ে গেলাম না। পটলকে আশ্বাস দিলাম, আচ্ছা, আমি, কোর্টবাবুকে বলে দেবো। আসছে তারিখে তোকে হাকিমের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবে।

    পটল মাথা নাড়ল, অর্থাৎ মাথাটা একদিকে কাত করল। কিন্তু কতটা খুশী হয়ে, আর কতটা আমাকে খুশী করবার জন্যে, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়ে গেল। তার সদিচ্ছার উপর নির্ভর না করে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলাম।

    বন্দীদের চিঠিপত্র, আপীল ইত্যাদি লিখে দেবার জন্যে একজন কনভিক্ট রাইটার বা কয়েদী মুন্সী ছিলেন। জেলে আসবার আগে তিনি ওকালতি করতেন। মক্কেলের কিছু গচ্ছিত অর্থ নিজস্ব আমানতে পরিণত করার দরুন বছর দুয়েকের জন্য সরকারী আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তাকে দিয়ে পটলের জবানিতে একখানি চোস্ত দরখাস্ত লিখিয়ে নিয়ে বিচারকারী ম্যাজিস্ট্রেটের বরাবর পাঠিয়ে দেওয়া হল। প্রার্থনা রইল’অধীনের এই অকপট স্বীকারোক্তি গ্রহণপূর্বক তাহার অপরাধের আশু বিচারের ব্যবস্থা হউক

    পর পর দুটো তারিখ অর্থাৎ আটাশ দিল চলে গেল, কোনো ব্যবস্থা হল না। প্রতি সোমবার রাউণ্ডে গিয়ে দেখতে পাই, পটল দাস সেই বিশেষ জায়গাটিতে বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ‘প্রসন্ন মুখ, নাহি কোনো দুখ’। আমাকে দেখলেই মুচকি হেসে মাথা নিচু করে। জিজ্ঞাসা করি, দরখাস্তের কোনো জবাব এসেছে কিনা, হাকিমের এজলাসে ডাক পড়েছে কিনা। দু’দিকে মাথা নাড়ে, অর্থাৎ ‘না’।

    জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে একটা ডি. ও. অর্থাৎ আধা সরকারী চিঠি লিখব কিনা ভাবছি, এমন সময় ‘জেল-ভিজিট’-এর পালা সারতে তিনি নিজেই একদিন এসে উপস্থিত। পটল দাসের কেস্টা কি অবস্থায় আছে জেনে নিয়ে আমাকে জানাবেন বলে গেলেন। পরদিনই তাঁর টেলিফোন পেলাম। সেইদিন থেকে সাবধান হয়ে গেছি। পরোপকার-আকাঙ্ক্ষা যখনই মাথা তুলে ওঠে, পটল দাসের নজির দেখিয়ে নিজেকে সঙ্গে সঙ্গে নিরস্ত করি।

    কোন মিথ্যাবাদী প্রচার করেছে—ল’ ইজ নাথিং বাট কমন সেন্স! আসল কথা—ল’ ইজ কন্ট্রারি টু কমনসেন্স। মানুষের সুস্থ সহজ সাধারণ বুদ্ধির বিরোধী বা বিপরীত যদি কিছু থাকে, তার’ নাম আইন। জোনাথান সুইফ্‌ট ঠিকই বলেছিলেন—সাত পুরুষ ধরে যে সম্পত্তি তুমি ভোগদখল করে আসছ, আইনের এক খোঁচায় হঠাৎ একদিন সাব্যস্ত হতে পারে, তুমি সেখানে অনধিকারী বা ইউজাপরি। তার চেয়েও তাজ্জব বাত ভেসে এল টেলিফোনের তার বেয়ে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব জানালেন, যথেষ্ট সময় নিয়েও পুলিস যখন পটল দাসের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারল না, প্রমাণাভাবে হাকিম তাকে বেকসুর খালাস দিতে যাচ্ছিলেন ঠিক এমন সময় তার দরখাস্ত গিয়ে হাজির। দোষ কবুল করবার পর আর তাকে ছাড়া যায় না। কিন্তু শাস্তি তো দিতে পারেন। না, তাও পারেন না। আইন বলছে, কেবলমাত্র স্বীকারোক্তির বলে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তার সমর্থনে অন্য সাক্ষ্য বা প্রমাণ চাই। কনফেশান অব্ দি অ্যাকিউজ্‌জ্ড মাস্ট বি করোবোরেটেড বাই আদার এভিডেন্স। যতদিন সেই আদার এভিডেন্স বা অন্য সাক্ষ্য সংগ্রহ করা না যাবে, অর্থাৎ কেউ এসে সেই মালখানায় গচ্ছিত পচা পটলগুলো দেখিয়ে না বলবে, হ্যাঁ, এই আসামীকে এই পটল আমি ক্ষেত থেকে তুলতে দেখেছি, ততদিন পটল দাস পচতে থাকবে জেলখানায়।

    ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেন, কেন মরতে দোষ কবুল করতে গেল ছেলেটা? এমনিতেই খালাস হয়ে যাচ্ছিল, খালি খালি আটকে গেল।

    কেমন করে বলি, সে যায়নি, আমি তার ভালো করতে গিয়েছিলাম।

    তারপর কী হল, অর্থাৎ কোন্ উপায়ে সেই এক সের পটল চুরির জটিল মামলার ফয়সালা হল, সে কথা এখানে অবান্তর। অন্তত একটা সাক্ষী যেমন করে এবং যেখান থেকে হোক পুলিসকে জুটিয়ে আনতে হয়েছিল’ নিশ্চয়ই।

    কাদেরের বেলাতেও সরকার পক্ষের অর্থাৎ পুলিসের উপর সেই দায়িত্ব এসে পড়ল। এবারে ভূতনাথবাবু স্বয়ং তার ভার নিলেন।

    কাজটা সহজ নয়। খুন করতে কেউ দেখেনি। অর্থাৎ চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না। কাদেরের বড় বউ সেই এক কথাই ধরে রইল। সে কিছু জানে না, রসুইঘরে ছেলেকে ভাত খাওয়াচ্ছিল, স্বামীর চিৎকার শুনে ছুটে এসেছে। আগের বারে এর উপর আরেকটা কথা যোগ করেছিল—ঘর থেকে কাউকে পালাতে দেখেনি, তবে পুলের উপর দিয়ে একজন কাউকে বেশ জোরে জোরে পা চালিয়ে চলে যেতে দেখেছিল; অন্ধকারে ঠিক ঠাওর করতে পারেনি, কে; কিন্তু চলবার ধরনটা তোফাজ্জলের মতো।

    এবারকার সাক্ষ্যে এ শেষের অংশটা উল্লেখ করল না। পুলিসও তার জন্যে পীড়াপীড়ি করল না। ভূতনাথবাবু জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্য একটা মূল্যবান সূত্রের সন্ধান পেলেন। ও পাড়ার এক বুড়ি মাঝে মাঝে কাদেরের মাকে দেখতে আসে। বেশ ভাব ছিল দুজনের মধ্যে। সেদিনও সন্ধ্যার আগে বেশ কিছুক্ষণ রোগীর কাছে কাটিয়ে গিয়েছিল। কী কথা হয়েছিল বড় বৌ জানে না, সেদিকে খেয়ালও করেনি। শুধু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিল। অন্যান্য বারে বুড়ি যখন আসে তার শাশুড়ীর কাছে, মাঝখানে কোনো কারণে বৌয়েরা এসে পড়লে দুই বুড়ির কথাবার্তায় কোনো ছেদ পড়ে না। সেদিন কী একটা কাজে বড় বৌ হঠাৎ ঘরে ঢুকতেই দুজনে কেমন চকিত হয়ে উঠল। কথা হচ্ছিল চাপা গলায়, অনেকটা ফিসফিস করে। তাও বন্ধ হয়ে গেল।

    ‘কথাটা নিশ্চয়ই তোমাকে নিয়ে। পাড়ার লোকের কাছে বৌয়ের নিন্দে করছিলেন তোমার শাশুড়ী। তোমার কানে যায় সেটা চাননি’।—হালকা সুরে এমনিধারা একটা মন্তব্য করেছিলেন ভূতনাথবাবু। পিছনে কোনো পুলিসী মতলব থেকে থাকবে। সাক্ষীকে চটিয়ে দিয়ে যদি কিছু তথ্যোদ্ধার ঘটে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বৌটি দৃঢ়স্বরে বলেছিল, তার শাশুড়ী সে রকম লোক ছিলেন না। তাকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতেন। সেও পারতপক্ষে তাঁর কোনো অযত্ন করেনি। বলতে বলতে তার চোখ দুটি জলে ভরে উঠেছিল।

    ভূতনাথ প্রশ্ন করেছিলেন, তাহলে কী এমন কথা হচ্ছিল ওদের মধ্যে, তোমার সামনে যা বলা যায় না!

    —তা কেমন করে জানবো?

    অতঃপর ‘সেই বুড়ির শরণ নিলেন ভূতনাথ। প্রথমটা সে কিছুই বলতে চায়নি। ঐদিন যে কাদেরের মাকে দেখতে গিয়েছিল, তাও অস্বীকার করে বসল। পুলিস পক্ষ উৎসাহিত হয়ে উঠল। এই সত্য গোপনের পথ ধরে বুড়ির উপর চাপ দেবার সুবিধা হল। ফলও পাওয়া গেল আশাতীত।

    ছেলের সেই ভয়ংকর প্রস্তাব কাদেরের মাকে প্রচণ্ড ভাবে বিচলিত করেছিল, সহজেই বোঝা যায়। সপত্নী-পুত্রটিকে চিনতে বৃদ্ধার বাকী ছিল না। বিদ্বেষের জ্বালা মেটাতে গিয়ে যে কোনো অমানুষিক নৃশংসতার চরম পথ সে বেছে নিতে পারে, দয়া মমতা ভয় সঙ্কোচ বা বিবেক সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, এর প্রমাণ সে আগেও দিয়েছে। প্রাণ নামক বস্তুটির উপর তার দরদ অতি সামান্য, শুধু পরের নয় নিজেরও, শিশুকাল থেকে তার অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। প্রাণ নিতে সে অনভ্যস্ত নয়, দিতেও অপ্রস্তুত ছিল না। এই কার্যটি সম্পন্ন করতে গিয়ে দু-একবার যে চরম বিপদের ঝুঁকি তাকে নিতে হয়েছে, তার তুলনায় বৃদ্ধা রোগজীর্ণা বিমাতার ঘাড়ে একটা রামদার কোপ বসিয়ে দেওয়া কিছুই নয়। এই রকম একটা অকেজো অনাবশ্যক জীবন (যার মেয়াদ আপনা থেকেই শেষ হয়ে এসেছে) বলি দিয়ে যদি শত্রু নিপাতের মতো মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করা যায়, সে প্রলোভন ত্যাগ করবার মতো মহত্ত্ব বা দুর্বলতা কাদের মোল্লার কাছে আশা করা যায় না।

    ভূতনাথবাবু বলেছিলেন, বেচারীর অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন। মরণ একেবারে শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে, অথচ করবার কিছু নেই। উঠবার চলবার শক্তি নেই যে পালিয়ে বাঁচবে, চেঁচিয়ে লোক জড়ো করতে হলে যতটুকু গলার জোর দরকার তাও তার ছিল না। শেষের দিকে লোকজনও বড় একটা আসত না তার কাছে। ঐ বুড়ি হঠাৎ এসে পড়েছিল। সে আবার ওর চেয়েও অসহায়। কেউ কোথাও নেই। লোকের দোরে চেয়েচিন্তে কোনোরকমে পেট চলে। তবু ডুবার আগে মানুষ যেমন একগাছা খড়কুটো পেলে তাই আঁকড়ে ধরে, কাদেরের মাও তেমনি ঐ বুড়িটাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল, ওর হাতদুটো চেপে ধরে বলেছিল, আমাকে বাঁচাও।

    তৃণখণ্ডের সাধ্য কি ডুবন্ত মানুষকে টেনে রাখে? নিজেকেই যে তাহলে ডুবতে হয়। তাই গা বাঁচিয়ে নিঃশব্দে সরে পড়া ছাড়া তার আর কি উপায় আছে? বুড়িও সরে পড়েছিল, কিন্তু একেবারে নিঃশব্দ থাকতে পারেনি। মুখ খুলেছিল এমন একজনের কাছে যে তারই মতো নিরুপায় কিংবা তার চেয়েও অক্ষম। কাজীপাড়ার খোঁড়া আবদুল। চলতে পারে না। উরুতের উপর নাটাই ঘুরিয়ে সারাদিন পাটের সুতুলি পাকায় আর নিজের মনে গুন গুন করে গান গায়। এই তার কাজ। বুড়ির বিচারে সে-ই বোধহয় ছিল সবচেয়ে নিরাপদ শ্রোতা। তাই ঘরে না ফিরে সোজা চলে গিয়েছিল খোঁড়া আবদুলের কাছে। সে কিন্তু ব্যাপারটাকে তেমন আমল দেয়নি। হয়তো খোদার সৃষ্টি মানুষের উপর তখনও তার কিছুটা বিশ্বাস ছিল। বলেছিল, দূর, তাই কখনও হয়? বুড়িকে মিছিমিছি ভয় দেখিয়েছে কাদের। গোঁয়ার হলেও মানুষটার দিল সাদা।

    সাক্ষী বলতে এই দুজন। যেটুকু জানে, শুধু সেইটুকুই বলেছিল। জেরার পাল্লায় পড়ে রাতকে দিন এবং দিনকে রাত করতে হয়নি। জেরা পর্বটাই ছিল অনুপস্থিত। আসামী কোনো উকিল দেয়নি। খুন-মামলার আসামী যদি অক্ষম হয়, সরকারী খরচে তার পক্ষে উকিল নিযুক্ত করবার ব্যবস্থা আছে। কাদেরের কাছেও যথারীতি সে প্রস্তাব এসেছিল। সে আমল দেয়নি। একজন জুনিয়র উকিল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন। বলেছিলেন, তোমাকে কোনো ফী দিতে হবে না। আমি এমনিই—

    ‘কী বললেন!’ গর্জন শুনে থতমত খেয়ে থমকে গিয়েছিলেন উকিলবাবু, ‘দরকার হলে আপনার মতো এক ডজন উকিল কাদের মোল্লা ফী দিয়েই রাখতে পারে। কিন্তু দরকার নেই। আপনি এবার আসুন। আদাব।

    দেখাটা হয়েছিল জেলখানায়। কাদেরের সেল-এর সামনে। সঙ্গে যে জেল-অফিসারটি ছিলেন, মাথা নেড়ে বলেছিলেন, এর নাম অনুতাপের জ্বালা।

    ‘অনুতাপ!’ এবারে হো হো করে হেসে উঠেছিল খুনের আসামী।

    পরের তারিখেই কাদের মোল্লার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেল। সেই সঙ্গে তোফাজ্জলের মুক্তির আদেশ। খালাস পেয়েই সে শ্যালকের সঙ্গে দেখা করতে ছুটেছিল। পুলিসের আর কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু কাদের রাজী হয়নি। জেলখানার সেই জালে ঘেরা কালো গাড়িটার দরজার সামনে ভূতনাথবাবুর দিকে নজর পড়তে বলেছিল, লোকগুলো কি বলছে জানেন বড়বাবু? আমি নাকি আপসোসের জ্বালায় থাকতে না পেরে খুন কবুল করেছি। হাঃ হাঃ হাঃ!

    হঠাৎ হাসি থামিয়ে অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর দু-চোখের তারায় আগুন ছড়িয়ে কেমন ভাঙা ভাঙা গলায় বলেছিল, ফাঁসি হলে তো বেঁচে যেত হারামজাদা। এক নিমেষে সব খতম। এবার সারা জীবন জ্বলে-পুড়ে মরুক।

    বলতে বলতে সহসা তার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ থেকে উপচে পড়েছিল খুশির জোয়ার— ‘একছিটে জমি নেই কোনোখানে। বসতবাড়িটা পর্যন্ত হালদারবাবুদের সেরেস্তায় বাঁধা একটা ছেলে, তাকে তো আগেই নিয়ে নিয়েছে খোদাতাল্লা। আমার বোনটা কেন কষ্ট পাবে খালি ভিটেয় পড়ে? রহিম তালুকদারের সঙ্গে নিকে দিয়ে দিলাম। বাড়ি গিয়ে দেখুক না একবার। সব খাঁ খাঁ করছে। মিঞা সাহেবকে এবার পরের জমির ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে পেট চালাতে হবে। হাঃ হাঃ হাঃ!”

    জেলের গাড়ি চলে গেল। তারপরেও অনেকক্ষণ সেই হাসিটা যেন এক বীভৎস উল্লাসের জ্বালা ছড়িয়ে চারদিকে গগম্ করতে লাগল।

    হাসি বলছি বটে, বললেন ভূতনাথবাবু, কিন্তু সে যে কী, আমি বলতে পারবো না। মানুষ অমন করে হাসে না।

    ভূতনাথবাবুর ট্রেন ধরবার তাড়া ছিল। কিন্তু ওঠবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। দীর্ঘ কাহিনী যখন শেষ হল, তারপরেও কেমন আচ্ছন্নের মতো নিঃশব্দে বসে রইলেন। তাঁর স্পেশাল সিগারেটের আধখানা টেবিলের উপর পড়ে ছিল। আমি দেশলাইটা এগিয়ে দিলাম। সেদিকেও নজর পড়ল না। মিনিট কয়েক পরে বললাম, একটু চা আনতে বলি? সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, প্রতিহিংসার তাড়নায় মানুষ কত কী করতে পারে! অনেক আশ্চর্য দৃষ্টান্ত আমি নিজের চোখে দেখেছি, আপনিও দেখে থাকবেন। কিন্তু শত্রুর ওপর এত বড় প্রতিশোধ এমন করে বোধহয় কেউ কোনদিন নেয়নি।

    তিনি চলে যাবার পর আমি সেইখানেই বসে রইলাম। হঠাৎ খেয়াল হল, ফতিমার কথা তো কিছু বলে গেলেন না। সে সত্যিই জলে ঝাঁপ দিয়েছিল, না—। উনি নিশ্চয়ই জানতে পেরেছিলেন। বলতে ভুলে গেছেন। আবার যখন আসবেন, জেনে নেবো। তারপর মনে হল, থাক। ভূতনাথ দারোগার কঠিন পুলিসী-হৃদয়ের কোণে কোনো একটা তুচ্ছ দ্বিচারিণী গ্রামের মেয়ে যদি একটু স্নিগ্ধ ছায়া ফেলে থাকে, তাকে রূঢ় আলোয় টেনে এনে কী লাভ? অনেক কিছু তো জানা গেল। ঐ জায়গায় থাক না একটুখানি গোপনত অন্তরাল।

  • তিন

    তিন

    দূরত্বের একটা নিজস্ব মহিমা আছে। কাছে থাকতে যার দিকে একবারও ফিরে তাকাইনি, দূরে গেলে তাকেই মনে হবে অপরূপ। সামনে বসে যে আমার মনকে কোনোদিন নাড়া দিল না, একদিন দেখলাম, নাগালের বাইরে গিয়ে সে কখন মন জুড়ে বসে আছে।

    কথাটা নতুন নয়, ভূতনাথবাবুকে দেখে নতুন করে অনুভব করলাম। জীবনের সাড়ে তিন ভাগ যাদের মধ্যে কাটিয়ে এলেন, আজ সেখান থেকে চিরদিনের মতো বিদায় নেবার পর যখন পিছন ফিরে তাকাবার অবসর হল, তাদের দেহে নতুন রং লেগেছে। আসলে তারা যা ছিল তাই আছে, বদলে গেছে ওঁর চোখের রং।

    তাঁর সঙ্গে যেদিন হঠাৎ দেখা, তারপর কয়েক মাস কেটে গেছে। ফতিমা-তোফাজ্জল আমার মনে ঝাপসা হয়ে এসেছে। এমন সময় একদিন তাঁর আকস্মিক আবির্ভাব।

    ভূতনাথবাবুকে ঠিক মেজাজে পেতে হলে একা পাওয়া দরকার। আগের দিন তাই পেয়েছিলাম। এদিন আর হল না। আমার কাছে অন্য এক ব্যক্তি বসেছিলেন। আমাদের দুজনেরই চেনা। দুর্ধর্ষ বাঘ-শিকারী কালু চৌধুরী। বাদা-অঞ্চলের লোক। একদিন বহু রয়াল বেঙ্গলের প্রাণ নিয়েছেন। তারাও চেষ্টার ত্রুটি করেনি। নেহাত বরাতজোরে বেঁচে গেছেন। অক্ষত দেহে নয়; হাতে, পায়ে, পিঠের ডান দিকে প্রখর নখর ও তীক্ষ্ণ দংশনের গৌরবচিহ্ন অক্ষয় হয়ে আছে। বৈঠকখানার সংলগ্ন দক্ষিণের বারান্দায় বসে সেই সব ইতিহাস শুনছিলাম।

    আষাঢ় অপরাহ্ণের আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার বর্ষণ শুরু হয়েছে। সবুজ ছাওয়া প্রশস্ত ‘লন’ এবং তার তিন দিক ঘিরে কৃষ্ণচূড়া, বকুল ও আমগাছের নীচে অকাল সন্ধ্যার আবছায়া অন্ধকার। একটানা জল পড়ার শব্দ। সিক্ত বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধ। সব মিলে শিকার-কাহিনীর যে একটা নিজস্ব নেশা আছে, তাকে আরও গাঢ় করে তুলেছিল।

    শুধু শিকারে নয়, তার বর্ণাঢ্য বর্ণনায় কালু চৌধুরীর জুড়ি মেলা ভার। তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ভারী জুতোর শব্দ এবং তার সঙ্গে এক ঝলক কড়া সিগারের গন্ধে সচকিত হয়ে উঠলাম।

    কালু চৌধুরী এক সময়ে ছোটখাটো জমিদার ছিলেন। ব্যসন হিসাবে শিকারে যেমন বেরোতেন, তেমনি মাঝে মাঝে দু-চারটা দাঙ্গা-ডাকাতি, নারীহরণ ইত্যাদি অভিযানের অভ্যাসও ছিল। সেই দিক দিয়ে তিনি ভূতনাথ দারোগার পুরনো মক্কেল। আজ যদিও দুজনের ভিতরকার সে সম্পর্ক বদলে গেছে, একজন করছেন পেনসন ভোগ, আরেক জনের জীবনে এসেছে উদ্বাস্তু জীবনের অসংখ্য দুর্ভোগ, তবু ওঁকে দেখে চৌধুরীর মধ্যে একটুখানি আড়ষ্টতা দেখা দিল। ভূতনাথবাবু সেটা কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন, নিজেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে সহজ ও দরাজ গলায় বললেন, কিসের গল্প হচ্ছে? শিকারের? তা থামলেন কেন? চলুক না।

    আমিও তাঁর প্রতিধ্বনি করে সময়োপযোগী উৎসাহ দিলাম। চৌধুরী একটু নড়েচড়ে বসে পূর্ব সূত্রে ফিরে গেলেন—’একটা জিনিস বরাবর দেখেছি। বাঘ আর বাঘিনী যখন জোড়ে থাকে, একটাকে কোনো রকমে শেষ করতে পারলে বাকীটার জন্যে আমাদের আর বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয় না।’

    বললাম, কী রকম? বাকীটার তো আরও সাবধান হবার কথা।

    —ঠিক উল্টো। সে তখন প্রতিশোধ নেবার জন্যে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিজের প্রাণের দিকে তাকায় না, কাণ্ডজ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। হিংস্র প্রাণী মাত্রেই রিভেঞ্জফুল, ভয়ানক প্রতিহিংসা-পরায়ণ। তাঁর মধ্যে সবচেয়ে বেশী বাঘ।

    —না।

    প্রতিবাদের সুরটা এমন জোরালো যে আমরা দুজনেই একসঙ্গে বক্তার মুখের দিকে তাকালাম। ভূতনাথবাবু তেমনি দৃঢ়কণ্ঠে যোগ করলেন, তাকেও ছাড়িয়ে যায় মানুষ। যাক, আপনি বলুন!

    চৌধুরী আবার শুরু করলেন—জোড়ার একটাকে মারবার পর শিকারীকেই বরং সব সময় হুঁশিয়ার হয়ে চলতে হয়। আর একটা যদি তখন ধারে-কাছে কোথাও লুকিয়ে থেকে থাকে (প্রায়ই তাই থাকে), যে মেরেছে তাকে চিনে রেখে দেয়। বাগে পেলে আর রক্ষা নেই। তাকে যদি হাতের কাছে না পায়, আক্রোশ গিয়ে পড়ে, যারা তার আপনজন, তাদের ওপর। বৌ, ছেলে, মেয়ে, কিংবা সঙ্গী-সাথী…

    ব্যাপারটা আমার কাছে আশ্চর্য মনে হল। বললাম, আমার ধারণা ছিল, বাঘের কাছে সব মানুষই সমান শত্রু। তার মধ্যে আবার বাছ-বিচার করে নাকি?

    —করে বৈকি। অবিশ্যি অন্য লোককে যে একেবারেই ছোঁয় না তা নয়। বিশেষ করে যেগুলো ম্যান-ইটার, মানুষের রক্তের স্বাদ যারা আগেই পেয়েছে। তবে প্রায়ই দেখা যায়, ক্ষতি যে করেছে তার ওপরেই শোধ নেবার চেষ্টা করে। তার জন্যে এমন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে বসে, অন্য সময়ে, মানে স্বাভাবিক অবস্থায়, যা কখনও নিত না। এই সেবারে যেমন হল-

    সুন্দরবনে ওঁর নিজেরই একটা শিকার-কাহিনী শোনালেন চৌধুরী। মানুষ-খেকো বাঘ নয়, অন্তত গোড়াতে ছিল না, কিন্তু ভীষণ দুর্দান্ত। মাসখানেকের মধ্যে গোটা সাতেক গরুমোষ চলে গেল তার পেটে। এতটা সাহস বেড়ে গেল যে দিনে-দুপুরে যেখানে সেখানে হানা দেয়। সাত-আট মাইল জুড়ে একটা মস্ত বড় অঞ্চল—সবাই তার ভয়ে তটস্থ। চাষ- বাস, হাট-বাজার বন্ধ হবার যোগাড়। খবর পেয়ে কালু চৌধুরী দুজন পুরনো সাকরেদ নিয়ে রওনা হলেন। এক গ্রামে শুনলেন, তার আগে আরও তিন-চারজন শিকারী পনেরো-ষোল দিন ধরে এখানে-ওখানে চেষ্টা করে গেছে। গাছের ডালে মাচা বেঁধে রাতের পর রাত কাটিয়েছে। বাঘের টিকিও দেখা যায়নি। অথচ ভোর হতে না হতেই খবর এসেছে, মাচা থেকে কয়েক পা দূরে উঠোন থেকে দুধেলা গাই নিয়ে পালিয়ে গেছে বাঘ। তার বিশেষত্ব হল, ‘কিল’-এর ধারে-কাছেও ঘেঁষে না। সেদিক দিয়ে অত্যন্ত নির্লোভ।

    কালু চৌধুরী কয়েকটা গ্রাম ঘুরে, বেছে বেছে ক’টা ‘নাদুসনুদুস মোষের বাচ্চা সংগ্রহ করলেন। ওদিকে তখন ভয়ানক জলাভাব। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দু-একটা ডোবা খুঁজে বের করা হল। তার চারিদিকে ব্যাঘ্র মহারাজের বহু পদচিহ্ন। অর্থাৎ খাদ্য যেখান থেকেই জুটুক, পানীয়ের জন্যে ওখানে তাকে ঘন ঘন আসতে হয়। একটি সুবিধাজনক জায়গায় মোষশাবকটিকে বেঁধে, যতটা দূরে সম্ভব, অর্থাৎ রাইফেলের পাল্লার প্রায় শেষ সীমায় ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাচা বাঁধলেন। বাইরে থেকে যেন কোনো রকমে বোঝা না যায়। কাঁটা ডালপালার শেষ টুকরোটা পর্যন্ত কুড়িয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দেওয়া হল। পর পর দু-রাত গেল। বাঘ এল না।

    আস্তানায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে পরের রাতটাও দেখবেন স্থির করে সবে দিবানিদ্রা সেরে উঠেছেন, এমন সময় এল এক মর্মান্তিক সংবাদ। গরু মোষ ছাগল নয়, বাঘের শেষ এবং সদ্যলব্ধ শিকার ঐ গ্রামেরই একটি বাইশ-তেইশ বছরের দুঃসাহসী জোয়ান ছেলে। জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়েছিল। একা নয়, যথারীতি দল বেঁধে। সঙ্গীরা ছিল অপেক্ষাকৃত ফাঁকার দিকে, ও একটু গভীর বনে ঢুকে পড়েছিল। বিশেষ কারও নজরে পড়ে নি। হঠাৎ তাদের কানে এল, প্রথমে সেই ছেলেটির চিৎকার এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঘের গর্জন। সবাই মিলে হৈ-হল্লা করে ছুটে গিয়ে দেখল একটা অর্ধেক কাটা গাছের গুঁড়ির খানিকটা দূরে ছেলেটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। প্রথমে ডাকাডাকি, তারপর নাড়া দিয়ে দেখা গেল, সব শেষ।

    কালু চৌধুরী যখন গিয়ে পৌঁছলেন, তখনও ছেলেটার ঘাড়ের পাশ থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। পিছন দিকের একতাল মাংসই শুধু লড়ে যাই নি, হাড়গুলো গুঁড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ আঘাত আর মৃত্যুর মধ্যে ব্যবধান বোধহয় কয়েক সেকেণ্ড।

    শিকারীর অভিজ্ঞ দৃষ্টি দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে লাশ এবং তার আশপাশটা পরীক্ষা করলেন চৌধুরী। ঊরুর পিছনে আর একটা জখম চোখে পড়ল। সেটা দাঁতের। বাঘ যে অমিতশক্তিশালী সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তার উপরে নররক্তের কিঞ্চিৎ আস্বাদন তার রসনায় পৌঁছে গেছে, তবু দেহটাকে ফেলে গেল কেন? চারিদিকটা আরও ভাল করে দেখা দরকার। এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ লোকগুলোর পিছন থেকে একটা আর্ত তীক্ষ্ণ নারীকণ্ঠ তাঁকে বাধা দিল। সবাইকে ঠেলে ফেলে ঝড়ের মতো ছুটে এসে মৃতদেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যে মেয়েটি, তার বয়স বোধহয় ষোল পেরোয় নি। কালো রং, নিটোল স্বাস্থ্য, বড় বড় দুটি চোখ। কয়েক মাস আগে ওদের বিয়ে হয়েছে। জল আনতে গিয়েছিল বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ফিরবার পথেই খবর পেয়েছে। কাঁখের কলসী ফেলে দিয়ে মাঠ ঘাট জঙ্গল পেরিয়ে ছুটতে ছুটতে এসেছে। সঙ্গীরা ধরে রাখতে চেষ্টা করেছিল, পারে নি। স্বামীর পিঠের উপর লুটিয়ে পড়ে তাদের স্বল্পস্থায়ী বিবাহ-জীবনের স্মৃতিভরা কত তুচ্ছ কথা বলে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছিল। মাথার আঁচল খুলে পড়েছে, একরাশ এলো চুল ছড়িয়ে গেছে পিঠময়। মুখে কপালে চোখের কোণে অশ্রুধারার সঙ্গে মিশে গেল রক্ত। এ কান্নার যেন শেষ নেই। এ শোকের কোনো তুলনা নেই। একটা গোটা গ্রামের এতগুলো নরনারী তাদের সব কলরব সমস্ত উত্তেজনা ভুলে গিয়ে স্তব্ধ পাথর হয়ে গেছে।

    কালু চৌধুরীও কিছুক্ষণ আচ্ছন্নের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর এগিয়ে এলেন জঙ্গলের দিকে। শুকনো পাতার উপর খানিকটা রক্ত। এক জায়গায় নয়, মাঝে মাঝে ফাঁক রেখে রক্তের একটা লাইন চলে গেছে। অর্থাৎ আততায়ী অক্ষত দেহে যেতে পারে নি। তখন খোঁজ পড়ল ছেলেটার হাতে যে টাঙ্গী ছিল সেটা কোথায়? টাঙ্গী নেই। ভিড়ের মধ্যে একটা কলরব উঠল। এই গভীর শোকাবহ দৃশ্য এতগুলো লোককে মুহ্যমান করে রেখেছিল। শুকনো মুখগুলো হঠাৎ প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। সকলের কণ্ঠের একটা স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস।

    সাবাস জোয়ান! প্রাণ দিয়েছে বটে, কিন্তু প্রাণ নিতে যে এসেছিল, তাকেও ঘায়েল না করে ছাড়ে নি। কী কব্জির জোর! টাঙ্গীটা এমন মোক্ষম জায়গায় বসিয়েছে, অতবড় বাঘের সাধ্য হয় নি খসিয়ে ফেলে। বাছাধনকে সেটা ঘাড়ে করেই পালাতে হয়েছে।

    এরা সুন্দরবনের লোক। বাঘ, সাপ, কুমীর আর বুনো শুয়োর এদের নিত্যসঙ্গী। তার উপর মাঝে মাঝে আসে বন্যা, মহামারী। উঠতে বসতে মৃত্যুর সঙ্গে মুখোমুখি। যমের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়। সেই লড়াইয়ের উত্তেজনা প্রিয়জন বিয়োগের বেদনাকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকতে দেয় না। এই লোকগুলোও যখন দেখল এই মৃত্যুটা যত বড় করুণই হোক, কাপুরুষের মৃত্যু নয়, মুহূর্ত-মধ্যে নিজেদের টেনে তুলে চাঙ্গা হয়ে উঠল।

    কয়েকজন যুবক এগিয়ে এসে শিকারীকে ঘিরে ধরল। টাঙ্গী নিয়ে বাঘ খুব বেশী দূর যেতে পারে নি, জখমের ফলে অনেকখানি কাবু হয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই, সবাই মিলে ধাওয়া করলে এখনই ধরে ফেলা যায়। এ সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না। চৌধুরী তাদের নিরস্ত করলেন। বহুদর্শী শিকারী। আহত বাঘ যে কী বস্তু, তাঁর জানা আছে। ধরা হয়তো যাবে, শেষ পর্যন্ত মারাও সম্ভব হতে পারে, কিন্তু প্রাণ দেবার আগে আরও দু-একটা প্রাণ সে না নিয়ে ছাড়বে না। তিনি মনে মনে অন্য কথা ভাবছিলেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করা কঠিন। করলেও এরা রাজী হবে না, বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন। তবু এই উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে প্রস্তাবটা করে ফেললেন।

    ছেলেটার বাপ বসেছিল ভিড় থেকে খানিকটা তফাতে একটা গাছের নীচে। তার মুখ থেকে একটা অস্ফুট শব্দও এতক্ষণ শোনা যায় নি। কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তারই কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন চৌধুরী। বললেন, দেহটাকে যদি একটা রাত যেমন আছে ঠিক তেমনি ভাবেই রেখে দেওয়া যায়, তিনি একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে পারেন। বাপ বিস্ময়ে বেদনায় মুখ তুলে তাকাল, কোনো উত্তর দিল না। এদিক-ওদিক চেয়ে প্রতিবেশীদের উদ্দেশে বলল, তোরা এখনও বসে আছিস? বেলা আর নেই, খেয়াল আছে?

    তাই তো! আশেপাশে অনেকে সজাগ হয়ে উঠল। সৎকারের আয়োজন এখনই শুরু করা দরকার। শ্মশান নেহাৎ কাছে নয়। সামনে অন্ধকার রাত। কয়েকজন প্রৌঢ় ও যুবক উঠে পড়ল। একজন বয়স্ক লোক চৌধুরীকে একপাশে ডেকে নিয়ে চাপা গলায় বলল, সে হয় না বাবু। মড়া বাসী করতে নেই। দোষ হয়। ওটা আমরা পারবো না।

    অনেকেই যাবার পথে পা বাড়িয়েছে, মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ বৌটাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার জন্যে এগোতে যাবে, এমন সময় কানে গেল তার দৃঢ় এবং স্পষ্ট কণ্ঠস্বর—’দাঁড়াও!’

    সকলে থমকে দাঁড়াল।

    কালু চৌধুরীও অবাক হয়ে দেখলেন, মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে, চোখে জল নেই, সমস্ত মুখখানায় যেন একটা স্থির সংকল্পের কাঠিন্য। ধীরে ধীরে তাঁরই কাছে সরে এসে তর্জনী তুলে বলল, ওকে এখানে রেখে দিলে এই রাতের মধ্যে বাঘটাকে মারতে পারবে?

    ঐটুকু মেয়ের কাছ থেকে এরকম প্রশ্নের জন্যে চৌধুরী প্রস্তুত ছিলেন না। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারলেন না। কিন্তু পরক্ষণেই থতমত ভাবটা সামলে নিয়ে বললেন, পারবো কিনা ঠিক করে কি বলা যায়? যদ্দুর পারি, চেষ্টা করবো।

    ‘চেষ্টা!” হঠাৎ চমকে উঠলেন কালু চৌধুরী। তাঁর মুখের উপর যেন একতাল কাদা এসে পড়ল। ‘চেষ্টা না ছাই, চেষ্টা করলে কি আজ আমার—’

    বলতে বলতে উচ্ছ্বসিত কান্নায় মেয়েটি ভেঙে পড়ল তাঁর পায়ের কাছে। সেইদিকে চেয়ে চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কী বলবেন, কোন্ কথা বলে তাকে সান্ত্বনা দেবেন ভেবে পেলেন না।

    সহসা আবার তড়িৎস্পৃষ্টের মতো সে উঠে দাঁড়াল। দুচোখে আগুন ছড়িয়ে বলল, কিসের শিকারী তুমি? একটা বাঘই যদি না মারতে পারলে, এতগুলো বন্দুক দিয়ে কি করো?

    ওর গুরুজন যারা ছিল, উঠে এসে মেয়েটাকে সরিয়ে নিয়ে গেল। কেউ মৃদুকণ্ঠে তিরস্কার করল—ছিঃ ছিঃ, অমন করে বলতে হয়!

    চৌধুরী যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। বললেন, ঠিকই বলেছে। ওর কোনো দোষ নেই। তোমাদের কাছে আমি একটিমাত্র ভিক্ষা চাইছি। আজকের মতো আমাকে একটা শেষ সুযোগ দাও। সমস্ত রাত রাখতে হবে না, ভোর চারটে পর্যন্ত থাক, তারপর এসে নিয়ে যেও।

    কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বললেন, তুমি বাড়ি যাও। কথা দিলাম, এ বাঘ না মেরে আমি ঘরে ফিরব না।

    মেয়েটি চোখ তুলে তাকাল। চৌধুরী দেখলেন, তার ভিতর থেকে উপচে পড়ছে সরল কৃতজ্ঞতা। কি যেন বলতে গিয়ে বলল না। বোধহয় লজ্জা হল। তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল। পরক্ষণেই সকলের দিকে চেয়ে অনেকটা যেন নির্দেশের সুরে বলল—চলে এসো তোমরা। -বলে আর দাঁড়াল না। দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল। লোকগুলোও যেন মন্ত্রচালিতের মতো তাকে অনুসরণ করল।

    কালু চৌধুরীর অনুমান, বাঘ এখানে বিশ্রাম করছিল, ছেলেটাকে আক্রমণ করবার কোনো মতলব হয়তো তার ছিল না। ও-ই হঠাৎ দেখতে পেয়ে টাঙ্গী চালিয়ে থাকবে। ক্ষেপে গিয়ে লাফিয়ে পড়ে তার ঘাড় মটকে দিয়েছে, এবং ছেলেটার মরণ চিৎকার আর লোকজনের শোরগোল শুনে লাশ না নিয়েই পালিয়ে গেছে। টাঙ্গীটা তার দেহের কোনোখানে বিঁধে রয়েছে। পরে যদি খুলেও গিয়ে থাকে, এই আঘাতের জ্বালা সে ভুলতে পারবে না। লোকজন সরে গেলে নিশ্চয়ই একবার শোধ নিতে আসবে। তাছাড়া মানুষের উষ্ণ রক্ত ক্ষণেকের জন্যে হলেও তার রসনা স্পর্শ করেছে। সে টানও কম নয়। তার চেয়ে প্রবলতর আকর্ষণ—প্রতিহিংসা। সে যে আসবেই সে সম্বন্ধে চৌধুরী প্রায় নিশ্চিত ছিলেন।

    মুশকিল হল মাচা বাঁধা নিয়ে। বাঘ যদি সন্দেহ করে, ধারে-কাছে কোনোখানে শিকারীর বন্দুক ওত পেতে বসে আছে, প্রতিহিংসার তাড়না যত বড়ই হোক, আত্মরক্ষার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হয়তো তাকে বাধা দেবে। সুতরাং একটা ক্যামোফ্লেজ দরকার, শিকারের চোখে ধুলো দেবার মতো খানিকটা গাছপালার অন্তরাল। হাতে সময় অতি অল্প। তার মধ্যে কোনো রকম করে একটা মাচা খাড়া করা হল। ত্রুটি রয়ে গেল অনেক। তখনকার মতো আর কোনো উপায় ছিল না।

    রাতের মতো সামান্য কিছু মুখে দিয়ে একজন হুঁশিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং রাইফেল, টর্চ ইত্যাদি সরঞ্জাম নিয়ে সন্ধ্যার পর থেকেই মাচায় চড়ে বসলেন। সময় আর কাটতে চায় না। মুহূর্তগুলো যেন ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে, ঠেলে সরানো যায় না।

    মাচায় বসে রাত কাটানো কালু চৌধুরীর জীবনে এই প্রথম নয়। সুন্দরবনের মশার পরিচয় আগেও অনেক পেয়েছেন। কাঠপিঁপড়ার দলবদ্ধ দংশন যে কি বস্তু, তার আস্বাদও জানা আছে। ওগুলোর কোনোটাই তাঁর গায়ে লাগে না। আজও লাগল না। শিকারকে তিনি শিকারীর দৃষ্টি দিয়েই দেখে এসেছেন। এল তো ভাল, না এলে সমস্ত রাত্রির ব্যর্থ প্রতীক্ষায় ক্লান্ত বা উত্ত্যক্ত হননি। নিতান্ত সহজ ভাবেই নিয়েছেন, কিন্তু আজ তিনি অধীর, অস্থির, অসহিষ্ণু। ঐ আশ্চর্য মেয়েটা তাঁকে চঞ্চল করে তুলেছিল। কখনও সেই দুটি দীপ্ত চক্ষু, কখনও সেই অশ্রুসিক্ত করুণ মুখখানা থেকে থেকে চোখের উপর ভেসে উঠছিল। নিজের মুখে তাকে কথা দিয়ে এসেছেন, তার স্বামীহন্তাকে শেষ না করে এখান থেকে তাঁর ছুটি নেই। আর মাত্র কয়েকঘণ্টা সময় তাঁর হাতে। যদি ব্যর্থ হন, কোন্ মুখ নিয়ে দাঁড়াবেন তার সামনে?

    একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, সহকারীর মৃদু স্পর্শে সচেতন হয়ে উঠলেন। সামনের দিকে তাকিয়ে মনে হল, দূরে ঐ দুটো বড় গাছের মাঝখানে অন্ধকারটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছিল, হঠাৎ আবার গাঢ় হয়ে উঠল। শুধু গাঢ় নয়, সচল। ধীরে ধীরে অত্যন্ত সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে। চৌধুরী রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সহসা সেই জমাট অন্ধকারের বুক চিরে দুটো অগ্নিগোলক দপ্ করে জ্বলে উঠল। তারই মাঝখানে নিশানা নিয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয় সংহত করে তৈরি হয়ে রইলেন কালু চৌধুরী। এখনও পাল্লার বাইরে! আর একটু, আর শুধু এক ধাপ এগিয়ে এলেই গর্জে উঠবে রাইফেল। অব্যর্থ তার সন্ধান, অমোঘ তার শক্তি।

    …হল না। অন্ধকার হঠাৎ মিলিয়ে গেল।

    অস্ফুটকণ্ঠে একটা কুৎসিত গালাগালি উচ্চারণ করে (বোধ হয় নিজেরই উদ্দেশে) কপালের ঘাম মুছলেন চৌধুরী। সমস্ত মন ক্ষোভে নিরাশায় ভরে গেল। আর আশা নেই। যেমন করে হোক, টের পেয়ে গেছে।

    ভোরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এখনই লোকগুলো লাশ নিতে আসবে। ঘায়েল বাঘকে বিশ্বাস নেই, কোথায় ওত পেতে বসে আছে কে জানে? যে আশা নিয়ে আসছিল, তার এই ব্যর্থতা হয়তো তাকে আরও মরীয়া করে তুলেছে। একটা ফাঁকা আওয়াজ করে তাড়িয়ে দেবেন কিনা ভাবছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে জঙ্গলের বাইরে থেকে একটা ভয়ার্ত শোরগোল কানে এল। তৎক্ষণাৎ গাছ থেকে নেমে পড়ে দুজনে ঊর্ধ্বশ্বাসে রাইফেল হাতে ছুটলেন। গিয়ে যা দেখলেন, শুধু করুণ বীভৎস ও মর্মস্পর্শী নয়, অতবড় বিস্ময় তাঁর বহুদর্শী শিকারী-জীবনে কোনোদিন চোখে পড়েনি, কোথাও ঘটেছে বলেও শোনেননি। বাঘ নামক জানোয়ারকে দেখবার চিনবার বহু সুযোগ তাঁর হয়েছে। তিনি জানেন, প্রতিহিংসা তার রক্তজ ধর্ম। তার বহু দৃষ্টান্ত তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁর চেয়েও অভিজ্ঞ অনেক শিকারীর মুখে শুনেছেন। কিন্তু সে যে এমন একটা আশ্চর্য নিপুণ রূপ নিতে পারে, একথা তাঁর জানা ছিল না।

    চার-পাঁচজন সশস্ত্র পুরুষ বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটি যুবতী মেয়ে, এখান থেকে কয়েকশ’ গজ ব্যবধানে জঙ্গলের মধ্যে যেমন করে পড়ে আছে একটি বলিষ্ঠ যুবক। এর কাঁধের উপরেও সেই একই নখরচিহ্ন, মাথাটা ঠিক তেমনি ভাবে এক দিকে ঝুলে পড়েছে।

    চৌধুরীকে দেখে লোকগুলো যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। সকলে মিলে একই সঙ্গে ভয় ও উত্তেজনা মিশিয়ে যে বর্ণনা দিল তার থেকে বোঝা গেল, সমস্ত রাত মেয়েটা একবারও দু’চোখের পাতা এক করেনি। কান পেতে বসেছিল, কখন বন্দুকের আওয়াজ শোনা যাবে, সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে দেখবে, বাঘটার চোখদুটো উড়ে গেছে, কিংবা সোজা বুকের মধ্যে ঢুকে গেছে বন্দুকের গুলি। ভোরের দিকে ওরা যখন খাটিয়া নিয়ে রওনা হল, কিছুতেই তাকে ধরে রাখা গেল না। ওকে মাঝখানে রেখে, টাঙ্গী হাতে সামনে দুজন, আর তিনজন চারদিকে চোখ রেখে বেশ হুঁশিয়ার হয়েই আসছিল। হঠাৎ এক ঝলক চোখধাঁধানো বিদ্যুৎ- চমকের মতো কোথা থেকে কী যেন ছুটে এসে লাফিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড মেঘ- গর্জন। কী যে হল, ঠাহর করবার আগেই দেখতে পেল তারা যেমন ছিল তেমনিই দাঁড়িয়ে আছে, মাঝখান থেকে শুধু একজন পড়ে আছে মুখথুবড়ে।

    এতক্ষণ একটানা বলে যাচ্ছিলেন কালু চৌধুরী। এবারে হঠাৎ থেমে গেলেন। কয়েক মিনিট পরে মুখ তুলে বললেন, ঠিক চার দিনের মাথায় সেই বাঘ আমারই হাতে মারা পড়ল। ঘাড়ের উপর মস্ত বড় একটা ঘা। তাতে পচ ধরতে শুরু করেছে। আমাকে ঘিরে সবাই মিলে যখন বাহবা দিতে লাগল আমি লজ্জায় মরে গেলাম।

    অতটুকু একটা মেয়েকে যে কথা দিয়েছিলাম, রাখতে পারিনি, তাকেও রাখা গেল না। ভূতনাথ এতক্ষণ নিঃশব্দে বসেছিলেন। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল, জানোয়ারটা নিশ্চয়ই বাঘিনী?

    চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ। আপনি কেমন করে জানলেন স্যার?

    —জানবো আর কেমন করে? আন্দাজ করছি।

    সুরটা ‘আন্দাজে’র নয়। ওটা যে বাঘিনী, সে বিষয়ে মনে মনে নিশ্চিত হয়েই যেন প্রশ্নটা করেছিলেন। আমরা দুজনেই একটু বিস্মিত হলাম।

    ভূতনাথ সেটা লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। কালুবাবুর বিদ্যা আমার জানা নেই। বনের বাঘিনীর খবর রাখি না। লোকালয়ে যে দু-একটি দেখেছি, তার থেকেই অনুমান করে নিয়েছিলাম।

    ব্যাপারটা আরো রহস্যময় হয়ে উঠল। সে সম্পর্কে আর কোনো প্রশ্ন করবার আগেই কালু চৌধুরী ক্ষান্ত-বর্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে উঠবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যে-কারণে বহুকাল অদর্শনের পর তিনি আমার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁর সঙ্গেও শিকারের যোগ ছিল। অতগুলো বন্দুকের লাইসেন্স নিয়ে খানিকটা অসুবিধায় পড়েছিলেন। আমার সাহায্যে যদি কর্তৃপক্ষের অনুদার মনোভাব দূর হয়, সেই আশা নিয়ে আসা। আমার যতটা সাধ্য, সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলাম। তিনি ধন্যবাদ নিয়ে বিদায় নিলেন।

    চৌধুরীকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে এসে ভূতনাথের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, কি দেখছেন? আজ আর কোনো মতলব নিয়ে আসি নি। এমনিই এলাম।

    —গাড়ি ধরবার তাড়া নেই তো?

    —না, রাতটা মেয়ের বাড়িতে থেকে যেতে হবে। সেদিন থাকি নি বলে ভয়ানক রেগে গেছে।

    —তাই বুঝি ছুটে আসতে হল?

    —কী আর করি বলুন? তাছাড়া আপনার সঙ্গে বসে পুরনো দিনগুলোকে উল্টেপাল্টে দেখা, সে লোভটাই বা কম কিসে?

    বলে হেসে উঠলেন।

    আমি বললাম, তাহলে শুরু করুন। মুখপাত, মানে ইন্‌ট্রোড্রাকশন তো হয়েই আছে।

    —কিসের?

    —কেন, বাঘিনী? …বনের নয়, লোকালয়ের!

    —ও, কিন্তু সে তো শিকার কাহিনী নয়। তার মধ্যে আর যাই থাক, থ্রিল পাবেন না।

    —থ্রিলের চাইতে গভীর কিছু পাবো। কালু চৌধুরীকে তখন যে প্রশ্ন করলেন, তার থেকে মনে হচ্ছে উনি যে বাঘিনীর কথা শুনিয়ে গেলেন, আর আপনি যাদের দেখেছেন, দুয়ের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো মূলগত মিল আছে।

    —আমার তো তা-ই বিশ্বাস। আপনি হয়তো মানতে চাইবেন না। সাহিত্যিক মানুষ! আপনার, শুধু আপনার কেন, সংসারে অনেকের চোখেই পুরুষের তুলনায় মেয়েজাতটা অনেক বেশী কোমল, স্নেহে, করুণায়, মমতায় অতি সহজে গলে যায়, ইত্যাদি। তাদের আরেকটা রূপ হয়তো আপনারা দেখেননি। বুকে যখন প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে, তখন ওরা যা পারে বা করে বসে, কাদের মোল্লারাও সেখানে হার মানবে।

    অর্ধবিস্মৃতির ধূলি-মলিন আবরণ ভেদ করে একটি অস্পষ্ট নারীমূর্তি আমার চোখের উপর ভেসে উঠল। বললাম, এই জাতের একজনকে আমিও চিনি। তবে বাঘিনীর চেয়ে নাগিনীর সঙ্গেই তার মিল বেশী।

    —আপনার কাশিম ফকিরের রূপসী বিবি কুটী বিবির কথা বলছেন তো? কিন্তু কাদেরের মতো সে-ও শেষরক্ষা করতে পারেনি।

    আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে চেয়ে কথাটা আর একটু পরিষ্কার করবার চেষ্টা করলেন, -কাদের তবু নিজেকে অন্তত বোঝাতে চেয়েছিল, ফাঁসির দড়ি গলায় পরে সে তার বোনাইয়ের ওপর চরম প্রতিশোধ নিয়ে গেল। কুটী বিবির তো সে সান্ত্বনাও নেই। একদিন যার ওপরে ‘শোধ নেবো’ বলে বাইশ মাইল ছুটে গিয়ে থানার বারান্দায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, আরেকদিন তারই ‘গলা বাঁচাবার’ জন্যে উকিলের হাতে সর্বস্ব তুলে দিতেও তার বাধেনি।

    —বোধ হয় সে-ও এক ধরনের শোধ নেওয়া, নিজের ওপরে নিজের প্রতিশোধ।

    —তাই যদি হয়, সেখানে তার নাগিনীর খোলশ খুলে পড়ে গেছে, বেরিয়ে পড়েছে, আপনারা কাব্য করে যাকে বলেন, ‘চিরন্তনী নারী’। কিন্তু আমি যার কথা বলছিলাম, সে একেবারে জাত-বাঘিনী। যে প্রতিশোধ সে নিয়েছিল, সেটাও নিছক এবং নির্জলা জৈব প্রতিহিংসা।

    বলতে বলতে ভূতনাথবাবুর চোখ দুটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে গেল। হঠাৎ আবার প্রবল বেগে শুরু হল ধারা-বর্ষণ। আমি আমার চেয়ারটা আর একটু কাছে টেনে নিলাম। বর্ষামুখর অন্ধকারের দিকে ক্ষণকাল চেয়ে থেকে তিনি অনুচ্চকণ্ঠে বললেন, তার নাম ছিল, থাক, আসল নামটা না-ই বা বললাম। তার চেয়ে আপনি একটা নতুন নাম দিন।

    বললাম, বনানী।

    —বড্ড আধুনিক হয়ে গেল না?

    —তা হোক, ওর মধ্যে একটা রহস্যের অন্ধকার আছে। আপনি শুরু করুন।

    —বেশ।

    .

    ভূতনাথবাবুর প্রায় সব কাহিনীর গোড়াতেই একটা করে প্রারম্ভিক প্রশ্ন থাকে। ঠিক প্রশ্ন নয়, বলা যেতে পারে, কোনো অ্যাসাম্পশন বা কিছু একটা ধরে নেওয়া, যার আকারটা প্রশ্নের।

    —ছেলেবেলায় ভূগোল পড়েছিলেন নিশ্চয়ই?

    বললাম—পড়েছিলাম। মানে পড়তে হয়েছিল। পরীক্ষা নিতে চাইলে মুশকিলে পড়ে যাব। ইস্কুলে থাকতে ঐ ভূগোলটা বড় গোল বাধাত।

    —তা হলেও বাংলাদেশের ম্যাপটা মোটামুটি মনে আছে তো? গোটা বাংলার কথা বলছি, আপনারা যাকে বলেন, আনডিভাইডেড্ বেঙ্গল। কথাটা আমি একেবারেই সইতে পারি নি। ওর মধ্যে একটা রাজনৈতিক মতলব আছে। ইংরেজদের ঐ ‘ডিভাইড্’ নামক কীর্তিটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। তা না হলে অংশ দিয়ে গোটা জিনিসের পরিচয়, এ কোন্ দেশী নিয়ম?

    যাই হোক, সেই পুরনো বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ম্যাপটা মনে করবার চেষ্টা করুন। বাঁ দিক দিয়ে নেমে এসেছে ভাগীরথী, আর ডান দিক দিয়ে পদ্মা-মেঘনা। দুটো ধারাই পড়েছে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে। মাঝখানে একটা বৃহৎ ব-দ্বীপ। আমাদের ভূগোলের মাস্টার বলতেন, ‘বদ্ দ্বীপ। মানুষগুলো সব বদ্। তোদের দিয়েই তো দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি ছিলেন মেদিনীপুরের লোক। ঐ ‘ব’-এর মধ্যে পড়েন না। আমরা সকলেই ‘ব’। রসিকতার ছলে বললেও কথাটা আমাদের লাগত। আমরা সামনে কিছুই বলতাম না, আড়ালে বলতাম ঘটি-মাস্টার।

    এই ত্রিভুজের তলার দিকে অনেকগুলো সরু সরু সবুজ রেখা দেখতে পাবেন। সব গিয়ে মিশেছে বে অব্ বেঙ্গলে। যত দক্ষিণে যাবেন, তত বেশী। ওগুলো সব বড় বড় নদী। কোনো কোনোটা পদ্মা-মেঘনার চেয়েও বড়। এপারে দাঁড়ালে ওপার চোখে পড়ে না। কিন্তু ম্যাপে বা ভূগোলে কোনো নাম নেই। কাছাকাছি যারা থাকে, কিছু একটা বলে ডাকে। গাঁয়ের লোকের দেওয়া গেঁয়ো নাম। আপনার পছন্দ হবে না। ওরই একটা নাম – না-জানা নদীর ধারে সুপুরি, নারকেল, মাদার আর ঢাকাই ভেরেণ্ডার ঘন বনের আড়ালে খানকয়েক টিনের চালা নিয়ে একটি ছোট পরিবার। জনচারেক লোক। মাঝবয়সী বাপ, জোয়ান ছেলে, ছেলের মা আর বৌ। সে-ই হল আপনার বনানী।

    হেসে বললাম, আমার বনানী হল কেমন করে?

    —বাঃ, নামকরণের একটা প্রাপ্তি আছে তো! তার ওপরে অমন সুন্দর নাম। বাপ ছেলের নাম দুটোও কি আপনি দেবেন?

    —না, ওখানে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।

    —বুঝেছি। তাহলে আমিই দিচ্ছি। ধরুন গোপী আর সুবল। সুখী গেরস্তই বলা চলে। অবস্থা সচ্ছল। নদীর চরে বিঘেকয়েক ধানজমি, তাতে সোনা ফলে। বছরের খরচ স্বচ্ছন্দে চলে যায়। তার ওপরে সুপুরি-বাগান, ওদেশের যেটা প্রধান খন্দ। এ ছাড়া গোপী বর্মনের কিছু কারবারও ছিল। চালানি কারবার। কখনও সুপুরি-নারকেল, কখনও ধান-চাল বোঝাই দিয়ে কয়েকজন বাঁধা লোক নিয়ে বড় বড় ছইওয়ালা নৌকোয় (ও অঞ্চলে বলে ঘাসি নৌকো) পাল তুলে চলে যায় শহরের দিকে। ফিরতে দু-তিন মাস লেগে যায়, কখনও কখনও তার চেয়েও বেশী।

    এই চালানি ব্যাপারটা আসলে ছিল শিকারীর ‘ক্যামোফ্লেজ’, কালু চৌধুরী যার আড়ালে বসে বাঘের চোখে ধুলো দেয়। গোপীর বাহাদুরি আরও বেশী; সে দিত পুলিসের চোখে। আদত কারবারটা ছিল তার পিছনে, শিকারীর মাচার মতো অন্ধকারে ঢাকা। সেও এক ধরনের চালানি। তফাৎ শুধু এই, মাল রওনা হবার খবরটা পাওয়া যেত, সে মাল কোথায় গিয়ে পৌঁছল, তার হদিস মিলত না। তাছাড়া কারবারী লোকটি সব সময়েই নেপথ্যে। এই ধরুন, পানসি সাজিয়ে বাজনা বাজিয়ে বর চলেছে বিয়ে করতে। সঙ্গে দামী দামী জিনিস-পত্তর। তারপরে যে কি হল, কোনো পাত্তা নেই। এক গা গয়না পরে পাঁচটা তোরঙ্গ ভর্তি দান-সামগ্রী নিয়ে কনে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। শুভ লগ্নে নৌকো ছাড়ল, কিন্তু ঘাটে আর ভিড়ল না। জমিদারের নায়েব লাটের কিস্তির টাকা বোঝাই দিয়ে সদরের পথে বজরা ভাসালেন। সঙ্গে লাঠি-সোঁটা, বন্দুক, পাইক-বরকন্দাজ। সবসুদ্ধ কোথায় কেমন করে তারা অদৃশ্য হল, সে খবর এপারে ওপারে কোথাও গিয়ে পৌঁছল না।

    পুলিসের জানা ছিল, এই সব ঘটনার প্রায় সবগুলোর পেছনেই রয়েছে একখানা ছিপ, তীরের মতো তার গতি, তার মধ্যে কয়েকটা মাত্র লোক এবং তাদের যে চালায় তার নাম গোপী বর্মন। কিন্তু রিভার পুলিসের লঞ্চ তার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না। তাড়া করলেই চোখের উপর ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যায়। লঞ্চের সারেঙ্ আর খালাসিদের বিশ্বাস, লোকটা মস্ত বড় গুণিন, অদৃশ্য হবার মন্ত্র জানে। জল-পুলিসের সিপাই জমাদার, এমন কি কয়েকজন দারোগাবাবুকেও সেই কথা বলতে শোনা গেছে। ভূতশুদ্ধি, প্রেতশুদ্ধি সব রকম বিদ্যাই নাকি তার জানা আছে। তা না হলে বন্দুকের গুলি এড়ায় কি করে? একশ গজ দূর থেকে পাক্কা নিশানা নিয়ে রাইফেল ছুঁড়ে দেখেছে, লাগেনি।

    একবার একখানা কাঁঠালের নৌকো মাল বিক্রী করে দেশে ফিরছিল। ধোপাডাঙার খাল পেরিয়ে বড় গাঙে পড়তেই কোত্থেকে একখানা ছিপ যেন বাজের মতো উড়ে এসে ছোঁ মারল।

    আমার মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল, কাঁঠালের নৌকো! তাতে আর কত টাকা ছিল?

    —তা কম কি? তিন-চার হাজার তো বটেই।

    —বলেন কি! কাঁঠাল বেচে অত টাকা!

    —সে সব কাঁঠাল আপনি দেখেন নি তাহলে। তার নাম ভাটির কাঁঠাল। এক-একটার ওজন আধমণ, ত্রিশ সের। কোয়াগুলো পাক্কা একপো, পাঁচ ছটাক। গালা নয়, মানে গালিয়ে রস করে দুধে মিশিয়ে খাবার জিনিস নয়। খাজা, কচ্ কচ্ করে চিবিয়ে খায়। ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনার ভাটির কাঁঠালের ভারি খাতির। তার কাছে রসগোল্লা কোন্ ছার। দেশী কাঠালের খন্দ শেষ হবার পর, অর্থাৎ শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে হাটে হাটে বড় বড় নৌকোর ভিড় লেগে যায়। ছোট্ট ছইটুকু বাদ দিয়ে বাকী জায়গা জুড়ে এক-একটা কাঁঠালের পাহাড়। গেরস্তের হাতে তখন পাট বিক্রির চকচকে নোট। এদিকে আউস ধানও ঘরে উঠে গেছে। দু-চার মাসের মতো খোরাকির ভাবনা নেই। ব্যস, আর কি চাই হাট-ফেরতা প্রত্যেকের কাঁধে একটা করে রাম কাঁঠাল, আর হাতে একসের দেড়সের ওজনের ইলিশ মাছ। …থানায় থানায় পুলিসের কাজ বেড়ে যায়।

    —কেন? এর মধ্যে আবার পুলিস এল কোত্থেকে?

    —খালি খালি কি আর আসে? ঐ কাঁঠাল আর মাছের টানে আসতে হয়। ঐ নিয়ে প্রথমে বাধে মানের লড়াই, দেখতে দেখতে সেটা আসল লড়াইতে গিয়ে ঠেকে।

    —মানের লড়াইটা কি রকম?

    —কি রকম? এই ধরুন, মাঝের পাড়ার মুন্সীসাহেব ইলিশ মাছ দর করছেন। জেলে বলেছিল তিন টাকা, উনি পাঁচসিকে থেকে সাতসিকে পর্যন্ত উঠেছেন, এমন সময় দক্ষিণ- পাড়ার চৌধুরী সাহেব ওধার থেকে বলে বসলেন, দু-টাকায় দিবি? ব্যস্ লেগে গেল।

    ‘টাকার গরম দেখাচ্ছ নাকি মিঞা-সাহেব?’

    ‘মনে কর তো, তাই। টাকা থাকলে তার গরমও থাকে।’

    ‘বটে!” দু-পক্ষেই লোক জড়ো হল। মুখোমুখি থেকে হাতাহাতি, তার পর লাঠি, সড়কি, বল্লম। আধঘণ্টার মধ্যে পাঁচটা জখম, একটা খুন।

    —এ সব তো জানা ছিল না।

    কেমন করে জানবেন? গাঁয়ে তো আর থাকতে হয়নি আমাদের মতো। ডিস্ট্রিক্ট্ টাউনের বাইরে কোনোদিন পা দেননি।

    —তা দিই নি, তবে ঐ সব চীজ নিয়ে আমাকেও তো ঘর করতে হয়েছে।

    —আপনি পেয়েছেন তৈরী ফসল। তার পেছনে যে জটিল ক্রিয়া-কলা—বীজ সংগ্রহ থেকে ঘরে তোলা—তার আঁচটুকুও গায়ে লাগেনি। সে-সব এই পুলিসের ঘাড়ে। যাক, এবার শুনুন।

    ছিপের লোকগুলো যখন বড় নৌকোয় লাফিয়ে উঠল, ব্যাপারীরা লাঠি, সড়কি, ল্যাজা নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল। বড় বড় গাঙ্ পাড়ি দিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরতে হলে ওসব সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে হয়। কিন্তু ডাকাতরা দলে ভারী, হাতিয়ারগুলোও মারাত্মক ফলে এদের একজন সঙ্গে সঙ্গে সাবাড় আর দু-তিনটা জখম। বাকী যারা ছিল, ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীর মধ্যে। তারই একজন কোনো রকমে সাঁতরে গিয়ে ডাঙায় উঠেছিল। গোপী বর্মনের বাড়ির কাছাকাছি তার বাড়ি। রং-টং মাখা থাকলেও গলার আওয়াজ শুনে চিনতে পেরেছিল। পুরো একদিনের পথ হেঁটে কোন রকমে থানায় গিয়ে খবরটা জানিয়েছিল।

    গোপীকে তখন পাওয়া যায় নি। পুলিস তাকে তাকে ছিল। দিন পনেরো পরে বাড়ি ফিরতেই ধরে নিয়ে হাজতে পুরে দিল। মাল-পত্তর টাকা-কড়ি কিছুই পাওয়া গেল না। যে লোকটি খবর দিয়েছিল, সেও কদিন পরে পিছিয়ে গেল। গাঁয়ের লোকে ভয় দেখিয়েছিল, গোপীর বিরুদ্ধে ‘সাক্ষী দিলে’ সে ‘বাণ মারবে’। ‘বাণ-মারা’ কি, জানেন তো?

    —কথাটা শুনেছি, ব্যাপারটা যে কী, ঠিক জানি না।

    —এক রকমের মন্তর। যাকে লক্ষ্য করে উচ্চারণ করা হবে, তার আর রক্ষা নেই, তেরাত্তির পেরোবার আগেই গুষ্ঠীসুদ্ধ মুখে রক্ত উঠে মারা যাবে। কাজেই ফরেদীকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

    সাক্ষী নেই, মাল নেই, মামলা দাঁড়াবে কিসের ওপর? আসামীকে আর হাজতে আটকে রাখা চলে না। রিভার পুলিসের ইন্সপেক্টর কালীপ্রসাদ মুখুজ্যে নিজেই তদন্ত চালাচ্ছিল। সবে প্রমোশন পেয়েছে। আশা করেছিল, গোপী বর্মনকে গেঁথে তুলতে পারলে রাতারাতি কনফারমেশন। আশাটা শুধু মনে মনে রাখেনি, একটা সাক্ষী হাতে পেয়েই বন্ধু-মহলে ছড়াতে শুরু করেছিল। কাজেই বুঝতে পারছেন, ওকে একেবারে আদাজল খেয়ে নামতে হল। হাকিমের হাতে-পায়ে ধরে কোনো রকমে আর চৌদ্দটা দিন জামিন বন্ধ রাখবার ব্যবস্থা করল। তারপর সেই রাত্রেই লঞ্চ নিয়ে রওনা হল আসামীর গাঁয়ের দিকে।

    প্রথম কদিন নানাজনের কাছে খোঁজ-খবর নেবার চেষ্টা চলল। দেখা গেল, বর্মনদের আশেপাশের লোকজন কেউ বিশেষ খুশী নয়। কিন্তু আসল ব্যাপারে সব মুখ বন্ধ। তন্ত্র- মন্ত্রের কাছে পুলিস কোন্ ছার। ইন্টারোগেশনের নাম করে কালীপ্রসাদ বেছে বেছে কারও কারও ওপরে দু-চারটে ডোজ যা চালাল, তাকে হালকা বলা চলে না। কিন্তু হাজার হলেও বাণ-মারার তুলনায় সেগুলো কিছু নয়। আর কোথাও কোনো সুবিধে করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ধরল গিয়ে সুবলকে। সে আবার দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ! বাপের ধারা একেবারে পায়নি। ছেলেবেলা থেকেই একটু বোষ্টম-বোষ্টম ভাব। গলায় তুলসীর মালা, মাথায় লম্বা চুল। দিনের বেলা চাষ-আবাদ নিয়ে কাটে, সন্ধ্যার পর নামকীর্তন। বাপ তাকে ঘাঁটায় না। সেও বাপের কোনো খোঁজ রাখে না। মনে মনে বরং ঘৃণাই করে। শুধু ছেলে নয়, স্ত্রীর সঙ্গেও গোপীর যোগাযোগ অতি সামান্য। সে বেচারা তার নানা রকম অসুখ-বিসুখ নিয়ে বিব্রত। সারা বছর প্রায় শুয়েই থাকে। সংসার দেখে ছেলের বৌ, আপনার বনানী। শ্বশুরের সঙ্গে যা কিছু সম্পর্ক তারই, যদিও তার আসল ব্যবসাটা যে কী, সে সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানে না।

    কালীপ্রসাদ গিয়ে প্রথমটা চেপে ধরল সুবলকে, তোর বাপ টাকা-কড়ি গয়না-গাঁটি রাখে কোথায়?

    সে আকাশ থেকে পড়ল, আমি কেমন করে বলবো?

    —কোথায় পোঁতা আছে দেখিয়ে দে। কাউকে কিছু বলবো না।

    —জানলে তো দেখবো!

    —তাহলে জেনে রেখে দে, তোর বাপ আর ফিরবে না।

    সুবল চুপ করে রইল। বাপের ফেরা বা না ফেরা নিয়ে তার বিশেষ দুশ্চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। কালীপ্রসাদ বলল, তুই না জানিস, তোর মা নিশ্চয়ই জানে।

    —মা! রোগ-ব্যামো নিয়েই বাঁচে না, টাকাপয়সার খবর রাখবে কখন?

    -–বেশ, তোর বৌকে ডাক। তাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখি।

    বনানীকে ডেকে আনা হল। লম্বা ঘোমটার ভিতর থেকে মাথা নেড়ে জানাল, সে কিছুই জানে না।

    কালীপ্রসাদ এদিকে মরীয়া হয়ে উঠেছিল। এস. পি.-কে কথা দিয়ে এসেছে, যেমন করে হোক গোপীটাকে ফাঁসাবার মতো মালমশলা যোগাড় করে তবে ফিরবে। চৌদ্দ দিন মাত্র সময়। তার মধ্যে সাত-আট দিন চলে গেছে। আইন বাঁচিয়ে আর কাঁহাতক চলে? এবারে শেষ অস্ত্র ছাড়ল। পাড়ার কারও কারও কাছে শুনেছিল, ছেলের চেয়ে বৌয়ের সঙ্গেই বুড়োটার যোগাযোগ বেশি। এদের চোখে দেখেও মনে হল, বোষ্টম-মার্কা হাবা ছোকরাটা আসলে ভাল মানুষ, বৌটা বদমাশ। সেই হল মাথা। কাজেই কান টানলে মাথা আসে, এই থিওরী খাটিয়ে বৌয়ের সামনেই সুবলকে নিয়ে পড়ল। শুরু হল ধোলাই। পরের ঘটনা-কালীপ্রসাদের নিজের কথায় বলি।

    “এসব তো আমাদের কাছে নতুন ব্যাপার নয়। আপনিও করেছেন, আমিও কম করিনি। বরাবর দেখেছি, বাড়ির পুরুষগুলোকে দু-চার ঘা লাগালেই মেয়েগুলো হয় পালায়, নয়তো ঘরের দরজা বন্ধ করে মড়াকান্না কাঁদতে বসে। এই রকম সামনে থাকতে বাধ্য করলে ছুটে এসে পা জড়িয়ে ধরে—আর মেরো না বাবু! এখানেও তাই আশা করছিলাম। কিন্তু যা দেখলাম সত্যিই তাজ্জব লেগে গেল দাদা। খানিকক্ষণ গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যে কাণ্ডটা করল, আপনি ধারণাও করতে পারবেন না। এক লাফে এগিয়ে এসে ছোকরাকে আড়াল করে দাঁড়াল। কোথায় গেল ঘোমটা! একেবারে আমার নাকের উপর আঙুল উঁচিয়ে, যেন হুকুম দিচ্ছে এমন ভাবে বলল, মারধোর করবেন না, দোষ করে থাকে চালান দিয়ে দিন।”

    কালীপ্রসাদ একেবারে ‘থ’। সত্যিই ধারণা করা যায় না। সময়টা দেখতে হবে তো? সতেরো-আঠারো সালের কথা। তখনও গান্ধী-যুগ শুরু হয়নি। ইংরেজ সরকারের পুলিসী-যুগ। আর ঐ মেয়েটাও লেখাপড়া জানা শহুরে মেয়ে নয়, অজ পাড়াগাঁয়ের নিরক্ষর চাষী-গেরস্তের বৌ। বাদা অঞ্চলের পাড়াগাঁ। ম্যাপে বাংলা দেশ হলেও, আসলে তার সঙ্গে কোন যোগ নেই। স্বদেশীওয়ালাদের ছায়াও সেখানে কেউ দেখেনি। তাদের কার্যকলাপের একটা ছোট ঢেউও গিয়ে পৌঁছায়নি ওর ধারে-কাছে।

    কালীপ্রসাদের চরিত্রে আর যাই থাক, মেয়েমানুষের ওপর কোনো পক্ষপাতের বালাই ছিল না। দুর্বলতা তো নয়ই। ‘থ’-ভাবটা কেটে যেতেই এক ধাক্কায় বৌটাকে সরিয়ে দিয়ে সুবলকে ঘাড় ধরে টেনে আনল সামনের দিকে। মুচকি হেসে বলল, “চালান? বেশ তাই দিচ্ছি। তোমার সামনেই দিচ্ছি।’

    দুটো সিপাইকে দাঁড় করিয়ে দিল বনানীর দু-পাশে, যাতে চলে না যায়, আর একজন আড়াইমণী জমাদারকে একটা বিশেষ ইশারা করে হুকুম দিল, ‘লেফট্-রাইট্ চালাও।’ জমাদার সুবলকে ঠেলে দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়ে নাল-লাগানো বুট দিয়ে তার বাঁ পা’টা চেপে ধরল। চিৎকার করে উঠতেই সেটা ছেড়ে দিয়ে বুট তুলে দিল ডান পায়ের উপর। এরই নাম লেফট্-রাইট।

    ভূতনাথ দারোগার ‘কবিরাজী মুষ্টিযোগ’গুলো আমার জানা ছিল। ‘লেফট্-রাইট্’- এর কথা এই প্রথম শুনলাম। বললাম, এটাও কি আপনার আবিষ্কার?

    —না, এটা কালীপ্রসাদ মুখুজ্যের পেটেন্ট।

    —আপনাকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছেন ভদ্রলোক। যাক, তারপর কি হল বলুন।

    —একবার বাঁ পা, সেটা ছেড়ে দিয়ে আবার ডান—এলোপাতাড়ি নয়, দস্তুরমতো মার্চের তালে। সুবল পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভিতরের কোন্ একটা ঘর থেকে চেঁচিয়ে চলেছে তার মা। বুড়ী বাতে পঙ্গু, নড়বার ক্ষমতা নেই। বনানীর মুখে শব্দ নেই, একফোঁটা জল নেই চোখের কোণে। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে স্বামীর দুটো পায়ের দিকে। থেঁতলে ফেটে রক্ত-মাখামাখি। হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। দু-চোখের ভেতর থেকে ঠিকরে এল আগুনের হল্কা। দু-পাশের সিপাই দুটো টের পাবার আগেই তীরের মতো ছিটকে পড়ল। তারা দুদিক থেকে টেনে ধরতে বেশি দূর এগোতে পারল না। সেখান থেকেই বাঁ পাটা বাড়িয়ে যত জোরে পারে আড়াইমণীর ঊরুর পেছনে বসিয়ে দিল লাথি।

    কালীপ্রসাদের কাজটা এতক্ষণ ছিল একতরফা। প্রভোকেশনের অভাবে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। এবারে আর কোনোদিকে কোনো বাধা রইল না। চালান দেবার প্রস্তাবটা বনানীই তুলেছিল, তারই উপরে সেটা প্রয়োগ করা হল। যে সে ব্যাপার নয়। ‘অ্যাসটিং এ পুলিস অফিসার’! তার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ—’সরকারী কর্মচারীকে কর্তব্য কর্ম সম্পাদনে বাধাপ্রদান’ ৩২৩-এর সঙ্গে ৩৫৩।

    গোপী বর্মনের ঘাট থেকে খানিকটা দূরে রিভার পুলিসের লঞ্চ আগে থাকতেই নোঙর করা ছিল। বনানীকে অ্যারেস্ট করে আপাতত সেখানে নিয়ে তোলা হল। ঐ রকম ডেঞ্জারাস আসামী, এতগুলো পুলিসের চোখের ওপর যে তাদেরই একজনকে লাথি মারতে পারে, আর্মড পুলিসের হেফাজত ছাড়া তাকে অন্যত্র রাখা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে বর্ষারাত। বাড়িটাও গ্রামের একধারে। দু-পাশে বাগান, পেছনে মাঠ, সামনে নদী। পালিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

    জনমানবহীন বিশাল নদীর মধ্যে কালীপ্রসাদের লঞ্চে সেই রাতটা তার কেমন করে কেটেছিল, সে কথা আর নাই বা বললাম। সে ইতিহাস, আপনি ওর নামকরণ প্রসঙ্গে যে কথাটি বলেছিলেন, ‘রহস্যের অন্ধকার’, তারই তলায় ঢাকা থাকে।

    কী মনে করে জানি না, আমি হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, আপনি তাকে দেখেছেন?

    —কেমন দেখতে জানতে চাইছেন তো! এক্ষেত্রে সেটা অবান্তর। সে নারী এবং তার দেহে যৌবন আছে, স্ত্রী-জাতির চরম সর্বনাশের পক্ষে এই দুটো ফ্যাক্টরই কি যথেষ্ট নয়?

    এ প্রশ্নের কোনো জবাব আমি দিতে পারি নি, ভূতনাথবাবু তাঁর কাহিনীর ছিন্ন সূত্রে ফিরে গেলেন—

    ‘পথি নারী বিবর্জিতা’—উক্তিটি বোধহয় চাণক্য পণ্ডিতের। কালীপ্রসাদ এবার এই শাস্ত্রবাক্যের আশ্রয় নিল অর্থাৎ যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে, তারপরে আর এই আপদটাকে সদরে টেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কেঁচো খুঁড়তে যদি সাপ বেরিয়ে পড়ে তখন মাথা বাঁচাবে কে? তাই ভোর না হতেই দুজন সিপাই ধরাধরি করে বনানীকে তার বনালয়ের এক কোণে ফেলে রেখে চলে গেল। তার কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল, জাঁদরেল জল-পুলিসের দল সামান্য একটা মেয়েমানুষের বাঁ পায়ের লাথি বেমালুম হজম করে পুরো স্পীডে লঞ্চ ছুটিয়ে ভেসে চলেছে শহরের দিকে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল কালীপ্রসাদ, যে মামলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠবার স্বপ্ন দেখেছিল, দুটোকেই মাঝপথে ভাসিয়ে দিয়ে যেতে হল।

    কালীপ্রসাদ ভুল করেছিল। তার আশঙ্কা ছিল, বনানী তাকে ফাঁসিয়ে দেবে। এ যে আলাদা জাত তা বুঝতে পারে নি। এরা নালিশ করে না। নিজের লাঞ্ছনার কথা অপরের কাছে তুলে ধরে দয়া ভিক্ষা এদের ধাতে নেই। আইনের আশ্রয় নেয় না, আইন তুলে নেয় নিজের হাতে। অত্যাচারের একটা মাত্র প্রতিকার ওরা জানে, তার নাম প্রতিশোধ। সদরে নিয়ে গেলেও সে উপরওয়ালার দরবারে কাঁদুনি গাইতে বসত না কিংবা বিচারপ্রার্থী হয়ে দাঁড়াত না ফরিয়াদীর কাঠগড়ায়।

    এখানেও সে কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশীর দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়াল না। রাতের অন্ধকারে কী ঘটেছে না ঘটেছে, তার ওপরে আর একটা মোটা কালো পরদা টেনে দিল। নিজের লাঞ্ছনা তো বটেই, দৈহিক যন্ত্রণাও চেপে রাখল বুকের তলায়। যেন কিছুই হয় নি, এমন ভাবে নিজের দুটো হাতের উপর দুটো কঠিন রুগীর ভার তুলে নিল। শাশুড়ী তো আগে থেকেই অচল। এবার স্বামীও পড়ল সেই দলে। পায়ের ঘা রোজ রোজ বেড়ে চলল। তার সঙ্গে জ্বর। ডাক্তার বলতে যা বোঝায়, সে রকম কিছু ও-তল্লাটে কোথাও নেই, মানে তখন ছিল না। কবরেজ গোছের একজন ছিল। তার গাছগাছড়াই একমাত্র সম্বল। শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাবার কথাই ওঠে না। গাঁয়ের লোক জানত, সেখানে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না। তা ছাড়া নিয়েই বা যায় কে? পুরোদমে বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। নদীর দিকে তাকানো যায় না। নৌকা চলাচল বন্ধ

    —ধারে-কাছে ওদের আত্মীয়-স্বজন কেউ ছিল না?

    —ছিল হয়তো, মুচকি হেসে বললেন ভূতনাথ, তবে আগেই বলেছি, গোপীর সঙ্গে কারোরই তেমন ভাব-সাব ছিল না। তার ওপরে সেদিন যে কাণ্ড ঘটে গেল! গাঁয়ের লোক আপনার আমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। তারা জানে, বাঘে ছুঁলে আঠরো ঘা, পুলিসে ছুঁলে তিন আঠারোং চুয়ান্ন। সুতরাং শতহস্তেন—

    বনানী সারাদিন কাজ করে যায়। রাত হলেই কান দুটো পেতে রাখে দরজার বাইরে কখন শ্বশুর এসে চুপি চুপি ডাকবে। অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, ঐ বুঝি এল। তাড়াতাড়ি উঠে এসে দেখে, কেউ না। এমনি করে দিনের পর দিন কেটে গেল। গোপী এল না। জেল থেকে ছাড়া পেল কিনা সে খবরটাও কেউ দিয়ে গেল না।

    প্রায় মাস দেড়েকের মাথায় সুবল মারা গেল। ঘায়ে পচ ধরেছিল, দুর্গন্ধে ধারেকাছে যাওয়া যেত না। তার কয়েকদিন পরেই গোপী এসে হাজির। পুলিস মামলা চালায় নি। বেকসুর খালাস। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়েই সঙ্গে সঙ্গে আসতে পারে নি। ‘দরকার’ ছিল। কী ‘দরকার’, এরা কেউ জানতে চাইল না। এখানকার খবর সম্বন্ধে বনানী প্রায় চুপ করেই রইল। বুড়ি যা বলল তাও ভাসা-ভাসা। সুবলের প্রসঙ্গে কালীপ্রসাদের কথা উঠতে গোপী বলে উঠল, ধৰ্ম্মের কল বাতাসে নড়ে। শালা আমার যেমন সর্বনাশ করে গেল, নিজেও তেমনি সহজে রেহাই পায় নি। ঘুষের মামলায় পড়েছিল। চাকরি নিয়ে টানাটানি। শেষটায় ডিগ্রেড হয়ে গেছে। জল-পুলিসের ইনেস্পেক্টর থেকে কোতোয়ালীর দারোগা। শাঁস বলতে কিছু নেই। স্রেফ ডাঁটা…বলে বুড়ো আঙুলটা তুলে ধরেছিল বুড়ির সামনে। বনানী কাছেই কি একটা করছিল, কথাটা কানে যেতে হঠাৎ মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, কোন্ কোতোয়ালী?

    বৌয়ের জ্ঞানের বহর দেখে গোপীর ভারি মজা লাগল। হেসে বলল, কোতোয়ালী আবার কটা থাকে রে বেটী? শহরের ওপর যে সদর থানা, তারই নাম কোতোয়ালী।

    —ও, বলে বনানী চলে গেল। কথাটা তার মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল। দিন কয়েক পরে মাঝরাত্রে গোপীকে একবার উঠতে হয়েছিল। বাগানের দিক থেকে ফিরে আসতে গিয়ে চমকে উঠল, ছেলের বৌয়ের ঘরের দরজা খোলা, ভেতরে কেউ নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, মনে করল হয়তো বাইরে গেছে। তারপর লণ্ঠন নিয়ে খুঁজতে বেরোল–বাগানে, মাঠে, নদীর ধারে। কোথাও কোনো চিহ্ন নেই।

    পরদিন আর ব্যাপারটা চেপে রাখা গেল না। যেসব প্রতিবেশী অত্যন্ত দুঃসময়ে ভুলেও একবার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায় নি, তারাই এবার দলে দলে আসতে শুরু করল। গবেষণা চলল নানারকম। জলে ঝাঁপ দেবার সম্ভাবনাটা দু-একজনে তুললেও, বেশীর ভাগ সরাসরি নাকচ করে দিল। অনেক মুখরোচক গল্পও তৈরী হল—কোথায় কবে কার সঙ্গে তাকে দেখা গেছে, কতদিন থেকে এই কাণ্ড চলছে—ইত্যাদি। গোপী চুপ করে রইল। খুঁজতে বেরোবার কথাটা যে একবারও মনে হয়নি তা নয়, কিন্তু পঙ্গু স্ত্রীকে একা ফেলে যাওয়া অসম্ভব বলেই হোক, কিংবা যে বৌ ঘরে থাকতে চাইল না, তাকে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করে কী লাভ, এই ভেবেই হোক, বেরোনো আর হল না।

    এখানে কিঞ্চিত বিরতি, নাটকের মাঝখানে যেমন ইন্টারভ্যাল। এরপর ভূতনাথবাবুর ভূমিকাও বদলে গেল। এতক্ষণ ধরে এ কাহিনীর সঙ্গে তাঁর যে সংযোগ, সেটা প্রত্যক্ষ নয়। পুলিশ ক্লাবে বসে সিগার টানতে কালীপ্রসাদ মুখুজ্যের বাহাদুরি জ্ঞাপনাচ্ছলে যেটুকু প্রকাশ পেয়েছিল, তার থেকে গোড়াপত্তন। তারপর বিভিন্ন সূত্র থেকে যে বিভিন্ন খণ্ডগুলো তার কানে এসেছিল, তাই মনে মনে জোড়া দিয়ে আমাকে শুনিয়ে গেছেন। পরবর্তী পর্ব তাঁর নিজস্ব সংগ্রহ। সেখানে তিনি তদন্তকারী পুলিস অফিসার। ঘটনাচক্রের কোন্ বিবর্তনে তাঁকে এই ভূমিকায় নামতে হয়েছিল সেকথা যথাস্থানে প্রকাশ পাবে। আপাতত একটা কথা বলা দরকার। সরকারী দপ্তরখানায় কী রিপোর্ট তিনি দাখিল করেছিলেন, তা আমি জানি না। আমি যেটা পেলাম, তার সুর ও প্রকৃতি আলাদা। তার মধ্যে তথ্যের সঙ্গে মেশানো এমন অনেক কিছু আছে, যা সরকারী রেকর্ডে নিশ্চয়ই স্থান পায় নি। এগুলো হয়তো তোলা ছিল তাঁর নিজস্ব রেকর্ড রুমের কোনো নিভৃত অন্তস্থলে। এতদিন পরে সেখান থেকে ধুলো ঝেড়ে বাইরে আনবার পর ধরা পড়ল, মানুষের মন নামক ব্যক্তিটি শুধু সংগ্রাহক নয়, স্রষ্টা। স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে তথ্যের বোঝা বয়ে এনে সাজাতে গিয়ে কখন যে তাতে হৃদয়ের রং লেগে যায়, সে নিজেই হয়তো জানে না। সুতরাং যদি কেউ প্রশ্ন করে বসেন, এটা তিনি কেমন করে জানলেন, ওটা কোথা থেকে পেলেন, আমাকেও বাধ্য হয়ে ঐ একটিমাত্র উত্তরের আশ্রয় নিতে হবে—আমি জানি না।

    বনানী নদীগর্ভে ঝাঁপ দেয় নি, দিয়েছিল তার চেয়েও বিপদসঙ্কুল অনিশ্চয়ের মধ্যে। দশ-এগারো বছর বয়সে সে একবার মাসীর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। শহরে। তার মেসো সেখানে মুদিখানার দোকান করত। তার কাছেই একটা পুলিসের আস্তানা। অত পুলিস এর আগে সে একসঙ্গে দেখে নি। মাসী বলত ‘ওটা কোতোয়ালী থানা। ওদিকে কখনও যাস নি।’ নিরাপদ দূরত্ব থেকে ভয়ে ভয়ে সেই নিষিদ্ধ জগতের দিকে চেয়ে থাকত। বিয়ে হল অনেক দূর, সাত সমুদ্র না হলেও তেরো নদীর পার। শহর-বাসের সেই ক’টা দিন এবং তার সঙ্গে জড়িত সেই অদ্ভুত বাক্যটা—কোতোয়ালী—মনের তলায় কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ শ্বশুরের মুখে আবার নতুন করে শুনবার পর ঐ নামটা তার রক্তে যেন দোলা দিয়ে গেল। এবারকার কোতোয়ালী তাকে একেবারে আলাদা এবং অনেক বেশি চড়া সুরে ডাক দিল। শুধু ডাক দিল না, দূর পল্লীপ্রান্তে নদীর ঘাট আর বাগানের বেড়া-ঘেরা গৃহস্থ বধূর স্নেহ-ভক্তি-কর্তব্যের বন্ধনময় একান্ত পরিচিত জীবনের মাঝখান থেকে উপড়ে টেনে নিয়ে এল। কোথায়, সে কথাটাও ভাববার অবসর দিল না।

    মেসো নেই, মাসী তখনও আছে। বোনঝিকে দেখে সে বিশেষ খুশী হল না। একটা বাড়িতে মেয়েমানুষকে পুষবার মতো অবস্থাও তার নয়। সেদিক দিয়ে বনানী তাকে ভরসা দিল। একেবারে খালিহাতে সে আসে নি। নগদ বিশেষ কিছু না আনলেও কিছু গয়না ছিল। অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হল। তার জন্যে তৈরীই ছিল সে। আশ্রয় পাওয়া গেল।

    সেই কোতোয়ালী তেমনি আছে, আরও হয়তো বেড়েছে খানিকটা। দশ বছর বয়সে তাকে ঘিরে যতটা বাধা-নিষেধ ছিল, আজ তার গণ্ডিটা অনেক বেশি প্রশস্ত। তখন সে দু-চোখ মেলে যত খুশি দেখত, তাকে দেখবার কারও গরজ ছিল না। আজ অন্যের দৃষ্টি এড়িয়ে ওখানে গিয়ে দাঁড়ানো বড় কঠিন। তবু যখনই সুযোগ পায়, গিয়ে দাঁড়ায়, একটি বিশেষ মানুষের গতিবিধি লক্ষ্য করে। এমনি করে ক’দিনের মধ্যেই বুঝল বনানী, যে তীব্র জ্বালা বুকে করে সে ঘর ছেড়েছিল, তাকে মেটাবার পথ তার সামনে খোলা নেই। তার চোখ দুটো যাকে এত কাছে থেকে অহরহ অনুসরণ করছে, আসলে সে অনেক দূরে। তবু মন মানে না। মাঝে মাঝে যখন নিরাশায় ভেঙে পড়ে ঠিক তখনই হয়তো চোখে পড়ে তার প্রায় সামনে দিয়ে সে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। বুকের ভিতরটা তোলপাড় করে ওঠে। হাতখানা আপনা হতেই চলে যায় জামা-কাপড়ের তলায়। স্পন্দিত হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে লেপটে আছে একটি বস্তু—কয়েক বছর আগে শ্বশুর এনে দিয়েছিল, তার কোন্ কামার বন্ধুর নিজের হাতে গড়া। বলেছিল, ‘আমাকে প্রায় বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়, ছেলেটা তো হাবা বোষ্টম, ওকে আমরা ভরসা নেই। জঙ্গলে ঘেরা বাড়ি, কার মনে কী আছে, এটাকে হাতের কাছে রেখো। দিনে বা রাতে শোবার সময় বালিশের তলায় রেখে শুয়ো।’

    সেই ভয়ঙ্কর রাত্রেও ওটা বালিশের তলাতেই ছিল। একবারটি যদি যেতে পারত সে ঘরে! পুলিস দুটো পথ আগলে ছিল, যেতে দেয় নি। নিষ্ফল আক্রোশে বুকটা আবার জ্বালা করে ওঠে। চোখের উপর ভেসে ওঠে থেঁতলে পিষে যাওয়া দুখানা ক্ষত-বিক্ষত পায়ের পাতা। তার ওপর লাফিয়ে চলেছে একটা দাঁতাল শুয়োর। মাঝে মাঝে তার দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসছে। সে আর সইতে পারে নি। তারপর?

    পরের দৃশ্যগুলো ভাবতে গেলে মাথার ভিতরে আগুন ধরে যায়। লঞ্চের ভিতরে আবছায়া অন্ধকারে ঢাকা সেই ছোট্ট কামরাটা। চারদিকে একপাল শকুন। সে নিশ্চয়ই মরে গিয়েছিল, আর সেই মরা দেহটাকে নিয়ে—আর ভাবা যায় না। মাথার ভিতরকার শিরাগুলো যেন জট পাকিয়ে যায়। তার মধ্যে হাতুড়ির ঘায়ে বাজতে থাকে তিনটি কথা—শোধ নিতে হবে, শোধ নিতে হবে।

    মাসী সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল, এবং দিন দিন বেড়ে চলল সে সন্দেহ। কাঁচা বয়সে কপাল পুড়িয়ে বসে আছে মেয়েটা; একা একা কোথায় যায়, কোথায় জড়িয়ে পড়বে কে জানে? বাড়ি ফিরে এলেই বনানীকে একগাদা কৈফিয়তের মুখে পড়তে হয়। এটা সেটা বলে সে এড়িয়ে যায়। একদিন সেই খাপে মোড়া জিনিসটা মাসীর নজরে পড়ে গেল, বেরোবার মুখে কোমরে গুঁজে আঁচল চাপা দিতে যাবে, ঠিক এমনি সময়। বুড়ি চেপে ধরল, ‘এটা কি?” বনানী ব্যাপারটাকে হাল্কা করবার চেষ্টা করল, ‘তোমাদের দেশে যে-রকম গুণ্ডার উৎপাত, সাবধান হয়ে চলতে হয়।’

    ‘ও সব বাজে কথা রাখ।’ খেঁকিয়ে উঠল মাসী।

    বনানীকে স্বীকার করতে হল, একটি বিশেষ জন ওর লক্ষ্য। কে সেই একজন সেটা অবশ্য ভাঙল না। মাসী শিউরে উঠল, ‘কি সব্বোনাশী মেয়ে গো!’ তারপর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, ওসব মতলব নিয়ে তার আশ্রয়ে থাকা চলবে না।

    এ ছাড়া আর একটা মুশকিল কিছুদিন আগে থেকেই দেখা দিয়েছিল। মাসীর দোকানের ক’জন খদ্দের (তার মধ্যে থানার লোকও ছিল দুজন) তার এই বোনঝিটির উপর বড় বিশেষ নজর দিতে শুরু করেছিল। এখানে থাকা আর সত্যিই সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু কোথায় যাবে, আর তার অভীষ্ট ব্রতই বা সফল হবে কেমন করে?

    মাসীর বাড়ি থেকে চলে যাওয়া স্থির, কেবল দিন-ক্ষণটা স্থির হয় নি, এমন সময় একদিন বিকালে নদীর ঘাটে গা ধুতে গিয়ে একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। ভাবও হল খানিকটা। দুই দিন পরে পিছন থেকে হঠাৎ কানে গেল, সেই মেয়েটি গা রগড়াতে রগড়াতে তার এক সঙ্গিনীকে বলছে, কালী-দারোগার কাণ্ড শুনেছিস? ময়নাকে তালাক দিয়ে সুধাটাকে ধরেছে। ধন্যি মানুষ বাবা! দু-দিন অন্তর মুখ না বদলালে চলে না!

    —ভালোই তো। তোর পালাও একদিন আসবে।

    বলে হেসে উঠল সঙ্গিনী। সে আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল, বনানীকে দেখতে পেয়ে থেমে গেল। বনানী বুঝল, ওরা কী মেয়ে। তবু যেটুকু সন্দেহ ছিল, পুরোপুরি মেটাবার জন্যে প্রস্তাব করল, নতুন সখীর সঙ্গে তার বাড়িটা একবার ঘুরে আসবে। সখী রাজী হল না, নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেল। তারপর গা-ধোয়া শেষ করে ওরা দুজনে যখন খানিকটা এগিয়ে গেছে, বনানী অলক্ষ্যে তাদের অনুসরণ করল। গৃহস্থ-বসতি ছাড়িয়ে বাজার, তার শেষপ্রান্তে সরু গলির মধ্যে একটা বস্তি। তার মধ্যে ঢুকে গেল মেয়ে, দুটো। তখন সেখানে ভিড় নেই। কিন্তু বনানীর বুঝতে বাকী রইল না, আর কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই দেখতে পাবে, সকালবেলার ছেড়ে রাখা দোমড়ানো শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে মুখে পালিশ আর চোখে কালি মেখে গলির ধারে সারি সারি এসে দাঁড়িয়েছে শুধু তারা নয়, তাদের সঙ্গে আরও অনেকে। আরও রাত হলে হয়তো দেখা যাবে সেই দুদিন-অন্তর-মুখ- বদলানো-বিলাসী মহামান্য ব্যক্তিটির সঙ্গে, তার জীবনে আজ যে একক, তার সমস্ত বাসনা যার দিকে উদগ্র।

    বাসায় ফিরে এসে সে রাত্রে সে কিছু খায়নি, সমস্ত রাত দু-চোখের পাতা এক করেনি, বার বার উঠে পড়ে শুধু জল গিলেছিল গেলাসের পর গেলাস। পরদিন ভোরেই কাপড়ের পোঁটলাটা হাতে করে গিয়ে বলেছিল, মাসী, আমি চললাম।

    —কোন্ চুলোয় শুনি?

    —দেখি কোথায় কোন্ চুলো জোটে। বলে আর দাঁড়ায়নি।

    সেই মেয়ে দুটো নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। হয়তো বোঝাবার চেষ্টাও করেছিল, ‘এখনও বলছি, ফিরে যাও। এ বড় কষ্টের জীবন’। তবে বাড়িওয়ালীর কাছ থেকে সাদর অভ্যর্থনার অভাব হয়নি। কয়েকখানা গয়না তখনও ছিল। তার বলে ওরই মধ্যে বেশ ভাল ঘরেই জায়গা পেয়েছিল, তার সঙ্গে এক সেট ভালো জামাকাপড়ও জোটাতে পেরেছিল।

    মাসী খোঁজ না নিয়ে ছাড়েনি। তার দোকানের যে ছোকরাটির মনে রং লেগেছিল, খবরটা এনেছিল সে-ই। বুড়ির কঠিন অসুখের নাম করে একদিন দুপুরবেলা ডেকে এনে দেখাটাও করিয়ে দিয়েছিল। মাসী দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, তোর মরণ হল না কেন?

    ‘মরণ তো হয়েছে মাসী’, বনানীর মুখে মৃদু হাসির রেখা, অনেক আগেই হয়েছে।’

    মাসী বুঝতে পারে নি, তার মানে?

    —মানে তুমি বুঝবে না। মরেছি আমি সেইদিনই। এটা তার জ্বালা। বলতে বলতে চোখ দুটোর ভিতর থেকেও একটা তীব্র জ্বালা ঠিকরে পড়েছিল।

    একদিন দুদিন নয়, পুরো তিনটে মাস। সে কি কঠিন পরীক্ষা! মুখে রং ঘষে প্রতি সন্ধ্যায় গিয়ে দাঁড়াতে হয় দরজার সামনে। কখন এসে অন্য ঘরে গিয়ে ঢুকবে, কে জানে? কিন্তু সে আসে না, আসে অন্য লোক। তাদের ঠেকানো যায় না। ভিতরে ডেকে নিয়ে হাতেপায়ে ধরে কত কাণ্ড করে আত্মরক্ষা করতে হয়। সঙ্গিনীরা মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘আদিখ্যেতা! নাচতে নেমে আমার ঘোমটা!’ বাড়িওয়ালী বলে, ‘অত বাছাবাছি করলে তোর চলবে কেমন করে?’

    বনানী চুপ করে থাকে। তার কথা যে কাউকে বলবার নয়। কেমন করে বলবে, সকলের চোখে সে বারনারী হলেও সংসারে শুধু একটি মাত্র পুরুষকেই তার প্রয়োজন। এর মধ্যে দু-একদিন যে সে না এসেছে তা নয়, কিন্তু হয় বনানীর ঘর পর্যন্ত পৌঁছায়নি, নয়তো তার দিকে ভালো করে না তাকিয়েই অন্য ঘরে গিয়ে ঢুকেছে।

    অবশেষে দীর্ঘ তিন মাস প্রতীক্ষার পর দেখা দিল সেই ‘শুভরাত্রি’। বাঞ্ছিত জন মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।

    বনানীর বুকের ভিতরটা নড়ে উঠল, যদি চিনতে পারে? জোর করে হাসি টেনে এনে বলল, দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসুন!

    —তোমাকে যেন কোথায় দেখেছি মনে হচ্ছে!

    —সে কপাল আর আমার হল কৈ? এতদিন ধরে আছি, একবারও তো গরীবের ওপর নজর পড়ল না।…… ওমা, সারারাত ঐখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি? বলে খিল্‌ খিল্‌ করে হেসে উঠল।

    —তুমি তো বেশ কথা বলতে পার। হাসিটাও ভারি মিষ্টি।

    বনানী স্মিতমুখে মাথা নুইয়ে পিছনে সরে গেল। সে-ও ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে।

    অকস্মাৎ বিদ্যুৎ-শিখার মতো ঝলকে উঠল একখানা খাপ-খোলা ছোরা। নেমে আসবার আগেই সতর্ক পুলিসের ক্ষিপ্র সবল মুষ্টি সেটা ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিল। নিরুপায় নারী তখন তার বিধাতা-দত্ত দুটি অস্ত্র—দাঁত আর নখ নিয়েই সমস্ত শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল শিকারের উপর।

    অনেক রাত্রে সার্কেল ইন্সপেক্টর ভূতনাথ ঘোষাল পুলিস হাসপাতালে গিয়ে দেখলেন, কালীপ্রসাদ চোখ বুজে পড়ে আছে। মুখে একটানা গোঙানির শব্দ। কপালে, গণ্ডে, চিবুকে, কাঁধে গভীর আঁচড়ের রেখা। তার থেকে রক্ত ঝরছে। ডাক্তার আস্তে আস্তে বুকের কাপড়টা তুলে দেখালেন। অনেকটা জায়গা জুড়ে তীক্ষ্ণ দাঁতের চিহ্ন, মাঝখানে খানিকটা মাংস নেই।

    সরকারী ব্যবস্থায় সব রকম চিকিৎসা সত্ত্বেও কালীপ্রসাদকে সুবলের পথ ধরতে হল। ঘা-গুলো সেপটিক হয়ে গিয়েছিল। মরবার কদিন আগে ভূতনাথবাবুকে বলেছিল, ‘দাঁতে আর নখে নিশ্চয়ই বিষ মেখে রেখেছিল রাক্ষুসী!’ ভুতনাথ মুখে কিছু বলেন নি, মনে মনে বলেছিলেন, ভুল করেছ ভায়া, ওরা বাঘিনীর জাত, বিষ নিয়েই জন্মায়, মাখতে হয় না।

    দেশলাই জ্বালাবার শব্দে চমকে উঠে দেখলাম, ভুতনাথবাবু সিগারে আগুন দিচ্ছেন। আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, বৃষ্টিটা ধরে গেছে, এবার ওঠা যাক। ক’টা বাজে?

    আমি জবাব দিলাম, বনানীর কী হল?

    —জানি না। অনেক খুঁজেছি। খুঁজতে হয়েছে। তদন্তটা আমার হাতেই দিয়েছিলেন সাহেব। পাইনি।

    একটু থেমে বললেন, পেলে কালীপ্রসাদের শেষ খবরটা জানিয়ে দিতাম। সুবলের মৃত্যুর ক্ষোভ হয়তো খানিকটা মিটত।

    আমি বললাম, আমার মনে হয় সে বেঁচে নেই।

    —এখন সেই প্রার্থনাই করি। শুনেছি,মৃত্যুর পরে মানুষ প্রেতলোক থেকে সব কিছু জানতে পারে। তাহলে সেও জেনেছে। আত্মার কিছুটা তৃপ্তি হয়ে থাকবে, অবিশ্যি বাঘিনীদের যদি আত্মা বলে কিছু থাকে।

  • চার

    চার

    আমার এই পুরনো চিঠির ঝাঁপিটা যখন খুলে বসি, সকলের আগে যে জিনিসটা চোখে পড়ে এবং দেখে বিস্ময় লাগে, সেটা হচ্ছে চিঠিগুলোর বৈচিত্র্য। একটা হাতের লেখা থেকে আরেকটা হাতের-লেখা যেমন আলাদা—কোনোটা বাঁকা ছাঁদের কোনোটা সোজা—সেই লেখার পিছনে যারা রয়েছে, তাদের তফাৎ আরও বেশি। প্রশ্ন উঠবে, তাতে আর বিস্মিত হবার কী আছে? বৈচিত্র্যই তো জীবনের আসল রূপ! জানি। মোহমুদ্‌গরের দর্শনও আমার জানা আছে। এই সংসার শুধু বিচিত্র নয়, ‘অতীব বিচিত্ৰ’! তবু বিস্ময় জাগে বৈকি। ক্ষোভ, দুঃখ, আনন্দ, হিংসায় উদ্বেলিত কত বিভিন্ন রংয়ের, কত মিশ্র’ সুরের মন আমার এই ছোট্ট পেটিকার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে।

    নানা পার্থক্য সত্ত্বেও একটি জায়গায় এরা এক—এই নিবন্ধের প্রথমেই যার উল্লেখ করেছি—সকলেরই কিছু জিজ্ঞাসা আছে। যতই ভিতরে ঢুকছি, দেখতে পাচ্ছি, সেটা এদের বহিরাবরণ। তার অন্তরালে আর একটি প্রচ্ছন্ন রূপ আছে—সকলেই কিছু শোনাতে চায়। একে আত্মপ্রচার না বলে বলব আত্মপ্রসার, নিজেকে মেলে ধরা, কিংবা আরেক ধাপ বেশি, খুলে ছড়িয়ে দেওয়া। তার মধ্যে আশ্চর্য বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। মানুষ মাত্রেই স্রষ্টা। এক বললেন, আমি বহু হব—এইটাই তো সৃষ্টির মূল তত্ত্ব।

    কমবয়সী কয়েদীদের একটা আলাদা জেল আছে। সরকারী সেরেস্তায় তার নাম ‘বস্টাল স্কুল। শুনেছি, তার এক বাতিক-গ্রস্ত সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট (তাঁর নাকি কিঞ্চিৎ লেখক- খ্যাতিও ছিল) গাঁটের পয়সায় একঝুড়ি নোট-বুক আর ডজন কয়েক পেন্সিল কিনে এনে ছেলেগুলোর হাতে হাতে দিয়ে বললেন, ‘এগুলো সরকারী নয়, তোদের নিজের জিনিস। যা ইচ্ছে হয় লিখবি, ছবি আঁকতে চাস আঁকবি, মাস্টারমশাইদের দেখাতে হবে না।’

    ছেলেদের আনন্দ দেখে কে! কথাটা যখন উপর-মহলের কানে গেল, একজন কর্তাব্যক্তি কথায় কথায় রহস্যচ্ছলে প্রশ্ন করলেন, ‘ব্যাপার কি বলুন তো? বাছাধনদের বুঝি এখন থেকেই “লেখক” বানিয়ে তুলছে চান?’

    ‘আজ্ঞে না’, সবিনয়ে উত্তর দিলেন সুপার, ‘লেখক ওরা আগে থেকেই আছে। লেখার কিছু সরঞ্জাম চাই তো, সাধ্যমত তারই যোগান দিচ্ছি।’

    কথাটা ও-তরফে ঠিক বোধগম্য হল না দেখে আরেকটু পরিষ্কার করে বললেন, ‘এ দুনিয়ায় লেখক নয় কে স্যার? আপনি, আমি, রাম, শ্যাম, যদু, মধু সবাই বর্ন-রাইটার, এক একটি পকেট-এডিশন রবিঠাকুর। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু লিখছি—কাগজে কলমে পাথরে কিংবা ক্যানভাসে না হোক, মনে মনে, মুখে মুখে। নিজেকে কোনো না কোনো প্রকারে প্রকাশ করে চলেছি। ওরাই বা তার থেকে আলাদা হবে কেন?’

    আমার এই পত্রগুচ্ছের যাঁরা লেখক, তাঁরাও নিজেকে প্রকাশ করতে চান। শুধু আমার কাছে নয়, আমার ভিতর দিয়ে, অর্থাৎ আমাকে আশ্রয় করে অপরের কাছে। সে অপর কোথাও ‘অপর-সাধারণ’, কোথাও বা কোনো ‘বিশেষ অপর’, কোনো বিশেষ জন।

    অপর্ণা চ্যাটার্জির কথা মনে পড়ছে। সেই ক্লান্তিভারানত মুখখানি শুধু নয়, একটি একুশ-বাইশ বছরের সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে তার বহু-বিড়ম্বিত জীবনের সে কাহিনী জেলখানার অফিসে বসে কখনও করুণ, কখনও উচ্ছল কণ্ঠে আমার কাছে অসঙ্কোচে ব্যক্ত করেছিল তাও নয়, তার চেয়ে বেশি, সেই ঠিকানা-হীন দীর্ঘ চিঠিখানা এই ঝাঁপির কোণে যা সযত্নে তোলা আছে, এবং যার প্রতিটি লাইন নানা কাজের ফাঁকে যখন-তখন আমাকে উন্মনা করে দেয়। সে লিখেছিল, ‘যে-কাহিনী সেদিন আপনার পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলাম, আশা করে বসে আছি, যত তুচ্ছই হোক, আপনার স্নেহবর্ষী লেখনীর মুখে একদিন সে রূপ নেবে। শুধু আশা নয়, এটা আমার শেষ আবেদন।’

    সে-কাহিনী আর কেউ পড়ুক না পড়ুক তা নিয়ে তার অণুমাত্র মাথা-ব্যথা ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল একটি বিশেষ মানুষ। শুধু সেই একজনের কাছে নিজের কথাটি পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়। আমার লেখার ভিতর দিয়ে ‘একটি বার তাঁর চোখের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো।’ হয়তো এ ছাড়া সেখানে যাবার আর কোনো পথ তার ছিল না। আমার রচনা যে একদিন সেই আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির নজরে পড়বে, এবং তিনি সেটা মন দিয়ে পড়বেন, এ বিশ্বাস তার কেমন করে জন্মেছিল আমি জানি না। যেমন করেই হোক, সেই নিশ্চিন্ত বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে অপর্ণার মন তাকে বলে দিয়েছিল—সেদিন ক্ষণেকের তরেও তাঁর মনে হবে, যতখানি হেয় বলে একদা তিনি যার মুখ-দর্শন পর্যন্ত করতে চান নি, ঠিক ততখানি হেয় বোধহয় সে নয়।

    অপর্ণার অনুরোধ আমি রেখেছিলাম। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে ‘লজ্জার মাথা খেয়ে’ আমার কাছে সে তার ‘শেষ আবেদন’ জানিয়েছিল তা সফল হয়েছে, না আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে, জানতে পারি নি। জানবার উপায়ও সে রাখে নি। নিজের ঠিকানাটা সে ইচ্ছা করেই গোপন রেখেছিল।

    অপর্ণা একা নয়। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, জীবনের প্রকাশ্য সড়ক থেকে পিছলে পড়েছিল, এমনি আরও কতজনের মর্মবেদনা এই নানা রঙের নানা আকারের লেফাফাগুলোর মধ্যে সঞ্চিত হয়ে আছে। সে সব আজ থাক। সংসারে একেই তো দুঃখের অন্ত নেই, তার উপরে আর নতুন ভার চাপাতে চাই না। তার চেয়ে এমন দু-একখানা চিঠি খোলা যাক, যাদের বক্তব্যবিষয় পত্র-লেখকের কাছে যতটা গুরুতর, পাঠকের কাছে ততটা নয়। জানি, তার মধ্যেও একটা ট্রাজেডি আছে—আমি যাকে প্রাধান্য দিতে চাই, আপনার চোখে তো অপ্রধান, আমার কাছে যেটা মর্মান্তিক, আপনার মর্মে সে কোনো রেখাপাত করল না। কি করব উপায় নেই। আমাদের সকলের জীবনেই এ ট্রাজেডি অহরহ ঘটছে। বিশেষ করে যারা লেখক। অভিধান ঘেঁটে বাছাবাছা শব্দ জুড়ে একটি হৃদয়দ্রাবী করুণ দৃশ্যের অবতারণা করলাম। আমার চোখে জল এসে গেল, আপনি মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “জলো’ ‘জলো’। মধুর হাস্যরস পরিবেশন করেছি ভেবে আমার মুখ যখন তৃপ্তির হাসিতে উজ্জ্বল, আপনার গোমড়ামুখে হয়তো তার একটি কুঞ্চনও ফুটে উঠল না।

    এই চিঠিগুলোর যারা লেখক, তাদের কারও কারও অদৃষ্টেও যদি সেই বিড়ম্বনা ঘটে, আমি নিরুপায়।

    এই সাড়ে-চুয়াত্তর-চিহ্নিত বেয়ারিং চিঠিখানাই ধরা যাক। ঠিকানা নেই, কিন্তু চেহারা দেখেই বুঝতে পাচ্ছি—এর উৎপত্তিস্থল মফস্বলের জেলখানা। প্রতি রাত্রে বিভিন্ন ওয়ার্ডে যেসব কয়েদী বন্ধ করা হল, তাদের নাম লিখবার জন্যে মোটা মোটা রেজিস্টার থাকে, যার নাম ‘গ্যাঙ-বুক’। চিঠির কাগজগুলো সেখান থেকে গোপনে সংগৃহীত এবং তারই একটা পাতা আটা-গোলা গঁদে জুড়ে তৈরি হয়েছে খাম। বলা বহুল্য, এ হেন বস্তু প্রকাশ্য রাস্তায়, অর্থাৎ সরকারী সেন্সর-এর ছাপ নিয়ে আসতে পারে নি। এসেছে গোপন পথে, এবং সেইজন্যেই ডবল রেটে ডাক-মাশুল যোগাবার ভারটা আমার ঘাড়ে ফেলা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। কিংবা লেখক হয়তো টিকিটের পয়সাটা কোনো সূত্রে জোগাড় করে থাকবে। চিঠি-পাচারকারী বন্ধুটি—জেলের সিপাই কিংবা কোন্ খালাসী কয়েদী—সেটা পোস্টাপিসকে না দিয়ে চা কিংবা পানের দোকানে ব্যয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছিল। আমি যে নিতান্ত নির্বুদ্ধির মতো কয়েক আনা পয়সা খরচ করে ফেললাম, তার কারণ ঐ গ্যাঙ-বুকের ছেঁড়া পাতা। যা কিছু নিষিদ্ধ ও গোপনীয়, যার মধ্যে কোনো রহস্যের গন্ধ আছে, তার দিকেই মানুষের আকর্ষণ। কৌতূহল নামক একটি নিরীহ শব্দের আবরণে ঢাকা দিলেও আসলে এটা লোভ। লোভ মাত্রেই পাপ, তার দণ্ড আছে। সুতরাং ঐ পয়সা ক’টির জন্যে আমার কোনো আপসোস করা চলে না।

    সেদিন কিন্তু চিঠিখানা পড়ে সত্যিই বড় আপসোস হয়েছিল। যা আশা করেছিলাম, তার কিছুই পেলাম না। না কোনো চিত্ত-চঞ্চলকারী লোমহর্ষক ঘটনা না কোন পদস্খলিতা নারীর মুখরোচক আত্মকাহিনী, যার সঙ্গে কিঞ্চিত চড়া রঙ মিলিয়ে আমি আমার পাঠক-হৃদয়ে রসসঞ্চার করতে পারি। আজ সেই ভুল-বানানে-ভরা কাঁচা হাতের লাইনগুলো আরেকবার পড়ে মনে হচ্ছে, তা না পারি, পাঠকদের কিছুটা কৌতুকের খোরাক হয়তো যোগাতে পারব। চিঠির লেখক নকুলচন্দ্র সাঁতরা অবশ্য তা চায় নি। তার দুর্ভাগ্যের বর্ণনা দিয়ে শ্রোতার মনে কিঞ্চিৎ দুঃখ বা সহানুভূতির উদ্রেক করাই বোধহয় তার কাম্য ছিল, যদিও স্পষ্ট করে সে-কথা সে কোথাও বলে নি। মনে মনে সেই অভিপ্রায় যদি তার থেকেও থাকে, আমার এবং আপনাদের কুণ্ঠার বা লজ্জার কারণ নেই। আমাদের বেশির ভাগ হাসির উৎস যে অন্যের অশ্রুজল, এ তো অত্যন্ত পুরনো কথা।

    দশধারা মোকদ্দমায় নকুল সাঁতরার এক বছর জেল হয়েছিল। চুরি, ডাকাতি, খুন ইত্যাদি মামলায় কোর্ট যে দণ্ড দেন, তার সঙ্গে এই দশধারার মেয়াদের তফাৎ আছে। এটা হল জামিনের বিকল্প ব্যবস্থা। কোর্টের আদেশমত উপযুক্ত জামিন দাঁড় করাতে পারলে আর জেলে যেতে হয় না। বেশির ভাগ আসামীই তা পারে না, নকুলও পারে নি। সুতরাং জেলে গিয়েছিল।

    ফৌজদারী আদালত এবং তার সংশ্লিষ্ট মহলে ‘দশধারা’র চলতি নাম—বি. এল. কেস। বি. এল. মানে ‘ব্যাচেলার অব্ ল’ নয়, ব্যাড লাইলিহুড’। জীবিকা-নির্বাহের পথটা যাদের প্রকাশ্য ও সরল নয়, বরং বাঁকাচোরা এবং তমসাচ্ছন্ন চালচলনে চাকচিক্য আছে, কিন্তু তার রসদ-সংগ্রহের সূত্রটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, তাদেরই এই বি. এল.-এর খপ্পরে ফেলা হয়। কোনো স্পেসিফিক বা নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রয়োজন নেই, প্রমাণ করতে হবে না, অভিযুক্ত আসামী অমুক জায়গায় সংঘটিত অপরাধের জন্যে দায়ী, শুধু দেখাতে হবে তার জীবনযাত্রার মান এবং জীবিকা-সংস্থানের উপায়—এ দুয়ের মধ্যে কোনো সংগতি নেই, সুতরাং ঐ কার্যটির জন্যে তাকে নিশ্চয়ই কোনো অসাধু পন্থার শরণ নিতে হয়। এইটুকু সম্পর্কে নিশ্চিত হলেই হাকিম তাকে দশধারার বঙ্ বা মুচলেকায় বেঁধে জেলে পাঠাতে পারেন।

    মনে পড়ছে, আমার এক অধ্যাপক বন্ধু একবার কোনো মহকুমা-আদালতে এই দশধারার বিচার দেখতে গিয়ে ফ্যাসাদে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিলেন। সাক্ষ্যগ্রহণাদি আগেই হয়ে গেছে। সেদিন ছিল সওয়াল জবাব। আসামী পক্ষের উকিল তাঁর ভগ্নীপতি। তিনিই শ্যালককে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন, সম্ভবত দেখাবার জন্যে—ছোট মফস্বল কোর্ট হলেও সেখানকার বক্তৃতার মান কলকাতার অভিজাত কলেজের চেয়ে ন্যূন নয়। বলা দরকার যে, আমার বন্ধুটির পাণ্ডিত্য যতই থাক, চেহারাটা মোটেই পণ্ডিত-জনোচিত ছিল না।

    কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টর সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনা করছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শুরু হল। উঠেই নাটকীয়ভাবে কাঠগড়ার দিকে তর্জনী তুলে বললেন, “সাক্ষ্য-প্রমাণাদি উল্লেখ করবার আগে মহামান্য আদালতকে আমি একবার ঐ আসামীর দিকে দৃষ্টিপাত করতে অনুরোধ করব। চেহারাটা একবার লক্ষ্য করুন, ধর্মাবতার। কী রকম তেল-চুকচুকে মোষের মতো গায়ের রং, কত বড় বুকের ছাতি, কী জমকালো গোঁফ, সুন্দরবনের বাঘের মতো ভরাট মুখ, ধর্ম্মের ষাঁড়ের মতো গর্দান…। আচ্ছা, এবার একটা ছোট্ট প্রশ্ন—

    এই পর্যন্ত এসে একটু থামলেন কোর্টবাবু, ঘাড় ঘুরিয়ে দু-পাশটা একবার দেখে নিলেন। তারপর আসামীর উকিলের দিকে একটা জয়-গর্বিত ভ্রূকুটি নিক্ষেপ করে বললেন, এতবড় একটা পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে কিসের জোরে?

    ‘অবজেকশন ইওর অনার’—তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন আসামী পক্ষের উকিলবাবু।—’আমার বন্ধু যা বললেন সব অর্থহীন অপ্রাসঙ্গিক।’

    হাকিম বক্তার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। তিনি বলে চললেন, সুযোগ্য কোর্ট সাব- ইন্সপেক্টর যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে আমার মক্কেলের চেহারার বর্ণনা দিয়েছেন, তার থেকে মনে হয় পুলিসের চাকরিতে না এসে তিনি যাত্রার দলে যোগ দিলেই বুদ্ধিমানের কাজ করতেন। দুঃখের বিষয় এটা আদালত। কিন্তু কী বলতে চান তিনি? চেহারাটাই যদি তাঁর মতে আসামীর অপরাধ বলে গণ্য হয়ে থাকে, তাহলে আমার এই অধ্যাপক শ্যালকটিকে কোর্টের সামনে হাজির করছি-

    ভগ্নীপতির অতর্কিত আক্রমণে আমার বন্ধুবর হতভম্ব। আত্মরক্ষার উপায় স্থির করবার আগেই উকিলবাবু তাঁকে দু-হাতে টেনে তুলেছেন। পরক্ষণেই হাকিমের সামনে আরও খানিকটা ঠেলে দিয়ে বললেন, ইওর অনার মে কাইগুলি হ্যাভ এ লুক। আসামীর সঙ্গে এঁর কোনো অমিল নেই। একই রঙ একই রকম বুকের ছাতি এবং তেমনি জমকালো গোঁফ। আমার বন্ধু কি বলতে চান, সেই অপরাধে এঁকেও দশধারায় চালান দিয়ে আসামীর ডক্-এ দাঁড় করাতে হবে?

    একটা হাসির রোল উঠল। হাকিমকে হাসতে নেই। সময়োচিত গাম্ভীর্য বজায় রেখেই তিনি বললেন, অর্ডার অর্ডার।

    যাক যা বলছিলাম। বি. এল. কেসে ফেলবার আগে নকুলকে প্রথমটা ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে আরও আসামী ছিল। মাস তিনেক কোর্টে আনা- নেওয়ার পর এল এই দশধারার অভিযোগ। নকুল লিখেছে, ‘এই নতুন মামলা কি করিয়া চাপিল, আপনাকে বলিয়া দিতে হইবে না। আপনি তো সবই জানেন।’

    সব না জানলেও চিঠির ইঙ্গিতটা বুঝতে পারছি। ডাকাতি প্রমাণ করা বড় শক্ত। রাত্রির অন্ধকারে মুখোশ লাগিয়ে কিংবা রং-চং মেখে মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে একদল লোক যখন হৈ-হল্লা করে বাড়ি চড়াও করে, গৃহস্থ তখন ধন-প্রাণ সামলাবে না চিনতে চেষ্টা করবে এরা কারা? অথচ ডাকাতি-মামলায় জড়াতে হলে যে-সব মাল-মশলার প্রয়োজন, তার মধ্যে প্রথম নম্বর এই সনাক্ত বা আইডেন্টিফিকেশন। যে অনুষ্ঠানের ভিতর দিয়ে এই সনাক্ত-কার্যের আয়োজন করা হয় তার নাম টি. আই. প্যারেড। তার ঘটনাস্থল জেলখানা

    আমার চাকরি-জীবনের প্রথম দিকে বিভিন্ন জেলে এমনি বহু টি. আই প্যারেডের আয়োজন আমাকেই করতে হয়েছে। যে ক’জন আসামী, তার সাত-আট গুণ অন্যান্য মামলার হাজতীদের সঙ্গে মিশিয়ে তাদের লাইনবন্দী করে দাঁড় করিয়েছি জেলখানার মাঠে। একজন জুনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট এসেছেন ফর্ম এবং অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে। তিনিই অনুষ্ঠানের পুরোধা। তাঁরই নির্দেশে জেলের বাইরে থেকে এক-একজন করে সাক্ষীদের ডাক পড়েছে। সাক্ষী—অর্থাৎ যার বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল, সেই হতভাগ্য গৃহস্থের পরিবারবর্গ। তার মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ দুই-ই আছে। আছে ক্ষীণ-দৃষ্টি বৃদ্ধ, অপোগণ্ড শিশু এবং তরুণী কুলবধূ, যে কোনোদিন জেলে ঢোকা দূরে থাক, ঘরের বাইরে পা দেয় নি। হাতে ও কানে বাঁধা ব্যাণ্ডেজ—বালা এবং দুল ছিনিয়ে নেবার ক্ষতচিহ্ন। আর আছে প্রাপ্তযৌবনা কুমারী মেয়ে, যে গয়না হারায় নি, হারিয়েছে তার চেয়ে অনেক বড় জিনিস—তার দেহের সম্ভ্রম ও শুচিতা।

    হাকিম নির্দেশ দিলেন,—কাছে গিয়ে দেখুন, কাউকে চিনতে পারেন কিনা। আমি তাদের মুখের দিকে চেয়ে দেখেছি—সন্ত্রস্ত উদ্‌ভ্রান্ত দৃষ্টি, ক’দিন আগে যে দৃশ্য দেখেছে, এখনও বুকে চেপে আছে নাইট-মেয়ার বা শ্বাসরোধকারী দুঃস্বপ্নের মতো। সেই আতঙ্ক ও বিহ্বলতা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারে নি। সম্পূর্ণ বিভিন্ন এবং ভয়াবহ পরিবেশে এক পলক যাকে দেখেছে তাকে মনে করবার মতো মানসিক স্থৈর্য ফিরে আসে নি। তাছাড়া কাকে চিনবে, কেমন করেই বা চিনবে? জেল-হাজতে জড়ো-করা এই বিভ্রান্তিকর ঘটনার মধ্যে সেই মুখগুলো যদি থেকেও থাকে, এতদিনে সেখানে স্বাভাবিক ও ইচ্ছাকৃত কত অদল-বদল ঘটে গেছে। কারও গালভরা সযত্নলালিত দাড়ি, কারও মাথায় যথেচ্ছ বর্ধিত রুক্ষ চুল। কেউ পাজামা ছেড়ে ধুতি ধরেছে, কেউ বা ধার-করা আলোয়ানে আপাদমস্তক জড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাশছে। কার সাধ্য চিনে বার করে কারা সেই কাল-রাত্রির ধ্বংসলীলার নায়ক? সাক্ষীরা এসেছে আর একবার করে ঘুরে চলে গেছে। কেউ বা এতগুলো চোর- ডাকাতের কাছে ঘেঁষবার মতো সাহস সঞ্চয় করতে পারে নি। কোনো সহৃদয় হাকিমের বারংবার আশ্বাসে ও নির্বন্ধে দু-একজন যদি বা কারও দিকে আঙুল তুলেছে, সে হয় ভুল লোক, অর্থাৎ অন্য মামলার আসামী, নয়তো নিতান্তই অ্যাকসিডেন্টের বলি।

    আমি একপাশে বসে বসে দেখছি, আর প্রতিবারেই মনে হয়েছে ফাঁকতালে একটি চমৎকার প্রহসন দেখে নিলাম।

    .

    নকুল সাঁতরাকে টি. আই. প্যারেডের অগ্নিপরীক্ষার ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। যথারীতি পাস করে গেছে। খানাতল্লাশে মালপত্রও কিছু পাওয়া যায় নি। আরও তদন্ত দরকার। সাক্ষী খুঁজে পেতে কিংবা তৈরি করতে সময় চাই। যাঁর কোর্টে মামলা, সেই হাকিমটি হয়তো বেয়াড়া ধরনের, বেশি সময় দিতে চান না। তখন পুলিসের হাতে একমাত্র ব্রহ্মাস্ত্র ঐ বি. এল. কেস। কিছুদিনের মতো একবার গেঁথে ফেলতে পারলে তারপর ডাকাতি-মামলার সাজ-সরঞ্জাম ধীরে সুস্থে জোটানো চলবে।

    দশধারার সাক্ষী বিশেষ দুষ্প্রাপ্য নয়। হ্যাঁ, লোকটার চলাফেরা সন্দেহজনক, নেশাভাঙ করে, স্বভাব-চরিত্র ভালো নয়, খায়দায় ভাল, জামা কাপড়ের জলুস আছে, অথচ জমিজমা নেই, রুজি-রোজগারের ব্যাপারটাও রহস্যময়। কখনও রাজমিস্ত্রী, কখনও ছুতোর, কখনও কোন্ চটকলের সর্দার—এসব কথা কোর্টে গিয়ে বলবার মতো লোক জুটে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে এগুলো মিথ্যাও নয়। প্রায় সব গ্রামেই দুজন একজন এই জাতীয় ব্যক্তির দেখা মেলে, যাদের সম্বন্ধে সাধারণ শান্তিপ্রিয় গৃহস্থ নিজেকে ঠিক নিরাপদ মনে করতে পারে না। এখানে-ওখানে চুরি-ছ্যাঁচড়ামি, মাঝে মাঝে দু-একটা ছোটখাটো ডাকাতি, গ্রামাঞ্চলে যা ঘটে থাকে, তার পিছনে যে ঐ ক’টি লোক কলকাঠি নাড়ছে, চাক্ষুষ প্রমাণ না থাকলেও গ্রামবাসীরা সবাই তা জানে এবং বিশ্বাস করে। এহেন চীজ যত দূরে থাকে ততই মঙ্গল। ওদের মধ্যে কারও গায়ে যদি একবার ‘জেলে’র দাগ লেগে থাকে, তাহলে তো অবশ্যই শতহস্তেন—। এই মনোভাবকে কাজে লাগাতে পুলিসের বিশেষ বেগ পেতে হয় না।

    নকুলচন্দ্র হয়তো ঐ অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের একজন। কিংবা অন্য কোনো কারণে সে কিঞ্চিৎ আঞ্চলিক বিরাগ অর্জন করেছিল। তারই সুযোগ নিয়ে, গ্রাম্য দশজনের সাহায্যে পুলিশ তাকে দশধারার জালে আটকে ফেলে থাকবে।

    আসল কেস অর্থাৎ ৩৯৫ ধারা তখনও চলছে। চৌদ্দদিন অন্তর তারিখ পড়ে এবং নকুলকে তার জেলের পোশাক ছেড়ে জেলখানার ক্লোদিং-গোডাউনে তুলে রাখা তার নিজস্ব সম্পত্তি—ময়লা, ভ্যাপসা গন্ধভরা ধুতি, আর তার উপরে একটা অপেক্ষাকৃত ফরসা কোঁচকানো শার্ট চাপিয়ে লোহার-জাল-দিয়ে-ঘেরা সঙ্কীর্ণ জানালাওয়ালা কয়েদী গাড়িতে একগাদা আসামীর সঙ্গে ঠাসাঠাসি বোঝাই হয়ে কাছারিতে যেতে হয়। সমস্তটা দিন কোর্ট-লক-আপ্ নামক প্রায়-সবদিক-বন্ধ একটা ছোট্ট কামরায় কাটিয়ে সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসে জেল-গেটে। আসামী সেরেস্তার কেরানীবাবু ওয়ারেন্ট দেখে পরের তারিখটা জানিয়ে দেন। নকুল আবার সেই সকালে-ছেড়ে-যাওয়া নম্বর-দেওয়া জাঙ্গিয়া-কুর্তা পরে ধুতি আর কামিজটা গুদামে জমা দিয়ে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে চলে যায়।

    এমনি কয়েক মাস যাতায়াতের পর একদিন কেস উঠল এবং কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দী নিয়ে নিম্ন আদালত তাকে দায়রায় সোপর্দ করলেন। আবার দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা। শেষ পর্যন্ত সেসন্সে, অর্থাৎ জজের আদালতে বিচার শুরু হল। সেখানকার সুবিধা, একবার শুরু হলে শেষ হতে দেরি হয় না। দিনের পর দিন শুনানি চলে। নকুলকে নিয়ে মোট আসামী ছিল আটজন। বিচারে আটদিনও লাগল না। সাতদিনের দিন রায় দিলেন দায়রা জজ। সব আসামী বে-কসুর খালাস।

    ডক থেকে নামিয়ে গোটা দলটাকে কোর্ট ইন্সপেক্টরের অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। একজন সিপাই প্রত্যেকের হাতে বাড়ি ফিরে যাবার খরচ বাবদ কয়েক আনা করে পয়সা দিয়ে বুড়ো আঙুলের টিপ নিয়ে বলল, যা ব্যাটারা, খুব বেঁচে গেছিস।

    সকলে খুশীমুখে চলে গেল, নকুল দাঁড়িয়ে রইল এক কোণে। অন্য সকলের সঙ্গে সে-ও ডাকাতি-মামলায় ছাড়া পেয়েছে, একথা সে জানে। কিন্তু জজসাহেব কি তাকে দশধারার মেয়াদ থেকেও মুক্তি দিয়েছেন? কোর্টের সিপাই অবশ্য তাকেও চলে যেতে বলছে, টিপ নিয়েছে, পয়সা দিয়েছে, তবু কোর্টবাবুকে জিজ্ঞাসা না করে যাওয়াটা বোধহয় উচিত হবে না। কী জানি যদি ওদের ভুল হয়ে থাকে। এমন সময় একজন দারোগা ঘরে ঢুকলেন। এঁকে সে বরাবর কোর্টে হাজিরা দিতে দেখেছে এবং তার দলের আসামীরা চাপা গলায় যখন-তখন তাঁকে বাপান্ত করেছে, তা-ও শুনেছে। ইনিই এই কেসের আই. ও. অর্থাৎ তদন্তকারী পুলিশ-অফিসার। নকুলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ যোগাযোগ ঘটেনি। ইনি যখন তদন্তের ভার নিয়েছেন, তার আগেই সে দশধারায় জেলে আটকে গেল। খালাস পাবার পর যখন সে ডক থেকে নেমে আসছিল, হঠাৎ কানে গেল উকিল বলাবলি করছেন, জজসাহেব তাঁর রায়ে এই আই. ও.-টিকে খুব একহাত নিয়েছেন। তার দলের ক’জন আসামীও এই নিয়ে আনন্দ করছিল। মোড়ল গোছের একজন বলছিল, শালাকে নির্ঘাত ডিগ্রেড করে দেবে দেখিস! কথায় কথায় রুলের গুঁতো, তার মজাটা এবার টের পাবেন বাছাধন

    আই. ও. যখন ঘরে ঢুকলেন, নকুল আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, তাঁর মুখখানা আষাঢ়ের মেঘের মতো থমথম করছে। হঠাৎ তার দিকে নজর পড়তেই তেড়ে উঠলেন, তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস?

    নকুল ভয়ে ভয়ে বলল, আজ্ঞে, আমাকে কি একদম খালাস দেওয়া হয়েছে?

    —ন্যাকামি হচ্ছে! মুখ ভেংচে বললেন দারোগাবাবু, ‘আমাকে কি একদম খালাস দেওয়া হয়েছে’? তার মানে, কিছু একটা হাতাবার তালে আছ?

    বাবুটি যে কারণে ভিতরে ভিতরে তেতে আছেন, সেটা বুঝতে পেরে নকুলেরও বোধহয় ওঁকে নিয়ে একটু মজা করবার ইচ্ছা হল। বলল, এখানে কী এমন সোনাদানা পড়ে আছে বাবু যে হাতাবো?

    —বটে! আবার রসিকতা হচ্ছে! ছাড়া পেয়ে বড্ড তেল হয়েছে দেখছি, বলে হঠাৎ চোখ পাকিয়ে গর্জে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে যে বাক্যটি নির্গত হল, শোনাবার পর নকুলও মেজাজ রাখতে পারল না, বেশ চড়া সুরে বলল, কেন মিছিমিছি মুখখারাপ করছেন? আপনার সঙ্গে তো আমি—

    কথাটা শেষ করবার আগেই দারোগাবাবু ‘তবে রে’ বলে পাশের টেবিলে যে রুলটা ছিল, তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং নকুল যতক্ষণ প্রাণের দায়ে ঘর ও বারান্দা পেরিয়ে মাঠে গিয়ে না পড়ল, ততক্ষণ সেটা সমানে চালিয়ে গেলেন। ভিতরে অনেক জ্বালা জমে ছিল, তার খানিকটা বোধহয় মিটল।

    নকুল লিখেছে, ‘সেদিন দারোগার উপর যত না রাগ হইয়াছিল, তাহার বেশি হইল নিজের উপর। বড় বেশি সাধু হইতে গিয়াছিলাম, হাতে হাতে তাহার ফল পাইলাম। কোনোরকমে উঠিয়া ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরিলাম। কয়েদীগাড়ি তাহার আগেই চলিয়া গিয়াছে।’

    পরদিন সন্ধ্যার দিকে পুলিস গিয়ে নকুল, সাঁতরাকে গ্রেপ্তার করল। তার একটু আগেই সে বাড়ি পৌঁছেছে। বৌ দুটো ভাতে-ভাত ফুটিয়ে দেবার আয়োজন করেছিল, তখনও নামানো হয় নি।

    অপরাধটা কী? জানতে চেয়েছিল নকুল। পুলিসের জমাদার সরাসরি জবাব দেয় নি, হেসে বলেছিল, ‘ব্যাটা পয়লানম্বর বুরবক! ভাগলিই যদি, দু-দিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে কী হয়েছিল?’ কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া বেঁধে জেল-গেটে যখন নিয়ে গেল, জেলের বাবুরাও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। একজন এসকেপড্ প্রিজনার, অর্থাৎ, পলাতক কয়েদী এত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, তাঁরা মোটে আশা করেননি। একটা ছিপে-গাঁথা মাছও তো ছিপওয়ালাকে খানিকক্ষণ ল্যাজে খেলিয়ে হয়রান না করে ডাঙায় ওঠে না!

    ল্যাজে না খেলালেও নকুল সাঁতরার একটা কৃতিত্ব আছে। তার এই এসকেপ্ উপলক্ষ করে জেল আর পুলিসে বেশ খানিকটা খণ্ডযুদ্ধ বেধে গিয়েছিল এবং তাতে শেষ পর্যন্ত হার হয়েছিল পুলিসের। ব্যাপারটা ঠিক কী নিয়ে বেধেছিল, নকুল স্পষ্ট করে বলতে পারেনি। যেটুকু আভাস দিয়েছে, তার থেকেই আমি বুঝতে পারছি।

    কোনো উপযুক্ত (আইনের ভাষায় কম্‌পিটেণ্ট) কোর্টের লিখিত নির্দেশ ছাড়া জেল কাউকে আটকে রাখতে পারে না। এ নির্দেশপত্রটির নাম ওয়ারেন্ট। যে-সব লোক বিচারাধীন, অর্থাৎ হাজতবাস করছে, তারা যখন কোর্টে যায় তাদের ওয়ারেন্টও ঐ সঙ্গে পুলিসের জিম্মায় গছিয়ে দেওয়া হয় এবং যখন ফিরে আসে, জেল সেটা বুঝে নেয়। যে লোকের একটা মামলায় মেয়াদ হয়ে গেছে, আরও মামলা রয়েছে, তাদের ওয়ারেন্টের পিঠে জেলকে বেশ স্পষ্ট করে লিখে দিতে হবে—’কনভিক্ট; নট টু বি রিলিজ্‌ড্ ফ্রম কোর্ট’—’দণ্ডিত কয়েদী; সুতরাং কোর্ট থেকে ছাড়া চলিবে না।’ এই উক্তিটির নীচে স্বয়ং জেল-সুপারের সই থাকবে।

    নকুল সাঁতরা ছিল এই শেষের দলে। আগে থেকেই সে জেল খাটছিল। সেদিন ডাকাতি-মামলাটা ফেঁসে যাবার পর কোর্ট-পুলিসের হয়তো সেটা খেয়াল হয়নি। তাকেও তার সহ-আসামীদের সঙ্গে বিদায় করে দিয়েছিল। সে বিদায় ‘জেল হইতে বিদায়’ কিনা, ভালো করে জেনে নেবার জম্যে সাঁতরার প্রতীক্ষা এবং তার পরেই আই. ও. বাবুর ‘রুলে’র আক্রমণ।

    সন্ধ্যার পর কাছারি-ফেরত আসামীদের সঙ্গে ওয়ারেন্ট মিলিয়ে নিতে গিয়ে জেলের কেরানীবাবু যখন হাঁক দিলেন ‘নকুলচন্দ্র সাঁতরা’, কারও সাড়া পাওয়া গেল না। কে একজন বলল, সে তো খালাস হয়ে গেছে।

    —খালাস হবে কি হে! ও তো কয়েদী!

    —তাই তো!

    জেল থেকে জরুরী চিঠি গেল পুলিসের কাছে—রং রিলিজ ফ্রম্ কোর্ট। দণ্ডিত কয়েদীকে কাছারি থেকে ভুল করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোর্ট-পুলিস কেমন করে জানবে সে দণ্ডিত? কেন, ওয়ারেন্টের পিঠে কী লেখা আছে? কোর্ট-ইন্সপেক্টরের অফিস থেকে প্রতিবাদ এল—ও লেখা প্রক্ষিপ্ত, আগে ছিল না। ঐ দিন খালি ওয়ারেন্ট ফিরে পাবার পর জেল ওটা বসিয়ে দিয়েছে।

    এসব বাদানুবাদের ফয়সালা হবার আগেই অবশ্য নকুল সাঁতরার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়ে গেছে।

    নকুলের বিরুদ্ধে নতুন মামলা দায়ের হল—এসকেপিং ফ্রম্ ল-ফুল কাস্টডি— আইনসঙ্গত হেপাজত থেকে পলায়ন। যথারীতি চার্জ গঠন এবং অন্যান্য পর্ব শেষ করে হাকিম প্রশ্ন করলেন—তোমার কিছু বলবার আছে?

    আসামী যা যা ঘটেছিল তার আদ্যন্ত বর্ণনা দিয়ে গায়ের দাগগুলো যেমনি দেখাতে যাবে কোর্ট-ইন্সপেক্টর হেঁকে উঠলেন, দিস্ ইজ্ ইররেলেভেন্ট ইওর অনার। আসামী যা বলছে, তার সঙ্গে বর্তমান কেসের কোনো সম্পর্ক নেই। সে একজন দণ্ডিত কয়েদী, এবং তার জেলের মেয়াদ শেষ হয় নি। পুলিসের পক্ষে যদি কোনো ত্রুটি হয়েও থাকে, তার সুযোগ সে নিতে পারে না। পুলিসের গাফিলতি দ্বারা, কয়েদী হিসেবে তার যে দায়িত্ব, তার খণ্ডন হয় না। সে দায়িত্ব পালনের একমাত্র পথ ছিল জেলে গিয়ে ধরা দেওয়া, টু সারেনডার অ্যাট্ দি জেল-গেট!

    সম্ভবত এই যুক্তি গ্রহণ করেই এস. ডি. ও. তাকে ‘ল-ফুল কাস্টডি’ থেকে পালাবার অপরাধে দু-মাসের জেল দিয়ে দিলেন।

    নকুল সাঁতরার শেষ চিঠির শেষ অনুচ্ছেদে একটি প্রশ্ন এবং সেটি আমার উদ্দেশে।

    ‘না পলাইয়াও যখন পলাইবার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইলাম, তখন পলাইতে আমার কি বাধা ছিল? কী দরকার ছিল. আই. ও. বাবুর রুল্ খাইবার? ইহার পরেও কি আপনি জেলের কয়েদীর সৎ এবং সাধু হইবার উপদেশ দিতে চান?’

  • পাঁচ

    পাঁচ

    কোনো প্রসিদ্ধ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ অধ্যাপক একবার আমার জেল ‘ভিজিট’ করতে এসেছিলেন। দিগ্‌গজ ব্যক্তি। যেমনি পাণ্ডিত্য, তেমনি ভূয়োদর্শন। দু-দুটো ‘ওলজীচে ডক্টর—ক্রিমিনোলজী এবং পিনোলজী। অর্থাৎ একাধারে অপরাধতত্ত্বের ও দণ্ডবিধানে বিশেষজ্ঞ। আমার চাকরি তখন শেষ হব-হব করছে। বহু জেল ঘুরে এবং ঘেঁটে ‘বিশেষজ্ঞ’ আখ্যা না পেলেও অভিজ্ঞতার ব্যাঙ্কে মোটা সঞ্চয়ের দাবী করতে পারি। সম্ভবত সেই কারণেই কারাবিভাগের কর্তারা তাঁকে আমার স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। আমিও বেশ কয়েক দফা বাক্‌চক্রের জন্য তৈরী হচ্ছিলাম, সরকারী পরিভাষায় যার নাম রাউণ্ড অব টক্স। বলা বাহুল্য অন্যদিকে যাই হোক, এই একটা বিষয়ে আমরা কোনো দেশের কারও চাইতে কম যাই না।

    কিন্তু ভদ্রলোক আমাকে রীতিমত নিরাশ করলেন। নিজেও কোনো পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা করলেন না, আমাকেও তার সুযোগ দিলেন না। তাঁর কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে দু-চারটি কথাবার্তার পর, প্রথম দিন থেকেই ‘ফিল্ড-ওয়ার্কে’ নেমে পড়লেন। ‘অ্যাডমিশন রেজিস্টার’ (যার মধ্যে কয়েদীদের নাম ধাম এবং যাবতীয় বিবরণের ফিরিস্তি থাকে ) চেয়ে নিয়ে, তার থেকে বেছে বেছে কতগুলো নাম সংগ্রহ করে তাদের সঙ্গে দেখাশুনো, আলাপ-সালাপ শুরু করলেন।

    কোন্ মন্ত্রবলে তিনি জাতি, বর্ণ, দেশ ও ভাষার বর্ম ভেদ করে ‘অপরাধী’ নামক প্রাণীর প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছে যেতেন, সেখান থেকে কেমন করে কি তথ্য সংগ্রহ করতেন, সে-সব কথা এখানে আলোচ্য নয়। দু-সপ্তাহের উপর আমার জেলে কাটিয়ে এখান থেকে কি অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলেন, যাবার আগে তারই আভাসস্বরূপ যে কথাটি বলেছিলেন, সেইটুকুই আমার বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘যাকে জাত-ক্রিমিনাল বলে, আপনার এখানে একটাও পেলাম না। আপনার এখানে বলি কেন, যে-ক’টা ইণ্ডিয়ান জেল ঘুরলাম—তা কম ঘুরি নি, সবখানেই তাদের সংখ্যা বড় কম।’

    ‘জাত-ক্রিমিনাল’ বলতে তিনি বোধহয় বোঝাতে চেয়েছিলেন—’ক্রাইম্’ যাদের ধর্ম এবং প্রকৃতি। হঠাৎ একদিন ঝোঁকের মাথায়, আবেগের বশে কিংবা প্রতিহিংসার তাড়নায় খুন করে বসল, বাহাদুরি দেখাবার জন্য দল বেঁধে ডাকাতি করে এল, সহসা কোনো অরক্ষিত স্ত্রীলোককে পেয়ে কামেচ্ছা মিটিয়ে নিল, কিংবা অপরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু টাকাকড়ি আত্মসাৎ করে গা-ঢাকা দিল—এই জাতীয় অপরাধীকে তিনি, ‘ক্রিমিনাল’ বলে যে একটা জাত আছে, তার মধ্যে ফেলতে চান নি। তাঁর মতে ওরা সব ‘ক্যাজুয়াল অফেনডার’। আসল ক্রিমিন্যাল তারা, ‘ক্রাইম্’ যাদের ধ্যান জ্ঞান সাধনার বস্তু, মজ্জাগত সংস্কার কিংবা অত্যাজ্য জীবন-দর্শন।

    ‘এখানে যাদের দেখলাম’, বলেছিলেন অধ্যাপক, ‘তাদের বেশির ভাগই অবস্থার দাস, যা কিছু করেছে, লোভে বা বিপাকে পড়ে কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে। তার পেছনে জীবনের কোনো গভীর প্রেরণা নেই। সত্যিকার ক্রিমিনাল কর্মযোগীর মতো নিষ্কাম, নিরুদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য হয়তো একটা থাকে, কিন্তু সেটা অজুহাত মাত্র, অনেক সময়ে ওটা নিজের মনকে ভোলাবার প্রয়াস। আসলে “ক্রাইম্” তার কাছে এক ধরনের ওয়ার্ক অব আর্ট, শিল্পীর সৃষ্টি। ইচ্ছা করে যে করে তা নয়, ভিতর থেকে কে একজন ঠেলে এগিয়ে দেয়, না করে উপায় নেই।’

    সেদিন তার কথা শুনতে শুনতে আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ রাজাবাহাদুরের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। হয়তো তার কারণ, অধ্যাপক যাদের সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন, তাদের সঙ্গে তাঁর কোথায় যেন মিল আছে। কিংবা হয়তো এমনিই মন কখন কি ভাবে, কেন ভাবে তার কি কোনো হেতু আছে? থাকলেও তাকে খুঁজতে যাওয়া নিছক বিড়ম্বনা। সেসব ‘কেন’র পিছনে না ছুটে যে লোকটিকে সেদিন মনে পড়েছিল, তার প্রসঙ্গটা কিঞ্চিৎ সবিস্তারে বলবার চেষ্টা করি।

    রাজাবাহাদুরের সঙ্গে দেখা আমার চাকরি-জীবনের প্রথম অধ্যায়ে। তখনও জেলের হাল-চাল, আইন-কানুন পুরোপুরি ধাতস্থ হয়নি। কারাবাসী ও কারাকর্মীর ভিতরে যে দুস্তর ব্যবধান, সেটা ঠিক বজায় রাখতে পারিনি। ‘প্রিজনার’ হিসাবে এই মানুষটিকে যতটা দূরে রাখা দরকার, তার চেয়ে একটু বেশী কাছে এসে পড়েছিলাম। তার প্রাথমিক কারণ বোধহয় তাঁর রূপ। নারীপুরুষ নির্বিশেষে রূপের যে একটি সর্বজনীন আকর্ষণ আছে, রাজাবাহাদুরকে দেখেই সেটা প্রথম অনুভব করেছিলাম। অতুলনীয় অঙ্গ-সৌষ্ঠব। দীর্ঘ উন্নত দেহ, প্রশস্ত ললাট, আয়ত চক্ষু। কাঁধ এবং বাহুযুগলের দিকে চেয়ে মনে হয়েছিল, ‘বৃষস্কন্ধ’ ও ‘শালপ্রাংশু’ বলে যে দুটি বিশেষণ কালিদাস ব্যবহার করে গেছেন, তার মধ্যে কোনো কবিজনোচিত অত্যুক্তি নেই। আর একটা কথা মনে হয়েছিল, এ দেহের প্রতি কণায় শোভাকে ছাড়িয়ে গেছে সম্ভ্রম, সৌষ্ঠবকে ছাপিয়ে উঠেছে আভিজাত্য। গিরীনদা বলেছিলেন, ‘সত্যিই রাজাবাহাদুর — Every inch an aristocrat!’ আমাদের অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ওয়ার্ডার জোস্-এর উপর ভার পড়েছিল ওঁকে সেল্‌-এ পৌঁছে দেবার। ফিরে এসে বলেছিল, Bloody Mountain. বিশেষণ ও প্রকাশের ভঙ্গিটা কিঞ্চিৎ অমার্জিত হলেও, এক কথায় এর চেয়ে যথার্থ পরিচয় বোধহয় আর হতে পারত না। যখনই দেখেছি মনে হত, লোকটা যেন গিরিশৃঙ্গের সমস্ত মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    রাজাবাহাদুর খুন-মামলার আসামী। ভ্রাতৃহত্যা। অব্যবহিত উপায়ে বিষপ্রয়োগ। কিন্তু তার প্রক্রিয়া অত্যাশ্চর্য ও অভিনব। বিষ সংগ্রহের সুদীর্ঘ এবং জটিল ইতিহাস অনুধাবন করতে গিয়ে পুলিস যে সব তথ্য উদ্ধার করেছিল, তার থেকে চিররহস্যাবৃত মানব-মনের একটি অনাবিষ্কৃত গোপন কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। সবটুকু তখনও উন্মোচিত হয়নি। যেটুকু দৃশ্যমান, তাতেই আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। একজন মানুষকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার জন্যে আর একজন মানুষের কি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, তার রূপায়ণে কি গভীর অভিনিবেশ, কি দুর্জয় নিষ্ঠা, কি ক্লান্তিহীন সাধনা! শুধু তাই নয়, যে মস্তিষ্ক সেই গুপ্ত চক্রান্তের প্রতিটি পদক্ষেপ পরিচালিত করেছে, যে ধীর স্থির শাণিত কূটবুদ্ধি প্রতি স্তরে তার স্বাক্ষর রেখে গেছে, তা দিয়ে অনেক কম আয়াসে একটা গোটা রাজ্য ছিনিয়ে আনা যেত। আর এখানে সেই বিপুল প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য ছিল একটিমাত্র নিরীহ মানুষের প্রাণটাকে ছিনিয়ে নেওয়া!

    আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, এই হত্যাযজ্ঞের অন্তর্নিহিত প্রেরণা সেই চিরন্তন রাজ্য- লোলুপতা, ক্ষমতা ও বিত্তের অধিকার-লিপ্সা, অনাদিকাল থেকে ছোট-বড় রাজপরিবারে যা বহু ভ্রাতৃহত্যা পিতৃহত্যার ইন্ধন যুগিয়ে এসেছে। তাই যদি হয়, সেই ঈপ্সিত বস্তুটিকে অনায়াসে আয়ত্ত করবার পথে এখানে তো কোনো বাধা ছিল না। যাকে হত্যা করা হল, সে তো স্বেচ্ছায় তার সব স্বত্ব ও স্বামিত্ব থেকে নিঃশব্দে সরে দাঁড়িয়েছিল। উনিশ বছরে পা দিয়েই সামান্য মাসোহারার বিনিময়ে তার অংশের সমস্ত সম্পত্তি বড় ভাইকে লিখে দিয়েছিল। পৈতৃক প্রাসাদে বাস করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত রাখেনি। সব ছেড়ে বেরিয়ে চলে এসেছিল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের দু-চারটি তুচ্ছ জিনিস ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে আনেনি। কোলকাতার এক অখ্যাত গলির ছোট ভাড়া-বাড়িতে লেখাপড়া নিয়ে দিন কাটাচ্ছিল। বিয়ে করেনি। করবার ইচ্ছাও ত্যাগ করেছিল। যাতে করে তার কোনো উত্তরপুরুষ, সুদূর ভবিষ্যতে, সে যা ছেড়ে দিয়ে চলে এল, তারই দাবী নিয়ে সেই প্রাসাদের দ্বারে গিয়ে দাঁড়াতে না পারে।

    উত্তরাধিকারের সঙ্গে জড়িত দুটিমাত্র জিনিস সে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল। একটি পিতার আমলের ভৃত্য গঙ্গাচরণ, আর একটি তারই মুখের ডাক—ছোট কুমার’। প্রথমটি তাকে ছাড়েনি, দ্বিতীয়টি সে অনেক বকাবকি করেও ছাড়াতে পারেনি। ঐ নামটুকু ছাড়া ‘কুমারত্বের’ আর কোনো নিদর্শন তার জীবনযাত্রার কোনোখানেই দেখা যায় নি। স্বভাবে নিতান্ত নিরীহ, নির্বিরোধ, সরল ও অমায়িক। চালচলনে অতিশয় সাদাসিদে। বই ছাড়া আর কোনো নেশার বালাই নেই। বন্ধু-সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ অতি ক্ষীণ। যেটুকু ছিল, তার মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ঘটবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও দেখা দেয়নি। সে যে কোনো দিন কারও আক্রোশ বা বিদ্বেষের পাত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে, একথা কে ভেবেছিল?

    তবু তাকেই একদিন আততায়ীর হাতে প্রাণ দিতে হল। আকস্মিকভাবে নয়, তার পিছনে কি বিপুল আয়োজন! সেই একই প্রশ্ন আবার আসছে—কেন? কি প্রয়োজন ছিল এই ছেলেটিকে অত কাণ্ড করে মেরে ফেলবার? কি উদ্দেশ্য?

    সে প্রশ্ন আজও আমার কাছে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পুলিস কিংবা আদালত সেই নিগূঢ় সত্যে পৌঁছতে পারেনি। কোনো মনস্তত্ত্ববিদ হয়তো এর উপরে কিছুটা আলোকপাত করতে পারেন, কিন্তু তাঁকেও স্বীকার করতে হবে, ‘এটা হয় এই পর্যন্ত জানি, কেন হয় তা জানি না।’

    আমার যেটুকু আবিষ্কার, তার মূলসূত্র রাজাবাহাদুরের নিজের উক্তি। দীর্ঘদিন পরে যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসবার সৌভাগ্য লাভ করেছি, তখন একদিন কথাচ্ছলে বলেছিলেন। মনে আছে, সেদিন আবিষ্কারের উল্লাসে আমি আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। এত চেষ্টা, এত সাধ্য-সাধনা, এত দীর্ঘদিনের গবেষণা ও অনুসন্ধানে যা কেউ পায়নি, আমি তাই পেলাম। কলম্বাসের চেয়েও আমি ভাগ্যবান। তারপর যেমন বয়স বেড়েছে, জীবনে অনেক কিছু দেখেছি এবং শুনেছি, ঘা খেয়ে খেয়ে অনেক কিছু শিখেছি, তখন মনে হয়েছে, রাজাবাহাদুর সেদিন যা বলেছিলেন, তার মধ্যে কপটতা হয়তো ছিল না, কিন্তু সেটাই যে সত্য সে-বিষয়ে কি নিজেই নিশ্চিত ছিলেন? আমার মনে হয়, ছিলেন না। উকিল, হাকিম, পুলিস এবং আমাদের মতো তিনিও একজন অনুসন্ধানী মাত্র। নিজের মনের ভিতরটা হাতড়ে দেখতে গিয়ে ঐ উত্তরটা পেয়ে গিয়েছিলেন। সেক্সপীয়রের ওথেলো নাটকের ভিলেন ইয়াগো মাঝে মাঝে নিজের কাছে তার চিন্তা ও আচরণের একটা কৈফিয়ত খাড়া করবার চেষ্টা করেছে। সেই সম্পর্কে একজন প্রসিদ্ধ সমালোচক বলেছেন—motive hunting of a motiveless malignity. আমার মনে হয়েছে, কথাটা রাজাবাহাদুরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটাও motive-hunting ছাড়া আর কিছু নয়। নিজের উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায়কে খুঁজে বের করবার চেষ্টা, আত্মানুসন্ধান—আসলে হয়তো কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। নিছক নিরুদ্দেশ্য ম্যালিগনিটি কিংবা আর কিছু।

    তবু রাজাবাহাদুরের সেই স্বীকারোক্তি আজ আর আমি গোপন করতে চাই না। যথাসময়ে প্রকাশ করব। তার আগে আরও কিছু বলার আছে। বিশেষ করে আর একজনের কথা, যার বিস্ময়কর প্রতিভার সুবর্ণ সংযোগ না ঘটলে রাজাবাহাদুরের পরিকল্পনা সার্থক হতো না। সে একজন তরুণ ডাক্তার। নাম ধরুন নিশানাথ লাহিড়ী।

    নিশানাথ মেডিক্যাল কলেজের কৃতী ছাত্র। সেখানে তার প্রধান অধীত বিষয় ছিল জীবানুতত্ত্ব। বেরিয়ে এসে তাই নিয়েই গবেষণা শুরু করেছিল। অণুবীক্ষণের ভিতর দিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কিন্তু মহাশক্তিধর মারীকীটের সন্ধান। উপযুক্ত সহায় ও সুযোগ পেলে এই তরুণ বিজ্ঞানী মানব-কল্যাণে এই বিশেষ ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেখিয়ে একদিন বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠালাভ করবে, সে বিষয়ে তার অধ্যাপকেরা নিঃসন্দেহ ছিলেন। কিন্তু কোত্থেকে আসবে সেই সুযোগ? কে হবে সেই সহায়? নিজের সঙ্গতি বলতে কিছুই ছিল না। বরং পাস করে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ মা-বাপ, অপোগণ্ড ভাইবোন স্ত্রী ও একটি শিশুকন্যার ভার কাঁধে এসে চেপেছিল। নিশানাথ বুঝেছিল, ‘রিসার্চ’-এর বিলাস তাকে ছাড়তে হবে। ল্যাবরেটারী ছেড়ে নামতে হবে রোজগারের ধান্দায়।

    সে পথও সহজ বা সরল নয়। তখনকার দিনে চাকরি মেলা দুষ্কর। আর প্র্যাকটিস? তার পিছনেও অনেকখানি প্রস্তুতির প্রয়োজন। সেই সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আনুকূল্যের আশা নিয়ে নিশানাথ একদিন হাজির হল তার হিতৈষী মুরুব্বি এবং প্রাক্তন শিক্ষক ডাক্তার মুস্তাফির কাছে। মুস্তাফি নামী ডাক্তার এবং রাজাবাহাদুরের গৃহ-চিকিৎসক। লাহিড়ী যখন গিয়ে পৌঁছল, তিনি তখন বেরোবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কয়েক সেকেণ্ড কি ভেবে নিয়ে বললেন, গাড়িতে ওঠো। নিশানাথ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতেই যোগ করলেন, “চল না!’—বলে সোজা নিয়ে গেলেন রাজাবাহাদুরের দরবারে। মোটামুটি একটা ক্লিনিক কিংবা ডিসপেনসারি সাজিয়ে বসবার মতো কিছু সাহায্য বিকল্পে একটা চাকরি—এর বেশি কোনো প্রত্যাশা মুস্তাফির মনেও ছিল না। কিন্তু ভাগ্যচক্রের কি আশ্চর্য বিবর্তন! ‘ছেলেটি’র প্রতিভার পরিচয় পাবার পর রাজহস্তের বদান্যতা আরও অনেকখানি প্রসারিত হল। সহকারী গৃহ-চিকিৎসক হিসাবে একটা মাসমাইনে চাররির ব্যবস্থা তখনই হয়ে গেল। রাজাবাহাদুর বিনীত মৃদু স্বরে মুস্তাফিকে বললেন, আত্মীয়-পরিজন, জ্ঞাতি- গোষ্ঠী, লোক-লস্কর নিয়ে পরিবারটি তো আমার ছোট নয়, স্যার। কারও না কারও একটা কিছু রোজই প্রায় লেগে আছে। সব ব্যাপারে আপনাকে ধরে টানাটানি—তার চেয়ে এ ভালোই হল। উনি একবার করে ঘুরে যাবেন। তেমন তেমন প্রয়োজন দেখা দিলে আপনি তো রইলেনই।

    এটা গেল প্রাথমিক বন্দোবস্ত। পরের পর্বটাই আসল। নিরুদ্বিগ্ন মন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবার মতো একটি সুসজ্জিত ল্যাবরেটরী। রাজাবাহাদুর খাজাঞ্চিকে ডেকে তখনই একটা মোটা টাকার চেক লিখে আনতে বললেন এবং নিশানাথের দিকে ফিরে বললেন, এটা শুধু ঘর আসবাবপত্তর আর আনুষঙ্গিক যা কিছু দরকার তার জন্যে। যন্ত্রপাতি বা রিসার্চের দরুন আর যা যা প্রয়োজন, তার একটা লিস্টি করে ফেলুন। কোনো রকম টানাটানি করবেন না। যেখানকার যেটা সেরা জিনিস বেছে নেবেন। দামের দিকটা আপনাকে ভাবতে হবে না। আমার ম্যানেজার এখন বিলেতে আছে। লিস্টিটা তার কাছে পাঠিয়ে দেবো। নিজে দেখে-শুনে সংগ্রহ করে সামনের ওপর প্যাক করিয়ে একেবারে সঙ্গে নিয়ে আসবে। কি বলেন স্যার, এইটাই ভালো ব্যবস্থা নয়? ও-সব ডেলিকেট জিনিস, সাবধানমতো নাড়াচাড়া না করলে পথেই কোনোটা খারাপ হয়ে যেতে পারে।

    শেষে কথাগুলো ডাক্তার মুস্তাফির উদ্দেশে। তিনি আবেগের সুরে বললেন, আমি আর কি বলবো, রাজাবাহাদুর? বলবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আপনার এই মহৎ দান-

    -–এই দেখুন, আপনিও যদি অমন করে বলেন স্যার, তাহলে তো বড় মুশকিল। দানটান কিছু নয় ডক্টর মুস্তাফি। একরাশ পড়ে পাওয়া টাকা ব্যাঙ্কে বসে বসে পচছে। একটা ছেলে নেই যে তার জন্যে রেখে যাবো। একটা মাত্র ভাই, সেও তো দেখলাম বিবাগী হয়ে বেরিয়ে গেল। কি হবে টাকা দিয়ে? তবু যদি এই রকম একটি প্রভিভাবান ছেলেকে একটু দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়, শুধু ওর নয়, দেশের-দশের মঙ্গল হবে। এই সুযোগটুকু যে আপনি আমাকে পাইয়ে দিলেন, তার জন্যে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আচ্ছা তাহলে ঐ কথাই রইল লাহিড়ী। তোমাকে কিন্তু ভাই আমি ‘তুমি’ বলেই ডাকবো।

    —নিশ্চয় নিশ্চয়, তুমি বলবেন বৈকি। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন ডাক্তার মুস্তাফি। একেবারে ছেলেমানুষ, তাছাড়া আমার ছাত্র।

    —শুধু ছাত্র নয় স্যর, আপনার উপযুক্ত ছাত্র।

    মাসখানেকের মধ্যেই ইউরোপ থেকে কয়েকটি সদ্য-আবিষ্কৃত মহামূল্য যন্ত্র এসে পৌঁছল। একেবারে আধুনিক সজ্জায় সজ্জিত হল ল্যাবরেটরী। রাজাবাহাদুর একদিন এসে দেখে গেলেন। নিশানাথ তখন কাজ করছিল, রাজ-অতিথিকে সসম্মানে অভ্যর্থনা করে একটি একটি করে প্রতিটি যন্ত্রের বৃত্তি সম্বন্ধে একটা মোটামুটি ধারণা দিয়ে দিল। তিনি মন দিয়ে শুনলেন। যাবার সময় বললেন, কোথাও কোনো ত্রুটি নেই তো? যা চেয়েছিলে, সব পেয়েছ?

    —তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি রাজাবাহাদুর। আশীর্বাদ করুন, যেন সেই পাওয়ার গৌরব বজায় রাখতে পারি।

    রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গীর মধ্যে একটি অরাজোচিত বিনম্র সঙ্কোচ সর্বদাই লেগে আছে। যেন তাঁর দৈবায়ত্ত রাজপদ এবং তার বাহক এই বিশাল দেহটার জন্যে তিনি সকলের কাছেই লজ্জিত। ব্যবহার ও কথাবার্তার মাধুর্য দিয়ে ঐ দুটি বস্তুকে যতখানি আড়াল করে রাখা যায় তারই জন্যে সচেষ্ট। নিশানাথের মতো একান্ত আশ্রিতজনের কাছেও তাঁর কুণ্ঠার সীমা নেই। তার কথায় অত্যন্ত লজ্জা পেয়েছেন এমনিভাবেই দাঁতে জিভ কেটে মাথা নেড়ে বললেন, না না, ও ‘কথা বলো না তোমাকে আশীর্বাদ করবার মতো স্পর্ধা আমার নেই। প্রাণভরে শুভেচ্ছা জানাই, তুমি অনেক বড় হও, আমাদের সকলের মুখ উজ্জ্বল কর, এই প্রার্থনা করি।

    বছর দেড়েক কেটে যাবার পর নিশানাথ তার গবেষণার এমন একটা স্তরে এসে পৌঁছল যেখানে বিশেষজ্ঞের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তেমন ব্যক্তি এদেশে অত্যন্ত দুর্লভ। দু-একজন যাঁরা আছেন, তাঁরা অন্য ক্ষেত্রে ব্যস্ত। ঐ বিশেষ গবেষণার উপযোগী কোনো ল্যাবরেটরীও তখন কোলকাতায় নেই। পশ্চিমভারতের একটি প্রসিদ্ধ ইনস্টিটিউট্-এ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়া যেতে পারে। উচ্চাঙ্গ রিসার্চে সাহায্য করার মতো বিদেশী বিজ্ঞানীও আছেন ক’জন। কিন্তু সেখানে জায়গা পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। অত্যন্ত নামী লোকের জোরালো সুপারিশ চাই। ডাক্তার মুস্তাফিকে কত আর বিরক্ত করা যায়? তাছাড়া তাঁর কথা কতখানি টিকবে, তাই বা কে জানে? সেদিক দিয়ে সুরাহা দেখা দিলেও আর্থিক প্রশ্নটা আরও বড়। অনেক টাকার দরকার।

    ওখানকার খরচ, কতদিন থাকতে হবে ঠিক নেই—তার উপরে কোলকাতার সংসারের ব্যয়ভার। অর্থাৎ চাকরিটি খোয়ালে চলবে না।

    রাজাবাহাদুরের কাছে কথাটা কেমন করে পাড়া যায়, এইসব যখন ভাবছে, হঠাৎ তাঁর কাছ থেকে ডিনারের নিমন্ত্রণ এসে হাজির। উপলক্ষের উল্লেখ নেই। অনেক সময়েই থাকে না। বিনা উপলক্ষে যখন-তখন বন্ধুবান্ধব এবং আশ্রিত-পরিজনদের ভুরিভোজে আপ্যায়িত করা ওঁর একটা বিলাস।

    কিন্তু এবারে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল নিশানাথ, নিমন্ত্রিত সে একা। খাবার যেখানে দেওয়া হল, সেটাও ভোজনশালা নয়, সদর ও অন্দরমহলের মাঝামাঝি রাজাবাহাদুরের নিজস্ব গোপন-মহলের একটি ছোট ঘর। তিনিও বসলেন অতিথির মুখোমুখি। মাঝখানে টেবিলের উপর খাবার সাজানো। উপকরণ যথারীতি, অর্থাৎ বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যের অভাব নেই। অভাব পরিবেশকের। সেই জমকালো পোশাকের তকমা-আঁটা ‘বয়’ বা ওয়েটারদের কোথাও দেখা গেল না। রাজাবাহাদুর তাঁর সেই নিজস্ব মধুর হাসির সঙ্গে মৃদু কণ্ঠ মিলিয়ে বললেন, রকম-সকম দেখে তুমি নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়ে গেছ?

    নিশানাথ অস্বীকার করল না—তা একটু হয়েছি।

    রাজাবাহাদুরের মুখে সেই হাসিটি মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার স্নিগ্ধ রেখাগুলো লেগে রইল। কয়েক মুহূর্ত বিরতির পর বললেন, অনেকদিন থেকে ভাবছি, একটা বেলা দুজনে একসঙ্গে বসে খাবো, সেখানে আর কেউ থাকবে না, এমনি কি বয়-বেয়ারার উৎপাত পর্যন্ত না। তোমার যেটি ভালো লাগবে, আমি নিজের হাতে পাতে তুলে দেবো। প্ল্যানটা খুব অরিজিন্যাল, কি বল?

    নিশানাথ বোধ হয় একটু বেশি অভিভূত হয়ে পড়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারল না। রাজাবাহাদুরও সেজন্যে অপেক্ষা করলেন না। বললেন, কিন্তু গোড়াতে কাজটা যত সোজা বলে মনে করেছিলাম, এখন দেখছি তা মোটেই নয়। ধর এই পদার্থটি—কি এটা? বোধ হয় চিংড়িমাছের মালাইকারী—এটিকে পাতে ঢালতে গিয়ে ডিশখানা যদি একবার তোমার কোলের উপর উপুড় করে ফেলি, ব্যাপারটা কি রকম দাঁড়াবে বল দেখি?

    বলে হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর চেয়ারটা একটু টেনে গোছগাছ করে বসে নিয়ে বললেন, নাও এসো। আরম্ভ তো করা যাক। তারপর তোমার সিল্কের পাঞ্জাবির কপালে যদি চিংড়িমাছের ঝোল ভক্ষণ লেখা থাকে, কে খণ্ডাবে বল?

    খেতে খেতে যে-সব কথাবার্তা চলল—রাজাবাহাদুরই চালালেন—তার বিষয় হাল্কা এবং সুরটি অন্তরঙ্গ; তার ফলে লাহিড়ীর মধ্যে প্রথমে যেটুকু আড়ষ্টতা দেখা দিয়েছিল, কাটিয়ে উঠতে দেরি হল না। নানা প্রসঙ্গের পর কিসের একটা সূত্র ধরে রাজাবাহাদুর হঠাৎ বলে উঠলেন, তোমার কাছে আমার কিন্তু একটি প্রার্থনা আছে, নিশানাথ

    ‘প্রার্থনা!’ ডাক্তারের কাঁটা-চামচে যেন ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল।

    —হ্যাঁ, প্রার্থনাই বলবো। সে জিনিস আর কারও কাছে চাওয়া যায় না, আর কেউ তা দিতেও পারবে না।

    —এ শুধু আমাকে লজ্জা দেওয়া রাজাবাহাদুর। আপনার কোনো কাজে যদি কখনও লাগতে পারি নিজেকে ধন্য মনে করবো—এ কথাও কি আপনাকে বলে দিতে হবে? কিন্তু এমন কি জিনিস থাকতে পারে, যা আমি আপনাকে দিতে পারি, কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না।

    –তোমার কাছে তা অতি সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান।

    মুহূর্তকাল থেমে ডাক্তারের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন রাজাবাহাদুর। তারপর যোগ করলেন, আমাকে কিছুটা প্লেগের জার্ম যোগাড় করে দিতে হবে।

    লাহিড়ী কাঁটায় গেঁথে একটা কি মুখে তুলতে যাচ্ছিল, সবসুদ্ধ ডিশের উপর পড়ে গেল। বিস্ময়-বিমূঢ় চোখ দুটো রাজাবাহাদুরের মুখের উপর রেখে ভীতি-বিহ্বল চাপাগলায় তাঁরই কথাটা শুধু আউড়ে গেল— প্লেগের জার্ম!

    রাজাবাহাদুর সহজ সুরেই বললেন, আমার বিশেষ দরকার।

    —ও দিয়ে আপনি কি করবেন! প্রশ্ন নয়, আরেক দফা বিস্ময় প্রকাশ।

    রাজাবাহাদুর সজোরে হেসে উঠলেন। পরক্ষণেই কুঞ্চিত চোখে লাহিড়ীর দিকে চেয়ে বললেন, তুমি না একজন প্যাথলজিস্ট! হাজার রকম রোগের জীবাণু ঘাঁটাই তো তোমার কাজ! প্লেগের নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেলে?

    কথাটা বোধ হয় জীবাণু-বিজ্ঞানীর অভিমানে আঘাত করল। সোজা হয়ে বসে আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বলল, আজ্ঞে না, ভয় পাই নি। জিজ্ঞেস করছিলাম, ওরকম মারাত্মক জিনিস আপনার কি কাজে লাগবে?

    ‘মারাত্মক কাজেই লাগবে’—তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন রাজাবাহাদুর -সেটাও তোমাকে জানাবো বৈকি। কিন্তু তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না! আর দুটো পোলাও নাও! দাঁড়াও আমি দিচ্ছি।

    চামচে করে খানিকটা পোলাও ডাক্তারের প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললেন, আব্দুল রাঁধে ভালো, ওর ঠাকুরদার বাবা নাকি জাহাঙ্গীর বাদশার খানা পাকাত। নূরজাহান খুশী হয়ে তাকে একটা সোনার মেডেল দিয়েছিলেন। সেটা অবিশ্যি নেই।

    নিশানাথের ভোজনস্পৃহা চলে গিয়েছিল। তবু পাছে দুর্বলতা ধরা পড়ে, তাই আপত্তি করল না। এটা-ওটা নিয়ে খানিকটা নাড়াচাড়াও করতে হল। এই ভাবান্তর রাজাবাহাদুরের নজরে পড়লেও তিনি আর ও নিয়ে কোনো কথাবার্তা বললেন না।

    ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল থেকে প্লেগ তখন বিদায় নিয়েছে। পুনরাক্রমণের সম্ভাবনাও নেই। সুতরাং কোনো ল্যাবরেটরীতে তার জীবাণু নিয়ে কারও গবেষণা করবার কথা নয়। করলেও লাহিড়ীর সে খবর জানা নেই। এই কথাই যে সে বলবে, রাজাবাহাদুর অনুমান করেছিলেন এবং তার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন। উত্তরে বললেন, এখানে সুবিধে হবে না তা জানি। তোমাকে একটু কষ্ট করে বাইরে যেতে হবে। বাইরে মানে বেশি দূরে নয়, দেশের মধ্যেই–

    বলেই পশ্চিমভারতের সেই প্রসিদ্ধ ইনস্টিটিউটের নাম করলেন। লাহিড়ী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ওরে বাপরে, ওখানে আমাকে ঢুকতে দেবে কেন?

    –দেবে না মানে? দেখবে?

    রাজাবাহাদুর উঠে গিয়ে পাশের কোনো একটা কামরায় ঢুকলেন। মিনিটখানেক পরে লোহার সিন্দুকের ভারী পাল্লা খোলার শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই একখানা খাম হাতে করে বেরিয়ে এসে ডাক্তারের দিকে বাড়িয়ে বললেন, পড়।

    খামের মুখটা খোলাই ছিল। ভিতরকার চিঠিখানায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ডাক্তার প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ওরা রাজী হয়ে গেছে! স্যার তো আমাকে এসব কিছুই বলেন নি?

    —বলবার সময় আসে নি বলেই বলেন নি। চিঠিটাও সবে দু-দিন হল পেয়েছি।

    লাহিড়ীর মুখে কথা সরলো না। আজ কার মুখ দেখে ভোর হয়েছিল? কে জানে আরও কত আশ্চর্য অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার জন্যে সঞ্চিত হয়ে আছে? প্রতিটির মধ্যেই তার ভাগ্যলক্ষ্মীর ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। যা ছিল তার একান্ত অন্তরের অব্যক্ত কামনা মাত্র, এক অন্তর্যামী ছাড়া আর কেউ যার সন্ধান পায় নি, তিনিই অলক্ষ্যে বসে তার সফল রূপায়ণের সমস্ত আয়োজন করে রেখে দিয়েছেন! এ সুযোগ সে অবহেলা করবে না। তার গবেষণার বিষয় অবশ্য প্লেগ নয়, তবু একে অবলম্বন করেই যাত্রা শুরু করা যাক। অত বড় প্রতিষ্ঠানের সিংহদ্বার একবার যদি খোলা পাওয়া যায়, তার পথ সে নিজের শক্তিতেই করে নিতে পারবে, ততখানি আত্মবিশ্বাস তার আছে।

    রাজাবাহাদুরের কাজ নিয়ে যাবার সব চেয়ে বড় সুবিধা হল—এখানকার চাকরিটি বজায় থাকবে। অন্তত সে দাবী করা চলবে। তার নিজের প্রয়োজনে যদি যেতে হত, মুস্তাফির সুপারিশ পাওয়া গেলেও, তাতেও সন্দেহ ছিল—চাকরির আশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তার মানে যাওয়া হত না। এতবড় একটা সাফল্যের স্বপ্ন চিরদিন আকাশ-কুসুমই থেকে যেত। আজ তার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

    ডাক্তার যখন এইসব দিকগুলো ভেবে দেখছিল, রাজাবাহাদুর তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছিলেন। যখন দেখলেন, যেটুকু টোপ ফেলা হয়েছে ব্যর্থ হয় নি, তখন বাকীটুকু ফেলবার আয়োজন করলেন। বললেন, এদিকের জন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না। ম্যানেজারকে বলে দিয়েছি, ওখানে তোমার যত দিনই লাগুক, সবটাই পুরো মাইনের ছুটি বলে গণ্য হবে। মাসের ১লা তারিখে আমারই লোক গিয়ে টাকাটা তোমার বাবার হাতে পৌঁছে দিয়ে আসবে। তার ওপরে যদি কখনও কিছু দরকার হয়, আমাকে একটু জানালেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করে দেবো। বৌমাকেও সেই কথা বলো। যে প্রয়োজনই হোক, জানাতে যেন কোনোরকম সঙ্কোচ না করেন।

    বলতে বলতে ভারী মুখের উপর একটা গাম্ভীর্যের ছায়া ঘনিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ মাটির দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন। আবার যখন শুরু করলেন, গলাটাও ভারী শোনাল। তেমনি নতমুখেই বললেন, কোনোদিন মুখ ফুটে না বললেও একথা তুমি নিশ্চয়ই জানো নিশানাথ, তোমাকে আমি নিজের ভাই-এর থেকে আলাদা করে দেখি না। সে হতভাগাটা যেদিন সব ছেড়েছুড়ে বাউণ্ডুলে হয়ে বেরিয়ে গেল, এতবড় বংশের মানটুকু রাখল না, একটা বিয়ে-থা পর্যন্ত করল না, সেদিন থেকে আমার মন ভিতরে ভিতরে কাকে যেন খুঁজছিল। সে যে নিজে থেকে বাড়ি বয়ে এসে ধরা দেবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি। তোমাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যে আমার নিজেরই গরজ।……থাক সে-কথা। ও, আর একটা ছোট্ট কাজ বাকী রয়ে গেছে।

    বলে তখনই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। পাশের ঘরে আবার সেই লোহার সিন্দুক খোলা এবং বন্ধ করার আওয়াজ। যখন বেরিয়ে এলেন, হাতে একখানা বিশেষ আকৃতির কাগজ, ডাক্তারের সঙ্গে যার পরিচয় আরও অনেকবার ঘটে গেছে। এগিয়ে ধরে বললেন, এটা রেখে দাও।

    কাগজের অঙ্কটা চোখে পড়তেই লাহিড়ীর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল—পাঁচ হাজার টাকা! তবু হাত না বাড়িয়ে অনেকটা নিস্পৃহকণ্ঠে বলল, কি ওটা?

    রাজাবাহাদুর সরাসরি তার জবাব না দিয়ে বললেন, যে পরিমাণ ক্ষতি তোমার করিয়ে দিলাম, অর্থ দিয়ে তার পূরণ হয় না, সে চেষ্টাও আমি করছি না। এটা এমনিই—মনে কর, ব্রাহ্মণ-ভোজনের দক্ষিণা। আমার ঠাকুর্দা হলে হয়তো একটা গ্রাম দান করে বসতেন। সে তুলনায় এ তো কিছুই নয়। নাও।

    লাহিড়ী দু-হাত বাড়িয়ে চেকখানা গ্রহণ করল এবং নত হয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বলল, যে ভাবেই দিন, আপনার স্নেহের দানকে অস্বীকার করবো, সে স্পর্ধা আমার নেই। আপনার কাছে হাত পাতা আমার নতুন নয়। তার মধ্যে লজ্জারও কোনো কারণ দেখি না। লজ্জা পাচ্ছি অন্য কারণে। আপনি আমার ক্ষতি করিয়ে দিলেন, এমন কথাও আপনার মুখ থেকে আমাকে শুনতে হল!

    —ক্ষতি করছি না?

    —কোথায়, কেমন করে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

    রাজাবাহাদুর মৃদু হেসে হাল্কা সুরে বললেন, দ্যাখ ডাক্তার, তোমার ঐ ল্যাবরেটরীতে বসে দিনের পর দিন তুমি কি কর, কি আছে ঐ যন্ত্রগুলোর মধ্যে, সে সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান দূরে থাক, ধারণা করবার মতো বিদ্যেও আমার পেটে নেই, তা আমি জানি। আমি তো কোন্ ছার, অনেক মহা-মহা পণ্ডিতেরও নেই। কিন্তু তোমার ঐ সাধনার দামটা যে কত বড়, সেটুকু বুঝবার মতো বুদ্ধিও এ ঘটে নেই, একথা মনে করছ কেন?

    নিশানাথ ভীষণ অপ্রস্তুতে পড়ে গেল। দাঁতে জিভ কেটে বলল, ছিঃ ছিঃ, কি যে বলেন তার ঠিক নেই! আমি বুঝি তাই বলেছি? আপনি বড্ড—

    ডাক্তারের কথা শেষ হবার আগেই তাঁর মৃদু কণ্ঠ ডুবিয়ে দিয়ে বেজে উঠল সুগম্ভীর স্বর—নিছক নিজের স্বার্থে সেই সাধনাপীঠ থেকে অন্তত কিছুদিনের জন্যে তোমাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সে লোকসানের কি তুলনা আছে?

    –এখানে আপনার ভুল হল, রাজাবাহাদুর। লোকসান তো নয়ই, রিসার্চের দিক থেকে আমি অনেকখানি লাভবান হলাম। এত বড় সুযোগ ক’জনের ভাগ্যে জোটে? কিন্তু এর মধ্যে আপনার নিজের স্বার্থটা কী এখনও জানতে পারি নি!

    —আজ থাক, সে কথা আরেকদিন বলবো।

    সে ‘আরেকদিন’ ক’দিনের মধ্যেই এসে গেল। নিজের প্রাসাদে নয়, নিশানাথের ল্যাবরেটরীর নিভৃতকক্ষে বসে নিতান্ত সহজ সুরে রাজাবাহাদুর তাঁর এই বিচিত্র অভিযানের গোপন উদ্দেশ্যটি ব্যক্ত করলেন। সেটি যে মারাত্মক’, সে আভাস তিনি আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। ডাক্তার তার জন্যে নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিল। মনে মনে তার একটা কল্পিত রূপও দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। শুনবার পর মনে হল, তার কল্পনাশক্তি কত দীন! আরও মনে হল, ভাষাকে যে ভাবপ্রকাশের বাহন বলা হয়, তার মধ্যে কোনো সত্য নেই, আসলে সে অনেক পিছনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছে। সংগৃহীত কীটাণুগুলোকে যে কাজে এবং যে ভাবে নিয়োগ করা হবে, ‘মারাত্মক’ নামক নিরীহ বিশেষণ দিয়ে তার শতাংশের এক অংশও ব্যক্ত করা যায় না। তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করবার মতো যোগ্য বিশেষণ এখনও তৈরী হয় নি।

    তারা দুজন ছাড়া সেখানে আর কেউ উপস্থিত ছিল না। ছিল কতকগুলো যন্ত্র। নিশানাথ সভয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, যেন যে-কোনো মুহূর্তে তারা সরবে প্রতিবাদ করে উঠবে। তারপর মনে পড়েছিল ওরা নিষ্প্রাণ, জড়পদার্থ। কিন্তু সে নিজে তো জড় নয়, পরিপূর্ণ চেতনাসম্পন্ন মানুষ। তবু প্রতিবাদ করতে পেরেছিল কি? পারে নি। তার ভিতর থেকে একজন সবেগে মাথা তুলে দাঁড়ালেও, আরেকজন এগিয়ে গিয়ে তার গলা টিপে ধরেছিল। প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয়টি অনেক বেশি শক্তিমান।

    একবার মনে হয়েছিল সে ডাক্তার, মানুষের কল্যাণ তার ব্রত, তার একমাত্র লক্ষ্য মানুষকে ব্যাধিমুক্ত করা, জরা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা। তারই জন্য তার এই দুস্তর সাধনা, এই বিপুল আয়োজন। সে আদর্শ থেকে স্খলিত হলে আর রইল কি? পরক্ষণেই সমস্ত মন আচ্ছন্ন করে জেগে উঠল লোভ—অর্থ, খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠার লালসা। বড় হতে হবে, নৈতিক আদর্শকে আঁকড়ে ধরে একটা ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে হাত পা ছুঁড়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকবার জন্যে তার জন্ম হয় নি। প্রচলিত ভালোমন্দ, ন্যায়- অন্যায় এবং পাপ-পুণ্যের সংস্কার দিয়ে তৈরি যে বন্ধন, তার পাশ কেটে তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। তার নির্ধারিত ভবিষ্যৎ সেই দিকেই তাকে টেনে নিয়ে চলেছে।

    তা যদি না হবে, কোথাকার কোন্ নিশানাথ লাহিড়ী, মেডিক্যাল কলেজের দরজা পেরোতেই যে হিমশিম খেয়ে মরছিল, দু’শ টাকা মাইনের একটা চাকরি পেলেই যে বর্তে যেত, তার জীবনে কোথা থেকে কেমন করে দেখা দিল স্বপ্নাতীত সুযোগ ও সাফল্যের ধারাবর্ষণ? এই অব্যাহত অগ্রগতির পিছনে নিশ্চয়ই কোনো অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত আছে, কোনো অলক্ষ্য বিধান, যা তাকে মেনে চলতেই হবে। এই তার ভাগ্যবিধাতার অভিপ্রায়।

    মানুষের অন্তরে ‘অ্যাম্বিশন’ নামক পদার্থটি (‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ বলা যেত কিন্তু ইংরেজির তুলনায় শব্দটি বড় নিষ্প্রভ) অগ্নিশিখার মতো ঊর্ধ্বগতি। একবার জ্বলে উঠলে নিজের শক্তিতেই বেড়ে চলে এবং চলতে চলতে পথের দু-ধারে যা কিছু পায়,—চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিবেচনা, দ্বিধা-সংস্কারের বাধা-বন্ধন—সব জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। নিশানাথের মনের মধ্যে যখন সেই প্রক্রিয়া চলছিল, রাজাবাহাদুর তার সঙ্গে কিঞ্চিত ইন্ধন যোগ করলেন। বললেন, এটা যে সাধারণ লোকের কাজ নয় তা আমি জানি। তাদের কাছে এর নৈতিক আর আইনের দিকটাই বড় হয়ে দেখা দেবে। তার বাইরে তাদের দৃষ্টি পৌঁছায় না। কিন্তু আমি তো তেমন কারও কাছে আসি নি। যার কাছে এসেছি, সে সাধারণ স্তরের অনেক ওপরে এবং তার চেয়ে বড় কথা, সে বৈজ্ঞানিক। আমার এই সঙ্কল্পকে সে বিজ্ঞানের নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে দেখবে, সে বিশ্বাস আছে বলেই সবকিছু তাকে বলতে পেরেছি। তা না হলে এ-সব তো কাউকে বলবার নয়।

    কোনো রকম দ্বিধা যদি লাহিড়ীর মনে তখনও থেকে থাকে, এর পরে তার লেশমাত্র রইল না। উত্তুঙ্গ উচ্চাশার কাছে হার হল শুভবুদ্ধির।

    দু-সপ্তাহের মধ্যেই পশ্চিমাঞ্চলের সেই বিশেষ শহরের উদ্দেশে রওনা হল নিশানাথ লাহিড়ী। ভারতবর্ষের মধ্যে ওখানকার ইন্‌স্টিটিউটই তখন একমাত্র গবেষণাগার যেখানে প্লেগের বীজাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। মুষ্টিমেয় বিশ্বস্ত, অভিজ্ঞ এবং কৃতী গবেষক সেখানে কাজ করছিলেন। অত্যন্ত জোরালো এবং বিশেষ বিশেষ সুপারিশ ছাড়া ডিরেক্টর কাউকে গ্রহণ করতেন না। সেই গোপন গণ্ডির মধ্যে তার প্রিয়তম ছাত্রের জন্যে একটি স্থান সংগ্রহ করা ডাক্তার মুস্তাফির মতো ভারত-বিখ্যাত চিকিৎসাবিদের পক্ষেও সহজ হয় নি। বহু চেষ্টার ফলেই শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়েছিল। নিশানাথের প্রতিভার উপর তাঁর গভীর আস্থা ছিল এবং সেটা যে অপাত্রে ন্যস্ত হয় নি, তার প্রমাণ কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া গেল। ডিরেক্টরকে খুশী করতে লাহিড়ীর বিশেষ বেগ পেতে হয় নি।

    রাজাবাহাদুরের পিতার যখন মৃত্যু হয়, ছোটকুমার তখন শিশু। তার কয়েক বছর পরে রাণীমাও স্বামীর অনুসরণ করলেন। প্রাচীন রাজবংশের ঐতিহ্য অনুসারে রাজাবাহাদুর তার কিছুদিন আগে একটি সুন্দরী কিশোরীর পাণিগ্রহণ করেছেন। বধূ নির্বাচন রাণীমাই করেছিলেন। তেমন কোনো বড় ঘরের মেয়ে নয়। একমাত্র রূপের জোরেই এখানে তার প্রবেশাধিকার। রূপের সঙ্গে ঐশ্বর্যের মিলন ঘটলে তার মধ্যে যে উগ্র জলুস বা তীব্র চমক ফুটে ওঠে, এ মেয়েটির তা ছিল না। তার শান্ত মুখশ্রী, স্নিগ্ধোজ্জ্বল শ্যামকান্তি এবং বিনম্র পেলব দেহসৌষ্ঠবের মধ্যে একটি মধুর কমনীয়তা ছিল। সম্ভবত সেইটিই রাণীমাকে আকৃষ্ট করে থাকবে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি আত্মীয় পরিজন আশ্রিত অমাত্য, কারোরই বিশেষ সমর্থন পান নি। নববধূ প্রাসাদে পা দিয়েই সেটা জানতে পেরেছিল। স্বামীর কাছ থেকে বাক্যে বা আচরণে বিশেষ কোনো রূঢ়তা বা অনাদর না পেলেও, তিনিও যে ঐ দলভুক্ত একথাও তার বুঝতে বাকী ছিল না। তার ফলে তার মনে প্রথম থেকেই কেমন একটা অপরাধীসুলভ সঙ্কোচ গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন ঘর করবার পরেও সে মনোভাব সে কাটিয়ে উঠতে পারে নি। স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানে একটা অলক্ষ্য দূরত্ব বরাবর রয়ে গেছে।

    ছোটকুমারের প্রকৃতি ছিল তার জ্যেষ্ঠের ঠিক বিপরীত। ঐশ্বর্যলিপ্সা কিংবা আভিজাত্য-গৌরব তাকে কোনদিন আকর্ষণ করে নি। রাজপ্রাসাদের বিলাস-বহুল জীবনযাত্রার অসংখ্য প্রলোভন থেকে নিজের মনটাকে মুক্ত রাখবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা বিধাতা তাকে বোধহয় মাতৃগর্ভ থেকেই দিয়েছিলেন। শিশুকাল থেকে সেখানকার সব কিছুর উপর তার নীরব ঔদাসীন্য ভৃত্যমহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নববধূ এসে যখন দেখল, এত বড় প্রাসাদের কোনো মহলে তার জন্যে সস্নেহ অভ্যর্থনার প্রসন্নদৃষ্টি নিয়ে কেউ অপেক্ষা করে নেই, তখন সকলের চেয়ে আলাদা এই কিশোর দেওরটির প্রতিই একটি অলক্ষ্য আকর্ষণ অনুভব করে থাকবে। সে নিজেও তখন কিশোরী। কৈশোরের স্বাভাবিক ধর্মও তাদের নিকটতর করবার সুযোগ দিয়েছে। কালক্রমে বৌরাণী এবং ছোটকুমারের মধ্যে যে প্রগাঢ় সখ্যবন্ধন গড়ে উঠেছিল, এইখানেই তার সূত্রপাত।

    রাণীমার মৃত্যুর পর সে বন্ধন দৃঢ়তর হল। বৌরাণীও তাঁর এই আত্মভোলা, উদাসীন দেওরটির মাতৃস্থানও অধিকার করলেন। বন্ধুত্ব ও মাতৃত্বের সে এক বিচিত্র সংযোগ। কিন্তু তার মিলিত শক্তিও এই সৃষ্টিছাড়া মানুষটিকে বেঁধে রাখতে পারল না। স্নেহ, প্রীতি, ঐশ্বর্য, বংশমর্যাদা—সব বন্ধন অনায়াসে ছিন্ন করে ছোটকুমার যেদিন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এল, কিছুতেই তাকে নিরস্ত করা গেল না। বৌরাণী সেদিন একটি কথা বলেন নি, একফোঁটা চোখের জলও তাঁকে কেউ ফেলতে দেখে নি। আত্মীয়-পরিজনেরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ভৃত্য ও আশ্রিতমহলে কানাকানি পড়ে গিয়েছিল—দেওরের ওপর কত যে দরদ, এইবার সব বোঝা গেছে! কেউ বলেছিল—সব কিছু যে লিখে-পড়ে দিয়ে গেল ছেলেটা! আজ তো ওর সুখের দিন, কাঁদতে যাবে কোন্ দুঃখে?

    সেইদিন থেকে বৌরাণীর মুখে ছোটকুমারের কোনো উল্লেখ একবারও শোনা যায় নি। যেন কিছুই হয় নি, এমনিভাবে সব কিছুর মধ্যে নিজেকে তিনি আরও নিবিড়ভাবে নিবিষ্ট করে দিয়েছিলেন। আগে মাঝে মাঝে বাইরে যেতেন, তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু কাজ আর কাজ, বিশ্রামহীন নিরলস ব্যস্ততা। যে দেখেছে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে। শুধু রাজাবাহাদুর বুঝেছিলেন, এ কর্মশক্তি সবটাই যান্ত্রিক, ভিতরে কোনো প্রাণের প্রেরণা নেই। একজনের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে তার সবটাই বোধ হয় নিঃশেষ হয়ে গেছে।

    এক অনেকদিন পরে ভাই-এর কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, লোকে জানে, আমাকে সে তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। কি নিয়ে গেছে, সে খবর কেউ রাখে না। সে কথা শুধু আমিই জানি।

    সেই যে একদিন পিতৃ-পিতামহের প্রাসাদতোরণ পিছনে ফেলে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে এসেছিল, তারপর আর একদিনের তরেও ছোটকুমার সেদিকে ফিরে তাকায় নি। ডাক এসেছে অনেকবার। প্রতিবারেই মৃদু হেসে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজাবাহাদুর এসেছেন, এ গলিতে তাঁর গাড়ি ঢোকে না—বড় রাস্তার মোড় থেকে গলিপথটুকু হেঁটে পার হয়ে, অতিকষ্টে সরু সিঁড়ি বেয়ে, কোনো রকমে উঠেছেন এসে দোতলার অপ্রশস্ত বসবার ঘরে। অনুযোগ দিয়েছেন, অভিমান প্রকাশ করেছেন, কখনও সস্নেহ আবেদন জানিয়ে দু-দিনের জন্যে একবারটি ঘুরে আসবার অনুরোধ করেছেন। একটি কুণ্ঠাপূর্ণ বিনীত হাসি ছাড়া আর কোনো উত্তর পান নি। কখনও বৌরাণীর নাম করে বলেছেন, তোকে একবার দেখতে চেয়েছে, বলেছে, যেমন করে পার ধরে নিয়ে এসো।

    এবার জবাব দিয়েছে ছোটকুমার—তাঁকে আমার প্রণাম জানিয়ে বলবেন, সময় হবে না।

    —কি রাজকাজে ব্যস্ত আছ যে সময় হবে না? তেড়ে উঠেছেন রাজাবাহাদুর। এ প্রশ্নের আর উত্তর আসে নি।

    প্রথমদিকে তাঁর আসাটা ছিল ঘন ঘন। ভাইকে বাড়ি নিতে পারুন আর না পারুন, একবার করে দেখে গেছেন। ক্রমশ তার ব্যবধান বেড়ে গেছে। ইদানীং কয়েক বছর তাঁর দেখা পাওয়া যায় নি। ম্যানেজার বা অন্য কোন আমলা পাঠিয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারপর সেটাও বিরল হয়ে এসেছে।

    অনেকদিন পরে সকালের দিকে ছোটকুমারের বাড়ির সামনে মোটর থামবার শব্দ শোনা গেল। তার কাছে যারা আসে, (বড় একটা কেউ আসে না) কারও গাড়ি নেই। গঙ্গাচরণের কৌতূহল হল। বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে একপলক তাকিয়েই ছুটে গেল মনিবের কাছে। ছোটকুমার তখন পড়বার ঘরে। গঙ্গাকে ব্যস্তভাবে ঢুকতে দেখে চোখ তুলতেই সে ফিসফিস করে বলল, রাজাবাহাদুর! বলেই নীচে নেমে গেল দরজা খুলতে।

    এত ছোট গাড়িতে রাজাবাহাদুরকে কখনও চড়তে দেখা যায় নি। বেশ কষ্ট হচ্ছিল নামতে। ড্রাইভারের সঙ্গে গঙ্গাচরণকে এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করতে হল। আগের চেয়ে অনেকটা কাহিলও হয়ে পড়েছেন। কুমার আছে কিনা জেনে নিয়ে গঙ্গার কাঁধে হাত দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন।…

    বারান্দায় পড়তেই ছোটকুমার অগ্রজের বাহু ধরে বসবার ঘরের দিকে নিয়ে চলল। যেতে যেতে অনুযোগের সুরে বলল, এতটা শরীর খারাপ, একটা খবরও তো দেন নি?

    —কাকে খবর দেবো? তোমাকে? ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন রাজাবাহাদুর, কি লাভ হত?

    ছোটকুমার যেমন মাথা নীচু করে চলছিল, তেমনিভাবে চুপ করে রইল।

    রাজাবাহাদুর সঙ্গে সঙ্গে সুর বদলে নিলেন। ঘরে ঢুকে সামনে যে কৌচটা পেলেন, তার উপর বসে পড়ে প্রসন্নমুখে বললেন, খুব রোগা হয়ে গেছি, না? ওটা কিছু না। শরীর আমার ভালোই আছে। খানিকটা চর্বি ঝরে গিয়ে বরং উপকারই হয়েছে। কিন্তু—কয়েক সেকেণ্ড থেমে ভাইয়ের মুখের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে যোগ করলেন, তোকে তো তেমন ভালো দেখছি না। রাজ জেগে খুব-ই পড়াশুনো হচ্ছে? দেখবার তো কেউ নেই— আচ্ছা, আমিও পরোয়ানা নিয়ে এসেছি।

    পকেট থেকে একখানা খাম বের করে হাত বাড়িয়ে বললেন, এই নাও।

    —কি ওটা?

    —পড়েই দ্যাখ।

    ছোটকুমার খামটা খুলে চিঠিখানায় একবার চোখ বুলিয়েই শুষ্ক-মুখে বলল, কি হয়েছে বৌরাণীর?

    —কি করে জানবো? মুখ ফুটে কিছু বললে তো? দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলে সেই এক কথা—কিছু হয় নি আমার। কত করে বললাম, একবার কোলকাতায় চল। মুস্তাফির মতো অতবড় ডাক্তার রয়েছে হাতের মধ্যে, দরকার হলে আরও বড় কাউকে দেখানো যেতে পারে। কিছুতেই রাজী হল না। কাল যখন কোলকাতায় ফিরছিলাম, ঐ চিঠিখানা দিয়ে বলল, ঠাকুরপোকে দিও, আর একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এসো।

    হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্তভাবে বললেন, ট্রেনের সময় হয়ে এল, যা, জামা- কাপড়টা বদলে আয়। গঙ্গা….

    গঙ্গাচরণ পাশের কোনো ঘর থেকে সাড়া দিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে জোড়হাত করে দাঁড়াল। রাজাবাহাদুর হুকুম দিলেন, একটা স্যুটকেসে ‘ছোট’র জিনিসপত্তরগুলো গুছিয়ে দে, দেরি করিস নে।

    ছোটভাইকে নাম ধরে বড় একটা ডাকতেন না। অন্যের কাছে উল্লেখ করবার বেলায় বলতেন ছোটকুমার, ডাকবার সময় তাকেই একটা সাদর ও সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়েছিলেন—‘ছোট’।

    ছোটকুমার চিঠিখানা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ কি ভাবল। তারপর মুখ তুলে বলল, আজ তো আমার যাওয়া হবে না।

    —কেন?

    —একটা বিশেষ কাজ আছে।

    —কি কাজ?

    —যাঁর কাছে ফ্রেঞ্চ শিখি, তাঁর আজ আসবার দিন। সন্ধ্যাবেলায় আসবেন।

    —কি শিখিস?

    —ফ্রেঞ্চ, ফরাসীভাষা।

    —তা দিয়ে কি হবে?

    কুমার মৃদু হেসে চুপ করে রইল। রাজাবাহাদুর বললেন, যত সব উদ্ভট খেয়াল! কোন্ দেশের লোক তিনি?

    —ইংরেজ।

    বেশ তো, একটা চিঠি লিখে রাখ—বিশেষ জরুরী কাজে বাড়ি যাচ্ছি। উনি এলে গঙ্গা সেটা দিয়ে দেবে।

    —তা হয় না, আমি বরং কাল যাবো। আপনাকে আসতে হবে না।

    —যাবে তো?

    কুমার একটু হাসল।

    রাজাবাহাদুর উঠে পড়ে বললেন, দেখো, তা না হলে আমাকে আবার ছুটতে হবে। ন’টা পঁচিশে ট্রেন। আমিও যাচ্ছি। টিকিট করে রাখবো। তাহলে অন্তত মিনিট পনেরো সময় হাতে রেখে যেও, ঠিক আটটায় এখানে গাড়ি আসবে।

    —গাড়ি লাগবে না।

    —কেন? অস্টিন্‌টা বেশ আসতে পারবে, আমি তো তাতে করেই এলাম। ছোটকুমার মাথা নেড়ে বলল, দরকার নেই। এখান থেকেই একটা ট্যক্সি নিয়ে নেবো।

    নিজের অজ্ঞাতসারেই রাজাবাহাদুরের কপালে কুঞ্চন দেখা দিল। রাজপরিবারের কেউ কোনোদিন ট্যাক্সিতে ওঠে না, তবু এ নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করলেন না। বুঝলেন, এ ‘না’-কে ‘হ্যাঁ’ করানো যাবে না।

    রাজাবাহাদুরকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ছোটকুমার ধীরে ধীরে সিঁড়ি ক’টা পেরিয়ে তার লাইব্রেরির কামরায় ফিরে গেল। কিছুক্ষণ আগে যে বইখানা পড়ছিল এবং খোলা রেখেই পাশের ঘরে চলে গিয়েছিল, সেটা তেমনি পড়ে রইল। পড়বার টেবিলে আর ফিরে যাওয়া হল না। কোণের দিকে একটা ইজিচেয়ার ছিল, তারই কোলে নিজেকে এলিয়ে দিল। মিনিট কয়েক পরে জামার পকেট থেকে বেরিয়ে এল একখানা ধার ছেঁড়া খাম, যার ভিতরকার বস্তুটির সঙ্গে এইমাত্র তার চাক্ষুষ পরিচয় ঘটে গেছে, তবু সেই ছোট্ট কাগজখানারই ভাঁজ খুলে আরেকবার তুলে ধরল চোখের উপর।

    গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কয়েকটি মাত্র লাইন—

    কল্যাণীয়েসু,

    ঠাকুরপো,

    কিছুদিন যাবৎ আমার শরীরটা বিশেষ ভালো যাইতেছে না। তোমাকে একবারটি দেখিতে ইচ্ছা করে। যত শীঘ্র হয়, অবশ্য অবশ্য আসিও।

    ইতি-
    আশীর্বাদিকা
    তোমার বৌরাণী

    আনমনে ধীরে ধীরে চিঠিখানা আবার ভাঁজ করে মুঠোর মধ্যে রেখে তেমনি অসাড়ের মতো অনেকক্ষণ পড়ে রইল ছোটকুমার। বৌরাণীর চিঠি। বৌরাণী তাকে ডাকছে! কত বছর পরে। কিন্তু এ কথা-ক’টির মধ্যে তাকে যেন কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। ‘ঠাকুরপো’ সম্বোধনটি কানে বড় নতুন ঠেকছে। এ বাড়িতে আসবার পর প্রথম প্রথম কয়েকদিন মাত্র ঐ নামে তাকে ডাকতে শুনেছিল, তারপর আর শোনে নি। হঠাৎ একদিন দাদার মতো ‘ছোট’ বলতে শুরু করল। তারপর কবে, কেমন করে মধুরতর রূপান্তর লাভ করে সেই ডাক ক্রমশ ‘ছোটু’তে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আজ আর মনে করতে পারে না। কেমন একটা আশ্চর্য তার ছিল সেই মিষ্টি-কণ্ঠের এই ছোটু কথাটুকুর মধ্যে, আজও দু-কান ভরে আছে। চিঠি যদি এল, তার উপরে ঐ সম্ভাষণটুকু জুড়ে দিলে কি ক্ষতি হত? একবার মনে হল, ঐ দুটি অক্ষরের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক একদিন জড়িয়ে ছিল, আজ তার অবসান ঘটেছে বলেই ওদের প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেছে। হয়তো ইঙ্গিতে সেই কথাটিই বলতে চলেছে বৌরাণী।

    তাই যদি হয়, তবে আর গিয়ে কি লাভ? যেখানে যা কিছু বন্ধন, সবই তো একদিন নিজে হাতে ছিন্ন করে চলে এসেছিল। ঐ একটি জায়গায় শুধু পারে নি। একটা অলক্ষ্য সূত্র রয়ে গেছে। ক্ষীণ হলেও তার ধার বড় তীক্ষ্ণ। অগোচরে থেকেও নিজের বেদনাময় অস্তিত্ব কোনদিন ভুলতে দেয় নি। আজ যদি তার একটা দিক কালক্রমে কিংবা অন্য কোনো কারণে বিলীন হয়ে গিয়ে থাকে, আর এক দিক থেকে সেই ছিন্ন সূত্রে জোড়া দিতে যাওয়া নিরর্থক।

    সহসা আবার হাতের চিঠিখানার দিকে নজর পড়তেই ছোটকুমারের সমস্ত চিন্তাস্রোত ঐ একটি ধারায় গিয়ে মিলিত হল। সমস্ত ক্ষোভ অভিমান ছাপিয়ে উঠল একটিমাত্র দুর্ভাবনা—কি অসুখ বৌরাণীর? কি জানি কেমন আছে?

    অকস্মাৎ কে যেন তাকে সজোরে ঠেলে তুলে দিল। কাল ন’টা পঁচিশে গাড়ি। তার আগে অনেকগুলো কাজ সেরে নিতে হবে।

    যে-ভাষায়, যেমন করেই আসুক, বৌরাণীর রোগশয্যার ডাক তার কাছে অলঙ্ঘ্য—এই পরম সত্যটাই সবকিছু ছাপিয়ে ছোটকুমারের অন্তরের মধ্যে প্রতিভাসিত হল।

    ন’টা পঁচিশের গাড়িটা দূরপাল্লার যাত্রী। বরাবরই বেশ ভিড় থাকে। তাছাড়া তার মিনিট দশেক আগে ঠিক পাশেই একখানা লোক্যাল এসে দাঁড়ায় এবং তার গহ্বর থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসে একপাল ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবমান ডেলিপ্যাসেঞ্জার। এই দুটো বিপরীতমুখী স্রোতের সংঘাতে মাঝখানের প্লাটফরমে যে ঘূর্ণাবর্ত দেখা দেয়, তার ভিতর থেকে নিজের দেহটাকে উদ্ধার করে গাড়ির কামরায় পৌঁছে দেওয়া শক্তির প্রয়োজন।

    ছোটকুমার যখন সেই সুকঠিন শক্তিপরীক্ষায় নাজেহাল হবার উপক্রম, হঠাৎ মনে হল কে যেন তার পিছন থেকে ঘাড়ের ঠিক নীচে একটা সূচ ফুটিয়ে দিলে। ‘উঃ’ বলে তৎক্ষণাৎ ফিরে তাকাল, কিন্তু সেই জনারণ্যের ভিতরে এমন কোনো লোককে চোখে পড়ল না, যাকে এই বিশেষ কর্মটির সঙ্গে জড়িত করা যেতে পারে। ব্যাপারটাকে মনে মনে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল, কার এমন কি গরজ পড়ল খামকা তার গায়ে সূচ ফোটাবার? পিন-জাতীয় কিছু একটা কারও হাতে থেকে থাকবে হয়তো, ভিড়ের ধাক্কায় হঠাৎ লেগে গেছে।

    আহত স্থানটায় তখন রীতিমত জ্বালা করছে। গাড়িতে উঠে দেখতে হবে কি ব্যাপার, এই কথা ভেবে সেই দিকেই পা বাড়াতে যাবে, এমন সময় চোখে পড়ল গঙ্গাচরণ ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে। চোখে মুখে ব্যস্ততার চিহ্ন। তাকে দেখে কুমারের মুখেও চিন্তার ছায়া পড়ল। গঙ্গার তো তার সঙ্গে যাবার কথা নয়! কাছে আসতেই জানতে চাইল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

    গঙ্গাচরণ একখানা খাম এগিয়ে ধরে চাপাগলায় বলল, বিধু এসে দিয়ে গেল। বৌরাণীর চিঠি। বলল, খুব জরুরী খবর আছে এর মধ্যে। আর বলেছে, এ চিঠির কথা রাজাবাহাদুর যেন জানতে না পারে।

    ভিড়ের মুখ থেকে একটুখানি সরে গিয়ে তাড়াতাড়ি খামের ধারটা ছিঁড়ে ফেলল ছোটকুমার। আগের মতো এ চিঠিখানাও সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সুর একেবারে আলাদা।

    ভাই ছোটটু,

    এর আগে যে-চিঠিটা পেয়েছ, তার অক্ষরগুলো আমার, কিন্তু কথা আমার নয়। তবু লিখতে হয়েছিল। কেন, তা জিজ্ঞেস করো না। সে চিঠিতে তোমাকে আসতে বলেছিলাম। এবার বলছি, এসো না। বলতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কতকাল তোমাকে দেখিনি, তবু বলছি, আমার মাথা খাও, তুমি এসো না।

    বৌরাণীর নাম সুষমা, তারই আদ্যক্ষর সু।

    ইতি সু—।

    সমস্ত চিঠিখানার মধ্যে যে শঙ্কা ও সংশয় ঘেরা গূঢ়রহস্য জড়িয়ে আছে, এই ছোট্ট অক্ষরটিও যেন তার থেকে মুক্ত নয়। ছোটকুমার বিস্ময়বিহ্বল দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চিঠিটা মুড়ে যখন খামে ভরতে যাবে, গঙ্গাচরণ চেঁচিয়ে উঠল, এ কি! তোমার জামার পিঠে রক্ত কিসের? লোকটা কি তাহলে কিছু একটা ফুটিয়ে দিয়ে গেল?

    —কোন্ লোকটা! চমকে উঠল ছোটকুমার।

    —ঢ্যাঙা কালো মতন একটা লোক। যা ভিড়, পাছে হারিয়ে ফেলি, তাই ঐখান থেকে আমি ঠায় তোমার দিকে নজর রেখেছি। মনে হল, সেই লোকটা যেন ডান হাতটা তুলে তোমার ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়ল। তারপর আর দেখতে পেলাম না।

    কুমার কি একটা বলতে যাচ্ছিল, থেমে গেল—ঠিক পিছনেই রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বর—কি হল, এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস? এখনই যে গাড়ি ছেড়ে দেবে!

    —আপনি উঠে পড়ুন, আমি যাই।

    —কোথায় যাবি?

    —বাসায়।

    –কেন?

    গঙ্গাচরণ বলে উঠল, এইমাত্তর কে একটা লোক ওর পিঠে কি যেন ফুটিয়ে দিয়ে গেল, রক্ত বেরুচ্ছে।

    রাজাবাহাদুর চিন্তিত মুখে উদ্বেগের সুরে বললেন, সে কি! কই দেখি!

    জামার পিছনটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে গঙ্গার দিকে চেয়ে বললেন, তুই দেখেছিস লোকটাকে?

    —আজ্ঞে ঠিক ঠাহর করে দেখিনি, দূর থেকে মনে হল যেন—

    —মনে হল! গাঁজার দমটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গেছে!

    কুমারের দিকে ফিরে বললেন, ও কিছু না। পোকায়-টোকায় কামড়েছে মনে হচ্ছে। গাড়িতে চল্–জামাটা খুললেই বোঝা যাবে কি হয়েছে। আমার ব্যাগে আইডিন আছে, লাগিয়ে দিলেই সেরে যাবে। ঐ লাস্ট্ বেল পড়ে গেল, আর মোটে পাঁচ মিনিট আছে গাড়ি ছাড়তে।

    —আজ ইচ্ছে করছে না, আরেক দিন যাবো।

    —তোরও কি গঙ্গার ঐ গাঁজাখুরি গল্প শুনে মন খারাপ হয়ে গেল?

    —না তা নয়। শরীরটা বিশেষ ভালো লাগছে না।

    —তাই নাকি? সঙ্গে সঙ্গে সুর বদলে গেল রাজাবাহাদুরের, তাহলে আর গিয়ে কাজ নেই! সোজা ভবানীপুরের বাড়িতে চল। ওখানে তো এক গঙ্গা ভরসা।

    —এখন থাক, পরে, যদি দরকার হয় যাবো।

    বলেই ছোটকুমার ফিরে যাবার জন্যে পা বাড়ালো। রাজাবাহাদুর পিছন থেকে বললেন, আমিও তাহলে থেকে গেলাম। কেমন থাকিস, কাল সকালেই যেন একটা খবর পাই। দরকার হলে মুস্তাফিকে একবার দেখিয়ে দেওয়া যাবে।

    .

    সেদিন যদি মুস্তাফিসাহেবের দেখা পাওয়া যেত, ঘটনার গতি চলে যেত অন্য পথে। এ কাহিনীর পরিণতি শুধু ভিন্ন নয়, নিকটতর হত। ব্যস্ত পাঠকদের অনেকখানি সময় বাঁচত। এইখানে ট্রামের টিকেট কিংবা ছেঁড়া হ্যাণ্ডবিল গুঁজে দিয়ে আর একটা ‘সিটিং’-এর জন্যে অপেক্ষা করতে হতো না। গোটা কয়েক পাতা কোনো রকমে এগিয়ে গিয়ে এ ঝঞ্ঝাট চুকিয়ে ফেলে অন্য বই ধরতে পারতেন। সংসারের নানা কর্মে রত যেসব ক্লান্ত পাঠিকা গল্প-উপন্যাসকে নিদ্রাকর্ষণের টনিক হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন, তাঁদেরও এই পর্যন্ত এসে পাতা মুড়ে রেখে পাশ ফিরে শোবার দরকার হত না। ঘনায়মান তন্দ্রার দোলায় দুলতে দুলতেই যবনিকায় পৌঁছে যেতেন।

    কিন্তু অলক্ষ্যে বসে যে বিশ্ববিধান-রচয়িতা বুদ্ধিগর্বিত মানুষের বহু-যত্ন-রচিত পরিকল্পনা একটিমাত্র অঙ্গুলিহেলনে ওলট-পালট করে দেন, তাঁর অভিপ্রায় ছিল অন্যরূপ। তাই ডাক্তার মুস্তাফিকে পাওয়া গেল না।

    রাজাবাহাদুর মনে মনে তাঁর প্রত্যাশিত ঘটনাগুলোকে পর পর সাজিয়ে রেখেছিলেন, এবং কার কোথায় কখন কি প্রয়োজন হবে, সব সেই অনুসারে স্থির করা ছিল। স্ত্রীকে চাপ দিয়ে চিঠি লেখানো, সেখানা হাতে করে ছোট গাড়ি নিয়ে একটা বিশেষ সময়ে ভাই-এর বাসায় গিয়ে ওঠা, নানা অভিনয়ের জাল ফেলে তখনই তাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা, সে চেষ্টা ব্যর্থ হলে অন্য দিন-নির্বাচন, তার সঙ্গে একটি বিশেষ ট্রেনের সাহায্য গ্রহণ—সবই তাঁর পূর্ব-পরিকল্পিত। তার মধ্যে ঐ ন’টা পঁচিশের গাড়ির ভূমিকাও কিছুমাত্র অপ্রধান ছিল না। ঐরকম ভিড়ের আড়াল না পেলে যত পাকা হাতই হোক এবং যত কম সময়ই লাগুক, সকলের অগোচরে ইনজেকসন পর্বটার নির্বিঘ্ন ও সফল সমাধান সম্ভব হত না।

    এ পর্যন্ত সবই পূর্ব-প্রস্তুত-নির্ঘণ্ঠ অনুসারে ঠিকমত চলেছিল, গোল বাধল এর পরের দফায়। গাড়িতে উঠবার পূর্বমুহূর্তে ছোটকুমার বেঁকে বসল—সে যাবে না। হাওড়া স্টেশনের ভিড়ের ভিতর কিসের না কিসের সামান্য একটা খোঁচা—সেই তুচ্ছ জিনিসটা যে ওর কাছে এত বড় হয়ে উঠবে, বৌরাণীর রোগশয্যার আহ্বান পর্যন্ত তার কাছে হার মানবে, এই আশ্চর্য ঘটনা রাজাবাহাদুরের হিসাবের মধ্যে ছিল না। এর জন্যে দায়ী ঐ ‘গঙ্গা-আপদটা’। কে ভেবেছিল যে ঠিক ঐ মুহূর্তে ঐখানটিতে তার আবির্ভাব ঘটবে এবং তারই কথায় কুমার দাদা ও বৌরাণীর সব উপরোধ উপেক্ষা করে ফিরে যাবে। তাও যদি তাকে ভবানীপুরের প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হত, কার্যসুচীর সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও শেষ পর্যন্ত কার্যোদ্ধার আটকে থাকত না। কিন্তু সেখানেও রাজাবাহাদুর ব্যর্থ হলেন। সেই ব্যর্থতার জ্বালা ক্ষণিকের তরে হয়তো তাঁর চোখের তারায় ফুটে উঠে থাকবে, গঙ্গার নজর পড়তেই সে চমকে উঠল। কিন্তু সে বেচারা তখনও জানে না, সে নিজেই এই রাজ- রোষের লক্ষ্যস্থল এবং অদূর ভবিষ্যতে নিজের জীবন দিয়ে তাকে তার অসতর্ক হঠকারিতার মূল্য দিতে হবে।

    হতভাগ্য গঙ্গাচরণ। সে যে নিমিত্ত মাত্র, যে বস্তুটি তার মনিবকে শেষ-মুহূর্তে স্টেশন থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, তার নির্দোষ বাহক, এই সত্যটি যদি রাজাবাহাদুর জানতে পারতেন, হয়তো তাকে অকালে অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে প্রাণ দিতে হত না। জানতে তিনি পেরেছিলেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, ঘটনাস্রোতের গতিপথও তাঁর আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে।

    সে চিঠি যিনি লিখেছিলেন, তিনিও ভাবতে পারেননি গভীর উৎকণ্ঠায় ভরা ঐ সামান্য ক’টি ছত্র একদিন তাঁর সমগ্র শ্বশুরকুলের ইতিহাস রচনা করবে। স্বামীর মনোরাজ্যে বৌরাণীর প্রবেশাধিকার ছিল না, তাঁর গতিবিধির কোনো খবরও তিনি রাখতেন না। তাকে দিয়ে এর আগের চিঠিখানা লেখাবার জন্যে রাজাবাহাদুর কেন যে অত পীড়াপীড়ি করেছিলেন, কি ছিল তাঁর মনে, তার কোনো আভাসও তিনি পাননি। শুধু মনে হয়েছিল, একটা কিসের কালো ছায়া যেন ঘনিয়ে আসছে। একটা কোনো অকল্যাণের ইঙ্গিত, যার লক্ষ্যস্থল তার পরম স্নেহ ও প্রীতিভাজন ছোটকুমার। এমনি একটা অস্পষ্ট আশঙ্কা তাঁকে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল করে তুলেছিল। ভেবেছিলেন, যেমন করে হোক তাকে নিরস্ত করতে হবে।

    কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে গোপনে বিশ্বস্ত ভৃত্যের হাত দিয়ে চিঠিখানা তাঁর আকৈশোর সখা সোদরোপম দেবরের কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেটা সিদ্ধ হয়নি—তাকে তিনি বাঁচাতে পারেননি, তবু কুমারের কাছে ঐ কথা ক’টিই ছিল তার শেষ দুটি দিনের মহামূল্য সম্পদ।

    তার মৃত্যুর পরে খোলা খামখানি তার বালিশের তলায় পাওয়া গিয়েছিল। সকলের অলক্ষ্যে রাজাবাহাদুর সেটি সংগ্রহ করেছিলেন। তিনিও এর জন্যে কিছুমাত্র কম মূল্য দেননি। সেকথা যথাস্থানে প্রকাশ করবো।

    স্টেশন থেকে রাজাবাহাদুর সোজা গিয়ে উঠলেন ডাক্তার মুস্তাফির বাড়িতে। তাঁকে পাওয়া গেল না। ছুটলেন মেডিক্যাল কলেজে। সেখানেও নেই। আবার তাঁর বাড়ি ফিরে এসে শুনলেন, তিনি বর্ধমানে রোগী দেখতে গেছেন। ফিরতে রাত হবে কিংবা পরদিন সকালেও আসতে পারেন। রাজাবাহাদুরের মুখে বিরক্তির কুঞ্চন দেখা দিল। তার লক্ষ্য বোধহয় তিনি নিজেই। তাঁর কার্যসূচীতে ডাক্তারের স্থান রয়েছে তারও পরের দিন। টেলিগ্রাম পাওয়ামাত্র তাঁদের ‘দেশে’র বাড়িতে রওনা হবার কথা। ততক্ষণে ছোটকুমারের দেহে ইনজেকশনের ক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। তারপর যা করণীয়, মুস্তাফিই তার ভার নেবেন—এই ছিল ব্যবস্থা। কিন্তু ঘটনাচক্রে এই মুহূর্তেই তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

    রাজাবাহাদুরের আর ভবানীপুরে ফেরা হল না। ভাগ্যক্রমে বর্ধমানের রোগীর ঠিকানা মুস্তাফির বাড়িতে পাওয়া গেল। সেটি সংগ্রহ করে ওখান থেকে গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড-এ গিয়ে পড়লেন। কিন্তু ভাগ্যের আনুকূল্য শেষ পর্যন্ত পেলেন না। গন্তব্যস্থলে গিয়ে শুনলেন রোগীটি মারা গেছে, সুতরাং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ডাক্তার কোলকাতায় রওনা হয়ে গেছেন। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ফেরালেন রাজাবাহাদুর। এতক্ষণে মনটা একটু প্রসন্ন হল। এই মৃত্যুটা বোধহয় শুভলক্ষণ। এর মধ্যে তাঁর উদ্দেশ্যসিদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

    ছোটকুমার যখন ট্যাক্সি করে বাসায় ফিরছিলেন, একটি চিন্তাই তাঁর সমস্ত মন অধিকার করে রইল—গুরুতর কারণ না থাকলে বৌরাণী তাকে এমন করে নিষেধ করত না। কিন্তু কী সেই কারণ? নিশ্চয়ই তার কোনো বিপদের আশঙ্কা করেছে বৌরাণী। কিসের বিপদ? সে তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি! তার বিরুদ্ধে কার কি অভিযোগ থাকতে পারে, কুমার কিছুতেই ভেবে পেল না। তবু এই চিঠির পর আর তার কোনোমতেই যাওয়া চলে না। বৌরাণী তাকে যেতে বলেনি, বলেছে তুমি এসো না। তবু তার এই সুস্পষ্ট ‘না’-এর ভিতর থেকে একটি ব্যাকুল অন্তরের স্নেহনির্ঝর ঝরে ঝরে পড়ছে। তাতেই সে অভিভূত হয়ে রইল।

    বাসায় ফিরবার কিছুক্ষণ পরেই কুমার বুঝল তার জ্বর এসেছে। কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল। গঙ্গা ব্যস্ত হয়ে উঠল। বারবার এসে বলতে লাগল, একজন ডাক্তার ডেকে আনি, তোমার সেই যে বন্ধুটি আসে, তাকেই না হয় খবর দিই।

    কুমার নিষেধ করল, এখন থাক, দরকার হলে পরে ডাকা যাবে।

    বিকেলের দিকে জ্বর খুব বেড়ে গেল। আর ওকে জিজ্ঞাসা করল না, শিয়ালদর কাছে ওর ডাক্তার-বন্ধু অমলবাবুর বাসা তার জানা ছিল, তাকে একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এল। কুমার তখন ভুল বকছে।

    রোগীকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার দেহের কয়েকটি বিশেষ জায়গায় এক ধরনের স্ফীতি লক্ষ্য করে অমল সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। তার যতদূর জানা, ওটা প্লেগের লক্ষণ। কিন্তু প্লেগ আসবে কোত্থেকে? হয়তো অন্য কারণে ফুলে থাকবে—যাই হোক, রক্তটা দেখা দরকার। তার এক সতীর্থ ছিল প্যাথলজিস্ট। তার কাছে ছুটে গেল। সে এসে তখনই স্লাইড্ নিয়ে গেল এবং মাইক্রোস্কোপের তলায় ফেলে চমকে উঠল। সত্যিই প্লেগের বীজাণু দেখা যাচ্ছে। দুজনেই টাটকা পাস করা অনভিজ্ঞ চিকিৎসক। নিজেদের বিদ্যার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে পরদিন সকালেই আর কয়েকটা স্লাইড্‌ নিয়ে দিয়ে এল মেডিক্যাল কলেজে এবং রিপোর্টের জন্যে সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগল। রোগীর কাছে করবার বিশেষ কিছু ছিল না, চিকিৎসার গতি-প্রকৃতি, এমন কি আরোগ্যও নির্ভর করছিল রোগ-নির্ণয়ের উপর।

    ওখানকার যিনি বিশেষজ্ঞ, কোনো কারণে তিনি তখন অনুপস্থিত। অনেক দেরিতে ফিরলেন। আরও বহু কেস্ ছিল, তাতেও খানিকটা দেরি হল। তারপর লালফিতার বেড়া পার হয়ে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কাগজখানি যখন অমল এবং তার বন্ধুর হাতে এসে পৌঁছল, তখন সন্ধ্যা হতে আর বাকী নেই। রিপোর্টে নিজেদের মতের সমর্থন দেখে তখনই ট্যক্সি নিয়ে ছুটল কুমারের বাসায়। গিয়ে দেখল কেউ নেই, শূন্য খাটখানা খাঁ খাঁ করছে।

    পাশের ঘর থেকে ঠাকুর এসে কেঁদে পড়ল

    তার মুখেই শোনা গেল, অমল বেরিয়ে যাবার পরমুহূর্তেই রাজাবাহাদুর কোনো এক বড় ডাক্তার নিয়ে এসে পড়েছিলেন, গোটা কয়েক ইন্জেকশনও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কুমারের আর জ্ঞান ফিরে আসেনি। তারপর দুপুরের মধ্যেই সব শেষ। এই কিছুক্ষণ হল যোগাড়যন্তর করে শ্মশানে নিয়ে গেছে। রাজাবাহাদুর সঙ্গে গেছেন। গঙ্গাকে তিনি নিতে চাননি, সে একরকম জোর করেই গেছে। কোন্ শ্মশানে, ঠাকুর ঠিক বলতে পারল না। হাত দিয়ে দক্ষিণ দিকটা দেখিয়ে দিল। অমল তার প্যাথলজিস্ট বন্ধুকে বলল, তাহলে বোধহয় কেওড়াতলায় নিয়ে গেছে। ওর বাবাও শুনেছি কোলকাতাতেই মারা যান এবং তাঁকেও কেওড়াতলায় দাহ করা হয়েছিল।

    —তার কারণ, ওদের ভবানীপুরের বাড়ি থেকে সেটা কাছে পড়ে। এখান থেকে নিশ্চয়ই অদূরে নিয়ে যায় নি।

    –যেখানেই নিক, শ্মশানে গিয়ে আর কী লাভ? উদাসকণ্ঠে বলল অমল। এই মৃত্যুতে সে অনেকটা ভেঙে পড়েছিল।

    বন্ধু বলল, তাহলেও একবার চল। ব্লাড-রিপোর্ট রইল আমাদের কাছে। সেটা না দেখেই ডেথ-সার্টিফিকেট দিলো কে, আর তাতে কি লিখল, একবার জানা দরকার। রাজারাজড়ার ব্যাপার, কোনো গণ্ডগোলও তো থাকতে পারে।

    —ওকে তুমি দ্যাখনি, তাই ওকথা বলছ। সব দাবিদাওয়া ছেড়ে এব কাপড়ে চলে এসেছিল। ওর বিরুদ্ধে কারও কোনো আক্রোশ থাকতে পারে না।

    —তবু একবার আমাদের যাওয়া উচিত। কোলকাতার শহরে হঠাৎ একটা লোক প্লেগে মারা গেল, ব্যাপারটা suppress করা ঠিক হবে না।

    কাশীমিত্তির এবং নিমতলায় সন্ধান না পেয়ে, কেওড়াতলাতে যখন ওরা পৌঁছল, তখন দাউ দাউ করে চিতা জ্বলছে। রাজাবাহাদুর এককোণে চুপ করে বসে আছেন। অমলকে দেখে গঙ্গা ছুটে এল। ওর পায়ের উপর পড়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল— সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে ডাক্তারবাবু? আমি নিজে গিয়ে তোমায় ডেকে নিয়ে এলাম!

    অমল কিছুক্ষণ তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে রাজাবাহাদুরের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অনুকূল শ্রোতা পেয়ে তাঁর শোকোচ্ছ্বাস তীব্র আকারে দেখা দিল।

    সেই সুযোগে অমলের বন্ধুটি ডেথ-সার্টিফিকেটের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করল। কিন্তু শ্মশান-কর্তৃপক্ষ তাকে আমল দিল না। একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির এজাতীয় কৌতূহল মেটাবার সরকারী দায় বোধহয় তাঁদের ছিল না। তখন অমল মনে মনে অনিচ্ছুক হলেও, ব্যাধি এবং তার সঙ্গে জড়িত অন্য দু-একটি বিষয়ের (যেমন হাওড়া স্টেশনে সুঁচ ফোটানো) গুরুত্ব বিবেচনা করে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টখানা পুলিসের গোচরে আনাই তার কর্তব্য বলে মনে করল।

    ইংরেজ-আমলের পুলিস। সরকারী কর্তব্য করতে গিয়ে চাকরির ভাবনা ভাবতে হত না। সুতরাং তৎপরতার অভাব হয়নি। সেই রাত্রেই ডেথ সার্টিফিকেটখানা তাদের দখলে এসে গেল। তার মধ্যে কোনো একটি মারাত্মক রোগের উল্লেখ নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেটা প্লেগ নয়। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার মুস্তাফি তাদের হেফাজতে এসে গেলেন। তাঁর অফিস-কামরায় তল্লাশ চালিয়ে যে-সব চিঠিপত্র পাওয়া গেল, তার সূত্র ধরে তারা প্রথমে হানা দিল নিশানাথের গবেষণাগারে এবং তারপর রাজাবাহাদুরের প্রাসাদে। আরেক দল চলে গেল সেই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের কাছে এবং বহু চাঞ্চল্যকর তথ্যাদি নিয়ে ফিরে এল। তার ফলে রাজাবাহাদুর এবং নিশানাথ একই দিনে আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করলেন।

    সেই চিরস্মরণীয় দিনটির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তদন্ত শেষ করে মামলা দায়ের করতে পুলিসের বহুদিন লেগেছিল। এই সুদীর্ঘ হাজতবাসের প্রতিটি দিন আমি রাজাবাহাদুরের নিকট থেকে নিকটতর সান্নিধ্যে এসেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। কার্য-সূত্রে যখনই একনম্বর সেল-ব্লকে যাবার প্রয়োজন হয়েছে, দেখেছি শ্বেতমর্মরে গড়া একটি বিশাল মূর্তি কখনও বসে, কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও শুয়ে আছে। শান্ত, মৌনী, অবিচল। দেখামাত্র সৌম্য মুখখানি জুড়ে একটি বিনম্র মৃদু হাসি, তার সঙ্গে দীর্ঘ হাত দুটি তুলে একটি ক্ষুদ্র বিনীত নমস্কার। কোনোদিন তার অন্যথা দেখি নি। নালিশ নেই, অভিযোগ নেই, বিন্দুমাত্র বিরক্তি-প্রকাশ নেই। কুশল প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর, ‘ভালো আছি’। অথচ আমরা তো জানি, এই অভিশপ্ত জীবনের অনভ্যস্ত কৃচ্ছ্রতায় দিন দিন তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল, ভালো তিনি ছিলেন না।

    হাজত থেকে যেদিন তাঁকে Condemned Cell অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদীদের সেল-ব্লকে নিয়ে যাওয়া হল, সেদিনও তাঁর মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায় নি। পাশের ঘরেই নিশানাথ। তারও ঐ একই দণ্ড। তার চিৎকারে, আবদারে, অভিযোগে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু রাজাবাহাদুর তেমনি নীরব, নিশ্চল। শুধু একটি দিন তাঁকে কিঞ্চিৎ ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেছিলাম, মুহূর্তের জন্যে একটুখানি ধৈর্যচ্যুতি। ঘটনাটির মধ্যে কিছু মজাও আছে। পাঠকের সেটা উপরি-পাওনা, সুতরাং বলে ফেলা যাক।

    ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে মাঝে মাঝে জেল পরিদর্শনে আসতে হয়। তখন ওখানে ছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ন। বেশ কড়া লোক, তার সঙ্গে একটু বোধহয় ছিটও ছিল। রাজাবাহাদুরের সেল্-এর সামনে গিয়ে যথারীতি জানতে চাইলেন—কোনো নালিশ আছে? তার অনেকদিন আগে ওঁরা দায়রা আদালতের রায়-এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করেছেন। বিচার দূরে থাক, শুনানির দিন পর্যন্ত ধার্য হয় নি। ব্যাপারটা শুধু আশ্চর্য নয়, অভূতপূর্ব। ফাঁসির আসামীর আপীল কখনও এতদিন পড়ে থাকে না। দিনের পর দিন এই অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে কাটানো এক দুঃসহ শাস্তি। তার থেকে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি মুক্তি দেওয়াই হাইকোর্টের চিরাচরিত রীতি। এক্ষেত্রে এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণ কি, তাঁরাই বলতে পারেন।

    ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশ্নের সেই মামুলী উত্তরই আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু রাজাবাহাদুরের নিঃসীম সহিষ্ণুতা, সেখানেও রোধহয় একটু ফাটল ধরেছিল। গরাদে দেওয়া রুদ্ধ দরজার সামনে একটু এগিয়ে এসে বললেন, আপনার যদি ক্ষমতা থাকে সাহেব, একটা উপকার করলে বিশেষ বাধিত হবো। মাসের পর মাস ধরে মাধার ওপর যে সোর্ডখানা ঝুলছে, তাকে সোজা ফেলে দিতে বলুন। এছাড়া আমার আর কোনো প্রার্থনা নেই।

    সাহেব আমাদের দিকে তাকালেন। ব্যাপারটা তাঁকে বুঝিয়ে দেয়া হল। কোনো ক না বলে অফিসে চলে এলেন, ওয়ারেন্ট এবং অন্যান্য কাগজ-পত্রাদি দেখলেন, তার ভিজিটরস্ বুক টেনে নিয়ে মামলার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে শেষের দিকে লিখলেন, কেটি মহামান্য হাইকোর্টের বিচারাধীন। এ বিষয়ে কোনোরকম মন্তব্য করবার অধিকার আমার নেই। কিন্তু এই জাতীয় কোনো পরিস্থিতি পৃথিবীর আর কোনো সভ্য দেশে ঘটেছে . বলে আমার জানা নেই, ঘটতে পারত কিনা সে-বিষয়েও আমি সন্দিহান।

    জেলের নিয়মানুসারে ভিজিটররা যে মন্তব্য করেন, সুপারিন্টেণ্ডেন্টের বক্তব্যসহ তার একটা নকল স্বরাষ্ট্রবিভাগে পাঠাতে হয়। দিন-তিনেক পরে হোম্ মেম্বারের কাছ থেকে ভীষণ জরুরী টেলিফোন, তার মধ্যে রীতিমত সন্ত্রাসের সুর—এ করেছ কি! এই কথাগুলো যদি কোনোরকমে হাইকোর্টের নজরে পড়ে, কালেক্টরকে যে তখনই তোমাদের অতিথি হতে হবে! সিরিয়স্ কনটেমপ্‌ট অব কোর্ট!

    —কি করতে হবে? ততোধিক ভীতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন সুপার

    —ভিজিটরস্ বুকের ঐ পাতাটি এখুনি ছিঁড়ে ফেলে দাও। অফিসে যদি তার নকল থাকে, ডেস্‌ট্রয় অ্যাটওয়ান্স! আমরাও তাই করছি।

    যথাসময়ে অর্থাৎ তার অনেক পরে হাইকোর্টের রায় বেরোল। ডেথ সেটেন্স কমিউটেড টু ট্রানসপোর্টেশন ফর লাইফ। নিশানাথেরও তাই। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। ডাক্তার মুস্তাফি আগেই খালাস পেয়েছিলেন।

    “রক্তপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সে খবর আমার আগে জানা ছিল না। তাহলে অবশ্যই তার রিপোর্টের জন্যে অপেক্ষা করতাম। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা মতো যে রোগে মৃত্যু বলে মনে হয়েছে, ডেথ সার্টিফিকেটে তারই উল্লেখ করেছি”–

    তাঁর এই উক্তি কোর্ট অবিশ্বাস করে নি।

    নিশানাথ সম্পর্কে বলেছিলেন, “প্রতিভাবান ছাত্র হিসাবে গবেষণার সুবিধার জন্যেই আমি তার জন্যে যা কিছু করেছি। সেখানে থেকে বীজাণু সংগ্রহ করে খুনের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ ইত্যাদি ব্যাপার যদি ঘটে থাকে, তার সঙ্গে আমার কোন সংস্রব নেই।”

    এ বিষয়েও দায়রা জজ তাঁকে বেনিফিট্ অব্ ডাউটের সুবিধা দিয়েছিলেন।

    রাজাবাহাদুরকে আন্দামানে পাঠানো হয় নি, ঐ জেলেই ছিলেন। তাঁর সেই পুরনো জায়গায়—একনম্বর সেল-ব্লক। সেখানে বসেই একদিন, হয়তো কোনো দুর্বল মুহূর্তে—যা সকলের জীবনেই আসে—তিনি আমার কাছে তাঁর সমস্ত অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। সে কথা এই আখ্যায়িকার গোড়ার দিকে উল্লেখ করেছি। আমার মনের মধ্যে সেদিন যে অসামান্য আবিষ্কারের উল্লাস জেগে উঠেছিল, তাও গোপন রাখি নি। কিন্তু সত্যিই কি আমি তাঁর দুয়ে মানসের রুদ্ধকক্ষে প্রবেশের অধিকার পেয়েছিলাম? মনে আছে, সেদিন তাঁকে কোনো প্রশ্ন করি নি, তার কদিন পরে আমার সাধারণ বুদ্ধিতে যে স্থূল সন্দেহ জেগেছিল, তারই একটু আভাস দিয়েছিলাম। অনেক ইতস্তত করে বলে ফেলেছিলাম, আচ্ছা বৌরাণী এবং ছোটকুমারের আচরণে এমন কিছু কি আপনি দেখেছিলেন, যার থেকে-

    রাজাবাহাদুর কথাটা শেষ করতে দেন নি। তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে দাঁতে জিব কেটে বলেছিলেন, ছিঃ ছিঃ, ওদের সম্বন্ধে একথা ভাবাই যায় না। দুজনেই নিষ্পাপ, পবিত্র।

    তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেছিলেন, হয়তো সেই জন্যেই আমি ঐ ছেলেটাকে কোনোদিন সইতে পারি নি। ও বড় বেশী শুদ্ধ, বড় বেশী মহৎ। ছেলেবেলা থেকে কোনো কিছুতে আসক্তি নেই, লোভ নেই। সেই সৃষ্টিছাড়া বৈরাগ্য আমাকে উঠতে বসতে পীড়া দিত। কখনও ভুলতে পারি নি, ও আমার অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে, আমার সাধ্য নেই কোনোদিন সেখানে উঠি। বিয়ে করে যাকে নিয়ে এলাম, সেও আমার নাগালের বাইরে চলে গেল। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। ওরা যে আমাকে একঘরে করে তাড়িয়ে দিল—কি করে যে আমার দিন কেটেছে, আপনাকে বোঝাতে পারবো না, মিস্টার চৌধুরী।

    আবার কিছুক্ষণের বিরতি। বোধহয় সেই দিনগুলোর মধ্যে ফিরে গিয়ে নতুন করে সেই যন্ত্রণাটা অনুভব করলেন। তেমনি গভীর সুরে বললেন, তারপর যেদিন সব কিছু আমাকে লিখে দিয়ে চলে গেল, আমার কি মনে হল জানেন? মনে হল সম্পত্তি নয়, সোনা-দানা নয়, একতাল কাদা ছুঁড়ে দিয়ে গেল আমার মুখের ওপর।

    —আপনি নিলেন কেন সে সম্পত্তি?

    —নিলাম তার কারণ, না নেবার মতো জোর আমার মধ্যে ছিল না। তাছাড়া আমি না নিলে হয়তো যাকে-তাকে দিয়ে যেত। যে সে আমার পিতৃ-পিতামহের সম্পত্তির অংশীদার হয়ে বসবে, আমার প্রাসাদের অর্ধেক অধিকার দাবি করবে, আমার জীবন থাকতে তা হতে পারে না। তাই নিতে হল, কিন্তু নিয়ে কি একদিনের তরেও স্বস্তি পেয়েছি মনে করেন? কেবলই মনে হত, সে আমাকে চিরদিনের তরে হারিয়ে দিয়ে গেল। সে স্পর্ধা কেমন করে সহ্য করা যায়, বলুন?

    আরেকদিন অন্য কি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমাকে লোকে বলে রূপবান পুরুষ। রূপ আমার পূর্বপুরুষের দান। ও সেটা পায় নি, তার বদলে এমন একটা halo ছিল ওর মধ্যে দেখতাম আর হাড়ে হাড়ে অনুভব করতাম, তার কাছে আমি কত কুৎসিত! চোখের ওপর একটি চোখ ঝলসানো আলো কতক্ষণ বরদাস্ত করা যায়?

    কোলকাতা এবং তার আশেপাশের জেলগুলোতেই অনেকদিন ধরে ঘুরেছি, লালদীঘির কর্তাদের সেটা খেয়াল হয় নি, যখন হল, মোটা কলমের এক খোঁচায় আমাকে একেবারে দক্ষিণ বাংলার শেষ প্রান্তে ঠেলে দিলেন। বছর কয়েক পরে সেখান থেকে পাঠালেন উত্তরে। তারপর গোটা পূর্বাঞ্চল ঘুরিয়ে দিলেন। এমনি করে তিনদিকব্যাপী দীর্ঘ পরিক্রমা শেষ করে স্বাধীনতার টানে ‘অপটী’-রূপে (optee) আবার পশ্চিম বাংলায় ফিরে এলাম। ততদিন আমার মাথার চুল উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু রাজাবাহাদুরের রূপ বিস্মৃতির কালিমায় ম্লান হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে কয়েক ধাপ উপরে উঠেছি, এবারে একটা বড় সেন্ট্রাল জেলের হাল ধরবার ডাক এসে গেল।

    চার্জ নেবার পরদিন সদলবলে ‘রাউণ্ডে’ চলেছি। দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদীদের চত্বর পার হয়ে বারান্দায় পড়ে ডানদিকে মোড় নিতে যাব, হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়তেই থমকে দাঁড়ালাম। মুখ থেকে অজ্ঞাতসারে বেরিয়ে গেল—এ কে! নমস্কারের সেই বিশেষ ভঙ্গিটি তেমনি আছে। কিন্তু যে স্নিগ্ধ হাসিটি সেদিন মুহূর্তমধ্যে সমস্ত মুখখানাকে উদ্ভাসিত করে দিত, আজ শুধু কতকগুলো বিকৃত কুঞ্চন দিয়ে তাকে কুৎসিত ও ভয়াবহ করে তুলল। কণ্ঠস্বরের সে গাম্ভীর্যও কোথায় চলে গেছে। কেমন একটা কর্কশ খনখনে আওয়াজ বেরিয়ে এল—চিনতে পাচ্ছেন?

    উত্তর দিতে ভুলে গেলাম।

    আমি তখন অনেকগুলো বছর পার হয়ে সেই দিনটিতে ফিরে গেছি, যেদিন প্রথম এঁকে দেখেছিলাম। সহসা-জ্বলে-ওঠা তড়িৎচমকে আমার স্মৃতিকক্ষের সব অন্ধকার সরিয়ে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘ, ঋজু, ভাস্বর পুরুষ, যার দিকে তাকিয়ে গিরীনদা বলেছিলেন—Every inch an Aristocrat. তার সঙ্গে এই কঙ্কালের কোনোখানে কোনো মিল নেই। চিনতে যে পেরেছি, সেটাই আমার কাছে বিস্ময়কর বলে মনে হল।

    যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ কুড়ি বছর। কিন্তু ‘Fourteen years’ rule নামক আইনের বলে রেমিশন সমেত চৌদ্দ বছর পার হলেই সুপারের অভিমত নিয়ে প্রাদেশিক সরকার বেশির ভাগ লোককে ছেড়ে দিয়ে থাকেন। রাজাবাহাদুরকে সে আইনের সুযোগ দেওয়া হয় নি। জেল থেকে যথারীতি সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। সরকার রাজী হন নি। এক বছর পরে কেসটা আবার নতুন করে পাঠাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

    পরের সপ্তাহে খবর এল, রাজাবাহাদুর আমার দর্শন-প্রার্থী। অফিসে নিয়ে আসতে বলে দিলাম। ধীরে ধীরে নুইয়ে-পড়া-দেহটাকে যেন কোনোরকমে টেনে নিয়ে আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে বললাম। খানিকটা ইতস্তত করে সসঙ্কোচে সেটি দখল করলেন। বললাম, বৌরাণী কেমন আছেন?

    —অনেকদিন খবর পাই নি।

    —মাঝে মাঝে দেখা করতে আসেন না?

    —আমিই বারণ করেছি। শুনেছি বেশির ভাগ সময় ঠাকুরঘরেই পড়ে থাকে, তাই আর ডিস্টার্ব করতে চাই নি।

    আর কোনো প্রশ্ন না করে জিজ্ঞাসু-দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকালাম। ইঙ্গিতটা বুঝলেও আরও কিছু সময় গেল দ্বিধার জড়তা কাটিয়ে উঠতে। তারপর ক্ষীণস্বরে ধীরে ধীরে বললেন, আসতে না আসতেই বিরক্ত করছি, অথচ-

    বললাম, আপনি নিঃসঙ্কোচে বলুন, আমি কিছুমাত্র বিরক্ত হবো না।

    —বেশ বুঝতে পারছি, ডাক এসে গেছে। আর বেশিদিন নেই। তাই ভাবছিলাম, শেষ নিঃশ্বাসটা যদি বাপ-পিতামহের ভিটেয় ফেলতে পারতাম তবু খানিকটা তৃপ্তি হত।

    বলতে যাচ্ছিলাম, ওসব আপনার মিথ্যা আশঙ্কা, সাহস হারাবেন না ইত্যাদি। ওঁর শরীরের দিকে চেয়ে নিরস্ত হলাম। ঐজাতীয় মামুলী সান্ত্বনা অন্য কাউকে দেওয়া যেত, এঁর বেলায় নিরর্থক। শুধু বললাম, আপনার কেস্টা আমি দেখেছি। আমার পক্ষে যতখানি সাধ্য চেষ্টার ত্রুটি করবো না।

    —জানি সেইটুকুই আমার ভরসা।

    কয়েকদিনের মধ্যেই খবর এল মন্ত্রী আসছেন। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম মন্ত্রী এবং এ জেলে তাঁর প্রথম পদার্পণ। রাজাবাহাদুরকে বলে পাঠালাম, ঐ ওয়ার্ডে যখন যাবেন, ওঁর প্রার্থনা যেন তাঁর কাছে পেশ করা হয়। তাই হল। এই কুখ্যাত মামলার বীভৎস ইতিহাস মন্ত্রীমহাশয়ের না জানবার কথা নয়। সেই হত্যাকাণ্ডের যে প্রধান নায়ক, তার উপরে কঠোর মনোভাব পোষণ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই লোকটার এই পরিণাম বোধহয় তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। তার উপরে তার শেষ নিবেদনের বিষয়বস্তু এবং যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে সেটা বর্ণিত হল, সবকিছু মিলে তাঁর মনে একটা অনুকূল আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে বুঝতে পারলাম। ওখানে একটা সময়োচিত জবাব দিয়ে অফিসে ফিরে গিয়ে বললেন, বিষদাঁত ভেঙে গেছে মনে হচ্ছে। এবার বোধহয় ছেড়ে দেওয়া যায়, আপনি কি বলেন?

    —আজ্ঞে আমারও তাই মনে হয়। Let him have the comfort of dying at home.

    কথাটা আমার রচনা নয়, জেলকোড-এর কোনো একটি ধারার পুনরুক্তি। যে হতভাগ্য বন্দীর জীবনের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে, কিন্তু জেলের মেয়াদ বাকী, তার বেলায় ঐ আরামটুকু মঞ্জুর করবার বিধান আছে।

    মন্ত্রী বললেন, তাহলে একটা পিটিশন দিতে বলুন, আর তার ওপরে আপনি একটু ভালো করে লিখে-টিখে দিন। তার মধ্যে ঐ কথাটা যেন থাকে—বেরিয়ে গিয়ে আবার একটা কিছু করবার মতো দেহের শক্তি বা মনোবল দুটোই চলে গেছে? অর্থাৎ পুলিস যাকে বলে reversion to further crime—তার কোনো chance নেই।

    দু-দিনের মধ্যে দরখাস্ত চলে গেল, এবং মন্ত্রীমহাশয়ের উপদেশমত আমার সুপারিশের সঙ্গে ঐ বিশেষ মন্তব্যটুকু জুড়ে দেওয়া হল।

    মাসখানেক পরে রাজাবাহাদুর মুক্তি পেলেন। তার আগে ওঁকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবার জন্যে জেল থেকে ওঁর দেশের বাড়িতে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল। দুজন পুরনো কর্মচারী এসেছিল—তারা এবং আমার কজন কর্মী ধরাধরি করে ওঁকে গাড়িতে তুলে দিল।

    এর পরের ঘটনাগুলো আমার সংগ্রহ। কিছুটা খবরের কাগজ থেকে, এবং বাকী অংশ একজন পুলিস অফিসার মারফৎ, এ বিষয়ে যাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে।

    রেলস্টেশন থেকে প্রাসাদে পৌঁছবার পরেও রাদাবাহাদুরকে গাড়ি থেকে ধরে নামাতে হয়েছিল। একতলায় তাঁর নিজস্ব মহলে কোনো একটা ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর নানা প্রশ্নের মধ্যে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার বন্দুকগুলো সব আছে তো?

    —আজ্ঞে, সবগুলো নেই। পুলিস লাইসেন্স দিতে চাইল না। কয়েকটা আছে।

    —চল তো দেখি।

    —এখনি যাবেন? খাওয়া-দাওয়ার পর বরং—

    —না, তার আগেই ঘুরে আসি চল।

    লোকজনের কাঁধে ভর করে তেমনি ধীরে ধীরে আর্মারিতে গিয়ে ঢুকলেন। তাঁর প্রথম যৌবনের শিকার-সঙ্গী প্রিয় রাইফেলটা বের করলেন, কয়েকটা রিভলবার নাড়া- চাড়া করে দেখলেন, গুলির বাক্সটাও খুলতে বললেন। ম্যানেজার ছিলেন দরজার বাইরে। তাকে লক্ষ্য করে বার বার অনুযোগ দিতে লাগলেন, এ করেছ কী? সব যে নষ্ট হতে বসেছে!

    এমন সময় বাইরে দাঁড়ানো চাকর-বাকরদের মধ্যে একটু চাঞ্চল্য দেখা দিল। কে যেন বলল, বৌরাণী আসছেন। চক্ষের নিমেষে সেই ভেঙে-পড়া অশক্ত দুর্বল ন্যুব্জ দেহটা সবেগে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল, এবং ক্ষিপ্রবেগে দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। হাতে রাইফেল, কাঁধে গুলিভর্তি ব্যাণ্ডোলিয়র। বৌরাণী ওদিকের বারান্দা দিয়ে এগিয়ে আসছিলেন—পরনে পট্টবাস, হাতে ঠাকুরের আশীর্বাদী ফুল। চেঁচামেচি শুনে মাথা তুলতেই চোখে পড়ল বন্দুকের নল তাঁরই দিকে উদ্যত। চিৎকার করে একটা থামের আড়ালে সরে গেলেন। গুলি গিয়ে লাগল পেছনের দেয়ালে। ছুটে এগিয়ে গিয়ে আবার নিশানা নিলেন রাজাবাহাদুর, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা চেয়ার সজোরে তাঁর পিঠের উপর এসে পড়ল। তিনি মুখথুবড়ে পড়ে গেলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে গুলি ছুঁড়লেন। একজন চাকর ছুটে পালাচ্ছিল, পিঠে লাগতেই সে পড়ে গেল। ততক্ষণে দুজন দারোয়ান বন্দুক নিয়ে ছুটে এসেছে। রাজাবাহাদুর গুলি চালাতে চালাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন।

    থানায় খবর দেওয়া হয়েছিল। ও. সি. ও এসেছিলেন জনকয়েক পুলিস নিয়ে, কিন্তু সেই গুলিবৃষ্টির মুখে এগোতে সাহস করেন নি। সদরে টেলিগ্রাম করে বেশ কিছু আম পুলিস আনিয়ে তারপরে আততায়ীকে আয়ত্তে আনতে পেরেছিলেন। তাও জীবন্ত মানুষটাকে ধরতে পারেন নি, পেয়েছিলেন তার প্রাণহীন দেহ। তার এক পকেটে ছিল সরকার প্রদত্ত মুক্তির আদেশের নকল, আরেক পকেটে এক টুকরো বহুদিনের পুরনো ভাঁজ করা বিবর্ণ কাগজ। তার সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় নি। পুলিস অফিসারের কাছে দু-একটি লাইন যা শুনেছিলাম, তার থেকে বুঝেছি ওটা সেই চিঠি—’ছোটু’র উদ্দেশে বৌরাণীর শেষ সম্ভাষণ।

    আমি রাজাবাহাদুরকে চিনি। যে-চিঠি তাঁর দীর্ঘদিনব্যাপী বহুযত্নরচিত পরিকল্পনাকে সাফল্যের পূর্ব-মুহূর্তে অকস্মাৎ বানচাল করে দিয়েছিল, তাকে তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেন না, একথা সহজেই বুঝতে পারি। সে চিঠি যার হাত থেকে বেরিয়েছিল, সে যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে এই আঠারো বছরের সঞ্চিত জিঘাংসা এবং প্রথম সুযোগেই তাকে চরিতার্থ করবার প্রচেষ্টা—এ-সবও আমার কাছে দুর্বোধ্য নয়, কিন্তু বিভিন্ন জেলখানার সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে ঐ কাগজটুকু কেন যে তিনি এত বছর ধরে এত যত্নে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন—সে রহস্য আজও ভেদ করতে পারি নি।

  • ছয়

    ছয়

    সেকালে কবি এবং কথাশিল্পীর কাজ ছিল রাজার মনোরঞ্জন। একালেও তাই, তবে এক রাজার নয়, বহু রাজার। তখন তাঁর গুণাগুণের বিচার করত রাজ-দরবার, এখন করে জন-দরবার। এ বড় কঠিন ঠাঁই। ‘একটি শ্লোকে স্তুতি গেয়ে’ সে-’রাজার কাছে’ হয়তো কোনো নগরপ্রান্তে একখানি ‘কানন-ঘেরা বাড়ি’ ‘চেয়ে’ নেওয়া যেত। এ রাজার কাছে সে আশা দুরাশা মাত্র। বহু শ্লোকেও এঁর মন গলে না। কখনও কারও ভাগ্যে মন যদি বা গলে, হাত দিয়ে যৎকিঞ্চিৎ দক্ষিণার বেশি আর কিছু গলে না। তবে একটা জিনিস মেলে, ‘ফাংশান’ নামক নাচ-গান-হাস্য-কৌতুকের আসরে একখানি উচ্চাসন, দীর্ঘ উৎসব-সূচীর শীর্ষদেশে একটি নাম—’সভাপতি’ কিংবা ‘প্রধান অতিথি’। ঐ সঙ্গে একটি গাঁদা কিংবা রজনীগন্ধার মালা। তাও ঠিক বিনামূল্যে নয়। বিনিময়ে বিমুখ এবং যথেচ্ছ আলাপরত শ্রোতৃমণ্ডলীর শির লক্ষ্য করে একটি কঠিন বস্তু ছাড়তে হয়, তার নাম ভাষণ

    দৈবক্রমে ‘লেখকে’র গদি যেদিন লাভ করলাম, তারপর থেকে ঐ আসনটিতে আমার মাঝে মাঝে ডাক পড়ে থাকে। সেই সূত্রেই একটা কোনো উপলক্ষে মফঃস্বলের যে শহরটিতে আমাকে যেতে হয়েছিল, কয়েক বছর আগে আমি ছিলাম সেখানকার বৃহৎ জেলখানার কর্ণধার। সেই বহু-পরিচিত সু-উচ্চ পাঁচিলের পাশ দিয়ে পথ। গাড়িখানা যখন একরাশ ধুলো উড়িয়ে দ্রুতবেগে তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল, নিজের অজান্তে একবার পিছন ফিরে তাকালাম। ঐ পাষাণ-বেষ্টনীর অন্তরালে জীবনের যে অধ্যায়টা একদিন ফেলে গিয়েছিলাম, তার ভিতরকার অনেকগুলো মুখ সহসা এসে মনের দুয়ারে ভিড় করে দাঁড়াল। দেখলাম, সেখানেও বহু ধুলো জমে গেছে। কোনোটিকেই ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। অথচ সেদিন এত বড় দুনিয়া থেকে আলাদা ঐ ঘেরা জায়গাটুকুই ছিল আমার জগৎ। ওর ভিতরে জড়ো-করা একদল বিশেষ শ্রেণীর জীব নিয়েই গড়ে উঠেছিল আমার মানসলোক। তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ছোট ও বড় বহু সমস্যা আমার ধ্যান ও কর্মের প্রায় সবখানি দখল করে রেখেছিল। মাঝখানে এই সামান্য কটা বছরের ব্যবধান, এরই মধ্যে সেখান থেকে তারা সরে গেছে, কিংবা বলা যেতে পারে, হটে গেছে। আর কিছুদিন পরে ঐ ধূলি-মলিন অস্পষ্ট কায়াগুলো হয়তো একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবে।

    গিরীনদা বলতেন, মানুষের মন বড় অকৃতজ্ঞ। আজ যারা তার খাদ্য যোগায়, সর্বক্ষণ তাকে সঙ্গ দেয়, তার ভাবনা-অনুভূতি আনন্দ-বেদনার সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে থাকে, দু-দিন যেতে না যেতেই তাদের দিকে সে ফিরেও তাকায় না। তখন সে কোনো নতুনের প্রেমে মশগুল। কালক্রমে সে নতুনও কোথায় মিলিয়ে যায়, দেখা দেয় ‘নতুন-তর’।

    সত্যিই তাই। ‘মনের’ মন পাওয়া বড় দুষ্কর। সে চির-চঞ্চল। এক আসন থেকে আরেক আসনে সতত-সঞ্চরমাণ। কারও প্রতি পক্ষপাতিত্বের বালাই নেই। মধুকর-বৃত্তিই তার ধর্ম।

    ‘দুই বিঘা জমি’র ভূতপূর্ব মালিক হতভাগ্য ‘উপেন’ দীর্ঘকাল পরে সন্ন্যাসী-বেশে একদিন যখন তার ‘সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ’ সেই পুরনো মাটিতে ফিরে এসে দাঁড়াল, সবিস্ময়ে চেয়ে দেখল—’কোথায় তার সে জমি। কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন।’ সেদিন ক্ষোভে, দুঃখে-বেদনায় সেই ‘নিলাজ কুলটা ভূমিকে’ সে বারংবার ধিক্কার দিয়েছিল। আমার এই মনটা কি তার চেয়ে নির্লজ্জ নয়? তবু কোনো ধিক্কারের সুর আমার কণ্ঠে বাজল না। ক্ষোভ এবং বিস্ময়ের যে সূক্ষ্ম বাষ্পজাল ক্ষণেকের তরে মনশ্চক্রবালে দেখা দিয়েছিল, তাকেও উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলাম। নিজেকে বোঝালাম পিছনপানে না তাকিয়ে নিয়ত এগিয়ে যাওয়াই তো সজীব মনের পরিচয়। অতীতের স্মৃতিভারে নুয়ে পড়াটাই মানসিক অবক্ষয় বা ‘ডেকাসেন্সের’ লক্ষণ

    সোজা হয়ে বসে সামনের দিকে তাকালাম। পশ্চাৎমুখী ঝিমিয়ে পড়া চিন্তার স্রোতকে টেনে নিয়ে এলাম আসন্ন কর্মধারার পথে। যে কাজে এসেছি, যে গৌরবময় গুরু দায়িত্ব- ভার এই মুহূর্তে আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে, তারই দিকে নিজেকে সজাগ করে তুললাম।

    তবু চলতে চলতে অন্তরের কোন্ কোণে কিসের একটা কাঁটা যেন খচ্ খচ্ করে বিঁধতে লাগল। যে কালো পাঁচিলটাকে পিছনে ফেলে এলাম, সে যেন সমস্ত পথটা আমাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে চলল, দূরে ঠেলে দিতে চাইলেও গেল না।

    যে প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে সভাস্থলে ছুটেছি, তার সুযোগ্য সম্পাদক আমার পাশেই বসেছিলেন। এতদিন ধরে তাঁদের এখানে যা কিছু গড়ে উঠেছে, এবং আজকের এই অনুষ্ঠানের যত কিছু আয়োজন, সবই যে তাঁর একক প্রচেষ্টার ফল, সেই সম্বন্ধে একটি দীর্ঘ ধারা-বিবরণী তিনি সগর্বে এবং সবিনয়ে আমার কর্ণমূলে পরিবেশন করে চলেছিলেন। আমি কিছুই শুনছিলাম না; মাঝে মাঝে শুধু মাথা নেড়ে দু-চারটা ‘ও’, ‘আচ্ছা’ ‘তাই নাকি’ যোগ করে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে ঐ জেলের পাঁচিলটার অলক্ষ্য অনুসরণ বোধহয় আমাকে একটু আনমনা করে দিয়ে থাকবে। সম্পাদক সেটা লক্ষ্য করলেন। কি ভাবলেন জানি না, ক্ষণেকের তরে গাড়ির বাইরে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললেন, আপনার পুরনো কর্মস্থল ফেলে এলাম, দেখে যাবেন নাকি একবার?

    —কী আর দেখবো? তাছাড়া সময়ই বা কই?

    —তাই তো, কাল ভোরেই যে আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে। কত কাজ আপনার। কত জায়গায় যেতে হয়। এত ব্যস্ততার মধ্যেও একটি দিনের জন্যে আপনাকে আমরা পেলাম, সেটাই আমাদের পরম সৌভাগ্য।

    স্তুতিবাদটুকু উপভোগ করলেও প্রতিবাদ-সূচক একটা কি জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই গাড়িটা সভামঞ্চের গেট্‌-এ এসে থামল এবং আমাকে নামিয়ে নেবার জন্যে কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিরা চঞ্চল হয়ে উঠলেন।

    তারপর যেমন হয়ে থাকে, বারকয়েক আলো নেভা ও মাইক-বিভ্রাট। তারই মধ্যে সভার কাজ শেষ হল, শুরু হল নাটক। সেটা বেশ ভালোই লাগছিল, বিশেষ করে অভিনয়, সাজ-পোশাক এবং পরিচালনার ছোটখাটো ত্রুটিগুলো—মফঃস্বলের নাটমঞ্চে ঐগুলোই বেশি উপভোগ্য, ওখানে যাঁরা নিখুঁত’-এর আশা নিয়ে যান এবং না পেলে মন খুঁত খুঁত করেন তাঁদের ঠকতে হবে। খুঁতের মধ্যেই তো রস। ড্রপটা যদি দু-একবার মাঝপথে আটকে না যায়, চন্দ্রবাবুর দাড়ি কিংবা রসিকদাদার গোঁফ যদি আগাগোড়া স্বস্থানে অটুট থাকে, অভিনেতারা মাঝে মাঝে পার্ট ভুলে গিয়ে প্রশ্টারের পানে ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে না তাকায়, তাহলে আর শখের থিয়েটার দেখে সুখ কোথায়? নাট্যকলার সঙ্গে এই সব মজাদার আনুষঙ্গিকগুলোকে সমভাবে উপভোগ করতে আমার কোনোদিন বাধে না। তাই এই জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে বরাবরই যথার্থ আনন্দ পেয়ে থাকি।

    আজও পাচ্ছিলাম, এবং মনের দিক থেকে মাঝপথে উঠে পড়বার কোনো তাগিদ ছিল না। কিন্তু এদিকে যে আবার ভি. আই. পি. সেজে বসে আছি, এই সব অসার বস্তুর পিছনে মন ও সময়ের একটি ক্ষুদ্র অংশের বেশি ব্যয় করা চলে না, পদ-মর্যাদায় বাধে। একটি অঙ্ক, শেষ হতে না হতেই আশেপাশের আসনগুলো ফাঁকা হতে লাগল। বৃহৎব্যক্তিরা একে একে সবিনয়ে বিদায় নিচ্ছেন। আমিও তো সেই দলে—সুতরাং আর বসে থাকাটা শোভা পায় না।

    বিয়ে-বাড়ির সাধারণ ভোজের আসরে যদু-মধুদের মধ্যে বসে অতি-বিশিষ্ট অতিথি যদি শাকভাজা থেকে মিঠে পান পর্যন্ত গোটা পর্বটা চালাতে থাকেন, সেটা তাঁর পক্ষে অতিশয় বেমানান। পেটে ক্ষিদে এবং জিভে লোভ যতই থাক, মুখে লাজ না দেখিয়ে উপায় নেই। বাড়ির কর্তাও মনে মনে তাই চান। মহামান্য অতিথিকে আলাদা কোথাও বসিয়ে গোটা দুই সন্দেশ, একটু দই এবং তার সঙ্গে প্রচুর মৌখিক আপ্যায়ন দিয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় করে দেন। এই সব সাংস্কৃতিক আসরের রীতিনীতিও তাই। বিশেষ ভাবে আমন্ত্রিত খ্যাতিমান ব্যক্তির বেলায় সংক্ষিপ্ত ভোজের ব্যবস্থা। শুধু অগ্রভাগ, বাকীটা অর্থাৎ উদ্বোধন থেকে উপসংহার পর্যন্ত বিস্তৃত যে বৃহৎ, প্রোগ্রাম, তা রইল অবৃহৎ ইতরজনের ভাগে।

    অতএব উঠে পড়লাম। উঁচু মহলের উদ্যোক্তাদের মুখে খুশির আভাস ফুটে উঠল। তাঁরাও যাবার জন্যে প্রস্তুত। আগেই যেতেন, ‘প্রধান অতিথি’কে ফেলে যাওয়াটা সৌজন্যে বাধছিল। এবং অপ্রধানজনিত আচরণে ভিতরে ভিতরে হয়তো অস্বস্তি বোধ করছিলেন। নীচের মহল, অর্থাৎ যারা সাক্ষাৎভাবে জড়িত— আয়োজক, শিল্পীগোষ্ঠী, তারা মনে মনে ক্ষুণ্ণ হল, যদিও মুখে সেটা প্রকাশ করতে সাহস করল না। ‘কষ্ট করে’ এতক্ষণ যে ছিলাম, সেটাই তো তাদের পরম ভাগ্য।

    সামিয়ানার বাইরে বেরোতেই অভিলাষবাবুর সঙ্গে দেখা। মুখ থেকে আপনা হতেই বেরিয়ে গেল—আপনি এখানে!

    তিনি হেসে বললেন—অবাক হবার কথাই। তবে যা মনে করছেন, তা নয়, বক্তৃতা শুনতে বা নাটক দেখতে আসি নি।

    —সেই কথাই ভাবছি। ওসব দুর্বলতা তো আপনার কোনো কালেই ছিল না।

    —দুর্বলতা নয় স্যার, বলতে পারেন অক্ষমতা। প্রথমটা বুঝি না, দ্বিতীয়টায় রস পাই না। এসেছি প্রাণের দায়ে। আপনাকে আমার ভয়ানক দরকার।

    —আমাকে!

    —হ্যাঁ, আপনি যা হয়েছেন তাঁকে নয়, আপনি যা ছিলেন তাঁকে।

    বুঝলাম, ভদ্রলোক আবার একটা কোনো ফ্যাসাদে পড়েছেন।

    অভিলাষবাবুর সঙ্গে পরিচয় আমার অনেক দিনের। একাধিক জেলে একসঙ্গে কাজ করেছি। উনি এক ধাপ নীচে ছিলেন আমার চেয়ে। সেটা নিছক অফিস-গত সম্পর্ক। তার বাইরে আমরা বরাবর বন্ধু। অবশ্য অফিসের বাইরে ওঁকে পাওয়াই ছিল দুরূহ ব্যাপার। ঢুকতেন সকলের আগে, আর বেরোতেন সকলের পরে। বেরনো মানে গেট পেরিয়ে কয়েক পা হেঁটে বাসায় গিয়ে বসা। সেটুকুও করতো ওঁর দেহ, মন থেকে যেত গেটের ভিতরে। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার জন্যে জেল ছেড়ে এলেও জেল ওঁকে ছাড়ত না, সিন্ধবাদ হয়ে ঘাড়ের উপর চেপে বসে থাকত। ভদ্রলোকের চিন্তা-ভাবনা আলাপ-আলোচনার পরিধিটাকে তার চার দেয়ালের বাইরে বড় একটা যেতে দিত না, গেলেও তখনি আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসত।

    নিজের সংসারের সঙ্গে অভিলাষবাবুর সম্পর্ক ছিল একমাত্র আর্থিক। সেটা চুকে যেত প্রতিমাসের পয়লা তারিখে—মাইনের টাকা কটি যখন স্ত্রীর হাতে এনে দিতেন। – বাকী যা কিছু, তার সব ভার ভদ্রমহিলা একাই বহন করতেন। না পারলে বা কোনোখানে আটকে গেলে স্বামীকে কখনও ঘাঁটাতেন না, জানতেন সেটা বৃথা—তাঁর সহকর্মীদের সাহায্য নিতেন। সেই সূত্রে ওদের পারিবারিক জটিলতার জট ছাড়াতে মাঝে মাঝে আমার ডাক পড়ত।

    একদিনের একটি ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ছে। সকালে অফিস যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছি, অভিলাষবাবুর আট বছরের মেয়ে পুঁটি এল ছুটতে ছুটতে। কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই গম্ভীর মুখ করে চুপি চুপি খবর দিল, ‘দাদা কাল বাড়ি আসে নি। মা বললে, তোর জ্যাঠামশাইকে বলে আয়। আর—’

    পরের অংশটুকু আন্দাজে বুঝে নিয়ে বললাম—মাকে গিয়ে বল, আমি যাবার সময় দেখা করে যাব।

    মাঝে মাঝে বাড়ি না-ফেরার পালা এই ‘দাদাটির পক্ষে নতুন নয়। সম্প্রতি যে পথ সে ধরেছিল, সেখানেও তাকে একা বলা চলে না। আশেপাশের বাড়িগুলো খুঁজলে কৈশোর থেকে যৌবনের প্রথমাঙ্কে যারা পা দিয়েছে, তাদের মধ্যে ঐ রকম ‘দাদা’ বেশ কয়েকটি পাওয়া যাবে। কেউ প্রকাশ্য, কেউ প্রচ্ছন্ন। কেউ একটু বেশি এগিয়ে গেছে, কেউ ততটা পেরে ওঠে নি। মৌলিক কারণটা প্রায় সাধারণ, অর্থাৎ সকলের বেলাতেই মোটামুটি এক।

    জেলের মাটিতে, অর্থাৎ তাকে কেন্দ্র করে তৈরি যে উপনিবেশ, যার সরকারী আখ্যা জেল-কোয়ার্টার্স, সেইখানে ওদের জন্ম। জন্মাবার পরেই যে বাতাসে ওরা নিঃশ্বাস নেয়, বিশেষ অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখলে ধরা পড়বে, তার মধ্যে এক ধরনের বিষাক্ত বীজাণু ভেসে বেড়াচ্ছে। তারা আকারে ছোটবড়, প্রকারেও বহুবিধ, সমষ্টিগত নাম ‘ক্রাইম’। সংক্রমণের দিক থেকে যক্ষ্মা বা বসন্তের চেয়ে কিছুমাত্র কম মারাত্মক নয়। কারণ এদের আক্রমণ দেহস্তরে নয়, দেহকে ভেদ করে পৌঁছে যায় মনের মজ্জায়, বাসা বাঁধে চরিত্রের অস্থিমূলে। সেই বিষে যারা আক্রান্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে জর্জর, তেমনি একদল মসিচিহ্নিত প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ও সংস্পর্শে ওখানকার ছেলেমেয়েগুলো মানুষ হয় অর্থাৎ বেড়ে ওঠে। কী হয়, সে কথা অনুক্ত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

    প্রশ্ন উঠবে—অতবড় পাঁচিল পেরিয়ে সংস্পর্শটা ঘটে কেমন করে? নানা ভাবে ঘটে। এক নম্বর—অলক্ষ্যে, মনস্তরে। নিজেদের অজ্ঞাতে ঐ ‘দাদাদের’ বাবা-কাকারাই জেল- ফটক থেকে প্রতি নির্গমে বীজাণুগুলো বয়ে নিয়ে আসেন এবং তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক প্রবণতা, আলাপ-আলোচনা, অভ্যাস ও আচার-আচরণের ভিতর দিয়ে সেই বিষ অন্তঃপুরে সঞ্চারিত হয়। বেচারা বাবা-কাকাদের দোষ দেওয়া যায় না। জেলকে ঘিরেই তাঁদের জীবন। সৌরমণ্ডলের কেন্দ্র ঐ কালো পাঁচিল এবং তার ভিতরকার জীবনধারা, তাঁরা হলেন গ্রহ-উপগ্রহ। পরিক্রমার বিরাম নেই। সূর্যোদয়ের বহু আগে শুরু, সূর্যাস্তের বহু পরে শেষ। মাঝখানে কিছুক্ষণ মাধ্যাহ্নিক বিরতি। তাও নির্বিঘ্ন বা নিরবচ্ছিন্ন নয়।

    ‘বেলা দ্বিপ্রহরে’ বাসায় ফিরে ধড়া-চূড়া ছেড়ে সবে দু-মগ জল মাথায় ঢেলেছেন কি ঢালেন নি, দরজার ওপার থেকে ফেটে পড়ল ‘গেট ফালতুর’ পরিচিত কণ্ঠ—’কাছারি সে টেলিফুক আয়া হুজুর’; কিংবা তার চেয়েও মারাত্মক মেসেজ—’একঠো ভিজিটর বাবু অফিসমে বৈঠল বা। অর্থাৎ তখনি আবার ছুটতে হবে। ভিজিটরবাবুকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখলে চাকরি নিয়ে টানাটানি।

    ‘রাত্রি দ্বিপ্রহরেও’ নিস্তার নেই। গাঢ় নিদ্রার নাসিকা গর্জন থমকে থেমে যাবে নাইট ডিউটি দেশোয়ালী জমাদারের বাঁজখাই গলার জরুরী আহ্বানে—’ডিভিজন সে বিশঠো আসামী চালান আয়া, জলদি আইয়ে।’ রাত দশটায় ট্রেন থেকে নেমেছে তারা। তিন মাইল পথ হাঁটিয়ে নিয়ে জেল-গেটে পৌঁছতে বারোটা তো বাজবেই।’ ছোট সাব ডিভিশনের এক-কামরাওয়ালা জেল। অত লোকের জায়গা নেই। কোর্ট থেকে আসা মাত্র রওনা করে দিয়েছে ডিস্ট্রিক্ট কিংবা সেন্ট্রাল জেলে। ওয়ারেন্ট ইত্যাদি পরীক্ষা না করে ‘রিসিভ’ করা যাবে না। অতএব ‘বোলাও ডেপুটিবাবুকো’। কেননা এটা ডেপুটি জেলারের বিশেষ দায়িত্ব। রামের বদলে শ্যাম এল কিনা, দলিলপত্র ঠিক আছে কিনা—সব দেখেশুনে নিতে হবে তাঁকেই।

    বন্দিশালার পরিধির বাইরেও যে একটা বিস্তীর্ণ জগৎ আছে, সেখানকার অতি সামান্য সাড়াই এদের কানে এসে পৌঁছায়। সব অকর্ষণ সব যোগাযোগ থেকে হাত, পা, চোখ, কান ইত্যাদি ইন্দ্রিয়গুলো গুটিয়ে এনে এরা কর্মের মতো আত্মনিবদ্ধ। তারই মতো শ্লথগতি। একটা সুনির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথ ধরে গুটি গুটি যাওয়া এবং আসার মধ্যেই দৈনন্দিন জীবন সীমাবদ্ধ। প্রাত্যহিক চিন্তাধারা এবং পারিবারিক কথাবার্তার বিষয়বস্তু যে সেই চিহ্নিত সীমাকে ছাড়িয়ে যাবে, তার সম্ভাবনা কোথায়? এদের যারা বংশধর, তারাও ঐ আবহাওয়ার ভিতরে বসে ঐভাবেই ভাবান্বিত হয়ে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য কি?

    দু-নম্বর সংযোগটা আরও স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ। সেখানে জীবাণুবহনের বাহন হল ‘জলভরি দফা’ নামক কয়েদীযূথ, জেল-কোড়-এর পরিভাষায় ‘ওয়াটার-ক্যারিং গ্যাঙ্’। নেহাৎ ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই তার সৃষ্টি। সেই ইতিহাসটুকু সংক্ষেপে ব্যক্ত করা যাক।

    ইংরেজরাজ যখন জিলায় জিলায় ফৌজদারী আদালতের পত্তন করলেন, তার পিছনে একটা করে জেলও জুড়ে দিতে হল। দুয়ের মধ্যে সম্পর্কটা অঙ্গাঙ্গী হলেও, অবস্থানটা ঠিক পাশাপাশি হল না। জেল মানে বৃহৎ ব্যাপার। অনেক লোকের স্থায়ী আস্তানা, অর্থাৎ বড় বড় ব্যারাক, তাদের খাবার-দাবার, কাপড়চোপড়ের গুদাম, কাজ করবার খাটনী ঘর, হাসপাতাল এবং অনেক কিছু। এই গেল এক দিক। আরেক দিকে এই সব বিশেষ ব্যক্তিদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং খবরদারির আয়োজনটাও কম বিপুল নয়। সেখানেও অনেক লোকের সমাবেশ। সাধারণ রক্ষী থেকে মুখ্য শাসক, মাঝখানে নানা স্তর এবং বিবিধ শ্রেণী। কারাগার এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যে পরিচালক-গোষ্ঠীর সর্বক্ষণের সান্নিধ্য প্রয়োজন। অর্থাৎ ‘জেল’ মানে শুধু বন্দিশালা নয়, তার চারদিক ঘিরে তার রক্ষক, পালক ও তদন্তকারীদের ছোট-বড় বাসস্থান। সব মিলিয়ে একটি নাতিবৃহৎ জনপদ। তার জন্যে জায়গা চাই, শহর যা দিতে অক্ষম, তাই কোর্টের পাশে, শহরের মধ্যে তার থাকা চলে না, সরে যেতে হল উপকণ্ঠে।

    যে কোন বসতির প্রাথমিক প্রয়োজন জল। শহরে তার যোগান দেয় মিউনিসিপ্যালিটি। আজকের দিনে কোথাও কোথাও শহরতলীর ভারও সে নিয়ে থাকে। কিন্তু তখনকার দিনে শহরের বাইরে, বিশেষ করে জেলখানার মতো বৃহৎ গোষ্ঠীর রাক্ষুসে পিপাসা মেটাবার মতো সামর্থ্য কোনো পৌরসংস্থার ছিল না। জেলকে তাই পুকুর কেটে, পাতকুয়ো খুঁড়ে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়েছিল। আভ্যন্তরীণ সরবরাহে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় নি। পাঁচিলের মধ্যে জনবলের অভাব ছিল না। কিন্তু মুশকিল দেখা দিল বাইরে। সেখানেও প্রয়োজনের পরিমাণ প্রচুর। সেটা নলকূপের যুগ নয়, তাহলে হয়তো এখানে সেখানে তারই গোটাকয়েক বসিয়ে দিয়ে কাজ চলে যেত। কিন্তু অনেকখানি দূরে একটা বা দুটো পাতকুয়ো থেকে পারিবারিক চাহিদামত জল-সংগ্রহের ব্যাপারটা কর্মীদের পক্ষে দুরূহ হয়ে দাঁড়াল। বাধ্য হয়ে সরকারই তার সুরাহা করে দিলেন। জেলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একদল জাঙ্গিয়া-কুর্তা-পরা ‘পানি-পাঁড়ে’। ঘরে ঘরে জলদানের পুণ্য কর্মটি তাদের ‘রিগারাস ইমপ্রিজনমেন্ট’ অর্থাৎ কঠোর কারাদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হল। যে-সব কয়েদীর মেয়াদ এক বছর বা তার চেয়ে কম, কিংবা দীর্ঘতর-মেয়াদী হলেও ওর বেশি যাদের বাকী নেই, তাদের ভিতর থেকে বেছে বেছে তৈরী হল ‘একস্ট্রা-মিউরাল গ্যাঙ’, অর্থাৎ প্রয়োজনমত তারা প্রাচীরের বাইরে যাবার অধিকারী। অতঃপর তারা পায়ে একটা করে লোহার মল পরে দলবদ্ধভাবে একজন সিপাই-এর জিম্মায় গেটের বাইরে জেলবাবুদের বাসায় বাসায় জল যোগাতে লাগল। ইংরেজি নামটা রইল খাতাপত্রে। সম্ভবত ঐ সিপাইরাই ওদের নতুন নামকরণ করল—’জলভরি’ বা ‘পানি-দফা’। কড়া আদেশ জারি হল—গোটা গ্যাঙটাকে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ‘মার্চ’ করিয়ে নিয়ে যেতে হবে, কেউ কখনও কোনো অবস্থাতেই যূথভ্রষ্ট হতে পারবে না। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কয়েদী তো বটেই, ভারপ্রাপ্ত সিপাইও দণ্ডনীয়।

    এই ব্যবস্থা যেদিন প্রবর্তিত হল, তারপর দীর্ঘকাল চলে গেল, প্রায় সবখানেই শহর বেড়ে বেড়ে জেলকে তার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছে এবং তার জল সরবরাহের দায়িত্ব ক্রমে ক্রমে চলে গেছে মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের হাতে। কোথাও কোথাও জেল- পল্লীর বাসায় বাসায় পাইপ বসে গেছে। কল ঘোরালেই জল। দূর থেকে বয়ে আনবার প্রয়োজন নেই। তবু ‘জলভরি’ রয়ে গেছে; যদিও জল আর তারা ভরে না। লম্বা কালো বড় বড় লৌহ-পিপার আংটায় বাঁশ চালিয়ে জোড়ায় জোড়ায় গোটা দলটা এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি মার্চ করে চলেছে—এই বহু পুরাতন দৃশ্যটি আর চোখে পড়ে না। গেট পর্যন্ত অটুট গ্যাঙ, বেরিয়েই দুজন একজন করে ছড়িয়ে পড়ে বাসায় বাসায়। কে কোন্ বাসার কয়েদী তাও ঠিক করা আছে। সেখানে তাদের অনেক কাজ। বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, বিছানা করা, আসবাবপত্তর ঝাড়া মোছা, রান্নাবান্নার যোগাড় দেওয়া এবং গৃহিণী যখন অন্যত্র আটকা থাকেন, তাঁর কচি শিশুটিকে আগলে রাখা। অনুগত গৃহভৃত্য, কিন্তু অবৈতনিক। সেদিক থেকে গৃহস্থ হয়তো কিঞ্চিৎ লাভবান, কিন্তু অলক্ষ্যে অগোচরে যে লোকসান ঘটে চলেছে, তার পরিমাণ ঐ ‘লাভে’র চেয়ে অনেক বেশি। সেটি হচ্ছে বহু নিষ্পাপ অপরিণত মনে ‘ক্রাইম’ নামক সংক্রামক ব্যাধির অনুপ্রবেশ। যেজন্যে জলভরি দফার সৃষ্টি হয়েছিল, সে দরকার মিটে গেছে। জলের বদলে আজ তারা জেলবাবুদের ঘরে ঘরে বিষ ভরে দেয়। শুরুটা প্রায়ই সামান্য। বারো বছরের ছেলের পকেটে হঠাৎ গোটা দুই সিগারেটের অবির্ভাব, তার সদ্য-যৌবন-প্রাপ্তা দিদির আঁচলে এক টুকরো উচ্ছ্বাসময় চিঠির আবিষ্কার কিংবা তাদের বাবার ব্যাগ থেকে কয়েক আনা পয়সার অন্তর্ধান। কোনোটারই হয়তো কোনো নিজস্ব গুরুত্ব নেই। বিচলিত হবার মতো কিছু নয়। কিন্তু এই তুচ্ছ সূচনাই বড় হয়ে হয়ে একদিন অনেক পরিবারের মূল ধরে নাড়া দিয়েছে, সে দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখেছি। অপরাধ ও অধঃপতনের পথ বড় মসৃণ। তার প্রথম ধাপগুলো আপাত-রমণীয় প্রলোভনের রঙে রঙিন। একটি বিশেষ বয়সের কাছে তাদের নিয়ত হাতছানি প্রায় অপ্রতিরোধ্য। অভিলাষবাবুর ছেলের মতো আরও কত ছেলে তার টানে ভেসে চলে গেছে, কে তার খবর রাখে?

    এমনি একটি ‘ছেলের’—সম্ভবত তখন আর সে ‘ছেলে’ নেই—একখানি চিঠি আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। ‘লৌহকপাট’-এর অর্গল খুলে দিয়ে সবে তখন কারা- শাসক থেকে লেখকের পদে উন্নীত হয়েছি। অভিনন্দনের স্রোত বইছে। সকালের ডাক খুলতেই মধুস্রাবী ভাষায় রাশি রাশি মনোরম প্রশস্তি :-”আপনার দরদী মনের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলাম”, “আপনি অমানুষের ভিতরে মানুষের সন্ধান পেয়েছেন”, “সমাজের নীচের তলায় যুগ যুগ ধরে যারা মূক হয়ে ছিল, আপনি তাদের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন একখানা অচেনা হাতের একপাতা চিঠির প্রথম কয়েক লাইনে চোখ বুলিয়েই প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেলাম। ক্ষুদ্র একটা ‘অন্তর্দেশীয়ের’ অন্তরে এত বড় মুষল লুকানো ছিল, কে ভেবেছিল?

    চিঠিখানা আমার কাছে নেই। হুবহু প্রতিলিপি দিতে পারছি না। সুর এবং উক্তি অনেকটা এই রকম—রাস্তার মোড়ে যখন চোর ধরা পড়ে, তার কপালে জোটে পাইকারী মার। সত্যি চোর কিনা, কী চুরি করল, সেটুকুও কেউ ভেবে দেখে না। সেই লোকটাই যখন জেলে যায়, তাকে দেখে লোকে আহা-উহু করে, তখন সে কয়েদী—বন্দী। বন্দীর জন্যে মানুষের কত দরদ, কত চোখের জল! তার কারণ বুঝি। তারা যে কী ভয়ঙ্কর চীজ, সাধারণ লোকে জানে না। কিন্তু আপনি? আপনি তো জানেন, কতজনের কত সর্বনাশ করে তারা জেলে আসে। আসবার পরে যে সর্বনাশ করে, তা-ও আপনি দেখেছেন নিশ্চয়। ‘জেলখানার ছেলে’ বলে যে একটা আলাদা জাত আছে, তা কি আপনি শোনেন নি? তাদের ছোঁয়াচ পাছে নিজেদের ছেলেপিলের গায়ে লাগে, আশেপাশের ভদ্রলোকেরা সেই ভয়ে সজাগ, তাও আপনার চোখে না পড়বার কথা নয়। কিন্তু কেন তারা ‘মন্দ’ ছাপ মেখে গোড়া থেকেই ‘মন্দের’ পথ ধরে, সে খবরটা বাইরের লোকে না জানতে পারে, আপনিও কি না জানবার ভান করছেন? তা যদি না হবে, সেই সত্যি কথাটা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করবার বাধা কোথায়? হয়তো সে সাহস আপনার নেই। কিংবা হয়তো মনে করছেন, তাতে করে বাহবা পাবার সুবিধা নেই। তাই জেলখানার চোর-ডাকাত, গুণ্ডা- বদমাশের কল্পিত দুঃখের বানানো কাহিনী দিয়ে আসর মাত করছেন, তারই হাতার মধ্যে বসে শুধু সেই কারণেই যারা মানুষ হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল, সেই হতভাগাদের ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন।

    বলা বাহুল্য, এই চিঠি পড়ে সেদিন বিরক্ত হয়েছিলাম। আত্মপ্রসাদের মোহে মন ছিল আচ্ছন্ন, তাই ভক্ত পাঠকের অতিরঞ্জিত স্তুতিবাদকেই আমার ন্যায্য পুরস্কার বলে ধরে নিয়েছিলাম। সেই স্পষ্ট-ভাষণকে মনে হয়েছিল রুষ্ট পাঠকের অন্যায় তিরস্কার। ধাতস্থ হবার পরে বুঝেছি—না, ওটা আমার প্রাপ্য ছিল।

    একটা কথা সেই প্রথম জীবনে মনে হত, আজও হয়,—সরকারের কাছে তার প্রশাসনিক প্রয়োজনটাই আসল, যার কাছে মানুষের স্বার্থ ও ভালমন্দ অনায়াসে বলি দেওয়া যায়। তা যদি না হবে, জেল-পাঁচিলের চারদিক ঘিরে তার কর্মী-উপনিবেশ গড়া হত না। যক্ষ্মা বা বসন্ত হাসপাতালের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের তো কই তার হাতার মধ্যে মাথা গুঁজে পড়ে থাকতে বাধ্য করা হয় না। সংক্রমণের হাত এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে বাস করবার অধিকার সেখানে স্বীকৃত। সে অধিকার নেই শুধু কারা-কর্মীর। তার কারণ এ নয় যে, কারাগার নামক যে ক্রাইম-হাসপাতাল, তার সংক্রামকশক্তি ঐসব হাসপাতালের চেয়ে কিছুমাত্র কম, কিংবা সেটা কর্তৃপক্ষের অগোচর। তার কারণ, এখানে নিরাপত্তার রূপ আলাদা।

    সেফটি নয়, সেফ্ কাস্টডি। শাসকের চেয়ে শাসিতের স্বার্থ বড়। তাদের জন্যেই দুর্ভাবনা। তাদের আগলে রাখা, আটকে রাখা—তারই প্রয়োজনে ইঁটের প্রাচীরের চারদিকে আবার মানুষের বেড়া। বিভিন্ন স্তরের মানুষ—অতবড় যন্ত্রটাকে চালাবার জন্যে যে সব রকম যন্ত্রীর দরকার—বেটন-ধারী, বন্দুক-ধারী তো বটেই, তার সঙ্গে ছোট-বড় কলম-ধারী। প্রথম দলের কিছু এবং শেষের দলের প্রায় সকলেই থাকে সপরিবারে। সরকারী দাক্ষিণ্যে ভাড়া দিতে হয় না। বরং কিছু উপরি-পাওনা আছে, আর্থিক নয়, সেবারূপী পাওনা, ইংরেজীতে যাকে বলে ‘স্যারভিসেজ’—অর্থাৎ ঐ ‘ওয়াটার-ক্যারিং গ্যাঙ’। তার আসল রূপটা যে কী, সে ‘লাভে’র কতটা যে ‘ক্ষতি’র ঘরে জমা হচ্ছে, তার হিসাব ওখানকার বাবুদের খাতায় হয়তো পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে তাঁদের কোনো কোনো পুত্র-কন্যার ভবিষ্যতের পাতায়। তারই একখানা একদিন পত্রাঘাতের আকার নিয়ে আমার কাছে এসে পড়েছিল, এইমাত্র যার উল্লেখ করেছি, আরও অনেক আমার আগে থাকতেই জানা।

    পুঁটির মা আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। গিয়েই শুনলাম, এযাত্রায় তাঁর শ্রীমানটি একটু বেশি এগিয়ে গেছেন, অর্থাৎ জনকয়েক বন্ধুর সঙ্গে গতরাত্রে জেলে এসে গেছেন। কোনো সূত্রে ভোরবেলাতেই তার কাছে খবর পৌঁছে গেছে। ‘সূত্রটি’ যে তাঁর স্বামী নন, জিজ্ঞাসা না করেই বুঝলাম। অথচ অভিলাষবাবুই তখন ‘আমদানী সেরেস্তার ভারপ্রাপ্ত অফিসার। সারাদিন ধরে যারা জেলে এল—হাজত বা কয়েদী—সন্ধ্যার পর তাদের সব ওয়ারেন্ট তাঁকে পরীক্ষা করতে হয়, এবং অ্যাডমিশন রেজিস্টার-নামক একটি বিশাল খাতায় তাদের নাম, ধাম, বিবরণের লম্বা ফিরিস্তি মিলিয়ে নিয়ে শেষ পংক্তিতে সই দিতে হয়। মেলাতে গিয়ে—ইংরেজীতে যাকে বলে চেক করা— অভিলাষবাবু ওয়ারেন্ট এবং খাতার বুকে এমন সজোরে এবং লম্বা হাতে পেন্সিল চালিয়ে থাকেন—যে তাঁর ‘কাজে’র সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই, তাদের মনে হবে সব কেটে-কুটে দেওয়া হয়েছে। একবার এক নতুন শ্বেতাঙ্গ জেল-সুপার ক্ষত-বিক্ষত খাতার দিকে চেয়ে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিলেন—ইজ্ দিস্ অল রঙ্গ (wrong)?

    অভিলাষবাবু ততোধিক বিস্ময়ে জবাব দিলেন, নো স্যার!

    —দেন হোয়াই ক্রস্‌ড্ আউট?

    এবার লজ্জিত হলেন অভিলাষ মজুমদার। মাথা চুলকে বললেন, আই হ্যাভ্ থরোলি চেক্‌ দা এন্‌ট্রিজ।

    অফিসে পৌঁছেই আগের দিনের ওয়ারেন্ট-গুচ্ছের ভিতর থেকে যথারীতি পেন্সিলাহত ‘দীপঙ্কর মজুমদার’-কে টেনে বার করলাম। অভিলাষবাবুকে ডেকে দেখাতেই তিনি প্রথমটা কিছু বুঝতে পারলেন না, আর একটু নজর দিয়েই চমকে উঠলেন— ‘গুলে’! তারপর কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়েই বললেন, ও হতভাগার যে ঐরকম একটা পোষাকী নাম আছে, খেয়াল ছিল না।

    —তবে বাপের নামটা দেখেও মনে পড়ে নি?

    —যে ঝঞ্ছাটে আছি, নিজের বাপের নামই খেয়াল থাকে না, স্যার তো, এ তো ছেলের বাপের নাম।

    বলেই ছুটতে ছুটতে চলে গেলেন নিজের টেবিলে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে তাঁর করণীয় কিছু নেই। ছেলের জেলে-আসার চেয়েও তাঁর কাছে বড় তাঁর জেলের ‘ঝঞ্ঝাট’।

    অভিলাষবাবুর ‘ঝঞ্ঝাট’ প্রায় বারো মাসই লেগে থাকত, এবং তার বেশির ভাগ তাঁর নিজের তৈরি। দু-একটার উল্লেখ না করে পারছি না।

    জেলের কয়েদী বা হাজতী আসামীদের সঙ্গে দেখা করতে হলে দরখাস্ত চাই। গেটের সামনে একটি করে বাক্স বসানো থাকে, দরখাস্ত-সংগ্রহের জন্যে, কোনো ফী দিতে হয় না। কিন্তু কোনো কোনো জেলে টহলদার সিপাইরা দর্শনপ্রার্থী জনসাধারণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কিঞ্চিৎ বেসরকারী ফী আদায় করে থাকেন। খবরটা উপর-মহলের অজানা নয়, কিন্তু এই দু-চার-আনার দস্তুরি নিয়ে কাউকে বিশেষ মাথা ঘামাতে দেখা যায় নি। অভিলাষবাবু হঠাৎ এই দুর্নীতি দমনে তৎপর হয়ে উঠলেন। মস্ত বড় সাইনবোর্ড পড়ল জেলের সামনে—’দেখা করিতে পয়সা লাগে না। কেহ পয়সা চাহিলে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নজরে আনুন।

    দিন কয়েক পরে দেখা গেল, রাতের অন্ধকারে ‘সাইনবোর্ড’ লোপাট। সান্ত্রীদের নিয়ে কদিন টানা-হেঁচড়া করলেন অভিলাষবাবু। কাউকে শাস্তি দেওয়া গেল না। সবাই বলল, দুর্ঘটনাটা তার ডিউটিতে ঘটে নি। নতুন সাইনবোর্ড টাঙানো হল এবং তার উপরে কড়া পাহারার ব্যবস্থা। ‘মোলাকাতি দস্তুরি’ সম্বন্ধেও কড়াকড়ি শুরু করলেন অভিলাষবাবু।

    কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতির ফিরিস্তি দিয়ে একেবারে খোদকর্তার বরাবর ঘন ঘন বেনামা দরখাস্ত পড়তে লাগল। তলায় তলায় গোপন তদন্তও চলল তার সঙ্গে। অভিলাষবাবু তখন ‘ওয়ার্ডার গার্ড’ নামক শাখার অফিসার-ইন-চার্জ। সিপাইদের ছুটির আবেদন, এবং তার বিলি—ব্যবস্থা ইত্যাদি তাঁর সেরেস্তার অন্তর্ভুক্ত। একদিন ‘কায়থি’ হরফে নাম লেখা একখানা খামের চিঠি এল জেলের ঠিকানায়। চিঠিপত্র বিভাগের কেরানী সেটা পড়তে না পেরে বড়সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। হাতের লেখা দেহাতী কায়থিতে তাঁর কিঞ্চিৎ দখল ছিল। শিরোনামটা ভাল করে না দেখেই খুলে ফেললেন, এবং কোনোরকমে পাঠোদ্ধার করে সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলেন।

    চিঠিখানা অভিলাষবাবুকে লেখা। লিখছে একজন সিপাই। ছুটিতে দেশে আছে, সেটা আরও কিছুদিন বাড়ানো দরকার।

    সকাতর প্রার্থনা জানিয়েছে, ‘বাবু’ যদি মেহেরবানি করে সাহেবকে বলে ছুটির ব্যবস্থা করে দেন, তাঁর ‘পান খাবার’ যথারীতি ব্যবস্থাও সে ফিরে এসেই করবে। সে বিষয়ে কোন অন্যথা হবে না। সাহেব চিঠিখানা চেপে গেলেন, যদিও আগেকার কতগুলো বেনামী অভিযোগের সঙ্গে এটাকে যুক্ত করে তাঁর মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহের ছায়া পড়ল। কদিন পরে ঠিক ঐ ধরনের আরেকখানা চিঠি আসতেই সেটা গাঢ়তর হল। তার পরেই নিতান্ত অসময়ে অভিলাষবাবুর বদলির হুকুম। অনেক অসুবিধা ছিল, রদ করবার চেষ্টা করলেন—। হল না।

    ব্যাপারটা আমি জানতাম। ওর সঙ্গে এ-ও জানতাম, ‘পান-খাওয়া’ নামক ব্যাধি থেকে অভিলাষবাবু সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। সবটাই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। দুর্নীতি-উচ্ছেদ- কল্পে তাঁর অতিরিক্ত উৎসাহের ফল, স্বেচ্ছা-আমন্ত্রিত ফ্যাসাদ।

    মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছি। এবার ফেরা যাক।

    সভাস্থল থেকে বেরিয়ে অভিলাষবাবুর মুখে যখন শুনলাম, তিনি আমার সাহায্যপ্রার্থী, দীর্ঘকাল পরে হলেও প্রথমেই মনে হল, তিনি হয়তো আবার কোনো স্ব-রচিত ‘ঝঞ্ঝাটে র কবলে পড়ে থাকবেন। আমার প্রোগ্রাম বদলাতে হল। পরদিন সকালে স্টেশনের বদলে হাজির হলাম জেলখানায়। গিয়ে বুঝলাম, না এলেই ভালো ছিল। অভিলাষবাবুর প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বিনা প্রয়োজনে আর একটা নির্মম কঠোর জীবন্ত সত্যের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াতে হবে কে ভেবেছিল?

  • সাত

    সাত

    সে কথা এখন থাক। অভিলাষবাবু যার জন্যে এত গরজ করে আমাকে টেনে নিয়ে এলেন, সেই ব্যাপারটা আগে বলে নিই।

    যা অনুমান করেছিলাম তাই। আবার একটা নতুন ঝঞ্ঝাট সাধ করে সেধে আনবার প্রয়োজন বোধ করছেন ভদ্রলোক। উদ্দেশ্য সেই—’অন্যায়ের প্রতিকার’। অর্থাৎ পঞ্চাশ পেরিয়েও ইংরেজীতে যাকে ‘ম্যাচিওরিটি’ বলে, সেটা ওঁর আসে নি। হয়তো কোনো কালেই আসবে না। একবার সিপাইদের দুর্নীতি তাড়াতে গিয়ে নিজেই তাড়িত হয়েছিলেন, সে কথা আমার মনে আছে, উনি বোধহয় ভুলে মেরে দিয়েছেন। কিংবা অভিলাষবাবুরা যে জাতের লোক, ‘ঠেকে শেখা’ বলে কোনো শব্দ তাঁদের অভিধানে নেই। ‘অব্যাপারে ব্যাপারং’ সম্বন্ধে হিতোপদেশের সাবধান বাণী তাঁরা কোনো কালেই কানে তোলে না।

    অভিলাষবাবু এবার যে কাণ্ডটা করতে চলেছেন, সোজা কথায় তাকে বলা যায় সরকারের ‘পলিসি’র গায়ে হাত। মারাত্মক অপরাধ। ইণ্ডিয়ান পেনাল কোড-এ ‘আউটরেজিং মডেস্টি’ বলে ধারাটা আছে, প্রায় তার সমতুল। ‘পলিসি’ হল মন্ত্রীমণ্ডলীর অসূর্যম্পশ্যা অন্তঃপুরিকা, চাকরে-গোষ্ঠীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই সহজ কথাটা কিছুতেই ওঁর মাথায় ঢুকতে চাইল না। ঢোকাবার চেষ্টা করতেই অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই স্কীম ওঁদের আসল উদ্দেশ্যকেই পণ্ড করবে!’

    —করুক। তাতে আপনার কী? ‘স্কীম’-এর সঙ্গে ‘ইমপ্লিমেনটেশান’ বলে যে আর একটা কথা আছে, সে কি এখনও আপনার মুখস্থ হয় নি? প্রথমটা ওঁদের এলাকা, দ্বিতীয়টা আপনার, সোজা বাংলায় যার নাম চোখ বুজে হুকুম তামিল করা। উদ্দেশ্য কী, সেটা সফল হবে না পণ্ড হবে—এসব অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামানো আপনার কাজ নয়।

    —এই জলজ্যান্ত গলদগুলো দেখিয়ে দেবো না?

    —না।

    –এতগুলো মেয়ের ভবিষ্যৎ যদি দেখতেন, কি রকম কান্নাকাটি করছে তারা।

    –করুক না? ওঁরা বলবেন দুনিয়ার নিজের মঙ্গল কে কবে বুঝে থাকে? যার ভাল করতে চান, সে-ই সবচেয়ে বেশী বাধা দেবে। কান্নাকাটি শুনতে গেলে রাষ্ট্রের চলে না, বিশেষ করে যে রাষ্ট্রের ব্রত হল জনকল্যাণ

    কথা হচ্ছিল, ‘সুপারে’র অফিস কামরায় বসে। টেবিলের উপর একটা খোলা ফাইল। তার ভিতরকার একটি সাম্প্রতিক সরকারী আদেশই ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। আদেশটি নারী-কয়েদী সম্পর্কে। সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধে বলা হয়েছে, এককালে ইম্‌প্রিজনমেন্ট, অর্থাৎ কারাদণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল দণ্ডিতের উপর রিট্যারিয়েশন প্রতিশোধ, বর্তমানে সভ্য রাষ্ট্রের শেষ কাম্য হল তার রিহ্যাবিলিটেশন, মুক্তির পর সমাজদেহে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তার জন্যে তাকে এমন একটি কার্যকরী বৃত্তি শিখিয়ে দেওয়া দরকার, বাইরে গিয়ে যার অনুসরণ করে সে সৎপথে জীবিকা-নির্বাহ করতে পারে।

    এর পরেই আসল বক্তব্য : সরকার উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছেন, বিভিন্ন জেলে, বিশেষ করে ডিস্ট্রিক্ট জেলগুলোতে যেসব মেয়ে-কয়েদী থাকে, তাদের বেলায় ঐজাতীয় শিক্ষার কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। তার প্রধান কারণ, তারা সংখ্যায় এত অল্প যে ঐ ক’টি মেয়ে নিয়ে কোনো কুটির শিল্প গড়ে তোলা যায় না। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান তাদের কুড়িয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করা। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই বৃহৎ সেন্ট্রাল জেলের একটি অংশকে পৃথক করে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত জেনানা-ফাটক। তার ভিতরে নানা রকমের ওয়ার্কশপ, সবজি-বাগান, স্কুল, খেলা-ধূলার মাঠ, মায় সূতিকাগার (মাঝে মাঝে দু-একটি গর্ভিণী স্ত্রীলোকও আমদানি হয়ে থাকে) ও নার্স ট্রেনিং সেন্টার বা শুশ্রূষাকেন্দ্র ইত্যাদি।

    সরকার আশা করেন, মেয়ে-কয়েদীরা যাতে করে এই ব্যাপক ব্যবস্থার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে ভবিষ্যতে কর্মঠ ও কুশলী নাগরিকে পরিণত হতে পারে, সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দেবেন।

    অভিলাষবাবু যখন এই বিশেষ সেন্ট্রাল জেলের কর্ণধার হয়ে এলেন, তার আগেই বিভিন্ন জেল থেকে দুটি চারটি করে মেয়েরা আসতে শুরু করেছে। মোট সংখ্যা পঞ্চাশের উপর। ওয়ার্কশপগুলো খুলবার আয়োজন চলছে।

    তাঁর চার্জ নেবার দিনতিনেক পরের ঘটনা। মঙ্গলবার। জেনানা-ফাটকের সাপ্তাহিক প্যারেড। নতুন সুপারের প্রথম পরিদর্শন। মেট্রন এবং তার সহকারিণীরা ভোরবেলা থেকে তার আয়োজনে ব্যস্ত। স্বয়ং জেলার গিয়ে একবার তদারক করে এসেছেন। মাঠের ধারে গাছের ছায়ায় মেয়েরা লাইন করে দাঁড়িয়েছে। পরনে সদ্য-কাচা শাড়ি, তার উপর ফিমেল কুর্তা। বাকী কিট্স, অর্থাৎ জামা-কাপড়-চাদর-কম্বল সযত্নে পাট করে প্রত্যেকের পায়ের কাছে সাজানো, তার পাশে ঝকঝকে করে মাজা অ্যালুমিনিয়মের থালা-বাটি। সুপারের ‘ফাইল’-এ খোঁপা বা বিনুনি বাঁধা নিষিদ্ধ। মাথায় কাপড় দেবারও হুকুম নেই। তাই বলে রুক্ষ মাথায় থাকা চলবে না। সরকারী খরচে আয়না-চিরুনি এবং কিছুটা নারকেলের তেল সরবরাহ করা হয়। তার সদ্ব্যবহারে কোনো ত্রুটি হয় নি। গত কয়েকদিনের বরাদ্দ থেকে বাঁচিয়ে তেলের ব্যবহারটা বরং একটু অতিরিক্তই বলা চলে। মেট্রন বার বার করে শাসিয়ে দিয়েছেন, বড়সাহেব যখন সামনে দিয়ে যাবেন, সবাই যেন মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সেইটাই নিয়ম। নালিশ থাকলে তেমনি মাথা নীচু করে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে জানাতে হবে। চোখ তুলে তাকানো বেয়াদপি।

    সপারিষদ অভিলাষবাবু সবেমাত্র লম্বা ‘ফাইল’-এর এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন, মেট্রনের বিচিত্র উচ্চারণের সামরিক বুলি—স্কোয়াড্ অ্যাটেনশন’ তখনও বাতাসে মিলিয়ে যায় নি—হঠাৎ এক বিপর্যয় কাণ্ড! কোথায় গেল ‘ফাইল’ আর কাপড়-চোপড় থালা-বাটির থাক! সব ভেঙে উল্টে দিয়ে নারীবাহিনীর প্রায় সবটা সক্রন্দনে ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল তাঁর পায়ের উপর। সকলে যে সে-পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না, তার কারণ এ নয় যে তাদের তরফে চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল। তার কারণ, সুপার যত বড় লোকই হোন, তাঁর পায়ের সংখ্যা মাত্র দুই, এবং সেই দুটি চরণের পক্ষে একসঙ্গে শত হস্তের কবলে পড়া কোনোমতেই সম্ভব ছিল না।

    চীফ হেড্‌ওয়ার্ডারের গর্জন এবং মেট্রন ও তার সহকীরিণীদের সবল হস্তক্ষেপে ভূলুণ্ঠিত বন্দিনীদের বহু কষ্টে টেনে তোলা হল। তারও বেশ কিছুক্ষণ পরে জানা গেল, এই সমবেত আবেদনের সুর ও ভাষা আলাদা হলেও বিষয় এক—সবাইকে অবিলম্বে যার যার ‘দেশের জেল’-এ পাঠিয়ে দেওয়া হোক। অভিলাষবাবুও সেই অনুমান করেছিলেন, এবং একে একে প্রশ্ন করে কারণ যেটা জানলেন, তাও তাঁর কাছে নতুন নয়। জেলে এলেও ঘর-সংসারের পাট তো আর শেষ করে দিয়ে আসে নি। সেখানে কেউ ফেলে এসেছে পাঁচ বছরের কচি বাচ্চা, কারও বা রয়ে গেছে বয়স্থা মেয়ে, রুগ্ন স্বামী, কিংবা বৃদ্ধ বাপ-মা। ওখানে থাকতে মাসান্তে কিংবা পক্ষান্তে একবার দেখা হত, লোহার জালে-ঘেরা গরাদের ফাক দিয়ে কথাবার্তাও হত দু-চারটা। এতদূরে আর সে সম্ভাবনা রইল না। আসবে কেমন করে? বুড়ো, কচি এবং মেয়েমানুষগুলোকে নিয়ে আসবে কে? সবচেয়ে বড় কথা, সে সঙ্গতি কই? বাড়ির সমর্থ পুরুষদের সে সময়ই বা কোথায়? সকলকেই উদয়াস্ত খেটে খেতে হয়, একদল পোষ্যকে খাওয়াতে হয়।

    কোণের দিকে একটি কমবয়সী মেয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। তার ‘কারণ টা একটু অন্য ধরনের। মুখ ফুটে বলতে চায় না। দু-তিনবার জিজ্ঞাসার পর মেট্রনকে জানাল চুপি চুপি। মেদিনীপুর থেকে এসেছে; জাতে বাউরী। মরদটি তার লোক ভালো। তাহলেও পুরুষমানুষ, তার জোয়ান বয়স। দূরের বৌকে একদিন মন থেকে দূর করে দেবে না, কে বলতে পারে? একদিন নয়, দু-দিন নয়, তিন বছর। তারপর ফিরে গিয়ে দেখবে, তার জায়গা আর একজন এসে দখল করে বসেছে।

    —তাই যদি করে, ওখানকার জেলে বসেই বা ঠেকাবে কেমন করে? প্রশ্ন করলেন অভিলাষবাবু, যদিও এর উত্তরটা তিনি জানেন। মেয়েটি জবাব দিল না। হয়তো লজ্জায়, কিংবা গুছিয়ে বলার মতো ভাষা খুঁজে পেল না। বলতে পারল না, ঘরের সঙ্গে মানুষের যে বন্ধন, শ্রীঘরে আসবার পর সেটা আপনা থেকেই শিথিল হয়ে আসে। বিশেষ করে, সে মানুষ যখন মেয়েমানুষ, ঘর তার দিক থেকে বড় তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবু মাঝে মাঝে ও-তরফের একটুখানি চোখের দেখা, এবং এ-তরফের দু-এক ফোঁটা চোখের জল সে বন্ধনকে কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে। দীর্ঘদিনের অদর্শন ও অসংযোগ সেখানে দ্রুত ছেদ টেনে দিতে সহায়তা করে। মেয়েটি আরও বলতে পারত—এই দুর্ভাগা দেশে, বিশেষ করে সমাজের যে স্তর থেকে ওরা এসেছে ( জেনানা ফাটকে তাদের সংখ্যাই বেশি), স্ত্রী নামক পণ্যটি বড় সুলভ। ঘাটতি পূরণে দেরি হয় না। রাজসিংহাসনের মতো পুরুষের হৃদয় নামক আসনটিও বেশি দিন খালি থাকতে পারে না। রাখতে চাইলেও সংসার তার নানা প্রয়োজন নিয়ে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। সুতরাং একজন চোখের আড়ালে চলে গেলে, আরেকজন এসে তার জায়গা জুড়ে বসবে, তাতে আর আশ্চর্য কি? মেয়েদের জীবনে এই ‘জায়গা’টাই আসল। সেটি যদি চলে যায়, ফিরে গিয়ে পরিচিত গৃহকোণের সেই আশ্রয়টুকু না জোটে, তাহলে কোন্ কাজে লাগবে এই দূর কারাগার থেকে বয়ে নেওয়া তার কারিগরি বিদ্যার বোঝা?

    অভিলাষবাবু এই কথাগুলোই ক’দিন ধরে মনে মনে নাড়া-চাড়া করে দেখলেন। তারপর গাঁটের পয়সা খরচ করে উঠলেন গিয়ে লালদীঘির উত্তর-পারে। বড়কর্তাদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন, এরা কয়েদী হলেও মেয়ে, এদের কাছে সামনের চেয়ে পিছনের টান বড়, আকাশ-বাতাসের চেয়েও বেশি সত্য মাটি। সেখান থেকে উপড়ে এনে যেখানে- সেখানে বসিয়ে দিলেই বাঁচবে এবং বাড়তে থাকবে, সে আশা করা যায় না। না, না, এ সেণ্টিমেন্টের কথা নয় (যদিও মেয়েদের বেলায় সে বস্তুটির দাম অনেক), এর প্রাক্‌টিক্যাল, অর্থাৎ বাস্তব দিকটাই বড়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এদের ভবিষ্যৎ, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এদের জড়ো করা হচ্ছে, সেই রিহ্যাবিলিটেশনের প্রশ্ন। অর্থাৎ কাজকর্ম না হয় শেখানো গেল, তারপর?

    বক্তব্যটাকে আরও বিশদ করবার চেষ্টা করেছিলেন অভিলাষবাবু। বলেছিলেন, পুরুষ-কয়েদীর কথা আলাদা, তাদের আমরা কিছু একটা শিখিয়ে দেবার চেষ্টা করি, তারপর মেয়াদ ফুরোলে গেটের বাইরে ছেড়ে নিয়ে নিশ্চিন্ত। একটা রেলের পাস আর কিছু পয়সা হাতে দিয়ে বলি, চরে খাওগে। তারপর সে কী করে, কোথায় যায়, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মেয়েগুলোর বেলায় তো তা বলা যায় না। পরের ভাবনাও ভাবতে হয়। পুরুষগুলো যেখানে-সেখানে পড়ে থাকতে পারে। রাত কাটাবার জন্যে মাথার উপর যা হোক একটা আচ্ছাদন যথেষ্ট। গাছতলাতেও বাধা নেই। কিন্তু এদের বেলায় বিধাতা সে সুবিধা দেন নি। কাজেই বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়। নিজের ঘরের চেয়ে বাঞ্ছনীয় আশ্রয় আর কী আছে একটি মেয়ের জীবনে? আমরা যা কিছু করবো, সব সেইদিকে চেয়ে। চেষ্টা করবো, জেলে এলেও স্বামী- পুত্র, বাপ-মা-ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজনের সংস্পর্শে থেকে সে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে, তাদের কাছে ফিরে যাবার পথে কোনো রকম বাধা সৃষ্টি না হয়।

    এই নতুন ব্যবস্থায় যে তা-ই হতে চলেছে, অন্য কেউ হলে উপরওয়ালাদের দরবারে সে কথাটা হয়তো একটু ঘুরিয়ে বলত। কিন্তু অভিলাষবাবুর ধরনটা চিরকালই খোলাখুলি, ইংরেজীতে যাকে বলে ব্লান্ট্। বলা বাহুল্য, কর্তারা সেটা মোটেই পছন্দ করেন নি। একজন মাঝারিগোছের মুরুব্বি ওঁর মতামত সরাসরি অগ্রাহ্য না করলেও স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এ বিষয়ে বর্তমান আদেশই বলবৎ থাকবে। বলেছিলেন, আরে মশাই, পুরো এক বছর লেখালেখির পর ফাইনান্স ডিপার্টমেণ্ট টাকা দিয়েছে। এখন যদি বলি দরকার নেই, তাদের কাছে মুখরক্ষা হয় কেমন করে?

    এ হেন মোক্ষম যুক্তিও অভিলাষবাবুকে নিরস্ত করতে পারে নি। বিষয়টাকে আরও জোরদার করবার জন্য বক্তব্যগুলো লিখিতভাবে পেশ করতে মনস্থ করেছেন। একটা খসড়াও করে ফেলেছেন। আমার প্রয়োজন সেইখানে। কয়েকটা ফুলস্ক্যাপ কাগজ আমার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার কলম তা চিনি স্যার, একটু ছোঁয়া লাগিয়ে দিন।

    বললাম, সে কলম বদলে গেছে অভিলাষবাবু। এর ছোঁয়ায় আপনার কাজ হবে না। বরং উল্টো ফল ফলতে পারে। তাছাড়া বুড়ো বয়সে সাধ করে কর্তাদের বিষনজরে পড়তে চাইছেন কেন?

    —আপনিও এই কথা ভাবছেন!

    —হ্যাঁ, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

    অভিলাষবাবু স্পষ্টত নিরাশ হলেন। কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় চীফ হেড্‌ ওয়ার্ডার ঘরে ঢুকে সেলাম ঠুকে জানাল, জেনানা-ফাটকের ‘ফাইল’ রেডি।

    —উঠিয়ে দাও। আজ আর সময় হবে না—

    ‘চীফ’-এর পিছনে মেট্রনকেও দেখা গেল। তার দিকে চেয়ে বললেন, তোমাদের নালিশ মানে তো ঐ একটি, শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। ওছাড়া আর কারও কিছু আছে নাকি?

    —একটি মেয়ে বলছিল, তার কি একটা জরুরী নালিশ আছে।

    –এখানে নিয়ে এসো।

    উঠবার আয়োজন করছিলাম, দরজার দিকে নজর পড়তে আর ওঠা হল না। অজ্ঞাতসারে মুখ থেকে বেরিয়ে এল—কুসুম! মেট্রনের পিছনে যে মেয়েটি বেশ সপ্রতিভ ভাবে ঘরে এসে ঢুকলো, সে কোনো জবাব দিল না। মেট্রনকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। সহজ বিনীত সুরে বলল, আপনি ভালো আছেন? আমি জবাব দেবার আগেই অভিলাষবাবু হাত বাড়িয়ে তার টিকেটখানা নিতে নিতে বললেন, ওঁর সময় থেকেই আছ বুঝি এখানে?

    কুসুম মৃদু হেসে বলল, না, মাঝখানে কিছুদিন বাইরে ছিলাম।

    —আবার এলে যে! এ প্রশ্ন আমার। বিস্ময়ের ভাবটা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারি নি।

    —আসতে হল। আঁচলের কোণটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে তেমনি হাসিমুখেই বলল কুসুম, যেন এই আসাটা নেহাৎ বেড়াতে আসার মতো।

    —ওখানে থাকতে পারলে না বুঝি?

    —কই আর পারলাম!

    —লেডি ডাক্তার রাখলেন না?

    —তিনি রাখতে চেয়েছিলেন, আমারই থাকা হল না।

    —কী কেস্-এ এলে?

    জবাব দিলেন অভিলাষবাবু—কেটি তো ভালোই দেখছি। একেবারে রাজসিক ব্যাপার—মার্ডার! আগে এসেছিলে কোন্ কেস্-এ?

    —’সেটাও খুন।’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এবং তার মধ্যে দ্বিধা বা সঙ্কোচের চিহ্নমাত্র নেই। তবে নিজে করি নি, জড়িয়ে পড়েছিলাম—উনি সব জানেন।’ চোখের ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিল।

    —এবার বুঝি নিজেই হাত লাগিয়েছ? হালকা সুরে বললেন অভিলাষবাবু। বহুদিনের পুরনো প্রবীণ জেল-অফিসার। এই জাতীয় খুনখারাপি ওঁর কাছে জল-ভাত। আমারও তাই। কিন্তু কুসুমের মুখ থেকে এবার যে জবাব এল, শুনে এবং তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম। এতক্ষণের সেই তরল সুর নয়। মুখের সে হাসি হাসি ভাবটাও সহসা কোথায় মিলিয়ে গেল। দু-চোখে আগুন ছড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, এবার নিজের হাতেই সাধ মিটিয়ে নিয়েছি।’

    বলতে বলতে চোখ বুজল-গভীর আরামে, পরম তৃপ্তিতে আপনা হতেই যেমন করে ধীরে ধীরে নেমে আসে চোখের পাতা।

    .

    এই জেলেই কুসুমের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা! সে দিনটা এখনও মনে আছে। ভারী মেয়াদ বলে কোন্ একটা ছোট জেল থেকে চালান হয়ে এসেছিল সেন্ট্রাল জেলে। নতুন আমদানী। তাই আমার অফিসে আনতে হয়েছিল, ভাষায় যাকে বলে ‘ভেরিফিকেশনে’র উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ জামা-কাপড় ইত্যাদি ওয়ারেন্টে যা লেখা আছে তাতে কোনো ভুল নেই, সুপারের সামনে এই তথ্যটি কবুল করিয়ে নেবার জন্যে। সকলের বেলাতেই সেই নিয়ম।

    আমি মাথা নিচু করে কি লিখছিলাম, আচমকা নারীকণ্ঠের খিল্‌-খিল হাসি শুনে চোখ তুললাম। হাসিটা শুধু প্রগল্ভ নয়, অনেকটা নির্লজ্জ। ও দাঁড়িয়েছিল আমার মুখোমুখি, খানিকটা দূরে, দরজার ঠিক সামনে। কোনো কারণে সেদিন বিদ্যুৎ-সরবরাহ বন্ধ ছিল। আমার পিছনে দাঁড়িয়ে এক কয়েদী বড় একখানা পাখা নিয়ে আমাকে হাওয়া করছিল। তার দিকে আঙুল তুলে মেট্রনকে উদ্দেশ করে কলকণ্ঠে বলে উঠল, মিলেটার কাণ্ড দেখুন মাসিমা। পাখা-টাখা বন্ধ করে কীরকম চোখ করে তাকিয়ে আছে। গিলে খাবে নাকি? ওমা, একেবারে হুঁশ নেই!…. বলেই আবার সেই হাসি। মেট্রনের চাপা ধমক খেয়ে তার তোড়টা যেন আরও বেড়ে গেল। একঘর লোক। জেলর থেকে সিপাই, মেট—কোনো পদই বাকী নেই। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। যে-কাজে ওকে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেটা বন্ধ রেখেই তাড়াতাড়ি সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা হল।

    পাখা-চালানো কয়েদীটাকে মনে মনে বিশেষ দোষ দিতে পারি নি। কিছুক্ষণের জন্যে যদি তার বৈকল্য বা চিত্তবিক্ষেপ ঘটে থাকে, তার জন্যে দায়ী, যার দিকে তাকিয়ে সে ‘হুঁশ’ হারিয়েছিল তার প্রতি অঙ্গে সঞ্চরমাণ এক ধরনের অপর্যাপ্ত উদ্ধত যৌবন। কথাটা বোধ হয় স্পষ্ট হল না। যৌবন তো একটা বিশেষ বয়সে হয়। নারীদেহকেই আশ্রয় করে। কোথাও কোথাও তার উপচে-পড়া দুরন্ত বেগও দুর্লভ নয়। কিন্তু কুসুমের দেহে সেদিন যা দেখেছিলাম, তার মধ্যে এসব ছাড়িয়ে আরও কিছু ছিল, যা শুধু টানে না, টেনে নামায়। তার রেখায় রেখায় সর্বনাশের হাতছানি। অথচ রূপ বলতে যা বোঝায়, অঙ্গের সুষমা ও সৌষ্ঠব, তা তার ছিল না।

    বিধাতার চক্রান্তেই হোক কিংবা ইচ্ছা করেই হোক, কাউকে টেনে নামাতে হলে নিজেকেও নামতে হয়। সে অলঙ্ঘ্য পরিণাম থেকে কুসুমও রক্ষা পায় নি। তার মায়ের বৃত্তি ধাইগিরি। বয়সকালে আরও কিছু করত, সেটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। ওদের বাড়িটা (অর্থাৎ ছোট একখানা চালাঘর এবং তার কোলে একচিলতে উঠোন) ছিল ছোট জেলা শহরের এক কোণে। মা ও মেয়ে মিলে সেখানে থাকত। বাবাকে কখনও দেখেছে কিনা মনে পড়ে না। যখন ছোট ছিল, অনেক রাত্রে কোনোদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে অন্য দু’একজনকে দেখেছে, যারা তাকে বাবার মতোই আদর করত। আরও একটু বড় হবার পর আর তাদের দেখতে পায় নি। তখন সে মায়ের সঙ্গে বেরোতে শুরু করেছে। মায়ের প্রকাশ্য ইচ্ছা বোধ হয় ছিল তার নিজের বিদ্যায় মেয়েকে তালিম দেওয়া। তার সঙ্গে আর কোনো গোপন মতলব ছিল কিনা কে বলতে পারে? মেয়ের কিন্তু সেই ‘আর কিছু’র দিকেই বেশি নজর। চারদিকের নানাবয়সী পুরুষের চোখে একটা বিশেষ দৃষ্টি এবং তার অর্থ তখন সে বুঝতে শিখেছে।

    কুসুমের নামকরণ কে করেছিলেন, জানবার উপায় নেই। শিশু বয়সে হয়তো তার সার্থকতা ছিল, যেমন সব শিশুরই থাকে। যৌবনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই যখন দেখা গেল ফুল হয়ে ফোটার চেয়ে আগুন হয়ে জ্বলার দিকেই তার গতি, তখন যেসব পতঙ্গের দল সেই আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল, তাদের মধ্যে শুধু একজনের কথা আমার জানবার সুযোগ হয়েছিল, তার, নাম অনাথ মল্লিক।

    অনাথের চাকরি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে। পৈতৃক বাড়ি রয়েছে জেলা শহরে। অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল, বয়স তিরিশের কোঠায়। পাড়ার ব্যায়ামশালায় তৈরি সবল সুস্থ দেহ। বাপ-মা নেই। দুটি ভাই, দুজনেই চাকরিসূত্রে প্রবাসী। একমাত্র স্ত্রী নিয়ে সংসার। সুন্দরী বলে তার খ্যাতি আছে। নাক-চোখ-রং—কোনোটার তুলনা নেই, তবে বড্ড রোগা গড়ন। তার উপরে মাস পূর্ণ হবার আগেই প্রথম সন্তানটি নষ্ট হবার পর স্মৃতিকায় ভুগে ভুগে গায়ে আর মাংস নেই। তার মধ্যে আবার মা হতে চলেছে।

    আগের বারে কুসুমের মা-ই খালাস করেছিল। এবার হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের ‘ডাক্তারকে বলা আছে। পুরনো ধাই অবশ্য সঙ্গে থাকবে। কিন্তু প্রসবের রাত্রে তাকে পাওয়া গেল না। বিকালেই দূরে কোথায় ‘কল্’-এ বেরিয়ে গেছে। তার বদলে এল কুসুম শুধু এল না, রয়ে গেল কঙ্কালসার প্রসূতি এবং তার ক্ষীণজীবী নবজাতকের ভার নিয়ে। ডাক্তারই ব্যবস্থা করে দিলেন। মেয়েটির সেবাপরায়ণ সুনিপুণ হাত দুটিই কেবল তাঁকে আকৃষ্ট করে থাকবে, বাকী অঙ্গের সর্বনাশা আকর্ষণ হয়তো প্রৌঢ় ভদ্রলোকের নজরে পড়ে নি।

    তাঁর না পড়লেও পড়ল আরেকজনের। আগুনের স্পর্শেই আগুন জ্বলে ওঠে। একদিনের অগ্নিস্রাবী যৌবন আরেকদিকের লালসা-বহ্নিকে উদ্দীপ্ত করে তুলল।

    কদিন যেতে না যেতেই রূপহীনার কাছে হার হল রূপসীর। পতিগতপ্রাণা সাধ্বী স্ত্রীর পবিত্র আসন ছিনিয়ে নিয়ে গেল তারই স্বৈরিণী পরিচারিকা। দীর্ঘ দাম্পত্যবন্ধন, শিক্ষাদীক্ষা, নৈতিক আদর্শ, লোকলজ্জা, ভয়—কিছুই টিকল না। বহুদিনের অতৃপ্ত দীর্ঘসঞ্চিত ক্ষুধা রুগ্না ক্ষীণাঙ্গীর শীতল সঙ্গ যা মেটাতে পারে নি। তৃপ্তি খুঁজতে গেল স্থূল মাংসপিণ্ডের উত্তপ্ত উত্তেজনায়।

    মাস দুয়েকের মধ্যে এবারকার বাচ্চাটিও মায়ের কোল ছেড়ে চলে গেল। প্রসূতি তখন চলতে ফিরতে পারে না, সবে উঠে বসে বিছানার উপর। সুতরাং ঝি-এর প্রয়োজন শেষ হল না। তার চেয়ে বড় প্রয়োজন তখন দেখা দিয়েছে অন্যখানে।

    একদিন গভীর রাত্রে মনিবের গাঢ় আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে কুসুম বলল, এবার ঘরে যাও।

    —কোন্ ঘরে? যেন বুঝতে পারে নি এমনি সুরে বলল অনাথ

    –কোন্ ঘরে আবার! তোমার বৌয়ের কাছে। একলা পড়ে আছে বেচারা।

    —থাক, তোকে আর অত দরদ দেখাতে হবে না।

    —না সত্যি, যদি জানতে পারে?

    —পারলেই বা, জেনে করবেটা কী?

    —বাঃ, তাড়িয়ে দেবে না আমাকে?

    —সে তাড়াবার কে? আমি তোকে রেখে দেবো।

    —তুমিই বা আর কদ্দিন রাখবে? আর একটু ভালো হলেই তো—

    —তখনও তোকে থাকতে হবে। তোকে আমি কোনোদিন ছাড়বো না।

    বলে ওকে আরও কাছে টেনে নিল। কুসুম আর কথা বলল না। সেই বলিষ্ঠ নিবিড় বাহুবন্ধনে নিজেকে সঁপে দিয়ে চোখ বুজল। পুরুষের বাহুপাশে ধরা দেওয়া কুসুমের কাছে এই নতুন নয়। এর স্বাদ সে এর আগে আরও পেয়েছে। কিন্তু এই সবল পেষণের মধুর যন্ত্রণা এমন করে আর কোথাও উপভোগ করে নি। আজ হোক, কাল হোক, একদিন এখান থেকে চলে যেতে হবে, এ চিন্তা তার কাছেও দুঃসহ। এই উত্তপ্ত আশ্রয়টুকু যদি চিরদিনের হত!

    এর দিন কয়েক পর অনাথ অফিস থেকে ফিরে চা খাচ্ছে। চাকর এসে জানাল, ‘মা’ তাকে ডাকছেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই স্ত্রীর ঘরে ঢুকে, মাঝে মাঝে যেমন করে, জিজ্ঞাসা করল, এখন কেমন আছ?

    হৈমন্তী সে প্রশ্নের উত্তর দিল না, একটু উষ্মার সুরে বলল, কুসুমের আর দরকার নেই, এখনি বিদায় করে দাও।

    কথাগুলোর মধ্যে যে উত্তাপ ছিল সেটা গায়ে না মেখে অনাথ বেশ সহজ ঠাণ্ডা সুরেই বলল, তার জন্য ব্যস্ত হচ্ছ কেন? তুমি আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠো!

    —না, ওকে আজই ছাড়িয়ে দিতে হবে।

    ভিতরে যাই ঘটুক, মল্লিকের মুখে বা কথায় তখনও কোনো বিরক্তি বা উত্তেজনা প্রকাশ পেল না—’আজই কি করে দিই? মাইনে চুকিয়ে দিতে হবে তো। মাসের শেষ, অত টাকা কোথায়?’

    দু-হাতে দু-গাছা বালা ছাড়া হৈমন্তীর দেহে তখন আর কোনো অলঙ্কার ছিল না। হঠাৎ তারই একটা খুলে নিয়ে স্বামীর দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, এই নাও। এটা বিক্রি করলেই বোধ হয় কুলিয়ে যাবে।

    —মাথা খারাপ করো না হৈম—গম্ভীর ভর্ৎসনার সুরে এই ক’টি কথা বলেই অনাথ বেরিয়ে যাচ্ছিল, স্ত্রীর চিৎকারে ফিরে দাঁড়াল। হৈমন্তী এতক্ষণ শুয়ে শুয়েই কথা বলছিল, অকস্মাৎ উঠে বসে তীক্ষ্ণ তীব্র কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, ও যদি আর একটা রাতও এ বাড়িতে থাকে, আমি মাথা খুঁড়ে মড়বো।

    —তাই মর।

    —কী বললে? আমি মরলে তোমার ভারি সুবিধে, পথের কাঁটা সরে যায়, না? বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল। অনাথ আর দাঁড়াল না।

    কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে কুসুম আগাগোড়া সবটাই দেখল এবং শুনল।

    তখন কিছু বলল না। সন্ধ্যার পর তার ছোট্ট পোঁটলাটা হাতে করে বাইরের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে বলল, আমি তাহলে যাই বাবু। মাইনের জন্যে তুমি ভেবো নি। মাস লাগলে মা এসে নিয়ে যাবে।

    অনাথ প্রথমটা ওকে দেখতে পায় নি। নিবিষ্ট মনে সিগারেট টানছিল। হঠাৎ চমকে উঠে বলল, কী বলছিস? না, তোর যাওয়া হবে না।

    —থেকে করবোডা কী?

    —কেন?

    কুসুম এক পলক এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, ঘরে ঢুকতে মানা করে দেছে।

    —ঢুকতে হবে না তার ঘরে। তুই—তুই এমনি থাকবি। আমার কাছে থাকবি।

    পরদিন থেকে শুরু হল নিত্য বিসংবাদ। যখন-তখন কথা-কাটাকাটি। ক্রমশ স্বামী-স্ত্রী কারও মুখেই আর বল্গা রইল না। দুজনের মধ্যে যে শালীনতার আড়ালটুকু ছিল, তাও ঘুচে গেল। দীর্ঘকাল রোগে ভুগে পর পর দুটি সন্তান হারিয়ে হৈমন্তীর আগে থাকতেই মাথার ঠিক ছিল না, তারপর নিজের চোখের উপর সংসারের মধ্যে বসে স্বামীর এই শোচনীয় বিবর্তন—সংযম ও সহিষ্ণুতার শেষ বাঁধ ভেঙে পড়ল। ওষুধ ঢেলে ফেলে, ভাতের থালা উল্টে দেয়, পাড়ার কোনো গৃহিণী ইনিয়ে-বিনিয়ে সহানুভূতি জানাতে এলে কড়া কথা শোনাতে ছাড়ে না। পুরনো ঠাকুর আগেই চলে গিয়েছিল, নতুন যে-ই আসে দু-দিনও টেকে না। ফলে সংসারের সব ভার আপনা থেকেই পড়ল গিয়ে কুসুমের হাতে। সে কদিন যাব-যাব করলেও যেতে পারল না।

    হৈমন্তীর মা নেই। বাপ থাকেন অনেক দূরে, দক্ষিণ বাংলার কোনো দুর্গম গ্রামে। দু-পুরুষ-আগে একটা ছোটখাটো জমিদারী ছিল। ইদানীং প্রায় বিত্তহীন। সে প্রতাপ নেই, কিন্তু তার তাপটা রয়ে গেছে। হঠাৎ একটা উড়ো চিঠি পেয়ে উত্তেজিত হয়ে ছুটে এলেন। কুসুম-ঘটিত ব্যাপারটা বেশ কিছুটা অতিরঞ্জিত হয়ে তাঁর কানে গিয়ে থাকবে। এসে যেটুকু দেখলেন, তাও কম নয়। তার উপরে মেয়ের শরীরের এই অবস্থা। অন্য কেউ হলে হয়তো মেয়ে-জামাইয়ের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার চেষ্টা করতেন। খুব সম্ভব ভূতপূর্ব জমিদারের উষ্ণ রক্ত সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। জামাতার সঙ্গে একবার দেখা করবারও প্রয়োজন বোধ করলেন না। সোজা গিয়ে হাজির হলেন থানায়।

    পুলিস এসে অনাথের বিরুদ্ধে বিশেষ কিছুই পেল না। রুগ্না স্ত্রীর উপর ‘অপ্রেশান বা অত্যাচারের অভিযোগ হৈমন্তী নিজেই অস্বীকার করল। বাবা বোঝাতে চাইলেন, ঐ রকম একটা সোমত্ত ঝিকে যে তাঁর মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়িতে পুষে রাখা হয়েছে, এইটাই তো সব চেয়ে বড় অত্যাচার। দারোগা হেসে চলে গেলেন।

    জামাইকে অন্য কোন উপায়ে ঢিট করা যায় কিনা, দু-একজন প্রতিবেশীর সঙ্গে বসে সে বিষয়ে যখন পরামর্শ করছেন, তখন দেশ থেকে নিজেরই কোনো মামলা-সংক্রান্ত জরুরী টেলিগ্রাম পেয়ে তাঁকেও হঠাৎ চলে যেতে হল। মেয়েকে আশ্বাস দিয়ে গেলেন, ওদিকের ঝামেলা মিটলেই আবার আসবেন।

    পুলিস কেস্ না নিলেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান (শহরের একজন প্রবীণ উকিল) অনাথকে ডেকে উপদেশের ছলে খানিকটা সাবধান করে দিলেন। উড়ো চিঠি তাঁর হাতেও পড়ে থাকবে। অনাথ আগুন হয়ে ফিরল। শ্বশুরকে এবং মনিবকে তাতিয়ে তোলার ব্যাপারে সাক্ষাৎভাবে পাড়ার কয়েকটা ছেলে-ছোকরার হাত আছে, একথা সে জানত। কিন্তু তার পিছনে হৈমন্তী নেই, এটা সে মনে মনে মেনে নিতে পারল না। ঐ ছোঁড়াগুলোর সঙ্গে নিশ্চয়ই তার গোপন যোগাযোগ আছে। কেউ কেউ তার ওখানে আগে থেকেই আসে যায়। ওকে দাদা এবং সেই সুবাদে হৈমন্তীকে বৌদি বলে ডাকে। হয়তো তাদের কাউকেই এইসব কাজে লাগানো হচ্ছে। অসুবিধা কিছুই নেই। মেয়েমানুষের যেটা প্রকৃতিদত্ত মূলধন চোখের জল, তার খানিকটা খরচ করলেই হল। সঙ্গে সঙ্গে ‘ঠাকুরপোদের’ শিভালরি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। কিন্তু আর নয়—তারই ঘরে বসে তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র, এখানে সেখানে অপদস্থ করবার অপচেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত চাকরি ধরে টানাটানি কিছুতেই বরদাস্ত করবে না—আজই একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলতে হবে।

    চেয়ারম্যানের কাছ থেকে অনাথ যখন ছাড়া পেল, তার আগেই সন্ধ্যা উরে গেছে। অনেকখানি পথ, বাড়ি ফিরতে রাত হল। ঠিক শহর নয়, শহরতলী। পাশেই রেল লাইন। ফাঁকা ফাঁকা বাড়ি। এমনিতেই লোক-চলাচল কম। এখন রাস্তা একেবারে খালি। প্রায় বাড়িতে আলো নিভে গেছে। হৈমন্তী তখনও জেগে। তার ঘরের দরজা আধ-ভেজানো। ভিতরে আলো জ্বলছে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কী একটা লিখছিল। বাইরে থেকেই নজরে পড়ে। অনাথ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেই ধমকের সুরে বলল, চেয়ারম্যানকে কী লিখেছ আমার বিরুদ্ধে?

    হৈমন্তী ঘাড় ফিরিয়ে স্বামীর দিকে একটা অবজ্ঞা-কুঞ্চিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার লেখায় মন দিয়ে বলল, কে চেয়ারম্যান?

    —ন্যাকামো করো না। চেয়ারম্যান কে তা তুমি জানো। তাকে চিঠি লিখবার মতো সাহস তোমার এল কোত্থেকে?

    —আমার দায় পড়েছে তাকে চিঠি লিখতে।

    —না লিখলে আমার সংসারের খবর তার কানে যায় কেমন করে?

    —সংসারের খবর মানে? এবার উঠে বসল হৈমন্তী, ঐ মাগীটাকে নিয়ে যে ঢলাঢলি চালিয়েছ সে খবর কার জানতে বাকী আছে, শুনি?

    —ইতরের মতো মুখ-খারাপ করো না। গর্জে উঠল অনাথ।

    হৈমন্তীর মুখেও পালটা গর্জন—ইতর আমি না তুমি? তুমি বলে এখনও লোকের কাছে মুখ দেখাও, অন্য কেউ হলে—তীব্র উত্তেজনায় বাকীটা আর বলা হল না।

    অনাথ কিছুমাত্র দমে না গিয়ে বলল, আমার যা খুশী তাই করবো। তোমার না পোষায় চলে যাও, বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।

    হৈমন্তী তখনও হাঁপাচ্ছিল। কোনোরকমে দম নিয়ে ক্ষীণ-কণ্ঠে বলল, বেশ, তাই যাচ্ছি। তার আগে, অ্যাদ্দিন যা করি নি, তাই করবো। পাড়ার দশজনকে ডেকে

    —খবরদার! রুখে উঠল অনাথ। কারও কাছে যাবে তো তোমারই একদিন কি আমারই একদিন।

    —আমি যাবো, কী করবে তুমি?

    দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই অনাথ একটা বাহু ধরে এক ঝটকায় তাকে খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। হৈমন্তীর শীর্ণ দুর্বল দেহ প্রথমে খাটের পাশে এবং তারপর গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। আর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।

    তীব্র বিহ্বল দৃষ্টি মেলে অনাথ শুধু তাকিয়ে রইল স্ত্রীর দিকে। ঐ সঙ্গে সেও যেন অসাড় হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, কুসুম এসে ঝুঁকে পড়ে কি দেখছে। পরক্ষণেই কানে গেল তার ত্রস্ত-কণ্ঠ—ঠাকুর, শীগগির এক বালতি জল নিয়ে এসো।

    জল এল। কোলের উপর মাথা রেখে কুসুমই ঘটির পর ঘটি জল ঢেলে চলল। কিছুক্ষণ পরে কী মনে হতে নাকের নীচে হাত দিল, সেই হাতটাই রাখল একবার বুকের বাঁদিকে, বাঁ হাতের কব্জিটাও টেনে নিয়ে দেখল। তারপর চোখ তুলে মনিবের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ঠোটে একটা বিকৃত ভঙ্গী করে নীরবে মাথা নাড়ল।

    একজন প্রসিদ্ধ ডাক্তারকে বলতে শুনেছি, ‘মায়ের কোলে যখন সন্তান আসে, যম তার শিয়রে ওত পেতে বসে থাকে। তাই যদি হয়, সব ক্ষেত্রেই সে শূন্যহাতে ফিরে যাবে, এতটা আশা করা যায় না। যেখানে মানুষে-যমে টানাটানি, কিছু ভাগ সে দেবতাটির হাতে পড়বেই। সুতরাং মায়ের (এবং ইদানীং তার নিজেরও) পেশার দৌলতে মৃত্যুর সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয় কুসুমের একাধিকবার ঘটে গেছে। হৈমন্তীর নিমীলিত চোখ দুটি যে আর খুলবে না, এটা সে নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরেছিল। তবু সম্ভবত মনিবকে প্রবোধ দেবার উদ্দেশ্যে তার মুখের দিকে চেয়ে বলল, ডাক্তারবাবুকে একটা খবর দিলে হয় না?

    কথাটা কানে যেতেই অনাথ হঠাৎ চমকে উঠল। খানিকটা ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে কি দেখল। তারপর ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

    কুসুম আর কিছু বলল না। হৈমন্তীর মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে কাঁধ আর হাঁটুর নীচে হাত দিয়ে শীর্ণ হালকা দেহখানা অনায়াসে তুলে নিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দিল। পায়ের কাছে গুটিয়ে রাখা চাদরটা ধীরে ধীরে গলা পর্যন্ত টেনে এনে মুখটা ঢাকতে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত সেইদিকে নিঃশব্দে চেয়ে রইল। তারপর তাড়াতাড়ি ঢাকা দিয়ে দিল।

    আমার পাঠক-পাঠিকাদের, বিশেষ করে পাঠিকাদের ওষ্ঠাগ্রে একটি সন্দিগ্ধ হাসির কুঞ্চন আমি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি। তাঁরা ভাবছেন, এই শেষের ছত্র দুটি আমার রচনা সন্দেহটা অযৌক্তিক নয়। তবু বলছি, না, এ আমার কল্পনা নয়, কুসুমই বলেছিল এবং সম্ভবত আমার মুখে অজান্তে ফুটে ওঠা কোনো বিস্ময়চিহ্ন লক্ষ্য করে একটা সকুণ্ঠ কৈফিয়তও জুড়ে দিয়েছিল ঐ সঙ্গে। তার নিজের ভাষায় বলেছিল, বেঁচে থাকতে একটিবারও সে আমার দিকে ভালো চোখে তাকায় নি, একটা কথাও কোনদিন ভালোভাবে বলে নি আমার সঙ্গে। তাই মরবার পর তার আসল মুখখানা দেখতে ইচ্ছা হল। দেখলাম সত্যিই রূপ ছিল মেয়েটার। কিন্তু কি কাজে লাগল সে রূপ!

    এইটুকু বলেই কুসুম সে প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে কাজের কথায় চলে গিয়েছিল। পলকের তরে তাকাতে গিয়ে একটা মৃদু নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসে যদি সেই মৃত্যু-শীতল মুখখানাকে স্পর্শ করে থাকে, সে নিজেই জানতে পারে নি। জানলেও সে তথ্যটুকু আমার কাছে অনুক্ত রয়ে গেছে। এ দৌর্বল্য যে তার পক্ষে একেবারে বেমানান, তার চরিত্রের এবং পূর্বাপর আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিহীন, এ সহজ কথাটা আমি যেমন বুঝি, তারও না বোঝবার কথা নয়। তাকে আর যা-ই বলা যাক, নির্বোধ বলা চলে না।

    .

    অনাথ সেই যে গেল আর দেখা নেই। গেলই বা কোথায়? এদিকে রাত বেড়ে চলেছে। একটা দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ লাগে? তার জের অত সহজে মেটে না। সবচেয়ে বড় পর্বটাই যে বাকী। তার আয়োজন এখন থেকেই শুরু করা দরকার। কুসুম উঠে পড়ল। হঠাৎ মনে হল, সে কে? তার এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার কী প্রয়োজন? তার কাজ তো ফুরিয়ে গেছে। অনেকদিন আগেই গেছে। তবু এতদিন এখানে পড়ে থাকবার একটা অজুহাত ছিল। লোকের কাছে একটা পরিচয় ছিল। ঝি, অসুস্থ গৃহিণীর সেবাদাসী। আজ তাও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এইটাই কি তার একমাত্র পরিচয়? এর অন্তরালে—ভাবতে গিয়ে কুসুমের গোপন মনে এক ঝলক পুলক ছড়িয়ে গেল। আজ সব বাধা ঘুচে গেছে। এত শীঘ্র যে ঘুচবে, কে ভেবেছিল?

    পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল আপাদমস্তক চাদর ঢাকা হৈমন্তীর দেহটার উপর সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একটা কোন্ অজানা ভয়ের কালো ছায়া ধীরে ধীরে উঠে এসে তার সমস্ত বুকটা গ্রাস করে ফেলল। ঐ মৃত্যুর সঙ্গে কোথায় যেন তারও একটা যোগ আছে। তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নিল। এই অশুভ চিন্তাটাকে মন থেকে জোর করে ঝেড়ে ফেলতে চাইল— না না, এসব কী ভাবছে সে? ওর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? এ মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়। তাই কী? অনাথ কী তাকে ঠেলে ফেলে দেয় নি? হ্যাঁ, সে তো শুধু ওকে বাধা দেবার জন্যে। ঝোঁকের মাথায় বেরিয়ে গিয়ে লোকজন ডেকে একটা হাঙ্গামা বাধিয়ে না বসে এই জন্যে। মেরে ফেলতে সে চায় নি। মনে মনে সে উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল না। পাড়ার লোকগুলো তো এমনিতেই অনাথের বিরুদ্ধে মুখিয়ে আছে, এরকম একটা সুযোগ পেলে তার উপর এক হাত নেবার চেষ্টা না করে ছাড়ত না সেই কথা ভেবে নিতান্ত বাধ্য হয়েই সে বৌয়ের গায়ে হাত তুলেছিল, তার ফল যে এমন সাংঘাতিক হয়ে দাঁড়াবে কে ভাবতে পেরেছিল?

    কিন্তু এর উল্টো দিকটাও ভাবল কুসুম—এ-কথা যদি লোকে বিশ্বাস না করে? যদি বলে, অনাথ তার স্ত্রীকে ইচ্ছা করে খুন করেছে? তাকেও এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলা কঠিন নয়। বাবুর সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক জানাজানি হতে বাকী নেই। হৈমন্তীর বাবা এসে একবার এই নিয়ে হৈ-চৈ বাধিয়ে দিয়েছিল। কিছু অবশ্য করতে পারে নি। এবার এই মৃত্যুটাকেই হয়তো কাজে লাগিয়ে দেবে। পাড়ার ছোকরাগুলো বলে বসবে—ঐ বৌটাই ছিল ওদের পথের কাঁটা। দুজনে মিলে তাকে রাতারাতি শেষ করে দিয়েছে।

    কুসুম এবার নিজের দিকটা আলাদা করে ভাবতে চেষ্টা করল। সত্যি সত্যি সে তো কোনো দোষ করে নি। তবে তার ভয় কিসের? সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, সংসারে ক’টা সত্যি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে? বেশির ভাগই তো মিথ্যার জয়-জয়কার। তার কঠোর দৃষ্টান্ত

    এইটুকু বয়সেই কতবার তার চোখে পড়েছে। নিজেও সে ঘা কম খায় নি। সুতরাং আর নয়, এবার এখান থেকে তার বিদায়ের পালা। লোকজন এসে পড়বার আগেই তাকে চলে যেতে হবে। তখন এখানে থেকে সে করবেই বা কী? তাই বলে বাবুকে না বলে সে পালিয়ে যেতে চায় না, দেখা করে বলে-কয়েই যাবে।

    অনাথ বাড়িতেই ছিল। কুসুমকে বেশি খুঁজতে হল না। ওদিকের ঘরে ও বারান্দায় না পেয়ে বাইরের ঘরে গিয়ে দেখল সে অন্ধকারে চুপ করে বসে আছে। মিনিটখানেক নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, রাত যে কাবার হয়ে এল বাবু, এখন কি হাত-পা কোলে করে বসে থাকার সময়?

    অনাথ সাড়া দিল না, যেমন ছিল তেমনই নিশ্চল হয়ে রইল। কুসুম আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই, যেন হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল। মুখ তুলে বলল, কোথায় যাচ্ছিস?

    —কোথায় আবার, বাড়ি!

    —এই দুঃসময়ে তুইও আমাকে ছেড়ে যাবি কুসুম?

    সহসা উঠে এসে ওর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, জানিস তো, তুই ছাড়া আপন বলতে আমার আর কেউ নেই। তার ওপরে চারিদিকে শত্রু। তোকে আমি কিছুতেই যেতে দেবো না। বলে আরও খানিকটা কাছে টেনে নিল।

    এ আকর্ষণ কুসুমের কাছে দুর্নিবার। তবু বলল, আমি মেয়েমানুষ, আমাকে দিয়ে আর কতটুকুন কি হবে? তাছাড়া পাড়ার পাঁচজন এসে—

    —কেউ আসবে না। মাঝখানে বাধা দিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলল অনাথ।

    —বাঃ, ঘাটে নিতে লোকজন লাগবে না?

    অনাথ এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু বলল, একমাত্র তোকেই আমার দরকার কুসুম, আর কাউকে চাই না।

    কথাটার তাৎপর্য বুঝতে না পেরে কুসুম বিস্মিত দৃষ্টি মেলে শুধু তাকিয়ে রইল। অনাথ তার বাহু ধরে জানালার ধারে নিয়ে গিয়ে একটা টুলের উপর বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসল তার মুখোমুখি। আলো জ্বালা হল না, তার প্রয়োজনও ছিল না। কৃষ্ণপক্ষের রাত। দূরে গাছপালার উপর থেকে হেলে-পড়া শীর্ণ চাঁদ জানলাপথে যে ক’টি চূর্ণ রশ্মি পাঠিয়ে দিয়েছিল, তাতেই তারা পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছিল। কুসুমের একটা হাত নিজের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে তার চোখে চোখ রেখে অনাথ তার পরিকল্পনার খানিকটা আভাস দিতেই সে চমকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল কয়েকটা ভীত- বিহ্বল শব্দ—”না না, এ আমি পারবো না।’ হাতটাও ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল। অনাথ ছাড়ল না, জোর করে তাকে টেনে এনে নিজের পাশটিতে বসিয়ে দিল। এক হাতে তার দেহ বেষ্ঠন করে আর এক হাতে চিবুকটা তুলে ধরে বলল, তোর কোনো ভয় নেই কুসুম। এতটুকু বিপদের আশঙ্কা থাকলে তোকে আমি এর মধ্যে টানতে পারি? তাছাড়া আমি তো তোর সঙ্গেই থাকবো। চল, আর দেরি করলে লোকজন উঠে পড়বে।

    কুসুমের কাছ থেকে তখনও কোনো সাড়া না পেয়ে অনাথ তাকে ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ক্ষুব্ধ উদাস সুরে বলল, থাক, তোর যখন ইচ্ছে নেই, আমি জোর করতে চাই না। মনে করেছিলাম, এই ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলে কাল সকালেই আমরা এ-দেশ ছেড়ে চলে যাবো, তোকে নিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধবো। এ সাধ কি আমার আজকের? কবে কেমন করে তা সফল হবে ভেবে পাই নি। ভগবানকে কত ডেকেছি। কে জানত এত শীগগির সাড়া পাবো, এমন করে রাতারাতি আমার সৌভাগ্যের দ্বার খুলে যাবে। কিন্তু ভাগ্যদেবী যখন মুখ তুলে চাইলেন, যাকে ঘিরে এত আশা, এত স্বপ্ন, সে রইল মুখ ফিরিয়ে। যাক, তোকে আর আটকে রাখবো না। বাড়ি যেতে চেয়েছিস, তাই যা। আমার অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে।

    টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, সেদিকে চেয়ে কুসুমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মুচড়ে উঠল। বলল, শোনো!

    অনাথ ফিরে দাঁড়াল। কুসুম উঠে এসে ওর একান্ত কাছটিতে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, ঠাকুরটা যে সব দেখে ফেলেছে!

    অনাথ যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। চোখের তারায় ফুটে উঠল ত্রাসের ছায়া। এই অবাঞ্ছিত লোকটাকে সে একেবারে ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু কুসুম ভোলে নি। পুরুষের চেয়ে স্ত্রী চিরদিনই বেশি হুঁশিয়ার। পুরুষ চলে ভাবাবেগে, ঝোঁকের বশে তার দৃষ্টি শুধু সুমুখপানে, স্ত্রীজাতি কোনো অবস্থাতেই তার বাস্তব বুদ্ধি হারায় না। ডাইনে বাঁয়ে না তাকিয়ে পা বাড়ায় না।

    ঠাকুরের খোঁজ করা হল। ঘরে বাইরে কোথাও তার পাত্তা নেই। কুসুম এদিক-ওদিক খানিকটা তাকিয়ে ঘরে এসে বলল, চলে গেছে।

    —চলে গেছে!

    —হ্যাঁ, জামা-কাপড় কিচ্ছু নেই।

    শুনে যেন কিছুটা আশ্বস্ত হল অনাথ। বলল, ভয় পেয়ে পালিয়েছে। তার মানে ওর দিক থেকে কোনো আশঙ্কা নেই। ভালোই, না পালালেই বরং মুশকিল ছিল। চল আমরাও বেরিয়ে পড়ি। রাত আর নেই বলে কুসুমের কাঁধের উপর হাত রেখে হৈমন্তীর ঘরের দিকে অগ্রসর হল।

    কুসুম তখনও দ্বিধাগ্রস্ত। কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না। চলছে আর ভাবছে, কী করবো! ‘একটা পা সামনে ফেলছি তো আর একটা পা পিছনে থেকে টানছে।’

    ছেলেমানুষ নয় যে নিজের অবস্থাটা বুঝতে পারছে না। তার উপরে যে ঘরে যেসব পারিপার্শ্বিকের মধ্যে মানুষ, সংসারের আসল রূপটা আগেই অনেকখানি চেনা হয়ে গেছে। সেই রাত্রে অনাথ মল্লিক তাকে দিয়ে যা করাতে চাইছিল, তার মধ্যে ঝুঁকি অনেক, সহজ বুদ্ধি দিয়েই তা সে বুঝতে পেরেছিল। সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ কতখানি বিপদসঙ্কুল, সে সম্বন্ধেও সে সচেতন ছিল না তা নয়। তবু কী ছিল ঐ লোকটার স্পর্শে, চোখে এবং কথায়, বিশেষ করে চোখ দুটিতে (একথা সে অনেকবার বলেছে), যার কাছে নিজেকে ধরে রাখা যায় না, সমস্ত অঙ্গ শিথিল হয়ে পড়ে, তীব্র স্রোতের মুখে অসহায় তৃণখণ্ডের মতো সারা মন ভেসে যেতে চায়। আসন্ন ভবিষ্যতের যে রমণীয় চিত্র সে কিছুক্ষণ আগে চোখের উপর তুলে ধরেছিল, তাও ওকে কম প্রলুব্ধ করে নি। তার মধ্যে একদিকে ছিল মদিরা, তার উদগ্র যৌবন যার জন্যে তৃষ্ণার্ত, আরেকদিকে ছিল স্নিগ্ধ বারি, যার স্পর্শে চির-গৃহলোলুপ নারীর শাশ্বত পিপাসা তৃপ্ত হয়।

    এতগুলো প্রবল আকর্ষণ কুসুম সেদিন রোধ করতে পারে নি। তারা বিধাতা তাকে যেসব বৃত্তি ও প্রবৃত্তি দিয়ে গড়েছিলেন, হয়তো তার মধ্যেই না-পারার বীজ নিহিত ছিল। তাই সব কিছু ছেড়ে, সব বিপদ মাথায় নিয়ে সেদিন অনাথের সঙ্গেই সে নিজের ভাগ্যকে জড়িয়ে ফেলেছিল।

    অনাথ মল্লিকের বাড়ির পিছনদিকে রেললাইন, মাঝখানে কোনো বসতি নেই। একটা অযত্নরক্ষিত বাগান আর কিছু ঝোপঝাড়, জঙ্গল। তার পাশ দিয়ে একফালি পায়ে চলার পথ রেলপথের গায়ে গিয়ে পড়েছে। শহরের প্রথম ট্রেন আসে ভোর পাঁচটার কিছু আগে, মফঃস্বলের বেশির ভাগ লোক তখন বিছানায়। স্টেশন দূরে নয়, ঘন ঘন হুইসিল্‌ দিতে দিতে এগিয়ে যায়, সেদিনও তাই যাচ্ছিল। যেতে যেতে হঠাৎ থেমে গেল। গাড়ির লোকেরা ভাবল, সিগন্যাল নামে নি। ‘রেল-বাবুদের বোধ হয় ঘুম ভাঙেনি’—মন্তব্য করলেন কে একজন।

    ড্রাইভার ব্রেক কষেই নেমে পড়েছিল। এঞ্জিনের পিছনেই যে কামরা, তার তলায় একবার উঁকি মেরে বিরস মুখে মাথা নাড়তেই ফ্যায়ারম্যান পাশ থেকে প্রশ্ন করল, সাবাড়?

    অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ড্রাইভার কথা বলল না। সঙ্গীর হাতে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাড়াতাড়ি এঞ্জিনে স্টার্ট দিল। গাড়িটাকে ধীরে ধীরে কয়েক গজ পিছনে নিয়ে গিয়ে আবার থামিয়ে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে নেমে বলল, একেবারে দু-টুকরো হয়ে গেছে।

    বিকৃত ওষ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল একটা আপসোস-সূচক শব্দ এবং তার সঙ্গে ‘সোয়ের’ Swear বা শপথ-জাতীয় বুলি, ওদের দোষ বা বিরক্তি প্রকাশের প্রচলিত বাহন। এক্ষেত্রে তার লক্ষ্য বোধ হয় সে নিজেই। কয়েক সেকেণ্ড আগে দেখতে পেলে এ দুর্ভোগটা এড়ানো যেত, কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে?

    ফায়ারম্যানের বয়স বেশি নয়। এগিয়ে গিয়ে খণ্ডিত দেহটাকে ভালো করে ঠাহর করে বলল, মেয়েছেলে! ড্রাইভার ঝাঁঝিয়ে উঠল, না, মেয়েছেলে হবে কেন—তোর মতো একটা বুড়ো মদ্দ এসে লাইনের ওপর শুয়ে পড়েছে!

    ততক্ষণে যাত্রীরাও অনেকে নেমে এসে ভিড় করেছে মৃতার চারিদিকে। নানা মুখে নানা ধরনের মন্তব্য—ইস্, একেবারে পেটের ওপর দিয়ে চলে গেছে চাকাটা!” ‘আহা, কাদের ঘরের বৌ গো!’ ‘কাঁচা বয়স মেয়েটার!’ ‘বাড়ির লোকেরা হয়তো কিছুই জানে না!’ ‘পুলিসে খবর দেওয়া দরকার।’

    হঠাৎ সেই ভিড়ের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। একে ঠেলে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জনতা ফুঁড়ে এগিয়ে এল দুজন—একটি পুরুষ, অন্যটি স্ত্রীলোক। দুজনেই ছুটে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মৃতদেহের উপর। তারপর শুরু হল গগনভেদী বিলাপ। পুরুষটি বলছে, ‘এ তুমি কী করলে গো? তোমার মনে এই ছিল, একদিনও তো জানতে পারি নি?’ স্ত্রীলোকটি আর এক পরদা সুর চড়িয়ে বলছে, ‘তোমার সোনার সংসার ফেলে কোথায় চললে দিদিমণি? এত বড় সব্বোনাশ কেন করতে গেলে গো?”

    গাড়িতে বোধ হয় একটি লোকও ছিল না—ছেলে, বুড়ো, তরুণ, তরুণী সবাই এসে দাঁড়িয়েছে রেললাইনের চারদিক ঘিরে। স্তব্ধ হয়ে দেখছে এই মর্মন্তুদ শোকোচ্ছ্বাস। মেয়েরা ঘন ঘন চোখ মুচছে। পুরুষেরা কেউ কেউ ভাবছে, এই হতভাগ্য লোকটার জীবনে কত বড় শূন্য সে রেখে গেল, একটিবারও যদি জানতে পারত মেয়েটা, হয়তো এমন করে নিজেকে শেষ করে দিত না।

    কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পিছন থেকে বেশ উঁচু গম্ভীর গলার নির্দেশ শোনা গেল, ‘আপনারা সব সরে যান, আমাদের কাজ করতে দিন।’ সমবেত দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বক্তার দিকে, সঙ্গে সঙ্গে একটা ফালি মতো পথ তৈরি হয়ে গেল। তার ভিতর দিয়ে এগিয়ে এলেন ইউনিফর্মধারী পুলিস অফিসার, পেছনে দুজন অনুচর। মিনিট কয়েক মৃতদেহের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে মাথার কাছে যে পুরুষটি বসেছিল তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কে হন আপনার?’

    অশ্রুজড়িত কণ্ঠে উত্তর এল, ‘আমার স্ত্রী।’

    –এটি কে? পাশের স্ত্রীলোকটির দিকে আঙুল তুললেন পুলিস অফিসার।

    —ও? ও আমাদের ঝি।

    অনাথকে আরও ক’টি প্রশ্ন করা হল এবং তার থেকে জানা গেল, গভীর রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই দেখে পাশে স্ত্রী নেই। প্রথমে মনে করেছিল, হয়তো বাথরুমে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরেও যখন ফিরল না, উঠে পড়ে খুঁজতে শুরু করল। বাথরুমের দরজা খোলা। ঘর, বারান্দা, উঠোন সব ফাঁকা, কেউ কোথাও নেই। তখন স্ত্রীর নাম ধরে ডাকাডাকি করতে লাগল। তাতেই বোধ হয় ঝিয়ের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সে-ও খানিকটা খোঁজাখুঁজি করল। বাড়ির বাইরে বাগান রাস্তা পর্যন্ত ঘরে এল দুজনে, পাওয়া গেল না। অনেকদিন রোগে ভুগে ভুগে ইদানীং মাথাটা কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। গাড়ির হুইসিল শুনলে বলত, ‘রেল আমাকে ডাকছে!’ কখনও বলত, ‘কি মিষ্টি ডাক, শুনেছ?’ হঠাৎ সে কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। বাগান পার হয়ে ছুটে এসে দেখে যা ভয় করেছিল তাই। রেল ওকে ডেকে নিয়ে গেছে। ….

    বলে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল অনাথ মল্লিক। কুসুমও যেন তৈরি হয়ে ছিল, এমনি ভাবে সঙ্গে সঙ্গে সুর মেলাল।

    ড্রাইভার স্বীকার করল, সে যখন দেখল লাইনের উপর সাদামতো একটা কি পড়ে আছে, তখন একেবারে কাছে এসে গেছে। ব্রেক কষতে কষতে ইঞ্জিনটা এগিয়ে গেল।

    দারোগা এবার ‘ঝি’-এর দিকে নজর দিলেন। প্রথমে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন। তারপর ভিড় থেকে একটু তফাতে সরিয়ে নিয়ে মিনিট কয়েক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। কী বুঝলেন তিনিই জানেন, ফিরে এসে অনাথকে বললেন, ‘আপনাদের দুজনকে একটু থানায় যেতে হবে।’

    ঘটনাস্রোত এবার যে পথ ধরল, তার বিশদ বিবরণ কুসুমের কাছ থেকে পাবার কথা নয়। তার কাহিনী শুনবার পর যেসব তথ্য আমি ওদের মামলার ‘রায়’ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম, তার বিস্তৃত বর্ণনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। যেটুকু প্রাসঙ্গিক, সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।

    পলাতক ‘ঠাকুর’কে তাদের দেশোয়ালী আড্ডা থেকে পুলিসই খুঁজে বের করেছিল। সেরাত্রে সে দূরে কোথাও যায় নি। অত বড় দুর্ঘটনার পর সম্ভাব্য পুলিসী হাঙ্গামার আশঙ্কা করে পাশের জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়েছিল। অপেক্ষা করছিল, অন্ধকারটা একটু পাতলা হলেই চলে যাবে। হঠাৎ দেখল, ‘বাবু’ আর কুসুম দুজনেই ধরাধরি করে ‘মাইজী’কে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা খানিকটা এগিয়ে যেতেই সে আর দাঁড়ায় নি, বেরিয়ে উল্টো দিক দিয়ে শহরের আরেক প্রান্তে একেবারে তাদের ‘আড্ডা’য় গিয়ে উঠেছিল।

    ‘দুর্ঘটনা’র সময় যে মনিব-বাড়িতে উপস্থিত ছিল, একথা ঠাকুর অস্বীকার করে নি, এবং যা যা ঘটেছিল তার যথাযথ বর্ণনাই দিয়েছিল।

    ময়না-তদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে সাক্ষীর উক্তির কোনো অসঙ্গতি দেখা যায় নি। মৃতার হার্টের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল, ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার ফলে মৃত্যু হওয়া অসম্ভব নয়। শরীরে কোনো প্রাক্-মৃত্যু আঘাত-চিহ্ন পাওয়া যায় নি। রেলের ক্ষতটা নিঃসন্দেহে ‘পোস্ট-মর্টেম’ অর্থাৎ মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরবর্তী।

    সরকারের তরফ থেকে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হলেও দায়রা আদালত সেটা গ্রহণ করেন নি। প্রথম আসামী অনাথ মল্লিককে দোষী সাব্যস্ত করলেন দুটো অপরাধে—অসতর্ক ও হঠকারিতামূলক কার্যের দ্বারা মৃত্যু ঘটানো, এবং তার প্রমাণলোপের অপচেষ্টা। দ্বিতীয় আসামী কুসুম দাসীর বিরুদ্ধে শুধু পরবর্তী অপরাধটা প্রমাণিত হল। দণ্ডের বেলায় অনাথের দ্বিতীয় ধারার মেয়াদ প্রথমটির সঙ্গে ‘কান্কারেণ্ট’ বা একযোগে চলবে বলে আদেশ দেওয়ায় দুজনের মধ্যে কার্যত কোনো তফাৎ রইল না। কিন্তু কারাদণ্ডের পরিমাণ এক হলেও, তফাৎ ঘটল কারাগারে এবং সেখানকার ‘স্ট্যাটাস্ বা পদমর্যাদায়। অনাথ মল্লিক শিক্ষিত ভদ্রলোক, সুতরাং ‘ডিভিশন টু’ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর সনদ নিয়ে সে চলে গেল কলকাতার কুলীন জেলে। কুসুম দাসী নিরক্ষর ‘ছোট জাত’, তার আশ্রয় হল মফঃস্বল সেন্ট্রাল জেলের তৃতীয় শ্রেণীর জেনানা ফাটক। উভয়ের দণ্ডই সশ্রম, কিন্তু শ্রম-বণ্টনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। অনাথের সেই পুরনো কেরানীগিরিই বজায় রইল। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের অফিস থেকে উঠল গিয়ে জেলের অফিসে। কুসুমের যা পেশা, জেল তা যোগাবে কোত্থেকে? তার কাজ হল রোজ দশ সের করে গম পেষা। প্রসূতি ও শিশুর সেবা নিয়ে যার দিন কেটেছে, তার হাতে উঠল দেড়মণি জাঁতার হাতল। দু-দিন ঘুরিয়েই দু-হাতের তালু জুড়ে দেখা দিল বড় বড় ফোস্কা

    সেই ফোস্কা-সূত্রেই তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। জেনানা-ফাটকের সাপ্তাহিক প্যারেডের জন্যে অপেক্ষা করবার ধৈর্য ছিল না, ‘বড় সায়েবের কাছে নিয়ে চল’ বলে এমন চেঁচামেচি বাধিয়ে দিয়েছিল যে মেট্রন তাকে সরাসরি আমার অফিসে হাজির না করে পারে নি। এসেই টেবিলের ওপার থেকে হাত দুটো প্রায় আমার মুখের কাছে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘মেরে ফেললেও আর জাঁতা ঘোরাতে পারবো না।’

    কী একটা কাজে জেল-ডাক্তার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমার ইঙ্গিত পেয়ে সেই সুডৌল হাত দু-খানা নিজের হাতে নিয়ে টিপে টিপে পরীক্ষা করলেন। যতটা এবং যতক্ষণ প্রয়োজন, তার চেয়ে কিছুটা বেশিই দেখলেন মনে হল। তারপর বললেন, কিছু দিন ‘রেস্ট’ দিতে হবে। বিশ্রামটা আপাতত সাময়িক হলেও ভবিষ্যতে স্থায়ী হয়ে দাঁড়াবে, সেটা আমি তখনই অনুমান করেছিলাম। সে অনুমান মিথ্যা হয় নি। ফোস্কা শুকিয়ে যাবার পরেও ডাক্তার তাকে বরাবরের জন্যে ‘আনফিট্ ফর হুইট্‌গ্রাইন্ডিং’ অর্থাৎ গম-খাটনির অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন। অন্য কোনো বিকল্প খাটনির ব্যবস্থা অবশ্যই হয়ে থাকবে। সেটা বোধ হয় কাগজ-কলম ছাড়িয়ে ‘হাতে-কলমে’ পর্যন্ত পৌঁছয় নি। তা যদি হত, তাই নিয়ে আরও দু-চারবার সে নিশ্চয়ই আমার অফিস পর্যন্ত ধাওয়া না করে ছাড়ত না।

    ধাওয়া অবশ্য ক’দিন পরেই করেছিল। তবে খাটনির ব্যাপারে নয়, অন্য নালিশ নিয়ে। আগের দিনের মতোই একখানা চিঠি আমার সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, যেন কৈফিয়ৎ তলব করছে এমনি সুরে বলেছিল, আমার চিঠিতে এত কালি ফেলেছে কেন? চিঠিখানা তুলে নিয়ে দেখলাম, এখানে ওখানে দু-তিনটা লাইন বাদ দিয়ে বাকী সবটাই সেন্সরের ঘন কালিতে আচ্ছন্ন। মিনিট খানেক অপেক্ষা করে যখন হতাশ সুরে বলল,

    ‘এটা দিয়ে আমি কী করবো’, আমিও মনে মনে তার প্রশ্নে সায় না দিয়ে পারলাম না। তার মধ্যে বস্তু বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। বললাম, তুমি একটু বাইরে যাও। খবর নিয়ে পরে আবার ডাকবো।

    সঙ্গে যে ফিমেল ওয়ারর্ডারটি এসেছিল, সে ওকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে কোনো রকমে অফিসের বারান্দায় নিয়ে গেল। আমি আমার সেন্সর অফিসার মাধববাবুকে ডেকে পাঠালাম। গম্ভীর প্রকৃতির বয়স্ক লোক। বললেন, ওখানে যেসব কথা ছিল, আমি আপনার সামনে মুখে আনতে পারবো না স্যার।

    —কী ধরনের কথা? অশ্লীল?

    —ঠিক অশ্লীল নয়, তবে—একটু থেমে ইতস্তত করে বললেন, রীতিমতো লাভ্- লেটার। ও-জেল থেকে কেমন করে এল তাই ভাবছি। বোধ হয় কেউ স্মাগ্‌ করে পাঠিয়েছে।

    লেখকের নামটা মাধববাবু কাটেন নি। কুসুমকে ডাকিয়ে এনে বললাম, অনাথ কে?

    —আছে একজন।

    –সেই একজনের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা আমাদের জানা দরকার।

    –কেন?

    —তাই বুঝে আমরা ঠিক করবো, চিঠির কতটা থাকবে আর কতটা কাটা যাবে।

    কুসুম একটুখানি কি ভেবে নিয়ে বলল, ওর কাছেই তো আমি ছিলাম। আমাকে খু-উ-ব ভালোবাসে। (বলতে বলতে মুখখানা কোমল হয়ে এল। গলাটাও অনেকটা স্নিগ্ধ শোনাল) বাবু বলেছে, জেল থেকে বেরোলেই আমাকে নিয়ে কলকাতায় বাসা করবে। এই চিঠিতে বোধ করি সেই কথাই ছিল। কোন্ ড্যাক্রা সব কালি ঢেলে বুজিয়ে দিয়েছে দ্যাখো না! বলে সম্ভবত মাধববাবুকেই সেই দুর্বৃত্ত মনে করে তাঁর দিকে একটি অগ্নিকটাক্ষ নিক্ষেপ করল।

    ফিমেল ওয়ার্ডার বোধ হয় হাসি চাপবার চেষ্টায় অন্য দিকে মুখ ফেরাল। মাধববাবুর চোখে মুখে বিরক্তি ও বিতৃষ্ণার ভ্রূকুটি আরও খানিকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে অভিযোগকারিণীকে তখনকার মতো ভিতরে পাঠানো হল।

    এর পরের চিঠিখানা মাধববাবু আমাকে দেখিয়েছিলেন। কুসুম যদি পড়তে পারত এবং ফিমেল ওয়ার্ডের একমাত্র বাসিন্দা হত, চিঠিটা বিনা সেন্সরেই তার হাতে দেবার নির্দেশ দিতাম। সে আগেই যে স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল, তার ‘নৈতিক উন্নতি’ নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার প্রয়োজন ছিল না। মাধববাবুর ওটা নিছক পণ্ডশ্রম। কিন্তু ওর সঙ্গে আরও মেয়ে থাকে—কয়েকজন তার মধ্যে উঠতি-বয়সী। এ চিঠি তাদেরও হাতে হাতে ঘুরবে। সে কথা আমাদের ভাবতে হয়েছিল। সুতরাং কুসুমের চিঠি পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল নানা রকম উৎপাত। যাকে যখন যা মুখে আসে তাই বলে, কোনো কাজ করে না, তুচ্ছ কারণে চেঁচামেচি করে, কখনও বা গুম্ হয়ে বসে থাকে।

    আবার একদিন এল আমার কাছে। মেট্রনের হাত ছাড়িয়ে ছুটে এসে পড়ল আমার পায়ের উপর। তিন-চারজনে টেনে তুলতে পারে না। সে কী আকুল কান্না! —আমাকে ওখানকার জেলে পাঠিয়ে দাও সায়েব। তাকে একবারটি না দেখলে আমি মরে যাবো।

    আমি ধমক দিলাম, একথা বলতে তোমার লজ্জা করে না?

    সে কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু করুণ কণ্ঠে বলল—তার পক্ষে যেটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত—তুমি যদি আমার সব কথা জানতে সায়েব, তাহলে বুঝতে। না, তার কাছে আমার কোনো লজ্জা নেই।

    এর পরেই সে আমার কাছে তার “সব কথা” খুলে বলবার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিল। মেট্রনকেও তাড়া দিয়ে দিয়ে পাগল করে তুলল। প্রথমটা আমি রাজী হই নি। তারপর মত বদলাতে হল। সেদিন তার যে অবস্থা, তাকে ঠিক প্রকৃতিস্থ বলা চলে না। পুরোপুরি মনোবিকার না ঘটলেও, কথায় বার্তায় আচরণে তার অনেকগুলো লক্ষণ সুস্পষ্ট। তার থেকে আমার একটা ধারণা হয়েছিল, ওর বহু অপরাধজড়িত তরুণ জীবনের যে অংশটা আড়ালে পড়ে আছে, তাকে খানিকটা উন্মোচিত করবার সুযোগ দিলে, উত্তেজিত ও অপরিণত মনের এখানে সেখানে যে-সব জট পাকিয়ে গেছে তার গ্রন্থিগুলো হয়তো খুলে যেতে পারে।

    অভিলাষবাবুর ঐ চেয়ারখানাই সেদিন একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বসেছিলাম। ও ছিল আমার পায়ের কাছটিতে। অকপটে শুধু নয়, গভীর আগ্রহভরে একটানা বলে গিয়েছিল তার শত দুষ্কর্মের দীর্ঘ ইতিহাস। বলতে পেরে যেন বেঁচে গিয়েছিল। জানি না, সেদিন কিসের আলোড়ন উঠেছিল তার অন্তর জুড়ে, যার তাড়নায় একজন অনাত্মীয় প্রবীণ পুরুষের কাছে যুবতী নারীর যে ব্রীড়াজনিত স্বাভাবিক সঙ্কোচ, সেটাও সে অনায়াসে অতিক্রম করে গিয়েছিল। আমাদের উভয়ের ভিতরে যে দুস্তর ব্যবধান, তাও তার দিক থেকে অণুমাত্র বাধা সৃষ্টি করে নি।

    সে যেমন করে তার নির্লজ্জ প্রগল্ভ কাহিনীর রাশ খুলে দিয়েছিল, আমি তেমনি করে তার পুনরুক্তি করতে পারি নি। তার ভাষাকে কিঞ্চিৎ ভদ্র পোশাক পরাতে হয়েছে।

    ‘ঐ জেলে পাঠিয়ে দাও’ বলে কুসুম প্রথমটা যে ঝোঁক ধরেছিল, ক্রমশ তার বেগ পড়ে গেল। ও নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করত না। তা-ই হয়। মানুষের মনের প্রবৃত্তিগুলো জোয়ারের জলের মতো। আসে, যায়, একটানা বেশি দিন থাকে না। আর একটা কারণ ছিল। অনাথের চিঠিতে আর সে উত্তাপ ছিল না। ভাষা ও সুর—দুটোই আশ্চর্যরকম বদলে গিয়েছিল। উচ্ছ্বাস নেই, আবেগ নেই, গোপন প্রণয়ের আবিলতা নেই, আগাগোড়া শুধু বড় বড় উপদেশ। মাধববাবুর সেন্সরের কাঁচি তার কোনোখানেই দাঁত বসাবার জায়গা পেত না। প্রতিটি চিঠি একেবারে অক্ষত দেহে ফিমেল ওয়ার্ডে গিয়ে পৌঁছত। মেট্রন পড়ে শুনিয়ে দিত। কিন্তু যার চিঠিতে তার কোনো আগ্রহ ছিল না, শুনে যেত, এই পর্যন্ত। চিঠিগুলো হাত বাড়িয়ে নিতেও চাইত না। মেট্রন দিতে গেলে বলত, থাক, ও দিয়ে আমি কী করব?

    তারপর অনেকদিন নির্বিবাদে কেটে গেল।

    কুসুমকে বিশেষভাবে চোখে বা মনে পড়বার মতো কোনো ঘটনা ঘটে নি। ইদানীং তার ভিতরকার সেই বন্য ভাবটা আশ্চর্যরকম শান্ত হয়ে গিয়েছিল। নিজেও কোনো নালিশ নিয়ে ছুটে আসে নি, তার নামেও কোনো ‘নালিশ’ ছিল না। দীর্ঘকাল পরে আমার অফিসেই আবার তাকে দেখলাম। অনেকটা যেন স্তিমিত। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একখানা খোলা চিঠি আমার টেবিলের উপর রাখল। বললাম, কী এটা?

    —পড়ে দেখুন।

    কয়েক বছর জেলে বাস করে কুসুমের ভাষার অনেকটা উন্নতি হয়েছিল। চিঠিটা তুলে নিয়ে লেখকের নামটা দেখে নিলাম। শ্রীঅনাথ মল্লিক। তার উপরে কয়েকটি মাত্র লাইন—

    কল্যাণীয়াসু

    কুসুম, এক-থোকে হঠাৎ খানিকটা ‘রেমিশন’ পেয়ে কালই আমি জেল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। তোমারও বোধ হয় খালাসের বেশি দেরি নেই।

    ভেবে দেখলাম তোমার পথ এবং আমার পথ এক নয়। তোমার জীবনের সঙ্গে নিজেকে আর জড়াতে চাই না। এতদিন পরে একটা নতুন দিকের সন্ধান পেয়েছি।

    তোমার কাছে এই আমার শেষ চিঠি। হয়তো আর কখনও দেখা হবে না। আশীর্বাদ করি তুমি সুখী হও।

    .

    চিঠিটা মুড়ে টেবিলের উপর রাখতেই সে বলে উঠল, এখানে কি বরাবর থাকা যায় না?

    —না, মেয়াদ শেষ হবার পরে একদিনও আমরা রাখতে পারি না।

    —তাহলে আমি কোথায় যাবো?

    এ প্রশ্নের একটি মাত্র উত্তর ছিল—’জানি না’ কিংবা ‘আমাদের তা নিয়ে মাথা ঘামাবার কথা নয়’—কথাটা বোধ হয় মুখে বাধল, তাই পাল্টা প্রশ্ন করলাম, মা-র কাছে যেতে তোমার আপত্তি কী?

    কোন্ মুখে যাবো? অ্যাদ্দিন আছে কিনা কে জানে? থাকলেই বা…. বলতে বলতে দুচোখ জলে ভরে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ়স্বরে বলল, আপনি বলুন, আমার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন? তা নৈলে কিন্তু আমি কখনো এখান থেকে নড়বো না, তাড়িয়ে দিলেও পড়ে থাকবো।

    বললাম, খালাসের তো এখনও মাস কয়েক দেরি আছে, তখন দেখা যাবে কি করা যায়।

    —কথা দিচ্ছেন তাহলে?

    সঙ্গে যে ফিমেল ওয়ার্ডারটি ছিল, সে ধমকে উঠল, কাকে কি বলিস তার ঠিক নেই চল্…বলে এক রকম জোর করেই ওকে টেনে নিয়ে চলল। হঠাৎ টেবিলের উপর নজর পড়তে বললাম, চিঠিটা? কুসুম যেতে যেতে দরজার মুখে থমকে দাঁড়াল, দ্রুতপায়ে ফিরে এসে চিঠিখানা তুলে নিল এবং সঙ্গে সঙ্গে শত টুকরো করে জানলার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সবেগে বেরিয়ে চলে গেল।

    আমাকে বিশেষ চেষ্টা করতে হয় নি, অনেকটা আপনা হতেই কুসুমের একটা মোটামুটি ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ফিমেল ওয়ার্ডের একটি কয়েদী তখন আসন্ন – প্রসবা। মাস পাঁচেক আগে ছ’মাসের সাজা নিয়ে এসেছিল। জেলের মধ্যে আঁতুড়ের হাঙ্গামা তো কম নয়। সেটা এড়াবার জন্যে জেলর তার টিকেটে মোটা ‘রেমিশন’-এর সুপারিশ করেছিলেন, যাতে করে ও-পর্বটা বাইরে গিয়ে সমাধা হতে পারে; অর্থাৎ তার আগেই তাকে ছেড়ে দেওয়া যায়। অতটা ‘মাপ’ দেবার কোনো সঙ্গত কারণ না থাকলেও আমি রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু বিধাতা বাধ সাধলেন। ডাক্তারের হিসাবমত নবজাতকটির যখন আসবার কথা, তার কিছুদিন আগেই তাকে পাঠিয়ে দিলেন। তাও এমন অকস্মাৎ যে লেডি ডাক্তার ডাকবার তর সইল না। তিনি যখন এসে পৌঁছলেন, শিশুটি তখন কুসুমের কোলে। প্রসূতিকে সুস্থ করে তুলতে ক’দিন সময় লেগেছিল। পর পর তিন চার দিন তাঁকে আসতে হল। না এলেও হত। কুসুম একাই সামলাতে পারতো। তার কাজ- কর্ম দেখে লেডি ডাক্তার এতটা খুশী হয়েছিলেন যে, খালাসের সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার হাসপাতালেই একটা চাকরি জুটিয়ে দিতে বিশেষ বেগ পেতে হয় নি।

    তার কিছুদিন পরে শুনলাম, তিনি ওখান থেকে হুগলী না হাওড়া কোথায় যেন বদলি হয়েছেন, এবং কুসুমকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

    .

    সেদিন অভিলাষবাবুর অফিস থেকে যখন বেরিয়ে পড়লাম, তার ঘণ্টা দেড়েক পরেই আমার ট্রেন! কুসুম তখনও ওখানেই অপেক্ষা করছিল। আসবার সময় আর তার দিকে তাকাই নি। কিন্তু সেই জ্বলন্ত চোখ দুটো সমস্ত পথ আমাকে অনুসরণ করে চলল। একবার ভাবলাম ফিরে যাই, জেনে আসি ঐ আগুনের ইতিহাস, এতগুলো বছর অন্তরের কোন্ নিভৃত কোণে ঐ অনির্বাণ শিখাটাকে সে জ্বালিয়ে রেখেছিল কেমন করে! তারপর নিজেকে বোঝালাম, না, ফেরা যায় না। কুসুম এবং তাকে ঘিরে যে জগৎ সেখান থেকে আমি চিরদিনের তরে সরে এসেছি। পিছনে যা রইল তা পিছনেই থাক। মায়া বাড়িয়ে কী লাভ? এ শুধু ক্ষণিকের দুর্বলতা। একে প্রশ্রয় দেওয়া চলে না।

    কোলকাতায় ফিরে নানা কাজের মধ্যে ডুবে গেলাম। কুসুম আবার ধীরে ধীরে মনের তলায় মিলিয়ে গেল।

    হঠাৎ একদিন আমার বৈঠকখানায় অভিলাষবাবুর আবির্ভাব। বিস্মিত হলাম। চাকরি জগতে ভূতপূর্বের সঙ্গে বর্তমানের যে স্বাভাবিক বিচ্ছেদ, তার উপরে সেতু রচনা করবার ইচ্ছা বা আগ্রহ কোনো তরফেই বড় একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে ভূতপূর্বের মাথায় যদি সাহিত্যের ভূত চাপে, বর্তমান তাকে সযত্নে এড়িয়ে চলবে, এইটাই প্রত্যাশিত। তাহলে কি উনি আবার নতুন কোনো ফ্যাসাদ ডেকে এনেছেন?

    বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, অভিলাষবাবু একটা খাকী রংয়ের খামে মোড়া বস্তু আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, এই নিন।

    —কী ওটা?

    —আমি কিছু জানি না। শুধু পৌঁছে দেবার কথা, তাই দিয়ে গেলাম। উঃ, চীজ বটে একখানা! আপনি যে কি করে ওকে বরদাস্ত করতেন স্যার, আপনিই জানেন। আমি তো দুদিনেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। ওর জন্যেই বোধ হয় পালাতে হবে ওখান থেকে।

    —কার কথা বলছেন?

    —ঐ যে, আপনার কুসুম না কী! আমি বলবো ক্যাক্‌টাস্, ভীষণ কাঁটাওয়ালা ক্যাক্‌টাস্, আমরা যাকে বলি ফণীমনসা! বিচ্ছুও বলতে পারেন।

    —খুব জ্বালাচ্ছে বুঝি?

    —জ্বালাচ্ছে মানে! প্রাণ বের করে দিল। সেদিন এসে বলছে—’সায়েবকে একটা চিঠি দেবো।’ ‘কোন্ সায়েব?’ ‘কোন্ সায়েব আবার! আমার সায়েব সেদিন যিনি এসেছিলেন।’ বললাম, ‘বেশ তো। তার জন্যে আমার কাছে আসবার কী দরকার ছিল? মেট্রনকে বললেই চিঠির কাগজ পেয়ে যেতে।’ বললে, ‘চিঠি আমার লেখা হয়ে গেছে।

    ‘তাহলে অফিসে পাঠিয়ে দাও।’ উত্তরে কি বললে জানেন? ‘না, এ চিঠি আর কেউ পড়ে, তা আমি চাই না। এটা আমি আপনার হাতে দিয়ে যাবো।’ ‘আমার হাতে!” “হ্যাঁ, আপনি যেদিন কোলকাতা যাবেন, তাঁর কাছে পৌঁছে দেবেন।’

    শুনুন কথা! আর কী টোন্! যেন কুইন ভিক্টোরিয়া হুকুম চালাচ্ছে!

    —আর আপনিও তো দেখছি সেটা সঙ্গে সঙ্গে তামিল করতে ছুটেছেন?

    —না ছুটে উপায় আছে, স্যার? এর পরে কি বললে, তা তো এখনও শোনেন নি!

    —কি বললে?

    বোঝাতে গিয়েছিলাম, আমার যাবার দরকার হবে না, ডাকে দিলেও চিঠি ঠিক পৌঁছে যাবে। কথাটা শেষ হবার আগেই রুখে উঠল—’আপনি নেবেন কিনা বলুন, তা নইলে আমি এইখানে আপনার সামনে মাথা খুঁড়ে মরবো।’….বুঝুন একবার। বুড়ো বয়সে শেষকালে খুনের দায়ে পড়বো?

    চিঠিখানা কুসুমের নিজের হাতে লেখা, সে তথ্যটি গোড়াতেই জানা গেল। আর জানলাম, এই নতুন বিদ্যা তার নিজের ইচ্ছা বা আগ্রহে অর্জিত হয় নি, এর পেছনে সবটাই তার ‘মাসিমা’ অর্থাৎ লেডি ডাক্তার মিস দাসের চেষ্টা। চেষ্টাটা বিশেষ ফলবতী হয়েছে বলে মনে হল না। সে বিষয়ে কুসুম নিজেও সচেতন। বলছে, ‘আমার এই লেখা আপনি পড়তে পারবেন কি? না পারলেও আমি সে কথা জানতে যাবো না। আমার বুকের বোঝা আমি নামিয়ে দিয়েই খালাস। তা নাহলে সারাজীবন ধরে গুমরে গুমরে মরতাম।’ এতদিন পরে একটা পুরো নিঃশ্বাস পড়ল।

    ‘এবারে জেলে এসেই শুনেছিলাম, আপনি আর চাকরিতে নেই। কোথায় আছেন কেউ বলতে পারে না। কতদিন আপনার কথা ভেবেছি, কিন্তু এ জীবনে দেখা পাবো, তা কি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিলাম? দেখে কী ইচ্ছা হয়েছিল জানেন? সেই সেদিনের মতো আপনার পায়ের কাছটিতে গিয়ে বসি, বলে যাই যত কথা জমে আছে বুকের মধ্যে, যা কাউকে বলি নি, আর কাউকে বলা যায় না। সে সুযোগ হল না। এ জীবনে কোনোদিনই হবে না। তাই সেদিন থেকে বসে এই চিঠিটা লিখেছি। লিখে মনে হল, এ চিঠি তো এরা পাঠাবে না। পাঠালেও কেটেকুটে একশা করে দেবে। তা যাতে না হয়, তার জন্যে কত কাণ্ড যে আমাকে করতে হয়েছে, শুনলে আপনি হাসবেন।….যাক সে সব বাজে কথা।‘

    চাকরি-জীবনের প্রথম দিকে শিক্ষানবিশি-স্তরে চিঠি-সেন্সর নামক দুরূহ কার্যটি আমাকে কিছুদিন করতে হয়েছিল। সেই বিদ্যার জোরে ভাষা, বানান এবং লিপি বিন্যাসের কাঁটাবন ভেঙে চিঠিখানার মোটামুটি পাঠোদ্ধার কোনো রকমে করা গেল। কিন্তু গোটা চিঠিটার হুবহু উদ্ধৃতি শুধু অসম্ভব নয়, আমার পাঠককুলের কাছে রুচিকর হবে না, লেখিকার উপর অবিচার করা হবে। এ চিঠি একান্ত ভাবে আমারই জন্যে লেখা, প্রকাশের জন্যে নয়। আমি তাকে জানি, তার নিগূঢ় মনোরাজ্যের সন্ধান রাখি, তার বিধাতা তাকে যে-সব বিচিত্র উপাদান দিয়ে গড়েছেন, তারও পরিচয় পেয়েছি। সে কথা সে নিঃসংশয়ে জানে বলেই তার নারী-হৃদয়ের অন্তরালে প্রবৃত্তির যে উদ্দাম তাড়না, কামনার যে নগ্ন আবেগ, কোনোটাই সে গোপন করে নি। একদিন মুখে যতটা বলেছিল, তার চেয়েও বেশি, তার নিরাবরণ অন্তর্লোক অসংকোচে উদ্‌ঘাটিত করে গেছে। তার উপর কিছুটা সেন্সরের কলম না চালিয়ে উপায় নেই। ভাষার উপরেও যে ঘষা-মাজার প্রয়োজন ঘটেছে, সে কথা তো আগেই কবুল করেছি।

    লেডি ডাক্তার মিস দাস কুসুমকে শুধু আশ্রয় ও মোটামুটি সচ্ছল জীবনযাত্রার সংস্থান করে দেন নি, তাঁর নিঃসঙ্গ প্রৌঢ় জীবনের অনেকখানি স্নেহও ওকে দিয়েছিলেন। অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো সেই স্নেহচ্ছায়ায় সুখে জীবন কাটিয়ে দিত। কুসুম তা পারে নি। সে সুখী ছিল না। মাসিমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। সে যে তাঁর নিজের মেয়ে নয়, এ কথা তিনি একদিনের তরেও বুঝতে দেন নি—এও তারই অকপট উক্তি। তবু সুখ’ যাকে বলে তা সে পায় নি। সংসারে সুখের চেহারা সকলের বেলায় এক নয়।

    ‘সেই লোকটা’ (চিঠির ভাষায়) গোপন প্রেমের যে ফেনিল সুরাপাত্র ওর পিপাসিত ওষ্ঠপ্রান্তে তুলে ধরেছিল, তার তীব্র স্বাদ কুসুমের শিরায় শিরায় পরিব্যাপ্ত হয়ে গেছে। তাকে আশ্রয় করে একটি অপরিণত নারীমন সেদিন যে-জীবনের স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল, দূরে গিয়েও সে দিনের পর দিন তারই উপরে নানা রঙের তুলি বুলিয়ে সেই জীবনকে আরও মোহময়, আরও লোভনীয় করে তুলেছে। মাধববাবুর সেন্সরের কালি তাকে ঢেকে রাখতে পারে নি, অতৃপ্ত রমণী-হৃদয়ের উদগ্র বাসনাকে আরও খানিকটা উসকে দিয়েছে। তারই মাদকরসে নিজেকে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দিয়ে যে দুঃসহ আনন্দ, কুসুমের কাছে তারই নাম ‘সুখ’। জেনানা ফাটকে বসে বসে সেই সুখের উপরেই সে একটি মনোরম স্বর্গ গড়ে তুলেছিল। তারপর যাকে অবলম্বল করে এত সাধের স্বর্গ-রচনা, তারই রূঢ় হাতের অপ্রত্যাশিত আঘাতে যেদিন সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তখনও তার দুর্জয় মোহ কুসুমকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করেছে। সেই দীর্ঘ-লালিত প্রলোভনের কবল থেকে নিজেকে টেনে সরিয়ে এনে মিস দাসের সহজ সুস্থ স্নেহময় গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে নিজেকে সে বসাতে পারে নি, হয়তো তেমন চেষ্টাও করে নি।

    তার অকপট স্বীকারোক্তি চিঠিতেই দেখতে পাচ্ছি—’আপনি তো সবই জানেন। এটুকু বলতে আর বাধা কী? আপনার কাছে আমার লজ্জাই বা কিসের? সত্যি বেশ লাগত। কত কী যে ভাবতাম! সব ‘তাকে’ নিয়ে। ‘তাকে’ নিয়ে সংসার পেতেছি। কোথায় জানেন? কোলকাতায়। একদিন দুজনে মিলে গিয়েছি আপনাকে প্রণাম করতে। সে যেতে চায় না, বলেছে, কি ভাববেন তিনি? আমি যেন জোর করে ধরে নিয়ে গেছি। তারপর নিজের মনেই হেসে ফেলতাম। ওমা, আপনার ঠিকানাই যে জানি না!…. কোনো কোনো দিন সে আসত। সত্যি বলছি আপনাকে, আমার পাশে এসে বসত। দু-হাতে জড়িয়ে ধরে আমাকে পিষে ফেলত। তারপর…হঠাৎ দেখতাম সব মিথ্যা, সব ভুল। আমি একা, সে কোথাও নেই। তখন সমস্ত শরীরে আগুন ধরে যেত। সে যে কী জ্বালা আপনাকে বোঝাতে পারবো না।

    এমনি করে কয়েক বছর কেটে গেল। কুসুমের রক্তধারায় সে দহন-জ্বালা হয়তো আপনা হতেই কিছুটা প্রশমিত হয়ে এল। আরও হত, অন্য কোনো কারণে না হলেও, মহাকালের অমোঘ বিধানে। কিন্তু হল না। বিধাতার হয়তো সে ইচ্ছা ছিল না। তাই তাঁরই হাতে লেখা ললাট-লিপি কুসুমকে টেনে নিয়ে গেল অন্য পথে, এক আকস্মিক, অভাবনীয়, ভয়ঙ্কর পরিণতির মধ্যে। চিঠির শেষ অংশ থেকে সেই কাহিনীটি উদ্ধার করছি।

    রাত আটটা বেজে গেছে। শহরতলীতে একটা ‘কল্’ সেরে মিস দাস ঘোড়ার গাড়ি করে ফিরছেন। সঙ্গে কুসুম। ওঁর এক বান্ধবীর বাড়ির সামনে দিয়ে পথ, হঠাৎ কী মনে হল, গাড়ি থামিয়ে বললেন, সতীর সঙ্গে একটু দেখা করে যাই, তুই চলে যা।

    ‘গাড়িটা পাঠিয়ে দেবো তো?’ জানতে চাইল কুসুম।

    —কী দরকার? আমি একটা রিক্শা নিয়ে নেবো

    গাড়ি আরও কিছু পথ এগোতেই, কাছাকাছি কোনো একটা বড় বাড়ি থেকে কীর্তনের সুর ভেসে এল। কানে যেতেই কুসুম চমকে উঠল। এ গলা যে তার চেনা। ‘চেনা’ বললে কিছুই বলা হল না, তার মর্মস্থলে গাঁথা হয়ে আছে—তার চেতনার পরতে পরতে জড়িয়ে গেছে।

    অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ল। হৈমন্তী তখন একটু সুস্থ হয়ে উঠেছে। বাড়ি থেকে ঘুরে আসবার নাম করে সন্ধ্যার দিকে মাঝে মাঝে ও ছুটি নিত। রেললাইন পার হয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘সে’ এসে পড়ত। তারপর দুজনে হাত-ধরাধরি করে নির্জন মাঠের অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। দূরে একটা ছোট নদী ছিল, কোনো-কোনোদিন তার তীরে গিয়ে বসত। তারপর শুধু কথা। কথা যখন ফুরিয়ে যেত, তখন গান। কীর্তন নয়, ভালোবাসার গান। কী দরদ দিয়ে যে গাইত! আজও দু-কানে ভরে আছে। সেই গলা! সে কি কখনও ভোলবার? কুসুমের সমস্ত দেহমন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।

    গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে যন্ত্রপাতির ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়ল। কোনো বড়লোকের বাড়ি। মস্ত বড় গেট। তারপরেই বিস্তৃত আঙিনা। সবটা জুড়ে ফরাস পাতা, মাথার উপর সুদৃশ্য সামিয়ানা। লোক গিজগিজ করছে। বাঁ দিকটায় ভর্তি মেয়েরা, ডাইনে পুরুষদের ভিড়। সামনে সুসজ্জিত মঞ্চের উপর কীর্তনের দল। মাঝখানটার চারদিকে আলো করে সে বসে আছে। দূর থেকে এক পলক দেখেই কুসুমের বুকের রক্ত দোলা দিয়ে উঠল। এও কি কখনও সম্ভব? স্বপ্ন কি কখনও সত্য হয়? হয়। এই তো তার জলজ্যান্ত প্ৰত্যক্ষ প্রমাণ। দুচোখে মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল কুসুম। দেখে আর আশ মেটে না। নতুন সাজে কি সুন্দর মানিয়েছে! পরনে দামী সিল্কের ধূতি-চাদর—উজ্জ্বল গেরুয়ায় রাঙানো। কাঁধ পর্যন্ত চুল, মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে সযত্ন-রচিত সিঁথি। কপালে চন্দন-তিলক।

    কুসুম মেয়েদের ভিড় ঠেলে আরও খানিকটা এগিয়ে গেল। গানের ফাঁকে ফাঁকে গায়কের ভাবগম্ভীর দৃষ্টি মাঝে মাঝে এদিকেও এসে পড়ছে। যদি একবার চোখাচোখি হয়ে যায়!

    গান শেষ হল। সবাইকে প্রণতি জানিয়ে বিদায় নিলেন গায়ক। বাড়ির মেয়েরা এসে সসম্ভ্রমে এগিয়ে নিয়ে গেল অন্দরমহলে। আসর আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেল। কুসুম তখনও একপাশে দাঁড়িয়ে। একজন ভদ্রলোক, সম্ভবত ঐ বাড়ির কেউ, এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি গোসাঁইজীর সঙ্গে দেখা করতে চান?

    আশেপাশের টুকরো কথা থেকে কুসুম জানতে পেরেছিল, ঐ নামেই এখানে ওর পরিচয়। বলল, হ্যাঁ।

    —আজ তো দেখা হবে না। এখন ওঁর বিশ্রামের সময়। কাল বিকেল পাঁচটায় আসবেন, দেখা হবে।

    কুসুম আর কিছু বলল না। লোকটি সরে যেতেই সকলের অলক্ষ্যে বাড়ির ভিতর গিয়ে ঢুকল। দালানের সামনে একটি ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে দেখা। তাকেই জিজ্ঞাসা করল, গোসাঁইজী কোন্ ঘরে আছেন, খুকী?

    —ঐ ঘরে। এখন যাবেন না।

    ততক্ষণে কুসুম সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। দরজা ভেজানো। ঠেলা দিতেই খুলে গেল। সামনেই প্রশস্ত খাটের উপর পুরু ধবধবে বিছানা। মাথার উপরে ঘূর্ণমান বৈদ্যুতিক পাখা। গোসাঁইজী শুয়ে আছেন। মাথার কাছে বসে একটি মেয়ে তাঁর উন্মুক্ত প্রশস্ত বুকের উপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পায়ের কাছে আরও দুজন—মুখোমুখি বসে দু-হাতে পদসেবায় ব্যস্ত। সকলেই যুবতী, সুন্দরী এবং সুসজ্জিতা। একটি নীলাভ মৃদু আলো ছাড়া ঘরে আর কোনো আলো নেই।

    শিয়রের কাছে যে মেয়েটি ছিল, কুসুমের উপর সকলের আগে তারই নজর পড়ে থাকবে। একটু রূঢ় স্বরে বলে উঠল, কী চাই আপনার?

    ‘কিছু একটা চাই বৈকি? সেটা আমার চেয়ে উনিই ভালো বলতে পারবেন’—চোখের ইঙ্গিতে গোসাঁইজীকে দেখিয়ে দিল। তিনি চোখ বুজে ছিলেন, পাতাদুটো যেন চমক লেগে খুলে গেল। মুখ থেকে বেরিয়ে এল—কে? সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড় করে উঠে বসলেন।

    কুসুম কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, চিনতে পারছ না কে? . ….আপনাদের আলোর সুইচটা কোথায়?

    পরের প্রশ্নটা পায়ের কাছে যে মেয়ে দুটি বসেছিল তাদের উদ্দেশে। তারই মধ্যে একজন উঠে বড় আলোটা জ্বেলে দিল। গোসাঁইজী মুহূর্তকাল বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কপাল কুঞ্চিত করে বললেন, আপনাকে কোথাও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না!

    কুসুম প্রথমটা হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণেই খানিকটা সামলে নিয়ে বলল, আমি কুসুম!

    ‘আপনি ভুল করছেন’—কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন গোসাঁইজী, ‘কুসুম বলে কাউকে আমি চিনি না। ও নামও কোনোদিন শুনি নি।’

    কুসুমের সমস্ত বাক্শক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল। তাদের পরিচয়টুকু পর্যন্ত ‘সে’ এমন স্রেফ অস্বীকার করে যাবে, এ যে তার স্বপ্নেরও অতীত!

    ততক্ষণে বাড়ির পুরুষেরাও এসে পড়েছেন। একটি যুবক এগিয়ে এসে ধমকের সুরে বলল, কে তুমি?

    —যে-ই হই, তাতে আপনার কী?

    —বটে! এখুনি বেরিয়ে যাবে কিনা বলো, তা না হলে—

    ‘উহুঁ, ওভাবে নয়’, করুণার্দ্র কণ্ঠে বাধা দিলেন গোসাঁইজী, ‘মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে- শুঝিয়ে নিয়ে যাও। পাগল-টাগল হবে বোধ হয়।’

    ‘পাগল!’ বিড় বিড় করে আপন মনে আউড়ে গেল কুসুম। মুহূর্তমধ্যে সত্যিই যেন তার মাথার ভিতরটা ওলট-পালট হয়ে গেল। সেই সঙ্গে তার দেহকোষে, তার মনের মজ্জায় মজ্জায় এতদিন ধরে যত জ্বালা জমা হয়ে ছিল—কুসুম জানে না সে কিসের জ্বালা, হয়তো অতৃপ্ত বাসনার, অবদমিত সম্ভোগ-লিপ্সার, ক্ষোভের, নৈরাশ্যের, বঞ্চনার, প্রতিহিংসার—সব যেন একীভূত হয়ে তার শিরায় শিরায় উদ্দাম হয়ে উঠল। কম্পমান মুঠি থেকে ব্যাগটা মাটিতে পড়ে গেল। কুসুমের নজর পড়ল তারই উপর। ক্ষিপ্রহস্তে তার ভিতর থেকে একটা কি যন্ত্র তুলে নিতেই গোসাঁইজী স্থান-কাল ভুলে ভয়ার্ত বিকৃত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন–কুসুম!

    ততক্ষণে সেই ধারালো অস্ত্রটা সবেগে বসে গেছে তাঁর চোখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে ফিকি দিয়ে উঠল রক্তধারা। তার উষ্ণ স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ল কুসুমের মুখে বুকে গলায়। খানিকটা লোনা স্বাদ তার দীর্ঘ-তৃষ্ণা-পীড়িত ঠোট দুটিতেও জড়িয়ে গেল।

    তারপর কি হল কুসুম জানে না, যখন জ্ঞান হল তখন সে থানায়। তিনদিন পরে জেলে বসে খবর পেল, গোসাঁইজী হাসপাতালে মারা গেছেন।

    কুসুমের চিঠির শেষ ক’টি ছত্র আরেকবার পড়লাম—’তাকে খুন করবার মতলব আমার ছিল না। সেই সর্বনেশে চোখ দুটো, যা দিয়ে একদিন আমাকে ভুলিয়েছিল, হয়তো আরও কত মেয়েকে ভুলিয়েছে, তাই শুধু চিরদিনের তরে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলাম …তাই বলে যা করেছি তার জন্যে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার সব জ্বালা জুড়িয়ে গেছে।

    শেষ চিঠিতে সে আমাকে সুখী হবার আশীর্বাদ জানিয়েছিল। তার ফল ফলেছে। আজ সত্যিই আমি সুখী।’

  • আট

    আট

    এতদিন যেসব জেল-থেকে-ফেরা অচেনা পত্রলেখক ও লেখিকা আমাকে তাদের আত্মকাহিনী শুনিয়েছেন (যার কিছু কিছু আমি পাঠক-দরবারে পেশ করেছি), তাদের দুটো দলে ফেলা যেতে পারে। এক যাঁরা বলতে চেয়েছেন, তাঁরা নিরপরাধ অর্থাৎ বিভ্রান্ত বিচারের বলি, দুই—যাঁরা প্রমাণিত অপরাধ স্বীকার করলেও তার পুরোপুরি দায়িত্ব মেনে নিতে চান নি, তার পিছনে দাঁড় করিয়েছেন হয় কোনো সামাজিক অসাম্য কিংবা অত্যাচার, অবস্থার প্রতিকূলতা, নয়তো কোনো অপ্রতিরোধ্য প্রলোভন বা সাময়িক উত্তেজনা। আজ যে চিঠিখানা আমার ঝাঁপির তলা থেকে বের করলাম, তার লেখক এর কোনো দলেই পড়েন না। তাঁকে জেলে যেতে হয় নি, অর্থাৎ গুরুতর যে অপরাধে অভিযুক্ত হলেও আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন নি, কিন্তু তিনি যে অপরাধী, এই চিঠির মধ্যে সে কথা অকুণ্ঠ অবলীলায় কবুল করেছেন, নিজেকে কোথাও সমর্থন করবার চেষ্টা করেন নি। একটি লোমহর্ষক ঘটনার এমন সহজ ও নিরুত্তাপ বর্ণনা দিয়ে গেছেন, যেন তিনি তার নায়ক নন, রিপোর্টার মাত্র।

    বেশীর ভাগ · আসামীর মতো আদালতের কাঠগড়ায় তিনিও নীরব ভূমিকা নিয়েছিলেন, ইংরেজের ফৌজদারী আইন যেটুকু পেলেই সন্তুষ্ট। অর্থাৎ হাকিমের প্রশ্নের উত্তরে দুটি মাত্র বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমি নির্দোষ’। তার দীর্ঘদিন পরে এই স্বীকারোক্তির উদ্দেশ্য কী এবং তার শ্রোতার পদে আমাকে কেন বরণ করলেন, সে কথা বলতে গিয়ে আমার সম্বন্ধে যে-সব মন্তব্য করেছেন, তার কোনোটাই শ্রুতিমধুর নয়। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছুটা প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি। তা না হলে তাঁর আসল বক্তব্যের মূল সূত্রটি ধরা যাবে না।

    তিনি লিখছেন, “গোড়াতেই বলে রাখি, আপনার লেখার সাহিত্যিক গুণাগুণ সম্বন্ধে আমার কিছু বলবার নেই।। সাহিত্য আমি বুঝি না, তা নিয়ে মাথা ঘামাবারও প্রয়োজন বোধ করি না। আমার ইন্টারেস্ট আপনার বিষয়বস্তু, – ক্রিমিন্যাল মাইণ্ড—আপনি যাকে কবিত্ব করে বলেছেন, ‘অপরাধী মানুষের মানস-লোক’। দুঃখের সঙ্গে বলছি, সেখানকার রহস্যোদ্ঘাটন করতে গিয়ে আপনি দার্শনিক স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় দিতে পারেন নি, সাহিত্যিক ভাবালুতার আশ্রয় নিয়েছেন। তাই যত কয়েদী আপনি আমদানি করেছেন; কোনোটাকেই ক্রিমিন্যাল বলে চেনা যাচ্ছে না, সবাই এক একটি রোমান্টিক হিরো কিংবা হিরোয়িন।

    “খুনী মাত্রেই মহানুভব, ডাকাত মাত্রেই হৃদয়বান। আপনার আয়রন-গে-এর অন্তরালে একটাও আয়রন-হার্টেড অমানুষ খুঁজে পেলাম না, সব কটাই গোল্ডেন্-হার্টেড অতিমানুষ। আপনার ভক্তেরা হয়তো বলবেন, কী আশ্চর্য লেখনী, যার স্পর্শে সব লোহা সোনা হয়ে গেছে। আমি ভাবছি, কী আশ্চর্য উপাদান আপনার হাতে ছিল। আপনি সেগুলোকে সত্যানুসন্ধানের কাজে না লাগিয়ে টিয়ারগ্যাস্-এর মতো ব্যবহার করেছেন। যার ফলে আপনার ভাবপ্রবণ পাঠক-পাঠিকার চক্ষুযুগল থেকে প্রচুর অশ্রু-পতন ঘটেছে আর কোনো কাজ হয় নি। আমার মনে হয়, ঐটাই আপনার উদ্দেশ্য ছিল। তা না হলে কেমন করে বিশ্বাস করি, এতদিন ধরে এত জেল ঘুরে এমন একটা অপরাধীও আপনি দেখতে পেলেন না, যার হৃদয় বলে কোনো বস্তু নেই? হয়তো দেখেছিলেন কিন্তু তার কথা বলতে চান নি, কিংবা যাদের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে ঐ পদার্থটি আপনি বসিয়ে দিয়েছেন, যে যা নয় তার উপর সেটি আরোপ করেছেন, প্রকৃতিকে বিকৃত করেছেন, সাহিত্যের স্বার্থে সত্যকে বিসর্জন দিয়েছেন।

    “কিংবা এও হতে পারে, জেলে বসে আপনার চারদিকে যে লোকগুলোকে বিচরণ করতে দেখেছেন, তারা তাদের আসল চেহারাটা আপনাকে দেখতে দেয় নি। কেউ কেউ সামনে এসে মুখ খুললেও মুখোশ খোলে নি। আপনি খোলকে আসল বলে ভুল করেছেন, খোসাকে মনে করেছেন শাঁস।

    “আজ আমি এমন একজনের কথা আপনাকে শোনাতে বসেছি, যার মুখে কোনো মুখোশ নেই, কোনো খোলসের আড়ালেও সে নিজেকে ঢেকে রাখতে চায় না। জেলের ছাপ তার গায়ে লাগে নি। তার কারণ এ নয় যে সে নিরপরাধ। তার অপরাধ প্রমাণিত হয় নি, আপনি তো জানেন, সেটা এমন কিছু নতুন বা আশ্চর্য নয়। আইন এবং তার প্রয়োগপদ্ধতি দুই অতি বিচিত্র ব্যাপার। নিতান্ত নির্দোষ লোকও যেমন অনেক সময় তার জালে জড়িয়ে পড়ে, তেমনি বহু দোষী ব্যক্তি কোনো একটা ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি যার কথা বলতে যাচ্ছি, সে এই দ্বিতীয় দলের।

    “ডিটেকটিভ গল্পের মতো রহস্যের আবরণটা শেষ পর্যন্ত ঝুলিয়ে না রেখে শুরুতেই তুলে দেওয়া যাক। সে ব্যক্তিটি স্বয়ং আমি, আপনার এই দুর্মুখ পত্রলেখক। কি, চমকে উঠলেন তো?….”

    না, চমকাই নি। অজ্ঞাতসারে চোখ দুটো একবার শুধু চিঠির শীর্ষ ও তলদেশটায় চকিতে ঘুরে এল। যা অনুমান করেছিলাম তাই। নাম এবং ঠিকানা দুই-ই অনুপস্থিত।

    এর পরে লেখক তাঁর দীর্ঘ কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। পুরোপুরি পুনরুক্তির লোভ ত্যাগ করছি—দুটো কারণে! এক নম্বর— তার মধ্যে বিকৃত মানব-মনের এমন সব বিস্ময়কর তথ্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে, যা আমি বিশ্বাস করলেও আমার পাঠকবৃন্দের কাছে নিতান্ত অবিশ্বাস্য এবং অবান্তর বলে মনে হবে। দু নম্বর—প্রগাঢ় বীভৎস রসের এমন স্বচ্ছন্দ পরিবেশন কোনো কোনো কোমলহৃদয় পাঠক-পাঠিকার স্পর্শকাতর স্নায়ুদেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। অন্তত আমার প্রতি বিশেষ বন্ধুভাবাপন্ন কয়েকটি সাময়িক পত্র সেই অভিযোগ তুলে আসর গরম করবার চেষ্টা করবেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

    কেবলমাত্র অনুমানের উপর ভিত্তি করে একথা বলছি না। এর নজির আছে এবং আশা করি এই সূত্রে তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

    ছ-সাত বছর আগেকার কথা। কোনো সুপরিচিত সাহিত্যিক তখন অল-ইণ্ডিয়া রেডিও’র কলকাতা কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সম্ভবত তাঁরই উদ্যোগে আমার রচনা থেকে সংগৃহীত কয়েকটি কাহিনীর নাট্যরূপ বেতারে পরিবেশন করবার প্রস্তাব এল। আমি সম্মতি দিলাম। শর্ত রইল নাটকের পাণ্ডুলিপি আমার অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে। আমি মফঃস্বলে থাকার দরুন এ বিষয়ে খানিকটা অসুবিধা দেখা দিয়েছিল। সে কথা এখানে বক্তব্য নয়।

    যথাসময়ে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে বিজ্ঞপিত হল, পর পর ছ’টি নাটক অভিনীত হবে। তিনটি কি চারটি প্রচারিত হবার পর দীর্ঘকাল অনুষ্ঠানসূচীতে বাকী ক’টির কোনো উল্লেখ না দেখে স্টেশন ডিরেক্টর মহাশয়কে লিখতে হল, ওগুলোর সম্বন্ধে কি স্থির করলেন জানালে বাধিত হব এবং এ বিষয়ে আমার কাছে যে ডজনখানেক অনুসন্ধান পত্র জড়ো হয়েছে, তাদের কৌতূহল নিবৃত্তির সুবিধা হবে। উত্তরে বলা হল, আপাতত আমার আর কোনো কাহিনীর নাট্যরূপ প্রচার করা হবে না। বললাম, তাহলে সেইমতো আর একটি বিজ্ঞপ্তি ‘বেতার-জগতে’ প্রকাশ করুন। ডিরেক্টর অফিস সংক্ষেপে জানালেন, তার কোনো প্রয়োজন দেখি না।’

    মনে করলাম, দু-একটি নাটক এবং অভিনয় সম্বন্ধে আমি কিঞ্চিৎ বিরূপ মন্তব্য করেছি, এটা বোধ হয় তারই প্রতিক্রিয়া। আসল ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলাম বেশ কিছুদিন পরে।

    যে মন্ত্রিবরের আদেশক্রমে আমাকে একদিন কলকাতার বৃহৎ জেল থেকে মফঃস্বলের ক্ষুদ্রতর জেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তিনি তখন গদিচ্যুত। তাঁর স্থলে যিনি নতুন অধিষ্ঠিত, তিনি হয়তো আমার সাহিত্যিক কার্যকলাপ তেমন বিপজ্জনক মনে করেন নি। অতএব নির্বিবাদে রাজধানীতে ফিরে এসেছি এবং এমন একটি বিশিষ্ট জেলের কর্তৃত্বভার আমার হাতে দেওয়া হয়েছে, যেখানে গোড়া-থেকে-পুরোপুরি-জেল-গোষ্ঠীভুক্ত আমিই বোধ হয় প্রথম ভারতীয়। এই ক’বছরে সাহিত্যিক মহলে সাক্ষাৎ পরিচয়ের সূত্রপাত হয়েছে, এবার সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত হল। তাঁদেরও কারও মুখে একদিন জানতে পারলাম, আকাশবাণীর নাট্যশালায় আমার কাহিনীর উপর্যুপরি অভিনয় জন-দুই প্রবীণ সাহিত্যিককে অত্যন্ত বিচলিত করে তুলেছিল এবং তাঁরাই অগ্রণী হয়ে কোনো ইংরেজী দৈনিকপত্রে কয়েকখানা কড়া চিঠি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল—এই সমস্ত বীভৎস ‘ক্রাইম-স্টোরী’ বহু সুকুমারমতি বেতার-শ্রোতার অন্তরে ‘বিভীষিকার উদ্রেক করছে, তরুণ-তরুণীদের মনে পাপের প্রতি সহানুভূতি জাগিয়ে তুলে তাদের বিপথে চালিত করছে, ইত্যদি ইত্যাদি। সুতরাং এদের প্রচার অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।

    স্থানীয় বেতার কর্তৃপক্ষ চিঠিগুলোকে বিশেষ আমল দেন নি, কিন্তু দিল্লীর কর্তারা হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠলেন। সম্ভবত সেখানে কিছুটা সরাসরি তদ্বিরাদি হয়ে থাকবে। কলকাতার অফিসে নাকি বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, কাহিনীগুলো ঠিক ‘ক্রাইম-স্টোরী’ নয়, যে গ্রন্থ থেকে তাদের সংগ্রহ করা হয়েছে, অল্পদিনেই সেটি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং চিঠিগুলোতে যে-সব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই।

    মিনিস্ট্রি অব্ ইনফরমেশন অ্যা ব্রডকাস্টিং এ কৈফিয়তে সন্তুষ্ট হলেন না। আদেশ হল—অভিনয় বন্ধ কর।

    বলা বাহুল্য, ইংরেজী দৈনিকে করেসপণ্ডেন্ট বা পত্রদাতার যে নাম ছিল সেটা কাল্পনিক।

    এই কৌতুকাবহ তথ্যটি যিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন, আসল লেখকদের নামও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। আমি সে সম্বন্ধে নীরব রইলাম। উভয়েই সাহিত্যক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত, তবে যদ্দুর শুনেছি, পাঠকমহলে বর্তমানে তেমন সমাদৃত নন। যাক সে কথা।

    আজ যে নির্লজ্জ এবং নিরাবরণ স্বীকারোক্তি আমার সামনে খোলা রয়েছে, তার কাছে সেদিনকার বেতার প্রচারিত কাহিনীগুলো নিতান্তই দুগ্ধপোষ্য। এর হুবহু চিত্রটা যদি প্রকাশ করি, আমার শির লক্ষ্য করে শুধু যে একদল সৎ সাহিত্যিক ও সম্পাদকের তীক্ষ্ণ লেখনী উদ্যত হবে তাই নয়, পুলিসের বাণও নিক্ষিপ্ত হতে পারে। সুতরাং শুধু অংশবিশেষের উল্লেখ করছি; তাও অনেক ক্ষেত্রে আমার নিজের ভাষায় ‘কোটিং’ দিয়ে।

    পত্রলেখক জানাচ্ছেন—আমার কাহিনীর প্রধান চরিত্র আমার স্ত্রী। ধরুন তার নাম মন্দাকিনী। তাকে নিয়েই উদ্বোধন, তাকে দিয়েই উপসংহার। সুতরাং একেবারে বিয়ের রাত থেকে শুরু করা যাক। না, প্রেম-ট্রেমের ব্যাপার কিছু নেই। বিয়ের আগে তাকে দেখি নি, এমন কি ছবি পর্যন্ত না। সম্বন্ধটা আমার বাবা এবং তার বাবা মিলে স্থির করেছিলেন, যেমন আগেকার দিনে হত, বিশেষ করে আমাদের মতো পরিবারে। আমার ঠাকুর্দার ছিল কতকগুলো পেটেণ্ট ওষুধের ব্যবসা। তার সঙ্গে কয়েকটা বাজার-চলতি নামকরা ওষুধের এজেন্সি নিয়ে কারবারটাকে বেশ বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তার মুলে কিছু গোপন রহস্য ছিল, আজকের দিনে যা সকলেই জেনে ফেলেছে এবং ব্যাপকভাবে চালাচ্ছে। অর্থাৎ ঐসব ওষুধের খালি শিশি সংগ্রহ করে আমরা আমাদের নিজেদের তৈরী রসায়ন বা বটিকা ভরে দিতাম। তার জন্যে আমাদের একটা ছোটখাটো কারখানা ছিল। আমি তার দেখাশুনা করতাম। বিশেষ করে সেই উদ্দেশ্যেই বাবা আমাকে বি.এস-সি পাস করিয়েছিলেন। আমার যা কাজ, তাতে অতখানি বিদ্যার দরকার ছিল না। নানা রকমের জংলী গাছগাছড়া সংগ্রহ করে তার নির্যাস বের করা এবং প্রয়োজনমত রং-টং মেশানো—সেসব আমাদের কর্মীরাই করত। যে জিনিস তৈরী হল তার গুণাগুণ নিয়ে আমরা কখনও মাথা ঘামাই নি। প্রথম প্রথম এ নিয়ে খানিকটা মন খুঁত-খুঁত করলেও অল্পদিনেই সেটা কাটিয়ে উঠেছিলাম।

    এই পরিবারে এবং এই পরিবেশে মানুষ হয়ে রোমান্স বা পূর্বরাগের চর্চা করবার মতো সময় সুযোগ বা মনোবৃত্তি সব কিছুরই অভাব ছিল। সুতরাং বিয়েটাকে নিছক দৈহিক এবং সাংসারিক প্রয়োজন বলে ধরে নিয়ে লক্ষ্মীছেলের মতো পিতৃ-আজ্ঞা পালন করেছিলাম।

    আমার স্ত্রী যে পরিবারের মেয়ে সেখানে স্ত্রী-শিক্ষার দৌড় ছিল গ্রাম্য পণ্ডিতের পাঠশালা পর্যন্ত। তার পর রান্না-বান্না এবং যাবতীয় গৃহকর্মে হাতেখড়ি, নানারকম ব্রত ও পূজানুষ্ঠানের ভিতর দিয়ে ‘পতি পরম গুরু’ নামক বৃহৎ আদর্শে দীক্ষাদান। সে বিষয়ে যে কোনো রকম ত্রুটি হয় নি, তার প্রমাণ বিয়ের রাতেই পাওয়া গেল।

    আপনারা অর্থাৎ সাহিত্যিক নামক বাস্তবজ্ঞানহীন ভাবপ্রবণ ব্যক্তিরা বলে থাকেন, স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করবার আগে তার মনকে জয় করতে হয়, ধীরে ধীরে ধৈর্যের সঙ্গে মধুর কলাকৌশলের ভিতর দিয়ে তার নারীসুলভ লজ্জা সঙ্কোচময় জড়িমার ঘুম ভাঙিয়ে—ইত্যাদি ইত্যাদি, আমি তার কোনোটাই করি নি। বাসর জাগতে যে মেয়েগুলো এসেছিল, তারা সরে যেতেই নিজের হাতে দরজা বন্ধ করে কোনো রকম ভূমিকার পথে না গিয়ে সরাসরি তার উপর পুরুষের সনাতন অধিকার প্রয়োগ করেছিলাম। সেই উদগ্র লালসার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সে যে কিছুটা যন্ত্রণা বোধ করেছিল, সেটা সহজেই বুঝতেই পেরেছিলাম। তখন তার বয়স চৌদ্দ পূর্ণ হয় নি, কিন্তু কথায় বা ব্যবহারে কিছুমাত্র আপত্তি প্রকাশ করে নি। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখকে তুচ্ছ করে স্বামীর ইচ্ছার কাছে নিজেকে একান্তভাবে বলি দেওয়া—এটাকেই সে ধর্ম বলে জেনেছিল এবং নিঃশব্দে পালন করেছিল।

    আমার দৈহিক দাহ মিটে যেতেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোরের দিকে যখন ঘুম ভাঙল, দেখি সে পাশে নেই। জ্যৈষ্ঠ মাস। ছোট শহর। বিদ্যুতের এলাকা নয়। অথচ বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। উপরের দিকে তাকাতেই কারণটা ধরা পড়ল। আমার শিয়রের কাছে বসে একটা হাতপাখা দিয়ে সে আমাকে বাতাস করছে। বোধ হয় সারারাত ধরেই চালিয়েছে। বেশ লাগল। তাই বলে মনটা যে স্নেহ ও কৃতজ্ঞতায়, আপনারা যাকে বলেন উদ্বেলিত হয়ে উঠল তা নয়। স্ত্রীর কাছে যা প্রাপ্য তাই সে দিয়েছে। এই তো তার কাজ। তবু নেহাত কিছু একটা বলতে হয় তাই বললাম, একি! তোমাকে হাওয়া করতে কে বলেছে?

    মন্দাকিনী কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নোয়াল।

    —তুমি বুঝি একটুও ঘুমোও নি?

    মৃদু কণ্ঠে উত্তর এল, আপনার খুব ঘাম হচ্ছিল।

    —তাই বলে সারারাত ধরে এত কষ্ট করে পাখা চালাতে হবে!

    —এতে আমার কোনো কষ্ট হয় না।

    কষ্ট যে তার কোনো কিছুতেই হয় না, সে প্রমাণ দীর্ঘজীবন ধরে প্রতি মুহূর্তে দিয়ে গেছে। কষ্ট হয় না—এ কথাটা ঠিক নয়। মানুষের শরীর তো! আমার কথা হল, আমার জন্যে সব কষ্টই সে স্বচ্ছন্দে এবং হাসিমুখে সয়ে নিতে পারে এবং তাই নিয়েছে। শুধু আমার জন্যে কেন, সমস্ত সংসারের জন্যে।

    অনেকদিন আগেই আমার মা মারা গিয়েছিলেন। সুতরাং বাবার সেবাশুশ্রষা, যত্ন- আত্তির সব ভারও ছিল তার হাতে। কেউ বলে দেয় নি। স্বেচ্ছায় এবং সানন্দে সে নিজেই তুলে নিয়েছিল। তার বদলে বাবার কাছ থেকেও যে বিশেষ কোনো আদর স্নেহ কিংবা মিষ্টি ব্যবহার পেয়েছে তা নয়। বরং কোথাও কোনো ত্রুটি হলে তৎক্ষণাৎ সেটা তাকে কড়াভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    আমরা পিতাপুত্র দুজনেই ছিলাম ভোজন-বিলাসী। রোজকার রান্নার ব্যাপারটার পদ ও পরিমাণ দু-দিকেই বেশ ব্যাপক আকারে চালানো হত। কিন্তু ‘ঠাকুর’ রাখবার মতো বিলাসকে আমরা কোনোদিন প্রশ্রয় দিই নি। চাকর একটা ছিল, বাকী সব মন্দাকিনী। আমরা একসঙ্গে খেতে বসতাম এবং আশমিটিয়ে খেতাম। সে অবিরাম যুগিয়ে যেত। তারপর কী থাকত, তা নিয়ে আমরা কখনও মাথা ঘামাই নি। মেয়েদের খাওয়া-পরার দিকে নজর দেওয়া “মেনীমুখো” পুরুষের লক্ষণ। মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে ইচ্ছে হলেও কেমন যেন পৌরুষে বাধত। মনে হত, তাতে করে নিজেকে অনেকখানি নামিয়ে আনা হবে।

    বাজার করবার ভার ছিল বাবার হাতে। কিন্তু ভালো ভালো জিনিসের লোভ যতখানি হাত ততটা দরাজ ছিল না। রসনার সঙ্গে পকেটের বিরোধ প্রায়ই লেগে থাকত এবং তার জের গিয়ে পড়ত পুত্রবধূর উপর। বাজারে বেরোবার সময় রোজই একবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কি কি আনতে হবে, বৌমা?’ প্রশ্নটা অনাবশ্যক। ‘বৌমা’ তো গৃহিণী নয়, রাঁধুনী মাত্র। কোন্ কোন্ জিনিসের প্রয়োজন, স্থির করবার কর্তা তিনি নিজেই। মন্দাকিনী তা জানত। তাই মৃদুস্বরে শুধু জানাত, মাছ তরকারী আপনার যেটা পছন্দ হয় আনবেন। মশলাপাতি, ঘি, তেল সব আছে।

    ওসব জিনিস মাসের গোড়াতেই পুরো মাসের মতো সংগ্রহ করা হত। সে ফর্দ তিনি নিজে করতেন। মাঝে মাঝে ঘাটতি পড়ত। সেদিনই হত মুশকিল। ‘বৌমা’ হয়তো ঘিয়ের টিনটা হাতে করে ভাঁড়ার থেকে বাইরে পা দিয়েছে, শ্বশুর অমনি গর্জে উঠতেন, ‘এই তো সেদিন ঘি নিয়ে এলাম, এরই মধ্যে শেষ করেছ?

    মন্দা জবাব দিত না, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনও বলতো না, ইদানীং পর পর কদিন রাত্রে রুটি-পরটার বদলে লুচি হয়েছে বলেই ঘিটা যদ্দিন যাবার কথা ছিল তা যায় নি।

    মাঝে মাঝে বাবা আবার আমাকে মধ্যস্থ মেনে বসতেন, বৌ-এর সামনে ডাকিয়ে এনে বলতেন, তুমি কি বল, পুরো মাসের হিসেবমত জিনিস আনা হচ্ছে, আর পঁচিশ তারিখ না যেতেই বাড়ন্ত—এরকম করলে চলবে কেমন করে?

    আমি মুখে কোনো জবাব দিতাম না বটে, কিন্তু জ্বলন্ত চোখে বৌ-এর দিকে তাকাতাম। চোখ না তুলেও সে নিশ্চয়ই দেখতে পেত। এই অপব্যয়ের সব অপরাধ যে তারই, সে বিষয়ে পিতার সঙ্গে পুত্রের মতান্তর হতে পারে, সেটা তার ধারণার অতীত। সব অভিযোগ নিঃশব্দে মেনে নিয়ে কাজে গিয়ে লাগত। উনুনে হয়তো কিছু একটা বসিয়ে এসেছে, পুড়ে গেলে রক্ষা থাকবে না!

    ‘বন্ধু’ বলতে যা বোঝায় তেমন কেউ আমার ছিল না। আপনার সাহিত্যিক ডাইঅ্যাগ্‌নৌসিস্ যদি এই হয় যে তার কারণ কারও সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠবার মতো হৃদয় আমার মধ্যে নেই, আমি আপত্তি করব না। জীবনে আর যা কিছুর চর্চা করে থাকি না কেন, হৃদয়চর্চা কখনও করি নি। ব্যবসায়-সুত্রে কারও কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। তার মধ্যে একজনের নাম ছিল রমণীমোহন (বলা বাহুল্য আসল নামটা আলাদা)। কাজের কথার বাইরে যেসব আলাপ সে করত (প্রলাপ বললেই হয়), তার প্রায় সবটুকু জুড়ে থাকত একটি বিশেষ রমণী, অর্থাৎ তার বৌ। তারই হাসি-কান্না, মান-অভিমান, রাগ- অনুরাগ, খেয়াল-খুশির লম্বা ফিরিস্তি যখন শুনতাম, আমার মাঝে মাঝে মনে হত, কই মন্দার মধ্যে তো এর কোনোটাই কখনও দেখতে পাই না! রমণীমোহনের বৌ-এর মতো সে কোনোদিন ‘অকারণ পুলকে’ আমার গলা জড়িয়ে ধরে নি, অহেতুক অভিমানে ছলছল চোখে জানালার গরাদের পাশেও বসে থাকে নি! সে ‘বিচিত্ররূপিণী’ নয়, তার একটি মাত্র রূপ—উদয়াস্ত মুখ বুজে কাজ করে, সংসারের প্রয়োজন মেটায়; অস্তের পরেও তার কাজ থাকে, সেটা আমার প্রয়োজন মেটানো। তাও সে মুখ বুজেই করে।

    আমাকে ভুল বুঝবেন না। সেজন্য আমার কোনো আপসোস ছিল না, কোনো অভাবও কোনোদিন বোধ করি নি। বরং মন্দা যে রমণীমোহনের বৌ-এর মতো হাবভাব ছলা- কলার ধার ধারে না, কথায় কথায় বায়না ধরে না, কোনো কিছু নিয়ে আবদার করে না, সেজন্য আমি মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম।

    একদিন সন্ধ্যার দিকে রমণীমোহন গম্ভীর মুখে আমার দোকানে ঢুকে বলল, চল বেরোই।

    —কোথায়?

    —চল না? যেতে যেতে বলবো।

    আমি একটু চিন্তিত হয়েই ওর গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। রাস্তায় কোনো কথা হল না। নিউ মার্কেটের সামনে গাড়ি রেখে যখন নেমে পড়ল, তখনও তার মুখ ভার। বললাম, কী ব্যাপার বল দিকিন?

    মার্কেটে ঢুকতে ঢুকতে তেমনি মুখেই বলল, একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি ভাই।

    —কী ভুল করলে?

    —কাল ছিল আমাদের বিয়ের অ্যানিভারসারী, ফিফ্থ্ মানে পঞ্চবার্ষিক উৎসব। আমার ছাই মনে নেই। এদিকে কারখানায় স্ট্রাইক, মাথার ঠিক ছিল না। ফিরতেও রাত করে ফেলেছি। ঘরে ঢুকে বৌ-এর দিকে নজর পড়তেই মনে পড়ে গেল। একটা নেহাত আটপৌরে ময়লা কাপড় পরে হাঁড়িমুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে খালিহাতে ঢুকতে দেখে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল। সারারাত ঘরে আসে নি। অনেক সাধ্যসাধনা করেও পাশের ঘরের দোর খোলানো গেল না। একটা বেশ ভালোরকম প্রেজেন্ট নিয়ে না গেলে আজ আর বাড়িমুখো হবার উপায় নেই।

    আমি এত জোরে হেসে উঠেছিলাম, আশেপাশের লোকগুলো নিশ্চয়ই মনে করে থাকবে, লোকটা হয় পাগল, নয় একোবারে গেঁয়ো অর্থাৎ কোলকাতার মতো সভ্য শহরে থাকবার যোগ্য নয়। কি করব বলুন, ব্যাপারটাকে নিছক হাস্যকর ন্যাকামি ছাড়া আমি আর কোনো ভাবে দেখতে পারি নি। আপনি হয়তো আপনার সাহিত্যিক দৃষ্টি দিয়ে এর মধ্যে একটা সম্রাট সাহাজান-সুলভ গভীর প্রেম আবিষ্কার করে বসবেন, আমার সে দৃষ্টি নেই। তাছাড়া আমার জীবনে এরকম দূরে থাক, এর কাছাকাছি কোনো অভিজ্ঞতাও কোনোদিন ঘটে নি এবং ঘটতে পারত না। বিয়ের অ্যানিভারসারী উদযাপন পড়ে মরুক, তার তারিখটাও মনে করে রাখি নি। আমার বিশ্বাস, আমার স্ত্রীও রাখে নি।

    রমণীমোহন সেদিন একটা কাণ্ড করে বসল। একগাদা বেনারসীর ভিতর থেকে অনেক বাছাবাছির পর (তার মধ্যে আমাকেও দু-একটা ‘হ্যাঁ’ ‘না’ বলতে হয়েছে) দু-খানা শাড়ি পছন্দ করল। একটা ভীষণ জমকালো, আর একটা ওরই মধ্যে একটু যাকে বলে sober—সেখানা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, এটা তুমি নাও।

    ‘আমি!’ রীতিমতো চমকে উঠলাম।

    —আহা, ভয় পাবার কি আছে? ঘরে বৌ থাকলে মাঝে মাঝে দু-একটা বাড়তি খরচ করতে হয়। এমন কিছু দামও নয়। সঙ্গে টাকা না থাকলে আমি চালিয়ে দিচ্ছি। যখন সুবিধে হবে দিও।

    –বৌ-এর শাড়ি কেনা আমার কাজ নয়, ওটা বাবার ডিপার্টমেন্ট। তাছাড়া এরকম দামী শাড়ি সে কখনও পরে না।

    —দাও না বলেই পরে না। একদিন দিয়ে দ্যাখ, কত খুশী হবে।

    ততক্ষণে বিল এসে গেছে এবং পুরো টাকাটা মিটিয়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমি বিরক্তির সুরে বললাম, কী যে কর তার ঠিক নেই। কথা নেই বার্তা নেই, হুট্ করে একটা শাড়ি নিয়ে গিয়ে উঠবো কী বলে? পূজোটুজোর সময় হলেও না হয়—

    —বৌকে প্রেজেন্ট্ দেবার আবার সময়-অসময় আছে নাকি? নাও!

    কাগজের বাক্সটা জোর করে আমার হাতে গুঁজে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠল—চল চল, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে জুয়েলারীর দোকানটাও একবার ঘুরে যেতে হবে।

    বাক্সটা লুকিয়ে নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম এবং লুকিয়ে রেখে দিলাম। তখন বাবা বাড়ি ছিলেন, মন্দাও রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত। রাত্রে যখন শুতে এল, কাপড়খানা বের করে ওর হাতে দিয়ে বললাম, দ্যাখ তো কেমন হল?

    এখানে একটা গোপন কথা স্বীকার করছি, যদিও জানি, হয়তো বিশ্বাস করতে দ্বিধা করবেন। কিন্তু সত্য বলছি, শাড়িটা দেবার পর মন্দার মুখে খুশির ঝলক না হলেও অন্তত একটা আভাস দেখতে পাব, এইরকম একটু আশা মনের মধ্যে ছিল। কিন্তু তার বদলে দেখলাম জিজ্ঞাসা। পরে ভেবে দেখলাম, সেইটাই স্বাভাবিক। বস্ত্র নামক বস্তুটিতে খাদ্যের মতো নিতান্ত দৈহিক প্রয়োজন হিসাবেই সে দেখে এসেছে। সেটা যে কখনও ‘উপহার’-এর মতো অনাবশ্যক রূপ নিতে পারে, সে অভিজ্ঞতা তার ছিল না। কাজেই তার মুখ থেকে যে কথাটি বেরিয়ে এল, সেটা একটি সরল প্রশ্ন—’এটা কার?’

    —কার আবার, তোমার।

    —’আমার!’ এটা নিছক বিস্ময়। ‘আমার তো শাড়ি রয়েছে!

    —থাকলই বা, এটা তোলা হিসেবে রইল। কোথাও যেতে আসতে পরবে।

    —বাবা জানেন?

    আমার পৌরুষে কিঞ্চিৎ আঘাত লাগল, যদিও লাগা উচিত নয়। উষ্মার সুরে বললাম, সব কিছুই যে বাবাকে জানাতে হবে, তার কি মানে আছে?

    —উনি শুনলে রাগ করবেন।

    কথাটা মিথ্যা নয়। তাই আমার মুখে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর যোগাল না। মন্দা মুহূর্তকাল কি ভেবে নিয়ে বললে, দোকানে ফেরত দিতে গেলে নেবে না?

    আমি কিছু বলবার আগেই হঠাৎ যেন সব সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে গেছে, এমনি ভাবে বলে উঠল, ভালই হয়েছে, ৭ই বীণার বিয়ে, আজই সকালে চিঠি এসে গেছে। একটা শাড়ি তো দিতে হত, এটা দিলেই হবে।

    বলে বেশ “খুশি” হয়েই মন্দা কাপড়খানা বাক্সে ভরে আলমারিতে তুলে রাখল। এই “খুশিই” কি আমি দেখতে চেয়েছিলাম?

    বীণা আমার পিসীমার মেয়ে। কাপড় দেখে বাবা যথারীতি মন্দার উপরই এক হাত নিতে ছাড়লেন না, যেন সে-ই আমাকে দিয়ে এমন একটা দামী শাড়ি আনিয়েছে। মেয়েমানুষকে তো রোজগারের ধান্দায় বেরোতে হয় না, পয়সার দাম বুঝবে কোত্থেকে— ইত্যাদি মন্তব্য তার মতো আমিও নীরবে গ্রহণ করলাম। বললাম না যে, এর ভিতরে ওর কোনো হাত নেই। কেন বলতে যাব? আপনি হয়তো বলবেন, মন্দার এই স্বার্থত্যাগের জন্যে তার উপর আমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত ছিল, অন্তত কিছুটা সহানূভূতি সে দাবি করতে পারত। কিন্তু তার এই প্রত্যাখ্যান তাকে আমার কাছে বড় করা দূরে থাক, আরও ছোট করে দিল। ‘প্রত্যাখ্যান’ কথাটা বোধহয় ঠিক হল না। তার মধ্যে একটা জোর থাকে; যা ওর চরিত্রে একেবারেই ছিল না। একে বলা যেতে পারে গ্রহণ করার অক্ষমতা। মন্দাকে যদি আমি ভালোভাবে না জানতাম, হয়তো তার উপরে রাগ হত, এই ভেবে যে সে আমার স্বামিত্বের অধিকারকে অগ্রাহ্য করছে, আমাদের ভিতরকার যে-সম্পর্কটা— প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক—সেই বিয়ের রাত থেকে মেনে আসছিল, তাকে যেন অস্বীকার করছে। কিন্তু মন্দাকিনীকে আমার চিনতে বাকী নেই, একথা তার সম্বন্ধে ভাবাই যায় না। এটা আর কিছু নয়, স্ত্রী হিসেবে তার নিছক অযোগ্যতা। কে জানে, রমণীমোহনের মাথার ভূতটা হয়তো কোনো দুর্বল মুহূর্তে আমার মাথায় চেপে থাকবে। মনে মনে তার বৌ-এর পাশে আমার বৌকে কখন বসিয়ে ফেলেছিলাম। ধাক্কা খেয়ে ভুল ভাঙল। হয়তো ঐ কল্পিত তুলনার ফলেই ও আমার কাছে আরও খেলো হয়ে গেল। স্ত্রীকে শ্রদ্ধা বা প্রীতির চোখে আমি কোনোদিন দেখিনি, এই ঘটনার পর থেকে তাকে রীতিমত ঘৃণা করতে শুরু করলাম।

    আপনার অনুচ্চারিত বিশেষণটা আমি শুনতে পাচ্ছি, বলছেন লোকটা কি পাষণ্ড! কি করবো বলুন? আমি যা তাই, আপনি কী ভাববেন তাই ভেবে মনের আসল রূপটা চাপা দিতে চাই না। তাহলে এই চিঠি লেখার কী প্রয়োজন ছিল?

    তবে আপনার তূণে যে-সব কড়া কড়া বিশেষণ আছে, সবগুলো যেন এখনই-নিঃশেষ করে বসবেন না। তাদের আসল প্রয়োজন দেখা দেবে শেষ অঙ্কে। অনাবশ্যক ভূমিকা না বাড়িয়ে এবার সেই দিকেই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।

    আমার এবং আমাদের সংসারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে মন্দাকিনী কোথাও কোনো ত্রুটি রাখে নি। ফাঁক ছিল শুধু এক জায়গায়। আমাদের একটি বংশধর সে দিতে পারে নি। বন্ধ্যা হলে হয়তো বা মার্জনা পেতে পারত, কিন্তু তার অপরাধ তার চেয়েও গুরুতর। সন্তান সে ধারণ করেছিল, জীবিতাবস্থায় পৃথিবীতে আনতে পারে নি। মাস পূর্ণ হবার আগে কি সব জটিলতা দেখা দেয়, যার ফলে হাসপাতালে না পাঠিয়ে উপায় ছিল না। ডাক্তারেরা এসব ক্ষেত্রে যা করে থাকেন তাই করলেন, অর্থাৎ ওঁদের ভাষায়—ফলের আশা ছেড়ে দিয়ে গাছের দিকেই পুরো নজর দিলেন, অনেক ধাক্কা ও ধকল খেয়ে ‘গাছ’ শেষ পর্যন্ত রইল বটে কিন্তু জানা গেল, সে চিরদিনের তরে নিষ্ফলা হয়ে গেছে।

    মোটা টাকা বেরিয়ে যাওয়ায় বাবার মেজাজ আগে থেকেই তেতে ছিল, তার উপর ডাক্তার এসে যখন এই শুভ সংবাদটি শুনিয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে আগুন হয়ে উঠলেন। আমার উপর হুকুম হল, ‘আবার বিয়ে কর’। আমার বিশেষ আপত্তি ছিল না। মন্দাকে দিয়ে সত্যিই আর কাজ চলছিল না। কিন্তু রমনীমোহন অজান্তে কখন আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার ঘরে যে চীজটি আছে, সেই রকম কিংবা তার কাছাকাছি কেউ এসে যদি ঘাড়ে চাপে, তখন কি করব। বাবা এদিকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যেতে লাগলেন। বৌ তাঁকে একটি পৌত্র-মুখ-দর্শনে বঞ্চিত করেছে, এইটাই তাঁর একামাত্র কারণ নয়, সংসারের চাকাগুলোকেও সে আগের মতো স্বচ্ছন্দ গতিতে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না, তাঁর সেবা-যত্ন-বিরামের ব্যবস্থায় মাঝে মাঝে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে এবং সে-সব পূরণ করতে একটি বাড়তি ঝি-এর প্রয়োজন হয়েছে।

    যাই হোক, বেশি দিন আর তাঁকে এই অসুবিধাগুলো ভোগ করতে হল না। ইদানীং যাকে তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারছিলেন না, সেই পুত্রবধূর কোলে মাথা রেখেই হঠাৎ একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

    গোটা ব্যবসাটা আমার হাতে এসে পড়ল। সেই দিকেই বেশি নজর দিলাম। মন্দা ফালতু ঝিকে ছাড়িয়ে দিয়ে গোটা সংসারের ভার আবার নিজের হাতে তুলে নিল। আমার চিরাচরিত অভ্যাস এবং প্রয়োজনগুলো কোথাও বিশেষ বাধা পেল না। সে বিষয়ে তার দৈহিক অক্ষমতা যতই থাক, অতিরিক্ত উৎসাহ দিয়ে তাকে ঢেকে রাখবার চেষ্টা করছে, সেটুকু বুঝতে কোনো অসুবিধা ছিল না। সেটা লক্ষ্য করে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে উঠতাম।

    —এতদিন হাসপাতালে কাটিয়ে এলে, ডাক্তারে ও ওষুধে এক ঝুড়ি টাকা বেরিয়ে গেল, এদিকে চেহারায় তো তার কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। কী হয়েছে, খুলে বলবে তো?

    —হবে আবার কী? মুখে একটা মৃদু হাসি টেনে আনবার চেষ্টা করত মন্দা। তাতে তাকে আরও কুৎসিত দেখাতো, আমি তো ভালোই আছি।

    —তবে শরীর সারছে না কেন?

    —আর কত সারবে? এর চেয়ে মোটা তো আমি কোনো কালেই ছিলাম না।….বলে কোনো একটা কাজের অছিলা করে তখনই আমার সামনে থেকে সরে যেত।

    .

    মন্দার এক ভগ্নীপতি থাকতেন পশ্চিমের কোনো স্বাস্থ্যকর শহরে। নামটা আপনার পক্ষে নিষ্প্রয়োজন, সুতরাং উহ্য রইল। কোলকাতায় বড় একটা আসতেন না। একবার কী কাজে আসতে হল। যাবার আগে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। শ্যালিকা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতেই খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মন্দা হাসিমুখে বলল, চিনতে পারছেন না?

    –পেরেছি, তবে অতি কষ্টে। এ কী চেহারা হয়েছে তোমার?

    আমি বাড়িতেই ছিলাম। শ্যালিকার সম্বন্ধে তাঁর উদ্বিগ্ন প্রশ্নের উত্তরে গত কয়েক মাসের একটা মোটামুটি ইতিহাস দিলাম। বলা বাহুল্য, এ বিষয়ে আমাদের তরফ থেকে চিকিৎসাদির যথাসাধ্য ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি হয় নি এবং তা সত্ত্বেও মন্দার স্বাস্থ্যের বিশেষ উন্নতি দেখা যাচ্ছে না—এই কথাটাই বোঝাবার চেষ্টা করলাম। আমার ভায়রাভাই বললেন, তার মানে একটা চেঞ্জ দরকার। তাহলে এক কাজ করা যাক, আমি ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। জল-হাওয়ার দিক দিয়ে জায়গাটা খুব ভালো। মাসখানেক থাকলেই সেরে উঠবে। না হয় আরও কিছুদিন কাটিয়ে আসবে। অনেকদিন দেখাশুনো নেই, ওর দিদিও খুব খুশী হবে। তাই করি, কী বলো?

    আমি বললাম, বেশ তো, আপনি নিয়ে যাবেন, তাতে আর আমার বলবার কি আছে? সেই সময়ে মন্দা এল চা এবং খাবার নিয়ে। তিনি খুশিমুখে তাঁর প্রস্তাব এবং আমার সম্মতি তাকে জানিয়ে দিয়ে বললেন, কাল সন্ধা সাতটায় গাড়ি। নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি সেরে আমি সাড়ে পাঁচটার আগে আসতে পারবো না, তুমি একেবারে তৈরী হয়ে থাকবে কিন্তু— আপনি একটু বসুন, আমি চুল বেঁধে আসি, তা বললে চলবে না। বাঁধা-ছাদা সব আগেই সেরে রাখবে।

    মন্দা চুপ করে রইল এবং ভগ্নীপতি চলে যেতেই বলল, কাল যখন আসবেন তুমি ওঁকে বুঝিয়ে বলো, আমার এখন যাওয়া হবে না।

    —কেন?

    কাপডিগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, সংসারে আর কোনো লোক নেই, তোমাকে দেখবে কে? তাছাড়া

    ‘তাছাড়া’র ফিরিস্তি শোনবার আগেই শ্লেষের সুরে ঝাঁজিয়ে উঠলাম, এই শরীর নিয়ে যা দেখা দেখছ, সেটা কিছুদিন বন্ধ রাখলে কোনো ক্ষতি হবে না। তার চেয়ে বরং নিজেকে দেখবার চেষ্টা করো। এই পোড়া-কাঠের ওপর যদি একটু মাংস লাগাতে পার, তাহলেই আমি কৃতার্থ হবো।

    এর পরেও বোধহয় সে এখানকার ব্যবস্থার কথা তুলত। সব রকম অপমান এবং রূঢ় ব্যবহার সহ্য করবার এক অদ্ভুত শক্তি ছিল তার। ‘শক্তি’ না বলে তার অভাব বলাই বোধহয় ঠিক। এক ধরনের অসাড়তা। যাই হোক, তখনকার মতো আর কিছু বলবার সুযোগ আর তাকে দিলাম না, সশব্দে চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দিয়ে উঠে পড়লাম।

    হাসপাতাল থেকে ফিরবার কিছুদিন পরে যে ঠাকুরকে সে ছাড়িয়ে দিয়েছিল, তাকেই কোত্থেকে খুঁজেপেতে ডেকে এনে নানারকম উপদেশ দিয়ে পরদিন সন্ধ্যার মুখে মন্দাকিনী এই প্রথম আমাকে ছেড়ে দূরে চলে গেল। যাবার আগে যথারীতি প্রণাম, সাবধানে থাকবার এবং অসুবিধা বোধ করলেই ফিরিয়ে আনবার অনুরোধ ইত্যাদি কোনো পর্বই বাদ যায় নি। চোখের জলও দেখেছিলাম। কিন্তু কিছুই আমার মনে এতটুকু স্নেহ বা করুণা জাগাতে পারে নি। নিজের চোখ দুটো অবশ্য দেখতে পাই নি, তবু নিশ্চয় করে বলতে পারি, তার মধ্যে তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছু ছিল না।

    আজ ভাবছি, সেদিন তার চোখে জলের বদলে এক কণা আগুন যদি দেখতাম, হয়তো কিঞ্চিৎ শ্রদ্ধা সে আমার কাছে পেলেও পেতে পারত, অন্তত এতটা হেয় এবং তুচ্ছ হয়ে যেত না। আপনি কী বলেন?

    য়া আশঙ্কা করেছিলাম তাই, মাসখানেক যেতে না যেতেই মন্দার চিঠি পেলাম, সে এরই মধ্যে অনেকখানি সেরে উঠেছে, আর ওখানে থাকবার দরকার নেই, সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি যেন তাকে বাড়ি আনবার ব্যবস্থা করি।

    শ্যালিকার যে চিঠি পেলাম, তার বয়ান ঠিক উল্টো। মন্দার শরীরে কোনো উন্নতি হয় নি। বেশ কিছুদিন ওখানে থাকা দরকার। কিন্তু আমাকে এখানে একা ফেলে সে কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। সুতরাং আমি যেন এদিকের কাজকর্মের কোনো একটা ব্যবস্থা করে অন্তত মাসখানেকের জন্যে ওখানে গিয়ে থাকি। তাহলে আমরা সকলেই খুব আনন্দিত হবো। অনেকদিন তোমাকে দেখি নি, তোমার দাদা তবু কালেভদ্রে কলকাতায় যেতে পারেন, আমার কোথাও নড়িবার উপায় নাই। ইত্যাদি।

    আমাদের কারবারের কথা আগেই বলেছি। তার মধ্যে কারচুপির অংশটাই বড়। কালক্রমে এইসব লাইনে আরও কিছু লোক এসে জুটল। শুধু প্রতিযোগীর সংখ্যাই যে বাড়ল তাই নয়, তার মধ্যে কয়েকজন রীতিমতো পেছনে লাগল। বাবা পাকা লোক, এদের সঙ্গে খানিকটা এঁটে উঠতে পারতেন। তিনি মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার অবস্থা কাহিল হয়ে উঠল। ক্রমশ নানা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম। শ্যালিকার নিমন্ত্রণ যখন এল, তখন আমারও এক পা নড়বার উপায় নেই। মন্দার স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হচ্ছে না এ খবর পেয়ে দুশ্চিন্তার বদলে বিরক্তিটাই বেড়ে গেল। এটা যেন তার ভালো না হবার পণ, এখানকার শত্রুদের মতো এই দুঃসময়ে সেও আমার পেছনে লেগেছে। তার উপরে তার ঐ প্যানপেনে ‘পতি-বিরহ’ অসহ্য আদিখ্যেতা বলে মনে হল। শ্যালিকার চিঠির উত্তরে অবশ্য তার ভগিনীর জন্যে যথারীতি উদ্বেগ প্রকাশের ত্রুটি হল না। সেই সঙ্গে তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণে অক্ষমতার জন্য ক্ষমা চাইলাম। আলাদা চিঠিতে মন্দাকে বেশ কড়া করে লিখলাম, রীতিমত সুস্থ হবার আগে ফিরে আসবার কোনো কথাই উঠতে পারে না, এবং আমার জন্যে তার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

    এর পরে রমণীমোহনের স্ত্রী বা তার দোসর কোনো মেয়ে হয়তো লিখত, না, আমি এখনই যেতে চাই, কিংবা ঐ ধরনের একটা কিছু। কিন্তু আমার স্ত্রী একেবারে অন্য জাতের। সে কোনো কথাই লিখল না, অর্থাৎ স্বামীর ইচ্ছাকেই নিঃশব্দে মেনে নিল!

    যদি বলি, মেনে না নিলেই আমি মনে মনে খুশি হতাম এবং স্পষ্ট বা জোরালো হলেও আমার চিঠির একটা ক্ষীণ প্রতিবাদ আশা করে বসে ছিলাম—আপনি বিশ্বাস করবেন কি, করবেন না। কিন্তু এটুকু জেনে রাখুন, সে আশা যখন পূরণ হল না, আমার মনটা তার উপরে শুধু তিক্ত নয়, বিষাক্ত হয়ে উঠল।

    মন্দার আর কোনো চিঠি আমি পাই নি, তার দিদিরও না। পরের চিঠিটা এল তার ভগ্নীপতির কাছ থেকে। বেশ কিছুদিন, তা প্রায় মাস দুই পরে। প্রথমে আমার কুশল সম্বন্ধে আশা প্রকাশ করে লিখেছেন, “বড়ই দুঃখের বিষয়, শ্রীমতী মন্দাকিনীর শরীর দিন দিন খারাপের দিকে যাইতেছে। বর্তমানে সে প্রায় শয্যাগত। এখানকার সর্বাপেক্ষা বড় ডাক্তারকে দেখাইয়াছি। তাঁহার মতে শ্রীমতীকে অবিলম্বে কলিকাতায় লইয়া গিয়া কোনো বিশেষজ্ঞের চিকিৎসাধীনে রাখা প্রয়োজন। এখানে একটি বিশেষ জরুরী কার্যে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছি। শীঘ্র ছাড়া পাইবার আশা নাই, নতুবা আমিই লইয়া যাইতাম। তুমি অতি সত্বর চলিয়া আসিবে। অন্য সকলে এক প্রকার আছে। ইতি।”

    অতি সত্ত্বর না হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই আমাকে যেতে হল। দেখলাম, “শয্যাগত” শব্দটিকে আমার ভায়রাভাই যে ‘প্রায়’ নামক বিশেষণ দিয়ে মডিফাই অর্থাৎ মোলায়েম করবার চেষ্টা করেছেন, সেটা প্রকৃত ঘটনার দিকে চেয়ে নয়, আমার দিকে চেয়ে, আমি পাছে অতিরিক্ত বিচলিত হয়ে পড়ি আশঙ্কায়।

    মন্দার অবস্থা দেখে, তার ব্যাধির ইতিহাস এবং কাশির শব্দ শুনে আমি সত্যিই ‘বিচলিত’ হয়ে পড়লাম। বলা বাহুল্য, ওঁদের বা অন্য দশজনের মনে যে কারণ জাগবে, সে কারণে নয়। একে এই “শয্যা’ থেকে টেনে তুলে দাঁড় করাতে যে বিপুল অর্থ, পরিশ্রম, শুশ্রুষা অপব্যয় হবে, সেই চিন্তাই আমাকে চঞ্চল করে তুলল। তার চেয়েও বেশী মনে হল—একে দিয়ে আমি করবো কী?

    আশা করি, আমার কথাটা আপনি বুঝতে পারছেন। আপনার গল্পের নায়কদের মতো আমার মধ্যে কোনো রোমান্স নেই বা কোনোদিন হৃদয়-চর্চার ধার ধারি না, সে কথা আগেই জানিয়েছি। আমি রমণীমোহন নই, ‘প্রেম’জ্বরে কখনও ভুগি নি। দয়া, মায়া, স্নেহ, প্রীতি এসব বড় একটা নিজেও পাই নি, অন্য কারও জন্যেও অনুভব করি না। নিছক ‘ইউটিলিটি’ বা প্রয়োজন ছাড়া ‘স্ত্রী’ নামক মানুষটিকে আর কোনো দিক থেকে দেখি নি। সেও কোনোদিন বুঝতে দেয় নি, এর বাইরে তার আর কোনো অস্তিত্ব আছে। সেই ইউটিলিটির কষ্ঠিপাথরে তার দাম অনেকদিন থেকেই কমে আসছিল। আজ যখন সেটা শূন্যে এসে ঠেকল, তখন একটি মাত্র প্রশ্নই আমার মনের মধ্যে মাথা তুলে উঠল—একে দিয়ে আমি করবো কি? আমার জীবনে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। সেইখানেই শেষ নয়, তারপরেও সে থাকবে—কে জানে কত বছর–আমার বা আমার সংসারের ভার নিয়ে নয়, আমার দুর্বহ ভার হয়ে। অথচ —

    ফার্স্ট ক্লাসের একটা ‘কুপে’ আমাদের জন্যে রিজার্ভ করা হল। ভাড়াটা অবশ্য আমিই দিলাম, কিন্তু ব্যবস্থাটা আমার ভায়রাভাই-এর। অনেকটা পথ, সঙ্গে ঐরকম রুগী, তার ওপর মেয়েছেলে, তৃতীয় যাত্রীর ঝঞ্ঝাট রইল না, নির্বিবাদে যাওয়া যাবে।

    স্ট্রেচার লাগল না। দিদি আর ভগ্নীপতি দুজনে দুবাহু ধরে ধীরে ধীরে প্লাটফরমটুকু পার করিয়ে গাড়িতে তুলে দিলেন। বিছানা করে ওকে শুইয়ে ঘণ্টা পড়তে নেমে গেলেন। গাড়ি যখন চলতে শুরু করেছে, আমার শালিকার অনুচ্চ কণ্ঠ থেকে শোনা গেল, দুর্গা দুর্গা’। ভায়রাভাই চেঁচিয়ে বললেন, পৌঁছেই একটা তার করে দিও।

    গরম কাল। রাত নটা। জামাটা খুলে ঝুলিয়ে দিয়ে মন্দার মাথার কাছে বসে একটা সিগারেট ধরালাম। ও চোখদুটো তুলে আমার মুখের দিয়ে চেয়ে বলল, হ্যাঁগো, এ গাড়িতে আর কেউ উঠবে না?

    —না।

    আর কিছু বলল না। লক্ষ্য করলাম, ওর মুখের উপর খুশির আভা ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পরে বলল, তুমি কোথায় শোবে?

    হাত দিয়ে উপরের বার্থটা দেখিয়ে দিয়ে বললাম, ঐখানে।

    —ওখানে! উঠবে কেমন করে?

    —ঐ শেকলটা ধরে উঠবো।

    —না, না, তার চেয়ে আমার বিছানাটা মেঝেতে নাবিয়ে দাও, তুমি এইখানে শোও। এই ছেলেমানুষি প্রস্তাবে অন্য কেউ হলে হয়তো হেসে ফেলত, আমি গম্ভীরভাবেই বললাম, মেঝেটা শোবার জায়গা নয়। আমি ওপরেই শোবো। তুমি ঘুমোও—আমার এখন ঘুম পাচ্ছে না।

    কয়েক মিনিট চুপ করে থেকে আবার বলল, একটু উঠে বসবো?

    —পারবে?

    —খুব পারবো। তুমি যদি এই বালিশটাকে একটু-

    বাকীটুকু আর বলল না। আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। নিজের জন্যে আমাকে হঠাৎ কিছু একটা ফরমাশ করে বসেছে—হলই বা সে অতি তুচ্ছ—এটা ওর পক্ষে একেবারে নতুন। সেই লজ্জাটা তখনও ওর চোখমুখে জড়ানো। আমি উঠে বালিশটা ওর পিঠের দিকে খানিকটা সরিয়ে দিলাম। আধশোয়া মতো বসে মন্দা অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি একমনে সিগারেট টানতে টানতে শুনলাম, ‘এই ক’মাসে তুমি অনেক রোগা হয়ে গেছ। খুব কাজ পড়েছে বুঝি?’

    আমি জবাব দিলাম না। ও তার অপেক্ষাও করল না। অনেকটা যেন নিজের মনে বলল, তাছাড়া দেখাশুনো কে করে, খাওয়া দাওয়া—

    বাধা দিয়ে বললাম, সেসব পরে ভাবলেও চলবে, এখন নিজের কথা ভাবো।

    —আমি এবার দু’দিনেই সেরে উঠবো।

    আমার মুখে বোধহয় অবিশ্বাসের কোনো চিহ্ন ফুটে উঠে থাকবে। হাসিমুখে তারই যেন প্রতিবাদ জানাল মন্দা— সত্যি দেখো তুমি!’

    এই জোর, এই তরল সুর—সবটাই আমার কাছে নতুন। যে মন্দাকে এতদিন দেখে এলাম, যাকে নিয়ে এতগুলো বছর ঘর করলাম, তার স্বভাবের সঙ্গে এটা যেন ঠিক খাপ খাচ্ছিল না।

    —’কী ভাবছ?’

    —’কিছু না।’ জবাবটা নিজের কানেই বেশ রূঢ় লাগল। ‘রাত দশটা বেজে গেছে, এবার ঘুমিয়ে পড়’ বলে উঠে পড়লাম।

    মন্দা আর কোনো কথা না বলে বালিশটা নিজেই ঠিক করে নিয়ে শুয়ে পড়ল।

    রাত বেড়ে চলল। আমার চোখে ঘুম নেই। গাড়ির সব জানালাগুলো খোলা, তার উপরে পুরোদমে পাখা চলছে, তবু মনে হচ্ছে, কী দুঃসহ গরম! দরজা খুলে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চাঁদ নেই, কিন্তু আকাশ ভরা তারা। খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে। বিহারের রুক্ষকঠিন, গাছপালাহীন, অসমান পাথুরে মাঠ। পাতলা অন্ধকারে ঢাকা। তারই মধ্যে চোখ দুটোকে ডুবিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। বৃথা চেষ্টা। তারা বার বার গাড়ির ভিতরে ফিরে আসতে লাগল। মন্দা শুয়ে আছে দেয়ালের দিকে পেছন ফিরে। আর সব আলো নেভোনো। শুধু একটা কম পাওয়ারের নীল আলো জ্বেলে রেখেছি। ওর কাঁধ পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মুখের একটা দিক আর নীচে নীচে গলাটা দেখা যাচ্ছে। অস্পষ্ট আলোয় শুকনো ভাঙা গালের ঠেলে ওঠা হাড়গুলো আরও ঠেলে উঠেছে, চোখটা যে কোন্ কোটরে তলিয়ে গেছে, দেখা যায় না। কণ্ঠার হাড় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। মানুষের মুখ যে এত কুৎসিত, এর আগে কোনোদিন দেখি নি। শুধু কুৎসিত নয়, কী বীভৎস! একটা জীবন্ত কঙ্কাল! কী মূল্য এই জীবনের? কী সার্থকতা এই বেঁচে থাকার? ভাবতে গিয়ে সমস্ত মনটা গভীর নৈরাশ্যে ভরে উঠল! সেই একই প্রশ্ন মনে এল—এই জীবন্ত অভিশাপ নিয়ে আমি করবো কী?

    রেলগাড়ির চলন্ত চাকায় তারই প্রতিধ্বনি বেজে চলল—আমি করবো কী—আমি করবো কী?

    এই কিছুক্ষণ আগে সে আমাকে ভরসা দিয়েছে (ভরসাই বটে!)—’আমি দুদিনেই সেরে উঠবো।’ আমি জানি, সে কোনোদিনই সেরে উঠবে না। কিন্তু সেই মিথ্যা আশা, বেঁচে থাকবার সেই প্রবল আকাঙ্ক্ষা ওকে সহজে মরতে দেবে না, মৃত্যু-কবলিত প্রাণটাকে কোনো রকমে জীইয়ে রেখে দেবে। কে জানে সে কত কাল, কত বছর!

    বিধাতার কি নিষ্ঠুর পরিহাস! আমি যখন প্রায় সারারাত ধরে এমনি করে জ্বলেপুড়ে মরছি, যাকে ঘিরে সেই জ্বালা, সে তখন নির্বিবাদে ঘুমোচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো ছোট স্টেশনে গাড়ি থামতেই তার সেই নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস আমাকে পাগল করে তুলছিল। ভাবছিলাম প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে কত আকস্মিক ঘটনা ঘটছে, এই নিঃশ্বাসের গতিটা হঠাৎ থেমে যেতে পারে না? নিজে থেকে না থামলেও—

    কাশির শব্দে চমকে উঠলাম। একটানা প্রবল কাশি। তার দমকে গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো যেন ঠিকরে পড়ছে। এমনি করেও তো দম বন্ধ হয়ে যেতে পারে! কিন্তু গেল না। কাশির বেগটা পড়ে যেতেই গলায় কেমন একটা বোবা আওয়াজ তুলে হাত দিয়ে মুখের দিকে ইঙ্গিত করল। বুঝলাম, যেটা উঠে এসেছে, কোথাও ‘ফেলতে হবে। সঙ্গে একটা ঝুড়ি ছিল, তার মধ্যে পিকদানি বা ঐরকম কিছু আছে কিনা খুঁজে দেখছিলাম। মন্দা ইশারায় বাথরুমটা দেখিয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করল। ধরে তুলে ধীরে ধীরে সেইখানে নিয়ে গেলাম। বেসিনের দিকে নজর পড়তেই গা পাক দিয়ে উঠল গয়েরের সঙ্গে জড়ানো রক্ত। অজ্ঞাতসারে হাতটা ওর বাহু থেকে সরে এল। দু-পা পিছিয়ে এলাম। সহসা মাথার ভিতরটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল—ঘৃণায়, আতঙ্কে, আক্রোশে না কিসের তাড়নায় আমি বলতে পারবো না। গাড়ির গতিটা একটু কমে এল। তারপরেই তলা থেকে ছুটে এল একটা জোরালো ঘর্ঘর ঠঠুন্ শব্দ। হঠাৎ চমকে উঠলাম—কিসের শব্দ? বুঝলাম ভয়ের কিছু নয়, গাড়িটা কোনো পুলের উপর দিয়ে চলেছে। তবু সেই বিপুল শব্দের সঙ্গে তাল রেখে কে যেন আমার মাথার ভিতরে অবিরাম হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল। মন্দা এসে দাঁড়াল বাথরুমের বাইরে এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার ডানদিকের দরজাটা দড়াম্ করে খুলে গেল। হাতলটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। খোলা নদীর দমকা হাওয়ায়, কিংবা ব্রীজের ঝাঁকুনি লেগে হঠাৎ খুলে গেছে।

    যে কারণেই হোক, সেদিন সেই মুহূর্তে গাড়ির পাল্লার সঙ্গে আমার গোপন মনের কোনো অজ্ঞাত কুঠরির অদৃশ্য পাল্লাটাও সহসা খুলে গিয়ে থাকবে। হয়তো তারই আলোয় দেখেছিলাম, আমার ঠিক বুকের কাছে যে এসে দাঁড়াল, সে আমার স্ত্রী নয়, একটা ভয়াবহ বিষাক্ত ভাইপার। তার উদ্যত ছোবল থেকে নিজেকে যেমন করে হোক বাঁচাতে হবে–এই একটি মাত্র চিন্তাই সমস্ত মনটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আর কোনো দিকে না চেয়ে দু’হাতে তার কাঁধ দুটো চেপে ধরে প্রচণ্ড বেগে খোলা দরজা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিলাম।

    গভীর রাত্রির বুক চিরে একটা ভাঙা গলার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ আমার কানে এসে লাগল।

    পাঁঠা-বলি দেখেছেন? গলাটা হাড়িকাঠের মধ্যে পুরে দিলে তার ভিতর থেকে যে অন্তিম ডাক ঢাকের শব্দ ছাপিয়ে বেরিয়ে আসে, তেমনি একটা আওয়াজ। একবার উঠেই গাড়ির শব্দে মিলিয়ে গেল।

    চলন্ত গাড়ির নিচে ও দু-পাশ জুড়ে তখনও সেই তুমুল ঘর্ঘর ঝন্‌ঝন্ বিপুল বেগে বেজে চলেছে, বলির পরেও যেমন চলতে থাকে ঢাক ঢোল কাঁসরের উন্মত্ত গর্জন। আমার মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহে শুদু তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সেই উত্তপ্ত উদ্দাম উত্তেজনা। আর কিছুই নেই। বিশ্ব-সংসার আমার কাছে লুপ্ত হয়ে গেছে।

    তার পর এক সময়ে সেই পাগল-করা দুর্দান্ত শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। নদীগর্ভের বিপদ-ঝঞ্ঝা পার হয়ে গাড়িটা যেন আবার নিরাপদ মাটির পৃথিবীতে ফিরে এল। তখনও সেই দরজার মুখেই দাঁড়িয়ে আছি। সামনে যতদূর চোখ যায়, বিস্তৃত খোলা মাঠ। সেই দিকে চেয়ে মনে হল, ওটা যেন আমারই অনাগত জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমার সামনেও অমনি অবাধ উন্মুক্ত মুক্তি।

    গাড়ির গতি মন্থর হয়ে গেল। দেখলাম, সেই একটানা মাঠ আর নেই, এখানে ওখানে দু-চারখানা বাড়িঘর, গাছপালা, রাস্তাঘাট, চলন্ত আলো। ক্রমশ আরও বাড়ি, আরও আলো, মানুষের কোলাহল। স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে হঠাৎ যেন একটা পরিপূর্ণ জীবজগতের মধ্যে জেগে উঠলাম।

    একটা কোন্ স্টেশনে এসে গাড়ি থামল। আমি যে দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম তার উল্টো দিকে প্লাটফরম্। এদিকে দৃষ্টি ফেরাতেই চোখে পড়ল মন্দার শূন্য শয্যা। মুহূর্তমধ্যে কে যেন একটা ভীষণ ঝাঁকানি দিয়ে আমাকে একেবারে রূঢ় বাস্তব নগ্ন সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিল। অগোছালো এলোমেলো বিছানাটার দিকে চেয়ে ভয়ে সমস্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। তবু সেখান থেকে চোখ ফেরাতে পারলাম না।

    এর পরের কয়েকটা মিনিট ঠিক কী ভাবে কেটেছিল, আজ আর মনে করতে পারছি না। মনের পরদায় যে-সব চিন্তার রেখা ছায়াছবির চেয়েও অনেক দ্রুত গতি নিয়ে ফুটেছিল এবং মিলিয়ে গিয়েছিল, এতদিন পরে সেগুলোকে গুছিয়ে তোলা অসম্ভব। তার কোনো প্রয়োজনও নেই। যে-জাতীয় খুনী মানুষের মনস্তত্ত্ব আপনাকে আকর্ষণ করে থাকে, আমি তাদের থেকে আলাদা। এক্ষেত্রে আপনার কৌতূহল না থাকাই স্বাভাবিক। সুতরাং মানসিক বিশ্লেষণে অযথা সময় নষ্ট না করে ঘটনার দিকে যাওয়া যাক।

    প্রথমটা যে খুব বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম, সেকথা লুকোতে চাই না। একবার মনে হয়েছিল পালাই। নামতে গিয়ে থেমে গেলাম। কোথায় পালাবো? কদ্দিন থাকবো পালিয়ে? তার পর? গাড়ির কামরা থেকে একটি অসুস্থ স্ত্রীলোকের এই আকস্মিক অন্তর্ধান বেশী দিন চাপা থাকবে না! গ্রীষ্মের পাহাড়ী নদীর শুকনো চড়ায় মৃতদেহটাই হয়তো তার সন্ধান দেবে। সেই সুত্র ধরে পুলিস যখন তার একমাত্র সহযাত্রীকে খুঁজে বের করবে, তখন তার এই নীরব পালিয়ে যাওয়াই তার বিরুদ্ধে সব চেয়ে সরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। দরজার হাতলটা খুলতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। হঠাৎ নজর পড়ল উপরের বার্থে। হোলড-অন-এর বাঁধন থেকে বিছানাটা খুলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—আমার ভায়রাভাই-এর চাকরটা বোধহয় করেছিল কাজটা—কিন্তু সন্ধ্যা থেকে সেটা স্পর্শ করা হয় নি। এতক্ষণে তার প্রয়োজন দেখা দিল। শুধু স্পর্শ নয়, বেশ করে ঘেঁটে চাদরটাকে এখানে ওখানে কুঁচকে দিলাম। তারপর সোজা গিয়ে শেকলটা টেনে ধরলাম।

    গার্ড এসে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার?

    —আমার স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না!

    —কোথায় ছিলেন তিনি?

    —এইখানে ঘুমোচ্ছিলেন।

    —আর আপনি?

    —ওপরের বার্থ-এ।

    —কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?

    ভুল করলাম। ব্রীজটা বোধহয় তখনও আমার মধ্যে ঘুরছিল, বললাম, ব্রীজের পর থেকে।

    গার্ড কপাল কোঁচকালেন—”ব্রীজের পর থেকে! এতক্ষণ শেকল টানেন নি কেন?”

    এ প্রশ্নের উত্তর আমার মাথায় যোগায় নি। বেশ কিছুদিন পরে যুগিয়েছিল আমার উকিলের মাথায়। আসামীর এই সন্দেহজনক আচরণ সরকারপক্ষের হাতে একটি ধারালো অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি এক কথায় তাকে ভোঁতা করে দিয়েছিলেন। সেসন্স জজের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ইয়েস, ইওর অনার, ব্রীজ ছাড়বার পরেই আসামী দেখতে পেয়েছিল, তার স্ত্রী বিছানায় নেই। ওপর থেকে ঝুঁকে পড়ে দেখেছিল। রুগ্না স্ত্রীর সম্বন্ধে তার মনে গভীর উদ্বেগ ছিল তার ফলেই দেখা। দেখে তার পক্ষে যেটা সহজ ও স্বাভাবিক সেই কথাই ভেবেছিলেন—স্ত্রী বাথরুমে গেছেন। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। মনে রাখবেন, তখন গভীর রাত। ঘুমিয়ে পড়াটা অপরাধ নয়। আমার মক্কেলের একমাত্র অপরাধ— যক্ষ্মারোগাক্রান্তা স্ত্রীর মনে যে আত্মহত্যার বীজাণু বাসা বেঁধেছে, সেটা সে কিছুমাত্র সন্দেহ করতে পারে নি। স্ত্রী যদি কাছে থাকত, হয়তো বুঝতে পারত। কিন্তু মেয়েটির দেহে এবং মনে যখন এই দুটি বীজাণুর আক্রমণ দেখা দেয়. ঘটনাচক্রে তখন সে স্বামীর কাছ থেকে দূরে গিয়ে পড়েছিল।

    আত্মহত্যার ব্যাপারটাকে প্রতিপন্ন করতে গিয়ে সুচতুর উকিলবাবু মন্দাকিনীর সমস্ত গার্হস্থ্য জীবনটাকে বিচারকের সামনে তুলে ধরেছিলেন (সে সম্পর্কে কয়েকজন প্রতিবেশীর সাক্ষ্য আগেই নিয়ে রাখা হয়েছিল)। তারপর শ্রদ্ধাপ্লুত গম্ভীর সুরে বলেছিলেন, এই মেয়েটি বয়সে নবীনা হলেও আদর্শে প্রাচীনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা সে পায় নি, কিন্তু হিন্দুনারীর যেটা সর্বোচ্চ শিক্ষা, তা সে সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করেছিল। শুধু শিক্ষা নয়, বলব ধর্ম। স্বামীসেবা। সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে দেখা গেছে, এই মহৎ আদর্শে সে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়োগ করেছিল। স্বামীকে সে একটি সন্তান উপহার দিতে পারে নি, তারই অপরাধে স্বামীর বংশ লোপ পেতে বসেছে—এজন্যে নিজের উপর তার একটা গম্ভীর ধিক্কার ছিল। যে-সেবা ছিল তার মহান ব্রত, স্বাস্থ্য সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এজন্যেও তার মনোবেদনার অন্ত ছিল না। তারপর যেদিন সে জানতে পারল, স্বামীর আদেশে রোগ সারাতে এসে সে তার চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক, একটা সংক্রামক রোগ বয়ে নিয়ে চলেছে, তখন সে আর নিজেকে ক্ষমা করতে পারে নি। যে-জীবন তার স্বামীর সেবায় লাগল না, তাকে সে স্বেচ্ছায় এবং স্বচ্ছন্দে শেষ করে দিল।

    জজ এবং জুরি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। আমিও একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। মনে পড়ছিল, মন্দার সেই শেষ কথাগুলো—”এবার আমি দু-দিনেই সেরে উঠবো… সত্যি দেখো তুমি।” সে মরতে চায় নি, অসম্ভব জেনেও বেঁচে উঠতে চেয়েছিল।

    একজন বিরুদ্ধ সাক্ষীর উক্তি জজসাহেবের মনে কিছুটা ছায়া ফেলে থাকবে। পাশের কামরার এক ভদ্রলোক। স্ত্রীলোকের গলার একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনে হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু একেবারের বেশী আর শুনতে পান নি। মনে করেছিলেন ওটা হয়তো তাঁর ভ্রম।

    ‘এই একবারের বেশী না শোনাটা’কে পুলিস এবং সরকারী উকিল আমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাবার চেষ্টা করেছিলেন। আমার উকিল জেরার ঘায়ে ভদ্রলোককে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লেও জজের মনকে সন্দেহমুক্ত করতে পারেন নি। কিন্তু ‘সন্দেহ’কে ‘প্রমাণে’ দাঁড় করাবার মতো কোন হাতল জজসাহেব শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেলেন না। কোনো একটা “মোটিভ”-এর জন্যে তিনি আকাশ-পাতাল হাতড়ে বেরিয়েছেন। খামকা এই লোকটা নিজের স্ত্রীকে খুন করতে যাবে কেন? মোটিভটা কী? তিনি সেই পুরনো থিওরি আঁকড়ে ধরে ছিলেন—খুন মাত্রেরই পিছনে একটি দু-অক্ষরের শব্দ থাকবে—নারী অথবা বিত্ত। হয় ইংরেজী ‘love’, নয়তো বাংলা ‘লাভ’। তার কোনোটাই যেখানে নেই সেখানে ন্যায়দণ্ড প্রয়োগ করা চলে না।

    একথা তিনি একবারও ভাবেন নি, যে মন দিয়ে মানুষ তার অনেকদিনের প্রিয় সঙ্গী এক পাটি ছেঁড়া জুতো টান মেরে ফেলে দেয়, সেই মন নিয়েই সে তার বহুব্যবহারে জীর্ণা, ব্যাধিগ্রস্তা শয্যাসঙ্গিনীকেও ট্রেন থেকে ঠেলে দিতে পারে।

    ‘মানুষে’র এই চেহারাটা হয়তো জজসাহেবের নজরে পড়ে নি, যদিও পড়া উচিত ছিল। তবু তাঁকে ক্ষমা করা যায়। আসামীকে তাঁরা দেখেন নথিপত্রের ভিতর দিয়ে। সে সংযোগ পরোক্ষ এবং সাময়িক। আপনার কয়েদীর সঙ্গে আপনার যে সুযোগ, সেটা প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘদিনব্যাপী তাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আপনি দেখতে পেয়েছেন। তবু যে এই জাতীয় একটা খুনী আপনার নজরে পড়ে নি, একথা কেমন করে বিশ্বাস করি? আমার মনে হয়, পড়েছে আপান ইচ্ছা করে এড়িয়ে গেছেন। তার কারণ যাই হোক, এ ত্রুটি ক্ষমা করা যায় না। শুধু ত্রুটি নয়, অপরাধ— আপনি সত্য গোপনের অপরাধে অপরাধী।

    চিঠির শেষে অংশটা পড়তে পড়তে শ্রীকান্তর কয়েকটি উক্তি আমার মনে পড়ল। অন্নদাদদির প্রসঙ্গে সে এক জায়গায় বলেছিল, “সংসারে পিশাচী কি নাই? নাই যদি, তবে পথে ঘাটে এত পাপের মূর্তি দেখি কাহাদের? সবাই যদি সেই ইন্দ্রর দিদি, তবে এত প্রকার দুঃখেরে স্রোত বহাইতেছে কাহারা? তবু কেমন করিয়া যেন মনে হয়, এ সকল তাদের বাহ্য আবরণ।… বন্ধুরা বলেন, ইহা আমার একটা শোচনীয় ভ্রুণ মাত্র। আমি তাহারও প্রতিবাদ করি না… শুধু বলি ইহা আমার যুক্তি নয়, আমার সংস্কার।”

    আমার বিরুদ্ধে এই পত্রলেখকের যে অভিযোগ আমিও তার প্রতিবাদ করছি না। যে রাজ্যে আমি দীর্ঘজীবন কাটিয়ে এলাম, সেখানে, ‘পিশাচে’র অভাব নেই, ‘পাপের মূর্তি’- ও কম দেখি নি। তবু মনে হয়েছে, সেইটাই সবটুকু নয়, তার অন্তরালে আরও কিছু আছে। কারও কারও বেলায় সেই ‘আরও কিছু’-টাই আমার চোখে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। আজও কোনো নির্জন অবসরে যখন পিছন ফিরে তাকাই সেই কটা লোকই সামনে এসে দাঁড়ায়—সেই বদর মুন্সী, কাশিম ফকির, মংখিয়া জং, জ্ঞানদা, পরিমল ব্রহ্মচারী সদানন্দ। তাদের কাছে ম্লান হয়ে যায় অনাথ, কুসুম, রাজাবাহাদুর এবং এই পত্রলেখকের মতো আরও যাদের দেখেছি।

    হয়তো শ্রীকান্তের মতো আমারও এটা একটা সংস্কার। তার মধ্যে অপরাধ থাকে, সে-অপরাধ আমি অকপটে স্বীকার করছি।

    ।। সমাপ্ত।।

  • হাদীছের গল্প

    হাদীছের গল্প

    হাদীছের গল্প

    গবেষণা বিভাগ, হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ

    প্রকাশকের নিবেদন

    গল্প, কবিতা, সঙ্গীত ইত্যাদি শিল্প ও সাংস্কৃতিক উপকরণ মানুষের স্বভাবজাত অন্তঃক্রিয়ার এক চিরন্তন অংশ। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সমাজ ও সংস্কৃতির একটি বিরাট অংশ দখল করে রয়েছে চিত্তবিনোদনের এ সকল বিমূর্ত উপকরণ। যা মানুষকে নিরন্তর কর্মপ্রেরণা যোগায়, সভ্যতা ও মননশীলতা শেখায়, জীবনকে অনেক অর্থপূর্ণ করে তোলে। ইসলামের দুই অভ্রান্ত সত্যের উৎস পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে মানব জীবন পরিচালনার পথ ও পদ্ধতি প্রদর্শিত হওয়ার সাথে সাথে নানা সামাজিক ও সাহিত্যিক উপকরণের রসদও যোগান দেয়। তাই দেখা যায় পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কার্যক্রম ও জীবন-যাপন পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বহু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যার একমাত্র উদ্দেশ্য জ্ঞান হাছিল করা ও তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘অতএব তুমি কাহিনী বর্ণনা কর, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে’ (আ‘রাফ ১৭৬)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোন বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হেদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা বিশ্বাস স্থাপন করে’ (ইউসুফ ১১১)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘এতে তোমার নিকট এসেছে সত্য, মুমিনদের জন্য শিক্ষা ও স্মরণিকা’ (হূদ ১২০)। এ সকল আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, পূর্ববর্তীদের কাহিনীসমূহ জানা এবং মানুষের কাছে তা প্রচার করা কেবল প্রয়োজনীয়ই নয় বরং অপরিহার্য। এতে একদিকে যেমন চিত্তবিনোদন হয়, অন্যদিকে তেমনি খুলে যায় শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের একটি উপভোগ্য দুয়ার।

    পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে মানবেতিহাসের এমন বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যাতে মানুষের জন্য অপরিমেয় জ্ঞান ও উপদেশভান্ডার লুকিয়ে রয়েছে। বাংলাভাষী পাঠকরা এসকল ঘটনা বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন গ্রন্থে হয়তবা ইতিমধ্যেই পাঠ করেছেন। কিন্তু সেসব ঘটনা অনেক সময় বিকৃত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে অথবা জাল-যঈফ কাহিনী মিশিয়ে চটকদার রূপ দেয়া হয়েছে। এমতবস্থায় সুধী পাঠককে ছহীহ হাদীছে তথা বিশুদ্ধে সনদে বর্ণিত গল্প ও কাহিনীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন গবেষণা বিভাগ’ ‘হাদীছের গল্প’ গ্রন্থটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এখানে সংকলিত ৩০টি গল্পের অধিকাংশই ইতিপূর্বে ‘মাসিক আত-তাহরীক’-য়ে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, হাদীছে বর্ণিত কাহিনীগুলো হুবহু অনূদিত হওয়ায় পাঠক হয়ত গাল্পিক ভাবধারায় কিছুটা ঘাটতি অনুভব করতে পারেন, তবে তা মূল উদ্দেশ্য তথা উপদেশ গ্রহণে কোন বাধার সৃষ্টি করবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। এজন্য পাঠকের সুবিধার্থে প্রতিটি গল্পের শেষেই শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিন্নধর্মী এই গল্পগ্রন্থটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে বলে আমরা আশাবাদী।

    বইটি প্রকাশনার সাথে জড়িত হা.ফা.বা. গবেষণা বিভাগসহ সকলকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং আল্লাহর নিকটে উত্তম জাযা কামনা করছি।

    প্রকাশক

    ঈমানদার যুবক ও আছহাবুল উখদূদের কাহিনী

    বহুকাল পূর্বে একজন রাজা ছিলেন। সেই রাজার ছিল একজন যাদুকর। ঐ যাদুকর বৃদ্ধ হ’লে একদিন সে রাজাকে বলল, ‘আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি। সুতরাং আমার নিকট একটি ছেলে পাঠান, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব’। বাদশাহ তার নিকট একটি বালককে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলেন। বালকটি যাদুকরের নিকট যে পথ দিয়ে যাতায়াত করত, সে পথে ছিল এক সন্ন্যাসীর আস্তানা। বালকটি তার নিকট বসল এবং তার কথা শুনে মুগ্ধ হ’ল। বালকটি যাদুকরের নিকট যাওয়ার সময় ঐ সন্ন্যাসীর নিকট বসে তাঁর কথা শুনত। ফলে যাদুকরের নিকট পৌঁছতে বালকটির দেরী হ’ত বলে যাদুকর তাকে প্রহার করত। বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট এ কথা জানালে তিনি বালককে শিখিয়ে দেন যে, তুমি যদি যাদুকরকে ভয় কর তাহ’লে বলবে, বাড়ীর লোকজন আমাকে পাঠাতে বিলম্ব করেছে এবং বাড়ীর লোকজনকে ভয় পেলে বলবে, যাদুকরই আমাকে ছুটি দিতে বিলম্ব করেছে।

    বালকটি এভাবে যাতায়াত করতে থাকে। একদিন পথে সে দেখল, একটি বৃহদাকার প্রাণী মানুষের চলাচলের পথ রোধ করে বসে আছে। বালকটি ভাবল, আজ পরীক্ষা করে দেখব যে, যাদুকর শ্রেষ্ঠ, না সন্ন্যাসী শ্রেষ্ঠ? অতঃপর সে একটি প্রস্তরখন্ড নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ্! যাদুকরের কার্যকলাপ অপেক্ষা সন্ন্যাসীর কার্যকলাপ যদি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় হয়, তবে এই প্রাণীটিকে এই প্রস্তরাঘাতে মেরে ফেল। যেন লোকজন যাতায়াত করতে পারে’। এই বলে প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে সে প্রস্তরখন্ডটি ছুঁড়ে মারল। প্রাণীটি ঐ প্রস্তরাঘাতে মারা গেল এবং লোক চলাচল শুরু হ’ল।

    এরপর বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে তাকে ঘটনাটি জানালে তিনি তাকে বললেন, ‘বৎস! তুমি এখনই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছ। তোমার প্রকৃত স্বরূপ আমি বুঝতে পারছি। শীঘ্রই তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হ’তে হবে। যদি তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হও তাহ’লে যেন আমার কথা প্রকাশ করে দিও না’। বালকটির দো‘আয় জন্মান্ধ ব্যক্তি চক্ষুষ্মান হ’তে লাগল, কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি নিরাময় হ’তে লাগল এবং লোকজন অন্যান্য রোগ হ’তেও আরোগ্য লাভ করতে লাগল।

    এদিকে রাজার একজন সহচর অন্ধ হয়েছিল। সে বহু উপঢৌকনসহ বালকটির নিকট গিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে চক্ষুষ্মান করে দাও, তাহ’লে এ সবই তোমার’।

    বালকটি বলল,  ‘আমিতো কাউকে আরোগ্য করতে পারি না । বরং  রোগ ভাল করেন আল্লাহ। অতএব আপনি যদি  আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন, তাহ’লে আমি আপনার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকটে দো‘আ করতে পারি। তাতে তিনি হয়ত আপনাকে আরোগ্য দান করতে পারেন’। ফলে লোকটি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করলেন।

    পূর্বের ন্যায় তিনি রাজার নিকটে গিয়ে বসলে রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল’? সে বলল, ‘আমার রব’। রাজা বললেন, আমি ছাড়া তোমার রব আছে কি’? সে বলল, ‘আমার ও আপনার উভয়ের রব আল্লাহ’। এতে রাজা তাকে ধরে তার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। অবশেষে সে বালকটির নাম প্রকাশ করে দিল।

    অতঃপর বালকটিকে রাজদরবারে আনা হ’ল। রাজা তাকে বললেন, ‘বৎস! আমি জানতে পারলাম যে, তুমি তোমার যাদুর গুণে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত লোকদের রোগ নিরাময় করছ এবং অন্যান্য কঠিন রোগও নিরাময় করে চলেছ। বালকটি বলল, আমি কাউকে রোগ মুক্ত করি না। রোগ মুক্ত করেন আল্লাহ’। তখন রাজা তাকে পাকড়াও করে তার উপর উৎপীড়ন চালাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সে সন্ন্যাসীর কথা প্রকাশ করে দিল। তখন সন্ন্যাসীকে ধরে আনা হ’ল এবং তাঁকে বলা হ’ল, তুমি তোমার ধর্ম পরিত্যাগ কর। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। তখন রাজার আদেশক্রমে করাত নিয়ে আসা হ’লে তিনি তা তার মাথার মাঝখানে বসালেন এবং তাঁর মাথা ও শরীর চিরে দ্বিখন্ডিত করে ফেললেন। তারপর রাজার সহচরকে আনা হ’ল এবং তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হ’ল। কিন্তু সেও অস্বীকৃতি জানালে তাকেও করাত দিয়ে চিরে দ্বিখন্ডিত করা হ’ল।

    তারপর বালকটিকে হাযির করে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হ’ল। বালকটিও নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করল। তখন রাজা তাকে তার লোকজনের নিকট দিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সঙ্গে করে পাহাড়ে আরোহণ করতে থাক। যখন তোমরা পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে পৌঁছবে, তখন তাকে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলবে। সে যদি অস্বীকার করে, তাহ’লে তোমরা তাকে সেখান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিবে’। তারা বালকটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠলে বালকটি দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের কাছ থেকে রক্ষা কর’। তৎক্ষণাৎ পাহাড়টি কম্পিত হয়ে উঠল এবং তারা নীচে পড়ে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকট এসে উপস্থিত হ’ল। রাজা তখন তাকে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীদের কি হ’ল’? তখন সে বলল, আল্লাহই আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

    তারপর রাজা তাকে তার একদল লোকের নিকট সোপর্দ করে আদেশ দিলেন, ‘একে একটি বড় নৌকায় উঠিয়ে  নদীর মাঝখানে নিয়ে যাও। যদি সে নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করে, তো ভাল। নচেৎ তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর’। তারা বালকটিকে নিয়ে মাঝ নদীতে পৌঁছলে বালকটি পূর্বের ন্যায় দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা কর’। এতে নৌকা ভীষণভাবে কাত হয়ে পড়ল। ফলে রাজার লোকজন নদীতে ডুবে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকটে আসলে রাজা তাকে বললেন, তোমার সঙ্গীদের কি অবস্থা? সে বলল, আল্লাহই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর সে রাজাকে বলল, ‘আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন আমাকে কোনভাবেই হত্যা করতে পারবেন না। যতক্ষণ না আমি যা বলব, আপনি তা করবেন। রাজা বললেন, ‘সেটা কি’? বালকটি বলল, ‘আপনি একটি বিস্তীর্ণ মাঠে  সকল লোককে হাযির করুন এবং সেই মাঠে খেজুরের একটি গুঁড়ি পুঁতে তার উপরিভাগে আমাকে বেঁধে রাখুন। তারপর আমার তূনীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকে সংযোজিত করুন। তারপর  بِسْمِ اللهِ ربِّ الْغُلاَمِ (বালকটির রব আল্লাহর নামে) বলে আমার দিকে তীরটি নিক্ষেপ করুন। আপনি যদি এ পন্থা অবলম্বন করেন, তবেই আমাকে হত্যা করতে পারবেন’।

    বালকের কথামত এক বিস্তীর্ণ মাঠে রাজা সকল লোককে সমবেত করলেন এবং বালকটিকে একটি খেজুর গাছের গুঁড়ির উপরে বাঁধলেন। তারপর রাজা বালকটির তূনীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যভাগে সংযোজিত করলেন। তারপর بِسْمِ اللهِ ربِّ الْغُلاَمِ বলে বালকটির দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। তীরটি বালকের চোখ ও কানের মধ্যভাগে বিদ্ধ হ’ল। বালকটি এক হাতে তীরবিদ্ধ স্থানটি চেপে ধরল। অতঃপর সে মারা গেল।

    এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনগণ বলে উঠল, ‘আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম’।

    তারপর রাজার লোকজন তাঁর নিকট গিয়ে বলল, ‘আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। সব লোক বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনল’। তখন রাজা রাস্তাগুলির চৌমাথায় প্রকান্ড গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। তার কথা মতো গর্ত খনন করে তাতে আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হ’ল। তারপর রাজা হুকুম দিলেন, ‘যে ব্যক্তি বালকের ধর্ম পরিত্যাগ করবে না, তাকে ঐ আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মার। অথবা তাকে বলবে, তুমি এই আগুনে ঝাঁপ দাও। রাজার লোকেরা তার হুকুম পালন করতে লাগল। ইতিমধ্যে একজন রমণীকে তার শিশুসন্তানসহ উপস্থিত করা হ’ল। রমণীটি আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতস্ততঃ করতে থাকলে শিশুটি বলে উঠল, ‘মা ছবর অবলম্বন (করতঃ আগুনে প্রবেশ) করুন। কেননা আপনি হক পথে আছেন’।

    পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস হয়েছিল গর্তওয়ালারা- ইন্ধনপূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসার্হ আল্লাহে’ (বুরূজ ৪-৮)।

    [ছহীহ মুসলিম হা/৩০০৫ ‘যুহদ ও রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭, ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হা/২৩৯৭৬]।

    শিক্ষা :

    ১. প্রত্যেকটি আদম সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে।

    ২. মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করবে ও কায়মনোবাক্যে তাঁর নিকট দো‘আ করবে।

    ৩. রোগমুক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ; কোন পীর-ফকীর বা সাধু-সন্ন্যাসী নয়।

    ৪. আল্লাহর পথের নির্ভীক সৈনিকেরা বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত করে না।

    ৫. মুমিন দুনিয়াবী জীবনে পদে পদে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তার ঈমানের মযবূতী পরখ করেন।

    ৬. হক্বের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

    কুষ্ঠরোগী ,  অন্ধ ও টেকোর কাহিনী

    বনী ইসরাঈলের মাঝে তিনজন ব্যক্তি ছিল- কুষ্ঠরোগী, টেকো ও অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন এবং তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। অতঃপর কুষ্ঠরোগীর কাছে এসে তিনি বললেন, ‘তোমার সবচেয়ে পসন্দের জিনিস কোন্টি’? সে বলল, ‘সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা মানুষ আমাকে ঘৃণা করে’। ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলালেন। এতে তার রোগ দূর হ’ল এবং তাকে সুন্দর বর্ণ ও সুন্দর চামড়া দান করা হ’ল। অতঃপর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নিকট কোন্ সম্পদ সবচেয়ে বেশী পসন্দনীয়? সে বলল, উট অথবা গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে, কুষ্ঠরোগী বা টেকো দু’জনের একজন বলেছিল উট আর অপরজন বলেছিল গরু। তাকে তখন দশ মাসের গর্ভবতী একটি উটনী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, ‘আল্লাহ এতে তোমায় বরকত দিন’। তারপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার সবচেয়ে পসন্দের জিনিস কেন্টি’? সে বলল, ‘সুন্দর চুল এবং এই টাক হ’তে মুক্তি, লোকেরা যার কারণে আমাকে ঘৃণা করে’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তার মাথায় হাত বুলালেন। এতে তার টাক ভাল হয়ে গেল এবং তাকে সুন্দর চুল দান করা হ’ল। এরপর ফেরেশতা বললেন, ‘কোন্ মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, গরু। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, আল্লাহ এতে তোমাকে বরকত দিন। তারপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার অধিক পসন্দের জিনিস কোনটি’? সে বলল, ‘আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিন, আমি যাতে মানুষকে দেখতে পারি’। ফেরেশতা তার চোখ স্পর্শ করলেন। এতে তার চোখের দৃষ্টি আল্লাহ ফিরিয়ে দিলেন। এরপর ফেরেশতা প্রশ্ন করলেন, ‘কোন্ মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, ছাগল। তাকে তখন এমন ছাগী দেয়া হ’ল, যা অধিকসংখ্যক বাচ্চা দেয়। তারপর উট, গাভী ও ছাগলের বাচ্চা হ’ল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল। তারপর ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন। সফরে আমার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহ ব্যতীত কেউ নেই, যার সাহায্যে আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছতে পারি, তারপর তোমার সহায়তায়। যে আল্লাহ তোমাকে সুন্দর বর্ণ, সুন্দর ত্বক ও সম্পদ দিয়েছেন, সে আল্লাহর নামে তোমার নিকট আমি একটা উট চাচ্ছি, যার সাহায্যে আমি গন্তব্যে পৌঁছতে পারি’। সে বলল, ‘(আমার উপর) অনেকের অধিকার রয়েছে’। ফেরেশতা বললেন, ‘তোমাকে বোধ হয় আমি চিনি। তুমি কি কুষ্ঠরোগী ছিলে না? লোকেরা তোমাকে কি ঘৃণা করত না? তুমি না নিঃস্ব ছিলে? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন’। সে বলল, ‘এই সম্পদ তো আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষ থেকে পেয়েছি’। তিনি বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তাহ’লে তোমাকে যেন আল্লাহ আগের মতো করে দেন’।

    এরপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে প্রথম লোকটিকে যা বলেছিলেন তা বললেন এবং সেও একই উত্তর দিল, যা পূর্বের লোকটি দিয়েছিল। ফেরেশতা একেও বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাক, তাহ’লে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন’। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে তাঁর আগের রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন মুসাফির। আমার সবকিছু সফরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন গন্তব্যে পৌঁছতে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপায় নেই, তারপর তোমার সহায়তায়। সেই আল্লাহর নামে তোমার কাছে একটি ছাগল সাহায্য চাচ্ছি, যিনি তোমাকে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন’। এ ছাগলটি দিয়ে আমি বাড়ি পৌঁছতে পারব। লোকটি বলল, ‘আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, আল্লাহই আমাকে ধনী করেছেন। কাজেই তোমার যত ইচ্ছা মাল তুমি নিয়ে যাও। আল্লাহর শপথ! মহান আল্লাহর ওয়াস্তে আজ তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্য আমি আজ তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না’। ফেরেশতা বললেন, ‘তোমার সম্পদ তোমার কাছেই রাখ। তোমাদেরকে শুধুমাত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তোমার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তোমার অপর দু’জন সাথীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন’

    [আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫১; মুসলিম হা/২৯৬৪, মিশকাত হা/১৮৭৮ ‘যাকাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫]

    শিক্ষা : সর্বদা আল্লাহর নে‘মতের শোকর-গুযার হ’তে হবে।

    কা ‘ ব বিন আশরাফের মৃত্যুকাহিনী

    জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, কা‘ব ইবনু আশরাফকে হত্যা করার জন্য কে প্রস্ত্তত আছ? কেননা সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, তাহ’লে আমাকে কিছু প্রতারণাময় কথা বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ বল। এরপর মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) কা‘ব ইবনু আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি [রাসূল (সাঃ)] ছাদাক্বা চায় এবং সে আমাদেরকে বহু কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার নিকট কিছু ঋণের জন্য এসেছি। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, আল্লাহর কসম! পরে সে তোমাদেরকে আরো বিরক্ত ও অতিষ্ঠ করে তুলবে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমরা তাঁর অনুসরণ করছি। পরিণাম কি দাঁড়ায় তা না দেখে এখনই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করা ভাল মনে করছি না। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, ধার তো পাবে তবে কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, কি জিনিস আপনি বন্ধক চান? সে বলল, তোমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বললেন, আপনি আরবের একজন সুদর্শন ব্যক্তি। আপনার নিকট কিভাবে আমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখব? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে আপনার নিকট কি করে বন্ধক রাখি? তাদেরকে এ বলে সমালোচনা করা হবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছে। এটা তো আমাদের জন্য খুব লজ্জাজনক বিষয়। তবে আমরা আপনার নিকট অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। শেষে তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) তার কাছে আবার যাওয়ার ওয়াদা করে চলে আসলেন।

    এরপর তিনি কা‘ব ইবনু আশরাফের দুধ ভাই আবূ নায়েলাকে সঙ্গে করে রাতের বেলা তার নিকট গেলেন। কা‘ব তাদেরকে দূর্গের মধ্যে ডেকে নিল এবং সে নিজে উপর তলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্ত্তত হ’ল। তখন তার স্ত্রী বলল, এ সময় তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, এই তো মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবূ নায়েলা এসেছে। ‘আমর ব্যতীত বর্ণনাকারীগণ বলেন যে, কা‘বের স্ত্রী বলল, আমি তো এমনই একটি ডাক শুতে পাচ্ছি যার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং দুধ ভাই আবূ নায়েলা (অপরিচিত কোন লোক তো নয়)। ভদ্র মানুষকে রাতের বেলা বর্শা বিদ্ধ করার জন্য ডাকলে তার যাওয়া উচিত। (বর্ণনাকারী বলেন) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) সঙ্গে আরো দুই ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে গেলেন। সুফইয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ‘আমর কি তাদের দু’জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন? উত্তরে সুফইয়ান বললেন, একজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। ‘আমর বর্ণনা করেন যে, তিনি আরো দু’জন মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, যখন সে (কা‘ব ইবনু আশরাফ) আসবে। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার সাথীদের সম্পর্কে) বলেছেন যে, (তারা হ’লেন) আবূ আবস্ ইবনু জাবর, হারিছ ইবনু আওস এবং আববাদ ইবনু বিশর। ‘আমর বলেছেন, তিনি অপর দুই লোককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেন, যখন সে আসবে তখন আমি তার মাথার চুল ধরে শুঁকতে থাকব। যখন তোমরা আমাকে দেখবে যে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা অাঁকড়িয়ে ধরেছি, তখন তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করবে। তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) একবার বলেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকেও শুঁকাব। সে (কা‘ব) চাদর নিয়ে নীচে নেমে আসলে তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আজকের মত এতো উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ বর্ণনা করেছেন যে, কা‘ব বলল, আমার নিকট আরবের সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধী ব্যবহারকারী মহিলা আছে। ‘আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমাকে আপনার মাথা শুঁকতে অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি তার মাথা শুঁকলেন এবং এরপর তার সাথীদেরকে শুঁকালেন। তারপর তিনি আবার বললেন, ‘আমাকে আবার শুঁকবার অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা কর। তাঁরা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে এ খবর দিলেন।

    [বুখারী হা/৪০৩৭ ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘কা‘ব ইবনু আশরাফের হত্যা’ অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/১৮০১]

    শিক্ষা :

    ১. রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি ভালবাসা ব্যতীত মুমিন হওয়া যাবে না।

    ২. পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    পাহাড়ের গুহায় আঁটকে পড়া তিন যুবক

    একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হ’ল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হ’তে এক খন্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎকাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আললাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আললাহর নিকট দো‘আ কর। তাহ’লে হয়ত আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর হ’তে পাথরটি সরিয়ে দিবেন।

    তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ্‌! আমার আববা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তান্দের  আগে আমার আববা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পছন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ্‌! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি আমাদের হ’তে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।

    দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে,আমি   তাকে  তার চেয়েও অধিক ভালবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু তা সে অস্বীকার করল যে পর্যন্ত না আমি তার জন্য একশ’ দিনার নিয়ে আসি। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম (অর্থাৎ সম্ভোগ করতে তৈরী হলাম) তখন সে বলল, হে আললাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয়  কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিয়ো না। (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা কিছুটা সরে গেল।

    তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করল আমাকে বলল, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও তার রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরী দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ঐগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকীটুকু সরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ পাথরটাকে সরিয়ে দিলেন।

    (আব্দুললাহ ইবনু ওমর  (রাঃ)  হ’তে  বর্ণিত,  বুখারী  হা/২৩৩৩,  ‘চাষাবাদ’  অধ্যায়, অনুচেছদ-১৩; মুসলিম হা/২৭৪৩, মিশকাত হা/৪৯৩৮)।

    শিক্ষা :

    ১. বান্দা সুখে-দুঃখে সর্বদা আল্লাহকে ডাকবে।

    ২. বিপদাপদের সময় আল্লাহকে ব্যতীত কোন মৃত ব্যক্তি বা অন্য কাউকে ডাকা শিরকে আকবর বা বড় শিরক।

    ৩. সৎ আমলকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।

    ৪. পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং স্ত্রী ও সন্তানদের উপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে।

    ৫. শ্রমিককে তার ন্যায্য পাওনা প্রদান করতে হবে।

    খোবায়েবের শাহাদাতবরণ

    রাসূল (সাঃ) একবার দশ ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসাবে সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন এবং আছিম ইবনু ছাবিত আনছারীকে তাঁদের নেতা নিযুক্ত করেন, যিনি আছিম ইবনু ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের নানা ছিলেন। তাঁরা রওনা করলেন, যখন তাঁরা উসফান ও মক্কার মাঝে ‘হাদআত’ নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন হুযায়েল গোত্রের একটি প্রশাখা- যাদেরকে লেহইয়ান বলা হয়, তাদের নিকট তাঁদের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়। তারা প্রায় দু’শত তীরন্দাজকে তাঁদের পিছু ধাওয়ার জন্য পাঠান। এরা তাঁদের পদচিহ্ন দেখে চলতে থাকে। ছাহাবীগণ মদীনা হ’তে সঙ্গে নিয়ে আসা খেজুর যেখানে বসে খেয়েছিলেন, অবশেষে এরা সে স্থানের সন্ধান পেয়ে গেল। তখন এরা বলল, এগুলো ইয়াছরিবের (মদীনা) খেজুর। অতঃপর এরা তাঁদের পদচিহ্ন দেখে চলতে লাগল। যখন আছিম ও তাঁর সাথীগণ এদের দেখলেন, তখন তাঁরা একটি উঁচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আর কাফিররা তাঁদের ঘিরে ফেলল এবং তাঁদেরকে বলতে লাগল, তোমরা অবতরণ কর ও স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব বরণ কর। আমরা তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, তোমাদের মধ্য হ’তে কাউকে আমরা হত্যা করব না। তখন গোয়েন্দা দলের নেতা আছিম ইবনু ছাবিত (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তো আজ কাফিরদের নিরাপত্তায় অবতরণ করব না। হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আপনার নবীকে সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন।’ অবশেষে কাফিররা তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। আর তারা আছিম (রাঃ) সহ সাত জনকে শহীদ করল।

    অতঃপর অবশিষ্ট তিনজন খুবাইব আনছারী, যায়দ ইবনু দাছিনা (রাঃ) ও অপর একজন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর নির্ভর করে তাদের নিকট অবতরণ করলেন। যখন কাফিররা তাদেরকে আয়ত্বে নিয়ে নিল, তখন তারা তাদের ধনুকের রশি খুলে ফেলে তাঁদেরকে বেঁধে ফেলল। তখন তৃতীয় জন বলে উঠলেন, ‘গোড়াতেই বিশ্বাসঘাতকতা! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না, যাঁরা শহীদ হয়েছেন আমি তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করব’। ফলে তারা তাকে টেনে-হিঁচড়ে তাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করলে কাফিররা তাঁকে শহীদ করে ফেলে এবং খুবাইব ও ইবনু দাছিনাকে নিয়ে চলে যায়। অবশেষে তাঁদের উভয়কে মক্কায় বিক্রয় করে ফেলে।

    এটা বদর যুদ্ধের পরের কথা। তখন খুবাইবকে হারিছ ইবনু ‘আমিরের পুত্রগণ ক্রয় করে নেয়। আর বদর যুদ্ধের দিন খুবাইব (রাঃ) হারিছ ইবনু ‘আমিরকে হত্যা করেছিলেন। খুবাইব (রাঃ) কিছু দিন তাদের নিকট বন্দী থাকেন। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, আমাকে ওবায়দুল্লাহ ইবনু ইয়ায অবহিত করেছেন, তাঁকে হারিছের কন্যা জানিয়েছে যে, যখন হারিছের পুত্রগণ খুবাইব (রাঃ)-কে শহীদ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি তার কাছ থেকে ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন। তখন হারিছের কন্যা তাকে একখানা ক্ষুর ধার দিল। সে সময় ঘটনাক্রমে আমার এক ছেলে আমার অজ্ঞাতে খুবাইবের নিকট চলে গেলে তিনি তাকে ধরেন এবং আমি দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসে রয়েছে এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। খুবাইব আমার চেহারা দেখে তা বুঝতে পারলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি কি এ ভয় করছ যে, আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করব না। আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের মত উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আমি একদা দেখলাম, তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় ছড়া হ’তে আঙ্গুর খাচ্ছেন, যা তাঁর হাতেই ছিল। অথচ এ সময় মক্কায় কোন ফলই পাওয়া যাচ্ছিল না। হারিছের কন্যা বলতো, এ তো ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হ’তে প্রদত্ত জীবিকা, যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন। অতঃপর তারা খুবাইবকে শহীদ করার উদ্দেশ্যে হারামের নিকট হ’তে হিল্লের দিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, তখন খুবাইব (রাঃ) তাদেরকে বললেন, আমাকে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতে দাও। তারা তাঁকে সে অনুমতি দিল। তিনি দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি তবে আমি ছালাতকে দীর্ঘ করতাম। হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করুন।’ (অতঃপর তিনি এ কবিতা দু’টি আবৃত্তি করলেন)

    وَلَسْتُ أُبَالِىْ حِيْنَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا * عَلَى أَىِّ شِقٍّ كَانَ لِلَّهِ مَصْرَعِىْ

    وَذَلِكَ فِىْ ذَاتِ الْإِلَهِ وَإِنْ يَشَأْ * يُبَارِكْ عَلَى أَوْصَالِ شِلْوٍ مُمَزَّعِ

    ‘আমি কোন কিছুরই পরোয়া করিনা যখন আমি মুসলিম হিসাবে নিহত হই। আল্লাহর রাহে যেভাবেই আমাকে পর্যদুস্ত করা হউক, তা কেবল আল্লাহর জন্যই করা হচ্ছে। তিনি ইচ্ছা করলে আমার বিচ্ছিন্ন অঙ্গ সমূহে বরকত দান করবেন’।

    অবশেষে হারিছের পুত্র তাঁকে শহীদ করে ফেলে। বস্ত্তত যে মুসলিম ব্যক্তিকে বন্দী অবস্থায় শহীদ করা হয় তার জন্য দু’রাক‘আত ছালাত আদায়ের এ রীতি খুবাইব (রাঃ)-ই প্রবর্তন করে গেছেন। যেদিন আছিম (রাঃ) শাহাদতবরণ করেছিলেন, সেদিন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দো‘আ কবুল করেছিলেন। সেদিনই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁর ছাহাবীগণকে তাঁদের সংবাদ ও তাঁদের উপর যা যা আপতিত হয়েছিল সবই অবহিত করেছিলেন। আর যখন কুরাইশ কাফিরদেরকে এ সংবাদ পৌঁছানো হয় যে, আছিম (রাঃ)-কে শহীদ করা হয়েছে তখন তারা তাঁর কাছে এক লোককে পাঠায়, যাতে সে ব্যক্তি তাঁর লাশ হ’তে কিছু অংশ কেটে নিয়ে আসে, যেন তারা তা দেখে চিনতে পারে। কারণ বদর যুদ্ধের দিন আছিম (রাঃ) কুরাইশদের এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। আছিমের লাশের (রক্ষার জন্য) মৌমাছির ঝাঁক প্রেরিত হ’ল, যারা তাঁর দেহ আবৃত করে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র হ’তে হেফাযত করল। ফলে তারা তাঁর শরীর হ’তে এক খন্ড গোশতও কেটে নিতে পারেনি।

    [আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বুখারী হা/৩০৪৫ ‘জিহাদ ও সিয়ার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭০, আহমাদ হা/৭৯১৫]

    শিক্ষা :

    ১. সর্বদা নেতার অধীনে সংঘবদ্ধ জীবন যাপন করতে হবে।

    ২. ওয়াদা ভঙ্গ করা কাফির-মুশরিকদের চিরাচরিত অভ্যাস।

    ৩. নারী ও শিশুর প্রতি ইসলামের সহমর্মিতা সীমাহীন। এজন্য যুদ্ধের ময়দানেও তাদেরকে আক্রমণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

    ৪. শাহাদাত মুমিনের কাঙ্খিত লক্ষ্য।

    তওবার অপূর্ব নিদর্শন

    একদা মা‘য়িয বিন মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন’। তিনি বললেন, ‘ধিক তোমাকে! তুমি চলে যাও। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তওবা কর’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি চলে গেলেন এবং সামান্য একটু দূরে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসলেন এবং আবারও বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবারও তাকে পূর্বের ন্যায় বললেন। এভাবে তিনি যখন চতুর্থ বার এসে বললেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি তোমাকে কোন্ জিনিস হ’তে পবিত্র করব’? তিনি বললেন, ‘যেনা হ’তে’। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (ছাহাবীগণকে) জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ লোকটি কি পাগল’? লোকেরা বলল, ‘না, সে পাগল নয়’। তিনি আবার বললেন, ‘লোকটি কি মদ পান করেছে’? তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তার মুখ শুঁকে তার মুখ হ’তে মদের কোন গন্ধ পেল না।

    অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যিই যেনা করেছ’? সে বলল, ‘হ্যাঁ’। এরপর তিনি রজমের নির্দেশ দিলেন, তখন তাকে রজম করা হ’ল। এ ঘটনার দু’তিন দিন পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (ছাহাবীগণের নিকট) এসে বললেন, ‘তোমরা মা‘য়িয বিন মালিকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ছাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ মা‘য়িয বিন মালিককে ক্ষমা করুন। এরপর রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘সে এমন তওবা করেছে, যদি তা সমস্ত উম্মতের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়, তবে তা সকলের জন্য যথেষ্ট হবে’।

    এরপর আযদ বংশের গামেদী গোত্রীয় এক মহিলা এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন’। তিনি বললেন, ‘ধিক তোমাকে! তুমি চলে যাও। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তওবা কর’। তখন মহিলাটি বলল, ‘আপনি মা‘য়িয বিন মালিককে যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমাকেও কি সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান? আমার গর্ভের এই সন্তান যেনার’। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি (সত্যই অন্তঃসত্তা)? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, ‘যাও, তোমার পেটের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। বর্ণনাকারী বলেন, ‘আনছারী এক লোক মহিলাটির সন্তান হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে গেলেন। সন্তান প্রসব হওয়ার পর ঐ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর খেদমতে এসে বলল, গামেদী মহিলাটি সন্তান প্রসব করেছে। এবার তিনি (সাঃ) বললেন, ‘এ শিশু বাচ্চাটিকে রেখে আমরা মহিলাটিকে রজম (পাথর মেরে হত্যা) করতে পারি না’। কারণ তাকে দুধ পান করানোর মতো কেউ নেই। এ সময়  জনৈক আনছারী দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করব’। রাবী বলেন, তখন তিনি তাকে রজম করলেন।

    অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মহিলাটিকে বললেন, ‘তুমি চলে যাও এবং সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। অতঃপর সন্তান প্রসবের পর যখন সে আসল, তখন তিনি বললেন, ‘আবার চলে যাও এবং তাকে দুধ পান করাও এবং দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। পরে যখন বাচ্চাটির দুধ খাওয়া বন্ধ হয়, তখন মহিলাটি বাচ্চার হাতে এক খন্ড রুটির টুকরা দিয়ে তাকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর খেদমতে হাযির হ’ল। এবার মহিলাটি এসে বলল, ‘হে আল্লাহর নবী! এই দেখুন আমি তাকে দুধ ছাড়িয়েছি, এমনকি সে নিজে হাতে খানাও খেতে পারে’। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বাচ্চাটিকে একজন মুসলমানের হাতে তুলে দিলেন। পরে মহিলাটির জন্য গর্ত খোঁড়ার নির্দেশ দিলেন। তার জন্য বক্ষ পর্যন্ত গর্ত খনন করা হ’ল। এরপর জনগণকে নির্দেশ দিলেন, তারা মহিলাটিকে রজম করল।

    খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তার মাথায় এক খন্ড পাথর নিক্ষেপ করলে রক্ত ছিটে এসে তার মুখমন্ডলের উপর পড়ল। তখন তিনি মহিলাটিকে গাল-মন্দ করলেন। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন ‘থাম হে খালেদ! যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, এই মহিলা এমন তওবা করেছে, যদি রাজস্ব আদায়ে কারচুপিকারী ব্যক্তিও এমন তওবা করত, তাহ’লে তাকেও ক্ষমা করা হ’ত’। অতঃপর তিনি ঐ মহিলার জানাযার ছালাত আদায়ের আদেশ দিলেন এবং নিজে তার জানাযা পড়লেন। অতঃপর তাকে দাফন করা হ’ল।

    অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জানাযা পড়লে ওমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি তার জানাযা পড়লেন? অথচ সে যেনা করেছে? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘এ মহিলা এমন তওবা করেছে যে, তা সত্তর জন মদীনাবাসীর মধ্যে বণ্টন করে দিলেও যথেষ্ট হয়ে যেত। তুমি কি এর চাইতে উত্তম কোন তওবা পাবে, যে ব্যক্তি স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে?’।

    [বুরায়দাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মুসলিম হা/১৬৯৫-৯৬, মিশকাত হা/৩৫৬২ ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়]।

    শিক্ষা :

    বান্দার গোনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম হ’ল তওবা। সে এর মাধ্যমে পূত-পবিত্র হয়ে মহান আল্লাহর প্রিয়ভাজন হ’তে পারে।

    মুমিনের কারামত

    বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির নিকট এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা কর্য চাইলে কর্যদাতা বলল, কয়েকজন লোক নিয়ে আস, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব। গ্রহীতা বলল, ‘আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট’। কর্যদাতা পুনরায় বলল, তবে একজন যামিনদার উপস্থিত কর! সে বলল, ‘আল্লাহই যামিনদার হিসাবে যথেষ্ট’। তখন কর্যদাতা বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। তারপর সে নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের শর্তে তাকে এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা ধার দিল। অতঃপর সে (গ্রহীতা) সমুদ্রযাত্রা করল এবং তার (ব্যবসায়িক) প্রয়োজন পূরণ করল। পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসলে সে যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে নির্ধারিত সময়ে কর্যদাতার নিকট এসে পৌঁছতে পারে। কিন্তু সে কোন যানবাহন পেল না। তখন সে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং কর্যদাতার নামে একখানা চিঠি ও এক হাযার দীনার ওর মধ্যে পুরে ছিদ্রটি বন্ধ করে দিল। তারপর ঐ কাষ্ঠখন্ডটা সমুদ্র তীরে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি তো জান, আমি অমুকের নিকট এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা কর্য চাইলে সে আমার কাছ থেকে যামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আল্লাহই যামিনদার হিসাবে যথেষ্ট। এতে সে রাযী হয়ে যায় (এবং আমাকে ধার দেয়)। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। তাতে সে রাযী হয়ে যায়। আমি তার প্রাপ্য তার নিকট পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম, কিন্তু পেলাম না। আমি ঐ এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা তোমার নিকট আমানত রাখছি। এই বলে সে কাষ্ঠখন্ডটা সমুদ্রবক্ষে নিক্ষেপ করল। তৎক্ষণাৎ তা সমুদ্রের মধ্যে ভেসে চলে গেল। অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার  জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল।

    ওদিকে কর্যদাতা (নির্ধারিত দিনে) এ আশায় সমুদ্রতীরে গেল যে, হয়তবা ঋণগ্রহীতা তার পাওনা টাকা নিয়ে কোন নৌযানে চড়ে এসে পড়েছে। ঘটনাক্রমে ঐ কাষ্ঠখন্ডটা তার নযরে পড়ল, যার ভিতরে স্বর্ণমুদ্রা ছিল। সে তা পরিবারের জ্বালানির জন্য বাড়ী নিয়ে গেল। যখন কাঠের টুকরাটা চিরল, তখন ঐ স্বর্ণমুদ্রা ও চিঠিটা পেয়ে গেল। কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে (পাওনাদারের নিকট) এসে হাযির হ’ল। সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি তোমার (প্রাপ্য) মাল যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যানবাহনের খোঁজে সর্বদা চেষ্টিত ছিলাম। কিন্তু যে জাহাযটিতে করে আমি এখন এসেছি এর আগে আর কোন জাহাযই পাইনি (তাই সময়মত আসতে পারলাম না)। কর্যদাতা বললেন, তুমি কি আমার নিকট কিছু পাঠিয়েছিলে? ঋণগ্রহীতা বলল, আমি তো তোমাকে বললামই যে, এর আগে আর কোন জাহাযই পাইনি। অতঃপর ঋণদাতা বলল, আল্লাহ পাক আমার নিকট তা পৌঁছিয়েছেন, যা তুমি পত্রসহ কাষ্ঠখন্ডে পাঠিয়েছিলে। কাজেই এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আনন্দচিত্তে ফিরে যাও [আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, ছহীহ বুখারী হা/২২৯১, ‘যামিন হওয়া’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১]।

    শিক্ষা :

    ১. সর্বদা আল্লাহর উপর অবিচল বিশ্বাস ও আস্থা প্রকৃত মুমিনের অন্যতম গুণ।

    ২. বিনা সূদে ‘করযে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ প্রদানের বহুগুণ প্রতিদান রয়েছে (বাক্বারাহ ২৪৫)।

    ৩. নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রহীতা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

    ৪. ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা থাকলে আল্লাহ পাক তার ব্যবস্থা করে দেন।

    সোনাভর্তি কলস

    এক লোক অপর লোক হ’তে একখন্ড জমি ক্রয় করেছিল। ক্রেতা খরীদকৃত জমিতে একটা স্বর্ণভর্তি কলস পেল। ক্রেতা বিক্রেতাকে বলল, আমার কাছ থেকে তোমার ঋণ নিয়ে নাও। কারণ আমি জমি ক্রয় করেছি, স্বর্ণ ক্রয় করিনি। জমিওয়ালা বলল, আমি জমি এবং এতে যা কিছু আছে সবই তোমার নিকট বিক্রি করে দিয়েছি। অতঃপর তারা উভয়েই অপর এক লোকের কাছে এর মীমাংসা চাইল। মীমাংসাকারী বললেন, তোমাদের কি ছেলে-মেয়ে আছে? একজন বলল, আমার একটি ছেলে আছে। অন্য লোকটি বলল, আমার একটি মেয়ে আছে। মীমাংসাকারী বললেন, তোমার মেয়েকে তার ছেলের সঙ্গে বিবাহ দাও আর প্রাপ্ত স্বর্ণের মধ্যে কিছু তাদের বিবাহে ব্যয় কর এবং বাকী অংশ তাদেরকে দিয়ে দাও।

    [আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৭২ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৪, মুসলিম হা/১৭২১]

    শিক্ষা :

    ১. আমানতদারিতা মুমিন চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

    ২. অন্যের জিনিসে লোভ করা সঙ্গত নয়।

    ৩. হালাল পথে জীবিকা অন্বেষণের চেষ্টা করতে হবে এবং হারাম বর্জন করতে হবে।

    ৪. বিচারককে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অধিকারী হ’তে হবে।

    কা ‘ ব বিন মালিক  ( রাঃ )- এর তওবা

    আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কা‘ব বিন মালিকের পুত্রদের মধ্যে আব্দুল্লাহ তাঁর পিতা কা‘ব (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাহায্যকারী ও পথপ্রদর্শনকারী ছিলেন। আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি কা‘ব বিন মালিককে তাঁর তাবূক যুদ্ধে পেছনে থেকে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি’। কা‘ব (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তাবূক ও বদর ছাড়া আর কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের কাউকে তিনি ভৎর্সনা করেননি। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শুধুমাত্র একটি কুরাইশ কাফেলার সন্ধানে বের হয়েছিলেন । অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের ও শত্রুদের মাঝে অঘোষিত এ যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। তাই আমি আকাবার বায়‘আতের চেয়ে বদরের যুদ্ধকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম না। যদিও মানুষের মাঝে আকাবার ঘটনা অপেক্ষা বদর যুদ্ধ অধিক প্রসিদ্ধ ছিল।

    যাহোক আমার ঘটনা এই যে, আমি যখন তাবূকের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলাম, সে সময়ের চেয়ে অন্য কোন সময়েই আমি অধিক শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম না। আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার কাছে কখনো একসাথে দু’টো সওয়ারী ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের সময় (যুদ্ধের পূর্বে) আমি তা সংগ্রহ করেছিলাম। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখনই কোন যুদ্ধের ইচ্ছা করতেন, তখন (যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে) সেজন্য বিপরীত পন্থা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় যখন আসল, তখন ছিল ভীষণ গরম। পথ ছিল দীর্ঘ এবং স্থান ছিল বিশাল মরুভূমি। আর শত্রুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেদিকে যাত্রা করবেন, তা বলে দিলেন। যাতে তারা তাদের যুদ্ধের সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তখন তার সাথে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ছিলেন। তবে তাঁদের নাম কোন রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ ছিল না।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, ফলে যদি কেউ যুদ্ধে না যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করত, তাহ’লে সহজেই তা করতে পারত, যতক্ষণ না তার বিষয়ে অহি নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এমন এক সময় এ অভিযান শুরু করেছিলেন, যখন ফলমূল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়ার সময় ছিল। রাসূল (সাঃ) এবং তাঁর সাথে সকল মুসলমান যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। আমিও প্রত্যহ সকালে তাঁদের সাথে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু ফিরে এসে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। শুধু মনে মনে বলতাম, ‘আমি তো যে কোন সময় প্রস্ত্তত হওয়ার ক্ষমতা রাখি। এভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আমার সময় কেটে যেতে লাগল। পক্ষান্তরে লোকেরা পুরোদমে প্রস্ত্ততি নিয়ে ফেলল।

    একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুসলমানদের নিয়ে রওয়ানা দিলেন। অথচ তখনো আমি কোন প্রকার প্রস্ত্ততি নেইনি। মনে মনে ভাবলাম, ‘দু’এক দিন পরে প্রস্ত্ততি নিয়েও তাঁদের সঙ্গে মিলিত হ’তে পারব’। তারা চলে যাওয়ার  পর একদা আমি মসজিদে গেলাম এবং প্রস্ত্ততি নেওয়ার পরিকল্পনা করলাম কিন্তু সিদ্ধান্তহীনভাবে ফিরে আসলাম। পরদিন সকালে যাওয়ার নিয়ত করলাম, কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত না নিয়েই ফিরে আসলাম। আমার এ দোদুল্যমনতার মাঝে মুসলিম সেনারা দ্রুত চলছিলেন এবং বহুদূর চলে গেলেন। আর আমি রওনা দিয়ে তাঁদের ধরে ফেলার ইচ্ছা পোষণ করতে থাকলাম। আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম (তাহ’লে ভালই হ’ত)! কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চলে যাওয়ার পর আমি যখন বাইরে বের হ’তাম, তখন পথে-ঘাটে মুনাফিকদেরকে অথবা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন, তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। আর এটা আমাকে চিন্তান্বিত করে তুলত।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাবূকে পৌঁছার আগে পর্যন্ত আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন না, তবে তাবূকে পৌঁছে যখন তিনি সবাইকে নিয়ে বসলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কা‘বের কি হ’ল’? বনী সালামার একজন ব্যক্তি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! তাঁর বসন-ভূষণ ও অহংকারই তাঁকে বাধা দিয়েছে’। মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) বললেন, ‘তুমি নিতান্তই বাজে কথা বললে। আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমরা তার ব্যাপারে ভাল বৈ আর কিছুই জানি না’। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চুপ করে থাকলেন।

    কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে অবহিত হ’লাম, তখন আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। ভাবতে লাগলাম, কোন মিথ্যা তালবাহানা করা যায় কি-না? যার মাধ্যমে আগামীকাল আমি তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচতে পারি। এ ব্যাপারে পরিবারের কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তির পরামর্শও চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন বলা হ’ল যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনার একেবারে নিকটে এসে পৌঁছে গেছেন, তখন আমার মন থেকে বাতিল ধ্যান-ধারণা বিদূরিত হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, তাঁর নিকট মিথ্যা বলে আমি মুক্তি পাব না। সুতরাং সত্য বলার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী হ’লাম।

    সকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় পৌঁছে গেলেন। আর তাঁর নিয়ম ছিল যখনই তিনি সফর থেকে ফিরে আসতেন, প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং সেখানে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন। তারপর লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বসে যেতেন। যখন তিনি ছালাত শেষ করে (মসজিদে নববীতে) বসে গেলেন, তখন তাবূক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা লোকেরা আসতে লাগল। তাঁরা হলফ করে নিজেদের ওযর পেশ করতে লাগল। এদের সংখ্যা ছিল আশির ঊর্ধ্বে। বাহ্যিক অবস্থার বিচারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের ওযর কবুল করতঃ তাদের কাছ থেকে পুনরায় বায়‘আত নিয়ে তাদের মাগফিরাতের জন্য দো‘আ করলেন এবং তাদের মনের গোপন বিষয় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করলেন।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, ‘আমিও আসলাম তার কাছে। আমি সালাম দিতেই তিনি বিরাগমিশ্রিত মুচকি হেসে বললেন, ‘এস এস’। আমি গিয়ে তাঁর সামনে বসে পড়লাম। অতঃপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি কারণে তুমি পিছনে পড়ে থাকলে? তুমি কি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাহন ক্রয় করনি’? আমি বললাম হ্যাঁ, ক্রয় করেছি’। আরো বললাম, ‘আল্লাহর কসম! যদি আমি আপনার সামনে না বসে দুনিয়ার অন্য কোন লোকের সামনে বসতাম, তাহ’লে আমি নিশ্চিত যে, যে কোন ওযর পেশ করে তাঁর ক্রোধকে নির্বাপিত করতে পারতাম। আর আমি তর্কে পটু। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি জানি, আজ যদি আপনার কাছে মিথ্যা বলে আপনাকে খুশী করে যায়, তাহ’লে অচিরেই আল্লাহ আপনাকে আমার উপর ক্রুদ্ধ করে দিবেন। আর যদি আজ আপনার সাথে সত্য কথা বলে যাই, তাতে আপনি নাখোশ হ’লেও আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। আল্লাহর কসম! আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম! আমি যখন (অর্থাৎ তাবূক যুদ্ধে) আপনাদের থেকে পিছনে থেকে যাই, তখনকার মত আর কোন সময় আমি ততটা শক্তি-সামর্থ্যের ও সচ্ছলতার অধিকারী ছিলাম না’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘যদি আসলে এরূপ হয়, তবে কা‘ব সত্য বলেছে। ঠিক আছে, চলে যাও, দেখ আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি ফায়ছালা দেন’।

    আমি উঠে পড়লাম। বনী সালামার কিছু লোক আমাকে অনুসরণ করতে লাগল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে তুমি কোন পাপ করেছ বলে তো আমরা জানি না। পেছনে থেকে যাওয়া অন্যান্য লোকদের মত তুমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট একটা বাহানা পেশ করতে পারলে না? তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনাই তোমার পাপ মোচনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। তারা আমাকে এমনভাবে তিরস্কার করতে লাগল যে, একপর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে ফিরে গিয়ে আমার প্রথম কথাটিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মনস্থ করলাম। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আমার  মতো নিজের ভুল স্বীকার করেছে এমন আর কাউকেও কি তোমরা সেখানে দেখেছ’? তারা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আরো দু’জন লোককে আমরা দেখেছি, যারা তোমার মত একই কথা বলেছে। আর তাদেরকেও তোমার মতো সেই একই কথা বলা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কারা? লোকেরা জবাব দিল, তারা দু’জন হচ্ছেন  মুরারাহ বিন রাবী আল-‘আমরী এবং হিলাল বিন উমাইয়া আল-ওয়াকেফী। তারা আমার কাছে এমন দু’জন সৎ লোকের কথা বললেন, যাঁরা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আদর্শস্থানীয় ছিলেন। তাঁদের দু’জনের কথা শুনে আমি চলতে শুরু করলাম।

    এদিকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের মধ্য থেকে আমাদের এ তিনজনের সাথে কথা বলা সমস্ত মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন। কাজেই লোকেরা আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং আমাদের  প্রতি তাদের আচরণ পরিবর্তন করে ফেলল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হ’তে লাগল যে, চিরচেনা দুনিয়া যেন অচেনা হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমরা ৫০ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার সাথীদ্বয় নীরব হয়ে ঘরের মধ্যে বসে গেলেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তবে আমি ছিলাম খুব শক্তিশালী ও ধৈর্যশীল যুবক। তাই আমি বাইরে বের হয়ে মুসলমানদের সাথে ছালাতে যোগ দিতাম এবং বাজারে ঘুরাফিরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না। আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে আসতাম। তিনি যখন ছালাতের পর মজলিসে বসতেন, আমি তাঁকে সালাম দিতাম। আমি মনে মনে বলতাম, আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়ল, কি নড়ল না? তারপর আমি তাঁর সন্নিকটে ছালাত আদায় করতাম। আমি আড়চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখতাম। কাজেই দেখতে পেতাম যে, যখন আমি ছালাতে মশগূল থাকি, তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার আমি যখন তাঁর দিকে দৃষ্টি দিতাম, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লোকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকল।

    একদিন আমার চাচাত ভাই আবূ ক্বাতাদাহর বাগানের প্রাচীর টপকে তার কাছে আসলাম। সে ছিল আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমি তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি তাকে বললাম, হে আবূ ক্বাতাদাহ! আল্লাহর দোহায় দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি জান না, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে ভালবাসি? সে চুপ করে থাকল। আমি আবার আল্লাহর নামে কসম  করে তাকে এ প্রশ্ন করলাম। এবারও সে চুপ করে থাকল। আমি তৃতীয়বার তাকে একই প্রশ্ন করলাম। এবার সে জবাব দিল, ’(এ ব্যাপারে) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন’। (এতদশ্রবণে) আমার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।  অতঃপর প্রাচীর টপকে পুনরায় ফিরে এলাম।

    কা‘ব বলেন, ইত্যবসরে একদিন আমি মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম। সিরিয়ার একজন খৃষ্টান কৃষক মদীনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি করতে এসেছিল। সে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করছিল, কে আমাকে কা‘ব বিন মালিকের ঠিকানা বলে দিতে পারে? তখন লোকেরা তাকে ইশারা করে দেখিয়ে দিল। সে আমার কাছে এসে গাস্সানের রাজার একটি চিঠি আমার হাতে অর্পণ করল। তাতে লেখা ছিল, ‘পর সমাচার এই যে, আমি জানতে পেরেছি আপনার সাথী আপনার উপর যুলুম করেছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেননি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন। আমরা আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব’। চিঠিটা পড়ে আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। কাজেই আমি চুলা খুঁজে চিঠিটা আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম।

    এভাবে ৫০ দিনের মধ্যে ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এমন সময় আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর একজন দূত এসে বললেন, রাসূল (সাঃ) তোমাকে তোমার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বললাম, আমি কি তাকে তালাক দিব, না কি করব? তিনি বললেন, না, তালাক দিবে না। বরং তার থেকে পৃথক থাকবে এবং তার কাছে ঘেঁষবে না। আমার অন্য দু’জন সাথীর কাছেও এ মর্মে দূত পাঠানো হ’ল। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আর আল্লাহ আমার এ ব্যাপারে কোন ফায়ছালা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান কর।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী রাসূল (সাঃ)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! হিলাল বিন উমাইয়া অতিশয় বৃদ্ধ। তার কোন সেবক নেই। যদি আমি তার সেবা করি, তবে কি আপনি অপসন্দ করবেন? তিনি জবাব দিলেন, না, তবে সে যেন তোমার কাছে না ঘেঁষে। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তার মধ্যে এ কাজের প্রতি উৎসাহবোধ-ই নেই। আল্লাহর কসম! যেদিন থেকে এ ঘটনা ঘটেছে সেদিন থেকে অদ্যাবধি সে কাঁদছে।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, আমাকেও আমার পরিবারের কেউ কেউ বলল, তুমিও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূল (সাঃ)-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এস, যাতে সে তোমার সেবা করতে পারে, যেমন হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী তার স্বামীর সেবা করার ব্যাপারে অনুমতি নিয়ে এসেছে। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি রাসূল (সাঃ)-এর কাছে কোন অনুমতি আনতে যাব না। জানি না যখন আমি এ ব্যাপারে অনুমতি চাইব, তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কি বলবেন। কারণ আমি একজন যুবক। এভাবে আরো দশদিন  অতিবাহিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর পঞ্চাশতম রাত্রিটিও অতিক্রম করল। ঐদিন সকালে ফজরের ছালাত আদায় করলাম এবং আমাদের এক ঘরের ছাদে বসেছিলাম, যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। মনে হচ্ছিল, জীবন ধারণ আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং পৃথিবী যেন তার সমস্ত বিস্তীর্ণতা সত্ত্বেও আমার জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন সময় আমি সাল‘ (سلع) পর্বতের উপর উচ্চৈঃস্বরে চীৎকারকারী একজনের শব্দ শুনতে পেলাম। সে চীৎকার করে বলছে, হে কা‘ব বিন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ কর!

    কা‘ব বলেন, আমি আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে গেলাম। আমি অনুধাবন করতে পারলাম যে, এবার সংকট কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফজরের ছালাতের পর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করেছেন। কাজেই লোকেরা আমার ও আমার অপর দু’জন সাথীর কাছে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আসতে লাগল। একজন তো ঘোড়ায় চড়ে এক দৌড়ে আমার কাছে আসলেন এবং আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি দৌড়িয়ে পাহাড়ে উঠলেন। তার কথা অশ্বারোহীর চেয়েও দ্রুততর হ’ল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল, তখন সুসংবাদ দেয়ার প্রতিদান স্বরূপ আমার পোশাক জোড়া খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম! তখন আমার কাছে ঐ পোশাক জোড়া ছাড়া আর কোন কাপড় ছিল না । তারপর আমি এক জোড়া পোষাক ধার করে নিলাম এবং তা পরিধান করে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের নিমিত্তে বের হ’লাম। পথে দলে দলে লোকজন আমার সাথে সাক্ষাৎ করছিল এবং তওবা কবুল হওয়ার জন্য তারা আমাকে মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তারা বলছিল, তোমার তওবা কবুল করে আল্লাহ তোমাকে যে পুরষ্কৃত করেছেন, এজন্য তোমাকে মুবারকবাদ। কা‘ব (রাঃ) বলেন, এভাবে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন। ত্বালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে দেখে দৌড়ে এসে মুছাফাহা করলেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর কমস! মুহাজিরদের মধ্য থেকে সে ব্যতীত অন্য কেউ এভাবে এসে আমাকে ধন্যবাদ জানায়নি। আমি কোনদিন তাঁর অনুগ্রহ ভুলব না।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সালাম দিলাম। তখন খুশীতে তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। রাসূল (সাঃ) বললেন, (হে কা‘ব)! তোমার মা তোমাকে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত অতিক্রান্ত দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর! কা‘ব বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এ (ক্ষমা) আপনার পক্ষ থেকে, না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, না, এ তো আল্লাহর পক্ষ থেকে।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন খুশী হ’তেন, তখন তাঁর চেহারা এক ফালি চাঁদের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমরা চেহারা দেখে তাঁর খুশী বুঝতে পারলাম। তারপর আমি তাঁর সামনে বসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার তওবা কবুলের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ  আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের পথে ছাদাক্বা করে দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ সাঃ) বললেন, তোমার সম্পদের কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দাও। তাতে তোমার কল্যাণ হবে। আমি বললাম, তাহ’লে আমি শুধু খায়বারের অংশটুকুই আমার জন্য রাখলাম। তারপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ এবার সত্য কথা বলার কারণে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। কাজেই আমার এ তওবা কবুল হওয়ার কারণে আমি জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে সত্য কথাই বলতে থাকব। আল্লাহর কসম! আমি জানি না, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে সত্য কথা বলার কারণে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ আমার প্রতি যে মেহেরবানী করেছেন, তেমনটি আর কোন মুসলমানের উপর করেছেন কি-না। আর রাসূল (সাঃ)-কে যেদিন থেকে এ কথা  বলেছি, সেদিন থেকে সজ্ঞানে মিথ্যা কথা বলিনি। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহ আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচাবেন বলে আশা করি। আর আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হ’লেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনছারদের প্রতি যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটকালে- এমনকি যখন তাদের এ দলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি তো তাদের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য তা সংকুচিত হয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যা, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন ব্যতীত, পরে তিনি তাদের তওবা কবুল করলেন যাতে তারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও’ (তওবা ১১৭-১১৯)।

    আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহণ করার পর এর চাইতে উৎকৃষ্ট আর কোন অনুগ্রহ আল্লাহ আমার উপর করেননি যে, রাসূল (সাঃ)-এর সামনে সত্য বলার তাওফীক্ব দান করে আমাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। অন্যথা অন্যান্য মিথ্যাবাদীদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। কারণ অহি যখন  নাযিল হচ্ছিল (অর্থাৎ রাসূল (সাঃ)-এর জীবদ্দশায়), সে সময় যারা মিথ্যা বলেছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ যে মারাত্মক কথা বলেছিলেন, তা আর কারো সম্পর্কে বলেননি। মহান আল্লাহ বলেছিলেন, ‘তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে অচিরেই তারা আল্লাহর শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে। তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের নিকট শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হও। তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হ’লেও আল্লাহ তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না’ (তওবা ৯৫-৯৬)।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, আর আমরা তিনজন সেসব লোকদের থেকে  আলাদা, যারা তাদের যুদ্ধে না যাওয়ার  জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে মিথ্যা শপথ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের কথা মেনে নিয়ে তাদেরকে বায়‘আত করিয়েছিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটি তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন (আল্লাহর উপর)। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ যে ব্যাপারে ফায়ছালা দিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই তিনজন, যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল’ (তওবা ১১৮)। (অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন)। যারা জেনে বুঝে জিহাদ থেকে পেছনে থেকে গিয়েছিল, তাদের কথা এখানে বলা হয়নি। বরং এখানে কেবল আমাদের (তিনজনের) কথা বলা হয়েছিল। আর যারা হলফ করেছিল ও ওযর পেশ করেছিল এবং তাদের ওযর রাসূল (সাঃ) গ্রহণ করেছিলেন তাদের থেকে আমাদের ব্যাপারে ফায়ছালাটি পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    [ছহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮ ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘কা‘ব বিন মালিকের ঘটনা’ অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/২৭৬৯, ‘তওবা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯]

    শিক্ষা :

    ১. সত্য কথা বিপদ থেকে মুক্তি দেয়।

    ২. কোন আনন্দের সংবাদে দিশেহারা না হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ।

    ৩. মুমিন ব্যক্তি তার কর্তব্য পালনে অবহেলা করলে ব্যথিত-মর্মাহত হয়।

    ৪. মুমিন তার ভাইকে কখনো লাঞ্ছিত-অপদস্থ-অপমানিত করবে না; বরং তার মান-সম্মান রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।

    ৫. মুমিন ব্যক্তি কোন প্রলোভনে পড়ে তার দ্বীন-ধর্মকে বিকিয়ে দিতে পারে না।

    যদি মানুষ শয়তানী প্ররোচনায় পাপ করে ফেলে তাহ’লে সে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হ’তে পারে।

    যমযম কূপ ও কা ‘ বাঘর নির্মাণের ঘটনা

    হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) শিশুপুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মা হাযেরাকে নিয়ে বের হ’লেন এমন অবস্থায় যে, হাযেরা তাকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা‘বাঘর অবস্থিত ইবরাহীম (আঃ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপর অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে রাখলেন। সে সময় মক্কায় ছিল না কোন জন-মানব, ছিল না কোন পানির ব্যবস্থা। তিনি একটি থলিতে খেজুর ও একটি মশকে সামান্য পানিসহ তাদেরকে সেখানে রেখে ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আঃ)-এর  মা পিছনে চলতে লাগলেন এবং বললেন, ‘হে ইবরাহীম! এই উপত্যকায় আমাদের রেখে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এখানে না আছে কোন মানুষ, না আছে পানাহারের ব্যবস্থা’। তিনি এ কথাটি তাঁকে বার বার বলতে থাকলেন। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর কথায় কান না দিয়ে চলতেই থাকলেন। অতঃপর হযরত হাযেরা জানতে চাইলেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ’। তখন হাযেরা বললেন, ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না’। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আঃ) সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখান থেকে স্ত্রী-পুত্র তাকে দেখতে পাচ্ছে না। সে সময় তিনি কা‘বার দিকে মুখ করে দু’হাত তুলে এ দো‘আ করলেন, ‘প্রভু হে! আমি আমার স্ত্রী ও পুত্রকে চাষাবাদহীন বিরান ভূমিতে তোমার সম্মানিত গৃহের সন্নিকটে  রেখে গেলাম। যাতে তারা ছালাত আদায় করতে পারে। তুমি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফলাদি দারা রূযী দান কর, যাতে তারা তোমার শুকরিয়া আদায় করতে পারে’ (ইবরাহীম ৩৭)।

    (এ দো‘আ করে  ইবরাহীম (আঃ) চলে গেলেন)। আর ইসমাঈল (আঃ)-এর মা  তাঁকে তার বুকের দুধ পান করাতেন আর নিজে সেই মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে তিনি পিপাসিত হ’লেন এবং তাঁর শিশুপুত্রটিও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা বর্ণনাকারী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশুপুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হওয়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ‘ছাফা’-কে একমাত্র তাঁর নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি উপরে উঠে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় কি-না তা দেখতে লাগলেন। কাউকে না পেয়ে ছাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমনকি যখন তিনি নীচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মতো ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ‘মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তাঁর উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কি-না? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।

    হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘এজন্যই মানুষ হজ্জ ও ওমরাহর সময় উক্ত পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার সাঈ করে থাকে’। এরপর তিনি যখন ‘মারওয়া’ পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি একাগ্রচিত্তে মনোযোগ দিয়ে শুনে বললেন, ‘তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। তোমার কাছে কোন সাহায্যকারী থাকলে আমাকে সাহায্য কর’। অতঃপর তিনি যমযমের নিকট একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। যিনি নিজের পায়ের গোড়ালি বা ডানা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন, আর অমনি মাটি ফেটে পানি বের হ’তে লাগল। তখন হাযেরা (আঃ) চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে একে হাউযের ন্যায় করে দিলেন এবং কোষ দ্বারা মশকটি ভরে নিলেন। কিন্তু তখনও পানি উপচে উঠতে থাকল।

    হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন! যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে বা কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করে যমযমকে ঐভাবে ছেড়ে দিতেন, তবে  উহা একটি কূপ না হয়ে প্রবাহমান ঝর্ণায় পরিণত হ’ত’। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি পান করলেন এবং তার পুত্রকে দুধ পান করালেন।

    ফেরেশতা তাকে (হাযেরা) বললেন, ‘আপনি ধ্বংসের ভয় করবেন না। কারণ এখানে রয়েছে আল্লাহর ঘর। এ শিশুটি এবং তার পিতা দু’জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে ধ্বংস করবেন না’। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। এরপর হাযেরা এভাবেই এখানে দিন যাপন করতে থাকেন।

    অতঃপর এক সময় ‘জুরহুম’ গোত্রের একদল লোক তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল অথবা রাবী বলেন ‘জুরহুম’ পরিবারের কিছু লোক ‘কাদা’ নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কার নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং একঝাঁক পাখিকে চক্রাকারে উড়তে দেখতে পেল । তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হ’ল। রাবী বলেন, ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ বলে তাদের মত প্রকাশ করল।

    হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, এ ঘটনা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাকে মানুষের সাহচর্যে থাকার সুযোগ করে দিল। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। অবশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হ’ল। আর ইসমাঈল (আঃ)ও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের কাছ থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পদার্পণ করে তিনি তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাদেরই একটি মেয়ের সাথে ইসমাঈল (আঃ)-এর বিবাহ দিলেন। ইতিমধ্যে হাযেরা মারা গেলেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈল (আঃ)-কে পেলেন না। তিনি ইসমাঈল (আঃ)-এর স্ত্রীর নিকট তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। পুত্রবধূ বলল, ‘তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি তাদের জীবিকা ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন ইসমাঈলের স্ত্রী দুর্দশার অভিযোগ করে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি’। এ কথা শুনে ইবরাহীম (আঃ) বললেন, ‘তোমার স্বামী বাড়ী আসলে আমার সালাম দিয়ে তার ঘরের চৌকাঠ বদলিয়ে নিতে বলবে’।

    এরপর  যখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বাড়ী আসলেন, তখন যেন তিনি কিছু আঁচ করতে পারলেন। তিনি বললেন, তোমার নিকট কোন ব্যক্তি এসেছিল কি? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। আমাদের নিকট এরূপ একজন বৃদ্ধ এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাকে আপনার খবর দেই। তিনি আমাদের জীবন-জীবিকা কিভাবে চলছে তা জিজ্ঞেস করেন। তখন আমি তাকে বলি, আমরা খুব কষ্টে ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে কোন বিষয়ের অছিয়ত করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি তার সালাম আপনাকে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং বলেছেন, তোমার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে নিও। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ‘উনি আমার পিতা। তিনি আমাকে তোমাকে পৃথক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি তোমার আপনজনদের কাছে চলে যাও’। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিয়ে অপর একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন।

    অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে আল্লাহ যতদিন চাইলেন ততদিন দূরে থাকলেন। অতঃপর তিনি আবার তাদের দেখতে আসলেন। এবারেও তিনি পুত্রকে দেখতে পেলেন না। পুত্রবধূকে তার পুত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। এরপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, তোমরা কেমন আছ? অতঃপর তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, আমরা ভাল ও সচ্ছল আছি এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কি? সে বলল, গোশত। তিনি আবার বললেন, ‘তোমাদের পানীয় কি? সে বলল, পানি। ইবরাহীম (আঃ) দো‘আ করলেন, ‘হে আল্লাহ! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূল (সাঃ) বলেন, তাদের জন্য তখন শস্য ছিল না। যদি থাকত তাহলে তিনি তাতে বরকত দানের জন্য দো‘আ করতেন। রাবী বলেন, মক্কা ব্যতীত অন্য কোথাও কেউ শুধু পানি ও গোশত দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা শুধু গোশত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হ’তে পারে না।

    ইবরাহীম (আঃ) বললেন, ‘তোমার স্বামী ঘরে ফিরে আসলে আমার সালাম দিয়ে তার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখার কথা বলবে’। অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) বাড়ী এসে বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে কোন বিষয়ের অছিয়ত করে গেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আমার পিতা, আর তুমি আমার ঘরের চৌকাঠ। তিনি আমাকে তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

    আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) বহুদিন পর এসে দেখেন তার পুত্র যমযম কূপের নিকটে একটি বড় গাছের নীচে বসে তীর মেরামত করছেন। পিতাকে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর পিতা ছেলের সাথে বা ছেলে পিতার সাথে সাক্ষাৎ হ’লে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, ‘হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আপনার প্রভু আপনাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করুন। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে? ইসমাঈল বললেন, আমি আপনাকে সাহায্য করব। ইবরাহীম (আঃ) বললেন, আল্লাহ এখানে আমাকে একটি ঘর নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। একথা বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইঙ্গিত করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি বাপ-বেটা কা‘বাঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আঃ) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেওয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আঃ) (মাক্বামে ইবরাহীম নামক) পাথরটি আনলেন এবং যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আঃ) তাকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তারা উভয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ করলেন যে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাত’ (বাক্বারাহ ১২৭)। তাঁরা উভয়ে আবার কা‘বাঘর তৈরি করতে থাকেন এবং কা‘বাঘরের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে এ দো‘আ করতে থাকেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন’ (বাক্বারাহ ১২৭; ছহীহ বুখারী হা/৩৩৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯)।

    শিক্ষা :

    ১. আল্লাহর হুকুমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে স্ত্রী-পুত্রসহ সবকিছু ত্যাগ করতে হবে।

    ২. সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে ও তাঁর উপর ভরসা করতে হবে। কোন অবস্থাতেই ধৈর্যহারা হওয়া চলবে না।

    ৩. পরিবার ও সন্তান-সন্ততির জন্য দো‘আ করতে হবে।

    ৪. একক নয়; বরং যৌথ উদ্যোগে সামাজিক কাজ সম্পাদন করতে হবে।

    ৫. হাযেরার মতো সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারীণী হওয়ার জন্য মা-বোনদের সচেষ্ট হ’তে হবে।

    আল্লাহর আনুগত্য ও ধৈর্যের পরিণাম সর্বদা কল্যাণকরই হয়।

    দোলনায় কথা বলা তিন শিশু

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, (বনী ইসরাঈলের মধ্যে) তিন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই দোলনায় কথা বলেনি।

    (১) ঈসা ইবনে মারইয়াম। [মারইয়াম (আঃ)-এর গর্ভে ঈসা (আঃ) অলৌকিক ভাবে জন্মগ্রহণ করলে লোকজন তার ব্যাপারে সন্দিহান হ’ল। তখন মারইয়াম (আঃ)-এর ইঙ্গিতে মূসা (আঃ) তাঁর মাতার পক্ষ থেকে জবাব দিয়ে বললেন, ‘আমি আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব (ইনজীল) প্রদান করেছেন এবং আমাকে নবী করেছেন’। ‘আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন ছালাত ও যাকাত আদায় করতে এবং আমার মায়ের অনুগত থাকতে। আল্লাহ আমাকে উদ্ধত ও হতভাগা করেননি’। ‘আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন জীবিত পুনরুত্থিত হব’ (মারিয়াম ১৯/২৯-৩৩)]।

    (২) ছাহেবে জুরাইজ (জুরাইজের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বাচ্চা)। জুরাইজ একজন আবেদ বান্দা ছিলেন। তিনি নিজের জন্য একটি ইবাদতগাহ তৈরী করলেন। তিনি সেখানে থাকা অবস্থায় একদিন তার মা সেখানে আসলেন। এ সময় তিনি ছালাতে রত ছিলেন। তার মা বললেন, ‘হে জুরাইজ! তখন তিনি (মনে মনে) বলেন, ‘হে প্রভু! একদিকে আমার ছালাত আর অন্যদিকে আমার মা’। জুরাইজ ছালাতেই রত থাকলেন। তার মা চলে গেলেন। পরবর্তী দিন তার মা আসলেন । এবারও তিনি ছালাতে মগ্ন ছিলেন। তার মা তাকে ডাকলেন, ‘হে জুরাইজ’! তিনি (মনে মনে) বলেন, ‘হে প্রভু! একদিকে আমার ছালাত আর অন্যদিকে আমার মা’। তিনি তার ছালাতেই ব্যস্ত থাকলেন। এভাবে তৃতীয় দিনেও জুরাইজ একই কাজ করলে তার মা বললেন, ‘হে আল্লাহ! একে তুমি যেনাকারী নারীর মুখ না দেখা পর্যন্ত মৃত্যু দিও না’।

    বনী ইসরাঈলের মধ্যে জুরাইজ ও তার ইবাদতের কথা আলোচিত হ’তে লাগল। এক ব্যভিচারী নারী ছিল। সে উল্লেখযোগ্য রূপ-সৌন্দর্যের অধিকারিণী ছিল। সে বলল, তোমরা যদি চাও, আমি তাকে (জুরাইজ) বিভ্রান্ত করতে পারি। সে তাকে ফুসলাতে লাগল, কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না। অতঃপর সে তার ইবাদতগাহের কাছাকাছি এলাকায় এক রাখালের কাছে আসল। সে নিজের উপর তাকে অধিকার দিল এবং উভয়ে ব্যভিচারে লিপ্ত হ’ল। এতে সে গর্ভবতী হ’ল। সে বাচ্চা প্রসব করে বলল, এটা জুরাইজের সন্তান। বনী ইসরাঈল (ক্ষিপ্ত হয়ে) তার কাছে এসে তাকে ইবাদতগাহ থেকে বের করে আনল, তার ইবাদতগাহ ধূলিসাৎ করে দিল এবং তাকে মারধর করতে লাগল। জুরাইজ বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? তারা বলল, তুমি এই নষ্টা মহিলার সাথে যেনা করেছ। ফলে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তিনি বললেন, শিশুটি কোথায়? তারা শিশুটিকে নিয়ে আসল। জুরাইজ বললেন, আমাকে একটু সুযোগ দাও ছালাত আদায় করে নেই। তিনি ছালাত আদায় করলেন। ছালাত শেষ করে তিনি শিশুটির কাছে এসে তার পেটে খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই শিশু! তোমার পিতা কে’? সে বলল, ‘আমার পিতা অমুক রাখাল’। উপস্থিত লোকেরা তখন জুরাইজের নিকটে এসে তাকে চুম্বন করতে লাগল এবং তার শরীরে হাত বুলাতে লাগল। আর তারা বলল, এখন আমরা তোমার ইবাদতগাহটি সোনা দিয়ে তেরী করে দিচ্ছি। তিনি বললেন, দরকার নেই, বরং পূর্বের মত মাটি দিয়েই তৈরী করে দাও। অতঃপর তারা তাই করল।

    (৩) একটি শিশু তার মায়ের দুধ পান করছিল। এমন সময় একটি লোক দ্রুতগামী ও উন্নত মানের একটি পশুতে সওয়ার হয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তার পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল উন্নত। শিশুটির মা বলল, ‘হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে এই ব্যক্তির মত যোগ্য কর’। শিশুটি দুধ পান ছেড়ে দিয়ে লোকটির দিকে এগিয়ে এসে তাকে দেখতে লাগল। অতঃপর বলল, ‘হে আল্লাহ!  আমাকে এই ব্যক্তির মত কর না’? অতঃপর ফিরে এসে পুনরায় মায়ের দুধ পান করতে লাগল। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি যেন এখনও দেখছি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিশুটির দুধ পানের চিত্র তুলে ধরছেন এবং নিজের তর্জনী মুখে দিয়ে চুষছেন। তিনি বলেন, লোকেরা একটি বাঁদিকে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল। আর বলছিল, তুমি যেনা করেছ এবং চুরি করেছ। মেয়ে লোকটি বলছিল, ‘আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম অভিভাবক’। শিশুটির  মা বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তানকে এই নষ্টা নারীর মত কর না’। শিশুটি দুধ পান ছেড়ে দিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল, অতঃপর বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এই নারীর মত কর’।

    এ সময় মা ও শিশুটির মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। মা বলল, হায় দুর্ভাগা! একটি সুশ্রী লোক চলে যাওয়ার সময় আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ!  আমার  সন্তানকে এরূপ যোগ্য করে দাও’। তুমি প্রত্যুত্তরে বললে, ‘হে আল্লাহ!  আমাকে এর মত কর না’। আবার এই ক্রীতদাসীকে লোকেরা মারধর করতে করতে নিয়ে যাচ্ছে এবং বলছে, তুমি যেনা করেছ এবং চুরি করেছ। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এরূপ কর না’। আর তুমি বললে,‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এরূপ কর’। শিশুটি এবার জবাব দিল, প্রথম ব্যক্তি ছিল স্বৈরাচারী যালেম। সেজন্যই আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এ ব্যক্তির মত কর না? আর এই মহিলাটিকে তারা বলল, তুমি যেনা করেছ। প্রকৃতপক্ষে সে যেনা করেনি। তারা বলছিল, তুমি চুরি করেছ। আসলে সে চুরি করেনি। এজন্যই আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এই মেয়ে লোকটির মত কর’ (বুখারী হা/৩৪৩৬ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৮, হা/২৪৮২ ‘মাযালিম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৫; মুসলিম হা/২৫৫০ ‘সদ্ব্যবহার ও শিষ্টাচার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২)।

    শিক্ষা :

    ১. আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা থাকলে কেউ পদস্খলন ঘটাতে পারবে না।

    ২. কোন হক্বপন্থী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যতই ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন, তা একদিন সত্যরূপে প্রকাশিত হবেই এবং ষড়যন্ত্রকারীরা লজ্জিত হবে।

    ৩. আমরা যাকে ভাল মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সে ভাল নাও হ’তে পারে। পক্ষান্তরে যাকে খারাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সে খারাপ নাও হ’তে পারে।

    ৪. সর্বদা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে।

    একজন খুনীর তওবা ও জান্নাত লাভ

    বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি নিরানববই জন মানুষকে হত্যা করে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করল। অতঃপর তাকে একজন খৃষ্টান পাদ্রীর কথা বলা হ’লে সে তার নিকট এসে বলল যে, সে নিরানববইজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এমতাবস্থায় তার জন্য তওবার কোন সুযোগ আছে কি? পাদ্রী বলল, নেই। ফলে লোকটি পাদ্রীকেও হত্যা করল। এভাবে তাকে হত্যা করে সে একশত সংখ্যা পূর্ণ করল। অতঃপর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করায় তাকে একজন আলেমের কথা বলা হ’ল। সে তাঁর নিকট গিয়ে বলল যে, সে একশ’জনকে হত্যা করেছে, এখন তার জন্য তওবার কোন সুযোগ আছে কি? আলেম বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে। তার ও তার তওবার মাঝে কিসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল? তুমি অমুক জায়গায় চলে যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদত করছে। তুমিও তাদের সাথে ইবাদত কর। আর তোমার দেশে ফিরে যাবে না। কেননা ওটা খারাপ জায়গা। লোকটি নির্দেশিত জায়গার দিকে চলতে থাকল।

    অর্ধেক পথ অতিক্রম করলে তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হ’ল। সে তার বক্ষদেশ দ্বারা সে স্থানটির দিকে ঘুরে গেল। মৃত্যুর পর রহমতের ও আযাবের ফেরেশতামন্ডলীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। রহমতের ফেরেশতা বলল, এ লোকটি নিখাদ তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। পক্ষান্তরে আযাবের ফেরেশতা বলল, লোকটিতো কখনও কোন ভাল কাজ করেনি। এমন সময় অন্য এক ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে তাদের নিকট আগমন করলেন। তখন তারা তাকেই এ বিষয়ের শালিস নিযুক্ত করল। তিনি বললেন, ‘তোমরা উভয় দিকের জায়গার দূরত্ব মেপে দেখ। যে দিকটি নিকটবর্তী হবে, সে দিকেরই সে অন্তর্ভুক্ত হবে’। আল্লাহ তা‘আলা সামনের ভূমিকে আদেশ করলেন, তুমি মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী হয়ে যাও এবং পিছনে ফেলে আসা স্থানকে আদেশ দিলেন, তুমি দূরে সরে যাও। অতঃপর জায়গা পরিমাপের পর যেদিকের উদ্দেশ্যে সে যাত্রা করেছিল, তারা তাকে সেদিকেরই এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী পেল। ফলে তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হ’ল এবং রহমতের ফেরেশতা তার জান কবয করল (আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৭০, মুসলিম হা/২৭৬৬, মিশকাত হা/২৩২৭ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়, ‘ইস্তিগফার ও তওবা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. পাপী যদি পাহাড় পরিমাণও পাপ করে তবুও সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে খালেছ অন্তরে তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। যেমন তিনি বলেন, ‘বল, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর অনুগ্রহ হ’তে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (যুমার ৫৩)। তিনি আরো বলেন, ‘তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন’ (শূরা ২৫)।

    ২. মূর্খ ব্যক্তি কোন সমস্যায় পড়লে কুরআন-সুন্নাহ্তে অভিজ্ঞ কোন আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করে তার সমস্যার সমাধান করে নিবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা না জান তাহ’লে সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহ জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর’ (নাহল ৪৪)।

    ৩. কোন বিষয়ে যথাযথভাবে না জেনে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।

    ইবরাহীম  ( আঃ ),  সারা ও অত্যাচারী বাদশাহ

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবরাহীম (আঃ) তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দু’বার ছিল আল্লাহর ব্যাপারে। তার উক্তি ‘আমি অসুস্থ’ (ছাফফাত ৮৯) এবং তাঁর অন্য এক উক্তি ‘বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি’ (আম্বিয়া ৬৩)। বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি [ইবরাহীম (আঃ)] এবং সারা অত্যাচারী শাসকগণের কোন এক শাসকের এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন তাকে খবর দেয়া হল যে, এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা আছে। তখন সে তাঁর নিকট লোক পাঠাল। সে তাঁকে নারীটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, এ নারীটি কে? তিনি উত্তর দিলেন, মহিলাটি আমার বোন। অতঃপর তিনি সারার নিকট আসলেন এবং বললেন, হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীতে আর কোন মু’মিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে, তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। অতঃপর বাদশাহ সারাকে আনার জন্য লোক পাঠাল। তিনি তার নিকট প্রবেশ করলেন এবং রাজা তার দিকে হাত বাড়াল। সারা অযূ করে ছালাত আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার উপর এবং তোমার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ব্যতীত অন্যদের থেকে আমার লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করেছি। তুমি এই কাফেরকে আমার উপর ক্ষমতা দিও না। তখন রাজা বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে পা দ্বারা আঘাত করতে লাগল। অতঃপর সারা বললেন, হে আল্লাহ! এ যদি মৃত্যুবরণ করে তবে লোকেরা বলবে, মহিলাটি একে হত্যা করেছে। তখন সে জ্ঞান ফিরে পেল। এ ঘটনা আরো দু’বার বা তিনবার ঘটার পর রাজা তার এক দারোয়ানকে ডেকে বলল, তুমি তো আমার নিকট কোন মানুষ আননি। বরং এনেছ এক শয়তান। অতঃপর রাজা সারার খিদমতের জন্য হাজেরাকে দান করল। অতঃপর তিনি (সারা) তাঁর (ইবরাহীম) নিকট আসলেন, তিনি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছিলেন। তখন তিনি হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, কি ঘটেছে? তখন সারা বললেন, আল্লাহ কাফির বা ফাসিকের চক্রান্ত তারই বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাজেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, হে আকাশের পানির (যমযম) ছেলেরা! হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা (বুখারী হা/২২১৭, ৩৩৫৮ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৮, মিশকাত হা/৫৭০৪)।

    শিক্ষা :

    ১.  আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে যাবতীয় বিপদ থেকে রক্ষা করেন।

    ২. সারার ঈমান ও চারিত্রিক দৃঢ়তা সকল মুসলিম রমণীর জন্য অনুকরণীয়।

    ৩. প্রকৃত ঈমানদারদের সংখ্যা সর্বদা কমই হয়ে থাকে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মানদন্ড নয়।

    মূসা  ( আঃ )  ও মালাকুল মঊত

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, মালাকুল মউতকে মূসা (আঃ)-এর নিকট পাঠান হয়েছিল। ফেরেশতা যখন তাঁর নিকট আসলেন, তখন তিনি তাঁকে চপেটাঘাত করলেন। এতে তাঁর একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেল। তখন ফেরেশতা তাঁর রবের নিকট ফিরে গেলেন এবং বললেন, আপনি আমাকে এমন এক বান্দার নিকট পাঠিয়েছেন যে মরতে চায় না। আল্লাহ্ বললেন, তুমি তার নিকট ফিরে যাও এবং তাকে বল, সে যেন তার একটি হাত একটি গরুর পিঠে রাখে, তার হাত যতগুলো পশম ঢাকবে তার প্রতিটি পশমের বদলে তাকে এক বছর করে জীবন দেয়া হবে। মূসা (আঃ) বললেন, হে রব! অতঃপর কি হবে? আল্লাহ্ বললেন, অতঃপর মৃত্যু। মূসা (আঃ) বললেন, তাহ’লে এখনই হোক। রাবী বলেন, তখন তিনি আল্লাহর নিকট আরয করলেন, তাঁকে যেন ‘আরযে মুক্বাদ্দাসা’ (জেরুজালেম) হ’তে একটি পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আমি যদি সেখানে থাকতাম তাহ’লে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পথের ধারে লাল টিলার নীচে তাঁর কবরটি দেখিয়ে দিতাম (বুখারী হা/৩৪০৭ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩১, মুসলিম হা/২৩৭২)।

    শিক্ষা : মৃত্যু চিরসত্য, অনিবার্য। এত্থেকে পালানোর কোন পথ নেই।

    সুলায়মান  ( আঃ )- এর হিকমতপূর্ণ বিচার

    আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, দু’জন মহিলা ছিল, তাদের সাথে দু’টি সন্তানও ছিল। হঠাৎ একটি বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। সঙ্গের একজন মহিলা বলল, ‘তোমার ছেলেটিকেই বাঘে নিয়ে গেছে’। অন্য মহিলাটি বলল, ‘না, বরং বাঘে তোমার ছেলেটি নিয়ে গেছে’। অতঃপর উভয়ে এ বিষয়ে দাঊদ (আঃ)-এর নিকট বিরোধ মীমাংসার জন্য বিচারপ্রার্থী হ’ল। তখন তিনি ছেলেটির বিষয়ে বয়ষ্কা মহিলাটির পক্ষে রায় দিলেন। অতঃপর তারা উভয়ে বেরিয়ে দাঊদ (আঃ)-এর পুত্র সুলায়মান (আঃ)-এর নিকট দিয়ে যেতে লাগল এবং তারা দু’জনে তাঁকে ব্যাপারটি জানালেন। তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, তোমরা আমার নিকট একখানা ছোরা নিয়ে আস। আমি ছেলেটিকে দু’টুকরা করে তাদের দু’জনের মধ্যে ভাগ করে দেই। এ কথা শুনে অল্প বয়ষ্কা মহিলাটি বলে উঠল, তা করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। ছেলেটি তারই। তখন তিনি ছেলেটি সম্পর্কে অল্প বয়ষ্কা মহিলাটির অনুকূলে রায় দিলেন (বুখারী হা/৩৪২৭ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪০, মুসলিম হা/১৭২০, মিশকাত হা/৫৭১৯)।

    শিক্ষা :

    ১. সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা অপরিসীম।

    ২. সুলায়মান (আঃ)-এর বিচক্ষণতা।

    ৩. প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত।

    খিযির ও মূসা  ( আঃ )- এর কাহিনী

    হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হ’তে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) একদা বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ’ল, কোন্ ব্যক্তি সর্বাধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমিই সর্বাধিক জ্ঞানী। জ্ঞানকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ না করার কারণে আল্লাহ তাকে তিরষ্কার করে বললেন, বরং দু’সাগরের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা আছে, যিনি তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁর নিকট পৌঁছতে কে আমাকে সাহায্য করবে? কখনো সুফইয়ান এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমি কিভাবে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি? তখন বলা হ’ল, তুমি একটি থলিতে করে একটি মাছ নাও। যেখানে তুমি মাছটি হারাবে, সেখানেই আমার সে বান্দা আছে। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) একটি মাছ ধরলেন এবং থলিতে রাখলেন। অতঃপর মাছ নিয়ে তাঁর সঙ্গী ইউশা বিন নূনকে সাথে নিয়ে চললেন। শেষ পর্যন্ত তারা একটি পাথরের কাছে পৌঁছলেন এবং তার উপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিলেন। মূসা (আঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলি থেকে বের হয়ে লাফিয়ে সমুদ্রে চলে গেল। অতঃপর সে সমুদ্রে সুড়ঙ্গের মত পথ করে নিল। আর আল্লাহ মাছটির চলার পথে পানির প্রবাহ থামিয়ে দিলেন। ফলে তার গমনপথটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল। অতঃপর তারা উভয়ে অবশিষ্ট রাত এবং পুরো দিন পথ চললেন। পরদিন সকালে হযরত মূসা (আঃ) তাঁর সাথীকে বললেন, আমরা তো সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের খাবার নিয়ে এস।

    হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ যে স্থানে যাবার কথা বলেছিলেন, সেই স্থান অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনরূপ ক্লান্তিবোধ করেননি। সাথী ইউশা বিন নূন তখন বলল, আপনি কি ভেবে দেখেছেন, যে পাথরটির নিকট আমরা বিশ্রাম নিয়েছিলাম সেখানেই মাছটি অদ্ভুতভাবে সমুদ্রের মধ্যে চলে গেছে। কিন্তু আমি মাছটির কথা আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। মূলতঃ শয়তানই আমাকে এ কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, পথটি মাছের জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গের মত আর তাঁদের জন্য ছিল আশ্চর্যজনক ব্যাপার। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, আমরা তো সেই স্থানটিরই অনুসন্ধান করছি। অতঃপর তারা তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললেন এবং ঐ পাথরের নিকটে পৌঁছে দেখলেন, এক ব্যক্তি কাপড় মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। মূসা (আঃ) তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, এখানে সালাম কি করে এলো? তিনি বললেন, আমি মূসা। খিযির জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বনী ইসরাঈল বংশীয় মূসা? মূসা (আঃ) বললেন, হ্যাঁ। আমি এসেছি এজন্য যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা হ’তে আপনি আমাকে শিক্ষা দিবেন। খিযির বললেন, হে মূসা! আমার আল্লাহ প্রদত্ত কিছু জ্ঞান আছে, যা আপনি জানেন না। আর আপনিও আল্লাহ প্রদত্ত এমন কিছু জ্ঞানের অধিকারী, যা আমি জানি না। মূসা (আঃ) বললেন, আমি কি আপনার সাথী হ’তে পারি? খিযির বললেন, ‘আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। যে বিষয় আপনার জ্ঞানের আওতাধীন নয় সে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করবেন কেমন করে? মূসা (আঃ) বললেন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না’ (কাহফ ৬৭-৬৯)।

    অতঃপর তাঁরা দু’জনে সাগরের কিনারা ধরে হেঁটে চললেন। তখন একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা তাদেরকে নৌকায় তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খিযির-কে চিনতে পেরে বিনা ভাড়ায় তাঁদেরকে নৌকায় তুলে নিল। যখন তাঁরা দু’জনে নৌকায় চড়লেন, তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকাটির কিনারায় বসল এবং সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা বা দুই ফোঁটা পানি পান করল। খিযির বললেন, হে মূসা! আমার ও আপনার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান হ’তে ততটুকুও কমেনি যতটুকু এ পাখিটি তাঁর ঠোটের দ্বারা সাগরের পানি হরাস করেছে। তখন খিযির একটি কুড়াল নিয়ে নৌকাটির একটা তক্তা খুলে ফেললেন। মূসা (আঃ) অকস্মাৎ দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেলেন যে, তিনি কুড়াল দিয়ে একটি তক্তা খুলে ফেলেছেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, আপনি একি করলেন? এ লোকেরা বিনা ভাড়ায় আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিল, আর আপনি তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য নৌকা ছিদ্র করে দিলেন? আপনি তো একটি গুরুতর কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার এ ব্যবহারে আমার প্রতি কঠোর হবেন না। মূসা (আঃ)-এর পক্ষ থেকে প্রথম এ কথাটি ছিল ভুলক্রমে।

    অতঃপর তাঁরা যখন উভয়ে সমুদ্র পার হলেন, তখন তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করছিল। খিযির ছেলেটির মাথা দেহ হ’তে ছিন্ন করে ফেললেন। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন? আপনি খুবই খারাপ একটা কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোন প্রশ্ন করি, তাহ’লে আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না।

    অতঃপর উভয়ে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তাঁরা একটি জনপদের অধিবাসীদের নিকট পৌঁছে তাদের নিকট কিছু খাবার চাইলেন। কিন্তু জনপদবাসী তাদের দু’জনের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সেখানে তারা একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন, যা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। হযরত খিযির প্রাচীরটি মেরামত করে সুদৃঢ় করে দিলেন। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, এই বসতির লোকদের নিকট এসে আমরা খাবার চাইলাম। তারা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। অথচ আপনি এদের দেয়াল সোজা করে দিলেন। আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। হযরত খিযির বললেন, এবার আমার এবং আপনার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেল। এক্ষণে যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, আমি এর তাৎপর্য বলে দিচ্ছি।

    নৌকাটির ব্যাপার ছিল এই যে, সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির। তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিতে চাইলাম। কারণ, তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে ভাল নৌকা পেলেই জোরপূর্বক কেড়ে নিত। তারপর যখন এটাকে দখল করতে লোক আসল, তখন ছিদ্রযুক্ত দেখে ছেড়ে দিল। অতঃপর নৌকাওয়ালারা একটা কাঠ দ্বারা নৌকাটি মেরামত করে নিল।

    আর বালকটি সূচনালগ্নেই ছিল কাফের। আর সে ছিল তার ঈমানদার বাবা-মার বড়ই আদরের সন্তান। আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে বড় হয়ে অবাধ্যতা ও কুফরী দ্বারা তাদেরকে কষ্ট দিবে। অতঃপর আমি ইচ্ছা করলাম যে, তাদের পালনকর্তা তাদেরকে তার চেয়ে পবিত্রতায় ও ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর একটি শ্রেষ্ঠ সন্তান দান করুন।

    আর প্রাচীরের ব্যাপার এই যে, সেটি ছিল নগরের দু’জন ইয়াতীম বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন। তাদের পিতা ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করে নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ ইচ্ছায় এসব করিনি। আপনি যে বিষয়গুলোতে ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, এই হ’ল তার ব্যাখ্যা (কাহফ ৭৯-৮২; ছহীহ বুখারী হা/৩৪০১ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, ‘খিযিরের সাথে মূসা (আঃ)-এর কাহিনী’ অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/২৩৮০, ‘ফাযায়েল’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৬)।

    শিক্ষা :

    ১. সকল জ্ঞানের আধার আল্লাহ রাববুল আলামীন। তিনি যাকে যতটুকু ইচ্ছা প্রদান করেন।

    ২. জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ৩. শয়তান সর্বদা মানুষের পিছে পড়ে থাকে। সে তাকে প্রতিনিয়ত আল্লাহবিমুখ করার চেষ্টা করে।

    ৪. জ্ঞান অর্জনের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করা যরূরী।

    ৫. অহংকার করা বা নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী ভাবা ঠিক নয়।

    আবূ ত্বালিবের মৃত্যুর ঘটনা

    সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব (রহঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, যখন আবূ ত্বালিব মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হ’লেন, রাসূল (সাঃ) তার নিকট গেলেন। আবূ জাহলও সেখানে ছিল। নবী (সাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লা-হ’ কালেমাটি একবার পড়ুন, তাহ’লে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব। তখন আবূ জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া বলল, হে আবূ ত্বালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হ’তে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ ত্বালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তা হ’ল, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবী (সাঃ) বললেন, ‘আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়’। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হল ‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, তবুও যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী’ (তওবা ১১৩)। আরো নাযিল হল : ‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না’ (ক্বাছাছ ৫৬; বুখারী হা/৩৮৮৪ ‘আনছারদের মর্যাদা’ অধ্যায়, ‘আবু ত্বালিবের কাহিনী’ অনুচ্ছেদ)।

    আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত যে, তিনি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন তাঁর সামনে তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের আলোচনা করা হ’ল, তখন তিনি বললেন, আশা করি ক্বিয়ামতের দিনে আমার সুফারিশ তার উপকারে আসবে। অর্থাৎ আগুনের হালকা স্তরে তাকে ফেলা হবে। যা তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছবে আর এতে তার মগয টগবগ করে ফুটতে থাকবে (ঐ, হা/৩৮৮৫)।

    শিক্ষা :

    ১. হেদায়াতের মালিক আল্লাহ তা‘আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এজন্য সবসময় তাঁর কাছে হেদায়াত চাইতে হবে।

    ২. জাহান্নামের আযাব অত্যন্ত ভয়াবহ। সবচেয়ে হালকা শাস্তি হওয়ার পরেও যদি আবূ ত্বালিবের এই অবস্থা হয়, তাহ’লে অন্যদের কি অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।

    ৩. সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষকে অনেক সময় হক গ্রহণ থেকে বিমুখ রাখে।

    ছুমামাহর প্রতি রাসূলুল্লাহ  ( সাঃ )- এর উত্তম আচরণের অনুপম নিদর্শন

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার রাসূল (সাঃ) নাজদের দিকে কিছু অশ্বারোহী (সৈন্য) পাঠালেন। তারা বনী হানীফা গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে ধরে আনল। তার নাম ছুমামাহ বিন উছাল। সে ইয়ামামাবাসীদের সরদার। তারা তাকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল। রাসূল (সাঃ) তার কাছে আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তুমি কি মনে করছ’? সে বলল,

    عِنْدِى يَا مُحَمَّدُ خَيْرٌ إِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ تُعْطَ مِنْهُ مَا شِئْتَ-

    ‘হে মুহাম্মাদ! আমার ধারণা ভালই। যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহ’লে অবশ্যই আপনি একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর  যদি আপনি অনুগ্রহ করেন

    , তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি মাল চান, তাহ’লে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা আদায় করা হবে’। তার কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তাকে (সেদিনের মত তার নিজের অবস্থার উপর) ছেড়ে দিলেন।

    অতঃপর পরের দিন নবী করীম (সাঃ) তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তোমার কি মনে হচ্ছে’? সে জবাবে বলল, ‘তাই মনে হচ্ছে, যা আমি আপনাকে পূর্বেই বলেছি। যদি আপনি আমার প্রতি মেহেরবানী করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর মেহেরবানী করবেন। আর যদি আপনি হত্যা করেন, তাহ’লে একজন খুনী লোককে হত্যা করবেন। আর যদি মাল-সম্পদ চান, তাহ’লে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা দেয়া হবে’। রাসূল (সাঃ) আজও তাকে (নিজের অবস্থার উপর) ছেড়ে দিলেন। এভাবে রাসূল (সাঃ) তৃতীয় দিনে  তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তোমার কি মনে হচ্ছে’? জওয়াবে সে বলল, ‘আমার তাই মনে হচ্ছে, যা আমি পূর্বেই আপনাকে বলেছি।  যদি আপনি আমার  প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরই অনুকম্পা করবেন। আর যদি আপনি  আমাকে হত্যা করেন, তাহ’লে একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি মাল-সম্পদ চান, তাহ’লে যতটা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা দেয়া হবে’।

    অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘তোমরা ছুমামাহকে ছেড়ে দাও’! (তাকে ছেড়ে দেওয়া হ’ল)। অতঃপর সে মসজিদের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে বলে উঠল : ‘আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়া রাসূলুহু’। ‘হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারও চেহারা আমার নিকট অধিক ঘৃণ্য ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! (ইতিপূর্বে) আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক অপ্রিয় দ্বীন আমার কাছে আর কোনটিই ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হয়ে  গেছে। আল্লাহর কসম! (এর আগে) আপনার শহরের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য শহর আর কোনটিই আমার কাছে ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে। আপনার অশ্বারোহীরা আমাকে এমন অবস্থায় ধরে এনেছে, যখন আমি ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। এখন আপনি আমাকে কি করতে হুকুম দিচ্ছেন? রাসূল (সাঃ) তাকে সুসংবাদ শুনালেন এবং ওমরাহ পালনের আদেশ করলেন। এরপর যখন তিনি মক্কায় পৌঁছলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি না কি বেদ্বীন হয়ে গেছ? তিনি জওয়াবে বললেন, ‘তা হবে কেন; বরং আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে ইয়ামামা হ’তে আর একটি গমের দানাও আসবে না’ (বুখারী হা/৪৬২, মুসলিম হা/১৭৬৪, আলবানী, মিশকাত হা/৩৯৬৪, ‘জিহাদ’ অধ্যায়, ‘যুদ্ধবন্দীদের বিধান’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    উত্তম আচরণ ও ক্ষমার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। এজন্যই বলা হয়, ক্ষমাই উত্তম প্রতিশোধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মন্দকে ভাল দ্বারা মোকাবেলা কর, ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে’ (হা-মীম সাজদাহ ৩৪)।

    মুহাম্মাদ  ( সাঃ )- ই একমাত্র শাফা ‘ আতকারী

    হযরত আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুমিনগণকে (হাশরের ময়দানে স্ব স্ব অপরাধের কারণে) বন্দী রাখা হবে। তাতে তারা অত্যন্ত চিন্তিত ও অস্থির হয়ে পড়বে এবং বলবে, ‘যদি আমরা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার নিকট কারো মাধ্যমে সুপারিশ কামনা করি, যিনি আমাদের বর্তমান অবস্থা থেকে স্বস্তি দিবেন’। সেই লক্ষ্যে তারা আদম (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবে, ‘আপনি মানবজাতির পিতা আদম, আপনাকে আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, জান্নাতে বসবাস করিয়েছেন, ফেরেশতা মন্ডলীকে দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছিলেন এবং তিনিই যাবতীয় বস্ত্তর নাম আপনাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন, যেন তিনি আমাদেরকে এই কষ্টদায়ক স্থান হ’তে মুক্ত করে প্রশান্তি দান করেন’। তখন আদম (আঃ) বলবেন, ‘আমি তোমাদের এই কাজের মোটেই উপযুক্ত নই’।

    নবী করীম (সাঃ) বলেন, তখন তিনি গাছ হ’তে ফল খাওয়ার অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা হ’তে তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিল। [আদম (আঃ) বলবেন] ‘বরং তোমরা মানবজাতির জন্য আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত সর্বপ্রথম নবী নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও’। তারা নূহ (আঃ)-এর কাছে গেলে তিনি তাদেরকে বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য একেবারেই যোগ্য নই’। সাথে সাথে তিনি তাঁর ঐ অপরাধের কথা স্মরণ করবেন , যা অজ্ঞতাবশতঃ নিজের (অবাধ্য) ছেলেকে পানিতে  না ডুবানোর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। (তিনি বলবেন) ‘বরং তোমরা  আল্লাহর খলীল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটে যাও’।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, এবার তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটে যাবে। তখন তিনি বলবেন , ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য কিছুই করার ক্ষমতা রাখি না’। সাথে সাথে তাঁর তিনটি মিথ্যা উক্তির কথা স্মরণ করবেন এবং বলবেন, ‘বরং তোমরা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর এমন এক বান্দা, যাঁকে আল্লাহ তাওরাত দান করেছেন, তাঁর সাথে বাক্যালাপ করেছেন এবং গোপন কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁকে নৈকট্য দান করেছেন’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তখন তারা সকলে হযরত মূসা (আঃ) এর নিকটে আসলে তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের জন্য সুপারিশের ক্ষেত্রে অপারগ’। তখন তিনি সেই প্রাণনাশের অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা তাঁর হাতে সংঘটিত হয়েছিল এবং বলবেন, ‘বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা  ও তাঁর মনোনীত রাসূল, তাঁর কালেমা ও রূহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও’।

    নবী করীম (সাঃ) বলেন, তখন তারা সবাই হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে গেলে তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই। বরং তোমরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহ তা‘আলার  এমন এক বান্দা, যার আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তারা আমার কাছে আসবে। আমি তখন আমার রবের কাছে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব। অতঃপর আমাকে তাঁর নিকট যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ আমাকে যতক্ষণ চাইবেন সিজদা অবস্থায় রাখবেন’। অতঃপর বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। আর যা বলার বল, তোমার কথা শুনা হবে। শাফা‘আত কর, কবুল করা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে’।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার রবের এমনভাবে প্রশংসা বর্ণনা করব, যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দিবেন। অতঃপর আমি শাফা‘আত করব। তবে এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তখন আমি আল্লাহর দরবার হ’তে উঠে আসব এবং ঐ নির্ধারিত সীমার লোকদেরকে জাহান্নাম হ’তে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। তারপর আমি পুনরায় ফিরে এসে আমার প্রতিপালকের দরবারে হাযির হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব এবং আল্লাহ যতক্ষণ চাইবেন আমাকে সিজদা অবস্থায় থাকতে দিবেন’। তারপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। আর যা বলার বল, তোমার কথা শুনা হবে, সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। তুমি প্রার্থনা কর, যা প্রার্থনা করবে তা দেওয়া হবে’। রাসূল (সাঃ) বলেন, তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার রবের এমনভাবে প্রশংসা ও গুণকীর্তন বর্ণনা করব, যা আমাকে শিখিয়ে দেওয়া হবে। এরপর আমি শাফা‘আত করব। তবে এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। তখন আমি আমার রবের দরবার হ’তে উঠে আসব এবং ঐ নির্দিষ্ট লোকগুলিকে জাহান্নাম হ’তে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। অতঃপর তৃতীয়বার ফিরে আসব এবং আমার প্রতিপালক আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছা আমাকে সিজদা অবস্থায় রাখবেন’। তারপর বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ!  মাথা উঠাও। তুমি যা বলবে তা শুনা হবে, সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। প্রার্থনা কর, তা দেওয়া হবে’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার রবের এমন হামদ ও ছানা বর্ণনা করব, যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দিবেন’। নবী করীম (সাঃ) বলেন, ‘তারপর আমি শাফা‘আত করব। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিবেন। তখন আমি সেই দরবার থেকে বের হয়ে আসব এবং তাদেরকে জাহান্নাম হ’তে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব’।

    অবশেষে কুরআন যাদেরকে আটকিয়ে রাখবে (অর্থাৎ যাদের জন্য কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী চিরস্থায়ী ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারিত হয়ে গেছে) তারা ব্যতীত আর কেউ জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে না। বর্ণনাকারী ছাহাবী হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরআনের এই আয়াতটি عَسَى أَنْ يَّبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا ‘আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক অচিরেই আপনাকে ‘মাক্বামে মাহমূদে’ পৌঁছিয়ে দেবেন’ (বনী ইসরাঈল ৭৯) তেলাওয়াত করলেন এবং বললেন, এটাই সেই ‘মাক্বামে মাহমূদ’ যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের নবীকে দেওয়া হয়েছে (ছহীহ বুখারী হা/৭৪৪০ ‘তাওহীদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২৪, মিশকাত হা/৫৫৭২ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা ও সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, ‘হাওযে কাওছার ও শাফা‘আত’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. সকল নবী-রাসূলের উপর মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব।

    ২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শাফা‘আতে পরকালে কিছু জাহান্নামীকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীর এমন একটি দো‘আ রয়েছে, যা (আল্লাহর নিকট) গৃহীত হয়, আর নবী সে দো‘আ করে থাকেন। আমার ইচ্ছা, আমি আমার সে দো‘আর অধিকার আখেরাতে আমার উম্মতের শাফা‘আতের জন্য মুলতবি রাখি’ (বুখারী হা/৬৩০৪, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১)।

    ৩. কোন পীর-ওলী পরকালে শাফা‘আতের অধিকার রাখবেন না।

    রাসূলুল্লাহ  ( সাঃ )- এর মু ‘ জিযা

    মুজাহিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলতেন, আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া কোন (হক্ব) ইলাহ নেই। আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম। আর কখনও পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। একদা আমি তাঁদের (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং ছাহাবীদের) রাস্তায় বসেছিলাম, যেখান দিয়ে তারা বের হ’তেন। আবূ বকর (রাঃ) রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আমি এ উদ্দেশ্যেই তা করলাম, যেন তিনি আমাকে কিছু খেতে দিয়ে পরিতৃপ্ত করেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন, কিছুই করলেন না। এরপর ওমর (রাঃ) আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকেও সেই একই উদ্দেশ্যে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম।  কিন্তু তিনিও চলে গেলেন, কিছুই করলেন না।

    অতঃপর আবুল কাসেম [অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)] আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে তিনি মুচকি হাসলেন। তিনি আমার চেহারা দেখে মনের কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, ‘হে আবূ হির (রাঃ)! আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি উপস্থিত। তিনি বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে চল’! অতঃপর তিনি চললেন, আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। অতঃপর আমি ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম।

    তিনি ঘরে প্রবেশ করে একটি পেয়ালায় কিছু দুধ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দুধ কোথা থেকে এসেছে’? বাড়ির লোকজন উত্তর দিল, ‘অমুক পুরুষ অথবা অমুক মহিলা আপনার জন্য হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছে’। তিনি বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা (রাঃ)’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল’! তিনি বললেন, ‘আহলে ছুফ্ফা’র লোকদেরকে গিয়ে এখানে ডেকে আন’। (রাবী বলেন) ‘আহলে ছুফ্ফা’ ছিল ইসলামের মেহমান। তাদের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না। আর এমন কেউ ছিল না, যার উপর ভরসা করা যায়। যখন কোন ছাদাক্বার মাল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আসত, তখন তিনি তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। নিজে সেখান থেকে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আর যদি কোন হাদিয়া (উপঢৌকন) আসত, তিনি সেখান থেকেও এক অংশ তাদের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে এতে তাদেরকে শরীক করতেন এবং নিজে এক অংশ গ্রহণ করতেন।

    (আবু হুরায়রা বলেন) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদেশ শুনে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। (মনে মনে) বললাম, এতটুকু দুধ দ্বারা ‘আহলে ছুফ্ফা’র কি হবে? আমিই এ দুধ পানের বেশী হকদার। আমি তা পান করলে আমার শরীরে শক্তি ফিরে পেতাম। যখন তারা এসে গেলেন, তখন তিনি আমাকে আদেশ দিলেন, আমিই যেন তাদেরকে দুধ পান করতে দেই। আর আমার আশা রইল না যে, এ দুধ থেকে আমি কিছু পাব। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর আদেশ মান্য করা ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না।

    সুতরাং আমি ‘আহলে ছুফ্ফার নিকট গিয়ে তাদেরকে ডেকে আনলাম’। তারা এসে (ঘরে প্রবেশের) অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে এসে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! আমি বললাম, আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, এটি তাদেরকে দাও। আমি (দুধের) পেয়ালা হাতে নিয়ে দিতে শুরু করলাম। এক ব্যক্তির হাতে দিলাম, সে পান করে পরিতৃপ্ত হ’ল এবং আমাকে পেয়ালা ফেরত দিল। অতঃপর আমি অন্য একজনকে দিলাম, সেও তৃপ্তি সহকারে পান করে পেয়ালা ফেরত দিল। তৃতীয় জনকে দিলে সেও তাই করল। এভাবে আমি (সর্বশেষে) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছলাম। সবাই পরিতৃপ্ত হ’ল। তিনি পেয়ালা নিলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল’! তিনি বললেন, ‘এখন আমি আর তুমি বাকী’। আমি বললাম, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল’।

    তিনি বললেন, ‘বসে পড় এবং পান কর’। আমি বসে পান করলাম। তিনি (পুনরায়) বললেন, ‘পান কর’। আমি পান করলাম। তিনি একথা বলতেই থাকলেন, অবশেষে আমি বলতে বাধ্য হ’লাম যে, ‘আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আমার পেটে আর জায়গা নেই’। তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে দাও’। আমি তাঁকে দিলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে বাকী দুধ পান করলেন (ছহীহ বুখারী হা/৬৪৫২, ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭, মিশকাত হা/৪৬৭০ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘অনুমতি’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. রাসূল (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। তিনি তাঁর ছাহাবীদের মুখ দেখেই তাদের অন্তরের অবস্থা বুঝতে পারতেন।

    ২. বসে পান করা সুন্নাত।

    ৩. বিসমিল্লাহ বলে পান করতে হবে।

    ৪. আমন্ত্রিত ব্যক্তি অনুমতি না নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করবে না।

    ৫. পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির জন্য হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদান করা সুন্নাত।

    ৬. বিপদগ্রস্ত বা অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।

    মদীনায় হিজরতের পথে

    বারা ইবনু আযেব (রাঃ) তাঁর পিতা হ’তে বর্ণনা করেন যে, একদা আযেব (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেন, হে আবূ বকর! যে রাতে আপনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে (হিজরতের উদ্দেশ্যে) সফর করেছিলেন, সে রাতে আপনারা কি করেছিলেন আমাকে অবহিত করুন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমরা একদিন এক রাত পথ চলার পর যখন দ্বিপ্রহর হ’ল এবং পথ-ঘাট এমন শূন্য হ’ল যে, কাউকেও চোখে পড়ছিল না। এমন সময় একটি লম্বা পাথর আমাদের নযরে আসল। তার পাশে যথেষ্ট ছায়া ছিল। সেখানে রোদ পড়ত না। আমরা সেখানে অবতরণ করলাম এবং আমি নিজ হাতে  রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য কিছু জায়গা সমান করলাম, যাতে তিনি শয়ন করতে পারেন। এরপর একটি চাদর বিছিয়ে দিয়ে তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ঘুমান। আমি আপনাকে পাহারা দিচ্ছি ও সবদিক খেয়াল রাখছি। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে আমি বের হয়ে চতুর্দিক থেকে তাকে পাহারা দিতে থাকলাম। তাঁকে পাহারা দেওয়ার সময় হঠাৎ দেখি একজন মেষচারক আমাদের ন্যায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পাথরটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বকরীগুলিতে দুধ আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি কি তা (আমাদের জন্য) দোহন করবে? সে বলল, হ্যাঁ। অতঃপর সে একটি বকরী ধরে এনে একটি পাত্রে সামান্য দুধ দোহন করল। আমার নিকট একটি পাত্র ছিল, যা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য এনেছিলাম, যেন তা দিয়ে তিনি তৃপ্তি সহকারে পানি পান করতে এবং ওযূ করতে পারেন। অতঃপর  আমি দুধ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকটে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগানো ভাল মনে করলাম না। কিছুক্ষণ পরে তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় পেলাম। তখন দুধ ঠান্ডা করার জন্য তাতে পানি মিশালাম, ফলে দুধের নিম্নভাগ পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! পান করুন। তিনি পান করলেন। এতে আমি খুব সন্তুষ্ট হ’লাম।

    অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় হয়েছে কি’? আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। আবূ বকর (রাঃ) বলেন, সূর্য ঢলে যাওয়ার পর আমরা রওয়ানা হ’লাম। এদিকে সুরাকা ইবনু মালেক আমাদের অনুসরণ করছিল। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাদের নিকটে শত্রু এসে পড়েছে’। তিনি বললেন, لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا ‘চিন্তা কর না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন’ (তওবা ৪০)। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সুরাকার জন্য বদদো‘আ করলেন, ফলে তার ঘোড়াটি তাকে নিয়ে শক্ত মাটিতে পেট পর্যন্ত দেবে গেল। তখন সুরাকা বলল, ‘আমার বিশ্বাস তোমরা আমার জন্য বদদো‘আ করেছ। তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্য দো‘আ কর, আল্লাহ তোমাদের সাহায্যকারী হবেন। আমি তোমাদের নিকট অঙ্গীকার করছি যে, তোমাদের অন্বেষণকারীদেরকে (শত্রুদের) আমি ফিরিয়ে দিব’। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জন্য দো‘আ করলে সে মুক্তি পায়। অতঃপর যার সাথেই সুরাকার দেখা হয়েছে, তাকেই সে বলেছে, ‘আমি তোমাদের কাজ সেরে এসেছি। এদিকে তারা কেউ নেই’। এমনিভাবে যার সাথেই তার সাক্ষাৎ হ’ত, তাকেই সে ফিরিয়ে দিত (বুখারী হা/৩৬১৫, মুসলিম হা/২০০৯, মিশকাত হা/৫৮৬৯ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়; ‘মু‘জিযা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. সর্বক্ষেত্রে যথাযথভাবে নেতার আনুগত্য করা। প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্ত্তত থাকা।

    ২. বিশেষ ক্ষেত্রে মহৎ ব্যক্তিগণকে ঘুম থেকে না ডাকা বিচক্ষণতার পরিচয়।

    ৩. যে কোন বিপদে একমাত্র মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রাখা।

    ৪. আল্লাহ তা‘আলা শত্রু বা যালেমদেরকে অনেক সময় প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করে থাকেন।

    জাবের  ( রাঃ )- এর মেহমানদারী ও রাসূল  ( সাঃ )- এর মু ‘ জিযা

    জাবের (রাঃ) বলেন, খন্দকের যুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এমন সময় একটা শক্ত পাথর দেখা দিল। তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে বলল, পরিখা খননকালে একটি শক্ত পাথর পাওয়া গেছে। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আমি নিজেই খন্দকের মধ্যে নামব’। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন, সে সময় তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তখন তিনদিন পর্যন্ত কিছু খেতে পায়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটির উপর আঘাত করলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হয়।

    জাবের (রাঃ) বলেন, আমি আমার স্ত্রীর নিকটে এসে বললাম, ‘তোমার কাছে খাওয়ার কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখলাম’। তখন সে একটি চামড়ার পাত্র হ’তে এক ছা‘ পরিমাণ যব বের করল। আমাদের একটি মোটাতাজা বকরীর বাচ্চা ছিল। তা আমি যবেহ করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষল। অবশেষে আমরা হাঁড়িতে গোস্ত চড়ালাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে চুপে চুপে বললাম, ‘আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমরা একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি। আর এক ছা‘ যব ছিল, আমার স্ত্রী তা পিষেছে। সুতরাং আপনি আরো কয়েকজন সঙ্গে নিয়ে চলুন’।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উচ্চৈঃস্বরে সবাইকে বললেন, ‘হে পরিখা খননকারীগণ! এস তোমরা তাড়াতাড়ি চল, জাবের তোমাদের জন্য খাবার তৈরী করেছে’। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, ‘তুমি বাড়ী ফিরে যাও। আমি না আসা পর্যন্ত গোস্তের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও বানাবে না’। এরপর তিনি লোকজনসহ উপস্থিত হ’লেন। তখন আমার স্ত্রী খামিরগুলি রাসূলের সম্মুখে দিলে তিনি তাতে লালা মিশিয়ে দিয়ে বরকতের জন্য দো‘আ করলেন। অতঃপর ডেকচির নিকট অগ্রসর হয়ে তাতেও লালা মিশিয়ে বরকতের জন্য দো‘আ করলেন। এরপর বললেন, ‘তুমি আরো রুটি প্রস্ত্ততকারিণীদের ডাক, যারা তোমার সাথে রুটি বানাবে। আর চুলার উপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারী নিয়ে পরিবেশন কর’।

    জাবের (রাঃ) বলেন, ‘ছাহাবীদের সংখ্যা ছিল এক হাযার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, সকলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারী ফুটতেছিল এবং প্রথম অবস্থার ন্যায় আটার খামির হ’তে রুটি প্রস্ত্তত হচ্ছিল’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৭৭ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়, ‘মু‘জিযা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. কর্মীদের উৎসাহ ও প্রেরণা দানের জন্য নেতাকে তাদের সাথে যে কোন কাজে নিজ হাতে সহযোগিতা করা।

    ২. কর্মীদের অন্যতম কর্তব্য হ’ল নেতার সার্বিক বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা।

    ৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পক্ষ হ’তে প্রকাশিত প্রত্যেক মু‘জিযার প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখা।

    ৪. দ্বীনের পথে যত কষ্টই আসুক না কেন হাসিমুখে তা বরণ করে নেওয়া।

    রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে আবূ সুফিয়ান

    সপ্তম হিজরী, ৬২৯ খৃষ্টাব্দ। মক্কার কাফেরদের কুরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যে ইসলামের নাম শুনলে জ্বলে উঠত কুরাইশদের গা, আজ সেই কুরাইশগণ স্পষ্টতঃ স্বীকৃতি দিল ইসলামকে একটি শক্তিশালী ধর্ম হিসাবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নদীর মোহনায় এসে তাঁর সাধনার স্রোতধারায় শুনতে পেলেন মহাসাগরের কল্লোল। তাই তিনি মনস্থ করলেন বিশ্বের শক্তিশালী রাজা-বাদশাহদের নিকট ইসলামের সুমহান বার্তা পৌঁছাতে।

    তৎকালীন বিশ্বের বুকে রোম ও পারস্য ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাধর শক্তিশালী সাম্রাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন সম্রাট হিরাক্লিয়াস। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রখ্যাত ছাহাবী দেহিয়া কালবী (রাঃ)-কে ইসলামের দাওয়াতপত্র তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস ঐ সময় জেরুজালেমে অবস্থান করছিলেন। এদিকে কুরাইশ নেতা আবূ সুফিয়ান (তখনও তিনি মুসলমান হননি) ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়াতে অবস্থান করছিলেন।

    আবদুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তাঁকে আবূ সুফিয়ান বিন হারব সংবাদ দিয়েছেন যে, একদা রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁকে একদল কুরাইশ সহ ডেকে পাঠালেন। তখন তাঁরা ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়াতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ সুফিয়ান ও কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর অমাত্যবর্গ পরিবৃত অবস্থায় ঈলিয়া বা জেরুজালেমে অবস্থানকালে তাঁরা সম্রাটের দরবারে আগমন করলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁদেরকে স্বীয় মজলিসে ডেকে নিলেন। তখন তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন রোমান প্রধানগণ। অতঃপর তিনি কুরাইশগণকে এবং তাঁর দোভাষীকে আহবান জানিয়ে বললেন, যে লোকটি তোমাদের মধ্যে নবী বলে দাবী করছেন বংশগতভাকে তোমাদের মধ্যে কে তাঁর অধিক নিকটবর্তী? আবূ সুফিয়ান বললেন, তখন আমি বললাম, ‘বংশগতভাবে আমিই তাঁর নিকটতম ব্যক্তি’। সম্রাট হিরাক্লিয়াস নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে আমার নিকটবর্তী করো এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীগণকেও ডেকে এনে তাঁর পেছনে উপস্থিত কর। অতঃপর সম্রাট তাঁর দোভাষীকে বললেন, তুমি তাদেরকে বল, আমি এই লোকটিকে তাঁর [(রাসূল (সাঃ)] সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করব। যদি সে আমার সাথে কোন মিথ্যা কথা বলে, তবে তোমরা যেন তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রমাণ করো। আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! লোকেরা আমার উপর মিথ্যা আরোপ করবে বলে যদি আমার লজ্জার ভয় না হ’ত, তাহ’লে তখন আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতাম’।

    সম্রাট সর্বপ্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যিনি নবী বলে দাবী করছেন তাঁর বংশ কেমন?

    আবূ সুফিয়ান : তিনি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশগত।

    সম্রাট : তাঁর পূর্বে তোমাদের মধ্য হ’তে কোন ব্যক্তি কখনও এমন কথা বলেছে কি?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিলেন কি?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : প্রভাবশালী লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বল লোকেরা?

    আবূ সুফিয়ান : দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণীর লোকগুলো।

    সম্রাট : তাদের সংখ্যা কি দিন দিন বাড়ছে, না কমছে?

    আবূ সুফিয়ান : না, বরং বাড়ছে।

    সম্রাট : তাদের মধ্যে কেউ কি সেই দ্বীনে প্রবেশ করার পর তাঁর দ্বীনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তা ত্যাগ করে থাকে?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : সে নবুঅত লাভের পূর্বে কি তোমরা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিতে?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : তিনি কখনো কোন অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন কি?

    আবূ সুফিয়ান : না। তবে আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাঁর সাথে এক সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি, জানি না এ সময়ের মধ্যে তিনি কি করবেন?

    আবূ সুফিয়ান (পরবর্তীতে) বলেন, এই কথাটি ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

    সম্রাট : তোমরা কি তাঁর সাথে কোন যুদ্ধ করেছ?

    আবূ সুফিয়ান : হ্যাঁ।

    সম্রাট : যুদ্ধের ফলাফল কি?

    আবূ সুফিয়ান : তাঁর ও আমাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত যুদ্ধের ফলাফল হ’ল বালতিতে পালাক্রমে পানি তোলার ন্যায়। অর্থাৎ কোনটায় তিনি জয় লাভ করেন এবং কোনটায় আমরা।

    সম্রাট : তিনি তোমাদেরকে কি নির্দেশ দিয়ে থাকেন?

    আবূ সুফিয়ান : তিনি বলেন, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক কর না। আর তোমরা তোমাদের বাপ-দাদারা যা বলে বেড়াত, তা পরিত্যাগ কর। তিনি আমাদেরকে ছালাত প্রতিষ্ঠা করতে, সর্বদা সত্য কথা বলতে, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকতে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে বলেন।

    সম্রাট হিরাক্লিয়াস দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে বল, আমি তোমাকে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তুমি উত্তরে বলেছ, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশজাত। প্রকৃতপক্ষে নবী-রাসূলগণ তাঁদের কওমের সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্রেরিত হয়ে থাকেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এ কথা (নবী হওয়ার কথা) বলেছেন? তুমি উত্তরে বলেছ, না। আমি বলতে চাই- যদি তাঁর পূর্বে কেউ এ কথা বলত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। আমি বলতে চাই- যদি তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে কোন বাদশাহ থাকতে, তাহ’লে আমি বলতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে ইচ্ছুক। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমরা তাঁর নবুঅত লাভের পূর্বে তাঁর প্রতি কোন মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলে কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। কাজেই আমি বুঝতেছি, তিনি এমন ব্যক্তি নন, যিনি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যারোপ করবেন এবং আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করবেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি যে, প্রভাবশালী লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে, না নিরীহ-দুর্বল লোকগুলো? তুমি উত্তরে বলেছ, নিরীহ-দুর্বল লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে। আসলে নিরীহ-দুর্বল লোকেরাই নবী-রাসূলগণের অনুসারী হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সংখ্যায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে, না হরাস পাচ্ছে? তুমি উত্তরে বলেছ, বৃদ্ধি হচ্ছে। ঈমানের ব্যাপারটি পূর্ণতা লাভের সময় পর্যন্ত এরূপই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, কেউ তাঁর দ্বীনে প্রবেশ করে বীতশ্রদ্ধ হয়ে আবার সে দ্বীন পরিত্যাগ করেছে কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। আসলে ঈমানের দীপ্তি ও সজীবতা অন্তরের সাথে মিশে গেলে এরূপই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। নবী-রাসূলগণ এরূপই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তোমাদেরকে কি নির্দেশ প্রদান করেন? তুমি উত্তরে বলেছ, তিনি তোমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি তোমাদেরকে মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করেন এবং তোমাদেরকে ছালাত প্রতিষ্ঠা করার, সত্য কথা বলার ও পূত-পবিত্র থাকার নির্দেশ প্রদান করেন। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে তিনি অত্যল্পকালের মধ্যেই আমার এ পদদ্বয়ের নিম্নবর্তী স্থানের (সিরিয়ার) মালিক হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য হ’তে হবেন, একথা ভাবতে পারিনি। আমি যদি যথাযথভাবে তাঁর নিকট পৌঁছতে পারব বলে জানতে পারতাম, তাহ’লে আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সর্ব প্রকার কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর নিকট থাকতাম, তাহ’লে অবশ্যই আমি তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।

    অতঃপর সম্রাট হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পত্রখানা আনতে বললেন, যে পত্রখানা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছাহাবী দেহিয়া কালবী (রাঃ)-কে বছরার শাসনকর্তার নিকট পাঠিয়েছিলেন। বছরার অধিপতি হারেছ পত্রখানা সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে প্রদান করলে তিনি তা পাঠ করলেন। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ-

    ‘পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও তদীয় রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। যারা সঠিক পথের অনুসারী, তাঁদের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক। অতঃপর, আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদে থাকতে পারবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহ’লে সকল প্রজার পাপ আপনার উপর বর্তাবে। ‘হে আহলে কিতাব! ‘তোমরা একটি কথার দিকে চলে আস, যে কথাটি আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন, আমরা যেন আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করি, তাঁর সাথে অন্য কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ যেন আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদের বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা মুসলিম’ (আলে ইমরান ৬৪)।

    আবূ সুফিয়ান বলেন, যখন সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর বক্তব্য ও পত্রখানা পাঠ শেষ করলেন, তখন তাঁর সম্মুখে শোরগোল ও চীৎকার চরম আকার ধারণ করল এবং আমাদেরকে বের করে দেয়া হ’ল। তখন আমি আমার সঙ্গী-সাথীদেরকে বললাম, আবূ কাবশার (মুহাম্মাদ) ছেলের বিষয় তো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, বনু আছফার (রোম)-এর বাদশাহও তাকে ভয় পাচ্ছে। তখন থেকে আমি বিশ্বাস করতাম যে, তিনি শীঘ্রই জয়ী হবেন। অবশেষে মহান আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক্ব দিলেন (ছহীহ বুখারী হা/৭, ‘অহির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬, মুসলিম হা/১৭৭৩, মিশকাত হা/৫৮৬১)।

    শিক্ষা :

    ১. গরীব-অসহায়রাই দ্বীনী কাজে অগ্রগামী থাকে।

    ২. আল্লাহ রাববুল আলামীন প্রত্যেক মানুষকে সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দ বুঝার অনুধাবন শক্তি দিয়েছেন।

    ৩. ক্ষমতালিপ্সা ও স্বার্থহানির ভয়ে মানুষ হক গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

    সৃষ্টজীবের প্রতি দয়া

    ইবনু ওমর (রাঃ) সূত্রে নবী (সাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক নারী একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গিয়েছিল, সে তাকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবারও দেয়নি, ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে যমীনের পোকা-মাকড় খেতে পারত (বুখারী হা/৩৩১৮ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১১, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯০৩)।

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘এক ব্যভিচারিণীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। সে একটি কুকুরের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন সে দেখতে পেল কুকুরটি একটি কূপের পাশে বসে হাঁপাচ্ছে। রাবী বলেন, পিপাসায় তার প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত ছিল। তখন সেই নারী তার মোজা খুলে তার উড়নার সঙ্গে বাঁধল। অতঃপর সে কূপ হ’তে পানি তুলল (এবং কুকুরটিকে পানি পান করাল)। এ কারণে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হল’ (বুখারী হা/৩৩২১ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯০২)।

    শিক্ষা : পশু-পাখির প্রতি সর্বদা সহানুভূতিশীল হ’তে হবে।

    লোক দেখানো আমলের ভয়াবহ পরিণতি

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে, সে হবে একজন (ধর্মযুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী) শহীদ। তাকে আল্লাহর নিকট উপস্থিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ পাক তাকে (দুনিয়াতে প্রদত্ত) নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, দুনিয়াতে তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য (কাফেরদের সাথে) লড়াই করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তোমাকে যেন বীর-বাহাদুর বলা হয়, সেজন্য তুমি লড়াই করেছ। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী) তোমাকে দুনিয়াতে তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

    অতঃপর সে ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যে নিজে দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করেছে এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে। আর পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেছে (এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে)। তাকে আল্লাহ পাকের দরবারে হাযির করা হবে। অতঃপর তিনি তাকে নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নে‘মতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি স্বয়ং দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির নিমিত্তে কুরআন তেলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং তুমি এজন্য ইল্ম শিক্ষা করেছ, যেন তোমাকে ‘বিদ্বান’ বলা হয় এবং এজন্য কুরআন অধ্যয়ন করেছ, যাতে তোমাকে ‘ক্বারী’ বলা হয়। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী) তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারীও বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। সুতরাং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

    অতঃপর এমন এক ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে, যাকে আল্লাহ তা‘আলা বিপুল ধন-সম্পদ দান করে বিত্তবান করেছিলেন। তাকে আল্লাহ তা‘আলা প্রথমে প্রদত্ত নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সে তখন সমস্ত নে‘মতের কথা অকপটে স্বীকার করবে। অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নে‘মতের শুকরিয়ায় তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, যে সমস্ত ক্ষেত্রে ধন-সম্পদ ব্যয় করলে তুমি সন্তুষ্ট হবে, তোমার সন্তুষ্টির জন্য সেসব খাতের একটি পথেও ব্যয় করতে ছাড়িনি। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে দান করেছিলে, যাতে তোমাকে বলা হয় যে, সে একজন ‘দানবীর’। সুতরাং (তোমার অভিপ্রায় অনুসারে দুনিয়াতে) তোমাকে ‘দানবীর’ বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। নির্দেশ মোতাবেক তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (মুসলিম হা/১৯০৫ ‘নেতৃত্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৩; মিশকাত-আলবানী হা/২০৫, ‘ইল্ম’ অধ্যায়)।

    শিক্ষা :

    লোক দেখানো আমলের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কাজেই সর্বদা আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে এবং প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে।

    আবু বকর  ( রাঃ )- এর মর্যাদা

    আবূদ্দারদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবূ বকর (রাঃ) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তার দু’হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবী (সাঃ) বললেন, তোমাদের এ সাথী এই মাত্র কারো সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে। তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এবং ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাযির হয়েছি। নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবূ বকর! এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর ওমর (রাঃ) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবূ বকর (রাঃ)-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবূ বকর কি বাড়িতে আছেন? তারা বলল, না। তখন ওমর (রাঃ) নবী (সাঃ)-এর নিকট চলে এসে সালাম দিলেন। (তাকে দেখে) নবী (সাঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবূ বকর (রাঃ) ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি। এ কথাটি তিনি দু’বার বললেন। তখন নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ আর আবূ বকর বলেছে, আপনি সত্য বলেছেন। তাঁর জান-মাল সবকিছু দিয়ে আমাকে সহানুভূতি জানিয়েছে। তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথীকে অব্যাহতি দিবে? এ কথাটি তিনি দু’বার বললেন। অতঃপর আবূ বকর (রাঃ)-কে আর কখনও কষ্ট দেয়া হয়নি (বুখারী হা/৩৬৬১ ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ছাহাবীদের ফযীলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫)।

    শিক্ষা :

    ১. ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ।

    ২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি আবূবকর (রাঃ)-এর ভালবাসা ও সাহায্য-সহানুভূতি ছিল প্রবাদতুল্য। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন, ‘আমি যদি আমার রব ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহ’লে আবূবকরকে গ্রহণ করতাম’ (বুখারী হা/৩৬৫৭, ‘ছাহাবীদের ফযীলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫)।

    আবূ যর  ( রাঃ )- এর ইসলাম গ্রহণ

    আবু জামরাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) আমাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে আবূ যর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করব না? আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, আবূ যর (রাঃ) বলেছেন, আমি গিফার গোত্রের একজন মানুষ। আমরা জানতে পারলাম যে, মক্কায় এক ব্যক্তি আত্মপ্রকাশ করে নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। আমি আমার ভাইকে বললাম, তুমি মক্কায় গিয়ে ঐ ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে এস। সে রওয়ানা হয়ে গেল এবং মক্কার ঐ লোকটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফিরে আসল। অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি খবর নিয়ে এলে? সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি এমন একজন ব্যক্তিকে দেখেছি যিনি সৎকাজের আদেশ দেন এবং মন্দ কাজ হ’তে নিষেধ করেন। আমি বললাম, তোমার খবরে আমি সন্তুষ্ট হ’তে পারলাম না। অতঃপর আমি একটি ছড়ি ও এক পাত্র খাবার নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হ’লাম। মক্কায় পৌঁছে আমার অবস্থা দাঁড়াল এমন যে, আমি তাকে চিনি না এবং কারো নিকট জিজ্ঞেস করাও আমি সমীচীন মনে করি না। তাই আমি যমযমের পানি পান করে মসজিদে থাকতে লাগলাম।

    একদিন সন্ধ্যা বেলা আলী (রাঃ) আমার নিকট দিয়ে গমনকালে আমার প্রতি ইশারা করে বললেন, মনে হয় লোকটি বিদেশী। আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চল। আবূ যর বলেন, অতঃপর আমি তার সাথে তার বাড়ি চললাম। পথে তিনি আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করেননি। আর আমিও ইচ্ছা করে কোন কিছু বলিনি। তাঁর বাড়িতে রাত্রি যাপন করে ভোরবেলায় আবার মসজিদে গেলাম ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য। কিন্তু ওখানে এমন কোন লোক ছিল না যে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলবে। তিনি বলেন, ঐদিনও আলী (রাঃ) আমার নিকট দিয়ে চলার সময় বললেন, এখনো কি লোকটি তার গন্তব্যস্থল ঠিক করতে পারেনি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে চল। পথিমধ্যে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বল, তোমার ব্যাপার কি? কেন এ শহরে এসেছ? আমি বললাম, যদি আপনি আমার বিষয়টি গোপন রাখার আশ্বাস দেন তাহ’লে তা আপনাকে বলতে পারি। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি গোপন করব। আমি  বললাম, আমরা জানতে পেরেছি, এখানে এমন এক লোকের আবির্ভাব হয়েছে যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন। আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্য আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফেরত গিয়ে আমাকে সন্তোষজনক কোন কিছু বলতে পারেনি। তাই নিজে দেখা করার ইচ্ছা নিয়ে এখানে আগমন করেছি। আলী (রাঃ) বললেন, তুমি সঠিক পথপ্রদর্শক পেয়েছ। আমি এখনই তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছি। তুমি আমাকে অনুসরণ কর এবং আমি যে গৃহে প্রবেশ করব তুমিও সে গৃহে প্রবেশ করবে। রাস্তায় যদি তোমার বিপদজনক কোন লোক দেখতে পাই তবে আমি জুতা ঠিক করার অজুহাতে দেয়ালের পার্শ্বে সরে দাঁড়াব, যেন আমি জুতা ঠিক করছি। আর তুমি চলতেই থাকবে। আলী (রাঃ) পথ চলতে শুরু করলেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। তিনি নবী (সাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করলে আমিও তাঁর সঙ্গে ঢুকে পড়লাম। আমি বললাম, আমার নিকট ইসলাম পেশ করুন। তিনি পেশ করলেন। আর আমি তৎক্ষণাৎ মুসলিম হয়ে গেলাম।

    নবী (সাঃ) বললেন, হে আবূ যর। এখনকার মত তোমার ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখে তোমার দেশে চলে যাও। যখন আমাদের বিজয়ের খবর জানতে পারবে তখন এসো। আমি বললাম, যে আল্লাহ্ আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! আমি কাফির-মুশরিকদের সামনে উচ্চৈঃস্বরে তাওহীদের বাণী ঘোষণা করব। (ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন) এই কথা বলে তিনি মসজিদে হারামে গমন করলেন, কুরাইশের লোকজনও সেখানে উপস্থিত ছিল। তিনি বললেন, হে কুরাইশগণ! আমি নিশ্চিতভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন (হক্ব) মা‘বূদ  নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। এতদশ্রবণে কুরাইশগণ বলে উঠল, ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে। তারা আমার দিকে এগিয়ে আসল এবং আমাকে এমন নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগল, যেন আমি মরে যাই। তখন আববাস (রাঃ) আমার নিকট পৌঁছে আমাকে ঘিরে রাখলেন। অতঃপর তিনি কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। তোমরা গিফার বংশের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছ, অথচ তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাফেলাকে গিফার গোত্রের নিকট দিয়ে যাতায়াত করতে হয়? এ কথা শুনে তারা আমার নিকট থেকে দূরে সরে পড়ল। পরদিন ভোরবেলা কা‘বাগৃহে উপস্থিত হয়ে গতদিনের মতই আমি আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্ণ ঘোষণা দিলাম। কুরাইশগণ বলে উঠল, ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে। গতকালের মত আজও তারা নির্মমভাবে আমাকে মারধর করল। এই দিনও আববাস (রাঃ) এসে আমাকে রক্ষা করলেন এবং কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে ঐ দিনের মত বক্তব্য রাখলেন। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এটাই ছিল আবূ যর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের প্রথম ঘটনা (বুখারী হা/৩৫২২ ‘মানাকিব’ অধ্যায়, ‘আবূ যর গিফারীর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা’ অনুচ্ছেদ, হা/৩৮৬১ ‘আনছারদের মর্যাদা’ অধ্যায়)।

    শিক্ষা :

    ১.  হক্ব অন্বেষণের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।

    ২. হকের পথের পথিকরা নানান মুছীবতের সম্মুখীন হন। এক্ষেত্রে তাদেরকে ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে।

    ৩. সমাজের প্রচলিত রসম-রেওয়াজের বিরুদ্ধে কথা বললে নানা বিদ্রূপাত্মক  পরিস্থিতির সম্মুখীন হ’তে হয় কিংবা নানা ব্যঙ্গাত্মক নামে ডাকা হয়। কিন্তু তাতে বিচলিত না হয়ে সত্য প্রচারে অটল থাকতে হবে।

    আবূ নাজীহ  ( রাঃ )- এর ইসলাম গ্রহণ

    আবূ নাজীহ আমর ইবনু আবাসাহ আস-সুলামী (রাঃ) বলেন, জাহেলী যুগে আমি ধারণা করতাম যে, লোকেরা পথভ্রষ্টতার উপর রয়েছে এবং এরা কোন ধর্মেই নেই। আর ওরা প্রতিমা পূজা করছে। অতঃপর আমি এক ব্যক্তির ব্যাপারে শুনলাম যে, তিনি মক্কায় অনেক আশ্চর্য খবর বলছেন। সুতরাং আমি আমার সওয়ারীর উপর বসে তাঁর কাছে এসে দেখলাম যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সাঃ)। তিনি গোপনে (ইসলাম প্রচার করছেন), আর তাঁর সম্প্রদায় (মুশরিকরা) তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করছে। সুতরাং আমি বিচক্ষণতার সাথে কাজ করলাম। আমি মক্কায় তাঁর কাছে প্রবেশ করলাম। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, ‘আমি নবী’। আমি বললাম, নবী কি? তিনি বললেন, ‘মহান আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন’। আমি বললাম, তিনি কি নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন? তিনি বললেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা, আল্লাহকে একক উপাস্য মানা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার নির্দেশ দিয়ে’। আমি বললাম, এ কাজে আপনার সঙ্গে কে আছে? তিনি বললেন, ‘একজন স্বাধীন এবং একজন কৃতদাস’। তিনি বলেন, তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তার মধ্যে তখন তাঁর সঙ্গে আবূ বকর ও বেলাল (রাঃ) ছিলেন। আমি বললাম, ‘আমিও আপনার অনুগত’। তিনি বললেন, ‘তুমি এখন এ কাজ কোন অবস্থাতেই করতে পারবে না। তুমি কি আমার অবস্থা ও লোকদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছ না? অতএব তুমি (এখন) বাড়ি ফিরে যাও। অতঃপর যখন তুমি আমার জয়ী ও শক্তিশালী হওয়ার সংবাদ পাবে, তখন আমার কাছে এস’।

    সুতরাং আমি আমার পরিবার-পরিজনের নিকট চলে গেলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় চলে এলেন। আর আমি পরিবারের সদস্যদের সাথেই ছিলাম। অতঃপর আমি খবরাখবর নিতে আরম্ভ করলাম এবং যখন তিনি মদীনায় আগমন করলেন, তখন আমি (তাঁর ব্যাপারে) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। অবশেষে আমার নিকট মদীনার কিছু লোক এল। আমি বললাম, ঐ লোকটার অবস্থা কি, যিনি (মক্কা ত্যাগ করে) মদীনায় এসেছেন? তারা বলল, লোকেরা তাঁর দিকে দ্রুত ধাবমান। তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল; কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হয়নি।

    অতঃপর আমি মদীনায় এসে তাঁর খিদমতে হাযির হ’লাম। তারপর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তো ঐ ব্যক্তি, যে মক্কায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলে’। আমি বললাম, হ্যাঁ। হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং যা আমার অজানা, তা আমাকে বলুন? আমাকে ছালাত সম্পর্কে বলুন’? তিনি বললেন, ‘তুমি ফজরের ছালাত পড়। তারপর সূর্য এক বল্লম পরিমাণ উঁচু হওয়া পর্যন্ত বিরত থাক। কারণ তা শয়তানের দু’শিং-এর মধ্যভাগে উদিত হয় (অর্থাৎ এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে) এবং সে সময় কাফেররা তাকে সিজদা করে। পুনরায় তুমি ছালাত আদায় কর। কেননা ছালাতে ফেরেশতা সাক্ষী ও উপস্থিত হন, যতক্ষণ না ছায়া বল্লমের সমান হয়ে যায়। অতঃপর ছালাত থেকে বিরত হও। কেননা তখন জাহান্নামের আগুন উস্কানো হয়। অতঃপর যখন ছায়া বাড়তে আরম্ভ করে, তখন ছালাত আদায় কর। কেননা এ ছালাতে ফেরেশতা সাক্ষী ও উপস্থিত হন। পরিশেষে তুমি আছরের ছালাত আদায় কর। অতঃপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত ছালাত আদায় করা থেকে বিরত থাক। কেননা সূর্য শয়তানের দু’শিং-এর মধ্যে অস্ত যায় (অর্থাৎ এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে) এবং তখন কাফেররা তাকে সিজদা করে’।

    পুনরায় আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর নবী (সাঃ)! আপনি আমাকে ওযূ সম্পর্কে বলুন’? তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ পানি নিয়ে (হাত ধোয়ার পর) কুলি করবে এবং নাকে পানি নিয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করবে, তার চেহারা, তার মুখ এবং নাকের গুনাহসমূহ ঝরে যায়। অতঃপর সে যখন আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী তার চেহারা ধৌত করে, তখন তার চেহারার পাপরাশি তার দাড়ির শেষ প্রান্তের পানির সাথে ঝরে যায়। তারপর সে যখন তার হাত দু’খানি কনুই পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার হাতের পাপরাশি তার আঙ্গুলের পানির সাথে ঝরে যায়। অতঃপর সে যখন তার মাথা মাসাহ করে, তখন তার মাথার পাপরাশি চুলের ডগার পানির সাথে ঝরে যায়। তারপর সে যখন তার পা দু’খানি গিট পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার পায়ের পাপরাশি তার আঙ্গুলের পানির সাথে ঝরে যায়। অতঃপর সে যদি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করে, আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে, যার তিনি যোগ্য এবং অন্তরকে আল্লাহ তা‘আলার জন্য খালি করে, তাহ’লে সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে বেরিয়ে আসে, যেদিন  তার মা তাকে প্রসব করেছিল।

    তারপর আমর ইবনু আবাসাহ (রাঃ) এ হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ছাহাবী আবূ উমামা (রাঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। আবূ উমামাহ (রাঃ) তাঁকে বললেন, ‘হে আমর ইবনু আবাসাহ! তুমি যা বলছ, তা চিন্তা করে বল! একবার ওযূ করলেই কি এই ব্যক্তিকে এতটা মর্যাদা দেওয়া হবে? আমর বললেন, হে আবূ উমামাহ! আমার বয়স ঢের হয়েছে, আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মৃত্যুও নিকটবর্তী। (ফলে এ অবস্থায়) আল্লাহ তা‘আলা অথবা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করার কি প্রয়োজন আছে? যদি আমি এটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট থেকে একবার, দু’বার, তিনবার এমনকি সাতবার পর্যন্ত না শুনতাম, তাহ’লে কখনোই তা বর্ণনা করতাম না। কিন্তু আমি তাঁর নিকট এর চেয়েও অধিকবার শুনেছি’ (মুসলিম হা/৮৩২, ‘মুসাফিরের ছালাত’ অধ্যায়)।

    শিক্ষা :

    ১. দ্বীনী বিষয় জানার জন্য আগ্রহ থাকতে হবে।

    ২. পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করতে হবে।

    ৩. ওযূর মাধ্যমে বান্দা তার পাপরাশি মোচন করে নিতে পারে।

    উয়াইস কারনীর মর্যাদা

    উসাইর ইবনু জাবির (রাঃ) বলেন, ইয়ামানে বসবাসকারীদের পক্ষ থেকে ওমর (রাঃ)-এর নিকট সাহায্যকারী দল আসলে তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, ‘তোমাদের মাঝে কি উয়াইস ইবনু আমির আছে’? অবশেষে (একদিন) উয়াইস (রহঃ) এসে গেলেন। তাকে ওমর প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি উয়াইস ইবনু আমির’? সে বলল, হ্যাঁ। ওমর (রাঃ) আবার বললেন, ‘মুরাদ’ সম্প্রদায়ের উপগোত্র ‘কারনের’ লোক? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল, আপনি তা হ’তে সুস্থ হয়েছেন এবং মাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান বাকী আছে’? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘আপনার মা জীবিত আছে কি’? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ওমর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘ইয়ামানের সহযোগী দলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’ জাতির উপজাতি ‘কারনের’ লোক। তার কুষ্ঠরোগ হবে এবং তা হ’তে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে, সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ তা‘আলা পূরণ করে দেন। তুমি যদি তাকে দিয়ে তোমার গুনাহ মাফের জন্য দো‘আ করাবার সুযোগ পাও, তাহ’লে তাই করবে’। ওমর (রাঃ) বলেন, ‘কাজেই আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দো‘আ করুন’। তখন তিনি (উয়াইস) ওমরের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে দো‘আ করলেন। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, ‘আপনি কোথায় যেতে চান’? তিনি বললেন, ‘কূফায়’। তিনি (ওমর) বলেন, ‘আমি সেখানকার গভর্ণরকে আপনার (সাহায্যের) জন্য লিখে দেই’? তিনি বললেন, ‘আমার নিকট গরীব-মিসকীনদের মাঝে বসবাস করাই বেশী পসন্দনীয়’।

    পরের বছর কূফার এক নেতৃস্থানীয় লোক হজ্জে এল। তার সাথে ওমরের দেখা হ’লে তিনি উয়াইস সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করলেন। সে বলল, ‘আমি তাকে এরকম অবস্থায় দেখে এসেছি যে, তার ঘরটা অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় আছে এবং তার জীবন-যাপনের উপকরণসমূহ খুবই নগণ্য’। ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক ইয়ামানের সাহায্যকারী দলের সাথে তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’ জাতির উপজাতি ‘কারন’ বংশীয় লোক। তার কুষ্ঠ রোগ হবে এবং তা থেকে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে এবং সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ পূরণ করে দেন। তুমি যদি তোমার গুনাহ মাফের জন্য তাকে দিয়ে দো‘আ করানোর সুযোগ পাও, তাহ’লে তাই করবে’। লোকটি ফিরে এসে উয়াইসের নিকট গিয়ে বলল, ‘আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দো‘আ করুন’। তিনি (উয়াইস) বললেন, ‘এইমাত্র আপনি মঙ্গলময় সফর (হজ্জ) থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন; বরং আপনিই আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য দো‘আ করুন’। তিনি বললেন, ‘আপনি কি ওমরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন’। সে বলল, হ্যাঁ। তার জন্য উয়াইস দো‘আ করলেন। উয়াইসের মর্যাদা সম্পর্কে লোকেরা সচেতন হ’লে সেখান থেকে উয়াইস অন্য স্থানে চলে গেলেন।

    অন্য বর্ণনায় এসেছে, ওমর (রাঃ)-এর নিকট কূফার অধিবাসীরা একটি সাহায্যকারী দল পাঠায়। দলের এক লোক উয়াইসকে বিদ্রূপ করত। ওমর (রাঃ) বললেন, ‘এখানে ‘কারন’ বংশীয় কেউ আছে কি’? ঐ ব্যক্তিটি উঠে আসলে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ইয়ামান থেকে উয়াইস নামে এক লোক তোমার নিকট আসবে। সে তার মাকে ইয়ামানে একা রেখে আসবে। তার কুষ্ঠরোগ হবে। সে আল্লাহর নিকট দো‘আ করবে, আল্লাহ তার রোগমুক্তি দান করবেন, শুধুমাত্র এক দীনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে কেউ তার দেখা পাবে, তাকে দিয়ে সে যেন তার গুনাহ মাফের জন্য দো‘আ করায়’।

    ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘পরবর্তীদের (তাবেঈ) মধ্যে উয়াইস নামে এক সৎ লোক হবে। তার মা বেঁচে আছে। তার শরীরে কুষ্ঠের চিহ্ন থাকবে। তার নিকট গিয়ে নিজের গুনাহ মাফের জন্য তাকে দিয়ে প্রার্থনা করাও’ (মুসলিম হা/২৫৪২, ‘ছাহাবীগণের মর্যাদা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৫)।

    শিক্ষা : পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকারী ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদাবান হবেন।

    দানের ফযীলত

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাঠে অবস্থান করছিল। এমন সময় সে মেঘের মধ্যে একটি শব্দ শুনতে পেল : ‘অমুকের বাগানে পানি দাও’। অতঃপর মেঘমালা সেই দিকে সরে গেল এবং এক প্রস্তরময় স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করল। তখন দেখা গেল, সেখানকার নালাগুলির মধ্যে একটি নালা সমস্ত পানি নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তখন সে ব্যক্তি পানির দিকে এগিয়ে গেল এবং দেখল যে, এক ব্যক্তি তার বাগানে দাঁড়িয়ে সেচযন্ত্র দ্বারা পানি সেচ দিচ্ছে। তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কি? ব্যক্তিটি জবাবে বলল, আমার নাম অমুক- যে নাম সে মেঘের মধ্যে শুনেছিল। তখন লোকটি বলল : হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কেন আমার নাম জিজ্ঞেস করলে? সে বলল : এই পানি যেই মেঘের তার মধ্যে আমি একটি শব্দ শুনেছি যে, তোমার নাম করে বলা হয়েছে, অমুকের বাগানে পানি দাও! (হে আল্লাহর বান্দা, বল) তুমি তা দ্বারা কি কি কাজ কর? সে উত্তরে বলল, যখন তুমি এ কথা বললে তখন শুনো, এই বৃষ্টির পানিতে যা উৎপাদন হয়, তার প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করি এবং তা ভাগ করি। এক ভাগ দান করি, একভাগ আমি ও আমার পরিবার খাই এবং অপর ভাগ জমিতে লাগাই (মুসলিম হা/২৯৮৪, মিশকাত হা/১৮৭৭ ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘দানের প্রশংসা ও কৃপণতার নিন্দা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা : অভাবগ্রস্তদেরকে দান করলে সম্পদ কমে যায় না; বরং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

  • নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রচ্ছদ শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রী, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ১৯৭১; প্রথম অখণ্ড সংস্করণ : জানুয়ারী ১৯৯৯। উৎসর্গ— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং আমার মাকে।

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে হল অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি জনপ্রিয় বাংলা উপন্যাস। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ নিয়ে লেখা বাংলা উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম সেরা উপন্যাস হিসাবে বিবেচিত। দেশভাগজনিত বহু সমস্যার অনবদ্য মানবিক দলিল এটি। রচনা কাল ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ। কলকাতার “করুণা প্রকাশনী” হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    প্রেক্ষাপট
    পূর্ব বাংলার বর্তমানে বাংলাদেশের এক গ্রাম এর কেন্দ্রীয় ভূগোল। সেখানকার সাধারণ মানুষ, হিন্দু মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক, জমিদার ও প্রজার সম্পর্ক আর সেই সঙ্গে সমস্ত গ্রাম্য প্রকৃতি, গাছপালা, পশুপাখি নিয়ে রূপায়িত হয়েছে গভীর মমতায়। বহু বিচিত্র চরিত্রের সন্নিবেশ, তাদের নানা বৃত্তির নানা মানসিকতা পরিস্ফুট হয়েছে। ঔপন্যাসিকের লুপ্ত অতীতের প্রতি বেদনা আর স্মৃতিমেদুর জগতের বিবরণ বর্ণিত হয়েছে চারশত বারো পৃষ্ঠার এই বইতে।

    নামকরণ
    উপন্যাসের মাঝে কয়েকবার ঘুরে ফিরে এসেছে নীলকণ্ঠ এক পাখির কথা, অবশ্যই রূপক হিসাবে। মানুষের চিরকালের না-পাওয়ার আর্তি – ওই পাখি। মানুষ তার মনের গোপন কামনাবাসনার জন্য, সুখ-দুঃখে গড়া জীবনে সবসময় এক নীল রঙে গড়া পাখির সন্ধানে ঘুরে ফেরে। উপন্যাসের চরিত্রেরা কখনো সমুদ্রের অসীম নীলে, উদ্বাস্তু কলোনির বাঁশঝাড়ে, পুকুরপাড়ের অর্জুন গাছে ক্ষণিকের জন্য সেই নীল পাখির দেখা পান। মহেন্দ্রনাথও প্রতিনিয়ত সেই নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে চলেন। হাতের তালি বাজিয়ে সেই পাখিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। পাখি ফেরে না ….. আকাশ নীল, স্বচ্ছ জল নীল, প্রকৃতির মাঝে এই রহস্যময় নীলে ঠাকুরদার আত্মাও নীল। নীলের অসীম গভীরতায়, বেদনাহত মুখও নীলবর্ণের। দেশভাগের যন্ত্রণা লেখকের সত্তাকে যে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল অনুভবী পাঠককে সেই ‘নীল সত্য’ কে উপলব্ধি করার অবসর দিয়েছে উপন্যাসটি।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও তিনটি মহতী উপন্যাস ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান’ – প্রত্যেকটি বিষয় বৈচিত্র্যে, লিখনশৈলীর ভঙ্গিতে এবং সেই বিশ্বময় ছড়ানো সেই রহস্যময় পাখিটি খুঁজে ফেরার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এগুলি ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব হিসাবে বিবেচিত।

    উপন্যাসটির প্রাপ্তি
    উপন্যাসটি কেবল বাংলা সাহিত্য জগতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তাই নয়,ভারতীয় সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট-এর উদ্যোগে এটি ক্লাসিক পর্যায়ে উন্নীত এবং বারোটি মূল ভারতীয় ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘শরৎ পুরস্কার’ এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে এই উপন্যাসটির জন্য লেখক আই.আই.পি.এম প্রবর্তিত “সুরমা চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্মৃতি পুরস্কার” লাভ করেন যার সাম্মানিক মূল্য দশ লক্ষ টাকা।

    বিদ্বজ্জনের প্রতিক্রিয়া
    সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন—
    অতীনের সেরা লেখা, এর মধ্যে অতীনের সত্তা ডুবে আছে, আমরা যাকে বলি ভর পাওয়া লেখা।

    অশোক মিত্রের মতে—
    পুতুলনাচের ইতিকথা’র পর এতটা আর অভিভূত হই নি।

    সমরেশ মজুমদার ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে—
    এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

  • প্রথম খণ্ড

    প্রথম খণ্ড

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    প্রথম খণ্ড

    দেশভাগ নিয়ে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজের চারটি পর্ব। প্রথম পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, দ্বিতীয় পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, তৃতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’, চতুর্থ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’। কিংবদন্তী তুল্য উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সম্পর্কে অগ্রজ সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন, ‘অতীনের সেরা লেখা, এর মধ্যে অতীনের সত্তা ডুবে আছে, আমরা যাকে বলি ভর পাওয়া লেখা। ‘পুতুলনাচের ইতিকথার পর এতটা আর অভিভূত হইনি’—অশোক মিত্র। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’—শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’—সমরেশ মজুমদার। সমকালের আর এক বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ লিখেছিলেন—‘দুই বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ঐক্যে বিশ্বাসী বলে আমার জানাতে দ্বিধা নেই যে, অতীনের এই রচনা এযাবৎকালের নজিরের বাইরে। ভাবতে গর্ব অনুভব করছি যে, আমার সমকালে এই তাজা তেজস্বী খাঁটি লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। আজ হয়ত তিনি নিঃসঙ্গ যাত্রী। কিন্তু বিশ্বাস করি, একদা আমাদের বংশধরগণ তাঁর নিঃসঙ্গ যন্ত্ৰণা অনুভব করে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তিরস্কার বর্ষণ করবে। ‘পথের পাঁচালীর’ পর এই হচ্ছে দ্বিতীয় উপন্যাস যা বাংলা সাহিত্যের মূল সুরকে অনুসরণ করেছে।’ পাঠিকা ঝর্ণা নাগ শিবপুর থেকে লিখেছিলেন—‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ পড়ে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ঈশ্বরের সৃষ্ট সুন্দর পৃথিবী দেখে মুগ্ধ হয়ে যেমন তার সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কৌতুক বিস্ময় জাগে এও তেমনি।’ এমন অজস্র চিঠি এবং সাহিত্যঋণের কথা স্বীকার করা হয়েছে অন্য তিনটি পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান’ সম্পর্কেও। বিদগ্ধ এবং গুণী ব্যক্তিরা লিখেছেন, ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ যদি মহৎ উপন্যাস, ‘অলৌকিক জলযান’ তবে মহাকাব্য বিশেষ—আর ‘মানুষের ঘরবাড়ি সোনার কিশোর জীবনের অবিনাশী আখ্যান। শেষ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’–এতে আছে দেশভাগ জনিত উদ্বাস্তু পরিবারটির সংগ্রামী বিষয়, অভিনব চরিতমালা এবং পটভূমি সহ জীবনের রোমাঞ্চকর অভিযানের লৌকিক-অলৌকিক উপলব্ধি পুষ্টি খণ্ডিত বঙ্গের অখণ্ড বর্ণমালা।

    ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের পরিচ্ছেদ সমূহ—

  • এক

    এক

    সোনালী বালির নদীর চরে রোদ হেলে পড়েছে। ঈশম শেখ ছইয়ের নিচে বসে তামাক টানছে। হেমন্তের বিকেল। নদীর পাড় ধরে কিছু গ্রামের মানুষ হাট করে ফিরছে। দূরে দূরে সব গ্রাম মাঠ দেখা যাচ্ছে। তরমুজের লতা এখন আকাশমুখো। তামাক টানতে টানতে ঈশম সব দেখছিল। কিছু ফড়িং উড়ছে বাতাসে। সোনালী ধানের গন্ধ মাঠময়। অঘ্রানের এই শেষ দিনগুলিতে জল নামছে খাল-বিল থেকে। জল নেমে নদীতে এসে পড়ছে। এই জল নামার শব্দ ওর কানে আসছে। সূর্য নেমে গেছে মাঠের ওপারে। বটের ছায়া বালির চর ঢেকে দিয়েছে। পাশে কিছু জলাজমি। ঠাণ্ডা পড়েছে। মাছেরা এখন আর শীতের জন্য তেমন জলে নড়ছে না। শুধু কিছু সোনাপোকার শব্দ। ওরা ধানখেতে উড়ছিল। আর কিছু পাখির ছায়া জলে। দক্ষিণের মাঠ থেকে ওরা ক্রমে সব নেমে আসছে। এ সময় একদল মানুষ গ্রামের সড়ক থেকে নেমে এদিকে আসছিল—ওরা যেন কি বলাবলি করছে। যেন এক মানুষ জন্ম নিচ্ছে এই সংসারে, এখন এক খবর, ঠাকুরবাড়ির ধনকর্তার আঘুনের শেষ বেলাতে ছেলে হয়েছে।

    ঈশম শেষ কথাটা শুনেই হুঁকোটা ছইয়ের বাতায় ঝুলিয়ে রাখল। কলকে উপুড় করে দিল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বের হল। উপরে আকাশ নিচে এই তরমুজের জমি আর সামনে সোনালী বালির নদী। জল, স্ফটিক জলের মতো। ঈশম এই ছায়াঘন পৃথিবীতে পশ্চিমমুখো হয়ে দাঁড়াল। বলল, সোভান আল্লা। শেষে আর সে দাঁড়াল না। নদীর পাড় অতিক্রম করে সড়ক ধরে হাঁটতে থাকল। ধনকর্তার পোলা হইছে—বড় আনন্দ, বড় আনন্দ। সব খুদার মেহেরবানি। সড়কের দু’ধারে ধান, শুধু ধান—কত দূরে এইসব ধানের জমি চলে গেছে। ঈশম চোখ তুলে দেখল সব। বিকেলের এইসব বিচিত্র রঙ দেখতে দেখতে তার মনে হল, পাশাপাশি এইসব গ্রাম—তার কত চেনা, কতকালের মেমান সব-নিচে খাল, মাছেরা জলে লাফাচ্ছে। সে সড়কের একধারে গামছা পাতল। নিচে ঘাস, গামছা ঘাসের শিশিরে ভিজে উঠছে। সে এসব লক্ষ করল না। সে দু’হাঁটু ভেঙে বসল। খালের জল নিয়ে অজু করল। সে দাড়িতে হাত বুলাল ক’বার। মাটিতে পর পর ক’বার মাথা ঠেকিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে গেল। অঘ্রানের শেষ বেলায় ঈশম নামাজ পড়ছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে বলে ওর ছায়াটা কত দূরে চলে গেছে। খালের জল কাঁপছিল। ওর ছায়াটা জলে কাঁপছে। কিছু হলদে মতো রঙের ফড়িং উড়ছে মাথার উপর। সূর্যের সোনালী রঙে ওর মুখ আশ্চর্যরকমের লাল দেখাচ্ছিল। যেন কোন ফেরেস্তার অলৌকিক আলো এই মানুষের মুখে এসে পড়েছে। সে নামাজ শেষ করে হাঁটতে থাকল। এবং পথে যাকে দেখল তাকেই বলল, আঘুনের শেষ ফজরে ধনকর্তার পোলা হইছে। ওকে দেখে মনে হয় তরমুজ খেত থেকে অথবা সোনালী বালির চর থেকে একটি খবর সকলকে দেবার জন্য সে উঠে এসেছে। সে সড়ক অতিক্রম করে সুপারি বাগানে ঢুকে গেল। বৈঠকখানাতে লোকের ভিড়। বাইরে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। সে প্রায় সকলকেই আদাব দিল এবং ভিতরে ঢুকে নিজের জায়গাটিতে বসে তামাক সাজতে থাকল।

    সোনালী বালির নদীতে সূর্য ডুবছে। কচ্ছপেরা ধানগাছের অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে। এইসব কচ্ছপ এখন একটু শক্তমতো মাটি পেলেই পাড়ে উঠে ডিম পাড়তে শুরু করবে। অনেকগুলি শেয়াল ডাকল টোডারবাগের মাঠে। একটা দুটো জোনাকি জ্বলল জলার ধারে। জোনাকিরা অন্ধকারে ডানা মেলে উড়তে থাকল। পাখিদের শেষ দলটা গ্রামের উপর দিয়ে উড়ে গেল। নির্জন এবং নিরিবিলি এইসব গ্রাম, মাঠ। অন্ধকারেও টের পাওয়া যায়। মাথার উপর দিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে। সে জানে ওরা কোথায় যায়। ওরা হাসান পীরের দরগাতে যায়। পীরের দরগায় ওরা রাত যাপন করে। শীতের পাহাড় নেমে এলে ওরা তখন দক্ষিণের বিলে চলে যাবে। ঈশম এবার উঠে পড়ল।

    .

    ঈশম ডাকল, ঠাইনদি আমি আইছি।

    দরজার বাইরে এসে ছোটকর্তা দাঁড়ালেন।—ঈশম আইলি?

    —হ, আইলাম। ধনকর্তারে খবর দিতে পাঠাইছেন? না পাঠাইলে আমারে পাঠান। খবর দিয়া আসি। একটা তফন আদাই কইরা আসি।

    ছোটকর্তা বললেন, যা তবে। ধনদাদারে কবি, কাইলই যেন রওনা দেয়। কোনও চিন্তার কারণ নাই। ধনবৌ ভাল আছে।

    —তা আর কমু না! কি যে কন! ঠাইনদি কই?

    —মায় অসুজ ঘরে। তুই বরং বড় বৌঠাইনরে বল তরে ভাত দিতে

    ঈশম নিজেই কলাপাতা কাটল এবং নিজেই এক ঘটি জল নিয়ে খেতে বসে গেল।

    বড়বৌ বলল, পাতাটা ধুয়ে নাও।

    ঈশম পাতাটার উপর জল ছিটিয়ে নিল। বলল, দ্যান।

    বড়বৌ ঈশমকে খেতে দিল। ঈশম যখন খায় বড় নিবিষ্ট মনে খায়। ভাত সে একটাও ফেলে না। এমন খাওয়া দেখতে বড়বৌর বড় ভাল লাগে। ঈশমকে দেখতে দেখতে ওর বিবির কথা মনে হল। ঈশমের ভাঙা ঘর, পঙ্গু বিবি, নাড়ার বেড়া এবং জীর্ণ আবাসের কথা ভেবে বড়বৌ-এর কেমন মায়া হল। অন্যান্য অনেকদিনের মতো বলল, পেট ভরে খাও ঈশম। একটু ডাল দেব, মাছ? অনেক দূর যাবে, যেতে যেতে তোমার রাত পোহাবে।

    ঈশম নিবিষ্ট মনে খাচ্ছে, আর হাত-দশেক দূরের অসুজ ঘরটা দেখছে। সেখানে ধনমামি আছেন, ঠাইনদি আছেন, ঈশম ঘরের কোণায় কোণায় বেতপাতা ঝুলতে দেখল। মটকিলা গাছের ডাল দেখল দরজাতে ঝুলছে। ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। বাচ্চাটা দুবার ট্যাও ট্যাও করে কাঁদল, ভিজা কাঠের গন্ধ, ধোঁয়ার গন্ধ, ধূপের গন্ধ মিলিয়ে এ বাড়িতে একজন নবজাতকের জন্ম। টিনকাঠের ঘর, কামরাঙা গাছের ছায়া—ধনমামি, বড়মামি—এবং এ-বাড়ির বড়কর্তা পাগল, একথা মনে হতেই ঈশম বলল, বড়মামি, বড়মামারে দ্যাখতাছি না।

    বড়বৌ বড় বড় চোখ নিয়ে ঈশমকে শুধু দেখল। কোনও কথা বলল না। বললেই যেন চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসবে। ঈশম যেন এই চোখ দেখে ধরতে পেরেছে বড়মামা এখন বাড়িতে নেই। অথবা কোথায় থাকে, কই যায় কেউ খোঁজখবর রখে না। রাখবার সময় হয় না। অথবা দরকার হয় না। ঈশম ডাল দিয়ে সবক’টা ভাত হাপুস করে মাকড়সার মতো গিলে ফেলল। বড়মামি এখন কাছে নেই। বৈঠকখানায় লোক পাতলা হয়ে আসছে। বড়মামির বড় ছেলে, ধনমামির বড় ছেলে রান্নাঘরে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিচ্ছে।

    ঈশম বৈঠকখানা থেকে লাঠি নিল একটা, লণ্ঠন নিল হাতে। ঈশম মাথায় পাগড়ি বাঁধল গামছা দিয়ে। এই আঘুন মাসের ঠাণ্ডায় কাদাজল ভাঙতে হবে। খাল পার হতে হবে, বিল পার হতে হবে। গামছা মাথায় সে পাঁচ ক্রোশ পথ হাঁটবে। কোথাও খালের পাড়ে পাড়ে,কোথাও পুলের উপর দিয়ে, কখনও চুপচাপ, কখনও গাজির-গীত গাইতে গাইতে ঈশম দীর্ঘপথ হাঁটবে। ঈশম রান্নাঘর অতিক্রম করবার সময় দেখল কুয়োতলার ধারে বড়মামি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কার জন্য যেন প্রতীক্ষা করছেন। ঈশমকে দেখে বড়বৌ বলল, ঈশম দেখবে তো তোমার বড়মামাকে ট্যাবার বটতলায় পাও কিনা, তুমি তো বটতলার পথেই যাবে।

    ঈশম বাঁশঝাড় অতিক্রম করে মাঠের অন্ধকারে নেমে যাবার সময় বলল, আপনে বাড়ি যান। যাইতে যাইতে যদি পাই—পাঠাইয়া দিমু। এই বলে ঈশম ক্রমে অন্ধকার মাঠে মিশে যেতে থাকল। ঈশমকে আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু মাঠের ভিতর লণ্ঠন দুলছে।

    ঈশমের ডান হাতে লাঠি, বাঁ হাতে লণ্ঠন। অঘ্রান মাস। শিশির পড়ছে। এখনও ভাল করে ধানখেতের ভিতর আল পড়েনি। সরু পথ খেতের পাশে পাশে। পথ থেকে বর্ষার জল নেমে গেছে—পথের মাটি ভিজা, কাদামাটিতে পা বসে যাবার উপক্রম। অথচ পা বসে যাচ্ছে না—কেমন নরম তাল তাল মাটির উপর দিয়ে ঈশম হেঁটে যাচ্ছে। গাঢ় অন্ধকার বলে ঈশম চারদিকে শুধু লন্ঠনের আলো এবং তার অস্তিত্ব ব্যতিরেকে অন্য কিছু প্রত্যক্ষ করতে পারল না। এ অঞ্চলে হেমন্তে শীত পড়তে আরম্ভ করে। শীতের জন্য ঝোপজঙ্গলের কীট-পতঙ্গরা কেমন চুপচাপ হয়ে আছে। ঈশম লণ্ঠন তুলে এবার উঁচু জমিতে উঠে এল। পাশে করলার জমি। উপরে ট্যাবার পুকুর আর সেই নির্দিষ্ট বটগাছ। এখানে অনেক রাত পর্যন্ত বড়কর্তা বসে থাকেন। এখানে বড়কর্তাকে অনেকদিন গভীর রাতে খুঁজে পাওয়া গেছে। ঈশম লণ্ঠন তুলে ঝোপে-জঙ্গলে বড়কর্তাকে খুঁজল। ঝোপে ঝোপে জোনাকি। বটের জট মাটি পর্যন্ত নেমেছে। পুরানো জট বলে জটসকল ভিন্ন ভিন্ন ঘরের মত ছায়া সৃষ্টি করছে। সে ডাকল, বড়মামা আছেন? সে কোনও উত্তর পেল না। তবু লণ্ঠন তুলে গাছটার চারধারে খুঁজতে থাকল—তারপর যখন বুঝল তিনি এখানে নেই, তিনি অন্য কোথাও পদযাত্রায় বের হয়েছেন, তখন ঈশম ফের নিচু জমিতে নেমে হাঁটবার সময় দূরে দূরে সব গ্রাম, গ্রামের আলো, হাসিমের মনিহারি দোকানে হ্যাজাকের আলো দেখতে দেখতে নালার ধারে কেমন মানুষের গলা পেল।

    সে বলল, কে জাগে?

    অন্ধকার থেকে জবাব এল, তুমি ক্যাডা?

    —আমি ঈশম শেখ। সাকিম টোডারবাগ। ঈশম যেন বলতে চাইল, আমি গয়না নৌকার মাঝি ছিলাম। এখন ঠাকুরবাড়ির খেয়ে মানুষ। অন্ধকার মানি না। বাবু ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার বাস। নদীর চরে তরমুজ খেত পাহারায় থাকি। ঠাকুরবাড়ির বান্দা আমি। বয়স বাড়ছে, গয়না নৌকা চালাতে আর পারি না।

    —আমি আনধাইর রাইতে হাসিম ভূঁইঞা জাগি। সাকিম কলাগাইছা।

    —অঃ, হাসিম ভাই। তা কি করতাছ?

    —মাছ ধরতাছি। দ্যাখছ না জল নামতাছে। আমি কৈ মাছের জাল পাইতা বইসা আছি। ঘুট-ঘইটা আনধাইরে কই রওনা দিলা?

    —য্যামু মুড়াপাড়া। ধনকর্তার পোলা হইছে। সেই খবর নিয়া যাইতাছি।

    —ধনকর্তার কয় পোলা য্যান?

    —এরে নিয়া দুই পোলা। তোমার কাছে কাঠি আছে, বিড়িটা আঙ্গাইতাম।

    ঈশম বিড়ি ধরাল। ওর বড়কর্তার জন্য মনটা খচখচ করছে। বড়কর্তা রাতে বাড়ি না ফিরলে বড়মামি অন্ধকারে মানুষটার জন্য জেগে থাকবে। সে বলল, বড়মামারে দ্যাখছ?

    —দুফরে দ্যাখছিলাম—নদীর চরে হাঁইটা যাইতাছে।

    ঈশম কেমন দুঃখের গলায় বলল, ভাইরে, তোমার আমার ছোটখাটো দুঃখ। ঠাকুরবাড়ির দুঃখে চক্ষে পানি আসে। ঈশম ফের হাঁটতে থাকল। সে হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে। ফাওসার খাল পার হবার জন্য সে হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে। হাট ভাঙার আগে যেতে পারলে সে গুদারাঘাটে মাঝি পাবে। নতুবা এই শীতে সাঁতার কেটে খাল পার হতে হবে। ঠাণ্ডার কথা ভাবতেই ওর শরীরটা কেমন কুঁকড়ে গেল।

    ইচ্ছা করলে ঈশম একটা সংক্ষিপ্ত পথ ধরে আরও আগে খালের পাড়ে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু একটি অজ্ঞাত ভয়, বিশেষ করে বামন্দি-চকের বুড়ো শিমুল গাছটা এবং ওর বাজে-পোড়া মরা ডাল বড় ভয়ের কারণ। নিচে কবর, আবহমানকাল ধরে মানুষের কবর, হাজার হবে, বেশিও হতে পারে—ঈশম ভয়ে সেই পথে খালের পাড়ে পৌঁছাতে পারছে না।

    ঈশম হাতের লাঠিটা এবার আরও শক্ত করে ধরল। সে ভয় পেলেই আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়। আল্লা মেহেরবান। সে যেন আসমানে তার সেই মেহেরবানকে খুঁজতে থাকে। অজস্র তারা এখন বিন্দু বিন্দু হয়ে জ্বলছে। নিচে সেই এক শুধু গাঢ় অন্ধকার। দূরে দূরে সব গ্রামের আলো, হ্যাজাকের আলো—গাছের ফাঁকে এবং ঝোপজঙ্গলের ফাঁকে এখনও দেখা যাচ্ছে। পরাপরদীর পথ ধরে কিছু লোক যাচ্ছিল জল ভেঙে—ওদের হাতে কোনও আলো নেই—জলে ওদের পায়ের শব্দ। কিছু কথাবার্তা ঈশমের কানে ভেসে আসতে থাকল।

    সে ক্রমে খালের দিকে নেমে যাচ্ছিল। ওর হাঁটু পর্যন্ত ধানগাছ শিশিরে ভিজছে। ঈশম পরাপরদীর পথ থেকে ক্রমশ ডাইনে সরে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে সে কোন মানুষের সাড়া পাচ্ছে না। নীরবে যেন একটা মাঠ গাভীন গরুর মতো অন্ধকারে শুয়ে আছে। পথ ধরে কোনও হাটুরে ফিরছে না। ফসলের ভারে গাছগুলি পথের উপর এসে পড়েছে। সে লাঠি দিয়ে গাছগুলি দুদিকে সরিয়ে দিচ্ছে এবং পথ করে নেমে যাচ্ছে। খালের পাড়ে গিয়ে দেখল গুদারা বন্ধ। মাঝি এপারে নৌকা রেখে চলে গেছে। নৌকাটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাঁ পাশে সে কয়েক কদম হেঁটে গেল। অদূরে মনে হল আকাশের গায়ে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। ঈশম জানত, এ সময়ে জেলেনৌকা থাকবে—বর্ষার জল খাল বিল ধরে নেমে যাচ্ছে। যে জল এ অঞ্চলে উঠে এসেছিল জোয়ারে—আঘুন মাসের টানে তা নেমে যাবে। জলের সঙ্গে মাছ এবং কচ্ছপ। জেলেরা এসেছে, খড়া জাল নিয়ে খালের ভিতর জাল পেতে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঈশম খালের পাড়ে সেই লণ্ঠনের আলো পর্যন্ত হেঁটে গেল। পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। ডাকল, আমি ঈশম। আমারে পার কইরা দ্যাও। আমি যাইতাছি এক খবর নিয়া। ধনকর্তার পোলা হইছে। তারপর সে কেন যে হঠাৎ ডাকল, বড়মামা আছেন, বড়মামা! বড়মামি আপনের লাইগা জাইগা বইসা আছে, বাড়ি যান। কোনও উত্তর এল না। শুধু একটা নৌকা ওপার থেকে ভেসে এল। বলল, ধনকর্তার পোলা হইছে?

    ঈশম বলল, হ।

    —তবে কাইল যামু, একটা গরমা মাছ লইয়া যামু। মাছ দিয়া একটা পিরান চাইয়া নিমু। বলে সে পাটাতন তুলে অন্ধকারে একটা বড় মাছ টেনে বের করল। ইশম লণ্ঠনের আলোতে নীল রঙের তাজা মাছটা পাটাতনে লাফাতে দেখল। চোখ দুটো বড় অবলা। যেন এক পাগল মানুষ নিরন্তর এইসব মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফুল-ফল পাখি দেখে বেড়াচ্ছে—এই চোখ দেখলে, পাগল মানুষটার চোখ শুধু ভাসে। বড়মামি বড় বড় চোখ নিয়ে প্রত্যাশায় বসে আছে, কখন ফিরবে মানুষটা। সে বলল, বড়মামারে দ্যাখছ?

    মানুষটা বলল, বড়কর্তারে আইজ দেখি নাই।

    ঈশম আর কোনও কথা বলল না। এইসব মাঠে পাগল মানুষ দিনরাত ঘুরে বেড়ান। কোন অন্ধকারে,কোথায় তিনি কার উদ্দেশে হেঁটে যান ঈশম টের করতে পারে না। তাকে খাল পার করে দিলে, সে মাঠ ধরে হাঁটতে থাকল শুধু।

    এখন সে পাটের জমি ভাঙছে। এখানে এখন কোনও ফসল নেই। কলাই, খেসারি এসব থাকার কথা—কিন্তু কিছুই নেই। শুধু ফসলহীন মাঠ। শুধু খোঁচা খোঁচা দাড়ির মতো পাট গাছের গোড়া উঁকি মেরে আছে। যোগী-পাড়াতে এত রাতেও তাঁত বোনা হচ্ছে। মাঠেই সে তাঁতের শব্দ পেল। সে গ্রামে উঠে যাবার মতলবে কোনাকোনি হাঁটছে। জেলেদের নৌকাগুলি এখন আর দেখা যাচ্ছে না। শুধু খড়া জালের মাথায় বাঁশের ডগাতে লণ্ঠনের আলো প্রায় যেন এক ধ্রুবতারা—ওকে পথের নির্দেশ দিচ্ছে। সে কতটা পথ হেঁটে এল, এবং কোনদিকে উঠে যেতে হবে—অন্ধকারে সেই এক আলো তাকে সব বাৎলে দিচ্ছে। এ মাঠের শেষেই সেই বুড়ো শিমুল গাছটা যেন ক্রমে অবয়ব পাচ্ছে। দিনের বেলাতে এ-জমি থেকে গাছটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেই গাছটার পাশের গ্রামে একবার মড়ক লেগেছিল—ঈশম কেমন ভয়ে ভয়ে হাঁটছে! শিমুলগাছটার দূরত্ব ঈশমকে কিছুতেই ভয় থেকে রেহাই দিচ্ছে না। সে যত দূর দিয়ে যাচ্ছে তত মনে হচ্ছে গাছটা ওর দিকে হেঁটে আসছে। ডান পাশে প্রায় আধ ক্রোশ হেঁটে গেলে সেই গাছ এবং নিচে তার কবরভূমি—যেহেতু টিলা জমি থেকে একবার সে গাছটাকে দেখতে পেয়েছিল, একদিন হাট ফেরত রাতে গাছটার মাথায় সে আলো জ্বলতে দেখেছিল—সেজন্য ঈশম ভয়ে ভয়ে দ্রুত পা চালিয়ে যোগীপাড়াতে উঠে এল। কেউ দেখে ফেললেই বলবে, এলাম সেই কবর ভেঙে—কারণ ঈশমের মতো সাহসী পুরুষ হয় না—এ তল্লাটে সে এমন একজন সাহসী মানুষ। কিন্তু ঈশম কোনওকালে তার ভয়ের কথা খুলে বলে না। সাহসী বলে সে রাতেবিরেতে পরাণের ভিতরে ভয় লুকিয়ে রেখে চোখ বুজে চলে যেতে থাকে। যোগীপাড়াতে উঠতেই মানুষের শব্দে, চরকার শব্দে এবং শানা মাকুর শব্দে ভয়টা কেটে গেল। তারপর পরিচিত মানুষের গলা পেয়ে বলল, আমীর চাচার গলা পাইতাছি।

    —তুমি……?

    —আমি ঈশম।

    —এত রাইতে!

    —যামু মুড়াপাড়া। ধনকর্তার পোলা হইছে—খবর লইয়া যাইতাছি। আপনার শরীর ক্যামন?

    —ভাল নারে বাজান। ভাল না। একটু থেমে বলল, বড়কর্তার মাথাটা আর ঠিক হইল না?

    —না চাচা।

    —শোনলাম বুড়া কর্তা চক্ষে দেখতে পায় না।

    —না। সারাদিন ঘরে বইসা থাকে। বড়মামি, বুড়া ঠাইরেন দেখাশুনা করে।

    —পোলাটা পাগল হইল আমার কর্তার-অ চক্ষু গেল।

    —হ চাচা।

    —তা একটু বইস। তামাক খাও।

    —আর একদিন চাচা। আইজ যাইতে দ্যান। ঈশম কথা বলতে বলতে সৈয়দ মিস্ত্রির শোলার মাচান অতিক্রম করে রামপদ যোগীর আমবাগানে ঢুকে গেল। তারপর গ্রামের মসজিদ পার হয়ে মাঠে পড়তেই শিমুল গাছটার কথা মনে হল। সে জোরে জোরে মনের ভিতর সাহস আনার জন্য বলল, এলাহী ভরসা। গাছটা যেন ক্রমে শয়তান হয়ে যাচ্ছে। শয়তানের মতো পিছু নিয়েছে। মাঝে-মাঝে হাতের লাঠিটা লণ্ঠনটা ভয়ানক ভারী-ভারী মনে হচ্ছে। সে ভাবল—এমন তো হবার কথা নয়। সে ভাবল, অনেক রাত, অনেক দূরে সে কত মানুষের সুসংবাদ, দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে গেছে—অথচ আজ এখনও সে ফাওসার চক ভাঙতে পারেনি। শিমুল গাছটা বড় কাছে মনে হচ্ছে। কখনও পেছনে তাড়া করছে, কখনও সামনে! সে দু’বার লাঠিটা মাথার উপর বন বন করে ঘোরাল। ওর পাইক খেলার কথা মনে হল-লাঠি খেলায় ওস্তাদ ঈশম এই মাঠে গাছটাকে প্রতিপক্ষ ভেবে মাঝে মাঝে লাঠি ঘোরাতে থাকল। লণ্ঠনটা সে বাঁ হাতে রেখে ডান হাতে লাঠি মাথার উপর ঘোরাচ্ছে এবং নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। যখন ধানগাছগুলো পা জড়িয়ে ধরেছে, সে লাঠি দিয়ে ধানগাছ সরিয়ে ফের হাঁটছে। সে লাঠি দিয়ে মাঝে মাঝেই ধান গাছ সরাচ্ছিল—কিছুটা নিজেকে অন্যমনস্ক করার জন্য, কিছুটা পথ পরিষ্কার করার জন্য। মাঠে নেমেই শরীরটা ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে। ভয়ানক শক্ত সমর্থ শরীর ঈশমের। এই বুড়ো বয়সেও সে `ঘাড়-গলা শক্ত রাখতে পেরেছে। অথচ এই রাত, অন্ধকার, বিশাল বিলেন মাঠ এবং যে শিমুল গাছটা এতক্ষণ ওকে তাড়া করছে—এই সব মিলে তাকে কেমন গোলমালের ভিতর ফেলে দিয়েছে। ঈশম লণ্ঠনের আলোতে যেন পথ দেখতে পাচ্ছে না। এই বিল ভেঙে উঠতে পারলেই ফের গ্রাম, ফের গ্রামের পথ, গোলাকান্দালের ভূতুড়ে পুল এবং পুরীপূজার মাঠ। ফের গ্রামের পর গ্রাম, তারপর বুলতার দিঘি এবং নমশূদ্রপাড়া-পেড়াব পোনাব, মাসাব গ্রাম।

    অন্ধকার বলেই আকাশে এত বেশি তারা জ্বলজ্বল করছিল। বিলেন জমি নিচে নামতে নামতে যেন পাতালে নেমে গেছে। আলপথগুলি এখনও ঠিক মতো পড়েনি, অঘ্রান গেলে, পৌষ এলে এবং ধানকাটা হলে পথগুলি স্পষ্ট হবে। এই বিলে পথ চিনে অন্য পারে উঠে যাওয়া এখন বড় কষ্টকর।

    অনেকক্ষণ ধরে ঈশম একটি পরিচিত আলপথের সন্ধান করল। যারা মেলাতে যায়, অথবা বান্নিতে, তারা এই আলপথে বিলের অন্য পাড়ে উঠে যায়, ধানজমির ফাঁকে ফাঁকে কোথায় যেন পথটা লুকিয়ে আছে। সে সন্তর্পণে গাছ তুলে তুলে দেখছে আর এগুচ্ছে। এই বুঝি সেই পথ, কিছু দূরে গেলেই মনে হচ্ছে, না সে ঠিক পথে আসেনি-পথটা ওকে নিয়ে বিলের ভিতর লুকোচুরি খেলছে। তারপর ভাবল, বিলের জমির ধারে ধারে হাঁটতে থাকলে সে নিশ্চয়ই পাশের গ্রামে গিয়ে উঠতে পারবে। মনে মনে আবার উচ্চারণ করল, এলাহী ভরসা। তাকে এ-রাতে, এ-বিল, এ-মাঠ অতিক্রম করতেই হবে। অন্ধকারে পথ যত অপরিচিত হোক, শয়তানের চোখ যত ভয়ঙ্কর হোক—সে এ-মাঠ ঠেলে অন্য মাঠে গিয়ে পড়বেই। ধনকর্তাকে খবর দেবেই।

    সে কখনও দৃঢ় হল। অথবা কখনও সংশয়ে ভুগে সে কেমন দুর্বল হয়ে পড়ছে। সে যেন ক্ৰমে এই বিলের ভিতর ডুবে যাচ্ছে। এবং মনে হচ্ছে তার, সে একই জায়গায় ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে। সে আদৌ এগুতে পারছে না। সে এবার বলল, খুদা ভরসা। সে যে ঘুরে ফিরে একই জায়গায় ফিরে আসছে পরখ করার জন্য হাতের লাঠিটা ধানগাছ সরিয়ে কাদামাটিতে পুঁতে দিল। সে সেই নির্দিষ্ট স্থানটি চিনে রাখার জন্য কিছু গাছ উপড়ে ফেলল। একটা কাকতাড়ুয়ার মতো করে গাছগুলিকে বেঁধে রাখল লাঠিতে। তারপর গোলমতো চারপাশে একটা দাগ দিল।

    অনেকক্ষণ ধরে এই বিল এবং পথ ওর সঙ্গে রসিকতা করছে। সে একটু সময় বসল। বিশ্বচরাচর নিঝুম। মনে হয় ঠিক যেন এই বিল সেই পাগল ঠাকুরের মতো রহস্যময়। সে নিজের মনে হাসবার চেষ্টা করল। অথচ গলা শুকনো। ওর সামান্য কাশি উঠে এল গলা থেকে। দ্রুত সেই শব্দ বিলের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। অপরিচিত শব্দ কোথাও। সে কান পেতে রাখল। এখন এই মাঠ আর তার কাছে পাগল ঠাকুরের মতো রহস্যময় নয়, নিঃসঙ্গ মাঠ অঘ্রানের শিশিরে ভিজে ওর পঙ্গু স্ত্রীর মতো ঘুমাচ্ছে অথবা রাতের কীটপতঙ্গ সকল, ঝিঁঝিপোকা সকল শীতের মরসুমের জন্য আর্তনাদ করছে। কবে শীত আসবে, কবে শীত আসবে, মাঠ ফাঁকা হবে, শস্যদানা মাঠে পড়ে থাকবে, আমরা উড়ে উড়ে খাব, ঘুরব-ফিরব, নাচব-খেলব। সে যত এইসব শুনতে থাকল, যত এইসব চিন্তায় বিষণ্ণ হতে থাকল তত সেই ভয়াবহ শিমুল গাছটা মাথায় আলো জ্বেলে ওর দিকে যেন এগিয়ে আসছে।

    শিমুল গাছটার মাথায় আলোটা জ্বলছে আর নিভছে। অথবা নিভে গিয়ে আলেয়া হয়ে যাচ্ছে। দূরে দূরে যেন বিলের এ-মাথা থেকে অন্য মাথায় আলেয়াটা ওকে নেচে নেচে খেলা দেখাচ্ছে। সে বলল, ভালরে ভাল! এভাবে বসে থাকলে ভয়টা ওকে আরও পঙ্গু করে দেবে। সে দ্রুত উল্টো মুখে ছুটতে পারলেই কোন-না-কোন গ্রামে উঠে যেতে পারবে।

    সুতরাং সে হাতের লণ্ঠন নিয়ে দ্রুত ছুটতে থাকল। হাতের লণ্ঠনটা দু’বার দপদপ করে জ্বলে উঠল। লণ্ঠনটা নিভে যাবে ভয়ে সে দ্রুত ছুটে যেতে পারল না। সে দু’হাঁটুতে আর শক্তি পাচ্ছে না। বার বার কেবল পিছনের দিকে তাকাচ্ছে। সে এবার দেখল, স্পষ্ট দেখতে পেল, শিমুল গাছটা যথার্থই এগিয়ে আসছে। সে দেখল গাছের মাথায় আলো আর ডালে ডালে মড়কের মৃতদেহ ঝুলছে। সে ধানখেত পার হয়ে কাকতাড়ুয়া জায়গাটায় ফিরে এসেছে। শিমুল গাছটা সহসা জীবন্ত হয়ে গেল। এতক্ষণে তবে সে একই বৃত্তে ঘুরছে! ভয়ে বিবর্ণ ঈশম দস্যুর মতো লাথি মারল কাকাতাড়ুয়াকে। উপড়ানো গাছগুলি অন্ধকারে বিলের প্রচণ্ড হাওয়ায় উড়তে থাকল।

    সে বলল, শয়তানের পো ভাবছটা কি শুনি! বিলের পানিতে আমারে ডুবাইয়া মারতে চাও! বলেই সে লাঠিটা তুলে উপরের দিকে ঘোরাল। যেমন সে মহরমের দিন বাজনার সঙ্গে সঙ্গে সামনে-পিছনে অথবা উপরে-নিচে, ডাইনে-বাঁয়ে লাঠি ঘোরাতো, লাঠি এগিয়ে দিত, পিছিয়ে আনত, সে উপরের দিকে উঠে যাবার সময় তেমন সব খেলা দেখাতে থাকল। এই বিলের জমি এবং শিমুল গাছটার ভয়ে সে এখন মরিয়া। কিন্তু খেলা দেখালে হবে কি—কারা যেন ওকে পেছনে টানছে। চারপাশে হাঁটছে কারা। মনে হচ্ছে সারা বিলে মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে। একদল অবয়বহীন শয়তান ওর সঙ্গে হাঁটছে অথচ কথা বলছে না। অন্ধকারে সে কেবল উপরে ওঠার পরিবর্তে নিচে নেমে যাচ্ছে। এবারে সে চিৎকার করে উঠল, খুদা এইটা কি হইল! ধনকর্তাগ, আমারে কানাওলায় ধরছে। সে লণ্ঠন ফেলে লাঠি ফেলে বিলের আলে আলে ঘুরতে থাকল। ধানপাতা লেগে পা কেটে যাচ্ছে। সে বার বার একই জায়গায় ঘুরে ঘুরে এসে হাজির হচ্ছে। আর এ সময়ই সে দেখল ভুতুড়ে আলোটা একেবারে চোখের সামনে জ্বলছে নিভছে। সেই আলোর হাজার চোখ হয়ে গেল, অন্ধকারের ভিতরে ভূতের মতো চোখগুলো জ্বলছে। ঈশম আর লড়তে পারল না, ধীরে ধীরে আলের উপর সংজ্ঞাহীন হয়ে গেল।

    .

    আগে সুন্দরআলি লণ্ঠন হাতে। পিছনে ধনকর্তা। তিনি চারদিন আগে ধনবৌর চিঠি পেয়েছেন। ধনবৌ লিখেছে—শরীরটা আমার ভাল যাচ্ছে না, এ সময় তুমি যদি কাছে থাকতে। ধনবৌর চিঠি পেয়ে চন্দ্রনাথ আর দেরি করেন নি। বড় কাছারি বাড়িতে মেজদা থাকেন, তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, দাদা, আমি একবার বাড়ি যামু ভাবছি। আপনের বৌমা চিঠি দিছে। অর শরীর ভাল না—একবার তবে ঘুইরা আসি। ভূপেন্দ্রনাথ তার সঙ্গে সুন্দরআলিকে দিয়েছেন। রাত হয়ে যাবে যেতে। সেরেস্তায় কাজের চাপ পড়েছে—নতুবা তিনি নিজেও বাড়ি যেতেন। ছেলে হয়েছে এমন খবর জানা থাকলে চন্দ্ৰনাথ এতটা বোধহয় উদ্বিগ্ন হতেন না। তিনি দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটছেন। সুন্দরআলিকে নিয়ে লণ্ঠন হাতে নেমে এসেছেন। শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাড়ে এসে বাজার বাঁয়ে ফেলে মাসাব পোনাব হয়ে বুলতার দিঘি ধরে ক্রমশ এগিয়ে চলেছেন। পেয়াদা সুন্দরআলি মাঝে মাঝে কাশছিল। নির্ভয়ে নিঃশব্দে তাঁরা এ মাঠে এসে নেমেছেন। মাঠ পার হলেই ফাওসার খাল, তারপর দু’ক্রোশ পথ। বাড়ি পৌঁছাতে দেরি নেই। এমন সময়ে সুন্দরআলি চিৎকার করে উঠল, নায়েব মশাই, খুন। হাত থেকে লণ্ঠনটা পড়ে যাবে ভাব হল সুন্দরআলির। সুন্দরআলি পেছনের দিকে ছুটে পালাতে চাইল।

    ধনকর্তা হকচকিয়ে গেলেন, এখানে খুন-ডাকাতি!

    সুন্দরআলি বলল, মাঠের উপর দিয়া আসেন কর্তা। নিচ দিয়া আমি যামু না।

    ধনকর্তা এবার জোরে ধমক দিলেন, আয় দ্যাখি, কি খুন কে খুন দ্যাখি। ধনকর্তা লণ্ঠন তুলে সন্তর্পণে মানুষটার মুখের উপর ধরলেন। মানুষটা বড় চেনা যেন। তিনি নাড়তে থাকলেন ওকে। দেখলেন শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে। তিনি ডাকলেন, ঈশম, তর কি হইল? ঈশম, অঃ ঈশম! ঈশমের শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই—তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন সব।

    ঈশমের পাশে বসে ধনকর্তা চোখ টেনে দেখলেন। না সবই ঠিকঠাক আছে। এবার মনে হল–বিলেন মাঠে এমন আঁধারে ঈশম পথ হারিয়েছে। তিনি বিল থেকে জল আনলেন। রুমালে ভিজিয়ে ভিজিয়ে জল দিলেন চোখেমুখে এবং একসময় জ্ঞান ফিরলে বললেন, কিরে তর ডরে ধরছে। আমি তর ধনমামা।

    ঈশম চোখ মেলে ধীরে ধীরে দেখল। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। তারপর কেমন অবিশ্বাসের গলায় ডাকল, ধনমামা! আপনে ধনমামা! ধনকর্তাকে দেখে সে কেঁদে ফেলল। মামাগ, আমারে কানাওলায় ধরছে! সারাটা মাঠ, বিল, জমি ঘুরাইয়া মারছে। শরীরটা আর শরীর নাইগ মামা।

    —আস্তে আস্তে হাঁট। বিলে তুই আইছিলি ক্যান?

    এতক্ষণ পর ঈশমের সব মনে হল। কেন এসেছিল এই মাঠে, কোথায় যাবে, কী করবে, কী খবর দিতে হবে সব এক এক করে মনে পড়ল। ধনমামা, আপনের পোলা হইছে। আমিও আপনের কাছে যামু বইলা বাইর হইছি। পথে এই কাণ্ড—কানাওলা।

    ধনকর্তা বিশাল বিলেন মাঠে আলো-আঁধারে দাঁড়িয়ে কি জবাব দিতে হবে ভেবে পেলেন না। আকাশে তেমনি হাজার নক্ষত্র জ্বলছে। ঠাণ্ডা হাওয়া ধানের গন্ধ বয়ে আনছে। ঈশম সে সময় বলল, চলেন মামা আস্তে আস্তে হাঁটি। যেতে যেতে খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, আমারে একটা তফন দিতে হইব।

    ওরা হেঁটে হেঁটে একসময় ট্যাবার পুকুর পাড়ে এল। অশ্বত্থ গাছ পার হতে গিয়ে ঈশম ডাকল, বড়মামা আছেন, বড়মামা! কোনও উত্তর এল না। পুকুর পাড়ে গভীর ঝোপ-জঙ্গল। এত রাতে এই জঙ্গলে বসে থাকলে কিছুতেই কেউ টের পাবে না। ভিতরে কেউ আছে কি নেই—দিনের বেলাতেও টের পাওয়া যায় না। ঈশম অথবা চন্দ্রনাথ বৃথা আর ডাকাডাকি করল না। করলা খেত পার হয়ে ধানের জমিতে নেমে আসতেই টের পেল যেন খেতের ভিতর খচখচ শব্দ হচ্ছে। ধান খেতে সামান্য জল। পায়ের পাতা ডোবে কি ডোবে না। ঈশম লণ্ঠন তুলতেই দেখল—বড়কর্তা। ধান খেতের ভিতর বড়কর্তা কেমন উবু হয়ে বসে আছেন। ঈশম খেতের ভিতর ঢুকে বলল, উঠ্যান। বাড়ি যাইতে হইব। বড়মামি আপনের লাইগা জাইগা আছে। কিন্তু বড়কর্তার মুখে কোনও কথা ফুটে উঠল না। যেমন বসেছিলেন তেমনি বসে থাকলেন। কিছুতেই উঠছেন না। কিসের উপর চেপে বসে আছেন। পায়ের নিচে অন্ধকার এবং ধান গাছ। খচখচ শব্দ। গাছগুলি নড়ছে। সে লণ্ঠনটা নিচে নামাতেই দেখল একটা বড় কাছিম। একটা প্রকাণ্ড কাছিমকে চিৎ করে তিনি তার উপরে বসে আছেন। কাছিমটা পা’গুলি বের করে মুখ বের করে কামড়াতে চাইছে। কিন্তু তাঁর হাত পা নাগাল পাচ্ছে না। কেবল গাছগুলি নড়ছে। ঈশম কি বলতে যাচ্ছিল, সঙ্গে সঙ্গে কাছিমের বুকে বসে বড়কর্তা হেঁকে উঠলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    ঈশম বলল, বড়মামা, এইটা আপনে কি করছেন? এতবড় একটা কাছিম ধইরা বইসা আছেন? তারপর সে বলল, আপনে বাড়ি যান। ধনমামায় আইছে। ধনমামার পোলা হইছে।

    ধনকর্তা বললেন, উইঠা আসেন বড়দা। কাছিমটা ঈশম লইয়া যাইবখন।

    বড়কর্তা ভাল মানুষের মতো ধনকর্তাকে অনুসরণ করলেন। বড়কর্তা কখন ছুটতে থাকবেন, কখন হাতে তালি বাজাবেন—এই সব ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার জন্য ধনকর্তা সন্তর্পণে পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকলেন। বড়কর্তা অন্ধকারে ছুটতে চাইলে ধনকর্তা বললেন, আমার হাতে লাঠি আছে বড়দা। ছুটবেন ত বাড়ি মারমু। ঠ্যাঙ ভাইঙ্গা দিমু।

    চন্দ্রনাথের মুখে এমন কথা শুনে বড়কর্তা ঘুরে দাঁড়ালেন। আমাকে তুমি ভর্ৎসনা করছ চন্দ্ৰনাথ! এমন এক করুণ মুখ নিয়ে চন্দ্রনাথকে দেখতে থাকলেন। তিনি যেমন কোনও কথা বলেন না, এখনও তেমনি কোনও কথা না বলে অপলক চেয়ে থাকলেন। এমন চোখ দেখলেই মনে হয় এই উত্তর চল্লিশের মানুষ বুঝি এবার আকাশের প্রান্তে হাত তুলে তালি বাজাবেন। চাঁদের কাকজ্যোৎস্না এখন আকাশের সর্বত্র। যথার্থই এবার বড়কর্তা দুহাত উপরে তুলে হাতে তালি বাজাতে থাকলেন, যেন আকাশের কোন প্রান্তে তাঁর পোষা হাজার হাজার নীলকণ্ঠ পাখি হারিয়ে গেছে। হাতের তালিতে তাদের ফেরানোর চেষ্টা। আর ধনকর্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব কিছু নতুন করে লক্ষ করলেন—বড়দার বড় বড় চোখ, লম্বা নাক, প্রশস্ত কপালের পাশে বড় আঁচিল, সবচেয়ে সেই সূর্যের মতো আশ্চর্য রঙ শরীরের এবং সাড়ে ছয় ফুটের উপর শরীরে ঋজুতা। দেখলে মনে হবে মধ্যযুগীয় কোন নাইট রাতের অন্ধকারে পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছেন! চন্দ্রনাথ দেখলেন, বড় এবং গভীর চোখ দুটো সারাদিন উপবাসে কোটরাগত। দুঃখে চন্দ্রনাথ চোখের জল রোধ করতে পারলেন না। বললেন, বড়দা আপনে আর কত কষ্ট পাইবেন, সবাইরে আর কত কষ্ট দিবেন!

    বড়কর্তা ওরফে মণীন্দ্রনাথ শুধু বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। ফের তিনি আকাশের প্রান্তে তালি বাজাতে থাকলেন। সেই তালির শব্দ এত বড় মাঠে কেমন এক বিস্ময়কর শব্দ সৃষ্টি করছে। এইসব শব্দ গ্রাম মাঠ পার হয়ে সোনালী বালির চর পার হয়ে তরমুজ খেতের উপর এখন যেন ঝুলছে। মণীন্দ্রনাথের বড় ইচ্ছা, জীবনের হারানো সব নীলকণ্ঠ পাখিরা ফিরে এসে রাতের নির্জনতায় মিশে থাক—কিন্তু তারা নামছে না—বড় কষ্টদায়ক এই ভাবটুকু। তিনি এবার চন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে ঘরের দিকে চলতে চলতে যেন বলতে চাইলেন, চন্দ্র, তোমার ছেলে হয়েছে, বড় আনন্দ! অথচ কথার অবয়বে শুধু এক প্রকাশ, গ্যাৎচোরেৎশালা। এবার তিনি নিজের এই অপ্রকাশের দুঃখে কেমন দুঃখিত হলেন—এত নক্ষত্র আকাশে অথচ তাঁর পাগল চিন্তার সমভাগী কেউ হতে চাইছে না। সকলেই যেন তাঁর ঠ্যাঙ ভেঙে দিতে চাইছে। মণীন্দ্রনাথ আর কোনও কথা না বলে সেজভাইকে শুধু অনুসরণ করে হাঁটতে থাকলেন।

  • দুই

    দুই

    ঢাক-ঢোলের বাজনা শোনা যাচ্ছে। ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে কেউ—মনে হয় কেউ দামামা বাজাচ্ছে। একদল লোক ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গোপাট ধরে উঠে আসছে। শচীন্দ্রনাথ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে সেই শব্দ শুনছিলেন। বুঝি ফেলু ফিরছে নারাণগঞ্জ থেকে। ফেলুর গলায় কালো তার বাঁধা। সে হা-ডু-ডু খেলে ফিরছে। কাপ-মেডেল কালো একটা কাপড়ে ঢাকা।

    এবারেও ফেলু তবে গোপালদির বাবুদের বিপক্ষে খেলে এসেছে। মুখের উপর ফেলুর চাপদাড়ি আছে বলে আর কাঁধে সব সময় গামছা ফেলে রাখে বলে গেঞ্জির উপর বুকের ছাতিটা কাছিমের মতো, কত প্রশস্ত মাপা যায় না। কিন্তু কাছে এলে দলটা মনে হল—না, ফেলুর দল নয়, অন্য দল। তবে কি ফেলু এবারে হেরে এল! ওর দলবল ফিরছে না কেন? এই প্রথম তবে ফেলু হেরে গেছে। ফেলুর যৌবন চলে যাচ্ছে তবে। যখন ওর যৌবন ছিল—তখন এই তল্লাটে দুই আদমি ফেলু আর সাবু—দুই বড় খেলোয়াড়, হা-ডু-ডু খেলোয়াড়। তখন এই তল্লাটে বিশ্বাসপাড়া, নয়াপাড়া, এমন কি দশ-বিশ ক্রোশ দূরে অথবা গোপালদির মাঠ পার হয়ে সেই মেঘনার চরে ওদের খেলা দেখার জন্য কাতারে কাতারে লোক—ফেলু হ্যা-রে…রে…ডু…ডু বলে যখন দাগের উপর বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ত—যখন ফাইনাল খেলার দামামা বাজত, ব্যাগপাইপ বাজত, তখন ফেলুর মুখ দেখলে মনে হতো ফেলু বড় কুশলী খেলোয়াড়। তখন কত মেডেল গলায় ঝুলত তার।

    কত কাপ এনে দিয়েছে সে তার দলের হয়ে! দিন নাই রাত নাই, ফেলু বিশ পঁচিশ ক্রোশ পথ হেঁটে খেলতে চলে গেছে। একবার বড় শহরে খেলতে গিয়েছিল, ফেরার পথে পালকিতে। জয় জয়ার ফেলুর। পালকির দুপাশে দু’মানুষের মাথায় দুই কাপ, ডে-লাইট জ্বালিয়ে দামামা বার্জিয়ে ওরা শহর থেকে গ্রামে ফিরেছিল। নাঙলবন্দের মাঠ এবং নদী পার হলে গ্রামের মানুষেরা বৌ-বিবিরা সেই যে দাঁড়িয়ে গেল দেখতে, তার আর শেষ নেই। ওরা ফেলুকে দেখছিল, দুই বড় কাপ দেখছিল, কালো তার গলায় দলের হা-ডু-ডু খেলোয়াড়দের দেখছিল—য্যান ঢাকার ঝুলনযাত্রা যায়। সেই ফেলু তবে এবারে হেরে গেছে! অন্য দলের মানুষেরা, জয় গোপালদির বাবুদের কি জয়…বলতে বলতে যাচ্ছে। শচীন্দ্রনাথের কেন জানি এ সময়ে ফেলুর মুখটা দেখতে ইচ্ছা হল। ফেলু হয়তো হেরে গিয়ে আগে বাড়ি চলে এসেছে। আর কিছু না পেয়ে হয়তো বিবি আন্নুকে ধরে পেটাচ্ছে।

    চন্দ্রনাথ এ-সময় তাঁর জাতক দেখছেন। আঁতুড়ঘরে শশীবালা চন্দ্রনাথকে আর একটু ঝুঁকতে বললেন। ধনবৌ পান খেয়েছে। ঠোঁট লাল। এ-ক’দিন সিঁদুর দিতে নেই কপালে—কপাল সাদা। ঘরের ভিতরে ভিজা কাঠ জ্বলছে। কিছু শতচ্ছিন্ন নেকড়া। এক কোনায় আগুনটা গনগন করছিল। দু-হাতে ধনবৌ জাতককে সামনে তুলে ধরল, চন্দ্রনাথ ছেলে না দেখে ধনবৌর মুখ দেখলেন, কেমন সাদা হয়ে গেছে মুখটা—শালুক পাতার মতো রঙ মুখে। ধনবৌর চোখ, আবার মা হতে পেরেছে বলে জ্বলজ্বল করছিল। হাতের নোয়া, লালপেড়ে কাপড়, দুহাতে জাতককে তুলে ধরার ভঙ্গি, সবটুকু মিলে ফিসফিস করে বলার মতো—কেমন দ্যাখছ। কার মতো হইব! তোমার মতো, না আমার মতো?

    তখন মণীন্দ্রনাথ একটা অশ্বত্থ গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন। এই পথ দিয়ে হা-ডু-ডু খেলার দলটা চলে গেছে। তিনি কাপ মেডেল এবং মানুষের উল্লাস দেখার জন্য ওদের পিছনে পিছনে বের হয়ে পড়েছিলেন—এখন তারা নয়াপাড়ার মাঠে নেমে গেছে। তিনি তাদের সঙ্গে অতদূর গেলেন না। এই অশ্বত্থ গাছটার নিচে এলেই দূরের এক যেন দূর্গ দেখতে পান। দূর্গে হয়তো অশ্বারোহী কিছু যুবক এখন কদম দিচ্ছে। দূর্গের দরজা খুলে গেলে যেমন হাজার সেনা বের হয়ে মাঠে চত্বরে খেলা দেখায়—এখন যেন তেমনি গাছের উপরে হাজার গাঙশালিক মাথার উপর উড়ে-উড়ে খেলা দেখাচ্ছে! যারা নদী থেকে ফিরে আসেনি, যারা খুঁটে খুঁটে নদীর চরে অথবা বিলে পোকামাকড় খাচ্ছে, তারা এবারে ফিরে আসবে। ফিরে এলেই তিনি এই গাছের নিচে বসে আপন মনে এক মনোরম জগৎ বানিয়ে বসে থাকবেন।

    গাছটার নিচে কিছু মটকিলার গাছ, কিছু বেতপাতার ঝোপ এবং বনকাশের জঙ্গল। কিছু ছাতার পাখি অনবরত ঝোপে-জঙ্গলে নেচে বেড়াচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ গাছটাকে প্রদক্ষিণ করার মতো ঝোপ-জঙ্গলের চারপাশে ঘুরতে থাকলেন। এত বড় গাছ। ঈশ্বরের মতো এই গাছ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে যেন। এবং তিনি ঈশ্বরকেই যেন প্রদক্ষিণ করছেন এমন একটা ভাব তাঁর চোখে মুখে। মুখ উঁচু করে গাছটা দেখছেন আর কি যেন বিড়বিড় করে বকছেন। তখন মুসলমান গ্রামের পুরুষেরা যেতে-যেতে আদাব দিল। বলল, কী মানুষ কী হইয়া গ্যাল! ওরা বলল, বাড়ি চলেন—দিয়া আসি। মণীন্দ্রনাথ ওদের কথায় বালকের মতো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন। তারপর ওরা যেই চলে গেল—সন্তর্পণে ঢুকে ঝোপের ভিতর বসে গেলেন। চুপচাপ ঝোপের ভিতরে বসে মটকিলার ডাল ভেঙে দাঁত মাজতে থাকলেন। কতদিন যেন দাঁত মাজেননি, কতকাল সব ভুলে বসেছিলেন যেন—তিনি মুখে দুর্গন্ধ দূর করার নিমিত্ত দাঁত ঘষে ঘষে সাদা করে তুলছেন। আবেদালি উঠে আসছিল গ্রামে, সে দেখল ঝোপের ভিতর পাগল ঠাকুর। সে বলল, কর্তা বাড়ি যান। আসমানের অবস্থা ভাল না।

    মনীন্দ্রনাথ ঝোপের ভিতর থেকে আবেদালির কথা শুনেও হাসলেন। মুসলমান. বিবিরা শালুক তুলে বাড়ি ফিরছিল। ওরা ঝোপের ভিতর খচখচ শব্দ শুনে উঁকি দিল। শিশুর মতো পাগল ঠাকুর ঝোপের ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে কি যেন অন্বেষণ করছেন। বিবিরা বলল, কর্তাগ, বাড়ি যান। মা-ঠাইরেন চিন্তা করব—আসমান বড় টান-টান ধরছে।

    আবেদালি বাড়ি উঠে ভাবল–কর্তারে ধইরা নিয়া গ্যালে হয়। কিন্তু বুড়ো ঠাকুরুণ শশীবালার কথা মনে করে কেমন সঙ্কুচিত হয়ে গেল। যদি তিনি অসন্তুষ্ট হন, যদি বলেন, তুই ক্যান অরে ধইরা আনলি। আবার অরে সান করান লাগব, এই সব ভেবে উঠোনে আর দাঁড়াল না। সে চন্দদের নৌকায় কাজ করে। নদীতে নৌকা থাকে। ক’দিন পর বাড়ি ফিরছে—ক্লান্ত এবং অবসন্ন তবু কী এক কষ্টের কথা ভেবে আসমানের দিকে তাকিয়ে ওর ডর ধরে গেল। ঝড়-জল আসমান ফেটে নামলে মানুষটা ভিজে-ভিজে মরে যাবে। সে মাঠে নেমে গেল। এবং নদীর চরে ঈশমের ছই, সে ছইয়ের দিকে হাঁটতে থাকল। ঈশমকে খবরটা দিয়ে ঘরে ফিরবে।

    ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আকাশের অবস্থা দেখে মাঠ থেকে মানুষেরা গ্রামে উঠে গেল। গরু-বাছুর নিয়ে গৃহস্থেরা ফিরে এল বাড়ি। ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে, শিলাবৃষ্টি হতে পারে, আকাশটা ক্রমে কালো হয়ে গেল। দুটো-একটা সাদা বক ইতস্তত উড়ে উড়ে নিরুদ্দেশে চলে যাচ্ছিল। খুব থমথমে ভাব। ডালপালা একটাও নড়ছে না। মুসলমান গ্রামে মোরগেরা ডাকতে থাকল। যত আকাশ কালো হচ্ছে, যত এই পৃথিবী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে মণীন্দ্রনাথ তত উল্লাসে ফেটে পড়ছেন। কি উল্লাস, কি উল্লাস! তিনি যেন ঘুরে-ফিরে নাচছিলেন। তিনি আকাশ দেখে, পাগলপারা আকাশ দেখে যেমন খুশি হলে তালি বাজান, ভুবনময় তালি বাজে—তিনি নেচে-নেচে তালি বাজাতে থাকলেন! টুপটাপ বৃষ্টি, গাছপাতা ভিজে যাচ্ছে। গরমে মাথা শক্ত হয়ে যাচ্ছে—এই টুপটাপ বৃষ্টি, আকাশের ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা ভাব ওঁকে সামান্য সহজ করে তুলছিল। কিন্তু এক্ষুনি শচী আসতে পারে, চন্দ্রনাথ আসতে পারে। ওরা এসে তাঁকে জোর করে নিয়ে যেতে পারে। ঈশ্বরের মতো গাছটার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারে ভাবতেই তিনি কাপড়ের আঁচলে গাছের ডালে নানা রকমের গিঁট দিতে থাকলেন। ঝড়ে ওঁকে ঠেলতে পারবে না, গ্রামের মানুষেরা ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। তিনি কাপড়টা গোটা খুলে গাছের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেললেন।

    টোডারবাগ থেকে নেমে আবেদালি সড়ক ধরে হাঁটতে থাকল। বাড়ির কাজ ফেলে, নামাজ ফেলে সে ঈশমের জন্য নদীর চরে নেমে যাচ্ছে। ছইয়ের নিচে কোনও লণ্ঠন জ্বলতে দেখল না। সে আলে দাঁড়িয়ে ডাকল, অ ঈশম চাচা, আছেন নাকি? বৃষ্টি পড়ায় আবেদালির শরীর ভিজে গেছে। ঠাণ্ডা হাওয়ার জন্য শীত করছে। সুতরাং সে বেশিক্ষণ আপেক্ষা করতে পারল না। সে নিজের গাঁয়ে ফিরে ঘরে ওঠার মুখে ডাকল, জব্বরের মা, আমি আইছি দরজা খোল। অথচ কোনও সাড়া না পেয়ে সে কেমন ক্ষেপে গেল। সে চিৎকার করে ডাকল, তরা মইরা আছস নাকি!

    বৃষ্টির শব্দের জন্যই হোক অথবা অন্য কোনও কারণে—জব্বর দরজা খুলতে দেরি করছে। আবেদালি বার বার ঝাঁপের দরজায় ধাক্কা মারতে থাকল। জব্বর দরজা খুললে সে কেমন পাগলের মতো চিৎকার করে বলল, তর মায় কই রে?

    —মায় গ্যাছে সামুগ বাড়ি।

    —ক্যান্ গ্যাল। আবেদালি তফন দিয়ে শরীর মুখ মুছল।

    —সামুগ বাড়িতে জাল্‌সা আছে।

    আবেদালি তিন-চারদিন পর বাড়ি ফিরেছে। সুতরাং গ্রামের কোথায় কি হচ্ছে জানার কথা নয়। আবেদালি চন্দদের বড় নৌকা নিয়ে নারাণগঞ্জে সওদা করতে গিয়েছিল। দন্দির বাজারে চন্দদের মুদির দোকান! আবেদালি চন্দদের বড় নৌকার মাঝি। ঘরে ফিরে সে কেমন শান্তি পাচ্ছিল না। ওর মনটা কেবল খচখচ করছে। এখনও হয়তো বড়কর্তা ঝোপে বসে আছেন। বাড়ির মানুষেরা বড়কর্তার জন্য ভাবছে। হয়তো কেউ কেউ খুঁজতে বের হয়ে গেছে। সে এবার ছেলের দিকে তাকাল–বলল, জব্বর, একটা কাম করবি বা’জান।

    জব্বর কেমন ঝাঁঝের গলায় বলল, কারণ এখন কত কথা এই বয়স্ক মানুষটা তাকে বলতে পারে, যাও মাঠের খেড় তুইলা আন। পানিতে ভিজা গেলে গরুতে খাইব না!—কী করতে কন!

    প্রথম ভাবল বিবির কথা বলবে। সে এসেছে—কোথায় বিবি এসে তাকে এখন খানাপিনার অথবা মর্জি মোতাবেক কিছু কথাবার্তা—তা না জাল্‌সায় পরাণ খুইলা দিছে। সে বিরক্ত হয়ে বলল, তর মায়েরে ডাক দিনি।

    —মায় কি অখন আইব?

    —আইব না ক্যান রে। তিনদিন ধইরা লগি বাইছি—এই জানডার লাগি তগ মায়া-মমতা নাই রে!

    —আর বেশিদিন কষ্ট করতে হইব না বা’জান

    এমন কথায় আবেদালি কি যেন টের পেয়ে বলল, হ, চুপ কর।

    জব্বর চুপ করে ছেঁড়া মাদুরটার এক পাশে বসে থাকল। সহসা বলল, হুঁকা খাইবেন বা’জান? আবেদালি বুঝল, জব্বরও এসময় একটু হুঁকা খেতে চায়। মনটাতে খোশ-মোজাজ এনে দেবার জন্য বলল, সাজা।

    জব্বর হুঁকা সাজাল। বাপকে দিল। তারপর নিজেও দু’টান দিয়ে বলল, আপনে নামাজ পড়েন, আমি ভাতটা বাড়তাছি।

    —নামাজ পড়মু না! আবেদালি এবার উঠল। বৃষ্টির জলে বদনা ভরল। এবং হাতে মুখে জল দিল। বাইরে জোর বর্ষণ হচ্ছে। মাঝে মাঝে আকাশটা চিরে যাচ্ছে। যেন কে মাঝে মাঝে আসমানের গায়ে স্বর্ণলতা ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে-ফালা ফালা আকাশে গর্জন উঠছিল—আবেদালির ঘরটা যেন পড়ে যাবে। শণের চাল পচে গেছে। টুই দিয়ে জল গড়িয়ে নামছে। পাটকাঠির বেড়া পচে গেছে। বাঁশের উপর ছেঁড়া পাটি এবং কাঁথা বালিশ, নিচে ছেঁড়া চাটাই। আবেদালি ছেঁড়া চাটাইয়ের উপর খেতে বসল। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়া দিচ্ছে, মাদার গাছের একটা ডাল ভেঙে পড়ল। আবেদালি ডাকল, অ, জব্বর! জব্বর! খুব ধীরে এবং সে সোহাগের গলায় ডাকল।

    —কিছু কন আমারে?

    —একটা কাম করতে পারবি?

    —কী কাম?

    —তুই একবার বা জান ঠাকুরবাড়িতে গিয়া ক’দিনি, বড়কর্তা গোরস্থানের বটগাছটার নিচে বইসা আছে। বা’জানরে, বড় কষ্ট বড়কর্তার—যা, একবার গিয়া কর্তার বাড়িতে খবর দে।

    —আমি পারমু না বাজান। আমারে অন্য কামের কথা কন!

    আবেদালি এবার খাবার ফেলে উঠে পড়ল। সে জব্বরের মুখের সামনে গিয়ে খেঁকিয়ে উঠল—যেন সে জব্বরকে মেরেই ফেলবে—পা’টা পিঠের কাছে নিয়ে কি ভেবে সরিয়ে আনল। বলল হালার পো হালা, তুমি আমার বাপজান। তোমার কথায় আমি চলুম!

    জব্বর তেমনি মাথা নিচু করে বসে থাকল।—আমারে অন্য কামের কথা কন। সে যেন কি স্থির করে রেখেছে মনে-মনে। সুখে এবং স্বচ্ছন্দে দিন যায় না–বাপ তার কত দিন পরে ঘরে ফিরে এসেছে। এসে কোথায় মিষ্টি কথা বলবে—তা না কেবল খ্যাক খ্যাক করছে খাটাশের মতো। সে ভিতরে-ভিতরে এতক্ষণ যা প্রকাশ করতে চাইছিল না, বাপের মর্জি দেখে, এই নিষ্ঠুর চেহারা দেখে মরিয়া হয়ে উঠল—যেন বাপ ফের বললে সে মুখের উপরে বলেই দেবে।

    —কি যাবি না!

    —না। আমারে অন্য কামের কথা কন।

    —তা হইলে আমার কথা থাকব না!

    —না।

    —ক্যান, কী হইছে! আবেদালি এবার স্বর নামাল।

    —আমি লীগে নাম লেখাইছি।

    —ত হইছে ডা কি! হইছে ডা কী ক? নাম লেখাইয়া বা’জানের কোরান-শরিফ শুদ্ধ কইরা দিছ!

    —কী হইব আবার। হিন্দুরা আমাগ দ্যাখলে ছ্যাপ ফালায়, আমরা-অ ছ্যাপ ফ্যালামু।

    —জাল্‌সাতে বুঝি এডাই হইতাছে!

    জব্বর এবার চুপ করে থাকল।

    বাপ্ বেটা এবার দু’জনেই চুপ। আবেদালি ফের খেতে বসে গেল। মাথা নিচু করে খেতে বসে গেল। ঝালে—কি ছেলের কথায়, চোখ ছলছল করছে বোঝা যাচ্ছে না। সে নিজের এই দুঃখটুকু সামলাবার জন্য জল খেতে থাকল। তারপর খুব ধীরে ধীরে যেন অনেক দূর থেকে বলার মতো বলল, বড়কর্তা পানিতে ভিজতাছে, তুই না গেলে আমি যামু। আবেদালি বদনার নল মুখে পুরে দিল এবং হাঁসের মতো কোৎ করে জলটা যেন গিলে ফেলল। তারপর বাকি জলটা মুখে রেখে অনেকক্ষণ কুলকুচা করল। দাঁতের ফাঁকে যা কিছু ভোজ্য দ্রব্য—যেখানে যেমন যে-ভাবে দাঁতের ফাঁকে লেগে আছে—সে জিভ দিয়ে দাঁতের ফাক থেকে বাকি খাদ্যবস্তুর স্বাদ নিতে নিতে কেমন নিষ্ঠুর চোখে ফের জব্বরের দিকে তাকাল। বলল, তুমি আমার ভাত পাইবা না, কাইল থাইকা তোমার ভাত বন্ধ। আবেদালি মরিয়া হয়ে উঠল। পুত্রের এমন সম্মান-অসম্মানবোধ ওর ভাল লাগল না। তিন দিনের পরিশ্রম এবং এ-সময়ে ঘরে বিবির অনুপস্থিতি ওকে পাগল করে দিল। একবার ইচ্ছা হল ঘরের কোণ থেকে সড়কিটা নিয়ে পেটে খোঁচা মারে—কিন্তু কি ভেবে সে বলল, আল্লা, দ্যাশে এটা কী শুরু হইল!

    আবেদালির কাঁচা-পাকা দাড়ি বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কুপির আলোতে আবেদালির মুখ ভয়ানক উদ্বিগ্ন। ঢাকায় রায়ট লেগেছে—এসব কথা কেন জানি বার বার মনে পড়ছে। হিন্দু-মুসলমান উভয়ই জবাই হচ্ছে। সব কচুকাটা। মুসলমান জবাই হলেই সে কেমন উত্তেজিত হয়ে পড়ে—কিন্তু বড়কর্তা ধনকর্তার এবং পাশের গ্রামের অন্যান্য অনেক হিন্দুর উদারতা, পুরুষানুক্রমে আত্মীয় সম্পর্ক সব দুঃখ, উত্তেজনা মুছে দেয়। দরজার ভিতর থেকেই হাত বাড়াল আবেদালি। একটা মাথলা মাথায় টেনে অন্ধকার পথে নেমে গেল।

    .

    শচী হাঁটছিলেন। আগে ঈশম যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে, সংসারে নানা রকমের দুঃখ জেগে থাকে—এই যে বড়কর্তা বিকেল থেকে নিরুদ্দেশে চলে গেল—কই গেল—ঝড়ে জলে এখন কোথায় আছে—এসব বলছিলেন। শত্রুর য্যান এমন না হয়! অশান্তি, অশান্তি! মারা গ্যালে-অ ভাবতাম, গ্যাছে। কতকাল এই দেখতে হবে ঈশ্বর জানে!

    শচী এই ঝড়-বৃষ্টিতে এবং শীতের হাওয়ায় কাঁপতে থাকলেন। ঈশমও শীতে কাঁপছে। ঝড়জলের ভিতর দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটছিলেন। ওরা অনেকগুলি জমি অতিক্রম করে মুসলমান পাড়ার ভিতর ঢুকতেই দেখলেন, ইমতালির বড় ছেলে মনজুর বারান্দায় বসে আছে। সামনে কোরাণশরিফ—উপরে দড়ি দিয়ে বাঁধা লণ্ঠন। ঝড়জল কমে গেছে। সে যেমন সাঁজ হলে রোজ পড়তে বসে তেমনি পড়তে বসার সময় দেখেছে—ঝড়জলে গ্রাম ভেসে যাচ্ছে। সে গরুগুলি গোয়ালে তুলে, হাঁসগুলি খোঁয়াড়ে রেখে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বসেছিল। ঝড়জল থামতেই দরজা জানালা খুলে দিয়েছে। আকাশ তেমন গর্জন করছে না। সুতরাং সে পা দুটো ভাঁজ করে অনেকটা নামাজ পড়ার ভঙ্গিতে বসার সময় দেখল লাউমাচানে আলো এসে পড়ছে! তারপর আলোটা বাড়ির দিকে উঠে এলে দেখল—ঠাকুরবাড়ির ছোটকর্তা—শচী ঠাকুর। সঙ্গে ঈশম। ওরা এত রাতে—এ-পাড়ায়! সে তাড়াতাড়ি নেমে গেল। বলল, কর্তা এই ম্যাঘলা দিনে বাইরে বাইর হইছেন!

    —বড়দারে দ্যাখছস এদিকে?

    —না-গ কর্তা তাইনত আইজ ইদিকে আসে নাই।

    মনজুর হ্যারিকেনটা হাতে নিল। বলল, আপনে বসেন! আমরা পাড়াটা খুঁইজা দ্যাখতাছি।

    শচী বললেন, তুই আবার এই বৃষ্টিতে যাবি কি করতে। সকলে কষ্ট কইরা লাভ নাই। বলে হাঁটতে থাকলেন। মনজুর কোনও কথা বলল না। শুধু সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে থাকল। এ-সময়ে গ্রামে কিছু কুকুর ডেকে উঠল। ফেলুর বাড়িটা বাঁশঝাড়ের নিচে অন্ধকারে ডুবে আছে। শচীর ইচ্ছা হল বলতে, ফেলু কি হাইরা গ্যাছে। ফেলুর বাড়িতে এত অন্ধকার! কুপি জ্বালাইয়া অর বিবিটা ত নলিতে সূতা ভরে! আইজ সাড়াশব্দ পাই না ক্যান। কিন্তু বলতে পারলেন না। কুল গাছে ফুলের গন্ধ। বৃষ্টি এবং ঝড়ের জন্য কিছু ফুল মাটিতে পড়ে আছে। শচী এসব মাড়িয়ে সহসা দেখতে পেলেন বড় একটা ডে-লাইট জ্বলছে সামুদের বাড়ি। বড় টিন-কাঠের ঘর, চওড়া বারান্দা, মূলি বাঁশের বেড়া, এবং ঠিক দরজার মুখে বাঁশে আলোটা ঝুলছে। সামনে সামিয়ানা টাঙানো ছিল, খুলে ফেলা হয়েছে। ঝড়জল একেবারে থেমে গেলে ফের সামিয়ানা টাঙানো হবে। এখন লোকগুলি ঘরে বারান্দায় এবং বৈঠকখানায় গিজগিজ করছে। অন্ধকারে গ্রামে সহসা এই আলো শচীকে বিস্মিত করল।

    মনজুর যেন টের পেয়ে গেছে। কর্তার মনে সংশয়। কর্তা কি যেন ভাবছেন। সে বলল, খুলেই বলল, জাল্‌সা কর্তা। শুনছি ইখানে সামসুদ্দিন লীগের একটা অফিস খুলব। ঢাকা থাইকা আইসা সামু আমাগ লীগের পাণ্ডা হইয়া গ্যাল।

    শচী কোনও উত্তর করলেন না। সামুর এই ব্যাপারটা শচীর ভাল লাগল না।

    মনজুর বলল, সামুরে ডাকি কর্তা। আপনে আইছেন।

    শচী বললেন, না দরকার নাই। ব্যস্ত আছে, ডাইকা ব্যতিব্যস্ত কইরা লাভ নাই।

    তবু খবর দিল মনজুর। ছোটকর্তা তোমার বাড়ির পাশ দিয়া যাচ্ছে তুমি বসে বসে জাল্‌সা করছ, একবার যাও। কর্তারে কও বইতে, পান-তামুক খাইতে।

    খবর পেয়ে সামসুদ্দিন তাড়াতাড়ি বের হয়ে এল। বলল, আদাব কর্তা।

    —ক্যামন আছ সামু?

    —ভাল নাই কর্তা। ধনকর্তার নাকি পোলা হইছে?

    —হ!

    —তবে মিষ্টি খাওয়ান লাগব। যামু একদিন।

    শচী এতক্ষণ যা বলবেন না ভাবছিলেন, অন্য কথা বলবেন ভাবছিলেন, কিন্তু মনের ভিতর কি রকম গোলমাল শুরু করে দিল। বললেন, চ্যালা-ফ্যালা যোগাড় হইছে। খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথাটা বললেন শচী।—হঠাৎ পাণ্ডা সাজলা। আগে না আজাদের খুব ভক্ত আছিলা।

    সামসুদ্দিন খুব বিব্রত বোধ করল। সে অন্য কথায় চলে আসতে চাইল। বলল কর্তা, বইসা যান।

    মনজুর বলল, বড় কর্তারে খুঁজতে বাইর হইছে।

    এবার সামসুদ্দিন শচীর সঙ্গে হাঁটতে থাকল। যেন একটা কী নৈতিক দায়িত্ব আছে এইসব মানুষের ভিতর। সংসারে এ যে এক মানুষ, অমন মানুষ হয় না—পাগল হয়ে যাচ্ছে। সব ফেলে—যা কিছু প্রিয়, যা কিছু সুখের—সব ফেলে মানুষটা কেবল নিরুদ্দেশে চলে যেতে চাইছে। সবাই সুতরাং চুপচাপ হাঁটছে। ঘরগুলি পরস্পর এত বেশি সংলগ্ন যে শচীকে প্রায় সময়ই নুয়ে পথ পার হতে হচ্ছিল, একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেই ঘরের সনচা এসে মাথায় ঠেকছে। এই বাড়িঘরের যেন কোনও নির্দিষ্ট সীমানা নেই—একটা বাড়ির সঙ্গে আর একটা বাড়ি লেগে আছে—কার কোন ঘর, কে কোন বাড়ির মালিক মাঝে-মাঝে শচীর পক্ষে নির্দিষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ বাড়িটা আবেদালির। বাড়ির উঠোনে আর একটা ঘর উঠছে। শচী ভাবলেন, আবেদালির দিদি জোটন নিশ্চয়ই ফিরে এসেছে। ঘরটা দেখলেই তিনি টের করতে পারেন। টের করতে পারেন কিছুদিন আগে জোটন বিবি ছিল, এখন বেওয়া হয়েছে। জোটনের সব সমেত তিনবার নিকাহ্। শচী হিসাব করে দেখলেন—এবারটা নিয়ে চারবার হবে। তালাক অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর জোটন প্রতিবার আবেদালির কাছে চলে আসে। আবেদালি তখন লতা এবং খড়ের সাহায্যে উত্তর দুয়ারি ছোট্ট খুপরি ঘরটা তুলে দেয়—এই পর্যন্ত আবেদালির সঙ্গে জোটনের সম্পর্ক। তারপর কিছুদিন ধরে জোটনের জীবনসংগ্রাম। ধান ভেনে দেওয়া, চিঁড়া কুটে দেওয়া পাড়াপ্রতিবেশীদের এবং যখন বর্ষাকাল শেষ হয়, যখন হিন্দু গৃহস্থের পূজা-পার্বণ শেষ তখন জোটন অনেক দুঃখী ইমানদারের সঙ্গে ভাতের হাঁড়িটা ধুয়ে-পাকলে জলে নেমে পড়ে। এবং সব পাট খেত চষে বেড়াতে থাকে শালুকের জন্য। শালুক শেষ হলে আবেদালির কাছে নালিশ— দ্যাশে কি পুরুষমানুষ নাইরে আবেদালি। সেই জোটন উঠানের উপর আলো দেখে মুখ বার করল। দেখল, শচীকর্তা হাঁইটা যান উঠানের উপর দিয়া। সে একবার ডাকবে ভাবল, কিন্তু বড় মানুষকে ডাকতে সাহস পেল না।

    শচী নেমে যাচ্ছিলেন, তখন আবেদালির দরজা খুলে গেল। ওরা পা টিপে-টিপে হাঁটছিল। জব্বর দরজা খুলতেই শচী দাঁড়ালেন। সব মাতব্বরদের দেখে জব্বর কিঞ্চিৎ ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। প্ৰথমে কী বলবে ভেবে পেল না। পরে সামুকে দেখে যেন সাহস পেল। বলল, বা’জী আপনেগ বাড়ি গেছে কর্তা

    —ক্যান রে?

    —বড়কর্তার খবর দিতে। বড়কর্তা গোরস্থানে বইসা আছে।

    ওরা আর দেরি করল না। তাড়াতাড়ি উঠান থেকে নেমে সড়কের উদ্দেশে হাঁটতে থাকল। জব্বর সকলকে দেখে ঘরে আর থাকতে পারল না। সে-ও ওদের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকল। বৃষ্টি ধরে এসেছে। ঝ’ড়ো হাওয়া আর বইছে না। গাছের মাথায়, ঝোপে-জঙ্গলে আবার তেমনি জোনাকি জ্বলতে শুরু করেছে। রাতের অন্ধকারে এই পাঁচটি প্রাণী মাঠে নেমে সেই গোরস্থানের বট গাছটার দিকে চোখ তুলে তাকাল।

    ঈশম যেন সকলের আগে পৌঁছাতে চায়। সে বলল, কর্তা, পা চালাইয়া হাঁটেন।

    অঘ্রাণের প্রথম শীত বলেই জোনাকির এই অল্প-অল্প আলো, প্রথম শীত বলেই কোড়া পাখি এত রাতেও ডাকছে না, ঘাস মাটি, বৃষ্টিতে ভিজে সব জল শুষে নিয়েছে। শক্ত মাটি। সড়কে কোথাও পথ পিচ্ছিল নয়—বরং শান্ত স্নিগ্ধ এক ভাব। অনেকদিন পর বৃষ্টি হওয়ায় ধানের পক্ষে ভালো হবে – সুদিন আসবে, দুর্দিন থাকবে না। ঈশম বড় বড় পা ফেলে হাঁটছে। কেউ কোনও কথা বলছিল না, যেন শচী ওদের সব দুষ্টুবুদ্ধি ধরতে পেরেছেন—যেন পুরুষানুক্রমিক আত্মীয়বোধটুকুতে দুঃখ ও বেদনা সঞ্চারিত হচ্ছে।

    সামসুদ্দিন মনে মনে কেমন এক অপরাধবোধে পীড়িত—যার জন্য সে প্রায় চুপচাপ হাঁটছিল।

    লণ্ঠন তুলে বটগাছটার নিচে খুঁজতেই দেখল, বড়কর্তা ফাঁসির মতো ঝুলে আছেন। ফাঁসটা গলায় নয় কোমরে। ধনুকের মতো বেঁকে আছেন। অথবা সার্কাসের তাঁবুতে খেলোয়াড় যেমন খেলা দেখায় তেমনি তিনি পিককের খেলা দেখাতে চাইছেন। ঝড়, শিলা-বৃষ্টি শরীরের উপর কিন্তু ক্ষত চিহ্ন রেখে গেছে। শরীরের ভিতর কোথাও এক যন্ত্রণা, ভালোবাসার যন্ত্রণা অথবা স্বপ্নের ভিতর এক মঞ্জিল আছে, মঞ্জিলে জাদুর পাখি আছে—সেই পাখি তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন তিনি তার সন্ধানে আছেন। মনে হয় পাখি উড়ে গেছে, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, সওদাগরের দেশ পেরিয়ে কোথায় জলপরীদের দেশ আছে, পাখি এখন সেখানে দুঃখী রাজপুত্রের মাথায় বসে কাঁদছে। তখনই ভিতরে বড়কর্তার কী যেন কষ্ট হয়—নিজের হাত নিজে কামড়াতে থাকেন। ওরা দেখল মানুষটা হাত কামড়ে ফালা ফালা করে দিয়েছেন। এবং জঙ্গলের উপর ঝুলে আছেন।

    ঈশম মটকিলার জঙ্গলে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেল। সে এ-গাছ ও-গাছ করে বড়কর্তাকে জঙ্গলের ভিতর থেকে মুক্ত করল। ঠাণ্ডায় বড়কর্তার চোখ-মুখ কাতর। অথবা যেন তিনি নিশিদিন জলের নিচে ডুবে ছিলেন—জল থেকে কারা তাঁকে তুলে এনে ঝোপে-জঙ্গলে ফেলে গেছে। হাত-পা সাদা ফ্যাকাশে। ঈশম জঙ্গল থেকে বের করে কাপড়টা ভালো করে পরিয়ে দিল। বড়কর্তা নিজের কব্জি থেকে নিজের মাংস তুলে নিয়েছেন। হাত মুখ রক্তাক্ত, বড়কর্তার শরীর মুখ এ-মুহূর্তে বীভৎস দেখাচ্ছে। চাপ-চাপ রক্তের দাগ। গাছের ডালে-ডালে পাখিদের আর্তনাদ-নির্জন মাঠে সকলকে সহসা বড় ক্লান্ত করছে যেন।

    শচী লণ্ঠন তুলে মুখ এবং কব্জি দেখতেই বড়কর্তা হেসে দিলেন। শিশুর মতো সরল হাসি। শচী তাকাতে পারছেন না। তাড়াতাড়ি এখন বাড়ি নিয়ে যেতে হয়। দূর্বা ঘাস তুলে শচী ক্ষতস্থানে রস ঢেলে দিলেন। জ্বালা এবং যন্ত্রণায় মুখটা কুঁচকে যাচ্ছে। তিনি কিছু বলছেন না। চিৎকার করছেন না। সবার সঙ্গে এখন আউলের মতো হেলে-দুলে হাঁটছেন শুধু।

    সামসুদ্দিন হাঁটতে হাঁটতে বলল, কর্তারে লইয়া কাশী, গয়া, মথুরা ঘুইরা আইলেন—কেউ কিছু

    করতে পারল না! ভাল করতে পারল না!

    মনজুর বলল, কইলকাতায় লইয়া গেলেন—বড় ডাক্তার দেখাইলেন, কেউ কিছু করতে পারল না?

    শচীর গলাতে অন্ধকারেও হতাশা ফুটে উঠতে থাকল! বললেন, কেউ কিছু করতে পারল না! দশ-বারো বছর ধইরা কত দেশ-বিদেশ করলাম!

    মনজুর বলল, হাসান পীরের দরগায় সিন্নি দিলাম—না, কিছু হইল না।

    শচী আর কথা বলছেন না। সকলেই এ দুঃখে যেন কাতর। যেন এই দুঃখ পাশাপাশি সব গ্রামকে বিপর্যস্ত করছে। বড়কর্তাকে নিয়ে একদা এই সব পাশাপাশি গ্রামের কত আশা, কত আকাঙ্ক্ষা। কত দিন থেকে বড়কর্তার অবিস্মরণীয় মেধাশক্তির পরিচয় পেয়ে এ-অঞ্চলের মানুষেরা গৌরব বোধে আচ্ছন্ন। আমাদের অঞ্চলেও একজন আছেন, আমরা একজনকে সবার সামনে রাজকীয় সম্মানে হাজির করতে পারি। সবার প্রীতি এবং স্নেহ যেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে অতি আদরে মনের ভিতরে সংগোপনে লালন করছে—সেই মানুষ দিন-দিন কী হয়ে যাচ্ছেন!

    মনজুর এ-সময়ে শচীকে প্রশ্ন করল, আইচ্ছা কর্তা, বা’জী আমারে কয়, বুড়াকর্তা নাকি জীবনে মিছা কথা কয় নাই!

    শচী বললেন, শুনছি, লোকে তাই কয়।

    —তবে এত বড় একটা তাজা শোক পাইল ক্যান?

    শচী উত্তর করতে পারলেন না। আকাশে যে মেঘ ছিল বাতাসে কেটে যাচ্ছে। ওরা গোপাট ধরে পুকুরপাড়ে উঠে এল না, ওরা নরেন দাসের গয়া গাছটার নিচ দিয়ে পথ সংক্ষিপ্ত করল। নরেন দাসের উঠোনে উঠে দেখল, কোনও আলো জ্বলছে না। নরেন দাসের তাঁতঘরেও কোনও শব্দ নেই। এত তাড়াতাড়ি সকলে শুয়ে পড়েছে! সামসুদ্দিন ভাবল নরেন দাসের বোনটা বিধবা হয়ে ফিরে এসেছে—সুতরাং শোক এ-বাড়ির আনাচে-কানাচে ছমছম করছে। সে একদিন দূর থেকে মালতীকে দেখেছে। বিধবা হবার পর থেকে মালতী ব্লাউজ পরে না। মালতীর কোনও সন্তান নেই। যে সালে বিলের জলে কুমীর আটকা পড়ল সে সালেই মালতীর বিয়ে হল। নরেন দাস বিয়েতে খরচ-পত্তর করেছিল। সুতরাং পাঁচ সাত বছর হবে মালতী এই গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিল। ফুটফুটে রাজপুত্রের মতো বর। ছোটোখাটো মানুষের চোখ দুটো ইচ্ছে করলে সামু এখন মনে করতে পারে। নরেন দাস নসিন্দি থেকে চারটে ডে-লাইট এনে ঘরে-বাইরে সকল স্থানে আলো জ্বেলে, আলোময় করে, চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিল বরের হাত ধরে, মালতীর মা নাই, বাপ নাই, তুমি ওর সব। নরেন দাস অনেকক্ষণ চৌকিতে পড়ে কেঁদেছিল। সকলে চলে গেল, বাড়ি ফাঁকা ঠেকল। তবু নরেন দাস দু’দিন তক্তপোশ থেকে উঠল না। ছোট বোনটা এ-বাড়ির যেন প্রজাপতির মতো ছিল। শুধু সারা দিন উড়ত, উড়ত। গাছের ছায়ায়, পুকুরের পাড়ে পাড়ে লটকন গাছের ডালে-ডালে মেয়েটা যেন নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে বেড়াত। সামু, রঞ্জিত ছিল বড় কাছের মানুষ তখন। ওরা কত দিন চুকৈর আনতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে। মালতী বিধবা হয়ে ফিরলে সে আর কথা বলতে পারেনি। কারণ ঢাকার রায়টে স্বামী তার কাটা গেছে।

    বাড়িতে ঢুকে শচী ডাকলেন মা জল দ্যাও।

    কাকার গলা পেয়ে লালটু বৈঠকখানা থেকে বের হয়ে এল। চন্দ্রনাথ বের হয়ে এলেন। শশীবালা স্বামীর পায়ের কাছে বসেছিলেন এতক্ষণ, উঠোনে শচীর গলা পেয়েই নেমে এলেন। মহেন্দ্রনাথ ছেলের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। আজকাল মণির নূতন উপসর্গ হয়েছে। কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া। এতদিন সে বৈঠকখানায় শুধু বসে থাকত অথবা পুকুর পাড়ে পায়চারি করতে করতে গাছপালা পাখির সঙ্গে কী যেন বিড়বিড় করে বকত। ছেলে ফিরেছে শুনেই কম্বলটা হাতড়ে মুখের উপর টেনে কাৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। ভিতরে যে উৎকণ্ঠা ছিল সেটা কেটে গেছে।

    শশীবালা উঠোনে নেমে অনেক লোক দেখতে পেয়ে বললেন, তরা!

    —আমি সামু ঠাইরেন।

    —আমি মনজুর, ঠাইরেন।

    বড় বৌ জানালা দিয়ে সব দেখছে। স্বামীর দীর্ঘ চেহারা এবং বলিষ্ঠ মুখ আর কি যেন তার ভিতরে এক আত্মপ্রত্যয়ের ছবি—সে ছবি মাঝে মাঝে হাওয়ায় দুলতে থাকলে—বড় বৌ হাত তুলে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে—ঈশ্বর আমার এই মানুষকে তুমি দেখে রেখো, উঠোনে মানুষজন বলে সে নেমে আসতে পারল না।

    শশীবালা সকলকে বসতে বলে ঘরে ঢুকে গেলেন। সামান্য জল, তুলসীপাতা এবং চরণামৃত এনে শচী আর মণির শরীরে ছিটিয়ে দিলেন। জল আনালেন এক বালতি। চন্দ্রনাথ পাট ভাঙা কাপড় বের করে আনলেন। ক্ষতস্থানে গাঁদা পাতার রস দিয়ে হাতটা বেঁধে দিলেন।

    সামসুদ্দিন বলল, ঠাইরেন, আমরা যাই।

    —যাও। রাইত অনেক হইছে। সাবধানে যাইও। তারপর কি ভেবে শশীবালা উঠোনের মাঝখানে এসে বললেন, সামু, চাইর পাঁচদিন ধইরা তর মায়রে দ্যাখি না!

    —ম্যার কমরে ব্যাদনা হইছে। উঠতে পারতাছে না। বাতের ব্যাদনা মনে হয়।

    —খাড়। বলে তিনি ঘরে ঢুকে একটা পুরনো শিশি বের করে আনলেন। বললেন, শিশিডা নিয়া যা সামু। কমরে ত্যাল মালিশ করতে কবি

    ওরা চলে গেল। ঈশম লণ্ঠন হাতে তরমুজ খেতে নেমে গেল। সোনালী বালির নদীর চরে তরমুজ খেতে ছইয়ের ভিতর সারা রাত সে বসে থাকবে। খরগোশ অথবা ইঁদুর কচি তরমুজের লতা কেটে দেয়। রাতে সে বসে টিনের ভিতর ডংকা বাজাবে। অনেক দূর থেকে কেউ প্রহরে জেগে গেলে সেই ডংকা শুনতে পায়, শুনতে পেলেই ধরতে পারে ঈশম, ঠাকুরবাড়ির বান্দা লোক, ঈশম এখন তরমুজ খেতে ডংকা বাজাচ্ছে। ডংকা বাজিয়ে ইঁদুর বাদুড় সব তাড়িয়ে দিচ্ছে।

    ছোটকর্তা শচীন্দ্রনাথ নিজের ঘরে বসে তখন দৈনন্দিন হিসাব লিখছেন। বড়কর্তাকে হাতমুখ পরিষ্কার করে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হল। তিনি ডাল দিলে ডাল খেলেন, ভাত দিলে শুধু ভাত, মাছ অথবা মাংস খাওয়ার সময় হাড়গুলি গিলে ফেললেন। কেমন বড় বড় চোখে তিনি রান্নাঘরটা দেখতে থাকলেন। তখন শশীবালা বললেন, মণিরে আর কষ্ট দিও না। তরকারী ভাতের লগে মাইখা খাও।

    মার এমন কথায় মণীন্দ্রনাথ কীটসের একটি প্রেমের কবিতা পূর্বাপর ঠিক রেখে গভীর এবং ঘন গলায় আবৃত্তি করে শোনালেন। মা অথবা চন্দ্রনাথ কেউ তার একবর্ণ বুঝল না। বলতে বলতে তিনি বড়বৌর দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকলেন। যেন নিদারুণ কোন যন্ত্রণার কথা তিনি বার বার এইসব কবিতার ভিতর পুনরাবৃত্তি করতে চাইছেন। যেন এই পৃথিবী নিরন্তর অসহিষ্ণুতায় ভুগছে। মণীন্দ্রনাথ এ সময়ে নিজের কপালে এবং মাথায় হাত বোলাতে থাকলেন, মাগো, তোমরা আমাকে আদর করো, এমন ভাব মণীন্দ্রনাথের চোখে মুখে। তাঁর অপলক দৃষ্টি যেন বলছে—আমার বড় কষ্ট বড় যন্ত্রণা!

  • তিন

    তিন

    সম্পর্কে জোটন বিবি আবেদালির দিদি হয়।

    সেই জোটন শোলার ছোট্ট ঝাঁপটা টেনে ঘর থেকে মুখ বার করল। এখনও ভোর হয়নি। সারা রাত জোটনের চোখে ঘুম নেই। মসজিদে সামু আজান দিচ্ছে, জোটন ঘরে বসে অন্ধকারে ছেঁড়া হোগলা এবং ছেঁড়া কাঁথাটা ভাঁজ করে এক পাশে রেখে দিল। অন্ধকার কাটছে না, সুতরাং ঘরের আসবাবপত্র অস্পষ্ট—শিকাতে দুটো হাঁড়ি, দুটো সরা—দু’দিন থেকে জোটনের ভাত নেই, দু’দিন ধরে জোটন শালুক সিদ্ধ করে খাচ্ছে। সে অন্ধকারে বসে শালুকগুলি খেতে থাকল। শুকনো বলে গলায় আটকাচ্ছে—একটু জল খেল জোটন। আবার দরজা ফাঁক করে যখন আকাশ দেখল—আকাশ পরিষ্কার, মোরগেরা ডাকছে—জোটন দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল।

    মসজিদের ওপাশটায় সূর্য উঠছে। আবেদালি বদনা হাতে মাঠ থেকে উঠে এল। আবেদালির বিবি জালালি পাতা দিয়ে উঠোনের এক কোনায় ভাত রান্না করছে। আবেদালিকে দাওয়ায় বসতে দেখে জোটন বলল, কি রে, মানুষটা ত কাইল আইল না।

    না আইলে আমি কি করমু। আবেদালি জোটনের এই ইচ্ছায় বিরক্ত। তিন তিনবারের পর ফের নিকাহের শখ!

    দু’দিন না খেয়ে জোটনও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। সে আবেদালিকে বলল, দন্দি যাওনের সময় মানুষটার খোঁজ কইরা যাবি। মানুষটা বাইচা আছে, না, মরছে কবি আইয়া!

    কমু গ কমু! আবেদালি দেখল জোটনের মুখ ভয়ানক শুকনো। দু’দিন না খেতে পেয়ে জোটনের চোখ কোটরাগত। বলল—তুই দুফরে আমার ঘরে খাইস। আবেদালি এবার জালালির মুখটা দেখল। সূর্য উঠছে বলে রোদের রঙ জালালির খড়খড়ে মুখটা আরও খড়খড়ে করে দিচ্ছে এবং আবেদালির এমত কথায় জালালির মুখটা রাগে ফোটকা মাছের মতো ফুলতে থাকল।—আরে, আরে, করতাছস কি। তর গাল যে ফাইট্টা যাইব!

    জোটন বুঝতে পেরে বলল, না রে থাউক। আমার খাওয়নের লগে কি আছে!

    আবেদালি বুঝল জোটন খাবে না। সে দেখল, জোটন উঠোন থেকে নেমে যাচ্ছে। জোটন রাস্তায় নেমে গেল এবং সড়ক ধরে হাঁটল না। যেখানে এখনও ধান খেতে জল আছে অথবা খেতের আল জাগছে সেই সব পথ ধরে কী যেন খুঁজতে খুঁজতে চলেছে।

    জোটন এই সব নরম মাটির আশ্রয়ে কচ্ছপের ডিম খুঁজছে। এ সময়ে কচ্ছপেরা ডিম পাড়বে মাটির আলে। জোটন এসময়ে এই সব মাটির আশ্রয় থেকে ডিম বের করে পশ্চিমপাড়া উঠে যাবে ভাবল এবং ডিমগুলি দিয়ে বলবে, আমারে এক টুকরি চাইল দিয়েন। সে এক দু’করে বিলের জমির অনেক আল ভাঙতে থাকল। সূর্য বিশ্বাসপাড়ার ফাঁক দিয়ে অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে। ধান গাছের শিশির, ঘাসের শিশির, লাই খেতের শিশির সব বিন্দুবৎ হয়ে পড়েছে এবং ইতস্তত রোদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মানুষটা গতকাল এল না, সে পুঁটলি বেঁধে বসে ছিল, মৌলভি সাবকে বলা ছিল, সাক্ষী ঠিক ছিল—অথচ মানুষটা এল না। মুশকিলাসান নিয়ে মানুষটা উঠোনে উঠে ডেকেছিল একদিন, এটা আবেদালির বাড়ি না? আবেদালি, জালালি এবং সকলে ফোঁটা নিয়েছিল—জোটনও উঠেছিল, ফোঁটা নিয়েছিল— পীরের দরগায় লোকটা থাকে। উঁচু, লম্বা গোটা গোটা চোখ—নাভির নিচে দাড়ি নেমে গেছে, গায়ে শতচ্ছিন্ন জোব্বা, মাথায় ফেটি এবং গলায় বিচিত্র রকমের মালা-তাবিজ। জোটন ফকির মানুষটার মহব্বতের জন্য প্রথম দর্শনে বিস্মিত এবং শীতের নরম রোদ যেন তাকে গভীর রাত পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেদিন।

    জোটন আলের ধারে ধারে তীক্ষ্ণ নজর রেখে হাঁটছে। কচ্ছপের ডিম এখানে নেই, সে হাঁটতে থাকল। সে ইতস্তত তাকাল এবং কয়েকগুচ্ছ ধানের ছড়া শামুকে কেটে কাপড়ের নিচে লুকিয়ে ফেলল। ওর পাশ দিয়ে কামলারা অন্য জমিতে উঠে যাচ্ছে—জোটন বসে পড়ল—যেন সে যথার্থই কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করছে। সে উঠছে না। কামলারা অন্য জমিতে এখন ধান কাটছে। জোটন ধান কাটছে না। হাতের ধারালো শামুকটা সে পেটের নিচে গুঁজে রেখেছে। জোটন অন্য জমিতে কামলাগুলিকে দেখার জন্য গোড়ালিতে ভর করে উঁকি দিল—জমিটা কার স্থির করার ইচ্ছায়। দূরে গরুগুলিকে জলে নেমে যেতে দেখল—মানুষটা এল না, সেই মুশকিলাসানের মানুষটা। তেরটি সন্তানের জননী জোটন আবার মা হবার জন্য এই আলে দাঁড়িয়ে কেমন ছটফট করতে থাকল। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছরের রমণী জোটন খোদাকে যেন এই ধানের জমিতে খুঁজছে—খোদার মাশুল উঠছে না গতর থেকে এমন ভাব এখন।

    দু’দিন পেটে ভাত নেই—আফশোস। দু’দিন হাইজাদির বিলে গ্রামের অন্য অনেকে দুঃখী ইমানদারদের সঙ্গে শালুক তুলেছে, দুঃখী হলেই ইমানদার হবে, খোদাকে স্মরণ করবে—এমনও একটা বিশ্বাস আছে জোটনের। এই যে এখন জোটন শামুকের ধারালো মুখটা দিয়ে কট করে আর একটা ধানের ছড়া কাটল এবং কোঁচড়ে লুকিয়ে ফেলল—যেন পেটের খিদে ভয়ানক দুঃসহ, খোদার কাছে নিজের গোনাগারের জন্য জোটন মোনাজাত করল—হায়রে খোদা, পেটের জ্বালায় সব হয়। সুতরাং জমির মালিককে যেন বলার ইচ্ছা, ভয় করার কিছু নেই, আর কিছু না হোক, জোটনের ইমান আছে। তোমার শক্ত ধানের ছড়া কাটছি না, আলের উপর যেসব ছড়া নুয়ে আছে শামুকের ধারালো মুখে তাই কেটে নিচ্ছি। হাসিমের বাপ নয়াপাড়ার নিমগাছ অতিক্রম করলে জোটন কট করে আরও একটা ধানের ছড়া কেটে কোঁচড়ে লুকাল। এবং এ-সময় মালতীর কথা মনে হল। নরেন দাসের ছোট বোন মালতী বিধবা হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে। বিধবা মালতীর টানে জোটন পুবের বাড়ির বোন্না গাছটার ফাঁক দিয়ে নরেন দাসের তাঁতঘর দেখল। তাঁতের শব্দ শুনতে পাচ্ছে—মাকুর শব্দ এবং চরকার শব্দ। জোটন কট করে তার ধানের ছড়া কাটতেই পিছন থেকে কে যেন চিৎকার করে উঠল—এই জুটি, মাথার খুলি ভাইঙ্গা দিমু।

    জোটন মুখ ঘুরিয়ে দেখল ঈশম আসছে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, না ঈশম ভাই, আমি এহানে কিছু করতাছি না।

    —তুমি আসমান দ্যাখতাছ। যা বাড়ি যা। কথা বাড়াইস না।

    সুতরাং বাড়ি উঠে যাওয়ার মতো করেই জোটন হাঁটতে থাকল, কিন্তু যেই ঈশম মসজিদের কুয়াতে জল তোলার জন্য বালতি নামাল—জোটন টুক করে আলের পরে বসে গাছের ছায়ায় নিজেকে ঢেকে ফেলল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে যেতে দেখল এক জায়গায় হাত লেগে মাটি সরে গেছে এবং সাদা গোল গোল ডিম বের হয়ে পড়ল। জোটন কী খুশি! সব আল্লার মর্জি। জোটন এবার উঠে দাঁড়াল। ইমান এবং মুশকিলাসানের লম্ফটা ওকে উষ্ণ করছে। দূরে দূরে সব ধান কাটা হচ্ছে। ধানের আঁটি বাঁধছে মুনিষেরা, ওরা গাজীর গীত গাইছে। দূরে দূরে গানের স্বর তরঙ্গ, নরেন দাসের বিধবা বোন মালতী এবং গতরাতের নিষ্ফল প্রতীক্ষা জোটনকে কাতর করছে। মালতীর বিয়ে হবে না, বাকি জীবন গতর কোনও মাশুল দেবে না—আল্লা নারাজ হবে। এই গতর মাটির মতো পতিত ফেলে রাখলে গুনাহ্। জোটন এই জন্যই মালতীর জীবনকে, ধর্মকে না-পাক কাফেরের মতো ভাববার ইচ্ছায় শরীরের জড়তা কাটাতে গিয়ে দেখল, বোন্না গাছের নিচে মালতী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওর শরীরে সাদা থান ভোরের হাওয়ায় উড়ছে। জোটন মালতীকে দেখে তাড়াতাড়ি সব ক’টা ডিম ভিজা মাটির ভিতর থেকে তুলে আঁচলে বেঁধে ফেলল।

    অন্যদিন হলে জোটন মালতীর সঙ্গে অন্তত কিছু কথা বলত। কিন্তু আজ মালতীর এই নিঃসঙ্গতা যথার্থই ওকে গীড়িত করছে। এক অহেতুক অপরাধ-বোধে মালতীর সঙ্গে সে কোনও কথাই বলতে পারল না। জোটন এই পথ ধরেই গেল—অপরিচিতের মতো তামুকের খেতে উঠে গেল। দেখল, মালতী বোন্না গাছ পার হয়ে লটকন গাছের নিচ দিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়াল এবং হাঁসগুলিকে জলে সাঁতার কাটতে দেখে কোন আনমনা হয়ে গেল।

    জোটন আর দাঁড়াল না। এখানে দাঁড়ালে কষ্টটা বাড়বে। তারপর শালুক খেয়ে শরীরে শক্তি পাচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি নরেন দাসের বাড়ি পার হয়ে গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে থাকল। বকুল গাছটা অতিক্রম করে ঠাকুরবাড়ির সুপারি বাগান। সে সন্তর্পণে বাগানে ঢুকে গাছতলায় সুপারি খুঁজতে থাকল। সে খুঁজে খুঁজে কোথাও যখন একটাও সুপারি পেল না, সে গাছের মাথার দিকে তাকাল এবং প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল, আল্লা একটা গুয়া দ্যা। সব গাছগুলির মাথায় সুপারি ঘন এবং হলুদ রঙের। হলুদ রঙের এই সুপারির খোসা ছাড়িয়ে একটা পান মুখে দেবার বড় শখ জোটনের। সে দেখল একটা কাঠঠোকরা পাখি এ-গাছ ও-গাছ করছে। আহা রে, আল্লা রে, একটা দ্যা না রে। তখনই বুড়ো ঠাকরুণের গলা শুনতে পেল সে। জোটন চুপচাপ বাগানের পাশে ঘন লটকন গাছের জঙ্গলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। জোটন অনেক্ষণ এই ঝোপের ভিতর পাখিটার বদান্যতার জন্য বসে থাকল। পাখিটা উড়ছে, জোটন ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতে উত্তেজিত হতে থাকল। পাখিটা সুপারির ওপর এবার ঘন হয়ে বসল, দুটো ঠোকর মারল এবং সঙ্গে সঙ্গে তিন চারটা সুপারি গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ল—য্যান মাণিক্য। যেন জোটনের সমস্ত দিনের ইচ্ছা এখন এই গাছটার ছায়ায় রূপ পাচ্ছে। জোটন চারপাশটা ভালো করে দেখল! পুকুরঘাটে বুড়ো ঠাকরুণ স্নান করছে। সে সব দেখছে, অথচ তাকে কেউ দেখতে পেল না। সে তাড়াতাড়ি গাছটার নিচে ছুটে গেল। সুপারি তিনটা আঁচলে বেঁধে সে হাঁটছে। সে বৈঠকখানা পার হয়ে ঠাকুরবাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। ডাকল—বড় মামি আছেন নাকি? বলতে বলতে সে পাছদুয়ারে ঢুকে আঁতুড়ঘরের সামনে দাঁড়াল। বলল, ধনমামি, একবার মানিক রে দ্যাখান। মানিকের লাইগ্যা কাছিমের ডিম আনছি। বড়মামিকে দেখে বলল, কাছিমের ডিম রাইখ্যা এক টুকরি চাইল দ্যান। চাল পেলে বলল, দুইডা পান নিমু বড়মামি

    —নে গা। গাছতলায় মেলা পান পইড়া আছে।

    জোটন চালগুলি আঁচলে বাঁধল। এবং বড়ঘরের পিছনে ঢুকে আলকুশী লতার কাঁটা ঝোপ পার হয়ে একটা শ্যাওড়া গাছের নিচে দাঁড়াল। পানের লতা গাছটাকে জড়িয়ে আছে, সে দুহাতে যতটা পারল পান কুড়িয়ে নিল, ছিঁড়ে নিল। সে বাড়ির ওপর দিয়ে গেল না। সে আলকুশী লতার ঝোপ ভেঙে মাঠে নেমে গেল। জল-কাদা ভেঙে ফের পুবের বাড়ির পুকুরপাড় ধরে ধান খেতের আলে উঠে যাবার সময় দেখল, মালতী আকাশ দেখছে। জোটন এবার মালতীকে ফেলে চলে যেতে পারল না। সে একটু হেঁটে এসে মালতীর পাশে চুপ করে বসল। ডাকল—মালতী!

    মালতী কথা বলল না। মালতী কাঁদল। জোটন মালতীর মুখ দেখতে পাচ্ছে না অথচ বুঝল মালতী চোখের জল ফেলছে। জোটন ফের ডাকল, মালতী কান্দিস না। কাইন্দা কি করবি। সব নসিব মালতী।

    জোটন উঠে পড়ল। মেয়েটা শোকে কাঁদছে, কাঁদুক। ওর তিন নম্বর খসমের কথা স্মরণ করতে গিয়ে গলা বেয়ে একটা শোকের কান্না উঠে আসতে থাকল। বেলা বাড়ছে। পেটে প্রচণ্ড খিদে। যে চাল আছে জোটনের দু’ওক্ত হয়ে যাবে। সে হাঁটবার সময় গোপাট থেকে কিছু গিমা শাক সংগ্রহ করল। তারপর আবেদালির ঘর অতিক্রম করে উঠোনে উঠেই তাজ্জব বনে গেল—যে মানুষটা কাল রাতে আসেনি, যে মানুষটার জন্য সে প্রায় সমস্ত রাত জেগে বসে ছিল, সেই মানুষটা ছেঁড়া মাদুরে নামাজের ভঙ্গিতে বসে তফন সেলাই করছেন। নীল কাঁথার মতো ঝোলা, মুশকিলাসানের লম্ফ, ভিন্ন ভিন্ন সব তাবিজের মালা, কুচ ফলের মালা, এবং পুঁতির হার—এই সব বিচিত্র বস্তুর সমন্বয়ে এখন ফকির সাব যেন ঘোড়দৌড়ের পীরের মতো।

    জোটন ফকির সাবকে দেখে বলল, সালেমালেকুম।

    ফকির সাব এতক্ষণে জোটনকে দেখতে পেলেন এবং বললেন, ওয়ালেকুম সেলাম।

    জালালি ঘরের কোণে ঘোমটা টেনে বসে আছে। জোটনেরও ইচ্ছা হল এ সময় বড় ঘোমটা টেনে ছোট ঘরটায় বসে থাকে। কিন্তু খিদমতের অসুবিধা হবে ভেবেই যেন শরমের জন্য দিল খুলে দিতে পারল না। সেই জালালির ঘরে ঢুকে বলল, মানুষটা খাইব, কি যে খাওয়ামু!

    জোটনের ফিসফিস কথা ফকির সাব শুনতে পেলেন।—আমার জন্য ভাইবেন না। দুইডা শাক-ভাত কইরা দ্যান। দেখেন, নিশ্চিন্তে ক্যামনে খাইয়া উঠি।

    জোটন বলল, জালালি, দুইটা পুঁটির সুঁটকি দ্যা।

    জোটন রান্নার জন্য, শোলার-পারা থেকে এক আঁটি শোলা নামিয়ে আনল। ঘরের পিছনে শোলাগুলিকে মড়মড় করে ভাঙল এবং ভাঁজ করে ঘরে ঢুকতে দেখল—ফকির সাব তখনও তফনে তালি মারছেন বসে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোটন ফকির সাবের প্রশস্ত বুক এবং কব্জি দেখে—গতরে খোদার মাশুল উসুল হতে বেশি সময় নেবে না—সুতরাং সুখী মনে জোটন রান্না করতে বসল। দু’সাল হল গতর বেশরমভাবে প্রায় রাতে বেইমানি করতে চাইছে। রাতে যতবার এমন হতো জোটন ছেঁড়া মাদুরে বসে আল্লাকে স্মরণ করে গতরের এই সব বেওয়ারিশ ইচ্ছাকে তাড়াতে চাইত। তিন তিনবার তালাক পেয়ে জোটন যেন বুঝতে শিখেছে ওর শরীরের খাক মেটাবার শক্তি পুরুষমানুষের ছিল না।—সুতরাং তালাক দিল—বলল, ইবলিশের গতর কেবল খাই-খাই। সে ফের উনুনে কিছু শোলা গুঁজে দিল এবং ফকির সাবের শরীর দেখল বেড়ার ফাঁক দিয়ে। সমস্ত চালটাই সে রান্না করছে। দু’জনের মতো ভাত। সে সুঁটকি মাছ দুটোকে আগুনে পুড়িয়ে নিচ্ছে, সে অনেকগুলো লাল চাঁটগাই লঙ্কা বেঁটে নিচ্ছে পাথরে, বড় বড় দুটো পেঁয়াজ কেটে সুঁটকি দুটোকে মড়মড় করে সানকির এক পাশে গুঁড়ো করে রাখল। তারপর লঙ্কা, পেঁয়াজ, নুন এবং সুঁটকির বর্তা বানাতে গিয়ে জিভে জল এল, এখন সে ইচ্ছা করলে দু’জনের ভাত যেন একা খেয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাড়িতে মেহমান—সে তার ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করল কিছুক্ষণের জন্য। ভাতের ফ্যানা টগবগ করে ফুটছে। সোঁদা সোঁদা গন্ধ ভাতের। সে ফ্যানটা গেলে একটা সানকিতে যত্ন করে রাখল, নুন মেশাল—সবটা ফ্যান পিছন ফিরে চুকচুক করে গিলতে থাকল—আহাঃ, এতক্ষণে যেন চোখ তার দৃশ্যমান বস্তুগুলিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ফকির সাহেবকে পীরের মতো মনে হল—দরগার পীর এই ফকির সাহেব। জোটন নিজের শরীরের দিকে নজর দিয়ে বুঝল, এ শরীরও ভয়ানক শক্তসমর্থ। ফকির সাবকে কাবু করতে খুব একটা আদা নুন লাগবে না। জোটন মনে মনে হাসল। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ডাকল, ফকির সাব সান করতে যান। আমার খানা পাকান হইয়া গ্যাছে।

    ফকির সাব সব তল্পিতল্পা সঙ্গে নিয়েই ঘাটে গেলেন, এমন কি মুশকিলাসানের আধারটাও। জোটন এই ঘরে বসে কাকের শব্দ পেল, আকাশে রোদ, গাছে এবং শাখাপ্রশাখায় রোদ। জাফরি রঙের ছায়া ঘরের পিছনে। বেত ঝোপে বোলতার চাক—নিচে বোন্না গাছের ঘন জঙ্গল, ফকির সাব হাসিমদের পুকুরে স্নান করতে গেছেন। জোটন বিবি গাজীর গীত ধরল গুনগুন করে। জোটন বিবির স্বপ্ন জাগছে চোখে, বেত ঝোপে বেথুনের মতো এই স্বপ্ন কবে টসটস করে পাকবে…জোটন স্বপ্নের কথা ঠিকঠাক ভাবতে পারছে না…স্বপ্নটা গাজীর গীতে গায়ানদারের হাতের ছড়ি য্যান; চাঁদের মতো মুখ করে চ্যাপ্টা নাকে চোখে জোটনের সকল সুখকে দ্যাখতাছে।

    জোটন তাড়াতাড়ি পাশের একটা গর্ত থেকে ডুব দিয়ে এল। চুলের জল ঝেড়ে ভাঙা আয়নায় ডুরে শাড়ি পরে নিজের সুন্দর মুখটি দেখল। উজ্জ্বল দাঁতের পাটি দেখে রাতে পীরের দরগায় সুখের হীরামন পাখির কথা মনে করে কেমন বিহ্বল হতে থাকল।

    ফকির সাহেব ছেঁড়া মাদুরে বেশ পরিপাটি করে খেতে বসলেন। ভিজা লুঙ্গি সিম লতার মাচানে শুকোচ্ছে। তিনি খেতে বসে দু’বার আল্লা উচ্চারণ করে আকাশ দেখলেন—আকাশ পরিষ্কার, বড় তকতকে এই উঠোনে ঝকঝকে আকাশের নিচে বসে গবগব করে খেতে পারলেন না। যেমন পরিপাটি করে বসেছেন তেমন ধীরে সুস্থে এক সানকি মোটা ভাত সুঁটকির ভর্তা দিয়ে কিঞ্চিৎ মেখে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেতে থাকলেন। নিচে দুটো-একটা ভাত পড়ছে—তিনি আঙুলের ডগায় তুলে সন্তর্পণে মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, যেন এই মোটা ভাত ফুরিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না—আল্লার বড় অমূল্য ধন। সানকির ভাতটা শেষ করতেই দেখলেন, জোটন আর এক সানকি ভাত এনে সামনে রেখেছে। তিনি সে ভাতটাও পরিপাটি করে শেষ করলেন। এবং ভাতের অপেক্ষায় ফের বসে থাকলেন। সহসা আবিষ্কারের ভঙ্গিতে তিনি মাদুরের এবং সানকির সংলগ্ন ভাতটিও আঙুলের চাপে মুখে তুলে দিয়ে বসে থাকলেন। নামাজের ভঙ্গিতে এই বসে থাকা ভাবটুকু সাবের বড় আরামদায়ক। এই সব জোটন ঘরের ভিতর থেকে লক্ষ করে শরমে মরে যাচ্ছে। সে হাঁড়ির ভিতর হাত দিল। শেষ দু’মুঠো ভাত সানকিতে তুলে শেষ ভর্তাটুকু তার কিনারে রেখে মাদুরের উপর রেখে দিল। ফকির সাব বললেন, বস্ হইব। ইবারে আপনে গিয়া খান।

    জোটন ঘরের এক কোনায় বসে থাকল। ওর মাথাটা ঘুরছে। সে খুঁটিতে হেলান দিল। কোমর থেকে ডুরে শাড়িটা খসে পড়ছে। আবেদালি নেই, জব্বর নেই, থাকলে বলত, আমার ঘরটা বন্ধক রাইখ্যা এক প্যাট ভাত দ্যা। সে ক্ষুধায় যন্ত্রণায় থাকতে না পেরে গিমা শাকগুলো সিদ্ধ করল এবং খেল। সে কিছু কাঁচাপাকা বেথুন এনে খেল। এ সময়ে উঠোনে গাছের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। কাক, শালিকরা প্রায় সকলে ডালে, ঝোপে জঙ্গলে যেন ঝিমোচ্ছে। ফকির সাব ছেঁড়া মাদুরে পড়ে ঘুমোচ্ছেন। জোটন আর বসে থাকতে পারল না। শরীরের জড়তায় সে ডুরে শাড়ির আঁচল পেতে মেঝের ওপর পেট রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

    বিকেল বেলাতে যখন উঠানের ওপর দিয়ে পাখিরা ডেকে গেল, যখন সাত-ভাই-চম্পা পাখিরা লাউ মাচানের নিচে কিচমিচ করল অথবা ধানের আঁটি নিয়ে কামলারা সড়কের ওপর কদম দিচ্ছে তখন জোটন ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটাকে টেনে টেনে তুলল। ফকির সাব হুঁকা খাচ্ছেন বসে। সব পোঁটলা-পুঁটলি যত্ন করে বাঁধা, যেন তিনি এখন উঠবেন, শুধু হুঁকা খাওয়াটা বাকি। জোটন আর অপেক্ষা করতে পারল না। ঘর থেকেই বলল, ফকির সাব, আমারে লইয়া যাইবেন না?

    ফকির সাব ঝোলাঝুলি কাঁধে নিতে নিতে বললেন, আইজ না। অন্যদিন হইব। কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। কবে ফিরমু ঠিক নাই। উঠোন থেকে নেমে যাওয়ার সময় দরজার ফাঁকে জোটনের শীর্ণ মুখে আশ্চর্য বিষাদ ধরতে পেরে উচ্চারণ করলেন, আল্লা রসুল, আহা এই ইচ্ছার সংসারে আমরা কতদূর যাব, আর কতদূর যেতে পারি। ফকির সাহেব ওইমত চিন্তা করলেন। তিনি হাঁটতে হাঁটতে ধরতে পারলেন, জোটনের চোখ দুটো এখনও ওকে অনুসরণ করছে অথবা যেন জোটন দেখল হাঁসের পালক মালতীর শরীরে—ইচ্ছার জল গড়িয়ে পড়ছে অথবা পীরের শরীর গাজীর গীদের গায়ানদারের লাঠি য্যান…হাঁটতাছে…হাঁটতাছে…চাঁদের মতো মুখ করে চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা নাকে চোখে জোটনের সকল দুঃখকে দ্যাখতাছে। জোটন এবার ডুকরে কেঁদে উঠল-আল্লা রে, তর দুনিয়ায় আমার লাইগ্যা কেউ বুঝি নাই রে!

  • চার

    চার

    একটা হাড়গিলে পাখি অনবরত সেই থেকে ডাকছে। বাড়িটার উত্তরে মোত্রা ঘাসের জঙ্গলে। এখন সেখানে নানারকমের কীটপতঙ্গ উড়ে বেড়াচ্ছে। বড় বড় কুমীরের মতো দুটো গোসাপ ঝোপের ভিতর ঢুকে গেল। পাখিটা তবু ডাকছে, অনবরত ডাকছে। মালতী আতাফল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সব শুনল। সে জঙ্গলের কাছে যেতে সাহস পাচ্ছে না। একাদশীর পরদিন, বেশ ঝালটাল খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। বেতের ডগা সেদ্ধ খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। নরম নরম ডগা একটু সর্ষের তেল এবং কাঁচা লঙ্কা হলে তো কথাই নেই। মালতী নরম বেতের ডগা কাটার জন্য আতাফল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। বেতঝোপে বোলতার চাক, ঝোপের ভিতর পাখিটা ডাকছে অথবা সাপে যদি ছানা খায়, পাখি গিলে খায়—এমন ভয়ে মালতী গাছটার নিচে থেকে নড়তে পারল না। মালতীর হাতে একটা লম্বা বাঁশ। বাঁশের ডগায় সে একটা পাতলা দা বেঁধে রেখেছে। সে কেবল ইতস্তত করছিল। গাছে আতাফুলের গন্ধ।

    ছোট একটা বেগুন খেত অতিক্রম করে আভারানীর রান্নাঘর। নরেন দাসের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁতের ঘরে অমূল্য তাঁত বুনছে। মাঝে মাঝে ওর মেঘভাসি গান ভেসে আসছিল। নরেন দাসের বৌ আভারানী বারান্দায় বসে বসে ডাঁটা কুটছে। মালতী এখনও বেতের ডগা নিয়ে ফিরছে না—সে ডাকল, মালতী অ মালতী ব্যালা বাড়ে না কমে।

    মালতী আতাফুলের গন্ধ শুকতে শুকঁতে কেমন বিভোর। ঝোপের ভিতর পাখিটার কেমন থেকে থেকে কান্না। দূরে জব্বর হাল চাষ করছে জমিতে। এটা কি মাস, ফাল্গুন হতে পারে, মাঘের শেষ হতে পারে। মালতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিসেব করল। এখন জব্বর অকারণে উঠে আসতে পারে, এসে বলতে পারে, মালতী দিদি এক বদনা পানি দ্যান। মালতী এমন সব দৃশ্য দেখতে দেখতে অথবা শুনতে শুনতে হাঁকল, বৌদি, আমার জঙ্গলে ঢুকতে ডর করে। হাড়গিলে পাখিটা সেই থাইকা ডাকতাছে।

    —হাড়গিলা পাখি ডাকতাছে ত তর কি?

    —মনে হয় পাখিটারে সাপে গিলতাছে।

    —তরে কইছে?

    মালতী আর কথা বাড়াল না। দেখল মালতী, গোপাট পার হয়ে সামু এদিকে হেঁটে আসছে। এসে একটা কাগজের মতো কিছু ফেলুকে দিয়ে গাছের গুঁড়িতে সেঁটে দিচ্ছে। মালতী ডাকল সা…মু…উ…, অ…সা…মু…উ।

    সামু বুঝল মালতী স্বামীর শোক ভুলে যাচ্ছে। বুঝল শৈশবে মালতী যেমন ওকে দিয়ে ঝোপজঙ্গল থেকে চুকৈর ফল আনিয়েছে, বেত ফল আনিয়েছে অথবা শাপলা-শালুকের দিনে যেমন সামু কত ফুল ফল তুলে দিত, তেমনি আজ হয়তো কিছু তুলে আনতে বলবে—সে গাছের নিচ থেকেই হাত তুলে জবাব দিল। বলল, আইতাছি। ইস্তাহারটা ঝুলাইতে দে।

    মালতী সেই আগের মতো গলা ছেড়ে কথা বলল, কিসের ইস্তাহার রে সামু?

    —লীগের ইস্তাহার।

    —অরে আমার লীগ। আগে শোনত, পরে লীগ করবি।

    সামু কাছে এলে বলল, দুইটা বেতের ডগা কাইটা দে। বলে, দা এবং বাঁশটা সে সামুকে এগিয়ে দিল।

    সামুসুদ্দিন দাটা বাঁশের আগায় শক্ত করে বাঁধল। তারপর ঝোপের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হাড়গিলে পাখিটা আর ডাকতে পারছে না। কেমন নিভে আসছে। থেকে থেকে অনেকক্ষণ পর পর ডাকছে। ঝোপজঙ্গল ভেঙে ভিতরে ঢুকলে কিছু পোকা উড়ল এবং মুখে শরীরে বসল। সে পোকামাকড় শরীর থেকে উড়িয়ে দিয়ে দুটো কচি বেতের ডগা কেটে আনল।–দ্যাখ, আর লাগব নাকি?

    —না। মালতী দা-টা এবং বাঁশটা সামুকে মাটিতে রাখতে বলল।

    সামু বাঁশটা মাটিতে রেখে দিল। মালতী আলগা করে তুলে নিয়ে হাঁটছে। সামু পেছনে পেছনে আসছে, মালতী মুখ না ঘুরিয়েও তা টের পেল। দা-টা সামু বাড়ি রেখে যাক—মালতীর এমন ইচ্ছা। যেতে যেতে মালতীর মনে হল শরীরে ব্লাউজ নেই—খালি গা, পিঠ বুক খালি, বার বার সে কাপড় সামলেও যেন শরীর ঢেকে রাখতে পারছে না। মানুষটা পেছনে আসতে আসতে ওর শরীর থেকে আতাফুলের সুবাস নিচ্ছে, সুবাস নিতে নিতে মানুষটা কতদূর পর্যন্ত যাবে টের পাচ্ছে না। মালতী তাড়াতাড়ি কাপড়ের আঁচলটা চাদরের মতো করে শরীর ঢেকে দিল। পেছনে সামু আসছে ভাবতেই, শরীরে কী যে এক কোড়াপাখি আছে—সময়ে অসময়ে কেবল ডাকে, কোড়াপাখিটা ডেকে উঠতেই মালতীর গা কাঁটা দিল। সুতরাং সে পিছনের দিকে না তাকিয়েই বলল, সামুরে, সামু, তর আর আসতে হইব না। তুই বাড়ি যা।

    সামু নিঃশব্দে দা-টা নরেন দাসের বারান্দায় রেখে মাঠে নেমে গেল। মালতী বেতের খোল তুলতে তুলতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। কচি কচি নরম শাঁস। সেদ্ধ দিলে একবারে মাখনের মতো নরম। আতপ চালের সুগন্ধ, সামান্য ঘি আর বেতের ডগা সেদ্ধ বৈধব্যের এক মনোরম ভোজ্যদ্রব্য। একাদশীর পরদিন এমন নরম ডগা পেয়ে মালতীর জিভে জল এসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শৈশবের কিছু ছবি ওর চোখের উপর ভেসে উঠল। সামসুদ্দিন, রসো, রঞ্জিত কতদিন মালতীকে মাঠ থেকে মেজেন্টা রঙের চুকৈর ফল এনে দিয়েছে। তারপর কোন কোন ঋতুতে বেতফল, লটকন ফল এমন কি বকুল ফুল সংগ্রহের জন্য ওরা পরস্পর প্রতিযোগিতা করত। এমন সব সুখস্মৃতিতে দিনটা কাটলেও রাত কাটতে চায় না মালতীর। জানালা খোলা রেখে কেবল সাদা জ্যোৎস্নায় মাঠ দেখতে ভালবাসে। মাঝে মাঝে সেই জ্যোৎস্নায় এক দানবের মতো মহাকাল—কি যে এক মহাকাল, কি যে তার মুখব্যাদান, রাঙাজবার লাখান চক্ষে ঠোঁট ব্যাদান কইরা রাখে–রাক্ষুসি এক, তারে তাড়া কইরা মারে। সারারাত তখন ঘুম আসে না মালতীর। শেষ রাতের দিকে ঘুম আসে। যখন ঘুম ভাঙে তখন ভোরের সূর্য অনেক উপরে। আভারানী ডেকে ডেকে হয়রান। নরেন দাস তাঁতঘর থেকে হাঁকবে—অরে ঘুমাইতে দ্যাও। এতবড় শোকটা অরে ভুলতে দ্যাও। ঘুমের ভিতর এক সুখপাখি মালতীর কেবল কাইন্দা কাইন্দা মরে-জলে নাও ভাসাওরে, আমারে লইয়া যাও বিলের জলে, ডুইবা মরি আনধাইরে।

    মালতী আতা বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখল, সামু নিঃশব্দে কখন চলে গেছে। তাঁত ঘরে চরকার শব্দ, মাকুর শব্দ। উঠোনে ধানের মলন দিচ্ছে মনজুর। চারটা বড় বড় মেলার গরু মলনে তুলে দিচ্ছে।

    দীর্ঘ দু’মাস পর মালতীর চোখ এই আকাশ এবং ধরণীকে প্রীতিময় ভেবে খুশি। ভোরে সেজন্য সামুকে চিৎকার করে ডাকতে পারল। কতকাল পর যেন সে এই মাটির মতো ফের সুজলা সুফলা অথবা যেন দুঃখের ভারে নিয়ত ভুগতে নেই—সে খুব খুশি খুশি মুখে অনেকদিন পর আঁচলে মুখ মুছল। অনেকদিন পর সে ছুটে গেল পুকুরের পাড়ে, পেয়ারা গাছের নিচে। গাব গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখল গাছে কোনও পাকা গাব আছে কিনা–থাকলে সে কোটা দিয়ে গাব পাড়বে, তারপর গাবের বিচি চুষতে চুষতে স্বামীর ঠোঁট অথবা জিভে কি ভয়ঙ্কর স্বাদ—সে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একটা পাকা গাব খুঁজে পেলে ফুৎফাৎ বিচি বাতাসে ওড়াবে। গাবের পাকা পিছল বিচি আর স্বামীর ঠাণ্ডা জিভ চুষতে যেন এক রকমের। একটা পাকা গাব খাবার জন্য ওর সুন্দর কচি মুখটা কেমন লাল হয়ে উঠল। বিধবা মালতী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে এখন গাছ দেখছে কি পাখি দেখছে বোঝা যাচ্ছে না।

    না, গাছে একটাও পাকা গাব নেই। শীতকাল শেষ হলে পাকা গাব আর গাছে থাকে না। সে বাড়ি উঠে এলে দেখল আভারানী, মালতী কি খাবে, কি খেতে ভালবাসে—বিধবা মানুষের কি আর রান্না, তবু যত্ন নিয়ে সাদা পাথরে মালতীর তরকারী কেটে রাখছে। মালতী চুপচাপ বৌদির পাশে ঘন হয়ে বসল, বলল—সামু আগের মতই আছে বৌদি। ডাকলাম আর দৌড়াইয়া আইসা পড়ল। বেতের ডগা কাইটা দিল।

    আভারানী বলল, সামু কি একটা পাস দিল না ল?

    —সামু অর মামার বাসায় থাইকা পাস দিল। তোমাগ জামাইর কাছে কত দিন ঘুরছে একটা চাকরির লাইগা। চাকরি একটা দেখছিল, কিন্তু বৌদি কি যে হইল…মালতী এই পর্যন্ত বলে আর প্রকাশ করতে পারল না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল—বৌদি আমার যে আর বাঁচতে ইচ্ছা হয় না।

    আভারানী বলল, কান্দিস না।

    বৌদিকে মালতী কাজে সাহায্য করছে। ধীরে ধীরে সে কিছু বেতের ডগা কুচি করে নিল। এইসব করতে করতে মনের ভিতর সেইসব বিসদৃশ ঘটনা উঁকি মারলে চুপচাপ হয়ে যায় মালতী। বড় বড় চোখে সংসারের সব কিছু দেখে। এবং বড় অর্থহীন মনে হয়। চুপচাপ বসে থাকলেই স্বামীর নানারকমের ছোটখাটো মান-অভিমানের কথা মনে হয়। জলে চোখের কোণটা ভিজে যায়। মালতীর এখন আর কিছুই ভালো লাগল না। সুতরাং বারান্দা থেকে উঠে ফের বেগুন খেত অতিক্রম করে যেখানে হাড়গিলে পাখিটা ডাকছিল সেদিকে হেঁটে গেল। নির্জন এই জায়গাটুকু ওর ভালো লাগছে। সে অন্যমনস্কভাবেই লেবু গাছ থেকে দুটো পাতা ছিঁড়ল। পাতাদুটো মুচড়ে গন্ধ নিল। এবং অকারণ জঙ্গলে বসে প্রিয়তমের চোখ মুখ ভাবতে ভাবতে, আহাঃ, কত বিচিত্র সব মধুর স্মৃতি—শেষে আরও কী সব ভেবে ভেবে উদাস।

    এখান থেকে হিজল গাছটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পথ ধরে যারা গেল তারা সকলেই ইস্তাহারটা ঝুলতে দেখল। যারা পড়তে পারছে, তারা দাঁড়িয়ে ইস্তাহারটা পড়ছে। সামু বেকার, সুতরাং লীগের পাণ্ডা। সামু গাছে গাছে মুসলমান গাঁয়ে গাঁয়ে এই ইস্তাহার ঝুলিয়ে শান্তি পাচ্ছে। মালতীর বড় ভয়ঙ্কর ইচ্ছা ইস্তাহারটা পড়ে দেখে—সামু ইস্তাহারে কী লিখেছে অথবা ধীরে ধীরে গিয়ে সকলের অলক্ষে সন্তর্পণে ছিঁড়ে দেয়। দিলে কেউ টের পাবে না। সামু টের পেলে শুধু বলবে, এডা করলি ক্যান?

    —ক্যান করুম না। দেশটা কেবল তর জাতভাইদের?

    —ক্যান আমার জাতভাইদের হইব। দেশডা তর আমার সকলের।

    —তবে কেবল ইসলাম ইসলাম করস ক্যান?

    —করি আমার জাতভাইরা বড় বেশি গরু-ঘোড়া হইয়া আছে। একবার চোখ তুইল্যা দ্যাখ, চাকরি তগ, জমি তগ, জমিদারী তগ। শিক্ষা দীক্ষা সব হিন্দুদের।

    —হইছে। মনে মনে মালতী ফয়সালা করে ইস্তাহারটার দিকে হাঁটতে থাকল। ইস্তাহারটা ঝুলছে। সামনের দুটো ধানজমি পার হলেই গাছটা। গাছটা নরেন দাসের। যেন এই গাছে ইস্তাহার ঝোলানোর উদ্দেশ্য, মালতীও একবার পড়ে দেখুক—ইসলাম বিপন্ন। এই বিপন্ন সময় থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হবে।

    এখন মাঠ ফাঁকা। ধান গাছ, কলাই গাছ, এমন কি মটরের জমি ফাঁকা। কিছু তামাকের খেত, পেঁয়াজের খেত। সে হেঁটে যাবার জন্য আলে আলে গেল না। সবাই জমি চাষ করে রেখেছে। শুকনো জমি। বড় বড় ডেলা মাটির। জমি ভেঙে সে সোজা হেঁটে গেল। হাঁটুর উপর কাপড় তুলে, দ্রুত গাছটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাটিতে পায়ের ছাপ, এবং আকাশ কতদিন পর নীল স্বচ্ছ। মালতী গাছটার দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় চুল উড়ছে। পাশের জমিতে একদা রসো এবং বুড়ি ডুবে মরেছিল এমন এক স্মৃতির উদয় হতে সে স্বল্প সময়ের জন্য এখানে দাঁড়াল। যেন কোনও এক অশ্রুজল নিরপেক্ষ ভালোবাসার বৃত্ত এই জমিতে দীর্ঘদিন পত্তন করে রেখেছে মানুষেরা।

    সে হাঁটতে থাকল। ইস্তাহারটা এখনও বাতাসে নড়ছে। গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে মালতী ইস্তাহারটা পড়তে পড়তে উত্তেজিত। হক সাহেব নতুন নতুন কথা বলছেন। নাজিমুদ্দিন সাহেবের একটা ছবি ইস্তাহারের এক কোণে। মালতী এ-সময়ে দেখল দূরের সব জমিতে হাল চাষ হচ্ছে। ওরা হাল চাষ করছে এবং গান গাইছে। সামসুদ্দিনের এই বিদ্বেষ মালতীর ভালো লাগল না। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্তর্পণে ইস্তাহারটা গাছ থেকে টেনে তুলে ফেলল। তারপর হনহন করে বাড়িতে উঠে এসে যেখানে হাড়গিলে পাখিটা সেই সকাল থেকে ডাকছে—সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল। স্বামীর মুখ মনে হতেই সে চিৎকার করে বলতে চাইল—আমি ঠিক করছি। সামুরে, তর সর্দারি আমার ভাল লাগে না। তুই তো ভাল মানুষ আছিলি রে।

    হাড়গিলে পাখিটা আবার ডাকতে শুরু করেছে। কুহক্ কুহক্‌ ডাকছে। ঝোপের কোথায় যে শব্দটা উঠছে—কিসের জন্য যে পাখিটা অনবরত ডাকছে মালতী বুঝতে পারল না। শব্দটা মনে হয় বড় দূর থেকে ভেসে আসছে। মোত্রাঘাসের জঙ্গলে জল নেই। জল নেমে গেছে, গাছের গুঁড়িতে হলদে মতো দাগ। সে, ডাকটা কোথায় উঠছে, কেন পাখিটা নিরন্তর ডেকে চলেছে দেখার জন্য বেগুন খেতে বসে ঝোপের ভিতর উঁকি দিল। পাখিটা ডাকছে, অনবরত ডাকছে—নিশ্চয়ই ওর কোনও অসহ্য কষ্ট। সে নানাভাবে উঁকি দিতে থাকল—কখনও বেত পাতা সরিয়ে, কখনও জঙ্গল ফাঁক করে, কখনও মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঝোপে জঙ্গলে পাখিটা কোথায় আছে দেখার জন্য উদগ্রীব হল। সে মোত্রাঘাসের জঙ্গলে ঢুকে গোড়ালি তুলে উঁকি দিল—ওখানে নেই পাখিটা, শব্দটা যেন ঝোপের গহন অবস্থান থেকে আসছে। সে বাড়ি থেকে কোটা এনে ভিতরটা খোঁচা দিয়ে দেখবে এই ভেবে চোখ ফেরাতেই দেখল ভীষণ কালো রঙের একটা পানস সাপ ঠেলে ঠেলে ঘন ঝোপে ঢুকে যাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু নড়তে পারছে না। কেমন লাল ঠিক বেদানার কোয়ার মতো চোখ নিয়ে মালতীকে দেখছে। পাখিটার প্রায় অর্ধেকটা শরীর সাপটার মুখে এবং গলায়। এতবড় পাখিটাকে কি করে গিলছে দ্যাখ! মালতী ভয়ে চিৎকার করে উঠল, বৌদি, দ্যাখেন আইসা কাণ্ড! হাড়গিলা পাখিরে পানস সাপটা কি কইরা গিলতাছে।

    —আল মরা, তরে খাইব। বলে আভারানী ছুটে এসে হাত ধরে টেনে আনল মালতীকে। আর মালতী জমিতে উঠেই দেখল সামু এ দিকেই হনহন করে আসছে। মুখে ওর কার্তিক ঠাকুরের মতো সরু গোঁফ এবং সমস্ত অবয়বে অভিমানের চিহ্ন। সামসুদ্দিন মালতীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। নরেন দাসের বৌ অদূরে ভীত-সন্ত্রস্ত। অথচ দেখল সামু অত্যন্ত বিনীত। ক্ষত-বিক্ষত, এমন স্বর গলায়—বলছে, তুই ইস্তাহারটা ছিঁড়লি ক্যান মালতী?

    —ছিঁড়লাম, হইছেডা কি?

    —তুই জানস না, ঢাকা থাইকা কত কষ্ট কইরা এগুলি আনাইতে হয়। কোন দিন আর ছিঁড়বি না!

    —ছিঁড়ুম, একশবার ছিঁড়ুম, এমন কথা বলার ইচ্ছা হল মালতীর। কিন্তু সামুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারল না। সে এবার কি ভেবে বলল, দ্যাখছস কতবড় হাড়গিলা পাখিটারে সাপটা ধইরা খাইতাছে।

    সামসুদ্দিন তাড়াতাড়ি পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এবং দেখল সাপটা এবার পাখিটাকে প্রায় গিলে এনেছে এবং গিলে ফেলতে পারলেই টেনে টেনে শরীরটা এদিকে নিয়ে আসবে। আর যদি কোনও কারণে সাপের মুখ থেকে পাখি ফসকে যায়—তবে আর নিস্তার নেই। সামু, এবার ধমক দিল, এই ছেরি, ভয়-ডর নাই? যা বাড়ি যা।

    —আরে আমার শাসকরে। মালতী কিঞ্চিৎ দজ্জাল মেয়েমানুষের মতো গলার স্বর করতে চাইল—কিন্তু না পেরে হোহো করে হেসে দিল।

    —হিটকানি থাকব না মালতী। মুখ থাইক্যা আহার ছুইটা গেলে সাপের মাথা ঠিক থাকে না।

    —মানুষের মাথা ঠিক থাকে?

    সামসুদ্দিন কেমন চোখ ছোট করে তাকাল। মালতীকে দেখল। মালতীর শরীরে পুবের দেশ থেকে বন্যা আসার মতো অথবা উজানি নদীর মতো রূপলাবণ্যে ঢল নেমেছে। বিধবা হলে কি যুবতী মাইয়ার শরীর রূপের সাগরে ভাইস্যা যায়! মালতীকে সামু শেষ পর্যন্ত বলল, যা বাড়ি যা। জঙ্গলে আর খাড়াইয়া থাকতে হইব না।

    মালতী নড়ল না। মালতী ফের ঝোপটার ভিতর উঁকি দিল। একটা শুকনো ডালে সাপটা শরীর পেঁচিয়ে রেখেছে। লাল চোখ দুটো বেদানার কোয়ার মতো উজ্জ্বল। ওরা একটু দূরে এসে দাঁড়াল। ওরা এখন কথা বলছে না—পাখিটাকে সাপের গলায় অন্তর্হিত হতে দেখছে। গলাটা ফুলে ফুলে সহসা সরু হয়ে গেল। তারপর সাপটা মৃতের মতো ডালে ঝুলতে থাকল একসময়।

    পরদিন ভোরে মালতী সকালে উঠে হাঁসগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে পুকুরে ফেলল। একটা গাছের গুঁড়িতে বসে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। শরীরে সাদা থান, শরীরের লাবণ্য এই কাপড়ের বিসদৃশ রঙে চাপা পড়ছে না। মালতীর সোনার শরীর—প্রজাপতির মতো মন অথচ রাতে গভীর ঘুমের জন্য এ-সময় গাছের গুঁড়িটার মতো মনটা বড় নির্বোধ। পায়ের পাতা ডুবিয়ে গাছের গুঁড়িতে বসে আছে। হাঁসগুলি জলে নেমেই এখন সাঁতার কাটবে, এবং এক রকমের খেলা—ওরা জলে ভেসে ভেসে অথবা ডুবে ডুবে অনেক নিচে চলে যাচ্ছে এবং ভেসে উঠেই পুরুষ হাঁসটা অন্য হাঁসগুলিকে তাড়া করছে অথবা পুরুষ হাঁসটা ছুটে ছুটে—যেমন তার মানুষ তাকে ছুটে ছুটে ঘরের ভিতর অথবা বাগানের ভিতর এবং রাত গভীর হলে লুকোচুরি খেলা—ছুইছুই খেলা—খেলতে খেলতে যখন আর ছুটতে পারত না তখন মানুষটা তাকে সাপ্টে ধরত এবং পাঁজাকোলা করে নিয়ে যেন কোন এক পাহাড়ে অথবা নদীর পাড়ে চলে যেতে চাইত—কী যে সুখ সুখ খেলা-হাঁসগুলি এখন তেমনি সুখ সুখ খেলা খেলছে। মালতীর পা ক্রমে স্থির হয়ে আসছে—শরীর শক্ত হয়ে আসছে। সুন্দর পা ওর জলের নিচে মাছরাঙার মতো ক্রমে ডুবে যাচ্ছিল। কেবল থেকে থেকে রঞ্জিতের কথা মনে পড়ছে। সে তখন বালক ছিল। ঠাকুরবাড়ির বড়বৌর ছোট ভাই। সে এখন কোথায় আছে কে জানে! শুনেছে সে এখন নিরুদ্দেশ। কেউ তার খোঁজ রাখে না।

    পুকুরের ও-পাশের ঝোপটায় একটা বড় মাছ নড়ে উঠল। কৈশোরে মালতী মাছ ধরত—যখন বর্ষাকাল, যখন গয়না নৌকায় বাদাম উড়ত, ঝোপেজঙ্গলে টুনি ফুল ফুটে থাকত, তখন এই ঘাটে কত যে চেলা মাছ, ডারকীনা মাছ এবং শাড়ি-পরা পুঁটি মাছ—মালতী সরু ছিপ দিয়ে বর্ষাকালে শাড়ি-পরা পুঁটি মাছ ধরত। একদিন নির্জন বিকেলে রঞ্জিত পাশে দাঁড়িয়ে মাছ ধরতে ধরতে ফিসফিস করে বলেছিল—যাবি? যাবি মালতী?

    মালতী জানত রঞ্জিত এই কথায় কী বলতে চায়। সে অবুঝের মতো চোখে মুখে এক বোকা ভাব ছড়িয়ে রাখত। রঞ্জিত আর বলতে সাহস পেত না।

    মালতী গাছের গুঁড়িতে বসে থাকল। উঠতে ইচ্ছা করছে না। পুকুরের জল নিচে নেমে গেছে। সুতরাং গাছের গুঁড়িটাকেও গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে নামানো হয়েছে। গাছের গুঁড়িটা ছিল সিঁড়ির মতো—সেই কবে গুঁড়িটা এখানে ছিল। রসো, রঞ্জিত, সামু বর্ষায় গুঁড়ি থেকে জলে লাফ দিয়ে পড়ত, ডুবত, ভাসত অথবা সাঁতার কেটে বর্ষার জলে ঝোপে জঙ্গলে লুকিয়ে মালতীকে ভয় দেখাত। রাতের কিছু কিছু স্বপ্ন, পুকুরের জল, হাঁসগুলির সুখী জীবন, সামনের মাঠ এবং যব-গমের খেত, কিছু কৃষকের এক সুরে ফসল কাটার গান সব মিলে মালতীকে কেমন আচ্ছন্ন করে রাখছে। রাতের কিছু স্বপ্ন অস্পষ্ট ‘স্মৃতির মতো—প্রিয়তমের মুখ গন্ধপাদালের ঝোপ থেকে যেন উঁকি মারছে। প্রকৃতির নীরবতা এবং ভোরের এই মাধুর্য মালতীকে ক্লিষ্ট করছে—হিজল গাছে সামু ইস্তাহার ঝোলাল—দেশটা দিন দিন কি যে হয়ে যাচ্ছে! মালতী এবার পুকুর থেকে হাতমুখ ধুয়ে উঠে এল। প্রিয়তমের মুখ স্মৃতির অতল থেকে তুলে এনে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করতে গিয়ে দেখল চোখে জল মালতীর।

    নরেন দাস ফিরছে পশ্চিমপাড়া থেকে। ওর হাতে গলদা চিংড়ি। সে দেখল, মালতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন নিবিষ্ট মনে হাঁসগুলির সাঁতারকাটা দেখছে। কেমন অন্যমনস্ক মালতী। নরেন দাস ইচ্ছে করেই গলায় এক রকমের উপস্থিতির শব্দ করল এবং যখন দেখল সংকোচে মালতী এতটুকু হয়ে গেছে—কি যেন তার ধরা পড়ে গেছে ভাব—এই যে খেলা, হাঁসের খেলা—খেলা তার ইহজীবনে আর বুঝি হবে না—সব শেষ। কেমন সে বিহ্বলভাবে তাকাল। নরেন দাসও কেমন সরল বালকের মতো, যেন কিছু বুঝতে পারেনি এমন এক চোখ নিয়ে তাকল। বলল, দ্যাখ দ্যাখ, কতবড় ইছা মাছ ধইরা আনলাম। মাছগুলি ভাতে সিদ্ধ দেইস। কিন্তু তখনই মনে হল, দাসের বোন মালতী বিধবা। সে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস চেপে বাড়িতে উঠে গেল।

    মালতী দাদার সঙ্গে পুকুরপাড় থেকে উঠে যাবার সময় বলল, দাদারে, সামু হিজল গাছটাতে ইস্তাহার ঝোলায়, অরে বারণ কইরা দেইস।

    —বারণ কইরা দিলে অন্যখানে ঝোলাইব।

    মালতী বুঝল প্রতিবাদে নরেন দাস যথার্থই অক্ষম। সুতরাং মাসখানেক পর সামসুদ্দিন যখন ফের ইস্তাহার ঝোলাতে এল, মালতী মাঠ পার হয়ে নেমে গেল। বলল, ইস্তাহার ঝুলাইবি না।

    —ক্যান?

    —গাছটা আমার দাদার।

    —তা হয়েছে কি!

    —তর গাছ থাকলে সেখানে ঝুলইয়া দে।

    —আমার গাছ এডা। তুই যা করতে পারিস করবি।

    —বড় বড় কথা কইবি না সামু। অদিনের পোলা, অখনই মাতব্বর হইয়া গেছস! নাকে তর দুধের গন্ধ আছে।

    —তর নাকে কিসের গন্ধ ল ছেরি। বলে ইস্তাহরাটাকে গাছে উঠে অনেক উপরে ঝুলিয়ে দিল।—নে পাড়। কত তর ক্ষ্যামতা দেখি।

    —আইচ্ছা! মালতী হনহন করে বাড়ি উঠে গেল। গাব গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল।

    সামু মালতীর এই রাগ দেখে মনে মনে হাসল। মালতী আগের মতেই জেদী একগুঁয়ে মালতী। কিন্তু মনের ভিতর কী এক শপথ সব সময় কাজ করছে। গাঁয়ে উঠে যাবার সময় ওর চোখমুখ দৃঢ় দেখাল। অথচ গাঁয়ের সবুজ বন ঝোপ দেখে মনটা আর্দ্র হয়ে উঠেছে। মালতীর শস্যদানার মতো রঙ শরীরের—তাছাড়া শৈশবের কিছু কিছু প্রীতিপূর্ণ ঘটনা, স্বামীর সাম্প্রদায়িক মৃত্যু এবং বৈধব্য বেশ, সব মিলে মনে এক অপার বেদনা সঞ্চার করছে সামুর। এই উগ্র জাতীয়তাবোধ ওর ভাল লাগল না। সে ছুটতে থাকল। সে আর হিজল গাছে ইস্তাহার ঝোলাবে না, অন্য কোনখানে গিয়ে ইস্তাহারটা টাঙিয়ে দেবে। সে ছুটে মাঠে নেমে দেখল, হিজল গাছের নিচে মালতী—একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে—মনে হয় ওর সেই বাঁশটা, যা দিয়ে বেতের ডগা কেটে দিয়েছিল—মালতী টেনে ইস্তাহারটা নামাচ্ছে। কেমন পায়ের রক্ত সব সামুর মাথায় উঠে এল। উত্তেজনায় অধীর সামু স্থির থাকতে পারল না। কাছে এসে রুষ্ট মুখে দাঁড়াতেই মালতী হেসে দিল।—কি দ্যাখলি, পাড়তে পারি কিনা!

    মালতীর এই উচ্ছ্বলতাকে অপমান করার স্পৃহা সামুর। এই প্রবঞ্চনামূলক ঘটনাতে সে নিজের দুর্বলতাকে দায়ী করে অত্যন্ত দৃঢ় এবং রুক্ষ কণ্ঠে বলল, তুই না বিধবা হইছস মালতী। এই হাসি ত তর মুখে ভাল লাগে না।

    —সামু…রে! মালতী, ইস্তাহারসহ ঢলে পড়ার মতো গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ল। এক শিশুসুলভ কান্নায় ভেঙে পড়ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বিধবা মানুষের হাসতে নেই। মালতী বিধবা, সামু বার বার কথাটা যেন মনে করিয়ে দিল। সামু মালতীর এমন চোখমুখ সহ্য করতে না পেরে গাঁয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। মালতী ক্রমে শান্ত হয়ে এল। পায়ের কাছে ইস্তাহার। মাঠ ফাঁকা। সে এবার মুখ তুলে দেখল সামু নেই—দূরে সে গ্রামের দিকে উঠে যাচ্ছে। কিছু মেলার গরু যাচ্ছে! গলায় ওদের ঘণ্টা বাজছে। কিছু লটকন গাছ, এখন বসন্তকাল বলে গাছে কোনও ফল নেই। নানারকম পাখি উড়ে এসেছে এ দেশটায়। বিলের জল কমে গেছে, সেই বড় বিলে, বাবুদের হাতি আসার কথা, কারণ এ-সময়ে বিলের জলে নানারকমের হাঁস উড়ে আসবে। ওর মনে হল, অনেক দিন ধরে সে সেই হাতি, মুড়াপাড়ার হাতির গলায় ঘণ্টা বাজতে শুনছে না। এই হাতি দেখলে সে সাহস পায়।

    তারপর এ অঞ্চলের ঘাস ফুল পাখি চৈত্রের গরম বাতাস সহ্য করে কাল-বৈশাখীর অপেক্ষাতে থাকল। এখন মাঠ খাঁ খাঁ করছে। আকাশ কাঁসার বাসনের মতো রঙে ধূসর হয়ে আছে। কিছু পাখপাখালি আকাশে উড়লে মনে হয় খড়কুটো উড়ছে। যেন এই মাঠ এবং নদী আর তরমুজ খেত সব পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। সূর্যের রঙ কমলার খোসার মতো। পলাশ গাছ নেড়া নেড়া। শিমুল গাছে নতুন পাতা এসেছে। ধানের খেত, কলাইর খেত সব এখন চাষবাসের উপযোগী। এ সময়ে চাষ দিয়ে রাখলে ফলন ভালো হবে, আগাছা জন্মাবে না। ঠাকুরবাড়ির ছোট ঠাকুর জমিতে হালচাষ কেমন হচ্ছে দেখে ফিরছেন। মালতী, ঠাকুরবাড়ির ধনকর্তার ছোট ছেলে সোনাকে কোলে নিয়ে আ আ করে তু তা করে, কি আমার সোনারে ধনরে বলে, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বিকেলের হাওয়া খাচ্ছিল। মাঝিবাড়ির শ্রীশ চন্দ দন্দির হাটে যাবে, নরেন দাসকে এক বাণ্ডিল সূতা কিনে দেবে—সেসব জেনে যাবার জন্য এদিকে হেঁটে আসছে। মালতীকে দেখে বলল, তর দাদায় কই। মালতী বলল, দাদায় তানা হাঁটতাছে। আপনের শরীর ভাল ত কাকা?

    জবাবে শ্রীশ চন্দ বলল, এই আছে একরকম। হাটের সুখ এখন নাই ল মা। পরাপরদীর বাজারে সব মুসলমানরা এককাট্টা। অরা ঠিক করছে হিন্দুগ দোকান থাইকা আর কিছু কিনব না

    —কি যে হইল দেশটাতে! মালতী একটা পলাশ গাছ দেখতে দেখতে এমন ভাবল। সোনা ওর বুকে লেপ্টে আছে। ঘুমাবে বোধ হয়। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে সর্বত্র। শরীর ঠাণ্ডা হচ্ছে। শরীর এবং মন দুই-ই হালকা বোধ হচ্ছে। সামু ঢাকা গেছে। এ-পাড়াতে সামু অনেকদিন আসছে না। হয়তো অনুশোচনার জন্য আসছে না। এমন যখন ভাবছিল মালতী তখনই দেখল একজন মিঞা মাতব্বর গোছের মানুষ হিজল গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। লম্বা একটা ইস্তাহার গাছে ঝুলিয়ে দিল।

    মিঞার পরনে তফন, গায়ে জোব্বা এবং গালে দাড়ি। মালতী বাড়ির শেষ সীমানা পর্যন্ত এল অথচ মাঠে নেমে যেতে সাহস পেল না। ইস্তাহারটা ঝুলিয়ে মানুষটি নিজের গাঁয়ে উঠে গেল না। কে এই মানুষ! মালতী দূর থেকে কিছুতেই চিনতে পারল না। ইস্তাহারটি এখন গাছের উপর নিশানের মতো উড়ছে। মানুষটা মালতীদের বাড়ির দিকে উঠে আসছে। নরেন দাসের ভিতর বাড়ির রাস্তা ধরে উঠে আসছে। মালতী ভাবল, দাদাকে ডাকবে। বলবে, দ্যাখছস দাদা, একটা মিঞা মানুষ বাড়িতে উইঠা আইতাছে। কিন্তু কাছে আসতেই—ওমা! একি তাজ্জব! সামু ওর কার্তিক ঠাকুরের মতো গোঁফ চেঁচে ফেলে গোটা গালে মৌলবী-সাবের মতো দাড়ি রেখেছে। মালতী সহসা কোনও কথা বলতে পারল না। সামুকে আর সামু বলে চেনা যাচ্ছে না। সে যেন কেমন ওর কাছে একেবারে অপরিচিত মানুষ হয়ে গেছে। সামু পর্যন্ত মালতীকে চিনছে না এমন ভাব চোখেমুখে। সে সোজা উঠে আসছিল, কথা বলছিল না; চোখমুখ শান্ত। সে কেমন বুক ফুলিয়ে হেঁটে গেল। মালতী এবার রাগে দুঃখে চিৎকার করে উঠল, দাদারে দেইখ্যা যা—কোনখানকার এক মিঞা বাড়ির ভিতর দিয়া যাইতাছে।

    নরেন দাস দূরে তানা হাঁটছিল। সে দূর থেকে কে মানুষটা চিনতে পারল না। সে ফ্রেমটা মাটিতে রেখে গাবগাছটার নিচে তাকাতেই দেখল, যথার্থই একজন মিঞা মানুষ মোত্রাঘাসের জঙ্গল পার হয়ে বাড়ির দিকে উঠে আসছে। সে চিৎকার করে ডাকল, অঃ মিঞা, ঠ্যাং ভাইঙা দিমু। পথ দেইখা হাঁটতে পার না। সদর অন্দর নাই তোমার!

    আর মালতী গাবগাছটার গুঁড়িতে দাঁড়িয়ে হা হা করে হেসে উঠল। মালতী প্রতিশোধের ভঙ্গিতে গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারা মুখে মনে প্রতিশোধের স্পৃহা। সোনা সেই হাসি শুনে কেমন চমকে গেল ঘুমের ভিতর। সে কোলের ভিতর ধড়ফড় করে জেগে উঠল। সোনা এখন কাঁদছে। এবং কয়েক মাস আগে এই জঙ্গলে একটা পানস সাপ একটা হাড়গিলে পাখিকে গিলে অনেকক্ষণ শুকনো ডালে মৃতের মতো পড়েছিল। এইসব দৃশ্য মনে হওয়ায় মালতীর আকাশ দেখার ইচ্ছা হল—নিচে এই মাঠ, ধরণীর সুখ-দুঃখ, মৃত পলাশের ডাল আর কোলে ধনকর্তার ছোট ছেলে সোনা সব মিলে মালতীকে কেমন অসহায় করে তুলছে। সামসুদ্দিন ততক্ষণে সদর রাস্তায় উঠে গেছে। সে একবার ফিরে পর্যন্ত তাকাল না। মালতীর মনে হল অনেকদিন পর বড় মাঠ পার হতে গিয়ে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে।

    .

    এভাবে এ-দেশে বর্ষাকাল এসে গেল। বর্ষাকাল এলেই যত জমি-জায়গা খাল-বিল সব জলে ডুবে যায়। শুধু গ্রামগুলো দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে। বর্ষাকাল এলেই গ্রাম থেকে বড় বড় নৌকা যায় উজানে। খাল-বিল-মাঠে বড় বড় মাছ উঠে আসে। ধানখেতে কোড়া পাখি ডিম পাড়ার জন্য বাসা বানায়; আত্মীয় কুটুম যা কিছু এ অঞ্চলের, এ-সময় বাড়ি বাড়ি আসতে থাকে। শাপলা শালুক ফুটে থাকে জলে। জলপিপি শালুক ফুলের উপর সন্তর্পণে এক পা তুলে শিকারের আশায় জলের দিকে চেয়ে থাকে।

    বর্ষাকাল এলেই বুড়োকর্তা মহেন্দ্রনাথ ঘরে আর বসে থাকতে পারেন না। তিনি ধীরে ধীরে বৈঠকখানার বারান্দায় এসে বসেন। একটা হরিণের চামড়ার উপর বসে বিকেলবেলাটা কাটিয়ে দেন। বয়স তাঁর আশির উপর। চোখে আজকাল আর একেবারেই দেখতে পান না। তবু বাড়ির উঠোনে, শেফালী গাছে এবং বাগানে যে সব নানারকম গাছ আছে, কোথায় কোন গাছ আছে, কি ফুল ফুটে আছে তিনি এখানে এসে বসলেই তা টের পান। তিনি এখনে বসলেই ধনবৌ সোনাকে রেখে যায় পাশে। একটা মাদুরের উপর সোনা হাত পা নেড়ে খেলে। মহেন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে কথা বলেন। ওর কোমরে রুপোর টায়রা, হাতে সোনার বালা, এই ছেলে হেসে হেসে বৃদ্ধকে নানা বয়সের ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি এই অতি পরিচিত বিকেলের গন্ধ নিতে নিতে সোনার সঙ্গে বিগত দিনের গল্প করেন—প্রায় যেন সমবয়সী মানুষ, একে অপরের অসহায় অবস্থা বোঝে। সোনা অ…আ…ত-ত করে আর বুড়ো মানুষটা তখন যেন দেখতে পান, পাট কাঠির আঁটি উঠোনের উপর দাঁড় করানো। উঠোন পার হলে দক্ষিণের ঘর। তার দরজা। ফড়িঙেরা নিশ্চয়ই এ বাদলা দিনে উড়ছে। এটা শরৎকাল। শরৎকাল এলেই ভূপেন্দ্রনাথ নৌকা পাঠাবে মুড়াপাড়া থেকে। অষ্টমীর দিন সে মহাপ্রসাদের আস্ত একটা কাটা পাঁঠার ছাল ছাড়ানো ধড় নিয়ে আসবে।

    তখন বড়বৌ এদিকে এল। হাতে গরম দুধ। শ্বশুরের সামনে দুধের বাটি রেখে পায়ের কাছে বসল। সামনে পুকুর। আম-জাম গাছের ছায়া। তারপর মাঠ। বর্ষাকাল বলে শুধু জল আর জল। যেখানে পাটের জমি—পাট কাটা হয়ে গেছে বলে সমুদ্রের মতো অথবা বড় বিলের মতো, যেন সেই এক বিল — রূপকথার রাজকন্যা জলে ভেসে যায়। বড়বৌ নদী মাঠ এবং জল দেখলে এইসব মনে করতে পারে। বড় বিলের কথা মনে হয়।—বিয়ের দিন বড় নৌকা করে সে এ-অঞ্চলে এসেছিল। এত বড় বিলে পড়ে বড়বৌর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল, কারা যেন এ-বিলের কথা বলতে বলতে যায়—কিংবদন্তীর পাঁচালীর মতো বলতে বলতে যায়—এক সোনার নৌকা রূপোর বৈঠা এ-বিলের তলায় ডুবে আছে। রাজকন্যার নাম সোনাই বিবি। বড়বৌ মেঘলা আকাশ দেখতে দেখতে সেই প্রথম দিন স্বামীর মুখে বিলের গল্প মনে করতে পেরে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। স্বামীর মাথার ভিতর কি গণ্ডগোলের পোকা তখনই ঢুকে গেছিল। নতুবা বাদলা দিনে হাটুরে মানুষের মতো এমন গল্প বলবেন কেন!

    বড়বৌ সোনার মুখের আদলটা দেখল ভাল করে। দেখতে দেখতে মনে হল এই মুখ ধনকর্তার মতো নয়, ধনবৌর মতো নয়। এ-মুখ বাড়ির পাগল মানুষটার মতো। বড়বৌ কলকাতায় বড় হয়েছে, কিছুকাল কনভেন্টে পড়েছে। পাগল ঠাকুরকে তার এখন আর পাগল বলে মনে হয় না। যেন সে তার কাছে এখন প্রায় মোজেসের মতো অথবা কোন গ্রীক পুরাণের বীর নায়ক—যুদ্ধক্ষেত্রে হেরে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে। বড়বৌ বলল, সোনার মুখ আপনার বড়ছেলের মতো হবে বাবা।

    মহেন্দ্রনাথ একটু হাসলেন! তারপর কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেলেন। বললেন—মণির সাড়াশব্দ পাইতাছি না।

    —পুকুরপাড়ে বসে আছে।

    মহেন্দ্রনাথ অনেকদিন থেকেই একটা কথা বলবেন বলে ভাবছিলেন। বড়বৌকে কিছু বলার ইচ্ছা ছিল। যেন বড়বৌর বাপের বাড়ির দিকের মানুষের একটা ধারণা–হয়তো মনে মনে বড়বৌ নিজেও সেটা বিশ্বাস করে, কিন্তু আমি তো জীবনে মিছা কথা কই নাই, তঞ্চকতা করি নাই। আমি এই বয়সে তোমারে একটা কথা কই—বিশ্বাস কর, না কর, কই! এমন ভেবে বললেন, বড়বৌমা, আমার ত সময় ফুরাইছে। তোমারে একটা কথা কমু ভাবছিলাম বৌমা।

    বড়বৌ সামান্য হাসল। বলল, বলুন না।

    —জান বৌমা, মণি যখন ছুটি নিয়া বাড়ি আসত আমি গর্বে বুক ফুলাইয়া থাকতাম। এ-তল্লাটে এমন উপযুক্ত পোলা আর কার আছে কও। সুতরাং আমি তোমার বাবারে কথা দিলাম। মাইনসে কয় আমার পোলা পাগল হইছে আমি নাকি বিয়ার আগেই জানতাম।

    বড়বৌ কোনও জবাব দিল না। সে বুড়ো মানুষটার পাশে সোনাকে কোলে নিয়ে বসে থাকল।

    —বোঝলা বৌমা, মণি যে-বারে এন্ট্রাস পরীক্ষায় জলপানি পাইয়া প্রথম হইল—সব্বাইরে কইলাম নারায়ণ আমার মুখ রাখছে। আর বিয়ার পরই যখন পাগল হইল তখন কইলাম নারায়ণ আমার তামাশা দেখছে। তিনি যেন এ-সময় কি খুঁজতে থাকলেন হাত বাড়িয়ে।

    চক্ষু স্থির, ঘোলা ঘোলা চোখ। চুল এত সাদা, গালের দাড়ি এত সাদা যে মানুষটাকে সান্তাক্লজের মতো মনে হয়। চামড়া শিথিল। বড়বৌ বলল, আপনার লাঠিটা দেব?

    —না বৌমা, তোমার হাতটা দ্যাও।

    বড়বৌ হাতটা বাড়িয়ে দিলে বৃদ্ধ সেই দু’হাত চেপে ধরে বললেন, বৌমা তুমি অন্তত বিশ্বাস কইর মণি তোমার বিয়ার আগে পাগল হয় নাই। জাইনা শুইনা আমি পাগলের সঙ্গে তোমারে ঘর করতে আনি নাই। বলে বৃদ্ধ একেবারে চুপ মেরে গেলেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখের রেখাতে এতটুকু ভাঁজ নেই। এক ভাবলেশহীন মুখ, মুখে কোনও আর ইচ্ছার রেখা ফুটে নেই, শুধু উদাস আর উদাস। মহাকালের যাত্রী হবার জন্য যেন পৃথিবীর এক পান্থশালায় জলছত্র খুলে বসে আছেন, সারাজীবন ধরে সকলকে জল দিয়েছেন, অবশেষে সেই জলের তলানিটুকু দিয়ে হাতমুখ প্রক্ষালন করে দূরের তীর্থযাত্রী হবার জন্য উন্মুখ। বৃদ্ধ অনেক দূর থেকে যেন কথা বলছেন, মণির মার কথা শুনলে বুঝি এমন হইত না। দ্যাখ বড়বৌ, আমি বাড়ির কর্তা, মণি আমার বড় পোলা—সে কিনা ভাব কইরা ম্লেচ্ছ মাইয়া বিয়া করব—ঠিক না বৌমা! এইটা ঠিক কথা না।

    বড়বৌ এ-সব কথা শুনলে আর স্থির থাকতে পারে না। চোখ ভার হয়ে আসে। সোনার টুকরো ছেলে ভালবেসে পাগল। কথা বললেই যেন এখন দরদর করে চোখে জল চলে আসবে। সে অন্য কথা বলল, চলুন বাবা, আপনাকে ঘরে দিয়ে আসি।

    —আমি আর একটু বসি বৌমা। বসলে মনটা ভাল থাকে। বারান্দায় বইসা থাকলে বর্ষার শাপলা শালুকের গন্ধ পাই। মনে হয় তখন ঈশ্বরের খুব কাছাকাছি আছি। তোমার মায় কই?

    —মা গেছেন পদ্মপুরাণ শুনতে। আপনার পদ্মপুরাণ শুনতে ইচ্ছে হয় না বাবা?

    —পদ্মপুরাণ ত আমি নিজেই। মাগো—সারাজীবন আমি চাঁদ সদাগরের পাঠ করছি, তুই বেহুলার। বৃদ্ধ টেনে টেনে বললেন, যেন এই বয়সে কেবল বর দেওয়া যায়—এখন এমন এক বয়স আর এমন এক মানুষ তিনি—সংসারে, এ-মানুষ প্রায় ঈশ্বরের শামিল যেন—তিনি টেনে টেনে যেন অনেক দূর থেকে বলছেন—বৌমা, তুমি আমার সতী সাবিত্রী। শাঁখা সিঁদুর অক্ষয় হউক মা তর।

    .

    গভীর রাতে বড়বৌ ঘুমে আচ্ছন্ন! একটা আলো ঘরে নিবু নিবু হয়ে জ্বলছে। জানালা খোলা। বর্ষার জলজ বাতাস ঘরে ঢুকে বড়বৌর বসনভূষণ আলগা করে দিচ্ছে। বড়বৌ হাত দুটো বুকের উপর প্রায় প্রার্থনার ভঙ্গিতে রেখেছে। দেখলে মনে হবে, সে ঘুমের ভিতরও তার মানুষের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্ৰাৰ্থনা করছে। তখন মণীন্দ্রনাথ ঘরে পায়চারি করছিলেন। ওঁর চোখে ঘুম নেই। তিনি দরজা খুলে ফেললেন সহসা। নদীর ওপারে তিনি কাকে যেন ফেলে এসেছেন মনে হল।

    আকাশে এখনও কিছু কিছু নক্ষত্র জেগে আছে। ঠাকুরঘরের পাশেই সেই শেফালি গাছ, ফুলেরা ঝরছে, ঝরে আছে, এবং কিছু কিছু বোঁটায় সংলগ্ন। ওরা ভোরের জন্য অথবা রোদের জন্য প্রতীক্ষা করছে। মণীন্দ্রনাথ দুই হাতে গাছের নিচ থেকে কিছু ফুল সংগ্রহ করে বোঁটার হলুদ রঙ হাতে মাখলেন। রাত নিঃশেষ হয়ে আসছে। তিনি কি ভেবে এবার বাঁশঝাড়ের নিচে এসে দাঁড়ালেন। সামনে ঘাট–বর্ষার জল উঠোনে উঠে আসবে বুঝি, তিনি ছোট কোষা নৌকায় উঠে লগিতে ভর দিতেই নৌকাটা জলে নেমে গেল—কিছু গ্রাম মাঠ ঘুরে সেই নদীর পাড়ে চলে যাবেন—যেখানে তাঁর অন্য ভুবন নিঃসঙ্গ নির্জন নদীতীরে খেলা করে বেড়াচ্ছে।

    মাথার ভিতর এক অ-দৃষ্ট যন্ত্রণা মণীন্দ্রাথকে সর্বদা নিরুপায় করে রাখে। মণীন্দ্রনাথ কেবল নির্জনতা চান।

    কোষা নৌকা ক্রমশ গ্রাম মাঠ এবং ধানখেত অতিক্রম করে বিশাল বিলের জলে অদৃশ্য হচ্ছে। চারিদিকের গ্রামগুলি খুব ছোট মনে হচ্ছে। আকাশের সঙ্গে সব গ্রামগুলি যেন ছবির মতো হয়ে ফুটে আছে। কোনও শব্দ নেই—ভয়ানক নির্জন নিঃসঙ্গ প্রান্তর। দূরে সোনালী বালির নদীর রেখা অল্পে অল্পে দৃশ্যমান হচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ পদ্মাসন করে বসে থাকলেন—সাধুপুরুষের মতো ভাব চোখে-মুখে। বিলের জমিতে গভীর জল—এক লগির চেয়ে বেশি হবে। মণীন্দ্রনাথ চুপচাপ বসে এই জলের ভিতর পলিনের মুখ যেন দেখতে পাচ্ছেন। পলিন কি করে যেন তার নদীর জলে হারিয়ে গেল। নদীর পাড়ে খেলা ছিল, কত খেলা! হায়, তখন কেবল সেই দূর্গের কথা মনে হয়! বড় মাঠ, মাঠের পাশে দূর্গ, দূর্গে কেবল থেকে থেকে জালালি কবুতর উড়ত। মণীন্দ্রনাথ এবার মুক্ত কণ্ঠে পরমপুরুষের মতো কবিতা আবৃত্তি করতে থাকলেন। কবিতার অবয়বে সেই এক স্মরণচিহ্ন—কীটস নামে এক কবি ছিলেন—তিনি বেঁচে নেই। পলিন মণীন্দ্রনাথের মুখে কবিতার আবৃত্তি শুনতে শুনতে এক সময় দূর্গের গম্বুজের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যেত।

    কিছু হিজল গাছ অতিক্রম করলে নন্দীদের ঘাট। ঘাট পার হলে মুসলমান গাঁ। অনেকদিন পর যেন তিনি ঘাটে নৌকা বাঁধলেন। সর্বত্র গ্রামের ঘাটে ঘাটে পাট পচানো হয়েছে—পচা গন্ধ উঠছে, ইতস্তত কচুরিপানার ঝাঁক-নীল সাদা রঙের কচুরি ফুল এবং পাতিহাঁস ঘাটে নড়ছে। ঘাটে ঘাটে কুমড়োর মাচান, মাচানের নিচে কুমড়োলতা নেমে গেছে। তিনি সব কিছু দেখে শুনে সতর্ক পা ফেলে উপরে উঠে গেলেন। এক তকতকে উঠোনে উঠে যেতেই ধান গোলার ফাঁক থেকে হামিদ বের হয়ে এল। বলল—সব বলাই অবশ্য নিরর্থক, তবু এত বড় মানুষটা, মানুষটার আর বয়স কত, সেই যে, যবে একবার হামিদ, হাসান পীরের দরগাতে এই মানুষকে বসে থাকতে দেখেছিল—মানুষটা যেন চোখের ওপর শৈশব পার করে যৌবনে পা দিয়েছে, যৌবন থেকে কিছুতেই নড়ছে না, শক্ত বাঁধুনি, শরীরের গঠন একেবারে আস্ত একটা দ্রুতগামী অশ্বের মতো—সে বলল, আমাগ কথা এতদিনে মনে হইল বড়ভাই!

    মণীন্দ্রনাথ বড় বড় চোখে হামিদকে দেখলেন। একটু হাসলেন।

    হামিদ বলল, একটু বইসা যান বড়ভাই।

    মণীন্দ্রনাথ ওর উঠোনে উঠে গেলে হামিদ একটা জলচৌকি দিল বসতে।—বসেন বড়ভাই। সে সকলকে ডেকে বলল, কে কোন খানে আছ দ্যাখ আইসা, বড়ভাই আইছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে হামিদের মা এল, হামিদের দুই বিবি এসে হাজির হল। বেটা, বিবিরা সকলে। এবং গ্রামে যেন বার্তা রটি গেল—সকলে এসে ঘিরে দাঁড়াল মণীন্দ্রনাথকে। সকলে আদাব দিল। মণীন্দ্রনাথ কোনও কথা বলছেন না, যতক্ষণ না বলেন ততক্ষণই ভালো। একসময় হামিদ ভিড়টাকে সরে যেতে বলল। মণীন্দ্রনাথ সকলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন। হামিদ তখন তার ছোট বিবিকে বলল, বড়ভাইয়ের নৌকায় একটা কুমড়া তুইলা দিঅ। যেন গাছের যা কিছু ভালো, নতুন যা কিছু, এই মানুষকে না দিয়ে খেতে নেই।

    গ্রামের উপর দিয়ে এক সময় হাঁটতে থাকলেন মণীন্দ্রনাথ। পিছনে গাঁয়ের ছোট বড় উলঙ্গ শিশুরা এবং বালক বালিকারা আখ খেতে খেতে মণীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করছে। তিনি ওদের কিছু বলছেন না। ছোট-বড় গর্ত, বাঁশঝাড় এবং কর্দমময় পিচ্ছিল পথ অতিক্রম করে তিনি হাজি সাহেবের বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধ হাজি সাহেব হুঁকোর নলে মুখ রেখে কোলাহল শুনে ধরতে পারলেন, পাগল ঠাকুর আজ এ-গাঁয়ে অনেকদিন পর উঠে এসেছে। হাজি সাহেব হুঁকো ফেলে ছুটে এলেন। বললেন, ঠাকুর বইসা যাও। এদিকে আর আস না। হাজি সাহেব জানেন, এইসব কথা পাগল ঠাকুরের সঙ্গে নিরর্থক তবু এত বড় মানী ঘরের ছেলে–কোনও কথা বলবেন না তিনি—পাগল ঠাকুর এই পথ ধরে চলে যাবে—কেমন যেন ঠেকছে।

    মণীন্দ্রনাথ এখানে বসলেন না। কয়েকবার চোখ তুলে হাজি সাহেবকে দেখলেন তারপর সেই এক উচ্চারণ—গ্যাৎচোরেৎশালা।

    হাজি সাহেব হাসলেন এবং চাকরকে ডেকে বললেন, পাগল ঠাকুরের নৌকায় দুই ফালা সবরীকলা রাইখা আসবি। হাজি সাহেব মণীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে যেন বলতে চাইলেন–ঠাকুর, কলাগুলি নিয়া যাও, পাকলে খাইয়। গাছের কলা—তোমারে না দিয়া খাইলে মনটা খুঁতখুঁত করবে। তারপর হাজি সাহেব আল্লার কাছে যেন নালিশের ভঙ্গিতে বলতে থাকলেন, বুড়া কর্তার কপালে এই আছিল খোদা!

    বর্ষাকাল। ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছিল বলে পথ ভয়ানক কর্দমাক্ত। কোথাও হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে—সুতরাং মণীন্দ্রনাথের কষ্ট হচ্ছিল হাঁটতে। পথের দু’পাশে আবর্জনা, মলমূত্রের দুর্গন্ধ। মণীন্দ্রনাথ এ-সবের কিছুই টের করতে পারছেন না। গ্রামের মুসলমান বিবিরা পাগল ঠাকুরকে দেখে পলকে ঘরে নিজেদের আড়াল করে দিচ্ছে। ওরা বড় নিঃস্ব। সুতরাং শরীরে পর্যাপ্ত আবরণ নেই। পুরুষেরা এখন প্রায় সকলেই মাঠে অথবা অন্যত্র পাট কাটতে গেছে। ওরা বিকেলে ফিরবে। মণীন্দ্রনাথ গ্রামটাকে চক্কর মেরে ফের ঘাটে এসে বসলেন নৌকায়। তারপর উদ্যোগী পুরুষের মতো সংগৃহীত বস্তুসকলকে একপাশে সাজিয়ে রেখে নৌকা বাইতে থাকলেন বর্ষার জলে। ঘাটে উলঙ্গ শিশুরা, বালক-বালিকারা পাগল ঠাকুরকে নেচে গেয়ে বিদায় জানাল। আর এ-সময়ই তিনি মনে করতে পারলেন বড়বৌ অপেক্ষা করতে থাকবে এবং বড়বৌর জন্য মনটা কেমন করে উঠছে। বড়বৌর সেই গভীর চোখ মণীন্দ্রনাথকে বাড়িমুখো করে তুলল। অথচ বিলের ভিতর পড়েই মণীন্দ্রনাথের বাড়ি ফেরার স্পৃহা উবে গেল। তিনি বিলের ভিতর চুপচাপ বসে থাকলেন। কতক্ষণ এভাবে বসে থাকলেন, কতক্ষণ তিনি সকালের সূর্য দেখলেন, বিশ্বাসপাড়া, নয়াপাড়ার উপর একদল কাকের উপদ্রব এবং ধানখেতে ঢুব ঢুব শব্দ কতক্ষণ তাঁকে অন্যমনস্ক করে রেখেছিল তিনি জানেন না। তিনি জলে নেমে গেলেন এবং স্বচ্ছ জলে সাঁতরাতে থাকলেন, শরীরের সর্বত্র গরম—এতবার ডুব দিয়েও তাঁর শরীরের ভিতরে যে কষ্ট, কষ্টটাকে দূর করতে পারছেন না। এই নির্জন বিলে এসে চুপচাপ বসে থেকে তিনি কতবার ভেবেছেন অপরিচিত সব শব্দ অথবা অশ্লীল উচ্চারণ থেকে বিরত হবেন। কিন্তু পারছেন না। সব কেমন ক্রমশ ভুল হয়ে যাচ্ছে। সব কেমন স্মৃতির অতলে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। জীবনধারণের জন্য কি করা কর্তব্য—অনেক ভেবেও কোনও পথ ঠিক করতে পারছেন না। তখন ভয়ঙ্কর বিরক্তভাব ওঁকে আরও প্রকট করে তোলে। দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করতে থাকেন—আমি রাজা হব।

    বিকেলের দিকে ভূপেন্দ্রনাথ এলেন কর্মস্থল থেকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ক’দিন থেকেই বাপের জন্য মনটা খারাপ লাগছিল। বুড়ো মানুষটার জন্য ভূপেন্দ্রনাথের বড় টান। এখনও যেন তিনি সকলকে আগলে আছেন। যৌবনে ভূপেন্দ্রনাথের কিছু আদর্শ ছিল। এখন আর তা নেই। স্বাধীনতা আসবে, স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন চোখে ভাসত। কিন্তু বড়দা পাগল হয়ে গেল—এত বড় সংসার শুধু জমি এবং যজমানিতে চলে না, ভূপেন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেলেন। বুড়ো মানুষটার জন্য, এত বড় সংসারের জন্য তিনি পায়ে হেঁটে নতুন ধানের ছড়া আনতে চলে গেলেন। সংসারে তাঁর জীবন প্রায় এক উৎসর্গীকৃত প্রাণ যেন। বিবাহ করা হয়ে উঠল না। চন্দ্রনাথের বিয়ে দিলেন; এখন শুধু কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই দেশে চলে আসা এবং বুড়ো মানুষটার পাশে সংসারের গল্প, জোতজমির গল্প, কোন জমিতে কোন ফসল দিলে ভালো হবে—এমন সব পরামর্শ। মনেই হয় না মানুষটার জীবনে অন্য কিছুর প্রয়োজন আছে।

    ভূপেন্দ্রনাথ নৌকা থেকে নামতেই বাড়ির সকলে যেন টের পেয়ে গেল—মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে, চাল, চিনি, কলা, কদমা এবং বর্ষাকাল বলে বড় বড় আখ এসেছে। ধনবৌ তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে ঘরে ঢুকে গেল। তিনি এখন এ-পথেই উঠে আসবেন।

    তিনি প্রথমেই বাড়িতে উঠে ছড়িটা বারান্দায় রেখে যে-ঘরে বুড়ো মানুষটা চুপচাপ বসে থাকেন সেখানে উঠে গেলেন। বাবাকে, মাকে প্রণাম করলেন। বুড়ো মানুষটা তাঁর কুশল নিলেন। মনিবের কুশল নিলেন। শরীর কেমন, এ-সব জিজ্ঞাসাবাদের পর মনে হল উঠোনে কে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝি বড়বৌ। বড়বৌকে প্রণাম করতে হয়। উঠোনে নেমে বাড়িটার কী কী পরিবর্তন হয়েছে লক্ষ করতে গিয়ে মনে হল বাড়িটার সেই শুকনো ভাবটা নেই। বাড়ির চারদিকে ঝোপঝাড়গুলি বেড়ে উঠেছে। উত্তরের ঘর পার হয়ে কামরাঙা গাছের পাশে ছোট একটা মাচান। মাচানে কিছু শশার লতানে গাছ, হলদে ফুল। কচি শশা দুটো-একটা ঝুলছে। পাশে ঝিঙের মাচান, করলার মাচান। চন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই ওগুলো লাগিয়ে গেছে। সেই দুই নাবালককে খুঁজতে থাকলেন তিনি। ওরা এখন বাড়িতে নেই—কোথায় গেল! গোটা বাড়িটা এই দুই নাবালক—লালটু পলটু চিৎকার চেঁচামেচি করে জাগিয়ে রাখে। ওদের জন্য সে হলদে রঙের পুরুষ্ট আখ এনেছে। মোটা এবং সরস। নরম এই আখ ওদের খুব প্রিয়। নিজে ভেঙে দিতে পারলে কেমন যেন মনটা ওঁর ভরে যায়। অরা গেল কৈ! এমন একটা প্রশ্ন মনে মনে।

    সেই দুই বালক তখন ছুটছিল। মেজকাকা এসেছে। পলটুর মেজকাকা লালটুর মেজ জ্যাঠামশাই—ওরা গ্রামের ওপর দিয়ে ছুটছে। ওরা খবর পেয়ে গেছে মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে। নৌকা আসা মানে ওদের জন্য আখ এসেছে, কমলার দিনে কমলা, তিলা-কদমার দিনে তিলা-কদমা। অথবা আম-জাম জামরুলের দিনে নানারকমের ফল। ওরা এসে দেখল, অলিমদ্দি মাথায় করে সব চাল-ডাল-তেল অথবা করলা-ঝিঙে নামাচ্ছে। একটা বড় মাছ এনেছেন, সেটা গলুইর নিচে, লালটু পলটু দু’জনে মাছটাকে টেনে তুলে আনছে। প্রায় এখন যেন উৎসবের মতো বাড়ি। কেবল বড়বৌ বিষণ্ণ চোখে চারদিকে কাকে যেন সারাদিন থেকে খুঁজছে। কে যেন তার চলে গেছে, আসার কথা, আসছে না। বড়বৌর বড় বড় অসহায় চোখ দেখে ভূপেন্দ্রনাথ ধরতে পারলেন—বড়দা আবার নিরুদ্দেশে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে যেন ভিতরে কী এক কষ্ট ভেসে উঠল। বড়বৌর মুখের দিকে আর তাকাতে পারলেন না।

    বিকেলের দিকে বুড়ো মানুষটা ভূপেন্দ্রনাথের কাছ থেকে নানারকম খবর নেবার জন্য বারান্দায় বসে থাকলেন। ভূপেন্দ্রনাথ পায়ের কাছে বসে সব বলছিলেন—এটা স্বভাব তাঁর। মুড়াপাড়া থেকে এলেই বাবাকে পৃথিবীর সব খবর দিতে হয়। বাবুরা অর্ধসাপ্তাহিক আনন্দবাজার কাগজ পড়েন। বাবুদের পড়া হয়ে গেলে ভূপেন্দ্রনাথ প্রায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব মুখস্থ করে ফেলেন। কেউ এলে তখন পত্রিকার খবর, যেন তার নখদর্পণে এই জগৎ সংসার। বাড়িতে এলে প্রাজ্ঞ ব্যক্তির মতো দেশের কথা বর্ণনা করেন। কাগজ থেকে কিছু খবরের কথা উল্লেখ করে বললেন, এবারে লীগপন্থীরা যে-ভাবে উইঠাপইড়া লাগছে তাতে আবার রায়ট লাগল বইলা।

    বৃদ্ধ অত্যন্ত আস্তে আস্তে বললেন, হাফিজদ্দির পোলা সামুরে তুই ত চিনস! সে নাকি টোডারবাগে লীগের ডেরা করছে। গাছে গাছে ইস্তাহার ঝুলাইতাছে। দেশটা দিন দিন কি হইয়া যাইতাছে বুঝি না।

    ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, বাবা, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দ্যাখলাম, গারো পাহাড় থেকে শহরে একজন সন্ন্যাসী আইছে। ভূত-ভবিষ্যৎ সব কইতে পারে। ভাবছিলাম বড়দারে নিয়া যামু।

    —যাও, যা ভাল বোঝ কর।

    —সঙ্গে ঈশম চলুক।

    বড়বৌ ঘরের ভিতর বসে বসে চাল, প্রায় দু’বস্তা চাল, ঝেড়ে তুলে রাখছে। সবজি যা এসেছে সাজিয়ে রাখছে। পাগল মানুষটাকে নিয়ে যাবে ওরা। সামান্য আশার আলো মনের ভিতরে জ্বলে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই কেমন তা নিভে গেল। মানুষটাকে নিরাময় করার জন্য কত চেষ্টা—দেখতে দেখতে প্রায় দশ বছর কেটে গেল। মানুষটা কিছুতেই ভালো হচ্ছে না।

    —আজকাল ত মণি দুই তিনদিন বাড়ি আসে না। কই থাকে, খায় ঈশ্বরই জানে।

    ভূপেন্দ্রনাথ যেন বলতে চেয়েছিলেন—এ ভাবে না খেয়ে ঘুরছে, কোথায় থাকছে, কোথায় রাত কাটাচ্ছে কেউ কিছু বলতে পারছে না—বরং বেঁধে রাখা ভালো। কিন্তু বলতে পারলেন না, কারণ এই ঘরে এখন মা আছেন, বড়বৌ আছে—ওরা সকলে এমন কথা বিশ্বাসই করতে পারবে না, তা’হলে যেন বাবা যে দু’দিন আরও বাঁচতেন তাও বাঁচবেন না। সুতরাং তিনি অন্য কথা বললেন, সোনারে আনেন দেখি, দ্যাখতে কেমন হইল দ্যাখি।

    বড়বৌ সোনাকে কোলে দিলে কেমন তাজ্জব হয়ে গেলেন তিনি। একেবারে বড়দার মুখ পেয়েছে। সোনাকে কাঁধে করে বারবাড়িতে চলে এলেন। সোনা যেমন অ আ ত ত করে কথা বলে তেমনি কথা বলছিল। অপরিচিত মানুষ দেখে সে এতটুকু কাঁদেনি। বরং মাঝে মাঝে কুটুস কুটুস দাঁতে কামড়াচ্ছিল। সোনার দুটো ছোট ইঁদুরের মতো দাঁত উঠেছে।—পোলা, তোমার অসুখ হইব দ্যাখতাছি। বলে দাঁতে দুটো টোকা দিলেন। যেন এই শিশুকে দাঁতে আঘাত করে ওর কঠিন অসুখ থেকে রক্ষা করছেন ভূপেন্দ্রনাথ। সোনা ভয়ঙ্করভাবে কেঁদে উঠতেই পাশের বাড়ির দীনবন্ধু পিছন থেকে ডাকল, মাইজা ভাই, ঢাকায় নাকি আবার রায়ট লাগব শুনছি।

    —তা লাগতে পারে।

    —কেডা জিতব মনে হয়?

    —কী কইরা কই! হার জিতের কি আছে ক?

    —কী দুর্ধর্ষ দ্যাখেন, দুধের পোলা, হালার হালা কথা নাই বার্তা নাই চাকু চালায়।

    —তুই দ্যাখছস নাকি?

    —তা দ্যাখমু না ক্যান। মালতীর বিয়ার সময় একবার ঢাকা শহরে গেছিলাম। ঘুইরা ফিরা দ্যাখলাম শহরটা। এলাহি কাণ্ড—না!—রমনার মাঠে গ্যালাম, সদর ঘাটের কামান দ্যাখলাম।

    .

    সন্ধ্যার পর ধনবৌ পশ্চিমের ঘরে হারিকেন জ্বেলে রেখে গেল। হাত-পা ধোওয়ার জল রেখে গেল। একটা জলচৌকি, ঘটি এবং গামছা রেখে দিল। তিনি হাত-পা ধুয়ে ঘরে ঢুকে যাবেন। আর বের হবেন না। কারণ গ্রামে খবরটা রটে গেছে। মুড়াপাড়া থেকে মাইজা কর্তা এসেছেন। বিশ্বের খবর তাঁর জানা আছে। গ্রামের পালবাড়ি থেকে মাঝিবাড়ি অথবা চন্দদের বাড়ি থেকে প্রৌঢ়গণ হাতে লাঠি এবং লণ্ঠন নিয়ে খড়ম পায়ে ঠাকুরবাড়ি এসে ডাকল, ভূপেন আছ? মাইজা কর্তা আছেন?

    ভূপেন্দ্রনাথ তখন হয়তো তক্তপোশে বসে ঈশ্বরের নাম নিচ্ছিলেন অথবা ঈশমের কুশলবার্তা। তখন তিনি এক দুই করে খড়মের শব্দ শুনতে পেলেন। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা এখন এসে ভিড় করবে। আড্ডা দেবে এবং পত্রিকার খবর নেবে। দেশের খবর, বিদেশের খবর, গান্ধীজী কি ভাবছেন, এমন সব খবরের জন্য ওরা উন্মুখ হয়ে থাকে। তিনি এই আড্ডার প্রাণ। তিনি তখন ঈশ্বরের চেয়েও বড়, তার কথা এদের কাছে ঈশ্বরের শামিল—এই বিশ্বাস লোকগুলির মনে। তিনি তখন বলবেন, দেশের বড় দুরবস্থা হারান।

    —ক্যান কাকা?

    —কাইল সারা বাজার ঘুইরা বাবুরহাটের একটা শাড়ি পাইলাম না।

    ক্যান এমন হইল?

    —কি জানি! মহালে তর আদাই নাই। এদিকে তোমার সারা ভারতে আইন অমান্য আন্দোলন চালাইতেছেন গান্ধী। ইংরাজরাও ছাইড়া কথা কইতাছে না। লাঠি চালাইতেছে। গুলি করতাছে। এদিকে তোমার বিলাতের প্রধানমন্ত্রী লীগের পক্ষ নিছে। সুতরাং বুঝতেই পারছ লীগের পোয়াবার।

    মাঝিবাড়ির শ্রীশ চন্দ্র বলল, ঘোর কলিকাল আইসা গেল মাইজা ভাই।

    ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, চারিদিকে তর একটা ষড়যন্ত্র। আনন্দময়ী কালীবাড়ির পাশে বনজঙ্গলের ভিতর পুরানো একটা বাড়ি আছে, একটা দিঘি আছে। কেউ খবর রাখে না। এখন তর চরের মৌলভি-সাব কয় ওটা নাকি মসজিদ। মুসলমানরা কয় নামাজ পড়ব।

    —তা হইলে গণ্ডগোল একটা লাগব কন!

    —বাবুরা কি ছাইড়া দিব? জায়গাটা অমর্ত্যবাবুর! পাশে আনন্দময়ী কালীবাড়ী। আগুন জ্বলতে কতক্ষণ।

    —অঃ, আমার হোমন্দির পো’ রে, দেশে আর বিচার নাই। আমাগ জাতধর্ম নাই। পূজা-পাৰ্বণ নাই। মাকালী নিব্বংশ কইরা দিব। তখনই সে দেখল উঠোনে ঈশম বসে তামাক টানছে। মাইজা কর্তা এলে একটু দেরি করে সে গোয়ালে গরু বাছুর তোলে। ঈশমকে দেখে সে কেমন জিভে কামড় দিয়ে ফেলল। উঠোনে মানুষটা বসে আছে সে খেয়ালই করেনি। এবার কেমন গলা নামিয়ে দুঃখের সঙ্গে বলল, আমার দোকান থাইকা মাইজা ভাই মুসলমান খরিদ্দার সওদা করতে চায় না। কতদিনের সব খরিদ্দার। কত বিশ্বাসের সব—অরা সরিবদ্দির দোকানে খায়।

    এ-সময় সকলেই চুপ হয়ে গেল। কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। শ্রীশ চন্দ তার দুঃখের কথা বলে চুপ হয়ে গেছে। ভূপেন্দ্ৰনাথ হুঁকা টানছেন। জোর হাওয়ার জন্য আলোটা মৃদু-মৃদু কাঁপছিল। দূরে সোনালী বালির নদী থেকে গয়না নৌকার হাঁক আসছে। শচীন্দ্রনাথ ঠাকুরঘরে শীতল ভোগ দিচ্ছেন। ঘণ্টার শব্দ, গয়না নৌকার হাঁক এবং ঈশমের ব্যাজার মুখ সকলকেই কেমন পীড়িত করছে। বুড়ো মানুষটা ঘরে শুয়ে শুয়ে কাঁদছেন। কোথায় এখন তাঁর পাগল ছেলে হেঁটে বেড়াচ্ছে অথবা গাছের নিচে শুয়ে আছে কে জানে। বড়বৌ পুবের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কামরাঙা গাছ, গাছ পার হলে বেতের ঝোপ এবং ডুমুরের গাছটা পার হলে মাঠ। বড় চাঁদ উঠে আসছে গাছটার মাথায়। এখন সাদা জ্যোৎস্না সর্বত্র। গাছগুলি স্পষ্ট। ফাঁকা মাঠে ধানগাছে সামান্য কুয়াশার পাতলা আবরণ। সে পথের দিকে তাকিয়ে আছে—যদি কোনও মানুষের ছায়া এই পথে উঠে আসে, যদি মানুষটা লগি বাইতে থাকে সামনের মাঠে অথবা নৌকার শব্দ পেলেই চমকে ওঠে—এই বুঝি এল, সাধু-সন্ন্যাসীর মতো এক উদাসীন মানুষ বুঝি বাড়ি ফিরে এল। পাগল মানুষটার প্রতীক্ষাতে বড়বৌ দাঁড়িয়ে আছে। ওর মানুষটার জন্য কেন জানি কেবল কান্না পাচ্ছিল।

    .

    কিছুদূর এসেই মণীন্দ্রনাথের বাড়ি ফেরার স্পৃহা উবে গেল। তিনি বার বার ধানখেতের চারপাশে ঘুরতে থাকলেন এবং মাঝে মাঝে নৌকাকে ঘুরিয়ে দিয়ে লগিটাকে মাথার উপর লাঠিখেলার মতো ঘোরাতে থাকলেন। এই যে নক্ষত্রপুঞ্জ আছে, আকাশ রয়েছে এবং বিলের জলে কোড়া পাখি ডাকছে সব কিছুর ভিতর কোন এক অদৃশ্য সংগ্রাম তাঁর। পাটাতনে লাফ দিচ্ছিলেন। হাতে ধরে কি যেন আয়ত্তে এনেছেন, তারপর গলা টিপে হত্যা। যত তিনি লাঠিটা ঘোরাচ্ছিলেন তত বন-বন শব্দ হচ্ছে। দূরে যারা পাট কাটছিল তারা দেখল বিলের জলে নৌকা ভাসছে আর পাগলঠাকুর মথার উপর লগি ঘোরাচ্ছে। কি মানুষটা কি হইয়া গ্যাল এমন সব চিন্তা।

    তিনি অনেক দূরে চলে এসেছিলেন নৌকা বাইতে বাইতে। সুতরাং ঘরে ফিরতে বেশ দেরি হবে। বড়বৌর বড় এবং গভীর চোখ দুটো তাকে এখন কষ্ট দিচ্ছে এই ভেবে যখন ধানখেত ভেঙে ঘরে ফেরার স্পৃহাতে লগি তুলছেন তখনই দেখতে পেলেন, সোনালী বালির নদীর বুকে একটা বড় পানসি নাও। তার কেন জানি মনে হল—এই নৌকায় পলিন আছে। পলিনকে নিয়ে এই নাও কোন এক অদৃশ্যলোকে হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি পাটাতনের নিচ থেকে বৈঠা বের করে জলে বড় বড় ঢেউ তুলতেই নৌকাটি গিয়ে হুমড়ি খেয়ে নদীতে পড়ল। স্রোতের মুখে তিনি ভেসে চলেছেন। এখন কোনও বেগ পেতে হচ্ছে না মণীন্দ্রনাথকে—তিনি পানসি নৌকাটার পেছনে হাল ধরে শুধু বসে আছেন।

    পানসি নৌকার মানুষেরা দেখল পিছনে পিছনে একটা নৌকা আসছে। হালে বসে আছে উদোম গায়ে গৌরবর্ণ এক সুপুরুষ। রোদে পুড়ে রঙটা তামাটে হয়ে গেছে। হালে মানুষটা প্রায় যেন চোখ বুজে আছে। এই বর্ষা এবং তার স্রোত যেদিকে নিয়ে যায় যাবে—মানুষগুলি দেখে হাসাহাসি করছিল। ভিতরে জমিদার পুত্র এবং বাঈজী বিলাসী একঘরে এক বিছানায়। গান শেষে কিছু কিছু কৌতুকের কথাবার্তা। এবং সরোদের টুংটাং শব্দ। বিলাসী তারে হাত রেখে পা দুটো ছড়িয়ে-হায় সজনিয়া, এমন এক ভঙ্গি টেনে পড়ে আছে। চোখমুখ জড়িয়ে আসছিল, নেশায় ওরা পরস্পর তাকাতে পারছে না। মণীন্দ্রনাথ দীর্ঘপথ ওদের কেবল অনুসরণ করলেন। তিনি সরোদের গম্ভীর আওয়াজের ভিতর কেবল যেন এক মেয়ের মুখ দেখতে পান—তিনি পলিনের অবয়ব এবং তার মুখ, তার প্রেম সম্পর্কিত সকল ঘটনা এই ধানখেতের ফাঁকে ফাঁকে সোনালী বালির নদীর চরে, জলে সর্বত্র দেখতে পাচ্ছেন। অথচ এক সময় আবার সবই কেমন গুলিয়ে গেল। কেন যে এত দীর্ঘ পথ পানসি নৌকার পিছনে অনুসরণ করলেন, মনে করতে পারছেন না। কোন পথ ধরে ঘরে ফিরতে হবে সব যেন ভুলে গেলেন। তিনি এবার নদী থেকে চরে উঠে আসার জন্য নৌকার মুখ ফেরালেন, কাশবনের ভিতর ঢুকে আর পথ পেলেন না। সূর্য পশ্চিমে হেলে গেছে—এবার সূর্যাস্ত হবে—কিছু গগনভেরী পাখির আর্তনাদ আকাশের প্রান্তে শোনা যাচ্ছিল এবং দূরে হাটফেরত মানুষেরা ঘরে ফিরছে। তিনি নৌকার পাটাতনে এবার শুয়ে পড়লেন। শরীরের কোথায় কী যেন কষ্ট। তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুধার্ত। অথচ কী করলে এই কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাবেন বুঝতে পারছেন না। সুতরাং চুপচাপ শুয়ে থেকে গগনভেরী পাখির আর্তনাদ কোথায় কোন আকাশে উড়ছে খুঁজতে থাকলেন। আকাশ একেবারে নিঃসঙ্গ। কোথাও একটা পাখি একটা ফড়িঙ পর্যন্ত উড়ছে না। তিনি ক্লান্ত গলায় যেন বলতে চাইলেন, পলিন, আমি তোমার কাছে যাব।

    দূরে কোন গ্রাম—সেখান থেকে কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। কোন মুসলমান গ্রাম থেকে আজানের শব্দ। কিছু কিছু নক্ষত্র আকাশে ফুলের মতো ফুটে উঠছে। এখন আকাশটাকে তত আর নিঃসঙ্গ মনে হয় না। কতদূর এইসব নক্ষত্রের জগৎ—ইচ্ছা করলে ওদের ধরা যায় না! এইসব নক্ষত্রের জগতে অথবা নীহারিকাপুঞ্জে নৌকায় পাল তুলে ঘুমিয়ে থাকলে কেমন হয়! তিনি কত বিচিত্র চিন্তা করতে করতে সবকিছুর খেই হারিয়ে সহসা কেমন উত্তেজনা বোধ করেন।

    কিছু জোনাকি জ্বলছে ধানগাছের পাতার আড়ালে। জ্যোৎস্নায় এই ধরণী শান্ত এবং স্থির। অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে। সমস্ত দিনের ক্লান্তি এই মিষ্টি হাওয়ায় কেমন উবে গেল। ফের পলিনের মুখ মনে পড়ছে। মণীন্দ্রনাথ কাৎ হয়ে শুয়েছিলেন এবং বিড়বিড় করে বকছিলেন। দেখলে মনে হবে না—তিনি এখন সুদূর কলকাতায় কোনও ইউরোপীয় পরিবারের সঙ্গে আলাপ করছেন। মনে হবে বিড়বিড় করে কি শুধু বকে যাচ্ছেন। জোরে জোরে উচ্চারণ করলে ইংরেজির স্পষ্ট উচ্চারণে সব ধরা পড়ত, কিন্তু হাতের ওপর মাথা রেখে অথবা এইসব কথা তাকে শুধু পাগল বলেই প্রতিপন্ন করছে। আমি পলিনকে ভালবাসি—এই উক্তি পরিবারের সকলের কাছে চিৎকার করে বলতে পারলে যেন খুশি হতেন। অথচ অঘটন ঘটে গেল। মণীন্দ্রনাথ যেন পিতৃসত্য পালনে বনবাসে গমন করলেন। পিতৃ আজ্ঞা শিরোধার্য করতে গিয়ে দ্বিধা এবং দ্বন্দ্বে অবশেষে বলেই ফেললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    মণীন্দ্রনাথ যখন দেখলেন মাঠে অথবা নদীর জলে কোথাও কোনোও নৌকার শব্দ উঠছে না তখন তিনি দাঁড়িয়ে বলতে চাইলেন, পলিন, আমি পাগল হইনি। আমাকে সবাই অযথা পাগল বলছে। আমি তোমার কাছে গেলেই ভালো হয়ে যাব। এইসব কথা এখন মাঠে মাঠে জলে জলে বনে বনে ঘাসে ঘাসে সর্বত্র প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছে—আমি পাগল হইনি। সবাই অযথা আমাকে পাগল বলছে।

    .

    রাত বাড়ছে। লালটু পলটু পড়ছে দক্ষিণের ঘরে। ঈশম আজ বুঝি বাড়ি যাবে না, গেলেও রাত করে যাবে। সে দক্ষিণের ঘরে মাদুর পেতে শুয়ে আছে। ধনবৌ হেঁশেলে। শশীবালা দরজায় বসে, কোলে সোনা ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনি তালপাতার পাখা নাড়ছেন। গরম পড়েছে বেশ। পশ্চিমের ঘরে যারা এতক্ষণ বসে রাজাউজির মারছিল, রাত গভীর হলে এক এক করে সকলে চলে গেল। দীনবন্ধু কেবল যায়নি। সে মেজকর্তার পায়ের কাছে বসে হুঁকো টানছিল। এবং জমিদারী সেরেস্তার গল্প শুনে কর্তার মন জয় করার তালে ছিল। দীনবন্ধু এতদিন যে জমিটা ভোগ করছে ভাগে, সে কর্তাকে খুশি করে জমিটার ভোগদখল চাইছে।

    শশীবালা রান্না হলে সকলকে খেতে ডাকলেন। বড়বৌ কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি পেতে দিল। লালটু পলটুর জন্য ছোট পিঁড়ি। জল দিল। বড় দোচালা ঘর। মুলি বাঁশের বেড়া সিমেণ্ট বাঁধানো মেঝে। শশীবালা এখন দরজার কাঠে হেলান দিয়ে ছেলেদের খাওয়া দেখবেন। বড়বৌ পরিবেশন করবে, ধনবৌ হেঁশেলে ঘোমটা টেনে বসে থাকবে—মাঝে মাঝে কানের কাছে কথা ধনবৌর, ফিসফিস করে কথা—এটা ওটা বড়বৌকে এগিয়ে দেবে।

    খেতে বসেই ভূপেন্দ্রনাথের মনটা ভারি হয়ে উঠল। বড়দার আসন পড়েনি। একটা দিক খালি! সেদিকে তাকিয়ে ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, বড়দা কখন বাইর হইছে?

    শচীনাথ পঞ্চদেবতার উদ্দেশে নিবেদন করছিলেন তখন, জলটা গণ্ডুষ করবে, ঠিক তখন মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর এখন খেয়াল থাকে না—বড়দার আসন খালি, তিনি জলটা গণ্ডুষ-করে বললেন, পরশু ভোরে বৌদি উইঠা দেখে দরজা খোলা। ঘাটে গিয়া দেখি কোষাটা নাই। হাসিমের বাপ কইছে তাইন নাকি দুপুরে বিলের দিকে নৌকা বাইয়া নাইমা গ্যাছে।

    —কাইল একবার চল দেখি—অলিমদ্দিরে লইয়া যাই।

    —চলেন। তবে মনে লয় পাইবেন না। কই থাকে কই যায় কেউ জানে না।

    বড়বৌ কোনও কথা বলছিল না। বসে বসে শুনছিল। এবং চোখে জল এসে গেলে ঘোমটা সামান্য টেনে দিল। কোন নালিশ নেই এমন ভাব চোখে-মুখে। কোনওদিন সুপুরুষ লোকটি আদর করে কথা বলেনি। কোনও প্রেম সম্পর্কিত সুখী ঘটনা ইদানীং আর ঘটছে না। শুধু মাঝে মাঝে তাও ক্বচিৎ কখনও বুকের কাছে টেনে এনে দস্যুর মতো কি এক আদিম প্রেরণা যেন, চোখমুখ ঘোলা ঘোলা—মানুষ বলে চেনা যায় না। বুকের কাছে নিয়ে একেবারে বন্যজীবের মতো করতে থাকে; বড়বৌ শরীর ছেড়ে দেয়—যা খুশী করুক—পাগল মানুষটাকে সে শিশুর মতো, অথবা সন্তানের মতো, অথবা তুমি যে এক আদিম মানুষ সে কথা তুমি কি করে ভুলে যাও—আমাকে দ্যাখো, খেলা কর। বন্যজীবের মতো বুকের কাছে টেনে নেবার ঘটনাও সে আঙুলে গুনে বলতে পারে—কত দিন, কতবার—জ্যোৎস্না রাত ছিল, না অন্ধকার রাত ছিল, সব বলে দিতে পারে।

    দু’দিনের উপর হয়ে গেছে। মানুষটা ফিরছে না। বড়বৌ পাগলঠাকুরকে আপনার ধন বলে জানে। মণীন্দ্রনাথ নামক ব্যক্তিটি বড় অপরিচিতি। বিয়ের পিঁড়িতে সে যেন এই পাগল মানুষটাকেই দেখেছিল। অশান্ত পুরুষ, জীবন থেকে তাঁর সোনার হরিণ হারিয়ে গেছে—মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন, অভিশাপ দেবার বাসনা যেন এবং মনে হচ্ছিল তিনি তাঁর লাবণ্যময়ীকে গিলে খাবেন। এত লোকজন, এত আলো আর সমারোহ, তবু বড়বৌর সেদিন ভয় করছিল। রাতে দিদিকে ডেকে বলেছিল, দিদি আমার বড় ভয় করছে। মানুষট। যেন আমাকে গিলে ফেলবে। আমাকে তোমরা কি দেখে বিয়ে দিলে! এমন গ্রাম জায়গায় আমি থাকবো কী করে! পরে বড়বৌ বুঝেছিল,—মানুষটি নিরীহ এবং মস্তিষ্ক বিকৃতি আছে। ততদিনে সে এই সুপুরুষ ব্যক্তিটিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। সুতরাং দুঃখকে জীবনের নিত্য অনুগামী ভেবে আজ-কাল আর নিজের জন্য আদৌ ভাবে না—মানুষটার জন্য রাতে কেবল ঘুম আসে না, কেবল জেগে বসে থাকে মানুষটা কখন ফিরবে।

    রাত ঘন হচ্ছিল। ঘাটে বড়বৌ বাসন মাজছে। সোনা কাঁদছিল বলে ধনবৌকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে এখন একা এই ঘাটে। শশীবালা খেয়েদেয়ে এইমাত্র বড়ঘরে ঢুকে গেছেন। নির্জন রাতে এমন কি বুড়ো মানুষটার কাশির শব্দও ভেসে আসছে না। বোধ হয় এখন সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নৌকাটা অলিমদ্দি ঘাটে রাখেনি। ঘাটের কিছুটা দূরে লগিতে বেঁধে ঘুমিয়ে পড়েছে। বড়বৌর বাসন মাজা হয়ে গেছে, তবু উঠতে ইচ্ছা করছে না। ঘাটের একপাশে লণ্ঠনের আলোতে বড়বৌর মুখ বিষণ্ণ। জ্যোৎস্না রাত বলে দূরের মাঠ দিয়ে নৌকা গেলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজ আর কুয়াশা ভাবটা নেই। বড়বৌ এই ঘাটে সেই নিরুদ্দিষ্ট মানুষের জন্য বসে আছে। তিনি হয়তো আসছেন, এক্ষুনি এসে পড়বেন। বড়বৌর কথা মনে ভেসে উঠলে মানুষটা পাগলের মতো ঘরের দিকে ছুটতে থাকেন।

    রাত বাড়ছে। একা একা ঘাটে বসে থাকতে আর সাহস পেল না বড়বৌ। শুধু ঝোপ জঙ্গলে কিছু অপরিচিত পাখ-পাখালি, কীট-পতঙ্গ রাতের প্রহর ঘোষণায় মত্ত। আলকুশি লতার ঝোপে ঢুব-ঢুব আওয়াজ। গন্ধপাদাল ঝোপে ঝিঁঝিঁ-পোকা ডাকছে। রাত গভীর হলে, নিশীথের প্রাণীরা কত হাজার হবে লক্ষ হবে এবং লক্ষ কোটির প্রাণের সাড়া এই ভুবনময়। গভীর রাতে জেগে থেকে টের পায় বড়বৌ, যেন মানুষটা এখন নিশীথের জীব হয়ে জলে-জঙ্গলে ঘোরাফেরা করছে।

    রান্নাঘরে বাসনকোসন রেখে পুবের ঘরে উঠে যাবার মুখেই মনে হল ঘাটে লগির শব্দ। বড়বৌর বুকটা কেঁপে উঠল। তাড়াতাড়ি ছুটে গেল ঘাটে। মানুষটা লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামছে। নৌকোটাকে টেনে প্রায় জমিতে তুলে ফেলল। কোন দিকে দৃকপাত নেই। লম্বা উঁচু মানুষটা—কী যে লম্বা আর কী যে রহস্যময় চোখ—এই সুদৃশ্য জ্যোৎস্নায় যেন এক দেবদূত আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। বড়বৌ দেখল মানুষটার শরীরে কোনও বসন নেই। একেবারে প্রায় উলঙ্গ এবং শিশুর মতো বড়বৌকে জেগে থাকতে দেখে হাসছে। নৌকায় কচু কুমড়া কলা। যার যা কিছু প্রথম গাছে হয়েছে, মানুষটাকে দিয়ে দিয়েছে। বড়বৌ বিস্ময়ে কোনও কথা বলতে পারল না। যেন এক সন্ন্যাসী দীর্ঘদিন তীর্থ-ভ্রমণের পর নিজের ডেরাতে হাজির হয়েছে। অন্যদিন হলে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে কাপড় পেড়ে আনত। আজ কিছুই ইচ্ছা হল না, এই সাদা জ্যোৎস্নায় এমন এক শিশুর মতো যুবকটিকে নিয়ে কেবল খেলা করে বেড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পাঁচ

    তখন বিকেলবেলা। বর্ষার জল মাঠে থইথই করছে। জোটন গোপাট ধরে জল ভাঙতে থাকল। সে সাঁতার কেটে পাশের গ্রামে উঠে যাবে। সে জলজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে ঝোপ-জঙ্গল অতিক্রম করে কেবল সাঁতার কাটছে। সে সাঁতার কেটে ঠাকুরবাড়ির সুপারি বাগানে উঠে দেখল একটাও সুপারি পড়ে নেই। ঘাটে একটা তেমাল্লা নৌকা বাঁধা। ছই-এর নিচে দুই মাঝি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। জলে সে সারাক্ষণ সাঁতার কেটেছে। শাড়ি ভিজে গেছে। জবাফুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে শাড়িটাকে খুলে চিপে ফেলল। তারপর ফের প্যাঁচ দিয়ে পড়তেই মনে হল—কোথায় যেন কারা চিঁড়া কুটছে। তালের বড়া ভাজছে। সে নাক টেনে গন্ধ নিল। চিঁড়া কোটার শব্দ ভেসে আসছিল। মামাদের এখন ভাদ্রমাস। ভিটা জমিতে আউশ ধান, আউশ ধানের চিঁড়া—সে ভাবল, চিঁড়া কুটে দিলে ওর নসিবটা খুলে যাবে।

    সে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। দেখল মাইজা কর্তা পশ্চিমের ঘরে তক্তপোশে একটা মোটা পুঁথি পড়ছেন। জোটন মাইজা কর্তাকে দেখেই দরজার সামনে দাঁড়াল। কে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তুলতেই দেখলেন আবেদালির দিদি জোটন। জোটনের শরীরটা একটু রু দেখাচ্ছে। চুল জোটনের নেই বললেই হয় এবং শণের মতো। মুখে কোনও কমনীয়তা নেই। ওর শরীরের গঠনটা কেমন যেন ভেঙে যাচ্ছে। গালে মেচেতা সুতরাং মুখটি কুৎসিত দেখাচ্ছিল। ভূপেন্দ্রনাথ বলল, কিরে জুটি, তুই।

    —হ কর্তা, আমি। আবার ফিরা আইছি।

    —আবার তরে তালাক দিল?

    —হ। কিন্তু নিব্বৈংশায় না দিল পোলা, না দিল এক ফালি ত্যানা!

    —পোলা না দিছে ভাল করছে—পোলা আইনা খাওয়াইবি কি?

    জোটন সেটা ভাল বোঝে বলে অন্য কথা আর বলল না। মাইজা কর্তা আবার বড় পুঁথিতে মন দিয়েছেন। চশমার ভিতর কর্তার সহৃদয় মুখ দেখে বলতে ইচ্ছে হল, মাইজাকর্তা, আমারে পুরান-দুরান যা হয় একখানা ঠিক কইরা দ্যান। কিন্তু বলতে পারল না। যেন বললে শোনাত—সেই ফকিরসাব এসেছিলেন, কষ্টের যা কিছু সঞ্চয় ছিল, মোটা ভাত একটু শুকনো মাছের বাটা দিয়ে মানুষটা সবক’টা ভাত খেয়ে সেই যে চলে গেলেন আর এলেন না। যেন জোটন এই দরজায় দাঁড়িয়ে মনে করতে পারে—ফকিরসাব হুঁকো খাচ্ছিলেন, সব পোঁটলা-পুঁটলি যত্ন করে বাঁধা। যেন তিনি উঠবেন, হুঁকো খাওয়াটা বাকি। জোটন ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারেনি। সে বলেছিল-ফকিরসাব, আমারে লইয়া যাইবেন না? ফকিরসাব ঝোলাঝুলি কাঁধে নিতে নিতে বলেছিলেন—আইজ না। অন্যদিন হইব। কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। কবে ফিরমু ঠিক নাই। সেই যে বলে চলে গেলেন আর এলেন না মানুষটা। আর আসবেন কিনা ঠিক নেই। তাকে একটা মানুষ ঠিক করে দেবার জন্য সে যেন দোরে দোরে ঘুরছে।

    আমারে একটা পুরান-দুরান যা হয় ঠিক কইরা দ্যান—বলতে সাহস পেল না। তিনবার তালাক এই শরীরকে যেন দুর্গন্ধময় করে রেখেছে—মাইজা কর্তা বললেন, কিছু কবি?

    —কি কমুগ কর্তা। আমার চলে কি কইরা!

    —আবার তর পাগলামি আরম্ভ হইছে। এইটা ঠিক না। মাইজা কর্তা বুঝতে পারছিলেন, পুরান-দুরান মানুষ ঠিক করে দেবার কথাটা সে বলতে এসেছে। জোটন কর্তার মুখে এমন কথা শুনে আর দাঁড়াল না। আতাবেড়ার পাশ দিয়ে ভিতর বাড়িতে ঢুকে গেল।

    ধনমামি বড়মামি দাঁড়িয়ে আছেন। হারান পালের বৌ চিঁড়া কুটে দিচ্ছে। মালতী সঙ্গে আছে। জোটন বলল, দ্যান, আমি চিঁড়া কুটি

    জোটন অতি অল্প সময়ে চিঁড়া কুটে খোলায় ছড়িয়ে দেখাল। সে যে ভাল চিঁড়া কুটতে পারে, চিঁড়াগুলি ওর বেশ বড় বড় হয়—খোলায় ছড়িয়ে যেন সকলকে দেখাতে চাইল। জোটন ওর চিঁড়াগুলি অন্য একটা বেতের ঢাকিতে রাখল। শশীবালা এই চিঁড়া দেখলে খুশি হবেন। যাবার সময় এক খোলা চিঁড়া ওর আঁচলে ঢেলে দেবেন।

    ধনবৌ বলল, তর নাকি আবার বিয়া বসনের শখ হইছে?

    —অঃ আল্লা, এডা এতদিনে জানলেন। কিন্তু পাইতাছি কই।

    —তর ক্ষমতা আছে জুটি!

    —কি যে কন আপনারা। শরমের কথা আর কইয়েন না। এডা গতরের কথা। আপনের-অ আছে আমার-অ আছে। আপনে সুখ পান কথা কন না, কর্তা আসে যায়। আমার মানুষ নাই, মানুষ আসে না যায় না। সুখ পাই না, কথা কই। এইসব বলে জোটন চিঁড়া কুটতে থাকল ফের, ওর মুখে একরকমের শব্দ; শব্দটা কোড়াপাখির ডাকের মতো। ভাদ্র মাস বলেই এত গরম এবং তালের পিঠা হচ্ছে বাড়ি বাড়ি—তার গন্ধ গ্রামময়। মাঠময়। হারান চন্দের বৌ ধান খোলাতে ভাজছে, শুকনো কাঠ গুঁজে দিচ্ছেন শশীবালা। সকলেই কোন-না-কোন কাজে ব্যস্ত। জোটন একটু জল চাইল। বড়বৌ জল আনতে গেছে কুয়াতে। আর এ সময় জাম গাছে একটা ইষ্টিকুটুম পাখি ডাকল। কাহাইলের দুধারে বস্তা পাতার সময় সে চোখ তুলে দেখল—গাছে পাখিটা ডাকছে। সে বলল, ধনমামি, গাছে ইষ্টিকুটুম পাখি। মেমান আসব।

    রান্নাঘরে পবন কর্তার বৌ, তার ছেলেপুলে, সবাই বেড়াতে এসেছে। শশীবালা এই বর্ষাকালটা সব নাইয়রীদের জন্য যেন প্রতীক্ষায় বসে থাকেন। সারা বর্ষাকাল কুটুম আর কুটুম। ধনবৌ তখন নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না। বড়বৌকে সারাদিন হেঁশেলে পড়ে থাকতে হয়। মুখ ফসকে ধনবৌ বলে ফেলেছিল আর কি—আর কুটুম না। কিন্তু ঘরে পবন কর্তার বৌ। সে বলতে পারল না, পাখিটারে উড়াইয়া দে জুটি। সারা বর্ষাকাল কুটুম আর কুটুম। দিন-রাইত নাই, আইতাছে যাইতাছে। অথচ বুড়ো ঠাকরুণ শশীবালার বড় শখ কুটুমে। কোন্ কুটুম কি খেতে পছন্দ করে—শশীবালার সব মুখস্থ

    এ-সময়ে মেঘনা-পদ্মাতে ইলিশের ঝাঁক উঠতে থাকবে। জোটন জানত, এসময় ঠাকরুণ কুটুমের জন্য ভাল-মন্দ খাবার অথবা নাইয়রীরা ঘুরে বেড়াবে ঘরময়, উঠোনময় শিশুদের কোলাহল, ঘাটে ঘাটে নৌকা বাঁধা—এইসব দৃশ্য, আর জোটন তখন দেখল হারান পাল নৌকা থেকে এক গণ্ডা ইলিশ নামাচ্ছে। বড় বড় ইলিশ-রূপোর মতো উজ্জ্বল রঙ অবেলার রোদে চিকচিক করছিল। জোটন ইলিশমাছগুলি দেখে চোখ নামাতে পারছে না।

    ওর ইলিশমাছগুলির দিকে তাকিয়ে থাকা–খুব করুণ অথবা রহস্যময় মনে হয়—যেন কতদিন এইসব মাছের স্বাদ ভুলে গেছে জোটন। শশীবালা এসব লক্ষ্য করে বললেন, রাইতে খাইয়া যাইস জুটি। জুটির চোখদুটো কেমন সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, ঠাইনদি, মাছগুলির প্যাটে ডিম হইব মনে হয়।

    —তরে ডিম ভাজা দিতে কমু।

    সে আর কি বলবে ভেবে পেল না। একমনে আবার চিঁড়া কুটতে থাকল। সেই কোড়াপাখির ডাকটা ওর ভিতর থেকে এখনও উঠছে। ওর পরনের শতচ্ছিন্ন শাড়িটা এতক্ষণে শুকিয়ে উঠেছে। বড়বৌ জোটনকে এক খোলা চিঁড়া দিল খেতে, সে খেল না। আঁচলে পোঁটলা বেঁধে নিল। পলটু এনে ক’টা কাঁচা সুপারি দিল। আঁচলে তা বেঁধে নিল। রাত হয়ে যাচ্ছিল অনেক। সে কলাপাতা ধুয়ে বসে থাকল—রান্না হলেই সে খেতে পাবে।

    জোটন খেতে বসে পেট ভরে খেল। চেটেপুটে খেল। বড় যত্নের সঙ্গে ভাত ক’টি খেল। বেগুনের সঙ্গে ইলিশমাছের স্বাদ এবং আউশ ধানের মোটা ভাত জোটনকে এই পরিবারের সহৃদয়তা সম্বন্ধে অভিভূত করছে। বুড়ো ঠাকরুণ, ধনবৌর উদারতা যেন এই পরিবারের পাগল ঠাকুরের মতো। এই ভোজনের সঙ্গে রাতের জ্যোৎস্না এবং এক পাগল মানুষের অস্তিত্ব, বুড়ো কর্তার সাত্ত্বিক ধারণা, ভূপেন্দ্রনাথের সততা, সব মিলে জোটনকে সুখ দিচ্ছে। আর কতকালের মেমান যেন এইসব পরিবার। সে বড়বৌকে ডেকে বলল, মামি গ, অনেকদিন পরে দুইডা প্যাট ভইরা ভাত খাইলাম। এ খাওয়নের কথা ভুলতে পারি না।

    বড়বৌ ওর দুঃখের কথা শুনে বলল, তুই যে বললি, কোন্ দরগার এক ফকিরসাব তোকে নিকা করতে চায়?

    —কি যে কন মামি! খোয়াব ত কত দ্যাখলাম গ মামি। কিন্তু আল্লার মর্জি না হইলে আপনে আমি কি করমু!

    —কেন, আবেদালি যে বলে গেল ফকিরসাব এসেছিল।

    —আইছিল। প্যাট ভইরা ভাত গিলছিল। গিল্যা আমারে কয় কি, আপনে থাকেন, আমি কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। ফিরনের সময় আপনারে লইয়া ফিরমু। এই বইলা নিব্বৈংশায় আইজ-অ গ্যাছে কাইল-অ গ্যাছে মামি।

    —যখন বলে গেছে তখন ঠিকই আসবে।

    জোটন আর কোনও কথা বলল না। সে কলাপাতায় সব এঁটোকাঁটা তুলে জামগাছের অন্ধকার অতিক্রম করে বড়ঘরের পিছনে এসে দাঁড়াল। গন্ধ পাদালের ঝোপ ছাড়িয়ে সে তার এঁটোকাঁটা নিক্ষেপ করল। জ্যোৎস্না রাত বলে এই ঝোপ-জঙ্গল, দূরের মাঠ, সবুজ ধানখেতের অস্পষ্ট ছবি তার ভালো লাগে। সে হিসাব করে বুঝল প্রায় দু’সাল হবে গতর আল্লার মাশুল তুলছে না। বিশেষ করে এই রাত এবং ঝোপ-জঙ্গলের ইতস্তত অন্ধকারের ছবি অথবা আকণ্ঠ ভোজনে এক তীক্ষ্ণ ইচ্ছা জোটনকে কেমন কাতর করছে। ফকিরসাবকে এ-সময়ে বড় বেশি মনে পড়ছিল।

    সে বড় মামির কাছ থেকে একটা পান চেয়ে নিল। কাঁচা সুপারি একটা আস্ত চিবোতে চিবোতে বাগানের ভিতর ঢুকে গেল। এক মন্ত্রবৎ ইচ্ছাশক্তি এই বাগানের ভিতর ওকে কিছুক্ষণ রেখে দিল—যদি একটা পাকা সুপারি, গাছ থেকে টুপ—এই শব্দ ঘাসের ভিতর, সে কান খাড়া করে রাখল—কোথায় টুপ এই শব্দ জেগে উঠবে—কখন বাদুড়েরা উড়ে আসবে। কিন্তু একটা বাদুড় উড়ে এল না। টুপ্ শব্দ হল না। শুধু কাঁচা সুপারির রসে মাথাটা কেমন ভারী ভারী, নেশার মতো মনে হল। সে এখন জলে নেমে যাবে। সাঁতার কেটে গ্রামে উঠে যেতে হবে। জ্যোৎস্না রাত। জলে সাদা জ্যোৎস্না এবং জোটন জলে নেমে যাচ্ছিল, ধীরে ধীরে সে শাড়ি হাঁটুর উপর তুলে ফেলল। যত জলে নেমে যেতে লাগল, তত সে শাড়ি ক্রমে উপরে তুলে তুলে এক সময় কোমরের কাছে নিয়ে এল। না, জল কেবল বাড়ছে। সে শাড়ি খুলে মাথার উপর তুলে একটা গোসাপের মতো জলে ভেসে পড়ল। এক কাপড় জোটনের। ভিজা কাপড়ে রাত্রিবাস বড় কষ্টের।

    ঝোপ-জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে জোটন দেখল নরেন দাসের বারান্দায় একটা কুপি জ্বলছে। পুবের ঘরে কোনও তাঁতের শব্দ হচ্ছে না। অমূল্য ওদের তাঁত চালায়। অমূল্য বাড়ি গেলে তাঁত বন্ধ থাকে। তাছাড়া সূতা পাওয়া যাচ্ছে না বাজারে। তার জন্যও নরেন দাস রাতে তাঁত বন্ধ করে রাখতে পারে। এখন আর জোটন নলী ভরতে পারছে না। জোটন অনেক কষ্টে একটা চরকা কিনে যখন বেশ দু’পয়সা কামাচ্ছিল, যখন ভাবল হিন্দু বাড়ির বৌদের মতো ছোট একটা কাঁসার থালা কিনে বড়লোক হবে এবং যখন সুতার মোড়া দু’পয়সা থেকে চার পয়সা হয়ে গেল এবং একজন ফকিরকে পোষার ক্ষমতা হচ্ছে তখন কিনা—বাজারে সূতা পাওয়া যাচ্ছে না।

    জোটন জল কাটছিল। দু’হাতে ব্যাঙের মতো জলের ওপর ভেসে ভেসে যাচ্ছে। হাত-পা জলের ভিতর ফুটকরি তুলছে। এই গরমে জলের ঠাণ্ডাটুকু, আকাশের স্বাচ্ছন্দ্যটুকু এবং পুব দিকের বড় চান্দের হাসি জোটনের ভিতর কতদিন পর মাশুল তুলতে বলছে। আকণ্ঠ খেয়ে শরীরে এখন কত রকমের শখ জাগছে। দূরের মাঠে একটা আলোর ফুলকি। সামনে সব পাটের জমি। পাট কাটা হয়ে গেছে—জল স্বচ্ছ। হাওয়ায় জল থইথই করছে চারদিকে। স্বচ্ছ জলে জোটন শরীরের উত্তাপ ঢালছিল—য্যান কতকাল গাজীর গীতের বায়নদারের মতো সূর্যের উত্তাপ না পেয়ে অবসন্ন। সে এসময় একমুখ জল নিয়ে আকাশমুখো ছুঁড়ে দিল। বলল আল্লা, তর দুনিয়ায় আমার কি কামডা থাকল ক’দিনি!

    আকাশে জ্যোৎস্না। জলে শাপলা-শালুক রয়েছে আর মাঠ শেষে আম-জামের ছায়া প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করছে। শাপলাফুলের মতো সে জল থেকে মুখটা তুলে দুটো মান্দার গাছ অতিক্রম করতেই দেখল, গোপাটের বটগাছটার নিচে একটা হারিকেন এবং নৌকার ছায়া। একটা মানুষেরও যেন। সে তাড়াতাড়ি জলের ভিতর হারিয়ে যাবার জন্য ঘাসের বনে শরীর আড়াল করে দিল। কিন্তু পালাবর সময় জলে শব্দ বুঝি একটা মাছ পালাচ্ছে। অথবা বঁড়শীতে, বোয়ালের বঁড়শীতে বড় বোয়াল মাছ আটকে গেছে। মানুষটা নৌকা নিয়ে মাছের খোঁজে এসে দেখল কে এক মানুষের মতো ঝোপে-জঙ্গলে জলের ভিতর ভেসে যাচ্ছে। জোটন তাড়াতাড়ি গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে শ্যাওলার জঙ্গলে শরীর লুকোতে চাইল—কিন্তু পারল না। ওর মুখের ওপর লণ্ঠন তুলে মনজুর বলছে, জোটন তুই।

    জোটন শরমে চোখ বুজে ফেলল। চোখ বুজেই বলল, হ আমি!

    —কই গ্যাছিলি?

    —গ্যাছিলাম ঠাকুরবাড়ি। পথ ছাড়, যাই।

    মনজুর জলের ভিতর ওর অবস্থা বুঝে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সে মুখ ফেরাল না। অথচ বলল আমি ভাবলাম বুঝি বড় একটা মাছ বঁড়শীতে ধরা পড়ছে।

    —আর কিছু ভাবস নাই।

    —আর কি ভাবমু। বলে সে নৌকাটার উপর বসল।

    —ক্যান, অন্য কিছু ভাবন যায় না। তুই ইদিকে ক্যান। বলে জোটন চোখ খুলল। কথাবার্তায় যেন সব সঙ্কোচ কেটে গেছে। দেখল, মনজুর খালি গায়ে। পরনে অত্যন্ত মিহি গামছা। তাও জলে ভিজে খানিকটা উপরে উঠে গেছে। মনজুর কিছুতেই জোটনের দিকে তাকাচ্ছে না। জোটনের ভারি হাসি পেল। তর ত ম্যালা পয়সা। একটা বড় গামছা কিনতে পারস না?

    মনজুর বলল, তুই যা দিনি।

    —যামুনা ত, কি করবি। জোটনের ভিতর ইচ্ছাটা বড় চাড়া দিচ্ছে!

    —কি আবার করমু। সে তার এই পরিস্থিতির জন্য অজুহাত দেখাল। বলল, হাইজাদি গ্যাছিলাম। ওষুধ আনতে। ফিরতে রাইত হইয়া গ্যাল। গোপাটে আইছি বঁড়শীতে মাছ লাগছে কিনা দ্যাখতে। আইয়া দ্যাখি তর এই কাণ্ড। জ্যোৎস্না রাইতে জায়গাটারে আনধাইর কইরা আছস। তর লগে দ্যাখা হইব জানলে তফন পইরা আইতাম

    মনজুর জোটনের সমবয়সী। শৈশবের কিছু ঘটনা উভয়ে এ-সময়ে স্মরণ করতে পারল। একদা শৈশবে এইসব পাটখেতের আলে-আলে ওরা ঘুরে বেড়িয়েছে। জোটন সেইসব স্মৃতির কথা স্মরণ করতে চাইল অথচ সঙ্কোচবোধে কিছু বলতে পারছে না। দু’সালের অধিক এই শরীর জ্বলে-জ্বলে খাঁক্। জোটন কাতর গলায় বলল, পথ দে। যাই।

    —তরে ধইরা রাখছি আমি!

    জোটন এই জল দেখে, রাতের জ্যোৎস্না দেখে এবং আকণ্ঠ ভোজনে কি যে তৃপ্তি শরীরে—জোটন কিছুতেই নৌকা অতিক্রম করে সাঁতার কাটতে পারল না। শরীর ওর ক্রমে কেমন জলের ওপরে ভেসে উঠছিল। জলের ওপর ব্যাঙের মতো যেন একটা সোনালী ব্যাঙ জোনাকি খাবার জন্য জলে ভেসে হাঁ করে আছে। মনজুর কোনও কথা বলছে না দেখে সে-ই বলল, আসমানের চান্দের লাখান তর মুখখান। কিন্তু দেইখা ত এহনে ত মনে হয় অমাবস্যার আনধাইর রাইত। য্যান ডরে শুকাইয়া গ্যাছে।

    —শুকাইয়া গ্যাছে! তরে কইছে।

    মনজুর ওর রুগ্ন বিবির মুখটা স্মরণে এনে কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে পড়ল। দীর্ঘদিন বিবির রুগ্ন শরীর ওর গরম কজের ভিতর জল ছিটাতে পারেনি। শুধু মনজুর জ্বলছে, জ্বলছে। একটা, সাদির যে শখ ছিল না—তা নয়, তবু মনজুর বিবিকে যথার্থই ভালোবাসে। মনজুর অনেক কষ্টে যেন বলল, পারবি আনধাইর রাইত আলো করতে। এবং মনজুর মুখ ফেরাতেই আবার শরীরটাকে জলের ভিতর জোটন ডুবিয়ে দিল। সামনে পিছনে জলজ ঘাস। বেশ আব্রু সৃষ্টি করেছে। জোটন এই জলজ ঘাসের ভিতর মনজুরকে নিয়ে ডুব দিতে চাইল। আর মনজুর সহ্য করতে না পেরে দু’হাতে যেন একটা মরা মাছ নৌকায় তুলে আনছে—টানতে-টানতে নৌকার পাটাতনে তুলে ফেলল।

    কিছুক্ষণ পরে পাটখেতের ফাঁক দিয়ে কেমন একটা কান্নার শব্দ গ্রাম থেকে ভেসে আসতে থাকল। জোটন শুনতে পাচ্ছে, মনজুর শুনতে পাচ্ছে। নৌকোর ওপর কিছু পোকা উড়ছিল। ধানের জমিতে চাঁদের আলো বড় মায়াময়। সুখ অথবা আনন্দ এই পাটাতনে এখন গড়াগাড়ি খাচ্ছে। সব দুঃখ ভেসে যাচ্ছিল জলে, সব উত্তাপ চাঁদের আলোর মতো গলে-গলে পড়ছে। ইচ্ছার সংসারে মনজুর পুতুল সেজে বিবির মরা মুখ দেখতে দেখতে বলল, ক্যাডা ক্যান্দে ল।

    —মনে হয় তগ বাড়ি থাইক্যা আইতাছে।

    —তবে বিবিডা বুঝি গ্যাল।

    জোটন দেখল পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগীর মতো মনজুরের মুখ। সব উত্তাপ এখানে ঢেলে দিয়ে মনজুর হাউহাউ করে কাঁদছে আর নৌকাটা বাইছে।

    .

    কুকুরটাকে ফেলে দিয়ে গেছে কারা। জলের ভিতর ফেলে দিয়ে নৌকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। কুকুরটা আপ্রাণ বাঁচার জন্য জলে সাঁতার কাটছে। কোনওরকমে নাকটা জাগিয়ে রেখেছে জলে। তারপর মনে হল টানমতো জায়গা। কুকুরটা সামান্য উঠে দাঁড়াল। না, দূরে কোনও গ্রাম দেখা যাচ্ছে না। হতাশায় চোখ-মুখ কাতর। শেষ বর্ষা এখন। জল, ধানখেত থেকে পাটখেত থেকে নেমে যাচ্ছে।

    পাগল ঠাকুর তখন নৌকাটাকে আলে আলে টেনে নিচ্ছিলেন। সোনা পাটাতনে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে। ধানগাছ হেলে পড়ছে। শ্রাবণ-ভাদ্রের সেই স্বচ্ছ ভাবটুকু আর নেই। জল ঘোলা। জলে পচা গন্ধ উঠছে। দু’ধারে কাদা জল, শামুক পচা দুর্গন্ধময় জলজ ঘাস। নৌকাটাকে কবিরাজের জমিতে ঢুকিয়ে দিতেই মনে হল একটা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে কাতর চেহারা। কুকুরটা পাগল ঠাকুরকে দেখে বলল, ঘেউ।

    পাগল ঠাকুর দাঁড়ালেন। তারপর পুরানো কায়দায় হাত কচলে বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    কুকুরটা ফের বলল, ঘেউ।

    পাগল ঠাকুর বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    জল কম বলেই আলের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে কুকুরটা। একপাশে দাঁড়িয়ে ওদের যাওয়ার জায়গা করে দিয়েছে। কুকুরের এই ভদ্রতাটুকু পাগল ঠাকুরের ভাল লাগল। তিনি আর তাকে মন্দ কথা বললেন না। তিনি পাশ কাটিয়ে নৌকা টেনে নেবার সময়ই কি মনে হতে পেছনে তাকালেন—কুকুরটা অবোধ বালকের মতো তাকিয়ে আছে। তিনি এবার আদর করার ভঙ্গিতে মুখে এক ধরনের শব্দ করতেই, জলের ভিতর ছপছপ শব্দ তুলে কুকুরটা পাশে এসে দাঁড়াল। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ কুকুরটার মুখে চুমু খেলেন এবং নৌকায় তুলে বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    কুকুরটা পাটাতনের এক পাশে দাঁড়াল। গা ঝাড়ল। তারপর লম্বা হয়ে আড়মোড়া ভাঙল এবং জিভটা বের করে রাখল কিছুক্ষণের জন্য। পাগল ঠাকুর এবং সোনাকে দেখতে দেখতে হাঁপাচ্ছে। কুকুরটা লেজ নাড়ছে অনবরত। মণীন্দ্রনাথ তখন লগি মারছেন।

    মণীন্দ্রনাথ শালুকের ফল তুলে খেলেন। ফল ভেঙে সোনাকে খেতে দিলেন। সোনা শক্ত জিনিস এখনও খেতে পারে না। সে খেতে গিয়ে বিষম খেল। ওর চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তিনি ওকে কোলে নিয়ে একটু আদর করলেন।

    দুটো জমি পার হলে হাসান পীরের দরগা। শীতের শেষে তিনি এখানে ঘুরে গেছেন। তখন পীরের মেলা ছিল, সিন্নি ছিল। গ্রাম পার হয়ে মানুষেরা এসেছিল এবং মোমবাতি জ্বেলে সওদা করে ঘরে ফিরেছিল। এখন কোনও মানুষের সাড়াশব্দ নেই। শুধু ভাঙা-মসজিদ এবং পীরসাহেবের কবরের পাঁচিলে কয়েকটা কাক অনবরত উড়ছে, সোনার কিছুতেই কান্না থামছে না। তিনি এক হাতে সোনাকে বুকে নিয়ে অন্য হাতে লগি বাইতে থাকলেন। হাসান পীরের নির্জন দরগাতে নৌকা ভিড়িয়ে এক সময় ভিতরে উঠে গেলেন।

    কাকগুলি পাঁচিলের উপর চিৎকার করছে। পীরসাহেবের কবরের পাশে পলাশ গাছটা এখনও তেমনি আছে। পাগল মানুষটাকে দেখে কাকগুলি পলাশ গাছটার উপর এসে বসল। ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দূরের মাইনর স্কুলটা দেখা যাচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ হেঁটে-হেঁটে একদা এই বিদ্যালয়ে বিদ্যাভাস করতে আসতেন।

    ভিটেমাটির মতো এই জমিটা উঁচু। কয়েকটা আমগাছ কিছু পাখপাখালি, বেতঝোপ, কাঁকড়া, সাপ এবং মোত্রাঘাসের জঙ্গল নিয়ে পীর সাহেব কবরের নিচে ঘুমোচ্ছেন। বন্যায় জল পীরসাহেবকে ছুঁতে পারে না। তখন অদূরের নদী-নালার কচ্ছপেরা পর্যন্ত নরম মাটির খোঁজে পীরসাহেবের কাছে চলে আসে। ডিম পাড়ার জন্য আশ্রয় চায়, ডিমে তা দেবার জন্য আশ্রয় চায়। অঘ্রাণ মাস, বেলা পড়তে দেরি নেই। সোনা তখনও কাঁদছিল। কুকুরটা ওদের পায়ে পায়ে হাঁটছে। কবরখানায় দুটো একটা পাতা ঝরে পড়ল। হেমন্তের শীত ভাবটা সকল ঘাস পাখি এবং পীরসাহেবের পাঁচিলের গায়ে জড়িয়ে আছে। পাঁচিলের নিচে কতরকমের গর্ত। কবরের বেদী থেকে ভাঙা কাঁচ আলগা হয়ে গেছে।

    মণীন্দ্রনাথ সোনাকে কোলে নিয়ে এই পাঁচিলের চারিদিকে ঘুরতে থাকলেন। কাকগুলি নির্জন নিঃসঙ্গ দরগায় সহসা মানুষ দেখে কেমন ক্ষেপে গেল। ওরা মণীন্দ্রনাথের মাথার উপর ঘুরে-ঘুরে উড়তে থাকল। কতদিন অথবা দীর্ঘ সময় বাদে মণীন্দ্রনাথ পীরসাহেবের দরগাতে এসেছেন, কতদিন অথবা দীর্ঘ সময় বাদে মণীন্দ্রনাথ পীরসাহেবকে গলায় দড়ি দিয়ে মরার কারণটা জিজ্ঞাসা করতে চাইলেন।

    সোনা এখন আর কাঁদছে না। পাগল ঠাকুর সোনাকে ঘাসের উপর শুইয়ে দিলেন। কুকুরটা এতক্ষণ পায়ে-পায়ে ঘুরছিল। মণীন্দ্রনাথ সোনাকে রেখে একটু হেঁটে গেলেন সামনে। কুকুরটা সোনার পাশে বসে থাকল। একটুকু নড়ল না। ঘাসের ওপর শুয়ে সোনা হাত-পা ছড়িয়ে এখন খেলছে। মণীন্দ্রনাথ যেন কোথায় যাচ্ছেন। তিনি পাঁচিলের দরজা টপকে ভিতরে ঢুকে গেলেন এবং বললেন, গ্যাৎচোরে শালা। যেন বলতে চাইলেন, পীরসাহেব, তোমার দরগাতে মেলা বসেছে, তুমি হিন্দু-মুসলমান সকল মানুষের পীর, তুমি গলায় দড়ি দিলে কেন, বলে বেদীটার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং একটা শুকনো ডাল এ সময় অন্য পাশে ভেঙে পড়ায় তিনি দেখলেন, ছাতিম গাছের মগডালে কিছু শকুন বাসা বেঁধেছে।

    পাগল মানুষ বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। বলার ইচ্ছা যেন, পীরসাহেব ভিতরে আছেন? তিনি বেদীটার পাশে বসলেন এবং কান পাতলেন মাটিতে—পীর সাহেবের মুখটা মনে করতে পারছেন, বুড়ো অথর্ব তখন পীরসাহেব। মণীন্দ্রনাথ দূরের বিদ্যালয় থেকে পাঠ নিয়ে ফেরার পথে এই দরগাতে এসে পীরসাহেবের দাড়ি-গোঁফবিহীন মুখটা দেখতেন। এবং সেই পীরসাহেব একদিন কেন যে রাত্রে গলায় দড়ি দিয়ে ছাতিম গাছটায় ঝুলে থাকলেন! হায়! ঈশ্বর জানেন, এমন মানুষ হয় না এবং কথিত ছিল পীরসাহেবের আহারের প্রয়োজন হতো না। পীরসাহেবের হুঁকো-কল্কে কোমরে বাঁধা থাকত। তিনি এই দরগার চারপাশে ঘুরতেন শুধু এবং রাতের অন্ধকারে যখন দূরে দূরে শুধু ইতস্তত গয়না নৌকার আলো, দূরে দূরে সব গ্রাম গভীর মায়ায় আচ্ছন্ন তখন তিনি শাক-পাতা অথবা পুরানো ছাতিম গাছের ডাল বেয়ে উঠে শকুনের ডিম অন্বেষণ করতেন, কচ্ছপেরা এই দরগাতে অথবা খালের ধারে হেমন্তের শেষে, শীতের প্রথমে ডিম পেড়ে রেখে যেত—তাও অন্বেষণ করে ঘরে তুলে রাখতেন।

    এখন আর সেসব শাক-পাতার গাছ এই দরগাতে নেই। হেজে মজে গেছে। বর্ষাকাল গেছে বলেই দরগার চারধারে নানারকমের আগাছার জঙ্গল—কিছু ঘাসের চিহ্ন। নরম ঘাসে সোনা ঘুমোচ্ছে—এই সময় সোনার কথা মনে হওয়ায় তিনি পাঁচিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। যখন দেখলেন সোনা ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমোচ্ছে, কুকুরটা পাহারায় আছে, তখন তিনি ফিরে এলেন। পাঁচিলটার ভিতরের দিকে প্রচুর জায়গা। বড় বড় গর্ত, কবর থেকে যেন ঢাকনা খুলে কারা মানুষ তুলে নিয়ে গেছে। বড় বড় শান পড়ে আছে। শান দিয়ে ঢেকে দিলেই একটা মানুষ গায়েব। কেউ জানবে না শানের নিচে একটা মানুষ আটকা পড়েছে। প্রচুর জায়গা দেখে, ঘর করে এখন কেমন এই দরগায় বসবাসের ইচ্ছা মণীন্দ্রনাথের। মেলার সময় যেখানে মোমবাতি জ্বেলে দেওয়া হয়, পীরসাহবের নামে সিন্নি চড়ানো হয়, সেই জায়গাটুকু শুধু পরিষ্কার। সেই জায়গাটুকুতে দূর্বাঘাস এবং সেই জায়গাটুকুতেই একটা কুঁড়েঘর ছিল, ভাঙা হাঁড়ি কলসি ছিল, কিছু দ্রব্যগুণ ছিল পীরসাহেবের—যার দৌলতে হাসান চোর ফকির হল এবং এক সময় পীর বনে গেল। মালা, তাবিজ নানারকমের হাড় সংগ্রহের বাতিক ছিল হাসানের। গোর দেবার সময় সবই ওর কবরে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন লম্বা বেদীর ওপর শকুনেরা শুধু হাগছেই। কাক এবং অন্য পাখপাখালি—যেমন শালিকের কথাই ধরা যাক, বড় বেশি ভিড় করছে এই দরগাতে। আর এই হাসান পীরই বলেছিলেন, তর যা চক্ষু মণি, চক্ষুতে কয় তুই পাগল বইনা যাবি।

    —কী যে কন পীরসাহেব!

    —আমি ঠিক কথাই কই ঠাকুর। তর সব লিখাপড়া মিছা। পীর-পয়গম্বর হইতে হইলে তর মত চক্ষু লাগে, তর শরীর মুখ লাগে। তর মত চক্ষু না থাকলে পাগল হওন যায় না, পাগল করন যায় না। আর ফোর্ট উইলিয়ামের র‍্যামপাটে বসে পলিন বলত, তোমার চোখ বড় গভীর বড় বিষণ্ণ মণি। ইত্তর আইজ আর গ্লুমি। অথবা বোটানিক্যালের পুরানো বটের ছায়ায় পলিন ববকাটা চুলে বিলি কেটে মিহি ইংরাজিতে উচ্চারণ করত, এস, আমরা দু’জনে একসঙ্গে বসে কীসের কবিতা আবৃত্তি করি। দেয়রস নান আই গ্রীভ টু লিভ বিহাইণ্ড বাট ওনলি, দি’। তখন দূরের নারকেল গাছ অথবা গঙ্গাবক্ষে জাহাজের বাঁশি এবং সমুদ্র থেকে আগত সব পাখিদের পাখার শব্দ উভয়কে অন্যমনস্ক করত। ওরা তখন পরস্পর নিবিষ্টভাবে পরস্পরকে দেখত। কবিতা উচ্চারণের পর পাখির পালকের মতো উভয়ে হালকা এক বিষণ্নতায় ডুবে থেকে কথা বলত না।

    পলিন বলত, চলো এইসব জাহাজে উঠে আমরা অন্য কোনও সমুদ্রে চলে যাই। মণীন্দ্রনাথ এই দরগায় বসে সেই সব স্মৃতিতে এখন কাতর হচ্ছিলেন। তাঁর ইচ্ছার ঘরে পলিন…১৯২৫-২৬ সাল, পলিন তখন তরুণী, প্রথম মহাযুদ্ধে পলিনের দাদার মৃত্যু এবং সেই পরিবারে কোনও রাতের আঁধারে মোমবাতির সামনে যীশুখ্রিস্টের ছবি, হাঁটু গেড়ে পলিনের বসে থাকা—কি সব স্মৃতি যেন বার বার মাথার ভিতর ভেসে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়। মণীন্দ্রনাথ কিছু মনে করতে পারেন না। তাঁর এখন কেবল ভালোমানুষের মতো কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল, ইচ্ছা হচ্ছিল এই দরগার মালিক হাসান পীরকে বলতে, আবার সেখানে ফিরে-যেতে পারি না পীরসাহেব? অথচ কথা বলার সময় সেই এক উচ্চারণ। আর এ-সময় পাখিরা উড়তে থাকল। হেমন্তের রোদ নেমে গেছে। বর্ষার জল এখন জলাজমিতে হাঁটু জলে এসে থেমেছে। ছোট ছোট চাঁদা মাছ, বৈচা মাছ ধানের গুঁড়িতে লেজ নেড়ে শ্যাওলা খাচ্ছে! শীতের এই আমেজ সকল প্রাণী-জীবনে শুভ এক বার্তা বয়ে আনছে। তবু অনেক মোত্রাঘাস পেরিয়ে, অনেক বন-জঙ্গল পেরিয়ে, নদী-নালা অতিক্রম করে শুধু সেই ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ, তার সবুজ মাঠ এবং গম্বুজের মাথায় জালালি কবুতর উড়ছে—মণীন্দ্রনাথ দরগার বেদীতে বসে এখন কেবল দুর্গের মাথায় সূর্য দেখছেন। যেন পলিন সেই সূর্যের আলো এই অবেলায় দরগার মাঠে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

    সোনা বসে নেই, অথবা হামাগুড়ি দিয়ে সোনা এগিয়েও যাচ্ছে না। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কুকুরটা বসে রয়েছে। নড়ছে না। তবুও যেন কেমন ঘুম পাচ্ছে। কুকুরটা চোখ বুজেছিল। মণীন্দ্রনাথ আরও দেখলেন হেমন্তের রোদ খুব সরু হয়ে পাঁচিলের গায়ে লেগে আছে। সোনার জলের মতো এই রেখা চিকচিক করছে। মণীন্দ্রনাথ পলাশের ডাল ফাঁক করে আকাশের ভিতর মাথা গুঁজে দিলেন এবং সেই আলোর জল যেখান থেকে ঝরে পড়ছে, তাকে দুহাতে ধরতে চাইলেন। বড় উষ্ণ মনে হচ্ছে সেই আঁধারকে। সুতরাং লাফ দিয়ে পাঁচিল টপকালেন। তারপর দু’হাত ওপরে তুলে সেই আলোর ঘর সূর্যকে ধরার জন্য ছুটতে থাকলেন। অথচ যত এগোচ্ছেন সূর্য তত ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ঘাস জঙ্গল পার হলেই দরগার জমি শেষ। তিনি ক্রমশ মাঠে নেমে যেতে থাকলেন, মাঠে হাঁটুজল, জল ভেঙে এগুতে থাকলেন—যেন ঐ সূর্য পালিয়ে যাচ্ছে যে রথে, তিনি সেই রথে এখন উঠে যাবেন এবং অশ্বের বল্গা ধারণ করবেন। তারপর সূর্যকে নিয়ে সেই নিরুদ্দেশে, যেখানে পলিন এখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। আর তা যদি না হয় এই সূর্যকে এনে অশ্বত্থের ডালে ঝুলিয়ে দেবেন। এই ধরিত্রীর সব লাঞ্ছনা দূর করতে, অন্ধকার সরিয়ে দিয়ে সূর্যকে ধরে আনবেন। অর্থাৎ তিনি যেন ধরিত্রীকে সব কলুষ-কালিমা থেকে রক্ষা করার জন্য অথবা এক প্রিয় নিদর্শন রাখার জন্য পাগলের মতো ধানখেত, শীতল জল এবং খাল-বিল সাঁতরে যখন ট্যাবার পুকুরপাড়ে উঠলেন তখন দেখলেন সূর্য পলাতকের মতো গাছগাছালির অন্য প্রান্তে নেমে গেছে। তিনি সূর্যকে ওপারে বিলের জলে অদৃশ্য হতে দেখে ভেঙে পড়লেন। পরাজিত সৈনিকের মতো একটা গাছে হেলান দিয়ে যেন বন্দুকের নল হাতে রেখেছেন এমন ভাবের এক ভঙ্গি টেনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। চারপাশে রাতের সব কীটপতঙ্গের আওয়াজ আর তার সঙ্গে অতিদূর থেকে আগত এক শিশুকান্না। তাঁর মাথার ভিতর ফের যন্ত্রণা হতে থাকল। পিছনে যেন কি ফেলে এসেছেন, একেবারেই মনে করতে পারছেন না। এতদূর থেকে কান্না সেই শিশুর, মনে হয় মাঠময় হাজার শিশু উচ্চরোলে কাঁদছে। তাঁর কিছুই মনে পড়ছে না। কর্দমাক্ত পথে তিনি বাড়ি ফিরে যাবেন। পথটা তাঁর খুবই চেনা। চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে, অথচ দূর থেকে আগত শিশুকান্নার জন্য ব্যথিত হচ্ছিলেন। সোনা যে একা বসে বারান্দায় খেলছিল, পাগল-জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে ভাঙা ভাঙা কথা বলছিল এবং তিনি যে তাকে আদর করে নিয়ে পাড়া বেড়াতে বের হয়েছেন, সকলের অলক্ষ্যে নৌকা নিয়ে-সোনা দ্যাখো, কত জমিন মাঠ, এই মাঠ এবং জমির ভিতর তুমি বড় হবে, এই তোমার জন্মভূমি, মায়ের চেয়ে বড়, ঈশ্বরের চেয়ে সত্য এই ঘাস ফুল মাটি–অথচ এখন কিছুতেই সেসব তিনি মনে করতে পারছেন না—কখন ঘর থেকে বের হয়েছেন, কে, কে তাঁর সঙ্গে ছিল।

    কুকুর, সোনা এবং কোষা নৌকাটা দরগার মাটিতে পড়ে থাকল। দরগার মাটিতে হাসান পীরের স্পর্শ ওদের জন্য থাকুক। ছাতিমের ডালে শকুনের আর্তনাদ—এইসব নির্জন নিঃসঙ্গ গ্রামকে ভয় দেখাচ্ছে। আর মণীন্দ্রনাথ ঘরে ফিরেই দেখলেন—সব মানুষ ছোটাছুটি করছে। প্রতিবেশীরা এসে জড়ো হয়েছে। সোনা কি করে নিখোঁজ হয়ে গেছে সংসার থেকে। ধনবৌ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, পাগল মানুষ বাড়ি একা ফিরেছেন, কোষা নৌকা আনেননি। ধনবৌ, বড়বৌ সকলেই কাঁদছিল। অন্ধ মানুষ মহেন্দ্ৰনাথ উঠোনে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মণীন্দ্রনাথ বুঝলেন—বাড়ি থেকে সোনা হারিয়ে গেছে। ওরা সকলে মিলে সোনাকে অন্বেষণ করছে। এবার মণীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে সব মনে করতে পারলেন, ধীরে ধীরে সকলের অলক্ষ্যে জলে নেমে গেলেন। হাঁটুজল ভেঙে যত এগুতে থাকলেন, তত কুকুরের আর্তনাদ স্পষ্ট হতে থাকল। তত তিনি বলতে চাইলেন যেন—হাসান পীর, তুই আছিস, তোর দরগা আছে, আমার সোনা তোর কাছে গচ্ছিত আছে। তিনি অন্ধকার পথে ছুটে চললেন। তিনি জল-কাদা ভেঙে ছুটলেন। তিনি ঘেমে যাচ্ছেন। কাদা জলে মুখ-শরীর ভরে যাচ্ছে। তিনি শুধু এখন কুকুরের ডাক অনুসরণ করে হেঁটে যাচ্ছেন। হাতে কোনও লণ্ঠন নেই—কোনও পরিচিত শব্দ পাচ্ছেন না। থেকে থেকে দূরে শেয়ালের আর্তনাদ। একটা কুকুর কী করে পারবে এত শেয়ালের সঙ্গে। সোনা, সোনারে। কেমন ভালোমানুষের মতো মুহূর্তে আবেগ ভরে ডেকে ফেললেন। আমি তোকে জঙ্গলে ফেলে এসেছি। আর কিছু বলতে পারলেন না। আলো ছিল না, তবু নক্ষত্রের আলোতে তিনি পথ চিনে নিতে পারছেন। অবশেষে তিনি আরও কাছে গিয়ে বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। তিনি জোরে জোরে একই উচ্চারণে ডাকলেন অথচ কুকুরটা কাছে আসছে না। পাঁচিলের কোন এক গহ্বর থেকে কুকুরটা যেন ডাকছে। তিনি ভিতরে ঢুকে দেখলেন, সোনা হামাগুড়ি দিচ্ছে আর কাঁদছে। কুকুরটা পাশে পাশে থাকছে। অনবরত কান্নায় ভেঙে আসছে গলা। শুধু গলাতে এখন একটা হিক্কার শব্দ। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি সোনাকে বুকে তুলে নিলেন এবং আদর করতে থাকলেন। সোনার হাত মুখ স্পর্শ করে, অক্ষত সোনার শরীরের জন্য এক অপার আনন্দ—ধনবৌর মুখ, ব্যথিত সংসার আর কুকুরটাকে কাছে টেনে এক নতুন সংসার-বার বার তিনি কৃতজ্ঞতায় কুকুরটাকে চুম খেয়ে কেমন পাগলের মতো ছুটে গিয়ে কোষা নৌকাটাতে উঠতেই শুনলেন, একদল ধূর্ত শেয়াল পাঁচিলের পাশে হুক্কাহুয়া করছে। তিনি আকাশ এবং দরগার ভাঙা কাচের স্বচ্ছ ভাবকে মথিত করে হেসে উঠলেন। কুকুরকে বললেন, আকাশ দ্যাখো, সোনাকে বললেন, নক্ষত্র দ্যাখো—ঘাস ফড়িং-ফুল-পাখি দ্যাখো, জন্মভূমি দ্যাখো। তারপর নিজে দেখলেন আকাশের গায়ে লেখা রয়েছে—সোনার মুখ, পলিনের চোখ। কুকুরটা পাটাতনে দাঁড়িয়ে নীরবে লেজ নাড়ছে।

  • ছয়

    ছয়

    আরও কিছুকাল পরে। সোনা নিবিষ্ট মনে তরমুজ খেতে বসে মাটি খুঁড়ছিল। বেলে মাটি, সুতরাং সে অনেকটা মাটি তুলে ফেলল। সোনালি বালির চর এখন শুকনো। চর পার হলে নদীর জল পাতলা চাদরের মতো, তিরতির করে কাঁপছে। স্বচ্ছ জলে ছোট ছোট মালিনী-মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। সোনা ছোট একটা নারকেলের মালার সাহায্যে জল নিয়ে এল নদী থেকে। ছোট গর্তটা জলে ভরে দিল। যেহেতু নদীতে হাঁটুজল, পার হয় গরু, পার হয় গাড়ি, সেজন্য হাঁটু জলে নেমে একটা মালিনী-মাছ ধরল সোনা। মাছটা অঞ্জলিতে রেখে সে নদী থেকে প্রথমে গর্তটার সামনে এসে দাঁড়াল। জলে মাছটা ছেড়ে খরগোশের মতো মাথা উঁচু করে দিল তরমুজ-পাতার ভিতর থেকে। দেখল, দূরে ছই-এর নিচে বসে ঈশম দাদা তামাক খাচ্ছে। সোনার প্রতি অথবা তরমুজের প্রতি যেন সে লক্ষ রাখছে। সোনা তরমুজ-পাতার আড়ালে নিজেকে আর একটু ঢেকে ফেলল। ছোট-শরীর সোনার। শরীরের রঙ বালির চরের মতো। সোনার পা খালি এবং এটা বসন্তকাল। নদীর চর থেকে বসন্তকালীন হাওয়া উঠে আসছে। বাতাস জোর বইছিল বলে তরমুজের পাতা ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য পাতার ফাঁকে সোনার শরীর স্পষ্ট। পাতার ফাঁকে সোনাকে নিবিষ্ট মনে বসে থাকতে দেখে ঈষৎ চিন্তিত হল ঈশম। সে ভাবল—সোনাডা আবার বইসা বইসা তরমুজের লতা উপড়াইতাছে না ত! সে ছই-এর ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হল। ডাকল, সোনা কর্তা কই গ্যালেন?

    সোনা তাড়াতাড়ি পাতার ভিতর আরও লুকিয়ে গেল। প্রথমত, সে একা একা বাড়ি থেকে এ জগতে চলে এসেছে, দ্বিতীয়ত, সে একটা গর্ত করে নদী থেকে জল এনে পুকুর তৈরি করছে। পুকুর তৈরি করতে গিয়ে দুটো তরমুজের লতা উঠে এসেছে। এসব অপরাধবোধ ওর মনে কাজ করছে। সে একবার পাতার ফাঁক দিয়ে মাথা উঁচু করে দেখল, ঈশম তাকে খোঁজবার জন্য এদিকেই আসছে। সোনা তাড়াতাড়ি পাতার ফাঁকে মাটির সঙ্গে মিশে হামগুড়ি দিতে থাকল। ঈশম যত ওর দিকে এগিয়ে আসছে তত সে পাতার আড়ালে উপরে উঠে যব খেতের ভিতর ঢুকে গেল এবং চুপচাপ বসে থাকল।

    ঈশম যেখানে সোনাকে বসে থাকতে দেখেছিল এখন সেসব জায়গা নির্জন। দুটো তরমুজের লতা উপড়ানো। একটা ছোট গর্তে কিছু জল এবং একটা মালিনী-মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। জলটা ক্রমশ কমে আসছে। মাছটা যেন উঁকি দিয়ে ঈশমকে দেখতে পেয়ে জলের ঘোলাটে অন্ধকারে লুকাল। ঈশম ফের ডাকল, সোনা কর্তা আমার, কই গ্যালেন?

    যেখানে নদীর পাড় ক্রমশ উঁচু হয়ে গ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে সেখানে যবের খেত, গমের খেত। খেত পার হলে গোপাট। কবিরাজবাড়ি। নীল রঙের ডাকবাকস। এখন যব গম কাটার সময়। কিছু গাঙশালিক যব গম খেতে উড়ছে। ঈশম ফের ডাকল সোনা কর্তা, কই গ্যালেন গ! আমি আপনের লগে পারি! আইয়েন কর্তা, আইলে কান্দে লইয়া নদী পার হমু।

    সোনা ডাক শুনতে পেল কিন্তু আড়াল ছেড়ে এতটুকু নড়ল না। ঈশমের সঙ্গে এখন ওর পলান্তি খেলার শখ যেন। সে যব খেতের ভিতর আরও ঘন হয়ে বসল। সে বসে বসে শুকনো ঘাস ছিঁড়তে থাকল। যব গাছ নড়ছিল। ঈশম জমির আল থেকে টের করতে পারছে সব। সে দ্রুত হেঁটে এসে যব খেতে ঢুকে সোনাকে সাপটে ধরল এবং বলল, এহনে যাইবেন কইগ কৰ্তা?

    সোনা হাত ছুঁড়ছিল যব খেতের ভিতর। ওর চিৎকারে যব গম খেত থেকে সব গাঙশালিক বিকেলের রোদে উড়ে গেল। ওরা উড়ে উড়ে নদীর চরে নেমে গেল। সোনা বলল, না যামু না। আমারে ছাইড়া দ্যান।

    —আপনারে আমি কিছু কইছি? আইয়েন আমার লগে। ছই-এর নিচে বসুম, আসমান দ্যাখমু। বলে, সোনাকে কাঁধে তুলে হাঁটতে থাকল ঈশম

    সোনার এখন আর পরাজিত ভাবটুকু নেই। সে কাঁধে পা দোলাতে থাকল। সোনালী বালির নদীতে জল, কিছু নৌকা, কিছু গ্রামের মানুষ দেখল সোনা। বসন্তের বাতাস এখন যব, গম খেতে ঢুকে অদৃশ্য হচ্ছে। নদীর পাড় ধরে যত দূর চোখ গেল শুধু যব গমের পাকা শীষ, কিছু হিজল গাছ এবং তার পাতা গাছের নিচে বিছানো শতরঞ্জের মতো। সোনা বলল, রাইতে আপনের একলা ডর করে না?

    —না গ কর্তা! আল্লা ভরসা। ডরে ধরলে আল্লার নাম লই।

    —নিশিতে যদি ধইরা লইয়া যায়?

    —আমারে নিব না।

    —নিব, দেইখেন। নিশিতে ধরলে আপনে ট্যার-অ পাইবেন না।

    —আমাকে নিব না। নিশি ব্যাডা আমার মিতা।

    —তবে মায় যে কয়, তুমি একলা কোনখানে যাইঅ না সোনা। নিশিতে ধইরা লইয়া যাইব-অ। নিশি নাকি ইচ্ছা করলে মার মত হইতে পারে, আপনের মত হইতে পারে।

    —তা হইতে পারে।

    —আমি আর কোনখানে যামু না।

    —আর যাইয়েন না।

    এবার সোনা ঈশমের মুখ দেখার চেষ্টা করল। চারপাশে মাঠ। ওর নানা রকমের ভয়ডরের কথা মনে হল। যবের শীষ ওর শরীরে লাগছে। ওর শরীর চুলকাচ্ছিল। ঈশমের কাঁধ থেকে নেমে সোনা তরমুজ খেতের ভিতর ঢুকে গেল। সে বলল, আমি একলা যামু না বাড়িতে। আপনের লগে যামু ঈশম দাদা। তারপর সে তার প্রিয় মাছটিকে খুঁজতে থাকল। ঈশমকে বলল, আপনে যান ছই-এর ভিতর, আমি পরে আইতাছি। সে একটা তরমুজের ওপর বসে গর্তের ভিতর মাছটাকে খুঁজতে থাকল। জলের নিচে মাছাটা এখন লুকোচুরি খেলছে। সে গ্রামের দিকে তাকাল, বেলা পড়ে আসছে। তরমুজ গাছের ফাঁকে ফাকে রোদ জলের রেখার মতো বেয়ে বেয়ে নামছে। সে দেখল একটা বড় তরমুজ, পাতার উপরে উঠে গেছে। সে দীর্ঘ সময় নদীর জলে সূর্যের আলো পড়তে দেখল। সে দীর্ঘ সময় বড় তরমুজটার ওপর বসে আকাশের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে মেঘের ছায়া দেখল এবং বিচিত্র রকমের সব পাখিদের গ্রামের দিকে উড়ে যেতে দেখল। ওর এখন উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ঈশম বার বার ছই-এর ভিতর থেকে ডাকছিল। তামাকের গন্ধ এদিকে নেমে আসছে, কিছু বালিহাঁসের শব্দ পেল সোনা, তবু সে উঠল না। সে নিবিষ্ট মনে নদীর চর দেখছে। বড় নির্জন এই অঞ্চলটা। একটা ভালুকের মুখ সে যব গমের খেতে দেখতে পেল। সে তাড়াতাড়ি ছই-এর দিকে হেঁটে যাবার সময়েই মনে করতে পারল ভালুকের মুখটা ছবির বইয়ে দেখা। সুতরাং ভীত হবার মতো কোনও ঘটনাই যেন নেই। ছই-এর ভিতর ঢুকে সোনা বলল, নিশি ব্যাডা আমার-অ মিতা। আমি কেয়রে ডরাই না।

    সোনা ছই-এর নিচে ঢুকে কিছুক্ষণ লাফালো। মাচানের নিচে মালসাতে তামাক খাবার জন্য ঈশম আগুন ধরে রেখেছে। ধোঁয়া উঠছিল।—বাইরে আইয়া বসেন, আসমানের নিচে কত সুখ দ্যাখেন। ঈশম বলল।

    ঈশম পা ছড়িয়ে বসল। তরমুজ খেতে সোনা ওর কোলে বসে বলল, আমারে যে কইলেন কান্দে কইরা নদী পার করব্যান, কই করল্যান না-ত! দীর্ঘকাল থেকে সোনার নদী পার হবার ইচ্ছা। কিন্তু ঈশম ওর কথায় রা করল না বলে মনে মনে অভিমান হতে থাকল। দূরে দূরে নদীর জল পাতলা চাদরের মতো কাঁপছিল। দু’জন বোরখা গরা বিবিকে দেখল নদীর পাড় ধরে যব গম খেতের ফাঁকে চরে নেমে আসছে। সে এবার যথার্থই ভীত হল। সে এবার ঈশমের কাছে খুব ঘন হয়ে বসল। ঈশম দাদার সেই সব ভূতের গল্প মনে পড়ছে—দু’চোখ সাদা, অন্য কোনও অবয়ব নেই। রাত্রিবেলা মায়ের বর্ণিত সেই সব রাক্ষস খোক্কোসেরা বালির চরে সন্তর্পণে নেমে আসছে যেন! সে খুবই কাতর গলায় বলল, ঈশম দাদা আমি মার কাছে যামু।

    —যাইবেন, আমার লগে যাইয়েন।

    —না, আমি এখন যামু

    দু’জন বোরখা পরা বিবি নদীতে নেমে যাচ্ছে। পিছনে নয়াবাড়ির বড় মিঞা। সে বুঝল বড় মিঞার দুই বিবি। সুতরাং সে হাত তুলে ডাকল, অঃ বড় মিঞা, বড় মি…ঞা। বড় মিঞাকে ধরবার জন্য সে সোনাকে কাঁধে নিয়ে তরমুজ খেত অতিক্রম করতে থাকল।

    নদীর পাড় ধরে বড় মিঞা এগিয়ে আসছে। ঈশম এখন বালির চর অতিক্রম করছে। এইসব ঘটনায় সোনা ভীত এবং বিব্রত। সে শুধু বলছে আমি যামু না, মার কাছে যামু। অথচ সে দেখল ঈশমের গলার আওয়াজে সেই অবয়বহীন কালো রঙের বোরখা দুটো পুতুলের মতো স্থির। সে বুঝল, ক্রমশ ওরা পরস্পর পরস্পরের সম্মুখীন হচ্ছে। সে আবার বলল, আমার ডর করতাছে, আমি বাড়ি যামু।

    ঈশম বলল, অঃ বড় মিঞা, ইট্টু খাড়ও। তোমার বিবিগ দ্যাখাইয়া লইয়া যাও। বোরখা পইরা যাইতাছে দেইখা সোনা কর্তার ডরে ধরছে।

    বড় মিঞার কুৎসিত বীভৎস মুখ; বসন্তের দাগ মুখে, একটা চোখ সাদা এবং মৃত।

    সোনা এবার ঈশমকে খুব শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল। বলল, আমি দুষ্টামি করমু না। আমারে ছাইড়া দ্যান।

    সোনার এমন কথায় বড় মিঞা না হেসে পারল না। বলল, ধনকর্তার পোলা?

    —হ! ঈশমও হাসল। ডরান ক্যান। আপনেগ পুরান আমলের চাকর।

    এখন সোনালী বালির নদীর জলে সূর্যের শেষ আলো সোনার রাজহাঁসের মতো দেখাচ্ছে। সেই কালো অবয়ব-বিহীন বস্তু দুটো নীরব এবং নিশ্চল, যেন কোনও জাদুকরের মন্ত্রগুণ এই দুই অপরিচিত প্রেতাত্মাকে বেঁধে রেখে ভূতের খেলা দেখাচ্ছে। সোনা ঈশমকে শেষবারের মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল—সার্কাসে সিংহের খেলা দেখার মতো এক অযাচিত ভয়, রোমাঞ্চকর সব দৃশ্য। বিসদৃশ অবয়ব- -বিহীন অন্ধকার রঙের বস্তু দুটো এগিয়ে আসছে।

    ঈশম বলল, এইবার তোমার দুই লবেজান বিবিরে দ্যাখাও। সোনাকর্তার ডরডা ভাঙাইয়া দ্যাও দ্যাখছ মুখে রা নাই।

    চারিদিকে গমের খেত। পাড়ে পাড়ে লটকন গাছ আর তেমনি গাছে গাছে নীলকণ্ঠ পাখিদের মতো শালিকেরা আশ্রয় নিয়েছে। কিচিরমিচির শব্দ। দূরে গাভীর ডাক। সূর্যের আলো তেমনি যেন সোনার রাজহাঁস। সেই আশ্চর্য বিস্ময়মুগ্ধ প্রকৃতির নীরবতার ভিতর বড় মিঞা তার দুই বিবির বোরখা তুলে দিল—আশ্চর্য মুখ এবং পাতলা গড়ন যুবতীদের—বড় মিঞার দুই বিবি—দুগ্‌গা ঠাকুরের মতো মুখ, গড়ন, নাকে নথ এবং পায়ের মলে ঝমঝম শব্দ। সোনার কাতর চোখ দুটো এখন নদীর জলে আঁধার রাতে নৌকার আলো যেন—বিস্ময়ে চকচক করছে।

    ছোট বিবি বলল, আইয়েন কর্তা, কোলে আইয়েন। বলে ঈশমের কোল থেকে সোনাকে নিজের কোলে তুলে নিল এবং মুখের কাছে মুখ রেখে বলল, কি দ্যাখতাছেন বড় বড় চক্ষু দিয়া?

    সোনা কোনও জবাব দিতে পারল না। সে ছোট বিবির মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঈশমকে দেখল। ঈশম এখন বড় মিঞার সঙ্গে ফসলের গল্প করছে।

    বড় বিবি বলল, কর্তা, চলেন আমাগ লগে।

    সোনা চোখমুখ বুজে বলল, না।

    সোনা ফের ছোট বিবির মুখের দিকে তাকালে, বলল, আমারে আপনের খুব পছন্দ লাগছে। হা গ বড় মিঞা, সোনা কর্তায় য্যা আমারে নজর দিতাছে। বলে খিলখিল করে হেসে উঠল।

    হাসি শুনে ঈশম বলল, তর হাসিডা আগের মতই আছে। সহসা মনে পড়ার ভঙ্গিতে ঈশম বলল, জাবিদা, তর ম্যায় ক্যামন আছে ল?

    —ভালই আছে ভাইসাব।

    ছোট বিবি সোনার চিবুক ধরে বলল, কর্তা, আমারে নিকা করতে হইলে গালে বড় বড় দাড়ি রাখন লাগব। দাড়ি না হইলে শখ মজাইতে পারবেন না। বড় বড় চক্ষু হইছে, ভারি ভারি নাক মুখ হইছে, নদীর চরের মত শরীরের রঙ হইছে—সব হইছে গ করতা, বড় খুবসুরত হয়েছেন। কিন্তু দাড়ি নাই গ গালে। বলে আড়চোখে বড় মিঞার দিকে তাকাল। বড় মিঞার মৃত চোখটা পর্যন্ত এমন কথায় সজাগ হয়ে উঠল। ছোট বিবির চোখে তখন মানিক জ্বলছিল। হেসে বলল, ডর নাই। এবং সোনাকে বুকের সঙ্গোপনে রেখে ভাবল; আল্লা, সোনা কর্তার মত একডা পোলা দ্যান।

    বড় মিঞা বলল, যাই ঈশম ভাই। ব্যালা পইড়া গ্যাছে। ঘরে ফিরতে রাইত হইব। সময় পাইলে যাইয়েন।

    ছোট বিবি বলল, ভাইসাব, ন্যান আপনের কর্তারে। বলে ছোট বিবি সোনাকে নিচে নামিয়ে রেখে মুখে বোরখা নামিয়ে দিল। তারপর ওরা চলতে থাকল। ওরা নদীতে নেমে যাচ্ছে। ওরা জল অতিক্ৰম করে ওপারে উঠে গেল। বড় মিঞা আগে, ছোট বিবি বড় বিবির পিছনে এবং সঙ্গে যেন ওদের রোদের ছায়া হেঁটে যাচ্ছে। সোনা ঈশমের হাত ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। বড় বিবির প্রতিবিম্ব জলে ভাসছে। ওরা নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল—ওরা সরে যাচ্ছে ক্রমশ। সোনার কষ্ট হতে থাকল—বড় বড় চোখ, দুগ্‌গা ঠাকুরের মতো নাকমুখ, নাকে নথ, পায়ে খাড়ু, এখনও ঝমঝম শব্দটা কানে বাজছে। তারপর সেই ছবির ভালুকটা আবার চোখের ওপর ভেসে উঠল। সে ঈশমকে বলল, মায় কইছে আমারে একটা বন্দুক কিনা দিব।

    ঈশমও যেন এতক্ষণে কী সব ভাবছিল। বড় বিবির যৌবনকাল অথবা অন্য কোনও প্রিয় ঘটনা ওকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক করে রেখেছিল। এবং এও হতে পারে…সূর্য ডুবছে, গাভীসকলের শব্দ এখন শোনা যাচ্ছে না, ঘাস নিয়ে মাঠ থেকে কামলা ফিরছে, সুতরাং ঘরে ফেরার সময় হলেই পঙ্গু বিবির কথা মনে হয়। বড় মিঞার কপালে সুখ, দুই বিবিকে নিয়ে ঘরে ফিরছে। তখন সোনা বলছে, বন্দুকটা দিয়া আমি একটা ভালুক মারমু।

    ঈশম এবারও কোন জবাব দিল না। সে সোনার হাত ধরে তরমুজ খেতের ভিতর ঢুকে গেল। কয়েকটি বড় বড় তরমুজ তুলে ছই-এর ভিতর রেখে দিল, তারপর ঝাঁপ বন্ধ করে বলল, লন যাই।

    সোনা মাচানের নিচে নেমে বলল, আমারে কান্দে লইয়া নদী পার হইবেন না?

    আইজ থাকুক। সন্ধ্য হইয়া আইতাছে, ধনমামি খোঁজাখুঁজি করব। তাড়াতাড়ি লন, বাড়ি যাই।

    তরমুজ খেত অতিক্রম করতেই সোনার মনে পড়ল ওর প্রিয় মালিনী-মাছটা একা পড়ে আছে তরমুজের জমিতে। সে বলল, ইট্টু খাড়ন, মাছটারে নদীর জলে ছাইড়া দিয়া আসি।

    সোনা লাফ দিয়ে তরমুজের পাতা এবং ফল ডিঙিয়ে গেল। সে খুঁজে খুঁজে নির্দিষ্ট জায়গাটুকু খুঁজে পেল না, তখন হতাশ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকল তরমুজের জমিতে। ঈশম বার বার ডেকেও সাড়া পেল না। কাছে এলে কেমন ভারি গলায় সোনা বলল, মালিনী-মাছটারে পাইতাছি না।

    ঈশম সোনার হাত ধরে গর্তটার সামনে নিয়ে দাঁড় করাল। গর্তটাতে এখন জল নেই। মালিনী-মাছটা বালি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সোনা গর্তটার পাশে বসল। হাতের তালুতে মাছটাকে রেখে উল্টে পাল্টে যখন যথার্থই বুঝল মাছটা মরে গেছে, কেমন এক শোকার্ত চোখ নিয়ে চারদিকে তখন তাকাতে থাকল। ওর উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না এখন। মালিনী-মাছের চোখ ওকে পীড়িত করছে অথবা যেন ছোট বিবির মুখ….সে এবার ধীরে ধীরে মাছটাকে বালি মাটিতে শুইয়ে দিল। পাড়ের মাটি দিয়ে শরীর মুখ ঢেকে দিল। এবং একটা ছোট্ট তরমুজ পাতা ছিঁড়ে ওর কবরের ওপর ছাউনির মতো করে রেখে দিল। তারপর ঈশ্বরের কাছে ছোট এই মাছের জন্য প্রার্থনা করার সময় দেখল, যব গম খেতের ফাঁকে বড় মিঞা তার সাদা মৃত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। যেন বলছে, হাউ মাউ কাউ মানুষের গন্ধ পাঁউ। অথচ সোনা দেখল সেই এক মাঠ–যব গম খেত, চরের বালিতে তরমুজের ঘন রঙ এবং নদীর জলে অবেলার শেষ রোদ আর নদীর ওপার থেকে বড় নিঃশব্দে সেই একটি মৃত চোখ–মুখে দাড়ি নিয়ে এগিয়ে আসছে। সুতরাং সব ফেলে ঈশমকে ফেলে চরের জমি ভেঙে কেবল ছুটতে থাকল সোনা। কেবল মনে হচ্ছে ওকে নিশিতে পেয়েছে। নিশির ডাকে সে এই সব নির্জন জায়গায় চলে এসেছে। সে ঈশমকে পর্যন্ত গরুর ছানা ভেবে এই অপরচিত জায়গা থেকে পালাতে চাইল। সে ছুটছে—ছুটছে। কিন্তু বেশি দূর ছুটতে পারল না। যব গম খেতের আলে পথ হারিয়ে ফেলল। ওর ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। সে জোরে কাঁদতে পারল না পর্যন্ত। সে ভয়ে বিবর্ণ। চারদিকে যব গমের শীষ এবং তার শরীর দেখা যাচ্ছে না।

    সে ভয়ে চোখ বুজে যখন পথ খুঁজছিল, যখন যথার্থই অন্ধকার নেমে গেছে মাঠে এবং আশেপাশে শেয়ালেরা ডাকতে আরম্ভ করেছে, তখন ঈশম সোনাকে বুকের কোমল উষ্ণতায় ভরে দিল। বলল, কর্তা, আপনে আমারে ফালাইয়া যাইবেন কই?

    এবার চোখ খুলল সোনা। দেখল সেই পরিচিত জায়গা, সেই প্রিয় বকুল গাছ…গাছের ছায়ায় অজস্র বকুল ফুলের গন্ধ। সোনা এবার নির্ভয়ে বলল, আমি কোনখানে যামু না ঈশম দাদা। আপনেরে রাইখা কোনখানে যামু না।

  • সাত

    সাত

    ক্রমে কিছু সময় গেল। কিছু বছর কেটে গেল।

    মাঠের শেষ শস্যকণা ঘরে উঠে গেছে। এখন চৈত্রের মাঝামাঝি

    মাঠ এখন ধু-ধু করছে। শুকনো জমিতে হাল বসছে না। সর্বত্র চাষবাসের একটা বন্ধ্যা সময়। যতদূর চোখ পড়ছে, সমানে সাদা ধোঁয়াটে ভাব। শুকনো কঠিন জমি পাথরের মতো উঁচু হয়ে আছে। পাখ-পাখালি যেন সব অদৃশ্য অথবা সব জ্বলে পুড়ে গেছে। মনেই হয় না এই সব জমিতে সোনার ফসল ফলে, মনেই হয় না এখানে কোনও দিন বর্ষায় প্লাবন আসে। ঝোপ-জঙ্গল ফাঁকা ফাঁকা। গরিব দুঃখীরা ঝরাপাতা সংগ্রহ করছে। মুসলমান চাষীবৌরা এইসব ঝরাপাতা সংগ্রহের সময় আকাশ দেখছিল।

    জোটনও আকাশ দেখছিল কারণ তার এখন দুর্দিন। ফকিরসাব সেই যে নাস্তা করে পাঁচ বছর আগে সিন্নির নাম করে চলে গেছে আর ফিরে আসেনি। আবেদালিও আকাশ দেখছিল কারণ চাষবাসের কাজ একেবারেই বন্ধ। নৌকার কাজ বন্ধ। গয়না নৌকার কাজ শীতের মরশুমেই বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে নতুন শাক-পাতা মাটি থেকে বের হবে, সেজন্য জোটন আকাশ দেখছিল। বৃষ্টি হলে চাষবাসের কাজ আরম্ভ হবে, সেজন্য আবেদালি আকাশ দেখছিল। এই অঞ্চলে আকাশ দেখা এখন সকলের অভ্যাস। কচি কচি ঘাস, নতুন নতন পাতা এবং ভিজে ভিজে গন্ধ বৃষ্টির—আহা মজাদার গাঙে নাইয়র যাওয়ানের লাখান। জোটন বলল, বর্ষা আইলে আবেদালি তুই আমারে নাইয়র লইয়া যাবি?

    আবেদালি বলল, তর নাইয়র যাওনের জায়গাটা কোনখানে!

    —ক্যান, আমার পোলারা বাইচা নাই?

    —আছে, তর সবই আছে। কিন্তু কে-অ তরে খোঁজ-খবর করে না।

    জোটন আবেদালির এই অপমানকর কথার কোনও উত্তর দিল না। গতকাল আবেদালির কোনও কাজ ছিল না। আজ সারাদিন হিন্দুপাড়া ঘুরে ঘুরে একটা কাজ সংগ্রহ করতে পারেনি। এখন চৈত্র মাস। সব কিছুতে টান পড়েছে। আবেদালি, গৌর সরকারের শণের চালে নতুন শণ লাগিয়ে দিয়েছে। যা মিলবে—সামান্য যা কিছু। সে পয়সার কথা বলেনি। আবেদালি সারাটা দিন কাজ করেছে—যেহেতু কামলার সংখ্যা প্রচুর এবং মুসলমান পাড়াতে রুজিরোজগার বন্ধ, যার গরু আছে সে দুধ বেচে একবেলা ভাত, অন্য বেলা মিষ্টি আলু সেদ্ধ খাচ্ছে। আবেদালির গরু নেই, জমি নেই, শুধু গতর আছে। গতর বেচে পর্যন্ত পয়সা হচ্ছে না। সারাদিন খাটুনির পর গৌর সরকারের সঙ্গে পয়সা নিয়ে বচসা হয়ে গেল। কুৎসিত গাল দিয়ে চলে এসেছে আবেদালি।

    আবেদালির বিবি জালালি তখনও পেট মেঝেতে রেখে পড়ে আছে। সারাদিন কিছু পেটে পড়ে নি। জব্বর আসমানদির চরে গান শুনতে গেছে।

    জালালি পেট মাটিতে রেখেই বলল, পাইলা নি?

    আবেদালি কোনও উত্তর করল না। সে তার পাশ থেকে ছোট পুঁটুলিটা ঢিল মেরে মেঝেতে ছুঁড়ে দিল! সামনে জোটনের ঘর। ঘরের ঝাঁপ বন্ধ। জালালি পুঁটিলিটা দেখতে পেয়েই তাড়াতাড়ি উঠে বসল। এবং দাঁড়িয়ে খোলা কাপড়ের গিঁট ফের পেটে শক্ত করে বাঁধল। আবেদালি অন্যমনস্ক হবার জন্য হুঁকো নিয়ে বসল। আর জালালি ঝরাপাতা উঠানে ঠেলে ঘোলা জলে পাতিল হাঁড়ি খলখল করে ধুতে গেল।

    আবেদালি কতক্ষণ হুঁকো খাচ্ছিল টের পায়নি। সে দেখল উনানের ওপাশে বসে জালালি হাঁড়িতে চাল দিচ্ছে। ওর খাটো কাপড়। দু হাঁটুর ভিতর দিয়ে পেটের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। শালী, মাগীর বড় পেট ভাসাইয়া রাখনের অভ্যাস। শরীর দেয় না আর। তবু এই ভাসানো পেট আবেদালিকে কেমন লোভী করে তুলছে। আবেদালি বেশিক্ষণ বিবিকে এভাবে বসে থাকতে দেখলে কখনও কখনও কলাইর জমি অথবা একটা ফাঁকা মাঠ দেখতে পায়। সে ফের নিজেকে অন্যমনস্ক করার জন্য বলল, জব্বাইরা গ্যাল কোনখানে? কাইল থাইকা দ্যাখতাছি না।

    জালালি আবেদালির দুষ্ট বুদ্ধি ধরতে পারছে যেন। সে বলল, জব্বাইরা গুনাই বিবির গান শুনতে গ্যাছে। কাঠের হাতা দিয়ে ভাতের চালটা নেড়ে দেবার সময় জালালি বলল, গুনাই বিবির গান শুনতে আমার-অ ইসছা হয়।

    এত অভাবের ভিতরও আবেদালির হাসি পাচ্ছে। এত দুঃখের ভিতর আবেদালি বলল—পানিতে নদী-নালা ভাইসা যাউক, তখন তরে লইয়া পানিতে ভাইসা যামু।

    জালালির এইসব কথাই যেন আবেদালির ছাড়পত্র। মাঠে নামার অথবা চাষ করার ছাড়পত্র।

    আবেদালির দিদি জোটন এতক্ষণ দাওয়ায় বসে সব শুনছিল। এত সুখের কথা সে সহ্য করতে পারছিল না। সে সন্তর্পণে ঝাঁপটা আরও টেনে চুপচাপ বসে থাকল। কোনও কর্ম নেই—শুধু আলস্য শরীরে। শার চুলের গোড়া থেকে চিমটি কেটে কেটে উকুন খুঁজছিল। আর জালালির এত সুখের কথা শুনেই যেন চুলের গোড়া থেকে একটা উকুনকে ধরে ফেলতে পারল। জোটনের মুখে এখন প্রতিশোধের স্পৃহা—মান্দার গাছের নিচে মনজুরের মুখ ভেসে উঠল। উকুনটাকে দু’নখের ভিতর রেখে ঝাঁপের ফাঁকে উঁকি দিতেই দেখল, উঠানের অন্য পাশে আবেদালি। জালালিকে সে সাপ্টে যেন বাঘ ঘাড় কামড়ে অথবা থাবার ভিতর শিকার নিয়ে পালাচ্ছে। জালালি লতার মতো দু’পায়ের ফাঁকে ঝুলে আছে। এখন চৈত্র মাস বলে কথায় কথায় ঘূর্ণি ঝড়। ধুলো উড়ে এসে ঝাপটা মারল—উঠোন অন্ধকার হয়ে ওঠায় ঘরের ভিতর আবেদালি কি করছে শিকার নিয়ে, দেখতে পেল না। সে রাগে দুঃখে এবার মাঠের ভিতর নেমে ধুলোর ঝড়ে ডুবে গেল।

    চৈত্র মাস সুতরাং রোদে খাঁ-খাঁ করছে মাঠ। পুকুরগুলিতে জল নেই। একমাত্র সোনালী বালির নদীর চরে পাতলা চাদরের মতো তখনও জল নেমে যাচ্ছে। মসজিদের কুয়োতে জল নেই। গ্রামের দুঃখী মানুষেরা অনেকদূর হেঁটে গিয়ে জল আনছে। সোনালী বালির নদীতে ঘড়া ডুবছে না। নমশূদ্রপাড়ার মেয়ে-বৌরা সার বেঁধে জল আনতে যাচ্ছে। ওরা খোঁড়া দিয়ে জল তুলছে কলসিতে। ট্যাবার পুকুরে, কবিরাজ বাড়ির পুকুরে, ঘোলা জল। গরু নেমে নেমে জল একেবারে সবুজ রঙ হয়ে গেছে। বড় দুঃসময় এখন। সে বের হবার মুখে কলসি নিয়ে বের হল। সোনালী বালির নদী থেকে এক ঘড়া জল এনে হাজি-সাহেবের বাড়িতে উঠে যাবে। বুড়ো হাজি সাহেবের জন্য এত কষ্ট করে জল বয়ে আনলে কিছু তেলকড়ি মিলতে পারে—পয়সা না হোক, এক কোনকা ধান। সে নেমেই দেখল মাঠে কারা যেন ছুটে ছুটে যাচ্ছে। একদল লোক খাঁ-খাঁ রোদের ভিতর দিয়ে পালাচ্ছে। ওদের মাথায় বোধ হয় ওলাওঠার দেবী। বিশ্বাসপাড়াতে ওলাওঠা লেগেছে। সে এতদূর থেকে মানুষগুলিকে স্পষ্ট চিনতে পারছে না।

    মাঠে পড়েই জোটনের মনে হল—জালালি এখন উদোম গায়ে ঘরের ভিতর। উনানে ভাত সেদ্ধ হচ্ছে। পাতা, খেড় অথবা লতাপাতায় আগুন ধরে গেলে আগুন লাগতে কতক্ষণ! নদীর দিকে হেঁটে যাবার সময় জোটনের এমন সব দৃশ্য মনে পড়ছিল। চৈত্র মাসে আগুন যেন চালে বাঁশে লেগেই থাকে। জোটনের মন ভাল ছিল না, সেজন্য দ্রুত হাঁটছে। সকলেই জল নিয়ে ঘরে ফিরছে, তাকেও তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। গ্রামে গ্রামে ওলাওঠা মহামারীর মতো। যেসব লোক রোদের ভিতর পালাচ্ছিল তারা ক্রমশ জোটনের নিকটবর্তী হচ্ছে। একেবারে সামনা-সামন্তি। জোটন তাড়াতাড়ি পাশে কলসি রেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। গাধার পিঠে ওলাওঠা দেবী যাচ্ছেন। মাথায় করে মানুষরা ঢাকের বাদ্যি বাজাতে বাজাতে নিয়ে যাচ্ছে। জোটন ওদের পিছন পিছন বেশিদূর গেল না। সড়কের ধারে সব মান্দার গাছ। মান্দার গাছে লীগের ইস্তাহার ঝুলছে। জোটন সেই মান্দার গাছের ছায়ায় গ্রামের দিকে উঠে গেল।

    পথে ফেলু শেখের সঙ্গে দেখা। ফেলু বলল, জুটি, পানি আনলি কার লাইগ্যা?

    জোটন থুতু ফেলল মাটিতে। মানুষটার সঙ্গে কথা বললে গুনাহ। মানুষটা এক কোপে আনুর মরদকে কেটে এখন আন্নুকে নিয়ে ঘর করছে। একদিন বসে বসে আবেদালিকে এইসব গল্প শুনিয়েছে—মানুষটার বুকের কি পাটা? ভয়ডর নাই। সামসুদ্দিনের সঙ্গে এখন লীগের পাণ্ডাগিরি করছে।

    জোটন কিছুতেই কথা বলছে না। আলের পাশে দাঁড়িয়ে ফেলুর যাবার পথ খালি করে দিচ্ছে।

    কিন্তু ফেলুর লক্ষণ ভাল না। সে দাঁড়িয়ে থাকল সামনে। কেমন মুচকি হাসছে। ওর একটা চোখ বসন্তে গেছে। মুখ কী ভয়ঙ্কর কুৎসিত। অর্ধেকটা মুখ ঢাকা থাকে এখন। হাডুডু খেলার রস মরে গেছে। গতরে তেমন শক্তি নেই বুঝি। তবু চোখটা ভয়ঙ্করভাবে কেবল জ্বলছে। ফেলু মুচকি হেসে বলল, জুটি, তর ফকিরসাব তবে আর আইল না?

    —কি করতে কন তবে। না আইলে কি করমু! জোটন ফের থুতু ফেলল।

    ফেলু এবার অন্য কথা বলল। কারণ জোটনের মুখ দেখে ধরতে পারছে এইসব ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকাটা সে পছন্দ করছে না। সে এবার খুব ভালো মানুষের মতো বলল, মানুষগুলাইন মাথায় কইরা কি লইয়া যাইতাছে।

    —ওলাওঠা দেবীরে লইয়া যাইতাছে।

    —মাথাটা ভাইঙ্গা দিলে ক্যামন হয়?

    জোটন এবারেও দাঁত শক্ত করে বলতে চাইল যেন, তর মাথাটা ভাঙমু নিব্বৈংশা। অথচ মুখে কোনও শব্দ করল না। লোকটার জন্য সকলের ভয়ডর। কার মাথা কখন নেবে, হাসতে হাসতে হ্যাৎ করে মাথা কাটতে ফেলুর মতো ওস্তাদ আর নেই। মানুষটাকে কেউ ঘাঁটায় না। যেন ঘাঁটালেই সে রাতের অন্ধকারে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে কোরবানির খাসির মতো গলার নলি ছিঁড়ে দেবে। কোরবানির দিনে মানুষটা আরও ভয়ঙ্কর। সুতরাং জোটন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে চাইল।

    ফেলু দেখল চৈত্রের শেষ রোদ বাঁশগাছের মাথায়। সামসুদ্দিন তার দলবল নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন সামনের মাঠ ফাঁকা। লতানে ঝোপ আর শ্যাওড়া গাছের জঙ্গল, আর জঙ্গলের ফাঁকে ওরা দু’জন। একটু ফষ্টিনষ্টি করার মতো মুখ করে সামনে ঝুঁকল, তারপর ফিসফিস করে বলল, দিমু নাকি একটা গুঁতা।

    জোটন এবার মরিয়া হয়ে বলল, তর ওলাওঠা হইবরে নিব্বৈংশা। পথ ছাড়, না হইলে চিৎকার দিমু। বলা নেই, কওয়া নেই, এমন একটা হঠাৎ ঘটনার জন্য জোটন প্রস্তুত ছিল না। ফেলু হাসতে হাসতে বলল, রাগ করস ক্যান! তর লগে মসকরা করলাম। তারপর চারিদিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলল, শীতলা ঠাইরেনের ডর আমারে দেখাইস না জোটন। কস তো আইজ রাইতে মাথাটা লইয়া আইতে পারি।

    সামসুদ্দিন দলবল নিয়ে সঙ্গে যাচ্ছে। লীগের সভা হবে। শহর থেকে মৌলবীসাব আসবেন। সুতরাং ফেলুকে নেতা গোছের মানুষের মতো লাগছে। পরনে খোপকাটা লুঙ্গি। গায়ে হাতকাটা কালো গেঞ্জি। আর গলাতে গামছা মাফলারের মতো প্যাঁচানো। সে জোটনকে পথ ছেড়ে দিল। ওরা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ওদের ধরতে হবে। সে আল ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে। মাঠ থেকে ওলাওঠা দেবীও গ্রামের ভিতর অদৃশ্য। তখন ধোঁয়ার মতো এক কুণ্ডলী গ্রাম মাঠ পার হয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সে যা ভাবছিল তাই। জল নেই নদী-নালাতে। মাঠ শুকনো, পাতা শুকনো। আর সারাদিন রোদে পাতার ছাউনি তেতে থাকে, পাটকাঠির বেড়া তেতে থাকে। জোটন কাঁখের কলসি নিয়ে দ্রুত ছুটছে। সে দেখল পাশের গ্রাম থেকেও মানুষেরা ছুটে আসছে। যারা সোনালী বালির নদীতে জল আনতে গিয়েছিল তারা পর্যন্ত দুঃসময়ে আগুনের উপর সব জল ঢেলে দিল

    কিন্তু এই আগুন আগুনের মতো আগুন, বাতাসের সঙ্গে মিলে-মিশে অশিক্ষিত এবং অপটু হাতের গড়া সব গৃহবাস ছাই করে দিতে থাকল। জোটনের ঘরটা পুড়ে যাচ্ছে। আবেদালির ঘরটা সকলের আগে পুড়েছে। আবেদালি জালালির অগোছালো শরীরটা সেই আগের মতো সাপ্টে ধরে রেখেছে। নতুবা ছুটে গিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে পারে। ওর কাঁথা, বালিশ, মাদুর, কলাইকরা থালা সানকি সব গেল। পুড়ে যাচ্ছে। ঠাস ঠাস করে বাঁশ ফাটছে, হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ হচ্ছে। আগুন গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ছে। সুতরাং কাঁচা বাঁশ অথবা কলাগাছ এবং কাদা জল সবই প্রয়োজনীয়। চারিদিকে বীভৎস সব দৃশ্য। যাদের কাঁথা বালিশ আছে তারা কাঁথা বালিশ মাঠে এনে ফেলল। জালালি তখন আমগাছের নিচে বসে কপাল থাপড়াচ্ছে। পুবের বাড়ির নরেন দাস একটা দা নিয়ে এসেছে। যেসব ঘরে আগুন লাগেনি এবার লেগে যাবে—হল্কা বের হয়ে হয়ে লম্বা হচ্ছে, চাল থেকে চালে আগুন লাফিয়ে পড়ছে, সেইসব চাল কেটে দিচ্ছে। ঘর আল্গা করে দিচ্ছে। যেন আগুন আর ছড়াতে না পারে। মানুষেরা সব হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, আগুন নেভানোর জন্য। কুয়োর জল ফুরিয়ে গেছে। হাজি সাহেবের পুকুরে যে তলানিটুকু ছিল তাও নিঃশেষ। মনজুরদের পুকুরে শুধু কাদামাটি। এখন লোকে কোদাল মেরে কাদামাটি চালে ছুঁড়ছে। তখন দূরে ওলাওঠা দেবীর সামনে ঢাক বাজছিল, ঢোল বাজছিল। বিশ্বাসপাড়াতে হরিপদ বিশ্বাস হিক্কা তুলে মারা গেল। সাইকেল চালিয়ে গোপাল ডাক্তার ছুটছে বাড়ি বাড়ি টাকার জন্য, রুগী দেখার জন্য। সে যেতে যেতে আগুন দেখে এইসব অশিক্ষিত লোকদের গাল দিল। ফি বছর হামেশাই কোনও কোনও দুঃখী গ্রামে এমন হচ্ছে। হাতুড়ে বদ্যি গোপাল ডাক্তারের এখন পোয়াবারো। রুগী কামিয়ে অর্থ, গরিব লোকদের অনটনে অর্থ দিয়ে সুদ। আলের উপর গোপাল ডাক্তার এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্রিং ক্রিং বেল বাজাচ্ছে। যেন বলছে, কে আছ এস, টাকা নিয়ে যাও, ওষুধ নিয়ে যাও! অর্থ দিয়ে সুদ দেবে, ঋণশোধ করবে।

    খড়ম পায়ে শচীন্দ্রনাথও ছুটে এসেছিলেন। জোটন, আবেদালি এবং গ্রামের অন্য সকলে সান্ত্বনার জন্য ওকে ঘিরে দাঁড়াল। শচীন্দ্রনাথ সকলের মুখ দেখলেন। সকলে এখন আবেদালি এবং জালালিকে দোষারোপ করছে। শচীন্দ্রনাথ বললেন, কপাল।

    সামসুদ্দিনের দলটা অনেক রাতে সভা শেষ করে ফিরে এল। ওরাও ঘুরে ঘুরে সকলকে সান্ত্বনা দিতে থাকল। আগুন নেভানোর চেষ্টায় বড় বড় বাঁশের লাঠি অথবা কাদামাটি নিক্ষেপ করে যখন বুঝল—কোনও উপায় নেই, সব জ্বলে যাবে—তখন ওরা মসজিদের দিকে চলে গেল। মসজিদটা এখন দাউদাউ করে জ্বলছে।

    চোখের উপর গোটা গ্রামটা পুড়ে যাচ্ছে। বিশ্বাসপাড়াতে এখন ওলাওঠা দেবীর অর্চনা হচ্ছে। মাঠে সব চাষের জমিতে পোড়া কাঁথা পেতে যে যার ভস্ম থেকে তুলে আনা ধন-সম্পত্তি আগলাচ্ছে। আগুনে ওদের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

    যখন আগুন পড়ে এল এবং এক ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব—জোটন শোকে আকুল হতে থাকল। ঘন অন্ধকার চারদিকে। থেকে থেকে ধোঁয়া উঠছে। সে অন্ধকারের ভিতর পোড়া ভস্ম ধন-সম্পত্তির আশায় চুপি চুপি হাজিসাহেবের গোলাবাড়িতে উঠে এল। সে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছিল। সে ঘুরেও গেল কতকটা পথ। ধান চাল পোড়া গন্ধ। আশেপাশে সব হা-অন্ন মানুষদের হা-হুতাশের শব্দ ভেসে আসছে। অন্ধকারে জোটন পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে বলল, ফুফা, আমার ঘরটা গ্যাল। ভালই হয়েছে। যামু গিয়া যেদিকে চোখ যায়। ঘরটার লাইগা বড় মায়া হইত। ফকিরসাব আর বুঝি আইল না, এও বলার ইচ্ছা। যখন এল না তখন আর কার আশায় সে এখানে বসে থাকবে। পরিচিত মানুষটা অন্ধকারে বসে টের পেল, জোটন অনেক কষ্টে এমন কথা বলছে।

    পরিচিত মানুষটি বলল, আবেদালির আফুর দুফুর নাই!

    জোটন এবার ফিরে দাঁড়াল। কাকে কি কমু কন। পুরুষমানুষ দিন নাই রাইত নাই খামু খামু করে, কিন্তু তুই মাইয়ামানুষ হইয়া আফুর দুফুর দ্যাখলি না। উদাম কইরা গায়ে গতরে পানি ঢাললি।

    জোটন আর দাঁড়াল না। সে বকতে বকতে অন্ধকারে হাজিসাহেবের গোলাবড়িতে ঢুকে গেল। বড় বড় গোলা ভস্ম হয়ে গেছে। ধান-পোড়া মুসুরি-পোড়া গন্ধ উঠছে। কোথাও থেকে এই দুঃসময়ে একটা ব্যাঙ ক্লপ ফ্লপ করে উঠল। জোটন আগুনের ভিতর খোঁচা মারল একটা। না, কিছু বের হচ্ছে না। অন্ধকারের ভিতর কিছু ছাইচাপা আগুন শুধু কতকটা ঝলসে উঠে ফের নিভে গেল। আগুনে জোটনের মুখ পোয়াতির মুখের মতো–লোভী এবং পেট সর্বস্ব চেহারা। সেই আগুনে জোটন অন্ধকারে পথ চিনে নিল। তখন ঢাকের বাজনা, ঢোলের বাজনা ওলাওঠা দেবীর সামনে। তখন হাজিসাহেব তার তিন বিবির কোলে ঠ্যাং রেখে কপাল চাপড়াচ্ছেন আর হাজিসাহেবের তিন বেটার তিন বিবি, মাঠের মধ্যে চষা জমির উপর বিছানা পেতে ওৎ পাতার মতো অপেক্ষা করছে।

    জোটনের মনে হল এই অন্ধকারে সে একা নয়। অন্য অনেকে যেন হাতে কাঠি নিয়ে পা টিপে টিপে গোপনে আগুনের ভিতর ঢুকে খোঁচা মারছে। দূর থেকে মনে হল হাজিসাহেবের একটা ঘর—সবটা জ্বলেনি। অথবা আর জ্বলবে না। সে লাফিয়ে এগোল। সে ঘরের ভিতর গতকাল কয়েক লাছি পাট দেখেছিল। জোটনের পরাণ এখন ভাদ্রমাসের পানির মতো টলমল করছে। আর তখন জোটনের পায়ের শব্দে অন্ধকার থেকে কে যেন বলল, কেডা?

    —আমি…আমি…।

    জোটনের মনে হল অন্ধকারে আর এক মানুষ যেন গোপনে তন্ন তন্ন করে কি খুঁজছে।

    জোটন বলল, তুমি কেডা?

    জোটনের মনে হল ফেলু শেখ। সেও অন্ধকারে আগুনে পোড়া সম্পত্তি চুরি করতে এসেছে। অথবা মাইজলা বিবির সনে পীরিত তার। হাজিসাহেবের মাইজলা বিবিও এই রাতের অন্ধকারে যখন কেউ কোথাও জেগে নেই, সকলে মাঠে নেমে গেছে, কিছু ফেলে গেছে এই নাম করে ফিরে এলে ফেলু শেখ চুপি চুপি চিনে ফেলবে। কার টের পাবার কথা! ফেলু সেই এক জ্বালা নিবারণের জন্য, কি যে এক জ্বালা, উজানে যেতে হাজিসাহেব ভোলা অঞ্চলের পাশে কোন এক সাগরের কূল থেকে এই মাইজলা বিবিকে তুলে এনেছিলেন। তখন সঙ্গে ছিল ফেলু। ফেলু ফুসলে ফাসলে টাকার লোভ দেখিয়ে হাজিসাহেবের নৌকায় এনে তুলেছিল মাইজলা বিবিকে। তখন হাজিসাহেব হাজি নন, তখন ফেলুর যৌবন কত বড়, ফেলুর কত নামডাক—জোয়ান মরদ ফেলু পীরিত করার অছিলা খুঁজছিল মাইজলা বিবির সনে। বোধ হয় এখন সংগোপনে গানটা গায় মাইজলা বিবি। যখন কলিমুদ্দি সাহেব হজ করতে গেলেন এবং যখন হাজি হয়ে ফিরে এলেন তখন মাইজলা বিবির সেই গান গলায়। একা আতাবেড়ার পাশে বসে বসে গাইত। ঘাটে ফেলু বসে থাকত। সে ওদের তখন বড় নৌকার মাঝি—কাজ কারবারে তাকে হাটে-বাজারে যেতে হয়, সওদা করে আনতে হয়। তাই মাইজলা বিবির সনে পীরিত রঙ্গরস করার অছিলাতে ঘাটের মাঝি হয়ে সে বসে থাকত। কিন্তু কলিমুদ্দি হজ করে এসে সবই টের পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, মিঞা, তোমার এই আছিল মনে। তারপর হাজিসাহেব ঘাট থেকে তাড়িয়ে দিলেন ফেলুকে। সে কবেকার কথা! সেই থেকে ফেলু আর হাজিসাহেবের বাড়ি যেতে পারে না। মাঝে মাঝে মাইজলা বিবির মুখ ওর পরাণে দরিয়ার বান ডেকে আনে। তখন সে একা একা প্রায় পাগল ঠাকুরের শামিল। সে গোপাটে অথবা অন্ধকার রাতে চুপি-চুপি অশ্বত্থের নিচে নেমে আসে। ঝোপ-জঙ্গলে উবু হয়ে বসে থাকে। আতাবেড়ার পাশে কখন উঁকি দেবে মুখটা। বিবি আন্নু আজকাল হাজিসাহেবের বাড়িতে আসে-যায়। ছোট বিবির সঙ্গে আন্নুর খুব ভাব। সেই বিবি ওকে লুকিয়েচুরিয়ে তেল দেয়, ডাল দেয়, মাসকলাইর বড়ি দেয়। আন্নু বলে ছোট বিবি দেয়—কিন্তু জোটনের মন বলে সব মাইজলা বিবির কাজ। মাইজলা বিবির সনে পীরিত বড় ফেলুর।

    জোটন বোঝে সব। আন্নু দেখায় ছোটবিবির সঙ্গে তার বড় ভাব—সখী সখী গলায় দড়ি ওলো সখী ভাব।

    আর ফেলুর যখনই ভাবের কথা মনে হয় তখন আর একমুহূর্ত দেরি করতে পারে না। সে এই অন্ধকারে আগুনের ভিতর মাইজলা বিবিকে দেখার বাসনাতে বসে আছে। যদি আসে। চারিদিকে হল্লা–কে কোথায় ছুটছে—কে কোথায় আছে কে জানে। এই ত সময়। সুতরাং সে এখানে বসে বিবির উঠে আসার অপেক্ষায়—কি জাদু বিবির চোখে আর কি জাদু আছে এই মনের ভিতর। এই মন কি যেন চায় সব সময়। ফেলু কি যেন চায় সব সময়। তার ঘরে যুবতী বিবি আন্নু। ফেলুর বয়স দুই কুড়ির ওপরে হয়ে গেছে—তবু মনটা কি যেন চায়। এত অভাব অনটনের ভিতরও ভিতরটা কি পেতে কেবল ইসছা ইসছা করে। কিসে যে সুখ—এই আন্নুর জন্য সে কী কাণ্ড না করেছে! আলতাফ সাহেবের গলাটা সে হ্যাৎ করে কেটে ফেলেছে। পাটখেতের ভিতর আলতাফ সাহেব বাছ-পাট কেমন হয়েছে দেখতে এসেছিল। বুড়ো আলতাফ সাহেবের শেষ পক্ষের বিবিকে সে ঈদের পার্বণে পীরের দরগায় দেখে প্রায় পাগলের মতো—কি করে, কি করে! কি করবে ফেলু ভেবে উঠতে পারল না। তখন ফেলুর যৌবনকাল যায়-যায়। সে তল্লাটের ফেলু। সুতরাং সে ঈদের আর এক পার্বণে মেমান সেজে চলে গেল আলতাফ সাহেবের বাড়ি। ওকে সে পাটের ব্যবসা করতে বলল- য্যান ফেলু কত বড় মহাজন। সে দাড়িতে আতর মাখত তখন, ভাল তফন কিনে আনতো বাবুর হাট থেকে। মন খুশ থাকলেই ম্যাডেল ঝোলাত গলায়।

    বুড়ো আলতাফ খেলার বড় উৎসাহদাতা ছিল। ফেলুর সঙ্গে কত জান পচান, কত বড় খেলুড়ে ফেলু তার বাড়ি মেমান হয়ে এসেছে—বিবি, বেটারা দেখুক। খেলোয়াড় ফেলুকে সে অন্দরমহলে একদিন ঢুকিয়ে দিল। ফেলুর পীরিতের ছলাকলা সব যেন জানা। ফাঁকা বুঝে ফুলের কুঁড়ির মতো আলতাফের ছোটবিবিকে কাছিমের মতো বুকের ছাতি দেখাল একদিন। আন্নু দেখল সেই বুকের ছাতিতে মেডেলগুলি ঝকঝক করছে। আন্নুর তখন মনে পড়েছিল ছোট বয়সের কথা। বালিকা আন্নু খেলা দেখতে গেছে—হা-ডু-ডু খেলা। ফেলু এসেছে খেলতে পরাপরদির হাটে। সেদিন হাটবার ছিল না, তবু কি লোক, কি লোক! দু’দশ মাইলের ভিতর কোনও যুবা পুরুষ আর সেদিন ঘরে ছিল না। মেলার মতো প্রাঙ্গণে-প্রাঙ্গণে নিশান উড়ছিল—য্যান ঈদ-মুবারক। ফেলু সেই মেলার প্রাণ ছিল। খেলা শেষ হলে ফেলুর জয়-জয়কার। আন্নু, বালিকা আন্নু সেদিনই কেমন ফেলুর ভালোবাসায় পড়ে গেল। সেই ফেলু এসেছে মেমান সেজে—আলতাফ সাহেবের বিবি নিজেকেই যেন শুধাল, এই আছিল তর মনে! তারপর সময় বুঝে হ্যাঁৎ করে গলাটা কেটে ফেলল ফেলু। পাটখেতের ভিতর হ্যাঁৎ করে কেটে ফেলল গলার নলিটা। যেমন সে কোরবানির দিন দশ পাঁচটা কোরবানিতে চাকু চালায়, বিশমিল্লা রহমানে রহিম বলে, তেমনি সে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে হ্যাঁৎ করে নলিটা আলতাফ সাহেবের কেটে ফেলল। যেদিন সে বিবিকে বোরখা পরিয়ে নিয়ে আসে, সেদিন সে, হ্যাঁৎ করে গলা কেটে ফেলেছে কথাটা প্রথম জানাল বিবিকে। আন্নু শুনে বলল, এই আছিল তর মনে! বলে সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ভিতর হা-হা করে হেসে উঠেছিল। আন্নুকে দেখলে মনেই হবে না ফেলুর জন্য সে এত বড় হত্যাকাণ্ড হজম করে গেছে।

    অন্ধকারে ফেলু দূরের একটা ছায়া-মূর্তি দেখছিল আর ভাবছিল। বুঝি চুপি চুপি মাইজলা বিবি উঠে আসছে। কিন্তু এখন এ কিকার গলা, জোটন মনে হয়! সে ধরা পড়ে যাবে, চুরি করতে এসেছে এই আগুনের ভস্ম ধনসম্পত্তি থেকে-তার ভয় ধরে গেল।

    জোটন তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, নাম কইতে পার না মিঞা! আমি কেডা।

    —আমি মতিউর। ফেলু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলল।

    —তোমাগ আর মানুষগুলান কই?

    —আগুন দেইখ্যা পালাইছে।

    —তুমি এখানে কি করতাছ?

    —সানকিডা খুঁজতাছি।

    —হাজিসাহেব জানে না, বৈঠকখানা ঘরডা পুইড়া যায় নাই।

    —আগুনে বড় ডর হাজিসাহেবের। লোকটা দূর থেকেই কথা বলছে। এই ভস্মরাশিকে এখন সকলেরই ভয়। গলাটা স্পষ্ট নয়। গলাটা কখনও ফকির সাহেবের মতো, কখনও মনে হচ্ছে ফেলুই মতিউরের গলায় কথা বলছে। তারপর মনে হল অন্ধকারে লোকটা কিছু কুড়িয়ে পেয়েছে। এবং পেয়েই এক দৌড়।

    জোটন বলতে চাইল—ধর-ধর। কিন্তু বলতে পারল না। সে নিজেও একটা সানকি খুঁজতে এসেছে অথবা কিছু চাল, পোড়া ধান হলে মন্দ হয় না, পোড়া কাঁথা হলে মন্দ হয় না—সে এখন যা পেল তাই নিয়ে আমগাছের নিচে জড়ো করল। জালালি সব জোটনের হয়ে সংরক্ষণ করছে। সে ভস্মরাশি থেকে খুঁজে-পেতে আনছে আর জালালিকে দিয়ে আবার অন্ধকারে খুঁজতে চলে যাচ্ছে।

    তখন কান্না ভেসে আসছিল বিশ্বাসপাড়া থেকে। তখন ওলাওঠা দেবীর সামনে আরতি হচ্ছিল। ওলাওঠাতে আবার হয়তো কেউ মারা গেল। জোটন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সানকি, ভাঙা পাতিল অথবা পেতলের বদনা খুঁজতে খুঁজতে সেই কান্না শুনছে। রাত তখন অনেক। মাঠের ভিতর দিয়ে কারা যেন নদীর পাড়ের দিকে ছুটছে আর গাছের নিচে ইতস্তত যেসব লম্ফ জ্বলছিল—বাতাসে সব এক-দুই করে নিভে যাচ্ছে। মাঠে একটামাত্র হারিকেন জ্বলছে। হারিকেনটা হাজিসাহেবের। মহামারী লাগলে যেমন এক অশরীরী বাতাসে ভেসে বেড়ায় তেমনি এই ভস্মরাশির অন্ধকারে জোটন ভেসে বেড়াতে লাগল। জোটন অন্ধকারে পা টিপে-টিপে হাঁটছে। হাজিসাহেব মাঠে এখন কেবল সোভান আল্লা, সোভান আল্লা বলে চেঁচামেচি করছেন। তিনি ঘুমোতে পারছেন না। মাঠের ভিতর তিনি তাঁর ছোট বিবিকে নিয়ে আছেন। কে কখন কি করে যাবে—ভয়ে ঘুম আসছিল না। যাদের ভাঙা ঘর শুধু গেছে, ছেঁড়া হোগলা বিছিয়ে ঘুম যাচ্ছে তারা। সকাল হলেই হিন্দু পাড়াতে রুজি রোজগারের জন্য উঠে যেতে হবে এবং হিন্দু পাড়াতেই সব বাঁশ কাঠ। সব শণের জমি ওদের। ওদের থেকে চেয়ে আনলে ঘর এবং ঘর বানাতে বানাতে ঘোর বর্ষা এসে যাবে। জোটন এ-সময় নিজের ঘরের কথা ভাবল, ফেলু সময়-অসময় গুতা দিতে চায়, মনজুরের মতো চোখ-মুখ গরম ছিল না, চান্দের লাখান গড়বন্দি আছিল না—দিমু তরে একদিন একটা গুতা—এইসব ভেবে জোটন নিজের অভাব জোড়াতালি দিয়ে আধপোড়া ঘরের ভিতরে আর একটা বদনা পেয়েই একদৌড়। সে জালালির পাশে এসে বসল, দ্যাখ কি আনছি।

    জালালি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদনাটি দেখল। কুপির আলোতে এত বড় একটা আস্ত পেতলের বদনা—সে কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবেদালি ঘাড় কাৎ করে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা তার।

    —এক বদনা পানি আন ঢক-ঢক কইরা খাই। বদনা দেখেই আবেদালির কেমন জলতেষ্টা পেয়ে গেল।

    জালালি বলল, আমি যাই। যদি কিছু মিল্যা যায়।

    জোটন জল আনতে গেছে। আশেপাশে কেউ নেই। আবেদালি তাড়াতাড়ি বসে পড়ল। তারপর এক থাপ্পড় নিয়ে গেল গালের কাছে। বলল, তর এত সাহস! তুই যাবি চুরি করতে। পরে সে গামছা দিয়ে মুখ মুছল। ঘামে গরমে মুখ চুলকাচ্ছে। সে আমগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসতেই দেখল জোটন জলের জন্য উঠে যাচ্ছে। জলের বড় অভাব। সে অন্ধকারে এখন জল চুরি করতে যাচ্ছে।

    জালালি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর কচ্ছপের মতো গলা লম্বা করে দিল। তারপর চিৎকার করে বলল,তর লাইগাই ত নিব্বৈংশা আগুন লাগল রে।

    চিৎকারে ভয় পেয়ে গেল আবেদালি।—আমার লাইগ্যা বুঝি!

    এবার জালালি খলখল্ করে উঠল, আমি সকলরে না কইছি ত কইলাম কি!

    —কি কইবি?

    —কমু তাইন আমারে ঘরে জোর কইরা ধইরা নিছে।

    —ঘরে নিছি, ভাল করছি। তুই নাড়া দিয়া রানতে-রানতে প্যাট ভাসাইলি ক্যান?

    —তার লাইগ্যা বঝি সময়-অসময় নাই?

    গোটা ঘটনাটাই আগুনের মতো। আবেদালি এবার আরও ঘন হয়ে বসল।—আমার বুঝি ইচ্ছা হয় না ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করি।

    .

    ফকিরসাব নিমগাছটার নিচে বসলেন। গাছটাতে একটা কাকও উড়ছে না। সুতরাং ফকিরসাব এ-গাঁয়ের ঘরগুলো দেখলেন। বৈশাখ মাস শেষ হচ্ছে। এখন গাছে-গাছে আমের ভাল ফলন। তিনি তাঁর মালা-তাবিজের ভিতর থেকে একটা বড় পুঁটুলি বের করলেন। আর গোস্তের ওজন দেখবার সময় মনে হল এবার গ্রামের কোরবানির সংখ্যা কমে গেছে। তিনি হাত গুণে বলতে পারছেন যেন সংখ্যায় কত তারা, বকরি ঈদে এত কম কোরবানি এই প্রথম আর এই জন্যই কাকগুলি গোস্ত খুঁজে খুঁজে হন্যে হচ্ছিল। কাকগুলি উড়ে উড়ে হয়রান হয়ে গেছে। অথচ কিছুই মিলছে না। ওরা উড়ে উড়ে এদিক-ওদিক চলে গেল। সুতরাং তিনি কিঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত বোধ করছেন। কোথাও পুঁটুলির ভিতর পান-সুপারি আছে অথবা চুনের কৌটা থেকে চুন নিয়ে ঠোঁটে লাগাবার সময়ই সুখী পায়রার মতো অনেকদিন আগের কসমের কথা মনে পড়ে গেল।

    সামনে সড়ক। দূরে কোথাও আজ হিন্দুদের মেলা আছে। ফকিরসাব মনে করতে পারলেন, হয়তো এদিনেই নয়াপাড়া পার হলে ঘোড়দৌড়ের মাঠে মরশুমের শেষ ঘোড়দৌড় হবে। একবার ঘোড়দৌড়ের মাঠে গেলে হয়। কিন্তু অনেক দিন পর এদিকে আসায় কসমের কথা মনে পড়ে গেল। সড়কের পথে গলায় ঘণ্টা বাজিয়ে ঘোড়া যাচ্ছে। বিশ্বাসপাড়ার কালু বিশ্বাসের ঘোড়া—য্যান নয়নের মণি। ঘোড়াটার রঙ কালো কুচকুচে। কপাল সাদা আর সোনালী কড়ির মালা ঝুলছে ঘোড়ার গলাতে। ঘোড়াটা সড়ক ধরে দূরে চলে গেল। গ্রীষ্মের শেষ জল-ঝড়ে এ অঞ্চলের কিছু বাড়ি-ঘর ফেলে দিয়েছে। মাঠে ছোট ছোট পাটের চারা বাতাসে দুলছে। ইতস্তত মাঠের ভিতর মাথলা মাথায় চাষীরা পাটের জমিতে নিড়ান দিচ্ছিল আর আল্লা ম্যাঘ দ্যা, পানি দ্যা—এই গান গাইছিল। চৈত্রের খরা রোদ এবং শুকনো ভাবটা কেটে গেছে। এখন শুধু সবুজ প্রান্তর এবং মানুষের মুখে সুখের ইচ্ছা অথবা যেন বছর শেষ, দুঃখ শেষ—এখন অভাব কম, গরিব মানুষেরা অন্তত শাক-পাতা খেয়ে বাঁচবে। বিশেষ করে এইসব গ্রীষ্মের দিনে কচি পাট-পাতার শাক অথবা শুক্তোনি এক সানকি ভাতের সঙ্গে মন্দ নয় এবং যখন কোরবানির গোস্ত মুশকিলাসানের পাত্রটার নিচে যত্ন করে রাখা আছে, যখন মনে হচ্ছিল শেষ বয়সের সম্বল জোটন বিবিকে ধরে নিলে গোস্তের মতোই সস্তা হবে, তখন সড়ক ধরে সামনে গ্রামটার দিকে হাঁটা যাক।

    মুশকিলাসানের আধারে তেল নেই। দরগার ছইয়ের নিচে রসুন গোটা ভিজানো আছে। তার তেল বড় উজ্জ্বল আলো দেয়। তেল নেই বলে আর এ-অঞ্চলে তিনি রাতে মুশকিলাসানের লম্ফ নিয়ে ঘুরতে পারবেন না। দরগায় গিয়ে লম্ফে আবার তেল ভরতে হবে। ফকির সাহেবের ইচ্ছা ছিল রসুন গোটার তেলে মুশকিলাসানের লম্ফ জ্বালাবেন এবং ছোটদের চোখে সুর্মা টেনে আস্তানা সাহেবের দরগাতে রসুলের কাছে দোয়া, জোটনের জন্য দোয়া ভিখ মেগে নিবেন। কিছুই হল না।

    মসজিদের কুয়া থেকে প্রথম জল তুলে পা ধুলেন ফকিরসাব। তারপর শতচ্ছিন্ন এক জোড়া কাপড়ের জুতো, যার ফাঁকে কচ্ছপের গলার মতো বুড়ো আঙুলটা বের হয়ে আসে এবং জুতোর ভিতর পা গলাবার সময় একটা ইষ্টিকুটুম পাখি ডেকে উঠলে ফকিরসাব ভাবলেন, দিনটা ভালোই যাবে। শেষে আবেদালির বাড়িতে ওঠার মুখেই ডাকতে থাকলেন, মুশকিলাসান সব আসান করেন এবং এইসব বলতে বলতে উঠেই তিনি বুঝতে পারলেন পরবের দিনে জোটন বাড়ি নাই। তিনি যেন এই উঠোন এবং ঝোপ জঙ্গলকে বললেন, ওনারে ডাইকা দিলে ভাল হয়। অনেক দূর থাইক্যা আইছি, আবার কবে আমু ঠিক নাই। তাই ভাবছি অরে নিয়া যামু। তারপর কারও উপর ভরসা না করে নিজেই ছেঁড়া লুঙ্গি ঘাসের উপর বিছিয়ে বসে পড়লেন। খুব সন্তর্পণে মালা-তাবিজ খুলে পোঁটলা-পুঁটলি পাশে রাখলেন অন্য কোনও দিকে তাকাচ্ছেন না। যেন সব ঠিকই করা আছে, উকিল বলা আছে, মৌলবী সাবকে বলা আছে আর দু-চারটে দোয়া। ফকিরসাব এবার গলা খেকারি দিয়ে চোখ তুলতেই দেখলেন, জালালি ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে জোটনকে খবর দিতে হাজিসাহেবের বাড়ির দিকে ছুটছে।

    ফকিরসাব ছেঁড়া তফনের উপর বসে জামরুল গাছের ফাঁকে সেই অস্পষ্ট মুখ দেখতে পেলেন। জোটন আসছে। আগের শক্তিসামর্থ্য যেন গায়ে নেই। জোটন নিজের ঘরে ঢুকে গেল। ফকিরসাব জোটনকে আর দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি নানারকম শব্দে ধরতে পারছেন জোটন এখন আর্শিতে নিজের মুখ দেখছে। ভিজা শনের মতো চুল—কত কষ্টে খোঁপা বাঁধা! আর তিনি মুখ না তুলেও যেন ধরতে পারছিলেন, জোটন বেড়ার ফাঁকে ফকিরসাবের মুখ হাত-পা অথবা সব অবয়ব দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যাচ্ছে।

    ফকিরসাব গাছ-গাছালিকে যেন ডেকে বললেন, তাড়াতাড়ি করতে হয়।

    ঘরের ভিতর জোটন সরমে মরে যাচ্ছিল। ঘরের ভিতর ফিসফিস্ শব্দ, আবেদালিরে আইতে দ্যান।

    ফকিরসাব উঠোন থেকে বললেন, উকিল দ্যাখতে হয়।

    জোটন এবার যেন গলায় শক্তি পাচ্ছে। ভাইবেন না। আবেদালি আইসা সব ঠিক কইরা দিব।

    ফকিরসাব সঞ্চিত কোরবানির গোস্তের উপর হাত রেখে বললেন, ব্যালায় ব্যালায় রওনা হইতে হয়। না হইলে গোস্ত পইচা যাইব। বলে ফকিরসাব গোস্তের পুঁটলিটা নাকের কাছে এনে শুঁকে বললেন, গোস্তে মশলা নুন দিতে আপনের হাত কেমন?

    এবার জোটন ঘরের ভিতর খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ঘরে নেওয়ার আগে একবার পরখ কইরা দ্যাখতে সাধ যায় বুঝি!

    —দ্যাখতে ইচ্ছা যায়, কিন্তু ব্যালা যে পইড়া আইতাছে।

    জোটন দাঁত খুঁটছিল। মুখ কুলকুচা করে হাঁড়ির ভিতর থেকে পান সুপারি বের করে মুখে পুরল। তারপর ঝোপের ফাঁকে যখন দেখল জালালি আসছে, যখন দেখল গোপাটের অশ্বত্থ গাছের মাথা থেকে রোদ নেমে যাচ্ছে এবং যখন কামলা ফিরছে মাঠ থেকে, মাথায় পাট গাছের আঁটি, ঘাসের বোঝা, আর আবেদালি পরবের দিনও ঠাকুরবাড়ির কাজে গেছে—ফেরার সময় এখন, হয়তো সে ফিরছে, তখন জোটন ঠোট রাঙা করে বাবুর হাটের ডুরে শাড়ি পরে দেখল বুকের মাংস একেবারে শুকিয়ে গেছে। সে একটু ঠোট থেকে থুতু এনে, বুকে মেখে দিল। পাতলা থুতু দিয়ে শরীরের শুকনো ভাবটা কমনীয় করতে চাইছে অথবা মনে হল, ফকিরসাহেবের বুড়ো হাড় অঘ্রানী ধানের মতো—আশ্রয় দেবে, নিকা করবে এবং ফাঁকা মাঠের মতো উদোম গায়ে রঙ্গরস করবে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা-আল্লার মাশুল তুলতে এই বয়সেও গতর কম কৌশল করবে না।

    বেলায় বেলায় আবেদালি এল। বেলায় বেলায় করণীয় কাজটুকু আবেদালি করে ফেলল। দু-চারজন গাঁয়ের লোক জমা হয়েছে উঠানে। আবেদালি সকলকে পান-তামুক খাওয়াল। হাজিসাহেবের ছোট বিবি একটা ছেঁড়া বোরখা দিল জোটনকে। আগুনের ভস্ম থেকে যে পেতলের বদনাটা তুলে এনেছিল, ফকিরসাহেবের পাশে সেটা রেখে দিল জোটন।

    দুটো মেটে কলসি এনেছিল জোটন লাঙ্গলবন্দের বান্নি থেকে—যাবার সময় জোটন জালালিকে ডেকে কলসি এবং ঘরের সামান্য জিনিসপত্র অর্থাৎ গ্রীষ্মের দিনে সংগ্রহ করা ঝরা পাতা, পাটকাটি এবং দুটো সরা,—সব দিয়ে দিল। আর ছেঁড়া তফনে জোটন তার ভাঙা আর্শি, ঠাকুরবাড়ির বৌদের পরিত্যক্ত ভাঙা কাঠের চিরুনী, একটা সানকি আর সম্বলের মধ্যে কিছু ভাতের শেউই বাঁধা পুঁটলি হাতে তুলে নেবার সময়ই অন্যান্যবারের মতো আবেদালির হাত ধরে কেঁদে ফেলল। এবার নিয়ে চারবার নিকা, এবং এবার নিয়ে চারবার জোটন এই উঠান ছেড়ে বাপের ভিটা ছেড়ে মিঞা মানুষের সঙ্গে খোদার মাশুল তুলতে চলে যাচ্ছে। ফকিরসাব পোঁটলাপুঁটলি যত্ন নিয়ে বাঁধছে। পিতলের বদনাটা হাতে নিয়ে দু’বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বদনা থেকে পানি চুষে খেলেন। তারপর বাকি পানিটুকু ফেলে দিয়ে—বাঁ-হাতে পেতলের বদনা, কাঁধে ঝোলাঝুলি এবং ডানহাতে মুশকিলাসান, মুখে আল্লার নাম অথবা রসুলের নাম নিতে নিতে গোপাটে নেমে যাচ্ছেন। জোটন একহাতে একটা পুঁটলি নিয়ে আবেদালির ঘরে ঢুকে বোরখাটা মাথার ওপর তুলে দিল। আবেদালিকে বলল, জালালির দিকে তাকিয়ে বলল, জালালিরে মাইর-অ ধইর-অ না ভাই। জালালিকে বলল, সময় মত দুইটা রাইন্দা দ্যাইস।

    এসব কথা বলার সময়ই জোটনের চোখ থেকে জল পড়ছিল। কত দীর্ঘদিন পরে ফের এই নিকা এবং এদিনে সে তার মোট তেরটি সন্তানের কথা মনে করতে পারল। যেন তাদের জন্যই চোখে জল। কোথাও তার দীর্ঘদিন ঠাঁই হয় না। জোটন চতুর্থবার স্বামীর ঘর করতে যাচ্ছে এবং আল্লার মাশুলের জন্য এই যাত্রা। যদি কোনও কারণে আল্লার দরবার শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তবে সে ফের ফিরে আসবে এবং সোনালী বালির নদীতে অথবা বিলে শালুক তুলে, বাড়ি বাড়ি চিঁড়া কুটে, পরবে পরবে গেরস্থ মানুষের কাজ করে দুঃখে সুখে তার দিন কেটে যাবে।

  • আট

    আট

    বাইরে ইতস্তত মুরগি চরে বেড়াচ্ছিল। ভুখা পেটে জালালি ঘরের দাওয়ায় বসে। সামসুদ্দিন এবং তার মজলিস, অথবা ভিতর বাড়িতে অলিজানের রান্না গোস্ত (মেহমানদের ভোগের জন্য) সবই বিসদৃশ। জালালি কচুর ঝোপ অতিক্রম করে মাঠে দৃষ্টি দিল। ধানখেতে কিছু হাঁস শব্দ করছে— প্যাঁক প্যাঁক। ওর পেট মোচড় দিয়ে উঠল। মকবুলের আতাবেড়াতে বাছ-পাট শুকোচ্ছে। তিন চারদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি বলে মাটি শুকনো, ঘাস শুকনো। খামারবাড়িতে জামরুল গাছ। গাছে জামরুল ফল ঝুলছে। এবং রোদের জন্য ওদের পাখির মতো মনে হচ্ছিল। আর গ্রামময় রসুন পেঁয়াজের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আর হাঁসগুলি তখনও গোপাটের ধানখেতে প্যাঁক প্যাঁক করে ডাকছে। সুতরাং জালালি বসে থাকতে পারছে না। মালতীর হাঁসগুলি আবার এই মাঠে। মিঞা মাতব্বরেরা মজলিস শেষ করে গোসলে যাচ্ছে। জালালি অলিজানের পাছদুয়ারে বসেছিল—চোখমুখ শুকনো এবং কাতর কণ্ঠ। অলিজান যেন তার এই প্রাচুর্যকে জালালির চোখের উপর ভাসিয়ে দিল। মেমানগণ বর্ষার জলে পানিতে গোসল করতে গেল। ওরা ডুব দিল অথবা জলে সাঁতার কাটল, তারপর নামাজ শেষ করে শীতলপাটিতে খেতে বসে গেল গোল হয়ে। বেশ খাওয়া–মাছের ছালোন, মুরগীর গোস্ত, রসুন সম্বারে মুগের ডাল। ওরা খেয়ে সানকিতে কুলকুচা করল। ওরা একই বদনার নলে মুখ রেখে পানি খেল। ওরা কোনও উচ্ছিষ্ট খাবার রাখল না। জালালির বসে থেকে হাঁটু ধরে গেছিল। জালালি থুতু গিলে শেষ পর্যন্ত নিজের কুঁড়েঘরটাতে আশ্রয় নিয়ে সকলের প্রতি এবং আল্লার প্রতি ক্ষুব্ধ কথাবার্তা নিক্ষেপ করে শান্তি পাচ্ছিল। মালতীর হাঁসগুলি প্যাঁক প্যাঁক করছে গোপাটের ধানখেতে; সুতরাং সে গামছা পরে গোপাটের জলে শালুক তুলতে নেমে গেল।

    মেমান সকল চলে গেল। সামসুদ্দিন ঘাটে সকলকে বিদায় জানাল। ওদের নৌকা গোপাট ধরে চলতে থাকল। কিছু পাটখেত অতিক্রম করলে নৌকাগুলি আর দেখা গেল না—মাঝে মাঝে লগির ডগাটাকে উঠতে নামতে দেখা গেল। ওরা পুবের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। পুবের বাড়ির মালতী অথবা নরেন দাসের বিধবা বোন মালতীর কথা মনে হল সামসুদ্দিনের। হিজল গাছের ইস্তাহারটাকে কেন্দ্র করে যে বচসা এবং অপমানে উভয়ে ক্ষত-বিক্ষত ছিল—এ সময়ে সবই কেমন অর্থহীন লাগল। বার বার সেই এক ইস্তাহার ঝুলত। অর্থাৎ এই দেশ সামুর, এই দেশ সামুর জাতভাইদের। গাব গাছটার নিচে মালতীর সঙ্গে কতদিন দেখা—কিন্তু মালতী কথা বলত না। কৈশোরে বয়সের কিছু স্মৃতি মনে করে কেমন কষ্ট বোধে পীড়িত হল সামু।

    ফতিমা পাশ থেকে ডাকল, বা’জান।

    সামু কেমন আঁৎকে উঠল, কিছু কইলি?

    —বা’জান, মায় আপনেরে ডাকতাছে।

    সামু ফতিমার মুখ দেখে, জলের নীল রঙ দেখে, এই ঘাস এবং মাটি দেখে, ক্রমশ সে কেমন ইসলাম প্রীতির জন্য এক গভীর অরণ্যের ভিতর ডুবে যেতে থাকল। সেই অরণ্যে সে দেখল কোনও এক ফকিরসাব ধর্মের নিশান হাতে নিয়ে মুসকিলাসানের আলোতে পথ ধরে শুধু সামনের দিকে হাঁটছেন। আলোর বৃত্তে বৃদ্ধের মুখ—অস্পষ্ট এক ইচ্ছার তাড়নাতে তিনি ক্লান্ত। সামু বার বার ডেকেও সেই শীর্ণ ক্লান্ত ফকিরকে ফেরাতে পারছে না। তিনি হেঁটে যাচ্ছেন এবং তিনি সামুকে শুধু অনুসরণ করতে বলছেন।

    ফতিমা ঘুরে এসে সামনে দাঁড়াল। বলল, মায় আপনেরে ডাকতাছে।

    সে ভিতর বাড়িতে ঢুকে গেল। তার বিবির খালি গা, নাকে নথ। বিবির চোখ ছোট, সুর্মাটানা হাতে নীল কাচের চুড়ি। পরনে ডুরে শাড়ি। গায়ে সেমিজ নেই, কাপড়ের নিচে সায়া নেই। সাদাসিধে এক প্যাচে কাপড় পরনে,সুতরাং শরীরে সকল অবয়বই প্রায় স্পষ্ট। অলিজানের শরীরটা এখন গাভীন গরুর মতো। শুধু যেন শুয়ে থাকতে পারলে বাঁচে। অথচ চোখ সুর্মাটানা বলে ইচ্ছার চেয়ে চোখে আবেগ বেশি। সে বলল, বেলা বাড়ে না কমে? আপনে খাইবেন না?

    সামু তক্তপোশে খেতে বসল। ওর বিবি কাছে বসে খাওয়াল। সামুকে খুব চিন্তিত দেখে বিবি বলল, কি ভাবতাছেন?

    সামু উত্তর দিল না। নিঃশব্দে খেয়ে যেতে থাকল।

    —কি, কথা কন না ক্যান?

    সামু বিরক্ত হল। বলল, তর সব কথায় কাম কি! দুইডা ভাত দিবি তা দ্যা। কতা বাড়াইস না।

    অলিজান বলল, কি কথা বাড়াইলাম?

    সামু মুখ তুলে অলিজানের মুখ দেখল, চোখ দেখল। অলিজানের চোখে কি যেন একটা আছে—যা দেখলে সে সব রাগ দ্বেষ হিংসা ভুলে যায়। সে বলল, আমি ভোটে লীগের তরফে খারমু ঠিক করছি। ছোট ঠাকুরের বিরুদ্ধে খারমু।

    —আপনের মাথায় যে কি ঢুইকা পড়ে না! বুঝি না! ক্যান, কী দায় পড়ছে ওই কাইজ্যা ডাইকা আননের। ছোট ঠাকুর আপনের কী ক্ষতি করছে? তিনি ত খুব ভালো মানুষ।

    সামসুদ্দিন বলল, আমি কইছি তাইন খারাপ মানুষ! বলে সে উঠে পড়ল। হাত মুখ ধুলো এবং যখন দেখল বেলা পড়তে দেরি নাই—ধনু শেখ পাটের আঁটি ঘরে তুলছে তখন নাও নিয়ে এবং ধনু শেখকে নিয়ে জলের ওপর ভেসে গেল। সে সব ঝোপজঙ্গল ভেঙে পুকুরের জল কেটে মাঠে গিয়ে পড়ল। এখন মসজিদের চালে মোরগ হেঁটে বেড়াচ্ছে। গরুছাগল সব উঠোনের উপর। বাড়ির সকল পুরুষরাই খাটতে গেছে। শুধু মনজুর নিজের জমি চাষ করে। হাজি সাহেবের কিছু জমি আছে। নয়া পাড়ার ইসমতালী বড় গেরস্থ। অলিজানকে সাদি করে সামু ভাবল, ইসমতালী-সাব এবার তার কথা বলবে। কিন্তু বড় হিন্দু ঘেঁষা লোক। সঙ্গে সঙ্গে সামুর মুখটা কঠিন দেখাল। আর এ-পাশের শালুকের জমি অতিক্রম করে জঙ্গলের ভিতর হাঁসের শব্দ পেতেই সে চোখ তুলে তাকাল। মনে হল ঝোপের ভিতর কোনও মানুষের চিহ্ন যেন। সে বলল, ঝোপের ভিতর ক্যাডা?

    ঝোপের ভিতর থেকে কোনও মুখ উঁকি দিল না। আশেপাশে বেতঝোপ এবং শ্যাওড়া গাছ। কিছু সোনালী লতা শ্যাওড়া গাছটাকে ঢেকে রেখেছে। একদল হাঁস ভয়ে প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে পুবের বাড়ির দিকে ছুটছে। আর তখন সে দেখল পানির তলা থেকে কাদামাটি সব উপরে উঠে আসছে। যেন কোনও গো-সাপ একটা বড় সাপকে ধরে পানির নিচে সামলাতে পারছে না, যেন পানির নিচে ঝোপের পাশে একটা প্রাগৈতিহাসিক জীব হেঁটে বেড়াচ্ছে।

    সামু পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। ধনু শেখ নৌকা থামিয়ে দিল। এবং নৌকাটাকে ঝোপের পাশে নিয়ে যেতেই দেখল জলের ওপর শাপলা-শালুকের পাতার ফাঁকে জালালি মুখ জাগিয়ে নিশ্বাস ফেলছে।

    সামু বলল, আপনে এহানে কি করতাছেন?

    জালালি গলাটা কিঞ্চিৎ তুলে বলল, শালুক তুলতাছি রে বাজী।

    —এহানে কি শালুক হইছে?

    —হইছে। ইট্টু ইট্টু হইছে। বলে সে ডান হাতে একটা শালুক তুলে দেখাল সামুকে। বলল, বড় হয় নাই, কষা। তারপর জালালি বিকালের রোদে মুখ রেখে বলল, তর চাচায় ফাওসার গয়না নৌকায় মাঝি হইয়া গ্যাল কবে! না খত, না পয়সা! খাই কি, ক! এয়ের লাইগ্যা, শালুক তুইল্যা চিবাইতাছি।

    জালালি গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রেখেছে এবং জালালির চোখ দুটোতে আতঙ্ক। জালালির শুকনো মুখ দেখে সামুর কষ্ট হতে থাকল। শাপলা-শালুকের জমি পার হলে ধানখেত। মালতীর হাঁসগুলি ধানখেতের ভিতর ভয়ে ভয়ে ডাকছে। সে আকাশে কোনও বাজপাখি উড়তে দেখল না—কোনও ঝোপজঙ্গলে শেয়ালের চোখ দেখল না—শুধু জালালির মুখটা লোভের জন্য পাপের জন্য ধীরে ধীরে বীভৎস হয়ে উঠছে, যেন মুখটা এখন যথার্থই শেয়ালের মতো।

    জালালি তার জায়গা থেকে এতটুকু নড়ল না। দু’হাতে হাঁসটার গলা জলের নিচে টিপে ধরেছে। এতক্ষণ ধরে সংগ্রামের পর সে ক্লান্ত! সামুর চাকরটা এখন লগি বাইছে। হাঁড়িটা বাতাসে ভেসে দূরে সরে যাচ্ছে। সামু গোপাটের অশ্বত্থ গাছটার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলে গাল দিল জালালি, নিব্বৈংশা। এহানে কি করতাছেন? তর মাথা চিবাইতেছি। বলে সে একটা গিরগিটির মতো জলে সাঁতার কাটতে থাকল। হাঁসটা ওর ডান হাতে। এবং হাঁসটাকে সে জলের নিচে সব সময় লুকিয়ে রাখার জন্য এক হাতে সাঁতার কেটে হাঁড়িটাকে যখন আয়ত্তে আনল তখন সামু অনেক দূরে—তখন বিকেলের রোদ সরে যাচ্ছিল এবং তখন আকাশে নানা রঙের মেঘ জমে ঈশান কোণটাকে কালো, গম্ভীর করে তুলছে।

    এবার সে বাড়ির দিকে উঠে যাবার জন্য হাঁসটাকে আড়ালে হাঁড়িতে ঢুকিয়ে দিল। পুরুষ্টু হাঁসের পেটটা এখনও নরম এবং উষ্ণ। সে পেটে হাত রেখে উত্তাপ নেবার সময় দেখল, অনেকগুলি ধানখেত পার হলে পুবের বাড়ির গাবগাছ, গাছের নিচে মালতী। মালতী ওর হাঁসগুলিকে খুঁজছে। জলের ওপর শরীরটাকে তুলে সে উঁকি দিল। এবং দূরে মানুষের শব্দ পেল জালালি। সে পরনের গামছাটা খুলে ভয়ে হাঁড়ির মুখটা ঢেকে দিল। দূর থেকে মালতীর গলাও ভেসে আসছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে চারদিকে। পাটখেতের ভিতর দিয়ে অন্য প্রান্তে কিছু দেখা যাচ্ছে না। জায়গাটা নির্জন। অশ্বত্থগাছ পার হলে মনজুরদের ঘর। ধনার মা বুড়ি ছাতিম গাছের নিচে বসে এখন প্রলাপ বকছে। সে ঘরের দিকে উঠে যাবার সময় যখন দেখল কোথাও কোনও মানুষের চোখ উঁকি দিয়ে নেই, যখন অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে তখন উষ্ণ পেটটাতে আর একবার হাত রাখল। সে গামছা তুলে ফের মৃত হাঁসটাকে উঁকি দিয়ে দেখল এবং চাপ চাপ অন্ধকারের ভিতর মৃত হাঁসটার পেটে হাত রেখে ফের বড় রকমের একটা ঢোক গিলে মাংস খাবার লোভে মরিয়া হয়ে উঠল।

    জলের ওপর দিয়ে মালতীর কণ্ঠ ভেসে আসছে—আয়, তৈ তৈ।

    দূরে ধানখেতের ভিতর হাঁসগুলি তেমনি প্যাঁক প্যাঁক করছে। ঘন ধান-গাছের ভিতর হাঁসগুলি লুকিয়ে আছে। মালতী জলে নেমে গেল। হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে ডাকল, আয়, তৈ তৈ। আয়….. আয়। চারদিকে অন্ধকার। হাটুরেরা ঘরে ফিরছে। খালের ধারে লগির শব্দ। নৌকার শব্দ। সে অন্ধকারে কোনও পরিচিত হাটুরের মুখ দেখতে পেল না। অমূল্য সূতা আনতে গেছে হাটে। শোভা, আবু ঘরে ঘরে আলো জ্বালছে এবং জল দিচ্ছে দরজাতে। নরেন দাসের বৌ বৃষ্টি আসবে ভেবে সব শুকনো পাটকাটি ঘরে নিয়ে রাখছে। আর ঝড়বৃষ্টি এলে হাঁসগুলি পথ ভুল করে দূরে চলে যেতে পারে অথবা কত রকমের দুর্ঘটনা…মালতী প্রাণপণে ডাকতে থাকল, আয়, তৈ তৈ।

    শোভা, আবু গাবগাছের নিচে পিসির গলা শুনতে পেল। সেই কখন থেকে পিসি হাঁসগুলিকে ডাকছে। ওরা কাফিলা গাছ অতিক্রম করে পিসির জন্য জলে নেমে গেল এবং পিসির সঙ্গে গলা মিলিয়ে ডাকতে থাকল। আর দূরে সামুর নৌকা ভেসে যাচ্ছে। বৃষ্টি আসবে জেনেও সামু ঘরে ফিরছে না। জালালি বৃষ্টির রঙ আকাশে দেখতে পেল। জলের পাশে কাঁটা গাছের সব ঝোপ। ঝোপ পার হলে, মান্দার গাছের নিচে ওর পাটকাঠির বেড়া দেওয়া ঘর। ভিজে মাটির গন্ধ আসছে। জোটন ফকিরসাবের সঙ্গে দরগায় চলে গেছে। বাড়িটা একেবারে ফাঁকা। হাজিসাহেবের খামারবাড়ি পার হলে তবে অন্য ঘর। অন্ধকার এবং নির্জনতা সত্ত্বেও মৃত হাঁসটাকে সে গামছা দিয়ে সন্তর্পণে ঢেকে রেখেছে। বৃষ্টি নামবে। বর্ষাকাল বলে ঘরের আশেপাশে এবং সর্বত্র আগাছার জঙ্গল। এক সবুজ সবুজ গন্ধ। সুতরাং জালালি সব দেখে-শুনে নগ্ন শরীরটাকে ঘরের দিকে গোপনে তুলে নিয়ে গেল। গামছা দিয়ে যেহেতু সে হাঁড়ির মুখ ঢেকে রেখেছিল, সেহেতু নগ্ন! অন্ধকার বলে, বৃষ্টি আসবে বলে গাবগাছের নিচে মালতীর গলা শোনা যাচ্ছে না—আশেপাশে শুধু কীট-পতঙ্গের আওয়াজ।

    মালতী দেখল ওর হাঁসি তিনটে ফিরে আসছে। হাঁসাটা নেই। মালতীর বুকটা কেঁপে উঠল। কত কষ্টের এই হাঁসা। প্রতিপালন করা কত বেদনা-সাপেক্ষ। ওর প্রিয় হাঁসাটাকে না দেখে মালতী চিৎকার করে উঠল, বৌদি গো, আমার হাঁসাটা কই। হাঁসি তিনটা আইতাছে, আমার হাঁসাটা ক‍ই গ্যাল!

    নরেন দাসের বৌ পাঁজা করে সব শুকনো পাটকাঠি তুলছিল। পাটকাঠিগুলিতে মড়মড় শব্দ হচ্ছে—সুতরাং সে মালতীর চিৎকার শুনতে পাচ্ছে অথচ স্পষ্ট বুঝতে পারছে না মালতী কী বলছে। সে পাটকাঠি ফেলে গাবগাছতলায় ছুটে গেল এবং জলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, কী হইছে তর?

    —দ্যাখেন, কি হইছে! হাঁসি তিনটি আছে, হাঁসাটা নাই। কেমন কান্না-কান্না গলায় মালতী বলল।

    —দ্যাখ, কোনখানে পলাইয়া রইছে।

    —আপনের যে কথা বৌদি! অর পরাণে বুঝি ডর নাই?

    —ডর আছে ল, ডর আছে। অমূল্য আসুক। নৌকা লইয়া খুঁজতে বাইর হইবনে। তুই জল থাইক্যা উইঠা আয়।

    সুতরাং মালতী জল থেকে উঠে এল। ওর মনটা বিষণ্ণতায় ভরে আছে। কান্না কান্না এক আবেগ বুকের ভিতর জমা হচ্ছে ক্রমশ। ওর এই হাঁসা বড় প্রিয়, বড় কষ্টে সে লালন করেছে এবং বিধবা যুবতীর একমাত্র অবলম্বন। ঝড় জলে সেই ছোট ছোট চারটা পাখি যে দিন নরেন দাস ডুলাতে করে ঘরে নিয়ে এসেছিল, সেইদিন থেকে কত যত্নের সঙ্গে এদের সে ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল। ছোট ছিল বলে ওরা কচি ঘাস খেতে পারত না, ওরা ভাত খেতে পারত না সুতরাং সে ছোট ডারকিনা মাছ ধরত পুকুর থেকে, ছোট ছোট জিড় তুলে যত্নের সঙ্গে খাইয়ে পুকুর-ঘাটে ছেড়ে ওদের বড় হতে সাহায্য করত। মালতী জল থেকে উঠে আসার সময় প্রাণপণ ডাকল, আয়, আয়, তৈ তৈ।

    অন্ধকার বলে, বৃষ্টি আসবে বলে ওরা আর গাবগাছের নিচে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারল না।

    .

    জালালি ঘরের ভিতর কুপি জ্বালল। ঘরে তার ছেঁড়া হোগলা এবং শিকাতে ঝোলানো নাঙলবন্দের বান্নি থেকে আনা হাঁড়ি পাতিল। একটা ভাঙা উনুন। কুপিটা জ্বলতে থাকল। সে ভিজা গামছাটা বিছিয়ে তার উপর মৃত হাঁসটাকে রেখেছে। ওর দরজার ঝাঁপ বন্ধ ছিল। কুপির আলোতে ওর তলপেট চকচক করছে। মুখে পেটুকের গন্ধ। সে হাঁসটার তলপেটে চাপ দিতেই বুঝল উষ্ণতা মরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁসটার শরীরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ওর শরীরের সব পালক দ্রুত তুলতে থাকল। ওর শরীর থেকে এখনও ইতস্তত জল ঝরছে। এই জলের জন্য নিচের মাটি ভিজে উঠছে—কাদা-কাদা ভাব। সে যত্নের সঙ্গে হাঁসটাকে, গামছাটাকে শুকনো মাটিতে টেনে আনল, যত্নের সঙ্গে হাঁটু গেড়ে মাংস ভক্ষণের নিমিত্ত প্রাণপণে মৃত হাঁসটাকে আগুন জ্বেলে সেঁকতে থাকল। বাইরে বৃষ্টি।

    কতদিন থেকে যেন পেটে ভাত নেই, কতদিন থেকে যেন জাম-জামরুল খেয়ে, কখনও শালুক খেয়ে জালালি ক্ষুধা মিটিয়েছে। পেট ভরে খাবার জন্য সারাদিন থেকে খোয়াব দেখছিল। বিকেলের এই হাঁসটা সে-খোয়াবকে সার্থক করছে। সুতরাং সে তার আল্লার কাছে এ মেহেরবানিটুকুর জন্য খুশি। খুশির জন্যই হোক অথবা ক্ষুধার তাড়নাতেই হোক এবং লোভের জন্যও হতে পারে সে কাপড় পরতে ভুলে গেছিল। ওর তলপেটের ফাটা সাদা সাদা দাগগুলোতে এখনও কিছু জলের রেখা চিকচিক করছে, অনেকটা মানচিত্রের নদী-নালার মতো। কি ভেবে জালালি তলপেটে হাত রাখল এবং ভাবল এই তলপেটে ফের চর্বি হবে, ফের আবেদালি গয়না নৌকার কাজ সেরে ঘরে ফিরবে।

    জালালি হাঁসটার পেটের ভিতর থেকে নখ দিয়ে টেনে টেনে ময়লাগুলো বের করবার সময়ই ভাবল আবেদালির বড় দুঃখ। সে বলত, জব্বইরা হওয়নের পর তর প্যাট যে নাইমা গ্যাল আর উঠল না, আর তর পেটে চর্বি ধরল না।

    জালালি মনে মনে বলল এ-সময়, তুমি আমারে হপ্তায় হপ্তায় হাঁসের গোস্ত খাইতে দ্যাও দ্যাখ ক’দিনে প্যাটে চর্বি লাগাইয়া দ্যাই। ওর এ-সময় মালতীর কথাও মনে হল। মালতী বিধবা যুবতী। দিন দিন মালতীর রূপ খুইল্যা পড়তাছে। আল্লা, আমারে অর রূপটা দিলি না ক্যান। বাইরে বৃষ্টি ঘন হয়ে নামছে তখন।

    এবার হাঁসের শরীর থেকে চামড়াটা তুলে ফেলল জালালি। বাঁশের চোঙাতে সরষের তেল নেই। একটু তেল আনতে সে কোথাও যেতে পারছে না বৃষ্টির জন্য! সুতরাং সে অনেকক্ষণ ধরে শরীরটাকে সেঁকছিল আর তার জন্য সেদ্ধ-পোড়া এক ধরনের গন্ধ উঠছিল। সে এই সেদ্ধ-পোড়া মাংস একটু নুন লঙ্কাতে ভেজে দুটো সানকিতে রাখল। এক টুকরো মুখে দিল, তারপর ফুৎ করে হাড়টা মুখ থেকে বের করে চেখে চেখে মাংসটা খাবার সময় দেখল, হাঁসের পালকগুলো কখন সব বাতাসে ঘরময় হয়ে গেছে। গাছার ওপর কুপিটা দপদপ করে জ্বলছে। আলোটার দিকে চেয়ে, ঘরময় পালকগুলো দেখে এবং চুরি করে হাঁস ভক্ষণের নিমিত্ত মনে মনে অসহায় হয়ে পড়ল জালালি। আবেদালি জানতে পারলে মারধোর করবে। সেজন্য জালালি আর মাংসের হাড় না চিবিয়ে খুঁটে খুঁটে সব পালকগুলো তুলে বৃষ্টির ভিতর জলে নেমে গেল। জল ভেঙে অন্ধকারের ভিতর গোপাটের দিকে চলতে থাকল। তারপর অশ্বত্থের নিচে যে ঝোপ-জঙ্গল ছিল, সেখানে সব পালকগুলি ছড়িয়ে দিয়ে বলল, আল্লা আমার ক্ষুধা পাইছে। আমি যাই। এখন বৃষ্টির জলে জালালির সব দুঃখ ধুয়ে যাচ্ছে। সুখের জন্য জালালি ঘরের দিকে ফিরছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সে বিদ্যুতের আলোয় দেখল, পাটখেত নুয়ে পড়েছে। সেই সব পাটখেত পার হলে জলের ওপর একটি আলোর বিন্দু ঘুরতে দেখল। এবং সন্তর্পণে কান পাতলে শুনতে পেল যেন তখনও মালতী ওর হাঁসাটাকে ডাকছে—আয়, আয়, তৈ তৈ। সে আর এতটুকু দেরি করল না। সে ঘরের ভিতর ঢুকে ঝাঁপ বন্ধ করে দিল। শরীর মুখ মুছল। এবার একটু সময় নিয়ে গামছাটা ভালো করে প্যাঁচ দিয়ে পরল। একটা কাঠের টুকরোর উপর বসে হাঁসের হাড় এবং গোস্ত চুষতে থাকল জালালি। মনে হল, মালতী যেভাবে ডাকছে—এখনই হয়তো হাঁসটা সানকির ওপর ডেকে উঠবে। সে গব গব করে এবার মাংস ছিঁড়ে খেতে থাকল। অথবা গিলতে থাকল। সে কিছুতেই হাঁসটাকে সানকির ওপর আর প্যাঁক প্যাঁক করে ডেকে উঠতে দিল না।

    .

    বৃষ্টি থামলে সামসুদ্দিন ঘরের দিকে ফিরল। ধনু শেখ নৌকা বাইছিল। দূরে ধানখেতের ভিতর অন্য একটি আলো দেখে মালতীর কণ্ঠ শুনে বুঝল, মালতী এখনও হাঁসগুলি পায়নি। মালতী এবং অমূল্য প্রাণপণ ডাকছে—আয়, আয়, তৈ তৈ এবং এই শব্দ গ্রাম মাঠ পার হয়ে বহু দূরে চলে যাচ্ছে—বড় দুঃখের এই ডাক, বড় কষ্টের। মালতীকে অনেকদিন পর সামু এই মাঠে দেখল—কী যেন অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে। অমূল্য নৌকা বাইছিল; ধানখেতের ভিতর, পাটখেতের ভিতর অথবা অন্য কোনও ঝোপ-জঙ্গলে হাঁসটা ভয়ে লুকিয়ে আছে কি না দেখছে মালতী। এ-সময় মালতী দেখল, অন্য একটা নৌকা, পাটাতনে সামসুদ্দিন। সামসুদ্দিন যেন কিছু বলতে চাইছে। হারিকেনের আলোতে সামসুদ্দিনের মুখ স্পষ্ট। মালতী এক বিজাতীয় ঘৃণাবোধে সামুর সঙ্গে প্রথমে কথা বলতে পারল না। সামু যেন হালে তামাসা দেখছে। মালতীর কান্না পাচ্ছিল হাঁসটার জন্য। সে মাথা নিচু করে বসে থাকল। সামসুদ্দিনকে দেখে কোনও কথা বলল না। সামু আজ অপমানিত বোধ করল না কারণ মালতীর এই বসে থাকাটুকু সহায়-সম্বলহীন নারীর মতো। সুতরাং সে বলল, তর হাঁসগুলি বাড়ি যায় নাই?

    —হাঁসগুলি গ্যাছে। হাঁসাটা যায় নাই।

    মালতী সংক্ষিপ্ত জবাব দিচ্ছিল। মালতী মাথা নিচু করে বসেছিল, চারদিকে ভিজা বাতাসের গন্ধ চারদিকে আঁধার আরও ঘন। বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামছে। সামু এবং অমূল্য দুজন মিলেই এবার ডাকতে থাকল, আয়, তৈ তৈ। কোথাও কোনও হাঁসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না শুধু অশ্বত্থ গাছটায় জোনাকি জ্বলছে। নিচে হাঁসের পালক উড়ছে। পালকগুলো জলে নৌকার মতো ভেসে যাচ্ছে।

    সামু, অমূল্য এবং মালতী গলা মিলিয়ে ডাকল। ওরা লণ্ঠন তুলে ধান-গাছের ফাঁকে অন্বেষণের সময় দেখল জলে ইতস্তত হাঁসের পালক ভেসে যাচ্ছে। গোপাটের অশ্বত্থ গাছটার নিচে এসে যথার্থই মালতী ভেঙে পড়ল। পালকের ধূসর রঙ, অশ্বত্থের ঘন জঙ্গল সব মিলে সে হাঁসটার মৃত্যু সম্বন্ধে সচেতন হতেই ডুকরে কেঁদে উঠল।

    এই কান্নার জন্যই হোক অথবা পালকের অবস্থানের জন্যই হোক, সামসুদ্দিন বিকেলের কিছু কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেখল, জঙ্গলের ফাঁকে যেন জালালির মুখ। সুতরাং অযথা সে আর হাঁসটাকে খুজল না। সে জানত এই হাঁসগুলিকে মালতী সন্তানবৎ স্নেহে লালন করে আসছে। মালতী বিধবা—সুতরাং বিধবা যুবতীর একমাত্র সম্বল!… সামু রাগে দুঃখে প্রথমে কথা বলতে পারল না। জালালির মুখটা ওর চোখের ওপর কেবল ধূর্ত শেয়ালের মতো ভেসে উঠছে, এবং মালতীর বেদনাবোধ সামুকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলল।

    সামু বলল, বাড়ি যা মালতী।
    অমূল্য বলল, চলেন দিদি।
    সামু বলল, কান্দিস না মালতী।

    মালতী এবার চোখ তুলল এবং সামুকে দেখে ভাবল সেই সামু—যার চোখ ছোট এবং গোল গোল ছিল—সেই সামু যে শান্ত ছিল, এবং মালতীর দুঃখে কৈশোর বয়সে কাতর হতো। সামু যেন আজ যথার্থই দাড়ি-গোঁফহীন পুরুষ—সামু যেন এক হিন্দু যুবকের মতো আজ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং মালতীর দীর্ঘদিনের ঘৃণাবোধ সরে গেল। সে অনেকক্ষণ নির্বোধ বালিকার মতো সামুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছু বলল না।

    নৌকা দুটো পাশাপাশি ছিল।

    হারিকেনের আলোতে ওদের মুখ স্পষ্ট ছিল। গ্রামের ভিতর থেকে কুকুরের ডাক জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসছে। বিশ্বাসপাড়াতে হ্যাজাকের আলো এবং আকাশে অস্পষ্ট মেঘের ছায়া। কিছু নক্ষত্ৰ যেন মালতীর শোকতাপকে আরও গভীর করছে। এই শোকতাপ সামুর ভিতরেও সংক্রামিত হল। সামসুদ্দিন বালক বয়সে এই গ্রাম মাঠ পার হয়ে বাপের হাত ধরে ধরে কোথাও চলে যাচ্ছে…যেন চারিদিকে ঢাকঢোল বাজছে—চারিদিকে পাইক-বরকন্দাজ…ওর বাপ দুগ্‌গা ঠাকুরের সামনে লাঠিখেলা দেখাচ্ছে—সামুর মনে হল, সেই সব কীর্তিমান পুরুষেরা আজ অথর্ব এবং এক নতুন ভাবধারা, নতুন ধর্মবোধ মানুষকে সংকীর্ণ করে তুলছে। সে জালালির ওপর যথার্থই ক্ষেপে গেল। সে মনে মনে বলল, শালীর প্যাটে পাড়া দিয়া গোস্ত বাইর করমু।

    সামুর নৌকা ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকল। ক্রমশ অদৃশ্য হতে থাকল। পিছনে অমূল্য, মালতী এবং হারিকেনটা পড়ে থাকছে। হারিকেনের আলো কিছুদূর পর্যন্ত অন্ধকারটাকে ঠেলে রেখেছিল, সামু যত দূরে সরে যেতে থাকল তত মালতীর মুখ অস্পষ্ট হতে থাকল।…মালতী যেন এক রহস্যময়ী নারী। বৃষ্টির জল ধানগাছ থেকে টুপটাপ জলে এবং নৌকার পাটাতনে ঝরছে, ঠিক মালতীর চোখের জলের মতো। সামু দূর থেকে চিৎকার করে বলল, তুই বাড়ী যা মালতী। অমূল্যকে বলল, অমূল্য, নৌকা ঘাটে লইয়া যাও। রাইতের ব্যালা এই মাঠময়দানে ঘুইর না। নির্জনে মালতীর এই বসে-থাকাটুকু সামুকে অসহায় করে তুলেছিল, কারণ, কলজের ভিতর কৈশোরের কাঁটাটা বড় বেশি আজ খচখচ করছে।

    .

    ধনু শেখকে নৌকাটা আবেদালির ঘাটে সন্তর্পণে ভিড়িয়ে দিতে বলল সামু। বলল, লগির য্যান শব্দ না হয়।

    সামু সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ওপরে উঠতে থাকল। ওকে হাঁটু পর্যন্ত কাদা ভাঙতে হল। এখন ঝোপ-জঙ্গল থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে নামছে। এখনও গাছ থেকে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ঝরে পড়েছে। ঘরের ভিতর স্তিমিত আলো। ভিতরে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আবেদালি নেই, জব্বর গেছে বাবুর হাটে এবং জোটনও অনুপস্থিত। বড় ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল। সে ঝোপের বেতপাত সরিয়ে বেড়ার ফঁকে চোখ ঠেলে দিল। দেখল, ছোট এক লম্ফ জ্বলছে। জালালি প্রায় নগ্ন হয়ে বসে আছে পিঁড়িতে। সে সানকির সব হাড় চুষছিল। হাড়ে কোনও গোস্ত লেগে নেই। সে দাঁতের ফাঁকে হাড়গুলোকে মড়মড় করে ভেঙে খাচ্ছিল। তারপর পানি খাচ্ছে। সামু দেখল, পানির ওপর যে ধূর্ত শেয়ালের মুখটা ভেসে ছিল জালালির – সারাদিন পর গোস্ত ভক্ষণে—সে মুখ সহজ এবং সুন্দর। সে মুখে আল্লার দোয়া। পানি খেতে খেতে দুবার সে তার আল্লার নাম স্মরণ করল। সামু গরিব এই মানুষগুলির জন্য ফের অরণ্যের ভিতর হেঁটে যেতে চাইছে, সুতরাং মালতীর হাঁস চুরির কথা অথবা জালালির পেট পাড়া দিয়ে গোস্ত বের করার কথা সব কেমন যেন মন থেকে নিঃশেষে মুছে গেল। কারণ জালালি একটা ছেঁড়া হোগলা পেতে এখন নামাজ পড়ছে। রসুলের মতো মুখ—সামনে দুহাত প্রসারিত জালালির। সামসুদ্দিন কিছুই বলতে পারল না। দীর্ঘ এই সংসারযাত্রার আসরে সে যেন কালনেমিনির মতো এক অলীক লঙ্কাভাগে মত্ত। ওর পা সরছিল না। মাটির সঙ্গে পা গেঁথে যাচ্ছে।

  • নয়

    নয়

    শীতকাল এলেই মানুষটা কিছুদিন যেন ভালো থাকে। ঠাণ্ডার জন্য মণীন্দ্রনাথ গায়ে র‍্যাপার জড়িয়েছেন। আগের মতো খালি গায়ে থাকছেন না। এমন করে ভালো হতে হতে একদিন হয়তো যথার্থই ভাল হয়ে যাবেন। তখন কোথাও দু’জনে চলে যাবে এক সঙ্গে—কোনও তীর্থে অথবা বড় শহরে। অথবা সেই যে বলে না, এক মাঠ আছে, মাঠের পাশে বড় দিঘি আছে, দিঘিতে বড় বড় পদ্মফুল ফুটে থাকে, বড়বৌ গ্রীক পুরাণের এই নায়ককে নিয়ে একদিন যথার্থই সেখানে চলে যাবে। মানুষটা ভালো হলেই জলদানের নিমিত্ত কোনও জলছত্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। তখন হয়তো কোথাও দূরে গীর্জায় ঘণ্টা বাজবে, পুরোহিতেরা মন্ত্র উচ্চারণ করবে—পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ কোনও হ্যামলক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সোনার হরিণের স্বপ্ন দেখবেন।

    বড়বৌ মানুষটাকে আজ স্বাভাবিক দেখে এক বাটি গরম দুধ নিয়ে এল। সঙ্গে নতুন গুড়, মর্তমান কলা। কিছু গরম মুড়ি। বড় আসন পেতে সে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল।

    সেই আশ্বিনের কুকুরটা মণীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিল। সোনা দক্ষিণের বারান্দায় পড়ছে। কুকুরটা মাঝে মাঝে ঘেউঘেউ করছিল। লাল জবা গাছটার নিচে দুটো শীতের ব্যাঙ্ ক্লপ ক্লিপ করছে। মণীন্দ্রনাথ গরম দুধ, মর্তমান কলা, নতুন গুড় মেখে খেলেন। কিছু তার প্রিয় কুকুরকে দিলেন। তারপর উঠে আসার সময় মনে হল সোনা চুপি চুপি পড়া ফেলে এদিকে আসছে। বড়কর্তা খুব খুশি—তিনি, কুকুর এবং সোনাকে নিয়ে শীতের ভোরে মাঠে নেমে গেলেন।

    ওরা সোনালী বালির নদীতে এসে নামল! এখন জলে তেমন স্রোত নেই। জল কমে গেছে। যেন ইচ্ছা করলে হেঁটে পার হওয়া যায়। পাড়ের পরিচিত মানুষেরা সোনা এবং মণীন্দ্রনাথকে আদাব দিল। আশেপাশে সব মুসলমান গ্রাম। ওদের দেখেই নৌকা নিয়ে মাঝি এ পাড়ে চলে এল। নৌকায় কুকুরটা সকলের আগে লাফিয়ে উঠেছে। সোনার অনেকদিনের ইচ্ছা—কোন ভোরে, পাগল জ্যাঠামশাইর সঙ্গে গ্রাম মাঠ দেখতে বের হবে। প্রতিদিন ক্রোশের পর ক্রোশ হেঁটে দুপুরে অথবা সন্ধ্যায় জ্যাঠামশাই ক্লান্ত সৈনিকের মতো বাড়ির উঠোনে উঠে আসেন, পায়ে তাঁর বিচিত্র নদী-নালার চিহ্ন থাকে, গরমে তরমুজ এবং শীতের শেষে আখের আঁটি সঙ্গে আনেন। সোনার কাছে মানুষটা বনবাসী রাজপুত্রের মতো। কতরকমের গল্প শোনার ইচ্ছা এই মানুষের কাছে—পাগল বলে অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প শোনাতেন। নির্জন নিঃসঙ্গ মাঠ পেলেই বলতে থাকেন। পাগল বলে গল্পের আরম্ভও নেই শেষও নেই।

    জ্যাঠামশাই বলতেন, পদ্মপুকুর যাবি?

    জ্যাঠামশাই বলতেন, ইলিশমাছের ঘর দেখবি?

    তারপর কোনও উত্তর না পেলে বলতেন, রূপচাঁদ পক্ষী দেখবি?

    সোনা কোনও উত্তর করত না। উত্তর দিলেই বলবেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। তবু একবার সে খুব সাহস সঞ্চয় করে বলেছিল, আমি পঙ্খীরাজ ঘোড়া দ্যাখমু। দ্যাখাইবেন?

    মণীন্দ্রনাথের যেন বলার ইচ্ছা, তোমার পদ্মপুকুর দেখতে ইচ্ছা হয় না! ইলিশমাছের ঘর দেখতে ইচ্ছা হয় না। রূপচাঁদ পক্ষী দ্যাখো না! দ্যাখো কেবল, পঙ্খীরাজ ঘোড়া। পঙ্খীরাজ ঘোড়া একটা আমারও লাগে। পাই কোথা! বলে সোনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন।

    আজ আর সোনার কিছুতেই পঙ্খীরাজ ঘোড়ার কথা মনে হল না। সে আজ পড়া ফেলে চলে এসেছে। মা, ছোট কাকা খুঁজছেন। সোনা কই গ্যাল, দ্যাখেন, পোলাটা কই গ্যাল—সকলে খুঁজবে। সোনার ভারি মজা লাগল। মা ওকে ফতিমাকে ছুঁয়ে দেবার জন্য মেরেছে। ঠাকুমা বলেছে ওর জাতধর্ম গেল। ওকে সকলে অযথা হেনস্থা করেছে। কতদিন লালটু পলটু ওকে, একটু কিছু করলেই কান ধরে ওঠ বোস করিয়েছে—আজ ওরা সকলে ভাবুক। সে, জ্যাঠামশাইর সঙ্গে বাড়ি থেকে চুপি চুপি বের হয়ে পড়ল। পাগল বলে তিনি শুধু হেসেছিলেন। পাগল বলে তিনি তাকে এই যাত্রার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। যেন বলেছিলেন, কোথাও পঙ্খীরাজ ঘোড়া আকাশে উড়ে বেড়ায়, কোথাও না কোথাও শঙ্খের ভিতর শঙ্খকুমার পালিয়ে থাকে আর কোথাও না কোথাও ঝিনুকের ভিতর চম্পকনগরের রাজকন্যা ‘সাপের’ বিষে ঢলে আছে। তুমি আমি সেখানে চলে যাব সোনা। সবার জন্য বড় মাঠ, সোনালী ধানের ছড়া, নিয়ে আসব।

    আহা, ওরা কত গ্রাম মাঠ ফেলে চলে যাচ্ছে। যত ওরা এগুচ্ছিল তত আকাশটা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। সোনা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে ক্ষুধায় অবসন্ন হয়ে পড়েছে। এতটা হেঁটেও সে আকাশ ছুঁতে পারছে না কিছুতে। ওর কতদিনের ইচ্ছা, জ্যাঠামশাইর সঙ্গে বের হয়ে সে, যে আকাশটা নদীর ওপারে নেমে গেছে—সেটা ছুঁয়ে আসবে। কিন্তু কি করে জাদুবলে আকাশটা কেবল সরে যাচ্ছে।

    কিছু পরিচিত লোক এই নাবালক শিশুকে পাগল মানুষের সঙ্গে দেখে বিস্ময়ে বলে উঠল, সোনাবাধু, আপনে। জ্যাঠামশাইর লগে কোনখানে যাইতেছেন। হাঁটতে কষ্ট হয় না!

    সোনা খুব বড় মানুষের মতো ঘাড় নাড়িয়ে বলল, না।

    কিন্তু মণীন্দ্রনাথ বুঝতে পারছেন সোনা আর যথার্থই হাঁটতে পারছে না। তিনি ওকে কাঁধে তুলে নিলেন। এখন সূর্যের উত্তাপ প্রখর। ঘাসের মাথায় আর শিশির পড়ে নেই। সূর্য মাথার ওপর উঠে গেছে। এ-সময় ওরা, কোথাও যেন ঘণ্টা বাজছে এমন শুনতে পেল।

    সোনার মনে হল বুঝি সেই পঙ্খীরাজ ঘোড়া। সে হাততালি দিতে দিতে বলল, জ্যাঠামশয় পঙ্খীরাজ ঘোড়া।

    আশ্বিনের কুকুরটা সহসা চলতে চলতে থেমে পড়ল। সে কান খাড়া করে শব্দটা শুনল এগিয়ে আসছে।

    মণীন্দ্রনাথের এখন বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ছে। সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনেই বুঝি বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। ডানদিকে এক দীর্ঘ বন। বনের ভিতর দিয়ে হাঁটলে ফের সেই সোনালী বালির নদী পাওয়া যাবে, নদীর পাড়ে তরমুজ খেত। এখন হয়তো তরমুজের লতা এক দুই করে বিছিয়ে যাচ্ছে ঈশম। আর তখন বনের ভিতর কত রকমের গাছ। সেই ঘণ্টার শব্দ ক্রমে নিকটবর্তী হচ্ছে। বনের ভিতর কত রকমের গাছ—সব চেনা নয়। তবু গন্ধ গোলাপজামের, লটকন ফলের। সব ফল এখন প্রায় নিঃশেষ সোনা গাছে গাছে কি ফল আছে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল তারপর ফাঁকা মাঠে নামতেই দেখল, এক আজব জীব। অতিকায় জীব। ওর গলায় ঘণ্টা বাজছে। সোনা চিৎকার করে উঠল, ঐ দ্যাখেন জ্যাঠামশয়।

    কুকুরটা ছুটতে চাইল এবং ঘেউঘেউ করে উঠল। জ্যাঠামশাই কুকুরটাকে ধরে রাখলেন। সোনাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে পাশাপাশি যেন তাঁরা তিন মহাপ্রাণ সেই আজব জীবের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। কাছে এলেই ছুটতে থাকবেন তাঁরা, অন্য পথে চলে গেলে কোনও ভয় থাকবে না।

    সোনা বিস্ময়ে কথা বলতে পারছে না। আসলে এত বড় মাঠ এবং এক বিরাট জীব—এ-হাতির গল্প সে মেজ-জ্যাঠামশাইর কাছে শুনেছে। জমিদার বাড়ির হাতি। হাতিটা দুলে দুলে ওদের দিকে নেমে আসছে। কাছে এলে, ওর মতো বয়সের এক বালক হাতির মাথায় বসে অঙ্কুস চালাচ্ছে দেখতে পেল। যে ভয়টুকু ছিল প্রাণে তা একেবারে উবে গেল। সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, জ্যাঠামশয়।

    জ্যাঠামশাই কতদিন পর যেন কথা বললেন, ওটা হাতি।

    সোনা বলল, হাতি!

    জ্যাঠামশাই বললেন, ওটা মুড়াপাড়ার হাতি।

    কিন্তু এ-কি! হাতিটা যে ওদের দিকেই ধেয়ে আসছে। বড় বড় পা ফেলে উঠে আসছে। এত বড় একটা জীব দেখে আর এমনভাব এগিয়ে আসছে দেখে সোনা ভয়ে গুটিয়ে গেল। একেবারে ওদের সামনে এসে পড়েছে। জ্যাঠামশাই নড়ছেন না। কুকুরটা ছুটোছুটি করছে। সোনা ভাবছিল পালাবে কিনা, ছুটবে কিনা অথচ এত বড় বিস্তৃত মাঠ পিছনে–সামনে ঝোপ–সে কোন দিকে ছুটে যাবে স্থির করতে পারল না। ভয়ে সে শুধু জ্যাঠামশাইকে জড়িয়ে ধরল। বলল, আমি বাড়ি যামু।

    জ্যাঠামশাই কোনও উত্তর করলেন না। তিনি এখন শুধু অপলক দৃষ্টিতে হাতিটাকে দেখছেন। যত নিকটবর্তী হচ্ছে তত তিনি কেমন মনে মনে অস্থির হয়ে উঠছেন।

    ক্ষোভে এবং আতঙ্কে এবার সোনা, জ্যাঠামশাইর হাত কামড়ে দিতে চাইল। জ্যাঠামশাই ওর কথা শুনতে পাচ্ছে না। সে বলল, আমি মার কাছে যামু। বলে কাঁদতে থাকল।

    কিন্তু আশ্চর্য, হাতিটা ওদের সামনে এসে চার পা মুড়ে বশংবদের মতো বসে পড়ল। মাহুত, জ্যাঠামশাইকে সেলাম দিল। তারপর হাতিটাকে বলল সেলাম দিতে। হাতিটা শুঁড় তুলে সেলাম দিল।

    জসীমের ছেলে ওসমান সামনে বসে। জসীম পিছনে। সে বলল, আসেন কর্তা হাতির পিঠে চড়েন। আপনেগ বাড়ি দিয়া আসি।

    ওরা এতদূর এসে গেছেন যে জসীম পর্যন্ত বুঝতে পারছিল বেলাবেলিতে পাগল মানুষ এই নাবালককে নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবেন না। সে তাদের হাতির পিঠে তুলে নিল। সোনা হাতির পিঠে বসে মেজ-জ্যাঠামশাইর কথা মনে করতে পারছে। তিনি মুড়াপাড়া থেকে বাড়িতে এলেই এই হাতির বিচিত্র গল্প করতেন—হাতিতে চড়ে একবার ওঁরা শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে কালীগঞ্জে যেতে এক ভয়ঙ্কর ঝড় এবং একটা গাছ উপড়ে এলে এই হাতি গাছ রুখে মেজ-জ্যাঠামশাইকে মৃত্যু থেকে রেহাই দিয়েছিল। সোনার এ-সব মনে হতেই হাতির জন্য মায়া হতে থাকল। এখন মনে হচ্ছে তার, হাতির পিঠে চড়ে সামনের আকাশ অতিক্রম করে চলে যেতে পারবে। হাতিটা হাঁটছে। গলায় ঘণ্টা বাজছে। পিছনে আশ্বিনের কুকুর। কুকুরটা পিছনে ছুটে ছুটে আসছে। কত গ্রাম কত মাঠ ভেঙে, ঝোপজঙ্গল ভেঙে ওরা হাতির পিঠে–যেন কোনও এক সওদাগর বাণিজ্য করতে যাচ্ছে—সপ্তডিঙায়, সাতশো মাঝির বহর…সোনা যুদ্ধ জয়ের মতো ঘরে ফিরছে।

    জসীম সোনাকে বলল, কখন আপনেরা বাইর হইছিলেন?

    সোনা বলল, সেই ভোরবেলা।

    —মুখ ত আপনের শুকাইয়া গ্যাছে।

    —ক্ষুধা লাগছে, কিছু খাই নাই।

    —খাইবেন? বলে জসীম পাকা পাকা প্রায় দুধের মতো সাদা গোলাপজাম কোঁচড় থেকে তুলে দিল। মিষ্টি এবং সুস্বাদু গোলাপজাম। সোনা প্রায় খাচ্ছিল কি গিলে ফেলছিল বোঝা দায়।

    তখন হতিটাকে দেখে কিছু গাঁয়ের নেড়িকুকুর চিৎকার করছিল। কিছু আবাদী মানুষ বাবুদের হাতি দেখছিল—মুড়াপাড়ার হাতিটাকে নিয়ে জসীমউদ্দিন প্রতি বছর এ-অঞ্চলে ঠিক হেমন্তের শেষে, শীতের প্রথম দিকে চলে আসে। বাড়ি বাড়ি হাতি নিয়ে জসীম খেলা দেখায়।

    জসীম সোনাকে বলল, কর্তা পাগল জ্যাঠামশয়র লগে যে বাইর হইলেন—যদি আপনেরে ফালাইয়া তাইন অন্য কোনখানে চইলা যাইত?

    —যায় না। জ্যাঠামশয় আমারে খুব ভালোবাসে।

    জসীম বলল, পাগল মাইনসের লগে বাইর হইতে ডর লাগে না?

    সোনা বলল, না। লাগে না। জ্যাঠামশয় আমারে লইয়া কতখানে চইলা যায়। একবার হাসান পীরের দরগায় আমারে রাইখা আইছিল, না জ্যাঠামশয়! সোনা পাগল জ্যাঠামশাইকে সাক্ষী মানতে চাইল।

    মণীন্দ্রনাথ ঘাড় ফিরিয়ে সোনাকে দেখলেন। যেন এখন কত অপরিচিত এই বালক। বালকের সঙ্গে কথা বলা অসম্মানজনক। তিনি তার চেয়ে বরং সামনের আকাশ দেখবেন। আকাশ অতিক্রম করে আরও দ্রুত চলে যাওয়া যায় কিনা অথবা যদি তিনি আকাশ অতিক্রম করে চলে যেতে পারেন–সামনে এক বিরাট দুর্গ পাবেন, দুর্গের ভিতর পলিন—তিনি এইসব ভেবে হামাগুড়ি দিতে চাইলেন হাতির পিঠে এবং সেই ক্ষুদ্র বালক ওসমানকে তুলে অঙ্কুশ কেড়ে হাতিকে নিজের খুশিমতো চালিয়ে নিতে চাইলেন—হাতি আমাকে নিয়ে তুমি দ্রুত হেঁটে পলিনের দেশে চল—সেই কোমল মুখ আমি আর কোথাও দেখছি না।

    জসীম চিৎকার করে উঠল, কর্তা, আপনে কি করতাছেন কর্তা! ওসমান পাগল মানুষটার দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। তিনি তার অঙ্কুস কেড়ে নিতে আসছেন। সোনা পিছন থেকে একটা পা চেপে ধরল।—জ্যাঠামশয় আপনে পইড়া যাইবেন। মণীন্দ্রনাথ আর নড়তে পারলেন না। তিনি করুণ এক মুখ নিয়ে সোনার দিকে তাকালেন। কারণ সোনার চোখে এমন এক জাদু আছে যা তিনি কিছুতেই অবহেলা করতে পারেন না। মাঠ পার হলে তিনি দেখলেন, পুবের বাড়ির নরেন দাস মাথায় কাপড়ের গাঁট নিয়ে বাবুর হাটে যাচ্ছে। হাতির গলায় ঘণ্টা বাজছিল বলে গ্রামের সব বালকবালিকা ছুটে এসেছে। আর নরেন দাসের বিধবা বোন মালতী সেই শ্যাওড়া গাছটার পাশে দেখল বড় বড় সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। শতরঞ্জি পেতে দেওয়া হয়েছে। মিঞারা, মৌলবীরা এসে জড়ো হচ্ছে। আর এই গ্রামের সর্বত্র, অন্য গ্রামের গাছে গাছে, মাঠে মাঠে ইস্তাহার ঝুলিয়ে চলে গেছে সামসুদ্দিনের লোকেরা অথবা তার ডান হাত যাকে বলা যায়—সেই ফেলু শেখ। তাতে কিছু শব্দ লেখা ছিল। লেখা ছিল—পাকিস্তান জিন্দাবাদ। লেখা ছিল, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান আর লেখা ছিল নারায়ে তকদির। মালতী নারায়ে তকদির এই শব্দের অর্থ জানত না। একদিন সে ভেবেছিল, চুপি চুপি সামসুদ্দিনকে অর্থটা জিজ্ঞাসা করবে।

    মালতী এবার নিজের দিকে তাকাল। শরীরের লাবণ্য ক্রমে বাড়ছে। স্বামীর মৃত্যুর পর ফের ঢাকায় গত মাসে দাঙ্গা হয়ে গেছে। ওর শ্বশুর এসে বলে গেল, ঢাকায় শাঁখারীরা, কুট্টিরা বড় বদলা নিছে। সেদিন থেকে মালতী খুশি। সামুরে, তুই গাছে গাছে ইস্তাহার ঝুলাইয়া কি করবি! সামুকে মনে মনে গাল দিল মালতী।

    সামিয়ানার নিচে মুসলমান গ্রামের লোকেরা জড়ো হচ্ছে। সিন্নির জন্য বড় উনুন ধরানো হচ্ছে। বড় বড় তামার ডেকচিতে দুধে জলে চালের গুঁড়ো সেদ্ধ হচ্ছে। গোপাট ধরে হাতির পিঠে রাজার মতো তখন পাগল মানুষ ঘরে ফিরে আসছেন।

    মালতী দেখল হাতির পিঠে পাগল ঠাকুর বাড়িতে উঠে আসছেন। ঘণ্টার আওয়াজে যে যেখানে ছিল ছুটে এসেছে। এই ঘণ্টার শব্দ কোনও শুভ বার্তার মতো এই অঞ্চলের সকল মানুষের কানে বাজছে ওরা মনে করতে পারল, সেই পয়মন্ত হাতি লক্ষ্মীর মতো রূপ নিয়ে, শুভ বার্তা নিয়ে তাদের দেশে চলে এসেছে। এই হাতির জন্য যারা গেরস্থ বৌ, যারা কোনওকালে একা একা ঘরের বার হয়নি তারা পর্যন্ত বাড়ির সব নাবালকের পিছু পিছু ঠাকুরবাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল।

    অথবা হাতিটা যখন পরদিন উঠোনের ওপর এসে মা মা বলে ডাকবে তখন সব গেরস্থ বৌদের প্রাণে ‘এই হাতি আপনার ধন’ অথবা ‘এই হাতি মা লক্ষ্মীর মতো’। এই হাতি বাড়ির উঠোনে উঠে এলে জমিতে সোনা ফলবে। ওরা হাতির মাথায় কপালে লেপে দেবার জন্য সিঁদুর গুলতে বসে গেল। হাতিটার কপালে সিঁদুর দিতে হবে, ধান দূর্বা সংগ্রহ করে রাখল সকলে। আর মালতী দেখল, হাতির পিঠে পাগল মানুষ হাততালি দিচ্ছেন। হাতির পিঠে সোনা। ফতিমা, সোনাবাবুকে নিচ থেকে বলছে, আমারে পিঠে তুইলা নেন সোনাবাবু। ফতিমা হাতির পিঠে ওঠার জন্য ছুটছিল। আর তখন ফতিমার বা’জী সামসুদ্দিন সামিয়ানার নিচে বড় বড় অক্ষরে ইস্তাহার লিখছিল, ইসলাম বিপন্ন। বড় বড় হরফে লিখছিল—পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

    মালতী এইসব দেখতে দেখতে ডেফল গাছটার নিচে বসে কেমন আবেগে কেঁদে ফেলল। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, সামুরে, তুই দেশটার কপালে দুঃখ ডাইকা আনিস না।

    হাতিটা পুকুরপাড় ধরে উঠে যাবার সময় আমের ডাল, অর্জুনের ডাল এবং জামগাছের ডাল অর্থাৎ নিচে যা পেল সব মটমট করে ডালপালা ভেঙে শুঁড় দিয়ে মুখে পুরে দিতে থাকল। আর সেই স্থলপদ্ম গাছটা, যে গাছের নিচে বসে পাগল মানুষটা স্বচ্ছ আকাশ দেখতে ভালোবাসতেন—সেই গাছটা পর্যন্ত মটমট করে ভেঙে হাতিটা মুখে ফেলে কট করে একটা শব্দ, প্রায় কাটা নারকেল খেলে মানুষের মুখে যেমন শব্দ হয়, হাতির মুখে স্থলপদ্ম গাছের ডালপালা কাণ্ড তেমন শব্দ তুলছে। জসীম বার বার অঙ্কুশ চালিয়েও হাতিটাকে দমিয়ে দিতে পারল না। হাতিটা গাছটাকে চেটে পুটে খেয়ে ফেলল। রাগে দুঃখে পাগল জ্যাঠামশাই হাত কচলাতে থাকলেন। তাঁর এই স্থলপদ্ম গাছ, তাঁর সখের এবং নীরব আত্মীয়ের মতো এই স্থলপদ্ম গাছের মৃত্যুতে তিনি বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    মাঠের ভিতর সামিয়ানা টাঙানো। মোল্লা মৌলবীরা আসতে শুরু করছে। ধানকাটা হয়ে গেছে বলে নেড়া নেড়া সব মাঠ। শস্য বলতে কিছু কলাই গাছ, মসুরি গাছ। ফেলু শেখ সব জুড়িদারদের নিয়ে বড় বড় গর্ত করছে। হাজিসাহেবের চাকর দুধ ফোটাচ্ছে। বড় বড় তামার ডেকচিতে দুধ এবং জলে চালের গুঁড়ো, মিষ্টি, তেজপতা, আখরোট, এলাচ, দারুচিনি, জাফরান, লবঙ্গ। পুরানো তক্তপোশের ওপর ছিন্ন চাদর পাতা। আর হাজিসাহেবের তিন ছেলে উজান গিয়েছিল ধান কাটতে, তখন একটা খ্যাস এনেছিল উজান থেকে। সেই খ্যাস পেতে প্রধান মৌলবীসাবের জন্য একটা আসন করা হয়েছে। সব মুসলমান চাষাভুষা লোক ক্ৰমে সামিয়ানার নিচে জড়ো হচ্ছিল।

    শচীন্দ্রনাথ জানতেন, এমন একটা ঘটবে। সামসুদ্দিন ভোটে এবারেও হেরে গেছে। লীগের নাম করে এবারেও সে মুসলমান চাষাভুষা লোকের সব ভোট নিতে পারেনি, শচীন্দ্রনাথ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাঁড়িয়ে এবারেও ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। সুতরাং তিনি এমন একটা ঘটনা ঘটবে জানতেন। সামসুদ্দিন ঢাকা গেছিল। সাহাবুদ্দিন সাহেবের আসার কথা। এত বড় একটা মানুষ আসবে এদেশে, একবার ওঁরও ইচ্ছা ছিল সামিয়ানার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু গোটা ব্যাপারটাই ধর্মীয় করে রেখেছে। বোধ হয় নিমন্ত্রণ করলেও তিনি যেতে পারতেন না।

    হাতিটা পুকুরপাড় ধরে উঠে আসার সময় তিনি এসব ভাবছিলেন। জসীম হাতিটাকে এখন উঠোনে তুলে আনছে। হাতিটা কাছে এলে তিনি বললেন, জসীম ভালো আছ?

    —আছি কর্তা। জসীম হাতিটাকে সেলাম দিতে বলল।

    —মাইজাদা ভালো আছেন?

    জসীম একটু নুয়ে বলল, হুজুর ভালো আছেন।

    —অনেকদিন পর ইদিকে আইলা।

    —আইলাম। আপনেগ দেখতে ইসছা হইল, চইলা আইলাম।

    —বাবুরা বুঝি এখন বাড়ি নাই?

    —না। বাবুরা ঢাকা গ্যাছে।

    সোনাকে এবার ছোটকাকা বললেন, হারে সোনা, তর ক্ষুধা পায় না। অরে নামাইয়া দে জসীম। অর মায় ত গালে হাত দিয়া ভাবতাছে, পোলাটা গ্যাল কৈ?

    হাতিটা পা মুড়ে বসে পড়ল। সোনা নেমে গেল। গ্রামে এখন এই হাতির জন্য উৎসবের মতো আনন্দ। জসীমের ছেলে ওসমান নেমে গেল। সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। জসীম পাগল মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, কর্তা, নামেন। পাগল মানুষ তিনি, তিনি এই কথায় শুধু হাসলেন। তিনি নেমে যাওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেন না। এই হাতি তাঁর প্রিয় স্থলপদ্ম গাছ খেয়ে ফেলেছে। ক্ষোভে জ্বলছেন। গাছের নিচে বসলেই তিনি জাহাজের সেই অলৌকিক শব্দ শুনতে পেতেন। কাপ্তান মাস্তুলে উঠে নিশান ওড়াচ্ছে। জাহাজটা পলিনকে নিয়ে জলে ভেসে গেল। আর হাতিটা সেই স্মৃতিসহ স্থলপদ্ম গাছটা চেটেপুটে খেয়ে এখন চোখ বুজে আছে।

    শচীন্দ্রনাথও অনুরোধ করলেন হাতির পিঠ থেকে নামতে; কিন্তু পাগল মানুষ তিনি—হাতির পিঠে সন্ন্যাসীর মতো পদ্মাসন করে বসে থাকলেন। এতটুকু নড়লেন না। জোর করতে গেলে তিনি সকলের হাত কামড়ে দেবেন। অথবা হত্যা করবেন সকলকে, এমন এক ভঙ্গি নিয়ে স্থলপদ্ম গাছের শেষ চিহ্নটুকু দেখতে থাকলেন।

    জসীম দেখল হাতির পিঠে বড়কর্তা বসে কেবল বিড়বিড় করে বকে যাচ্ছেন। তিনি কারও অনুরোধ রাখছেন না। শচীন্দ্রনাথ বার বার বলছেন, দু’চারজন মাতব্বর মানুষ হাতিটা ঠাকুরবাড়ি উঠে আসতে দেখে জড়ো হয়েছিল—তারাও বলছে, বড়কর্তা নামেন। হাতিটা অনেকটা পথ হাঁইটা আইছে, অরে বিশ্রাম দ্যান। বড়কর্তা ভ্রূক্ষেপ করলেন না, তিনি বরং হাতিটার কানের নিচে পা রেখে বলতে চাইলেন, হেট্‌ হেট্।

    তখন হাতিটা ইঙ্গিত পেয়ে উঠে দাঁড়াল। পাগল মানুষ বড়কর্তা হাতিটা নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। জসীম ডাকল, কর্তা এইডা আপনে কি করেন! কর্তা, অঃ কৰ্তা!

    বাড়ির প্রায় সকলেই বিপদ বুঝতে পেরে পিছনে ছুটল। ততক্ষণে হাতিটা পুকুরপাড় ধরে নিচে নেমে যাচ্ছে। পুবের বাড়ির মালতী দেখল, পাগল ঠাকুর মুড়াপাড়ার হাতিটা নিয়ে মাঠে নেমে যাচ্ছে। মাঠে নরেন দাসের জমি পার হলেই সেই শ্যাওড়া গাছ, গাছে ইস্তাহার ঝুলছে, গাছে গাছে সামসুদ্দিন ইস্তাহার ঝুলিয়ে সেই এক বাক্য বলছে, ইসলাম বিপন্ন, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। অথবা নারায়ে তকদির এবং এমন সব অনেক কথা লেখা আছে—যা মালতীর দু’চোখের বিষ। মালতীর চিৎকার করে বলার ইচ্ছা, সামুরে তর ওলাওঠা হয় না ক্যান!

    তখন হাতিটা নরেন দাসের জমি পার হয়ে মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে। পিছনে ছোট ঠাকুর, জসীম, জসীমের পুত্র ওসমান ছুটছে। গ্রামের কিছু ছেলে-বুড়ো ছুটছে। ওরা সকলে হৈ হৈ করছিল—কারণ পাগল মানুষ এক অবলা হাতি নিয়ে মাঠে ঘৌড়দৌড়ের বাজী জেতার মতো ছুটছে। কিছুদূর গেলে সামসুদ্দিনের সামিয়ানা টাঙানো মণ্ডপ। মণ্ডপের বাইরে খোলা আকাশের নিচে বড় বড় ডেকছি—ফেলু সিন্নি চড়িয়েছে। মৌলবীসাব আজান দিয়ে এইমাত্র মঞ্চে উঠে নামাজ পড়ছেন। যারা দূর গাঁ থেকে সভায় ইসলাম বিপন্ন ভেবে সিন্নির স্বাদ নিতে এসেছে অথবা ইসলাম এক হও এবং এই যে কাফের জাতীয় মানুষ যাদের পায়ের তলায় থেকে সংসারের হাল ধরে আছি—কি না দুঃখ বল, এই জাতি তোমাদের কী দিয়েছে, জমি তাদের, জমিদারী তাদের—উকিল বল, ডাক্তার বল সব তারা—কী আছে তোমাদের, নামাজ পড়ার পর এই ধরনের কিছু কিছু উক্তি—যা রক্তে উত্তেজনার জন্ম দেয়—মানুষগুলি কান খাড়া করে মৌলবীসাবের, বড় মিঞার এবং পরাপরদির বড় বিশ্বাসের ধর্মীয় বক্তৃতা শোনার সময় পিছনে ফেলু শেখের চিৎকারে একে অন্যের ওপর ছিটকে পড়ল। সেই ঠাকুরবাড়ির পাগল ঠাকুর এক মত্ত হাতি নিয়ে এদিকে ছুটে আসছে। সবাই হৈ হৈ করতে থাকল। তিনি পাগল মানুষ, হাতি অবলা জীব—সারাদিনের পরিশ্রমের পর হাতিটা বুঝি ক্ষেপে গেছে। হাতিটা পাগলা হাতির মতো শুঁড় উঁচু করে চিৎকার করতে করতে সেই সামিয়ানার ভিতর ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিল।

    ফেলু তামার ডেকচিগুলির পাশে লুকিয়েছিল। ভিতরে দুধে জলে চালের গুঁড়োতে টগবগ করে ফুটছে। সেই মত্ত হাতি ভিতরে ঢুকে গেলে সকলে নানাভাবে মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে। সকলে দৌড়ে দৌড়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করছে। সামসুদ্দিন আতঙ্কে ভাঙা তক্তপোশের নিচে লুকিয়ে পড়ল। ফেলু পালাচ্ছিল, পালাতে গিয়ে হাতিটার একেবারে সামনে পড়ে গেল। হাতিটা সহসা ওকে শুঁড়ে জড়িয়ে ধরল এবং ধরার জন্য একটা হাত ভেঙে গেল। সকলে চিৎকার করছে দূরে, কেউ কাছে আসতে সাহস পাচ্ছে না, হায় হায় করছে, একটা মানুষ হাতির পায়ের নিচে বুঝি শেষ হয়ে গেল। মণীন্দ্রনাথ হাতির পিঠে বসে গালে হাত দিয়ে হাতি কতটুকু কি পারে যেন এমন কিছু দেখছিলেন। যেন তিনি ভাবে মগ্ন। হাতির পিঠে চড়ে বেশ তামশা দেখা যাচ্ছে যেন, যেন এমনি হওয়া উচিত ফেলুর। পাগল ঠাকুর এবারে ফের হাতির কানের নিচে পা দিয়ে খোঁচা মারতেই একান্ত বশংবদের মতো ফেলুকে মাটির ওপর পুতুলের মতো দাঁড় করিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাতিটাকে এই স্থান-কাল-পাত্র পরিত্যাগ করে চলে যেতে বললেন। আর হাতিটাও স্থান-কাল-পাত্র পরিত্যাগ করে মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকল।

    .

    তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তখন নদীর চরে ঈশম তরমুজের লতা নিড়ান দিয়ে সাফ করে দিচ্ছিল। হেমন্তের শেষে শীত এসে যাচ্ছে। সূর্য পশ্চিমে নামতে থাকলেই ঘাসে ঘাসে শিশির পড়তে থাকে। জসীম চিৎকার করছিল, আর হাতিটার পিছনে ছুটছিল। বাবুদের হাতি—সে এই অঞ্চলে হাতি নিয়ে ঘুরতে এসে কী এক দুর্যোগে পড়ে গেল—সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ভিতর থেকে পাগল মানুষকে হাতির পিঠে তুলে না নিলেই এখন মনে হচ্ছে ভাল হতো। সেই যে তিনি হাতির পিঠে চড়ে বসলেন আর নামতে চাইলেন না। এখন কী হবে! হাতিটা ক্রমশ মাঠ ভেঙে গ্রামে, গ্রাম ভেঙে মাঠে পড়ছে। হাতির পিঠে মণীন্দ্রনাথ তালি বাজাচ্ছেন। গ্রামের ছোট বড় সকলে পিছনে ছুটে ছুটে যখন হাতিটার আর নাগাল পেল না, যখন হাতিটা নদীর চর পার হয়ে অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকল—তখন মণীন্দ্রনাথ চুপচাপ বসে বুঝলেন—আর ভয় নেই। হাতিটাকে কৌশলে তিনি যেন বলে দিলেন, অবলা জীব হাতি, তুমি এবার ধীরে ধীরে হাঁটো। তোমাকে এখন আর কেউ খুঁজে পাবে না।

    রাত হয়ে গেছে। এটা কোনও মাঠ হবে, বোধ হয় দামোদরদির মাঠ হবে। আর একটু গেলেই মেঘনা। নদীর পাড়ে বড় মঠ। অন্ধকারে এখন মঠ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ত্রিশূলের মাথায় একটা আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে।

    .

    শচীন্দ্রনাথ তখন বাড়ির ভিতর। আরও সব মানুষজন এসেছে। জসীম উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। এত বড় হাতি নিয়ে পাগল ঠাকুর কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। সে মাহুত হাতির—বাবুদের হাতি, লক্ষ্মীর মতো পয়মন্ত হাতি—এখন কী হবে, সে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিল না। উঠোনের ওপর গ্রামের লোকেরা কী করা যায় পরামর্শ করছে। গ্রামে গ্রামে এখন খবরটা পৌঁছে গেছে। ঈশম লণ্ঠন হাতে আবার বের হয়ে পড়েছে এবং প্রায় একদল মানুষ লণ্ঠন হাতে সোনালী বালির নদীর চরে নেমে যাচ্ছে। তারা জোরে জোরে ডাকছিল। জসীমও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনি। সে ওসমানকে রেখে একা সেই দলটার সঙ্গে মেশার জন্য কাঁধে গামছা ফেলে দৌড়াতে থাকল।

    সামসুদ্দিন লণ্ঠন হাতে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। ফেলু খুব বেঁচে গেছে এ যাত্রা। ওকে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা তছনছ ভাব এবং পাগল ঠাকুর ইচ্ছা করে এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছেন যেন, যেন তিনি জানতেন সামসুদ্দিনের এই যে ইস্তাহার ঝুলিয়ে স্বার্থপর মানুষের মতো একই সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার বাসনা—এই বাসনা ভালো নয়। পাগল মানুষ তিনি। এইটুকু ভেবে গোটা উৎসবের মতো এক ছবিকে তছনছ করে চলে গেছেন। সামসুদ্দিনের আপ্রাণ চেষ্টার দরুন এই মাঠে এত বড় একটা জাল্‌সা হতে পারছে। এত বড় জাল্‌সাতে শহর থেকে মোল্লা মৌলবীরা এসেছিল। ওরা যখন হাজিসাহেবের বাড়িতে উঠে, তোবা তোবা, কি এক বেমাফিক কাজ হয়ে গেল। সামসুদ্দিনের ইচ্ছা হল এখন সে নিজের হাত কামড়ায়। আর মনে হল গোটা ব্যাপারটাই এক ষড়যন্ত্র। যেন ছোট ঠাকুর আবার ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হতে চায়। আবার কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ছোট ঠাকুর দাঁড়াবে এবং কবিরসাবকে ধরে এনে কংগ্রেসের পক্ষে বড় এক বক্তৃতা করাবে। সে ভাবছিল, এমন একটা হাতি পাওয়া যাবে না সেদিন! হাতির পিঠে ফেলু বসে থাকবে। অথবা ফেলুকে দিয়ে মণ্ডপে আগুন ধরিয়ে দিলে যেন সব আক্রোশের শোধ নেওয়া যাবে। লণ্ঠন হাতে সামসুদ্দিন জব্বরকে দিয়ে সব তৈজসপত্র, ভাঙা টুল টেবিল, ছেঁড়া সামিয়ানা এবং বড় শতরঞ্জ সব একসঙ্গে মাঠ থেকে বাড়িতে তুলে আনার সময় এসব ভাবল।

    তখন বাড়ির বৃদ্ধ মানুষটি প্রশ্ন করেছিলেন—তিনি অতিশয় বৃদ্ধ বলেই ঘরের ভিতর বসে প্রদীপের মৃদু আলোতে সামান্য কাশছিলেন, এখন আর তিনি তেমন বেশি ঘর-বার হন না—অধিকাংশ সময় ঘরের ভিতর খাটে একটা বড় তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে শুয়ে থাকেন—অতিশয় গৌরবর্ণ চেহারার এই মানুষ উঠোনে গোলযোগ শুনে বড়বৌকে প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে বড়বৌ? উঠোনে এত গণ্ডগোল ক্যান?

    বড়বৌ প্রদীপে আলো একটু উসকে দিল। টিন-কাঠের ঘর। জানালা দিয়ে শেষ হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাস ভেসে আসছে। বড়বৌ এই সংসারে বৃদ্ধ শ্বশুরের দেখাশুনা করার সময় প্রায়ই জানালায় দূরে সব মাঠ দেখতে পায় এবং সেই মাঠে সংসারের এক পাগল মানুষ ক্রমান্বয়ে হেঁটে হেঁটে কোথায় যেন কেবল চলে যেতে চাইছেন। উঠোনের সেই গণ্ডগোল, মানুষটার এভাবে হাতিতে চড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া এ-সব বড়বৌকে বিপন্ন করছে। মানুষটা আবার ক্ষেপে গেলেন। ভোরেও বড়বৌ এই মানুষকে খেতে দিয়েছে। ভালোমানুষের মতো খেয়ে প্রতিদিনের মতো নিরুদ্দেশে চলে গেছিলেন। সংসারের ছোট এক বালক সোনা সঙ্গ দিয়েছে মাঠে মাঠে এবং গ্রামে গ্রামে। তারপর কোন এক দূর গ্রাম থেকে মাঠ ভেঙে সোনার হাত ধরে এই পাগল মানুষ গ্রামের দিকে ফিরছিলেন, তখন জসীম আসছে হাতিতে চড়ে। জসীমের ছেলে ওসমান হাতির সামনে। ওরা দেখল সেই বড় মাঠে ঠাকুর ছোট বালকের হাত ধরে কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। এই মানুষটার জন্য তল্লাটের সকলের কষ্ট—কারণ এমন মানুষ হয় না, কথিত আছে তিনি দরগার পীরের মতো এক মহৎ পুরুষ। জসীম পাগল ঠাকুরকে হাতির পিঠে তুলে বলেছিল, চলেন বাড়ি দিয়া আসি কর্তা। জসীম, সোনা এবং পাগল মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়ে এই কাণ্ড। বড়বৌ খুব দুঃখের সঙ্গে বৃদ্ধের পায়ের কাছে বসে সব বলল। বৃদ্ধ পুত্রের হাতিতে চড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনে পাশ ফিরলেন শুধু। বৃদ্ধের মুখে এক অসামান্য কষ্ট ফুটে উঠেছে। বড়বৌর কাছে ধরা পড়ে যাবেন ভাবতেই মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে শুধু অন্ধকার দেখতে থাকলেন। এই সময়ে তাঁর এক পাগল ছেলে মাঠময় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সব দুঃখের মূলে তিনি—তাঁর জেদ, এ সব ভেবে তাঁর দুঃখের যেন অন্ত ছিল না। তিনি বললেন, বৌমা, জানালাটা বন্ধ কইরা দ্যাও। আমার শীত করতাছে।

    —একটা কম্বল গায়ে দ্যান বাবা।

    —না। জানালাটা বন্ধ কইরা দ্যাও।

    বড়বৌ জানালা বন্ধ করার সময়ই দেখল কামরাঙা গাছের ওপারে যে বড় মাঠ, ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে—সেখানে অনেক লণ্ঠন। বড়বৌ বুঝল, এইসব মানুষ যাচ্ছে অন্ধকারের ভিতর পাগল মানুষ এবং হাতিটাকে খুঁজতে

    আর জসীম অন্ধকারে ডাকছিল হাতিটার নাম ধরে-লক্ষ্মী, অ লক্ষ্মী! সে সবার আগে ছুটে ছুটে যাচ্ছিল। যেন তার ঘরের বিবির মতো এক রমণী অন্ধকারে নিরুদ্দেশ হয়েছে অথবা সেরা মানুষ পাগল ঠাকুর—দশাসই চেহারা, গৌরবর্ণ—ঠিক পীরের মতো এক মানুষের সঙ্গে তার পোষা হাতি, তার ভালোবাসার লক্ষ্মী চলে গেছে। সে প্রাণপণ ডাকছিল, লক্ষ্মী অ লক্ষ্মী! আমি তর লাইগা চিঁড়ামুড়ি তুইলা রাখছি, লক্ষ্মী অ লক্ষ্মী, তুই একবার অন্ধকারে ডাক দিহি, মাঠের কোন আনধাইরে তুই বইসা আছস একবার ডাইকা ক’ দিহি। আমি পাগল ঠাকুরের মতো তরে লইয়া ঘরে ফিরমু।

    ঈশম বলছিল, আরে মিঞা, এত উতালা হইলে চলব ক্যান। বড়কর্তা বড় মানুষ। হাতি অবলা জীব, ভালবাসার জীব। তিনি হাতির মতো পোষা জীব লইয়া পলিনেরে খুঁজতে বাইর হইছেন।

    জসীম বলল, পলিন, কোন পলিনের কথা কন!

    —আরে আছে মিঞা।

    জসীম বলল, হাঁটতে বড় কষ্ট। কিস্সা কইলে বেশি হাঁটতে পারি।

    ঈশম বলল, বড় মানুষের কথা অধমের মুখে ভাল শুনাইব না। অথবা যেন ঈশমের বলার ইচ্ছা—মিঞা, তল্লাটের লোক কে না জানে এ-কথা। তুমি এডা কি কও! তুমি জান না কর্তা ফাঁক পাইলে নৌকায়, না হয় হাঁটতে হাঁটতে নিরুদ্দেশে যান। তারপর ঈশম এক বর্ষার কথা বলল। এক বর্ষাকালে পাগল ঠাকুর নৌকা নিয়ে তিনদিন নিরুদ্দেশ ছিলেন, তার গল্প করল। সোনালী বালির নদীর জলে তখন স্রোত ছিল। তিনি একা স্রোতের মুখে নৌকা ছেড়ে বসেছিলেন। যেন সেই নাও তাঁকে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অথবা গঙ্গার জেটির পাশে বড় এক জাহাজে পৌঁছে দেবে। পাগল মানুষ বলে তিনি মনে মনে বিলের ভিতর বড় এক কলকাতা শহর বানিয়ে বসেছিলেন এবং সারাদিন সারা রাত ধরে যেন তিনি সেই বিলের জলে পলিনকে খুঁজেছিলেন। বিলের জলে এক স্বপ্ন ভাসে, স্বপ্নে সেই বড় কলকাতা শহর—গাড়ি ঘোড়া হাতির মিছিল, আর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, দুর্গের পাশে মেমরিয়েল হল—কার্জন পার্ক। গড়ের মাঠে সাহেবরা উর্দি পরে কুচকাওয়াজ করছে। পাগল ঠাকুর হে হে করে হাসতে হাসতে শুধু বলছিলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। কারণ তাঁর প্রতিবিম্ব জলে দেখা যাচ্ছিল, আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। শহরটা নিমেষে কেমন জলের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাগল মানুষের প্রতিবিম্ব তখন শুধু পরিহাস করছে, হায় বেহুলা জলে ভাইস্যা যায় রে, জলে ভাইস্যা যায়।

    সবই যেন জলে ভেসে যাচ্ছিল। এতবড় বিল, এই অন্ধকার চারদিকে, জোনাকিরা জ্বলছে। উড়ে উড়ে জোনাকিরা পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথকে এবং হাতিটাকে ঘিরে ধরল। মণীন্দ্রনাথ হাতির পিঠে চড়ে বিলের পাড়ে পাড়ে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। বিলের জলে শুধু অন্ধকার। হেমন্তকাল বলে ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসছে। পাকা ধানের গন্ধ মাঠে মাঠে। এই অন্ধকারে হাতির পিঠে বসে পাকা ধানের গন্ধ পাচ্ছিলেন। আর আকাশে কত হাজার নক্ষত্র, পাগল মানুষ প্রতিদিনের মতো হাতির পিঠে বসে সেইসব নক্ষত্র দেখতে দেখতে, যেন সেইসব নক্ষত্রে কোনও একটি তার প্রিয় পলিনের মুখ—তিনি হাতিতে চড়ে অথবা নৌকায় উঠে কিছুতেই আর সেই প্রিয় পলিনের কাছে অথবা হেমলক গাছের নিচে পৌঁছতে পারলেন না। তিনি হাতিটাকে সম্বোধন করে বললেন, হ্যাঁ লক্ষ্মী, তুমি আমাকে নিয়ে পলিনের কাছে যেতে পার না। সেই সুন্দর মুখ—ঝরনার জলের উৎসে তুমি আমাকে পৌঁছে দিতে পার না!

    সহসা এই পাগল মানুষের ভিতর পূর্বের স্মৃতি তোলপাড় করলে তিনি আর স্থির থাকতে পারেন না। মনে হয় আর কিছুদূর গেলেই তিনি তাঁর প্রিয় হেমলক গাছটি খুঁজে পাবেন এবং সেই হেমলক গাছের নিচে সোনার হরিণটি বাঁধা আছে। এইভাবে কতদিন একা একা মাঠ থেকে মাঠে, গ্রাম থেকে গ্রামে এবং এমন তল্লাট নেই এ-অঞ্চলে তিনি যেখানে একা-একা চলে যান না, তারপর এক-সময় ফের মনে হয় সেখানে আর তিনি এ-জীবনে পৌঁছাতে পারবেন না। সুতরাং সেই এক বড়বৌর মুখ এবং তার বিষণ্ণ চোখ পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথকে অস্থির করে তোলে। তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকেন। তখন মনে হয় হাতিতে অথবা নৌকোয় কখনও সেই হেমলক গাছের নিচে পৌঁছানো যাবে না। সোনার হরিণেরা বড় বেশি দ্রুত দৌড়ায়।

    জসীম, ঈশম এবং নরেন দাসের দলটা সারারাত লণ্ঠন হাতে খুঁজে হাতিটা এবং মানুষটাকে বার করতে পারল না। ওরা সবাই রাতের দিকে ফিরে এসেছিল। আরও দুটো দলকে শচীন্দ্রনাথ পুবে এবং পশ্চিমে পাঠিয়েছিলেন। তারা নানা রকমের খবর দিল। কেউ বলল, অশ্বত্থ গাছের নিচে গত রাতে পাগল মানুষ এবং হাতিটাকে দেখেছে। কেউ বলল, বারদির মাঠের উত্তরে একদিন দেখা গেছে মানুষটাকে। উত্তর থেকে খবর এল, পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ হাতিটাকে দিয়ে সব আখের খেত খাইয়ে দিচ্ছেন। কেউ কিন্তু হাতিটার নাগাল পাচ্ছে না। সপ্তাহের শেষ দিকে আর কোনও খবর এল না। সবাই তখন বলল, না আমরা পাগল মানুষ এবং হাতিটাকে দেখিনি।

    বাড়িতে প্রায় সকলের মুখে একটা শোকের ছবি। কেউ জোরে কথা বলছে না। লালটু, পলটু, সোনা সারাদিন বড়িতেই থাকছে। পুকুরপাড়ের অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ওরা প্রতিদিনই হাতিতে চড়ে মানুষটা ফিরছেন কিনা দেখত। বিকালের দিকে জ্যাঠামশাই মাঠের ওপর থেকে উঠে আসবেন প্রতীক্ষায় অর্জুন গাছটার নিচে বসে থাকত। সঙ্গে থাকত সেই আশ্বিনের কুকুর। ওরা প্রিয় মানুষটির জন্য গাছের নিচে বসে সারা বিকেল, যতক্ষণ সন্ধ্যা না হতো, যতক্ষণ গোপাট অতিক্রম করে মাঠের বড় অশ্বত্থ গাছটায় অন্ধকার না নামত, ততক্ষণ অপেক্ষা করত। আর এ-ভাবেই একদিন কুকুরটা ঘেউঘেউ করে উঠল—কুকুরটা কেবল চিৎকার করছে—সূর্য তখনও অস্ত যায় নি। তখন ওরা দেখল কুকুরটা দৌড়ে দৌড়ে মাঠে নেমে যাচ্ছে। আবার সোনার কাছে উঠে আসছে। ওরা দেখল পুবের মাঠে আকাশের নিচে কালো একটা বিন্দুর মতো কি কাঁপছে। ক্রমে বিন্দুটা বড় হচ্ছে। হতে হতে ওরা দেখল এক বড় হাতি আসছে। সোনা চিৎকার করে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল, হাতিতে চইড়া জ্যাঠামশয় আইত্যাছে।

    গ্রামের সকলে দেখল পাগল মানুষ ক্লান্ত। বিষণ্ণ। চোখমুখে অনাহারের ছাপ। তিনি হাতির পিঠে প্রায় মিশে গেছেন।

    হাতিটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল উঠোনে। যেন এই হাতি আর কোথাও যাবে না। এখানেই বসে থাকবে। জসীম বলল, কর্তা নামেন। লক্ষ্মীরে আর কত কষ্ট দিবেন!

    গ্রামের সকলে অনুরোধ করল নামতে। কিন্তু তিনি নামলেন না।

    শচীন্দ্রনাথ বললেন, তোমরা সকলে বাড়ি যাও বাছারা, আমি দেখি। বলে, তিনি হাতিটার কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, বড়দা, বড়বৌদি কয়দিন ধইরা কিছুই খায় নাই। বৌদিরে কত আর কষ্ট দিবেন!

    কিন্তু কোনও লক্ষ্মণ নেই নামার। শচীন্দ্রনাথ বললেন, সোনা, তর বড় জ্যাঠিমারে ডাক।

    বড়বৌ ঘোমটা টেনে ডালপালা ভাঙ্গা স্থলপদ্ম গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। শচীন্দ্রনাথ বললেন, আপনে একবার চেষ্টা কইরা দ্যাখেন

    বড়বৌ কিছু বলল না। সেই সজল উদ্বিগ্ন এক চোখ নিয়ে হাতির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মণীন্দ্রনাথ হাতি থেকে নেমে বড়বৌকে অনুসরণ করলেন—তিনি এখন এক সরল বালক যেন। তাঁর এখন বড়বৌর দুই বড় চোখ ব্যতিরেকে কিছু মনে আসছে না। ঘরে ঢুকে দেখলেন, তাঁর প্রিয় জানালাটা খোলা। তিনি সেখানে দাঁড়ালেই তার প্রিয় মাঠ দেখতে পান। এবং তখন মনে হয় মাঠে বড় এক হেমলক গাছ আছে, নিচে পলিন দাঁড়িয়ে আছে। এতদিন অকারণে তিনি নদী বন মাঠের ওপারে পলিনকে খুঁজেছেন।

  • দশ

    দশ

    বড়বৌ পূজার ফুল তুলছিল। শীতকাল। বাগানের ভিতর শীতের সব ফুল ফুটে আছে। খুব ভোরে মালতী স্নান করতে এসেছিল ঘাটে। ঘাটে শীতের কুয়াশা ছিল তখন, ঘাটের সিঁড়িতে রোদ ছিল না। কিরণী আবু পাড়ে বসে ব্রতকথা বলছিল—ওঠ ওঠ সুয্যিঠাকুর ঝিকিমিকি দিয়া…তখন মালতী ঘাটে নেমে গেল। ঘাটে এসে বড়বৌ দেখল, মালতী শীতের ঠাণ্ডায় জলে ডুবে ডুবে স্নান করছে। যেন এই শীত, শীত নয়, মালতী জলের উপর ভেসে যেতে থাকল।

    মালতী এক সময় জল থেকে উঠে পড়ল। ভেজা কাপড়ে হিহি করে কাঁপছে। সে বড়বৌকে ভেজা কাপড়েই কিছু ফুল তুলে দেবার অছিলায় অতসী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল।

    বড়বৌ বলল, তোর এই সাত সকালে স্নান?

    মালতী কোনও কথা বলল না। সে ফুলগাছ অথবা ঝোপজঙ্গলের ভিতর উঁকি দিয়ে কি যেন অনুসন্ধান করছে। দেখলে মনে হবে, ওর কিছু হারিয়ে গেছে। সুতরাং মালতীকে বিষণ্ন দেখাচ্ছে। মালতীর পরনে ডুরে শাড়ি-পাতলা। শাড়ি দেখে সেই স্বপ্নটার কথা মনে করতে পারছিল—সেই স্বপ্ন, স্বপ্নে সে মধুমালা সেজে বসেছিল। মালতী ডুরে শাড়ি পরে মধুমালা সেজে বসেছিল। মদনকুমার আসবে, সেই মদনকুমার, যার সখের সীমা ছিল না, যে হাটে বাজারে গেলেই ডুরে শাড়ি কিনতে ভালোবাসতো মালতীর জন্য। স্বপ্নে সেই মানুষ কতদিন পর রাতে ওর কাছে এসেছিল। পাশে বসেছিল। দাঙ্গার কথা বলার সময় মুখ বড় করুণ। তারপর সব ভুলে মানুষটা গল্প করতে করতে ওর মুখ চিবুক টেনে শেষে মালতীকে কোলে নিয়ে ধপাস করে মোটা গদিয়ালা বিছানাতে ফেলে দিয়েছিল। আর কী? আর কী করেছিল স্বপ্নে? স্বপ্নে স্বামীর সঙ্গে সহবাস। সে সহবাসের পর সোজা পুকুরঘাটে স্নান করতে চলে এসেছে। মালতী শরীরের উত্তাপ জলে ভাসিয়ে পাড়ে উঠতেই শুনতে পেল, দক্ষিণের ঘরে এখন কে যেন দুলে দুলে পড়ছে, পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। শীতের সকাল। মাঘমণ্ডলের ব্রতকথা শেষ করে পালেদের দুই মেয়ে পুকুর পাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছিল। ওরা কবিতার মতো আবৃত্তি করছিল, ওঠ ওঠ সুয্যিঠাকুর ঝিকিমিকি দিয়া, না উঠতে পারি আমি ইয়লের লাগিয়া।

    সোনা পড়ছিল, পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির।

    লালটু পড়ছিল, অ্যাট লাস্ট দি সেফিস জায়েণ্ট কেম্।

    পলটু পড়ছিল, এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যার…

    দক্ষিণের ঘরে তখন পড়ার প্রতিযোগিতা চলছে। ওরা তিনজনই চেঁচিয়ে পড়ছে। বাড়িতে দূরদেশ থেকে দীর্ঘদিন পর বুঝি সেই যুবক ফিরে এসেছে। বোধ হয় এখন উচ্চ স্বরে পড়ে এই বালকেরা কত বেশি পড়ছে এবং কত কঠিন পড়া পড়তে হয়, চেঁচিয়ে মানুষটাকে জানাচ্ছে। মালতী গতকাল সন্ধ্যায় খবর পেয়েছে। কিন্তু সংকোচের জন্য আসতে পারেনি। মানুষটাকে দেখার বড় ইচ্ছা। প্রায় সারা রাত সে যেন মানুষটার জন্য জেগেছিল।

    লালটু একই লাইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ছে। অ্যাট লাস্ট দি সেফিস্ জায়েন্ট কেম্। সেফিস্ জায়েন্ট। মনে মনে উচ্চারণ করল কথাটা। ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই কবেকার কথা। তখন বিলের জলে কুমীর ভেসে আসেনি, তখন মালতী ফ্রক পরত। একদিন সেই কৈশোরে সেফিস জায়েন্ট লুকোচুরি খেলতে গিয়ে মালতীকে সাপ্টে ধরেছিল। চুমু খেয়েছিল। মালতী রাগে দুঃখে ঠিক রাগে দুঃখে বলা চলে না, কেমন যেন রঞ্জিত ওকে না বলে না কয়ে চুমু খেয়ে—কী একটা ফাজিল কাজ করে ফেলেছে। বলতে হয় কিছু, না বললে, কুমারীর সম্মান থাকে না। বড়বৌকে বলে দেবে এমন ভয় দেখিয়েছিল রঞ্জিতকে। পরদিন ভোরে বাপ-মা মরা সেলফিস্ জায়েন্ট কিছু না বলে কয়ে ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

    ঠাকুরবাড়ির বড়বৌর পিতৃমাতৃহীন ছোট ভাই-এর খোঁজ-খবর কেউ আর দিতে পারেনি। তারপর কত জল সোনালী বালির নদীতে ভেসে গেল, কত শীত, কত বসন্ত চলে গেল। বিলের জলে যেবার কুমীর ধরা পড়ল—মালতীর সেবারেই বিয়ে। মালতী একদিন চুপি চুপি বলেছিল, বড়বৌদি, রঞ্জিত আপনেরে চিঠি দ্যায় না?

    —দ্যায়।

    —কি ল্যাখে।

    —কিছু লেখে না। শুধু লেখে ভালো আছি।

    —ঠিকানা দেয় না।

    —ঠিকানা দিতে নেই

    —ক্যান?

    —দেশের কাজ করে। ঠিকানা দিতে নেই।

    শীতের সূর্য উঠতে চায় না। রোদ দিতে চায় না। গাছপালার ছায়ায় বাড়িগুলি ঢেকে থাকে। বুড়ো মানুষেরা রোদের জন্য প্রায় হাহাকার করছিল। ভোরের দিকে তখন খুব অন্ধকার নয়, আবার আলোও নয়—মালতী চুপি চুপি ঘাটে আসার সময় দেখেছিল, অমূল্য তাঁতঘরের পাশে বসে আগুন পোহাচ্ছে। খড়কুটো এনে—শীতের দিন বলে শুকনো পাতা সংগ্রহ করে রেখেছিল অমূল্য। অমূল্য বসে সেই খড়কুটোর ভিতর আগুন জ্বেলে শীত থেকে রক্ষা পেতে চেয়েছিল। আর শোভা, আবু, নরেন দাসের বৌ আগুনের পাশে গোল হয়ে বসেছিল।

    মালতী দরজা খুলে বের হবার মুখেই দেখল অমূল্য ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মালতী সোজা উঠানে নেমে এল না। চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আগুনের ভিতর থেকে অমূল্যর মুখ ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। স্বপ্নে দেখা মৃত মানুষটার মুখ, চোখে আর ভাসছে না। শুধু অমূল্যর মুখ চোখে ভাসছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল এক অশুচি ভাব শরীরের সর্বত্র। শীতে কোথায় অমূল্যের পাশে বসে আগুন পোহাবে, কোথায় শীতের ভিতর উত্তাপ খুঁজবে-তা না করে মালতী ছুটে গেছে পুকুরে। স্বামীর মৃত মুখ মনে করে জলে অধিক সময় ডুব দিয়ে থেকেছে। অমূল্যর মুখ ভুলে থাকার জন্য, পাপ চিন্তা ভুলে থাকার জন্য মালতী শীতের জলে, ঠাণ্ডা হিমের মতো জলে বোধহয় ডুব দিয়েছিল।

    সুতরাং স্থলপদ্ম গাছটির পাশে দাঁড়িয়ে মালতী মনে করতে পারল না, সে কোন নির্দিষ্ট কারণে এসে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মালতী এখন ঠাকুরঘরে প্রণাম করছে এবং বিড়বিড় করে বকছে। নিজেকে গালাগালি দিচ্ছে। সে ঠাকুরঘরের দরজায় মাথা ঠুকছিল। যেন ভগবানের ইচ্ছা—বিধবা মানুষের যৌবন থাকতে নেই, সুখ থাকতে নেই, ভালোবাসা থাকতে নেই। যৌবন থাকলে পাপ, ভালোবাসা থাকলে পাপ এবং সুখ চাইলে পাপ। মালতী মাথা ঠুকে ঠুকে বলতে চাইল যেন, ভগবান, তুমি আমার পোড়া যৌবন হরণ করে নাও। আমার পোড়া কপাল। ভালোবাসার কপাল থাকলে আমার মানুষ ঘরে থাকত। রায়টে কাটা পড়ত না। স্বপ্নটার কথা কেবল মনে আসছিল মালতীর। কতদিন পর যেন যথার্থই তার কাছে জল চাইতে এসেছিল। কিন্তু সে যতবার জল নিয়ে ওর হাতে দিয়েছে ততবার মানুষটার মুখ বদলে গেছে। মুখটা যেন অমূল্যের। তাঁতঘরে অমূল্য যেমন হেসে হেসে কথা বলে, যেমন খুব সহজে নেকা নেকা কথা বলে—যেন কিছু জানে না অমূল্য, কিছু বোঝে না, দিদি, অ মালতী দিদি, আমার ঘরে জল পাঠাইয়া দ্যান। দিদি, আপনের জন্য বেথুন পাইড়া আনছি, দিদি, জলের তলে শালুক হয়, শালুকের ফল হয়—আপনের জন্য আমি কী না করছি। স্বপ্নে নিজের মানুষটাকে জল দিতে গিয়ে মালতী কেবল সেই অমূল্যকে বিছানার ওপর বসে থাকতে দেখল।

    মালতী ঘরে ফিরে কাপড় ছাড়ল, সাদা থান পরল একটা। তাঁতের চাদর গায়ে দিল। ঘরের পাশে পেয়ারা গাছের নিচে মালতী আগুন জ্বালল। আজ ইচ্ছা করেই মালতী অমূল্যর পাশে গিয়ে আগুন পোহাতে বসল না। যেন ওর পাশে আগুন পোহাতে বসলেই শরীরের গ্লানিটা আবার ভেসে উঠবে। সে আবুকে ডেকে আনল, শোভাকে কিছু শুকনো কাঁঠালের ডাল এনে দিতে বলল—শীতের জন্য হাত পা বড় বেশি সাদা দেখাচ্ছে। শীতের ভিতর আদর করে ঠাণ্ডা হাত আবুর গালে ঘষে দিল। হাত গরম করতে চাইলে শোভার গালে হাত রাখে। মেয়েগুলি এই শীতেও কেমন গালগলা গরম করে রেখেছে।

    শীতের রোদ লম্বা হয়ে নামছে। বাড়ির নিচে সব জমি, বড় বড় তামাক গাছ সামনের মাঠে। পেছনে সব পেঁয়াজের জমি–পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বাঁধাকপি। এবং নরেন দাস জমির জন্য, তাঁতের জন্য সারা মাস খেটে খেটে এই সংসারকে সোজা করে রাখছে! নরেন দাস তার এই সংসারকে বড় বেশি ভালোবেসে সারাক্ষণ মাঠে অথবা তাঁতঘরে কোন-না-কোন কাজের ভিতর ডুবে থাকে। নরেন দাস, পুবের বাড়ির নরেন দাস জমিতে এখন পেঁয়াজের গুঁড়িতে মাটি তুলে দিচ্ছে। মালতী দেখল, এই আগুনের ভিতর থেকে দেখল, নরেন দাস জমির মাটি সোনার মতো হাতে নিয়ে অপলক চেয়ে থাকছে। নরেন দাস মাটির ভিতর কি রস আছে, ফসলের মাটি কি রস দিয়ে গড়া, এই যে সোনার ফসল ঘরে ওঠে কিসের এত পুণ্য এই সংসারে—বোধ হয় নরেন দাস মাটির ভিতর তার রহস্য খুঁজছিল। মাটির সঙ্গে বিড়বিড় করে নরেন দাস তখন কথা বলতে আরম্ভ করে দিয়েছে অথবা গাছগুলির সঙ্গে হতে পারে, কারণ ওর চারদিকে তামাক গাছ, চীনাবাদামের গাছ। কত যত্ন করে জল টেনে নরেন দাস মাটির ভিতর এইসব শস্যকণা পুঁতে দিয়েছিল। এইসব শস্যের জন্য নরেন দাসের বড় ভালোবাসা। প্রতিদিন ভোর হলে নরেন দাস সে তার নিজের জমির ভিতর নেমে আসবে, কিছু না কিছু মাটি গাছের গুঁড়িতে দিতে দিতে গাছের সঙ্গে কথা বলবে, খেতে ভুলে যাবে। জীবনের অন্য সুখ-দুঃখের কথা ভুলে যাবে।

    মালতী বড় একটা ঘটি নিল জলের, কিছু মুড়ি, তেল দিয়ে মেখে বড় বড় দুটো পেঁয়াজের টুকরো নিল হাতে, নুন এবং কাঁচা লঙ্কা নিয়ে জমির পাশে নেমে গেল নরেন দাসকে খেতে দিতে। আর আসার সময় দেখল, গ্রামের সব মানুষই এই শীতের সকালে জমি এবং ফসলের ঘ্রাণে মাঠে নেমে যাচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির ছোট ঠাকুর নেমে গেল মাঠে, পিছনে ঈশম—ওরা নিশ্চয়ই সোনালী বালির চরে নেমে যাচ্ছে। ঈশম নিশ্চয়ই জমি থেকে জল নেমে যাচ্ছে না বলে চিন্তিত। নিশ্চয়ই ছোট ঠাকুরকে বিশ্বস্ত মানুষ ঈশম জমিতে নিয়ে গিয়ে এই জল নিয়ে কী করা যায়, কীভাবে জল নামিয়ে দেওয়া যায়, চরের বুক থেকে, সেইসব সলাপরামর্শ করবে। তখন গোপাট ধরে বাজারে যাচ্ছিল মনজুর, জব্বর এবং অন্য অনেকে। নয়াপাড়ার বিশ্বাসেরা, হাসিমের বাপ জয়নাল, আবেদালি কেউ যেন বাকি নেই। সকলে ষাঁড় গরু নিয়ে মাঠের রোদে নেমে আসছে। ফেলু শেখ হাজিসাহেবের খোদাই ষাঁড়টাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মাঠে। এদের এখন শুধু ফসলের জন্য চাষাবাদ আর এই চাষাবাদই মানুষগুলির সব—আশা আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন অথবা ভালোবাসা। আর কী চায় মানুষগুলি? মানুষগুলি তারপর ধর্ম করতে চায়। হিন্দু পাড়াতে তখন যাত্রা নাটক হবে, রাবণ বধের পালাগান, রামায়ণ গান, রাম সেজে আসবে লোকনাথ পাল। মাঝিবাড়ির বড় সামিয়ানার নিচে ঢোলক বাজবে—গ্রামের বুড়োবুড়িরা তখন কেউ ঘরে থাকবে না। এই শীত এলে কবিগান হয় চন্দদের বাড়ি, বড় বড় ডে-লাইট জ্বলবে, মনে হবে তখন গ্রামটা মেলার মতো। পরাপরদির হাট থেকে দোকানপাট তুলে শ্রীশচন্দ্র চলে আসবে। শীত এলেই কতরকমের মেলা বসবে, দূরে দূরে কত মানুষ চলে যাবে, ঘোড়দৌড় হবে, বাজি জেতার জন্য বিশ্বাস পাড়াতে রোজ ঘোড়দৌড়ের মহড়া হচ্ছে।

    সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, অমূল্যও তাঁতঘরে মহড়া দিচ্ছে। অথচ এই অমূল্য আগে কত হাবাগোবা ছিল। এই অমূল্য সারাক্ষণ তাঁত বুনে ঘরের বার হলে চোখ তুলে তাকাত না পর্যন্ত। অমূল্য মালতীর বান্দা লোক ছিল। সেই অমূল্য কী করে গত বর্ষায়—ওরা সেই যে অষ্টমীর স্নানে এক সঙ্গে এক নৌকায়, বড় নৌকা, প্রায় তেমাল্লা হবে, পাড়ার বড় পিসি, ধনবৌ, মাঝিবাড়ির কালপাহাড়ের মা, নরেন দাস – প্রায় গ্রামের গোটা লটবহর এক নৌকায় শুয়ে বসে একদিনের পথ নাঙ্গলবন্ধ, নাঙ্গলবন্ধের বান্নিতে মালতী সকলের সঙ্গে স্নান করতে গিয়েছিল। অষ্টমীর স্নানে কত মানুষ, নদীর দু-পাড়ে কত দেব-দেবীর মূর্তি। মাটি দিয়ে গড়া ভৈরব ঠাকুরের বড় নীল রঙের পেটের দিকে তাকিয়ে অমূল্য রসিকতা করেছিল। বড় নদী, দু’পাড়া প্রায় দেখা যায় না নদীর। কত নৌকা এসেছে। কত মানুষ এসেছে স্টিমারে, আর পাপ ঢেলে পুণ্য নিতে দু’পাড়ে তিল ধারণের স্থান ছিল না। মালতীও সকলের সঙ্গে নদীর জলে স্নান করতে নেমেছিল। পাড়ে অমূল্য। পকেটে তামার পয়সা। মালতীর হয়ে ঠাকুরের দক্ষিণা, তিলতুলসী সব সংগ্রহ করে দিচ্ছিল। গোটা মেলাতে সে-ই সারাক্ষণ মালতীকে দেখাশুনা করেছে। সে মালতীকে নিয়ে ঘুরেছে—একটা লক্ষ্মীর পট কিনে দিয়েছিল অমূল্য, মালতীর জন্য পয়সা খরচ করতে পেরে অমূল্য গুনগুন করে এক সময় গান ধরেছিল। পয়সা খরচ করার হকদার হতেই মালতী অমূল্যের জিম্মায় কী করে যেন চলে গেল। অমূল্য মালতীকে এক সময় বলেছিল, দিদি আসেন, সাঁতার দিয়া নদী পার হই।

    —নদী পার হইতে তোমার বুঝি ইচ্ছা যায় অমূল্য!

    —বড় ইচ্ছা যায়।

    —নদীর জলে এক কুম্ভীর ভাইস্যা যায়, তোমার গানটা মনে পড়ে অমূল্য?

    অমূল্য বলেছিল, পড়ে।

    মালতী ভিড়ের ভিতরে অমূল্যর দিকে অপলক তাকিয়ে বলেছিল, বড় ডর ঐ কুম্ভীরকে।

    —কোন ডর নাই মালতী দিদি। এবং ডর নাই বলেই হয়তো অমূল্য সারাটা দিন মালতীকে নিয়ে ঘুরতে পেরেছিল। অষ্টমীর স্নানে মালতীকে আর কেউ এত আদর করে সোহাগ করে মেলা দেখায়নি। শোভা, আবু সঙ্গে ছিল না। নরেন দাস তাঁতের কাপড়ের দোকান খুলে বসেছিল আর সেই থেকে অমূল্য হাবাগোবা থাকল না। বান্দা লোক অমূল্যর খাই খাই সহসা বড় বেশি বেড়ে গেল।

    সূর্য এবার গোপাটের ওপাশে উঠে এল। এখন হাতে পায়ে শীতটা জমে নেই। মালতী দেখল হাঁসগুলি গর্তের ভিতর প্যাক প্যাক করছে। মালতী গর্তের মুখ থেকে টিনটা তুলে দিল। হাঁসগুলি গলা বের করে দিল প্রথম। বড় পুরুষ হাঁসটা সকলকে ঠেলে প্রথম বের হয়ে এল। অমূল্য বারদীর হাট থেকে পুরুষ হাঁসটা কিনে দিয়েছে মালতীকে। গত বর্ষায় কোথায় যে তার প্রিয় পুরুষ হাঁসটা হারিয়ে গেল, রাতের অন্ধকারে বিলের মাঠে সে এবং অমূল্য পুরুষ হাঁসটাকে ঝোপে জঙ্গলে খুঁজে খুঁজে পেল না। অন্ধকার রাতে হাঁসটার অন্বেষণে নৌকায় মালতী এবং অমূল্য ধানখেতের ভিতর ঘোরাঘুরি করছিল। সামু নৌকায় গ্রামে ফেরার সময় ওদের দেখে অমূল্যকে বলেছিল, অমূল্য বাড়ি যাও। মালতীকে বলেছিল, আনধাইর রাইতে মাঠে ঘাটে একা ঘুরতে নাই মালতী। বাড়ি যা। হাঁসটা আমি দ্যাখতাছি কই গ্যাল। সামু শেষ পর্যন্ত হাঁসটার খোঁজ দিতে পারেনি, হাঁসটা নিখোঁজ হবার পর থেকেই মালতী বড় ম্রিয়মাণ ছিল। অমূল্যর পুরুষ হাঁসটা নীল, কালো এবং খয়েরী রঙের। কী করে, কত কষ্ট করে এবং সারা হাট ঘুরে মাত্র এই একটা তাজা হাঁস মালতীর জন্য অমূল্য সংগ্রহ করতে পেরেছে, প্রায়ই কথায় কথায় এই হাঁসের জন্য অমূল্যর কী কষ্ট গেছে, অমূল্য কত লোককে একটা ভালো পুরুষ হাঁস মালতী দিদির জন্য বলে রেখেছিল—সময়ে অসময়ে কথাটা শোনাবার চেষ্টা করত। আর এই হাঁস কিনে দেবার পর থেকে অমূল্যর আবদারটা আরও বেড়ে গেল। অমূল্য, তুমি তাঁত বুনে খাও, বিধবার ধম্ম কী বুঝবে! যেন মালতীর বলার ইচ্ছা, বিধবার সম্মান বৈধব্যে, বিধবার শাক অন্নে। তুমি অমূল্য, তাঁতের খটখট শব্দ শুনে দু’কান ভোঁতা করে রেখেছ, নাকে তোমার গন্ধ থাকে না, চোখে তোমার স্বপ্ন ঝোলে—আমি বিধবা মালতী সারাদিন এই সংসার করে, ঘরদোর পরিষ্কার রেখে তোমার তাঁতের নলী ভরে শাক অন্নে আমার ভুরিভোজন। ঢেকুরে আঁশের গন্ধ থাকলে আমার সম্মান বাঁচে না। পুরুষ হাঁসটার মতো বনেবাদাড়ে, জলের ঘাটে অথবা রাতের আঁধারে ঘাড় কামড়ে সুখ পেতে চাও, তাতে আমার সম্মান বাঁচে না। তুমি আমায় ভালোবাসা দাও, শুধু আঁশের আশায় ঘুরলে আমিও একদিন গলা কামড়ে দেব। শুধু আঁশে আমার ভালোবাসা কথা কয় না।

    স্বপ্নটা দেখার পর থেকেই কেন জানি অমূল্যর প্রতি নৃশংস ভাবটা আরও বেড়ে গেল। অমূল্য আর জব্বর বড় বেশি ঘুরঘুর করছে। মালতী ভাবল, দাদাকে একদিন সে সব বলে দেবে। কারণ জব্বরও কম যায় না। জব্বরের কথা মনে আসতেই মালতীর মুখটা ঘৃণায় কুঁচকে গেল।

    মালতী এখন হাঁস নিয়ে ঘাটে যাচ্ছে। মনে মনে অমূল্য ওর ভিতরে তাঁত বুনছে। একবার এদিক, একবার ওদিক। পুরুষ হাঁসটা অন্য হাঁসগুলিকে জলে নামতে দিচ্ছে না। তার আগেই ঠোঁট কামড়ে ঝগড়া করতে চাইছে। মালতী পুরুষ হাঁসটার কাণ্ড দেখে অন্যদিনের মতো আজও মুখে আঁচল চাপা দিল। ওর ভিতর থেকে এখন আবার সেই দুষ্ট হাসিটা মুখে খেলে গেল। তর সয় না। মালতী হাঁসগুলিকে জলের দিকে নিয়ে যাবার সময় কথাটা বলল। আর এইসব দেখলেই মনটা তাঁতের মাকুর মতো কেবল এদিক ওদিক করতে থাকে। এই একটা ইচ্ছার ভাব থাকে ভিতরে, সাপ্টে ওকে কেউ খেয়ে ফেলুক। কিন্তু ফের কেন জানি মনে হয়, বিধবা মানুষের এই ইচ্ছা ভালো নয়। তখন শুধু স্নানের ইচ্ছা, ডুবে ডুবে শরীর থেকে সব পাপ চিন্তা মুছে দেবার ইচ্ছা। যেন স্নান না করলে জাত যাবে। তারপর আবার মনে হয় বিধবার আবার জাত, বিধবার আবার ছোট বড়—সবল যুবতী মালতী যার অঙ্গে লাবণ্য ঝরে পড়ে—যার মুখ পেঁয়াজের কোমল খোসার মতো নরম আর যার ইচ্ছার ঘরে অমূল্য শুধু একটা বাঁদর—সারাক্ষণ লেজ তুলে বসে আছে, সেই অমূল্যকে স্বপ্নে দেখে মুখ বড় বিস্বাদ লাগছিল।

    হাঁসগুলি জলে নেমে গেলে মালতী একবার চারদিকে তাকাল। হাঁসগুলি ডুবে ডুবে স্নান করছে। কেউ নেই কাছে। তামাক খেত পার হলে উঁচু জমি, জব্বর সেখানে হালচাষ করছে। নরেন দাস জমির নিচ থেকে রস তুলে পেঁয়াজ রসুন অথবা চীনাবাদামের শরীর পুষ্ট করার চেষ্টায় আছে। আর যেন কোথাও কোনও দৃশ্য ঝুলে নেই। শুধু ঠাকুরবাড়ির সোনা পড়ছে—পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। লালটু পড়ছে, অ্যাট লাস্ট দি সেফিস্ জায়েন্ট কেম। জব্বর হাল চাষ করছে। মালতীকে দেখতে পেলে জব্বর গাই গরু ফেলে এক্ষুনি ছুটে আসবে—মালতী দিদি, বদনাতে পানি দ্যান। গলাটা শুকাইয়া গ্যাছে মালতী ভাবল, জব্বর এলে সামসুদ্দিনের খবর নেবে। সামু এখন এখানে নেই। ঢাকা গেছে। পাগল ঠাকুর হাতি দিয়ে ওদের জলসা ভেঙে দিয়েছিলেন। ফেলু শেখের হাত ভেঙে দিয়েছেন। তারপর থেকে সামু বুঝি হিন্দুপাড়া আসা ছেড়ে দিয়েছে। ছোট ঠাকুর শচীন্দ্রনাথ একদিন গোপাটে দাঁড়িয়ে সামুর সঙ্গে কি সব কথা বলতে বলতে বচসা করেছিলেন। সেই থেকে সামু আর আসে না। সামুর মেয়েটা মাঝে মাঝে গোপাটে এসে ওদের ছাগল গরুগুলি নিয়ে যায়। বড় নথ নাকে দিয়েছে মেয়েটা। ঠাকুরবাড়ির অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়েছিল। কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। মালতী চুপি চুপি হেঁটে গিয়ে বলেছিল, কিরে ফতিমা, তুই!

    ফতিমার ছোট চোখ। বড় নথ নাকে। শিশু বয়সের মুখচোখ শুধু লাবণ্যে ভরা। বিনুনী বাঁধা চুল। ফতিমা কিছুক্ষণ মালতীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, পিসি, সোনাবাবুরে দিয়েন। বলে, সে কোঁচড় থেকে দুটো লটকনের থোকা মালতীর হাতে দিয়েছিল।

    অসময়ে লটকন ফল! সুতরাং মালতী বিস্মিত

    ফতিমা নিজেই বলল, আবেদালি চাচা উজান থাইকা আনছে

    মালতীর কেন জানি দু’হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু মুসলমানের মেয়ে ছুঁয়ে দিলেই জাত যাবে। সে লটকনের ফল খুব আলগা করে হাতে নিল। সে ফতিমাকে ছুঁল না। শুধু হাসতে হাসতে বলল, সোনাবাবুর লাইগা বড় কষ্টরে তোর। বড় হইলে বাবুর লগে বিয়া দিয়া দিমু।

    ছোট মেয়ে। অথচ সামান্য রসিকতা ফতিমাকে কেমন লজ্জিত করেছিল। ফতিমা আর দাঁড়ায় নি। সে গোপাট ধরে ছুটছিল। লজ্জায় হোক অথবা অন্য এক কারণ যেন, মেয়েটাকে গোপাট ধরে ছুটে যেতে সাহায্য করছে। অথবা এত যে গাছগাছালি যার ছায়া সারা গ্রামে এবং মাঠে জড়িয়ে আছে তার ভিতর নিরন্তর এক সুষমা আছে যেন। এই সুষমা, ভালোবাসার সুষমা মেয়েটার সারা অঙ্গে লেপ্টে আছে। হেমন্তের শেষ বিকেল ছিল সেটা। মেয়েটা ক্ৰমে এক সুষমার ভিতর হারিয়ে গেল।

    সেই সুষমা মালতীকে দীর্ঘদিন অভিভূত করে রেখেছে। সোনা পড়ছে তখনও—পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। হাঁসগুলি জলে ডুবছিল ভাসছিল। পাড়ে দাঁড়িয়ে মালতী। জলে ওর লম্বা ছায়া, মালতী জলে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে। এই পাড়ে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে হয়, সামুর কথা মনে হয়। রসো এবং বুড়ির কথা মনে হয় আর সেই মানুষের কথা মনে হয়। সে মানুষ কৈশোরে ওকে সাপ্টে চুমু খেয়েছিল তারপর ভয়ে নিরুদ্দিষ্ট। সেই মানুষ গত রাতে এসেছে। এখন আর তেমন ছোট নেই। কথায় কথায় ঝগড়া করবে না। এখন মানুষটা বড় এবং মহৎ। মানুষটা দেশের কাজ করে বেড়াচ্ছে। জেলে ছিল কিছুদিন। সবই এখন কেন জানি গল্পকথার মতো মনে হয়। মালতী জলে আর হাঁস দেখতে পাচ্ছিল না, শুধু মানুষটার শরীর মুখ জলের ওপর ভেসে যেতে দেখছে। এই মানুষটাকে দেখার জন্য কেমন পাগলের মতো ঠাকুরবাড়ির ঘাটে সারাটা সকাল ডুবে ডুবে স্নান করল। বড়বৌর জন্য পূজার ফুল তুলে দিল। এমন কি ঠাকুরঘরের পাশে মানুষটাকে দেখতে পাবে ভেবে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কোথায়! ফের সেই অমূল্যর মুখ, অমূল্য এবং জব্বর উভয়ে মিলে কেবল যেন ওকে গিলতে আসছে। সে মানুষটার জন্য ঠাকুরঘরের দরজায় অধিক সময় অপেক্ষা করতে পারল না—কেউ দেখে ফেলে এই ভয়ে। এমন কি বড়বৌকে বলতে পারল না, বৌদি, রঞ্জিত নাকি কাইল রাতে আইছে? কারণ, ভালোবাসার সুষমা মালতীর চোখে। মালতী রঞ্জিতকে দেখার জন্য ঘাটের পাড়ে যেসব ঝোপজঙ্গল ছিল সেখানে নিজেকে অদৃশ্য করার ইচ্ছাতে বসে পড়তেই কে যেন বলে উঠল, মালতী, তুমি এখানে একা।

    মালতীর বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে পিছনের দিকে মুখ ফেরাতেই দেখল রঞ্জিত দাঁড়িয়ে আছে। হাত ধরে আছে সোনা। সব লুকোচুরি এবার বুঝি ফাঁস হয়ে গেল। মালতী প্রথম মাটি থেকে কিছুতেই চোখ তুলতে পারল না, পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির—এখন আর কেউ পড়ছে না। সব সহসা বড় চুপ মেরে গেছে। এমন কি কীট-পতঙ্গের আওয়াজ টের পাওয়া যাচ্ছে না। মালতী ভয়ে ভয়ে বলল, হাঁস ছাড়তে আইছি। এই বলে মুখ তুলে তাকাল রঞ্জিতের দিকে। মনে হল এখন কোথাও কিছু চুপ হয়ে নেই। সকল কিছু ডেকে বেড়াচ্ছে, হাঁস-মুরগি,গরু-বাছুর, কাকপক্ষী সকলেই কলরব করছে। ঠিক তখনই মালতী তাঁতঘরে অমূল্যর ঠকঠক তাঁতের শব্দ শুনতে পেল।

    রঞ্জিতকে দেখে মালতীর দীর্ঘদিন পর সব ভয় কেটে গেছে। জব্বর অথবা অমূল্য কেউ বুঝি আর তাকে গিলে খেতে পারবে না।

    কোথাও যেন তখনও একই স্বরে কে পড়ে আছে—অ্যাট লাস্ট দি সেফিস্ জায়েন্ট কেম। মালতী কান পেতে শোনার সময় রঞ্জিতের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। রঞ্জিতও সামান্য না হেসে পারল না।